Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Madhuri

Raychowdhury,debkumar · 2009/11/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মামুন্নী
শ্রীদেবকুমার রায়চৌধুরী
প্রণীত
১৩'১৬

কলিকাতা,
২৫ নং রাজা নবকৃষ্ণের স্ট্রীট, “ভৈষজ্য-ষ্টীম-মেসিন-যন্ত্রে
শ্ৰীউপেন্দ্রনাথ মণ্ডল দ্বারা মুদ্রিত।
মূলা— আট আনা

তস্মিন প্রীতিসুপ্রিয়কাৰ্যসাধনঞ্চ তদুপিসনমেব।

No text on this page.

উৎসর্গ
অগ্রজপ্রতিম,
কবিবর
শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
শ্ৰকরসরােজযু

No text on this page.

ভূমিকা এই কাব্যের অধিকাংশ কবিতাই প্রবাসী ভারতী’ ‘সুপ্রভাত ‘মৃন্ময়ী’ ‘ভারত-সুহৃৎ ‘ইন্দিরা’ ‘মানসী' প্রভৃতি বিবিধ মাসিকপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। এক্ষণে সেগুলি সংগ্রহ করিয়া এই পুস্তক রচনা করিলাম। এ পুস্তকে সন্নিবিষ্ট কবিতা গুলি ব্যতীত, বিভিন্ন মাসিক পত্রে প্রকাশিত আমার যাবতীয় “স্বদেশী” কবিতা ভবিষ্যতে পৃথভাবে মুদ্রিত করিবার বাসনা আছে। সেগুলি এ কাব্যের অন্তভুক্ত করিলে, আমার মতে—প্রথমতঃ, এ কাব্যখানির রস-ভঙ্গ হইত; এবং দ্বিতীয়ত, গ্ৰন্থখানির আকারও অত্যধিক দীর্ঘ হইয়া পড়িত। “স্বদেশী পাঠকবর্গ বঙ্গীয় গ্রন্থকারগণের প্রতি যেরূপ অনুগ্রহ প্রকাশ করেন তাহাতে দীর্ঘ কাব্য ছাপাইবার দুঃসাহস স্বপ্নেও লেখকগণের মনে স্থান পাইতে পারে না। প্রধানতঃ, এই দুই কারণেই ঐ সকল কবিতা একাব্য হইতে বাদ দিতে বাধ্য হইলাম। আমার অন্যান্য কাব্যের ন্যায় ইহাতেও পাঠক একটি ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করিবেন। সেইহেতু, এ পুস্তকখানি কতকগুলি গীতি-কবিতার সমষ্টি হইলেও, আদ্যোপান্ত না পড়িয়া, বিচ্ছিন্নভাবে ইহার দুই চারিটি কবিতা পড়িলে আমার প্রতি পাঠক অবিচার করিবেন মাত্র ;-রচনার সম্যক্ রস-গ্রহণ সেভাবে সম্ভবপর কিনা, তদ্বিষয়ে আমার একটু সন্দেহ আছে।

ভূমিকা। পাঠক ও সমালােচকগণের প্রতি আমার সানুনয় অনুরােধ—তাহারা যেন আমার এ কাব্যখানি আদ্যন্ত পড়িয়া মন্তব্য প্রকাশ করেন। তাহারা যদি একটু কষ্ট স্বীকার করিয়া আমার এই সকল রচনা পড়েন তবেই আমার সাহিত্য-সেবা ও অর্থব্যয় সার্থক হইবে । --শ্রীদেবকুমার।

সূচী বিষয় পৃষ্ঠা। সূচনা মা’র প্রতি চেতনা • • • ••• কেন ভালবাসি ••• গুণে রূপ * * ••• ১৪ প্রেমে ••• ... মিলনে বিরহ অতৃপ্তি • • • সম্ভোগ ••• আলাে ••• • • ••• ••• ... ২৮ প্রেম-তত্ত্ব কল্যাণী ••• প্রেম- ••• ৩২ অভিমানে ৩৬ • • • ৪৪ প্রেম কলঙ্কিনী বিধবা • • • ••• ৪৫ । ••• ৫২ ino সূচী •• ৫৬ ৫৭ । ••। শ্মশান-স্মৃতি যাদু কন্যার প্রতি শীতঋতুর প্রতি । • • স্বপ্ন ও সত্য ৭২ • • ৭) ৭৪ সখ (১) সখ্য (১) তৃষিতের আবাহন ঘুম-ঘোর সঞ্জীবন আহ্বান সমুদ্রের উদ্দেশে জ্যোৎস্নায় প্রকৃতির বিরহ ৭৫ ৭৮ ••• ••• ৭৯ ••• ৮৪ আশ্রয় ৮৮ ••• ৮৯ প্রার্থনা মাধুরী •••

No text on this page.

No text on this page.

সূচনা
-:-
ঝরিত অশ্রু নয়নে আমার
কেন, কে জানে ;
কি হেতু জানিনা—ছিল হাহাকার
আমার প্রাণে ;
হৃদয় ভরিয়া আছিল অসহ
ব্যাকুল তৃষা ;
জীবনে জাগিত পূজিবার সাধ
দিবস-নিশা ;
জানিনি, বুঝিনি-কেন হেন হার,
বেদনা মাের;
লক্ষ্য-বিহীন শুধু ছিল এহি
জীবন মাের।
ভাৰিতাম মনে হেরি” শণীপানে-
তারেই চাহি ;
প্রকৃতির শােভা হেরি’ কভু বীণা
উঠিত গাহি’ ;
কভু পঙ্কজ্ব-মধু-আশে প্রাণ
আকুল হত ;

মাধুরী কাদিতাম কভু হেরি’ মধু-মুখ মনের মত ; উত্তাল বীচি-বিভঙ্গময়ী তটিনী’ পরে হেরি’ চন্দ্রিকা শতধা হইয়া নাচিয়া মরে, এ আমার মন একটি কিরণ- কণিকা প্রায় . তখনি সে সুধা-লহরী মাঝারে ভাসিত হায় ! -এমনি করিয়া সুন্দর এহি সৃষ্টি মাঝে কি চাহি না জেনে, ঘুরে’ ফিরিতাম সবারি পাছে। আকুল আবেগে আছিল এ মন অবাধ-গতি। লক্ষ্য ছিল না; তাই, ছিল প্রাণ সবার প্রতি। কিন্তু, কিন্তু, কি বলিব আর ? তবু তাে হায়,

মাধুরী
পাইনি কিছুই, মিলিল না তাহে-
প্রাণ যা চায় !
অবশেষে মাের জীবনে নামিল
নিরাশা যবে,
অবসাদ যবে কহিল শ্বসিয়া
“কি আর হবে”-
তখনি তখনি তুমি এলে অয়ি
চেতনা মম,
নীরবে, সহসা অজানিত খনে
স্বপন সম!
বসন্ত যথা প্রকৃতি-কুঞ্জ
বিকশি’ আসে-
তেমনি আমার ক্ষুটা’য়ে জীবন
নবীন আশে,
পুলকিত করি’ এ হিয়া আমার,
হে মাের প্রাণ,
আসিলে গােপনে চিরবসন্ত।
করিলে দান
ও

মাধুরী
শুধু সন্তোষ, শুধু আনন্দ,
শুধুই প্রীতি,
শুধুই শান্তি, শুধুই তৃপ্তি,
শুধুই গীতি!
বেদনার মাঝে জেগেছ বলিয়া
ওরে ও ‘আমি’,
তােমারেই আমি প্রেমভরে ডাকি,
‘জীবন-স্বামী’!
বিরহে উদিলে সান্ত্বনা সম ;
দুখের মাঝে
সুখের মতন বিকশি উঠিলে
মােহন সাজে।
অ মাঝারে তুমি আনন্দ।
অবনী-তলে
সকল কর্মে তুমিই শক্তি।
জলে স্থনে,
গগনে, বিশ্ব-প্রকৃতি মাঝারে,
চেতনে, ঘুমে
৪

মাধুরী
ব্যাপ্ত আজিকে তুমি-অয়ি সুধা ।
দ্বিধার ধূমে
আর নহ তুমি অজানিত কভু
হে অযাচিত;
আজিকে তুমিই প্রকাশিত, 'ওগাে
অপরাজিত !
তােমারে লভিয়া ক্ষণতরে, তাই
বুঝেছি ধ্রুব
তােমারেই আমি চাহিম ; আজ
হে মাের শুভ,
তাই, সুদীর্ঘ সাধন-অন্তে
তােমারে লভি,
সব সাধ মাের, সকল তৃষ্ণা
মিটেছে সবি !
আজি তুমি ভাষা, তুমি মাের ভাব,
তুমিই মম ;
দুঃখের মাঝে তুমিহে ‘মাধুরী’
হৃদয়-রম!
৫

মাধুরী
মা'র প্রতি
বুকের পরে
করিলি দান আমার প্রাণ
আপন হৃদি-রুধিরে
রাখিলি মােরে
তুলিয়া!
আমি যে দীন ;
সে মহা ঋণ
কেমনে মাগাে, শুধি রে ?
যাইব কোথা তােমার কথা
ভুলিয়া!
নাহি গাে যদি সে রূপ-জ্যোতি,
কি আছে, তাহে ক্ষতি মা ?-
. ও হিয়া যাবে স্নেহ তে রাজে
তেমনি !
বিগত সব
তব বিভব,
অতীত তব গরিমা
তবু, তাে তুমি জনমভূমি
;
জননী !
৬

মাধুরী
এমন করে
মেহের ভরে
বাঁচালি সুধা পিয়ায়ে
কেন মা, যদি না পারি ক্ষতি
পূরাতে?
সহি’ এ হেন যাতনা, কেন
রাখিলি
বুকে
জীয়ায়ে ?--
যদি না পারি ও আঁখি-বারি
মুছাতে ?
দুখিনী বলে উঠেছে জ্বলে
আজি এ প্রাণে বেদনা ;
পড়ে গাে ঝরি’
নয়ন ভরি’
ভকতি!
মিনতি করি
চরণে ধরি’
কেঁদ না মাগাে, কেঁদ না।
তব এ দুখে জেগেছে বুকে
শকতি !
৭

মাধুরী
আজি মা, তােরে বেসেছি ওরে-
দ্বিগুণ ভালােবেসেছি ;
ভকতি সনে জেগেছে মনে
বেদনা !
কেটেছে মাের তন্দ্রা-ঘাের,
এসেছি, ছুটে এসেছি ;
কেঁদনা আর কেঁদনা মাগাে,
কেঁদনা !

মাধুরী
চেতনা
বুঝিনি তােমারে ; তাই, এত হাহাকার।
অতৃপ্তির দাবানলে হৃদয় আমার
তাই সদা দহিয়াছে,—চিতার সমান
জ্বলিয়াছে সে আগুণ না লভি’ নিৰ্ব্বাণ ।
আগে যদি জানিতাম—আছে আজনম
'ওবক্ষে লুকানাে প্রেম সাগরের সম ;
আগে যদি ভাবিতাম-ওই আঁখি-কোণে
নিত্য ঝরে কার লাগি’ মুকুতা নির্জনে ;
আগে যদি ক্ষণতরে ওই দৃষ্টি মাঝে
পারিতাম নেহারিতে—যে করুণা রাজে
এই হতভাগ্যতরে, তা হলে জীবন
নিরাশায় জ্বলে পুড়ে’ হত না এমন!
বুঝিতাম তাহা হলে বিশ্বে বাহা নাই,
লুকানাে রয়েছে তব প্রাণে মাের তাই!
৯

মাধুরী
কেন ভালবাসি
আমার এ অনুরাগ জন্মে নাই প্রথম দর্শনে
অজ্ঞাত কারণে,
নহে ইহা আকস্মিক, নহে ইহা মধুর স্বপন
স্বার্থ-বিস্মরণ ;
তােমায় যে ভালবাসি তবে কি তা’ রূপের লাগিয়া ?
—তাও নহে প্রিয়া ।
চেতনা-বিহীন মনে শুদ্ধ ইহা মহাজাগরণ,-
আত্ম-নিবেদন,
ইহা গুণ-মুগ্ধ ভক্ত-হৃদয়ের সঞ্চিত বিস্ময়-
সঞ্জাত প্রণয়।
কাছে কাছে রহি’ নিত্য, যে অনন্ত নির্ভরের সনে,
অকুণ্ঠিত মনে
আমারে আপন জেনে’, আপনারে দিয়ে বলিদান
বিকাইলে প্রাণ
যে অপূৰ্ব স্বার্থ ত্যাগে সতী-প্রেমে মম প্রীতি তরে,
একান্ত অন্তরে
আমারি সেবায় সদা নিজ সৰ্ব্ব সুখ তেয়াগিয়া,
রয়েছ মজিয়া ;
১০

মাধুরী
যে মহত্বে কর তুমি অনুগত আশ্রিতের প্রতি
দয়া নিরবধি ;
যে সদ্গুণে মম গৃহে ফেরে নাই আজো কোনদিন
দুঃখী-দীনহীন ;
যে প্রগাঢ় ভক্তিভরে সাশ্রুনেত্রে পূজ’ সঙ্গোপনে
রাধিকারমণে,--
দুর্লভ সে গুণরাজি হেরি’ দেবি, তব অনুপম,
এ পরাণ মন
শ্রদ্ধায়, বিস্ময়ে মুগ্ধ হইয়াছে ক্ৰমে, ধীরে ধীরে।
পুলকানীরে
আজি আমি বন্দী তাই তব প্রেমে, হে দেব-ললনা।
গাহি এ বন্দনা
তাইহে, তােমারি আজি আনন্দ-বিহ্বল, পূর্ণ তানে,
—পরিপূর্ণ প্রাণে।
তােমাতে যে অপ্সরার রূপ-জ্যোতি হেরিতে না পাই,
-তাহে ক্ষতি নাই ;
তােমাতে যা আছে তাহা নিত্য,সেই গুণরাশি লয়ে
আছি তৃপ্ত হ'য়ে।
১১

মাধুরী
ক
রূপেরে চাহিনা আমি; রূপ নাহি রহে চিরতরে,
তাহা পড়ে ঝরে ;
প্রস্ফুটিত সরােজের মত সে যে শুকাইয়া যায়
আঁধার সন্ধ্যায় !
যাহা নিত্য নহে, যাহা সন্তর্পণে ক্রমে দীপ্তি পায়
অন্নান প্রভায়,
আছে সেই রত্নরাজি অমূল্য, অতুল্য, অনুপম,
—স্পর্শমণি সম--
তােমারি মাঝারে সখি। তাই, আজি লয়ে’ তব নাম
আমি পূর্ণ-কাম ;
আপনাকে ধন্য মানি’ হইয়াছি প্রণয়-বিভাের,
অয়ি প্রিয়া মাের
১২

মাধুরী
গুণে রূপ
নিৰ্ম্মল গগন হ’তে বিধাতার আশীৰ্বাদ সম,
প্রভাতের স্নিগ্ধ সূৰ্য-কর
ফুটন্ত মল্লিকাসম পবিত্র ও তনু’ পরে আসি’
হাসিতেছে!—মরি কি সুন্দর!
কোথা ছিল এতদিন এত রূপ লুকাইয়া সখি?
দেখিনি তাে তােমারে এমন ?--
কোথা হতে আজি প্ৰাতে লভিলে এ রূপ-জ্যোতি তুমি।
—ভরে’ দিলে এ নয়ন-মন।
=
গুণে তুমি গরীয়সী,-শুষ্ক প্রাণে সঞ্চারিলে প্রেম ;
প্রেমে তুমি হইলে প্রেয়সী ;
প্রেয়সী হইয়া তুমি দেবতার শুভাশীষ লভি
প্রেম-রাজ্যে হ'য়েছ রূপসী।

মাধুরী
প্রেমে
তুমি ‘ভুমি’ বলে আমি বাসিয়াছি ভালাে-
হে মাের নয়ন-মণি, আঁধারের আলাে।
১২

