Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Bela Shesher Gan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বেলা শেষে
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
এম, সি, সরকার এণ্ড সন্স,
৯০২এ হ্যারিসন রােড, কলিকাতা
মুল্য ১৫০ •
প্রকাশক,
সুধীরচন্দ্র সরকার
এম, সি, সরকার এণ্ড সন্স,
৯২এ হ্যারিসন রােড, কলিকাতা
৯১২ মেছুয়াবাজার স্ট্রীট, নববিভাকর যন্ত্রে
কপিলচন্দ্র নিয়ােগী দ্বারা মুদ্রিত
উৎসর্গ
পরমারাধ্যা মাতৃদেবী
হামায়া দত্ত
পূজনীয়াষু
No text on this page.
সূচী বিষয় পৃষ্ঠা প্রণাম ভােরাই ••• । • • সরযু ••• ময়ূর-মাতন ০ ০ :: ••• ৮ ১৩ ৫ । ২৪ ••• ••• ••• ••• ••• ০ ••• ৫০ সুরার কাহিনী উড়ে জাহাজ ভারতের আরতি ব্লাজা কারিগর সবাই যুক্তবেণী অরুন্ধতী ছন্দ-হিল্লোল কাগজের হাতী বা নবদিগুনাগ-প্রশস্তি নাপ্পি-পীরিতি-কথা... সা-পহেলী ... ভীম-জননী চরকার আরতি বাঙ্গালী পল্টনের গান ঘুম-গুম্ফায় ••• বুদ্ধ পূর্ণিমা কাঠগড়া ... ০ ০ ০ । • ৭২ ৭৪ • পৃষ্ঠা ।।। '' ৭৫ ••• । ৭৬ । । । ৭৯ । । । ৮০ ০৩। ৮১ ৮২ ৮৬ : . ••• । । ৮৯ ••• ••• ••• ১০১ ••• ••• ••• । ১০৪ বিষয় বেতালের প্রশ্ন সাল-তামানী স্বপ্ন-সুন্দরী কবির তিরােধান ইচ্ছামুক্তি শিরাজ-ই-হিন্দ, ফরিয়াদ কয়েকটি গান বুদ্ধ-বরণ নমস্কার . গান্ধিজী অপঞ্চক বাণীর পূজারী বিধানতা যশােধন অগ্রহারী শ্রদ্ধা-হােম মাতা মনু আখেরী দিল্লী-নাম খাঁচার পাখী বিদ্যুৎবিলাস কবিজুবিলি ••• • • • ১১৩ ••• ••• ১১৪ ১১৭ । । ।। ১১৮ ••• ••• ••• ••• •• ৫ । ••• ••• ১৩৪ •• ••• ১৫৭ ••• ••• সূচী ( প্রথম লাইনের সুচী ) ১৩ ৮২ ৮। ৬৫ ৬২ ••• ১১৮ ৮১ অতনু আকাশে যাঁর বিহার অতুল! বিরাট! বিপুল দিল্লী আজ কি আবার ফুল ধরেছে ইরাণ দেশের শিরাজ এ নয়, হিন্দু মুলুকের এই শিরাজ উর্বশী মােরে দিয়েছে পাঠায়ে এক হল আজ অষ্ট বজ,-যুদ্ধ ভয়ঙ্কর এস এস চির চারু চির-চেনা চরকা! ••• ও কে আসছে গাে মুখ ঢেকে লাের পর্দায় ওগাে! কাল-ভােলা কীৰ্ত্তি তােমার অচপল কলম হাতে ভাবছি কেবল লিখতে এসে সঠিক সালতামামী কে তাহারে বন্দী করে? ফলী এটে বাঁধূবে কে সিন্ধুকে গায়ের রােয় যায় না দ্যাখা, সন্ধ্যা হ’ল রাত্রি আসে ঘুম দিয়ে—নিকুম দিয়ে ঘ্যান ঘ্যান শব্দে আকাশ ভরি’ •• জয় জয় ভারত! জয় জয় মাতা! জয় কবি। জয় জগৎপ্রিয় জাগাে বধু! জাগাে, কত ঘুম মাগাে যা তুই অকাতরে জীবন সিন্ধু-জলের ঢেউয়ে ধাক্কা খেয়ে হয় যারা চুরমার, তােমার কথাই মানব মােরা মনুর বচন মান্না দাও ধুয়ে পথ নগরবাসী আনন্দাশ্রুধারে, দিনে দীপ জ্বালি’ ওরে ও খোলী। কি লিখিস হিজিবিজি । দুরে থেকে দেখে দিগগজ ব'লে ৫৮ २४ ৫ । ৭৪ .: ১১৫ ' ১৮ । ১০৪ * * * ••• •••• ৮৯ ••• ৮০ ১২৯ .। ••• ••• ১১৪ ৪ ধূলির অধম নালিশ জানায়-তােমার প্রায়ে ত্রিভুবনের রাজা! । নমস্কার! করি নমস্কার। পরিচয় দিয়ে যাও গাে চলিয়ে পথে যেতে আজ কুড়ায়ে পেয়েছি প্রাণের পরশমণি ! পাব না একলাটি আজ ঘরে পাব না রইতে! ••• পাখী ডেকে ওঠে ওই গাে ওই ফুল নীরবে যেমন ঝরে তেমনি করে মরে গেল কবি বকেয়া হিসাব চুকিয়ে দে রে বছর-শেষের শেষ দিনেতে, বাল্মীকি গড়িল যাহা সংস্কৃতের সংহত শিলায় বাণী-পূজা-দিনে উদয় তােমার বিস্মরণের ভস্মমাঝে কি গান তুমি গাইছ উদাস মনে, বাক্যে অর্থে ফারুখ হেরি, ভাের হ’ল রে, ফর্সা হল, দু উষার ফুল-দোল! মেঘলা থস্থ, সূৰ্য্য ইন্দু মৈত্র-রুণার মন্ত্র দিতে দান মধু মােস্ আর শিলাজতু খুঁজে পাহাড়ের জঙ্গলে “যেথা যাই সেথাই গৌরব মাত্র সার” রাজ-কারিগর বিশ্বকৰ্ম্মা। হিল্লোলে যেথা ছেলে লাবণ্য পান্নার শুন্যে ঘােরে সূৰ্য্যশত সােনার চাপা ছড়িয়ে রে। সেথা তার বীণকার মঙ্গল গায় । ••• সাঁঝে আজ কিসের আলো সিন্ধুর রােল ••• ৩ ••• ••• ৫০ ৭২ । ০ ৮ । । ••• ২৯ ••• ••• ••• ৩৩ ১৭ বেলা শেষে প্রণাম অতনু আকাশে যার বিহার, যার প্রকাশ চিত্তে ভা, সবি বার বয় যাহার, আজ প্রণাম তার দু পায়। সাগরে সরিতে মূচ্ছনায় হয় নিতুই যাৰ বােধন- প্রভাতে প্রদোষে রােজ গান অর্থ ফর পুপবন; == দেহে দেহে যিনি প্রাণ প্রবল, প্রাণপুটের প্রেম অনুপ ;- প্রেমে প্রেমে যিনি হন্ উজল,- রূপ যাহার বা অপ্ত ; ভারতী আরতি-হেমপ্রদীপ, যার পূজায় নিত্য দিন, মানসে যিনি আনন্দ-নীপ, বন্দি তার জাগরে,দীন।
বেলা শেষের গান
জাগিয়া, মাগিয়া ও আশিস,
গাও নবীন ছন্দে গান,
নব সুরে ওরে! আজ বাঁধি
তাের তানেই বিশ্ব প্রাণ।
তাজা তাজা আজি ফুল ফোটায়
এই আলােয় এই হাওয়ায়।
কচি কিসলয়ে কুঞ্জ ছায়-
সব তরুণ আজ ধরাম !
তরুণী আশারেসঙ্গী কর
আজ আবার, মন রে মন!
চির নূতনেরি যেই নিঝর
ব্যক্ত আজ সেই গােপন।
প্রাণে প্রাণে শুধু যার প্রকাশ,
যার আভাষ মন্পবন,
গানে গানে নিতি যাঁর বিলাস
বন্দি আজ তার চরণ।
ভােরাই
ভাের হ’ল রে, ফর্সা হল, দুলল উষার ফুল-দোল!
আন্কো আলােয় যায় স্থাখা ওই পদ্মকলির হাই-তােল।
জাগল সাড়া নিমহলে, অথই নিখর পাখার-জলে-
আলপনা স্থায় আলতাে বাতাস, ভােরাই সুর মন্ ভােলা!
ভােরাই
ধানের ক্ষেতের সবুজে কে আজ সােহাগ দিয়ে ছুপিয়েছে।
সেই সােহাগের একটু পরাগ টোপর-পানায় টুপিয়েছে।
আলােয় মাঠের কোল ভরেছে, অপরাজিতায় রং ধরেছে -
নীল-কাজলের কাজল-লতা আসমানে চোখ, ডুবিয়ে যে।
কল্পনা আজ চলছে উড়ে হাল্কা হাওয়ায় খেল খেলে’!
পাপড়ি-ওজন পাসি কাদের সেই হাওয়াতেই পাল পেলে !
মােতিয়া মেঘের চামর পিজে পায়রা ফের আলােয় ভিজে
পদ্মফুলের অঞ্জলি যে আকাশ-গাঙে যায় ঢেলে।
পূর্ব গগনে থির নীলিমা ভুলিয়েছে মন ভুলিয়েছে।
পশ্চিমে মেঘ মেলছে জটা—সিংহ কেশর ফুলিয়েছে।
হাঁস চলেছে আকাশ-পথে, হাসছে কারা পুষ্প-রথে,
রামধনু-রং আঁচল তাদের আলে-পাথার দুলিয়েছে!
শিশির-কণায় মাণিক ঘনায়, দুৰ্ব্বাদলে দীপ জ্বলে !
শীতল শিথিল শিউলি-বোঁটায় সুপ্ত শিশুর ঘুম টলে।
আলাের জোয়ার উঠছে বেড়ে গন্ধ ফুলের স্বপন কেড়ে,
বন্ধ চোখের আগল ঠেলে রঙের ঝিলি ঝলমলে
নীলের বিথার নীলার পাথার দরাজ এ যে দিল-খােলা!
আজ কি উচিত ভঙ্গ দিয়ে ঝাণ্ডা নিয়ে ঝড় তোেল ?
ফিছে ফিঙে দুলিয়ে ফিতে, বােল ধরেছে বুলবুলিতে।
গুঞ্জনে আর কুজন-গীতে হর্ষে ভুবন হরুবােলা !
ক
বেলা শেষের গান
{
সরযু
বিস্মরণের মাঝে কি গান তুমি গাইছ উদাস-মনে,
রঘুকুলের হে রাজলক্ষ্মী ! হে সরযু ! স্বর্ণ-শ্রোতস্বতী।
দুঃখ-দিনেও ললাট তােমার অঙ্কিত যে ইন্দ্রাণী লক্ষণে,
হে সুন্দরী! অনিন্দিতা ! অঙ্গে তােমার চন্দ্ৰমালার জ্যোতি।
সন্ন্যাসিনীর বেশে রাণী! কি কথা হয় জপছ নিরজনে,
কোন্ অতীতের সঙ্গীতে মন তরদিয়া চলছ শ্লথগতি ।
শুন্যে তােমার পুষ্ট হল দিগ্বিজয়ী রঘুর বিপুল সেনা,
সুহ্ম-মগধ-পাণ্ডকেল-ঘুণ-পারসীবন-দর্পহারী ;
ধাত্রী তুমি সম্রাটেদের; সরিৎ-স্রোতে সাগর-ঢেউএর ফেনা
উথলাতে বল ধরে যারা, তেমন ছেলে পুষলে বারম্বারই
পীযূষদানে। কবির গানে অমর যারা, যারা সবার চেনা,
মানুষ হ’ল তােমার স্নেহে তারা সবাই জৈত্র-ধনুধারী।
মান্ধাতারও ধাত্রী তুমি! গঙ্গারে যে আলে স্বর্গ হতে
সে পঙ্গুরে বল দিয়েছ মুক্তি দিতে ষাট হাজারে, মরি
ইক্ষাকুর তুই প্রসুতি, ফিত যে জন নিত্য ইয়র্থে ;
যে যােদ্ধাদের পরাক্রমে নাম এ পুরীর অযােধ্যা নগরী,
-অ-যােধ্য যা’ সৰ্ব্ব যােধের-তারা সবাই অয়ি শুচিত্ৰতে।
তাের মমতায় স্নান করেছে, পান করেছে মেহের সুধা তোরি।
তােমার স্নেহের রাখী হাতে রাক্ষসেদের বশ করেছে নরে,
সর-খাত সাগর-জলে বঁধলে সেতু তোমার সন্তানেরা।
ভঙ্কা দিয়ে দিগ্বিদিকে, ঝাণ্ডা নিয়ে দেশে দেশান্তরে
গড়লে কতই উপভারত, উপনিবেশ বাঁধলে কতই ডেরা ;
সরযু
।
তাদের কীৰ্ত্তি লব-পুরী সে, মগের দেশে আজো বিরাজ করে,
আর দ্বিতীয় অবােধাপুর মেকং-তীরে স্মৃতির ডােরে ঘেরা।
বিভীষণের ভীষণ মুখে ভক্তি রেখা ফুটিয়েছে যে রাজা,
যার অভিমান হৃদয় জয়ী, গেড়েছে যে জয়ের ধ্বজা মনে ;
বাল্মীকি আর কালিদাসের কাব্যে যাহার কীর্তি চির তাজা,
পায় যে পূজা কৃত্তিবাসের তুলসীদাসের ছন্দ-সুচন্দনে,
হরের ধনুক ভাঙলে যে জন,- দপীজনে দিলে উচিত সাজা,
তােমার বুকের সেই শতদল ঘুমায় আজি তােমার আলিঙ্গনে।
যাত্রী এসে দেশ-বিদেশের তাের তীরে তার চরণ-চিহ্ন খোঁজে,
চোখের জলে ঝাপসা দু’চোখ,-খোঁজে সীতার রাঙা পায়ের রেখা।
নিমেষ-মাঝে নিমেষ-হারা, তিনটা যুগের স্বপ্ন দ্যাখে ও যে,
সৈকতে তাের সােনার রেণু, জলে নব দুৰ্ব্বাদলের লেখা!
পাণ্ডা হেঁকে চমক ভাঙায়, একাল সেকাল সঝাতে মন ফেরে-
কোথায় সীতা? কোথায় বা রাম ? লােকের ভিড়ে
একা নেহাৎ একা?
রাবণ-জয়ীর জনম-ঠাই দাড়িয়ে আজি ধ্বজা বাবরশাহী,
যে বাবরের ধৰ্মী-গরব ডুবে গেছে রাঙা মদের হ্রদে ;
“মুণ্ড-পাহাড়” ভিন্ন যাহার ভূমণ্ডলে অন্য কীর্তি নাহি,
সেই গড়েছে ভজন-শালা, ভিতের পাথর ভিজিয়ে দেমাক-মদে ;
বাহুবলের মদের মাতাল কোথায় গেছে সুরা সরিৎ বাহি' ?
মৌলবীরা হয় ত জানেন,- পরলােকের পরম কোন্ গারদে ।
রক্ত-কাদায় তক্ত-তাউস্!...মস্ত কীৰ্ত্তি প্রাচীন কীর্তিনাশে!...
কোন “ঘবনে ধলে সাকেত”. সেকথা আজ কেউ রাখেনা মনে ?
বেলা শেরের গান
।
।
বিরূঢ়কের রূঢ়তা লীন বাবরশাহী বর্বরতার পাশে
নিষ্ঠুরতার কাহিনী, হায়, যায় তলিয়ে অগাধ নিষ্ঠীবনে !
ভয় জাগিয়ে যে-সব পশু বানায় পশু মানুষকে ভয়-ত্রাসে
দুঃস্বপনের মতােই তারা, দিন দুদিনে ডােবেই বিস্মরণে।
৫
যুগের পরে যুগ চলে যায় নাগরদোলায় চলছে ঘােরাঘুরি,
ওঠা-নামার চলছে তুফান, আগমনী ডাকছে বিসর্জনে,
ছায়াবাজীর পুতুল চলে সারি সারি উচিয়ে ছায়া-তুরী,
নেচে চলে হিন্দু মােগল, প্রসেনজিতের প্রাচীন ও পত্তনে।
রয় না দেমাক, রয় নাক’জক, অটুট কারাে না রয় জারিজুরি,
থাক কেবল পুণ্যশ্লোকের পুণ্যস্মৃতি প্রাণের রামায়ণে।
আজ সরযু ! তাের ছেলেরা কুলির বেশে যাচ্ছে ফিজিদ্বীপে,
যাচ্ছে সুদূর মরীচ-শহর, পেটের দায়ে বিকিয়ে দিয়ে মাথা,
কূলে কূলে কান্না ওঠে, চিরবিদায়-বার্তাতে যায় নিবে
কত ঘরে সন্ধ্যা-প্রদীপ, কেঁদে মরে কন্যা জায়া মাতা।
অধীনতার ধিক্কারে হায় সকল আশায় মারূছে গলা টিপে,
ধোয়ায় ভরে যাচ্ছে দু’চোখ, ধোঁকায় ভরে উঠছে মনের খাতা।
ঘুরছে ধাঁধায় হিন্দু-তুরক লাঞ্ছনা আর সইছে গ্লানির বাণী,
আত্মা-লাভের নাই যেন বল আঁধির আঁধার রয়েছে দিক ভরি,
রঘুকুলের ক্ষত্রিয়েরা একা-গাড়ীর কছে গাড়োয়ানী,
বাবর-শাহের খান্দানীরা আজকে শুনি রেঙ্গুনে দপ্তরী !
বিজিত আর জেতার ধূলায় চোখের জলে আজকে সাঁতার-পানি,
আজ সরযু অশ্রুনদী, সরিৎ-রূপা এ রাজ-রাজেশ্বরী।
ময়ূর-মাতন
ময়ূর-মাতন
ও কে আছে গাে মুখ ঢেকে লাের-পর্দায় !
ছেয়ে কদমের পেখমের ভাের জর্দায়।
ওরে দূর থেকে দেখে মেতে উঠল ভুবন,
তাই হাওয়া ফেরে ফফ সর্দায়।
কোন্ দেয়াসিনী রূপসীর বাজল নূপুর।
তাই কেয়-বনে দেয়া সনে মাল ময়ূর !
মরি পানার ঢাকৃনায় স্পলে তনু,
ভরি’ পালকের এসরাজ পুলকের সুর!
-“ওরে! নড়ল কি ঘােষ্টার মেঘলা আষাঢ় ?
ওরে! উড়ল কি পর্দার এতটুকু পাড় ?
হেথা অন্তরে সন্তরে সাত শশা স্বপন,
হােথা লাগল কি চেউ তার জাগল কি সাড়?”
!
কেকা রব তুলে বলে শিখী টলে পায় পায়।
হানে লাবণির পশলা সে অবনীর গায়
তার স্পন্দনে ছড়াছড়ি ইন্দ্রধনু।
তার গােপনের শিহরণে বীণ বেজে যায়।
আজি মন ফেরে মেঘে মেঘে, অভ্র-শিখায়
খুজে দূর রাকা, দূর রাস, দূর রাধিকায় ।
আজ আকাশের রুধি' দ্বার রসের রণ।
সারা দুপুরের নূপুরের শিঞ্জিনিকায়।
বেলা শেষের গান
(বৌদ্ধ যুগের একটি কাহিনী অবলম্বনে।
পথে যেতে আজ কুড়ায়ে পেয়েছি প্রাণের পরশমণি !
চির অধন্য হয়েছি হঠাৎ সকল ধনীর ধনী।
আহলাদ মাের সকল অঙ্গে অঙ্গে ধরে না আর!
বন্ধ্যা এনেছি তব তরে স্বামী সন্তান-উপহার।
জঠরে ধরিতে দ্যা নি বা বিধি সে ধন পেয়েছি পথে,
মন ছােটে আজ আট ঘােড়া জুড়ে মনের মানস-রথে।
জগতের আগে আজিকে, আমার লজ্জার অবসান,
আঁটকুড়া নাম দূর হ’লদেহে জেগেছে মায়ের প্রাণ !
স্নানে চলেছিনু শােণ-গঙ্গার সঙ্গমে আজ প্রাতে
অশথে বাঁধিতে আঁচলের সুতা মাথার চুলের সাথে,
হারীতির বরে সূতা ধরে সুত আঁচল ধরিবে এসে
এ ছিল কামনা ; তখন জানি না এত ত্বরা পূরিবে সে।
ছাড়ি ‘সুগন্ধপ্রসাদের ঘাট ‘সঙ্কর্যণ-ঘাটে-
স্নান সারি ভরি’ লয়ে হেমঝারি অশথ বটের বাটে,
চলেছিনু জল-অঞ্জলি ডালি’ ছায়াতরু মূলে যত
ভুট্টার দানা ভিখ, দিয়া দুটো ভুখারে রােজেরি মত।
মহা-পদ্মের নগর জুড়িয়া ধোঁকে আজি পালে পাল
কোটর-চক্ষু বারাে বছরয়া আকালের কঙ্কাল।
কঙ্কাল-পাণি পেতে বসে কেহ, বলিবার নাহি বল,
অধর ওষ্ঠ কেঁপে থেমে যায়, ঘােল চোখ নিশ্চল।
জন্মের মত নেছে কেউ মাটি, চোখের মণিতে মাছি,
দাতে কাটে চানা অবিকারে কেউ ব’সে তারি কাছাকাছি।
মন করে যাই মাটিতে লুকায়ে ; যেদিকে ফিরাই আঁখি
মহামরণের অট্টহাস্য আঁখি-জলে মাখামাখি ।
আকালে বেহাল মানুষের পাল পলে পলে মেশে চুপে
মহাপদ্মের মহানগরের আবর্জনার স্তুপ।
ধিক্কার বুকে ওঠে দেরি হয়ে, মানুষ-জনমে গ্লানি,
আয়ু না ফুরাতে টুটে প্রাণ-বায়ু অনশনে মরে প্রাণী।
বিক্ষত মনে খলিত গমনে চলিতে পথের বাঁকে
সহসা কি শুনি!...শিশুর রােদন।•• কি নড়ে ঝােপের ফাঁকে।
কঙ্কালসার শবরীর কোলে চাদ সে পড়েছে খসি।
সদ্য শিশুরে দংশিছে! আরে! প্রসূতী না রাক্ষসী!
ছেড়ে দে !...ছেড়ে দে !...লই কাড়িয়া,.. সহজে কি দ্যায় ছেড়ে ?
দশটা আঙুল বঁড়শীর মত মাংসে বসেছে গেড়ে !
লই কাড়িয়া ঝকান দিয়া ; লটকান রাঙা দাঁতে
জিভটা বুলায়ে বলে রাক্ষসী কর হানি বুকে মাথে,
‘মরি,...মরে যাই...ক্ষিদের জালায়, . বুকে পিঠে খিল ধরে,
একে অনাহার তাহে লহু ক্ষয়, দেহ ঝিম্ ঝিম্ করে,
এক মুঠা ভাত ভিক পাওয়া ভার দুর্ভিক্ষের দিনে,
ধিক্ দিল শুধু ভিক্ দিল না রে, সবারে নিয়েছি চিনে,
কেউ দিলে নাকো',...বিধাতা দিয়েছে,...এ মাের মুখের গ্রাস
কোথা হতে এলি তুই চণ্ডালী !...কেড়ে নিয়ে কোথা যাস্ ?
দাঁড়ানু থমকি’ একহাতে রুখি’ ক্ষুধা-উন্মাদ নারী,
আর হাতে বুকে চাপিয়া শিশুরে ফেলিয়া জলের ঝারি। •
অচলে যে ছিল ভুট্টা সেগুলাে ছড়ায়ে পড়িল ভূয়ে ;
মােরে ছেড়ে নারী ভুট্টার লোভে মাটিতে পড়িল নুয়ে।
বেলা শেষের গান
.
ভুট্টার বেশী কঁকর কুড়ায়ে চিবায় বিকৃত মুখে,
ধ-ধক্ পেট কুত্তা ক্ষুধার দংশনে মুহু ধুকে।
হাঁকুপাঁকু করে, কি যে গালে ভরে রুখু চুল ললাটে ধূলে,
চোখে জল এসে ভরে গেল তার দশা দেখে আঁখি-কূলে।
“হল না, হল না, মিটিল না ক্ষুধা”, সহসা ফুকারি কহে,
“ফিরে দে মাংসপিণ্ডটা মােরে, খাইব তােরেই নহে।”
কথা শুনে তার আঁখি থির, ফেরে অাঁখিতারা শিশু পরে,
পড়িল নজর মাংসপিণ্ড বন্ধ্যার পয়ােধরে।
কহিলাম, “ওরে! দিবনাক তােরে খেতে এ দুধের বাছা,
মাংসপিণ্ড চাসূ যদি নে রে এ মাের মাংস কাঁচা ;
বৃথা মাংস এ বন্ধ্যার শুন, আয় ক্ষুধাতুরা আয়,
এতে ক্ষুধা যদি মেটে তাের কেটে নে রে তুই খায়।
বাঁচুক প্রসূতি বাঁচুক কুমার বাঁচুক দু দুটা প্রাণ,
বন্ধ্যার দানে বন্ধ হউক সন্তান বলিদান।
তা’ সনে ঘুচুক বওয়া এ অপয়া পয়ােহীন পয়ােধর।”
বিস্ফারি’ নারী কোটর চক্ষু চাহে মাের মুখ পর।
ক্ষুধায় হন বন্যের মত মুখে তার যুগপৎ।
ফোটে বিস্ময়, বিশ্বাস, ভয়, উল্লাস সুমহং।
“দেখি, দেখি খুঁজে ; না, না, না, পালাবি আঁচলটা ধরে রাখি
বলি’ তরুমূলে খাপরা সে খোঁজে দুই-মুখাে দুটো আঁখি।
খােলা খুঁজে ফেরে ক্ষুধাতুরা নারী ঘােলা দুটা চোখ রাঙা,
দৈবে মিলিল শিকড়ের ভিড়ে আঁকষির ফলা ভাঙা।
মুঠা করে ধরে টুকরা লােহায় নেহাৎ নিকটে এসে
চোখে চোখ রেখে সুধায় “পারিবি ?” নিশাসে নিশাস মেশে
;
সুখে
“পরের ছেলের পরাণ বাঁচাতে পারিবি সহিতে দুখ?
কাটাটি ফুটিলে কী ক্লেশ জানি? কেন দিবি নিজ বুক !”
“জানি রে পারিব ; করিস না দেরী।” “বড় দেখি বুক দড়,
তার চেয়ে মাের পেটের ফসল দে রে খাই ক্ষুধা বড়।
পারিবি না তুই আপনার দেহ কেটে দিতে, ঠাকুরাণী,
কেহ পারে নাক’; শুধু ক্ষুধা খেদ বাড়াইবি মাের, জানি।”
কহিনু, “গরবী! আর্ষের নারী যা বলে কাজে তা করে;
দে দেখি লােহাটা, মাংস কাটিয়া দিব আমি নিজকরে।”
লােহা হাতে যেন কাঠের পুতুল চাহে সে মূঢ়ের মত,
আঁীর ফলা দিতে মােরে করে ঈষৎ ইতস্তত।
মুঠা থেকে তার নিয়ে হাতিয়ার অধর চাপিয়া দাঁতে
দিনু বসাইয়া নিজের বুকের মাংসে নিজেরি হাতে।
ভোতা হাতিয়ারে ছেয়ে গেল গাটা, টপ, টপ, লহু ঝরে
শিরে উপশিরে শিহরে তড়িৎ তীক্ষ্ণ ব্যথার ভরে!
আবার হানিমু,নিশ্বাস রুধে ; নাড়ী-ঘেঁড়া একি ব্যথা,
চক্ষু ঠিকরে যন্ত্রণা-ভরে ঝিম্ ঝিম্ করে মাথা।
টলমল মন, টলমল পণ, সজারুর কাঁটা-চুল,
সংজ্ঞা টুটিলে টুটে প্রতিজ্ঞা,-এই ভয়ে সমাকুল।
সহসা কাঁদিয়া উঠিল ছেলেটা, যন্ত্রণা গেনু ভুলে ;
অশরণ সেই মুখ চেয়ে, আঁখি ঝটিতি উন্ধে তুলে,
“বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি কহিলাম মনেমনে
নিজেরে সঁপি বিশ্ববােধের বুদ্ধের চরণে।
তার পর শুধু দৃঢ় করি মুঠা নিজেরে হেনেছি নিজে
জানি না কখন লােহুর বদলে পীযূষে উঠেছি ভিজে।
১২
বেলা শেষের গান।
পাগলের মত কেবলি হেনেছি, যন্ত্রণা-বােধ-হারা,
জানি নাই ছেড়া হাজারাে নাড়ীতে ঝরিছে দুধের ধারা।
মমতায় লহু ক্ষীর যে হয়েছে জানিতে পারিনি আমি
বুদ্ধের বরে বন্ধ্যার বুকে পীযুষ এসেছে নামি !
হুশ ছিল নাক’ দুর্দম বেগে হেনেছি দু'চোখ মুদে,
জানিনে বসনে রক্তের লেখা ধুয়ে গেছে দুধে দুধে !
ভাঙিল চমক শবরীর স্বরে, কহে সে “চমংকার।”
অঞ্জলি ভরি পিয়ে ক্ষুধাতুরা বন্ধ্যার ক্ষীরধার!
ক্ষতক্ষীণ স্তনে পান করে মাতা, ক্ষতহীন স্তনে ছেলে,
স্বপ্ন এ যেন দেখি জাগ্রতে বিস্মিত আঁখি মেলে।
ক্ষুধা-উপশমে কহিল শবরী, “মা তুই জীবনদাতা,
উপােষে যে পশু হতে বসেছিল বাঁচাইলি তারে মাতা।
তুই দেবী, তুই অঘট ঘটা; চরণে নােয়াই শির ;
ক্ষীরমাতা ক্ষীরভবানী গাে তাের লােণা-লহু মিঠা-ক্ষীর !
এ ছেলে তােমার নিয়ে যাও তুমি, জীবন দিয়েছ এরে,
আমি রাক্ষসী ক্ষুধার তাড়নে চেয়েছি ফেলিতে মেরে।
আমার বুকে মা শুন্য নাহিক, আমার জঠরে ক্ষুধা,
পেটে যা ধরেছি বাঁচাতে পারি যে নাহি মা বুকে সে সুধা
তাহার উপর ক্ষুধা বৰ্ব্বর, মানে না পেটের ছেলে,
জঠরে আগুন জ্বলিলে কি ঘটে জানি না মা ক্ষুধা পেলে।
নিয়ে যাও ছেলে, দয়াময়ী দেবী, নিয়ে যাও তুমি ওরে,
বাঁচে যদি, বড় হয় যদি, মায়ী! রেখাে কিঙ্কর করে।
নিয়ে যাও মাতা ; মায়ের মমতা কলিজায় আলে বাতি,
আপন মনের প্রভু নই মােরা অবর শবর জাতি।
সুরার কাহিনী
ও ছেলে তােমার, কিনেছও তুমি নিজের মাংস দিয়ে ;
লােভ করিব না, চলে যাই আমি বাছার বালাই নিয়ে !”
এত বলি ছুঁয়ে শিশুর ললাট কঙ্কাল করে’ খালি
স্খলিত গমনে মিলাইল বনে এলােকেশী কঙ্কালী।
আমি ফিরে এনু, ছেলে নিয়ে, স্বামী, সঁপিতে তােমার কোলে,
আর পায়ে তুমি ঠেলিতে আমারে নারিবে বন্ধ্যা বলে।
ভিখ, দেছে দুর্ভিক্ষ আমারে, নিধি দেছে আলে-করা,
বুকের মাংস বিনিময়ে, দ্যাখাে, পেয়েছি কী!বুক-ভরা !
সুরার কাহিনী
(কুজাতক' অবলম্বনে।
মধু মােম আর শিলাজতু খুঁজে
পাহাড়ের জলে,
বনচারী সুর ক্লান্তি আতুর
বসেছিল শিলাতলে।
অদুরে ত্রিশাখ বিশাল পাদপ
দাড়ায়ে ভগ্ন-চূড়া,
সরা-গায়ে তার গুফ শেহালী
রুখু গুগগুলু-গুড়া।
কলরবে মুড়া-গাছের মাথায়
ঠোট হানে এসে পাখী,
কি যে পান করে, কি যে গান করে,
কি যে করে ডাকাডাকি।
১৪ বেলা শেষের গান টলে টলে চলে, উড়িবার ছলে মেলে পা কুতুহলে; ক্ষণে অচেতন মৃতের মতন লুটি' পড়ে তরুতলে! বিস্মিত সুর ভাবে, কালকূট ও তরু-কোটরে আছে, তাই করে পান হারাইছে প্রাণ- পাখীরা নিমেষ-মাঝে । বিস্ময় ভারি মানে বনচারী আঁখির পাতা না মুড়ে ; ক্ষণ পরে, একি! মূৰ্জিত পাখী ডানা ঝেড়ে যায় উড়ে। “এ তত ভারি মজা।” ভাবে মনে সুর, “দ্যাখা যা উঠে গাছে, বিচুড় তরুর চুড়ার হাড়লে সুধা কি গরল আছে। অন্তর্পণে কুতুহলমনে উঠে গাছে দ্যাখে সুর - ভগের হাড়ল বৃষ্টির জল- ভরা টইটুম্বুর। ঝড়ে-পড়া ভাতে পচে আমলকী গজনি অহর্নিশ, পচে পাখীদের চষ্ণুচ্যুত নীবার-ধানের শীষ। 1
সুরার কাহিনী
তীব্র-মধুর
ওঠে সৌরভ
বাতাসেতে ভ ভর,
অঞ্জলি ভরে নিল পান করে
কুতুহলী বনচর।
রিঝিম্ মাথা, ফুর্তির গাথা
রক্ত আলোড়ি ঘুরে,
অকারণে হাসে, অকারণে গায়
বিকৃত-বিষম সুরে!
