Bally Sadharan Granthagar
Naba Malancha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ܪܙ
܀
ܐ
No text on this page.
রমলথ প্ররকের স্থান
আষাঢ় ১৩৫৩
প্রকাশ করেছেন
রণেন্দ্র কুমার শীল
পর্ণ কুটার
৬, কামার পড়া সেন
বরাহনগর
মুত্রন করেছেন
গৌরহরি দাস
পর সে
১৯, গ্রেট,
কলিকাতা
প্রচ্ছদপট শিল্পি
গনেশ বন্ধু
প্রদপট মুদ্রন
নিউ গয়া আট প্রেস
টাকা চার আনা
প্রবােধ কুমার সান্যালের অন্যান্য বই- দেবাত্মা হিমালয়, তুচ্ছ, আঁকাবাঁকা, হাসুবানু, বনহংসী, মহাপ্রস্থানের পথে, দেশ দেশান্তর, নদ ও নদী, উত্তরাকাশ, কাদামাটির দুর্গ, অরণ্যপথ, শ্যামলীর স্বপ্ন, পুষ্পধনু ইত্যাদি।
এই ছােট উপন্যাসটি কয়েক বছর আগে চলচ্চিত্রে
রূপান্তরিত হয়, এবং তখন এর গল্পাংশের সঙ্গে
শৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায়ের অনেকটা যোগাযােগ
ঘটেছিল। চলচ্চিত্র নির্মাণ কালে সেই সময়ের
এয়ােজনে আমি এর যে-নামকরণটি করেছিলুম,
সেটি তৎকালে আমার পছন্দসই হয়নি। এই গ্রন্থের
মূল কাহিনীটি পাঠক সমাজের প্রিয়, সেইজন্যে তার
সঙ্গে নূতন শিরােনামটি দেবার সুযােগ পেয়ে আমি
খুসী হতাম।
প্রবােধ কুমার সাঙ্গাল
মরমালঞ্চ
No text on this page.
গ্রামের নাম চন্দনডাঙ্গা। ছােট গ্রাম-রেলস্টেশন থেকে অনেক
দূরে। সেই গ্রামের যিনি জমিদার তার বালিকা কন্যার নাম
সুরবালা। সেই মেয়েটির একটি সহচরী ছিল—তার নাম সূর্যমুখী।
সূর্যমুখী গরীবের মেয়ে।
পুতুল খেলা নিয়ে দুজনের ভালবাসা হয়, ঝগড়া বাধে, গল্প চলে
—কিন্তু যা কিছুই হয় সবই সূর্যমুখীদের বাড়ীতে। সূর্যমুখীদের
বাড়ীটি প্রাচীন। আগে তাদের জমি জায়গা কিছু ছিল, কিন্তু দেনার
দায়ে সব গেছে। এখন কষ্টে দিন চলে।
সেদিন দুপুর বেলা দুজনে খেলা করছে। সূর্যমুখী নিজের
পুতুলটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে আপন মনেই বলে, বাঃ কেমন মানিয়েছে,
এবার বলত? মাথায় সােনার মুকুট, চাঁদের মালা দুলছে গলা,
এবার ময়ুরপঙ্খী রথে চড়ে যাবি আনন্দ-সরােবরে—
সখীরা যাবে সঙ্গে কেমন?-ইস অমনি মেয়ের রাগ হল
বুঝি?—আচ্ছা, আচ্ছা, বেশত,
পাহাড়, পৰ্বত, নদী পেরিয়ে যাবি অনেক-অনেক-দূরে, নিজের
মনে যেতে যেতে দেখবি ? সেই এক গভীর বন—সেখানে কাঠ,
কাটতে এক কাঠুরিয়া-সে ঘুমিয়ে আছে বনে-মােনার স্বপনের
মতন তার ঘুম!-রাজপুতুরের মতন তার রূপ—তাকে জাগিয়ে
তুলবি, তারপর হাসিমুখে তার গলায় মালা দিবি কেমন?
ওপাশে বসেছিল সুরবালা। সেও নিজের মনে বলে উঠে
কাঠুরিয়া কেন ভাই, আমার এমন রাজপুত্তয়—এর গলায় তাের
মেয়ে মালা দেবে না।
-
সূর্যমুখী বলে, না ভাই আমরা গরীবড় লােকের বাড়ী মেয়ের বিয়ে আমি দেবােনা। সুরবালা বলে, কেন শুনি ? সূর্যমুখী বলে, তােদর যে টাকা বেশী, তােরা নাক উচু করে, থাকিস। সুরবালা এগিয়ে এসে একটু উষ্ণকণ্ঠে বলে, বড়লােকের ওপর তাের এত ঘেন্না, আর যদি তাের মেয়ের বিয়ে একদিন হঠাৎ বড়লােকের ঘরেই হয় ? সূর্যমুখী জোর দিয়ে বলে ওঠে, না কিছুতেই না, আমার মেয়েও হবেনা, তার বিয়ের কথাও উঠবে না। সুরবালা বলে, জোর করে বলছিস, মেয়ে হলে বড় লােকের ধরে দিবিনে? সূর্যমুখী বলে, হঁ্যা, জোর করেই বলছি-- সুরবালা বলে, তবে ভাই কাল থেকে আর তােমাদের বাড়ী আসবাে না।—সুধু সুধু বড়লােক বলে গাল দেওয়া—কি দোষ করেছি শুনি?—এই রইলাে ভাই তােমার পুতুল সূর্যমুখী মুখ ফিরিয়ে বলে, বড়লােকের ঘরে বিয়ে হলে মান থাকে না তা জানিস? সুরবালা বলে, আমার বাবা বড়লােক, মা বড়লােক-তাতে আমার কি ? সূর্যমুখী বলে, তুইও বড়লােক হবি একদিন। সুরবালা বলে, তা যদি হই হবে।কিন্তু আমরা দুজনে সই পাতিয়েছি—আমি তাের সই—তাের মেয়ে আসবে আমার ছেলের ঘরে—এর মধ্যে বড়লােক আর গরীব লােকের কথা আসে কেন ভাই- সূর্যমুখী আপত্তি করে বলে, না ভাই, শকুন্তলা যখন রাজা
দুষ্মন্তের দরবারে গিয়েছিল, রাজা তখন বউ বলে চিনতেই পারেনি
—ওতে আমি রাজি নই।
সুরবালা নিশ্বাস ফেলে বলে, বেশ মনে রেখােসইকে
তাড়িয়ে দিলে তুমি! আমিও আড়ি দিয়ে গেলুম!—এই বােলে
সে এগােয়। দরজার কাছ থেকে পুনরায় ডাকে, সই—এই
সূর্যমুখী।
সূর্যমুখী মুখ তুলে তার দিকে তাকায়।
সুরবালা এগিয়ে আসে, বলে, হঁা ভেবে নিয়েছি সব এবার ঠিক
হয়েছে, তােরই জিত-বুঝলি?
কি শুনি?
সুরবালা গুছিয়ে বলে, আচ্ছা ধর তাের ছেলে আর আমার
মেয়ে—তাহলে আর দোষ নেই ত? এবার বিয়ে দিবিত? কেমন ?
সূর্যমুখী একমনে কী যেন ভাবতে থাকে।
সুরবালা বলে, চুপ করে রইলি যে?মত আছে ত? আমার
মেয়ে আর তোর ছেলে।
সূর্যমুখীর মুখে হাসি ফুটে উঠে, বলে, আমার ছেলেকে কী দিবি
বল? অর্ধেক রাজত্ব-হাতীশালা-ঘােড়াশালা
সুরবালা বলে, কুবেরের ভাণ্ডার-ঢাল-তরােয়ালসােনার
পালঙ্ক-হীরে-জহরৎ-জড়ােয়া-কেমন, এবার রাজী ত’? বল
e
মুখ ফুটে।
সূর্যমুখী গম্ভীর কণ্ঠে বলে, এতে অবিশ্যি রাজী হওয়া যায়।
সুরবালা বলে, বাবারে কী একগুয়ে মেয়ে তুই আমার মাথা
হেঁট করালি তবে ছাড়লি—তুই ঠিক দজ্জাল শ্বাশুড়ীহবি—
সূর্যমুখী বলে, এইনে তাের মেয়ে নে, মালা বদল করে দে—এই
ত বিয়ে হয়ে গেল। শিগগীর শাক বাজা সুরবালা
সুরবালা তার খেলা ঘরের শখটি নিয়ে বাজাতে লাগলাে।
তারপর অনেককাল চলে গেছে। সুরবালা আর সূর্যমুখী
উভয়ের বিয়ের পর কে কোথায় চলে গেছে তার ঠিক নেই।
সুরবালা এখন বড়লােকের বৌ। তার একটি মেয়ে হয়েছে বছর
সাতেক আগে। সেদিন তাদের বাড়ীতে তার বালিকাকন্যার জন্মতিথি
উপলক্ষে মস্ত ঘটা। চারিদিক থেকে নিমন্ত্রিত অভ্যাগতরা এসেছেন।
এখানে ওখানে জটলা। গুঞ্জনরত জনতা। ওদের মধ্যে সমাগত
দুটি লােক বাড়ীর বাইরে দাড়িয়ে বলাবলি করছিল। একজন
বললে, আদিখ্যেতা—এ যা দেখছে এসবই আদিখ্যেতা।
আদিখ্যেতা করবে না কেন বলাে? জমীদারের একটি মাত্র
মেয়ের জন্মতিথি। ' আদিখ্যেতা করবে না কেন শুনি?
তা যা বলেছ! এ আর তােমার আমার ঘরের মেয়ে নয় যে
কন্যাদায়ে কপাল চাপড়াবাে।
অন্দর মহলেও সমান অবস্থা। ওপাশে কয়েকটি স্ত্রীলােক
আনাগােনার পথে দাড়িয়ে বলাবলি করছে। এ আর এমন কী
ঘটা দেখছ। মনে আছে আমার মামাত ননদের ভাসুরঝির
ভাতের ঘটা?—বল না রে
অপর জন বলে, বলতে গেলে গায়ে কাঁটা দেয়। ঠাকুর দেবতা
সাক্ষী ছিল।
জন দুই স্ত্রীলােক এগিয়ে এসে বলে, কি--কি-কি রে ?
দ্বিতীয় স্ত্রীলােকটি বলে, তবে শােন্ ভাই বলি। ঘটার চোটে।
মেঘ ডেকে উঠলাে।
-ওমা তাই নাকি?
-হ্যালাে, হঁ্যা। তার কাছে তােদের এই ঘটা তাদের তুল্য
জোনাকী।
সিড়িতে পায়ের শব্দ শােনা যায়। কেউ বােধ হয়
আসছে।
-ওমা, ঠ্যালা মেরে যাও কেন গা? অংশারে চোখে দেখতেও
পাও না! তােমরা না হয় বড়লােক, আমরাও বিনি নেমন্তনে
আসিনি!পরের গয়নায় বড়মাষি••••সিড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে
বলে দ্বিতীয় স্ত্রীলােকটি।
অলঙ্কার পরা স্ত্রীলােকটি কটাক্ষে একবার তাকিয়ে ভিতর দিকে
চলে গেল।
ভিতরে যেখানে আয়ােজন চলেছে সেখানেও বহুলােকের ভীড়।
গ্রামের ইতর ভদ্র সকলেই এসে উপস্থিত। ভিতর থেকে একটি
মেয়ে আস্তে আস্তে বললে, হঁ্যা মা, তুমি যে বললে, এখানে এলেই
পানতুয়া দেবে ?
দাতে দাত চেপে পুটির মা বলে, কৈবল খাই খাই! বলছিনা
একটু সবুর কর!—এই বলে মেয়েটাকে একটা ঝাঁকুনি দেয়।
এক ঝোড়া ফল-পাকড় মাথায় নিয়ে একটি লােক ভীড় ঠেলে
ভেতরে ঢুকে বললে, ওগাে একটু সরে বাপু তােমর
আর একজন আসছিল দই ও মিষ্টান্নের ভার নিয়ে। সে এসে
ভীড় সরিয়ে এক জায়গায় তার ভার নামালাে। এবং তারও
পিছনে আর একটি লােক একটি রংচঙে চোরীতে একরাশী নানাবিধ
খেলনা নিয়ে এসে প্রবেশ করলাে। খেলনা দেখে ছােট ছেলে
মেয়েরা হৈ চৈ করে উঠলাে।
খিড়কির পথ দিয়ে একটি স্ত্রীলােক ভিতরে এসে সবিনয় কুণ্ঠায়
এক বর্ষীয়সী মহিলাকে বললে, এটি আমি বোমার মেয়ের হাতে দিতে
এম মা-
বর্ষীয়সী মহিলাটি বললেন, আচ্ছা ডেকে দিই। রে সুরবালা-
তাের মেয়ের জন্যে কি-এনেছে-নে-
সুরবালা দূর থেকেই বললে, ওখানেই রেখে যাওয়া বাপু।
একটি মেয়ে তার জবাব শুনে তখনই বললে, ওমা দেমাক
দ্যাখাে-বড়লােকের বউ বলে-
এমনি সময়ে সেই সুসজ্জিতা স্ত্রীলােকটি ভিতরে এলেন।
এবাড়ীর বৌ সুরবালা তাকে অভ্যর্থনা করে বললে, এসস পােন্দার
গিন্নি•••এত দেরী যে?
পােন্দার গিন্নি বললে, আর বলল কেন দিদি ? লােহার সিন্দুকের
চাবিটা-খুজে পাচ্ছিলুম না। পরের গয়না নিয়ে কারবার কিনা-
যাকে উপলক্ষ করে আজকের এ অনুষ্ঠান, 'এত আয়ােজন।
সুরবালার সেই মেয়েকে তার পিশিমা ওধারে খাওয়াতে বসেছেন।
সুরবালার মেয়ে ভােজনের আসন থেকে বলে উঠলো, না, না,
আর আমি খেতে পারবাে না! এত কি খাওয়া যায় ?
পিসিমা বললে, লক্ষ্মীটি, এই ক্ষীরটুকু মুখে দাও মা?
সুরবালা হাসিমুখে বলে, ও সব খেয়ে খেয়ে আমার মেয়ের মুখে
অরুচি, পিসিমা।
পিসিমা বললে, তা হােতূ আজ একটু মুখে দিতে হয় ! এসাে
মা লক্ষ্মীটি, মুখে দাও!
মেয়েটি বিরক্ত হয়ে বলে, না--এই বলে সে দাড়িয়ে ওঠে,
খালি ক্ষীর, আর সর, আর সন্দেশ! ও আর আমি খাবাে না-
এই বলে সে একদিকে ছুটে চলে যায়।
পিসিমা হাঁ করে চেয়ে থাকেন।
অনেককাল পরে সূর্যমুখীর খোঁজ পাওয়া যায়। একটি গরীব পাত্রের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু তার স্বামী যখন সবেমাত্র ভাগ্য পরিবর্তন ক'রে উঠছে, এমন সময় একটা কলেরায়ােগে তার মৃত্যু ঘটলাে। সূর্যমুখী অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে তার একটিমাত্র ছেলেকে নিয়ে দিন কাটায়। ছেলেটির নাম মানিক। মানিকের প্রায় দশ- বছর বয়স। একদিন খেতে বসে মানিক হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলাে, না, কিছুতেই খাবােনা, ও আমি কিছুতেই খেতে পারবো না, তোমাকে বলে দিলুম—এই বলে ভাতের থালাটা সে ছুড়ে দেয়। সূর্যমুখী বলে, ছি মানিক, কত কষ্টে রাঁধলুম, খেয়ে নাও বাবা, লক্ষ্মীটি। মাণিক বলে, ছাই রাঁধলে, রাঁধলে কি শুনি? কই এত’, সবই ফ্যাণ-এর মধ্যে ভাত কোথায়, দেখাও দেখি ? সূর্যমুখী বলে, ওমা, কী অবুছ তুই মাণিক? তােকে দেখিয়ে তখন চাল দিলুম হাঁড়িতে ? মাণিক বলে, কই দেখালে ? সে কি চাল ? সে ত ক্ষুদ আমি কি গরু যে ক্ষুদ সেদ্ধ খাবাে?—আর এটা কি শুনি? এই ঘাস চচ্চড়ি খাবে কে? যত রাজ্যের কুটনাের খােসা, আর মটর শাকের ডাঁটা—এ মানূষে খায়? নিশ্বাস ফেলে সূর্যমুখী বলে,—আর কোথায় কি পাবনা বাবা- আজকের দিনটাও চললল, কাল থেকে আর চলবে না। মাণিক বলে, না, চলবে না। না চললে তুমি কি করবে শুনি? কই তুমি কি রাঁধবে নিজের জন্যে, দেখি?
সূর্যমুখী বলে, আচ্ছা, তার জন্যে তাের ভাবনা নেই, তুই
খা-বিধবার রান্না কি দেখতে আছে, বাবা-তে যে ঠাকুরের
ভােগ হয়!
মাণিক কী যেন কতক্ষণ চিন্তা করে। তারপর ডাকে, মা?
সূর্যমুখী বলে, কি বল ?
মাণিক বলে, তুমি আর ক’দিন উপােস করবে শুনি?
সূর্যমুখী বলে, আ বােকা ছেলে ! জানিসনে, তাের কল্যাণে
আমাকে উপােস করিতে হয় ?
মাণিক বলে সে ত’ ষষ্ঠীর দিনে তুমি না খেয়ে থাকে।
ছেলে মানুষ, কিছুই জানিস নে তুই। ষষ্ঠি, মহাসপ্তমী, অশােক
অষ্টমী, রাম নবমী, ভীম একাদশী-কতদিন উপােস করতে হয়, বাক !
তুমি মিছে কথা বলছ কেন মা?
সূর্যমুখী বলে, বেশ ত, তুই যখন বড় হয়ে বলবি, তােমাকে আর
উপােস করতে দেবাে না'মা, সেদিন থেকে আর উপােস করবে না।
মাণিক বলে, আমি কিন্তু বলে রাখলুম মা, বাবুদের পেয়াদা যদি
এসে আবার খাজনা চেয়ে তােমাকে কিছু বলে, আমি ঠিকবলছি-
কাঁকর ছুড়ে ওর চোখ কানা করে দেবাে। আমাকে চেনে না !
সূর্যমুখী বলে, চুপ, চুপ, ওকথা বলতে নেই মাণিক। এখানে
থাকাও আর চলছে না, তােকে নিয়ে এখান থেকে কবে যাব তাই
ভাবছি। ওদের সঙ্গে যেন আর ঝগড়া করতে যাসনে, বাবা।
মাণিক চেঁচিয়ে বলে, তাই বলে তােমাকে অপমান করে
যাবে মা?
সূর্যমুখী যেন একটু অস্থিরভাবে বলে, তুই তাড়াতাড়ি বড় হয়ে
ওঠ, তাহলে আর আমাকে কেউ অপমান করবে না !
মাণিক বলে, আচ্ছা মা-
সূর্যমুখী বলে, কেন রে?
মাণিক বলে—আজ তােমার কিসের উপােস মা?
সূর্যমুখী বলে, আজ বলছি—দাড়া—এই বলে সে উঠে
দাড়ায়, মনে মনে কী যেন খোঁজে, তারপর বলে, কি যেন একটা
ঠিক মনে পড়চেনা—তুই খেয়ে নে, মাণিক। মাণিক এতক্ষণে
সমস্তটাই বুঝতে পারে। দেখতে দেখতে তার চোখে জল নেমে
আসে। সূর্যমুখীও অলক্ষে চোখের জল মােছে।
এমন সময় বাইরে থেকে কার যেন মােটা গলার আওয়াজ, এবং
কয়েকটি বালক বালিকার কলরব শােনা যায়।
সূর্যমুখী দরজার দিকে তাকায়।
কই গাে, বৌমা ? বৌমা কোথায় গাে? বলতে বলতে একটি
বুড়ো লােক একেবারে বাড়ীর উঠানে এসে দাড়ালাে। সূর্যমুখী
মাথায় ঘােমটা টেনে দিয়ে হতভম্বের মত তাকিয়ে থাকে। লােকটি
বলে—এই যে বৌমা, এই তােমাকেই খুঁজছিলাম। আর বলল
কেন, তােমার ভরসাতেই আসা! চিনতে পারলে না ত? তা
পারবে কেন! কোনদিন ত দেখনি। আমি সম্পর্কে তােমার খুড়
শ্বশুর গাে। আ কপাল, মানষের কুটুম এলে-গেলে !-যাওয়া-আসা
ত’ আর নেই, তাই অচেনা—তা হবে বৈ কি!-আসছিলুম মাঠ
পেরিয়ে, গায়ে ঢুকে দেখি কিছুই চিনিনে। তারপর বাউরী
পাড়ার একটি মেয়ে এই চালাটা দেখিয়ে বলে গেল, তুমিই অধর
চাটুৰ্য্যের বউ সূর্যমুখী! কেমন চিনে-চিনে এসে পড়েছি বলে দিকি,
বৌমা ?
,
দম নেবার জন্যে লােকটি বােধ হয় থামে।
ওদিকে পাঁচটি ছেলে মেয়ে তখন ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো
হামলাচ্ছিল। বুড়াে সেদিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠে, এই—এই—হাত
দিসনে, ওকে খেতে দে। দেখাে, দেখাে, যেন কুকুর বাচ্চার দল।
আর বলােনা বৌমা, দামােদরের বানে গেল গ্রাম ভেসে। বউটা মরে
গেল ওলাওঠায়—ছেলেমেয়ে কটাকে নিয়ে কোথায় আর যাই- ভাবলুম, হাজার হক, বাপ পিতে মাের ভিটে—তুমিও আই এখানে—তাই-এটি কে, তােমারই ছেলে বুৰি বৌমা? বেশ, বেশ—তােমার শ্বশুর ছিল আমার জ্যাঠতুতাে খুড়াের সততা ভাই—তাহলেই হােলােকর্তা-মার সেজছেলের পিসতুতাে ভায়রা- সবই, মানে—ওই সবই—নিজেদের জ্ঞাতি গােষ্ঠির মধ্যেই, বুঝলে বৌমা ? তা যাই হােক, আজ থেকে আমরা এখানেই থেকে গেলুম, বৌমা-হেঁ হেঁ—সবই আপনা আপনি ত! সূর্যমুখী যেন পাথরের মত দাড়িয়ে সব শুনছিল। সহসা নিরুপায়ের মত সে তাকালাে। মাণিক এবার হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলাে। বললে, বা রে, থাকবাে বললেই হলাে। এখানে কোথায় থাকার জায়গা? আলাদা ঘর কই, শুনি? বুড়াে বচক্ষে বলে, হু, ছেলেটি তােমার ভারি মুখােড় দেখছি। তা হবেনা কেন বলল রৌমা—চাটুয্যে বাড়ীর ছেলে, জাত সাপের বাচ্চা, বিষ ত থাকবেই! ওদিকে ছেলে মেয়েগুলাে তখন প্রবল কলরবে এদিক ওদিক হাট বাধিয়েছে। বুড়াে আবার বলে, তা শােনাে বৌমা, এই ঘরটাতেই যা হােক করে আমাদের চলবে, চালায় চারটি খড় ছেয়ে নেবােখন। আর- ওই ত’ তােমার উনুনটা—যা হােক করে মিলে-মিশে থাকতে হবে বৈকি। কই, চিড়ে মুড়কি চারটি আছে নাকি-দাও দেখি বৌমা, শকুনিরা ছিড়ে খেলে। সূর্যমুখী মৃদুস্বরে বলে, ঘরে কিছু নেই। বুড়ো বলে, নেই। তবে এক কাজ করে। হাঁড়িটা চড়িয়ে চারটি চাল, নাও দেখি? পাঁচটা ছেলে মেয়ে—পাঁচ পাে চাল নিলেই হবে। আর আমার জন্যে পােয়া তিনেক—মানে, সের দুই চাল- মাণিক চোখ পাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে, চাল আসবে কোখেকে শুনি? - বুড়াে বলে, বাপরে, তােমার ছেলেটার কী রােখ দ্যাখাে বৌমা। সঁতের বিষ নেই, কিন্তু ল্যাজের ঝাপটায় ধুলো ওড়ে। মাণিক বলে, আমাদের এইটুকু ঘরে থাকবে কোথায় তােমরা ? খাওয়াবেই বা কে? চাল অমনি হাঁড়িতে দিলেই হােলাে! বুড়াে বলে, হুম্। জ্ঞাতগুষ্টির ছেলে কিনা- হবেই ত ! বুঝলে বৌমা, নেয্য অধিকার নিতে এলেই বন্ধু বিগড়ােয়—এ জানা কথা! কিন্তু একটি কথা বলে রাখি, ছেলেকে তুমি লেলিয়ে দিয়ে আমার কিছু করতে পারবে না, আমি সে বান্দা নই। তার চেয়ে ভালোেয় ভালােয় আমাদের ঘর দোর ছেড়ে দাও, বৌমা। মাণিক দাড়িয়ে উঠে বলে, আমার মাকে এসব কথা বলে শাসিও বলছি—ভালাে হবে না-- বুড়াে বলে, কি করবি রে তুই আমার ছোড়া? এই ব'লে বুড়ােটা একটু এগিয়ে আসে। সূর্যমুখী আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। মাণিক বলে, যা করবে তা আগে থেকে বলবাে না! বুড়াে বলে, এ যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা। একটি চড়ে এখনি বংশের বাতি নিবিয়ে দেবাে। খবরদার- মাণিক মরিয়ার মত বলে ওঠে, কী বললে ? কি বললে শুনি? এই বলে সে একখানা হাত নিয়ে মারমুখী হয়ে দাড়ায়। সূর্যমুখী তখন ছুটে এসে ছেলেকে ধরে বলে, মাণিক, ছি-ছি বাবা- লক্ষীটি গুরুজনের সঙ্গে এমন করতে নেই-দে, ছাড়হাতা ছেড়ে দে- .
মানিক তখন রাগে কাঁপছে। সূর্যমুখী তখন ঘােমটা টেনে
মিনতির সুরে বলে, ও ছেলে মানুষ, আপনি কিছু মনে করবেন না।
আপনার সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে, আপনি ভাববেন না।
বুড়া বলে, বেশ আমি ততক্ষণ বাইরে বসিযা হয় ব্যবস্থা
একটা করে দাও,-তােমার স্বামী শ্বশুরের ভিটে, তুমি এখানকার
ঘাট-পথ সবই জানাে বৌমা। বানের জলে ভাসতে ভাসতে কুটো
ধরেছি, বুঝলে? এ-কুটো কি আর সহজে ছাড়বাে? বলতে বলতে
লােকটা একটু বাইরের দিকে এগিয়ে যায়।
এই
সেদিন সমস্ত বিকাল সন্ধ্যা রাত বসে বসে সূর্যমুখী কত কি
ভাবলাে। কিন্তু আর কোন উপায় নেই। স্বামী আর শ্বশুরের
ভিটে ছেড়ে তাকে চলে যেতেই হবে। অবশেষে শেষ রাত্রের
দিকে সূৰ্য্যমুখী উঠে বসলাে। ভাের হতে আর দেরী নেই!
বেলা বেরিয়ে না পড়লে চলবে না। মানিক পাশে অকাতরে
ঘুমিয়েছিল। সূর্যমুখী তার গা নেড়ে ডাকলে, মানিক-মানিক
আর ঘুম নয়, বাবা–ওঠ—
মানিক উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বললে, কেন মা?
সূর্যমুখী বলে, চল, খানিক রাত থাকতে থাকতে আমরা বেরিয়ে
পড়ি, বাবা।
মাণিক বলে, কোথায় যাবাে মা?
সূর্যমুখী বলে, চল আগে বােনােই,তারপর বলব- গায়ে
জামাটা দে। মানিক প্রস্তুত হয়ে নিল। সূর্যমুখী সজলচক্ষে এদিক
ওদিক তাকিয়ে বললে, না নেবার কিছুই নেই—চল বাবা বেরিয়ে
পড়ি। ভােরের ঝাপসা অন্ধকার থাকতেই মা ও ছেলে পথে
বেরিয়ে পড়লাে।
প্রথমটা তাড়াতাড়ি তারা হাঁটতে লাগলাে। তখনও আলাে
ফোটেনি। আকাশের তারা তখনও ঝলমল করছে। উপরের
আকাশে সেই ধ্রুব তারাটির দিকে তাকিয়ে সূর্যমুখী ক্রন্দন কম্পিত
কণ্ঠে বললে,তােকে মানুষ করে তুলবাে, তুই একদিন বড় হবি
মানিক—তুই মায়ের সব দুঃখ ঘােচাবি—তাের মাথা যেন সকলের
উচুতে ওঠে।
মাণিক বললে, মা ?
কেন রে ?
কোথা যাবে বললে না ত ?
চল না, সইয়ের কাছেই যাই—তার কাছে গেলে আর আমাদের
কোনাে ভাবনাই থাকবে না। আমার সেই সইয়ের গল্প কি তাের
মনে নেই ?
মাণিক একটু থেমে এক সময়ে বলে, তুমি যে বাবাকে বলতে,
তােমার সইয়ের কাছে কিছুতেই যাবে না। তবে আবার যাচ্ছ
কেন শুনি ?
সূর্যমুখী বলে, চল মানিক, দাড়াসনে-
ক্রমে ভাের হয়ে আসে। দিনের আলাে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
পাখীরা গান গাইতে থাকে। কৃষকরা লাঙ্গল গরু নিয়ে মাঠের
দিকে যায়। মা ও ছেলে অনেকদূর পথ হাঁটতে থাকে। এক সময়
আপন মনে সূর্যমুখী বলে, যেতে ইচ্ছে ছিল না রে, কিন্তু যাচ্ছি
তােরই জন্যে বাবা।
মাণিক বলে, আমার জন্যে ? কেন মা?
তােকে মানুষ করে তােলবার আর আমার কোনাে উপায়ই
নেই, মাণিক।
মাণিক বলে, তাই বলে তুমি যাবে তােমার সইয়ের কাছে হাত
দূরে একটি মন্দিরের দিকে তাকিয়ে সূর্যমুখী বলে, হাত পাতবাে
কেন, বাবা! তুই তাে জানিসনে মানিক•••আমাদের দুজনে কত
ভালবাসা কতদিনের কত .•••তার কাছে গেলে আমি ছােট
হবে না।
মানিক বলে, মা?
সূর্যমুখী মুখ ফিলল।
মাণিক বলে, গিয়ে কি বলবে, তােমার সইকে ?