মাধুরী
মিলনে বিরহ
তােমারে কি ভালবাসি?
—তােলরেই বটে
ভালবাসি প্রাণপণে। রহিলে নিকটে
সব জ্বালা ভুলে যাই! তােমারি দর্শনে
নাহি জানি কেন, কোন্ অজ্ঞাত কারণে
এ বিষন্ন মনে মাের আসে প্রসন্নতা
হৃদয়ের অন্তস্তলে সৰ্ব্ব সঙ্কীর্ণতা
সেইক্ষণে দূরে যায় ! তােমারে লভিলে
এ বিশুদ্ধ হিয়া মম আনন্দ-সলিলে
পূত, পূর্ণ হয়ে ওঠে। তােমারেই আমি
আত্ম-বিস্মরিয়া, সত্য নিত্য দিন-যামি’
অকপটে বাসিতেছি ভালাে।
কিন্তু, তবু
নাহি জানি কেন, মাের মনে জাগে কভু
এমনন আশঙ্কা—যেন মাের প্রেমাঞ্জলি
ঢালি বটে তােমা’পরে, যায় যেন চলি’
তাহা কোন্ সুগভীর রহস্য-মাঝার
স্বপ্ন সম লীন হ'য়ে ; সে পূজা-সম্ভার
যেন তুমি নাহি পাও।

মাধুরী
উষা-রবি-করে
হরিত নিকুঞ্জ-বনে যবে থরে থরে’,
অপরূপ, মধু- গন্ধি ফুটে ওঠে ফুল ;
যবে সুধা-স্বাদমত্ত, বিভ্রান্ত, ব্যাকুল
ভ্রমর গুঞ্জরি' ফেরে অশ্রান্ত ঝঙ্কারে
গুণ-গুণি'; যবে এই সৌন্দর্য্য-পাথারে
পরিস্নাত প্রজাপতিগুলি কঁপি কঁপি’
বেড়ায় সুখের মত। নীলাম্বর-ব্যাপি
বিচ্ছুরি’ মাধুরী-রসে, বিহঙ্গ নিচয়
বিশ্ব চিত্ত বিমােহিয়া, সারা ধরাময়
গেয়ে ওঠে ভাষাহীন, প্রাণান্মাদী গান ;
যবে শিহরিয়া উঠে, কঁদাইয়া প্রাণ,
গন্ধবহ দিব্যানন্দে, মন্থর আবেশে
বহে যায় ধীরে ধীরে ; যবে হেসে হেসে
সূৰ্য-করে ঝলকিয়া শরতের নদী
চলে যায় পারাবারে ; যবে নিরবধি
প্রসন্ন, নিবিড়-শ্যাম, বিমুক্ত গগনে
শুধুই উচ্ছসি’ ওঠে আবেগ-প্লাবনে
অপূৰ্ব্ব ঝঙ্কার সহ অনন্তের প্রাণ
;
১৬

মাধুরী
সােন্দৰ্য-লহরী সম; যবে অবসান
সকল হীনতা-গ্লানি এ আনন্দ-মাঝে-
তখন জাগিয়া উঠি’, ধেয়ে তব কাছে
ছুটে আসি ক্ষিপ্তপ্রায়। মাের সেইক্ষণে
মনে হয় হে সুন্দরি, ও দু’টি চরণে
যেন এ সৌন্দৰ্যরাশি পড়ি’ছে মূৰ্জিয়া
অতুল্য আঁধার লভি’; যেন বিশ্ব-হিয়া
তােমা’পানে চেয়ে আছে ; যেন তােমাকেই
করি’ছে বন্দনা শান্ত প্রেমভরে এই
নিখিল-সংসার ; যেন তুমি কেন্দ্রসম
টানি’ছ তােমারি মাঝে এই অনুপম
মাধুরী-বিন্যাসরাশি!—হে মাের মােহিনি,
হে সৌন্দৰ্য-সারভূত-নিৰ্যাস-রূপিনি,
মধুময়ি, মনােময়ি, আমিও সে ক্ষণে
উদ্দাম আগ্রহভরে, সুখের বেদনে
একান্ত ব্যাকুল হয়ে, ও রূপ-প্রভায়
তন্ময় প্রণয়ভরে লভিতে তােমায়--
চাহি’ তব স্পর্শমাত্র কাছে ছুটে আসি।
স্পর্শে করি অনুভব—তুমি মােহ নাশি’
১৭

মাধুরী
;
তেমনি সম্মুখে মাের রহে’ছ জাগিয়া ;
তুমি আর কেহ নহ তুমি মাের প্রিয়া,
গুণময়ী সেই মাের সামান্য মানবী,
-সে-ই তুমি ; আমি শুদ্ধ সেই ভক্ত কবি
কল্পনা বিভ্রান্ত, মৃঢ় !
ক্ষণেক না যেতে,
এই ভ্রান্তি, অর্থহীন স্বপ্ন নিমেষেতে
কোথায় উড়িয়া যায় ! হারাইয়া ফেলি
স্বপ্ন-স্মৃতি, পুনঃ অনিমেষ নেত্ৰ মেলি’
চেয়ে চেয়ে দেখি তােমা’পানে। ধীরে হায়,
মনে হয়—ভাল আমি বেসেছি তােমায়,
আর কাহারে ও নহে; বেশি কিছু নয়।
বিহ্বল দূরে গিয়ে চিত্ত শান্ত হয়,
কৰ্ম্মে পুনঃ দেই মন।
কৰ্ম্মের সাগরে
বহুদিন মগ্ন রহি', একদিন ওর,
লভিয়া তােমারে কাছে বিরহের পরে,

মাধুরী
একান্ত আগ্রহে, যেই ক্ষুব্ধ প্রীতিভরে
বক্ষে টেনে লইলাম—অমনি আবার
মনে হ’ল—যেন বক্ষে নাহি তুমি আর,
বেদনা-আধার সম কি যেন আমারে
করিতেছে দিশাহীন ; যেন সে আধারে
একান্ত দুর্লভ হয়ে, যারে আমি চাই
সে যেন লুকায়ে আছে ;তুমি সেথা নাই ।
আলিঙ্গনে বুঝি—যেন দেহ-কারাগার
রেখেছে সংগুপ্ত করি’ সুধার ভাণ্ডার,
আমি যেন চাহি সেই অমিয়-অতলে
বিলুপ্ত, বিলীন হ’তে ভাসি’ অশ্রুজলে
দুঃসহ আকাঙ্ক্ষাবশে ;তব এই দেহ
যেন তার বাধা! যেন মাের প্রীতি-স্নেহ
নহে তব তনু লাগি,চাহিনা তােমারে ;
চাহি—অন্য কোন কিছু কিম্বা সেই তরে
যারে আমি নাহি চিনি ; তুমি তারি যেন
শুদ্ধ এক প্রতিবিম্ব, নাহি জানি কেন
চাহিতেছ—তবু ওই দেহ-অন্তরালে
তাহারেই ঢাকিবারে। যে কিরণ ঢালে
ওই আঁখি তাহা যেন তােমারি হে নহে ;
১৯

মাধুরী
যেন—যেন তােমা’মাঝে আরাে কিছু রহে !
যেন তুমি—তুমি নহ। যেন তব মাঝে
কে যেন দুর্লভ হ'য়ে লুকাইয়া আছে।
চাহি আমি—সেই তারে তােমারে লাতিয়া
চাহি—লভিবারে সেই বাঞ্ছিত অমিয়া,
তােমারেই আমি নাহি চাহি !
অনিবার
এইমত ভ্রান্তিসনে চেতনা আমার
জাগিতেছে অন্তরে-জীবনে! প্রেমমরি,
যবে তােমারেই মাের বক্ষে টেনে লই
চির-সুধাময়ী জ্ঞানে, বক্ষে রুদ্ধ করি
দেখি—তুমি ব্যবধান ; সারা বক্ষ ভরি’
জাগিছ বেদনাসম !
স্বপ্ন ভেঙে যায়।
আবার জাগিয়া উঠি উদাসের প্রায় ।
স্বপ্ন-অন্তে, জাগরণে চাহিয়া আবার
তােমারেই হেরি’ চক্ষে মােহিনি আমার,
২০

মাধুরী
;
সন্দেহ ঘুচিয়া যায়। ভাবি মনে মনে---
তােমারেই চাহি আমি ; তােমারি বরণে
এত প্রেমাঞ্জলি রচি; আমি ভালবাসি
নিতান্তই তােরে, ওরে মাের সর্বনাশি।
এ কেমন প্রেম-লীলা? কি জানি কেমন!
ব্যবধান জাগাইয়া দেয় আলিঙ্গন।
প্রেমের সম্ভোগে জাগে প্রেমের পিপাসা,
ভালােবাসি, ভালবাসি,-নাহি মেটে’ আশা।
কিসের এ ভাব মাের ? কি ভীষণ ব্যথা--
নাহি পাই কোন সীমা, কোন সার্থকতা
যা’র বিশ্ব-বঙ্গভূমে !
কিন্তু, তবু হায়-
অহনিশি এ জ্বালা যে সহ নাহি যায়
২১

মাধুরী
আজীবন হেনভাবে !
ভ্রান্তির কুহকে
আজো পাগলের মত এসেছি এ শশাকে
তােমারে দেখিতে তবু ; জানিতে নিশ্চয়
যে, আমার প্রিয়তম আর কেহ নয়,
-সে শুদ্ধ তুমিই প্রিয়ে।
কিন্তু, তবু, হায়--
বড় ব্যথা : এ বেদনা বলা নাহি যায় ।

মাধুরী
অতৃপ্তি
স্পর্শ ? আলিঙ্গন ?--সে তো দারুণ বিরহ
স্পর্শমাঝে গুপ্ত রহি’ মধুর, অসহ
বেদনা কাঁদিয়া কহে—মিশে যেতে চাই
ওই ও পাথার-তলে, (যা’র কোথা’ নাই
কোন সীমা ) ওই তব জীবনের সনে ।
•
বক্ষে চেপে ধরি যবে বৃথা প্রাণপণে
তখনাে এ হিয়া মাের কঁদে ফুকারিয়া,
কহেদাও, দাও মুক্তি ; যাই হে মিশিয়া
যে সঙ্গীত অবিরাম গুণের স্পন্দনে
ঝঙ্কারি’ উঠিছে প্রিয়ে, তােমারি জীবনে,
তাহারি মাঝারে! প্রাণ সেইক্ষণে কয়-
আসুক এ বিশ্ব-তলে এখনি প্রলয় ;
নি সব ভেঙে চুরে', ছিন্ন ভিন্ন করে ;
সেই সনে দি এই হৃদয়-পঞ্জরে
বিলুপ্ত, বিলীন করি’ ওই প্রেমামৃতে ;
মরিয়া, জাগিয়া উঠি শান্তি-সমাধিতে !
২৩

মাধুরী
এ কেমন লীলা তব হে অন্তর-যামি,
কত চাই, কারে চাই, কিবা চাই আমি?
২৪

মাধুরী
সম্ভোগ
হে সমুদ্র, আজি এই প্রসন্ন প্রভাতে
বহু বর্ষ পরে দেখা হ’ল তব সাথে।
অগণিত বীচিমালা তপন-কিরণে
‘খল খল’ শুভ্র হাস্য করে ক্ষণে ক্ষণে।
হেরি হে তােমারে তাই, বিস্ময়-বিভাের।
রােমাঞ্চিত দেহে এবে মনে হয় মাের
আমি বিশ্বে একা নহি ; তুমি হে যেমন
অনন্ত তরঙ্গসহ সম্পূর্ণ, শােভন,
অখণ্ড বিরাটুরূপী, সংসারে তেমনি
সংখ্যাতীত প্রাণ নিয়া সম্পূর্ণ আপনি!
তব দরশনে এবে ওগগা পারাবার,
আঁধার অন্তরে মাের অপূৰ্ব আশার
জাগিছে চেতন-জ্যোতি। আজি মাের প্রাণ
শুনিতেছে অসীমের আকুল আহ্বান ;
করে হিয়া এ বিজনে একান্তে সম্ভোগ
নিজ সনে সারা বিশ্ব-নিখিলের যােগ।
হে মহান, তাই, শুয়ে তব উপকূলে,
তুচ্ছ দুঃখ-সুখ মাের সব গিছি ভুলে

মাধুরী
আলাে
নিশা চাহে সহস্র নয়নে,
দিনের শুধুই এক আঁখি ;
তবু, সেই একেরি বিহনে
অন্ধকারে বিশ্ব ফেলে ঢাকি।
শত চোখে চেয়ে দেখে মন,
একই লােচন হৃদয়ের ;
তবু, অন্ধ হলে সে নয়ন
নিবে’ যায় জ্যোতি জীবনের ।
From "Light" by F. W. Bourdillon.
২৬

মাধুরী
সতী
সংসারে যখন শত নিৰ্ম্মম আঘাতে
ক্লিষ্ট, সঙ্কুচিত হয় এ ক্ষুদ্র হৃদয়
তখন তুমিই শুধু রহ মাের সাথে,
বরষি’ সান্ত্বনা মােরে দেওহে অভয়।
এ বিশ্ব-গগনে যবে ঘাের ঘনঘটা
উপেক্ষার হাস্যসম বিদ্যুতের ছটা
প্রকাশিয়া, ইহুঙ্কারে গরজিয়া আসে;
যবে কাল-তরঙ্গিনী উদ্দাম উল্লাসে
এ জীর্ণ জীবন-তরী চাহে গ্রাসিবারে
তখন তুমিই দেবি, রহ মাের ধারে ;
লহ টানি’ বক্ষ-মাঝে আলিঙ্গন-পাশে
একান্ত আগ্রহে, দাও ঘুচাইয়া ত্রাসে।
এ আঁধারে আমি পান্থ, তুমি মাের জ্যোতি।
তুমি চির-সুধাময়ী অয়ি মাের সতি।

মাধুরী প্রেম-তত্ত্ব প্রেম যে রহস্যে ঢাকা রহে চিরদিন, কহিল তা একবাক্যে সবে। কি রহস্যে গুপ্ত সে যে, কেহ নাহি জানে; অজ্ঞাত প্রকৃতি তার ভবে। কবি কহে—পূত-ধারা মন্দাকিনীসম সঞ্জীবিত করি’ দগ্ধ হিয়া, অমৃতে করিয়া পূর্ণ মানব-হৃদয়, প্রেম চলে নিভৃতে বহিয়া। দার্শনিক কহে—ওহে নহে, তাহা নহে। প্রেম শুধু আত্ম-বিসর্জন। অপূর্ণ-প্রকৃতি জীব পূর্ণ হইবারে করে এই মহা আয়ােজন। ধৰ্ম্ম-প্রাণ মহাজন কহিলেন ধীরে- ওগাে তােরা শশা, তবে শােন- বিধাতার নিজ হস্তে গঠিত, মধুর, প্রেম এক বিরাট বন্ধন। ২৮

মাধুরী
শুনিয়া সকল কথা ভাবিলাম মনে
সবাই কহিছে সত্য বাণী ;
তবু, সব উক্তিতেই ত্রুটি রহে যায় ;
তাই, তৃপ্ত নহে কোন প্রাণী
প্রেম বটে সদা চাহে আত্মবলিদান,
বটে তাহা আত্ম-বিসর্জন।
কিন্তু, চাহে কেন বিশ্ববাসী—‘আপনার
করিবারে, প্রাণপ্রিয় জন ?
‘আপনার করা কভু নহে স্বার্থত্যাগ !
তবে কি তা প্রেম কভু নহে ?
তাহা হ'লে এ নিখিলে ষােল আনা লােক
প্রেম-শূন্য হয়ে নিত্য রহে।
‘আপনার মনে যদি করিতে না চাই
তাহাহ’লে নাই ভালবাসা ;
প্রেমের এ ইচ্ছাটুকু অতি স্বাভাবিক ;
যথা—দুঃখে কাদা, সুখে হাসা!

