Bally Sadharan Granthagar
Madhabir Janya O Anayanya Galpo Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
২২ রাসবিহারী এভিনিউ, কলকাতা থেকে
বুদ্ধদেব বসু কর্তৃক প্রকাশিত
আ খি ন + ৩৯
मोर
মডার্ণ ইণ্ডিয়া প্রেস, • ওয়েলিংটন স্কোয়ার, কলকাতা থেকে
তজেন্দ্রকিশোের সেন কতৃক মুদিত
মাধবীর জন্য
অন্যান্য গল্প
প্রতিভা বসু
কবিতা
২০২ রাসবিহারী এভিনিউ
কলকাভা
মাধবীর জঙ্গ ৩ । । । । ৪। অনর্থক ‘নিরুপমার চোখ মুক্তি দৈবাৎ | r + । ৮১ । । ; . . পরিশেষ • • • ॥ ॥ ১৩৭
No text on this page.
No text on this page.
মাধবীর জন্য
No text on this page.
হঠাৎ মাধবীর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল।
আমি
নিউমার্কেটে ফুল কিনতে গিয়েছিলাম, দেখি এক ভদ্রমহিলা
ওজন নিচ্ছেন দাড়িয়ে। ওজন নেবার মতনই বটে। দৈর্ঘ্যে
প্রস্থে একজন মেয়েমানুষের যতখানি বাড়া সম্ভব উনি ঠিক
ততখানি বেড়েছেন। আগে লক্ষ্য করিনি, হঠাৎ চোখে
চোখ পড়লাে। সাহেবি পােষাকে সজ্জিত পুরুষটিকে দেখে
ওঁকে তারই স্ত্রী ভেবে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম, কিন্তু
একটু পরেই বুঝলাম ভদ্রমহিলাটি আমাদেরই মাধবী এবং
ভদ্রলােকটি মাধবীর নতুন স্বামী। স্তম্ভিত হলাম।
—এ কী, বকুল যে।
‘বা তুমি কোথেকে। এই হল আলাপের সূত্রপাত।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাধবী আমাকে রেহাই দিল না, জোর
করে নিয়ে এলো ওর বাড়িতে, বল্ল, ‘আমার কথা তােমাকে
শুনতেই হবে, আমি যে একটা অমানুষ বা পাষণ্ড নই সে-কথা
তােমার জানা দরকার।
বাড়িটি বেশ। একতলা ঘােট বাড়ি, সাজানাে গুছােনাে-
মাধবীর নিখুত হাতের ছাপ সর্বত্র। বছর দশেকের একটি
মেয়েকে ও নিয়ে এলাে—“মাসিমাকে প্রণাম কর, লক্ষ্মী।
আমি দুই চোখ মেলে লক্ষ্মীকে দেখতে লাগলাম—দেখতে
মা থ বীর জন্য
লাগলাম বল্লে ভুল হয়, গিলতে লাগলাম, আর আমার
চোখের তলায় পঁড়িয়ে লক্ষ্মী অস্বস্তিতে মরে যেতে লাগলাে।
অবশেষে দুই হাতে ওকে কোলের উপর টেনে এনে মাথায়
অজস্র চুমু খেয়ে বল্লাম, ওকে তাে আমার কিছু দেওয়া উচিত,
, মাধবী ? আমি হলাম মাসিম। হাত থেকে অতি
প্রিয় এবং অতি দামি একমাত্র গহনা আমার হীরের আংটিটি
ওর কচি নরম আঙুলে পরিয়ে দিলাম । টলটল করতে
লাগলাে, মাধবী রাগ করতে লাগলাে, কিন্তু তবু আমি
কিছুতেই আর তা খুলে নিলাম না।
মাধবীর
নতুন
স্বামীটি দেখলাম বেশ ভালােমানুষ। চা
খেতে-খেতে সামান্য আলাপ হলাে। কথাবার্তায় অতিশয়
ভদ্র এবং মার্জিত। চা খেয়েই উনি বেরিয়ে গেলেন কোথায়।
মাধবী এবার ঘনিয়ে বসলাে কাছে।‘লক্ষ্মী, যা তাে বাবা-
তাের মাসির সঙ্গে আমার কথা আছে।'—আমার বুকের
মধ্যে ঢিপঢিপ করতে লাগলো—কী বলবে মাধবী, কী কথা
আছে ওর।
‘তুমি নিশ্চয়ই ভয়ানক অবাক হয়েছ--
মাথা নেড়ে বল্লাম, বলাই বাহুল্য।
তবে যে কিছু জিজ্ঞেস করছ না?
या वयो।
‘কিছু একটা হয়েছে।'—নেহাৎ উদাসীনভাবে কথাটা
এড়াবার চেষ্টা করলাম।
‘তােমার কী মনে হয় ?—আমার মা মনে হয়েছিল তা
যে ঠিক নয় সে বিষয়ে যেন হঠাৎ আমি সন্দিগ্ধ হলাম।
বল্লাম, তুমি যা বলবে বল না।
মাধবী কথা ঘােরালাে, আমার স্বামীকে তােমার কেমন
লাগলাে ?
‘ভালােই ত।
‘কে বেশি ভাল—অশােক না এই ভদ্রলােক ?
এ নামটা আমার সয় না। শুনলে ভিতরে ভিতরে
বিশীরকম একটা যন্ত্রণা হয়। জবাব যে কী দেব ভাবতে
একটু সময় নিয়ে বল্লাম, আমার চেয়ে তা তুমিই ভাল জান।
মাধবী একটু চুপ করে থেকে বল্ল-তােমার সঙ্গে
আমার প্রায় দশ বছর পরে দেখা, এই ক’ বছরে যদি আমার
স্বামীর মৃত্যু হয়ে থাকে তা কি খুব আশ্চর্য ?’-একটু
থেমে—আর মৃত্যুর পরে যদি আমি বিয়ে করি সেটা কি খুব
অন্যায়?' মাধবীর কথার ধরনে প্রথমে যে-বিষয়ে আমি
নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম তা ধূলিসাৎ হলাে। অশােকের মৃত্যু যে
আমার পক্ষে বেদনাদায়ক হবে এ-বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ
মাধবী র ,
ছিলাম কিন্তু সে-বেদনা যে এত গভীরেও নাড়া দিতে পারে
তা আমি জানতাম না। অনেকদিন আগেকার আরেকটা
দুঃখের স্বাদ মনে পড়লাে। নতুন করে অভিভূত হলাম।
মুখ নিচু করে জিজ্ঞাসা করলাম—“কী হয়েছিল ওঁর ?
‘খুব সম্ভব যক্ষ্মা।
‘বােধ হয়।
মুখ তুলে বল্লাম, ‘বােধ হয় কেন? ব্যারাম কি ওঁর শেষ
পর্যন্তও নির্দিষ্ট হয় নি ?
‘শেষ পর্যন্ত আমি জানিনে—কেননা আমার যখন
সন্দেহ হতে সুরু হ’লাে তখনই আমি ওকে পরিত্যাগ করে
আসি।
‘পরিত্যাগ ? কথাটা আমার মুখ থেকে যেন সঙ্গে-সঙ্গে
খসে পড়লাে‘তবে যে তুমি বল্লে অশােকের মৃত্যু
‘পরিহাস করেছি।
এ-সব নিয়েও কি পরিহাস তােমার আসে ?
‘স্বচ্ছন্দে। আমাকে নিয়েই বা অশােক কম পরিহাসটা
করলো কী?
যাৰীৰ জন্য
‘অশােক বেঁচে আছে ?
তাই তাে জানি।
ড়ে চড়ে সহজ হয়ে বসে বললাম, “তবে ওঁর জীবদ্দশায়
যেকে তুমি পেলে কী করে?
টুকু দয়া করবার উদারতা ও শেষ পর্যন্ত দেখিয়েছিল
আমাকে। নিঃশ্বাস ফেলে নীরবে বসে রইলাম। মাধবী
বলতে লাগলাে, “অশােকের সঙ্গে বিয়ে হবার পরে আমি স্পষ্টই
বুঝতে পারলাম ভাঙা আর জুড়বে না, তালি আর টিকবে
। খুব অবাক হবে এবং বিশ্বাসও করবে না হয়তাে যে
বিয়ের পরে পুরাে চার বছর আমরা একসঙ্গে ছিলাম কিন্তু
একদিনের জন্যেও আমরা একসঙ্গে ওইনি। প্রত্যেক রাত্রে
একই ঘরে পাশাপাশি খাটে দু’জনে দু’জনের নিঃশ্বাস শুনতে
শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছি। একদিন আমি সারারাত
কেঁদেছিলাম, আর সারারাত চুপ করে বসে ও আমার
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। আমি বল্লাম, “এরকম যন্ত্রণা
কি জীবন ভরেই পাব ?” বল্লে, “কেন, আমি কি তােমাকে
কষ্ট দিই, আমি কি ভালাে ব্যবহার করিনে?”
‘কঁদতে-কাঁদতে বল্লাম, “ভয়ানক কষ্ট দাও—ভালাে যদি
নাই বাসবে তবে কেন এ-রকম করলে?”
মাধবী র জ স্ক
ক
‘বিষন্ন মুখে বল্ল, মাধবী, আমি লম্পট, আমি পাপিষ্ঠ
কিন্তু আমাররা তাে হৃদয় আছে, আমারাে তত সুখ!
অনুভূতি আছে—অনুতাপ আছে। কয়েকটা দিন, :
দিন অন্তত আমাকে তুমি ভিক্ষা দাও—একলা থাকার
দাও।”—দুই হাতে মুখ ঢেকে উপুড় হয়ে ও কঁদতে লাগলো
পাগলের মতাে। আমি হাত ধরে উঠিয়ে বসালাম, শান্ত
করলাম—বল্লাম, “অশােক, আর আমি তােমাকে পীড়ন
করবে না, যেদিন মনে পড়বে আমার কথা সেদিনই তুমি
আমার কাছে এসাে, আমাকে ডেকো—কিন্তু দায়ে পড়ে
ভালােবাসার ভাণ দেখিও না, সে আমার সইবে না।”
‘তার পরদিনই আমি মার কাছে চলে এলাম।
‘টানা ছ'মাস ছিলাম কিন্তু তবুও সে আমাকে ডাকলাে
। ফিরে যেতে সে লিখেছিল, কিন্তু আমি জানতাম সেটা
তার একান্তই আত্মসম্মান বজায় রাখবার জন্যে। স্ত্রীকে
পিত্রালয়ে ফেলে রাখতে তার রুচিতে বেধেছিল। আমি
ফিরে গিয়ে তার একটুও পরিবর্তন দেখলুম না। তবে শেষ
পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে কী হত জানিনে, কেননা শেষের
দিকে আমাকে যেন ও ভালােবাসতে শুরু করেছিল মনে হত।
কিন্তু আমি তার অবসর দিলাম না। অনেকদিন এমন
মাধবীর জন্য
হয়েছে যে শুতে এসে দেখেছি আমার বিছানায় শুয়ে শুয়ে
সে মেয়ে নিয়ে খেলা করছে। বলেছি, “ওঠো, এবার আমি
শােব।” হাত দিয়ে নিজের পাশে দেখিয়ে দিয়েছে, “শােও
।” “ধ্যেৎ!”—আমি অমনি প্রতিবাদ করেছি। “তবে কিন্তু
মেয়ে নিয়ে যাবে।” “অনায়াসে,” সাংঘাতিক ঠাণ্ডাভাবে
আমি জবাব দিয়েছি।
৫ “ঈস”, অশােক হেসে বলেছে—“মেয়ে যদি সত্যিই
নিয়ে যাই তখন আর ফুটুনি খাটবে না। তার চেয়ে লক্ষ্মী
মাঝখানে শুয়ে থাক্, আমি আর তুমি দু'পাশে শুয়ে
থাকি।”
“পাগল !” আমি আমলেই আনিনি কথাটা।
‘নিঃশ্বাস ফেলে ও উঠে গেছে নিজের বিছানায়, আর
আমি শুয়ে-শুয়ে চিন্তা করেছি কেন আমার এই প্রতিশােধ
নেবার এমন দুরন্ত অভিলাষ ?
বিবেক বলেছে এত দম্ভ
ভালাে নয়,—কিন্তু তবু আমি নিজেকে খর্ব করে ওর ডাকে
সাড়া দিতে পারিনি, কেননা এটকু আমি স্পষ্টই বুঝতে
পারতাম এখনাে ও সম্পূর্ণভাবে তােমাকে ভােলনি, ক্ষতের
উপর সামান্য একটা প্রলেপ পড়েছে মাত্র। আর সেই
প্রলেপটি হচ্ছে আমাদের সন্তান। অপমানের কথা নয়,
৫
মাধবী র জ স্থ
তবু সন্তানের জন্যই আমার মূল্য এ-কথা ভাবলে আমার
দাহ হত। ঠিক এই রকম সময়ে বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা।
বিলেত থেকে ফিরে এসেছেন খনিবিদ্যা শিখে। মেজদার
সতীর্থ, সেই সূত্রে আলাপ হতে-হতেই যে কেমন করে এত
সহজে ঘনিষ্ঠতায় দাড়িয়ে গেল তা নিজেও বুঝতে পারলাম
প্রথম-প্রথম কিছুটা ভাণ করতাম অশােককে দেখিয়ে,
মনে হত অশােকের ঈর্ষাবৃত্তিটা হয়তাে জেগে উঠবে এ দেখে
এবং ও কষ্ট পাবে, কিন্তু সব চেয়ে আশ্চর্য—তা ও পেতে
না, বরং আমার ন্যাকামির আভাস পেলেই ও স’রে পড়তে
সেখান থেকে। শেষ পর্যন্ত দেখি আমার ভাণকে বিনয়বাবু
সত্যি মনে করে বসে আছেন, আর আমারও মনে হল
আমি অশােককে কখনােই ভালােবাসিনি—স্ত্রীলােকের পক্ষে
স্বামীর ভালােবাসা না পাওয়ার মত পরাজয় আর নেই--
আমি এতদিন সেই গ্লানিতেই পুড়ে-পুড়ে সারা হয়েছি। আজ
আমার দুয়ারে সত্যি-সত্যিই যে প্রার্থী তাকে আমি
ফেরাবােই বা কেন। বঞ্চিত হবার জন্য জীবন নয়-বঞ্চনা যে
করে তাকে পুজো করবার জন্যও জীবন নয়। সুখ চাই সমৃদ্ধি
চাই প্রেম চাই—কেন পড়ে থাকবে এখানে। কী আছে
অশােকের, কী পেয়েছি আমি ওর কাছে থেকে। মনকে
गांव यौन 3
শক্ত করে ফেল্লাম আমি। একদিন রাত্তিরে ঘুমুতে গিয়ে
বল্লাম, “তােমার সঙ্গে আমার কথা আছে।” বই পড়ছিল
শুয়ে-শুয়ে-মুখ তুলে তাকালাে। আমি বল্লাম, “আর
কতকাল ভার হয়ে থাকবাে-তুমিই বা আর কতকাল তা
বইবে।” “কী হলাে তােমার ?” অত্যন্ত মধুর করে ও
হাসলাে।
‘তুমি তাে জানাে হাসলে ওকে কী আশ্চর্য ভালাে লাগে,
মুহূর্তের জন্য মনটায় একটু মােহ এলো, আমল দিলাম না।
অত্যন্ত সহজভাবে বল্লাম, “বিনয়বাবু আমাকে ভালােবাসেন,
তা বােধ হয় তুমি জাননা না।”
“জানি—” কথাটা বলেই বইয়ে চোখ ডােবালাে, আর
আমি স্তব্ধ হয়ে চুপ করে রইলাম। তারপর বুঝতেই পারে-
মাস ছয়েক এইভাবে চল্ল, আর তারপর একদিন ওঁকে
পরিত্যাগ করে চলে এলাম। সমস্যা হয়েছিল মেয়ে নিয়ে
-অশােক নিজে থেকেই বল্ল, “বিনয়বাবু রাজি থাকলে মেয়ে
দিতে আমার আপত্তি নেই। আমার আয়ু হয়তাে শেষ
হয়ে এসেছে কেননা ভিতরে ভিতরে আমি বড় শ্রান্ত, আমার
এই ঘুষঘুষে জ্বর আর ঘুরে ঘুরে কাশি, এটা আমার ভালাে
মনে হয় না, এজন্যেও লক্ষ্মীকে সরানাে দরকার।”
=
মাধবীর জ
তবু সন্তানের জন্যই আমার মূল্য এ-কথা ভাবলে আমার
দাহ হত। ঠিক এই রকম সময়ে বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা।
বিলেত থেকে ফিরে এসেছেন খনিবিদ্যা শিখে। মেজদার
সতীর্থ, সেই সূত্রে আলাপ হ'তে-হ'তেই যে কেমন করে এত
সহজে ঘনিষ্ঠতায় দাঁড়িয়ে গেল তা নিজেও বুঝতে পারলাম
। প্রথম-প্রথম কিছুটা ভাণ করতাম অশােককে দেখিয়ে,
মনে হত অশােকের ঈর্ষাবৃত্তিটা হয়তাে জেগে উঠবে এ দেখে
এবং ও কষ্ট পাবে, কিন্তু সব চেয়ে আশ্চর্য-তা ও পেতে
না, বরং আমার ন্যাকামির আভাস পেলেই ও স'রে পড়তে
সেখান থেকে। শেষ পর্যন্ত দেখি আমার ভাণকে বিনয়বাবু
সত্যি মনে করে বসে আছেন, আর আমারও মনে হল
আমি অশােককে কখনােই ভালােবাসিনি—স্ত্রীলােকের পক্ষে
স্বামীর ভালােকাসা না পাওয়ার মত পরাজয় আর নেই
আমি এতদিন সেই গ্লানিতেই পুড়ে-পুড়ে সারা হয়েছি। আজ
আমার দুয়ারে সত্যি-সত্যিই যে প্রার্থী তাকে আমি
ফেরাবােই বা কেন। বঞ্চিত হবার জন্য জীবন নয়--বঞ্চনা যে
করে তাকে পুজো করবার জন্যও জীবন নয়। সুখ চাই সমৃদ্ধি
চাই প্রেম চাই—কেন পড়ে থাকবে এখানে। কী আছে
অশােকের, কী পেয়েছি আমি ওর কাছে থেকে। মনকে
-
১.
माय वौद्र -
শক্ত করে ফেল্লাম আমি। একদিন রাত্তিরে ঘুমুতে গিয়ে
বল্লাম, “তােমার সঙ্গে আমার কথা আছে।” বই পড়ছিল
শুয়ে-শুয়ে-মুখ তুলে তাকালাে। আমি বল্লাম, “আর
কতকাল ভার হয়ে থাকবে—তুমিই বা আর কতকাল তা
বইবে।” “কী হলাে তােমার ?” অত্যন্ত মধুর করে ও
হাসলাে।
‘তুমি ত জানাে হাসলে ওকে কী আশ্চর্য ভালাে লাগে,
মুহূর্তের জন্য মনটায় একটু মােহ এলে, আমল দিলাম না।
অত্যন্ত সহজভাবে বল্লাম, “বিনয়বাবু আমাকে ভালােবাসেন,
তা বােধ হয় তুমি জানাে না।”
“জানি—” কথাটা বলেই বইয়ে চোখ ভােলাে, আর
আমি স্তব্ধ হয়ে চুপ করে রইলাম। তারপর বুঝতেই পারে-
মাস ছয়েক এইভাবে চল্ল, আর তারপর একদিন ওঁকে
পরিত্যাগ করে চলে এলাম। সমস্যা হয়েছিল মেয়ে নিয়ে
-অশােক নিজে থেকেই বল্ল, “বিনয়বাবু রাজি থাকলে মেয়ে
দিতে আমার আপত্তি নেই। আমার আয়ু হয়তাে শেষ
হয়ে এসেছে কেননা ভিতরে ভিতরে আমি বড় শ্রান্ত, আমার
এই ঘুষঘুষে জ্বর আর ঘুরে ঘুরে কাশি, এটা আমার ভালাে
মনে হয় না, এজন্যেও লক্ষ্মীকে সরানো দরকার।” ।
মাধবীর
মাধবী চুপ করলে, সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের মধ্যে এমন একটা
নিস্তব্ধতা এলাে যে আমি ভয়ংকর অস্বস্তি বােধ করতে
লাগলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, লক্ষ্মী তখন কত বড়?
ভাঙা-ভাঙা গলায় মাধবী বল্ল, ‘চার বছরের’–একটু
থেমে বল্ল, ‘প্রথমট।
খুব কঁাদত বাপের জন্যে, কিন্তু বিনয়বাবু
অসাধারণ লােক, তিনি স্নেহ দিয়ে প্রেম দিয়ে আমাদের মা
মেয়েকে একেবারে ভ'রে রেখেছেন।
আমার গলা দিয়ে আওয়াজ আসছিল না—কেশে
বল্লাম, ‘অশােক এতদিনও বেঁচে আছে কিনা কী করে
জানলে ?
