Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dolan Chapa Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দোলন চাঁপা
নজরুল ইসলাম
আৰ্য পাবলিশিং হাউস
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা
প্রকাশক
শ্ৰীশরচ্চন্দ্র গুহ, বি, এ,
আৰ্য পাবলিশিং হাউস,
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ, আশ্বিন ১৩৩০, দুহাজার
দাম পাঁচ সিকা
৫
প্রিন্টার-শ্ৰবজনীকান্ত রাণা
চেরী প্রেস লিমিটেড,
৯৩১এ, বহুবাজার ঈীট, কলিকাতা
ট দু’টি কথা সে আজ বন্দী। তার সত্য-মুক্ত প্রাণ যে ভৈরব রুদ্র-ছায়ানটের হিল্লোণে নৃ-পাগল ছন্দে এক অভিনব সৃষ্টি-রচনা করে গেল,সে আজ মুক্ত! কোনাে রাজ-শক্তির জকুটি সে মানে না, কোনাে লৌহ-নিগড় কোনােদিন তারে বাঁধতে পারে না—সে আপনার তালে নেচে চলে, আর পায়ের তলায় গুড়িয়ে যায় কত রক্ত-নন, কত শাসবচন, কত শাস্তি-রচন। সে ক্ষে প্রলয়ানলে-ভরা কনটের নৃত্য, ছন্দ যে তার কাল-বৈশাখীর মনের মত এলোমেলো, সুর যে তার সৃষ্টির ব্যথা-গৌরব ভরা। সুর আজ স্বেচ্ছাচার, সুর আজ বর্ণ। সে আজ ব্রী। তবু সে একদিন যুগযুগান্ত সঞ্চিত রুদ্ধাহমানীর বুকে অগ্নিকণা এনে দিয়েছিল, তার রুদ্র বীণে কোন সৰ্বভু দেবা ওর চিমন্দির গড়ে নিল, আর সেই অগ্নি-বীণে তার দিবস-নিশার দহন-আলােয় আপন অন্তরে ৩ার চিলবাসরের চি। চিনা করে নিল,-সবার আড়ালে, সবার গােপনে, সবার উপরে নিজের হাসি-কান্না, ব্যঙ্গবিদ্রুপের বহু বহু দূরে ;-সেখানে বসে সে তার অন্ত:তাফ যে গাথা পেয়ে চলেছে তাতে বন্ধনের কৃষ্ণ রেখা নেই, দুৰ্বল কম্পিত হিয়ার ক্ষীণ রাগিণী নেই-সেখানে সে আর তার অন্তর-দেবতা) নিখিল নরনারী বাইরে দাঁড়িয়ে রুদ্ধ দুয়ার দেখে ফিরে আসে শুধু। সে আজ বন্দী। রাজার দেওয়া লৌহ-নিগড়ে তার অন্তরের বিদ্রোহী-বীর কোন দেবতার আশীষ নিৰ্ম্মাল্য দেখতে পেল, তাই সাদরে বরণ করে নিল তাকে আপনার গলে। তারপর একদিন যখন বাঙলার যুবক আবার জল দমন্দ্রে বাধা-বন্ধহারা হয়ে স্বাধীনচিত্ত ভরে বাঙলার চিরশ্যামল চিরঅমলিন মাতৃমূর্তি উন্মাদ আনন্দে বক্ষে টেনে নেবে, সেই শুভ আরতিলগ্নে ইমগ্নকন্যাণ সুরে যে নবতের রাগিণী বেজে উঠবে, তাতে হে কবি, তোমার প্রেম-বৈভব-গাথা-তােমার অন্তর-বহ্নি-ব্যথা সন্ধ্যা-রা-রক্তে আপনি বেজে উঠবে; জননীর শ্যামবক্ষে তােমার স্মৃতি ব্যথা-ভারাতুর হয়ে সকল পূজার মাঝে বারে বারে তোমাকেই স্মরণ করিয়ে দেবে,-হে কবি, সে আজ নয়। ইতি-পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়।
No text on this page.
alleet som
No text on this page.
আজ সুখের উল্লাসে মাের মুখ হাসে মাের চোখ হাসে মাের টগবগিয়ে খুন হাসে আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে। আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পলে বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার-ভাঙা কল্লোলে। আল হাসি, আল কাদন, মুক্তি এলাে, আল বাঁধন, মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মাের তিক্ত দুখের সুখ আসে ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে- আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে। আসল উদাস, খল হুতাশ, সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস, ফুললাে সাগর দুলাে আকাশ ছুটলাে বাতাস, গগন ফেটে চক্র ছােটে, পিণাক পাণির শূল আসে। ঐ ধূমকেতু আর উল্কাতে চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে, আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। আজ হাসল আগুন, খল ফাগুন, মদন মারে খুন-মাখা তূণ পলাস অশােক শিমুল ঘায়েল ফাগ লাগে ঐ দিক্বাসে দিগবালিকার পীতবাসে ; আজ রঙ্গন এলাে রক্ত প্রাণের অঙ্গনে মাের চারপাশে আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে। ফপট কোপের তুণ ধরি, ঐ আল যত সুন্দরী, কারুর পায়ে বুক-ডলাখুন, কেউ বা আগুন, কেষ্ট মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে। তাদের প্রাণের বুক-ফাটেতাও-মুখ ফোটে-না-বাণীর বীণা মাের পাশে, তাদের কথা শােনাই তাদের আমার চোখে জল আসে আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
भाब
আল উসা, সঙ্কা, দুপুর,
আসল নিকট আল সুদূর,
আল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন
পাগলা-গাজন-উচ্ছাসে !
আল আশিন শিউলি শিথিল
হাল শিশির দুব, ঘাসে
সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
यांक
আজ
জাগল সাগর, হাল মরু,
কাপল ভূধর, কানন-তরু,
বিশ্ব-ডুবান্ আল তুফান, উছলে উজান
ভৈরবীদের গান ভাসে,
মাের ডাইনে শিশু সদ্যোজাত ‘জরায়-মরা বাম পাশে।
মম ছুটছে গাে আজ বল্ল-হারা অশ্ব যেন পাগল সে
আজ
সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
আজ
সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে !!
সূচীপত্র ১০ ১১ ১৩ ০৮০ ২৪ ৮০০ ১৫ ৮০০ ১। মেদুল দুল ২। বেলা শেষে ৩.পউষ ৪। পথহারা ৫। ব্যথার ৬। উপেক্ষিত ৭। সমর্পণ সমপণ ॥ ৮। পূবের চাতক ৯। অবেলার ডাক ১০। চপলসাখী ১১। পূজারিণী ১২। অভিশাপ ১৩। আশান্বিতা ১৪। পিছু ডাক ১৫। মুখরা ১৬। সাধের ভিখারিণী ১৭। কবি-রাণী ১৮। আশা ১৯। শেষ প্রার্থনা : ৫৫। ২৩ ৪• ৮০০ ১৪ ••• ৪৭ ৪৯ ৫ । ৫ । তে 0
No text on this page.
দোদুল দুল
| আরবী মােতাকারিব’ ছন্দ ]
দোদুল দুল
দোদুল দুল !
বেণীর বাঁধ
আলগ-ছাঁদ,
আলগ-ছাদ
খোঁপার ফুল,
কানের দুল।
খোঁপার ফুল
দোদুলু দুল
দোদুল দুল !
অলক-হায়
কপােল ছায়,
পরশ চায়
অলস
দালন-চাঁপা
বিমুবিন্
কেশের উল
দোদুল দুল
দোদুল-দুল !
অসস্থত,
কঁখের ভিত্,
অসত,
পিঠের চুল,
লােহিত পীত
নােলক দুল
দোদুল দুল
দোদুল দুল !
সােহাগ-ঘায়
দোল-গায়
কাপন খায়
আপন পায়,
পায়ের নখ
মাথার চুল
দোদু দু
দোদুল দুল!
পরাগ-ফাগ
• ছড়ায় আজ ,
শিরাজ-বাগ
ইরাণ-গুল;
দোল-দোল
দে বুলবুল
দোদুল দুল
দোদুল দুল।
দোদুল দুল
কাকণ চায়
নাচন্ ফিন্
রিমিক ঝিম
ঝিমিক ঝিম।
আচলবীণ
চাবির রিং
বুলায় নিদ
চুলায় চুল
দোদুল দুল
দোদুল দুল !
নিশাসরেপ
কাপায় বেশ
মােতির হার
হিয়ার দেশ,
কাপায় শেষ
প্রাণের কূল
দোদুল দু
দোদুল দুল !
বুকের কোল
আদর যায়
দোলায় দোল
দোলায় দোল,
শরম-লােল
মরমমূল
দোদুল দুল
দোদুল দুল।
দোলন-পা
কলকাখ
পুকুর যায়,
আঁচল চায়
চুমায় ধূল,
দখি হাত
ঝুলন্ ঝুল
দোদুল দুল
কঁকাল ক্ষীণ
মরাল গ্রীব
ভূলায় জড়-
ভুলায় জীব,
গম-দোল
অতুল তুল
দোদুল দুল
দোদুল দুল !
হাসির ভাস,
ব্যথার স্বাস,
চপল চোখ,
আঁখির লাস,
নয়ননীর
রাতুল তুল
রাতুল তুল
দোদুল দুল
দোদুল দুল!
দোদুল দু-
মৃণাকােত,
নয়ন-পাত,
গালের টোল,
চিবুক দোল
সকল কাজ
করায় ভুল,
প্রিয়ার মাের
কোথায় তুল ?
কোথায় তুল
কোথায় তুল?
স্বরূপ তার
অতুল তুল,
রাতুল তুল,
কোথায় তুল
দোদুল দুঃ
দোদুল দুল !!