মাধুরী
‘সে আমার মনে করি’ তারি মধু-স্মৃতি
দিবানিশি ভাবি’
একমনে,
নিজের করিতে গিয়া, নিজ স্বার্থটুকু
জড়াইয়া ফেলি তারি সনে।
তখন তাহারি সুখে নিজে পাই সুখ,
তারি দুঃখে ভাসি অশ্রুজলে ;
‘আপনার’ ভেবে ভেবে অপনারে ধীরে
সঁপে দিই তা'রি কর-তলে।
তখন তাহারে ছাড়া অস্তিত্ব নিজের
রহে না, রহেনা ভিন্নরূপে ;
তখনি পরার্থ মাঝে বুঝি-স্বার্থটুকু
অজানিতে ডুবে গেছে চুপে!
ইহাই প্রেমের ধর্ম ; এই প্রেম ধীরে
হীন সঙ্কীর্ণতা ফেলে নাশি’ ;
এই প্রেম জীবনের মরুভূমি’পরে
ফুটায় কুসুম রাশি রাশি।

মাধুরী
কল্যাণী
আমি পরিশ্রান্ত, খিন্ন, হতাশ পথিক ;
চলেছি একাকী নাহি জানি কোন্ দিক!
কে তুমি হে সখি, সদা চলিয়াছ সাথে ?
বার বার চাহিতেছ নিতে নিজ মাথে
আমার বােঝার ভার ? কে তুমি সজনি ?
যবে নিদ্রা যাই আমি, গভীর রজনী,
মৌন, স্তব্ধ চারিদিক্‌, সেই নিরালায়
দুঃস্বপ্ন নেহারি যবে ক্ষুব্ধ বেদনায়
চমকি’ জাগিয়া উঠি, দেখি হে তখন
ভার-পিষ্ট শির মম তুলিয়া আপন
সুকোমল অঙ্ক’পরে তুমি আছ বাসি’
তন্দ্রাহীন জাগরণে?
হে মাের মানসি,
তব মাঝে করুণার একি মনােহর
নিল সরসী হেরি এ মরু-ভিতর ।
৩১

মাধুরী
প্রেম-স্বপ্ন
কি দেখিছ ?
-দেখিতেছি তােমারে হে প্রিয়া,
দেখিতেছি যেন ভাবনায়। যেন তুমি নহগগা রূপসী,
কিম্বা নহ আমার প্রেয়সী ;
যেন তুমি শুধু সুধা-বাঞ্ছিত অমিয়া ;
পূর্ণ, মগ্ন করে আছ আমার এ হিয়া ;
সদা স্নাত করিতেছ মােরে
;
লহরে লহরে !
যেন এই দেখিতেছি তােমারে প্রথম স্বপ্ন-মাঝে ।
মাের মুখপানে ওই—ওই যে নয়ন চেয়ে আছে,
যেন সেই নেত্র মাের অস্তিত্বেরে করি’ দীর্ণ, ধীরে
প্রবেশি’ এ অন্তঃপুরে, মনেরে ডুবায়ে তন্দ্রা-নীরে,
ফেলিয়াছে অবসন্ন, জ্ঞান-হারা করে’! আজি তাই,
যেন মাের জাগিবার বুঝিবার কোন শক্তি নাই।
1
তুমি তাে আমার নহ কেহ!
কে তুমি, কি তুমি কহ।
তবে কিবা, কেবা তুমি ?
৩২

মাধুরী
;
আজি তব নাহি কোন দেহ,
আজি তুমি রূপময়ী,—যে রূপের অতুলন প্রভা
ওই স্বচ্ছ হিয়া ভেদি উঠেছে ফুটিয়া ! একি শােভা,
না, এ মায়া মােহময়ি ? সুখভরা এ বেদনা হায়,
কহ-কহ কেন জাগে অনিবার হেরিলে তােমায় ?
কেগাে তুমি ?—কেহ নহ ; যেন তুমি নহ পৃথিবীর !
উদিয়াছ শুধু আলাে দিতে,-যেমন আঁধার রজনীর
গাঢ় তম ঘুচাইয়া দিতে ওঠে শরতের শশী,
যেন তুমি সেইমত! তাই কিগাে ?—উঠিলে উল্লসি’
একবার মৌন হাস্যভরে তুমি, অনন্ত পাথার
তাই কি অমন কাঁপে আবেগ-তরঙ্গে অনিবার?
নহে, হায়—তাহা নহে। তুমি যে আমার কাছে বসি’
শুধু মােরে দহিতেছ তাপহীন দাহে! রবি-শশী
তবে নহ তুমি।
কিন্তু, তবে কিবা তুমি? রহি’ রহি
এই যেগগা নিরন্তর করিতেছ বিচেতন, দহি
এই যে এমন ভাবে সুখী করি’--দিতেছ বেদনে,
এ আবার কোন্ লীলা? নহ দেবী; তবে বা কেমনে
এত মায়া করি’ছ বিস্তার ? তবে, হেরিলে তােমায়,
কেঁদে উঠি হাসিতে হাসিতে কেন হেন? এ আমায়

মাধুরী
কেন তবে হারাইয়া ফেলি আমি তােমার মাঝারে
পলে পলে ? কেন তবে এত ব্যথা ? তবে, এ সংসারে
তুমি মোের তৃপ্তি নহ ?
তবে কিগাে, মলিন মরতে
তুমি শুধু খসে-পড়া এক বিন্দু তারা ? চিন্তা-স্রোতে
তুমি কিগাে ভেসে’-আসা অপূৰ্ব্ব চেতনা? তুমি তবে
শুধু কিগাে স্বরগের সঙ্গীতের মূচ্ছনায়—ভবে
আসিয়াছ নামি’ ভ্রমে সুমধুর গীতি-অংশ সম?
তুমি কিগাে শুধু এক স্বপ্ন-স্মৃতি—চির-অনুপম,
প্রীতি ও বেদনামাখা ?
তুমি কি ? ভাবিগাে তাই আমি-
যেন তুমি কিসের আভাস! যেন নিত্য দিন-যামি’
তুমি দ্বিপ্রহরে দীপ্ত, তপন-উত্তপ্ত বনানীর
ছায়া-তল প্রবাহিত, স্নিগ্ধ, মন্দ, মৰ্ম্মর সমীর।
যেন তুমি দীর্ঘশ্বাস শুধু ! যেন তুমি ?—কিছু নহ।
শুধু এক মূর্তিমান, প্রণােন্মাদী, অতৃপ্ত বিরহ।
জাগিছ-ঝঙ্কার সম ; আলােকে সঙ্গীতে সুমহান ;
অপূৰ্ব গন্ধের মত!
কে তুমি হে নিখিলের প্রাণ?
৩৪

মাধুরী
ক কwি,
উন্মাদ মত
কি কহিছ ?
একি স্বপ্ন ? কি বলেছি প্রিয়া?
কহিয়াছি কিছু? বুঝি নহে ! শুধু মুখর,
কহে’ছি নিরর্থ কথা যত !
ক্ষমা কর অপরাধ ! কিন্তু, কি দেখিয়া
তােমাতে, কেমন হল! বক্ষে আলিঙ্গিয়া
এস, এস-তবে ডুবে যাই ;
-ঘুচু বালাই।
৩৫

মাধুরী
অভিমানে
এত অভিমান প্রিয়ে, এত অভিমান।
সুদীর্ঘ বিরহ পরে, উদ্বেলিত প্রাণ
আজি তব দরশন লভিয়া, যেমনি
চাহিল তােমার প্রতি-আলিঙ্গন, ধনি,
তুমি নাহি দিলে ধরা ;গেলে দূরে সরে ;
আমি শুধু ব্যথাহত, কুষ্ঠিত অন্তরে
হেরিলাম তােমার সে গর্বের গরিমা ;-
চক্ষু ছেয়ে অশ্রু উছলিল। নাহি সীমা
নিতা অভিনব তব বিচিত্র লীলার।
তুমি চলে গেলে যবে তখন আমার
ব্যথিত হৃদয় খানি হস্তে চেপে ধরি,
ধীরে আমি ফিরিলাম।
কিন্তু, মরি মরি-
মায়াবিনি, কি মােহিনী তব !-আমি যত
চলিয়া আসিতে চাহি দূরে, আশাহত
মরীচি-বিমুগ্ধ মৃগসম তত মাের
তবু, তবু তােমাপানে ধাইল অন্তর।
এত হেলা; তবু, তাই এসেছে ফিরিয়া
দুৰ্বল এ দু:খী অসহায়! অয়ি প্রিয়া,

মাধুরী
আসিয়াছি পুনঃ তব কাছে,—দেখাে চেয়ে!
সত্যই এ নারীজাতি পাষানীর মেয়ে !
বাষ্পকুল, রুদ্ধ কণ্ঠে তখনাে প্রেয়সী
মুখ না ফিরায়ে, মােরে করিলেন দোষী
-“সংবাদ দেওনি” বলে’; এতদিন পরে
আসিলাম গৃহে ফিরি’
; তবু, সে আদরে
নাহি দিল আলিঙ্গন, না কহিল হায়,
কোন কথা নিজ হ’তে ; শত সাধনায়
শুধু বারেকের তরে মুখ না ফিরায়ে
কহিল সে দুটো কথা—“কেন গাে আমায়
সংবাদ দেওনি এতদিন?” যেন তাঁর
দৰ্পের-স্পন্ধার কোন সীমা নাহি আর ;-
আমি যেন বাধা ভৃত্য। ভাবিলাম মনে-
একি ঘাের বিড়ম্বনা কবির জীবনে।
বেদনা বাজিল মনে সে কথা শুনিয়া।
মুখ ফিরিল না হেরি আমারাে এ হিয়া
৩৭

মাধুরী উলিল অভিমানে === কহিলাম তারে--- ‘থা প্রিয়ে, কাজ নাই ; আর বারে বারে আলিঙ্গিতে তােমা নাহি চাহিব কখননা, বৃথা হেন সাধিব না আর! কহি শােন- অযথা এ অভিমান তব অকারণে ! লিপি লিখি নাই সত্য ; কিন্তু, মনে মনে তােমারি নিকটে আমি করিয়াছি বাস এতদিন ; প্রাণপণে আমি বারাে মাস তােমারেই বাসি ভালাে ; তাই, আর নাহি তােমারে লইতে বক্ষে অধীরতা। বাহি একান্ত নিশ্চিন্তে এ জীবন মনােময়ি ; তাই, আর পূৰ্বমত আমি নাই হই তােমা লাগি বিহ্বল এখন ;-নাহি আর ‘হারাই হারাই’ বলে আশঙ্কা আমার! এতদিনে বুঝিয়াছি-প্রকৃতই প্রেমে এ পৃর্থী-নরক হতে আসিয়াছি নেমে',

মাধুরী
অমৃতেরি পারাবারে এতদিন পরে
যেন আমি পশিয়াছি আকুল অন্তরে !
আপনারে বিস্মরিয়া বাসিয়াছি ভালাে,
বুঝিয়াছি তাই এতদিনে।
আজি ঢালাে-
ঢালাে দেবি, যত পার অভিমান-বারি
নয়নের ; আমি জানি যে, তুমি আমারি।
পার যদি—ভালােবেসােনাক; আমি জানি
-তুমি তবু আর কারাে নহ। শােন বাণী
প্রেম নাহি চাহে প্রতিদান ; সে কেবল
আপনাতে সম্পূর্ণ আপনি। অবিরল
অশ্রুপাত প্রণয়ের নহেগাে প্রকৃতি ;
প্রণয় সে ধীর, শান্তরূপী ।
;
তব প্রতি
আজি হ’তে যদি আর সঞ্জীবিত মােরে
নাহি করে ;-তবু, আমি তােমারি ভিতরে
রহিব রহিব ডুবে’! বিশ্ব-চরাচরে
যে বারেক প্রণয়ের অন্তহীন করে
নিজেরে দিয়েছে ধরা, সে কি কভু পারে
৩৯

मांधूनौ
উপলক্ষ্য-স্মৃতিটিরে কভু ভুলিবারে ?
অহরহ প্রচ্ছন্ন যে সঙ্গীত-লহরী
নিখিলের রন্ধ্রে রন্ধে রহিয়াছে ভরি’
অবিরাম—সে অপূৰ্ব্ব, সুমহান গান
যে বারেক শুনিয়াছে ; পেয়েছে সন্ধান
প্রেমের মাধুরীরাশি যেই জন-সে কি
পারে কভু আধারে ভুলিতে ?
আমি দেখি
তাই আজি—‘ঝলমল’ তটিনী-প্রবাহে
তব দীপ্ত চিকণ ; তাই, লভি তাহে
তােমারি সরস সঙ্গ সখিরে আমার ।
যবে ক্ষেত্রে স্বর্ণ-বর্ণ শস্যের ভাণ্ডার
মন্দ বায়ু সহ ধীরে হিল্লোলিত হয়
তখন মনেতে মাের জাগে-মধুময়
তােমার সে রূপরাশি ; উঠিছে এমন
যেন তব সুধাভরা হৃদয়-স্পন্দন
তােমারি মৃদুল শ্বাসে! নিৰ্ম্মল আকাশে
উজ্জ্বল আঁধার-পটে যবে ধীরে ভাসে
অগণ্য নক্ষত্রপুঞ্জ, হয় মাের মনে-
যেন অয়ি দেবি, তব পুণ্যেরি কিরণে

মাধুরী
উঠিছে প্রদীপ্ত হয়ে তব অশ্ৰচয়
সুস্নিগ্ধ, অপূৰ্ব্ব- দ্যুতি ! পুনঃ, ধরাময়
ভানুর রক্তিম বিন্দু জ্বলিয়া কপালে,
উষা যবে বিহগের কণ্ঠে সুধা ঢালে
জাগা’তে কোরক-সুপ্ত কুসুমের রাশি
অমৃত-ঝঙ্কারে, মাের মনে হয়—হাসি’
হাসি’ যেন সুবিমল উষারি স্বরূপে,
জ্বলন্ত সিন্দু-ফোঁটা পরি’, চুপে চুপে
আসিয়া আমার কাছে তুমি একেবারে
সহসা ঝঙ্কারি’ উঠি’ ডাকিছ আমারে
-“ওঠ, ওঠ, ঘুমায়াে না আর”! সেইক্ষণে
সত্যই চমকি” আমি জাগি অন্যমনে ;
দেখি--তুমি হাসিতেছ চরাচরে প্রিয়া,
অসীম লাবণ্যময়ী, আমারে মােহিয়া
প্রীতিভরে।
এইমত আমি তােমাতেই
হারা’য়ে ফেলেছি মােরে ! আজি কিছুতেই
তােমারে ভুলিতে আমি পারি না গাে আর।
আজি তুমি শুধু নহ প্রেয়সী আমার ;
৪১

মাধুরী
আজি তুমি বিশ্বময়ী, আমার চেতনা,
আমার আমিত্ব টুকু, আমার কল্পনা !
আত্মহারা আজি আমি! শুধু ভালবেসে
পেয়েছি তােমারে এক অজানিত দেশে !
সেথা তুমি ‘আমি’-মাঝে হ'য়ে গেছ লীন
সেথা আর আমি নহি কলঙ্ক-মলিন,
এই তুচ্ছ স্বামী তব ; সেখানে সদাই
আনন জাগিয়া আছে, আর কিছু নাই।
কি কহি তা বুঝিলে কি ? সাধিয়া প্রণয়
চাহি না তােমার আর,-নাহি মাের ভয়।
আজি আমি যাহা চাই তাহারি সন্ধান
লভিয়াছি, তারি মাঝে এ অনিত্য প্রাণ
নিত্য ডুবে’ অতলেতে যেতেছে তলায়ে !
আজি আমি প্রেম-তৃপ্ত। চাহিনা এ ছার
তােমার চুম্বন কিম্বা আলিঙ্গননা আর।
82

মাধুরী
আজি তুমি প্রেমার্থিনী, আমি গাে প্রেমিক ;
অলি আমি গৃহবাসী, তুমি গাে পথিক।
3

মাধুরী
প্রেম
প্রেম—এক ব্যর্থ অন্বেষণ !
সেই প্রেমে পূর্ণ এ সংসার।
প্রাণে প্রাণে উঠিছে ক্রন্দন--
‘কোথা তুমি হে আমি আমার”।
৪৪