‘পরশু কাগজে কি দেখনি তার ছবি বেরিয়েছে—সমস্ত
সম্পত্তি সে গরিব ছাত্রদের বৃত্তির জন্য দান করেছে, বছরে
পঞ্চাশ হাজার টাকার সম্পত্তি।
না বলে পারলুম না, মাধবী, ছবিটা একটু দেখাতে
পারে ?” মাধবী তক্ষুনি উঠে ভিতরের ঘর থেকে কাগজখানা
নিয়ে এলাে, ছবিটার দিকে তাকাতে আমার ভয় করছিল,
একটুখানি চোখ বুলিয়েই এ-কথা সে-কথার পরে অনেক
সংকোচ নিয়ে বল্লাম, “তােমার তো প্রয়ােজন নেই বােধ হয়,
ছবিটা আমি নিলে কি ক্ষতি হবে ?
১২
মাধবীর জয়
মাধবীর মনের ইচ্ছা বােঝা গেলাে না, কিন্তু সহজভাবেই
সে ছবিটা আমাকে দিল। তারপরে আর বেশিক্ষণ সেখানে
আমি ছিলাম না। হস্টেলে ফিরে এসেই অত রাত্তিরে স্নান
করলাম, তারপর খাব না বলে এসে ঘরে শুয়ে রইলাম।
সমস্তটা রাত্তির একবিন্দু ঘুম এলাে না, জানালা দিয়ে রাস্তার
আলাে আসতে বলে জানালাটা বন্ধ করেই রাখতাম রােজ,
মধ্যরাত্রিতে উঠে সেটা খুলে দিলাম, তারপর আবছা
আলােতে সন্তর্পণে ব'সে বারবার দেখতে লাগলাম অশােকের
ছবিখানা। ছবিখানা বােধ হয় বর্তমান চেহারার, তাই এমন
বিবর্ণ বিষয়। মনের মধ্যে গুমরে উঠতে লাগলাে কত কথা,
তন্নতন্ন করে যাচাই করতে লাগলাম কী সুখ আমি পেয়েছি
এ জীবনে। মা নেই, বাপ নেই—সাতকুলে কেউ নেই।
দুটো ছােট বােন আছে, তাদের তাে কোন জন্মে বিয়ে হয়ে
গেছে, দেখাও হয় না। থার্ডক্লাশে উঠেই মাষ্টারি করে-
করে পড়তে হয়েছে! মা বাবার মৃত্যুর পরে কাকার
আশ্রয়ে দু’বছর ছিলাম কিন্তু দুটো যুগও মানুষের এর চেয়ে
সহজে কাটে। কাকিমা মানুষ ভাল ছিলেন, কিন্তু কাকা
একটি মূর্তিমান শয়তান। আমরা তিন বােনে তার কাধে
যে কী ভীষণ বােঝ এ-কথা তিনি দিনে অন্তত তিরিশবার
মাধবীর মত শােনাতেন এবং ঝি চাকর রাখবার আর তার ক্ষমতা নেই, বলে আমাদের দিয়ে সব কাজ চালাতেন। কোনােরকমে ম্যাটিকটা পাশ করেই আমি বােনেদের নিয়ে হস্টেলে এসে উঠলাম। দিনে তিনটে টিউশানি করে তবে বােনেদের খরচ চালিয়েছি, কাকার অধপয়সাও আর গ্রহণ করিনি। আই. এ. পাশ করে যখন বি. এ.-তে ভর্তি হলাম, তখন আমার বন্ধুতা হয় মাধবীর সঙ্গে। সে-বন্ধুতা এমন প্রগাঢ় হয়েছিল যে মাধবীর মা বাবার সঙ্গেও শেষ পর্যন্ত আমার একটা সম্বন্ধ হয়ে গেল। আমি তখন বাইশ বছরের মেয়ে, বিদ্যাসাগর কলেজে থার্ড-ইয়ারে পড়ি। সেই হস্টেলেই বােনেদের নিয়ে থাকি এবং সকাল সন্ধ্যা দুটো টিউশানি করি। একদিন সন্ধ্যাবেলা টিউশনি সেরে ফেরবার পথে মাধবীদের বাড়ি গিয়ে দেখলাম মাধবীর মা বসবার ঘরে একটি যুবকের সঙ্গে বসে কথা বলছেন। আমি যেতেই বল্লেন, “ওমা, তুই জানিস না বুঝি, মাধবী তাে চুচুড়া গেছে ওর পিসি-বাড়ি। আমি সঙ্কুচিত- ভাবে দরজায় দাড়িয়েই বল্লাম, “তাই নাকি?” তাই বলে কি ঘরেই ঢুবিনে নাকি ?--মাধবীর মা সস্নেহে আমাকে ডেকে আনলেন তারপর যুবকটির দিকে ১৪
‘থাকি না বটে, কিন্তু আমি প্রায় রােজই। তাছা,
সম্প্রতি দিনকয়েক তাে এখানেই আছি। আসুন না এর
মধ্যে আর একদিন ?”
“আচ্ছা’--নমস্কার করে বিদায় নিলাম।
অবিবাহিত যুবক দেখলেই আমার তার সম্বন্ধে কৌতূহল
হয়, কেননা সম্প্রতি আমার বােনের বিবাহ দেবার কথা আমি
ভাবছিলাম। এদের দু’বােনের বিবাহ দিয়ে উঠতে পারলে
আমার অনেক কষ্টের লাঘব। ছােটটি পনেরাে বছরের, থার্ড
ক্লাসে পড়ছিল, কিন্তু তার উপরেরটির সতেরাে তাে হল।
বিয়ের পক্ষে এমন সুন্দর বয়স আর নেই, সবে কুড়ি
ফুটেছে। মাঝে-মাঝে ওকে ঠাট্টা করে দেখেছি ও খুব
উপভােগ করে। ফাস্ট ইয়ারে পড়ছিল, একটা টিউশনিও
করে—নিজে এত কষ্ট করছি বলে ওর কষ্টটা আমার লাগে
বেশি। আমি বড়, দায়িত্ব আমার, ওকে কেন কষ্ট করতে
দেব। বাণী তা শশানে না, তাই আমি ভেবেছি ওকে এখনি
বিয়ে দিয়ে দেব।
বাণী বলে, ‘বিয়ে তো দেবে কিন্তু পয়সা পাবে কোথায় ?
—কথাটা ভাববার মতই, কিন্তু এমননা তাে মানুষ আছে যারা
পয়সা নেয় না। তাছাড়া মার গহনা আমরা কিছু
পেয়েছিলাম। সাবেকি—তাই শুধুই সােনা। তিন বােনেরটা
দিয়ে এক বােনকে নিশ্চয়ই পার করা যাবে। বাণী বলে,
‘নিজের কথা তাে তুমি ভাবই না, কিন্তু রাণীকেও তাে বিয়ে
দিতে হবে? ওঃ রাণী! রাণীর জন্য ভাবনা নেই, ও বড় হ'তে-
হ’তে আমি বি. এ. পাশ করে একটা ভাল চাকরি পাবই,
তারপর না-খেয়ে টাকা জমাবাে। বাণী ভবিষ্যৎ শুনে হাসে।
অশােককে দেখে আমার মনে কেমন একটা আশা হ’লল।
পরের দিন মাধবীকে কলেজে বল্লাম কথাটা। আমার যদি
অন্তদৃষ্টি থাকতাে তবে দেখতাম মাধবীর মুখ সাদা দেখাচ্ছে,
কিন্তু নিজের চিন্তাতেই আমি বিভাের। মাধবী বলে,
‘ক্ষেপেছিস-বাপের এক ছেলে—গাড়ি বাড়ি দাসদাসী নিয়ে
মশগুল-সে কি আর অনাথ নিয়ে উদারতা দেখাবে?
ভয়ানক আঘাত লাগলাে। মাধবীর কথায়। চাপতে চেষ্টা করা
সত্ত্বেও আমার মুখ গম্ভীর হলাে, না-বলে পারলাম না, ‘অনাথ
মানে রাস্তার ভিখিরিও নয়, কারাে কৃপাপ্রার্থীও নয়।
মাধবী অপ্রস্তুত হলাে। যদিও কিছু না-ভেবেই ফস্ করে
কথাটা বলে ফেলেছিল, তবু আমার মর্মমূলে তা এমন বিদ্ধ
হয়ে গেল যে মাধবী অনেকবার ক্ষমা চেয়েও তা আর উপড়ে
আনতে পারলাে না। বুঝতে পারলে আমার মন মেঘমুক্ত
।
১৮
[ সহজ হবে না, তাই হয়তাে ভাবলাে মার হাতে ফেলে 'য়াই বুদ্ধিমানের কাজ—অগত্যা পরের দিন ওদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে চলে গেল বিষন্ন মনে। আবার আমার সঙ্গে অশােকের দেখা হল। প্রায় সমস্ত দিনটাই ওখানে কাটিয়ে যখন হস্টেলে ফিরে এলাম তখন কেবলি মনে হতে লাগলাে এত তাড়াতাড়ি দিন কাটলাে কেমন করে? আর আমিই বা এত শিগগির চলে এলাম কেন? ঘর থেকে ঘরে, বারান্দা থেকে বারান্দায়, জানালা থেকে জানালায় এমন চঞ্চল পায়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম যে হস্টেলের প্রত্যেকটি মানুষ আমার ভাবান্তরে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। বড়মানুষের ছেলেদের সাধারণত সাধারণত যা হয়ে থাকে, অশােকেরও ঠিক তাই হয়েছিল। বাপ মাইকার ব্যবসা করে প্রচুর অর্থোপার্জন করেছিলেন। চেহারা ভাল আর বাপের টাকা আছে এটাই তাে শ্রেষ্ঠ গুণ—উপরন্তু ওর বিশ্ব- বিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল বলে যে-কোনাে যুবতী মেয়ের মায়ের মনােহরণ ক'রে বহু মেয়ে নিয়ে খেলবার একটা অনায়াস অবকাশ ও পেয়েছিল। আমাদের মাধবী তখন ওর নতুনতম আবিষ্কার। ঠিক এই সময়েই আমাদের দেখা। কী যে
নেশা হলাে জানি না, আমি ওকে প্রশ্রয় দিলাম এবং কয়েক
দিনের মধ্যেই এমন হলাে যে দেখা না হলে আমাদের আর
দিন কাটতাে না। প্রথম প্রথম মাধবীদের ওখানেই চলছিল,
কিন্তু সেটা সুবিধের হলাে না, শেষে কোনােদিন গড়ের মাঠে,
কোনােদিন সিনেমায়, কোনােদিন গঙ্গার ধারে, কখনাে বা
ট্যাক্সিতে—এই করে-করে দিন কাটতে লাগলাে।
মাসখানেক পরে ও একদিন বল্ল, বকুল, আমাকে কি তােমার
কখনােই খারাপ লােক মনে হয়েছে?
নিঃসংশয়ে বল্লাম, ‘না’ ।
‘আমাকে ভালাে করে জানবার অবকাশ তুমি পাওনি,
তাই। তােমাকে যেদিন প্রথম দেখলাম সেদিনই মনে
হয়েছিল আর সকলের মত এ-অবকাশ আর তােমাকে
দিতে পারবো না, আমার মধ্যে যা মেকি তা সমস্তই এবার
পুড়ে যাবে তােমার উত্তাপে। অনেকে অনেক বলতে পারে
—যদি শােননা মন খারাপ কোরাে না। তােমার কাছে
যে-রূপ সেই তাে আমার আসল ।
কথা বলতে-বলতে ও কেমন বিষন্ন হয়ে গেল। আমি
বল্লাম, তুমি কি ভাবে আমার মন এতই কঁাচালােকের
চোখ দিয়ে আমি যাচাই করবাে তােমাকে ?
#ং বীর জন্য
হ’তেও তােত পারে ?
‘কখনােই না।
‘আচ্ছা ধরাে, কোনাে সূত্রে যদি জানতে পারাে, যে আমি
দেবতার ছদ্মবেশে একটি শয়তান--
‘থামাে, থামাে’—আমি বলে উঠলাম—আর বিনয়ে
কাজ নেই। তাছাড়া শয়তানকেও তত মানুষ ভালােবেসে
ফেলতে পারে। জানাে না রবীন্দ্রনাথের কথা “খােকা বলেই
ভালােবাসি ভালাে বলেই নয়”।
ও বল্ল, ‘তবু আমি আশ্বাস পাচ্ছিনে, বকুল। বকুল, তুমি
বিশ্বাস করাে, আমি তােমাকে ঠকাইনি, আমার সমস্ত প্রাণে-
মনে আমি তােমাকে গ্রহণ করেছি। এমন ব্যাকুলতা ছিল
কথাগুলােতে যে আমি বলবার কিছু খুঁজে পেলাম না।
চুপ করে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, তারপর ফিরে এলাম ।
হস্টেলে।
তার দিন কয়েক পরে একটু বিষ মুখে বল্ল, বকুল,
আমাকে বােধ হয় শিগগিরই বাইরে যেতে হবে!
‘বাবার বাত হয়েছে, ডাক্তাররা তাকে নিয়ে পুরী যেতে
বলেন।
মাধবীর ও ন্য ‘ও।” আমার এই সংক্ষিপ্ত জবাবে ও সুখী হ’লাে না—একটু অপেক্ষা করে বললে, “আর কিছু বলছ না যে? ‘কী বলব? ‘কেন, বলবার কি কিছুই নেই?’-মৃদু হাসলাম, জবাব দিলাম না। না না-ও-রকম বিমর্ষ হলে চলবে না। অধীর আগ্রহে ও আমার হাত ধরে নাড়া দিল। আমি বল্লাম, খবরটা কি আমার পক্ষে খুব হর্ষ করবার মত ? ‘ও, তাই।' একটু থেমে—“কিন্তু দুঃখ করবারও বােধ হয় কিছু নেই, কী বলে? তােমাকে তাে কম জ্বালাই না আমি। কিছুদিন ‘নাও, ছেলেমাষি কোরাে না’—প্রায় ধমকে উঠলাম-- ‘এখন যে আমাদের কত ভাববার দিন এসেছে তাও কি তােমাকে বলে দিতে হবে ? ‘ভাবনা আবার কী। বাবাকে বলবাে, মত দিলে ভালাে, -দিলেও ক্ষতি নেই—তোমার অনুমতি পাওয়া দিয়েই হচ্ছে কথা। কিন্তু বকুল, একটা কথা - ‘বলল-
‘মানে—এই— অনেক ইতস্তত ক'রে থেমে-থেমে ও
বল্ল, বলছিলাম কী, মাধবীরা কি এসব জানে ?
‘খুব সম্ভব না—আর জানলেই বা কী।
‘না, না, খবরদার’--অত্যন্ত ব্যগ্রভাবে অশােক বলে
উঠলাে। আমার তা ভালাে লাগলাে না, বল্লাম, “কেন বলাে
‘না, কারণ কিছুই নেই, তবে ওরা আমাকে আশা
করেছিলেন এই আরকি।
হঠাৎ আমার মাধবীর কথা মনে হলো, বড়লােকের
ছেলে বাড়ি গাড়ি দাসদাসী নিয়ে মশগুল, সে আর অনাথ
নিয়ে উদারতা দেখাবে না। প্রতিহিংসার একটা আনন্দ
বিদ্যুতের মত খেলে গেল হৃদয়ের মধ্যে।
বল্লাম, ‘অশােক, তােমাকে বলাই ভালাে-দ্যখাে, আমি
একান্তই নিঃসম্বল মেয়ে, বাপ দাদার সাহায্য কী বস্তু তা
আমার জানা নেই-মাধবীর ভাষায় নিতান্ত অনাথ,-~এখন
সময় আছে ভেবে দেখবার' বলতে বলতে আমি অশােকের
দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার কথায় ওর মন নেই, অন্য দিকে
তাকিয়ে গভীরভাবে কী চিন্তা করছে।
‘কী ভাবছ ?
২৩
মাধবীর জ
“
উহঠাৎ যেন জেগে উঠলাে। না, বলছিলাম কী-
সেই পূর্ব কথারই জের টেনে বললাে, “পাঁচজনকে জানাবার
দরকারই বা কী, আর দেরিই বা মিছিমিছি করছি
কেন ?
‘দেরি মানে?—আমি অবাক হয়ে বল্লাম, “তুমি মনে-মনে
কী যেন ভাবছ।
বকুল, আমার যেন মনে হয় পুরী থেকে ফিরে এসে আর
তােমাকে পাবদা না, তার চেয়ে এসাে কালকেই আমরা
নােটিশ দিয়ে আসি, তারপর যে করেই হােক, আর পনেরাে
দিন আমি বাবাকে ঠেকিয়ে রাখবে—একেবারে রেজিস্ট্রি
করে শেষে পুরী যাব।
‘পাগল।আমি আমলই দিলাম না কথাটায়। এ কি
সম্ভব নাকি? আমার টাকা কোথায়? তা ছাড়া দু'টো
বােন মাথার বােঝ। কত দায়িত্ব, কত ভাবনা, ছট্ ক'রে
একটা বিয়ে করলেই হ’লাে নাকি ?
‘তােমার আবার বাড়াবাড়ি’--অধীর হয়ে অশােক বল্ল।
‘টাকার জন্য যদি আবার ভাবনাই করবে তবে এ অভাগাকে
দিয়ে হবে কী? আর রাণী বাণী? বেশ তাে, তােমার
কাছেই থাকবে ওরা।
सपनोज व
“আরে না, না, আমার অবস্থা তুমি বুঝবে না—আজন্ম
সুখে লালিত তুমি, যখন যা ভাব নিমেষেই তা করতে
পারে, কিন্তু আমি
অশােক দীর্ঘশাস ফেলে চুপ করে গেল।
তার দু'দিন পরে ও পুরী চলে গিয়েছিল। যাবার
আগে একটা মাস ওকে নিয়ে আমি এমন মত্ত হয়ে
ছিলাম যে অন্যদিকে মন দেবার আর আমার অবকাশ
ছিল না। মাধবী কলেজে আসতাে না, শুনেছিলাম ওর
অসুখ। এবার মনে হলাে খুব অন্যায় করেছি। সেদিনই
বিকেলে টিউশানির পরে ওকে দেখতে গেলাম। গিয়ে
দেখলাম বাড়ি ফাকা—শুনলাম আজ প্রায় পনেরো দিন
ওরা কোথায় গেছে, কবে ফিরবে তাও কেউ জানে না।
মনে-মনে যেন কেমন একটা মুক্তি পেলাম। আমার কেবলি
ভয় হচ্ছিলাে ওরা বুঝি সব জেনে ফেলেছে—ওদের দেখা
-পেয়ে দুঃখিত হবার অবকাশ আর আমার হলাে না।
অশােক গিয়ে আমাকে রােজ একখানা চিঠি লিখতে
লাগলাে। জীবনে চিঠি লেখা বা পাওয়া কী বস্তু তা
আমার অভিজ্ঞতায় এই প্রথম। আমি পেরে উঠতাম না
ওর সঙ্গে। শেষে মাস দেড়েক পরে মনে হতে লাগলাে
আধ বীর শক্ত
এখনাে যদি অশােক ফিরে না আসে আমিই বুঝি চলে
যাবাে ওখানে। দিন আর কাটে না-রাত্রে ,
পারিনে। লিখলাম, ‘অশােক, তুমি তখন যা বলেছিলে
তাতে সম্মত না-হ'য়ে ভুল করেছি, চিরটা দিন কেবল
ভেবে-ভেবে আমার স্বভাবই গেছে খারাপ হয়ে, সব
বিষয়েই আমার ভাবনার বাড়াবাড়ি। তুমি নেই, এখন
তো আমার দিন কাটে না। তুমি কি আমাকে আরাে
কষ্ট দেবে ?
এর দিন দশেক পরেই ও ফিরে এলাে কলকাতায়।
দেখা হতেই বল্ল, বকুল, বাবা কিন্তু খুব খুশি হয়েছেন।
একদিন তােমাকে যেতে হবে বাবার কাছে। আর ওঁর
ইচ্ছে বিবাহটা হিন্দুমতে হয়।
মুখে বল্লাম, ‘ভালােই তাে’—কিন্তু মনে আবার চিন্তা
এলাে। আমার বিবাহ আমাকেই যেখানে দিতে হচ্ছে
সেখানে রেজিস্ট্রিই উৎকৃষ্ট পন্থা। কোথায় নেব বাড়ি,
কে আসবে কনে সাজাতে, কে করবে সম্প্রদান, কে কিনবে
বিবাহের দান-সামগ্রী—এ-সব বিলাস কি আমার মত নিঃস্ব
মেয়ের জন্য ? হিন্দুমতে বিবাহ ব্যাপারটাই আসলে বড়-
লােকের জন্যে, যাদের টাকা এত বেশি আছে যে খরচ
২
মৰ বীর জন্য
না করলে আর ধরছে না ঘরে, তাদের জন্যে। তা নয়
তত এক রাত্তিরের একটা সামান্য আমােদের জন্য হাজারে
হাজারে টাকা কী করে মানুষ অকাতরে খরচ করতে
পারে ? অশােক বল্ল, “আজকে ধরাে আষাঢ় মাসের সাতাশে
-শ্রাবণ মাসের আঠারাে তারিখেই একটা বিবাহের দিন
আছে।”
‘ওরে বাবা, একেবারে দেখছি তারিখও মুখস্ত করে
এসেছ।
তবে কী—তােমার কি এখনাে আরাে কিছুদিন ভাবতে
হবে নাকি ?