নেশা চ'ড়ে গেল মাথায় সুরের
জবাফুল হ’ল আঁখি,
চকি জ্বেলে পুড়িয়ে সে খেলে
মাতাল তিতির-পাখী।
মদের সঙ্গে মাংসও হ'ল,
চার পােয়া হ’ল পূরা,
সুর সে প্রথম পান যা করিল
তার নাম হল সুরা।
(২)
বনের প্রান্তে সীমান্ত গ্রাম
আজ সেথা হাটবার,
সুর সে চলেছে বশের চোঙায়
সুরাটুকুনিয়ে তার।
মধুমােম আর মৃগনাভি যারা
কিনিত সুরের ঠায়ে,
ঘিরিয়া ধরিল, বহুদিন পরে
দেখিয়া তাহারে গাঁয়ে
ক
১৬
বেলা শেষের গান
সুর বলে, “ভাই মৃগনাভি নাই,
এবারে নতুন চীজ,
হিমাচল হ’তে এনেছি এ হাটে
করি’ বহু তজবিজ।
পাবে আনন্দ আপন মুঠায়
এ চীজ করিলে পান।
“বটে! বটে!” বলে যত হাটুরিয়া
সুরা করে আঘ্রাণ।
ঘ্রাণ শেষে পান, ক্ৰমে নাচ গান,
বাখানে সওদাগরে,
গ্রাম হতে ক্রমে বার্তা ছুটিল
নগরের ঘরে ঘরে।
রাজা খায় মরা, প্রজা খায় না,
“আনন! আনে।* রব ওঠে,
সুরার জন্যে ঘন অরণ্যে
বারে বারে সুর ছােটে।
কারাে জমে নেশা, কানাে বা ব্যবসা-
এই সে দুনিয়াদারী,
সুর ভাবে, সুরা লাগি বারে বারে
বনে ছোটা ঝকমারি।
গ্রামে গ্রামটি ক্রমশঃ বসিল,
পিয়ে সুরা জনে জনে।
রাজা পান করে মণ্ডপ রচি
বিপুল রাজাঙ্গনে।
সুরার কাহিনী, ১৭ . ১ প্রজা পান করে ছাড়ি নক কাজ- বাড়ে দুর্গতি ক্লেশ, নগর শূন্য,-ব্যসনে পূর্ণ, শ্মশান-সমান দেশ! ( ৩ ) প্রমাদ গণিয়া পলাইল এর সীমান্ত গ্রাম ছাড়ি, বারাণসী পুরে কলি প্রবেশ লইয়া সুরার হাঁড়ি। পসার জমায়ে দুদিনে সেথায় নেশা ধরাইয়া লােকে পয়সা লুটিল দুই হাতে সুর সুরা-ঘূর্ণিত চোখে। সুরায় ডুবায়ে শূদ্র বৈশ্য ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণে, ছারেখারে দিয়ে ধৰ্ম্ম, কর্ম, সুর শুধু টাকা গণে চোরে জুনাচোরে ভরে গেল দেশ লক্ষ্মীছাড়ার দলে ; রাহাজানি কার:সরাবের তরে ; বারাণহী সাতলে। “ফুরায়েছে’পুজি, নেশার পয়সা ... দিতে পারিবে না এরা,” মনে বিচারিয়ায় বিক্রয়ী তুলিল ভাঙা-ডেরা। {
১৮ ,
বেলা শেষের গান
কাশী.ছেড়ে এল অবােধাপুর,
সেথাও অমনি ক্রমে
আবাল বৃদ্ধ বদ্ধ মাতাল
বিমুখ পরিশ্রমে।
নিৰ্মার বেড়ে গেল দল,
বেড়ে গেল অনাচার,
দেখিতে দেখিতে সুরার প্রসাদে
অযযাধ্যা ছারখার।
দেশে দেশে দিয়ে কদভ্যাসের
দীক্ষা এমনি রীতে,
সুরা-বিজ্ঞান-বিজ্ঞ মুর
পশিল শ্রাবস্তীতে।
সুরার বাখান করি’ গান সেথা
ভিজায়ে রাজার মন
রাজাদেশে সেথা পাঁচ শ’ জালার
করিল সে আয়ােজন।
সারি সারি ভাঁড়ে পচে গুড়-চাল
রাজার ভাঁড়ার-ঘরে,
পাশে পাশে বাঁধে বিড়াল, সুরায়
ইহুর সে পাছে পড়ে।
দিনে দু’দিনে পচিয়া গাজিয়া
ভড়ে ভাঁড়ে মদমাতে ;-
খাদ্য গুড়, ক্ষুধার অন্ন
পরিণত মরিতে।
।
। সুরার কাহিনী
ভাণ্ডের গায় মদ্য চুয়ায়
মিঠা মিঠা বাস তার,
ভাড় সাথে বাঁধা লুব্ধ বিড়াল
শোকে আর চাটে ভড়।
শুকিতে চাটিতে মাতাল বিড়াল
দুলে দুলে পড়ে ভূমে,
মূৰ্জিত কিবা মৃত, কে বা জানে ?
মগ্ন নেশার ঘুমে।
(৪)
সারারাত গেল অমনি কাটিয়া ;
রাজার ভাড়ারী প্রাতে
ভাঁড়ার-দুয়ার খুলিয়া যখন
ঢুকিলেন চাবি-হাতে,
চমকিয়া তিনি দেখিলেন, একি!
ইদুরের পটম
পাঁচ শ’ বিড়ালে ডিঙায় মাড়ায়
করে একি কীর্তন।
“এ কি হল ? মৃত পাঁচ শ’ বিড়াল!
কি দেখি ভঁড়ার ঘুরে,
ইঁদুরে খেয়েছে বিড়ালগুলার
নাক কান কুরে কুরে ।
পাচ শ’ জালায় কী চীজ রেখেছে ?
পাঁচ শ বিড়াল মৃত';
লােকটা বিদেশী, সন্দেহ হয়
বিটশ রাখেনি ত?”
২০ বেলা শেষের গান . রাজ- দবারে গেল সমাচার, রাজা শুনে ক্রোধে ফুলে, সুরার আবির্ভা খবীশ সুরকে দিলেন শূলে। সভা ছেড়ে রাজা গেলেন ভাঁড়ারে ভাঁড় দিতে ভেঙে টুটে, অপগত-নেশা পাঁচ শ’ বিড়াল তখন বসেছে উঠে। বসে আছে সব ছিন্ন কানের ক্লিন্ন শােণিত মেখে, বিন্নিত চোখে রহি’ ক্ষণকাল রাজা কহিলেন হেঁকে “মরেনি বিড়াল ; তবু ভাল কাজ নাই ঘরে রেখে ; ভেঙে ফ্যালাে ভাড়, কবর ও সাবাড় যেতে চাই চোখে দেখে জলো সামগ্রী পচিয়ে সড়িয়ে সৃষ্টি হয়েছে যার সকল ভালাে সে পচিয়ে সড়িয়ে সব দেবে ছারেখার। নগরের বার করে ফেলে, ঢেলে, দাও গে উষর মাঠে, ঘরে ও থাকিলে বিড়ালের কান সাহসে ইঁদুরে কাটে।
উড়ােজাহাজ
ঘ্যান ঘ্যানর শব্দে আকাশ ভরি,
কে তুমি শূন্যে ফিরিছ ঘুরিছ, মরি।
‘পুষ্পক রথ ! ভট্টচার্য বলে দেখি’ ;
ঠান্দিদি বলে ‘নারদ-মুনির টেকি।”
‘গরুড়-যন্ত্র। বিষ্ণুশর্মা বলে,
উঠিছে নামিছে কীলিকা-প্ৰয়ােগ কলে!
তেল পিয়ে পিয়ে ফিরিছ আকাশময়,
তৈলপ! তুমি তেলাপােকা, পাখী নয়।
কি চেহারা! যেন উড়াে কড়িকাঠখানি !
গােলােকের ছাদ ধ্বসিল বা অনুমানি।
-
ছাদে ছাদে লােক হাঁ করে ও-রূপ গেলে,
পথে আ-দেখলে দাঁড়ায় দন্ত মেলে;
ঘাড়ের উপরে মােটর আসিয়া পড়ে,
গালাগালে মন, ধাক্কায় দেহ ছড়ে-
ঘাড় খ’চে যায়,তবু পুরুরবা হেন
উডডীয়মান উর্বশী দেখে যেন!
আয়সী প্রেয়সী তুমি যাও সরে সরে
ঘ্যানর ঘ্যান শব্দে বধির করে।
জানালায় বসে আমি ভাবি অবিরত
কবে ছ্যা-ছ্যা হবে ছ্যাকা-গাড়ীর মত?
২২
বেলা শেষের গান
কলের চিমনি কুশ্রী করেছে ধরা,
করােগেটগুলো দেখে দেখে আঁখি জরা ;
চোখ জুড়াইতে নীলাকাশ ছিল বাকী,
তারেও কুশ্রী করিলে টিনের পাখী।
হাঁফ, ছাড়ে লােক যে আকাশ পানে চেয়ে,
তাও দিতে চাও জ্ঞািপনেতে ছেয়ে !
সৃজিয়াছে তােরে বিজ্ঞান বুড়াে কাণা,
ওরে কদাকার ভূত-বাদুড়ের ছানা !
ওরে ভূতে-পাওয়া ! ওরে ও সাগর-পারী ।
দেশে দেশে তুমি অচিরে ছড়াবে মারী।
পেট পুরে পূরে পেটুৱােল খালি পিয়ে,
দেমাকে বেড়াও মাথার উপর দিয়ে
ঘর বলে কিছু রাখিলে না গরীবের,
বেপর্দা আজ কোণটি ইজ্জতের ;
লাজ ঢেকে ছিল কুঁড়েয় গরীব মেয়ে,
তুমি এলে তার আবার মাথা খেয়ে।
ঘর বলে কিছু রহিল না ঢাকাঢুকি,
পরের দৃষ্টি সেখানেও দেবে উকি!
কবন্ধ-রথ মােটর মারিছে প্রাণে,
তুমি কোপ দিলে গরীবের সম্মানে।
7
আফ্রিদি যদি হতাম আমি রে আজ,
বন্দুকবাজ তীক্ষ তীরন্দাজ,
উছে জাহাজ
তাহলে তােমায় মাথার উপর দিয়া,
যেতে না দিতাম কখনাে ঘর্ঘরিয়া
তা হলে নিরীহ চিড়িয়া-শিকার ছাড়ি,
করিতাম শুধু শিকার চিড়িয়া-গাড়ী ;
বাস্তু আমার, আমার কেল্লা মানি,
তার নিভৃত পরে করে যাবে হানি ?
ভরতের যদি বাঁটুলটা পাই আমি,
বাদর না মেরে শুধু মারি বাঁদরামি ।
সন্ত্ৰম নাই নারীর স্নানের ঘাটে,
ট্রেদ্ধা করাে না মাড়ায়ে চৌকাটে।
লাঘিয়া যাও মন্দির গির্জারে,
নমাজের ঠাই ডিঙাও নির্বিচারে !
সাধুর সমাধি পীরেদের আস্তানা,
ডিঙাও হেলায়, মাননা না কোনই মান।
সিংহকারক প্রতীচ্য বিদ্বান্,
অস্থি কুড়ায়ে সিংহে দিয়েছে প্রাণ।
বিজাগরবে জাগায়েছে শয়তানে,
ফল যে কি হবে বিষ্ণুশর্মা জানে।
মেঘে মেঘে ফেরাে রাবণ রাজার নাতি,
ধাড়ি-আমুলা দম্ভ-মদের হাতী ;
রাক্ষসী রীতি শিখায়েছ তুমি রণে,
আবরু নাশ করে শক্তির ক্ষণে ;
বেলা শেষের গান
।
গ্রাহ্য করাে না দুনিয়ার কোনাে কথা,
ওরে কিস্তৃত! নব্য-বর্বরতা!
পৃথিবীর পেটে যতদিন পেট্রােল,
করে নে রে পাপ! ততদিন সােরগােল্ ;
নরে নিতি নব শয়তান-পনা শিখা,
উদাত-পাখা জাঁদরেল পিপীলিকা!
ভারতের আরতি
(ছালিক্য ছন্দের অনুসরণে )
জয় জয় ভারত! জয় জয় মাতা!
ঋদ্ধির নিধান! সিদ্ধির দাতা
অক্ষয় তােমার কীর্তির গাথা ! জয় ! জয়।
দুর্দম তােমার শৌর্যের বরে
পূৰ্ব্বত দাড়ায় গর্বের ভরে
সূর্যের গমন বােধূবার তরে! জয়! জয়!
উদ্দাম সাগর মন্থন করাে !
আদ্যের ‘বরুণ ছত্তর’ ধরাে!
সিংহল এভােজ লাখ,দ্বীপ ভরে ! জয় ! জয়!
পাণ্ডবরাঘব-মৌর্যের প্রসূ !
ক্ষত্রের স্বরগ! বৈশ্যের বসু!
পায় তাের লুটফ হিংসার পশু ! জয়! জয়!
ভারতের আরতি
२८
ডঙ্কায় তােমার ডিণ্ডিম ওঠে।
কাশগড় খােটান কােজ লােটে!
ঝাণ্ডায় তােমার গৈরিক ফোটে। জয়! জয়
গান্ধার, ইরাণ, মিড্রাম, মিতান,
পুত্রের তােমার কীত্তির নিধান ;
চীন, শ্যাম, জাপান, শিষ্যের বিতান ! জয়! জয়।
পুণ্যের অমল দর্পণ তুমি!
বিশ্বের হৃদয়-তর্পণ তুমি!
কর্মের ফলের অর্পণ-ভূমি! জয়! জয়
শক্তির গরুড়! ভক্তির চাতক।
আত্মার গভীর শান্তির সাধক।
নৈরাশ-হরণ উজ্জল পাবক! জয়! জয় !
।
জয় জয় ভারত! বিশ্বের সুতা !
পৃথীর তিলক! তীর্থতা।
মন্দারমুকুল! নন্দনচ্যুত ! জয়! জয় !
ক, সাম তােমার কুণ্ডল কানে !
দিগগজ তােমার কিঙ্কর স্নানে !
মেঘ-দূত তােমার মঞ্জীর দানে। জয় ! জয়।
ছয় ছয় ঋতুর পল্লব-গাঁথা
ফুলময় তােমার কিঙ্ব পাতা
লা, লাখ, যুগের শিল্পীর মা ! জয়! জয়!
বেলা শেষের গান
মন্দির-গােপুর-চৈত্যের-বীথি।
পর্বত-পটের গৌরব স্মৃতি।
বল্মীক-শয়ান উল্লাস গীতি! জয়! জয় !
অঙ্গন তােমার চম্পক: ঢাকা,
অঙ্গের পশ চন্দন-মাখা,
চৌরস ললাট চন্দ্রক আঁকা! জয়! জয় ।
ব্ৰহ্মার আদিম ওঙ্কার তুমি !
মুক্তির বীণার ঝঙ্কার তুমি !
হিন্দোল বিলাস গঙ্গার তুমি! জয়! জয় !
বিক্রম প্রতাপ বাপ্পার দেবী
বুদ্ধের বােধন। জয় নির্লেপী
বিশ্বের প্রেমেই ওই পদ সেবি! জয়! জয়!
জয় জয় ভারত! যজ্ঞের মাতা !
আত্মার আপন অন্নের দাতা।
উষ্ণীষ তােমার ধূস্তুর-গাঁথা ! জয়! জয় !
বিশ্বের নাথে বল্লভ বরি’
নিষ্ঠুর ফণী-কঙ্কণ পরি’
গৌরীর গায়ে গৈরিক, মরি! জয় ! জয়!
চিত্তের গভীর নৈমিষ মাঝে
তন্ময় শােনন ও ওম্ বাজে,
নিত্যের নিদেশ উজ্জ্বল রাজে! জয়! জয় ।
ভারতের আরতি
২৩
আত্মার অমল দীপ্তির খনি।
পৃথ্বীর মাঝে অদ্বয় গণি ;
কৌটায় তােমার কৌস্তুভ মণি! জয় ! জয়! ,
পদ্মের মেলায় লক্ষ্মীর ছবি।
কাব্যের কবির তুই বান্ধবী।
নিষ্কাম যাগের নিৰ্ম্মল হবি! জয় ! জয়।
আদ্যের গুরু অর্ধেক ধরার!
মৃত্যুর ডেরায় মুক্তির করার।
চিন্ময় অতীত তন্দ্রার ত্বরার! জয়! জয় !
নিৰ্ম্মল তােমার নির্ভয় আঁখি,
কল্যাণ-করে মৈত্রীর রাখী,
সংসার নীড়ে স্বর্গের পাখী। জয়! জয় ।
অহৎ শ্ৰমণ-তীর্থঙ্করে
গৌরব তােমার কীৰ্ত্তন করে,
সৌরভ তােমার অম্বর ভরে ! জয়! জয় !
জয় জয় ভারত! বুদ্ধের মাতা!
নিষ্ঠার নিধান! শুদ্ধির দাতা!
অক্ষয় তােমার শান্তির গাথা। জয়! জয়!
দপীর দুলাল, ধৃষ্টের আগে
আক্ষোভ তোমার অক্রোধ জাগে।
বিশ্বের হিয়ায় বিস্ময় লাগে ! জয় ! জয় ।
২৮ বেলা শেষের গান নিত্যের প্রেমে দুষ্কর কারা, সত্যাগ্রহে লাঞ্ছন বরাে, হেমাের ফেলি’ শৃঙ্খল পরে ! জয়! জয়: তপ তাের অটুট তাণ্ডব নাচে, দুর্বোধ দাড়া শত্রুর কাছে, পায়-পায় ফিরিস মৃত্যুর পাছে! জয় ! জয় ! মৃত্যুর পারের নিত্যের লাগি ক্লেশ তুই সহিস যুগ যুগ জাগি’- যুগ যুগ অসীম দুঃখের ভাগী! জয়! জয় ! বুদ্ধের ধারায় যুদ্ধের ধারা চেষ্টায় তােমার হয় ফের হার- গঙ্গায় গ্লানি পঙ্কের পারা! জয়! জয় ! ক্ষুদ্রের পরম দুর্ভোগ তুমি, ধূৰ্ত্তের চরম দুৰ্যোগ তুমি, পত্যের কৃপাণ নিৰ্ম্মোঘ তুমি ! জয় ! জয়! অম্লান তােমার আত্মার বাণী । অক্ষয় তােমার আশ্বাস, জানি ; বিশ্বাস-কিরীট বিশ্বের রাণী ! জয়! জয় ! জয় জয় ভারত। আত্মার দাতা। আবর-অশােক-ভীষ্মের মাতা। অক্ষয় তােমার কল্যাণ-গাথা ! জয়! জয়!
রাজা-কারিগর
২
জয় জয় ভারত! সংশয় ত্রাতা।
চিত্তের অমােঘ শক্তির দাতা।
ত্রিশ ক্রোর ব্ৰতী পুত্রের মাতা ! জয়! জয় !!
রাজা-কারিগর
(গান)
রাজা কারিগর বিশ্বকৰ্মা !
দুনিয়ার আদি মিস্তিরি!
তােমার হুকুমে হাতুড়ি হাঁকাই,
করাতের দাতে শাল চিরি ।
ঘাটা পড়া কড়া লাখাে হাতে তুমি
গড়িছ কত কি কৌশলে ।
কামার শালের গনগনে রাঙা
আগুনে তোমার চোখ জলে!
হাপরে তােমার নিশ্বাস পড়ে
খুব জানি মােরা খুব চিনি,
মাইদুরের গণেশ তুমি হে -
ছুটোছুটি চৌপর দিনই !
সিদ্ধি তােমার হাতে হাতিয়ারে
সোনা করাে তুমি খা নিয়ে,
দুনিয়ার সমৃদ্ধি, তােমার
গলে আঙুলের ফাঁক দিয়ে
বেলা শেষের গান
রাজা-কারিগর বিশ্বকৰ্ম্মা।
দুনিয়ার সেরা মিস্তিরি
তােমার হুকুমে লােহা হ’ল নি,
পদানত যত গজগিরি।
জ
ইন্দ্রের তুমি বজ গড়েছ
দধীচির দৃঢ় হাড় কুঁদে,
গ্রহ তারা তুমি গড়েছ ফু দিয়ে
ফুলিয়ে আগুন-বুদ্ধদে!
অগ্নির তুমি জন্ম দিয়েছ
কাঠে কাঠে ঠুকে চমকি,
সূর্যের শান-যন্ত্রে চড়ায়ে
গড়িলে বিষ্ণুচক্র কি!
ছিন্ন ভানুর জালার মালায়
গড়িলে শিবের শূল তুমি,
যমের জাঙাল গড়িতে গড়িতে
রেখে দিলে কেন মুতুবি !
তারার খিলান রয়েছে যে তার
আধখানা আসমান জুড়ে,
কীৰ্ত্তি তােমার উজ্জ্বল জাগে
অনাদি অন্ধকার ফুড়ে :
রাজা-কারিগর বিশ্বকর্মা !
পর্গলোকের মিস্তিরি!
এ
রাজা-কারিগর
৩১
তােমার হুকুমে যত কারিগরে
ঘরে ঘরে নব দ্যায় ছিরি ।
।
পথ গড় তুমি, রথ গড় তুমি,
নখদর্পণে শিল্পবেদ,
সকল কাৰ্ম্ম সিদ্ধহস্ত
যজ্ঞ করিয়া সর্বমেধ ।
অষ্টবসু কুলের দুলাল
হুনর তােমার সাত বুড়ি,
হাজার হাতের হাতুড়ি তােমার
তুড়তুড়া-তুড় আয় তুড়ি।
তুপু হ’ল তাপুর। তব,-
নেহাইএ নেহাইএ দাও তেহাই,
উল্লাস-ভরে হুল্লোড় কভু,
গুগু গান শুনতে পাই।
তােমার ভক্ত সেবক যে তার
বুকে পিঠে যেন ঢাল বাধা,
দকচা মারা জোয়ান্ চেহারা
কোচকানাে ভুরু, মন শাদা!
রাজা-কারিগর বিশ্বকর্মা ।
স্বর্গে মর্ত্যে মিস্তিরি!
তােমার প্রসাদে শ্রমেও আমােদ
ধমনীতে হােটে পিচকিরি
৩২
বেলা শেষের গান ".
তােমার হুকুমে হাতিয়ার ধরি
আমরা বিশ্ব বাংলাতে ; ।
থলথলে মাটি, ঠনঠনে লােহা
অনায়াসে পারি সালাতে।
মণিকাঞ্চনে আমরা মিলাই,
মণি-মালঞ্চে হার গীথি," !
বন-কাপাসীর হাসি কুড়াইয়া
টানা দিই তাতে দিন রাতি।
রুখখা শুখাে কাঠে ফুল যে ফোটাই
বাটালির ঘায়ে বশ করি,
কর্ণিক, ছেনি, হাতুড়ি চালাই,
তুপু মাকু বা’শ ধরি।
তােমার প্রসাদে শ্রমে অকাতর
মােরা দড় বিশ কর্মদ
দীক্ষা নিয়েছি তােমারি হুকুমে
পরিশ্রমের ধৰ্ম্মেতে।
রাজা-কারিগর বিশ্বকর্মা !
সকল কাজের মিস্তিরি ।
তােমার হুকুমে হীরা কাটি মােরা,
‘অনায়াসে ইস্পাত চিরি।
তােমার প্রসাদে স্রোত বাঁধি মাের,
পুল বেঁধে করি জয় জলে
সাঁঝাই
হাওয়া করি জয় গরুড়যন্ত্রে
কীলিকা-প্ৰয়ােগ-কৌশলে
বিদ্যুতে বাঁধি তামার বেড়ীতে
দস্তার দিয়ে হাতকড়ি,
বে-টপ,বে-গােছ বে-গােড় মাটিতে
প্রাসাদ দেউলদেব গড়ি,
অষ্টবসুর যজমান মােরা,
ত্বষ্টা ঋষির সন্ততি ;
লস্কর মােরা সূর্যদেবের ;
স্বাস্থ্য মােদের সঙ্গতি।
রাজা-কারিগর বিশ্বকর্মা ।
বুনিয়াদি আদি-মিস্তিরি!
তােমার আশিসে হাতিয়ার হাতে
হাসি-মুখে ত্রিভূবন ফিরি।
সঁঝাই
সাঁঝে আজ কিসের আলো,
ভুলালাে মন ভুলালো।
ফাগুয়ার ফাগ মিলালাে
শরতের মেঘের মেলায়।
আলােতে ডুবিয়ে আঁখি
পুলকে ডুবতে থাকি।
হবহু সােনার ফাঁকি
ঝুরুকুর হাওয়ার খেলায় ।
৩৪
বেলা শেষের গান
।
মরি, কার পরশমণি
গগনে ফলায় সােনা।
হৃদয়ে নূপুর-ধ্বনি-
অজানার আনাগােনায়।
সোনালি জর্দা চেলি
দিয়ে কে শুন্যে মেলি
নিথরের পর্দা ঠেলি
উদাসে আঁচল হেলায়।
ধরে রূপ জর্দা আলাের
ঝরে কার রূপের আতর।
নয়নের কাৰ্বা যে মােৰ
ছাপিয়ে ঢেউ খেলে যায়।
নলিনীর ক্লান্ত ঠোঁটে
অবেলায় হাসি ফোটে।
গহনে স্বপন-কোটে
সেফালি চোখ মেলে চায়।
অলকার রত্নাগারে
ঢুকেছি হঠাৎ যেন।
ডুবে যাই চমৎকারে।
সায়রে শিশির হেন ;
আঙুলে হিঙুল নিয়ে
ফেরে কে মেঘ মাঙিয়ে।
গােপনের কিনার দিয়ে
পারিজাত ফুল ফেলে যায়।
সঁঝাই
বলি, ও স্বৰ্গনদী ।
বিলালে স্বর্ণ যদি,
তবে কি এই অবধি ?
এসসা আর একটু নেমে ;
থেকনা আধেক পথে,
এস গাে এই মরতে,
অতসীর এই জগতে
প্রতিমার কপােল ঘেমে।
মরতের কুঞ্জগেহে
ঝরে যে যায় গাে চাঁপা,
তারা রয় তােমার দেহে,
সে বরণ রয় কি ছাপা ?
ধরণী সাজল ক’নে
যে আলোর সুচন্দনে
সে আলাের আলােক-লতা
থেকনা শূন্যে থেমে।
ফুলের তােমায় সাধে,
সুবাসের শােলােক বঁাধে,
নিরালায় উশীর কাদে,
থেকনা বধির হয়ে,
এস গাে অরূপ হ'তে
মুরতির এই মরতে,
দ্যাখা দাও আলাের রথে,
ডাকে প্রাণ অধীর হয়ে।
- ২
৩
বেলা শেষের গান
থেকনা আবছায়াতে
কিরণের হিরণ-মায়া ?
প্রদোষের পদ্মপাতে
থেকনা লুকিয়ে কায়া,
তােমারি মুক আরতির
কঁপে দীপ প্রজাপতির,
দুলােকের মৌন দু’ তীর
উঠেছে মদির হ'মে।
যুক্তবেণী
হিল্লোলে হেথা দোলে লাবণ্য পান্নার!
বিভূতির বিভা ছায় সারা গায় হােথা কার ?
কার রূপে পায় রূপ নিশীথের নিদালি !
কার.বুকে ভস্মে ও চন্দনে মিতালি ।
ললিত-গমনা কে গাে তরঙ্গভঙ্গা !
জয়তু যমুনা জয় ; জয় জয় গঙ্গা
খর রবি মুরছায় কার শ্যাম অঙ্গে!
তােড়ে পাড় তােলপাড় কার গতি-রঙ্গে।
নীল মাণিকের মালা শােভে কার বেণীতে
কে সেজেছে দেনময় ধুতুরার শ্রেণীতে ।
মাধব-বধূটী কে গাে হর-অরধঙ্গা!
জয়তু যমুনা জয়! জয় জয় গঙ্গা!
কালীয় নাগের কালাে নির্মোক পরে কে ?
হর-জটা ভুজগেরে ভুজতটে ধরে কে!
!
৩৭
যুক্তবেণী
আঁখি হায় কে ভুলায় তলিত তন্দ্রা !
সাগরের বোল বলে কে ও ভাল-চন্দ্রা !
শরীরিণী স্বপ্ন এ, সরণি ও সংজ্ঞা !
জয়তু যমুনা জয়! জয় জয় গঙ্গা!
ছায়া-ঘন দেহে কার স্নেহ আর শান্তি।
কে চলেছে ধুয়ে ধুয়ে ধরণীর ক্লান্তি !
এ যে আঁখি ঢুলাবার-ভুলাবার মুর্তি!
ও যে চির-উতরােল কল্লোল-ত্তি
সুখে এ যে মােহ পায় ও বাজায় ডঙ্কা।
জয়তু যমুনা জয়! জয় জয় গঙ্গা!
বাহুপাশে বাধা বাহু গৌরী ও কৃষ্ণা।
কোলাকুলি করে একি তৃপ্তি ও তৃষ্ণা !
কালােচুলে পিঙ্গলে একি বেণীবন্ধ !
ঘুচে গেল কালাে-গায় গােরা-গায় দ্বন্দ্ব !
সখী-সুখে মুখে মুখে দুই নিঃসঙ্গা!
জয়তু যমুনা জয়! জয় জয় গঙ্গা।
খুলে যায় মুছ আজ অন্তৰ-দৃষ্টি ।
অবচন একি শ্লোক। অপরূপ সৃষ্টি।
সাম্যের একি সাম! পূত হ’ল চিত্ত !
নিত্যের ইঙ্গিত-এ মিলন-তীর্থ !
টুটে ভেদ-নিষেধের শিলাময় জ!
জয়তু যমুনা জয়! জয় জয় গঙ্গা!
বিধি-কৃত সংহিতা ! হের দ্যাখ নেত্র
আর্য-অনাৰ্য্যের সঙ্গমক্ষেত্র !
বেলা শেষের গান ,
গলাগলি কোলাকুলি আলো আর আঁধারে !
ঢেউএ ঢেউ গেথে গেঁথে চলে মেতে পাথারে!
আঙুলে আঙুল বাঁধা ভেদ-বাধা-লজ্জা!
জয়তু যমুনা জয়! জয় জয় গঙ্গা!
দেহ প্রাণ একতান গাহে গান বিশ্ব !
অমা চুমে পূর্ণিমা ! অপরূপ দৃশ্য!
চুয়া মিলে চন্দনে! বর্ণ ও গন্ধ !
চির চুপে চাপে বুকে শতরূপা-ছন্দ!
অঞ্জন-ধারা সাথে চলে অকলঙ্কা!
জয়তু যমুনা জয়, জয় জয় গঙ্গা!
অপরূপ ! অপরূপ! আনন্দ-মল্লী।
অপরাজিতার হারে পারিজাত-বল্লী।
দ্রবময় দর্পণে হরিহর-মুরতি।
অপরূপ ! দ্রবধূপ দ্রব-দীপে আরতি।
মন হরে! জয় করে সঙ্কোচ শঙ্কা!
জয়তু যমুনা জয়! জয় জয় গঙ্গা!
অরুন্ধতী
=
[ বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর শত পুত্রকে কল্মষপাদ রাজা ক্রোধে রাক্ষসের
ন্যায় হইয়া বিনষ্ট করেন; এই শত পুত্রের জ্যেষ্ঠ ছিলেন শক্তি। ক্ষমাধর্মী
পুত্রশােকাতুর বশিষ্ঠ তপঃক্ষয়ের ভয়ে পুত্রহস্তা কল্মষপাদকে কিছু না বলিয়া
আত্মনাশের জন্য নিজেকে পাশবন্ধ করিয়া নদীতে নিক্ষেপ করেন;
নদী তাঁহাকে গ্রহণ না করিয়া পাশ মােচন পূৰ্ব্বক তীরে নিক্ষেপ করে ;
সেই হইতে ঐ নদীর নাম বিপাশা। তিনি পুনৰ্বার অন্য নদীতে নিমজ্জিত
।
অরুন্ধতী
৩৯
হইলে সে নদীও তাহাকে ত্যাগ করিয়া শতদিকে ধাবিত হয় ; সেই নদী
সেই হইতে শতদ্রু নামে পরিচিত।
শক্তির হত্যাকালে তাঁর পত্নী গর্ভবতী ছিলেন ; সেই গর্ভজাত পুত্র
পরাশর পরে পিতৃবধের বৃত্তান্ত অবগত হইয়া পৃথিবী হইতে রাক্ষস এবং
রাক্ষসপনা উচ্ছেদ করিবার জন্য রাক্ষস-সত্রের অনুষ্ঠান করেন।]
জাগাে বধূ! জাগাে, কত ঘুম মাগাে
যা তুই অকাতরে,
স্বপ্ন,-সত্য,-সব কিছু মিলে
মােরে যে পাগল করে।
এখনাে কাঁপিছে হৃৎপিণ্ডটা
স্বপনের তাড়নাতে,
স্মর গােবিলে চিত্ত রে মাের
বিভীষিকাময় রাতে।
ভােরের বাতাস ওঠে নি এখনাে
কালিয়ে গিয়েছে দেহ,
স্তিমিত গার্হপত্য অগ্নি
নিশুতি-নিথর গেহ।
নি-মহলের সাতালি-পাহাড়-
• প্রাচীরেতে ঘেরা ঘরে
সবাই ঘুমায় ; কালসাপ শুধু
মােরে দংশন করে।
শয়নে স্বপনে অন্তরে মাের
নাই শান্তির কণা,
স্মরি দিনে রাতে মানুষের হাতে
মানুষের লাঞ্ছনা।
.
বেলা শেষের গান ।
জাগাে বধূ জাগা, কত মা ঘুমা
বিধবার কম্বলে,
ছায়ার মহলে ছুয়ে থাকি তােরে,
ভয় ভাঙি কথা বলে।
গর্ভে তােমার আশার আধার
শক্তির সন্তান,
স্বপ্ন সে যদি সঁচা হয়, বাছা,
ঘুচাবে সে অপমান।
পিতৃ-বধের দিবে প্রতিশােধ
গর্ভ-শয়ান আশা,
বধূ! বধু! তুমি অন্ত-ভানুর
ন্যন্ত তেজের বাসা।
নর-রাক্ষসে নষ্ট করেছে
মাের সন্ততিমালা,
এই অনাগত ঘুচাবে সে ক্ষোভ
ঘুচাবে শশাকের জ্বালা।
শক্তি আমায় এই বলে গেল,
স্বপ্ন সে নয়,-সাচা,
তপ্ত বৈতরণী পার হয়ে
এসেছিল মাের বাছা।
এসেছিল মাের প্রথম প্রসূন
আমারি শিয়রে হা রে,
শস্ত্রপাণির সম্ভা দেমাক
বলি নেছে 'হায় মারে।
অরুন্ধতী
০
যমলােক হতে এসেছিল ফিরে
অতিথি বাঞ্ছনীয়,
শােকাতুর মায়ে সান্ত্বনা দিতে
আমার মমতা-প্রিয়।
নয় সে ভীষণ, নয় কুৎসিত,
একটু কেবল ম্লান।
দ্যাখ, মেয়ে, তারে ফিরে পেয়ে মাের
অশ্রুর অবসান।
অবাক্ নয়নে রহিনু চাহিয়া,
কথা না জুয়ায় মাের ;
হারা মর তবে ফিরে পাওয়া যায়,
এই বিস্ময়ে ভাের।
সহসা শুনিনু শক্তি কহিছে।
“ত্যাজো মা মিথ্যা শােক,
মৃত্যু মিথ্যা, কালে কালে শুধু
ত্যজি মােরা নির্মোক।
অমর আত্মা, সাক্ষী তাহার
• দেখ মা, এসেছি ফিরে,
প্রাণ-লােকে দ্বিজ হয়েছি, ডুবিয়া
মৃত্যুনদীর নীলে।
চুম্বিয়া শিরে কহিলাম ধীরে
এসেছি ফিরে যদি,
মায়েরে ছাড়িয়া যাসনে রে দূরে
কাছে থাক্ নিরবধি।
8२
বেলা শেষের গান
.