মাধুরী
কলঙ্কিনী
এত রূপ! হারমণি, এই কিরে শেষ পরিণাম ?
সবারে পুড়ায়ে তাহে মিটিল কি তাের মনস্কাম ?
খুলিয়া রূপের ফাঁদ, অসহায়, ভ্রান্ত পথিকেরে
ফেলিয়া সে ফাঁদে নারি, সুখ তার সইতেছ কেড়ে।
ইথে কি বাসনা তব—ব অয়ি প্রতিমা মায়ার,
মিটিতেছে পূর্ণভাবে? ইহাতে কি হৃদয়ে তােমার
গভীর দুঃখের ছায়া, বুক-যােডা অনুতাপ-ব্যথা
জাগিয়া উঠিছে নারে ? পরাণে কি কোন কাতরতা
আসি’ছে না ?
তবে কেন আঁখি-কোণে নারি,
সরােজে শিশির সম কঁপিতেছে ‘ঢলঢল বারি ?
কেন তবে মুখে সেই সারল্যের মাধুরী-বিমল
খুঁজিয়া পাই না আজ ? কোথা সেই স্থির, অচঞ্চল,
শান্ত, সৌম্য, জ্যোতির্ময়, অমলিন, স্নিগ্ধ কান্তি তব ?
--হায়রে অবুঝ, নিজে সাধ করে হারাইলি সব !
করিনে প্রতারণা, সত্য কথা শুধাই তােমায়--
কিসে সুখী তুই নারি ? শান্তি প্রতি তাের সে কোথায় ?
চারিদিকে রূপ-বহি জ্বেলেছি চিতার সমান,
মাঝে রয়েছিস বসে তাপ-দগ্ধ, বিশুদ্ধ পরাণ ।
৪৫

মাধুরী
আগুণ উঠিছে জ্বলি’, পতঙ্গ পুড়িয়া মরে শত ;-
একি খেলা জ্বালাময়ি ? একি লীলা তাের অবিরত ?
‘ধূ ধূ বহ্নি উৰ্দ্ধ-শিখা জেলে’ কিরে সুখ আছে তাের ?
ৰ কুহকিনি, ইথে পূরিছে কি ও শূন্য অন্তর?
নাই, নাই ! কিছু নাই ! শান্তি নাই !--শুধু হাহাকার।
পলে পলে জ্বলিতেছে আপনার রূপের মাঝার ;
একে একে রূপরাশি পুড়ে পুড়ে হইতেছে ছাই ;
তারি মাঝে আছে বসে মায়াবিনী। শান্তি তার নাই।
পথের ও পঙ্কপূর্ণ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আবৰ্ত্ত মাঝারে
খুজিস্ প্রণয় তুই ? রে অভাগি, সে অমৃত-ধারে
অমন করিয়া কভু খুজিতে হয়না পথে পথে ;
উচ্ছসিত হয়ে তাহা ঝরে পড়ে অনাবিল স্রোতে;
তাহা সেই প্রেমনিধি, মধুময় দেবতা-চরণে
জন্ম লভি’, কল-স্বরে নেমে আসে মানব-জীবনে।
নেমে আসে গাহি’ দিব্য, সুমধুর, অপূর্ব সঙ্গীত
কানে পশে সে রাগিনী, সবে শশানে হইয়া স্তম্ভিত!
**
৪৬

মাধুরী
আসে নামি’ প্রেম-উৎস, সঙ্গে আনে স্নিগ্ধ সজীবতা,
ভাসাইয়া ধুয়ে ফেলে জীবনের সর্ব মলিনতা।
সেই প্রেম সুধা-উৎস! প্রেম নহে পণ্য-দ্রব্য ; সখি,
কিনিতে হয়না তারে বিশ্ব-হাটে সযত্নে নিরখি।
তুমি তারে হারায়েছ, হারায়েছ তার অধিকার।
হায়রে ললনা, তাের দুঃখে প্রাণ কাঁদিছে আমার ।
এমন মধুর তুই,-যেনরে ফুটন্ত ঘূইফুল,
এমন নয়ন দু’টি—যেন দুটি ভ্রমর ব্যাকুল,
-এতই সুন্দরী তুই ; হা ভগিনি, এই তাের দশা !
আজি তুই বিশ্ব-ঘৃণ্য, আজি তুই ভূজঙ্গী, বিবশা !
অহহ, কি করিলি তুই ! হায়, হায়—কি হইবে তাের।
এমনি কি যন্ত্রণায় চিরদিন বহিবি বিভাের ?
কোথা সেই গৃহ তব—পরিপূর্ণ আত্মীয়-স্বজন ?
কোথা সেই বাল্যকাল ? কোথা সেই খেলাঘর বােন্?
কোথা আজ তাের সেই নিদ্রাগত পুতুল স্নেহের ?
কোথা সেই পুষি-মেনিছিল তব বড় আদরের?
৪৭

মাধুরী
কোথা সেই মাতৃক্রোড়? যেথা গেলে তব দুঃখ-ভয়
পলাইত তােরে ছাড়ি–কোথা সেই নিভৃত আশ্রয় ?
কোথা পিতা তব-যিনি দিনান্তের শান্তি পাশরিয়া,
লইতেন তােরে ডাকি’ বক্ষ-মাঝে সযত্নে টানিয়া ?
কোথায়, কোথায় সেই
মধুময়
প্রিয়-পরিবার ?
আজি সে সবারে ছাড়ি’ কি সুখেরি জীবন তােমার ।
মনে পড়ে সেই দিন ?--যেদিন তােমারে অশ্রুজলে
পি তব হস্তখানি সঁপিয়া অন্যের করতলে,
ধূপ-গন্ধ-আমােদিত, মুখর, সে ধূসর সন্ধ্যায়
মঙ্গল-আশীষবাণী বষিলেন তােমার মাথায় ?
কল্যানী জননী যবে ধরিয়া তােমারে বক্ষ-মাঝে,
অশ্রু-রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে কহিলেন-‘বাছা, লক্ষ কাজে
মগ্ন হয়ে এসংসারে ভুলিনে মাতার আদেশ
অজ্ঞাত ভবিষ্য-গর্ভে আজি বংসে, করিলি প্রবেশ ।
সংসারের সৰ্ব্বকৰ্ম্মে, পদে পদে ছায়ার মতন,
পতি-ইচ্ছাধীনা হয়ে তারি পায়ে সাঁপিও জীবন ।
স্বামীর সুখের লাগি হৃদয় পাতিয়া দিও বালা ;
পতিরে করিলে সুখী নারী-জন্মে ঘােচে সব জ্বালা।
শাঁখা হাতে দিয়ে মাগাে, এ সিন্দুর সিঁথিতে রাখি!
আর কি কহিব বাছা ? নে’রে তাের মাতার আশীষ।
৪৮

মাধুরী
শুনি’ এ বিদায়-বাণী কাদিলি রে সরল উচ্ছাসে।
মা’র বাক্যে মন-মাঝে পেলি বল নবীন বিশ্বাসে।
এলি ছাড়ি’ বাল্য-গৃহ ;-ফুরাইল জীবনের উষা
চলে এলি নবীন সংসারে পরিয়া সুদিব্য, চারু ভূষা
|
বিচিত্র সংসার-কাৰ্যে কিছুদিন রহিলি মগন,
স্বামীর সােহগে—সুখে কিছুকাল যাপিলি জীবন।
সহসা, কুহকে ভুলি’ নিমেষেতে ঘটালি প্রমাদ।
পলকের ভ্রান্তিসহ ভেসে গেল মাতৃ-আশীৰ্বাদ !
স্বামি-গৃহ ছেড়ে’ এলি! গৃহিণীর রত্নসিংহাসন
পদাঘাতে চূর্ণ করি’, চলে’ এলি প্রমাদে আপন।
ভুলে গেলি ভবিষ্যৎ ; রূপ-গৰ্ব্বে, অন্ধ মত্ততায়
সহস্রের মাঝে এলি ক্ষিপ্ত হয়ে, দলি’ মৰ্যদায়।
;
আজি তুই পরিত্যাক্ত! আজি তাের নাই—শান্তি নাই !
এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তাের নাহি আর দাঁড়াবার ঠাই ।
সম্মুখে সুস্বচ্ছ বারি ; কণ্ঠ তাের দহি’ছে তৃষায় ;-
বারিবিন্দু পানে তাের নাহি আর অধিকার হায় !
;
৪৯
৪

মাধুরী
সহস্রের লালসায়, নিজমুখে দিয়ে জলাঞ্জলি,
যােগাও ইন্ধন সদা-আত্ম-পরে শত মতে ছলি।
কি ভীষণ প্রবঞ্চনা ! কি দুর্বহ এ তাের জীবন।
সহস্রে বিক্ষিপ্ত হয়ে পলে পলে লভি’ছ মরণ।
শােক-দুঃখ-অনুতাপ হৃদয়-মাঝারে গুপ্ত করি',
অজানারে ভুলাইতে ছলনায় আছ প্রাণ ধরি।
মিথ্যা-ভাণ ভালবাসা, তৃপ্তিহীন আত্ম-প্রতারণা
-এই শুধু লক্ষ্য তব। হায়, হায়—কি তাের যাতনা ?
অসহায়, অনাদৃতা, বৃন্তচুতা রে মল্লিকা ফুল,
এ দশা হেরিয়া তাের দুঃখে আমি হয়েছি আকুল।
চেয়ে দেখ, একবার——ঐ সব সােণার সংসার
হাসি’ছে নিৰ্ম্মল প্রেমে, পুষ্প-অর্ঘ্য বিশ্ব-দেবতার।
পাত্রে পাত্রে সুসজ্জিত, সুগন্ধি কুসুমরাশি সম
কি মাধুরী বিকশিত প্রতি গৃহে-শুদ্ধ, নিরুপম।
ওই হাসি তােমাদেরি শুচি-স্পর্শে উঠেছে ফুটিয়া ;
কল্যাণ-প্রদীপখানি তােমরাই রেখে’ছ জালিয়া ;

মাধুরী
তােমাদেরি প্রেমে ভাসে বিশ্ববাসী আনন্দ-লহরে ;
তােমাদেরি প্রেমে নারি, শৃঙ্খলা বিরাজে ঘরে ঘরে।
-সেই সে শান্তির মৰ্ম্ম, বিশ্বের মঙ্গল-কেন্দ্রস্থল
রমণী যদি না রহে, যদি তারা হয়রে চঞ্চল
তাহাহ’লে মুহূর্তেকে এ ব্ৰহ্মাণ্ড চূর্ণ হয়ে যায় ;
জড়-জীব লুপ্ত হয় প্রলয়ের অন্ধ তমসায়।
কলঙ্কিনি, রে ভগিনি, ওরে মাের হারাণে রতন,
কি সুখে বঞ্চিতা তুই ! রসাতলে হলি নিমগন।
কি মােহে ভুলিয়া হায়, বিশ্ব ছাড়ি হইলি প্রবাসী
ফিরিবাররা পথ নাহি, হায় রে—অভাগি, সৰ্ব্বনাশি !
কি আর কহিব তােরে ? আমি কবি গাহি দুঃখ-গান !
কথা নাহি সরে আর ; বেদনায় কেঁদে ওঠে প্রাণ।
আয়রে দুঃখিনি আয়, আয় এক সাথে নিরালায়,
আয় মােরা কঁদি শুধু , আঁখি-জলে ভাসি দু’জনায়।
অনুতাপে, বিধাতার বরে তাের নিশা পােহাইয়া যাক্ ;
বিধাতা করুন তােরে কৃপা ! ডারে অভাগি, ত’রে ডাক।
৫১

মাধুরী
বিধবা
;
সে কোথায় গেল চলি’-তােমায় কিছু না বলি,
অজানিত দেশে।
ক্ষণেক বিলাপ করি', তারপরে, শান্তভাবে
এলাইয়া কেশে;
তাঁ’র সনে উপহৃত তারি রত্ন-আভরণ
ত্যজি’ অযতনে ;
বারেক অনন্ত, নীল, উৰ্দ্ধপানে আঁখি তুলি’,
অতৃপ্ত নয়নে
কি যেন হেরিয়া ; শেষে, ধীর পদে গৃহে এসে,
আত্ম-সম্বরিয়া,
সৰ্ব আশা, সৰ্ব্ব ইচ্ছা, সর্ব মান-অভিমান
একান্তে ত্যজিয়া ;
অনন্ত ধৈর্যের ভরে, আত্মহারা হয়ে, তুমি
পরার্থ-চিন্তায়
জীবন সঁপিয়া দে’ছ আপনারে ব্যাপ্ত করি
অনন্তের গায় !
শতরূপে, চারিদিকে—ঘৃণিত সংসার-মাঝে
বৃথা, অকারণে,

মাধুরী
তীক্ষ্ণ, তীব্র অপমান, অজস্র উপেক্ষারাশি
অশ্রান্ত বর্ষণে
তােমা’পরে ঝরে নিত্য ; তবু, তুমি দয়াময়ী
কিছু নাহি গণি’,
অন্তহীন ক্ষমাভরে তুচ্ছ
করি’ সে সকলি,
-“হে মাের জননি,
করুণা করিয়া সবে অসীম স্নেহেতে শুধু
সেবিতেছ সুখে ;
এত যে দুঃসহ, ঘাের অবিচার ; তবু, মাগাে,
কথা নাহি মুখে !
আপনারে বিস্মরিয়া,রাখি’ কোন্ অন্তরালে,
পর-হিত তরে
মৌন কর্মে রত সদা। পালি’ছ নিষ্কাম ধৰ্ম্ম
অনন্য অন্তরে।
ওরে চির-উপেক্ষিত, অনাদৃত পারিজাত,
কলাণী প্রতিমা,
কলুষ-তিমিরাবৃত এ সংসার দীপ্ত করি’,
স্বর্গীয় মহিমা

মাধুরী
•
বিচ্ছুরিছ বিশ্বে তুমি মহান্ চরিত্রে তব
-স্নিগ্ধ, মধুময় !
আজি তাই, ভক্তিভরে চরণে লুটায়ে মাগাে,
গাহি তব জয়।
অতুল-সুন্দর, এহি চির-স্থির রূপরাশি
বাহিরে ভিতরে ;
হেন সৌম্য, হেন শান্ত, এহেন আদর্শ নাহি
বিশ্বচরাচরে !
প্রলােভন হতে দূরে--বিজনে, অরণ্য-কোণে
যােগ কি বৈরাগী
সংযমিতে আত্ম-মন, যে সাধন-সিদ্ধি লাগি
নিত্য রহে জাগি' ;
-তুমি এ সংসারে রহি’, শত বাসনার মাঝে
সদা বিচরিয়া,
অচ্যুত ধৈর্য্যের বলে, অসীম সংযমভরে
আত্ম-সম্বরিয়া,
সেই মহাসাধনায় মহীয়সী দেবী সম
সিদ্ধিলাভ করি,
পাপার্ক এ লােকালয়ে পবিত্র আদর্শরূপে
আছ দেহ ধরি’!
৫৪

মাধুরী
ওগাে পুণ্যময়ী দেবি, অয়ি মূর্তিমতী প্রীতি,
দীপ্তি মনােহরা,
প্রণমি ও পদাম্বুজে-যাহার মঙ্গল-স্পর্শে
শুচিস্মিতা ধরা!
৫৫

মাধুরী
শ্মশান-স্মৃতি
এই সেই পুণ্য তীর্থ!
আজো পড়ে মনে
সেদিনের কথা--যবে এ মহা শ্মশানে
শত সতী পুণ্যবতী আপন জীবনে
তুচ্ছ করি’, আত্ম-হারা পতি-পদ-ধ্যানে,
হাসিয়া হাসিয়া ভালে লেপিয়া সিন্দুর,
পরি’ দিব্য রক্তাম্বর, একান্ত নির্ভরে,
উদ্ভিন্ন প্রসূন সম যৌবন মধুর--
প্রজ্জ্বলিত,উর্ধশিখা চিতার উপরে
অনায়াসে ফেলিত নিক্ষেপি’!
সেইদিন
আজো জ্বলে স্মৃতি-পটে! সে স্মৃতি মলিন
হইবার নহে কভু। সৰ্ব্ব তীর্থ-সার,
এ পবিত্র ক্ষেত্রে আসি’ আজি বারম্বার
ভক্তিবাস্পে ভাসে আঁখি ; সম্রমে অপার
সে স্মৃতির পদে প্রাণ করে নমস্কার।