দোলন-পা
বেলা
শেষে
ধরণী দিয়াছে তার
গাঢ় বেদনার
রাঙা মাটিরাঙা মান ধূসর আঁচলখানি
দিগন্তের কোলে কোলে টানি।
পাখী উড়ে যায় যেন কোন্ মেঘ-লােক হতে
সন্ধ্যা-দীপ-জ্বালা গৃহ-পানে ঘর-ডাকা পথে।
আকাশের অন্ত-বাতায়নে
অনন্ত দিনের কোন্ বিরহিনী ক’নে
জ্বালাইয়া কনক-প্রদীপখানি
উদয়-পথের পানে যায় তার অশ্রু-চোখ হানি? •
‘আসি’-বলে-চলে যাওয়া বুঝি তার প্রিয়তম আশে;
অস্ত-দেশ হয়ে ওঠে মেঘ-বাষ্প-ভারাতুর তারি দীর্ঘশ্বাসে।
আদিম কালের ঐ বিষাদিনী বালিকার-পথ-চাওয়া চোখে-
পথ-পানে-চাওয়া-ছলে দ্বারে-আন সন্ধ্যা-দীপালােকে
মাতা বসুধার মমতার ছায়া পড়ে।
বেলা শেষে
করুণার কঁাদন ঘনায় নত-আঁখি স্তব্ধ দিগন্তরে।
কাঙালিনী ধরা-মা’র অনাদি কালের কত অনন্ত বেদনা
হেমন্তের এমনি সন্ধ্যায় যুগযুগ ধরি’ বুঝি হারায় চেতনা।
উপুড় হইয়া সেই স্তুপীকৃত বেদনার ভার
মুখ গুজে পড়ে থাকে ; ব্যথা-গন্ধ তার
গুমরিয়া গুমরিয়া কেঁদে কেঁদে যায়
এমনি নীরবে শান্ত এমনি সন্ধ্যায়।••••••
ক্রমে নিশীথিনী আসে ছড়াইয়া ধূলায়-মলিন এলােচুল,
সন্ধ্যা-তারা নিবে যায়, হারা হয় দিবসের কূল।••••••
তারি মাঝে কেন যেন অকারণে হায়
আমার দু’চোখ পূ’রে বেদনার গ্লানিমা ঘনায়।
বুকে বাজে হাহাকার-করতালি,
কে বিরহী কেঁদে যায় “খালি, সব খালি।
“ঐ নভ, এই ধরা, এই সহ্ম্যালােক,
“নিখিলের করুণা যা-কিছু, তাের তরে তাহাদের অশ্রুহীন চোখ।”
মনে পড়ে--তাই শুনে মনে পড়ে মম
কত না মন্দিরে গিয়া পথের সে লাথি-খাওয়া ভিখারীর সম
প্রসাদ মাগি আমি
“দ্বার খােললা, পূজারী দুয়ারে তব অগিত যে স্বামি!”
খুলিলদুয়ার, দেউলের বুকে দেখিনু দেবতা,
পূজা দিমু রক্ত-অশ্রু, দেবতার মুখে নাই কথা।
হায় হায় এ যে সেই অশ্রুহীন চোখ,
কেঁদে ফিরি, “ওগাে একি প্রেমহীন অনাদর-হানা দেব-লােক!
ওরে মূঢ়, দেবতা কোথায় ?
পাষাণ-প্রতিমা এরা, অশ্রু দেখে নিষ্পলক অকরুণ মায়াহীন,
চোখে শুধু চায়।
এরাই দেবতা, যাচি প্রেম ইহাদেরই কাছে,
অগ্নি-গিরি এসে যেন মরুভূর কাছে হায় জলধারা যাচে।
দোলন-পা
আমারি সে চারি পাশে ঘরে ঘরে করে পূজা কত আয়ােজন,
তাই দেখে কাঁদে আর ফিরে ফিরে চায় মাের ভালােবাসা-ক্ষুধাতুর
অপমানে পুনঃ ফিরে আসে,
ভয় হয়, ব্যাকুলতা দেখি মাের কি জানি কখন কে হাসে।
দেবতার হাসি আছে, অশ্রু নাই ;
ওরে মাের যুগযুগ অনাদৃত হিয়া, আয় ফিরে যাই !•••
এই সাঁঝে মনে হয়, শূন্য চেয়ে আরাে এক মহাশূন্য রাজে
দেবতার-পায়ে-ঠেল। এই শূন্য মম হিয়া-মাঝে।
৫
আমার এ ক্লিষ্ট ভালােবাসা,
তাই বুঝি হেন সর্বনাশা।
প্রেয়সীর কণ্ঠে কভু এই ভুজ এই বাহু জড়াবে না আর,
উপেক্ষিত আমার এ ভালােবাসা মালা নয়, খর তরবার।
৮
পউষ পউষ এলাে গাে! পউষ এলাে অশ্রু-পাথার হিম-পারাবার পারায়ে । ঐ যে এলাে গাে- কুঙ্কটিকার ঘােটা-পরা দিগন্তরে দাড়ায়ে। সে এল আর পাতায় পাতায় হায় বিদায়-ব্যথা যায় গাে কেঁদে যায়, অন্ত-বধূ (আহা) মলিন চোখে চায় পথ-চাওয়া দীপ সন্ধ্যা-তারায় হারায়ে । পউষ এলাে গাে- এক বছরের শান্তি পথের, কালের আয়ুক্ষয়, পাকা ধানের বিদায়-ঋতু, নতুন আসার ভয়। পউষ এলাে গাে ! পউষ এলাে শুকনাে নিশাস, কঁদন-ভারাতুর বিদায়-ক্ষণের (আ-হা; ভাঙা গলার সুর- ‘ওঠ পথিক! যবে অনেক দূর কালাে চোখের করুণ চাওয়া ছাড়ায়ে ।
দোলন-পা
পথহারা
বেলা-শেষে উদাস পথিক ভাবে
সে যেন কোন্ অনেক দূরে যাবে-
উদাস পথিক ভাবে।
‘ঘরে এস’ সন্ধ্যা সবায় ডাকে,
‘নয় তােরে নয়’ বলে একা তাকে ;
পথের পথিক পথেই বসে থাকে,
উদাস পথিক ভাবে।
বনের ছায়া গভীর ভালােবেসে
আঁধার মাখায় দিগবধূদের কেশে,
ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে
শৈলমূলে শৈলবালা নাবে—
উদাস পথিক ভাবে।
বাতি আনে রাতি আনার প্রীতি,
বধুর বুকে গােপন সুখের ভীতি,
বিজন ঘরে এখন সে গায় গীতি,
একলা থাকার গানখানি সে গাবে—
উদাস পথিক ভাবে।
হঠাৎ তাহার পথের রেখা হারায়
গহন ধাঁধার আঁধার বাঁধা কারায়,
পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায়
আর কি পূবের পথের দেখা পাবে
উদাস পথিক ভাবে।
sol
ব্যথা-গরব,
তােমার কাছে নাই অজানা কোথায় আমার ব্যথা বাজে।
ওগাে প্রিয় ! তবু এত ছল করা কি তােলায় সাজে?
কেন তােমার অনাদরে বক্ষ আমার ডুকরে ওঠে,
চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে, কলজে ছিড়ে রক্ত ছােটে,
এ অভিমান ব্যথাটি মাের
জানি, জান, হে মনচোর,
তবু কেন এমন কঠোর
বুঝতে পারি না যে !
অনূহেলা না পুলক-লাজে ।
যখন ভাবি আমার আদর কই তােমায় হানে বেদন,
বুকের ভিতর আছড়ে পড়ে অসহায়ের হুতাশ নােদন
যতই 'আমায় সইতে নার
আঁকড়ে ততই ধরি আরাে ;
মরে প্রিয় আরাে মারাে
তােমার আঘাতচিহ্ন রাজে
যেন আমার বুকের মাঝে।
১১।
দোলন-গঁপা
মনে পড়ে সেদিন তুমি ঘুমিয়ে ছিলে অঘাের ঘুমে
এ দীন কাঙাল এসেছিল তােমার পায়ের আঙুল চুমে।
আমার অ-আঘাত লেগে
চমকে তুমি উঠলে জেগে
চরণ আঘাত করলে রেগে
সেই পরশের সান্ত্বনা যে
আজো আমার মৰ্ম্মে রাজে।
এমনি তােমার পদ্মপায়ের আঘাত-সােহাগ দিয়াে দিয়ে।
এই ব্যথিত বুকে আমার, ওগাে নিঠুর প্রাণপ্রিয় !
সেই পদ-চিন বক্ষে রেখে
ভগবানে কইব ডেকে—
‘ছাই ভৃগুপদ, যাও হে দেখে
কি কৌস্তভ এ হিয়ায় রাজে?
মরূবে হরি হিংসা-লাজে ।
বিষ্ণুজয়ী ভালােবাসার গর্বে এ বুক উঠবে দুলে,
সর্বহারার হাহাকার আর কঁদবে না কো চিত্ত-কূলে।
এই যে তােমার অবহেলা
তাই নিয়ে মাের কাটবে বেলা,
হেলাফেলার বসবে মেলা,
একলা আমার বুকের মাঝে
সুখে দুখে সকল কাজে।
১৫
উপেক্ষিত
কান্না-হাসির খেলার মােহে অনেক আমারাল বেলা।
কখন্ তুমি ডাক দেবে মা, কখন্ আমি ভাঙব খেলা।
অজানাকে আনতে জিনে
জগৎটাকে ফেনু চিনে,
• চাই যারে মা তায় দেখি নে
ফিরে এ9 তাই একেলা
পরাজয়ের লজ্জা নিয়ে বক্ষে বিধে অবহেলা।
আজকে বড় শ্রান্ত আমি আশার আশায় মিথ্যা ঘুরে
ওমা এখন বুকে ধর, মরণ আসে ঐ অদূরে!
