Makardah Saraswat Library, Howrah
Mohini
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আট-আনা সংস্করণ-গ্রন্থমালার পাশাতিতম গ্রন্থ
মােহিনী
শ্রীললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এম-এ
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
ফান-১৩২৯
শ্রীহরিদাস ২০৩/ss.
চট্টোপাধ্যম
গুরুদাস
কলকাত।
কাওয়ালিম
চট্টপাধ্যায়
এণ্ডস
প্রিন্টার-নরেন্দ্রনাথ কোঙার
ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্ক
২০১১ কর্ণওয়ালিস ট্রীট, কলিকাতা
উপহারু
No text on this page.
কৈফিয়ত আজকালকার দিনে যেমন এক দিকে আবালবৃদ্ধবনিতা গল্প পড়িবার জন্য লালায়িত, তেমনি অন্য দিকে নবীন-প্রবীণ-স্ত্রী-পুরুষ- নিৰ্বিশেষে গল্প লিখিতে প্রবৃত্ত। অন্তে পরে কা কথা, দর্শনশাস্ত্র ও ব্যবহারশাস্ত্রের মত গুরুগম্ভীর বিষয়ের অধ্যাপকও গল্পের পসরা লইয়া সাহিত্যের হাটে ফিরি করিতেছেন। ইহা যুগধৰ্ম্ম, এড়ান অসাধ্য, অসম্ভব বলিলেও হয়। এ অবস্থায়, বর্তমান লেখকের যখন সুকুমার সাহিত্যের পঠন-পাঠন লইয়াই কার-কারবার, তখন তাহার পক্ষে এই পথের পথিক হওয়ায় বিস্ময়ের বিষয় কিছুই নাই। তবে ইহা স্বীকার করিতে হইবে যে, সাহিত্য-সৌধের অন্য দুই একটি প্রকোষ্ঠে তাহার অল্পবিস্তর প্রবেশাধিকার থাকিলেও, এই প্রকোষ্ঠে তাহার নিতান্তই অনধিকার-প্রবেশ। কালের ধর্ম বশেই ইহা ঘটিয়াছে, লেখকের এইমাত্র সাফাই । এই ক্ষুদ্রকায় পুস্তকে প্রকাশিত আটটি গল্পের মধ্যে দুইটি বদেশী গল্প বা কিংবদন্তীর ভিত্তির উপর গঠিত ; একটি অন্যের মুখে শ্রুত আখ্যানের অনুবৃত্তি, দুইটি সত্য-ঘটনামুলক, অবশিষ্ট তিনটি লেখকের নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত। নিরবলম্বে গল্প লেখা এই অক্ষম লেখকের শক্তিতে কুলায় না, এবংবিধ স্বীকারােক্তি
[ ২ ]
অনেকদিন পূর্বে ‘বিষবৃক্ষের উপবৃক্ষের উপলক্ষে করিয়াছিলাম।
‘দাদামশায়’ গল্প লিখিতে গিয়াও অর্ধপথে থামিয়া গিয়াছিলাম।
গত কয়েক বৎসরে লেখকের এই পথে কতটুকু উন্নতি হইয়াছে,
মােহিনী’ তাহার পরিচয় দিবে । এসম্বন্ধে অধিক বলা
বাহুল্য-মাত্র। গল্পগুলির হাস্যরসে আরম্ভ হইয়া করুণর
অবসান হইয়াছে—তাহার কারণ ‘পাগলা ঝােরার ভূমিকায়
একবার বলিয়াছি। পুনরুক্তির প্রয়ােজন নাই। ইতালমতি
বিস্তরেণ।
১লা কান ১৩২৯
হায়কর
সূচি
১
মাহি
প্রজাপতির নির্বন্ধ
ফলিত জ্যোতিষ
স্বপ্নাদা মাদুলি
শবনাথ
৩১
লক্ষম।
সরস্বতী
১০৪
১১৮
লক্ষম-সরস্বতী-সম্বন্ধে মন্তব্য
পরিশিষ্ট (স্বপ্নাহ মাদুলি’ গল্পের মূল)
গ্রন্থকারের অন্যান্য পুস্তক
২,
০ ০
i' ?
প্রেমের কথা ( আট আনা সংস্করণ)
ফোয়ারা (৩য় সংস্করণ, পরিবর্ধিত )
পাগল কোরা (২য় সংস্করণ, y)
কপালকুণ্ডলা-তত্ত্ব (২য় সংস্করণ, , )
কাব্যসুধা ( ননদ-ভাব ইত্যাদি)
সখী
অনুপ্রাস
ককারের অহঙ্কার
ব্যাকরণ-বিভীষিকা (২য় সংস্করণ) !y০
বাণান-সমস্যা (২য় সংস্করণ)
সাধুভাষা বনাম চলিত ভাষা
ছেলেমেয়েদের জন্য
ছড়া ওগল্প (৫ম সংস্করণ )
আহলাদে আটখানা (৩য় সংস্করণ)
রসকরা
সাত নদী (৮থানি তিন-রঙ্গের ছবি আছে ) ... :
৩
এ
মােহিনী
মােহিনী
মোহনের ডায়েরি
লা জানুয়ারী । আজ ছুটির দিন, ইডেন গার্ডেনে
বড়াইব বলিয়া বেলা থাকিতেই বাহির হইয়া পড়িলাম।
বৌবাজার ষ্ট্রীট দিয়া যাইতেছি এমন সময়, দোতালার
জানাল হইতে কে যেন ডাকিল, ‘মােহন দা’। মুখ
তুলিয়া দেখি ‘মােহিনী। সে উপরে যাইতে ইসারা
করিল। উপরে উঠিবামা হাসিমুখে দুয়ার পর্যন্ত আসিয়া
আমাকে দুই হাত বাড়াইয়া ধরিল, ধরিয়া এমন নিবিড়
আলিঙ্গন করিল যে, প্রিয়তমাও কখনও তেমন করেন
( কথাটা শুনিলে এমতী হয়ত ‘দুর্জয় মান’
করিয়া বসিবেন !) কত কাল দেখা।
নাই।
মােহিনী
২
বসাইয়া সে
কত সুখ-দুঃখের কথা বলিল ; আমিও
নীরব রহিলাম না। ছেলেবেলাকার ভাব, সেই বাগানে
বাগানে আম, জাম, লিচু, গােলাপজাম, জামরুল, পেয়ারা,
ফা, কুল পাড়িয়া খাওয়া আর পাখীর ছানা চুরি করা।
সমবয়সীরা মােহন’ আর ‘মােহিনী’বলিয়া কত ছেপলামি
ঠাট্টা করিয়াছে। তখন সেজন্য কত রাগ করিয়াছি,
দু’জনেই কত লজ্জা পাইয়াছি। এখন সে সব মনে
করিলে হাসি পায়। এমনি সব অালাপে কতক্ষণ
কাটিল।
সে কি আর ছাড়িতে চাহে ? রাত হইয়া
গেল। শীঘ্রই আর একদিন আসিব বলিয়া বিদায়
লইলাম। বিদায়কালেও আবার সেই নিবিড় আলিঙ্গন।
প্রভেদের মধ্যে কেবল হাসিমুখের বদলে বিষঃ মুখ।
আহা, মােহিনী যে চিরদিনই কোমলপ্রকৃতি। বাল্যের
ভালবাসার মধুর স্মৃতি লইয়া ঘরে ফিরিলাম।
২রা। ছুটীর পর বাঁধাধরা কান আরম্ভ। কিছুই
লিখিবর নাই। মােহিনীর কথা থাকিয়া থাকিয়া
মনে পড়িতেছে। আর কত রুতি
উজ্জ্বল। হইয়া
উঠিতেছে। হায় রে ! সে সুখের দিন ।
৩রা। আজ হিষ্ট্রর প্রােফেসার আসেন নাই,
মােহিনী
এক ঘণ্টা আগে ছুটি পাওয়া
গেল। ভাবিলাম,
মােহিনীর ওখানে বেড়াইয়া আসি। অনেক দিন দেখি
নাই, স্মৃতি প্রায় মুছিয়া গিয়াছিল। এখন नून
করিয়া আবার সব কথা মনে পড়িয়া প্রাণটা আকুল
করিয়া তুলিয়াছে। তাই মােহিনীকে অনেক কাল পরে
দেখিয়া বার বার দেখিতে ইচ্ছা হয়। বাল্যের ভালবাসা-
সহজে ভােলা যায় না। তাহারও কত আনন্দ,
আগ্রহ—এক পা দু'পা করিয়া তাহার ওখানে গেলাম।
বড় আরামে এক ঘণ্টা কাটাইয়া আসিলাম। হায় !
আর সে সুখের ছেলেবেলা ফিরিয়া আসে না ?
ওঠা। আহারের পর কলেজ, কলেজের পর ঘরে
ফেরা। বৈকালে বন্ধুদের পাল্লায় পড়িয়া ফুটবল ম্যাচ
দেখিতে যাওয়া। রাত্রে পড়াশুনার পর শয়ন। স্বপ্নে
মােহিনীর সঙ্গে গ্রামের পুকুরে সাঁতার দিতেছি—মােহিনী
বড় ভীতু, বেশী দূর আগাইতে চাহিতেছে না, ইত্যাদি।
৫ই। আজ প্রাতে শীতটা বেশী বেশী বােধ হইতেছে।
( কাল রাত্রে স্বপ্নে পুকুরে সাঁতার কাটার জন্য নহে ত ? )
উঠিতে বেলা হইল। এই শীতের ভােরে তখনকার দিনে
নাগরী হইতে খেজুর-রস ঢালিয়া খাওয়ার কথা, মােহিনীর
মােহিনী
৪
গলায় রস ঢালিয়া দেওয়ার কথা মনে পড়িল। মােহিনী
শীতে জবুথবু হইয়া পড়িত, ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে খেজুর-রস
খাইতে চাহিত না। রস তাহার বুকের কাপড় বহিয়া
পড়িত, তাই লইয়া কত হাসাহাসি চলিত। যাক, আর
সে পুরাণ কথা লইয়া তােলপাড় করিব না। প্রাতে
উঠিয়া পড়া শুনা, আহারান্তে কলেজে যাওয়া ইত্যাদি।
৬ই। আজ শনিবার। কলেজ হইতে ফিরিয়া
মােহিনীর একখানি ছোট চিঠি পাইলাম। তাহার
ওখানে রাত্রে আহারের নিমণ। যাই, বাহির হইয়া
পড়ি। আবার কোন্ বন্ধু আসিয়া পড়িবে, যাইতে
বিলম্ব ঘটিবে । হয় ত বন্ধু থিয়েটার কি বায়ােস্কোপ
দেখিবার, কি এই রকম একটা না একটা সৃষ্টিছাড়া
আবদার করিয়া বসিবে।
ডায়েরির বিপদ
মােহনচন্দ্র ছােটখাট জমিদার ; ‘যৌবনং ধনসম্পত্তি
প্রভুত্ব তিনই তাহার ছিল, কিন্তু ‘অবিবেকি ছিল
না, সুতরাং বহিয়া বা বকিয়া যান নাই, গ্রামের স্কুল
হইতে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করিয়া কলিকাতায়
মােহিনী কলেজে পড়িতে আসেন, এখন বি এ পড়িতেছেন । একটু বেশী বয়সেই পাশ করিয়াছিলেন, তাহাতে আবার জমিদার, অতএব বিবাহটা কলেজে পড়া আরম্ভ করার সমকালেই হইয়াছিল ; এবারকার পূজার ছুটির পর প্রারব্ধযোবনা পন্নী হরিদাসীকে কলিকাতার বাসায় আনিয়াছেন—অবশ্য অভিভাবিক। কেহ নাই। শ্যাম- বাজারে হরিদাসীর দিদি কৃষ্ণদাসী স্বামিগৃহে থাকেন- আপদে বিপদে তাহাদেরই ভরসা। হরিদাসী পাড়া- গাঁয়ের মেয়ে, অল্প স্বল্প লেখাপড়া জানে, নভেল-নাটক পড়িতে পারে, তবে স্বামীর অগাধ (?) বিদ্যার লাগাল ধরিতে পারে না। স্বামী একখানি अन्नात বাধান খাতায় চুপি চুপি কি লেখেন (কবিতা নহে ত ?) আবার ডেকে বন্ধ করিয়া রাখেন, বড় জানিতে ইচ্ছা করে ; কিন্তু এখনও প্রগম্ভ হইয়া পড়ে নাই, মুখ কটিয় জিজ্ঞাসা করিতে পারে না। আজ মােহনচ মােহিনীর সহিত মিলিত হইবার জন্য তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া পড়িবার সময় ডায়েরি ও মােহিনীর চিঠিখানি ডেক্সের উপর ফেলিয়া রাখিয়াছেন, বন্ধ করিয়া রাখিতে ভুলিয়া গিয়াছেন। বৈকালে চুল বাঁধিয়া গা ধুইয়া কাপড়
মােহিনী
কাচিয়া সান্ধ্য সাজে সাজিয়া-হরিদাসী স্বামীর পড়ার ঘরে
গিয়া এটা সেটা নাড়িতে নাড়িতে দেখিল, সেই সুন্দর খাতা-
খানি ডেক্সের উপর পড়িয়া আছে। কাছে গিয়া দেখিল,
একখানি ছােট্ট চিঠিও তাহার পাশে রহিয়াছে। সে তাহার
বড় লােভের জিনিস খাতাখানির খােলা পাতা দুইটি পড়িল
আর চিঠিখানিও পড়িল। চিঠিতে এইরূপ লেখা-
—নং বৌবাজার ষ্ট্রাট
শনিবার।
“মােহন দা, আজ দু’দিন আসনি। বড় মন কেমন
করে। আজ সন্ধ্যেবেলা অবিশ্যি করে এসাে। এইখানেই
খাবে। “বাবু’ আজ ঘরে নেই, দেশে গেছেন। খুব
ফুৰ্ত্তি হবে। বৌদিদির হাতের লুচি-ছক্কা খাওয়া হবে
বলে হয়ত দুঃখিত হবে, তিনিও হয়ত রাগ করবেন।
কিন্তু বৌদি আজ দু’দিন তােমাকে দখল করেছেন, আমার
দখল অনেক দিনের। সে দিন আবার পাট্টা নতুন করে
নিয়েছি। মােদ্দা, তিনি আর এখন যােল আনার মালিক
নহেন, আট আনা না হাে দু’আনা, নিদেন এক পাই
দখল আমার থাকবে। আমি যে তােমার সেই ছেলেবেলার
মােহিনী।”
৭
মােহিনী
!
ছােট্ট চিঠি, আঁখরগুলি মুক্তোর মত সাজান।
হরিদাসী এমন লিখিতে পারে না। ডায়েরির পাতা
দুইটি মােহিনীর কথায় ভরা। চিঠি ও ডায়েরি পড়িয়া
তাহার মনের অবস্থা কি হইল, তাহা সহজেই অনুমেয়।
অনেকক্ষণ দম ধরিয়া থাকিয়া খানিকটা সামলাইয়া সে
মনের মধ্যে তােলাপাড়া করিতে লাগিল,-“উঃ! ছুড়ীটা
কি বেহায়া, কি ব্যাপিকা, কি বচরিত্রা, স্বামী একদিন
ঘরে নেই আর পুরােনাে পীরিতের লােককে ডেকেছে !
আবার ‘দাদা’ বলাটুকুও আছে! আর এরই বা কি
প্রিবিত্তি ! এমন যদি, তবে আমাকে বিয়ে করাই বা
কেন, আর ভালবাসা দেখিয়ে কাছে রাখাই বা কেন ?
ও ভুলে যাচ্ছি, তখনও যে গুণের মােহিনী যােটে নি।
তাই এ ক’দিন দেখি—কেমন যেন অন্যমনস্ক, সর্বদাই
মনটা ভার ভার। মাগাে, আমার কপালে এতও ছিল।”
এইরূপ মর্মান্তিক কষ্টে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া সে আরও
খানিকক্ষণ গুম হইয়া থাকিল। সহুরে মেয়ে নহে, তাই
হিষ্টিরিয়া চাগিল না। তা’র পর ভাবিল, ‘আর না, এ
জ্বালায় জ্বলার চেয়ে কোেসিনের আগুন পুড়ে চিরজীবনের
জন্যে আলা জুড়ুই, তিনিও নিষ্কণ্টক হন। এই সঙ্কল্প
মােহিনী করিল বটে, কিন্তু তাহাতেও মনটা বেশ হাল্কা হইল না। বরং এই প্রথম-মোবনে অতৃপ্ত বাসনা লইয়া প্রিয়জনকে ছাড়িয়া যাইবার কথা ভাবিয়া তাহার বুক ভাঙ্গিয়া পড়িল ফুলশয্যার রাত্রি হইতে স্বামীর যে সোহাগ-আদর পাইয়া আসিতেছে সে সব কথা মনে পড়াতে তাহার হৃদয় ভারাক্রান্ত হইল। অবশেষে তাহার চক্ষুঃ ফাটিয়া জল পড়িতে লাগিল। বিপদভঞ্জন মধুসূদন কতক্ষণ ধরিয়? সে এই ঘরটিতে বসিয়া অঝাের- নয়নে কাদিতেছিল, তাহা সে জানে না। শেষে তাহার ভগিনীপতি মধুসূদন বাবু যখন সেই ঘরে প্রবেশ করিয়া অশ্রুমুখী শ্যালিকাকে দেখিয়া ‘এ কি!' বলিয়া উঠিলেন, তখন তাহার সাের হইল। তাহাকে দেখিয়া তাহার চোখের জল আরও শতধারে ছুটিল। ইনি একজন পুলিশ-কর্মচারী, সুতরাং রাশভারী লােক। হরিদাসীর দিদি কৃদাসীকে কখন চটুল প্রেমালাপে পরিতৃপ্ত করেন , সেজন্য দিদি কত দুঃখ করিয়াছে, আর হরিদাসী দিদির অবস্থার সহিত নিজের স্বামিসৌভাগ্যের কথা মনে
১
মােহিনী
মনে তুলনা করিয়া কত সুখ, কত গর্ব অনুভব করিয়াছে—
আজ সে সুখ, সে গৰ্ব্ব ধূলিসাৎ হইয়াছে, সে মােহন-স্বপ্ন
টুটিয়াছে। ভগিনীপতির পুনঃ পুনঃ প্রশ্নের উত্তরে সে একটি
কথাও বলিতে পারিল না, কেবল ফোপাইয়া ফোপাইয়া
কাদিতে লাগিল। শেনে ডায়েরির খােলা পাতা ও খােল
চিঠি তাহার নজরে পড়াতে তিনি সেগুলি পড়িয়া শ্যালিকার
মনােবেদনার কারণ বুঝিতে পারিলেন। তিনি গম্ভীর-প্রকৃতি,
কতক গুলা বাজে বকুনি বকিয়া সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা কৰিলে।
না। শুধু বলিলেন, “এর জন্যে ভাবনা কি? আমরা
পুলিশের লােক, চোরকে এখনি বমাল-সমেত গ্রেপ্তার
করব। তুমি ঠিক হয়ে থাক, আমি গাড়ী ডাকতে যাচ্ছি।"
মিনিট দশেক পরে তিনি গাড়ী লইয়া আসিলেন ;
হরিদাসী ঝীকে সঙ্গে লইয়া তাহার অনুরােধে মন্ত্রচালিতের
ন্যায় গাড়ীতে উঠিল। দরওয়ান বাসার উপর নজর
রাখিতে বলিয়া মধুসূদন বাবু কোচওয়ানকে বোবাজার
ঈীটের দিকে গাড়ী চালাইতে হুকুম দিলেন।
যথাসময়ে গাড়ী বোবাজার ঈটের
নং বাড়ীতে
আসিয়া লাগিল। মধুসূদন বাবু,
দেখিলেন, বাড়ীর দরজা
খােলা, দরজায় কেহ নাই। তিনি হরিদাসী ও ঋীকে
মােহিনী
গাড়ীতে রাখিয়া কোনওরূপ সাড়া না দিয়া বরাবর
উপরে উঠিয়া গেলেন। গৃহস্থ-বাড়ীতে নীচে হইতে
‘ঋী, ঋী বা হাল-ফ্যাশানে বেয়ারা, বেয়ারা’ বলিয়া
চীৎকার করিতে হয়, অথবা ‘কে আছেন বাড়ীতে
বলিয়া টেক্স-দাবােগার মত ‘আকাশে’ প্রশ্ন করিতে হয়,
সভ্যতার এসব নিয়ম-কানুন জানিলেও, এক্ষেত্রে
তিনি একটু ডিটেকটিভ-গিরির লােভ সংবরণ করিতে
পারিলেন না।
উপরে উঠিয়াই তিনি যে দৃশ্য দেখিলেন, তাহাতে তিনি
হাসিবেন কি কাঁদিবেন, কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না।
তিনি দেখিলেন, মেসের বাড়ীর একটি অপরিষ্কার ঘরে
দুইথান কেওরা-কাঠের তক্তাপােষ ঘুড়িয়া একখানি
তেলচিটে শতরঞ্চ পাতা, তাহার উপর বসিয়া মােহনচন্দ্র ও
আর তিনটি যুবক তাস পিটিতেছে, প্রত্যেকের পাশে
একজন করিয়া তন্ত্রধারক ; কেহ বিড়ি, কেহ সিগারেট
টানিতেছে, কেহ বা নস্য লইতেছে, আবার কেহ বা ডাব
হুকায় তামাক খাইতেছে ; আর এক দিকে বায়া, তবলা,
বেহালা, ফুট, হারমােনিয়া প্রভৃতি রহিয়াছে, বােধ হয়
দুই এক বাজি উঠিলেই সঙ্গীতচর্চা আরম্ভ হইবে, অথবা
মােহিনী
সঙ্গীত-সুধা-পানের পর যুবকগণ খেলায় মাতিয়াছে। ইহার
ভিতর ‘মােহিনী কোথায়, তিনি কিছুই ঠাহর করিতে
পারিলেন না। এই সময়ে মােহনচন্দ্র হঠাৎ মুখ তুলিয়া
চাহিয়া দেখিলেন, সম্মুখে মধুসূদন বাবু।
মধুসূদন বাবু। তিনি কি
প্রয়ােজনে এখানে উপস্থিত, ঠিকানাই বা জানিলেন কি
প্রকারে, মােহনচন্দ্র ইহার বিন্দুবিসর্গও বুঝিতে না পারিয়া
ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিলেন। মেসের সকলেও
এই অপরিচিত ব্যক্তির অতর্কিত আগমনে অবাক।
যাহা হউক মধুসূদন বাবু পুলিশের লােক, সহজে
মিবার পাত্র নহেন। কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হইয়া তিনি
হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মােহন ভায়া, ইহার
মধ্যে তােমার মােহিনী কে?” মােহন এই প্রশ্নে
একটু বিস্মিত হইয়া পার্শ্বোপবিষ্ট তন্ত্রধারককে দেখাইয়া
দিলেন। মধুসূদন বাবু অপরিচিতকে উদ্দেশ করিয়া
বলিলেন, “মশায়, মােহিনী বাবু বলিনি সেজন্যে মাফ
করবেন। আপনি বােধ হয় ‘বাবু’ নন, ‘বাবু’ আপনাদের
মধ্যে কেউ আছেন কি ?” মােহিনী ভালমানুষ, একথায়
অপমান-বােধ না করিয়া আস্তে আস্তে বলিল, “আজ্ঞে,
ঠিকই বলেছেন, আমরা সব ভাই ভাই, আমাদের মধ্যে
মােহিনী বাবু টাবু কেউ নেই, আমাদের মেসের ম্যানেজার বাবুকেই কেবল আমরা ঐ নামে ডাকি। তিনি রাশভারী লােক, ‘বাবু’ না বললে রাগ করেন। কিছু মনে করবেন , তিনি আজ গরহাজির বলেই আমরা আজ এত স্থ বিতে আছি যে, আপনার আসা লক্ষ্য করিনি। মধুসূদন বাবু, এখন ব্যাপারটা বুঝিলেন। তিনি মােহিনীর সহিত আর উত্তর-প্রত্যুত্তর না করিয়া মােহন চন্দ্রকে বলিলেন, “ভায়া, আমার সঙ্গে এক যেতে হবে- বড় জরুরী কাম। এখনকার মত তােমার বন্ধুদের কাছে বিদায় নিয়ে উঠে পড়।” মােহন চন্দ্র এই জরুরী তলব ঝাড়িঃ ফেলা অসম্ভব বুঝিয়া শুষ্কমুখে চিন্তাকুল-মনে বাল্যবন্ধু মােহিনী ও অপর সকলকে মধুসূদন বাবুর সংক্ষেপে পরিচয় দিয় তাহাদিগের কাছ হইতে বিদায় লইলেন। মধুসূদন বাবু, নীচে আসিয়া মােহনচন্দ্রকে গাড়ীর দরজা খুলিয়া যে দৃশ্য দেখাই- লেন, তাহাতে মােহনচন্দ্র একেবারে চমকাইয়া উঠিলেন। পাছে হরিদাসী উটা বুঝিয়া বসে, এই আশঙ্কায় মধুসূদন বাবু সময়ােচিত পরিহাস করিয়া অনুচ্চস্বরে বলিলেন, “ওগাে মানময়ি রাধে, এই নাও তােমার পলাতক আসামী। মােহিনী তােমার প্রেমের প্রতিদ্বন্দিনী