সূর্যমুখী বলে, বলতে হবে কেন রে? সে কি বুঝবেনা?—চল
বাবা, সইয়ের ঠাকুর বাড়ী এসে পড়লো বলে—চল—
সূর্যমুখী মানিককে কতকটা যেন টেনে নিয়ে সেদিকে চললেন।
বাসন্তীপুর গ্রামে সেদিন রামনবমীর উৎসব। এই উৎসবে গ্রাম
গ্রামান্তর থেকে নরনারী আসে। জমীদারের প্রথা হলাে, প্রথম
রামনবমীর পূজা দেবেন জমীদার গৃহিণী, আর সেই উপলক্ষ্যে
সমবেত দরিদ্র স্ত্রী-পুরুষ বালক-বালিকাগণকে তিনদিন আহার ও
বাসস্থান দেওয়া হবে।
মন্দিরে সেদিন বাজনা বাদ্যরব চলছে, এমন সময়ে সূর্যমুখী
ও মাণিক সেই মন্দিরের চত্বরে এসে দাড়ালাে। প্রথমটা তারা
হকচকিয়ে গেল, তারপর যখন শুনলো যে, দিন দুই তিন থাকলে
রাণীমার সঙ্গে দেখা হতে পারে, তখন সূর্যমুখী স্থির করলাে,
૨૨
একটা কিছু সিদ্ধান্ত না হওয়া অবধি তাকে এখানে থেকে
যেতেই হবে।
তিনদিন তাদের একপ্রকার এখানে কেটে গেল। কিন্তু
চারদিনের দিন আর কাটে না। সকলেই বিরক্ত হয়ে উঠে।
সবাই তাদের প্রতি বিরূপ বলে মনে হয়। অন্নজল আর গ্রহণ
করতে হাত ওঠে না। এমন সময় কি যেন একট কথা ঝিকে
জিজ্ঞেস করতেই ঝি ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, ওই নাও-চারদিন ধরে
তােমার ওই একই কথা, বাছ! কতবার বলছি রাণী-মা আজ
আসবেন—আজ যে রামনবমী! ঠিক আসবেন।
সূর্যমুখী সবিনয়ে বলে, কিন্তু এত বেলা হােলল কিনা
কি কটু কণ্ঠে বলে, সে খবরে তােমার কি কাজ? যাও দিকি,
গতরটা একটু নাড়াে! ক’দিন ধরে তােমাদের সেবা করতেই
আমার প্রাণ বেরুলাে। এই বলে সে নিজের কাজে চলে যায়।
সূর্যমুখী নিশ্বাস ফেলে চুপ করে বসে থাকে।
ওদিকে একদল গ্রামের লােক খেতে বসেছে। তার কাছেই
একখানা চৌকীর ওপর ম্যানেজার বসেছে খাতাপত্র নিয়ে। ম্যানে-
জারের হাতে খাতাপত্র, লােকের ভিড়-ভােজের পাত পাতা
ক্ষুধার্ত বালক-বালিকা অন্যান্য নরনারী—সবাই খাবার জন্য লােলুপ
হয়ে পাত পেতে বসে গেছে। ম্যানেজার তার খাতায় নাম দেখে
দেখে তার সঙ্গে লােকজনদের মিলিয়ে নিচ্ছে। এমন সময় ভাতের
গামলা হাতে নিয়ে রাঁধুনি বামুন এসে বলে, নাও, বসসা, বসে যাও
মেরা-
ম্যানেজার একটি বুড়াে লােককে ঠেলে দিয়ে বলে, আচ্ছা, তুমি
যাওলােকটা পাত পেতে বসে যায়।
ম্যানেজার আর একটি লােককে ধাক্কা দিয়ে বলে, হ্যা, তুমিও
তুমি যাও—তুমি-
চারিদিকের জটলার মধ্যে ম্যানেজার সহসা একটি মেয়ের দিকে ফিরে বলে, হাগা বাছা,-তুমিই না সৌদামিনী দাসী? তিনদিন ধরে পেট পুরে খেলে,আবার তবে পাত পাড়তে যাচ্ছ কেন? একি পায়রা মটর ছড়ানাে, যে ঠুকরে খেলেই হলো? যাও যাও—মেয়েটি বাধা পেয়ে কুষ্ঠিত হয়ে একপাশে সরে দাড়ালাে। ম্যানেজার হঠাৎ মানিকের দিকে চেয়ে বলে ওঠে, ওরে -ওই— তুই যে আবার গিয়ে বসলি ? বটে! পাকাল মাছের মতন পিছলে ঢুকে পড়েছ, না? রাখাল ভট্টচার্যির চোখে ধূলাে দেওয়া অত সহজ নয়! ওঠ ওঠ,—ওরে, দে ত ছোড়ার কান ধরে তুলে? *ণিক যেন ফেটে ওঠে। চেঁচিয়ে বলে, কেন? তুলে দেবে কেন শুনি? তুমি খাওয়াচ্ছ ? একি তােমার ভাত? ম্যানেজার কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, দেখােদেখাে-আবার চোখ রাঙাচ্ছে। ধানি লঙ্কার ঝাল বেশী-কেমন ? দাড়াওরে রামশরণ- মাণিক বলে, খাবাে, বেশ করবে খাবােসবাই খাবে আমি খাবাে না ? ম্যানেজার উঠে দাড়িয়ে বলে, বটে-বটে। দাড়া, খাওয়াচ্ছি। বাপের হােটেল পেয়েছ, না? ওরে, ধর ত’ ছোড়াকে ? দে-দে তুলে—কান ধরে তাড়া! মাণিক তখনাে চেঁচাচ্ছে, এমন সময় দ্রুতপদে সূর্যমুখী কাছে এসে ডাকলেন, মাণিক, ছিঃ বাবা-দুটি ভাতের জন্যে ঝগড়া করতে নেই। আয়, এদিকে আয় মাণিক উচ্চকণ্ঠে বলে, কেন যাবে? অত ভাত রয়েছে, আর আমি খাবাে না? সূৰ্য্যমুখী বলে, তিন দিনের বেশী এখানে খাওয়া নিয়ম নেই যে, বাবা । ২৪
মাণিক বলে, তিন দিন খেয়েছি তাতে হয়েছে কি, তারপরে ।
আর ক্ষিদে পায় না?
এমন সময় ওদিক থেকে লােজন চীৎকার করে ওঠে, চুপ
কয়রা, চুপ করাে তােমরা পথ ছেড়ে দাও-রাণী মা আসছেন
সূর্যমুখী বলে, মাণিক এদিকে আয়, শিগগির এদিকে আয়
. ম্যানেজার হস্ত দন্ত হয়ে রাণীমার পথের দিকে এগিয়ে যায়।
সবাই পথ ছেড়ে সরে দাড়িয়ে দর্শন করে রাণীমার আবির্ভাব।
জনতার ভিতর দিয়ে তার পথ। সামনে সিড়ি। দুধারে লােকদের
মাঝখানে সূর্যমুখী আর মানিক ছিল দাড়িয়ে। রাণীমা চোখ বুলিয়ে
নিলেন সেদিকে, কিন্তু যেন দেখতে পেলেন না। সিড়ি দিয়ে তিনি
উঠে যাচ্ছেন—এমন সময় সহসা নিরুপায়ের মতন সূর্যমুখী ডাকলে,
সই। সই।
রাণীমা ফিরলেন, কিন্তু সইকে চিনতে পারলেন না। মাণিক
হকচকিয়ে ক্রুদ্ধভাবে তার দিকে তাকালাে। অপর উঠল সিড়িতে।
কিছুদূর উঠে গিয়ে পিছন থেকে হঠাৎ রাণীমার আঁচল টেনে চেঁচিয়ে
বললে, পুরনাে বন্ধু, ডাকলে চিনতে পারাে না কেন, শুনি?
রাণীমা সহসা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, কে, কে তুই ?
এমন সময় চারিদিক থেকে সবাই ছুটে এলাে। তার মধ্যে
ধাক্কাধাক্কি, গােলমাল, মারামারি।
সকলে বলতে লাগলাে, ছেলেটা কেরে? কাদের ছেলে।
হতভাগা! পাগল! কী আস্পদ্দা দেখাে ছেলেটার
-ধর-ধর-গলা ধাক্কা দে-
মাণিককে সবাই ধাক্কা দিয়ে সিড়ি থেকে ফেলে দিল।
গড়াতে গড়াতে ওলােট পালট খেয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাে।
রাণীমা উপরে উঠে গেলেন। সবাই গেল তার পিছু পিছু।
সূর্যমুখী স্তব্ধভাবে কাষ্ঠপুত্তলীর মতাে দাড়িয়েছিল।
কেন, কেন ওরা মারলে আমাকে—আমি কোনাে দোষ
করিনি—মার দিকে চেয়ে মাণিক ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।
সূর্যমুখী সহসা মাণিককে ধরে বেদম প্রহার করতে লাগল।
বললে, যত অপমান, যত অশান্তি তাের জন্যে—যা, যা দুর হচলে
যা সামনে থেকে বলতে বলতে মাণিককে ঠেলে বার করে দিল।
মাণিক কেঁদে বললে, আমি কোনাে দোষ করিনি--আমি কোনো
দোষ করিনি। চোখ মুছতে মুছতে মাণিক দেউড়ীর দিকে
এগিয়ে গেল।
প্রথমটা কাঁদতে কাঁদতে মাণিক বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাকে
ছেড়ে সে যাবেই বা কোথায় ? কিছুক্ষণ পরে কান্না শান্ত হলে সে
আবার মন্দিরে ফিরে এলো। সূর্যমুখী ইতিমধ্যে তারই খোঁজে
বেরিয়ে গিয়েছিল।
মাণিক ভিতরে এসে দাড়িয়েছে, এমন সময় সেই ঝি-টির সঙ্গে
দেখা। ঝঙ্কার দিয়ে বি বললে, পােড়ার মুখ নিয়ে আবার এলি
কোন্ মতলবে ?
মাণিক বললে, আমার মা কোথায় ?
ঝি মুখ বেঁকিয়ে বক্রকণ্ঠে বললে, মা! মা কোথায়। দেখগে যা
কোন্ চুলােয় গেছে তাের মা-এখানে এলে আর ঢুকতে দেবাে না।
যা দুর হ’-মাণিক তাড়াতাড়ি অন্য পথ দিয়ে মন্দির ছেড়ে
বেরিয়ে গেল।
সামনের পথটা ধরে মাণিক কিয়ৎক্ষণ চললাে। কিন্তু এদিকে
তার মা যাবেই বা কেন? মাণিক অন্যপথ ধরলাে। সেই পথে
কিছুদূর গিয়ে একটি স্ত্রীলােককে দেখে মাণিক প্রশ্ন করলাে, আচ্ছা,
এদিকে তোমরা আমার মাকে যেতে দেখেছ?
স্ত্রীলােকটি বললে, কাদের ছেলে গাে? কে তােমার মা? কই
দেখিনি ত ?
মাণিক এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বললে, ও—এই বলে সে
আবার চলতে লাগলাে।
সন্ধ্যা হয়ে এলাে দেখতে দেখতে। মাণিক তখনও চলেছে।
পথে একটি কৃষক তাকে দেখে বললে, তুমি কাদের ছেলে, বাবা?
মাণিক বলে, আমার মায়ের ছেলে। মা কোনদিকে গেল,
দেখেছ ? লােকটা বললে, কই না! মাকে খুঁজে পাচ্ছনা বুঝি?
মাণিক কম্পিত কণ্ঠে বললে, না-তাে-
কৃষক বললে, হাটতলার দিকে যাও দেখি। এই রাস্তা
মাণিক ছুটতে ছুটতে হাটতলার দিকে চললাে।
হাটতলায় এসে মাণিক ক্লান্তভাবে চারিদিকে তাকালাে।
লােকেরা তখন কাজ সেরে এদিকে ওদিকে চলেছে।
মাণিক একবার ঘুরে ফিরে চারিদিকে খোঁজ করলাে। অবশেষে
চীৎকার করে ডাকলাে, মা! মা!••••মা গাে ! কিন্তু কোথাও
মায়ের সন্ধান পেলাে না!
ওদিকে মন্দির থেকে বেরিয়ে সারাদিন সূর্যমুখ মাণিককে খুঁজে
বেড়াতে থাকে। সেই যে মার খেয়ে মাণিক বেরিয়ে পড়েছে, তারপর
আর তা’র খোঁজ খবর নেই। সূর্যমুখী অবশেষে পাগলের মতাে
ছুটোছুটি করতে করতে অপরাহের দিকে এক সময় ষ্টেশনের ধারে
এসে পৌছলাে।
তখন সবে মাত্র একখানা ট্রেণ এসে ষ্টেশনে
দাড়িয়েছে।
.
সূর্যমুখী দূরের থেকে দেখলে একটি ছেলে উঠছে গাড়ীতে। সে
চীৎকার করে উঠলাে, মাণিক-মাণিক—শােন—যাসনে বাবা—এই
যে আমি-
গাড়ী তখন বাঁশী বাজিয়ে ছাড়ছে। এমন সময় বেপরোয়ার মতো
সূর্যমুখী সেই সায়াহ্নকালের আসন্ন অন্ধকারে ছুটতে ছুটতে ষ্টেশনের
প্লাটফরমে ঢুকে সােজা ঝাঁপিয়ে গাড়ীতে এসে উঠলাে।
কিন্তু—কিন্তু একি, এত’ মাণিক নয়!
গাড়ী তখন চলছে।
সূর্যমুখী রুদ্ধশ্বাসে অপ্রস্তুত হয়ে বললে, ও বুঝতে পারিনি,
বাবা! আমি নামবাে-আমি নেমে যাবে। একটি বুড়াে লােক
এপাশের বেঞ্চে বসেছিলেন। তিনি বাধা দিয়ে বললেন, আহা করাে
কি বাছা-কয়রা কি ? গাড়ী চলছে যে-
সূর্যমুখী ব্যস্তভাবে বললে, কিন্তু মাণিক যে পড়ে রইলো—আমি
নামবাে-আমি নামবাে-
বুড়াে বললে, নামতে পারবে কেন মা, এ যে চলন্ত গাড়ী-
সূর্যমুখী বললে, এ গাড়ী আবার থামবে কখন বলতে পারেন?
গাড়ী তখন দ্রুতগতিতে চলেছে। দুইধারের মাঠ দুইদিকে সরে
যাচ্ছিল।
বুড়াে বললে, শান্ত হও মা, একটু বাদেই গাড়ী থামবে। তখন
নেমে যেয়াে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে একটি ষ্টেশনে গাড়ী এসে থামতেই সূর্যমুখী
আর সেই বুড়ো লােকটি নামলাে। বুড়াের সঙ্গে ইতিমধ্যে সূর্যমুখীর
অনেকটা আলাপ হয়েছে। বুড়াে নেমে ষ্টেশন মাষ্টারের কাছে গেল,
কিছুক্ষণ বাদে আবার ফিরেও এলাে। এসে বললে, ইষ্টিশন মাষ্টার
বললেন, সকালের আগে তােমার ফেরবার আর গাড়ী
নেই, মা।
সূর্যমুখী ব্যাকুল হয়ে বললে, তা হলে কি হবে বাবা? আমাদের
যাবার আগে মাণিক যদি অনেক দূরে চলে যায় ?
বুড়াে বললে, ভয় কি মা, তুমি যখন আমাকে বাবাব’লে ডেকেছ,
তােমার ছেলে যত দূরেই যাক—তােমার কোলে তাকে ফিরে এনে
দেবােই। দরকার হয় দেশসুদ্ধ তােলপাড় করবাে, কাগজে কাগজে
বিজ্ঞাপন দেব-গাঁয়ে গাঁয়ে খুজে বেড়াবে।
সূর্যমুখী অরুদ্ধকণ্ঠে বললে, বাবা, মাণিক যে আজ খেতে
পায়নি, তা’র যে থাকারও জায়গা নেই-রাত তার কেমন করে
কাটবে?—তা’র কণ্ঠস্বর কান্নার আবেগে যেন থর থর করে
কাপছিল। আর কিছু সে বলতে পারলাে না।
বুড়াে সান্ত্বনার সুরে বললে, কি করবে মা, সব দুঃখীর বন্ধু যিনি,
তিনিই তােমার ছেলেকে দেখবেন। হুঃ—মেয়েটাকে হারিয়ে-
ভাবলুম নিশ্চিন্তে গিয়ে কাশীবাস করবো-কিন্তু তুই বাবা বলে
ডেকে আবার আমার জ্বালা বাড়ালি মা!
সূর্যমুখী মুখ ফিরিয়ে সহসা প্রশ্ন করলাে, আপনার মেয়ে কি
হারিয়েছে, বাবা?
বুড়াে ভগ্নকণ্ঠে বললে, হারিয়েছে মা, হারিয়েছে। একেবারেই
হারিয়েছে। তুই তাের হারান মাণিককে আবার ফিরে
পাবি মা, কিন্তু আমার হারানাে উমা আর কোনাে দিন
ফিরবে না।
সূর্যমুখী তার অশ্রুসজল দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে অন্ধকারের
গভীরের দিকে তাকালাে। অন্ধকার অরণ্য পথ, প্রান্তর-সমস্ত
পেরিয়ে তার বড় বড় চোখ দুটো ছুটলাে হারানাে মাণিকের
পিছনে পিছনে।
২
আর ঠিক সেই সময় বহুদুরে কোনাে এক গ্রামের একান্তে
হাটতলায় খুটির পাশে মাণিক কাতরভাবে নিদ্রিত, এমন সময়
স্বপ্নলােকে তার জননীর নিত্য জাগ্রত করুণ দুটি চক্ষু এসে তার
মুখের উপর যেন স্থির হলাে। মাণিক যেন তার মায়ের কোমল
স্নেহের স্পর্শ অনুভব করছে ঘুমের ঘােরে।
সূর্যমুখী যেন তার কপালে হাত রেখে বলছে, মাণিক, তুই বড়
হবি, মানুষ হবি, তাের মায়ের দুঃখ ঘােচাবি—তাের মাথা একদিন
সকলের চেয়ে উচুতে উঠবে।
মাণিক সহসা জেগে উঠে নিদ্রালুচক্ষে ডাকলো, মামা! ..
চারিদিকে সে তাকালাে। কিন্তু কোথায় তার মা ?••তখন
ক্লান্তভাবে মাণিক উঠে দাড়ালাে। সামনের পথটা ধরে এলােমেলাে
ভাবে সে চলতে লাগলাে।
ভাের বেলা জনৈক ব্ৰহ্মণ সেই পথে আসছিলেন। মাণিক থমকে
দাড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করলো, আচ্ছা, দেখুন, একটা কথা, আমার
মাকে দেখেছেন এপথে ?
ভট্টচার্যিমশাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। বললেন, কে
তােমার মা।
মাণিক বললে, আমার মা, মাকে খুঁজছি কিনা
ভচার্যিমশাই বললেন, ও, দেখলুম বটে একজন মেয়েছেলেকে
ওই যে সেরেস্তার দিকে গেল—সুন্দর মতােন,—দেখাে দেখি বাবা।
কথাটা শুনেই মাণিক সেইপথে দৌড়লাে। ভট্টচাষিমশাই তার
পথের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন।
মাণিক ছুটতে ছুটতে এসে কাছারী বাড়ীর মধ্যে ঢুকলাে। একটা
অপরিচিত ছেলেকে এইভাবে ঢুকতে দেখে বার বাড়ীর একটি লােক
।
বলে উঠলাে, আরে-আরে—আরে—এই ছোঁড়া, ভেতরে যান
কোথায় ?
মাণিক বলে, আমার মা আছে ভেতরে-আমাকে যেতে দাও।
মাণিক ভিতরে ছুটলাে পাগলের মতাে।
লােকটা চেঁচিয়ে বললে, দেখাে, কাণ্ডটা দেখাে-আঁস্তাকুড়ে
জঞ্জাল ঠাকুর ঘরে গিয়ে ঢোকে। খবরদার বলছি—এই—ওরে-
ওদিকে কে আছিস?
লােকটা ছুটলাে মাণিকের পিছু পিছু।
অন্দরমহলে বৌরাণী তখন নায়েবের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
তাদের সামনে একটি মহিলা রয়েছে দাড়িয়ে। নায়েব তাকে দেখিয়ে
বললেন, আজ্ঞে হঁা, এর কথাই আপনাকে বলছিলুম কালকে।
তিন তিন কিস্তির খাজনা বাকী। নালিশ করলে পথে দাড়াবে-
এখন এর উপায় আপনার হাতে
স্ত্রীলােকটি বললে, তােমরা না দেখলে আমাকে পথে দাড়াতে
হবে, বোমা ।
রাণীমা বললেন, আমি আপনার জন্যে কি করতে পারি বলুন?
স্ত্রীলোকটি বললে, যদি এবারের খাজনাটা মাপ করে দাও,
তবে আমি যাহােক করে ঘটি বাটি বেছে কাশী চলে যেতে পারি।
রাণীমা বললেন, সেখানে আপনার কেমন করে চলবে?
স্ত্রীলােকটি বললে, কিছুই জানিনে মা, তবে বাবা বিশ্বনাথের
দয়ায় যদি সেখানে ভিক্ষে সিকেও মেলে।
রাণীমা বললেন, আচ্ছা, আপনাকে আর কোনাে বিপদে পড়তে
হবে না। আমি আপনার যা হয় একটা ব্যবস্থা করে দেবাে।
স্ত্রীলােকটি বললে, তবে এখন আসি মা। তােমার কথাই
আমার পক্ষে আশীৰ্বাদ। এই বলে মহিলাটি বিদায় নিলেন।
নায়েবমশাই বিদায় নিয়ে চলে যাবেন এমন সময় বাইরে থেকে
কার কণ্ঠস্বর শােনা গেল, আমার মা, আমার মা আছে ছেত তরে- আমাকে যেতে দাও—যেতে দাও- বৌরাণী জিজ্ঞাসা করলেন, কে ? কে ডাকছে নায়েব মৰাই নায়েবমশাই ফিরে তাকাতেই মাণিক তার জীর্ণ মলিন পরিচ্ছদে দ্রুতপদে ভিতরে এসে ঢুকলাে। বৌরাণী কেমন যেন চকিত হয়ে উঠলেন। মাণিক সহসা থমকে হতাশভাবে বললে, ওমা কোথায় ? নায়েবমশাই জকুঞ্চন করে বললেন, কে রে? কাদের ছেলে তুই? যা-যা এখান থেকে। বলা নেই-কওয়া নেই-পালা, পালা-যা মাণিক সজল চক্ষে এবার বলে উঠলাে, দেখুন••••আমি এলুম.•• দুদিন ধরে মাকে--খুজছি—পাচ্ছিনে-- নায়েব সবিস্ময়ে বৌরাণীর দিকে তাকালেন। বললেন, তাইত বাণীমা, বেশ ছেলেটা দেখছি। কিন্তু তাের মা এখানে কোথায় রে ? এটা জমিদার বাড়ী,এখানে তাের মা কোথায় ? মাণিক তখন নিরুপায় হয়ে চলে যাবার জন্য পিছন ফিরলাে। বৌরাণী ডাকলেন, শােন খােকা- মাণিক ফিরে দাড়ালাে। বৌরাণী বললেন, তুমি যেয়াে না, আমি তােমার মাকে খুঁজে দেবে। মাণিক সকরুণ কণ্ঠে বললে, কি বলছেন আপনি? বৌরাণী নায়েবমশাইকে বললেন, আপনি তাহলে ওই মহিলাটির যা হয় ব্যবস্থা করে দেবেন, দেখবেন, ওর নামে যেন নালিশ না হয় যে আজ্ঞে।-বলে নায়েবমশাই একবার মাণিকের দিকে সকৌতুকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
এলেন।
বৌরাণী এবার এগিয়ে এলেন মাণিকের দিকে। বললেন, মাকে
কেমন করে হারালে, বাবা?
মাণিক বললে, মা আমাকে মারলাে, আমি রাগ করে চলে গেলাম,
তরপর••••••••আর দেখিনি। গায়ে গায়ে খুঁজে কোথাও পাইনি।
আপনি দেবেন খুজে ?—আমার মাকে ?
বৌরাণী স্নেহের সঙ্গে বললেন, হ্যা, নিশ্চয় দেবে, তুমি থাকো
এখানে? পাবে বৈ কি-ঠিক এসে পড়বে একদিন তােমার মা-
আমি কথা দিলুম।আহা, বাছারে—
এমন সময় জমিদার যুগলবাবু ওধারের বারান্দা পেরিয়ে
এধারে
নতুন একটি বালককে দেখে বললেন,
এ আবার কে গাে? কোন্ ডােবা থেকে আবার আগাছা তুলে
আনলে ?
বৌরাণী বললেন, আহা, ওকথা বলােনা! ওর মা হারিয়েছে
তাই খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে পড়েছে।
যুগলবাবু বললেন, তা বেশ ভালােই, তােমারই সুবিধে হলাে ।
নাও, এবার খাওয়াও, পরাও, বাঁশী কিনে দাও, নতুন জুতো দাও,
ইস্কুলে পাঠাও! তা বেশ ভালাে। কিন্তু মনে রেখে বড়বউ,
জঙ্গলের পাখী কোনকালেই পােষ মানে না। যতই করাে না
কেন তার চোখ দুটো থাকে বনের দিকে।
বৌরাণী স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর মাণিকের
দিকে চেয়ে বললেন, যদি চলে যাবার পথ খুঁজে পায় একদিন না
হয় যাবে। কিন্তু আজ সে কথা থাক—
এস বাবা-মাণিককে
নিয়ে তিনি ভিতর মহলের দিকে পা
বাড়ালেন।
যুগলবাবু নিঃশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগলেন, হুঃ যত সব বেনােজলের
দৌরাত্ম্যি এবাড়ীতে! কাছারিটেকেও করে তুলেছে সব হরিঘােষের
গােয়াল। নাঃ দেখছি কাশীই পালাবদা, নৈলে এরা আ জ হবে
না।-বলি নায়েব, ওহে শুনছ ?-
নায়েবমশাই কোথায় ওধারে যেন ছিলেন, তাড়াতাড়ি
ভিতরে এলেন।
যুগলবাবু বললেন, বলি, ভেবেছ কি তােমরা?
নায়েবমশাই বললেন, আজ্ঞে, কই কিছু ত ভাবিনি।
যুগলবাবু বললেন, ভেবেছ বৈ কি—ভেবেছ, সব ছেড়ে ছুড়ে
দিয়ে আমি কাশী পালাবাে, আর তােমরা এই জমিদারীটে লুটে
পুটে খাবে কেমন?
নায়েবমশাই অবাক হয়ে বললেন, আজ্ঞে না, ওসব কথা কি
আমরা ভাবতে পারি, কর্তামশাই ?
যুগলবাবু বললেন, আলবৎ ভেবেছ। ওই কথাটা ভেবে ভেবেই
শরীর কাহিল করেছ। নৈলে এই দ্যাখাে দেখি, এই যে হাসপাতালে
এত টাকা দান করলে-এ কা’র হুকুমে ?-এই বলে তিনি ফাইলটা
খুলে ধরলেন।
নায়েবমশাই বললেন, আজ্ঞে, আপনিই ত ও টাকার বরাদ্দ
করেছেন।
যুগলবাবু বললেন, বটে, আমি করেছি বলেই তুমি অমনি দিয়ে
দিলে। বিচার নেই, বিবেচনা নেই—টাকাটা কি গাছের ফল ? পেড়ে
দিলেই হােলাে—আর এটা কি, এই যে লাল কালির দাগ টানা
খরচটা—এ তুমি কোখেকে পেলে?
নায়েবমশাই বললেন, আজ্ঞে, ও দাগটানা টাকাটা আপনিই ত
নিয়েছিলেন ?
যুগলবাবু চেঁচিয়ে বললেন, মিছে কথা! তুমি মিথ্যেবাদী।
অন্যে খরচ আমি একটুও করিনে। এসব যা কিছু অন্যে
অনেষ্য নিয়েই তােমাদের কারবার।
নায়েবমশাই সবিনয়ে বললেন, আজ্ঞে, আপনার স্মরণ নেই কর্তামশাই! যুগলবাবু ফেটে পড়লেন, বললেন, বটে আমার স্মরণ নেই। তােমার রাণীমার মতন বুঝি আমাকেও ভূতে পেয়েছে ? ওসব হবে না নায়েব, বুঝলে? ওসব চলবে না—অত খরচ চলবে না--ওসব অসঙ্গত, অনাবশ্যক।-এই দেখনা, কোথাকার কোন্ ইত্যিজাতের ছেলে•••উদোর পিণ্ডি বুধাের ঘাড়ে এসে চড়লাে।ওসব হবে না, বারাে ভূতকে খাইয়ে আমার জমিদারী ফতুর করা চলবে না। ছোঁড়াটাকে তাড়াও। আজই তাড়াও। এমন সময় মাণিক সহসা ঝড়ের মতাে এসে দাড়ালাে। বললে, আমাকে গাল দিলেন, আমি কি করেছি ? যুগলবাবু বললেন, করেছ মাথা আর মুণ্ডু! ছুচ হয়ে চুকে ফাল হয়ে উঠছে। এখন তােমাকে তাড়াই কি করে তাই বলে দিকি, বাপু? মাণিক বললে, আমি নিজেই চলে যাবে। আমি থাকবাে না, কারে গালাগালি শুনবে না। এই বলে সে যাবার উদ্যোগ করতেই বৌরাণী পিছন থেকে এসে তার হাত ধরলেন। স্বামীকে উদ্দেশ করে বললেন, হ্যাগা, কি হলো, কি বলেছ ? হ্যা রে, কোথা যাস মাণিক ? মাণিক উত্তেজিতভাবে বললে, আমি থাকবাে না, আমি চললুম- সে আবার যাবার চেষ্টা করলাে। বৌরাণী বুঝিয়ে বললেন, শােন্ বাবা, শােন্সক্ষ্মীটি—আমি যে বলেছি তাের মাকে দেবােকোথা যাস—শােন- এনে মাণিক তাঁর হাত ছাড়িয়ে চললাে। বললে, না, না, না—আমি থাকবে না--আমার মা এখানে আসবে না—ছুটতে ছুটতে সে * বাইরের দিকে গেল, আর বৌরাণী চললেন তার পিছু পিছু বললেন, শােন্, হ্যা রে- মাণিক বললে, না, না, থাকব না—আমাকে চলে যেতে দিন- বৌরাণী বললেন, যাস নে, শুনে যা,-মাণিক মাণিক বললে, না, আমি শুনবে না,-না-না- কিন্তু বাইরে যাবার পথে গিয়ে মাণিক দেখে দেউড়ী বন্ধু। তখন সে সেইখানে থমকে দাড়িয়ে গেল। যেন এই দেউড়ী তার মুখের ওপর চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। এমন সময় বৌরাণী ছেলের কাছে এগিয়ে এলেন, মাণিকের চোখে তখন ছলছলিয়ে জল এসেছে। বৌরাণী অতি স্নেহের সঙ্গে সেই জল মুছিয়ে দিয়ে বললেন, তাের মাকে আমি এনে দেবে। যতদিন না পারি, ততদিন আমাকেই তাের মা হতে দে, বাবা—আমার কথা শােন-- মাণিক শান্তভাবে চুপ করে রইলাে। যেন নূতন এক জননীর স্নেহ সে লাভ করেছে। সেইদিন রাত্রে ছেলেটা শুয়ে রয়েছে নিশ্চিন্তে একটি খাটে। এপাশের খাটে বৌরাণীর চোখে নিদ্রাভাব। এমন সময় দরজার পাশে যুগলবাবুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বড় বউ? বৌরাণী উঠে বসলেন। বললেন, কি গাে? যুগলবাবু বললেন, একটা কথা বলছিলুম-কি যেন ভাবছিলুম-~- ওই তােমার ছেলেটার কথাই বলতে এলুম- বৌরাণী বললেন, কি বলছ ? যুগলবাবু বললেন, কথাটা তােমাকে ঠিক বােকাতে পাচ্ছিনে। মনের চেহারাটা বােঝানাে যায় না, জানাে ত ? কিন্তু আর যাই করাে, বড় বউ ছেলেটাকে তুমি যেন আর ছেড়ে দিয়াে না। বৌরাণীর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
বৃদ্ধের সঙ্গে সূর্যমুখী অবশেষে কাশীতে এসে হাজির হয়েছে। ইতিমধ্যে বুড়াে কৈলাসবাবু বাংলার বহু স্থানে নিজে ও লােকমারফৎ মাণিককে খুজেছেন—কিন্তু কোনাে ফল হয়নি। তখন তিনি স্থির করলেন, কাশী গিয়ে সুস্থির হয়ে বসে তিনি এই সমস্যার একটা কিনারা করবেন। তাছাড়া সূর্যমুখীর কোনাে আশ্রয় নেই, সে মেয়েছেলে,-তা’রও যা হােক একটা ব্যবস্থা করা চাই। এই সব নানাবিধ চিন্তা করে কৈলাসবাবু সূর্যমুখীকে সঙ্গে নিয়ে কাশীতে এসেছেন। একটি বাসাবাড়ীতে তারা থাকেন, আর নানাস্থানে চিঠিপত্র লিখে পাঠান। দেখতে দেখতে হারাননা প্রাপ্তি আর নিরুদ্দেশের’ ফাইলে তার শােবার ঘরটি ভরে উঠলাে। চারিদিকে রাশি রাশি কাগজপত্র, আর সংবাদপত্রের বিভিন্ন কাটিং। এরই মাঝখানে কৈলাসবাবু বসে কাজ করেন। সেইদিন সেইখানে বসে তিনি হাঁকাহাঁকি করে উঠলেন, এই নাও, সেরেছে, কই, কোথা ফেললুম! এই যে এইখানেই ছিল- গেল কোথা ?—বলি কই গাে মা, কলকাতাটা-কলকাতাটা কোথা— হারাম বলে দিকি ? সূর্যমুখী রায় চড়িয়েছিল। কৈলাসবাবুর ডাকে তাড়াতাড়ি এঘরে এলো। বললে, আমায় ডাকছেন বাবা। কৈলাসবাবু বললেন, ডাকছি কি সাধে? বাঁশ বনে ডােম কানা। ,
এই দ্যাখাে এই মেদিনীপুর--এই বাঁকুড়া-আর এই হলাে তােমার
বর্ধমান-কলকাতাটা হারালুম কোথায়? দেখাে দেখি মা—কোথায়
চাপা পড়লাে ?
সূর্যমুখী এদিক ওদিক খুঁজে বলল, আপনার হাতে ওটা কি?
কৈলাসবাবু বললেন, হাতে! তাইত—দেখলি ত মা? সব
ভুল ঘটছে—ঘটবেইত—বুড়াে বয়সে এলুম নিশ্চিন্তে কাশীবাস করতে,
ভাবলুম মেয়েটা মলাে—সব চুকে বুকে গেল। কিন্তু এ আর কি
উৎপাত বল দেখি? তুমি তােমার ছেলে হারানাে চাপালে আমার
ঘাড়ে—এখন করি কি?
সূর্যমুখী করুণ চক্ষু তুলে উপর দিকে তাকাল। তার বলবার
কথা মুখের মধ্যে থিতিয়ে রইলাে।
কৈলাসবাবু নতুন ফাইলটা তুলে নিলেন। বললেন, এই দ্যাখাে
—আমি দিলুম কাগজে বিজ্ঞাপন তােমার ছেলেটার জন্য—তার
বদলে যত হারানাে আর নিরুদ্দেশের ছবি জড় হ’ল আমার ঘরে-
কার মা হারালাে ; কার মেয়ে কোনদিকে ইচ্ছে করে হারালো,-
তা আমার কি ? আমি কি করব--আমি নিশ্চিন্তে এলুম কাশীবাস
করতে,আর আমি খুঁজে বেড়াব যত রাজ্যের মেয়ে আর ছেলে?
হারাক, হারাক, সবাই হারাক-মেয়ে হারাক—ছেলে হারাক
পারিস যদি তুইও হারা মা!
সূৰ্য্যমুখী বললে, বাবা!'