প্রাণে প্রাণে তুই আছি দেখিয়া
হৃদয় অমৃতে ভরে,
দুঃখ-সুখের মিলিত কাকলি
কণ্ঠে কলহ করে।
ভুলে যাই শােক, ভুলে যাই গ্লানি,
ভুলি যত যন্ত্রণা,
কিন্তু ভুলিতে নারি ক্ষত্রের
এই রাক্ষস পনা।
তাই তাে তােমার কথা শুনে মাের
মন দিতে নারে সায়,
শত শরতের শ্লথ নিম্মোক
নিজে খসে জানি ; হায়,
কঁচা গায়ে ছুরি বসাবে তা বলে-
সে কি নির্মোক খােলা ?
মৃত্যু মিথ্যা বলে কভু যায়
হত্যার পাপ ভােলা?
কলুষ-ক্লিন্ন কল্মষপাদ,-
রাক্ষস নরবেশে;
হরিণ বরাহ নির্মূল করি
'মানুষ মৃগয়া শেষে ?
লঘু দোষে গুরু দণ্ড করিবে
হায় রে শস্ত্রপাণি,
দিতে যা’ পার না সেই প্রাণ নেবে
এত কি মস্ত মানী।
৪
অরুন্ধতী
কেড়ে নেবে কিনা বিধাতার দেওয়া
বাঁচিবার অধিকার,
দন্ত সুরার ঠুনকো কলস
স্পর্ধা এমনি তার !
পথের কলহ ঘটে অহরহ,
তার নাকি এই সাজা ?
বিস্মৃত হল—বিশ্বপ্রজার
প্রধান সেবক রাজা।
বিনা দোষে বুকে শেল দিল মাের
কোল খালি একেবারে,
শত পুত্রের কঙ্কাল কাঁদে,
এ ব্যথা জানাব কারে ?
নাই প্রতীকার নরহত্যার?
এ কি নিদারুণ, হায়,
ত্যক্তশস্ত্র-প্ৰতধারী-জেনে-
শুনে তবু মেরে যায় !
করে কশাঘাত মদ-গর্বিত
ক্ষত্রিয়-রাক্ষস,
ব্ৰহ্মনিষ্ঠ সহে অনিষ্ট
পরবশ। পরবশ ।
ক্ষমা-ধৰ্মীর ক্ষত হিয়া জ্বলে
অবশে আনিতে রােষে,
আপন অঙ্গ কাটে ভুজঙ্গ
অক্ষম আক্রোশে।
৫৪
বেলা শেষের গান
সপ্ত সিন্ধু ব্যাপিয়া বাড়ব
বহ্নি-নিশাস ফেলে,
আঁধারে আলেয়া বাতাস বিষয়ে
লেলিহ জিরা মেলে।
পাশ বেঁধে গলে ঝাঁপ দিলে জলে
খােলে পাশ বিপাশায়,
দেহ তুলে দিয়ে কূলে শতদ্রু
শতধা সে দ্রুত ধায়।
বৃহৎ জীবন-ব্ৰহ্মণ্যের
মহা আদর্শ নিয়ে
তপক্ষয়ের ভয়ে কাটে কাল
অশ্রু-সলিল পিয়ে !
বাছা রে, ব্যথার অন্ত কোথায় ?
বুকভরা হাহাকার ;
রাক্ষস-পনা করে রাজন্য
কোথা এর প্রতীকার ?
প্রাণ
প্রাণ করে খালি আথালি-পাথালি
নিক্রিয় নাগপাশে,
শত সন্তান নিহত আমার
। মকারণে অনায়াসে।
;
হইনু নীরব, দ্রুত অপসারি
তপ্ত অনীরে
হিম হাতখানি থুইল শক্তি
ললাটে আমার ধীরে।
অরুন্ধতী
ঝিম্ ঝিম্ মাথা, ছেয়ে আঁখিপাত
ধোয়া করে গুগল।
দেখিনু বধূ লাে নাভিপুটে:তাের
ফুটেছে পদ্মফুল !
পদ্মফুলের কোলে হাসে ছেলে
নয়ন-জুড়ানাে মুখ,
যে ছেলের তরে আছে প্রাণ ধরে
হিয়া মরণােৎসুক।
দেখিতে দেখিতে বড় হয়ে ওঠে
পদ্মফুলের ছেলে,
করে তপস্যা, বিনা ইন্ধনে
হােমের আগুন জেলে।
শােকে শুচি সেই তরুণ তাপস
ঋত্বিক দৃঢ়মনা,
তপের প্রভাবে পােড়ায় ধরার
পাপের আবর্জনা।
জলে রাক্ষস-সত্রের শিখা
অ'লে উঠে রণরণি,
পিতৃবধের শােধ নিতে, পড়ে
মন্ত্র আকর্ষণী।
দূর সুদূরের উগ্র জুরের
মত্র সে কেপে ধরে,
পাগলের মত রাক্ষস যত
আঘাতে পরস্পরে!
বেলা শেষের গান
:
বাড়ে রাক্ষসে রাক্ষসে রণ
রূঢ় রাক্ষসী রীতে,
বাড়ে রাক্ষস-সত্রের শিখা
নব নব আহুতিতে।
ভূত-তাড়িতের মত এসে পড়ে
আগুনের ঘূর্ণাতে,
পােড়ে নৃশংস অনুবংশ
পাপের পাংশু মাথে।
ত্রাণ পেতে কেহ আঁকড়ে পাহাড়,
পাকড়ে বনস্পতি,
মন্ত্রের বলে তবু দলে দলে
পুড়ে মরে মূঢ়মতি।
বিকট শব্দে কাঁপে দশদি,
কেঁপে কেঁপে ওঠে ধরা,
যজ্ঞের শিখা জ্বলে অক্ষয়,
তা নাহিক ত্বরা।
পােড়ে রণ-ত নর-ভােজী যত,
পুড়ে মরে রমনা,
ব্যবসা যাদের পরপীড়া আর
পরের উদ্বেজনা।
পােড়ে দর্পিত দর্পমদের
খর্পর নিয়ে হাতে,
নর-কঙ্কালে গড়া পালঙ্কে
পুড়ে মরে প্রিয়া সাথে।
অরুন্ধতী
৪।
রক্ষ-কুলের বাঘা পােড়ে, পােড়
রক্ষ-কুলের মূষা,
হাঙ্গর-র্দাতের কষ্ঠী গলায়,
সাপের চক্ষু ভূষা।
ধূধূ ধূধূ শুধু বহ্নি বাড়িছে,
ধূমে নভতল ঢাকে,
হুড় করে হুড়ােমুড়ি করে পােড়
নিশাচর লাখে লাখে।
দৈত্য-অসুর-রাক্ষস পােড়ে,
পােড়ে রাক্ষস-পনা,
পুড়ে যায় যার যতটুকু আছে
নৃশংসতার কণা।
বাঘের নখের ধার গেল, গেল
বরাহের দাত উচা,
কাটার সাঁজোয়া খােয়ায়ে হঠাৎ
সজারু হইল ছুঁচা!
পাড়ে কত রাজা কত রাজন্য
ক্রুরতার অবতার।
ডান হাত সহ কল্মষপাদ
জিহ্বা খােয়ল তার।
দেখি সে দৃশ্য জর আনন্দে
জ্বলজ্বল আঁখি মাের,
সহসা কি দেখি! আঁখি ছুতে আসে
সত্রের শিখা ঘাের।
১৮
বেলা শেষের গান
ফাঁফরে পড়িয়া ধাই আতঙ্কে
শিখা ধায় সাথে সাথে,
প্রাণ করে ত্রাহি, মুখে রব নাহি,
অশ্রু নয়ন-পাতে।
ছুটিয়া চলেছি অসীম শূন্যে
পিছে ফেলে দিবা নিশি,
ছুটিয়া চলেছি ; সহসা সমুখে
নেহারি সপ্ত ঋষি।
মােরে যেন তারা নারে চিনিবারে,
মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ;
“র আনন্দ—এ তার দণ্ড”
বলে রে পরস্পরে।
বলে—“রাক্ষস-সত্রের শিখা
সব ক্রুরতার অরি,
নিষ্ঠুর সুখে সুখিত যে আঁখি
সে আঁখি আহুতি ওরি।”
ডুকরিয়া কেঁদে উঠিলাম জেগে
শঙ্কা-আবেগে কেঁপে,
বধু ! বধূ! এ কি সাঁচা না স্বপন?
মন যে রয়েছে চেপে।
এই আছ তুমি,—এই দৃঢ় ভূমি,
জেগে আছি, আছি ঘরে ;
সত্যে স্বপনে মিলে তবু, হায়,
আমারে পাগল করে।
1
অরুন্ধতী
থ
নােসস বধ নােসােআরাে কাছে বোসাে,
আর ভয় নাই কোনো,
আশা-জ্বণ মাের তােমারি জঠরে
করে বেদগান শোনো।
স্বপ্ন আমার একেবারে মিছে
হবে না জেনেছি প্রাণে,
পাপের পঙ্ক পুড়ে যাবে, তােৰ
পুত্রের কল্যাণে।
ভাবিস, নে মনে বিশ্ব সৃজিয়া
বিধাতা নেছেন ছুটি,
ভাগ্যচক্র ঘােয় মােদের
ভৃঙ্গীর ভির কুটি ;-
ভুল কথা, বধূ, মরণের মূল,
ও-কথা আমি না মানি,
চরমে ধরম হবে জয়ী হবে
মরমে মরমে জানি।
নিঠুর দর্প বিপুল সর্প
নােয়বে নােবে ফণা,
হবে রাক্ষস সবনে ভস্ম
পাপের আবর্জনা।
এই তপােবনে স্বপনের নিধি
পদ্মফুলের ছেলে --
জাগিবে ; জাগিবে তরুণ তাপস
পাপের তিমির ঠেলে।
বেলা শেষের গান
এই চোখে আমি দেখিব তাহার
ললাটে যজ্ঞ-টীকা,
দেখিব তাহার মহাসলের
আহুতি-বিপুল শিখা।
ক্রর আনন্দ দূর করে দিয়ে
পাঠা রে পাতাল-বাসে,
ধৰ্ম্মের জয় দেখিব বসিয়া
সপ্ত ঋষির পাশে।
ছন্দ-হিন্দোল
।
মেঘলা থমথ, সুৰ্য্য-ইন্দু
ডুবল বালায়, দুলল সিন্ধু।
হেম্ কদম্বে তৃণ-স্তম্বে
দুটুল হর্ষের অশ্রুবিন্দু !
মৌন নৃত্যে মগ্ন খঞ্জন,
মেঘ-সমুদ্রে চলছে মন্থন !
দগ্ধ-দৃষ্টি বিশ্বসৃষ্টির
মুগ্ধ নেত্রে স্নিগ্ধ অঞ্জন।
গ্রীষ্ম নিঃশেষ! জাগছে আশ্বাস !
লাগছে গায়—কায় গৈবী নিঃশ্বাস ।
চিত্ত-নন্দন দৈবী চন্দন
ঝছে, বিশ্বের ভাসছে দিশ পাশ !
ভছে বিল খাল, ভাসছে বিলকুল !
ঝাপসা ঝাপটায় হাসচে জুইফুল!
। ছন্দ-হিন্দোল ধান্য শীষ, তার কছে বিস্তার তলিয়ে বন্যায় জাগছে জুলজুল ! বাজছে শূন্যে অভ্র-কন্তু; কাপছে অম্বর কাপছে অম্বু ; লক্ষ ঝর্ণায় উঠছে ঝঙ্কার ওম স্বয়ম্ভু!” “ওম, স্বয়ম্ভু!” ঝছে ঝঝ, ঝরূছে ঝম্ঝম্, বজ গর্জায়, ঝঞ্চা গঙ্গ, লিখছে বিদ্যুৎ মন্ত্র অদ্ভুত, বলছে তিন লােক “বম্ বব বম্”! ‘ব বব ব’ শব্দ গম্ভীর বৃন্তে ছছ স্তব্ধ জম্বীর। যে,-শৃদঙ্গে প্রাণ সারঙ্গে স্বপ্ন-মল্লার, স্বপ্ন হাম্বীর। সান্দ্র বর্ষণ হর্ষ কল্লোল। ঝিল্পী-গুঞ্জন মঞ্জু হিল্লোল ! মূচ্ছে বীণ, আর মুচ্ছে বীণকার- মুচ্ছে বর্ষার ছন্দ-হিন্দোল।
বেলা শেষের গান ।
কাগজের হাতী
t
বা
নব্য দিও নাগ প্রশস্তি
দূরে থেকে দেখে দিগগজ বলে
ভুল করেছিনু প্রায় তারে,
কাছে এসে দেখি দিগগজ একি
নজগজে এ যে একবারে।
পথ জুড়ে চলে প্রতি পদে টলে,
চঁাচাড়ি-চেরাই-দন্ত রে,
ঘােড় ভড়কায় দেখে আচম্কা,
ছেলে ভয় পায় অন্তরে।
আগে আগে চলে ময়ূরপঙ্খী,
কাগজের হাতী ধায় পিছে,
প্রহলাদ মারা শুড়ের বহর,
কিন্তু সে ভুয়গা, সব মিছে!
ও ঔড় কারেও মুড়ে তুলে কভু
পাটে
তুলে রাজা কবে কি ?
ও শুড় কখনাে মহালক্ষ্মীর
অভিষেক-ঘট
ধবে
ও শুড়ে পাকড়ি 'বট-পাকুড়ের
পাতাটাও ছেড়া যায় না রে,
ও শুধু খাদ্ধা সমাস ভাঙিতে
পট টেনিসন-টার্ণারে ।
নাপ্পি-পীরিতি-কথা
ন
নাপ্পি-পীরিতি-কথা
বাক্যে অর্থে ফাখৎ হেরি,
ফাখৎ রাধা শ্যামে ;-
রাসের মঞ্চে নাচিছে আয়ান,
শিশু রাই নচ বামে।
যাঙ্ক স্মরিছে মুস্কিলসান,
বররুচি কঁপে প্রাণে
ইস্কুলে ঢোকে অমরসিংহ
শিখিতে কথার মানে!
ডিগবাজী খায় ছাপার হরফ,
ডিক্স নারী গেল তল,
রসের কুঞ্জে চাষ দিতে আসে
পদ্মাপারের দল !
শব্দ ধুনিয়া ধাই ধাঁই, করে-
কাদানী বিস্তর ;
• গৌড়-বঙ্গ হাঁ-করিয়া শােনে
পূৰ্ব্ব’ মানে যে পর’!
অর্থ শব্দ হয়েছে জব্দ
বেফাঁস বাক্য-জালে,
পূৰ্ব্বরাগের মানে সেই রাগ
ঘটে যাহা পরকালে।
নাপ্পি-খােরের পড়শীরা নােনা-
মাছ গেঁথে বঁড়শীতে,
করে বাহাদুরী গুম্ফ চুমরি’.
নাপ্পি-নায়িকা-প্রীতে ।
বেলা শেষের গান
পূৰ্বরাগের হাড়েতে দূৰ্ব্বা
গজাইয়া সারি সারি,
বিশ্বে যা’ সাঁচা, বঙ্গে তা মিছে,
ভণিছে পদ্মাপারী!
বাজাইয়া ধামী রজকিনী রামী
কহিছে চণ্ডীদাসে,
চল বড় রসতত্ত্ব শিখিব
পােষ্ট-গ্র্যাজুয়েট ক্লাসে ।
তুমি যে রামীর পূর্বপুরুষ
সন্দেহ তার নাই,
পরপুরুষে ও পূর্বপুরুষে
হয়ে গেছে একজাই ।
পূৰ্ব্ব’ মানে যে ‘পিছন’ হে বধু!
সেই কথা পাকা কথা,
ফক্কিকা-কৃত ব্যাখ্যান এ যে,
নাহি মিলে যথা-তথা !
পদ্মা, পারের প্রতিভা চেরাগে
নব-বাণী লহ পড়ে,
পূৰ্ব্ব-বঙ্গ মানে সে বঙ্গ
পিছিয়ে যে রয় পড়ে।
যাদের কথারটনে সাড়া দেয়,
ডিশিন নিশিনপাড়া,
তাদের সদনে তত্ত্ব শিখিব,
চল বড়, কর তাড়া
। সাল,পহেলী
পূৰ্ব্বরাগেরে পান্তা করিয়া,
পানসে করিয়া নাড়ী,
নাপ্পিপীরিতি সাধনার রীতি
বখানে পদ্মাপারী ।।
সাপহেলী
শূন্যে ঘােরে সূর্য্য শত সােনার চাপা ছড়িয়ে রে।
অগাধ আকাশ-নাগরদোলার দেশ!
চক্রে চলে চন্দ্র-তারা জ্যোতির পরাগ উড়িয়ে রে।
নাইক সুরু, নাই সে গতির শেষ !
সেই অশেষের অনির্দেশে অলখ-লেখার দাগ দিয়ে
নূতন হ'য়ে নিচ্ছে চিরন্তন ;-
ডালি-ফুলে উথলে পুলক,-কুসুম-ফুলে ফাগ দিয়ে,
চন্ননাদের গায় দিয়ে চন্দন ;-
স্বপন-পুরে চলছে উড়ে দেখিয়ে আঙুল কোন্ দূরে,
না পাই এচে কয় কি ইসারায়,
আশার আলােয় গলিয়ে আঁধার জ্বালিয়ে বাতি কপূরে
চাদের চোখে চমক দিয়ে চায় ।
উড়িয়ে ফুয়ে তুলােট-পুথি ধূলােট খ্যালে চুলে
ফুল-বিলাসী দখিন হাওয়া,তাই,
সুর হেগে তিন পিচ কিরি পিক দ্যায় জাগিয়ে বুলে
পাপিয়া শ্যামার কণ্ঠে বিরাম নাই ।
সি দূর-মাখা সােনার মােহর কৃষ্ণচূড়া তাই ঢালে
সর-পথে দরাজ করে মন,
বেলা শেষের গান
আনন্দেরি মুদ্রা ঝরে বকুল-ফুলের টাকশালে,
আলােয় আলাে গন্ধরাজের বন!
প
-
পাওনা দেনার গদিতে আজ গাওনা চলে দিল খােলা,
দকা খরচ করূছে বেনের দল,
কেবল ধূনাে-গঙ্গাজলে আজ খুসী নয় হাটখােলা,
আজকে সেথায় চলছে গােলাপ-জল !
চলছে খুসীর সওদা শুধু, চলছে নিছক শিষ্টতা
প্রসন্নতার সদাব্রত আজ,
আনন্দ আজ মূৰ্ত্তিমন্ত কুটিল ভুরুর ক্লিষ্টতা
তলিয়ে গেছে কোন্ অতলের মাঝ !
পান্না-পাতির ছিকে দিয়ে সাজিয়ে অশথ দেবদারু
তরুণ হ'তে ডাকছে তরুর দল,
নূতন পাতার নূতন খাতা !...আজ বাকী না রয় কারু
খুলতে হৃদয় ভুলতে অকৌশল।
বাতিল হ’ল বকেয়া কেতাব, আর যেন না যায় দেখা
অসংখ্য ভেল অসংখ্য ভুল তার,
নিরঙ্ক এই নূতন খাতায় নিষ্কলঙ্ক লেখ, লেখা,
পঙ্কে ফুটুক পদ্ম চমৎকার।
জানিয়ে দে রে এই প্রভাতের নবীন প্রভার দেবতাকে
নূতন হবার শক্তি চিরন্তন,
ডুবিয়ে দে রে অনুশােচন, যা কিছু আক্ষেপ থাকে-
আজকে ক্ষ্যাপা ! সব দে বিসর্জন।
তাজা হবার তাগিদ এল সৃজন করে নওরােজে,
জঞ্জালে আজ আগুন জ্বালার দিন,
। ভীম-জমনী
৭
চাকার ভিতর চলছে চাকা,...বুঝ আছে যার সেই বােঝে,
জমায় পাড়ি অগাধ জলের মীন।
দিন কিনে নে প্রাণের হাটে ঘূর্ণি-ঘােরর মাঝখানে
বৃহৎ প্রাণের চাই রে রসদ চাই,
নূতন তারে সাজিয়ে সেতার চল্ সে গুণীর সন্ধানে,
নবীন প্রাণের গান আছে যার ঠাঁই।
প্রাচীন শাখী তরুণ হ’ল কিসলয়ের হাস্যে রে,
বিশ্বে চলে রসের রসায়ন,
নূতন তালে রক্ত চলে হিয়ায়, হাওয়ায়, লাস্যে রে,
নবীন আলােয় বিভােল, দু’নয়ন!
চিরদিনের ঘূর-পাকে এই যে নূতন মনগড়া
এর সাথে আজ মিলিয়ে নে রে হাত,
অশােক-ফুলের স্তবকে, দ্যাখ, রাঙা-চেলীর গাঁটছড়া
জর্দা-চেলীর উত্তরীয়ের সাথ!
বাঘছালে যার নাগের বাঁধন তার দু'নয়ন টুলুছে রে
ভুলছে সে আজ বিষাণ-বাদন তার,
আরম্ভেরি বােল, কেবলি ডমরু তার তুলছে রে,
অম্বরে ভায় স্বয়ম্ভ-ওস্কার!
ভৗম-জননী
[ভীম-জননী কুন্তী যখন পঞ্চপুত্র সহ একচক্রাপুরে অজ্ঞাতবাস করিতে-
ছিলেন, সেই সময়ে একচক্রার রাজচক্রবর্তী বক-রাক্ষসের নিয়মে প্রজাদের
ভিতর হইতে প্রতিদিন এক এক জনকে রাজার আহাৰ্য্য হইতে হইত।
০
৫৮
বেলা শেষের গান,
কুন্তী যে গৃহে ছিলেন একদিন সেই গৃহের সকলকে কাঁদিতে দেখি, কার
জিজ্ঞাসা করায় জানিতে পারেন যে, সেদিন ঐ পরিবারের মধ্যে কোনো
একজনের রাক্ষসের মুখে যাইবার পালা। কুন্তী আশ্রয়দাতা-গৃহস্বামীকে
অনেক বুঝাইয়া নিজ পুত্র ভীমকে বকের কাছে পাঠান।]
গায়ের রােয় যায় না ছাখা, সন্ধ্যা হ’ল রাত্রি আসে
কুয়াসা কি জমাট দ্যাখাে, একটি তারাও নেই আকাশে !
পাখীর ডাকা ঘুমিয়ে গেল, ঝিঝির ডাকা ঝিমিয়ে জাগে ;
ডাপালাতে অন্ধকারের অন্ধ হাওয়ার উছট লাগে।
শব্দ কি ও? ভীম কি এল ?...কেউ না, বুঝি নেড়ে তবে
সাঁঝ না হতেই গাঁয়ের পথে শুকনাে পাতায় ফিচে, হবে।
ব্রাহ্মণদের বাস্তু এ গ্রাম, বাণের শঙ্কা নাইক মােটে,
তাই শিকারের অন্বেষণে জনপদেও আপ জোটে।
নাই সাহস একচক্রাপুরে, ধরূতে ধনুক কেউ না জানে,
নইলে কি বক-রাক্ষসে রাজচক্রবর্তী মাষে মানে ?
পালা করে গায়ের লােকে রাক্ষসে দ্যায় মানুষ খেতে,
শকট ভরে অন্ন জোগায় প্রত্যুষে হায়, প্রত্যেকেতে।
পালা এল এই ঘরে আজ কান্নায়রালের মধ্যিখানে-
ঠাই দিলে যে নিরাশ্রয়ে রাক্ষসে আজ তাদের টানে।
মাথা গুজে যাদের ভিটায় নির্বাসনের দেশ ভুলেছি,
তাদের মুখে কি শুনি আজ ?''চকে গেছি, চমকে গেছি ।
রাজায় প্ৰজায় খাদ্য-খাদক! কেমর আজ! কেমন প্রজা।
এ অনাচার সয়না প্রাণে স্পষ্ট বলে দিলাম স্লোজা।
কাঁচা মাথা খাজনা নেবে? এই কি, ছি ছি, রাজার রীতি,
নইলে পরে শাস্তি দেবে জ্বালিয়ে ভিটা জাগিয়ে জীতি।
ভীম-জননী
চমকে গেলাম ব্যাপার শুনে, অনাৰ্য্য এ, অনাৰ্য্য এ ;
অব্ৰহ্মণ্য ব্ৰহ্মাবৰ্ত্তে ! ব্রাহ্মণেরে বুঝিয়ে কয়ে—
উপরােধে পথ রুধি তার, - অনুরােধের আঁচল গলে,
বন্ধ করে দিলাম যাওয়া ; পাঠিয়ে দিলাম তার বদলে
ভয় বিজয়ী ভীমকে আমার আশীর্বাদের কবচ দিয়ে,
ধনুর্বাণে সাজিয়ে নিজে, বীর যে এ মাের পীযুষ পিয়ে।
বনবাসের দুর্গ যে মাের, মত্ত হাতীর বল যে ধরে,
বৃকের প্রতিমল্ল যে রীর, পাঠিয়েছি সেই বৃকোদরে।
জয়ী হবে পুত্র আমার মুখ তুলে চান্ দো যদি,
হবে সে একচক্রাপুরের চক্রবর্তী দৈত্য বধি।
ঠাকুর! ঠাকুর! ..চাচায় পাচা!..বুকের ভিতর মুচড়ে ওঠে,
গায় কাটা দ্যায়...ভীমকে আজি পাঠিয়েছি রাক্ষসের কোটে।
বালাই!...বালাই!...কি ছাই ভাবি...ডেকেছে কর্তব্য তাকে,
নিত্য ভয়ে দ্যায় যে অভয় বিপদে তায় দেতা রাখে।
তাজা বুকের রক্ত যে চায় খাজনারূপে প্রজার কাছে,
কাঁচা মাথার মজ্জা যে খায়, নিত্য নরমাংস যাচে,
তার দাবীতে সই দিয়ে লােক বেঁচে মরে রয় কি করে,
কেমন করে বাঁচে মানুষ কাটার শেষে সাপ-শিয়রে !
শুনেছি র রক্ষা করে এ-গ্রাম পর-চক্ৰ হ’তে
গলাতে কেউ নারে মাথা হেথায় নাকি কোনই মতে ;
পারে না কেউ দাঁত বসাতে এমনি নাকি জলুস্ দাঁতে,
• প্রজার মাথা খরচ শুনি ধাতের জলুস বৃক্ষাখাতে !
শাসন কড়া, শান্তি চরম, যেমন শান্তি যমের ঘরে,
রাক্ষসের এই রাখালীতে জীয়ন্তে লােক রয় রে মরে।
০
বেলা শেষের গান
৫
পরের চক্র ব্যর্থ করার বেতন বড় নিচ্ছে বেশী,
তপস্বীদের খাচ্ছে মাংস পশুর মতই এ রাজবেশী।
পালা করে প্রাণ দিতে যায় অজগরের-দৃষ্টি-জরা,
বরাদ্দ বােজ একটি মানুষ!-রাক্ষসের কি রক্ষা করা।
বাধা-বিধান নিত্য-সেবার—আজ ছেলে যায় কাকে পিতা,
নইলে ঘটায় অনর্থ হায়, ঘরে ঘরে শােকের চিত।
নাই মানুষ একচক্রাপুরে, এমন নির্দেশ নইলে মানে ?
খাজনা নেবে ছেলের মাথা, মানুষ হয়ে সইবে প্রাণে !
ভীম গিয়েছে•••তার কাছে আজ••আপনি দিতে গ্রামের দেয় ;
আমার ছেলে,"বীর সে•••ছুতে পাবে না কেশাগ্র কেহ।
মূৰ্ত পাতক মানুষ-খাদক নষ্ট হবেই; দেবতা আছে ।
ধৰ্ম্ম-ক্রোধের দীপ্ত-পাবক পারবেনাকো ভীমের কাছে।
জয়ী হয়ে ফিবে ছেলে, দিব্য চোখে দেখছি আমি,
শুছি কানে জয়ধ্বনি, পুষ্পবৃষ্টি আসছে নামি।
সংশয়ে মন জায়না আমল, দ্যায়নাকো ঠাই আশঙ্কারে,
ব্যথাই পেলাম, পেলাম না ভয় যুধিষ্ঠিরের তিরস্কারে।
যতই আমায় দুষছে লােকে, বলছে যতই দুঃসাহসী,
টছে না মন আজ সে যেমন অত্যাচারের মৃত্যু অসি!
আজ সে যেন বিধির বজ্র, স্বয়ং যােগা বঁল বিধাতা,
আজ দেখেছি ছেলের দেহে অভয়ব্রতী অভয়-দাগ !
তাই পেরেছি পাঠিয়ে দিতে মুক্তিমন্ত মৃত্যু-মুখে,
অন্যায়ে যার প্রতিষ্ঠা তার কতে পরখ দুর্গে ঢুকে।
পাঠিয়েছি আজ কিশাের পুত্রে জুরের ঘরে কৃপাণ পাণি,
প্রাত্যহিকী হত্যালীলা দেখতে নারি ক্ষত্রিয়াণী ।
। ভীম-জননী
;
সৰ্ত্তে বেঁধে শুষবে রক্ত!...রাজস্বে প্ৰাণ করবে দাবী।
আতঙ্কে লােক সঙ্কুচিত নরললকে নরক ভাবি।
অনাৰ্য্য এ রাক্ষসী রীত...এর সাথে নয় কোনােই রফা,
অজগরের গরাস হয়ে পাংশু-মুখে ইষ্ট জপা !
হােক না সে একচক্রাপুরে দৈত্য একছত্র প্রভু,
পরের চক্রে বাঁচায় বলেই কুক্রিয়া নয় মান্য কভু।
মানুষ যে খায় মা না তায়-অন্যায়ে সে কায়েম করে,
নিত্য পাপে সিক্ত সে নীচ,-বিধির বজ্র তার উপরে ;
সে বর্জ আজ পুত্র আমার-ক্ষুদ্র মানুষ মাত্র সে নয়,
রাক্ষসেদের সেই প্রতিবােধ, আজ বিধাতার নিশান সে বয়।
নিশ্বাসে তার ছিন্ন হবে অন্যায়েরি কুঙ্কটিকা,
নৃশংস বক-রাক্ষসেরি লুপ্ত হবে রাজার টীকা ;
ভয়ের গুমােট কাটবে, আবার প্রসাদ-বাতাস বইবে ফিরে,
এ বিশ্বাসেই পাঠিয়েছি তায়, সাজিয়ে তারে ধনুক-তীরে।
দেবতা যদি মুখ তুলে চা, ফিবে সে মাের সগৌরবে,
রুদ্র যদি রােদন পাঠান—সইতে হবে, সইতে হবে।
হৃদয় বারে বলছে শ্রেয় তাই বরেছি সরল মনে, •
অসময়ে ঠাই যে দেছে করেছি রােধ তার মরণে।
সাপের মুখে পাঠিয়ে ছেলে দিয়েছি আজ অভয় চিতে,
নগর-জোড়া অভিশাপের আওতারি ঘাের ঘুচিয়ে দিতে।
জয়-পরাজয় হাত কারো নয়, যুঝতে হবে শ্রেয়ের লাগি ;
অজগরের দাড়িয়ে ঘরে লড়াই, বিধির আশিস্ মাগি।
আশীবিষের বিষদাতে হাত বীর যে হবে...সেই লাগাবে,
ওপড়াতে দাত পাক, হারু, ম’লেও জগৎ কীর্তি গাবে।
৬২
বেলা শেষের গান
এই তাে জানি ক্ষ-রীতি, ক্ষত্রিয়াণীর এই সে বাণী,
জয় না হলেও মান্ব না ভয়, আসুক বিপদ, আসুক হানি
চরকার আরতি
এস এস চির-চারু চির-চেনা চরকা।
এস ঘরে শ্রীর পাদপদ্মের ভােরা!
অপলক চক্ষের জ্বেলে কোটি দেউটি
তােমার আরতি করি ত্রিশ কোটি আমরা।
শিবের ললাটে চাদ, সে চাদের বক্ষে
অঙ্কিত তােমারি সে স্বস্তিক-মূর্তি,
ঘরে ঘরে জ্বেলে দাও হরষের জ্যোৎস্না,
ঢেলে দাও দেহে প্রাণে কর্মের স্মৃত্তি।
খুল্লনা-হেন দীনা শ্রীহীনা এ বঙ্গ,
তুমি এলে ফিরিবে শ্ৰী, ফিরিবে শ্ৰীমন্ত,
বাংলার ফিরে এস পুরাতন বন্ধু,
অশরণা দুখিনীর কর দুখ অন্ত।
এস বাস্তুর প্রিয় ! গৃহমেধী শিল্পে
জীয়াইয়া গৃহে গৃহে পাল হে গৃহস্থে,
বস্তির দস্তুর হয়ে যাক লুপ্ত,
দুর্ভিক্ষের রাহু যা চির-অন্তে।
যে দেশে বানাত টুপি নিজ হাতে বাদশা
পদতলে ছিল যার দিল্লীর তক্ত,
চরকার-আরতি
চরকার চর্চায় সেথা কার লজ্জা ?
হিন্দু ও মােলেম চরকার ভক্ত।
তােনারে করিয়া হেলা, শুনি চীন-পুরাণে,
বঞ্চিত পতি-প্রেমে সূর্যের কুমারী ;
হ’ল স্বামী-সােহাগিনী সেবি’ পুন তােমা’ সে,
পূজার প্রচার চীনে তদবধি তােমারি।
ময়দানবের দেশে ইন্কার পেরুতে
গৃহে গৃহে পূজা পেতে তুমি,গৃহ-দেবতা,
পতিপ্রাণ পেনেলােপে ঘেরে পর-পুরুষে,
বাঁচায়েছ তুমি তারে, কে না জানে সে কথা।
তােমারে নিধান করে তিন বােন নিয়তি
রচে নিতি দুনিয়ার ভাগ্যের সূত্র,
অধনের ধন তুমি চির-যুগে ধন্য,
অনাথার স্বামী তুমি অবীরার পুত্র।
সতী সে মগের রাণী সতিনীর কুৎসায়
হ’ল যবে বনবাসী, তুমি দিলে অন্ন ;
সখী তুমি ব্রিটেনের রাণী আনি বুলেনের
কাড়াকাড়ি যার বােনা ‘মিটেনের জন্য।
কবি কবীরের মিতা সঙ্গীতে সঙ্গী
তােমারে বরণ করি কবীরের সঙ্গে,
কিং লীয়রের কবি হাটে-ভ্রষ্টা
করেছে তােমার সেবা কৈশাের রঙ্গে।
বেলা শেষের গান'
বুলবুল-কুল শােনাে উল্লাস অন্তর
বলিছে কি বসূরাই গােলাপের ফুলে নীল,
“ইরাণের কবিবর জুলাহা-ই-অবহ
চরকার চর্চায় মশগুল হদিন”
শুভসূচী! এস শুচি-জীবনের বন্ধু ।
কৰ্মীর হে সুহৃৎ! অকেজোর শুদ্ধি ।
কৃষাণীর কি রাণীর যতনের রত্ন।
দানাে ফিরে জনে জনে মৰ্য্যাদা-বুদ্ধি।
ভুখা যে তােমার বরে লভুক্ সে আরবার
আত্মবশের স্বাদ আপনাতে নির্ভর ;
যন্ত্রের যন্ত্রণা দূর হােক দুনিয়ার,
কলে-গড়া কম্ফর্ট!—খেসারৎ বিস্তর।
নগরের নােংরায় ডুবে যায় সন্ত্রম,
ম্লান করে মানুষেরে চিনীর নিঃশ্বাস,
অকুলীন কুলি’ নাম—পঙ্কের অঙ্ক
মুছে দাও, দাও তুমি বিশ্বেরে আশ্বাস।
ভস্মলােচন নব ভব্যতা রুক্ষ
কল করে গিলে খায় জোয়ানের জোয়ানী,
চুয়ে যায় ক্ষেত-ভূই চিন্নীর ধোঁয়াতে,
গঙ্গা সে সেপটিক ট্যাঙ্কের বােয়ানী!