সৃষ্টিটাকে পায়ের তলে
এসেছি মা হেলায় দলে
হৃদয় শুধু জিতে বলে
খেয়ে এমু পায়ের ঠেলা
আর সহে না মাগাে এখন আমায় নিয়ে হেলাফেলা।
বিশ্বজয়ের গর্ব আমার জয় করেছে ঐ পরাজয়,
ডিআশা নেতিয়ে পড়ে, ওমা এসে দাও বরাভর।
চারদিকে মা প্রবঞ্চনা
ভালােবাসার গিল্টিসােনা,
আজ মঞ্জি কাল ধূলিকণা
জুয়ার হাট এই প্রেমের মেলা।
খুইয়েছি সব সাধের খেলায়, বুক ভেঙেছে হেলার ঢেলা।
এখন তুমি নাও মা কোলে, নয় অকূলে ভাসাই ভেলা।
#
দোলন-গপ
সমর্পণ
প্রিয় ।
এবার আমায় সপে দিলাম তােমার চরণ-তলে।
তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।
তােমার আঁখি কাজল-কালাে
অকারণে লাগল ভালাে
লাগল ভালাে,
পথিক আমার পথ ভুলালাে
সেই নয়নের জলে।
আজকে বনের পথ হারালেম ঘরের পথের ছলে।
তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।
৫
দিগবালিকার আঁখি-পাতা অনেক দূরের কানন-ছায়ে
কাপচে অভিমানে,
এলা-আমার পথ দেখাত ঐ বালিকাই চপল পায়ে
দিক হতে দিক-পানে।
মুঠার মাণিক ঠেলে পায়ে
এলেম তােমার কুটীর ছায়ে
চরণ-ছায়ে,
শ্রান্তি আমার দাও মুছায়ে
দীপঢাকা অঞ্চলে।
আপন মালা পরাও বালা পরাও আমার গলে!
এবার আমায় সপে দিলাম তােমার চরণ-তলে।
পূবের চাতক সকাল সাঁঝে চেয়ে থাকি পূব-গগনের পানে কেন যে তা তার আঁখি আর আমার অখিই জানে। নদীপারের দেশে থাকি এমনি তারও আঁখি-পাখী দিগ-বালিকার পূব-কপােল চাওয়ার পাখা হানে। চাওয়ায় চাওয়ায় চুমােচুমি বােজ মােদের ঐখানে। মােদের চোখের চুমুর মিলন ভােরের তারার পূবে, সেই মিলনের ভরাট পূলক অস্তঘাটে ডুবে। হাৱা সে চোখ নতুন করে ভােরের আলােয় উঠে ভ'রে নিশি-জাগা আঁখির লালা লাগে উষার প্রাণে। দূরের দেখা দুইটি চাওয়ায় করুণ রেখা টানে। উদয়-ঘাটে হাসে যখন পােড়ামুখী শশী শশীর মুখে চেয়ে ভাবি শশী তাে নয় দোষী। তার চোখের ঐ কাজল-রাগই রুচির চঁাদে করলে দাগী কলঙ্কী চাদ কাজল-আঁখির সজল চাওয়ার বানে। দোষী শশীর কলঙ্ক তা’র আঁখির স্মৃতি আনে। ৫ পূবের দেশের চাতক আমি চাই না কো আন্ পানে, তাইত সেও তার চাহনি পূব গগনেই হানে। সে থাকে মাের উদয়-দেশে তাই সে দেশে ভালােবেসে তাকাই না গাে পিছন পানের অস্তমরূদ্যানে, পাছে তাহার বাজে ব্যথা কোমল অভিমানে। যেদিন আমি নেব শেষের খেয়া বেয়ে জানি নাতার আঁখি সেদিন থাকবে কোথায় চেয়ে। তাইত এমন মিটিয়ে ক্ষুধা চোখ ভরে পিই চোখের সুধা, দূরের বেদন ভুলায় মাের ঐ চাউনি-তরঙগানে। এবার এ চোখ হারিয়ে গেলাম পূবের পরীস্থানে। • • ৯০
দো-গাপা
অবেলার ডাক
অনেক করে বাসতে ভালাে পারি নি মা তখন যারে,
আজ অবেলায় তারই মনে পড়ছে কেন বারেবারে ॥
আজ মনে হয় রােজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে,
চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হাত আঘাত ভােরের ঘুমে।
ভাবতু তখন এ কোন্ বালাই !
কত এ প্রাণ পালাই পালাই।
আজ সে কথা মনে হয়ে ভাসি অঝাের নয়ন-ঝরে।
অভাগিনীর সে গরব আজ ধুলায় লুটায় ব্যথার ভারে।
তরুণ তাহার ভরাট বুকের উপচে-পড়া আদর সােহাগ
হেলায় দু’পায় দলেছি মা, আজ কেন হয় তায় অনুরাগ ?
এই চরণ সে বক্ষে চেপে
চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে
জল ঝয়েছে, 'তখনাে মা কই নি কথা অহঙ্কারে,
এমনি দারুণ হতাদরে করেছি মা বিদায় তারে।
দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা,
ঘর হতে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি ঝাটা ।
ভেবেছিল আমার কাছে
তার দরদের শান্তি আছে।
আমিও গাে মা ফিরিয়ে দিলাম চিনতে নেরে দেবতারে।
ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।
পথ ভুলে সে এসেছিল সে মাের সাধের রাজ-ভিখারী,
মাগাে আমি ভিখারিণী, আমি কি ভঁয় চিনতে পারি ?
তাই মাগাে তার পূজার ডালা
নিই নি, নিই নি মণির মালা,
দেবতা-আমার নিজে আমায় পূজল সােড়শ-উপচারে।
পূজারীকে চিনলাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।
অবেলায় তা
আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগাে আমি তা কি জানি ?
ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী ।
ওরে আমার ভালােবাসা !
কোথায় বেঁধেছিলি বাসা
যখন আমার রাজা এসে দাড়িয়েছিল এই দুয়ারে ?
নিঃশ্নসিয়া উঠছে ধরা, নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!
সে যে পথের চিরপথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া ?
দূর হতে মা দুরান্তরে ডাকে তাকে পথের ছায়া।
মাঠের পারে বনের মাঝে
চপল তাহার নূপুর বাজে,
ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে,
ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে।
মাগাে আমার শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধরে রাখার ?
তার তরে নয় ভালােবাসা, সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার।
তাই মা আমার বুকের কবাট
খুলতে নারল তার করাঘাত,
এ মন তখন কেমন যেন বাত ভালাে আর কাহারে,
আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে ।
সােহাগে সে ধরতে যেত নিবিড় করে বক্ষে চেপে,
হতভাগী পালিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠত কেঁপে।
রাঙ্গ ভিখারীর আঁখির কালাে
দূরে থেকেই লাগত ভালাে,
আলে কাছে ক্ষুধিত তার দীখল চাওয়ার অশ্র-ভারে
ব্যথায় কেমন মুসড়ে যেতাম, সুর হারাতাম গনের তারে ।
আজ-কেন মা তারই মতন আমার এই বুকের ক্ষুধা
চায় শুধু সেই হেলায় হারা অদর-সোহাগ-পরশ-সুধা
১৭.
দোলন-পা
আজ মনে হয় তার সে বুকে
এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে
গভীর দুখের কঁাদন কেঁদে শেষ করে দিই এই আমারে।
যায় না কি মা আমার কাঁদন তাহার দেশের কানন-পারে
আজ বুঝেছি এ জনমের আমার নিখিল শান্তি আরাম
চুরি করে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণায়াম।
হে বসন্তের রাজা আমার।
নাও এসে মাের হার-মানা-হার!
আজ যে আমার বুক ফেটে যায় অওঁনাদের হাহাকারে,
দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন করে কাঁদতে পারে ।
তােমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে,
দাবানলের দারুণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে।
জাগলপুকে ভীষণ জোয়ার,
ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার,
মুকের বুকে দেবতা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে।
বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে—মাগো মানা করছ কারে?
• স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চলে যাওয়ার সাথে,
এখন আমার একার বাসর দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে।
ঘুম ভাঙাতে আসবে না সে
ভাের না হতেই শিয়র পাশে,
আসবে না আর গভীর রাতে চুমু চুরির অভিসারে,
কাঁদবে ফিরে তাহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পায়ে।
আজ পেলে ভঁয় হুমুড়ি খেয়ে পড়তুম মাগাে যুগল পদে
বুকে ধরে পদ্-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে।
বসতে দিতাম আধেক আঁচল,
সজল চোখে চোখ-ভরা জল
১৮
মবেলা ভাল
ভেজা কাজল মুছাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে,
আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে।
দেখতে মাগাে তখন তােমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশ
মুখ ধুয়ে তার উদার বুকে বলত, আমি ভালােবাসি!
বতে গিয়ে সুখ-শরমে
লাল হয়ে গাল উঠত ঘেমে,
বুক হতে মুখ আসত নেমে লুটিয়ে কখন্ কোকিনারে,
দেখতুম মাগাে তখন কেমন মান করে সে থাকতে পারে।
এমনি এখন কতই আশা ভালােবাসার তৃষ্ণা জাগে
তঁার ওপর মা অভিমানে, ব্যথায়, গে, অনুরাগে।
চোখের জলের ঋণী করে
সে গেছে কোন্ দ্বীপান্তরে ?
সে বুঝি মা 'সাত সমুদ্র তের নদীর সুদূরপারে ?
ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি না সে দূরু-দেশে যেতে নারে ?
তারে আমি ভালােবাসি সে যদি তা পায় মা খবর,
চৌচির হয়ে পড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর।
চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে
ধরার সাগর-অশ্রু ছেপে,
উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে,
ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘূর্ণী নেচে ঘিবে তারে।
ছিমা ! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন করে ?
তার চেয়ে মা তারই কোনাে শােন-কথা শুনাও মােরে ।
শুনতে শুনতে তােমার কোলে
ঘুমিয়ে পড়ি-ওকে খােলে
দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মত ধাক্কা মারে?
ঝােড়ো হাওয়া ! ঝােড়া হাওয়া! বন্ধু তােমার সাগর-পারে ।
১৯
দোলন-চঁপা
সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে,
যে দেশে নাই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে।
তবু কেন থাকি থাকি
ইচ্ছা করে তারেই ডাকি।
যে কথা মাের রইল কী হয় সে কথা শুনাই কারে ?
মাগাে আমার প্রাণের কাঁদ আছড়ে মরে বুকের দ্বারে !
যাই তবে মা! দেখা হলে আমার কথা বলাে তারে
রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিণী ঠেলতে পারে ?