‘ভাবনার অবসান তাে করেই ছিলাম’, হেসে-হেসে
সত্যি কথাটাই বল্লাম। নতুন করে ভাববার খােরাক
ততা তুমিই জোগালে।
“কেন বলাে তো?
‘বাঃ, হিন্দুমতে বিয়ে, সে কি একটা সামান্য কথা ?
কোথায় রে বাড়ি, কোথায় রে টাকা-কেনাে লাঠি,
কেননা ছাতা, বাসন, কোসন--
নাও, ভারি তােমার গরব। দৈন্য না-দেখিয়ে কাজের
কথা শােনাে তত। কাল রােবর। সকালবেলা আমি
২।
মা ধৰীৰ এই
আবার আসবাে--তােমাকে নিয়ে যাবে আমাদের বাড়ি।
রাণী বাণীও যাবে।
‘ওদের আর কেন-ও-বেচারারা এখনাে জানে দিদি
তাদের জন্যেই ব্যবস্থা করছে-
“আহা, ওরা কি আর কিছু বােঝে! নেহাৎ খুকি কিনা।
‘তা মুখােমুখি যখন কিছু বলেনি তখন নেপথ্যে থাকাই
ভালাে।
‘বেশ, যা ভালাে বােঝে কোরো, কিন্তু প্রস্তুত থেকে
মােটমাট।
পরের দিন বেলা প্রায় আটটার সময় ও আমাকে
নিয়ে গেল। গাড়িতে বসে সাংঘাতিক ঝগড়া, কেন আমি
সাদা শাড়ি পরে এলাম। আমি ছেলেবেলা থেকেই শস্তা-
দামের মিলের সাদা শাড়ি পরেই অভ্যস্ত—নিজে উপার্জন
করবার পরে কখনাে-কখনাে যে সখ না হত এমন নয়,
কিন্তু দু’টি ছােট বােন আছে, কোর সমস্ত সখ ওদের
দিয়েই মেটাতে হতাে। তাই সত্যি বলতে আমার ছিলই
রং করা কোনো ভালাে শাড়ি। বলতে গিয়ে তাড়া
খেলাম এবং গাড়ির মােড় ফিরলাে অন্যদিকে। শাড়ির
দোকানে এসে গাড়ি থামতেই আমার মুখ লাল হয়ে
মা এবী ॥
উঠলাে। কারাে কাছে কখনাে পাইনি, কাজেই কেউ কিছু
দিতে চাইলে সেটা মনে হতাে দয়া। অনর্থক ঘা লাগলাে
আত্মসম্মানে, বল্লাম, ‘ছি, ছি, এটা তােমার বােঝা উচিত
অশােক, এখনাে আমি তােমার স্ত্রী হইনি, আমার জন্য
উপহার কেনা তােমাকে মানায় না। আমার কথা না-
শুনে তবুও নামতেই আমার মুখের ভাব বদলে গেল।
বল্লাম, “অশোেক, আমাকে গরিব পেয়ে অপমান করছে?
‘অপমান! তােমাকে?-অশােকের মুখ মুহূতে বিবর্ণ
দেখালাে। নিঃশব্দে উঠে এসে গাড়িতে বসলাে, আর
দ্বিতীয় কথা আমাদের হলাে না গাড়িতে।
ওদের বাড়ি এসে পৌঁছতেই বছর আঠাবাের একটি
মেয়ে এসে আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেল
ঘরে। কার্পেট-মােড়া সিড়ি উঠে গেছে . দোতলায়
উপরের সিড়িতে লাঠি ভর দিয়ে দাড়িয়েছিলেন প্রৌঢ়
এক ভদ্রলােক। অশােক বল্ল, আমার বাবা, প্রণাম করাে।
ভদ্রলােককে আমি জীবনে ভুলবাে না। অমন অদ্ভুত
স্নেহমাখা কণ্ঠস্বর আমি কখনাে কোনো মানুষের শুনিনি-
মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেন, “থাক্ মা। যে-
ঘরখানায় গিয়ে বসলাম সেখানা বুঝলাম আমার জন্যেই
মাধবীর স্য
বিশেষরূপে সাজানাে হয়েছে। প্রায় মাটি সমান নিচু বিরাট
একটি তক্তাপােষে ধবধবে সিলকের পুরু চাদর পাতা—তার
পাশে পাশে চোখ-ঝলসানাে ব্রোকেডের তাকিয়া—মাঝখানে
মন্ত বড় এক রূপাের থালায় ধান-দূর্বা আর ফুলচন্দন।
মেঝেতে কাশ্মীরি কার্পেট। ভদ্রলােক আমাকে সস্নেহে
সেই তক্তাপােষের উপর নিয়ে বসালেন, বল্লেন, “অশােকের মা
নেই তা তাে জান—তিনি থাকলে ব্যবস্থা হতে অন্যরকমের
এমনই অদৃষ্ট করে অভাগা এসেছে যে একটা দিদি ছিল
সেটাও সইল না কপালে—এই দ্যাখে। তার স্মৃতি বহন করে
বেড়াচ্ছি আজো মেয়েটিকে তিনি আঙুল তুলে দেখালেন।
ঠিক যেন বাণী। অকৃত্রিম মমতায় তাকে কাছে টেনে
নিলাম।
‘তােমারই সমস্ত, মা-তুমি হবে আমার ঘরের মূর্তিমতী
লক্ষ্মী।
তােমাকে দেখার আগে তােমার কথা শুনেই আমি
ভেবেছিলাম এ-কথা—দেখে মনে হচ্ছে তুমি তার চেয়ে
অনেক বেশি।
এতখানি স্নেহভাষণের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না—
আমার আশা অতদূর যায়নি-সহসা চোখ ভ'রে জল এলাে
আমার। মায়ের মৃত্যুর পরে বােধ হয় এই প্রথম চোখে
মাধবীর জন্য
দল। স্পষ্টই মনে হলাে এত সুখ আমার জন্যে নয়— -মুখী
দুবার জন্য আমি জন্মাইনি। দাউদাউ করে উঠলাে মনের
মধ্যে। অবশেষে এতদিনকার দুঃখের পাষাণ গলে-গ'লে
চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগলাে। অশােক অবাক হয়ে
তাকিয়ে রইল আমার দিকে, আর ওর বাবা হাত বুলুতে
লাগলেন মাথায়। একটু শান্ত হলে উনি আমাকে একজোড়া
জড়ােয়া কঙ্কণ—আর এক ছড়া সােনার হার দিয়ে আশীর্বাদ
করলেন এবং একখানা মােহর দিলেন হাতে।
ফেরবার পথে অশােক বল্ল, ‘তুমি অত কঁদলে কেন ?
‘কঁাদবাে না? তােমার বাবা আমাকে অত আদর
করলেন কেন? আদর কি এর আগে কখনাে আমি পেয়েছি,
সংসারে কি আমার জন্যেও আদর আছে ?
‘পাগলি। অশােক ঝুকে পড়লো আমার মুখের
উপর—এই প্রথম ও এই শেষ—ও আমার সঙ্গে একটু
অসংযত ব্যবহার করলাে, এবং আমিও প্রশ্রয়।
দিলাম।
হস্টেলের দরজায় নেমে প্রথমেই সেই কঙ্কণ আর হার
ছড়া খুলে ভিতরে এলাম—কেউ জানতে পারলাে না। কিন্তু
আগুন কি ছাইচাপা থাকে? সেদিনই সন্ধ্যাবেলা আমাদের
बार दो बस
হস্টেল-সুপারিন্টেডেন্ট আমাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে বল্লেন,
বকুল, এ-সব কী শুনি?
কী শােনেন ?
‘তুমি নাকি একজন যুবকের সঙ্গে প্রণয় করেছে। এ
রকম অপরিণামদর্শী হলে তার জন্য যথেষ্ট দুঃখভােগ করতে
হয় শেষে তা জানাে?
আমাদের হস্টেলের এই কত্রীঠাকুরানীর এ-সব বিষয়ে
অসাধারণ ঈর্ষার খবর হস্টেলবাসিনী আমরা প্রত্যেক মেয়েই
জানতাম। তিনি দেখতে অসাধারণ খারাপ-যৌবনে নাকি
এত বেশি খারাপ ছিলেন যে তার দিকে তাকিয়ে কথা
বলতেই ভয় করতে। হৃদয়ের দিক থেকে তিনি তাে আর
পাচজন মানুষের মতই, কাজেই শারীরিক রূপের জন্য পৃথিবী
যে-বঞ্চনা আঁকে করেছিল আসলে তারই একটা প্রতিক্রিয়া
হয়েছিল তার মনে। অন্যের প্রেম ইনি সইতে পারতেন না।
যাকে চেনেন না, তারও যদি বিবাহের খবর পেতেন রাগে
সর্বশরীর কঁপিয়ে দাত বার করে আমাদের ভয় দেখিয়ে
আধমরা করে রাখতেন।
সভয়ে বল্লাম, ‘আমি বিয়ে করছি।”
‘বিয়ে! বােমা এবার ফাটলাে। এ-হস্টেলে ও-সব
૨
মা বা র
এখন
চলবে না, এত সব অবিবাহিত মেয়ে আছে, কই, কেউ তাে
তোমার মত এরকম বিয়ে করতে চাইছে না।
“আর কাউকে দিয়ে আমার কী হবে? বিয়ে তাে
করছি আমি। আর তাছাড়া এ-হস্টেলে তে
কোনাে নিয়ম নেই যে এখানে থাকলে কেউ বিয়ে করতে
পারবে না।”
যাও, যাও, জ্যাঠামি কোরাে না। একটু পরে-বকুল,
তুমি ভেবে দ্যাখাে, কাজটা কিন্তু ভালাে করছ না
‘আমার ভাবনার জন্য আপনার উপদেশের প্রয়ােজন
নেই।
এর পর সুর বদলিয়ে কত্রীঠাকরুন বল্লেন, বকুল,
তােমাকে কি আমি ভালােবাসি না? আমি কি তােমার
চেয়ে ঢের বেশি অভিজ্ঞ না?—আমার কথা শােনন, বিয়ে
তুমি কোরো না। পুরুষরা ভারি অমিতচারী জীব। আজকে
তােমার চেহারা সুন্দর আছে, তাই—'এবার আসল কথায়
উনি এলেন, “ধরে কাল তােমার বসন্ত হলাে, তারপর
তােমার মুখ
বীভৎস দাগে ছেয়ে গেলে চুল
গেলে'—তখন তােমার উপায় ? ভদ্রমহিলার কথা শুনে
বুক কেঁপে উঠলাে, বললাম, ও-সব বলছেন কেন—আপনার
উঠে টাক পড়ে
মা ও বীর জঙ্গ
অসুবিধে করে আমি হস্টেলে থাকবে না—আমি কালই
চলে যাবে।
‘না, না, চটো কেন—আহা চটো কেন। উনি দাত বের
করে হাসতে লাগলেন।
পরের দিন ভােরে উঠেই বেরিয়ে গিয়ে ফোন করলাম
অশােককে। দেখা হতেই সব বল্লাম। তবে উপায়?
অশােকের মুখ শুকিয়ে গেলাে। বল্লাম, ‘ভয় পাচ্ছ কেন?
আমি আপাতত আমার কাকার বাড়িতে গিয়ে উঠি।
মধ্যে তুমি আমার জন্যে একটা বাড়ির খোঁজ করে এক
মাসের জন্যে—আজকে দ্যাখাে উনত্রিশ তারিখ, আর ক'টা
দিন বা আছে, কেটে যাবে।
‘কোন পাড়ায় বাড়ি নেবে?
‘হস্টেলের কাছেই নেয়া ভালাে কেননা আমার তাে বন্ধু-
বান্ধবরাই সব—ওদের যেখানে সুবিধে সেখানে থাকাই
ভালাে। ফিরে এসে রাণী-বাণীকে জিনিসপত্র গােছাতে বলে
যারা বিশেষ বন্ধু তাদের ডেকে বল্লাম সমস্ত কথা—মুহূর্তে
হস্টেলটি সরগরম হয়ে উঠলাে—কেউ উলু দিতে লাগলাে,
কেউ গান ধরলাে, কেউ বা তবলা বাজায়—বেলা বারােটার
সময় এমন মারাত্মক গণ্ডগােল আরম্ভ হলাে যে চেয়ে দেখি
আশে-পাশের বাড়ির জানালায় সব, জোড়-জোড়া চোখ। উত্তেজনা থামলে বল্লাম, “দ্যাখ, তােদের মেকুরঠাকরুন তাে আমাকে হস্টেলে থাকতে দেবেন না। আমাদের হস্টেল সুপারিনটেনডেন্টের একটি বদ অভ্যাস ছিল, কয়েকজন মেয়েকে একসঙ্গে জটলা করতে দেখলেই উনি পা টিপে টিপে এসে পিছনে দাড়াতেন—তার ধারণা মেয়েরা একসঙ্গে হলে নিশ্চয়ই প্রেমের গল্প করে।পুষ্প আমার সহপাঠিনীও ছিল এবং সবচেয়ে অন্তরঙ্গও ছিল- ঢাকার মেয়ে সে-ঢাকার প্রাদেশিক ভাষায় বেড়ালকে ‘মেকুর’ বলে—এ নামকরণ পুষ্পরই কীর্তি ও অবিশ্যি ‘মেকুর ঠাকরুন’ বলত না, বেশির ভাগই বলতাে‘মেকুরনিটা -কখনাে-কখনাে রাগ কম থাকলে ‘মেকুরঠাইন’। কী ভীষণ হাসাদাসি হ’তে আমাদের মধ্যে এ নামকরণ নিয়ে সে-কথা ভাবলে এখন অবাক লাগে। ওঁর আসল নাম , সুললিত ব্যানার্জি। এই সুললিতা নামটির জন্যও বেচারা অসম্ভব লাঞ্ছিত হতেন। আমাদের শান্তিদি—তিনি আবার একটি পদ্যও লিখেছিলেন এই নিয়ে শােনন মিস্ ব্যানার্জি মা-বাপের মরজি ৩t
আবীর
তাই করি সহি
তােমার ও-নাম।
হ’তে যদি হিড়িম্বা,
হস্তিনী, কি
জয়জগদম্বা,
মিলতাে স্বনাম!
ওঁর বাথরুমের দেয়ালে অতি সুরূপা একটি নারী-মূর্তি
একে তার পাশে এই পদ্যটি লেখা হয়েছিল।
পুষ্প বল্ল, ‘কেন, হস্টেল কি মেকুরনির সম্পত্তি নাকি ?
কিছুতে তুই যাবিনে বকু-দিক্ তাে তােক তাড়িয়ে, দেখি
কত বড় বুকের পাটা। কিন্তু ভাই বকু-- আমার গলা
জড়িয়ে ধরে ও রঙ্গ করে বল্ল, ‘তুই তাে দিব্যি টোপ গেলালি
—আর এ-অভাগিনীগুলােকে কি ভাসিয়ে দিবি?
‘তুমি বাবা গভীর জলের মাছ—আর আমরা চুনােপুটিরা
হায় হায়রে—' বলে অণিমা ঠাঠাস্ কপাল চাপড়াতে
লাগলাে। শান্তিদি গানে মত্ত ছিলেন, কান এগিয়ে দিয়ে
বল্লেন, এই কী বললি তােরা ?
আমি বল্লাম, শান্তিদি, কাজের কথা শােনন। মেকুরনির
সঙ্গে ঝগড়া করে এখানে থাকা আমার ভালাে মনে হয় না-
মাধবী ও
আজ আমি আমার কাকার বাড়ি চলে যাই, কাল ভরে
তুমি আর পুষ্প হস্টেলে অপেক্ষা কোরাে, তিনজনে মিলে
একটা বাড়ি খুঁজে বার করবাে। পুষ্প খুনােখুনি করতে
লাগলাে, ‘ক্ষেপেছিস নাকি?-অত মিনিমুখাে হয়ে অন্যায়
সহ্য করে তুই চলে যাবি? না—তা হবে না। অনেক
বলে-কয়ে ওকে শান্ত করলাম আর তার ঘণ্টা কয়েক পরে
আমার শান্তির আবাস চিরতরে ভেঙে ফেলে বেরিয়ে এলাম
রাস্তায়।
তিন বছর পরে আবার দেখা কাকার সঙ্গে। বাইরের
ঘরেই বসেছিলেন, ট্যাক্সি থামতেই ইকো হাতে এগিয়ে
এলেন, ‘এ কী, তােরা যে।'—হাসি মুখে বল্লাম, ‘এলাম।
ব’লেই ব্যাগ থেকে দু'খানা দশ টাকার নােট বার করে
কাকার হাতে দিয়ে বল্লাম, ‘ট্যাক্সি ভাড়াটা ঢুকিয়ে, টাকাটা
আপনার কাছেই রেখে দেবেন।
কাকা ইঙ্গিত বুঝে খুশি হয়ে অভ্যর্থনা করলেন, যা, যা,
ভিতরে যা, এতদিনে মনে পড়লাে !
তারপরের কয়েকটা দিন অবর্ণনীয়। সমস্ত দিন ঘােরা-
ঘুরি—জিনিষপত্র কেনা—বাড়িঘর ঠিক করা—টাকাটাও
আমার, পরিশ্রমটাও আমার তবু কাকাকে শিখণ্ডীরূপে দাড়
মা ধ ধীর এই
করিয়ে রাখতে হলো। আমার নতুন বাড়ি ঝমঝম্ করতে ।
লাগলাে আর এতদিনের সমস্ত সঞ্চয় আমি দু’হাতে উড়িয়ে
দিলাম মনের আনন্দে।
বিবাহের তিনদিন আগে অশোেক বল্ল, ‘চলাে তােমাকে
নিয়ে আংটি কিনতে যাবাে। বেরুলাম দু’জনে, এখানে
ওখানে ঘুরে কেনা হল আংটি-গাড়িতে বসে ও আমার
আঙুলে।
পরিয়ে দিল। হেসে বল্লাম, হীরের আংটি দিয়ে
ভালােই করলে, প্রয়ােজন হলে আত্মহত্যা করা সহজ হবে।
ফেরবার পথে হস্টেলে নামলাম। যেতেই শান্তিদি বল্লেন,
‘আজ দু’দিন ধরে মাধবীর বাড়ি থেকে তােকে এমন জরুরি
ডেকে পাঠাচ্ছে কেন রে ?
মাধবীরা এসেছে?
“নিশ্চয়ই, নয়তাে ডেকে পাঠাবে কেন?
‘তবে তাে আজই যাওয়া উচিত আমার।
পুষ্প বল্ল, “আরে বােস্ বােস—
‘না ভাই, মরবার সময় নেই আমার।
গেলাম মাধবীদের বাড়ি। বসবার ঘর পার হয়ে খাবার
ঘরে ঢুকতেই মাধবীর সঙ্গে চোখাচোখি।
‘কোথায় গিয়েছিলি তােরা ? উৎসাহভরে কঁাধে হাত
শীষীর এই
দিলাম- মাধবী নিঃস্পন্দ। কী হয়েছে তাের ?” বলেই
মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওকে আর মাধবী বলে চেনা
যায় না। অমন সুন্দর লাবণ্যভরা মুখময় কে যেন দোয়াতের
কালি ঢেলে দিয়েছে। একখানা রঙিন খদ্দরের চাদরে সমস্ত
দেহ আবৃত করে অতিশয় নিচু সুরে বল্প, ‘তােমার সঙ্গে
আমার কথা আছে, আমার ঘরে এসাে।
ঘরে গিয়ে বসতেই বল্ল, ‘তােমার নাকি বিয়ে ?
‘হ্যা’
কার সঙ্গে ?
‘তুমি কি কিছুই জানে না
“জানি না ঠিক, তবে জনরব কানে এসেছে। সত্যিই কি
অশােক ?
‘হ্যা।
‘অশােক তােমাকে বিয়ে করছে?
‘আপাতত তত তাই ঠিক।
‘অশােক কি কখনাে বিয়ে পর্যন্ত এগােয়?
আমি অসহিষ্ণু হয়ে বল্লাম, এ-সব ব’লে এখন লাভ কী,
মাধবী, যা হচ্ছে তা আর ফিরবে না।
আমার কথায় একটু ঝাঁঝ ছিল। কেননা আমােক
৩.