কৈলাসবাবু বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, বাবা, আর
বাবা। মেয়েটা মােলাে ভাবলুম-আর বুঝি কেউ ডাকবে না বাবা
বলে। বাবা বলেই তুমি আবার আমার সর্বনাশ করলে। নাও,
নাও-না-কি বলছ ?
সূৰ্যমুখী বললে, আপনি অনেক চেষ্টা করলেন, শুধু আমারই
জন্য। কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া গেল না—এ আমারই ভাগ্য।
-
কৈলাসবাবু বললেন, কে বলে পাওয়া গেল না? পেতেই হবে-
খুজে আমি তাকে বার করবই! খুজতে খুজতে বাবা বিশ্বনাথকে
-একদিন পাব, আর তােমার ছেলেকে খুঁজে পাব না?
সূর্যমুখীর করুণ চক্ষু দুটি জলে ভরে এলাে।
কৈলাসবাবু যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে বললেন, এই আমি চললুম।
তাের ছেলে আমি খুঁজে দেবােই। আমি এলুম নিশ্চিন্তে কাশীবাস
করতে•••আর যত সব মেয়েটা মলল, ভাবলুম—যা বেঁচে
গেলুম। কিন্তু এখন দেখছি মা আর মেয়েতে দেশ ভরা—পালাবার
যাে নেই।
বলতে বলতে তিনি চটি পায় দিয়ে কঁাধে উড়ুনী নিয়ে বেড়িয়ে
গেলেন।
সূর্যমুখী জলভরা নেত্রে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
জমিদার বাড়ীর পথে সেদিন এক জটলা দাড়িয়ে গেছে।
নানাজনে নানাকথা বলাবলি করে। এমন সময় ওধার থেকে শশধর
এগিয়ে এসে বললে,-বলি ওহে খুড়াে, একি শুনছি ?-তােমার
নাকি অন্ন উঠলাে।
খুড়াে রাগে গরগর করে উঠলাে, কেন? কেন শুনি?
শশধর ব্যাঙ্গ হাসি হেসে বললে, জমিদার বাড়ীর পুৰিপুত্তর
ছিলে••••••সময়ে অসময়ে কলাটা মুলােটা পেতে এবার যে
তােমার বরাত উঠলাে।
খুড়া চোখ পাকিয়ে বললে, কি-ই-ই? মুখের চেয়ে ভাের
কথা বড়? সাবধান বলছি।
জলধর নিশ্বাস ফেলে বললে, আমাদের ভাই জন্ম থেকেই কপাল
মন্দ। নৈলে-ছোঁড়াটা তাহলে কায়েম হয়েই বসলে, কেমন ?
হলধর হতাশভাবে বললে, তা বসলে বৈ কি-বাবা মদ্যিনাথের মতন একেবারে চেপে বসলাে! তখনই বলেছিলুম- খুড়াে হলধরকে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে বললে, থাম থাম- বলেছিলুম আর বলেছিলুম। হলধর চোখ পাকিয়ে বললে, এই খবরদার বলছি খুড়ো—গায় হাত দিয়ে নাও আমি সইতে পারিনে।আমি তখনই বলেছিলুম, বেনােজল ঢুকে বেড়াজলে আটকে যাবে? এখন নাও খুভাের দুঃখে কাঁদো সবাই। খুড়াে রাগে অপমানে চেঁচিয়ে উঠলাে, কি-ই-ই। এই ব্যাপার নিয়ে কথা কাটাকাটি যখন বেশ ঘােরাল হয়ে উঠেছে, সেই সময় শশধর বলে উঠলাে, আরে—চুপচুপ-নায়েবমশাই? নায়েবমশাই কাছারি বাড়ী থেকে বেরিয়ে এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, শশধরকে দেখে বললেন, এই যে শশধর—তাহলে তােমরা কতদূর কি করলে? শশধর হাত কচলিয়ে বললে, আজ্ঞে, আশেপাশে প্রায় তিরিশখানা গায়ে খোঁজাখুজি করলুম। মাণিকের মা বলে কাউকে পাওয়া গেল না। নায়েবমশাই কিছুক্ষণ কি যেন চিন্তা করলেন। পরে বললেন, হু’-আচ্ছা—কিন্তু খোঁজাখুঁজি ছেড়াে না তােমরা, বলে রাখলুম। শশধর বললে, যে আজ্ঞে খুঁজে খুঁজে হয়রাণ হলেও আমরা খোঁজাখুজি ছাড়বে না। নায়েবমশাই যেমন এসেছিলেন, তেমনি আবার চলে যাচ্ছিলেন, এমন সময় গদাধর তার ফাইলটা বাড়িয়ে দিয়ে বললে, আজ্ঞে চৌধুরীদের দরুণ এই চালানটা নায়েবমশাই ব্যস্তভাবে বললেন, আচ্ছা থা—ওসব কাল হবে- এখন আমার মরবারও সময় নেই-
বলতে বলতে তিনি অন্যমনস্কভাবে অন্যত্র চলে গেলেন।
বাইরে একটি ফুলবাগান ছিল। নায়েব মশাই বেরােতেই দেখেন
তারই একান্তে একটি পেটির ওপর বসে রয়েছে মাণিক। তার
সামনে ওই আমের চারাগাছটি তার যেন নিঃসঙ্গ জীবনের একটি
সঙ্গীরাজসংসারের এত বড় সমারােহের মাঝখানে তার শিশু মন
উন্মুখ হয়ে ছুটেছে নিরুদ্দেশ জননীর সন্ধানে
নায়েবমশাই তার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে পিছন থেকে
ডাকলেন, ছােটবাবু!
মাণিক ফিরে তাকালাে।
নায়েবমশাই সস্নেহে বললেন, একলা বসে যে?
মাণিক উদগত অশ্রু দমন করে বললে, ভেতরে আমার ভালাে
লাগে না।
নায়েবমশাই বললেন, মায়ের জন্যে মন কেমন করছে, না? ভয়
কি? এই ত’ কর্তামশাই ক’দিন থেকে কতুদিকে কত লােকজন
পাঠিয়েছেন—খবর একটা পাওয়া যাবে বৈকি!
মাণিক বললে, খবর কবে আসবে, শুনি?
নায়েবমশাই বললেন, খবর। খবর এলেই পাওয়া যাবে।—এই
দ্যাখােনা ছােটবাবু, তােমাকে পেয়ে রাণীমার মুখে কতকাল পরে
হাসি ফুটলাে!—এই বলে তিনি নিশ্বাস ফেললেন। সে আজ বহন
দশেকের কথা-বুঝলে ছােটবাবু, সাত দেবতার দোর ধরে একটি
বংশধর যদি বা হােললা, ছেলেটি বাঁচলাে না-
মাণিক তার দিকে মুখ ফিরে তাকালাে।
নায়েবমশাই বললেন, ছেলেটি সবে হাঁটতে শিখছিল-রাণীমা আদর
করে নাম দিয়েছিলেন বিশু-কিন্তু ভাগ্য বিরূপ—সইলাে না। তিন
দিনের জ্বরে ছেলেটা চলে গেল। সেই থেকেই কর্তামশাই আধপাগলের
মতন হয়ে গেলেন,-কাকে কখন কি বলেন, তাঁর হুস থাকে না।
এমন সময় ওধার থেকে রাণীমার কণ্ঠস্বর শােনা গেল, মাণিক ?
নায়েবমশাই বললেন, ওই যে, মা আসছেন ?
বৌরাণী বাইরের বাগানের প্রান্তে এসে দেখেন, মাণিক বসে।
তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এলেন, খুঁজে পেলেন যেন তার রত্নটিকে।
চোখে মুখে সহাস্য মাতৃস্নেহ, মধুর বাৎসল্যের আবেশ-কল্যাণরূপিণী
তিনি। কাছে এসে মাণিকের মাথায় হাত রেখে করুণ স্নেহে
ডাকলেন, মাণিক
কেমন একপ্রকার সলজ্জ কুণ্ঠায় মাণিক তার দিকে মুখ ফিরিয়ে
তাকালাে।
রাণীমা বললেন, তুই আড়ালে থাকলে আমিও যে একলা পড়ে
যাই বাবা-
মাণিক নতমুখে চুপ করে বসে রইলাে।
রাণীমা বললেন, নায়েবমশাই, রতনডাঙ্গার ওদিকে লােক
পাঠিয়েছেন কি?
নায়েবমশাই বললেন, হ্যা মা,—চারদিকেই লােক পাঠিয়ে খোঁজা
খুঁজি করছি! কিন্তু সময় না হলে কোনাে কাজই হয় না মা।
যাই, আমাকে আবার এখুনি,তবু বলে যাই মা, আমি সাধ্যমতো
আজো চেষ্টা করছি। দরকার হলে এমন কাজও করব যা
সাধ্যের বাইরে।
বলতে বলতে নায়েবমশাই সেখান থেকে চলে গেলেন ব্যস্তভাবে।
রাণীমা ধীরে ধীরে মাণিককে কাছে টেনে নিলেন। বললেন,
মাণিক। বাবা-
মাণিক মুখ তুললাে।
রাণীমার কোমল আয়ত দুটি চক্ষু অতীত কালের সন্তান বিয়ােগ
বেদনার স্মৃতিতে অশ্রুসজল হয়ে এসেছিল। মাণিক কিছুই বুঝতে
পারলাে না, কিন্তু অভিভূতভাবে যেন নিজেকে ছেড়ে দিল।
রাণীমা বললেন, আমার জীবনটা যেন অন্ধকারে খা খা করছিল, তুই এসে আলো জ্বেলেছিস, মাণিক। মাণিকের একখানি হাত ধীরে ধীরে রাণীমার গলার কাছে উঠে একটি সান্ত্বনার আশ্রয়ের মতাে তঁাকে আঁকড়ে ধরলো। এমন সময় দেখা গেল অদূরে নিঃশব্দে যুগলবাবু দাড়িয়ে বা সল্যের এই স্বর্গীয় মহিমা নিরীক্ষণ করছেন-অভিভূতের মতাে। যুগলবাবু প্রসন্ন স্মিতমুখে কাছে এসে দাড়ালেন। ডাকলেন, বড় বউ! বড়বউ হাসিমুখে তার দিকে তাকালেন। যুগলবাবু বললেন, তােমাকে ডাকছিলুম-না না, তােমার ওই মাণিককেই বােধ হয় খুজছিলুম। মানে, ঠিক মনে নেই—তা, এ বেশ করেছ, বড়বউ। হা-এইটিই চেয়েছিলুম- বড়বউ সহাস্যে সকুণ্ঠায় বললেন, কি বলছ তুমি ? যুগলবাবু বললেন, তাও ঠিক মনে নেই—নায়েব থাকলে মনে করিয়ে দিতে পারতে!-হ্যা, হা—মনে পড়েছে। আমাদের সেই বিশুর কথাই ভাবছিলুম, বড় বউ ! সে হাঁটতে শিখেছিল, খেলা করতাে, আমার কাঁধে চড়ে নাচতে। শক্ত নিরেট, পাথরের মতন আমার সেই ছেলে !--এই বলে তিনি মাণিকের পিঠ চাপড়ে বললেন, এইবার ঠিক হয়েছে। হ্যা, হঁা, এরও সেই ঢলঢলে মুখ, সেই কালাে দুটো চকচকে চোখ-বড়বউ—এই ত—এই ত আমাদের সেই বিশু। বড়বউ-বড়বউ—তুমি এক কাজ করে এর নাম রেখে দাও বিশ্বনাথ-বিশু আর বিশ্বনাথ—বেশ মিলবে। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি—ডাকো নায়েবকে—আচ্ছা, আমি ডাকছি—নায়েব-নায়েব বলতে বলতে মুখ লুকিয়ে তিনি চলে গেলেন। রাণীমা মাণিককে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
৪
এই ঘটনার পর পনেরােটি বছর উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ধনী
জমিদারের ঘরে মাণিক মানুষ হয়েছে। তার নাম বদল করা হয়েছে ।
এখন তার নাম বিশু। আজো বিশু তার মাকে খুঁজে পায়নি।
দেশ দেশান্তর পরিভ্রমণ
পরিভ্রমণ করে জমিদারের লােকেরা ফিরে
এসেছে।
বিশু বড় হয়েছে। গ্রামের স্কুল থেকে পাশ করে সে এখন
কলকাতার কলেজে পড়ছে। সে এখন জমিদার বাড়ীর সবচেয়ে
প্রয়ােজনীয় ব্যক্তি। সবাই তাকে সমীহ করে। সকলেই জানে সে
ভাবী জমিদার।
পনেরাে বছর অতিত হলেও দেখা যাচ্ছে তেমনই রয়েছে
জমিদার বাড়ীর সেই প্রাচীন আবহাওয়া। সেই আমের চারাটি
বড় হয়ে বৃক্ষে পরিণত হয়েছে শাখা প্রশাখায়।
সেদিন আমগাছের নীচে রাণীমা ও বিশ্বনাথকে দেখা গেল।
বিশ্বনাথ শান্তভাবে বসে রয়েছে। তার কলেজের ছুটি ফুরিয়েছে,
এবার সে কলকাতায় চলে যাবে।
রাণীমা বললেন, আচ্ছা বিশু, এই ত শুনি, কত লােক হারায়,
আবার তাদের খুঁজেও পাওয়া যায়—তুই আর একবার ভালাে করে
তাের মায়ের খোঁজ খবর কনা বাবা?
বিশু বললে, খোঁজ খবর এতকাল ধরে করলুম-কলকাতায়
15
কত লােককে বলেও রেখেছি। কিন্তু জানাে ত মা—এ নিয়ে বেশ হৈ চৈ করতে পারিনে। রাণীমা মুখ উজ্জ্বল করে সস্নেহে বললেন, হ্যা, তা বুঝি বৈকি বাবা। তা সে যাই হােক, এবার থেকে যেন আর ভুল হয় না বিশু, এবারে কলকাতায় গিয়ে সপ্তাহে দুখানা চিঠি নিশ্চয় দিবি। বিশু হাসিমুখে বললে, তােমার কেবল চিঠি আর চিঠি! যদি আমাকে ছেড়ে থাকতে না পারে। তবে কলেজে পড়তে পাঠিয়েছিলে কেন শুনি ? এমন সময় যুগলবাবু চেঁচামেচি করতে করতে বাগান পেরিয়ে এধারে এসে ডাকলেন, বড়বউ, এর জন্যে তােমরা সবাই দায়ী যত বিশৃঙ্খলা আর অব্যবস্থা,সবাই মিলে তােমরা একটা মস্ত গণ্ডগােল পাকিয়ে তুলেছ! আমি দেখতে পাচ্ছি, তােমাদের ছেড়ে দিলে কোনাে কাজ সহজে হবার উপায় নেই। বড়বউ বললেন, কেন, হয়েছে কি? যুগলবাবু বললেন, কি হয়নি। এই যে তােমার বিশু আজ বাদে কাল কলকাতায় যাবে, তার খাওয়া দাওয়া চলাফেরার কথাটা ভেবেছ কি ? বিশু বললে, না না, আপনি ব্যস্ত হবেন না, সেখানে আমার কোনাে অসুবিধে নেই। যুগলবাবু বললেন, আছে বৈকি হাজারাে অসুবিধে আছে- তােমার রান্না করবে কে, বিছানা পেতে দেবে কে, চা করে দেবে কোেমার খুচরাে কাজের লােক কেউ নেই! লক্ষ অসুবিধে ! নাঃ বড়বউ, তােমাদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না!—ডাকি নায়েবকে— নায়েব, নায়েব। নায়েবমশাই কাছারি বাড়ীতে বসেছিলেন নানা কাজ নিয়ে, কর্তামশাইয়ের উচ্চকণ্ঠ শুনতে পেয়ে তিনি ছুটতে ছুটতে এলেন। ৫০
তাঁকে দেখেই যুগলবাবু যেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। বলনে, হা-হে-
নায়েব, তুমি ভেবেছ কি ?
নায়েবমশাই হকচকিয়ে বললেন, আজ্ঞে কি হয়েছে, বলুন?
যুগলবাবু বললেন, হয়নি কি? হয়েছে, একশাে বার হয়েছে।
এই যে আমার বিশু কলকাতায় যাবে, তুমি তার কোনাে কথা
ভেবেছ ?
নায়েবমশাই বললেন, আজ্ঞে, ছােটবাবুর মাসিক টাকাকড়ির
বন্দোবস্ত আমি ত’ সব ঠিক করে রেখেছি।
যুগলব,বু বললেন, মাথা কিনেছ!—বলে চীৎকার করে উঠলেন।
পুনরায় বললেন, টাকা–টাকা—কেবল টাকাই চিনেছ,-সমস্ত
জীবনটা কেবল দেনা-পাওনার খাতা খুলে রেখেছ,-ছেলেটা
কলকাতায় গিয়ে যে বেঘােরে পড়বে, তার কি'করেছ শুনি ?
নায়েবমশাই হাত কচলাতে কচলাতে বললেন, আজ্ঞে-
যুগলবাবু বললেন, কেবল আজ্ঞে আর আজ্ঞে ! কেবল হাত
কচলানাে নায়েবিটাই শিখে রেখেছ।
বিশু মায়ের কাছ থেকে সরে এলাে। তারপর বললে, আপনি
ব্যস্ত হবেন না। আমার ঘরে চুরি হবার পর থেকে ঠিক করেছি
ঠাকুর-চাকর আর রাখবে না।
রাণীমা বললেন, তাহলে তাের সেখানে কেমন করে
চলবে ?
বিশু বললে, কিছু অসুবিধে হবে না মা,—সেটা যে কলকাতা,
চাইলেই সব পাওয়া যায় ?
যুগলবাবু বললেন, এই ত চাই,দেখলে, ছেলেকে কেমন করে
মানুষ করে তুলেছি ?—বলি, দেখলে ত নায়েব, দেখলে ত, এবার
বুঝতে পারলে ত’?
নায়েবমশাই সবিনয়ে বললেন, আজ্ঞে।
।
যুগলবাবু বললেন, আবার আজ্ঞে ? ছাই বুঝেছ, সব ছেড়ে ছুড়ে কাশী না গেলে তােমর কোনােদিন কিছু বুঝবে না!—এই বলে রাগে গর গর করতে করতে তিনি চলে গেলেন। পরের দিন সকালেই বিশু সকলের কাছে বিদায় নিয়ে বেরুলাে। গ্রামের পথ, এখানে গরুর গাড়ী ছাড়া আর কোনাে সুবিধা নেই। তখন শীতের শেষ—মাঠে মাঠে ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে। ধুলাে উড়িয়ে তার গরুর গাড়ী ষ্টেশনে এসে হাজির হলো। ট্রেনখানা এলাে প্রায় মধ্যাহ্নকালে। রাত্রে গিয়ে কলকাতা পৌঁছবে। বিশু একখানা সেকেণ্ডক্লাস টিকিট কিনে গাড়ীতে উঠলাে। কাছারির লােক আর বরকন্দাজ বিদায় নিল। প্যাসেঞ্জার গাড়ী প্রায় প্রত্যেক ষ্টেশনেই থামে—সুতরাং ভ্রমণটা কিছুটা বিরক্তিকর। যাই হােক একখানা ইংরেজি মাসিকপত্র খুলে নিজের মনে বিশু হেলান দিয়ে বসে রইলাে। কতক্ষণ বসে রইলাে একভাবে বই মুখে নিয়ে, আর একটির পর একটি ষ্টেশনে গাড়ী থেমে আবার চলতে লাগলাে। প্রায় বেলা অপরাই। এমন সময় কি যেন একটা ছােট ষ্টেশনে গাড়ী এসে থামলাে। সামনে একটা চা-ওয়ালাকে দেখতে পেয়ে বিশু গাড়ী থেকে নামলােবসে ব'সে তার হাত পা যেন জড়িয়ে গেছে। সবেমাত্র চা-ওয়ালার হাত থেকে এক পেয়ালা চা নিয়ে সে মুখে দিয়েছে এমন সময় দূরে একটা ভীষণ হৈ চৈ শুনে সে মুখ ফিরিয়ে তাকালাে। দেখলাে একটি লােক লাইনের পর দিয়ে উদ্ধশাসে ছুটতে ছুটতে তার দিকে আসছে। লােকটা কেবল চীৎকার করছে এই বলে,-পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ? মামনুসর । ৫৭ পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ? মামনুসর! মামনুসর! লােকটার পরণে গেরুয়া, একমুখ দাড়িগোঁফ, কপালে মস্ত সিদুরের টানা, হাতে কি যেন একটা। বিশু একটু উদভ্রান্তভাবে তাকালাে--দেখলে সবাই ছুটোছুটি করছে। কিন্তু তার কি করা উচিত এই কথা ভালাে করে ভাববার আগেই সেই কাপালিকের মত লােকটা ছুটে এসে তার সেই বীভৎস দাত বার করে হাসিমুখে বললে, পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ? মামনুসর। ষ্টেশন মাষ্টার, টিকিটবাবু, কুলি—সবাই ছুটোছুটি করছে। সকলে ভয়ে তটস্থ। ওধার থেকে একজন চেঁচাচ্ছে—পালাও, পালাও, পুলিশ- পাগল আবার বললে, পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ? বিশু চীৎকার করে বললে, কি-কি-বলছেন? পাগল উচ্চ হাসি হেসে বললে, এসাে-কথা আছে! আড়ালে বলবাে বলবাে। তারপর বিশুকে কতকটা পথ টেনে নিয়ে গিয়ে সে বললে, ইয়া, এইত চাই! তা বেশ। আহা, কদিন পরে দেখা।-প্রায় হাজার দশেক বছর হােলল, না ? বিশু আঁৎকে উঠে বললে, আঁ—আমায় ছেড়ে দিন- পাগল অত্যন্ত অন্তরঙ্গের মতাে বললে, আরে ভাই-দাড়াও না মজার কথা আছে। বিশু বললে, মজা! কিসের মজা? কে তুমি? পাগল হেসে বললে, আরে সাংঘাতিক মজা।—এই দ্যাখােনা, আমার কথায় সূর্য উঠলাে, আমারই কথায় এই তােমার গাড়ী থামলাে ! যাবে কোথা ? বিশু বললে, কি—মানে— ৪৮
পাগল বললে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ—তাই ত তােমার সঙ্গে দেখা।
দাড়াও চুপটি করে দাড়াও। কাজের কথা শােনন। বলি,
তােমাকে যে-কাজে পাঠালুম, তার কি করলে?
বিশু বললে, কাজ—কিসের কাজ?
পাগল বললে, কেন, এই ত বুদ্ধ—বুদ্ধকে পাঠালুম—অহিংসা
দিয়ে গেল! চৈতন্য-চৈতন্যটা কিছু না।
শুধু প্রেম দিয়ে
পালিয়ে গেল—কিন্তু—একটা ধম তৈরী করে দিলে—তুই-তুই
ছোঁড়া যা তাই রয়ে গেলি। একেবারে অপদার্থ। তাের দ্বারায়
কিচ্ছু হলাে নানা কিছু হােলল না! তা—আয় কাছে আয়।
মাখাটা দে—ভয় কি ? এই বলে হাতের ছুরিখানা বার করে
বললে, খুলিটা অস্ত্র করে দিই আয় আয়-
বিশু বললে, না, না, ছাড়ুন, ছেড়ে দিন।
পাগল হিংস্র আনন্দে বললে, আয়-আয় খুলিটা অস্ত্র করে
দিই—শক্তি পাবি কি করে?-হারা হারা বােবােম
প্রথমটা বিশু তার সঙ্গে ঝটাপটি করলাে, তারপর অগত্যা
তা’কে শক্তি প্রকাশ করতে হলো। ছুরিসুদ্ধ পাগলের ডান
হাতখানা ধরে তাকে একটা ঝট্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। পাগলটা
তখনই হুমড়ি খেয়ে উঠে চীৎকার করলাে, পথিক, তুমি কি পথ
হারাইয়াছ? মামনুসর।
বিশু আর কোনােদিকে না তাকিয়ে সামনের একখানা কামরায়
উঠে লুকিয়ে পড়লাে।
পাগল তখন চীৎকার করছে—মেরেছিস কলসীর কানা, তা
বলে কি
এমন সময় ওদিক থেকে একটি তরুণী টিকিট ঘর থেকে টিকিট
করে যখন এগিয়ে আসছে সেই সময় সহকারী মাষ্টারমশাই দৌড়ে
এসে বললেন, দেখুন, শিগগির আপনি গাড়ীতে উঠে পড়ন?
৪২
তরুণী মুখ তুলে বললে, কেন? মাষ্টারমশাই বললেন, একটা পাগল এদিকে মােরা ফেরা == পাগল! হ্যা—এই কাছেই পাগলা গারদ থেকে বেরিয়ে পড়েছে আপনি—আপনি তাড়াতাড়ি গাড়ীতে উঠে পড়ুন- তরুণী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললে, যদি হঠাৎ এদিকে এসে পড়ে। যদি মাষ্টারমশাই বললেন, না, না, ভয় নেই—আপনি শিগগির গাড়ীতে উঠে পড়ন—এই যে—এই গাড়ীটা একেবারে খালি তরুণী বললে, কিন্তু কিন্তু ধরুন একলা খালি গাড়ী পেয়ে পাগলটা যদি এসে পড়ে ? সহকারী মাষ্টারমশাই বললেন, আপনি উঠে পড়ে গাড়ীর দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিন—তা ছাড়া আমরা আছি- পাগলট। যাতে গাড়ীতে না উঠতে পারে আমরা দেখবাে। আচ্ছা, ধন্যবাদ ।-বলে তরুণী গাড়ীতে উঠে একটি বেঞ্চ দখল করে বসলাে সুস্থ হয়ে। তরুণীর নাম নিরু। বাঁশী বাজিয়ে গাড়ী ছেড়েছে। গাড়ী বেশ চলছে! নিরু সহজ হয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসবার চেষ্টা করতেই সহসা তার পায়ের আঘাত লাগলাে বিশুর গায়ে। বিশু ভয়ে তখন বেঞ্চের তলায় লুকিয়ে ছিল। নিরু চমকে উঠতেই বিশুর পক্ষে অমনভাবে আত্মগােপন করে থাকা নিতান্ত অস্বাভাবিক হয়ে উঠলাে। হুমড়ি দিয়ে পড়ে থাকা আর চলে না বুঝে বিশু বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতেই ধাক্কা লেগে একটা জলের কুঁজো প'ড়ে ভেঙ্গে গেল-জল ছড়ালাে এদিক ওদিক। নিরু শিউরে চমকে চেঁচিয়ে উঠে বললে, আঁ, সেই—সেই পাগলটাই—
বিশু উঠে থতমত খেয়ে বললে, আমি পাগল। কী বলছেন
পাগলের মতন? এই বলে সে বেঞ্চের অপর দিকে সরে
দাড়ালাে।
ভীত উদ্ভ্রান্ত চক্ষে নিরু বিবর্ণ মুখে তাকালো-কি যে করবে,
ভেবে পেলাে না। কিন্তু উদ্বিগ্ন চঞ্চল ভাবে সে উঠে দাঁড়িয়ে
অনেকটা যেন আত্মরক্ষা করবার চেষ্টা করলাে।
বিশু তার ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করে হাসিমুখে বললে, আপনি ভয়
পাবেন না, আমি পাগল নই।
নিরুর ভয় বেড়ে গেল। সে বললে, না, ভয় পাইনি-কই,
‘ভয় ত’ পাইনি? কিসের ভয়? ভয়ের কিছু নেই।
বিশুর ঝাঁকড়া-মাকড়া চুল, মুখখানা রাঙা, চোখে অপরাধীর
ভাব। কিন্তু তবু সে সবিনয় হাস্যে বললে, তবু আপনি ভয় পাচ্ছেন
মনে হচ্ছে কিন্তু আমি পাগল নই।
নিরু তা’কে একপা এগােতে দেখেই ভীত কণ্ঠে বললে, না,
কে বলেছে তুমি পাগল ?-কই না, তুমি ত’ পাগল নও—তুমি বেশ
লােক, ভালো লােক—কিন্তু
বিশু এবার কৌতুক বােধ করে বললে, কিন্তু কি বলুন?
আড়চখে অস্বস্তিভরে
নিরু তার দিকে তাকালাে। বললে-
, না কিছু নয়,—কিছু বলিনি তাে। কিন্তু কিন্তু তুমি ওইখানেই
থাকে—
বিশু এবার হা হা করে হেসে উঠলাে। বললে, আপনি যেন
পাগলকেই শান্ত করছেন। কিন্তু আমি বলছি, আমি সত্যই পাগল
নই। আপনাকে স্পষ্ট করেই বলি—
নিরু চঞ্চল হয়ে বলে, না,-না না–থা স্পষ্ট করে আর
বলতে হবে না—অস্পষ্ট কিছু নেই—
বিশু শান্ত হাসিমুখে আবার বললে, শুনুন, মিছেমিছি ভয়
পাচ্ছেন—আমি যে তখন বেঞ্চের তলায় লুকিয়েছিলুম সে কেবল- নিরুর মনে হােলাে লােকটা কেবল পাগল নয়, গভীর শয়তান। সে চেঁচিয়ে বললে, আমি নামতে চাই। বিশু বললে, ও কি, কি করছেন? অকারণে চেন্ টানবেন না পঞ্চাশ টাকা ফাইন হবে।–দাড়ান, এক্ষুনি গাড়ী থামবে পরের ষ্টেশনে। নিরু হতাশভাবে দরজার কাছে দাড়িয়ে মুহুর্ত গুতে লাগলাে। বিশু বললে, ওঃ, আপনি যা করছেন—পাগল ত’ পাগল বাঘ- ভাল্লুককে দেখলেও লােকে এত ভয় পেতাে না। অচেনা জায়গায় আপনি কেন মিথ্যে নামতে চান ? নিরু চঞ্চলভাবে বললে, হােক, অচেনা হােক—আমি নামবাে, আমার দরকার। এমন সময়, প্যাসেঞ্জার গাড়ীর গতি মন্থর হয়ে এলাে। গাড়ী- খানা ধীরে ধীরে একটি ষ্টেশনের প্লাটফরমের ধারে এসে দাড়ালাে। দরজাটা খুলে নিরু নামবার উদ্যোগ করতেই বিশু এগিয়ে এসে দাড়ালাে। তারপর বললে, শুনুন, আপনাকে নামতে হবে না। অচেনা দেশে আপনার কোনাে দরকার থাকতে পারে না, আমি জানি। আমিই নেমে যাচ্ছি। এই বলে সুটকেসটা হাতে নিয়ে দিব্যি সহজ সুস্থ ব্যক্তির মতাে বিশু প্লাটফরমে নেমে পড়লো। তারপর দরজার কাছে দাড়িয়েই সে বললে, আচ্ছা নমস্কার-কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে এসে বললে, কিন্তু দেখুন-হা-একটা কথা নিরু সবিস্ময়ে তাকালাে! ট্রেণের বাঁশী বাজলল। বিশু বললে, একটা কথা, কথাটা বার বার মনে হচ্ছে। ক্ষমা করবেন। * আমার গায়ে তখন আপনার পা লেগেছিল, তার জন্যে পায়ে আপনার লাগেনি ত? আচ্ছা নমস্কার। নিরু অবাক হয়ে চেয়ে রইলাে। ট্রেন ছেড়ে দিল। কলকাতার কলেজগুলি থেকে সেই সময় কয়েকজন ছাত্র ও ছাত্রীকে নিয়ে একটি অভিনয় করার চেষ্টা চলছিল। দিন আর বেশী নেই, এই বেলা মহড়া না দিলে সময়মতাে সাধারণ রঙ্গালয়ের উপযােগী করে ছেলেমেয়েদের গড়ে তােলা সম্ভব হবে না—এই মনে করে একটা তাড়াহুড়াে পড়ে গেছে। ভালো করে মহড়া দেবার জন্য সুরমা-দি নিজের বাড়ীর নীচের তলাকার বড় হল ঘরটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তা ছাড়া নিজেও কতকটা মেয়েদের তৈরী করে দেবার ভার নিয়েছিলেন। অথচ ছাত্র- ছাত্রীদের মধ্যে তেমন বিশেষ চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে না বলে তাঁর দুশ্চিন্তার অবধি ছিল না। একদিন তিনি সকলকে তিরস্কার করে বললেন, তােমরা ভাই কেউই আমার কথা শুনছে না—আজ বাদে কাল নাটক প্লে হবে—কিন্তু তােমাদের কারাে গা-ই নেই। সুরমা-দির কথার উত্তরে একটি মেয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে আয়নায় নিজের মুখের টয়লেট দেখে বললে, হা, কি বলছেন, সুরমা-দি ? ,
সুরমা-দি বিরক্ত হয়ে বললেন, কথা ভাই তােমাদের কানে ওঠে
—সেই থেকে ব’কে ব’কে সারা হলুম—এই যে, অলকা—তােমার
পার্ট মুখস্থ হয়েছে ত ?