ভূত বাদুড়ের মত বুক চাপে বিশ্বের
বাষ্পীয় সভ্যতা ইস্পাতদন্ত,
চরকার আরতি কারুখানা মানুষের হাড়খানা বাদে আর সব খায়, আয়ু বল সব করে অন্ত। ঘর্ঘর কলঘর থ-থ ইমারৎ, বুক-দুৰ্বল-করা অহরহ কম্প, দানবের দাঁতগুলাে ঝলসিয়ে দৃষ্টি। নরমাংসের লােভে দ্যায় যেন লক্ষ্য। বাঘের গলার হাড় বার করে চড়য়ে! দানবের পেটে ঢুকে মানবের করে কি যাবে যে হজম হয়ে নিগমের আগেতেই। হুস্ নাই! হাশফাশ ! ওঠে কি সে পড়ে কি ? সারি সারি খাটে কুলি স্ত্রী-পুরুষ একসা, রাশ রাশ ওড়ে ফেশশা, পেটে গেলে যক্ষ্মা ; ঘড়ঘােড়ে কল-ঘরে কার শিশু সুপ্ত ? ধূলো-ভূলাে রােধে শ্বাস, কেবা করে রক্ষা? বাস্তুতে ঘুঘু চরে, তার ঠায়ে বস্তি। উবে গেল উড়ে গেল মমতার প্রিয় নীড় ; কুলিনী কোলের শিশু ফেলে স্বামী রুগণ ভেগে যায় ‘মেট সাথে, অনাচার করে ভিড়। পদে পদে বাড়ে শুধু হৃদয়ের ঘন- ময়দানে কঁাদে কচি গােপনের পয়দা, সহরের বিষ ঢােকে পল্লীর ঘর ঘর লালসার লােল শিখা বাড়ে রে বে-ফয়দা।
বেলা শেষের গান
ধ্বসা পশ্চিমা লেগে পচে যায় দুনিয়া,
ছেয়েছে কুকুর-লােভ কামনার ছোঁয়াচে,
শয়তান লেলিয়েছে বােতলের বেতালে,-
দহিছে আগুন-পানি, কে বাঁচাবে ওআঁচে?
বিজ্ঞান-বিজ্ঞের বিজ্ঞতা-ঝটকায়
উড়ে গেল ‘ওপ পাট’! উপে গেল সদ্য ।
হাজারাে নিরীহ প্রাণ অকারণ বলিদান
দেমাকে করাতে পান ডাকিনীর মদ্য !
জগৎ ফুকারি’ বলে, ক্ষমা দে রে আর না,
নাচানে ভূত আর অভিচার-মন্ত্রে,
সাধনার শব জেগে সাধকের মুণ্ড
ঘন ঘন করে দাবী ভৈরব-মন্ত্রে !
ব্যথিত দুনিয়া কাদে ; এস তুমি চকা!
কলবলে কাজ নাই, প্রাণ চায় শান্তি !
এসাে ফিরে দুনিয়ায়, ধ্রুব হও বাংলায়
শিল্পীর ইজ্জৎ! শিল্পের নান্দী!
হিংসা-বিরাগী জনে দিলে তুমি সুৰসন,
ব্রাহ্মণে হে পুরােধা ! দিলে তুমি পৈতা
বাখানিতে তব গুণ ব্রহ্মা চতুর্মুখ,
বল দেখি লেন্ মতে এক মুখে কই ?
মিছিল সাজায়ে করি মােরা তব উৎসব,
রসবিতা তুমি ক্রো-দাতা বলে,
। চরকার আরতি
আবরুয়া, শবনম্, জামদানী, মলিন,
স্বপ্নের কিচ্ছবি নিয়ে এস সঙ্গে।
ঘরে ঘরে আরবার ঠাই নাও আপনার,
চারুতায় ছাই দাও মিল্ মেড, শিল্পে,
কারু-ছত্রের ছাত! বিশাইএর হাতিয়ার।
গেঁথে তােলে গ্রামে গ্রামে ঋদ্ধির পিক্সে।
“যা কিছু নিজের বশে সেই সুখ-স্বর্গ”
প্রতি গৃহ-কোণে রহি দাও এই মন্তর,
চির-দুর্ভিক্ষের কর তুমি উচ্ছেদ,
মৰ্য্যাদা-বােধে ভর গরীবের অন্তর।
শিশিরে যেমন করে পালক গজিয়ে তােলে
প্রকৃতির ইঙ্গিতে পাখীদের অঙ্গ,
কল্যাণে চরকার আপনার দকার
পূরণ করুক আজ সেইমত বঙ্গ।
.
পর-প্রত্যাশা ছার দুর হােক সবাকার
নিঃস্বে স্বয়ম্প্রভু হােক উদ্বুদ্ধ।
পতিতা ত্যজিয়া পাক সৎপথে ভাত পা,
অবিরােধে মরণের দ্বার হােক রুদ্ধ।
t বেলা শেষের গান বাঙালী পল্টনের গান এক হ’ল আজ অষ্ট বজ্র, যুদ্ধ ভয়ঙ্কর ! শাহারীর ডঙ্কা বাজে বক্ষে নিরন্তর। মর্দ যারা মরুতে জানেনেই কিছু কেয়ার, হাত আছে যার সেই ছুটেছে ধরূতে হাতিয়ার। সাচ্চা পুরুষ-বাচ্চা যারা নাচছে তাদের মন, মরুক বাঁচুক কবে লড়াই—এই সে আকিঞ্চন। এমন দিনে ঘরের কোণে কে পারে থাকতে? মন আমাদের যুদ্ধে গেছে কেহই না ডাকতে। শরীর শুধুই পিছিয়ে মােদের, এগিয়ে গেছে মন- মানস-লােকে মার্চ, করে যায় বাঙালী-পল্টন! মন আমাদের খাকী পরে সেজেছে সােজার, এমন সময় হুকুম এলাে-পরােয়ানা রাজার! পরােয়ানা এ প্রাণ-মাতানাে-এমন দেখি নাই, মন এতদিন যা চেয়েছে আজ পেয়েছি তাই। জোয়ান্ ! তােমার জোয়ানী আজ দেখবে জগতে, ঘরের পরের বাড়বে আস্থা তােমার তাগতে ; অন্ত্র ধর! প্রাণের আদেশ কবে কে পালন ? বেরিয়ে পড়! বেরিয়ে পড়! বাঙালী পল্টন। অস্ত্র-দীক্ষা সমর শিক্ষা নতুন তােমার নয়, চার যুগই যে দিচ্ছে তােমার শৌর্য-পরিচয় বাঙালী পল্টনের গান . দিগবিজয়ী রঘুর সঙ্গে তােমরা যুঝেছ, কীর্তি রঘুর গঙ্গা স্রোতে হেলায় মুছেছ । আঠারাে দিন বিষম লড়াই কলে অহর্নিশ ধৰ্ম্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে বঙ্গ-প্ৰাগজ্যোতিষ । শৌর্যে তােমার গৌড়েতে রাজলক্ষ্মী আকৃষ্টা, তােমার বাহু কলে কপিল-বাস্তু প্রতিষ্ঠা, তােমার সৃষ্টি সাতগাঁ এবং শ্রীপৌণ্ড্রবর্ধন, কান্সােনা সে তৈরী তােমার বাঙালী পলটন। শক-হুণে আতঙ্ক মােদের কিসের ? তা' ভাই বল- রাক্ষসেদের লঙ্কা কেড়ে বানিয়েছি সিংহল। গঙ্গার আ’লে বস করি আমরা বাঙালী, যার নামে গ্রীক, সৈন্য হঠাৎ সাহস কাঙালী। কাশ্মীরেতে দুঃসাহসী নিশান উড়ালে, রাজার ইষ্টদেবের মূৰ্ত্তি ক্রোধে গুড়ালে, কেশাগ্র কেউ না ছুঁতে-চক্ষে হুতাশন, মেঘের মতন আওয়াজ গলার বাঙালী পলটন। গ রাজ্য-হারা জয়াপীড়ের তােমরা হে সহায়, আর্যাবর্ত জয় করে থােও পাল-রাজাদের পায়, হাতীর হলকা ছুটলাে তােমার দক্ষিণাপথে, মগ-মােগলে রুখলে তুমি নৌকাতে রথে । নিমকহারাম হায় গাে যে-দিন মুলুক থােয়ালে, বৃদ্ধ রাজার সঙ্গে ক্ষোভে মাথা নােয়ালে ;
বেলা শেষের গান
দুদিন পরেই বাংলা ছেড়ে নিশান অগণন
উড়ল তােমার কাংড়া-গড়ে! বাঙালী পল্টন।
!
সিংহবাহুর তােমরা বাহু দৃপ্ত সুবিশাল,
চঁাদ-প্রতাপের কেদার রায়ের তােমরা খাড়া ঢাল ।
শশাঙ্ক আর গণেশ রাজার সাঁজোয়া বজ্রসার,
তােমরা বিজয়সিংহ দেবের পাথর যে কেল্লার।
ফ্রান্সে তােরা অস্ত্র ধরিস্ ভীষণ বিপ্লবে,
ব্রেজিলেতে সৈন্য চাণী অমর গৌরবে ;
নামজাদা লাল পল্টনে, ভাই, তােরাই ছিলি, শােন,
এম্পায়ারের ভিৎ গেড়েছে বাঙালী পল্টন।
আজকে আবার ডাক এসেছে-যুদ্ধে যাবার ডাক,
লাভ ক্ষতি কে খতিয়ে দ্যাখে ? হিসাব এখন থাক।
বেরিয়ে পলাম স্পন্দনেতে বৃহৎ জীবনের
কুচকাওয়াজের ছন্দে মেতে আনন্দে মনের!
অনেক লােকের সঙ্গে যাব, যাব অনেক দূর,
পব খাকী, ধব কিরীচ, এই সুখে ভরপুর।
বুকের বলে কব মােরা অসাধ্য-সাধন
কাম দ্যাখালেই কম্যাৎ, পাবে বাঙালী পল্টন।
পরােয়ানা ভাই পেইছি যখন, কুছ পরােয়া নেই,
কঁাধে সঙী উড়িয়ে নিশান চলব এগিয়েই ;
ঘুম-গুফায় কি পাই, না পাই, আমরা তা ভাই মােটেই ধরিনে, মার্চ, ক'রে যাই গােলার মুখে খেয়াল করিনে। কিছুই চাওয়ার ধার ধারিনে আজ মােরা বিলকুল, বীরের বরণ লাভ করে মন ফুর্তিতে মশগুল্। যশের পথে জয়ের পথে চলছে ছুটে মন, উড়িয়ে নিশান গান গেয়ে চল বাঙালী পলটন। এ সেথা সেথা সেথা সে যে সেথা যেন সেথা যত, ঘুম-গুম্ফায় তন্দ্রার বীণকার মঙ্গল গায় ! মেঘমল্লীর বন অঙ্গন ছায়! অৰ্ব্বদ পৰ্বত অদ্ভুত ঠাম ! দুর্গম দুশ্চর যক্ষের ধাম। ঘুম-ডাইনীর হাই দেখ ঝাপসায়, গুগগুল-মশগুল, ঢেউ আশায়, দিয়ে গায় কুয়াসার ভােট-কম্বল উদাসী বাতাসের ঘোঁট মণ্ডল। লামাদের কপালের ভমরুর সাথ কঙ্কাল-বংশীর তান দিন রাত ! চলে জপ অবিরল জপ-যন্ত্রে ! ঘরে থাম ‘মণি-পাম্ হুম’ মন্ত্রে ! দিনরাত বিশ-সাত দীপ উজ্জল, তিন রত্নের নীড়,-হেম-উৎপল । পূজা পায় ত্রিপিটক পুষ্পে ঢাকা, অবতার দেবতার মূৰ্ত্তি আঁকা। ওঠে সেথা সেথা সেথা সে যে সেথা १२ বেলা শেষের গান সেথা , যেন বুদ্ধের বিগ্রহ গভীর ভায়, শান্তির আগ্রহ আশ্রয় পায়, আত্মার মুক্তির নির্বাক, গান, বিশ্বের ঝঙ্কার শেষ,-নির্বাণ! যেন সেকি নিতে সেকি সেকি দৃষ্টির চন্দন-বৃষ্টি, মরি, সৃষ্টির সম্ভাপরিষ্টি হরি, কাঞ্চন-চম্পক-লাঞ্ছন রূপ, সৌরভ-তন্ময় পুণ্যের ধূপ ! ঝিল্লীর উল্লাস-হিল্লোল-বায় নিত্যের নিঃশ্বাস চিত্তের গায়। সূর্যের চোখ সদা ধ্যান-মগ্ন, শান্তির কান্তিতে মন লগ্ন ! সেথা লাগে সেথা মহা- সেথা মহাপুরুষের ছায় মহামহীয়ান্ তৃষাতুর অমৃতের পায় সন্ধান, বিশ্বের বীণকার যুগ যুগ ধায় কুঙ্কুম-রুমঝুম ঘুম-গুম্ফায় । সেথা সেই বুদ্ধ-পূর্ণিমা মৈত্র-করুণার মন্ত্র দিতে দান জাগ হে মহীয়ান্ ! মরতে মহিমায় ; সৃজিছে অভিচার নিঠুর অবিচার নােদন-হাহাকার গগন-মহী ছয়।
বুদ্ধ পূর্ণিমা
নিরীহ মরালের শােণিতে অহরহ
ভাসিছে সংসার, হৃদয় মােহ পায়,
হে বােধিসত্ত্ব হে। মাগিছে মৰ্ত্ত যে
ও পদ-পঙ্কজ শরণ পুনরায় ।
মনন-ময় তব শরীর চির নব
বিরাজে বাণীরূপে অমর দ্যুতিমান্ ;
তবুও দেহ ধরি এস হে অবতরি’
হিংসা-নাগিনীরে কর হে হতমান।
জগত ব্যথা-ভরে জাগিছে জোড় করে
এ মহা-কোজাগরে কে দিবে বরদান,
এস হে এস শ্রেয়। এস হে মৈত্রেয়।
কুরতা-মূঢ়তার কর হে অবসান ।
হে রাজ-সন্ন্যাসী! বিমল তব হাসি
ঘুচা গ্লানি তাপ কলুষ সমুদায় ;
কোধেরে অক্রোধে জিনিতে দাও বল,
চিত যে বিচলিত,চরণে রাখ তায় ;
নিখিলে নিরবধি বিতর ‘সম্বােধি’
মরমী হাে লােক তােমারি করুণায় ;
ভুবন-সায়রের হে মহা-শতদল!”
জাগ হে ভারতের মৃণালে গরিমায় ।
চাদের করে গড়া করভ কুমার,
ভুবন-মরুভূমে মুরভি চারুতার ;
৭৪ বেলা শেষের গান বিরাজো চারুহাতে অমিত জোছনাতে জুড়াতে জগতের পিয়াসা অমিয়ার! তােমারি অনুরাগে অযুত তারা জাগে, তৃষিত আঁখি মাগে দরশ আর-বার, ভারত-ভারতীর সারথি চির, ধীর, তােমারি পায়ে ধায় আকুতি বসুধার । মুনির শিরােমণি ! হৃদয়-ধনে ধনী চিন্তা-মণি-মালা তােমারে ঘিরি ভায়, বসিয়া ধ্যান-লােকে নিখিল-ভরা শশাকে আজো কি শতধারা কমল-আঁখি ছায় ? মমতাময় ছবি। তােমারে কোলে লভি ভূষিত হ’ল ধরা স্বরগ-সুষমায়, করুণা-সিন্ধু হে! ভুবন-ইন্দু হে! ভিখারী জগজয়ী। প্রণতি তব পায় । কাঠগড়া জীবন-সিন্ধু-জলের ঢেউয়ে ধাক্কা খেয়ে হয় যারা চুমার, ঝড়-তুফানের খেলনা-হেন জুড়ে মাথা পড়ে হাজার বার, কালের জোয়ার হুড়িয়ে তাদের এই ঠিকানায় হাজির করে বােজ- ব্যথার ভয়ের রােষের মূৰ্ত্তি ! হেথায় এলে সবার মেলে খোঁজ, এখান দিয়ে যায় চলে সব রসাতলের তলায় একেবারে, ক্লিন্ন দেহ দীর্ণ-আত্মা তলিয়ে হঠাৎ-মিলায় অন্ধকারে বেতালের প্রশ্ন মিলায় তাদের অপরাধের অবসাদের স্মৃতি নিরাস্বাদ- হােটেল-খানার বদহজম আর শুড়িখানার আবর্জনার গাদ। সকল কসুর মেনে নিয়ে ও জুড়িয়ে ক্রমে আসে মনের রাগ, থাকে শুধু শােণিত-চিহ্ন থাকে শুধু চোখের জলের দাগ। এখানে কার ঠাই হ’ল আজ? ঘৃণার চোখে ওরে দেখিনে রে, চলতে না হয় পারেইনি ও,-আইনকারে বেবাক আঁখি ঠেরে বন্ধু! সবুর। কাঠগড়াটার ঝাড়ছ কেন ধূলো মনের ভুলে ? কাঠগড়াতে যারা দাঁড়ায় অশুচি তাে নয়কো তারা মূলে,- অন্তত নয় তেমন,—যেমন গলাকাটা মহাজনের দল, কিম্বা যেমন জমীদারের জুলুম জবর আলা নায়েব খল। কাঠগড়া তাে অশুচি নয়, অশুচি ও নয়কো কোনমতে, ওখানে তাে জজ বসে না,-ফসীর হুকুম হয় না ওখান হতে। বেতালের প্রশ্ন ( অর্চনায় “ঘরে বাহিরে কবিতা পাঠে) পরিচয় দিয়ে যাও গাে চলিয়ে, হিদুয়ানী-অবতার আমার ! সন্দীপ কৃত সীতার গ্লানিতে . বােম বিদরে বার জামার ? “ঘরে-বাইরেটা ঘরের বাহির করিতে তাে তুড়ে ফয়ত দাও, হিন্দুয়ানীর পুচুকে দুয়ানী । এদিকে বারেক চোখ, তাকাও ০
বেলা শেষের গান
“জানকী মালিনী মাসী” বলে হেথা
হল্লা করে কে হাঁক ডাকে,
আমি বলি বুঝি নিমে দত্তটা,
তুমি বল দেখি, লােকটা কে?
সীতারে খেটাউনী বানায়ে কে
নাচালে বানর-বৈঠকে,
আমি বলি ওটা গেজেল জামাই,
যে হােক, চাবুক দাও ওকে।
ব’কে ধমকিয়ে থ’ বানিয়ে দাও,
ক’সে ওকে তুমি দাও গালি,
রেয়ৎ কোরাে না,—হিদুর শক্ত,
কই!—কোথা গেল ? চুণকালি ?
সা-মামী
কলম হাতে ভাবুছি কেবল লিখতে বসে সঠিক সান্তামামী
এই দুনিয়ার অশ্রুকণার নিখুৎ হিসাব কোথায় পাব আমি।
নিঃস্ব যারা সকল-হারা সিশস তাদের কুড়িয়ে কি কেউ রাখে,
নিঃসহায়ের প্রাণের হাহা সংখ্যা তাহার সুধাই বল কাকে ?
দুর্বলেদের দাবীর প্রদীপগুলি
প্রবল হাওয়ায় যায় যে নিবে গােণার আগেই ধোঁয়ার ধ্বজা তুলি।
'
সা-তামামী
খতিয়ে এদের কেউ রাখেনা, মিছে খোঁজা বােড়?-বহির পিঠে
আছে খ’তে ডঙ্কা-ববে, অভ্রভেদী মুণ্ড-পিরামিডে !
পল্টনেরি আনা-গােনায় গেল যে-প্রাণ হয়নি তাদের গণ,
প্রসাদ-লােভর পথে শুধু প্রশংসা পায় পরম দপনা।
আসল ফসল যায় মিশে জঞ্জালে,
অহঙ্কারের বিপুল অঙ্ক লেখা থাকে অজস্র কঙ্কালে।
%
লােক্সানে লােক ডুবছেযতই খাতা ততই অঙ্কে ওঠে ভরে,
বেসাত্ করে ফ্যাসাদ করে মরূছে মানুষ অঙ্ক বুকে করে।
আলােয় পড়ে আছে ভাঁটা, মসী-ঘটায় আকাশ পাংশু-ছবি,
ক্লান্ত দেহের ডেকো-টাতে লােভের প্রদীপ উঙ্কে নিয়ে, লােভী।
জমা-খরচ দেখুবি রে আর কত ?
তামান্সালের সাল-তামামী হয়নি রে তাের মােটেই মনের মত।
বড় আশার ধন-ঘড়া তাের যায় তলিয়ে ঘাটের কাছে এসে,
স্বস্ত্যয়নের সাত পুরুতে চুলােচুলি ঘটছে অবশেষে !
মুষল-পৰ্ব লিখছে গণেশ বাঁহাত দিয়ে ব্যাসের অসাক্ষাতে
শেষ না হ’তে শান্তি-প,ইদুরে তার কাছে পাতে পাতে ।
চিল-শকুনে চলছে কানাকানি,
বিষিয়ে তােলে বিশ্ব-বাতাস সর্পজি সুসভ্য শয়তানী !
“সবাই হবে স্বয়ম্প্রভু”—এমনি ধারা গেছল শােনা বুলি,
“ছটো-বড় নির্বিশেষে ; না যেতে সন দেখি নয়ন তুলি
৭৮
বেলা শেষের গান
দল পেকেছে, প্রবল বেগে নিজের পাতে চলেছে ঝােল টানা,
রবার-ক্ষেতের বর্বরতা যে-ধন পাবে রুমের তাহে মানা!
সান্টঙে টং বেঁধে উচু করে
রইল জাপান, চীন হতমান, ভারত মিশর রইল চাপা গােরে।
বিস্মিত কে যুদ্ধকালে দুমনেদের দুষ্ট আচার দেখে ?
শান্তিকালে প্রজার ভালে বােম্ ছাড়ে সেই চিড়িয়া গাড়ী থেকে
রক্তে-কাদা খুনী-বাগে হুণ-হাসানাে হ’ল আইন জারী,
মাইনে-করা কাইজারেরা করে নিলে দিন-কত কাইজারী !
আদর্শ সে রইল বইয়ে আঁকা,
দুনিয়াদারী কাবারে হায়, চাই নেহাৎই দু’সেট খাতা রাখা।
মন ভেঙে যায়, মােহ ফুরায়, মুহুর্মুহু ধাক্কা যত লাগে,
রামধনুকের রঙীন স্বপন গুড়াে হয়ে যায় উড়ে কোন্ বাগে।
পায়ের তলে পৃথ্বী টলে, ভয় পেয়ে ধাই দেউল-আঙিনাতে,
ভেঙে পড়ে দেউল-চূড়া প্রার্থনাশীল লক্ষ লােকের মাথে !
লক্ষ জীবন ধূলার পরে ললাটে,
ভুয়গা হয়ে যায় দুনিয়া, হাহা করে হুতাশহাওয়া ওঠে!
পাঁজরাগুলাে ফোপরা ঠেকে, আগুন জ্বলে সারা মগজ জুড়ে,
ভাঙনে সব পড়ছে ভেঙে, আশার বাসা যাচ্ছে উড়ে পুড়ে,
বিশ্বাসে ঘুণ ধছে যেন, দিনের বেলা রাত আসে ঘনিয়ে,
“সভ্য-বর্বরতার তরে ‘বী’ আস কলসী দড়ি নিয়ে।
।
স্বপ্ন-সুন্দরী
৭৯
কালপেঁচা ওই বলছে বিকট ডেকে ;
কেঁপে কেঁপে উঠছে আকাশ, কলজে চেপে ধছে থেকে-থেকে!
ভুবন-ভরা হাহাকারে ওগাে প্রভু! ওগাে ভুবন-স্বামী!
শুকিয়ে ওঠে হৃদয় আমার, শুকিয়ে ওঠে চির-তােমার আমি ;
সকল আলো সঙ্কুচিত সূৰ্যে হেরি কলঙ্ক-নিশানা,
জাগাে তুমি সত্য সূৰ্য্য! জগৎ-ভরা সংশয়ে দাও হানা।
বিশ্বে জাগাে বিশ্ব-হিয়ার প্রীতে,
দাও হে অভয়, হােক পরিচয়, হােক পরিণয় মঙ্গলে শক্তিতে।
*
রুদ্ররূপে রােদন তুমি, সান্ত্বনা সে শান্ত-শিবের রূপে ,
জ্যোতিষ্ক হয় ফুৎকারে ছাই, পরম-জ্যোতি জাগাও ধূলির স্তুপে ;
মৃত্যু-তালের নৃত্যে হৃদয় পড়ছে ঢ’লে চলুতে তােমার সনে,
জাগাও প্রভু মুহ্যমানে, গতি-ক্রমের ক্রান্তি-সংক্রমণে ;
রোদন-মাঝে বাজুক বোধন-বাঁশী,
তারার আখর রাখুক লিখে হিসাব-হারা হিয়ার কান্না-হাসি।
স্বপ্ন-সুন্দরী
( গান ), •
সুম দিয়ে
ওকি
নিঝুম দিয়ে।
আওয়াজ হারা হাওয়ায় এল গাে
চা-চারুণের ভূম দিয়ে!
৫
বেলা শেষের গান
ওকি
ওকি
দুলদুলে ওই চোখের চাহনি
ভুলিয়ে নিল ঝিল্পিরই ধ্বনি।
জোনাক্-আলা তারার আলাে গাে
(সব) শীতলে দিল চুম দিয়ে ।
জ্যোৎস্নাটুকু ফুরিয়ে এল অস্ত-লগনে
ফুলের বাসে ঝামর আঁচল ঢুলিয়ে গগনে
মূচ্ছ। ওকি রূপ ধরেছে রে !
হরেছে মাের মন হরেছে রে!
ভরেছে যে হর্ষে আকাশ গাে
তারারি কুঙ্কুম দিয়ে।
কবির তিরােধান
( স্বভাব-কবি গােবিন্দদাসের দেহান্তে )
ফুল নীরবে যেমন ঝরে তেমনি করে মরে গেল কবি,
চলে গেল মানস-যাত্রী প্রজাপতির নীরব পাথার ভরে ;
‘হাওয়া শুধু ককূলে হাহা, আমনে হয় ; সেই সমাচার লভি’
দূরের বাঁশীর সুরের ধারা কেঁপে বারেক উঠল নিমেষ তরে।
এই দুনিয়ার একটি কোণে কাটার বনে জন্মেছিল সে যে,
ফুটেছিল সেই কেয়াফুল সাপের ডেরায় কঁাটার মালা গলে ;
পাতায় চাপা গন্ধটুকু পূবে হাওয়ায় বেরুল নীড় ত্যেজে,
পাথর-চাপা রইল কপাল, বাল করে রইল চোখের জলে।
ধন-জনের ধাত না ধার, চিত তারে অল্প কটি লােকে,
নয় দারােগা, নয় খেতাব্দী, খাতির দাবী কবে সে কোন্ মুখে।
৮)
ইচ্ছামুক্তি
মরমী কেউ বা ভালাে, কল্পনা তার দেখত প্রীতির চোখে,
গান গেয়ে সে গেছে চলে, রেশ রয়েছে সারা দেশের বুকে।
বা রাতির সাথী সে যে, শরৎ-প্রাতের আলােয় গেছে ঝরে,
মরেনি সে, জুড়িয়ে গেছে, বঞ্চনা-লাঞ্ছনার ঝঞ্চা সয়ে ;
সরস্বতীর পায়ের ছায়ে যে পদ্মটি ফুটছে ত্রিকাল ধ'রে,
কবি জানে, পরম সুখে সে আছে আজ তারি পরাগ হয়ে।
ইচ্ছামুক্তি
( ম্যাক ইনির মৃত্যু উপলক্ষে )
কে তাহারে বন্দী করে ? ফন্দী এটে বাঁধবে কে সিন্ধুকে ?
মুক্ত পুরুষ, মুক্তি তাহার হাতের মুঠায় মুক্তা হয়ে আছে।
‘মুক্ত হবই! একথা যে বলতে পারে জোর করে বুক ঠুকে
পাষাণ-কারা তাসের গৃহ, লােহার শিকল ব্যর্থ যে তার কাছে।
মরণকে যে তুচ্ছ মানে, ভীন্ন সমান যেজন প্রতিজ্ঞাতে,
ইচ্ছামৃত্যু, ইচ্ছামুক্তি-অপূর্ব সে আত্মরি গৌরবে;
চুয়াত্তরী লঘনে যার চিত্ত অটল নিত্য-যন্ত্রণাতে
বীর সে ঋষি, পূর্ণ দিশি তার মরণের নীরব মাভৈরবে।
অটুট কভু রয় না কারাে অনন্তকাল হুকুম মহকুমা,
আগলে ঘাঁটি আঁকড়ে মাটি মিছেমিছি মন্ত্রণা, হায়, আটা,
সুমতি যে সুনাম সে চায়, ভূমির আগ্নে আকাঙ্ক্ষা তার ভূমা,
চাণক্য তায় দ্যায় না আমল, অর্থশাস্ত্রে নেহাৎ সে নাম-কাটা।
মানুষ তারে করবে পূজা, ঠাট্টা তারে করবে অমানুষে,
জাতীয়তার খৃষ্ট সে, তার শরীর পতন স্বাধীনতার কুশে।
৮২
বেলা শেষের গান
শিরাজ-ই-হিন্দ,
ইরাণ দেশের শিরাজ এ নয়, হিন্দু, মুলুকের এই শিরাজ !
শর্কী-সৈয়দ-সুতাদের স্মরণ-সাধন জড়ােয়। তাজ !
অগজলির মীর-জাওলির গজ-গানের উৎস এই,
যে গান শুনে ঘুম্তী নদী ঘুরছে বিভােল, বিরাম নেই।
ফিছে বিবশ স্বপ্নাবেশে স্বর খুঁজে কার ফুলবনে,
বেল-চামেলির ক্ষেতগুলিতে কল্কা কেটে আমনে!
কবির মতন কৃষাণ হেথায় কেবল ফুলের চাষ করে !
ফুলের ফসল ক্ষেত-ভরা ! -লােক ভােস্ত্র হয়ে বাস করে।
নিখিল কবির রাজধানী এ, এই নগরী সুন্দরী,
কাজী সুরে গুজরী বাজে এর দুটি পায় গুঞ্জরি’!
হাজার-গুণীর চুনীর নুপুর টুকটুকে পায় রয় মিশে,
জৌপুরী তােড়ির হােড়া বাজায় হাজার মজলিশে !
কেউ দেছে নাম ‘যবনপুরী’, কেউ বা জমদগ্নিপুর,
কয় কবি ‘যৌবনপুরী’ এ, গুলাব-গজলুময় মধুর !
লাল শিরাজীর স্বপ্ন ঘেরা শিরাজ এ হিন্দুস্থানে,
রাজ-সদনে কুর্শী সােনার মিত কবির এইখানে।
গুণীর আসন কায়েম ছিল সুলতানের সামনেতে,
কাব্যে-সরস খিল জমি দিল, মিলত যাদের লাল ক্ষেতে।
দর্পে যারা দিল্লী দখল করূতে যেত দুই বেলা,
গুল-চামেলির চাষ তাদেরি, ‘পিউ কাহা’দের এই মেলা
বসিয়ে তারা বিদায় নেছে জুটিয়ে কোকিল বুলবুলে।
তাদের সৃজন হিন্দে শিরাজ দেউল ভাঙা এই ধুলে!
' শিরাজ,ই-হিন্দ,
৮৩
তাদের লীলা শিল্প শিলা ছড়িয়ে সে আজ শিথিল-বেশ
চেহেল, সাতুন, প্রাসাদ তাদের মিউটিনিতে স্বপ্ন শেষ ।
আজ সে ধূলায় কাকে যারে ঢক্কা তুরী জয় দিলে,
আজকে চাষা বাঁধছে বাসা লাল দরজার মঞ্জিলে।
দিল্লীপতির খাজনা যারা কত দখল মাঝপথে,
কোথায় তারা ? সংজ্ঞাহারা পথের ধূলায় রাজপথে।
–
ক
কোথায় ফিরােজ ? কোথায় জাফর ? কোথায় কুমার করফুল?
মামুদ শাহের রাজিয়া কোথা? কোথায় সে তার রূপ অতুল ?
কোথায় রাণী মাল্কা-জাহান ? কোথায় বা তার উচ্চাশা ?
লােদির গুড় হুশেন, কোথা ? কোন, ধূলিতে তার বাসা ?
কই সে খােজা, হাজার হাতী করলে যে বশ অঙ্কুশে,
দুনিয়াকে যে চকে দেছে নপুংসকের পৌরুষে ।
কোথায় ভিখন ভ্রাতৃঘাতী—কোথায় হিসাব চুকিয়েছে ?
কোথায় সে মা ছেলের তূণের তীর-ফলা যে লুকিয়েছে ?
গঞ্জ-শহীদের যােদ্ধারা কই? কই বা সে-সব হিন্দুবীর,
লাখকোটের যুদ্ধে যারা লুটিয়ে দিল লক্ষ শির।
কোথায় বা সে হিন্দু দেশে আরূবী চেরাগ জ্বলে যে,
কো-কেরলে নদীরজলে রক্তধারা ঢাললে যে?
মৌখরি আর কনোজিয়ার কলে কীর্তি লােপ যারা,
ভজনশালার ধাপ, গড়েছে বিগ্রহে এয,কই তারা ?
প্রতীক-পূজার সােপান বেয়ে পূজতে পরমেষ্ঠীরে
উঠছে মানুষ বুক দে’ হেঁটে কঠোর শিলায় বুক চিরে ;
‘পায় দলে তায় ওঠ, রে তােরা'-বললে যারা ঢাক পিটে,
ধৰ্ম্মকথার মর্ম গেল বুঝিয়ে দিতে মাপিটে,-
৮৪
বেলা শেষের গান।
কই সে গাজী কোথায় আজি? কাফেরগুলাে ট না !
ধমক দিয়ে ধর্ম প্রচার? -গল না মন গল না।
অটল দেবীর ভাঙল দেউল, পূজা অটল রইল তার ;
সত্যে দিল ব্যর্থ করে প্রচারকের অহঙ্কার।
দেউল ভেঙে লাঠির জোরে গড়ল কে গো মসজিদে ?
