Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Soundarnanda Kabya

Laha ,bimalacharan · 2010/01/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সৌৱনন্দ কাব্য
শ্রীবিমলাচরণ লাহা, এম-এ, বি-এল,
কর্তৃক
বঙ্গভাষায় অনুবাদিত
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এ সক
২০৩১১ কর্ণওয়ালিস ষ্টীট, কলিকা
আষাঢ়-১৩২৯

গীহুবিসি২৪
সুরঙ্গাব্দ
চট্টোপাধ্যায়
এ সঙ্গ
মূল্য ১ এক টাকা
প্রিন্টার—শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী
কালিকা প্রেস
২১, নন্দকুমার চৌধুরীর ২য় লেন, কলিকাতা

অনুবাদকের কথা মহাকবি অশ্বঘােষ-বিরচিত “সৌন্দরনন্দ” মহাযান-বৌদ্ধ গ্রন্থের মধ্যে একখানি সুন্দর কাব্য। ইহা আজ পর্যন্ত কোন ভাষায় অনূদিত হয় নাই বলিয়া আমার বিশ্বাস, তাই বাঙ্গলা ভাষায় ইহা অনুবাদ করিতে আমি প্রবৃত্ত হইয়াছি। মূলের অস্পষ্টতার জন্য স্থানে স্থানে অনুবাদ প্রাঞ্জল করিতে পারা যায় নাই, দুর্বোধ্যই থাকিয়া গিয়াছে। অনুবাদকালে শ্ৰীযুক্ত কালীপদ তর্কাচাৰ্য কাব্য-ব্যাকরণ-তর্ক-তীর্থ এবং শ্ৰীযুক্ত দক্ষিণাচরণ ভট্টাচাৰ্য মহাশয়দ্বয় আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রধান সংস্কৃতাধ্যাপক শ্রদ্ধেয় শ্ৰীযুক্ত নীলমণি চক্রবর্তী এম-এ মহাশয় এবং পাটনা কলেজের সংস্কৃতধ্যাপক শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার শাস্ত্রী এম-এ, পি- আর-এস, মহাশয় আমার পাণ্ডুলিপিখানি সংশােধন করিয়া দিয়াছেন। প্রবাসীর সহকারী সম্পাদক শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বি-এ, মহাশয়ের নিকট হইতে আমি অনেক বিষয়ের সাহায্য পাইয়াছি। ইহারা সকলেই আমার ধন্যবাদাহঁ। মহামহােপাধ্যায় শ্ৰীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এম-এ, সি-আই- ই, মহাশয় এই পুস্তকখানির অমূল্য ভূমিকা লিখিয়া দিয়া আমাকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করিয়াছেন। ২৪ নং সুকিয়া স্ত্রী কলিকাতা শ্ৰীৰ্বিমলাচরণ লাহা ২১ জুন ১৯২২

No text on this page.

ভূমিকা
সতর আঠার শত বৎসর পূর্বে ভারতবর্ষে কণিষ্ক নামে
এক রাজা ছিলেন। পুরুষপুর বা পেশােয়ার তাহার রাজধানী
ছিল। তাঁহার রাজত্ব খুব প্রকাণ্ড ছিল। একজন ইউরােপের
পণ্ডিত বলিয়াছেন তাহার রাজত্বের একদিকে বিন্ধ্যপর্বত ও
আর একদিকে আটাই পৰ্বত ছিল। তিনি এই প্রকাও
ভূখণ্ডের একচ্ছত্র রাজা ছিলেন। আফগানিস্থা ও পারস্যের
অধিকাংশ স্থান তাহার রাজ্যভুক্ত ছিল। তাঁহার টাকায়
অনেক সময় অগ্নিকুণ্ড ছাপা থাকিত, অনেক সময় মানুষের
কঁাধে চঁাদ আঁকা থাকিত, অনেক সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের চিহ্ন
থাকিত। অনেকের বিশ্বাস তিনি বৌদ্ধ ছিলেন, অথবা শেষে
বৌদ্ধ হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার সময় বৌদ্ধধর্মের যে খুব
শ্ৰীবৃদ্ধি হইয়াছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।
তাহার রাজসভায় ভারতবর্ষের তিন জন বড় মােক
ছিলেন। একজনের নাম চরক, একজনের নাম মাঠর,
একজনের নাম অশ্বঘােষ। চরক কবিরাজ ছিলেন ; মাঠর
প্রধান মন্ত্রী ছিলেন ; অশ্বঘােষ গুরু ছিলেন।
প্রােফেসর সিল্ভা লেভি চীন হইতে আনিয়া আমাদের
দিয়াছেন। চরক চরকসংহিতার কৰ্ত্তা। মাঠর কপিল-সূত্রের
ভাষ্যকার, ইহাই অনেকের ধারণা ; এ ধারণা
এ খবরটি
সত্যও

•
;
হইতে পারে, মিথ্যাও হইতে পারে, কারণ চরক ও মাঠর
দুইটিই ব্রাহ্মণের গােত্র। সুতরাং কণিষ্কের সভার চরকই
যে কবিরাজী অত্রি-সংহিতার প্রতিসংস্কার করিয়াছিলেন
একথা সাহস করিয়া বলা যায় না। মাঠরের কথাও তাই।
তবে অশ্বঘােষের কথা স্বতন্ত্র। তিনি সুবর্ণাক্ষীর পুত্র ; তাঁহার
বাড়ী সাকেতনগরে ; তিনি গােড়ায় ব্রাহ্মণ ছিলেন; তাহার
পরে বৌদ্ধধৰ্ম্ম লইয়া খুব বড় পণ্ডিত হইয়াছিলেন। তিনি যে
বৌদ্ধধৰ্ম্ম কেবল প্রচারই করিতেন তাহা নহে, গানে তাহার
খুব দক্ষতা ছিল, দর্শনশাস্ত্রে তিনি একজন প্রগাঢ় পণ্ডিত
ছিলেন এবং তাহার উপর তিনি মহাগুরু ছিলেন। দেশের
লােকে তাঁহাকে অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা করিত। একসময়ে কণিষ্ক
আসিয়া পাটলিপুত্র অবরােধ করেন। পাটলিপুত্রের রাজা
যুদ্ধের কিছুই উদ্যোগ করেন নাই, তিনি টাকা দিয়া কণিষ্কের
সহিত সন্ধি করিতে বাধ্য হইলেন। কণিষ্ক নয় কোটি টাকা
দাবি করিয়া বসিলেন। রাজার টাকা ছিল না। তিনি
বুদ্ধদেবের ভিক্ষাপাত্র দিলেন। উভয় পক্ষে ডাকিয়া তাহার
মূল্য হইল তিনকোটি। আর তিনি অশ্বঘােষকে দিলেন।
উভয়পক্ষে ডাকিয়া তাহারও মূল্য হইল তিন কোটি। দেশের
লােকে অশঘােষকে কত ভক্তি করিত ইহা হইতে তাহার কিছু
বােঝা যায়।
অশ্বঘােষ পেশােয়ারে গিয়া কণিষ্কের গুরু হইলেন এবং
সেখানে গিয়া নানারূপ বই লিখিতে লাগিলেন। তাঁহার

০ দর্শনশাস্ত্রের বই “মহাযানশ্রদ্ধোৎপাদসূত্র।” তখনও মহাযান জমে নাই, কিন্তু মহাসাঘিকেরা ক্রমে মহাযানী হইয়া যাইতেছিল। এই শ্রদ্ধোৎপাদসূত্রে সেকালের বৌদ্ধদের অনেক মত জানিতে পারা যায়। পরে যখন নাগার্জুন আর্যদেবের আমলে মহাযান খুব জমিয়া আসিল, তখন দেখা গেল মহাযানের যা-কিছু জড় সবই শ্রদ্ধোৎপাদসূত্রে ছিল, বরং আবৃত্ত বেশী ছিল, কারণ মহাযানের ভিতর যখন ভিন্ন ভিন্ন মত চলিতে লাগিল তখন সকলেই শ্রদ্ধোৎপাদসূত্রের দোহাই দিত। সূত্রালঙ্কার বলিয়া অশ্বঘােষের আর-একখানি বই ছিল। সেখানিও দর্শনের বই, কিন্তু সেখানি একেবারেই পাওয়া যায় না। বহুকাল পরে অসঙ্গ সেই সূত্রালঙ্কার ধরিয়া আর-একখানি সূত্রালঙ্কার লেখেন। মহাযানে যে যােগাচার মত আছে, সেইখানি তাহাদের প্রধান সূত্র। জাপানী পণ্ডিত সুজুকি শ্রদ্ধোৎপাদসূত্র ইংরেজীতে তর্জমা করিয়াছেন, আর প্রােফেসার লেভি সাহেব অসঙ্গের সূত্রালঙ্কার ফরাসী ভাষায় তর্জমা করিয়াছেন। কিন্তু দর্শনের বই লইয়া আমাদের কাজ নাই, আমাদের কাজ কাব্য লইয়া। অশ্বঘােষ বুদ্ধচরিত নামে একখানি কার লিখিয়াছেন। কাব্যখানি ২৮ সর্গে। বুদ্ধদেবের জন্ম হইতে মরণ পৰ্য্যন্ত সব ঘটনা এই পুস্তকে ছিল। পূরা পুস্তক এখনও পাওয়া যায় নাই। পূরা তর্জমা কিন্তু চীনে ভাষায় আছে। তাহারও আবার ইংরেজী তর্জমা হইয়াছে। সংস্কৃতে ১৪ সর্গ । মাত্র নেপালে পাওয়া গিয়াছে। কাউয়েল সাহেব দুইশত বৎসরের পুরাণ দুইখানি নেওয়ারী পুথি দেখিয়া ওই ১৪ সর্গ ছাপাইয়াছিলেন। পুথি অনেক জায়গায় পােকায় কাটা ছিল ; সে জায়গাগুলি বাদ দিয়া ছাপিতে হইয়াছে। যখন কাউয়েল সাহেব বই ছাপেন, তখন নেওয়ারী অক্ষরও ভাল করিয়া লােকে পড়িতে পারিত না, এবং “স”র জায়গায় “গ” হইয়াছে এবং “গ”র জায়গায় “স” হইয়াছে। নেপাল দরবারের পুথিখানায় একখানি অতি প্রাচীন তালপাতায় লেখা পুথি আছে, সেও চৌদ্দ সর্গ। কিন্তু তাহা পােকায় কাটা নহে। অশ্বঘােষের একখানি নাটক পাওয়া গিয়াছে। তার দেশের মরুভূমি খুড়িয়া উহা পাওয়া গিয়াছে। সবটা পাওয়া যায় নাই, খানিক খানিক পাওয়া গিয়াছে। আমি ১৯০৭ সালে যখন কাউয়েলের ছাপা বইয়ের সঙ্গে দরবারের পুথিখানি মিলাইতেছিলাম, পুথিখানার সুব্বা সাহেব আমাকে বলিলেন, অশ্বঘােষের আর-একখানি মহাকাব্য আছে। আমি দেখিতে চাহিলে তিনি দুইখানি পুথি আনিলেন। এক- খানি অতি প্রাচীন তালপাতায় লেখা। তালপাতার পুথিখানির লেখা অংশটি ধনুকের মত হইয়া পচিয়া গিয়াছে। উপরের একটি কি দুটি ছত্র ঠিক আছে, তারপর প্রতি ছত্রেই খানিক খানিক নাই। কোন রকমে দুইখানি পুথি একত্র করিয়া আমি সৌন্দরনন্দখানি ছাপাইয়াছি। যেরূপ আসল পুঁথি পাইয়াছিলাম তাহাতে ছাপা যে নির্দোষ হইবে তাহার সম্ভাবনা

vo
বড় কম। যাহা হউক, ছাপা হইয়া গিয়াছে। ছাপা হইয়া
যাওয়ার পর দেখিলাম যে সৌন্দরনন্দ বইখানি আমাদের দেশে
অপরিচিত নহে। আমাদের একজন পূর্বপুরুষ সৰ্বানন্দ বড়য্যে
যখন ১১৫৯ সালে দশখানি টীকা দেখিয়া অমবকোষের একখানি
বিশ্বকোষী টীকা লেখেন, তখন সৌন্দরন কাব্য হইতে অনেক
প্রয়ােগ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। মতিলালদের পূর্বপুরুষ
বৃহস্পতি মহিন্তা যিনি রাজা গণেশের নিকট রায়মুকুট উপাধি
প্রাপ্ত হইয়াছিলেন এবং যিনি ইংরেজী ১৭৩১ সালে অমরকোষের
আর-একখানি টীকা লেখেন তিনিও সৌন্দরনন্দ হইতে উদাহরণ
সংগ্রহ করিয়াছিলেন। অষ্টম শতকের একখানি জৈন বইয়ে
সৌন্দরনন্দের কয়েকটি খুব ভাল কবিতা ভােলা আছে।
দীপাে যথা নিবৃতিমভপেতে
নৈবনিং গচ্ছতি নান্তরীক্ষং।
দিশং ন কাঞ্চিৎ বিদিশং ন কাঞ্চিৎ
স্নেইক্ষয়াৎ কেবলমেতি শান্তিম্ ॥
তথা কৃতী নিবৃতিমভপেতে
নৈবনিং গচ্ছতি নান্তরীক্ষং।
দিশং ন কাঞ্চিৎ বিদিশং ন কাঞ্চিৎ
ক্লেশক্ষয়াৎ কেবলমেতি শান্তিং ।
সুতরাং বইখানি ব্রাহ্মণেরাও যত্ন করিয়া পড়িতেন,
বৌদ্ধেরাও যত্ন করিয়া পড়িতেন, জৈনেরাও যত্ন করিয়া
পড়িতেন। বইখানিতে কালিদাসের মত “নবনবােন্মেষিণী

ly০ শক্তি” অথবা নূতন জিনিষ গড়ার শক্তি দেখিতে পাওয়া যায় । কিন্তু উহার ভাব ভাষা কবিত্ব অত্যন্ত চমৎকার। অনেক সময় কালিদাস এই গ্রন্থ হইতে ভাব লইয়াছেন। নমুনা দেখুন- মার্গাচলব্যতিকরাকুলিতেব সিন্ধুঃ । শৈলাধিরাজতনয়া ন যযৌ ন তস্থে । কালিদাস। তং গৌরবং বুদ্ধগতং চকর্ষ ভাৰ্যানুরাগঃ পুনরাচকর্ষ। সােহনিশ্চয়ান্নপি যুযৌ ন তস্থে তরংস্তরঙ্গেধিব রাজহংসঃ । অশ্বঘােষ। গল্পটি অতি সরল। বুদ্ধদেব বাপের বাড়ী আসিয়াছেন, কিন্তু ভিক্ষা করিয়া খান এবং আপনার শিষ্যশ্রাবক লইয়া বাহিরের বাগানে থাকেন। তাঁহার এক বৈমাত্রেয় ভাই ছিল, নাম নন্দ। বুদ্ধদেব যখন বিবাগী হইয়া গেলেন তখন বাবা ভাবিলেন—“আচালাও যেদিকে যায় পাচালাও সেদিকে যায়,” নন্দও ত বিবাগী হইয়া যাইতে পারে, তাই তাহার বিবাহ দিলেন। এমন একটি সুন্দরী কন্যা দিলেন যে নন্দ তাহাতে একেবারে মজিয়া গেল। দুটিতে কখনও কাছ-ছাড়া হয় না। ইহাদের ভালবাসা বর্ণনা করিতে গিয়া অশ্বথােষ যেরূপ গুণপনা দেখাইয়াছেন সেসব অন্য কবিতে বড় পাওয়া

l/
নন্দ গিয়া
যায় না। একদিন তাহারা বসিয়া একখানি আরসির সম্মুখে
নানারূপ কীৰ্ত্তি করিতেছেন, এমন সময়ে দাসী আসিয়া
খবর দিল বুদ্ধদেব তােমার বাড়ী ভিক্ষা করিতে আসিয়া-
ছিলেন, কাহাকেও না পাইয়া ফিরিয়া গেলেন।
শুনিয়া তাড়াতাড়ি বুদ্ধদেবকে ঠাণ্ডা করিবার জন্য যাইতে চায়,
সুন্দরী যাইতে দেয় না। শেষে শীঘ্র আসিব বলিয়া নন্দ চলিয়া
গেল। বুদ্ধদেব তখন একটু আগে গিয়াছেন। নন্দ পিছনে
পিছনে যাইতে লাগিল। বুদ্ধদেব এগলি ওগলি করিয়া অনেক
ঘুরিয়া শেষে আপনার আশ্রমে গিয়া উপস্থিত।
তাহাকে ধরিল এবং অনেক কাকুতি মিনতি করিয়া তাহাকে
ফিরিয়া যাইতে বলিল। বুদ্ধদেব কিন্তু রাজী হইলেন না, তখনই
নাপিত ডাকাইয়া তাহার মাথা মুড়াইয়া ভিক্ষু করিয়া দিলেন
এবং তাহার শিক্ষার ভার বৈদেহ মুনির হাতে দিয়া দিলেন।
দু চারদিন বাদে বৈদেহ আসিয়। বুদ্ধদেবকে খবর দিল—নন্দ
সংসারে ফিরিয়া যাইতে চায়, সে তাহার স্ত্রীকে ছাড়িয়া থাকিতে
চাহে না। বুদ্ধদেব নন্দের কাছে গেলেন এবং তাহার হাত
ধরিয়া বলিলেন, “চল নন্দ, বেড়াইতে যাই।” নিকটেই হিমালয়।
বুদ্ধদেব হিমালয়ে উঠিতে লাগিলেন। বন, জঙ্গল, ফোয়ারা,
ঝরণা পার হইতে হইতে এক জায়গায় বুদ্ধদেব দেখিলেন এটা
কাণা বানরী কি করিতেছে। বুদ্ধদেব চন্দকে জিজ্ঞাসা
করিলেন, “তােমার স্ত্রী কি এই বানরী অপেক্ষা সুন্দরী ?”
নন্দ বলিল, “সে কি! এটা বানরী, আর সে অনুপম সুন্দরী,

তার সঙ্গে কি এটার তুলনা হয়?” বুদ্ধদেব আর কিছুই
বলিলেন না, ক্রমে উঠিতে লাগিলেন, উঠিতে উঠিতে একেবারে
স্বর্গে গিয়া উপস্থিত। সে একেবারে ইন্দ্রভুবন, কাছেই নন্দনবন,
অপ্সরীরা নৃত্য করিতেছে, বিদ্যাধরেরা গান করিতেছে। বুদ্ধদেব
এক অপ্সরাকে দেখাইয়া নন্দকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “অপ্সরা
সুন্দরী, না তােমার স্ত্রী সুন্দরী ?” নন্দ বলিল, “বানী হইতে
আমার স্ত্রী যত তফাৎ, আমার স্ত্রী হইতে এই অপ্সরারা ততই
তফাৎ।” বুদ্ধদেব বলিলেন, “একটি অঙ্গরা লইবে ?” নন্দ
বলিল, “হ্যা।” বুদ্ধদেব বলিলেন, “তবে তপস্যা কর, বিনা
তপস্যায় ত অপ্সরা পাওয়া যায় না।” নন্দ বলিল, “হ্যা, তা
করিব।”
বুদ্ধদেব তাহাকে আবার আশ্রমে ফিরাইয়া
আনিলেন ও তপস্যায় লাগাইয়া দিলেন।
সে খুব তপস্যা
করিতে লাগিল, অতি কঠোর তপস্যা করিতে লাগিল।
কিন্তু বুদ্ধদেবের শিষ্যেরা তাহাকে ঠাট্টা করিতে লাগিল,
বলিতে লাগিল, “নন্দ অপ্সরার জন্য তপস্যা করিতেছে।”
তখন নন্দর তপস্যা একটু মিষ্ট লাগিয়াছে। সে বলিল, “আমি
অপ্সরা চাহি না, আমি তপস্যাই করিব।” বুদ্ধদেব তাহাকে
অনেক উপদেশ দিলেন, সে একাকী নির্জনে তপস্যা করিতে
লাগিল। এক সময়ে সে যেমন স্ত্রীর প্রতি একাগ্র হইয়া
গিয়াছিল, এখন শুধু তপস্যার চরম ফল নির্বাণলাভের
জন্য একাগ্র হইয়া উঠিল। এবং অল্পদিনের মধ্যেই তাহার
সিদ্ধিলাভ হইল। সে আসিয়া বুদ্ধদেবকে প্রণাম করিয়া

1/০
বলিল, “গুরুদেব, তুমি আমাকে সংসারপথ হইতে উদ্ধার করিয়া
পরমপদ পাওয়াইয়া দিলে।” বুদ্ধদেব বলিলেন, “তা বেশ
হইয়াছে, তােমার কাজ শেষ হইয়াছে। কিন্তু বসিয়া থাকিলে
চলিবে না, তুমি আর লােককে এই পথে আনিবার চেষ্টা
কর।” নন্দ বাহির হইল। লােকে আশ্চর্য হইয়া দেখিতে
লাগিল যে ঘাের বিলাসী নন্দ পরমযােগী হইয়াছে। অনেকে
নন্দের চেলা হইতে লাগিল। সুন্দরী আসিয়া নন্দের চেলা
হইল। কাব্য শেষ হইল।
অশ্বঘােষ বলিয়াছেন দর্শনের বই আমি অনেক লিখিয়াছি।
তাহাতে বিশেষ ফল হয় নাই। তাই আমি কাব্যের ছলে মুক্তির
পথ দেখাইয়া দিতে বসিয়াছি। ব্যায়রাম হইলেও লােকে তিক্ত
ঔষধ খাইতে চাহে না, সেইজন্য তাহাকে মধু মিশাইয়া ঔষধ
খাওয়াইতে হয়। আমি এখানে তাহাই করিলাম।
এই অপূর্ব গ্ৰন্থখানি স্নেহভাজন শ্ৰীযুক্ত সিমলাচরণ লাহা
মহাশয় বাঙ্গালা গদ্যে তর্জমা করিয়া বাঙ্গালীকে উপহার
দিতেছেন। বিমলা-বাবুর বিশেষ পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক।
কারণ তিনি সাহিত্যজগতে সুপরিচিত কলিকাতার লাহা-
বাবুদের ঘরের ছেলে। ধনে ও মানে তাহারা খুব উচু
হইয়াছেন, বিদ্যাতেও তাঁহারা উচু হইতেছেন। বিমলা-বাবুর
বৌদ্ধধর্মের উপর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা আছে। তাহার অনেক লেখা
বড় বড় কাগজে বাহির হইয়াছে।
শ্রীহরপ্রসাদ শাস্ত্রী

No text on this page.

সুচীপত্র
প্রথম সর্গ
কপিলবাস্তব “ন
পৃঃ ১-৯
দ্বিতীয় সর্গ
রাজবর্ণন
পৃঃ ১০-১৯
তৃতীয় সর্গ
তথাগত বর্ণন
পৃঃ ২০-২৬
চতুর্থ সর্গ
ভাৰ্যাযাচিতক
পৃঃ ২৭-৩৪
পঞ্চম সর্গ
নন্দ প্রব্রাজন
পৃঃ ৩৫-৪৩
ষষ্ঠ সগ
ভাৰ্য্যাবিলাপ
পৃঃ ৪১-৫১
সপ্তম সগ
নন্দ বিলাপ
পৃঃ ৫২-৬০
অষ্টম সগ
স্ত্রী বিঘাত
পৃঃ ৬১-৭০
নবম সগ
মদাপবাদ (মত্তত নিষেধ )
পৃঃ ৭১-৭৯

পৃঃ ৮০-৮৯
পৃঃ ৯০-৯৭
পৃঃ ৯৮-১০৩
দশম সগ
স্বর্গ-নিদর্শন
একাদশ সগ
স্বৰ্গাপবাদ
দ্বাদশ সগ
প্রত্যবমর্শ ( অনুসন্ধান বা ধ্যান)
ত্রয়ােদশ সগ
শীল ও ইন্দ্রিয়-জয়
চতুর্দশ সগ
আদি প্রস্থান
পঞ্চদশ সগ
বিতর্ক পরিহার
যােড়শ সগ
আর্যসত্য ব্যাখ্যা
সপ্তদশ সগ
০ ০
পৃঃ ১০৪-১১০
০ ০ ০
পৃঃ ১১১-১১৮
পৃঃ ১১৯-১২৭
০ ০৫
পৃঃ ১২৮-১৪২
অমৃত প্রাপ্তি
পৃ: ১৪৩-১৫৩
অষ্টাদশ সর্গ
আজ্ঞাব্যাকরণ
পৃঃ ১৫৪-১৬৫

সৌন্দৱনন্দ কাব্য
(অনুবাদ)
প্রথম সর্গ
কপিলবাস্তু বর্ণন
১। ধাৰ্ম্মিকশ্রেষ্ঠ গােতমগােত্রীয় কপিল মুনি কক্ষীবতের
পুত্র গােতমের ন্যায় তপস্যায় অত্যন্ত শ্রান্ত হইয়াছিলেন।
২। কাশ্যপের ন্যায় যাহার দীপ্ত বিস্তৃত তপস্যা তেজের
জন্য বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া কাপের ন্যায় উত্তম সিদ্ধি আশ্রয়
করিয়াছিল।
যিনি হবি ও আত্মপালনের জন্য বশিষ্ঠের ন্যায়
গােপালন করিতেন। এবং তপস্বী শিষ্যগণের নিকট বশিষ্ঠের
ন্যায় গভীর উপদেশ প্রয়ােগ করিতেন।
৪। যিনি মাহাত্ম্যে দ্বিতীয় দীর্ঘপা ঋষির ন্যায় এবং
বুদ্ধিতে কাব্য (শুক্র) ও আঙ্গিরসের (বৃহস্পতি) তৃতীয় স্থান
অধিকার করিয়াছিলেন।
৫। উক্ত তপস্বিপ্রবর কপিলের তপঃক্ষেত্র ও বাসস্থান
হিমালয়ের শুভকর পার্শ্বে ছিল।

৭। সৌন্দরনন্দ কাব্য যে স্থানে সুন্দর লতা ও বৃক্ষরাজি, এবং অতিশয় স্নিগ্ধ ও মৃদু শাদলসমূহ শােভা পাইত, এবং চন্দ্রাতপবৎ প্রতীয়মান যজ্ঞীয় হবিধূমে যে স্থান সর্বদা মেঘের ন্যায় দেখা যাইত। যে স্থানে বালুকাসমূহমণ্ডিত বিস্তৃত বিস্তৃত ভূমিভাগ কোমল ও স্নিগ্ধ এবং ইতস্ততঃ-বিক্ষিপ্ত কেসর-পু দ্বারা আবৃত থাকায় পাণ্ডুবর্ণতা-প্রযুক্ত যেন অঙ্গরাগযুক্ত বলিয়া বােধ হইত। যে-সকল তীর্থ বলিয়া খ্যাত সরােবরের চিন্তা করিলেও পবিত্রতা জন্মে, এরূপ কতিপয় পদ্ম-সরােবর থাকায় যাহাকে বন্ধুযুক্ত বলিয়া মনে হইত। স্থানে প্রচুরফুলপুস্পযুক্ত বনরাজি বর্তমান থাকায় মানব উপায়বিশিষ্ট মনুষ্যের ন্যায় শােভা ও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইত। ১০। সেই স্থানে নীবার-ফল-সন্তুষ্ট স্বস্থ শান্ত ঔৎসুক্য- শূন্য বহু তাপস থাকিলেও ঐ স্থানকে অত্যন্ত শূন্য বলিয়া বােধ হইত। যে স্থানে কেবল যজ্ঞীয় অগ্নিতে আহুতি দিবার শব্দ এবং কেকারবকারী ময়ুরগণের ও অভিষেক-কালে তীর্থজলের শব্দ শ্রুত হইত। ১২। যে স্থানে পবিত্র যজ্ঞবেদিতে হরিণগণ নিদ্রিত থাকায় দেখা যাইত যেন লাজযুক্ত মাধবীপুষ্প দ্বারা উপহার কল্পনা করা হইয়াছে। ৯। ১১।

কপিলবাস্তু বর্ণন
যে স্থানে শান্ত ভাবে ক্ষুদ্র মৃগসমুহ মৃগগণের সহিত
বিচরণ করায় মনে হইত যেন শরণ্য মুনিগণের নিকট তাহারা
বিনয় শিক্ষা করিয়াছে।
১৪। পরস্পর-বিরুদ্ধ বহু শাস্ত্র থাকায় পুনর্জন্ম বিষয়ে
সন্দেহ উপস্থিত হইলেও প্রত্যক্ষদর্শীর ন্যায় (দৃঢ় বিশ্বাস
সহকারে ) তপস্বিগণ তথায় তপস্যা করিতেন।
১৫। যে স্থানে কেহ কেহ ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ করিত, কেহ
কেহ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিত না। যথাকালে সােমরস দ্বারা
যাগ করিত, অকালে করিত না। ( অথবা অকালে
মরিত না)।
যে স্থানে তাপসসমূহ নিজ শরীরে নিরপেক্ষ
থাকিয়া ধৰ্ম্মকেই একমাত্র ধন ভাবিয়া আনন্দসহকারে অতি
যত্নে তপস্যা আচরণ করতেন।
১৭।
যে স্থানে স্বর্গের প্রতি অত্যন্ত-আগ্রহ-বশে তাত্যন্ত
শ্রম সহকারে মুনিগণ তপস্যার আচরণ করায় যেন তপােরাগ
হেতু তাহারা ধর্মের লুণ্ঠন করিতেন।
১৮। পরে এক সময় কতিপয় ইক্ষাকুবংশীয় রাজপুত্র সেই
তেজস্বিগণের আশ্রয়ভূমি তপােবনে বাস করিবার জন্য গমন
করিলেন।
১৯। তাহাদের শরীর সুবর্ণময় স্তম্ভের তুল্য, বক্ষস্থল
সিংহের ন্যায়, ভুজদ্বয় বিশাল, মহৎ এই আখ্যার যােগ্য এবং
শ্রী ও বিনয়ের আশ্রয়স্থল

3
সৌন্দরন কাব্য
২০। ২)। সম্মানাহ মহাত্মা প্রাজ্ঞ সেই ইক্ষাকুতনয়গণ
অযােগ্য চঞ্চলচিত্ত প্রজ্ঞাশূন্য কনিষ্ঠ ভ্রাতৃব্যের মাতৃরূপে
প্রাপ্ত সম্পদ সহ্য করিতে না পারায় পিতার সত্য রক্ষার
অনুরােধে বনে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন ।
২২। মুনি গােতম-গােত্রীয় কপিল তাহাদের উপাধ্যায়-
পদ গ্রহণ করিলেন, অতএব তাহারা কৌৎসগােত্র হইয়াও গুরুর
গােত্রানুসারে “গৌতম” হইলেন।
যেমন একই মাতা ও পিতার সন্তান হইয়াও পৃথক
গুরু স্বীকার করায় রাম গার্গ হইলেন এবং বাসুভদ্ৰ গােতম
হইলেন।
২৪। তাঁহারা শাকবৃক্ষ-বেষ্টিত নিজ বাসভূমি নির্মাণ
করিয়া বাস করায় জগতে ইক্ষাকুবংশীয় হইয়াও শাক্য নামে
বিশ্রুত হইলেন।
২৫। ২৬। মুনি উর্ব যেমন কুমারের, ভার্গব যেমন
সগরের, কথ যেমন শকুন্তলাগৰ্ভজাত শক্তিমান্ ভরতের, এবং
ধীমান্ বাল্মীকি যেমন প্রশস্তবুদ্ধিসম্পন্ন মৈথিলী-পুত্রের
( লব ও কুশের ) নিজ বংশােচিত জাতক-সংস্কারাদি সুসম্পন্ন
করিয়াছিলেন, সেইরূপে গােতমও তাহাদের নিজ-বংশােচিত
ক্রিয়াবলী সুসম্পন্ন করিলেন।
২৭। সেই বন কপিল মুনি এবং সেই শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয়গণের
অবস্থান হেতু শান্ত ও রক্ষিত হইয়া একই কালে ব্রাহ্মণ ও
ক্ষত্রিয়ের শ্রী ধারণ করিয়াছিল।

কপিলবাস্তু বর্ণন
২৮।
পরে একদিন সেই কপিল মুনি একটী জল-কলস
লইয়া আকাশে উঠিয়া রাজপুত্রগণের বৃদ্ধি কামনায় তাহাদিগকে
বলিলেন।
২৯। অক্ষয়-সলিল সম্পন্ন এই কলস হইতে যে ধারা
পতিত হইবে তাহা লঙঘন না করিয়া যথাক্রমে আমার অনু-
গমন কর।
পরে “ভাল” এই কথা বলিয়া মস্তক নত করিয়া
মুনিকে প্রণাম করিয়া শীঘ্রগামী বাহনে অলঙ্কৃত রথে তাঁহার
সকলে আরােহণ করিলেন।
অনন্তর তঁাহারা রথে মুনির অনুগামী হইলে তিনি
আকাশে যাইয়া উক্ত আশ্ৰমভূমিকে জলধারায় বেষ্টন
করিলেন।
৩২। নানাবিধ মাঙ্গলিক উপকরণে ঐ ভূমিকে সুরভি
করিয়া জলধারা দ্বারা অষ্টাপদের (পাশার ছক) ন্যায় চিহ্নিত
করিয়া রাজপুত্রগণকে বলিলেন।
৩৩। আমি যখন স্বর্গে যাইব তখন তােমরা ধারা-বেষ্টিত
রথ-নেমি-চিহ্নিত এই স্থানে পুর নিৰ্মাণ করিবে।
পরে সেই মুনি স্বর্গে প্রস্থান করিলে একদা সেই
বীর রাজপুত্রগণ যৌবনে উদ্দাম হইয়া অঙ্কুশশূন্য গজের ন্যায়
চারি দিকে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
৩৫। তাহাদের অঙ্গুষ্ঠে অঙ্গুলিত্ৰাণ (দস্তানা), হস্তে
কাৰ্ম্মক শরপূর্ণ মহাতৃণ, এবং বসন দৃঢ়ভাবে বদ্ধ।
৩৪।

সৌন্দরন কাব্য
৩৬। তাহারা বনে হস্তী ও শার্দল প্রভৃতির উপর নিজ
কৃতহস্ত পরীক্ষা করিয়া বনবাসী দুষ্মন্তনন্দনের অলৌকিক
কার্য্যের অনুকরণ করিয়াছিলেন ।
৩৭। পরে মুনিগণ যখন দেখিলেন উ হারা ব্যাঘ্ৰশিশুর
স্যায় বড় হইয়া নিজ স্বভাব প্রাপ্ত হইয়াছেন, তখন তাহারা
উক্ত বন পরিত্যাগ করিয়া হিমালয় পর্বত আশ্রয় করিলেন ।
পরে যখন রাজপুত্রগণ দেখিলেন সমস্ত মুনিগণ বন
ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন, বন শূন্য, তখন তাহারা দুঃখে সর্পের
স্থায় দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করিলেন।
৩৯। তার পর উন্নতির সময় উপস্থিত হওয়ায় সেই
পুণ্যকৰ্ম্মা রাজপুত্রগণ নিধিজ্ঞ ব্যক্তিগণের কথাক্রমে সেই স্থানে
বহু নিধি (ভূমি-প্রােথিত অর্থ) প্রাপ্ত হইলেন।
৪০। শত্রুহীন প্রচুর রত্নরাশি প্রাপ্ত হইলে তাহা দ্বারা
ধৰ্ম্ম অর্থ কাম এই ত্রিবর্গ সাধন করা যাইতে পারে।
৪১। অতএব তাহা প্রাপ্ত হইয়াও কর্মের পরিণাম বশতঃ
সেই স্থানে রাজপুত্রগণ
রাজপুত্রগণ সুন্দর একটী পুরী নিৰ্মাণ
করিলেন।
৪২। তাহার চারিদিকে নদী তুল্য বিস্তীর্ণ পরিখা,
অভ্যন্তরে বিস্তৃত রাজপথ, শৈলের ন্যায় উচ্চ প্রাচীর, তাহা
যেন একটা অপর “গিরিব্রজ” (অর্থাৎ মগধ দেশের প্রাচীন
রাজধানী রাজগৃহ)।
৪৩। তাহাতে সুন্দর শুভ্রবর্ণ অট্টালিকা, তথায় বহু আপণ

কপিলবাস্তু বর্ণন
সুবিন্যস্ত, নানাবিধ হৰ্ম্মমালা, যেন উহা হিমালয়ের সুন্দর
গম্বর।
৪৪। সেই স্থানে যটকৰ্মশালী বেদ-বেদাঙ্গাভিজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ
দ্বারা তাহারা শান্তি ও বৃদ্ধির জন্য জপাদি করাইয়াছিলেন।
৪৫। সেই ভূমি আক্রমণের জন্য যাঁহারা উদ্যত হইতেন
তাহাদের নিবৃত্তির জন্য নিজ প্রভাবে ভৃত্যগণ দ্বারা দণ্ডনীতি
প্রয়ােগ করাইতেন।
৪৬। যাহারা চারিত্রসম্পন্ন, ধনবান্, সলজ্জ ও দূরদর্শী
এবং মাননীয় এমন শৌর্যশালী দক্ষ আত্মীয়গণকে পৈত্রিক
পদে নিযুক্ত করিতেন ।
৪৭। বুদ্ধি বাক্য ও বিক্রম প্রভৃতি এক এক গুণযুক্ত
ব্যক্তিগণকে নিজ নিজ যােগ্য কাৰ্যে সচিবরূপে নিযুক্ত
করিতেন।
যেমন কিন্নরীগণ দ্বারা মন্দর পর্বত শােভমান হয়,
সেইরূপ ধনী, অবিভ্রান্ত, প্রচুরবিদ্যাসম্পন্ন, ও বিস্ময়শূন্য ব্যক্তি-
গণ দ্বারা যে পুরী শােভমান হইত।
৪৯। যে স্থানে হৃষ্টচেত রাজপুত্রগণ পৌরগণের প্রিয়
কামনায় সুন্দর উদ্যান নির্মাণ করাইয়াছিলেন। সেইগুলি যেন
তাহাদের যশের আগার স্বরূপ হইয়াছিল।
৫০। চারিদিকে তাহারা উৎকৃষ্ট-জলসম্পন্ন মঙ্গলময়
পুষ্করিণীসমূহ নিজবুদ্ধিবলেই নির্মাণ করাইয়াছিলেন, কাহারও
আজ্ঞাক্রমে নহে।
৪৮।

৮ সৌন্দরনন্দ কাব্য ; ৫১। তাহারা পথে পথে এবং উপবনে উপবনে মনােজ্ঞ সুন্দর প্রষ্ঠিসমূহ’ (?) এবং চতুর্দিকে কূপযুক্ত সভাস্থান স্থাপন করিয়াছিলেন। ৫২। সেই পুর হস্তী অশ্ব ও রথে পরিব্যাপ্ত ছিল ; উহা অসঙ্কীর্ণ ও অনাকুল। (তথায় ) কাহারও ধনাদি গুপ্ত ছিল না। জ্ঞান এবং পরাক্রম লইয়া কেহ গর্ব করিত না। ৫৩। উহা যেন অর্থের একমাত্র সন্নিধিক্ষেত্ৰ, তেজের একমাত্র আশ্রয়, বিদ্যার একমাত্র বাসভবন, সম্পদের একমাত্র সঙ্কেতস্থান ছিল। ৫৪। গুণবাগণের বাসবৃক্ষ, আশ্রয় প্রার্থীজনগণের অনন্য- সাধারণ আশ্রয়, শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির উৎসাহের স্থান, ও বীরগণের আলান স্বরূপ ছিল। ৫৫। ঐ বীৰ্যশালী রাজপুত্রগণ সভা, উৎসব, দান, ক্রিয়া প্রভৃতি দ্বারা সমস্ত বস্তুর আশ্রয় সেই পুরীটীকে অলঙ্কত করিয়াছিলেন। ৫৬। তাহারা কাহারও নিকট হইতে অন্যায়রূপে কর গ্রহণ করিতেন না বলিয়া অল্পকাল-মধ্যে সেই পুরী লােকে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল । ৫৭। তাহারা সেই পুরী মহর্ষি কপিলের আশ্রমে করিয়া- ছিলেন বলিয়া তাহার নাম হইল কপিলবাস্তু। ৫৮। ককন্দ, মকন ও কুশাম্বের আশ্রমে যেরূপ পুরীর কথা শােনা যায়, কপিলের আশ্রমেও সেইরূপ সেই পুরী।

কপিলবাস্তু বর্ণন ৬০। ৫৯। ইন্দ্রতুল্য সেই রাজপুত্রগণ আৰ্যজনােচিত তেজ ও নিরহঙ্কারিতা সহকারে সেই পুরে থাকায় যযাতির পুত্রগণের ন্যায় নিত্য কীৰ্ত্তি প্রাপ্ত হইলেন। যেমন সহস্র সহস্র তারকা আকাশে থাকিলেও চন্দ্র না উঠিলে আকাশের শােভা হয় না, সেইরূপ উক্ত রাজ- পুত্রগণ সত্ত্বেও রাজ্য অরাজক থাকায় তেমন শােভা পাইল না। পরে বৃষগণের মধ্যে যেমন শ্রেষ্ঠ বৃষভ, বৃষভ, সেইরূপ ভ্রাতৃগণের মধ্যে যিনি গুণে ও বয়সে উচ্চ তাহাকে, আদিত্যগণ যেমন ইন্দ্রকে স্বর্গের রাজা করেন সেইরূপ, রাজা করিলেন, কারণ তাহারা জ্যেষ্ঠভ্রাতার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। পরে ইন্দ্র যেমন দেবগণে পরিবৃত হইয়া স্বর্গরাজ্য পালন করেন সেইরূপ আচারনিষ্ঠ বিনয়ী নীতিজ্ঞ ক্রিয়াতৎপর জ্যেষ্ঠ শাক্য রাজচ্ছত্র ধারণ করিয়া ভ্রাতৃগণে পরিবৃত হইয়া ধৰ্ম্মের জন্য রাজ্য পালন করিতে লাগিলেন, ইন্দ্রিয়সুখের জন্য নহে। সৌন্দরনন্দ কাব্যে প্রথম সর্গ সমাপ্ত দ্বিতীয় সর্গ রাজবর্ণন ১। পরে কালক্রমে একদা বিশুদ্ধক্রিয়ান্বিত জিতেন্দ্রিয় রাজা শুদ্ধোদন সেই বংশে জন্মগ্রহণ করিলেন। ২। যিনি সর্বদা সাধু জিনগণের কাম্য বস্তুতে সর্বদা রত থাকিতেন ; ঐশ্বৰ্য্যলাভে কখনও গর্বিত হইতেন না ; সমৃদ্ধিহেতু পরকে অবমাননা করিতেন না এবং পরের ঐশ্বৰ্য বা ব্যবহানাদিতে দুঃখিত হইতেন না। ৩। তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন মানসিক- বল-ও-বুদ্ধিসম্পন্ন বিক্রমবান্ নীতিজ্ঞ ধীর ও সৌন্দৰ্য্যবিশিষ্ট ছিলেন। ৪। তঁাহার বিরাট বপু থাকিলেও তিনি জড় ছিলেন না। । তিনি দক্ষিণ (পরচ্ছন্দানুবর্তী) হইলেও অসরল ছিলেন না। তেজস্বী হইলেও ক্ষমাশীল ছিলেন না তাহা নহে (অর্থাৎ ক্ষমাশীল ছিলেন)। এবং কাৰ্য্য করিয়া অহঙ্কার করিতেন না। ৫। যুদ্ধকালে শত্রুগণ কর্তৃক আক্ষিপ্ত হইলে নিজ তেজস্বিতাহেতু সমরে বিমুখতা অবলম্বন করিতেন না এবং সুহৃগণ তাহার আশ্রয় গ্রহণ করিলে দানের ইচ্ছায় কখনও বিমুখ হইতেন না।

রাজবর্ণন
১১
৬। যিনি পূর্ব পূর্ব রাজগণ কর্তৃক আচরিত ধৰ্ম্মপথে
সর্বদা থাকিবার ইচ্ছায় রাজ্যটীকে দীক্ষামন্ত্রের ন্যায় গ্রহণ
করিয়া চরিত্রে পিতৃপুরুষগণের অনুবর্তন করিতেন।
৭। ধাঁহার সুন্দর ব্যবহারে এবং রক্ষণে প্রজাগণ নিরুদ্বেগে
যেন পিতার ক্রোড়ে সুখে বাস করিত।
যে কোনও শাস্ত্রজ্ঞ বা শস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি বা উন্নতকুলে
উৎপন্ন ব্যক্তি তাহার দৃষ্টিতে পতিত হইতেন তাহার
সাফল্যের অভাব হইত না।
৯। যাঁহাকে হিতকর অপ্রিয় কথা বলিলেও অক্ষুব্ধভাবে
শ্রবণ করিতেন, বহু অপকার বিস্মৃত হইয়া অল্পমাত্র উপকারও
স্মরণ করিতেন।
১০। যে তাহার নিকট নত হইত তাহাকে তিনি অনুগ্রহ
করিতেন ; বংশের শত্রুগণের সহিত
যুদ্ধ
করিতেন ; বিপন্নগণকে
রক্ষা করিতেন এবং | গৃহধৰ্ম্ম ছাড়িয়া ] বাহার পথে বাহির
হইয়াছে (অর্থাৎ উচ্ছঙ্খল ) তাহাদিগকে শাসন করিতেন।
১১। তাহার রাজ্যে তদীয় অনুবর্তী জনগণ যেমন তাহার
চরিত্র অনুকরণ করিয়া ধনাদি অৰ্জন করিত, এইরূপ গুণগুলিও
অৰ্জ্জন করিত।
১২। তিনি পরব্রহ্ম-বিষয়ে অধ্যয়ন করিতেন ; সতত ধৃতি
হইতে চ্যুত হইতেন না; সৎপাত্রে দান করিতেন ; কোনও
পাপকাৰ্য্য করিতেন না।
১৩। উৎকৃষ্ট অশ্ব
অশ্ব যেমন উদ্যত রথদণ্ড বহন করে