বলেছিলাে মাধবী আশা করেছিল ওকে-বুঝলাম সেই ঈর্ষায়
মাধবী আজ এত বিচলিত।
‘আলবৎ ফিবে। আমি হঠাৎ চমকে উঠলাম ওর
গলার জোরে।
‘তুমি কি পাগল হ'লে, মাধবী? এমন করছাে কেন?
‘এমন করছি কেন’-মাধবী উত্তাল হয়ে কঁদতে-কাঁদতে
বল্ল, আমি ওকে ভালােবাসি, বকুল-বকুল, ওকে তুই ছেড়ে
দে। বকুল, তাের কাছে আমি আজন্ম কেনা রইবাে-তু
ওকে ছেড়ে দে।—তুই ওকে ছেড়ে দে।
আমি কী বলবে ভেবে পেলাম না—উঠে পড়ে বল্লাম,
মাধবী, আমি আজ যাই।
হঠাৎ মাধবী দুই হাতে আমার পা জড়িয়ে ধরলাে, বকুল,
তুই কথা দিয়ে যা এ-বিয়ে তুই ভেঙে দিবি।
মাধবী, তা আর হয় না, তুমি ভালােবাস একা, আমাদের
ভালােবাসা পরস্পরের। তা ছাড়া তােমার সুখী হতে ইচ্ছে
করে, আমার করে না? কী পেয়েছি এ-জীবনে—অনাথ
বলে তুমিও অবহেলা করেছে, আমি ছাড়বাে না—কক্ষনে
ছাড়বাে না—ওঠো তুমি পা ছেড়ে। ছিনিয়ে আনলাম পা
মাধবী চোখ মুছে মুখখামুখি দাড়ালাে। বকুল, সব সত্যি।
==
মাধবীর জন্য
কিন্তু আমাকেও তত পথ বলে দেবে তাের স্বামী। তার
সন্তান যে আমি এই চারমাস ধরে এত কষ্টে এত দুঃখে
লালন করছি তার কী উপায় হবে ?
‘তার সন্তান। বজ্রাহতের মতাে আমি বসে পড়লাম
মাটিতে।
‘হ্যা, তাঁর সন্তান।
‘অশােকের সন্তান?
‘হা, অশােকের সন্তান। শুধু আমাকে নয়, বকুল, ফঁাদে
ফেলে সে অনেককেই এই উপহার হয়তাে দিয়েছে, তার
ভালােবাসার ভাণ আমরা বুঝিনি।
‘এত বড় লম্পট অশােক! এত বড় লম্পট।
ঘৃণায় দুঃখে অভিমানে অপমানে জর্জরিত হয়ে ফিরে
এলাম বাড়িতে। সমস্ত রাত্রি জেগে চিঠি লিখলাম দুখানা।
একখানা অশােককে, একখানা মাধবীকে। পরের দিন
ভাের হ’তেই তা ডাকে ফেলে বেরিয়ে গেলাম বাড়ি থেকে।
ট্রামে বাসে রিক্শাতে সমস্তটা দিন কী করে যে কাটালাম
জানি না।
এ লজ্জা আমি রাখব কোথায়? কী কৈফিয়ৎ
দেবব সকলকে? বাড়ি ফিরলাম চারটাতে। ফিরেই শুনলাম
অশােক প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বসে আছে আমার জন্যে। কী
৪
আবীর জন্য
করি-ইচ্ছে ছিল না দেখা করবার, কিন্তু ছােট বােনদের
সামনে ‘সী করতে পারলাম না।
আমি যেতেই অশােক মাথা নিচু করলাে। বললাম,
‘আমার চিঠি পাননি?
‘পেয়েছি।
তবে এসেছেন যে ?
‘পাপ করেছি আমি, কিন্তু তার প্রায়শ্চিত্ত কি তুমিও
করবে ?
‘আমি করবাে কেন ?
‘আমার সঙ্গে তােমার বিবাহ না-হওয়া মানেই তােমারও
প্রায়শ্চিত্ত। বকুল, মাথা
ঠাণ্ডা করে—আমাকে ক্ষমা
‘অশােকবাবু।”—আমার ডাক শুনে অশােক কেঁপে
উঠলাে। যা বলছি শুনুন--আপনি আর আমার বাড়িতে
আসবেন না।
‘এই কি শেষ কথা ?
হাঁ, এই আমার শেষ কথা।
অশােক বেরিয়ে গেলো বিবর্ণ মুখে।
মাধবীকে বিয়ে করতে ও বাধ্য হয়েছিলাে শেষ পর্যন্ত।
মাধবী ।
।
চামি সেই সময়ে ময়মনসিংহে কাজ, জোগাড় করে চলে
সেছিলাম।
অশােকের বাবার দেওয়া সেই জড়ােয়ার কঙ্কণ আর হার
মামি আশীর্বাদ পাঠিয়েছিলাম মাধবীকে। হীরের আংটিটি
পারিনি খুলতে। কত রাত্রে, কত দিনে, কত নিরালা
বকাশে এই আংটিটা আমাকে দুঃখ দিয়েছে, তবু খুলিনি।
১তমানুষের চিহ্ন যেমন তার সন্তান—এই আংটিটাও আমার
কাছে তেমনি ছিল, আজকে দিয়ে এলাম অশােকের সন্তানকে
সেটা। সেই থেকে এই তত দশ বছর কাটলাে। মাষ্টারি
করে-করে হাড় পাকা হয়ে গেলো। এমনকি আমাকে
দেখলে পর্যন্ত লােকেরা জিজ্ঞেস করে, “আপনি বুঝি মাষ্টারি
করেন ? তবু কেন পােড়া জায়গায় চাপ দিলেই ঘা বেরিয়ে
সে?
কিন্তু অশােক কেমন আছে এখন ? কে ওর সেবা
করে ?••কী নিষ্ঠুর মাধবী!
।
ভাবছি কাল একবার অশােককে দেখতে যাবাে।
৪৩
No text on this page.
অনর্যক
No text on this page.
আমি একথা কখনােই বুঝিনি যে সমীর আমাকে ভালােবাসে। বাপ ওর সবজজি করে চুল পাকিয়েছেন, এসব বিষয়ে তার শ্যেনদৃষ্টি। মাঝে-মাঝে এ-বাড়ি আসবার অপরাধে ছেলেকে লাঞ্ছিত করতেন শুনেছি। আমার বাবা মহাদেব তাঁর মনে দুর্বুদ্ধি নেই, একথা তাই মনে করেননি যে সমীরের সঙ্গে মেশামেশির ফলে কোনাে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। চরিত্র খারাপ হবার ভয়ে তিনি আমাকে চেপেও রাখেননি। অতিশয় সহজে মনের আনন্দে আমি স্ত্রী-পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছি, বন্ধুতা পাতিয়েছি এবং ছেলেবেলা থেকে মেলামেশায় বাধা না-পেয়ে স্ত্রী-পুরুষ সম্বন্ধে সচেতনও হইনি। সমীরকে ভালো লাগতাে, সমীর এলে খুশি হতাম এবং যতক্ষণ সমীর থাকতাে সময়টা কাটতাে ভালাে। ওর বিলেত- ফেরত দাদার কাছে ও নানারকম খেলা শিখেছিলাে, সে-সব খেলা আমাকে শেখাতাে, আমি পাড়া থেকে ছেলে-মেয়ে সংগ্রহ করে খেলার সঙ্গী করতাম। সবাই বলতে সমীর
बौदोन
দেখতে সুন্দর, আমি বলতাম না। ও ফস ছিল বটে, কিন্তু
পুরুষমানুষ অত ফস। আমি পছন্দ করতাম না। ওর চোখ
বড় বড় ছিল, কিন্তু আমি তাতে বুদ্ধির দীপ্তি দেখিনি। ওর
হাত ছিল গােল গােল নরম আর ধবধবে ফর্সা। পুরুষমানুষের
ঐ ননীর শরীর দেখলেই আমার মােটাবুদ্ধি রাখু গয়লাকে
মনে পড়তো। এ-কথা বলে আমি সমীরকে ঠাট্টা করে
রাখতাম না। সমীর ম্লানমুখে বলতাে, আমার কিছুই কি
তােমার ভালাে লাগে না? আমার রং ফর্সা তার আমি কী
করতে পারি, আমার হাত গেল তাতেই বা আমার কি হাড়
আছে, আমার চোখের দৃষ্টিতে বুদ্ধি খেলে না সেও বিধাতার
অভিশাপ। আমি ওর হাতের উপর হাত রেখে বলতাম,
রাগ করলে?' তক্ষুনি লক্ষ্য করেছি ওর চোখে আলো
বলে উঠেছে-হাসিতে ভরে উঠেছে মুখখানা।
আমার বয়স যখন চোদ্দ তখনই আমার সমীরের সঙ্গে
প্রথম দেখা। ও তখন সবে আই-এ পড়ছে। চোদ
বছরের মেয়ের মধ্যেই সাধারণত জোয়ার আসে, আমার
এসেছিলাে দেরিতে। অর্থাৎ যােলাে বছর বয়সে আমি প্রথম
উন্মনা হ’তে শিখলাম। ফাল্গুন মাসে আমার জন্ম, আমার
জন্মদিন উপলক্ষ্যে সেবার যারা এলে তারা সবাই বললে
জলে - মন *
I
আমার আর আগের মত উদ্দাম আনন্দ নেই। ওরা বুঝলাে।
ना | আমার মনে এখন উদ্দাম বসন্ত নেমেছে। আর দেরিতে
নেমেছিলাে বলে তার গভীরতা হয়তাে একটু বেশি
হয়েছিলাে। সেদিন আমি একজনকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।
সে যখন আমার কাছে পান চেয়েছিলাে তার চোখের দিকে
চেয়ে বুক কেঁপে উঠেছিলাে। সমীর সেখানে ছিলাে-কী
ভেবেছিলাে জানি না, হঠাৎ উঠে বাড়ি চলে গেলাে।
পরের দিন বিকেলে এলাে না, তারপরের দিনও এলাে
। আমার বাবার এক বন্ধু থাকেন ওদের পাড়ায়, বাবার
সঙ্গে তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম সেখান থেকে সমীরের খোঁজে
গেলাম তাদের বাড়ি। ওর সঙ্গে আমাদের পচিয়,
আত্মীয়তার ছেড়ালতায়। আর পরিচয়ের পর থেকে এমন
দিন যায়নি যেদিন বিকেলে সমীরকে আমাদের বাড়ি-ছাড়া
কেউ দেখেছে। পারলে সে সমস্ত দিন থাকে, কিন্তু প্রশ্রয়ের
অভাবে সে-ইচ্ছা ও চেপে রাখতে অতি কষ্টে। গিয়ে
দেখলাম বাড়িতে কেউ নেই, অন্ধকার ঘরে সমীর কপালে
হাত রেখে ডে-চেয়ারে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে
লাফিয়ে উঠলাে। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝছি ওর বুক
তখন ধ্বক করে কঁপছিলাে, হয়তাে আমার কান থাকলে
৪
মা এবীর ।
সে-স্পন্দন শােনা কিছুই কষ্ট হতাে না। এ কী, তুমি
এসেছাে? মুখে ওর রক্ত উঠে এসেছিল বােধ হয়। দৌড়ে
গিয়ে সুইচ টিপলাে। আমি বললাম, তুমি যে যাও না?
‘এমনি।
‘এমনি মানে?'—আমি একটু রাগ করে বললাম।
সমীর কোনাে জবাব দিলাে না।
একটু চুপ করে থেকে বললাম, “পিসি কোথায় ?
‘বিয়ের নেমন্তন্নে গেছেন।
“তুমি গেলে না যে?
‘বিয়েতে যেতে আমার ভালাে লাগে না।
তারপর একটু ইতস্তত করে বললে, “অশােকের সঙ্গে
তােমার কতদিনের আলাপ ?
‘ও, অশােক ? আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, “ও তাে
ছােটমামার বন্ধু, আমার সঙ্গে ঐ সেদিনই দেখা। ভারি
চমৎকার কিন্তু।
বিদ্রুপের স্বরে সমীর মুখে-মুখে বলে উঠলো, “তাই
নাকি?
ওর বিদ্রুপ বুঝতে পেরে একটু যেন বিরক্ত বোধ
করলাম। অশােকের মুখ তখন স্পষ্ট আমার মনে দাগ
কেটে আছে। প্রথম দেখেছি, তাও হয়তাে বড় জোর আধ
ঘণ্টার দেখা। অথচ এ দু’দিন ক্রমাগতু ওর প্রসঙ্গ উঠলে
আমি যেন উত্তাল হয়ে উঠতাম। সমীরের কথার জবাব
না দিয়ে চুপ করে রইলাম।
রাগ করলে নাকি?-সমীর কোমল গলায় বললে।
“রাগ করবাে কেন ?
কথা বলছে না যে?
‘এবার যাই—আর কি।
না, না, বােসসা বােসাে’—তারপর হঠাৎ একান্ত কাছে
এসে বসলাে-বললে, “মণি, আমি বি, এ. পাশ করে
কলকাতা চলে যাবাে।
‘বেশ তাে, বেড়িয়ে আসবে।
ভাই, বেড়াতে না-পড়তে।
‘ভালো লাগছে না এখানে। পরীক্ষার আমার দেরি
নেই বেশি—অথচ একটুও পড়ায় মন দিতে পারছিনে।
ঠাট্টা করে বল্লাম, ‘প্রেমে পড়েছে নাকি?
‘া।
সমীর যে হ্যা কথাটা উচ্চারণ করলো তার মধ্যে এতটুকু
মাধবীর জন্ম,
হালকা সুর ছিলাে না। কথাটা যেন সত্যি করেই বললো।
আমি জানতাম সমীরের বাবা যখন খুলনা ছিলেন তখন ছােট্ট.
একটি মেয়েকে তারা বৌ করবেন এরকম জল্পনা-কল্পনা
করতেন। সেখানকারই এক মুন্সেফের মেয়ে। হঠাৎ পাঁচ
বছর পরে সেই মুন্সেফ যখন পেন্সন নিয়ে এসে টাকা বাড়ি
করে বসলেন তখন সমীরের মা কথাটা প্রায় পাকা করে
ফেলবার চেষ্টা করলেন। মেয়েটি তেরো বছরের। সমীরের
মা বলেছিলেন কথা এখন ঠিক করে রাখবাে তারপর ছেলে
এ. এ. পাশ করলে বিয়ে দিয়ে বিলেত পাঠাবাে। বিলেতের
খরচাটি অবিশ্যি মুন্সেফবাবুই দেবেন।
সমীর একটু পরে আবার বললাে, “আচ্ছা মণি, অশােককে
তােমার কেমন লাগলাে? ব্রিলিয়েন্ট ছেলে শুনেছি, কিন্তু
দুর্নাম অনেক।
ঠোট উল্টিয়ে বল্লম, ‘ভারি দুনাম, কেউ একটু
মাথা তুললেই লােকেরা অমন বলতে থাকে—আমি ওসব
মানি না।
সমীর সে-কথার জবাব দিলাে না, একটু চুপ করে থেকে
বললে, “আমি কলকাতা যাবার আগে তােমাদের বাড়ি আর
যাবে না ভেবেছি।
২
অ নর্থ ক
‘ভালােই তো ভেবেছো। আমি রাগ করে মুখ
যােরালাম।
সমীর মৃদুস্বরে বললে, “তুমি তাে তা হলে খুশিই হও।
“তুমি তাে দেখছি অন্তর্যামী।
‘আর কারাে না হই, তােমার অন্তর্যামী অন্তত।
তবে যেয়াে না।” আমি রাগ ক'রে উঠে দাড়ালাম।
‘পাগল নাকি’--সর্দীর আমার হাত টেনে বসালাে।
শুনতে পেলাম বাবার পায়ের শব্দ। জুতাের শব্দ করতে-
করতে উনি উঠে এসে বললেন, ‘মণি—যাবি না? সমীরকে
জিজ্ঞেস করলেন, তােমার মা কোথায়? ‘বিয়ে বাড়ি
গেছেন, বসুন না একটু।” সমীর কাকুতি করতে লাগলাে
আর-একটু বসবার জন্যে, কিন্তু বাবা আর বসলেন না। চলে
এলাম।
তারপরে ওর সঙ্গে আমার একমাস মাত্র আর ভালাে
করে দেখাশােনা হয়েছিলাে। সত্যি-সত্যিই ও বি. এ.
পরীক্ষা হবার পর কলকাতা চলে এলাে পড়তে। আমার
ভারি কষ্ট হয়েছিল ও চলে আসবার দিন। আগের দিন
সন্ধ্যাবেলা যখন বললাে, ‘কাল থেকে তােমাকে দেখবে না।
ভাবতে বড় কষ্ট হয়, আমার কান্না পেয়েছিলাে, ভাঙা গলায়
৫৩
ওর।
মাধবীর জন্য"
বলেছিলাম, তুমি যাচ্ছে নতুন জায়গায়—আমি তো
এখানেই থাকলাম—আমারই অভাবটা লাগবে বেশি।
‘তােমার কষ্ট হবে? আমার কথা তুমি ভাববে এরকম
সময়? কথাটার যেন জবাব শুনবে ব’লে উৎসুক হয়ে
ও তাকিয়ে রইলাে আমার মুখের দিকে। আমি চুপ করে
রইলাম।
তারপরে দেখা আমাদের পুরাে এক বছর পরে।
বাবা মাও কলকাতা গিয়ে ছিলেন কিছু দিন। ছেলেকে
লায়েক করে দিয়ে শেষে হস্টেলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে
এলেন এতদিনে। সমীরকে দেখে আমার লজ্জা করলাে যেন।
চমৎকার বাবু হয়েছে দেখলাম। চেহারাও বলেছে কিছু।
কথাবার্তায় দিব্যি সপ্রতিভ। আমাকে চুপ করে থাকতে
দেখে বললাে, বাঃ, এতদিন পরে এলাম, প্রণাম করলে না?
‘ঈস।
‘ঈ কী-আমি তাে তােমার বড়’—বলেই আমার
কাপড়ের আঁচল টেনে বসিয়ে দিলাে। বললাম, কেমন
আছাে ?
“দেখছােই তাে—তুমি কেমন আছে?
‘ভালােই।
৫৫
র চিঠির জবাব দাওনি যে?
কী এর জবাব দেবে।
তা দেবে কেন—আমাকে মনেই থাকতে ভারি।
‘চিঠিটাই নাকি মনে রাখার নিদর্শন।
“নিশ্চয়ই।
তবে এবার থেকে দেবাে।”
তারপর এ-কথা সে-কথার পরে হঠাৎ বললো, তােমার
অশােক রায়ের খবর কী?