বিমুখ হ’ল বিশ্বমানব, মিশল যে আফশােষ জিদে।
সত্য সে বীজ শস্য ছিল, ফল্গু সােনার ফল তাতে,
পরশ-পাথর ব্যর্থ হল জোর জবরীর ইস্পাতে।
কাড়াকাড়ির নাকাড়াতেই পড়ল কাঠি বারংবার,
সত্য গেল ব্যর্থ হয়ে, বিপুল হল দম্ভভার।
শড় কী খাঁড়ার ঝন্ঝনাতে ঝঞ্চা মাতে ভূত-বাতাস,
এই ইতিহাস প্রণয়-বিলাস মহাকালের অট্টহাস।
হানাহানির এই কাহিনী, এই ইতিহাস দুনিয়াটার ;-
লােহার কাটায় বুক বেঁধে হায়, ছােটায় না-হ রক্তধার।
আঁতের কথা বলতে গিয়েও হঠাৎ কেমন দাঁত দ্যাখায়,
ধর্ম নিয়ে তর্ক করে ইম্পাতে ইম্পাত ঠেকায়।
নাচেন রণচণ্ডী মাথায়, মগজ-ভরা জিঘাংসা,
কামান দিয়ে মাংস থুড়ে ধর্মমতের মীমাংসা।
শকুনগুলাে ফুলছে ফলে তরুণ শবের বুক কুরে’,
মুণ্ডলগন মজ্জা মেরুর কাবাব জোগায় কুকুরে।
ক্রোধের মদের মাতাল মানুষ শাস্ত্র শস্ত্র এক করে।
বুদ্ধি বিচার পঙ্কে পুতে ছয় রিপুতে জুৎ ধরে।
লােভের হানার বান ডেকে যায়, দিগগজেদের দি ভােলায়,
অনেক খালেদ শাস্ত্র আখান্ ঢাকতে নিজের লুব্ধ।
শিরাজ, ই-হিন্দ,
সিংহাসনের সিংহ সেজে সহজ মানুষ হয় বাক',
মুসলমানের মসজিদে তাই মুসলমানের তােপ দাগ।
রুক্ষ হাওয়ায় কর্কশতায় উঠল না মন উঠল না,
গােলাপ-কাটার শুকনাে বেড়ায় গুলশিরাজী ফুটল না।
বাজপাখী সে যতই চঁাচাক আসবে নাকো বসন্ত,
বুলবুলি সে ডাকছে কোথায়, চল, করি তাই তদন্ত।
বাণীকে পুষ্পেরি তাজ পরায় যে তার তত্ত্ব নে,
তারাই পটু সত্যি-অটুট ভারের শিরাজ-পত্তনে।
ঝড়ের ফাঁকে উজল আঁখে এই ধরাকে দেখছে কে,
পাপিয়া ডাকে কার কানুনের কণনরবে কান রেখে ?
নিমের বনে আমের বনে মন্দ মধুর বয় হাওয়া,
অমূর্ত রস জাগায় হরষ মূর্তি ধ’রে কার গাওয়া?
সঙ্গীতে কার ঢেউ ওঠে রে নিথর নিতল জ্যোৎস্নাতে,
পুলক মিলায় কোকিল-শামা বােস্তানী-বুলবুল সাথে ।
শান্ত-ছবি দীন সে কবি, সেই গরীবের ইঙ্গিতে,
সুফির শিরাজ করবে বিরাজ বেদান্তেরি এই ভিতে।
আদর্শেরি দর্শনে যে ধন্য হল দুনিয়াতে,
স্পর্শ পেলে বুদ্ধ হ’ত বুদ্ধদেরি বুনিয়াদে ;-
ভুলিয়ে তারাই দ্যায় ব্যবধান, স্থায় ভুলিয়ে দেশ-কালে,
হিলে শিরাজ হয়নি গড় গড়বে তারাই শেষকালে।
আরা শুধু আধটা দেখি ঘুমতি-নদীর তীর ঘুরে,
পূর্ণ দ্যাখার পৌর্ণনাধী,-আশায় তারি মন ঝুরে।
বেলা শেষের গান
ফরিয়াদ
['General Dyer is lecturing in London.....,on his
expedition in Persia in 1916. This is the first lecture
of a series, the proceeds of which will be distributed
amongst the relatives of Indians who fell at Amritsar."
- Daily News. ]
ধূলির অধম নালিশ জানায় তােমার পায়ে ত্রিভুবনের রাজা!
তৃণের চেয়েও নম্র যারা, কেন প্রভু এত তাদের সাজা?
কোন্ অপরাধ প্রমাদ হ’তে ধাক্কা দিয়ে অন্য প্রমাদ-মাঝে
যাচ্ছে নিয়ে ত্রিশ কোটিরে ডুবিয়ে মুহু ধিক্কারে আর লাজে ?
নিরেট নিভাঁজ অবজ্ঞাতে জ্যান্ত ম'রে আছি অগৌরবে
মড়ার পরে মারূবে খড়-সয় বলে কি সত্যি সবই সবে ?
আপীল-শুন্য পুলিশ-জুলুম আইন নামে কায়েম হ’ল দেশে,
র হ’ল না বােলট-পালট, তিরিশ-কোটির আর্জি গেল ভেসে!
ভুয়ো জেনেও ডায়ার্কি হায় ডায়ার কুলের চোখ টাটালো ভারি,
আল-তন্ত্র মারণ মন্ত্র আগে ভাগেই রাখলে করে জারি।
নিষ্কলঙ্ক স্বদেশ-নিষ্ঠ, নির্বাসনে সইলে সে নিগ্রহ,
সিভিলিয়ান্ মা শীতলার অতি শীতল হ'ল অনুগ্রহ।
ছুটল প্রজা করূতে নালিশ, ছুটুল গুলি ফরিয়ন্দীদের 'পরে,
বিগাড় সব বিগড়ে দিলে, দেখলে জুজু আঁৎকে না-হক ডরে।
নালিশ যাদের বাদশাজাদাও শুত স্বয়ং নিত্য ঘণ্টা ঘরে,
নাহ তাদের মারূলে গুলি নিহাকিমের জবরূদন্ত চরে।
মূৰ্ত্তিমন্ত দন্ত এলেন অমৃৎসরে মৃত্যু-মশাল জ্বেলে,
ইতিহাসের পৃষ্ঠা পরে ধৃষ্টতারি নিবিড় পঞ্চ ঢেলে।
ফরিয়াদ
চিড়িয়া-গাড়ী শাঁজোয়াগাড়ী সাজিয়ে এলেন মাবুতে নিরেের,
‘বেবি-কিলার জাদুয়েল এলেন জালিয়াঁবাগে, জবর ফৌজ ঘেরে ;
ভাঙতে সভা বললে নাকো, বললে নাকো “নইলে সাজা হবে,
হঠাৎ সুৰু মৃত্যুবৃষ্টি! আকাশ বধির আর্ত-কলরবে!
দুপ্রবেশের সব অবকাশ আটক করে বর্বরতার শুরু,
মানুষ নামের কলঙ্ক, হায়, করে দিলে খাদ্ধা খুন সুরু!
বিশ-হাজারের নিবিড় ভিড়ে চালিয়ে গুলি ফুরিয়ে টোটার পুঁজি
খুন জখমের খাজা-খা শেষ ঘরে ফিরে গেলেন সােজাসুজি-
চলে গেলেন ফৌজ নিয়ে, খােদমেজাজে বাহাল তবিয়তে,
দেখলেনাকে ফিরেও বারেক মছে কারা ধূলার পরে, পথে !
পেলে না
জল-গণ্ডুষও হয় শুষ্কতালু জখম মানুষগুলাে ;
বাঁচতে যারা ওষুধ পেলে, ওষুধ বিনা হ’ল পথের ধূলে ;
বৃদ্ধ কত নিরপরাধ পড়ল মারা বাচ্ছা নিয়ে বুকে,
গুলির ঘায়েল, জোয়ান ছেলে সারাটা রাত কাৎরে ম’ল ধুকে!
ময়দানেতে খেলতে এসে ভিড় দেখে হায় গিছল জমে যারা
দুধের ছেলে মায়ের দুলাল মায়ের কোলে ফিরল না আর তারা।
অজ্ঞ কৃষাণ গ্রাম ছেড়ে যে এসেছিল বৈশাখী মেলাতে,
নাহ তারা প্রাণ খােয়ালে স্বেচ্ছাচারীর বীভৎস উৎপাতে।
ঘরে ঘরে পুত্রহারা ভর্তৃহারা ভ্রাতৃহারা নারী
গুমরে কাঁদে ; পঞ্চনদে মুলুক-জোড়া ফৌজী আইন জারী ।
আসামী বুক ফুলিয়ে বেড়ায়,-স্বর্গে মর্ত্যে কেউ দিতে নেই সাজা,
“সিলা-ওলা সালে নেছেন,” জুলুম বলে, “বাজা রে বুক বাজা?”
গ
নীরবে সব সইল ভারত; খবর কিন্তু রইল না কো চাপা ;
লােক-দ্যাখান কমিশনে চলা অনেক মুখ-থাবা বাঘ-থাবা !
বেলা শেষের গান
বর্বরতার গর্ব করে কাঠগড়াতে কীর্তিমন্তু কত
গোঁয়ার্তুমির সমর্থনে মানবতার ককূলে মাথা নত !
জবাবদিহির ডর ছিল না, ডায়ার গেল খােলকা বাত কয়ে,
স্তম্ভিতবং রইল ভারত, কাণ্ড কি যে, বুঝল র’য়ে র’য়ে।
নন্-কোবাদের শঙ্খ হঠাৎ উঠল বেজে ভারত-গগন ব্যেপে,
তিরিশ কোটির নমিত শির সােজা হল দীতে অধর চেপে ;
সত্য গ্রহণ কবুলে ভারত, হে বিশ্বরাজ। তােমায় প্রণাম করে ;
চিত্ত দিল সকল বিত্ত ; গান্ধী দিলেন পুণ্য-গন্ধে ভরে;
নেহরু দিলেন নহর কেটে ; ত্যাগের প্লাবন উপচে গেল ভেসে ;-
যুগল আলির দীপালীতে উজল হ’ল দেশাত্মবােধ দেশে!
চমৎকারের বন্যা এল, চামার মেথর দেশের কাজে মাতে।
শুড়িখানায় লােক ঢোকে না, বিলাস-ব্যসন ডুবল তপস্যাতে!
ভবিষ্যতের বিশ্ব-স্বপন বর্তমানের সঙ্গে অতীত কালে
ছাইছে যখন, চাইছে নয়ন যবনিকার দেখৃতে অন্তরালে,-
এমন সময় কি শুনি হায় ! সাগর-পারে সাধুর পােষাক পরে
“মিউটিনিটা বাঁচিয়ে দিলাম” বলে শিলিং কুড়িয়ে পকেট ভরে
হ্যাট হাতে ফের বেরিয়েছে কে, মরি মরি ভারত-প্রেমীই বটে।
মেহেবানী কবে ডায়ার ! ভারত জুড়ে তাড়িৎ-বার্তা বটে।
খুন করেছে কালকে যাদের, শ্রীপুত্রদের তাদের কিছু দেবে
বক্তৃতাতে কুড়িয়ে কড়ি,-এমনি কাঙাল রেখেছে হায় ভেবে
ভারত-প্ৰজায় ;-এমনি ঘৃণ, এমনি মনুষ্যত্বশূন্য তারা,
ক্ষুধার তাড়ায় পুত্র তীর ‘খুন’ মাখা হাত চাটবে কুকুরপার,-
তাইতে কড়ি কছে জমা, ভিক্ষা দেবে, শুনছি ঘৃণার বাণী,
অমৃৎসরের নারী-নরে ডায়ার শেষে কবে মেহেরবানী!
• কয়েকটি গান
৮
৮৯
“কে নিবি আয় শােণিতমূল্য” হাজার আত্মা বলছে আর্তনাদে,
জালিয়াঁবাগের রক্ত কাদায় ; শব-কোলে ওই রতন-দেবী কঁদে!
সে কি নেবে স্বামীর মূল্য? সে প্রথা তাে নেই এদেশে, প্রভু!
ভারত-নারী মরবে ক্ষুধায়, স্বামীর মাথার দাম নেবে না কভু,
ধৃষ্ট জনের মেহেরবানী হারাম বলে জানে মুসলমানে,
হিন্দু-শিখের গােরক্ত সে, কে ছোঁবে তায়, নেবে সে কোন্ প্রাণে ?
দুর্গতি ঢের সয়েছে দেশ, অনেক হানি অনেকতর গ্লানি,
আর মাথা হেঁট কোরাে না, দেব! চাইনে মােরা কারাে মেহেরবানী।
নানা মতে খাটো করে নতুন বেশে আসছে দুনিয়তি,
তাইতাে তােমায় নালিশ জানায়, তৃণের তৃণ, ত্রিভুবনের পতি!
দণ্ড দিতে চাও যদি দেব, ভারত যদি হয় পাতকেই ভারী,
নাম মুছে দাও দণ্ডদাতা! একসাথে দাও পাঠিয়ে অকাল, মারী।
দয়া করে করতে দয়া পাঠিয়ে না আর ডায়ার ও ডায়ারে,
এ দান প্রতিগ্রহের আগেই ভুখা ভারত মতে যেন পারে।
কয়েকটি গান
(গুজরাটী গরুবার সুরে গেয়)
( ১ )
পাবনা এটি আজ ঘরে পাব না বইতে।
চঁদ ডাকে পাপিয়াকে দুটো কথা কইতে ।
নিরালার কোল-ভরা,
ফুল জাগে আলােকৱা,
যেচে কার খুনসুড়ি সইতে।
অথই পাখার-পারা
জ্যোছনায় মাতােয়ারা
দিশেহারা হ’ল হাওয়া চৈতে।
১০
বেলা শেষের গান
!
শােন্ সখী! গায় কারা আজ রাতে গুজরাতী গরুবা।
খঞ্জন-নন-হিল্লোল-গর্ভা।
প্রিয়া গন্ধর্বের
হিয়া কন্দপের
হার মানে ঠুরী কাহাবা !
দুনিয়ার আদরের,
ফুতির আতরের
মনােহারী বেলােয়ারী কাবা!
চল রে দখিনার হিল্লোলে সাগরের ছন্দ।
কোন্ বনে চন্দন, কোন্ বনে গন্ধ !
মল্লিকা উল্লাসে
স্বপ্নেরি হাসি হাসে
সৌরভে সাঁতারে আনন্দ !
আকে। কী সুখ-ভরে আকুলি-বিকুলি করে
খুলছে যে পাপড়িটি বন্ধ !
( ৪ )
খিল্-খােলা ফর্দাতে যাব চল্, সাধ জেগেছে।
রইবে কে ঘরে আজ চাঁদ ডেকেছে।
আলাে হােথা চুপিচুপি নিয়ে পাউডার-থুপি
ফুল দিয়ে ফুল ঢেকেছে!
দিল-দরিয়ার জলে
উথলিয়ে ঢেউ চলে
নিশুতির বাঁধ ভেঙেছে!
t
খিল এটে ঘরে থাক, হােস্ন চাঁদের নাটে সঙ্গী।
জালা ভেজিয়ে দে রে, ও চাদ কলঙ্কী!
০ কয়েকটি গান ; যে জানে লো রীত, ওর যে জানে চরিত ওর / যাবেনা সে মানা মাের লঘি’ সাতাশের ঘর করে সালি:বাসর-ঘরে বাতাসে মাতাল করে রঙ্গী। ( ৬ ) শুনব না! কোনো মানা মান্ধ না ! চাঁদকে চেনেনি, শুধু চিনেছে কলঙ্ক। আঁধার যে ভুলিয়েছে, পাথার যে দুলিয়েছে, উথলিয়ে হৃদয়ে তরঙ্গ, একা হয়ে একশ’ যে-শত তা যারে ভজে, ধূলির তবু যে চায় সঙ্গ! জলে যায় অঙ্গ। ৭ } - জাগল রে নিঘরে পাখী, আজ নারে নি সইতে। আঁখি হ’ল অনিমেষ আলো-থইথইতে। শােন্ সখী শােন মুহু কুহু কুহু কুহু কুহু বুক-ভরা সুখ নারে বইতে। সে সুরের মনােহরে জোছনার সরােবরে শত তারা এলাে জল-সইতে । ( ৮ ) কোন বনে নিরজনে কাজ-ভােলা কার বাণী বাজল। হিয়ার গহনে ফুল যােবন কাজল! হাওয়া ভুভু তাই মহুয়া ফুলের হাই। রূপহীনে রূপটানে মাজল! মউএর ঝাপট দিয়ে উলসিয়ে বিলসিয়ে মানিনীর মান-মণি যাচল।
বেলা শেষের গান
কার পাশে কেও নাচে, কার পানে চেয়ে ও কে হাসে।
উল্লাসে কারা ভাসে অনুভব-রাসে !
যত তারা তত সাধ
যত সাধ তত চাদ
মণ্ডলে নাচে নীলাকাশে।
যত চাদমুখ আছে চাদ আছে কাছে কাছে
মনােভব মঞ্জু বিলাসে!
( ১ )
আসমানে রাসলীলা গােপনের যবনিকা টুটুল।
আলােক-লতারে ঘিরে হাসিমুখ ফুটুল ।
স্বপনেরি ঝরােকায়
তারা উকি দিয়ে চায়,
কাতারে কাতারে তারা জুটুল,
স্মরণ সরণি 'পরে
ফুল ফোটে থরে থরে,
পুলকে আঁখির ধারা ছুটল।
( ১১ )
লজ্জিত আঁখি নত অনুখন সঞ্চরে তারা।
উন্মদ মধুকর গুঞ্জন-হারা !
মৌন মুরতি ধরে
মৌনে আরতি করে
স্বপন-ভস মাতুয়ারা !
মনােহর।
হার মন - অবচন নিবেদন
বরিষণ চন-ধারা ।
( ১২ )
চশ্রেনি চিত ভরি কে গাে আজ কে গাে তুমি, চিত্রা!
চোখে চোখ ! কি পুলক! পুষ্প-পবিত্রা!
কয়েকটি গান দুহু চির দূরে দূরে D পরিচয় চাউনিতে জোছনার ছাউনীতে সুন্দরী! সুদূর-সুমিত্রা ! আঁখি থির, মন ঝুরে, জাগরণ-সাগর-বহিত্রা! ( ১৩ ) কী ফুল ফোটায় হায় দুনিয়ায় চোখের চাওয়া। চোখের চাওয়ায় কত হারানাে, পাওয়া ! চোখে চোখে দেয়া নেয়া চোখে পাড়ি চোখে খেয়া চাহনিতে চৈতী হাওয়া ! চাহনির উড়াে-পাখী মন হরে দিয়ে ফাঁকি। চোখে-চেয়ে চামেলী-ছাওয়া ! ( ১৪ ) মন হরে অজানার নয়নের-অচেনা চোরে! কে কারে কখন্ বাঁধে কিসের ডােরে ! ভ্রমর আঁখির মেলা। ভালােবাসা-বাসি খেলা চোখে চোখে আরতি করে। নয়নে নাগরদোলা এই ফ্যাল। এই ভােলা ঢেউ-বাওয়া জনম ভরে। ( ১৫ ) অম্বরে জাগে চাদ তারকার ফুল-শেযে রাত-ভাের কি কথা বলিতে চায় ঘুম হারাম-চোর! * গগনের নিরালায় মন কোথা ভেসে যায় । জোছনায় মাখা আঁখি-লাের মরতের মল্লিকা • কারে বেশী চায় মন ওর। ! তারকার রূপশিখা
৯
বেলা শেষের গান
{ ১৬ )
আকাশ-কুসুম চাষ করে চাঁদ তারার ক্ষেতে।
পাগল সে, আছে শুনি ওতেই মেতে !
খুঁজে খুঁজে হাসিমুখ ভরে শুধু রাখে বুক
আলােকেরি মালিক গেঁথে ।
যুগে যুগে নিশি জাগে রূপের নিছনি মাগে
নাহি জানি কি ধন পেতে !
চাদমুখে আছে ভরে, বলে চাদ, হৃদয়ের আয়না !
ভালােবাসা ভালােবাসি আর কিছু চাই না।
আকাশ-কুসুম বনে
তাই ফিরি আনমনে,
কাজের বাটে তাে মন ধায় না।
আঁথি দিয়ে পিয়ে সুধা
মিটাই হিয়ার ক্ষুধা
ধনের মানের নেই বায়না।
(১৮)
চাই কারে জানি না রে আমি শুধু ফিরি স্বপনে !
ভালােবাসা ভালােবাসি, মন-গােপনে।
আকাশ-কুসুম তুলি
কুমুদের ফুলে বুলি,
দিক্ ভুলি, ফিরি ভুবনে ।
জোছনার জাল পেতে জোনাকীর হার গেঁথে
কার ছবি জপি গো মনে।
নিশি নিশি জাগো চাদ ! নিরালায় নিতি নিরখি ।
হারানাে ছবির মালা জপ কর কি ?
কয়েকটি গান ১ কত আঁখি কত যুগে কত দুখে কত সুখে ! আঁখি তব গেছে পুলকি’, ছাই হয়ে গেছে যারা তারা অতীতের তারা, একাকী তাদের স্মর কি (২০) কার কথা কবেকার কার কানে দিলে আজ পৌঁছে। আলুথালু হ’ল চাঁদ ঢুলুঢুলু মৌজে ! জোনাকী সে জোছনায় মােহ পায় মুরছায় পারুলী-পিয়ালফুলী কোচে । হাওয়া ভােব বিহ্বলে •কিরণের থির জলে অবগাহি’ বাদশাহী হৌজে। (২১) কার হাসি কার ঠোটে কার ভােলা দিঠি কার চক্ষে। স্বপনের রাসলীলা মরমের কক্ষে। কার কথা কও” স্বরে মন কে উদাস করে ইসারায় বলে কি অলক্ষ্যে। মন করে চিনি চিনি হৃদয়ের স্বদেশিনী বসতি বা ছিল এই বক্ষে! (২২) কে সে ভরেছিল মন, মনে পড়ে তারে? সেই ভরণী ? বিরহিণী যে রােহিণী নিয়েছি ধরণী ? কোথা রোদের রাধা কোথা সেই অনুরাধা? শ্রবণা শ্রবণ-মন-হরণী ? কোথা অতীতেরণী মুক্ত-হাসিনী স্বাতী ? স্বপন-গাঙে কি বায় তরুণী?
বেলা শেষের গান
(২৩)
অপ্সরী কোথা শা সভ্ৰষ্টা সে অশ্বিনী হায় রে ?
আহৃদয়া হায় আর্জা কোথায় রে?
ভদ্রা দু’বােন তারা কোন মেঘে হ’ল হারা ?
কে বাঁধিল মৃগ-নয়নায় রে ?
ফ-প্রেমের পোঁত
ফনী গেল কোথা ?
বিশাখা কি নীহারিকা-ছায় রে ?
( ২৪ )
চৈতী এ জোছনায় একি হায় কুয়াশার কান্না!
কান্নার হাহা হাওয়া, গান না রে গান না !
আকাশের পরকোলা কাদের নিশাসে ঘােলা?
তার'লােকে খােলা যত জাল না !
ভরা নয়নের কোলে
মুকুতার মুখ দোলে,
ঠোটে চুনি, চুলে তার পান্না!
(২৫ )
করে ফাগ করে জ্যোৎস্নাতে চাদ হােলি থেছে !
কপূরী কুঙ্কুম ফুলে ফুলে ফেছে!
হিল্লোলি’ উল্লাসে
মাতি অনুভব-রাসে
মল্লিকা হাসি হেনে হেলছে।
উবে-যাওয়া রূপ কত
তারা-ফুলে অবিরত
হীরার লাবণি-মণি মেলছে!
(২৬)
রং বিনা দোল-খেলা, প্রাণে স্রেফ, জৈাছনারি রঞ্জন।
স্মৃতির মুরতিহারে,রাল রুমে কোন্ জন।
কয়েকটি গান = আজ পরাণের পুটে সরােজ-কুমুদ ফুটে একসাথে রস ভুঞ্জন! আকাশে ঝরােকা খােলা, তারা আঁকে, পথ-ভােলা- স্বপনের চোখে অঞ্জন! (২৭) প্রেম মানে প্রাণ পাওয়া, প্রাণে মরা প্রেম হারাণে ; এই ধারা দুনিয়ার মানাে না-মাননা। নিশি নিশি অনিবার মরে বাঁচে বারে বার -- তাই চঁাদ; জানাে না জানাে ! ভালােবাসা-রং-ছুট ফুল হয় ধূলাে মঠ, প্রেমে ফিরে পায় পরাণ ও! (২৮) মরে গিয়েছিলে চঁাদ! বেঁচে ফিরে, ফিরে এয়েছ। আঁখির আলােতে কার প্রাণ পেয়েছ ! কোন্ পুণ্যের বলে এমন নতুন হলে, কোন্ গাঙে তুমি নেয়েছ ! কোন্ সুধা পিয়ে এলে, কোন্ আশা নিয়ে এলে। রূপে ত্রিভুবন ছেয়েছ ! (২৯) ফুটে ঝরে ফোটে ফুল বারেবার আকুল বনে। কত মরা কত বাঁচা এই জীবনে। কত না। বিরতিরতি পীরিতির গােয়তি হা-কাঁদা মন-গোপনে। মলয়া মরুর হাওয়া কত করে আসা-যাওয়া চাদেরও সাধের স্বপনে।
৯৮ বেলা শেষের গাল ক ঝঙ্কারে রিমঝিম্ ঝিঝি গায়, আজ না রে আজ না ! তনু ভরি মরি মরি নুপুরেরি বাজনা ! আজ নয় আজ নয় আজ কোনাে কাজ নয়, অপরূপ! ভাের না, এ সাঁঝ না ! যে দূরে, যে আছে কাছে সবারি হৃদয় যাচে জোছনায় অলখেরি সাজনা । বুদ্ধ-বরণ কলিকাতা নগরে শ্ৰী ধৰ্ম্মরাজিক চৈত্যবিহারে বুদ্ধদেবের দেহাবশেষ- স্থাপন উপলক্ষে রচিত) দাও ধুয়ে পথ নগরবাসী আনন্দাশ্রু-ধারে, বুদ্ধদেবের বিভূতি আজ এই নগরের দ্বারে। আড়াই হাজার বছর আগে সেই যে রাজার ছেলে বিশ্বজীবের ব্যথার ব্যথী সােনার রাজ্য ফেলে বেরিয়ে গেছে ফকীর-বেশে ছাই দিয়ে সংসারে চিন্তামণির অন্বেষণে ; কৃচ্ছ-তপের পারে- পেয়েছে যে পরম নিধি, শান্তি-সুধা-বরি, রিক্ত হয়ে পূর্ণ হ’ল যার হৃদয়ের ঝারি, সম্বােধি যার পরশ-পাথর-কাঁচকে করে সোনা, যার আঁখি-ছায় নিখিল-হিয়ার নিত্য আনাগােনা, মৈত্রী-মধুর করুণা যার জুড়ায় হাহাকার, জগৎ ঘুরে সেই এসেছে এই নগরের দ্বারে।
বুদ্ধ-বরণ
৯৯
শুদ্ধোদনের শুদ্ধ কুলে মায়াদের কোলে
জন্মেছে যে জম্বুদ্বীপে আনন্দ-হিন্দোলে,
কীৰ্ত্তি যাহার গগন ছাপায় নিখিল ভুবন ভরি,
সৈন্য বিনা জয় করে যে, শাক্যকুলের হরি,
মহাপ্রজাবতীর দুলাল সেই যে মহাপ্রজা
ছয় রিপুরে জয় করে যে উড়ায় কাষায়-ধ্বজা,
যজ্ঞশালার বিড়ম্বনায় বলিপশুর হাটে
কুষ্ঠিত প্রাণ সহজ হ’ল যাহার শান্তি-পাঠে,
বারাণসীর শ্রুতির টোলে উদাত্ত যার স্বরে
‘ধৰ্ম্ম হ’ল উদ্বোধিত যজ্ঞবেদীর পরে,
নগ্ন ক্ষপণকের মেলায় ভব্য ছবি যার
নিগম্বরে শ্বেতাম্বরী কলে বারম্বার,
মগধ পতি নমে যারে তাপন-গেহ থেকে,
কোশল-পতি চরণ চুমে ছত্র চামর রেখে,
সেই এসেছে দ্বারে তােমার আজ বিভূতির বেশে;
বরণ করে নাও গাে তারে পর্যটনের শেষে।
গ
উদ্ভবে যার লুম্বিনী বন মর্ত্যে স্বতন্তরা,
জেরুজালেম্ বেথলেহেমের অগ্র-সহােদরা,-
অক্রোধে ক্রোধ জিলে যে-জন বিজন মৃগদাবে,
ভারত হ’ল কেন্দ্র ধরার যাহার কিভাবে,
মুকুট ছেড়ে যে-জন নিলে কষায় উত্তরীয়,
বৈশ্বানরের বন্দনীয় বিশ্বনরের প্রিয়,
যে সন্ন্যাসীর পুণীহাসির পবিত্র মহিমা
ছাপিয়ে চলে ভূভারতের বিপুল চতুঃসীমা,
"১০০
বেলা শেষের গান
চারিত্রে যে পূজ্য হ’ল ঝালীকে গান্ধারে
শােণ কাবেরী সদরিয়া কাজিল, নদীর ধারে,
লঙ্কা শায়া চীন জাপানে লাল-মানুষের দেশে
পৌছাল যার পরমবাণী পাখীর মুখে ভেসে,
তাতার ইরাণ একদা যার পূজত সৌম্যছবি,
চার যুগে যার বন্দনা গায় নিখিল ধরার কবি,
শক-হ্রণে আর গ্রীক-রােমকে রাজায় প্রায় মিলে
পুলকে যার চল-পথের ধুলি মাথায় নিলে,
কণিষ্ক যার চিতার ভস্ম কিনলে নিষ্ক দিয়ে,
চণ্ড-অশােক ধৰ্ম্মী হ’ল বার করুণা পেয়ে,
নিখিল নরের ঐক্য প্রথম দেখলে যে-জন ধ্যানে,
সেই এসেছে বাংলা দেশের ঐ নগবােদ্যানে।
গ
স
ভক্তেরা যার পশুর ভরেও গড়লে সেবা-গেই,
বিশ্বজনের কল্যাণে যার অর্পিত মন দেহ,
সত্তা যাহার করুণাতে, সত্যে যাহার স্থিতি,
সংঘ যাহার নূতন সৃষ্টি, সংবােধি যার প্রীতি,
সংযমে যার পরম শৌৰ্য্য, বীৰ্য্য মােহের নাশে,
ধর্ম চরম প্রতিষ্ঠা যার সােমপায়ীদের পাশে,
শীল সে যাহার অঙ্গভূষণ, অনঙ্গ যার বশে,
যার নয়নের বিমল বিভায় মনের বন্ধু খসে,
সুপ্ত ধরায় প্রবুদ্ধ যে অতুল মর্ত্যধামে,
চায় না অকাজ বাড়ানাে যে কিছু করার নামে,
নিষ্ক্রিয় যার বরং প্রিয় দুস্ক্রিয় জন হতে,
নিৰ্বাণই যার অ-লােভ স্বর্গ জন্ম-মরণ স্রোতে,
নমস্কার কৰ্ম্ম শেষে শালের বনে বন তরুর মূলে চিতায় শুয়ে ঘুমিয়েছে যে নিরঞ্জনার কূলে, সেই সে অকূল কাল-সাগরে জমিয়ে খেয়ার পাড়ি এসেছে আজ এই নগরে চৈত্য-শয়ন ছাড়ি। ৩ . . ছিল যে তার আসার কথা অনেক বছর থেকে, শ্রীমা সার্থপতির বধূ রেখেছে তায় ডেকে ! ভক্ত অনাথপিণ্ডদেরি কন্যা যে সেই নারী, বঙ্গে পুণ্ড বর্ধনে যে পতির গেহ তারি, সে ডেকেছে আসতে হবে,...তাই বুঝি আজ আসা ; মনে আছে নিমন্ত্রণ ! পূরাতে তার আশা- শতাব্দী সব ঠেলে ঠেলে এল নীরব পায়ে,... নাইক খেয়াল রাজ্য নগর ভাঙছে ডাহিন বয়ে! বঙ্গে এল বুদ্ধ-বিভা, কিন্তু সে নাই বেচে, নগর পুণ্ড্রবর্ধনও নেই—স্বপ্ন হয়ে গেছে! নেই বালিকা উপাসিকা ; আমরা তারি হয়ে বিভা চিত্ত-প্রদীপ লয়ে ; চৈত্য দিয়ে যত্নে ঘিরি বুদ্ধ-বিভূতিরে, নিরঞ্জনা-তীরের স্মৃতি ভাগীরথীর তীরে। বরণ করি বুদ্ধ- নমস্কার নমস্কার! করি নমস্কার। কবিতা কমল-কুঞ্জ-উল্লসিত আবির্ভাবে যার, আনন্দের ইন্দ্রধনু মােহে মন বাঙ্কার ইঙ্গিতে, আত্মার সৌরভে যার স্বৰ্গনী রহে তরঙ্গিতে,
১০২
বেলা শেষের গান
কূজনে গুঞ্জনে গানে মত্ত হ’ল ঘূর্তি-পিরবার,
অন্তরের মুক্তিমন্ত ঋতুরাজ বসন্ত সাকার,-
নমস্কার! করি নমস্কার ।
ফটিক জলের তৃষ্ণা যে চাতক জাগাইল প্রাণে,
অমর করিল বঙ্গে মৃত্যু-হরা মৃত্যু-হারা তানে;
ছাতারে-মুখর যুগে গাহিল যে চকোরের গান,
করিল যে করল যে জনে জনে চন্দ্র-সুধা পান ;
তত্বের নিথরে যেবা বিথারিল রসের পাথার,-
নমস্কার করি নমস্কার ।
চন্দন-তরুর বনে বাঁধিল যে বাণীর বসতি,
দুর্লভ চন্দন-কাঠে কুঁড়ে বাঁধা শিখেছে সম্প্রতি
অকিঞ্চন কবিজন গৌড়ে বঙ্গে আশীর্বাদে যার,
বেণু বীণা জিনি মিঠা বাণী যার খনি সুষমার,
চিত্তপ্রসাধনী পরী দিল যারে নিজ কণ্ঠহার,
নমস্কার! করি নমস্কার ।
প্রতিভা-প্রভায় যার ভিন্নতমঃ অভিচার-নিশি,
আবেদনে-আস্থাহীন, ‘আত্মশক্তি’-মন্ত্র-দ্রষ্টা ঋষি,
ভীরুতার চিরশত্রু, ভিক্ষুতার আজন্ম-অরাতি,
শশাণিত-নিষেক-শূণ্য নৈযুজ্যের নিত্য-পক্ষপাতী,
বঙ্গের মাথার মণি, ভারতের বৈজয়ন্ত হার,
নমস্কার
করি নমস্কার ।
রুদ্ধ-কণ্ঠ পাঞ্জাবের লাঞ্ছনার মৌনী অমারাতে
নির্ভয়ে দাঁড়াল এক বাণী ধার পাঞ্চজন্য হাতে
নমস্কার
১০৩,
ঘােষিল আত্মার জয় কামানের গর্জন ছাপায়ে
অতিচারী ফিরিঙ্গীর ঘাঁটা-পড়া কলিজা কাঁপায়ে
তুচ্ছ করি’ রাজ-রােষ উপজে দিল যে ধিক্কার,
নমস্কার! করি নমস্কার ।
দাঁড়ায়ে প্রতীচ্য ভূমে যে ঘােষে অপ্রিয় সত্য কথা,-
“জঘন্য জন্তুর যােগ্য পশ্চিমের দস্তুর সভ্যতা!”