১২ সৌন্দরন কাব্য সেইরূপ যিনি ধৈৰ্য্যসহকারে প্রতিজ্ঞা পালন করিতেন ; সত্য- ভ্রষ্ট হইয়া মুহূৰ্তমাত্র জীবিত থাকিবার কামনা রাখিতেন না। ১৪। (তিনি) বিদ্বান্গণের সম্মান করিতেন। চরিত্রবত্তা হেতু শশাভা পাইতেন। আশ্বিনমাসের চন্দ্রের ন্যায় (শারদ চন্দ্রমার ন্যায়) শিষ্টব্যক্তিগণের নিকট তিনি দীপ্তি (অথবা অনুরাগ ) পাইতেন। ১৫। যিনি বুদ্ধিবলে ও শাস্ত্রজ্ঞান-বলে ঐহিক ও আমুষ্মিক মঙ্গল জানিয়া লইতেন। ধৈৰ্য্য ও বীৰ্যবলে ইন্দ্রিয় ও প্রজাসমূহের রক্ষা করিতেন। ১৬। যিনি আৰ্ত্তগণের দুঃখ এবং শত্রুগণের বিস্তৃত যশ হরণ করিতেন। এবং নীতি দ্বারা নিজের প্রচুর যশের সহিত ভূমি লঞ্চয় করিতেন। ১৭। দুঃখিত ব্যক্তিগণকে দেখিয়া স্বভাবত তাঁহার হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হইত। অন্যায়রূপে ধন সংগ্রহ করিয়া কখনও যশ হইতে বিচ্যুত হইতেন না। ১৮। মিত্রগণ গুণহীন হইলেও সৌহার্দ ও দৃঢ়ভক্তি হেতু তাদিগকে (তিনি) ত্যাগ করিতে চাহিতেন না। প্রসন্নাননে তাহাদিগকে সদুদ্দেশ্যে নিজ বিভব দান করিতে চাহিতেন। ১৯। পূজ্যগণকে অগ্রভাগ নিবেদন না করিয়া তিনি স্বয়ং কিছুই আহার করিতেন না। প্রখর তৃষ্ণা দ্বারা গাে দোহনের ন্যায় অধৰ্ম্ম দ্বারা পৃথিবী দোহন করিতেন না। ২০। কখনও তিনি যুদ্ধের (বা পাপাদি রূপ কলির )

রাজবর্ণন
সৃষ্টি করিতেন না। ( সকল সময়েই ) সম্রাটের সম্মানেই
থাকিতেন না। ধৰ্ম্মের জন্য শাস্ত্র দ্বারা বুদ্ধি পূর্ণ করিতেন
কিন্তু কীর্তির জন্য নহে।
২১। তিনি ক্লিষ্টকৰ্ম্মা, তিনি ক্লেশের যােগ্য ব্যক্তিকে ও
কখনও ক্লেশ দিতেন না। আৰ্যভাব-প্রযুক্ত শত্রুরও গুণ
থাকিলে তাহাতে তিনি দ্বেষ করিতেন না।
২২। চন্দ্র যেমন নিজ মূৰ্ত্তির শােভায় সকলের দৃষ্টি
আকর্ষণ করে, সেইরূপ তিনি শরীর-শােভায় প্রজাগণের দৃষ্টি
আকর্ষণ করিতেন। সর্পের বিষম বিষের ন্যায় পরস্ব স্পর্শ
করিতেন না।
২৩। তদীয় রাজ্যে কাহারও দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া কেহ
হীন হইয়া পড়িত না। তাহার হস্তস্থিত কাক আগণের
অভয় বিধান করিত।
২৪। কেহ তাহার নিকট অপরাধ করিয়াও প্রিয়বাক্যে
প্রণত হইলে তাহাকে তিনি দর্পণের ন্যায় নিৰ্ম্মল দৃষ্টি ও কোমল
বাক্যে আশ্বস্ত করিতেন।
২৫। তিনি বিষয়ের আসক্তি পরিত্যাগ করিয়া বহু বিদ্যা
অভ্যাস করিয়াছিলেন। এবং সত্যযুগের ধৰ্ম্মে বৰ্তমান থাকিয়া
অতিকষ্টেও ধৰ্ম্ম হইতে বিচ্যুত হইতেন না।
২৬। যিনি গুণরাশি ও মিত্রসম্পদে নিত্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত
হইতেন ; বৃদ্ধগণের আনুগত্য করিতেন এবং বিগর্হিত আচার
অবলম্বন করিতেন না।

১৪
সৌন্দরন কাব্য
২৭। (তিনি) শরসমূহ দ্বারা শত্রুর উপশম করিতেন,
গুণ দ্বারা বন্ধুগণকে প্রীত করিতেন, দোষ করিলেও ভৃত্যগণকে
তাড়াইতেন না, প্রজাগণকে করগ্রহণে পীড়ন করিতেন না।
২৮। পালন এবং বীরত্ব দ্বারা নিখিল পৃথিবীতে বীজ
বপন কবাইতেন। এবং স্পষ্ট দণ্ডনীতি দ্বারা চৌর প্রভৃতি
নিশাচরদিগকে উচ্ছেদ করিতেন।
২৯। (তিনি) রাজর্ষি-আচার দ্বারা কুলে যশ স্থাপন
করিয়াছিলেন। তেজঃপুঞ্জে আদিত্য যেমন অন্ধকার নাশ করে
সেইরূপ (তিনি) শত্রু নাশ করিয়াছিলেন।
৩০। (তিনি) সৎপুত্রোচিত গুণ দ্বারা পিতৃপুরুষগণের
খ্যাতি সম্পাদন করিয়াছিলেন। মেঘ যেমন জল দান করিয়া
প্রজাবৃন্দকে আলাদিত করে সেইরূপ তিনি চারিত্র দ্বারা
প্রজাগণকে আহ্লাদিত করিয়াছিলেন।
৩১। (তিনি) অজস্র বিপুল দান করিয়া বিপ্রগণ দ্বারা
সােমযাগ করাইতেন। রাজধৰ্ম্মনিষ্ঠতা হেতু তিনি সময়কে
অর্থ-প্রসব করাইতেন।
৩২। বাগী রাজা কাহাকেও অধৰ্ম্মকথা বলাইতেন
। সম্রাট-সদৃশ শুদ্ধোদন ধৰ্ম্মের জন্য পরকে উৎসাহিত
করিতেন।
৩৩। (তিনি) তাহার সৈন্যগণ দ্বারা কখনও অন্য রাজ্য
ধ্বংস করিতেন না। উদ্যম সহকারে ভৃত্যগণ দ্বারা শত্রুর দর্প
( মাত্র) বিনাশ করাইতেন। (অর্থাৎ শত্রু নরপতিকে যুদ্ধে

রাজবর্ণন ১৫ পরাজিত করিতেন, কিন্তু সেখানকার প্রজাগণকে উৎপীড়িত করিয়া অর্থ লুণ্ঠনাদি করিতেন না।) ৩৪। (তিনি) নিজ গুণরাশির দীপ্তিতে কুল উজ্জ্বল করিতেন। সব ধৰ্ম্ম যথাযথ ব্যবস্থিত থাকায় প্রজাগণকে শােধন করিতে হইত না। যাগপ্রবণ রাজা যথাকালে অশ্রান্তভাবে যজ্ঞভূমির পরিমাণ করিভেন, ( অর্থাৎ যজ্ঞভূমি মাপাইয়া যজ্ঞক্রিয়া নিষ্পন্ন করিতেন )। যথাযােগ্য পালন হেতু দ্বিজগণ নিরুদ্বিগ্ন থাকায় ব্রহ্মসাক্ষাৎকারে আনুকূল্য করিতেন। ৩৬। (তিনি) গুরুগণ দ্বারা যথাকালে যথাবিধানে সােমরস পরিমাণ করাইয়া লইতেন। তপ ও তেজে শত্রুসৈন্য- গণকে লঘু করিয়া দিতেন। ৩৭। পরমধর্মবিৎ রাজা প্রজাগণের সূক্ষাধৰ্ম্ম স্থাপন করিতেন ; ধৰ্ম্মজ্ঞতা হেতু যথাকালে স্বর্গভােগ উৎপাদন করিতেন। ৩৮। অর্থকষ্ট হইলেও স্পষ্ট অধাৰ্ম্মিককে প্রতিষ্ঠিত করিতেন না। (অর্থাৎ আপৎকালেও অধাৰ্মিক কর্মচারী কর্তৃক প্রজাপীড়ন করিয়া অর্থ সংগ্রহ করিতেন না।) প্রিয় বলিয়াই অনুরাগহেতু অশক্তকে বর্ধিত করিতেন না [ অর্থাৎ তাহার প্রিয়পাত্রকেও তাহার বিদ্যাবুদ্ধির অনুপযুক্ত উচ্চপদে নিযুক্ত করিতেন না।] ৩৯। (তিনি) নিজ শারীরিক ও মানসিক বলে দৃপ্ত

সৌন্দরনন্দ কাব্য
রিপুগণকে দগ্ধ করিতেন, প্রদীপ্ত কীর্তিপ্রভায় সমস্ত পৃথিবীকে
দীপ্ত করিতেন।
৪০। রাজা ক্রুরতাশূন্য হওয়ায় সর্বদা অর্থীকে দান
করিতেন কিন্তু কীর্তির জন্য নহে। পরম উৎকৃষ্ট দ্রব্য দান
করিয়াও তাহার প্রখ্যাপন করিতেন না।
৪১। তাহার নিকটে শত্রও শরণাগত অবস্থায় থাকিলে
তাহাকে তিনি ত্যাগ করিতেন না। অতি উদ্দপ্ত শত্রুকে
জয় করিয়াও বিস্ময়ে অভিভূত হইতেন না (বা গর্ব
করিতেন না)।
৪২। (তিনি) কোনও কামনা, ভয়, বা দ্বেষবশতঃ কাহারও
মৰ্যাদা নষ্ট করিতেন না। প্রচুর ভােগ্য বস্তু থাকিলেও ইন্দ্রিয়-
পরায়ণতা অবলম্বন করিতেন না।
৪৩। তিনি কখনও কোথাও কোনও কাৰ্য্যকে দুস্কর
বলিয়া মনে করিতেন না। অপ্রিয় ও প্রিয় এই উভয় ব্যক্তির
কার্য সম্পাদন করিতে যাইয়া তিনি কখনও নিন্দা প্রাপ্ত
হইতেন না।
৪৪। তিনি কসূত্রোক্ত নিয়মানুসারে সােমরস পান
করিতেন এবং যশ রক্ষা করিতেন। সর্বদা যেমন বেদ পাঠ
করিতেন তেমন বেদোক্ত ধৰ্ম্ম মানিয়া চলিতেন।
৪৫। এইরূপ সুলভ-গুণরাজি-ভূষিত শাক্যরাজ শুদ্ধোদন
অনুগত বীর সামন্তরাজগণে যুক্ত থাকিয়া ইন্দ্রের ন্যায় প্রতীত
হইতেন।

রাজবর্ণন ১৭ ৪৬। এমন সময়ে ধৰ্ম্মকামী দেবগণ জগতের ধম্মাচরণ দেখিবার জন্য চারিদিকে বিচরণ করিতে লাগিলেন। ৪৭। ধৰ্মাত্মা দেবগণ ধৰ্ম্ম জানিবার জন্য জগতে বিচরণ করিতে করিতে সবিশেষ-ধৰ্ম্মাত্মা সেই রাজাকে দেখিতে পাইলেন। ৪৮। পরে “তুষিত”-নামধেয়-স্বর্গ-নিবাসী দেবগণের নিকট হইতে বােধিসত্ত্ব জগতে জন্মগ্রহণ করিতে উদ্যত হইয়া উক্ত মহারাজ শুদ্ধোদনের কুলে জন্মগ্রহণ করিবার যুক্তি নিশ্চয় করিলেন। ৪৯। সেই রাজা শুদ্ধোদনের মহিষী মায়া। তাহার ক্রোধরূপ তমঃ ছিল না। তাহাকে সকলে স্বর্গস্থিত দেবতা মায়ার ন্যায় মনে করিত। একদা মায়াদেবী নিদ্রিতাবস্থায় স্বপ্নে দেখিতে পাই- লেন যেন ঐরাবতের ন্যায় তেজস্বী একটী ষড়দন্ত শ্বেত হস্তী তাঁহার গর্ভে প্রবেশ করিতেছে। ৫১। স্বপ্নবিৎ দ্বিজগণ সেই স্বপ্নের কথা শুনিয়া বলিলেন যে শ্ৰী-কীর্তি-ও-ধৰ্ম্ম-সম্পন্ন একটী উত্তম কুমার জন্মগ্রহণ করিবে। ৫২। সেই মহাপ্রাণ জন্মক্ষয়কামী (মুমুক্ষু ) কুমারের জন্মকালে পৃথিবী অচলা হইলেও তরঙ্গাভিহত নৌকার ন্যায় চঞ্চলা হইয়া উঠিল। ৫৩। সূৰ্য্যরশ্মির সহিত আকাশ হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতে মনে হইতে লাগিল যেন দিগগজের করবিক্ষেপে স্বর্গোদ্যান হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতেছে । গিল।

১৮
সৌন্দরনন্দ কাব্য
৫৪। স্বর্গে দুন্দুভি বাজিয়া উঠিল। তাহাতে মনে হইল
যেন তথায় দেবগণ আনন্দ করিতেছেন। সূর্যের দীপ্তি বাড়িয়া
উঠিল। মঙ্গলময় পবন প্রবাহিত হইল।
৫৫। সদ্ধর্মের প্রতি সম্মান এবং প্রাণীদিগের প্রতি অনু-
কম্পাহেতু “তুতি” ও “শুদ্ধাবাস” দেবগণ তুষ্ট হইয়াছিলেন।
৫৬। কল্যাণ যেন যশের সহিত মিলিত হইল। শান্ত
লক্ষমীর সহিত মিলিত হইয়া শরীরধারী ধৰ্ম্ম যেন শােভিত
হইল।
৫৭। অরণিতে যেমন অগ্নি উৎপন্ন হয় সেইরূপ ঘােট
রাণীর গর্ভেও বংশের আনন্দপ্রদ নন্দ নামক পুত্র জন্মগ্রহণ
করিলেন।
৫৮। যাহার বাহুযুগল সুদীর্ঘ, বক্ষঃস্থল প্রশস্ত, অংসদ্বয়
সিংহের ন্যায়, ঈক্ষণযুগল বৃষভের ন্যায় এবং যিনি শরীরের
সৌন্দৰ্য হেতু নামের সহিত “সুন্দর” এই উপাধি প্রাপ্ত হইলেন।
৫৯। সেই নন্দ উত্তম শ্ৰীযুক্ত হওয়ায় মনে হইত যেন
বসন্ত ঋতু আবিভূত হইয়াছে বা নব চন্দ্রমা সমুদিত হইয়াছে
কিম্বা অনঙ্গ কামদেব বুঝি শরীর পরিগ্রহ করিয়াছেন।
সজ্জনের হস্তে যদি মহান্ অর্থরাশি পতিত হয় সেই
অর্থ যেমন ধৰ্ম্ম ও কাম এই উভয়ের বর্ধন করিয়া থাকে সেইরূপ
রাজা অত্যন্ত হর্ষের সহিত ঐ পুত্রদ্বয়ের বৃদ্ধি সাধন করিতে
লাগিলেন।
৬১। কালক্রমে গুরুকার্যকারী আৰ্যব্যক্তির ধর্ম এবং

রাজবর্ণন অর্থ যেমন উন্নতির হেতু হইয়া থাকে সেইরূপ ভয়াপহ তাঁহার পুত্রদ্বয় উন্নতির জন্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলেন। ৬২। হিমবান্ এবং ( বিন্ধ্যপর্বতের একদেশ) পারিপাত্র পর্বতের মধ্যে “মধ্যদেশ” যেরূপ শােভা পায় সেইরূপ শাক্য- রাজ শুদ্ধোদন সাধু পুত্রদ্বয়ের মধ্যে শােভা পাইতে লাগিলেন। পরে ক্রমে উভয় পুত্র যখন সংস্কারসম্পন্ন এবং কৃতবিদ্য হইলেন তখন নন্দ অজস্র বিষয়ভােগে আসক্ত হইলেন, কিন্তু সর্বার্থসিদ্ধ তাহাতে অত্যন্ত আসক্ত হইলেন না। ৬৪। তিনি বৃদ্ধ আতুর ও মৃত ব্যক্তি দর্শন করিয়া আর্ত- হৃদয়ে জগৎকে অত্যন্ত অজ্ঞ বিবেচনা করিয়া অপরিমেয় জন্ম- মৃত্যুভয় দূর করিবার জন্য ইচ্ছু হইয়া নিঃশঙ্কে বিষয়বাসনা পরিত্যাগ করিলেন। কলহংস যেমন নলিনরাশি দলিত করিয়া সরােবর হইতে অন্যত্র চলিয়া যায় সেইরূপ সৰ্বার্থসিদ্ধ জরামরাদিভয়ে মােক্ষে চিত্তবৃত্তি নিহিত করিয়া বনে গমন করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়া যে গৃহে তদীয় বরাঙ্গনা শয়ন করিয়াছিলেন সেই রাজগৃহ হইতে রাত্রিকালে বহির্গত হইয়া গেলেন। সৌন্দরনন্দ কাব্যে দ্বিতীয় সর্গ সমাপ্ত তৃতীয় সর্গ তথাগত বর্ণন ১। অনন্তর সর্বার্থসিদ্ধ অশ্ব-গজ-রথসমূহযুক্ত ভয়শূন্য অনুরক্তজনপূর্ণ শ্ৰীসমন্বিত কপিলবাস্তু নগর পরিত্যাগ করিয়া দৃঢ়চিত্তে তপস্যার জন্য বনে গমন করিলেন। ২। বিবিধশাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন তপস্যায় নির্মল বিবিধনিয়ম- পরায়ণ বিষয়বাসনাশূন্য বহু মুনিগণকে দর্শন করিয়া ইহা চঞ্চল অজ্ঞান এই বুঝিয়া নিবৃত্ত হইলেন। পরে মােক্ষবাদী অরাড় এবং উপশমে কৃতনিশ্চয় উদূদ্রককে তত্ত্বজ্ঞানের জন্য আশ্রয় করিয়া ইহাও উৎকৃষ্ট পথ নহে এই বুঝিয়া পরিত্যাগ করিলেন, কারণ তিনি প্রকৃত পথ বুঝিতে পারিতেন। ৪। তিনি শাস্ত্রসমূহের মধ্যে কোন্ শাস্ত্র উৎকৃষ্ট ইহা নিশ্চয়প্রসঙ্গে বিচারপূর্বক নিশ্চয় করিতে না পারিয়া অন্তে কেবল দুষ্কর তপস্যাই করিতে লাগিলেন। অনন্তর ইহাও প্রকৃত সৎমার্গ নহে ইহা বুঝিয়া উৎকট তপস্যাও পরিত্যাগ করিলেন। ব্যাধির বিষয় বুঝিয়া অমৃতত্ব লাভের (মােক্ষলাভের) জন্য নরের ভােগ্য অন্ন ভােজন করিলেন।

তথাগত বর্ণন ৮। ৬। সুবর্ণদণ্ডের ন্যায় বাহুযুগসম্পন্ন বৃষভগতি বিশালনেত্র সর্বার্থসিদ্ধ এই বিষয়ে নিশ্চয় করিবার জন্য প্লক্ষ-তরুর তলে আশ্রয় লইলেন। ৭। সেইস্থানে পর্বতরাজ হিমাচলের ন্যায় স্থির দৃঢ় ধৈৰ্য- যুক্ত নিপুণবুদ্ধি সৰ্বার্থসিদ্ধ প্রবল মার-বল জয় করিয়াছিলেন। এবং শিবময় অহাৰ্য্য অব্যয় পদ জানিয়াছিলেন। পরে মুক্তাত্মা দেবতাগণ তাহাকে কৃতকাৰ্য দেখিয়া অত্যন্ত হর্ষ লাভ করিলেন। বিরুদ্ধ মার-সম্প্রদায় তাহাতে ক্ষুভিত হইল। ৯। পর্বতের সহিত পৃথিবী চঞ্চলা হইল। মঙ্গলময় পবন প্রবাহিত হইল। দেবদুন্দুভি বাজিয়া উঠিল। মেঘশূন্য আকাশ বর্ষণ করিল। প্রভু লােকের প্রতি দয়াবশতঃ অজর পরমার্থবিষয়ে জ্ঞান লাভ করিয়া নিত্য অমৃত উপদেশ দানের জন্য বরণ- পরিবেষ্টিত পুরীতে (বারাণসী) গমন করিলেন। ১১। পরে জগতের হিতের জন্য ঋষি সর্বার্থসিদ্ধ ধৰ্ম্মচক্র লােকসম্প্রদায়ের সমক্ষে চালাইয়া দিলেন। ঐ ধৰ্ম্মচক্রের মধ্য- রন্ধ, ঋত বা সত্য, ধৃতি মতি ও সমাধি তাহার নেমি, বিনয় ও নীতি অর বা চক্ৰমধ্যস্থিত শলাকা। ১২-১৩। ইহা দুঃখ এবং ইহা হইতে দুঃখ প্রবৃত্ত হইতেছে অর্থাৎ ইহা দুঃখের কারণ, ইহা শান্তি এবং ইহা শান্তির উপায়—এই চারিটী বিভাগক্রমে জ্ঞাতব্য বস্তু এবং অতুলনীয়, ১০।

২২ সৌন্দর কাব্য অনিবৰ্ত্তনীয়, শ্রেষ্ঠ ত্ৰিপরিবর্তের কথা ও “দ্বাদশনিয়তবিকল্প” বিষয় ব্যাখ্যা করিয়া সর্বপ্রথমে কৌণ্ডিনগােত্ৰীয়কে শিক্ষা দিলেন। ১৪। তিনি অগাধ দোষসাগর স্বয়ং উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন এবং অপর লােককেও উত্তীর্ণ করিয়াছিলেন, যে দোযসাগরের জল প্রতারণা, মনটব্যথা জলজন্তু, ক্রোধ মত্ততা, ও ভয় তরঙ্গ। ১৫। তিনি কাশী, গয়া ও গিরিব্রজে (রাজগৃহে ) লােক- দিগকে শিক্ষা দিয়া পরমকরুণাতৎপরতাহেতু অনুগ্রহ-কামনায় পৈত্রিক নগরেও (কপিলবাস্তুতেও) গমন করিয়াছিলেন। ১৬। সূৰ্য্য যেমন অন্ধকার বিনাশ করেন সেইরূপ বিবিধ- মার্গে গতিশীল বিষয়াসক্ত ব্যক্তিগণের অজ্ঞান সূর্যের ন্যায় তেজস্বী গৌতম সর্বার্থসিদ্ধ নষ্ট করিয়াছিলেন । ১৭। সর্বশুভাশ্রয় ও পূর্বপরিচিত কপিলবাস্তুতে আসিয়া সর্বার্থসিদ্ধ নিস্পৃহতা হেতু সাধারণ বন যেরূপ মনে করিতেন অতিসুন্দর উপবনগুলিকেও সেইরূপ ভাবিতে লাগিলেন ( উহা অধিক আসক্তির বস্তু মনে করিলেন না)। স্বদেশে স্বজন হইয়াও সংযতমতি আত্মাধীশ্বর বুদ্ধদেব অনেকবিধ ভয়জনক প্রিয়বস্তুরও প্রতিগ্রহ করেন নাই। কেহ পূজা করিলে তিনি হর্ষান্বিত হইতেন না, বা কেহ অবজ্ঞা করিলে দুঃখিত হইতেন না। অসি ও চন্দন এবং সুখ ও দুঃখে দৃঢ়চিত্ত সর্বার্থসিদ্ধের বিকার ছিল না। ২। পরে রাজা যখন জানিলেন যে তদীয় পুত্র তথাগত ১৮। ১৯।

তথাগত বর্ণন
{ বুদ্ধ ) নগরে আসিয়াছেন, তখন অল্পমাত্র অশ্ব সমভিব্যাহারে
পুত্র-দর্শন-কামনায় সত্বর গমন করিলেন।
২১। সুগত রাজা শুদ্ধোদনকে সেই প্রকারে আগত
দেখিয়া এবং অধীরতাবশতঃ অবশিষ্ট জনসমূহকে সানেত্র
দেখিয়া তাহাদের শিক্ষা দিবার জন্য গগনে উত্থিত হইলেন।
২২। তিনি পৃথিবীর ন্যায় আকাশেও বিচরণ করিতে
লাগিলেন। উপবেশন করিলেন, আবার দাড়াইলেন, দৃঢ়চিত্ত
সর্বার্থসিদ্ধ তথায় শয়ন করিতে বাসনা করিলেন এবং একবার
বহুরূপ ধারণ করিলেন, আবার পূর্ববৎ একরূপ হইলেন।
২৩। (তিনি) ক্ষিতির ন্যায় সলিলে বিচরণ করিতে
লাগিলেন, জলের ন্যায় পৃথিবীর মধ্যে প্রবেশ করিলেন, মেঘের
ন্যায় আকাশে বর্ষা করিতে লাগিলেন, আবার উজ্জ্বল হইয়া
সূৰ্য্যের ন্যায় আকাশে দৃষ্টিগােচর হইলেন।
২৪। একই সময়ে অগ্নির ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া এবং মেঘের
ন্যায় জল বর্ষা করিয়া তপ্ত কাঞ্চনের ন্যায় প্রভায় সন্ধ্যাপ্রদীপ্ত
মেঘের স্যায় দীপ্তি পাইতে লাগিলেন।
২৫। রাজা স্বর্ণ ও মণিজাল-পরিবেষ্টিত ধ্বজের ন্যায়
তাহাকে দর্শন করিয়া অতুল প্রীতি লাভ করিলেন এবং জনসমূহ
নত হইয়া তাহার প্রতি সম্মান দেখাইল।
পরে রাজা ও পৌরজনকে ঋদ্ধি-সম্পদের পাত্র
দেখিয়া তৎফলে তাহাদিগকে সেই বিনায়ক ধৰ্ম্ম ও বিনয়
উপদেশ দিতে লাগিলেন।

২৪
সৌন্দরন কাব্য
;
৩০।
২৭। পরে নৃপতি প্রথমতঃ মােক্ষ ও ধর্মবিষয়ে সিদ্ধ
ব্যক্তির ফল লাভ করিলেন ; সর্বার্থসিদ্ধ মুনির নিকট অতুল ধৰ্ম্ম
শিক্ষা করিয়া প্রযত হইয়া গুরুর ন্যায় তাহাকে নমস্কার
করিলেন।
পরে বৃষগণ যেমন অনল-ভয়ে ছুটিয়া পলায় সেইরূপ
জরা-মরণাভিয়ে ভীত হইয়া নিৰ্ম্মলচিত্ত কৃতী শাক্যবংশীয়
ব্যক্তিগণ প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিলেন।
২৯। যাহারা পুত্র পিতা ও মাতার দিকে চাহিয়া গৃহ
পরিত্যাগ করিতে পারিল না তাহারাও একাগ্রচিত্তে মরণকাল
পর্যন্ত নিয়মবিধি রক্ষা করিতে লাগিল।
যাহার জীবহত্যাই জীবিকা এমন ব্যক্তিও অল্পমাত্র
প্রাণীর হিংসা করিত না। বিপুলগুণসম্পন্ন সৎকুলজাত সদয়
ব্যক্তি যে তদীয় উপাসনায় অনুরাগী থাকিয়া প্রাণীর হিংসা
করিত না এ বিষয়ে আর অধিক কি।
৩১। প্রচুরউদ্যমশীল ব্যক্তি ধনহীন ও পর-পরিভবে
অসহিষ্ণু হইয়া ও অন্য বিভব অপহরণ করিত না, অন্যের বিভবকে
ভুজঙ্গের ন্যায় স্পর্শ করিতে ভয় পাইত।
৩২। লােক ধনী তরুণ এবং বিষয়ে চঞ্চলেন্দ্রিয় হইয়াও
পরদার গমন করিত না, পরবনিতাকে অগ্নির ন্যায় মনে করিত
কেহ মিথ্যা কথা বলি না, সত্য হইলেও অপ্রিয়
কথা বলিত না, কোমল এমন অহিত কথা কহিত না, পৈশুল্যশূন্য
এইরূপ হিতকর কথা বলিত।

তথাগত বর্ণন
২৫
৩৫।
৩৪। লােভী হইয়াও পরধমে কখন কেহ মানসিক লােভ
করিত না। সজ্জন ব্যক্তি কামমুখকে অসুখ বিবেচনা করিয়া
তদ্বিষয়ে তৃপ্তবৎ থাকিতেন।
কোনও লােক সদয় হেতু পরের বিনাশের কথা
মনেও স্থান দিত না। তথায় লােকসমূহ পরস্পর পরস্পরকে
মাতা পিতা পুত্র ও বন্ধুর তুল্য মনে করিত।
৩৬। কৰ্ম্মফল পূর্বেও হইয়াছে, এখনও হইতেছে এবং
ভবিষ্যতে পরকালেও হইবে, লােকের গতি নিশ্চিত আছে-
এইরূপ সাধু দৃষ্টি উৎপন্ন হইয়াছিল।
৩৭। গুণশূন্য অপকৃষ্ট এই কলিকালেও মুনি সর্বার্থসিদ্ধির
আশ্রয়ে লােক উৎকৃষ্ট দশবিধ কৰ্ম্ম দ্বারা উক্তরূপে বিহার
করিত।
ঐ-সকল গুণ থাকায় কেহই সাংসারিক উপপত্তির
সুখ কামনা করিত না। সমস্ত সংসারকে অমঙ্গলকর জানিয়া
মােক্ষের জন্য সকলে চেষ্টা করিত, জন্মের জন্য নহে।
৩৯। পরমপরিশুদ্ধদৃষ্টি বহু গৃহস্থ ‘কেন এই কথা জিজ্ঞাসা
করিয়া সেই স্রোতেই গা ভাসাইয়া দিয়াছিলেন।
অপার
রজোগুণের ক্ষীণতা সম্পাদন করিয়াছিলেন (সত্ত্বগুণ বিস্তারের
দ্বারা)।
যে ব্যক্তি বিভব সদৃশ বিষম বিষয়ে বর্তমান ছিল
সে ব্যক্তিও ত্যাগ বিনয় ও নিয়মে রত থাকিত, সৎপথ হইতে
বিচলিত হইত না।
৩৮।
৪০।

সৌন্দরন কাব্য
৪১। নিজ হইতে, পর হইতে বা দৈব হইতে কোনও রূপ
ভীতি উপস্থিত হইত না। সত্যযুগে রাজা মনুর অধিকারে
যেমন সুখ ও সুভিক্ষগুণে প্ৰজাগণের হর্ষ অব্যাহত থাকিত
তথায়ও সেইরূপ ছিল।
৪২। মােক্ষোপদেশাৰ্থ বীতরাগ মহর্ষি তথায় মঙ্গলার্থ
বর্তমান থাকায় সেই কপিলবাস্তুনগর কুরু রঘু ও পুরুর নগরের
ন্যায় আনন্দিত নিরাময় ও আপৎশূন্য হইয়াছিল।
সৌন্দরনন্দ কাব্যে তৃতীয় সর্গ সমাপ্ত

চতুর্থ সর্গ
ভাৰ্যাযাচিতক
স্ত্রীর নিকট প্রার্থনা
কপিলবাস্তু নগরে ভগবান্ বুদ্ধদেব ধর্মোপদেশ প্রদান
করিতে লাগিলেন। তাহার জ্ঞাতিগণ (তাহার উপদিষ্ট )
ধর্মের প্রতি সমাদর প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। কিন্তু নন্দ
কামের বশীভূত হইয়া প্রিয়ার সহিত প্রাসাদেই বিহার করিতে
লাগিলেন।
২। চক্রবাক যেরূপ চক্রবাকীর সহিত মিলিত হয় সেইরূপ
প্রিয়ার উপযুক্ত নন্দ প্রিয়ার সহিত মিলিত হইয়া শ্ৰমণ কিংবা
ইন্দ্র কাহারও বিষয় চিন্তা করিতেন না। যেন এইরূপ অবস্থার
জন্যই তিনি পূর্বে ধর্মাচরণ করিয়াছেন।
৩। (নন্দপ্রিয়ার) তিনটী নাম ছিল। রূপ ও সৌন্দর্যের
জন্য তাহার নাম ছিল সুন্দরী। ঔদ্ধত্য ও গর্ব ছিল বলিয়া
লােকে তাহার নাম রাখিয়াছিল মানিনী। দীপ্তি ও মানের
জন্য লােকে বলিত ভামিনী।
৪। হাস্য-রূপ হংস, নেত্র-রূপ ভ্রমর ও পীনস্তন-রূপ উন্নত
পদ্ম দ্বারা অলংকৃতা সেই সুন্দরী-রূপ পদ্মিনী নন্দ-রূপ সূর্যের
স্বগৃহে উদয়ে অত্যন্ত শােভাযুক্ত হইয়াছিলেন।

সৌন্দরন কাব্য
৫। সেই সময়ে পৃথিবীতে অত্যন্ত মনােহর রূপ ও রূপের
অনুরূপ কাৰ্য্য দ্বারা সুন্দরী স্ত্রীগণের মধ্যে প্রধানা, ও নন্দ’
পুরুষ-গণের মধ্যে প্রধান ছিলেন।
৬। বিধাতা যেন নন্দনচারিণী দেবতার ন্যায় নন্দপ্রিয়া
ও বংশের আনন্দবর্ধন নন্দকে মানবদিগের উপরে ও দেবতা-
দিগের নীচে (অর্থাৎ মানব ও দেবের মধ্যস্থলে) সৃষ্টি
করিয়াছিলেন।
৭। সুন্দরী যদি নন্দকে অথবা নন্দ যদি সেই নত
সুন্দরীকে লাভ (বিবাহ) না করিতেন তাহা হইলে চন্দ্রহীন
রাত্রি এবং রাত্রিহীন চন্দ্রের তুল্য সেই প্রণয়ি-যুগল শােভা
পাইতেন না।
৮। কন্দর্প ও রতির লক্ষ্যভূত, প্রমােদ ও আনন্দের
আবাসস্থল, হর্ষ ও তুষ্টির পাত্র সেই মান্ধ প্রণয়িযুগল পরস্পর
পরস্পরের সহিত ক্রীড়া করিতেন।
৯। সেই প্রণয়িযুগলের নয়ন পরস্পরকে দেখিবার জন্য
তৎপর থাকিত। তাহাদের চিত্ত পরস্পর কথা বলিবার জন্য
উৎসুক থাকিত। পরস্পর আলিঙ্গন দ্বারা একের অঙ্গরাগ
অন্যের অঙ্গে লাগিত। তাহারা একজন অন্যের (মন) হরণ
করিলেন।
১০। পৰ্বত-নিঝরস্থ ভাবানুরক্ত কিন্নর-কিন্নরীর ন্যায়
উভয়ে সৌন্দয্যে পরস্পরকে তিরস্কৃত করিয়া ক্রীড়া করিতেন ও
শােভিত হইতেন।

ভাৰ্যাযাচিতক
১১। তাহারা পরস্পরের অনুরাগ বর্ধন করিয়া পরস্পর
ক্রীড়া করিতেন। ক্লান্তি অবসানে পুনরায় আকাঙ্ক্ষা-বলে
বিলাসের সহিত পরস্পর পরস্পরকে প্রমত্ত করিতেন।
১২। প্রিয়াকে সেবা করিবার ইচ্ছা করিয়াই নন্দ তাহাকে
ভূষিত করিতেন, শুদ্ধি সম্পাদনের জন্য নহে। নিজের
রূপের দ্বারা বিভূষিত হইয়াই নন্দপ্রিয়া অলঙ্করণেরও অলঙ্কার
ছিলেন।
১৩। সুন্দরী নন্দের হস্তে একখানি দর্পণ দিয়া বলিলেন—
যতক্ষণ পর্যন্ত আমি (মৃগনাভি চন্দনাদি দ্বারা) বদন চিত্রিত
করি ততক্ষণ এই দর্পণখানি আমার সম্মুখে ধারণ কর ।
নন্দও সেখানা ধারণ করিয়াছিলেন।
১৪। তখন ভর্তার শ্মশ্রু নিরূপণ করিতে করিতে সুন্দরী
নিজের মুখে সেইরূপ শ্মশ্রু চিত্রিত করিতে লাগিলেন।
নিশ্বাসবায়ু দ্বারা দর্পণখানিকে দোষযুক্ত করিয়া তাহার চেষ্টা
ব্যর্থ করিয়াছিলেন।
১৫। সুন্দরী নন্দের সুললিত শঠতা দেখিয়া মনে মনে
হাসিলেন। কিন্তু বাহ্যতঃ রুষ্ট হইয়া তাঁহাকে কুটিল কুটী
প্রদর্শন করিলেন।
১৬। মদে অলস বাম হস্ত দ্বারা সুন্দরী নন্দের স্কন্ধে
কর্ণোৎপল নিক্ষেপ করিলেন। অর্ধনিমীলিতনয়ন নন্দের
মুখপ্রদেশে সেই পত্রাঙ্গুলি কম্পিত করিলেন।
১৭। তখন নন্দ ভয়ে প্রিয়ার চঞ্চলনূপুরপীড়িত নখপ্রভা

সৌন্দরন কাব্য দ্বারা অধিকতর শােভিত অঙ্গুলিযুক্ত ও নলিনােপম চরণে নত হইলেন। ১৮। পুষ্পভারহেতু বায়ু দ্বারা সুবর্ণ বেদীতে নত নাগ- বৃক্ষের ন্যায় প্রিয়ার প্রিয়কারী নন্দ পুষ্পশােভিত মস্তক নত করিয়া শােভা পাইলেন। ১৯। তখন সুন্দরী তাহাকে দুই হাতে জড়াইয়া উঠাইলেন। তাহার হারষ্টি স্তনের উপর লুষ্ঠিত হইতে লাগিল। তাহার কুণ্ডল বক্রভাবে দুলিতে লাগিল। তিনি হাসিয়া বলিলেন- “কেমন হইয়াছে ?” ২০। তারপর দর্পণধারী পতির মুখে বারংবার দৃষ্টিপাত করিয়া সুন্দরী তমালপত্রার্দ্রতল গণ্ডস্থলে বিশেষক’ রচনা করিলেন। ২১। তখন তাহার তমালপত্রযুক্ত রক্তিমাধবােষ্ঠ চিকুরায়- তাক্ষ মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ, ভ্রমরযুক্ত, সশৈবল পদ্মের ন্যায় শােভা পাইতেছিল। ২২। নন্দ তখন প্রসাধনক্রিয়ার সাক্ষিভূত দর্পণ সাদরে ধারণ করিয়া বিশেষক দর্শনের জন্য বক্রদৃষ্টিতে প্রিয়ার সুন্দর মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। ২৩। তাহার কুণ্ডল দ্বারা বিশেষকের প্রান্তদেশ লুপ্ত হইতেছিল। কারণ্ডব (হংস)-ক্লিষ্ট অরবিন্দের ন্যায় তাহার সেই মুখের দিকে চাহিতে চাহিতে নন্দ পুনর্বার প্রিয়ার আনন্দ- বর্ধন করিতেছিলেন।

ভাৰ্যাযাচিতক
;
২৪। বিমানকল্প সপ্ততলগৃহের মধ্যে নন্দ এইরূপে আনন্দ
করিতেছিলেন। এদিকে ভিক্ষাকালে তথাগত সেই গৃহে
ভিক্ষার জন্য প্রবেশ করিলেন।
২৫। তিনি ভ্রাতার গৃহেও অপর গৃহের মত অধােমুখ
এবং প্রণয়বিহীন হইয়াই রহিলেন। অনন্তর ভৃত্যগণের
অনবধানে ভিক্ষা না পাইয়াই সেই গৃহ হইতে ফিরিয়া গেলেন।
২৬। দাসীগণের মধ্যে কেহ কেহ অন্ত্রবিলেপন পেষণ করিতে-
ছিল ; কেহ বস্ত্র গন্ধযুক্ত করিতেছিল ; কেহ বা স্নানের যােগাড়
করিতেছিল ; কেহ বা সুগন্ধি পুষ্পমাল্য রচনা করিতেছিল।
২৭। সেই গৃহে গৃহস্বামীর ক্রীড়ানুরূপ শােভনকাৰ্যকারিণী
যুবতী দাসীগণ সেইজন্য বুদ্ধকে দেখিতে পায় নাই। অথবা
বুদ্ধেরই ঐরূপ ইচ্ছা ছিল।
২৮। কোনও যুবতী সেই প্রাসাদের গবাক্ষ দিয়া ঢাহিয়া-
সে মেঘমধ্য হইতে সূর্যের ন্যায় বহির্গমনরত সুগতকে
দেখিল।
সে গৃহস্বামীর গৌরব ও নিজের ভক্তি ও অহঁতের
অর্চনা হেতু নন্দের নিকট বলিবার জন্য উপস্থিত হইল। নন্দের
আজ্ঞা পাইয়া তাহা বলিল।
৩০। ভগবান্ অনুগ্ৰহ করিয়া আমাদের গৃহে প্রবেশ
করিয়াছিলেন। ভিক্ষা, বাক্য অথবা আসন না পাইয়া শূন্য
অরণ্য হইতে যেরূপ ফিরিয়া যান সেরূপ আমাদের গৃহ হইতে
ফিরিয়া যাইতেছেন।
ছিল।

সৌন্দরনন্দ কাব্য ৩১। মহর্ষির গৃহাগমন এবং সৎকার না পাইয়া গমনের কথা শুনিয়া অনিলকম্পিত কল্পদ্রুমের তুল্য বিচিত্র-আভরণ- বসন-ও-মাল্যধারী তিনি কম্পিত হইলেন। ৩২। তৎপরে মস্তকে পদ্মসদৃশ অঞ্জলি ধারণ করিয়া ভাৰ্যার নিকট গমন প্রার্থনা করিয়া বলিলেন-আমি গুরুকে প্রণাম করিতে যাইব। আমাকে অনুগ্রহপূর্বক অনুমতি দাও। ৩৩। বাতসঞ্চালিত লতার ন্যায় কাপিতে কাঁপিতে শাল- বৃক্ষ সদৃশ তাঁহাকে সুন্দরী আলিঙ্গন করিলেন। অশ্রুপ্লত- নেত্রে চাহিয়া থাকিয়া দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বলিলেন। ৩৪। তুমি গুরুকে দেখিতে ইচ্ছা করিয়াছ। আমি তােমার ধর্মপীড়া করিতে পারি না। আৰ্যপুল, তুমি যাও ; কিন্তু বিশেষক শুষ্ক হইবার পূর্বেই শীঘ্র ফিরিয়া আসিবে। ৩৫। তুমি যদি বিলম্ব কর তােমার প্রতি ভীষণ দণ্ডবিধান করিব। শয়িত তােমাকে পুনঃ পুনঃ কুচযুগল দ্বারা বিবােধিত করিব কিন্তু চালিত করিব না। ৩৬। কিন্তু যদি বিশেষক শুষ্ক হইবার পূর্বেই ফিরিয়া আইস তাহা হইলে আর্দ্রবিলেপনযুক্ত ভূষণবিহীন হস্তদ্বয় দ্বারা তােমাকে আলিঙ্গন করিব। ৩৭। সুন্দরী কর্তৃক মধুরকণ্ঠে এরূপ কথিত ও নিপীড়িত হইয়া নন্দ বলিলেন-হে চণ্ডি, তাহাই হইবে। গুরুর দূরে গমনের পূর্বে আমাকে ছাড়িয়া দাও।

ভাৰ্য্যাযাচিতক
তখন সুন্দরী যে ভুজ দ্বারা স্তনে চন্দন লেপন
করিয়াছেন সেই হস্তের বন্ধন হইতে (স্বামীকে ) মুক্ত করিলেন
কিন্তু মন হইতে মুক্ত করিলেন না। নন্দ তখন বিলাস-বেশ
ত্যাগ করিয়া তৎকাল-যােগ্য বেশ ধারণ করিলেন।
৩৯। (সুন্দরী) গমনরত স্বামীকে ধ্যানশূন্য নিশ্চল নয়নে
ধ্যান করিতে লাগিলেন—ভ্রান্তমুখী মৃগী যেরূপ উন্নত কর্ণে
তৃণ-গ্রহণ ত্যাগ করিয়া ভ্রান্ত মৃগকে ধ্যান করে।
৪। নন্দও মুনিকে দেখিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া তাহার
দিকে চাহিতে চাহিতে সত্বর গমন করিতে লাগিলেন—করী
যেরূপ বিলাসশীল করেণুর প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে করিতে
চলিয়া যায়।
৪১। এক হস্ত দ্বারা জলপান করিয়া লােক যেরূপ তৃপ্ত
হয় না, নন্দও সেরূপ পর্বতের উজ্জ্বল গুহার মত কৃশােদরী
পীনস্তনী পীনােক্স সুন্দরীর প্রতি তির্য্যগ, লােচনে দৃষ্টিপাত
করিয়া তৃপ্ত হন নাই।
৪২। একদিকে বুদ্ধের প্রতি ভক্তি তাহাকে আকর্ষণ
করিতেছিল, অপর দিকে ভাৰ্যার প্রতি অনুরাগও ভঁহাকে
আকর্ষণ করিতে লাগিল। কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া
নদীতরঙ্গে সন্তরণশীল রাজহংসের ন্যায় নন্দ গমনও করিতে
পারিলেন না, সেখানে অবস্থানও করিতে পারিলেন না।
একবার সুন্দরীর দৃষ্টিবহির্ভূত হইয়া নন্দ সেই
প্রাসাদ হইতে তাড়াতাড়ি অবতরণ করিলেন। পুনরায়
৪৩।

৩৪ সৌন্দরন কাব্য নূপুর-শব্দ শুনিতে পাইয়া হৃদয়ে গৃহীত হইয়া বিলম্ব করিতে লাগিলেন। ৪৪। (নন্দ) কামরাগে রুদ্ধগতি ও ধৰ্ম্মরাগে আকৃষ্ট হইয়া স্রোতের বিপরীত দিকে গমনশীল নৌকার মত অতি কষ্টে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। গুরু চলিয়া না যান এবং আর্দ্রবিশেষকা বিশেষক- প্রিয়া প্রিয়াকে আলিঙ্গন করিতে হইবে এই ভাবিয়া নন্দ দীর্ঘতম পদক্ষেপে চলিতে আরম্ভ করিলেন। ৪৬। অনন্তর নন্দ পথে সম্মুখে সম্মানত্যাগী, পিতৃনগরেও অভিমানশূন্য, বিলম্বকারী, অনুগমনকালে ইন্দ্ৰধ্বজ সদৃশ পূজনীয়, দশবলযুক্ত বুদ্ধকে দেখিতে পাইলেন। ৪৫। সৌন্দরনন্দ কাব্যে চতুর্থ সর্গ সমাপ্ত পঞ্চম সর্গ নন্দপ্রব্রাজন অনন্তর নিজ নিজ সমৃদ্ধি অনুসারে সজ্জিত শাক্য- বংশীয়গণ অশ্ব রথ ও হস্তী হইতে অবতরণ করিয়া মহামুনি বুদ্ধের প্রতি ভক্তিভরে প্রণাম করিল, এবং বিশাল বিপণি হইতে বণিকগণ তাহাকে প্রণতি করিল। কেহ বা প্রণাম করিয়া কিছুকাল অনুগমন করিল ; কেহ বা প্রণাম করিয়া কাৰ্যবশে চলিয়া গেল। কেহ বা হাত জোড় করিয়া তদীয় দর্শনে আগ্রহান্বিতভাবে নিজ বাসস্থানে অবস্থিতি করিয়াছিল। ৩। বুদ্ধদেব সেই রাজপথে জনগণ কর্তৃক স্তুত হইয়া বর্ষাকালীন নদীর স্রোতের ন্যায় প্রবল ভক্তিমান্ জনশ্রেণীর মধ্যে অতি কষ্টে প্রবেশ করিতেছিলেন। ৪। অনন্তর পথে মিলিত জনসমূহ কর্তৃক পূজিত তথাগতের নিকটে (অত্যন্ত জনতা বশতঃ ) যাইতে না পারিয়া নন্দ তাহাকে নমস্কার করিতে পারিলেন না। কিন্তু গুরুর সেই মহিমায় তিনি সন্তুষ্ট হইলেন। ৫। বুদ্ধদেব পথে জনসঙ্গ বৰ্জ্জনের জন্য এবং অন্যমতি ব্যক্তির ভক্তি রক্ষা করিবার জন্য ও গৃহাসক্ত নন্দকে আকর্ষণ করিবার জন্য অপর পথ অবলম্বন করিলেন।