অলকা বললে, না সুরমাদি, এবারেও উইক-এণ্ডে আমাদের
অভিটিং ছিল কিনা, তাই সময় হয়ে ওঠেনি।
সুরমা-দি বললেন, তবে ভাই তােমাদের ওই ছাইভস্ম নাটক
আর প্লে হবে না। কেবল তােমাদের অডিটিং, কেবল পিকনিক,
-এই দেখােনা, নিরুকে বললুম, তােমাকে হিরােয়িনের পার্ট
নিতে হবে—নিরু অমনি নিরুদ্দেশ হলাে—
কথাটা তার শেষ হয়নি, এমন সময় ঝড়ের মতাে নিরু এসে
উপস্থিত।
নিরু হাসিমুখে বললে, না সুরমাদি, নিরুদ্দেশ হইনি—একটু
কাজ ছিল, তাই দিন দুয়েকের জন্যে বাড়ী গিয়েছিলুম।
সুরমা-দি কতকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, বেশ, তােমাকে
পাওয়া গেল, এবার নিভার তােমােদ করিগে। আমার
হয়েছে যত মাথা ব্যাথা! বলতে বলতে তিনি চলে গেলেন।
ইলা বললে, এই নিরু, তুই হিরােয়িনের পার্ট, করবি, গলা,
শুকিয়ে যাবে না?
নিরু বললে, গলা শুকোবে কেন?
ইলা বললে,-আরে, হিরাে সাজবে যে আমাদের চ্যাটার্জি দি
গ্রেট।
নিরু কুঞ্চন করে বললে, কে আবার তােদের চ্যাটার্জি দি
গ্রেট।
ইলা বললে,—হ, অত বড় স্কলার, আই-এস-সিতে ফাষ্ট
হলাে—তার নামটাও তাের কাণে ওঠেনি? দেখবিতার সামনে
অভিনয় করতে গিয়ে ভয় পেয়ে মরবি।
নিরু বললে, ভয়! কিসের ভয়? অভিনয় করতে ভয় কিসের ? রেবা বগলে, না ভাই না, আমি ওই জন্যেই কোন পার্ট নিইনি। আমার ভাই ভয় করে ছেলেদের সঙ্গে অভিনয় করতে। যদি হঠাৎ হাত ধরে ? লাবণ্য বললে, আমারাে ভাই ভয় করে। যদি কোনাে বোস কথা বলে বসে? নিরু বললে, তােদের এক কথা! অভিনয় করবাে, অত ভয় কিসের। আমার ভাই অত ভয় টয় নেই—ভয় পেলে কোনাে কাজই হয় না। ঠিক সেই সময় সহসা অদূরে বিশুকে দেখে সকলে সবিস্ময়ে আনন্দে গুঞ্জন করে উঠলল! নিরু কিন্তু বিমূঢ় আতঙ্কে বলে উঠলল, ও কি—আঁ—ওই যে সেই রেবা বললে, কি রে, কি বলছিস ? নিরু বিস্ফারিত চক্ষে বললে, ওই ত সেই, সেই ট্রেণে—সেই ইলা চুপি চুপি বললে, আরে ওই ত’ চ্যাটার্জি দি গ্রেট—ওর কথাই তােকে বলছিলুম-তুই চিনিস নাকি ? নিরু থতমত খেয়ে বললে, নামানে—ঠিক চিনিনে—তবে, হা—আমি যাই- বলতে বলতে সে বেরিয়ে গেল একপাশ দিয়ে। দরজা পেরিয়ে বারান্দা দিয়ে ঘুরে সে যখন বাইরের দিকে এসেছে, সেই সময় কোথা থেকে এসে বিশু বললে, এই যে, ভাল আছেন ত ? নমস্কার! নিরু কুষ্ঠিতস্বরে জবাব দিল, হা-আপনি- বিশু বললে, হঁা। মানে-সেই আমি। নিরু বললে, আপনি তাহলে-বলতে বলতে মুখখানা একটু রঙীন হয়ে উঠলাে। বিশু বললে, না, পাগল আমি নই—সুস্থকায় একটি ভদ্রলােক।
এই বলে সে হাসলাে।
হেসে পুনরায় বললে, সেদিন ট্রেণে
অকারণে আপনি ভয় পেয়েছিলেন।
নিরু নিজেকে কতকটা সামলে বললে, সেদিন অনেক অন্যায়
হয়ে গেছে, কিছু মনে রাখবেন না।
বিও হাে হাে করে হেসে উঠলাে। তারপর বললে, না না, ও
কিছু ভাববেন না-আপনি বসুন, ওদিকে আমি রিহাসল কর
এগুলাে দেখে আসি।
-এই বলে বিশু সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
এদিকে মেয়েরা ততক্ষণে একটু সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছে।
পিছনে যেন কোথাও কিছু একটা আছে, এইটিই তারা আঁচ করে
নিল ইতিমধ্যে।
নিরু ফিরে আসতে লাবণ্য বললে, আগে থেকে তােদর দুজনের
ভাব ছিল, কি বলিস?
অলকা বললে, হাঁ, চ্যাটার্জি কিন্তু ঢং দেখিয়ে গেল খুব। ডুবে
ডুবে জল খাওয়া।
রেবা বললে, তাহলে এটা নিতান্ত অভিনয় না রে নিরু?
নিরু বললে, আমি ভাই আগে চিনতুম না ওঁকে!
রেখা বললে, তা বেশ, এখন চেনাচিনি দেখে খুশী হলুম। কি
বলিস, সুনন্দা ?
সুনন্দা বললে, যা বলেছিস! “পঞ্চশরে দগ্ধ করে করেছ একি
সন্ন্যাসী, বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে।”
নিরু হেসে বললে, যা পােড়ারমুখী, কী যে বলিস।
অলকা বললে, কী আর বলব ভাই? সুধু বলি, “রাখালী ললা
রাখালী, কত রঙ্গ দেখালি।”
ওপাশে তিন চারিটি ছাত্র বসে বসে কাণাকাণি করছিল।
তাদের মধ্যে একজন বললে, তাের বন্ধুর ব্যাপারটা দেখলি? .
আজকাল বেশ ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে।
ধীরেন বলে, আরে নে, খেলােই বা একটু জল-সাঁতারটা
ভাললা জানলেই হােলাে-ডুবে না যায়।
হরেন বললে, আরে, ডুবে গেলেও ডুববে না—চৌকস ছেলে-
ডুব-সাঁতার জানে।
ওদের সবাইকে এড়িয়ে নিরু আর বিশু কতকটা যেন নিষ্ঠের
মতাে আলাপ করে চলেছে। কথাবার্তার শেষে নিরু বললে,
বেশ ত, তাহলে আসুন না আমার গাড়ীতে আপনাকে পৌছে
দেবাে ?
বিশু সপ্রতিভভাবে বললে, কিন্তু
নিরু বললে, না, না, অসুবিধে হবে না—আসুন।
বিশুর আর আপত্তি করবার কিছু রইলাে না। সে নিরুর গাড়ীতে
গিয়ে উঠে বসলাে। নিরু হাসিমুখে গাড়ীতে স্টার্ট দিল।
বিশু বললে,
গাড়ী ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়লে ভবানীপুরের এক পাড়ায়।
বললে, আমার আপনার কতখানি দেরী
হয়ে গেল।
নিরু হেসে বললে, তা হােক, কত গল্প করলুম দুজনে।
বিশু বললে, আচ্ছা এবার আমি নামব,—ওই ল্যাম্পপােঠের
কাছে গাড়ী থামা-
গাড়ী এসে থামলাে একখানা বাড়ীর সামনে। বিশু নেমে
পড়লাে। কিন্তু সেই সময় পিছন থেকে ডেকে নিরু বললে, দাড়া
সেদিন আপনাকে ‘পাগল’-“তুমি’—আমরা কি যেন সব বলেছিলুম,
মনে আছে তা
*
ও 'যিশু হেসে বললে, হ্যা, আছে বৈ কি-
নিরু বললে, বেশ, তার জন্যে একদিন আপনার বাসায় চড়াও
হয়ে, ক্ষমা চেয়ে নিয়ে যাবে। কেমন ?
বিশু হেসে বললে, বেশ ত? এলে খুশীই হবে।
নিরু হাসিমুখে আবার গাড়ী ছুটিয়ে দিল। বিশুর সঙ্গ ছাড়বার
পরমুহুর্ত থেকে নিরু উল্লাসে অধীর হয়ে উঠেছে—একটা অজ্ঞাত,
অনাস্বাদিত, অসহ্য উল্লাস এলাে তার সর্বাঙ্গে। সহসা আপন
উদ্দীপনাকে অপব্যয় করার জন্য সে দ্রুত উন্মত্তবেগে মােটরখানা
চালিয়ে, গাড়ীখানাকে ঘুরিয়ে, দুলিয়ে, পাক খাইয়ে, যেখানে সেখানে
যেমন তেমন করে বেঁকিয়ে যেন নিজেকেই সে বিদীর্ণভাবে প্রকাশ
করতে লাগলাে।
; অবশেষে সে বাড়ীর ধারে এসে গাড়ী থামিয়ে ঝাঁপিয়ে নামলাে।
সামনে তার পােষ একটি লােমবহুল বিড়াল বসেছিল,নিরু
তাকে লুফে তুলে নিয়ে অধীর আবেশে আদর জানিয়ে উচুতে তুলে
আবার ঝপ করে নামিয়ে ছুটে চললাে একটা গানের কলির সুর
নিয়ে চললো ভিতরে।
ভিতরে একটি সুসজ্জিত কক্ষে সৌম্যদর্শন, স্বাস্থ্যবান, সহাস্য
এক বৃদ্ধ আপন মনে “patience” খেলছিলেন। নিরু তার দৃষ্টি
আকর্ষণের জন্য এটা ওটা নাড়াচাড়া করে আওয়াজ করলাে,
কিন্তু ব্যর্থ হয়ে অবশেষে সে পূর্বেকার সঙ্গিতের সুরটিই ধরলাে
হাসি মুখে—বৃদ্ধের চমক ভাঙলল,-সমেহ মধুর দৃষ্টিতে তিনি
তাকালেন। নিরু কাছে এগিয়ে এলাে।
নিরু ডাকলাে, দাদু ।
দাদু চশমা সরিয়ে মাথা তুললেন। বললেন, এই যে, এ আবার
,
নতুন কি শুনি ?. ‘ঘরেতে ভ্রমর এলাে গুনগুনিয়ে। বলি, ব্যাপার
খানা কি, বল দেখি দিদি।
নিরু বললে, ব্যাপার আমার মাথা আর তােমার মুতু!
বলেই সে ভ্যানিটি ব্যাগটা ছুড়ে একধারে ফেলে দিল।
দাদু সহাস্যে বললেন, তাই নাকি? মাথাটা ঘুরে গেল, না মুণ্ডু
কাটা গেল,কোষ্টা?
নিরু দু হাতে দাদুর গলাটা জড়িয়ে ধরে বললে, দাদু কি
বলব তােমাকে—একদম ম্যাজিক্-যাকে তুমি বলাে, রূপকথার
ইজাল ।
দাদু হাসিমুখে বললেন, বটে—তাহলে বল রিহার্সালটা বেশ
জমিয়েছিস্?
নিরু হেসে জানালার ধারে সরে গেল, তারপরে দেওয়ালে টাঙানাে
ছবিটার দিকে তাকাল। সেখান থেকে এলাে আয়নার কাছে।
দাদু তার ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করে বললেন, হুম। লক্ষণ ভালাে নয়-
সাপে কামড়েছে। ডাক্তারের দরকার।
নিরু সকৌতুকে বললে, ডাক্তার কেন দাদু, তুমি মন্তর পড়ে বিষ
নামাতে পারাে না।
দাদু বললেন, হা ভগবান, কাল কেউটের বিষ, ওকি মরে
নামবে ? না—আমার কপাল পুড়লাে
দেখছি। বলি নায়কটি
কে শুনি ?
নিরু কপট গাম্ভির্য্যে বললে, দাড়াও বলছি। এই ধরাে তার
পরণে বাঘের ছাল, গলায় সাপের মালা, মাথার জটায় গঙ্গার ধারা
-যাকে তুমি বলাে, তােমার দেবাদিদেব বিশ্বনাথ।
দাদু বললেন, বটে। মনে হচ্ছে তাের গলার আওয়াজে কাঁপন
লেগেছে, চোখে চাঞ্চল্য, হাতে পায়ে নদীর জোয়ার-তা হলে
উপসর্গ মিলছে কেমন ?
নিরু চোখ নামিয়ে বললে, কি যে বল তুমি দাদু !-মুবানা ।
রাঙা হয়ে উঠেছে।
দাদু বললেন, দিদি, গান্ধর্ব মতেই বলছি। এবার তাহলে
শ্রীশ্রীপ্রজাপতয়ে নমঃ। যথাবিহিত সম্মানপুরঃসর নিবেদং মিং-
কেমন ?
নিরু খিল খিল করে হেসে লুটিয়ে পড়লাে।
দাদু বললেন, তারপরে আদ্যিকালের মালাবদল! তারপরে
তুই চিঠি দিবি তাকে? ঠিকানার পাশে লিখবি ‘যাও পাখী বলল
তারে, সে যেন ভােলে না মােরে! ওপিঠে লিখবি ‘সাড়ে চুয়াত্তরের
দিব্যি, মালিক ভিন্ন কেহ পত্ৰ খুলিবেন না।-কেমন?
নিরু হেসে বললে, দাদু, তােমাদের কালে বুঝি তােমরা এই সব
কীর্তি করতে।
দাদু বললেন, ওরে দিদি, এসব কীর্তিকাহিনী সেই আদ্যিকাল
থেকে চলে আসছে। সেকালের ফুল একালেও ফোটে—সেই একই
গন্ধ। সেই একই নদী বয়ে চলে আজও একই গান গেয়ে।-এই যে
আজ তাের চোখে মুখে রংয়ের আবেশ লেগেছে, প্রাণের ঢেউ উঠেছে
তাের চলাফেরায়-এটা আগের দিনও ছিল যে, দিদি ছিল!-ওকি,
পালা কেন ?
নিরু বললে, দাদু যেন কী-অস্ফুটস্বরে বলে সে চলে
গেল!
দাদু উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলেন।
নব অনুরাগিনী রাজহংসীর মত লীলায়িত গতিতে নিরু বেরিয়ে
এসে সিড়ি দিয়ে উঠলাে। তার চোখে, তার হাতে, তার সর্বাঙ্গের
ভাষা হােলল, হে পৃথিবী, তুমি সুন্দর,যা কিছু সব সুন্দর। তার
গতি ত্বরিত নয়, কিন্তু স্বলিতও নয়।-সে যেন সঙ্গীতরূপিনী হয়ে
উঠেছে।
মাঝসিড়ির বারান্দাপথে সে এসে দাড়ালাে। জানালার বাইরে দশমীর বিপুল জ্যোলােকের স্বপ্ন—সেই স্বপ্ন নিবিড় হয়ে এলাে তার চোখে। সে গান গাইতে লাগলাে। নীচে গানের সুরে দাদু আনমনা হয়ে উঠলেন। তাঁর চোখের সামনে নিরুনিরুপমার অন্তরের আবেদন যেন প্রকাশমান হয়ে উঠলাে। তিনি বাইরে এলেন, সিড়ি দিয়ে উঠলেন, নিরুপমার পিছনে গিয়ে দাড়ালেন মুগ্ধ হয়ে। নিরুপমার গান যখন থামলাে, দাদু তখন কাছে গিয়ে বললেন : দিদি, কি আশ্চর্য তাের গান, এমন করে ত কোনাে-দিন গানি। এই বলে তিনি নিরুর মাথার উপর স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। ঘন মেঘে সেদিন বর্ষার চেহারা দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টির অভাব- অন্ধকারের আচ্ছন্ন ছায়া—চাপা চাপা বাতাসের বেগ-ঝড়বৃষ্টির সঙ্কেত। বিশু ঘরে একলা। মনােভাব-“যদি সে আসতো—এমন ঘনঘাের মেঘের আর অন্ধকার অবেলায়” বিশু একটু অস্বস্তিবােধ করে, একটু অশান্ত-একটু অপেক্ষামান- নিরুর কণ্ঠস্বর যেন ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়—“আপনার বাসায় চড়াও হবে, ক্ষমা চেয়ে নিয়ে যাবে।” = বিশ হাসিমুখে সহসা মুখ ফিরিয়ে বলে, আরে, আপনি আসুন আসুন—কী সৌভাগ্য আমার। আপনার কথাই ভাবছিলুম- বসুন-ইয়া, ঠিক হয়েছে।—কিন্তু এই যা—আর ত’ জানিনে— এর পরে কি বলব? কী কথা বলে কথা আরম্ভ করতে হবে? বিশুর মুখের এই কথাগুলো শুনলে হঠাৎ মনে হতে পারে যে ঘরের মধ্যে দ্বিতীয় একজন নিশ্চয়ই উপস্থিত। কিন্তু আসলে তখন ঘরের মধ্যে বিশু ছাড়া আর কেউ নেই। তাকে যে নিরু একদিন পাগল বলে ঠাউরেছিল, সেটা মিথ্যে নয়। এমন সময় বাইরে কার কড়ানাড়ার শব্দ হতেই বিশু বললে, কে?—এই রে, সত্যিই বুঝি তিনি এসেছেন।—কে? এই বলে এগিয়ে দরজাটা খুলতেই জিতু আর শ্যাম এসে ঢুকলাে হাসিমুখে। বিশু বললে, ধ্যেৎ তেরি মূর্তিমান গদ্য- জিতু বললে, বিশু তুমিই ত ওকে বলে কয়ে মামার কাছে পাঠিয়েছিলে—এবার নাও এনেছি ওকে ধরে বিশু শ্যামকে প্রশ্ন করল, বল তাের মামার সঙ্গে কি হয়েছে এবার খুলে বল! শ্যাম বললে, সােজা মামার কাছে গিয়ে বললুম, মামা চাকরি দাও! মামা বললে, সে কি, এটা কাঠের কারবার, কাজকর্ম শিখে আসতে হয়। তাছাড়া শুনেছি তুই একজন কবি—তাের কবি এখানে কি কাজে লাগবে রে ? বিশু বললে, তুই কি বললি? শ্যাম বললে, মামাকে বললুম, মামা, তােমার এই শুকনাে কাঠেই আমি ফুল ধরাবাে।মামা অবাক। জিতু হেসে বললে, তারপর ? শ্যাম বললে, তারপর-মামাকে যথারীতি শুনিয়ে দিলুম আমার আরেকটা সাম্প্রতিক রচনা- R
এই বলে সে কবিতার খাতা বার করে পড়তে সুরু করল।
জিতু বললে, এই সেরেছে। এখন সামলা?
বিশু বললে, তুই ত ওকে খোঁচালি! এখন তুই সামলা!
শ্যাম বললে, শােনাে মন দিয়ে শােনাে-এর নাম, লাল ধোয়া
---রচয়িতা শ্যাম লাহা। গ্রন্থকার কর্তৃক এর নাট্যস্বত্ব, সিনেমা,
গ্রন্থস্বত্ব, রেকর্ডস্বত্ব ইত্যাদি সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
জিতু বললে, মর্মান্তিক।
শ্যাম তার কবিতাটি অতি মনোেযােগের সঙ্গে পড়তে লাগলাে :
কাঠের গােলায় শুনি অরণ্যের কান্না,
তার সঙ্গে চৌরঙ্গীতে মেয়েদের
লিপষ্টিক মাখা ঠোট আর
হি তােলা পাদুকার খটখট শব্দ।
আগুনের মতো নীল তার শাদা চোখ,
যেন হলদে ডিমের থেকে কালো পাখী
ছুটে আসে ঠিক যেন লাল তুষার।
শুধু বেকার যুবক চেয়ে থাকে
রােগা চোখে বাতায়ন পথে!
বিশু আর জিতু দুজনে হাসতে হাসতে কি যেন ইসারা কয়লা,
তারপর জিতু শ্যামকে ঠেলে বললে, বাঃ চমৎকার—এবার চলে
লক্ষ্মীটি-চলাে যাই বেড়িয়ে আসিগে—
বলতে বলতে জিতু তাকে জোর করে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে
গেল। ওদের বিদায় নেবার পর বিশু এগিয়ে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে
এসে জালাটা খুলে দিয়ে বসতে যাবে—এমন সময় আবার দরজার
আওয়াজ। দরজা খােলর পর আর একটি বন্ধু প্রবেশ করলাে।
বিশু বললে, ওঃ তুই ?
বন্ধু বললে, হ্যা আমি।
খুব নিরাশ হয়ে গেলি দেখছি?
বিশু বললে, হবারই কথা। পদ্মবনে মত্ত হস্তীর প্রবেশল যে। বন্ধু বললে, বটে! বিরহী যক্ষের মতন বসে তাহলে সেই মেয়েটির কথাই ভাবছিলি-কেমন? বিশু বললে, কেমন করে বুঝলি?-এই বলে সে হাসলো। বন্ধু বললে, তােমার ওই মধুর হাসিই তার প্রমাণ !- বেশ, মেয়েটিকে কেমন মনে হচ্ছে? বিশু বললে, কেমন মনে হচ্ছে, বল দেখি? বন্ধু একটু হেসে জবাব দিল, “কিছু পাশের নেশা, কিছু বা চাপায় মেশা—” এই না ? বিশু বললে, কি উত্তর চাস, শুনি? বন্ধু বললে, আচ্ছা থাক্-বুঝলুম-মনে মনে রঙে রসে জাল বুনছিস?—তা কর এগােলি? প্রথম পর্ব শেষ? বিশু বললে, মানে? বন্ধু বললে, মানে, অকারণে হাসি, বাঁকা চোখে চাওয়া, গদগদ ভাষা, চাপা চাপা নিশ্বাস- বিশু বললে, নাঃ তােরা দেখি ঝড়ের আগেই দৌড়স— বন্ধু বললে, আমাদের ভাই দোষ কি? তুমিই রেলগাড়ীতে পাগল সাজলে, মােটরে চড়ে ঘুরে বেড়ালে,এখন আবার দেখছি পাগল হয়ে একলা একলা ঘরে বসে হা-হুতাশ করছ! ঝড় ত’ তুমিই তুললো-এই বলে সে উঠে দাড়ালো। পুনরায় বললে, তা বেশ, ঝড় তােমাদের চলুক—আমি এখন চললুম। এবার বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবাে, কবিতা লেখাে, গান বাঁধে, এসব যদি না পারে, মেয়েদের মতন বালিশে মুখ গুজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদো!-বলতে বলতে বন্ধু হতাশভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বিও হাে হাে করে হেসে ঘরভরিয়ে তুললাে।
ঠিক সেই সময় পুনরায় তার ঘরে কে কড়া নাড়লাে। বিত
ভাবলাে, বটে, এরা চক্রান্ত করেছে আমার বিরুদ্ধে। দাড়াও—এই
বলে সে আস্তিন গুটালে। পরে চেঁচিয়ে উঠল, কে? কি চাই?
আবার দরজায় আওয়াজ।
বিশুর বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠলো। এগিয়ে গিয়ে দরজা
খুললাে। কিন্তু সহসা নিরুকে দেখে সে হতবিস্ময়ে বলে উঠল,
আরে এই যে! আপনি ?—আসুন।
নিরু ভিতরে এসে দাড়ালাে। হাসিমুখে বললে, আপনি বুঝি
এখানে একলা থাকেন ? আত্মীয়রা।
বিশু বললে, তারা দেশে !-বসুন।
নিরু বললে, থাক, আপনাকে আর খাতির করতে হবে না !
বিশু বললে, বারে, আপনাকে খাতির করবাে বলে কতগুলো
কথা গুছিয়ে রেখেছিলুম যে।
নিরু বললে, হয়েছে, থামুন। এখন কাজের কথা শুনুন, যে
জন্যে এসেছি।
বিশু বললে, কোনাে কাজ নিয়ে আপনার আসার কথা
ছিল না ত ?
নিরু ভঙ্গী করে বললে, ও তবে বুঝি ভেবেছেন আমি ক্ষমা
চাইতে এসেছি। সেটি কিন্তু হচ্ছে না।
বিশু সহাস্যে বললে, বেশ, তা হলে আপনার রাকাটা
কি শুনি?
নিরু দমকা হাওয়ার মতন বলে উঠল, 'শুনলে ঠাট্টা করবেন আমি
জানি। কিন্তু সত্যই বলছি, আপনাদের ওই আজগুবী নাটকে
আমি হিরােয়িন সাজতে পারবাে না।
বি সবিস্ময়ে বললে, আরে, আমিও যে এই কথা জানিয়ে
এসেছি।
নিরু কৌতুহল ভরে জিজ্ঞাসা করল, কি জানিয়েছেন ?
বিশু বললে, বলেছি হিয়াের পার্ট আমার দ্বারা হবে । তাহলে
দুজনেই আমরা সরে পড়লুম, কেমন ?
নিরু বললে, হঁা, সেই ভালাে। ওদের নাটক যা হয় হােকগে।
আমাদের সামনে বি-এ পরীক্ষা এসে গেছে।
বিশু বললে, আপনাকে—মানে, আপনাকে একটু—এই বলে
সে চারিদিকে নিরুপায়ের মত তাকালাে।
নিরু বললে, আমাকে কি ? কি বলছেন?
বিশু বললে, না, কিছু না।-হু-না-কোন অসুবিধে
নেই। আপনাকে একটু চা খেয়ে যেতে হবে-হ্যা, ঠিক চা দিতে
পারবাে। হ্যা, একটু-একটু দাড়ান, ওকে ডাকি, ওই আমার
চাকরটাকে—মানে, কী যেন ওর নাম ? হ্যা—মনে পড়েছে।
বনমালী? ওরে-বনমালী, বনমালী—দু পেয়ালা চা তৈরী
৮
নিরু কুঞ্চণ করে বললে, বেশ ত, চা করবে বনমালী। এর
জন্যে আপনার এত হৈ চৈ কেন ?
আপনি স্থির হােন্।
বিশু বললে, মানে না, না, কৈ, কিছু না। চাকরটা কানে একটু
খাটো কিনা-ওকে কান ধরে না দেখালে কিছু বােঝে না। আপনি
একটু বসুন—কোনাে অসুবিধা নেই, কোন অসুবিধে হবে না।
বনমালী, বনমালী।
বলতে বলতে সে এবর থেকে গিয়ে ওঘরের পরদা সরিয়ে ভিতরে
ঢুকলো। সে-ঘরটিতে জনপ্রাণী নেই; অথচ সেই ঘরে দাড়িয়ে
বি কল্পিত এক ব্যক্তিকে তিরস্কার করে বলতে লাগলাে, ব্যাটা,
চোখের সামনে থেকে যাস কোথায়? নে, চায়ের জল চড়িয়ে দে।
হ্যা, হঁা, দু’ পেয়ালার মতন--আর সব বলে দিতে হবে।-ইয়া,
ঠিক হয়েছে।-জল ফুটলে বলবি।
•
এই বলে সে আবার সহজ মুখে বেরিয়ে এলাে। এসে
বললে, বুঝলেন, নতুন চাকর কিনা,—চা করতেও জানে না।
নিরু বললে, এবার আপনি স্থির হয়ে বসুন
বিশু বললে, হা,–এই যে! বসবার কি যাে আছে।
নিরু বললে, ওদিকে তাকাচ্ছেন কেন বার বার ।
বিশু থতমত খেয়ে বললে, না তাকালেই ব্যাস—সব লণ্ডভ
বেটা কিছু জানে না—একেবারেই আনাড়ি-
নিরু মুখটিপে হেসে বললে, আপনার চেয়েও ?
বিশু বললে, না, না, কিছু জানে না—আমিও পারি—আমিও
চা করতে। কই রে, কর হােলাে? জল ফুটলাে।
নিরু যেন একটু উদ্বিগ্ন কৌতুকের সঙ্গে বললে, কিন্তু আপনার
বনমালী ত কই সাড়াও দেয় না।
বিশু হতাশ কণ্ঠে বললে, সেই ত’ বিপদ,—দেখি, নিজেই
দেখি!-না দেখলে কিছুতেই চলবে না।
বলতে বলতে বিশু পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলাে। সেইখানে
গিয়ে কল্পিত ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে পুনরায় বললে, হতভাগা,
জল ফুটে গেছে, ষ্টোভ বন্ধ কর ?-এই বলে নিজেই ঠোঙ্গ বড়
করলাে। আবার বললে, কিচ্ছু জানে না কিছু জানে না।
এই—এই—এমনি করে বন্ধ করতে হয়। বলে নিজের হাতেই
জল নামাল, তারপর বলতে লাগলাে, এমনি করে চা দিতে
নে, ঢাকা দে।—নিজেই সে ঢাকাটা বিয়ে দিল।
তারপর নিজেই এগিয়ে বললে,—ওই যে, এবার কাপ দুটো
আন্-কী বললি, কাচের পেয়ালা ভেঙে ফেলিছিস? হতভাগা
আন—ওই গেলাস দুটো আন্-বলে দুটো গেলাস নিজের হাতে
আনলে তারপর বললে, নে ঢাল এবার—উঃ-হাতটা গেল পুড়ে
সশব্দে বিশুর হাত থেকে কেটলী পড়ে গেল,-একটা ঝ
ঝন্ শব্দ। ঠিক এমনি সময় নিরু পিছন দিক থেকে এসে
দাড়ালাে। বললে, কি--কি হােলল? কি হলাে?
বিশু হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললে, উঃ, ছ্যাকা লেগেছে।
নিরু খিলখিলিয়ে হেসে গড়িয়ে লুটিয়ে পড়লাে। পরে বললে
মিছে কথা বললে অমন ছ্যাকা লাগে বৈকি। কোথায় আপনার
কাযালী।-যাক খুব বাহাদুরী হয়েছে, এবার সরুন দেখি?
এই বলে নিরু পাশের ঘরে এসে টেবিলের কাছে তির্যক
ভঙ্গীতে দাড়িয়ে বললে, সেই থেকে আমাকে ধাপ্পা দেবার চেষ্টা
করছিলেন। কোথায় আপনার বনমালী, আর কোথায় বা কী।
আপনি ত ভয়ানক লােক !
চাপা হাসিতে নিরুর দেহট। দুলে দুলে উঠল।
বিশু তাকে বােঝাবার চেষ্টা করলাে, এক্ষেত্রে মিছে কথা
বলে আর কোনাে উপায় ছিল না।
নিরু পেয়ালায় চা ঢালতে ঢালতে বলে, ভারি হাসি পাচ্ছে
কিন্তু
বিশু করুণ কণ্ঠে বললে, তা ত পাবেই—আমার হাত পুড়লে,
আর আপনার মুখে হাসি।
নিরু বললে, না, সত্যি, সেজন্যে নয়। আমার জন্যে আপনাকে
গােড়া থেকেই কত যে নাকাল হতে হলাে তাই ভাবছি।
বিশু বললে, যাক্, এই কৃতজ্ঞতাটুকুই আমার পক্ষে পুরস্কার।
দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে তখন অকারণ মধুর হাসি হাসছে,
দিন তিনেক পরে আবার তাদের দুজনকে দেখতে পাওয়া
গেল ময়দানের প্রান্তে কোনাে একটি নিরিবিলি কেন্দ্রে। সেদিন
চায়ের আসরের ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি চলছিল।
অপরাহু প্রায় সন্ধ্যার কাছে এগিয়ে এসেছে। দূরে গঙ্গার দুই পারে এরই মধ্যে কোথাও কোথাও আলাে জ্বলেছে। গাছে পালায়, হাওয়ায় নতুন বসন্তকালের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নিরু মুখ টিপে টিপে তখনও হাসছে। বিশু বললে, হাসি আরম্ভ হলে আর থামতেই চায় না। কি হাসিই হাসেন একেবারে পাগলের হাসি। নিরু বললে, হাসবাে না? সেদিনকার কথা ভাবলেই আমার হাসি আসে। না হয় আপনার গায়ে হঠাৎ আমার পা-ই লেগে গিয়েছিল-তাই বলে যাবার সময় আপনি বলে গেলেন কিনা, পায়ে আপনার লাগেনি ত ? উ-কী তামাসাই আপনি করতে পারেন। যখনই ভাবি, তখনই হাসি পায়। একেবারে বিয়ের অবতার। বিশু হেসে বললে, আচ্ছা বেশ, কী বললে আপনি হতেন। এ ছাড়া আর কি বলতে পারতুম, শুনি? নিরু বললে, যা বলতে পারতেন, তা আপনি বলেননি। বিশু বললে, বেশ যা হােক—একলা ট্রেণে আসছি—মাঝখানে শেকল ছেড়া পাগলের উৎপাত—তারপর দেখতে দেখতে হঠাৎ এক তরুণীর আবির্ভাব—কিন্তু হা হতােস্মি।—আমাকে দেখে পাগল বলে আঁতকে ওঠা-সুধু এই নয়-শেষ পর্যন্ত পাগলের মতন গাড়ী থেকে নেমে গিয়ে প্রমাণ করতে হােলাে—আমি পাগল নই। নিরু কথার মােড় ঘুরিয়ে বললে, আপনি পাগল কি না সে কথা এখন থাকুকই, কি যেন বলবেন বলছিলেন? বিশু চুপ করে কী যেন ভাবতে লাগল। নিরু পুনরায় বললে, আচ্ছা, আমি একটা সত্যি কথা বলব ? ; বিশু হেসে বললে, নাসারাদিন ঘুরে ঘুরে দুজনে ক্লান্ত- সন্ধ্যে হয়ে এলে—সত্যি-মিথ্যে এখন থাক—
নিরু উৎসুক ভরা দৃষ্টিতে বিশুর মুখের দিকে অকালে।
বললে, তাহলে?
