Bally Sadharan Granthagar

Sukher-milan

Shil, Sri Chintamani · 2009/08/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সুখেৱ-মিলন ।
(সত্য-ঘটনা-মূলক উপন্যাস)
C
শ্ৰীচিন্তামণি শীল
৫)
প্রণীত।
প্রকাশক
শচিন্তামণি শীল।
চোবাগান, কলিকাতা।
১৩২২।
কলিকাতা,
১৪৭ নং বারাণসী ঘােষের স্ক্রীট, যােড়াসাঁকো,
ফাইন আর্ট প্রিন্টিং সিণ্ডিকেট,
প্রিয়নাথ দাস দ্বারা মুদ্রিত।

No text on this page.

;
মুখবল।
সাহিত্য-ভূমিতে চিত্রাঙ্কণ করা দুরে থাক, সামান্য উঁচড় কাটিলেই
কৈফিয়ৎ দিতে হয়। এই কৈফিয়তই ভূমিকা, মুখবন্ধ, রচয়িতার
নিবেদন; প্রবেদন ইত্যাদি বিভিন্ন নামে বিদিত হয়। আকাক্ষার
প্রবল তাড়নায় সাহিত্যক্ষেত্রে হঠাৎ অনধিকার প্রবেশ করিয়া সেখানে
ফসল নষ্ট, অযথা আচরণ ও বিগহিত কাৰ্য্য করিয়া ফেলিয়াছি।
অতএব আমার সবিনয় নিবেদনই তাহার কৈফিয়ৎ।
এই আখ্যায়িকাটি একটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে লিখিত ; কিন্তু
অতিরঞ্জিত নহে।
আমার ভাষার জ্ঞান নাই, ব্যাকরণে ব্যুৎপত্তি
নাই, অথচ এই সত্য ঘটনাটি দেখিয়া পুস্তিকা প্রণয়ন রূপ কয়নের
মংলা হইতে নিরঙ হইতে পারি নাই। ইহাতে অনেক লম প্রমাদ
বহিয়া গেল।
অতএব সাহিত্যিকগণ আমার এই জ্ঞানকৃত অপরাধ
মার্জন করিয়া মহানুভবতার পরিচয় দিবেন।
আমার সবিনয় নিবেদন এই যে,~এই পুস্তিকা প্রণয়নে আমি
আমার অন্যতম বন্ধু শ্ৰীযুক্ত বাব আভাসচন্দ্র নিয়োগী মহাশয়ের নিকট
হইতে অনেক সাহায্য পাইয়াছি তজেন্য তাকে আমার আন্তরিক
ন্যবাদ। ভগবানের দয়ায় ও তাহার সহায়তায় এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাখানি
প্রকাশিতহইল ।
এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ আমার বন্ধুবান্ধব ও সহৃদয় পাঠক পাঠিকাগণঙ্গুে
আমি সাদরে উপহার দিলান। তাহারা ইহা ধৈর্য ধরিয়া, বন্ধুর ত্রুটি
মার্জনীয় জ্ঞানে, আদ্যোপান্ত পড়িয়া কিছুমাত্র আনন্দ উপভােগ করিলে,
আমার শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব।
.
চিন্তামণি শীল।

No text on this page.

(4/57
শ্রীশ্রীরাধাদামােদর জয়তি।
উৎসর্গ।
আমার
পরমারাধ্য স্বর্গীয় পিতৃদেবের
চরণ-কমলে
আন্তরিক ভক্তি ও শ্রদ্ধার নিদর্শন-স্বরূপ,
এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাখানি
উৎসর্গ করিয়া
কৃতার্থ হইলাম ।
কলিকাতা,
অধম সন্তান
চোরবাগান।
শ্ৰীচিন্তামণি।

No text on this page.

সুখের-মিলন ।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
বে
শাখ মাসের প্রচণ্ড রৌদ্রে বেলা ১২টার সময় চন্দন
নগর হইতে দক্ষিণাভিমুখে যে বড় রাস্তা গিয়াছে,
সেই পথে দুইটা যুবক যাইতেছিল, একটীর বয়স অনুমান
২৮ বৎসর, আর অপরজী ১০ বৎসরের ছােট। উহারা
দুইটী সহােদর ভাই ; যুবক দুইটাকে দেখিলে বােধ হয়, তাহারা
আমদের বঙ্গদেশীয় লোক-উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ও বলিষ্ঠ।
উক্ত গ্রাম্য
রাস্তাটির দৃশ্য অতিশয় মনােহর-সুদূর দুই পার্শ্বে বিটপী শ্রেণী গগন ভেদ
করিয়া বিরাজ করিতেছে, মস্তকে সুনীল আকাশ আবরণ করিয়া
বহিয়াছে, মধ্যে মধ্যে বৃক্ষোপরি হইতে কোমল কণ্ঠে পাপিয়া মধুর
স্বর বর্ষণ করিয়া পথশ্রান্ত, বৃক্ষছায়ায় উপবিষ্ট পথিকের মন কথঞ্চিৎ
উল্লসিত করিতেছে।

সুপের-মিলন।
অনেক দূর আসিয়া যতীন তাহার বড় দাদা নরেন্দ্রকে বলিল-~-
দাদা, আমাদের এখনও অনেক দূর যাইতে হইবে। আমরা বড়
রাস্তা দিয়া না আসিয়া গ্রামের ভিতরের পথে আসিলে, এতক্ষণে
বাটী পৌছিম, রৌদ্রে আমাদের এত কষ্ট পাইতে হইত না।
যাহা হউক, রৌদ্রের তাপে আমার বড় তৃষ্ণা পাইয়াছে ; একটু
জল পান করিয়া বিশাম করিলে ভাল হয় না?
নরেন্দ্র। ভাই যতীন, এখান হইতে আমাদের বাটী ত ' আর
বেশী দূর নয় ।
ঐ দেখ, আমাদের বাড়ী মাঠের ওপারে দেশ।
যাইতেছে, আমাদের সকাল সকাল বাটা ফিরিবার কথা। ম
বাবা আমাদের জন্য কতই না ভাবিতেছেন।
তবে তোমার যদি
বেশী কষ্টবােধ হয় তাহা হইলে এইখানে এস, একটু বিশ্রাম ওয়া
মাক, এই বলিয়া দুইটী ভায়ে একটি বড় বটবৃক্ষের ছায়ায় আসিয়া
বসিলা এবং উত্তরীয় দ্বারা দেহের ঘাম মুছিয়া দ্বারা হাওয়া
খাইতে লাগিল।
নরেন্দ্রও বড় কম শ্রান্ত হন নাই। সুশতনা ছায়ায় কিছুক্ষণ
বিমের পর তিনি তন্দ্রাভিভূত হইয়া পড়িন এবং যতীন তাহাকে
তদবস্থা দেখিয়া জাগরিত করিতে সাহী হইলেন না।
পূর্কেই বলা হইয়াছে যে, যতীনের বড়ই জল তৃষ্ণ পাইয়াছিল।
তিনি কিছুক্ষণ জ্যেষ্ঠের পাশে বসিয়া তাঁহাকে ব্যজন করার পর,
নিজের জল তৃষ্ণা নিবারণের জন্য নিকটস্থ কোন ভাল পুষ্করিণীর
সন্ধান করিতে লাগিলেন।
সম্যক্ চেষ্টার ফল অবক্তবী।
মই তিনি একটি প্রকাণ্ড
পুষ্করিণী দেখিতে পাইয়া তদভিমুখে যাইতেন। পুষ্করিণীর জল অতি
স্বচ্ছ, ঘাটে যাইবার একটি পাকা সিড়ি এখানে ওখানে ভাঙ্গিয়া

প্রং' পরিচ্ছেদ। পড়িয়া কারে কঠোর শাসনের পরিচয় দিতেছে। যতীন হাত পা মুখ ধুইয়া অঞ্জলি করিয়া জল পান করিলেন ও কঞ্চিৎ সুস্থ হইলেন। চারিদিক নিরীক্ষণ করিতে করিতে পুকুরের অপর পড়ে কতকগুলি ক্রীড়া-নিরত বালিক। তাহার নয়নপথে পড়িল । বলিকগণের ধ্যে তিন চার জন কিশোর বয়স্কা; কিন্তু সকলেই ৩.বাহিতা বলিয়া বোধ হইল। তিনি কয়েক পদ ফিরিয়া আসিতে • {তেই এক করুণ চীৎকার ও তৎসঙ্গে ক্রন্দন ধ্বনি তাহার প্রণদূরে প্রবেশ করিল। বহে তিনি সঙ্গী পদে ক্রন্দনধ্বনি না করিয়া অগ্রসর হইয়া সেই পুকুরে পড়ে আসিয়া দেখেন যে, বালিকগণের ধ্যে তিন চারিটি কোমর জ, নমিয়া। কি জিতেছে ও কঁদিতেছে তাহাকে দেখিতে পাইয়া তীরস্থ একটি বালিক। তাহার কছে আলুথালু বেশে দৌড়িয়া আসিয়া ভয়-কম্পিত-স্বরে বলিল, মাশয়, সৰ্ব্বশ হইয়াছে ; আমাদের সুশী গে এইমাত্র ডুবিয়া গেল এবং অলি সঙ্কেত দ্বারা পুকুরের টের স্থান নির্দেশ করি। দিতে না দিতেই যতীন অনুমানে সমস্ত বিনা জলস্থ তর বালিকগণকে নিমেষে তীরের দিকে সাইয়া দিয়া নিজের গলাজলে নামিয়া এক ডুব দিলেন এবং পর মুহূর্তেই একটী পরমাসুন্দরী বালিকার সলিল সিক্ত মৃত প্রায় দেহ স্কন্ধ করিয়া তীরে উঠিয়াই দুই হস্তে সবলে মাথার উপরে পরিয়া ' দুই তিন বার ঘুরাইতেই বালিকার মুখ ও নাক দিয়া কতকটা জন উদগীরণ হইয়া গেল এবং বালিকাকে শয়ন করাইয়া তাহার শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য বিদিত কয়েকটি ক্রিয়া শেষ করিয়া তাড়াতাড়ি যতীন ঐ বালিকার নাসিকার নিকট হাত লইয়া গিয়া দেখিলেন যে, বালিকার অতি গীণভাবে নিশ্বাস বহিতেছে ।

সুখের-মিলন। ইহা দেখিয়া যতীনের মন আজাদে আপ্লুত হইল এবং নিকটস্থ স্তম্ভিত ও নির্বাক বালিকাগুলিকে সমােধন করিয়া বলিলেন যে, ভগবানের কৃপায় তােমাদের বন্ধু বাঁচিয়া গিয়াছেন, তােমাদের কোন ভয় নাই ; কিন্তু তােমাদের একটী কাজ করিতে হইবে আমায় একটি পাত্রে করিয়া খাবার জল ও একটু গরম দুধ আনিয়া দাও, দেখিও যেন দেরি না হয়। ইহা শুনিয়া তাহাদিগের ভিতর একজনদৌড়িয়া জল ও দুধ আনিতে গেল। ইতিমধ্যে যতীন বালিকার মস্তকে তাহার চাদর দিয়া বাতাস দিতে লাগিলেন, বাতাস করিতে করিতে বালিকাটির অল্প জ্ঞানের লক্ষণ দেখা দিল। প্রায় অর্ধ ঘণ্টার পর বালিকাটির সম্পূর্ণ জ্ঞান হইল এবং এক অপরিচিত সুন্দর যুবককে পার্শ্বে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া তাড়াতাড়ি সে উঠিবার চেষ্টা করিল বটে, কিন্তু পারিল না; এবং যতীন সযত্নে নিবারণ করিয়া বলিলেন, আপনি উঠিবার চেষ্টা করিবেন না, আপনার শরীর বড়ই কাহিল হইয়াছে, এই দুধটুকু খান, তাহা হইলে আপনি শরীরে বল পাইবেন। আরও অৰ্দ্ধ ঘণ্টাকাল কাটিয়া গেল, বালিকার দেহে বল আসিল এবং সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল এবং তাহার সঙ্গিনীগণকে পরােক্ষে জিজ্ঞাসা করিল, আমি কোথায় ? আমার কি হইয়াছিল, আর ইনিই বা কে ? * সঙ্গিনীগণ বলি, না ভাই, সুহাস, তােমার বিশেষ কিছু হয় নাই, তবে তুমি ফুটন্ত পদ্ম ফুল তুলিতে গিয়া বেশী জলে পড়িয়া গিয়াছিলে । আমরা চীৎকার করিয়া উঠায়, উনি আমাদের নিকট আসেন এবং আমাদের ব্যাপার শুনিবামাত্র জলে ডুব দিয়া তােমাকে জল হইতে তুলিয়াছেন। বয়স্তাগণের মধ্যে কুমুদিনী নামধেয়া একজন বয়ােজ্যষ্ঠ অগ্রসর হইয়া বলিল এস ভাই, আমরা উহার পরিচয় লই, এই বলিয়া কুমুদিনী যতীনকে সম্বােধন করিয়া কহিল, মহাশয় আপনি অতি সন।

as
মঠোণী-
“পুষ্করিণী তীরে শায়িতা সংজ্ঞা রহিত সুহাসিনীকে যতীন উত্তরীয়
দ্বারা বাতাস দিতেছে”—৪ পৃষ্ঠা
U. RAY & SONS.

No text on this page.

প্রথম পরিচ্ছেদ। 5 * 5. ^^^d nN । আমরা আপনার অপরিচিতা তথাপি আপনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া আমাদের বন্ধুর প্রাণদান করিয়া আমাদের যে উপকার করিলেন, তাহা আমরা জন্মেও ভুলিব না। আমরা আপনার নিকট চিরবাধিত হইয়া রহিলাম । যতীন কথার উত্তর দিতে অক্ষম হইলেন। একবার আকাশের দিকে তাকাইলেন, বােধ হইল, ভগবানকে মনে মনে স্মরণ করিলেন এবং নিজ কার্য সম্পাদন করিতে সফল হওয়ায়, এক অভূতপূর্ব আত্মসুখে তাঁহার মুখে এক আনন্দের ভাব ফুটিয়া উঠিল। পরক্ষণেই বলিলেন, দেখুন, আমার দ্বারায় আপনাদের যদি কোন উপকার হইয়া থাকে, তাহাতে আমার কোন গৌরবের কথা নাই, ইহা আমার কর্তব্য কৰ্ম্ম ; আর যদি আমি সম্মুখে কাহারও বিপদ দেখিয়া আমার যথাসাধ্য সাহায্যদানে অক্ষম হই, তাহা হইলে আমি ভগবানের নিকট দোষী হইব। যতীন যে সময় এই কথা বলিতেছিলেন, সুহাসিনী একদৃষ্টে তাহার মুখের দিকে চাহিয়াছিল এবং তাহার কথা শেষ না হইতে হইতেই যতীনের দৃষ্টি সুহাসের দিকে পড়ায়, চারি চক্ষে মিলন হইল। যতীন একটু অন্যমনস্ক হইলেন এবং কি জানি, সুহাসের মুখ লাল হইয়া উঠিল ও সে মাটিরদিকে চাহিয়া ভিজা কাপড়ের আঁচল নিঙড়াইতে লাগিল। নিমেষের মধ্যে এই ব্যাপার ঘটিয়া গেল ; কিন্তু পাঠক পাঠিকার মত কোন পাকা লােক ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত থাকায়, কেহ তাহা বিশেষ করিয়া লক্ষ্য করিল না এবং যতীন ও সুহাস জেরার দায় হইতে অব্যাহতি পাইল। কুমুদিনী তাহার সহচরী সুহাসকে পরােক্ষে বলিল, দেখ ভাই, ইনি বড় ভাল। ইনি যদি তাের বর হন ত, বেশ হয়। সুহাস কোন কথা কহিতে পারিল না, কেবল তাহাকে একটি চিটি কাটিল এবং ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিল।

সুখের-মিলন। । ।। ।। ।। ।। । যতীনও ভাবনার হাত হইতে নিষ্কৃতি পায় নাই। তাহার মনে হইতেছিল, আহা, বালিকার দেহের গঠন কি সুন্দর, বর্ণ চাপা স্কুলের ন্যায়, চক্ষু দুইটি স্বচ্ছ সরােবরে যেন দুইটি পদ্ম ফুটিয়া রহিয়াছে, বালিকার বয়স অনুমান বার তের বৎসর হইবে, কিন্তু দেহের লাবণ্য যেন উথলিয়া পড়িতেছে। অবশ্য সুহাস সুন্দরী বটে, কিন্তু যতীনের চক্ষে সুহাসের সকলি সুন্দর বােধ হইতেছিল, কেন হইতেছিল, ইহার সমস্যা পূরণ পাকা পাঠক পাঠিকাগণ অনুগ্রহ করিয়া করিবেন, এবং নিশ্চয়ই বলিবেন “ভালবাসার চক্ষে ভালবাসার লােকের সকলই সুন্দর দেখায়।” যতীন কুমুদিনীকে জিজ্ঞাসিলেন—আপনার বন্ধুর নাম ও পরিচয় জানিতে পারি কি ? কুমুদিনী। আপনি ওরকম কথা বলিয়া আমাদিগকে লজ্জা দিতেছেন কেন? আমার বন্ধুর নাম সুহাসিনী, পিতার নাম ভােলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, এখন শুনিলেন ত ? সে যাহা হউক, আপনি ত আর আমাদের নাম ধাম চাহেন না ? যতীন থতমত খাইয়া বলিলেন-না তা নয়, না তা নয়, আপনাদেরও নাম বলুন না। সুহাস কুমুদিনীকে টিপিয়া বলিল, তুই বড় দুষ্ট। এখন ভাই ওর পরিচয় এইবার জিজ্ঞাসা করিয়া নে না। কুমুদিনী জিজ্ঞাসা করিল, মহাশয়ের নাম ও বাড়ী কোথায় আমাদের বলিবেন কি ? না, সুহাস জিজ্ঞাসা করিলে বলিবেন ? যতীন। অবশ্য আপনারা জানিতে পারেন ; আমার শ্ৰীযতীন্দ্রনাথ ঘােষাল, বাড়ী বৈদ্যবাটী, পিতার নাম শ্রীভজহরি ঘােষাল।

প্রথম পরিচ্ছেদ। ১৬ যতীন । উভয়ে উভয়ের পরিচয় পাইয়া কিছুকাল চুপ করিয়া রহিল। কেন, তাহা কে বলিতে পারে ? তবে গ্রন্থকারের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে এই বােঝায় যে, তমসাচ্ছন্ন হৃদয়ের মধ্যে আশারূপ আলােকের ক্ষীণ জ্যোতিঃ কি জানি কি এক অজানিত ভাবে দুটি হৃদয় আলােকিত করিয়া তুলিল। পূর্বোক্ত ব্যাপারে পর প্রায় আধ ঘণ্টা অতীত হইয়াছে সহসা যতীনের নিদ্রিত ভ্রাতার কথা মনে হওয়ায়, যতীন বালিকাগুলিকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন যে, আপনারা এখন বাড়ী ফিরিয়া যান, আমিও আসি। কুমুদিনী। আমরা যাইতেছি, আপনি আমাদের ভুলিবেন না। সে কি কখনও হইতে পারে। আমি আমার মামার বাড়ী যাইতে হইলেই এই ধার দিয়া যাই, আবার দেখা হইবে। এই বলিয়া যতীন বিষন্ন বদনে তাহাদের নিকট হইতে বিদায় ভাইয়া সেই বটবৃক্ষের তলায় আসিলেন, আসিয়া দেখিলেন, নরেন্দ্র তখনও ঘুমাইতেছেন। যতীন তাহার পার্শ্বে বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন ; আহা! ভগবানের সৃষ্টির কি বিচিত্র শােভা, তিনি কত রকম জীব ও পশু সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহাদের আহার .যােগাইতেছেন। তাহার কত রকম নামই যে দিয়াছেন, তাহার কিছু ঠিক করিয়া উঠিতে পারা যায় না। পরক্ষণেই সুহাসের কথা মনে হওয়ায় ভাবিলেন, বালিকাটির কি সুন্দর নাম ও কি সুন্দর গঠন ও কিশাের বয়স, যেন নব প্রস্ফুটিত চম্পক ফুল, তাহার কি সলজ্জভাব ও সরল কটাক্ষ, সেই কটাক্ষে মনের ভাব সম্যকরূপে পরিস্ফুট হইতেছিল ইত্যাদি। এমন সময় বৃক্ষোপরি হইতে পাপিয়া ডাকিয়া উঠিল, তাহার স্বরে নরেন্দ্রের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল, সে দেখিল, তাহার ভাই যতীন তাহার পার্শ্বে বসিয়া ।

