Makardah Saraswat Library, Howrah
Hater Kaj Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
হাতের কাজ
No text on this page.
হাতের কাজ
হিরন্ময় ঘােষাল
দি ন্যাশন্যাল লিটারেচার কোম্পানী
১০৫, কটন ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ, ভাদ্র, ১৩৪৮।
“দি ন্যাশন্যাল লিটারেচার কোম্পানীর পক্ষ হইতে শ্ৰীঅমরেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
কতৃক প্রকাশিত ; এবং টুথ প্রেস ৩, নন্দন রােড হইতে
শ্রীসুধাংশুরঞ্জন সেন কতৃক মুহিত।
Halko,
gdzie twój kraj
tam i mój.
No text on this page.
পরিচয়-লিপি এই সমষ্টির প্রথম তিনটি কাহিনী “পরিচয়”-পত্রিকায় বেনামীতে প্রকাশিত হয়েছিল। শেষের তিনটি আজ পর্যন্ত একেবারে অসূর্যম্পশ্যা। এই ছ’টি আখ্যায়িকা নিয়ে হাতের কাজ”। “হাতের কাজ” এই জন্যে যে, কাহিনীক’টির মনন ও বিষয়বস্তু অপেক্ষা তার গঠন ও পরিণতির দিকে অধিক দৃষ্টি রাখা হয়েছে। শুনতে পাই, নাকি মানুষের ভাষণ-শক্তির বিকাশের আগে তার মানবতার পরিচয় ছিল তার দু'খানা হাত, যার বলে ও কৌশলে সে অভিব্যক্তির নিয়মের অনুসারে মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হয়েছে। এ দিক দিয়েও “হাতের কাজ” নামের সার্থকতা, কারণ কাহিনীগুলি কথা-সাহিত্যে লেখকের প্রথম প্রয়াস। কলের কাজের নির্ভুলতা এদের নিশ্চয়ই নেই এই অতি সহজ কারণে যে, তাহলে তার হাতের কাজ হতে পারতাে না। প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনাটি * পােলদেশের চাষার হাতে বােনা মােটা অতসীর কাপড়ের ওপর রঙিন সূতাের বৈচিত্র্য। অশিক্ষিত কিষাণের সৌন্দর্য-সৃষ্টির নিদর্শনটুকুকে এই কাহিনী-সমষ্টির ঠিক প্রতীক নয়, কতকটা আদর্শরূপে ব্যবহার করেছি। শেষ ক এই যে, আখ্যায়িকাগুলি অনুবাদ ও নয় বা কোনাে পােলীয় গল্পের ছায়াও নয়। এগুলি বাংলাভাষায় পােলীয় দৈনন্দিন জীবন অবলম্বন করে’ মৌলিক গল্প, ওদেশে লেখকের দীর্ঘকাল প্রবাসে এদেশের মানুষ ও গাছপালার সঙ্গে যে নিবিড় আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল, তারই নিতান্ত স্বাভাবিক প্রকাশ । কলিকাতা, ভা, ১৩৪৮। হিরন্ময় ঘােষাল * শ্রীমতী Maria Stefkowa প্রকাশিত গ্রাম্য সূচী-শিল্প-সংহ থেকে পুন: দ্রিত।
No text on this page.
স্মীগান ‘বুগ’ নদীর ধারে যেমন তেমন করিয়া ছাড়ানো কয়েকখানা চাষার ঘর লইয়া যে ক্ষুদ্র গ্রামখানি তাহার সরকারী নাম কাহারাে জানা নাই। নদী হইতে গ্রামে উঠিবার পথে একখানা লৌহফলকে ঐ গ্রামের বিবরণ সহজেই পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে : পুরুষসংখ্যা ২৮, স্ত্রীসংখ্যা ৩৩, শিশুসংখ্যা ১৯। এই নগণ্য মানবগােষ্ঠীর একমাত্র অধিনায়ক বৃদ্ধ স্ল্যিনারচ্যি কিছুদিন হইল আমেরিকায় দ্বাদশ বর্ষ প্রবাসের পর আপন বাপ-দাদার কবরের পাশে স্থান লইবার জন্য তাহার বহুকষ্টে অর্জিত ডলারের পুঁজি লইয়া দেশে ফিরিয়াছে। তাই এ গ্রামের নিজ দারি- দ্র্যের মাঝে স্লিনারচ্যিকের ইট, কাঠ ও টালির বাড়ীখানাকে উলঙ্গ ব্যক্তির বাহারে টুপির মত দেখায়। মিনারচ্যিকের আস্তাবলে ঘােড়া, গোহালে গরু, শুয়ারখানায় শূকর, গুদামভরা গম, রাইশস্য, মটর, কাশা,* বার্লি-জাতীয় এক প্রকার শস্য, দেখিতে কতকটা মুগের ডালের মত। প্রায় সমস্ত স্লাভ-দেশে পরিচিত।
হাতের কাজ আলু, ও সারা আঙ্গিনা ভরিয়া পর্বতপ্রমাণ বিচালীর গাদার আশেপাশে নানা রংবেরঙের অসংখ্য হাঁস, মুরগী ও পেরু খুটিয়া খুঁটিয়া খাইয়া ফেরে। একদা শীতের রাত্রে পৃথিবী যখন বৈধব্যের শ্বেতবসনে আবৃত হইয়া উপুড় হইয়া পড়িয়া পড়িয়া কঁদিতেছে, তখন ধরার এক অদ্ভুক্ত সন্তান বাইবেল ও খ্রীষ্টের আদেশ উল্লঙ্ঘন করিয়া ধনী প্রতিবেশী স্ন্যিনার- চিকের শস্যপরিপূর্ণ কোষাগারে প্রবিষ্ট হইল। পরদিন দ্বিপ্রহরবেলায় কোন্ এক দুর গ্রাম হইতে আনীত হিংস্র-স্বভাব ৎীগান্ মিনারচ্যিকের আজীবন-অর্জিত ঐশ্বর্যের প্রহরীরূপে নিযুক্ত হইল। গুদামঘরের একপাশে মেঝের মাটি ধসিয়া একটা গুহার মত গর্ত হইয়াছিল, তাহাতে করােগেডের টিনের দেওয়াল আর মাটির মাঝখানে যে ফাক দিয়া মিনারচ্যিকের শস্যসম্পদের কয়েকটিমাত্র কণা অপহৃত হইয়াছিল, সেইখানেই এই নবানীত যক্ষের আস্তানা নিরূপিত হইল। খড় ও চট বিছানাে গর্তের মধ্যে ঘােলা অন্ধকারে স্ফীগানের নেশাখােরের মত রাঙা চোখদুইটা হিংস্র নিবুদ্ধিতায় জ্বলজ্বল করিত। বহু রক্তের সংমিশ্রণে স্ত্রীগানের জন্ম, তাই তাহার আকৃতিতে কোনাে বিশেষ জাতির প্রকট চিহ্ন দেখা যাইত না। কান দুইটা ঝােলা ঝােলা, থ্যাড়া মুখটা কতকটা বুলডগের মত, এবং মাথাটা ইডিয়টের মত চ্যাপ্টা। রং কালাে ও স্থানে স্থানে নানা মেশানো রঙের ছিটু। তাহার মুখের ভিতরটা কুচকুচে কালাে ও দাতগুলা ড্রাগনের দাতের মত। দাত ছাপাইয়া তাহার থর জিভটা অজগরের জিভের মত আল-জড়িত লালসায় সর্বদাই লগ করিত। তাহার শরীরের সমস্ত অংশের মধ্যে তাহার বলিষ্ঠ জ্যা দুইটা এক উনস্বাভাবিক ঐন্দ্রিকতার পরিচয় দিত, এবং তাহার এই অস্বাভাবিক ইন্দ্রিয়-ক্ষুধাকে অভুক্ত রাখিয়া তাহার হিংস্রতাকে শানাইয়া তুলিবার জন্য তাহাকে অষ্টপ্রহর বাঁধিয়া রাখা হইত।
স্তীগান রংটা কালাে বলিয়া তাহার নাম ছিল শ্রীগান্ *, কিন্তু স্ত্রীগান্ বলিয়া হাজার বার ডাকিলেও সে ক্ষেপমাত্র করিত না, যেন মানুষের দেওয়া (কানাে নামকেই সে গ্রাহ্য করে না। আপন মস্তিষ্কের এক গহন কোণে তাহার কৰ্ত্তব্য সম্বন্ধে একটা ধোয়াটে রকমের ধারণাকে স্মরণ রাখিয়া সে চুপ করিয়া পড়িয়া থাকিত, আর কখনন কখনাে গভীর রাত্রে দূর পথে চলা কাহারাে পায়ের খ-খস্ শব্দ শুনিয়া জংলী জানােয়ারের মত এক অদ্ভুত ভাঙ্গা ফাঁপা গলায় চীৎকার করিয়া পাড়া মাথায় করিত। তাহার সেই স্বর উন্মাদের অর্থহীন চীংকারের মত রাত্রি ভেদ করিয়া দিকে দিকে প্রতিধ্বনিত হইত। তাহাতে তাহার অন্ধ রােষ যেন শতমাত্রায় বৃদ্ধি পাইত এবং সে আপনা-আপনি গজৱাইয়া গজৱাইয়া অস্থির হইত। শীত কাটিয়া বসন্ত আসিল, এবং স্লিনারচ্যিকের সারা আঙ্গিনায় যেন উৎসবের ধুম পড়িয়া গেল। শূকরের ছানা ও হাঁস ও মুরগীর বাচ্চাগুলা দুরন্ত শিশুর মত আনাচে-কানাচে হৈ-হৈ করিয়া বেড়াইতে লাগিল, এমন কি পােষ খরগােশের বাচ্চাকয়টা পর্যন্ত দু'একবার চৌকাঠের বাহির হইয়া উকিঝুকি দিল। দেওয়ালের ফাক দিয়া জীবজগতের এই অকারণ আনন্দের পানে চাহিয়া ৎীগানের মনটা যেন কিসের এক অব্যক্ত বেদনায় টষ্ট করিয়া উঠিল। রৌদ্রের দিকে পিট দিয়া এবং সানের পা দুইটার উপর মাথা রাখিয়া সে দিন-দুপুরে স্বপ্ন দেখিতে বসিল। ‘দুরে ঐ যে মানুষের মত কী একটি চলা ফেরা করিতেছে, ও বুড়ী মিনারচ্যিকভা, নয় ? , সেইরকম গন্ধ পাইতেছি বটে, মানুষের গন্ধের ইউরােপের অধিকাংশ দেশে বেদেরা ৎীগা নামে পরিচিত। ১ হাতের কাজ সঙ্গে গরুর গন্ধ মেশানাে একটা অদ্ভুত জীব! জীবটা করিতেছে কী ? বুঝিয়াছি, এইবার খাবার দিবার সময়। হাতে ঐ পাত্রটাতে কী ? ইস্ সেই পুরানাে দৈনন্দিন খােরাক! আলুসিদ্ধ চটকানাে, তাহাতে একটু পচা দুধ মেশানাে আর খানিকটা নূন ! যেদিন হইতে এ বাড়ীতে পা দিয়াছি সেই দিন হইতে এ খােরাকের একটুও বদল হয় নাই। গরু- ঘােড়াগুলা চক্ষু মুদিয়া শুনে ঘাসের রস উপভােগ করে দেখিয়াছি, তবে ওগুলা জন্তুমাত্র, উহাদের আবার খাওয়া ! তাছাড়া সারাদিন তাহারা মাঠে মাঠে চরিয়া বেড়ায় এবং গাছপালা আগাছা যাহা পায় তাহাই গােগ্রাসে গিলিয়া ফেলে। উঠানের শাের-মুরগীগুলা পর্যন্ত একটু বৈচিত্র্য পায়। ঐ দেখ না, ঐ কালো মােরগটা একটা মস্ত কেঁচো কোং- কোং কয়িয়া গিলিয়া ফেলিল। থু, কী কদাকার রুচি! “চিপূ-চিপূচিপ —চীপ!” স্ল্যিনারচ্যিকভা মুরগী ও পেরুগুলাকে ডাকিতেছে। তাহারা উদ্ধশ্বাসে ছুটিল। নির্বোধ জানােয়ারগুলা কীসের লােভে ছুটিতেছে! সেই ত অপরূপ আলু চকানাে !–“মালুংকী—মালু-মালু-মালু-উ !” এবার শশারের বাচ্চাগুলার পালা। আরে বাস! সব কয়টা একসঙ্গে কোথা হইতে হুটাপুটি করিয়া ছুটিয়া আসিল। একটা আমার কান ঘেঁসিয়া ছুটিয়া গেল, একটু সজাগ থাকিলে ধরিতে পারিতাম। আ-হা-হা, বড় ফসকাইয়া গেল ! অমন ছােট্ট গােলগাল চেহারাটি, বােধ করি একটুও হাড় নাই, আর যদিও বা থাকে ত একেবারে কচি নরম তুলতুলে। আমার দাত শানাইবার মত একদম নয়, তবে নিশ্চয়ই ভারী মুখরােচক। কয়দিন হইল না, দুইটাকে মারিয়া বুড়া-বুড়ী কতকগুলা অপরিচিত মানুষের রসনা পরিতৃপ্ত করিল ! কৈ হাড় একটাও ত কোনােখানে দেখিলাম না, এত শোকা-কি করিলাম! বহুদিন আগে পূর্বের প্রভুর বাড়ীতে একটু ছাড়া পাইয়া যে খরগােশের বাচ্চাটাকে ধরিয়া এক গ্রাসে স্তীগান গিলিয়া ফেলিয়াছিলাম, শােরের ছানাগুল নিশ্চয়ই খাইতে সেরূপ হইবে। ঐ যে বুড়ী আসিতেছে এইদিকে। ইস্ কী বােটকা গন্ধ ! আমায় ডাকিতেছে বােধ করি—ংস্কীগান, শ্রীগান্ ! আমি কিন্তু একটুও নড়িব না। রাখিয়া যাক না খাবার ঐ বাটিটাতে, যতক্ষণ ক্ষুধা সহ্য করিয়া থাকিতে পারি ততক্ষণ উহা আমি মুখে তুলিব না, এই শপথ করিতেছি। হস্তীগা, স্তীগান্ ! কেন রে বাপু অমন আদরের ডাক ! ঐ অপরূপ খাদ্য সামগ্রীটি যথাস্থানে রাখিয়া প্রস্থান করাে না মা! কোনদিন হয়তাে মেজাজ হারাইব, একটা খুনােখুনী কাণ্ড হইবে। ঐ ত খাবার, তাহাও যদি একটু শ্রদ্ধা করিয়া দিত, সব জানােয়ারগুলাকে খাওয়াইয়া তবে আমাকে ! ইহারা সজ্জাতের সম্মান করিতে জানে না। শুধু তাই নয়, আমি না থাকিলে ঐ জন্তুগুলা থাকিত কোথায়! এই ত সেদিন রাত্রে অন্ধকারে একটা অজানা মানুষের গন্ধ পাইলাম ঠিক মুরগীগুলার ঘরের কাছে। একটু ডাকাহকি করাতে লােকটা উধাও হইল, গন্ধটা এখনও যেন আমার নাকের ডগায় পাইতেছি। জগতে কৃতজ্ঞতা কি আছে ? মা, বুড়ী খাবার রাখিয়া চলিয়া গেল, বাঁচিলাম যেন! মাঝে মাঝে মেজাজটাকে সামলাইতে ভারী কষ্ট হয়, তাহার উপর রাগ চাপিয়া অতি ভদ্রভাবে আমার ঐ অবশিষ্ট লেজের একটুখানি নাড়িতে যেন আমার মাথাটা একেবারে কাটা যায়। হ্যা, কী যেন ভাবিতে ছিলাম না। তাই ত, হু, জন্তুগুলা খাবার শেষ করিয়া আবার এই দিকে আসিতেছে। সারা আঙ্গিনায় তিল ধরিবার ঠাই নাই, শশারের ছানা, মােরগ, মুরগী, পেরু, হাঁস—কতগুলা হইবে? ঐ একটা, ঐ একটা, ঐ একটা, ইস অনেকগুলা ! সেই হদে রঙের মােরগটাকে দেখিতেছি না কেন? সেই যেটা ভাের হইতেই বেড়ার উপর বসিয়া সারা উঠানটাকে যেন তাহার চাচা গলার ডাকে চিরিয়া ফেলিত। মাথায় ছিল তাহার প্রকাণ্ড ঝুটি, হাতের কাজ কী একটা অন্য পাখীর মত। আর ঠ্যাং দু’খানা, মনে পড়িলে আমার ভিতরটা যেন পা দিয়া উঠে। একদিন সেটা আমার বাটি হইতে খানিকটা খাবার চুরী করিতে আসিয়াছিল। আমি রােদে পড়িয়া ঘুমাইতেছিলাম, জাগিয়া দেখি প্রায় সমস্ত খাবার সে খাইয়া শেষ করিয়াছে। চোখ দুইটা আধােভাবে খুলিয়া তাহার ঘাড়টার দিকে তাগ করিতেছি, এমন সময়ে সে কী ভাবিয়া উদ্ধশ্বাসে দৌড়িয়। পলাইয়া গেল, লজ্জায় নয়, ভয়ে। আশ্চৰ্য, কে যেন আমার মৎলবটা তাহাকে ইশারায় জানাইয়া দিল। কে, কে জানে, অথচ আমি শপথ করিয়া বলিতে পারি, অতটা বুদ্ধি তাহার ঐ তিল-পরিমাণ মগজে কোনােমতেই জোগাইত না। হউক তাহাকে আজ দেখিতেছি না কেন ? , বুঝিয়াছি, কাল সেটা কর্তার পাতে পড়িয়াছে, কারণ কাল সকালে কাগিন্নীতে পরস্পর পরস্পরের প্রতি লক্ষ্য করিয়া হাত ও মাথা নাড়িয়া খুব খানিকটা চেঁচামেচি করিল। এ রকম প্রায়ই হয়, যেন দুইটা মােরগে ঝগড়া করিতেছে। কর্তা যত চেঁচায়, গিন্নী তাহার শতাধিক। এবং সেইদিনই বিকালের দিকে একটা না একটা মােরগ বা মুরগীকে দেখা যায় না, সুধু উঠানের পাশে দু'একটা রক্তমাখা পালক পড়িয়া থাকে, আর হাড়গুলা যায় কোথায় কে জানে! আচ্ছা, দু’একখানা হাড়ও কি আমায় দিতে নাই যে দু’দণ্ড কিছু চিবাইতে পাই! ইস, হাড়ের নামেও যেন আমার দু’পাটি দাতের প্রত্যেকটি আড়ামােড়া ভাঙ্গিয়া উঠিয়া বসে! শেষবার যে হাড়টাকে পাই সেটাকে পাথর বলিলেই হয়। আমিই সেটাকে কানাচের মাটি খুঁড়িয়া বাহির করি, সেটা কিসের হাড় মনে নাই, মুরগীর কখনই নয়, কিন্তু তাহাতে মুরগীর পায়ের মতন অনেকগুলা আঙুল ছিল। সেটাকে দু’একবারমাত্র চুষিয়াছি, এমন সময়ে তাহাতে কর্তার নজর পড়িল। আর তাহা লইয়া যে কেলেঙ্কারীটা হইল তাহা ভাবিতেও প্রবৃত্তি স্তীগ হয় না। সেদিন মনে হইয়াছিল, বুড়ার শুকনাে চামড়া-ঢাকা হাড় কখানা ঠিক এমনি করিয়া চিবাইয়া ফেলি ! কিন্তু আমার শরীরের সমস্ত শক্তিকে আমার গলার শিকলটা যে মুঠা করিয়া ধরিয়া রাখিয়াছে । কোনদিন ওটাকে সত্যই ছিড়িয়া ফেলিব। ইস, বেরালটা ঐ রক্তমাখা পালক গুলা চাটিতেছে, এই বন্দী অবস্থায় হাঁক দিয়া করিব কী, সে অমনি ছেনালী করিয়া আরাে দেখাইয়া দেখাইয়া টুকিয়া টুকিয়া খাইবে ! বেরাল জাতটাকে দেখিলে আমার সর্বশরীর জ্বলিয়া ওঠে। ছােট জাত, অথচ মানুষের কাছে তাহার আদর কম নয়। আমার পাওনা হাড়মাংসগুলা নিশ্চয়ই সে ফেলিয়া ছড়াইয়া আপন ইচ্ছামত খাইয়া বেড়ায়। একবার ছাড়া পাইলে তাহার উপযুক্ত শাস্তি সে পাইবেই পাইবে। ইস, কাঁচা রক্ত, একটা বিন্দুও যদি জিভে দিতে পারিতাম ! এই এত বড় গুদাম ঘটায় একটা ইদুর পর্যন্ত একবার উকি দেয় না। ইদুরের রক্ত, মনে করিলে কেমন গা ঘিন্ ঘিন্ করে। কিন্তু রক্ত, সে সব সমান, কাচা লােনা রক্ত! এই যা, রক্তের কথা মনে করিতে করিতে জিভের জলে মাটিটা পর্যন্ত ভিজিয়া গেছে! থুঃ ! যাক ওসব কথা ভাবিয়া কাজ নাই। একটু কিছু খাইলে হইত। বাটির আলু চটকানােটার দিকে তাকাইতেও প্রবৃত্তি হয় না। কিন্তু মুরগীগুলা কী আনন্দেই না ক কল্ করিয়া তাহা গিলিয়া ফেলে! খানিকটা ত খাইলাম, বাকিট। পরে চেষ্টা করিয়া দেখা যাইবে। এখন একটু আরাম করিয়া শোওয়া যাক্। ছােট্ট হাঁসের বাচ্চাটা বেপরােয়াভাবে অন্ধের মত এদিকে আসিতেছে। আর একটু আগাইয়া আসুক না। না, কিছুদূর আসিয়াই থামিয়া গেল। সমস্ত জানােয়ারগুলা আমার চারিপাশে একেবারে গা ঘেঁসিয়া ঘেঁসিয়া ঘােরাফেরা করিতেছে, যেন তাহারা দল বাঁধিয়া আমায় ব্যঙ্গ করিতে আসিয়াছে। একবার ছাড়া পাইলে সমস্তগুলার ঘাড় ছিড়িয়া উপযুক্ত হাতের কাজ শিক্ষা দিয়া দিতাম। একটার পর একটার টু টি টিপিয়া সমস্ত তাজা রক্ত পান করিয়া লইতাম, তারপর মাংস ও পেশীসংলগ্ন হাড়গুলাকে দিনের পর দিন ধরিয়া চিবাইতাম। কিন্তু এই শিকলটা, যেদিকে ফিরি ওটা সর্বক্ষণ আমার গলা ধরিয়া সঙ্গে সঙ্গে ফেরে। ওটাকে কী করিয়া কাবু করা যায় সেই সম্বন্ধে কয়দিন ধরিয়া ভাবিতেছিলাম, না? তাইত, কী করিয়া উহার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় ! ওটাকে ছাড়াইবার জন্য সেদিন যখন রাগের মাথায় মক্ষমভাবে কামড়াইয়া ধরিলাম, তখন আমার জিভ কাটিয়া ঝর ঝর করিয়া রক্ত ঝরিতে লাগিল। উহার সঙ্গে দাত, সেই দাতগুলা মেলাইয়া সেদিন সে আমার দিকে চাহিয়া খুব খানিকটা হাসিল। মাথাটা নীচু করিয়া দুই পা দিয়া আস্তে আস্তে ওটাকে কনের উপর দিয়া হয়তাে গলাইয়া দেওয়া যায়। না, কান পর্যন্ত আসিয়াই আবার ওটা ঝনাৎ করিয়া ঘাড়ের উপর আসিয়া পড়ে। টিনের দেওয়া শটার উপর ঘসিলেও ওটাকে কাবু করা যায় না! কিন্তু সেই ঘর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তাহার ঐ দাতগুলাকে আমার গলার উপর সে অতি নির্মমভাবে কনকসে করিয়া বসাইতে থাকে। কিন্তু—এইবার একটা বেশ রীতিমত মংব মাথায় আসিতেছে, কিন্তু তাহাকে যেন ঠিক ধরিতে পারিতেছি না। দাড়াও দেখি, এই শিকলটা ত ঐ আংটাটার সঙ্গে বাঁধা, আর আংটাটা? ওটা মাটির মেঝের সঙ্গে কী এক অদ্ভুত উপায়ে আটকানাে। হাত-পায়ের নখগুলাে কি একেবারে ভোতা হইয়া গেছে। ঐ আংটাটার চারিপাশে খুঁড়িলেই ত সব গােল চুকিয়া যায়। কিন্তু অতি সন্তর্পণে কাজটা করিতে হইবে। এখন ঠিক সুবিধা হইবে না, বুড়ী আবার খাবার লইয়া এখনই আদিখ্যেতা করিতে আসিবে। একটু গা-ঢাকা মত হইয়া আসুক, এবং জন্তুগুলা সব শুইতে যা। কিন্তু কাজটা আজই রাত্রে শেষ করা চাই। ঐ শাদা মােরগটাকে আগে খতম করিব, তারপর ঐ বােকাগােছের ১৪ গান হসটাকে, তারপর ঐ খোড়া পেরুটাকে, তারপর, তারপর একে একে সব কয়টাকে সাবাড় করিতে হইবে। ই, কিন্তু জন্তুগুলাকে রাখিব কোথায় ? গুদামঘরে রাখিলে কর্তা কালই আসিয়া সেগুলাকে টানিয়া বাহির করিবে এবং একটা কেলেঙ্কারী হইয়া যাইবে। না, এ বাড়ীর ত্রিসীমানায় নয়, কিন্তু কোথায় রাখা যায় ? খুব দূরে কোথাও, যেখানে মানুষের যাওয়া-আসা নাই। ঐ দূরে ঝাউবনটায় যেখানে ওপাড়ার ফীগার সহিত আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়, সেখানে পুঁতিয়া রাখিলে কেমন হয় ? কেন সে ত খাসা মংলব, কেহ টের পাইবে না। ফীগাটার সম্প্রতি কতক গুলা এণ্ডাবাচ্চা হইয়াছে, তাহার দেমাকে সে পাড়ার কাহারও দিকে ফিরিয়া ও তাকায় না, আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া সে সুধু ঐ কেঁচোর মত বাচ্চাগুলাকে লইয়া নাকি রােদে একপাশে পড়িয়া থাকে। ফীগাকে লইয়া তাহার এক অনুগামীর সঙ্গে একদিন বেশ একটু মন- কসাকসি হইয়াছিল, মনে আছে। দুই জনে যখন ফীগার মন কাড়িবার জন্য রীতিমত মল্লযুদ্ধে প্রস্তুত হইয়া উঠিয়াছি, এমন সময়ে ঐ বােটকা গন্ধ-ওয়ালা বুড়ীটা একটা চ্যালাকাঠ লইয়া আমাকে শাসাইল, এবং পরে কর্তা আসিয়া জোর করিয়া আমাকে শিকল দিয়া বাঁধিয়া রাখিল। ইহাতে উক্ত অনুগামীটি ফীগাকে ইশারা করিয়া একটু দুরে লইয়া গেল। কথাটা মনে করিলে আজও আমার ভিতরটায় কিসের একটা ভোতা ব্যথার মত বেদনা অনুভব করি। আজ রাত্রে একবার ওপাড়ায় যাইব নাকি ? ফীগা সারা রাত ছাড়া থাকে, রাত্রির নিঃসঙ্গতায় হয়তাে আজ আমায় সে প্রত্যাখ্যান করিবে না। আর প্রত্যাখ্যান করিলেই বা ক্ষতি কী, আপন জঘর পেশীগুলা ত আজও শিথিল হইয়া যায় নাই! ফীগাই ত কত ছল করিয়া আমার আস্তানার আশেপাশে ঘােরাঘুরি করিত, তবে সে ঐ অপগণ্ডগুলা জন্মাইবার কিছু পূর্বে। কিন্তু আজ সে পাঁচ ছেলের হাতের কাজ । মা হইয়া উঠিয়া এমন কাহার কি মাথা কিনিয়াছে। ফীগ যদি প্রত্যাখ্যান করে, লেডী আছে, আর লেডীরও যদি মন না উঠে ত মাঠের মাঝখানের ঐ বাড়ীটার নরাও ত আজ বাঁচিয়া আছে, যদিও তাহার বয়স কম হয় নাই এবং দাঁতগুলা রীতিমত আঙ্গা হইয়া পড়িয়াছে । কাজ আরম্ভ করিব না কি ? না, একটু অপেক্ষা করা যাক। ইস, শিকলটার দিকে তাকাইয়া যেন তর সহিতেছে না। ঐ যে বুড়ী আসিতেছে। স্টীগা, স্তীগান্! ভালাে মানুষের মত একটু মাথাটা তুলিয়া লেজটাকে বার দু’এক নাড়া যাক্। বুড়ী খাবার রাখিয়া চলিয়া গেল। দেখিতে দেখিতে বেশ একটু গা-ঢাকা মত হইয়া আসিয়াছে। জানােয়ারগুলাকে খাওয়াইয়া বুড়ী ঐ ঘরটায় বন্ধ করিল। একটা শােরের বাচ্চার বােধ করি খোঁজ মিলিতেছে না। বুড়ী ডাকিল, “মালুংকী, মালু—মালু—মা-উ।” ডাক শুনিয়া আধ-খােলা দরজা দিয়া ভিতরের সব শশারের বাচ্চা কয়টা বাহির হইয়া আসিল। ঐ যে হারানো বাচ্চাটা কোথা হইতে ছুটিয়া আসিল। সব কয়টাকে একসঙ্গে ঘরে পূরিয়া বুড়ী অন্ধকারে মিশিয়া গেল। তাহার মাথায় বাঁধা শাদা কাপড়টা এখনও দেখা যাইতেছে। এইবার সে আপন ঘরে ঢুকিয়া দোর দিল, হুড় কার আওয়াজ পাইলাম না। সন্ধ্যা হইবার কিছু পরেই সারা গ্রামখানা যেন অন্ধকারে একেবারে হারাইয়া যায়। সুধু স্লিনারচ্যিকের অতুল বৈভবের সাক্ষ্যস্বরূপ তাহার বাড়ীর জানালা দিয়া খানিকটা আলাে বিজন সমুদ্রের মাঝে জনহীন আলােকস্তম্ভের মত জাগিয়া থাকে। রাত একটু গভীর হইয়া আসে, স্তীগান্ বুড়াবুড়ী শুইতে যায়, জানালার আলােটা ক্রমে মুমুর্মুর চোখের মত নিস্তেজ হইয়া আস্তে আস্তে নিবিয়া যায়। তখন এই ক্ষুদ্র মানবগােষ্ঠীর শেষ চিহ্নরূপে গ্রামের পথটা ভদকা-খােরের মত ধূলায় লুটাইয়া যেন নেশায় ভাের হইয়া অসাড়ভাবে পড়িয়া থাকে। সেদিন আকাশে একটিও তারা নাই, গভীর রাতে হঠাৎ মেঘ করিয়া ঝড় উঠিল। স্লিনারচিক্যের বাড়ীর চারিপাশের তপলা-গাছগুলা পরস্পরের গায়ে পড়িয়া সিরসির শব্দে কী একটা বিষয় লইয়া কানাকানি করিতে বসিল। ঐ ঝাউবনটার দিক হইতে মাঝে মাঝে একটা চাপা গােঙানীর শব্দ বাতাসে ভাসিয়া আসে, যেন কে কাহার গলাটা আলু ছাড়াইবার ছুরী দিয়া পেঁচাইয়া পেঁচাইয়া কাটিতেছে। বুড়ী পড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া স্বামীকে জাগাইল। উভয়ে অনেকক্ষণ ধরিয়া কান পাতিয়া শুনিল, এবং একে একে সমস্ত সন্তগণের নাম করিয়া আবার পাশ ফিরিয়া ঘুমাইয়া পড়িল। হু-হু করিয়া বৃষ্টি নামিল, এবং ঝড় ও বৃষ্টিতে মিনারচিক্যের সারা আঙ্গিনাটায় দুইটা শকুনীর মত ঝটাপটি করিতে লাগিল। মাঝে মাঝে শুয়ারখানা হইতে শিশুর কান্নার মত শব্দ শােনা যায়, হাঁস ও মুরগীর ঘরটায় অনেকগুলা পাখা একসঙ্গে ঝাপটাইয়া উঠে, আবার সব থামিয়া যায়, এবং থাকিয়া থাকিয়া ঐ বনটা হইতে গােঙানীর শব্দটা বৃষ্টিকে ছাপাইয়া উঠে। মানুষের স্নায়ুগুলাতে ভয় বলিয়া বে পদার্থ টা রক্তের সঙ্গে মিশিয়া থাকে তাহা যেন এই দুর্যোগের রাতে ছাড়া পাইয়া প্রেতের মত হা-হা করিয়া বেড়াইতেছে। ভােরের দিকে বৃষ্টি থামিল, এবং সকাল হইতেই স্লিনারচ্যিকের আঙ্গিনাটা রােদে ভরিয়া উঠিল। বুড়ী দুয়ার খুলিয়া বাহিরে আসিয়াই হতবুদ্ধির মত দাড়াইয়া রহিল। দুয়ারের কাছে ভিজা ঘাসের উপর দুইটা হাঁস ও একটা মােরগ ঘাড় নেতাইয়া পড়িয়া আছে। তাড়াতাড়ি ১৭:
হাতের কাজ মনে হাঁস ও মুরগীর ঘরের দিকে ছুটিয়া গেল, দেখিল দুয়ার খােলা, শুধু একটা মুরগী এক কোণে বসিয়া ডিমে তা দিতেছে, তাহার মুখে তখনও আতঙ্কের ছাপ লাগিয়া আছে। ডাকিল, “মাক্কী—মালু-মালু-উ!” কিন্তু একটা শূকরশাবকও সে-ডাকে ছুটিয়া আসিল না। স্লিনারচ্যিকের মাথায় যেন সেইদিনের বসন্তের ঐ আকাশখান। একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িল। তাহার আজীবন-সঞ্চিত ডলারের পুজির যে দশগুণ সুদের হিসাব সে মনে কষিয়া রাখিয়াছিল, তাহার মনের সেই হিসাবের খাতাখানাকে কে মুহূর্তে ছিড়িয়া কুটিকুটি করিয়া ফেলিল। যে প্রতিবেশী তাহার এই সবনাশ করিল তাহার রক্ত দর্শন করিয়া তবে সে জলগ্রহণ করিবে, এইরকম কী একটা শক্তগগাছের শপথ করিল। কিন্তু উঠানের কাদার উপর কিসের একটা চিহ্ন দেথিয়া সে একেবারে হতবাক হইয়া গেল। সারা আঙ্গিনা- টায় কে যেন শিকলের মত কী একটা টানিয়া টানিয়া বেড়াইয়াছে। হাঁস ও মুরগীর ঘর হইতে রেখাগুলা আঁকিয়া বাঁকিয়া আলুর ক্ষেত পার হইয়া বনের দিকে চলিয়া গেছে। যে-ব্যক্তি একাজ করিয়াছে সে যে বহুবার আনাগােনা করিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু দাগগুলা স্থানে স্থানে স্পষ্ট শিকলের। কী ভাবিয়া স্ন্যিনারচ্যি হাঁকিল, “ংস্কীগান্” ! কোন উত্তর আসিল না। আবার ডাকিল, “স্তীগান্, স্তীগান্!” আপন গহ্বর হইতে মুখ বাড়াইয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। “স্তীগা, আয় এদিকে !” শ্রীগান এবার লজ্জার মাথা খাইয়া একেবারে বাহিরে আসিয়া দাড়াইল। আংটায় বাঁধা শিকলটা তাহার চিবপুরাতন সঙ্গীর মত তাহার সঙ্গে সঙ্গে বাহির হইয়া আসিল। মিনারচ্যি গজিয়া উঠিল, “শ্রীগান, তাের এমন কাজ!” স্তীগান্ যেন লজ্জায় মরিয়া গিয়া মাথাটা নীচু করিয়া নিতান্ত সঙ্কোচভরে তাহার অবশিষ্ট লেজটুকু নাড়িতে হস্তীগান ১৮ ৎীগান নাড়িতে শাস্তির প্রতীক্ষায় স্থির হইয়া দাড়াইয়া রহিল। মিনারচ্যি উঠান হইতে একটা ভাঙ্গা গাড়ীর ধুরা কুড়াইয়া লইয়া গানের লজ্জা বনত মাথার উপর তাহার আজীবন-সঞ্চিত ডলারের পুজির ধ্বংসাধনের প্রতিশােধ লইল। স্টীগান যেমন হতবুদ্ধির মত তাকাইয়া ছিল তেমনই তাকাইয়া রহিল, সুধু তাহার মাথার মধ্যস্থল ফাটিয়া কয়েক বিন্দু রক্ত তাহার মুখের উপর গড়াইয়া পড়িল। শিকলটাকে লইয়া সে ঐখানেই ঐ ভিজা মাটির উপর ধীরে ধীরে শুইয়া পড়িল । ভারশৌ, ৩রা জুলাই, ১৯৩৭।
ইমিয়েনীন্তী • সে-বছর “ছে মাকি”, * রবিবার ও স্তানিস্লাভের “ইমিয়েনীন্তী” + একসঙ্গে পড়িল। তাহাতে দুই দুইটা ছুটি একেবারে মাঠে মারা যাইলেও পানী ! স্তানিস্লাভার অপরিসর গৃহে অতিথি-সমাগম অন্যান্য বৎসর অপেক্ষা কিছু কম হইল না। দুই মেয়ে, জামাই ও বড়ছেলে নানা বর্ণ ও নানা আকারের পুলিন্দা ও পুষ্প সমভিব্যাহারে একে একে প্রবিষ্ট হইল, এবং মার হস্তচুম্বন করিয়া দ্যে মাতুকি ও নামােৎসবের দুইটা কৰ্তব্যই একসঙ্গে সারিয়া লইল। =k “মা’র দিন”—অর্থাৎ মাতৃ-উৎসব। ঐ দিনে সমগ্র পােলদেশে মাতৃ-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। + ইউরােপের বহু দেশে জন্মােৎসবের পরিবর্তে নামমাৎসব অনুষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ ব্যক্তিবিশেষের নাম অনুযায়ী যথা য়ান্ (জন্), পাত্র ( পিটার) ইত্যাদি—উক্ত সন্তগণের উৎসবের দিন জন্মদিনরূপে রক্ষিত হয়। * শ্রীমতী বা মহাশয়া। পােলভাষায় “আপনি” অর্থেও “পা” (পুং) বা “পানী” (স্ত্রী) ব্যবহৃত হয়। ০ ইমিয়েনীখী পানী স্তানিস্লাভা কৃত্রিম রােষ সহকারে ভৎসনা করিলেন,“দেখােদেখি পাগলা ছেলেমেয়েদের কাণ্ড! এই সব ছাইভস্ম কিনে পয়সা নষ্ট করা। ততারা সবাই মানুষ হয়েচিস, বেঁচে বত্তে আচি, তাতেই আমার সুখ। এই সব জিনিষ পত্র দিয়ে কি আমার সে-সুখ বাড়বে রে?” উত্তরে মেয়ে, জামাই ও বড়ছেলে পুনরায় মার হস্ত চুম্বন করিল। ফুলের মােড়কগুলা খুলিতে খুলিতে পানী স্তানিস্লাভা নানা আনন্দোক্তি করিতে লাগিলেন, “বাঃ কী চমৎকার ফুল ! আজালিয়া রােদোদে, কলিয়া, নাৎসিজ, এই মে মাসে অমন মাগনােলিয়া কোত্থেকে পেলিরে ? ভারী চমৎকার, ভারী চমংকার। তবে পয়সা নষ্ট করা। এবার যা করেচি তা করেচিস, আর যেন কিনিসনে আমার জন্যে এসব বাছা। তােরা ত আর রাজা-রাজড়া ন’ বাপু! হঁা, কী বলছিলুম, ক্রাকুফ, থেকে স্তেফা টেলিগ্রাম করেছে, আর সকাল হতে না হতেই পিওন এক মস্ত মােট নিয়ে হাজির! স্থির হয়ে ব’স তােরা, দেখাচ্চি। পাগল ছেলেটা, লিখেচে আসতে পারবে না, ছুটি পায়নি বলে। তার ওপর কচি মেয়েটা, তাকে নিয়ে নাড়ানাড়ি করা ! না এসেচে ভালই করেছে। দাড়াও দেখাচ্চি কী পাঠিয়েছে। কেবল পয়সা নষ্ট করা !” বলিতে বলিতে পানী স্তানিস্লাভা চক্চকে নিকেল-করা কী একটা কল আনিয়া হাজির করিলেন। “দেখাে দেখি পাগল ছেলেটার কাণ্ড!” আনন্দাশ্রু সম্বরণ করিয়া পানী স্তানিস্লাভা কহিতে লাগিলেন—“দেখাে দেখি একবার, এই সব কিনে পয়সা নষ্ট করা। ঐ ত রােজগার, তার ওপর বৌ, মেয়ে, দেখাে দেখি পয়সা নষ্ট করা!” তাহার আদরের ছােট ছেলে স্তেফান যে তাঁহাকে সকলের অধিক ভালােবাসে, এই গর্বে তাঁহার মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। “এই সব কল-কজা নিয়ে আমার হবে কী বল তাে?