সৌন্দরন কাব্য ৬। পরে সন্মার্গবিৎ বিশুদ্ধচিত্ত (বুদ্ধ ) নির্জন পথে চলিতে লাগিলেন। এবং নন্দ অগ্রসর হইয়া শ্রেষ্ঠ ও ত্যক্ত- সকলানন্দ তাহাকে প্রণাম করিলেন। ৭। নন্দ ধীর গতিতে যাইতে যাইতে গললগ্নীকৃতবাস ও কৃতাঞ্জলি হইয়া অৰ্ধকায় নত করিয়া উদ্ধানেত্রে বুদ্ধকে গদ্গদ- ভাবে ইহা বলিতে লাগিলেন। ৮। আমি প্রাসাদে থাকিয়া শুনিতে পাইলাম ভগবান অনুগ্রহ দেখাইবার জন্য আমার আলয়ে প্রবেশ করিয়াছিলেন। অতএব আমি গৃহের প্রকোষ্ঠের প্রতি দ্বেষবশতঃ আপনার সমীপে সত্বর উপনীত হইয়াছি। ৯। অতএব হে সাধুপ্রিয় ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ, আমার সন্তোষের জন্য আপনি তথায় ( আমার গৃহে) ভিক্ষা গ্রহণ করুন। ঐ দেখুন, সূৰ্য্যদেব নভােমণ্ডলের মধ্যভাগে যাইতে উদ্যত হইয়া মধ্যাহ্নকাল বুঝাইতেছেন। পরে স্নেহভরে তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া প্রণয়- সহকারে যখন নন্দ বুদ্ধদেবকে ঐ কথা বলিলেন, তখন বুদ্ধদেব এমন একটী নিমিত্ত উৎপাদন করিলেন যাহাতে আহারের বিষয়ে নন্দের জ্ঞান না হয়। ১১। তারপর নন্দ বুদ্ধদেবকে প্রণাম করিয়া গৃহে প্রত্যা- বৰ্ত্তনের মতি করিলেন। পদ্মপলাশনেত্র ভগবান বুদ্ধ তাহার প্রতি অনুগ্রহপূর্বক একটী পাত্র দান করিলেন। নন্দ সংযতভাবে পদ্মতুল্য চাপগ্রহণসমর্থ করদ্বয়ে ১০।

নন্দপ্ৰব্ৰাজন
৩৭
১৪।
জগতে ফল প্রদ অপ্রতিম সৎপাত্র বুদ্ধের সেই পাত্রটী গ্রহণ
করিলেন।
যখন নন্দ বুঝিলেন বুদ্ধদেব ফিরিয়া অন্যমনস্কতা
ধারণ করিয়াছেন, তাঁহার দিকে আর বুদ্ধদেবের বিশেষ লক্ষ্য
নাই, তখন পাত্রটী হস্তে করিয়াই মুনির দিকে দেখিতে দেখিতে
পথ হইতে গৃহে গমনের জন্য অপসৃত হইলেন।
পাত্র হস্তে করিয়াই যখন নন্দ ভার্যার প্রতি
অনুরাগ হেতু গৃহে যাইবার ইচ্ছা করিতেছিলেন, তখন মুনি বুদ্ধ
তাহার পথ আবরণ করিয়া তাহাকে মােহিত করিলেন।
১৫। মুনি তাহার (নন্দের) মৃদু জ্ঞান, তীব্র ক্লেশরজঃ,
মালিন্য ও ক্লেশাকুল বিষয় সকল দেখিয়া মুক্তির উপায় স্থির
করিলেন, এবং স্বয়ং তাহাকে আকর্ষণ করিলেন।
১৬। তিনি দেখিলেন যে দ্বিবিধ সংক্লেশ পক্ষ ও দ্বিবিধ
অবদান পক্ষ (সৎকাৰ্য)। যাহার তর্কশক্তি প্রবল তাহার
আত্মাশ্রয় ও যাহার বিশ্বাস অধিক তাহার পক্ষে বাহাশ্রয়
(পরের আশ্রয় গ্রহণ করা)।
১৭। যাহার হেতুবল অধিক তাহাকে একটু উদ্বোধ করিয়া
দিলেই অনায়াসে তাহার মুক্তি হয়। কিন্তু পরের বুদ্ধিতে যাহারা
পরিচালিত (অর্থাৎ স্বীয় বিবেক যাহার তেমন প্রবল নহে)
তাহারা পরকে আশ্রয় করিয়া অতি প্রযত্নে মুক্তিলাভ করে ।
নন্দ পরের প্রত্যয়ে প্রত্যয়বান বলিয়া যখন যাহা
আশ্রয় করিতেন তখনই তাহাতে তন্ময়তা প্রাপ্ত হইতেন ;
১৮।

সৌন্দরনন্দ কাব্য
১৯।
এইজন্য মুনি তাহার প্রতি স্নেহ হেতু উদ্ধারের ইচ্ছায় যত্ন
করিতে লাগিলেন।
নন্দ অগত্যা দুঃখসহকারে গুরুর (জ্যেষ্ঠভ্রাতার)
অনুগমন করিলেন। কিন্তু ভাৰ্যার চঞ্চলনেত্রশােভিত
আতিলকবিরাজিত মুখখানি তাহার মনে হইতে লাগিল।
২০। পরে মুনি বুদ্ধ বসন্তমাসের ন্যায় সুন্দর মাল্যশশাভিত
নন্দকে স্ত্রীবিহারে বাধা দিয়া জ্ঞানের ভূমি বুদ্ধবিহারে লইয়া
গেলেন।
২১। অতি দয়াশীল বুদ্ধদেব তাহার (নন্দের) দীনতা
দর্শনে সদয় হইয়া চক্রচিহ্নিত করতল দ্বারা তদীয় মস্তক স্পর্শ
করিয়া বলিতে লাগিলেন।
হে সৌম্য, যতক্ষণ হিংস্রস্বভাব কৃতান্ত আসিয়া
উপস্থিত না হয় ততক্ষণ শম বিষয়ে বুদ্ধি কর। মৃত্যু সকল
অবস্থাতেই সকলকে বিনাশ করিয়া থাকে।
২৩। সাধারণ কামসুখ স্বপ্নের তুল্য অসার, তাহা হইতে
চঞ্চল চিত্ত সংযত কর। বায়ুবীজিত অনল যেমন ধৃতে শান্তি
প্রাপ্ত হয় না, সেইরূপ কাম্যবস্তু দ্বারা লােকের কখনও তৃপ্তি
হয় না।
২৪। সমস্ত ধন অপেক্ষা শ্রদ্ধাই উত্তম ধন, সমস্ত রস
অপেক্ষা প্রজ্ঞাই উৎকৃষ্ট তৃপ্তিকর, সকল সুখ অপেক্ষা অধ্যাত্ম
সুখই প্রধান, সমস্ত রতি অপেক্ষা অবিদ্যারতিই দুঃখদায়ক।
২৫। সকল বন্ধু অপেক্ষা হিতবাক্যবাদী জনই উত্তম বন্ধু,

নন্দপ্রব্রাজন নাই। ২৮। সকল শ্রম অপেক্ষা ধৰ্ম্মের জন্য শ্রমই উত্তম, প্রিয়াগণ অপেক্ষা ধৰ্ম্মকাৰ্য্য প্রশস্ত। ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব অবলম্বনে ফল কি ? ২৬। অতএব ভয়- ক্লেশ- ও শােক-শূন্য, স্বায়ত্ত, পরের দ্বারা অহাৰ্য্য, নিশ্চিত, নিত্য, শিবময় শান্তিসুখ বরণ কর। অনর্থপূর্ণ ইন্দ্রিয়ভােগ্য বিষয়ে আসক্ত হইয়া ফল কি? ২৭। জগতে জরার তুল্য আর অশুদ্ধি নাই, ব্যাধির তুল্য লােকের আর অনর্থ নাই, মৃত্যুর তুল্য আর পৃথিবীতে ভয় যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়ের বশীভূত অসংযমী তাহাকে এই তিনটী ভােগ করিতে হয়। স্নেহের তুল্য পাশ (বন্ধন ) নাই, তৃষ্ণার মত আর আকর্ষণকারী স্রোত নাই, বাসনাগ্নির ন্যায় আর অগ্নি নাই। এই তিনটী যদি তােমার না থাকে তবেই তােমার সুখ হইবে। ২৯। প্রিয়জনের সহিত অবশ্য বিয়ােগ হইবে, এবং সেইজন্য তােমাকেও শােক ভােগ করিতে হইবে। শােকবশতঃ উন্মত্তদশা লাভ করিয়া রাজর্ষি ও অন্য ব্যক্তি সকলেই বিচলিত হইয়াছেন জানা যায়। ৩০। অতএব তুমি বিবেকবৰ্ম্ম পরিধান কর, তাহা হইলে সংযমী তােমার শরীরে শােকবাণ প্রবেশ করিতে পারিবে না। এই সংসাররূপ মহৎ শুষ্কতৃণ দগ্ধ করিবার জন্য (অর্থাৎ মুক্তির জন্য ) আত্মতেজঃরূপ অল্প অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া তােল। ৩১। যেমন বিষ নিবারণের ঔষধ হাতে থাকিলে বিষ-

৪০
সৌন্দরনন্দ কাব্য
৩৪ }
বৈদ্যকে ভুজঙ্গ দংশন করে না, সেইরূপ মােহশূন্য ব্যক্তিকে
শােকরূপ ভুজঙ্গম কখনও দংশন করে না।
৩২। যেমন কোনও বীর ব্যক্তি বর্ম পরিধান করিয়া
কাৰ্ম্মক ও অপর অস্ত্র লইয়া শত্রুজয়ের ইচ্ছায় যুদ্ধে অবতীর্ণ
হইলে তাহার কোনও ভয় থাকে না, সেইরূপ যে ব্যক্তি যােগ
অবলম্বন করিয়া তত্ত্বজ্ঞানী হয় মৃত্যুকালে তাহার আর ভয়
থাকে না।
৩৩। সর্বভূতে দয়াবান্ বুদ্ধদেব নন্দকে এই-সকল কথা
বলিলেন। নন্দ হৃদয়ে অবসন্ন হইয়াও মৌখিক উৎসাহ দেখাইয়া
“হা তাহাই” বলিয়া স্বীকার করিয়া লইলেন।
পরে মৈত্রানুরাগী মহর্ষি বুদ্ধ প্রমাদ হইতে নন্দকে
উদ্ধার করিবার ইচ্ছায় তাহাকে শাস্ত্রোপদেশের যােগ্য মনে
করিয়া বলিলেন, হে আনন্দ, ইহাকে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করাও।
একথা শুনিয়া যখন মনে মনে লােদন
করিতেছেন এমন সময়ে বৈদেহমুনি বলিলেন, আগমন কর।
কিন্তু নন্দ ধীর গতিতে তাহার নিকট যাইয়া বলিলেন, আমি
প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিব না।
৩৬। বৈদেহমুনি নন্দের অভিপ্রায় শুনিয়া বুদ্ধের নিকট
নিবেদন করিলেন। বুদ্ধদেব তাহার নিকট হইতে নন্দের ভাব
জানিয়া পুনর্বার নন্দকে বলিতে লাগিলেন।
৩৭। হে সংযমিন, আমি তােমার অগ্রজ প্রব্রজ্যা গ্রহণ
করিয়াছি এবং আমার অনুগামী হইয়া ভ্রাতৃগণ ও অপরাপর
নন্দ

নন্দপ্রব্রাজন ৪১ জ্ঞাতিগণ প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিয়াছে। গৃহস্থগণ সংযম অবলম্বন করিয়াছে। ইহা দেখিয়াও তােমার চিত্তে জ্ঞানের উদ্রেক হইতেছে না। তােমার কি হৃদয় নাই ? যে পূর্ববর্তী রাজর্ষিগণ হাসিতে হাসিতে ভােগ- লালসা দূরে বর্জন করিয়া শান্তি কামনায় বন আশ্রয় করিয়া- ছেন, ঈদৃশ নিকৃষ্ট বিষয় ভােগে আসক্ত হন নাই, তাহাদের কথা কি তুমি জান না ? ৩১। মুমূষু ব্যক্তি যেমন উপদ্রবযুক্ত স্থান ত্যাগ করিতে চাহে না, সেইরূপ গৃহস্থাবাসে পুনঃ পুনঃ দোষ দেখিয়া এবং ত্যাগের শুভ আলােচনা করিয়াও তুমি গৃহত্যাগ করিতে চাহিতেছ না। ৪। সার্থভ্রষ্ট বণিকের ন্যায় তুমি সংসাররূপ কান্তারে আসক্ত থাকায় কেন মঙ্গলময় পথে আরােহণ করিতে চাহিতেছ ? আমি তােমাকে সেই পথে তুলিয়া দিতেছি, তথাপি তুমি তাহা হইতে ভ্রষ্ট হইতেছ। ৪১। সমস্ত গৃহ যখন দগ্ধ হইতে থাকে তখন মূখতাবশতঃ গৃহ পরিত্যাগ না করিয়া তথায় শয়ান ব্যক্তির ন্যায় অজ্ঞ ব্যক্তিই ব্যাধি ও জরারূপ শিখাযুক্ত কালাগ্নি দ্বারা জগৎ জ্বলিতে থাকিলে তাহা পরিত্যাগ করে না। যেমন কোনও মত্ত ব্যক্তিকে বধের জন্য বধ্যভূমিতে লইয়া গেলে সেই ব্যক্তি হাস্য ও প্রণাম করে, সেইরূপ পাশ হস্তে কৃতান্ত দণ্ডায়মান আছে বলিয়া বিপরীতবুদ্ধি অনবহিত ব্যক্তি পােচ্য অবস্থা প্রাপ্ত হয়। ৪২।

৪২ সৌন্দরনন্দ কাব্য ৪৩। যখন রাজা বা গৃহস্থ সকলেই বন্ধু দারা প্রভৃতি পরিত্যাগ করিয়া গমন করিয়াছে করিবে ও করিতেছে, তখন আর অনিত্য প্রিয় বস্তুর প্রতি অনুরাগ কেন ? ৪৪। যেখানে অনুরাগের বিষয় কিছুই দেখিতেছি না সেখানে অন্য ভাব অর্থাৎ বিরাগ হইলে দুঃখ হয় না। অতএব অনুরাগ কোথায়ও উপযুক্ত নহে ( উচিত নহে)। যদি তাহা করিতে সমর্থ হও তাহা হইলে সেই দ্রব্যের অভাবে শােক হইবে না। ৪৫। হে সৌম্য, যদি তােমার দুঃখজাল উচ্ছেদ করিবার ইচ্ছা থাকে, তবে জগৎ নশ্বর, এবং ঐন্দ্রজালিক মায়ার ন্যায় চিত্তকে মিথ্যা বস্তুর উপদেশক নিশ্চয় করিয়া প্রিয়া-নামক মােহজাল পরিত্যাগ কর। ৪৬। যে ভােজ্য বস্তু আপাততঃ অনিষ্টকর হইয়াও ভবিষ্যতে শুভফল দান করে তাহা, আপাততঃ স্বাদু হইয়াও ভবিষ্যতে অহিত উৎপাদন করে এরূপ ভােজ্য দ্রব্য অপেক্ষা উত্তম। এইজন্যই আমি আপাততঃ তােমার অপ্রিয় হইলেও মঙ্গলময় পবিত্র পথে তােমাকে নিযুক্ত করিতেছি। ৪৭। বালকের ধাত্রী যেমন লােষ্ট্র গ্রহণ করিয়া আত্মপুট- প্রবিষ্ট লােষ্ট্র উদ্ধার করে, সেইরূপ আমি তােমার মঙ্গলের জন্য অনুরাগ-শল্য উদ্ধার করিতে ইচ্ছা করিয়া তােমাকে কর্কশ কথা বলিতেছি। ৪৮। বৈদ্য যেমন বােগাতুর ব্যক্তিকে কষ্ট দিয়াও তদীয়

নন্দপ্রব্রাজন
১৩
৫১।
অনভিলষিত কটু ঔযধ দান করে, সেইরূপ আমি ভবিষ্যতে
শুভপ্রদ আপাতপ্রতিকূল এই বাক্য তােমার প্রতি অনুগ্রহ
করিয়া বলিয়াছি।
৪৯। অতএব সময় থাকিতে, মৃত্যু যতক্ষণ আসিযা না পড়ে,
যতক্ষণ যােগকাৰ্য্যে বয়সের যােগ্যতা থাকে, ততক্ষণের মধ্যে নিজ
শ্রেয় বিষয়ে বুদ্ধি যুক্ত কর।
৫০। হিতৈষী পরম কারুণিক বিনায়ক এই কথা বলিলে
নন্দ বলিলেন, ভগব, আমি তােমার আজ্ঞাক্রমে সমস্ত কাৰ্য
সম্পাদন করিব।
পরে বৈদেহমুনি তাহাকে গ্রহণ করিয়া আলিঙ্গন
করিলেন এবং অপূর্ণনয়নে সেই (নন্দের) ছত্ৰতুল্য মস্তকের
কেশশােভা অপসারিত করিলেন মস্তক মুণ্ডন করিয়া দিলেন ।
৫২। পরে তাহার মস্তক মুণ্ডিত হইয়া গেলে তাঁহার মুখে
লােদন-শব্দ এবং বাষ্পরাশি দেখা দিল ; তখন তাঁহার মুখখানি
বক্ৰনালযুক্ত বর্ষাজলক্লিন্ন তড়াগস্থিত পদ্মের ন্যায় দেখা
যাইতেছিল।
৫৩। অনন্তর নন্দ পবিত্র কাষায় বস্ত্র ধারণ করিলেন, কিন্তু
নবগৃহীত হস্তীর ন্যায় তাহার সচিন্তভাব উপস্থিত হইল। কাষায়-
বস্ত্র-শােভায় তাহাকে কৃষ্ণপক্ষের রাত্রির অবসানে বালাতপরঞ্জিত
পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় দেখা যাইতেছিল।
সৌন্দরনন্দ কাব্যে পঞ্চম সর্গ সমাপ্ত
;

যষ্ঠ সর্গ
ভাৰ্য্যাবিলাপ
১। পতি বুদ্ধভক্তি দ্বারা হৃত হইল। প্রীতি ( কোথায় )
চলিয়া গেল।
মন খারাপ হইল। তখন সেই প্রাসাদোপরি
থাকিয়াও সেই সুন্দরী আর শােভা পাইলেন না।
২। তিনি পতির আগমন প্রতীক্ষা করিয়া গৰাক্ষদেশ
পরােধর-যুগল দ্বারা আক্রমণ করিয়া দ্বারের দিকে উন্মুখ হইয়া
বক্ৰী কৃতকুণ্ডল-মুখে হৰ্ম্মতল হইতে নত হইয়া দেখিতে
লাগিলেন।
৩। তঁাহার হার দুলিতে লাগিল। তাঁহার যােক্তক
কঁপিতে লাগিল। তিনি সেই সপ্তভূমিক প্রাসাদ হইতে অবনত
হইয়া শােভা পাইতে লাগিলেন। দেখা যাইতে লাগিল যেন
কোন শ্রেষ্ঠা অপ্সরা আকাশ হইতে ভ্রষ্ট প্রিয়ের দিকে দৃষ্টিপাত
করিতেছে।
৪। স্বামীকে অন্যাসক্ত আশঙ্কা করিয়া তাহার ললাটপ্রদেশ
স্বেদযুক্ত হইল, দীর্ঘনিশ্বাস দ্বারা বিশেষক শুষ্ক হইল। তাহার
অক্ষিযুগল চিন্তায় নিশ্চল হইল।
অনেকক্ষণ এরূপ ভাবে অবস্থান করায় সুন্দরী পরি-
শ্রান্ত পৰ্যঙ্কোপরি পতিত হইয়া বক্রভাবে শয়ন করিলেন।
তাহার হার ছড়াইয়া পড়িল। পাদুকা পাদবদ্ধ ছিল, পাদদেশের
অর্ধ (শয্যা হইতে) বিলম্বিত হইতেছিল।

ভাৰ্য্যাবিলাপ ৪৫ ৬। অনন্তর কোনও রমণী অশ্রুপূর্ণনয়না দুঃখিতা তাহাকে দেখিতে ইচ্ছা না করিয়া সহসা কঁদিতে কাঁদিতে পাদদেশ দ্বারা প্রাসাদের সােপানতলে শব্দ করিল। ৭। সুন্দরী তাহার সােপানতল-শব্দ শুনিয়াই তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িলেন ; প্রিয়ের আগমন আশঙ্কা করিয়া প্রীতিযুক্ত হইয়া হর্ষ প্রকাশ করিলেন । ৮। সুন্দরী বলভীপুটস্থ পারাবতদিগকে নূপুরশব্দে ত্রাসিত করিয়া আনন্দে ভ্রষ্ট বসনের দিকে লক্ষ্য না করিয়াই সােপানগৃহে অগ্রসর হইলেন। ৯। সেই রমণীকে তথায় দেখিয়া বঞ্চিত হইয়া দীর্ঘনিশ্বাস গ্রহণ পূর্বক (তিনি) পুনরায় শয্যায় শয়ন করিলেন। শীত- কালের আগমনে আকাশে চন্দ্র যেমন বিবর্ণ হইয়া শােভা পায় , তাঁহার মুখও সেইরূপ বিবর্ণ হইয়া শােভাবিহীন হইল। ১০। তিনি ভর্তার অদর্শনে দুঃখিত, কাম ও কোপে দহমানা হইয়া হস্ততলে মুখ ন্যস্ত করিয়া উপবেশন পূর্বক শােকরূপ-জল-বিশিষ্ট চিন্তারূপ নদী পার হইলেন (শােকে চিন্তা করিতে লাগিলেন)। ১১। পল্লবরাগবৎ তাম্রবর্ণ হস্তোপরি ন্যস্ত তাহার পদ্মসদৃশ মুখমণ্ডল জলস্থিত ছায়াময় পদ্মের উপরে নত অন্য পদ্মের ন্যায় দেখাইতেছিল। ১২। সুন্দরী স্ত্রীস্বভাব বশতঃ অনুরক্ত অভিমুখ এবং ধৰ্ম্মাশ্রিত পতির বিষয়ে নানারূপ চিন্তা করিয়া বাস্তব বিষয়

৪৬
সৌন্দরনন্দ কাব্য
জানিয়া সেই সেই বিষয় কল্পনা করিয়া বিলাপ করিতে
লাগিলেন।
১৩। বিশেষক শুষ্ক হইবার পূর্বেই আসিব এরূপ প্রতিজ্ঞা
করিয়া কি হেতু দয়িতপ্রতিজ্ঞ আমার প্রিয় আজ মিথ্যাপ্রতিজ্ঞ
হইলে ?
১৪। তুমি আৰ্য, তুমি সাধুপ্রকৃতি, তােমার হৃদয় করুণায়
পূর্ণ, তুমি আমাকে সর্বদা ভয় করিতে, তুমি অতিশয় দক্ষিণ,
নিজের অনুরাগবিহীনতা হেতু অথবা আমার দোষে তােমার
এই অভূতপূর্ব বিকার কোথা হইতে আসিল।
১৫। রতিপ্রিয় প্রিয়বী আমার প্রিয়ের হৃদয় নিশ্চয়ই
বিরক্ত হইয়াছে। যদি তাহার অনুরাগই থাকিত তাহা হইলে
আমার চিত্তরক্ষী আমার প্রিয় কখনও না আসিয়া থাকিতে
পারিত না।
১৬। অথবা রূপ-ও-ভাব-বিশিষ্ট অপর কোনও রমণী
দৃষ্ট হইয়াছে কি ? সেই জন্যই কি সে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়া সতী
অনুরক্তা আমাকে পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে ?
১৭। বুদ্ধের প্রতি যে ভক্তির কথা বলিয়াছিল তাহা বােধ
হয় গমন করিবার ছল মাত্র। যদি মুনির প্রতি তাহার ভক্তিই
থাকিত তাহা হইলে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর পরেই তাহাকে ভয় করিত।
১৮। বিভূষণরত আমার পত্রাবলী রচনা করিবার জন্য
অনন্যচিত্তে আদর্শ ধারণ করিয়া সে যদি অন্য কোনও রমণীর
আদর্শ ধারণ করে তবে সেই চঞ্চল বন্ধুত্বকে নমস্কার।

ভাৰ্য্যাবিলাপ
৪৭
১৯। যে-সকল স্ত্রীলােক এইরূপ শােক পাইতে ইচ্ছা করে
, তাহারা যেন আমার মত পুরুষদিগকে বিশ্বাস করে না।
কোথায় আমার প্রতি তাহার সেই পূর্ব অনুরাগ, আর কোথায়ই
বা সাধারণের মত মুহূৰ্ত মধ্যে এরূপ পরিত্যাগ।
২০। প্রিয়বিপ্রযুক্তা সুন্দরী প্রিয়ে অন্যরূপ আশঙ্কা করিয়া
এইরূপ বলিতে লাগিলেন। সেই রমণী ভয়ে ভয়ে সেই গৃহে
প্রবেশ করিয়া সাশ্রনয়নে বলিতে লাগিল।
২১। যুবা, প্রিয়দর্শন, সৌভাগ্য- ভাগ্য- এবং কৌলিন্যযুক্ত
হইয়াও যে প্রিয় তােমাকে কখনও অনাদর করে নাই, কেন ।
তুমি কাতর হইয়া তাহাকে অন্যরূপ আশঙ্কা করিতেছ।
২২। স্বামিনি, সেই প্রিয় প্রিয়াহঁ প্রিয়কারী স্বামীকে
দোষ দিও না। চক্রবাক যেমন নিজের চক্রবাকী ভিন্ন অন্য
কোন চক্রৰাকীকে জানে না, তিনিও তুমি ছাড়া অন্য কোনও
রমণীকে জানেন না।
২৩। তিনি তােমারই জন্য গৃহবাস অভিলাষ করিয়াছিলেন,
তােমারই পরিতােষের জন্য বাঁচিতে ইচ্ছা করিতেন।
ভ্রাতা আৰ্য তথাগত নেত্ৰজলাদ্রবক্ত তাঁহাকে প্ৰব্ৰাজিত
করিয়াছেন।
২৪। স্বামীর সেই সংবাদ শুনিয়া সুন্দরী সহসা কঁপিতে
কপিতে উঠিয়া বসিলেন। হৃদয়ে বিষলিপ্ত শর দ্বারা আহত
করেণুর তুল্য বাহুদ্বয় দুইদিকে করিয়া উচ্চস্বরে বিলাপ করিতে
লাগিলেন।

৪৮ সৌন্দরনন্দ কাব্য ২৫। ফলভারাবনতা আলতার মত তিনি পড়িয়া গেলেন। রােদন করিতে করিতে তাহার নয়ন রক্তবর্ণ হইল। তাহার সমস্ত শরীর সন্তাপে ক্ষোভিত হইল। তাহার হার বিশীর্ণ হইল। ২৬। পদ্মাননা পদ্মদলায়তলােচনা সুন্দরী পদ্মরাগ বসন পরিধান করিয়া ছিলেন। পদ্মহীনা লক্ষীসদৃশী (সুন্দরী) নিশ্চল নয়নে পতিত হইয়া আতপপিত পদ্মমাল্যের মত শুকাইয়া গিয়াছিলেন। ২৭। স্বামীর গুণসমূহ চিন্তা করিয়া করিয়া তিনি দীর্ঘ- নিশ্বাস ত্যাগ করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। প্রকোষ্ঠে ও তাম্রবর্ণ করে ধৃত অলঙ্কার-শ্ৰী কপিতে লাগিল। এখন আমার অলঙ্কারের প্রয়ােজন নাই এই মনে করিয়া তিনি চারিদিকে অলঙ্কারগুলি ছড়াইয়া ফেলিলেন। বিশীর্ণ-পুষ্পস্তবকা লতার ন্যায় ভূষণহীনা সুন্দরী (ভূমিতে) পতিত হইয়াও শােভা পাইতে লাগিলেন। ২৯। আমার প্রিয় ধারণ করিয়াছিলেন এই মনে করিয়া স্বর্ণনিৰ্ম্মিতমুষ্টি দর্পণ আলিঙ্গন করিলেন। যত্নবিন্যস্ত তমালপত্রবিশিষ্ট গণ্ডপ্রদেশ রােষে জোরে ঘসিতে লাগিলেন। শেন কর্তৃক চক্ৰবাকের অগ্রপক্ষ আহত হইলে চক্রবাকী যেরূপ চীৎকার করে, বিমানস্থিত কূজনপ্রিয় পারাবত- গণের কূজনধ্বনিকে স্পর্ধা করিয়া তিনি জোরে সেরূপ চীৎকার করিতে লাগিলেন।

ভাৰ্য্যাবিলাপ
৪১
৩১। বৈদূৰ্য- ও হীরক-মণ্ডিত, বিচিত্র-কোমল-আবরণযুক্ত
মহামুল্য স্বর্ণপদবিশিষ্ট খটায় শুইয়া ( সুন্দরী ) ধড়ফড় করিতে
লাগিলেন, শান্তিলাভ করিতে পারিলেন না।
৩২। স্বামীর অলঙ্কারসমূহ, বস্ত্র ও বীণা প্রভৃতি লীলা-
দ্রব্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া তাহার শােক বাড়িয়া গেল।
তখন পঙ্কাবতীৰ্ণার ন্যায় তিনি উচ্চস্বরে কাঁদিতে লাগিলেন।
কিছুতেই প্রসাদ লাভ করিলেন না।
৩৩। বজ্রাগ্নি-সংভিন্ন গুহামুখের ন্যায় প্রতি নিশ্বাসে তাঁহার
উদর কম্পিত হইতে লাগিল। শােকাগ্নি দ্বারা অন্তহৃদয়ে দগ্ধ
হইয়া তিনি তখন বিভ্রান্তচিত্ত হইয়া পড়িলেন।
৩৪। তিনি রােদন করিতে লাগিলেন, ম্লান হইয়া গেলেন,
কাঁদিতে লাগিলেন, শ্রান্ত হইয়া পড়িলেন, চলিতে আরম্ভ করিলেন,
আবার স্থির হইয়া রহিলেন, বিলাপ করিতে লাগিলেন, চিন্তারত
হইলেন। রােষ করিতে লাগিলেন, মাল্য বিকৃত করিলেন, মুখ
আঁচড়াইতে লাগিলেন, কাপড় টানিয়া ছিড়িতে লাগিলেন।
৩৫। সেই চারুদন্তী সুন্দরীকে অত্যন্ত রােদন করিতে
শুনিয়া তত্ৰত্য স্ত্রীলােকেরা অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়া, কিন্নরীগণ
যেরূপ পর্বতে আরােহণ করে সেরূপ, ভয়ে ভয়ে অন্তহ হইতে
বিমানে আরােহণ করিল।
৩৬। তাহাদের মুখ বাষ্পত্যাগ-হেতু বর্ষার আদ্র পদ্ম
পদ্মিনীর ন্যায় ক্লিন্ন এবং বিষন্ন দেখাইতেছিল। তাহারা তাহার
দুঃখে সন্তপ্ত হইয়া যথাযযাগ্য স্থানে উপবেশন করিল।

সৌন্দরনন্দ কাব্য
৩৭। শরৎকালের আকাশে বিদ্যুৎ-পরিবেষ্টিত শশাঙ্করেখার
ন্যায় হম্মতলে সেই অঙ্গনাসমূহ-পরিবৃত চিন্তিত-হৃদয় সুন্দরী
শােভিত হইতেছিলেন।
৩৮। তাহাদের মধ্যে যে রমণী তাহার বয়ােধিকা, মান্যা
এবং ভাষণনিপুণা, সে পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া,
অশ্রু মার্জনা করিয়া বলিতে আরম্ভ করিল।
৩৯। স্বামী ধৰ্ম্ম আশ্রয় করিয়াছে বলিয়া রাজর্ষিবধূ
তােমার শােক করা কখনও উচিত নহে। তপােলই ইক্ষাকু-
বংশীয়দিগের অভিকাঙিক্ষত পৈতৃক সম্পত্তি।
৪০। মােক্ষের জন্য বহির্গত শাক্যবংশীয় ঋষি-পত্নীগণের
কথা প্রায়ই তােমার অবিদিত নাই। তাহাদের গৃহই ছিল
তপােবন। তাহারা কামের ন্যায় সাধ্বীব্রতেরই আশ্রয় গ্রহণ
করিয়াছিল।
৪১। যদি অধিক-রূপ-গুণ-বিশিষ্টা অপর কোনও রমণী
তােমার স্বামীকে হরণ করিয়া থাকিত, তাহা হইলে অশ্রুবর্ষণ
করিতে পারিতে। হৃদয় ক্ষত হইলে কোন্ রূপবতী, ধনাঢ্যা,
মনস্বিনী রমণী অশ্রুবর্ষণ না করেন ?
৪২। যদি স্বামী কোনওরূপ বিপদ প্রাপ্ত হইত—তাহা
যেন না হয়—তাহা হইলে বাষ্পত্যাগ করা যুক্তিসঙ্গত হইত।
(কারণ) পতিদেবতা সৎকুলসম্ভবা নারীর তাহা অপেক্ষা
অধিক আর কোনও দুঃখ নাই।
৪৩। কিন্তু সুস্থদেহ অবিপন্ন সুখে লালিত হইয়া বীতস্পৃহ

ভাৰ্য্যাবিলাপ
৪৪।
হইয়া তিনি সুখে ধৰ্ম্ম আশ্রয় করিয়াছেন। অয়ি বিক্লবে,
এরূপ আনন্দের সময়ে তুমি কাঁদিতেছ কেন ?
স্নেহ হেতু এইরূপে বহুপ্রকার উক্ত হইয়াও তাহার
ধৈৰ্য আসিল না। অনন্তর অপর কোনও রমণী সময়ােচিত
মনের অনুকূল বাক্য সপ্রণয়ে বলিল।
৪৫। আমি সুনিশ্চিত সত্য কথা বলিতেছি, শীঘ্রই প্রিয়কে
পুনরাগত দেখিতে পাইবে। চেতনাবিহীন জীবনের ন্যায়
তােমাকে ছাড়িয়া তিনি সেখানে থাকিবেন না।
৪৬। যদি তুমি তাহার পার্শ্বে না থাক তাহা হইলে লক্ষীর
ক্রোড়েও ভঁহার নিবৃত্তি নাই। ভয়ানক বিপদেও তােমাকে
দেখিলে তঁাহার দুঃখ থাকে না।
৪৭। তুমি নিশ্চিন্ত হও। বাষ্পবর্ষণ ত্যাগ কর। তপ্তা-
মােক্ষ হইতে চক্ষুকে রক্ষা কর। তােমার উপর তাঁহার যেরূপ
ভাব ও অনুরাগ, তােমার বিরহে তিনি ধৰ্ম্মেও রত হইবেন না।
৪৮। ধাৰ্মিক বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া একবার
কাষায় গ্রহণের পর আর তাহা ত্যাগ করিবেন না তাহাও নহে।
অনিচ্ছায় গ্রহণ করিয়া গৃহগমনােম্মুখ লােকের পুনরায় তাহা
ত্যাগ করিতে কি দোষ ?
৪৯। স্বামীকর্তৃক হৃতহৃদয়া সুন্দরী যুবতিজনকর্তৃক এরূপ
সামানা হইয়া অপরােগণ-পরিবৃতা রম্ভার পূর্বকালে ক্ষিতি-
তলে গমনের ন্যায় দ্ৰমিড়াভিমুখে গমন করিলেন ।
সৌন্দরন কাব্যে ষষ্ঠ সর্গ সমাপ্ত

সপ্তম সর্গ
নন্দবিলাপ
১।
নন্দ যথাবিধানে উপদিষ্ট চিহ্ন কেবল শরীরে ধারণ
করিলেন, মনে তাহাতে অনুরাগ থাকিল না ; ভাৰ্য্যাবিষয়ে
মানসিক চিন্তাহেতু অভিভূত হইয়া আনন্দ লাভ করিতে
পারিলেন না।
২। তিনি বসন্তকালের পুস্পশােভা ও কামদেবের সাৰ্বত্রিক
প্রচার ও যৌবনের সমাশ্রয়হেতু বিহারে থাকিয়াও শান্তিলাভ
করিতে পারিতেছিলেন না।
যে সহকারকুঞ্জে ভ্রমরগণ প্রচুরভাবে লীন হইয়া আছে
সেই সহকারকুঞ্জে অবস্থিত হইয়া যুগকাষ্ঠের ন্যায় সুদীর্ঘ বাহু-
সম্পন্ন দীনাবস্থাযুক্ত নন্দ প্রিয়াকে চিন্তা করিয়া অত্যন্ত জ্বা
(হাই) পরিত্যাগ করিতেন। তাহাতে মনে হইত যেন তিনি
চাপ আকষর্ণ করিতেছেন।
৪। নবগৃহীত করীর ন্যায় নন্দ পাপচূর্ণকের ন্যায় চূতবৃক্ষ
হইতে ছােট ঘােট পুষ্পের বৃষ্টি লাভ করিয়া ভাৰ্যার চিন্তায়
দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করিতেন।
৫। যে নন্দ একদিন শরণাগত ব্যক্তির শােক নাশ করিতেন
এবং গর্বিত শত্রুর শােক উৎপাদন করিতেন, তিনি আজ

নন্দবিলাপ অশােক বৃক্ষ দেখিয়া শােকগ্রস্তভাবে অশােকবনপ্রিয়া প্রিয়ার জন্য শােক করিতে লাগিলেন। প্রিয়ার অতিপ্রিয় প্রতনু প্রিয়ঙ্গুল দেখিয়া প্রিয়ঙ্গু কুসুমের ন্যায় নির্মলা ও ভীতভাবে সমীপচারিণী অশ্রুমুখী প্রিয়াকে বাষ্পকুল লােচনে স্মরণ করিতে লাগিলেন। ৭। তিলক বৃক্ষের পুষ্পশােভিত শিখর প্রদেশে উপবিষ্ট কোকিলাকে দর্শন করিয়া শুক্লবর্ণ অট্টালিকাস্থিত প্রিয়ার উৰ্দ্ধবদ্ধ কেশরাজি বলিয়া কল্পনা করিতে লাগিলেন। ৮। চুতবৃক্ষের পার্শ্বে একটী কুসুমিতা মাধবীলতা তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া রহিয়াছে দেখিয়া ভাবিতে লাগিলেন এইরূপে আমার প্রিয়া সুন্দরী আমাকে আলিঙ্গন করিবে। ৯। হেমগর্ভ সুন্দর সমুদ্গকের (কৌটা) ন্যায় পুষ্প- সমূহে শােভিত নাগকেশর বৃক্ষগুলিও কান্তারস্থিত বৃক্ষের ন্যায় দুঃখিত, ইহার চক্ষু আকর্ষণ করিতে পারিল না। ১০। গন্ধর্বদেশীয় সুগন্ধ গন্ধপুষ্প সুগন্ধ বিস্তার করিয়াও অন্যচিত্ত শােকযুক্ত তাহার ঘ্রাণ আকর্ষণ করিতে পারিল না। ( কেবল) হৃদয়ে (আরও) দুঃখ দিতে লাগিল। ১১। সুন্দরকণ্ঠস্বরযুক্ত ময়ূরগণ, প্রহৃষ্ট কোকিলগণ ও মধুপানমত্ত ভ্রমরগণ কর্তৃক শব্দিত কানন তাহার চিত্ত চঞ্চল করিয়াছিল। ১২। নন্দ ভাৰ্যারূপ অরণি-সস্তৃত বিতর্করূপ ধূমযুক্ত মােহরূপ শিখাযুক্ত কামরূপ অগ্নি দ্বারা মানসিক তাপভােগ

৫৪
সৌন্দরনন্দ কাব্য
করিতে লাগিলেন এবং ধৈৰ্য্য পরিত্যাগ করিয়া বক্ষ্যমানরূপে
বিলাপ করিতে লাগিলেন।
১৩। আজ আমার মনে হয় যে যাঁহারা অশ্রুমুখী কাতরা
প্রিয়াকে উপেক্ষা করিয়া কঠোর তপস্যা আচরণ করিয়াছেন,
করিতেছেন ও করিবেন, তাহারা অত্যন্ত দুষ্কর কাৰ্য্য করিয়াছেন,
করিতেছেন ও করিবেন।
১৪। চঞ্চলনেত্রযুক্ত প্রিয়ার আনন ও সুন্দর বচন যেরূপ
জগতে দৃঢ় বন্ধন, জগতে দারু, তন্তু বা লৌহের বন্ধনও সেরূপ
দৃঢ় নহে।
১৫। ঐ-সকল বন্ধন নিজের পৌরুষ ও সুহৃদের শক্তি দ্বারা
ছিন্ন ভিন্ন করা যায়। কিন্তু স্নেহ-বন্ধন জ্ঞান ও রুক্ষতা
ব্যতিরেকে মােচন করা যায় না।
১৬। যে জ্ঞান শম উৎপাদন করে, আমার সে জ্ঞান নাই।
আমি অতি দয়াশীল, অতএব রুক্ষতাও নাই। আমার বিষয়-বাসনা
অসীম। (সুতরাং আমার পক্ষে স্নেহ-বন্ধন ছিন্ন করা অসম্ভব।
কিন্তু) বুদ্ধদেব গুরু (তাহার আদেশও অলঙ্ঘনীয়)। আমার
উভয়-সঙ্কট যেন ( রথ )-চক্রের নিম্নে পতিত হইয়াছি।
আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও ঋষি বুদ্ধদেব এবং আনন্দ ও
বৈদেহ এই দুই গুরু আমাকে উপদেশ দিয়াছেন। কিন্তু চক্রবাক
যেমন চক্রবাকীর বিয়ােগে অশান্ত হয় আমি ভিক্ষু-পরিচ্ছদ
ধারণ করিয়াও সর্বাবস্থায় অশান্তি ভােগ করিতেছি।
১৮। এখনও আমার মনে পড়ে আমি দর্পণখান ব্যাকুলিত
১৭।

নন্দবিলাপ
৫৫
১৯।
করিলে সে মিথ্যা ক্রোধ দেখাইয়া শাঠ্যের সহিত হাসিতে
হাসিতে আমাকে বলিল “কেমন [ তােমায় ] করিয়াছি।”
সে যে চঞ্চল নেত্রে অশ্রুজল ফেলিতে ফেলিতে
আমাকে বলিয়াছিল, “বিশেষক শুষ্ক হইবার পূর্বে ফিরিয়া
আসিও।” তাহার সেই কথা এখনও আমার মনকে কষ্ট দিতেছে।
২০। এই ভিক্ষু বদ্ধাসনে পাদপতলে ও নিঝরে স্বস্থভাবে
থাকিয়া যেরূপ ধ্যান করিতেছেন, আমি শান্ত তৃপ্তের ন্যায়
উপবিষ্ট হইয়া কখনও এরূপ পরিব না।
২১। ইনি যেরূপ পুংস্কোকিলের শব্দ উপেক্ষা করিয়া
ও বসন্তশােভায় চক্ষু স্থাপন না করিয়া স্থির ভাবে শাস্ত্র
অভ্যাস করিতেছেন, তাহাতে মনে হয় যে ইহার চিত্ত প্রিয়ার
আকর্ষণ-শূন্য।
২২। স্থিরনিশ্চয়সম্পন্ন কৌতূহল- ও বিস্ময়-শূন্য শান্তাত্মা
অন্তমুখচেতা ঔৎসুক্যবর্জিত পরিভ্রমণকারী এই মহাপুরুষকে
নমস্কার।
২৩। ধর্মের বিষ্মভূত চৈত্রমাসে কোন্ নবযৌবনসম্পন্ন
ব্যক্তি পদ্মযুক্ত জল ও পবিত্র কোকিল-শব্দিত কানন দর্শন
করিয়া সংযম-শক্তি রক্ষা করিতে পারে ?
২৪। স্ত্রীগণ ভাব গর্ব গতি সৌন্দর্য স্মিত ক্রোধ মত্ততা
ও বাক্য দ্বারা দেবতা নৃপ ও ঋষিসমূহ পৰ্যন্ত বশীভূত করিয়াছে।
তবে আমাদের ন্যায় ব্যক্তিকে কেন চঞ্চল করিবে না ?
২৫। অগ্নি কামাভিভূত হইয়া স্বাহাকে, ইন্দ্ৰ অহল্যাকে