বিশু বললে, এখন সুধু দু’জনের খেয়াল আর খুশীর কথা হােক।
দু’জনে কিয়ৎক্ষণ চুপ করে রইল। এক সময় নিরু গা।
ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, এবার কিন্তু যেতে হবে। নৈলে
দাদু কী ভাববেন।
বিশু উঠে দাড়ালাে। বললে, হঁ্যা, চলুন।
• আর একদিন দু’জনের দেখা হেলাে কলেজ থেকে বেরিয়ে।
ওরা একজন আর এক জনকে খুঁজে পাবার জন্য অনেক সময়ে
একটা বিশেষ পথের মােড়ে এসে দাড়ায়। তারপর হাসি বিনিময়
করে দুরে কোথায় গিয়ে এক হয়। সেদিন এসপ্লানেডের শেডের
ভিতর দাড়িয়ে বিশু বলে, কিন্তু একটা কথা
নিরু বললে, বলুন?
বিশু লজ্জিত কণ্ঠে বললে, না—শুনলে আবার আপনি
হাসবেন।
নিরু বললে, বাজে কথা বুঝি? নিরুর চোখে দুষ্টুমী।
বিশু বললে, না, লজ্জার কথা
নিরু বললে, অর্থাৎ নিরুর কণ্ঠে আগ্রহ।
যিশু বলেন, অর্থাৎ—আপত্তিজনক।
নিরু বললে, যদি অভয় দিই।
বিশু বললে, সাহস পাইনে।
নিরু বললে, তা হােক—বলুন। বলতেই হবে।
বিশু মৃদু গুঞ্জন করে বললে, কিন্তু বলার সময় এখনাে ষ্ণে
হয়নি। এখনাে সন্ধ্যায় তারা জাগেনি, এখনাে দখিণ সাগর থেকে
বাতাস ওঠেনি, এখনাে আকাশপথের পাখী তার বাসাখুজে পায়নি।
এই বলে সে দুষ্টুমির হাসি হাসতে লাগলাে।
নিরুর উৎসুক চোখে মুখে সর্বাঙ্গে আনন্দ-আবেশের থরথরু
কম্পন যেন দেখা দিল।
বিশু মৃদুস্বরে বললে, আগে চাদের আলাে ঘন হয়ে উঠুক, তখন
বলবাে। চলুন এবার
দু’জনে চলতে লাগলো। মাঠের পথ ধরে। অনেকক্ষণ পরে তারা
এলাে মেমােরিয়েলের কাছে। একটা গাছের ছায়ার ধারে বেঞ্চে
বসে বিশু বললে, সেদিনকার সেই কথাটা,
কই বললেন
ত ?
নিরু সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করল, কি ? কোন্ কথা?
বিশু হেসে বললে, সেই যে—সেদিন রাতে কি যেন দুঃস্বপ্ন
দেখেছিলেন ?
নিরু “ওঃ ব’লে হেসে উঠলাে। একটু পরে শুরু করল, সে
ভারি মজার দুঃস্বপ্ন।
বিশু সকৌতুকে বললে, কি রকম?
নিরু দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে বললে, আপনার শুনে লাভ?
বিশু কৃত্রিম গাম্ভীর্যে বললে, না লাভ কিছু নেই! দুঃস্বপ্ন
দেখে আপনি কেঁদে উঠেছিলেন কি না তাই জানতে চাইছি।
নিরু বললে, যদি বলি সে-কান্নার কোনাে সাক্ষী ছিল না।
বিশু হাসিমুখে বললে, ছিল বৈকি! আর একবার মনে করুন
ত? স্বপ্নে কি কাউকেই দেখতে পান্ না ?
নিরু বললে, হঁ্যা, মাঝে মাঝে পাই ।
বিশু বললে, কাকে? একটু বলুন না ।
কটাকে তাকিয়ে নিরু বললে, গান গেয়ে জানাতে পারি, সােজা
ভাষায় বলা কঠিন।
অধীর আগ্রহ নিয়ে বিশু বললে, কেন?
ঠোঁট উলটে নিরু বললে, বড্ড সােজাসুজি, বড়ই পাশাপাশি
দু’জনে উচ্চকণ্ঠে হেসে বাতাসকে মুখর করে তুললাে।
সেদিন স্থির হয়েছিল দু’জনে যাবে কলকাতার একটু বাইরে বন্ধু
দের সঙ্গে পিকনিক করতে। সেই মতাে আয়ােজনও হয়েছে। আবার
দু’জনে ফিরবে সন্ধ্যায়। নিরু যখন সাজসজ্জা করে প্রস্তুত হচ্ছে,
সেই সময় নীচে দাদু ফুলদানিতে একটি গােলাপের তােড়া
সাজাচ্ছিলেন প্রসন্ন আননে। এমন সময় সিড়ি দিয়ে তরতর করে
নিরু নেমে এলাে,-একবার ঘড়ির দিকে তাকালবেলা
এগারােটা বাজে-তারপর আরও দ্রুতপদে সে যখন নীচের বারান্দা
পেরিয়ে দাদুর ফুলজাননার দিকে সহাস্যে চেয়ে বেরিয়ে যাবে-
দাদু তখন তাঁর অতিপরিচিত লঘু পদশব্দে ফিরে তাকালেন।
হেসে ডাকলেন :
“সুধু বেগে ধাও, উদ্দাম উধাও, ফিরে নাহি চাও!”
নিরু একগাল খুশীর হাসি হেসে কাছে এসে দাদুর হাত ধরে
বললে, পরের লাইনটা বুঝি মনে নেই তােমার ? “যা কিছু
তােমার সব দুই হাতে ফেলে যাও!”—কিন্তু আমি ত’ ফেলিনি
দাদু, তুমি আমার সব।
দাদু তামাসা করে বলেন, তুই ত’ ভাই মৌখিক আশ্বাস
দিলি! কিন্তু এখন যে দেখছি “আমার বঁধুয়া আনুবাড়ী যায়,
আমারই আঙ্গিনা দিয়া।”
নিক চকচকে চোখে চেয়ে বললে, কিসে বুঝলে?
দাদু বললেন, চলনে-বচনে,চরণে,-ধরণে—কি দিদি,
তােদের রিহাসলি কি আজো চলছে। আর কন্দিন ।
ক
৭
নিরু ও দাদু উচ্চকণ্ঠে হেসে যেন ফেটে পড়লাে, আর তারই ওপর দিয়ে নিরু ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে চলে গেল। অসীম উদ্বেগ, আকুলতা ও চঞ্চলতার সঙ্গে নিরু এসে বিশুর বাড়ীর সিড়ি বেয়ে দরজার সামনে এসে দাড়াল। দেখলল, ঘরের দরজার শিকলে ও কড়ায় তালা বন্ধ। অবাক হয়ে সে থমকে গেল। এমন সময় পাশের ফ্ল্যাটের একটি চাকর এক চাঙ্গারি বাজার নিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল—নিরু সহসা তাকে প্রশ্ন করলাে : আচ্ছ- চাকরটা থমকে দাড়িয়ে পড়ল। নিরু জিজ্ঞাসা করলাে, আচ্ছা, এই ফ্ল্যাটের বিশ্বনাথবাবু কোথা গেছেন বলতে পারাে? চাকরটা বললে, হঁা, এই ত’ আজ সকালে দেখলুম- নিরু বললে, কি দেখলে বলল ত? দেখলুম, বাক্স বিছানা নিয়ে কোথা যেন চলে গেলেন। নিরু বললে, চলে গেছেন? কোথায়? জানাে কিছু ? নিরুর মুখে চোখে উদ্বেগ আর অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠলে। চাকরটা বললে, আজ্ঞে না, তা বলতে পারিনে!—এই বলে সে উপরে গেল। নিরু হতাশ ও শ্রান্তভাবে সিড়ি দিয়ে নামতে লাগলাে। কিছুই সে বুঝতে পারলাে না। আর কোনােদিন বিশু তাকে কথা দিয়ে এমন আচরণ প্রকাশ করেছে, এ তার মনেই পড়লাে না। হঠাৎ কেমন যেন একটা আঘাত খেয়ে নিরু ধীরে ধীরে পথে নেমে একদিকে চলতে লাগলাে। আর কোথাও তার যাওয়া হােলাে নাবাড়ীতেও সে গেল না। কোন এক বান্ধবীর বাড়ীর দিকে সে মন্থর গতিতে চলতে লাগলাে আনমনে।
৭
বিও টেলিগ্রাম পেয়েছিলাে সকালে। জরুরী তার, দেশে ডাক
পড়েছে। নিরুকে খবর দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ নিরুদের বাড়ীর
সঙ্গে তার কোনও পরিচয় নেই। হঠাৎ একটা কথা বলার জন্য
অপরিচিত সে যাবে নিরুর ওখানে, এটা তার কাছে খুব অসুবিধা-
জনক মনে হয়েছিল। নিরুদের বাড়ীতে টেলিফোন আছে সে
জানে। কিন্তু না জানে নম্বর, না জানে তার দাদুর নাম। সুতরাং
ঘণ্টাখানেক ধরে অনেক চেষ্টাচরিত্র করেও সে নিরুকে সংবাদ দেবার
সুবিধা করতে পারলাে না।
অথচ টেলিগ্রাম পেয়ে বাড়ীতে রওনা হবে না, এত কল্পনার
অতীত। হয়ত সেখানে অঘটন কিছু ঘটেছে, হয়ত কোন বিপদ।
হয়ত বা তার জননীর সংবাদ পাওয়া গেছে। নানাপ্রকার তোলা।
পাড়া করে বিশু সকালের ট্রেণ ধরে সােজা দেশের দিকে রওনা হয়ে
গেল। ফিরে এসে নিরুকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেই চলবে।
দেশের বাড়ীতে এসে পৌঁছলে পরের দিন ভােরবেলা। বাড়ীতে
এসে দেখলাে, সবাই হাসিখুশী, সকলেই নিরাপদ। বিশু একটু
ক্ষুই হােলল। এক সময় রাগ করে বৌরাণীকে বললে, বাবার
অসুখ বলে মিথ্যে-মিথ্যে তােমরা টেলিগ্রাম করে আমাকে
আনালে। এমন করলে পড়াশুনাে হয় না-সব ছেড়েছুড়ে
তােৰ্গদের নিয়ে আমাকে বসে থাকতে হয়।
বৌরাণী হেসে বললেন, শােন, রাগ করিসনে আমার ওপর। অসুখ ত’ ওঁর আছেই বারোেমাস,তা’র ওপর উনি হঠাৎ সেদিন নায়েব মশাইকে ডেকে চেঁচামেচি করে তাের বিয়ের ঠিক করলেন-- বিশু সবিস্ময়ে বললে, বিয়ে! কি বলছ? তার মানে কি শুনি? মাতাপুত্রের আলাপ চলছে, এমন সময় ওঘর থেকে যুগলবাবুর উচ্চ কণ্ঠস্বর শােনা যাচ্ছিল। বৌরাণী বললেন, যতীন ঠাকুরপাে, এসেছেন। যুগলবাবু চেঁচিয়ে বলছিলেন, বুঝলে যতীন, তােমরা সব শকুনির পাল, মরবার আগেই এসেছ ছিড়ে খেতে। ওসব চলবে না, ও আমি পারবাে না- বিশু বললে, ঐ শােননা, ওঁর কেবল চেঁচামেচি। বৌরাণী বললেন, ওর ওই স্বভাব! তাের সঙ্গে বসে চারদণ্ড উনি কথা কইবেন মনে করেছিলেন, এমন সময় এলেন যতীন ঠাকুরপাে। তাই চটে গেলেন। বলতে বলতে বৌরাণী পাশের ঘরের ভিতর উকি দিয়ে কি যেন দেখলেন। ভিতরে তখন দুই জ্ঞাতি ভাই আলাপ করছেন। যতীন- বাবু বললেন, আহা, আপনি শান্ত হয়ে শুনুন না, দাদা। যুগলবাবু চেঁচিয়ে বললেন, শুনবে কি? শােনবার কি আছে? তুমি ত আর আমার সহােদর ভাই নও যে, মায়া মমতা দেখাতে এসেছ! তােমরা আত্মীয় কুটুম্ব! এসেছ কেবল নিজের কাজ গােছতে-না, এ আমি হতে দেব না, এ কিছুতেই হবে না। উত্তেজনা অত্যন্ত বেড়ে চলেছে দেখে বিশু আর থাকতে পারলাে না; এ ঘরের ভিতরে এসে দাড়ালাে পিছন থেকে। তাকে কেউ লক্ষ্য করলাে না। যতীনবাবু বললেন, কিন্তু তবু আমার কথাটা আপনাকে
শুনতেই হবে, দাদা। আপনি না হয় ছেলেটাকে রা থেকে
কুড়িয়ে এনে মানুষ করেছেন—কিন্তু দত্তক নেননি ত? হ্যা-
গরীবের ছেলে—আপনার এখানে ভাত কাপড় পেয়ে মানুষ হয়েছে,
লেখাপড়া শিখেছে-বেশ ত, ওকে কিছু ধরে দেবেন। কিন্তু
তাই বলে ত আর পথের ছেলেকে ধরে এত বড় জমিদারীটা
বিলিয়ে দিতে পারেন না ?
যুগলবাবু চীৎকার করে উঠলেন, বিলিয়ে ? বিলিয়ে তুমি
কাকে বলে ? বুকের রক্ত দিয়ে আমরা যাকে মানুষ করে
তুললুম, তাকে তুমি কতটুকু জানাে যতীন? হ্যা, পথ থেকেই
বিশুকে কুড়িয়ে পেয়েছি, পথেরই ছেলে সে,-হা, তুমি ঠিকই
বলেছ। কিন্তু পথের নুড়ি তুলে এনে লােকে যখন মন্দিরে
বসায়, তখন তার নাম দেয় শালগ্রাম, সে হয় নারায়ণ।
তুমি তার কী বুঝবে? তােমরা অধার্মিক, তােমরা স্বার্থপর।
এমন সময় বিশু তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললে, শুনুন- আপনি
শান্ত হােন
যুগলবাবু ও যতীনবাবু এক সঙ্গে তার দিকে তাকালেন।
বিশু ' বললে, যতীনবাবু কিছু অন্যায় বলেননি। আপনারা
আমার অতি দুর্দিনে আশ্রয় দিয়েছেন, বড় করে তুলেছেন, মানুষ
করেছেন। আপনাদের কাছে আমি অনেক পেয়েছি, কত যে পেয়েছি
তার সীমা নেই-তারপরেও আর যদি কিছু না পাই দুঃখ জানাবাে
-হাসি মুখেই চলে যেতে পারবাে। তা ছাড়া বিষয় সম্পতি
আমাকে কেনই বা দান করবেন,—আমি ত, সত্যিই আপনাদের
কেউ নেই।
যুগলবাবু যেন ফেটে উঠলেন। বললেন, দেখলে যতীন—ওই
দ্যাখাে তুমিও যা, ও-ও তাই। এত বড় অধার্মিক যে, নিজের
বাড়ীকে বলে পরের আশ্রয়। বলে, অনেক পেয়েছি। কী পেয়েছ
.তনি? কই দেখাও দেখি ? স্বার্থপর-ঘাের স্বার্থপর । আমাকে জমিদারীর মধ্যে ডুবিয়ে রেখে উনি চলে যাবেন হাসিমুখে। একালের ছেলে কিনা, তাই মা-বাপের মুখের ওপর সুধু হাসতে শিখেছ! কিন্তু আমিও বলে রাখলুম-আমিও শাস্তি দিতে জানি। নায়েবকে সাক্ষী রেখে তােমার মতন স্বার্থপর ছেলের নামে দানপত্তর লিখে দিয়ে কাশী পালাবােতখন তােমার ওই চাদমুখে কেমন হাসি ফোটে, দেখবাের অধার্মিক—সব অধার্মিক। বিশু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শান্তকণ্ঠে বললে, আপনাকে বােথ হয় আমার কথাটা ঠিক বােঝাতে পারলুম না যুগলবাবু দুই হাত নেড়ে বললেন, বােঝাবে কি? বােঝাবুঝির আছে কি ? তােমরা সবাই কাজ গােছতে এসেছ বৈ ত’ নয়। যতীনবাবু বললেন, আমি তবে এখন উঠলুম, দাদা। কিন্তু যাবার আগে আবার বলে যাই, আর যাই করুন—বৌ-ঠানকে যেন পথে বসাবেন না!বলতে বলতে যেন পরসাত্মীয়ের দুশ্চিন্তা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তার চলে যাবার পর রৌরাণী মুখটিপে হাসিমুখে ঘরে ঢুকলেন। স্বামীর মাথার কাছে এসে দাড়িয়ে বললেন, হ্যা গা, এমন সরল সাদাসিদে মানুষকে তুমি চিনলে না? শুনাে মুখে ফিরিয়ে দিলে? যুগলবাবু প্রশ্ন করলেন, কার কথা বলছ ? বৌরাণী একটু হেসে বললেন, কেন, আমার ওই যতীন ঠাকুরপাে? আমার ওপর যা’র এত মমতা, তাকে দুটো মুখের মিষ্টি কথাও বললে না? যুগলবাবু জ্বলে উঠলেন, মিষ্টিকথা? ভস্মে ঘি ঢালা। মিষ্টিকথা শুনবে কে, বড়বউ? এই দ্যাখােনা তােমার বিশু। এতকাল পরে বলে কিনা এটা পরের আশ্রয়। যতীনের সামনে আমার কানটা ধরে জানিয়ে দিল, ও পরের ছেলে, ও একদিন হাসিমুখে
•
চলে যাবে—বড়বউ, এতকাল ধরে ও আমাদের কেউ নয়। বলতে
ওর মুখে একটু বাধলো না? তুমি ঘর তুলেছ চোরাবালির ওপর
চোরাবালির ওপর।
বিশু অত্যন্ত ব্যস্তভাবে বললে, না না, বাবা—আমি ওকথা
বলতে চাইনি। আমি আপনাকে বােঝাতে পারিনি।
যুগলবাবু এবার কতকটা শান্তভাবে বললেন, আচ্ছা বেশ, তুমি
বােঝাতে পারেনি, আমিও না হয় বুঝিনি! ফুরিয়ে গেল। এবার
তাহলে তােমার বিয়ের কথায় এসাে। একটি নয়, তিন-তিনটি
মেয়ে দেখে রেখেছি।
বৌরাণী হাসিমুখে বললেন, ওরে, তাব’লে তিনটি নয়, একটিকেই
উনি বিয়ে করতে বলছেন।
বিশু বললে, কিন্তু মা-
বৌরাণী বললেন, কি বল।
আমার এখন বিয়ে করা কি সম্ভব? নতমুখে বলল বিশু।
যুগলবাবু দপ করে জ্বলে উঠলেন, বললেন, অসম্ভব কেন, শুনি?
বৌরাণী বললেন, আহা, তুমি চেঁচিও না। বিশু এখন বড়
হয়েছে, ওর কথাটাও শুনতে হয়।
যুগলবাবু উচ্চকণ্ঠে বললেন, তােমাদের শুধু কথা আর কথা।
কাজের কথা বাদ দিয়ে কেবল বাজে কথা।
বিশু বললে, বাবা।
কি বলল। অনুগ্রহ করে বলাে। বলে আমার মাথাটা কেনাে।
যুগলবাবু ক্ষিপ্তকণ্ঠে প্রায় চীৎকার করে উঠলেন।
একটু চুপ করে থেকে বিশু বললে, এখন আমার পক্ষে বিয়ে
করা চলে না, বাবা-
চলে না। চলে না কেন? যুগলবাবু আবার চটে উঠলেন।
বৌরাণী বললেন, কেন রে ?
বৌরাণীর মুখের দিকে চেয়ে বিশু বললে, তুমি ত আমার
আগেকার সব কথাই জানাে মা। বিয়ের কথা আমি কেমন করে
বলতে পারি ? এমন সমস্যায় তােমরা আমাকে ফেল না। বতে
বলতে নতমস্তকে সে বেরিয়ে গেল।
যুগলবাবু এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হাত পা নেড়ে বলে
উঠলেন, শুনলে বড়বউ। এবার তােমার চোখ ফুটলাে। মােহ
ঘুচলাে।
বৌরাণী বললেন, কিন্তু বিশুর কথাটাও ভাবতে হবে বৈকি।
যুগলবাবু হতাশভাবে বললেন, বেশ, তাই ভাবাে, সবাই মিলে
বির কথাই ভাবো। কিন্তু আমার জন্যে তােমরা আর কেউ ডেবাে
, বড়বউ। আমার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি—আমার পথ আমি
খুঁজে পেয়েছি।—বলতে বলতে তিনি উঠে বেরিয়ে গেলেন।
•
অসুখের টেলিগ্রাম পেয়ে বিশু এলো বাড়ীতে—কিন্তু কোথা
থেকে কী যেন বিড়ম্বনা দেখা দিল। যতীনবাবু এলেন কাণে মন্ত্র
দিতে, যুগলবাবু এক কথা বলতে গিয়ে অন্য কথা নিয়ে মাথা গরম
করেন—আর মায়ের ইচ্ছা বিয়ে করা,—এই প্রকার একটা
গণ্ডগােলের ভিতরে পড়ে বিশু যেন দিশাহারা হয়ে গেল।
যুগলবাবু নিশ্চিত তার ওপর রাগ করেছেন সন্দেহ নেই;
বৌরাণী অবশ্য অনেকটা নির্লিপ্ত,কিন্তু এইপ্রকার অবস্থার ভিতরে
যদি বিশুর প্রতি কোথাও কোনাে কর্তব্যের আহ্বান থাকে, তবে
সে তা সম্পাদন করবে নিশ্চয়ই। জমিদারীর দায়িত্ব অদূর ভবিষ্যতে
তাকে নিতে হবে, এই বিরাট কাছারি—এই পরিবার-সায়ি
খাজনার ঝুঁকি—প্রজাসাধারণকে সুপরিচালিত করা—এ সবই
’র কর্তব্য। এগুলি তার পক্ষে প্রাথমিক কাজকর্ম।
কিন্তু তার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখে বেড়ানাে,মা-বাবার এ কি বাতুলতা। আড়ালে এসে বিশু নিজের মনে খুব হাসতে লাগলাে। রঙ্গে রসে আনন্দে তার সমগ্র চিত্তাকাশে যে পরিপূর্ণত-তা’র সংবাদ ওঁরা জানেন কতটুকু? জীবনে সে আর কোনো নারীর কল্পনা যে সে করতে পারে না, এটি যেন তার জানবার প্রবল বাসনা জাগতে লাগলাে। কিন্তু বিশু কিছুই করলাে না, কেবল একলা নিজের মনে বসে চুপি চুপি অনেকক্ষণ হেসে নিল। কলেজে ছুটি নিয়ে সে আসেনি, ছুটি নেবার সময় সে পায়নি। তাছাড়া—তাছাড়া যার কাছে সত্যকার ছুটি নেবার তাকেও কিছু বলে আসতে পারেনি। তাকে না বলে চলে আসার ভয়ানক লজ্জাটা এবার যেন বিশুকে অশান্ত ও অস্থির করে তুলতে লাগলাে। সে স্থির করলে মাকে যা হােক করে বুঝিয়ে আগামীকাল তাকে আবার কলকাতা রওনা হতেই হবে। বিশু সেই মতাে আয়োজন করতে লাগলো। নায়েবমশাইকে জানিয়ে দিল, যাবার ব্যবস্থা প্রস্তুত করতে। বহুদিন পরে সূর্যমুখীকে আবার দেখতে পাওয়া গেল। আশা হতাশা কোনােটাই এখন তার আর নেই। কলের পুতুলের মতাে তার জীবন। কৈলাসবাবুর শরীর ভেঙ্গে এসেছে, তার মেরুদণ্ড একটু অবনত হয়েছে, সূর্যমুণীর কপালের দুইদিকের চুলে এসেছে ধূসরতা, মুখে অস্পষ্ট বলি রেখা, ঘরের ভিতরে চারদিকে জীর্ণতা, ধুলাে জমেছে ফাইলগুলােয়। কৈলাসবাবু খুক খুক করে কাশছিলেন, এমন সময় সূর্যমুখী ঢুকলাে। মুখে চোখে যেন তার নৈরাশ্যের অখণ্ড অবসন্নতা- কৈলাসবাবু বললেন, আবার তুই কবরেজি ওষুধ এনেছিস, মা?
সূর্যমুখী বললে, ওষুধ না খেলে আপনার কাশি যে কমবে না,
বাবা
কৈলাসবাবু বললেন, ও বুঝেছি, ছেলেটাকে খুঁজে না দিলে তুই
মরতে দিবিনে কেমন?
সূর্যমুখী বললে, বাবা।–কি যেন বলতে গিয়ে সূর্যমুখী চুপ
ফরে গেল।
কৈলাসবাবু বললেন, কি বল ?
সূর্যমুখী বললে, আপনি কি এখনও আশা রাখেন?
কৈলাসবাবু সহসা যেন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন। বললেন, নিশ্চয়।
জলজ্যান্ত ছেলে তোর যাবে কোথা ? দাড়া শরীরটা সারুক, আবার
খুঁজবাে—তুই এক কাজ কর দেখি? ফাইলগুলাে দেখ, পুরাননা
চিঠিগুলো বার কর।
সূর্যমুখী বললে, বাবা!—আপনি আর কত ছুটোছুটি
করবেন? আপনার সব চেষ্টাই যে মিথ্যে হতে চললাে।
কৈলাসবাবু বললেন, মিথ্যে। ছেলে যদি না পাই তাহলে সবই
মিথ্যে—বাবা বিশ্বনাথও মিথ্যে।
এমন সময় বাইরে একদল ছেলেমেয়ের কলরব শােনা
গেল?
স্টাদ আকাশে দোলে মা ষষ্ঠীর কোলে
কাছে আসে যে, মিষ্টি পাবে সে।”
কৈলাসবাবু বললেন, সেই ক্ষুদে রাক্ষস ব্যাটারা আবার এসেছে
বুঝি? একটা ছেলের বদলে তুই একপাল ছেলে জোগাড় করেছিস,
যা-মা-যা-ব্যাটাদের বিয়ে করগে
সূর্যমুখী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কৈলাসবাবু আপন মনেই
বললেন, এসেছিলুম নিশ্চিন্তে কাশীবাস করতে,যতসব
বলতে বলতে তিনি খক খক করে কাশতে লাগলেন। শেষ বয়সে
এই অসুখটা তার ধরেছে। আজকাল প্রায়ই অর , প্রায়ই
উপবাসে কাটে।
সূর্যমুখী বাইরে এসে দাড়াল। অপর একটি মহিলাও এসে
দাড়িয়ে রয়েছেন। তিনি বহুকাল থেকে কাশীতে বাস করছেন,
নাম তার রাজলক্ষ্মী। সূর্যমুখীকে দেখে তিনি বললেন, ছেলেমেয়েরা
এসে ঘিরেছে তােমাকে, আজ বুঝি ষষ্ঠী ?
সূর্যমুখী বললে, হঁা, দিদি-
বেশ-বেশ—এরাই তােমার ছেলে, ভাই, চেয়ে দ্যাখাে-এদের
মধ্যেই তােমার মাণিককে তুমি খুজে পাবে!
সূর্যমুখীর মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। খাবারের থালাগুলি এনে
সে ছেলেমেয়েদের সকলকে বিতরণ করতে থাকে। ছেলেমেয়েরা
শ্লোক আউড়ে চেঁচায়,
“চঁদ আকাশে দোলে মা ষষ্ঠীর কোলে
কাছে আসে যে, মিষ্টি পাবে সে।”
সূর্যমুখী এবং সেই মহিলাটি শান্ত স্নেহের হাসি হাসতে থাকেন।
ওঘর থেকে কেবল কৈলাসবাবুর হাঁপানি-কাশির আওয়াজটা এখান
থেকে শােনা যায়।
কলকাতায় ফিরে বেশ কিছুদিন ধরে অনেক প্রকার কৌশল
অবলম্বন করে তবে বিও নিরুর কাছে খবর পাঠাতে সমর্থ হােনল।
একটা গভীর লজ্জা যেন তাকে ঘিরে রয়েছে নিরুর কাছে
গিয়ে সে দাড়াবে কেমন করে? কেমন করে সে বলবে যে, যা
আর বাবা তার জন্য পাত্রী দেখে তাকে খবর পাঠিয়ে দেশে নিয়ে
গিয়েছিলেন? সে নিজের ইচ্ছায় যায়নি, বিয়ে করার ইচ্ছে তার
নেই, আর কোনাে মেয়েকেই জীবনে সে কল্পনা করতে পারে না।
এসব কথা নিরুকে সে বােঝাবে কেমন করে? নিরু তার কথা
বিশ্বাস করবেই বা কেন?
খবর পেয়েই নিরু এলাে তার বাসায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরে
টুকতেই বিশু তাকে অভ্যর্থনা করে হাসিমুখে বললে, আমার চিঠি
পেয়েছিলেন?
নিরু সহাস্যে বললে, পেয়েছিলুম, কিন্তু তাতে মনের কথা
পাইনি। আপনার বাড়ীর খবর কি?
ভালাে।-বলে বিশু রক্তিম মুখ নত করে রইলাে।
নিরু বললে, মহাকবি কালিদাসের আমলে পােষ্ট অফিস ছিল না,
তাই তিনি মেঘের চর পাঠিয়ে খবর জানাতেন। আপনার কি সে
বুদ্ধিও হয়নি?
বিশু হাসি মুখে বললে, মহাকবি একটা সুবিধা পেয়েছিলেন,
সেটা বর্ষাকাল অনেক মেঘ ছিল। আমি যেদিন গেলুম, সেদিন
রােচ্ছরে কাঠ ফাটছিল। তাছাড়া যক্ষের অবস্থা ঘটলে একটা কিছু
ব্যবস্থা করতে হােত বৈকি।
দু’জনেই উচ্চ হাসিতে ঘর ভরিয়ে তুললাে।
আলাপটা পুনরায় সহজ আনন্দের মধ্যে এসে পৌছবার পর
বিশু বললে, বাস্তবিক, খবর না দিয়ে চলে যাওয়া ভারি অন্যায় হয়ে
গেছে। কিন্তু কোনাে উপায়ই আর ছিল না। যাক্, যা হবার হয়ে
গেছে। তারপর? এসে যখন দেখলেন তালাবন্ধ, কি মনে
উদ্দেশ্য ? নিরু মুখে চোখে কৃত্রিম ঔদাসীন্য এনে বললে, সে আর কি বলব, দশােদিশি একেবারে অন্ধকার। বিশু হাসিমুখে বললে, বটে। তাহলে বলুন, রাই উন্মাদিনী হলেন? নিরু বললে, তা হলেন বৈকি। তবে ললিতা বিশাখা সঙ্গে কেউ ছিল না যে, সাক্ষী করবাে! বিও হেসে বললে, সাক্ষী থাকলে কী করতেন? নিরু বললে, করবার বিশেষ কিছু ছিল না। তবে সখীকে ডেকে বলতুম, সখিরে, কৃষ্ণ বিনে কিছু আর ভাল লাগে না—এই সাজ সজ্জা বসন ভূষণ-এদের ভার আর বইতে পারিনে-আমাকে তােরা নতুন করে সাজিয়ে দে। বিশু মুখ টিপে হেসে বললে, বটে নিরু বললে, উদ্দেশ্য অতি মহৎ। গেরুয়া বসন অঙ্গে তুলে নেবাে শঙ্খের কুণ্ডল পরি। বিশু হাসিমুখে বললে, ওরে বাবা, অতঃপর? নিরু বললে, অতঃপর, যােগিনী হইয়ে যাব সেই দেশে যেখানে নিঠুর হরি। বিশু বললে, বলেন কি! কান্নাকাটিও করেছিলেন ? নিরু কুঞ্চন করে বললে, ওমা, তা আর করিনি। একেবারে ঝরঝরিয়ে! বৃন্দাবন থেকে মথুরা-জল দাড়িয়ে গেল ! এমন সময় বাইরে সহসা কড়ানাড়ার শব্দ হােলাে। দুজনে চমকে উঠলাে। বাইরে থেকে গলার সাড়া এলােলা, ছােটবাবু? ছােটবাবু আছ নাকি ? বিশু নিরুর দিকে তাকিয়ে চুপ করে বললে, এই রে নায়েব- মায়ের গলা। নিরু সভয়ে বললে, কিন্তু আমাকে এখানে দেখলে—কি ভাববে ?
হা, কিছু মনে করতে পারে!-একটু-একটু ওঘরে গিয়ে
লুকোন ত ?
নিরু দৌড়ে গিয়ে পদাটা টেনে আত্মগােপন করলাে।
ছােটবাবু।
কে ?—ও, এই যে নায়েবমশাই। আসুন, খবর কি ?
নায়েবমশাই ভিতরে এসে ঢুকলেন। বললেন, যা অনেক
কষ্টে ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি।-তা খবর আর কি, ছােটবাবু।
কর্তামশাই ত সপরিবারে সন্নিসী হলেন। তােমার ওপর রাগ করে
একেবারে দেশত্যাগী
বিশু সবিস্ময়ে বললে, কোথায় গেছেন?