হাতের কাজ আমাদের সেকেলে কয়লার উনুন কি খারাপ বাপু ? তা আজকাল সব নতুন বিধেন! কয়লা গেল, এল গ্যাস, আবার এই নতুন ফ্যাশান, ইলেকটি! ইলেক্ট্রিকের উনুন, বলে, মা ধোঁয়ায় রাধতে তােমার কষ্ট হয়, চোখ জলে, ইলেকটিকের সে বালাই নেই। তাছাড়া এতে নাকি ঘর নােংরা হয় না। পাগল ছেলেটা।” নিকেল-করা এই অভিনব যন্ত্র দর্শনে মেয়ে, জামাই ও বড়ছেলে মিশ্রিত আনন্দধ্বনি করিয়া উঠিল, “বাঃ বাঃ! সত্যিই কী চমৎকার। এবার মা, শুয়ে শুয়েই তুমি চায়ের জল ফোটাতে পারবে। কেলীতে জল ভরে শােবার আগে উনুনের ওপর বসিয়ে রাখা, আর সকালে শুয়ে শুয়েই বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে সুইচটা টিপে দেওয়া !” পানী স্তানিস্লাভা গর্বভরে কহিলেন, “শুধু তাই নয়, এ উনুনে নাকি পােড়া-ঝােড়ারও কোন বালাই নেই। রান্না চড়িয়ে পার্কে দু’চক্কর দিরে এসো, রান্না তৈরী হয়ে আছে, অথচ একটী আনাজ পর্যন্ত পােড়নি। তবে পয়সা নষ্ট করা ! যা বাছা তােরা, ঐ বড় ঘরটায় গিয়ে বগে বা।” পরে স্বর নামাইয়া, একপ্রকার চুপি চুপি বলিলেন, “ভাড়াটেরা মানুষ ভারী ভালাে, এই দেখােনা আমার এই ত একখানা ঘর, তার আধখানা আবার রান্না ঘর । তা আজ সকালে পানী যানীনা এসে বললেন, ‘পানীর ঘরে আজ লােকজন আসবে, তা পানী আজ আমাদের ঘরটাতেই লােকজন বসাতে পারবেন। য! বাপু তাের বড় ঘরটায় গিয়ে ব’গে যা, আমি এক্ষুনি আচি। পান্না কাতাঝীনা এসেছেন, তার সঙ্গে কথাবার্তা ক’ গে যা, উনি একলা বসে আচেন। ভাড়াটের মানুষ ভালাে তবে অচেনা, অজানা মানুষ, পান্না কাতাঝীনার একটু সমীয় হচ্চে বােধ হয়। যা, তােদের উনি জানেন শশানেন, বা বাপু তােরা।” *কুমারী। २२ ইমিয়েনীষ্ঠী উক্ত “বড় ঘর” হইতে তখন পান্না কাতাঝীনার অপ্রতিহত কথার ছােট বড় ঢেউ, দরজার ফুটা-ফাটা দিয়া ভাঙ্গা নৌকার খােলের ভিতর যেমন অবাধে জল আসিয়া ঢােকে, তেমনি করিয়া কুলকুল শব্দে প্রবেশ- কক্ষকে ভরিয়া ফেলিতেছে । দরজাটা খােলার সঙ্গে সঙ্গেই পান্না কাতাঝীনার উল্লসিত চীৎকার সকলকে অভ্যর্থনা করিল, “ওমা আজ কতদিন তােমাদের দেখি নি গো ! আট বচ্ছর আগে, সেই যে পানী স্তানিস্লাভার হমিয়েনীতীতে দেখা হয়, তার পর আর তােমাদের দেখি নি। তা পানী স্তানিস্লাভার ছেলেমেয়েরা অমন ডাগর হয়ে উঠেছে যে আর তুই-তুকারী করবার জো নেই। পান্ ভীত, ত একেবারে মস্ত পুরুষ মানুষ হয়ে উঠেছেন !” ত্রিশ বছর বয়সেই পান্ ভীতদের মাথার মধ্যস্থল একেবারে পালিশ । করা হাতীর দাতের মত চক্চক্ করিতেছে। পান্না কাতাঝীনার হস্ত চুম্বন করিয়া সে একখানা চেয়ার টানিয়া লইয়া মিনিট গুনিতে বসিল, এখন আটটা বাজিয়া সতেরাে মিনিট, ন'টায় তাহার ইয়ার স্তানিস্লাভের বাড়ী যাইতে হইবে। সেখানেও ইমিয়েনীন্তী, স্তানিস্লাভ অবিবাহিত, তাহার ঘরে ডানদিক্কার দেওয়াল-আলমারীতে নানা রঙের ও নানা আকারের বােতলগুলা এবং টেবিলে নােন্তা “শ্লে” মাছ “কাভিয়ারের”+ কথা মনে করিয়া তাহার জিভটা শুকাইয়া উঠিতে লাগিল। দুই মেয়ে ভান্দা ও হাল্কা পান্না কাতাঝীনার সহিত চুম্বন-বিনিময় করিয়া দেওয়ালের কাছে দিনটার উপর বসি। জামাই তাহার কুটুম্ব-সুলভ লজ্জা সহকারে একখানা চেয়ারের পিঠ ধরিয়া দাঁড়াইয়া ইংরেজী “হেরিং”, কতকটা ইলিশ মাছের মত। এক প্রকার মাছের ডিম, রুশিয়া ও পপলদেশে বিশেষ পরিচিত। : ২৩ হাতের কাজ দাড়াইয়া স্মিতহাস্যে ঘরখানাকে উদ্ভাসিত করিতে লাগিল। তাহার কাল-শুভ্র মাথাটার ভিতর বসিব” কি “বসিব না” এই দুইটা প্রশ্ন টেকি-দোলনার মত দুলিতে থাকিল, এবং যতই সময় বাইতে লাগিল, বসা তাহার পক্ষে ততই দুরূহ হইয়া উঠিল। তাহার মনে হইল যেন ঘরসুদ্ধ সকলেই তাহাকে ইচ্ছা করিয়া বসিতে বলিতেছে না! সে যে ৬২ বৎসর বয়সে ২৫ বছরের ভান্দাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করিয়াছে, এবং তাহাতে যে ভান্দার আত্মীয়স্বজন কেহ খুসী হয় নাই, সেই দোষ-বােট। তাহকে অতিশয় পীড়া দিতে লাগিল। তাই তাহার বাধানো, বিবর্ণ দাতগুলাকে বাহির করিয়া সে মমীর মত হাসিতে হাসিতে বসিবার সুযােগের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। ভান্দা দিভানের উপর পাতা সতরঞ্চীর ঝালর গুলা আঙ্গুলের চারিপাশে জড়াইতে লাগিল এবং তাহার ছােট বােন হাকা দেওয়ালপজিতে আঁকা কুকুরটার দিকে তাকাইয়া ভাবিতে লাগিল, সে যখন বিবাহ করিয়া ঘর-সংসার পাতিবে, তখন ঠিক ঐ জাতের একটা কুকুর সে পুষিবেই পুষিবে। এমন সময়ে কল- ঘরের ঝারার মত পান্না কাতাঝীনার কথার ঝাপটা ভান্দার আনত মুখের উপর একেবারে উছলিয়া পড়িল- “বলি পানী ভালো,* পানীকে দেখে আমার বােনঝি বারবারার কথা মনে পড়ে। একেবারে হুবহু বসানাে, সেই মুখ, সেই চোখ, সেই নাক, সেই ভুরু, সেই চুল, এমন কি গায়ের রংটি পর্যন্ত। পানীকে দেখে কে বলবে যে পানী আমার বােঝি বাবারা ন’? পানী যেই ঘরে ঢুকলেন, আমি অমনি একেবারে চমকে উঠলুম, বলি ওমা, পানী স্তানিস্লাভার বাড়ীতে বারবারা কোত্থেকে গা ! তার পর অনেকক্ষণ ঠাওর করে দেখলুম যে, না এ নিশ্চয়ই পানী স্তানিস্লাভার বড় মেয়ে *সম্বোধন কারক। २४ ইমিয়েনীন্তী পানী ভান্দা! ত ভগবানের এমনি ছিষ্টি যে বয়েসটাও কি ঠিক এক হ’তে হয় গা !” ভগবানের সৃষ্টি সম্বন্ধীয় এই দার্শনিক গবেষণায় যােগ দিয়া পানী- স্তানিস্লাভার ভাড়াটে পানী যানীনা তাহার গ্রাম্য উচ্চারণকে যথাসম্ভব শহুরে এবং কণ্ঠস্বরকে তদুপযুক্ত শ্রুতিমধুর ও সভ্য করিয়া বলিলেন, “ই। ভগবানের সিষ্টির কথা যদি বলেন পানী কাত্যাঝীননা, ত সুধু মানুষে মানুষেই যে মিল বা সাম্য পাওয়া যায় তা নয়, উংভিদ এবং জীবজগতেও এমন মিল দেখা যায় যে, সত্যই আশ্চর্য না হয়ে থাকা যায় না। লক্ষ গাছ পাতা, তার একটাও আর একটার সঙ্গে মেলে না, 'অাবার এমনও দেখা যায় যে দুটো পাতায় একেবারে হুবহু মিল।” পান্না কাতাঝীনার কথার ঝারা হু-হু করিয়া বহিয়া চলিল :- “তা পানী যা বললেন তা একেবারে খাঁটী সত্যি। বলবো কি, প্রর্শে পাস্তভা,* পানশুভাে শুনলে বিশ্বেস করবেন না। ভীনােয় থাকবার সময় একটা কুকুর পুষেছিলুম, তার নাম নেরাে। নেরো আমার ঐ দেয়ালের ছবির কুকুরটার মতন কতকটা। কান দু’টো ঝােলা ঝােল, একেবারে কুচকুচে কালাে, সুধু ন্যাজের ডগাটা শাদা। ও-জাতের কুকুর প্রায়ই কালাে হয়, নেয়াের শুধু তাজের ডগাটা একটু শাদা। তা ব’বাে কী, প্রশে পানশুভা, একদিন বিকেলের দিকে বসে আচি পার্কে, ::পোল ভাষায় ভদ্রতার পরিচায়করূপে কথার মাঝখানে “শোেনা” (”) “প্রশে পানী” (স্ত্রী) ও “প্রশে পাস্তুভ।” (বহুবচন, স্ত্রী ও পুং) ব্যবত হয়। কতকট। ইতালীয় ভাষার “প্রেগাে”র মত। আপনারা (পু ও স্ত্রী)। তদনুরূপে, “পানভিয়ে’-গাপনারা (পুং), “পানি।” -অাপনারা (স্ত্রী)। উক্ত সর্বনাম ও অন্যান্য পোলীয় শব্দ গল্পের স্থানীয় বই বজায় রাখিবার জন্য ব্যবহৃত হইল। ২৫ হাতের কাজ দেখি নেরে চলেছে কোন্ এক পানের সঙ্গে! আমি ত অবাক্ ! বলি, এই মাত্তর নেৰােটাকে গিলিয়ে কুটিয়ে দোর বন্ধ করে একটু বেড়াতে বেরিয়েছি তা সে বেরুলো কোনখান দিয়ে ! ডাকলুম্ ‘নেরাে! আর এদিকে!’ ডাক শুনে নেরাে একবার ফিরে তাকালে, কিন্তু ভাবট। দখালে যেন সে আমায় জীবনে কখনো দেখেনি। ফিরে একবার তাকিয়ে সে চললো সেই পানের সঙ্গে সঙ্গে। ভাবলুম, নেরােকে চোরে নিয়ে বাচ্চে। ছুটলুম পিছু পিছু, যতবার ডাকি ‘নেয়াে’, নেরাে ততবারই ফিরে তাকায় অথচ ভাবটা দেখার যেন সে আমায় চেনেও না। ধমক দয়ে বললুম, হতভাগা কুকুর, কোন এক অজানা মানুষের সঙ্গে চলেছে। গেলবার লােভে, জানো না যে তােমায় চোরে নিয়ে যাচ্চে? জ্যান্ত ছাল ছাড়িয়ে যে মারবে তােমায় ! জানেন ত পাস্তভাে, শােনা যায় যে হারানাে কুকুর ধরে চোরে দস্তানার কারখানায় বেচে দেয়, তার পর জ্যান্ত ছাল ছাড়িয়ে সেই ছালে দামী দামী দস্তানা তৈরী হয় ? আমি কেঁদে মরি, বলি নেবাের আমার সেই দশাই করবে ওরা। ছুটতে ছুটতে কাছে গিয়ে সেই পাকে ডেকে বললুম, ‘বলি, আমার কুকুরটাকে ধরে নিয়ে যাচ্চো, এক্ষুনি ছেড়ে দাও, তা না হলে পুলিশ ডাকবাে’ । আমার কথা শুনে সেই পান্ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘পানীর কুকুর ! অর্থাৎ ? বলি, অর্থাৎ আবার কী ? এ আমার কুকুর! বলে, ‘পানীর মাথার একটু দোষ আচে কী ? ধমক দিয়ে বলি, ‘এক্ষুণি যদি ছেড়ে না দাও ত পুলিশ, ডেকে একটা অনর্থ কাণ্ড করবাে!' বলে, হয় পানীর মাথা খারাপ আর না হয় পানী তামাসা করছেন। এ আমার কুকুর নেরে ! চেঁচামেচি শুনে লােক জড় হয়ে গেল, পুলিশ, এলো। তবুও সেই পান্ বলে, এ আমার কুকুর নেরাে। আমি বলি, অমনি বললেই হলাে, আমার কুকুর নেরাে, ও-যে আমার দুধের বাচ্চাটি থেকে ২৬ ইমিয়েনাষ্ঠী মানুষ করা নেরো গা! পুলিশ, সেই পাকে নিয়ে চললল থানায়, আর সঙ্গে সঙ্গে আমি ! কুকুর-চোর দেখে আমাদের পেছনে পেছনে জোয়ারের মতন লােক চলেচে। নেরাে কী ভেবে আমায় দু’একবার শুকে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠলাে। ধরতে যাই ধরতে দেয় না, কেবল ঘেউ ঘেউ করে ডাকে। থানায় যাবার পথে আমার বাড়ী পড়ে। পুলিশ কে বলি, 'বাপু দাও আমার কুকুর আমায়, নিশ্চয় ওর একটা অসুখ-বিসুখ করেছে। তা পােড়। কুকুর ধরতে দেবে না, কেবল ঘেউ ঘেউ করে’ আমায় কামড়াতে আসে। তার পর বাড়ীর কাছে এসে আমি একেবারে থ হয়ে গেলুম ! দেখি, জানলার গরাদ দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আমার নেরাে ! দেখাে দিকি কী কাণ্ড! আমি ত লজ্জায় মরি। দু'টো কুকুরে একেবারে হুবহু মিল, এমন কি নামটা পর্যন্ত এক !” সুবিধা পাইয়া জামাই চেয়ারটার উপর বসিয়া পড়িয়া ভগবানের সৃষ্টি সম্বন্ধীয় কী একটা অতিশয় জ্ঞানী গবেষণার উত্থাপন করিতে যাইতেছে এমন সময়ে আচমকা ঢেউয়ের মত পান্না কাতাঝীনার বাক্য- স্রোত সকলকে ভাসাইয়া লইয়া চলিল- “তারপর কী বলছিলুম, প্রশে পানস্তভা, হঁ্যা, মানুষে-মানুষে মিয়া এমন হয় যে দু’জন লােককে চেনা পর্যন্ত যায় না। যমজে-মজে মিল অনেক সময় হয় বটে। কিন্তু দু'টো মানুষ, একেবারে অচেনা, অজানা, কোন সম্পর্ক পর্যন্ত নেই, কেমন করে যে একরকম হয় তা ভগবানই জানেন! পান্তভােকে ব’লবােকি, একবার ভারী অপ্রস্তুতে পড়েছিলুম। আমার বােঝি বারবারার সই মাগােঝাতা বারবারারই সমবয়সী। তার ভগ্নিপােত, বয়েস বছর পঁয়ত্রিশ হবে, সেঁদর-সুপুরুষ মানুষটো, তার ওপর ভারী সৌখীন, হাজার মানুষের মধ্যে তাকে চিনে নেওয়া যায়। চুল শুলটানাে, চকচকে বুরুশ-করা আমেরিকান্ জুতাে পায়ে, ইংরিজি পােক ২৭ ইতের কাজ ছাড়া অন্য কোন পােষাক পরে না, রুমাল, টাই, শার্ট, সমস্ত ইংরিজি, একেবারে লণ্ডনে তৈরী, হাতের দস্তানা জোড়াটা পর্যন্ত। বারবারার সই মালগােঝাতার ভগ্নিপােতকে একবার সে দেখেছে সে আর ভােলেনি। তার চলার ধরণ, মুখের হাসি, সব একেবারে পেটেন্ট-করা, দস্তান। জোড়াটাকে হাতের মুঠোর মধ্যে ধরবার কায়দাটি পর্যন্ত ! তা প্রশে পানস্তভা, একদিন চলেচি ট্রামে করে’, দেখি ইষ্টিশানের কাছে বারবারার সই মালগােঝাতার ভগ্নিপােত আমাদের গাড়ীটাতেই এসে উঠলাে চেনা মানুষ, তাই তার দিকে তাকিয়ে, একটু মুচকে হাসলুম। ত: সে এমন ভাবটা দেখালে যে আমার জন্মে দেখে নি। বিচ্ছিরি ব্যাপারটা হয়ে গেল, হাজার হােক মেয়েমানুষ পুরুষমানুষের দিকে তাকিয়ে হাসা, লােকে ব’লবে কীণ ! ভাবলুম, হয়তাে আমায় চিনতে পারে নি। তাই কাছে গিয়ে ব’লুম, নমস্কার। ওমা, তা লােকটা একটা নমস্কার পর্যন্ত করলে না! বলি, ‘মাপ করবেন, পান মাগােঝাতার ভগ্নিপােত না?’ বলে মাগােব্যতা, মাগােঝাতা! ফে ফেল করে’ আমার মুখের দিকে তাকায়, বলে, 'আজ্ঞে না, পানী ভুল করেছেন, আমি মাগােঝাতার ভগ্নিপােত নই, মালগােঝাতা বলে আমার শালী-টালী কেউ নেই, আমি বিয়ে পর্যন্ত করিনি। দেখো দিকিনি কী লজ্জার কথা, লােকটা কী ভাবলে বলাে ত! অপ্রস্তুতের একশেষ! আমি তাড়াতাড়ি গাড়ী থেকে নেবেই দে ছুট! তার পর মাঝে মাঝে ট্রামে দেখা হয় লােকটার সঙ্গে, এখন সে নিজেই টুপি খুলে নমস্কার করে, এমন কি তার সঙ্গে দস্তুরমত পরিচয় পর্যন্ত হয়ে গেছে। দেকে। দিকি ভগবানের ছিষ্টি!” পান্না কাতাঝীনার এই অসম্ভব কথা শুনিয়া ভাড়াটে পানী যানীনার পােষ্যপুত্র ( জিজ্ঞাসা-চিহ্ন, কারণ পানী রানীনার বয়স ৩২ এবং পােয়- পুত্রের বয়স ২৩) পান্ তাদেউশ, একটা বিস্ময়সূচক শব্দ করিয়া তাহার ২৮ ইমিয়েনীন্তী অল্পবয়সী কবিদের মত ঝকড়া চুল গুলা কানের দুইপাশে সরাইয়া দিয়া মুখখানাকে যথাসম্ভব ব্রাজি করিয়া কয়েকদিন আগে পঠিত নিটশের জ্ঞানগর্ভ বাণী হইতে কী একটা সৎকথা আওড়াইতে যাইতেছিল, সহসা পান্না কাতাঝীনার বাক্যস্রোতে তাহার সে প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করিয়া দিল। শুকনো রুটি গেলার মত একটা কেঁৎ করিয়া শব্দ করিয়া সে চুপ করিয়া রহিল। পান্না কাতাঝীনা নূতন প্রসঙ্গের উত্থাপন করিলেন- “পাস্তভাে ভাগ্যে বিশ্বেস করেন ?” তাহার উত্তরে “হ” বা “না” বলিবার পূর্বেই পান্না কাতাঝীনা সুরু করিলেন- “ভাগ্যে আমিও বিশ্বেস করতুম না, কিন্তু এমনসব কথা আমার নিজের জীবনে একেবারে হাতে হাতে ফলে’ গেছে যে, এখন ভাগ্যে বিশ্বেস না করে উপায় নেই। আমার জানা এক বেদে বুড়ী আচে, ব’লবাে কী, প্রশে পানস্তভা,সে যা-যা বলে দিয়েছিল আজ পাঁচ বচ্ছর আগে তার একটু নড়চড় পর্যন্ত হয় নি। বলে, “মা তুমি লটারীতে অনেক টাকা জিতবে, তবে তার কিছুদিন পরেই একটা ফাড়াও আচে, তা ভয় করো না মা, লটারীতে অনেক টাকা জিতবে। আমি ত হেঁসেই উড়িয়ে দিলুম, বলি, হাঃ লটারীতে আবার নাকি জেতা যায় ! সুধু টিকিট কেনার টাকাগুলো গরচা দেওয়া ! তার পর সে বেদে বুড়ী, লটারীতে টাকা জেতার কথা সব ভুলে গিছলুম। বলি, গতর খাটিয়ে খাই মেয়েমানুষ, বরাতে যে কত সুখ তা তাতেই বােঝা যায়। আমার বাপ ছিলেন বড় মানুষ, কিন্তু বাবা মার। বাবার পর একটি ভাঙ্গা গ্ৰশ, * পর্যন্ত কেউ না খাটিয়ে দেয় নি। তা যাই হােক, একদিন আপিসের এক বুড়াে কেরাণী বলে, ‘পানী লটারীর টিকিটের যদি অর্ধেক কেনেন ত দুজনে মিলে একখানা টিকিট : কাণা কড়ি। ২৯ হাতের কাজ কেনা যায় ! ঝুলাে-ঝুলি, বলে, দশটা জলতী * দিয়ে টিকিট কেনবার পয়সা নেই, তাই পানী যদি আধখানা কেনেন ত পাঁচটা জুতী চেষ্টা-বেষ্টা করে দেওয়া যায়। বলি, বুড়াে মানুষ বলচে এত করে’, দিলুম পাঁচটা জলতী। যাই টিকিট কেনা তার এক হপ্তা পরেই, প্রশে পাস্ত ভা, আমার অমন পাকা চাকরীটি গেল। বিনি কারণে দিরেতরের সঙ্গে কী নিয়ে একটা মন-কষাকষি হ’লল, আমায় জবাব দিলে, বলে, পানীর বয়েস হয়েচে, আপিসের কাজ করতে পানীর কষ্ট হয়। দেখাে দিকি, বলে বয়েস হয়েছে, এইত সবে চল্লিশ পেরিয়েচি। এখন যাই কোথা বলে , একলা মানুষ, বিয়ে করিনি, গা’ করিনি, ছেলেপুলে নেই যে বুড়ো বয়সে আমায় খাওয়াবে। মনে মনে বলি, হা আমার কপাল, আমার নাকি আবার কোনদিন বরাত খুলবে ! ব্যাগে গােটাকতক জুলী পড়ে আচে, আর সেই লটারীর টিকিটের আধখানা বেচে পাঁচট জলতি পাওয়া যাবে, তাই দিয়ে কিছু না হােক, অন্ততঃ দু’টো দিনও ত বাপু, শুকনো রুটি খেয়ে কাটানাে যাবে। চললুম বােনের বাড়ীর দিকে, পথে ভাবছি, টিকিটটে বেচবে কি বেচবাে না। হঠাৎ সেই বেদে বুড়ীর কথা মনে পড়লাে। ভাবলুম, যাকগে, দেখাই যাক না কী হয়, দু’দিন না হয় উপােস করেই কাটানাে যাবে। বােনের বাড়ী না গিয়ে নিজের ঘরেই রিম । তারপর, প্রশে পাস্ত ভা, ব’লবাে কী, ব’ললে বিশ্বেস করবেন না, পরের দিন সকালে সেই বুড়াে কেরাণী এসে হাজির! বলে, এই দেখুন পানী টিকিটের নম্বরটা মিলিয়ে ! দেখি আমাদের টিকিটখানা জিতেছে, নগদ ৫ে০,০০০ লতী!” সংখ্যাটা উপস্থিত সকলকেই স্তম্ভিত করিয়া দিল। বড়ছেলে পান ভীতল দেনায় হাবুডুবু খাইতেছে, সে ভাবিতে লাগিল, ইস্ সংখ্যাটার দুই জলতী = ১১ টাকা। * ইমিনী একটা শূন্য বাদ দিয়াও যদি সে কয়েক হাজার জৰ্তী পাইত ত সে ছাত্র- জীবন হইতে সুরু করিয়া যত দেনা করিয়াছে তাহা সুদে আসলে শেষ করিয়া দিত এবং একটা পার্টি দিবার মত শ'খানেক জলতীও তাহার হাতে থাকিত। তা ভগবানের বিচারে সমস্ত পাকা পাকা নম্বরগুল ত ঝাড়ুদার ও বিধবা বা অবিবাহিতা বুড়ীদের হাতে আসিয়া পড়ে। জামাই তাহার পাকা চুলগুলার উপর হাত বুলাইয়া ভাবিতে লাগিণ- ইস, অতগুলা টাকা! সে যদি পাঁচ শত জলতীও জিতিতে পরিত - পরের দিনই ইতালিয়া যাত্রা করিত, রােম, মিলানাে, ভেনেংসিয়া। গন্দোলায় চড়িয়া ইতালিয়ার নীল আকাশের দিকে তাকাইয়া সে নোলার মাঝিদের গান শুনিত। দুরে নানা গির্জার গম্বুজ দেখা যাইতেছে, ঠিক যেমন সে দেখিয়াছে ভারশৌএর* ইতালীয় কুল্পিবরফের দোকানগুলায়। নীল জল, নীল আকাশ, লাল ও সবুজ রঙের গন্দোলা, এবং গন্দে’লার মাঝিদের মিষ্টি তেনর + । সুধু পাঁচ শত জলতী পাইলেই যথেষ্ট হইবে, এমন কি পারীটা পর্যন্ত দেখা হইয়া যায়। পারী সম্বন্ধে সে কত বই পড়িয়াছে, কত ছবি দেখিয়াছে। জোসেফিন্ বেকারও নাকি পারতেই বেশীর ভাগ থাকে। পারীতে কত অদ্ভুত ব্যাপারই না ঘটে যাহার কথা সে অতি মনােযােগ সহকারে চায়ের দোকানে বসিয়া চিত্রিত সাপ্তাহিক- গুলাতে পড়িয়া থাকে। একখানা সাপ্তাহিকের একটি বিশেষ ছবির কথা। তাহার মনে পড়িল। নেগ্লিজে-পর একটি মেয়ে বারান্দায় পাতা বেতের চেয়ারে বসিয়া একচোখ টিপিয়া আপন প্রস্ফুটিত বক্ষের প্রতি ভারী একটা মুখরােচক ইশারা করিতেছে । পারীতে নাকি এমন দৃশ্য বিরল নয়, দু’পয়সা খরচ করলে নাকি ইহার চেয়েও অধিক সুড়সুড়ি-দায়ক দৃশ্য দেখা * পােলদেশের রাজধানী, ইং ওয়ারস। t Tenor, সঙ্গীতে কণ্ঠস্বরের প্রকার ভেদ। ৩১ হাতের কান যান, এবং আরাে দু’পয়সা খরচ করিলে উক্ত মেয়েটির মরালগ্রীব-বিনিনিত হাত দুখানাও তাহার গলায় অতি মৃদু, অতি মধুরভাবে পুরাইয়া দিতে পারে। এবং তারপর আরাে দু'পয়সা খরচ করিলে এবং আরাে দু’পয়সা.. সহসা পান্না কাতাঝীনার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর জামাইয়ের অমন চমৎকার দিবাস্বপ্নটা একেবারে মাটি করিয়া দিল। পান্না পান্না কাতাঝীনা নূতন প্রসঙ্গের উত্থাপন করিলেন— “ভগবানের এমনই সুখু বিচার যে মানুষকে না খাটিয়ে তিনি এক পয়সা দিতে চান্ না। ভাগ্যের ফের, কখনো ওঠে, কখনাে নাবে । এই দেখো না লটারীর টাকাগুলো জিৎলুম, একটা-আধটা জলতী নয়, গত ১,০০০! ভাবলুম, এবার আমার দুঃখ ঘুচলো, জীবনের শেষ কট বচ্ছর আর হা-পয়সা জো-পয়সা করে কাটাতে হবে না। টাকাগুলো বা জমা রাখলুম, ভাবলুম, সুদে খাটালে, কী জানি বাপু কে ফাকি দেয় না দেন। বাঙ্কে কম সুদ, তা কমই সই। সেখানে চোর-জোচ্চোরের বালাই নেই। মাসে মাসে সুদ পাই আর কিছু কিছু আসল ভাঙ্গাই, এমনি করে’ মাস কয়েক কাটলাে। তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এক নতুন গেরাে। প্রশে পাস্ত ভা, দিনে-দুপুরে পথ চলতে চলতে কলার খােসায় পা দিয়ে পিছলে পড়ে গিয়ে পাটা ভাঙলুম ! ছ’টি মাস হাসপাতালে শুয়ে ! ডাক্তারেরা বলে অস্তর করতে হবে, হাড়টা নাকি ভেঙে একেবারে দু’টুকরাে হয়ে গেছে। পায়ের মাংস কেটে ভাঙা হাড়টাকে টেনে বার করতে হবে, তারপর হাড়ের টুকরাে দু’টোকে ইস্কুপ দিয়ে জোড়া দিতে হবে, এবং সেই অবস্থায় কড়িকাঠ থেকে দড়ি দিয়ে বেধে পাটাকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে ছ’টি মাস, যেন মাংসের দোকানে ভেড়ার ঠ্যাং !” উক্ত উপমায় উপস্থিত সকলেই টেবিলের উপরে সাজানো, নানা ইমিয়েনীন্তী নয় ! অলঙ্কারে অলঙ্কত ও নানা রূপে রূপান্তরিত মাংসের খাবারগুলার প্রতি আপন অজ্ঞাতসারে একবার দৃষ্টিপাত করিল। ছােট মেয়ে হাকার ভিতরটার একটা মােচড় দিয়া উঠিল, সে মা’কে সাহায্য করিবার অছিলায় সেই যে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল তাহার পর তাহাকে আর দেখা গেল না। পান্না কাতাঝীনা কহিতে লাগিলেন- “তারপর, প্রশে পাস্ত ভা, ২৫০০০ জলতীর ১৫০০০ চোখের নিমেষে বেন একেবারে উবে গেল ; ডাক্তাররে, ওষুধরে, পত্তিরে। দু’টি মাস বিছনায় শুয়ে, আর পাটা কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে, যেন সেটা আমার পা’ তারপর সেরে উঠে গেলুম হাওয়া বদলাতে পাহাড়ে, এক সানাতো- বউমে, আবাে পাঁচ হাজার গেল তাতে। তারপর যে ডাক্তার চিকিচ্ছে করে আমার সারিয়ে তুললে, ভারী সোঁদর-সুপুরুষ মানুষটে, তাকে একটা সােনার ঘড়ি কিনে উপহার দিলুম, দামী ঘড়ি, তার উল্টো দিকে খোদাই করে লেখ, অসীম কৃতজ্ঞতার পরিচায়ক এই সামান্য স্মৃতিচি~- উপকৃতা। তাতেও প্রায় হাজার খানেক জলতী লাগলো। তারপর পাঁচশ' জলতী দিলুম গিয়ে, মানত করেছিলাম যে চেঁস্তোহােভার * মা মারীয়া যদি পাটা ভালাে করে দেন ত মা’কে পাঁচ শ' জলতী গুনে দেবো। তারপর অমুক রে তমুক রে, হেন রে তেন রে। বাকী রইল হাতে কয়েক শ’ জলতী। তাতে ত আর সারা জীবন চলবে না। তাই আবার কাজের খোঁজে বেরুলুম । এখন আবার যে কে সেই, গতর খাটিয়ে খাচ্ছি।” পান্না কাতাঝীনা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। টাকাগুলা যে স: পোলদেশের প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান। চেঁস্তোহাের মান্না পরীক্ষা-পাস, আরােগ্যলাভ প্রভৃতি গুণাবলী-দ্বারা আমাদের কালীঘাটের মা কালীকেও হার মানাইতে পারেন ।
হাতের কাজ ৪ ভয় করে। অমন ক্ষিপ্রগতিতে খরচ হইয়া গেল তাহা শুনিয়া বড়ছেলে ভীতলদ জামাই উভয়েই অকারণে এক গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল ? পান্না কাতাঝীন এক নূতন প্রসঙ্গের উত্থাপন করিলেন— “হাসপাতালে ছ’টা মাস যে করে কাটিয়েচি তা ভাবতেও ‘জীবন’, ‘জীবন, লােকে কথায় বলে, জীবন যদি কোথাও থাকে ত সে বাড়ীতে নয়, রাস্তাঘাটে নয়, থিয়েটার-সিনেমাতে নয়, সে হাসপাতালে ! বিছানায় শুয়ে শুয়ে কত জিনিষই দেখলাম যে তা লিখলে একখানা বই হয়ে যায়। পানস্তভাে বললে বিশ্বেস করবেন না, একবার যে-কাণ্ডটা হলাে আমি যে-ঘরটায় শুয়েছিলুম ঠিক সেই ঘরটার মাঝ-মধ্যিখানে। আমি যে ঘরটায় শুয়েছিলুম সেটা অন্তর-করা রুগীদের ঘর । রুগীদের চেহারাগুলাের কথা মনে পড়লে যেন গাটা শিউরে ওঠে! কারাে সর্বাঙ্গ বেজে-করা, সুধু নাকটা খােলা, কারাে বা একটা হাত নেই, কারাে বা পাদুটোর একটাও নেই। সবাই মড়ার মতন পড়ে আচে, সুধু নিঃশ্বেস ফেলার সঙ্গে সঙ্গে গায়ের কম্বলটা একটু একটু কাঁপচে মাত্র। আমার একটু দুরেই একটা রুগী ছিল, বয়েস বেশী হবে না মেয়েমানুষটার, বছর তিরিশ বত্রিশ হবে। তার পায়ে একটা কী অন্তর করা হয়েছে। তার মুখ দেখে মনে হয় না যে তার কোনাে অসুখ-বিসুখ করেছে, সুধু শুয়ে থাকে আর বই পড়ে, আর না হয় ঘুমােয়। এখন হয়েছে কী, একদিন মাঝ-রাত্তিরে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার অন্তর-করা আঙুলটা দিয়ে টপ টপ করে রক্ত পড়ে বেণ্ডেজটা একেবারে ভিজে উঠেছে। তা কোথায় নাকে ডাক্ তা নয়, ব’লবাে কী, প্রশে পাস্ত ভা, মাগীটা সটান্ উঠে গিয়ে একটা বাৰ্তী এনে বিছানার তলায় রেখে আবার পাশ ফিরে শুলাে ! আমি বলি কী জানি বাপু, হয়তাে ডাক্তারে তাই বলেচে। অমন দুয়াে মাগীটার ঘটে অতটুকু ৩৪ ইমিয়েনী বুদ্ধি নেই, তা আমি জানবো কেমন করে গা ! বলি, হয়তাে বুদবুক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। তারপর, প্রশে পাস্ত , সারারাত ট, টপ,ন্ট, টপ, ঠিক ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতন টপ, টপ, টপ, টপ। সারারাত আমি চোখে-পাতায় করতে পারি নে। মানুষটোর পা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে, বিছানা ফুড়ে নীচের বাৰ্তীটার ভেতর গিয়ে পড়চে, টপ, টপ, টপ, টপ! ভাের বেলায় যখন নাস এলো তখন তার শেষ হয়ে গেছে।” পান্না কাতাঝীনা কিছুক্ষণ চুপ করিলেন, বড় মেয়ে ভান্দা উঠিয়া স্বামীর কানে ফিফিস্ করিয়া কী বলিয়া বিদায় না লইয়াই তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেল। পান্না কাতাঝীন পুনরায় শুরু করিলেন— “হাসপাতালে যেসব কাণ্ড ঘটে তা, প্রশে পাস্তভা, কোনাে নভেল- নাটকেও পড়া যায় না। শােনােই না গো একবার কী-ব্যাপারটা ঘটলো! অবশ্য সে আমাদের ঘরে নয়, মড়ার ঘরটায়।” মৃত্যু ও মৃতদেহের কথা শুনিয়া জামাই যেন একটু অস্বস্তি বােধ করিতে লাগিল। আজ গত ৬৫ বৎসর ধরিয়া সে মৃত্যুকে ফাকি দিয়া আসিয়াছে, মৃত্যুর কথা যখনই মনে হইয়াছে তখনই সে একটা না একটা বৈজ্ঞানিক বা রাজনৈতিক প্রশ্ন লইয়া দিনের পর দিন বই পড়িয়া কাটইয়াছে। সহসা পান্না কাতাঝীনার বাস্তবিকতাপূর্ণ কী এক মৃত্যুর কাহিনীর ভয় তাহাকে কিছু বিহ্বল করিয়া ফেলিল। কোনো অছিলায় ওঠা যায় কি না তাহা ভাবিবার আগেই পান্না কাতাঝীনা নূন কাহিনী সুরু করিলেন- “প্রশে পাস্তভা, এ গল্প নয়, একেবারে সত্যি ঘটনা, বাস্তব। আমি বে-হাসপাতালটায় ছিলুম, তাতে পুরুষ নাসও ছিল, মেয়ে নাও ছিল। পুরুষদের ঘরে প্রায়ই পুরুষ না থাকতো। এখন হয়েছে কী, মড়ার ঘরে সেদিন গােটা দশেক লাশ পড়ে আছে।
হাতের কাজ সুড়ঙ্গের মতন ঘরটায় সারি সারি খাট পাতা, আর তার ওপর রুগীগুলাে যেমন শুয়ে ছিল, মারা যাওয়ার পরও তেমনি অবস্থাতেই মড়ার ঘরে শুয়ে আছে, সুধু শাদা কাপড় দিয়ে তাদের আপাদমস্তক ঢাকা দেওয়া। মস্ত বড় ঘরখানা, সেখানে দিনের বেলাতেও অন্ধকার থম-ম করে। সারি সারি শাদা কাপড়ে ঢাকা মড়া, সুধু দু’একখানা খাট খালি পড়ে আচে। এখন, মড়ার ঘরে সারা রাত একজন চৌকিদার থাকে, কেন কী জানি বাপু! তা হয়েছে কী, একদিন রাত্তির বেশ গভীর হয়ে এসেচে, চৌকিদারটা দোরের কাছে বসে ঝিমােচ্চ। ঘরের এককোণে মিটমিট করে সুধু একটা আলাে জ্বলছে। হঠাৎ চৌকিদারটা চোখ চেয়ে দেখে, একটা মড়া যেন একটু নড়ে উঠলাে। ভাবলে, হয়তো তাব চোখের ভুল। দু’চার বার পায়চারী করে আবার তার চেয়ারটাতে এসে বসলাে। কিছুক্ষণ পরে দেখে ওমা, মড়াটা দিব্যি পাশ ফিরে শুলাে। সর্বনাশ ! ভয়ে তার প্রাণ একেবারে শুকিয়ে উঠেছে। ভাবলে, পালাবে কি পালাবে না। কাঠখােট্টা গোঁয়ার-গােবিন্দ গােছের লােকটা, তা না হলে কি তাকে মড়ার ঘরে চৌকি দিতে দিয়েছে ? ভাবলে, না পালাবে না, ও ভূত-পেরেত কিছু নয়, হয়তো একটা মড়া বেচে উঠেছে। এমনও ত হয় গাে বাছা ? , সাহস করে এগিয়ে গিয়ে মড়াটার খাটের কাছে দাড়িয়ে ভাবছে, কী করবে? দেখে, মড়াটার নিশ্বেসে তার মুখের কাপড়টা থেকে থেকে কেঁপে উঠচে। বলে, দেখিই না ব্যাপারটা কী ! বলে তার মুখের ওপর থেকে কাপড়টা খুলে ফেললে। দেখে—” পান্না কাকীনা পাকা গল্প-লেখকদের মত গল্পের শেষের দিকে হঠাৎ থামিয়া গেলেন। পানী যানীনার পােয্যপুত্র ( জিজ্ঞাসা-চিহ্ন) পান্ তাদেউশ, অধীরভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “কী দেখলে” ?
ইমিয়েনা পান্না কাতাঝীনা গম্ভীর, কম্পিত কণ্ঠে বলিলেন- “দেখে, একটা পুরুষ নার্স, কাজে ফাকি দেবার মৎলবে মড়ার ঘরে এসে মড়াদের পাশাপাশি মুখে ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়েছে। জলজ্যান্ত মানুষটা দশট। লাশের মাঝ-মধ্যিখানে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্চে !" জামাই একটু ইতস্ততঃ করিয়া দাড়াইয়া উঠিল, বলিল, “ভালেচকার শরীরটা তেমন ভালাে নেই। সে বাড়ী চলে গেচে, দেখি গিয়ে সে কেমন আচে। মা করবেন, ভান্দচকা যদি ভালো থাকে ত তাকে নিয়ে আবার আসবো এক্ষুনি।” বলিয়া সে পান্না কাতাঝীনার হস্তচুম্বন করিয়া যৌন- পরিপূর্ণ পদবিক্ষেপে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। বড়ছেলে পান্ ভীত অধীরভাবে ঘড়ির দিকে তাকাইয়া তাহার চেয়ারটার উপর মনে মনে কাটা পাঠার মত ছটফট করিতে লাগিল। এতক্ষণে তাহার ইয়ার স্তানিস্লাভের ঘরে নিশ্চয়ই অন্যান্য ইয়ারবুন আসিয়া হাজির হইয়াছে। স্তানিস্লাভ, বােধ করি এইবার তাহার নিজের হাতে তৈরী-করা ভিশূন্যকার * বােতলটা টেবিলের মাঝখানে রাখিল। তাহার পাশে আনারসের ভদকাটাও নিশ্চয় ভােলে নাই, এবং কমলালেবুর ভদকাটাও কি বাদ গিয়াছে ? টেবিলের উপর মস্ত চেটালাে থালায় সাজানো কাভিয়ারের স্যাণ্ডউইচ, তাহার পাশেই শ্লে-মাছের দাগাগুলা অলিভের তেলে ভাসিতেছে। তাহার চারিপাশে মিহি করিয়া কাটা পেঁয়াজ। পান্ ভীত মানসচক্ষে দেখিতে লাগিল, সে নিজে একটুকরা কালাে রুটির উপর কাভিয়ার মাখাইয়া মুখে পূরিয়া দিল, এবং অনতিবিলম্বে গেলাস ভরিয়া খানিকটা ভিন্যু। গলার ভিতর ঢালিয়া দিল। কড়া ভদকা তাহার কণ্ঠ ও পাকস্থলী বাহিয়া ধীরে ধীরে নীচে নামিয়া চলিল। * চেরী-ভদকা।
হা3ে ক = পান ভীত কল্পনার চক্ষে উক্ত পেয়টির উষ্ণ প্রতিক্রিয়া অনুভব কলিতেছে এমন সময়ে পান্না কাতাঝীনা এক নূতন গল্প আরম্ভ করিলেন- “প্রশে পানস্তভা, আর একবার যে কেলেঙ্কারীটা হলো সে কথা নিশ্চয়ই খবরের-কাগজওলার ছাপিয়েচে, পাস্তভো হয়তো পড়ে থাকবেন । সেও আমি হাসপাতালে থাকবার সময়। পাস্তভাে জানেন যে হাসপাতালে ছাত্রদের দেখাবার জন্যে মরা মানুষের হাত, পা, পিলে, ‘লবার, ফুসফুস্ এইসব কড়া হস্পিরিটে জরিয়ে রাখা হয়। মা গো, ভাবতে গেলেও গা’টা ঘিঘিন্ করে ওঠে ! প্রকাও একটা কাচের চৌবাচ্চার এক চৌবাচ্চা ইম্পিরিট, আর তার মধ্যে পিলে, লিবার ফুসফুগুলাে যেন কচ্ছপের মতন ভেসে বেড়াচ্চে। ছাত্রদের যার যখন যেটা দরকার হয়, সেই চৌবাচ্চায় হাত ডুবিয়ে সেটা টেনে তােলে, আবার কাজ হয়ে গেলে চৌবাচ্চার ইম্পিরিটের ভেতর ফেলে দেয়। ভারী কড়া ইম্পিরিট, তাতে মাংসগুলো চট করে পচতে পারে না। এখন হয়েছে কী, হঠাৎ দেখা গেল যে চৌবাচ্চার পিলে, লিবার, ফুসফুগুলো দু’দিন যেতে না বেতেই পচতে সুরু করচে। কী ব্যাপার, কী ব্যাপার! কী ব্যাপার! নিশ্চয়ই ইস্পিরিটে কোন দোষ আছে। তারপর ইস্পিরিট খানিকটে নিয়ে পরীক্ষে করে দেখলে হাসপাতালে, দেখে তার বেশীর ভাগই জল । কী ব্যাপার, ইস্পিরিটে জল কোত্থেকে এল, এই নিয়ে নানা তদন্ত শুরু হ'লে। শেষকালে জানা গেল যা তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে।” সবাই একসঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিল, “তাইত ইম্পিরিটে আবার জল কোথেকে আসবে ? বােধ হয়, দোকানে ভেজাল স্পিরিট বেচেছে।” পান্না কাতাঝীনা কহিলেন— “উঁহু, সে এক অদ্ভুত কাণ্ড! পাস্তভাে বললে বিশ্বেস করবেন না, ইমিয়েনীগী হাসপাতালের কতক গুলাে চাকরে মিলে সেই চৌবাচ্চা থেকে গেলাস ভরে ভরে ইম্পিরিট তুলে নিয়ে ভূকা তৈরী করে গিলেচে, আর তার বদলে দেদার জল ঢেলেচে চৌবাচ্চায় !” পান ভীত পান্না কাতাঝীনার হস্তচুম্বন করিতে করিতে বলিল, “আমায় এক্ষুণি যেতে হলাে, মাপ করবেন। আমার এক বন্ধুর নামও স্তানিস্লাভ, সেখানেও ইমিয়েনীগী, না গেলে রাগ করতে পারে।” বলিয়া সে একপ্রকার ছুটিয়াই ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। পান্না কাতাঝীনা কী একটা নূতন কাহিনী সুরু করিলেন। পানী স্নাননা ও তাহার পােষ্যপুত্র ( জিজ্ঞাসা-চিহ্ন) উভয়েই টেবিলের উপর খাবারগুলার দিকে পিঠ দিয়া বসিয়া সেই গল্প শুনিতে শুনিতে কোনাে- প্রকারে আত্মসম্বরণ করিয়া রহিলেন। পানী স্তানিস্লাভা এতক্ষণ ধরিয়া তাহার “পাক-প্রণালীর উপদেশ অনুসারে কী একটা নূতন রকমের মাংসের পিঠা তাহার নূতন ইলেটিকের উনানটাতে প্রস্তুত করিতে প্রবৃত্ত ছিলেন। খাবারের থালা হাতে করিয়া ঘরে ঢুকিয়া তিনি অবাক্ হইয়া গেলেন, জিজ্ঞাসা করিলেন, “ছেলেমেয়েগুলাে আবার গেলাে কোথায়?” পান্না কাতাঝীনা স্থিরভাবে উত্তর করিলেন, “কেন, যে-যার বাড়ী চলে গেচে। পানীর সঙ্গে দেখা করে যায় নি ? আমায় বললে, এবার আসি তাহলে’, আর আমিও এমন ভােলা মানুষ যে একবার খেয়ে যেতেও বললুম না। তা পানী স্তানিস্লাভাে, আমিও এবার উঠি, রাত হয়েছে অনেক বােধ হয়।” পানী স্তানিস্লাভা বাধা দিয়া বলিলেন, “ওমা সে কি কথা গাে, পাছে কাতাঝীনে! কিছু খেলে না দেলে না এর মধ্যেই উঠচো যে ! না না, তাও কী হয়, কিছু খেয়ে যেতে হবে বৈকি!”