সৌন্দরনন্দ কাব্য ভজনা করিয়াছিলেন। তবে সেই সত্ত্ব ও দেবভাব-শূন্য স্ত্রীনিজ্জিত মনুষ্য আমি, আমার কথা কি ? ২৬। সূৰ্য্য রম্ভার প্রতি অনুরাগী হইয়া তাহার প্রতি ভাল- বাসার জন্য নষ্ট ( নিরুদ্দেশ ও অদৃশ্য ) হইয়াছিলেন শুনিতে পাই, এবং অশ্বরূপে অশ্ববধূর সহিত মিলিত হইয়া অশ্বিনী- কুমার দ্বয়ের জন্ম দিয়াছিলেন। ২৭। বৈবস্বত ও অগ্নি এই দুইজনে মিলিয়া স্ত্রীর জন্য বিরােধবুদ্ধিসম্পন্ন হইয়া অধীর ভাবে বহু বর্ষ যুদ্ধ কবিয়াছিলেন, তবে অন্য কোন ব্যক্তি স্ত্রীর জন্য চঞ্চল হইবে না ? ২৮। সাধুগণের শীর্ষস্থানীয় বশিষ্ঠদেব কামহেতু অক্ষমালা চণ্ডালীতে উপগত হইয়াছিলেন, যে চণ্ডালীর গর্ভে বিবস্বান তুল্য ভূজনাদ কপিঞ্জলাদ পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ২৯। তীক্ষশাপবর্ষী মহর্ষি পরাশর মৎস্যগর্ভস্যুতা মৎস্য- গন্ধার ভজনা করিয়াছিলেন। যাহার গর্ভে বেদবিভাগকর্তা ভগবান্ দ্বৈপায়ন জন্মগ্রহণ করেন। ৩০। ধর্মপরায়ণ দ্বৈপায়ন ঋষি কাশীতে বেশ্যার সহিত সঙ্গত হইয়াছিলেন, যে বেশ্যা বিদ্যুল্লতা যেমন মেঘে আঘাত করে সেইরূপ চঞ্চলনূপুরযুক্ত চরণে দ্বৈপায়নকে আঘাত করিয়াছিল। ৩১। ব্রহ্মার পুত্র অঙ্গিরা ঋষি অনুরক্তচিত্তে সরস্বতীর ভজনা করেন, যাহার গর্ভে নষ্ট বেদের পুনঃপ্রচারক সারস্বত পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। ৩২। রাজর্ষি দিলিপের যজ্ঞে কাশ্যপ স্বর্গস্ত্রীর প্রতি আসক্ত নন্দবিলাপ হইয়াছিলেন, তাহাতে তাহার যে তেজ শরীর হইতে ক্ষরিত হইয়াছিল উহা ঐ দ্বারা অগ্নিতে ক্ষেপণ করায় অসিত নামক পুত্রের উৎপত্তি হয়। ৩৩। এইরূপ অঙ্গদ তপস্যা শেষ করিয়া ও কামাভিভূত হইয়া যমুনাকে ভজনা করিয়াছিলেন, যাহাতে ধীরশ্রেষ্ঠ সারঙ্গপুষ্ট রথীতর জন্মগ্রহণ করেন। ৩৪। ভূমিকম্পে যেমন উচ্চশৃঙ্গ পৰ্বত বিচলিত হয়, সেই- রূপ মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ শান্তিগুণে ও বনে থাকিয়াও রাজকন্যা শান্তাকে দেখিয়া বিচলিত হইয়াছিলেন। ৩৫। যে গাধিত বিশ্বামিত্র বিষয়াসক্তিশূন্য হইয়া রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া ব্ৰহ্মর্ষি হইবার জন্য বনে আশ্রয় লইয়া- ছিলেন, তিনিই ঘৃতাচীর কটাক্ষে অভিভূত হইয়া দশ বৎসর একদিবসের ন্যায় মনে করিয়াছিলেন। ৩৬। ঐরূপ স্থূলশি। মহর্ষি রম্ভার প্রতি কামাভিভূত হইয়া মূচ্ছিত হন। ক্রোধবশতঃ অনিবার্যভাবে কিছুর অপেক্ষা করিয়া তিনি রম্ভাকে শাপ দিয়াছিলেন। ৩৭। প্রিয়া প্রমত্বরার ইন্দ্রিয় ভুজঙ্গ কর্তৃক অপহৃত হইতে দেখিয়া রুরু ‘সর্বেন্দ্রিয় নষ্ট করিয়াছিলেন। রােষে তপ রক্ষা করিতে পারেন নাই। ৩৮। যশস্বী গুণিপ্রবর দেবপ্রভাবসম্পন্ন বুধের পুত্র চন্দ্রের পৌত্র রাজর্ষি ঐড় অপ্সরা উর্বশীকে চিন্তা করিয়া উন্মাদ অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

৫৮ সৌন্দরন কাব্য ৩৯। তাগজ গিরিশিখরে কামবশে মেনকার প্রতি অনুরাগী হইয়াছিলেন এবং বজ্র যেমন হিন্তাল তরুতে আঘাত সেইরূপ বিশ্বাবসু সরােষে তাহাকে পদাঘাত করিয়াছিলেন। ৪০। মৈনাক পর্বত যেমন জলে প্রবেশ করিয়া সমুদ্রকে রুদ্ধ করিয়াছিল, রাজর্ষি জহ্ন, সেইরূপ নিজ উৎকৃষ্ট অঙ্গনা গঙ্গাজলে বিনাশ প্রাপ্ত হইলে অনঙ্গাভিভূতচিত্তে ভুজ দ্বারা গঙ্গাকে রােধ করিয়াছিলেন। ৪১। মূল থাকিতেও বৃক্ষ যেমন গঙ্গাজলে ঘুরিতে থাকে রাজর্ষি প্রতিপের পুত্র কুলপ্রদীপ শ্রীমান্ শান্তনু গঙ্গার বিরহে অধীর হইয়া সেইরূপ ঘূর্ণিত হইয়াছিলেন। রাজ্যের ন্যায় তদীয় স্ত্রী উর্বশীকে সৌনন্দকী হরণ করিলে, সবৃত্তসম্পন্ন সােমশ্মা শােক করিতে করিতে কামবশতঃ ধর্মচিন্তা ত্যাগ করিয়া ভ্রমণ করিয়াছিলেন। ৪৩। দেবসেনাপতির ন্যায় আর্নসেন বলহেতু সেনাক নামে প্রসিদ্ধ, ভীমপ্রভাব রাজা ভীমক মৃতভাৰ্যার জন্য দেহত্যাগ করিয়াছিলেন। ৪৪। স্বামী শান্তনু স্বৰ্গগত হইলে জনমেজয় তদীয় পত্নী কালীকে (মৎস্যগন্ধাকে) হরণ করিবার ইচ্ছা করিয়া ভীষ্ম হইতে মৃত্যু লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু তগত কাম পরিত্যাগ করিলেন না। ৪৫। “স্ত্রী-সঙ্গমে মৃত্যু প্রাপ্ত হইবে” এইরূপভাবে শাপ- ৪২।

নন্দবিলাপ
গ্রস্ত হইয়াও পাণ্ডু কামবশতঃ মাদ্রীতে গমন করিয়াছিলেন।
মহর্ষিশাপে ‘ইহা অসেব্য ইহা চিন্তা করেন নাই।
৪৬। এইরূপে দেবতা ও রাজর্ষিগণ কামবশে স্ত্রীগণের
বশ্যতা স্বীকার করিয়াছেন। তবে আমি বুদ্ধি ও বলে দুর্বল
হইয়া প্রিয়ার অদর্শনে কেন কষ্টভােগ করি।
৪৭। অতএব আমি পুনরায় গৃহে ফিরিব, এবং যথাবিধি
ইচ্ছামত কামভােগ করিব। চঞ্চলেন্দ্রিয় অন্যাসক্ত ধৰ্ম্মপথচুত
ব্যক্তির বাহচিহ্ন ধারণযােগ্য নহে।
৪৮।
যে ব্যক্তি হস্তে ভিক্ষাপত্র ধারণ করে, শির মুণ্ডিত
করে, মান পরিত্যাগ করে এবং কাষায় বস্ত্র পরিধান করে
তাহার যদি ধৈৰ্য বা শান্তি না থাকে, তবে সেই ব্যক্তির সত্তা
চিত্র প্রদীপের ন্যায় অসৎকল্প (থাকা না-থাকা সমান)।
যে ব্যক্তি গৃহ পরিত্যাগ করিয়াও কামশূন্য নহে
এবং চিত্তের মালিন্যশূন্য না হইয়াও কাষায় বস্ত্র ধারণ করে,
এবং হস্তে ভিক্ষাপাত্র ধারণ করিয়াও গুণের আশ্রয় নহে, সেই
ব্যক্তির ভিক্ষু-চিহ্ন থাকিলেও সে গৃহীও নহে ভিক্ষুও নহে।
৫০। আমি বিবেচনা করিতেছি যে সৎকুলজাত ব্যক্তির
ভিক্ষু-চিহ্ন ধারণ করিয়া আবার তাহা পরিত্যাগ করা ন্যায্য
নহে, কিন্তু যে-সকল প্রধান নৃপতি তপােবন পরিত্যাগ করিয়া
গৃহ আশ্রয় করিয়াছেন তাহাদের কথা ভাবিলেই, ঐ বিবেচনা
নষ্ট হইয়া যায়।
৫১। পুত্রযুক্ত শান্বদেশের অধিপতি অম্বরীষ, অন্ধ রাম,
৪৯।

সৌন্দরন কাব্য
ও সারুতি রন্তিদেব—ইহারা চীরবাস পরিত্যাগ করিয়া উত্তম বস্ত্র
ধারণ করিয়াছিলেন, এবং কুটিল জটা ছেদন করিয়া মুকুট
পরিধান করিয়াছিলেন।
৫২। অতএব আমার গুরুদেব ভিক্ষায় গমন করিয়াছেন,
এই অবসরে কাষায় বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া এস্থান হইতে আমি
গৃহে যাইব। যাহার বুদ্ধি ক্লেশযুক্ত চঞ্চল সেই ব্যক্তি পূজ্যচিহ্ন
ধারণ করিলে তাহার ঐহিক ও পারত্রিক দ্বিবিধ অর্থই নষ্ট
হইয়া যায়।
সৌন্দরন কাব্যে সপ্তম সর্গ সমাপ্ত

অষ্টম সর্গ স্ত্রীবিঘাত অনন্তর একজন শ্ৰমণ (বৌদ্ধ সন্ন্যাসী) চঞ্চলনেত্র অত্যন্ত উৎসুক নন্দকে গৃহগমনের জন্য ব্যাকুল দেখিয়া শান্ত- ভাবাপন্ন দৃষ্টিপাতে মিত্রভাবে নিকটে যাইয়া বলিলেন। ২। তােমার অব্যাপ্ত মুখ তােমার হৃদয়ের ভাব ব্যক্ত করিতেছে, তােমার এই ভ্রম কেন, ধৈৰ্য্য ধারণ কর, বিকারের উপশম কর, শম এবং বাষ্প একসঙ্গে শােভা পায় না। লােকের বেদনা দুই রকম হয়, একটি মানসিক ও অন্যটি দৈহিক। যাহারা শাস্ত্র এবং উপচার জানেন এই দুই রকম ব্যক্তিই উহার চিকিৎসা বিষয়ে সমর্থ। ৪। অতএব যদি তােমার দৈহিক রােগ হইয়া থাকে তবে সত্বর বৈদ্যের নিকট উহা বিজ্ঞাপন কর; রােগী ব্যক্তি যদি নিজ রােগ গােপন করে তবে অচিরকাল মধ্যে তাহাকে অনর্থে পড়িতে হয়। আর যদি তােমার কোনও মানসিক দুঃখ হইয়া থাকে তবে বল আমি তাহার উপযুক্ত ঔষধ বলিয়া দিব। মনের সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ এই তিন বিষয়ে একমাত্র অধ্যাত্মবি ব্যক্তিগণই চিকিৎসাক্ষম।

৬২
সৌন্দরনন্দ কাব্য
৬। যদি আমার নিকট বক্তব্য মনে কর তবে সমস্ত কথা
সত্য বল, চিত্তের গতি বহু প্রকার, এবং উত্তমকুলে বহু গুহ
বিষয় থাকে।
৭। শ্ৰমণ এই কথা বলিলে তিনি নিজ চেষ্টা বলিবার
অভিপ্রায়ে হস্ত দ্বারা তাহার হাত ধরিয়া অন্য বনে প্রবেশ
করিলেন।
৮। পরে সেই কুসুমবর্ষী বিশুদ্ধ লাগৃহে মৃদু-বায়ু-সঞ্চালিত
কোমল-পল্লবরাজি-প্রচ্ছাদিত হইয়া তাহারা দুইজনে উপবেশন
করিলেন।
৯। পরে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া প্রব্রজ্যাবলম্বী ভিক্ষুর
পক্ষে বলা অনুচিত নিজ অভীষ্ট শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন সেই বিদ্বান্
ভিক্ষুর নিকট ব্যক্ত করিলেন।
১০। হে ভদ্র, তুমি ধৰ্ম্মচারী ; প্রাণীর প্রতি সতত তােমার
মিত্ৰভাব। আমার এই অধীর অবস্থায় যদি আমার হিত
অভিলাষ কর তবে তাহাই তােমার যােগ্য হইবে ।
১১। অতএব তােমার নিকট আমি বলিবার জন্য উদযুক্ত
হইয়াছি, চঞ্চলচিত্ত অসাধু ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেও তাহার
নিকট আমি আমার এই ভাব ব্যক্ত করিব না।
১২। তবে সংক্ষেপে আমার ভাব শ্রবণ কর, আমি প্রিয়া-
শূন্য
হইয়া ধৰ্ম্মবিধানে শান্তিলাভ করিতেছি না, যেমন কামী
কিন্নর গিরির সানুপ্রদেশে কিন্নরীশূন্য হইয়া শান্তি লাভ
করে না।
;

স্ত্রীবিঘাত
১৩। আমি বনবাসে পরান্মুখ হইয়া গৃহে যাইবার বাসনা
করিয়াছি, যেমন রাজা উত্তম শ্রী-শূন্য হইয়া শান্তিলাভ করেন
নাই সেরূপ আমিও প্রিয়াশূন্য হইয়া শান্তিলাভ করিতেছি না।
১৪। প্রিয়া ভাৰ্যার প্রতি আসক্ত দুঃখিত নন্দের কথা
শুনিয়া শ্ৰমণ শিরঃসঞ্চালন করিয়া স্বগতভাবে ধীরে বলিতে
লাগিলেন।
১৫। হায়, ব্যাধের ভয়ে যে শূণপ্রিয় মৃগ একবার নিজ
সম্প্রদায় হইতে বিচ্যুত হইয়াছে, সেই মৃগই আবার গীতরবে
আকৃষ্ট হইয়া বাগুরায় (জালে) পতিত হইতে ইচ্ছা করিতেছে।
যে পক্ষী জালে বদ্ধ হইয়া একবার হিতকামী
ব্যক্তির সাহায্যে জালমুক্ত হইয়াছে সেই আবার ফল- ও
পুপযুক্ত বনে ভ্রমণ করিতে করিতে স্বয়ং পঞ্জরে প্রবেশ করিতে
চাহিতেছে।
১৭। যে করীশাবককে একদা বহুপঙ্কময় বিষম নদীতল
হইতে করী উদ্ধার করিয়াছে, সেই করীশাৰক আবার জলতৃষ্ণায়
কুম্ভীরপূর্ণ নদীতে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা করিতেছে।
১৮। সর্পযুক্ত গৃহে শয়ান ব্যক্তি জাগরিত ব্যক্তির দ্বারা
প্রবােধিত হইয়া নিজ যৌবনের উন্মাদে ও ভ্রমে স্বয়ং সেই উগ্র
সপকে ধারণ করিতে অভিলাষ করিতেছে।
যে বৃক্ষ বিশাল অগ্নি দ্বারা প্রজ্বলিত হইতেছিল,
সেই দ্রুম পরিত্যাগ করিয়া পক্ষী আবার নিজ নীড়ের মায়ায়
নিঃশঙ্কচিত্তে সেই বৃক্ষে স্থান গ্রহণ করিতে চাহিতেছে।
১৯।

৬৪ সৌন্দরনন্দ কাব্য ২০। যে জীবঞ্জীবক পক্ষী শ্যেন-ভয়ে প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিয়াছিল, সেই আবার কামবশে মুগ্ধ হইয়া অধীর হইয়া পড়িয়াছে, লজ্জা পরিত্যাগ করিয়াছে এবং অতি কষ্টে জীবন যাপন করিতেছে। ২১। দীন সারমেয় অজ্ঞতা ও তৃষ্ণার আক্রমণে ঘৃণা- ও দয়াশূন্য হইয়া নিজ বাস্ত (বমন) পুনরায় ভােজন করিবার কামনা করিতেছে। ২২। এইরূপে কাম-শােক গ্রস্ত নন্দকে দেখিয়া মুহূর্তকাল তদ্বিষয়ে চিন্তা করিয়া ও তাহার দিকে চাহিয়া তদীয় হিতকামনায় শ্ৰমণ গুণযুক্ত অপ্রিয়বাক্য বলিতে লাগিলেন। ২৩। তুমি শুভাশুভ বিবেচনা করিতে পারিতেছ না, বিষয়েই তােমার চিত্ত আসক্ত, তােমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয় নাই, অতএব তােমার যে শ্ৰেয় বিষয়ে আসক্তি নাই ইহা যুক্তিযুক্ত। ২৪। যাহার মতি শ্রবণ, গ্রহণ, ধারণ, পরমার্থতত্ত্বের জ্ঞান ও মনের শমগুণে আসক্ত নহে, তাদৃশ চঞ্চলচিত্ত ব্যক্তির ধৰ্ম্মে রতি হয় না। ২৫। কিন্তু যে ব্যক্তি বিষয়ে দোষ দেখিয়া থাকে, যিনি পরিতুষ্ট, শুদ্ধ, ও মানশূন্য এবং শুভকর্মে যাহার চিত্ত যুক্ত আছে এরূপ নিপুণবুদ্ধি ব্যক্তির অসন্তোষ থাকে না। ২৬। কামী ব্যক্তি ঐশ্বৰ্য্যলাভে সন্তুষ্ট, মূঢ় ব্যক্তি কাম- সুখে তৃপ্ত, সাধু ব্যক্তি তত্ত্বজ্ঞানহেতু ভােগাকাঙক্ষা বর্জন করিয়া প্রশম গুণে সন্তুষ্ট হইয়া থাকেন।

স্ত্রীবিঘাত ৬৫ ২৭। সম্মানের যােগ্য চিহ্ন (সন্ন্যাসীর চিহ্ন প্রভৃতি) যিনি ধারণ করেন, সৎকুলজাত প্রসিদ্ধ বুদ্ধিমান্ ব্যক্তির গৃহের প্রতি আকাঙক্ষা, বায়ুবশে গিরির নম্রতার ন্যায়, যােগ্য নহে। ২৮। যে ব্যক্তি নিজের আয়ত্ত স্বাধীনতা পরিত্যাগ করিয়া পরায়ত্ত বস্তুতে আসক্তি স্থাপন করে সেই ব্যক্তিই শিব- ময় শান্তির পথে যাইয়া আবার দোষপূর্ণ সংসার-গৃহের প্রতি আসক্ত হয়। ২৯। যেমন বন্ধনমুক্ত ব্যক্তি নিজ ব্যসন-দোযে আবার বন্ধন প্রাপ্ত হইতে পারে, সেইরূপ একবার বনে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া মূঢ় জন আবার গৃহ নামক বন্ধনে বদ্ধ হইতে পারে। ৩০। যে ব্যক্তি কলিকে পরিত্যাগ করিয়া করিয়া আবার কলির সেবা করিতে চাহে সেই মূর্ণ ব্যক্তিই অজিতেন্দ্রিয়তা- হেতু একবার ত্যাগ করিয়া আবার কালস্বরূপ স্ত্রীর সেবা করিয়া থাকে। ৩১। যেমন বিষযুক্ত লতা আশ্রয় নিলো ভাবী বিপদ হয়, সর্পযুক্ত গুহা আশ্রয় করিলে অন্তে মরণ হয় এবং ধারযুক্ত অসি যেরূপ মৃত্যুর কারণ, স্ত্রীগণও ঐরূপ ভবিষ্যৎ বিপদ আনয়ন ৩২। স্ত্রীগণ মদমত্ত হইয়া মত্ততা তানিয়া দেয়, আনন্দ- শূন্য হইয়া হৃদয়ে ভীতি জন্মায়, এইজন্য তাহার দোষ ও ভয়ের আকর, অতএব তাহারা কখনই সেবার যােগ্য নহে। ৩৩। স্ত্রীর জন্য স্বজন স্বজনের সহিত এবং বন্ধু বন্ধু

সৌন্দরন কাব্য
সহিত বিচ্ছিন্ন হয়। স্ত্রীগণ পরের দোষ কথনে একান্ত অনুরক্ত।
অতএব তাহারা অন্যায্যকারিণী।
৩৪। সুজন ব্যক্তি যে দৈন্য অবলম্বন করে এবং অযােগ্য
সাহস আশ্রয় করে, ও বেগে সৈন্যসম্মুখে যুদ্ধার্থে দণ্ডায়মান হয়,
তাহার একমাত্র কারণ অঙ্গনা।
৩৫। রমণীগণ বচন দ্বারা নানাবিধ বর্ণনা আহরণ করে,
তীক্ষ্ণ চিত্ত দ্বারা দুঃখ দান করে, তাহাদের মুখে মধু এবং হৃদয়ে
কালকূট বিষ বর্তমান থাকে।
যে অগ্নি দাহ করে তাহাকেও গ্রহণ করা যায়,
পবনের দেহ না থাকিলেও তাহাকে গ্রহণ করা যায়, সর্প কুপিত
হইলে তাহাকেও গ্রহণ করা যায়, কিন্তু কামিনীগণের চিত্ত
কখনও গ্রহণ করা যায় না।
৩৭। স্ত্রীগণ শারীরিক সৌন্দৰ্য্য বিবেচনা করে না ;
ঐশ্বর্যের কথা ভাবে না ; বুদ্ধি, কুল বা বিক্রমের বিষয় চিন্তা
করে না; জলজন্তু-সমাকুল নদীর ন্যায় অত্যন্ত অনিষ্ট সাধন
করিয়া থাকে।
৩৮। স্ত্রী মধুর বাক্য, সমাদর বা সৌহার্দ স্মরণ করে না।
চঞ্চলা বনিতার ন্যায় কুটিল এ জগতে আর কিছু নাই।
যে কিছু দান করে না তাহার প্রতিও প্রমদাগণ
নৰ্ম্ম ব্যবহার করে, আবার যে ব্যক্তি প্রচুর দান করে তাহার
উপর নানা বিভ্রম প্রকাশ করে ; প্রণত ব্যক্তির নিকট গর্বিত
হয়, আবার মানী ব্যক্তির নিকট তৃপ্তি লাভ করে।
৩৯।

স্ত্রীবিঘাত ৬৭ ৪০। ভর্তা গুণবান্ হইলে তাহাকে ভর্তা বলিয়া ব্যবহার করে, গুণহীন হইলে তাহার সহিত শক্রর ন্যায় আচরণ করে। ধনবান্ হইলে আকাঙ্ক্ষাবশত তাহার অনুগামিনী হয়, ধনহীন হইলে তাহার প্রতি অবজ্ঞাভরে ব্যবহার করিয়া থাকে। ৪১। যেমন ক্ষেত্র হইতে আহত হইয়াও ক্ষেত্ৰান্তরে যাইয়া গাে সুখে বিচরণ করে, সেইরূপ অঙ্গনা পূর্বের সৌহার্দ বিস্মৃত হইয়া অন্যত্রগামিনী হইয়া অতি তুষ্ট থাকে। ৪২। যদিও স্ত্রীগণ পতির সহিত চিতায় প্রবেশ করে, কিম্বা অনুমরণ প্রাপ্ত হয়, তথাপি তাহারা পতির জন্য যন্ত্রণা ভোগ করে না, কারণ হৃদয়ে তাহারা কাহাকেও ভাল বাসে না। ৪৩। কদাচিৎ কোনও কোনও রমণী পতিকে দেবতা ভাবিয়া পতির সেবা করে। (কিন্তু) সহস্র সহস্র রমণী চঞ্চল- চিত্ততা হেতু নিজের হৃদয়কেই সন্তুষ্ট করিয়া থাকে। ৪৪। শত্রুজিতের কন্যা শপচ অর্থাৎ চণ্ডালকে, কুমুদ্বতী বক-মীন-রিপুকে, বৃহদ্রথা মৃগরাজকে বরণ করিয়াছিলেন। স্ত্রী- লােকদিগের অগম্য কিছুই নাই। ৪৫। কুরু, হৈহয় এবং বৃষ্ণিবংশজগণ, বহুমায়াচারী শম্বর, উদ্ভ্রান্ত-চিত্ত মুনি গৌতম, ইহারা সকলেই স্ত্রী-সংক্রান্ত কলঙ্ক প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ৪৬। বনিতাগণের হৃদয় এইরূপ অকৃতজ্ঞ ন্যায্যপরায়ণ এবং অস্থির, অতএব পণ্ডিতগণ সেই চঞ্চলচিত্ত রমণীগণের উপর কেন চিত্ত আসক্ত করিবেন ?

৬৮
সৌন্দরন কাব্য
৪৭। যদি তােমার সূক্ষ বুদ্ধি থাকে তবে দেখিবে যে
প্রিয়ার বাসনা তােমার লঘুতা। তুমি নিজের হৃদয় বুঝিতেছ
। বনিতাগণের শরীর অশুচিরসক্ষরণকারী অসগৃহ। কেন
তুমি বনিতাগণের চরিত্র আলােচনা করিতেছ না ?
৪৮। প্রতিদিন প্রক্ষালন বসন ভূষণ প্রভৃতি দ্বারা সেই
অশুভ বস্তুকে শুদ্ধ করিয়া লইয়া উৎকৃষ্ট মনে করিতেছ, নিকৃষ্ট
বুঝিতে পারিতেছ না। কারণ অজ্ঞান তােমার চক্ষু আবৃত
করিয়া রাখিয়াছে।
৪৯। অথবা তুমি বুঝিতেছ যে ঐ তনু অশুচি, তথাপি
তােমার স্থির তত্ত্বজ্ঞান হইতেছে না, কারণ, তদীয় অশুচি
ভাবের উপশমের জন্য তুমি কতরূপ সুরভিক্রিয়া আচরণ
করিয়া থাক।
৫০। যদি (রমণীগণের ) অনুলেপন, অঞ্জন, মাল্য, মণি,
মুক্তা, সুবর্ণ, বা বসনই ভাল হয় (অর্থাৎ স্ত্রীলােকের সৌন্দর্যের
কারণ হয়) তাহা হইলে ইহার মধ্যে কোনটী স্ত্রীলােকদিগের
স্বাভাবিক ? ( কোনটাই নয়।) তাহাতে শুচির অনুসন্ধান কর।
৫১। যদি তােমার সুন্দরী তাম্বর পরিত্যাগ করিয়া
নগ্নতা অবলম্বন করে, এবং শারীরিক স্বাভাবিক মলরূপ পঙ্ক
ধারণ করে, স্বভাবজ নখ দন্ত ও রােমাবলী ব্যাপ্ত থাকে, তবে
আর তােমার কাছে নিশ্চয়ই সে সুন্দরী বলিয়া গণ্য হইবে না।
৫২। যদি কেবলমাত্র মক্ষিকার পক্ষের ন্যায় পাতলা
চৰ্ম্মের দ্বারাই আবৃত না থাকিত তাহা হইলে কোন্ ঘৃণাশীল

স্ত্রীবিঘাত ৫৪। লােক ভগ্ন পাত্রের ন্যায় অশুচি এবং স্রাবকারী স্ত্রীলােককে স্পর্শ করিত। ৫৩। যদি শরীরটী পরিবেষ্টিত অস্থিপঞ্জর বুঝিতেছ তবে সবলে তােমাকে কাম কিরূপে আকর্ষণ করিতেছে। হায় ? মদনদেব ঘৃণা ও ধৈর্য্যের একান্ত বিরােধী। হে অবিচক্ষণ, অশুভময় নখ দন্ত স্ব কেশ ও বােম- সমূহকে শুভ বলিয়া ভাবিয়া তুমি যােষিগণের প্রকৃতি ও প্রভাব বুঝিতেছ না। ৫৫। অতএব বনিতাগণকে মন ও শরীর উভয় বিষয়ে সদোষ ভাবিয়া জ্ঞানবলে নিজ চঞ্চল সমুৎসুক চিত্তকে নিবারণ কর। ৫৬। তুমি শাস্ত্রজ্ঞানী, বুদ্ধিমান, সৎকুলজাত এবং তুমি উৎকৃষ্ট শমগুণের ভাজন ; অতএব একবার কোনরূপে নিয়ম লাভ করিয়া আবার তাহা পরিত্যাগ করা তােমার উচিত নহে। ৫৭। যে ব্যক্তি মহাকুলজাত মনস্বী যশােহভিলাষী সম্মানপ্রার্থী, সেই ব্যক্তি আত্মাকে স্থির রাখিয়া নিধন প্রাপ্ত হয় তাহাও ভাল, কিন্তু চঞ্চলতা আশ্রয় করিয়া নিয়মভ্রষ্ট হইয়া জীবিত থাকা ভাল নহে। ৫৮। যেমন কোনও যােদ্ধা শরীরে কবচ ও করে চাপ ধারণ করিয়া রথে উঠিয়া যুদ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়া পলাইলে অত্যন্ত নিন্দা লাভ করে, সেইরূপ কোনও ব্যক্তি ভিক্ষুর চিহ্ন ধারণ করিয়া ভিক্ষু-আশ্রম স্বীকার করিয়া যদি কামাভিভূত হয় তবে তাহার নিন্দা হইয়া থাকে।

৭০
সৌন্দরন কাব্য
৬০।
৬১।
৫৯। যদি চঞ্চলতম কোনও ব্যক্তি উৎকৃষ্ট আভরণ বসন
ও মাল্য এবং কাৰ্ম্মক ধারণ করিয়া ভৈক্ষাবৃত্তি আচরণ করিতে
থাকে সে যেমন লােকের নিকট হাস্যাস্পদ হয়, সেইরূপ যে ব্যক্তি
বাহিরে ভিক্ষুর পােক লইয়া পরপিণ্ডে জীবিকা ধারণ করিতেছে
সে গৃহসুখের অভিলাষ করিলে হাস্যাস্পদ হইয়া থাকে।
যেমন কোনও শূকর উত্তম অন্ন ভােজন উত্তম শয্যায়
শয়ন করিয়াও আবার নিজ পরিচিত অশুচি ( বিষ্ঠা প্রভৃতি)
বস্তুর দিকে ধাবিত হয়, সেইরূপ কাম-তৃষিত ব্যক্তি শ্রেয়স্কর
বিষয় শুনিয়া প্রশম-সুখের আস্বাদন করিয়াও শমপ্রধান কানন
দূরে ফেলিয়া গৃহ কামনা করে।
যেমন একটী অনলের উল্কা হাতে থাকিলে বায়ু-
তাড়নে তাহা প্রজ্বলিত হইয়া দগ্ধ করে, যেমন সর্পকে পদাঘাত
করিলে ক্রোধে অধীর হইয়া সে আঘাতকারীকে দংশন করে,
যেমন একটী ব্যাঘ্র শিশু-অবস্থায়ও গৃহানীত হইয়া গৃহস্থের প্রাণ
বধ করে, সেইরূপ স্ত্রীসংসর্গ বহুবিধ অনর্থের কারণ হইয়া থাকে।
অতএব নারীগণের চিত্তে ও শরীরে এই-সকল দোষ
জানিয়া এবং কামসুখ নদীপ্রবাহের ন্যায় চঞ্চল ক্লেশ এবং
শশাকের একমাত্র কারণ ইহা নিশ্চয় করিয়া ও মৃত্যুসংসৃষ্ট এই
জগৎ আম পাত্রের ( নূতন অদগ্ধ মৃৎপাত্রাদির) ন্যায় অত্যন্ত
দুর্বল ইহা সিদ্ধান্ত করিয়া মােক্ষের দিকে স্বীয় অনুপম বুদ্ধির
পরিচালনা কর। উৎকণ্ঠা পােষণ করা উচিত নহে।
সৌন্দরনন্দ কাব্যে অষ্টম সর্গ সমাপ্ত

নবম সর্গ
মদাপবাদ (মত্ততা নিষেধ।
১। ভিক্ষু নন্দকে ঐ-সকল কথা বলিলেও তিনি প্রিয়ার
প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করিলেন না। তিনি প্রিয়াকেই
চিন্তা করিতেছিলেন বলিয়া বিহ্বলতা হেতু তদীয় বাক্য শুনিতে
পাইলেন না।
যেমন মুমূর্ষ রােগী হিতকামী বৈদ্যের বাক্য গ্রহণ
করে না, সেইরূপ বল রূপ ও যৌবনে মত্ত নন্দও তদীয় হিতকর
বাক্য গ্রহণ করিলেন না।
৩। অজ্ঞানে যাহার চিত্ত আবৃত রহিয়াছে রাগ-জনিত
পাপ যে তাহাকে অভিভূত করিবে ইহা আশ্চৰ্য্য নহে। অজ্ঞান
যখন বিনাশ প্রাপ্ত হয় তখনই লােকের পাপ নবৃত্ত হইয়া
থাকে।
অনন্তর সেই বৌদ্ধসন্ন্যাসী নন্দকে বল রূপ ও যৌবনে
অত্যন্ত বিক্ষিপ্তচিত্ত এবং গৃহ-গমনে অত্যন্ত অনুরাগী দেখিয়া
শান্তির জন্য বলিতে লাগিলেন।
৫। তুমি বল রূপ ও যৌবনকে যেরূপ ভাবিতেছ তাহা
আমি বুঝিয়াছি। আমি ঐ তিনটীকে যেরূপ অস্থির বুঝি তুমি
তাহা বুঝিতেছ না।
৪।

৭২
সৌন্দরন কাব্য
৬। এই দেই রােগের আয়তন, জরার অধীন, নদীতটের
বৃক্ষের ন্যায় চঞ্চল, জলফেনের ন্যায় দুর্বল, তাহা তুমি
জান না, যে হেতু তুমি তাহাকে অত্যন্ত সবল মনে
করিতেছ।
৭। এই শরীর অন্ন পান অশন ও গমনাদি কার্যের
স্বল্পতা বা আধিক্য হেতু যখন বিপদ প্রাপ্ত হয় তখন আর বলের
অভিমান কেন ?
৮। হিম আতপ ব্যাধি জরা ও ক্ষুধা প্রভৃতি দ্বারা জগৎ
অনর্থে আক্রান্ত হয় এবং গ্রীষ্মকালে সূর্যরশ্মি দ্বারা জলের ন্যায়
ক্ষয় প্রাপ্ত হয়, হে বলদর্পী, ইহা কি তােমার মনে হয় ?
৯। ত্বক্ অস্থি মাংস ও রক্ত প্রভৃতি লইয়া যে দেহ গঠিত
তাহা আহার-বলেই রক্ষা পায়। তাহ নিরন্তর পীড়িত হয় ও
তাহার ক্ষুধা প্রভৃতির প্রতিকারে ব্যস্ত থাকিতে হয়। অতএব
আমি শক্তিশালী এই অভিমানে নষ্ট হইতেছ কেন ?
১০। যেমন কোনও মন্মষ্য মৃন্ময় আম ঘট আশ্রয় করিয়া
তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সমুদ্র উত্তীর্ণ হইতে উদ্যত হয়, সেইরূপ
অসার দেহ লইয়া লােক বিষয় ভােগে উদ্যত ও বল প্রয়ােগে
১১। এই শরীর মৃন্ময় আম ঘট অপেক্ষাও অসার ইহা
আমার মনে হয়। কারণ ঘট যত্নে রক্ষা করিলে বহুকাল
অক্ষুন্নভাবে থাকে, কিন্তু এই দেহ অতি যত্নে রক্ষা করিলেও নষ্ট
হইয়া যায়।

মদাপবাদ ৭৩ ১২। শরীরশ্রিত জল পৃথিবী বায়ু ও তেজ ধাতু বিষম সর্পের ন্যায় শরীরে নিরুদ্ধ হইয়াও অনর্থহেতু হইয়া থাকে। তবে বােগ-বিষয়েই বা বলের চেষ্টা কেন করিতেছ? ১৩। সর্পগণ মন্ত্রে উপশম প্রাপ্ত হয়, কিন্তু শরীরধাতু মন্ত্রে উপশম লাভ করে না। কোনও কোনও সর্প কাহাকেও কাহাকেও দংশন করে, কিন্তু শরীরধাতু সর্বদা সকলকে পীড়া দেয়। ১৪। এই শরীর শয়ন আশন পান ও ভােজনাদি গুণ দ্বারা বহুকাল যত্ন করিলেও, একটা মাত্র ব্যতিক্রমও সহ্য করে , যেহেতু বিষম ভুজঙ্গের ন্যায় অল্প কালেই উহা কুপিত হয়। ১৫। যখন হিমে আৰ্ত্ত হইয়া জীবের অগ্নিসেবা করিতে হয়, গ্রীষ্মে পীড়িত হইয়া শীতল বস্তুর সেবা করিতে হয়, ক্ষুধান্বিত হইয়া অন্নের এবং তৃষ্ণান্বিত হইয়া জলের সেবা করিতে হয়, তখন কোথায় কাহার কোথা হইতে কিরূপে কোন্ বল নিশ্চয় করা যাইবে ? ১৬। অতএব শরীরকে এইরূপে নানা রােগে আৰুৱ জানিয়া আমি সবল এই কথা ভাবিতে পার না। এই জগৎ অসার দুঃখপরিণাম এবং অনিশ্চিত, এজগতে কোনও বলই ব্যবস্থিত নহে। ১৭। অশনি যেমন গিরির শৃঙ্গ ভগ্ন করে সেইরূপ ভৃগু- পুত্র পরশুরাম যাহার সহস্রবাহু কৰ্তন করিয়াছিলেন সেই সহস্র- বাহুসম্পন্ন কাৰ্তীৰ্যাৰ্জ্জুনের সে বল কোথায় ?

৭৪
সৌন্দরনন্দ কাব্য
১৮।
তরঙ্গরাজের পুটভেদী, কংসঘাতক হরির সেই বলই
বা কোথায় ? ক্রমাগত জরা যেমন সুন্দর কান্তি নাশ করে
সেইরূপ একবাণেই জরা (ব্যাধ ) তাহাকে হত করিয়াছিল।
১৯। দেবতাগণের ক্রোধজনক সেনানুরক্ত নমুচি দৈত্যের
সে শক্তি কোথায়-ক্রুদ্ধ কৃতান্তের ন্যায় যুদ্ধস্থলে বর্তমান যে
দৈত্যকে বাসব ফেন দ্বারা নাশ করিয়াছিলেন ?
২০ । যে-সকল কুরুবংশীয় যােদ্ধগণ শক্তি ও বেগ বশতঃ
যজ্ঞস্থলে সমিপ্রদীপ্ত প্রজ্বলিত বহ্নির ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া
পৰ্যবসানে গতাসু হইয়া ভস্মরূপে পরিণত হইয়াছেন, তাহাদের
সে শক্তিই বা কোথায় ?
২১। অতএব যাহারা যাঁহারা বল-বীর্যের অভিমান
করিতেন তাহাদের সকলেরই বল প্রতিহত হইয়াছে জানিয়া এবং
এই জগৎ জরা ও মৃত্যুর একান্ত অধীন নিশ্চয় করিয়া আর
বল বিষয়ে অহঙ্কার করা তােমার উচিত নহে।
২২। অথবা যদি তােমার বল মহৎ বলিয়াই বিশ্বাস থাকে
তবে ইন্দ্রিয়গণের সহিত যুদ্ধ কর ; যদি জয় হয় তবেই তােমার
বল মহৎ (সার্থক), আর যদি পরাজয় হয় তবে তােমার বল
নিরর্থক।
২৩। যেহেতু, যাহারা অশ্ব রথ ও হস্তীর সহিত পুরুষগণকে
জয় করে তাহারা সেরূপ প্রকৃত বীর নহে, যেরূপ যড়-ইন্দ্রিয়-
জয়কারী মনীষী ব্যক্তিগণ প্রকৃত বীর।
২৪। নিজে বপুষ্মান, বলিয়া যে মনে করিতেছ, তাহাও
;

মদাপবাদ
ঠিক নহে ইহা তুমি স্বীকার করিয়া লও। (শরীরের সৌন্দর্যের
জন্য বিখ্যাত) গদ, সাম্য ও সারণের সেই বিখ্যাত শরীর এখন
কোথায় ?
যেমন ময়ুর স্বভাব-চঞ্চল বিচিত্র পুচ্ছের চিত্র থাকায়
উৎকৃষ্ট রূপ ধারণ করে, যদি শরীরের সংস্কার ব্যতীত ঐরূপ রূপ
ধারণ করিতে পার, তবেই প্রকৃত রূপবান্ বলা যায়।
২৬। যদি বসনে শরীর আচ্ছাদিত না করা যায়, যদি
শৌচকালে জল স্পর্শ না করা হয়, এবং বিশুদ্ধি বিশেষ আশ্রয়
করা যায়, তবে তােমার শরীর কিরূপ হইবে ?
২৭। নিজ নবীন বয়স আলােচনা করিয়া তােমার চিত্ত
যে বিষয়-সুখ লাভ করিবার জন্য গৃহােম্মুখ হইয়াছে, শৈল-নদীর
বেগের ন্যায় উহাকে সংযত কর। যৌবন দ্রুত চলিয়া যায়,
ফিরিয়া আসে না, উহা ক্ষণভঙ্গুর ।
২৮। এক ঋতু চলিয়া যায়, আবার ফিরিয়া আসে; চন্দ্র
একবার ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়া, আবার প্রত্যাবর্তন করে; কিন্তু নদীর
জল ও লােকের যৌবন একবার চলিয়া গেলে আর ফিরিয়া
আসে না।
২৯। যখন তুমি দেখিবে তােমার মুখের শ্মশ্রুজি বিবর্ণ
হইয়াছে, শরীরের চর্ম লুলিত হইয়াছে, দন্ত বিশীর্ণ, ভী শিথিল
ও মুখ প্রভাশূন্য জর্জর হইয়াছে, তখন জরার আক্রমণে মদশূন্য
হইবে।
৩০।
লােক মতাজনক উত্তম পানদ্ৰব্য পান করিয়া

সৌন্দরনন্দ কাব্য নিশা অবসানে বহুকাল পরে মত্ততাশূন্য হয়, কিন্তু বল- রূপ- ও যৌবন-মদে মত্ত ব্যক্তি জরা প্রাপ্ত না হইয়া মত্ততা-মুক্ত হয় না। যেরূপ ইক্ষুদণ্ডের রস গ্রহণ করিয়া ফেলিয়া দেওয়া হইলে সে দহনের জন্য শুষ্ক হইতে থাকে, সেইরূপ জরাযন্ত্র- নিপীড়িত এই শরীর সারহীন হইলে মরণের জন্য অপেক্ষা করে। ৩২। যেমন একটী উন্নত বৃক্ষ দুইটী লােক কর্তৃক করপত্র (করাত) দ্বারা পীড়িত হইয়া (পতনকালে) বহু বস্তু ভগ্ন করে, সেইরূপ দিন ও রাত্রির দ্বারা পরিচালিত হইয়া জরা উন্নত প্রজাগণকে পাতিত করে। জরা হইতে স্মৃতি লুপ্ত হয়, শরীরের পরাভব হয়, রতি নষ্ট হয়, কর্ণ ও চক্ষুর দোষ জন্মে, শ্রম উপস্থিত হয়, বল ও বীৰ্য্য নষ্ট হয়, অত এব জরার ন্যায় দেহীর পক্ষে এমন শত্রু আর নাই। ৩৪। অতএব জরাকে জগতের অত্যন্ত ভীতিজনক ভাবিয়া উপদেশ লাভ কর, আমি বপুম্মা আমি করবান্ ও যুবা এই বলিয়া অন্যায্য অভিমান করা তােমার উচিত নহে। ৩৫। কলিতে শরীর লইয়াই আমি আমার ইত্যাদি সাংসারিক জ্ঞান হইয়া থাকে। যদি সংসার হইতে মুক্তি চাও তবে উহা পরিত্যাগ কর। আমি ও আমার এই জ্ঞানই ভয়ের কারণ। ৩৬। বিবিধ অত্যাচার দ্বারা উপদ্রুত শরীর যখন কাহারও মদাপবাদ ৭৭ ৩৭। ৩৮। ৩৯। বশে থাকে না, তখন আপদের গৃহ এই শরীর আমি বা (ইহা) আমার ইহা জানিতে কি করিয়া সমর্থ হইবে ? যে ব্যক্তি পন্নগযুক্ত অবিশুদ্ধ গৃহকে বিশুদ্ধ করিয়া সসন্তোষে অবস্থান করে সেই বিপরীতবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি দুষ্ট- ধাতুযুক্ত নশ্বর দেহে একান্ত রতি প্রাপ্ত হয়। যেমন পরাক্রান্ত কুনৃপতি প্রজাগণের নিকট হইতে অশেষ ধন রত্ন আহরণ করে কিন্তু তাহাদের রক্ষার প্রতি দৃষ্টি করে না, সেইরূপ কায় বহু ব্যসনাদি উপকরণ আহরণ করে কিন্তু অনুকূলতা আশ্রয় করে না। যেমন ক্ষিতিতে যেখানে-সেখানে যত্ন ব্যতিরেকেও গৃহ [ মূলে গৃহ আছে, কিন্তু ইহা বােধ হয় তৃণ হইবে ? হইতে পারে কিন্তু ধান্য অতি যত্ন করিলে তবে জন্যে, সেইরূপ সংসারে দুঃখ ব্যতিরেকে যেখানে-সেখানে যত্ন হইয়া থাকে কিন্তু সুখ কোথাও অতি যত্ন করিলে হয় অথবা হয় না । ৪৩। অতি কষ্টময় চঞ্চল শরীরধারী ব্যক্তির বাস্তবিক সুখ কিছুতেই নাই, অতি ক্ষুদ্র দুঃখ উপস্থিত হইলেও তাহার প্রতিকার-চেষ্টায় লােকে সুখের আকাঙ্ক্ষা করে। ৪১। যেরূপ প্রচুর ঈপ্সিত সুখের অপেক্ষা না করিয়া অল্প মাত্র দুঃখও শরীরকে কষ্ট দেয়, সেইরূপ দুঃখের অপেক্ষা করিয়া কাহার ও কোন বিষয়ে সুখ হয় না। ৪২। যদি তুমি ফলের অনুরােধে শরীরকে এইরূপ বহু

৭৮
সৌন্দর কাব্য
৪৪।
৪৫।
দুঃখময় নশ্বর বলিয়া বােঝ, তবে শস্যকামী গাের ন্যায় ফলােম্মুখ
চিত্তকে ধৈৰ্য্যরশ্মিতে সংযত কর ।
৪৩। যেমন অগ্নিতে হবিঃ প্ৰক্ষেপ করিলে উহা শান্ত হয়
, পরন্তু জ্বলিয়া উঠে, সেইরূপ কামভােগ চিত্তের তৃপ্তি সাধন
করে না, পরন্তু কাম-সুখে যেমন সংলগ্ন হয় অমনি তাহার বিষয়-
ভােগের ইচ্ছা বাড়িতে থাকে।
যেরূপ কুষ্ঠরােগী ব্যক্তি শরীরে উত্তাপ দান করিয়া
শান্তি প্রাপ্ত হয় না, সেইরূপ অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি বিষয় ভােগে
রত হইয়া তাহাতে শান্তি প্রাপ্ত হয় না।
যেরূপ ভৈষজ্যসুখের আকাঙক্ষায় মােহবশতঃ কেহ
রােগ ভজনা করে, রােগক্ষয় ভজনা করে না, সেইরূপ বিষয়
ভােগের আকাঙক্ষায় মােহবশতঃ বহুদুঃখভাজন শরীরে রতি
প্রাপ্ত হয়।
৪৬। যে ব্যক্তি পুরুষের অনিষ্ট কামনা করে সেই ব্যক্তি
ঐ কৰ্ম্ম হেতু তাহার শত্রু হয়। বিষয়গুলি অনর্থের মূল, অতএব
শক্রর ন্যায় তাহাকে পরিত্যাগ করা উচিত।
যে-সকল শত্ৰু পুরুষের অনিষ্ট করে তাহারাই
আবার কালক্রমে হার মিত্রতা প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কিন্তু
ইহকাল ও পরকালে দুঃখের হেতু কামসমূহ কখনও কাহারও
মঙ্গলময় হয় না।
যেমন কিম্পাক ফল (মাকাল ফল ) সুন্দর রস বর্ণ
ও গন্ধ থাকিলেও লােকের অনিষ্ট সাধন করে কিন্তু পুষ্টি
৪৭।
৪৮।