নায়েবমশাই মুখের একটা শব্দ করে বললেন, বুঝতেই পাচ্ছ,
সেই তীর্থশ্রেষ্ঠ কাশী। আমার হয়েছে যত জ্বালা।
বিশু অবাক হয়ে বললে, বাবা কাশী গেছেন ? আপনি
তাহলে
নায়েবমশাই বললেন, হা,–আমার অবস্থা এখন ঠিক ফুটবলের
মতন. একবার ঠিকরে গেলুম কাশীতে, সেখান থেকে ফিরে
এখানে—এখান থেকে ঠিকরে ওখানে! তুমি আর যাই করাে
ছােটবাবু, মাথাপাগলা জমিদারের চাকরি যেন কখনাে করাে না।
বেশ তােমার এই ঘরটি ছােটবাবু—দক্ষিণ খােল-ওঘরটিতে বুঝি
রান্নাবান্ন হয় ?
নায়েবমশাই এগিয়ে গিয়ে ওঘরে উকি মেরে দেখবার চেষ্টা
করতেই বিশু সহসা চঞ্চল হয়ে উঠলাে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে
অত্যন্ত অস্থিরভাবে সে বললে, না-হা-হা-রান্না হয়-এখন
কিছুই নেই ওঘরে—মানে, আপনি এদিকে আসুন—বেশ হাওয়া-
ওই—ওই দেখুন—এয়ােপ্লেন উড়ছে—তা—তা মা’র শরীর এখন
নায়েবমশাই হেসে উঠলেন। বললেন, ওই নাও, আসল কথাটাই
ভুলবাষট্টির আগেই এলাে বাহাত্তরে-হা-বৌরাণীমার কথা।
ভালােই আছেন; তার ভালাে আর মন্দ। ওই একরকম চলছে।
মাথাপাগলা স্বামীকে নিয়ে আমারই মতন তার দশা। হা কাজের
কথাটা বলি। রাণীমা তিনিই ত’ আমাকে বলে দিলেন চুপি চুপি-
আমিও—চুপি চুপি এসে পড়লুম।
বিশু উদ্বিগ্নভাবে প্রশ্ন করলাে, কি বলুন ত ?
নায়েবমশাই যেন উৎকর্ণভাবে এদিক ওদিক তাকালেন।
তারপর বললেন, এই বেলা কেউ কোথাও নেই—কথাটা চুপি
চুপিই বলি—
বিশু বললে, হঁা, বলুন?
নায়েবমশাই বললেন, তুমিই বা চুপ করে বসে কেন ছােটবাবু?
এতে লুকোবার আছে কি। গা ঢাকা দিয়ে তুমিও চুপি চুপি দু’চার
দিনের জন্যে যাও না কেন?
বিও বললে, কোথায়? কোথায় যাবে ?
নায়েবমশাই নিজের মুখে আঙুল দিয়ে বললেন, চুপ কেউ না
শশানে, দেয়ালেরও কান আছে। কাশী যেতে বলছি। কিচ্ছুটি
করতে হবে না—চুপি চুপি গিয়ে সােজা সামনে দাড়াও ! সব রাগ
জল হয়ে যাবে? তুমিও ত’ জানাে ছােটবাবু, খড়ের আগুন—এই
জ্বলে—এই নেবে।
বিশু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললে, ওঃ-আচ্ছা, আচ্ছা যাবাে-
কিছুদিনের মধ্যেই যাব। মা’কে আপনি বুঝিয়ে বলবেন। কিন্তু
আপনি এখন এলেন—এমন সময়ে--আপনাকে কোথায়--মানে,
আপনার খাওয়া-দাওয়া-থাকা-
নায়েবমশাই হাত নেড়ে বললেন, না না, ও তুমি কিছু ভেবে
-ডান হাতের ব্যাপার একেবারে কাশী গিয়েই হবে।—এদে
আমি বিশ্বাস করিনে, বুঝলে, এক তিলও নয়-
বুঝলে, এক তিলও নয়—তুমিও কোয়াে না,
ছােটবাবু।
বিশু বললে, কাদের বিশ্বাস করেন না?
নায়েবমশাই বললেন, ওই যারা ট্রেণ চালায়। এমন মাথা পাগলা
আর দেখিনি। কখন্ ছাড়ে, কখন্ ধরে—কখন্ চলে, সবই ধোয়া।
—যাই, গাড়ীতে উঠে এইবেলা চুপি চুপি বসে থাকিগে! রাতেই
ছাড়ক ক আর দিনেই ছাড়ুক-বাছাধন যে আমাকে ফেলে যাবেন,
সেটি আর হতে দেব না।—যাইপালাই চুপি চুপি। তাহলে
তাহলে চুপি চুপি তুমি একবার যেয়ো ছটবাবু—এই কথাই রইলো।
বলতে বলতে নায়েব মশাই দু’জনকে ভয়ানক বিপদ থেকে
বাঁচিয়ে ধীরেসুস্থে বিদায় নিলেন। নায়েবের পায়ের শব্দ সিড়িতে
মিলিয়ে যাবার পর বিশু হৈ চৈ করে যখন হেসে উঠলাে সেই সময়
নিরু এলাে আড়াল থেকে বেরিয়ে। এসেই সে ভীষণভাবে অভিনয়
আরম্ভ করে দিল। কোলাহল কলরব করে, সে উচ্চকণ্ঠে বলতে
লাগলাে,-না, হা-না, এদিকে আসুন—বেশ হাওয়া—ওদিকে
যায় না, ওদিকে যেতে নেই, দেখুন—ওই এরােপ্লেন উড়ছে••••উঃ
লােককে আপনি কি ধোঁকাই দেন— কী ভাগ্যে আপনার
নায়েবমশাই চুপি চুপি পদটা সরিয়ে দেখননি—তাহলে এই
বনমালীকে, মানে আমাকে—ঠিকই দেখতে পেতেন —খুব হয়েছে,
এখন চলুন দেখি বাইরে। আবার দেরী করলে কোন্ ভগ্নদূত যে
এসে পড়বে তা জানিনে। চলুন, শিগগির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি।
ঘরে তালাচাবি লাগিয়ে ওরা দুজনে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে
পড়লাে।
পথে নেমে হাঁটতে হাঁটতে তারা অনেকদূর এসে পড়লাে। এক
সময় হাসিমুখে নিরু বললে, একটা কথা মনে পড়েছে
বিশু চলতে চলতে বললে, কি বলুন ত ?
• নিরু বললে, সেই যে সেই এক দিনের সন্ধ্যাক মধুর ছিল সেদিন— বিশু বললে, আজকের সন্ধ্যাও ত’ তাই- নিরু বললে, তা হতে পারে কিন্তু সেদিনের সন্ধ্যায় একজনের মন কান্নায় ভরে উঠেছিল, তা আপনি কল্পনা করতে পারেন? বিশু সবিস্ময় কৌতুকের সঙ্গে বললে, কার কথা বলছেন? নিরু ব্যথিতকণ্ঠে সবিনয়ে বললে, একটি মেয়ের গল্প। সেই সন্ধ্যায় একটি ছেলের সঙ্গে তার দেখা হবে—দুজনে মিলে যাবে কোথাও—এই ছিল কথা। মেয়েটি আসছে—অধীর হয়ে আসছে পায়ে পায়ে তার কী আগ্রহ, মনে মনে কী স্বপ্ন চোখে মুখে কী বিহবলতা—কী নিবিড়, অনুরাগ—কিন্তু তার সবই মিথ্যে হয়ে গেল সেদিন। বিশু সবটা বুঝতে পারলাে এবার। সেও বললে, এবারে ধরুন, আমি যদি বলি, সেই ছেলেটিও আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সেও মনে প্রাণে নিরু কম্পিতকণ্ঠে বললে, একি সত্যি? বিশু বললে, সত্যি ।--ছেলেটিকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন। আমি জানি মেয়েটির জন্যে সেও অধীর হয়ে বসেছিল—সে আসবে, সে আসছে, সে এসে পড়লাে, সে এলাে বুঝি নিরু প্রশ্ন করল, তবে কেন দু’জনের দেখা হলাে না? বিশু বললে, ভাগ্য দু’জনকেইলরিহাস করেছিল। কিন্তু সেদিন দেখা হয়নি বলেই ত’ আজকের সন্ধ্যা এমন অপরূপ। কিন্তু সেদিনের সন্ধ্যা আবার ফিরে এসেছে, আজ দু’জনে দেখা হয়েছে- আজ একটি মন শুনতে চায় আর একটি মনের কথা। নিরু আবেগ ভরা কণ্ঠে বললে, এতদিনেও কি সেই মন আয়েকটি মনের কথা শােনেনি ? ৯
বিশু কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাে। তারপর কেমন যেন স্বপ্ন
চক্ষে চেয়ে বললে, তবে দু’জনের সেই মন আজ এক হয়ে যা।
আম, একমনে গড়ে তুলি আমাদের স্বপ্নলােক—সেখানে চাদের
আলাে চিরদিন জেগে থাকুক, সেখানকার আকাশ চিরবসন্তে রঙীন
হয়ে যাক—সেখানকার জগৎ নন্দনকানন হয়ে উঠুক
নিরু ফেনিলকণ্ঠে বললে, আর তার মাঝখানে থাকবে আমাদের ,
একখানি পর্ণ কুটীর-কেমন? মাধবী লতার বেড়া দিয়ে ঘেরা
আমাদের অঙ্গন, কুটীরের কোল বয়ে যায় ছােট নদীটির
ধারা-
বিশু বললে, প্রভাতী পাখীর গান শুনে যেন আমাদের ঘুম
ভাঙে
নিরু জুগিয়ে দিল, কনকচাপার গন্ধে যেন শিউরে উঠি--
বিশু বললে, তারপর দিন যখন শেষ হবে-অন্ধকারে ডুবে
মায়া—আমাদের প্রাণের প্রলাপ নিয়ে আকাশে জেগে উঠবে
তারা-
নিরু উদ্দীপ্ত মধুর কণ্ঠে বললে, নদীর কল্লোল শুনব কান
পেতে–বাগানের একান্তে বসে নিরু মােহমুগ্ধ কণ্ঠে গান রে
দিল। আকাশে তখন সন্ধ্যাতারকার দল ঘনিয়ে এসেছে। কান্ত
বাতাস গুদের মুখে চোখে আবেশ-বিহ্বলতা জাগিয়ে দিয়ে
চলেছে।
বিশু ধীরে ধীরে নিরু কুখানি হাত নিজের হাতের মুঠোয়
মধ্যে ধরে বললে, এর চেয়ে আমার বেশী পাবার আর কিছু
নেই, নিরু ।
গান থামিয়ে জলভরাচোখে মুখ তুলে নিরু বললে, আমি জানি
আমি কত সামান্য। আমি জানি, তােমার জীবনে যেন জোর করে
আমি এসেছি।
বিশু বললে, একথা মিথ্যে, এর চেয়ে মিথ্যে আর কিছু নেই! নিরু নতমুখে চুপ করে রইলো। একসময় বিশু বললে, চলল আজ তােমার বাড়ীতে তােমাকে পৌঁছে দেবে। নিরু গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বললে, চলাে—প্রায় আটটা বাজে। নায়েবমশাই কাশী-ষ্টেশনে পৌছে হন্তদন্ত হয়ে বাসার দিকে চললেন। একাগাড়ী একবার উল্টে গিয়েছিল,টাঙা গাড়ী তাকে নিয়ে একবার খানায় পড়েছিল, সুতরাং সেইভয়ে তিনি একখানা সইেকেল-রিক্স নিয়ে সােজা দশাশ্বমেধের পথে চললেন। মাঝপথে মিসরি-পুরায়ের দিকে বাঁক নিলেন। তারপর একটা গলির ভিতর ঢুকে তাদের বাসা পাওয়া গেল। তিনি গাড়ী ভাড়া চুকিয়ে তাড়া তাড়ি অন্দরমহলে গিয়ে ঢুকলেন। যুগলবাবু কয়েকদিন থেকে কী যেন একটা ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। ডাক্তারেরা ভয় পেয়েছেন। তার অবস্থা তেমন ভালাে নয়। হৃদযন্ত্রের অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। নায়েবমশাই ভিতরে আসতেই বৌরাণী ছুটে এলেন। উদ্বিগ্ন ব্যস্ততার সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, নায়েবমশাই, তাকে আনতে পারলেন না ?
নায়েবমশাই হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আসবে নিশ্চয়ই আসবে
মা। কি যেন কাজ আছে, সেরেই চলে আসবে।
বৌরাণী ব্যাকুল হয়ে বললেন, কিন্তু ওঁর অবস্থা ভালাে দেখছিনে
নায়েবমশাই-আমি বােধ হয় আর রাখতে পারলুম না।বলতে
বলতে তার চোখে জল এলাে।
এমন সময় ওঘর থেকে ডাক এলাে ভগ্নকণ্ঠে, বড়বউ
বৌরাণী তাড়াতাড়ি পাশের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
তারপর স্বামীর মাথার নিকট এসে বললেন, কেন, কী বলছ ?
যুগলবাবু বললেন, কই না, কিছু না।—আচ্ছা বড়বউ? তুমি
যেন কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
বৌরাণী বললেন, হ্যা, উনি নায়েবমশাই—দেখতে পারছ না?
যুগলবাবু বললেন, ও, নায়েব। আমি যেন কা’র গলা শুনতে
পেলুম! মনে করলুম বুঝি আর কেউ।
বৌরাণীর চোখ আর বাধা মানলো না, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে
পড়লাে।
নায়েবমশাই পিছনে পিছনে এসেছিলেন। এইবার বৌরাণীর
দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, সে আসবে কর্তামশাই শিগগিরই
আসবে।
যুগলবাবু বললেন, ও, আসবে? এখনাে আসেনি।-আচ্ছা
বড়বউ তুমি কি দেখতে পাও না তা’র আসার সময় হয়েছে।
তােমরা কি দেখতে পাও না নায়েব, আমি দু’হাত বাড়িয়ে বসে আছি
শুধু তাই জন্যে? কখন্ আসবে।
বৌরাণী বললেন, তুমি একটু চুপ করে, সে শিগগিরই
আসবে।
যুগলবাবু কম্পিতকণ্ঠে বললেন, ওদিকে বেলা ফুরিয়ে এলাে,
বড়বউ-অন্ধকার ঘনিয়ে এলাে আমাকে জেনে যেতে হবে-
শেষকালের আলােটুকু ফুরােবার আগে আমাকে জেনে যেতেই
হবে—আমার বিশু—আমারই বিশু-পথের ছেলে সে নয়!
নায়েবমশায়ের চোখ অশ্রুপূর্ণ হয়ে এলাে। কিন্তু যুগলবাবু
তখনই একবার উচ্চ হাসি হেসে উঠলেন। হেসে বললেন, বুঝেছি,
বুঝতে পেরেছি!-বড়বউ, আমার চোখ পরিষ্কার হয়ে গেছে!
হা হা হা।
বড়বউ উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, ওগাে, চুপ করাে তুমি, আবার সেই
ব্যথাটা বাড়বে।
যুগলবাবু হাসিমুখে বলবেন, না বড়বউ, আর কোনাে ব্যথা নেই।
-এবার বুঝতে পেরেছি কেন সে আসতে পারছে না! কেন
জানাে? সে যে আমার ক্ষমা পেতে চায় বলতে বলতে তিনি
পুনরায় হাসতে লাগলেন।
সহসা একবার ধড়ফড়িয়ে উঠে উত্তেজিতভাবে তিনি বললেন, না
-না, কিছুতেই না--মা আমি করবাে না !—কি বলো নায়েব?
দোষ কিছু করেনি, অথচ ক্ষমা করবাে? লােকে হাসবে যে!
না না, লােক-হাসাতে আমি পারবাে না! দাও, দাও নায়েব
তাকে একটা টেলিগ্রাম করে দাও—পষ্ট বলে দাও, যার দোষ
নেই, তা’র ক্ষমাও নেই! দাড়িয়ে রইলে কেন, যাও ?
নায়েবমশাই মাথা হেঁট করে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন।
বৌরাণীও বেরিয়ে এলেন পিছনে পিছনে। তারপর ডাকলেন,
নায়েবমশাই--
নায়েবমশাই মুখ ফিরিয়ে বললেন, কি মা?
বৌরাণী বললেন, অবস্থা দেখলেন ত? এখুনি বিশুকে একটা
তার করে দিন
নিজের রুদ্ধ নিশ্বাসে তার নিজের কণ্ঠস্বর যেন রুদ্ধ হয়ে
এলাে।
নায়েবমশাই বললেন, বেশ, তাই দিচ্ছি মা-এখুনি দিচ্ছি—
বলতে বলতে তিনি একপ্রকার ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
আজ দিন আষ্টেক হােলদা বুড়াে কৈলাসবাবু মারা গেছেন। তাঁর,
সংস্থান তেমন বিশেষ কিছু ছিল না। তবে তার অন্তিমকালে
ঘর ঝেটিয়ে ফাইলপত্র জড়াে করে সূর্যমুখী পুরনাে কাগজওলার
কাছে কিছু পেয়েছিল। তাছাড়া ঘরে আসবাবপত্রও সামান্য কিছু
ছিল। সেইগুলি ছুটোছুটি করে বিক্রী করে সূর্যমুখী ডাক্তার ডেকে
কৈলাশবাবুকে ঔষধ খাইয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই কোনাে ফল পাওয়া
যায়নি। হারানাে সন্তানকে খুঁজে বার করার সমস্ত কল্পনা
মহাকালের ভাণ্ডারে অসমাপ্ত রেখে কৈলাসবাবুকে একদিন বিদায়
নিতে হলাে।
সূর্যমুখী নতুন করে পথে বসলাে না—কারণ পথে সে বসেই
ছিল। সে কাদলাে না, কারণ অশ্রুর সমুদ্রেই তার জীবনের ভেলাটা
ভাসছে আজ পনেরাে যােণ বছর। নিজের জীবনধারণের কথাটা
ভাবলাে না, কারণ সেটা বাবা বিশ্বনাথের হাতে। কিন্তু সে কেবল
পাথরের মত স্তব্ধ হয়ে রইলাে।
এমন সময় একদিন সেই রাজলক্ষ্মী নাম্নী কাশীবাসিনী মহিলাটি
এসে তার কাছে দাড়ালেন। বললেন, এতে মানুষের হাত নেই
ভাই। তােমার ছেলেকে তিনি খুঁজে পেলেন না, কিন্তু বাবা বিশ্বনাথ
তাকে খুঁজে নিয়ে পায়ে ঠাই দিলেন।
সূর্যমুখী বললে, দিদি, আমার আর কোনাে-
তা’র গলার স্বর অবরুদ্ধ হয়ে এলাে।
রাজলক্ষ্মী বললেন, উঠে দাড়াও দিদি, ভয় কি? যার দয়াতে
১৩
একদিন তুমি কাকাবাবুকে পেয়েছিলে, তার দয়ায় আবার তােমার
একটা আশ্রয় জুটে যাবে। এসাে তুমি আমার সঙ্গে।
সূর্যমুখী মুখ তুলে বললে, কোথায় দিদি ?
রাজলক্ষ্মী বললে, ওমা, কত জায়গা আছে, এ যে কাণী। এসাে
তুমি। আর দেরী করাে না।
ঘরে কিছু নেই, নেবার মত কোনাে জিনিসেরও অভাব।
সূর্যমুখী ঘরের শিকলটা লাগিয়ে গায়ে চাদরখানা জড়িয়ে পথে এসে
নামলাে। রাজলক্ষ্মী চললেন তার পাশে পাশে।
গণেশ মহল্লার পথে পেরিয়ে কালীতলা দক্ষিণে রেখে দশাশ্বমেধ
ছেড়ে তারা চললে উত্তর পশ্চিমের পথে গােধুলিয়ার রাস্তায়
সেখান থেকে মিরিপুকরায়-একটা গলিপথে ।
একজন ধনী ব্যক্তির বাড়ীতে ঢুকে ভিতরে দোতলায় উঠে
রাজলক্ষ্মী ডাকলেন,-বৌমা-বৌমা শুন্ছ ?
যিনি বেরিয়ে এলেন তিনি বৌরাণী। রাজলক্ষ্মী প্রশ্ন করলেন,
আজ কর্তামশাই কেমন আছেন ?
বৌরাণীর চক্ষে জল এলাে। তারপর কম্পিতস্বরে বললেন,
ভালাে নেই।
রাজলক্ষ্মী বললেন, তােমার ছেলে আজো এসেছেন নি, বোনা ?
বৌরাণী বললেন, না-
অতঃপর রাজলক্ষ্মী সূর্যমুখীকে দেখিয়ে বললেন, এই যে, এর
কথাই তােমাকে বলেছিলুম, বৌমা। ইনি তােমার কাছে থাকলে
তােমার অনেক উপকার হবে! ইনি গেরস্থ ভদ্র ঘরের মেয়ে।
তবে কিনা দুরবস্থায় পড়ে
বৌরাণী সূর্যমুখীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আসুন। আমার
বড় বিপদ-আপনি আমার কাছে থাকবেন। এর বেশী আর কিছু
এখন বলতে পাচ্ছিনে, দিদি।
সূর্যমুখী বললেন, আর কিছু বলতেও হবে না, বােন। আপনার
বিপদ-আমাদের সকলের বিপদ!
এমন সময় ওঘর থেকে আর্তভগ্ন-কণ্ঠে কে যেন কেঁদে উঠলাে,
বড়বউ ?
বৌরাণী দ্রুতপদে সেখান থেকে চলে গেলেন।
এঘরে ছুটে এসে তিনি একেবারে স্বামীর মুখের ওপর ঝুকে
পড়লেন। বলিলেন, কি-কি বলছ ?
যুগলবাবু বললেন, রাত এখনও শেষ হয়নি, বড়বউ ?
বৌরাণী বললেন, ওগাে এখনও সন্ধ্যা হয়নি যে।
যুগলবাবু বললেন, ও, সন্ধ্যা হয়নি। তবে সব জানলা খুলে
দাও, বড়বউ। চারদিক থেকে আলাে এসে পড়ুক, বড়বউ-আলাে
চাই-আলাে চাই।
বৌরাণী তাড়াতাড়ি জানালাগুলাে খুলে দিলেন। ঘরের মধ্যে
আলাে এসে পড়লাে। সেই আলােয় যেন আনন্দে বিহ্বল হয়ে
যুগলবাবু ডাকলেন, বড়বউ ?
বৌরাণী বললেন, কেন?
শুনতে পাচ্ছ ?
কি ? কি শুনবাে গাে ?
যুগলবাবু বললেন, কান্না।
বৌরাণী বললেন, কান্না! কার ?
যুগলবাবু বললেন, জানিনে। কিন্তু অনেক নীচে থেকে যেন
কান্না উঠে আসছে। বড়বউ, বলে ত, অমন করে কাঁদে কেন?
জানালার পাশে সূর্যমুখী দাড়িয়ে সকরুণ চোখে রােগীর দিকে
তাকালাে।
বৌরাণী স্বামীর গলা জড়িয়ে বললেন, ওগাে, অমন করাে না
তুমি,-আমি থাকতে পারিনে।
যুগলবাবু বললেন, কিন্তু ওই কান্নটা আমি কেমন করে চাপা দেব, বড়বউ ? বৌরাণী বললেন, কই, এখানে ত’ কেউ কাদেনি। যুগলবাবু বললেন, কাঁদছে, কাঁদছে—তুমি শুনতে পাচ্ছ না বড়বউ-বুক ফাটা কান্না কাঁদছে। যতদিন ফিরে না পাবে ও কান্না কিছুতেই থামবে না! ও-কান্ন উঠছে অনেক নীচের থেকে। শুদ্ধ ? কবে ও-কান্না থামবে বলতে পারাে, বড়বউ ? ওধারে সুর্যমুখীর চোখ দিয়ে দেখতে দেখতে জল গড়িয়ে এলাে। বৌরাণী বললেন, ওগাে, বিশুকে তার করা হয়েছে, সে শিগগিরই আসছে। এই বলে স্বামীকে তিনি এক দাগ ঔষধ খাওয়ালেন। যুগলবাবু একটু থেমে বললেন, বড়বউ। বড়বউ- বৌরাণী বললেন, ওগাে, অত অস্থির হয়ে না তুমি। যুগলবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, একখানা মই—একখানা মই দিতে পারাে। বৌরাণী বললেন, মই। কি বলছ? তিনি যেন মনে মনে অস্থির হয়ে উঠলেন। যুগলবাবু বললেন, হ্যা, হঁা—একখানা মই। বিকারের ঘােরে যুগলবাবু সহসা উঠে বসলেন। তিনি যেন একটা অন্ধ গুহাগহবর থেকে প্রাণপণে উঠে দাড়াবার চেষ্টা করছিলেন। পুনরায় বললেন, মই, মই একখানা! কেন ওই কান্নাটার তলায় তলিয়ে যাব? কেন সবাই নীচের দিকে আমাকে টেনে রাখছে। আমাকে উঠতে দাও, মইখানা দাও, মইখানা না দাও বাঁধন কেটে পালাতে দাও বড়বউ-তুমি আমার হাত ধরে। বৌরাণীর চোখে জল এলাে।—তিনি আর্তকণ্ঠে বললেন, ওগাে, ওগাে—এবার তুমি চুপ করাে, তুমি চুপ করাে। তার পেলেই তােমার বিত ছুটে আসবে।
সূর্যমুখী আর স্থির থাকতে পারলাে না, আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে অন্তিম শয্যাশায়ী যুগলবাবুর পায়ের কাছে পাথরের মত দাড়িয়ে রইল। কলকাতায় বিও নিরুদের বাড়ীতে হন্তদন্ত হয়ে এসে প্রবেশ করলাে। প্রথমেই বাইরের ঘরে পাওয়া গেল একজন পৰুকেশ বৃদ্ধকে। সঙ্কোচ কাটিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে বিশু বললে, ক্ষমা করবেন,-আপনাকে একটু বিরক্ত করব। দাদু হাসিমুখে তাকালেন তার প্রতি। বললেন, বেশ- বিরক্তই হই—বলে? বিশু ব্যস্ত উদ্বিগ্নভাবে বললে, নিরুপমাকে একটা কথা বলতে এসেছিলুম—বিশেষ দরকার ছিল— দাদু তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কে? বিশু একটু আড়ষ্টভাবে বললে, আমাকে বােধ হয় আপনি চিনবেন না! দাদু বললেন, বটে! যদি বলি চিনি? সাংঘাতিক রকম চিনি। বিশু শান্তভাবে বললে, আপনার সঙ্গে আগে আমার পরিচয় ছিল না। দাদু বললেন, কে বললে ? পরিচয়টা কত ঘনিষ্ঠ তা কি তুমি জাননা? বিশু তাড়াতাড়ি দাদুর পায়ে প্রণাম করলে দাদু তাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। বিশু বললে, আমাকে আজকেই কাশী যেতে হচ্ছে—সেইজন্যে-
এমন সময় নিরু তরতর করে নেমে এসে এঘরে ঢুকলাে।
বিশুকে দেখে সহসা হতবিমূঢ়ের মতাে প্রশ্ন করলাে, আপনি হঠাৎ
বিশু বললে, বাবার খুব অসুখ—এই টেলিগ্রাম—আজই আমাকে
যেতে হবে—পাঁচটার গাড়ী
নিরু ব্যস্ত হয়ে উঠলাে। বললে, টিকিট করা হয়েছ?
বি বললে, না।
দাড়ান,বলে নিরু দ্রুতপদে বাইরে এলাে। এসে ডাকলাে,
কার্তিক-কার্তিক
ওধার থেকে কার্তিক সাড়া দিয়ে বললে, আজ্ঞে, কি বলছেন?
নিরু বললে, তুমি তাড়াতাড়ি গাড়ী নিয়ে যাও—একখানা কাশীর
টিকিট কিনে আনন। সরকার মশায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে
যাও। একটুও দেরি করাে না।
কার্তিক গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে যাবার পর নিরু দ্রুতপদে এ-ঘরে
এলাে। তারপর বিশুকে বললে, আপনার আর দাড়ান চলবে
-সাড়ে তিনটে বাঁজে। যা হােক করে সুটকেসটা গুছিয়ে
নিনগে—আমি এখুনি টিকিট নিয়ে যাচ্ছি।
দাদু উঠে দাড়িয়ে বললেন, তাহলে দিদি, ওকে কিছু
খাইয়ে দে?
বিশু বললে, কিন্তু আমার যে আর সময় নেই।
নিরু বললে, তবে থা—আপনি বেরিয়ে পড়ুন—আমি ঠিক
সময় যাচ্ছি—
বিশু দাদুর কাছে বিদায় নিয়ে দ্রুত পথে বেরিয়ে পড়লাে।
ছুটতে ছুটতে অবশেষে যখন বাসার কাছে এসেছে, দেখতে পেল
বিপরীত দিক থেকে আসছে একজন টেলিগ্রাফ পিওন। বিশু
গেটের কাছে থমকে দাড়িয়ে পড়ল। পিওন এসে সাইকেল
রাখলে গ্যাস পােষ্টে হেলান দিয়ে। তারপর পকেট থেকে
টেলিগ্রাম বার করে বিশুর হাতে দিল। টেলিগ্রামখানা খুলে, বিশু ছিড়তে যাবে, সেই মুহুর্তে গ্যাস পােষ্টের ধার থেকে লাল রংয়ের সাইকেলখানা সশব্দে ঝড় ঝড় করে পথের ধারে আছাড় খেয়ে পড়লাে। যেন ওটা একটা অমঙ্গলের চিহ্ন। টেলিগ্রামখানা পড়ে বিশু কাঠের মত স্তব্ধ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। কার্তিক ফেরবার পর টিকিটখানা নিয়ে নিরু বেরুতে যাবে, এমন সময় ঘরে টেলিফোন বেজে উঠলাে। তাড়াতাড়ি গিয়ে ফোন ধরে নিরু বললে, কে ? হঁা—আমি—কি বল্লেন ?—আপনার বাবা মারা গেছেন ? টেলিফোনে জবাব এলাে, হঁা নিরু, আমার সবচেয়ে বড় আশ্রয় আজ ভেঙে পড়লো ! নিরু নিশ্বাস ফেললাে। তারপর অবরুদ্ধ কণ্ঠে বললে, আপনার সঙ্গে তার শেষ দেখা হােলো না, সেই কথাই বার বার মনে হচ্ছে। ওপাশ থেকে বিশু বললে, দেখা না হওয়ার জন্যে তিনি কতখানি আঘাত স’য়ে গেলেন তা তােমাকে বােৰাতে পারবাে না নি। বিশুর কণ্ঠে বেদনা ঝরে পড়ল। নিরু একটু চুপ করে থেকে বললে, আমি বুঝতে পারছি এ আঘাত তােমার পক্ষে কতখানি কঠিন, কিন্তু তবুও, ভেঙে পড়লে চলবে না। আমি তােমাকে ভেঙে পড়তে দেবাে না।
যুগলবাবুর মৃত্যুর পর সকলে কাশী থেকে দেশে ফিরে গেলেন। যতীনবাবু ইতিমধ্যেই একটা চক্রান্ত পাকিয়ে তুলেছেন খবর পাওয়া গেল—সুতরাং নায়েবমশাইও আর একটি দিনও অপেক্ষা করতে পারেননি। যতীনবাবুর আচরণে সকলেই বিস্মিত। শ্রাদ্ধ শান্তি সমস্তই দেশের বাড়ীতে সম্পন্ন হবে এবং সেই অনু- যায়ী বিশুকে জানানাে হােললা, সে যেন কলকাতা থেকে সটান দেশের বাড়ীর দিকে চলে যায়। বিশু জবাব পাঠিয়েছে, তাই সে যাবে। দেশের দিকে রওনা হবার সময় বৌরাণীর সঙ্গে চললেন সূর্যমুখী —তিনি অনেকটা পার্শ্বচারিণীর মতাে হয়ে বৌরাণীর পরিবারভুক্ত হয়েছেন। তাছাড়া সূর্যমুখীর আচার আচরণে ও সেবাপরায়ণতায় সকলেই মুগ্ধ। সুর্যমুখীও অতি সহজে এবং অনায়াসে সকলকে আপন করে নিয়েছেন। বৌরাণী বিধবার বেশে দেশের বাড়ীতে ফিরে শ্রাদ্ধের সমস্ত আয়ােজন করছেন। তার শয়নকক্ষের সামনে দরদালানে যুগলবাবুর বৃহৎ তৈলচিত্র দেখা যায়। এ পাশে বিশুর একটি বড় ছবি ঝুলছে। আজ বিওর আসবার দিন। বৌরাণী কি যেন কাজে ঘর থেকে বেরােচ্ছিলেন, দেখলেন বিশুর ছবিটির প্রতি সূর্যমুখীর একাগ্রদৃষ্টি নিবদ্ধ। সূর্যমুখী কেমন যেন
আনমনা। যাবার সময় থমকে বৌরাণী বললেন, হ্যা, ওই আমার
ছেলে।
সূর্যমুখী যেন অভিভূতের মতাে বললেন, ও, তােমার ছেলে।
বেশ ছেলে!
বৌরাণী হাসিমুখে বললেন, ওর নাম বিশ্বনাথ—বিশু বলে
সবাই ডাকে।
সূর্যমুখী গদগদভাবে বললেন, ও, বিশু।
বৌরাণী বললেন, তুমি অত করে কী দেখছ দিদি ?