বললাম, “আমি কী জানি! সত্যিই আমি জানতাম না।
সেই যে একদিন এসেছিলো—তারপর বড় জোর আর দু’দিন
এসেছিলাে কিনা সন্দেহ।
হেসে টিপ্পনি কেটে বললাে, তােমার বন্ধুর খবর তুমি
রাখাে না, ভারি আশ্চর্য তাে।
টিপ্পনিটুকু আমার কোথায় যেন বাজলাে। বললাম, বন্ধু
হলে খুশি হতাম, কিন্তু বন্ধু না-হ'য়েও একথা সবাই জানে যে
অশােক রায় এবার এ, এ.-তে ফার্স্ট হয়েছে।
সমীর গম্ভীর হয়ে রইলাে।
গ্রীষ্মের আড়াই মাস ছুটির মধ্যে দেড় মাসই প্রায়
কলকাতায় কাবার করে এসেছিলাে। দিনকুড়ি থেকে আবার
गावदोबस
চলে গেলাে। প্রথম প্রথম গিয়ে আমাকে চিঠি লিখতে
কিন্তু ওর মাথায় কী যে এক অশােকের চিন্তা ঢুকেছিলাে-
সব চিঠিতেই একটা রূঢ় মন্তব্য না-করে পারত না। ফলে
আমি জবাব দিতাম না, কাজে-কাজেই সম্পর্কটা শিথিল হয়ে
এলাে।
তাছাড়া একবার লিখলাে মুন্সেফের মেয়েটিকে
বিবাহ করার জন্য পিড়াপিড়ি করায় মার সঙ্গে ও ঝগড়া
করেছে। আমি অবাক হলাম, কিন্তু সত্যি-সত্যি তার পরে যে
ও এলাে সে একেবারে এম.এ. পরীক্ষা শেষ করে। বললাে,
বিলেত যাচ্ছে একমাসের মধ্যে। যাবার দিন আমাকে
একটা ফাউন্টে পেন্ উপহার দিয়ে বলেছিলাে, “চিঠি লিখাে।
আমি সেদিন কেঁদেছিলাম। সমীরের জন্য নয়—একজন
মানুষ অত দূরে চলে যাচ্ছে ভেবে। সমীর কী বুঝলাে জানি
না—আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাে, ‘তিনটি বছর
, আরাে, আরাে তিনটি বছর। আমি এখন সম্পূর্ণ মা-বাপের
হাতের মুঠোয় ; আমি এখনো নাবালক। কথাটা বলতে-
বলতে ও উত্তেজিত হয়ে উঠলাে। হঠাৎ পলকে যেন আমি
ওর মনের কথাগুলাে বুঝতে পেরে লাল হয়ে উঠলাম, কিন্তু
কয়েকদিন পরেই তা আর মনে রইলাে না।
এক বিকেলে বকশিবাজার থেকে ফিরছিলাম ঘােড়ার
গাড়িতে। প্রত্যেক রবিবার মার এক বন্ধুর বাড়ি আমার
নিমন্ত্রণ থাকতাে। বন্ধুটি আমার চেয়ে কম করেও দশ
বছরের বড়। নতুন ফিরেছেন বিলেত থেকে তারপর কাজ
নিয়ে এসেছেন মেয়েদের কলেজে। আমার সঙ্গে দেখা হবার
কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা বয়সের অত ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও
পরস্পরের বন্ধু হলাম। মাধুরীদি যে আমাকে কেবলমাত্র
স্নেহ করতেন তা নয়, কেমন একটা বন্ধু হয়েছিলাে যার জন্য
দু’জনে সমস্ত দিন একসঙ্গে কাটিয়েও আমরা বিরক্ত বােধ
করতাম না। স্নেহাস্পদের সঙ্গে মানুষ কখনােই সমস্ত দিন
হাসি-গল্প করে কাটাতে পারে না—কিন্তু আমরা এক খাটে
শুয়ে সমস্তটি দুপুর যে-রকম উচ্চস্বরে হেসেছি আর কথা
বলেছি তাতে কেউ একথা মনে করতে পারেনি যে আমি
মাধুরীদির অত ছোট, এবং সমস্ত দিক দিয়েই ছােট।
বৃষ্টি পড়ছিলাে সেদিন। সমস্ত দিন পরে বিকেল প্রায়
পাঁচটার সময় একটু যেন থামলাে। আমি মাধুরীদির
চাপরাশি নিয়ে গাড়ি করে ফিরছিলাম, কিন্তু একটু পরেই
বৃষ্টি আবার ঘন হয়ে নামলাে। এস্তে জানালাটা টেনে দিতে
গিয়েই পথে দেখলাম অশােক। কেঁচা লুটিয়ে সে ভিজতে-
ভিজতে চলেছে, হাতে ছাতা নেই। আদ্দির পাঞ্জাবি ভিজে
মাধবীর জন্য ভিতরের শরীরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আমি নিমেষে গাড়ি থামাবার আদেশ করলাম, তারপর মুখ বাড়িয়ে ইশারায় তাকে ডাকলাম। গাড়ির দরজাটা ধরে মৃদু হেসে নমস্কার করলাে। চেয়ে দেখলাম তার হাসির তুলনা নেই, তার চোখের তুলনা নেই। কুষ্ঠিতভাবে বললাম, “গাড়িতে আসুন’ -কথা কয়টার সুরে আমার মনের সমস্ত ইচ্ছা হয়তাে জড়ানাে ছিল। সে আপত্তি করলো না—অত্যন্ত সহজে গাড়ির মধ্যে ঢুকে বললাে, “বাঁচালেন। তারপর সমস্তটা পথ প্রায় চুপ করেই কাটলাে। অশােকদের বাড়ি পথে পড়ে না, আমি গাড়ােয়ানকে ডেকে ওদের বাড়ির দিকে যাবার কথা বলতে যাচ্ছিলাম। অশােক বাধা দিয়ে বলল, “ক্ষেপেছেন- আপনি একজন মহিলা, আপনাকে ফেলে আমি আগে নেমে যাবাে? আপনাকেই আগে পৌছিয়ে দিয়ে আসি। চলুন। হেসে ফেললাম—বাঃ, আমি তাে একাই যাচ্ছিলাম। ‘তা যাচ্ছিলেন—কিন্তু সঙ্গী যখন জুটলাে তাকে এই সম্মানটুকু অন্তত দিন। কী বলবাে, চুপ করে রইলাম। বাড়ি পৌছিয়ে দিয়ে সে সেই গাড়িতেই চলে গেলাে। অনেক বলেছিলাম কিন্তু নামলাে না, গাড়ি-ভাড়াও দিতে - ।”
দিলে না। পরের দিন বিকেলের ডাকে ধন্যবাদ বহন করে
শুধু এইটুকু একলাইন চিঠি এলাে।
জবাব দেবার কিছু নেই, তবু সমস্তদিন সে-ইচ্ছার তাগিদে
আমি উন্মনা হয়ে ঘুরে বেড়ালাম। চিঠির লাইন দুটি
একশােবার মনে-মনে আবৃত্তি করলাম, তারপর সন্ধ্যার
নির্জন অবকাশে আবছা অন্ধকারে বসে-বসে দেয়ালের গায়ে
ইটের কণা দিয়ে লিখলাম, আমি তাকে ভালােবাসি’
কতবার লিখলাম তা জানি না—একবার, দু’বার তিনবার,
অসংখ্যবার একটার গায়ের উপর আর একটা লিখে
চললাম।
এর ঠিক ছ'মাস পরে আমাদের বিয়ে হয়েছিলাে।
ছ’মাসের মধ্যে তিনমাস অশােক ঢাকায় ছিল—আর সে
তিনমাসেই আমরা পরস্পরকে সম্পূর্ণ বুঝতে পেরেছিলাম,
এতটুকু মেকি বা ফাকি ছিল না। তিনমাস পরে অশােক
কলকাতার এক কলেজে প্রােফেসরি নিয়ে চলে এলাে—
‘ভালাে করে ভেবে দেখাে এ তিন মাস।
সুদীর্ঘ তিনমাস পরে বাবাকে বললাম। বাবা একটু
অবাক হলেন। এমন কিছু ওঁরা পাননি আমাদের ব্যবহারে
যা থেকে একটু আঁচও করতে পারেন। তাছাড়া এ তিনমাসে
মাধবীর জন্য
অশােক আর আমি চিঠিপত্র লেখালেখিও করিনি। মা
বললেন, ‘অশােক তাে এখানে নেই। আমি বললাম,
তাতে কী।
তবে কী করে হবে?
আমি অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে অস্ফুটে বললাম, “আমি
লিখবাে। মা-বাবা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন, আমি
কুষ্ঠিতভাবে পাশের ঘরে চলে এলাম। কয়েকদিন পরে মার
নামে চিঠি এলাে অশােকের মার কাছ থেকে।
বিয়ে হবার এক বছর পরে শুনলাম সমীর ফিরে এসেছে।
মনটা ব্যগ্র হলাে দেখবার জন্যে।
অশােককে বললাম, সমীর আমার অত্যন্ত বন্ধু ছিলাে,
কতদিন পরে এলাে, দেখতে ইচ্ছে করছে। অশােক বললাে,
‘কোথায় আছে জানাে ?
‘তা তো জানি না।
।
‘তাই তাে।
মাকে লিখলাম ঠিকানার জন্যে। মা লিখলেন তিনিও
জানেন না। আরাে কিছুদিন পরে খবর পেলাম সমীর
ভালাে কাজ পেয়েছে, আছে কলকাতাতেই। আমার
অনর্থক
আগ্রহও ততদিনে নিবে এসেছিল। দেখা হলে খুশি হই
এ পর্যন্ত।
হঠাৎ সেদিন সমীরের মামাতাে ভাই বাবলুর সঙ্গে পথে
দেখা। কথায়-কথায় বললে, সমীরদার খবর রাখাে ?
আগ্রহের সঙ্গে বললাম, “তুমি রাখাে নাকি? ঠিকানা
জানাে ?
‘নিশ্চয়ই—আরে সে যে মস্ত সাহেব হয়ে ফিরেছে,
শুনছি নাকি মেম বিয়ে করে এসেছে। মা-বাপ তাে বিয়ে
দেবার চেষ্টায় খুন হয়ে গেলাে।
“তাই নাকি?’--অবাক হয়ে বললাম।
বাবলু একটু ঠাট্টার সুরে বললে, “কেন, তােমার সঙ্গে
এত ভাব, আমরা তাে তখন কতই ভেবেছিলাম—তােমার
সঙ্গেও দেখা করেনি ?
আমি সে-কথার জবাব না দিয়ে বললাম, আমাকে ওর
ঠিকানাটা দিতে পারাে ? বাবলু একটা টুকরাে কাগজ বার
করলাে পকেট থেকে—তারপর ঠিকানা লিখে দিল।
কী যে কৌতূহল হ’লল, ঠিকানা নিয়ে এসেই অশােককে
বললাম, এই চলে। না-সমীরকে দেখে আসি।
‘তুমি যাও, আমি তাে চিনি না।
১১
মাধবী। এই ‘তাতে কী! আমারই তত বন্ধু। আর এই তাে কাছে থাকে। অশােকের কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যিই যাওয়া হােলল না। অগত্যা আমি একাই গেলাম দেখা দোতলার ফ্ল্যাট। বিলিতি ধরনে সাজানাে গােছানাে। বসবার ঘরে গিয়ে বসতেই ‘বয় এসে অত্যন্ত বিনয় ক'রে বললে, “মেমসাব থােড়া বৈঠিয়ে—সাব বাহার গিয়া। আমি অত্যন্ত হতাশ হয়ে গেলাম। এত কষ্ট করে বাড়ি খুজে এলাম, তাও কিনা বাবু বাড়ি নেই। উদ্বিগ্ন- ভাবে বললাম, সাহেব কখন আসবেন জানাে? মাথা নিচু করে বয় বিনয়ের ভঙ্গিতে বললে, এই আবভি আ যায়গা মাইজিআপ থােড়া বৈঠিয়ে। বসলাম একটুখানি। তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখতে লাগলাম এদিক-ওদিক। কিন্তু মিনিট পনেরাে কাটলো, তবু সমীর এলাে না। কতক্ষণ আর বসবাে। তার চেয়ে বরং একখানা চিঠি লিখে রেখে চলে যাই। বয়কে বলতেই সে পুরু নীল কাগজের একটা প্যাড, আর কলম নিয়ে এলো। প্যাডের মলাটটি ওলটাতেই অধসমাপ্ত একখানা চিঠি চোখে পড়লাে। সমীরের হাতের লেখা এতদিনেও একটু বদলায়নি দেখলাম। পাতাটা ওলটাতে গিয়ে হঠাৎ একটা জায়গায় আমার নামটা চোখে পড়তেই আমি থমকে গেলাম। বুঝতে পারছিলাম খুব অন্যায় হবে তবু কিছুতেই চিঠিটা পড়বার লােভ সামলাতে পারলাম না। চিঠিটি কোনাে-একজন বন্ধুকে লেখা, এবং তা এই রকম— ‘তুমি আমায় জিজ্ঞেস করেছে, এখনাে কেন আমি বিয়ে করতে চাই না। মা-বাবা কষ্ট পাচ্ছেন সে কথার উল্লেখ করতেও ভােলেনি। মা-বাবার মনের কথা জানিনে--আমি নিজে যে বিয়ে না-করে কষ্টে নেই এ-কথা তুমি বিশ্বাস কোরো। তাছাড়া বিয়ে যদি করতেই হয় তবে আমার মতে মা-বাবাকে সুখী করবার চাইতে নিজের সুখের কথাটাই বেশি ভাবা দরকার। কিন্তু আসলে সুখী হবার যােগ্যতাই বােধ . হয় আমার নেই, নয়তাে অকারণে এমন একটা অনর্থ ঘটবে কেন! এখন অবশ্য খুব স্পষ্টই বুঝতে পারছি যে আমি আগাগােড়াই মণিকে ভুল বুঝেছিলাম। কিন্তু তখন মনে হয়েছিল—যাগে, সে-কথা বলে আর কী হবে। তবে এটুকুই বাঁচোয়া যে মণিও বরাবর আমাকে ভুল বুঝেছিলাে। নয়ততা লজ্জায় আমাকে মরে যেতে হতাে। তুমি বলবে এ- সব কথা দুঃখবিলাস মাত্র-যথেষ্ট সময় কাটলে এ দাগের
উপর পলিমাটি পড়বে সে-কথাও সত্য, তবে যতদিনে সেই
সুদিন আসবে, ততদিনে
এই পর্যন্ত লিখেই চিঠিটা শেষ হয়ে গেছে। চিঠিটা
পড়বার পরে আমি একটু বসে রইলাম চুপ করে, তারপর
মলাট উল্টিয়ে প্যাড টি বয়ের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে আস্তে
নেমে এলাম সিড়িতে। ঠিক শেষ সিড়িটির মুখেই সমীরের
সঙ্গে দেখা হয়ে গেলাে একেবারে মুখােমুখি।
‘আরে মণি যে, এসাে, এসাে। বিস্ময়ে আনন্দে সমীর
থমকে দাড়ালাে।
‘অনেকক্ষণ বসে ছিলাম, এবার আমাকে যেতেই হবে।
‘ক্ষেপেছে নাকি—একটু বসবে চলো—দু’সিড়ি লাফিয়ে
উঠে ও আমাকে ডাকতে লাগলাে। আমি তবু নেমে এলাম
নিচে‘সত্যি সমীর, এবার আমার না-গেলেই নয়।
সমীর আস্তে-আন্তে নেমে এলাে কাছে, আর আমি একটু
ফিরে দাড়ালাম, চকিতে তাকালাম ওর মুখের দিকে।
সমীর সঙ্গে-সঙ্গে এলে একটুখানি, তারপর দাড়িয়ে
রইলাে স্থির হয়ে।
মনটা বড়ই খারাপ লাগছিলো, কিন্তু আমি কী করতে
পারি ?
নিরুপমার চোখ
No text on this page.
নিরুপমাকে আমি পড়াই। পড়াই আমি দু’বছর যাবত,
তখন নিরুপমা ছিল চোদ্দ বছরের মেয়ে, এখন তার যােলো।
ওর ঠাকুরদা বলেন এই সবে বারো পেরিয়ে তেরােয় পা
দিলো।
অতিশয় সনাতনী ভাব ওর বাপ-ঠাকুরদার। যতক্ষণ
পড়াই সমস্তক্ষণ ওদের পুরােনাে আমলের চাকর হরিসাধন
শাসক এবং প্রহরীরূপে সেখানে মােতায়েন থাকে, মাঝে-
মাঝে ওর কর্মহীন ঠাকুরদাও তার জরাজীর্ণ দেহ নিয়ে শয্যা
ছেড়ে উঠে আসেন নাতনিকে দেখতে। আর নিরুপমা নতমুখ
আরাে নত করে, তার সংকুচিত দেহ আরাে কুঞ্চিত হয়।
শীত-গ্রীষ্ম তাকে ফুলহাতা জামা পরতে দেখি, তা ছাড়া সমস্ত
শরীরকে সে শাড়ি দিয়ে এমনভাবে আবৃত করে রাখে যে
একমাত্র হাতের আঙুল ক’টি ছাড়া আর কিছুই দেখবার
উপায় নেই। মুখখানা এতই নিচু করে রাখে যে টানা
ভুরুর তলায় ফোলা-ফোলা দুটি চোখের পাতা আর টিকোলে
নাকটিই শুধু চোখে পড়ে। অদ্ভুত মাষ্টারি আমার। এ-রকম
বোৰা পড়ানাে যে কী দুঃসাধ্য-সাধন তা কেবল আমিই
জানি। অনেকদিন বিরক্ত হয়ে কাজ ছেড়ে দিতে চেয়েছি,
কিন্তু মন থেকে সায় পাইনি। মাস গেলেই কুড়িটা টাকা,
অতএব লজ্জাই স্ত্রীলােকের অঙ্গের ভূষণ ব'লে নিরুপমাকে
দু’বছর যাবত কেবল ক্ষমাই করে আসছি। নিরুপনার
ঠাকুরদা বলেন তাদের নিরুর বয়স তেরাে হলে কী হবে,
দেখতে সে বেজায় বড় হয়ে গেছে, যদি ভালাে ছেলে-টেলে
খোঁজে থাকে -আমি মুখে বলি “নিশ্চয় নিশ্চয়’, আর মনে-
মনে ভাবি ঐ বােবাকে বিয়ে করতে বয়ে গেছে মানুষের।
এমন অশিক্ষিত লজ্জার স্তপ নিয়ে মানুষ করবে কী? আড়-
চোখে চেয়ে দেখি তার মুখের ভাব কিছু বদলালো নাকি,
কিন্তু আশ্চর্য, চোখের পাতাটি পর্যন্ত তার নছে না।
আমার নাম বিমলানন্দ। থর্ড ইয়ারে উঠেই এই
টিউশনিটা পেয়েছিলাম। বাপ অধ পয়সার মালিকও করে
যাননি। বিধবা মাকে নিয়ে জ্যাঠার আশ্রয়ে দিন কাটছিলো।
স্কলারশিপের টাকায় পড়া চলত, এই টিউশনিটা পেয়ে
হাতে স্বর্গ পেলাম। নিরুপমার বাবা সদানন্দবাবু আমার
বাবাকে চিনতেন এবং আমাদের বর্তমান অবস্থা জানতেন
বলেই অবিশ্যি আমার ভাগ্য খুলেছিলাে। নচেৎ আমার মতো
একজন যুবক যে তাদের মেয়ের মাষ্টারি করছে এটা ভারি
আশ্চর্য। আমি প্রত্যেকদিন সাড়ে-ছ'টা বাজতেই সকালে
পড়াতে যাই। গেলেই সর্বপ্রথম ঠাকুরদা উকি দেন, তারপর
আসে নিরুপমার ছােট ভাই শঙ্কর—অবশেষে হরিসাধনের
সঙ্গে-সঙ্গে অত্যন্ত মৃদুগমনা নিরুপমা বই আর কাপড়ের স্তুপ
সামলাতে-সামলাতে এসে আমার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে।
লজ্জাটা ছোঁয়াচে, আমারও যেন চোখ তুলে তাকাতে লজ্জা
করে তবু গলা-খাকারি দিয়ে নড়ে-চড়ে বসি। নিঃশব্দে
নিরুপমা হােমওঅর্কের খাতাটি বের করে, আর আমি সেটা
টেনে নিয়ে ভুল থাকলে শুদ্ধ করি। ততক্ষণে জানি নিরুপমা
ইংরেজি বইয়ের নির্দিষ্ট পাতায় চোখ ডুবিয়েছে। নিভুল
গতিতে চলে এই নিয়ম।
আমাদের পাড়ায় অরি-একটি মেয়ে আছে। তার নাম
সুমি, অর্থাৎ সুমিতা। এ মেয়েটি আবার একেবারে
নিরুপমার উল্টো। লজ্জা-শরমের বালাই নেই, সময়-অসময়ে
ছুটে-ছুটে এ-বাড়ি আসে, আমি নিঃস্ব পর জেনেও আমার সঙ্গে
ফাজলেমি করে, ঘুমিয়ে থাকলে মুখে চুনকালি মেখে রাখে,
পড়াশুনাের ব্যাঘাত করে এবং নাম ধরে ডাকে। আমি
কখনাে-কখনো অন্যের সামনে ভারি কুণ্ঠিত বােধ করি; কিন্তু
;
ওর সংকোচ নেই। ওর বাবার পয়সা আছে, কাজেই
প্রতিপত্তিও আছে। অতএব আমার জ্যাঠাইমা আবডালে
ওকে অসভ্য মেয়ে বলে অভিহিত করেন এবং সামনে প্রশ্রয়ের
সীমা থাকে না। আমার মা ওকে সত্যিই ভালোবাসেন।
আমার এক বােন অল্প বয়সে মারা যায়, বেঁচে থাকলে অত
বড়ই হতো, হৃদয়ের এই দুর্বলতার সুযােগেই সুমি অরে।
আপন হয়ে ওঠে মা-র কাছে। সুমির বয়স যাই হােক, তার
সরলতা ও নিঃসংকোচ দাপাদাপি সত্যিই মমতা কাছে।
দৃষ্টিকটু হলেও অনেক সময় তাকে বকতে মায়া হয়।
আবার মা বলেন যত মেয়ে তিনি আজ পর্যন্ত দেখেছেন তার
মধ্যে সুমির মত ভালো তার কাউকেই লাগেনি। এমনকি
নিজের মেয়ে থাকলেও ওর চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন কিনা
সন্দেহ। আমি ঠাট্টা করে বলি নিজের মেয়েকে না হ'তে
পারে বৌকে নিশ্চয়ই বেশি ভালােবাসবে। মা হাসেন,
তারপর বলেন, কপালের কথা বলা কি যায় । সুমির বাবার
বিদ্যানুরাগ আছে। কথাটা খচ, করে বেঁধে মনের মধ্যে।
ও, এই বুঝি মার মনের কথা। এক রবিবার
দুপুরে নিরালা
বুঝে খপ করে সুমির আঁচল টেনে বলি, এই সুমি
ভুরু কুঁচকে সুমি জবাব দেয়, ‘কী?
জবাবটার মধ্যে একটুও যদি রস থাকতো।সারা দুপুর
এ-রকম হুটোপুটি করে কেন ?
‘তাতে তোমার কী?