মদাপর্বদ
৭৯
সাধন করে না, ঐরূপ বিষয়সমূহ চঞ্চলচিত্ত ব্যক্তির অনর্থই
উৎপাদন করিয়া থাকে, উন্নতি সাধন করে না।
৪৯। মােক্ষধৰ্ম্মই জগতের উত্তম হিত ইহা নিষ্কাম অন্তঃকরণ
দ্বারা নিশ্চয় করিয়া সজ্জনগণের সম্মানিত আমার এই মত গ্রহণ
কর, অথবা কথা বলিয়া তােমার নিশ্চয় জানাও।
এইরূপে বহুপ্রকারে শাস্ত্রজ্ঞশ্রেষ্ঠ শ্ৰমণ নন্দকে
হিত উপদেশ দিলেও, মদমত্ত হস্তী যেমন মদাল্কতাবশতঃ ধৈৰ্য্য ও
শান্তি পায় না সেইরূপ, নন্দ ধৈৰ্য বা শান্তি লাভ করিলেন না।
পরে সেই ভিক্ষু নন্দের চঞ্চল চিত্ত গৃহমুখে আসক্ত,
ধৰ্ম্মে আসক্ত নহে, ইহা জানিয়া সৰ্বশুদ্ধ ও অনুতাপদগ্ধ চিত্তের
পরীক্ষাকারী তত্ত্বজ্ঞ বুদ্ধের নিকট ঐ-সকল বলিলেন।
৫১।
সৌন্দরনন্দ কাব্যে নবম সর্গ সমাপ্ত

দশম সর্গ স্বর্গ-নিদর্শন ১। সদ্ব্ৰত ত্যাগেচ্ছু ভাৰ্য্যাদর্শনেচ্ছু গৃহগমনােৎসুক নিরানন্দ ধৈৰ্যহীন নন্দের কথা শুনিয়া মুনি তাঁহাকে উদ্ধার করিবার ইচ্ছা করিয়া আহ্বান করিলেন । ২। চিত্তভ্রষ্ট মােক্ষমার্গচ্যুত তাহাকে আগত দেখিয়া সুচিত্ত মুনি তাঁহাকে চিত্তস্থলনের কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনিও লজ্জিত হইয়া লজ্জাশীল নিশ্চয়জ্ঞ মুনির কাছে নিজের নিশ্চয়ের কথা বলিলেন। অনন্তর সুগত তাহাকে ভাৰ্য্যরূপ তান্ধকারে ভ্রমণ করিতে দেখিয়া সাধু যেরূপ জলে মল শােধন করে সেরূপভাবে তাহার উদ্ধার মানসে তাহাকে হাতে ধরিয়া আকাশে উঠিলেন। প্রসন্ন আকাশে কার্যয়বস্ত্রধারী কনকবর্ণ তঁাহারা দুইজন সরােবরে সঞ্চরণশীল পরস্পর-আলিঙ্গনবদ্ধ বিস্তারিত- পক্ষ চক্রবাক্‌-যুগলের ন্যায় শােভা পাইতেছিলেন। ৫। তাহারা দেবদারুসুগন্ধযুক্ত নদী-সরােবর-প্রস্রবণসমূহ- শােভিত ধাতুমান্ দেবীর্ষিজুষ্ট হিমবানের কোনও শিখরে শীঘ্র উপস্থিত হইলেন। ৬। দুর্গমপারবিশিষ্ট আশ্রয়হীন আকাশের মধ্যে দ্বীপের ৪।

স্বর্গনিদর্শন ৮১ স্যায় সিদ্ধ-চারণ-সেবিত কোনও কল্যাণময় পর্বতে আসিলেন। ঘৃতাহুতির ধূম ঐ পর্বতের উত্তরীয়ের ন্যায় দেখাইতেছিল। ৭। শান্ত-ইন্দ্রিয়-বিশিষ্ট বুদ্ধমুনি সেখানে অবস্থিত হইলে নন্দ চারিদিকে গুহা কুঞ্জ পশু প্রভৃতি পর্বতের বিভূষণ বিস্ময়ের সহিত দেখিলেন। ৮। সেই বহুবিস্তৃত শ্বেতবর্ণ পর্বতশিখরে ময়ূরগণ পুচ্ছ সংক্ষিপ্ত করিয়া শয়ন করিয়া ছিল। তাহাদিগকে আয়ত ও পীন- বাহু বলদেবের বাহুস্থিত বৈদুৰ্য্যময় কেয়ূরের ন্যায় দেখাইতেছিল। ৯। সিংহ মনঃশিলা ধাতুর সংস্রবে পীতাঙ্গ হইয়া শােভা পাইতেছিল, আকাশের রৌপ্যনির্মিত শীর্ণ বলরের উপর যেন উত্তপ্ত সুবর্ণখচিত কারুকার্যের ন্যায় দেখাইতেছিল। ১০। ক্লান্তিহেতু ব্যায়াত, খেলগামী এবং গিরির প্রস্রবণের জল পানেচ্ছু ব্যাঘ্র লালচক্র দক্ষিণ স্কন্ধে স্থাপন করিয়া শোভা পাইতেছিল। দেখা যাইতেছিল যেন পিতৃলােকদিগকে জল দান করিতে (তৰ্পণ করিতে ইচ্ছুক হইয়া অপসব করিয়াছে। ১১। চঞ্চলকবিশিষ্ট হিমালয়ের নিতম্বদেশে সুদীর্ঘ তরুতে চমর লম্বিত হইয়াছিল। সাধুচরিত্র কুলীন যেরূপ প্রতিবন্ধন ছেদন করিতে পারে না, এই চমর ও সেরূপ বৃক্ষে লগ্ন স্বীয় পুচ্ছকে ছিন্ন করিতে পারে নাই। ১২। সুবর্ণগৌরবর্ণ কিরাতসমূহ ময়ূরপুচ্ছ দ্বারা গাত্ররেখা উজ্জ্বল করিয়া পর্বতের উদ্গারের ন্যায় গুহা হইতে ৰ'গ্ৰ গতিতে বহির্গত হইতেছিল।

৮২ সৌন্দরন কাব্য ১৩। গুহাবিচরণকারিণী অতিসুন্দরী মনােহর-শ্রোণি- কুচোদরবিশিষ্টা কিন্নরীসমূহ ঊদ্ধবিকীর্ণপুষ্প লতার ন্যায় শােভা পাইতেছিল। ১৪। কপিগণ পৰ্বত হইতে পর্বতারে দেবদারু-সমূহকে ক্লেশ দিয়া বিচরণ করিতেছিল। এবং ব্যর্থানুগ্রহ স্বামীর ন্যায় তাহাতে ফল না পাইয়া তাহা হইতে চলিয়া যাইতেছিল। ১৫। সেই বানরশূথভ্রষ্ট নিপীড়িত অলক্তক সদৃশ রক্তমুখী একচক্ষুহীন একটী বানরীকে দেখিয়া মুনি নন্দকে বলিলেন। ১৬। সেই রমণী যেখানে তােমার মন আকৃষ্ট হইয়াছে এবং ঐ যে একচক্ষু বানরীকে দেখিতেছ, এই দুজনের মধ্যে কে রূপে ও চেষ্টায় বেশী সুন্দর ? সুগত এইরূপ বলিলে নন্দ একটু হাসিয়া বলিলেন- কোথায়, ভগব, রমণীশ্রেষ্ঠ আপনার বন্ধু (সুন্দরী) আর কোথায়ই বা এই পৰ্বতক্লেশদায়িকা বানরী। অনন্তর মুনি তাহার কথা শুনিয়া অন্য কোনও কারণের অনুসন্ধান না করিয়াই নন্দকে লইয়া ইন্দ্রের নন্দন- কাননে উপস্থিত হইলেন। যেখানে বৃক্ষসকল ঋতুতে ঋতুতে ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করে, কোনও কোনও বৃক্ষ আবার সমস্ত বিচিত্র আকৃতি ধারণ করে, অপরে ছয় ঋতুর সৌন্দর্য ধারণ করে। কোনও কোনও বৃক্ষ সুন্দর সুরভি-বিশিষ্ট, কোনও ১৭। ১৮।

স্বর্গনিদর্শন কোনও বৃক্ষ বিচিত্র গ্রথিত মালা ধারণ করিয়াছে। কোনও কোনও বৃক্ষে বা কুণ্ডল হইতেও মনােহর রমণীর কর্ণালঙ্কারের আকৃতি-বিশিষ্ট পুষ্প প্রস্ফুটিত হইয়াছে। ২১। কোনও বৃক্ষে রক্ত-কমল প্রস্ফুটিত হওয়াতে প্রদীপ- বৃক্ষের ন্যায় শােভা পাইতেছে। কোথাও বা নীলােৎপল প্রস্ফুটিত হওয়াতে মনে হইতেছে যেন সেই বৃক্ষগুলি উন্মীলিত নয়নে চাহিয়া রহিয়াছে। ২২। কোনও বৃক্ষে নানারাগবিশিষ্ট, পাণ্ডরবর্ণ, সুবর্ণ- রেখাখচিত, তন্তুবিহীন, ঘন সূক্ষম বস্ত্রসকল ফলিয়া রহিয়াছে। ২৩। যেখানে হার, মণি, সুন্দরকুণ্ডল, উত্তম কেয়ুর নূপুর প্রভৃতি স্বর্গানুরূপ আভরণ বৃক্ষে ফলিয়া থাকে। ২৪। সেখানে যে পদ্মিনী হয় সেগুলির গন্ধ অতি মনােহর, সেগুলি স্পর্শ সহ্য করিতে পারে। তাহাদের নাল বৈদূৰ্যনিৰ্ম্মিত, পদ্ম কাঞ্চননিৰ্ম্মিত, কেশর হীরকনিৰ্ম্মিত। ২৫। মণিহেমচিত্র বৃক্ষসকল, দেবতাদের ক্রীড়ার সহায়, পত্রায়ত সেইসকল শায়মান দৃঢ় বাদ্যের উপকরণ প্রসব করে। ২৬। যেখানে মন্দার, পদ্ম, এবং পুস্পানত কোকনদ বৃক্ষকে মাহাত্মগুণে পরাজিত করিয়া শােভমান্ পারিজাত বৃক্ষ বর্তমান আছে। ২৭। অখিন্ন তপস্যা ও শীলের প্রভাবে কৃষ্ট স্বর্গভূমিতে এইরূপ দেবতাদিগের চিত্তানুরূপ ভােগবিধানকারী বৃক্ষসকল জন্মগ্রহণ করে।

৮৪. সৌন্দরনন্দ কাব্য ৩০। ২৮। যেখানে বিহঙ্গগণের বদন মনঃশিলা-তুল্য, চক্ষু স্ফটিকের ন্যায়, পক্ষ লােহিতান্ত শ্বেতবর্ণ, এবং পাদদ্বয় অর্ধশ্বেত মঞ্জিষ্ঠাবর্ণ। ২৯। সুবর্ণচ্ছদবিশিষ্ট, বৈদূৰ্য্যনীল নয়নযুক্ত, শীঞ্জিরিকা নামক পক্ষীও শ্রোত্রমধুর রবে মন হরণ করে। যেখানে পক্ষিগণ অগ্রভাগে রক্তবর্ণ মধ্যভাগে স্বর্ণ- বর্ণ এবং উপান্তে ও মধ্যে বৈদূৰ্যবৰ্ণ লতাসমূহ দ্বারা শশাভিত হইয়া বিচরণ করে। ৩১। রােচিষ্ণু নামে পক্ষিগণ দীপ্ত অগ্নির তুল্য উজ্জ্বলবদনে মনােহর স্বর দ্বারা অপসরাদিগের মন হরণ করিয়া এবং শরীর দ্বারা দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বিচরণ করে। ৩২। যেখানে ইষ্ট-চেষ্টাযুক্ত সতত-প্রহৃষ্ট অকাতর জরা- ও শােক-বিহীন স্বয়ংপ্রভ পুণ্যকারী হীন মধ্যবর্তী ও উত্তম ব্যক্তিগণ নিজ নিজ কর্ম দ্বারা শশাভিত হয়। ৩৩। সেই নিত্যোৎসবযুক্ত তন্দ্রা-নিদ্রা-অরতি-শােক- রােগ-বিহীন লােক দেখিয়া নন্দ জরামৃত্যুযুক্ত সদাদুঃখশীল নরলােককে শ্মশান বলিয়া মনে করিলেন। নন্দ বিস্ময়ােৎফুল্ললােচনে চারিদিকে সেই ঐন্দ্র বন দেখিতে লাগিলেন। অপসরাগণ হর্ষান্বিত হইয়া সগর্বে পরস্পরকে দেখিতে দেখিতে চারিদিকে ভ্ৰমণ করিতেছিল। ৩৫। তাহারা চির-যুবতী, মদনৈককাৰ্য্যা, পুণ্যবাদিগের সাধারণ বিহার স্বরূপ। তাহারা স্বর্গীয়, তাহাদের পরিগ্রহে ৩২।

স্বর্গনিদর্শন
কোনও
দোষ নাই।
তাহারা দেবতাদিগের তপস্যার
ফলস্বরূপ।
৩৭।
৩৬। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ ধীরভাবে উদাত্তস্বরে গান
করিতেছিল। কেহ কেহ পদ্মগুলিকে ললিতভাবে ভাঙ্গিতেছিল।
অপরে স্তনভিন্ন-হার-বিশিষ্টা, বিচিত্র অঙ্গ চালনের সহিত
পরস্পর হর্ষে নৃত্য করিতেছিল।
যেখানে বিলাসবতী অপসরাগণ তপস্যারূপ মূল্য
দ্বারা স্বর্গ ক্রয়ের জন্য কৃতনিশ্চয় তপস্বীদিগের খিন্ন মন হরণ
করিতেছিল।
৩৮। কাদম্ব-বিঘটিত পদ্ম-সকল বিদ্ধপর্ণ আকরের মধ্য
হইতে যেরূপ শােভা পায়, সেরূপ কাহারও কাহারও
চঞ্চলকুণ্ডলবিশিষ্ট বদনমণ্ডল বনমধ্য হইতে শােভা পাইতেছিল।
মেঘের মধ্য হইতে তড়িতের ন্যায় বনমধ্য হইতে
তাহাদিগকে নিঃসৃত হইতে দেখিয়া চঞ্চল জল মধ্যে চন্দ্রের
প্রভার ন্যায় অনুরাগে নন্দের শরীর কম্পিত হইতে লাগিল।
৪০। কৌতূহল-বিশিষ্ট দৃষ্টি দ্বারা সংশ্লেষতৃষ্ণায় জাতানুরাগ
হইয়া নন্দ তাহাদের দিব্য বপু ও ললিত চেষ্টা মনে মনে হরণ
করিলেন।
৪১। তৃষিত নন্দ অপসরাদিগকে ভােগ করিতে ইচ্ছা
করিয়া, তাহাদিগকে পাইবার জন্য দুঃখিত ও কাতর হইয়া,
এবং চঞ্চল ইন্দ্রিয়রূপ অশ্বগণ কর্তৃক মনােরথে হৃত হইয়া
কিছুতেই ধৈৰ্য্য অবলম্বন করিতে পারিলেন না।
৩৯।

সৌন্দর কাব্য ৪৩। ৪২। লােকে যেরূপ মলিন বস্তুকে মল নাশের জন্য মলােৎপত্তির জন্য নয়—পুনরায় ক্ষারের দ্বারা মলিন করে, বুদ্ধদেবও সেইরূপ নন্দকে পবিত্র করিবার জন্য (অপ্সরা-রূপ) রজে আকর্ষণ করিয়াছিলেন। ভিষ যেমন শরীর হইতে রােগ-ক্লেশ তাড়াইবার জন্য রােগীকে ক্লেশ দেন, সেইরূপ মুনি নন্দের অনুরাগ নষ্ট করিবার জন্য তাহাকে আরও গাঢ়তর অনুরাগের ভিতর লইয়া গেলেন। ৪৪। উদিত সূর্যের দীপ্তি যেরূপ দীপের প্রভা নষ্ট করে, সেরূপ অপসরাদিগের সৌন্দৰ্য মনুষ্য-লােকের রমণীদিগের সৌন্দৰ্য্যকে নষ্ট করে। মহৎ রূপ অণুমাত্র রূপকে নষ্ট করে, মহান্ শব্দ অল্প শব্দকে পরাভূত করে, গুরু রােগ স্বল্প বােগকে নষ্ট করে। সমস্ত মহানই অণুমাত্রের বধের হেতু। ৪৬। মুনির প্রভাবেই নন্দ তাহাদের দর্শন সহ্য করিতে পারিয়াছিলেন যাহা অপরে পারে না। অপসরাদিগের শরীর- সৌন্দৰ্য্য রাগযুক্ত দুর্বলের মন দহন করে। তখন নন্দকে জাতরাগ--কিন্তু ভাৰ্যাসম্বন্ধে গতরাগ মনে করিয়া অনুরাগ দ্বারা অনুরাগ নষ্ট করিতে ইচ্ছা করিয়া বিরাগ মুনি বলিলেন। ৪৮। এই-সকল দেবাঙ্গনাদিগকে দেখ। দেখিয়া সত্য কথা বল। ইহারা অথবা যেখানে তােমার মন আছে ৪৫। ৪৭।

স্বর্গনিদর্শন
সে-ইহাদের মধ্যে রূপে ও গুণে কে তােমার কাছে সুন্দর
বলিয়া মনে হয়।
৪৯। তখন নন্দ অপসরাদিগের প্রতি দৃষ্টি নিবিষ্ট করিয়া
ছিলেন। তাঁহার হৃদয় রাগাগ্নি দ্বারা প্রজ্বলিত হইতেছিল।
তিনি কামযুক্ত চিত্তে গদগদ ভাবে কৃতাঞ্জলি হইয়া বলিলেন।
৫০। সেই একচক্ষুহীন বানরী ও আপনার বন্ধুর মধ্যে যে
ভেদ, সেই বধূ ও এইসকল অপসরাদিগের মধ্যে সেই প্রভেদ।
৫১। ভাৰ্য্যা সুন্দরীকে দেখিয়া যেমন পূর্বে অন্য কোনও
স্ত্রীতে আমার আস্থা ছিল না, ইহাদের রূপ দেখিয়া তাহার
প্রতি এখন আমার বিন্দুমাত্র আস্থা নাই।
যেরূপ মৃদু-আতপপ্রতপ্ত (বস্তু) মহানলে দগ্ধ হয়,
সেরূপ আমি মৃদু অনুরাগ দ্বারা প্রতপ্ত হইয়া এখন মহা
অনলে দগ্ধ হইতেছি।
৫৩। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি পদ্মশত্রুর ন্যায় দগ্ধ না হই,
ততক্ষণ আমাকে বাক্যরূপ জল দ্বারা সিক্ত করুন। বৃক্ষাগ্র
পৰ্যন্ত উথিত অগ্নি যেরূপ শুরু তৃণকে দগ্ধ করে, সেইরূপ
রাগাগ্নি আজই আমাকে দগ্ধ করিতে ইচ্ছা করিয়াছে।
৫৪। মুনে, তুমি প্রসন্ন হও, আমি অবসন্ন হইতেছি।
আমাকে মুক্ত কর। হে পৃথিবীসদৃশ ধৈৰ্যশালি, আমার আর
ধ্যে নাই। আমার মন বিমুক্ত হইয়াছে। প্রাণ ত্যাগ করিতে
বসিয়াছি। মুমুর্মু আমাকে বাক্যরূপ অমৃত দাও।
৫৫। হে মহাভিষ, আমাকে ঔষধ দাও। আমি

تاط সৌন্দরন কাব্য কন্দর্পরূপ-সর্প দ্বারা হৃদয়ে দষ্ট হইয়াছি। সেই সর্পের ফণা “অমঙ্গল”, দৃষ্টি তাহার (ধ্বংস ) নাশজনক, প্রমাদ তাহার দংষ্ট্রা, আর তমঃই তাহার অগ্নিসদৃশ বিষ। ৫৬। এই আঘাতকারী মদন-সর্প দ্বারা দষ্ট হইয়া কেহই মনে অচঞ্চল হইয়া থাকিতে পারে না। চঞ্চলচিত্ত (সাংখ্যদর্শন- প্রবক্তা) বােঢ়র মন মুগ্ধ হইয়াছিল, ধীমান শন্তনু ক্ষীণতা অবলম্বন করিয়াছিলেন। ৫৭। তুমি আমার বিশিষ্ট অবলম্বনীয় আশ্রয় সত্ত্বে আমি যাহাতে বহু দিকে বিক্ষিপ্ত না হই এবং যাহাতে ব্যসন ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়া (পুনরায় ) গৃহে যাইতে পারি আমাকে তুমি সেইরূপ উপদেশ দাও। ইহা আমি বলিতেছি। ৫৮। চন্দ্র যেরূপ রাত্রির অন্ধকার নাশ করে সেরূপ তাহার হৃদয়ের তমঃ নাশ করিতে ইচ্ছা করিয়া জগতের তমােহরণকারী তমােবিহীন মহর্ষিশ্রেষ্ঠ গৌতম বলিলেন। ৫৯। ধৈর্য ধারণ পূর্বক বিকৃতি ত্যাগ করিয়া কর্ণ ও চিত্ত নিগৃহীত করিয়া শ্রবণ কর। এই-সকল রমণীদিগকে যদি প্রার্থনা কর তাহা হইলে শুল্কস্বরূপ উত্তম তপস্যা কর। ৬০। ইহাদিগকে বল সেবা সংপ্রদান বা রূপবত্ত দ্বারা লাভ করা যায় না। কেবল মাত্র ধর্মচর্চা দ্বারা ইহাদিগকে লাভ করা যায়। সেইরূপ ইচ্ছা থাকিলে ধৰ্ম্ম আচরণ কর। ৬১। এই স্বর্গে দেবতাদিগের সহিত বাস, রম্য বন ও

স্বর্গনিদর্শন
জরাশূন্য স্ত্রীগণ, এ সবই নিজের শুভ কার্যের ফল, অন্য কিছুতেই
হয় না, কারণ ভিন্নও হয় না।
৬২। পৃথিবীতে মানবগণ ধনু প্রভৃতি দ্বারা কখনও
বহুশ্রমে স্ত্রী লাভ করিয়া থাকে, কখনও বা তাহাও করে না।
কিন্তু পুণ্যকৰ্ম্মা জনগণ ধৰ্ম্মচৰ্চ্চা দ্বারা এই-সকল যে লাভ করিয়া
থাকে তাহাতে আর সন্দেহ নাই।
৬৩। যদি অপসরাদিগকে লাভ করিতে ইচ্ছা কর তাহা
হইলে অপ্রমত্ত হইয়া নিয়ম পালন কর। তুমি যে স্থিরত
দ্বারা ইহাদিগকে প্রাপ্ত হইবে সে বিষয়ে আমি প্রতিভূ
(জামিন) রহিলাম।
৬৪। অনন্তর ইহাই পরম এইরূপ দৃঢ়নিশ্চয় করিয়া নন্দ
মুনির কথায় ধৈৰ্য্য স্থাপন করিলেন। তখন মুনি তাহাকে
লইয়া বাতাসের মত আকাশ হইতে নামিয়া পুনরায় পৃথিবীতে
আসিলেন।
সৌন্দরনন্দ কাব্যে দশম সর্গ সমাপ্ত

'একাদশ সর্গ
স্বৰ্গাপবাদ
১। অনন্তর নন্দ নন্দনচারিণী সেই-সকল রমণীগণকে
দেখিয়া দুর্দমনীয় চঞ্চল মনকে নিয়মরূপ স্তম্ভে বন্ধন করিলেন ।
২। মান পদ্ম সদৃশ বিরস নন্দ অপসরাদিগকে হৃদয়ে
নিবিষ্ট করিয়া ধর্মাচরণ আরম্ভ করিলেন, মােক্ষলাভ ইচ্ছা
করিয়া নহে।
৩। সেইরূপ দয়িতাধীন চঞ্চললন্দ্রিয় হইয়াও ইন্দ্ৰিয়ার্থের
নিমিত্তই তিনি ইন্দ্রিয়দিগকে সংযত করিলেন।
৪। কামচৰ্য্যানিপুণ ভিক্ষুচৰ্যাভীত নন্দ পরমাচাৰ্য কর্তৃক
চালিত হইয়া ব্রহ্মচর্যা করিতে লাগিলেন।
৫। (পরস্পর বিরুদ্ধ ) জল ও অগ্নির ন্যায়, একান্তে স্থিত
শমগুণ ও তীব্র মদনের দ্বারা তিনি শান্ত হইয়া ছিলেন এবং
শুষ্কতাও প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
অপ্সরাগণের চিন্তায় এবং বহুল নিয়ম পালন দ্বারা
দর্শনীয়-শরীর হইয়াও নন্দ বৈরূপ্য প্রাপ্ত হইলেন।
৭। প্রিয়ভাৰ্য্য হইলেও ভাৰ্যার সম্বন্ধে কথা উঠিলে তিনি
অনুরাগহীনের ন্যায় অবস্থান করিতেন, আনন্দ বা ক্ষোভ
কিছুই করিতেন না।

স্বৰ্গাপবাদ প্রবল ৮। ভঁহাকে ভাৰ্যারাগপরায়ুখ এবং দৃঢ়ত দেখিয়া আনন্দ র্তাহার কাছে আসিয়া প্রণয়ের সহিত বলিলেন। ৯। ইন্দ্রিয়দিগকে নিগৃহীত করিয়া স্বস্থ ও সংযত হইয়া তুমি তােমার বিদ্যা ও বংশের অনুরূপ কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়াছ। ১০। কামপ্রসক্ত অনুরাগযুক্ত বিষয়াসক্ত তােমার যে এই ( সংবিৎ ) জ্ঞান হইয়াছে ইহার কারণ অল্প নহে। ১১। মৃদু ব্যাধি অল্প যত্নে নিবারণ করা যায়। ব্যাধি প্রবল যতেও নাশ করা যায় কি না সন্দেহ। ১২। তােমার দুরারােগ্য বলবান মানস ব্যাধি হইয়া- ছিল। যদি তুমি (তাহা হইতে নিবৃত্ত হইয়া থাক) আরােগ্য লাভ করিয়া থাক তাহা হইলে তােমাকে ধৈৰ্য্যশীল বলিতে হইবে। সাধনা দ্বারা মহান্ হইলেও মানীর পক্ষে মৃদু, লুব্ধের পক্ষে ত্যাগ ও অনুরাগীর পক্ষে ব্রহ্মচর্য্য দুষ্কর। ১৪। তােমার এই নিয়ত ধৃতিতে আমার এক সন্দেহ আছে। যদি বক্তব্য বলিয়া মনে কর তাহা হইলে সানুনয়ে জিজ্ঞাসা করি। সরলভাবে কথিত বাক্য অন্যরূপ মনে করা উচিত নহে। অভিপ্রায় মন্দ না হইলে, তাহা কর্কশ হইলেও সৎ- লােকেরা কর্কশত্ব প্রাপ্ত হন না। ১৬। অপ্রিয় কিন্তু হিত বাক্য গ্রহণ করা উচিত। অহিত কিন্তু প্রিয় বাক্য গ্রহণ করা উচিত নহে। স্বাদু ও উপকারী

•
সৌন্দরনন্দ কাব্য
ঔষধ যেরূপ দুলভ, সেইরূপ প্রিয় এবং হিত বাক্যও
দুলভ।
১৭। বিশ্বাস, অর্থচৰ্চ্চা, সুখদুঃখে সমানত্ব, ক্ষমা এবং প্রণয়
সৎলােকের বৃত্তি।
১৮।
অতএব তােমাকে প্রণয়বশতঃ জিজ্ঞাসা করিতেছি,
জিঘাংসা-বশতঃ নহে। তােমার শ্রেয়ই আমার বিবক্ষা ;
তাহা আমি উপেক্ষা করিতে পারি না।
১৯। অপসরার জন্য ধৰ্ম্ম আচরণ করিতেছ বলিয়া শুনা
যায়। ইহা কি বাস্তবিক সত্য অথবা পরিহাস ?
২০।
যদি ইহা সত্যই হয় তাহা হইলে ইহার ঔষধও
বলিব। বক্ত,দিগের ঔদ্ধত্য ও তাহাদিগের রজঃ অর্থাৎ পাপের
কথা বলিব।
২১। অনন্তর তৎকর্তৃক তিনি হৃদয়ে আহত হইয়া চিন্তা
করিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন, এবং ক্ষণকাল অধােমুখ
হইয়া রহিলেন।
২২। অনন্তর তাহার মনের সংকল্পসূচক ইঙ্গিত বুঝিয়া
আনন্দ অপ্রিয় কিন্তু মধুর-ফল-বিশিষ্ট বাক্য বলিলেন।
২৩। তােমার আকৃতি দেখিয়াই তােমার ধৰ্ম্ম-প্রয়ােজন
বুঝিতে পারিতেছি। তাহা বুঝিয়া তােমার প্রতি আমার হাস্য
ও কারুণ্য হইয়াছে।
২৪। যেমন কেহ আসনের নিমিত্ত ভারী শিলা বহন করে,
সেরূপ তুমিও কামের জন্য নিয়ম পালন করিতে উদ্যত হইয়াছ।

স্বর্গাপবাদ
২৫। তাড়নেচ্ছা দেখিলেই যেমন মেষ পলায়ন করে,
সেরূপ অব্ৰহ্মচর্যের নিমিত্ত তােমার এই ব্রহ্মচর্য্য।
২৬। বণিকেরা যেমন লাভের জন্য পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে,
সেরূপ এই ধৰ্ম্মাচরণও তােমার পণ্যভূত ; শান্তির জন্য নহে।
২৭। কৰ্ষক যেমন ফল বিশেষের জন্য বীজ বপন করে,
তুমিও সেরূপ বিষয়কার্পণ্য হেতুই বিষয় ত্যাগ করিয়াছ।
২৮। যেমন প্রতীকারসুখপ্রাপ্তির ইচ্ছায় রােগ আকাঙ্ক্ষা
করা, সেইরূপ তুমিও বিষয়তৃষ্ণার জন্য দুঃখ ইচ্ছা করিতেছ।
২৯। (মধুহারী) যেমন মধুর দিকেই চাহিয়া থাকে,
প্রপাতের (পতন) দিকে দৃষ্টিপাত করে না, তুমিও সেরূপ
অপসরাই দেখিতেছ, শেষে যে পতন হইবে তাহা লক্ষা
করিতেছ না।
তােমার হৃদয় কামাগ্নি দ্বারা দীপ্ত হইতেছে, আর
তুমি শরীর দ্বারা ব্ৰত আচরণ করিতেছ। তুমি মনে ব্রহ্মচারী
নহ । তােমার এ কিরূপ ব্রহ্মচর্য্য।
৩১। তুমি যখন সংসারে ছিলে তখন তুমি শত শত অপরা
পাইয়াছ এবং ত্যাগ করিয়াছ। আবার তাহাদের জন্য তােমার
অভিলাষ কেন ?
৩২। অগ্নির কখনও কাষ্ঠ দ্বারা তৃপ্তি হয় না। লবণােদধির
( সমুদ্রের) কখনও জল দ্বারা তৃপ্তি হয় না। কামে অতৃপ্ত
লােকের কখনও কাম তৃপ্তিদায়ক হয় না।
তৃপ্তি না থাকিলে শান্তি কোথায় ; শান্তি না
৩০।

১৪
সৌন্দরনন্দ কাব্য
৩৭।
থাকিলেই বা সুখ কোথায় ? সুখের অভাবে প্রীতিই বা
কোথায় ? প্রীতি না থাকিলে রতিই (আনন্দ) বা কোথায় ?
৩৪। যদি তােমার আনন্দ পাইবার ইচ্ছা থাকে তাহা
হইলে অধ্যাত্ম বিষয়ে মন দাও। অধ্যাত্ম তুল্য প্রশান্ত ও
অনবদ্য রতি (আনন্দ) কোথায়ও নাই।
৩৫। তাহাতে নৃত্য গীত রমণী বা অলঙ্কারের কোনও
প্রয়ােজন নাই। যেখানে-সেখানে থাকিয়া তুমি একলাই সেই
আনন্দ উপভােগ করিতে পারিবে।
৩৬। তৃষ্ণা থাকিলে বলবান্ মানস দুঃখ থাকিয়া যায়।
সেই তৃষ্ণা দূর কর। তৃষ্ণাও থাকিবে না, দুঃখও থাকিবে না।
সম্পদে ও বিপদে, দিনে ও রাত্রিকালে, কামে সতৃষ্ণ
ব্যক্তির শান্তি হয় না।
৩৮। কামের প্রার্থনা দুঃখকারী ; পাইলেও তৃপ্তি নাই।
বিয়ােগ হইলেই দুঃখ নিয়ত। বিয়ােগও অবশ্যম্ভাবী।
৩৯। দুষ্কর কৰ্ম্ম করিয়াও, দুলত স্বর্গ লাভ করিয়াও,
প্রবাস হইতে স্বগৃহের ন্যায় পুনরায় নরলােকে আসিতে হয়।
৪০। সেইরূপ ভ্রষ্টের সম্বন্ধে কুশল ও মঙ্গল কিছুই
নাই। তির্যক প্রাণীর মধ্যে, নরকে অথবা পিতৃলােকেই
তাহার স্থান।
৪১। স্বর্গে উত্তম বিষয় ভােগ করিবার পর ভ্রষ্ট আর্ত
লােক দুঃখের আস্বাদ কি করিয়া করিবে ?
৪২। শিবি শ্যেনকে প্রাণিবাৎসল্য হেতু নিজের মাংস দান

স্বৰ্গাপবাদ
করিয়াছিলেন। এই দুষ্কর কাৰ্য্য করিয়াও তিনি স্বর্গভ্রষ্ট
হইয়াছিলেন।
৪৩। রাজশ্রেষ্ঠ মান্ধাতা ইন্দ্রের অর্ধাসন পাইয়া ও দেবত্ব
লাভ করিয়া কালে অধঃপতিত হইয়াছিলেন।
৪৪। দেবতাদিগের রাজা হইয়াও নহুষের পৃথিবীতে
পতন হইয়াছিল। তিনি ভুজঙ্গত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এখনও
মুক্তি লাভ করেন নাই।
৪৫। সেইরূপ দিবিড় রাজা রাজকাৰ্য্য দ্বারা সংস্কার লাভ
করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছিলেন। তিনি পুনরায় স্বর্গভ্রষ্ট
হইয়া সমুদ্রে কূৰ্ম্ম হইয়াছিলেন।
৪৬। ভূরিদ্যুম্ন, যযাতি এবং অন্য নরপতিগণ কৰ্ম্ম দ্বারা
স্বর্গ প্রাপ্ত হইয়াও কৰ্ম্মক্ষয়ে পুনরায় স্বর্গ ত্যাগ করিয়াছিলেন।
৪৭। অসুরেরা পূর্বে দেবতা ছিল। দেবতারা তাহাদের
শ্রী হরণ করিয়াছিলেন। তাহারা শ্ৰীর জন্য শােক করিতে
করিতে পাতালে আশ্রয় গ্রহণ করিল।
৪৮। রাজর্ষি, অসুর ও দেবগণ হেতু শত শত মহেন্দ্রের
পতন হইয়াছে। মাহাত্মও চিরস্থায়ী নয়।
৪৯। চণ্ডবিক্রম উপেন্দ্র ইন্দ্রসভার শােভাবর্ধন করিয়া
কৰ্ম্ম ক্ষীণ হইলে অপসরাগণের মধ্য হইতে পৃথিবীতে পতিত
হইয়াছিলেন।
৫০। হা চিত্ররথ, হা বাপি, হা মন্দাকিনি, হা প্রিয়ে, এরূপ
আর্ন্তভাবে বিলাপ করিতে করিতে দেবগণ পৃথিবীতে পতিত হন।

সৌন্দরনন্দ কাব্য ৫১। বুদ্ধিমাদিগের মৃত্যুকালে তীব্র দুঃখ হয়। দেব- গণের মধ্যে সুখভােগকারিগণের স্বর্গ হইতে পতন-কালের কথা আর কি বলিব ? ৫২। ( ভঁহাদের) বসন ধূলিমলিন হয়, সুন্দর মাল্য ম্লান হয়, অঙ্গ-সকল হইতে স্বেদ উৎপন্ন হয়, মনের আনন্দ নষ্ট হয়। ৫৩। মুমূষু মানবগণের অমঙ্গলসূচক অরিষ্ট-চিহ্নের ন্যায় এইগুলিই দেবতাগণের স্বর্গ হইতে পতনের চিহ্ন। ৫৪। স্বর্গে কাম উভােগ করিবার সময় যে সুখ উৎপন্ন হয় তাহাই স্বর্গভ্রষ্টদিগের পক্ষে দুঃখ। এই দুঃখই কেবল অবশিষ্ট থাকে। অতএব স্বৰ্গকে পরিণাম-দুঃখাবহ, অত্রাণ, অবিশ্বাস্য, অতৃপ্তিদায়ক ও ক্ষয়শীল জানিয়া অপবর্গ প্রাপ্তির অভিলাষ কর। ৫৬। উদ্ৰক মুনি অশরীর শ্রেষ্ঠ জন্ম পাইয়াও কৰ্ম্মাবসানে তাহা হইতে চ্যুত হইয়া তিৰ্য্যগ যােনি প্রাপ্ত হইবেন। ৫৭। সুনেত্র সপ্তবর্ষীয়া মৈত্রার সহিত ব্ৰহ্মলােকে গিয়াও পুনর্বার ফিরিয়া আসিয়া গৰ্ভস প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ৫৮। যখন ঐশ্বর্যশালী স্বর্গবাসীরাও ক্ষয় প্রাপ্ত হয়, তখন কোন্ জ্ঞানী ক্ষয়শীল স্বর্গবাসের জন্য স্পৃহা করিবেন ? ৫৯। সূত্রবদ্ধ বিহঙ্গ যেমন দূরে গিয়াও পুনরায় ফিরিয়া আসে, সেরূপ অজ্ঞানসূত্রে আবদ্ধ জীবও দূরে গিয়া ও পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়া আসে।

স্বর্গাপবাদ যেরূপ প্রতিভূর সহিত সময় করিয়া লােকে বন্ধন- মুক্ত (জামিনে খালাস) হইয়া গৃহসুখ ভােগ করে, আবার সময় অতীত হইলে পূর্ব বন্ধন গ্রহণ করে, সেরূপ আত্মনিয়ম পালন ও ধ্যানাদি দ্বারা স্বর্গ প্রাপ্ত হইলেও আবার কালে কম্ম ক্ষয় হইলে পৃথিবীতে ফিরিয়া আসিতে হয়। জালমধ্যগত প্রমত্তচিত্ত তড়াগস্থিত মৎস্য যেমন বন্ধনজনিত বিপদের কথা জানিয়া ও সুস্থচিত্তে জলে বিচরণ করে, সেইরূপ পৃথিবীস্থ কৃতাৰ্থমতি জনগণ স্বর্গে ধ্যান করিতে করিতে নিজের পুনরাবৃত্তিযুক্ত স্থানকেই শিব অচ্যুত এবং ধ্রুব বলিয়া মনে করে। অতএব এই জগৎ জন্ম- রােগ- মৃত্যু ও বিপদ-যুক্ত মনে করিয়া সংসারে স্বর্গে নরকে, তির্যাগযােনিতে, পিতৃগণের মধ্যে এবং মানবগণের মধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে বহি ত্রাণশাল ভয়হীন শিব মরণহীন জরাহীন শােকহীন এবং অমৃত তার জন্য ব্রহ্মচর্য আচরণ কর। চঞ্চল স্বর্গের প্রতি ( রুচি ) অভিলাষ ত্যাগ কর। ৬২। সৌন্দরনন্দ কাব্যে একাদশ সগ সমাপ্ত ৭

দ্বাদশ সর্গ
প্রত্যবমর্শ ( অনুসন্ধান বা ধ্যান)
১। “তুমি অপসরার জন্য ধর্ম আচরণ করিতেছ’ আনন্দ
কর্তৃক এরূপ কথিত হইয়া নন্দ অত্যন্ত লজ্জিত হইয়াছিলেন।
২। অত্যন্তলজ্জাহেতু হৃদয়ে প্রমােদ হয় নাই। প্রমােদের
অভাবে তাঁহার বিমুখ মন ব্রতে স্থির ছিল না।
৩। যদিও কামরাগই তাহার প্রধান ছিল, যদিও তিনি
পরিহাস বাক্যের যােগ্য ছিলেন, তথাপি ( অপসরা-প্রাপ্তি-
রূপ) হেতু চলিয়া যাওয়ায় তিনি সেই বাক্য উপেক্ষা করিতে
পারিলেন না।
৪। (নন্দ) বিবেচনার অভাবে পূর্বে স্বর্গকেই ধ্রুব বলিয়া
মনে করিয়াছিলেন ; স্বর্গ ক্ষয়শীল শুনিয়া অত্যন্ত ভয় পাইলেন।
৫। অপ্রমত্ত সারথির মহারথ যেমন উন্মার্গ হইতে নিব্রত
হয় সেইরূপ সঙ্কল্পরূপ অশযুক্ত তাহার মনােরথ সুর্গ হইতে নিবৃত্ত
হইয়াছিল।
৬। মিষ্ট অপথ্য হইতে বিরত জীবিতেচ্ছু রােগীর ন্যায়
স্বর্গতৃষ্ণা-নিবৃত্ত তিনি তৎক্ষণাৎ যেন সুস্থ হইয়াছিলেন ।
৭। তিনি যেরূপ অপসরা-দর্শন পাইয়া প্রিয়া ভাৰ্য্যাকে
বিস্মৃত হইয়াছিলেন, সেরূপ নিত্য দ্রব্যের জন্য উদ্বিগ্ন হইয়া
অপসরাগণকেও বিস্মৃত হইলেন।

প্রত্যবমর্শ ৯৯ মহা মহা প্রাণীদিগেরও আবৃত্তির (পুনর্জন্ম ) কথা চিন্তা করিয়া অত্যন্ত আবেগ-ভরে অনুরাগ-যুক্ত হইলেও তিনি ( এখন ) বীতরাগ হইলেন। ৯। সেই আবেগ তাহার শ্রেয়ােবৃদ্ধির জন্যই হইয়াছিল— যেমন বৈয়াকরণগণ আখ্যাতে ধাতুর পূর্বে অধি উপসর্গ তদর্থের উৎকর্ষ-বােধের জন্য স্থাপন করেন। ১০। পর্বকালে প্রচলিত “অস্তি” নিপাত যেমন বিশেষ কোনও কালে নিয়ন্ত্রিত নহে, সেইরূপ নন্দের চিত্তও কোন কালে কোনও নির্দিষ্ট বস্তুতে নিবদ্ধ হইতেছিল না। ১১। খেলগামী মহাবাহু মদহীন গজেন্দ্ৰতুল্য নন্দ নিজের ভাব বলিতে ইচ্ছা করিয়া যথাসময়ে গুরুর নিকট উপস্থিত হইলেন। ১২। তিনি গুরুকে বাষ্পকুল-লােচনে প্রণাম করিয়া লজ্জায় অধােমুখে কৃতাঞ্জলি হইয়া বলিলেন। ১৩। অপসরা প্রাপ্তি সম্বন্ধে ভগবান যে আমার প্রতিy ছিলেন সেই অপসরার প্রয়ােজন নাই। আমি আপনার প্রতিভূত্ব ত্যাগ করিতেছি। আবৰ্ত্তক স্বর্গ ও সংসারের বিচিত্রতার কথা শুনিয়া স্বর্গ ও মর্ত্য কোথায়ও থাকা আমার ভাল লাগে না। ১৫। যদি নিয়ম ও দম দ্বারা যত্নে স্বর্গ প্রাপ্ত হইয়াও সেই স্বর্গ হইতে অতৃপ্ত হইয়া পতিত হইতে হয় তাহা হইলে ত্যাগ- কারী সেই স্বর্গকে নমস্কার।

সৌন্দরনন্দ কাব্য
১৭।
১৮।
১৬। অতএব
অতএব সচরাচর নিখিল লােককে জানিয়া
সর্বদুঃখক্ষয়কারী আপনার পরম ধৰ্ম্মে আমি রত হইব।
অতএব সংক্ষেপে ও বিস্তৃতভাবে তাহা আমাকে
বিশেষ করিয়া বলুন যাহা শুনিয়া পরম পদ লাভ করা যায়।
তখন তাহার অভিপ্রায় জানিয়া, ইন্দ্রিয়-সকল
বিপক্ষ ও শ্রেয়-অভিমুখীভূত বুঝিয়া তথাগত বলিলেন।
১৯। তারণি মথিত হইলে অগ্নি দর্শনের পূর্বে যেরূপ ধুম
উথিত হয় দেখা যায়, সেরূপ এই প্রত্যবমর্শই শ্রেয়ের পূর্ববেগ
মনে কর।
২০। চঞ্চল ইন্দ্রিয়াশগণ কর্তৃক বিপথে চালিত হইয়া
শুভদৃষ্টবশতঃ অবিমূঢ় দৃষ্টি দ্বারা সৎপথে অবতীর্ণ হইয়াছ।
অদ্য তামার জন্ম সফল। অদ্য তােমার মহান্
লাভ। কারণ কামরসজ্ঞ তােমার মন মােক্ষের জন্য উৎসুক
হইয়াছে।
২২। যে সংসার-গৃহে থাকাই আরামজনক মনে হয়
তাহাতে নিবৃত্তি বিষয়ে রতি দুর্লভ ; মূখগণ প্রপাতের ন্যায় মােক্ষ
হইতে ভীত হয়।
২৩। লােকে চেষ্টা করে যেন দুঃখ না হয়, সুখ হয়।
দুঃখের অত্যন্ত অভাবই যে সুখ তাহা বােঝে না।
২৪। শক্ৰস্বরূপ অনিত্য দুঃখহেতু কাম প্রভৃতিতে আসক্ত
হইয়া জগৎ অব্যয় সুখ লাভ করিতে পারে না।
২৫। কিন্তু বিষপান করিয়া যথাসময়ে যে ঔষধ পান