হাতের কাজ পান্না কাতাঝীনা অতিশয় ক্ষোভের সুরে কহিলেন, “পানী স্তানিস্লাভে, খেতে কি আমার অসাধ গাে, কিন্তু খাবে কে ? ডাক্তারে খাওয়া একেবারে প্রায় বারণই করে দিয়েছে, বলে, আমার শরীরে যতগুলাে পাথুরী আচে তা দিয়ে নাকি একখানা বাড়ী গাঁথা যায় ! আজ বাদে কাল আবার একটা অন্তর করাতে হবে। আর খাওয়াও আজকাল যা হয়েছে তা বিষ বললেই হয়। এত বড় বড় হােটেল-রেস্তোরা চলচে, বড় বড় বাড়ী, ফ্যাশানের আসবাব, চাকরবাকর, আর খাবার একেবারে বিষ, খাঁটি বিষ !” বলিতে বলিতে পান্না কাতাঝীনা প্রবেশকক্ষে আসিয়া তাহার পুরুষালী ধরণের পাতাে’টা * পরিতে রত হইলেন। পরে কহিতে লাগিলেন, “আমি হােটেল কিম্বা রেস্তোরাঁর ধার দিয়েও যাই নে পানী স্তানিস্লাভো। হয় নিজে বেঁধে খাই, আর না হয় কারাে, জানা- শােনা লােকের বাড়ীতে, তাও কি কিছু খাবার জো আচে? এক টুকরাে রুটি, একটু মাখন, একবাটি চা, ব্যস! তাও আবার ঘড়ি ধরে। আজকালকার হােটেল-রেস্তোরাগুলােও যা হয়েচে, যত সব রােগের এক একটি ঘটি ! এই কিছুদিন আগে কাগজে পড়েন নি, একটা নামজাদা হােটেলে কী কেলেঙ্কারীটা হলাে! তা বলি শুনুন, পানী- স্তানিস্লাভাে।” সদর দরজাটা খুলিয়া, চৌকাঠের উপর দাঁড়াইয়া পান্না কাতাঝীনা আর এক নূতন গল্প ফাদিয়া বসিলেন- “মস্ত হােটেলটা গাে, কাগজে তার নাম দেয় নি, মােটা ঘুষ খেয়েছে নিশ্চই। যাই হােক, সেই হােটেলে যারা যারা খেতে যেত তাদের অনেকেরই গায়ে হঠাৎ একটা বিদঘুটে রকমের রােগ দেখা দিলে, * ওভারকোট।
ইমিয়েনীন্তী কতকটা কুটের মতন। ডাক্তারের পরীক্ষে করে দেখলে, সে রােগের বীজ কেমন করে খাবারের সঙ্গে শরীরে ঢুকেচে। তাই নিয়ে হােটলের খাবার সম্বন্ধে তদন্ত শুরু হ’গো। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল ব্যাপারটা এই : কী একটা গরম দেশের একটা বিদঘুটে রাগেব বীজ নিয়ে এখানকার একটা হাসপাতালে কয়েকজন ডাক্তার কতক গুলাে খরগােশের ওপর পরীক্ষে করছিল, রােগটার একটা ওষুধ বের করতে পারলে নাকি ওলন্দাজ সরকারের কাছ থেকে অনেক টাকা পুরস্কার পাওয়া যাবে। সে যাই হােক, এখন হয়েছে কী—সেই হাসপাতালের একটা চাকরখরগােশ- গুলাে ফেলে না দিয়ে সটান্ সেই হােটেলে এসে বেচে দিয়ে যেত। সস্তার খরগােশ হােটেল ওলাও দেদার কিনে খদ্দেরদের পাতে দিতে লাগলাে। দেখ দিকি একবার লােকটার কাণ্ড! রুগ্ন খরগোেশ গুলাে মানুষকে খাওয়ানাে! তাই বলি পানী স্তানিস্লাভাে, পানী এত কষ্ট করে খাবার দাবারগুলাে তৈরী করলেন, আর ছেলেমেয়েরা কেউ তা মুখে পর্যন্ত দিলে না! আজকালকার ছেলেমেয়ে, তাদের যত সব ফ্যাশানের হােটেল-রেস্তোরা ছাড়া আর কিছু ভালাে লাগে না। পয়সা দিয়ে কেবল বিষ কিনে খাওয়া। আচ্ছা, আসি তাহলে আমি এইবার পানী স্তানিস্লাভ, আজ সন্ধ্যেটা পানীর বাড়ীতে বেশ কাটলাে। আসবেন একদিন আমার ওখানে যদি সময় পান্, আমি বিকেলের দিকে প্রায়ই বাড়ী থাকি। আচ্ছা, আসি তাহলে।” বলিয়া পান্না কাতাঝীনা বাহির হইতে ঝনাৎ করিয়া সদর দরজাটা বন্ধ করিয়া দিলেন। দরজার ওদিক হইতে তাহার স্বগত কথােপকথন বহুক্ষণ পর্যন্ত শােনা গেল--“এই দেখাে না, সিড়ির আলােটা আবার নিবে গেছে! সুইচটা কোথায় কে জানে, হ্যা এই যে, এইবার আলােটা জ্বালা গেল, আবার নিবে না আজকালকার যতসব কলকারখানা, আলােটাও আবার যায়। ৪১ হাতের কা আপনা-আপনি নিবে যায়। বা রাস্তার আলো দেখা যাচ্চে, ওমা, আবার বৃষ্টি পড়চে যে গো, পােড়া কপাল আমার, ছাতাটাও আনতে ভুলে গেচি” ইত্যাদি ইত্যাদি। পানী স্তানিস্লাভ ঘরে ঢুকিয়া দেখিলেন, টেবিলের উপর অত ধরে সাজানো খাবারগুলা কেহ স্পর্শ পর্যন্ত করে নাই। পানী রানীন দিনটার উপর আধো-শােয়া অবস্থায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন, এবং তাহার পােযপুত্র ( জিজ্ঞাসা-চিহ্ন) একটা চেয়ারে বসিয়া আর একটা চেয়ারের পিঠের উপর মাথা রাখিয়া অসাড়ে নিদ্রা যাইতেছে। কাহাকেও না জাগাইয়া, পানী স্তানিস্লাভা পা টিপিয়া আপন ঘরে আসিয়া আলােট। নিবাইয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলেন। নিত্যকার অভ্যাস মত নিদ্রার পূর্বে তাহার পুত্রকন্যাদের কল্যাণে প্রার্থনা করিবার কথাটা পর্যন্ত আজ তাহার মনে রহিল না। ভারশে, ২৫শে মে, ১৯৩৮ মাদা ইউরােপের পেট্রোল-চালিত লৌহ-সভ্যতা যখন পাথর-বাধা পৃথিবীর বুকের উপর হাতুড়ী পিটিতে পিটিতে ক্ষেপার মত ছুটিয়া বেড়ায়, তখন পিঠের কালাে চুলের বেণী খেলাইয়া, নানারঙের ঘাার ঢেউ তুলিয়া দলে দলে বেদেনী, দেমাক্-ভরা পা ফেলিয়া নৃত্যের তালে দেহ দুলাইয়া পথ চলে (ক্রাশের পর ক্রোশ। গ্রীষ্মের এক স্বেদ-সিক্ত মধ্যাহ্নে ভারশৌএর একখানা আফিস-মুখে ট্রামে এক নগ্নদেহ শিশুকে কোলে লইয়া যুবতী বেদেনী আসিয়া উঠিল। পরনে সবুজ জমীর উপর লাল ফুল আঁকা ঘাঘ, হলুদ রঙের কঁচুলী, মাথায় একখানা লাল টকটকে রুমাল কাকপক্ষের মত কালো চুলের রাশি আলগােছে ধরিয়া রাখিয়াছে। দুইখানা নগ্নহাতের উষ্ণ স্নেহে শিশুকে কে চাপিয়া ধরিয়া সে একপাশে দাড়াইল। তাহার বয়স বছর কুড়ি হইবে, শরীরের প্রতি অঙ্গে যৌবন উছলিয়া পড়িতেছে। পুরু ঠোটের কুটিল রে গালের উপর হাসির ঘূর্ণির মত টোল দুইটার সঙ্গে মিশিয়াছে ।
হাতের কাজ টানা ভুরুর কোলে চোখ দুইটা যেন কালে আগুন। শিশুর কচি আঙ্গুল গুল চুম্বন করিয়া বেদেনী যেন তাহার মুখের উপর আঁকা কত কী গুপ্ত সৌন্দর্য দুই চোখ ভরিয়া দেখিতে লাগিল। কালাে আফিসী পােষাক পরা, ছড়ি ও দস্তানা হাতে উচ্চপদস্থ ভদ্র- লােকটি একটু সরিয়া দাড়াইলেন। বেদেনীর আক্রবিহীন অস্তিত্বটা তাহাকে একটু বিব্রত করিয়া তুলিল। খালি পায়ে পথ চলিলে অনভ্যস্ত মানুষের গা’টা যেমন সি-সির করিয়া উঠে, তাহার সর্বশরীরে ঐরকম একটা অনুভূতি মাকড়সার মত হাঁটিয়া বেড়াইতে লাগিল। হাতের পুরাণ ইংরেজী টাইখানা খুলিয়া তিনি তাহাতে মনােনিবেশ করিলেন। বছর তিনেকের একটি ছােট ছেলে বেদেনীর দিকে আঙ্গুল দেখাইয়া ফিফিস্ করিয়া তাহার মা’র কানে-কানে বলিল-“দেখুঁচো মা, খােকাটা একবারে নেংটা!” তাহার হাতের উপর মৃদু আঘাত করিয়া মা বলিলেন —“দুষ্ট ছেলে, অসভ্য ছেলে, ওদিকে তাের তাকাতে হবে না—ঐ দেখ দেখুঁচি, ঐ মস্ত কালাে ঘােড়াটা, ইস্ ওর গায়ে কী ভীষণ জোর, ঐ প্রকাণ্ড মালগাড়ীখানাকে টেনে নিয়ে চলেছে। আর ঐ দে কী সুন্দর কুকুরটা, দেচি” মার কথায় কান না দিয়া ছেলেটি জিজ্ঞাসা করিল “অতবড় পানী,* ওর পায়ে জুতা নেই কেন ?” চোখ রাঙাইয়া মা তাহাকে ট্রামের জানালা দিয়া পথের নানা বিচিত্র দ্রব্যসামগ্রী দেখাইতে লাগিলেন—“দেখচিস্ ঐ লােকটা কতগুলাে ফানুস নিয়ে চলেছে? কিনে দেবােখন একটা—কী সুন্দর মটর-গাড়ীটা গাে ! আচ্ছা, আমরা যখন মটর কিনবাে তখন কী রঙের মটর কেনা যাবে বক্ততা।” : “মহিলা”। ৪৪ মাদনা উত্তরে কিছুক্ষণ ভাবিয়া ছেলেটি বলিল—“বেগুনী রঙের”। কিন্তু তাহার মনের চারিপাশে অতবড় পানীর পায়ে জুতা নাই কেন, এবং থােকাটা নেংটা কেন, এই দুইটা প্রশ্ন ঘুরিয়া ফিরিয়া পায়চারী করিতে লালিল। বেদেনীর ঐ লজ্জা-সরমহীন ব্যবহার লইয়া দুইটা চাষী বুড়ী আপােষে অালােচনা শুরু করিল—“হ্যাঃ, বেদেমাগীদের আবার নজ্জাসরম! দু'টো পা দু'টো হাত থাকলেই কি আর মানুষ বলে মা ! জংলী, জংলী মানুষ ও গুনাে, ওদের আবার নজ্জামান, সভ্যতা-ভব্যতা! কাতলি হলেও বা কতা ছেলাে ! ভগমান্ জানেন আগুন জেলে, নেচে কুঁদে ওদের কী ঢঙের পূজো-আচ্ছে ! ওদের দেবতা আবার দে!-শয়তান্। দেকোনা একবার ছুড়ীটের কাণ্ড, নিজের ত ঐ বেশ তার ওপর আবার ঐ উলঙ্গ ছেলেটারে নে’ নােকসমাজে বেরুননা! দেকোই না ছেলেটা আবার কা’র গায়ে কী না করে দেয় ! ছি ছি ছি ! ঐ জংলী মানুষ- শুনােরে গাড়ীতে ঘোঁড়াতে উটতেই বা দেওয়া কেন বাপু! যত সব বিদিশী মাষে আমাদের সব্বনাশ করলে! এক ইহুদীতে রক্ষে নেই তার ওপর আবার বেদে ! ঐ বেদেনী ছুড়ীদের রূপের ছিরি দেকেই আমাদের মিন্সেগুনাের যেন চোক ঠিরে পড়ে গো ! ব’তে নজ্জায় মরি মা, আমার কর্তার যখন বয়েস ছেলে, তখন ঐ ওদেরই এক বেদেনী ছুড়ীকে নে’ কী ঢলাঢলিটাই করলে! বলে, ওদের সঙ্গে বেইরে যাবে! বলে, ওরা বাদু জানে, আমি সেই যাদু শিববা! দেকো দিকি কাতলিকের কতার ছিরি, যীশুখ্রিষ্টের কাতলিক ধম্ম ছেড়ে উনি ওদের ধন্ম নেবেন । বেদেনীরা যা না জানলে কি আর অমন মন্দ মিন্সেটারে বশ ক’ত্তে পারে! এক ইহুদীর আলায় রক্ষে নেই, তার ওপর আবার বেদে।” ইহুদীর নাম শুনিয়া এক বৃদ্ধ ভদ্রলােক, পােষ্ট-আফিসের কেরাণীর মত চেহারা, কপালে চন্মা তুলিয়া সানের অপর এক বৃদ্ধকে লক্ষ্য করিয়া হাতের কাজ বলিতে লাগিলেন-“ইহুদীগুলােই ত, প্রশে পানা, * জগতের সর্বনাশ করলে! হিটলারকে লােকে মন্দ বলে, কিন্তু প্রশে পানা, জগতের শিরদাড়াটার ওপর ইহুদীরূপ যে পাকা ফোড়াটা, তার ওপর অস্তর যদি করে থাকে কেউ ত সে ঐ পান্ হিটলার! ইউরোেপ সভ্যদেশ, সেখানে অসভ্য মানুষের জায়গা নেই। আমরা, পানিয়ে, ভারী নরম মানুষ। দেখুন না, ঐ বেদেষ্ঠুড়ীটা ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে নিয়ে ট্রামগাড়ীর একেবারে মাঝমধ্যিখানে দাড়িয়ে ! ভেবে দেখুন ত এরকম দৃশ্য কি কল্পনা করা যায় বার্লিনে, পারীতে, লণ্ডনে, নিউইয়র্কে ! দেবে ফাটকে পূরে, সাতদিনের জেল !” বলিতে বলিতে বৃদ্ধ খানিকটা কাশিয়া জানালা দিয়া মহা আড়ম্বরে মুখামৃত ত্যাগ করিলেন, পরে বলিতে লাগিলেন-“বেদে গুলাে, পানিয়ে, চোরের একশেষ ! বাগানের ফল, ক্ষেতের সর্জী এই সন্ধ্যেবেলা গুণে গেঁতে গেলে, পরের দিন সকালে প্রর্শে পান, তার অর্ধেকও নেই । নতুন আনকোরা পােষাকটা, পানিয়ে, পেট্রোল দিয়ে পরিষ্কার করে বারান্দায় শুকোতে দিয়ে একটু পেছন ফিরেছো, কি পােষাকটা নেই। প্রশে পানা, আমি থাকি গ্রামে, বেদের উপদ্রব যে কী তা আমার জানতে বাকী নেই। ঐ নেংটো ছেলেটা, পানিয়ে, একটু বড় হয়ে কথা বলতে শেখবার আগেই চুরী করতে শিখবে! চুরীবিদ্যে, পানিয়ে, ওদের রক্তে। ভারশোতে আমার এক জ্ঞাতি থাকে, পানিয়ে, জোয়ান মানুষটা, লেখাপড়া জানা, অনেকগুলাে বিদেশী পাশ-করা, লণ্ডনে ছিল পূরাে একটি বছর ! পর্শে পানা, এখানে সে থাকে বড় মানুষদের পাড়ায়, চমৎকার আপার্তামেন্ত-এ, কলঘরের মেঝেটা পর্যন্ত * পােল ভাষায় “প্রশে পানা” (পুং) “প্রশে পানী” (স্ত্রী) বা “পানিয়ে” (পুঃ ) আমাদের ভাষায় “মশাই” শব্দের মত কথার যেখানে-সেখানে অজস্র পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। ৪৬) দিন শ্বেতপাথরে বাধানো, কলে গরম জল, খাসা আপাঠামেন্ত, পানিয়ে । একদিন, প্রশে পানা, একটা বেদেনী পথ দিয়ে হেঁকে যাচ্চে, ‘কে হাত গােণাবে, কে হাত গােণাবে! তা সে বলে, দেখিই না বেদেনীর কতবড় বিদ্যে ! বলে’ পানিয়ে, খেলার ছলে বেদেনীটাকে ডেকে হাত গােণাতে দিলে। বেদেনীটা বলে, আমার মুখের দিকে তাকাও’! তার খানিক পরে ঐ অতগুলাে পাশ-করা মানুষটা, পানিয়ে, ব্যাগ খুলে পয়সাকড়ি বা ছিল সব ঐ বেদেনীটার হাতে ! বলে, “কী ব্যাপারটা হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারচি না, শুধু মনে আছে যে ব্যাগ খুলে বেদেনীর হাতে টাকাকড়ি যা ছিল সব দিয়ে দিলুম ! দেখুন দেখি চোর মাগীটার কাণ্ড! বেদেনী চলে যাবার অনেকক্ষণ পরে তার হুস হলো। হুস হয়ে দেখে তার সােনর ঘড়িটা নেই ! পুলিশ ডাকো, খোজো বেদেনীকে, আর খোজো! সােনার ঘড়িটা আর নগদ চলি। জলতী, * দু’দু’থানা কড়ি জলতীর নােট, পানিয়ে।” বেদেনী শিশুকে হাসাইবার জন্য তার চিবুক নাড়িয়া, তাহার নিজের ভাষায় কত কী আদরের কথা বলিল, কতপ্রকার মুখভঙ্গী করিল, পরে চোখ ঠারিয়া তাহার ঐ জীবন্ত পুতুলটার কানে কানে কী বলিয়া হাসিয়া উঠিল। ঐ ক্ষুদ্র শিশুটা যেন তাহার প্রেমিক, তাহার সঙ্গে কত ঠাট্টা- তামাসা, কত রঙ্গরস, কত প্রেমালাপ চলিতে লাগিল। সে যে তাহার ছেলে, তাহাকে সে যে গর্ভে ধরিয়াছে, তাহার শরীরের রক্ত দিয়া সে যে গড়া, সে যে তাহার নিজের, সম্পূর্ণ আপনার! বেদেনী আবার শিশুকে বুকের উপর চাপিয়া ধরিল। দুইটা উঁচু ক্লাসের ইস্কুলের ছাত্র, ফিফিস করিয়া বেদেনীর রূপ * ২ লতী--১২ টাকা।
হাতের কাজ প্রভৃতির আলােচনা করিতে লাগিল। চাপা গলায় ইস্কুলী ভাষা কাহারো বুঝিবার সাধ্য নাই। খিখিল করিয়া হাসিয়া একজন অপরের পিঠে চাপড় মারিয়া বলিল,-“যাঃ মাইরী, তুই একেবারে উচ্ছন্ন গেছিস?” বেদেনীর শিশু হাসি ছাড়িয়া কান্না শুরু করিল। বেদেনী তাহাকে কত বােঝাইল, কত কথা বলিয়া ভােলাইবার চেষ্টা করিল। শিশুর কান্না থামিল না। তখন বেদেনী তাহার হলুদরঙের কঁচুলী তুলিয়া তাহার ফুটন্ত স্তনের একটা শিশুর বুভুক্ষু মুখে পূরিয়া দিয়া তাহার কপালে চুমা খাইল, এবং পরে সেই অবস্থায় ভিড় ঠেলিয়া, ঘাঘা নাচাইয়া, দেমাক্ভরা পা ফেলিয়া ট্রাম হইতে নামিয়া গেল। ইস্কুলের ছাত্র দুইটি ট্রাম হইতে মুখ বাড়াইয়া হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল—এক বৃদ্ধ অপর বৃদ্ধের প্রতি চোখ ঠারিয়া কী একটা ইশারা করিল–চাষী বুড়ী দুইটা বেদেনীর ছেনালী ও বেহায়াপনায় একমত হইল—এবং ছােট ছেলেটি বায়না ধরিল—“মা, আমার ক্ষিদে পেয়েছে, চকোলেট কিনে দাও।” ভারশো, ৭ই জুন, ১৯৩৮ ৪৮ কারি-পাউডার একদা এক শীতের প্রভাতে ভারশো সহরে যখন ঘটা করিয়া তুষার নামিয়াছে, তখন সদ্য ফু’র আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিয়া শ্ৰীমান সমীর রায় দিভান্-খাটের উপর পালকের লেপে সর্বাঙ্গ ঢাকিয়া, চক্ষু মুদিয়া দেশপ্রেমে মজিয়া আছে। সঙ্কীর্তনের আবেশের মত চেতনা ও অবচেতনার মাঝামাঝি মধুর তন্দ্রা তাহার মনকে মুঠা করিয়া ধরিয়াছে। খােলা জানালার কাছে আলে রাখিবার বাহারে টেবিলটার উপর কড়া কাফি জমিয়া প্রায় বরফ হইয়া উঠিয়াছে। প্রবাসী সমীরের সূক্ষ্মদেহ তখন আমাদের এই বঙ্গদেশের একখানা ঝুল-পড়া, গােবর-লেপা, ওড়িয়া ঠাকুরের গামছা-টাঙাননা রান্নাঘরে টুল পাতিয়া বসিয়াছে। যাদু-কাঠির সংস্পর্শে এক-এক নিমেষেই এক-এক কড়া তরকারি নামিয়া মেঝের উপর পদ্ম-কাটা কঁসি ভত্তী হইতেছে । উচ্ছের সূত্তানী, পালম শাকের ঘণ্ট, বড়ি-হেঁচকি, লাউ-চিঙড়ী, এ চড়ের ডান্না, বাঁধা কোপির দোমা, কুমড়ার ছক্কা, পােনা মাছের কালিয়া, মুডাের দাল, মাংসের ঝােল, ছানার পােলাও ইত্যাদি ইত্যাদি। যেন ৪৯ হাতের কাজ লন্দনে থাকিবার সময় ইহার সমস্তগুলির দর্শন না পাইলেও, আহাদ। আলাদা মা কিনিয়া দু'একটা গৃহস্থ-পােষা তরকারি বেশ ভালাে করিয়াই রাঁধা যাইত। অন্ততঃ মুডাের ঘন্ট, আলুর দম, বা মুলাে, আলুর খােসা, স্পিনে , বেগুন, বরবটি, কচি পেঁয়াজ এবং “প্রণের বাচ্চা দিয়া, আর তাহাতে বহুদিনের পুরাণাে ছাতা-পড়া একটু জলপাইয়ের তেল দিয়া একটা চচ্চড়ি, এবং মটর বা মুসুরীর দাল রাঁধিতে ভাবিতে হইত না, বা টিউব ভাড়া দিয়া পিকাদিল্লীতে বার্কারের দোকান পর্যন্ত ধাওয়া করিতে হইত না। ঐ গলির বাকে গ্রোসারের দোকানটাতেই টিনভরা কারি- পাউডার পাওয়া যাইত, ম্যালে কারি, বেঙ্গল কারি, ম্যাড্রা কারি, ছােট চার আউন্সের টিন, বড় এক পাউণ্ডের টিন। সরিষার তেল হাতের কাছে না পাওয়া যাইলেও অলিভ অয়েলের অভাব ছিল না। ভারশোএ আসিয়া সমীর ঠিকানার বই খুলিয়া প্রত্যেকটি মুদী বা বেনের দোকানে খোঁজ লইয়াছে, কিন্তু কারি-পাউডার বা তদ্বিধ কোনো মসল্লার তল্লাস পায় নাই। অবশেষে পরিচিত এক উদ্ভি-শাস্ত্রজ্ঞ অধ্যাপকের সাহায্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ গ্রন্থাগারের মােটা মােটা বই হাটুকাইয়া সে একবার হলুদের সন্ধান পায় ভারশৌএর সব চেয়ে বড় ডাক্তারখানায়। চকে, ঝকঝকে আমারীর ভিতর সুন্দর গলাটেপা শিশিতে সুপারী-কুচীর মত ছােট ছােট টুকরা করিয়া কাটা হলুদ; শিশির উপর বাহার করিয়া লেখা Curcuma longa, ভেষজটির প্রতি লেখকের ভীতি ও ভক্তির সাক্ষ্য দেয়। পরিষ্কার কাগজের ছােট্ট খামের ভিতর অতি সন্তর্পণে ঢালিয়া দিল, কম্পাউণ্ডার-মেয়েটি, আধ আউন্স। সমীর কৃত্রিম বাল-সুলভ সরলতা, প্রতিভা-উদ্দীপ্ত প্রেক্ষণ, মজার মজার গল্প বলিয়া হাসানন, প্রভৃতি পুরুষের করগত স্ত্রীজাতিকে বশ করিবার মহা মহা ব্রহ্মাস্ত্র গুলি প্ৰয়ােগ করিয়া ও মেয়েটির মন গলাইতে পারে নাই। ৫০ কারি-পাউডার গম্ভীরভাবে আধ আউন্স হলুদসহ কাগজের মােড়কটি সমীরের সামনে ধরিয়া দিয়া, দু'একবার