মােহিনী
চন্দ্রাবলী নয়,
একজন গােঁফদাড়ীওয়ালা পুরুষ-মানুষ।
বিশ্বাস না হয়, চল ওপরে গিয়ে সরেজমিনে তদারক করবে
এস।” হরিদাসী এই কথা শুনিয়া লজ্জায় অধােবদন
যে গম্ভীর-প্রকৃতি ‘বড় জামাই বাবু তাহার দিদির
সঙ্গেও কোন দিন রসিকতা করেন না, তিনি তাহাকে লইয়া
এমন কষ্টিনষ্টি করিলেন, ইহাতে তাহার বড় লক্ত হইল।
তাহার উপর স্বামীকে অন্যায় সন্দেহ করাতে তাহার লজ্জা
আরও দশ গুণ বৃদ্ধি পাইল। অনুতাপে তাহার হৃদয় ভরিয়া
গেল। মােহনচু এতক্ষণে ব্যাপারটা একপ্রকার বুঝিলেন,
যেটুকু বাকী ছিল--মধুসূদন বাবু, ডায়েরি ও চিঠির প্রসঙ্গ
তুলিয়া দু’ কথায় তাহা বুঝাইয়া দিলেন। মােহন পন্নীর
অবস্থা ভাবিয়া অপ্রস্তুত হইলেন ; সুতরাং উভয়েই নীরব,
আড়ষ্ট-হেঁটমুখ।
এসময়ে একজন তৃতীয় পক্ষের অবস্থান প্রেমিক-যুগলের
মহাবিপ্ন, ইহা বুঝিয়া উপস্থিত বুদ্ধি মধুসূদন বাবু, “আমার
এখন অন্য কার্য আছে, ভায়া তােমরা যুগলে ঘরে যাও”
বলিয়া শাড়ীর দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া কোচওয়ানকে গাড়ী
ফিরাইতে ইঙ্গিত করিয়া ধীরপদবিক্ষেপে বিপরীত দিকে
প্রস্থান করিলেন।
প্রজাপতির নির্বন্ধ
বা
এক লাঠিতে দুই সাপ
রদ্ধার স্বপ্ন
রামধন চক্রবর্তীর বালিকা কন্যা টেপু ভােরবেলায়
গ্রামের পুকুর-ঘাটে গিয়া কাথা কাচিতেছে। তাহার তিন
বৎসরের ভাইটী প্রায় এক বৎসর জ্বর ও পেটের ব্যারামে
ভুগিতেছে, তিন মাস হইতে এতই দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে
যে, একেবারে শয্যাধরা হইয়াছে, বিছানায়ই মলমূত্র ত্যাগ
করে ; দিনের মধ্যে অনেক বারই বিছানা বদলাইতে
হয়। রােগা ছেলে, তাহাতে আবার কোলের ছেলে, মা-
ছাড়া হইলেই কাঁদিয়া অস্থির হয়। সুতরাং মা ছেলেকে
ফেলিয়া এক পাও নড়িতে পারেন না, আট বছরের মেয়ে
প্রজাপতির নির্বন্ধ
।
টেপুকেই ঘাটে কথা মাদুর ন্যাকরা কানি কাচিতে
যাইতে হয়।
টেপুর নামকরণের সময় ত্রিপুরাসুন্দরী কি এপাশীল।
কি এইরূপ একটা কোন জাকাল নাম রাখা হইয়াছিল
কিনা জানি না। কিন্তু গ্রামের লােকে টেপী বা টেপা বলিয়া
ডাকে, মা বাপে আদর করিয়া বলেন, টেপু, খেলার সাথীরা
বলিত টেপারী। হয়ত ইহা ছাড়া তাহার কমলা বা উষা,
বা আর কোন ভাল নাম ছিল। কিন্তু সে নাম কেহ
আমলে আনিত না। কলিকাতায় দেখা যায়, ঘরে অনেকে
আটহাতী ঠেটী পরিয়া থাকেন, বাহিরে যাইবার সময়
ফরাসডাঙ্গার ধুতি পরিয়া লম্বা কেঁাচা ঝুলাইয়া বাহার
দেন। নামেরও সেইরূপ আটপৌরে পােফকী আছে।
সেকালে ছিল ডাকনাম ও রাশনাম। একালে হইয়াছে
আটপৌরে নাম ও পােষাকী নাম। যাহাই হউক, টেপু
নাম শুনিয়া কেহ ভাবিবেন না যে, মেয়েটি নিতান্ত কুরূপা।
যেমন কাণা ছেলের নাম পদ্মলােচন হইতে আটক নাই,
তেমনই অনেক গৌরবর্ণ সুপুরুষের নাম কালী, কৃষ্ণ, ও
ভূতনাথ হইতে দেখা যায়। মেয়ের নামের বেলায়ও সেই
কথা। বাস্তবিক টেপুর মত সুন্দরী, সে গ্রামে কেন, সে
মােহিনী
অঞ্চলে অতি অল্পই ছিল। অমন দুধে-আলতা রং, অমন
টানা টানা পটোলচেরা চোখ, অমন তুলি দিয়ে চিত্র করা
ভুরু, অমন বাশীর মত নাক, অমন নবদ্বীপের কুমারের হাতে-
গড়া ভগবতী-প্রতিমার মত মুখ, অমন গােল গােল নরম
নরম হাত পা, দেখিলেই মনে হইত যেন দেবকন্যা। টেপুকে
দেখিলে, “অষ্টবর্য। ভবেগৌরী’ এই বচনটি সার্থক বলিয়া
মনে হইত। মার ঘরে এমন সুলক্ষণা মেয়ে, তা’র ঘরে যে
ব্যারাম পীড়া আপদ বালাই আসে ইহাই আশ্চর্য্য।
এত ভােরে ঘটে কেহ আসে নাই। টেপু ঐটুকু মেয়ে,
কিন্তু তাহাকে সংসারের অনেক কাষই করিতে হয়।
সর্বদাই রােগা ছেলে লইয়া ব্যস্ত, তার নিজের শরীর ও ভাল
নহে, ঘরে আর কেহ নাই, কাযেই ভাের ভাের থাকিতে
ঘাটে আসিয়া কাথা মাদুর কাচিয়া না গেলে টেপু সারাদিন
কাযের উলকূল পায় না। আর ময়লা কাথা নেকড়া
বেলায় কাচিলে গ্রামের আর দশজনের কাছে অনেক
গালাগালি খাইতে হয়। টেপু বসিয়া এক এক খানি
কথা ও ন্যাকড়া কাচিয়া নিঙ্গরাইয়া ঘাটের ধারে একখানি
ছােট পিঁড়ের উপর রাখিতেছে, আবার আর একখানি
লইয়া কাচিতেছে। তাহার কায শেষ হইয়া আসিয়াছে,
১৭ প্রজাপতির নিবন্ধ ; • এমন সময় আশুর মা ঘাটে আসিলেন। আশুর মার কন্যা- কালে কি নাম ছিল তাহা আমরা কেন, গ্রামের কোন লােকই জানে না। গ্রাম্য প্রথানুসারে, সস্তানের নাম- করণের সঙ্গে সঙ্গে তাহার ও নূতন নামকরণ হইয়াছিল। বিবাহের পর কয়বৎসর তিনি স্বামীর নামে পরিচিত। ছিলেন, পুত্রবতী হইয়া অবধি তাহার পুত্রের নামেই পরিচয়। আশুর মা টেপুকে বড় ভালবাসিতেন ; মেয়েটিকে সুশীলা ও সুরূপা বলিয়া গ্রামের সকল স্ত্রীলােকেই ভাল- বাসিত ; তবে আশুর মার ভালবাসার আর একটু কারণ ছিল, সে কথা এখনই প্রকাশ পাইবে। টেপুকে দেখিয়া আশুর মা বলিলেন “কি মা টেপু, এত ভােরে তুমি ঘাটে এসেছ ? আহা তােমার মার যে কষ্ট, তা না এলেও ত চলে না। নইলে এত কচি মেয়ের কি এই কায ? যা’ হােক মা, আজ সকালে উঠে তাের মুখ দেখলাম, দিনটা আমার ভাল যাবে। শেষ রাত্রে স্বপন দেখিছি মা, আমার আশু বাড়ী এসেছে। হায়! আমার এমন কপাল কি হবে যে আমার হারানিধিকে ফিরে পাব। তা’ মা, শেষ রাতের স্বপন ত ফলে লােকে বলে। আর তাের মুখ দেখলে সুস্বপন ফলতে পারে, তুই যে মা বড় পয়মন্ত মেয়ে।
মােহিনী
১৮
তুই যার ঘরে যাবি, মা লক্ষ্মী তা’র ঘরে অচল হয়ে
থাকবেন। তুই যে মা সাক্ষাৎ লক্ষ্মী ঠাকরুণ। আহা,
মনে মনে কত সাধ ছিল আমার আশুর কল্যাণে যদি ঘরের
লক্ষ্মী বরণ করে তুলতে পারি”--টেপু তাহার স্বাভাবিক
আগ্রহের সহিত বৃদ্ধার দুঃখের কথা শুনিতেছিল, বৃদ্ধার
কথায় তাহার চোখের পাতা ভিজিয়া আসিতেছিল, কিন্তু
আশুর সঙ্গে বিবাহের প্রসঙ্গ উঠিতেই তাহার কেমন লজ্জা
হইল, কোন কথা না বলিয়া সে কাপাসুদ্ধ পিড়ি কাকালে
করিয়া এক ছুটে বাড়ী পলাইয়া গেল। বুদ্ধা এত দুঃখে ও
একটু মুচকি হাসিলেন।
হারানিধি
অনেক সময় স্বপ্ন ফলে। এ ক্ষেত্রেও তাহাই হইল।
ঐ দিন দুপুরবেলা একখানি গরুর গাড়ীতে চড়িয়া শ্রীমান্
আশুতােষ চারি বৎসর পরে নিজগ্রামে ফিরিলেন। শ্রীমান্
নিকটস্থ আর একখানি গ্রামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে পড়িতেন,
টেষ্ট পরীক্ষায় সকল বিষয়ে ফেল হওয়াতে এন্ট্রান্স পরীক্ষা
দিতে পান নাই। তখন তাহার বয়ঃক্রম ( ষাটের কোলে ।
প্রায় কুড়ি বৎসর। সঙ্গীদিগের বিজপে মৰ্ম্মাহত হইয়া
প্রজাপতির নিবন্ধ
আশুতােষ একদিন কাহাকেও কিছু না বলিয়া গ্রাম ছাড়িয়া
পলায়ন করিলেন। অনেক অনুসন্ধানেও তাহার কোন
সংবাদ পাওয়া গেল না। তাহার বিধবা মাতার মনে যে
কি কষ্ট হইল, তাহা বােধ হয় আর কাহাকেও বুঝাইতে
হইবে না। বিধবার একমাত্র সম্বল ঐ পুত্রটী ।
মায়ের প্রাণ সহজে পুত্রের অমঙ্গলের কথা হামরাইতে চাহে
, সেই জন্য পুত্র আত্মহত্যা করিয়াছে বা কোথায়
বেঘোরে পড়িয়া মারা গিয়াছে, এরূপ চিন্তা মনে স্থান না
দিয়া আশুতােষের মাতা ভাবিলেন তাহার বাছা বিবাগী
হইয়া গিয়া সন্ন্যাসী হইয়াছে। হয়ত বাছার একদিন না
একদিন মায়ের কথা মনে পড়িবে, তখন ফিরিয়া আসিবার
ইচ্ছা হইবে, এই আশায় তিনি বুক বাঁধিলেন।
এতদিনে দুঃখিনী জননীর আশা পূর্ণ হইল। আশুতােষ
সত্য সত্যই দেশে ফিরিলেন। শ্রীমানের মুখে শুনা গেল
যে, তিনি প্রথমে আড়কাটির কুহকে পড়িয়া আসামের
চা-বাগানে কুলি হইয়া চালান যান, পরে চা-বাগানের
সাহেবের নিকট আত্মপরিচয় দেওয়াতে এবং তিনি এন্ট্রান্স
পৰ্যন্ত পড়িয়াছিলেন এই কথা বলতে, সাহেব দয়া করিয়া
তাহাকে ৩০ টাকা বেতনে একটি কেরাণীগিরি দেন এবং
মােহিনী ভালরূপ কাম দেখানতে সাহেব সি হইয়া তাহার বৎসর বৎসর বেতন-বৃদ্ধি করিয়া দেন-এক্ষণে তাহার বেতন ৬০ টাকা। আশুতোেষ নিজের খরচ চালাইয়া এই রি বৎসরে কিছু সঞ্চয় ও করিয়াছিলেন । চাকরীর সুখও বেশ ছিল। কিন্তু হইলে কি হয়, তিনি আসামের নামজাদা কালাজ্বরে ভুগিয়া ভুগিয়া জেরবার হইয়া পড়িয়াছিলেন। চা-বাগানের ডাক্তারের ব্যবস্থায় তাল তাল কুইনিন খাইয়া কিছুই ফল পান নাই । রােগযন্ত্রণায় মাতা ও মাতৃভূমির কথা মনে পড়িয়াছিল। এতদিন মাকে কোন সংবাদ দেন নাই বলিয়া অনুশোচনাও উপস্থিত হইয়াছিল। শেষে তিনমাসের ছুটি লইয়া বাঙ্গালা মুলুকে ফিরিলেন। কলিকাতায় আসিয়া তিনি একটি বিরাট অট্টালিকার গায়ে -“বটিকা”র বিজ্ঞাপন দেখিয়া ও তাহার গুণের কথা দশজনের মুখে শুনিয়া এক কৌটা কিনিলেন এবং এই ঔষধের দোকানে সুগন্ধ তৈলের শিশিগুলি সুন্দর সাজান রহিয়াছে দেখিয়া তাহাও একটি কিনিলেন। কলিকাতায় যে দুই চারিদিন থাকিলেন, সেই কয়দিন ঔষধ-সেবনেই বেশ ফল বুঝিতে পারিলেন। রােজ বৈকালে একটু ঘুস- ঘুসে জ্বর হইত, মাথা ধরিত, গা হাত পা জ্বালা করিত,
প্রজাপতির নির্বন্ধ
এই কয়দিনে সে সব লক্ষণের উপশম হইল। তিনি
তাহার পর দেশে রওয়ানা হইলেন।
হারানিধি পাইয়া আশুতােষের মাতার যে কত আনন্দ
তাহা আর কি বলিব ? তিনি কখন হাসিতেছেন, কখন
কাদিতেছেন, কখন পুত্রকে তিরস্কার করিতেছেন, কখন
আদর করিতেছেন, কখন গায়ে হাত বুলাইয়া দিতেছেন,
কখন বাতাস করিতেছেন। তাহার পর তাড়াতাড়ি পাঁচ
ব্যঞ্জন ভাত রাঁধিয়া পুত্রকে খাওয়াইলেন। মাতা ও পুত্র
উভয়ের তৃপ্তি হইল। সংবাদ পাইয়া গ্রামের সকল স্ত্রী-পুরুষ
নিধিকে দেখিতে আসিল। আশুতোষ সকলকে
যথাযোগ্য অভিবাদন করিয়া মিষ্টালাপ করিতে লাগিলেন।
বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা তাহার ব্যবহারের জন্য অনুযােগ করিলেন ;
সমবয়স্ক সঙ্গীরা পূৰ্ব্বকথা স্মরণ করিয়া প্রথম প্রথম তাঁহার
সহিত আলাপ করিতে একটু লজ্জাবােধ করিল, তাহার পর
সকলে বেশ প্রাণ খুলিয়া আমােদ আজাদ করিতে লাগিল।
গ্রামের সকলেই আশুতােষকে দেখিতে আসিয়াছিল ।
কেবল টেপুর মা-বাপ রােগী শিশুকে লইয়া ব্যস্ত থাকায়
আসিবার অবকাশ পান নাই। বৈকালে আশুতোেষ যখন
বেড়াইতে বাহির হইলেন, তখন তাহার মাতা তাহাকে
মােহিনী
বলিলেন,-“বাবা, টেপুকে তােমার মনে পড়ে ? সেই
ছােট ফুটফুটে দুধের মেয়েটি। তুমি প্রায়ই কোলে করে
বাড়ী আনতে আর বলতে যে মা, দেখ কেমন টুকটুকে
মেয়েটি, আহা আমার যদি এমনি একটি বােন থাকত।
ত’ বাবা এখন সে ষাটের একটু বড়সড় হয়েছে। তাদের
বড় বিপদ ! তুমি দেশ ছাড়বার পর তার একটি ছােট
ভাই হয়েছে, সেটি কিছুদিন হতে জ্বর আর পেটের ব্যারামে
ভুগছে, বাচবার আশা নাই। যাও অনেক দিন পরে
এলে, একবার তাদের তত্ত্ব নাওগে। চক্রবর্তী মশায় মাটির
মানুষ।” বলা বাহুল্য আশুতােষ ফিরিয়া আসাতে এবং
তাহার ভাল বেতনে চাকরী হওয়াতে তাহার মাতার মনে
টেপুর সঙ্গে তাহার বিবাহ দেওয়ার আশা আবার
জাগিয়াছে। তাই তিনি একটু বুদ্ধি করিয়া আশুতােষকে
তাহাদের বাড়ী আপ্যায়িত করিতে পাঠাইলেন।
আশুতােষেরও অবশ্য টেপুর কথা বেশ মনে ছিল।
তিনি বলিলেন, “মা, আমি আমার পুরাতন জ্বরের জন্য
কলিকাতা হইতে যে ওষুধ এনেছি সেটাতে ত ছেলেটির
উপকার হতে পারে।” আশুতােষের মা বলিলেন “তা,
বেশ ত ওষুধটা সঙ্গে নিয়ে যাও না। আমাদের পাড়াগঁয়ে
প্রজাপতির নিবন্ধ
ত ভাল ওষুধ পাওয়া যায় না। এ ওষুধে যদি উপকার হয়
তবে ত ছেলেটি এযাত্রা রক্ষে পায়।” আশুতােষ তাহাই
করিলেন।
চক্রবর্ত্তী মহাশয়ের সঙ্গে দেখাশুনা করিয়া
কয়েক টি বটিকা তঁাহাকে দিয়া আসিলেন। এবং রােজ
সকালে বিকালে গিয়া রােগীর অবস্থা দেখিতে লাগিলেন।
৫/৭ দিনের মধ্যেই বেশ উপকার বুঝা গেল, জ্বর অনেক সময়
থাকে না (পূৰ্বে চব্বিশঘণ্টাই লাগিয়া থাকিত ), অন্যান্য
উপসর্গের হ্রাস হইল, পেটের পীড়া নির্দোষ হইয়া সারিয়া
গেল। পনর দিনে শিশু খাড়া হইয়া উঠিল। চক্রবত্তী
কৰ্ত্তা-গৃহিণীর আল্লদের আর সীমা থাকিল না।
তাহারা আশুতােসকে সাক্ষাৎ দেবতা-জ্ঞানে আদর
করিলেন।
বিবাহ ও ফুলশয্যা
চক্রবর্তীর ছেলেটি বেশ সারিয়া উঠিল। এদিকে আশুর
মা চুপ করিয়া না থাকিয়া টেপুর সঙ্গে তাহার যাহাতে
বিবাহ হয় তলায় তলায় সেই চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
বরের মা হইয়া নিজে প্রস্তাব করিলে খাট হইতে হইবে এই
ভাবিয়া কয়েকজন প্রতিবাসিনী দ্বারা কথাটা টেপুর মার
মােহিনী
কাণে তুলিলেন। লােকে কন্যার বর খুজিতে হয়রান হয়,
আর টেপুর বেলায় আপনি সম্বন্ধ উপস্থিত হইল, ইহাতে
চক্রবর্ত্তী মহাশয় ও
তাহার পত্নী খুব খুসী হইলেন।
আর আশুতােষও যােগ্যপা, চাকুরী করিতেছে, তাহার
উপর সম্প্রতি শিশুটির প্রাণরক্ষা করিয়াছে, সেজন্য তাহারা
তাহার উপর খুবই রাজী। তাহা ছাড়া মেয়েটিকে
দূরদেশে
শ্বশুরবাড়ী পাঠাইতে হইবে না, কাছে-কাছেই থাকিবে,
অপরন্তু চক্রবর্ত্তী মহাশয় গৌরীদানের ফল পাইবেন
বলিয়া তাহার খুব আহাদ। টেপুর মার আরও
আলাদ। তাহারা প্রস্তাব শুনিয়া কৃতার্থ হইলেন।
সত্বরই কথার একটা পাকাপাকি হইয়া গেল। আশু-
তােষের মাতা এমন সুলক্ষণা সুন্দরী বধূ ঘরে আনিবেন
এই আহলাদে কন্যাকৰ্ত্তার নিকট নগ্ন শ পঞ্চাশ চাহিয়া
বসিলেন না। চক্রবর্তী মহাশয় সাধ্যমত যাহা দিতে পারেন,
আশুর মা তাহাতেই সন্তুষ্ট ; তিনি বলিলেন “ছেলেই
আমার কত টাকা রােজগার করে। তার আবার পয়সার
ভাবনা কি ? আর মেয়ে বেচার মত আমি ত আর ছেলে
বিক্রী করতে বসিনি।” বড় আশ্চর্যের কথা। আশুর মা যদি
বর্তমান কালের শিক্ষিত শ্রেণীর লােক হইতেন তাহা হইলে
প্রজাপতির নির্বন্ধ
তিনি নিশ্চয় পুত্রের ওজনে সােণা রূপা হীরা জহরৎ লইবার
কেট ধরিতেন।
বিবাহের কথাবার্তা চলিতেছে এ সংবাদে আশুতােষের
মনের ভাব কিরূপ হইল ? আসামের চা-বাগানে চারি বৎসর
ধরিয়া কেবল কুলীরমণীদিগের রূপরাশি দেখিয়া দেখিয়া
তাহার রমণীতে অরুচি জন্মিয়াছিল, দেশে টেপুর নিটোল
গঠন টুকুটুকে রং ও সুন্দর চোখ মুখ দেখিয়া তাহার চক্ষু
জুড়াইয়াছিল। আসিয়া অবধি রােজ টেপুদের বাড়ী যাতায়াত
করিতে করিতে টেপুকে তাঁহার খুব মনে ধরিয়াছিল। তাহার
মা যদি এ বিষয়ে উদ্যােগী না হইতেন তাহা হইলে বােধ হয়
নিজেই বিবাহের ঘটকালী করিতে প্রবৃত্ত হইতেন এবং চক্রবর্তী
মহাশয় সম্মত না হইলে শ্রীমান্ আবার দেশত্যাগী হইতেন।
আর আট বছরের মেয়ে টেপু-তাহার কিরূপ মনের
ভাব হইল ? বিবাহ কি পদার্থ তাহা সে ভাল বুঝে না,
তবে বিবাহের কথায় কেমন একটা লজ্জা আসিয়া পড়ে,
অথচ মনে মনে কেমন একটু উল্লাসও হয়, তাহার মনের
এ উভয় অবস্থাই হইয়াছিল। বিবাহ হইলে খেলার সঙ্গী
দিগকে ছাড়িয়া মা বাপ ভাই বন্ধুকে ছাড়িয়া দূরদেশে
‘বনবাসে’ যাইতে হইবে না ইহাতে টেপুর খুব আহলাদ।
মােহিনী,
তবে সে সঙ্গিনীদিগের কাছে ‘পাশকরা বর’ ‘পাশকরা বর’
একটা কথা শুনিত, এখনকার মেয়েরা ত আর সাধ করে
‘রামের মত পতি পাব’ কি ‘শিবের মত বর পাব’ ;
তাই আশুতােষ পাশকরা নহেন বলিয়া বালিকার মন যেন
একটু ক্ষু, একটু অপ্রসন্ন ।
যাহা হউক শুভদিনে শুভক্ষণে শুভবিবাহ সুসম্পন্ন হইল।
চক্রবর্তী মহাশয় যথাশক্তি গ্রামের দশজনকে ফলাহার
করাইলেন। আশুর মা বৌ-বেটা বরণ করিয়া ঘরে
তুলিলেন ও ঘটা করিয়া বৌভাত দিলেন।
আজ ফুলশয্যার রাত্রি। একবার চতুর্বিংশতি-বর্ষীয় বর
ও অষ্টবর্ষা বধূর আলাপটা আড়ি পাতিয়া শুনিলে হয় না?
বর। টেপু, ও টেপু, ছেলেবেলাকার কথা মনে পড়ে ?
সেই তুমি কারও হাতে দুধ খেতে না। কিন্তু আমি
তােমাদের বাড়ী গেলেই আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে
ও আমি কোলে করে দুধের বাটী মুখে ধরলে চো চো
করে খেয়ে ফেলতে। এখন তেমন করে দুধের বাটী ধরলে
চুমুক দেবে ত?”