মাগাে আমি জানি জানি
আসবে আবার অভিমানী
খুজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে,
বলাে তখন, খুজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে।
চপল সাথী
প্রিয়! সালে ফেলে চলাে এবার চপল তােমার চরণ !
তােমার ঐ চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন মরণ।
কোথায় দূরে নূপুর বাজে তােমার পায়ে,
হেথায় রােদন আমার ওঠে উথলায়ে,
তােমার উদাসীন ঐ বিষম চলার ঘায়ে
আজ কাপে আমার সকল শরম ভরম।
এখন
ঐ দ্বিধাহীন চরণ কর মাের বুকে সম্বরণ।
তোমার ঐ চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন মরণ।
তুমি চলার ঝোঁকে দেখছে না হায় পড়ছে চরণ কোথায়,
ওগাে চপল পরাণ প্রিয়।
এবার তােমার পা পড়েছে আমার বুকের ব্যথায়,
এখন ধীরে চরণ নিয়ে !
তােমার ঐ যে দোলন দোদুল-দোলা-চলায় ;
আজ পথ-পাগলের পথের নেশা ভােলায়,
এবার থামাও সে দোল আমার বুকের তলায়,
আর সদিয়াে না মাের ব্যথায়-বাজা চরণ।
আমার ব্যথায় রেঙে হােক ও-চরণ নিখিল-মনােহরণ।
ঐ
অধীর চরণ চলার নেশায় হলে বিপথগামী
আমি বাঁচব কি আর প্রিয়?
তােমার বিপথ সে যে আমার তরে মৃত্যু-আঘাত, স্বামি !
এখন ধীরে চরণ নিয়াে ।
দোলন-পা
ওগাে জানি জানি শুধু চলার সুখে
তুমি পা ফেলেছে আমার ব্যথার বুকে,
ঐ চলাই তােমার আমার গভীর দুখে,
শেষে প্রেম হয়ে সে করলাে অবতরণ।
আজ একা তােমার নয় ও-চরণ আমার নিখিল শরণ!
তােমার ঐ চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন মরণ !
সামলে ফেলে চলাে এবার চপল তােমার চরণ
প্রিয়,
৭২
পূজারিণী
.
এত দিনে অ-বেলায়--
প্রিয়তম !
ধূলি-অন্ধ ঘূর্ণী সম
দিবা যামী
যবে আমি
মচ ফিরি রুধিরাক্ত মরণ-খেলায়----
এত দিনে অ-বৈলায়
জানিলাম, আমি তােমা জন্মে জন্মে চিনি।
পূজারিণী ।
ঐ কণ্ঠ, ওকপােত-কাদানাে রাগিনী,
ঐ আঁখি, ঐ মুখ,
ঐ ভুরু, ললাট, চিবুক,
ঐ তব অপরূপ রূপ,
ঐ তব দোলে-দোলাে গতি-নৃত্য দুষ্ট দুল রাজহংসী জিনি--
চিনি, সব চিনি।
তাই আমি এতদিনে
জীবনের আশাহত ক্লান্ত শুষ্ক বিদগ্ধ পুলিনে
মূচ্ছাতুর সারা প্রাণ ভরে
ডাকি শুধু ডাকি তােমা,
প্রিয়তমা।
ইষ্ট মম জপমালা ঐ তব সব চেয়ে মিষ্ট নাম ধরে ।
তারি সাথে কঁদি আমি
ছিন্ন-কণ্ঠে কঁদি আমি, ‘চিনি তােমা, চিনি চিনি চিনি,
বিজয়িনী নহ তুমিনহ ভিখারিণী,
তুমি দেবী চির-শুদ্ধা তাপস-কুমারী, তুমি মম’চির-পূজারিণী !,
দোলনচাঁপা যুগে যুগে এ পাষাণে বাসিয়াছ ভালাে, আপনারে দাহ করি’ মাের বুকে জ্বালায়েছ আলাে, বারেবারে করিয়াছ তব পূজা-ঋণী। চিনি প্রি চিনি তোমা’ জন্মে জন্মে চিনি চিনি চিনি। চিনি তােমা বারে বারে জীবনের অস্ত-ঘাটে, মরণ-বেলায়, তারপর চেনা শেষে। তুমি-হারা পরদেশে ফেলে যাও একা শূন্য বিদায়-ভেলায় !•••••• আজ দিনান্তের প্রান্তে বসি’ আঁখি-নীরে তিতি আপনার মনে আনি তারি দূর দূরান্তের স্মৃতি :- মনে পড়ে-বসন্তের-শেষে-আসা ম্লান মৌন মাের আগমনী সেই নিশি যেদিন আমার আঁখি ধন্য হ’ল তব আঁখি-চাওয়া সনে মিশি, তখনাে সরল সুখী আমি—ফোটে নি যৌবন মম, উম্মুখ বেদনা-মুখী অ্যাসি-আসি উষা সম আধ-ঘুমে আধ-জেগে তখনাে কৈশাের, জীবনের ফোটো-ফোটো রাঙা নিশি ভাের। বাধা বন্ধ-হারা অহেতুক নেচে-চলা ঘূর্ণীয় পারা দুরন্ত গানের বৈগ অফুরন্ত হাসি নিয়ে এলু পথ-ভােলা আমি অতিদূর পরবাসী। সাথে তারি এনেছিনু গৃহ-হারা বেদনার আঁখি-ভরা বারি। এসে রাতে—ভােরে জেগে গেয়েছিনু জাগরণী সুর, ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিলে তুমি কাছে এসেছিলে, মুখ-পানে চেয়ে মাের সকরুণ হাসি হেসেছিলে, হাসি হেরে কেঁদেছি—“তুমি কার পােষাপাখী কান্তার-বিধুর ? ‘চোখে তব সে কী চাওয়া ! মনে হল যেন তুমি মোর ঐ কণ্ঠ ঐ সুর— বিরহের কান্না-ভারাতুর - পুজাণিী • বনানী-দুলানন, দখিনা সমীরে ডাকা কুসুম-ফোটানাে বন-হরিণী-ভুলাননা আদি জন্মদিন হতে চেন তুমি চেন ! তারপর—অনাদরে বিদায়ের অভিমান-রাঙ্গ অশ্রু-ভাঙা-ভাঙা ব্যথা-গীত গেয়েছিনু সেই আধ-রাতে বুঝি নাই আমি সেই গান-গাওয়া ছলে কারে পেতে চেয়েছিনু চিরশূন্য মম হিয়া-তলে, শুধু জানি, কঁচা-ঘুমে-জাগা তব রাগ-অরুণ-আঁখি-ছায়া লেগেছিল মম আঁখি-পাতে। আরাে দেখেছিনু, ঐ আঁখির পলকে বিস্ময়-পুলক-দীপ্তি ঝলকে ঝলকে ঝলেছিল, গলেছিল গাঢ় ঘন বেদনার মায়া, করুণায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল বিরহিনী অন্ধকার-নিশীথিনী-কায়া ! - s তৃষাতুর চোখে মাের বড় যেন লেগেছিল ভালো পূজারিণী ! আঁখি-দীপে-জ্বালা তব সেই স্নিগ্ধ সকরুণ আলাে- তারপর--গান গাওয়া শেষে নাম ধরে কাছে বুঝি ডেকেছিনু হেসে। অমনি কী গর্জে-ওঠা রুদ্ধ অভিমানে (কেন কে সে জানে) দুলি’ উঠেছিল তব ভুব্ধ-বাঁধা স্থির আঁখি-তরী, ফুলে উঠেছিল জল, ব্যথা-উষ্ণ-উৎস-মুখে তাহা ঝরঝর পড়েছিল ঝরি একটু আদরে এত অভিমানে ফুলে-ওঠা, এত আঁখি-জল, কোথা পেলি ওরে কা’র অনাদৃতা ওরে মাের ভিখারিণী বল মােরে বল, ! এই ভাঙ বুকে ঐ কান্না-রাঙা মুখ থুয়ে লাজ-সুখে বুল, মােরে বল-
দেনাপা
মােরে হেরি কেন এত অভিমান ?
মাের ডাকে কেন এত উথলায় চোখে তব জল ?
অ-চেনা অজানা আমি পথের পথিক
মােরে হেরে জলে পুরে ওঠে কেন তব ঐ বালিকার অাঁখি অনিমিখ ?
মাের পানে চেয়ে সবে হাসে,
বাঁধা-নীড় পুড়ে যায় অভিশপ্ত তপ্ত মাের শ্বাসে;
মণি ভেবে কত জন তুলে পরে গলে
মণি যবে ফণী হয়ে বিষ-দগ্ধ-মুখে
দংশে তার বুকে,
অমনি সে দলে পদতলে !
বিশ্ব যারে করে ভয় ঘৃণা অবহেলা,
ভিখারিণী ! তারে নিয়ে একি তব অকরুণ খেলা ?
তারে নিয়ে একি গৃঢ় অভিমান? কোন্ অধিকারে
নাম ধরে ডাকাটুকু তাও হানে বেদনা তােমারে ?
কেউ ভালােবাসে নাই ? কেউ তােমা করে নি আদর ?
জন্ম-ভিখারিণী তুমি? তাই এত চোখে জল, অভিমানী, করুণা-কাত
নহে তাও নহে-
বুকে থেকে তিক্ত কণ্ঠে কোন রিক্ত অভিমানী কহে-
নিহে তাও নহে।
দেখিয়াছি শতজন আসে এই ঘরে,
কতজন না চাহিতে এসে বুকে করে,
তবু তব চোখে মুখে এ অতৃপ্তি, এ কী স্নেহ-ক্ষুধা !
মােরে হেরে উছলায় কেন তব বুক-ছাপা এত প্ৰীতি-সুধা ?
সে রহস্য, রাণী ।
কেহ নাহি জানে-
তুমি নাহি জান—
আমি নাহি জানি।
চেনে তাহা প্রেম, জানে শুধু প্রাণ
কোথা হতে আসে এত অকারণে প্রাণে প্রাণে বেদনার টান •••••
নাহি বুঝিয়াও আমি সেদিন বুঝি তাই, হে অপরিচিতা !
চির-পরিচিতা তুমি, জন্ম জন্ম ধরে মাের অনাদৃতা সীতা!