গলা সাফ করিয়া লইয়া, লজ্জায় অপােবদন হইয়া বলিয়াছিল—“ছেলেপুলেদের কৃমিবােগ ঐটুকুতেই সেরে যাবে। করে আসছে বারে ডাক্তারের প্রেক্রিপশন্ নিয়ে আসবেন।” আধ আউন্স হলুদের সঙ্গে খানিকটা লঙ্কার গুড়া ও রাই সরিষা পিবিয়া দিয়া সমীর যে মাংস রাঁধিয়াছিল, তাহা খাইয়া তাহার এদেশী বন্ধু-বান্ধবীরা বলিয়াছিল, এরূপ প্রথম শ্রেণীর হাঙ্গারীয় গুলশ, তাহার জীবনে আস্বাদন করে নাই। দিনটা যে-ভাবের সে-রকম দিন বাংলাদেশে হইলে ঠাকুরকে ছুটি দিয়া বঙ্গবন্ধুগণ ফুল-কোপি বা ডিমের ভুনি-খিচুড়ী রাবিতে পাকগৃহে আবিভূত হইতেন। সুতরাং সদ্য রােগমুক্ত, প্রবাসী সমীরের মন যে সহসা দেশপ্রেমে মজিবে তাহাতে আর আশ্চৰ্য কী ? বাটনা-বিরহাতুর সমীর কাগজকলম লইয়া লন্দনের এক ভারতীয় বন্ধুকে লিখিল, যেন তাহাকে এক পাউণ্ডের একটা কারি-পাউডারের টিন পত্রপাঠ পাঠাইবার ব্যবস্থা করা হয়। এতৎসহ দাম পাঠানো হইতেছে। হিসাব করিয়া সমীর দেখিল বড়দিন আসিতে এখনও তের দিন বাকী। সুতরাং ঝিকে রান্নার কাজে ছুটি দিয়া বড়দিনের সময় সে-ই মাংসের ঝােল, মাছের কালিয়া ও ডিমের ডান্না স্বহস্তে রাঁধিয়া পরিচিতদের ভূরি-ভােজন করাইবে, একরকম প্রায় স্থির করিয়া ফেলিল। লন্দন হইতে ভারশো পৌছিতে কারি-পাউডারের লাগিতে পারে, খুব বেশী হইলেও এক সপ্তাহ। কিন্তু এক সপ্তাহ ছাড়িয়া দশ দিন কাটিয়া গেল, তখনও কারি-পাউডারের দেখা নাই। পিওন ইলেটি কের বিল দিয়া গেল, বইএর দোকানের বিল দিয়া গেল, গাদাগাদা বিজ্ঞাপনসহ হাতের কাজ ছাপা-চিঠি দিয়া গেল, রাদিও কিনিবার তাগাদা, ভালাে সুট কোথায় তৈরী হয়, তাহাদের সমাচার, ধােপার দোকানের ঠিকানা, কোথায় এক হাল ফ্যাশানের অশনগৃহ খােলা হইয়াছে, তাহার ঠিকানা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এগার দিনের দিনও পীতকলেবর কারি-পাউডারের শিখাগ্রভাগটি পর্যন্ত দেখা গেল না। অবশেষে---২৪শে দিসেম্বর তারিখে ডাকহরকরা আসিয়া ঘণ্টার বােম টিপিল এবং দরজা খােলামাত্রই সমীরের হাতে পােষ্ট-আফিস হইতে আগত এক টুকরা কাগজ গছাইয়া দিয়া একটি সামরিক সেলামের সাহায্যে প্রতিবৎসর খ্ৰীষ্ট-জন্মের দিনে তাহার প্রাপ্যটা স্মরণ করাইয়া দিল। কাগজের টুকরাটি পড়িয়া সমীর তাহার যে মর্ম গ্রহণ করিল তাহা এই যে তাহার নামে লন্দন হইতে একটি পুলিন্দা আসিয়াছে, কিন্তু তাহার ভিতর হলুদ রঙের পদার্থ টির জাতি-নিরূপণ না হওয়া পর্যন্ত উদ্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে তাহা অর্পণ করা যাইতে পারে না। কারণ তজ্জন্য স্বাস্থ্য-মন্ত্রিত্ব, বাণিজ্য-মন্ত্রিত্ব ও রাষ্টকর-মন্ত্রিত্বের অনুজ্ঞা প্রয়ােজন। পিওন আর একটি সমরিক সেলাম ঠুকিয়া পরামর্শ দিল, “প্রশে পান। # আপনি বিদেশী লােক, বড় পােষ্ট-আফিসে ৫৪ নম্বর ঘরে একবার নিজে গিয়ে দেখা করলে, প্রশে পানা, আপনাকে তৎক্ষণাৎ আপনার জিনিষ দিয়ে দিবে। ৫৪ নম্বর ঘরে।” বশিস, লইয়া পিওন আপাদমস্তক রােমে ঢাকিয়া, অভ্রের মত তুষার-রাশির উপর জুতা দিয়া কিচ কিচ, শব্দ করিতে করিতে চলিয়া গেল। দুননা জানালার ভিতর দিয়া সমীর দেখিল বাহিরে রাস্তার দুইপাশে * পােল-ভাষায় “প্রশে পানা” (পুং), “অশে পানী” (স্ত্রী) বা “পানিয়ে” (পুং), আমাদের ভাষায় “মশাই”-শব্দের মত যেখানে-সেখানে অজস্র পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।
কারি-পাউডার মানুষের মাথার সনান বরফ জমিয়াছে, এবং তাহার ভিতর দিয়া পথ করিয়া সারি সারি বড়দিনের ক্রেতার দল চলিয়াছে। তাহাদের কালাে রঙের রােমের পােষাকগুলা তুষারে শাদা হইয়া গেছে। মানুষের ত্বরিত পদবিক্ষেপ দেখিয়া মনে হয় শীত অন্ততঃ ২২ ডিগ্রী শূন্থের নীচে, এবং উত্তুরে হাওয়া জমা ভী-নদী ডিঙ্গাইয়া ভারশো সহরের পথে-ঘাটে প্রেত- নৃত্য সুরু করিয়াছে। সমীর বহুক্ষণ ভাবিয়া দুইটা ওভারকোট এবং রােমের টুপি ও রােমের দস্তানা আঁটিয়া, গলশ, পরিয়া, তাক্সি করিয়া পােষ্ট-আফিস অভিমুখে ধাবিত হইল। যাইবার সময় ঝিকে বলিয়া গেল, সে নিজে এক মজার জিনিষ রধিবে, সুতরাং রান্নার কাজে তার ছুটি। পথে তাক্সি দাড় করাইয়া কিছু উৎকৃষ্ট মেষ-মাংস কিনিতেও সে ভুলিল না। ভেড়ার মাংস ওদেশে একদিন ভিনিগারে জরাইয়া রাখিতে হয়, নচেৎ বােকা গন্ধ মরে না ; তাই একদিন আগেই মাংসটা কিনিয়া রাখিল। বাড়ীতে গােটাকয়েক ছােট এলাচ আছে, লবঙ্গ এবং দারুচিনি ত পাওয়াই যায়, সুতরাং গরম- মল্লার জন্য ভাবনা নাই। এখন তেলটা কী লওয়া যাইবে, অর্ণী না সস্তা দরের অলেই ঝেপাকভী বা অলেই মাকভী কিংবা অলেইনিয়ানী? অবশ্য অলেই ঝেপাকভীটাই নিতান্ত ছােটলােকের খাদ্য হইলেও সরিষার তেলের মত খাইতে। পথে খানিকটা দই এবং কিছু তেজপাতা ও আদার গুড়া লইতে হইবে। সমীর রান্নার ফর্দ করিতে করিতে পােষ্ট-আফিসে আসিয়া পৌছিল । রূপকথার কোষাগারের মত দরজার পর দরজা পার হইয়া ৫৪ নং ঘর-পােষ্ট-অফিসের শুল্ক-বিভাগ। মাঝখানে লম্বা কাঠের কন্তোয়ার, তাহারই দুইপাশে সারি দিয়া দাড়াইয়া আছে শ্রীমান্ সমীরের মতই উমেদারের দল ও সবুজ উর্দি-আঁটা কর্মচারী। একটি কর্মচারী তাহার হাতের কাজ সম্মুখস্থিত প্রার্থীর আবেদনের রায় দিতেছে—“সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এ অ্যালবাম একমাত্র ব্যবসার জন্যেই আমদানী হতে পারে । মরােক্কো চামড়ার বাঁধাই, তার ওপর সােণার জলে ফুলকাটা, নিজের ব্যবহারের জন্যে হতেই পারে না।” উমেদার নিতান্ত বিনীতভাবে আপন এজাহার সুরু করিতেছে—“প্রশে পানা, পানিয়ে দিয়েঝে, আমার কাকা, তিনি আজ দু’মাস হলাে আমেরিকায় গেছেন, তাই, মানে ইয়ে, এই বড়দিনের এই উপহার পাঠিয়েছেন, মানে ইয়ে, উনি জানেন, আমি অটোগ্রাফ জোগাড় কিনা। মানে ইয়ে— কর্মচারী নাকের ডগার কাছে, চশমা নামাইয়া কতকটা শিবচক্ষুর ভাব করিয়া গম্ভীরভাবে শুধাইল—“আপনি বলতে চান, এ অ্যালবাম ব্যবসার জন্যে নয়, আপনার নিজের ব্যবহারের জন্যে ?-- হ্যা, প্রশে পানা। ঠিক বলছেন? হ্যা, প্রশে পানা। ১) ? ঠিক ? আজ্ঞে হ্যা, পানিয়ে দিরেকতঝে। আচ্ছা বেশ, তবে- কর্মচারী কন্তোয়ারের ভিতর হইতে একটি মাঝারী আকারের ছিদ্রকলা বাহির করিয়া তাহার লৌহময় ওষ্ঠ ও অধরের মাঝখানে অ্যালবাম্পানিকে পুরিয়া দিয়া হাতল টিপিয়া দিল। লােকটি হা-হা করিয়া বাধা দিবার আগেই এ্যাম্বামের B-অক্ষর প্রমাণ একটি ছিদ্র মরােক্কো বাঁধনাে মলাটখানাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করিয়া ফেলিল। কর্মচারী তাচ্ছিল্য সহকারে অ্যামখানি কন্তোয়ারের একপাশে ঠেলিয়া দিয়া সমীরের প্রতি মনােযােগ ফিরাইল। সমীর যথাসম্ভব গাম্ভীর্যের সহিত পােষ্ট-আফিসের কাগজের টুকরাটি কারি-পাউডার কর্মচারীর হাতে দিয়া ইংরেজী সুরে পােল-ভাষায় বলিল-“প্রশে পান, আমি বিদেশী। আমার নামে একটা পাসে এসেছে, সেটা নিতে এসেছি।” কর্মচারী কাগজের টুকরাটির উপর চশমাটাকে অনুবিক্ষণের মত ধরিরা কিছুক্ষণ গভীরভাবে প্রণিধান করিল, যেন অধুনা-অজ্ঞাত কী একটা বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কার করিতেছে, পরে বাঙ্কের কেরাণার মত পালিশ-করা ভদ্রতার সহিত বলিল—“আপনার পাপর্ত, ?” পাশের একটি কর্মচারী ফিফিসাইয়া তাহার কানে-কানে বলিল—“হ্যা, বিদেশী না আরো কিছু! লেফকীর বৃটিশ প্রজা, পালেস্তি-তো, আবার বেকিয়ে বেকিয়ে ওর কথা শোেন না।” সমীরের পাল্প, পরীক্ষা করিয়া কর্মচারী শুধাইল—“আপনার জন্ম ?" পরে নিজেই যােগ করিল,-“ওঃ এই যে ! কাকুত্তা, কালকুত্তা।” স্কুলে মুখস্থ করা ভুগােলের পাঠ আওড়াইবার মত হুড় হুড় করিয়া বলিয়া গেল—“বােম্বাই, মাদ্রাস, কাকুত্তা, ওসাকা, নাগাসাকি, দেহী, দালিলি দার্জিলিং থেকে চা আসে। আপনি হিন্দুস!” হ্যা, প্রশে পানা। গান্দী, তাগােরে ? না, তারা আমার সম্পর্কে কেউ হন না। অর্থহীন কথােপকথনকে যথাসম্ভব স্বল্পায়তন করিবার জন্য সমীর কাজের কথা পাড়িল—“দয়া করে প্যাকেষ্টা যদি দেন ত বিশেষ উপকৃত হই।” “প্যাকে?—এতক্ষণ যেন ট্রেনে-আলাপী মানুষের সঙ্গে খােশ গল্প |হইতেছিল। “প্যাকেট! ওঃ! হ্যা। তা আপনি ত বেশ পােলভাষা * ভারশো সহরের ইহুদী ঘেততা।
হাতের কাজ। ? মহা- বলতে পারেন, কোথায় শিখলেন? ঈন্দিয়ে, হিন্দুস্থান, ঈলিয়ে বৃতি- ঈস্কিয়ে। তা প্রশে পানা, আপনি হিন্দুস, ত আপনার মাথায় তুরবান দেখচি না। এই গেল বছর একটা জার্মানী সার্কাস কোম্পানী এসেছিল ভারশৌএ-জী ঈংলিশ, সার্কাস্ না, কী। সেখানে, প্রশে পানা, কুড়িটা হিন্দু দেখালে, সবার মাথায় তুরবান্, পানিয়ে, যেন এক-একজন মাহারায়! কী বলেন আপনারা, মহারায় না মাহারাজা ? हो রাজা! মহারাজা, মহারাজা। কিছুদিন আগেও দেখেচি, এই ভারশৌতেই একজন মহারাজা ছিলেন, পানিয়ে, মাথায় ইয়া তুরবান্। তৰে মানে ইয়ে—ভারশাভীয়াকাদের * তার ভারী পছন্দ। আমারই এক আত্মীয়ের বাড়ী তার নেমন্তন্ন হয়েছিল একদিন, তা সে বলে পানিয়ে, সারাটি সন্ধ্যে ধরে’ পান্ মহারাজা ভারতীয়কাদের সুখ্যাতি করেছেন, বলেন, এত দেশ ঘুরেছি পানিয়ে, ও তােমার ইতালিয়া, ফ্রস্, ইস্পানিয়া, কিন্তু ভারশাভীয়াকাদের মত সুন্দর মেয়ে আমি দেখি নি।” একটু মনরাখা কেঠো হাসি হাসিয়া সমীর আবার কাজের কথা পাড়িল—“প্রশে পানা, প্যাকেটটা-” “ও হাে, প্যাকেট!—এই যে হঁ্যা, বলি এই স্তেফানিয়ে, স্তেফানিয়ে, গিয়ে বল্ পান্ দিরেতরকে, এখানে এক পা হিন্দুস্ এসেছেন, কাকুত্তা থেকে। তঁার একটা কী পার্সেল না কী এসেচে। নম্বর, নম্বর—এই নিয়ে যা কাগজটা, নম্বর এতে আচে। তা, প্রশে পান, আমাদের দেশ আপনার লাগচে কেমন ? কাকুফ, দেখেছেন ? ক্রাকুফ, দেখেছেন ? ভীননা? ভূফ, ? শীতে আপনার কষ্ট হয় না ? আচ্ছা, একটা কথা বলুন ত, পানিয়ে, সত্যি করে’, শুনতে পাই, কিন্তু নিজের চোখে না দেখলে, পানিয়ে, বিশ্বাস হয় না। আপনাদের মােগা না কী বলে, তারা নাকি * ভারশৌএর অধিবাসিনীগণ।
কারি-পাউডার সশরীরে “হিন্দুসের আগমনে স্বয়ং পা দিরের নীচে নামিয়া আসিয়াছেন। সমীরকে দেখিয়া বেশ একটু আশ্চর্য হইয়া দিরের শুধাইলেন—“আপনি হিন্দু, মাহারায়া ?” সমীর উত্তর দিবার আগেই কর্মচারী সংশােধন করিয়া দিল-“পানিয়ে দিরেতঝে, “মহারাজজা', আমরা ভুল করে বলি, ‘মাহারায়।” “মাহারায়।” লইয়া নূতন প্রসঙ্গ উঠিবার আগেই সমীর কাজের কথা পাড়িল—“পানিয়ে বিরেক্তগে, আমার নামে একটা পার্সেল এসেছে, সেটা পেলে বিশেষ উপকৃত হই।” পার্সেল ? হ্যা, পাসেল বটে—কিন্তু-উ-উ-তত আপনাকে আমরা দিতে পারবে না। এজিনিষ এদেশে আনবার হুকুম নেই। কী জিনিষ ? কী জিনিষ, শুনবেন ? স্তেফানিয়ে, স্তেফানিয়ে, এই স্তেফানিয়ে, ডেকে নিয়ে আয় বড়বাবুকে ? ও-জিনিষ, পানিয়ে যার কাছে পাওয়া সায় তার মােটা জরিমানা হয়, প্রশে পানা! বড়বাবু সমীরের প্রতি গভীর রহস্য-পরিপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বেশ একটু কঠোরভাবে কহিলেন—“প্রশে পানা, আপনাদের দেশে নাকি আছার এ-মালের চলন, কিন্তু ইউরােপে (ইউরােপ' কথাটার উপর জোর পড়িল) এসব জিনিষ ব্যবহার করে দুশ্চরিত্র ব্যক্তিরা, তাও অতি গােপনে।” কী জিনিষ ? কী জিনিষ, আপনারই জানা থাকা উচিৎ। যদি ভান করেন যে জানেন না, ত নামটা আমি পুলিসের সামনেই করতে চাই। আরে, প্রর্শে পানা, আপনাদেরই একজন নামজাদা ব্যবস্থাপকসভার হাতের কাজ সভ্য এ-জিনিষ খেয়ে, এদেশে যাতে এর চলন হয়, সে চেষ্টা করবেন বলেছেন।” বটে ?!! কোনো সম্রান্ত ব্যবস্থাপকসভার সভ্যের নামে একরকম বদনাম রটানাের ফলাফল বােধ করি আপনার জানা আছে। বনাম ?! বদনাম নয় ত কি সুনাম !? তাল-তাল গাজা, গুলি, চণ্ডু, চরােশ খাওয়া কী সুনাম পানিয়ে ? (কোটা দেখাইয়া) এই কৌটোভরা বে এতখানি গাঁজা না সিদ্ধিজাতীয় কী পদার্থ, মেদ ঈ ঈদিয়া, তা কী আপনার অজানা ? গাজা?! আরে পানিয়ে, এ-জিনিষে আমাদের নাড়ী কাটা। জন্মাবধি আমরা এ-জিনিষ খেয়ে আসছি, আর আপনি বলেন- বলেন কী, ছেলেবেলা থেকেই এ-জিনিশ খান্ আপনারা? আর কাল আমার এক সহকর্মচারী, ভদ্রলােকের খুব কড়া জিনিষ খাওয়া অভ্যেসে, বলে, দিন্ না পানিয়ে, একটু চেখে দেখা যাক্, বলে’, পানিয়ে, তার পাইপের সিকি-পাইপ ভরে দেশলাই জ্বাললে। তারপর সেই যে ‘আমার শরীরটা কী রকম করছে', বলে, তাক্সি করে বাড়ী গেল, আর তার দেখা নেই। আজ বেচারা আর আফিসে আসেনি। ভারতবর্ষের ওঝারা যাহা পােড়াইয়া তাহার গন্ধে ভূত, প্ৰেতিণী, ব্রহ্মদৈত্য, শঙ্খচূর্ণী, স্কন্ধকাটা প্রভৃতি মহা মহা আত্মাদের আত্মারাম খাঁচা- ছাড়া করাইয়া দেয়, তাহার ধোঁয়া যে বেচারা কর্মচারীর শরীরে অবাধে প্রবেশ করিয়া কণ্ঠনালী দিয়া ফুসফুস্ পর্যন্ত বারকয়েক টহল দিয়া নাসারন্ধ্র-পথে নিঃসৃত হইয়াছে, তাহা মনে করিয়া সমীরের গায়ের ভিতরটায় দড়ি-পাকানাের মত পাক দিতে লাগিল। ব্যাপারটা অনর্থক যাহাতে বেশীদূর গড়াইতে না পায়, সেইজন্য সমীর সথাসম্ভব সংক্ষেপে কারি-পাউডার কারি-পাউডারের একটা বিবরণী দিয়া কহিল—“প্রশেপান, এ সুধু খাদ্য নয়, আমার কাছে এ একেবারে ওযুধের সমান। দুটি বেলা যদি আমাদের পেটে ঐ জিনিষটি একটু করে না পড়ে ত এক টুকরাে রুটি হজম করে কার সাধ্যি। যার যেমন অভ্যেস পানিয়ে। আমার কাছে এ আহার ওষুধ দু’ই।” কিছুক্ষণ ধরিয়া এ ওর দিকে তাকাইতে লাগিল। পরে বড়বাবু, একটিপ নস্য লইলে নস্যি-খােরের মুখখানা যেমন প্রসন্ন-গম্ভীর হইয়া ওঠে, সেইরকম ভাব করিয়া বলিলেন-“বলেছিলুম কিনা, পানিয়ে, এর মধ্যে কোনাে গুরুতর ব্যাপার আছে। এখন বােঝা গেল, এ কোনাে গুপ্ত ওষুধ, মেদ ঈ ঈদিয়া।” পরে চুপি চুপি পা দিরেক্টরের কানে- কানে কহিলেন—“মনে আছে কি, পানিয়ে দিরেকৃতঝে, গত বছরের কাণ্ডটা ? এক ব্যাটা ইহুদী এই কম্ম করছিল । বিদেশ থেকে আনা কী একটা বড়ি খাইয়ে দেশের মেয়েদের সর্বনাশ করছিল।” পান্ দিরের কঠোরস্বরে সমীরকে শুধাইল—“আপনি বলতে চান, এটা খাবার জিনিষ ?” আজ্ঞে হ্যা, পানিয়ে দিবেকতঝে। বিশ্বাস না হয় ত পরখ ক'লেই দেখুন না। পান দিরের কৌটা খুলিয়া পদার্থ টা মুখে দিবার আগে জীব- জগতের স্বভাবসিদ্ধ রীতিতে তাহার একটু আঘ্রাণ লইলেন ও সঙ্গে-সঙ্গে বেসামাল হইয়া পার্শ্বে ই দণ্ডায়মান বড়বাবুর টেকো মাথার উপর বিরাশি- সিক্কা ওজনের একটা হাঁচির ঝটিকাঘাত করিলেন । সমীর প্রস্তাব করিল, সে ঐ কৌটার ঢানায় যতটা ধরে ততটা খাইয়া দেখাইয়া দিবে পদার্থ টা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাহার কথা শুনিয়া এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখিবার জন্য কর্মচারীরা আপন-আপন কাজ ছাড়িয়া হাতের কাজ ভিড় করিয়া দাঁড়াইল। সমীর অসঙ্কোচে ঢান-পরিমাণ কারিপাউডা: মুখে ফেলিয়া তাহা অনায়াসে গলাধঃকরণ করিল। পান্ দিরের ও বড়বাবু উভয়েই স্মিয়মান সমীরের প্রতি ফে-ফেস্ করিয়া তাকাইয় ভারতীয় বােগী-পুরুষদের কজাগত রসি-ভেলি বা ঐধরণের কিছু একট যাদু-কারসাজির প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। প্রথমােক্ত কর্মচারী দেরাজ খুলিয়া একমুঠো আলপিন আনিয়া সমীরের সাননে ধরিয়া কহিল—“পানিয়ে, এ বাজীটাও দেখিয়ে দেবেন নাকি ? সেবার ঈংলিশ, সার্কাসে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল যে দেখাবে, কিন্তু আগুন- খাওয়া দেখালে বটে, তবে মুঠো মুঠো কাটা পেরেক কোয়েকার ওটসের মত কচুমচিয়ে চিবিয়ে খাবার খেলাটা দেখালে না।” সঙ্গে-সঙ্গে রব উঠিল—“হ্যা পানিয়ে, হ্যা পানিয়ে, আর মানুষের মুণ্ডু কেটে তাকে জোড় দেওয়ার খেলাটা, আর জুতাের ভেতর থেকে সাপ বার করবার খেলাটা, এই পা দিরেত রেরই জুতাের ভেতর থেকে বার করুন না, পানিয়ে, আর কী বলে, সেই চোখের নিমিষে গাছ গজানাের খেলাটা, আর মুঠোর ভেতর থেকে আংটি ওড়াবার খেলাটা, আর সেই যে কী বলে, পানিরে মনে পড়ছে না, হঁা, ওভারকোটের ভেতর থেকে একটা ফুটফুটে সুন্দরী। মেয়ে বার করবার বাজীটা, এই আমার ওভারকোটের ভেতর থেকে হ্যা, সেইটে, সেইটে, পানিয়ে, প্রশে পানা, দোহাই আপনার কর্মচারীদের কাছ হইতে কোনােরকমে রেহাই পাইয়া সেই দারুণ শীতে ঘর্মাক্তকলেবর, অবসন্নদেহ সমীর বাড়ী ফিরিয়া পােষ্ট-আফিসের বিধাতাকে একখানি পত্রে আপন নালিশ জানাইল । তাহার পর ভারশৌএর পথের একহাঁটু বরফ উষ্ণ রৌদ্রকিরণে গলিয়া ভীসলা-গর্ভে মিশিল, শীত কাটিয়া বসন্ত উত্তীর্ণ হইল, এবং গ্রীষ্মের প্রথমে ??