টেপু ফিক্ করিয়া হাসিয়া ফেলিল, অনেক চেষ্টায়ও
হাসি চাপিতে পারিল না। এবার আশু বলিল, “আচ্ছা
২৭
প্রজাপতির নির্বন্ধ
তােমাকে দুধের বাটীতে চুমুক দিতে হবে না, তার চেয়ে
একটা সােজা কাম করলেই চলবে।” এই বলিয়া আশু-
তােষের মনে একটা খেয়াল চাপিল। সেই যে কলিকাতা
হইতে একশিশি গন্ধতৈল আনিয়াছে, সে আর কখন কোন
কামে লাগিবে ? এই মনে ভাবিয়া আশু আস্তে আস্তে
বিছানা হইতে উঠিয়া কুলুঙ্গী হইতে শিশিটা নামাইয়া লইয়া
একটু তৈল টেপুর ঘােমটা সরাইয়া কাল কাল কোচকান
কোচকান চুলগুলিতে লাগাইয়া দিল। সুগন্ধে ঘর
আমােদিত হইল। ফুলশয্যায় বিছান ফুলের সুঘ্রাণও তাহার
কাছে হারি মানিল। টেপু বালিকাসুলভ কৌতূহলের
সহিত শুধাইল-ছি ছি! বিয়ের কনে ফুলশয্যায় কথা
কহিয়া ফেলিল-“ও কি ?” আশু বলিল “কলকাতা হতে
এই তেল এনেছি, সরেস তেল, তাই তােমার লক্ষ টাকার
মূল’ খোঁপায় একটু মাখিয়ে দিয়ে হাত শুদ্ধ, করলাম।”
টেপু আর কিছু বলিল না। মাথা ঠাণ্ডা হওয়াতে
শীঘ্রই ঘুমাইয়া পড়িল।
ঘুমের ঘােরে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিল। সে সবিস্ময়ে
দেখিল, যেন এক শ্বেতশ্মশ্রু দিব্য-পুরুষ তাহার শিয়রে
দাড়াইয়া, পরিধানে পট্টবাস,—তিনি বলিতেছিলেন, “অয়ি
০
মােহিনী ২৮ বালিকে, আমি প্রজাপতি। যে প্রজাপতি গায়ে বসিলে তােমরা পরস্পরকে উপহাস কর যে শীঘ্রই বিবাহের ফুল ফুটিবে, আমি সে প্রজাপতি নহি। আমি প্রজাপতি ব্রহ্মা, আমারই নিৰ্বন্ধে শ্রীমান্ আশুতােষের সঙ্গে তােমার শুভ- বিবাহ সংঘটিত হইয়াছে। তুমি পাশকরা বর পাও নাই বলিয়া মনে দুঃখ করিয়াছ, তাই তােমাকে অভয় দিতে আসিয়াছি। পাশে কি ফল ? তােমার স্বামী যে রাজ- গার করিতেছে, তাহা বি-এ পাশ করার ভাগ্যেও যােটে ! তবু যদি তােমার পাশের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে তাহার উপায় বলিয়া দিতেছি। যে তৈল তােমার বর তােমার চুলে মাখাইয়া দিয়াছেন তাহাকে তাহাই নিয়মিত ব্যবহার করিতে বলিবে। তাহাতে তাহার মেধাবৃদ্ধি হইবে, স্মৃতিশক্তি প্রখর হইবে, বুদ্ধিবৃত্তি মার্জিত হইবে, তিনি অনায়াসে আগামী বৎসরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিবেন। আমারই ইচ্ছায়-ঘটিকা দ্বারা তােমার ভ্রাতার প্রাণরক্ষা হইয়াছে ও তােমাদের বিবাহের পথ প্রস্তুত হইয়াছে। এই তৈলেও অভিপ্রেত ফল পাইবে। ইহাও আমার ইচ্ছাধীন।” এই বলিয়া প্রজাপতি ঠাকুর অন্তর্ধান হইলেন। বালিকারও চটকা ভাঙ্গিয়া গেল।
প্রজাপতির নির্বন্ধ টেপুর হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে আশুতোষ জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি! অমন করে উঠলে যে? ক্ষিদে পেয়েছে কি ? একটু দুধ গরম করে আনব কি ?” টেপু বলিল, —“বাও!” তাহার পর তাহার পর অনেক সাধ্যসাধনার পর আশুতােষ ভিতরের কথা জানিয়া লইলেন। স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনিয়া আশুতােষ একটু লজ্জিত হইলেন, টেপুর মনের অভিলাষটা কি তাহার বেশ একটু আঁচ পাইলেন। যাহা হউক সুখের রাত্রি যথাসময়ে প্রভাত হইল। শেৱক্ষা [ শুভ বিবাহেই নভেল শেষ হয়। কিন্তু যে দেশে ‘বাল্যবিবাহ প্রচলিত, সে দেশে গল্পটি ঘােরালাে করিতে হইলে বিবাহের পরবর্তী জীবন কতকটা চিত্রিত না করিলে উপায় নাই।] পরদিন আশুতোেষ ভিন্ন গ্রামের স্কুলের হেড মাষ্টার মহাশয়ের নিকট গেলেন, তখনও ভর্তির সময় অতিবাহিত হয় নাই, তিনি যথারীতি স্কুলে ভর্তি হইলেন ও ‘কেঁচে গণ্ডুষ’ করিলেন। কেহ বা তাহার অধ্যবসায়ের প্রশংসা করিল, কেহ বা টিটকারী দিল। আশুতােষ নবদ্বার-
মােহিনী
নিষিদ্ধবৃত্তি হইয়া অধ্যয়নে রত হইলেন। এবং যথাসময়ে
টেষ্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাদানের
অনুমতি পাইলেন। পরিশ্রমের ফলেই হউক, পরিণত
বয়সের প্রভাবেই হউক, সেই তৈলের গুণেই হউক, অথবা
ম্যাটি কিউলেশন পরীক্ষায় কল্যাণেই হউক, আশুতােষ
এবার প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হইলেন। টেপু পাশ-করা
বর পাইয়া কৃতার্থ হইল, আমরাও তাহার সুখে সুখী।
*
এক সময়ে গন্ধতৈলের বিজ্ঞাপন-হিসাবে গল্প-রচনার এক
একটা ধূম পড়িয়াছিল, এজন্য পুরস্কার-ঘােষণাও হইত। এখনও এই
তরঙ্গ একেবারে যায় নাই। এই শ্রেণীর রচনার উপর বিদ্রুপ করিবার
জন্য বর্তমান গল্পটি লিখিত হইয়াছিল। পাঠকবর্গ এই ভাবে গল্পটি
বুঝিলেই শ্রম সার্থক বিবেচনা করিব।
ফলিত জ্যোতিষ গণনা প্রতি রবিবারে ও অন্যান্য ছুটির দিনে ভােরবেলা হইতে বেলা দুপুর পর্যন্ত জ্যোতিষ বাবুর ‘বৈঠকখানা-ঘরে’ বিষম ভিড় হয়। সে ভিড় গীতবাদ্যের বা তামপাশার আকর্ষণে জমায়েত হয় না। বাবুটি আফিসের বড় বাবু নহেন, তথাপি তাহার কাছে এত লােক-সমাগম হয় কেন ? এইরূপ প্রচার যে, তিনি করকোষ্ঠী বিচারে অদ্বিতীয় ; এবং সে জন্য রজত-দক্ষিণা গ্রহণ করেন না ; কেবল পরােপ- কারের জন্যই এত শ্রম স্বীকার করেন। এমন বে-খরচায় ভবিষ্যৎ জানিতে পারিলে কাহার না সে বিষয়ে কৌতূহল হয় ? এ অবস্থায় কেন এত লােকে তাহার দ্বারস্থ হয় এবং তাহার নিমতলস্থ অপ্রশস্ত বৈঠকখানা-ঘরে’ কেওড়া- ;
মােহিনী
কাঠের ছারপােকা-সমাকুল তক্তপােষের উপর বিছান
ধূলিধূসরিত, স্থান স্থানে ছিন্ন, লাল-কাল প্রভৃতি নানাবর্ণের
মসীরঞ্জিত শতরঞ্চে ঠেসাঠেসি করিয়া বসিয়া থাকে, তাহা
সহজেই অনুমেয়। কাহার কবে চাকরী হইবে, কাহার
কবে বেতন বৃদ্ধি হইবে, কাহার কবে অবস্থার উন্নতি হইবে,
কাহার কবে পুত্রলাভ বা স্ত্রীবিয়ােগ হইবে, কাহার করে
বড় ঘরে পুত্রকন্যার বিবাহ হইবে ইত্যাদি বিষয়ে তিনি
বষমাস কেন, দিন ঘটা মিনিট পর্যন্ত ঠিকঠাক গণিয়া
বলেন, আর সে সব কথা হুবহু ফলিয়া বা মিলিয়া যায়
বলিয়া তাহার ভক্তমহলে খুব একটা নামডাক ছিল।
একদিন বেলা ১টার সময় মােটরবিহারী একজন
সুশ্রী ও সুবেশ যুবক একটি সহচর-সঙ্গে জ্যোতিষীর দরবারে
আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সঙ্গীটি নাছােড়বান্দা,
জ্যোতিষীর অশেষ গুণগান করিয়া যুবককে
এখানে
আসিতে সম্মত করাইয়াছেন। যুবকটি ধনী, মানী, বিজ্ঞান ও
সচ্চরিত্র, নাম রমণীমােহন; পিতা, পিতৃব্য, মাতুল
প্রভৃতি অবিভাবক-অভাবেও অসৎসঙ্গ করেন নাই, কোনও
রূপ বদখেয়াল নাই, পরন্তু সুখ্যাতির সহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের
পরীক্ষাসাগর উত্তীর্ণ হইয়া দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীর এম এ
ফলিত জ্যোতিষ উপাধিভূষিত হইয়াছেন এবং আপাততঃ আইন অধ্যয়ন করিতেছেন। সম্প্রতি একটি রূপবতী গুণবতী ধনিকন্যার সহিত তাহার বিবাহ-সম্বন্ধ হইয়াছে। কন্যাটি ধনী পিতার একমাত্র সন্তান। সুতরাং একক্ষেত্রেই কামিনী ও কাঞ্চন- লাভ ঘটিবে। বর স্বয়ং কন্যা দেখিয়া পছন্দ করিয়াছেন ( ইহাই হইল হাল-আইনের শুভদৃষ্টি—অর্থাৎ ভােগের আগে প্রসাদ বা বােধনের আগে দেবীবরণ) এবং মধুময় পরি- ণয়ের জন্য উন্মুখ হইয়া দিন গণিতেছেন। ভাবী জীবনে দাম্পত্যসুখে কিরূপ সুখী হইবেন, বােধ হয়, তাহা জানি- বার প্রচ্ছন্ন কৌতূহল তাহার জ্যোতিষীর নিকট আসিতে সম্মত হইবার মূলে ছিল। সূর্যোদয় হইতেই করকোষ্ঠী দেখা চলিতেছিল। লােক- সমাগম বেলাবৃদ্ধির সঙ্গে বাড়িতেছিল বই কমিতেছিল না। ঠিক যেন রেল-গাড়ীর থার্ড ক্লাস। যাহা হউক, যাহাদের ভাগ্যপরীক্ষা হইয়া গিয়াছিল অথচ অপরের সম্বন্ধে মন্তব্য শুনিবার লােভে স্থানত্যাগের বড় ইচ্ছা ছিল না, বিশিষ্ট ভদ্রলােক দেখিয়া তাহারা অনেকে উঠিয়া দাড়াইল, অপর সকলেও যথাসম্ভব সরিয়া সরিয়া বসিল, কষ্টেসৃষ্টে আগন্তুক- দ্বয়ের জন্য শতরঞ্চের এক কোণে একটু স্থান হইল। গণৎ- মােহিনী ৩৪ কার আফিসে কি বেশে বাহির হয়েন, জানি না, তবে এক্ষেত্রে ত তাহার পরনে পট্টবস্তু, গলায় রুদ্রাক্ষালা, কপালে দীর্ঘ ত্রিপুণ্ডুক, মস্তকে জটাক্ত অথচ সুবিন্যস্ত কেশ ; চেহারাটিও দর্শনধারী বটে । আরও যে কয়েকজন ‘তীর্থের কাকের মত প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, জ্যোতিষী একটু চটপট তাহাদিগের কাৰ্য্য সমাধা করিয়া এই সুবেশ ভদ্রলােকটির দিকে ঝুকিলেন। তাহাকে দক্ষিণ করতল প্রসারিত করিতে বলিয়া নিজের দক্ষিণ হস্তে তাহা তুলিয়া লইলেন এবং অনেকক্ষণ নিবিষ্টচিত্তে তৎপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাহার মুখের ভাব যেন কেমনতর হইয়া গেল, তিনি যেন চমকিত হইয়া ধৃত হস্ত ছাড়িয়া দিলেন। পরে একটু সামলাইয়া লইয়া বাম করতল দেখিতে চাহিলেন। বাম করতলে দৃষ্টি বিন্যস্ত করিয়াও তাঁহার পূর্বভাবের ব্যত্যয় হই! না। আশেপাশে উপবিষ্ট ব্যক্তিগণ তাহার ভাবগতিক দেখিয়া তটস্থ হই- লেন। রমণী বাবুও একটা অজ্ঞাত আতঙ্কে আচ্ছন্ন হই- লেন। যাহা হউক, জ্যোতিষীর বহুলোেক লইয়া কারবার করিতে হয়, এরূপ ভড়কাইলে চলে না। কিয়ৎক্ষণ পরে তিনি প্রকৃতিস্থ হইলেন এবং যেন এতক্ষণে করকোষ্ঠী উদ্ধার
ফলিত জ্যোতিষ
করিয়াছেন, এই ভাব দেখাইয়া কতকগুলি বাঁধা বুলি
আওড়াইতে লাগিলেন,—“আপনি দীর্ঘজীবী, নীরােগ,
যশস্বী ও সৰ্বসুখে সুখী হইবেন, রূপবতী গুণবতী পত্নী
লাভ করিবেন, এবং স্ত্রীর সঙ্গে সম্পত্তি লাভ করিবেন।
শীঘ্নই আপনার একজন দূর আত্মীয় বা আত্মীয়ার সম্পত্তিও
আপনার লভ্য হইবে।” এই বলিয়: তাহাকে আপ্যায়িত
করিয়া জ্যোতিষী এক জন নবাগতের দিকে ফিরিলেন ও
তাহার করকোষ্ঠী-বিচারে প্রবৃত্ত হইলেন। রমণী বাবু ও
তাহার সহচর অগত্যা জ্যোতিষীর নিকট বিদায় গ্রহণ
করিলেন।
রমণী বাবু কিন্তু ভিতরে ভিতরে বড়ই উদবিগ্ন হইলেন,
তিনি (বশ বুঝিলেন, জ্যোতিষী কি একটা অশুভ কথা
গােপন করিয়া গেলেন। পথে যাইতে যাইতে সঙ্গীর
সহিত এ বিষয়ে আলােচনা করিতে তাহার প্রবৃত্তি হইল
না। তিনি তাহাকে একটা ছলে বিদায় দিয়া আবার ফিরিয়া
জ্যোতিষীর গৃহাভিমুখে গেলেন এবং একটু তফাতে থাকিয়া
সকলের প্রস্থানের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। সকলে
চলিয়া গেলে তিনি ধীরে ধীরে জ্যোতিষীর সম্মুখীন
হইলেন। জ্যোতিষী তাহাকে আবার আসিতে দেখিয়া
মােহিনী একটু বিচলিত হইলেন। তথাপি সে ভাব গােপন করিয়া হাসিমুখে তাহাকে অভিবাদন করিলেন ও বসিতে বলিলেন। রমণী বাবু বেশী ভূমিকা না করিয়া অনুচ্চস্বরে বলিলেন, “দেখুন, আপনি তখন কি একটা অশুভ কথা আমার কাছে গােপন করিলেন। বােধ হয়, বেশী লােকজন ছিল বলিয়া চাপিয়া গিয়াছেন, এখন নিরিবিলি আমাকে কথাটি বলিতে হইবে।” জ্যোতিষী এড়াইবার অনেক চেষ্টা করিলেন, কিন্তু রমণী বাবু তাঁহাকে এমন করিয়া ধরিয়া বসিলেন (এবং এক শত টাকা পুরস্কারের লােভ দেখাই- লেন) যে, শেষে জ্যোতিষীকে বাধ্য হইয়া গুপ্ত কথা ব্যক্ত করিতে হইল। তিনি আমতা আমতা করিয়া বলিলেন, “আপনার দ্বারা এক জনের প্রাণের হানি হইবে, কররেখা হইতে এইরূপ যেন একটা আভাস পাওয়া যায়। তবে হয় ত আমার বিচারে প্রমাদ ঘটিয়াছে, কেন না, মানুষ অভ্রান্ত নহে, আর আমাদের শাস্ত্রও বড় জটিল অতএব আপনি ইহার জন্য দুশ্চিন্তা করিবেন না। ‘ত্বয়া হৃষীকেশ হৃদি স্থিতেন যথা নিযুক্তোহম্মি তথা কৰােমি এই ঋষিবাক্য স্মরণ করিয়া জীবনযাত্রা নির্বাহ করিবেন।” এই কথার পর রমণী বাবু শুল্কমুখে অবসন্ন-হৃদয়ে প্রস্থান করিলেন।
৩৭ ফলিত জ্যোতিষ ভার। কি কুক্ষণে রমণী বাবু পার্শ্বচরের প্ররােচনায় জ্যোতিষীর গৃহে যাইতে সম্মত হইয়াছিলেন, জ্যোতিষীর মুখে গুপ্ত কথা ব্যক্ত হওয়ার পর হইতে তাহার মনের সুখশান্তি একেবারে নষ্ট হইয়া গেল। তিনি আকাশ-পাতাল ভাবনায় পড়ি- লেন। এই সবেমাত্র সুরূপা ধনিকন্যার সহিত বিবাহ- সম্বন্ধ স্থির হইয়াছে, বিমল প্রণয়ের রঙ্গীন স্বপ্নে তাহার নবীন হৃদয় রাঙ্গিয়া উঠিয়াছে, আর সেই সময়ে এই নিদারুণ অদৃষ্টগণনা। এ যে বিনা-মেঘ বজ্রাঘাত। বিবাহের পরে, যে কোন সময়ে খুনের অপরাধে ধৃত ও দণ্ডিত হইলে তাহার নিজের জীবন ত ব্যর্থ হইবেই, সঙ্গে সঙ্গে সুখের ক্রোড়ে পালিতা প্রিয়তমা পত্নীর জীবন চিরদিনের মত বিষময় হইবে, ধনী মানী শ্বশুরের উচ্চ মাথা হেঁট হইবে, পিতৃকুল শ্বশুরকুল উভয়ই কলঙ্কের কালিমাকীর্ণ হইবে। এ অবস্থায় অন্ততঃ পরের মেয়েকে সারাজীবনের জন্য দুঃখসাগরে না ভাসাইয়া চিরকুমার থাকাই সুবিবেচনার কাৰ্য। অথচ বিবাহের সব ঠিকঠাক হইয়াছে, দিনস্থির পয্যন্ত হইয়া গিয়াছে, এখন কি উপায়েই বা তিনি বিবাহ
মােহিনী
এমন
সম্বন্ধ ভাঙ্গেন, কিছুই কূলকিনারা পাইলেন না। আবার
বিবাহের আশা ত্যাগ করিতেও তাহার মন সায় দেয় না।
সুন্দরীর লােভ দুর্দমনীয়, সুখের স্বপ্ন ভাঙ্গিবার চেষ্টা
অসাধ্য। এই বিষম সমস্যা লইয়া তিনি তিন দিন তিন
রাত্রি আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া দারুণ অশান্তিতে,
অসহ যন্ত্রণায় কাল অতিবাহিত করিলেন।
কেহ অন্তরঙ্গ বন্ধু নাই যে, তাহার কাছে এই গুপ্ত রহস্য
প্রকাশ করিয়া মনের ভার লাঘব করেন, এবং তাহার
কাছ হইতে উপায়-নির্ধারণ-সম্বন্ধে সৎপরামর্শ গ্রহণ
করেন। যাহা হউক, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া তিনি দুই
প্রবল অথচ পরস্পর-বিরুদ্ধ প্রবৃত্তির মধ্যে এইভাবে রফ
করিলেন,-কাহাকেও অতি গোপনে ও সুকৌশলে খুন
করিয়া সেটা চাপিয়া রাখিবেন এবং কিছুদিন অপেক্ষা করিয়া
যখন দেখিবেন যে, খুনের আস্কারা হইল না, আর শাস্তির ভয়
নাই, তখন নিশ্চিন্তমনে বিবাহ করিবেন। আর খুনও
এমন লােককে করিবেন, যাহার মরণে জগতের কোনও
ক্ষতি হইবে না, কোনও পরিবারের আর্থিক বা মানসিক কষ্ট
হইবে না, যাহার মৃত্যু শােচনীয় অকালমৃত্যু বলিয়া নিরতি-
শস্য দুঃখের কারণ হইবে না। মীমাংসাটা তর্ক-বিজ্ঞান ও
ফলিত জ্যোতিষ ; নীতিবিজ্ঞানে পারদশী চরিত্রবান্ লােকের মত হইল কি না, পাঠকবর্গ তাহার বিচার করিবেন। এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া তিনি তখন পাত্র ও প্রণালী স্থির করিতে মনঃসংযােগ করিলেন। পাত্র-শ্রীবিষ্ণু পাত্রী অল্প আয়াসেই নির্বাচিত হইল। তাহার দিদি-মার এক দুর-সম্পর্কীয়া ভগিনী বহু বৎসর যাবৎকাশীবাস করিতে- ছিলেন, অশীতিপর বৃদ্ধা, মধ্যে মধ্যে শূল-বেদনায় যমযন্ত্রণা ভােগ করে, অথচ বুড়ী মরিবার নামও করে না; মরিতে পারিলেই বুড়ী যেন বাঁচে। বুড়ী মরিলে তাহার জন্য শােক করিবে, এমন লােক তিন কুলে কেহ নাই। বুড়ীর সঞ্চিত ধনও বিস্তর, তাহার একমাত্র ওয়ারিশান রমণী বাবু স্বয়ং। এ অবস্থায় তাহার বিবেচনায় বুড়ীর ভববন্ধন ঘুচাইয়া দেওয়া সৰ্ব্বতভাবে কৰ্তব্য। কাশীতে অপমৃত্যু হইলেও শিবত্ব প্রাপ্তিতে বাধা নাই, অতএব ঐহিক পারত্রিক উভয়তই ইহা শ্রেয় পন্থা। এইবার উপায়-নির্ধারণের পালা। রমণী বাবু দর্শন- শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়া সম্প্রতি সৌখীন ( amateur) ভাবে বিজ্ঞান লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছিলেন। এখন এই কার্যের জন্য তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে রসায়নশান্ত্রের রহস্য মােহিনী উদঘাটনে ব্যাপৃত হইলেন। অনন্যকৰ্ম্মা হইয়া বই গ্রন্থ ও গবেষণাত্মক প্রবন্ধ-নিবন্ধ খাটিয়া, বহু বিজ্ঞান- শালায় ঘুরিয়া, বহু বৈজ্ঞানিকের সহিত তত্ত্বালােচনা করিয়া তিনি অবশেষে এমন একটি বিষের সন্ধান পাইলেন, যাহার ক্রিয়া যন্ত্রণাহীন। ( অবশ্য, বিষের নামটি পাঠকবর্গকে জানা- ইতে সাহস হয় না। কেন না, কাহার মনে কি আছে, কে জানে ?) ইহা হইতে প্রস্তুত লজেসের মত মিষ্টস্বাদ এক প্রকার বটিকা বিষপ্রয়ােগ-কাৰ্যে বৈজ্ঞানিক-জগতে বিনি- যােজিত হয়। সাধারণতঃ ঔষধালয়ে যাহাকে তাহাকে এই বিষাক্ত মােক বিক্রয় করে না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক-সমাজে রমণীবাবুর খাতির যথেষ্ট, আর পয়সার অসাধ্য কিছুই নাই। তাহাকে উক্ত দ্রব্য সংগ্রহ করিতে বিশেষ বেগ পাইতে হইল । কার্যসিদ্ধির প্রথম সােপান উত্তীর্ণ হওয়াতে তাহার হৃদয় আনন্দে ভরিয়া গেল। তিনি কাহাকেও কিছু না বলিয়া একাকী কাশীযাত্রা করিলেন। তথায় গিয়া কাশীর প্রস্তুত একটি সুদৃশ্য কাঠের কৌটায় বটিকাটি পুরিয়া পকেটে ফেলিলেন এবং অবি- ২১ ফলিত জ্যোতিষ লম্বে বৃদ্ধার চরণ বন্দনা করিতে গেলেন। রমণী বাবুই বৃদ্ধার উত্তরাধিকারী, সুতরাং বৃদ্ধার তাহার উপর একটু আবদার অভিমান করিবার অধিকার ছিল। নাতিকে সম্মুখে পাইয়াই তিনি খুব একচোট লইলেন, “কথনও একবার পথ ভুলেও আস না ; তা আবে কেন ? বুড়ীর আদর কে কোন্ কালে করে ? এখন আবার রাঙ্গা নাতবৌ ঘরে আসবে, সেই চিন্তেয়ই মগ্ন আছ।” নাতির ফুশল- প্রশ্নে উত্তর করিলেন, “আর দাদা ও কথা শুধিও না। শূল- বেদনা যখন ওঠে, তখন যে কি যন্ত্রণা তার আর কি বলব ? তখন ইচ্ছে করে, আপ্তঘাতী হয়ে জ্বালা জুড়ই, তবে আত্ম- হত্যে মহাপাপ, তাই করতে পারিনে।” এ কথা শুনিয়া রমণী বাবু গম্ভীরভাবে বলিলেন, “দিদিমা, আর তােমাকে সে যন্ত্রণা ভােগ করূতে হবে না, আমি কলকাতা থেকে এমন ওষুধ এনেছি যে, তা একবার খেলে আর কখনও বেদনা উঠবে না।” বুড়ী সাগ্রহে বলিল, “কৈ দাও দাদা, এখনি খেয়ে ফেলি।” রমণী বাবু একটু ফাঁফরে পড়িলেন। তাহার ইচ্ছা নহে যে, তিনি উপস্থিত থাকিতেই বুড়ী বিষাক্ত বটিকা গলাধঃকরণ করে, কেন না, সে ক্ষেত্রে বুড়ীর আকস্মিক মৃত্যুর সহিত তাঁহাকে জড়াইতে পারে। তিনি একটু মােহিনী সামলাইয়া লইয়া বলিলেন “না, দিদিমা, ওষুধটা যখন তখন খাবার নয়। যখন বেদনা উঠবে, তখুনি গিলে ফেলবেন, সকল যন্ত্রণা দূর হবে।” এই বলিয়া তিনি কৌটাটি বুড়ীর হাতে দিলেন এবং দুই চারিটা কথার পর আজই বিশেষ দরকারে দিল্লী যাইতে হইবে বলিয়া চটপট বিদায় লইলেন। বড় ভয়, পাছে তিনি থাকিতে থাকিতেই বুড়ীর বেদনা উঠে ও বুড়ী তৎক্ষণাৎ বটিকা ভক্ষণ করিয়া তাহাকে কোনও ফ্যাসাদে ফেলে। কাণীতে তাহার কাৰ্য্য আপাততঃ ফুরাইল; তিনি জ্ঞান- কৃত পাপের জন্য জ্ঞানবাপীর জল মাথায় ছিটাইয়া সেই দিনকার ট্রেনেই দিল্লী রওনা হইলেন এবং তথায় পৌছিয়া কলিকাতার কর্মচারীকে ঠিকানা জানাইলেন। দিল্লীতে বসিয়া বসিয়া তিনি উৎকণ্ঠিতচিত্তে বুড়ীর মৃত্যুসংবাদের ‘তার’ পাইবার জ) দিন কাটাইতে লাগিলেন। মাস- খানেকের মধ্যেই খােসখবর আসিল, তাহার দুর্ভাবনা ঘুচিল, তিনি বুড়ীর শ্রাদ্ধাদি কাৰ্য্য সম্পন্ন করিবার জন্য ও সম্পত্তির দখল লইবার জন্য কাশী ছুটিলেন। শাস্ত্রের অনু- শাসন, পিণ্ডং দত্ত্বা ধনং হরেৎ। মহাসমারােহে শ্রাদ্ধকৃত্য সমাপ্ত হইল। বুড়ীর সঞ্চিত ফলিত জ্যোতিষ অর্থ অনেক ছিল, রমণী বাবু তৎসমস্ত গ্রাস করতে ব্যগ্র ছিলেন না, সুতরাং উহার অধিকাংশ ব্যয় করিয়া খুব ঘটা করিয়া শ্রাদ্ধ হইল। শ্রাদ্ধাদির পর এক দিন বুড়ীর শয়ন- ঘর পরিষ্কার করাইতে গিয়া রমণী বাবু তাহার প্রদত্ত সুন্দর কৌটাটি পাইলেন ; শুধু 'হাই নহে, কৌটা খুলিয়া দেখি- লেন, তন্মধ্যস্থ বটিকাটিও রহিয়াছে। তাহা দেখিয়া তিনি একেবারে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। তবে : তাহার সকল আয়ােজনই পণ্ড হইয়াছে ; বুড়ী খুন হয় নাই, রােগের সন্ত্রণায় বা বয়সের গতিকে স্বাভাবিক ভাবেই মরিয়াছে। সুতরাং তাহার ভবিষ্যৎ-সম্বন্ধে আশঙ্কা আবার প্রবল হইল, খুনের ভবিতব্যতা ত খণ্ডাইল না। খানিক দম ধরিয়া থাকিয়া আবার তিনি নবােৎসাহে অন্য শীকারের চষ্টায় মাথা ঘামাইতে লাগিলেন। অনেক চিন্তার পর তাহার স্মরণ হইল যে, তাহার পিতার মাতামহ অত্যন্ত স্থবির হইয়া পড়িয়াছেন, অথচ মার্কণ্ডেয়ের পরমায়ুঃ লইয়া বিরাজ করিতেছেন। শৈশবে পঠিত কবি- তাংশও তাহার মনে পড়িল,—‘অশীতিপরের বটে মরণ মঙ্গল! বুড়ো বয়স পর্যন্ত তাহার একটি বাতিক ছিল,