আমার ভালো লাগে না।
না লাগলো তো বয়ে গেল।--সুমি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন
ক'রে চলে যেতে চায়।
যেয়াে না, শােনাে-
না, আমি শুনবে না।
কেন শুনবে না ?
‘আমার ইচ্ছে।
না, অত ইচ্ছে আর খাটবে না-তােমার বাবা আমায়
কাছে তােমাকে অঙ্ক কষতে বলেছেন দুপুরবেলা।
‘ঈস'-সুমি আমার হাত ছাড়াতে চেষ্টা করে।
আমি শক্ত করে চেপে রেখে বলি, তােমার একটুও লজ্জা
নেই কেন? আমার ছাত্রী নিরুপমা তােমার থেকে মাত্র
এক বছরের বড়, সে আমার কাছে দু’বছর যাবত পড়ছে কিন্তু
আজ পর্যন্ত সে আমার দিকে চোখ তোলেনি।
এবার কিন্তু অত বড় নির্বোধ সুমিরও আত্মাভিমানে
আঘাত লাগে। ভারি আশ্চর্য, যত বােকাই থােক বা যত
সরলই তােক মেয়েরা কখনােই অন্য মেয়েদের প্রশংসা সইতে
পারে না। তাই সুমির ঐ শিশু-চোখেও একটু অভিমানের
আভাস দেখা দেয়। বলে, “সে-কথা আমাকে বলবার
হয়েছে কী?
হেসে বলি, ‘তাতে যদি তােমার একটু শিক্ষা হয়।
“শিক্ষা ?-আচম্বিতে সুমি প্রচণ্ড এক চিম্টি কেটে
পালিয়ে যেতে যেতে বলে, ও-সব শিক্ষা তােমার ছাত্রীকেই
শিখিয়ে, আমার সঙ্গে লাগতে এসাে না।
মা-র পছন্দ যে একটুও ভালাে না সে-বিষয়ে এবার
নিঃসন্দেহ হই। মার আসল নজর কি ঐ মুমিই, না সুমির
বাপ? মার মুখে অনেকদিন শুনেছি আমাকে বিয়ে দেবেন
মুরুব্বি দেখে। তার আইডিয়েল মুরুব্বি বােধ হয় তাহলে
সুমির বাবাই। মার ঘরে গিয়ে দেখি সুমি আচার খাচ্ছে
চেটে-চেটে। শুনতে পাই, “কাকিমা, কি সুন্দর আচার করে।
তুমি। কাকিমা বলেন, “আর-একটু খাবি নাকি ? সুমি
নিশ্চয়ই আরাে চাইতো। আমাকে দেখেই বলে, “ঐ এসেছেন
তোমার আদুরে ছেলে,-এখানে কেন, যাও না তােমার
ভালো ছাত্রীর বাড়ি।
আমি বলি, ‘ম, সুমিকে আর আচার দিয়াে না, ওকে
অবিশ্রান্ত প্রশ্রয় দাও বলেই ও আমাকে মা করে না।
‘আহা রে—কী আমার মান্যবযু' মুখের এক অপূর্ব
ভঙ্গি দেখিয়ে সে আবার আচারে মনােনিবেশ করে। মুখভঙ্গি
দেখে হেসে ফেলি।
দিন কয়েক পরে মা হঠাং বলেন, “বিমল, এখন তাে তুই
বিয়ে করলেও পারিস। বিস্মিত চোখে তাকাই-মা কি
লক্ষ টাকার স্বপ্ন দেখছেন নাকি? আমি যেখানে নিজেই
পরায়ে প্রতিপালিত সেখানে আমার অন্নপুষ্ট হবার জন্য
কাউকে আমন্ত্রন করা কি একান্তই পাগলামি নয়? মার
মুখ কিন্তু হাসি-হাসি। বলেন-“কথায়-কথায় তোর জ্যাঠা
সুমির সঙ্গে তোর বিয়ের কথা পেড়েছিলেন—সুমির বাবার
আপত্তি নেই। ঐ তো একমাত্র মেয়ে, ভদ্রলােক তো টাকা
দিতে অপারগ নন-তিনি ঠিক এই রকম ছেলেই চান যাকে
নিজের মন-মতো গড়ে নিতে পারবেন।
মার কথা শুনে আত্মসম্মানে আঘাত লাগে অামার।
ভুরু কুঁচকে বলি ‘গ’ড়ে নেওয়া মানে? আমি কি একটা
মাটির ডেলা ?
৭
নিতান্ত নিরুদ্বেগে মা বলেন ‘এই বিলেত-টিতে পাঠানাে
আরকি।
বিলেত! আজন্মের স্বপ্ন আমার বিলেত। মনের ভাব
চেপে একটু চুপ করে থেকে বলি যত সব বাজে কথা
তােমাদের, খেয়ে-দেয়ে কি আর কোন কাজ পাও না?
এবার মা রাগ করে বলেন, ‘তাের ভালাের জন্যেই আমার
চিন্তা তা নৈলে আর কি এ বিয়ে যদি তোর হয় তা হলে
বুঝবি নিতান্তই তাের বরাৎ ভালাে। রাজকন্যা আর রাজত্ব:
তাের কাছে আপনা থেকেই থাক্, থাক্’-মাকে আর
কথা বাবার অবকাশ না দিয়ে সেখান থেকে পালাই। কিন্তু
কথাটা ভাববার মত বইকি! টাকা আমার নিতান্তই
দরকার—তবু বিয়ের কথাটা আমার যেন কিছুতেই ভালাে।
লাগে না।-বাড়িতে চলছে ফিসফাস্ গুঞ্জন-সুমি কি জানে ?
একদিন সুযােগ মতো আবার ধরলুম সুমিকে। বল্লুম
‘এই, এখন আর রাত-দিন আমাদের এখানে এসো না।
‘কেন ?
‘কেন আবার কী, তুমি জানাে না কিছু?
সুমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাে আমার মুখের দিকে।
আমি বলুম ‘তোমার বাবা যে আমার সঙ্গে তােমার বিয়ে
‘অসভ্য'—আচমকা ঠাস করে সে আমার পিঠে একটা চড়
মেরে ছুটে পালালাে। আমি আহত পিঠে হাত বুলােতে-
বুলােতে ভাবলুম ওর হাতে শেষে মার খেয়ে মরবাে নাকি?
সন্ধেবেলা ডাক পড়লাে জ্যাঠামশায়ের ঘরে। আমাকে
দেখেই বল্লেন, “আমাদের সকলেরই তাে খুব ইচ্ছে, তুমি
বল্লেই হয়। এতে অমত কোরাে না-জীবনের সমস্ত
উচ্চাশার মেরুদণ্ডই হ'লাে টাকা-আর তুমি যখন ভালো
ছাত্র তখন বিলেত-ফিলেত যদি একবার ঘুরে আসতে
পারে। এর পরের কথাটি জ্যাঠামশায় ভাবভঙ্গী দিয়ে
বুঝিয়ে দাড়িতে হাত বুলােত লাগলেন।
আমাকে চুপ করে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বল্লেন, আচ্ছা
ভেবে দ্যাখাে গিয়ে-কালকে বােলো।
বলাই বাহুল্য, সুমির বাবার টাকা আমাকে লুব্ধ করলে
এবং মাসখানেকের মধ্যে পাকা হয়ে গেলাে আমাদের বিয়ে।
সকলেই সুমিকে নিয়ে আমাকে ঠাট্টা ইয়ার্কি করে—সকলেরই
ধারণা সুমিকে আমি ভালােবাসি, তাই এই বিয়ে। খুব এক
রােমান্টিক ব্যাপার। আমি কিন্তু এখনাে সুমিকে স্ত্রী ব'লে
কল্পনা করে একটুও আনন্দ পাই না—আগের মতো সব
সময় আসে না বটে, কিন্তু এলে আমার সঙ্গে দেখা হয়ই,
এ-কথা একবারও মনে হয় না দুদিন বাদে ওর সঙ্গে আমার
বিয়ে হবে-একটু লজ্জা, একটু আনন, কিছুটা নেশা, সমস্ত
কিছুর একটা মিশ্রণে হৃদয়কে অভিভূত করতে চেষ্টা করি,
কিন্তু ওকে কাছে দেখলেই সমস্ত উবে যায়। তবে কি সুমিকে
আমি পছন্দ করি না, ভালােবাসি না? না, তাও নয়, আসলে
সুনির সঙ্গে আমার যে সম্বন্ধ তাতে স্নেহ-মমতা যথেষ্ট আছে,
কিন্তু প্রেম নেই।
যেদিন বিয়ে তার দুদিন আগেই নিমন্ত্রণ চিঠিখানা পকেটে
করে নিরুপমাকে পড়াতে গেলাম। দিন কয়েক পড়াতে
আসবাে না একথা বলবার ইচ্ছে ছিল। পড়াশুনাে শেষ
করে তাকিয়ে দেখলাম হরিসাধনের িির্দষ্ট বসবার স্থানটি
শূন্য। চিঠিখানা অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে পকেট থেকে বের
করে অনেক ইতস্তত করে বললাম, আপনার ঠাকুর্দা কি
বাড়ি নেই ?
নিরুপমা মাথা নেড়ে জানালাে, নেই।
‘কোথায় গেছেন?
অত্যন্ত মৃদুস্বরে জবাব এলাে, ‘পিসিমার বাড়ি।
‘এই চিঠিখানা বলে চিঠিখানা টেবিলে রাখলাম, কিছু
বলতে বড়ই লজ্জা করতে লাগলাে। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো
৭৬
নিপ মার চোখ
নিরুপমা চঞ্চল হয়েছে এবং ওর শাড়ির ভিতর থেকে একখানা
হাত দ্রুত বেরিয়ে এলো চিঠিখানার উপর-নিমেষে চোখ
বুলিয়ে হঠাং মুখ তুলে এমন এক দৃষ্টি নিয়ে স্থির হয়ে আমার
চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো যে আমি খানিকক্ষণের জন্য
ও সেই দৃষ্টির কাছে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম। এই প্রথম
দেখলাম ওর চোখ। কী যে ছিলো সেই চোখে আমি জানি
না, কেন ও-কাজ করলাম তাও জানি না। হঠাৎ নিরুপমার
হাত থেকে চিঠিখানা কেড়ে নিয়ে কুটিকুটি করে ছিড়ে
ফেলে বেরিয়ে এলাম বাই সাইকেলে ওঠবার আগে
অর-একবার পিছন ফিরে তাকালাম, দেখলাম দুই হাতে মুখ
ঢেকে ও বসে আছে শক্ত হয়ে।
তারপর আজ! এই ভোরবেলা উঠেই আমি বিমর্ষ
মুখে মাকে বলেছি, ‘মা, শেষ রাত্রের দিকে ভারি এক অদ্ভুত
স্বপ্ন দেখলাম। মা আজকাল সর্বদাই ব্যস্ত, কী কাজে
যেতে-যেতে দাড়িয়ে বললেন, 'কী স্বপ্ন ?
“থাক, বলবাে না-
‘আহা, বল না।
না, শুনলে তোমার মন খারাপ হবে।
মার কৌতুহল বেড়ে গেলো। এবার বিছানায় বসে
পড়ে. বললেন, ‘নে, নে, শিগগির বল, আমার কত কাজ। ‘বাবাকে দেখলাম-( একটু থামলাম এখানে), উনি বললেন, “বিমা, আর দু’মাস পরে তােকে এখানে পাবে, কিন্তু আমার তাতে সুখ হচ্ছে না”। (মার চোখ বড়-বড় হয়ে উঠেছে) “তুই সংসারে থাকবি, সুখী হবি, সর্বোপরি তোর দুঃখিনী মায়ের আশ্রয় হবি এই আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু যার সঙ্গে তাের বিয়ে হচ্ছে সে-মেয়ের দু’মাসের মধ্যেই বৈধব্য লেখা আছে। ‘সর্বনাশ!'—মার মুখ দিয়ে কথাটা ঠিক আত নাদের মতাে বেরুলো। মুহুতে বাড়িতে রাষ্ট্র হয়ে গেলে এই স্বপ্ন কোথায় গেলো খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা, আত্মীয়-কুটুম্ব- খবর গেলে সুমির বাবার কাছে- বিষম ব্যাপার একমুহূর্তে। আমি ফঁাক বুঝে চম্পট দিয়েছি—এবং সবেগে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি নিরুপমাকে পড়াতে। এখন আপনারাই বলুন, কাজটা কি আমি খুব অন্যায় করেছি। কিন্তু নিরুপমা কেন চোখ তুলে তাকাগে?
মুক্তি
No text on this page.
মেয়ের উপযুক্ত পাত্ৰ সন্ধান করে-করে অনাদিবাবুর স্ত্রী
প্রায় পাগল হয়ে উঠেছিলেন। এতদিনে তার অবসান হলো।
মেয়ে তার সুন্দরী, শিক্ষিতা, গায়িকা, গুণের অন্ত নেই-আর
সবচেয়ে বড় গুণ-বড়লােক, বাপের একমাত্র সন্তান সে।
এমন মেয়েরও কি পাত্রের অভাব হয়? কিন্তু হয়েছিল।
মেয়ের না-হলেও মায়ের বিচারে বাংলা দেশে পাত্রের বড়ই
অকাল লেগেছিলাে। অবশেষে ভাবনা তাঁর ঘুচলল।
সবিতার যে সম্মতি ছিলাে না তা তার মুখ দেখলেই বােঝা
যেতাে, কিন্তু ওর কি বুদ্ধি আছে। যেমন বাপের মেয়ে
তেমন তাে হবে। স্বামীর বুদ্ধির উপর চিরদিনই হেমলতা
দেবীর দারুণ অবজ্ঞা অথচ একটা মাত্র সন্তান সেটাও ঠিক
তারই প্রতিমূর্তি। যাক্, বাপে-মেয়েতে যে কোনাে কেলেংকারি
-করে ভালােয়-ভালােয় রাজি হলাে এ-ই যথেষ্ট। এখন
দু’হাত এক করতে পারলেই শান্তি।
চারটা না-বাজতেই তিনি মেয়েকে তাড়া দিলেন, যা, যা,
এক্ষুনি প্রস্তুত হয়ে নে গে, প্রতাপ এসে বসে থাকবে
নাকি?
অসন্তোষের চিহ্ন সবিতার সমস্ত মুখে ফুটে উঠলো—কিন্তু
মায়ের উপর কথা বলা তার অভ্যেস নেই—সুইচ, টেপা
কলের মতাে সে বই রেখে তােয়ালে নিয়ে ঢুকলে এসে
বাথরুমে। কিন্তু বাথরুমে তাে সে স্বাধীন ; দরজা বন্ধ করে
চুপ করে বসে রইলাে দেয়াল ঘেষে।
এই প্রতাপকে নিয়ে ঠিক ক’জন হলাে? মনে-মনে সে
হিসেব করলাে। প্রথমবার কিন্তু তার ভালােই লেগেছিলাে।
তখন সবে সে যােলােয় পা দিয়েছে। সুধীরকে সে সরল
অন্তঃকরণেই ভালােবেসেছিলাে। এখনাে মনে হয় তার কথা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মার পছন্দ হলাে না। স্পষ্ট মনে আছে।
মার শিক্ষামতে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে তার চোখ ভ'রে
গিয়েছিলাে জলে, কথা বলতে-বলতে গলা ভেঙে গিয়েছিলাে।
তবু সে মার ইচ্ছার বাইরে পা বাড়াতে পারেনি—জোর করে
বলতে পারেনি নিজের কথা।
তার ঠিক ছ'মাস পরেই অবনী পালিত আর নলিনাক্ষ রুদ্র
একসঙ্গে। দু’জনেই মার চোখে সমান প্রতিযােগী। অবনী
পালিতের বাপের টাকার খ্যাতি বহুদূর বিস্তৃত আর নলিনাক্ষ
স্বয়ং আই. সি. এস.। শেষ পর্যন্ত অবিশ্যি খসলাে দু’জনেই,
কেননা দু’নৌকোয় পা রাখা আর খাটলাে না। কিন্তু চিহ্ন
৮২
রইলাে অনেক শরীরে মনে আর দামি দামি উপহারে। উপহারগুলােই মার সান্ত্বনা হলাে। এর পরে সেই চিরলম্পট পান্না সেন। উঃ—সবিতা শিহরিত হয়ে উঠলাে সে-লােকটার কথা ভেবে। মন থেকে মুছে ফেলতে চাইলে সে-সব কথা, তারপর ঝরনা খুলে দাড়ালাে নিচে। সমস্ত শরীর বেয়ে নামলাে শান্তির ধারা। টাকা। টাকা! টাকা! হেমলতা দেবীর আর যথেষ্ট মনে হয় না কিছুতেই—অবশেষে এই প্রতাপ। অনেক বার তিনি বঁড়শিতে মেয়েকে গেঁথে টোপ ফেলেছেন, কিন্তু টোপ যতই শসালাে হােক না, ঠুকরেছে সব চুনােপুটি—অন্তত তাঁর তাই ধারণা। কিন্তু এই প্রতাপ—কে হিসেব করবে সে কত টাকার মালিক। দুষ্ট লােকে রটায় বটে ওটা অমানুষ- অমানুষ আবার কী। টাকাই পুরুষমানুষের মনুষ্যত্ব—টাকাই স্ত্রীলােকের মুখশান্তি। হঁ্যা, বলবার মতাে বটে তার জামাই। কে না চেনে প্রতাপ সিংহের বাপ অমর সিংহ আর তার বাপ দীনদয়াল সিংকে? কে কবে তল পেয়েছে তাদের তিন পুরুষের টাকার ? হেমলতার এতদিনের প্রতীক্ষা সত্যিই সফল হলো। অনাদিবাবু চোখে চশমা এটে ভাবতে বসলেন এটা ঠিক ।
মাৰী নয় হলাে কিনা, এ-বিয়েতে সবিতার সম্মতি আছে কিনা। জিজ্ঞেস করতে হবে। হা, জিজ্ঞেস তাে করাই উচিত—বিয়ে হচ্ছে তার ইচ্ছা অনিচ্ছা তত তারই—হেমলতার কী। সভয়ে তিনি একবার চারদিকে তাকালেন—কে জানে, হমলতা আবার মনের কথাও শুনে ফেলেন। স্নান করে বেরিয়ে এলাে সবিতা। মন তার শান্ত হয়েছে, স চিন্তা করে দেখেছে সুখ দুঃখ বলে সংসারে কিছুই নেই- সমস্তই মেনে নেয়া না-নেয়ার প্রশ্ন। প্রতাপকে তার ভালাে মনে হয় না—বেশ তাে, নাই বা হলাে ভালাে, তাতে তার কী এসে যায়। বিয়ের পরে মুঠো-মুঠো টাকা সে মাকে এনে দেবে—ব্যস্। সুখ কী? সে কী রকম? আর দুঃখটাই বা কিসের? যত সব মনের বিকার। মৃদু হেসে সে লম্বা চুল মেলে দিয়ে অত্যন্ত প্রশান্তচিত্তে অনাদিবাবুর ঘরে এসে দাড়াতেই হেমলতা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, এখনাে তাের হয়নি, কী আশ্চর্য ! প্রায় পনেরাে মিনিট ধরে প্রতাপ এসে বসে আছে। সবিতার মন এতক্ষণের চেষ্টাকৃত সংযমের বাঁধ ছিড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলে, কিন্তু হেমলতার চোখের দিকে তাকিয়ে বাঘের ভয়ে ভীরু হরিণের চকিত গতিতে সে ফিরে এলাে প্রস্তুত হতে।
প্রতাপ একেবারেই স্বাধীন। মা-বাপের বালাই তাে
অনেকদিনই চুকেছে, এক পিসি ছিল সেও গত প্রায় মাস
ছয়েক যাবৎ। (এটাও হেমলতার একটা আকর্ষণ। তিনি
পছন্দ করেন না মেয়ের স্বাধীনতায় অন্য-কোনাে গুরুজন
অন্তরায় থাকেন।) বিবাহের যা-কিছু সমস্ত প্রতাপকে
একাই করতে হবে। বলে গিয়েছিলাে সবিতাকে কী কী তার
জন্য কিনতে হবে তার একটা লিষ্টি করে রাখতে। কথাটা
হেমলতার অগােচর ছিলো, কাজেই গাড়িতে উঠেই দেখা
গেলে সবিতা সেটা করেনি। প্রতাপের এত তাড়াতাড়ি
গাড়ি নিয়ে আসবার কারণই ছিলাে এটা। একটু বিরক্ত
হয়ে বল্লে, ‘তােমার দেখছি কিছুই মনে থাকে না।
“তা একটু কমই থাকে।--হেমলতার অসাক্ষাতে সবিতা
একটু-আধটু স্বাধীন ইচ্ছায় কথা বলত। অবিশ্যি মায়ের
প্রভাব সে সর্বদাই অনুভব করতে তার ভীরু মনের মধ্যে।
আর তার নির্দেশও সে পালন করতে যথাযথভাবে—এবং
এ-সব ক্ষেত্রে মনােরঞ্জনের নির্দেশটাই যে মুখ্য সেটাও সে
জানতো, তবু মাঝে-মাঝে মন তার শক্ত ধুটি আলগা
করবার চেষ্টায় ছটফট করে উঠতে।
এবার প্রতাপ একটু রসিকতার চেষ্টা করে বল্ল, “তবে’
৫
তত তােমার একটু স্মরণশক্তির চর্চা করা দরকার! মনে না-
রাখাটা যদি শেষে এই অভাগার উপর এসে পড়ে—'তাকালে
সে সবিতার মুখের দিকে। সবিতা রসিকতাটা হয়তাে হৃদয়ঙ্গম
করতে পারলাে না অথবা ইচ্ছে করেই অন্যমনস্কতার ভাণ
করে চুপ করে রইলাে।
‘চুপ করে রইলে যে? কী হয়েছে?