ছিন্নমস্তা ইয়ােরােপ শোনে বাণী স্বপ্নহত-পারা-
ছিন্নমুণ্ডে শিবনে, দেখে নিজ রক্তের ফোয়ারা-
শিহরি’ কবন্ধ মাগে যার আশে শান্তিবারিধার—
নমস্কার ! তারে নমস্কার ।
স্বদেশে যে সৰ্বপূজ্য, বিদেশে যে রাজারও অধিক,
মুখরিত যার গানে সপ্ত সিন্ধু আর দশদিক,
বিশ্বকবি-ছত্রপতি, ছদারথী, নিত্য-বন্দনীয়,
বিতরে যে বিশ্বে বােধি,—বিশ্ববােধিসত্ত্ব জগৎপ্রিয়,
নিত্য তারুণ্যের টীকা ভালে যার, চিত্ত-চমৎকার,
নমস্কার! তারে নমস্কার!
ষাটের পাটনে এসে দেশে দেশে বরযাত্রা যার,
নিশীথে মশাল জ্বেলে যার আগে নাচে দিনেমার,
ওলন্দাজ খুলি তাজ যার লাগি কাতারে কাতার
শীতে হিমে রাজপথে দাড়াইয়া ছবি প্রতীক্ষা,
দ্বন্দ্ব ভুলি’ ‘ফুণ’ ‘গ’ যার লাগি রচে অর্ঘ্যভার,
নমস্কার। তারে নমস্কার!
১৪
বেলা শেষের গান
নয়নে শান্তির কান্তি, হাস্য যার স্বর্গের মন্দার,
পকেশে যে লভিল বরমাল্য রম্যা অরােরার
বুদ্ধের মতন যার ‘আনন্দ’ সে নিত্য-সহচর,
সৰ্ব্ব ক্ষুদ্রতার উর্দ্ধে মেলে পাখা যাহার অন্তর,
বিশ্বযােগে যুক্ত যে গাে “বাণীমূৰ্ত্তি স্বদেশ-আত্মার”—
বারম্বার তারে নমস্কার!
চারি মহাদেশ যার ভক্ত, করে ভক্তিনিবেদন,
গুরু বলি’ শ্রদ্ধা সঁপে উদ্বোধিত আত্মা অগণন,
ভাবের ভুবনে যার চারি যুগে আসন অক্ষয়,
যার দেহে মূৰ্ত্তি ধরে ঋষিদের অমূৰ্ত্ত অভয়,
অমৃতের সন্ধানী যে ধ্যানী যে নিদ্বন্দ্ব-সাধনার
নমস্কার! নমস্কার! বারম্বর তারে নমস্কার।
-
গান্ধিজী
দিনে দীপ জ্বালি’ ওরে ও খেয়ালী! কি লিখিস্ হিজিবিজি ?
নগরের পথে রােল ওঠে শােন ‘গান্ধিজী। গান্ধিজী!’
বাতায়নে দ্যাখ, কিসের কিরণ ! নব জ্যোতিষ্ক জাগে !
জন-সমুদ্রে ওঠে ঢেউ) কোন্ চন্দ্রের অনুরাগে !
জগন্নাথের রথের সারথি কে রে ও নিশান-ধারী,
পথ চায় কার কাতারে কাতার উৎসুক নরনারী।
কৃষাণের বেশে কেও কৃশ-তনু-কৃশানু পুণ্যছবি,
জগতের যাগে সত্যাগ্রহে ঢালিছে প্রাণের হবি!
গান্ধিজী
১.৫
!
কেঁৗসুলি-কুলি করে কোলাকুলি কার সে পতাকা ঘেরি,
কার মৃদুবাণী ছাপাইয়া ওঠে গর্ষী গােরার ভেরী
জোর টাকা কার ভিক্ষা-ঝুলিতে, অপরূপ অবদান,
আগুলিয়া কারে ফেরে কোটি কোটি হিন্দু-মুসলমান !
আত্মার বলে কে পশু-বলের মগজে ডাকায় ঝিঝি
কেরে ও খুৰ্ব্ব সৰ্ব্বপূজ্য?-‘গান্ধিজী! ‘গান্ধিজী।
••
•
মহাজীবনের ছন্দে যে-জন ভরিল কুলিরও হিয়া,
ধনী-নিধনে এক করে নিল প্রেমের তিলক দিয়া
আচরণ যার কোটি কবিতার নিঝর মনােরম,
কষ্মে যে মহাকাব্য মূৰ্ত্ত, চরিতে যে অনুপম ;
দেশ-ভাই যার গরীব বলিয়া সকল বিলাস ছাড়ি
‘গড়া’ যে পরে গাে, ফেরে খালি পায়ে, শােয় কম্বল পাড়ি
তপস্যা যার দেশাত্মবােধ ছােটও ছােটর সাথে,
দিন-মজুরের খােরাকে যে খুসী তিন আনা পয়সাতে;
স্বেচ্ছায় নিয়ে দৈন্য যে, কাছে টানিল গরীব লােকে,
ভালাে যে বাসিল লক্ষ কবির ঘন অনুভূতি যােগে,
অহিংসা যার পরম সাধনা হিংসা-সেবিত বাসে,
আসন যাহার বুদ্ধের কোলে, টলষ্টয়ের পাশে,
দীনতম জনে যে শিখায় গৃঢ় আত্মার মর্যাদা,
চিত্তের বলে লঘিয়া চলে পাহাড়-প্রমাণ বাধা,
বীর-বৈষ্ণব-বিষ্ণু-তেজেতে উজল যে-জন ভিজি’
ওই সেই লােক ভারত-পুলক, ওই সেই গান্ধিজী!
বেলা শেষের গান
কাফির ভিটা আফ্রিকা,ভূমে প্রিটোরিয়া-নগরীতে,
বারে বারে ক্লেশ সহিল যে ধীর স্বদেশবাসীর প্রতে,
উপনিবেশের অপহুজুরের না মানি জিজিয়া-কর,
মুদি-মাকালিরে আত্মার বলে শিখাল যে নির্ভর,
বারণ যাদের ওঠা ফুটপাথে তাদের স্বজাতি হয়ে
ফুটপাথে হাঁটা পণ যে করিল গােরার চাবুক স’য়ে,
মার খেয়ে পথে মূচ্ছ। গিয়েছে, পণ যে ছাড়েনি তবু,
বারে বারে যারে জরিমানা করে হার মেনে গােরা প্রভু
র করে বন্ আইন চরমে রেহাই পেয়েছে তবে।
ধীরতায় বীর সেরা পৃথিবীর, নাই জোড়া নাই ভবে!
প্লেগের প্লাবনে কুলি-পল্লীতে নিল যে সেবা-ব্রত
বুয়ার-লড়াইয়ে জুলুর যুদ্ধে জখমী বহিল কত,
কেঁৗসুলি-কুলি-মুদি-মহাজনে পল্টন গড়ে নিয়ে
উপনিবেশীর কথা-বিশ্বাসে খাটিল যে প্রাণ দিয়ে,
কাজের বেলায় ইংরেজ যারে মেনেছিল কাজী বলে,
কাজ ফুরাইলে পাজী হ’ল হায় বর্ণ-বাধার গােলে !
কথা রাখিল না যবে হীন-মনা কথার কাপ্তেনেরা,
কায়েম রাখিল বকেয়া যুগের জিজিয়া—ক্ষোভের ডেরা,
তখন যে-জন কুলির ধাতুতে বৈষ্ণবী সেনা সৃজি’
ধৈৰ্য-বীর্যে মােহিল জগৎ, এই সেই গান্ধিজী।
গ
সাগরের পারে স্বদেশের মান রাখিল যে প্রাণপণে,
গােরা-চাষা-দেশে নিগ্রহ সহি’ নিগ্রো-কুলের সনে,
বিদেশে স্বদেশী বটের চারায় রােপিয়া যে নিজ-হাতে
বিশ্বাস বারি সেচনে বাঁচাল বাওবাব-আওতাতে,
গান্ধিজী
ভারত-প্ৰজারে চোরের মতনথানায় থানায় গিয়ে
নাম লেখাইতে হবে শুনে, হায়, আঙুলের টিপ দিয়ে,
যে বিধি অবিধি তারে নির্মূল করিবারে বিধি ঠেলে
দেশ-আত্মায় অপমান হতে বাঁচাতে যে গেল জেলে,
গেল চলে জেলে জ্বালাইয়া রেখে পুণ্য-জ্যোতির জ্বালা
ভয়-তরণের সুধা-ক্ষরণের উদাহরণের মালা
ধায় দেশী কুলি দেশী কুঠিয়াল না শশানে কাহারাে মানা,
দেখিতে দেখিতে উঠিল ভরিয়া যত ছিল জেলখানা,
মর্দে-মেয়েতে চলিল কয়েদে দলে দলে অগণন,
স্বেচ্ছায় ধনী হ’ল দেউলিয়া, তধু ছাড়িল না পণ!
ক্ষুধিত শিশুরে বক্ষে চাপিয়া দেশ-প্রেমী কুলি-মেয়ে
ইঙ্গিতে যার কষ্টের কারা বরণ করেছে ধেয়ে,
দীক্ষায় যার নিরক্ষরেও সাতারে দুঃখ-নদী,
বুকে আঁকড়িয়া সদ্য-লব্ধ মৰ্য্যাদা-সম্বােধি।
তামিল-যুবক মরিয়া অমর যে পরশমণি ছুয়ে,
চিরপদানত মাথা তােলে যার মন্ত্র-গর্ভ ফুয়ে,
পুলকে পােল মিতালি করিল যার চারিত্র্য-গুণে,
ভারতে বিলাতে আগুন জ্বলিল যার সে দীপক শুনে,
বাঁধিল যাহারে প্রতি-বন্ধনে বিদেশীরও রাখী-সূতা-
ভেট যারে দিল প্রেমী অ্যান্ড্রজ অযাচিত বন্ধুতা,
আপনার জন বলি’ যারে জানে ট্রান্সভাল হ’তে ফিজি,
জীর্ণ খাঁচার গরুড় মহা--এই সেই গান্ধিজী।
*।
এশিয়া বে নয় কুলিরই আলয় প্রমাণ কৱিল যেবা,
কুলিতেজাগায়ে মহামানবতা নর-নারায়ণ-সেবা,
১০৮
বেলা শেষের গান
ধৈর্য্যে ও প্রেমে শিখাল যে সবে কায় মনে হতে খাঁটি,
সত্য পালিতে খেল যে সরল পাঠান চেলার লাঠি,
বিশ্বধাতার বহে যে পতাকা উজল জিনিয়া হেম,
“সত্য” যাহার এক-পিঠে লেখা আর-পিঠে “জীবে প্রেম”,
সত্যাগ্রহে দহিয়া সহিয়া হয়েছে যে খাটি সােনা,
দেশের সেবার সাথে চলে যার সত্যের আরাধনা,
অযুত কাজের মাঝারে যে পারে বসিতে মােন ধরি
শবরমতীর বরণীয় তীরে ধ্যানের আসন করি,
অর্জন যার ব্রহ্মচর্য, তপের বৃদ্ধি কাজে,
উজ্জ্বল যার প্রাণের প্রদীপ তর্ক-আঁধার-মাঝে,
মেথরের মেয়ে কুড়ায়ে যে পােষে, অশুচি না মানে কিছু,
চাকরের সেবা না লয় কিছুতে, নরে সে যে করা নীচু,
ক্ষুদ্রে মহতে যে দেখেছে মরি আত্মার চির-জ্যোতি ;
দাস হ’তে, দাস রাখিতে যে মানে চিত্তের অধােগতি,
প্রেমময় কোষে বসে যে দেশের, শক্তি-বীজের বীজী,
অন্তরে বৈকুণ্ঠ যাহার,-এই সেই গান্ধিজী।
দপীতাপন ভারত-পাবন এই সে বেণের ছেলে,
শুচি মহিমায় দ্বিজকুলে স্নান করিল যে সবহেলে,-
কুণ্ঠা রহিত বৈকুণ্ঠের জ্যোতি জাগে যার মনে,
সাজা নিতে নয় কুণ্ঠিত কর্তব্যের আবাহনে,
নীলকর আর চাকর-চক্রে কুলির কান্না শুনি
ফেরে কামরূপে চম্পারণ্যে অশ্রুমুকুতা চুনি,
কায়রা-আকালে শাসনের কলে শেখালে যে মর্মিতা,
নিজে ঝুকি নিয়া খাজনা রুখিয়া রায়তের চির মিতা;
০
গান্ধিজী
রাজা-গিরি নয় কেবলি হুকুম,কেবলি ডিক্রিজারি,
হাল গােৰু ক্রোক আকালেরও কালে করিতে মালগুজারি,
এ যে অনাচার এর ঠাঁই আর নাই নাই ভূভারতে,
রাজায় প্রজায়, একথা প্রথম বুঝল যে বিধিমতে,
সাতশত গাঁয়ে বাজারে অমােঘ সত্যাগ্রহ ভেরী,
প্রজার নালিশ বােঝতে রাজারে হ’ল নাকো যার দেরী,
অভয়-ব্ৰতের ব্ৰতী যে, সকল শঙ্কা যে-জন হরে,
বিশ্বপ্রেমের পঞ্চপ্রদীপে কুলির আরতি করে ;
আদর্শ যার সুধা আর প্রহলাদ মহীয়া,
পিতারও হুকুমে করে নাই যারাআত্মার অপমান,
পূজনীয়া যার বৈষ্ণবী মীরা চিতােরের বীণাপাণি,-
রাজারও হুকুমে সত্যের পূজা ছাড়েনি যে রাজরাণী
জপমালে যার সারা দুনিয়ার সত্য-প্রেমীর মেল,
গ্রীসের শহীদ সক্রেটিস, আর ইহুদীর দানিয়েল,
যার আলাপনে বন্দী মনের বন্ধন হয় ক্ষয়,
তার আগমনী গাও কবি আজ, গাও গান্ধির জয় ।
}
p
গ
*
এসিয়ার হক, হারুণের স্মৃতি, ইস্লাম্-সম্মান,
মৰ্ম্ম-বীণার তিন তারে যার,পীড়িয়া কাঁদাল প্রাণ,
দরাজ বুকেতে সারা এসিয়ার ব্যথার স্পন্দ বহি,
সব হিন্দুর হয়ে যে, খােলস খেলাফতে দিল সহি,
চিত্ত-বলের চিত্র দেখায়ে পেল যে পূর্ণ সাড়া,
সত্যাগ্রহ-ছন্দে ধিল ঝড়েরে ছন্দ-ছাড়া,
প্রীতির রাখী যে বেঁধে দিল দুহু হিন্দু-মুসলমানে,
পঞ্চনদের জালিয়র জ্বালা সদা জাগে যার প্রাণে,
১০
বেলা শেষের গান
ভারত-জনের প্রাণ-হরণের হরিবারে অধিকার
নৈযুজ্যের হ’ল সেনাপতি যে রথী দুনিবার,
বিধাতার দেওয়া ধৰ্ম বােষের তলােয়ার যার হাতে
সােনা হয়ে গেছে সত্যাগ্রহ-রসায়ন-সম্পাতে;
ঘষি’ স্বাতন্ত্র শাসন-যন্ত্র আম্লা অস্ত্র সহ
অভয়-মন্ত্র দিয়ে দেশে দেশে ফিরিছে যে অহরহ।
মহাবাণী যার শকতি-আধার, অনুদার কভু নহে,
লুকানাে ছাপানাে কিছু নাই যার, হাটের মাঝে যে কহে
“স্বরাজ প্রয়াসী জাগগা দেশবাসী, স্বরাজ স্থাপিতে হবে,
ত্যাগের মূল্যে কিনিবসে ধন, কায়েম করিব তপে।
যা কিছু স্ববশে সেই তাে স্বরাজ, সেই তাে সুখের খনি,
আপনার কাজ আপনি যে করে,-পেয়েছে স্বরাজ গণি ;
স্বপাকে স্বরাজ, স্বরাজস্বকরে নিজের বসন বােনা,
স্বরাজ-স্বদেশী শিল্প পােষণে স্বাধিকারে আনাগােনা,
স্বরাজ-আপন ভাষা-আলাপনে, স্বরাজ-স্ব-রীতে চলা,
স্বরাজ—যা কিছু অশুভ তাহারে নিজের দু’পায়ে দলা
স্বরাজস্বয়ং ভুল করে তারে শােধূরানাে নিজ হাতে,
স্বরাজ-প্রাণীর প্রাণে অধিকার বিধাতার দুনিয়াতে।
সেই অধিকারে দ্যায় যারা হাত প্রেষ্টিজ-অজুহাতে,
স্বরাজ-সে নৈযুজ্য তেমন আমলাতন্ত্র সাথে ।
হাতে হাতিয়ারে শিক্ষা সূরাজ, স্বপ্রকাশের পথে,
স্বরাজ-সে নিজ বিচার নিজেরি স্বদেশী পঞ্চায়তে,
চারিত্রবলে আনে যে দখলে এই স্বরাজের মালা,
কর-গত তার সারা দুনিয়ার সব দৌলৎশালা,
গান্ধিজী
হাতেরি নাগালে আছে এর চাকী, আয়াস যে করে লভে,
অক্ষম ভেবে আপনারে ভুল কোরাে না।” কহে যে সবে ;
আত্ম-অবিশ্বাসের যে অরি, মূৰ্ত্ত যে প্রত্যয়,
পরাজয় আজো জানেনি যে, সেই গান্ধির গাহ জয়।
হেস না হেস না হ্রস্বদৃষ্টি, হেস না বিজ্ঞ হাসি,
মূৰ্ত্ত তপেরে শেখ বিশ্বাস করিতে অবিশ্বাসী,
অবিশ্বাসের বিষ-নিশ্বাসে হয় যে প্রাণের ক্ষয়,
বিশ্বাসে হয় বিশ্ববিজয়, বিজপে কভু নয়।
ব্যঙ্গমা ! তাের ব্যঙ্গ এবং বঙ্গ বাখান রাখ,
গুঞ্জনে শােন্ ভরি’ ভরি’ ওঠে ভারতের মৌচাক,
ভীরুলও হ’ল মৌমাছি আজ যার পুণ্যের বলে
তার কথা কিছু জানিস, তাে বল, মন দোলে কুতুহলে,
জানিস, তাে ব মােহনদাসেরে মহাদুষমন গণি
কি ফিকির আঁটে সুরা-রাক্ষসী পুতনা বােতনী,
বােতল কাড়িয়া মাতালের, গেল কোন্ তেলি কারাগারে,
কোলাট ঢাকে অশােকের লাট মদের ইস্তাহারে।
জানিস্ ত ব কি যে হ’ল ফল আবকারী-যুদ্ধের,
মধ-জাতকের অভিনয় শুরু হ’ল কি মগধে ফের!
ওরে মূঢ় তুই আজকে কেবল ফিরিসনে ছল খুঁজে,
খুটিনাটি বােল কবে কি বলেছে,তাহারি উততর যুঝে,
গােকুল শ্ৰেয় কি শ্রেয় খানাকুল—সে কলহ আজ রেখে
ভারত জুড়ে যে জীবন-জোয়ার নে রে তুই তাই দেখে।
পারি যদি তাে শুচি হয়ে নে রে স্নান করে ওই জলে,
চিনে নে চিনে নে মহা-আত্ম মহাত্মা কারে বলে।
'১১২
বেলা শেষের গান
এতখানি বড় আত্মা কখনাে দেখেছি কোনাে দিন ?
দেশ যার আত্মীয় প্রিয়—তবু বিশ্বাসহীন ?
দূরবীন ক’সে বিজ্ঞেরা ঘােষে, সূর্যের বুকে পিঠে
আছে মসী-লেখা!” আলাের তাহে কি হয় কমি এক ছিটে ?
সেই মসী নিয়ে হাস্যে তপন বিশ্ব ভরিছে নিতি,
রশ্মির ঋণ বাড়াঁয়ে শশীর, ফুলে ফুলে দিয়ে প্রীতি।
কুটিরে কুটিরে মহাজীবনের জ্বেলেছে যে হােশিখা,
দিন-মজুরের জনে জনে সঁপি’ মৰ্য্যাদা-শুচি টীকা,
পৌছে দেছে যে পৌরুষ নব চাষাদের ঘরে ঘরে,
যার বরে ফিরে শিল্পীর গেহ কাজের পুলকে ভরে,
যার আহ্বানে সাড়া দিয়েছে রে তিরিশ কোটির মন,
দেশের খতেন যশের অঙ্ক লেখে সাধারণ জন,
আত্মবিলােপী কর্মী-সঘ যার বাণী শিরে ধরি
নীরবে করিছে ব্রতের পালন দুঃসহ দুখ বরি’ ;
ছাত্রের ত্যাগে স্বার্থের ত্যাগে পুলকিয়া বহে হাওয়া,
রাজ-ভৃত্যের বৃত্তির ত্যাগে রাজপথ হ’ল ছাওয়া,
যারে মাঝে পেয়ে কাজিয়া থামায়ে হিন্দু ও মােসলেম,
‘আত্মদমন স্বরাজ’ সমঝি ভুঞ্জে পরম প্রেম,
মহম্মদের ধৰ্ম্ম-শোৰ্য্য যাহার জীবন-মাঝে
বুদ্ধদেবের মৈত্রীতে মিলি’ স্ফুরিছে নবীন সাজে ;
সারাটা জীবন খৃষ্টদেবের ক্রুশ যে বহিছে কাঁধে,
বিক্ষত-পদে কন্টক-পথে ‘সত্য-ব্ৰত যে সাথে;
যার কল্যাণে কুড়মি পালায় প্রণমিয়া চরকারে,
ভরে ভারতের পল্লী-নগরী কবীরের ‘কাচারে’ ;
অর্ঘপঞ্চক
১১৩
যাহার পরশে খুলে গেছে যতনিমহলের খিল,
পূরা হয়ে গেছে যার আগমনে তিরিশ কোটির দিল,
তার আগমনী গা রে ও খেয়ালী! গৌড়বঙ্গময়
গাও মহাত্মা পুরুষােত্তম গান্ধির গাহ জয়।
অর্ঘ্যপঞ্চক
(কবি কৃত্তিবাসের স্মৃতি-পূজায় বিনিয়ােগ )
বঙ্গ-বাল্মীকি
বাল্মীকি গড়িল যাহা সংস্কৃতের সংহত শিলায়
তারি কি নকল তুমি করেছ হে গঙ্গামৃত্তিকায়
কৃত্তিবাস ? তব কবিচিত্তের সুষমা রাশি রাশি
করেনি কি রঞ্জিত তা-সবে পদে-পদে ? তব হাসি,
তব অশ্রু? দেশের দেহের ধাতু ভক্তিনীরে ছানি
গড়েছ যে নব সীতা, নিৰ্ম্মিয়াছ নব সীতাজানি,
আর সে দোসর চির গড়েছ হে সােদর লক্ষ্মণ ;
ওগো কবি! তব স্পর্শে রামায়ণ হয়েছে নূতন,
হয়েছে যে বাঙালীর একান্ত আপন-মন্ত্রে তব,
বাল্মীকির পুনর্জন্ম তব তপে হয়েছে সম্ভব,
নির্মম দরে তুমি আ করি দেছ মমতায়,
জাগায়েছ দুবৃত্তের চিত্তবাসী সুপ্ত দেবতার ;
জীবে জীবে ওগাে কবি! জাগায়েছ শিব-সম্ভাবনা ;
নকল-নবীশ
নও, কবি তুমি, তুমি মহামনা,
দুষ্টের পরাণ-কোষে দেখিয়াছ অভীষ্টের ছবি,
গ্লানিহ তব গীতি, তব গান পবিত্র জাহ্নবী।
!
১১৪
বেলা শেষের গান
বাণীর পূজারী
“যার কণ্ঠে সদাকালে বৈসে সরস্বতী
বাণী-পূজা-দিনে উদয় তােমায়
উদয়ে ধন্য জন্মভূমি,
বঙ্গ-বাণীর পূজার প্রচার
যােড়শােপচারে করিলে তুমি।
অশেষে করিলে বিশেষে প্রকাশ,
আভাষে বাঁধিলে ভাষায় গুণী।
ভক্তির সাজি ভরিলে স্বদেশী
বাঁধুলি টগর দোপাটি চুনি।
কবি-সনােহ ফুটিল যে সরে
তব তপে সেথা আসিল নামি’
পাবনী ফোয়ারা জাহ্নবী-ধারা,
বাঁওড়ের জল সাগরগামী।
পল্বলে ওঠে প্লাবনের ঝােল,
কল্লোল ওঠে প্রণবে মিশি’ "
তােমার গানের সুরধুনী স্নেহে
শীতলিছে দেশ দিবস নিশি;
শীতলিছে আর করিছে অমল
চির-নিরমল পানের পানি,
ছােটো বড় তাহে সুখে অবগাহে
রাঢ়-বাংলার নিখিল প্রাণী।
দেব দেবলােকে যে ছিল গাে,
তব তপে সে যে এল কানাচে ;
বিধান দাতা ১১ সপ্তকোটির হৃদয়-পরাণ আজ তব নামে তাইতাে নাচে। সপ্তকোটির মিলন-তীর্থ তৃণ-সুনীচেরও মনের মিতা, পূজারী পসারি সবারী যে তুমি একাধারে চারি বেদ ও গীতা। তােমার গানের রেশ লাগি কানে কত প্রাণে গান উঠিল জেগে, কত নীহারিকা সূৰ্য্য হ’ল গাে দানা বেঁধে তব জ্যোতিমেঘে। ভক্তির বলে শক্তি জাগালে, দেশ-ভারতীরে করিলে ধনী, বাংলাদেশের বাল্মীকি ওগাে, বঙ্গবাণীর পদ্মযােনি। বিধান-দাতা তােমার কথাই মান্ব মােরা, মনুর বচন মানব না, সংহিতাতে ছাই দিয়ে আজ চলুক তােমার গান শােনা। তােমার গানে পেইছি যে ধন, সার সে সকল সংহিতার- কবি যখন বিধানদাতা সবাই পাবে ন্যায়-বিচার।
১১৬
বেলা শেষের গান।
ক
তােমার গানের তােমার প্রাণের
পঞ্চবটীর আবৃছায়ায়
কত যে বীজ ছড়িয়ে আছে
বলবে কে তা জাবে হায় !
আদি-কবি নও হে শুধু,
সাম্য-সামের হও আদি
কাঠগড়তে বামুন-ঠাকুর
পথের কুকুর ফরিয়াদী।
কুকুরকে দাও ডিক্রি তুমি,
ঠাকুরকে দাও দণ্ড হে,
রাজার সেরা রামকে দিয়ে
ককূলে একি কাণ্ড হে!
অন্যায়ে মন আয়নি সে সায়
বুঝছি সে সুপষ্ট হে,
কবি! তােমার প্রাণ যে কাঁদায়
উৎপীড়িতের কষ্ট হে!
কুকুরকে তাই জয় দিয়েছ,
পৈতে ছেড়ার শঙ্কা নেই,
সাম্য-মহাসাম গগয়েছ
হয়তাে নিজের অজ্ঞাতেই।
উদ্ভাসিছে গান যে তােমার
ভবিষ্যতের পূর্ব-ভাস,
কবি তুমি, দ্রষ্টা তুমি
কীর্তিমন্ত কৃত্তিবাস।
যশোধন
শূদ্র-দ্বিজের পৃথক আইন
আছে মনুর কুকীর্তি,
ঠাকুর-কুকুর একসা করে
নড়িয়ে দিলে সে ভিত্তি।
গানে তুমি মন কেড়েছ,
তােমার পিছেই চবে দেশ;
গানের গায়ন কয় যে আইন
সেই আইনই ফলবে শেষ।
যশােধন
“যেথা যাই সেথাই গৌরব মাত্র সার।”
চাও কেবল যশ অমল
কীর্তিসার কৃত্তিবাস !
স্বর্ণ নয়, হৰ্ম্ম নয়,
দাস-দাসীর নাইক আশ।
ওনা পদ, পয়সা নয়,
রাজপ্রসাদ চাওনা তাও,
গৌরবের সৌরভেই
মন মাতাল, ধাও উধাও।
ঢের রাজার যাও সভায়,
গান শােনাও, রস বিলাও,
রাজ-শ্রেতায় দ্যায় যা পায়
নাওনা তাও, তাও ফিরাও।
এই তাে ঠিক প্রাণ কবির,
এইতাে রীত ম-ভােলার,
বেলা শেষের গান = রাজ-দাতায় দাও জবাব “নিই নে দাম দিল্ খােলার। যাই যেথাই রস বিলাই পাই সেথাই যশ কেবল, লই যে দান সে সম্মান আর শ্রোতার মন্-কমল।” এই কবির উচ্চ শির- এই কবির উচ্চ প্রাণ- হােক মােদের হােক্ সহজ কৃত্তিবাস কীর্তিমান্। উচ্চলােত দগ্ধ হােক সব কবির মাের দেশের,- পূর্ণতার উৎস যার চিত্ত, তার ক্ষোভ কিসের? দাও হে বর-হেঁট না হয় শির কবির বঙ্গে আর, যেই দেশের মূল গায়ন কৃত্তিবাস কীর্তিসার। অগ্রহারী ওগাে ! কবি ! কাল-ভােলা কীৰ্ত্তি তােমার অচপল, মৃত্যু-বিজয় তব কাব্য সল ; কণ্ঠে পিযুষ তব নিত্য-কালে ; রাজটীকা ভায় তব দীপ্ত ভালে। ঝরে অগ্রহারী ১১৯ তুমি ওঠে ; আনে তুমি এলে তুমি এল কঙ্কালে প্রাণ দিলে সঞ্চারিয়া! মন্ত্রে তােমার মৃত সিংহ জীয়া! হর্ষে শ্যামল হ’ল রিক্ত মরু! সঙ্গীতে মুঞ্জরে শুষ্ক তরু! অব্দেরি বীকে অঙ্গ, ঢাকা, উদ্ভাসে বঙ্গ ও-কীর্তি-রাকা কণ্ঠে সরস্বতী, চক্ষে বিভা; গৌড়ে নূতন দিবা ঐ-প্রতিভা। বঙ্গবাণীর প্রিয় আদ্য কবি বজ্র-সাধন-শেষে সৌম্যছবি ; নিৰ্ম্মিলে দেশ-ভাষা কাব্য-ছাঁদে, গঙ্গা তরঙ্গিয়া শঙ্খনাদে ! মান্সবােবর-জলে হংস তুমি, স্বপ্নে বাণীর পাদপদ্ম চুমি পথ ভােলা হংস শ্রীপঞ্চমীতে বা দেবতার বীণা এই নিভৃতে। জাগলে দখিন হাওয়া পূর্ণ মাবে কুঞ্জে কোকিল শান কেউ না জাগে, জাগিয়ে যখন দিলে জাগল সবাই, লক্ষ পাখীর গানে বিশ্রামই নাই। সব গানে গুঞ্জনে অর্ঘ্য তােমার, বঙ্গ পরায় গলে বন্দনা-হার, ছন্দে যে, শিষ্য সে কৃত্তিবাসের কেন্দ্র,হে ছন্দেরি, রাস-বিলাসের। ছিলে বুঝি এলে বহি তুমি যবে তুমি আজি আজি সারা লেখে তুমি
১২•
বেলা শেষের গান
আজি
তারি
বিশ্বে যে পয় পূজা বঙ্গবাণী
গড়লে প্রথম তুমি আাখানি,
পূজবে যে পূজবে তােমায় সে, কবি ।
অজ্ঞানে অর্পিবে যজ্ঞ-হবি।
.
শ্রদ্ধা-হােম
(কবিগুরু-প্রশস্তি। গৌড়ী গায়ত্রী ছন্দ)
জয় কবি! জয় জগৎপ্রিয়
বরেণ্য হে বন্দনীয়।
অগম শ্রুতির শ্রোত্ৰয় ! জয়! জয়!
প্রাণ-প্রণবের দ্রষ্টা-নব।
গান সে অসপত্ন তব,-
অমৃত-সমুদ্ভব! জয়! জয়!
যুব প্রাণের গাও আরতি,
যে প্রাণ বনে বনস্পতি,
নবীন সবনের ব্ৰতী! জয় ! জয়!
বাক্ তব বিশ্বম্ভবা সে,
নৃত্যে মাতায় বিশ্ব-রাসে,
চিত্তে দোলায় উল্লাসে! জয়! জয়!
পাবনী-বাগদেবীর কবি।
পাবীবীর গায়ন !ি
পুণ্য পাবকচ্ছবি! জয়! জয়!
জয় কবি ! জয় হৃদয়-জে।
দিগ্বিজয়ীদিগের নেতা।
চি-সায়ন প্রচেতা! জয়! জয়!
মাতা মনু
শ্রদ্ধা-হােমের লও আহুতি,
মানস-হবি এই আকুতি ;
কবি! সবিতা-তি! জয়! জয়!
প্রাণের কাঙাল, মানের নহ,
মান ঠেলে পায় কুলির সহ
অসম্মানের ভাগ লহ ! জয়! জয় !
তােমায় দেখে প্রাণ উথলে,
হাসি-উজল চোখের জলে
অফুট বােলে দেশ বলে—‘জয়! জয়!
তােমার সুব্রহ্মণ্যা বাণী
তারার ফুলের মাল্যখানি
কণ্ঠে কবি দ্যা আনি! জয়! জয়!
মাতা মনু
পাখী ডেকে ওঠে ওই গাে ওই,
• বয় ভােরের হিম বাতাস ;
জাগল কার শান্ত চোখ
ফুটল কাপুষ্পহাস!