মােহিনী
৪*
বােধ হয়, এই বাতিকেই তাহাকে জীয়াইয়া রাখিয়াছিল ।
অসংখ্য ঘড়ী তাহার প্রশস্ত বৈঠকখানায় জমিয়াছিল, নূতন
রকমের ঘড়ীর সন্ধান পাইলেই তিনি কিনিতেন, আর
নিয়মিতরূপে বুড়ীগুলিতে স্বহস্তে দম দেওয়া তাহার
নিত্যকৰ্ম্ম-পদ্ধতির একটি অঙ্গ ছিল। রমণী বাবু এই রন্ধ
দিয়া তাহার শনি হইয়া প্রবেশ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন।
সেই সময়ে বাঙ্গালা দেশে বােমার ব্যাপারে হুলস্থূল
লাগিয়াছে। রমণী বাবুর মাথায় এই বুদ্ধি যােগাইল, ঘড়ীর
ভিতর কৌশলে এমন ভাবে বােম রাখা হইবে যে ঘড়ীতে
দম দিতে গেলেই বােমা ফাটিয়া তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটাইবে ।
বােমাওয়ালাদের সহিত তাহার সাক্ষাৎ-সম্বন্ধে না হইলেও
পরােক্ষভাবে জানাশুনা ছিল। তিনি অতি গােপনে মধ্যবর্তীর
মারফত উক্ত দলের এক জন মাতব্বরের কাছে এইরূপ
একটি ঘড়ীর ফরমায়েস পাঠাইলেন। বােমাওয়ালা এরূপ
এক জন ধনী, মানী ও বিদ্বান্ লােককে এই সূত্রে হাতে
রাখিতে পারিলে ভবিষ্যতে অনেক উপকার পাইবে, সেই
উৎসাহের সহিত ঘড়ী সত্বর প্রস্তুত করিয়া দিল।
ঘড়ী লইয়া রমণী বাবু হাসিমুখে বৃদ্ধের নিকট উপস্থিত
হইলেন ও কুশলপ্রশ্নান্তে ঘড়ীটি তাহার হস্তে দিলেন।
আশায় খুব
ফলিত জ্যোতিষ
ঘড়ীর কারুকার্য দেখিরা বৃদ্ধ খুসী হইলেন এবং ঘড়ীটির
মূল্য জানিতে চাহিলেন। রমণী বাবু যখন বলিলেন “ইহার
মূল্য লাগিবে না, আমি এটি আপনাকে ভক্তি-উপহার
দিলাম,” তখন তিনি প্রাণ খুলিয়া দৌহিত্রপুত্রকে আশীৰ্বাদ
করিলেন। রমণী বাবুর মনােগত অভিপ্রায় জানিলে বৃদ্ধ যে
তাহাকে উচ্ছ্বসিত আশীর্বাদের পরিবর্তে কঠোর অভিশাপ
দিতেন, তাহা বলা বাহুল্য।
সেই অবধি রমণী বাবু পর পর কয় দিন বৃদ্ধের বাড়ীতে
হাজিরা দিতে লাগিলেন, বুড়া কোন্ দিন ঘড়ীটিতে দম
দিতে গিয়া নিজে বেদম হইয়া যান, তাহার সংবাদ
রাখিবার জন্য। কিন্তু এবারও তাহার আশাভঙ্গ হইল।
বৃদ্ধ এক দিন রমণী বাবু আসিবামাত্র বলিলেন, “তুমি দেখছি
ঘড়ীর আসল মজাটকুই আমার কাছে প্রকাশ কর নি,
বােধ হয়, আমাকে হঠাৎ তাক লাগা’বার মতলবে।”
রমণী বাবু কম্পিতবক্ষে অথচ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, “কি বলুন ত?” বৃদ্ধ সকৌতুকে বলিলেন, “দম
দিতে গেলেই ঘড়ীতে এক তাজ্জব ব্যাপার ঘটে, যেন সার
সা পটকাতে কে আগুন লাগিয়েছে, চটপট শব্দ দশ
মিনিট ধরে চলতে থাকে।” কথা শুনিয়া রমণী বাবু
–
মােহিনী
৪৬
একেবারে আক্কেল
গুড়ুম
হইলেন। তিনি বেশ
বুঝিলেন, তঁাহার কপালের দোষে বা বুড়াের বরাতের
জোরে সাঙ্ঘাতিক বােমা ছেলেখেলার পটকায় পরিণত
হইয়াছে। তিনি মনে মনে আনাড়ী বােমাওয়ালাকে ও
বাহাত্তরে বুড়াকে জাহান্নামে পাঠাইয়া, কোনও প্রকারে
ঢোক গিলিয়া কষ্টহাসি হাসিয়া জরুরী কাষের অছিলায়
বুড়ার কাছ হইতে বিদায় লইয়া সরিয়া পড়িলেন।
দুই দুই বা বড় আশায় বঞ্চিত হইয়া রমণী বাব
একেবারে মুখড়িয়া গেলেন। ওদিকে নানা অজুহাতে,
মামলা মূলতবী করার মত, বিবাহ স্থগিত করার জন্য
ককৰ্ত ও কাকৰ্ত্তার আত্মীয়-স্বজনগণ খুবই বিরক্ত
হইতেছিলেন। অনেক শুভানুধ্যায়ী, কন্যার পিতাকে
লুব্ধ আশ্বাসে বসিয়া না থাকিয়া, কালবিলম্ব না করিয়া,
বয়ঃপ্রাপ্তা কন্যার অন্যত্র বিবাহের চেষ্টা দেখিতে পরামর্শ
দিলেন। কিন্তু এমন সুপাত্রের অাশা একেবারে ত্যাগ
করিতে মন সরে না বলিয়া কন্যার পিতা সে কথা বড়
গায়ে মাখিলেন না।
৪৭
ফলিত জ্যোতিষ
এদিকে রমণী বাবুর মনের অবস্থা বড়ই শােচনীয় হইয়া
দাড়াইল। তাহার বড় আশা ছিল, জ্যোতিষী গণনার
একটা কিনারা করিয়া তিনি নিশ্চিন্তমনে মনােরমা পত্নী
বিবাহ করিয়া জীবনের সার-সুখ অনুভব করিবেন, কিন্তু
এত দিনে ‘সে আশা হইল দূর। দুই দুই বার চেষ্টা ব্যর্থ
হওয়ায় তিনি একেবারে হাল ছাড়িয়া দিলেন। নৈরাশ্যে
তাহার বুক ভাঙ্গিয়া গেল। সৰ্ব্বদাই একা একা থাকেন,
বিমর্ষভাবে কাল কাটান, আমােদ-প্রমােদ দূরে থাকুক,
আহার-নিদ্রায়ও কোনও সুখ পান না। কি করিবেন,
কি করিলে হৃদয়ের শূন্যতা দূর হয়, একটু শান্তিলাভ হয়,
তিনি কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। কখনও
ভাবেন, সব ছাড়িয়া ছুড়িয়া দিয়া বিবাগী হইয়া একদিকে
বাহির হইয়া যান, দেশে দেশে ঘুরিয়া বেড়ান ; কখনও
ভাবেন, আত্মহত্যা করিয়া সকল জ্বালা জুড়ান। কোন
মীমাংসায়ই আসিতে পারিলেন না।
মনের এইরূপ অবস্থায় তিনি একদিন সন্ধ্যাকাল হইতে
খানিক রাত্রি পর্যন্ত অন্যমনস্কভাবে হাওড়ার পুলের উপর
দাঁড়াইয়া আছেন, এমন সময়ে হঠাৎ তাহার নজর পড়িল,
জ্যোতিষী অদুরে দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন; তিনিও কেমন
মােহিনী করােনারের বিচারালয়ে সাব্যস্ত হইল, একজন অজ্ঞাত- পরিচয় ব্যক্তির নদীতে পতনে আকস্মিক মৃত্যু। জুরীর রায়ে খুনের সন্দেহমাত্র ছিল না। তখন রমণী বাবু ‘রাম বল, বাঁচা গেল’ বলিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিলেন এবং মহােৎসাহে বিবাহােৎসবের ব্যবস্থা করিতে লাগিয়া গেলেন । বিবাহের বােশনাই ও মিছিল, ব্যাঙ ও ব্যাগপাইপের বাজনা, রােশনচৌকীর মধুর-আলাপ, ভূরিভােজন ও প্রীতি-উপহার, স্ত্রী-আচার ও বারণ প্রভৃতির সরস- বিবরণ দিয়া পুথি বড়াইব না । ইহার পর যদি কখনও কথা-প্রসঙ্গে কেহ রমণী বাবুকে জিজ্ঞাসা করিত, আপনি ফলিত জ্যোতিসে বিশ্বাস করেন কি না, তিনি মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “শিক্ষণ বিশ্বাস করি। আমার জীবনে জ্যোতিষী গণনা অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়াছে, তাহারই ফলে আমি নিরবচ্ছিন্ন দাম্পত্য-সুখ ভােগ করিতেছি।” * * একটি ইংরেজী গল্পের অনুসরণে লিখি।
স্বপ্নদ্য মাদুলি -- সােণডা:: বন-তুল্য জমিদার ভবন আজ নিবা- নন। চাক:-& : মামল-ফায়লা, আত্মীয়-স্বজন, সকলেই শোক । জমিদার ঐল যুক্ত রমাকান্ত রায় মহাশয় মূ** * তাহার সর্বসুখের আধার, আনন্দ- নির, সুরূপ। - . "ীর আজ জীবনান্ত ঘটিয়াছে। সেই সুবর্ণ-প্রতিমা 2. :-:শলে শয্যায় পড়িয়া আছে। শোকের (বে' # ৭ং প্রশমিত হইলে, দেওয়ান লােক- জন ঠিক করি । এই সংকারার্থ গঙ্গাতীরে লইয়া যাইবার বন্দোবস্ত ক?.... পবিয়ােগবিধুর রমাকান্ত বাবু তখন মূচ্ছাভঙ্গে । দেহের পার্শ্বে নিশ্চল, নিস্তব্ধ, মূক, পাষাণ-মুৰ্ত্তি খং উ : 1 দেওয়ান গলদলােচনে তাহার হাত ধরিয়া ক'। ২ র লইয়া যাইবার চেষ্টা করিলেন, লােজন সেই কষ্ঠে প্রবেশ করিয়া মৃতদেহ বহন মােহিনী। করিবার উদ্যােগ করিতে লাগিল। রমাকান্ত বাবু এক- বার সকলের মুখ-পানে চাহিয়া হঠাৎ যেন চমকাইয়া উঠিলেন ; তাহার পর দুই বাহু দিয়া প্রিয়তমার দেহ আশুলিয়া ধরিয়া চীৎকার করিয়া বলিলেন, “আমি কিছুতেই এ দেহ উঠাইতে দিব না।” দেওয়ানজি, পুরােহিত ঠাকুর ও দুই একজন প্রবীণ আত্মীয় তাহাকে বিস্তর বুঝাইলেন ; কিন্তু তিনি অটল ভাবে সেই দেহ ধরিয়া রহিলেন। কাহার সাধ্য তাহার বাহ-পাশ হইতে তাহা ছিনাইয়া লয় ? বিশেষতঃ তাহার তখনকার উন্মত্তের মত মুক্তি দেখিলে অতিসাহসিকেরও হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হয়। এই ভাবে অর্থদণ্ড কাল কাটিল। তাহার পর পুরাে- হিত ঠাকুর ইতিকৰ্ত্তব্য স্থির করিতে না পারিয়া আস্তে আস্তে রমাকান্ত বাবুর পার্শ্বে মৃতদেহের সম্মুখীন হইয়া বসিলেন। দৈবাৎ তঁাহার নজরে পড়িল যে মৃতদেহের বাম বাহুতে একটি সুবর্ণ-মাদুলি রহিয়াছে। এই মাদুলিটির ইতিহাস গৃহিণীর প্রমুখাৎ তিনি শ্রুত ছিলেন। রমাকান্ত বাবু বিবাহের পর হইতেই পীর এরূপ অনুরাগী ছিলেন । এমন কি, যােবনে বিলাসী জমিদার বাবু রাত্রে গৃহে থাকিতেন না, এমন দিনও গিয়াছে। তাহার পর,
স্বপ্নদ্য মাদুলি
জমিদার-গৃহিণী একটি স্বপ্ন মাদুলি ধারণ করিয়া স্বামীর
প্রণয় আকর্ষণ করিতে পারিয়াছিলেন। সেই অবধি
স্বামী আর কখন ও তাহার আঁচল-ছাড়া হয়েন নাই।
পুরােহিত ঠাকুর বুঝিলেন, এ সেই মাদুলি। ইহাতে
ভবিষ্যতে অপর কাহারও উপকার দর্শিতে পারে, এই
ভাবিয়া পুরােহিত ঠাকুর অতি-সন্তর্পণে ঘুনসী-সহ মাদুলিটি
খুলিয়া লইয়া আপাততঃ সেটি নিজের দক্ষিণ বাহুতে ধারণ
করিলেন এবং একজন বর্ষীয়সীকে অবশিষ্ট স্বর্ণালঙ্কারগুলি
খুলিয়া লইতে ইঙ্গিত করিলেন। ইহার পরেই রমাকান্ত
বাবুকে যেন শান্ত দেখা গেল । এবার একবার-মাত্র
অনুরােধে তিনি পুরােহিত ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে কক্ষান্তরে
গেলেন, এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে পদব্রজে গঙ্গাতীরে গিয়া
যথাশাস্ত্র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধা করিতেও আপত্তি করিলেন
। তাহার পরে গঙ্গাস্নানান্তে তিনি পুরােহিত ঠাকুরের
সঙ্গে সঙ্গে গৃহে ফিরিলেন।
আশ্চর্যের বিষয়, তিনি শশাকে যেরূপ মুহ্যমান হইবেন
বলিয়া সকলে আশঙ্কা করিয়াছিল, সেরূপ দেখা গেল না।
সকলে ইহা পুরােহিত ঠাকুরের জ্ঞান গর্ভ সান্ত্বনা-বাক্য ও
উপদেশের ফল বলিয়াই বুঝিলেন ।
মােহিনী
( ২ )
পরদিন হইতেই কিন্তু রমাকান্ত বাবুর ইহা অপেক্ষা ও
বিস্ময়জনক পরিবর্তন সকলে লক্ষ্য করিল। তিনি কারী-
দিগের বা আত্মীয়বর্গের কথা ভাল করিয়া নেন না,
দেওয়ানকে নিতান্ত অবহেলা করেন, কিন্তু পুরােহিত
ঠাকুরকে সর্বদা নিকটে রাখিতে চাহেন এবং তাহার সঙ্গেই
সাংসারিক ও জমিদারি-সংক্রান্ত সকল কথার আলােচনা
করেন। শেষে একদিন দেওয়ান কৰ্ম্ম হইতে অবসর
গ্রহণ করিতে আদেশ পাইলেন এবং তৎপদে ভট্টাচায্য
ব্রাহ্মণ পুরােহিত ঠাকুর নিযুক্ত হলেন ?
পুরােহিত ঠাকুর এই উচ্চপদ লাভ করিবার ৷ কোনও
রূপ কৌশল অবলম্বন করেন নাই, এরূপ উচ্চাভিলাষ
তাহার কোনও দিন ছিল না। তবে তিনি প্রতিপালক
যজমানের অনুবােধ লঙ্ঘন করিতে না পারিয়াই অগত্যা
এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং অন্যান্য কর্মচারিগণের
পরামর্শ লইয়া জমিদারির কাৰ্য্য চাইতে প্রবৃত্ত হইলেন।
তিনি ভূতপূৰ্ব দেওয়ানের মােটা বৃত্তি নির্ধারিত করিয়া
কাশীবাসের ব্যবস্থা করিয়া দিলেন।
স্বপ্নাদ্য মাদুলি কিছুদিন এই ভাবে কার্য চলিতে লাগিল। কিন্তু সাত্বিক-প্রকৃতি ব্রাহ্মণ যতই জমিদারি-কার্য্যের ভিতর প্রবেশ করিতে লাগিলেন, ততই তাহার এ বিষয়ে বিতৃষ্ণা জন্মিতে লাগিল। প্রজা-পীড়ন, উৎকোচ-গ্রহণ, কূট- কৌশল প্রভৃতি তাহার নিতান্তই প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ছিল। তিনি প্রায়ই মনিবের নিকট কাৰ্য্যত্যাগের ইচ্ছা জানাই- তেন, কিন্তু মনিব সে কথায় কর্ণপাত করিতেন না। পরন্তু সর্বদাই তাহাকে কাছে কাছে রাখিতে চাহিতেন বলিয়া ব্রাহ্মণের নিত্যকৃত্যের অনেক ব্যাঘাত হইত। তিনি কি উপায়ে এই কৰ্ম্মভোগ হইতে নিষ্কৃতি পান, কিছুই স্থির করিতে পারিতেন না। এই ভাবে কয়েক মাস মাস গেল। জমিদার-গৃহিণীর স্বপ্নাদ্য মাদুলিটা পুরোহিত ঠাকুর সেই যে খুলিয়া লইয়া নিজের বাহুতে ধারণ করিয়াছিলেন, তদবধি তাহা আর অন্যত্র রাখিবার কথা তাহার মনে পড়ে নাই। কিন্তু একদিন ঘুনসী পচিয়া যাওয়াতে মাদুলিটি পড়িয়া গেল। পুরােহিত ঠাকুর সেটি কুড়াইয়া লইয়া যে কুলুঙ্গিতে তাহার জপের মালা প্রভৃতি থাকিত, সেইখানে রাখিলেন। পরদিন তিনি যখন জমিদার-বাড়ী গেলেন, তখন
মােহিনী
তিনি লক্ষ্য করিলেন যে, রমাকান্ত বাবু আর তাহার প্রতি
পূর্বের মত অনুগত-ভাব দেখাইলেন না, তেমন আগ্রহের
সহিত তাহার কথা শুনিলেন না বা তাহার সঙ্গলাভ করিবার
চেষ্টা করিলেন না। ইহাতে পুরােহিত ঠাকুর বিস্মিত
হইলেন, কিন্তু ক্ষুস হইলেন না। মনিবের নিকট তিনি
মে অতিরিক্ত আদর পাইতেন, তাহা তাহার ভাল লাগিত
এখন যেন তিনি একটু স্বস্তি বােধ করিলেন। এই
ভাবে দু’-চার দিন গেলে তিনি আবার কৰ্ম্ম ত্যাগের প্রস্তাব
উথাপন করিলেন । এবার তাহার প্রার্থনা মঞ্জুর হইল।
তিনি সাবেক দেওয়ানকে কাশীধাম হইতে আনাইয়া পুনঃ
প্রতিষ্ঠিত করিলেন এবং এতদিনের পর হাঁফ ছাড়িয়া
আবার চিরাভ্যস্ত পূজাহ্নিক-প্রভৃতিতে অধিক সময় ক্ষেপ
করিতে লাগিলেন।
কিন্তু বেশী দিন ন! যাইতেই পুরােহিত ঠাকুরের আর
এক অশান্তির কারণ উপস্থিত হইল । প্রৌঢ় রমাকান্ত বাবু
হঠাৎ একদিন পুরােহিত ঠাকুরের বালিকা কন্যা অলকাকে
বিবাহ করিবার জন্য উপযাচক হইলেন : ব্রাহ্মণ ত প্রস্তাব
স্বপ্নাদ্য মাদুলি শুনিয়া একেবারে স্তম্ভিত : পঞ্চাশবর্ষীয় জমিদারের নিকট বালিকা কন্যাকে বলি দিয়া খুব একটা দাও মারিতে বিষয়- বুদ্ধিসম্পন্ন অনেকে হয়ত খুবই রাজি হইত; কিন্তু পুরােহিত ঠাকুর সে প্রকৃতির লােক ছিলেন না। এ দিকে রমাকান্ত বাবু, ক্রমেই বেশ একটু পীড়াপীড়ি আরম্ভ করিলেন । পুরােহিত ঠাকুর কি উপায়ে প্রবল প্রতাপ জমিদার মহাশয়কে প্রত্যাখ্যান করিবেন অথচ তাহার ক্রোবাগ্নিতে ভস্মীভূত হইবেন না, তাহা ভাবিয়া স্থির করিতে না পারিয়া অত্যন্ত ব্যাকুলচিত্ত হইয়া পড়িলেন। একদিন জমিদার-বাটা হইতে ঐ প্রস্তাব-সম্বন্ধে অপ্রিয় আলােচনা করিয়া পুরােহিত ঠাকুর গৃহে ফিরিতেই দেখিলেন, কন্যা অলকা তাহার শিশু ভ্রাতাকে কেলে করিয়া দাঁড়াইয়া আছে, শিশুটি দিদির বাহুসংলগ্ন একগাছি ঘুনসি ধরিয়া টানাটনি করিতেছে, কিছুতেই ছাড়িতেছে না। এই দৃশ্য- দশনে তাহার মনে একটা খটকা, একটা আশঙ্কা জাগিল। তিনি কন্যাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তার হাতে ওটা কি থােকা টানাটানি করছে ?” কন্যা হাসিতে হাসিতে বলিল, “বাবা, ও একটা মাদুলি।” “কোথায় পেলি ?” এই প্রশ্নের উত্তরে সে বলিল, “কুলুঙ্গির নীচে মাটিতে পড়ে মােহিনী পেয়েছি।” পিতা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “এটা কবে থেকে ধারণ করেছিস ?” কন্যা বলিল, “এই দিন দশেক হ’ল।” তিনি চিনিলেন, এ সেই জমিদার-গৃহিণীর স্বপ্নাদ্য মাদুলি। অলকা সেটি কুড়াইযা পাইয়া কোথা হইতে এক- গাছি ঘুনসি সংগ্রহ করিয়া ছেলেমানুষি-খেয়ালে উহা ধারণ করিয়াছে, আর সেই দিন হইতেই পত্নীবৎসল রমাকান্ত বাবুর অলকার উপর নজর পড়িয়াছে, তাহাকে পূৰ্ব্ব-পত্নীর স্থলাভি- ষিক্ত করিতে মন গিয়াছে, এই কাৰ্যকরণ-সম্বন্ধ এখন তিনি যেন নখদর্পণে দেখিলেন। তিনি কন্যাকে “ঠাকুরদের জিনিস, হাতে দিতে নেই’ বলিয়া মৃদু ভৎসনা করিয়া অবিলম্বে মাদুলিটি কন্যার বাহু হইতে খুলিয়া লইলেন এবং শীঘ্রই এটিকে গঙ্গাজলে বিসর্জন দিবেন সঙ্কল্প করিয়া আপাততঃ গুপ্তস্থানে রাখিয়া দিলেন। বলা বাহুল্য, তাহার পর হইতে রমাকান্ত বাবু, আর বিবাহ-সম্বন্ধে কোন উচ্চবাচ্য করিলেন না। পুরােহিত ঠাকুর এই পরিবর্তনের নিগূঢ় কারণ বুঝিয়া মনে-মনে হাসিলেন।
স্বপ্নদ্য মাদুলি
( ৪ )
ইহার পরে একদিন প্রত্যুষে পুরােহিত ঠাকুর মাদুলিটি
গঙ্গাজলে বিসর্জন দিবার অভিপ্রায়ে গঙ্গাস্নানে যাত্রা
করিলেন। পথিমধ্যে ঘটনাচক্রে তাহার রমাকান্ত বাবুর
সহিত দেখা হইল, রমাকান্ত বাবু তখন প্রাতভ্রমণে বাহির
হইয়াছেন। ‘ভট্টাচার্য; নহাশয়, কোথায় যাইতেছেন,
“অনেক দিন গঙ্গাদৰ্শন হয় নাই, তাই যাইতেছি'—এইরূপ
কথােপকথনের পর রমাকান্ত বাবু বলিলেন ‘চলুন, আমিও
বাই’, এই বলিয়া তিনি পুরােহিত ঠাকুরের অনুগমন
করিলেন। পুরােহিত ঠাকুর একটু বিপন্ন হইলেন, কিন্তু
সঙ্গীর অজ্ঞাতে মাদুলীটির গতি করিতে পারিবেন, মনকে
এইরূপ প্রবােধ দিয়া অগত্যা তাহার প্রস্তাবে
সম্মত হইলেন। সঙ্গত আপত্তি
করিবারও ত কিছু
ছিল না।
যথাকালে গঙ্গাতীরে পৌঁছিয়া উভয়ে গঙ্গাগর্ভে অবতরণ
করিলেন। পুরােহিত ঠাকুর ভক্তিভরে তিনটি ডুব দিলেন
এবং তৃতীয় ডুবে মাদুলিটি গঙ্গায় বিসর্জন দিলেন।
দিনে মাদুলির জড় মরিল ভাবিয়া তিনি মনে-মনে তৃপ্তি
মােহিনী
অনুভব করিলেন এবং গঙ্গাস্তব-পাঠ, সন্ধ্যা-আহ্নিক প্রভৃতি
সমাধা করিয়া তীরে উঠিলেন।
রমাকান্ত বাবুর কিন্তু গঙ্গাগর্ভ হইতে উঠিবার কোন ও
তাড়া দেখা গেল না। তিনি বারবার ডুব দিতে লাগিলেন।
বড়-মানুষের সুখী শরীর, অধিকক্ষণ জলে পড়িয়া থাকিলে ও
অধিক ডুব দিলে শরীর অসুস্থ হইয়া পড়িবে, পুনঃ পুনঃ এই
অনুযােগ করিয়া পুরোহিত ঠাকুর কোনও প্রকারে তাহাকে
তীরে তুলিলেন। কিন্তু পুরােহিত ঠাকুর যখন গৃহে ফিরিবার
উদযােগ করিলেন, তখন রমাকান্ত বাবু একেবারে বাকিয়া
বসিলেন। তিনি গঙ্গাতীরে বাস করিবেন, সে স্থান
পরিত্যাগ করিয়া এক পাও অগ্রসর হইবেন না, এই
অভিমত প্রকাশ করিলেন। তাহাকে টলান দুঃসাধ্য ব্যাপার
বুঝিয়া পুরােহিত ঠাকুর ক্ষুন্নমনে একাকী স্বগৃহে ফিরিলেন
এবং দেওয়ানজিকে সংবাদ দিলেন।
দেওয়ানজি সদলবলে প্রভুর নিকট উপস্থিত হইয়া বল
সাধ্যসাধনা করিলেন, কিন্তু তিনিও প্রভুকে এই সঙ্কল্প হইতে
প্রতিনিবৃত্ত করিতে পারিলেন না। উপায়ান্তর না দেখিয়া
তখনকার মত একটি দোকানে প্রভুর বসবাসের বন্দোবস্ত
করিয়া দিয়া দেওয়ানজি তাহার হুকুম তথায় গঙ্গাবাসের
স্বপ্নদ্য মাদুলি
উপযােগী গৃহ-নির্মাণের জন্য লােক-জন লাগাইলেন। যত
দিন গৃহ প্রস্তুত না হইল, জমিদার মহাশয় সেই দোকানেই
নির্বিকার-চিত্তে বাস করিতে লাগিলেন। পরে গৃহ প্রস্তুত
হইলে পুরোহিত ঠাকুরকে দিয়া শুভদিন দেখাইয়া তিনি
গৃহপ্রবেশ করিলেন। তদবধি তিনি যে কয় বৎসর জীবিত
ছিলেন সে কয় বৎসর কেমন যেন উদভ্রান্তভাবে গঙ্গাজলে
অবগাহন করিতেন বা গঙ্গাতীরে পরিভ্রমণ করিতেন।
অনেক চেষ্টায় তাহাকে আহাৱাদি ব্যাপারে প্রবৃত্ত করিতে
হইত। শেষে একদিন গভীর রাতে তিনি রক্ষিবর্গের সতর্ক
পাহারা কোনও প্রকারে এড়াইয়া গঙ্গাগর্ভে ঝাপাইয়া
পড়িয়া সকল জ্বালা জুড়াইলেন। যে হারানিধির অন্বেষণে
তিনি এরূপ ‘উদবিগ্নচিত্ত পরিখেদিতমনা' হইয়া এই দীর্ঘ
কয় বৎসর কাটাইয়াছিলেন, কে জানে জীবনান্তে হার
সে নিধি মিলিয়াছিল কি না?