প্রত্যবমর্শ
১০১
করিতে ইচ্ছা করিতেছ, সর্বদুঃখনাশক সেই অমৃত তােমার
হস্তেই রহিয়াছে।
যে তােমার তাদৃশ রাগাগ্নি ধর্মের প্রতি ঔৎসুক্যের
প্রতিবন্ধক ছিল, সেই তােমার নিকট অনুপযুক্ত সংসার-ভয়ই
সম্মানার্য করণীয় ছিল।
২৭। পিপাসু পথিক যেমন মলিন সলিল দেখিয়াও
ধৈৰ্য্যহীন হয়, সেইরূপ মনে যখন উদ্দমনীয় অনুরাগ সঞ্চার হয়
তখনও লােকে ধৈৰ্যহীন হয়।
২৮। তােমার এরূপ বুদ্ধি রজোগুণ দ্বারা নিরুদ্ধ হইয়া
ছিল, যেরূপ প্রচণ্ডত-সময়ে ধূলি দ্বারা সূৰ্য্যের প্রভা নিরুদ্ধ
ইয়।
২৯। মেরু-বিনিষ্ক্রান্ত-সূৰ্য্য-প্রভা যেরূপ নৈশ অন্ধকার
নাশ করিয়া প্রকাশিত হয়, সেরূপ তােমার এখন হৃদয়ের
তমােনাশক বুদ্ধি প্রকাশিত হইয়াছে।
৩০। তুমি যে নৈষ্ঠিক সূক্ষম শ্রেয়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ
করিতেছ ইহা শুদ্ধসত্ত্ব চিত্তেরই উপযুক্ত।
৩১। এই ধৰ্ম্মেচ্ছা সেই হেতু বর্ধিত কর। হে ধৰ্ম্মজ্ঞ,
সমস্ত ধৰ্ম্মেরই হেতু ইচ্ছা (ছন্দ ), ইহাই নিয়ত।
৩২। গমনবুদ্ধি (ইচ্ছা) হইলেই লােক গমনে প্রবৃত্ত হয়,
শয়নবুদ্ধি হইলে শয়ন করে এবং অবস্থানবুদ্ধি হইলেই অবস্থান
৩৩। লােকে যখন ভূমির ভিতরে জল আছে ইহা বিশ্বাস

সৌন্দরনন্দ কাব্য .
(শ্রদ্ধা) করে এবং যখন প্রয়ােজন হয়, তখন যত্নের সহিত এই
পৃথিবীকে খনন করে ।
৩৪। যদি অগ্নির প্রয়ােজন কাহারও না থাকে অথবা
অরণিতে শ্রদ্ধা না থাকে তাহা হইলে কেহ অরণি মন্থন করে
। অগ্নির প্রয়ােজন ও অরণিতে শ্রদ্ধা থাকিলে মন্থন করে।
৩৫। কৃষক যদি ভূমিতে শস্যোৎপত্তি বিশ্বাস না করে
অথবা তাহার যদি শস্যের প্রয়ােজন না থাকে তাহা হইলে সে
ভূমিতে বীজ বপন করে না।
অতএব শ্রদ্ধাকেই আমি হস্ত বলিয়া নির্দেশ
করিয়াছি।
অক্ষত হস্ত যেরূপ দায় গ্রহণ করে, সেরূপ শ্রদ্ধা ও
সদ্ধৰ্ম্ম গ্রহণ করে। [ যাহা দ্বারা গ্রহণ করে তাহাই হ :
সুতরাং শ্রদ্ধা সদ্ধৰ্ম্মের অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের হস্তস্বরূপ ।]
৩৭।
প্রাধান্য হেতু ‘ইন্দ্রিয়’, স্থিরত্ব হেতু ‘বল’ এবং গুণ
ও দারিদ্র্য প্রশমন হেতু “ধন” বলিয়া শ্রদ্ধা বর্ণিত হইয়াছে।
ধৰ্ম্মের রক্ষণ হেতু “ঈষিকা”, এবং দুর্লভত্ব কে?
“রত্ন” বলিয়া শ্রদ্ধা লােকে কথিত হয়।
শ্রেয়ের নিমিত্ত বলিয়া “বীজ” এবং পাপের শুদ্ধি
“নদী” বলিয়া শ্রদ্ধা অভিহিত হয়।
৪। যেহেতু
যেহেতু ধৰ্ম্মোৎপত্তির প্রতি শ্রদ্ধাই প্রধান কারণ,
সেইজন্য কাৰ্যত সেই সেই বিষয়ে সেই সেইরূপ বলিয়াছি।
৪১। অতএব এই শ্রদ্ধাঞ্জুরকে সংবর্ধিত কর। যেরূপ মূলের
বৃদ্ধিতে বৃক্ষ বর্ধিত হয় সেরূপ শ্রদ্ধার বৃদ্ধিতেই ধৰ্ম্ম বর্ধিত হয়।
৩৯।

প্রতামর্শ
৪২। যাহার দর্শন ব্যাকুল, যাহার নিশ্চয় দুর্বল, তাহার
চঞ্চল শ্রদ্ধা হইতে কোনও কাৰ্যই হয় না।
৪৩। যতদিন পর্যন্ত তত্ত্ব দৃষ্ট অথবা শ্রুত না হয়, ততদিন
পর্যন্ত শ্রদ্ধা স্থির ও সবল হয় না। নিয়ম দ্বারা বিজিতেন্দ্রিয়
লােকের তত্ত্ব দৃষ্ট হইলে শ্ৰদ্ধারূপ বৃক্ষ সফল হয়।
আশ্রয় (ধৰ্ম্মাশ্রয়) ও সাফল্য লাভ করে ।
সৌন্দরনন্দ কাব্যে দ্বাদশ সর্গ সমাপ্ত

ত্রয়ােদশ সর্গ
শীল ও ইন্দ্রিয়-জয়
১। এইরূপে নন্দ মহর্ষি বুদ্ধ কর্তৃক শ্রদ্ধার দিকে আকৃষ্ট
হইয়া অমৃত-স্নাত হইয়াই যেন পরম আনন্দ লাভ করিলেন ।
২। বুদ্ধ সেই শ্রদ্ধা হেতু নন্দকে কৃতাৰ্থবৎ মনে করিলেন,
এবং নন্দও বুদ্ধ দ্বারা সংস্কারযুক্ত হইয়া শ্রেয় যেন হস্তগত
হইয়াছে ভাবিলেন।
৩। বুদ্ধদেব কাহাকেও কোমল বাক্যে, কাহাকেও কঠোর
বাক্যে, কাহাকেও বা উভয় উপায়ে শিক্ষা দিতে লাগিলেন।
৪-৫-৬। যেমন স্বর্ণ মৃত্তিকা হইতে জন্মগ্রহণ করিয়া
মুত্তিকাতে থাকিয়াও ধূলিদোষে দুষ্ট হয় না, উহা নিৰ্ম্মল বিশুদ্ধ
পবিত্র ; যেমন পদ্মপত্র জল হইতে উৎপন্ন হইয়া জলে থাকিয়াও
উপরিভাগে ও অধােভাগে জললেপ লাভ করে না; সেইরূপ
ভগবান্ বুদ্ধও লােকের প্রতি অনুগ্রহে রত থাকিয়াও কৃতিত্ব ও
লৌকিক ধৰ্ম্মে সংসৃষ্ট হইতেন না।
৭। সম্পর্ক বা ত্যাগ, প্রিয় বা রুক্ষ ব্যবহার, কথা বা ধ্যান
তিনি কেবলমাত্র মন্ত্রকালে চিকিৎসার জন্য (লােকের চিত্তবৃত্তি
প্রভৃতির শােধনের জন্য) আশ্রয় করিতেন, নিজ চিত্তের
সন্তোষাদির জন্য নহে।
নিৰ্ম্মল হেতু

শীল ও ইন্দ্রিয়-জয় ১০৫ ৮। কিরূপে আমি প্রাণিগণকে মুক্ত করিব এইরূপ প্রবল করুণায় অনুপ্রাণিত হইয়াই দয়াশীল বুদ্ধ নিজ শরীর ধারণ করিয়াছিলেন। পরে নন্দের অত্যন্ত আনন্দ দর্শনে নন্দকে তক্কোপ- দেশের যােগ্য স্থির করিয়া ক্রম বাগীশ্রেষ্ঠ ক্রমে শ্রেয় বিষয়ের উপদেশ দিতে লাগিলেন। ১০। হে সৌম্য, তুমি শ্রদ্ধাযুক্ত চিত্তে আজ হইতে মােক্ষ লাভের জন্য নিজ বৃত্ত রক্ষা করিবে। ১১। কায় এবং বাক্যের যাহাতে বিশুদ্ধভাবে প্রয়ােগ হয়, উত্তান বিবৃত গুপ্ত ও অচ্ছিদ্র অবস্থাযুক্ত হইয়া তাহাই করিবে। ১২। সত্ত্বভাবের উৎপত্তি হেতু উত্তান, অগােপন হেতু বিবৃত, রক্ষণতৎপরতা হেতু গুপ্ত, এবং অনিন্দনীয়তা হেতু অচ্ছিদ্র হয়। ১৩। শরীর ও বাক্যের শুদ্ধি ও সপ্তাঙ্গযুক্ত কৰ্ম্মে শৌচ বশতঃ আজীবন রত থাকিবে। ১৪। ১৫।১৬। কুহন প্রভৃতি পঞ্চবিধ দোষের সেবা না করায়, বৃত্তির বৈরী জ্যোতিষ প্রভৃতি চতুধি বস্তুর ত্যাগ করায়, বর্জনীয় প্রাণী ধান্য ও ধনের প্রতিগ্ৰহ হইতে নিবৃত্ত হওয়ায়, নিয়ত প্রাপ্ত নিসৃষ্ট ভৈক্ষ্যের আদান করায় পরিতুষ্ট বিশুদ্ধ সুন্দর থাকিয়া মুক্তির জন্য সর্বদা দুঃখের প্রতীকার কমে চেষ্টা করিবে।

সৌন্দরন কাব্য
১৭। কায়- ও বাক্-সস্তৃত দুষ্ট কৰ্ম্ম হইতে পৃথভাবে
জীবিকা ধারণ দুঃশােধনীয় ইহা আমি বলি।
১৮। গৃহস্থ বিবিধ-দৃষ্টিযুক্ত বলিয়া তাহার দৃষ্টি দুঃশােধনীয়
এবং ভিক্ষুর জীবিকা পরের আয়ত্ত বলিয়া তাহারও জীবিকা
বিশুদ্ধ নহে।
১৯। চরিত্র ও আচার সম্বন্ধে সংক্ষেপে ইহাই কথিত হইয়া
থাকে। উহার নাশ হইলে আর আমাদের প্রব্রজ্যা রক্ষিত
হয় না।
২০।
অতএব চরিত্রসম্পন্ন হইয়া অণুমাত্র নিন্দনীয়
বিষয়েও ভীত হইয়া দৃঢ়তাসহকারে ব্রহ্মচর্য্য আচরণ কর।
২১। অবস্থানাদি ক্রিয়া যেমন একমাত্র পৃথিবীকে আশ্রয়
করিয়া বর্তমান, সেইরূপ সমস্ত শ্রেয়ঃবিষয়ের ক্রিয়াই একত্রি
শীল আশ্রয় করিয়া বর্তমান থাকে।
হে সৌম্য, মােক্ষের একমাত্র উপনিষৎ (রহস্য)
বৈরাগ্য জানিবে, বৈরাগ্যের সংবিৎ ও সংবিদের জ্ঞান দৃষ্টি।
২৩। জ্ঞানের উপনিষৎ সমাধি, সমাধির উপনিষৎ শরীর
ও মনের সুস্থতা।
২৪। কায় ও চিত্তের বিশুদ্ধি সুস্থতার, এবং বিশুদ্ধির
উপনিষৎ প্রীতি জানিবে।
২৫। প্রীতির উপনিষৎ পরম হৃষ্টতা, এবং তাহার উপনিষৎ
কুকৃত (কুৎসিত কাৰ্য) ও অকৃত বস্তুতে হৃদয়ের দুঃখ না
হওয়া।

শীল ও ইন্দ্রিয়-জয়
১০৭
২৬। উক্তরূপে লেখশূন্য হৃদয়ের একমাত্র শীলই উপনিষৎ,
শীলই শােককে উন্নত করে, অতএব উহা শশাধন কর।
২৭। ২৮। ২৯। কান্তারে যেমন দৈশিক (পথপ্রদর্শক)
লােকই আশ্রয়, সেইরূপ জগতে একমাত্র শীলই আশ্রয়। জগতে
শীলই একমাত্র মিত্র বন্ধু রক্ষা ধন ও কাম ; অতএব শীলের
সংশােধন করা উচিত। যােগিগণের মােক্ষজনক কাৰ্যে ইহা
ও অপর কতিপয় ( আচার ) প্রধান উপযােগী।
৩০। তার পর সর্বদা ঐরূপ স্মৃতি রাখিয়া স্বভাবত চঞ্চল
ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিবে।
৩১। নিজ ইন্দ্রিয়ের যেরূপ ভয় করা উচিত, শত্রু মৃর্ষিক
অহি বা বজের ভয় তত করা উচিত নহে, কারণ উহা দ্বারা
অসংখ্য লােক নষ্ট হয় ।
৩২। দ্বেষকারী শত্রু দ্বারা কদাচিৎ কেই পীড়িত হয়, নাও
হয়; কিন্তু ইন্দ্রিয় দ্বারা সকলে সর্বদাই পীড়িত হইয়া থাকে।
শত্রু প্রভৃতি দ্বারা হত হইলে নিয়ত নক লাভ হয়
, কিন্তু চঞ্চল ইন্দ্রিয় দ্বারা নষ্ট হইলে নরকে নিয়ত আকৃষ্ট
;
৩৪। শত্রু প্রভৃতি দ্বারা হত হইলে কদাচিৎ মানসিক দুঃখ
হয়, নাও হয়; কিন্তু ইন্দ্রিয় দ্বারা হত ব্যক্তির মানসিক ও শারী-
রিক উভয়বিধ দুঃখ নিয়ত হয়।
৩৫। ৩৬। সংকল্পরূপবিষদিগ্ধ চিন্তারূপ পুঙ্গযুক্ত রতিরূপ
ফলাযুক্ত বিষয়রূপ আকাশগামী পঞ্চ-ইন্দ্রিয়রূপ শরসমূহ কাম

১০৮
সৌন্দরনন্দ কাব্য
নামক ব্যাধ কর্তৃক চালিত হইয়া মনুষ্যরূপ হরিণকে নাশ
করে। (লােকে) যদি তাহার প্রতীকার না করে তবে উহা
দ্বারা ক্ষত হইয়া বিনাশ প্রাপ্ত হইতে হয়।
৩৭। নিয়মরূপ প্রাঙ্গণে থাকিয়া ধৈৰ্যরূপ কাৰ্ম্মক ও
স্মৃতিরূপ বৰ্ম্ম ধারণ করিয়া (ঐ শরসমূহকে) নিবারণ করিবে।
৯। যেমন শত্রুকে নিগ্রহ করিতে পারিলে লােক সুখে
থাকে এবং সুখে নিদ্রা যায়, সেইরূপ ইন্দ্রিয়ের উপশম হইলে
যথায়-তথায় থাকিয়া সুখােপভােগ করে।
৩৯। জগতে কুকুর যেমন আশায় মুগ্ধ হইয়া দৈন্য হেতু
শান্তি লাভ করে না, সেইরূপ বিষয়াকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিও জগতে
শান্তিলাভ করে না।
৪০। নিরন্তর সলিলে পূর্ণ হইতে থাকিয়াও যেমন সমুদ্র
তৃপ্ত নহে, সেইরূপ ইন্দ্রিয়সমূহ নিরন্তর বিষয় ভােগ করিতে
থাকিয়াও তৃপ্ত হয় না।
৪১। ইন্দ্রিয়সমুহ স্বীয় স্বীয় বিষয়ে অবশ্য বর্তমান থাকিবে,
কিন্তু তাহাতে কাৰ্য বা কারণ অনুসন্ধান করিবে না।
৪২। চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া কেবল ধাতুমাত্রে
ব্যবস্থিত থাকিবে, স্ত্রী বা পুরুষ ইত্যাদি বিশেষ কল্পনা করিবে
না।
৪৩। যদি কোথাও কোনও স্ত্রী বা পুরুষ-রূপ বিশেষভাবে
গ্রহণ করা হয়, তবে শােভমান তদীয় কেশ-দন্তাদির প্রতি
বিশেষভাবে অনুরাগী হইবে না।

শীল ও ইন্দ্রিয়-জয়
৪৬।
৪৪। তাহা হইতে কিছু আকর্ষণ করিবে না, তাহাতে
কিছু প্রক্ষেপও করিবে না। যে প্রাণী যেরূপ তাহাকে শুধু
তপে প্রত্যক্ষ করিবে।
৪৫। এইরূপে যদি তুমি ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহে তত্ত্বদর্শী
হইতে পার, তবে চিন্তা ও দৌর্ম নস্য তােমাতে থাকিবে না।
যেমন অরি অন্তরে শত্রুতা রাখিয়া মুখে মিত্রের ন্যায়
প্রিয় বাক্য বলিয়া অনিষ্ট সাধন করে, সেইরূপ কামচিন্তা
কামাত্মক জগৎকে প্রিয়ভাবে নষ্ট করিয়া থাকে।
৪৭। বিষয়াশ্রিত দৌমনস্থ একটী প্রধান শত্রু, মােহবশতঃ
যে দৌমনস্যের অনুবৰ্তন করিলে লােক পরকাল ও ইহকাল
উভয় স্থানে হত হয়।
৪৮। চঞ্চল-ইন্দ্রিয়-সম্পন্ন জগৎ শীত ও উষের ন্যায়
অনুরাগ ও বিদ্বেষ দ্বারা পীড়িত হইয়া সুখ ও শান্তি প্রাপ্ত
হয় না।
৪৯। যে পৰ্যন্ত মনের আসক্তি বিষয়ে পতিত না হয়,
ইন্দ্রিয়সমূহ তাবৎ কাল বিষয়ে থাকিয়াও আসক্ত হইতে পারে
না ।
৫০।
যেমন কাষ্ঠ ও বায়ু এই দুইটা বর্তমান থাকিলে
অগ্নি প্রজ্বলিত হয়, সেইরূপ বিষয় ও সঙ্কল্প এই দুইটী থাকিলে
ক্লেশগ্নি জ্বলিয়া উঠে।
৫১। বিষয়ের মিথ্যাজ্ঞান দ্বারা লােক বদ্ধ হয়, আর সেই
বিষয় যথার্থরূপে জানিতে পারিলে মুক্ত হয়।

১১০ সৌন্দরন কাব্য ৫২। একই রূপকে একজন দেখিয়া অনুরাগী হয়, অপর একজন দেখিয়া আনন্দিত হয়, আবার অপর একজন দেখিয়া ঔদাসীন্য অবলম্বন করে, এবং অন্য একজন দেখিয়া ঘৃণা প্রাপ্ত ৫৪। ৫৩। অতএব বিষয় বন্ধ বা মুক্তির কারণ নহে, সঙ্কল্প- বিশেষ হেতু বন্ধু ও বন্ধাভাব (মুক্তি) হইয়া থাকে। অতএব পরম যত্নে ইন্দ্রিয় সংযম করিবে। ইন্দ্রিয় সংযত না হইলে উহা দুঃখ ও জন্মের কারণ হইয়া থাকে। ৫৫। কামভােগ যে ইন্দ্রিয়-সর্পের ফণাস্বরূপ, আত্মদৃষ্টি দৃষ্টিস্বরূপ, প্রমত্ততা শীর্ষস্বরূপ, প্রহর্ন লােলজিহবা-স্বরূপ, মন আশ্রয়-বিল-স্বরূপ ও স্পৃহা বিষস্বরূপ, সে যাহাকে দংশন করে একমাত্র শমলাভ বা শশাস্ত্র ব্যতীত এমন কোনও ঔষধ নাই যাহা দ্বারা উহার চিকিৎসা করা যায় । অতএব চক্ষু ঘ্রাণ কর্ণ রসনা ও স্পর্শনেন্দ্রিয়রূপ তা শুভকারী এই কয়টী রিপুর সংযমনে সকল ব্যক্তি অপ্রমত্ততা অবলম্বন করে। তুমি ক্ষণকালও এই বিষয়ে অনবহিত হইও না। সৌন্দরন কাব্যে ত্রয়ােদশ সর্গ সমাপ্ত

চতুর্দশ সর্গ
আদিপ্রস্থান
৪।
১। স্মৃতিরূপ কপাট দ্বারা ইন্দ্রিয় নিরুদ্ধ করিয়া সমাধি
ও নিরাময়তার জন্য ভােজন বিষয়ে পরিমাণজ্ঞ হইবে।
২। অত্যন্ত আহার করলে তাহাতে প্রাণ ও অপান বায়ুর
কষ্ট হয়, গ্লানি ও নিদ্রা জন্মে, এবং পরাক্রম নষ্ট করে।
যেমন অতিরিক্ত আহার করিলে উহা অনর্থকর হয়,
সেইরূপ অল্প আহার করিলেও সামর্থ্য লাভ করা যায় না।
অল্প আহার করিলে শরীরের পুষ্টি কান্তি উৎসাহ
প্রয়ােগ ও বল ক্ষীণ করিয়া দেয়।
যেমন অধিক ভার হইলে তুলা (পাল্লা) নত হয়,
এবং লঘু ভারে উন্নত হয়, কিন্তু সম হইলে তুল্যই থাকে, সেইরূপ
ভােজনও অধিক হইলে শরীর নত, তাল্প হইলে ক্ষীণ, ও সম
হইলে সম হয়।
অতএব নিজ শক্তি অনুসারে বিবেচনাপূর্বক অতি-
ভােজন ও অল্প ভােজন করিবে না, নিজ পরিমাণে উহা পরিমাণ
করিয়া লইবে।
৭। হঠাৎ অল্প অগ্নিতে অনেক কাষ্ঠ দিলে উহা যেরূপ
উপশান্ত হয়, সেইরূপ যদি গুরু অন্ন আহার করা যায় তবে
শরীরের তাগ্নি আক্রান্ত হইয়া উপশান্ত হইয়া যায় ।

সৌন্দরন কাব্য ১০। যেমন ইন্ধনশূন্য হইয়া অনল নির্বাণ প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ অনাহারেও শারীরিক অনল নির্বাণ প্রাপ্ত হয়। এইজন্য আহারের অতি অল্প সংহরণও প্রশস্ত নহে। ৯। যেহেতু সকল প্রাণীরই আহার ব্যতীত স্থিতি অসম্ভব, অতএব আহার দোষযুক্ত নহে। কিন্তু এ বিষয়ে বিশেষ নিবারণ করিতে হইবে। (অর্থাৎ শরীর ধারণাৰ্থ আহার দোষ- যুক্ত নহে; কিন্তু এইটী খাইতে হইবে, ঐটী খাইব, ইত্যাদি বুদ্ধি নিবারণীয়।) অজ্ঞাত আহারে যেমন লােক আসক্ত হয়, এরূপ একটা বিষয় নাই যাহাতে সকল প্রাণী সমভাগে আসক্ত হয়। তাহার কারণ বুঝিতে হইবে। যেমন যে ব্যক্তির ব্রণ হয় সেই ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য ব্ৰণে লেপ প্রদান করে, সেইরূপ মুমুক্ষু ক্ষুধার উপশমের জন্য আহার করিবে। যেমন ভারবহনের জন্য রথে অক্ষদণ্ড যােজনা করা হয়, সেইরূপ বিবেকী ব্যক্তি প্রাণযাত্রা রক্ষার জন্য আহার করিবে। ১৩। দম্পতি যেমন পথে যাইতে যাইতে কান্তারপথ অতিক্রমণের জন্য অতি দুঃখিতান্তঃকরণে পুত্রমাংসও ভােজন করিয়া থাকে। ১৪। এইরূপ পরিমাণমত ভােজন করিবে; উহা ভূষা, শরীর, মত্ততা, বা দুর্পের জন্য নহে।

আদিপ্রস্থান
১১৩
যেমন কোনও গৃহ দুৰ্বল (জীর্ণ) হইয়া পতনােম্মুখ
হইলে উহাতে উপস্তম্ভ বা পেয়ালা দেওয়া হয়, সেইরূপ শরীর
ধারণের জন্য ভােজন করা হয়।
১৬। কোনও ব্যক্তি ভেলা বন্ধন করে এবং উহা রক্ষা করে,
তাহা যেমন স্নেহ
নহে কিন্তু জলপ্রবাহ উত্তীর্ণ
হইবার ইচ্ছায়।
১৭। সেইরূপ দোষাদোষবিবেকী ব্যক্তিগণ বহু উপচারে
যে শরীর পােষণ করেন উহা মেহ হেতু নহে, কিন্তু দুঃখসমূহ
উত্তীর্ণ হইবার (মুক্তির) জন্য।
১৮-১৯। যেমন লােক শত্রু কর্তৃক পীড্যমান হইয়া
দুঃখ করিতে করিতে শত্রুকে ধনাদি অর্পণ করে, উহা ভক্তি বা
আকাঙক্ষা-প্রযুক্ত নহে, কিন্তু কেবল নিজ প্রাণ
করিবার জন্য, সেইরূপ যােগী ব্যক্তি কেবল ক্ষুধার নাশেব
জন্য শরীরকে আহার দেয়, কিন্তু রাগ বা ভক্তির জন্য
নহে।
২০। সংযতেন্দ্রিয় হইয়া মনের ধারণা দ্বারা দিবস অতি
বাহিত করিবে এবং যােগ দ্বারা নিদ্রা নিরুদ্ধ করিয়া রাত্রি ও
অতিবাহিত করিবে।
২১।
যখন সংজ্ঞাযুক্ত হইলেও তােমার হৃদয়ে নিদ্রার
আবির্ভাব হইবে তখন সেই সংজ্ঞাকে (জ্ঞান) গুণবৎসংজ্ঞা
বলিয়া মনে করিবে না।
২২। চেষ্টা ও ধৃতি এবং স্থিতি ও গতি এই সকল

১১৪
সৌন্দরনন্দ কাব্য
বিষয়ের মূল (কারণ) অবলম্বন করিয়া নিদ্রা দ্বারা বাধ্যমান
হইয়াও নিত্যই মনে চিন্তা করিবে।
২৩। যে-সকল ধৰ্ম্ম তুমি শ্রবণ করিয়াছ তাহা , বিশদভারে
পাঠ করিবে, এবং পরকে উপদেশ দিবে, নিজেও চিন্তা করিবে।
২৪। জল দ্বারা আনন প্রক্ষালন করিবে, সকল দিকে দৃষ্টি
রাখিবে, জাগরণেচ্ছায় তারকার প্রতি দৃষ্টি রাখিবে।
২৫। অচঞ্চল বশ্যতাপন্ন ইন্দ্রিয়গুলিকে অভ্যন্তরে নিরুদ্ধ
করিয়া অবিক্ষিপ্ত চিত্তে রাত্রিকালে বিচরণ করিবে অথবা
অবস্থান করিবে।
ভয় প্রীতি ও শােক এই তিন বিষয়ে নিদ্রা দ্বারা
লােক অভিভূত হয় না, অতএব নিদ্রার আক্রমণের সময় এই
তিনটী আশ্রয় করিবে।
২৭। মৃত্যুর আগমনে ভয়, ধৰ্ম্ম আশ্রয় হেতু প্রীতি, ও
অসীম জন্মদুঃখে শােক আশ্রয় করিবে।
হে সৌম্য, জাগরণের জন্য এইরূপ প্রথা অবলম্বন
কৰ্ত্তব্য। কোন্ প্রাজ্ঞ ব্যক্তি শয়ন (নিদ্রা) হেতু আয়ুকে
নিষ্ফল করিবে ?
যেমন গৃহস্থিত সর্পকে উপেক্ষা করিয়া নিদ্রাভােগ
উচিত নহে, সেইরূপ দোষরূপ সর্পকে উপেক্ষা করিয়া মহাভয়
অপনােদনে অভিলাষী ব্যক্তির নিদ্রাভােগ উচিত নহে।
যেমন প্রজ্বলিত গৃহে নিশ্চিন্ত ভাবে শয়ন করিয়া
থাকা উচিত নহে, সেইরূপ মৃত্যু- ব্যধি ও জরা-রূপ অগ্নি দ্বারা
২৮।
৩০।

আদিপ্রস্থান :
প্রদীপ্ত জীবলােকে নিশ্চিন্ত ভাবে শয়ন করিয়া থাকা কাহার
পক্ষে উচিত?
৩১। শত্রুগণ সশস্ত্রে বর্তমান থাকিলে যেমন নিদ্রা যাওয়া
উচিত নহে, সেইরূপ যে পর্যন্ত দোষ প্রশমিত না হয় সে পর্যন্ত
তমঃ জানিয়া নিদ্রা ভােগ করা উচিত নহে।
৩২। ত্রিযামা রজনীর পূর্বম প্রয়ােগ দ্বারা (প্রকৃষ্ট
যােগ বা তদঙ্গ ক্রিয়া দ্বারা) অতিবাহিত করিয়া শরীরের
বিশ্রামের জন্য অনলসভাবে শয্যা আশ্রয় করিবে।
৩৩। লৌকিক নিয়মে দক্ষিণ পার্শ্বে থাকিয়া হৃদয়কে
প্রবুদ্ধ রাখিয়া শান্তি অভিলাষে শয়ন করিবে।
৩৪। আবার তৃতীয় যামে উখিত হইয়া বিচরণ করিয়া
অথবা উপবিষ্ট থাকিয়া ইন্দ্রিয়সংযম সহকারে মনঃশুদ্ধি বিষয়ে
যােগবিধি অনুষ্ঠান করিবে।
৩৫। অনন্তর হৃদিতে আসনগতা আস্থা দেখিবে না। সমস্ত
ক্রিয়া বিষয়ে জ্ঞান লাভ করিয়া স্মৃতি ধারণে চেষ্টা করিবে।
৩৬। যে রক্ষিত পুরের দ্বারে দ্বারাধ্যক্ষ নিযুক্ত রহিয়াছে
শত্রুগণ যেমন তাহা আক্রমণ করিতে পারে না, সেইরূপ যাহার
চিত্তে স্মৃতি অব্যাহত আছে তাহাকে দোষে অভিভূত করিতে
পারে না।
৩৭। যাহার কায়বিষয়ে স্মৃতি ধাত্রী যেমন বালককে রক্ষা
করে ঐরূপ সর্বদা চিত্তকে রক্ষা করে, তাহার ক্লেশ উৎপন্ন
হয় না।

১১৬
সৌন্দরনন্দ কাব্য
বিকীর্ণ গােসমূহকে
যেমন
গােপ
৩৮। যেমন বর্মহীন ব্যক্তি সমরস্থিত হইয়া প্রতিদ্বন্দ্বী
শত্রুর শরের লক্ষ্য হয়, সেইরূপ স্মৃতিবৰ্ম্মশূন্য ব্যক্তি সমস্ত দোষের
লক্ষ্য হইয়া থাকে।
৩৯। দৃষ্টিরহিত ব্যক্তি বিষয়ে বিচরণ করিতে গিয়া যেমন
নিরাশ্রয় হয়, সেইরূপ যাহার চিত্ত স্মৃতি দ্বারা রক্ষিত নহে
তাহার চিত্ত অত্যন্ত নিরবলম্বন ।
৪০। লােক যে অনর্থবিষয়ে আসক্ত এবং স্বার্থ হইতে
পরায়ুখ ও ভয়কারণে ভীত নহে, ইহার একমাত্র কারণ স্মৃতি-
লােপ।
৪১। নিজ শরীরে শীল প্রভৃতি যে-সকল গুণ আছে
উহাদিগকে, ক্ষেত্রে
( রাখাল ) অনুগমন করে, ঐরূপ স্মৃতি অনুগমন করিয়া
থাকে।
৪২। যাহার স্মৃতি অপসৃত হয় তাহার মােক্ষ নষ্ট হয়,
যাহার কায়গত স্মৃতি আছে তাহার মােক্ষ করতলে
বৰ্তমান।
৪৩। যাহার স্মৃতি নাই তাহার আৰ্য ন্যায় কোথায় ?
যাহার আর্য ন্যায় নাই তাহার সৎপথ নষ্ট হয়।
৪৪। যাহার সৎমার্গ নষ্ট, তাহার মােক্ষপদ নষ্ট হয় ;
যাহার অমৃত পদ নষ্ট হয় সেই ব্যক্তি দুঃখমুক্ত হইতে
পারে না।
অতএব বিচরণ-কালে আমি বিচরণ করিতেছি এবং
৪৫।

১১৭ ৪৬। আদিপ্রস্থান অবস্থান-কালে ‘আমি অবস্থান করিতেছি এইরূপ স্মৃতি সর্ব- কালে জন্মাইতে চেষ্টা করিবে। হে সৌম্য, যােগের অনুকূল নির্জন ও নিঃশব্দ শয্যা ও আসন আশ্রয় কর। প্রথমতঃ কায়ের বিশুদ্ধি লাভ করিলে মনের বিবেক সুখে লাভ করা যায়। ৪৭। যে ব্যক্তি রাগযুক্ত এবং চিত্তপ্রশমশূন্য হইয়া নির্জন প্রচার আশ্রয় করে না, সেই ব্যক্তি বহুকণ্টকযুক্ত ভূমিতে বিচরণের তুল্য প্রকৃত পথ প্রাপ্ত না হওয়ায় ক্ষয় প্রাপ্ত হয়। ৪৮। যে তত্ত্বজ্ঞানহীন যােগীর চিত্ত বিচিত্র বিষয়ে অবস্থিত তাহার চিত্ত সহসা উহা হইতে নিবৃত্ত করা যায় না, যেমন শস্য- মধ্য হইতে জলপানাৰ্থ আকৃষ্ট গােজাতিকে নিবৃত্ত করা যায় না। ৪৯। যেমন যে অগ্নিতে বায়ুর প্রেরণা নাই সেই অগ্নি শান্তি প্রাপ্ত হয় সেইরূপ বিবিক্ত প্রদেশে অনুদ্বেজিত থাকায় অল্প প্রযত্নেই চিত্ত শান্তি লাভ করে । ৫০। যে ব্যক্তি কোথাও যাহা-হয়-কিছু ভােজন করিয়া বা যাহা-হয়-কিছু পরিধান করিয়া আত্মারাম হইয়া বিজনে অনুরাগী হয় এবং যে ব্যক্তি পরের সংসর্গ কণ্টকের ন্যায় পরিহার করে, সেই শম-সুখে-অভিজ্ঞ নিপুণমতি ব্যক্তিই কৃতার্থ জানিবে। ৫১। যদি সুখ ও দুঃখে রত বিষয়ে একান্ত আসক্ত এই জগতে শান্তহৃদয় কৃতী পুরুষ দ্বন্দ্বশূন্য হইয়া বিজনে বিহার করে,

১১৮
সৌন্দরনন্দ কাব্য
তবে অমৃতের ন্যায় প্রজ্ঞারস পান করিয়া তৃপ্তহৃদয় হইয়া
বিশুদ্ধতা হেতু আসক্তিযুক্ত ও বিষয়ােপভােগের জন্য কৃপার
পাত্র জগতের জন্য শোেক করিতে থাকে।
৫২। যদি শূন্যগৃহে একাকী থাকিয়া শান্তি লাভ করে,
শত্রুর ন্যায় ক্লেশের সহিত ক্রীড়া না করে, আত্মায় একমাত্র
সস্তুষ্ট থাকিয়া যদি প্রীতিসলিল পান করে, তবে সেই ব্যক্তি
স্বর্গরাজ্য অপেক্ষাও উত্তম সুখ ভােগ করিতে থাকে।
সৌন্দরনন্দ কাব্যে চতুর্দশ সর্গ সমাপ্ত

পঞ্চদশ সর্গ বিতর্ক পরিহার ১২। যে কোনও বিবিক্ত প্রদেশে অতি উত্তম “পৰ্য” আসন বন্ধ করিয়া শরীর সরল করিয়া এবং স্মৃতিকে অভিমুখ- বৰ্ত্তিনী রাখিয়া নাসার অগ্রভাগে ললাটদেশে কিংবা যুগলের মধ্যস্থলে চঞ্চল চিত্তকে কোনও একটা বিষয়ে সংলগ্ন করিবে । ৩। কামবিতর্করূপ মানসিক ব্যাধি যদি তােমাকে আক্রমণ করে তবে বসনে রেণু সংলগ্ন হইলে যেমন তাহা দূর করিয়া ঝাড়িয়া ফেলিতে হয়, রাখিতে হয় না, সেইরূপ উহা দূর করিয়া দিবে। ৪। যদ্যপি জ্ঞান হেতু তুমি কাম পরিত্যাগ করিয়াছ তথাপি, প্রকাশ যেমন অন্ধকার নাশ করে সেইপ, জ্ঞান দ্বারা উহা নাশ করিয়া ফেল। ৫। ভস্মে যেমন অগ্নি আবৃত থাকে, সেইরূপ তনুতাপ প্রচ্ছন্ন থাকে। অতএব জল দ্বারা অগ্নির ন্যায় ভাবনা দ্বারা উহার শান্তি করিতে হয়। ৬। বীজ হইতে যেমন অঙ্কুর উদ্গত হয়, সেইরূপ উহা হইতে আবার কাম উদ্ভূত হইতে পারে ; তাহার নাশ করিলে বীজনাশে অঙ্কুরের ন্যায় আর উহা উদ্গত হয় না।

সৌন্দরন কাব্য
৭। কামিগণ কাম হইতে অৰ্জনাদি দুঃখ লাভ করিয়া
থাকে দেখিয়া মিত্ৰনামক শত্রুর ন্যায় উহাকে সেই মুলদেশ
হইতে ছিন্ন কর।
৮। কাম অনিত্য, সত্বস্তু হরণ করাই তাহার ধর্ম, রিক্ততা
ও ব্যসনের একমাত্র কারণ এবং বহুজনের ভােগ্য ; অতএব
উৎকট সর্পের ন্যায় উহাকে পরিত্যাগ করা উচিত।
৯। যাহাকে অন্বেষণ করা দুঃখকর, রক্ষা করা দুঃখকর,
ক্ষতি অত্যন্ত শােক উৎপাদন করে, এবং প্রাপ্তিও অত্যন্ত তৃপ্তি
জন্মায় না।
১০। বিত্তপ্রকর্ষে তৃপ্তি এবং স্বর্গলাভে কৃতার্থতা ও কাম
হইতে সুখ লাভ যে ব্যক্তি মনে করে সে নাশ প্রাপ্ত হয়।
১১। কাম চঞ্চল, অসম্পূর্ণ, অসার, ও অব্যবস্থিত এবং
কল্পনায় সুখজনক ; অতএব তাহা স্মরণ
করা উচিত
নহে।
১২। যদি প্রাণীবধ বা প্রাণীর প্রতি অসূয়া তােমার চিত্ত
ক্ষুভিত করে, তবে মণি দ্বারা যেমন মলিন জল নিৰ্ম্মল করা হয়
সেইরূপ মলিন চিত্তকে তাহার বিরােধী ভাব দ্বারা নির্মল
করিবে।
১৩। মৈত্রী ও করুণা এই দুইটী বিষয় হিংসা ও অসূয়ার
বিরােধী ; আলােক ও অন্ধকার যেমন এক স্থানে থাকে না,
সেইরূপ উক্ত দুইরূপ ভাব এক স্থানে থাকে না।
১৪। যাহার দুঃশীলতা নিবৃত্ত হইয়াছে অথচ হিংসাবৃত্তি

; বিতর্ক পরিহার ১২১ প্রবৃত্ত হইতেছে সেই ব্যক্তি, স্নাত হস্তী যেমন পুনরায় ধূলিলুষ্ঠিত হয় সেইরূপ, আত্মাকে মলিন করিয়া থাকে। ১৫। ব্যাধি মৃত্যু ও জরা দ্বারা দুঃখিত জীবকে কোন্ সদয় ব্যক্তি অপর দুঃখ দিতে চাহে? ১৬। দুষ্ট চিত্ত পরের পীড়া কখনও করে, নাও করে; কিন্তু দুষ্টচেতা ব্যক্তির দুষ্ট চিত্ত স্বয়ং সদ্যই পীড়া ভােগ করিয়া থাকে। ১৭। অতএব সর্বভূতে মৈত্রী ও কারুণ্য করিবে, হিংসা ও অসূয়া করিবে না। ১৮। মানব যে যে দ্রব্য প্রসক্তভাবে চিন্তা করে সেই সেই দ্রব্যে অভ্যাসক্রমে তাহাদের আসক্তি জন্মে। ১৯। অতএব অকুশল বস্তু পরিত্যাগ করিয়া কুশল বস্তুর চিন্তা কর, যাহা তােমার ইহকালে অর্থ- ও পরকালে পরমার্থ- জনক হইবে । ২০। অন্যায় বিতর্ক হৃদয়ে ধারণ করিয়া বর্ধন করিলে উহা নিজ ও পরের তুল্যভাবে অনিষ্টজনক হয়। ২১। শ্রেয়ােবিঘ্ন উৎপাদন করে বলিয়া নিজের অনিষ্ট- জনক এবং সৎপাত্রর নাশ পরভক্তির পক্ষে অনিষ্টজনক। ২২। যদি বাঁচিতে ইচ্ছা কর তাহা হইলে মনকে নানা কৰ্ম্মে নিক্ষিপ্ত কর। হে সৌম্য, অকল্যাণ বিতর্ক করা উচিত নহে। ২৩। কামব্রয়ােপভােগের নিমিত্ত মনে যে চিন্তার উদয় হয় সেই চিন্তা হইতে কোনও গুণই (ফল) পাওয়া যায় না। বন্ধনই তাহার পরিণাম।

১২২
সৌন্দরনন্দ কাব্য
২৪। সত্ত্ব অর্থাৎ প্রাণীদিগের নাশের বা ক্লেশের জন্য মনে
যে কলুষ-মােহ উৎপন্ন হয় তাহার পরিণাম নরক।
২৫। মৃত্তিকাবতী ভূমি খনন করিতে করিতে রত্নের
আঘাতে সুশস্ত্র যেরূপ বিকৃত হয়, সেইরূপ অকুশল বিতর্ক দ্বারা
আত্মাকে নাশ করা উচিত নহে।
২৬। অনভিজ্ঞ লােক যেরূপ অগুরুকাষ্ঠতুল্য উৎকৃষ্ট
কাষ্ঠকেও
ও দহন করে, ইহাও সেরূপ অন্যায়ের দ্বারা মনুষ্যত্বও
নাশ করে।
২৭। যেমন কোন ব্যক্তি রত্নদীপ হইতে রত্ন ত্যাগ করিয়া
লােষ্ট্র সংগ্রহ করে, সেইরূপ লােক মােক্ষধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া
অশুভ চিন্তা করে।
২৮। যেমন হিমালয়ে গমন করিয়া কেহ ঔষধ পরিত্যাগ
করিয়া বিষ ভােজন করে, সেইরূপ মনুষ্যত্ব লাভ করিয়া মুখ
ব্যক্তি পাপের সেবা করে ।
২৯। যেমন সূক্ষ কীলক দ্বারা কাষ্ঠের মধ্য হইতে
কীলক বহির্গত করা হয়, সেইরূপ বিরােধী ভাব দ্বারা বিতর্ক
অপসারণ করিবে।
জ্ঞাতিজন-বিষয়ে বৃদ্ধি ও অবৃদ্ধির চিন্তা হইলে
তাহার নিবৃত্তির জন্য জীবলােকের স্বভাব পরীক্ষা করা উচিত।
৩১। স্বীয় কৰ্ম্ম দ্বারা সংসারে আকৃষ্যমাণ প্রাণি-সমুহের
মধ্যে কেই বা সুজন কেই বা কুজন ? লােকে মােহবশে অন্য
জনের প্রতি আসক্ত হয়।

বিতর্ক পরিহার
৩৩।
৩২। অতীত, পথে (কালে) যাহারা, তােমার আত্মীয়
ছিলেন, তারা এখন পৃথক্ জন ( অপরিচিত ); আবার এখন
যাঁহারা সামান্য জন, হারা ভবিষ্যতে তােমার স্বজন হইবেন।
যেমন কতকগুলি পক্ষী সায়ংকালে আসিয়া মিলিত
হয়, ঐরূপ প্রতি জন্মে স্বজনগণের সমাগম হইয়া থাকে।
৩৪।
যেমন পথিকগণ পান্থনিবাসে সম্মিলিত হয়, আবার
পরস্পর পরস্পরকে ত্যাগ করিয়া যায়, সেই জগতে জীবের
সহিত সমাগম ত্যাগ হইয়া থাকে।
৩৫। এই জগতে সকলেরই অবস্থা ভিন্ন, কেহই কাহারও
প্রিয় নহে। ইহা কাৰ্যকারণহেতু বালুকা-মুষ্টির ন্যায় চঞ্চল।
৩৬। মাতা যে পুত্রকে পালন করেন তিনি ভাবেন পুত্র
আমাকে পালন করিবে, আবার মা আমাকে গর্ভে ধারণ
করিয়াছেন ইহা ভাবিয়াই পুত্র মাতাকে সেবা করিয়া থাকে।
জ্ঞাতিগণ যখন অনুকূল ভাবে কাৰ্য করে তখনই
তাহাদের প্রতি প্রণয় থাকে, আবার ইহার বিপৰ্যয় হইলে
শত্রুতা উপস্থিত হয়।
জ্ঞাতিও কখনও শত্রু হয়, আবার শত্রুও কখনও
হিতকারী মিত্র হইয়া পড়ে ; অতএব দেখা যায় কাৰ্যবশতই
লােক স্নেহ ছিন্ন করে বা স্নেহ স্থাপন করিয়া থাকে।
৩৯।
চিত্রকর যেমন নিজ কল্পনাবলে একটী স্ত্রীচিত্র
অঙ্কিত করিয়া তাহা আসক্তি সহকারে রক্ষা করে, মনুষ্য সেইরূপ
স্বয়ং স্নেহ করিয়া লােকের প্রতি অনুরক্ত হয়।
৩৭।