কানন-কাঁদানাে তুমি তাপস-বালিকা
অনন্ত কুমারী সতী; তব দেব-পূজার খালিকা
ভাঙিয়াছি যুগে যুগে, ছিড়িয়াছি মালা
খেলা-ছলে ; চির মোনা শাপ-ভ্রষ্টা ওগাে দেব-বালা।
নীরবে সয়েছ সবি-~-
সহজিয়া। সহজে জেনেছ তুমি, তুমি মাের জয়লক্ষী, আমি তব কবি।
,
.
তারপর—নিশি-শেষে পাশে বসে শুনেছিনু তব গীত-সুর
লাজে-আধ-বাধবাধ শঙ্কিত বিধুর ;
সুর শুনে হ’ল মনে-ক্ষণে ক্ষণে-
মনে-পড়ে-পড়ে না এ হারা-কণ্ঠ যেন
কেঁদে কেঁদে সাধে, ‘ওগাে চেন মােরে জন্মে জন্মে চেন।
মথুরায় গিয়া শ্যাম রাধিকায় ভুলেছিল যবে,
মনে লাগে—এই সুরে এই গীত-রবে কেঁদেছিল রাধা ;
অবহেলা-বেঁধা বুক নিয়ে এ যেন রে অতি অন্তরালে ললিতার কঁদা।
বন-মাঝে একাকিনী দময়ন্তী ঘুরে ঘুরে ঝুরে
ফেলে যাওয়া নাথে তার ডেকেছিল ক্লান্ত কণ্ঠে এই গীত-সুরে।
কান্তে পড়ে মনে
বিষাদিনী শকুন্তলাকেঁদেছিল এই সুরে বনে সঙ্গোপনে।
হেমগিরি-শিরে
হারা-সতী উমা হয়ে ফিরে
ডেকেছিল ভােলানাথে এমনি সে চেনা-কণ্ঠে হায়,
কেঁদেছিল চিরসতী পতি-প্রিয়া প্রিয়ে তার পেতে পুনরায় ।•••
দোলন-পা
৫
চিনিলাম বুঝিলাম সবি-
যৌবন সে জাগিল না, লাগিল না মর্মে তাই গাঢ় হয়ে তব মুখ ছবি।
তবু তব চেনা-কণ্ঠে মম কণ্ঠ-সুর
রেখে আমি চলে গেনু কবে কোন্ পল্লী-পথে দূর।•••
দুদিন না যেতে একি সেই পুণ্য গােমতীর কূলে
প্রথম উঠিল কঁাদি’ অপরূপ ব্যথা-গন্ধ নাভি-পদ্মমুলে।
খুঁজে ফিরি, কোথা হতে এই ব্যথা-ভারাতুর মদ-গন্ধ আসে-
আকাশ বাতাস ধরা কেঁপে কেঁপে ওঠে শুধু মাের তপ্ত ঘন দীর্ঘশ্বাসে।
কেঁদে ওঠে লতা পাতা,
ফুল পাখী নদী জল
মেঘ বায়ু কাঁদে সবি অবিরল,
কাঁদে বুকে উগ্ৰসুখে যৌবন-জ্বালায়-জাগা অতৃপ্ত বিধাতা।
পােড়া প্রাণ জানিল না কারে চাই,
চীৎকারিয়া ফেরে তাই—কোথা যাই,
কোথা গেলে ভালােবাসাবাসি পাই ।
হুহু করে ওঠে প্রাণ, মন করে উদাস-উদাস,
মনে হয়—এ নিখিল যৌবন-আতুর কোনাে প্রেমিকের ব্যথিত হতাশ
চোখ পুরে লাল নীল কত রাঙা, আবছায়া ভাসে,
আসে—আসে-
কার বক্ষ টুটে
মম প্রাণ-পুটে
কোথা হতে কেন এই মৃগ-মদ-গন্ধ-ব্যথা আসে?
মন-মৃগ ছুটে ফেরে; দিগন্তর দুলি’ ওঠে মাের ক্ষিপ্ত
হাহাকাসে।
কস্তুরী হরিণ সম
আমারি নাভির গন্ধ খুঁজে ফেরে গন্ধ-অন্ধ মন-মৃগ মম।
আপনারই ভালবাসা
আপনি পিইয়া চাহে মিটাইতে আপনার আশা।
পুজাণিী,
অনন্ত অগস্ত্য-তৃষাকুল বিশ্ব-মাগা যৌবন আমার
এক সিন্ধু শুষি বিন্দু সম মাগে সিন্ধু আর ?
ভগবান! ভগবান! একি তৃষ্ণা অনন্ত অপার !
কোথা তৃপ্তি তৃপ্তি কোথা? কোথা মাের তৃষ্ণাহরা প্রেম-সিন্ধু
অনাদি পাথর!
মাের চেয়ে স্বেচ্ছাচারী দুরন্ত দুর্বার ।
কোথা গেলে তারে পাই
যার লাগি এত বড় বিশ্বে মাের নাই শান্তি নাই।
ভাবি আর চলি শুধু, শুধু পথ চলি
পথে কত পথ-বালা যায়,
তারি পাছে হায় অন্ধ বেগে ধায় •
ভালােবাসা ক্ষুধাতুর মন,
পিছু ফিরে কেহ যদি চায়---অভিমানে জলে ভেসে যায় দু’নয়ন !
দেখে তারা হাসে,
চাহিয়া কেহ চলে যায়, ‘ভিক্ষা লহ’ বলে কেহ আসে দ্বার-পাশে।
প্রাণ আরাে কেদে ওঠে তাতে
গুমরিয়া ওঠে কাঙালের লজ্জাহীন গুরু বেদনাতে।
প্রলয়-পয়ােধি-নীরে গর্জে-ওঠা হুহুঙ্কার সম
বেদনা ও অভিমানে ফুলে ফুলে দুলে দুলে ওঠে ধূধু
ক্ষোভ-ক্ষিপ্ত প্রাণ-শিখা মম।
পথ-বালা আসে ভিক্ষা হাতে
লাথি মেরে চূর্ণ করি গৰ্ব তার ভিক্ষাপাত্র সাথে।
কেদে তারা ফিরে যায়, ভয়ে কেহ নাহি আসে কাছে ;
এনাথ পিণ্ড সম •
মহাভিক্ষু প্রাণ মম
প্রেম-বুদ্ধ লাগি হায় দ্বারে দ্বারে মহাভিক্ষা যাচে,
‘ভিক্ষা দাও পুরবাসি।
বুদ্ধ লাগি ভিক্ষা মাগি, দ্বার হতে প্রভু ফিরে যায় উপবাসী।
কােন-পা কত এল কত গেল ফিরে কেহ ভয়ে কেহবা বিস্ময়ে ভাঙা-বুকে কেহ কেহ অ-নীরে- কত এল কত গেল ফিরে। আমি যাচি পূর্ণ সমর্পণ, বুঝিতে পারে না তাহা গৃহ-সুখী পুরনারীগণ। তারা আসে হেসে, শেষে হাসি-শেষে কেদে তারা ফিরে যায় আপনার গৃহ-স্নেহচ্ছায় বলে তারা, “হে পথিক! বল বল তব প্রাণ কোন্ ধন মাগে ? সুরে তব এত কান্না, বুকে তব কার লাগি এত ক্ষুধা জাগে ?” কি যে চাই বুঝেনাক কেহ, কেহ আনে প্রাণ মন কেহ বা যৌবন ধন কেহ রূপ দেহ। গর্বিতা ধনিকা আসে মদমত্তা আপনার ধনে, আমারে বাঁধিতে চাহে রূপ-ফাঁদে যৌবনের বনে।... সব ব্যর্থ, ফিরে চলে নিরাশায় প্রাণ পথে পথে গেয়ে গেয়ে গান- “কোথা মাের ভিখারিণী পূজারিণী কই ? যে বলিবে--‘ভালােবেসে সন্ন্যাসিনী আমি ওগাে মাের স্বামি । রিক্তা আমি, আমি তব গরবিনী, বিজুয়িনী নই।” । মরু মাঝে ছুটে ফিরি বৃথা হুহু করে জ্বলে ওঠে তৃষা তারি মাঝে তৃষ্ণা-দগ্ধ প্রাণ ক্ষণেকের তরে কবে হারাইল দিশা
পূজারিণী
দূরে কার দেখা গেল হাতছানি যেন--
ডেকে ডেকে সেও কাঁদে--
‘আমি নাথ তব ভিখারিণী,
আমি তােমা চিনি,
তুমি মােরে চেন!