সূর্যমুখী বললেন, না-না-কিছু না! দেখছি—বেশ ছেলেটি।
বৌরাণী সস্নেহে স্মিতমুখে বললেন, এই ত’ সকালের গাড়ীতেই
বিশু এসে নামবে—হয় ত’ নেমেছে এতক্ষণ আমি খবর নিই।
মােক্ষদা-মােক্ষদা-
মােক্ষদা কাজ ফেলে তাড়াতাড়ি ছুটে এলাে। বৌরাণী বললেন,
নায়েবমশাইকে বলগে যা,ছােটবাবুর জন্থে ষ্টেশনে লােকজন
গেছে.ত ?
ঝি বললে, হঁা মা, আমি জানি, তারা অনেকক্ষণ গেছে—এই
এলাে বলে ।
বৌরাণী বললেন, আচ্ছা—যা-
মােক্ষদা চলে গেল।
বৌরাণী নিজের মনে বললেন, ভালােয় ভালােয় শ্রাদ্ধের কাজটা
এখন হয়ে গেলে হয় !
সূর্যমুখী বললেন, ভালােয় ভালােয় চুকবে বৈকি, বােন।
কর্তার কাজ, একাজে কোনাে বাধা হবে না।
বৌরাণী বললেন, তাই বলে দিদি, আমাদের সকলের যেন
মুখরক্ষে হয়।
এমন সময় বাইরে নায়েবমশাই ও বিশুর গলার আওয়াজ
শােনা গেল। নীচে থেকে নায়েবমশাই তখন বলছে, এবাড়ী
কাজে কত যে হাঙ্গামা জোটবাবু-
বিশু বলছিল, আপনি ব্যস্ত হবেন না, নায়েবমশাই
বৌরাণী বললেন, ওই বিশু এসেছে ।-বলতে বলতে তার চোখে
জল এলো। পুনরায় সূর্যমুখির দিকে চেয়ে বললেন, আজ
মা-ছেলে দু’জনের চেহারাই আলাদা!-দিদি, তুমি ভাই একটু
জলখাবার এনে দাওনা!-হয়ত , বাছা গাড়ীতে কিছু
খেতেই
পায়নি।
সূর্যমুখী চুপ করে দাড়িয়ে সম্মুখে বিশুর ছবি ও নীচে বিশুর
কণ্ঠস্বরকে কেমন করে যেন অভিভূতের মত মেলাতে
লাগলেন।
নীচে থেকে বিশুর কণ্ঠস্বর তখনও শােনা যাচ্ছে, আপনি একটু
অপেক্ষা করুন নায়েবমশাই-আগে আমি মার কাছে যাই।—এই
বলে সে উপরে আসার পথ ধরলাে।
এদিকে বৌরাণী ডাকলেন, দিদি-
সূর্যমুখী যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠলেন। বললেন, ও—এই
যাই—হা—যাচ্ছি—যাচ্ছি—বলতে বলতে তিনি যেন অপরাধীর
মত ধরা পড়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে গেলেন।
উপরে উঠে এসে বিশু বৌরাণীর কাছে এলাে। তার বাঁ হাতে
একটি আসন-পরনে শাদা ধুতি ও কাছা গলায়-মুখে গোঁফ-দাড়ি।
বিশুকে দেখেই বৌরাণী ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন। কান্না
কিছুক্ষণ পরে শান্ত হলে বিশু দেওয়ালে হেলান দিয়ে বললে,
বৌরাণী বললেন, বাবা-
বিশু বললে, এমন হবে এ আমি কখনাে ভাবিনি, মা। এমন
জানলে আমি কিছুতেই বাবাকে ছেড়ে যেতুম না ।
দুজনের চোখ বেয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগলাে।
অ=
বোরাণী বললেন, আমরা সকলেই তাকে মানা করেছিলুম বাবা, কিন্তু কারাে কথা তিনি শুনলেন না—কাণ গেলেন। বিশু বললে, আমি জানি মা, এ শােধ তিনি আমার ওপরেই নিলেন, আমারই অপরাধ। আমায় তুমি ক্ষমা করাে, মা। বৌরাণী বললেন, তুই কাছে ছিলিনে বাবা, কিন্তু ক্ষমা যার করবার তিনিই করে গেছেন। বাইরে থেকে গলার আওয়াজ পাওয়া গেল—ছােটবাবু- বলতে বলতে নায়েবমশাই এসে ঢুকলেন। বললেন, এই যে, এখানেই আছছ। ছােটবাবু, একবার এদিকে এসস, নৈলে কাজ এগােয় না। এদিকে আর হাতে সময় নেই- বিশু বললে, হ্যা, এই যাই, যাচ্ছি নায়েবমশাই— নায়েবমশাই বললেন, আজকের ডাকে নেমন্তন্নর চিঠিগুলাে ফেললে লোেক এসে পৌছতেই পারবে না! এসাে ভাড়াতাড়ি হ্যা, চলুন-বলে বিশু নায়েবমশাইয়ের পিছনে পিছনে চলল। বৌরাণী ডেকে বললেন,—বিশু, একটু জল খেয়ে গেলে হােত না, বাবা.? বিশু বললে, এখুনি আসছি মা। তুমি একখানা নতুন ধুতি আনন—এই বলে সে বেরিয়ে গেল। বাইরে এসে দাড়াতেই চুপিচুপি নায়েবমশাই বললেন, ওখানে রাণীমার সামনে তখন বলিনি—যতীনবাবুর কাছে কি চিঠি পাঠাবাে? বিশু বললে, না, তার কাছে কোনাে চিঠি যাবে না। নায়েবমশাই বললেন, আমারও তাই ইচ্ছে ছছাটবাবু, কিন্তু রাণীমা- বিশু বললে, মা কি বললেন ? নায়েবমশাই বললেন, তার ইচ্ছে, কেউ না বাদ যায়—এটা কর্তার কাজ- ০ . বিশু বললে, যতীনবাবুর ওপর বাবা একেবারেই খুশী ছিলেন না, সুতরাং বাবার কাজে তাঁর আসা হবে না-মাকে আমি বুলিয়ে বলছি এই বলে সে আবার ভিতরের দিকে গেল। ওদিকে তখন ভিতরের ঘরে সূর্যমুখী প্রবেশ করছেন। তাঁর হাতে জলখাবারের থালা। তিনি ধীরে ধীরে এসে থালা হাতে বিশুর ছবির দিকে চেয়ে পিছন ফিরে দাড়ালেন। বিশু তাড়াতাড়ি এসে ডাকলাে, মা- সূর্যমুখী পিছন ফিরে থেকেই মাথায় কাপড় টানলেন। বিশু বললে, মা, তুমি নাকি যতীনবাবুকে নেমন্তন্ন করার কথা বলেছ ? উনি বাবাকে কি রকম বিরক্ত করেছিলেন, তােমার মনে নেই। তিনি এখানে শুধু কাজ পণ্ড করতেই আসবেন—চারিদিকে গণ্ডগােল পাকিয়ে তুলবেন।-মা, কথা বলছ না যে? চুপ করে রইলে কেন?-একটু থেমে পুনরায় সে বললে, ও, বেশ,-তাই হােক তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি চললুম-নায়েবমশাইকে বলে দিই- এই বলে সে সিড়ি পর্যন্ত এগিয়ে গেল, আবার কি যেন ভেবে ফিরে এসে বললে, কিন্তু একটা কথা তােমাকে বলে রাখি মা- যতীনবাবু এসে যদি সূর্যমুখী সামনে ফিরে দাড়ালেন। বিশু তার দিকে তাকিয়ে সহসা চীৎকার করে উঠলাে; একি—মা-মা তুমি ? সূর্যমুখীর কম্পিত হাত থেকে থালা পড়ে গেল ঝন্ ঝন্ শব্দে। দুইটি ব্যগ্র বাহু বিস্তার করে তিনি বিশুর দিকে এগিয়ে এলেন, বললেন,-মাণিক-মাণিক-বাবা- অধীর আর্ত-পক্ষী-শাবকের মতাে বিশু এতকাল পরে প্রাণ ভরে ডাকলােমা-মা-কোথায় ছিলে তুমি? মামাগাে দু’জনের গলার আওয়াজ পেয়ে বৌরাণী ও-ঘর থেকে ছুটে এলেন। বললেন কেন রে, আমাকে ডাকছিস, বি-এই যে আমি
ঝড়ের মতাে তিনি এ ঘরে এসে ঢুকলেন। সহসা এই
অচিন্তনীয় দৃশ্য দেখে তিনি হতচকিতভাবে স্তব্ধ হয়ে বললেন, একি
বিশু-দিদি -এ ত’ আমি-আমি কখনাে ভাবিনি। আজ একি
শুভদিন? উনি বেঁচে থেকে দেখে যেতে পারলেন না?
ধীরে ধীরে বৌরাণীর চোখে বড় বড় অশ্রুর ফোটা ঘনিয়ে এলাে।
সুদীর্ঘ পনের বৎসর পরে মাতা ও পুত্রের মিলন ঘটলাে।
এই মহিমাময় দৃশ্য দেখার জন্য বাড়ী ও কাছারীর সমস্ত জনতা
ভীড় করে এসে দাড়িয়ে আনন্দ করতে লাগলাে।
বিশু হাসিমুখে বললে, তুমি আবার আমাকে মাণিক বলে
ডাকবে ত’ মা?
সূর্যমুখী হাসিমুখে বললেন, না। কাশী গিয়ে বাবা বিশ্বনাথকে
ডেকে ডেকে আবার তােকে পেয়েছি ! তুই আমারও বিশু।—তা
ছাড়া-
বিশু বললে, কি মা?
সূর্যমুখী বললেন, যেদিন আমাকে হারিয়ে তুই পথে পথে ঘুরে-
ছিলি, যেদিন তাের আর কেউ ছিল না—সেদিন যারা তােকে কোলে
তুলে নিয়েছিল, তারা যে আমার কত আপন—ততাকে বুঝাতে
পারবে না, বিশু। তুই আমার বুকের মাণিক, সুখের বিও।
এমন সময় নায়েবমশাই এসে দাড়ালেন। বললেন, এই যে বড়মা-
সূর্যমুখী বললেন, এসস বাবা।
নায়েবমশাই বললেন কী সৌভাগ্য যে সকালে মা-অন্নপূর্ণার দর্শন
পেলুম। এ বুড়াের মাথাটাও ওই পায়ে একবার ঠুকতে দিন্ মা-
নায়েবমশাই সূর্যমুখীর পায়ে প্রণাম করলে।
বিশু বললে, নায়েবমশাই, আপনার হাতে কাগজখানা কি?
নায়েবমশাই সহসা চেঁচিয়ে উঠলেন, ওই দেখাে, আসলেই ভুল।
আরে এইজন্যেই ত’ এসেছি। এই দ্যাখােদ্যাখাে—তােমার সেই
বক-ধার্মিক যতীনকাকা’র কাণ্ড!
বিশু বললে, কি হয়েছে, নায়েবমশাই?
নায়েবমশাই বললেন, যা হবার তাই হয়েছে। তােমাকে কতবার
বলেছি, ছােটবাবু এ লােকটা হােলাে বহুরূপী !–কর্তামশাই কতবার
আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে বলেছেন—ওহে নায়েব, কেবল হাত
কচলাতেই শিখেছ, আর যে-আজ্ঞে’ই শিখেছ—মানুষ চিনতে
শেখােনি। আমি মনে মনে ভাবতুম,—হু হু কাকে না চিনি।
বাইরে থেকে কথাবার্তা শুনে বৌরাণী ঘয়ে এসে ঢুকলেন।
বললেন, কি, কি হয়েছে নায়েবমশাই?
নায়েবমশাই বললেন, শমন এসে হাজির, রাণীমা ! যতীনবাবু
নালিশ করেছেন। জমিদারীটা নাকি সবই তার, আমরা সবাই
ভঁকে ঠকিয়ে খাচ্ছি।
বৌরাণী অপার বিস্ময়ে বললেন, সত্যিই তবে যতীন ঠাকুরপাে
নালিশ করেছেন।
বিশু বললে, আশ্চর্য, এ আমরা কখনাে ভাবিনি।
বৌরাণী গম্ভীকণ্ঠে বললেন, ঠাকুরপাের এতখানি দুঃসাহস ?
নায়েবমশাই বললেন, দুঃসাহস নৈলে আর সাপের গর্তে হাত
দেয় মা! কি বলব, কর্তামশাই ছিলেন নির্বিরােধীতার হুকুমে
মামলা-মােকদ্দমা একরকম ভুলেই ছিলুম। কিন্তু এবার যতীনবাবুকে
বেশ ভালাে করেই দেখবে,—আমরা ঢোঁড়া সাপ নই—আমরা
সেই পুরনাে আমলের জমিদার—সেই চিরকেলে জাত সাপ।
বৌরাণী বললেন, কিন্তু নায়েবমশাই—
নায়েবমশাই বললেন, না মা, আপনি আর কারাে মুখ
চাইবেন না। যে-ফঁদ তিনি নিজেই পেতেছেন, সেই কঁদেই আমি তাকে বাঁধবাে--তবেই আমার নাম মহেশ মুখুজ্যে। ব’লে গেলুম ছােটাবু, মা আপনিও দেখে নেবেন, যতীন বড়য্যে কেমন করে নিজের ভিটেয় নিজেই ঘুঘু চরান্। এই কথা বলে কারাে কথা না শুনে তিনি ঘর থেকে হন্ হন করে বেরিয়ে গেলেন। যথাসময়ে আদালতে মামলা উঠলাে। কিন্তু একখানা অত্যন্ত মােম কাগজ নায়েবমশাইয়ের হাতে থাকার জন্য মামলার সমস্ত চেহারাই একদিনে বদলে গেল। মােকদ্দমাটা দেওয়ানী থেকে ফৌজদারীতে গিয়ে দাড়ালাে। এই রকম একদিন অপরাঢ়ে নায়েব- মশাই হাসিমুখে বাড়ী ফিরে সােজা অন্দরমহলে গিয়ে বৌরাণীকে ডাকলেন। বৌরাণী এলেন সমস্ত উৎকণ্ঠা নিয়ে। তারপর নায়েক মশাইকে দেখে মামলার কি হােলদা জিজ্ঞাসা করলেন। নায়েবমশাই কৃত্রিম বিষন্ন সহানুভূতির সঙ্গে বললেন, যতীনবাবু নিজের জালে নিজেই জড়ালেন। তার জেল হবে, মা! বৌরাণী ভীতকণ্ঠে বললেন, জেল হবে। কি বলছেন, নায়েব- মশাই। একটু দাড়া, পুজোটা সেরে আসি-সব শুনবাে। এই বলে তিনি ঠাকুর-ঘরে চলে গেলেন। সেই সময় এদিকের বারান্দায় বিশুকে দেখে মােক্ষদা ভালাে, ছােটবাবু বিশু বললে, কি রে ? মােক্ষদা বললে, একজন মেয়েছেলে এসেছে, আপনার সঙ্গে একবারটি দেখা করতে চায়।
* বিশু বললে, মেয়েছেলে। আমার সঙ্গে? কে? নাম কি?
সহসা নিরুর চেহারাটা এবাড়ীতে কল্পনা করে তার বুকটা ধ্বক
করে উঠলাে।
মােক্ষদা বললে, তা বলেনি, শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করতে
চায়।
শুধু আমার সঙ্গে ? চল দেখি, এই বলে বারান্দা পেরিয়ে সে
সিড়ি দিয়ে নেমে গেল।
বিশু নেমে এসে দেখলাে, একটি মহিলা দাড়িয়ে। ঘােমটার
ভিতর থেকে তার মুখখানা স্পষ্ট দেখা যায় না। বিশু বললে, কে
আপনি?
মৃদুকণ্ঠে মহিলাটি বললেন, আমাকে বােধ হয় তুমি চিনবে না,
বাবা।
বিশু প্রশ্ন করলে, কি দরকার, বলুন?
আমার স্বামীর জন্যে এসেছি তােমার কাছে।
বিশু বললে, বলুন, কি বলতে চান—
মহিলাটি সবিনয়ে বললেন, আমার স্বামীর জেল হবে, কিন্তু
তুমিই তাকে বাঁচাতে পারাে, বাবা।
বিশু সচকিত হয়ে বললে, ও, আপনি যতীনবাবুর স্ত্রী!—কিন্তু
দেখুন, এ বিষয়ে আমার কোনো কথা বলবার নেই।
নায়েবমশাই জানেন, আর মা জানেন। আপনি বরং তাঁদের
কাছে যান্।
মহিলাটি করুণ কণ্ঠে বললেন, না বাবা, স্বামীর জন্যে ওঁদের কাছে
কিছু বলবার মুখ আমার নেই, তাই লুকিয়ে তােমারই কাছে এলুম।
তােমার হাত ধরেই বলছি, বাবা-
এই বলে তিনি ঘােমটা সরিয়ে মুখ তুললেন, তার মুখখানা
লক্ষ্য করেই বিশু যেন চমকে উঠলাে। সহসা সে বললে, আপনাকে
पमद
১০
যেন আগে দেখেছি মনে হচ্ছে— আচ্ছা, বাসন্তীপুর গ্রাম আপনি
-হা জানি বৈ কি-বাবা
বিশু বললে, সেখানে কা-র—সেখানকার ঠাকুরবাড়ী ?
-হ্যা-
বিশু অধীর কণ্ঠে বললে, সেখানে বছর-বছর রামনবমীতে
কাঙালীদের ভাত খাওয়ানাে হয়, না ?
মহিলাটি বললেন, হ্যা বাবা, সে-ঠাকুরবাড়ী আমারই
বিশু বললে, ও! তার মায়ের সেই সই সুরবালাকে এবার
চিনতে বিশুর আর দেরী হােলল না। সে বললে, আচ্ছা, সেখানে
উপবাসী মানুষ আর পথের কুকুর একই ব্যবহার পায়, সেটা কি
আপনারই হুকুমে ?
সুরবালা সবিস্ময়ে বললেন, এসব কি বলছ বাবা, এরকম হুকুম
কি মানুষে দিতে পারে ?
বিশু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, হ্যা, পারে বৈ কি? ঠিকই বলছি,
আপনারা অনেক টাকার মালিক, টাকার জোরে পৃথিবীকে শাসন
করেন, টাকার অহঙ্কারে গরীবের বুক পা দিয়ে মাড়িয়ে যান
আপনাদের সেই ঠাকুরবাড়ীতে মানুষ আর কুকুর বােধ হয় একই
কি বলেন?
সুরবালা নরম শুরে বললেন, তুমি রাগ করছ কেন, বাবা?
রাগের কথা নয়, আমার মনের কথা। একদিন আপনার
পায়ের তলায় পড়ে কুকুরের মতন মার খেয়েছিলুম, আপনারা
আমার মুখের ভাত কেড়ে নিয়েছিলেন—তাই মনে আছে। বিশুর
কণ্ঠে অতীত যেন কথা কয়ে উঠল।
সুরবালা সবিস্ময়ে বললেন, তুমি-তুমি কে বাবা? তােমার
ওপর জুলুম হয়েছে, কই—মনে পড়ে না ত ?
বিশু বললে, যে মারে সে মনে রাখে না—যে মার খায় সে কোনদিনই ভােলে না—তা জানেন ত? হ্যা, আমাকে নাই- চিনলেন, কিন্তু গরীব বলে যাকে একদিন ইচ্ছে করে আপনি চেনেন নি—আমি তারই ছেলে। সুরবালা হতাশ কণ্ঠে বললেন, কে তিনি? তবে কি—তবে কি বাবা, যেমন এসেছি তেমনি আমাকে ফিরে যেতে হবে ? বিশু বললে, এর জবাব আমি আপনাকে দিতে পরবাে না। আপনি আসুন ওপরে- এই বলে সে আগে আগে গিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাে। সুরবালা সভয় কুণ্ঠার সঙ্গে বিশুর অনুসরণ করলেন। সড়ি পেরিয়ে উপরে উঠে দরজার কাছে এসে বিশু বললে, একটু দাড়া এখানে—এই বলে সে মায়ের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। ডাকলে, মা- সূর্যমুখী উঠে দাড়িয়ে বললেন, কি রে ? বিশু বললে, একটা কথা, মা- সূর্যমুখী বললেন, কি বল। বিশু বললে, বাসন্তীপুর গ্রামের ঠাকুরবাড়ী তােমার মনে পড়ে?. সূর্যমুখী বললেন, হ্যা, পড়ে বৈ কি! বাবা- বিশু বললে, সেখানে একদিন আমার মুখের ভাত কেড়ে নিয়েছিল, তােমাকে আমাকে অপমান করে তাড়িয়েছিল—মনে আছে? সূর্যমুখী ঈষৎ গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, হ্যা, আছে, ভুলিনি। বিশু বললে, সেখানে একদিন একজন তােমাকে ইচ্ছে করে চিনতে পারেনি, মনে পড়ে কি ? সূর্যমুখী বললেন, হ্যা, তাও ভুলিনি। বিশু বললে, কার কথা ভােলােনি, বলল ত? সূর্যমুখী বললেন, একদিন যাকে সই বলে ডাকতুম । বি বললে, তা হলে বাইরে এসাে ==
বিশুর পিছনে পিছনে সূর্যমুখী দ্রুত বাইরে এলেন। বাইরের
বারান্দায় অনতমুখী সুরবালা এবার মুখ তুললেন।
বিশু সুরবালাকে সম্বােধন করে বলল, দেখুন ত ভালাে করে,
এবার একে চিনতে পারেন কি না ?
সূর্যমুখী বিস্ময় বিস্ফারিত চক্ষে সুরবালার দিকে চেয়ে বললেন,
এ কি ? তুমি ? সই ?
সুরবালা কেঁদে বললেন, তুমি ? সই ?
সূর্যমুখী বললেন, হ্যা—কতদিন পরে দেখা! তােমাকে আর
কোনােদিন দেখবাে এ আশা আমি করিনি সই।
সুরবালা নতমুখে বললেন, কিন্তু দেখা দেবার মতন মুখ আর
আমার নেই, সই। আমি তােমার পায়ে ধরতে এসেছি। আমাকে
তুমি ক্ষমা করাে বােন্।
সুর্যমুখী হতচকিত হয়ে বললেন, ওমা, সে-কি ? পায়ে ধরতে।
ছি ছি, এমন কথা বলতে নেই, তুমি যে আমার সেই ছােটবেলাকার,
সেই, বড় আদরের সই!—এসস, ভেতরে এসাে। তুমি দোষ
করেছিলে আমার কপালদোষে,
সই-তােমার কোন দোষ নেই।
এসাে !
বিশু স্তব্ধ অভিভূতের মতাে দাড়িয়ে রইলাে। এমন সময় পিছন
থেকে ছুটে এলেন বৌরাণী। এসেই দু’জনকে দেখে বললেন, একি
ছােট বৌ? দিদি ?
সূর্যমুখী বললেন, হ্যা বােন্, আমরা দু’জনে ছােটবেলার, সই।
সুরবালা সজলচক্ষে চেয়ে বললেন, দিদি, তােমার ঠাকুরপােকে
তােমরা বাঁচাও।
বৌরাণী বললেন, হােট বৌ, যতীন ঠাকুরপাের কিছু হবে না-
আমি কথা দিচ্ছি। আমি যে ঠাকুরের কাছে মানত করে রেখেছি।
বিশু, চুপ করে থাকিসনে-ছােট বৌকে তুইও কথা দে।
p
বিশুর মুখমণ্ডল ধীরে ধীরে ক্ষমায় ও প্রসাদগুণে উজ্জ্বল হয়ে
উঠলাে। হাসিমুখে সে বললে, তুমি কথা দিলে, সেই ত আমার
কাছে সকলের বড় হুকুম মা।
সুরবালা জলভরা নেত্রে বিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
=
কতকাল পরে দুই সইতে দেখা হােলাে—সে যুগান্তরের কথা।
কত গল্প, কত আলাপ, কত ঘটনা ও মনের কথা
সূর্যমুখী বললেন; সে আজ কতদিনের কথা মনে পড়ে, সই ?
সুরবালা বললেন, পড়ে বৈ কি! দিনরাত পুতুল খেলা নিয়ে
আমাদের কত ঝগড়া ঝাটিই না হােত!
সূর্যমুখী বললেন, শুধু ঝগড়া! ভাব হতেও দেরি হেতাে না।
সুরবালা হাসলেন। বললেন, হা,–এই দ্যাখাে না, বুড়াে হতে
চললুম, এখনও সেই ঝগড়া আর সেই ভাবই চলছে। নৈলে কে
জানত সই, আবার দু’জনে দেখা হবে, আবার পুরণাে কথা মনে
হবে-
সূর্যমুখী হাসলেন। বললেন, আবার দু’জনে মান-অভিমানের
পালা গাওয়া হবে।
সুরবালা বললেন, না ভাই, মান-অভিমান আর নয়। কিন্তু
ছােটবেলার সবচেয়ে দামী কথাটা তােমাকে মনে করিয়ে দিতে
এলুম, সই।
সূর্যমুখী বললেন, কি বলল ত ? সুরবালা বললেন, সেই-যে দু’জনে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, আমাৰু যদি মেয়ে হয়, আর তােমার যদি ছেলে হয়—তাহলে—মনে পড়ে? সূর্যমুখী বললেন, হ্যা, কিছু ভুলিনি—আমরা ঠিক করেছিলুম, সেই ছেলের সঙ্গে সেই মেয়ের বিয়ে দেবে। সুরবালা উৎসাহিত হয়ে বললেন, তাহলে আমাদের সেই ছােটবেলা আবার ফিরে আসুক। তােমার পুতুলের সঙ্গে আমার পুতুলের এবার সত্যি বিয়ে হােক? সূর্যমুখীও উৎসাহিত হলেন। বললেন, বেশ তা বৌরাণীকে বলে এই ফাল্গুনেই আমি দিন ঠিক করে ফেলি। সুরবালা বললেন, তা হলে পাঁজি দেখাদেখি হােক, সই। সূর্যমুখী বললেন, হ্যা, এক্ষুণি— সুরবালা বললেন, বেশ, তবে যাই—ওঁকে সুখবরটা দিই গে, সই। এই বলে সুরবালা সেদিন অপ্রত্যাশিত আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বিদায় নিলেন। সুরবালা বাড়ী ফিরলেন প্রায় সন্ধ্যায়। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে বললেন, ও গাে, শুন্ছ ? যতীনবাবু বললেন, এসেছ? কি খবর? সুরবালা বললেন, আজ আমাদের পুরাে ইতিহাস সব প্রকাশ হয়ে পড়েছে। বলছি একে একে, দাঁড়াও! আজ বড় আনন্দের দিন। সইয়ের ছেলের সঙ্গে খুকির বিয়ে! যতীনবাবু সবিস্ময়ে বললেন, বলাে কি? তােমাদের ছােট- বেলাকার কথা সত্যি হয়ে উঠলাে ?
সুরবালা সানন্দে বললেন, তােমার ব্যাপার আমি সব মিটিয়ে এসেছি, ওরা ক্ষমা করেছে। যতীনবাবু আক্ষেপের সুরে বললেন, আমিও ভুল করেছিলুম হােট বৌ। ওরা এত ভালাে আগে জানিনি। সুরবালা হাসিমুখে বললেন, সব ভালাে যার শেষ ভালাে। তা হলে আমাদের খুকির সঙ্গে বিশুর বিয়ের ঠিক করে ফেলি, কি যতীনবাবু আনন্দের সঙ্গে বললেন, নিশ্চয়ই। শুভস্য শীঘ্রম্ । সুরবালা তখন সমস্ত কাহিনী গুছিয়ে বলতে বসলেন। বিশু প্রথমদিকে কানাকানিটা বিশ্বাস করেনি—হেসে উড়িয়ে দিয়ে ছিল। কিন্তু যখন ব্যাপারটা ঘনিয়ে উঠলাে, তখন তার পক্ষে দুশ্চিন্তার কারণ ঘটলাে। একদিন সে মায়ের ঘরে ঢুকে বললে, মা তােমরা এসব কী ছেলেমানুষি করছ, শুনি? সূর্যমুখী সহাস্যে বললেন, ও কথা বলতে নেই বাবা,-এ বিয়ে আজ তিরিশ বছর আগে ঠিক হয়ে আছে। বিশু একটু উত্তেজিত ভাবেই বললে, আমার জন্মাবার আগেই আমার বিয়ের ঠিক হয়ে আছে। এ হতে পারে না, মা- সূর্যমুখী একটু চঞ্চল ও উদ্বিগ্নভাবে বললেন, তাের কথা শুনলে ভয় করে, বিশু। তুই কি চাস, ললাকের কাছে আমি মিথ্যেবাদী হই ? বি একটু আহত হলাে। বললে, তুমি কি চাও মা, আমি তােমার কথার অবাধ্য হই। সূর্যমুখী একটু অসহায়ভাবে বললেন, আমি যে সুরবালাকে ছােট- বেলা থেকে কথা দিয়ে রেখেছি, বিও।
বিশু বললে, সেটা হােটবেলাকার কথা, মা।
সূর্যমুখী বললেন, কিন্তু তার নাম যে অনেক।
বিশু বললে, যদি সেলাম তােমার ছেলের মাথা ছাড়িয়ে ওঠে।
মনুষ্যত্ব ছাপিয়ে ওঠে?
সূর্যমুখী বললেন, মায়ের কথা রাখলে তাের মনুষ্যত্ব ছােট হবে
, বিও।
বিশু বললে, কিন্তু নিজের কাছে আমি যে কত ছােট হয়ে যাবাে,
তা তােমরা কেউ জানে না, মা। এই বলে সে যাবার জন্য পা
বাড়ালাে। কিন্তু সূর্যমুখী তাকে ডাকলেন, বিশু-
বিশু মুখ ফিরিয়ে দাড়ালাে। বললে, কি, বলাে মা ?
সূর্যমুখী বললেন, কথা না রাখলে ধর্মের হানি হবে যে! .
বিশু অশান্ত কণ্ঠে বললে, এ তুমি কী বলছ মা? তােমায় ধর্ম
কি এই কথা বলে, ছেলের ভালাে মন্দ কিছু চাইতে নেই? তােমার
কথার অবাধ্য আমি হতে পারবাে না, তবু তুমি এই কথা
বলছ, মা ?
সূর্যমুখী সভয়ে বললেন, কিন্তু ছােটবেলা থেকে আমি যে কথা
দিয়ে রেখেছি রে ?
বিশু বললে, সেটা ছােটবেলাকার কথা, তার দাম কতটুকু?
আমাকে তােমরা এমন বিপদে ফেলে না, মা-এই বলে সে ঘর
থেকে বেরিয়ে গেল।
সূর্যমুখী পিছন থেকে ডাকলেন, বিশু—বিশুশােন্-
কিন্তু বিশু চলে গেল সেখান থেকে।
এমন সময় বৌরাণী ঘরে এসে ঢুকলেন। বললেন, কি হােলদা
मिनि?
সূর্যমুখী কাতরকণ্ঠে বললেন, বিশু বিয়েতে রাজী নয়।
বৌরাণী সবিস্ময়ে বললেন, সে কি ?
সূর্যমুখী বললেন, হ্যা, সে আমার কথা শুনলাে না। তুমি একটু
বুঝিয়ে বলল বােন্—আমি যেন মিথ্যেবাদী না হই-কখনাে মিথ্যে
আমি বলিনি।
বৌরাণী কিয়ৎক্ষণ চুপ করে দাড়ালেন। তারপর যাবার সময়
বলে গেলেন, আচ্ছা, আমি বলছি।
বিশু মার কাছ থেকে চলে এসে শােবার ঘরে ঢুকল। নিজের
মনে বললে, না, না, এ কিছুতেই হতে পারে না—এ হয় না, এ হতে
দেবাে না-
কিন্তু একটি একটি করে সকলের কথা যেন তার কানে বাজতে
লাগলাে।
বৌরাণী যেম বলছেন, মাকে মিথ্যেবাদী করিসনে, বিশু, মা
তাের সকলের বড়! অনেক দুঃখে তােকে মানুষ করেছে।
সুরবালা যেন বলছেন, আমার অনেকদিনের আশা, আমার
মেয়েকে সইয়ের ছেলের হাতে তুলে দেবে!
নায়েবমশাই যেন বগছেন, ছােটবাবু, মায়ের কথা রাখলে স্বর্গ
থেকে কত মশাইও আশীর্বাদ করবেন।
বৌরাণী যেন বলছেন, বিশু, আমাদের মান রাখ, বাবা, তাের
কাছে আমরা অনেক আশা করি।
মা যেন বলছেন, বিশু, লােকের কাছে আমি যেন মিথ্যেবাদী
হই। ছােট বেলা থেকে কথা দিয়ে রেখেছি যে।
বিশু অস্থির হয়ে উঠলাে। তার মনে ঝড় উঠেছে। ও-ঘরে
গিয়ে সে চিঠি লিখতে বসল। প্যাডের ওপর কিছুক্ষণ হিজিবিজি
কাটাকুটি করল–পরে কলম ছেড়ে উঠে দাড়ালাে। কি ভেবে
এগিয়ে এসে জানালা খুলে দাড়াল। বাইরে বাতাস তখন তীব্র হয়ে
উঠেছে—ঝড়ের ঝাপটা লাগছে তার মুখে চোখে, ঝড়ের দাপটে
প্যাডের কাগজ উড়ে গেলাে। দেয়ালের ছবি উলটে পড়ল—ধর
হােলাে ওলােট-পালট-সেই বায়ুগর্জনের মধ্যে বিশুর অশান্ত আতুর
কণ্ঠ নিজের মনে বলতে লাগলাে, না না, বিশু তুমি রাজি হােয়য়া না,
এ হতে পারে না।
এমন সময় বৌরাণী ঘরে এসে ঢুকলেন। স্নেহভরা দৃষ্টিতে
বিশুর দিকে তাকিয়ে তিনি ডাকলেন, বিশুE
বিশু মুখ ফিরিয়ে তাকালো! দৃষ্টি তার অশান্ত ও উদভ্রান্ত।
বৌরাণী বললেন, আমাকে বল সত্যি করে, তাের কি
হয়েছে ?