কারি-পাউডার “সবুজ-উৎসব” * আসিয়া পড়িল। ছুটির দিনটায় সমীর কল্পনার চক্ষে পাঁচজন বন্ধুবান্ধবীদের লইয়া কারির সসে অভিষিক্ত রাজহংসের পদযুগল, পক্ষদ্বয়, নিটোল বক্ষ প্রভৃতি শরীরাংশের তারিফ করিতেছে, এমন সময়ে তাহার সাকাঙ্খ ইচ্ছাশক্তির জোরে বিধাতার টনক নড়িল। ঝি আসিয়া ডাকহরকরার শুভাগমনবার্তা ঘােঘণা করিল, এবং তাহারই পিছনে একটি সসম্রম সামরিক দণ্ডবতের সাহায্যে পিওন একটা মােটা রকম বশিসের পূর্বাভাষ দিল । “ছে দ িপানু।। এতদিন পরে এল আপনার জিনিষ। বলে- ছিলুম কি না, যে আপনি পানিয়ে বিদিশী মানুষ, হেঁ হে, তাছাড়া সারা পােষ্ট-আফিসে কে না জানে, আপনি হে হে, কি বলে, মাহারাজ,জা! আমি অবিশ্যি আপনাকে প্রথম দিন দেখেই আমার স্ত্রীকে বলেছিলুম, বলি আজ একজনের সঙ্গে দেখা হলাে, তিনি হচ্ছেন হিন্দুস, মহারাজ জা—“বলিতে বলিতে, চামড়ার ঝােলা খুলিয়া একটা পুলিন্দা অতি সন্তর্পণে টেবিলের উপর রাখিল। তাহার পর এক টুকরা কাগজসহ এক লম্বা ফর্দ সমীরের হাতে গছাইয়া দিল। বিল আসিয়াছে ২৫ জুতী, ৫০ গ্ৰশ, । তাহার মধ্যে কারি-- পাউডারের রাসায়নিক পরীক্ষার মজুরী প্রভৃতির সঙ্গে লেখা আছে কারি-পাউডারে পােষ্ট-আফিসের গুদামঘরে ছয় মাস দশ দিনের ভাড়া এত, এবং শুল্ক বাবদ এত। ফর্দ-সংলগ্ন কাগজের টুটির সার মর্ম এই : নিনান্ত দুঃখের সহিত জানানো হইতেছে যে, ভবিষ্যতে এতদ্বিধ : পােলভাষায় “ঝেলনে খ্যন্ত কি”, জুন মাসে অনুষ্ঠিত হয়। । সুপ্রভাত। । ১২।
হাতের কাজ দ্রব্যের, যে-কোনো উদ্দেশ্যেই হউক, আমদানীর জন্য বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রকর-মন্ত্রিত্বের অনুজ্ঞা আবশ্যক। প্রথমে পদার্থ টি কী, তাহা বহু পরীক্ষা সত্বেও জানা যায় নাই। পরে কৌটার উপর স্পষ্টাক্ষরে লিখিত “Curry Powder,” সকল প্রশ্নের সমাধান করিয়া দেয়। ভারশৌএর এক খ্যাতনাম্নী সৌন্দর্য-নিপুণা মত দেন যে, মহিলাদিগের মধ্যে যাহার সখ করিয়া সারাদিন রােদে পুড়িয়া সামান্য কৃষ্ণাঙ্গী হইয়াছেন, তাহাদের মধ্যে পারী হইতে এই জাতীয় মুখ-রেণু আমদানী করা হইতেছে। ডাকহরকরাকে বিদায় দিয়া সমীর যখন কারি-পাউডারের কোটা খুলিয়া তাহার আঘ্রাণ লইল, তখন সে আশৈশব-পরিচিত পিসিমার বড়ি-হেঁচকির উপকরণ, লঙ্কা, হলুদ, ধনে ও সরিষার সংমিশ্রণটিকে চিনিতে পারিল না। ওকলঞ, মিৎসুকো, কনভালিয়া, সঁ ফ্ল্য, নাৎসিস, রে দে রােজ, এবং আরাে শত-শত জ্ঞাত ও অজ্ঞাতকুলশীলাদের সহিত দীর্ঘ ছয় মাস দশ দিনের সহবাসে আমাদের এই ভেতাে বাঙ্গালীর বাচ্চা বেঙ্গল কারি একেবারে আত্মবিস্মৃত হইয়াছে। একটু জিভে দিয়া সমীর দেখিল, স্বাদ বাটনার বটে, তবে গন্ধে সে যে-কোনাে উৎকৃষ্ট মুখ-রেণুকে হার মানাইতে পারে। কলিকাতা, ১২ই চৈত্র, ১৩৪৭ ৬২ তুলা সারাদিন ধরিয়া পথ চলিবার পর সন্ধ্যার কিছু আগে পা দুইটা যখন জগদ্দল পাথরের মত ভারী ও নিসাড় হইয়া উঠিয়াছে, তখন হিসাব করিয়া দেখিলাম, পরবর্তী ক্ষুদ্রতম জনপদ সেখান হইতে প্রায় তিন ক্রোশ। তপনীংসা নদী পার হইয়া জাম। জামশ্চের প্রাচীন সোধাবলী, নরনারীর অঙ্গসৌষ্ঠব ও ভাষার লালিত্য তাহার বিলুপ্ত বংশ- গৌরবের পরিচয় দেয়। তাহার পর মাঠের পথ ধরিয়া, চাষার ঘর, ক্ষেতখামার ও চারণভূমি ছাড়াইয়া ভিয়েপূশেৎস। ভিয়েপশেৎস হইতে রাহদশ, প্রায় সাত ক্রোশ। চলিতে চলিতে পথ ক্রমে জনবিরল হইয়া আসে, এবং আচম্বিতে চোখের সুমুখে আসিয়া দাঁড়ায় উদাত্ত বনানী, পত্র-পল্লব শাখা-প্রশাখার অবারিত বিস্তার আকাশ ধরিয়া ধরিয়া একেবারে দিগন্তে গিয়া ঠেকিয়াছে। ক্ষেত হইতে সদ্য-তােলা আলুর বস্তা-বােঝাই, গাড়ীখানার দুই পাশে চাষী মেয়ের দল, মাথায় রঙিন রুমাল বাঁধিয়া খালি পায়ের অবাধ চলার হাতের কাজ তালে তালে ঘা নাচাইয়া, যেন দিন ও রাত্রির সন্ধিরেখা টানিয়া টানিয়া, কোন অদৃশ্য লােকালয় লক্ষ্য করিয়া চলিয়াছে। মাঠের যে-অংশটায় অরণ্যের পূর্বরাগ, ছােট ছােট ঝােপ-ঝাড়ে পৃথিবীর বুকে সবুজের শিহরণ জাগাইয়াছে, সেইখানে গাড়ী থামাইয়া তাহারা লাল বঁইচের মত বরূফ কি তুলিয়া আপন-আপন এপ্রন্ ভরাইতে লাগিল। কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, রাহদশের পথে ধারে-কাছে রাতের মত কোনাে আশ্রয় পাওয়া যাইবে কিনা। “রাহদশ,” !—সর্বকনিষ্ঠার নিটোল কণ্ঠস্বর “হ”-অক্ষরের উপর লাস্য-বিলাসে ঢলিয়া পড়ে—“রাহদশ ! হেই পানিম্নে, * সে অনেক দুর, জঙ্গলের ভেতর দে’ পথ, এখন নেড়ে নেই বটে, তবে” এ-অঞ্চলের কী একটা দুর্ধর্ষ ভয় যেন তাহাদের অভিভূত করিয়া ফেলিল, লক্ষ্য করিলাম। তাহারা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিয়া চোখের ভাষায় বলাবলি করিতে লাগিল, এই ভর-সন্ধ্যোবেলা কথাটা মনে না করিলেই হইত। তাড়াতাড়ি বরূফ কি ভােলা সাঙ্গ করিয়া, কেঁচড় গুটাইয়া, কপালের উপর ঝাঁপাইয়া-পড়া অতসী-বরণ চুলের গােছ মাথার রঙিন রুমালটার ভিতর গুজিয়া দিয়া, যাইতে প্রস্তুত হইল। তাহাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড় মেয়েটি একটু ইতস্তত করিয়া আগাইয়া আসিয়া সাবলীল উক্রাইনী ছন্দে পােল ভাষায় বলিল—“এই আঁধার রাতে কোথায় যাবে গাে, বাপু? আমরা থাকি এই জঙ্গলের ভেতর, নায়েব বাবুর কুঠীতে, ক্ষেতখামারের কাজকর্ম করি। এসাে * পেলি ভাষায় “পানিয়ে” (পুং), “প্রশে পানা” (পুং), “প্রশে পান।” (স্ত্রী), আমাদের ভাষায় “মশাই”-শব্দের মত যেখানে-সেখানে কথার ফাকে ফাকে অজস্য পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। ৬৪ তুরলাক আমাদের সাতে। আপনারা হ’চ্ছ ভদ্দরনােক, পান নায়েব ভদ্দরনেকের মুখ দেখেন নি আজ কতদিন?” পরে নিতান্ত সমীহভরে যােগ করিল “কথায় বলে, অতিথ এলাে দোরে, না ঠাকুর এলেন ঘরে, পান্ নায়েবের বাড়ীতে জায়গা না হলে, তা * আমাদের কুঁড়েতেই জায়গা করে দেবে’খন।” শেষ কথা কয়টা বলিবার সময় তাহার কেঁাচড় হইতে লাল চক্চকে পুঁতির মত বরূকি গুলা ছর ছর করিয়া ছড়াইয়া পড়িল। তাহার অবস্থা দেখিরা সখীর স্বচ্ছন্দ কলহাস্যে অরণ্যের কুঞ্চিত-ল, সান্ধ্যায়মান গাম্ভীর্যকে বহু দূর পর্যন্ত অপসারিত করিয়া দিল। “ভী-ও! হেৎ-তা!” বলিয়া দলের একটি মেয়ে ঘােড়ার লাগাম তুলিয়া লইয়া, তাহার মসৃণ, তাম্রাভ পৃষ্ঠে মৃদু আঘাত করিল । এবং পথের পাথরে মুহু মুহু স্থলিতচক্র শকট দুরন্ত শিশুর মত টলিতে টলিতে বনানীর বুকে ঝাপাইয়া পড়িল। মাথার উপর, যতদুর দৃষ্টি চলে, সবুজ পটভূমির কোলে হেমন্তের পত্রপুষ্পের হেম আলিম্পন, মাঝে মাঝে আকাশের অবকাশ এবং শতাব্দী বৃদ্ধ সনা, তপলা, বুক্, গাব, ও নবােন্মােষিত রাঝেঙ্গীনা, চেরেহা’র অপ্রতিহত পরিবেষ্টন কী এক বিচিত্র আব্রা রচনা করিয়াছে। সেই অপূর্ব বনসৌধের চন্দ্রাতপতলে কে যেন অতি সন্তর্পণে একটি একটি করিয়া তারার প্রদীপ জ্বালিয়া দিল। ক্ষীণপ্রভ নক্ষত্রের আলােকে কোনােমতে পথ চিনিয়া, পরিচিত সসনা, দম্ব, বা তপলাকে দক্ষিণে, বামে রাখিয়া মেয়েকয়টি নিঃশব্দে অগ্রসর হইতে লাগিল। একটু দূর হইতে অন্ধকারের বুকে তাহাদের অধবদন, অস্পষ্ট রেখা-মুর্তি দেখিয়া মনে হয়, তাহারা যেন মুহ্যমান পদক্ষেপে শবের অনুগমন করিতেছে। : বাবা হাতের কাজ কিছুক্ষণ পথ চলার পর বনবেষ্টনী ঈষৎ শিথিল হইয়া আসে, এবং পাহাড়-ঘেরা হ্রদের মত খানিকটা খােলা জায়গা অশীনা ও বনমালীনার পাতার ফাকে ফাকে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করে। দূরে মাঝে মাঝে একটি একটি করিয়া আলাে ফুটিয়া ওঠে, যেন পর্বতের গহন অধস্তলে হদের শৈবাল-কৃষ্ণ বক্ষে নক্ষত্রের স্তিমিত ছায়াপাত হইয়াছে। এক হাঁটু আগাছার জঙ্গল ভাঙ্গিয়া আমরা একেবারে উন্মুক্ত আকাশের তলায় আসিয়া পড়িলাম। অরণ্যের মুষ্টিবন্ধনের মধ্যে এই সামান্য একটু আলাে-বাতাসের মুক্তির জন্য মেয়েকয়টির প্রাণ যেন উন্মুখ হইয়া ছিল। বনস্পতির শীর্ষে শীর্ষে হাল্কা গান ও দিল-খােলা হাসির প্রতিধ্বনি তুলিয়া, সুস্থ দেহের অসংযত আনন্দে দিগন্ত বিচ্ছুরিত করিয়া তাহারা পথ চলিতে থাকে। হঠাৎ শুনিতে পাই, “বৃ——র, বর—” শব্দে তাহারা অশ্বের গতিরােধ করে। চাহিয়া দেখি, আমরা যেন কোন্ ঐন্দ্রজালিকের মায়ার বশে চোখের নিমেষে দূরত্ব অতিক্রম করিয়া, একেবারে নায়েব-কুঠীর প্রবেশদ্বারের সামনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছি। নায়েব-পরিবার, কয়েক ঘর চাষা, কিছু জমজমা ও গৃহপালিত পশু, এই লইয়া অরণ্যের অন্তঃস্থলে যে উপনিবেশটি গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে দেখিয়া মনে হয়, যেন ইহারা দক্ষিণ আমেরিকার কোন্ এক উত্তুঙ্গ পর্বতের প্রাচীরবেষ্টিত উপত্যকায় বহুকাল ধরিয়া বসবাস করিয়া বৰ্হিজগতের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক-বিচ্যুত হইয়া গেছে। বনভূমির বাহির হইতে আমার আগমনবার্তায় স্বয়ং নায়েব ছুটিয়া আসিয়া আমায় সুধু আলিঙ্গন করিতে বাকী রাখিলেন, এবং আমার স্নানাহারের ব্যবস্থা করিবার জন্য দাসদাসী ও বাড়ীর সকলকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। সেইদিনই প্রভাতে জঙ্গলের ভিতর কয়েকটা বন-খরা ধরা পড়িয়াছে, এবং ইহারই দু'একদিন আগে বেশ বড়গােছর একটা হরিণ তুলাক মারা হইয়াছে। বাড়ীর ভিতের তলায় পিপা-ভরা, মিহি করিয়া কাটা বাধা- কোপি, আপেলের টুকরা ও গাজর-কুচি এবং মৌরী ও ধনে দিয়া জরানো আছে। গৃহকত্রী খরা ও হরিণের মাংস এবং তাহাতে এটা ওটা সেটা মিশাইয়া অপূর্ব “পাতে” প্রস্তুত করিয়াছেন। আগের দিন সমগ্র উপনিবেশের জন্য বালিশের মত বড় বড় দেহাতী পাউরুটি সেঁক। হইয়াছে। দুধ, ছানা ও মাখনের অভাব নাই। এবং আনুষঙ্গিকরূপে আপেলের পিঠা তৈরী করা হইতেছে। সুতরাং এই অরণ্য-নির্বাণী পরিবারে অতিথি-সংকারের অনুষ্ঠানের কোনো ত্রুটি নাই। সান্ধ্যভােজনের শেষ পদ আসিয়া পৌছিতে পৌছিতে রাত্রি প্রায় একটা বাজিয়া গেল। নায়েব আমাকে লইয়া বেঠকখানার আগুনের ধারে আসিয়া বসিলেন। অগ্নিকুণ্ডে দুইটা লােহার শিকের উপর একটা সনার গুড়ি দাউদাউ করিয়া জ্বলিতেছে। তাহারই আলােতে আমরা দুইজনে মুখােমুখি বসিলাম। বন-মালীনার জ্যাম ও আরক মেশানাে দুই গেলাস চা দিয়া গৃহকত্রী রাত্রের মত বিদায় লইয়া গেলেন। হাতে-তৈরী চেরী-কাঠের পাইপ ঠুকিয়া সাফ করিতে করিতে নায়েব আমার দিকে তামাকের বগলী আগাইয়া দিলেন। পরে অগ্নিকুণ্ড হইতে একটা শুনাে দম্বের ডাল জ্বালাইয়া আমার পাইপের উপর ধরিলেন। প্রজ্বলিত সন্নার আলাে ও গন্ধে এবং পাইপের ধোঁয়ায় ঘরটার ভিতর এমন একটি আবহাওয়ার সৃষ্টি করিল যাহাতে অতি সাধারণ কথােপকথনও গল্পের মত দানা বাঁধিয়া ওঠে। বাহিরে হেমন্তের পাতা-ঝরানো ঝড় ও অবিরত বৃষ্টি-উন্মাদিনীর অসান্ত্বন ক্রন্দনের মত বন হইতে বনান্তরে হাহাকার করিয়া ফিরিতেছে। সদ্য নির্বাপিত পাইপে গােটাকয়েক নিফল টান দিয়া নায়েব সহসা শুধাইলেন, “জানলার বাইরে কাউকে দেখলেন ?”