ভিজে ওঠে আঁধারের আঁচল
মেক্তিকের স্নিগ্ধ ভায়,
কম্পমান অঙ্গে স্নান
কল্প-শেষ রাত্রি যায়।
বেলা শেষের গান সারা-নিশি-ভরা যন্ত্রণার দুঃস্বপন টুটুল মাের, অশ্রু আর দুর্দশার হয় রে শেষ, হয় রে ভাের। একাকী আছিনু মুহ্যমান এই ধূলায় কল্প কাল ; কার আল-ফুল চাপার, বুল আজ স্বপ্নজাল। কোথা হতে এল এই অতিহ্- এই কোমল—এই অরুণ- এই চমৎকার আমার মাের প্রসব—মাের প্রসূন। --- বাছা! ওরে বাছা! মাের দুলাল ! মাের হিয়ার একটি ফুল । সঙ্গী মাের—অঙ্গ মাের— স্বপ্ন মাের—তুই অতুল ! তােরে পেয়ে প্রাণে উল্লাসের উঠল ঢেউ, ভুল বুক, উৎসবের উৎস তুই, উৎসুকীর নিত্য সুখ। তােরে হেরে চোখে নেই পলক, হাল্কা তুই- মাের পুতুল, পাপড়িময় তাের শরীর প। তুই প্রাণ-মুকুল।
মাতা মনু ১২৩, কোথা তােরে আমি রাখব বল, কই তেমন ঠাই কোথায় ? হায় রে হায় একটুতেই অঙ্গে তাের নােছা যায় । পাথরে কাকরে এক্সা ভূঁই ঘুচলাে-ধার বন কাটার, স্থল যেমন তেমনি জল,- দু-পাথর-মুন্-পাথার। কোথা পাব আমি ইন্দ্রাণীর মারের শ্যা, হায়, দুর্ভাগার দুখ-হরণ এই রতন থুই কোথায় ? অদিতি যদিচ বােন্সতী হায় রে এই বঞ্চিতার,- বঞ্চি কাল এই ধূলায়, স্বর্গে ভাগ নেই আমার। সােদরা অদিতি মাের নিজের, সূৰ্য্য চঁাদ পুত্র তার, তার ছেলের রূপ-ছটায় মূচ্ছ। পম অন্ধকার। তারা পেয়েছিল জন্মিয়েই নীল গগহিন্দোলায়, তাের তেমন কিছু নেই- জন্ম, হায়, তাের ধূলায়। ০ ১২৪ বেলা শেষের গান ক্ষিদে পেলে তুমি ঠোট ফোলাও, কই আধার ? হায় রে হায়। দুর্ভাগার পুত্র তুই, বৎস মাের নিঃসহায়। হরিষে বিষাদে দ্বন্দ্ব ঘাের মাের হিয়ায় আজ কেবল, দুখ-সুখের ঝঞ্চনায় কাঁপছে বুকমন বিকল। আঁখি ভরে আসে জল কেবল ঝাপসা চোখ একশােবার- নেই রে নীড় মাের শিশুর, খাদ্য নেই মাের বাছার। নাড়ীতে নাড়ীতে কান্না-রােল, মন শরীর প্রাণ অধীর, হয়না ক্ষার এই হিয়ার রক্তধার মিষ্ট ক্ষীর ? ক্ষণে-ক্ষণে ছেয়ে ফেলছে সব অশ্রুময় অন্ধকা। নয় নিখুৎ-নয় রে সুখ- ধন পেয়েও সাত রাজার। ‘দনু-দিতি-অদিতি আপন মার পেটের বােন আমি, বােন্সতীন আমরা সব সব বোনের এক স্বামী।
। মাতা মনু ১২৫ আমি অভাগিনী সব-শেষের প্রেচরুর পাইনি আগ, , সব নীচেই ঠাই আমার, পাইনি তার ঢের সােহাগ। দাসীপনা করে সাত বােনের কাটুল মাের কাটুল কাল এই কঠিন এই ধূলার পৃথ্বীপর সাঁঝ-সকাল। দুখেরি তপে যে দিন কাটায় তার তপেই নেই কি ফল ? আজ আমার হােক সহায় সেই তপের পুণ্য-বল। স্নেহ বলে শুধু করতে চাই মাের বাছার দুঃখ দূর, হবে তার সব অভাব এই হিয়ার স্বর্গপুর। কিছু যে পেলেন পিতৃধন- থাকতে যার নেই গেহ, বিত্ত তার মার আশিস, নিত্য-নীড় মাের স্নেহ। বাছা ওরে বাছা! মাের দুলাল! ভাবনা নেই, ভয় কি তাের, স্বর্গ নিক সূৰ্য্য চাদ, রত্ন নি সর্প চোর।
১২৬, বেলা শেষের গান প তুমি যে পেয়েছ মাতৃকোল,- দেবতা সব যার ললাভে জন্মাবেন এই ধরায় ম্লান ধূলার সংক্ষোভে। ফিরে-ফিরে হেথা ফুটবে ফুল, উঠবে গান নিত্যকাল, এই ধরায় নন্দনের মন্দারের মুইবে ডাল। তােরি স্নেহে দেহে দুধ-নদীর ' উঠল ঢেউ লাল লােহে । তাের পরশ ইন্দ্রজাল, তাের হরষ মন মােহে। ভালবাসা সে যে দৈবী তপ যত্ন মার দিব্য হােম, সেই হােমের তুই পাবক- তুই পাবন স্বর্ণ-সােম। মায়েরি পীযূষে তুই অজয়, তাের কবচ মার আশিস; সাপ,গরুড় দেব-দানব তাের মাঝেই ভুলবে বিষ। তরি প্রাণে সবে কবে বাস, ঘিরূবে তাের বক্ষনীড়, সাত পাতাল তাের জানিস, তুই মালিক সব নিধির।
মাতা মনু ১২৭ স গরুড়ের মত কুণ্ঠাহীন ফিবি বৈকুণ্ঠ তুই, পাখনা নেই? প্রেম এবং প্রজ্ঞা তাের পাখনা দুই। দানবেরা হবে স্বপ্ন-শেষ, দৈত্যানুর যুগ পরে থাকবে তাের বিক্রমের বিদ্রোহের অন্তরে। দ্বাদশাদিত্যে কবে স্নান তাের ধ্যানের দিব্য চোখ, ছাইবে লােক মৈত্রী তাের, ধর্লোকের তুই আলােক! তপে তােরি হবে অগ্নি স্নান, বিদ্যুতের ক্ষীণ দ্যুতি ; সৃষ্টি তাের সৃষ্টিসার- সূক্ত, সাম, গান, স্তুতি। ত্রিভুবনে হবি সব-সেরা সব-শেষের সৃষ্টি তুই, তুই রে ধন বুক চেরা, মিষ্টি তুই, মিষ্টি তুই! মায়েরি-আশিসে তুই রে বীর, তুই তাপস তপ বিপুল, ইন্দ্র নস, চন্দ্র নস, . ন’স অমর,-তুই অতুল।
১২৮ বেলা শেষের গান . এ মম স্নেহেরি সব ধারায় স্নান করায়, ধন, তােমায়। দ্যায় লেহন সব লেহায় বৎস তাের সর্ব গায়। দিনে দিনে বেড়ে উঠবি তুই মাের প্রাণের পুণ্যদীপ ; এই ভূলােক ভবি তুই, মেলবি দল স্বর্ণ নীপ! যুগে-যুগে জেগে রইল মাের দুই নয়ন আর পরাণ। ক্লান্তি তাের করব দূর, ঘি রােজ তাের শিথান। চুপে বসে নিতি শুত্ব তাের মঞ্জু গান দৃপ্ত ভাষ, দেখব তাের উচ্চ শির উচ্চ প্রাণ উচ্চ আশ। ঘ্রাণে প্রাণে পাব এই কেশের সৌরভের নীপ-কেয়া, শুদ্ধ বােজ ওই ‘মা’-বােল নাম ও মাের তাের দেওয়া। কি নামে মা তােরে ডাকবে বল? তুই মনুর—তুই মনুজ- কশ্যপের অংশ তুই দেবতাদের তুই অনুজ।
আখেরী
০
১২৯,
তােরি চোখ চেয়ে দেখতে পাই
দূর ভবিষের লিপি,
রক্তিমায় অঙ্গারের
অঙ্গ ছয় দীপদীপি।
তােরি তপে হেরি এই কঠোর
কূপিঠ শস্যময়,
তাের হিয়ার নীড় মাঝার
স্বর্গ রয়, বিশ্ব বয় !
বাছা ওরে বাছা! মাের দুলাল !
মাের হিয়ার মূর্ত-প্রাণ!
তাের হাসির ফুল্ল ভায়
চন্দ্র স্নান—সূৰ্য্য ম্লান।
আখেরী
বকেয়া হিসাব চুকিয়ে দে রে বছর-শেষের শেষ দিনেতে,
মজ্জাগত গােলাম-সমঝ শেষ করে দে, শেষ করে দে।
কেউ কারো দাস নয় দুনিয়ায়, এই কথা আজ বলব জোরে;
মিথ্যা দলিল তাদের, যারা জীবকে দ্যাখে তুচ্ছ করে।
দলিল তাদের বাতিল, যারা মানুষকে চায় করতে খাটো,
হাম্বড়াইএর সংহিতা কোড, বেবাক কাটো, বেবাক কাটো
সবাই সমান এই জগতে—কেউ ছটো নয় কারােই চেয়ে,
কার কাছে তুই নােয়াস মাথা, চোখে কম্পদেহে ?
সবাই সমান আঁতুড় রে, বলের দেমাক মিছাই করা,
সবাই সমান শ্মশান-ধূলে, বড়াই-ধুয়া মিছাই ধরা।
১৩০
বেলা শেষের গান
মিথ্যা গরব গােত্র-কুলের, মিথ্যা গরব রঙ বা ঢঙের,
ভেদের তিলক-তমাতে লােক সংখ্যা বাড়ায় কেবল সঙের।
মরদ বলেই গরব যাদের, চায় নারীদের দলতে পায়ে,
তৈমুরও যার শুন্তে মানুষ মরদ সে কি ? আয় সুধায়ে।
চেঙ্গিজও যার পীযুষ-কাঙাল পুরুষ সে কি ? জিজ্ঞাসা কর ।
মাংসপেশীর পেষণ-বলে হয়না মহৎ হয়না ডাগর।
কংস জরাসন্ধ রাবণ সেকেন্দার ও মিহিরকুলে
দেখে নে তুই কল্পনাতে প্রসব-ঘরে শ্মশান-ধূলে।
মিছের ঝুলে আকাশ জুড়ে জাল পড়ে যে জছে কালি,
পুড়িয়ে দে তুই সেই লুজাল দুইহাতে দুই মশাল জ্বালি।
পুড়িয়ে দে তুই স্বর্গ নরক, পুণ্য পাতক ছাই করে দে,
লােভের চিঠা ভয়ের রােকা জ্বালিয়ে দে একসঙ্গে বেঁধে
মেকীর উকীল মেকলে আর ভারত-মন্যু মনুর পুথি
স্বার্থ-ক্লিন্ন যে শ্লোক ঘৃণ্য বহ্নিকুণ্ডে দে আহুতি।
আৰ্য্যামি আর জিঙ্গোপনায় ছাই দিয়ে দে, কিসের দেরী,
ছাই হয়ে যাক মর্দ-গরব, আজ আখেরী—আজ আখেরী।
প্রণাম দাবী করছে কারা মুনি-ঋষির দোহাই পেড়ে ?
স্পষ্ট বলি পৈতাগুলায় ও-লােভ দিতে হচ্ছে ছেড়ে।
থাইকো দরে আদর করে অমানুষের দল বেড়েছে,
থাক-বাঁধা জাত মিছার অবাদ, বিচার-বুদ্ধি দেশ ছেড়েছে।
হাজার হাজার বছর পরে দেশছাড়া ফের ফিছে দেশে,
ভয় ভেগেছে উষার আগেই, দেশ জেগেছে স্বপ্ন-শেষে !
দেশ জেগেছে অবিচারের বন্যাতে বাঁধ দেবার আশে,
পাইকারী প্রেম থাউকে ভক্তি উড়িয়ে দেব অট্টহাসে।
আখেরী
১৩৯
-প্রণাম কারাে একচেটে নয়, শ্রদ্ধেয় যে শ্রদ্ধা পাবে,
দধীচ মুনি মহৎ বলে অর্ঘ্য ভবানন্দ খাবে?
ঘুষ খেয়ে যে ডুবিয়ে দিলে সােনার বাঙলা অন্ধকারে,
বামুন বলেই পূজব কি সেই ঘরের কুমীর মজুন্দারে ?
বামুন বলেই করূব ভক্তি চাঁদ-কেদারের পুরােহিতে,
অন্নদাতার কন্যাকে যে মুসলমানে পালে দিতে?
বামুন বলেই কব খাতির শুনঃশেপের ঘৃণ্য পিতায়—
হাড়কাটে যে নিজের ছেলে বাধতে রাজী, ধন যদি পায় ।
ঘুষের রাস্তা বন্ধ দেখে রাজায় ডেকে যজ্ঞশালে
পুত্র বলির যুক্তি যে চায় পূজব কি সেই খণ্ডহালে?
বামুন বলেই পূজবে হিন্দু ভৃগুকুলের মত্ত হাতী ?
কৃষ্ণপ্রেমিক পূজবে তাদের কৃষ্ণে যারা দ্যাখায় লাথি ?
ভিক্ষু শ্ৰমণ চাইতে কিছু দক্ষিণ কম মিল বলে
হষেরে খুন করূতে যে যায়, অলােভ তাদের কই কি ছলে ?
গুজরাটেতে আবরু নিয়ে দাঁত খিচিয়ে পরস্পরে
স্বদেশ যেজন পরকে দিলে পূজব কি সেই বিবরে ?
রাজপুতনার গড় ঘিরে যে, মুসলমানের অভিয়ানে,
বাঁধতে গরু যুক্তি দিলে পূজব কি সেই বুদ্ধিমানে?
“দুর্গপথে তুলসী ছড়াও, মাড়াতে তায় নারূবে মােগল”
এমন যুক্তি যাদের তারাও ভক্তিভাজন ? হায়রে পাগল।
হিন্দুচুড়া নন্দকুমার-যে পরালে তাঁরেও ফাঁসি
গলায় দ’ড়ে রাম-ফাঁসুড়ে তারেও দেব অর্ঘ্যরাশি ?
তুড়ঙে যার শালােনাকো, আতে হ’ল গিলােটনে
মদ্ৰ হ’তে বঙ্গভূমে, সেও বেঁধেছে বিপ্র-ঋণে ?
১৩২
বেলা শেষের গান
পুলিশ টাউট্ নেশায় আউটগঙ্গাজলী সাক্ষ্য দড়
বিট বিদূষক ভেড়য়া পাচক বামুন বলেই মানব বড় ?
কালিদাসের কাব্য অমর, তার গুণে দেশ আছেই কেনা,
তাই বলে পাউরুটিওলার পায়ের ধূলাে কেউ নেবে না।
জাতের খাতায় সাফ সুকৃতি দেখিয়ে শুধুই মস্ত হবে ?
দুষ্কৃতি যে দেউলে’ করে দ্যায় তলিয়ে অগৌরবে
তারে হিসাব চাইছে জগৎ, দাখিল করাে নাইক দেরী,
প্রণাম দাবী ছাড়তে হবে নাইক দেরী, আজ আখেরী।
শ্রদ্ধাভাজন সত্যি যে জন তারেই মানুষ শ্রদ্ধা দেবে,
রাহাজানি ককূলে ভক্তি বিশ্বমানব হিসাব নেবে।
পাইকারীতে তরায় না আর জাতের টিকিট মাথায় এটে,
সে যুগ গেছে, সে দিন গেছে, সে কুয়াসা যাচ্ছে কেটে।
সেক্সপীয়ারের স্বজাত ব’লে পুছবে না কেউ কিপলিঙের,
চৌচাপটে ভক্তি করার রােগটা ক্রমে আসছে সেরে।
বা সেরিডান মহৎ ব’লে ইম্পে-ক্লাইব পূজবে কেবা?
হেয়ার বেথুন স্মরণ করে হোঁৎকা গােরার চরণ-সেবা ?
কর্জনেরে কেউ দেবে না লর্ড ক্যানিঙের প্রাপ্য কভু,
লঙ, সাহেবের মর্যাদা কি লুটবে জিঙ্গো পাী প্রভু ?
হৈমবতী উমার অর্ঘ্য কাড়বে ওলাই-চণ্ডী কি হয় ?
বেসান্ট, সে নৈবেদ্য নেবে অর্পিত যা’ নিবেদিতায় ?
রং দেখিয়েই ভড়কে দেবে? তেমন শিশু নাই দুনিয়া,
ভিক্টোরিয়ার প্রাপ্য নেবে ডায়ার প্রেমী হিষ্টিরিয়া ?
মন্দ ভালাে গুলিয়ে দেবে এমনি কি মাহাত্ম ত্বকে ?
ফস। ব’লেই কব খাতির চর্ম গূঢ় মহত্ত্বকে ? ·
।
আখেরী
।
১৩৩
।
দোকানী যে রেজকী কুড়ায়, নাক তুলে রাজ-কায়দা করে,
তারেও কি রাজভক্তি দেব? রাখব কী ধন রাজার তরে?
অভদ্র যে রেলগাড়ীতে, অভব্য যে খেলার মাঠে,
তারেও নাকি কব খাতির অকথ্য যে রাস্তাঘাটে ?
নিশীথে যার হরিণ শীকার, ফকির শিকার দিন দুপুরে,
যার পরশে কুলির প্লীহা বিক্ষুবকের মতন ফুরে,
রাস্তাতে যে বুকে হাঁটায়, নিরস্ত্রে যে খাওয়ায় খাবি,
ঘােষ্টা খুলে দ্যায় যে থুতু, রাজপূজা সেও করূবে দাবী ?
সাহেব বলেই কব সেলাম ? মন্দ ভালাে বাছব নাকো?
অন্যায়ে যে কবে কায়েম বলব তারে সুখে থাকো?
খুনীরে যে দেয় খােলদা আইন গড়ে রাতারাতি
প্রশস্তি তার পড়ব কি হায়, প্রকাশ করে দন্তপাতি ?
গােরা ব'লেই গৌরবে কি দিতে হবে শ্ৰী বুট মুড়ে ?
বামুন বলেই নাহক প্রণাম করূতে হবে হস্ত জুড়ে ?
মরদ বলেই মর্দানি কি সইবে নীরব মাতৃজাতি?
আত্মলাভের প্রসাদ-পবন জাগছে রে দ্যাখ, নাইক রাতি।
সঙ্কুচিত চিত্ত জাগে- দেখিস, কি আর চিন্তার টেরি,
হিসাব নিকাশ করূতে হবে, আজ আখেরী, আজ আখেরী।
ক্ষ
বুঝ সমঝের বইছে হাওয়া, গােলাম-সমঝ, যাচ্ছে টুটে,
সাবালকীর কছে দাবী সব দুনিয়া দাঁড়িয়ে উঠে।
মুরুব্বিদের কছে তলব, চাইছে হিসাব, চাইছে চাবি, •
মানুষ বলেই সকল মানুষ ইজ্জতেরি করূছে দাবী।
তাবৎ জীবে শিব যে আছেন রুদ্র, তিনি অবজ্ঞাতে,
নিখিল লয়ে র নারায়ণ পুণ্য পাঞ্চজন্য হাতে।
১৩
বেলা শেষের গান
তাঁর সাড়া আজ সকল প্রাণে বর্ণ-জাতি-নির্বিশেষে।
বিশ্বে নিকাশ-আখেরি আজ নূতন যুগে যুগের শেষে।
চিনি ব’লে চুন যে খাওয়ায় চলবে না তার সওদাগরী,
নিখুত হিসাব তৈরী করাে-রেখােনা ভুল খাতায় ভরি’ ।
খাদ ক’ষে দাম চুকিয়ে দেবার দিন এসেছে এবার দেশে,
মদের গেলাস আছড়ে ভাঙো, মুরুব্বিদের ওড়াও হেসে।
মন খুলে বল্ মনের কথা, জমতে বুকে দিসনা ঘৃণা,
মন্দকে বল্ মন্দ সােজা, পালিস বিনা--সাবিনা।
দাম-নিরূপণ পাটিয়ে কর -রদ্দি যে তায় ফেল রে ছুড়ে,
মধুফলে মিলে পােক। ঠাই হবে তার আঁস্তাকুড়ে।
সত্য কথা বল্ খােলস-করিসনে ভয় নিন্দা গালি,
মিথ্যাবাদী নাম যারা দ্যায় তাদের মুখে দে চুনকালি ।
পাওনা দেনা ঠিক দিয়ে নে-দিল-গােলামীর নিকাশ ক'রে,
মানুষ আবার মানুষ হবে বিশ্বে বিশ্বনাথের বরে।
রুজু দিয়ে পাতায় পাতায় খরচ জম তৈরী রাখাে-
জান্ধা-জুজুর ভয় কোরাে না, ঠিক দিয়ে ঠিক্ তৈরী থাকো।
নতুন খাতার বেদাগ পাতায় স্বস্তিকে কে সি দূর দেবে--
তৈরী থাকো; অরুণ উষায় নতুন জীবন আসবে নেবে।
ক
দিল্লী-নামা
প্রম কলি
অতুল! বিরাট! বিপুল দিল্লী!
শত-সম্রাট প্রেয়সী অয়ি
গজমােতি-গুড়া তব পথ-ধূলা,
মােহিনী! রূপসী ! মহিমাময়ী!
দিল্লী-নামা
তুমি চির-রাণী, চির-রাজধানী,
চির-যৌবনা উর্বশী যে,
ইন্দ্রের তুমি মর্ত্য-বিলাস
ইন্দ্রপ্রস্থ তুমি যে নিজে !
তুমি অতুলন ময়ূর-আসন,
শত ফুলবন কলাপ তব ;
চির-শূরবীর দিগ্বিজয়ীর
তুমি গাে বাহন্ যুবন-নব।
সাতটি রাজার নিধি সে মাণিক
দাম তার কেউ বলিতে নারে,
সাতশাে রাজার নিধি তুমি, তব
পায়জোর ভারী মাণিক-ভারে।
দিলু কি দিলীপ নাম দিল তােরে
দিল্লী গাে দিদার নগরী।
ভুলে গেছি মােরা পুরাণাে সে কথা,
ভুলে গেছি রাজ-রাজেশ্বরী ।
জানি শুধু তুমি চির-লােভনীয়।
কামনার ধন অবনীতলে,
রজোগুণ রাঙা আগুনের শিখা
দীপিছ, দহিছ, হাজার ছলে !
তুমি বিচিত্রা! তুমি ব্রাদুকরী !
শত রাজা লুটে ওই চরণে ;
শােণিত-মদ্যে অভিষেক তব
যুগে যুগান্তে রণাঙ্গনে।
বেলা শেষের গান
।
দ্বিতীয় কলি
হাজার হাজার বীরের রুধিরে
আঁকিয়াছ ভালে বক্তটীকা,
গড়-কেল্লার কঙ্কাল-জালে
সাজিয়াছ আজ তুমি কালিকা!
ভৈরবী তুমি, ভুবনেশ্বরী!
যুগে যুগে তব শব-সাধনা,
শবের পাহাড় তব পাদপীঠ
আসন তােমার বামুকী-ফণা!
হিন্দুর দৃঢ় লােহার কীলক
বিধে আছে সেই ফণার পরে,
অযুত যুগের স্তম্ভ অটল
রাজদণ্ড সে তােমার করে।
উগ্ৰ তােমার আঁখির দৃষ্টি,
ব্যগ্ৰ তােমার অধরে হাসি,
আগ্রহ তব পাষাণ-মুঠিতে,
তবু অদৃষ্টে তুমি উদাসী ।
খপরে পান করিয়াছ তুমি
দুঃশাসনের দর্প-মােহ,
কুরু-চৌহান মারাঠা-পাঠান
তেমুর-মােগল শিখের লােহ !
কত ভূপতির শ্মশান তুমি যে
করিব তাহার কি লেখা-জোখা ?
কুমাের-পােকার কেল্লা গড়িয়া
কত মরে গেছে কুমাের-পােকা!
দিল্লী-নামা
১৩৭,
তৃতীয় কলি
মােগল মরেছে, মরেছে পাঠান,
জেগে আছে তার কীৰ্ত্তি যত,
কেল্লা-কসর পাহাড়-সােসর
বুরুজ-মীনার সমুদ্যত।
পাণ্ডব নাই, যজ্ঞের তার
কুণ্ড বৃহৎ আজিও রাজে,
নাই পৃথুরাজ, রায়-পিথােরার
প্রাচীর এখনাে দাঁড়ায়ে আছে।
রয়েছে ‘কুতব’, নাই কেহ সেই
কৃতরাজ ক্রীতদাসের কুলে,
শের শাহ নাই, শের-মণ্ডলে
আজিকে কেবল বাদুড় বুলে!
কাব্য-রসিক হুমায়ুন নাই,
রয়েছে তঁাহার কেতাবখানা,
দীনহীন বেশে আছে দাড়াইয়া
‘দী-পান’ আর ‘জাহানপােনা।
তোগলকাবাদে শৃগাল ফিরিছে,
ধাওলিতে ভেক নাহিছে শুধু,
ফিরোজাবাদের শূন্য মহল,
শুষ্ক নহর করিছে ধূধূ।
ধৰ্ম্মাশােকের মনের মূরৎ,
স্তম্ভ উখাড়ি’ দিল্লী 'পরে
স্থাপিল যে, হায়, সে আজ কোথায় ?
ঘুমায় সে কোন্ ধূলির স্তরে।
বেলা শেষের গান
কত অতিকায় কামনার কায়া
কঙ্কালসার পড়িয়া আছে,
অতীত জীবের শিলা-পঞ্জর
পাষাণী গাে! তোর পায়ের কাছে
চতুর্থ কলি
কতবার হাসি কত নিম্মোক
ত্যজিলে হেলায় দিল্লীপুরী।
কত বেশে আহা কালে কালে তুমি
জগতের মন করিলে চুরি!
ভাবিনী ! তােমার অশেষ ভাবন,
সােনলি তােমার রঙীন পাণি,
শিলার সাঁজোয়া গুম্বজ-তাজে
সাজিয়াছ তুমি রাজার রাণী
সপ্ত শিঙার সজ্জা তােমার,
তােমারে ঘিরিয়া রয়েছে পড়ি ;
যে শাড়ীটি দিল অনঙ্গপাল
পড়ে আছে তার পাড়ের জরি।
তাতারীর বেশ পড়ে আছে তব
বিপুর্ণ তব-মীনার-ঘরে,
খিজাই সাজ এসেছ ছাড়িয়া
কখন্ আলাই-দরােজা পরে।
রঙীন ফিরােজী পেশােয়জ তুমি
অশােকের লাটে লুটালে হােথা,
দিল্লী-নামা
• ১৩
ছাড়িলে ঘাঘরি তােগলকি স্মরি’
পিতৃঘাতের পাপ-বারতা।
পাঠান-পােষাক শের-মসজিদে,
মােগল-পােষাক সাজাহাবাদে,
লােদির দত্ত বােকা তােমার,
কে জানে সে কোন্ ধূলায় কাঁদে?
পঞ্চম কলি
তোমার বক্ষ আসন করেছে
কত রাজা, কত বাদশাজাদা,
উচ্চাভিলাষ-বিলসিত ভূমি !
আধা মধু তব মদিরা আধা !
ভারত মৃগীর তুমি মৃগনাভি,
সৌরভ তব ভুবন জুড়ি’,
তুমি রমণীয় ইন্দ্রের প্রিয়
তুমি—তুমি পারিজাতের কুঁড়ি!
মােগল বাগিচা সাজায়েছে হেথা,
পাঠান গেঁথেছে মীনার তার,
'ও রূপ-লােলুপ কত ভূপ, হায়,
করেছে রাজ্য-বলাৎকার।
কত ভবঘুরে পশিল এ পুরে
বাশার পরে বাদশা হয়ে,
ক্ষমতা-মদের লক্ষ মাতাল
ঘুমাল ও
ও-বুকে
প্রলাপ কয়ে।
.
১৪০
বেলা শেষের গান
কা
কত হানাহানি, কত কানাকানি,
কত সলা, ষড়যন্ত্র কত,
রাজ্য কামুক কত কালামুখ
ন্যায়-ধরমেরে করিল হত।
ধরম তেয়াগি” শুধু তাের লাগি
পিতায় ভ্ৰাতায় বধিল প্রাণে ;
আপন ছেলের আঁখি উপাড়িল,
আয়ু নিল হরি আফিম-দানে ।
ন্যায়ের নিখতি আঁখি-আগে রাখি’
শত অন্যায় করিল, মরি,-
দিল্লীশ্বর হইবার লােভে,
জগদীশ্বরে তুচ্ছ করি’!
ষষ্ঠ কলি
তুমি অপরূপ! হে চিরজীবিনী!
ঘুমের বুড়ীর চাইতে বুড়া,
তরুণীর চেয়ে সুন্দরী তবু,
মােহিনী তুমি গাে নগরী-চূড়া !
যা দেখেছ আর যে ভােগ ভুগেছ,
যা পেয়েছ তার নাই তুলনা,
চা-কবি গান শুনায়েছে তােরে,
পদ-নখে তাের চাঁদের কণা।
মিশ্র শুনাল ভামিনী-বিলাস,
শ্লোক-কানােজিয়া ভূষণ-কবি,
-
দিল্লী-নামা
১৪১
-
আফগান কবি রচিল কি রুবা
খুল হান্ পৌরুষের ছবি ।
আমীর-খ বিরচিল হেথা
দেব-দেবীর মিলন-গাথা,
মিঞা তাসেন রাগ আপিল
নীরস তরুর জাগায়ে পাতা!
কত ওস্তাদ নক্সা-নবীশ
আলােকিল তাের প্রাচীর পুথি ।
কত ঝাটুমল, পীরু, বনােয়ারী
পরাল শিলার করবী যুথী।
অঙ্গে তোমার রয়েছে জড়ায়ে
ওস্তাদ মনসুরের স্মৃতি,
জড়ায়ে রয়েছে অণুতে অণুতে
নবজাত কত রাগিণী-গীতি।
চলমান কাল ধরা দিয়েছিল
তাের যন্তর-মন্দিরেতে,
একটিও ছছাটো পল কি বিপল
দৃষ্টি এড়ায়ে পারেনি যেতে।
জঙ্গীজ যবে জগতের আগে
দেখাল আপন পাঞ্জা খুনী-
মিলিল দিল্লী-দরবারে ভীত
এশিয়ার যত কবি ও গুণী ;
তাহারা, তােমার বন্দী ও ভাট,
বন্দনা-গান গিয়েছে রচি’,
১৪২
বেলা শেষের গান
মর্ত্যভুবনে তুমি অতুলন
সপত্নীহীন তুমি গাে শচী!
সপ্তম কলি
ক
দুহিতা তােমার নারী-সুতান
পুরুষ-বেশিনী রিজিয়া রাজা,
পালিতা তােমার নারী নূরজাহ
জিনি’ তলােয়ার ধারালাে মাজা।
কত বীর, হায়, পূজিল তােমায়,
ভজিল তােমায়, মজিল রূপে,
অন্তিমে শেষ বিছাল ও-বুকে
দেশী ও বিদেশী কত না ভূপে।
নব-গ্রহের নয়-মঞ্জি
কোনাে সুলতান্ স্থাপিল হেথা,-
ভাঙি’ তেত্রিশ ঠাকুর-দুয়ার
একের দেউল-কোনাে বিজেতা।
কেহ রাজপুত বীরের মূরৎ
দ্বারপাল করি’ রাখিল দ্বারে,
হিন্দুরে কেহ বন্ধু মানিয়া
আধা-রাজকাজ সাঁপিল তারে।
দিবালােকে তুমি “আরব-রজনী”,
খোলীর চিরধাত্রী তুমি,
কত মিঞা আবু হােসেনে ক্ষেপালে
কৌতুকময়ী স্বপন-ভূমি!
s
*
।
দিল্লী-নামা
আইম্ করিয়া বেশ্যাক বিয়া
দেওয়াইল হেথা আলমগীর,
পৌত্র তাহার তারি তাজ পরি’
যত অবীরার হইল বীর।
আরাকান্ হতে ইরাণ অবধি
হেথা বসি’ কেউ বিথরে বাহু,
দস্তার পায়ে তাজ রাখে কেউ
রােহিল পাঠানে মানে গাে রাহু।
কোনাে বাদশার কায়া ঢাকি’ হেথা
কোটি মুদ্রার কবৰু বাজে,
গােলামের হাতে পরাণ হারায়ে
কেহ পচে পড়ি পথের মাঝে।
অনেক দেখেছ অনেক ঘুগেতে
এখনাে অনেক দেখিতে আছে,
ধূলীভূত সােনা শােণিতের কণা
তােমারে ঘিরিয়া ঘুরিয়া নাচে !
ক্ষ
অষ্টম কলি
যাওয়ার দাপটে আকাশের পটে
পথ-ধূলি তাের মুরতি ধরে,
সৈন্যের
বৃহচলে সমারােহে
বাশা-বেগম-সফর করে।
তাঞ্জাম চলে হাওদার পিছে,
নাকাড়া সে বাজে, নকীব হাঁকে,
১৪১
বেলা শেষের গান
চলে চোদার ধুজা-বদ্দার,
চোখ-বাঁধা বাজ চলেছে আঁকে,
বাদশার পর বাদশা চলেছে
মিলায় চোখের পলক পাতে,
কারো হাতে ফুল কারাে হাতিয়ার
শটুকার নল কাহারাে হাতে,
কেহ বা খেলায় সারা দুনিয়ায়,
কেহ ক্রীড়নক পরের তবে,
কেহ জেগে আছে সদা-সতর্ক
কেহ বা ঘুমায়, কেহ বা ভাবে।
অকালে নিদ্রা ভেঙে গেল কার !
জাগিল তুষিতে মরণে কেবা !
রুটি কে সেকায় বেগমেরে দিয়া,
কেবা লয় লাখ লােকের সেবা !
দুই হাতে কেহ করি’ লুণ্ঠন
উড়ায়ে দিতেছে খেয়াল-পিছু,
খাজানা প্রজার গচ্ছিত জানি
কে ওই নিলনা ছুলনা কিছু!
পুত্রের ব্যাধি আপনি লইয়া
কে ও মেহী রাজা অকালে মরে ;
সাত বছরের ছেলে কোলে নিয়া
কে ওই শাজাদা যুদ্ধ করে।
আমারীতে'কে ও মরণ-আহত,
আমীরে কহিছে-“ধর হে মােরে ;
দিল্লী-নামা
১৫
r
জয় নিশ্চয়, শুধু ভয় পাছে
ঢলে পড়া দেখে’ সিপাহী সরে।
শাজাদীরে কে ও আইবুড়াে রাখে,
পায় না কুলীন দুনিয়া খুজে।
নর্তকী কার হইল মহিষী
মােসাহেবে কে ও উজীর বুঝে।
নুতন ধর্ম প্রচারিতে চায়
কে ওই খিলিঙ্গী সুরায় মাতি।
সকল গোঁড়ামি হাসিয়া উড়ায়
কে ওই বাদশা ইলাহি-সাথী।
পঙ্ক-লিপ্ত কৃশ হাতী পরে
কে ওই চলেছে বন্দীবেশে ?
ওকি গাে দিল্লী-বল্লভ দারা ?
আগুলিছে পথ ভিখারি এসে।
গায়ের ওঢ়ন দিয়া শেষ দান
রিক্ত চলেছে মৃত্যু-মুখে !
নিরীহের লহে স্নান করি’ হােথ
নমাজ পড়ে কে কবুকে ?
দিনে দুপহরে মরীচিকা একি
সৃজিছে রবির মরীচি-মা ?