সুখের-বিলন। ১। অন্যমনে কি ভাবিতেছে। ইহা দেখিয়া, সে যতীনকে জিজ্ঞাসা করিল, ভাই যতীন, তুমি কি কোথাও গিয়াছিলে? আর তােমার এত দেরি হইল কেন ? যতীন দাদার এইরূপ হঠাৎ প্রশ্নে একটু থতমত খাইয়া বলিল, দাদা, আমি এইখানে ভাল পুষ্করিণীর সন্ধানে বেড়াইতে বেড়াইতে রাস্তা ভুলিয়া গিয়াছিলাম, তাই আমার আসিতে এত দেরি হইল। দাদা, তােমার কি কোন অসুখ করিয়াছে যে, তুমি ঘুমাইতেছিলে ? ১ ভাই, আমার শরীর ভাল আছে, তবে পথশ্রম অধিক হওয়ায় কিছু ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম তাই ঘুমাইয়া পড়িয়াছি। এদিকে পশ্চিম গগনে সূর্যদেব প্রায় অস্ত গমনােখ, পক্ষীসক নিজ নিজ বাসায় ফিরিয়া যাইতেছে, সমস্ত ধরণী যেন সমস্ত দিনের পর বিশ্রাম করিতে যাইতেছেন। ইহা দেখিয়া নরেন্দ্র বলিল, যতীন সন্ধ্যা হইয়া আসিল, ভাই বাটীতে বাবা ও মা বােধ হয় আমাদের জন্য বড়ই ভাবিতেছেন, চল, আর বেশী দেরি করা উচিত নয়, এই বলিয়া উভয়ে সত্বর গৃহাভিমুখে চলিল। নরেন্দ্র। ।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। বে দ্যবাটী গ্রামে একঘর ব্রাহ্মণ বাস করিত। বাটীর কর্তার নাম ভজহরি ঘােষাল, কিন্তু গ্রামস্থ লােকে তাঁহাকে ঘােযাল ঠাকুর বলিয়াই জানিত। তিনি আর অপর কেহ নহেন পূর্ব পরিচ্ছেদে বর্ণিত নরেন্দ্র ও যতীনের পিতা। তাহার বসতবাটী খানি গ্রামের প্রান্তভাগে অবস্থিত। কয়েকখানি পর্ণ কুটীরের সমষ্টি মাত্র। বাড়ী খানি পর্ণকুটীর হইলে কি হয়, তাহা এমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং গৃহস্থের উপযােগী আসৱ, পত্র সাজ সরঞ্জাম আদি এমন যথাস্থানে এবং রুচিপূৰ্ব্বক সন্নিবেশিত যে, তাহা দেখিলেই মা লক্ষ্মীর আবাসস্থান বলিয়া স্পষ্টই অনুমিত হয়। এবং ইহা হইতেই বাটীর কর্তা, কত্রীঠাকুরাণি ও অন্যান্য পরিবারগণের গৃহকৰ্ম্ম নিপুণতার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণের পরিবার- বর্গ বড় বেশী নহে। নরেন্দ্র ও যতীন নামক দুইটি পুত্র, একটী অবিবাহিতা কন্যা, নাম সরলা; কিন্তু লােকে তাহাকে ছােট টি বলিয়া ডাকিত। ঘােষাল গৃহিণী প্রমদাসুন্দরী ও পুত্রবধু (নরেন্দ্রের • সুখের-মিলন। স্ত্রী) বিমলা। যতীনের এখনও বিবাহ হয় নাই, তবে কথাবার্তা হইতেছ মাত্র। ঘােষাল সংসারে লক্ষ্মী শ্ৰী বৰ্তমান থাকায় কৰ্ত্তা ও কত্রীঠাকুরাণী’ পুত্র পুত্রবধূ, মাতা, পুত্র, ভ্রাতা, ভগিনী, ভ্রাতৃত্বায়া ও দেবর পরস্পর পরস্পরের প্রতি সম্বন্ধ উপযােগী ও বয়সানুযায়ী স্নেহ ও ভক্তিপূর্ণ বাবহারে এমন একটা কমনীয়তা ও আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হইত যে, তাহা বর্তমান হিন্দু সংসারে একেবারেই দৃষ্ট হয় না। প্রায় সন্ধ্যা হইয়াছে, এখনও যতীন ও নরেন্দ্র বাড়ীতে আসে নাই, তাহার মাতা বড়ই ভাবিত হইলেন। তিনি তাহার স্বামিকে বলিলেন, হাগা, একবার একটু এগিয়ে দেখিলে হয় না? ছেলেরা কোথায় গেল, এখনও বাড়ীতে আসিল না কেন ? ইহাতে ভজহরি বাবু বলিলেন, তাইত, ছেলেরা কেন এখনও বাড়ী আসিল না । মন কিছু চঞ্চল হইলেও তাহা গােপন করিয়া বলিলেন, যাহা হউক, তুমি ভাবিত হইও না, আমি শীঘ্র দেখিতেছি । এই বলিয়া তিনি রাস্তায় বাহির হইলেন, রাস্তায় বাহির হইয়া অধিক দূর যাইতে না যাইতে দেখিলেন যে, যতীন ও নরেন্দ্র অতি দ্রুতপদে আসিতেছে ; দেখিয়া তাহার মনে বড়ই আহলাদ হইল; কিন্তু পরক্ষণেই এক অজানিত আশঙ্কায় তাহার মন বড়ই ভাবিত হইতে লাগিল, মনে মনে করিলেন, তাহারা এত দ্রুতপদে আসিতেছে কেন, কোনরূপ বিপদগ্রস্থ হয় নাই । এদিকে যতীন নরেন্দ্র দেখিল যে তাহাদের পিতা তাহাদের দিকেই আসিতেছেন—দেখিয়া তাহাদের প্রাণে বড়ই ভয় হইল, বােধ হয় বাটীতে কোনরূপ বিপদ উপস্থিত হইয়াছে, কিম্বা আমাদের আসিতে বিলম্ব হওয়ায়, পিতা আমাদের পুঁজিতে বাহির হইয়াছেন। যাহা v• ••

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
হউক কিছু দূর আসিয়া তাহারা উভয়ে পিতার সহিত মিলিত হইল,
পিতা তাহার সন্তান দুটীকে দেখিয়া যার পর নাই সুখী হইলেন
এবং জিজ্ঞাসা করিলেন-তােমাদের বৈকালে ফিরিবার কথা,
তােমাদের এত দেরী হইল কেন ? রাস্তায় কোনরূপ বিপদ ঘটে
নাই ত?
নরেন্দ্র। না বাবা আমাদের কোন বিপদ ঘটে নাই, তবে
মামার ছাড়িলেন না, বলিলেন, অনেক দিন পরে আসিয়াছ,
আমি তােমাদিগকে না খাওয়াইয়া ছাড়িব না, তাই আমাদের
আসিতে এত দেরী হইল।
অবশেষে তাহারা সকলে তাহাদের বাড়ী ফিরিয়া আসিতেছে
দেখিয়া ঘােষাল গৃহিণীর আর আহলাদের সীমা রহিল না, যতীন ও
নরেনকে জিজ্ঞাসিল - হ্যা বাবা নরু, যভী হারে তােদর
বৈকালে মামার বাড়ী থেকে আসিবার কথা, তা এত দেরী হ’ল
কেন ? তখন তাহার স্বামী আদ্যোপান্ত সমস্ত বুঝাইয়া দিলেন
এবং বলিলেন যে, যাও এখন তােমার ছেলে দুটীকে ত পাইয়াছ,
-আর ভাবনা কেন, খাব:রের উদ্যোগ দেখগে।
রাত্রি প্রায় নয় ঘটিকা, ঘােষাল সংসারে রাত্রের আহারাদ্রি
শেষ হইয়া গিয়াছে। রান্নাঘর পরিষ্কার ও উচ্ছিষ্ট বাসনগুলি মাজিয়া
ধুইয়া বিমলা ও ছােট পুটা কাপড় কাচিয়া অপর কাপড় পরিয়া :
পান খাইতে খাইতে বিমলা তাহার শয়ন ঘরে স্বামী নরেন্দ্রের
নিকট এবং ছােট পু টা তাহার মায়ের কাছে গেল। আসুন
কৌতুহলী পাঠক পাঠিকা একবার হিন্দুকুলবধূর ব্রীড়া সমন্বিত
সঙ্কোচপূর্ণ অথচ গভীর প্রণয়পুরিত কথােপকথন অভিসারে শ্রবণ
করি।

১২ সুখের-মিলন। //// \/\/\/y://///// আহারাদির পর নরেন্দ্র পিতৃসন্নিধানে গিয়া বসিলেন, ভজহরি বাবু তখন তাম্রকুট সেবনে মগ্ন হইতে চেষ্টা করিতেছিলেন। নরেন্দ্রকে দেখিয়া বলিলেন, নরেন্দ্র, বাবা আজ সমস্ত দিন তােমাদের বড়ই কষ্টে গিয়াছে, অতএব শীঘ্র শয়ন করিয়া সুস্থ হও। নরেন্দ্রও পিতৃ-আজ্ঞা শিরােধার্য্য করিয়া আপনার শয়নঘরে গিয়া দেখিলেন যে, তাঁহার প্রিয়তমা-পত্নী বিমলাসুন্দরী, তখনও ঘরে আইসেন নাই। সেই জন্য তিনি বিছানার সন্নিকট একখানি টুলে বসিয়া ও কাপড়ের দেরাজে হেলান দিয়া একখানি পুস্তক খুলিয়া বসিলেন, বসিলেন মাত্র। কিন্তু পাঠে মনােনিবেশ করিতে পারিতেছেন না। কেন ? আপনারা জানেন কি ? প্রণয়িণীর আগমন প্রতীক্ষায় এক একবার দ্বারের দিকে দেখিতেছেন, আর এক একবার দেরাজের উপরিস্থিত টাইপিসের দিকে লক্ষ্য করিতেছেন। ঘড়ি কাহারও কথা শুনে না, আপনার কাজ টিক্ টিক্ করিয়া সারিয়া যাইতেছে ; নরেন্দ্রের একটু তন্দ্রা আসিবার উদ্যোগ হইয়াছে, এমন সময় অবগুণ্ঠনবতী বিমলা অতি সন্তর্পণে পা টিপিয়া টিপিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া নিঃশব্দে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিল। পরে নরেন্দ্রের নিকট আস্তে আস্তে গিয়া দাঁড়াইল, মাথার কাপড় একটু তুলিয়া অনিমেষ-নয়নে হিন্দু পতিব্রতা স্ত্রীর একমাত্র দেবতা নরেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিল, তাঁহাকে একটু তন্দ্রাভিভূত দেখিয়া আলো সরাইয়া পাখা লইয়া আস্তে আস্তে হাওয়া করিতে লাগিল। শয়ন ঘরের পার্শ্বে শৃগালাদি কোন জন্তুর বাটীর প্রাঙ্গনে চোরের মত প্রবেশ করিবার চেষ্টায় নিকটস্থ ছাইএর গাদায় শায়িত গৃহ- পালিত সারমেয়ের হঠাৎ বিকট চীৎকারে নরেন্দ্রের তন্দ্রা ভাঙ্গিয়া গেল, চক্ষু মুছিয়া চাহিতেই তাঁহার হৃদয় সরােবরের একমাত্র দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। নয়ে। পদ্মকলিকা বিমলাসুন্দরীকে মিটিমিটি হাসিতে দেখিয়া বলিলেন, বিমলা, হাসিতেছ কেন ? বিমলা। তােমাকে দেখিয়া । আমাকে কি কখনও দেখ নাই ? আর আমাকে দেখিলেই কেন তােমার হাসি আসে ? বিমলা। তােমাকে দেখিব না কেন? সেই বিবাহ রাত্রে বরণের সময় শুভদৃষ্টি হইতে আরম্ভ করিয়াত দেখিয়া আসিতেছি । কিন্তু তােমাকে দেখিয়া কি আশা মেটে ? যতই দেখি ততই দেখিতে ইচ্ছা হয়, তােমাকে সুধু দেখিয়া মন কেমন হইয়া যায় এবং দেখিতে দেখিতে কি জানি কেন হাসিয়া ফেলি। তুমি এমনই নিষ্ঠুর যে আমার হাসিটুকুও বুঝি তােমার ভাল লাগে না। বেশ মানুষ যা হােক । নরেন্দ্র বিমলার হাতখানি ধরিয়া আস্তে আস্তে কাছে টানিয়া আনিয়া বাহুযুগল দ্বারা বিমলার স্বল্পস্পন্দিত দেহখানি • আলিঙ্গনে বদ্ধ করিলেন এবং তাহার বক্ষোপরি স্থাপিত বিমলার মুদ্রিত নয়নে ও ঈষৎ কম্পিত ওষ্ঠে ও কপােল আবেগভরে কয়েকটি চুম্বন বসাইয়া দিলেন, পরে নরেন জিজ্ঞাসা করিলেন–মা শুইতে গিয়াছেন কি ? বিমলা। হ্যা, আমি তাঁহার পান ও দোক্তা দিয়া আসিলাম, তিনি শুইবার ঘরে যাওয়ায় আমি এখানে আসিয়াছি। স্বামি স্ত্রীর অনেক বিষয়ে কথাবার্তা হইল। যতীনের কথা উত্থাপিত হওয়ায় নরেন্দ্র কহিল দেখ, বিমল, তুমি একটি কাজ করিতে পারিবে ? আমার মনে হয় তােমার দ্বারাই এ কাৰ্যটি নির্বিবাদে সম্পন্ন হয়। বিমলা। তুমি এত কিন্তু হইয়া কথা কহিতেছ কেন ? পৃথিবীতে এমন কি কাৰ্য্য আছে যাহা স্বামীর আদেশে স্ত্রী না করিতে পারে ? এখন বল দেখি শুনি, কি হুকুম তামিল করিতে হইবে।

১৪ সুখের-মিলন। ; নরেন্দ্র। দেখ—আজ দুপুর বেলা মামার বাড়ী হইতে আসিবার সময় আমরা রৌদ্রে বড়ই ক্লান্ত হইয়া পড়ি। এক গাছের ছায়ায় বসিয়া বিশ্রাম করিতে করিতে আমি ঘুমাইয়া পড়ি। যতীনের তৃষ্ণা পাইয়াছিল—শুনিলাম, ভাল পুষ্করিণীর সন্ধানে যাইয়া পথ ভুলিয়া যায়, পরে আমার কাছে আসিয়া আমাকে হাওয়া করিতেছে, এমন সময় আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া যায়। যতীনকে পথ ভুলার কথা বিশেষ করিয়া জিজ্ঞাসা করায়, যতীন যেন একটু থতমত খাইয়া গেল এবং তাহাকে কিছু অন্যমনস্ক ভাব দেখিলাম বাড়ীতে আসিয়াও তাহার কেমন কেমন অন্যমনস্ক ভাব দেখিলাম। আমার মনে একটু খটকা লাগিল যে, ইহার মধ্যে এমন কিছু আছে, যাহা যতীন আমার সমক্ষে প্রকাশ করিতে কুষ্ঠিত হইতেছে ; কারণ যতীন ত আমার তেমন ভাই নয় যে, আমার কাছে সে অপ্রকাশ রাখিবে। তাই আমার মনে হইতেছিল যে, বিমলা গােয়েন্দা লাগাইলে তাহার মনের কথা সকলই বাহির হইয়া পড়িবে। বিমলা। আচ্ছা, ঠাকুরপােকে জিজ্ঞাসা করিবে। তাময় সে মার পেটের বড় বােনের মত ভক্তি ও যত্ন করে । এখন আমার হাত যশ। 'আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর দম্পতিযুগল ঘুমাইয়া পড়িল। পরদিন মধ্যাহ্নে আহারাদির পর নরেন্দ্র পাড়ায় একজনের বাটীতে একটু দরকারে গেল। ভজহরি বাবু চণ্ডীমণ্ডপে একটু বিশ্রামের চেষ্টায় গিয়াছেন। ছােট পুটীকে লইয়া ঘােষাল গৃহিণী ঘরের মেঝেয় শয়ন করিয়াছেন। এমন সময় যতীন “মা একটু খাবার জল দাও ত” বলিয়া দাওয়ায় উঠিল । ঘােষাল গৃহিণী পুত্রবধূ বিমলাকে ডাকিলেন, বোমা, যতীনকে জালা থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা খাবার জল দিয়া যাওনা মা। আমার ভাত খাওয়া কাপড়, আমি আর জলের জালা ছুই না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
বিমলা তাড়াতাড়ি যতীনকে হাতছানি দিয়া ডাকিয়া এক গ্লাস জল
খাইতে দিলেন।
যতীন জল খাইতে খাইতে বলিল—বৌদিদি, জুলটি
বে
ঠাণ্ডাত আর একটু দাওনা বৌদিদি। বিমলা আর একটু ঢালিতে
ঢালিতে হাসিয়া বলিলেন-ঠাকুরপাে, শুনিলাম কালও এই সময়ে
তােমার বেজায় পথ হাঁটিয়া জল তেষ্টা পাইয়াছিল—ভাল পুকুরের
সন্ধানে গিয়া আবার পথ হারাইয়াছিলে নাকি ?
যতীন। হঁা গাে বৌদিদি। একটি ভাল পুকুর দেখিলাম পরে
জল খাইয়া দাদার কাছে আসিব মনে করিতেছি, এমন সময়-
না থাক, সে কথা-বৌদিদি একট। পান দেবে ?
বিমলা। কেন দেব না ভাই-কিন্তু কি বলিতে যাইতেছিলে,
তা না বলিলে পাইবে না। আমি কি ভাই শুনিতে পাই না—যদি
বলিবে না, তবে কথা তুলিলে কেন?
বৌদিদির এই অভিনপূর্ণ একটু মিঠেকড়া তিরস্কারে যতীনের
মন উথলিয়া উঠিল, পরে ধীর সতর্কতার সহিত বলিল-সে এমন কিছু
নয়, এই বলিয়া একটু যথাযথ একটু ভাঙ্গিয়া চুরিরা অদল বদল করিয়া
বলিতে গেল ; কিন্তু সত্য কথা গােপনে অভ্যস্ত থাকায় ও বৌদিদি
রূপ সদর জেলার ফৌজদারী মকদ্দমায় নিযুক্ত আসামী পক্ষ সমর্থন
কারী বিলাত প্রত্যাগত নামজাদা কৌন্সিলির জেরায় কাবু হইয়া পড়িল,
এবং অবশেষে সমস্ত কথা প্রকাশ হওয়ায় যতীনের কি অজানিত
আশঙ্কায় চোখ মুখ একটু লাল হইয়া উঠিল এবং একটু সঙ্কোচভাবে
অভিভূত হইল। তাহা দেখিয়া বৌদিদি যতীনকে একটু প্রকৃতিস্থ
করিবার মানসে বলিগেন, আহা সে মেয়েটী কাদের গাে? বেঁচে
গ্যাছে ?

সুখের-মিলন। যতীন। হ। সেই জন্যই আমার এত দেরী হইল। তাহার মুখে চোখে জল দিয়া তাহার চেতনা আনাইয়া বাটী পাঠাইয়া দিয়া তবে আসিয়াছি। বৌদিদি। হাঁ, বেশ করেছ, তুমি তােমার কর্তব্য কাজই করিয়াছ এবং এই পৃথিবীতে কেবল পরের উপকার করাই দরকার আর ও যখন তােমার হাতেই আসিয়া পড়িয়াছিল তখনই আমি বুঝিয়াছি যে তােমার দ্বারা তাহার ভাল বই মন্দ হইবে না। তা বেশ কাজই করিয়াছ, এখন বল দেখি ভাই মেয়েটী কেমন দেখিতে আর তাহার বয়স কত ? যতীন। মেয়েটা দেখিতে বেশ সুন্দর এবং বয়স অনুমান ১২ বৎসর হইবে। বিমলা। ঠাকুরপাে, তােমার ওই রকম একটী কনের সহিত কেন ওই মেয়েটী সহিত—যদি বিবাহ হয় ত বেশ হয়, কেমন না ? যতীন লজ্জায় অভিভূত হইল মুখে বলিল—বৌদিদি বড় দুষ্ট- কিন্তু মনে মনে বৌদিদির মুখে ফুলচন্দন পড়ার ব্যবস্থা যে না করিয়া- ছিল এমন নহে। বৗদিদিও বেশ বুঝিতে পারিল ইহাতে যতীনের সম্মতি ছাড়া অমত নাই। F

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
রিদিন প্রাতে নরেন্দ্র তাহার পিতামাতাকে বলিল যে,
মামারা বলছিলেন যে, তাহার ছােট পুটির বিবাহের
ভাল একটা সম্বন্ধ খুঁজিয়া রাখিয়াছেন। তাহাদেরই
বাড়ীর নিকটে, পাত্ৰটী খুব ভাল এবং পয়সাও আছে।
যদি আপনাদের পছন্দ হয়, তাহা হইলে মামাদের খবর দিতে
বলিয়াছেন।
ইহা শুনিয়া ঘােষাল গৃহিণী স্বামীকে বলিলেন—কি গাে, ভাবছ কি ?
মেয়েটী যে মাথা ঝাড়া দিয়া উঠিতেছে, আর কত দিন চুপ করিয়া
বসিয়া থাকিবে।
ভজহরি। ভাবিব আর কি ? ও সম্বন্ধ যখন তােমার ভায়েরা
আনিয়াছেন, তখন আর কোন কথাই নাই। তবে পাটীর সম্বন্ধে
একবার এবং দেনা পাওনা সম্বন্ধে একটু ভাল করিয়া বিবেচনা করিতে
হইবে। কারণ আমি গরীব লােক-অবস্থার অতিরিক্ত দিতে ত
পারিব না।
২

সুখের-মিলন। ; গৃহিণী। ফ্লাগা, তােমার মেয়ে আগে, না পয়সা আগে ? ছেলেটা দেখিতে শুনিতে ভাল ও সচ্চরিত্র হইলে এবং ভাত কাপড়েয় স্বচ্ছলতা ও মাথা গুজিবার নিজের একটু কুঁড়ে থাকিলে দেওয়া থােয়ার বিষয়ে বিশেষ আজকালের বাজারে কড়াকড়ি করিলে ত চলিবে না। তবে উহার মধ্যে ন্যায্য গণ্ডা যা চাহিবে তাহাই দিতে হইবে। আমাদের যােগাড়ের টাকাতে যদি না সংকুলান হয়, তবে বেশী ২০০১০০ টাকার জন্য তােমায় বিশেষ ভাবিতে হইবে না—আমার যে ২১ খানা গহনা আছে তাহা দিলেই বােধ হয় চলিতে পারিবে। ভজহরি। আচ্ছা, সে এখন পরের কথা; আগেশ্বরের ইচ্ছায় সম্বন্ধটা ঠিক হইয়া যাক, তার পর ওসব কথা হইবে। আচ্ছা নরেন্দ্র, তুমি তােমার মামাকে বলিও যে, বাবা বলিলেন, ও আর ভঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবার কিছু দরকার নাই; সম্বন্ধ যখন আপনি আনিয়াছেন, তখন আপনি ও আমার মাতা যাহা ভাল বিবেচনা বােধ করিবেন তাহাই করিবেন, কেবল সময় থাকিতে তাহাকে খবর দেন যেন, তিনি এধারকার সব উদ্যোগ করিতে পারেন। আরও তােমার মামাকে বলিও যে তাহারা কি চান আমায় যেন শীঘ্রই জানান। প্রমদা । চল এখন ভাত খাওগে, বেলা হইয়া গিয়াছে। নরেন্দ্র এস বাবা, তুমিও খাবে এস, আবার তােমায় আজ মামার বাড়ী যেতে হবে। নরেন্দ্র ভাত খাইয়া একটু বিশ্রামের পর তাহার মামার বাটীর অভিমুখে চলিল-প্রায় দুই ঘণ্টা কাল চলিয়া আসিয়া সে তাহার মামার বাড়ী পৌছিল। তাহার বড় মামা তাহাকে অসময়ে হঠাৎ আসিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসিলকি হে নরেন্দ্র, হঠাৎ এমন সময়ে যে, খবর ভাল ত ?