বিশু করুণ সুরে বললে, বলতে পাচ্ছিনে মা-
বৌরাণী বললেন, বলতে আমাকেই তুই পারিস, বিশু।
বিশু বললে, মা! কণ্ঠ তার রুদ্ধ আবেগে কাঁপছে।
বৌরাণী বললেন, হ্যা, বল!
বিশু কাতরকণ্ঠে বললে, কিন্তু মনের কথা তােমরা যে শুনতে
চাও না।
বৌরাণী বিস্ময় কৌতূহলে বললেন, তাের মনের এমন কী কথা,
যা আমাকেও শােনাতে চাসনে ?
বিশু অশান্তকণ্ঠে বলে, চাই, তােমাকেই শােনাতে চাই। তুমি
আমাকে সাহস দাও মা, কেউ যেন কোনাে দিন আমার হাতে
অবিচার না পায়।
বৌরাণী সস্নেহে বললেন, অবিচার তুই কানাে ওপর কখনন
করবিনে, আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু কার কথা বলছিস?
ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে ঘুরে বেড়িয়ে বিশু হঠাৎ বলে
উঠলাে, আর কিছু তুমি জানতে চেয়াে না মা। আমি একবার
কলকাতায় যেতে চাই, আমাকে তােমরা মানা করাে না, মা?
বলতে বলতে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বৌরাণী চুপ করে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে
রইলেন। কোথায় কি যেন একটা ঘটেছে, সেটা তিনি স্পষ্ট বুঝতে
পারলেন না। স্তব্ধভাবে তিনি দাড়িয়ে রইলেন।
১২
বিশু কলকাতায় চলে এলাে। নিজের বাসায় এসে নিঃশব্দে
দিনচারেক বসে রইলাে নিষ্ক্রিয়ভাবে। চারদিনের দিন চিঠি এলো
দেশের বাড়ী থেকে,-মা লিখেছেন। সেই কথা,-“তার ধর্ম
বিপন্ন। মায়ের প্রতিজ্ঞা পালন করা মনুষ্যত্বের ধর্ম। বিশু যেন
মনে মনে ঝড়ে বিধ্বস্ত হতে লাগলাে। যেন কোথাও কূল নেই,
—আশা নেই,—অন্ত নেই।
নিরুর কাছে গিয়ে সে দাড়াবে, কিন্তু কোন্ মুখে দাড়াবে ?
দাদুকে সব কথা খুলে বলবে, কিন্তু কি বলবে ? এমন অভিযােগ
আসতে পারে, সে এতদিন ভালােবাসার অভিনয় করে এসেছে
মাত্র! পরীক্ষার দিন যখন এলাে, ভালােবাসা টিকলাে না। না,
সেখানে যাবার তার কোনাে মুখ নেই আর।
কিন্তু কী যেন ভেবে সহসা একদিন সে উঠে দাড়ালাে। জামাটা
গায়ে চড়িয়ে দরজায় তালা দিয়ে সে চললল নিরুর বাড়ীর দিকে।
আর কিছু না হােক, সেখানে গিয়ে দাড়ানাে দরকার, দেখা দেওয়া
১১৮
দরকার। নিজের ভিতরের মানুষটাই যেন একদিন তাকে ছিছি করতে আরম্ভ করেছে।' ট্রাম থেকে নেমে কিছু দূর গিয়ে সে নিরুদের বাড়ীর দরজায় এসে উঠলাে। সেই সময় কোথায় যাবার জন্য নিরু উপর থেকে নীচে নেমে এলাে। এসে বাইরের ঘরে ঢুকেই সে বিশুকে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলাে। বিশু ইতিমধ্যে এসে একান্তে যেন অসীম চিন্তাসমকা নিয়ে বসে রয়েছে—তাড়াতাড়ি কাছে এগিয়ে এসে তার পিঠে হাত রেখে সস্নেহে নিরু বললে, একি, তুমি ? কখন এলে? বারে, বেশ যা হােক—আমাকে এতক্ষণ ডাকোনি যে ? বিশু মুখ তুললল। কথা বললাে না। নিরু প্রশ্ন করল, কী হয়েছে তােমার ? কথা বলছ না কেন? বিশু ক্লান্তকণ্ঠে নতমুখে বললে, কোন্ কথা দিয়ে কথা বলব- তাই ভাবছি। নিরু সবিস্ময়ে বললে, মানে? কী বলছ ?—এতদিন পরে এসে তােমার মুখে কথা ফুরিয়ে যাবে, এই কি আমি আশা করেছিলুম ? এই বলে সে বিশুর পাশে এসে বললো। বিশু মুখ তুলে বললে, তুমি যা আশা করাে না, এমন ঘটনাও ঘটে, নিরু। নিরু অধীরকণ্ঠে বললে, এমন কী ঘটেছে, যা আমাকে বলতে পারছে না ?—এই ব’লে ঝুকে পড়ে বিশুর হাতে হাত রেখে পুনরায় সে বললে, কোনাে বিপদে পড়ােনি ত ? বিশু চিন্তিত বিপন্ন-কণ্ঠে বললে, তুমি আমাকে বুঝিয়ে দিতে পারাে ? নিরু বললে, কিন্তু বিপদে পড়লে তুমি ত’ উঠে দাড়াতে জানােনা। বিশু বললে, জানি এইটিই জানতুম। কিন্তু ।
নিরু বিশুর মুখের দিকে সপ্রশ্নদৃষ্টিতে তাকালাে।
বিশু বললে, আজকের বিপদে তােমার কাছে সাহা না পেলে
আমি উঠে দাড়াতে পাচ্ছিনে, নিরু!
নিরু বললে, যদি বিপদেই পড়ে থাকে, সে-বিপদ তােমার ত’
একার নয়।
বিশু বললে, তবে শােননা। তুমি আমি এতদিন ধরে যেখানে
পঁড়িয়ে আছি, সেখানকার মাটি আজ কেঁপে উঠেছে।—নিরু, আর
কিছু নয়, শুধু ভাবছি, আমি যদি ভালাে করে মায়ের অবাধ্য হতে
পারতুম।
নিরু অনেকক্ষণ কী যেন চিন্তা করলো। তারপর বললে, ও,
বুঝেছি। তা হলে তুমি এই বলছ, মা চান্ না তুমি আর আমি
বিশু বললে, মা হয়ত চাইতেন, কিন্তু তার ছােটবেলাকার
প্রতিশ্রুতি চায় না—তুমি আর আমি পাশে থাকি, কাছে থাকি।
-তুমি-আমি যদি এক জায়গায় দাড়াই, সেখানে মায়ের সত্য, মিথ্যে
হয়ে যাবে।
নিরু মুখ তুলে বিশুর মুখের দিকে তাকালাে। তারপর কী যেন
একটা স্থির করে নতমুখে বললে, কিন্তু একটি কথা মনে রেখাে।
এতকাল পরে যে-মাকে এত দুঃখে তুমি ফিরে পেয়েছ, তাঁর কথার
অবাধ্য হ'তে তােমাকে আমি দেব না! আমার চেয়ে তােমার
মা অনেক বড়।
বিশু সবিস্ময়ে বলে, এ তুমি কী বলছ, নিরু?
নিরু ভঙ্গী করে বললে, যা বলা উচিত, সবাই যা বলতাে।
বিশু উত্তেজিতভাবে বললে, সবাই যা বলতাে, তােমার মুখ
থেকে সেটা শােনার জন্যে এতদূর ছুটে আসিনি নিরু।
নিরু বললে, কিন্তু মায়ের কথার অবাধ্য হয়ে যা তুমি পাবে,
তা কি তােমার কাছে এতই বড়?
বিশু অস্থির উত্তেজনায় বললে, কোটা বড়, কোটা হােট কথা এখন থাক। চলাে, তােমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। আমি তােমাকে এখনি নিয়ে যাবে। নিরু সবিস্ময়ে বললে, কোথায়? বিশু উন্মাদের মতাে বললে, যেখানে খুশি। যাবার আগে শুধু তােমার দাদুকে জানিয়ে যাবে। আমি সব দিক ভেবেই তােমার এখানে এসেছি। নিরু শান্তভাবে বললে, না, তুমি যাও, আমি যাবাে না। যেতে পারবে না। এই বলে সে মুখ ফিরিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করলাে। বিশু বললে, তাহলে বলাে আমার বিপদে তুমি আমাকে ত্যাগ করতেই চাও? নিরু নিজের মুখের ভাব গােপন করলাে। বললে, হ্যা তা চাই বৈ কি। বিশু রুদ্ধকণ্ঠে বললে, দাঁড়াও, তবে একথাও বলে যাও, আমরা মনে মনে যে-ঘর বেঁধেছিলুম, সে সুধু খেলাঘর ? নিরু বললে, ঘর আমরা বাঁধিনি, স্বপ্ন দেখেছিলুম। সে-স্বপ্ন আজ ভেঙ্গে গেল। বিশু বললে, ও, যাবার আগে তাহলে এই কথাই জেনে যাই- খেলাঘর ব’লে তাই ভাঙলো; সত্যি ঘর হলে কোনদিন ভাঙতে । শুধু খেলাঘর বেঁধে আমরা এতদিন শুধু খেলাই করে এসেছি। বেশ-বলে হন্ হন্ করে বিশু ঘর ছেড়ে রাস্তায় এসে আর কোনােদিকে না তাকিয়ে সােজা চলে গেল। কেমন যেন একটা আকস্মিক আঘাতে নিরু কেঁদে উঠল—বুঝতে পারলাে না তাই কঁদলাে, বােঝাতে পারলো না তাই কাদলো। তার ভালােবাসা কাদলাে, তার প্রাণ কাঁদলাে—পৃথিবীর সকল ৮
ব্যর্থ নারীর বুকের ব্যথা স্মরণ করে কাদলােসে শুধু আপন
সত্তার উৎপীড়িত যাতনায় কাদলাে। ঝরঝরিয়ে সে কাঁদতে
লাগলাে।
অনেকক্ষণ পরে সে উঠলাে। ঋলিত বেশ,অতি শান্ত, ক্লান্ত
তা’র আর কোনাে শক্তি নেই—আর সে কিছু চায় না, কিছু কাম্য
নেই—সমস্ত পৃথিবী তার চোখে বিষন্ন, ভগ্ন—সে যেন সর্বস্বান্ত হয়ে
গেছে। ক্লান্ত ও ভারাক্রান্ত দুই পায়ে কোনােমতে নিজেকে ভর
করে সে সিড়ি বেয়ে অতি কষ্টে অতিশয় ক্লান্তির সঙ্গে উপরে
উঠতে লাগলাে।
মাঝপথে বড় সিড়িতে পৌছে তার ভগ্ন-কণ্ঠ থেকে কান্নার
মতাে আর্তস্বর নিঃসৃত হয়ে এলাে।
নিরু নিজের ঘরে ঢুকে সােফার উপর লুটিয়ে পড়ল। উচ্ছসিত
কান্নায় তার সারা শরীর দুলে দুলে উঠছে। ইতিমধ্যে দাদু
'কে কি যেন সাংসারিক প্রয়ােজনে খুঁজছিলেন। নিরু যে আজ
বেরােইনি, এটা তিনি চাকরের মুখে জেনেছেন। সুতরাং পা টিপে
টিপে উপরে উঠে এ-ঘরে এসে নিরুর কাছে দাড়ালেন। হেসে
বললেন, বলি দিদি, চুপটি করে শুয়ে বুঝি কড়িকাঠ গুণছিস?
তােকে দেখে, বুঝলি দিদি, সেই গানটা মনে পড়ে,
যার লাগি ফিরি একা, আঁখি পিপাসিত নাহি দেখা,
তারই বাশী বাজে হিয়া ভরি।জাগরণে যায় বিভাবরী।
হঠাৎ নিরুর দিকে তাকিয়ে বললেন, একি দিদি, চোখে
জল যে ?
নিরু ভগ্নকণ্ঠে বললে, দাদু, কিছু শুনতে চেয়ে না—এই বলে
উঠে সে দাদুর বুকের ওপর মাথা রেখে অঝরে কাঁদতে লাগল।
দাদু হা-হা করে হেসে উঠলেন, বললেন, এমন শুভদিন, শুভক্ষণ,
ভলগ্ন—এমন সময় চোখে জল ? তাহলে বল আনন্দের অশ্রু ?
১২২
- নিরু ক্রন্দনকম্পিতকণ্ঠে বললে, দাদু, আর আমার কিছুতে আনন্দ নেই। দাদু বললেন, আছে দিদি, আছে, আনন্দ কি এতই দেউলে হয়ে গেছে যে, তােকে আনন্দ দিতে সে নারাজ ?-ওঠ, উঠে দাড়া হেঁটে চল—আমি তােক পথ দেখাবে। আয়— নিরু মাথা তুলে বললে, কোথায় দাদু? দাদু উদ্ভাসিত মুখে বললেন, যেখানে আলাে! সেখানে তােকে আমি দেখবাে, নিজেকেও তুই দেখবি!-আয়—চল- নিরু বললে, দাদু! দাদু বললে, কি দিদি ? নিরু বললে, মনের আলো যদি নিবে গিয়ে থাকে, বাইরের আলাে কেমন করে দেখবে? দাদু সানন্দে হাসলেন। হেসে বললেন—দিদি, এ তুই কি করলি? হার মেনে মাঝপথে ভেঙে পড়লি? ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে তুই এত বড় লজ্জা দিলি? তােকে এমন করে মানুষ করে তুললুম, তার কোনাে দামই দিলিনে। নিরু স্পষ্টকণ্ঠে বললে, তুমি কী বলতে চাও, দাদু ? দাদু বললেন, বলতে চাই মার খেয়ে পায়ের কাছে পড়ে তােরা শুধু কঁদতেই শিখেছিস, পায়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে শিখিসনি ! নিরু আবেগের সঙ্গে বললে, দাদু? দাদু বললেন, হ্যাজোর করে উঠে দাড়িয়ে বল, এ আমি স্বীকার করবনা! বল, তাের ভেতরে রয়েছে আগুন, রয়েছে ঝড়, রয়েছে বন্যা ! বল, ভাগ্যকে মান্ না, শাসনকে ভয় করব না, বাঁধনের কাছে ধরা দেবাে না! বেঁচে ওঠ, অস্থির হয়ে জেগে ওঠ —মনের দারিদ্র ঘুচিয়ে দে, দিদি।
নিরু কম্পিত কণ্ঠে বললে, আমাকে তুমি কি করতে বলল, দাদু ? দাদু উচ্চকণ্ঠে নিরুকে উত্তেজিত করে তােলার জন্যই যেন বলেন, একথা বলবনা, ঘরপােষা মেয়ে তুই ঘরের কোণে নির্জীব হয়ে বসে থাক্। একথাই বলব, হাত পেতে তুই যা পাসনি, কঠিন হাতে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে আয়! দিদি, জীবনের সব চেয়ে বড় জিনিসটি পাবার জন্যে মানুষ দূরে চলে যায় ছুটে চলে যায় একি তুই কোনােদিন শুনিসনি? নিরু আবেগে থর থর করে কেঁপে উঠলাে—বিহবল হয়ে উঠলাে। দাদু তেমনি বলে চললেন, কিন্তু তােরা নিতান্ত নিতান্তই সামান্য মেয়ে। সত্যের জন্যে যুদ্ধ করতে তাে শিখলিনে, ভালােবাসার জন্যে বিদ্রোহ করতে সাহস পেলিনে, জীবনে সব চেয়ে বড় যা কাম্য, তাকে পাবার জন্যে দুর্গমের দিকে ছুটলিনে! তােরা সুধুই পােষ মানা শান্তশিষ্ট মেয়ে! নিরু আবেগবিহ্বল কণ্ঠে বললে, দাদু, এমন কথা—এমন কথা তুমি ত কোনােদিন বললানি ? দাদু বললেন, আজকে দরকার হয়েছে তাই বললুম রে। দিল্কি ভালােবাসার পথ স্বর্গেও ও নয়, স্বপ্নেও নয়-ভালােবার পথ সত্যের পথ, ধর্মের পথ। নিরু বললে, তাহলে—তাহলে তুমি আমাকে এই আশীর্বাদই করে আমার মধ্যে তুমি যা চাও, আমি যেন তার মর্যাদা দিতে পারি। শুধু এইটুকু জানিয়ে আজ তােমার কাছে বিদায় নিলুম, দাদু !-ঘর ছেড়ে বেরিয়ে নিরু চলে গেল—দাদু সেইদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে উদ্ভাসিত হাসি হাসতে লাগলেন। ওরে
নিরুর ওখান থেকে উত্তেজিত হয়ে ফিরে বেপরােয়ার মত
জিনিসপত্র নিজেই বাঁধা ছাদা করে বিশু যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলাে।
সে যখন ট্রেনভ্রমণােপযােগী পােষাক পরে নিচ্ছে, এমনি সময়ে
আ’র কলেজের এক বন্ধু এসে ঘরে ঢুকলাে। বললে, এ কি রে
বিশু, দেশে যাচ্ছিস নাকি?
বিশু বললে, দেশে নয় রে, বিদেশে।
বন্ধু সবিস্ময়ে বললে,
বিদেশে? করে?
বিশু বললে, আপাতত রাজপুতানা-
বন্ধু বললে, তারপর ?
বিশু বললে, তারপর পাঞ্জাবের দিকে ইচ্ছে আছে।
সে কি রে? সকালে দেখে গেলুম দিব্যি সহজ সুস্থ, এবেলা
একেবারে দেশত্যাগী। হঠাৎ সব ভেঙেচুরে গেল যে ?
বিশুর মুখে করুণ হাসি ফুটে উঠল, জীবনটা এমনি! হঠাৎই
সব ভেঙে চুরে যায়!
বন্ধু সবিস্ময়ে বললে, ও কি বলছিস?
বিশু হাসিমুখে বললে, সুধু খেলা! সুধু খেলাঘর!
নিরুর মােটর ছুটলাে দ্রুতবেগে। কলকাতা ছাড়ালাে।
শহর গ্রামে পরিণত হলাে। মােটর ছুটছে। দূর-দূরান্ত পেরিয়ে
চলেছে। ড্রাইভার গাড়ী চালাচ্ছে। পথঘাট বুঝতে মােটামুটি
অসুবিধে নেই। সেদিন রাত কাটলে পথে পথেই। পরে দিন
সকাল পেরিয়ে আন্দাজ বেলা এগারােটার সময় যুগলবুর বাড়ীর
গেটের কাছে এসে মােটর থামলাে। মােটরের ইঞ্জিন বন্ধের একটা
আওয়াজ হলাে। নিরু ঝাঁপিয়ে গাড়ী থেকে নেমে কাছারি বাড়ী
পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলো। সেই সময় অন্দর মহলের ভিতরে
বিপরীত দিক থেকে সূর্যমুখী এদিকে আসছিলেন। নিরু ব্ৰস্তপদে
এগিয়ে এলো। সূর্যমুখী সবিস্ময়ে তাকালেন। এই অপরিচিতা ও
সুত্র মেয়েটিকে আগে তিনি কখনাে দেখেননি। এ বাড়ীতে
কেউই দেখেনি।
সুর্যমুখী সবিস্ময়ে বললেন, তুমি কে, মা?
নিরু বললে, আমি—আমাকে বােধ হয় চিনবেন না।
নূতন একটি মেয়ের আবির্ভাবের কথা বৌরাণীর কানে গেল।
তিনি নেমে এলেন। নিরুকে সামনে দেখে, সূর্যমুখীর দিকে
তাকিয়ে বললেন, তুমি কে? কোথেকে আসছ, মা ?
নিরু বললে, কলকাতা থেকে আসছি।-বিশ্বনাথবাবুকে খুঁজতে
এসেছি।
সূর্যমুখী সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন, বিশুকে ?
নিরু একটু থমকে গেল। বৌরাণী বললেন : কোনাে দরকার
আছে ?
নিরু বললে, আজ্ঞে হঁ্যা, বিশেষ দরকার। আপনারা কে ?
বৌরাণী ও সূর্যমুখী পরস্পর মুখের দিকে তাকালেন। তাঁদের
জীবনে যে পরস্পরকে এমন একটা অভিনব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে
হবে—এ তারা নিজেরাও জানতেন না। কারাে মুখ থেকে সহসা
বাক্যস্ফুরিত হলো না।
সূর্যমুখী স্মিতমুখে বললেন, ইনি বিশুর মা।
নিরু বললে, ও, আপনি।
নিরু বৌরাণীর পায়ের ধূলাে নেবার চেষ্টা করতেই বৌরাণী
বললেন, না, আমি নয়—ইনি।
বৌরাণী সূর্যমুখীকে দেখিয়ে দিলেন–নিরু আগে সূর্যমুখীর ও
পরে বৌরাণীর পায়ের ধুলাে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাে। তারপর একবার
মুখ তুলে দুজনের দিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নতমুখে বললে, আমি
তার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।
সূর্যমুখী বললেন, কে তুমি মা? বিশুকে কেন?
বিনীতকণ্ঠে নিরু বললে, তার দেখা পেলে তাকেই বলতুম !
সূর্যমুখী প্রশ্ন করলেন, এমন কী কথা যা তুমি আমাদের কাছে
বলতে পারাে না ?
নিরু বললে, আপনারা গুরুজন, আপনাদের কাছে কেমন করে
বলবাে?
বৌরাণী বললেন, বিশুর কাছে তুমি যা বলতে, আমাদের কাছে
তা বলবে না কেন?
নিরু বললে, সে-কথা একজনের জীবন-মরণের, অাপনাদের কাছে
কি বলা চলে ?
সূর্যমুখী সবিস্ময়ে বললেন, কার কথা বলছ তুমি ?
বৌরাণী প্রশ্ন করলেন, কে সে বলল ত?
নিরু বললে, একটি মেয়ে—আমি তারই জন্যে ছুটে এসেছি।
বৌরাণী ও সূর্যমুখী উদ্বিগ্ন আকুল চক্ষে নিরুর দুই চোখের প্রতি
অপলক দৃষ্টিতে তাকালেন। তারা যেন কিছু বুঝলেন,«যেন কিছু
বুঝতে পারলেন না।
সূর্যমুখী বললেন, কে সে মেয়ে ? কেমন মেয়ে ?-যার জন্যে
তুমি ছুটে এলে?
নিরু বললে, হঁ্যা, ছুটে এলুম, ছুটে আসতেই হােলদা, ছুটে না
এসে উপায় ছিল না।
বৌরাণী একটু বিচলিতভাবে বললেন, এমন করে তুমি কেন
বলছ মা?
১২।
নি বলে, বলছি-সে মেয়েটির আজ বড় ফিপক্ষ।
সূর্যমুখী বললেন, বিপদ-কি হয়েছে?
নিরু বললে, আপনাদের কেমন করে বােঝাবাে আমিনে। কিন্তু
সে-মেয়েটির জীবন, তার ধর্ম, তার মনুষ্যত্ব, তার ভালােবাসা তার
যা কিছু—আজ সবই বিপন্ন।
বৌরাণী বললেন, তুমি—তুমি কি এই কথাই বিশুকে বলতে
এসেছিলে?
নিরু বললে, সুধু বলতে আসিনি, জানাতে এসেছিলুম।
সূর্যমুখী বললেন, যার কথা তুমি বলতে এলে, সে নিজে এলােনা
কেন ?
নিরু বললে, সে এলাে না, আবরণ ঘুচিয়ে বাইরে এসে দাড়াতে
সে পারলাে না—আমি এসেছি তা’র মন নিয়ে, তার প্রাণ নিয়ে।
সূর্যমুখী ও বৌরাণী পরস্পরের প্রতি অভিভূত বিস্ময়ে
তাকালেন।
বৌরাণী বললেন, আচ্ছা মা, একটা কথা বলতে পারো-বিশু কি
কে ভালবাসে? মানে—সেই মেয়েটিকে
নিরু বললে, আমি—আমি সে-কথা বলতে পারবাে না। কিন্তু
মেয়েটির মনের কথা আমি জানি—ভালাে করেই জানি।
বৌরাণী সবিস্ময়ে কুঞ্চন করে যেন আসল কথা জানতে
চাইলেন। বললেন,
তােমার কি মনে হয়, মেয়েটি বিশুকে
ভালােবাসে?
নিরু আরক্ত আলজ্জ নম্রমুখী হয়ে রইলো। যে-নিরুকে যবনিকার
অন্তরালে লুকিয়ে রেখে এসেছিল, সেই নিরুর ভালােবাসার সত্তা
তা’র সকল মহিমা নিয়ে এই নিরুর মুখে চোখে উদ্ভাসিত হয়ে
উঠতে লাগলাে।
বৌরাণী মিষ্ট মৃদুকণ্ঠে বললেন, বলো মা, স্পষ্ট করে বলল।
?
১২
নিরু তা’র কম্পিত সপ্রতিভ দুটি চোখ তুললাে।
বললে, হা, বাসে বৈ কি—নিশ্চয়ই বাসে।
বৌরাণী বললেন, একথা তুমি ঠিক জানাে ?
নিরু বললে, হা, জানি। সেই জন্যেই ত সে আমায় ছােটাল
এমন করে পথে নামালো।
সূর্যমুখী এতক্ষণ চুপ করে কী যেন দেখছিলেন। এবার
বললেন আচ্ছা, বলতে পারে মা—বিশু কি তাকে কোনাে কথা
দিয়েছে
নিরু বললে, কিসের কথা বলছেন?
সূর্যমুখী বললেন, ওরা কি স্থির করেছিল, দুজনের বিয়ে হবে?
নিরু বললে, তা জানিনে, কিন্তু দুজনে ঠিক করেছিল জীবনে
কোনােদিন কোনাে কারণেই ওদের ছাড়াছাড়ি হবে না।
সূর্যমুখী স্পষ্টকণ্ঠে বললেন, কিন্তু এবার যে তাই হবে মা।
নিরু বললে, না না, তা হতে পারে না, হলে চলবে না-আমি
সেই কথাই বলতে এসেছি—বােঝাতে এসেছি।
'বৌরাণী বললেন, তুমি কি এই কথা বােঝাতে এসেছে, বিশু
তার মায়ের অবাধ্য হক, মায়ের সত্য সে মিথ্যে করে দি?
নিরু এতক্ষণে সূর্যমুখীর দিকে তাকিয়ে বিশুর মাকে চিনতে
পারলাে। বললে ? আপনার সত্য মিথ্যে হােক—এ আমি চাইনে,
কিন্তু মা হয়ে আপনিই কি চান্ একটি মেয়ের জীবন এমনি করেই
মিথ্যে হয়ে যায়।
সূর্যমুখী বললেন, না, তা চাইনে, চাইতে পারিনে। কিন্তু
বিশুর জন্মের আগে যে-কথা স্থির হয়ে আছে, তাকে ভাঙতে এসে
তুমি ভুল করেছ।
নিরু অবরুদ্ধকণ্ঠে বললে, হয়ত ভুল করেছি হয়ত ভালােবাসা
ভুল করে।
বৌরাণী এবার সস্নেহে বললেন, ভালােবাসায় ভুল ঘটলে
এজীবনে তার প্রতিকার নেই, এ কি তুমি জানতে না?
নিরু বললে, এ ভালােবাসা ভুল, এই আপনি বলেন ?
বৌরাণী বললেন, যে ভালােবাসায় মায়ের আশীর্বাদ থাকলাে না,
থাকতে পারলাে না—সেই ত ভুল!
নিরু বললে, ভুল যদি হয়েই থাকে, তাকে টেনে তুলে মা
আশীৰ্বাদ করবেন না, মা কি এতই কঠিন? তার, মন কি এতই
কঠোর ?
সূৰ্য্যমুখী প্রশ্ন করলেন, তুমি কি বলতে চাও, মা ?
নিরু বললে, বলতে চাই যে-দুটো জীবন ভালােবাসার মহিমায়
গৌরবে আনন্দে ভরে উঠেছে—তারা যদি আজ ভেঙে পড়ে—তবে
কি আপনাদের সেই খেলাঘরের সত্যটাই দাড়িয়ে থাকতে পারে?
সূর্যমুখী এবার যেন সহসা অভিনব আবিষ্কার করে বলে
উঠলেন, যেন—যেন মনে হচ্ছে তুমি নিজের কথাই বলছ।
বৌরাণী বললেন, তবে কি এসব তােমারই কথা? তুমিই কি
সেই মেয়ে?
নিরু বললে, এ আমার কথা, এ তার কথা, এ সব মেয়ের কথা।
বৌরাণী বললেন, তবে কি ছুটে এসেছিলে তুমি তােমারই জন্যে ?
এমন সময় সহসা বিপরীত দিক থেকে দাদু, বিশুর বন্ধু ও বিশু
তাড়াতাড়ি ঘরে এসে ঢুকলাে। সকলেই বিস্ময় বিমূঢ়।
দাদু গলা ঝাড়া দিয়ে হাসিমুখে বৌরাণীর কথার সূত্র ধরে
বললেন, না, ঠিক তা নয়-
সকলে সচকিত বিস্ময়ে তাকালো।
দাদু বললেন, মানে কথাটা কি জানেন ?—একটু ভুল হােসল।
যার জন্যে ছুটে এসেছে, তাকে নিয়ে আমিই এলুম ছুটতে ছুটতে।
কি দিদি, তাই না?
নিরু বিমূঢ়ের মত শুধু বললে, দাদু
বিশু নিরুকে এখানে দেখে হতবাক। কিছুক্ষণ পরে শুধু বললে,
একি—তুমি এখানে?
বৌরাণী সস্নেহে ডাকলেন, বিশু
সূর্যমুখী এগিয়ে এসে বললেন, কোথা গিয়েছিলি?
বিশুর বন্ধু এবার হাসিমুখে বললে, বেশীদূর নয় মা–ওর দৌড়
ছিল লিলুয়া পর্যন্ত—ফিরিয়ে এনেছি।
দাদু হাসিমুখে একবার সূর্যমুখী আর বৌরাণীর দিকে চাইলেন,
তারপর বললেন, আমাকে বােধহয় চিনতে দেরী হচ্ছে। আমি
সেই চিরকেলে যাদুকর। যেখানে মেলেনা সেখানে মিলিয়ে দিই,
যেখানে বিচ্ছেদ সেখানে মিলন ঘটাই, যেখানে ধরা দেয় না
সেখানে বাঁধন দিয়ে দিই।আর একটু বলবো ?—খেলা ভেঙে
দিই, আবার সেই খেলা জমিয়ে তুলি--সেই খেলায় সবাই যখন
মেতে ওঠে, আমি কৌতুক নিয়ে থাকি চোখের আড়ালে—আমি
যে প্রজাপতি।
একটু থেমে দাদু আবার বললেন, দাড়ান সবাই—আরাে একটু
বিস্ময় হাতে রেখেছি। কই গাে মা ?
সহসা আর একদিক থেকে সুরবালা ও যতীনবাবু প্রবেশ করলেন।
বিস্ময়ে বিহ্বল নিরু বলে উঠল, একি—মা-বাবা!
দাদু হাে হাে করে হেসে উঠলেন।
সূর্যমুখী অপার বিস্ময়ে বললেন, সই-সইও মেয়ে তােমার ?
যতীনবাবু দাদুর দিকে
দাদুর দিকে ফিরে বললেন, এসব কি তবে
আপনারই
অসহ্য আনন্দে নিঃশব্দে নিরু সকলের চোখের অন্তরালে
অন্তর্ধান হয়ে গেল।
দাদু হাে হাে করে হেসে উঠলেন।
১৩১
ওদিকে নায়েবমশাই চোরের মতাে পা টিপে টিপে চুপি চুপি
প্রবেশ করলাে।
নায়েবমশাই বললেন, হেঁ হেঁ এসে পড়লুম চুপি চুপি-এই যে
কুটুম্বয়াও এসেছেন দেখছি—তাহলে রাণীমা—এই সঙ্গে যা হােক
করে মিষ্টি মুখও হয়ে যা-হেঁ হেঁ—যাই চুপি চুপি। নায়েবমশাই
দৌড়ে চলে গেলেন।
বৌরাণী হেসে উঠে বললেন, ছােট বৌ, মেয়ে তাের পালালাে
কোথায় ?
দাদু বললেন, কোথাও পালায়নি—আড়ি পেতে আছে।
কই—বিশুর হাত ধরে তিনি বলে উঠলেন, এই যে-যাও ত
বাপু-তাকে খুঁজে আনােগে এবার তােমারই যাবার কথা।
বিস্ময়ে বিহ্বল বিশুর গায়ে একটা ঠেলা দিয়ে তিনি আবার
বললেন-যাও, যাও শিগগির বরবেশ ধারণ করে গান্ধবমতে
মেয়েটাকে টেনে আনন। যাও। ৪
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.