হাতের কাজ । তা হলে আমার চোখের ভুল।পরে কতকটা সবাক্ চিন্তার মত যােগ করিলেন—ব্যাটাকে শেষ করেছি, কিন্তু তবুও কি নিস্তার আছে ? তার পাগলী মাটা সারারাত ধরে’ বনে বনে কেঁদে কেঁদে বেড়ায়। কি জানি, হয়তাে আমার মনের ভুল ! লক্ষ্য করিলাম, এই ঝড় বাদলের রাতে কিসের দুর্নিবার উদ্বেগে নায়েবের মন উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিয়াছে। শিষ্টতা রক্ষা করিবার জন্য নিহত ব্যক্তি সম্বন্ধে কৌতুহল প্রকাশ করায় নায়েব গেলাসের আরক- সুবাসিত চাটুকু নিঃশেষ করিয়া তাহার কাহিনী শুরু করিলেন। আপনি কি ভিয়েপশেৎস্ দিয়ে এলেন ? পথে আসতে আসতে যেটুকু বন দেখেছন তাকে বন বলাও যা, আর মাছিকে হাতী বলাও তাই। প্রশে পানা, সত্যিকার বন যদি দেখতে চান ত কালকের দিনটা থেকে যা শিকোরে বেরুনাে যাবে’খন। এই বৈঠকখানার পেছন দিকটায়, অবশ্য এখন অন্ধকারে কিছু দেখা যাবে না, সুধু শ'খানেক শ’ দুই হাত খােলা জমী, তার পরই জঙ্গল। এমন জঙ্গল এদেশে খুব অল্পই দেখা যায়। আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার যে-সব জঙ্গলের বিবরণ পড়েছি, তাতে মনে হয় আমাদের অঞ্চলের এই জঙ্গলটি তুলনায় খুব কম হবে না। পানিয়ে ! সে জঙ্গলে মাথা গলায় কার সাধ্যি ! কতরকমের যে গাছ আছে পানিয়ে, তার ইয়ত্তাই হয় না। কয়েক বছর আগে বাবুদের এক বন্ধু এসেছিলেন, কোথাকার এক নামজাদা বনিকা’র প্রফেসার, তা তিনি ঐ জঙ্গলে ঢুকে বলেন, “প্রশে পানা, আমার যা বিগ্নে তাতে এসব t গাছপালা নিয়ে গবেষণা করা চলে না। বছর দশ-পনেরাে পড়াশুনাে করে’ আবার আসা যাবে।” আর কত রকমেরই যে জন্তুজানােয়ার! ছােট ছােট খরা থেকে আরম্ভ করে’ হরিণ, খেকশিয়াল, বুননা শাের, নেড়ে, এমন কি ঋ* পর্যন্ত ! খুঁজলে যে দু'একটা ভাল্লুকও পাওয়া যাবে না, এমন বিশ্বাস হয় না। তাছাড়া এত রকমের পাখী সারা ইউরােপে দেখা যায় কিনা সন্দেহ। সাপ-খােপেরও অভাব নেই, পানিয়ে। এক কথায়, ঐ ক্রোশ দুই-তিন জুড়ে যে জঙ্গলটা, ওর ভেতর যে কী আছে না আছে তা কেউ বলতে পারে না। কখনাে কখনাে গাছ কাটাবার জন্যে বা শিকার করতে যাই বটে, কিন্তু ভেতরে ঢুকে বাইরের এই খােলা একটু আলাে- বাতাসের জন্যে প্রাণটা হাঁপিয়ে ওঠে, মনে হয় যেন কোন বন-দানব তার লক্ষ-লক্ষ হাত বাড়িয়ে গলার টুটি চেপে ধরতে আসছে। এই জঙ্গলে আর যাই থাক, এর শত-সহস্র দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বাসিন্দার মধ্যে একটি জীবের সন্ধান পাওয়া গেল, যার অত্যাচারে এ-অঞ্চলের সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাে। সেটি একটি মানুষ। নাম, তুলা। এখন অবশ্য তাকে মানুষ বলছি, কিন্তু যখন সে বেঁচে ছিল, তখন সে যে কে বা কী, তা কেউ জানত না। সবাই জানতে তার নাম তুলা। কিন্তু এই তুলাকে এ-অঞ্চলের চাষা-ভূষােরা একটা জিন্-টি গােছর কিছু বলে মনে করতাে, কারণ তার কার্যকলাপ ছাড়া তার বাস্তবিক অস্তিত্বের কোনো চিহ্নই সে কখনও রেখে যেত না। আমি, প্রশে পানা, আজ তিরিশ বছর বাবুদের জমীদারী দেখাশুননা করছি। রুশীদের আমলে প্রফেসারের সঙ্গে ঝগড়া করে লেখাপড়া ছেড়েছি, সে ত আজকের কথা নয় ! পানিয়ে সেই থেকে আজ তিরশ বছর ধরে বাবুদের জমীদারীর এমন জায়গা নেই, যেখানে আমি ঘুরি নি। * এক প্রকার বাঘের মত বন-বিড়াল। সম্ভবতঃ সং ঋক্ষ শব্দের সহিত সংশ্লিষ্ট।
হাতের কাজ এবং বাবুদের জমীদারীর বহরটা ত আপনার জানাই আছে। ইউরােপের পূর্ব অঞ্চলে তাদের নাম জানে না, এমন কে আছে ? এই তিরিশ বছর ধরে’ কত বনে জঙ্গলে ঘুরেছি তার ইয়ত্তা নেই, এক-এক জায়গায় পাচ-সাত বছর করে থেকেওছি। বললে হয়তাে অনেকে হেসে উড়িয়ে দেবে পানিয়ে, কত রাতে স্বচক্ষে দেখেছি, গাছের ডালের ওপর বসে বেঁটে বেঁটে হােহ লিরা * থিক্-খি করে’ হাছে, কিংবা আমার সামনে এই হাত পঞ্চাশ দূরে আগাছার জঙ্গল মাড়িয়ে মাড়িয়ে হুড়মুড়িয়ে হেঁটে চলেছে অতিকায় বন-দানব, প্রকাণ্ড গাছের মত, তার গা বেয়ে লম্বা লম্বা মসের মত ঝোঁয়া মাটিতে লুটিয়ে চলেছে। পানিয়ে, এসব আমার চোখে দেখা জিনিষ, তা আপনার বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। জীবনে অনেক দুর্ধর্ষ জিনিষ চোখে পড়েছে, কিন্তু তুরলাকের সঙ্গে তুলনা দেবার মতও কিছু দেখলাম না, আজ পর্যন্ত। বাবুদের এই মহলটায় আসি প্রায় পাঁচ বছর আগে, এই পাঁচ বছর ধরে সে আমায় যে-ভােগনটা ভুগিয়েছে তা আমি জীবনে ভুলবাে না। আমার এখানে আসাটাও একরকম দুঃসাহসিক কাজ বলা যেতে পারে। কারণ আমার আগে যিনি ছিলেন তিনি সপরিবারে এই তুরলাকের হাতে প্রাণ হারান। কী ভাবে তাদের খুন করা হয়, তা কেউ জানে না। ভদ্রলােকের চারটে বন্দুক ছিল, আর বাক্সভরা টোটা। একটা হাঁক দিলে দু-দুটো ষণ্ডামার্কা চাষা, আলাদিনের দৈত্যের মত এসে হাজির হয়, তাদের চেহারা ত আপনি নিজেই দেখেছেন। আগেকার নায়েবের সংসার বেশ একটু বড়গােছের ছিল, অনেকগুলি ছেলেপুলে, চাকরদাসী। এতগুলাে মানুষ মারা গেল, কিন্তু এ বাড়ীর বাইরে তা কেউ ঘুণাক্ষরে জানতে পারলে না। সকালে চাষার বৌ দুধ দুইতে এসে দেখে, আপনার * ক্ষুদ্রকায় বন-দানব।
তুরলাক্ পেছনে জাল্লাটার বাইরে যে একটু খােল। জমী, সেখানে নায়েব- পরিবারের অসাড় দেহ সারি-সারি সাজানাে। সাজানাের কায়দাও অদ্ভুত ! ভিজে ঘাসের ওপর রক্তমাখা মৃতদেহগুলো একটার পর একটা এমনভাবে রাখা হয়েছে যে স্পষ্ট অক্ষরে পড়া যায়—TVRLAK. নায়েব পরিবারের ওপর তুলাকের রাগের কারণ আর কিছুই নয়, শুধু জঙ্গলের রাজ্যে তুরলাকের আধিপত্বের ওপর হস্তক্ষেপ। ভদ্রলােক এ-অঞ্চলে আসার পর থেকেই নানা উপায়ে তুরলা তাকে জানিয়ে দেয়, এ-বনের রাজা সে নিজেই, কোনো জমীদার-হ্রারিয়ার * তার একাধিপত্যে হাত দেবার অধিকার নেই। নায়েব-পরিবারের এই রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের একটা মুখ্য কারণ ছিল, তা শুনলে আপনি হয়তাে বেশ একটু আশ্চর্য হবেন। চাষারা বলে, তুরলা নাকি নিজেকে “বন-রক্ষক বলে জাহির করতাে। কোন কোন রাজাদের উপাধি যেমন “ধর্মরক্ষক”, তুরলাকের নিজের দেওয়া নামও তেমনি ছিল “বন-রক্ষক”। লেখাপড়া বিশেষ জানতো কিনা সন্দেহ, কিন্তু চ্যেহভের “বন-দানব” নাটক যা পরে “ন্যা মামা”-রূপে বদল হয়ে ছাপা হয়, মনে আছে বােধ হয় আপনার, গাছপালার প্রাণ বাঁচাবার জন্যে ডাঃ আস্ত্ৰভের সে কী অদ্ভুত নিষ্ঠা !যা সে অন্য কথা, কিন্তু চেহভের “বন-দানবের” খবর সে কোথায় পেলে কে জানে! অথচ এই দুই নাটকে চেহফ, মানুষের নিষ্ঠুর কুঠারাঘাত থেকে গাছপালার প্রাণ বাঁচাবার জন্যে যা-যা বলেছেন, তুলা যেন একেবারে তার হুবহু প্রতীক। আমার পূর্বতনকে সে বারে বারে সাবধান করে দিয়েছে, যেন তুলাকের বন-রাজত্বে একটি গাছের পাত অবধি না হেঁড়া হয়। কথাটা অবশ্য শুনতে ভারী সুন্দর। সত্যিই ত, এই যে লক্ষ-কোটি প্রাণী পৃথিবীর অঙ্কস্থল * কাউন্ট।
হাতের কাজ ভেদ করে আলাে-হাওয়ার ভেতর জন্মলাভ করেছে, এবং শত-শত বছর ধরে’ ধরিত্রীর বক্ষমধু পান করেছে, এদের কি পৃথিবীর কাছে কোনাে দাবী নেই ? আদিম মানুষ যে-অধিকারে বনের পশু শিকার করে, আকাশের পাখীকে তীরের আঘাতে ধরাশায়ী করে, জলের মাছ ডাঙ্গায় টেনে তােলে সেই অধিকারে, প্রয়ােজনের তাড়নায় মানুষ যদি গাছের গােড়ায় কুডু চালাতাে, তা হলে হয়তাে তুলাকের বিশেষ আপত্তি হতাে না। কিন্তু যখন দেখি, শতাব্দীবৃদ্ধ মহীরুহের শবদেহ কুঠারের লাঞ্ছনায় অবমানিত করে পণ্যদ্রব্যরূপে মানুষ অন্য মানুষের কাছে পাঠাচ্ছে ভারে-ভারে কাতারে-কাতারে, এই যে নিহতের দেহাবশেষ নিয়ে বেচা-কেনা, যখন স্বচক্ষে দেখি, তখন মনে হয় তুা একজন মহাপুরুষ, উদ্ভিদের নির্বাক্ সুখ-দুঃখকে যে অমন আপন করে নিতে পেরেছিল, তাকে খুন করে আমি মহাপাতকের ভাগী হয়েছি। কিন্তু জমীদারবাবুরা ত সে-সব কথা শুনবেন না! আমার পূর্বতনও যে তুরলাকের মত উদ্ভি-জীবনের নিরাপত্তা সম্বন্ধে আকুতি অনুভব করতেন না, একথা আমার বিশ্বাস হয় না আপনারা হয়তাে বুঝতে পারবেন না, বনে যারা কয়েক বছর বাস করে, তাদের কাছে প্রত্যেকটি চারাগাছ পর্যন্ত কতদুর প্রিয় ! কিন্তু তিনি করবেন কী ? হয় চাকরী, না হয় আনাহার ! এই দুই অন্তিমের মাবে মানুষ যখন দাঁড়ায়, তখন তাকে অনেক গর্হিত কাজই করতে হয়, এ- জানা কথা। কিন্তু তুরলাকের নৈতিকতা স্বার্থসিদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল , তাই সে আমার পূর্বতনকে বারে বারে সতর্ক করে যখন ফল পেলে না, তখন সে বিচার ও শাস্তিবিধানের ভার নিজের হাতে নিলে, ছিন্নমূল গাছের মত সপরিবার নায়েবের দেহ মাটিতে লুটিয়ে রেখে গেল। আমার পূর্বতন মারা যাবার অল্পদিন পরেই অন্য মহল থেকে বদলী করে পান্ হ্রাবিয়া আমায় এখানে পাঠালেন। কাছারীতে যখন তার ৭২ তু7ি সঙ্গে দেখা করতে যাই, তখন তিনিই আমাকে প্রথম তুরলাকের কথা বলেন। তখন তুরলাকের কার্যকলাপের বিবরণ শুনে আমি হেসে উঠেছিলাম। একটু দুঃখও হয়েছিল এই জন্যে যে, আগেকার কর্তা থাকলে তিনি নিজেই মহলে গিয়ে তুরলাকের বাবাকে সায়েস্তা করে দিয়ে আসতেন। পানিয়ে, তারা সব অন্য ধরণের মানুষ ছিলেন। পরাধীন দেশের হাবিয়া হওয়া সত্বেও কর্তা যখনই রুশী সাবের দরবারে যেতেন, তখন সার সিংহাসন ছেড়ে নিজে এসে তাকে অভ্যর্থনা করতেন। কর্তার সে চোহারাই বা কী ছিল! যেন শ্বেতপাথরে খােদাই করা এক বিরাট প্রতিমূতি। ধধবে শাদা চুল, শাদা গোফ, লম্বা জোব্বা, কোমরে কোমরবন্ধ। একজন মানুষে তার খাপ-সুদ্ধ তলােয়ালখানা তুলতে পারতাে না। সে-সব আর আজকাল নেই, আজকালকার হাবিয়া- জমীদাররা সব পারী, অক্সফোর্ড, কেজি-ফের্তা, বেশীরভাগ সময় কাটান বিদেশে, অনেকেই সুইসদেশে, ফ্রস বা আঙ্গলিয়াতে বাড়ী ঘরদোর করেছেন, কেউ কেউ পােলভাষা পর্যন্ত ভুলে গেছেন। যা সে অন্য কথা। পান্ হাবিয়া আমায় তুলা সম্বন্ধে বিশেষ সাবধান করে দিলেন। হেসে বললাম, “পানিয়ে হ্রাবিয়, কর্তার হাতে-গর নায়েব আমরা, বনে-জঙ্গলে সারাটা জীবন কাটালাম, আর এই বুড়াে বয়সে একটা ডাকাতের হাতে প্রাণ দেবাে, সে ভয় করি না।” এখানে এসে যা দেখলাম তাতে মনে হলাে, পান্ হ্রাবিয়ার কাছে যে- কথা জোর গলায় জাহির করে এলাম, তা কাছারীর দারােয়ান-রক্ষী, পাই-বরকন্দাজ প্রহরিত আবহাওয়ায় যেমন সহজ ও শশাভন শােনালাে, বনের অরক্ষিত বিস্তারের মাঝে তা তেমনি অসম্ভব ও হাস্যকর। হেই পানিয়ে ! জঙ্গলের আইনে অধিকার বলে যদি কিছু থাকে ত সে গায়ের জোর আর চাতুরী। এখানে এক অন্যকে গায়ের জোর বা চাতুরী দিয়ে ধ্বংস করবার জন্যে দিনরাত ওৎ পেতে আছে, এবং আক্রান্ত জীব অহর্নিশি আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। পান নায়েব কিছুক্ষণের জন্য আপন কাহিনী বন্ধ করিয়া অগ্নিকুণ্ডের সনার গুড়িটার উপর কাফির জন্য ছােট একটি কেলীতে জন চড়াইয়া দিলেন। পরে আবার তাহার গল্প সুরু করিলেন । একদিন সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময়ে আমরা এখানে এসে পৌছলাম । ঐ ধ গু-মার্কা চাধা দু'টো বারা আমাদের জামঞ্চ থেকে ঘােড়ার গাড়ীতে করে আনতে গিয়েছিল, তারা পথে একরকম জানিয়েই দিলে, যে এ মহলে নায়েব হয়ে আসা মানে মৃত্যুর কবলে আত্মসমর্পন করা। সঙ্গে আমার স্ত্রী আর দুটি মেয়ে। অমন স্পষ্টাস্পষ্টি ভাবে কথাটা শােনাতে তাদের অবস্থা কী রকম হতে পারে তা তো বুঝতেই পারছেন। সন্ধ্যার আবছায়ায় জঙ্গলটার ভেতর দিয়ে আসবার সময় কথাটা শুনে যে আমার মন ও বিশেষ সুস্থির থাকতে পারলে, একথা বললে মিথ্যে কথা বলা হবে। তবুও অন্ততঃ নিজের মনে একটু ভরসা আনবার জন্যে আমি বেশ একটু জোর গলায় হেসে উঠলাম। বনের ভেতর আমার হাসির প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাবার আগেই চোখের সামনে বে কাণ্ডটা ঘটলে তাতে বুঝলাম, আমার আততায়ী বড় সাধারণ মানুষ নয়। আঙুল দুই চওড়া আর বিণং খানেক লম্বা, এক ঝলক বিদ্যুতের মত ঝকঝকে লক্লকে একখানা তুলা চুরীর মত কী একটা জিনিষ আমাদের মাথার ওপর দিয়ে সঁ করে’ ছুটে গেল। আমরা সবাই তার হাওয়া কেটে চলে যাবার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম। স্ত্রী আর মেয়েদের শান্ত করবার জন্যে তাদের শুনিয়ে চাষাদের জিজ্ঞেস করলাম, “কী পাখী হে ওটা?” কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তাদের তাড়াতাড়ি গাড়ী হাঁকাতে ইশারা করলাম। জিনিষটা যে ছুরী ছাড়া আর কিছু নয়, সে-বিষয়ে আজ পর্যন্ত আমার কোনাে সন্দেহ নেই। সেই হ’লল তুলাকের কাছে আমার প্রথম অভ্যর্থনা। তারপর হপ্ত। দুই একেবারে চুপচাপ। সারাটা জীবন প্রায় বনে-জঙ্গলে কাটালাম, পানিমে, তুলাকের এ-চাল বুঝতে আমার বাকী রইল না। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, সে আমাকে আস্তে আস্তে নিশ্চিন্ত করে ফেলতে চায়, তারপর ক্রমে যখন তার কথা ভুলে যাব, সেই সময়ে একদিন সে হঠাৎ এসে হাজির হবে। অবশ্য তার চুপচাপ থাকার কারণ এও হতে পারে যে, সে হয়তাে ভেবেছিল তার ললকে ছুরীর দৌড় দেখে আমি ভড়কে যাবাে, এবং হয় দু'একদিনের মধ্যেই এখান থেকে পালাবো, আর না হয় গাছ-পালা কাটা একেবারে বন্ধ করে দেবাে। যাই হােক, তুলা চুপচাপ্ থাকলেও, আমি সব দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখলাম। প্রর্শে পানা, পালানাে তামার কুষ্টিতে লেখে না। সুতরাং কয়েক দিনের মধ্যেই বেশ সংসার গুছিয়ে বসলাম। তবে মুস্কিল হলো গাছ কাটা নিয়ে। এখানে তুলাকের সঙ্গে আমার কোনাে মতের অমিল নেই তিরিশ বছর ধরে হাজারে হাজারে গাছ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদ্বির করে’ কাটিয়েছি ! এক শ বছরের পুরাণে সমা, দম্ব, বা গ্রাবের গায়ে যখন কুড়ুলের প্রথম চোট লাগে তখন আমি আজও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকি। নিজেকে নৃশংস ঘাতক বলে মনে হয় ; কুতুলের চোট লাগার সঙ্গে সঙ্গে এক-একটা গাছ থেকে যেন ফিনকী দিয়ে রক্ত পড়ার মত হু-হু হাতের কাজ করে রস পড়ে, যেমন ধরুন ভূর্জ। গাছপালার যে মানুষের বা অন্য কোনাে জীবের মত প্রাণ আছে সুধু তাই নয়, তাদের যে জীবের মত চেতনা এবং বােণশক্তি আছে, এ কথা আমি লাল কালি দিয়ে লিখে দিতে পারি। কে একজন হিন্দুস্ এ নিয়ে গবেষণা করেছেন, কাগজে পড়েছি। কিন্তু পানিয়ে, কথাটা এমন পরিস্কার যে তা নিয়ে কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার দরকার আছে বলে মনে হয় না। গাছের সুধু চেনা নয়, স্নেহবােধও আছে, এ আমি নিজে অনুভব করেছি। আপনি যে-কোনাে গাছকে সত্যিকার ভালােবাসা নিয়ে জড়িয়ে ধরে দেখবেন, তার অবদ-ঘুমন্ত চেতনায় একেবারে যেন স্নেহের বান ডেকেছে। তাকে চোখে না দেখলে বা কানে না শুনলেও, সে-য়েহ সৃষ্টির এক আদিম উপরে, যেমন করে আমরা অন্যের নির্বাক্ প্রেম বা ঘৃণা উপলব্ধি করি, সেই উপায়ে আপনার চেতনাকে স্পর্শ করবে। গাছের ভাষা আছে, আপনি স্বীকার করেন ? তার গােড়ায় কোপ মারলে, সে যে দস্তুরমত তার প্রাণরক্ষার জন্য অনুনয়-বিনয় করে, এ আমার চোখে দেখা জিনিষ, তা আপনারা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। যাক্ সে-সব অন্য কথা। এখন মুস্কিল হলাে এই যে, ঠিক যে-সময়ে আমি তুরলাকের সঙ্গে দেখা করে তার উদ্ভিদ জীবনের প্রতি এই অদ্ভুত ভালােবাসা সম্বন্ধে দু’একটা তথ্য জেনে নেবাে সঙ্কল্প করছি, ঠিক সেই সময়ে সদর থেকে গাছ কাটাবার তাগিদ এলাে। মাসখানেকের মধ্যে দীনিয়া বন্দরে একখানা খালি জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে, কোথায় সেই কোন মুল্লুক আর্জেন্তিনায় আমাদের দেশ থেকে কাঠ চালান যাবে, শ পাঁচেক গাছ চাই, দু’হপ্তার মেয়াদ, কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তি-সর্ত সব সই করা হয়ে গেছে। এই মর্মে জামশ্চ থেকে চিঠি নিয়ে লােক এসে হাজির হলাে। সেই দিনই ধারে-কাছে যত কাঠুরে পাওয়া গেল, তাদের খরব দিয়ে ডেকে পাঠালাম। পরের দিন সকাল থেকে বনে তুলা যে সব প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গাছে আগে থেকেই কাটবার উপযােগী বলে দাগ, দেওয়া ছিল তাদের গােড়ায় কোপ পড়তে লাগলাে। সারা দিন ধরে সমস্ত বন জুড়ে গাছকাটার ধপধপ শব্দ। পানিয়ে, মনে হলাে যেন পাগল হয়ে যাবাে। থেকে থেকে এক-একবার বন কঁপিয়ে একটা প্রকাণ্ড গাছ হুড়মুড়িয়ে শুয়ে পড়ছে, আবার সেই বন্ধ। বনে তার প্রতিধ্বনি শুনলে হঠাৎ মনে হয় যেন সমগ্র বনভূমি প্রতি আঘাতে আর্তনাদ করে উঠছে। নিজেকে অন্যমনস্ক রাখবার জন্যে ঘােড়ায় করে’ নানা জায়গায় ঘুরি, কখনাে কখনাে কাঠুরেদের কাছে গিয়ে তাদের কাজের তদারক করি । সেদিন গাছ কাটার তদ্বির করতে করতে জঙ্গলের ওদিকটায় যখন গিয়ে পৌছলাম তখন সূর্য অস্ত গিয়ে সন্ধ্যে হয়ে এলো। ওদিককার বনের পথ আমার একেবারেই জানা ছিল না। কাজেই ফেরবার সময় একটা কাঠুরেকে সঙ্গে নিয়ে আসতে হ’লল, এ-বনে একবার পথ হারালে অন্ততঃ সে-রাতে আর ফেরবার সম্ভাবনা নেই। সন্ধ্যে হবার কিছু পরেই ফিরতে ফিরতে ভাবছি, বাড়ীতে স্ত্রী আর মেয়েদের একলা রেখে এসে ভালল করি নি। এখন কাঠ কাটাবার সময়, চাষাদেরও নানা কাজে তদারক-তদ্বির করে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যাওয়া সম্ভব। তাছাড়া, তারা চীৎকার শুনে আসতে আসতে তুরলাকের পক্ষে তার কাজ হাসিল করে যাওয়া এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয়। এবং তুরলা যে দু'একদিনের মধ্যেই তার বন-প্রজাদের গায়ে হস্তক্ষেপ করার জন্যে কোনাে একটা কঠোর প্রতিশােধ নেবেই, এ বিষয়ে আমি একেবারে নিঃসন্দেহ ছিলাম। বাড়ী পৌছতে বেশ একটু রাত হয়ে গেল। বাড়ী পৌছে দেখলাম আমার স্ত্রী আর মেয়েরা থর-থর করে কাঁপছে। অনেকক্ষণ পরে একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে তারা যা বললে তাতে বােঝা গেল, এইবার তুলাকের সঙ্গে ৭৭ হাতের কাজ আমার খােলাখুলিভাবে সংঘর্ষ শুরু হলাে। শুনলাম, ঘণ্টাখানেক আগে, আমার আসতে দেরী হচ্ছে দেখে আমার স্ত্রী আর মেয়েরা যখন চিন্তিত হয়ে উঠেছে, তখন বাড়ীর কাছাকাছি শুক্ননা পাতা মাড়ানাের শব্দ শােনা গেল। আমি আসছি মনে করে’ ঝি দোর খুলে দিতে যাচ্ছে, এমন সময়ে দোরের ওপর পাঁচবার গুনে গুনে ঠক্ ঠক্ করে’ কে আওয়াজ করলে। ঝি কথাটি না বলে তাড়াতাড়ি আলােটা নিবিয়ে দিয়ে স্ত্রীর কাছে ছুটে গিয়ে চুপি চুপি বললে, আমি নই, অন্য কেউ। ঘরের এক কোণে দাড়িয়ে চারজন মেয়েমানুষ থরথরিয়ে কঁপছে, আর থেকে থেকে দোরের ওপর ঘা পড়ছে, ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্ ! আমার স্ত্রী বলেন, প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে’ দরজার ওপর ঠক্ঠক্ আওয়াজ শােনা গেল । শেষকালে ঘরের ভেতরকার অন্ধকার আর বাইরের ঠক্ঠক্ আওয়াজ যখন অসহ্য হয়ে উঠলাে তখন মরিয়া হয়ে আমার স্ত্রী জোর গলায় জিজ্ঞেস করলেন--“কে ও?” শান্ত, সংযত স্বরে উত্তর এলে—“অমুক বাড়ী আছেন ?”—অর্থাৎ আমি। , কাজে বেরিয়েছেন। এত রাত্তিরে ? হু। কাজের লােক, কাজে বেরিয়েছেন। অবশ্য যদি সত্যিই না বেরিয়ে থাকেন, আর যদি সত্যিই তিনি পুরুষ মানুষ হন, ত একবার একটু বাইরে বেরিয়ে এলে ভালাে হতাে। তার সঙ্গে আমারও একটু কাজ ছিল । এখন বাড়ী নেই, কাল সকালে দেখা হতে পারে। সকালে? সকালে, দিনের আলােয় কি সব কথা হয় ? বলুন না, কষ্ট করে একটু বেরিয়ে আসতে। এমন রাত্তিরটা একেবারে মাটি ক’রবাে! দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢােকা কি ভদ্রতা হবে ? তা ছাড়া সত্যিই ৭৮
তুরলাক
যদি বাড়ী না থাকেন ত একঘর মেয়েমানুষসুদ্ধ, বাড়ীতে চড়াও হওয়া, সে
একটা লজ্জার ব্যাপার হবে বুঝলেন না?
ন}, সত্যিই তিনি বাড়ী নেই।
ঠিক ?
হ্যা, সত্যি।
বেশ, তা হলে চললুম, আবার দেখা হবে।
কে তুমি ?
কে আমি ?
খানিকক্ষণ কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। তারপর কী এক অদ্ভুত
স্বরে জবাব এলাে-“তুরলা।” আমার স্ত্রী বলেন, সব কথাগুলােই তার
সাধারণ মানুষের মত, এমন কি মনে হয় লােকটার স্বভাব ভারী মিষ্টি।
কিন্তু “তুরলা” কথাটা সে এমনভাবে উচ্চারণ করে যে গায়ে কাটা
দিয়ে ওঠে। ধপ করে একটা আওয়াজ হলাে। তরপর খসখস করে
শুক্ননা পাতা মাড়ানাের শব্দ বনের ভেতর আস্তে আস্তে মিশিয়ে গেল।
অনেকক্ষণ যখন কোনাে আওয়াজ পাওয়া গেল না, তখন ঝি এসে
চাষাদের ডাকবার জন্যে বেনি দোর খুলেছে, অম্নি সে চীৎকার করে
মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়লাে। তাড়াতাড়ি স্ত্রী ছুটে এসে দেখেন,
দরজার ওপর তেঁতা হাত দেড়েক একখানা কাফকাসী কিল্কা,
অন্ধকারে ঝক্-ঝক্ করছে। এর কিছু পরেই আমি এসে পড়ি।
জ্বলন্ত সসনার গুড়ির ওপর কেলীতে কাফির জল ফুটিতে সুরু
করিয়াছে। নায়েব পাশের আলমারী খুলিয়া কাফির সরঞ্জাম বাহির
: কাফকাস বা ককেসাস দেশের ছোরা বিশেষ।
হাতের কাজ করিয়া টেবিলের উপর সাজাইতে লাগিলেন। দেখিলাম, এই বিজন বনভূমিতেও নায়েবের সংসারে নাগরিক জীবনের প্রত্যেকটি খুটিনাটি প্রয়ােজনীয় সামগ্রী মজুত রহিয়াছে। এমন কি সুস্বাদু কাফি তৈরী করিবার স্পিরিট-ল্যাম্প-সংযুক্ত কাচের কলটি পর্যন্ত বাদ যায় নাই। নিবিষ্টমনে কাফি তৈরী করিতে করিতে নায়েব কহিতে লাগিলেন- “প্রশে পানা, এই নেশাটুকু আমি হাজার চেষ্টা করেও ছাড়তে পারি নি। এখানে মানুষ কী নিয়েই বা থাকতে পারে, বলুন। থিয়েটার নেই, লাইব্রেরী নেই, প্রতিবেশী নেই, এমন কি একটা পিয়ানাে পর্যন্ত নেই। সারাটা দিন ধরে’ টো টো করে’ বনে বনে ঘােয়রা ! সন্ধ্যেবেলা খাওয়া দাওয়া শেষ করে স্ত্রী বােনার জিনিষ নিয়ে আর না হয় পেশেন্স, সাজিয়ে বসেন, মেয়েরা বসে সূতো-তােলার কাজ নিয়ে। আর আমি অগুনটিতে আমার কেলীটি চাপিয়ে দিই। এই নিগ্রো-রঙের পেয়টি না পেলে, পানিয়ে, আমার রাতে ঘুম হয় না। অবশ্য কাফি তৈরী করতে জানা চাই। খানিকটা গরম জলে কাফি ঢেলে দিলেই কি আর সে কাফি হলো? আপনার যদি না জানা থাকে ত কাফি তেরী করবার কারসাজিটা আপনাকে বলে দিই। হাতীঘােড়া কিছুই নয় পানিয়ে, শুধু একটি চিটি নূন আর এই এতটুকু ভানিল্লার গুড়ো ! কাফি তৈরী করবার কল থাকলে ত কথাই নেই। আর তা না হলে নজর রাখতে হবে, যেন গুনে গুনে দুটিবার উৎলে ওঠার পর আর যেন এক সেকেণ্ড আগুনের ওপর না রাখা হয়। ব্যস্!” দেখিলাম, কাফি তৈরী-করা শিল্পে নায়েবের দক্ষতা দম্ভোক্তিমাত্র নয়। কয়েক চুমুক পান করিয়াই স্বীকার করিতে হইল, অমন কাফি পূর্বে কখনো আস্বাদন করি নাই। কালাে কাফির পেয়ালা হাতে লইয়া নায়েব পুনরায় তাহার গল্প সুরু করিলেন।