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
নরেন্দ্র। আজ্ঞে হাঁ, খবর সব ভাল, তবে বাবা আপনার নিকট
পাঠাইয়া দিলেন। পুটির বিবাহের সম্বন্ধের বিষয় বাবার ও মার মত
আছে, তাঁহারা বলিলেন যে, ও আমরা আর কি বলিব, তােমার মামার
যাহা ভাল বিবেচনা করিবেন তাহাই হইবে, তবে আমাদের একটু আগে
যেন পাকা খবরটা দেওয়া হয়, আর দেনা পাওনা সম্বন্ধে বলিও যে,
আমরা গরীব মানুষ যেন তােমার মামারা বিবেচনা করিয়া যাহা ভাল
হয় তাহাদের বলেন।
মামা। ও আর বেশী কথা কি।
ভােলানাথ বাবু আমার বন্ধু,
আমি তাহাকে সব ভাল করিয়া বলিব, তবে তুমি এখন একবার বাড়ীর
ভিতর যাও গিয়া একটু জলটল খাও।
নরেন্দ্র। না মামা, আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে, আজ আমি
যাই, আর একদিন আসিব।
নরেন্দ্র বাটীর অভিমুখে ফিরিল।
কিছুক্ষণ পরেই তাহার মামা বাটীর নিকটেই ভােলানাথ
বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাটীতে যাইয়া উপস্থিত হইলেন।
ভােলানাথ বাবু যদু বাবুকে যথেষ্ট অভ্যর্থনা করিয়া বসাইলেন এবং
কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।
যদু বাবু। খবর ভাল, তােমার ছেলের সহিত আমার ভাগিনেয়ীর
বিবাহের সম্বন্ধ লইয়া আসিয়াছি, এখন বিবাহ দিয়া অনুরােধ রাখিতে
হইবে। এখন কি বলিবে বল ?
ভােলানাথ বাবু। ও আর আমার কি মত, তুমি যখন এর মধ্যে
আছ, তখন তুমি যাহা ভাল বিবেচনা করিবে তাহাই হইবে, তবে
কি জান, কেবল ছেলের গর্ভধারিণীর মতটা হইলেই হয়—আচ্ছা, আমি
এ বিষয়ে তাকে বলিব এবং তার কি মত তােমাকে জানাইব।

২• সুখের-মিলন । মধ্যাহুকাল ; আহার সমাপনান্তে ভােলানাথ বাবু স্বকীয় বিশাল বপুখানি একখানি শীতল পাটীর উপর ঢালিয়া দিয়া তাম্রকূট সেবনের মৌজ অনুভব করিতেছিলেন। এমন সময় তাহার স্ত্রী পান চিবাইতে চিবাইতে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল–হাগা, ওবাড়ীর যদুবাবু আসিয়াছিলেন কেন? ভােলানাথ বাবু। তাহার একটী ভাগিনেয়ী আছে, তার সঙ্গে তােমার ছেলের বিয়ের জন্য। রাজবালা। মেয়েটা কেমন ? দেনা পাওনা কি দিবে বলিলে ? ভােলানাথ বাবু। মেয়েটা বেশ, যেন পরী-তবে তারা গৃহস্থ মানুষ, তত দিতে থুতে পারবেন না, তবে তুমি যাহা বলবে আমি তাহাই বলিব। রাজবালা। আমার ছেলে ত যে সে ছেলে নয়, আমার দুটো পাশ করা ছেলে, আমি কি অমনি ছেড়ে দেব, তার বিয়েতে এই সব চাই- দেড় হাজার টাকা নগদ, খাট, বিছানা, একশ ভরি সােণা, ঘড়ির চেন, হীরার আংটী। যদি দিতে পারে তবে মেয়ে আ, আর নয়ত ছেলের বিয়ে দেব না। আর মেয়ে আমি নিজে দেখবাে, আমার যদি পছন্দ হয়, তাহা হইলে অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি বিয়ে দিব। ভােলানাথ বাবু। ও বাবা, তুমি যে একেবারে এক ছেলের বিয়ে দিয়ে রাতারাতি বড় মানুষ হতে চাচ্চ দেখছি। আচ্ছা গিন্নী, আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, তুমি এখন তােমার ছেলের বিবাহ বলিয়া বলিতেছ যে আমার এত চাই, এর কমে হবে না; কিন্তু এটা মনেতে ভাবিলেও না যে, হাঁ, আমারও একটা মেয়ে আছে, আমাকেও দুই মাস পরে তার বিবাহ দিতে হবে। যেটা রয় সয় সেইটা বলেই ভাল হয় না ? তােমায় ভগবান আর যে কেন ছেলে দেন নাই, তাহা ;

তৃতীয় পরিচ্ছেদ। এখন বুঝছি, ভালই করিয়াছিলেন, কেন না, তােমার একটা ছেলের বিয়েতেই তার ভাবী শ্বশুর পথে বসবেন। রাজবালা। হ্যাগাে হা, তােমার কেবল ওই কথা--আচ্ছা, এর কমে আমি কখনই ছেলের বিয়ে দেব না-হাজার টাকা নগদ, খাট বিছানা, ষাট ভরি সােণা, ঘড়ির চেন, হীরার আংটা। কেমন গাে, এইবার বােধ হয় পছন্দ হয়েছে ? ভােলানাথবাবু। আচ্ছা, এর কমে তােমার ছেলের ত বিয়ে দেওয়া হবে না। ভােলানাথ বাবু ও গিন্নীর কল্পিত আকাশ কুসুমে কথঞ্চিৎ আস্থা যে না দিলেন, এমন নহে, কিন্তু হংসের স্বর্ণ ডিম্ব প্রসবের ব্যাপার মনে হওয়ায় বড়ই উদভ্রান্ত হইয়া পড়িলেন ; তখন তাম্রকুট সেবনরূপ চিত্ত প্রশান্তকারী বামের (Balm) নিকট আত্ম সমর্পণ করিলেন। রাজবালাও সুখস্বপ্নে বিভাের হইয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। সময় কাহারও হাত ধরা নয়- মানুষ নিমকহারাম হইতে পারে, কিন্তু সেই মানুষ নিৰ্ম্মিত ঘটিকাযন্ত্র কখনও বেইমান হইতে পারে না ; ক্রমশঃ এক, দুই, তিন করিয়া চারিটা বাজিল, ভােলানাথ বাবু রাজবালার ঘুম ভাঙ্গাইতে সাহসী হইলেন না, যদিও রাজবালার হুকুম হুজুরে তামিল করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন, এক্ষণে রাজবালার ঘুম আপনি ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় তাহার চিত্ত কথঞ্চিৎ প্রশমিত হইল ; রাজবাল হাই তুলিয়া উঠিয়া বসিয়া বলিলেন-যদুবাবুর কাছে যাবে কখন? এধারে বেলা গেল যে। আমি মরে ঘুমাইয়াছিলাম-তুমি ত জাগিয়াছিলে আমাকে কি ডাকিয়া দিতে নাই—কত কাজ সংসারের পড়িয়া রহিয়াছে। ভােলানাথ বাবু। হাঁ, বেলা শেষ হয়ে এল, আমিও কাপড় ছেড়ে যদুবাবুর কাছে এখনি যাইতেছি।

মুখের-মিলন। দুবাৰু কাপড় পরিয়া বাহির হইবার উদ্যোগ করিতেছেন, এমন সময় ভােলানাথ বাবু যাইয়া উপস্থিত হইলেন। তাহাকে দেখিয়া যদু বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন-কি হে তায়া, এমন সময়ে যে, কি খবর ? ভােলানাথ বাবু। না তেমন কিছু নয়, তবে তােমার সঙ্গে একবার দেখা করূতে এলাম। তা থাক এখন, তুমি বাহির হইতেছ, আমি আর এক সময় আসিব এখন। যদুবাবু। তা হােগ, তুমি বল না হে তােমার খবর কি ? আমার কাছে আবার এত ভারিকি ভাব কেন বল ? ভােলানাথ বাবু। তা নয় তবে তােমার ভাগিনেয়ীর বিবাহ সম্বন্ধে দেনা পাওনা বিষয় যা বলিব বলিয়াছিলাম, তাই বলতে আসিয়াছি। যদুবাবু। এই কথা ; এর জন্যে আবার বলিতেছিলে যে, আর এক সময়ে আসিব। কেন, তুমি কি আমার পর? আমরা উভয়ে উভয়ের বন্ধু, আমাদের আবার সময়ের সুবিধা ও অসুবিধা কি ? যার যখন দরকার তখনি ডাকিয়া পাঠাইবে, এই ত হ’ল বন্ধুর কাজ। নাও, এখন বল তােমার দেনা পাওনার বিষয় বল ভােলানাথ। ভাই আমি গিন্নীকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, সে বলে, আমার এই চাই—হাজার টাকা নগদ, খাট বিছানা, ষাট ভরি সােণা, ঘড়ির চেন ও হীরার আংটা, এর কমে আমি ছেলের বিয়ে দেব না। তা ভাই তুমি একবার তােমার ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিও এবং তাহারা কি জবাব দেন, তাহ পরে আমায় বলিও, কেমন ? যদু বাবু। ভাই ভােলানাথ, আমার অনুমান যে, তাঁরা এত দিতে পারবেন না, কারণ তারা গরীব মানুষ, আবার একটা ছেলের বিয়ে দিতে তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ০ | বাকী আছে, তবে তুমি যখন বলিতেছ, তা আমি কল্যই নরেন্দ্রকে ডাকাইয়া সব বলিব। পরদিন প্রাতে যদুবাবু তাহার ভগ্নির বাটী বৈদ্যবাটীতে যাইয়া উপস্থিত হইলেন এবং তাহার ভগ্নিকে সব বলিলেন যে, বরেরা এই এই চায় ; তাহাতে তাহার ভগ্নি প্রমদ। বলিল, বেশ ভাই, তােমার ঘােষাল মহাশয় আসিলে, সমস্ত বলিয়া রাখিব এবং নরেন্দ্রদ্বারায় খবর পাইব। উভয়ে বসিয়া আর নানাবিধ কথােপকথন হইতেছিল, এমন সময়ে তথায় ভজহরি বাবু ও নরেন্দ্র উপস্থিত হইল। ভজহরি বাবু তাহার শ্যালক যদুকে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া তাহাদের উভয়ে বড়ই আশ্চর্যান্বিত হইল এবং কি খবর জানিবার জন্য বড়ই আগ্রহ হইল এবং যদুকে জিজ্ঞাসিল, কি হে সম্বন্ধি বাবু, কি খবর? আজ যে আমাদের একেবারে বাদ দিয়া ভগ্নির কাছে উপস্থিত। যাহা হােক, তােমাদের বাটীর সব খবর ভাল ত? আজ যে এমন অসময়ে হঠাৎ উপস্থিত, ব্যাপার কি বল ? যদু। না, তেমন কিছু নয়, তবে খবর বড়ই ভাল, সেই জন্য আজ আপনাদের সহিত এ সময়ে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছি। এই আপনি আমাকে যে ভােলানাথ বাবুর ছেলের সহিত আমাদের ছােট পুটির সঙ্গে বিবাহ সম্বন্ধ ঠিক করিতে বলিয়াছিলেন, তাহা প্রায় এক রকম সব ঠিক হইয়াছে, কেবল আপনার মতের অপেক্ষায় আছি, তাহারা এই এই চায় ; এর কমে তাহারা বিবাহ দিবেন না। ভজহরি বাবু তাহা শুনিয়া একেবারে গালে হাত দিয়া বসিলেন, নরেন্দ্রও পঁাড়াইয়াছিল বসিয়া পড়িল, ইহা দেখিয়া প্রমদা বলিল, হ্যাগাে তুমি যে একেবারে গালে হাত দিয়া বসিলে, যাহা হয় একটা জবাব দাও।