;
১২৪
সৌন্দরন কাব্য
৪০। যে ব্যক্তি পরলােকে (পূর্বজন্মে) তােমার বন্ধুজন
ছিল সংপ্রতি, সে তােমার কি উপকার করিতেছে অথবা তুমিই
বা তাহার কি উপকার করিতেছ ?
৪১। অতএব জ্ঞাতির বিষয় চিন্তা করিয়া তুমি মনকে
অভিভূত করিও না, এ সংসারে স্বজন বলিয়া একটা নির্দিষ্ট
বস্তু নাই।
৪২-৪৩। যদি তােমার মনে হয় যে ঐ দেশ সুভিক্ষ ও
মঙ্গলময়, তবে ঐ বিতর্কও তােমার পরিত্যাগ করা উচিত; কেন
, সকল স্থানই দোষরূপ অগ্নি দ্বারা প্রজ্বলিত।
৪৪। ঋতুসমুহের পরিবর্তন ও ক্ষুৎপিপাসাজনিত কষ্টে
সকল স্থানেই দুঃখ নিশ্চিত, কোথাও মঙ্গল নাই।
৪৫। কোনও স্থানে শীত, কোথাও বা গ্রীষ্ম, কোথাও ব
রােগ, কোথাও বা ভয় লােকের অত্যন্ত বাধা জন্মায় ; অতএব
জগতে নিরাপদ আশ্রয় নাই।
৪৬। জরা ব্যাধি ও মৃত্যু লােকের অত্যন্ত ভীতিপ্রদ ; জগতে
এমন কোনও স্থান নাই যেস্থানে ঐ ভয় উপস্থিত না হয়।
৪৭। শরীর যেস্থানে যাইবে সেই স্থানেই তাহার সঙ্গে
সঙ্গে দুঃখ যাইবে; এমন আশ্রয় নাই যেখানে গেলে ঐ দুঃখ
উপস্থিত না হয়।
৪৮। যে স্থানে গেলে দুঃখে দগ্ধ হইতে হয় এমন স্থান
সুন্দর সুভিক্ষ ও ক্ষেমময় হইলেও তাহাকে কুদেশ বলিয়া
জানিবে।

বিতর্ক পরিহার
১২৫
৪৯। শারীরিক ও মানসিক এই উভয়বিধ দুঃখে ক্লিষ্ট
জীবের এমন ক্ষেমময় স্থান নাই যেখানে গমন করিলে সুস্থতা
থাকে।
যখন সর্বদা সৰ্বস্থানে লােক দুঃখই ভােগ করে,
তখন জগৎরূপ চিত্রে অনুরাগরূপ বর্ণরেখা অঙ্কিত করিবে না।
যখন জগৎচিত্র হইতে তােমার অনুরাগ নিবৃত্ত
হইবে, তখন সমস্ত জীবলােককে তুমি প্রজ্বলিতবৎ মনে
করিবে।
৫২।
যদি কখনও তােমার চিত্তে মরণ হইবে না এইরূপ
বিতর্ক উপস্থিত হয় উহা নিজ ব্যাধির ন্যায় বিশ্বাস করিবে।
৫৩। মুহূৰ্তমাত্র জীবনবিষয়ে বিশ্বাস করিবে না। ব্যাঘ্র
যেমন গুপ্তভাবে থাকিয়া বিশ্বস্তচিত্ত ব্যক্তির অপকার করে, সেই
রূপ কালও নিশ্চিন্ত ব্যক্তির অপকার করে।
৫৪। আমি বলবান্ ও যুবা এ ধারণাও যেন তােমার হয়
; কারণ মৃত্যু সর্ব অবস্থায় আইসে, বয়স পর্যালােচনা
করে না।
অনর্থের একমাত্র আশ্রয় শরীর যিনি ধারণ করেন,
তাঁহার বিষয়দৃষ্টি থাকিলে সুস্থতা বা জীবনের আশা প্রবল
হয় না।
৫৬। পরস্পরবিরােধী সর্পের অধিষ্ঠান যেমন শান্ত নহে,
সেইরূপ মহাভূতের আশ্রয় দেহ বহন করিয়া কোন ব্যক্তি নিবৃতি
প্রাপ্ত হয়।

সৌন্দরনন্দ কাব্য
৫৭। মানব যে দৃষ্টির সম্মুখে শ্বাস প্রশ্বাস পরিত্যাগ করে
ইহাই আশ্চৰ্য্য, কারণ জীবনের বিশ্বাস নাই।
ইহাও অপর একটী আশ্চর্য্য যে নিদ্রিত ব্যক্তি
জাগরিত হয় এবং উঠিয়া আবার সে নিদ্রিত হয়। কারণ
শরীরীর বহু শত্রু।
৫৯। যেমন উচ্চত-খড়গহস্ত শত্রুকে কেহ বিশ্বাস করে না,
সেইরূপ যে মৃত্যু গর্ভ হইতেই জিঘাংসু ভাবে লােকের অনুবর্তন
করে তাহাকে কে বিশ্বাস করে ?
৬০। জগতে যে ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করে তাহার শাস্ত্রজ্ঞান
ও অসীম সামর্থ্য থাকিলেও সে কৃতান্ত জয় করিতে কোন কালে
পারে নাই, পারে না, বা পারিবে না।
৬১। মৃত্যুকাল উপস্থিত হইলে সাম দান ভেদ দণ্ড বা
নিয়ম দ্বারা উহার প্রতিবােধ করা যায় না।
অতএব চঞ্চল আয়ুতে কখনও বিশ্বাস করিবে না।
কাল নিত্যই হরণ করিয়া থাকে, বার্ধক্য অপেক্ষা করে না।
লােক জলবুদবুদের ন্যায় দুর্বল, ইহা জানিয়াও
কোন্ অনুত্তচিত্ত ব্যক্তির ইহার অমরত্ব-বিষয়ে বিতর্ক হয় ?
৬৪। অতএব এইসকল বিতর্কের পরিহারের জন্য সংক্ষেপে
“আনাপান স্মৃতির আশ্রয় করিবে।
৬৫। এইরূপ যথাকালে রােগের নিবৃত্তির জন্য ঔষধের
ন্যায় বিতর্কের নিবৃত্তির জন্য তাহার বিরােধী ভাব আশ্রয়
করিবে।

বিতর্ক পরিহার ১২৭ ৬৬-৬৭। যেমন “ধূলিধাৰক” (অর্থাৎ যাহারা ধুলি প্রক্ষালন করিয়া স্বর্ণ সংগ্রহ করে) সুবর্ণের জন্য প্রথমত বৃহৎ মৃত্তিকা প্রক্ষালন করে ওপরে সূক্ষ সূক্ষ মৃত্তিকার অংশগুলি ধুইয়া ফেলিয়া দেয় এবং স্বর্ণের কণাগুলি সংগ্রহ করে, সেইরূপ যুক্ত- চেতা ব্যক্তি মুক্তির জন্য প্রথমত স্থূল দোষগুলি পরিহার করিয়া পরে বিশুদ্ধির জন্য সূক্ষ সূক্ষ দোষগুলিকে পরিত্যাগ করিয়া ধৰ্ম্মের অংশগুলি সংগ্রহ করিয়া থাকে। ৬৮। যেমন ক্রমে স্বর্ণগুলিকে জল দ্বারা প্রক্ষালন করিয়া ধূলিশূন্য করিয়া কৰ্ম্মকার উহা অগ্নিতে পাক করে এবং উলটাইয়া পালটাইয়া দেয়, সেইরূপ যােগাচারী ব্যক্তি চিত্তকে নিপুণ ভাবে দোষমুক্ত ও ক্লেশশূন্য করিয়া মনকে শান্ত ও সংক্ষিপ্ত করিয়া থাকে। ৬৯। যেমন কর্মকার সৌকর্য্যসহকারে নিজ-অভিপ্রায়-মত সুবর্ণকে বহুপ্রকারে অলঙ্কারকার্য্যে বিনিয়ােগ করে, সেইরূপ ভিক্ষুও বশ্যতাপন্ন বিশুদ্ধ চিত্তকে “অভিজ্ঞা” বিষয়ে যথেচ্ছ ভাবে শান্ত করিয়া যেখানে ইচ্ছা সেইখানেই চালিত করিতে সৌন্দরনন্দ কাব্যে পঞ্চদশ সর্গ সমাপ্ত যােড়শ সর্গ আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা ১। এইরূপে মননধারণ দ্বারা ক্রমে কিছু ত্যাগ এবং কিছু গ্রহণ করিয়া, চারি প্রকার ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া যােগী যথানিয়মে পঞ্চ অভিজ্ঞ প্রাপ্ত হয়। বহু প্রকার ঋদ্ধি, বিবেক, পরের চিত্ত এবং চরিত্র- জ্ঞান, দীর্ঘ অতীত জন্মস্মরণ, দিব্য এবং বিশুদ্ধ চক্ষু ও কর্ণ অনন্তর তত্ত্ব পরীক্ষা দ্বারা আব (পাপ) ক্ষয়ের জন্য মননানিবেশ করে। তারপর দুঃখ প্রভৃতি চারিটী সত্য সম্যক্‌- রূপ বুঝিতে পারে। ৪। এই পীড়াদায়ক দুঃখ সর্বদাই বর্তমান, দুঃখের কারণও জন্মাত্মক, দুঃখক্ষয় নিঃশরণাত্মক এবং এই প্রাণাত্মক পথ শান্তির (প্রশমের) জন্য। ৫। এইরূপে বুদ্ধি দ্বারা চারিটী আৰ্যসত্য বুঝিয়া, সম্যক্‌- রূপে জ্ঞান লাভ করিয়া সমস্ত আস্রব ভাবনা দ্বারা অভিভূত করিয়া শান্তিলাভ করিয়া পুনর্বার জন্মগ্রহণ করে না (মুক্তি লাভ করে)। ৬। তত্ত্বাত্মক এই চতুষ্টয় ( চারিটী) যে বােঝে না সেই

আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা
১২৯
ব্যক্তি এই সংসারদোলায় আরােহণ করিয়া এক জন্মের পর
অন্য জন্ম লাভ করে। কখনও শান্তি লাভ করিতে পারে না।
৭। অতএব জরা প্রভৃতি ব্যসনের কারণ জম্মরূপ দুঃখই
জানিবে। পৃথিবী যেমন সর্বপ্রকার ওষধির উৎপত্তির কারণ,
সেইরূপ জম্মই সর্বপ্রকার আপদের ক্ষেত্র।
৮। ইন্দ্রিয় এবং রূপের জম্মই অনেকপ্রকার দুঃখের জন্মের
কারণ। এই শরীরের উৎপত্তির সহিতই রােগ ও মৃত্যুর উৎপত্তি
হইয়া থাকে।
৯। সৎই হউক আর অসৎই হউক, বিষমিশ্রিত অন্ন
যেমন বিনাশেরই কারণ, পালনের কারণ নহে, ললাকেও
(জগৎকেও ) সেইরূপ তিস্থানে, উপরে অথবা নিয়ে সমস্ত
জন্মই দুঃখের জন্য, সুখের জন্য নহে।
১০। প্রবৃত্তি হইলেই জরা প্রভৃতি প্রজাদের বহুবিধ অনর্থ
উৎপন্ন হয়।
ঘাের বায়ু প্রবাহিত হইলেও অজাত তরুগণ
কম্পিত হয় না।
১১। পবনের উৎপত্তিস্থান যেরূপ আকাশ, শর্মীগর্ভ
যেরূপ অগ্নির উৎপত্তিস্থান, জল যেরূপ পৃথিবীর মধ্যে উৎপন্ন
হয়, দুঃখও তপ চিত্ত এবং শরীরে উৎপন্ন হয়।
১২। জলের দ্রবত্ব, পৃথিবীর কঠিনত্ব, বায়ুর চলত্ব, অগ্নির
উষ্ণতা, যেরূপ স্বভাব, সেইরূপ শরীরের ও চিত্তের স্বভাবই
দুঃখ।
১৩। শরীর থাকিলেই ব্যাধি জরা প্রভৃতি এবং ক্ষুধা

সৌন্দরন কাব্য
;
তৃষ্ণা বর্ষা উষ্ণ হিম প্রভৃতির জন্য দুঃখ হয়, সেরূপ রূপাশ্রিত
সানুবন্ধ ( ভাবপ্রবণ) চিত্তে শােক অরতি ক্রোধ ভয় প্রভৃতি
দুঃখ হইয়া থাকে।
১৪। এই জন্মের দুঃখ প্রত্যক্ষ দেখিয়া অতীত জন্মের
দুঃখও জানিতে পার। অতীত দুঃখ. এবং বর্তমান দুঃখও
যেরূপ, অনাগত (ভবিষ্যৎ ) দুঃখও সেইরূপ।
১৫। বীজের স্বভাব এখন যেরূপ দেখা যায়, অতীত ও
ভবিষ্যতের কথাও সেইরূপই অনুমান করা যায়। অগ্নি প্রত্যক্ষে
যেরূপ উষ্ণ, ভূত ও ভবিষ্যৎ অগ্নিও সেইরূপই উষ্ণ।
১৬। হে গুণযােগ্য উদারচিত্ত, যে বস্তুরই নাম এবং
রূপ আছে তাহাতেই দুঃখ আছে, কিছুই দুঃখশূন্য নহে; কারণ
দুঃখ হইতেছে, হইয়াছে, ও হইবে।
১৭। লােকে তৃষ্ণা প্রভৃতি দোষসমূহ সেই প্রবৃত্তিদুঃখের
কারণ। ঈশ্বর, প্রকৃতি, কাল, স্বভাব, বিধি অথবা যদৃচ্ছা
( দৈব) তাহার কারণ নহে।
১৮। এই হেতু দোষ হইতেই লােকের জন্ম ইহা জানিবে।
যেহেতু রজঃ এবং তমােগুণবিশিষ্ট প্রাণীই প্রাণত্যাগ করে,
রজঃ এবং তমােগুণবিহীনের জন্ম হয় না।
১৯। সেই সেই বিষয়ে ইচ্ছা হইলেই গমনাবস্থানাধি
কাৰ্য্য
অতএব তৃষ্ণাবশেই লােকের
জানিবে।
২০। প্রাণীদিগকে অনুরাগাধীন এবং স্বজাতিতে অতীব
জন্ম হয়

আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা
১৩১
প্রীতিপর.দেখিয়া তাহারা অভ্যাসযােগেই সেইসকল দোষযুক্ত
হইয়াছে জানিবে।
২১। ক্রোধ আনন্দ প্রভৃতি দ্বারা যেমন আশ্রয়দিগের
বিশেষ (ভেদ) উৎপন্ন হয়, সেইরূপ ক্লেশকৃত বিশেষ প্রতিজন্মে
একরূপ হয় না।
২২। দোষাধিক্য হেতু জন্ম হইলে তীব্ৰদোষ উৎপন্ন হয়।
রাগাধিক্য হেতু জন্ম হইলে তীব্ররাগ উৎপন্ন হয়। মােহাধিক্য
হেতু জন্ম হইলে মােহবলাধিক্য উৎপন্ন হয়। অল্পদোষ হেতু
জন্ম হইলে অল্পদোষ উৎপন্ন হয়।
২৩। সাক্ষাৎ যেরূপ ফল দেখা যায় তদনুসারে তাহার
অতীত একটা বীজ নির্ণয় করা যায়। এবং সাক্ষাৎ বীজ প্রভৃতি
দেখিয়া তাহার একটী ভবিষ্যৎ ফল নির্ধারণ করা যায়।
২৪। বৈরাগ্যহেতু যে যে জন্মবিষয়ক দোষ যাহার ক্ষীণ
হইয়াছে তাহার আর সেই সেই জন্ম হয় না। যে যে জন্ম
বিষয়ে যাহার দোষাশয় বর্তমান রহিয়াছে পরাধীনভাবে তাহাকে
সেই সেই জন্ম ভােগ করিতে হয়।
হে সৌম্য, বহুবিধ জন্মের একমাত্র তৃষ্ণা প্রভৃতিই
কারণ ইহা জানিয়া দুঃখমুক্তি কামনা করিয়া উহার ছেদন
কর। কারণনাশে কাৰ্যনাশ হইয়া থাকে।
২৬। হেতুর ক্ষয়ে দুঃখনাশ হয়। শান্তি-মঙ্গলময়, তৃষ্ণা-
বিরাগহেতু, ত্রাণের হেতু, লয় ও নিরােধকর, সনাতন, অহাৰ্য্য,
আৰ্য্য ধর্ম প্রত্যক্ষ কর।

সৌন্দরনন্দ কাব্য,
=
।
২৭। যে পদ লাভ করিলে জন্ম, জরা, মৃত্যু, ব্যাধি,
অপ্রিয় সম্পর্ক, ইচ্ছাবিঘাত, বা প্রিয়হানি হয় না, সেই নৈষ্ঠিক
অক্ষয় পদই অত্যন্ত আশ্রয়যােগ্য।
২৮। যেমন দীপ নির্বাণপ্রাপ্ত হইয়া ভূমি বা অন্তরিক্ষ
আশ্রয় করে না কিম্বা কোনও দিক্ বা বিদিক প্রাপ্ত হয় না,
কেবল স্নেহপদার্থের অপগমে শান্তি প্রাপ্ত হয়।
২৯। এইরূপ কৃতী পুরুষ নিবৃতি প্রাপ্ত হইয়া ভূমি বা
অন্তরিক্ষে দিক বা বিদিকে গমন করে না, কেবল ক্লেশক্ষয়ে
শান্তি লাভ করে।
৩০। ইহার একমাত্র প্রাপ্তির উপায় ত্রিবিধ “প্রজ্ঞা” ও
দ্বিবিধ “প্রশম”। বিশুদ্ধ ত্রিবিধ চরিত্রে বর্তমান থাকিয়া
বুদ্ধিমান ব্যক্তি ঐ মার্গ উদ্ভাবন করিবেন।
৩১। সম্যক্ বাকৰ্ম্ম, যথাবিধি কায়কৰ্ম্ম ও বিশুদ্ধ
জীবিকা বা “আজীবনয়” এই ত্ৰিচরিত্রকে আশ্রয় করিলে ধৰ্ম্ম
লাভ হইয়া থাকে।
৩২। সত্য ও দুঃখাদি বিষয়ে সাধুদৃষ্টি, সম্যক্ বিতর্ক ও
চেষ্টা এই তিনটী জ্ঞানবিধিতে প্রবৃত্ত হইয়া প্রজ্ঞা আশ্রয় করিলে
ক্লেশক্ষয় হয়।
৩৩। ন্যায্যরূপে সত্যলাভের জন্য সম্যক্ স্মৃতি ও সম্যক
সমাধি এই দুইটী যােগবিধিতে শম-সহকারে প্রবৃত্ত হইলে
চিত্তের বশ্যতা হইয়া থাকে।
কাল অতীত হইয়া গেলে যেমন বন্ধুর উৎপন্ন
৩৪।

আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা
হয় না, সেইরূপ উত্তম শীল উৎপন্ন হইলে ক্লেশের অঙ্কুর হয়
। বিশুদ্ধ শীল উৎপন্ন হইলে পুরুষের দোষসমুহ লজ্জিত
হইয়াই যেন পুরুষের চিত্তকে আক্রমণ করে না।
৩৫। পৰ্বত যেমন নদীর বিপুল বেগ নিরুদ্ধ করে, সেইরূপ
সমাধি ক্লেশকে নিরুদ্ধ করে। মন্ত্রবশীকৃত সর্প যেমন লােককে
আক্রমণ করিয়া অনিষ্ট করে না, সেইরূপ সমাধি স্থির হইলে
দোষসমূহ আর আক্রমণ করিয়া অনিষ্ট করে না।
৩৬। যেমন বর্ষাকালে নদী তীরবৃক্ষকে সম্পূর্ণ নষ্ট করিয়া
ফেলে, সেইরূপ প্রজ্ঞা নিঃশেষরূপে দোষ নষ্ট করে। যে প্রশ্ন
উৎপন্ন হইলে, বজ্ৰানলে বৃক্ষ যেমন দগ্ধ হয় আর অঙ্কুরিত হয়
না সেইরূপ, দোষসমূহ দগ্ধ হইয়া আর উৎপন্ন হয় না।
৩৭। উক্ত স্কন্ধত্রয়যুক্ত অষ্টাঙ্গ অহাৰ্য্য আৰ্য মার্গ স্পষ্ট
রূপে আশ্রয় করিলে লােক দুঃখের হেতু দোষসমূহ পরিহার
করে, এবং অত্যন্ত মঙ্গলময় পদ প্রাপ্ত হয়।
৩৮। ধৈৰ্য্য, সরলতা, লজ্জা, সাবধানতা, বিশুদ্ধি, অল্প বাসনা,
তুষ্টি, সঙ্গশূন্যতা, এবং রতি ও ক্ষমা ইহার অনুকূল জানিবে।
৩৯। দুঃখের স্বরূপ, তাহার উদ্ভব ও তাহার নিরােধ
যে ব্যক্তি যথার্থরূপে জানিতে পায়, সেই ব্যক্তি কল্যাণ-মিত্রযুক্ত
থাকিয়া আৰ্যমার্গে শান্তি প্রাপ্ত হয়।
যে ব্যক্তি ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া ব্যাধি, তদীয় নিদান ও
তদীয় ঔষধ সম্যক্‌রূপে জানে, সেই ব্যক্তি অভিজ্ঞ মিত্র দ্বারা
সেবিত হইয়া অচিরকাল মধ্যে আরােগ্য প্রাপ্ত হয়।
৪০।

১৩৪ সৌন্দরনন্দ কাব্য ৪১। অতএব, চারিটী আৰ্যসত্যের মধ্যে দুঃখকে ব্যাধি বলিয়া, দোষকে ব্যাধিনিদান বলিয়া, নিরােধকে আরােগ্য বলিয়া ও মার্গকে ভৈষজ্য বলিয়া ধর। ৪২। দুঃখে প্রবৃত্তি বলিয়া জানিবে, দোষসমূহকে প্রবর্তক, জানিবে, তাহার নিরােধকে নিবৃত্তি বলিয়া জানিবে, এবং মার্গকে নিবৰ্ত্তক জানিবে। ৪৩। শির ও বসন যখন প্রজ্বলিত হইয়াছে তখন সত্য- বােধের জন্য মতি করিবে, সত্যনয়ের অদর্শনে জগৎ দগ্ধ হইয়াছে, হইতেছে ও হইবে। ৪৪। যখন মনুষ্য নাম ও রূপ নশ্বর জানে তখন তাহার উক্ত জ্ঞানই উৎকৃষ্ট, তখন যথার্থ দৃষ্টি হেতু নির্বেদ প্রাপ্ত হয়। এবং “নন্দী” ক্ষয় বশতঃ তাহার রাগ ক্ষয় প্রাপ্ত হয়। ৪৫। ঐ নন্দী ও রাগ ক্ষয় প্রাপ্ত হইলেই চিত্ত প্রকৃত বিমুক্ত বলি, এবং মন সম্যক রূপে উক্ত দুই পদার্থ দ্বারা বিমুক্ত হইলে আর উহার কর্তব্য থাকে না। :... ৪৬। স্বভাবত নাম ও রূপ, তাহার হেতু ও বিনাশ পৰ্যালােচনা করিলে সম্যক্‌রূপে আশ্রয়ের ক্ষয় হয় ইহা আমি বলিতেছি। ৪৭। অতএব হে সৌম্য, শীঘ্র উত্তম শক্তি সম্পাদন করিয়া আশ্রব ক্ষয়ের জন্য বিরাজ কর। অনিত্য মিথ্যাভূত দুঃখময় ধাতুসমুহকে বিশেষভাবে পরীক্ষা করিতে থাক। ৪৮। যে ব্যক্তি ক্ষিতি অপ, তেজ, প্রভৃতি ছয়টী ধাতুর আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা লক্ষণ দ্বারা সামান্যরূপে বিজ্ঞান প্রাপ্ত হয়, উহা অপেক্ষা অন্য বস্তুর পর্যালােচনা করে না, সেই ব্যক্তি উহা হইতেই পরম মােক্ষ প্রাপ্ত হয়। ৪৯। ক্লেশ পরিহারের জন্য যে ব্যক্তি উদ্যত সে, কাল এবং উপায় পরীক্ষা করিবে। যােগবিধিও অকালে বা প্রকারান্তরে সম্পাদন করিলে উহা অনর্থের কারণ হয়, গুণের কারণ হয় না। যে গাভীর বৎস জন্মে নাই ঐ গাভীকে যদি কেহ অকালে দোহন করে, তবে সে দুগ্ধ প্রাপ্ত হয় না। যথাকালে যদি অজ্ঞতা বশতঃ শৃঙ্গ দোহন করে তবেও দুগ্ধ লাভ করে না। ৫১। জলার্জ কাষ্ঠ হইতে যদি কেহ অনল কামনা করে তবে সে অত্যন্ত যত্ন করিয়াও অনল পাইতে পারে না। কাষ্ঠ শুষ্ক হইলেও অনিয়মে চেষ্টা করিলে তাহা হইতে অগ্নিলাভ করিতে পারে না। অতএব দেশ কাল যথাবিধানে পরীক্ষা করিয়া যােগের মাত্রা ও উপায় নির্ধারণ করিয়া নিজ শক্তির পরিমাণ মত প্রযত্ন করিবে, তাহার বিরুদ্ধরূপ চেষ্টা করিবে না। ৫৩। হৃদয়ের চঞ্চল অবস্থায় আসক্তিজনক বস্তুর সেবা করিবে না। বহ্নি যেমন বহ্নির প্রেরণায় শান্তি প্রাপ্ত হয় না, ঐরূপ উক্তভাবে চিত্ত প্রশম লাভ করে না। ৫৪। চঞ্চল চিত্তে যে বস্তু শম উৎপাদন করে তাহাই সেবা করা চিত্তের চঞ্চল অবস্থার যােগ্য। প্রজ্বলিত অগ্নি সৌন্দর কাব্য যেমন জলে শান্তি প্রাপ্ত হয় ঐরূপ উক্তকারণে চিত্ত প্রশমপ্রাপ্ত হয়। ৫৫। চিত্ত যখন বিলীন হইতে থাকিবে তখন শমকারণ বস্তুও চিত্তে আশ্রয় করিবে না। অল্পসার অগ্নি যেমন চালিত না হইলে অল্পকাল মধ্যে বিলীন হয়, সেইরূপ ঐরূপে চিত্তও বিলীন হইয়া যায়। ৫৬। চিত্ত যখন লয় প্রাপ্ত হইয়াছে এই অবস্থায় প্রগ্রাহক নিমিত্ত আশ্রয় করিবার সময়, কারণ অগ্নি যেমন ইন্ধন দিলে আবার প্রজ্বলিত হয় সেইরূপ প্রগ্রাহক যােগে চিত্তও ক্রিয়া- সমর্থ হইয়া উঠে। ৫৭। চিত্ত লীন বা উদ্ধত যেরূপই হউক না কেন উহা উপেক্ষা করা উচিত নহে। কারণ রােগী ব্যক্তির ব্যাধি উপেক্ষা করিলে যেমন তাহার অনিষ্ট হয়, ঐরূপ যােগীরও উক্ত উপেক্ষায় অনিষ্ট হইয়া থাকে। ৫৮। চিত্ত যখন সমতা প্রাপ্ত হয় তখনই উপেক্ষা আশ্রয় করিবার সময়। বশীভূত অশ্বে চালিত রথ যেমন গমন দ্বারা অভীষ্ট কাৰ্য্যের উপযােগী হয়, সেইরূপ ললাকের প্রয়ােগও অভীষ্ট কাৰ্য্য সাধনে সমর্থ হয়। ৫৯। রাগবশতঃ যখন চিত্ত অত্যন্ত চঞ্চল অবস্থায় রহিয়াছে তখন মৈত্রোপসংহার করিবে না। কারণ, যেমন কফ- দোষ উপস্থিত হইলে তৈলাদি দ্বারা উহার বৃদ্ধি হয়, সেইরূপ মৈত্র দ্বারা রাগ বৃদ্ধি লাভ করে।

আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা
৩০।
যখন রাগ দ্বারা চিত্ত উদ্ধত রহিয়াছে তখন অশুভ
নিমিত্তের সেবা করিবে। যেমন রুক্ষ বস্তুর সেবা করিলে কফ
শান্তি লাভ করে, সেইরূপ উক্ত নিমিত্ত আশ্রয় হেতু রাগ শান্তি
প্রাপ্ত হইয়া যায়।
৬১। হিংসাদিদোষে যদি চিত্ত উদ্ধৃপ্ত হয়, তখন অশুভ
নিমিত্ত আশ্রয় করিবে না। যেমন পিত্তপ্রধান শরীরের পক্ষে
তী উপচার বিনাশের হেতু হয়, সেইরূপ দ্বেষবান্ ব্যক্তির
পক্ষে অশুভ নিমিত্ত মহা অনিষ্টের উৎপাদন করে।
৬২। হিংসাদোষ দ্বারা যদি চিত্ত ভিত হয়, তবে
স্বপক্ষের সহিত মৈত্রী স্থাপন করিবে। যেমন পিত্তপ্রধান
ব্যক্তির পক্ষে শীতল উপচায় উপকার করে, সেইরূপ দ্বেষবান্
ব্যক্তির পক্ষে মৈত্রী প্রশম আনয়ন করে।
৬৩। চিত্ত যদি মােহযুক্ত হইয়া বিহার করিতে থাকে,
তবে মৈত্রী বা শুভ আশ্রয় করা উচিত নহে। বায়ুপ্রধান
ব্যক্তির পক্ষে যেমন রুক্ষ উপচার মােহ আনয়ন করে, সেইরূপ
উহাও মােহ আনয়ন করে।
৬৪। চিত্তের প্রবৃত্তি যখন মােহাত্মক হইবে তখন “ইদম্প্রত্যয়”
আশ্রয় করিবে। বায়ুপ্রধান শরীরে যেমন স্নিগ্ধ উপচার শান্তির
উপায়, মােহযুক্ত চিত্তেও ইহাই একমাত্র শান্তির উপায়।
৬৫। যেমন স্বর্ণকার উল্কামুখস্থিত সুবর্ণ যথাকালে অগ্নি
দ্বারা দগ্ধ করে, যথাকালে জল দ্বারা তাহাকে সিক্ত করে,
ক্রমে যথাকালে উহা রাখিয়া দেয় ।

১৩৮
সৌন্দরনন্দ কাব্য
৬৬। অকালে উত্তাপ দিয়া সুবর্ণ দহন করা উচিত নহে।
অকালে দগ্ধ সুবর্ণ জলে নিক্ষেপ করিয়া ঠাণ্ডা করা উচিত নহে।
এবং অকালে পরীক্ষা করিয়া সুবর্ণকে পরিপক্ক করা উচিত
৬৯।
৬৭। অতএব সংগ্রহ প্রশম ও যথাকালে উপেক্ষা এই
তিন বিষয়ের সম্যক্‌ নিমিত্ত চিত্ত দ্বারা বিশেষভাবে আলােচনা
করিবে। যদি অন্যায় ভাবে যত্ন করা যায় তবে উহা নাশের
তুল্য।
৬৮। এইরূপে সুগত অন্যায়ের নিবৃত্তি ও ন্যায় মার্গ নন্দের
নিকট বলিলেন। পুনরায় তাহার চরিত্র জানিয়া বিতর্ক
উপায় বলিতে লাগিলেন।
যেমন চিকিৎসক পিত্ত কফ ও বায়ু ইহার যে
দোষ কুপিত হয় তাহারই উপশমের জন্য প্রযত্ন করেন, বুদ্ধও
তদ্রুপ করিয়াছিলেন।
৭০।
প্রথম উপক্রমে যদি নিতান্ত অভ্যাসবশত অশুভ
বিতর্ক পরিহার করিতে না পারে তবে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করিবে,
কিছুতেই গুণবান্ প্রয়ােগ পরিত্যাগ করিবে না।
৭১। অনাদি কাল হইতে ক্লেশসমূহ পুষ্টিলাভ করিয়া
আসিয়াছে, উহারা অত্যন্ত বলবান্ এবং সম্যক্ যােগাদি প্রয়ােগ
অত্যন্ত দুষ্কর। অতএব সহসা দোষসমুহ নিরাস করা
অসাধ্য।
৭২। বুদ্ধিমান ব্যক্তি যেমন অতি ক্ষুদ্র অণি দ্বারা বিপুল

আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা অসি চালিত করে সেইরূপ (কল্যাণদায়ক) অন্য নিমিত্ত সেবন দ্বারা অকুশল নিমিত্ত ত্যাগ করা উচিত। ৭৩। অথবা তুমি নূতন অধ্যাত্মভাব লাভ করিয়াছ বলিয়া যদি তােমার অশুভ বিতর্ক শান্ত না হয়, তবে পথিক যেমন শ্বাপদযুক্ত পথের দোষ বিবেচনা করিয়া উক্ত পথ পরিত্যাগ করে, তুমিও দোষ বিবেচনায় উহা পরিত্যাগ করিবে। ৭৪। যেমন লােক ক্ষুধার্ত হইয়াও বাঁচিবার ইচ্ছায় বিষ- মিশ্রিত অন্ন ভােজন করিতে চাহে না, সেইরূপ বিবেকী ব্যক্তি দোষাবহ বুঝিয়া অশুভ নিমিত্তের সেবা করে না। ৭৫। যে ব্যক্তি দোযকে দোষ বলিয়া বােঝে না তাহাকে উক্ত দোষ হইতে কে নিবৃত্ত করিতে পারে? যে ব্যক্তি গুণে গুণ বােঝে, সে বারিত হইয়াও উক্ত গুণের দিকে ছুটিয়া যায়। ০৬। সৎকুলজাত ব্যক্তিগণ অন্যায্যবৃত্তি মানসে উদিত হইলেও তাহাতে লজ্জিত হয়। আর পাপে সংলগ্নচিত্ত বপুস্মান্ যুবা অনবরত চক্ষু দ্বারা অন্যান্য বিষয় প্রত্যক্ষ করিয়াও লজ্জিত হয় না। ৭৭। যদি পরিত্যাগ করিতে গেলেও লেশমাত্র অশুভ বিতর্ক থাকিয়া যায়, তবে অধ্যয়নক্রিয়া প্রভৃতি কাৰ্যান্তর দ্বারা উহার বিস্মরণের যত্ন করিবে। ৭৮। বিচক্ষণ হয় সুপ্তিলাভ করিবেন কিম্বা কায়ক্লেশ স্বীকার করিবেন। কিন্তু যে বিষয়ে আসক্ত হইলে অনর্থ ঘটে এমন অসৎ নিমিত্তের চিন্তাও করিবেন না।

৭৯। ১৪ সৌন্দরন কাব্য যেমন চৌরভয়ে ভীত ব্যক্তি রাত্রিকালে প্রিয়- ব্যক্তির সমাগমেও সহসা দ্বার উন্মােচন করে না। সেইরূপ দোযহেতু প্রাজ্ঞব্যক্তি শুভ ও অশুভ দ্বিবিধ বস্তুর প্রয়ােগ তুল্যরূপেই সংহৃত করে। ৮০। এইরূপ উপায়সমূহ দ্বারা নিবারিত হইয়াও যদি তাহারা পরায়ুখ না হয় তাহা হইলে সুবর্ণকল্কের ন্যায় স্কুল ক্রমে সূক্ষন পর্যন্ত সেগুলিকে পরিত্যাগ করিবে। ৮১। তীক্ষ্ণ কাম প্রয়ােগে খিন্ন হইয়া লােকে যেমন দ্রুত- গমন প্রভৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে, সেইরূপ প্ৰাজ্ঞেরও দোষ ঘটিতে পারে। ৮২। সেইসকল অসবিতর্ক বাধা না পাইয়া যদি উপশমিত না হয়, তাহা হইলে গৃহে আহত সর্পের ন্যায় মুহূর্ত কালও তাহাদিগকে আশ্রয় দিবে না। ৮৩। দন্তে দন্ত সংযুক্ত করিয়া জিহ্বা দ্বারা তালুর অগ্র- ভাগ সম্যকরূপে উৎপীড়িত করিয়া এবং চিত্ত দ্বারা চিত্তকে গ্রহণ করিয়াও যত্ন করা উচিত। তথাপি সেগুলির অনুবর্তন করা উচিত নহে। ৮৪। সুস্থমনা মােহহীন লােক বনে গমন করিয়াও যে মােহ প্রাপ্ত হয় না তাহাতে আর আশ্চৰ্য্য কি? যে লােক হৃদয়ে কারণসমূহ দ্বারা পীড়িত হইয়াও ক্ষুব্ধ হয় না সেই কৃতী, সেই ধীর। ৮৫। অতএব শনিগ্রহের জন্য, অজিতা লমীকে জয়

আৰ্য সত্য ব্যাখ্যা
১৪১
৮৬।
করিতে ইচ্ছুক রাজার স্যায়, আৰ্য সত্যাধিগমের জন্য পূর্বে এই
উপায় দ্বারা পথ শােধিত কর।
যােগানুকূল প্রাকৃতিক কল্যাণময় এইসকল
অরণ্যে শরীরের বিবেকমাত্র সংসাধন করিয়া ক্লেশধ্বংসের পথ
ভজনা কর।
৮৭। কৌণ্ডিল্য, নন্দ, ক্রিমিল, অনুরুদ্ধ, তিষ্য, উপসেন,
বিমল, রাধ, বাষ্প, উত্তর, ধৌতকি, মােহরাজ, কাত্যায়ন, দ্রব্য,
পিলিন্দ, বৎস,
৮৮। ভদ্দানি, ভদ্ৰায়ণ, সর্পদাস, সুভূতি, গােদত্ত, সুজাত,
বৎস, সংগ্রামজিৎ, ভদ্রাজিৎ, অশ্বজিৎ, শ্রোণ, শােণ, কোটিকর্ণ,
৮৯। ক্ষেমাজিৎ, নন্দক, নন্দমাত, উপালি, বাগীশ, যশঃ,
যশােদ, মহায়, বল্কলি, রাষ্ট্রােল, সুদর্শন, স্বাগত, মেঘিক,
৯০। কপ্পিন, উরুবি, কাশ্যপ, মহামহাকাশ্যপ, তিষ্য,
নন্দ, পূর্ণ, পূর্ণ, পূর্ণক, শােণাপরান্ত, পূর্ণ,
৯১। শারদ্বতীপুত্র, সুবাহু, চুল, কোয়ে, কাপ্য, ভৃগু,
কুণ্ঠধান, শৈবল, রেবত, কঠিল, মৌদগল্য গােত্র গংপতি
৯২। প্রভৃতি যােগবিধিতে যেরূপ বিক্রম প্রকাশ
করিয়াছেন, বিধি অনুসারে সেরূপ বিক্রম প্রকাশ কর। তাহা
হইতে তাঁহাদের প্রাপ্ত স্থান, সম্মান ও যশ প্রাপ্ত হইবে।
৯৩। দ্রব্য যেরূপ কটুরস হইয়াও পরিপাক হইলে মধুর
হয়, সেইরূপ শ্রম দ্বারা অর্থসিদ্ধি হইলে কটু বিক্রমের মধুর
পরিণাম হয়।

১৪২'
সৌন্দরন কাব্য
৯৪। কাৰ্য্য করণে বীৰ্য্যই মূল। বীৰ্য্য ছাড়া কোনও
রূপ সিদ্ধি হয় না। বীৰ্য্য হইতেই সর্ব সম্পৎ উৎপন্ন হয়।
নির্বীৰ্যতা হইতে সকল রকম পাপ উৎপন্ন হইয়া থাকে।
১৫। নিবীৰ্য্য লােকের অলব্ধ দ্রব্য লাভ হয় না, উপলব্ধ
দ্রব্য বিনষ্ট হয়, আত্মাবজ্ঞা, বড় ব্যক্তির নিকট পরাভব, তম,
নিস্তেজত্ব, শ্রুতি নিয়ম ও তুষ্টি হইতে বিরতি এবং বিনিপাত
হয়।
৯৬। নীতি শ্রবণ করিয়া অশক্ত যে বৃদ্ধি লাভ করে না,
ধৰ্ম্ম জানিয়াও যে উপরে নিবাস লাভ করে না, মুক্তির জন্য গৃহ
ত্যাগ করিয়াও যে শান্তি লাভ করে না, ইহার কারণ পুরুষের
অন্তররিপু “অলসতা”।
৯৭। উৎসাহসম্পন্ন লােক যদি পৃথিবী খনন করে তাহা
হইলে জল লাভ করে। অরণি মন্থন করিলে অগ্নি উৎপন্ন
যােগে নিযুক্ত হইলে নিশ্চয়ই শ্ৰমফল লাভ করে।
দ্রুত ও নিত্যগামী সরিৎ গিরিকেও ভেদ করে ।
৯৮। পৃথিবী কৰ্ষণ করিয়া বহুশ্রমে পরিপালন করিলে
শস্যসম্পত্তি লাভ করা যায়। যত্নে সাগরজলে বিগাহন করিয়া
রত্নসম্পত্তি লাভ করা যায়।
লাভ করা যায়। রাজা শত্ৰুদিগকে শর দ্বারা
পরাজিত করিয়া রাজ্যশ্রী ভােগ করেন। অতএব শান্তি
প্রাপ্তির জন্য বীৰ্যবান্ হও। বিনিয়ত বীৰ্য সর্বপ্রকার
ঋদ্ধির কারণ।
সৌন্দরন কাব্যে যােড়শ সর্গ সমাপ্ত

সপ্তদশ সর্গ
অমৃতপ্রাপ্তি
১। এইরূপে তত্ত্বমার্গের উপদেশ ও বিমােক্ষ মার্গ প্রাপ্ত
হইয়া নন্দ সর্ব ভাবে গুরুকে প্রণাম করিয়া ক্লেশধ্বংসের জন্য
বনে গমন করিলেন।
২। সেখানে কোমল-নীল-শষ্পবৃন্ত, তরুগণযুক্ত, শান্তিময়,
বৈদূৰ্য্যবৎ-নীল-জলবিশিষ্ট, নিঃশব্দে-প্রবাহিত নদী-পরিবৃত স্থান
দর্শন করিলেন।
৩। তিনি সেখানে পদ ধৌত করিয়া পবিত্র মঙ্গলময় সুন্দর
বৃক্ষমূলে উমরূপ কোমর বাঁধিয়া বীরাসনে উপবেশন
করিয়াছিলেন।
সমগ্র শরীর প্রণিহিত (নিরােধ) করিয়া, স্মৃতিকে
শরীরের অভিমুখী করিয়া এবং আত্মাতে সমস্ত ইন্দ্রিয় নিরুদ্ধ
করিয়া যােগ আরম্ভ করিলেন।
৫। অনন্তর নিখিল তত্ত্ব আয়ত্ত করিবার জন্য, মােক্ষের
অনুকূল বিধিসকল পালন করিতে ইচ্ছা করিয়া জ্ঞান ও লােক্য
এবং শম দ্বারা (অথবা লােকের পক্ষে হিতকর শম দ্বারা)
সাধনা-ক্ষেত্রে বিচরণ করিতে লাগিলেন।
৬। প্রশান্তচিত্ত নিয়মতৎপর নন্দ ধৈৰ্য্য অবলম্বন, বীৰ্য্য,
৪।

১৪৪ সৌন্দরন কাব্য ৮। ধারণ, আসক্তি পরিহার, ও শক্তি আশ্রয় করিয়া স্বভাব আশ্ৰয় করিলেন এবং তাহার বিষয়ের আস্থা দূরীভূত হইল। ৭। বর্ষাকালে বিদ্যুৎ যেমন উৎপন্ন হইয়া জলকে মাঝে মাঝে ঝলসাইয়া থাকে, সেইরূপ নন্দ বৈরাগ্যহেতু একাগ্রভাব অবলম্বন করিতে চেষ্টা করিলেও বিশেষ অভ্যাসবশতঃ কাম- সংজ্ঞা আঁহার চিত্ত আকুল করিতেছিল। নন্দ স্থিরতা প্রাপ্ত হইয়া ধৰ্ম্মহানিজনক প্রিয়তম কামসংজ্ঞাকে, মনস্বীব্যক্তি ক্রুদ্ধ হইয়া যেমন গুণবতী প্রিয়া রমণীকেও পরিত্যাগ করে সেইরূপ, সদ্যই পরিত্যাগ করিলেন মনের শান্তির জন্য কৃতযত্ন হইলেও তাহার পুনরায় অকুশল বিতর্ক আসিয়া উপস্থিত হইল, যেমন ব্যাধিপ্রণাশের জন্য নিবিষ্টবুদ্ধির ঘাের উপদ্রব উপস্থিত হয়। ১০। সেইসকল বিতর্ক নাশ করিবার জন্য যােগানুকূল অন্য কুশল রূপ আশ্রয় করিলেন যেমন ক্ষীণবল ব্যক্তি বলী শত্রু কর্তৃক পরাভূত হইয়া আৰ্ত্তের আশ্রয়স্বরূপ কোনও বলী ব্যক্তিকে আশ্রয় করে। ১১। যেমন রাজা পুরনির্মাণ ও দণ্ডবিধির আচরণ, মিত্র সংগ্রহ ও বিপুর বিনাশ সাধন করিয়া পৃথিবী লাভ করে, মুমুক্ষু ব্যক্তিরও যােগবিষয়ে ঠিক ঐরূপ নীতি। ১২। মুক্তিকামী যােগীর চিত্ত পুর, জ্ঞানবিধি দণ্ড, গুণসমূহ মিত্র এবং দোষসমূহ অরি, আর যে মুক্তির জন্য প্রযত্ন করা হয় উহাই পৃথিবী ( বিজিত শত্রুরাজ্য)।

অমৃতপ্রাপ্তি
১৪৫
১৩। সেই নন্দ মহান্ দুঃখজাল হইতে মুক্তিলাভের জন্য
এবং মােক্ষমার্গের বােধে প্রবেশ করিবার জন্য ও পরম পথ
দর্শন করিবার জন্য জ্ঞান লাভ করিয়া শম অবলম্বন
করিলেন।
১৪। যে ব্যক্তি অজ্ঞানের আশ্রয় সেই অযােগ্য ব্যক্তি
তত্ত্ব শ্রবণ করিয়াও অনবহিত হইয়া থাকে। কিন্তু নন্দ মােক্ষের
জন্য যােগ্যতা অবলম্বন করিয়াছিলেন বলিয়া নিজ মন নিজ
আত্মায় সংহৃত করিলেন।
অনন্তর আত্মবান্ নন্দ ধৰ্ম্মের সম্যক পুষ্টি, বিশ্বাস,
আস্বাদ, দোষবিশেষ এবং নিরাশ্ৰয়ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে বিধি
অনুসারে পরীক্ষা করিতে লাগিলেন।
১৬। সার’ অবলােকনের জন্য, রূপযুক্ত ও রূপহীন সমস্ত
শরীরের ভিতর অনুসন্ধান করিলেন। কিন্তু দেখিলেন শরীর
অপবিত্র, দুঃখজনক, অনিত্য, অস্ব এবং নিরাত্মক।
১৭। শরীরের অনিত্যতা, শূন্যতা, নিরাত্ম, এবং দুঃখ
দেখিয়া, (মার্গবিজ্ঞান দ্বারা) তিনি ক্লেশমকে সঞ্চালিত
করিলেন।
১৮। যেহেতু সমস্ত বস্তুই পূর্বে না থাকিয়া উৎপন্ন হয়
এবং উৎপন্ন হইয়াও পুনর্বার ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ সহেতুক
এবং ক্ষয়শীল, অতএব হেতুম এই জগৎ অনিত্য বলিয়া মনে
করিলেন।
১৯। যেহেতু জাতব্যক্তির কৰ্ম্মযােগ বন্ধন নাশের হেতু