তুলাক এইবার তুলাকের সঙ্গে আমার একরকম প্রকাশ্য বিবােধ বেঁধে গেল। তাকে ঠিক বিরােধ বললে ভুল হবে। কারণ তুলাকের ওপর আমার কোনো বিদ্বেষ ছিল না, তার ওপর আমার বরং প্রচুর সহানুভূতি ও সমবেদনাই ছিল। কিন্তু তা তাকে দেখাবার সুযােগ ঘটে উঠলো না। আর তুলাকের সঙ্গে দেখা হলে আমি তাকে কীই বা বলতাম ? তার সঙ্গে বােঝা-পড়ার মুস্কিল ছিল এই যে, সে যা বিশ্বাস করতাে তা প্রাণ দিয়ে, সমগ্র চৈত্য দিয়ে বিশ্বাস করতাে। আমি যে সখ করে, নির্যাতনের আমােদ উপভােগ করবার জন্যে গাছ কেটে বেড়াই না, এ যে আমার পেটের দায়ে ঘাতক-গিরি, তা তাকে বােঝাতে গেলে নিশ্চয়ই উত্তর পেতাম, কেন জগতে কি অন্য কোন কাজ নেই ? আছে বৈকি। কিন্তু পচিশ বছর যে বনে-জঙ্গলে কাটিয়েছে, সমাজের তর্জনী-শাসন থেকে যে এই উদার অরণ্যের প্রসারতায় সম্পূর্ণ মুক্তি লাভ করেছে, তার পক্ষে ভারশৌএর ট্রামের ভিড়ে গাদাগাদি করে, কত অদ্ভুৎ-অস্পৃশ্য, দুশ্চরিত্র, রুগ্ন, কুৎসিত মানুষের সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁসি করে’, আধুনিক জীবনযাত্রার অসাধু, অনৈতিক পূতিগন্ধ বরদাস্ত করে’, দু’বেলা আফিস করা যে কতদুর অসাধ্য তা আপনি আমি হয়তাে বুঝতে পারলাম। কিন্তু তুরলাক্, যে জীবনে শহর এমন কি গণ্ডগ্রাম পর্যন্ত দেখেনি, এই বনভূমির মুক্ত অঙ্কস্থলে যার জন্ম ও লালন, শতায়ু সস না, তপল, এবং বছরখানেকের শিশু অশীন। ও বনমালীন বার একান্নপরিবারভুক্ত, তার কাছে রুটি-জলের কোনাে যুক্তিই যে খাটতাে না, তা আমি আগে থেকেই জানতাম। তুরলা জংলী জানােয়ারের মত বেপরােয়া হয়ে আমায় আক্রমণ করলে, এবং আমাকেও নিরুপায় হয়ে সে আক্রমণের প্রতিরােধ করতে হলাে। যুদ্ধ যখন বেঁধে গেল, তখন প্রতিপক্ষকে সহানুভূতি দেখানো বা তার তরফের যুক্তিতর্ককে বুঝতে যাওয়া যে আত্মরক্ষার সাপেক্ষ নয়, একথা ত হাতের কাজ জানেনই। সুতরাং হাজার অনিচ্ছা সত্বেও তার অত্যাচার যেমন বেড়ে চ’ললো, সেই অনুপাতে আমিও ক্রমে তার ঘাের শত্রু হয়ে দাড়ালাম। সে আমায় সপরিবারে হত্যা করবার জন্যে যে-সব চাতুরী অবলম্বন করলে তাকে মারবার জন্যে, তার চেয়ে সূক্ষ্ম নানা রকম চালাকির আশ্রয় নিতে হলো। যুদ্ধ চললাে পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছর কে হারবে, কে জিতবে, তার কোনােরকম স্থিরতা ছিল না। এই পাঁচ বছরের ঘটনা যদি শুনতে চান্, পর্শে পানা, ত আরাে দিনকতক থেকে যান্। আজ রাতও হলো অনেক, আর আপনিও সারাদিন পথ চলে’ খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সুধু একদিনের ঘটনা শুনলেই বুঝতে পারবেন, কী দুর্ধর্ষ শত্রুর সঙ্গে আমায় পাঁচবছর ধরে সমানে লড়তে হয়েছে। বছরখানেক আগের কথা বলছি। একবার একটা কাজের জন্যে আমায় রাহদশ, যেতে হয়। কেরবার সমর খানিকটা মেঠো পথ পাওয়া গেল বটে, কিন্তু তার পরই জঙ্গল সুরু হ’লল, ঐ ওদিককার জঙ্গলটা। বনে ঢােকবার একটু পরেই দিনের শেষ আললাটুকু আস্তে আস্তে মুছে গেল। তখন গরমকাল, অন্ততঃ রাত দশটা পর্যন্ত গােধূলির আলাে থাকে * ভেবেছিলাম, কোনােরকমে আলাে থাকতে থাকতে পৌছন যাবে। কিন্তু দেখা গেল, মেঠো পথের দূরত্বটা আমরা ঠিক অনুমান করতে পারি নি। যাই হােক্, বনের মধ্যে হঠাৎ অন্ধকার ঘনিয়ে এলাে। গাড়ীর সঙ্গে যে লণ্ঠনটা ছিল সেটা জ্বালিয়ে অনেক কষ্টে বড় বড় গাছের ফাকে ফাকে যা একটু পথের মত আছে, সেইখান দিয়ে আস্তে আস্তে আসছি। ভাড়া-করা গাড়ী, রাহদশের কাছে মাঠ ধরে যাচ্ছিল। আমায় দেখে গাড়ী থামিয়ে চাষা ব’ললে—“পানিয়ে, এই বন-জঙ্গলের পথে কোথায় ইউরােপের উত্তরাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে বহুক্ষণ পর্যন্ত গােধূলির আলাে পাওয়া যায়। ৮২ তুলা যাবেন একলা, আমাকে গােটা পাঁচেক জলতী* দিলে আপনাকে পৌছে দিয়ে আসি। আপনার ঘােড়াটাও একটু জিরােতে পার!” ভাবলাম, সত্যিই ত ঘােড়াটা আমায় পিঠে নিয়ে সারাদিন টো-টো করে ঘুরেছে, আবার পাচ ক্রোশ পথ আমায় নিয়ে যদি যেতে হয় বেচারাকে তা হলে তার আর কিছু পদার্থ থাকবে না। তাছাড়া বন-জঙ্গলের পথ, একবার হারালে সে-রাতে বাড়ী পৌছবার আসা থাকবে না। চাষাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে আমার ঠিকানা চিনে যেতে পারবে কিনা। “পানিরে, এ অঞ্চলে। পানকে না চেনে কে ?”—চাষা উত্তর দিলে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বয়েস ষাটের নীচে নয়, লম্বা লম্বা পাকা দাড়ী, মাথায় একঝাক পাকা চুল, কপালের ওপর হেমন্তের চষা জমীর মত গভীর বলিরেখা। অতদূর আত্মীয়তা দেখিয়ে সে যখন অমন আকিঞ্চন করে আমায় পৌছে দিয়ে আসতে চাইলে তখন আমিও রাজী হয়ে গেলাম। তারপর চাষ। বললে—“পানিয়ে, এবছর বা অজন্মা, ঘরে একমুটো দানা নেই যে এই জানােয়ারটাকে খাওয়াই ! বাবুদের দয়ায় এইরকম বা দু'এক পয়সা কামাই তাতেই কোনাে রকমে সংসার চালাই।” দু'একটা কথাতেই বুড়ােকে আমার ভারী ভালো লেগে গেল । চললাম তার সঙ্গে। ঘােড়াটাকে গাড়ীর পেছনে বেঁধে দিলাম। বনের মধ্যে লণ্ঠনের মিটমিটে আলােতে চারপাশের হাত চার পাঁচ পর্যন্ত দেখা যায়। তারপর আলকাতরার মত কালো, গাঢ়, টলটলে, চটচটে অন্ধকার। হঠাৎ মনে হলাে যেন কী একটা ভৌতিক উপায়ে আমরা মাটির নীচে কোন্ এক জি-এর রাজত্বে গাড়ী-ঘােড়া সবসুদ্ধ বন্দী হয়ে রয়েছি, আর আমাদের চারিপাশে আমি যে হাজার-হাজার গাছ কাটিয়ে তাদের মৃতদেহ জাহাজ ভরে’ চালান দিয়েছি, তাদেরই প্রেতাত্মা ২ জুলীতে এক টাকা। ৮ হাতের কাজ আমাদের ঘিরে এক অদ্ভুত শব্দহীন অট্টহাস্যে আমাকে বিদ্রুপ করছে। এরকম একটা সৃষ্টি-ছাড়া উপমা যে কেন মনে এলাে, তা ভগবানই জানেন ! কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও আমি আমার মনের ভুলটা যে ভুলমাত্র, এই সামান্য কথাটাও উপলব্ধি করতে পারলাম না। হঠাৎ চমক ভাঙ্গার মত এতটা ভাব হলো। বুঝতে পারলাম, এতক্ষণ ধরে’ ঢুলতে ঢুলতে কী একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। চারিপাশে তাকিয়ে দেখলাম, আমরা ঠিক আগের মতই বড় বড় গাছের ফাঁকে ফাঁকে লণ্ঠনের মিটমিটে আলােতে পথ খুঁজে খুঁজে আস্তে আস্তে চলেছি। চাষাটা ঠিক আগের মতই নিঃশব্দে গাড়ী হাঁকাচ্ছে, তবে কেন জানি না, সে এই গরমকালে যেন শীতে জড়ােসড়ো হয়ে, গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে গুড়িশুড়ি হয়ে বসেছে। জিজ্ঞেস করলাম—“কী হে, শীত করছে নাকি?” সে যেন একটু থতমত খেয়ে উত্তর দিলে—“না, পানিয়ে তবে আমার বাতের ধাত কি না। রাত হলাে অনেক, একটু একটু করে শিশির পড়তে শুরু করেছে, গায়ে কিছু চাপা না দিলে, পানিয়ে কাল আর উঠতে পারবাে না।” অস্পষ্ট আলােতে তার পাকা চুল আর দাড়ী দেখে মনে মনে একটু হাসলাম, ভাবলাম শত্রুর আক্রমণের ভয়ে মানুষ নিজের ছায়াকেও সন্দেহ করে। বাড়ী পৌছতে অনেক রাত হয়ে গেল। সারাদিন ধরে ঘােরাঘুরি করার পর যেমনি ক্ষিধে তেমনি ঘুম পেয়েছে। মেয়েরা অনেকক্ষণ শুয়ে পড়েছে। সুধু স্ত্রী খাবার নিয়ে বসেছিলেন। খেয়ে নিয়ে, প্রশে পানা, শােবার আগে আমার এই কাফিটুকু নিয়ে একটু বসেছি এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ঝি এসে চুপি চুপি বললে—“প্রশেপানা, শিগগির শিগগির বন্দুকটা বার করুন, এসে পড়লাে বলে’!” বন্দুকটা রাতে বরাবরই আমার শােবার ঘরে থাকে, সেটা হাতে নিয়ে ঝিকে জিজ্ঞেস ২৫ তুলাক করলাম, কী হয়েছে। উত্তরে যা শুনলাম তাতে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। ঝি ব’ললে, “শে পানা, বুড়ােটাকে খাইয়ে দাইয়ে আমি আস্তাবলের ওপরে ছােট ঘরটায় তার শােবার জায়গা করে দিয়ে এলুম। তারপর প্রশে পানা, ঘরদোর সেরে আমি সদর দরজা বন্ধ করতে যাবাে, এমন সময়ে দেখলুম, যেন আস্তাবলের দিক থেকে মিটমিট করে একটু আলো আসছে। ভাবলুম, বলি, আবার গেল বছরের মত আগুন লাগবে? যাই বুড়ােকে বলে’ আসি যেন ওঘরে আলাে না জ্বালে কিংবা সিগারেট না খায়। চারিদিকে কাট-কাটরা খড়, কাপড় তুলে এইসব, আগুনের একটি ফুলকি কোনােরকমে যদি ছিটকে পড়ে ত চোখের নিমিষে সব পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে আস্তাবলের ঘরে ঢুকতে যাবাে এমন সময়ে কী মনে হলাে, ভাবলুম, দেখি না, বুড়ােটাকে এই শুইয়ে গেলুম, আর সে আলাে জ্বেলে এত রাত্তিরে কী করছে ! বাইরের দিকে মই লাগানো ছিল। আস্তে আস্তে উঠে ফুটো দিয়ে দেখি, কোথায় বুড়াে ! আমার দিকে পেছন করে বসে আছে দিব্যি ষণ্ডামার্কা এক জোয়ান, তার পাশে পড়ে আছে শাদা পরচুলাে আর দাড়ী। লােকটা আঙুল দিয়ে প্রকাণ্ড একখানা ছােরার ধার পরখ করছে, আর বিড়বিড়িয়ে ছােরাটাকে কী বলছে ! আমি ত প্রশে পানা, উঠি কি পড়ি, সড়-সড় করে নেমে এসে দে ছুট! তবে তাড়াতাড়িতে নামতে গিয়ে মইখানা মাটিতে পড়ে গেল। মইখানা পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই শুনতে পেলাম দুপটুপ করে’ আস্তাবল ঘর থেকে ছুটে কে বাইয়ে লাফিয়ে পড়লাে। মনে হলাে আমায় তাড়া করছে। প্রশেপানা, চট করে’ আসুন, এক্ষুনি এসে পড়লাে বলে।” কথাগুলাে ঝি এক নিঃশ্বাসে বলে’ গেল। তার কথা শেষ হবার ৮৫ হাতের কাজ সঙ্গে-সঙ্গেই আমি যেখানে চাষার গাড়ীখানা রাখা হয়েছিল, সেইদিক লক্ষ্য করে ছুটলাম । তার কাছাকাছি গিয়ে শুনতে পেলাম, রাতের বন কাপিয়ে খটাখট্ করে’ ঘােড়া আর গাড়ীর শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল! অত তাড়াতাড়ি পালানাে যে তুরলা ছাড়া আর কারাে ক্ষমতায় কুলােত না, সে-বিষয়ে কোনাে সন্দেহ নেই। তবে আশ্চর্য এই যে, জঙ্গলের মধ্যে একলা পেয়ে, আমায় আধা ঘুমন্ত অবস্থাতে সে অনায়াসে খুন করতে পারতো, কিন্তু তা করে নি। তার কারণ আর কিছুই নয়, তার খেয়াল আমাকে সপরিবারে হত্যা না করলে আমার ওপর ঠিক প্রতিশােধ নেওয়া হবে না। আরাে মজা এই যে, আমায় আলাদা আর আমার স্ত্রী কন্যাদের আলাদা খুন করে তার স্বস্তি হবে না। সেদিন এই সুৰােগ সে পেয়েছিল অনেক বছর অপেক্ষা করার পর। কিন্তু কেন যে পালালাে, তা জানিনা। হয়তে অতর্কিতে তার মতলবটা ফাঁস হয়ে যাওয়াতে, হঠাৎ তার মনের বল এমনভাবে ঝাঁকানি পেয়েছিল যে, তার আর লড়বার ক্ষমতা ছিল না। এও হতে পারে যে তার ছােরার সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে পারে যে, সেদিন মারামারিতে তার পরাজয় সুনিশ্চিত, কারণ আমি সেদিন তাকে জন্মের মত খতম করবার জন্যে একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। সেইদিনই স্থির করলাম, তুলাকে শেষ না করলে সে আবার কী ছলে এসে আমাদের শেষ করে যাবে। প্রশে পানা, কাহাতক আর শত্রুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা যায় ! তাছাড়া তার উৎপাত ক্রমে বেড়েই চললো। মাঠ থেকে আমার গরুগুলাে একটা একটা করে উধাও হতে লাগলাে, আমার সখের বিশ্বস্ত ঘােড়াটাকে হঠাৎ একদিন পাওয়া গেল না, টষ্টস্থানাকে ঠেঙিয়ে ভেঙ্গে রেখে গেল, কাঠুরেদের ঘর জ্বালিয়ে দিলে, আমার তাঁবের চাষাদের ক্ষেত খামার নষ্ট করে তছনছ করে দিয়ে গেল, তুলা কাঠুরেদের সর্দারকে কচুকাটা করে বাক্সে পুরে আমার দোরগােড়ায় রেখে গেল ! পুলিসে খবর দিলাম। কিন্তু পুলিসে করবে কী? সরকার থেকে ঘােষণা করলে, তুলাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরে এনে হাজির করতে পারলে মােটা পুরস্কার পাওয়া যাবে। কিন্তু এ অঞ্চলে কারাে ঘাড়ে এমন মাথা নেই যে তুলাকের মাথাটি থালায় সাজিয়ে এনে থানার দারােগার সামনে ধরে দেবে। শেষকালে ও-কাজটা আমাকেই করতে হলাে। অবশ্য ঠিক অক্ষরে অক্ষরে নয়। তুরলাকের ওপর মারাত্মকভাবে চটে গেলাম একটা কারণে। ওদিককার বনটার ভেতর খানিকটা ফাকা জায়গা আছে, ঠিক আমাদের এই ফাকা জায়গাটার মত। সেখানে চালান দেবার জন্যে কাটা গাছ জুমা হচ্ছিল। প্রশে পান থাকে থাকে সাজানাে গাছ এ-গুড়ো থেকে ও-মুড়ো পর্যন্ত। প্রায় শ’ পাঁচেক হবে। প্রায় শ’ পাঁচেক হবে। সেখানে অষ্টপ্রহর পাহারা রেখেছিলাম। কিন্তু কী এক অদ্ভুত উপায়ে শুনাে খটখটে গাছগুলােতে আগুন লেগে গেল। ঘণ্টা কয়েকের মধ্যেই সব গাছ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। বাবুদের লােকসান ত হলােই, তাছাড়া আমার সবচেয়ে প্রিয় দারােয়ান, যে আমার সঙ্গে ছিল আজ প্রায় বিশ বছর, সে জীবন্ত পুড়ে ম’রলল। সে কী নিষ্ঠুর দৃশ্য ! একটা শুকনাে গাছের সঙ্গে তাকে শক্ত করে বেঁধেছে। তার চারিদিকে জাফ্রান রঙের আগুনের শিখা। আমাকে দেখে তাকে বাঁচাবার জন্যে সে কি করুণ মিনতি! ধারে-কাছে এক ফোটা জল নেই, আর অতগুলাে জ্বলন্ত গাছ ডিঙ্গিয়ে তার কাছে যাওয়াও অসম্ভব। আমরা কান্না চেপে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রইলাম। চোখের নিমেষে সে হু হু করে পুড়ে শেষ হয়ে গেল, যেন একগাছা শণের দড়ি। গায়দা পুড়ে মরবার পর আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। ৬ ৮৭ হাতের কাজ হুকুম দিলাম, বনে যত গাছে দাগ দেওয়া আছে, সব কেটে লােপাট করতে। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত চললো দুই মানুষের দ্বন্দ্বে নিরীহ বনস্পতিদের ওপর নৃশংস কুঠারাঘাত। আবার বন কঁপিয়ে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মহীরুহের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, ভাঙ্গে কত পাখীর বাসা, বরূফ কি আর বন-মালীনার গাছ পিষে যায়, এস্ত জন্তুরা বন ছেড়ে পালায়। সে এক বীভৎস দৃশ্য ! কিন্তু এ ছাড়া আর গতি ছিল না। ঠিক জানতাম, তুরলাকের বন-রাজ্যের প্রজাদের ওপর অত্যাচার সে বেশীদিন সইতে পারবে না, আমার ওপর প্রতিশােধ নেবার জন্যে তার গহন বন-প্রাসাদ ছেড়ে হন্যে হয়ে বেরিয়ে আসবে। একদিন সন্ধ্যের একটু আগে আমি নিজে দাড়িয়ে থেকে বন কাটাচ্ছি। এই কিছুদিন আগেকার কথা। গ্রীষ্মের তামাটে আকাশ ভেঙ্গে সেদিন প্রথম হেমন্তের বৃষ্টি শুরু হলাে। প্রায় ছ' মাস ধরে অনাবৃষ্টি। মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। সমগ্র বনভূমি এক বিন্দু জলের জন্যে উন্মুখ হয়ে ছিল। প্রথম বৃষ্টির জল পেয়ে গাছ-পালার সে কী আনন্দ! আমার সঙ্গে উদ্ভিদের, প্রশেপানা, কী এক অদ্ভুত যােগ আছে, তা জন্মগতও হতে পারে, কিংবা গাছ-পালার সঙ্গে বহুকাল সহবাসের জন্যেও হতে পারে। সেদিন দাড়িয়ে ভাবছি, এই যে আমার জীবনের দ্বন্দ, একদিকে শত-সহস্র উদ্ভিদের প্রতি আমার গভীর ভালবাসা, এই যে স, তপলা, গ্রাব, দম্ব, অর্শীনা, বনমালীনার সঙ্গে আমার নিকট আত্মীয়, আর অপর দিকে পেটের ওজরে ক্ষণে ক্ষণে মুহূর্তে মুহূর্তে স্বজাতি-হত্যা, এই দ্বন্দ্বের কি কোন দিন অবসান হবে ? এমন সময়ে একজন কাঠুরে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলাে—“পানিয়ে সাবধান !” তার কথা শেষ হবার আগেই একখানা ছুরী আমার এই বাঁ হাতের ওপর এসে বিধলাে। ফিকি দিয়ে রক্ত ছুটলাে। সঙ্গে-সঙ্গে দেখলাম, একটু ৮৮ দুরে আগাছার বন তোলপাড় করে যেন একটা নবরাহ ছুটে চলেছে । তার গতি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লাম। বয়েস কম হয়নি, কিন্তু আমার হাতের গুলি যেন শিকারকে নিজে খুঁজে বার করে। দেখলাম, একটু পরেই আগাছা গুলো স্থির হয়ে গেল। তুরলাককে স্বচক্ষে দেখলাম সেইদিন প্রথম ও শেষ বার । বনভূমির কোলে যেন কোন্ বন-দেবতার অপার্থিব মূতি। মানুষ যে অমন নিখুঁত সুন্দর হতে পারে, তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বয়েস তিরিশের বেশী হবে না, কিন্তু তার চেহারায় সে কি অলৌকিক প্রসাদ, কি নিবিষ্ট আত্মসংযম । যেখানে সে শুয়ে ছিল, সেইখানেই তাকে মাটি চাপা দেবার ব্যবস্থা করে বাড়ী ফিরলাম। তুলাকে খুন করে আমার মনের অবস্থা কেমন হলাে, যদি জিজ্ঞেস করেন, ত আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, পাচ বছর ধরে ক্রমাগত এক অদৃশ্য চতুর শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে সত্যিই আমার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটেছিল। তা ছাড়া যে-কোনো প্রাণী যখন দেখে তার নিজের গানের রক্ত ফিকি দিয়ে মাটিতে পড়ছে তখন তার খুন চেপে যায়। সুতরাং এখন দেখলাম রক্তে তুরাকের বুক ভেসে গেছে, তখন মনে মনে ভারী একটা সন্তোষ অনুভব করলাম। ভেবেছিলাম, তুরলাকে মেরে এতদিন পরে বেশ একটু শান্তি উপভােগ করা যাবে। কিন্তু আবার এক নতুন অশান্তি সুরু হলাে। এই বন-দেবতাই বলুন আর অতি-মানুষ বা প্রতিভাই বলুন, এর জন্ম সে এক কুৎসিত, বিকলাঙ্গ, পাগলী চাষীর গর্ভে, হয়তো কোন ইন্দ্রিয়- ক্ষুধায় মত্ত সম্রান্ত পথিকের ক্ষণিক সহবাসে, তা কেউ জানত না। তুরলা মারা যাওয়ার পর তার পাগলী মা’টা বনে বনে কেঁদে বেড়াতে শাবন্ত করলে। সে যেন মানুষের কান্না নয়। হেমন্তের সন্ধ্যায় বৃষ্টি- হাতের কাজ ভেজা ঝড় জঙ্গলের ভেতর যেমন বিকট কান্নার রােল তােলে, এ যেন তাই। এক-একবার গভীর রাতে অন্ধকারে আমার জানলার বাইরে এসে দাড়ায়। বােবা, কালা, হাউ হাউ করে কী বলতে যায়, ব’লতে পারে না। আবার কাঁদতে কাঁদতে বনের দিকে চলে যায়। ঝড়-বৃষ্টি ছাপিয়ে সে কান্নার হাহাকার মানুষকে পাগল করে দেয়, প্রশে পান। দেখি, আর কতদিন এমনভাবে চলে। পরে একটা বিলি-ব্যবস্থা করতেই তবে! আমার নিজের, স্ত্রীর আর মেয়েদের যা মনের অবস্থা হয়েছে, গতে বেশীদিন এ-অঞ্চলে থাকা চলবে না। বাবুদের বলে অন্য মহলে বদলী হয়ে যাবো, ভাবছি। ওঃ, তিনটে বেজে গেছে ! আপনাকে এই ছাইভস্ম গল্প বলে’ এতক্ষণ জাগিয়ে রাখলাম! আপনি অতিথি, আমার পক্ষে ভারী অভদ্রতা হয়েছে। যত দোষ এই কালো কাকিটুকুর! শিক্ষিত মানুষের সঙ্গ পাই না, একলা-একলা আগুনের ধারটিতে বসে’ পেয়ালার পর পেয়ালা নিগ্রো রঙের কাফি ঢালি আর খাই। কত কথাই মনে হয়, সব কথা ত সবাই বুঝতে পারে না, আর নিজেকে সব কথা শােনাতে গেলে ভয় হয়, হঠাৎ একদিন হয়তাে বিড় বিড় করে নিজের মনে ব’কতে সুরু ক’রবাে। এই কাকিটুকুর নেশা না থাকলে, প্রর্শে পানা, কোন কালে শুতে যাওয়া যেত ! তাছাড়া আপনি যখন কাল যাবেনই, তখন অন্তত মাস ছয়েকের মত গল্প করার সাধ এক রাত্রেই মিটিয়ে নেওয়া গেল। পরের দিন রাহদশ পর্যন্ত যাইবার জন্য নায়েব জোর করিয়া তাহার টষ্ট গছাইয়া দিলেন, এবং বনে প্রবেশ করা পর্যন্ত যতদূর দেখা যায় আমার দিকে তাকাইয়া মাঝে মাঝে হাত নাড়িয়া বিদায় জানাইলেন।
তুলা
»
সারা রাত বৃষ্টি পড়িয়া সমস্ত বনভূমি ধুইয়া মুছিয়া সাফ করিয়া দিয়াছে।
পােলদেশের সােনার হেমন্ত গাছে-গাছে যেন আগুন লাগাইয়াছে। ঐ
সামান্য একটু খােলা মাঠের মাঝখানে প্রকাণ্ড একটা তপলার পত্ৰমৰ্মরের
নীচে নায়েব-কুঠী বনের আড়ালে ধীরে ধীরে আত্মগােপন করিল।
কলিকাতা,
১৮ই বৈশাখ, ১৩৪৮
বিগস্ শ্রীমৎ অমুকানন স্বামী যখন ভারতবর্ষের কোন এক মহাপীঠস্থানে প্রাচীন আর্য-দেবতা মিত্রের মন্দির স্থাপনের জন্য দেশে-বিদেশে চেক সংগ্রহ করিয়া বেড়াইতেছিলেন, ঘটনাটা সেই সময়কার। একদিন লিবনের একটা নামজাদা পান্থশালার শয়নকক্ষ-সংলগ্ন স্নানাগারে অর্গণ- বদ্ধ অবস্থায় স্বামীজী কামধনু আকারের পঞ্চধাতু নির্মিত জিভ-ছােলার সাহায্যে সশব্দে রসন-মার্জনে ব্যাপৃত, এমন সময়ে বাদাম-চেরা চোখে হাসির ঝলক্ লাগাইয়া পর্তুগালী পরিচারিকা টেবিলের উপর এক গােছ চিঠি রাখিয়া স্নানাগারের দরজায় মৃদু আঘাত করিয়া জানাইয়া গেল- “পস্তা সেঞর।” উত্তেজনায় একরকম মূল্য ধরিয়া দেওয়া গােছের স্নান সারিয়া, স্বামীজী যথারীতি বােতল হইতে ছিপি দিয়া হােমিওপাথ। ঔষধ ঢালিবার মত করিয়া একবিন্দু “সিন্ধু-বারির সাহায্যে সংস্পর্শদুষ্ট কাফি, রুটি, মাখন এবং আরাে কী কী প্রাতরাশের উপকরণগুলিকে পবিত্র করিয়া লইয়া, দক্ষিণ হস্তে মুখে পূরিতে পূরিতে বাম হাত দিয়া চিঠিগুণ। উলটাইয়া পালটাইয়া পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। মিত্রধর্মপ্রচারক বিগ অমুকানন্দ স্বামীর সদস্তখং ফটো পট প্রকাশ করে নাই, ইউরােপের যে- কোনো দেশে যে-কোনাে ভাষায় এমন কোনাে সচিত্র সাপ্তাহিক বা মাসিক আছে কিনা সন্দেহ। তাছাড়া প্রায় সকল ভাষাতেই মিত্রধৰ্ম্মের বিবরণ ও তাহার বিশ্বমৈত্রীর আদর্শ-পরিপুর্ণ পুস্তিকা মুদ্রিত করিয়া সদস্য হইবার নিয়মাবলী ও ফরম সমেত তাহা ইউরােপের সকল সম্রান্ত ব্যক্তিদের ঠিকানায় স্বামীজী ইহার আগেই চিঠি-বাক্স-সাং করিয়াছেন। স্বামীজীর উত্তেজনার কারণ সম্বন্ধে পাছে কেহ অযথা সন্দেহ পােষণ করেন, সেইজন্য এই অবান্তর কথাকয়টি লিপিবদ্ধ করিলাম। ফলকথা, বহুদিন ধরিয়া তিনি মিত্র-দেবের একটি শসালে ইউরােপীয় সম্রান্ত ভক্তের আবির্ভাবের আশায় বসিয়া আছেন। সেদিনকার চিঠিগুলাতেও আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাহায্যদানে অসামর্থ্য- জ্ঞাপন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবে শেষকালে পড়িবার জন্য যে চিঠিখানি স্বামীজী একপাশে সরাইয়া রাখিয়াছিলেন, সেইখানা দেখিয়া স্বামীজীর মনে হইল, মিত্রদেব বুঝি এতদিন পরে তাহার সেবায়তের দিকে মুখ তুলিয়া চাহিলেন। চিঠিখানার ওজন নকরে আধপােরা হইবে। পাতার পর পাতা প্রেরণা-পরিপূর্ণ, দর্শন ও কাব্য মিশ্রিত, সালঙ্কার-ইংরেজী বাক্যবিন্যাসের গােলােকধাধার অলিতে গলিতে মাথা ঠুকিয়া যখন স্বামীজী কোনাে রকমে বাহির হইয়া আসিলেন, তখন তিনি তাহার যে সারমর্ম গ্রহণ করিলেন, তাহা শাদা কথায় এই : আর্যভূমিতে “মিত্রা-দেওয়ার” পুনরাবির্ভাবে হ্রাবিয়া * হরেদো অতিশয় আনন্দিত হইয়াছেন। একমাত্র মিত্র-দেওয়াই যে বর্তমান হিংসা-বিধ্বস্ত সংসারে মৈত্রী স্থাপন করিবে, সে বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ। মিত্রা-দেওয়ার মন্দির প্রতিষ্ঠা কল্পে তিনি বৎসামান্য লাখ কয়েক টাকা দিতে চান। তবে সে সম্বন্ধে তিনি স্বামীজীর * কাউন্ট হাতের কাজ সহিত সাক্ষাতে বিশদ আলােচনা করিতে ইচ্ছুক। সুতরাং কালবিলম্ব না করিয়া স্বামীজী যদি তাহার জায়গীরে তাহাকে দর্শনদানে অনুগৃহীত করেন ত তিনি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করিবেন। স্বামীজী আশা করিয়াছিলেন, নিমন্ত্রণপত্র-সংলগ্ন ভাড়া ও রাহাখরচ বাবদ বেশ মােটা রকমের একখানা চেক্ থাকিবে। কিন্তু চিঠির প্রত্যেক খানি পাতা পুনঃপুনঃ পরীক্ষা করিয়াও চেকের উপস্থিতিব্যঞ্জক প্রকটি আপিনের ছিদ্র পর্যন্ত আবিষ্কার করিতে না পারিয়া তিনি একটু চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। পথ কম নয়। লিন্ হইতে ইস্পানিয়া, ফ্রাস্, বেলজিয়া, আলমানিয়া পার হইয়া তবে পােলদেশ। তাহার পর ভারশে হইতে ট্রেনে করিয়া পােলদেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চলে হাবিয়ার জায়গীরে পৌছিতে প্রায় ঘণ্টা দশেক লাগিবে। টমাস কুকের টহল-বুরাে হইতে স্বামীজী এই তথ্য সংগ্রহ করিলেন। তাছাড়া পথে অন্ততঃ চার বার গাড়ী বদল করিতে হইবে, এবং পথশ্রান্তি দূর করিবার জন্য পান্থশালায় রাত্রিযাপন করিতে হইবে। তত্ৰাচ মিত্রদেবকে স্মরণ করিয়া স্বামীজী পরের দিনই সুদুর, অজ্ঞাত পােলদেশ অভিমুখে যাত্রা করিলেন । ইহার সপ্তাহখানেক পরে একদিন বিকালের দিকে সূর্যমুখী রঙের রেশমী পাগড়ী ও মােটা পশমের জোব্বার বর্ণচ্ছটায় দিগন্ত উদ্ভাসিত করিয়া ও স্থানীয় অধিবাসিদের চোখে ধাঁধা লাগাইয়া, স্বামীজী হ্রাবিয়ার জায়- গীরের নিকটবর্তী স্টেশনে অবতরণ করিলেন। তাহার যথােচিত অভ্যর্থনার জন্য স্বয়ং হ্রাবিয়া আপন অশ্বিনীকুমারদ্বয়-বিনিন্দিত, রূপার সাজ পরাননা শাদা ঘােড়া ও আবলুশ-কালাে জুড়ী লইয়া উপস্থিত ছিলেন। ঘােড়ার গলায় বাঁধা ঘুঙুরের বাজনায় পথ-চলা কিষাণ-কিষাণীদের সন্ত্রস্ত করিয়া যখন তাহারা হ্রাবিয়ার প্রাসাদে পৌছিলেন, তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গেছে।
বিগ অন্ধকারে হ্রাবিয়ার প্রাসাদের, কেল্লার মত জায়গায় জায়গায় খােবরাল ছাদ, ও ঘড়িওয়ালা মিনারের যেটুকু চোখে পড়িল, তাহা দেখিয়া শ্রীমৎ অমুকানন্দ স্বামী বারে বারে মিত্রদেবের উদ্দেশে প্রণাম জানাইলেন। হ্রাবিয়া হরেষ্কোর প্রসাদে যে মিত্ৰমন্দিরের স্বর্ণচূড়া আকাশ ভেদ করিয়া স্বয়ং সবিতাদিত্যের হিরন্ময় পাত্রাবরণকে ম্লান করিয়া দিবে, সে-বিষয়ে স্বামীজীর সন্দেহ রহিল না। গাড়ী প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে প্রবেশ করিতে না করিতেই ডজনখানেক চাপরাসি-বাট্রলার ও দাস-দাসী তাহাকে ঘেরিয়া দাঁড়াইয়া তাহার হাতের হস্তিদন্ত-নির্মিত, মুক্তাখচিত পরিব্রাজকের যষ্টি ও মৃগচর্মের হাত-ব্যাগটি একপ্রকার ছিনাইয়া লইল। তাহার পর বাথটবে স্নিগ্ধ, সুবাসিত নকল সমুদ্রের জলে স্নানান্তে পথশ্রান্তি দূর করিয়া স্বামীজী হ্রাবিয়ার সহিত দর্পণ বিচ্ছুরিত সারি-সারি ঝাড় লণ্ঠনের তীব্র আলােকে উজ্জ্বলিত অশনকক্ষে প্রবেশ করিলেন । এতক্ষণ পরে সুস্থির লইয়া হাবিয়ার সহিত মুখােমুখি বসিবার সুযােগ ঘটিল। বয়স তাহার ঘাট পার হইয়াছে, মাথাভরা ধবধবে শাদা চুল, প্রাচীন রােমক পণ্ডিতের মত তীক্ষ্ণ নাসিকা ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ওষ্ঠাধর, বড় বড় শাদা গোঁফ বংশপরম্পরায় আধিপত্য-গৌরবের পরিচয় দেয়। কালাে চোখ দুইটার অসাধারণ জ্যোতি দেখিয়া তাহাকে হঠাৎ বৈদিক যুগের তপঃক্লিষ্ট ব্রাহ্মণ বলিয়া ভুল হইতে পারে। কিন্তু কিছুক্ষণ আলাপের পরই তাহার বাহ্যিক ও উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত আভিজাত্যের কঠোর আবরণ ভেদ করিয়া ভিতরের সহজ ও সরল প্রকৃতির মানুষটি ধীরে ধীরে বাহির হইয়া আসে। তখন তাহার উদ্দীপ্ত চোখে শিশুর হাসি ভরিয়া ওঠে, এবং মসৃণ গণ্ডস্থলে একটি গভীর ও প্রীতিকর সিনিকতার রেখাপাত হয় ।