একটি ইয়োরােপীয় কিংবদন্তী-অবলম্বনে লিখিত।
শিবনাথ
মাতঙ্গী
অনুচ্চ কিন্তু আবেগপূর্ণ কণ্ঠে স্বামী শিবনাথ বলিলেন,
“মাতু, তুমি যে বড়ই বাড়াবাড়ি করে তুললে, শেষে একদিন
একটা কেলেঙ্কারী না করে আর তুমি ছাড়বে না দেখছি।
ক্ষান্ত দাও, আর মিছেমিছে কথা কাটাকাটি করাে না।
জানই তো কথায় কথা বLে ।”
স্ত্রী মাতঙ্গী কঙ্কর দিয়া বলিয়া উঠিলেন—“কেলেঙ্কারীট।
আবার কিসে হবে ? ঘরের ভেতর রাত্তিরকালে তোমাকে
দুটো কথা বলবে, তার অব ঢাকা রাখা কি ? আমি তো
অন্যায় কথা কিছু বছিনে। তুমি বছরে দুবার করে
দুদিন তিনদিন ধরে ডুব দাও, জিজ্ঞেস করলে কোন কথা
ভাঙ্গে না। এর একটা জবাবদিহি চাই-ই চাই।
করে কোথায় পড়ে থাক, বল দেখি।”
স্বামী পূৰ্বের মত অনুচ্চস্বরে বলিলেন,-“ছিঃ মা,
শিবনাথ
আমাকে কি নেশাখােরের মত দেখায় ? আর নেশাখাের
কি ছমাস চুপ করে থেকে একদিন নেশা করে দুদিন
বেহুস হয়ে পড়ে থাকে ? যাক আমি যেখানে যাই, সে
খোজে তােমার প্রয়ােজন কি ? কৈ শ্বশুর মহাশয় তাে
কোনদিন তার জন্যে কৈফেৎ চাননি ? মেয়েমানুষের
অত কথা জেনে কি লাভ ?”
মাতঙ্গী চড়া গলায় বলিলেন—“ বাবার তাে খেয়ে
দেয়ে কায নেই, তাই জমিদারীর ভাবনা ভুলে তুমি কি
কর কোথায় বাও তার খবর রাখুবেন, তুমি তো তার
মাহলের নায়েব {গামস্তা নও। সে ভার আমার।”
স্বামী এবারও নরমসুরে বলিলেন,-“মাতু, ক্ষেমা
দাও, আর অনেক রাত্তির হয়েছে, এখন একটু ঘুমুতে
দাও।”
পত্নী ঝাকিয়া উঠিয়া বলিলেন,-কি বারে বারে
মাতু মাতু করছ, আমি কি তােমার ছােট বােন না।
দাসীবাদী?
স্বামী মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিলেন,-তবে কি বলব ?
গিন্নী মশায়, মনিব ঠাকরুণ না হুজুর !”
পত্নী ধৈৰ্য্যচ্যুত হইয়া বলিলেন,-“নাও, ঠাট্টা রাখ,
মােহিনী
৬৯
ঠাট্টা করে আসল কথা চাপা দিলে চলবে না। তুমি
কোথায় যাও না জালে আমি ছাড়ছিনে।”
এই বলিয়া মাতঙ্গী উঠিয়া বসিলেন,—এতক্ষণ পালঙ্কে
অদ্ধশয়ানাবস্থায় ছিলেন। রাগে চোখ-মুখ লাল হইয়াছে,
স্বর উচ্চে উঠিয়াছে ।
শিবনাথ গম্ভীরভাবে বলিলেন,-“বাপরে, তুমি যে
দেখছি একেবারে গুরুমশায় সেজে বলে। আমি যদি না
বলি, তুমি কি করূবে ?”
মাতঙ্গী তখন একেবারে রাগে জ্ঞান হারাইয়াছেন।
তিনি উচ্চকণ্ঠে বলিলেন,-বলবে না, তােমার এত বড়
আস্পর্ধা! একি তােমার বাবার বাড়ী পেয়েছ ? এ আমার
বাবার বাড়ী, এখানে আমি যা বলব তাই শুতে হবে।”
শিবনাথ গাঢ়স্বরে বলিলেন, “ছি বাপ তুলল না।
এ কি ছেলেমানুষি ?”
মাতঙ্গী বিকৃতস্বরে বলিলেন,-ওমা গেছি গো !
বাপের তাে বড় দরদ ! তা’ বছর অন্তর একটু জলপিণ্ডিও
তাে দেওয়া হয় না।”
শিবনাথ বলিলেন,-আমার কর্তব্য করি কি না তার
জবাবদিহি তত তােমার কাছে দিতে হবে না। আমার
শিবনাথ
বাবার কাষ তো তোমার বাবার ভিটেয় বসে করতে
পারিনে। করতে হলে সে নিজের বাপের ভিটেয় বসেই
করতে হয়। বাপ-মায়ের কাম করতেই যে আমি সে
ভিটেয় যাইনে, তা তুমি কিসে বুঝলে?”
মাতঙ্গী তখন কপাটা পাটাইয়া লইয়া বলিলেন,-
“তা’ সে ভিটেয় যদি এত মায়া তাে সেখানে মাটি কামড়ে
পড়ে থাকলেই হয়। এখানে সালাতে আস কেন?”
শিবনাথ উত্তর করিলেন,—“সেও পিতৃদেবের সত্যরক্ষার
জন্য। তিনি যে আমাকে ঘরজামাই করবার ব্যবস্থা করে
গেছেন।
তা’ নইলে আর এই অপমান সই ?” এই
বলিয়া শিবনাথ গদ্গদ-কণ্ঠে আবৃত্তি করিলেন,
“পিতা স্বর্গ পিতা ধৰ্ম্মঃ পিতা হি পরমন্তপঃ।
পিতরি প্রীতি মাপন্নে প্রয়ন্তে সর্বদেবতাঃ ॥”
মাতঙ্গী ইহাতেও নরম না হইয়া তেনি গরমভাবেই
বলিলেন,—“তা, এখন না হয় বাপের কাছে গিয়ে
বন্দোবস্তটা খারিজ করিয়ে আন। আমারও জ্বালা জুড়ােয়,
তুমিও নিশ্চিন্দি হও।”
এই শেষ কয় ফোটা মধুবৰ্ষণ করিয়া ধনি-কন্যা স্থূলাঙ্গী
মাতঙ্গী ক্লান্ত হইয়া শুইয়া পড়িলেন।
মােহিনী
৬৬
শিবনাথ একবার ভাবিলেন, এই অপমানের পর তখনই
গৃহত্যাগ করেন, কিন্তু জামাইবারিকে’র অভয়ের মত
দুপুররাত্রে একটা সরগােল না করিয়া কৌচের উপর
হেলান দিয়া চক্ষু বুজিয়া পড়িয়া থাকিলেন। শৈশবে
স্বর্গগতা মাতার কথা, পিতার স্নেহের কথা, দারিদ্র্যের
কথা, অনেক কথাই মনে পড়িল। পত্নীর গর্বিত ব্যবহার
অনেক দিন হইতেই তাহার মনে বিধিতেছিল, তবে এতটা
অপমান আর কোনদিন ঘটে নাই। ইতিকৰ্ত্তব্য স্থির
করিতে বিনিদ অবস্থায় রাত্রিটা কাটাইলেন। ভােরে
চাকর-দাসীর কলরব শুনিবামাত্ৰ নিদ্রিত শিশুপুত্র সুকুমারের
কচি মুখখানি একবার দেখিয়া লইয়া প্রাতভ্রমণের বেশে
গৃহত্যাগ করিলেন। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস আর দু'ফোটা
চোখের জল তাহার হৃদয়-বেদনার সাক্ষী রহিল ।
পুরুষাস্য ভাগ্যম
শিবনাথ দরিদ্রের সন্তান ছিলেন। শৈশবে মাতৃহার
শিশুকে লইয়া তাহার দরিদ্র পিতা বড়ই বিপন্ন হইয়াছিলেন।
প্রতিবেশীদিগের সাহায্যে কোনও প্রকারে শিশুটীর
রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া চতুর্দশবর্ষীয় বালককে রামনগরের
১৭
শিবনাথ
জমিদার মহাশয়ের সবিশেষ অনুরােধে তাহার ঘরজামাই
রাখিতে দিতে সম্মত হইলেন। দরিদ্র পিতা শুধু সন্তানের
ভবিষ্যৎ ভাবিয়াই এই কাৰ্য্য করিলেন, এক পয়সাও গ্রহণ
করিলেন না। বৈবাহিক মহাশয় মাসহারা দিতে চাহিলেও
তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন,—“আপনি যাহা ইচ্ছ।
জামাতাকে দিতে পারেন। আমি কিছু লইব না। আমি
তো পুল বিক্রয় করিতেছি না, উৎকোচও লইতেছি না।”
সেই অবধি জমিদার মহাশয় জামাতাকে আলাদা মাসহারা
কন্যাকে আলাদা মাসহার দিয়া আসিতেছেন। বিবাহের
কয়েক বৎসর পরে শিবনাথের পিতৃবিয়ােগ হইল। এতদিন
পিতা নাচিয়াছিলেন, শিবনাথ বৎসরে দুইবার করিয়া
পিতৃচরণ দর্শন করিতে যাইতেন। জমিদার মহাশয়
তাহাতে প্রসন্নচিত্তে সম্মতি দিয়াছিলেন। পিতার মৃত্যুর
পরেও যে শিবনাথ পিতার ও মাতার একোর্দিষ্ট শ্রদ্ধের
উপলক্ষে পৈত্রিক ভিটায় যাইতেন, জমিদার মহাশয়
অত খবর রাখিতেন না, তবে রাখিলেও নিশ্চয়ই আপত্তি
করিতেন না।
এক্ষণে শিবনাথ পত্নীর ব্যবহারে বড়ই মর্মাহত হইলেন,
আত্মধিক্কারে তাহার মন পরিপূর্ণ হইল। তাই তিনি
মােহিনী
ছিল।
নবজাত আত্মজের মায়া কাটাইয়া, ও শ্বশুর মহাশয়কে
এই লজ্জাকর ব্যাপার না জানাইয়া শ্বশুরের ভিটা ত্যাগ
করিলেন। বাৎসরিক শ্রাদ্ধাদির পরও হাতে কিছু টাকা
একবার ভাবিলেন, এই ঘরের টাকা আর নিজের
প্রয়োজনে খরচ করিবেন না। তাহার পর বুঝিলেন যে,
শশুর মহাশয় তাে কখন অপমান করেন নাই, আর ইহার
পরেও তাে সেখানকার টাকা তিনি স্পর্শ করিবেন
না। অতএব বাকী কয়টা টাকা খরচ করিতে দোষ কি ?
এই কয়টা টাকা লইয়া তিনি পশ্চিম’ যাত্রা করিলেন ;
পঠদ্দশায় যে অল্প বিদ্যা অর্জন করিয়াছিলেন, তাহারই
জোরে পশ্চিমে একটা চাকরীর যােগাড় করিতে পারিবেন
এই আশায় বুক বাঁধিলেন। স্ত্রী-পুত্রের ভাবনা নাই,
একটা পেট একরকমে চলিবেই। সাধারণতঃ বড়মানুষের
ঘরজামাই হইলে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত যুবকেরা যেরূপ
অধঃপাতে যায়, শিবনাথের সেরূপ হয় নাই। তাহার
বিদ্যা বেশী না থাকিলেও পিতৃপুণ্যবলে চরিত্র নিৰ্ম্মল ছিল ।
সে-বারে রেলওয়ে কর্মচারীদিগের ধৰ্ম্মঘট, মহা হুলস্থূল
লাগিয়াছে, সকল ট্রেণই এসেনসােলে আটকাইয়া
যাইতেছে।
সহস্র সহস্র যাত্রী সেই অপরিচিত স্থানে
শিবনাথ পড়িয়া থাকিতেছে। তবে স্থানীয় ভলােকদিগের আতিথ্যে সৌজন্যে যাত্রীদিগের কষ্টের 'অনেক লাঘব হইয়াছিল। শিবনাথ এই যাত্রীদিগের ছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনি তাহার একজন বাল্যবন্ধু মতিলালকে এখানে পাইলেন। মতিলাল এক্ষণে এসেন- সােলে স্থায়ী হইয়াছেন, কয়লার খনি কিনিয়া বড়মানুষ হইয়াছেন। শিবনাথকে পাইয়া মতিলাল বড় অঙ্গাদিত হইলেন। আহার ও বিশ্রামের পর শিবনাথ ঠাহকে অকপটে সকল কথা বলিলে, মতিলাল বলিলেন,—“শিবু দা, ছেলেবেলা হ’তে তােমাকে বুদ্ধিমা ও সংস্কভাব ব'লে জানি। আমার এই ব্যবসায় একজন বিশ্বাসী ম্যানেজারের দরকার। মাহিনা-করা লােক দিয়া ঠিক এ কাব হয় না। তুমি যদি রাজী থাক, তোমাকে এই কান দিই। আপাতক তােমার যখন যা দরকার আমার কাছ থেকে পাবে, আমার বাড়ীতেই থাকবে। ব্যবসায় শূন্য বরাদার হয়ে তুমি কাজ আরম্ভ কর, তারপর যদি উন্নতি দেখাতে পার, তােমাকে লাভের একটা বথুরা দেব। চাকর-মনিব সম্পর্ক আমাদের মধ্যে রইল না। আমরা যেন সেই ছেলেবেলাকার মত ভাই-ভাই।” শিবনাথ বাল্যবন্ধুর
মােহিনী
१२
মতিলালের স্বতন্ত্র বাসা করিবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু নিঃসন্তান।
শ্যালকপন্নী মতিলালের ছেলে-মেয়েদের কাছে পাইয়া
কিছুতেই ছাড়িয়া দিতে রাজী হইলেন না। মতিলালের
গৃহিণীও দাদা ও বো-দিদিকে ছাড়িয়া অন্য বাসায় যাইতে
নারাজ। বলিলেন,-“তবে আর এখানে এলাম কেন ?
সেই কয়লার গুদামে থালেই হত।” একটু অভিমান
করিয়া অনুনাসিক স্বরে বলিলেন,-“তােমার এখানে না
পােষায়, তুমি না হয় বন্ধুকে নিয়ে দু’জনে আলাদা বাসা
করে থাকগে। আমি কিন্তু তােমাদের দেখা-শুনেও
করূতে পাবনা না, চাকর বামুন চরাতেও পারব না, তা
বলে রাখছি।”
অগত্যা গিন্নীর রায়েই রায় দিতে হইল। শিবনাথ
তখনও এত দুর্বল যে তাহার আর ওজর-আপত্তি করিবার
শক্তি ছিল না।
হাজারিবাগের হাওয়ার গুণেই হউক, অথবা অপর
কোন গুঢ় কারণেই হউক, এখানে আসিয়া অবধি
শিবনাথের স্বাস্থ্যের দ্রুত উন্নতি হইতে লাগিল। কিন্তু
স্বাস্থ্যলাভের সঙ্গে সঙ্গে একটা নূতন ব্যাধি অতর্কিতভাবে
দেখা দিল। শরীর দুর্বল থাকিলে মনও দুর্বল হয়।
৭
শিবনা?
সেই জন্যই হউক অথবা আরােগ্যলাভের সময় মনের এমন
একটা প্রসন্নতা ও সরলতা আসে যে, তখন সকল জিনিশেই
একটা
নূতন
সৌন্দৰ্য্য অনুভব করা যায় এইজন্যই হউক,
অথবা প্রজাপতির নিৰ্বন্ধেই হউক, মতিলালের একটা
অবিবাহিতা চতুর্দশবর্ষীয়া শ্যালিকাকে দেখিয়া প্রৌঢ়
শিবনাথের ভাবান্তর উপস্থিত হইল। শ্যালক-প্রবর একটু
সাহেবী মেজাজের, তাই এতদিন ভগিনীকে অবিবাহিত
রাখিয়াছিলেন, অর্থের অভাবে নহে। প্রথম প্রথম
ঈষভিন্ন-যৌবনা কমলা অপরিচিত শিবনাথের কাছে ঘেঁষিত
ন। কিন্তু শিবনাথ বাটীর সকলের সহিতই এমন
আত্মীয়-সূত্রে বদ্ধ, আর শরীরের অবস্থার জন্য সকলেরই
এমন করুণার পাত্র যে, তাহার নিকট লজ্জা করা কমলার
বেশীদিন চলিল না, পরিবেষণ-প্রভৃতির সময়ে শিবনাথের
সম্মুখে বাহির হইতে হইত। এইরূপে ক্রমে তাহার লজ্জাসঙ্কোচ
অনেকটা ঘুচিল, যেটুকু থাকিল সেটুকু বড় মধুর। শিবনাথ
শুধু যে নয়নে সেই কিশােরী-মুক্তি দেখিতে লাগিলেন তাহ
নহে, তাহার এক আধটি কথাও শ্রুতিমুখ জন্মাইল ;
শিবনাথের শুষ্ক হৃদয় সরস হইল।
এ সব জিনিষ চট করিয়া স্ত্রীলােকদিগের চোখে পড়ে।
}
মােহিনী মতিলালের স্ত্রী ও শালাজ শীঘ্রই ব্যাপারটা বুঝিলেন। জাতিফুলেও অমিল ছিল না, সুতরাং মতিলালের স্ত্রী ঘটকী হইয়া মতিলালের কাণে কথাটা তুলিলেন, মতিলাল শিবনাথের মন বুঝিবার ভার লইলেন। শিবনাথ মৃদু আপত্তির পর বাল্যবন্ধু সােরােপম মতিলালের প্রস্তাবে মত দিলেন। বহুদিন পূর্বে দৃষ্ট নিদ্রিত শিশুর মুখ ও তাহার গর্বিতা জননীর কথা দু একবার মনে পড়িল বটে, কিন্তু সরাগ-হৃদয় এখন আর সে বাধা মানিল না। যথারীতি উদাহ-মঙ্গল সমাধা হইল। শিবনাথ ভাঙ্গা শরীর ও ভাঙ্গা মন যােড়া দিয়া কন্য- স্থানে ফিরিলেন। এবার অবশ্য তাহার স্বতন্ত্র বাসগৃহ হইল। খনির কাৰ্য আবার পূর্বের মত উদ্যমে-উৎসাহে চলিতে লাগিল। রত্নগর্ভা কমলাও স্বামীকে একটি কন্যার উপহার দিলেন। আহা! এমনি সুখে যদি শিবনাথের অবশিষ্ট জীবন চলিয়া যাইত ! কিন্তু—যবিধেমনসি স্থিত। দুইবৎসর না যাইতেই নবীনা জননী কমলা শিশু-কন্যার মায়া কাটাইয়া দুর্ভাগ্য স্বামীকে নিমিষের জন্য সুখস্বপ্ন দেখাইয়া, বৈকুণ্ঠ- ধামে চলিয়া গেলেন। বিপত্নীক (?) শিবনাথ শিশু-
শিবনাথ
কন্যাকে বুকে ধরিযা ও ‘, ন্য, সব শূন্য’ অনুভব
করিলেন।
এয়শ্চরিত্রম
বহুকাল রামনগরের জমিদাব-বাটার সংবাদ পাওয়া
যায় নাই। একবার সেদিকে প্রত্যাবর্তন করি।
s{% বৎসর অতীত হইয়াছে। “চিবৎসরে মানব-ভাগ্যে
অনেক পরিবর্তন হয়, শিবনাথের জীবনেই আমরা তাহা
দেখিলাম। জমিদার-গৃহেই কি কোন পরিবর্তন হয় নাই ?
জমিদারের প্রাসাদ পুরেই ন্যায় উচ্চ ও সমৃদ্ধ,
লােকজন তেমনি গমগম করিতেছে কিন্তু সবই কি তেমনি
আছে ? একবার অন্তঃপুরে উকি দিয়া দেখি।
এ কি ? এই দীন-হীনার ন্যায় মলিনমুখী মলিনবেশ
নারী—ইনিই কি পনি-কন্যা গর্বিত। মাতঙ্গী ?
চোখে জল, ব্যাপার কি ?
ব্যাপার কি বুঝিবার জন্য অধিক বিলম্ব করিতে হইল
। ক্রোধে ঘূর্ণিতলােচ। বড় বধূ আসিয়া কর্কশকতে
বলিলেন,-বলি ঠাকুরঝি ! তােমার দস্যি ছেলের জ্বালায়
কি আমরা ছেলেপিলে •িয়ে ঘর করতে পাব না? তােমার
মােহিনী
আদরের জাদুর জন্যে আমার সােণাৱ বাছার কি খােয়ার
হয়েছে, একবার এসে দেখ দেখি। শ্বশুর ঠাকুর তো
তােমায় একেবারে রাজকন্যে বানিয়ে রেখে গেছেন। এখন
সেই বাপের কাছে আবদার করগে না। তিনি গেলেন,
তােমায় আর তােমার এই ননীর পুতুলকে নিয়ে গেলেই
তাে পারতেন । আমাদের জন্যে এ সুখ-শেল রেখে গেলেন
কেন ? ওমা যাব কোথা একটু কথার ঘা সয় না !
কিছু বলিনি, একেবারে ঝাঝরা চোখে আর জল ধরে না
যে! আবার ননীগােপালটিও যে কেঁদে আকুল। আপনি
মেরে আবার কান্না! কি ছেলের কল্লা ! ও কি কথা কওন।
যে! একেবারে বাক্যি হ’রে নিয়েছে। বাক্যি-যন্ত্রণা দিয়ে
ঠাকুরজামাইকে বাড়ীছাড়া করেছ, এবার ভাই-ভাজদের
তাড়াও না গাে।”
মাতঙ্গী এই বাক্যের স্রোতে কিছুমাত্র বাধা দিলেন না,
নিজেই ভাসিয়ে গেলেন, পুত্রকে বুকে চাপিয়া চাপা কান্নায়
ফুলিতে লাগিলেন। একহাতে তালি বাজে না। বড় বউ
ঝগড়ার সুবিধা না পাইয়া রাগে গরগর করিতে করিতে
ও আপন মনে গজগজ করিতে করিতে চলিয়া গেলেন।
বউ চলিয়া গেলে ছেলে কাঁদিতে দিতে বলিল,-
*
৭৭
শিবনাথ
“মা, সত্যি তুইই কি বাবাকে তাড়িয়েছিস্? মা, এত
বকুনি কেন সইবি? চল্ না বাবার কাছে চলে যাই।
বাবা আমাকে কত ভালবাসেন, বছর বছর কত খে
কত খাবার পাঠিয়ে দেন।”
ছেলের কথা শুনিয়া মা আরও কাদিয়া উঠিলেন।
কষ্টে বলিলেন,-“বাছা, সে পথ যে আমি নিজেই
খুইয়েছি।” মনে মনে ভাবিলেন, “হায়, তখন কি জানতাম
যে বাবা না
আমার এমন খেয়ার হবে।
কথায় বলে,
বাপ রাজা তো, রাজার কী
ভাই রাজা তো, আমার কি ?
আর এখন ওঁকে পাবই বা কোথা? কোথায় থাকেন
কিছুই জানিনে, তার মনে ব্যথা দিয়েছি, দেবতা স্বামীর
অপমান করেছি, তাই তাে এই দশা। এখন কি করি?
আত্মঘাতী হয়ে সব জালা জুড়তে পারি, কিন্তু দুধের
বাছাকে কার হাতে দিয়ে যাব? আমি থাকতে এই,
আমি মলে তাে দজ্জাল বৌ ছেলেটাকে আস্ত রাখবে না।
আহা, তার হাতে যদি সঁপে দিতে পারতাম, তাহলে সুখে
মরুতে পাতাম। সুখে ? না, মরণেও তাে আমার সুখ
মােহিনী
نا4
হবে না—যতক্ষণ তিনি আমার অপরাধ ক্ষমা না করবেন ।
হায় ! অহঙ্কারে কি অপমানটাই তাঁকে করিছি ! তিনি
কি কখনও এই পাপিছাকে মাপ করবেন ? তার কি
কখনও দেখা হবে ?
অনেক কাদিয়া কাটিয়া একটু সুস্থ একটু শান্ত হইয়া
ভাবিয়া চিন্তিয়া মাতঙ্গী স্বামীকে তাহার পৈত্রিক ভিটার
ঠিকানায় একখানি চিঠি লিখিলেন। যে পৈত্রিক ভিট
লইয়া তিনি একদিন দরিনে স্বামীকে টিটকারী নিয়াছিলেন,
সেইখানেই এখন শরণ লইতে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু স্বামী
তে নিরুদ্দেশ, চিঠি তিনি পাইবেন কি ?