২৪
সুখের-মিলন।
~~~~~~~~~~~~
ভজহরি বাবু। তাইত গিন্নি, এ যে মেয়ের বিয়ে দেওয়া নয়,
একেবারে গলায় পা দেওয়া। যাহা হউক, দেখ যদু, তুমি তাহাদিগকে
বলিও যে, আচ্ছা আপনারা যাহা চাহিয়াছেন, তাহাই দিব এবং
অগ্রহায়ণ মাসের ১৫ই নাগাইত যেন বিবাহের দিন ঠিক করা হয় ও
একটু শীঘ্র যেন বিবাহটা দেওয়া হয়। কেমন প্রমদা ও নরেন্দ্র এই ত
তােমাদের মত ?
নরেন্দ্র। ও যখন আপনি মা ও মামা আছেন, তখন আর আমার
মত জিজ্ঞাসা করিবার বিশেষ দরকার নাই এবং আপনার যাহা ভাল
বুঝিবেন তাহাই করিবেন।
।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। s, ন্ম, বিবাহ, মৃত্যু মানব অনুজ্ঞায় পরিচালিত হয় না। ইহার পরিচালন কোন অলক্ষিত উচ্চ শক্তির—বিধাতৃ আদেশের—অপেক্ষা করে। ইহার মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু ধ্রুব সত্য বা শরীরীগণের অবশ্যম্ভাবী নিয়তি বলয়া নির্দিষ্ট। কারণ, জন্ম হইলেই মৃত্যু একদিন না একদিন “কান টানিলে মাথা আসার” নত আসিবেই। কিন্তু বিবাহ বিষয়ে এইরূপ কোন নিশ্চয়তা নাই। বিবাহরূপ পবিত্র বন্ধনে সম্মিলিত না হইয়াছেই , বসুন, এরূপ মানব অথবা বিবাহরূপ যুপকাষ্ঠে বলি হয় নাই, এরূপ অনেক ধেড়ে কার্তিক” পৃথিবীস্থ সকল জাতীয়ের মধ্যেই দেখিতে পাওয়া যায়। সে যাহা হউক, হিন্দুর উদ্বাহ কাৰ্য্য এক অদ্ভুত ব্যাপার। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজন্ম বিভিন্ন উদ্দেশে পরিচালিত ক্ষুদ্র কিন্তু সরল মানব মনের চিরজন্মের মত একত্র সম্মিলন, ইহাতে স্বার্থের আবিলতা নাই—আমিত্বের অস্তিত্ব নাই। ইহা পাশ্চাত্য জাতীর কোর্টসিপ বা বিবাহ চুক্তি পত্রের পূর্ব অনুরাগের প্রথম চাউনিতেই সুখের-মিলন। মাৎ” বা যুবক যুবতীর Love at the first sightএর ক্রমবিকাশ বা ফল নহে ঘােষাল ঠাকুরের কন্যা ছােট পুটির বিবাহের সমস্ত কথাবার্তা দেনা- পাওনা স্থির হছে-এখন শুভদিনে—দুই হাত এক হওয়া বাকী। সেই শুভদিনের কয়েক দিব আগ্নে হইতেই উদ্যোগ পৰ্ব চলিতেছিল ক্রমশঃ সময়নেমির আবর্তনে সেই দিন আসিয়া উপস্থিত হইল। গত কল্য হইতেই বৈদ্যবাটী গ্রামে মহা হুলস্থুল পড়িয়া গিয়াছে—কারণ, কাল শুভ গাত্র হরিদ্রা ইইয়াছে। দুপুর বেলা আহারাদির পর মেয়ে মহলে এবং বৈকালে পুকুর ঘাটে পালিয়ামেন্ট বা বড় মিটিং বসিয়া গিয়াছে—সে মিটিংএর বিবেচিত বা সমালােচিত বিষয়ের যথাযথ ধারাবাহিক বিবরণ সাধারণের সমক্ষে পেশ করা মাদৃশ অধমের ক্ষমতার অতীত—তবে অহার আভাসমা সহৃদয় পাঠক পাঠিকা কথঞ্চিৎ ক্ষমা ঘেন্না ক্লরিয়া জানিতে পারেন। এই মেয়েবৈঠকে গ্রামস্থ বড়, ছােট, ঈ, পুরুষ, বালক, বালিকা, প্রৌঢ় এবং তদাভাবে এমন কি গাছের কাঠবিড়ালী, চালের গিরগিটি, টিকটিকি, বাড়ীর পােষমান কুকুর বিড়াল প্রভৃতিরও সমালােচনার হাত হইতে পরিত্রাণ পাওয়া বড়ই কঠিন। তায় আবার গ্রামে বিবাহ, আর যায় কোথা। কতদিনের সঞ্চিত রুদ্ধ বাষ্পশক্তি (Pent up energy) এখন (Safety valve)পথে ছাড় পাইয়াছে, আর রক্ষা নাই, অশীতিবর্ষ বয়স্ক বৃদ্ধ হইতে যুবতীসকল তাহাদের নিজের, তাহাদের আত্মীয়স্বজনের, পরে “বসুধৈব, কুটুম্বক” এই কথার যাথার্থতা সম্পাদনে “সইএর বউএর বােনপাে বউ এর বকুল ফুলের ভাগ্নী জামাইএর বিবাহের”, ও তাহার আনুসঙ্গিক তত্ত্ব সকলের আদ্যশ্রাদ্ধ চলিতে লাগিল। কিশাের বয়স্কা এবং অল্প বয়স্কা বালিকারা কাহার কিরূপ বর হইয়াছে, কিরূপ বর চতুর্থ পরিচ্ছেদ। হইলে ভাল হয়, কাহর বর বড় রসিক, কাহার বর ফচকে, কাহার বাসরে কি হইয়াছিল, এবারে কি কি হওয়া সম্ভব, তাহার এষ্টিমেট। কে কোন কাপড়, কোন কোন এবং কি কি গহনা পরিবে ইত্যাদি বিয়ের গভীর গবেষণা পূৰ্ব্বক আলােচনা চলিতেছে। বাহিরে ছোেট ছেলে মহলে ধুম পড়িয়া গিয়াছে। আগে বরযাত্রী ও কন্যাত্রী, মধ্যে বিবাহ সভায় প্রশ্নোত্তর লইয়া মহা তরজার লড়াই হইত, এখন আধ তাহার কিছুই নাই। এখন ছােট ছোেকরা মহল বিবাহ সভায় স্বরস্বতীর সহিত সম্বন্ধ পরিত্যাগ করিয়া কেৱল বেশভূষার পারি- পাট্য, মকের কেশের পারিপাট্য, থিয়েটারের টপ্পার উৎকর্ষতা সাধনে ব্যস্ত থাকিয়া ডিম ফুটেই বেল্লিকের” যাথার্থতা সম্পাদন করিতেছে। আনন্দের সময় শীঘ্রই কাটিয়া যায়। বিবাহ দিনে কন্যার বাড়ীতে মহা কোলাহল-বাহির বাটাতে নানাপ্রকার লােকের গমনাগমন, নানা লােক নানা কাৰ্যে ব্য-অন্দরে স্ত্রীলােকদিগের মধ্যে মধ্যে মাঙ্গলিক কার্যের সময় শঙ্খধ্বী ও উচ্চ কলরব ও হাস্য-এধারে বিবাহের প্রয়ােজনীয় দ্রব্য, সকলের ফৈ-ওধারে নিমন্ত্রিতগণের যথাযােগ্য চ্য,চোলেহ, পেয়ের ব্যবস্থার জন্য হুড়াহুড়ি ইত্যাদিতে একেবারে সরগর-দিনমণি আপনুর দৈনন্দিন কার্য সম্পাদনে ক্লান্ত হইয়া যেন সুন্দরীকে একটিনি” দিয়া অস্তাচল, শিখরে গা ঢালিলেন স্যার অন্ধকার ঘীভূত হইলে, কেরােসীন ও এসিটীলিন গ্যারালাক বাড়ী হাঁসিম উঠিল কন্যা কৰ্ত্তার বাড়ীতে ত গ্রল হরিবাবুর বৈবাহিক শ্ৰীযুক্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ময়ুর গ্রামের একজন সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ—তাহার পুত্রের বিবাহে আয়ােজন বড় কম করেন নাই। তাঁহার একমাত্র পুত্রের বিবাহ দিতেছেন বলিয়া ভােলানাথ ২৮ সুখের-মিলন। A4 তিনি অনেক খরচ পত্র করিয়া ও অনেক আত্মীয়সহ অদ্য বৈদ্যবাটী গ্রামে বিবাহ দিতে চলিয়াছেন। বর বৈদ্যবাটী ষ্টেশনে পঁহুছিল এবং তথা হইতে অনেক লােকজন বাদ্য ও আলো সহ সহভিমুখে চলিল, রাস্তায় অনেক লােক দাড়াইয়া এই শােভাযাত্রা দেখিতে লাগিল, ও অনেক বাটীর ছাত ও জানালা হইতে অনেক মেয়ে ছেলে হাতের সমস্ত কাজ কৰ্ম্ম ফেলিয়া দেখিতে লাগিল, পল্লীগ্রামের পক্ষে ইহা একটী ধুমধামের বর বলিয়া তাহাদের বােধ হইতে লাগিল এবং যথার্থ ই ইহাতে ভােলানাথ বাবু যথেষ্ট ব্যয় করিয়াছেন। অবশেষে প্রায় রাত্র নয় ঘটিকার সময় বর ভজহরি বাবুর বাটী পঁহুছিলেন, বর- যাত্রীর ভিতর অনেক রকমের লােক ছিল, আত্মীয়স্বজন গ্রামস্থ ব্যক্তিগণ ছিলেনই এবং ভােলানাথ বাবুর অনেক চাষা প্রজাও ছিল। বরযাত্রীরা সকলে যখন বাটীর ভিতরে প্রবেশ করিতেছিল, সেই সময় সদর দরজায় ভজহরি বাবু ও তাহার দুই পুত্র তথায় দাঁড়াইয়া সকলকে অভ্যর্থনা করিতেছিলেন। বাড়ীতে মহা কোলাহল পড়িয়া গেল, ভজহরি বাবু বকর্তা ও বরযাত্রীদের লইয়া বড়ই ব্যস্ত আছেন ও মধ্যে মধ্যে ডাকিতেছেন, ওরে রামা, শ্যামা জল, পান ও তামাক লইয়া আয়। এইরূপে কিছুকাল কাটিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরেই শুভলগ্নে ভজহরি বাবু তাঁহার কন্যাকে সুপাত্রে দান করিলেন, বরযাত্রীও পরিশেষে বরকাদের যত্নের সহিত খাওয়াইয়া দিলেন, তাহারা সব আপন আপন বাড়ী অভিমুখে চলিয়া গেল। ওদিকে কন্যাও বাসরঘরে গেল এবং বাড়িীর মেয়েরা সব বরকে লইয়া বাসরঘর আমােদিত করিতে লাগিল। বাসরঘরের বর্ণনা আর কি করিব-বড় বড় সাহিত্যৰথী ও কবিবৃন্দ ইহার স্বরূপ বর্ণনা উজ্জ্বলরূপে করিয়া গিয়াছেন। সেখানে চতুর্থ পরিচ্ছেদ। ২৯ আমার ন্যায় ব্যক্তির এ বিষয়ে চেষ্টা করা খঞ্জের পর্বত লঘনের ন্যায় সুদূরপরাহত। “বাসর” এই কথা মনে হইলেই এক অভূতপূর্ব অশ্রুতপূৰ্ব্ব আনন্দে মন নাচিয়া উঠে। কত কথা, অতীতের সুখস্মৃতি মন-পটে উদয় হয়—তখন বর্ণনা করিতে যাইতেছি তাহা ভুলিয়া যাইতে হয়—মন সুখ-স্মৃতি লইয়া আত্মহারা হয়-বাহিক জগতের স্থিতি লােপ পায় মােট কথা বলিতে কি—আমাকে পাঠক পাঠিকা হয়ত বিদ্রুপ করিবেন; কিন্তু কি করিব-আমি নাচার—আমার মনে যা হইতেছে, তাহাই স্বরূপ বলিতেছি—আমাদের এত বয়স হইয়াছে, কিন্তু সত্য কথা বলিতে কি—এ বুড়া বয়েসে বাসরের নাম হইলে মুখে লাল পড়ে ও ফের হামাগুড়ি দিতে ইচ্ছা করে। পাশ্চাত্যশিক্ষা প্রাপ্ত—নৈতিক বলের পক্ষপাতী ব্যক্তিবর্গ রাগে ও ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া এখনি আম্মার ন্যায় Old Foolএর একশতবার মৃতু! ব্যবস্থা বা চৌদ্দ বৎসর ফাসীর ব্যবস্থা করিবেন, না হয়ত অশ্লীলতার খনি বলিয়া ধরাইয়া দিয়া Moralityর পরাকাষ্ঠা দেখাইনে। কিন্তু তাহাদের নিকট আমার বিনীত নিবেদন এই যে, আমার কল্পিত বাসর এবং আধুনিক বাসরের সময় গত অনেক প্রভেদ দাঁড়াইয়াছে। পূৰ্ব্বেকার সে তালপুকুরের এখন পুকুর নাই, কেবল শুষ্ক তালগাছ তাহার সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। পূর্বের সে বাসরের নির্দোষ আমােদ প্রমােদের একটা আন্তরিকতা ছিল-এখন তাহা লােপ পাইয়াছে। তখন কিশােরী ও যুবতীগণ—যাহারা সম্পর্কে বরের সহিত কথা কহিতে পারেন, তঁাহারাই কেবল শিষ্টভাবে বসন পরিহিত হইয়া অবগুণ্ঠণের মধ্য হইতে, আপনাদের মধ্য হইতে নিৰ্বাচিত কোন অপেক্ষাকৃত মুখরা বয়স্যাকে মধ্যস্থা ( spokes man) করিয়া অলক্ষ্যে, স্বগতের ছলে, খুব নিম্নস্বরে, দুই একটা নির্দোষ ঠাট্টা তামাসা বরের ৩০ সুখের-মিলন। « লক্ষ্যে, দিকে ছুড়িয়া মারিতেন-আর সেকালের বরেরাও যেন বিবাহ বাড়ীতে বাসরঘরে “বর না চোর” সাজিয়া অলঙ্কারের রুনুঝুনু-নিকণি-সমন্বিত ও মলের শব্দে বিভাসিত অবগুণ্ঠনবতী রমণী-কূহের মধ্যে পড়িয়া একেবারে বিশেষতঃ পাশের চেলীর পুটুলির মােহে তন্ময় হইয়া জুজুর মত চুপ করিয়া থাকিত এবং যে উহাদের মধ্যে বড়ই সাহসী, সে নয় দুই একটা কথার উত্তর কাটিত মাত্র ; কিন্তু এখনকার বাসর বর্ণনার অযােগ্য-এখন মুক্তবেণী শােভিত আধঘােটাত আধুনিকবৈদেশিক-অর্ধনগ্ন-বেশভূষায় ও অলঙ্কারাদিতে সজ্জিতা, বেনারস-হইতে-আনীত সূৰ্ত্তি-জরদা-মিশ্রিত-তাম্বুলরাগরঞ্জিত- অধরা, চটুলচাহনিযুক্তা নারীসুলভলজ্জাবিরহিতা ও আধুনিক শিক্ষাপ্রাপ্ত! কিশােরী, যুবতী ও প্রৌঢ়াগণের একত্র সম্মিলন—বর বাবু বা বিংশশতাব্দীর জামাই বাবুও আধুনিক—অতএব সেয়ানে সেয়ানে মেশামিশি—অনেক সময়—রসিকতার প্রসঙ্গে শ্লীলতার মাথায় বিনামা ব্যবহার করা হয় এবং রুচির আদ্যশ্রাদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। সমাজহীনতা জাতীয় হীনতার পরিচায়ক ; সময়ের পরিবর্তনে প্রাচ্য প্রতীচ্যের সম্মিলনে কত • বৈদেশিক ভাব আমাদের সমাজের ভিতর ক্রমশঃ প্রবেশ করিয়া কি ভয়ানক পরিবর্তন ঘটাইয়াছে ও ঘটাইতেছে এবং আমাদের নৈতিক বল শিথিল করিয়া দিতেছে, তাহা সহজেই অনুমেয়। এইরূপে দেখিতে দেখিতে রজনী প্রভাত হইয়া আসিল, অদ্য বর ক’নেকে লইয়া 'বাটী যাইবে; সেই জন্য, ভজহরি বাবু ও তাহার স্ত্রী প্রমদার মনটা বড়ই খারাপ হইয়াছিল ; যাহা হউক, তাহারা বিমর্ষমনে শুভকাৰ্যাদি সব শেষ করিয়া লইলেন, এদিকেও দেখিতে দেখিতে বর চতুর্থ পরিচ্ছেদ। ৩১ কত্তা আসিয়া উপস্থিত হইল। ভজহরি বাবু তাহাদিগকে যথেষ্ট সমাদর ও অভ্যর্থনা করিয়া বসাইলেন এবং জলপান ও তামাক দিবার সুবন্দোবস্তু করিয়া দিয়া তিনি বাটীর ভিতর খবর দিলেন এবং তাহাদের জলযােগের বন্দোবস্ত করিতে বলিলেন। প্রমদা তাহার যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া আহারের বহুবিধ ভাল ভাল দ্রব্য তৈয়ার করিয়া বর- কর্তাদের জন্য পাতা সাজাইতে লাগিলেন। ওদিকে বাড়ীর মেয়েরা * শীঘ্র শীঘ্র বর কনের মাঙ্গলিক কাৰ্য সকল সকল সমাধা করিতে লাগিলেন। এইরূপে বাড়ীর সকলেই একটা না একটা কাৰ্যে ব্যস্ত আছেন ; কিন্তু আমাদের যতীন আজ কেন হঠাৎ কিছু বিমর্ষ আছেন। তাহা পাঠক পাঠিকা বলিতে পারেন কি ? যাহা হউক, সে বিষয়ে আমরা আর এখানে সময় নষ্ট করিতে পারিব না, আমাদের এখনও জানিবার অনেক বাকি। হিন্দুর ঘরে কনে বিদায় বড়ই করুণ রস মিশ্রিত--হিন্দু স্ত্রীর একমাত্র গতি অবলম্বন যে স্বামী, তাহার সহিত তাহার বাটীতে যাইতেছে—আবার ফিরিয়া আসিবে এবং যাওয়া আসা চলিবে, তবু মার, বাপের ও বাটীস্থ অপর সকলের চোখ ফাটিয়া জল পড়ে কেন ? “মায়ার বন্ধন ছেদ মাত্র” এতদিন মা বাপের একেবারে নিজস্ব ছিল, এখন তাহা রহিল না। ভােলানাথ বাবু, তাহার পুত্র ও পুত্রবধূ এবং পাত্র মিত্র লইয়া নিরাপদে চন্দননগরে পৌছিলেন ; ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী তার পুত্রবধূর মুখদর্শন করিয়া যারপর নাই সুখী হইলেন এবং ঘরের লক্ষ্মীকে কোলে করিয়া আনিয়া—বরণাদি করাইলেন ; নূতন বোমার ও তাহার বাপেদের অনেক সুখ্যাতি করিতে লাগিলেন। বাড়ীর অপর মেয়েরা সব কনে দেখিবার জন্য বড়ই উৎসুক হইয়াছিল এবং ; ;

সুখের- মিন। মনে মনে ভাবিয়াছিল; বৌ বুঝি ভাল হইবে না, পরে যন তাহারা নিজে চক্ষে দেখিল, বলিল—বাঃ বেশ মেয়েটি ত ? বেশ রং, মুখশ্রী ভাল এবং আমাদের ছেলের সঙ্গে মিলিয়াছে বেশ, আমাদের ছেলের রং কিছুর নিন্দার নয়, এইরূপ অনেকেই নিজের নিজের মত প্রকাশ করিতে লাগিলেন। গােলমালে আমােদে প্রমােদে সেই দিন কাটিল। পরের দিন ফুলশয্যা কেহ কেহ সেই দিনেই পাকস্পর্শের দিন স্থির করেন। ভােলানাথ বাবুর ছেলের বিবাহ বৃহস্পতিবার হইয়াছিল, সুতরাং তাহার পরবর্তী শনিবার ফুলশয্যার দিন। কলিকাতা উপকূলস্থিত গ্রামবাসীদের মধ্যে যাহারা রােজ কলিকাতা আফিসে কৰ্ম্ম করিতে যান; তাহাদের পক্ষে ও তাহাদের বাড়ীর স্ত্রীলােক- দিগের পক্ষে শনিবার বড়ই মধুবার । কেন না, পরের দিন তাহাদের প্রতুষে উঠিয়া তাড়াতাড়ি স্নানাদি সমাপন করিয়া অর্ধসিদ্ধ তপ্ত ভাত কয়েক নিশ্বাসে খাইয়া দৌড়াদৌড়ি করিয়া আফিসে যাইতে হইবে না, আর বাড়ীর মেয়েরা সেই দিন সেই জন্য একটু হাঁপ ছাড়িবার অবসর পান। অতএব এ ক্ষেত্রে এই সুবিধার জন্য শনিবারেই ফুলশয্যা ও পারুস্পর্শের দিন স্থির করিবার জন্য অনুরােধ উপরােধ ও advice gratis আসিতে লাগিল। কিন্তু কেহ কেহ শনিবারে পাকস্পর্শ রীতি আচার বিরুদ্ধ বলিয়া আপত্তি উত্থাপন করায়, ভােলানাথ বাবু সৰ্ব্ব- সম্মতিক্রমে পাকস্পর্শের জন্য আহারাদির নিমন্ত্রণ ফুলশয্যার দিনেই রাখিলেন। রবিবারে নিয়মমত কেবল বৌভাত ও আপনার নিকটস্থ আত্মীয়স্বজনের মধ্যাহ্ ভােজনের ব্যবস্থা কশিলেন। তিনি নূতন বধু ঘরে আনিয়াছেন, অতএব আত্মীয়স্বজন পরিচিত ও গ্রামস্থ সর্বসম্প্রদায়স্থ শােককে নিমন্ত্রণ করিলেন।

৩ চতুর্থ পরিচ্ছেদ। maima শনিবার হইতেই গ্রামে হুলস্থূল পড়িয়া গেল। সন্ধ্যার প্রাকাল হইতেই ভােলানাথ বাবুর নিমন্ত্রিত দুই পাঁচটী করিয়া লােক আসিতে লাগিল, তাহাদের সকলের মুখে এক কথা, কনের বাড়ী হইতে ফুলশয্যা আসিয়া পোঁছিয়াছে কি না। যখন বরের বাটীতে এই রকম চলিতে- ছিল, তখন আসুন পাঠক পাঠিকারা কনের বাড়ীতে ফুলশয্যা পাঠান। কিরূপ বন্দোবস্ত হইতেছে দেখা যাউক। ভজহরি বাবু অঙ্গীকৃত ফুলশয্যার সমস্তই আয়ােজন করিয়াছিলেন, সন্ধ্যার গাড়ীতে দশজন লােক মারফৎ এবং নাপিতের কর্তৃত্বাধীনে বরের বাড়ীতে ফুলশয্যা রওনা হইল। পাকস্পর্শের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিবার জন্য ভজহরি বাবু যতীনকে যাইতে আদেশ করিলেন। যতীন কাপড় চোপড় ছাড়িয়া ফুলশয্যার সঙ্গেই রওনা হইলেন। ভােলানাথ বাবুর বাটীতে পৌছাইতে রাত্র আটটা বাজিয়া গেল। • ফুলশয্যা আসিয়াছে, ফুলশয্যা আসিয়াছে মহা রব উঠিল, শাক বাজিয়া উঠিল এবং নিমন্ত্রিত রমণীগণের কলরবে বাটা মুখরিত হইতে লাগিল। নিমন্ত্রিত লােকদের আদর ও আপ্যায়ন ও আহারাদি সমাপনান্তে বাড়ীর ভিড় কমিতে লাগিল। ভােলানাথ বাবু যতীনের নিকট নূতন বৈবাহিক ও তাহার বাটীস্থ সকলের কুশল সংবাদ লইলেন। যতীনও যথাযথ উত্তর দিলেন বটে, কিন্তু তাহার মনটা হঠাৎ কোন অভাবনীয় কারণে, কোন এক অতীত স্বতি জাগরিত করিয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ চিন্তিত করিল। যতীনের আদর আপ্যায়ন বড় কম হইল না। আহার সমাপনান্তে যতীন আপনার ছােট বােষ্টীর সহিত একবার দেখা করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করায়, তাহাকে ভােলানাথ বাবু সঙ্গে করিয়া ফুলশয্যার জন্য নির্দিষ্ট ঘরের বারের নিকট আনিয়া সমবেত মেয়েদের উদ্দেশ করিয়া বলিলেন, ওগো সুখের-মিলন। তােমরা একবার নূতন বৌমাকে এখানে আনত। তাহার ভাই তাঁহার সহিত একবার দেখা করিতে আসিয়াছেন। ভােলানাথ বাবুর আদেশে নূতন বৌমার সমবয়স্কা তিন চারিটা বালিকা ছােট পুটীকে সঙ্গে করিয়া যেখানে যতীন দাড়াইয়াছিল সেই খানে আনিল এবং উহাদের মধ্যে একজন একটু অগ্রসর হইয়া আসিয়া যতীনকে দেখিয়া বলিল আপনি কি নূতন বৌএর ভাই ? যতীন হ বলিয়া উত্তর দিবার সময় প্রশ্নকারিণীর মুখের দিকে চাহিতেই যেন তাহাকে কোথাও দেখিয়াছেন, যেন চেনা চেনা বলিয়া মনে হইল। প্রশ্নকারিণীও যতীনকে দেখিয়াই যেন চমকিত হইলেন, পরক্ষণেই পাশ্ববর্তিনী আর এক কিশােরীর দিকে ফিরিয়া একচী চিটি কাটিল। তাহাতে সেই কিশােরী রাগান্বিত হইবার অগ্রে তাহার "কানে ফিস ফিস করিয়া কি এক মন্ত্রৌষধি দিল, যাহাতে সেই কিশােরীর রাগ অপনয়ন হইয়া মুখে একটু সলজ্জভাব আসিল এবং সকলের সাক্ষাতেই “চুরি করিয়া যতীনের মুখ দেখিতে লাগিল। আমাদের এই সকল কথা বলিতে অনেক সময় লাগিল বটে; কিন্তু এই সকল ঘটনা নিমেষের মধ্যেই চুকিয়া গেল, প্রশ্নকারিণী ও তাহার চিটি বিনা বাক্যব্যয়ে হজমকারিণী সহচরীটি কে তাহা আর বলিয়া জানাইতে হইবে কি? প্রশ্নকারিণীই আমাদের পূর্ব অধ্যায়ে বর্ণিত কুমুদিনী ও তাহার কিশােরী সহচরী ভােলানাথ বাবুর কন্যা সুহাস বা সুহাসিনী। এধারে যতীন ব্যাচারী বড়ই বিভাটে পড়িল—কোথায় তাহার ছােট বােনটির সহিত দেখা করিয়া সাময়িক ২১টা কথা কহিয়া পালা শেষ করিয়া, সেই রমণী ব্যুহের মধ্য হইতে চম্পট দিয়া হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিবে, না তাহার মস্তিষ্কের ও মনের উপর কোন অতীত স্মৃতি জাগাইবার জন্য জোর জুলুম চলিতে লাগিল—ছােট বােনটির ?