দিল্লী, তােমার পানে চেয়ে চেয়ে
নন কখনাে হল না আশা।
১৪৬
বেলা শেষের গান।
নাম কলি
তােমার ধূলিতে মিশে গেছে আহা
ক্ষয় পেয়ে কত হাতের সােনা-
কত রাঙা হাত মণি-বলয়িত
লীলা-চপলিত না যায় গােণা!
কত বৈসরের নীল আর চুনী,
কণ্ঠীর মুগা, কানের মােতি,
কত মরিয়ামা, তাম্রা, আজবা,
কত দাচিনা হারাল জ্যোতি।
পােয় ওজনের পান্না তােমার,
চৌদ্দ ভরির পদ্মরাগ,
ছটায় অনুপ ছটাকী হীরক
ধূলায় তােমার হয়েছে খাক।
যাদের অঙ্গে সাজিত সে-সব
কোথায় তাহারা ? জান কি তুমি ?
যাদের গহনা নকল করিয়া
প্রতিমা সাজায় বঙ্গভূমি ?
কোথা কাশ্মীরী বেগম ? কোথায়
ইস্তাম্বুলী ? কান্দাহারী ?
কোথা যােধপুরী ? কোথা মরিয়ম ?
কোথা উদিপুরী? রােকিয়া নারী ?
কোথা নূরজাহ? কোথা মতাজ?
দিল্স্ বানু আজ কোথায় ?
কোথায় দারার প্রেয়সী নাদিরা ?
হামিদ, মাহুম কোথায় ? হায় !
দিল্লী-নামা
১৪
কোথা জাহানারা। শম্প-শয়ান!
কোথা রােশিনারা ? রৌদ্রে দহে।
কিশােরী মূরিয়া, কোথায় জিৎ?
কেবা জানে হয়, কে তাহা কহে?
যমুনা দেখিতে উচ্চ মীনারে
চড়িত যাহারা কই গাে তারা?
কই দিল্লীর আদিম রাণীরা?
তাের ধূলিতলে হয়েছে হারা ।
পৃথ্বীর সংযুক্তা মহিষী—
কোথা সেই সতী? সেই রূপসী ?
সব রূপসীর রূপ হরি’, বুঝি,
দিল্লী গাে তুমি চির-ঘােড়শী !
দশম কলি
দর্পদলনে তুমি মাতঙ্গী,
আগুন জ্বালাতে উগ্রতারা,
অভিষেক-ঘট ধরিয়া তােমার
দশ-দিগগজ ঢেলেছে ধারা।
রক্ত দেখেছ ছিন্নমস্তা
যুগে যুগে নিজ
বুক
চিরিয়া,
* দেখেছ নাদীরী রুধিরােৎসব
• সুনেহলি মসজিদ ঘিরিয়া।
মুণ্ডমালায় কালিকা সাজাল
তােরে তােগলী মহম্মদ,
।
১t
১৪৮
বেলা শেষের গান '
বেড়া-আগুনের পূমে তৈমূর
দিল ধূমাবতী-পরিচ্ছদ!
বারে বারে তুমি দগ্ধ হয়েছ
তুমি অবিনাশ অম-পাখী,
আপন ভস্ম-কুগুলি-মাঝে
প্রাণ পেয়ে পুন মেলেছ আঁখি!
ভৈরবী তুমি ভুবনেশ্বরী।
জিহ্বা টানিতে তুমি বগলা,
সাজা দিতে তব অতুল প্রতিভা,-
করেছ'রচনা শাস্তি-কলা!
গরু ও গাধার কাঁচা চাড়াতে
সিঞায়ে মেরেছ বিদ্রোহীরে,
সন্দেহে, হায়, কত রূপসীরে
জ্যান্তে গেঁথেছ তুমি প্রাচীরে !
কারাে দুই কান সদ্য ফুড়িয়া
পায়রার ঘুড়ি দিয়েছ জুড়ে,
কোমর অবধি পুতেছ কারে,
গজাল ঠুকেছ কাহারাে মুড়ে।
কান্না দেখেছ, হাস্ত দেখেছ,
দেখেছ লােভীর লােভের ধাঁধা,
গালে-চুনকালি ওরা গলে
দেখেছ ঘােড়র তােবড়া বাঁধা।
আপনার হাতে কতশত বার।
ঘুরায়েছ তুমি যমের জাল,
দিল্লী-নামা
পূত মসজিদে সাহ্লােদ রাজার
* দেখেছ খসিয়া পড়িতে মাথা।
অতীতের রাখী রক্তে রঙীন্।
অতীত-সাক্ষী দিল্লী তুমি!
তুমি দশমহাবিদ্যা-রূপিণী
শক্তির তুমি লীলার ভূমি।
একাদশ কলি
শক্তিবিহীনে তুমি ঘৃণা কর
থাক না গাে দুর্বলের বশে,
শক্তি-শিবের বিয়া যে ঘটায়
তার কাছে রহ তুমি হরষে।
কালরূপা তুমি পাপের প্লাবনে
দেখিছ সারি সাঁচা ও স্কুটা,
অট্ট হাসিয়া দিতেছ দেখায়ে
দিগ্বিজয়ীর রিক্ত মুঠা !
মরণ-মরুর মধ্যে দাড়ায়ে
করিছ পরখ জীবনমণি
দেখেছ দেখিছ অনিমেষ চোখে
মকামনা,অগাধ খনি।
দেখেছ অশেষ তাণ্ডবলীলা
মােগল-কুলের
দেখেছ ঘেসেড়া মন্তিয়া
এসেছে লড়িতে বাদশা সাথে ।
p
০
অধঃপাতে,
১৫%
বেলা শেষের গান ।
দেখেছ নিলাজ জুহারের
সাধারণী রাণী লাল-কুঁয়ারী,
অশ্বশালায় বাদশা ঘুমায়
নগরেতে টিটি কেলেঙ্কারী।
শিখ, বৈরাগী বান্দাকে হায়
এই অমানুষ মেরেছে প্রাণে ।
দরবারে শিশু হত্যা দেখেছ,
দিল্লী! সে কথা কে না জানে?
লােদির হিন্দু বিরাগ দেখেছ,-
চুল-দেজা মানা মানৎ মেনে,
দেউলে বন্ধ শঙ্খধ্বনি,
হুকুম জাহির ফৌজ এনে।
দেখেছ আবার আবর শার
মার শােকে গোঁফ দাড়ি মুড়াননা,
মহলের মাঝে গণেশের পূজা
দিল্লী গাে তুমি সকলি জানে।
তব ইঙ্গিতে দিল বাদশাহ
ভূমিদান গুরু অমরদাসে,
হিন্দু জৈন খৃষ্টীয় যত
সাধু সজ্জনে আনিল পাশে।
তােমারি অঙ্কে তেগ বাহাদুর,
আলগীরের আরাম-শনি-
লাঞ্ছনা সহি দিল নিজ মাথা,
দিল না ধরম মাথার মণি!
{
দিল্লী-নাম
১৫১
মরাঠা-জাঠের হল্লা শুনেছ,
দুরানী-শিখের হুহুঙ্কার,
কেঁদেছ কি, হায়, হেসেছ ? জানি না,
সম সুখ দুখ দুই তােমার।
দ্বাদশ কাল
আউলিয়া সাধু নিজামুদ্দিন
সাঁপিল তােমায় স্বরগ-জ্যোতি,
কবরে যাহার খিনির ফুল
শােভা পায় উপাখীর মােতি।
তােমারে নরক করিতে চাহিল
দুলোভী দুই সৈয়দ্ভ্রাতা,
স্বর্গ নরক তােমারে ঘিরিয়া
রচিল রুধির অশ্রু-গাথা।
দেখেছ দিল্লী! জীবে দয়াশীল
অশােকের অনুশাসন-আগে
কত যে গাে-বধ-নর-নারী-বধ
খুনের তুফান রাগে-বিরাগে।
ব্ৰহ্মবাদী সে বােধন বিপ্রে
বধিল হেথায় কালান্দারে,
• বিচারে জিতিয়া হেরেছিল সে যে
হিন্দু জাতির জাতীয় হারে।
ন্যাংটা ফকিৰ সৰ্ম্মদ শাহ
না মানি আরংজেবের কথা
১৫২
বেলা শেষের গান
নগ্ন রহিল ; তার প্রাণে মারি’
বাদশা ঘুচাল অশ্লীলতা।
হেথা গাজী হ’ল মানুষ মারিয়া
কালা মসজিদে তুকমান্,
হেথা ঝরােকার পর্দা তুলিয়া
কুতূহলী নারী হারাল প্রাণ।
বাহাদুর শাহ হইল সে শিয়া,
মােল্লা রাখিল মনের মত,
সুন্নি শাজাদা দিনে দুপহরে
মসৃজিদে তারে করিল হত।
তুমি বিচিত্র, তুমি গাে মুখর
মানস-ঝড়ের মন্ত্র-গানে,
বন্ধুর তুমি বল-বান্ধবী
পতনে এবং সমুত্থানে।
এয়ােদশ কলি
দীপ্ত দুপরে হে চির-নগরী।
তপ্ত ধূলার বােকা টানি
তিরিশ-হাজারি বাগিচার ছায়
আনে কিবা ভাব না জানি।
মাসে মাসে আর নাই খুশ-বােজ,
নও-বােজ নাই নব-বরষে,
মাে-হাওদায় বাদশাজাদীরা
চলে না দোলায়ে দিল, হরষে,
দিল্লী-নামা
১৫৩,
নাই সমারােহ, পথের দু'ধারে
কোরান রচে না দীপের মালা,
হাবসী তাতার সৈন্য ঘেরে না
সিদি মৌলার অতিথশালা
বাঘ চলে নাকো শিকল পরিয়া
বাদশাজাদার ঘােড়ার সাথে,
হাতীর লড়ায়ে পাখীর লড়ায়ে
মাকোষা-লড়ায়ে দেশ না মাতে।
মুসাফের রােজ আসে নাকো আর
ম্লান মুসাফের-খানার আলাে,
থেমেছে ডঙ্কা, তুমি ভাবিছ কি ?
সুখের চাইতে স্বস্তি ভালাে?
চতুর্দশ কলি
ক
যন্ত্র-হাতীর দিন চলে গেছে
তবু আজো হায়, মনে কি পড়ে
শত শিবিকায় রাজপুত সেনা
নরীবেশে কবে পশিল গড়ে,
কে যে কবে ঐশ্বৰ্য-গরবে
চেয়ে বসেছিল কাহার নারী,
অপমানে কারা হইল মরীয়া
'আজো কি স্মরিছ কাহিনী তারি ?
পিপা পিপা সুরা আরুক উজাড়ি
কে বহাল স্রোত নগরী-পথে,
.
১৫৫
বেলা শেষের গান
৫
সপ্তাহ যায়, আঙ রসের
কর্দম হায় ঘােচে কি মতে ?
মনে পড়ে কে সে রাজ্যের বাঁশী
সেতার কাড়িয়া চাঁদিনী চকে-
জড়াে করি দিল আগুন জ্বালায়ে,
মনে আছে সেই গীত-মূরখে ?
পাহারা এড়ায়ে পেঁড়ার ওড়ায়
দিল্লী! কে যায় নিজেরে ছাপি’ ?
বেদের ঝােড়ার ভিতরে কে নড়ে ?
নীচে ৩ উপরে সাপের ঝাপি!
গুম হ’ল কারা? গায়েব হ’ল কে ?
হে নগরী! সবি তােমার জানা,
শত শাজাদায় দেখিয়াছ তুমি
তপ্ত সূচীতে হইতে কাণ।
ধৰ্ম্মের ধ্বজা ধূলায় লুটিতে
দেখেছ গাে তুমি দেখেছ চোখে,
পাপের বিজয়-ডঙ্কা শুনেছ
ভরেছে দু’চোখ বজালােকে।
পঞ্চদশ কলি
ময়ুর-আসন চোরে নিয়ে গেল,
কোহিনূর গেল সাগর আরে,
কিছুনা কহিলে মৌন রহিলে,
গরবী! এই তো সাজে তােমারে।
দিল্লী-নামা
১৫৫
কালে কালে তুমি কত তেয়াগিলে
পুরাণে শরীর -পুরাণে শাড়ী,
গীতার বাণী যে কানে আজো বাজে,
কুরুক্ষেত্র তােমার বাড়ী।
স্থির হয়ে বসে আছ তুমি একা
অবিরাম যাওয়া আসার স্রোতে,
সৃজিয়া তােমায় আপিল বিধাতা
মরতে তিলােত্তমার ব্রতে।
রজোগুণময়ী! রাজ্য-কামনা!
সজীব তােমার শিক্ষাব্রজ,
রাজা-মহারাজা ফিরেও দেখ না,
রাজাগণ তব পথের রজ।
শত শত রাজমুকুটের মণি
ধূলা হয়ে আছে তােমার পায়ে,
দর্প ও মান গুড়া হয়ে আছে
তােমার পায়ের ডাহিনে বায়ে ।
ধৃতরাষ্ট্রের কত ছেলে এল
গায়ের বসন করিতে ঢিলা,
দিল্লী গাে তাের দ্রৌপদী শাড়ী
যােজন জুড়িয়া হ’ল যে শিলা!
ধংসের মাঝে বসে আছ তুমি,
জীবনের রণে হারিয়া জিনি’
ধর্মের জয় দেখিবার লাগি
চির-রাণী ওগগা, চির-যােগিনী!
বেলা শেষের গান
।
খাঁচার পাখী
আজ কি আবার ফুল ধূরেছে
ডালিম-গাছের ডালটিতে
উতল হাওয়ার পালট লাগে
ভরা-বুকের পালটিতে।
তাে সে আজ আতা-গাছের
পাতায় পাতায় ফিছে কি?
সবুজ শিখার দীপান্বিতা
সকল শাখা ঘিছে কি ?
ঘেরাটোপের অন্ধকারে
বন্দী আছি, সঙ্গী নেই,
ব্যথার ডালি ব্যর্থ জীবন
ডুবিয়ে দিয়ে সঙ্গীতেই।
অসাড় ডানা ঝাপসা দু চোখ,
খাঁচার জীবন একটানা
তার মাঝে আজ উঠলে কি ঢেউ
দখিন হাওয়া দেয় হানা?
ঘেরাটোপের পর্দা কাঁপে,
কাঁপছে আমার সকল গা,
বলক দিয়ে ক্ষীরসায়রে
ছুটছে পুলক অ-বগা !
হঠাৎ কেমন হচ্ছে মনে
ফুল ধরেছে সব গাছে,
সবুজ পাতা সার দিয়েছে
এই খাঁচারি খুব কাছে।
;
বিদ্যুৎ-বিলাস তােরের আলাে আজ সকালে কাদের গালে রং বুলায় ? ফুলের সঙ্গে ফল ধরে কি, ডালিম-গাছের ডালগুলায় ? বাতাস যেন বদলে গেছে- বদলে গেছে মন্তরে, ঘেরাটোপের নাে নীলে ডালিম-ফুলের রং ধরে। চোখে আমি ঝাপসা দেখি আসে মরি আফশােষে, বল গাে তােরা বসন্ত কি জাল ধরার হৃদ কোষে ? কান্না-কোলে কঁপছে গলা কণ্ঠে কেঁপে যাচ্ছে তান, বল্ গাে তােরা বকুল-চাপায় বসন্ত কি মূর্তিমান ? বিদ্যুৎ-বিলাস (শার্দল-ৰিক্ৰীড়িত ছন্দের অনুসরণে ) সিন্ধুর নােল মেঘে ভিড়ল আজ গরজে বাজ, বিদ্যুৎ বিলােল- রক্ত চোখ। .
১৫৮ বেলা শেষের গান ঝঙ্কার দোল সারা সৃষ্টিময়, জাগে প্রলয় ; তাণ্ডব বিভাে- ছায় ছালােক। বৃষ্টির স্রোত করে বিশ্ব লােপ; নিয়েছে খােপ- নিশ্চপ কপােত নিশ্চপল ; পর্জনের চলে শূন্যে রথ, ধ্বনি মহৎ ; নির্জ নীপের কুঞ্জতল। সূখের নাম হল শব্দ-শেষ, প্রতি নিমেষ তন্দ্রার ত্রিম অন্ধকার! মেঘূ-মল্লায় শত ঝিল্লি গায়, খুঁথি-লতায় বিদ্যুৎ বিলাস চুম্বন বিথার অপ্সরার! দেব-ঝর্ণার জলে জলসা আজ ধরণী-মাঝ, কিন্নর বীণার উঠছে তান ; অঞ্জ-মেঘ চলে ঐরাবৎ জুড়ি জগৎ, ঝঙ্কার আবেগ ছায় পরাণ! ইলের ধন হের পৃথীছায়— সােনা বিছায়, বর্ষার সৃজন দিক্ ছাপায় ! তাজে গর্ভবাস, ফেলে নিশস- ভূই-ভাগ আবার ভূইচাপায় ।
বেলা শেষের গান
ঝাপসার রূপ
ভুলাল কাজ
মৌনের অনুপ
;
মূচ্ছনায় ;
শষ্পের গান
ভরে তুলছে মন
সারাটি ক্ষণ
বাষ্পের বিতান
রস ঘনায়।
বিদ্যুৎ-ঠোঁট
হানে ধূম্রচূড়
ঝড়-গরুড়,
পাখসাট আচোট
বন লােটায় ;
গর্জন, গান,
* মেশে হর্ষ, খেদ,-
পাশরি ভেদ;
বজ্রের বিধান
ফুল ফোটায় ।
বজ্রের বীজ
ফেরে রাত্রিদিন
করে নবীন,
কবি-জুবিলি
মৃত্যুর কিরীচ,
প্রাণ বিলায় !
বিস্ময়, ভয়,
মেশে হর্ষে, আজ,
রাজাধিরাজ
রুদ্রের সদয়
দানলীলায়।
কবি-জুবিলি
মিছিল
প্রথম মূরৎ-স্বর্গদূত
উৰ্বশী মােরে দিয়েছে পাঠায়ে
স্বর্গ-ভুবন হ’তে-
কবিরে পরাতে মন্দার-মালা
এসেছি মরাল-রথে !
জননী, জায়া, কি কন্যার মত
ভকতি কি স্নেহ, প্রেম
দেয় নি সে; দেছে স্মৃতির নিকষে
চির-উজ্জল হেম!
জীবন-ভােরের সঞ্চয় সে যে,
সে যে গে দিব্য দান,
ক্ষয় অপচয় হয় না তাহার
হয় না কখনাে ম্লান।
১১
১৬
বেলা শেষের গান
অমরার সার মন্দারহার
পর এ মর্তে বসি’
মর্তের কবি। এ মালা তােমারে
পাঠায়েছে উর্বশী ।
দ্বিতীয় মুরৎ-প্রকৃতি
বরষার বেণী এলাইয়া দাও,
শীতেরে কাদাও ফুলের ঘায়ে ;
ভাসাও গাে সাদা মেঘের ভেলাটি
শরতের সাথে গগন-গায়ে ।
ফাল্গুনী ফুলে নামহারা কোন্
নায়িকার নাম দেখ গাে লেখা,
অতীতের পুরে পশি হের কার
আঁচলে হংস-মিথুন আঁকা ;
পুষ্পের সাথে পুলকিয়া ওঠ,
ঝঙ্কার সাথে দাও গাে দোলা ;
কিবা সে অতীত কিবা অনাগত
তব তরে সব দুয়ার খােলা!
দীপ্ত-লােচন লুপ্ত-বচন
তাপস গ্রীষ্ম ভীষণ-ছবি,
তাহারেও কথা কহাও গাে তুমি,
ভাষা দাও তুমি তাপেও, কাব !
অনাগত আর অতীতের মাঝে
বাঁধিয়া তুলিছ মানসী সেতু,
কবি-জুবিলি
১৬৩ •
অচেত-চেতনে মিলায়ে যতনে
উড়ায়ে দাও হে বিজয়-কেতু!
বায়ু বহে যায় ধীরে অতিধীরে
কানে কহে’ যায় তােমারি শুধু,
ওগগ গগনের চির-আত্মীয়,
'ওগাে জগতের পুরাণ বঁধু !
মৌন মাটিরে বাসস তুমি ভালাে
মূক বলে তারে কর না ঘৃণা ;
মুগ্ধ প্রকৃতি হৃদয়ের প্রতি
নিবেদিছে তাই বচন-হীনা।
তৃতীয় মূরৎ-বালক
বাজিয়েছিলাম পাতার বাঁশী
রথের মেলায় গিয়ে,
আপনি নাকি তাই লিখেছেন
ছাপার হরফ দিয়ে ?
আমার ভেঁপুর আওয়াজ, সে কি
সব্বের উপর ওঠে
সােপােল অর খােল কতাল
ছাপিয়ে উধাও ছােটে ?
সবচেয়ে কম বেশী আমায় ।
জানে হাবুল,টেপু;
আপনি নাকি বাণী বাজান ?
আমিও বাজাই--ভেঁপু !
?
১৬৪
বেলা শেষের গান
চতুর্থ মূরৎ-বঙ্গের ‘হাসি’ ‘তা’
l
বরষে বরসে সারা দেশ জুড়ি
বলির রক্ত ছােটে,
সারা দেশ জুড়ি’ শিশুহিয়াগুলি
শিহরি শিহরি ওঠে।
দেবতা দেখিতে দেখে বিভীষিকা,
ঘুমাতে পারে না। রাতে,
স্বপনে গড়ায় রক্তের ধারা,
মােছে তারা দুই হাতে!
সঙ্কোচে সারা প্রাণ ভরে ওঠে,
ঘােচে না রক্তরাশি,
নিষ্ঠুর খেলা খেলে প্রবীণেরা
শিশুর শুকায় হাসি।
ওগাে কবি! ওগো তরুণ-হৃদয়,
করুণ তােমার গাথা-
করিছে স্মরণ অশ্রনয়ন
বঙ্গের ‘হাসি’ ‘তাতা’!
পঞ্চম মূরৎ-ভিখারিণী মেয়ে
ছুটে এসেছিনু মা-হারা বালিকা
মায়ের মায়ার লােভে,
পূজা-বাড়ী নাকি মা এসেছে, শুনি ;
ভরা ঘট দ্বারে শােভে
কবি-জুবিলি
১৪৫
অচল প্রতিমা ফিরে চাহিল না,
কথা কহিল না কেহ ;
ক্ষুন্ন ফিরিয়া চলেছি ;-সহসা
তুমি ডেকে দিলে স্নেহ !
যাহা দিলে, ওগাে! ভিক্ষা সে নয়,
সে নহে অনুগ্রহ ;
মমতায় করে নিলে আপনার
আমারে,--মুনিম সহ।
দেবতার মত ভালবাস তুমি,
নাহিক তােমার তুলা,
সকলের সাথে তােমারে নমি হে
ভিখারী-পথের বলা।
ষষ্ঠ মূরৎ-বঙ্গবন্ধু
বালিকা-বয়সে মার কোল ছাড়ি,
পরবাসে বাধে যেজন গেহ,
পরখ যাহারে করে গাে সবাই,
শাসন করে গাে, করে না হেত।
আগমনী শুনি’ ভিখারিণী-মুখে
মন ছুটে যার রাগের ঘরে,
কুণ্ঠিত সেই বঙ্গের বধূ
হে কবি। তােমারে প্রণাম করে।
মূক বেদনারে ভাষা দেছ তুমি,
হাল্কা করেছ মনের ব্যথা,
১৬
বেলা শেষের গান
মনে মনে তাই নিবেদি চরণে
মালা এ অশ্রু-সলিলে গাঁথা।
*
সপ্তম মূরৎ-উপেক্ষিত
মরিয়া যে শুধু দিতে জানে, হায়,
জীবনের পরিচয়,
চোর নয় তবু চুরি যে করেছে
ভুলিয়া লজ্জা ভয়,
‘আপদ” বলিয়া দুর হতে যারে
লােকে করে বর্জন,-
ভালবেসে কবি তাদেরাে ফুটালে!
করি তােমা বন্দন।
অষ্টম মুরৎ-ভৃত্য
।
চুরি অপৰ্বাদ ভূষণ যাহার,
ত্রুটি অপরাধ নিত্য,
ঘাের নির্বোধ, দেখিলেই যারে
রাগে জ্বলে যায় পিত্ত,
উশেই বল, কেষ্টাই বল,-
যা খুসী বলিয়া আক,
উত্তর দিবে, হইবে হাজির,
মােটে সে চটিবেনাক।
।
.
কবি-জুবিলি
পােষা জন্তুর মত পােষ-মানা
সদা প্রফুল্ল-চিত্ত,
দেউড়িতে এসে গড় করে আজ
সেই পুরাতন ভৃত্য !
হইতে পারে সে ক্ষেত্রবিশেষে
মােহন কি শঙ্কর,-
অনায়াসে প্রাণ দিতে পারে; তবু
নিরেট ভয়ঙ্কর ।
*
নবম মূরৎ-খুড়া মহাশয়
দু’কুড়ি ও দশ?-তােমার বয়স ?
তুমি আরাে টের বুড়া !
তােমার অনেক পরে জন্মেছে
চক্রবর্তী খুড়া।
তারি গোঁফ চুল ভুরু পেকে গেল,
টাকে মুড়াইল চূড়া;
দু’কুড়ি ও দশ ? মােটে ? ভুল! তুমি
ব্ৰহ্মার চেয়ে বুড়া।
গ
দশম মুরৎ-বৃদ্ধ
রায় বসন্ত দিয়েছে পাঠায়ে
এই অদন্ত বুড়ারে হেথা,
সেই মানুষটি দেখিতে এসেছি
ফাঁস করে যেই বুড়ার কথা !
১৮ বেলা শেষের গান শাদা মন আর শাদা মাথা নিয়ে এসেছি অনেক দিনের পরে, শুনে মধুবাণী দেখে হাসিখানি ফিরে চলে যাব দেশান্তরে। আবােলা আর তবলা সিতার পাল্কীতে হােথা এসেছি রেখে, হেসে হেসে আর বাঁচিনে রে ভাই বুড়ার নকল নাকাল দেখে। ( আমুদে বুড়ার নকল দেখে !) একাদশ মূরৎ-গৌরাঙ্গভজা জনম অবধি মােরে গালি দেওয়া ! লাঞ্ছিত লজ্জিত করা খালি। বিদ্রোহী করিয়া তােলা ? আমার সে ভগ্নীপতিব্রতা যত শালী, না হয় গৌরাঙ্গে মজি ভজি তারে; অভদ্র বিদ্রুপ তাই বলি' ? জোন্স, স্মিথু-টসন- নামাঙ্কিত উপহার দেওয়া নামাবলী ?
কবি-জুবিলি
১৬
সিঁদুর মাখায়ে বুটে
হায় হায় !
মাথা হেঁট–অপমান করা ?
হায়রান শুধু শুধু
পাঠাইয়া
হাকিমের মিথ্যা হকরা !
কংগ্রেসে দিলাম চাদা,
তবু মিছে
ছল ধরা ? গেছি আমি চটে,
তােমাদের হুজুগেতে
আমি-আমি-
আমি যােগ দিবনাক মােটে।
দ্বাদশ মুরৎ—অপরূপ-রূপা বাংলা
বাংলা দেশের হৃদয়ের মাঝে
যেজন বিরাজ করে,
ডান হাতে যার খড়গ জ্বলিছে।
বা হাত শঙ্কা হরে,
লালাট-নেত্রে বহ্নি যাহার,
মেহ-বিভা, দু'নয়নে,
হে কবি। তােমারে দেছেন প্রসাদ
তিনি প্রসন্ন-মনে।
দেউলের দ্বার খুলেছে তাহার,
মিলেছে মিলেছে দিশা,
১৭
বেলা শেষের গান
তাঁর ইঙ্গিতে, সঙ্গীতের
হে কবি ! পােয় নিশ।
এয়ােদশ মূরৎ—বিশ্বযােগী—ভারত-মহিম।
বিতরিলে ব্ৰহ্মবিদ্যা ; মিশাইলে সীমায় অসীমে
রচিলে ভাবের সেতু যুক্ত করি’ পূরবে পশ্চিমে।
সমীপে আনিলে স্বর্গ ; স্বদেশেরে জানিলে সুন্দর,
স্বর্গ হতে গরীয়ান্!-মূর্ত যেন দেবতার বর !
প্রতিষ্ঠা করিলে প্রাণে ভারতের প্রাচীন সাধনা,
বহুর মাঝারে এক,-জগতের চির-আরাধনা !
সপ্তর্ষির পুণ্য-জ্যোতি সমর্পিলে বাঙালীর ভালে;
সত্যের নিষ্কাম ভায় লুপ্ত করি’ দিলে দেশ কালে !
বিশ্ব-যােগে যুক্ত হলে—বিশ্বনাথ প্রেরিল বারতা।
জগতে ঘােষিত হ’ল বিশ্বমানবের আত্মীয়তা।
“জ্যোতিষ্ক কুটুম্ব যত হেরি তােমা আনন্দিতমন,
নক্ষত্র অক্ষরে * লিখি’ পাঠাইল তােমারে লিখন ।
কৰ্ম্ম-ক্লিষ্ট কোলাহল মন্ত্রে যেন শূন্যে গেল মিশি’ ;
মহাশান্তি এল নামি’ + তব পুণ্যে ; হে কবি! হে ঋষি ?
চতুর্দশ মুরৎ-কাবুলিওয়ালা
প্রকাণ্ড এই চেহারাটায়
।
প্রকাণ্ড যে হৃদয়' আছে-
* পাঠান্তর—জ্যোতির অক্ষরে ।
+ পাঠান্তর—দিব্যশাস্তি এল মর্ভে।
কবি-জুবিলি
১৭
বাংলাদেশের ওগাে কৰি !
গােপন সে নেই তোমার কাছে।
ভুষাে-মাখা পাঞ্জাখানি
ছাপা ছিল পাঁজর পরে,
কারেও তাে সে দেখাইনিক,
দেখলে তুমি কেমন করে ?
বাংলা মুলুক যাদুর মুলুক,
তুমি যাদুগিরের রাজা,
তােমার তরে বাবুসাহেব!
এনেছি এই আঙুর তাজা।
স
পঞ্চদশ মুরৎ-সঙ্গীতাধিষ্ঠাত্রী
জীবন তিক্ত হয়ে উঠেছিল
সার্কাস করি শূন্যে ;
পুরাণে। গরিমা ফিরিয়া পেয়েছি
হে কবি! তােমারি পুণে।
পুরাণে গরিমা সহজ মহিমা
প্রাণের রং মহলে,
সার্থক ফিরে হ’ল এ জীবন
প্রাণের গভীর তালে।
সুরে ও কথায় মিলিয়া লতায়
নিঝরে রবিরশ্মি !
পল্লবগ্রাহী পণ্ডিত শুধু
করিতেছে'হা হতোহম্মি'।
૧૨
বেলা শেষের গান
পরাণের মাঝে জনম লভিয়া
সহজে পরাণে পশি,
আজিকে আবার চলনে আমার
শত চাঁদ পড়ে খসি।
যােড়শ মুরৎ-দাসী
রাণী নই, তবু রাজার প্রসাদ
মাথায় ধরেছি আমি,
সৌরভে তার ভরি’ আছে মম
জীবনের দিনযামী ;
আঁধারে শুনি সে চরণের ধ্বনি,
আঁধারে একেলা হাসি,
বাসক-সজ্জা করি আমি তার
আঁধার ঘরের দাসী।
বন্দনা
।
কীর্তি-গগন-সূৰ্য হে!
বঙ্গ-ভুবন-পূজ্য হে!
প্রতিভা তােমার
করিল প্রচার
আঁধারে যা ছিল উহ্য হে।
পূজ্য হে!
ও যা ছিল অজানা তুচ্ছ হে,
কর কটাক্ষে উচ্চ হে,
১৭৬
কবি-জুবিলি
জগতে কবি-
সভা-মাঝে কবি,
বাজাও বঙ্গ তুৰ্য হে!
পূজ্য হে!
জুবিলি
রাজার যদি হয় জুবিলি
কবির হতে পাবে সে,
রাজার পূজা আপন রাজ্যে,
কবির পুজা সব দেশে !
চাণক্যের এই প্রাচীন বাক্য
লক্ষ কথার এক কথা,
রাজার যদি হয় জুবিলি
কবির হতে পাবে তা।
নজীর খুঁজে নাই যদি পাই
নাই তাতে ভাই দুঃখলেশ,
পর্ব
নুতন কবে সৃজন
বঙ্গভরা বঙ্গদেশ।
রাজার প্রভাব আপন রাজ্যে
কবির প্রভাব সব দেশে,
রাজার যদি হয় জুবিলি
কবির হতে পাবে সে।
বিধা দিলাম পাতি লিখে
সই করিলাম নিম্নে তার ;
কবির সেরা বঙ্গবি
জানাই রে নমস্কার
No text on this page.
কবিবর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রণীত
সৰ্বজনসমাদৃত পুস্তকাবলী
বেণু ও বীণা
বিবিধ বিষয়ের গীতিকবিতার পুস্তক। দাম এক টাকা
হােমশিখা
পুণ্য ও তেজস্বী ভাবপূর্ণ কবিতা-পুস্তক। দাম এক টাকা
তীর্থ-সলিল
সকল দেশের ও কালের রচনার কাব্যানুবাদ। দাম এক টাকা
তীর্থবেণু
সকল দেশের বাছা বাছা কবিতার পদ্যানুবাদ। দাম এক টাকা
কুহু ও কেক।
বসন্তের মঞ্জু রাগিণী ও ঘনবর্ষার মেঘমল্লার হিল্লোলিত কাবগ্রন্থ
দাম এক টাকা
জন্মদুঃখী
অন্যায়পীড়িত । দরিদ্র-জীবনের করুণ কাহিনী-উপন্যাস। দাম
বারাে আনা
রঙ্গমল্লী
চীন, জাপান ও ইউরােপীয় নাটকের অনুবাদ। দাম বারা আনা
ফুলের ফসল
কবিতাগুলি ফুলের মতােই পেলব ও গন্ধমধুর। দাম আট আনা
তুলির লিখন
কবিতায় গল্প। মানবহৃদয়ের সূক্ষ্ম চিত্তবৃত্তির মনােরম ছবি
দাম এক টাকা
৫
অভ্র-আবীর
মৌলিক বিবিধ কবিতার বই। দাম পাঁচ সিকা
মণিমঞ্জষা
এই কাব্যগ্রন্থে বহু দেশের বহু কবির বিচিত্র রসের মধুর কবিতার
সরস অনুবাদ আছে। দাম পাঁচ সিকা
হসন্তিকা
হাস্য ও ব্যঙ্গ রসাত্মক কবিতার বই। দাম আট আনা
কবির মৃত্যুর পর তাহার রচনা-সংগ্রহ- যন্ত্রস্থ
ডঙ্কানিশান
বৌদ্ধ ভারতের ঐতিহাসিক উপন্যাস।
কবির বহু বিক্ষিপ্ত রচনা সংগ্রহ
বিদায় আরতি কাব্যগ্রন্থ
দাম ১০
সি, সরকার এণ্ড সন্স,
কলিকাত।
No text on this page.
No text on this page.