প্রথম প্রথম শিবনাথ পৈত্রিক ভিটর ও তথাকার
জ্ঞাতিদিগের কোনও ঘেঁজ লইতেন না, কিন্তু দুই বৎসর
পূৰ্বে নতন বিবাহ-উপলক্ষে তিনি সাদরে সকলকে নিমন্ত্রণ
করিয়াছিলেন এবং নিজের অবস্থা পরিবর্তনের কথাও
জানাইয়াছিলেন। জ্ঞাতিরা আনলে পাকস্পর্শ-উপলক্ষে
এসেনসােলে গিয়াছিলেন এবং কেহ কেহ তাহার নিকট
অর্থসাহায্যও চাহিয়াছিলেন। সেই অবধি শিবনাথের
তাহাদিগের সহিত চিঠিপত্র চলিত।
সুতরাং মাতঙ্গীর
চিঠিখানি মাঠে মারা গেল না, একজন জ্ঞাতি ঠিকানা
৭৯
শিবনাথ
পরিবর্তন করিয়া এসেনসােক পাঠাইলেন। শিবনাথ একে
প্রিয়তমা পত্নীর শােকে বিকলচিত্ত, তাহার উপর অনেক
দিন পরে এই ব্যাপারে সম্ভিত হইলেন।
পত্রে মাতঙ্গী
অনেক দুঃখের কথাই লিখিয়াছে, নিজের অপরাধের জন্য
বার বার ক্ষমা চাহিয়াছে, আর সে কত কি লিখিয়াছে,
তাহার আর কি বলিব ।
শিবনাথ কি করিবেন স্থির করিতে না পারিয়া
মতিলালকে দর কথ; মুনাইনে। মতিলাল আবার
গৃহিণীর কাছে সব কথা খুলিয়া বলিলেন। কা-গিন্নীতে
অনেকক্ষণ ধরিয়া এ বিষয়ে পরামর্শ হইল। তাহার পর
মতিলাল শিবনাথকে বুঝাইলেন,-"বো-ঠাকুরাণী এখন যদি
এত নরম হয়েছেন, তখন এখনে আনাই উচিত। আর
তােমার কচি মেয়েটারও একটা দেখবার লােক হয়।
শিবনাথ বলিলেন,-“অবস্থার পরিবর্তনে তিনি এখন নরম
হয়েছেন বটে, কিন্তু আমি আবার বিয়ে করেছিলাম, সতীনের
মেয়ে তার ঘাড়ে পড়বে, এ সব কথা জানলে তিনি এতটা
নরম থাকবেন কি ? এখানে এসে সব দেখে শুনে হয় তো
একটা কেলেঙ্কারি ক?
চলে যাবেন।” মতিলাল
বুঝাইলেন,—“ন দাদা তুমি বুঝছ না, এখন তিনি যে রকম
মােহিনী
৮০
নরম হয়েছেন, এতে আপত্তি করবেন না। আর সতীন
তাে আর বেঁচে নেই, সুতরাং তা প্রধান ভয়টাই গেছে।
আর কচি খুকীটিকে দেখে অবিশ্যিই তার দয়ামায়া হবে।”
এই বলিয়া মতিলাল একটু হালকাসুরে বলিলেন,-“এখন
দাদা দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়।” শিবনাথ অনেকক্ষণ ভাবিয়া
বলিলেন, “না ভাই, আমার মনের যে অবস্থা তাতে
আমার সেখানে যাওয়া অসম্ভব। এতদিন পরে সেখানে
যেতে বড় বধ-বাধ ঠেকে। বিশেষ শ্বশুর মশায় জীবিত
নেই, শালা-বাবুরা কি রকম ব্যবহার করূবেন, কে জানে ?”
মতিলাল আবার গৃহিণীর সঙ্গে পরামর্শ করিয়া পরদিন
শিবনাথকে বলিলেন,—“আচ্ছা দাদা, তুমি সব কথা খুলে
ব’লে বেশ ক'রে একখানা চিঠি লিখে দাও। আমিই ৰী
সঙ্গে করে গিয়ে বৌ-
ঠাণকে নিয়ে আসছি।” শিবনাথ
অনেক ভাবিয়া সেই কথাতেই সায় দিলেন।
কয়েকদিন পরে মতিলাল ঝীকে সঙ্গে লইয়া রামনগরে
গেলেন। মাতঙ্গী পত্রে ও ঝীর মুখে সবই জানিলেন,
কিন্তু সব জানিয়াও যাইতে আপত্তি করিলেন না, বরং
আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। শালা-বাবুরা মতিলালের মুখে
শিবনাথের ঐশ্বর্যের কথা শুনিয়া তাহাকে খুব খাতির
শিবনাথ
করিলেন এবং ভগিনীকে পাঠাইতেও সম্মত হইলেন—এখন
আপদ বিদায় হইলেই তাহা নাচেন।
পরদিন মাতঙ্গী সপুত্র রওয়ানা হইলেন ও যথাসময়ে
এসেনসােলে পেছিলেন । গৃহে প্রবেশ করিয়াই মাতঙ্গী
গলায় বস্ত্র দিয়া স্বামীর পা জড়াইয়া ধরিলেন ও চোখের
জলে ভাসিতে ভাসিতে বলিলেন,—“আমি বড় পাপ করেছি,
তুমি যতক্ষণ মাপ না কৰ্ব্বে ততক্ষণ পা ছাড়ব না।”
শিবনাথ সজলনয়নে তাহাকে ক্ষমা করিলেন। তথন মাতঙ্গী
চক্ষু মুছিয়া মাতৃহীন শিশুটিকে বুকে তুলিয়া লইলেন, আর
শিবনাথ কতকাল পর স্নেহের সুকুমারকে গাঢ় আলিঙ্গন
করিলেন।
উম।
পূজার গল্প
“পুরবাসী বলে উমার মা,
তাের হার। তারা এলো ওই,
শুনে পাগলিনীর প্রায়,
অমনি রাণী ধায়, কই উমা বলি কই।
কেঁদে রাণী বলে,
একবার আয় না, একবার আয় মা,
একবার আয় মা করিকোলে।
এই ঘাের কলিকালে লােকের দেবদেবীতে বিশ্বাস ও
ভক্তি শিথিল হইয়াছে, বিপদে পড়িলে লােকে আর তেমন
একাগ্রচিত্তে, তেমন আকুলকণ্ঠে, দেবতাকে ডাকিতে পারে
তাই মানুষের ডাকে আর দেবতার আসন টলে না,
নহিলে ডাকের মত ডাক দিতে পারিলে কি ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণ
করিতে তাহারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করেন ? কিন্তু আমরা
;
যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে দেবতা ও মানবে অন্তরঙ্গভাব ছিল, বিপদে পড়িলে ভক্ত দেবতার শরণ লইত, দেবতারাও মানবের বিপদভঞ্জন করিতে কালবিলম্ব করিতেন না। { সেই সােণার সত্যযুগে এক গ্রামে এক ব্রাহ্মণ-দম্পতী বাস করিতেন। ব্রাহ্মণের নাম শৈলেশ্বর, ব্রাহ্মণীর নাম শিরিরাণী। ব্রাহ্মণ ধাৰ্ম্মিক ও সচ্চরি, বিদ্বান ও অমায়িক প্রকৃতি ছিলেন ; ব্রাহ্মণী ও সর্বাংশে তাহার মেগা ছিলেন । তাহার মধুর স্বভাবের গুণে ব্রাহ্মণ দারিদ্র্যের মধ্যেও শান্তিতে কালযাপন করিতেন। কেবল একটি বিষয়ে তাহাদিগের (ক্ষোভ ছিল, তাহাদিগের কোন সন্তান সন্ততি ছিল না : হউক, এই ভাবে বহু বৎসর অতিবাহিত হইলে তাহাদিগের সে ক্ষোভও থাকিল না ; ব্ৰহ্মণী অধিক বয়সে এক সৰ্ব্বাঙ্গসুন্দরী সুলক্ষণা কন্যা প্রসব করিলেন। দেবী- ভক্ত ব্রাহ্মণ আদর করিয়া কন্যার নাম রাখিলেন ‘উমা”। উমা দিন দিন শুক্লপক্ষের শশিকলার ন্যায় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতে লাগিল। মাতাপিতা তাহাকে পুত্রের ন্যায় স্নেহে ও আদরে লালন পালন করিতে লাগিলেন। উমা রূপে-গুণে শুধু মাতাপিতার কেন, পল্লীস্থ আবালবৃদ্ধ-বনিতার আনন্দ- মােহিনী ৮৪ দায়িনী হইল। সকলেই বলিত, সাক্ষাৎ নগেন্দ্ৰনন্দিনী নিষ্ঠাবান্ ব্রাহ্মণের ভক্তিতে প্রসন্না হইয়া তাহার কন্যারূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন। ক্রমে উমা বিবাহবােগ্যবয়সে উপনীত হইল; ব্রাহ্মণ কন্যাকে সৎপাত্রস্থ করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী উভয়েরই ইচ্ছ। এমন সুরূপা সুশীল সুলক্ষণ কন্যাকে কোন বিদ্বান্ রূপবান সচ্চরিত্র এবং ধনশালী বরের হস্তে সম্প্রদান করেন। কিন্তু দরিদ্র ব্রাহ্মণের এমন কি সহায়-সঙ্গতি আছে যে এই উচ্চ আশা চরিতার্থ করিতে পারেন ? ‘উত্থায় হৃদি লীয়ন্তে দরিদ্রাণাং মনােরথাঃ।' ব্রাহ্মণ কন্যাদায় হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য সর্বদাই বিপদ- বারিণী দুর্গার স্মরণ করিতেন। জগজ্জননীর যােগাযােগে একদিন এক পরমসুন্দর পূতচরিত্র ব্রাহ্মণ রাজকুমার ছদ্মবেশে দেশভ্রমণ করিতে করিতে এই গ্রামে উপনীত হইলেন এবং মধ্যাহ্নে ব্রাহ্মণের গৃহে অতিথি হইলেন। ব্রাহ্মণ সে সময়ে গ্রামান্তরে গিয়াছিলেন, সুতরাং অতিথি-সৎকারের ভার উমার উপর পড়িল। কিয়ৎক্ষণ পরে ব্রাহ্মণও গৃহে ফিরিলেন। আতিথেয়তা-পরিতৃপ্ত রাজকুমার উমার রূপ-গুণে মুগ্ধ হইয়া উমা ব্রাহ্মণের নিকটে আত্মপরিচয় দিয়া সলজ্জ ভাবে উমাকে বিবাহ করিবার প্রস্তাব করিলেন এবং ব্রাহ্মণ সম্মত হইলে পিতার অনুমতি পাইতে বাধা ঘটিবে না, একথাও বলিলেন। ব্রাহ্মণ আশার অধিক আনন্দ পাইয়া তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন; রাজকুমার স্বদেশে ফিরিয়া মিত্রদিগের পারা মাতাপিতাকে সমস্ত কথা জানাইলেন। রাজা বিশ্বস্ত লােকদ্বারা কন্যা ও কন্যার পিতার তত্ব লইয়া সন্তুষ্ট হইলেন এবং হৃঃচিত্তে বিবাহের উদ্যােগ করিলেন। মহাসমারােহে শুভক্ষণে রাজকুমারের সঙ্গে উমার শুভ বিবাহ হইল। উমা সাশ্রনয়নে পতির সহিত শ্বশুরালয় যাত্ৰা করিল। ব্রাহ্মণী একমাত্র সন্তানের বিরহাশঙ্কায় মৰ্ম্মভেদী ক্রন্দনে কন্যাকে আরও ব্যাকুল করিয়া তুলিলেন । রাহ্মণ রাজার সাদর-নিমন্ত্রণে কন্যা-জামাতার সহিত রাজভবনে গমন করিলেন। বিবাহের আনুষঙ্গিক পাক- স্পর্শ-প্রভৃতি ব্যাপার অনুষ্ঠিত হইলে ব্রাহ্মণ যখন কন্যাকে নিজালয়ে আনিবার জন্য রাজার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন, তখন কিন্তু এক বিষম ব্যাঘাত উপস্থিত হইল। রাজা বলিলেন, “রাজ-সংসারের নিয়ম এই যে, রাজ-বধূ কখন রাজপুরী ছাড়িয়া পিত্রালয় বা অন্যত্র যাইবে না।” এই মােহিনী কথা শুনিয়া ব্রাহ্মণের মস্তকে যেন বজ্রাঘাত হইল। হউক, আরও কয়েক দিন কন্যার মায়ায় রাজ-ভবনে কাটাইয়া ব্রাহ্মণ বিমগ্নমনে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। ব্রাহ্মণীর অবস্থা সহজেই অনুমেয়। নবােঢ়া দুহিত। শ্বশুরালয় হইতে শীঘ্রই ফিরিয়া আসিবে, এই আশায় তিনি এ কয় দিন বুক বাঁধিয়া ছিলেন। এক্ষণে স্বামীর মুখে নিদারুণ বাৰ্তা শুনিয়া তিনি কবিরহ-যন্ত্রণায় শস্য লইলেন। ব্রাহ্মণ দৃঢ় সংযমের গুণ কোন প্রকারে ধৈর্য। ধারণ করিয়াছিলেন ; কিন্তু পত্নীর অবস্থা দেখিয়া তাহার সেই ধৈর্য্যের বন্ধন ছিন্ন হইল। উভয়েই কন্যার জন্য উন্মত্তপ্রায় হইলেন, দিবানিশি শয়নে স্বপনে জাগরণে কেবল ‘উমা, উমা বলিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর এই আকুল ক্রন্দনে ভগবতী কৈলাসে- শরী আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি নারদকে স্মরণ করিলেন এবং নারদ আসিলে তাহা দ্বারা ব্রাহ্মণকে বলিয়া পাঠাইলেন, “দেবীর আজ্ঞা, তুমি এ বৎসর দুর্গোৎ- সব কর এবং তদুপলক্ষে বৈবাহিককে নিমন্ত্রণ করিয়া কন্যা-জামাতা পাঠাইতে অনুরােধ কর, তাহা হইলেই তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে। অর্থাভাবের জন্য ইতস্ততঃ ৭ উমা করিও না, তােমার যথাশক্তি যে আয়ােজন করিবে, তাহাতেই দেী প্রসন্ন হইবেন।” ব্রাহ্মণকে এই আদেশ জানাইয়া, নারদকে আরও কি কি করিতে হইবে তৎসম্বন্ধে দেবী তাহাকে উপদেশ দিলেন। তদনুসারে নারদ মর্ত্য- লােকে অবতরণ করিয়া ব্রাহ্মণকে দেবীর আদেশ জানাই- লেন এবং রাজাকে নিমন্ত্রণ করিবার ভারও গ্রহণ করিলেন। কিয়ৎকাল পরে নারদ ব্রাহ্মণের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং ব্রাহ্মণের হস্তে বহু ধন দিয়া বলিলেন, “রাজা আপনার নিমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করিয়াছেন এবং পুত্র-পুত্রবধূকে পূজা- উপলক্ষে এই বাটীতে পাঠাইতে স্বীকৃত হইয়াছেন, পরন্তু পূজার ব্যয় নির্বাহের অঙ্গ আপনাকে এই অর্থ- সাহায্য করিয়াছেন। এই বলিয়া নারদ প্রস্থান করিলেন। ব্রাহ্মণ মহা-আনন্দে ও উৎসাহে দেবী-পূজার উদ্যােগ- আয়ােজন করিতে লাগিলেন। নানাবিধ দ্রব্য-সম্ভারে ভাণ্ডার পূর্ণ হইল। ক্ৰমে বােধনের দিন আসিল। পুরােহিত সায়ম আমন্ত্রণাধিবাসের উদ্যােগ করিতেছেন, যেমনি কাসর-ঘণ্টা বাদিত হইল, অমনি শিবিকা-বাহকগণের কোলাহল শত হইল, পরক্ষণেই ব্রাহ্মণ-ব্ৰহ্মণী এবং অন্যান্য উপস্থিত স্ত্রী- মােহিনী ৮৮ পুরুষগণ দেখিলেন, নানা বস্ত্রালঙ্কার-ভূষিতা অলক্তরাগ- রঞ্জিতচরণা উমা রাজরাজেশ্বরী-মূর্তিতে স্বামিসহ প্রাঙ্গণে দণ্ডায়মান। উমা মাতা পিতার পদধূলি-গ্ৰহণান্তে উপস্থিত সকলকে যথাযােগ্য প্রণাম-অভিবাদন ইত্যাদি করিলেন । উমার মুখচন্দ্র-দর্শনে মাতাপিতা সুখের সাগরে ভাসিলেন এবং আশা পূর্ণ হওয়াতে গদগদকণ্ঠে গলগ্নীকৃতবাসে দেবীপদে প্রণাম করিয়া আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইলেন। উমা সাননে স্বহস্তে পাকশালার ভার লইলেন সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী-পূজার তিন দিন অক্লান্ত পরিশ্রমে ও অদম্য উৎসাহে স্বয়ং ভােজ্যদ্রব্যাদি পাক করিয়া নিমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গ ও অতিথি অভ্যাগতগণকে পরিতােষ-পূর্বক ভােজন করাইলেন। সকলে একবাক্যে তাহার রন্ধনের ভূয়সী প্রশংসা করিল। সকলেই বলিতে লাগিল, যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা দীন ব্রাহ্মণের গৃহে সশরীরে অবতীর্ণ । পূজা-অন্তে বিজয়া দশমী। উমা সাশ্রনয়নে মাতা- পিতাকে জানাইলেন, সেই দিনই তাহাকে স্বামিসহ শশুরা- লয়-যাত্রা করিতে হইবে, রাজার এই আদেশ। দেবীর কৃপায় তিন দিন জনক-জননী প্রাণের উমার মুখশশী নিরীক্ষণ করিবার সৌভাগ্য-লাভ করিয়াছেন, ইহাতেই উমা তাহারা কৃতার্থ, সুতরাং কোন প্রকারে ‘নয়নের বারি নয়নে নিবারি’ তাহারা বিজয়াদশমী-কৃত্য সমাধা হইলে হিমালয়- নন্দিনী উমার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণকন্যা উমাকেও আবার আসিস মা’ বলিয়া বিদায় দিলেন। পরদিন ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণকে বলিলেন, ‘পূজার কয়দিন বন্ধন-পরিবেষণাদিতে ব্যস্ত থাকায় উমার আমার ভাল করিয়া আহার হয় নাই ; অতএব উদ্ব ও দ্রব্যাদি হইতে উপযুক্ত পরিমাণ মিষ্টান্ন লইয়া তুমি উমার শ্বশুরালয়ে গমন কর।' সেই পরামর্শ-অনুসারে ব্রাহ্মণ মিষ্টান্ন লইয়া জভবনে গেলেন। রাজা বৈবাহিককে পরম-সমাদরে অভ্যর্থনা করিলেন এবং কুশলাদি-প্রশ্নের পর আগমন- প্রয়ােজন জিজ্ঞাসা করিলেন। ব্রাহ্মণ দেবীর পূজা- উপলক্ষে রাজপ্রদত্ত অর্থসাহায্যের জন্য এবং স্বামিসহ উমাকে পিত্রালয়ে প্রেরণের জন্য রাজার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিলেন এবং উমা একপ্রকার অভুক্ত অবস্থায়ই শ্বশুরালয়ে প্রত্যাগমন করিয়াছিল, তজ্জন্য মিষ্টান্নাদি আনিয়াছেন, ইহাও বলিলেন। রাজা সমস্ত শুনিয়া বিস্মিত হইলেন এবং তৎসম্বন্ধে তিনি কিছুই অবগত নহেন বলিলেন। তিনি রহস্টোছেদের জন্য রাজকুমারকে তথায় মােহিনী } ডাকাইলেন, রাজকুমার সমস্ত শুনিয়া অবাক হইলেন। তাঁহাদিগের সন্দেহ হইল, ব্রাহ্মণ কন্যাবিরহে বিকৃতমস্তিষ্ক হইয়াছেন। ব্রাহ্মণ পুনঃপুনঃ তাহাদিগের কথার প্রতিবাদ করিয়া কাতরভাবে বলিলেন, “আচ্ছা, আমার কন্যার সহিত একবার সাক্ষাৎকার হইলেই এ কথার শেষ মীমাংসা হয়। কিন্তু ব্রাক্ষণ কন্যার নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত বলিলে কন্যাও অতিমাত্ৰ বিস্মিত হইল এবং পিতার উন্মাদদশায় মম্মাহত হইল। ব্রাহ্মণ তখন সংশয়ান্দোলিতচিত্তে ঈষদুচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, “তবে কি আমি সত্যসত্যই উন্মাদগ্রস্ত হইলাম । আমি কি এই প্রান্ত ? সে সমস্তই কি স্বপ্ন ? কে তবে উমারূপে দেবীপূজার কয়দিন আমার কুটির আলাে করিয়াছিল ?” তখন সহসা সেই প্রকোষ্ঠ দিব্যজ্যোতিতে সমুদ্ভাসিত এবং পদ্মগন্ধে আমােদিত হইল। সকলে বিস্মিতলােচন দেখি- লেন—রাজরাজেশ্বরী-মূর্তিতে আর এক উমা তথায় আবি- ভূত হইয়াছেন। সকলে সবিস্ময়ে শুনিলেন, তিনি মধুরহাস্য-সহকারে সকরুণকণ্ঠে বলিতেছেন, “বাবা, তুমি কন্যাবিরহকাতর হইয়া অনুক্ষণ ‘উমা, উমা বলিয়া ক্রন্দন করিতে, আমি সে ডাকে স্থির থাকিতে না পারিয়া কৈলাস-
উমা
ধাম ত্যাগ করিয়া দেবাদিদেব মহাদেবের সঙ্গে মর্তে
পূজাগ্রহণের ব্যপদেশে পূজার কয়দিন তােমার ভবনে
অবতীর্ণ হইয়াছিলাম। আরও আমি তােমার নিকট
প্রতিশ্রুত রহিলাম, প্রতিবৎসরই আমি ঐ সময়ে এরূপে
তােমার গৃহে আসিব।” এই বলিয়া ভক্তবৎসল জগন্নাত
অসুহিতা হইলেন।
“নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমাে নমঃ।
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা " •
.; গল্পট কাশীধামের প্রসিদ্ধ কথক ক্ষেত্ৰনাথ মুখোপাধ্য!!