মাধুরী
যাদু
একদিন বসে আছি
মুক্ত গগনের কোলে
-অসীমের কাছাকাছি,
প্রেমামৃত পাব বলে।
হেন কালে তুই এলি
‘বাবা আমি বলে যেই
দেখিনু নয়ন মেলি
যেন সেথা তুই নেই !
উঠিলি ঝপায়ে বুকে,
ও বাবা আমার বলে,
হেরি’ সে স্বর্গীয় মুখে
সৰ্ব্ব ব্যথা গেল চলে!
তােরে পেয়ে, শুধু তাের
মুখে রহিলাম চাহি’
এ সংসারে যেন মাের
আর কোন লক্ষ্য নাহি ।
;

মাধুরী
তুই যেন পুত্ররূপে
আমার আনন্দ ওরে ;
দিস তাই, চুপে চুপে
আমারে বিহ্বল করে।
তােরে কোলে নিয়ে আজ
রােমাঞ্চ হতেছে মাের ;
ডুবি’ছে ও রূপ-মাঝ
যেন বিশ্ব-চরাচর।
তােরে হেরি আজি ওরে,
চক্ষে মাের আসে জল ;
কি যাদু করিলি মােরে?--
বল বৎস, মােরে বল।
ক
৫৮

কন্যার প্রতি
ধেয়ে নেচে নেচে আয় ওরে দুলালী আমার।
হাসি-হাসি মুখখানি তাের
হেরিলে নয়ন আমি ফিরা’তে না পারি আর ;
তােরে পেলে হইরে বিভাের।
আয়রে মাণিক মাের, বুকে করে রাখি তােরে ;
গণ্ডে দেই শত চুমা’ আয় ;
দিব আয় রাঙা ফুলে রাঙা দু’টি মুঠো ভরে;
আতা পরা’য়ে দিব পায়।
আয়রে উজ্জ্বল, শুভ্র, অম্লান শিশির-কণা,
আয়রে বুকের ধন, বুকে!
করি আধ’-কথা শুনে তাের সনে আলাপনা,
ডুবে’ রহি তাের প্রেমে সুখে।
সংসার-অরণ্যে হিংস্র জীব করে বিচরণ,
চারিদিকে ওঠে হাহাকার ;
তারি মাঝে তাের তরে গড়িয়াছি বাছাধন,
স্নেহ দিয়ে ক্ষুদ্র কারাগার।

মাধুরী
-সেথা তাের নাহি ভয় ; সেথা আমি তােরে লয়ে
নিরালায় ছেলে খেলা করি ;
সেই মধু-সঙ্গে মাগাে, ঘৃণিত জগতে রয়ে
আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়ি।
তাের কাছে রহি যবে, বাল্যকাল পড়ে মনে ;
মনে পড়ে—প্রীতির জীবন।
সংসারের হিংসা-দ্বেষ ভুলে গিয়ে সেইক্ষণে
লভি প্রাণে স্বর্গের কিরণ।
অয়ি ত্রিদিবের দূত, কেন এলি এজগতে ?
-এ যে বড় নির্মম প্রবাস !
এখানে বল্‌রে, তােরে হিংস্র আক্রমণ হতে
কেমনে রক্ষিব বারাে মাস ?
কখন্ না জানি যাব ডুবিয়া কালের স্রোতে
এ জীর্ণ জীবন-তরী বেয়ে
আমি চিরদিন হায়, রহিব না তােরে পাশে;
তুইও রবিনে মুখ চেয়ে!
তখন-তখন মাগাে পুণ্যময়ি, কে তােমারে
৬০

মাধুরী
?
রাখিবে ঢাকিয়া
বুক
দিয়ে
যদি মা, যাতনা পেয়ে ভাসিস্ নয়ন-জলে,
সান্ত্বনা লভিবি কোথা গিয়ে ?
বৃথা সে ভাবনা মাের ! আছে রে, আশ্রয় আছে ;
সে আশ্রয়ে হবে তাের ঠাঁই।
চিরদিন সত্য-পথে চলি সংসার-মাঝে,
দূরে যাবে সকল বালাই।
তাের জনকেররা যিনি পিতা ও বিধাতা, তার
চরণে রাখিস্ স্থির মতি;
তাহারি শরণ নিস্-সংসারের ব্যথা-ভার
বড় তীব্র মনে হয় যদি।
দূর হােক মিছে চিন্তা! আয়রে নয়ন-মণি,
আয় মোরা খেলাঘর পাতি ;
পুতুলে পাড়ায়ে ঘুম, আয় পুতি গণি গণি’
পুতুলের ‘বিছে হার’ গাথি।
“বিছে হার’ ভাল হলে, মােরে কিন্তু দিতে হবে
দুই গলে সলোল চুম্বন!
৬১

মাধুরী
সংগ্রামে বিক্ষত আমি ; তুই চুমা দিস্ যবে,
আসে প্রাণে নব-সঞ্জীবন!
৬২

মাধুরী
শীত ঋতুর প্রতি
এসেছ ? এসহে মুক্তি লহ লহ প্রাণ।
চূর্ণ কর প্রকৃতির দৃপ্ত অভিমান
দুর্বিষহ। পত্র-পুষ্প-ফলের সম্ভার
পূর্ণ করেছিল তার রূপের ভাণ্ডার
শতরূপে। শুধু তাই, অন্ধ অহঙ্কারে
মুগ্ধ হয়ে, মত্ততায় এ বিশ্ব-সংসারে
এতকাল উপেক্ষিয়া অপরের ব্যথা
আপনারে প্রচারিত করিত সৰ্বথা
নির্দয় উল্লাসভরে।
আজি সব শেষ!
কদম্ব-চম্পক আর পাশের বেশ
-চন্দ্র-তারা-রবি-দীপ্ত চন্দ্রাতপ-তলে,
পীক-কণ্ঠে স্পন্দমান পবন-হিল্লোলে,
যূথী-বেলা-আমােদিত এই রঙ্গালয়ে
ঝরিয়া পড়িবে তব স্পর্শে শুষ্ক হয়ে
মুহূর্তেকে স্বপ্নসম !
তব আগমনে
হের-থর-থর কাপে মলিন আননে
গরবিণী সভরে ! কি লাগিয়া ভয়?

মাধুরী
কে ওরে বুঝয়ে দেবে তুমি মৃত্যু নয় ?
তুমি শুধু পুরাতন অসারতাগুলি
বিশ্ব হয়ে উপাড়িয়া ফেলিতেছ তুলি
নবীনে করিতে প্রতিষ্ঠিত
-জীর্ণ পুরাতনে
উদ্দীপ্ত করিয়া দিতে নব সঞ্জীবনে,
তব এই মহা আয়ােজন। প্রাণ নিয়া
তুমি তারে কর না সংহার; সাজাইয়া
নবীন ভূষায়, প্রক্ষালিয়া পঙ্কিলতা,
বল সঞ্চারিয়া তাহে, সৃষ্টির বারতা
ললাটে অঙ্কিত করি’, শুভাশীষ সম
তুমি তারে কর দান উজ্জ্বল জনম
সৌন্দর্যে মণ্ডিত করি’! তবে কেন ভয়?
তােমাতে বিরাজে মুক্তি,-সমাপ্তি তা নয়।
এস এস মেলি’ তব শুভ্র পক্ষ দু’টি ।
পড়ুক প্রকৃতি ওই পক্ষতলে লুটি
মায়া-আকর্ষণে তব নিদ্রার আবেশে।
ক্ষণপরে, পুনঃ, ধীরে উঠুক সে হেসে’—
শুচি-স্নাত, সদ্যোজাত মায়া-কন্যাসম ;
ফুটুক তাহার মুখে শান্তি নিরুপম।
৬৪

মাধুরী
२
প্রকৃতির সনে তুমি আরাে লহ টানি’
এই পূতিগন্ধময় বিশ্ব-রাজধানী
যেথা জীব-জন্তু সবে নরকের মাঝে,
বীভৎস চীৎকারে, ঘাের পৈশাচিক কাজে
নিত্য মগ্ন হয়ে আছে। লহ ইহাদেরে
তব হিম-স্পর্শ-স্নিগ্ধ আলিঙ্গন-ফেরে।
হের-এ সংসারে সদা ধৰ্ম পদানত
হইতেছে পদে পদে ; অধৰ্ম্ম সতত
ভৈরব প্রতাপে হেথা রাজত্ব বিস্তার
করিতেছে চারিদিকে ; পুণ্য-সাধুতার
বুঝি স্থান নাহি হেখা। এবে, এ সংসারে
কপট বিনে জীব তিষ্ঠিতে না পারে
মুহূর্তেক ; এবে, হেথা হের-ঘরে ঘরে
পিতা-পুত্র কেহ কারে বিশ্বাস না করে
প্রাণ ভরি’ ; যেন লােকে শুধু স্বার্থ লাগি
শঠতা করিয়া হয় সমদুঃখ-ভাগী
অপরের ; ছলনা ও মিথ্যা-ব্যবহার
গৃহে ও বাহিরে সদা স্বীয় অধিকার
বাপিতেছে ধীরে ধীরে ; প্রাণ ঢেলে যদি
;

মাধুরী
কেহ কারাে করে উপকার, নিরবধি
অভাগা সে উপকৃত নিকটে নিয়ত
লাঞ্ছিত হইতে থাকে ঘৃণ্য কাটমত
পথে, ঘাটে, লােকালয়ে। বিনয়, সম্মান,
কৃতজ্ঞতাহেথা হ'তে করেছে প্রয়াণ
চিরতরে। এবে, শুধু তীব্ৰ হিংসা-টানে
ডুবিল-ডুবিল বিশ্ব রসাতল পানে।
কোথায় ধর্মের জয়”? গেল গেল সব।
নরক-প্রেতের ওঠে ভীম কলরব
অভ্র ভেদি অবিরত। কেন, আর কেন ?
সহিতে পারিনা আর প্রহসন হেন
অমিশ্র কলুষপূর্ণ ;-একি রঙ্গ-খেলা?
এ নাটকে যবনিকা ফেল এই বেলা
হে প্রবল শীত-ঋতু! কুম্ফটিকা-জালে
টেনে’ দাও সংসারের উন্মুক্ত কপালে
লজ্জা-বাস সম ; লহ তারে বক্ষে টানি,
-বুলাও সর্বাঙ্গে তার তব হিমপাণি
জুড়াইয়া সব জ্বালা। এ বিশ্ব-সংসার
প্রমত্ত হয়েছে পিয়ে তীব্র মদিরার
প্রতপ্ত কাঞ্চন-বারি। সহবাসে তারে

মাধুরী
মত্ততা ঘুচায়ে, ধীরে শ্রান্তির মাঝারে
তব স্পর্শ-সুখ দানে নিদ্রা দান কর ;-
ভ্রান্তির এ মােহ তা’র ধীরে অপহর’!
দিও পুনঃ নিদ্রা-অন্তে তা’রে নব বল ,
করাে পুনঃ এ সৃষ্টিরে আনন্দ-উজ্জ্বল
৬৭

মাধুরী
স্বপ্ন ও সত্য
স্তন্যপায়ী শিশু সুখে হাসে-মা মা বলে’
চুমি’ছে সে মুখ মাতা ভাসি’ অশ্রু-জলে।
দার্শনিক হেরি’ তাহে কহে-এ যে ভুল!
মুগ্ধ কবি কাদি’ কহে-অতুল, অতুল’ !

মাধুরী
‘আপন’ যবে না রহে কেহ,
আঁধারি আসে ধরণী,
এলায়ে আসে অবস দেহ,
কঁপিয়া ওঠে ধমনী,
দুঃখ যবে ঘনা’য়ে আসে,
অশ্রু ঝরে নয়নে,
নিরাশা যবে কুটি’ হাসে,
কঁদিয়া যাচি মরণে-
তখন তুমি নীরবে, ধীরে,
স্বার্থ-সুখ ভুলিয়া,
সংবেদন-অশ্রু-নীরে
লহগাে বুকে তুলিয়া!
দেহ গাে মুছি’ লােচন-লাের ;
অমিয়-মাখা বচনে
শকতিহীন শরীরে মাের
আনহ নব জীবনে ;
পরশে তব পরাণে নব
জাগিয়া ওঠে চেতনা,
৬৯

মাধুরী
হাসিয়া ওঠে আঁধার ভব,
ঘুচেগাে সব বেদনা ;
শ্রবণে আশা ওঠেগাে গাহি
সঞ্জীবন—কি সুরে!
দেখিহে চাহি’—জগতে নাহি
হিংসা-শােক কিছু রে !
তখন পুনঃ গরবে দলি’
শতেক কঁাটা চরণে,
কৰ্ম্ম-পথে যাইগাে চলি’
দৃপ্ত করি-গমনে।
এমন দিন আসিবে কবে
বিশ্ব যবে তােমারে
দেবতা সম বরিয়া ল’বে
করিবে সদা পূজা রে!
কঁদিবে সবে পরের দুখে,
কেহ না রবে ‘পর’ গাে,

মাধুরী
মলিন এহি মরত-বুকে
রাজিবে মহাস্বর্গ ।
সেথায় শুধু শাস্তিভরা
প্রেমের সুধা-পাথারে
ভাসিবে এহি তপ্ত-ধরা ,
ঘুচিবে শােক-জ্বালারে !
অযুত বীচি বহে গাে যথা
চন্দ্রে ল’য়ে বক্ষে,
রাখিয়া তারে হৃদয়ে, সদা
আমরা শত লক্ষে
যাইব বহি’ অসীম, ধীর,
বিরাট সেহি সাগরে ;
লক্ষ প্রাণে জাগিবে থির,
মহান অনুরাগ রে!
ওগাে বিধা, এমন দিন
আসিবে পুনঃ কবে গাে-
ভুলিবে সবে সকল হীন
স্বার্থ এহি ভবে গাে !
৭১

মাধুরী
সখ্য
সকল বন্ধনে-
সৰ্ব্ব প্রেমে এ ভুবনে
রহে স্বার্থ-গন্ধ। চিরদিন
শুদ্ধ তুমি শুভ্র, অমলিন।
৭২

মাধুরী
তৃষিতের আবাহন
শুষ্ক কণ্ঠে পিপাসায় হয়ে উৰ্দ্ধমুখ
চেয়ে আছে বিশ্ব-প্রাণ একান্ত উৎসুখ
আকাশের পানে! কোথা, কোথা বারিধারা ?
আজি ধরা কঁপিতেছে সুখ-শান্তি-হারা
অসহ উত্তাপে।
ওই সুস্বচ্ছ অম্বরে
বাম্পাকারে বারিপুঞ্জ আছে থরে থরে
অদৃশ্য সাগর সম। তাহে, এ তিয়াস
মেটে না, মেটে না কভু! প্রতপ্ত নিশ্বাস
কণ্ঠাগত-প্রাণ এই ক্ষিতি-বক্ষ হ'তে
উঠিছে প্রবল বেগে ; সমীরণ-স্রোতে
কঁপি’ছে প্রকৃতি আজি প্রলয়ের কোলে !
কোথায় জীবন-ধারা ?
গগনের তলে
এস, এস ‘কৃষ্ণ-মেঘ, ধীর গরজনে;
-স্নিগ্ধ কর এ জগতী সফল বর্ষণে ।
৭৩