সবিতা মুখ ফিরিয়ে বল্ল, “কী আবার হবে।
‘কী জানি, তােমার মনের কথা জানবার সৌভাগ্য কি
আমার হয়?—প্রতাপ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো—চেষ্টা
করলাে হাত ধরবার।
কিন্তু সবিতা তক্ষুনি হাত সরিয়ে নিয়ে বল্ল, “আচ্ছা
প্রতাপ, ক'টা দিনই বা আর আছে—অত অধীর হওয়া কি
ভালাে?
অত্যন্ত অসহিষ্ণুভাবে প্রতাপ বল্ল, এ-কথারও কোনাে
মানে হয় না সবিতা, এ-রকম নিয়মমাফিক সাধ্বী থাকাও
নেহাৎ হাস্যকর।
কথাটা ঠিক বিদ্রুপের মতাে শােনালাে। সাধ্বী বলতে
সাধারণত যা বােঝয় সত্যিই তো সবিতা তা নয়—এ-হাত
কি আর-কাউকেই সে ছুতে দেয়নি। প্রণয়-ভাষণ কি
– আর কারাে মুখ থেকে সে শােনেনি। অনেক অসংযম- করা সত্যিই উচিত নয় তাও সে অনেকবার করেছে মায়ের প্রচ্ছন্ন অভিপ্রায়ে। তবে প্রতাপের বেলাতেই কেন এই হাস্যকর বিতৃষ্ণা। ভাবতে গেলে একমাত্র প্রতাপেরই এ-সব প্রাপ্য-সে ফাকি দেয়নি—সত্যিই তার টাকা আছে সত্যিই মা তাকে নির্বাচন করেছেন, বিয়ে তাদের সত্যিই হবে। কিন্তু তবু—তবু কেন ভালাে লাগে না, কেন আর ভালাে লাগে না এই অভিনয় ? সহসা হাসিমুখে সে নিজের হাত প্রতাপের হাতের উপর রেখে বল্ল, নাও, হলো? কী আছে হাতের মধ্যে বলতে পারে ? ‘তুমি বােঝাে না ? না। ‘আশ্চর্য ! প্রতাপ একটু চুপ করে থেকে বললে, ‘আমার এক-এক সময় মনে হয় কী, জানাে? মনে হয় তােমার কোনাে উত্তাপই নেই—তুমি যেন কলের মানুষকে চাবি টিপলো আর অভ্যেসমতাে চলতে লাগলে তুমি। ‘হয়তাে সেটাই সত্যি। তবে—তবে কী চাও তুমি আমার কাছে ?”—প্রতাপ উত্তেজিতভাবে বলে উঠলাে। --- ৮।
সবিতার ঠোট পর্যন্ত একটা জবাব ঠেলে উঠে আবার
বুকের মধ্যে মিলিয়ে গেল। মায়ের দুই চোখ ভেসে উঠলাে
তার চোখে—সে-চোখ যেন এক্ষুনি ফেটে যাবে ভৎসনার
ভাবে—ভয়ে সংকোচে সে এতটুকু হয়ে গেলাে, ভেবে
পেলল না প্রতাপের মন রাখবার জন্য এর পর তার কী
করা উচিত।
হু হু করে ছুটলাে গাড়ি—প্রতাপ আর একটি কথাও
বললাে না তারপর। নির্দিষ্ট জুয়েলারের দোকানে এসে গাড়ি
থামতেই প্রতাপ লাফিয়ে নেমে দুম করে বন্ধ করে দিলাে
দরজাটা। সঙ্গে-সঙ্গে সবিতার বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠলো।
প্রতাপ কি রাগ করলাে ? যােললা থেকে তেইশ বছর বয়স
পর্যন্ত—কত গেলােকত এলাে—সিনেমার মতাে রীলে
গাঁথা সব ছবি মনের মধ্যে তার কিলবিল করে ফুটে উঠলাে।
কত কষ্ট করে সে গড়ে তুলেছে-কত সহজে সে ভেঙেছে।
প্রতাপ যদি এখন বিয়ে না করে তবে ভাঙবে—আবার ভাঙবে,
ভাবতেই সবিতার কান্না পেলাে। সে আর-কিছু চায় না-
চায় এ-সব থেকে মুক্তি। আর সে-মুক্তির দূত একমাত্র
প্রতাপই তাে-প্রতাপই তাকে বিয়ে করে মুক্তি দেবে আর
একমাত্র প্রতাপেরই এত টাকা আছে, যা তার মায়ের
৮৮
আকাঙক্ষাকেও ছাপিয়ে যায়। ছলছল করে উঠলাে সবিতার
চোখ বাধা দিলে না সে-মােটা-মােটা ফোটায় গড়িয়ে
পড়তে লাগলাে দুই গাল বেয়ে।
হঠাৎ সে লজ্জিতভাবে চোখে রুমাল ঘষে হাসবার
চেষ্টা করে বল্ল, হয়ে গেলাে?”—প্রতাপ কখন এসে নিঃশব্দে
দাড়িয়ে আছে গাড়ির দরজা ধরে।
একটু পরেই একটা লােক প্রকাণ্ড এক মখমলের কেস
এনে উঠিয়ে দিলে গাড়ির মধ্যে—তারপর মাথা নিচু করে
প্রতাপকে সম্মান জানিয়ে দাড়িয়ে রইলাে গাড়ি না-
ছাড়া পর্যন্ত।
গাড়ি ছাড়তেই সবিতা বল্ল-‘প্রতাপ, আমার যেন কেমন
স্বভাব, ঝগড়া না-করেই পারি না—তাই বলে কি তুমি
আমার উপর রাগ করবে ?
‘না, রাগ কিসের।
সবিতা এবার তার সমস্ত শরীর এলায়িত করে (এটি
তার অব্যর্থ ভঙ্গি) আবদারের সুরে বল্ল, কক্ষনাে তুমি
বাগ করতে পারবে না— সঙ্গে-সঙ্গে সে প্রতাপের কঁাধে
মাথা ছোয়ালাে।
“দ্যাখাে, সবিতা”- প্রতাপ গম্ভীরভাবে বল্ল, মেয়েদের
সমস্ত ভঙ্গি আমি চিনি—একমাত্র মেয়ে তাে তুমিই নও যাবে
প্রতাপ সিংহ আজই প্রথম প্রত্যক্ষ করলাে। তেরাে থেকে
তেত্রিশ—এই কুড়ি বছর যাবৎ-ততামাকে বলাই ভালে
-কী যে আমি করেছি আর কী যে করিনি তার হিসে
দিতে গেলে একেবারে মহাকাব্য হয়ে দাড়ায়। স্ত্রীলাে
আমি খুব ভালাে করেই চিনি।
লজ্জায় অপমানে সবিতার শরীরে আগুনের স্রোত ব’
গেলাে। তীক্ষ্ণস্বরে বল্ল-এ-সব তাহলে গােপন করেছিলে ।
প্রতাপ হাসলাে-“দ্যাখাে, গােপন তা আমার স্বভাে
আকারে-প্রকারে তােমার মাকে আমি সমস্ত কথা
জানাবার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু তিনি অত্যন্ত উদারমতে
স্ত্রীলােক পুরুষের নৈতিকতা সম্বন্ধে।
‘হু’—সবিতা বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাে।
‘তাই বলছি, প্রতাপ আগের কথার জের টেনে ব
“আমার মনে হয় আমার সঙ্গে বিবাহ ব্যাপারে তােমা
নিজের ব্যক্তিগত কোনাে মতামত তুমি খাটাচ্ছে না।
অত্যন্ত শান্তভাবে সবিতা মুখ ফিরিয়ে বল্ল, ‘এতখা
অগ্রসর হবার আগেই সুবুদ্ধিটা কাজে লাগালে কি ভাবে
হতাে না ?
‘অগ্রসর কী—কোনাে অধ্যায় ব্যবহার আমি তােমা
সঙ্গে আজ পর্যন্ত তাে করিনি। তা আমি তােমার সে
করতে পারি না। একটু থেমে—“দ্যাখাে সবিতা’ বল?
বলতে প্রতাপের গলার স্বর হঠাৎ অদ্ভুত বদলে এলাে—“আf
এখন শান্তি চাই, আর সে-শান্তি আমার তােমার মধ্যে
আমার ভালাে নেই, মন্দ নেই, একমাত্র তুমি যদি’—গাড়ি
খচ, ক'রে থেমে গেলােসঙ্গে-সঙ্গে প্রতাপ যেন সম্বি
ফিরে পেলাে। নিজের দুর্বলতা যে কখন কোন প
আত্মপ্রকাশ করলাে এ-কথা ভেবে তার দস্তুরমতাে লজ্জ
করতে লাগলাে। এ তত তার উদ্দেশ্য ছিলাে না-সিগারে
ধরিয়ে হাসিমুখে
বল্ল, ‘রামাে, রামমা, কী সব বাজে কথা
এতক্ষণ কাটলো—কী, নামছে না যে-ও, গয়নার দোকানে
নিয়ে যাইনি বলে বুঝি অভিমান হয়েছে! না, না, এসে
লক্ষ্মীটি। শাড়ি কেনা কি পুরুষের কর্ম !
সবিতার ইচ্ছে করলাে না বাদানুবাদ করতে। নিঃশবে
নেমে এলাে গাড়ি থেকে।
সবিতার ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় পছন্দে-অপছন্দে মিলিয়ে
এত শাড়ি প্রতাপ কিনলাে যে তার উদ্দামতায় দোকানির
পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে গেলাে।—গাড়িতে চড়ে প্রতাপ প্রফুল্ল
নাৰী এ
মুখে বল্ল, তুমি নিশ্চয়ই ভাবলে যে টাকার দম্ভ দেখাচ্ছি।
কিন্তু সত্যিই তা নয়। এই নিয়ে আরাে অনেকবার আমার
শাড়ি গয়না কেনবার দরকার হয়েছে কিন্তু নিজের স্ত্রীর জন্য
তো কখনাে কিনিনি--এই কেনাতে যে এত আনন্দ লুকিয়ে
ছিলাে তা কি আমি জানতুম!
সবিতা কথা বল্ল না। প্রতাপ আবার বল্প, স্পষ্ট বুঝতে
পারছি তােমার ভালাে লাগছে না এ-সব, তুমি মনের সঙ্গে
মিলিয়ে নিতে পারছে না, কিন্তু কী করতে পারি তাও তত
ভেবে পাই না—নিজের সুখ যাতে হয়, তা আমি এ-জীবনে
ছাড়িনি—অন্যের সুখ-দুঃখ ক্ষয়-ক্ষতি কিছুই আমাকে বিচলিত
করে না—কী করবে বলে, এই আমার স্বভাব, আমি
মানুষটাই এমন স্বার্থপর। একটু থেমে, তবে আজকে ঠিক
এই মুহূর্তে আমার মনের এমন একটা অবস্থা হয়েছে যাতে
মনে হচ্ছে কারাে জন্য কিছু করতে পারলে যেন ধন্য হয়ে
যাই—যদি তুমি ইচ্ছে করে তাহলে এক্ষুনি এই মুহূর্তে
আমি তােমাকে মুক্তি দিতে পারি--আমার মনে হচ্ছে
এ-বিবাহ একান্তই তােমার মায়ের ইচ্ছায়।
‘প্রতাপ, একটা কথা শােনাে, অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে
মােটরের পিঠে হেলান দিয়ে বসে ততােধিক শান্তভাবে
সবিতা বল্ল আমাকে তােমার অতীত জীবন শুনিয়ে লাভ
আছে? এ-কথা আর না-তােলাই ভাল। গুনে দ্যাখাে, মাত্রই
আর চার দিন আছে মাঝখানে—এখন আর কোনাে হাঙ্গামা
বাধিয়াে না-দয়া করে আমাকে স্থান দাও তােমার ঘরে,
এর বেশি কোনাে আকাঙ্ক্ষা কোনাে ইচ্ছা আর আমার
নেই। এর উত্তরে প্রতাপ কিছু বলবার আগেই ড্রাইভার মুখ
ফেরালাে-সাব, চা পিনেকো যায়েগা ?
যাবে ?
“তােমার ইচ্ছা হলে চলাে’-সবিতা বললাে।
থাকগে—নেই—তােম যাও আলিপুর।
অনাদিবাৰু আলিপুরে থাকেন। হেমলতা দোতলার
বারান্দায়ই দাড়িয়ে ছিলেন—তাদের আসতে দেখেই বুকে
বললেন, ‘তােমরা এরই মধ্যে চলে এলে?
প্রতাপ নেমে হাত ধরে নামালে সবিতাকে, তারপর
হাসিমুখে উপরের দিকে তাকিয়ে বল্ল, হঁা, শিগগিরই হয়ে
গেলাে’-বলতে-বলতে সে আবার উঠে বসলাে গাড়িতে।
‘এ কী, তুমি নাববে না? সবিতা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা
করলো।
, ভালাে লাগছে না।”
মা থ বীর এই
‘সে কী কথা!’--সবিতার মুখে উদ্বেগের ছায়া পড়লাে।
হেমল দেবী উপর থেকে ওদের কথা শুনতে পাচ্ছিলেন
না, কিন্তু বুঝলেন প্রতাপ চলে যেতে চাইছে। ডাকলেন,
‘সবি’,উপরের দিকে চোখ তুলতেই তিনি প্রতাপকে ধরে
রাখার ইঙ্গিত জানালেন। কলের মতাে সবিতা বলতে
লাগলাে, না, না, সে হয় না, তােমাকে নামতেই হবে—চা
খাবে না? অত্যন্ত অনুনয়ের ভঙ্গিতে প্রতাপ বল্ল, “তুমি
একটুও রাগ কোরাে না আমার উপর-সত্যিই কেন জানি
আমার কিছু ভালাে লাগছে না। আমি যাই।’--ড্রাইভার
গাড়িতে স্টার্ট দিলো, মুহুতে গাড়ি অদৃশ্য হয়ে গেলাে
সবিতার চোখের উপর।
এবার নেমে এলেন হেমলতা দেবী। অত্যন্ত ব্যস্তভাবে
তিনি বল্লেন ‘সে কী রে! প্রতাপ চলে গেলাে কেন? কিছু
বলিসনি তাে? চারদিক তাকিয়ে—“কই, কিছু যে দেখছিনে?
কেনা-কাটা হয়নি?
‘হয়েছে।
‘কোথায় সে-সব ?”
একটু উদ্ধতভাবে সবিতা বলে উঠলাে, “কী জানি, আমি
জানিনে...বলেই থতমত খেয়ে গেলাে-মায়ের সঙ্গে
১৪
ও-ভাবে কথা বলা তার অভ্যেস নয়। • ভয়ে সে চুপ করে
গেলাে।
‘জানিনে মানে ? হেমলতা ভ্রুকুটি করলেন।
ভীতভাবে সবিতা বল্ল, ‘ভুলে গেছে বােধ হয় রেখে
যেতে—মা, কী বলবাে’–সহসা সবিতা মায়ের মন জয়
করবার পথটা যেন খুঁজে পেলো—হাসিমুখে বল্ল, ‘এত কাপড়
আর এত গয়না ও কিনে এনেছে আমার জন্যে যে তা দিয়ে
বেশ বড় রকমের দুটো দোকান খােলা যায়।'
চকিতে হেমলতার মুখের ভাব বদলে গেলাে, কিন্তু ঠাট
বজায় রেখে বল্লেন, “আচ্ছা আচ্ছা, সে হবে’খন, উপরে চল।
পরের দিন সকালবেলা হেমলতা দেবী প্রতাপের আশায়
ছটফট করে কাটাতে লাগলেন। জিনিসপত্রগুলাে না-দেখা
পর্যন্ত যেন তার মন আর শান্ত হতে পারছিলো না। সমস্ত
প্রতীক্ষা ব্যর্থ করে সারাটি সকাল কাটলাে, প্রতাপ এলাে
। ব্যগ্র হ'য়ে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হারে, কালও
এলাে না-রাগ টাগ করেনিতাে ?
'না, রাগ করবে কেন, বিকেলে নিশ্চয়ই আসবে।
অনাদিবাবু চা খাচ্ছিলেন, ( সময়-অসময়ে চা খাওয়া তার
=
মাধবীর এই
দিকে।
অভ্যেস) বল্লেন, নাই বা এলাে একবেলা, অত অস্থির হবার
কী হয়েছে?
‘চুপ করাে তত তুমি’-হেমলতা অস্বাভাবিক জোরে
ধমকে উঠলেন—মনের বেগটা বেরুবার যেন একটা গতি
পেলে,—শরীরের ডাক্তারি করেই তাে চুল পাকিয়েছে,
মনস্তত্ত্ব জানাে কিছু?
খুব মৃদু গলায় অনাদিবাবু বল্লেন, আমার তাে জানি
বলেই ধারণা—আড়চোখে তিনি তাকালেন
‘যদি জানতে হবে নাকে চশমা এটে অহোরাত্রি কেবল
বই ঘেটেই দিন কাটাতে পারতে না। আমি হায়রান হয়ে
গেলাম মেয়েটার বিয়ে নিয়ে, আর তুমি কী করেছে?
‘আমি যে কিছু করিনি সেটাই তো আমার মনস্তত্ত্বজ্ঞানের
পরিচয়।
যাও, যাও'— হেমলতা বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন।
প্রতাপ কিন্তু বিকেলেও এলাে না—পরের দিন সকালেও
—বিকেলের দিকে হেমলতা ফোন করলেন। প্রতাপকে
পাওয়া গেলাে না। সবিতার মনেও যথেষ্ট উদ্বেগের ছায়া।
পড়েছিলাে। তার চোখে-মুখেই সে-কথা ছড়ানাে। পরশু
তাদের রেজিস্টেসন অথচ প্রতাপের হলাে কী! পরের দিন
রবিবার। বন্ধু-বান্ধবের আনাগােনা, শুভেচ্ছাজ্ঞাপনের পালা
সমস্তই আরম্ভ হয়ে গেলাে কিন্তু প্রতাপ এলাে না। বিয়ে
হচ্ছিলাে খুব ঘটা করেই। একমাত্র মেয়ে হেমলতার—বিয়ে
হচ্ছে রাজপুত্রের সঙ্গে-এ-কথা আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব
চেনা-অচেনা কাউকে বলতেই হেমলতা বাদ দেননি।
বাড়িঘর ভরে উঠলো কলরবে। অবশেষে অনাদিবাবুও
একটু বিচলিত হলেন প্রতাপের অনুপস্থিতিতে। তার জীবনে
জ্ঞানত এম রবিবার কখনাে যায়নি যেদিন তিনি উপাসনা
ভুলে অন্য কাজে মন দিয়েছেন—কিন্তু সেদিন তার ব্যাঘাত
হলো। তিনি মন্দিরে না-গিয়ে গেলেন খিদিরপুর প্রতাপের
বাড়ি। বিরাট বাড়ি—কোথা দিয়ে যে কোনখানে ঢুকবেন
যেন দিশে পেলেন না। কন্যা আর স্ত্রীর কাছেই এ-বাড়ি ।
পরিচিত, তাঁর অভিযান এই প্রথম। কিন্তু কোথায়
প্রতাপ ? আমলা গােমস্তা, দাসদাসী, দরােয়ান সেপাই,
কুকুর-কাকাতুয়াবাড়িটি যেন একটি প্রকাণ্ড চিড়িয়াখানা
-নানা জনে নানা কথা বলে তাকে বিদায় দিলাে, কিন্তু
কোথায় গেলে প্রতাপকে পাওয়া যায় সেটাই জানা গেলাে
হতাশ হয়ে তিনি বাড়ি ফিরে এলেন।
এদিকে গর্জাতে লাগলেন হেমলতা, ‘দেবব ওকে—নিশ্চয়ই
৯।
মা ধৰী। জ
জেলে দেবােস্কাউণ্ডেল—হতভাগা'—মেয়ের উপরও তাঁর
কম রাগ হলাে না। অপদার্থ মেয়েটাই নষ্টের গােড়া, তার
অনুপস্থিতিতে কী বলেছে কী করেছে কে জানে। বাপেরই
তাে মেয়ে। গল্প করতে-করতে তিনি এলেন মেয়ের
ঘরে। সবিতা চুপ করে বসেছিলাে জানলার পাশে, উদ্বেগে
উৎকণ্ঠায় লজ্জায় ঘৃণায় ইচ্ছে করছিলাে তার মরে যেতে
ভয়ে সে তাকাতে পারলাে না মায়ের চোখের দিকে। মাথা
নিচু করে নিঃশব্দে বসে রইল।
‘সবি—সত্যি কথা বল তুই, সেদিন কী বলেছি
প্রতাপকে।'—সেই যে প্রতাপ ওকে নামিয়ে জিনিসপত্র না-
রেখে চলে গেলে সেই থেকে হেমলতার মনে কন্যার
নির্বদ্ধিতা সম্বন্ধে এক বিষম সন্দেহ আলােড়িত হচ্ছিলো।
তিনি তার শ্যেনদৃষ্টিতে এটা খুব লক্ষ্য করতেন যে প্রতাপের
যে-কোনাে তুচ্ছতম প্রণয়ভঙ্গিতেও সবিতার মুখে অপরিসীম
বিরক্তি ফুটে উঠতাে।
মায়ের জেরায় সবিতা বিব্রত হয়ে উঠলাে। ক্ষীণ গলায়
বললে, ‘কিছুই তাে বলিনি, মা।
‘নিশ্চয়ই বলেছো-মা’র স্বর চড়ে উঠলােতােমাকে
আমি চিনি না—সবটাতে তােমার মান যায়—সব জায়গায়
তােমার সুনীতি। পুরুষমানুষকে বিয়ে করতে হলে একটু
প্রশ্রয় দিতেই হয়-
সবিতার কান পুড়ে গেলো। মা আর কী বলবেন এর পর?