ড্রামণির মুখে শুনিয়:ছিলাম। কাশীধামে প্রবাসকালে তাহার
কথকত-শ্রবণে বড়ই আনন্দ পাইতাম । সম্প্রতি কয়েক বৎসর হইল
কথক মহাশয়ের কাশীপ্রাপ্ত হইয়াছে।
লক্ষী ( সত্য ঘটনা-অবলম্বনে লিখিত। গুণময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল রত্ন, শিক্ষাদীক্ষায় সভ্য- তায় ভব্যতায়, চরিত্রের পবিত্রতায় আদর্শ যুবক। কিন্তু আজ তাহার আচরণে তাহার শ্বশুরবাড়ীর সকলেই মম্মাহত ; দুই বৎসর হইল বিজয় বাবুর একমাত্র কন্যা মনােরমার সহিত তাহার বিবাহ হইয়াছে। মনােরমা এখন চতুর্দশ- বর্ষীয়া, সে ইহার মধ্যে কয়েকবার শ্বশুরঘর করিয়াছে। গুণময়ও শনিবারে শনিবারে শ্বশুরালয়ে আসিতেন। উভয় গৃহই কলিকাতায়, সুতরাং কোন পক্ষেই অসুবিধা নাই। বেশ আনন্দে দু’জনের দিন কাটিতেছিল। কিন্তু দৈবক্রমে আজ রাত্রে গুণময় শ্বশুরমন্দিরে আসিয়া একজন ঝির মুখে কথায় কথায় শুনিয়াছেন যে বিজয় বাবুর একটি রক্ষিতা আছে, তাহাকে তিনি বিস্তর টাকা খরচ করিয়া প্রকাণ্ড বাড়ী করিয়া দিয়াছেন, ও তাহার উপর মােটা
সক্ষম।
টাকা মাসহার। দেন। যত কাষই থাকুক না কেন, নিজ
বাটীতে যত বিপদই ঘটুক না কেন, বৃষ্টি-বাদলা ঝড়-ঝাপটা
যতই হউক না কেন, রােজ একটিবার করিয়া সেখানে
গেলে তাহার চলে না। তবে যে কারণেই হউক,
সেখানে রাত্রি কাটান না। প্রবীণ শ্বশুর মহাশয়ের এই
কীর্তির কথা শুনিয়া চরিত্রবান্ জামাতার মন ঘৃণায় লজ্জায়
রাগে ক্ষোভে পূর্ণ হইল। তিনি কোট ধরিলেন, এখনই
মনােরমাকে নিজগৃহে লইয়া যাইবেন, আর কখনও তাহাকে
বাপের-বাড়ীমুখাে হইতে দিবেন না। এমন বাপের বাতাস
লাগিলেও মনােরমার চরিত্র কলুষিত হইয়া যাইবে, গুণময়ের
এইরূপ বিশ্বাস। তিনি স্পষ্টাস্পষ্টি এই কথা স্ত্রী ও শ্বাশুড়ীকে
বলিলেন এবং শ্বাশুড়ী ঠাকুরাণী যে ঘরণী গৃহিণী হইয়াও
স্বামীর এমন অনাসৃষ্টি অনাচার সহ্য করেন, সে জন্যও
তাহাকে দু’কথা বলিতে ছাড়িলেন না। ভাগ্যে বিজয় বাবু
তখন গৃহে ছিলেন না, নতুবা উচ্চশিক্ষিত জামাতা তাহাকেও
খাতির করিতেন না। শাশুড়ী ঠাকুরাণী দু’একবার
মৃদুস্বরে জামাতাকে নিবৃত্ত হইতে অনুরােধ করিলেন, কিন্তু
তাহাতে ফল হইল না দেখিয়া তিনি বেশী তর্ক করিতে
গেলে আরও কেলেঙ্কারী হইবে বুঝিয়া নিরস্ত হইলেন।
মােহিনী গুণময় ভাড়াটিয়া গাড়ী ডাকিয়া অশ্রুমুখী মনােরমাকে লইয়া প্রস্থান করিলেন। মনােরমার জননী নীরবে চক্ষু মুছিলেন। বিজয় বাবু যথাসময়ে গৃহে ফিরিয়া সকল কথা শুনিলেন : শুনিয়া রাগ বা দুঃখ, অভিমান বা অপমান-জ্ঞান, কোনও- রূপ মনােভাব প্রকাশ করিলেন না, গভীর-মুখে খানিক ক্ষণ গুম হইয়া থাকিলেন। পরে অফিস-ঘরে গিয়া একখানি চিঠি লিখিয়া বেয়ারাকে তথনই তথনই ডাকে দিতে বলিয়: শষ্যাগৃহে প্রবেশ করিলেন। গুণময় পরদিন প্রাতে শ্বশুর মহাশয়ের চিঠিখানি পাইলেন। পােষ্টকার্ডে সামান্য কয়টি কথা। সব চিঠিখান নকল করিয়া দিতেই বা ক্ষতি কি? “মঙ্গলাস্পদেষু- বাবাজী, তােমার কাৰ্যে দুঃখিত হই নাই, বরং সন্তুষ্ট হইয়াছি। তােমার নিষ্কলঙ্ক চরিত্র ও উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত কাৰ্য্যই করিয়াছ। তবে তােমাকে একটা কথা বলিবার প্রয়ােজন আছে। একবার সন্ধ্যার সময়-নং বেলিয়াঘাটা লক্ষী রােডে আমার একটি বন্ধুর বাটীতে আমার সঙ্গে দেখা করিতে পারিবে কি ? হয়তাে আমার গৃহে আর পদার্পণ করিবে না, তাই অস্ত্র দেখা করিতে বলিতেছি। আশা করি, আমার এই শেষ অনুরােধ রক্ষা করিতে ইতস্ততঃ করিবে না । একবার একদণ্ডের জন্য আমার সংস্পর্শে আসিলে তােমার চরিত্রহানির সম্ভাবনা নাই। (Robust) দৃঢ় চরিত্রের লক্ষণই এই। আণীৰ্বাদক বিজয়লাল বসু।” চিঠিখানি পড়িয়া গুণময়ের প্রথম ঝোক হইল, কখনই এমন শ্বশুরের সহিত বাক্যালাপ করিবেন না। কিন্তু চিঠির শেষ কথাটিতে তাহার আত্মাভিমান বেশ একটু স্ফীত হইল ; তিনি নিজ চরিত্রবলের উপর নির্ভর করিয়া অনুরােধ রক্ষা করাই স্থির করিলেন, অকিন্তু এই সুযােগে শ্বশুর- মহাশয়কে সুনীতির মহিমা বুঝাইবার চেষ্টা করিয়া দেখিবেন, ইহাও মনে মনে স্থির করি লন। সন্ধ্যাকালে গুণময় পত্রে নির্দিষ্ট বাটীতে পোঁছিলে কারওয়ান তাহাকে দ্বিতলের একটি প্রশস্ত কক্ষে লইয়া গেল। গুণময় দেখিলেন, বিজয় বাবু শুভ্র ফরাসে তাকিয়া হেলান দিয়া বসিয়া অলবেলায় টান দিতেছেন, আর কেহ সেখানে উপস্থিত নাই। বিজয় বাবু জামাতাকে কাছে বসিতে মােহিনী বলিলেন ও বাটীর সকলের কুশল-প্রশ্ন করিলেন। পরে একটু দম লইয়া ও জামাতাকে একটু বিশ্রামের অবকাশ দিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন—“তােমাকে আমার জীবনের ইতিহাস শুনাইব বলিয়া আহ্বান করিয়াছি। একটু স্থির হইয়া সবটা শুনিতে হইবে, শুনিয়া তােমার যথাকৰ্ত্তব্য করিবে, আমি কোন আপত্তি করিব না।” গুণময় ইঙ্গিতে সম্মতি জানাইলেন। বিজয় বাবু গম্ভীরভাবে বলিতে আরম্ভ করিলেন।- “আজ আমার যে উন্নতির অবস্থা দেখিতেছ, আমার প্রথম জীবনে ইহার কিছুই ছিল না। আমি দরিদ্রের গৃহে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলাম। আমার শৈশবেই মাতাপিতা স্বর্গারােহণ করিয়াছিলেন। জাতির গৃহে আশ্রয় পাইয়াছিলাম, সেখানে আদরও ছিল না, অনাদরও ছিল না। তিনি নিজের ধান্ধায় ঘুরিতেন, আমার তত্ত্বাবধান করিতেন না। নির্ভাবনায় সমবয়স্ক- দিগের সহিত মিলিয়া বাগানে বাগানে ফুল পেয়ারা খাওয়া ও খেলাধুলা করাই আমার কার্য ছিল। নামমাত্র স্কুলে যাইতাম। কিছুদিন পরে, গ্রামের স্কুলে ভাল পড়া হয় না এই অছিলায় (কেননা প্রায় বৎসরই ক্লাসে উঠিতে
১৭
লক্ষী
পারিতাম না। কলিকাতা শহরে এক ধনী আত্মীয়ের
বাটীতে উপস্থিত হইলাম। তিনি অকাতরে অনুদান
করিতেন, কিন্তু তিনিও আমার উপর দৃষ্টি রাখিলেন না।
তাহার অর্থসাহায্যে সহরের স্কুলে পড়িতে লাগিলাম।
সহুরে ছেলেদের সঙ্গে মিশিয়া ঘ্রই বেশ বকিয়া গেলাম,
রীতিমত বদখেয়াল শিখিলাম। হাতে অর্থ ছিল না, वनौ
সহপাঠীদের লেজ ধরিয়া আমোদ-সাগরে সাঁতার দিতে
লাগিলাম।
“এ সব কুৎসিত কথা তােমার কাছে বলা উচিত নহে,
কিন্তু না বলিলে তুমি আমাকে ঠিক বুঝিতে পারিবে
না, তাই বাধ্য হইয়া বলিতেছি। একটু ধৈর্য্য ধরিয়া তােমাকে
শুনিতে হইবে, আবার এই অনুরােধ করিতেছি।
“এই বেলিয়াঘাটায় এক রাত্রে কুস্থানে ইয়ারবর্গের
পাল্লায় পড়িয়া বেজায় বাড়াবাড়ি করিয়াছিলাম।
শুনিয়াছি, বন্ধুবৰ্গ যখন আমােদ-প্রমােদের পর চলিয়া গেল,
তখন আমি অন্ধ-অচেতন, শরীরটা রীতিমত বেএক্তার
হইয়া পড়িয়াছিল। সেই অবস্থায় ঐ ফুস্থানের একটি নারী
(তাহার নাম থাকমণি) সেবাশুশ্রুষা করিয়া আমাকে সুস্থ
করিয়াছিল। সেই অবধি আমার উপর তাহার কেমন মায়া
পরে
মােহিনী পড়িয়া গেল। কেন জানি না, সে আমাকে সােণার চক্ষে দেখিল। ক্রমে বন্ধুবর্গের সে বাড়ীতে আনাগােনা কমিয়া আসিল, কিন্তু আমি প্রায়ই সেখান যাইতাম আর দরিদ্র হইলেও আদর-যত্ন পাইতাম। বাবাজী, বিরক্ত হইও না, মিছামিছি তােমাকে এই লজ্জাকর কথা বলিতেছি না। মন্দর ভিতর ভালর বীজ নিহিত ছিল, সেই কথাই এখন বলিব। “এক দিন থাক আমাকে বলিল, “দেখ, একটা কথা বলি, রাগ করিও না। তুমি যে ইয়ারদের দলে মিশিয়া একেবারে বয়াটে হইয়া যাইতেছে, ইহার শেষ কোথায় একবার ভাবিয়া দেখিয়াছ কি ? উহাদের সকলের রেস্ত আছে, ফুর্তি করিতেছে, তােমার দশা কি হইবে? ভূতের মুখে রাম- নামের ন্যায় তাহার মুখে এই হিতবাণী শুনিয়া আমি বােক বনিয়া গেলাম । হাসিয়া উড়াইয়া দিতে ইচ্ছা হইল, কিন্তু তাহার মুখ-পানে চাহিয়া সে সাহস হইল না। অগত্যা লজ্জায় অপােবদন হইলাম । সে আরম্ভ করিল, “দেখ, ও সব চলিবে না। উহার ঢের সময় আছে ; এখন তোমার লেখাপড়ার সময়। মন দিয়া লেখাপড়া কর, মানুষ হও, দু’পয়সা আনিতে শেখ, তার পর হৃত্তির সুবিধার অভাব হইবে না। এবার আমি কথা কহিলাম। বলিলাম, লম। লেখাপড়া এমন অবহেলা করিয়াছি যে এখন আর চেষ্টা করিয়া শােধরাইয়া লওয়া অসম্ভব। সে বলিল, 'বেশ, তা” হলে হোমিওপ্যাথি স্কুলে পড়িয়া ডাক্তার হও। তা’ বশী বিদ্যেসাধ্যির তে দরকার নাই। আমি বলিলাম, বই কিনিতে, মাহিন দিতে, লাগিবে : আমি কোন মুখে আশ্রয়দাতার কাছে বলিব, এদিকার লেখাপড়া হইল না, হােমিওপ্যাথি পবি, খ, দিন। এক বলিল, “টাকার ভাবনা তােমাকে ভাবিতে হইবে না। * লাগে আমি দেব । এতে আর ন'শ পঞ্চাশ লাগবে ন: তুমি মন স্থির করিয়া পড়া আরম্ভ কর। ‘আমি তো এই প্রস্তাব শুনিয়া অবাক্ বাহক, তাহার ক খ ঠলিতে পারিলাম না । কেমন সুবৃদ্ধি হইল, তাহার প্রস্তাবে রাজী হইলাম। ক্রমে দুই বৎসর পড়িয়া পাশ করিয়া বাহির হইলাম । যে দিন পাশের সংবাদ শুনিল, সে নি থাক আনলে হরির লুঠ দিল ও আমাকে সােড়শাে- পরে আহার করাইল! “তাহার আনন্দবেগে একটু ভাটা পড়িলে আমি সঙ্কোচের সহিত বলিলাম, ‘পাশ করিয়া তো বাহির হইলাম। এখন করিব কি ? এ পাশে চকরি মেলে না। ডাক্তার-
মােহিনী
খান খুলিয়া বসিতে হইলেও অনেক টাকার খেলা। আর
কলিকাতায় গলিতে গলিতে ডাক্তার, পসার জমাইতে
কখনও পারিব কিনা সন্দেহ। তােমার পরামর্শ শুনিয়া
দেখিতেছি যাঁড়ের গােবর হইলাম।
“সে একটু হাসিয়া বলিল, “আগে যা হচ্ছিলে সে যে
একেবারেই, ষাঁড়ের গােবর তবু তে পদে আছে। যাহ,
তােমাকে যখন পাশ করিতে বলিয়াছি, তখন এ কথা না
ভাবিয়া রাখিয়া বলি নাই। এই বলিয়া সে ক্যাশ-বাক্স
হইতে পাচশত টাকার নােট বাহির করিয়া আমার হাতে
দিয়া। বলিল, “এই টাকায় আপাততঃ দোকান সাজাও,
পরে আরও লাগে আরও দেব। আমি তাহার পুজিব
টাকা লইতে আপত্তি করিয়া বলিলাম, “সে কি হয় ?
তােমার আপদ বিপদ আছে, সঞ্চিত টাকা কি এমন করিয়া
নষ্ট করিতে আছে ? সে এবার খুব এক চোট হাসিয়া
বলিল—( সে হাসি শুনিয়া আমি শিহরিয়া উঠিলাম ),
‘আমাদের টাকার ভাবনা কি, বন্ধু ? তুমি আর দ্বিধা করিও
, কাযে বসিয়া যাও। আমি একটু দম লইয়া বলিলাম,
‘তাই তাে, এ টাকা তােমায় কি করিয়া শােধ করিব তাই
ভাবিতেছি।' সে বলিল, 'ওগো, ভাবনায় কায নাই।
লক্ষমা
যখন বড় ডাক্তার হইবে, তখন ডাকিলেই আসিবে, এই
সর্তে টাকাটা তােমায় দিলাম। দেখো, তখন যেন ব’লােনা,
আমরা কাষের লােক, বাজে কাযে সময় নষ্ট করিতে
পারি না। আমি আবেগের সহিত গাঢ়স্বরে বলিলাম,
‘সৈ কথা ভাবিও না, থাক। আমি যত বড়ই হই, তােমার
দয়া তােমার স্নেহ কখনও ভুলিব না, তুমি না ডাকিলেও
রােজ একবার করিয়া আসিব।” সে বলিল, “আচ্ছা গাে
আচ্ছা, সেই কথাই থাকল। দেখা যাবে, তুমি কেমন
সত্যবাদী।
“তারপর দোকান সাজাইলাম, ধড়াচূড়া বাধিলাম,
রােগীর সন্ধানে ফিরিতে লাগিলাম। জানি না, আমার
কোন্ গুণে ভগবান মুখ তুলিয়া চাহিলেন। দেখিতে দেখিতে
পসার জমিয়া গেল, হাতযশে সকলে মুগ্ধ হইল, বড় বড় ঘরে
ডাক আসিতে লাগিল, মাসে হাজার টাকা উপায় করিতে
লাগিলাম।
“কিন্তু ধনগর্বে আমি সেই দয়াময়ী স্নেহময়ী পতিতাকে
ভুলি নাই। নিজের উচ্চ প্রাসাদ-নির্মাণের আগে বেলিয়া-
ঘাটার সেই খােলর বাড়ীর জমি কিনিয়া এই দেখ আমার
দারিদ্র্যহারিণী থাকমণির অট্টালিকা করিয়া দিয়াছি। ,
মােহিনী , আর তাহাকে, থাক’ বলিব না, তাহা হইতেই আমার এই লক্ষ্মী, এখানে লক্ষ্মী’মন্দির নির্মাণ করাইয়াছি। অসময়ে যে আমাকে অধঃপতনের অতল হইতে উদ্ধার করিয়াছে, অকূলে কূল দিয়াছে, তাহার কাছে কি আমি অকৃতজ্ঞ হইতে পারি ? তাহারই অনুরোধ বিবাহ করিয়াছি, সংসারী হইয়াছি ; স্ত্রী-পুত্র-কন্যা লইয়া সুখে জীবন কাটাই- তেছি। কিন্তু আমার সেই পূৰ্ব্ব প্রতিশ্রুতি মনে করিয়া দিনান্তে একবার তাহাকে দেখা না দিয়া থাকিতে পারি । অন্যায় করিয়াছি কি ?” ;
ক্ষমী
।
জামাতা বাবাজী পতিতার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হইতে
প্রথম প্রথম একটু উসফিস করিতেছিলেন, কিন্তু শেষটা
বেশ নিবিষ্টচিত্তেই বৃত্তান্তটা শুনিলেন। তাহার পর শ্বশুরের
পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, “আপনি পিতৃতুল্য, আমি যে
হঠকারিতার কার্য করিয়াছি, বালকের ছেলেমানুষি মনে
করিয়া তাহার জন্য মাফ করুন। আর সেই দয়াবতী
মহিলার কাছে আমাকে একবার লইয়া চলুন, আমি তাহার
চরণধূলি লইয়া ধন্য হইব।”
বিজয়বাবু আনন্দের আবেগে জামাতাকে বুকে টানিয়া
লইলেন এবং আবেগ একটু প্রশমিত হইলে অনুচ্চকণ্ঠে
ডাকিলেন, “লক্ষ্মী, একবার এদিকে এস।” ‘লক্ষ্মী, বােধ হয়
পাশের ঘরেই ছিল, ধীরপদবিক্ষেপে শ্বশুর-জামাতার সম্মুখীন
গুণময় অবাক হইয়া দেখিলেন, বিধবার বেশে
অৰ্দ্ধবয়স্কা এক নারী, চোখে, মুখে হাবভাব কিছুমাত্র
নাই, মুখে ম্লান হাসি ও দৃষ্টি নত । দেখিয়া গুণময় অগ্রসর
হইয়া তাহাকে প্রণাম করিতে হেঁট হইতেছিলেন, লক্ষ্মী
ব্যস্ত হইয়া তাহার হাত দুইটি ধরিয়া ফেলিল, “ছিঃ বাবা,
হইল।
মােহিনী
১০৪
আমাদের মত পাপিষ্ঠাকে কি তােমার মত সচ্চরিত্র
ভদ্রবংশীয় ছেলের প্রণাম করিতে আছে ? এমনিই আমাদের
পাপের অন্ত নাই, আবার তােমার প্রণাম গ্রহণ করিয়া কি
আরও পাপে ডুবিব ? যাহ, আমি তােমার বয়ােজ্যেষ্ঠা,
আশীৰ্বাদ করিতেছি—বেঁচে থাক, সুখে থাক, চরিত্রধনে
ধনী হও।”
তাহার পর লক্ষ্মী’ ঘটা করিয়া উভয়কে জলযােগ
করাইল, সে সব বিবরণ দিয়া আর পুথি বাড়াইতে চাহি না !
}
সরস্বতী
( সত্যঘটনা-তাবলম্বনে লিখিত)
আষাঢ়ের প্রবল বর্ষণে আফিসের (ফতা ঘরমুখো
হরি বাবু বড় ফাঁফরে পড়িলেন। প্রায় বারাে আনা রকম
পাড়ি জমাইয়াছেন, এমন সময় হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ
হইল। ছাতায় মাথা আটকান যায় কিন্তু জুতা আটকান
যায় না; আজকালকার কালে ভগবানের গড়া মাথা
অপেক্ষা চৰ্ম্মকারের গড়া জুতার দরদই বেশী, কেননা মাথা
ভিজিলে সহজে মুছিয়া শুকাইয়া লওয়া যায়, কিন্তু জুতা
ভিজিলে ব্যাপার সঙ্গীন হইয়া পড়ে। অথচ মধ্যবিত্ত গৃহস্থের
জামা-কাপড়ের বেলায় যা কিছু বাহুল্য থাকুক, জুতার
বেলায় এক প্রস্থর বেশী আর দুই প্রস্থ কপালে যােটে না।
জুতা হাতে করাটাও হালফ্যাশানের ভদ্রলােকের পক্ষে যেন
কেমন বেয়াড়া দেখায়। এই জুতা-সমস্যায় পড়িয়া অগত্যা
মােহিনী
হরি বাবু একটি বাড়ীর দরজা খােলা দেখিয়া অসঙ্কোচ
দরজার ভিতর গিয়া গড়াইলেন। নীচে লােকজনের
সমাগম নাই, কিন্তু উপরের বারাণ্ডা হইতে একজন
আগন্তুকের দরজায় প্রবেশ লক্ষ্য করিল। হরি বাবুর
উপরদিকে চাওয়া অভ্যাস ছিল না, সুতরাং তিনি সেটা
জানিতে পারিলেন না।
একটু পরে একজন ঝি আসিয়া বলিল, “বাবু, এখানে
কতক্ষণ দাড়িয়ে কষ্ট পাবেন ? ওপরে গিয়ে বসবেন আসুন।”
হরি বাবু সারাদিন কলম পিষিয়া ক্লান্ত হইয়াছিলেন, কোথায়
বাড়ী গিয়া গা-পা ছড়াইয়া একটু আরাম করিবেন ও
শ্রান্তিহারিণী তামাকুদেবীর প্রসাদে ক্লান্তি দূর করিবেন,
তা’ না এই দুৰ্যোগ উপস্থিত। এমন অবস্থায় তিনি এই
আমন্ত্রণ উপেক্ষা করিতে পারিলেন না, ঝির পশ্চাৎ পশ্চাৎ
উপরে উঠিলেন। উপরে উঠিয়া দেখিলেন, একটি ঘরের
ভিতর দিয়া আর একটি ঘরে যাইতে হয়, প্রথম ঘরটিতে
বিশেষ বেশী আসবাব নাই, কিন্তু দ্বিতীয় ঘরটির সাজসজ্জা
ও গৃহের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর চেহারা দেখিয়া হরি বাবু অনুমানে
বুঝিলেন এ কোথায় আসিয়া পড়িয়াছেন। তিনি যেন দুই
পা পিছাইয়া যাইবার ভাব দেখাইনে। গৃহস্বামিনী
১৭ সর। তাহা বুঝিতে পারিয়া তাড়াতাড়ি আগাইয়া আসিয়া বলিল, “আপনি ভদ্রলােক, কষ্ট পাচ্ছেন দেখে ঝিকে উপরে ডেকে আনতে বলেছি। আমার কোন কু-মতলব নেই। আসতে যদি আপত্তি থাকে, তা বেশ ঐ ঘরেই বসুন।” এই বলিয়া সে একখানি সুদশ্য ও সুপরিসর গালি বিছাইয়া দিল ও বলিল, “আমার গুরুদেবের ব্যবহারের জন্য এই আসন কিনেছি, কোন দ্বিধা বােধ না করে এই আসনে বসুন।” হরি বার. একটু অপ্রস্তুতভাবে রম। প্রদত্ত আসনে বসিয়া পড়িলেন। রমণী তখন ভরসা পাইয়া বলিল, “আকাশের যে রকম গতিক, আপনাকে অনেকক্ষণ বতে হবে বােধ হচ্ছে। জামাটামা ছাড়ন, ঝিকে দিয়ে মাজাঘষা পেতলের ঘটতে জল আনিয়ে দিচ্ছি, হাত- মুখ ধুয়ে ঠাণ্ডা হ'ন। আর তামাক অভ্যেস আছে কি ?” হরি বাবু শেষের কথাটায় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়িলেন। তখন রমণী বলিল, “গুরুদেব আবেন বলে নতুন হুকো- ক’কে কিনে রেখেছি, আপনি তাহতে তামাক সেবা করুন ; ঝি সেজে দিচ্ছে। গুরুদেবের জন্যে আবার হুকো- ক’কে আনালেই হবে।” হরি বাবু নাহু নাহু করিয়াও শেষটা রমণীর নির্দেশমত ;
মােহিনী
১০৮
সব কার্যই করিলেন । তখন আর একটু সাহস পাইয়া
রমণী বলিল, “আপনার অফিসের কাপড়চোপড় দেখছি ;
সারাদিন খাটুনির পর অবিশ্যিই ক্ষিদে-তেষ্ণা পেয়েছে, যদি
অনুমতি করেন, ঝিকে দিয়ে বাজার থেকে ডাব আর সন্দেশ
আনিয়ে দিই, একটু জলযােগ করুন।” “মৌন সম্মতি-
ক্ষণ” বুঝিয়া রমণী ঝিকে ডাকিয়া ভিতরের ঘরে লইয়া
গিয়া পয়সা দিল ও কি কি আনিতে হইবে বলিয়া দিল।
এ সব স্থানের ঝি-চাকরের এমন তৰিবৎ ষে বাদলাবৃষ্টি
ঝড়ঝাপটা বজাঘাতেও তাহারা মনিবের ফরমাশ খাটিতে
অবহেলা করে না। আর ঝির জুতা ভিজিবারও ভয় নাই !
একটু পরে ঝি ফিরিল। হরি বাবু তাহার হাত হইতে
সন্দেশ ও মুখকাটা ডাব লইয়া ক্ষুধাতৃষ্ণা দমন করিলেন ও
আর এক কিস্তি গম্ভীরভাবে তামাকুদেবীর আরাধনায়
মনােনিবেশ করিলেন।
ক্রমে দুর্যোগের অবসান হইল। তিনিও আস্তে আস্তে
উঠিয়া গৃহাভিমুখে প্রস্থানােস্থত হইলেন। যাইবার সময়
কেমন বাধ-বাধ ঠেকিল, রমণীকে আতিথ্যের জন্য ধন্যবাদ
দেওয়া ঘটিয়া উঠিল না। রমণী তাহাকে উঠিতে দেখিয়া
সঙ্গে সঙ্গে সদর দরজা পর্যন্ত গেল ও সপ্রতিভভাবে বলিল,
সরস্বতী
“তবে আসুন বাবু, দেরীর জন্যে ঘরের লােকে না জানি
কত ভাবছে। আবার কবে আ-" এই পর্যন্ত বলিয়া
সে একটু অপ্রতিভ হইয়া বলিল, “এই দেখুন বাবু, কেমন
বদ অভ্যেস হয়ে গেছে, কি বলতে যাচ্ছিলাম। যাক,
কিছু মনে করূবেন না।” হরিবাবু হাঁ না কিছু না
বলিয়া আস্তে আস্তে বাড় গুজিয়া দরজার বাহির হইয়া
গেলেন।
মােহিনী
১১০
( ২ )
}
হরিবাবু গৃহে ফিরিলে গৃহিণী একবার জিজ্ঞাসা করিলেন,
“আজ এত দেরি যে ! বৃষ্টিতে আফিসের বার হতে
পারনি বুঝি ?” তিনি মৃদুস্বরে উত্তর করিলেন, “বৃষ্টির জন্যে
পথে আটকা পড়েছিলাম। মােটের উপর সত্য কথাই
বলিলেন, কোথায়, কি বৃত্তান্ত, গৃহিণ ও জিজ্ঞাসা করিলেন
না, তিনিও ভাঙ্গিয়া বলিলেন না। আজ বৎ ক্ষুধা নাই,
একটু রাত্রি করিয়া আহাৱাদি করিব-এই মন্তব্য প্রকাশ
করিয়া কাপড়চোপড় ছাড়িলেন, ও হাতমুখ ধুইয়া নূতন
করিয়া ধূমপানে মন দিলেন । অমৃতে কি কখন অরুচি
হয় ? তাহাতে আবার এক্ষেত্রে তামাকু গৃহিণীর শ্রীহস্তের
সাজা। রাত্রে আহারাদির পর গৃহকৰ্ম্মবিরতা গৃহিণীর
সঙ্গে কিছুক্ষণ প্রেমালাপের পর নিদ্রার শরণ লইতে উন্মুখ
হইলেন। কিন্তু সুনিদ্রা হইল না। থাকিয়া থাকিয়:
অতিথিসেবাপরায়ণা নবপরিচিতার যত্ন-আদর ও অতিথি
নিষ্ঠারক্ষার জন্য আগ্রহ, এই সব কথা মনে পড়িতে লাগিল ।
এই শ্রেণীর স্ত্রীলােকের হাবভাব-সম্বন্ধে তাহার যে ধারণ
ছিল, ইহার চরিত্রে তাহার বিপরীত ধরণ দেখিয়
সরস্বতী
তাহার হৃদয় সেই রমণীর প্রতি কেমন একটা শ্রদ্ধায়
ভরিয়া উঠিল।
যাহা হউক, প্রাতে উঠিয়: যথারীতি প্রাতঃকৃত্য সারিয়া
ও স্নানাহার করিয়া তিনি আফিসে গেলেন। কিন্তু সেদিন
অন্যদিনের মত পিয়া অফিসের কা করিতে পারিলেন
না, কেমন যেন অন্যমনস্ক ! মনে কেবলই সেই রমণার
আদর যত্নের কথা উঠিত লাগিল । মােহের এই তে
প্রকৃতি ।
আফিসে ছুটি হইলে অন্যমনস্কভাবে চলিতে চলিতে
ঠিক সেই বাড়ীর দরজায় তাহার গতিরোধ হইল।
দেবদুর্যোগ নাই, তবুও একবার সেখানে আশ্রয় লইতে
মন টানিল । একটু ইতস্তত করিয়া তিনি ‘ঝী, ঝী,
বলিয়া ডাকিলেন ; গলার সাড়া পাইয়া ঝী আসিল না,
কিন্তু গৃহস্বামিনী বারাণ্ডায় বাহির হইয়া উহাকে দেখিতে
পাইল ও একটু মকিত হইয়া মৃদুমধুরস্বরে বলিল, “ওপারে
আসুন, বি দোকানে গেছে।”
হরি বার এই কোমল আহ্বানে উৎসাহের সহিত শিড়ি
ভাঙ্গিয়া উপরে উঠিলেন এবং বরাবর ভিতরের ঘরেই
গেলেন।
আর অর রমণী তাহাকে গুরুদেবের আসন
মােহিনী
দিল না, একখানি চেয়ারে বসিতে বলিল। আসন-গ্রহণান্তে
হরি বাবু গলাটা পরিষ্কার করিয়া বলিলেন, “কাল তােমার
আদর-যত্নে বড় আপ্যায়িত হয়েছি, তখন ধন্যবাদ দিতে
পারিনি, তাই আজ সেই ত্রুটী শােধ রাতে এসেছি।” রমণী
এ কথার কোন উত্তর না দিয়া একটু মৃদু হাসিয়া তাহাকে
হাত-মুখ ধুইতে জলের ঘটী সাইয়া দিল এবং ধুমপান ও
জলযােগের ব্যবস্থা করিল ; তবে আজ ঘরের তৈয়ারি
খাবার-বাজারের নহে। হরি বাবু খাবার খাইতে একটু
মৃদু আপত্তি করিয়া শেষে জিনিশগুলির সদ্ব্যবহারে প্রবৃত্ত
হইলেন।
জলযােগান্তে গৃহস্বামিনীর তৈয়ারি তামাক টানিতে
টানিতে শয্যাপার্শ্বে হারমােনিয়ামটা দেখিয়া তিনি একটু
আদ্দারের সুরে বলিলেন, “বাজনাটা দেখে’ লােভ হচ্ছে
একটু গান শুনি। আমার এ অনুরােধটা না রাখলে
অতিথি-সৎকারে ত্রুটি থেকে যাবে কিন্তু।” রমণী দ্বিরুক্তি
না করিয়া আবার একটু মৃদু হাসিয়া যন্ত্রে সুর দিয়া কীর্তন
ধরিল এবং উপরি-উপরি ৩৪টি বিরহ গায়িয়া তাহার পর
চাবিটা বন্ধ করিয়া দিল।
গানের রেশ যত ক্ষণ কাণে রহিল, তত ক্ষণ হরি বাবু
১১৩
সরস্বতী
কেমন এক রকম হইয়া থাকিলেন। তাহার পর ধ্যানভঙ্গ
হইলে বুঝিলেন, রমণীর অনেকটা সময় লইয়াছেন, তাহারও
অনেক বিলম্ব হইতেছে, তিনি ধড়মড় করিয়া উঠিয়া
পড়িলেন। রমণী বাধা দিল না।
কেবল কল্য যে কথাটা
‘অদ্ধোক্তে’ চাপিয়া গিয়াছিল, অদ্য সেই কথাটা স্পষ্ট করিয়া
বলিল, “আবার কবে আসবেন ?” হরি বাবু জড়িতকণ্ঠে
কি একটা জবাব দিলেন তাহা ভাল করিয়া শুনা গেল না।
সেইদিন হইতে প্রায় প্রত্যহই হরিবাবু আফিসের
ফেরতা এইখানে ‘চিত্তবিশ্রাম করিতে আসিতেন, দু’দণ্ড
বসিতেন, দু’টা গান শুনিতেন, দু’টা মিষ্টালাপ করিতেন,
( মিষ্টমুখও কোন্ না করিতেন ?) ও পরে বিদায়
লইতেন। ক্রমে তিনি রমণীর নাম-পরিচয় পাইলেন ;
নামটিও সার্থক, কেননা পতিতা সরস্বতী দেবী সরস্বতীর
কৃপায় গীতবাদ্যনিপুণা, অর্থাৎ ‘রূপে লক্ষ্মী না হইলেও
‘গুণে সরস্বতী’। রমণীও তাহার নাম-ধাম সংসারের
কথা সবই জানিয়া লইল। হরি বাবু ঘরে ফিরিয়া
অক্ষুধার ও বিলম্বের কি কৈফিয়ৎ দিতেন আনি না,
মােহিনী
১১৪
জানিলেও সে মিথ্যাচারের, কৈতববাদের পরিচয় দিতে
চাহি না। গৃহিণী আতা আতা উত্তর শুনিয়া আকারে-
ইঙ্গিতে ব্যাপার বুঝিয়াও, ইহা লইয়া আর খোঁচাখুচি
করিতেন না, স্বভাবসুলভ গাম্ভীৰ্য্য ও ধীরতার সহিত সহ
করিয়া যাইতেন।
এইভাবে অনেকদিন
সারস্বতকুঞ্জে সুখ-সম্মিলন
চলিল। কতদিন কে জানে ? ‘বৎসরেই কি কালের
পরিমাণ হয় ?