মাধুরী
ঘুম-ঘাের
সংখ্যাতীত তনয়ের জননী-আমার,
বুক
ফেটে যায় মাগাে, নেহারি তােমার
হেন দশা ! ছিলে রাজ-রাজেন্দ্রানী দেবী;
কৃতার্থ মানিত বিশ্ব শ্রীচরণ সেবি’!
আজি সেই তুমি দেবি, ভিখারিণী-প্রায়
শুষ্ক মুখে, রুক্ষ কেশে লুটি’ছ ধূলায় ;
কেহ নাহি লহে খোজ! অযুত সন্তান
পুষ্ট হইতেছে স্তন্য-সুধা করি’ পান ;
তবু, নাহি চেনে তােরে! শত নির্যাতনে
গুমরি’ কাদি’ছ মাগাে, প্রতি ক্ষণে ক্ষণে ;
তথাপি—তথাপি মাগাে, তব পুত্র সবে
ঘুমায়ে কাটায় কাল এ জাগ্রত ভবে !
৭8

মাধুরী
সঞ্জীবন
ক্ষান্ত হও ভ্রান্ত পান্থদল ; অন্ধ মােহ এবে পরিহরি,
নয়ন উন্মীলি’ চেয়ে দেখ—আত্ম-মদে, আপনা বিস্মরি,
কোথা হতে, কোন্ পথে, কতদূরে এসেছ চলিয়া ;
ভীষণ আঁধার এবে চতুর্দিকে আসে আচ্ছাদিয়া !
সম্মুখে হুঙ্কারি’ হের-আস্কালিয়া আসে পারাবার
প্রমত্ত উল্লাসভরে, লক্ষ বাহু করিয়া বিস্তার,
গ্রাসিবারে তােমাদেরে! শান্ত হও ক্ষণেক এখন।
দিশাহারা হয়ে আর অতলে হয়ােনা নিমগন।
===
দাড়াও। আত্মস্থ হ'য়ে ভেবে দেখ—কোন্ লক্ষ্য ধরি’
চলিয়াছ এই দিকে। অদূরে যে উল্লম্ফন করি’
বারম্বার তােমাদেরে আলিঙ্গিতে চাহিছে জলধি,
প্রবেশিতে তারি গর্ভে তীব্র ইচ্ছা জেগে থাকে যদি
–যাও তবে, অনায়াসে হেনভাবে হও অগ্রসর ;
অস্তিত্বে বিলুপ্ত করি’ পৃথী হ’তে লুকাও সত্বর।
আর যদি বাঁচিবারে—যদি চাহাে রক্ষিতে জীবন,
ক্ষান্ত হও তবে মুর্থ ; মুক্ত কর মুদ্রিত নয়ন।
জেনে লও আপনারে—কর মনে অতীত গৌরব ;
৭৫

মাধুরী
বুঝে দেখ—কি কুহকে বিদলিয়া অনন্ত বৈভব,
কি মােহে নরক-গর্ভে ডুবিবারে চলেছ ধাইয়া!
ভেবে দেখ আজিহায়, কোথা হতে এসেছ নামিয়া।
বড় উর্দ্ধে ছিল সেই মহােজ্জল প্রেম-সিংহাসন ;
যেথা হতে ধ্যান-লব্ধ, অগ্নিগর্ভ বেদান্ত-বচন
প্রসৃত হইত নিত্য—ভূ-তৃপ্ত ঋষি-কণ্ঠ হতে,
সঞ্জীবিত করি’ এই অজ্ঞ, অন্ধ, পঙ্কিল জগতে।
এ সংসার সেইক্ষণে নিৰ্ণিমেষ রহিত চাহিয়া
একান্ত বিস্ময়ভরে, বহুনিম্নে নিঃশ্বাস রােধিয়া,
-শ্রদ্ধায়, বিনয়ে মুগ্ধ, অনুতপ্ত আপন অজ্ঞানে,--
সেই জ্যোতির্ময়, শান্ত, নিৰ্বিকার পুরুষের পানে!
বিশ্বের বিস্ময়-কেন্দ্র, মরতের সে আদর্শ প্রাণ
তােমাদেরি মাঝে ওরে, অংশে অংশে আজো বিদ্যমান।
সে পুণ্য রুধির বহি’ বক্ষ-মাঝে, আজো অচেতন,
ভ্রান্তিমদে ক্ষিপ্ত বেগে কোথা অহহ, ধাইছ এমন।
-
সুপ্ত শক্তি না জাগায়ে, না জানিয়ে নিজ পরিচয়
কোথা যাও ? ফিরে চল। আছে ওরে, আছে রে সময়!

মাধুরী
চল পুনঃ সেই স্মৃতি পূর্ণ করি’ অন্তর-কদরে ;
আপনা’ সম্বরি চল মহত্ত্বের সে উচ্চ শিখরে ;
ঐক্যমন্ত্রে লভ দীক্ষা, হও সবে আত্ম-সমাহিত ;
চল, ফিরে চল পুনঃ মহালক্ষ্য করিতে সাধিত।
প্রাণপণে স্মরি’ ’রে কহ সবে—“জয় বিশ্ব-প্রভু” !
জেনাে স্থিরতার প্রেমে বিফল না র'বে বাঞ্ছা কভু, !
৭৭

মাধুরী
আহ্বান
স্বহস্তে রচিয়া যত্নে দাসত্বের জাল
বিজড়িত, বিলাঞ্ছিত হয়ে, এতকাল
ছিলাম বিমুগ্ধ, অন্ধ,
ঊর্ণনাভপ্রায়
অক্ষম, দুৰ্বল, অতি ঘৃণ্য, অসহায়।
তাই, আজি প্রেমভরে অগতির গতি
রাজ-রাজেশ্বর আসি’, স্বহস্তে তাহার
আমাদেরে দিয়াছেন অবাধ মুকতি
ছিন্ন করি’ দুঃখ-জাল! বহিছে এবার
তপ্ত চিত্তে শান্তি-ধারা ; এসেছে নূতন
জীবনে আবার পুনঃ নব জাগরণ
স্নিগ্ধ আশা-জ্যোতির্ময় ! আজি নাচে প্রাণ
শুনিয়া বিশ্বের কণ্ঠে মহান্ আহ্বান
আত্ম-নির্ভরের। আর নাহি ওরে ভয় !
ধাও, ধাও কৰ্ম্মক্ষেত্রে ; গাহ তা’র জয়।
৭৮

মাধুরী
সমুদ্রের উদ্দেশে
সীমাহীন ওগগা পারাবার,
বহু বর্ষ পরে আজি হ’ল যদি দেখা,
শােন তবে একবার--শুধু একবার--
পদ-প্রান্তে দাঁড়াইয়া ত্রস্ত ভক্ত একা,
ক্ষীণ-বিকম্পিত কণ্ঠে করে দীন যেই নিবেদন,
হে অনন্ত, হে ভয়াল, হে সুন্দর, করহ শ্রবণ।
হেরিতেছি—উদ্দাম উল্লাস,
সেই দৃপ্ত আস্ফালন তব নিরবধি।
আজো অনাহত গৰ্ব্বে:তুমি বাবােমাস
প্রমত্ত তরঙ্গ-ভঙ্গে বহি’ছ জলধি।
কালের প্রভাব বলে আজো তুমি হও নাই নত ;
সৃষ্টির আদিম ক্ষণে যাহা ছিলে, আজো সেইমত।
৭৯

মাধুরী
কিন্তু, হায়, হে দেব মহান,
দ্বাদশ বরষ পূর্বে আমারে যখন
প্রথম দেখিয়াছিলে—লঘু,স্বচ্ছ-প্রাণ,
ওই ক্ষুদ্র, হাস্যোজ্জ্বল লহরী মতন—-
তব এই উপকূলে, কোথা মাের অহহ সেই দিন ?
আজি আমি অবসন্ন, সুখহারা, কলঙ্ক-মলিন !
সংসারের মােরা তুচ্ছ
প্রাণী
পদে পদে নিয়তির নির্মম পেষণে
দলিত, বিধ্বস্ত হয়ে, পরাজয় মানি’,
তিলে তিলে লভিতেছি সঙ্কীর্ণ মরণে।
আর তুমি?হাহাকারে নিরন্তর মন্তবেগে ধাও,
দুর্দম উৎসাহে ক্ষুব্ধ ; কি করিবে ভাবিয়া না পাও?
৮০

কি করিবে পার না বুঝিতে ?
স্বার্থের সংঘর্ষে নিত্য যবে বসুন্ধরা
আপনার পাপ-ভার না পারে বহিতে
—হ'য়েছে বিদ্বেষ-হিংসা-প্রবঞ্চনাভরা,
পার নাকি তাহে এবে গ্রাসিবারে অম্বুরাশি দিয়া
পার নাকি একেবারে এ যাতনা দিতে জুড়াইয়া?
আছাড়িয়া পড়ি’ছ নিয়ত
ধরিত্রীর প্রান্তে তবে কেন বারম্বার ?
রােগ-শােক-দুঃখ তা’র হেরি’ অবিরত
অনুকম্পা জেগেছে কি অন্তরে তােমার ?
তাই যদি, হে বারিধি, এ আলার কর অবসান ;
--তােমার শীতল অঙ্কে এ মহীরে দেহ তবে স্থান!
৮১

মাধুরী
কিম্বা তুমি প্রচণ্ড আগ্রহে
দুরন্ত প্রণয়বশে প্রেমিক প্রধান,
হেরি’ বেদনার বিষে বিশ্ব সদা দহে,
কহি’ছ কলঙ্কী জীবে করিয়া আহ্বান
‘সঙ্কীর্ণতা পরিহরি’, অসীমের লইতে সম্বাদ
আয় মাের পদ-প্রান্তে ! নিয়ে যা’রে মাের আশীর্বাদ
ব্যথাতুর, এ বিরস হিয়া
তাই হে পাথার, আজি তােমারি চরণে
এনেছি বহিয়া আমি ; দেহ জুড়াইয়া
জীবনের সর্ব জ্বালা তরঙ্গ-প্লাবনে!
অন্ধ আমি ; তােমাতেই হেরিতেছি মহিমার আলাে ;
ক্ষুদ্র আমি ; তবু, তােমা’ হে অনন্ত, বাসিয়াছি ভালাে ।
৮২

মাধুরী
জ্যোৎস্নায়
রােমাঞ্চ হ’তেছে মাের হেরি আজি এ শান্ত মাধুরী ।
-যেন এক স্বপ্ন-বিশ্ব জুড়ি’
বিচ্ছুরিত—সুধাপ্লত, সুনির্মল, তরল আহলাদ !
যেন শুধু এক সুধা-স্বাদ
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড ভরা ! যেন এক বিবৃত কল্পনা
অতীত জন্মের ! উন্মাদনা
যেন আজি মূৰ্ত্তিমান-স্বচ্ছ, এহি অপূর্ব স্বরূপে ।
যেন চাহি’ অজ্ঞাত মধূপে
চরাচরে ফুটি’ আছে একটি বিরাট, শতদল--
সুখ-স্বপ্নে রচিত, উজ্জ্বল ।
যেন আজি আমি নাই! মনে হয় যেন কি ঝঙ্কার
উঠিছে এ অঙ্গে অনিবার
পরাণ-প্রমত্ত-করা ! যেন আজি কোন কিছু হায়,
জানা কিম্বা বুঝা নাহি যায় !
যেন হেরিতেছি—ব্যাপ্ত, সুদুঃসহ সুখ-বেদনার
দীপ্ত এক মৌন হাহাকার।

মাধুরী
প্রকৃতির বিরহ
মরি, মরি—
মধুময়ী প্রকৃতি-সুন্দরী।
রজত চন্দ্রিকারাশি
সর্বাঙ্গে পড়েছে আসি’ ;
মাধুৰ্য-পাথারে যেন রয়েছে ডুবিয়া !
‘ঝিরি ঝিরি’ মৃদু বায়
খাস সম বহি’ যায়,
শিহরিছে ক্ষণে ক্ষণে যােগ-মগ্ন হিয়া।
নিস্তব্ধ বাসন্তী নিশি,
নিদ্রামগ্ন দশ দিশি।
কা’র তরে জেগে আছে লাবণ্যের রাণী
এবে, এই নিরজনে ?-কিছু নাহি জানি।
আমিও ছিলাম অচেতন।
সহসা কোকিল কেন
করিল ঝঙ্কার হেন ?
কেন সে গাে ডাকিল এমন?
চমকি’ জাগিয়া উঠি
বাহিরে এলাম ছুটি
হেরিলাম—স্বপ্নের সাগরে
একাকিনী এ কল্যাণী, ত্রিলােক-বাঞ্ছিতা রাণী,
জেগে আছে যেন কা’র তরে।
৮৪

मांधूनी
তার ক্ষুন্ন হৃদি হতে
মলয়-মারুত-স্রোতে
মুহুর্মুহু পড়ি’ছে নিঃশ্বাস !
চিন্তাভরে, অযতনে
অঙ্গ হতে ক্ষণে ক্ষণে
খসিয়া পড়িছে লজ্জা-বাস।
আবরণ পড়ে খসি’!
কা’র হেন ধ্যানে বসি
অসময়ে দীর্ঘশ্বাসে বালা?
মরি, মরি—কি বিরহ ! কি সাধনা, কি আগ্রহ।
কি দুঃসহ এ অন্তর-জ্বালা !
শ্রান্তি নাহি, শান্তি নাহি যা’র---
সে বিরহ অনন্ত, অপার !
প্রকৃতির মাঝে, তাই,
হেরি—আজ বেদনাই
ফুটিয়া উঠি’ছে চারিধার ;
কোকিল করুণ তানে
ব্যথিত, উদ্ভান্ত প্রাণে
কহে নাহি সীমা বেদনার ;
উহু’ বলে’ তাই পাখী ডাকে এবে থাকি থাকি
‘উ-উ’ আর সহা নাহি যায় !
সমীর নিঃশ্বসি’ কহে
বহিতে না শক্তি রহে ;
৮৫

মাধুরী কোথা তুমি-কোথায়, কোথায় ? নারিকেল-নিম্ব-শাখা পরিমিত, জ্যোৎস্নামাখা,- শিহরি’ উঠিছে ক্ষণে ক্ষণে ; বেদনার অশ্রুজলে তটিনী কল্লোলি’ চলে তাই, হেন বিরহ-প্লাবনে ; ঝাউ-বৃক্ষ শ্বসি’ কহে সন্তাপে অন্তর দহে ; তাই আমি হয়েছি উদাসী; তাই, যেন কার তরে মুক্ত গগনের পরে লঘু, শুভ্র, খণ্ড মেঘরাশি কিসের সন্ধান করি, সৰ্ব্ব শান্তি পরিহরি’ ফিরিতেছে বিরহ-বিভাের ; পাপিয়াও কহে হায়, সে বিহনে প্রাণ যায়, কেঁদে কেঁদে’ ‘চো গেল’ মাের । কেন, কেন ? কার তরে এ যাতনা চরাচরে ? কা’রে চাহে বিশ্ব নিরন্তর ? এ সবের যিনি প্রাণ- প্রকৃতি, তিনিও চান —কারে লভি’ পূরা’তে অন্তর ? এ বিশ্ব-প্রকৃতি আজি এ হেন সুন্দরী সাজি

মাধুরী
কি বিরহে হয়েছে এমন ?
-নাহি জানি, নাহি বুঝি ;
তারি মাঝে রহস্য-কারণ !
তবু, তবু আমি খুঁজি
প্রকৃতি নিয়ত রহে আবরণ-অন্তরালে ;
তাই, তারে দেখিয়াও চিনি নাই এতকালে!
আজ যেই এ নিশীথে
ক্লান্ত, নিদ্রালস চিতে
বাহিরিয়া হেরিলাম—প্রকৃতি-মূরতি,
অমনি চমকি’ মাের ভেঙে গেল ঘুম-ঘাের ;
বুঝিলাম—সেও হায়, অসহায় অতি ;
দেখিলাম—বেদনায়
ফেটে যায় ;
সে-ও চাহে—পূরিবারে অভাব আপন।
আজি শান্ত নিরজনে নিদ্রা ত্যজি’, সঙ্গোপনে
জানিয়া লইল কবি প্রকৃতির মন।
তা’রাে বুক
নিখিল-প্রকৃতি-রাণী বিরহিণী অতি ।
চারিদিকে শুধু ব্যথা, পরিপূর্ণ ক্ষতি।
কি যেন সদাই চাহে, তবু নাহি পায় ।
বিশ্বভরা অনিবার শুধু ‘হায় হায় !
৮৭