হাতের কাজ আহার্যের প্রতীক্ষা করিতে করিতে লম্বা তুর্কী সিগারেট সমেত কুল-চিহ্ন-খচিত রূপার বাক্সটি স্বামীজীর দিকে আগাইয়া ধরিয়া, তাহার আত্মম্ভরি প্রত্যাখ্যান একপ্রকার লক্ষ্য না করিয়াই তিনি নিজে একটি সিগারেট ধরাইলেন, ও পরে সবিস্তারে আত্ম-পরিচয় শুরু করিলেন। দেখুন মস্কো স্বামী, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবার জন্যেই বিশেষ করে আমার জায়গীরে আহ্বান করি। আমাকে দেখে কি হঠাৎ হিন্দু বলে ভুল হয় ? দেখুন ত ভালাে করে তাকিয়ে আমার মুখের দিকে। হয়, তাে? দেখুন, ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই। আপনি শুনলে আশ্চর্য হবেন, মস্কো স্বামী, আমি জাতিতে হিন্দুস! আপনি কি পােল-কবি মিংক্যেভিচ-এর মহাকাব্য “পান্ তাদেউ” পড়েছেন ? ? কেন ? আশ্চর্য ! এখনও অতবড় মহাকাব্যের ইংরেজী বা ফরাসী তর্জমা হয় নি ! বলেন কী! যাই-হ, “পান্ তাদেউ”এ আমার সামান্য বংশ-পরিচয় পাওয়া যায়। আমারই প্র-প্রপিতামহ ব্রাবিয়া হরেদোর চরিত্র-বিবরণ “পান্ তাদেউশ”-এর পাতায় পাতায়। যদি কখনাে পড়েন, ত দেখতে পাবেন, তার চরিত্রের আধ্যাত্মিক সম্পদ। তার জীবনের একমাত্র ব্রত ছিল সৌন্দর্য্যের সেবা। থেকে থেকে আচম্বিতে তার সৌন্দৰ্যবােধ তাকে বিহ্বল করে ফেলতে! অতীন্দ্রিয়ের সঙ্গে তার এক অদ্ভুত অলৌকিক যােগ ছিল যা ক্ষণে ক্ষণে নিবিড়, অনির্বচনীয় আনন্দে আত্মপ্রকাশ করতে। হ্রাবিয়া হঠাৎ অতি সাধারণ কোনাে জায়গা দিয়ে ঘােড়ায় চড়ে চলতে চলতে কী এক অজানা কাব্যলােকের বিগ ভেতরে গিয়ে হাজির হতেন। “পান তাদেউশ”-এ তার এই অতীন্দ্রিয় আনন্দ-বােধের বিবরণ পড়তে পড়তে, কয়েক বছর আগে একদিন ভাবছি, তার এই ঐশ্বরিক শক্তি, যার সামান্য অংশ আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি, তা এলাে কোথা থেকে! হঠাৎ উপলব্ধি করলাম, তার রক্তে এবং আমার রক্তে এমন বীজ আছে, যা যুগ যুগ ধরে আনন্দের স্বরূপে ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করে এসেছে। সে বীজ, অন্ততঃ আপনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন, মস্যো স্বামী, ইউরােপের অনুর্বর, অনাধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে জন্মলাভ করে নি। এর কিছুদিন পরে ইতিহাস ও ভাষাতত্ব নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতেই ব্যাপারটা আমার কাছে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হলো। এখানেই বলে রাখা ভালাে যে, আমাদের বংশ পােলদেশে বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করলেও আমাদের উৎপত্তি লিতুয়ানিয়ায়, এবং বরাবরই আমাদের বিবাহাদি লিতুয়ানীয়দের সঙ্গে হয়ে আসছে। আমাদের অবশ্য এ-দেশে লিতুয়ানীয় বলে না, বলে জুমুজি। আমাদের সম্বন্ধে একটা কথা আবিষ্কার করলাম, তা এই যে, আমরা এই অল্পসংখ্যক জ মুজি, কোন এক প্রাচ্য দেশ থেকে এসেছি। প্রাচ্য মানে, চীন থেকেও নয়, জাপান থেকেও নয়, আরব, ইরাণ বা তুরাণ-দেশ থেকেও নয়। আমাদের উৎপত্তি ভারতবর্যে । তার প্রমাণ পাবেন, আমাদের কালে চোখে আর আমাদের ভাষায়। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে, ইউরােপীয় আর্যভাষাসমূহের মধ্যে সাস্কৃতার সঙ্গে নিকটতম সম্বন্ধ লিতুয়ানীয়ের, এবং আমার মনে হয় জ মুজিদের ভাষার। এই গেল এক কথা। দ্বিতীয়তঃ, আমরা যদি পােল হই, তা হলেও আপনাদের সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ খুব দুরের নয়। পােল ও অন্যান্য স্লাভ ভাষার সঙ্গে সাঁতার যােগ দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। এ আমি একটি হাতের কাজ প্রাচ্য ভাষায় পণ্ডিত অধ্যাপকের কাছে শুনেছি। শুনেছি, নাকি আপনাদের দেশে ব্রাহ্মণরা নিজেদের শর্মা বলে অভিহিত করেন। আর জানেন, পােলদেশের প্রাচীন নাম কী ছিল ? সার্মাতিয়া ! এই শৰ্মা ও সাৰ্মাতীয়দের মধ্যে প্রাচীন আত্মীয় কী ছিল, তা একদিন ইতিহাস অতীতের কবল থেকে উদ্ধার করবে, আপনি দেখে নেবেন, মস্কো স্বামী। তৃতীয়তঃ, রক্ত যে সুধু লাল ও শাদা রঙের অণুতনুর সমষ্টি,একথা আমি মানি না। আমার বিশ্বাস, আমাদের জড়দেহের শিরা-উপশিরার সঙ্গে এক সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক দেহের শিরাউপশিরা অদ্ভুত উপায়ে জড়িত। দৈহিক রক্তের মত আমাদের আধ্যাত্মিক রক্তও এই সূক্ষ্মশরীরের ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত। আমার প্র-প্রপিতামহের শরীরে, আমার বিশ্বাস, হিন্দুস্তানের আধ্যাত্মিক রক্ত প্রবাহিত ছিল, এবং সে রক্ত আমি আমার দেহমনের প্রতি অংশে অনুভব করি। এই দেখুন না কেন, যেমনি আপনার মিথা-ধর্ম সম্বন্ধীয় পুস্তিকা হাতে এলাে, অমনি আমার প্রাণ সাড়া দিয়ে উঠলাে। ভাবলাম, ইউরােপের সভ্যতায় আজ সর্ববিষয়ে এই যে অসঙ্গতি পদে পদে, এর মূলে তার ঘাড়ে চাপানাে, বিদেশী, বিজাতীয়, না-আর্য, ইহুদী ধর্ম, যা তার কাছে আজও দুর্বোধ্য, এবং বার আদর্শের সঙ্গে তার অন্তরের, তার রক্তের কোন যােগ নেই। আমাদের প্রাচীন আর্য-ধর্ম, যা আপনার মত মনীষীরা পুনর্জীবিত করতে চেষ্টা করছেন, 'চতুর্মুখ “খ্যাতভি” বা বিশ্বদর্শী,* আগ্নি বারুণা, মিথা প্রভৃতি দেবতার অর্চনা যে-দিন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, সেই দিনই ইউরোেপ সত্যিকার আধ্যাত্মিক মুক্তিলাভ করবে। হিন্দুস্তানের নূতন মহাপীঠস্থান মিথপুরে মিথ-মন্দির স্থাপনা সম্বন্ধে আলােচনা পরে বিস্তারিতভাবে করা যাবে। * পােলদেশে প্রাপ্ত প্রাচীন স্লাভদের দেব-মুতি।
বিগ মন্দির-প্রতিষ্ঠাকলে কয়েক লাখ জলতী * দেবার ইচ্ছে আছে, আগেই লিখেছি। টাকাটা এখনও পাই নি, হাতে এলেই আপনার বাঙ্কে পাঠিয়ে দেব। তার আগে, আপনাকে এই কথাটা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চেয়েছিলাম যে, আমি আপনার ওসব দানশীল বড় মানুষদের ঘৃণার চক্ষে দেখি। তারা দান করেন নামের জন্যে। মিথ-মন্দির স্থাপনে আমার যে এই সামান্য কয়েক লাখ জলতীর চাদা, তাকে দান বলে মনে করবেন না, মস্যো স্বামী, এ সুধু জনৈক প্রবাসী হিন্দুসের স্ব-ধর্মের প্রতি যৎসামান্য কর্তব্য পালন বলে মনে করবেন, এই আমার অনুরােধ। আমি যে জাতিতে হিন্দুস্ , আমার শরীরে যে হিন্দুদের আধ্যাত্মিক রক্ত প্রবাহিত, এর প্রমাণ যদি চান্ ত ভূরি ভূরি দিতে পারি, মস্কো স্বামী। একটা ঘটনার কথা বলি শুনুন। আমাদের এ-অঞ্চলটা আগে রুশীদের অধিকারে ছিল। সুতরাং সারের পতন হবার সঙ্গে সঙ্গেই পিল্ পিল করে’ এসে হাজির হলে দলে দলে বশেভিক্। বােধ হয় লক্ষ্য করেছেন, এদিকে সুধু চাষা-কিষাণদের বাস, এমন কি আমার নায়েব, গােমস্তা, কেরাণী, সরকার ছাড়া এ-অঞ্চলে একটা বুর্জোয়া ভদ্রলােকের পর্যন্ত দেখা পাওয়া কঠিন। কেবল চাষা আর চাষা। সুতরাং বশেভিক্রা এসে আমার চাষা প্রজাদের ক্ষেপিয়ে তুললে। হাজার বছর ধরে আমাদের এই বংশ চাষাদের আপন সন্তান নির্বিশেষে লালন ও পালন করে এসেছে। বলশেভিকদের প্ররােচনায় তারা হঠাৎ বিদ্রোহের লাল ঝাণ্ডা তুললে। সঙ্গে-সঙ্গে তারা আমার জায়গীরের নানান রকম ক্ষতি করতে সুরু করলে। শেষকালে একদিন তাদের খুন চেপে গেল। আমার বাড়ীর ওদিকটায় থাকতাে আস্তাবল-ভরা ঘােড়া, খাটি আরবী আর আউস্ত্রালীয়। ঘােড়ার সখ আমার বরাবর। একদিন * ২ জলতী =১১ হাতের কাজ চাষারা এসে আস্তাবলসুদ্ধ ঘােড়া জীবন্ত পুড়িয়ে মারলে, তারপর মশাল জ্বালিয়ে হাজারে হাজারে চাষা এলে আমাদের বাড়ীতে আগুন লাগাতে। আমার স্ত্রী তখন বেঁচে ছিলেন। চারা মশাল জ্বলিয়ে, ফটক ভেঙ্গে, বাড়ীর একেবারে দোরগােড়ায় এসে পড়েছে। তাদের থামাবার উপায় নেই। ভাবছি, কী করবাে। এমন সময়ে হঠাৎ কী মনে হলাে, ছুটে এসে বারান্দায় দাড়ালাম। মশালের আলােয় উঠোন, বাগান একেবারে লাল হয়ে উঠেছে। আমি বারান্দায় দাড়িয়ে সুধু চাষাদের সর্দারের দিকে শান্ত, সংযতভাবে তাকালাম। ব’লবাে কী, মস্কো স্বামী, কয়েক সেকেণ্ড সেও আমার দিকে কমটিয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর যেন ঘুম থেকে আচমকা জেগে ওঠার মত ফেল ফেল করে’ চারিদিকে তাকাতে লাগলাে। তারপর চাষাদের দিকে ফিরে বললে, তাবারি, আমরা করছি কী? এ যে আমাদের বাপ, মাপা হ্রাবিয়া আর পানী ভ্রাবিনা! লজ্জায় মাথা হেঁট করে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে তারা বাড়ী ফিরে গেল। সেই দিন স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম, আমার রক্তে কী এক অদ্ভুত শক্তি আছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। তাছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমি স্বপ্নে বা ধ্যানে এমন সহজভাবে আবিষ্কার করি যে, তা শুনলে আপনি আশ্চর্য হয়ে যাবেন। সে-সব কথা পরে ব’লবাে। ঐ শক্তিরই সাহায্যে একটা মােটা রকমের টাকা পাবার কথা আছে যে-টাকাটা আপনার বাঙ্কে জমা দেব, বলছিলাম। যা সে কথা পরে ব’লবাে। এখন, আমি যে সত্যিকার হিন্দু, এর প্রমাণ একটু পরেই পাবেন। আগে থেকেই আপনাকে বলে রাখি, আমি নিরামিষাশী। আগে অবশ্য খুবই মাংস খেতাম। এমন মাংস নেই যা আমি খাই নি ! যত রকমের জন্তু-জানােয়ার আর পাখী। এমন কি দক্ষিণ আমেরিকায় বড় বড় ইদুরের মত একরকম জানােয়ার পাওয়া যায়, তা অবধি। কিন্তু এই বিগত্ শেষ বয়সে, তেমনি তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে। আমার ভেতরকার আধ্যাত্মিক রক্ত সে-সব সহ্য করবে কেন ? কয়েক বছর আগে এমন গাউট আরম্ভ হলাে যে ডাক্তাররা স্পষ্ট বলে দিলে, আমার পক্ষে একটুকরাে মাংস আর এক ডেলা বিষ, দুই সমান। সেই থেকে আমার মাংস খাওয়া বন্ধ। বড় বড় কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে শেষকালে একজন নিরামিষ রান্নার পাচক পাওয়া গেল। লােকটার অদ্ভুত ক্ষমতা মশাই। সুধু আনাজ দিয়ে এমন জিনিষ রাঁধবে যে, তা খেয়ে কে না বলবে তা মাংসের তৈরী ! লন্দন, পারী, বালি, ভারশোএ এমন নিরামিষ রেস্তোর। নেই, যেখানে আমি খাই নি। কিন্তু সেখানে সুধু সেদ্ধ আর সেদ্ধ ! ও আপনার আলু, মটর, গাজর, বরবটি, কোপি, বীট, যা চান্, সব সেদ্ধ, আর তার ওপর খানিকটা শুকনো পাউরুটির গুড়াে ভাজার সঙ্গে গলানাে মাখন ! আমার রাঁধুনী, মশাই, যা রাধে, তার তুলনা আমি কোথাও পাই নি, আজ পর্যন্ত। এইসূত্রে, আপনাকে বলি, মস্কো স্বামী, যদি রেস্তোরাঁর কথা তােলেন, ত লন্দনে হিন্দুদের যে রেস্তোরাঁ। দেখে এসেছি, সেরকম রেস্তোরাঁ। আমি কোথাও দেখি নি। ও আপনার কাট, রিট, স্যাভয়, আমীর-ওমরাহদের আড্ডা বটে, কিন্তু খেয়ে সুখ ঐ যে কী বলে, নামটা মনে নেই, হিন্দুদের একটা রেস্তোরাঁয়। আর সে গাসদেরই বা চেহারা কী! রঙ-বেরঙের তুরবান্ মাথায়, যেন এক- একজন মাহারায়া ! সান্ধ্যভােজনের প্রথম পদ আসিয়া হাজির হইল, ক্ষুধা শানাইবার জন্য অরূ ভে! বালার সসম্ভমে স্বামীজী ও হ্রাবিয়ার থালায় একটু একটু ১০১ হাতের কাজ / করিয়া সাজাইয়া দিল, মেয়নেজের সসে মাখা মটরশুটি, গাজরের টু, বী ও আলুর কুচী দিয়া তৈরী সালাদ রুস। এক পাশে চাক্তি করিয়া কাটা তােমাতে ও পেঁয়াজ। তাহার এদিকে বম্বে ডাক্এর মত করিয়া ভাজা বরবটি, ওদিকে আনাজের তৈরী সসেজ, থালার মাঝখানে পােলাওয়ের পুর দেওয়া বড় বড় গােল গােল দুইটি তুর্কী লঙ্কা। বুভুক্ষু স্বামীজী অর প্তের-এর সব উপকরণ:কয়টিই চোখের নিমিষে উদৱসাং করিলেন। হাবিয়া কহিতে লাগিলেন। কেমন বলুন ত মস্কো স্বামীজী, রান্না ভালো কি না। যা খেলে তাতে মাংসের সম্পর্ক পর্যন্ত নেই। ও খাঁটি নিরামিষ জিনিষ । আপনাদের দেশে যে-কোনো ব্রাহ্মণের পাতে দেওয়া যায়। মেয়নেজের সসে অবশ্য একটু মুগীর ডিমের কুসুম থাকেই, তা সে ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। ওর বেশীর ভাগই অলিভের তেল। তারপর বরবটি ভাজা ঠিক বঙ্গে ডাক্-এর মত খেতে লাগলাে কি না বলুন। হাতী ঘােড়া কিছুই নয়। স্রেফ আগুনের মত গরম লার্ড-এ ফেলে ছাঁকা ভেজে নাও ব্যস্। আর ঐ সসেজের মত যা খেলেন, ওর সবটাই আনাজ, আর বার্লি। সুধু ওর ছালটুকু, নাম করবাে না, পাছে আপনার খেতে বিঘ্ন হয়, সেই জন্তুর পাকস্থলী, অবশ্য খুব পরিষ্কার করে বােরা, একেবারে কেমিক্যালি ক্রীড়। স্বামীজী মিত্র-নাম স্মরণ করিয়া লিম্বনে ফিরিয়াই প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা মনে মনে স্থির করিয়া রাখিলেন। কোনো ছুতা করিয়া ওঠা যায় কিনা, ভাবিতেছেন, এমন সময়ে একটার পর একটা পদ আসিয়া বুভুক্ষু স্বামীজীর মনে বিকার ঘটাইয়া দিল। সমস্ত সঞ্চিত পাপের একত্র বিগ প্রায়শ্চিত্তের সঙ্কল্প করিয়া তিনি পুনরায় আহারে মনােনিবেশ করিলেন হাবিয়া পূর্বের মত পাকপ্রণালীর গল্প করিয়া চলিলেন। জানি, আপনারা হিন্দুস্তানের মানুষ, ভারী শুদ্ধাচারে থাকেন, মাছ-মাংস খান না, প্রাণিবধ আপনাদের পবিত্র গ্রন্থাদির অনুশাসন-বিরুদ্ধ। আপনাদের দেশের ব্রামা, শিওয়া, বুদদা, যে-সব কথা বলে গেছেন, অতবড় শিক্ষা জগৎ আজ পর্যন্ত কার কাছে পেয়েছে ? আপনাদের মাহাত্মা গান্দীও যে আজ এই নিষ্ঠুর বস্তুবাদী জগতের বুকে দাড়িয়ে তার আহিঙ্গা প্রচার করছেন, তার তুলনা কোথায়? নিরামিষ আহার সম্বন্ধে যদি আমার মত জিজ্ঞেস করেন ত আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, অতবড় আদর্শ জগতে আজ পর্যন্ত হয় নি, হবে না। তবে সঙ্গে-সঙ্গে একথা না মেনে উপায় নেই যে, প্রাণিবধ বন্ধ হয়ে গেলে জগতের সব চেয়ে আদিম ও বােধ হয় সর্বশ্রেষ্ঠ যে শিল্প, পাক-শিল্প, তার সমুহ ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী। আপনাকে গােটাকয়েক উদাহরণ দিই। ধরুন আমাদের এই পােলদেশের গৌরবের বস্তু, বিগত্। পােলদের পােলীয়তার বীজমন্ত্র ঐ একটি কথা বিগস, এ আপনি নিশ্চয়ই জানবেন। বিগসের উৎপত্তি অবশ্য আমারই মত, লিতুয়ানিয়ায়। তার প্রমাণ পােলভাষায় অ-অন্ত শব্দ নেই, এবং লিতুয়ানীয় বিশেষ্য-মাত্রই প্রায় অঅন্ত। তবে বিগস এখন মধ্যযুগের লিতুয়ানীয় সম্রাট গেল্লোর মত সমগ্র পােলদেশে প্রভুত্ব করছে। এই বিগসের কতরকম যে হেরফের তার ইয়ত্তা নেই। কয়েক রকম বাছা বাছা বিগসের বিবরণ শুনতে চান্ ত বলি। অবশ্য আশা করি, তাতে আপনার গুতের কাজ ধরুন আহারে বিঘ্ন ঘটবে না, আপনি শুদ্ধাচারী মানুষ ! “বিগ”- শব্দের পােলভাষায় আরও একটা অর্থ আছে তাও আপনাকে বলে রাখি। “বিগ” মানে ইংরেজীতে যাকে বলে “হ-পচ”, জগা-খিচুড়ী। যাই হােক, এখন বিগসের বর্ণনা শুনুন, বলি। এক কথায় বলতে গেলে, বিগসের উপকরণ মুখ্যত মিহি করে কাটা জরানাে ট বাঁধা কোপি, যাকে জার্মানী কায়দায় ইংরেজীতে বলা হয় সাউয়ারক্রাউট, আর মাংস। আপনি জার্মানিতে সাউয়ারক্রাউট খেয়েছেন কিনা, জানি না। জার্মানী সাউয়ারক্রাউ বললে যা বােঝায়, পােলদেশের কৃভাশনা কাপূস্তা বা জরানাে ট বাঁধা কোপির সঙ্গে তার তুলনাই হয় না। আমাদের টক্ কোপি তৈরী করা সহজ নয়, মস্যো স্বামী! সূতাের মত মিহি করে বাঁধা কোপি কাটতে হবে। পনেৰােটা কোপি। তার সঙ্গে সেরখানেক গাজর চাকতি করে কেটে মেশাও, ছােট্ট ছােট্ট কুলের মত আপেল আধখানা করে কেটে, ভেতরকার বিচি ফেলে দিয়ে তার সঙ্গে দাও, সের দুই আড়াই, তার পর নূন, মৌরী একটু একটু করে। পিপে কিংবা বড় মাটির বা কাঠের গায় জরানো চলতে পারে। খানিকটা করে কোপি ঢালতে হবে, তার পর আস্তে আস্তে একখানা চাকী বা হাত দিয়ে পিটে, ঘেঁৎলাতে হবে, যাতে সামান্য একটু রস বেরয়। তারপর আবার এক থাক কোপি। এমনি করে সব কোপিটুকু যখন ধরে গেল, তখন তার ওপর পিপের গােল ঢাকনা বা বারকোশ-টারকোশ, গােছের কাঠের তৈরী কিছু দিয়ে চাপা দিয়ে তার ওপর বেশ ভারী গােছের একখানা পাথর চাপিয়ে দাও। কিছুদিন পরেই কোপি ভেসে উঠে তার ওপর ফেণা জমে উঠবে। ফেণাটুকু খুব সাবধানে ফেলে দিতে হবে, কারণ তাতে কোপির তেতো রসটুকু বেরিয়ে এসে জমা হয়েছে। তারপর হপ্তাখানেক পিপে বা গামলা আলগা বিগস রাখতে হবে, পরে ওপর থেকে লাঠি দিয়ে তলা পর্যন্ত গােটা কয়েক গর্ত করে দিয়ে, কোপির ওপর চাপা-দেওয়া কাঠখানা এমন ভাবে রাখাে যাতে, কৈাপির জল আস্তে আস্তে তার ওপর এসে জমা হয়। এর নাম আমাদের কৃভাশনা কাপূস্তা, জরানাে টক্ কোপি। তার সঙ্গে মাংস। এখন এই বিগস, কী ভাবে রাঁধতে হবে, শুনুন। বড়দিন, ঈষ্টার বা অন্য কোনো উৎসব উপলক্ষে যে বিগ রাঁধা হয় তার পাকপ্রণালী হচ্ছে এই : প্রথমে, বেশ বড় একটুকরাে চর্বিওয়ালা, কী বলে আপনার, ইয়ে, ছােট মাংস, জন্তুটার নাম না করলেও বুঝতে পারছেন নিশ্চয়, বেঁটে, মােটা, তাকিয়ার মত, ইস্কুপের মত পাকানাে লেজ, শুড়হীন হাতীর মত মুখ । মাংসটা কিন্তু বেশ চর্বিওয়ালা হওয়া চাই। অনেকক্ষণ ধরে তাকে সেদ্ধ করতে হবে। তারপর তার চর্বি-টল্টলে জলটুকু আলাদা করে রাখ। গােটা কয়েক পেঁয়াজ চালা করে কেটে চর্বিতে একটু নেড়েচেড়ে সামান্য ভেজে নাও। তারপর খানিকটা টক্ কোপি আর ঐ পেঁয়াজ, রাঁধবার পাত্রে ফেলে আগুনে চাপিয়ে আস্তে আস্তে মাংসের জলটুকু তাতে ঢেলে দাও। আগুন যেন জোরালাে না হয়। মাংসের জলে কোপি গুমে গুমে সেদ্ধ হতে থাক। ইতিমধ্যে যত রকমের মাংস পাওয়া যায় হাতের কাছে, আভেনে পূরে দাও বােষ্ট, করতে। ও তােমার হাঁস, মুর্গী, পেরু, খরা, গিনী-ফাউল, উৎসবের সময় এসব থাকেই। অবশ্য, কী বলে, আপনার, বড় মাংসও খানিকটা চাই। মাংস রােষ্ট করা হয়ে গেলে, খানিকটা করে কেটে নাও। তারপর যখন তা বেশ জুড়িয়ে শুক্ননা হয়ে যাবে, তখন সব রকমের বােষ্ট, মাংস ছােট ঘােট চৌকো করে কেটে হাতের কাছে মজুত রাখ। তার সঙ্গে বেশ খানিকটা স্মােকড় হামও চাই, আর সসেজ, ঐ রকম চৌকো করে কাটা। এইবার দেখতে হবে, কোপিসেদ্ধ কতদূর। কোপির জল মরে’ যখন বেশ একটু হাতের কাজ তেলাতেলা ভাব হয়ে আসবে, তখন মাংসের টুকরােগুলাে ফেলে, বেশ নেড়ে চেড়ে একত্র মিশিয়ে, ঢাকা দিয়ে দাও। খানিকক্ষণ পরে যখন বেশ মাখােমাখাে হয়ে আসবে, তখন নামিয়ে নাও। এর নাম বিগস্। অবশ্য এখানেও এর শেষ নয়। যেদিন বঁধা হলাে, সেদিনই তাকে পাতে দেওয়া চলবে না। বিগ রাধা হ’লল বটে, তবে এখন তাকে বাসি করতে হবে। দিন দুই ধরে এইসব উপকরণগুলি একত্র সহবাসে পরস্পরের সঙ্গে মিশতে সুরু করবে। দু’দিন পরে আবার তাকে গরম করে, এবং গরম-গরম পাতে দাও। বিগস্ সাত, আট দশ দিন পর্যন্ত খাওয়া চলে। যত দিন যাবে, এবং যত বার গরম করা হবে, ততই এর ভেতরকার মিষ্টি, রহস্যময় রসটুকু আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসবে। বিগ মানে জগা-খিচুড়ী বটে, কিন্তু মস্কো স্বামীজী, সঙ্গীতে ঐক্যতানের যা আদর্শ পাক-শিল্পে বিগস একেবারে তাই। হারমনিয়া, সমন্বয়। বিগসের বর্ণনায় স্বামীজী আপন মৃগচর্মের ব্যাগস্থ সমুদ্রপীড়া- প্রতিরােধক কী একটা বড়ির কথা ভাবিতে ভাবিতে থালার উপর অর্ধভুক্ত আহার্য লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছেন, এমন সময়ে হ্রাবিয়া পাত্রস্থ ভােজ্যটির প্রতি নির্দেশ করিয়া কহিলেন— খাবারটার চেহারা যেমন, কিন্তু আসলে তা মােটেই নয় ! ভেতর আছে সুধু চীস, মটরশুটি বাটা, আরাে কী কী, আর ডিম। একেবারে নিরামিষ, মস্কো স্বামীজী, আপনি অনায়াসে খেতে পারেন। তবে লােকটা যে কী যাদু জানে মশাই! খেয়েই অবশ্য আপনার মনে হয়েছে, ওটা ভী। স্বাদ ভীলের বটে, তবে ওর উপকরণ নিরামিষ ।
বিগস ঐটেই লােকটার কারসাজি! ওটি আমার প্রিয় খাদ্য। জানতাম আপনি ভী খাবেন না, অবশ্য আমিও খাই না, তাই ঐ জিনিষটি আজ বিশেষ করে রাঁধতে বলেছিলাম। মিত্রোপাসক, সব্রাহ্মণবংশসভৃত স্বামীজী স্বামীজী ভাবিতে লাগিলেন, আজিকার সন্ধ্যায় যে-সমস্ত জিনিষ উদরস্থ ও কর্ণবিবরস্থ করিলেন, তাহার প্রায়শ্চিত্ত বােতলভরা সমস্ত সিন্ধুনদের জলে, এমন কি সমস্ত সিন্ধু-নদটাকে গ্রাস করিয়া ফেলিলেও, সম্ভব কিনা সন্দেহ। হাবিয়া অন্য একরকম বিগসের বর্ণনা শুরু করিলেন। এত গেল সাধারণ বিগসের কথা, যা আপনি ভারশোএর বা ভীনাের বা অন্য কোনাে সহরের যেকোনাে রেস্তোরাঁয় আছার পাবেন। এখন সত্যিকার বিগসের কথা বলি। তার মাম “শিকারীদের বিগস।” বিগস জিনিষটা আসলে শিকারীদের একচেটে ছিল। শিকার করতে গিয়ে তারা বনে-জঙ্গলে খাবে কী ? চাষাভূষােদের কাছে পেত টক্ কোপি, বাদবাকী উপকরণ তাদের সঙ্গেই থাকত। শিকারের ঘাঁটিতে তা রান্না করা হত। পাক-প্রণালী প্রায় একই, তবে মাংস যা পাওয়া যায় তাই। সাধারণতঃ হরিণ, খরা, বুনন হাঁস, যতরকমের পাখী, তাছাড়া যদি শিকার মেলে ত বুননা ছােট মাংস। মশাই, ঐ জিনিষটি বাদ দিয়ে বাঁধা বিগ বিগসই নয়। তার মাংস এমন টটকে গাঢ় লাল, যে তাকে দূর থেকে একেবারে কালাে দেখায়। আর তার ঐ বুনন-বুননা, সোঁদা-সোঁদা গন্ধটি, অভ্যেস না থাকলে খেতে বিঘ্ন হয় বটে, কিন্তু দু'একবার খেলে ও-ছাড়া আর কিছু মুখে রুচবে না। আর সে কী নরম, যেন মাখন! এই মুখে দিয়েছ কি এই হাতের কাজ নেই। শিকারীদের বিগসে আর একটি জিনিষ অবশ্য চাই-ই চাই, সেটি হচ্ছে পুরাে একটি বােতল উৎকৃষ্ট মাদের। মস্কো স্বামীজী, সে বিগ নয়, অমৃত! স্বয়ং আগ্নি, মিথ, বাৰুণার খাদ্য। স্বামীজী বহুকষ্টে আত্মসম্বরণ করিতে চেষ্টা করিলেন বটে, কিন্তু অশনকক্ষ হইতে কোন্ এক অজ্ঞাত, অপরিচিত কলঘরের পথে হ্রাবিয়ার দামী ইরাণী গালিচাখানিকে লিম্বনের পথে বিস্কে উপসাগররূপে ব্যবহার করিলেন। পরের দিন তিনি তাহার মৃগচর্মের ব্যাগ ও হস্তিদন্তের পরিব্রাজকের যষ্টি হাতে লইয়া হাবিয়ার কাছে বিদায় লইবার সময় শুনিতে পাইলেন, পবিত্র মহাপীঠস্থান মিথপুরে মিথামন্দিরের স্থাপনাকল্পে কয়েকলাখ জাতীর চেকখানি হ্রাবিয়া কিছুদিনের মধ্যেই তাহার নামে তাহার বাঙ্কে পাঠাইয়া দিবেন। তবে একটু দেরী হইতে পারে, কারণ তিনি তাহার অলৌকিক, আধ্যাত্মিক শক্তির সাহায্যে এক বিখ্যাত চিকিৎসককে কী এক দুরারােগ্য রােগের বীজাণু ও তাহার প্রতীকারের সন্ধান বাতাইয়া দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। উক্ত চিকিৎসক নােবেল পুরস্কার পাওয়া মাত্রই তাহার অর্ধেক অর্থ হ্রাবিয়াকে দিবেন, এইরূপ চুক্তি হইয়াছে। সুতরাং যে মিগ্ৰাদেবের আশীর্বাদে হাবিয়া এই অলৌকিক শক্তি লাভ করিয়াছেন, এই সামান্য কয়েক লাখ জ্বলতী যে তিনি তাঁহারই সেবায় লাগাইবেন, তাহাতে আর আশ্চর্য কী ? অনবদ্য শিষ্টতা সহকারে হাবিয়া পুনরায় তাহার অশ্বিনীকুমারদ্বয়- বিনিন্দিত শাদা ঘােড়া ও আবলুশ-কালাে জুড়ীতে করিয়া, ঘুঙুরের শব্দে কিষাণ-কিষাণীদের সন্ত্রস্ত করিয়া, স্বামীজীকে ষ্টেশনে পৌছাইয়া দিয়া ১৮ বিগস আদিলেন, এবং সুযােগ পাইলে আবার তাহার জায়গীরে আসিতে পুনঃ পুনঃ অনুরােধ করিলেন। তঁাহার মিষ্ট স্বভাব ও শিষ্টাচারের অজস্র অভিব্যক্তির মাঝে লিম্বন্ হইতে যাওয়া-আসার ট্রে-ভাড়া ও রাহ-খরচের কথাটা উল্লেখ করা নিতান্ত অশােভন হইবে ভাবিয়া স্বামীজী তাড়াতাড়ি গাড়ীতে উঠিয়া পড়িলেন। গাড়ী ছাড়িবার সময়ে বিয়া স্বামীজীকে মনে করাইয়া দিতে ভুলিলেন না, যেন তিনি এই প্রবাসী হিন্দুটির কথা ৰম্মত না হন্। কলিকাতা, ২৪শে বৈশাখ, ১৩৪৮
উচ্চারণ-নির্দেশ
পােলভাষার উচ্চারণ স্থূলতঃ বাংলা ভাষার অনুরূপ। যে শব্দ কয়টি
এই গ্রন্থে বাংলা অক্ষরে সম্যক্রূপে প্রকাশ করা সম্ভব হয় নাই তাহা এই ও
জ=2.
ঝ=j (ফরাসী)।
উদাহরণ : zলতী, কাতা না, vীত।
সূচীপত্র
হস্তীগান্
৭
২ ০
ইমিয়েনীন্তী
১৩
মাদনন।
কারি-পাউডার
৪৯
তুলা
বিগস
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.