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। সহিত কথা কহিবে কি; তাহার মনে কি মন আছে ; অন্যমনস্ক হইয়া কোন রকমে বােনটির সহিত কথা কহিল বটে কিন্তু আমরা শপথ করিয়া বলিতে পারি যে, সে লজ্জার বাধা না মানিয়া দুই একবার নির্নিমেষ দৃষ্টিতে ছােট পুটির পার্শ্ববর্তিনী কিশােরীগণকে দেখিতে ছাড়েন নাই। এইরূপে গােলমালে কয়েক দিবস কাটিয়া গেল, এক দিবস রাত্রে ভােলানাথ বাবু আহার করিয়া উপরে বসিয়া আছেন, এমন সময় তাহার স্ত্রী আসিয়া বলিলেন যে, কাল দুপুর বেলায় একজন ঘটকী এক জায়গা থেকে তােমার মেয়ের সম্বন্ধ লইয়া আসিয়াছিল, বলিতেছিল যে ঘরটি ভাল ও জামাইটি ভাল, তবে তাহারা গৃহস্থ মানুষ তাহাদের মােটা খােটা থামওয়ালা বাড়ীও নাই আর জুড়ি গাড়ী নাই। ভােলানাথ বাবু বলিলেন যে হ, এইবার আমার সুহাসিনীর একটি ভাল বর পাইলেই হয়। আমার সব কাজ শেষ হয়—তা বেশত দেথ-তােমার যদি ওখানে পছন্দ হয়, আর না হয়, আরও দুই এক জায়গায় দেখ ; কিন্তু একটা কথা তােমায় বলি, এমন ঘর দেখিবে যেখানে জামাই খুব ভাল হয়, তাদের পয়সা তত থাকুক আর নাই থাকুক। ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী বলিলেন—যে, হাঁ আমিও তাই তাহাকে বলিয়াছি। এইরূপে নানারূপ কথােপকথনের পর তাহারা উভয়ে শয়ন করিতে গেলেন। পরদিন প্রাতে পুনরায় সেই ধটকি আসিল এবং বলিল, কি মা কি হইল, তােমাদের কি ঐ জায়গায় বিয়ে দেওয়া মত? ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী বলিলেন যে হ—বাবুকে বলিয়াছিলাম, তিনি বলিলেন যে, আমার তত বড় ঘর না হইলেও চলিবে, কিন্তু জামাইটি যেন খুব ভাল হয়। ;

সুখের-মিলন। ঘটকী। মা তােমার যে জামাইয়ের কথা আমি বলিতেছি, সে ছেলের গুণ আর তােমায় কি বলিব—স্বভাব চরিত্র নিখুঁত, লেখা পড়ায় মাছারি, যেন কার্তিকের মত চেহারা, বয়সও কম--আন্দাজ ১৯২৩ বৎসর তবে মা আমিত গােড়ায় বলিয়াছি যে, তাহারা গৃহস্থ মানুষ। ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী। আচ্ছা, তুমি এইখানে বােস ; আমি কর্তাকে একবার ডাকি—এই বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন এবং কিছু ক্ষণ পরে ভােলানাথ বাবুকে সঙ্গে লইয়া সেইখানে উপস্থিত হইলেন। ভােলানাথ বাবু আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন যে, এই তােমার সেই টক ঠাকরুণ যাহার কথা বলিয়াছিলে ? ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী। হাঁ, এই সেই লোেক, এ বলিতেছে যে ছেলেটী খুব ভাল ও কার্তিকের মত চেহারা, তবে তাহারা গৃহস্থ মানুষ। ভােলানাথ বাবু। তাইত চাই। আচ্ছা, আমি গােটা কতক কথা জিজ্ঞাসা করি, বলি হাগা ভাল মানুষের মেয়ে, তুমি যে সম্বন্ধ আনিয়াছ তাঁহাদের বাড়ী কোথায়? আর ছেলের বাপের নামই বা কি? আমি জানিতে ইচ্ছা করি। ঘটকী। বাবু, ছেলের বাপের নাম ভজহরি ঘােষাল বাড়ী বৈদ্য- বাটী গ্রামে। ভােলানাথ বাবু। ও ভজহরি বাবুর ছেলে, ভজহরি বাবু যে আমাদের নূতন কুটুম্ব, বৈবাহিক, এত আমাদের জানা ঘর। আচ্ছা, তা বেশ হয়েছে-ও ঘরত ভাল আর, ভজহরি বাবুর ছেলেদেরও আমি জানি, তারাও খুব ভাল ছেলে, আচ্ছা—তুমি যাও আমার মত আছে। ওই খানেই আমি আমার মেয়ের বিবাহ দিব, তুমি তাদের বলিও আর তাঁরা কি কি পাওনা চাহেন, তাহা আমায় পরে জানাইও চতুর্থ পরিচ্ছেদ। ঘটকী। আচ্ছা বাবা, আমি তবে আসি, কিন্তু দেখিও কথার যেন নড় চড় না হয়, মা তােমায়ও বলিতেছি যেন গরীব মেয়ের দিকে নজর থাকে। আমি বাছা তােমার দিক বই তাঁদের দিকে টানবাে না, তবে আমি আসি, এই বলিয়া সে চলিয়া গেল। ভােলানাথ বাবু তাহার স্ত্রীকে বলিলেন, কেমন ঠিক বলিয়াছি ত ? আর তােমার ওখানে দেওয়া পছন্দ ত ? ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী। , ওত আমাদের জানা ঘর, তবে ছেলেটা কেমন তা জানা নাই বটে, তবে আমাদের বউমার নিকট হইতে সমস্ত খবর পাওয়া যাইবে। ভােলানাথ বাবু। হাঁ, হাঁ, বৌমার কাছেই তাঁহার ভাইএর সকল কথা মিলিবে। তবে সে ছেলে মানুষ, আচ্ছা, তাকে একবার ডাকনা দেখাই যাক। ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী তার বউমাকে ডাকিতেন, বোম”-এ ঘরে একবার এস ত। নজ্জা কি-তােমার শ্বশুর একটা কথা জিজ্ঞাসা করিবেন। বৌমা ভারি বিপদে পড়ি-ঘঘামটা টানিয়া দিয়া অতি ধীরে ঘরের ভিতরে উপস্থিত হইলেন। ভােলানাথ বাবু। ই। মা, এইবার যে তােমায় তােমার ঠাকুরজির বিবাহের একটু ঘটকিগিরী করিতে হইবে। কিন্তু মা, তোমায় ঘটকি বিদায় কিছু দিব না। বৌমা লজ্জায় মুখ হেঁট করিয়া আর একটু ঘােমটা দিয়া বসিলেন। শ্বাশুড়ী। ওকি, অত আর লজ্জা করিতে হইবে না-বউমা, নাও মুখ তুলে বস। ভােলানাথ বাবু। হাঁ মা, তােমার কি একটি ভাইএর বিবাহ হয় নাই। ঘােমটার মধ্য হইতে আস্তে আস্তে কথা বাহির হইলনা।

সুখের-মিলন। ভােলানাথ বাবু। সেইটি কি তােমার ঘােট দাদা, তার নামকি মা? বউমা। হাঁ, সেইটি আমার ঘােটদাদা-নাম যতীন। ভােলানাথ। তােমার ভায়ের বয়স কত, আর কেমন ছেলে ? বউ মা। আন্দাজ ১৯/২০ হইবে, বলিয়া মুখ হেঁট করিয়া রহিলেন। ভােলা। মার আমার লজ্জা হয়েছে, আচ্ছা, আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করিব, তােমার ভাই কি করে মা ? বউ মা। না, সে কিছু করে না, বাড়ীতেই থাকে। ভােলা। আচ্ছা, যাও মা, তােমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। ভােলানাথ বাবুর স্ত্রী। দেখলে বউ-মার নিকট হইতে তবু অনেকটা খবর জানা গেল। এখন তারা কি কি চান, তাহার একটা ঠিক হইয়া গেলেই হয়, বােধ হয় তারা অল্পেতে রাজী হবেন না, কি বল ? ভােলা। দেখ এখন তারা কি বলেন। আমার বােধ হয়, তারা কুটুম্ব ঘর বলিয়া বেশী কিছু চাইতে পারিবেন না। আর যদি চান, তাহলে তাই দিতে হবে, কারণ, আমরাও তাদের মেয়ের বিয়ের সময় লইয়াছি। যাক, এখন পরের কথা পরে হবে, এখন বেলা অধিক হইয়াছে, আমাদের খাবারের উদ্যোগ দেখগে, এই বলিয়া উভয়ে উভয় দিকে চলিয়া গেলেন। পাঠক পাঠিকা! চলুন, আমাদের সুহাসিণীর খপরটা একবার লওয়া যাক। পিতা মাতা ও বউ যখন কথা কহিতেছিল, তখন সুহাস দরজার আড়াল হইতে সব শুনিতেছিল এবং বুঝিল যে তাহারই বিষয় তাহারা কথা কহিতেছেন। বলা বাহুল্য, সুহাসের জলে ডােবার পর হইতেই তাহার ক্ষুদ্র কোমল মন কি জানি কি এক অজানিত ভাবে যতীনের দিকে আকৃষ্ট হইতেছিল। আবার ঘােট পুটির সহিত তাহার ভাইএর বিবাহ হইয়াছে।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। জহরি বাবু তাহার কন্যার বিবাহের পর হইতেই শরীরটা কিছু বেশী রকম খারাপ বােধ করিতে লাগিলেন। ইহা দেখিয়া তাহার স্ত্রী শ্ৰীমতী প্রমদাসুন্দরীর মনটা বড়ই ব্যাকুল হইয়া উঠিল। তিনি একদিবস আহারান্তে যখন ভজহরি বাবু শয়ন গৃহে বসিয়া আছেন, সেই সময় আস্তে আস্তে বিমর্ষ বদনে যাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। ইহা দেখিয়া ভজহরি বাবুর মনে একটা সন্দেহ হইল, তিনি মনে মনে ভাবিলেন যে, এ ত কখনও এরূপ চুপ করিয়া থাকে না, সদাই আলাদিত ও হাসি মুখে কালযাপন করে, হঠাৎ আজ কেন এর এ ভাব হইল, ইহার ভিতর নিশ্চয় কিছু আছে; ইহা জানিতে হইবে, এই বলিয়া তিনি তাঁহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসিলেন—প্রমদা, তােনার শরীরটা কি খারাপ আছে ? তুমি অমনধারা বিমর্ষভাবে বসিয়া কেন ?

৪০ সুখের-মিলন। **** * প্রমদার এতক্ষণে চমক ছিল, তিনি তাড়াতাড়ি গায়ের কাপড় টানিয়া দিয়া বড়ই লজ্জার পড়িলেন এবং এর যে কি জবাব দিবেন, তাহা আর ভাবিয়া উঠিতে পারিলেন না। ভজহরি বাবু তাহাকে নিরুত্তর দেখিয়া তাহার মনে কেমন একটা ঘােতর সন্দেহ উপস্থিত হইতে লাগিল, তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসিলেন, প্রমদা, তুমি কি ভাবিতেছিলে বল ? প্রমদা। কি আর মাথামুণ্ডু ভাববাে, তবে তােমার কথাটা ভাল বুঝিতে পারি নাই, তাই উত্তর দিতে দেরি হইতেছে-এ ছাড়া আর অন্য কিছুই নহে। ভজহরি বাৰু। আমি বলছিলাম যে, তুমি অমনধারা বিমর্ষভাবে আসিয়া বসিলে কেন ? তােমার শরীর ভাল আছে ত, এখন বুঝিতে পাৰিলে ত ? প্রমদা। তােমার কাছে কি একবার চুপ করিয়া বসিয়া থাকিবার যাে নাই, যখন আসিব তখনি কি কথা কইতে হইবে। আচ্ছা, এবার থেকে জানা রহিন—আর কখনও তােমার সামনে চুপ করিয়া বসিয়। থাকিব না। ভজহরি বাবু। প্রমদা আর ঠাট্টা করিয়া উড়াইয়া দিলে কি হবে, বল নিশ্চয় তােমার শরীরটা খারাপ আছে—তা না হলে তােমায় আর চুপ করিয়া থাকিতে হয় না। প্রমদা। নাও, তুমিত কেবল আমায় ঠাট্টা করিতে দেখ কিনা, আমার শরীরে আবার কি ছাই হয়েছে, যে খালি খালি বলছ শরীর খারাপ হয়েছে। আমার শরীর ত ভাল আছে। ভজহরি বাবু। আচ্ছা, শরীর যদি ভাল আছে, তবে অমনধারা হয়ে বসে বসে কি ভাবছিলে বল ?

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৫ প্রমদ। ভাবব আবার কি, কই কিছুই ত ভাবি নাই, এই বলিয়া তিনি আর কথা কহিতে পারিলেন না, চোখ ছল ছল করিয়া জল ভরিয়া উঠিল এবং নীরবে মাথাইেট করিয়া অশ্রুপাত করিতে লাগিলেন। ভজহরি বাবু। কি প্রমদা আবার যে বলিতে বলিতে চুপ করিয়া রহিলে ? এই বলিয়া ভজহরি বাবু মুখ ফিরাইয়া লক্ষ্য করিয়া দেখেন যে, তাহার স্ত্রী প্রমদা নিরবে যােদন করিতেছেন, ইহা দেখিয়া তিনি তাড়াতাড়ি উঠিয়া নিকটে গিয়া অতি ব্যাকুল হইয়া তাহার হাতখানি ধরিয়া বলিলেন, ছি প্রমদা তুমি আবার কাদিতে বসিলে ? কাঁদিবার মতন কথাত তােমাতে আমাতে কিছুই হয় নাই। প্রমদা। না, আমি সে জন্য কাঁদিতেছি না। তবে কি জন্য তুমি কাঁদিতেছ আমায় তাহার সঠিক বিবরণ বল, তাহাতে আমার দ্বারা যদি তােমার মনেদুঃথের কোন রকমে অবসান হয়, তাহা হইলে আমি তাহা করিবার জন্য প্রাণ পৰ্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছি। এমদা। না, সে তেমন কিছুই নয় যে তােমায় তাতে প্রাণ দিতে হইবে, ও আর তুমি শুনিয়া কি করিবে, মিছে তােমার মনটা খারাপ করা কেন! ভজ। প্রমদা, এমন কি কথা তােমার আছে, যাহাতে আমার মন খারাপ হইবে—আর তােমার মনটা যখন খারাপই আছে, তথনও আমার মন খারাপ হবেই। যাহা হউক, তুমি শীঘ্র বল কি কথা, আমার শুনিবার জন্য মন বড়ই ব্যস্ত হইয়াছে। প্রমদা। তুমি তাহলে দেখছি না শুনে ছাড়ছ না, তবে শুন, বলিয়া স্বামীর পদযুগল জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, আমার অপরাধ লইও না, কিছু আমায় মার্জনা কর।

৪২
সুখের-মিলন।
ভজ। কি তুমি পাগল নাকি তুমি আবার কবে কি অপরাধ
করিয়াছ যে, আমার কাছে মাপ চাহিতেছ-নাও বল।
প্রমদা। দেখ, আমি বলিতেছিলাম যে তােমার শীরটাত বড়ই
খারাপ হচ্ছে, আগেত খারাপ ছিলই, তবে পুটির বিবাহের পর
থেকেই কিছু বেশী রকম খারাপ হইয়াছে, তাই বলিতেছিলাম যে,
'তুমি থাকিতে থাকিতে আমার শেষ কাজটা (যতীনের বিবাহ) করিয়ে
দাও, তাহা হইলে তুমিও নিশ্চিন্ত—আমিও নিশ্চিন্ত। আরও যতীনের
মুখটা আজকাল ভাল করিয়া দেখিয়াছ কি ? কি রকমের একট।
ভাবনাযুক্ত বলিয়া বােধ হয় ।
ভজ। হাঁ, ঠিক বলিয়াছ, আমিও ওটা বিশেষ লক্ষ্য করিয়া
দেখিয়াছি এবং তােমায় রােজ বলিব বলিব মনে করি, কিন্তু মনে
থাকে না, আজ যেমন কথা উঠিল, তাই মনে পড়িল, তা বেশ, তুমি আজ
থেকে ওর ১টি ভাল সম্বন্ধ দেখ, আরও যখন তােমার মনে উঠিয়াছে
যে বিবাহ দেওয়া চাই, তখন আর দেরি করা উচিৎ নয়, শীঘ্র শী
কাজটা হইয়া যাক।
প্রমদা। আচ্ছা, তােমার যখন হুকুম পাইয়াছি, তখন কল্য
হইতেই আমি ইহার চেষ্টায় থাকিব, এখন চল, অনেক রাত হইয়া গেল
শােয়া যাক ; কাল আবার পুটি আসিবে, এই বলিয়া উভয়ে শয়ন
করিতে গেল।
পরদিন প্রাতে ভজহরি বাবুর কন্যা তাহার শ্বশুরালয় হইতে
আসিয়া উপস্থিত হইল। ভজহরি বাবু ও তাহার স্ত্রীর আহলাদের
সীমা রহিল না, কারণ, তাঁহাদের মেয়ে এইমাত্র এই প্রথম শ্বশুর ঘর
করিয়া আসিয়াছে।
মাথায় অল্প ঘােমটা দেওয়া পুটি পাল্কি হইতে নামিয়াই বাপ মা ও

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪৩ দাদাদের প্রণাম করিয়া পদধুলি লইল। তাহার বাপ মা হাত ধরিয়া উঠাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-কেমন আছ মা, তােমার শ্বশুর শাশুড়ী ও বাড়ীর আর আর সকলে কেমন আছেন ? পুটি বাড়ীর সকলে ভাল আছেন। এইরূপে নানা কথােপকথনের পর প্রমদা তাহার কন্যা আসিয়াছে বলিয়া বিবিধ ব্যঞ্জন সহ অন্ন তৈয়ার করিলেন এবং তাহার স্বামী, পুত্রদ্বয় ও কন্যাকে ভাত খাইতে ডাকিলেন। অবশেষে সকলে ভাত খাইতে বসিলে পর প্রমদা তাহার কন্যাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, পুটি এইবার তােমার ছােট দাদার একটা ভাল বৌ খুঁজিয়া দে দিখিনি। ইহা শুনিয়া ভজহরি বাবু বলিয়া উঠিলেন, হাঁ, বেশ ঘটুকী তুমি ঠিক করেছ, ওবেটীর দ্বারাই ভাল ভাল মেয়ের সন্ধান পাওয়া যাইবে, ওদের শ্বশুর বাটীর কাছে অনেক ভাল ঘর আছে না পুটি ? পুঁটি। হাঁ, আমি আবার বুঝি লােকের বাড়ী বাড়ী খুজে খুজে বেড়াব যে, কোথায় ভাল মেয়ে আছে, তবে তােমাদের একটা কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছিলাম তাহা এখন এই কথা উঠিতে আমার মনে পড়িয়া গেল, দেখ বাবা ও মা একদিন আমার শ্বশুর আমাকে ডাকিয়া বলিলেন,- বউমা, শুনলুম তােমার একটি ভায়ের বিবাহ নাই, তাই কি ঠিক ? আমি বলিলাম, হাঁ, আমার ঘােট দাদার বিবাহ হয় নাই, তাহাতে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, সেটি কি তােমার ছােট ভাই এবং তার নাম কি, আর সে কি করে ? আমি বলিলাম, তাহার নাম যতীন, সে আমার ছােট দাদা, আর সে এখন কিছু করে না। আপনারা ত জানেন আমার এক আইবুড় ননদ আছে।

৪৪ মুখের-মিলন। ইহা শুনিয়া ভজহরি বাবু ও তাঁহার স্ত্রী উভয়ে অত্যন্ত আলাদিত হইলেন এবং বললেন, তা মা, ভগবান করুন, আমার যতীনের যেন ভােলানাথ বাবুর মেয়ের সহিত বিবাহ হয়, ওখানে যদি হয়, তাহলে আর আমাদের কোথাও মেয়ে খুজিতে হইবে না, ও মেয়েটি আমাদের দেখা আছে, আর মা তুমিও ত জান, রােজ দুই বেলা তাকে দেখছ, তুমি বলনা। কা। হাঁ মা, মা ও মেয়েটাকে বেশ ভাল দেখিতে, ও রং খুব আছে, তবে একটু বেশী বয়স হয়েছে-এই যা, তা না হলে আর সব ভাল। এধারে যতীনও ত ভাত খাইতে বসিয়াছে, সে মা বাপের মুখ হইতে তাহার বিবাহের কথা উঠিল শুনিয়া, কোথা হইতে লজ্জা আসিয়া তাহাকে যেন নাগ-পাশে ঘিরিয়া ফেলিল। সে আগে তবুও দুই একটি কথা কহিতেছিল, এখন লজ্জায় অধােবদন হইয়া নীরবে অন্যমনে ভাত খাইতে লাগিল, তাহার উপর যখন পুটির মুখ হইতে ভােলানাথ বাবুর মেয়ের সহিত (পাঠক পাঠিকার মনে আছে সেই আমাদের “সুহাসের” সহিত) তাহার বিবাহ সম্বন্ধ হইতেছে শুনিল, তখন তাহাতে তাহার মন আর রহিল না—মন উড়িয়া কল্পনা-সাহায্যে মানসচক্ষে তাহার সুহাসের সহিত এক অপার্থিব সুখ-স্মৃতি দীপ্ত-রাজ্যে পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। চতুরা পাঠিকাগণ! কুঞ্চিত করিয়া হয়ত বলিবেন যে, গ্রন্থকার কি প্রকারে যতীনের মনের অবস্থা জানিলেন, তিনি গণককার নাকি ? তদুত্তরে আমার বিনীত নিবেদন এই যে—কারণ হইতেই কাৰ্য্য হয় এবং কাৰ্য্য হইতেই কারণ অনুমিত হয়। এই সময়ে যতীনের কায়াতে যে তাহার মন অনুপস্থিত ছিল, তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই যে, যতীন পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪৫ পতার সুনি খাইতে গিয়া মাছের ঝােলে হাত দিতেছিল-মাছের কােলের মাছ ও আনাজ তরকারি হাত দিয়া পাতে তুলিয়া লইতে গিয়া ডালের বাটীর ডালের ভিতর হাত দিয়া-মাছ, আলু, পটল, তুলিতে গিয়া কিছু না পাইয়া অপ্রস্তুত হইল। ভাতের বিষম লাগাতে জলের গাস মুখে তুলিতে গিয়া হাত পিছলাইয়া থালের উপর পড়িয়া গিয়া জল চারিদিকে চড়াইয়া পড়িল। ইহা দেখিয়া যতীনের মা বলিলেন-যতীন, কি করছ বাছা-আর যদি কিছু না খাস ত উঠিয়া গিয়া আঁচাও এবং কৰ্ত্তার গাড়, গামছা দাওয়া হইতে আনিয়া দাও। বলা বাহুল্য যতীন মাতৃ আদেশ নিমেষে পালন করিতে গিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। অবশেষে সকলের আহার হইয়া গেলে পর, প্রমদা ও তাহার বড় বধূ আহারে বসিল, ওদিকে ভজহরি বাবু ও নরেন্দ্র আহার করিয়া বাহিরে বসিলেন। ইতিমধ্যে একজন ধোপ দেওয়া থান কাপড় পরিহিত তিলক কাটা ঘটকী অাসিয়া উপস্থিত হইল এবং জিজ্ঞাসিল, এই কি ভজহরি বাবুর বাটী ? ভজহরি বাবু বলিলেন হাঁ এই বাটী ; কেন বল দিকিন-এবং তুমি কোথা হইতে আসিতেছ ? ঘটকী। আমি চন্দননগরের ভােলানাথ বাবুর বাটা হইতে আসিতেছি, তার মেয়ের সম্বন্ধের জন্য । ভজহরি। তুমি আমার বেয়াইর ওখান থেকে আছ, তা বেশ বাড়ীর ভিতর যাও মা, ঠাকুরাণরা আছেন । প্রমদা খাইয়া হাত ধুইতেছেন, এমন সময় সেই ঘটকী যাইয়া উপস্থিত হইল এবং বলিল—মা, আমি আপনার বেয়াই বাড়ী থেকে আসছি। আপনার ছেলের (বউএর) সম্বন্ধ লইয়া, আপনাদের সব ভাল ত ?