বুঝি না, ডাকিনীর ডাক এ যে,
এ যে মিথ্যা মায়া,
জল নহে, এ যে খল, এ যে ছল মরীচিকা ছায়া।
‘ভিক্ষা দাও বলে আমি এমু তার দ্বারে,
কোথা ভিখারিণী ? ওগাে এ যে মিথ্যা মায়াবিনী
ঘরে ডেকে মারে।
এ যে ক্রুর নিষাদের ঈদ,
এ যে ছলে জিনে নিতে চাহে
ভিখারীর ঝুলির প্রসাদ
হল না সে জয়ী,
আপনার জালে পড়ে আপনি মরিল মিথ্যাময়ী।
কাটা-বেঁধা রক্তমাখা প্রাণ নিয়া এমু তব পুরে,
জানি নাই ব্যথাহত আমার ব্যথায়
তখনাে তােমার প্রাণ পুড়ে।
তবু কেন কতবার মনে যেন হত,
তৰ লিগ মদির পরশ মুছে নিতে পারে মাের
সব জ্বালা সব দগ্ধ ক্ষত
মনে হত প্রাণ তব প্রাণে যেন কাদে অহরহ
‘হে পথিক! ঐ কাঁটা মােরে দাও, কোথা তব ব্যথা বাজে
কহ মােরে কহ।
')
দোলন-পা ৫ নীরব গােপন তুমি মৌনা তাপসিনী, তাই তব চির-মৌন ভাষা শুনিয়াও শুনি নাই, বুঝিয়াও বুঝি নাই ঐ ক্ষুদ্ৰ চাপা বুকে কাদে কত ভালােবাসা আশা । এরি মাঝে কোথা হতে ভেসে এল মুক্তধারা মা আমার সে ঝড়ের রাতে, কোলে তুলে নিল মােরে, শত শত চুমা দিল সিক্ত আঁখি-পাতে। কোথা গেল পথ কোথা গেল রথ ডুবে গেল সব শােক জ্বালা, জননীর ভালােবাসা এ ভাঙা দেউলে যেন দোলাইল দেয়ালীর মালা । গত কথা গত জন্ম হেন হারা-মায়ে পেয়ে আমি ভুলে গেনু যেন। গৃহহারা গৃহ পে; অতি শান্ত সুখে কত জন্ম পরে আমি প্রাণ ভরে ঘুমাইনু মুখ থুয়ে জননীর বুকে। শেষ হল পথ-গান গাওয়া, ডেকে ডেকে ফিরে গেল হাহা স্বরে পথ-সাথী তুফানের হাওয়া। আবার আবার বুঝি ভুলিলাম পথ- বুঝি কোন বিজয়িনী-দ্বারপ্রান্তে আসি বাধা পেল পার্থ-পথ-রথ । ভুলে গেনু কারে মাের পথে পথে খোজা, ভুলে গেনু প্রাণ মাের নিত্যকাল ধরে অভিসারী মাগে কোন্ পূজা, ভুলে গেনু যত ব্যথা শােক, নব সুখ-অশ্রুধারে গলে গেল হিয়, ভিজে গেল অশ্রুহীন চোখ। যেন কোন রূপ-কমলেতে মাের ডুবে গেল আঁখি, সুরভিতে মেতে উঠে বুক, উলসিয়া বিলসিয়া উথলিল প্রাণে এ কী ব্যগ্র উগ্র ব্যথা-সুখ। ৩২
পুণি
বাঁচিয়া নতুন করে, মরিল আবার
সীধুলােভী বাণ-বেঁধা পাখী।••••••
ভেসে গেল রক্তে মাের মন্দিরের বেদী
জাগিল না পাষাণ-প্রতিমা,
অপমানে দাবানল সম তেজে
রুখিয়া উঠিল এইবার যত মাের ব্যথা-অরুণিমা,
হুঙ্কারিয়া ছুটিলাম বিদ্রোহের রক্ত-অশ্বে চড়ি, •
বেদনার আদি-হেতু স্রষ্টা পানে মেঘ অভ্রভেদী,
ধূমধ্বজ প্রলয়ের ধূমকেতু-ধূমে
হিংসা হােমশিখা জ্বালি’ সৃজিলাম বিভীষিকা
স্নেহ-মরা শুষ্ক মরুভূমে।
••••••একি মায়া। তার মাঝে মাঝে
মনে হ’ত কতদূর হতে, প্রিয়, মাের নাম ধরে যেন
তব বীণা বাজে।
সে সুদূর গোপন পথের পানে চেয়ে
হিংসা-রক্ত আঁখি মাের অশ্রু রাঙা বেদনার রসে যেত ছেয়ে !
সেই সুর সেই ডাক স্মরি’ স্মরি’
ভুলিলাম অতীতের জ্বালা,
বুঝিলাম তুমি সত্য—তুমি আছ,
অনাদৃতা তুমি মাের, তুমি মােরে মনে প্রাণে যাচ,
একা তুমি বন-বালা
মাের তরে গাঁথিতেছ মালা
আপনার মনে
লাজে সঙ্গোপনে।
জন্ম জন্ম ধরে চাওয়া তুমি মাের সেই ভিখারিণী।
অন্তরের অগ্নি-সিন্ধু ফুল হয়ে হেসে উঠে কহে-‘চিনি, চিনি।
বেঁচে ওঠ মরা প্রাণ ! ডাকে তােরে দূর হতে সেই .
যার তরে এত বড় বিশ্বে তাের সুখ শান্তি নেই।
দোলন-পা
তারি মাঝে
কাহার ক্রন্দন-ধ্বনি বাজে ?
কে যেন রে পিছু ডেকে চীৎকারিয়া কয়-৫
‘বন্ধু এ যে অবেলায় ! হতভাগ্য, এ যে অসময়!
শুনিনু না মানা, মানিনু না বাধা,
প্রাণে শুধু ভেসে আসে জন্মান্তর হতে যেন বিরহিনী ললিতার কাঁদা।
ছুটে এনু তব পাশে
মৃত্যু পথ অগ্নি-রথ কোথা প'ড়ে কাঁদে, রক্ত-ক্লেতু গেল উড়ে পুড়ে,
তােমার গােপন পূজা বিশ্বের আরাম নিয়া এলাে বুক জুড়ে !
তারপর যা বলিব হারায়েছি আজ তার ভাষা,
আজ মাের প্রাণ নাই, অশ্রু নাই, নাই শক্তি অশা!
যা বলিব আজ ইহা গান নহে, ইহা শুধু রক্তঝরা প্রাণ-রাঙা
তা-ভাঙা ভাষা !
ভাবিতেছ, লজ্জাহীন ভিখারীর প্রাণ--
সেও চাহে দেওয়ার সম্মান !
সত্য প্রিয় সত্য ইহা ; আমিও“তা স্মরি'
আজ শুধু হেসে হেসে মরি !
তবু শুধু এইটুকু জেনে রাখাে প্রিয়তমা দ্বার হতে দ্বারান্তরে
ব্যর্থ হয়ে ফিরে
এসেছিনু তব পাশে, জীবনের শেষ চাওয়া চেয়েছিনু তােমা।
প্রাণের সকল আশা সব প্রেম ভালােবাসা দিয়া
তােমারে পূজিয়াছিনু, ওগো মাের বে-দরদীপূজারিণী প্রিয়া !
ভেবেছিনু, বিশ্ব যারে পারে নাই তুমি নেবে তার ভার হেসে,
বিশ্ব-বিদ্রোহীরে তুমি করিবে শাসন
অবহেলে শুধু ভালােবেসে।
পূজারিণী
ভেবেছিনু, দুর্বিনীত দুৰ্জ্জয়ীরে জয়ের গরবে
তব প্রাণে উদ্ভাসিবে অপরূপ জ্যোতি, তারপর একদিন
তুমিই মাের এ বাহুতে মহাশক্তি সঞ্চারিয়া
বিদ্রোহীর জয়লক্ষী হবে।
ছিল আশা, ছিল শক্তি বিশ্বটারে টেনে
ছিড়ে তব রাঙা পদতলে ছিন্ন রাঙা পদ্মসম পূজা দেবব এনে !
কিন্তু হায়! কোথা সেই তুমি ? কোথা সেই প্রাণ ?
কোথা সেই নাড়ী-ছেড়া প্রাণে প্রাণে টান ?
?
এ-তুমি আজ সে-তুমি তাে নই ;
আজ হেরি—তুমিও ছলনাময়ী,
তুমিও হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী।
কিছু মােরে দিতে চাও, অন্য তরে রাখ কিছু বাকী,
দুর্ভাগিনী ! দেখে হেসে মরি! কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি
মাের বুকে জাগিছেন অহরহ সত্য ভগবান,
তার দৃষ্টি বড় তীক্ষ্ণ, এ দৃষ্টি যাহারে দেখে,
তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখে তার প্রাণ।
লােভে আজ তব পূজা কলুষিত প্রিয়া,
আজ তারে ভুলাইতে চাই,
যারে তুমি পূজেছিলে পূর্ণ মন প্রাণ সমর্পিয়া।
তাই আমি ভাবি, কার দোষে-
অকলঙ্ক তব হৃদি-পুরে
জ্বলিল এ মরণের আলাে কবে প’শে ?
তবু ভাবি, একি সত্য? তুমিও ছলনাময়ী ?
যদি তাই হয়, তবে মায়াবিনী অয়ি !
ওরে দুষ্ট তাই সত্য হােক।
জ্বালাে তবে ভালাে করে জ্বাল মিখালােক !
৩e
দোলন-প
আমি তুমি সূৰ্য্য চন্দ্র গ্রহ তারা
সব মিথ্যা হােক,
জ্বালাে ওরে মিথ্যাময়ী, জ্বালাে তবে ভালাে করে
জ্বালাে মিথ্যালােক।
তব মুখ পানে চেয়ে আজ
বাজ সম বাজে মর্মে লাজ
তব অনাদর অবহেলা স্মরি’ স্মরি’
তারি সাথে স্মরি মাের নিলজ্জল
আমি আজ প্রাণে প্রাণে মরি।
মনে হয়—ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি, মা বসুধা দ্বিধা হও!
ঘৃণাহত মাটীমাখা ছেলেরে তােমার
এ নির্লজ্জ মুখ-দেখা আলাে হ'তে অন্ধকারে লও !
তবু বারে বারে আসি আশা-পথ বাহি’
কিন্তু হায় যখনই ও-মুখপানে চাহি
মনে হয়, হায় হায়, কোথা সেই পূজারিণী,
কোথা সেই রিক্তা সন্ন্যাসিনী ?
এ যে সেই চির-পরিচিত অবহেলা,
এ যে সেই ভাবহীন মুখ!
পূর্ণা নয়, এ যে সেই প্রাণ নিয়ে ফাঁকি-ফাকি-
অপমানে ফেটে যায় বুক!
প্রাণ নিয়া একি নিদারুণ খেলা খেলে এরা হায়,
রক্ত-ঝরা রাঙা বুক দলে
অলক্তক পরে এরা পায় !
এরা দেবী, এরা লােভী, এরা চাঁহে সর্বজন প্রীতি।
ইহাদের তরে নহে প্রেমিকের পূর্ণ পূজা, পূজারীর পূর্ণ সমর্পণ,
পূজা হেরি ইহাদে ভীরু-বুকে তাই জাগে এত সত্য-ভীতি।
নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারাে,
এরা দেবী, এরা লােভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরাে।
।
ইহাদের অতিলােভী মন
একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়,
যাচে বহু জন ।
যে পূজা পূজি নি আমি স্রষ্টা ভগবানে
যারে দিনু সেই পূজা সে-ই আজি প্রতারণা হানে
বুঝিয়াছি, শেষবারঘিরে আসে সাথী মাের মৃত্যু-ঘন আঁধি,
রিক্ত প্রাণ তিক্ত সুখে হুঙ্কারিয়া উঠে তাই,
কার তরে ওরে মন, আর কেন পথে পথে কঁদি?