মাধুরী
আশ্রয়
সাগরে ভাসা’য়ে তরী ভাবিতেছি মনে—
একটি অভাবব নাহি পূরিল জীবনে,
বৃথা বিশ্বে আসিলাম। কে আছে আমার ?
এ সংসারে নাহি প্রাণ। তবে, হাহাকার
কেন আর করে’ মরি। কে বােঝে বেদনা?
জলরাশি কহে হাসি’—“কেহ না, কেহ না”।
আকাশে বিস্তারি’ মন ভাবি নিশ্বাসি’--
কেন মিছে এ ধরায় শুধু যাই আসি?
কোথা হ'তে আসি, পুনঃ কোথা যাই চলে ?
নিমেষের তরে কেন ভাসি অশ্রুজলে ?
কেমনে নিবারি অশ্রু ? কে দিবে সান্ত্বনা ?
তারারাশি কহে হাসি’—“কেই না, কেহ না”
এ নিখিল-বিশ্বে নাথ, কি আছে আমার ?
কিছু নহে তােমা’ বিনে ওগাে সারাৎসার।

মাধুরী
প্রার্থনা
বহুদিন পরে প্রভু, আসিলাম আজি তব কাছে!
কিম্বা, হায়, একি কহি !—তুমি বিনা ঠাই আর আছে
কোথায় এ সংসারে, জনক? চিরদিন চিন্তা করি
যত ভাবে,সেকি দেব, তােমারি স্মরণ নহে? স্মরি
যবে তনয়-দুহিতা কিম্বা আপন কল্যাণ তবে
কিগাে, তােমারি কর্তব্য নাহি করি সম্পাদন? ভবে
কোন কাজ আছে প্রভু, যাহা নহে তােমার নির্দেশ ?
আমি কে জীবন-নাথ ?-নহি কিগাে তােমারি দীনেশ ?
আমি কি অমৃত-পুত্র নহি ? যবে সতীর শ্রীমুখে
হেরি’ আমি অপরূপ অপার্থিব দ্যুতি, লহি বুকে
টানিয়া তাহারে-তবে করি নাকি তােমারেই পূজা
প্রীতি-ফুল, বিকশিত অন্তর-পলাশে? দশভুজা-
রূপে যবে মৃগয় এ শক্তি-মূৰ্ত্তি হেরি’, ভক্তি ভরে
নত করি শির মম-তখন কি তােমারি চরণ’পরে
নাহি করি প্রণিপাত ? বিশ্বরাজ, তবে একি কহি?
তােমারি এ দীন চিরদিন ; আমি অহর্নিশি রহি
তােমাতেই অবগাহি'।
৮৯

মাধুরী
হে মহেশ, হে আমার মায়া,
হে প্রভু, হে দেব, প্রিয়, প্রাণেশ্বর, সখা, পুত্র-জায়া,
হে আমার মন-প্রাণ, চিন্তা, শক্তি, সৰ্ব্ব দুঃখ-সুখ,
জীবনের হে আনন,—আজি বড় শূন্য মম বুক !
পূর্ণকর সাধ মম ; শান্ত কর এ অন্তর-দাহ ;
পুরাও এ অভাবের অপূর্ণতা এ জীবনে ! চাহো
বারেক আমার পানে; হের মাের আয়ােজন ;
ডুবাও পাখার-তলে ; কর-- কর সুধা-নিমগন ।
এসেছি আজিকে তাই, শূন্য হৃদি পূর্ণ করিবারে
প্রেমের প্লাবনে—যথা মরু-তাপ তব বারিধারে
স্নিগ্ধ, ধৌত, বিপ্লাবিত করে 'ওগাে ইচ্ছাশক্তিময় ।
এসেছি আজিকে তাই, এ অনন্ত অভাব বিলয়
করিবারে ; আসিয়াছি লভিবারে অমৃতের স্বাদ
বহুক্ষণ পরে! হে দেবতা, দুর করি’ অবসাদ
কৰ্ম্ম-ক্লান্ত জীবনের,-শক্তি সঞ্চারিতে হে কল্যাণ,
এস এ অস্তিত্ব ছে’য়ে। কর ওহে শিব, ব্যবধান
অন্তরের এ অভাব মাের—পরশন-আলিঙ্গনে
তব। কর দূর-ওগাে অন্তৰ্য্যামি, এই আবর্জনে
তব এ মন্দির হতে ;-মুক্ত করি’ আমার জীবনে
ক্ষণতরে, এসে সেই শুচি-স্নাত তব সিংহাসনে ।
;

মাধুরী
একবার—কর রাজ্যেশ্বর, অধিষ্ঠান! এসাে! এসাে ।
মুহূৰ্ত্ত লাগিয়া ওগাে বিশ্ব-শক্তি, আমাতে নিবেশে
চেতনার সর্ব দ্বার দিয়া যেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে
তােমারেই করি অনুভব ; চক্ষে যেন মাের আসে
প্রেম-স্বপ্নবেশসম এ বিশ্ব-প্রকৃতি অপরূপ,
মােহন স্বরূপে সাজি’! মােরে বিকাশিয়া হে মধূপ,
তব যােগ সরােজের সম, এসএস মাের মাঝে
শুধু নিমেষের লাগি ।
!
দেখাে নাথ, আর কেবা আছে
মাের? প্রকৃতই দেখােশা-প্রিয়তম, হে জীবন-স্বামি,
কতদুঃখে, কত জ্বালা সহে’ হেথা রহিয়াছি আমি
অসীম আশায় তব ! হেরাে, দেখাে-এ অন্তরদাহ।
জ্বলে গেল, পুড়ে গেল প্রভু ! বল-এ গুপ্ত বিরহ
হেন ভাবে সদা আর সহা কিগাে যায়? অবিরাম
এত সাজা কেন দাও? জীবন-বল্লভ, প্রাণারাম,
কই, কই কোথা তুমি? একবার—একবার আসি
দেহ—দেহ জ্বালায়ে এ ক্ষীণ স্মৃতি ! শুধু, হাসি হাসি’
একবার আজি দেব, শুধু একবার, মাের পানে

মাধুরী
-সকল আঁধার অপসারি’, দীর্ঘ নিশা-অবসানে
বরষার সূৰ্য যথা চেয়ে দেখে প্রকৃতির প্রতি
সুধামাখা, সকরুণ চোখে-চাহে, চাহাে বিশ্ব-জ্যোতি।
শুনিছ কি এ ক্রন্দন? বিশ্বপতি, এ ধারা-প্রবাহ
ক্রমেই যে আসে শীর্ণ, স্নান, শুষ্ক হয়ে ;—চাহাে, চাহাে।
নাথ, দেখ এ দুর্দশা মাের—মরিতেছি! দেবে না কি
তবুও প্লাবন হেথা ?
৬
যবে কুঞ্জে গেয়ে ওঠে পাখী;
ফোটে ফুল , বহে বায়ু ; গরজে জলদ-পারাবার ;
যবে বর্ষে বারি মেঘ ‘ঝরঝরে’,-করিয়া বিস্তার
তীব্র ক্ষণপ্রভা-হতি; যবে হিল্লোলিত শস্যরাশি
নব প্রণয়িনীসম স্বভাবের বুকে—হাসি হাসি
রভসে লুটায়ে পড়ে মনােহর সাজে ; যবে কল-গান
গাহি', শরতের নদী আপনার শ্যাম-স্বচ্ছ-প্রাণ
পূর্ণ করি’ বিরঞ্জিত গগনের বিচিত্র প্রভায়, যায় বহি
সাগর-সঙ্গমে——তবে মনে মাের ওঠে রহি' রহি’
দারুণ বেদনা সুমধুর ! যে সবারে মনােময়,
-যতই সে সবে করি অনুভব আমি, এ হৃদয়
৯২

মাধুরী
ততই যেনগাে কেঁদে ওঠে; কি অভাবে ক্ষিপ্ত হয়
যেন চিত্ত মম। মুহুর্মুহু উঠি’ শিহরিয়া, আমি
সেইক্ষণে যেন কোন্ রহস্য-পাথারে যাই নামি
পুলকিত ব্যথার মতন! কার তরে এ ব্যথায়
কেঁপে কেঁপে’, কেঁদে কেঁদে মরি হেন, জান ? প্রভু, হায়-
সে শুদ্ধ তােমারি লাগি ।
একে একে সকল সম্ভোগ
সংসারের ভুঞ্জিয়া তো দেখিলাম ! বুঝেছি এ রােগ,
হে মাের ওষধি, তুমি বিনে সারিবার নহে কভু !
বহুবারি জানিয়াছি—চাহি তােমারেই; কিন্তু, তবু,
এমনি বিভ্রান্তি কি এমনি গাে মায়া-লীলা তব,
তবু এ বিম্বেরি মাঝে খুজিয়াছি পরম বৈভব!
বিম্ব-মুগ্ধ, লুব্ধ প্রায় যেই পড়িয়াছি ঝম্ফ দিয়া
অমনি এ নেশা-ঘাের কাটিয়া গিয়াছে। প্রাণ-প্রিয়া
প্রেয়সী আমার সাধ্বী; তারে ভালবাসিয়া যে ক্ষণে
করিয়াছি প্রেমভরে বক্ষে আলিঙ্গন, মাের মনে
অমনি জেগেছে চিন্তা, এ প্রচণ্ড অতৃপ্তির জ্বালা –

মাধুরী
যেন আরাে কারে চাই, যেন কষ্ঠে দিব্যরত্নমালা-
ভ্রমে, পরেছি এ গুঞ্জা-হার। যেন প্রিয়ের মাঝারে
চাহি—চাহি প্রিয়তম, আরাে কিছু, আরাে যেন কারে
চাহি না শুধুই তারে দেব ।
এইমত বিশ্বে এই
পার্থিব সৌন্দর্য্যে, প্রেমে, সম্ভোগে চরম শান্তি নেই,
ঠেকিয়া শিখেছি আজি ; তাই, ক্ষণতরে প্রাণাধিক,
ভ্রান্তি জাল দূরে গেছে এ জীবন হ’তে। আজি ঠিক
জেনেছি হে প্রাণনাথ, তুমি ছাড়া আর কিছুতেই
তৃপ্তি নাহি অভাবের ; সবি ব্যর্থ ;-চাহি তােমারেই।
হেনভাবে, অহরহ এ সংসারে সর্ব কৰ্ম্মে মাের
জাগে অনিবাৰ্য অবসাদ ; সৰ্ব্ব দৃশ্যে এ অন্তর
করে ঘাের আর্তনাদ ; যেন এ জীবনে কি অসহ
জাগিছে বেদনা নিত্য, নিদারুণ, অসীম বিরহ।
v
হে আমার অন্তৰ্য্যামি, সকলি তত জানাে ! তবে কেন
দিতেছ এ জ্বালা মােরে? তুষানলে কেন তবে হেন
দহিতেছে নিরন্তর ? এসএস হৃদয়ের ধন,
এসহে সৰ্বস্ব মাের, হে অন্ধের অস্ফুট নয়ন,
৯৪

মাধুরী
হে মাের চেতনা, শান্তি, ওগাে মাের মরণের প্রাণ,
হে মাের অমৃত, ওগাে আনন্দের সিন্ধু সুমহান,
এসএস বক্ষে এস ! স্নিগ্ধ কর এ তাপিত হিয়া !
ডুবাও-ডুবাও দেব, তােমা মাঝে মােরে আবরিয়া!
নিবাও—এ দাহ্ মম! ক্ষম—ক্ষম যত অপরাধ
করিয়াছি ও চরণে নাথ। মিটাইয়া সৰ্ব্ব সাধ
এস—এস হে মধুর, সার্থক করিয়া আজি মােরে ;
ক্ষণতরে দেহ মােরে শান্ত, পূর্ণ, সঞ্জীবিত করে !
এসাে নাথ, প্রভু মাের, এসাে ওগাে, এস প্রাণেশ্বর,
সহিতে পারিনা আর এ বিরহ!-- দহিছে অন্তর ।

মাধুরী
মাধুরী
গান গাহি। কেন গাহি ? -কহিবার কিছু নাহি !
আজি বিশ্বে শুধু হেরি -
মাধুরী অপার !
তবে, বৃথা হাহাকার
কেন আর-কেন আর ?
ডুবে যা’ রে এ অমৃতে
পরাণ আমার ।
৯৬

বিজ্ঞাপন।

No text on this page.

শ্রীদেবকুমার রায়চৌধুরী-প্রণীত
গীতিকাব্য
অরুণ।
ছাপা, কাগজ, বাঁধাই অত্যুৎকৃষ্ট। মূল্য,-আট আনা মাত্র।
যাবতীয় মাসিক ও সংবাদপত্রে “অরুণের সমালােচনা বাহির
হইয়াছে। এস্থলে মাত্র কয়েকটি মতামত উদ্ধত হইল।
.
* অনেকদিন পরে প্রাণের কবিতা পাঠ করিয়া আমরা
সত্য সত্যই শান্তিলাভ করিলাম। দেবকুমারবাবু সৌন্দর্য্যের সেবক,
কিন্তু সে সৌন্দৰ্য্য দেবােপভােগ্য, তাহাতে অন্য কোন গন্ধ নাই
বসুমতীতে স্থানাভাব, নতুবা দেবকুমারবাবুর কবিতাগুলি এক একটি
করিয়া তুলিয়া দেখাইতাম যে, কেমন সরলসুন্দর তাহার কবিতা,
কেমন প্রাণস্পর্শী তাহার ব্যাকুলতা, কেমন ননসুবাসে তাহার কুঞ্জ
আমােদিত।
বসুমতী।
* যথেষ্ট কবিত্বশক্তি প্রকাশিত হইয়াছে,
সময়।
“কবির মৌলিকতা মৃগনাভির মত সৌরভ-সম্পদশালী।
-প্রতিবাসী।
* * * A dawning genius.”—The Amrita Bazar
Patrika,