তাহার পর একদিন আকাশে মেঘ দেখা দিল, দুর্দিন
পড়িল। হরি বাবু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হইলেন, আফিস যাওয়া
বন্ধ হইল, সুতরাং আফিসের ফেরত গান শােনার পাঠও
বন্ধ হইল। কয়েকদিন অদর্শনে সরস্বতী বিমনাঃ হইয়া
উঠিল ; ঠিকানা জানা ছিল, সে আর থাকিতে না পারিয়া
কৌশলে সংবাদ সংগ্রহের জন্য কীকে হরি বাবুদের পাড়ায়
পাঠাইল। ঝী আসিয়া যে সংবাদ দিল তাহাতে সে বসিয়া
পড়িল। যা হ’, কতকটা সামলাইয়া লইয়া একটু ইতস্তত
করিয়া শেষে সে নিজেই রােগীর উদ্দেশে যাত্রা করিল।
গৃহিণী অপরিচিতা নারীকে শুষ্কমুখে ও ব্যাকুলকণ্ঠে স্বামীর
পীড়া-সম্বন্ধে প্রশ্ন করিতে শুনিয়া একটু বিস্মিত হইলেন,
সরস্বতী হয়তাে একটু সন্দেহও করিলেন। কিন্তু যে কালের ছায়া তখন পড়িয়াছে, তাহাতে আর বিস্ময়-বিদ্বেষের বিশেষ অবসর ছিল না, তিনি কোন প্রশ্ন না করিয়া রমণীর প্রার্থনামত তাহাকে স্বামীর নােগশয্যাপাশ্বে লইয়া গেলেন। হরি বাবু তখন বাকশক্তি হারাইয়াছেন, কিন্তু সরস্বতীকে কাছে পাইয়া তাহার রােগষ্টি বিশীর্ণ বদনমণ্ডলে যে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটিল ও পরক্ষণেই দুই চক্ষু দিয়া যে অশ্রু ধারা ঝরিতে লাগিল, তাহা লক্ষ্য করিয়া গৃহিণী ব্যাপারটা সবই বুঝিলেন। কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি তখন আর গৃহিণীর বিরাগ-বিদ্বেষ-বরাষ-অভিমানের সময় নহে। সরস্বতী ম্লানমুখে রােগীর শয্যাপাশ্বে কায়েমী-ভাবে বসিল এবং সেবার ভার গ্রহণ করিল। চাপাগলায় গৃহিণীকে বলিল, “দিদি, এখন বেশী কথার সময় নয়। আমি প্রাণ- পণে এর সেবা করূব। এমন রুগী ফেলে’ বােজ বাড়ী যাওয়া চলবে না। আমাকে দু'বেলা দু'মুঠো দিও। আর যাতে ভাল ডাক্তার দেখান হয়, তার ব্যবস্থা কর। টাকার জন্যে ভেবাে না।” সহরের সর্বশ্রেষ্ঠ ডাক্তার আনা হইল, চিকিৎসার কিছুই ত্রুটি হইল না, কিন্তু রােগীর অবস্থা ক্রমেই খারাপ
মােহিনী
১১৬
দাড়াইল ; কেবল কষ্টে বাক্যস্ফ ৰ্ত্তি হইল। হরি বাবু
নিঃসন্তান নিঃসহায় গৃহিণীর পানে যখনই চাহিতেন তখনই
তাহার বুক ভাঙ্গিয়া যাইত, দুই চক্ষু জলে ভরিয়া যাইত,
তাহার অবর্তমানে গৃহিণীর কি দশা হইবে—শুধু ভদ্রাসন
বাড়ীখানি ও প্রভিডেন্ট ফণ্ডের কিছু টাকা ভরসা—এই
ভাবনা তাহার রােগযন্ত্রণাকেও ছাপাইয়া উঠিল। সে কথা
তিনি গৃহিণীকে কিছুতেই বলিতে না পারিয়া একদিন
গৃহিণীর অসাক্ষাতে সরস্বতীকে বলিয়া ফেলিলেন।
মৃদুস্বরে বলিল, “ভয় কি ? আপনি সেরে উঠবেন, অত
ভাবেন না। আর যদি মন্দটাই হয়, তবে দিদির জন্যে
আপনি মন খারাপ করূবেন না, সে ভার আমার রইল,
এবিষয়ে তাকে কোনও কষ্ট পেতে দেব না।” তখন হইতে
রােগীর মুখখানা একটু প্রসন্ন হইল, কিন্তু কালরােগে
তাহাকে অব্যাহতি দিল না। সেই রাত্রেই পদপ্রান্তে
লুষ্ঠিত গৃহলক্ষ্মীকে ও শিবরাদেশে উপবিষ্টা পতিতা সরস্বতীকে
কান্দাইয়া তিনি কোন অজানা দেশে চলিয়া গেলেন।
১১৭
সরস্বতী
( ৪ )
শ্রাদ্ধাদির পরে শশাকের প্রথম বেগ কথঞ্চিৎ শান্ত
হইলে অভাগিনী বিধবা বিধবাবেশধারিণী সরস্বতীকে
বলিলেন, “বােন, আমার ইচ্ছে বাড়ীখান বেচে ও আফিসের
টাকা তুলে নিয়ে কাশীবাস করি। তুমি আর কত দিন
আমার কাছে পড়ে থাকবে ?” সরস্বতী ভগ্নকণ্ঠে বলিল,
“দিদি, তুমি তীর্থযাত্রা করূবে, বাধা দেব না। কিন্তু এই
বাড়ীই আমার মহাতীর্থ, আমি এবাড়ী ছাড়তে পারব না।
দশজন পাড়ার লােক ডেকে বাড়ীর ন্যায্য দাম ঠিক কর,
আমিই তােমাকে সে দাম দেব। তবে ইচ্ছে ছিল, ষে
ক’দিন এ পােড়াপ্রাণ থাকবে, তােমার মত সতীলক্ষ্মীর
সেবা করে পূর্বজন্মের ও এ জন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত
কব, কিন্তু দয়াল ঠাকুর আমার কপালে তা লেখেন নি ?”
কথাটা শুনিয়া বিধবা অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিলেন।
পরে বলিলেন, “বােন, তুমি যে বলছ এ বাড়ী আমাদের
মহাতীর্থ, তা’ বটে। আমারও ইচ্ছে করে, তার চরণ স্মরণ
করে, এইখানেই পড়ে থাকি, কিন্তু আফিসের সামান্য
টাকায় ত পােড় পেটে কুলােবে না। আরও কতকাল
মােহিনী বাঁচতে হবে তা কে জানে ? তাই বাড়ী বিক্ৰী করুতে চাই।” সরস্বতী উত্তর করিল, “দিদি, তােমার যদি এই বাড়ীতে থাকা মত হয়, তবে সে জন্যে ভাবতে হবে না। আমি তার ব্যবস্থা করুব। আমি তো তােমার আশ্রয়েই থা, আমার বাড়ীখানার আর দরকার কি ? সে খানাই বেচে ফেলি। তুমি এতে অমত করাে না, লক্ষ্মী দিদি, সে বাড়ী আমার পৈত্রিক–পাপের ধনের নয়। তুমি অনুমতি দাও, সেই বাড়ীবেচা টাকা সুদে খাটালে দুটো বিধবার পেট বেশ চলে যাবে।” হয় ত অন্য সময়ে হইলে বিধবা এ প্রস্তাব ঘৃণার সহিত প্রত্যাখ্যান করিতেন; কিন্তু আর মনের জোর নাই। তাহা ছাড়া সর্বদা সরস্বতীর সংসর্গে থাকিয়া তাহার স্বভাব- চরিত্র দেখিয়া, তাহার সেবা পাইয়া, তাহার মনটা আর তাহার দিকে বিমুখ ছিল না। তিনি গদগকণ্ঠে বলিলেন, “সরি, তুই আর জন্মে আমার বােন ছিলি ! তাের যা ভাল বােধ হয় তাই ক, আমি কোনও কথা কইব না।” এই কথাবার্তার পর সরস্বতী পাপের অর্জিত সমস্ত অর্থ অনাথাশ্রমে দান করিল ও বাড়ী বিক্রয় করিয়া যে টাকা পাইল শুধু তাহাই সম্বল করিয়া দুই জনের জন্য
১১৯
সরস্বতী
পুজি করিল। সে যত দিন বাঁচিয়া ছিল, বিধবার নিয়ম
পালন করিয়া ও দিদির সেবা করিয়া কাটাইয়াছিল।
তাহার পর একদিন হতভাগিনীর জীবন-বত্তিকা নিবিল
সে ‘দিদি’র চরণে মাথা রাখিয়া, তাহার ক্ষমাভিক্ষা করিয়া,
মহাযাত্ৰা করিল। বিধবা সেই যুগল শুশান-স্মৃতি হৃদয়ে
বহন করিয়া আরও কিছুদিন দারুণ মনঃকষ্টে জীবন
কাটাইয়া শেষে পরলােকে পতির সহিত মিলিত হইলেন ।
কে জানে সেখানে লক্ষ্মী-সরস্বতীর ন্যায় উভয়েই স্বামি-
নারায়ণের পদসেবার অধিকার পাইয়াছিলেন কি না?
লক্ষী-সরস্বতী-সম্বন্ধে মন্তব্য ‘নারায়ণে’ ( শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন ১৩২৬) গণিকাতন্ত্র সাহিত্য- শীর্ষক প্রবন্ধাবলিতে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছি, যে ‘পতিতার মসীময় চরিত্রেও অতর্কিত ভাবে একট। শুভ্র রেখার আবির্ভাব হয়, কালে। মেঘের কোলে অকস্মাৎ একটু ঝিকিমিকি করে, প্রকৃত প্রেমের প্রভাবে পতিতার প্রকৃতির পরিবর্তন হয়, ইত্যাদি বাপার রোমান্টিক রীতির প্রভাবে সাহিত্যে প্রকটিত হইতেছে। ইহারই সমর্থন কর্পে বিশ্বস্তসূত্রে অবগত দুইটি প্রকৃত ঘটনা-অবলম্বনে ‘লক্ষ্মী' ও 'সরস্বতী’ নামে দুইটি গল্প শিখিয়াছি। এই দুইটি প্রকৃত ঘটনা হইতে বুঝ: যায়, প্রবীণ লেখক মুক্ত জলধর সেনের ‘হরিশ ভাণ্ডার গল্পে পতিত দুর্গার চরিত্র-সংশোধন নিতান্ত কবিকল্পনা নহে, এরূপ ব্যাপার বাস্তবজীবনেও ঘটে। এইটুকু দেখানই আমার উদ্দেশ্য। গণিকা সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধিসাধন আমার উদ্দেশ্য নহে। আমার গল্প-রচনার উপযুক্ত কল্পন! ও আর্ট নাই, সুতরাং এই ভোঁত ভূমিকায় অঙ্কিত লক্ষ্মী-সরস্বতী গুণীচিত্রকর জলধর বাবুর নিপুণ ভূমিকায় অতি দুগার পাশে স্থান পাইবে, এরূপ দুরাশা করি না।
পরিশিষ্ট
{ ‘স্বপ্ন মাদুলি’ গল্পের মূল )
JONES : CREDULITIES PAST & PRESENT.
(CH. III, Amulets and Talismans, 1-12.)
܀
The Germans have a curious legend connected
with this talisman. It was framed by some of
the magi in the train oi the anlassadors of
Aaroun-al-Raschid to the mighty Emperor of the
West, at the instance of his spouse Fastrada. with
the virtue that her husband would be always
lascinated towards the person or thing on which
it was.
The constant love of Charles to this his
spouse was
the consequence;
but as it was not
taken from her finger after death, the affection
of the emperor was continued unchanging to the
corpse, which he would on no account allow to
be interred, even when it became offensive. His
confessor, having some knowledge of the occult
sciences, at last drew off the amulet from the
( 2 ) inanimate body, which was then permitted to be buried ; but he retained possession of it himself, and thence became Charle'ss chief favourite and prime minister, till he had been promoted to the highest ecclesiastical dignity, as Archbishop of Mainz and Chancellor of the Empire. At this pitch of power, whether he thought he could rise no higher, or scruples of conscience were awakened by the hierarchical vows, he could hold the heathen charm no longer, and he threw it into a lake not far from his metropolitan seat, where the town of Aachen now stands. The regard and affection of the monarch were immediately diverted from the monk and all men, to the country surrounding the lake; and he determined building there a magnificent palace for his constant residence, and robbed all the ancient and imperial residences, to the distance of Ravenna, in Italy, to adorn it. Here he subsequently resided and died, but it seems the charm had a passive as well as an active power ; his throes of death were long and violent; and though dissolution seemed every moment impend. on even
ing, still he lingered in ceaseless agony, until the
archbishop, who was called to his bedside to
administer the last sacred rites, perceiving the
cause. had the lake dragged, and obtaining the
talisman, he restored it to the person of the dying
monarch, when his struggling soul parted quietly
way. The grave was opened by Otto III. in
997, and possibly the town of Aachen
may
have
been thought the proper depository,
আট-আনা-সংস্করণ-গ্রন্থমালা মূল্যবান্ সংস্করণের মতই কাগজ, ছাপা, বাধাই-সৰ্ব্বাঙ্গসুন্দর —আধুনিক শ্রেষ্ঠ লেখকের পুস্তকই প্রকাশিত হয়। বঙ্গদেশে যাহা কেহ ভাবেন নাই, আশাও করেন নাই। আমরাই ইহার এম প্রবর্তক। বিলাতকেও হার মানিতে হইয়াছে—সমগ্র ভারতবর্ষে ইহা নূতন সৃষ্টি। বঙ্গসাহিত্যের অধিক প্রচারের আশায় ও যাহাতে সকল শ্রেণীর ব্যক্তিই উৎকৃষ্ট পুস্তক পাঠে সমর্থ হন, সেই মহা উদ্দেশ্যে আমরা এই অভিনব ‘আট-আনা-সংস্করণ প্রকাশ করিয়াছি। মফঃস্বলবাসীদের সুবিধার্থ, নাম রেজে করা হয় গ্রাহকদিগের নিকট নবপ্রকাশিত পুস্তক ভিঃ পিঃ ডাকে প্রেরিত হয়। পূর্ব প্রকাশিতগুলি একত্র, বা পত্র লিখিয়া, সুবিধানুযায়ী, পৃথক পৃথকও লইতে পারেন। ডাকবিভাগের নূতন নিয়মানুসারে মাশুলের হার বর্ধিত হওয়ায়, গ্রাহক দিগের প্রতি পুস্তক ভিঃ পিঃ ডাকে ৬০ লাগিবে । অ-গ্রাহকদিগের wo লাগিবে । গ্রাহকদিগের কোন বিষয় জানিতে হইলে, “গ্রাহক-নম্বর” সহ পত্র দিতে হইবে। প্রতি বাঙ্গালা মাসে একখানি নুতন পুস্তক প্রকাশিত হয়। ১। অভাগী। ৬ষ্ঠ সংস্করণ)—রায় জলধর সেন বাহাদুর। ২। ধর্মপাল (৩য় সংরাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, এম-এ।
[ ২ ]
৩। পল্লীসমাজ ( ষ্ঠ সং)-শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
- । কাঞ্চনমালা ( ২য় সং - হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এম-এ।
৫। 'ববাহ-বিপ্লব (২য় সং-কেশবচন্দ্র গুপ্ত, এম-এ, বি-এ
৬। চিত্রালী ( ২য় সং)-শ্রীসুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বি-এ।
৭। দু'দল ( ২য় সং)- খতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত।
৮। শাশ্বত ভারী ( ২য় সং -শরাধাকমল মুখখাপাধ্যায়।
৯। বড়বাড়ী (৫ম সংস্করণ -রায় ও সূধর সেন বাহাদুর।
১০। অরক্ষণীয়। (৬ষ্ঠ সং --শ্রীশৰংল চট্টোপাধ্যায়।
১১। ময়ূখ (২য় সং)--রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, এম-এ।
১২। সত্য ও মিথ্যা ( ২য় সং)-এবিপিনচন্দ্র পাল।
১৩। রূপের বালাই ( ২য় সং)-শাহরিসাধন মুখােপাধ্যায়।
১৪। সোনার পদ্ধ। ২য় সং)-শাসরেজরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৫। লাইক (২য় সংস্করণ - শ্ৰমতা হেমনলিনী দেবী।
১৬। আলে; (২য় সংস্করণ)--মত নিরুপমা দেবী।
১৭ : বেগম মরু ( সচিত্র – ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৮। নকল পাঞ্জাবী ( ২য় সংস্করণ).. শ্রীউপেন্দ্রনাথ দত্ত।
১১। বিশ্বদল- যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত।
২০। হালদার বাড়ী-মুনীপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী।
২১। মধুপক-হেমেন্দ্রকুমার রায়।
২২। লীলার স্বপ্ন-মনােমােহন রায়, বি-এ।
২৩। জুখের ঘর (২য় সং)-শ্ৰীকালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত, এম-এ।
২৪। মধুমল্পী--শ্ৰীমতী অনুরূপা দেবী।
{
২৫। রনির ডায়েরী শমী কাঞ্চনমালা দেবী।
৬। ফুলের তােড়-শ্ৰীমতী ইন্দিরা দেবী।
২৭। ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাস-ঐসুরেন্দ্রনাথ ঘােষ।
২৮। সীমন্তিনী—এদেবেন্দ্রনাথ বসু।
২৯। নব-বি জান-অধ্যাপক রুদ্র ভট্টাচাৰ্য, এম-এ।
৩০। নববর্ষের স্বপ্ন-সরল দেবী।
৩১। নীল মাণিরায় বাহাদুর শানেশচন্দ্র সেন, ডি-লিট ।
৩২। হিসাবনিকাশ - শকেশব ল গুপ্ত, এম-এ, বি-এল।
৩৩। মায়ের প্রসা:-বীরেন্দ্রনাথ ঘােষ।
৩৪। ইংরেজী কাব্যc.g—শ শশুতােষ চট্টোপাধ্যায়, এম-এ ।
৩৫। জলছবি-মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়।
৩৬। শয়তানের দান--শাহরিসাধন মুখোপাধ্যায়।
৩৭। ব্রাহ্মণ-পরিবার(২য় সংস্করণ। শ্রীরামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য।
৩৮। পথে-বিপথে-অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সি-আই-ই।
৩৯। হরিশ ভাণ্ডারী ( ৩য স স্করণ) রায় শ্রীজলধর সেন বাহাদুর
৪০। কোন্ পথে-শ্ৰীকালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত, এম-এ।
৪১। পরিণাম—শ্রীগুরুদাস সরকার, এম এ ।
৪২। পল্লীরাণী-শ্রীযােগেন্দ্রনাথ গুপ্ত।
৪৩। ভবানী—নিত্যকৃষ্ণ বসু।
৪৪। অমিয় উৎস-যােগেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়।
৪৫। অপরিচিতা (২য় সং)-শ্রীপান্নালাল বন্দ্যোপাধ্যায়, বি-এ!
৪৬। প্রত্যাবর্তনশীহেমেন্দ্র প্রসাদ ঘােষ, বসুমতী-সম্পাদক।
[ ৪ ]
৪৭। দ্বিতীয় পক্ষ-শ্রীনরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, এ-এ, ডি-এল।
১। ছবি। ২য় সং )-শরৎচন্দ্র চট্টোপাধয়।
১৯। মনােরমা- *ীম :: সরসবল দেব।
৫। সুরেশের
শিশীবসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, এম-এ।
১। নাচওলী--:"পেন্দন পদাষ।
৫২। (প্রমের কথা বলি : টুর বন্দপাধ্যায়, এম-এ।
৫০। গৃহহারা— :বভূতিভূষণ বন্দোপাধায়।
৫৪। দেওয়া{জী- রমা ভট্ট, যা ।
কাঙ্গালের রায় ৷ জলধর সেন বাহাদুর ।
৫৬। গৃহদেবী ( ২য় করণ -বিজয়রত্ন মজুমদার।
৫৭। হৈমবতী— 'শখর কর।
৫৮। বােঝাপড়া-- নরেন্দ্র দেব।
৫৯। বৈ ৬ানিকের বিরুত বুদ্ধি-সুরেন্দ্রনাথ রায়।
৬০। হারান ধন-শাশরাম বেশৰ্ম্মা।
৬১। গৃহ-কল্যাণী-প্রফুল্লকুমার মণ্ডল।
৬২। সুরের হাও-প্রব্লচন্দ্র বসু, বি-এস সি।
৬৩। প্রতিভাশ্রীবরদাকান্ত সেন গুপ্ত ।
৬৪। আত্রেয়ী—শ্রীজ্ঞানেন্দ্ৰশশী গুপ্ত, বি এল !
১৫। লেডী ডাক্তার-শ্রীকালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত, এম-এ।
৬৬। পাখীর কথা-সুরেন্দ্রনাথ সেন, এম-এ।
৬৭। চতুঝেদ (সচিত্র )—ভিক্ষু সুদর্শন।
৬৮। মাতৃহীন—ীমতী ইন্দিরা দেবী।
[ ৫ ]
৩৯। মহাশ্বেত-শ্ৰীবীরেন্দ্রনাথ ঘােষ।
৭০। উত্তরায়ণে গঙ্গাস্নান-ঐশরকুমারী দেবী।
৭। প্রতীক্ষা-শ্রীচৈতন্যচরণ বড়াল, বি-এল।
২। জীবন সঙ্গিনী-যােগেন্দ্রনাথ গুপ্ত।
৭৩। দেশের ডাক-সরােজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায়।
৭৪! বাজীকর--শপ্রেমাঙ্কুর আতর্থী।
৭৫। স্বয়ম্বরা-শ্ৰীবিধুভূষণ বসু।
৭৬। আকাশ কুসুম-ঐনিশিকান্ত সেন।
। বরপন-সুরেন্দ্রনাথ রায়।
৭৮। আহাতি-শ্ৰীমতী সরসীবালা বসু।
১। অন্ধা-শ্ৰীমতী প্রভাবতী দেবী।
৮০। মটর মা-চরণদাস ঘােষ।
৮১। পুষ্পদল-শ্ৰীযতীক্রমােহন সেন গুপ্ত।
৮২। রক্তের খান-শ্রীনরেশচন্দ্র গুপ্ত, এম-এ, ডি-এ ;
৮৩। ছােড় দিবিজয়রত্ন মজুমদার।
৮৪। কালাে বো-শ্ৰমাণিকচন্দ্র ভট্ট চাৰ্ষ্য বি-এ, বি-টি ।
৮৫। মােহিনী-ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এম-এ
৮৬। অকালকম্যাণ্ডের কীত্তি-শৈলবালা ঘােষজায়।
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ ফ্রীট, কলিকাতা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.