১৪৬ সৌন্দরন কাব্য হয়, অতএব দুঃখপ্রতীকার-বিষয়ে সুখময় সংসারও অসুখের বলিয়া মনে করিলেন। ২০। যেহেতু বিবেচনা করিলে সমস্তই সংস্কার মাত্রে পৰ্য্যবসিত হয়, কেহ কর্তা বা কেহ জ্ঞাতা নাই, সামগ্ৰহেতুই প্রবৃত্তি (জন্ম) হয়। অতএব এই লােক শূন্যময় বলিয়া জানিলেন। ২১। যেহেতু জগৎ নিশ্চেষ্ট ও পরাধীন, কেহই প্রভুত্ব করিতে পারে না, তত্তবিষয়ের প্রতীতি হইতেই ভাবসমূহ উৎপন্ন হয়, অতএব সমস্ত জগৎকে তিনি নিরাত্মক বলিয়া স্থির করিলেন। ২২। যেমন উষ্ণ হইলে ব্যজন দ্বারা বায়ু লাভ করা যায়, কাষ্ঠের অভ্যন্তরবর্তী অগ্নি যেমন নির্মথনবশত লাভ করা যায়, খনন হেতু যেমন ক্ষিতির অন্তর্বর্তী জল লাভ করা যায়, সেই- রূপ নন্দ অলৌকিক দুর্লভ মার্গ প্রাপ্ত হইলেন। ২৩। নন্দ বিশুদ্ধ শীলব্রতরূপ বাহন আশ্রয় করিয়া সৎ- জ্ঞানরূপ চাপ ও স্মৃতিরূপ বৰ্ম্ম পরিধান করিয়া চিত্তরূপ রণাঙ্গনে অবস্থিত ক্লেশরূপ শত্রুগণের সহিত যুদ্ধ করিবার ইচ্ছু হইয়া বিজয়াভিলাষে অবস্থিত রহিলেন। ২৪। বােধ্যরূপ তীক্ষ্ণধার অস্ত্রধারী সম্যক্‌প্রধান উত্তম বাহনে অবস্থিত ও মার্গাঙ্গরূপ হস্তিবলে যুক্ত হইয়া ধীরে ধীরে ক্লেশচর মধ্যে প্রবেশ করিলেন। ২৫। স্মৃতির আরাধনারূপ বাণ দ্বারা দুঃখের হেতু চারিটী

১৪৭
অমৃতপ্রাপ্তি
বিপৰ্য্যাসময় শত্রুকে ক্ষণকালের মধ্যে নিজ নিজ চতুঃসংখ্যক
প্রচারায়তন দ্বারা বিদীর্ণ করিলেন।
২৬। অনুপম পঞ্চবিধ আৰ্য্যবল দ্বারা চিত্তের পঞ্চবিধ
দোষকে বিনাশ করিলেন। অষ্টবিধ “অঙ্গ” রূপ নাগ দ্বারা
অষ্টবিধ “মিথ্যা” রূপ নাগকে দূরীভূত করিলেন।
২৭। অনন্তর সকল আত্মদৃষ্টি পরিত্যাগ করিয়া চতুর্বিধ
সত্য বিষয় নিশ্চয় করিয়া বিশুদ্ধ শীলব্রতে ধৰ্ম্ম দর্শন করিয়া
ধৰ্ম্মের প্রধান ফলভূমি প্রাপ্ত হইলেন।
২৮২৯। তিনি আচতুষ্টয়ের দর্শন হেতু এবং ক্লেশের
এক দেশের বিয়ােগ হেতু, প্রতি আত্মার বিশেষ জানিয়া এবং
প্রত্যক্ষ রূপে জ্ঞান ও সুখের বিষয় অবগত হইয়া, প্রসন্নতা ও
ধৈর্য্যের স্থিরতা বশতঃ এবং চতুর্বিধ সত্যে অমূঢ়তা বশতঃ ও
উত্তম শীলের অক্ষুন্নতা হেতু ধৰ্ম্মবিষয়ে সংশয়শূন্য হইলেন।
৩০। তিনি কুদৃষ্টিসমূহশূন্য হইয়া জগৎকে উক্তরূপে
জ্ঞানের আশ্রয় জানিয়া প্রীতি প্রাপ্ত হইলেন।
এবং পুনরায়
গুরুর প্রতি অধিক প্রসন্নতা (বা ভক্তি ) লাভ করিলেন।
যে ব্যক্তি প্রবৃত্তিকে অকারণে বা অন্য কারণে
অনুৎপন্ন নিয়ত বলিয়া জানে, এবং ঐরূপ জানিয়া তত্ত বিষয়ে
সংলগ্ন হয়, সেই ব্যক্তিই নৈষ্ঠিক আৰ্য্য ধৰ্ম্ম জানিয়া থাকে।
৩২। যে ব্যক্তি শান্ত, মঙ্গলময়, জরা-ও রাগশূন্য, নিঃশ্রেয়স
ধৰ্ম্ম দেখে ও সেই ধর্মের উপদেষ্টা আৰ্যশ্রেষ্ঠকে বুদ্ধ বলিয়া
জানে, সেই ব্যক্তিই চক্ষু লাভ করিয়াছে।
ارد

১৪৮ সৌন্দরন কাব্য ৩৩৩৪। যেমন চিকিৎসকের শিবময় উপদেশে রােগমুক্ত হইয়া রােগী কৃতজ্ঞভাবে চিত্তদৃষ্টি ও মৈত্রীবশতঃ তাহার অনুস্মরণ করিয়া নিজ বিবেকবশতঃ তুষ্ট হয়, সেইরূপ আৰ্যতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি আৰ্যমার্গে মুক্ত হইয়া বুদ্ধের অনুস্মরণ করতঃ মৈত্রী ও সর্বজ্ঞতা হেতু পরিতুষ্ট হয়। ৩৫। সেই ব্যক্তি দৃষ্টিগত অনিষ্টকারী বস্তু হইতে মুক্ত হইয়া পুনর্জন্মের সীমা দেখিয়া ঘৃণা ও ক্লেশ বশতঃ বিস্ফারিত- শায়ক মৃত্যু বা দুর্গতি হইতে ভীত হয় না। ৩৬। পরে তিনি ত্বক পায়ু মেদ রুধির অস্থি মাংস ও ক্লেশাদি রূপ অপবিত্র বস্তু দ্বারা পূর্ণ এই কায়ের আলােচনা করিয়া ইহাতে অনুমাত্রও সার লাভ করিলেন না। ৩৭। পরে স্থিরাত্মা নন্দ কাম ও রাগরূপ বিঘ্নদ্বয়কে যােগ দ্বারা ক্ষীণ করিলেন। বিশাল-বক্ষ সম্পন্ন-তনুযুক্ত নন্দ ঐ দুইটীকে ক্ষীণ করিয়া আৰ্য্যধৰ্ম্মে দ্বিতীয় ফল লাভ করিলেন। ৩৮। তিনি লােভরূপ চাপযুক্ত ও পরিকল্প বাণযুক্ত অম্লাবশিষ্ট রাগনামক মহাশত্রুকে কায়স্বভাবে অধিগত অশুভা রূপ পৃষক (বাণ )-সম্বলিত যােগায়ুধাস্ত্রে বিভিন্ন করিলেন। ৩৯। এবং দ্বেষরূপ আয়ুধযুক্ত ক্রোধরূপ বাণক্ষেপকারী অন্তঃকরণজাত হিংসারূপ শত্রুকে ধৈৰ্য্যরূপ তুণস্থিত ক্ষমারূপ ধনুর্জাক্ষিপ্ত মৈত্রীরূপ বাণ দ্বারা বিনষ্ট করিলেন। যেমন শত্রু তিনটী লৌহাগ্ৰশায়ক দ্বারা কার্দুকধারী সেনামুখে অবস্থিত তিনটী শত্রুকে বধ করে, সেইরূপ সেই বীর . .. ৪০।

অমৃতপ্রাপ্তি ১৪৯ তিনটী মােক্ষায়তন দ্বারা অশুভের তিনটী শুভের তিনটী মূল উচ্ছিন্ন করিলেন। ৪১। তিনি কামধাতুর অতিক্রমের জন্য পার্ষিরক্ষী অরিসমূহকে পরাভূত করিয়া দ্বারী যেমন পুরের দ্বার রক্ষা করে সেইরূপ অনাগামী ফল প্রাপ্ত হইয়া নির্বাণদ্বার রক্ষা করিতে লাগিলেন। ৪২। অনন্তর তিনি কামশূন্য ও মলিনধৰ্ম্মশূন্য বিতর্ক- ও বিচারযুক্ত প্রীতিসুখােপপন্ন বিবেকজ “প্রথম ধ্যান প্রাপ্ত হইলেন। যেমন ঘর্মাক্ত ব্যক্তি জলে অবগাহন করিয়া শান্তি প্রাপ্ত হয় এবং দরিদ্র ব্যক্তি বিপুল অর্থ লাভ করিয়া আনন্দিত হয়, নন্দ সেইরূপ কামাগ্নির দাহে মুক্ত হইয়া ধ্যানসুখ হেতু অত্যন্ত আনন্দ লাভ করিলেন। ৪৪। তাহাতেও ধৰ্ম্মগত বিতর্ক গুণাগুণ বিষয়ে প্রস্ত বিচার মনঃক্ষোভকর ও শান্তিশূন্য জানিয়া তাহার পরিহারের জন্য মনন করিলেন। ৪৫। যেমন প্রসন্ন জলপ্রবাহযুক্ত সিন্ধুকে উর্মিমালা ক্ষুভিত করে, সেইরূপ একাগ্রচিন্তারূপ জলের পক্ষে বিতর্কগুলি ক্ষোভ উৎপাদন করিয়া থাকে। ৪৬। যেমন ভিন্ন সুপ্ত ও নিবৃত ব্যক্তির পক্ষে শব্দরাশি বাধা উৎপাদন করে, সেইরূপ আত্মায় ঐকাগ্রযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে বিতর্কসমূহ বাধা জন্মাইয়া থাকে।

সৌন্দরন কাব্য ৪৭। পরে ক্রমে চিত্তের একাগ্রতা হেতু বিতর্ক ও বিচার- শূন্য সমাধিপ্রসূত অধ্যাত্মশিব প্রীতিসুখসংসৃষ্ট দ্বিতীয় ধ্যান অবলম্বন করিলেন। ৪৮। এইরূপে তিনি চিত্তের মৌন ও ধ্যান লাভ করিয়া অপূর্ব প্রীতি প্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু বিতর্কের ন্যায় সেই প্রীতিতেও দোষ দেখিতে লাগিলেন। ৪৯। যাহার যে বিষয়ে অধিক প্রীতি থাকে ঐ প্রীতির বিপৰ্যয়ে তদ্বিষয়ে তাহার দুঃখ হইয়া থাকে। অতএব প্রীতির দোষ দেখিয়া প্রীতির ক্ষয়ে যােগ অবলম্বন করিলেন। ৫০। প্রীতির প্রতি বিরাগ হেতু কায় দ্বারা আৰ্যসেবিত সুখলাভ করিয়া জ্ঞান ও উপেক্ষা এবং স্মৃতির সাহায্যে তৃতীয় ধ্যান ধীরভাবে আশ্রয় করিয়া বিহার করিতে লাগিলেন। ৫১। সাধারণ সুখ অপেক্ষা ঐ অবস্থায় অধিক সুখ থাকায় আর সুখের প্রবৃত্তি হয় না, এইজন্য পরাপরজ্ঞ যােগী হইয়া মৈত্রী দ্বারা শুভের সমগ্র আশ্রয় ঐ অবস্থাকে উৎকৃষ্ট বলিতে লাগিলেন। আবার ঐ ধ্যানেও দোষ পৰ্যালােচনা করিয়া নিরঞ্জন অবস্থাকে শান্তিময় ভাবিলেন। তখন প্রবৃত্ত সুখ ভােগ অপেক্ষাও তদীয় চিত্ত “ড়িত করিতে লাগিল। যাহাতে পীড়া ও স্পন্দন আছে, যাহাতে দুঃখের বিক্ষোভ আছে, সেই সুখকে যতিগণ প্রশান্তি-কামনায় বর্জন করিয়া থাকেন।

অমৃতপ্রাপ্তি
৫৪।
অনন্তর সুখ-দুঃখের পরিহার এবং মানসিক
বিকারের পরিহার হেতু দুঃখসুখশূন্য উপেক্ষা ও স্মৃতিবিশুদ্ধ
চতুর্থ ধ্যান প্রাপ্ত হইলেন।
৫৫। যেহেতু উক্ত ধ্যানবিধিতে সুখ দুঃখ বা তদবিষয়ে
জ্ঞান থাকে না, এইজন্য ঐ চতুর্থ ধ্যানবিধিতে উপেক্ষা নামক
স্মৃতিপরিশুদ্ধি কথিত হয়।
যেমন জিগীষু কোনও রাজা অজিত দেশ জয় করিতে
সত্ত্বলাভের জন্য বলবান্ আৰ্য মিত্রকে আশ্রয় করে, সেইরূপ তিনি
চতুর্থ ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া অহত্ত্ব লাভের জন্য মনন করিলেন।
৫৭। পরে ভাবনা-পরিচালিত প্রজ্ঞারূপ অসি দ্বারা
উৰ্দ্ধগামী উত্তম বন্ধন পাঁচটী ও সংযােজন উত্তম বন্ধন পাঁচটী
সমগ্ৰ ছেদন করিলেন।
৫৮। সপ্ত বােধ্যঙ্গনাগ দ্বারা সপ্তবিধ চিত্তের অনুশয়
দলিত করিলেন কাল যেমন আসন্নমৃত্যু সপ্ত দ্বীপকে সপ্ত গ্রহ
দ্বারা নষ্ট করে।
৫৯। জলপ্রবাহ, বায়ু, অগ্নি, ও সূর্যের যেমন যথাক্রমে
অগ্নি, বৃক্ষ, আজ্য ও জল বিষয়ে নির্বাপণ উৎপাটন দাহ ও
শশাষণ রূপ চতুধি বৃত্তি, সেইরূপ নন্দ দোষ বিষয়ে নির্বাপণ
প্রভৃতি বৃত্তি অবলম্বন করিলেন।
৬০। এইরূপ বেগত্ৰয়- মীনয়- ও বীচিত্রয়-যুক্ত একান্ত
পঞ্চবেগযুক্ত কূলদ্বয়সমন্বিত গ্রাহদয়বিশিষ্ট দুস্তর দুঃখার্ণব
অষ্টাঙ্গযুক্ত প্লব (ভেলা) দ্বারা উত্তীর্ণ হইলেন।

সৌন্দরনন্দ কাব্য ৬১। পরে নন্দ অহত্ত্ব প্রাপ্ত হইয়া সৎক্রিয়াযােগ্য নিরুৎ- সুক প্রণয়শূন্য আশারহিত ভীতি-শােক-মত্ততা-ও-রাগশূন্য হইয়া ধৃতি হেতু অপর ব্যক্তির ন্যায় প্রতীত হইতে লাগিলেন। ৬২। ভ্রাতা ও উপদেশক বুদ্ধের উপদেশ এবং নিজ শক্তি হেতু নন্দ প্রশান্তচিত্ত ও পরিপূর্ণকাম হইয়া স্বগত ভাবে এই কথা বলিতে লাগিলেন। যে বুদ্ধদেব হিতেচ্ছা ও করুণা হেতু আমার বহু দুঃখ অপনােদন করিয়াছেন এবং বহু সুখের উপসংহার করিয়া- ছেন তাহাকে নমস্কার। ৬৪। যেমন দৃপ্ত হস্তী অঙ্কুশ দ্বারা নিবারিত হয়, সেইরূপ আমিও শরীরজাত অনার্য ভাবের তাড়নে আকৃষ্ট হইতেছিলাম, এরূপ অবস্থায় তদীয় বচনাঙ্কুশে নিবারিত হইয়াছি। ৬৫। সেই পরম কারুণিক উপদেশকশ্রেষ্ঠ বুদ্ধদেবের আজ্ঞাক্রমে হৃদয়ের শল্যস্বরূপ রাগবৃত্তি উৎপাটিত করিয়া আজই আমার কি শান্তি। সর্বক্ষয় হইয়া নির্বাণ লাভ করিলে যে শান্তি হইবে তাহার কথা আর কি বলিব ? যেমন জল দ্বারা বহ্নি নির্বাপিত হয়, সেইরূপ ধৃতি- সলিলে প্রদীপ্ত কামাগ্নি নির্বাপিত করিয়া গ্রীষ্মকালে শীতল হ্রদে অবতীর্ণ ব্যক্তির ন্যায় আমি পরম আনন্দ লাভ করিয়াছি। ৬৭। আজ আমার কোনও বস্তু প্রিয় বা অপ্রিয় নহে, কোনও বস্তুর প্রতি আমার অনুরাগ বা বিরাগ নাই, হিম এবং অমৃতপ্রাপ্তি আতপকষ্টশূন্য ব্যক্তির ন্যায় আমি আজ ঐ বিরুদ্ধভাবের বিরহ হেতু অসীম আনন্দ লাভ করিতেছি। ৬৮৬৯৭। মহাভয় হইতে ক্ষেমের ন্যায়, মহাবন্ধন হইতে মুক্তির ন্যায়, মহান্ অর্ণব হইতে প্লবশূন্য ব্যক্তির উত্তরণের ন্যায়, ভয়াবহ অন্ধকার হইতে প্রকাশের ন্যায়, অসহ রােগযাতনা হইতে আরােগ্যের ন্যায়, অনন্ত ঋণ হইতে অদৃণ- তার ন্যায়, শত্রুর নিকট হইতে অপগমের ন্যায়, দুর্ভিক্ষযােগ হইতে মুভিক্ষের ন্যায়, আমি যে বিনায়কের অনুগ্রহক্রমে শান্তি লাভ করিয়াছি, পুনঃ পুনঃ সেই পূজনীয় বুদ্ধদেবকে নমস্কার করিতেছি। ৭১৭২৭৩। যে বুদ্ধদেব আমাকে স্বর্ণশৃঙ্গ পর্বতে উপনীত করিয়া স্বর্গ দেখাইয়া বানরপত্নীর দৃষ্টান্তে যুবতীময় কলি-সমাসক্ত আমাকে স্বৰ্গবিহারিণী অঙ্গনা দ্বারা আকাণ করিয়াছেন ; ক্রমে পঙ্কমগ্ন করী শিথিল হইয়া পড়িলে যেমন তাহাকে পঙ্ক হইতে কেহ উদ্ধার করে, সেইরূপ ব্যসনপর আমাকে অনর্থপঙ্ক হইতে উদ্ধার করিয়া যিনি আমাকে এই শান্থ রজো- মুক্ত দুঃখশােকশূন্য মােযুক্ত নৈষ্ঠিক সৎ ধৰ্ম্মে স্থাপন করিয়াছেন; সেই পরম কারুণিক প্রকৃতিগুণ আশয়বেদী দশবলযুক্ত সম্যক্‌জ্ঞানসম্পন্ন পরিত্রাতা ভিষপ্রধান ভগবান্ বুদ্ধদেবকে মস্তক নত করিয়া আবার আমি নমস্কার করিতেছি। ; সৌন্দরন কাব্যে সপ্তদশ সর্গ সমাপ্ত

অষ্টাদশ সর্গ
আজ্ঞাব্যাকরণ
১। অনন্তর দ্বিজবালক যেমন বেদ লাভ করিয়া কৃতাৰ্থৰ্ম্মন্য
হইয়া গমন করে, বণিক যেমন লাভবান্ হইয়া কৃতার্থতাবােধে
উপদেষ্টার নিকটে যায়, ক্ষত্রিয় রাজা যেমন অরিসৈন্য জয় করিয়া
কৃতার্থতাবােধে গুরুর কাছে উপস্থিত হয়, সেইরূপ নন্দ কৃতার্থতা-
জ্ঞানে গুরুর নিকটে আসিলেন।
২। জ্ঞানের পরিণতি অবস্থায় গুরু শিষ্যের এবং শিষ্য
গুরুর সাক্ষাৎকার কামনা করে “আমার প্রতি তােমার
পরিশ্রম সফল হইয়াছে” ইহা জানাইবার জন্য ; এইজন্য নন্দ
তদীয় গুরুর দর্শন কামনা করিলেন।
৩। যে ব্যক্তি যাহার নিকট হইতে বিশেষ জ্ঞান লাভ
করে সেই ব্যক্তি তাহার উত্তম অর্চনা করিতে পারে। সেই
ব্যক্তি সরল হইয়াও মানশূন্য ও রাগমুক্ত হইয়া থাকে।
৪। যাহার ভক্তি কামভব তাহার ঐ ভক্তি স্বতঃই
রূঢ়মূল হইয়া বর্তমান থাকে; যাহার ভক্তির অনুরাগ ধৰ্ম্মসমৃদ্ধ
তাহার হৃদয়ে প্রসাদ বদ্ধমূল।
কনকের ন্যায় নির্মল নন্দ কায়বস্ত্র ধারণ করিয়া

আজ্ঞাব্যাকরণ বায়ুকম্পিত পল্লবতাম্র পুষ্পশশাভাযুক্ত কণিকার বৃক্ষের ন্যায় নতশিরে গুরুকে প্রণাম করিলেন। ৬। পরে নিজ শিষ্যগুণ এবং মহামুনি বুদ্ধদেবের উপদেশ- গুণ প্রদর্শন করাইবার জন্য নিজ কার্যসিদ্ধি ভঁহাকে বলিতে লাগিলেন, অভিমান হেতু নহে। ৭। হে প্রভু, যে দৃষ্টিশল্য আমার হৃদয়ে গাঢ়ভাবে সংলগ্ন থাকিয়া আমাকে তীক্ষ্ণভাবে পীড়িত করিতেছিল, শল্যাদ্ধারকত্তা যেমন সন্দংশমুখে আকর্ষণ করিয়া শল্য উদ্ধার করে সেইরূপ তুমি বচন দ্বারা আমার সেই শল্য উদ্ধার করিয়াছ। ৮। হে সংসারশূন্য, আমি যে সংসারনিবন্ধন একটা অনিশ্চয়ের অন্ধকারে পড়িয়া ছিলাম তাহা আর আমার নাই ; পথহারা ব্যক্তি যেমন অভিজ্ঞ ব্যক্তির উপদেশে সৎপথ লাভ করে সেইরূপ আমিও আপনার উপদেশে সৎপথ লাভ করিয়াছি। একান্ত ভােগপ্রবল ইন্দ্রিয় দ্বারা দপবশতঃ আমি যে কর্পবিষ পান করিয়াছি, উৎকৃষ্ট ঔষধে যেমন বিষ নষ্ট হয় সেইরূপ আপনার বচনৌষধে আমার তাহা নষ্ট হইয়াছে। ১০। হে মুক্ত, আমার জন্ম নষ্ট হইয়াছে, আমি সম্যক সদ্ধৰ্ম্মসেবা প্রাপ্ত হইয়াছি। হে কৃতার্থ, আমার সমগ্ৰ কাৰ্য সম্পন্ন হইয়াছে, আমি আর লৌকিকভাবযুক্ত নহি। ১১। উত্তম বৎস যেমন স্তন- সাত্মভাব-দুগ্ধ- ও শৃঙ্গ-যুক্ত গাভীর দুগ্ধ পান করিয়া তৃষ্ণার শান্তি করে, সেইরূপ আমিও

সৌন্দর কাব্য
মৈত্রী- সামভাব- সৰ্ম্ম- ও প্রতিভা-যুক্ত আপনার বচন শ্রবণ
করিয়া তৃপ্তি লাভ করিয়াছি।
১২। আমি যে জ্ঞানী ব্যক্তির জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়াছি তাহা
আপনি আমার নিকট হইতে সংক্ষেপে শ্রবণ করুন। হে সর্বজ্ঞ,
আপনার সমস্তই বিদিত, তথাপি আমি নিজের অবস্থা বলিবার
ইচ্ছা করিতেছি।
অন্য যে-সকল মুমুক্ষু ব্যক্তি তাহারাও মুক্তির জন্য
অপর মুমুক্ষু ব্যক্তির রীতি নীতি জানিয়া রােগী যেমন রােগ
হইতে মুক্তিলাভ করিয়া সুখী হয় সেইরূপ মুক্তিলাভ করিয়া
সুখী হয়।
১৪। যেহেতু জন্ম বিষয়ে পৃথিবী প্রভৃতি দ্রব্যাদিই উপা-
দান, উক্ত পৃথিবী প্রভৃতির মধ্যে আত্মা কিছু নহে। সেইজন্য
তাহাতে আমার শক্তি নাই। আমার মতি ও বহিঃস্থিত কায়
সমান।
১৫। রূপ প্রভৃতি পঞ্চ স্কন্ধ চপল এবং অসার বলিয়া
আমার মনে হয়, উহার স্বরূপ মিথ্যা এবং নশ্বর, অতএব আমি
এই অশিব বস্তু হইতে মুক্ত হইয়াছি।
১৬। আমি সকল অবস্থায়ই ইন্দ্রিয়ের উদয় ও সত্তা
অনুভব করিতেছি, অতএব অনিত্য মিথ্যাভূত দুঃখময় এই পদার্থে
আমার আসক্তি নাই।
১৭। সকল জ্ঞানী ব্যক্তিরই অসারতা দর্শনে সমস্ত বস্তুই
অসৎ বলিয়া মনে হইতেছে। বুদ্ধি এবং মন দ্বারা ইহাই আমার

আজ্ঞাব্যাকরণ
১৫৭
বদ্ধমূল হইয়াছে, অতএব আমি বলিয়া আর আমার একটা
অনুরাগ হয় না।
বহু প্রকারে প্রসক্ত চতুর্বিধ আহারবিধিতে আর
আমি আসক্ত নহি, আমার মােহ বা সঙ্গদোষ নাই, অতএব
আমি ত্রিবিধ সংসার হইতে মুক্ত।
১৯। যেহেতু দৃষ্ট এবং শ্রুত ব্যবহারধৰ্ম্মে অনাসক্তচিত্ত
নিরবলম্ব এবং সমভাবাপন্ন হইয়া বিষয়বিয়ােগ লাভ দ্বারা
আমি মুক্ত হইয়াছি।
২০। এই কথা বলিয়া গুরুর প্রতি সম্মানবশতঃ নন্দ
তাহাকে ভূমিতলে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিলেন। তখন
তাঁহাকে বায়ুচালিত লােহিতচন্দনাক্ত সুবর্ণস্তম্ভের ন্যায় দেখা
গিয়াছিল।
২১। অনন্তর অনবধান হেতু নন্দ পূর্বে প্রস্ত হইয়া-
ছিলেন এবং সম্প্রতি তাঁহার ধৈৰ্য্য ও ধৰ্ম্মব্যাখ্যান, অনুগত ধৰ্ম্ম
সম্বন্ধ এবং প্রসাদ জানিয়া মুনি মেঘগম্ভীর স্বরে বলিতে
লাগিলেন।
২২। হে শিষ্যধৰ্ম্মনিষ্ঠ, তুমি ধর্ম বিষয়ে উদ্যম কর, আমার
চরণে মস্তক স্থাপন করিয়া পতিত হইয়াছ কেন ? আমাকে
প্রণাম করাই তােমার সেরূপ অর্চনা নহে যেরূপ ধৰ্ম্ম বিষয়ে
প্রতিপত্তি।
২৩। আজ তুমি প্রকৃত প্রব্রজ্যা লাভ করিয়াছ যে হেতু
হে জিতেন্দ্রিয় তুমি নিজের মধ্যে ঐশ্বৰ্য্যলাভ করিয়াছ, জিতা

১৫৮ সৌন্দরনন্দ কাব্য ব্যক্তিরই প্রব্রজ্যা উত্তম, কিন্তু অজিতেন্দ্রিয় চঞ্চলচিত্ত ব্যক্তির নহে। ২৪। আজই তুমি প্রকৃত উৎকৃষ্ট শৌচ লাভ করিয়াছ, যেহেতু তােমার বা কায় ও চিত্ত সমস্তই বিশুদ্ধি প্রাপ্ত হই- য়াছে, ইহা হইতেই তুমি পুনার অবিশুদ্ধ অপকৃষ্ট গর্ভশয্যা প্রাপ্ত হইবে না। ২৫। হে আৰ্য্যবৃত্ত, শাস্ত্রের অনুরূপ ধৰ্ম্ম প্রাপ্ত হওয়ায় আজ তােমার জ্ঞানীর যােগ্য জ্ঞান হইয়াছে। শাস্ত্রজ্ঞান- সম্পন্ন হইয়াও যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ থাকে সেই ব্যক্তি গৃহীতশাস্ত্র নিৰ্বীৰ্য ব্যক্তির ন্যায় নিন্দনীয়। ২৬। ইহাই আশ্চর্য যে তুমি বিষয়ে আসক্ত হইয়াও মােক্ষবিধিতে চিত্ত স্থাপন করিতে পারিয়াছ। মূখ ব্যক্তি আমার নিষ্ঠা উপস্থিত হইবে এই বলিয়া জন্মক্ষয় হইতে ত্রাস প্রাপ্ত হয়। ২৭। সৌভাগ্যবশতঃ শুভকালােদয় সকলের ভাগ্যে সুলভ নহে। মােহবশে ঐ কালােয় ব্যর্থ না করাও সুলভ নহে। সমুদ্রস্থ কূৰ্ম্মের ন্যায় একবার নিম্নে পতন হইলে পূনর্বার উপরে আসা অতি দুঃখেই হইয়া থাকে। ২৮। তুমি আজ দুর্নিবার মারকে যুদ্ধে জয় করিয়া প্রকৃত রণশাস্ত্রবীর হইয়াছ। যে ব্যক্তি শত্রুর ন্যয় দোষসমূহ দ্বারা হত হয়, সে ব্যক্তি শূর হইয়াও অশূর বলিয়া খ্যাত হয়। ২৯। আজ তুমি উদ্ৰিক্ত রাগাগ্নি নির্বাপণ করিয়া দাহ

আজ্ঞাব্যাকরণ
শূন্য হইয়া সুখে নিদ্রা যাইবে। উৎকৃষ্ট শয়নে থাকিয়াও
ক্লেশগ্নি দ্বারা যাহার চিত্ত দগ্ধ হইতে থাকে সে ব্যক্তি দুঃখে
কালযাপন করে।
৩০। পূর্বে যে তােমার দ্রব্যমদ অত্যন্ত উৎকট ছিল
আজ সেই তুমি তৃষ্ণার উপরমে সমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়াছ। যতক্ষণ
পুরুষ তৃষ্ণাযুক্ত থাকে ততক্ষণ সেই ব্যক্তি সমৃদ্ধ হইয়াও
দরিদ্র জানিবে।
৩১। রাজা শুদ্ধোধন আমারও পিতা। অতএব অদ্য
তােমাকে উপদেশ দেওয়া আমার উপযুক্তই ( উচিতই )
হইয়াছে। ধৰ্ম্মভ্রষ্ট ব্যক্তির পিতৃগণের সহিত বিনাশ হয় বলিয়া
কুলােপদেশ শ্লাঘ্য নহে।
৩২। যেমন কোনও ব্যক্তি কান্তার অতিক্রম করিয়া
সারধন প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ তুমিও আজ ভাগ্যবশে পরম শান্তি
লাভ করিয়াছ। যেমন কান্তারস্থিত সকল ব্যক্তি ভয়ে
আৰ্ত্ত হয়, সেইরূপ সংসারগত সকল ব্যক্তি ভয়ে আর্ন্ত
৩৩। পূর্বে আমার এইরূপ একটা ইচ্ছা ছিল না যে
আমি কখন নন্দকে অরণ্যচারী ভৈক্ষ্যসংগ্রাহী বিনীত এবং
মৌনী দেখিব। সম্প্রতি তুমি ভাগ্যবশে সেইরূপ অবস্থা লাভ
করিয়াই আমার সম্মুখে দৃষ্ট হইতেছ।
৩৪। কেহ রূপবর্জিত হইলেও যদি শ্রেষ্ঠগুণ দ্বারা
অলঙ্কত হয় তবে সেই ব্যক্তি দর্শনীয় হয়। আর যদি কেহ

সৌন্দরনন্দ কাব্য
মালিন্যসম্পাদক দোষ দ্বারা যুক্ত হয় তবে তাহার রূপ
থাকিলেও সে ব্যক্তি বিরূপ জানিবে।
৩৫। আজ তােমার প্রকৃষ্ট বুদ্ধিমত্তা উৎপন্ন হইয়াছে
এবং তাহাতে তােমার সমস্ত আত্মকাৰ্য্য সাধিত হইয়াছে।
উত্তম শাস্ত্র-জ্ঞানসম্পন্ন হইলেও যাহার মােক্ষ বিষয়ে বুদ্ধি
হয় না তাহার প্রকৃত বুদ্ধি নাই।
যে ব্যক্তি চক্ষু মেলিয়া আছে এবং যে ব্যক্তি চক্ষু
বুজিয়া আছে উভয় ব্যক্তিরই চক্ষু তুল্য, যে ব্যক্তির প্রজ্ঞা-
চক্ষু নাই সে ব্যক্তি চক্ষুষ্মন্ হইয়াও চক্ষুশূন্য জানিবে ।
লােক আৰ্ত্ত হইয়া কৃষি প্রভৃতি ক্রিয়ার দ্বারা
দুঃখ প্রতীকারের নিমিত্ত খেদ প্রাপ্ত হইয়া থাকে, কিন্তু তাহাতে
সে আরও খেদই প্রাপ্ত হয়, আজ তুমি তাহার অন্তসাধন
করিয়াছ।
৩৮। লােক সর্বদাই আমার যাহাতে দুঃখ না হয় এবং
সুখ হয় এই বলিয়া প্রবৃত্ত হয়, কিন্তু সে জানে না যে কিরূপে
উহা প্রাপ্ত হইতে হয়—আজ তুমি যেরূপে অসুলভ উহা প্রাপ্ত
হইয়াছ।
৩৯। এইরূপে স্থিরবুদ্ধি নন্দকে হিতার্থে বুদ্ধদেব বলিলে,
প্রশংসা ও নিন্দা বিষয়ে নিরপেক্ষ হইয়া নন্দ কৃতাঞ্জলিপুটে
বলিতে লাগিলেন।
৪০। হে বিশেষজ্ঞ, আপনি আমার প্রতি বিশেষরূপে
করুণা প্রদর্শন করিয়াছেন। যেহেতু হে ভগব, আমি কামপঙ্কে

আজ্ঞাব্যাকরণ
১৬১
নিমগ্ন হইয়াছিলাম, আমাকে আপনি সংসারভয় হইতে ত্রাণ
করিয়াছেন।
৪১। শ্রেয়ােবিষয়ে উপদেশক ভ্রাতা (আপনি), প্রাপ্ত
কাম পিতা ও মাতা যদি আমাকে নিরাশ করিতেন, তাহা
হইলে যূথভ্রষ্ট অকৃতাৰ্থ প্রাণীর ন্যায় আমি কখনই মুক্তিলাভ
করিতাম না।
৪২। শান্ত, তুষ্ট, বিজ্ঞাততত্ত্ব, পরীক্ষক ব্যক্তির বিবেক
সুখকর। মান- ও মদশূন্য অসক্তবুদ্ধি ব্যক্তির বৈরাগ্য সুখকর।
৪৩। এখন আমি সম্যক্ তত্ত্ব জানিয়া দোষ পরিত্যাগ
করিয়া শান্তিলাভ করিয়া নিজ গৃহস্থাশ্রমের বিষয় বা সেইজন
(অর্থাৎ সুন্দরী ) অপ্সরা ও দেবতার বিষয় চিন্তা করি না।
৪৪। এই শমগুণের বিশুদ্ধ সুখ ভােগ করিয়া আর আমার
চিত্ত কামজ সুখের আকাঙ্ক্ষা করে না, যেমন সুধাভােগ
করিয়া পরিতুষ্ট দেবতা অদৈবহৃত অন্ন মহৎ হইলেও তাহা
ভােগ করেন না।
৪৫।
হায়।
জগৎ অত্যন্ত অন্ধতায় মুগ্ধ, এইজন্য
পটাচ্ছাদিত উত্তম সুখ তাহারা দেখিতে পায় না। তাহারা
স্বাধীন অধ্যাত্মসুখ পরিত্যাগ করিয়া কামসুখের জন্য বিপুল শ্রম
করিয়া থাকে।
৪৬। যেমন দুৰ্ম্মতি কোনও ব্যক্তি রকরে যাইয়া
অসৎ মণি সংগ্রহ করে, সেইরূপ সম্যক জ্ঞানসুখ পরিহার
করিয়া কামসুখের লাভের জন্য তােক শ্ৰম আশ্রয় করে।

১৬২ সৌন্দরনন্দ কাব্য ৪৭। সর্ব প্রাণীর প্রতি মিত্রব্যবহারী বুদ্ধদেব, আপনার অনুগ্রহ কামনা অতি প্রচুর, যেহেতু আপনি নিজের ধ্যানমুখ পরিত্যাগ করিয়া পরের দুঃখােপশমের জন্য শ্রম করিতেছেন। ৪৮। মহার্ণব হইতে তরঙ্গবিচূর্ণিত নৌকার ন্যায় আমাকে আপনি যে ভবার্ণব হইতে উদ্ধার করিয়াছেন, এজন্য হিতৈষী করুণাশীল গুরু আপনার প্রতি আর কি প্রতিদান করিতে পারি। ৪৯। অনন্তর বাগ্নিশ্রেষ্ঠ মুনি তাঁহার মুক্তিপূর্ণ আস্রব- শূন্যতাসূচক বাক্য শুনিয়া এরূপ বাক্য বলিলেন যাহা একমাত্র ঘন (বুদ্ধদেবই ) বলিতে পারেন। হে ধীম, কৃতাৰ্থ পরমার্থবিৎ কৃতী তুমিই একমাত্র এই কথা বলিতে পার। যে মহাবণি কান্তার অতিক্রম করিয়া ধনলাভ করিয়াছে সেই ব্যক্তিই যেমন গুল্মস্থানাধিপতির উৎকর্ষ বলিতে পারে। ৫১। কৃতী “অ” যেরূপ শান্তচিত্ত বৃষশাবকতুল্য মানবসমূহের সারথি-তুল্য (অথবা নরশ্রেষ্ঠ সারথি ) বুদ্ধের সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করে, অন্য লােকে বুদ্ধিমান্ হইলেও এবং সত্য দর্শন করিলেও সেরূপ জ্ঞানলাভ করিতে পারে না। ৫২। রজঃ এবং তমােগুণের আবরণ হইতে তােমার আত্মা মুক্ত হওয়ায় এ কৃতজ্ঞতা তােমারই মােগ্য। রজো- গুণের প্রকর্ষ লইয়া জগৎ যখন অবস্থিত থাকে তখন জগতে কৃতজ্ঞভাব অত্যন্ত দুর্লভ।

আজ্ঞাব্যাকরণ
১৬
৫৫।
হে ধাৰ্ম্মিক, ধৰ্ম্মান্বয় হেতু যখন আমার প্রতি
তােমার উত্তম ভাব ও অধিগম হেতু কৌশল উৎপন্ন হইয়াছে,
এইহেতু আমার তােমাকে আরও কিছু বলিতে ইচ্ছা হইয়াছে।
ভক্তের মধ্যে যে ব্যক্তি নত সেই ব্যক্তি উপদেশের পাত্র।
৫৪। তুমি প্রকৃত কাৰ্য্যলাভ করিয়াছ, উৎকৃষ্ট গতিলাভ
করিয়াছ, আর তােমার অণুমাত্র কর্তব্য নাই। ইহার পর,
হে সৌম্য, তুমি অপর কৃচ্ছ যুক্ত প্রাণিগণের মােসাধনেচ্ছায়
অনুকম্পা সহকারে বিচরণ কর।
অধম ব্যক্তি ইহলােকের বিষয় লাভের জন্যই
কাৰ্য করে, মধ্যম ব্যক্তি ইহলােক এবং পরলােকে এই উভয়
লােকের কাৰ্য্য উদ্দেশে কাৰ্য্য করে, (অন্য) মধ্যম ব্যক্তি
পারলৌকিক ফলের জন্যই কাৰ্য্য করে। কিন্তু বিশিষ্টধর্মযুক্ত
ব্যক্তি সেরূপ কাৰ্য্য করে যাহাতে তাহার আর আবৃত্তি
হয়।
৫৬। যে ব্যক্তি উত্তম নৈষ্ঠিক ধৰ্ম্ম লাভ করিয়া সুগচিন্তা
করিয়াও পরের প্রতি শমােপদেশ দান করিতে ইচ্ছু থাকে
সেই ব্যক্তি উত্তম অপেক্ষাও উত্তম।
৫৭। অতএব হে স্থিরচিত্ত, নিজ কার্য পরিত্যাগ করিয়া
পরের কাৰ্যেও মনােযােগ কর। সমস্ত প্রাণী তমােবৃতাত্মা
হইয়া ভ্রমণ করিতেছে। এই মােহাবস্থায় শাস্ত্রজ্ঞান-রূপ প্রদীপ
প্রকাশ কর।
৫৮। তুমি যখন ধর্মোপদেশ দান করিতে থাকিবে তখন

১৬৪ সৌন্দরন কাব্য . . সকলে বিস্মিত হইয়া এই কথা বলুক যে—কি আশ্চর্য্য! রাগবান্ নন্দ আজ মুক্তির জন্য উপদেশ দিতেছে। ৫৯। নিশ্চয়ই তােমার মনােরথ হইতে নানাবিষয় অপক্রান্ত হওয়ায় তােমার চিত্ত অস্থির হইয়াছে। ইহা শুনিয়া তােমার গৃহে অবস্থিত বধূও তােমার অনুকরণ করিয়া স্ত্রীগণের নিকট বিরাগের কথা বলিতে থাকিবে। ৬০। তুমি পরম ধৈৰ্যসম্পন্ন হইয়া তত্ত্বে নিবিষ্ট হইয়াছ বলিয়া তােমার স্ত্রীও নিশ্চয়ই ভবনে থাকিয়া শান্তি লাভ করিবে না, যেমন পরীক্ষক ব্যক্তির মন শম দমাদি দ্বারা বিবেক প্রাপ্ত হইলে কামসুখে রতি প্রাপ্ত হয় না। ৮১। এইরূপে পরমকারুণিক বুদ্ধদেবের বাক্য ও চরণ সমকালে শিরের দ্বারা ধারণ করিয়া স্বস্থ প্রশান্তচিত্ত নিবৃত্ত- কৰ্ম্মা নন্দ মদশূন্য করীর ন্যায় তাহার পার্শ্ব হইতে চলিয়া গেলেন। ৬২। পরে যথাকালে ভিক্ষার নিমিত্ত নগরে প্রবেশ করিয়া লােকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া, লাভ অলাভ, সুখ অসুখ, প্রভৃতি বিষয়ে সমজ্ঞানী, স্বস্থেন্দ্রিয় নিস্পৃহ সেই ব্যক্তি লােকের প্রার্থনায় মােক্ষের কথা বলিলেন। উন্মার্গগামী কাহাকেও নিন্দা কিম্বা আত্মার উৎকর্ষ প্রকটন করিতেন না। সৌন্দরনন্দ কাব্যে অষ্টাদশ সর্গ সমাপ্ত

আজ্ঞাব্যাকরণ
৬৩। আমি কাব্যচ্ছলে যে এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছি ইহা
অন্যাসক্ত শ্রোতার জ্ঞানের জন্য। ইহা রচনার কারণ
শান্তিলাভ, রতি নহে, যেহেতু ইহার গর্ভে মােক্ষাৰ্থ রহিয়াছে।
ইহাতে মােক্ষের বিষয় ভিন্ন অপর যে বিষয় আমি নিবদ্ধ
করিয়াছি তা কেবল কাব্য রক্ষা করিবার জন্য। যাহাতে
তিক্ত ঔষধও মধু-সম্পৃক্ত বলিয়া লােকের
লােকের মন আকর্ষণ
করিতে পারে।
৬৪। প্রায় লােককেই বিষয়াসক্ত মােক্ষভ্রষ্ট দেখিয়া
কাব্যচ্ছলে আমি মােক্ষের উদ্দেশে তত্ত্ব প্রকাশ করিয়াছি।
অতএব ইহাতে শম ভাবের যে বস্তু আছে উহা অবধান সহকারে
গ্রহণ করিতে হইবে, বিশ্বাস নহে,-যেমন ধাতুজ ধূলি হইতে
স্বর্ণ গ্রহণ করিতে হয়, ধূলি নহে।

No text on this page.

নির্ঘণ্ট অনুরুদ্ধ ১৪১ অশ্বজিৎ ১৪১ আঙ্গিরস ১ ইক্ষাকু ৩ ইন্দ্ৰধ্বজ ৩৪ গয়া ২২ গার্গ ৪ গিরিব্রজ ৬, ২২ চক্রবাক ২৭, ৪৭, ৪৮ চক্রবাকী ২৭, ৪৮ তথাগত ৩১ উর্ব ৪ ঐরাবত ১৭ তুষিত ১৭, ১৮ নন্দ ১৮, ১৯, ২৮, ৩১, ৩২, ৩৪, ৩৫, ৩৮, ৪০ ৪৩, ৫২ ১৪১, ১৪৩ পারাবত ৪৫ কৰ ৪ কপিল ১, ৫, ৮ কক্ষিত ১ কাত্যায়ন ১৪১ কারণ্ডব ৩০ কাশী ২২ কাশ্যপ ১, ১৪১ কৌণ্ডিল্য ১৪১ শাক্য ৪, ৩৫, ৫০ শান্তনু ৫৮ শ্যেন ৪৮, ৫৩, ৯৪ হিমালয় ১

[ ২ ]
বশিষ্ট ১
বারাণসী ২১
বাল্মীকি ৪
মহামহাকাশপ ১৪১
মাধবীলতা ৫৩
মান্ধাতা ৯৫
বাসুভদ্র ৪
রাজগৃহ ১৯
বুদ্ধদেব ২২, ৩৫, ৩৭, ৪০, রাজর্ষি ৩৯
৪৬, ১৬২
রাজহংস ৩৩
ভরত ৪
রাম ৪
ভাগব ৪
লব ৪
মধ্যদেশ ১৯
লক্ষী ১৪

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Soundarnanda Kabya

Author
Laha ,bimalacharan
Title
Soundarnanda Kabya
File name
Soundarnanda Kabya
Text
OCR done
Citation
1922
Published
2010/01/8
Publisher
Gurudas Chattopadhyay And Sons , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
192
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essays
Keywords
Kabya
DLI number
511464
Barcode
4990010018608.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
g2rtiUzMaZ5
Download PDF

Soundarnanda Kabya