( ৪ ) “যিনি বাল্যে অথবা শৈশবে এই প্রকার বীণাঝার করিতে শিখিয়াছেন, পরিণত বয়সে তাঁহার বংশীধ্বনিতে যে সমগ্র বঙ্গভূমি উন্মাদিনী হইবে, তাহা নিশ্চিত। * # ”—–বিকাশ। * কবি ‘অরুণে’ যে কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন তাহাতে আশা করা যায়, একদিন তিনি কাব্যসংসারে শ্রেষ্ঠ অসিন গ্রহণ করিবেন।” বাঁকুড়াদর্পণ। “পাঠ করিয়া দেখা গেল, কবিতায় লালিত্যের পারিপাট্য আছে, * * রচনা ভাব-রসযুক্ত। পাঠ করিয়া আমরা প্রীতিলাভ করিয়াছি। জন্মভূমি। “নবীন কবি দেবকুমারের মৌলিকত্বের অভাব নাই ; সেই মৌলি- কত সরস, সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী -নবযুগ। * * বড় মধুর লাগিল।” বরিশাল-হিতৈষী। The volume before us is rich in the promises of a distinguished poetical career; for, the author of which, we trust, will be dedicated to the services of his country, To no higher mission can a poot address himself than to be the guide and instructor of his people and to lead them upwards and onwards to a higher and nobler life. Dante was the creator of modern Italy. Who is to be the poet of the regenerated India ? To the young poet, whose verses We are reviewing, we can offer no nobler career more worthy of the gifts, of which there is so much evidence in the book before us. The style of the author is o one ( ৫ ) simple and sonorous, his thoughts pure and olevating. We commend the poem to the favourable notice of the public. -The Bengalee. * * অরুণের কবি চিন্তাশীল ও ভাবুক। * * * কবির প্রাণের ভিতর প্রবেশ করিতে আয়াস পাইতে হয় না।”-উৎসাহ। * * * কবিতাগুলি সরল ও সুন্দর। পাঠ করিলেই নবােগ কবিত্বশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। * * * *---বঙ্গভাষা। এt ৪ + + দেবকুমার দেবশিশু, কাব্য-রাজ্যের অনিন্দিত স্ফুট কুসুম। দেবকুমারের ভাষা ভাল, রুচি, ভাল, শিল্প-নৈপুণ্য ভাল। * * * গ্রন্থকারের ভবিষ্যৎ বড় উজ্জ্বল ! * * * নব্যভারত। অরুণের লেখা যেমন প্রাঞ্জল তেমনি মধুরতাপূর্ণ । --কাশীপুর নিবাসী। The yoaog author, ia his first attempt at authorship has, however, not only shown that he has in him those tendencies of life which can stimulate and inspire the higher instincts of men, and contribute towards their steady growth and developement, but also that he has in him the instinctive genius of a poet--that natare had sown in him with all the care of a kind mother, the Seeds of a life, which is pre-eminently fit for metrical composition. His sweet and simple style, his chaste and elegant thoughts and sentiments are the onmistakable index of the poetic talents which he poossessea. "Aran" la

verily the dawn of that glorious day. *** And it will live,
for it is verily "A thing of beauty."-The Indian
Mirror.
‘অরুণ তরুণ কবির প্রতিভারুণের অরুণালােক।
ইহার ভাষাটি সহজ ও সুখবােধ্য,কবিতাগুলিতে সরস্বতীর
ক্রীড়াশীল পদের মঞ্জীরধ্বনি শুনা যায় না—কিন্তু শান্ত, সৌম্য,
ধীর গমনে তিনি যেন তরুণ কবির কুঞ্জে আসিয়া তাহার ললাটে
ভাবী সুশের স্বপ্ন আঁকিয়া দিতেছেন।
ভারতী।
উক্ত গ্রন্থকার-প্রণীত
গীতিকাব্য
প্রভাতী
এন্টিক কাগজে চেরি-প্রেসের ছাপা, সিল্কে বাঁধানাে।
মূল্য-৮০ বারাে আনা।
অসংখ্য সমালােচনার দুই একটি মাত্র
এ স্থলে উদ্ধত হইল।
“ আমরা এমন সরল, সুন্দর, পবিত্র, উচ্চভাবপূর্ণ কবিতা
অতি কমই পড়িতে পাই। * কোনটি ছাড়িয়া কোটি উদ্ধৃত
করিব ?—আগাগােড়াই উদ্ধত করিতে ইচ্ছা করে।
-বসুমতী।
প্রভাত-শিশির-শিক্ত পুষ্পপুঞ্জসম মনােমদ।
বঙ্গবাসী।
==

( ৭ ) এ# এই কাব্য-নদী সরল, স্বাভাবিক ভাবে বহিয়া গিয়াছে। বিলাস লালসার গন্ধমাত্র না থাকিলেও, রসগ্রাহী পাঠক-পাঠিকা ইহাতে অবগাহিত হইয়া পরম তৃপ্তিলাভ করিবেন। ** -সময়। সার শ্রীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-“* * অতি সুন্দর। ভাষা যেমন সরল, সুন্দর, অর্থপূর্ণ; ভাবও তেমনি পবিত্র, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী।” কবিবর শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়—“মােটের উপর খুবই ভালাে লাগিয়াছে। *” কবিবর শ্রীযুক্ত নবীনচন্দ্র সেন-“* প্রভাতী পড়িয়াছি; ততােধিক সৌভাগ্যের কথা, বুঝিয়াছি। এখনকার বাঙ্গালা কবিতা প্রায়ই বুঝিতে পারিনা। এ কবিতাগুলি সম্বন্ধে আমিও বলিতে পারি- “যাটি বর্ষ মম, পড়িলে তথাপি শিরায় শিরায় শােণিত নাচে।” উক্ত গ্রন্থকার-প্রণীত নূতন পুস্তক ব্যাধি ও প্রতিকার। { স্বদেশী-আন্দোলন ও জাতীয় পুনরুত্থান-বিষয়ক গ্রন্থ।) অতি বিশদরূপে এই পুস্তকে “স্বদেশী-আন্দোলনের সর্বাঙ্গীন সমালােচনা আছে। আমাদের কি কি অভাব, এবং তন্নিবারণের উপায় ( ৮ ) কি তাহা নির্দিষ্ট হইয়াছে। এরূপ পুস্তক বঙ্গভাষায় অদ্যাপি প্রকাশিত হয় নাই। স্বদেশী তুলট কাগজে, সম্পূর্ণ স্বদেশীভাবে মুদ্রিত। মূল্য—- আট আনা মাত্র। বঙ্গদেশের যাবতীয় সংবাদ ও মাসিকপত্র এবং মনস্বী সমালােচক- বর্গ এই গ্রন্থের একবাক্যে সুখ্যাতি করিয়াছেন। এস্থলে মাত্র কয়েকটি অভিমত উল্লিখিত হইল। কবিবর ৩ নবীনচন্দ্র সেন। “ব্যাধি ও প্রতিকার পাঠ করিয়া স্তম্ভিত হইয়াছি। ** আমি সমালােচক নহি, সমালােচনা জানি না। তবে এই মাত্র বলিতে পারি যে, আপনি কাছে থাকিলে আপনাকে বুকে লইয়া এ জীবনে একটি অভূতপূর্ব পরিতৃপ্তি লাভ করিতাম। আপনি প্রকৃতই দেবকুমার। এমন দেব-পুত্র বঙ্গদেশে তত আর নাই ; অন্য দেশে আছে কিনা, জানি না। * ইহার পর আপনার ও আমার যে এক মত তাহা বােধ হয় আর বলিতে হইবে না।” বঙ্গের অদ্বিতীয় কবি-দার্শনিক শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। “ব্যাধি ও প্রতিকার সম্বন্ধে যাহা বক্তব্য তাহা অবক্তব্য। কারণ, সেটা একটা স্তবের মত শশানাবে। এর ভাষা অতুল। * এই ভাষাই গদ্যের ভাষা হওয়া উচিত। অনর্থক আড়ম্বর-শূন্য, অনাবশ্যক বিশেষণ- হীন,-সুবােধ্য, অথচ সতেজ এবং সরল। উপমার প্রাচুর্যে ভারাবনত নয়, অথচ সঙ্গীতময় । + * ভাব সম্বন্ধে—আমার সঙ্গে সবই মেলে। মাঝে মাঝে বােধহয় আমার হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। পরবর্তী (৯ ) যুগের তুমিই সর্বশ্রেষ্ট কবি ও লেখক, আমি অকুতােভয়ে এই ভবিষ্যৎ বাণী কলাম।” প্রসিদ্ধ কবি ও সমালােচক শ্রীযুক্ত বিজয়চন্দ্র মজুমদার। “দেশে নবশক্তি জাগিয়াছে। যােহ্মার ঘােড়ার মত কর্মক্ষেত্রে চুটিয়া যাইবার জন্য সকলেই যেন উৎসুক এবং চঞ্চল। যতক্ষণ চীৎকার করিয়া নিদ্রিত জাতিকে জাগাইবার প্রয়ােজন ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত, কি কাজ করিতে হইবে, কেমন করিয়া কাজকর্ম চালাইতে হইবে, এ সকল কথা ভাল করিয়া ভাবিবার আবশ্যক হয় নাই। এখন এই কৰ্ম্ম-দীক্ষিত জাতিকে উপযুক্ত পথে চালাইয়া কাৰ্য্য সাধনের সময় উপস্থিত। প্রথম উৎসাহটুকু যদি অবিবেচিত কাৰ্য্যে কিম্বা অকাৰ্য্যে ব্যয়িত হয় তবে সকল উদ্যোগ, সকল উৎসাহ এক নিমিষের মধ্যে ফুরাইয়া যাইবে। এই সময়ে বিশেষ করিয়া বুঝিয়া লইবার প্রয়ােজন, যে আমাদের যথার্থ অভাব কি, এবং সেই অভাব দূর করিবার উপায় কি। ঠিক সেই কথা বুঝাইবার জন্যই আপনি এই গ্রন্থখানি রচনা করিয়াছেন। * * অতি আবশ্যকীয় কথাগুলি যে প্রকার সরল ভাষায় ও সংক্ষেপে ব্যক্ত হইয়াছে, বিশেষ বিচার্য বিষয় গুলি যে প্রকার চিন্তাশীলতা এবং অপক্ষপাতিত্বের সহিত সমালােচিত হইয়াছে, এবং আমাদের সামাজিক দোষগুলি যেপ্রকার নির্ভয়ে এবং অকপটভাবে প্রদর্শিত হইয়াছে তাহাতে এই গ্রন্থ পাঠে সকল শ্রেণীর লােকই উপকৃত হইতে পারিবেন।” মনস্বী লেখক শ্ৰীযুক্ত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। * পড়িয়া দেখিলাম, অধিকাংশ স্থলেই আমার সহিত এতটা মিলিয়া গেল যে, সমালােচনার অবসর পাওয়াই দুষ্কর। যাহা হউক, কাব্য- ( ১০ ) • রসের সহিত রাজনীতিরসের একত্ৰাৰস্থিতি সামঞ্জস্যের সহিত ঘটিতে পারে, আপনি তাহার একটি দৃষ্টান্ত দেখাইলেন। ইহা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।” দেশ-পূজ্য, সার শ্রীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। * ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, এই পুস্তক গ্রন্থ- কর্তার চিন্তাশীলতার প্রচুর পরিচয় প্রদান করিতেছে। গ্রন্থের ভাষা অতি সরল, সুন্দর ও তেজস্বী; এবং ভাবগুলি অতি উন্নত ও হৃদয়গ্রাহী #” অকৃত্রিম স্বদেশ-হিতৈষী, মহাপ্রাণ শ্ৰীযুক্ত অশ্বিনীকুমার দত্ত। “ব্যাধি ও প্রতিকার” পড়িলাম। পড়িয়া মনে হইল—গ্রন্থকার জাতীয় ব্যাধি-নির্ণয়ে যেরূপ, ঔষধি নির্বাচনেও তদ্রুপ পারদর্শিতা দেখাইয়াছেন। ইনি যে অল্প দিনের মধ্যে একজন ভিষকশ্রেষ্ঠ হইয়া আমাদিগের ব্যাধি নাশ করিতে অগ্রণী হইবেন, ইহা ধ্রুব বিশ্বাস করি। পুস্তকখানির ভাব ও ভাষা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি।” “প্রবাসী”তে কবিবর শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। “শ্রীযুক্ত দেবকুমার রায়চৌধুরী ১৩১৩ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে “ব্যাধি ও প্রতিকার” নামক একখানি পুস্তিকা রচনা করিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। অদ্য তাহা পাঠ করিয়া আমি আনন্দের সহিত স্বীকার করিতেছি যে, গত শ্রাবণ মাসের “প্রবাসী” পত্রে আমার “ব্যাধি ও প্রতিকার প্রবন্ধে আমি হিন্দু-মুসলমানের বিচ্ছেদ সম্বন্ধে যে প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়াছি শ্রীযুক্ত দেবকুমারের গ্রন্থে তাহা সুন্দররূপে আলােচিত ( ১১ ) হইয়াছে। অথচ সে সময়ে হিন্দু-মুসলমানের সংঘর্ষ উৎকট হইয়া উঠে নাই। গ্রন্থকার এই গ্রন্থে নিপুণভাবে ও সরল ভাষায় ভারতবর্ষের বর্তমান অবস্থার বিচার করিয়া যে প্রাজ্ঞতা প্রকাশ করিয়াছেন তাহাতে দেশের প্রধানগণের নিকট হইতে তিনি সাধুবাদ লাভ করিয়াছেন ;-- তাহার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিয়া পাঠকগণকে এই গ্রন্থ পাঠ করিতে অনুরােধ করি বসুমতী। ১৬ই ভাদ্র, ১৩১৩। “কবিবর দেবকুমার বাবু আমাদের দেশে রাজনৈতিক চিকিৎসাক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তিনি যথার্থই রােগ-নির্ণয় করিয়াছেন, এবং তিকারের পথ সুন্দরভাবে দেখাইয়া দিয়াছেন। আমরা গদ্য-সাহিত্য- ক্ষেত্রে এই কবি-চিকিৎসককে সাদরে অভ্যর্থনা করিতেছি। পুস্তক- থানি বড়ই আন্তরিকতাপূর্ণ।” বঙ্গবাসী। ৩০শে ভাদ্র, ১৩১৩। “রায়চৌধুরী মহাশয় সুকবি। তিনি সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত। * * আলােচ্য গ্রন্থে ভাষায় ও ভাবনায় সাহিত্যেরই মৰ্য্যাদা রক্ষিত হইয়াছে। লিখনভঙ্গীতে ওস্তাদির প্রমাণ পাই। ** * * রায়চৌধুরী মহাশয়ের গ্রন্থে যাহা লেখা আছে, তাহা এখন ভাবিবারই কথা।” সময়। ২৯শে ভাদ্র, ১৩১৩। * আমরা এতদিন মনে করিতাম, দেবকুমার বাবু কবিতা লেখাতেই সিদ্ধহস্ত। কিন্তু, তিনি যে প্রবীণের ন্যায় চিন্তা করিতে পারেন, এবং অতি সুন্দর ও প্রাঞ্জল গদ্য লিখিতে পারেন তাহা জানিতাম না। এই পুস্তকে প্রত্যেক প্রবন্ধ স্বদেশ-হিতৈষণায় অনুপ্রাণিত ও মুখরিত। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, পলিত-কেশ বৃদ্ধেরাও পুস্তক পাঠ করিয়া এই ( ১২ ) চরজীবী হও, * উপকৃত হইবেন। * এই গ্রন্থ বঙ্গের ঘরে ঘরে বিরাজিত থাকা উচিত। পুস্তকখানি আগাগােড়া স্বদেশী কাগজে মুদ্রিত হইয়াছে। ** নবযুগ। ৩রা কার্তিক, ১৩১৩ | “গ্ৰন্থখানি পাঠ করিয়া গ্রন্থকর্তাকে সত্য সত্যই “দেবকুমার” বলিয়া পূজা করিতে বাসনা হয়। * আমাদের মতে, গদ্যের ভাষা এরূপই হওয়া উচিত। * যেখানে ভাষায় তেজস্বিতা প্রযুক্ত হইয়াছে সেখানেই যেন গ্রন্থকারের অতুল ন্যায়-নিষ্ঠা, স্পষ্টবাদিতা এবং বিচার-শক্তির অপূৰ্ব্ব বিকাশ লক্ষিত হয়। * আজ একাগ্রচিত্তে ভগবানকে সাক্ষী করিয়া বলিতেছি—“দেবকুমার, তুমি তুমি অমরত্ব লাভ করিলে !” THE BENGALEE. NOV. 9, 1906.- In it the author bas entered upon a thoughtful inquiry into the causes of our national degradation. We have no hesitation in saying that his proposals deserve the most careful consideration, Self sacrifice is & virtue which can not be too highly extolled and Babu Deva-kumar very properly gives it the most prominent place among the specifica he has prascribed for our well-being. We commend the book to the favourable acceptance of our readers and we hope it will be very widely read as it deservos to be. The style is graceful and chatty and writing, as the author does, with a feeling heart the book has a charm all its own. বাহুল্য অনাবশ্যক। অতি অল্প সংখ্যক মাত্র পুস্তক অবশিষ্ট রহিয়াছে। যাহাদের প্রয়ােজন, অবিলম্বে অর্ডার পাঠাইবেন। শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায়। ২০১ নং কর্ণওয়ালীস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Madhuri

Author
Raychowdhury,debkumar
Title
Madhuri
File name
Madhuri
Text
OCR done
Citation
1909
Published
2009/11/27
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
RayChowdhury,Debkumar
DLI number
512874
Barcode
4990010019906.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
fwrymQipIBt
Download PDF

Madhuri