৪৬ সুপের-মিলন। প্রমদা তাড়াতাড়ি হাত ধুইয়া তাহাকে উপরের ঘরে লইয়া যাইয়া বসাইল এবং বলিল— মা, আমাদের বাড়ীর সব খবর ভাল, তাঁদের বাড়ীর সব ভাল আছেন, আর আমার জামাই কেমন আছে ? ঘটকী। হ আমাদের ও ওবাটীর সব ভাল আর তােমার জামাইও ভাল আছেন, এখন আমি আসিয়াছি যে, আপনারা কি ওখানে ছেলের বিবাহ দিবেন তা বলুন আর আমার বােধ হয় ও মেয়েকে আপনাদের সব দেখা আছে, আরও আপনার মেয়ের কাছে সব জানিতে পারেন, যে কেমন মেয়ে কি বৃত্তান্ত। প্ৰ। হাঁ, আমাদের ওমেয়েকে জানা আছে বই কি, মেয়েটা ভাল, তবে একটু বয়স হয়েছে যাই হােক তুমি বােস আমি কর্তার সঙ্গে পরামর্শ করিয়া আসিতেছি। এই বলিয়া প্রমদা তাহার স্বামীর নিকট চলিয়া গেল। ভজহরি বাবু ও ঘটকি ঠাকরুণের আগমনের ফলাফলে জন্য উৎসুক ছিলেন, এমন সময় প্রমদা হেলিতে দুলিতে স্বামীর নিকট গেল এবং জিজ্ঞাসা করিল, ওগাে কৰ্ত্তা, তােমার ছেলের বিবাহের সম্বন্ধ করিতে বেয়াই বাড়ী থেকে লােক এসেছে, বলে যে ওখানে কি তােমার ছেলের বিবাহ দিবে। ভজহরি। হা আমি জানি, ও আগে ত আমার কাছে আসিয়াছিল, তা যাক, বেশ ভালই হয়েছে। আমরা যা ভাবছিলাম, তা ভগবান যােটাইয়া দিয়াছেন, তা বেশ আমার আর মত কি ? তােমার যদি মত থাকে তাহলেই হল কিন্তু তােমায় একটা কথা বলিয়া দিই, দেনা পাওনার বিষয় যেন একটু বিবেচনা করে বলিও কারণ, ও আমাদের বেয়াই বাড়ী, বুঝলে ত ! প্রমদা। হাঁ, আমারও মত আছে যে আমি যেন আমার যতীনের বিবাহ ওখানে দিতে পারি, তবে দেনা পাওনার বিষয় কি বলা যায়, এ পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪৭, বল না ? আমার ত এই রকম ইচ্ছা আছে, যে হাজার টাকা নগদ, খাট বিছানা ও ৮০ ভরি সােণা, এর কমে ত আর হয় না, কেমন এই ত, ঠিক! ০ ভজহরি । আচ্ছা, তুমি ওই বল ত—তবে তারা রাজী হলে হয়, আর একটা কথা বলিয়া রাখিও যে, আমরা ছেলের বিবাহ ও মাসের গােড়া গুড়িই দিব, যেন নড় চড় না হয়। প্রমদা। আচ্ছা, আমি যাই, বলিগে, সে অনেকক্ষণ বসিয়া আছে, এই বলিয়া প্রমদা চলিয়া গেল এবং তাহার নিকট যাইয়া বলিল- যে মা, তােমায় অনেকক্ষণ বসিতে হইয়াছে, তা মা বাবু বলিলেন—যে হাঁ, ও মেয়েত আমাদের জানা আছে, আর আমাদের ওখানে ছেলের বিবাহ দেওয়া মত আছে, তবে মা একটা কথা তিনি বলিতে বলিয়াছেন যে, আমাদের ছেলের বিবাহ আমরা ওমাসের গােড়াগুড়িই দিব, সেটী যেন হয়। ঘটকী। আচ্ছা, আমি বলিব যে, তাহাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে আর তার ওমাসের গােড়াগুড়িই বিবাহ দিবে, যেন দেরী না হয়। আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, আপনাদের পাওনাটা কি দিতে হইবে তাহা জানিতে ইচ্ছা করিতেছি। প্রমদা। ও আর আমরা কি বলিব, ও আমাদের কুটুম ঘর আমরা কি কিছু বলিতে পারি, আর বাবুও বলিয়া দিয়াছেন, না, আমরা কিছু বলিব না, তাদের যা ইচ্ছে হয় তাই তাঁহারা তাহাদের মেয়েকে আশীৰ্বাদ করিয়া দিবেন। ঘটকী। হাঁ, ভদ্রলােকের কথাইত এই, তবে মা, যখন তারা আমায় জিজ্ঞাসা করিবেন, তখন আমি কি বলিব, আরও মনে মনে করিবেন যে, এ লােক কোন কাজের নয় এবং তারাও কি জান ৩

৪৮
সুখে-মিলন।
ত আবার উদ্যোগ করিবে, মেয়ের বিবাহ দেওয়া ত অমনি নয়, তুমি
ত জান মা ?
প্রমদা।
তবে শােন বাছা যখন একান্তই ঝাড়বে না তখন বলি ।
নগদ কিছু চাই, তা বাছা হাজার টাকার কমে আর কি বলিব। ঘড়ি
ঘড়ির চেন, আংটী, বাট বিছানা, ৮০ ভরি সােণা এর কমে হইবে না।
আর এখানে কুটুম ঘর বলিয়া অমনি যা তা একটা ঠিক হইল, অপর
যায়গায় এত কমে কিছুতেই হইত না।
ঘটকী। তা এ সব ত শুলাম, এখন আমি তবে আসি মা ?
প্রমদা। সে কি হয় মেয়ে একটু মিষ্ট মুখ করিয়া যেতে হবে, এই
বলিয়া তাহার বউমাকে বলিলেন-বউমা, ঘটকী ঠাকরুণকে একটু
জল খাইয়ে দাও মা।
ঘটকী। তা ত আপনাদেরই খাচ্চি মা-আপনাদের মত দশ
জনের কাছে খেয়ে দেয়েই মানুষ ; অবশেষে জল খাইয়া ঘটকী বাড়ী
ফিরিয়া আসিল।
কিছু পরে ভজহরি বাবুর কন্যা ঘুমাইতেছিল, চোখ রগড়াইতে
রগড়াইতে সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং তাহার মাতাকে
জিজ্ঞাসিলেন—মা, তুমি যে এখনও এখানে বসিয়া আছ যে, কি
কছিলে মা?
প্রমদা। না মা, কি আর করব এই তােমার শ্বশুর বাড়ী থেকে
একজন ঘটকী এসেছিল, তাই তার সঙ্গে কথা কহিতেছিলাম।
কন্যা। কি বলে মা? দাদার কি তবে ঐ খানেই বিবাহ
স্থির হইল ?
প্রমদা। হা মা, তােমার বাবারও মত আছে যে, ওইখানেই
যেন বিবাহ হয়।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। e কন্যা, তা বেশ হয়েছে মা, একটু শীঘ্র শীঘ্র দাদার বিয়েটা দাও, আর তারা কি দেবেন থােবেন বল্লেন, মা ? প্রমা? না, তা কিছু বলে নি বটে, তবে তাঁরা সা করেছেন। কন্যা। তাতে তােমরা কি বলে ? প্রমদা। আমরা বললাম আমাদের এই চাই। হাজার টাকা নগদ, খাট বিছানা, ঘড়ি ঘড়ির চেন, আটী ও ৮০ ভরি সােণা, কেমন মা, ঠিক হয়নি, ওর চেয়ে কমে আর কি ছেলের বিয়ে দেওয়া চলে ? কন্যা। তা বেশ হয়েছে, তােমরা যা ভাল বুঝবে তাই করবে ও আর আমি কি বলিব । এ দিকে যতীন কিঞ্চিৎ আভাসে বুঝিয়াছিল যে, তাহার বিবাহের জন্য তাহার পিতামাতা বড়ই উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন, আরও সে দিবস ভাত খাইবার সময় যে সকল কথা শুনিয়াছিল, তাহাতে সে বুঝিয়াছিল যে, তাহার বিবাহের সম্বন্ধ ভােলানাথ বাবুর কন্যার সহিত ঠিক হইতেছে। এই কয়েক দিনের ঘটকীর যাতায়াত, পিতামাতার পরামর্শ, ভ্রাতৃজায়ার ও কনিষ্ঠা সহােদরার হাস্য পরিস্ফুট, অথচ সলজ্জ কথােপকথনের ভাব যতীনের মনে ঈপ্সিত মরম বাসনা লাভের জন্য এক অভূতপূৰ্ব আনন্দের সৃষ্টি করিয়া কল্পনা সাহায্যে তাহা স্ফীত করিয়া তুলিয়া তাহার মুখে চোখে এক স্বর্গীয় ভাব বিকশিত করিয়া দিল। সে যতীন এখন আর নাই। কিন্তু এই সকলের মধ্যে তাহার মনে কেমন এক সঙ্কোচভাব, সলজ্জভাব আসিয়া পড়িয়াছে--সে কাহারও সহিত মুখ তুলিয়া তাহার স্বভাব সুলভ-উচ্চৈঃস্বরে কথা কহিতে পারে না-যেন কেমন বাধ বাধ ঠেকে। পাছে কেহ তাহার বিবাহ প্রসঙ্গ উত্থাপন করে, এই ভয়ে ও লজ্জায় তার মুখ ক্ষণে ক্ষণে লাল সুখের-মিলন। হইয়া উঠে-সদাই একলা একুলা থাকিতে ভালবাসে, এবং কে কোথায় কি কথা কহিতেছে, তাহা নিভৃতে গিয়া অপরের অলক্ষে শােনে। যদিও এই রকম কথাবার্তা শুনা বড়ই ঘৃণার কথা; ইহাতে যতীন ব্যাচারীরই বা দোষ কি ? সেত ছেলে মানুষ—আমরা অনেক পােড়খেকোকেই এ ক্ষেত্রে এতদপেক্ষা হাস্যোদ্দীপক ব্যবহার করিতে দেখিয়াছি। যাহা হউক, তাহার পরিষ্কার আনন্দিত হৃদয়াকাশের এক কোণে একটি সরু কাল দাগের মত একখানি কাল মেঘ উঠিয়া ভবিষ্যৎ প্রলয়ের কথঞ্চিৎ সূচনা দেখাইতেছিল এবং সে ক্ষুব্ধ হইতেছিল। তাহার মনে একটা বিষয় বড়ই তােলাপাড়া করিতেছিল, সে তাহার মাতাকে তাহা বলিবার জন্য, বলিয়া ভারাক্রান্ত হৃদয়ের বােঝা কমাইবার জন্য, কেবল একটি সুযােগ খুজিতেছিল । আজ সে সুবিধা পাইয়া তাহার সাধারণ সলজ্জ ভাব ত্যাগ করিল এবং এক অসাধারণ বলে বলিয়ান হইয়া তাহার মাতাকে বলিতে চলিল। গিয়া দেখে যে, তাহার মাতা একলা একটা ঘরে বসিয়া আছেন-- সে উত্তম সুযােগ বুঝিয়া তাহার মাতাকে নির্ভয়ে অথচ তারগম্ভীর স্বরে বলিল-মা, তুমি কি আমার একটা কথা রাখবে ? না, তােমাকে তাহা রাখিতেই হইবে। মা। কি বাবা যতীন, আগে কি কথাটাই শুনি, তারপর বলব এখন। যতীন। না মা, সে হবে না, আগে তুমি আমার মাথায় হাত দিয়ে হা শুনব। আর যদি না শুন তাহলে আমি বলছি আমি কখনও বিবাহ করিব না। মা। তুই কি পাগল হলি নাকি, তাের আবার এ সব বাই ধরিল কেন যে, তাের কথা না শুনলে তুই বিয়ে কবি না। আচ্ছা—আমি শুনব, তুই বল কি কথা? বল যে, পঞ্চম পরিচ্ছেদ। = = = = যতীন। হা মা, তােমরা বােধ করি আমার কোথাও বিবাহ দিবার ঠিক করিয়াছেন। কিন্তু আমার একটা বিশেষ অনুরােধ আছে, আমি ছোলবেলা এইতেই মনে মনে সংকল্প করিয়া আসিতেছি যে, আমার বিকহে কন্যাপক্ষ হইতে কিছুই লইতে দিব না—এখন সেই সংকল্প কার্যে পরিণত করিবার, আজন্ম পরিপােযিত আশা ফলবতী করিবার, সুযোেগ উপস্থিত। আমি মা তােমার কাছে আমার এ ‘আব্দার গ্রাহ্য হইবে বলিয়া, বড় আশায় বুক বাঁধিয়া তােমার কাছে-- মুখ ফুটিয়া বলিতে সাহসী হইলাম। অতএব এই বিবাহ ব্যাপারে কন্যার পিতার কাছ হইতে তােমরা কিছু লইতে পারিবে না, এ যদি স্বীকার হও, তাহলেই আমি বিবাহ করিব, আর নচেৎ মা। যতীন, তুই বলিস কি, তাের কি মাথা খারাপ হয়েছে যে, তুই ও কথা বলিতেছিস! কেন, তাের কি মনে নেই, না চোখে দেখিস ই, যে তাের ভগ্নির বিবাহের সময় তাের বাপকে কত ধরে দিতে হইয়াছিল। আর তাের ভগ্নির যেখানে বিবাহ হইয়াছিল, সেইখানেই তাের বিবাহ, তবে তারা যখন নিতে পেরেছেন, তখন তাঁহারা কি দিতে পারিবেন না, না আমরাই কি নিতে পারব না ? আর দেনা পাওনার বিষয় ঘটকীরসঙ্গে কথাবার্তা সমস্ত স্থির হয়ে গেছে, এবং তাহারাও দিতে প্রস্তুত আছেন, এখন কি হয় ! যতীন। মা, আমি তােমার পায়ে ধরে বলছি যে, তারা যদি একটা অন্যায় কাজ করে থাকেন, তাবলে মা আমরা কেন সে রকম অন্যায় কাৰ্যে প্রশ্রয় দিব ? আর দেখ, আমাদের বাঙ্গালি জাতির এই কারণেই এতদূর অবনতি হচ্ছে, আমাদের হিন্দুদিগের উদ্বাহ জিয়া ধৰ্ম্মরূপ দৃঢ় ভিত্তির উপর সম্পূর্ণরূপে স্থাপিত—ইহার উদ্দেশ্য ধৰ্ম্মরক্ষা, মুখেয়-মিলন। সমাজরক্ষা ব্যতীত কিছুই নহে! ধৰ্ম্মরক্ষা করাই যখন বিবাহের মুখ্যতম উদ্দেশ্য, তবে সুধু ফুলমালা দিয়া বিবাহ কাৰ্য্য সমাধা হয় না কেন মা? ধৰ্ম্মরূপ প্রধান ভিত্তিকে দূরে ফেলিয়া দিয়া এখন বিবাহ ব্যাপারে অর্থকে প্রাধান্য দিয়া কন্যার পিতা বা অভিভাকগণের উপর “এত না দিলে” বা “এই এই ন দিলে” বিবাহ হইবে না, হইতে পারে না, বলিয়া বরপক্ষ হইতে এত জুলুম করা হয় কেন ? মা। এর আর জুলুম কি ? এখনকার কালে কনের বাপকে ত মেয়ের বিয়ের সময় টাকাত ঢালিতেই হয়। অধিকন্তু আমরা মেয়ের বিবাহে ইহাদের যেমন দিয়াছি, ছেলের বিবাহে আমরা সেইটা আদায় পরিতেছি মাত্র। যতীন। যাহাতে এই আদায় না করিতে হয়—এ রকম ব্যবস্থা আগে হইতে করিলে কি চলিত না? না, অর্থের সহিত, পণের সহিত সম্বন্ধ রাখিলে, জুলুম করিয়া কন্যাপক্ষের নিকট হইতে আদায় না করিলে সুধু ফুলমালা দিয়া বিবাহ ব্যাপার মঞ্জুর হইত না? দিয়া আদায় করা অপেক্ষা একেবারে না দিয়া না আদায় করিলেই ত সকল দিক রক্ষা হয়। মা। বাপ, আগেই বলিয়াছি এখন রীত হয়েছে, কন্যা পক্ষের নিকট হইতে কিছু লওয়া। তা তারা যখন দেনা পাওনায় স্বীকার পেয়েছেন, তখন তাের কথার দরকার কি? আর তুই ত নিজে নিচ্চি , এখন কথা বাহিরে গিয়াছে, আত্মীয় কুটুম্ব, পাড়াপড় সী, স্বজাত ও বিজাত, যখন শুনিয়াছে যে বিবাহ ঠিক হইয়াছে—এত দেনা পাওনায় স্থির হইয়াছে—তখন তাের এ পাগলামী শুনিলে লােকেই বা কি বল্‌বে-আত্মীয় কুটুষেরাই বা কি বলবেন-নতুন পঞ্চম পরিচ্ছেদ। D কুটুম্বেরাও বলিবেন যে, কি টাটা ছেলে গাে। তাই বলি বাপ- ক্ষ্যামা দে। যতীন। মা, আত্মীয় কুটুম্বের কথা যখন তুলিলে, তখন বলি- পয়সা লইয়া কুটুম্ব করিলে কি যথার্থ কুটুম্ব করা হয় ? না, তাহাদের প্রকৃত সহানুভূতি-যাহাতে পরের সুখ দুঃখ টানিয়া নিজের করিয়া লওয়া বলে—তাহা পাওয়া যায় ? এ ঘাের দুর্দিনে, অকালের দিনে, বিবাহরূপ পবিত্র ধর্মের দোহাই দিয়া কেবল কন্যাপক্ষ হইতে “দেহি- দেহি” শব্দে দোহন করিলে কুটুম্বের আত্মীয়তা বা সহানুভূতি পাওয়া যায় না, ইহা ধ্রুব সত্য। লােকে ছেলে মেয়ের বিবাহ দিয়াই ত পরকে আপন করিয়া লইত, আত্মীয় কুটুম্ব বৃদ্ধি করিত; কিন্তু আধুনিক সময়ে বিবাহের রাত্রি হইতেই দুই পক্ষের মন কষাকষি, শক্রতা বৃদ্ধির সৃষ্টি হয়। আর তাহার জের গিয়া পড়ে সেই কোমল স্বভাবা বলিকা কন্যার উপর—সেই বালিকা-অনেক স্থলে যাহার দ্বাদশ বর্ষ এখনও অতিক্রম করে নাই বা সবে মাত্র করিয়াছে—সেই বালিকাকে শ্বশুর বাড়ীতে বাকশক্তি থাকিতেও বােব হইয়া থাকিতে হয়। তাহারা নীরবে চক্ষের জলে বুক ভাসাইয়া অহােরাত্র হৃদয়ে কি তুমুল সংগ্রাম করিয়া ক্ষতবিক্ষত হইয়া পড়ে ! শেষে মা বাপের খােয়ার সহ কৃষিতে পারিয়া প্রস্ফুটোম্মুখ কলিকা কোরকেই বিনষ্ট হয়। আর যাহারা অবশিষ্ট থাকে, তাহাদের ত দাম্পত্য-সুখে একেবারেই বঞ্চিত হইয়া জীবন্মত হইয়া থাকিতে হয়। কি দুঃখে, কি পাপে তাহাকে এই দারুণ কষ্ট পাইতে হয় বলিতে পারি না; কিন্তু ইচ্ছা করিলে কি ইহার নিরাকরণ হয় না ? ইহা ত বরের অভিভাবক অভিভাবিকাগণের হাতেই আছে। তাহারা যদি এই বুঝেন যে, এক জনের সর্বনাশ করিয়া —সর্বস্ব দোহন করিয়াভিটা মাটী চাটী করিয়া যে অর্থ শােষণ হয়, ৫৪ সুখের-মিলন। সেই পয়সায়, পরের পয়সায়, কখনও কাহারও দুঃখের অবসান বা আশান হয় নাই, হয় না, হইবে না। তাহা হইলে আধুনিক স্বার্থপূর্ণ বিবাহ (যাহা পূৰ্বে নিঃস্বার্থ ছিল) দুঃখপূর্ণ না হইয়া কতু মুখের আকর হইত, তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। ছেলের বিবাহ দেওয়া -ছেলের সুখ স্বচ্ছলতার জন্য—ইহা ত স্বীকার করিবেন ? কিন্তু যে বিবাহে ছেলের সুখ শান্তি রহিল না—পুত্রবধূ তাহার জন্য তাহার পিতামাতার দুর্দশা ঘটিয়াছে, এই মনে করিয়া কেবল দুঃখের বােঝ বহিতে থাকিল—অবসাদ মনকে গ্রাস করিয়া রহিল-এখন তাহার মানসিক স্ফুৰ্ত্তি আদৌ বিকাশ পাইল না--তখন তাহাদের দাম্পত্য জীবন কতদূর সুখের হইবে বা হইতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়। সেই জন্য মা অজ নির্লজ্জের ন্যায় মুখ ফুটিয়া এই সকল কথা তােমার কাছে নিবেদন করিতে সাহসী হইলাম—মনে দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, অপর কারণে না হউক, অন্ততঃ তােমার ছােট ছেলে তােমার যতীর” ও মুখ চাহিয়া এই দানগ্রহণরূপ কুপ্রথার প্রশ্রয় না দিয়া তাহার নিবারণ মানসে বদ্ধপরিকর হইয়া এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত দেখাইয়া দাও—তাহাতে তােমার অসীম আনন্দ উপভােগ হইবে—সকলেই তােমাকে ধন্য ধন্য করিবেন এবং সেই সঙ্গে তােমার গর্ভের সস্তান আমরাও ধন্য হইয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিব। এতক্ষণ যতীন এক অমানুষিক বলে বলীয়ান হইয়া এই সকল কথা বলিতেছিল, তখন তাহার মুখে চক্ষে এক স্বর্গীয় ভাব প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছিল এবং তাহার মাতা ঠাকুরাণী তাহার মুখের দিকে একদৃষ্টে এবং তন্ময় হইয়া তাকাইয়াছিলেন এবং আমাদের বােধ হয়, যতীনের কথার মর্ম বিশেষরূপে উপলব্ধি করিতেছিলেন।