জ্বলে ওঠ এইবার মহাকাল-ভৈরবের নেত্রজ্বালাসম ধধ,
হাহাকার-করতালি বাজা! জ্বালা তাের বিদ্রোহের রক্ত-শিখা অনন্ত পাবক।
আন তাের বহ্নি-রথ, বাজা তাের সর্বনাশা তুরী!
হান্ তাের পরশু-ত্রিশূল ! ধ্বংস ক এই মিথ্যাপুরী !
রক্ত-সুধা-বিষ আন্ মরণের ধর টিপে টুটি! •
এ মিথ্যা জগৎ তাের অভিশপ্ত জগদ্দল চাপে হােক কুটি কুটি।
কণ্ঠে আজ এত বিষ এত জ্বালা,
তবু, বালা।
।
থেকে থেকে মনে পড়ে
যতদিন বাসি নি তােমারে আমি ভালাে,
যতদিন দেখি নি তােমার
বুক-ঢাকা রাগ-রাঙা আলো,
তুমি ততদিনই।
যেচেছিলে প্রেম মোর, ততদিনই ছিলে ভিখারিণী।
ততদিনই একটুকু অনাদরে বিদ্রোহের তিক্ত অভিমানে
তব চোখে উছলাতে জল, ব্যথা দিত তব কাঁচা প্রাণে।
০৭
দালন-পা একটু আদর-কণা একটুকু সােহগের লাগি কত নিশি-দিন তুমি, মনে কর, মাের পাশে রহিয়াছ জাগি, আমি চেয়ে দেখি নাই; তারই প্রতিশােধ নিলে বুঝি এত দিনে! মিথ্যা দিয়ে মােরে জিনে অপমান ফাকি দিয়ে করিতেছ মাের শ্বাস-রােধ। ; --- আজ আমি মরণের বুক থেকে কাঁদি অকরুণা! প্রাণ নিয়ে একি মিথ্যা অকরুণ খেলা । এত ভালােবেসে শেষে এত অবহেলা কেমনে হানিতে পার, নারী! এ আঘাত পুরুষের, হানিতে এ নির্মম অঘত, জানিতাম মােরা শুধু পুরুষেরা পারি। ভাবিতাম, দাগহীন অকলঙ্ক কুমারীর দান একটি নিমেষ মাঝে চিরতরে আপনারে রিক্ত করি’ দিয়া মনপ্রাণ লভে অবসান। ভুল, তাহা ভুল! বায়ু শুধু ফোটায় কলিকা অলি এসে হ'রে নেয় ফুল! বায়ু বলী, তার তরে প্রেম নহে প্রিয়া । অলি শুধু জানে ভালাে কেমনে দলিতে হয় ফুলকলি-হিয়া ! পথিক দখিনা বায়ু অামি চলিলাম বসন্তের শেষে মৃত্যুহীন চিররাত্রি নাহি-জানা দেশে ! বিদায়ের বেলা মাের ক্ষণে ক্ষণে ওঠে বুকে আনন্দাশ্রু ভরি’ কত সুখী আমি আজ সেই কথা স্মরি। আমি নাবাসিতে ভাললা তুমি আগে“বেসেছিলে ভালাে, কুমারী-বুকের তব স স্নিগ্ধ রাগ-রাঙা আলো প্রথম পড়িয়াছিল মাের বুকে মুখে --- 'ভুখারীর ভাঙা বুকে পুলঝের রাঙা বান ডেকে যায় আজ সেই সুখে।
পুজারিণী
সেই প্রীতি, সেই রাঙা সুখ-স্মৃতি স্মরি’
মনে হয় এ জীবন এ জনম ধন্য হ’ল-আমি অজি তৃপ্ত হয়ে মরি !
-চাহিতে বেসেছিলে ভালাে মােরে তুমি—শুধু তুমি,
সেই সুখে মৃত্যু-কৃষ্ণ অধর ভরিয়া
অাজ অামি শতবার করে তব প্রিয় নাম চুমি!
মােরে মনে পড়ে
একদা নিশীথে যদি প্রিয়
ঘুমায়ে কাহারও বুকে অকারণে বুক ব্যথা করে,
মনে করাে, মরিয়াছে গিয়াছে আপদ !
আর কভু আসিবে না
উসুখে কেহ তব চুমিতে ও পদ-কোকনদ !
মরিয়াছে—-অশান্ত অতৃপ্ত চির-স্বার্থপর লোভী,
অমর হইয়া ছে—রবে চিরদিন,
তব প্রেমে মৃত্যুঞ্জয়ী
ব্যথা-বিষে নীলকণ্ঠ কবি।
০
দোলন-পা
অভিশাপ
যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে!
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে
‘ফিরবে মরু কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে-
বুববে সেদিন বুঝবে!
স্বপন ভেঙে নিশুত রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোঁয়ায় উঠবে ও-বুক ছমকে,
জাগবে হঠাৎ চমকে’!
ভাবে, বুঝি আমিই এসে
বসনু বুকের কোলটি সেঁপে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন।
বেদনাতে চোখ বুজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
০
অভিশাপ, ০ গাইতে ব'সে কণ্ঠ ছিড়ে আসবে যখন কান্না, বলবে সবাই—“সেই যে পথিক, তার শেখানাে গান না?” আসবে ভেঙে কায়া। পড়বে মনে আমার সােহাগ, কণ্ঠে তােমার কাঁদবে বেহাগ! পড়বে মনে অনেক ফাকি, অশ্রু-হারা কঠিন আঁখি ঘন ঘন মুছবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! ০ আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভরূবে তােমার অঙ্গন, তুলতে সে ফুল—গাঁথতে মালা কাঁপবে তােমার কঙ্কন কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন। শিউলী-ঢাকা মাের সমাধি পড়বে মনে, উঠবে কাঁদি। বুকের মালা কবে জ্বালা চোখের জলে সেদিন বালা মুখের হাসি ঘুচবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-হেঁচা রাত্রি, থাকবে সবাই-থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রীই। আবে শিশির-রাত্রি। থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন, থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন, বঁধুর বুকের পরশনে আমার পরশ আনবে মনে- বিষিয়ে ও-বুক উঠবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! • দোলন-পা . | ১ আসবে আবার শীতের রাতি, অাসবে নাক আর সে- তােমার সুখে পড়ত বাধা থাকলে যেজন পার্শ্বে, আসূবে নাক আর সে। পড়বে মনে, মাের বাহুতে মাথা থুয়ে যেদিন শুতে, মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায় ! সেই স্মৃতি নিত, ঐ বিছানায় কাটা হয়ে ফুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! ও আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে, সেই তরীতে হয় তােত কেহ থাকবে তােমার সঙ্গে দুলবে তরী রঙ্গে। পড়বে মনে, সে কোন্ রাতে এক তরীতে ছিলে সাথে, এমনি গাঙে ছিল জোয়ার, নদীর দু’ধার এমনি আঁধার, তেমনি তরী ছুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে তােমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ, আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয় তাে হবে অন্ধ- সখার কারা-বন্ধ ! বন্ধু তােমার হাবে হেলা, ভাঙবে তােমার সুখের মেলা ; দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর, বইভে প্রাণের শ্রান্ত এ ভার মরণ-সনে যুঝবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে অভিশাপ ফুটবে আবার দোলাপা চৈতি-রাতের চাদনী, আকাশছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদনী চৈতি-রাতের চাদনী। ঋতুর পরে ফিরবে ঋতু, সেদিন--- হে মাের সােহাগ ভীতু! চাইবে কেঁদে নীল নভাে গায়, আমার মতন চোখ ভ’ল্প চায় যে তারা, তায় খুজবে বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে ঝড়ি, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন, কাঁপবে কুটীর, সেদিন ত্রাসে জাগবে বুকে ক্রন্দন টুটবে যবে বন্ধন! • পড়বে মনে, নেই সে সাথে বাঁধতে বুকে দুঃখ রাতে ! আপনি গালে যাচবে চুমা, চাইবে আদর, মাগবে ছোঁওয়া, আপনি যেচে চুমবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। আমার বুকের যে কাঁটাঘা তােমায় ব্যথা হাত, সেই আঘাতই যাচবে আবার হয় তো হয়ে শান্ত- আসব তখন পান্থ! হয় তাে তখন আমার কোলে সােহাগ-লােভে পড়বে ঢ’লে, আপনি সেদিন সেধে কেঁদে চাপবে বুকে বাহুয় বেঁধে, চরণ চুমে পূজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! • ৪৩,
দোলন-গপা
আশান্বিত
আবার কখ আসবে ফিরে সেই আশাতে জাগব রাত,
হয় তত সে কোন্ নিশুত রাতে ডাকবে এসে অকস্মাৎ।
সেই আশাতে জাগব রাত।
যতই কেন বেড়াও ঘুরে
মরণ-বনের গহন জুড়ে
দূর দূরে,
কাঁদলে আমি আসবে ছুটে, রইতে তুমি নারূবে নাথ।
সেই আশাতে জাগব রাত।
কপট! তােমার শপথ-পাহাড় বিন্ধ্যসম হােক না সে,
ঝড়ের মুখে খড়ের মতন উড়বে তা মাের নিশ্বাসে—
একটি ছােট্ট নিশ্বাসে !
রাত্রি জেগে বদছি আমি
শুনবে যখন হে মাের স্বামি
সুদূরগামী !
আগল ভেঙে আসবে পাগল, চুমবে সজল নয়ন-পাত,
সেই আশাতে জাগব রাত
৪৪
আশাষিরা
জানি সখা, আমার চোখের একটি বিন্দু অশ্রুজল
নিবে তাতেই তােমার বুকের অগ্নি-সিন্ধু নীল গরল,
আমার চোখের অশ্রুজল।
তােমার আদর-সোহাগিনী
তাই তাে কাঁদায় নিশিদিনই
এ অধীনী,
ভুলবে জানি তােমার রাণী গরবিনীর সব.আঘাত!