পঞ্চম পরিচ্ছে। এমন সময় যতীন বলিল--মা, তাঁহাদের বলিয়া পাঠাও যে, তাহারা আশীর্বাদ করিয়া স্বেচ্ছায় ও স্বচ্ছন্দে তাহাদের মেয়েকে যাহা দিবেন, তাহাই সাদরে গৃহীত হইবে, অপর কিছুই চাহি না। এই বলিয়া যতীন মায়ের পা দুটী জড়াইয়া তাহাতে আপনার মস্তক রক্ষা করিলেন। মাও হাত ধরিয়া ছেলেকে পদপ্রান্ত হইতে উঠাইয়া মস্তক আম্রাণ করিয়া সস্নেহে বলিলেন—বাবা, তাের কথাই আমি . রাখিব। যতীনও মার পদধূলি মস্তকে দিয়া সে স্থান হইতে প্রস্থান করিল। যতক্ষণ চক্ষের আড় না হইল, ততক্ষণ তাহার মাতা একটা দীর্থ- নিশ্বাস ফেলিলেন এবং তাহার গণ্ড বহিয়া দুই একটা আনন্দাশ্রু গড়াইয়া পড়িল। প্রম। কিন্তু বড়ই ফাঁপরে পড়িলেন—আগের দিনেই পুটির শ্বশুরবাড়ী ঘটকঠাকরুণকে দিয়া বলিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে, যতীনের বিবাহে এই এই চাই এবং এত দিতে হবে—আবার কি বলিয়াই বা আজ বারণ করিয়া পাঠান যে, কিছু চাই না—আবার এ ধারে না বলিয় পাঠাইলেও ছেলেও ধনুর্ভঙ্গ পণ করিয়াছে, বিবাহ করিবে না-হাজার হোক মায়ের প্রাণ তায় যতী আবার ছেলের ছােটটী—সে চিরকাল আইবুড় থাকিবে—তাহাও বা কিরূপ দ্যাখায়-পরে ভাবিয়া ঠিক করিলেন যে, বারণ করিয়া পাঠাইব-আগে আমার ছেলে, তারপর ত পয়সা। ছেলে বিগড়াইলে আমি কি পয়সা লইয়া ধুইয়া খাইব ইত্যাদি সাত পাঁচ ভাবিয়া, তার এক ঝিকে ডাকাইয়া তাহাকে সব বুঝাইয়া দিয়া বলিয়া দিলেন যে, আজই একবার পুটির বাড়ী যা এবং তার শ্বাশুড়ীকে সব বুঝাইয়া বলবি।

সুখের-মিলন। প্রমদা জানিতেন যে, তাঁহার স্বামীর ( ভজহরি বাবুর) এই দান লওয়া সম্বন্ধে সম্পূর্ণ মত থাকিবে। কারণ, বরাবরই তিনি পণ গ্রহণে বড়ই নারাজ-অতএব তাহাকে আর কোন কথা এখন ভাঙ্গিয়া বলিবার প্রয়ােজন নাই।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
ক দিবস বৈকালে ভােলানাথ বাবু বাহির হইবার উদ্যোগ
করিতেছেন, এমন সময় তাহার ভৃত্য আসিয়া খবর
দিল যে, বাটীর ভিতর মা ঠাকরুণ একবার ডাকিতে
ভােলানাথ বাবু। কেনরে, আমি যে বেরিয়ে যাচ্ছি।
ভৃত্য। আজ্ঞে, একজন ঘটকী আসিয়াছে, তাই মা ঠাকরুণ
'আপনাকে ডাকছেন।
ভােলানাথ বাবু। আচ্ছা, চল আমি যাচ্ছি।
ভােলানাথ বাবু ভৃত্যকে বিদায় দিয়া বুঝিতে পারিলেন যে, সেই
ঘটকী আবার আসিয়াছে, সেই কারণ তিনি সত্বর কাপড় ছাড়িয়া লইয়া
তাহার কাছে যাইয়া উপস্থিত হইলেন।
ঘটকী। বাবা, আমি বরের বাটা গিয়াছিলাম, তাদের মেয়ে
পছন্দ হয়েছে, আর তারা বললেন-ও ত আমাদের জানা ঘর ।

মুখের-মিলন। ভােলানাথ বাবু। হাঁ, সে সব ত আমি বুঝলাম, যে মেয়েও পছন্দ, আর জানা ঘরও বটে; কিন্তু তারা তােমায় এ দক্ষিণার বিষয় কি বল্লেন বল দিকিন, সেটা আগে জানা দরকার । ঘটকী। তারা বল্লেন, ও আর আমরা কি বলিব, আমাদের কুটুম্ব ঘর, আমরা কি কিছু বলতে পারি ? তবে শেষ বেলায় আমি অনেক জেদাজিদি করিবার পর তারা বলেন যে, এই এই চাই বলি ও হাজার টাকা নগদ, খাট বিছানা, সােণার ঘড়ি ঘড়ির চেন, আংটী, ও ৮০ ভরি সােণা। ভােলানাথ বাবু। ও বাবা, এই কি তাদের কম, আবার বলিয়াছে কিনা কুটুথ ঘর, যাহা হােক, তুমি আর একদিন আসিও, আমরা ত সব শুনিলাম, পরে যাহা হয় তােমায় বলিব এখন। ঘটকী। ঘঁ, বলবে বইকি বাবা, আর তারাও যে খুব বেশী চাহিয়া বলিয়াছেন তাও ত নয় তবে বাবা, এটা’ত সত্যি যে, আজকাল সচরাচর লােকে যাহা চাহে, তাহার চেয়ে অনেক কম তারা বলিয়াছেন আর একটা কথা ভুলিয়া গিয়াছি, বাবা ভগবান করুন, যদি তােমাদের মত হয় তা হইলে তারা ও মাসের গােড়াতেই বিয়ে দিবে, এটা যেন ভুল না হয়, তবে বাবা, ও মা আসি, দেখবেন যেন আপনাদের গরীব মেয়ে না মারা যায়, এই বলিয়া ঘটকী ? চলিয়া গেল। ভােলানাথ বাবু তাহার স্ত্রীকে বলিলেন—কিগাে, সব শুলে ত! এখন আমি যা বলিয়াছিলাম তাই ঠিক হ’ল ত, এখন আর বসে ভাবলে কি হবে বল–মেয়ে যে বড় হয়েছে—সময় সংক্ষেপ, দেরি চলিবে না--আর জানা ঘর-তায় ছেলে পছন্দসই—যা চাইবে তাই আমাদের দিতে হবে, আর আমরাও ত লইয়াছি।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
৫১
এইরূপে দুইজনে কিছুক্ষণ সুখ দুঃখের কথাবার্তা কহিবার পর,
তাহারা আপন আপন কাৰ্য্যে চলিয়া গেলেন; কিন্তু রাজবালার মনটা
দমিয়া গিয়াছিল।
পরদিন প্রাতে ভজহরি বাবুর বাটী হইতে একজন ঝি আসিয়া
উপস্থিত হইল। সে একেবারে বাটীর ভিতর গিয়া যেখানে ভোলানাথ
বাবুর স্ত্রী কাজ করিতেছিলেন, সেইখানে যাইয়া বলিল, কি মা ঠাকরুণ
ভাল আছেন ত—বাড়ীর সব ভাল ?
রাজবালা! হাঁ মা, সব ভাল, তােমাদের বাটীর খবর সব ভাল
ত, আমার বউমা কেমন আছে ও কবে আসবে ?
ঝি। আপনার বউমা ভাল আছেন, আর বাড়ীর সবও ভাল
আছেন, যবে আপনি বলে পাঠাবেন, সেই দিনই আমার দিদিমণি
আপনাদের এখানে আসবেন—ও আর কি-তার ত এই ঘর, জন্ম
জন্ম যেন হাতের নােয়া বজায় রেখে পাকা মাথায় সিদুর পরে এই ঘর
যেন করে। তবে কি জানেন মা, বড় ছেলে মানুষ, সেই যা।
রাজবালা। হাঁ, তা নয় ত কি মা, আবার সেয়ানা হলে সে
আপনার ঘরকন্না—নিজেই থাকবে, তখন আর যাবার নামও
কবে না।
ঝি। হাঁ, --- যা বলতে এসেছিলুম, আমার মা ঠাকরুণ আপনাদের
নিকট পাঠাইয়া দিলেন যে, বলে আয় যে, “আমার ছেলের সঙ্গে আর
তাদের মেয়ের সঙ্গে বিবাহ ঠিক হইয়াছে, তাহাতে আমাদের
সম্পূর্ণ মত আছে। আর আমরা যে দেওয়া থােয়ার বিষয় ঘটকীকে
যাহা বলিয়াছিলাম তাহা আর আমাদের চাই না। তবে তাদের মেয়ে,
তাহারা তাদের মেয়েকে আশীর্বাদ করিয়া যাহা দিবেন, তাতেই
আমরা খুসী হইব।”

সুখের-মিলন।
.
রাজ। কেন, এই যে কাল বিকালে সেই ঘটকী আসিয়া বলিয়া
গেল যে, তারা এর কমে বিয়ে দেবেন না আর এর মধ্যে আবার কিসে
তাদের মতটা ঘুরিয়া গেল। কিছু বুঝতে পাচ্ছি না, তবে তাঁরা বলুন
আর নাই বলুন, আমাদের হল পেটের মেয়ে, আমরা কি এমন চামার
যে, মেয়েকে শুধু অমনি এক গাছি নােয়া হাতে দিয়া বিয়ে দেব, তাত
আর নয়।
ঝি। হাঁ, তা না ত কি মা, কে আবার মেয়েকে কবে শুধু মােয়
হাতে দিয়া বিয়ে দিয়েছে, যারা খুব গরীব তারাও মেয়েকে কিছু না
কিছু দেয়।
তবে একবার কি আমাদের বউমণিকে দেখতে পাইব
কি মা।
রাজবালা। হাঁ, দেখবে বই কি বাছা, এই বলিয়া তিনি সুহাসকে
ডাকিলেন।
ভাবী শ্বশুর বাড়ীর ঝি বাড়িতে আসিতেই সুহাসিনী বুঝিতে
পারিয়াছিল এবং বাহিরে কি কাজ করিতেছিল তাহা ফেলিয়া
রাখিয়া ঘরে গিয়া অন্যমনস্ক হইয়া বসিয়াছিল, পরে মাতা ডাকিতেছেন
শুনিয়া, কাপড় গুছাইয়া মাথায় কাপড় টানিয়া দিয়া সঙ্কোচ ও একটু
সলজ্জজাবে মার কাছে কাপড়ের খুট খুঁটিতে থুটিতে আসিয়া
দাড়াইল।
সুহাসিনী আসিলে তিনি বলিলেন ওগাে মেয়ে এইটী তােমাদের
বউমনি হইবে ।
ঝি। বাঃ বেশ মেয়ে, চোখ মুখ নাক বেশ, রং ও খুব, তা একবার
দেখা হল ভালই হল, তবে মা আমি আসি বেলা হয়ে গেছে,
আপনাদের ত তাহা হলে ও মাসের গােড়াতেই বিয়ে দেওয়া
মত ত ?

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
r৭ - -
রাজবালা। হাঁ আমাদের ও মাসের গােড়াতেই বিয়ে দেওয়া মত।
তা মা তুমি কি অমনি যাবে, অনেক দুর থেকে এসেছ, আবার যেতেও
অনেক বেঘা হবে, সে কি হয় দুটি ভাত খেয়ে যেতে হবে এই বলিয়া
তাকে তথায় বসাইয়া বামুন ঠাকুরকে বলিলেন ওকে বেশ ভাল করিয়া
সব রকম তরকারী দিয়া ভাত দেওগে আমি জল খাবার লইয়া আসছি।
যাহা হােক কিছুক্ষন পরে ঝি খাইয়া উঠিয়া বলিলেন, মা তবে আমি
এখন আসি, আবার আসব এখন।
রাজবালা। হাঁ আসবে বৈকি মা এখন ত তােমাদেরি ঘর বাড়ী
হইল।
যাহা হউক রাজবালা তাহার বেয়াই বাড়ীর ঝিকে বিদায় দিয়া
মনে মনে ভারী খুসী হইলেন বটে কিন্তু বরেরা আমাদের নিকট
কিছু চান না ইহাতেই কেমন একটা হীনতা মনে আসিয়া পড়ায়
তাদের আত্ম সম্মানে একটু আঘাৎ লাগিতে ছিল। মনের এই
চাঞ্চল্য লইয়া তাড়াতাড়ি স্বামীর নিকট চলিলেন এবং গিয়া দেখেন যে
তিনি ও
স্নান করিয়া আহারের জন্য নামিয়া আসিতেছেন।
ইতি মধ্যে তিনি গিয়া পড়িলেন এবং বলিলেন, কিগো এখনও কি
আহারের সময় হয়নি বুঝি ?
ভােলানাথ। কেন বল দেখি, আজ যে দেখছি কিছু বেশী রকমের
খাতিরটা, আজ বােধ করি কিছু মতলব আছে-না ?
রাজবালা। হাঁ~-নাও এস আর ঠাট্টার সময় পেলেনা বুঝি,
বেশ,-বেলা কত হয়েছে জান এই বলিতে বলিতে উভয়ে রান্নাঘরাভি-
মুখে চলিলেন, ভে লানাথ বাবু আহারে বাসলে কিছুক্ষন পরে রাজবালা
বলিলেন যে ওগাে আজগের দিনটা আমাদের খুব ভাল দেখছি আজ
সকাল বেলাই আশাতীত বােজগার হইয়া গেল বুঝলে ?
n

সুখের-মিলন। ভােলানাথ। কি রকম রোজগারটা হােল এবং কি রকমে হােল শুনতে পাই নাকি ? রাজবালা। পাবে বই কি, ও রােজগারটায় আমার যত উপকার হােক আর নাই হােক তোমার পক্ষে খুব ভাল হইয়াছে বটে ; কিন্তু আজ ভােরের বেলায় তোমার ভাবী নূতন বেয়াই বাড়ী থেকে তাদের ঝি আসিয়া উপস্থিত—সে বলিয়া গেল যে, “আমার বউমা, আমায় বলিয়া দিলেন যে, আমরা যে দেওয়া থােয়ার বিষয় ঘটকীৰে বলিয়া দিয়াছিলাম, তাহা আর আমাদের কিছুই চাহি না। আপনাদের মেয়ে, যাহা তাকে আশীৰ্বাদ করিয়া দিবেন তাতেই আমরা খুসি হইয়া লইব ; কিন্তু ও মাসের গােড়াতেই যেন বিবাহ দেওয়া হয়।” ভােলানাথ বাবু কিছু ভাবিয়া বলিলেন-বল কি, তাহাদের আবার এ মত হল কেন, এর ভিতর নিশ্চয়ই কিছু ব্যাপার আছে, যাহা হউক, এই সুখবরটায় আমি অত্যন্ত সুখী হইলাম--আর এ একটা মস্ত রােজগার বটে; কিন্তু একটা কথা, তাহারা তাদের ছেলের বিবাহে কিছু না লইতে পারেন,তাই বলিয়া আমরা কি এতই হীন যে, আমাদের মেয়েকে বিবাহের সময় কিছু না দিয়া থাকিতে পারি, দিন আনে দিন খায়, এমন ডোম ডােক্লারাও যে মেয়ের বিবাহে কিছু দিয়া থাকিতে পারে না। তবে আমাদের সাধ্যমত এবং যাহা না দিলে বিশেষতঃ যখন আমরা কিছু দিন আগে তাহাদের কাছ হইতে আদায় করিয়াছি, সমাজে নাম না খারাপ হয়, মান বজায়, থাকে তাহাই দিব। সুখের বিষয় ইহাতে জুলুম রহিল না, তাহা হইলেও আমাদের আর চুপ করিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। যদি ভগবান এতই দয়া করিতেছেন, তখন আমাদের এই মাসের কয়দিনের মধ্যেই সমস্ত ঠিক করিয়া যােগাড় রাখিতে হইবে।

মঠ পরিচ্ছেদ। ০ রাজবাল।। , আর দিন নাই বটে; এইবার থেকে সব উদ্যোগ করা যাক, তবে ঐ যা বলিলে-তারা যদি কিছু ! ই চান, আমাদের সাধ্যমত দেওয়া চাই—তাহা তােমার যা ইচ্ছা হলে এই নি, ও আর আমি কিছু বলব না। ভােলানাথ বাবু। হঁা, সে পরের কথা পরে হবে আর যা দেওয়া হবে, সে তােমায় না জানাইয়া কিছু করিব না জানিও। ভােলানাথ বাবু আহার করিয়া উঠিয়া বাহিরে আসিলেন, ভৃত্য অমনি তামাক লইয়া আসিল। ভােলানাথ বাবুর কিন্তু মনে মনে বড় আহলাদ হইয়াছিল যে, যা মেয়ের বিবাহে বৈবাহিকের হুকুম তামিল করিতে হইল না। আজকালের বাজারে কম সৌভাগ্যের কথা নহে। এদিকে দেখিতে দেখিতে যতীন ও সুহাসিনীর শুভ বিবাহের দিন আসিয়া উপস্থিত হইল—যতীনের মা প্রমদা আধুনিক রীতি নাতির আচার ব্যবহারের তত পক্ষপাতী ছিলেন না। বহুকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে বিবাহের আনুসঙ্গিক ক্রিয়াকলাপ বজায় রাখিতে সদাই সচেষ্ট। তাই তিনি পাড়ার পাঁচজনের সাহয্যে আনন্দ নাড়, তৈয়ার করিয়াছেন, অনেক নব্যারা আনন্দ নাড়, কি তাহা হয়ত জানেন না। আমাদের বাঙ্গালির আনন্দের তিরােভাবের সময় হইতে কোন শুভকর্শ্বে ‘আনন্দ নাড়ও বিদায় গ্রহণ করিয়াছে। এখন বাবুদের ডিস্পেন্সিয়া- তাহার দৌলতে এখন লুচির ফোস্কা ছিড়িয়া খাইতে হয় । রসগােল্লা পান্তুয়ার ছাল ছিড়িয়া খাইতে হয়—আমরা আর্থিক-শারীরিক ও মানসিক হিসাবে সদাই নিরানন্দ। যাহাদের প্রাণে আনন্দের লেশ মাত্র নাই—তাহারা আনন্দ নাড়, খাইবে কি প্রকারে ? ভজহরি বাবুর বাড়ীতে কয়দিন ধরিয়া পাড়াস্থ গ্রামস্থ অনেক চাষাভুষ লােক ছােট দাদাঠাকুরের(যতীনের)বিবাহ উপলক্ষে বামুন বাড়ীতে প্রসাদ ০ সুখের-মিলন। পাইতেছে—তাহারা আজ অন্য দিনের জল খাবার চিড়ে মুড়ির পরিবর্তে আজ আনন্দ নাড়, খাইতেছে ও তারিপ করিতেছে। ভিতর বাড়ী পল্লীস্থ স্ত্রীলােকদিগের কলরবে মুখরিত। যতীনের খুড়তুত, পিসতুত, মাসতুত, জাসতুত, মামাত, ভ্রাতৃজায়া সম্পর্কীয়া রমণীগণ সতীনকে আজ দুই একটা ঠাট্টা করিতেছে, যতীনও সকলের সহিত যথাযােগ্য মাধ্যানুসারে তাহাদের কোন কথার উত্তর দিতেছে—কোনটায় বা যথাযথ উত্তর না দিতে পারিয়া অপ্রতিভ হইতেছে ; এই রকমে দিব। প্রায় অবসান হইয়া আসিতে লাগিল এবং বরের বিবাহ যাত্রা উদ্যোগ চলিতে লাগিল। পাঠক পাঠিকা! আসুন, একবার আমরা ভােলানাথ বাবুর বাড়ী যাই। কনের বাড়ীতে বিবাহের দিন সকাল হইতেই সকলেই কোন না কোন কার্যে ব্যস্ত। সানাই বাজানে ওয়ালারা থামিলেই সকলেই বলে ওরে বাজা বাজা। সমস্ত লােকের ফমাস মত বাজাইতে গেলে তাদের বুকের কলজের উপর বড়ই জুলুম করা হয় দেখিয়া, ব্যাচারীর। কখনও বা ডুগী তবলায় গুপাে বা চাটি দিয়া, কখনও বা শুধু পেঁ৷ ধরিয়া জান বাচাইবার চেষ্টা করিতেছে, তবে ওরি মধ্যে বাড়ীর হােমর চোর। কেহ বাজাইতে বলায়, ভাবী পুরস্কারের আশায় একটু মণ্ডল হইয়া হইয়া এক আধখানা গানের দুই একটি কলি বাজাইয়াই রাগিণ ধরিয়া কেরামতি দেখাইতেছে। ভিতর বাটী হইতে মাঙ্গলিক শঙ্খধ্বনি হইতেছে। ক্রমশঃ দিবা অপরাহ্ন হইয়া আসিল। গগাধূলি লগ্নে বিবাহ। অতএব সমস্ত বন্দোবস্তের শেষ বর আসিবার আগেই করিতে হইবে ভাবিয়া ও জানিয়া, কোলাহল—লােকের হুড়াহুড়ি ক্রমশঃ বাড়িতে লাগিল। যথা সময়ে বরযাত্রী সমভিব্যবহারে যতীন বর সাজিয়া ;

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। আসিয়া উপস্থিত হইল। হৈ হৈ রৈ রৈঃ পড়িয়া গেল। এত গােলমালেও যতীন কিছু অন্যমনস্ক ছিল- তাহার মানসপটে ভোলানাঃ বাবুর কন্যা সুহাসিনীর-সেই জলমগ্ন সুহাসিনীর কথা— সুহাসিনীর বালিকা বন্ধুগণের আৰ্তনাদ শুনিয়া কৌতুহল চিতে যতীনের পুকুর ধারে গমন, আদ্যোপান্তু ঘটনা সংক্ষেপে শুনিয়া নিমেষে ডুব দিরা সংজ্ঞা-রহিতা সুহাসিনীকে জলরূপ কবর হইতে তীরে উত্তােলন—শুশ্রুষায় চৈতন্যোৎপাদন -সুহাসের কৃতজ্ঞতাপূর্ণ সলজ্জ চাহনি একে একে সকলই মানস পটে উদয় হইতে লাগিল এবং সেই যতীনের “কি জানি এক ভাবের” ক্ষীণ আশা এখন সমুদ্র সহিত মিলনেচ্ছুক ক্ৰমশঃ বেগবতী নদীর ন্যায় বর্ধিত হইয়া, পরিস্ফুট হইয়া সফল হইতে চলিল দেখিয়া, এক গভীর কৃতজ্ঞতারসে তার হৃদয় আপ্ন ত হইয়া ভগবৎ চরণে প্রণত হইল। বর আসিয়া নির্দিষ্ট বিছানায় বসিলেন—বরযাত্রী ও কন্যাশ্রীগণের তামাক, পান ইত্যাদি দ্বারা আদর অভ্যর্থনা হইতে লাগিল। কিয়ৎ- ক্ষণ পরে ভােলানাথ বাবু পট্টবস্ত্র পরিয়া সভায় আসিলেন এবং কৃতাঞ্জলি করপুটে সভাস্থ সকলের অনুমতি লইয়া শুভলগ্নে কন্যা দান করিলেন। বর কনে বাড়ীর ভিতর চলিয়া গেলে পর, বৈবাহিকের বিশেষ জেদা- জেদিতে কিছু জল-খাবার খাইয়া জ্যেষ্ঠ পুত্র সমভিব্যাহারে ও বাটা প্রত্যাগমনােমুখ অবশিষ্ট বরযাত্রীকে লইয়া ভজহরি বাবু চন্দননগরের বাড়ীতে আসিলেন। ওদিকে ভােলানাথ বাবুর বাড়ীতে সম্মিলিত নিমন্ত্রিত মেয়েরা বর কনেকে বাসরে লইয়া গিয়া আমােদ আহলাদ করিতে লাগিলেন। সেই সময়ে সুহাসিনীর বিশিষ্ট সহচরী আমাদের পূর্ব পরিচিত কুমুদিনী যে তথায় উপস্থিত না ছিল, এমন নহে। সে কিছুক্ষণ সুখের-মিলন। যতীনের মুখের দিকে তাকাইয়া, থাকিয়া থাকিয়া মুখ টিপিয়া হাসিতে ছিল—কিন্তু অধিকক্ষণ না জানান দিয়া থাকিতে পারিল না—সে সাহসে বুক বাঁধিয়া যতীনকে মিঠি সুরে সম্বােধন করিয়া বলিল- কি গো বর মহাশয়, এত মাথা হেঁট করিয়া আছেন কেন ? বলি, আমাদের কি চিন্তে পারেন ? হঠাৎ এই প্রশ্নে চমকিত হইয়া যতীন যেমন প্রশ্ন- কারিণীর মুখের দিকে চাহিল, অমনি দেখিল যে সে আর অপর কেহ নহেন—তাহার নব-পরিণীতা অৰ্ধাঙ্গিনীর প্রিয়তমা সহচরী কুমুদিনী ও যতীনও মৃদুস্বরে উত্তর দিল, তা আর মনে পড়বে না? কুমুদিনীর এই আকস্মিক প্রশ্নেও যতীনের তৎপর হইয়া উত্তর দেওয়ায় সমবেত সমস্ত মেয়েরা কৌতুহল পরবশ হইয়া একবার যতীনের দিকে একবার কুমুদিনীর দিকে চাহিতে লাগিল—কুমুদিনী সুহাসিনীর মাকে সম্বােধন করিয়া বলিল-মাসি মা, তােমার জামাই, বাছা, আমাদের অচেনা নয়। সে তখন সকলকে ডাকিয়া বলিতে লাগিল--মাসিমার জান আমাদের অচেনা নয়—হাগা! তােমাদের ত মনে আছে যে, সুহাস আজ বছর দুয়েক আগে চাটুয্যেদের বাগানের পুকুরে পদ্মফুল তুলতে গিয়া জলে ডুবে গেছ লো- এই ইনি-তােমাদের জামাই বা--আজ আমাদের বর বাবু—সুহাসকে ডুব দিয়া জল হইতে তুলিয়া বাঁচান। ইনি না থাকলে সুহাসের সেদিন যে কি হত, তাহা ভাবতে গেলে এখনও হৃৎকম্প হয়- ইহার ন্যায় পরােপকারী লােক দ্যাখা যায় না—ভগবানের বিশেষ দয়ায় নিয়তি চক্রে আজ সেই সুহাসের প্রাণদাতা যতীন বাবু ও আমাদের সুহাস সংসারক্ষেত্রে পতি পত্নী স্বরূপে সম্মিলিত হইল। যেমন উহাদের উভয়ের মনের আশা ছিল, যেন তারা দুইজনে স্বামী ও স্বী হইয়া আজন্ম সুখে কাল কাটায়। পরম কারুণিক ঈশ্বর ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। . ***** তাহাদের সে আশা পূর্ণ করিয়াছেন। ভগবান আশীৰ্বাদ করুন, আপনারা সকলে আশাব্বাদ করুন এবং আমি কায়মনােবাক্যে ঈশ্বরের কাছে এই ভিক্ষা করিতেছি যে, এরা দুটীতে চিরকাল সুখে স্বচ্ছন্দে মনের সুখে থাকে। সেখানে উপস্থিত সকলেই বড়ই আশ্চয্যান্বিত হইল এবং সাধারণতঃই সকলের সহানুভূতি যতীন সুহাসের দিকে আকৃষ্ট হইল। কুমুদের আহলাদ আর ধরে না--সে সুহাসের পাশে গিয়া কিছু মৃদুস্বরে বলিল—কি ভাই সুহাস মনে পড়ে, যখন যতীন বাবু শাকে রক্ষা করিয়া আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া যান, তখন তােমার চোখ মুখ নীরব ভাষায় হৃদয়ের ভাব কি জানাইতেছিল ? জেদাজেদী করিয়া ধরায় তখন না বলিছিলি, যদি উনিই আমার বর হন ত বেশ হয়-কেমন না ? এখন ত ভাই তিনিই তােমার “চেষ্টার ফল তেষ্টার জল” বর হলেন—এখন যেন বরকে পেয়ে আমাদের ভুলে যাসনি । যতীনের দিকে চাহিয়া মৃদুস্বরে বলিল-ওগাে বােনাই বাবু, এই আমার সুহাসকে আজ আপনার হাতে সঁপে দিলুম-সে বালিকা- আমার চেয়ে দুই বছরের ছােট—তাহার দোষ গুণ মানাইয়া লইয়া শিক্ষা দিয়া তাহাকে আপনার মনের মতন করিয়া লইবেন এবং আমি যতদূর জানি, সুশি আমার আপনার মত ভাল গুরু মহাশয়ের হাতে পড়িয়া ভাল পড়ুয়া হইয়া দাঁড়াইবে। যতীনও কুমুদের এই স্নেহের বন্যায় ডুবিয়া গেলেন। বলিলেন- দেখা যাক, পরমেশ্বরের কৃপায় আমি আপনার হুকুম তামিল করিতে কতদূর সফল হই। তবে এখন আর একলা আপনার ভগ্নীকে নয়— তাহার সহিত আমাকেও—এ অধমকেও যেন ভুলিয়া যাইবেন না।

সুখের-মিলন। কুমুদ বলিল-যতীন বাবু সত্য কথা বলিতে গেলে এখন সুহাসের চেয়ে আপনিই আমাদের অধিক স্নেহের পাত্র হইলেন, কারণ এখন সুসির মান, অপমান, অভিমান, মঙ্গলামঙ্গল সমস্তই আপনার উপর নির্ভর করিতেছে। এখন সুসির নিজের অস্তিত্ব নাই—তাহা আপনাতেই মিশাইয়া দিয়াছে। কুমুদের আনন্দ ধরে না—সে আজ যাহাতে যতীন ও সুসির কোন কষ্ট না হয়--তাহার জন্য সদাই সচেষ্ট রহিল। সমস্ত ত্রিই নির্দোষ আমােদে প্রমােদে রাত্রি কাটিয়া গেল। পরদিন বরক’নে বিদায় হইবার সময় কুমুদকেও অজস্রধারে অশ্রুসিক্ত হইতে দেখা গিয়াছিল ; কিন্তু সে দম্পতি যুগলের ভাবী মঙ্গল কামনায় পরমপিতা পরমেশ্বরের নিকট আন্তরিক প্রার্থনা করিতে বিরত হয় নাই। পরদিন যথারীতি মাঙ্গলিক কাৰ্য শেষ হইলে বরক’নে বৈদ্যবাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইল ও কয়েক দিন আমােদ প্রমােঙ্গে কাটিয়া গেল।

উপসংহার ।

No text on this page.

উপসংহার আমাদের এই ক্ষুদ্র আখ্যায়িকার নায়ক যতীন ও নায়িকা সুহাসের বিবাহের পর প্রায় দুই বৎসর অতীত হইয়া গিয়াছে-সুহাসের শ্বশুরালয়ে আগমনের পর হইতে প্রমদার লক্ষ্মীর সংসারের আরও শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছে-বধূ দুইটী প্রমদার যেন আপনার পেটের মেয়ের অপেক্ষাও বেশী স্নেহের সামগ্রী হইয়া দাঁড়াইয়াছ। তাহারা দুইটা সহােদর ভগ্নীর মত পিতৃমাতৃতুল্যা শ্বশুর শাশুড়ীর আদেশ মান্যের সহিত প্রতিপালনে সদাই যত্নবতী-তাহারা দুইজনেই সংসারের কাজ-কর্ম প্রমদার হাত হইতে কাড়িয়া লইয়া করিতে পাইলে বড়ই আনন্দিত হয়। ভজহরি বাবু একদিন প্রমদাকে বলিতেছিলেন- গিন্নি, বৌমারা তােমায় যেমন রান্না-বান্না ইত্যাদি সংসারের কাজ হইতে পেন্সন দিয়াছেন—আমার নরেন যতীর কল্যাণে আমাকেও সামাজিক বল, আর্থিক বল, সাংসারিক বল, কোন বিষয়েই আর বড় মাথা ঘামাইতে হয় না। তারা দুইজনে আমার কাজের আসান করিয়া দিয়াছে। আমরা মনের মত দুটী ছেলে ও ঘরের লক্ষ্মীস্বরূপিণী १२ সুখের-মিলন। বৌমা দুটীকে পাইয়া এখন মনের সুখে ঘরকন্না করিতেছি। আমাদের উপর ভগবানেয় অসীম দয়া, এমন সুখ কয়জনের ভাগ্যে হয় ! প্রমদা। আমাদের উপর ভগবানের যে কত দয়া তাহা আর কি বলিয়া জানাই। ভজহরি। মানুষের প্রার্থনার অন্ত নাই—অতএব তার চরণে এই নিবেদন যে, যেন আমরা বুড়ােবুড়ী দুইজনেই সমস্ত সংসারের ভার নরেন যতীর উপর দিয়া জীবনের বাকী কয়টা দিন কায়মনােবাক্যে, ভগবৎ আরাধনায় নিয়ােজিত করিয়া ছেলেদের কোলে মাথা রাখিয়া, সুস্থির হইয়া যেন ভববন্ধন মুক্ত হইতে পারি। ভজহরি বাবু যখন এই সকল কথা বলিতেছিলেন, তখন প্রমদা চুপ করিয়াছিল এবং তাহার চক্ষু হইতে দরদর-ধারে আনন্দাশ্রু পড়িতেছিল। সে স্বামীর কথা শেষ হইতে না হইতেই বলিয়া উঠিল—স্বামি! আমি নারী— আমার নারীজন্ম তােমার মত দেবতুল্য স্বামী এবং সােণার চাদ দুইটী ছেলে, মনের মত দুইটী ৗেমা এবং আদরের পুটিকে পাইয়া সার্থক হইয়াছে-এখন আশীৰ্বাদ কর, যেন তােমাদের রাখিয়া আমি এই পৃথিবী হইতে প্রস্থান করিতে পারি—বলিতে বলিতে সে ভজহরি বাবুর পায়ে মাথা রাখিয়া লুটাইয়া পড়িল। ভজহরি বাবু সাধ্বী সহধর্মিণীকে আদরের সহিত উঠাইলেন। সুহাসিনী ছেলেবেলা হইতেই বড় সুবােধ মেয়ে, সে কখনও অবাধ্যতার জন্য বা কোন দুষ্কর্মের জন্য বাপ মার কাছে বিশেষরূপ ভৎসিত, তিরস্কৃত বা প্রহৃত হয় নাই। তাহার উপর যতীনের মত উপযুক্ত স্বামীর কাছে শিক্ষালাভ করিয়াছে—অতএব এক কথায় শ্রীলােকের যে যে গুণ থাকিলে হাজারের মধ্যে একটা হওয়া যায়,

Baud
Aass.
??
“চাদিন রাত্রিতে ঘরের সম্মুখস্থ ছাতের উপর যতীন ও সুহাসিনী” —-
U. RAY & SONS

No text on this page.

উপসংহার। ৭৬ *** ' হা সমই তাহাতে অশাইয়াছে। বাড়ীর কাজকর্ম, রাত্রিতে তাগাদা ইত্যাদি করিতে করিতে কখনও যতীনের শুইতে আসিতে অনেক রাত্রি হইত। সুহাসিনী কিন্তু স্বামী ঘরে না আসা পর্যন্ত জাগিয়া কাটাইত, অপরে জিজ্ঞাসা করিলে বলিত, আমার ঘুম কেমন কম- শীঘ্র ঘুম হয় না। যতীনও মাঝে মাঝে বলিত-সুহাস, আমার আসিতে বিলম্ব হইলে কি তােমার ঘুমাইতে নাই ? সুহাস উত্তরে বলিয়াছিল—বেশ ত বলিলে ? তুমি বাড়ী বাহিরে একে পাড়াগা-পথে কত বিপদ আছে আমি কি নিশ্চিন্ত হইয়া ঘুমাইতে পারি ? আর এক সময়ে যতীনের কয়েক দিন বাড়ী আসিতে অনেক রাত্রি হইয়াছিল, বাড়ী আসিয়া দেখে যে সুহাস আলাের কাছে বসিয়া শুপারী কাটিতেছে । যত কথা-প্রসঙ্গে ঠাট্টার ছলে সুহাসকে জিজ্ঞাসা করিল–আচ্ছ। সুশি—আমি এত রাত্রে বাড়ীতে আসিলাম, তাহাতে আমার প্রতি তােমার মনে কি কোন সন্দেহ বা অবিশ্বাস স্থান পায় না ? স্বাধ্বী সতী সুশি উত্তর দিয়াছিল—কি বলিলো ? তােমায় অবিশ্বাস - হৃদয়ের দেবতাকে অবিশ্বাস ? দেবতার প্রতি অবিশ্বাস করিলে কি মনে শান্তি পাওয়া যায় ? কখনই না। অতএব অগ্নিাস না করিয়া তােমার উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি এবং তাহাতেই শান্তি পাই—আমার মিনতি সে শান্তি উপভােগ করিতে বঞ্চিত করিও এই উত্তরে.কি এক গভীর ভাব নিহিত রহিয়াছে। যতীনকে আর এ বিষয়ে ঠাট্টা করা বন্ধ করা হইয়াছিল, তাহা সহজেই অনুমেয়।

৭৪ সুখের-মিলন। ১ । । । । । একদা এক নিদাঘকালের জ্যোৎস্না-প্লাবিত রাত্রে যতীন ও সুশী আহারের পর ছাতের উপর বেড়াইতেছিল, আর ওদিকে দক্ষিণ বাতাস মুদুমন্দভাবে বহিতেছিল এবং উভয়ের মন স্নিগ্ধ করিয়া পুলকিত করিতেছিল। এইরূপে দুইজনে গভীর নির্জন জ্যোৎস্নাময়ী রাত্রে হাস্যপরিহাস কথাবার্তায় কাটাইতেছিল। এমন সময় হঠাৎ যতীন জিজ্ঞাসা করিল—সুহাস, বল দেখি, যে দিন ঘটনাচক্রে তােমাতে আমাতে পুকুরপাড়ে দেখা হয়, সে দিনটা কেমন আর এই আজ রাত্রে দুই জনে স্বামী-স্ত্রী রূপে মনের আনন্দে কাটাইতেছি এই বা কেমন ? সুহাসের গণ্ড আরক্তিম হইয়া উঠিতেছিল, যদিও চাদনী রাতে তাহা ভাল দেখিতে পাওয়া গেল না। সে বলিল, সে কথা মনে হইলে আমি যে তােমার কাছে কত ঋণী তাহাই মনে জাগরুক হইয়া উঠে, আর তাহা এ জনমে শােধ দিতে পারিব না। যদি স্ত্রীলােক হইয়াই জন্মগ্রহণ করিতে হয়, তাহা হইলে ভগবানের নিকট কায়মনােবাক্যে প্রার্থনা করি, যেন তােমার মত স্বামীর, স্ত্রী হইয়া আমার নারী-জন্ম সার্থক করিতে পারি—বলিতে বলিতে সুহাসের কথা বােধ হইয়া আসিতে লাগিল দেখিয়া, যতী, দুই হাতে আলিঙ্গন করিয়া তাহার মস্তক নিজ বক্ষোপরি স্থাপিত করিলেন, চক্ষে পুলকাশ্রু বহিতে লাগিল ও গভীর খাস প্রসের ক্রিয়া যতীন অনুভব করিতে লাগিল। যতীন তাহারই মুখের দিকে একদৃষ্টে স্থাপিত সুহাসের মুখখানি আবেগভরে ধরিয়া কম্পিতওষ্ঠে একটী দুইটী করিয়া কয়েকটী সস্নেহ-চুম্বন বসাইয়া দিলেন। ঝড় কথঞ্চিৎ প্রশমিত হইলে যতীন আবার জিজ্ঞাসা করিল, মনে কর যদি তােমার সহিত আমার বিবাহ না হইত—তাহা হইলে তুমি িকরিতে ?

উপসংহার। সুহাসিনী। হিন্দুর ঘরে আজন্ম অবিবাহিত থাকিয়া তােমার উদ্দেশে, আমার ইষ্টদেবতার উদ্দেশে, এই নশ্বর জীবন অতিবাহিত করিতাম। মনে করিতাম আমার সাধনা এখনও পূর্ণ হয় নাই বলিয়াই আমার হৃদয়ের দেবতা আমার হৃদয়াসনে সমাসীন হইলেন না— আরও কঠোর চেষ্টা করিতাম আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একজন আর একজনকে যদি নিস্বার্থ- ভাবে ভালবাসিতে পারে, তাহাতে তন্ময় হইতে পারে, তবে সেই অপর জন এজনকে ভাল না বাসিয়া কখনই থাকিতে পারে না। মানব হৃদয়ের এইরূপ লৌহ চুম্বকের ন্যায় অদৃশ্য আকর্ষণী শক্তি, ইহাই প্রাকৃতিক নিয়ম, ইহাই ব্যতিক্রম খুব কমই দেখা যায়। যতীন এইরূপ উত্তর পাইয়া এই রকম গুণবতী স্ত্রী তাহার ভাগ্যে জুটিয়াছে ভাবিয়া মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে লাগিল ও আনন্দ রসে তাহার মন আপ্লুত হইল । ঘােষাল সংসারে এইরূপ সুখে দিন কাটিতেছিল কিন্তু এই মরজগতে নিরবচ্ছিন্ন সুখ কাহারও ভাগ্যেও ঘটে না—এই প্রাকৃতিক নিয়মেরও ব্যতিক্রম কিছু ঘটিল না। ভজহরি বাবুর শরীর কয়েকমাস হইতে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল। আজ জ্বর, কাল পেটের অসুখ, পরশু কত বেদনা, কিন্তু তিনি বড় পরিমিতাচারী নিষ্ঠাবান্ ব্রাহ্মণ ছিলেন। ব্যাহাড়ম্বর আদৌ তিনি ভালবাসিতেন না। পুণ্যের শরীর বলিয়া তাহার মনের বল যথেষ্ট ছিল নিজের অসুখে কাতর হইতে একদিনও দেখা যায় নাই। তাহার অসুখ বৃদ্ধি হইল—ছেলেরা, পুত্রবধুরা তাঁহার সেবা করিতে লাগিল। ভাল বিচক্ষণ কবিরাজ আনান হইল—তিনি তত ভরসা দিতে পারিলেন . না । তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, তাঁহার অন্তিম সময় দুই পাঁচ দিনের মধ্যেই আসিবে-তাহাতে তিনি কিছুমাত্র সুখের-মিলন। । বিচলিত না হইয়া, একদিন নরেন, যতীন-দুই ছেলে, প্রমা-স্ত্রী, বিমলা ও সুহাস-দুই পুত্রবধূ ও কন্যা পুটি ইত্যাদিকে নিকটে ডাকিয়া প্রত্যেককে যথাযােগ্য আদেশ উপদেশ সান্ত্বনা দিয়া মাথায় হাত দিয়া আশীর্বাদ করিলেন। প্রমদা এই সপ্তাহ কয়েক স্বামীর শয্যা-পার্শ্বেই কাটাইতেছিলেন। এইরূপে কোন দিন একটু ভাল, কোন দিন একটু খারাপ হইতে হইতে, একদিন অসুখ বড়ই বৃদ্ধি পাইল-কবিরাজ আসিলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। তিনি সজ্ঞানে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করিতে করিতে এই শােক-দুঃখ-পাপ-তাপ পূর্ণ মরজগৎ ত্যাগ করিয়া অনন্ত- বামে চলিয়া গেলেন। তাঁহার দেহ পঞ্চভুতে মিশাইল। ঘােষাল সংসারে এইরূপ একটা অশুভের ঝটিকা বহিয়া গিয়াছে। কালে সকলের শশাকের ক্রমশঃ উপশম হইতে লাগিল। স্বামী বিয়ােগের পর হইতে প্রমদার মন বড়ই দমিয়া গেল—ঈশ্বর আরাধনায় দিন দিন কাটাইতে লাগিলেন—উপযুক্ত পুত্রবধূয়ই মিলিয়া মিশিয়া সংসারের সমস্ত কাজকর্ম যথারীতি সম্পাদন করেন এবংসমস্যা ঠেকিলে দুইজনেই প্রমদার মত লইয়া কাৰ্য্য করেন—কিন্তু অযথা শাশুড়ী ঠাকুরাণীকে বিরক্ত করিতে সাহসী হয় না। আরও কয়েক মাস পরে যতীনের একটী পুত্র-সন্তানহইল। নাতিকে পাইয়া প্রমদার শােক কতকটা উপশম হইল বােধ করা যায় কেন -প্রমদা নাতিটিকে সদা সর্বদা কোলে বুকে পিঠে করিয়া রাখেন-আদর করেন এবং একটু হাসি ঠাট্টাও করেন। দেখিতে দেখিতে ছেলেটী দুই বৎসরের হইল-এখন সে ঠাকুমা ভি আর কাহারও কাছে—এমন কি সময়ে সময়ে তাহার মারে উপসংহার। ৭ *** । । ১*, 13, • ১। কাছে (সুহাসের কাছে) থাকিতে চাহিত না, এখন সে মা মা বলে- হটিতে শিখিয়াছে। একদিন যতীন আহারাদির পর নিজের ঘরে তাকিয়া হেলান দিয়া বসিয়া আছে, আর তাহার সম্মুখে তাহার স্ত্রী ছেলেকে লইয়া গেল। করিতেছে ; এমন সময় সুহাসের বাল্য-সংচরী কুমুদিনী তথায় আসিয়া উপস্থিত হইল। সুহাসিনী তাহাকে দেখিয়া গিয়া পরমানন্দে যত্ন করিয়া বসাইল এবং জিজ্ঞাসা করিলকি ভাই কুমো তােমাদের সব ভাল ত ? তােমার কর্তা (যােগেশ বাবু) কেমন আছেন ? ছেলে মেয়ে কেমন আছে ? তুমি ভাই কেমন আছ ? কুমুদ তাড়াতাড়ি খােকাকে কোলে তুলিয়া লইয়া বুকে চাপিয়া চুমাে খাইতে লাগিলেন—খােকাও অবাক হইয়া তাহার মুখ পানে ও মা বাপের মুখ পানে চাহিতে লাগিল। পরে বলিল—তুই জালালি সুশি- একেবারে প্রশ্নের সারি সারি কেয়ারী বসাইয়া দিলি যে—আর জিজ্ঞেস করিবার কিছু বাকী আছে কি ? দাড়া-এই এলুম অনেক দিনের পরে-একটু স্থির হই-খােকামণিকে আদর করি, এই খােকার বাবার (যতীনের দিকে আড়ে চাহিয়া) সহিত দুইটা কথাবার্তা কই। আচ্ছা—আমার ভাই এখন আপাততঃ এক রকম মঙ্গল। এখন গুলি ? পরে যতীনকে লক্ষ্য করিয়া কি গো যতীন বাবু, কেমন আছেন আপনি? কুমুদের এরূপ অভাবনীয় আগমনে যতীনও মহা আনন্দিত হইয়া বিছানা হইতে উঠিয়া আসিয়া কুমুদকে কি রকমে খাতির করিবেন, তাহাই ভাবিতেছিলেন এবং কুমুদের এই প্রশ্নে বলিলেন—আপনার

৭৮
সুখের-মিলন।
- " । । । ।
. * * * *
.
সহিত এ অধমের বাটীতে এ সময়ে যে সাক্ষাৎ লাভ হইবে, তাহা
স্বপ্নের অগােচর। বলিতে পারি না—কাহার মুখ দেখিয়া আজ সকালে
উঠিয়াছিলাম।
কুমুদ। কাহার মুখ দেখিয়া আর উঠিবেন—যার মুখ দেখে রােজ
রােজ উঠেন-- এই যে, এই আমার সুশীর-এই বলিয়া সুশির মাথার
কাপড় সরাইয়া দিয়া চিবুক ধরিয়া যৰ্তানকে দেখাইলেন।
সুশী কুমুদের হাত ছাড়াইয়া মাথার কাপড় টানিয়া দিয়া বলিল,
তুই ভাই বড় দুষ্ট-যেমন দুষ্ট ছেলেবেলায় ছিলে, এখনও কিছু কমৃতি
হয় নাই।
যতীন। তিনি কেমন আছেন?
কুমুদ। হাঁ, আছেন এক রকম।
যতীন। আপনার ছেলে মেয়ে কেমন আছে ?
কুমুদ। তাহারা আপনার আশীর্বাদে ভাল আছে বলিয়া সুশীল
কাণে কাণে ফুস ফুস করিয়া কথা কহিতে আরম্ভ করিল।
সুশী। না, তা হবে না-না, তা হবে না।
কুমুদ। সে যাহা হউক, আজ বড় তাড়াতাড়িতে আসিয়াছি ভাই--
আর একদিন সুবিধাক্রমে আসিব।
যতীন। আবার কবে আমাদের কপাল ফিরবে, আপনার সুবিধা
হইবে, তার আসিবেন—সে এখন বহুত দূর। যখন দয়া করিয়া
আসিয়াছেন, তখন বাল্য সহচরীর সহিত দু দণ্ড কথাবার্তা কহিতে
থাকুন। এখন কি কৰ্ত্তাকে পাইয়া আমাদের সকলকেই ভুলিতে হয়?
কুমুদ। তা মহাশয়-কৰ্ত্তাকে পাইয়া অপর সকলকে সময়ে সময়ে
একটু ভুলিতে হয় বই কি? আপনি যেমন সুশীর প্রাণ বাঁচাইয়া
তাহার প্রাণটা একেবারে কিনিয়া মৌরসি করিয়া লইয়া, নিশ্চিন্ত

উপসংহার। ৭ হইয়াছেন—কিন্তু আমার কর্তার মনটি আমার দিকে, টানিয়া আমার হেপাজতে রাখিতে আমার অনেক কাঠ খড় খরচ হয় ও সময়ও যায়— সেইজন্যই কৰ্ত্তাকে দেখিলে মাঝে মাঝে অপর সকলকেই ভুলিয়া যাই। এতে আপনারা আমার দোযই দিতেছেন, কিন্তু এ দোষের হাত হইতে কাহারও নিষ্কৃতি নাই। মােটের উপর—যতীন-সুশার আন্তরিক যত্নে কুমুদকে বাধ্য হইয়া সেই দিন দিব্য-চৰ্ব্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয়ের ব্যবস্থায় ভাগ বসাইতে হইয়াছিল। সুশার বিবাহের হই কুমুদের বিবাহ হইয়া গিয়াছিল। তাহার স্বামী যােগেশ ব্যবুও বেশ আমুদে লােক ও কুমুদেই উপযুক্ত স্বামী। এই দম্পতি-যুগল পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও স্নেহের বাঁধনে এই দুঃখময় ; মরুময় জীবনে যেন ওয়েসিসের সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহার ছেলে মেয়েরাও কুমুদের শাসনে ও যোগেশ বাবুর শিক্ষা ভালভাবেই লালিত পালিত হইতেছে। ভবিষ্যৎ জীবন তাহাদের ভাল হইবে, এইরূপ আশা করা যায় । সময়ে যােগেশ বাবর সহিত আমাদের যতীনের বেশ সম্প্রীতি জন্মিল। ক্রমশঃ মেশামেশিতে পরস্পরের ছেলে মেয়েদের মধ্যেও একটু সৌহার্দভাব স্বভাবতঃ দাড়াইয়া গেল। মোটের উপর দুই সংসার সুখের বন্যায় ভাসিয়াযাইতে লাগিল। আসুন, পাঠক পাঠিকা। আমরাও “সুখের-মিলন” দেখিয়া যবনিকার অন্তরালে গমন করি।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sukher-milan

Author
Shil, Sri Chintamani
Title
Sukher-milan
File name
Sukher-milan
Text
OCR done
Citation
1915
Published
2009/08/19
Publisher
Sri Chintamani Shil, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
99
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
513360
Barcode
4990010020345.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
fwgHi1x5zh9
Download PDF

Sukher-milan