সেই আশাতে জাগব রাত
আসবে আবার পদ্মানদী, দুলবে তরী ঢেউ-দোলায়,
তেমনি করে দুলব আমি তােমার বুকের পকোলায়।
দুলবে তরী ঢেউ দোলায় ।
পাগলী নদী উঠবে ক্ষেপ,
তােমায় তখন ধরুব চেপে
বক্ষ ব্যেপে,
মরণ-ভয়কে ভয় কি তখন, জড়িয়ে কণ্ঠ থাকবে হাত।
সেই আশাতে জাগব রাত।
পােড় চোখের জল ফুরায় না, কেমন করে আসবে ঘুম?
মনে পড়ে শুধু তােমার পাতাল-গভীর মাতাল চুম,
কেমন করে আসূবে ঘুম ?
আজ যে আমার নিশীথ জুড়ে
একলা থাকার কান্না ঝুরে
হুতাশ সুরে,
পূবের হাওয়ায় কঁদবে সে সুর, আসবে পছি হাওয়ার সাথ!
সেইআশাতে জাগব রাত।
-
• বিজলী-শিখার প্রদীপ জ্বেলে ভাদর রাতের বাদল মেঘ, দিখিদিকে খুজছে তােমায় ডাকছে কেঁদে বজ্র-বেগ- দিগ্বিদিকে খুঁজছে মেঘ। তােমার আশায় ঐ আশা-দীপ জ্বালিয়েছে আজ দিক ভরে নীপ হে রাজ-পথিক। আজ না অস, এসস যেদিন দীপ নিবাবে ঝঞাবাত। সেই আশাতে জাগব রাত।
পিছু-ডাক
সখি! নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি আর মনে?
সেথায় তােমার নতুন পূজা নতুন আয়ােজনে।
প্রথম দেখা তােমায় আমায়
যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,
যেথায় প্রতি ধূলি কণায়
লতাপাতার সনে
নিত্য চেনার বিত্ত বাজে চিত্ত-আরাধনে,
শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাছে নিরজনে।
সেথা তুমি যখন ভুলতে আমায়, আস্ত অনেক কেহ,
আমার হয়ে অভিমানে কঁাদূত যে ঐ গেহ।
যেদিক পানে চাইতে সেথা
বাজত আমার স্মৃতির ব্যথা,
সে গ্লানি আজ ভুলবে হেথা
নতুন আলাপনে।
আমিই শুধু হারিয়ে গেলেম হারিয়ে-যাওয়ার বনে
৪৭
দোলন-পা
‘আমার এতদিনের দূর ছিল না সত্যিকারের দূর,
ওগাে আমার সুদূর করুত নিকট ঐ পুরাতন পুর !
এখন তােমার নতুন
বাঁধন,
নতুন হাসি, নতুন কঁাদন,
নতুন সাধন, গানের মাতন
নতুন আবাহনে।
আমারই সুর হারিয়ে গেল সুদূর পুরাতনে ।
সখি! আমার আশাই দুরাশা আজ, তােমার বিধির বর,
মাের সমাধির বুকে তােমার উঠবে বাসর ঘর !
শূন্য ভ’রে শুতে পেনু
ধেনু-চরা বনের বেণু-
হারিয়ে গেনু হারিয়ে গেনু
অস্ত-দিগঙ্গনে।
বিদায় সখি, খেলা-শেষ এই বেলা-শেষের খনে!
এখন তুমি নতুন মানুষ নতুন গৃহকোণে।
৪৪
মুখ আমার কাচা মনে রং ধরেচে আজ, ক্ষমা কর মাগাে আমার আর কি সাজে সাজ ? কাচা মনে রং ধরেচে আজ । আমার আমার ভুবন উচে রেঙে তাঁর পরশের সােহাগ লেগে, ঘুমিয়ে ছিনু দেখনু জেগে মা জড়িয়ে বুকে দাড়িয়ে আছেন নিখিল হৃদয়-রাজ ! ক্ষমা কর মাগাে আমার মার কি সাজে লাজ ? আমায় আমায় আমায় দিনের আলােয় নিলো বুকে আপনি লজ্জাহারী, মাগাে, আমি আর কি মিথ্যা লজ্জা করে পারি ? দিনের আলােয় নিলেন বুকে আপনি লজ্জাহারী । জগৎ যারে পায় না সেধে সেই সে যখন সাধছে বেদে আমার চরণ বক্ষে বেঁধে মা, বাঁধব না চুল, এই ভালাে মাের ভিখারিণীর সাজ। ক্ষমা কর মাগাে আমার আর কি সাজে লাজ ? আমি আমার মাগাে কিসের সজ্জা, কিসের জঞ্জা, কিসের পরাণপণ ? বক্ষে আমার বিশ্বলোকের চির-টাওয়া ধন। কিসের সজ্ঞা, কিসের লজ্জা, কিসের পরাণপণ ? আমার বিশ্ব-ভুবন যার পদ-ছায় ঘেই এসে হায় মাের পদ চায়, সুখ-আবেগে বুক ফেটে যায় মা, লাজ ভুলেছি, সাজ ভুলেছি ভুলেছি সব কাজ। ক্ষমা কর মাগাে আমার আর কি সাজে লাজ? আমার আজ ৫ ৪৯।
দোলন-পা
সাধের ভিখারিণী
তুমি
তুমি
মলিন বাসে থাক যখন, সবার চেয়ে মানায়!
আমার তরে ভিখারিণী, সেই কথা সে জানায়।
জানি প্রিয়ে জানি জানি
তুমি হতে রাজার রাণী,
খাত দাসী বাজত ৰাশী
তোমার বালাখানায়।
সাধ করে আজ ভিখারিণী, সেই কথা সে জানায়
তুমি
দেবি !
তুমি সত্য অন্নপূর্ণা, নিখিল তােমার স্বাণী,
ভিখারীকে ভালোবেসে সাজলে ভিখারিণী ।
সব ত্যজি’ মাের হলে সাথী,
আমার আশায় জাগচ রাতি,
তােমার পূজা বাজে আমার
হিয়ার কাণায় কাণায় !
সাধ করে মাের ভিখারিণী, সেই কথা সে জানায়
তুমি
কবি-রাণী
তুমি আমায় ভালােবাস তাই তাে আমি কবি।
আমার এ রূপ--সে যে তােমার ভালােবাসার ছবি
আপন জেনে হাত বাড়ালাে
আকাশ বাতাস প্রভাত-আলাে,
বিদায়-বেলার সন্ধ্যা তারা
পূবের অরুণ রবি,-
তুমি ভালােবাস বলে ভালােবাসে সবি।
আমার আমি লুকিয়েছিল তােমার ভালােবাসায়,
আমার আশা বাইরে এলাে তােমার হঠাৎ আসায়।
তুমিই আমার মাঝে আসি
অসিতে মাের বাজাও বাঁশি
আমার পূজার যা আয়ােজন
তােমার প্রাণের হবি।
আমার ৰাণী জয়মাল্য, রাণি ! তােমার সবি ।
তুমি আমায় ভালোবাস তাই তাে আমি কবি।
আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালােবাসার ছবি।
৫১
দোলন-পা
আশা
আমি
আমার
শ্রান্ত হয়ে আস্ব যখন পড়ব দোরে টলে,
লুটিয়ে-পড়া দেই তখন ধবে কি ঐ কোলে ?
বাড়িয়ে বাহু আসবে ছুটে ?
ধবে চেপে পরাণ পুটে ?
বুকে রেখে চুমৰে কি মুখ
নয়ন-জলে গলে ?
শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে ট’লে !
আমি
তুমি
তা
এতদিন বা দুঃখ দিয়েচ হেনে অবহেলা,
ভুলবে না কি যুগের পরে ঘরে-ফেরার বেলা ।
বল বল জীবন-স্বামি
সে দিনও কি ফিরব আমি ?
অন্তকালেও ঠাই পাব না
ঐ চরণের তলে ?
এন্তি হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে ট’লে ।
৫
ܕܝ
আমি,
০২
শেষ প্রার্থনা লাল } চোখের জলে প্রার্থনা মাের শেষ বরষের শেষে, এমনি কাটে আসছে-জনম তােমায় ভালােবেসে। এমনি আদর, এমনি হেলা, মান অভিমান এমনি খেলা, এমনি ব্যথার বিদায় বেলা এমনি চুমু হেসে, খণ্ডমিলন পূর্ণ করে নতুন জীবন এসে! ব্যর্থ আমার আশা যেন সকল প্রেমে মেশে! চোখের জলে প্রার্থনা মাের শেষ বরষের শেষে। যেন 2 এবার যেন এবার আর না কাঁদায় দ্বন্দ্ব-বিবােধ, হে মাের জীবন-স্বামি । এক হয়ে যাক প্রেমে তােমার তুমি আমার আমি ! আপন সুখকে বড় করে যে দুখ পেলেম জীবন ভরে এবার তােমার চরণ ধরে ০ ৩ নয়ন-জলে ভেসে মাের। পূর্ণ করে তােমায় জিনে সব-হারানাের দেশে, মরণ-জয়ের বরণমালা পরাই তােমার কেশে। চােখের জলে প্রার্থনা মাের শেষবিদায়ের শেষে। আজ ০৩
দোল-পা
সে যে
যাচে
চাতকই জানে তার মেঘ এত কি,
ঘন ঘন বরিষণ কেন কেতকী,
চকোরই চেনে আর চেনে কুমুদী,
প্রাণ কেন প্রিয়ে প্রিয়-তম্ চুমু দি’
চাদে
নজরুল ইলম
অগ্নিবীণা
১০
ব্যথার দান
১০
নলিনী গুপ্ত :
সাহিত্যিক
১০
উল্লাসকর দত্ত
কারা-জীবনী
বারীন ঘােষ
দ্বীপান্তরেরর কথা
আত্ম-কাহিনী
মিলনের পথে
সুরেশ চক্রবর্তী
উড়াে-চিঠি
১০
ইরাণী উপকথা
আৰ্য পাবলিশিং হাউস
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.