মা, চুপ করাে, চুপ করাে'-সবিতা দুই হাতে মুখ ঢেকে
ফেললাে।
।
রাত্রিতে অনাদিবাবু চিন্তিতমুখে পায়চারি করছিলেন
আর বসে-বসে ভাবছিলেন কী করা উচিত
কিমােনাে গায়ে জড়িয়ে সবিতা ঘরে এলো। অনেকক্ষণ
আগেই ও শুতে গিয়েছিলাে—ওকে দেখে অনাদিবাবু
পায়চারি থামিয়ে বল্লেন, ‘তুই ঘুমােসনি, মা ?
‘না, বাবা।
‘যা, যা, রাত করিসনে।'—অনাদিবাবু আবার হাঁটতে
লাগলেন।
সবিতা মায়ের দিকে তাকালো, বল্ল, “মা, আমার জন্য
তােমাদের যত কষ্ট।
হেমলতা জবাব দিলেন না।
অনাদিবাবু আবার বল্লেন, যা মা, রাত করিসনে—আমি
এক্ষুনি আলাে নিবিয়ে শুয়ে পড়বে। তিনি টেবিলের ধারে
মাধবীর জন্য এগিয়ে এলেন। খুঁজতে লাগলেন চশমার খাপটা। কাগজ- পত্রে স্তুপ করা টেবিল—নিজের অগােছালাে স্বভাবের জন্য বিরক্ত হলেন—দুই হাতে আবােলতাবােল কাগজ সরাতে- সরাতে হঠাৎ একখানা খামে ভরা চিঠির উপরকার হাতের লেখা দেখে তার চোখ নিবদ্ধ হলো। চিঠিখানা বিকেলের ডাকে এসেছে, চাকররা রেখে গিয়েছিলাে অভ্যাসমতো চাপা দিয়ে, কিন্তু চোখে পড়েনি অনাদিবাবুর-কিম্বা কোনাে কাগজ খুঁজতে গিয়ে কার তলায় এটাকে তিনি ফেলেছিলেন তার ঠিক নেই। ফস্ করে খুলে ফেললেন চিঠির মুখ ‘শ্রীচরণেষু, বিশেষ কোনাে কারণে আমি এ দু’দিন কলকাতার বাইরে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম, আজ এইমাত্র এলাম। নাওয়া-খাওয়ার সময়ও আমার ছিলাে না তাই খবর দিতে পারিনি। আসবার আগে আমি ড্রাইভারকে বলে এসেছিলাম আপনার কন্যার জন্য যে-সব সামান্য জিনিসপত্র কেনবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলাে তা পৌছে দিতে। ড্রাইভার আমার পাঁচ বছরের বিশ্বস্ত লােক কিন্তু এসে জানলাম জিনিসপত্র নিয়ে সে ফেরার হয়েছে। হাজার পাঁচেক টাকার গহনা আর শ পাঁচেক টাকার শাড়ি সেখানে ছিল। যা-ই হােক, যা গেছে তা গেছেই, ভবিষ্যতে আপনাদের দয়ার যে-মূল্য আমি পাবাে বলে আশা করছি তার আনন্দের কাছে এ-জিনিস
।
কেন--আমার সমস্ত জীবনও অতি তুচ্ছ। তবে আমার মতাে
দুর্ভাগার অদৃষ্টে বিধাতার এত আশীর্বাদ হয়তাে নেই।
আজকে আমি যে-সত্যের মুখখামুখি এসে দাড়িয়েছি—তার
মধ্যে কোনাে ছলনা কোনাে আড়াল রেখে আমি আর শান্তি
পাচ্ছিনে। পাপ-পুণ্য জানিনে, তবে আজ মনে হচ্ছে এ-কথা
স্বীকার না-করলে অন্যায় হবে যে আপনারা আমাকে যা
ভেবে কন্যার যােগ্য বিবেচনা করেছেন আমি তা নই। এমনকি
আমার বাড়িটি পর্যন্ত এখন দেনার দায়ে বাঁধা। মায়ের
অজস্র গহনা বিক্রি করে-করে এতদিন তবু চলছিল কিন্তু তার
শেষ গহনাটির বিনিময়েই সেদিন আমি সবিতার জন্য কিছু
কিনেছিলাম। এ-গহনাটি আমার মায়ের একান্ত সাধের
ছিলাে, এটি তিনি তার পুত্রবধূর জন্যই সযত্নে তুলে রেখেছিলেন
--আমি তার সেই অন্তিম ইচ্ছাই পূরণ করতে চেয়েছিলাম।
বাকি আরাে পাঁচহাজার টাকা ছিল তা থেকে, সে-টাকা আমি
সবিতাকে দিলুম-যদি আমাকে আপনারা ত্যাগ করেন তবুও
এ-সামান্য টাকাটা গ্রহণ করে আমাকে চিরবাধিত করবেন।
আপনি মহৎ, আপনি আমাকে দয়া করুন-ক্ষমা করুন,
আপনার দয়ার উপরই নির্ভর করছে আমার সমস্ত জীবন।
হতভাগ্য প্রতাপ
চিঠি পাঠ শেষ করে অনাদিবাবু উদাসভঙ্গিতে ব'সে
পড়লেন চেয়ারের উপর হেমলতা এতক্ষণ ভদ্রতা করে ধৈর্য
ধরে ছিলেন (ভদ্র হবার তার যথেষ্ট প্রচেষ্টা ছিলাে) এবার খপ,
করে টেনে নিলেন চিঠিটা। তারপর পড়তে-পড়তে তিনি
অসম্ভব উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ছুড়ে দিলেন সবিতার
দিকে, তারপর আশাভঙ্গের দুঃখে ফুলে-ফুলে
উঠতে লাগলেন
রাগে আর কান্নায়। বলতে লাগলেন, স্কাউণ্ডেল, নােগ,
দেখে নেবাে, দেখে নেবাে আমি একবার’—তার গলা কেঁপে-
কেঁপে ক্রমশই চড়তে লাগলাে আর সবিতা চিঠিখানা নিয়ে
আস্তে উঠে এলো নিজের ঘরে। সমস্তটা প'ড়ে চুপ করে
দাঁড়িয়ে রইলো খানিকক্ষণ। অনির্দেশ্য একটা করুণায় ভরে
গেলাে তার সমস্ত হৃদয়।
মনে পড়লে প্রতাপের মুখ। সে-মুখ চোখে দেখে তার
অত সুন্দর মনে হয়নি কখনাে, কিন্তু মনের মধ্যে যা অঙ্কিত
আছে তার তাে তুলনা নেই।
সবিতা জানে এ-বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলাে
প্রতাপের জন্য। আবার কেউ আসবে ।
চলবে অভিনয় ; আবার নতুন করে বালির বাঁধ, ভাবতেই
অস্থির হয়ে উঠলে ওর শরীর-মন। চাই মুক্তি, মুক্তি চাই।
ঐ অপরিসর চারটা দেয়ালে ঘেরা ঘরের মধ্যে যেন তার দম
বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। একান্ত অশান্ত পায়ে পায়চারি
করতে-করতে হঠাৎ একসময়ে নিঃশব্দ পায়ে দরজা খুলে নেমে
এলাে রাস্তায়।
;
দৈবাৎ
No text on this page.
গ্রামের মধ্যে কুন্টি স্বনামধন্য । তাকে না চেনে এমন
কে আছে ? তেরাে বছরের বাড়ন্ত মেয়ে, আঁটোসাঁটো
গড়ন, সরল সুন্দর চোখ। কোমরে কাপড় জড়িয়ে কেঁকড়া
কালাে বাড়ি চুল মেলে দিয়ে দিব্যি মনের আনন্দে সে
ঘুরে বেড়ায় পাড়ায় পাড়ায়। ঘুড়ির দিনে ঘুড়ি ওড়ায়,
সারাদিন লাট্ট, ঘােরায়, মারবেল খেলে, কড়ি দিয়ে জুয়াে
জেতে-- আমগাছে আম, পেয়ারা গাছে পেয়ারা, কুলগাছে
চড়ে কুল—এমন কোনাে দুরূহ কম নেই যা সে করে না।
মা বাবা মারা গেছেন এইটুকু রেখে। নিঃসন্তান কাকা-
কাকিমার নয়নের মণি। তাদেরই গভীর স্নেহচ্ছায়ায় তার
এই সরল সদানন্দতা দিনের পর দিন অবাধ প্রশ্রয়ে বেড়ে
উঠেছিলাে। ঝুষ্টির কাকা রথীবাবু মেয়ের এই দস্যিপনা
এমন সন্ধেহ হাসির সঙ্গে উপভােগ করতেন যে সেই সময়
তার মুখখানা দেখলে মনে হতাে এর চেয়ে সুখ আর কোথাও
তার নেই। কিন্তু গ্রামে এ নিয়ে ভয়ানক আলােচনা
হতে লাগলাে। প্রথমে রেখে-ঢেকেই চলছিলাে কিন্তু ক্রমে
তা প্রকাশ্য শত্রুতায় দাড়ালাে। একবার উষা এ নিয়ে
তার স্বামীর মনােযােগ আকর্ষণ করবার একটা ব্যর্থ চেষ্টা
ক’য়ে মেয়ের শাসনভার নিজের হাতেই গ্রহণ করলে।
কাকির এই নিষ্ঠুরতায় ঝুটি প্রথমটা অবাক হলাে বটে, কিন্তু
ফল হলাে না কিছুই।
গ্রামের জমিদার হরিশবাবু, তঁারই ম্যানেজার ঝুল্টির কাকা।
উষা এ নিয়ে জমিদারের কাছে নালিশ জানাতে বললাে
স্বামীকে। তঁাদের একটা হুঙ্কারেই হয়তাে গ্রামবাসীর
মস্তিষ্ক কিঞ্চিৎ ঠাণ্ডা হবে। রথী চটে উঠলাে—বলছ
কী তুমি—কী নিয়ে নালিশ জানাবাে : আমি ? একটা
পারিবারিক ব্যক্তিগত ঘটনা, তা নিয়ে আর হরিশবাবুর
মাথা-ব্যথার অন্ত নেই, না? আর হরিশবাবু নিজেও এর
চেয়ে কিছু কম যান কিনা।
এর মধ্যেই একটা কাণ্ড ঘটে গেল। কাছারিতে যাবার
মুখে রথীর একদিন দেখা হয়ে গেলাে গ্রামের পাণ্ডা হরিহর
ভটচার্যের সঙ্গে। হাসিমুখে সম্ভাষণ জানিয়ে এগিয়ে গিয়েই
রথী থমকে গেলাে। ভটচাষ গম্ভীর মুখ করে বলে উঠলেন,
‘ছুয়াে না বাবাজি, জাত-জন্ম তাে এখনাে কিছু আছে।
রথীকে অবাক হতে দেখে ভটচায় বললেন, এটা কি
তােমাদের উচিত হচ্ছে, রথী! অত বড় মেয়ে যে ছেলে
১৬
देवा
ছছাকরাদের সঙ্গে অমন দামালি করে বেড়ায় এতে
' তােমাদের একটুও লজ্জা করে না? সমাজকে কি তােমাদের
একটুও ভয় নেই? আমি কাল নিজ চক্ষে দেখেছি ঐ নতুন
লেখাপড়া-শেখা অযযাধ্যা দাসের বড় ছেলেটার সঙ্গে সে
আম-মাখা খাচ্ছে।”
‘তাতে কী হয়েছে?
‘কী হয়েছে! অবাক করলে, রথী ! ও মেয়ের কি
জাতজন্ম আর বাকি আছে নাকি? তা বাপু ও-সব বিবিয়ানা
তােমরা সমাজের বাইরে বসেই চালিয়াে। অযােধ্যা দাস
আজই না-হয় চাকরি করে, দু’ অক্ষর লিখতে শিখে
ভদ্দর হয়েছে—চিরদিন তাে মাছ ধরেই কাটলো। তার
সঙ্গে এখনাে আমরা প্রকাশ্যে ব'সে খাইনে।
রথী একটু চুপ করে থেকে বললে, “তা হলে আপনি
কী করতে বলেন ?
‘আমি আর বলব কী বাপু-ঐ সতী-সাবিত্রী মেয়ের
একটা গতি করাে—আমার মেয়ে হলে তােত আমি তার
গলায় কলসি বেঁধে ডুবিয়ে দিতাম।
তা আমি জানি’রথী চড়া সুরে বললে--‘ডুবিয়ে কি
কাউকে আপনি দেননি মাকি? ঐ একফেঁটা মেয়েকে
মাধবীর জন্য
পনি যদি স্বেচ্ছায় সত্তর বছরের বুড়াের হাতে দিতে পারেন
টাকার লােভে, তবে তাে আপনি সবই পারেন। ঘৃণাভরে
রথী পা বাড়ালাে যাবার জন্যে।
হরিহর ভটচাষ এবার হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘বড়ই দেখছি
আশধ হয়েছে তােমার, রথী! কাকে কী বলছ ঠাহর নেই !
এ-গ্রাম থেকে তােমাকে যদি উচ্ছেদ না করি তো আমার
নাম হরিহর ভটচাষ নয়, আমার বাপের নাম নরহরি ভটচাষ
নয়, আমার ঠাকুর্দার নাম হরচন্দ্র ভটচায—
রথী আর না-শুনে হন্ করে চলে গেলাে কাছারিতে।
মনটা বড়ই খারাপ হয়ে গেলো।
বিকেলবেলা ফিরে এসেই রথী উষার সঙ্গে পরামর্শ করে
কুন্টিকে দিনকয়েকের জন্য তার মামাবাড়ি ঢাকা রেখে আসা
স্থির করলাে। রথীর মতাে সাদাসিধে মানুষ যে হরিহরের
মতো ধূত মানুষের সঙ্গে কিছুতেই এটে উঠতে পারবে না,
এটা উষা ঠিক জানতাে। বছর দুয়েক আগে একটা ঘটনা
ঘটেছিলাে রায়ের বাড়ি। রায়েদের সঙ্গে প্রায় পুরুষানুক্রমে
ভটচাদের শত্রুতা, কিন্তু তার রূপ যে এত বীভৎস, এত
হৃদয়বিদারক হতে পারে এটা কেউ কল্পনা করতে পারেনি।
সেটা যে এই হরিহরের দ্বারাই সাধিত-এ-কথা গ্রামের সবাই
দৈ বা ও জানে। রায়েদের বড় ছেলে বরদা রায়ের একমাত্র মেয়েকে তিনদিন পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে পুবপাড়ার ধানখেতে যে-অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তা স্মরণ করে উষার হৃৎকম্প হতে লাগলাে। কাজে-কাজেই দুই চক্ষের জলে ভেসে পরের দিন সকাল- বেলা ছ'টার লঞ্চে যাবার জন্য মেয়েকে সে প্রস্তুত করে দিলো। কিন্তু লঞ্চঘাটে যেতেই ঝুষ্টি অবাক হয়ে বললে, ‘কাকা, এখানে কেন এলে ? ‘ঢাকা যাবে যে তােকে নিয়ে। ‘ঢাকা ? কেন ? 'তাের মামাবাড়ি। সেখানে তােক রেখে আসবাে-- লেখাপড়া করবি, ভদ্রলােক হবি। ‘না, আমি যাবো না'—সজোরে কুন্টি হাত ছাড়িয়ে ঘুরে পঁড়ালো। “সে কী রে ? রথী স্নেহভরে তাকে কাছে টেনে এনে বললে–বেড়াতে যেতে তাে তুই ভালােই বাসি—কী সুন্দর শহর--কত দোকান, কত খেলা- ‘হােগে, আমি যাবাে না-ঝুন্টি প্রবলভাবে আপত্তি জানিয়ে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে পড়লাে। ১৯
মাধবী। এ
থী বেগতিক দেখে বললে, ও মা, বায়ােস্কোপ
দেখবিনে? সেইজন্যেই তাে তােকে নিয়ে যাচ্ছি—এখানে
আর কেউ দ্যাখেনি—
ঝুন্টির শক্ত পা একটু নরম হলােনড়ে-চড়ে বললে,
তবে কাকিমাকে আনলে না কেন?
“ওঃ, কাকি! কাকিকে নেবে কেন ? সেবার যে যাত্রা
হয়েছিলাে তােকে নিয়েছিলো? ঘুম পাড়িয়ে রেখে কী
রকম লুকিয়ে দেখে এলাে।
হু’, ঝুটির পা চললল এবার—ঠিক বলেছাে, কাকামণি,
খুব জব্দ হবে এবার। ওর টানা চোখ খুশিতে ভরে গেলাে।
বিনা ঝঙ্কাটে এবার বুল্টি লঞ্চে উঠলাে। শ্ৰপুর থেকে ঢাকা
মােটে তিন ঘণ্টার রাস্তা—দেখতে-দেখতে এসে গেলাে তারা।
নদীর কাছাকাছিই ওর মামাবাড়ি। মামা পােস্টমাস্টার।
তার দুই মেয়ে সন্ধ্যা আর আরতি ঝুন্টিকে দেখে ভারি
খুশি। বুন্টি তার কাকার শার্টের কোণ আঁকড়ে বিমর্ষমুখে
দাড়িয়ে রইলাে শক্ত হয়ে। মামিমা আদর করলেন, মামা
টানলেন, কিন্তু তার মুঠি আলগা হ'লাে না।
রাত বারােটায় একটা গহনার নৌকো ছাড়ে, ঝুষ্টি ঘুমুলে
রথী সেই নৌকোতে ফিরে এলাে দেশে।
১১.
পরের দিন সকালে উঠে বুন্টি কাকাকে দেখতে না-পেয়ে বডােই ব্যাকুল হয়ে উঠলাে, অবশেষে কাকার এই বিশ্বাস- ঘাতকতায় কাতর হয়ে কাঁদতে লাগলাে। কিন্তু একদিন গেলে, দুদিন গেলাে, এই করে-করে অনেকদিন পরেও যখন কাকা আর এলেন না তখন সে একেবারে শান্ত হয়ে গেলাে। সেই গণ্ডি-ঘেরা ছােট্ট বাড়ি—হুকুম নেই বাইরে আসবার। রাস্তায় ঢাকাই মুসলমান ছেলেমেয়েরা খেলা করে গান গেয়ে চলে যায়—‘বাে কাট্টা' ঘুড়ি ওড়ায় আর আনন্দধ্বনি করে, জানালায় বসে তা দেখে-দেখে ঝুষ্টির শিক ভেঙে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করে। সূর্যালোেক যেন নিবে গেছে তার জীবন থেকে। বিকেলবেলা মামাতাে বােনেরা নিজেরা সাজে, মুখে পাউডর দেয়, চোখে কাজল মাখে, কপালে দেয় কুম- কুমের ফোটা—ঘুরিয়ে সুন্দর রঙের শাড়ি পরে, তারপর জুতাে পায়ে দিয়ে তাকে নিয়ে বেড়াতে যায় নদীর ধারে। যেখান থেকে সব গহনার নৌকো ছাড়ে, লঞ্চ ছাড়ে, সে-সব দেখায়—দেখিয়ে-দেখিয়ে বলে, ‘ঝুন্টি, যাবে নাকি? ঐ দ্যাখাে শ্রীপুরের গহনা-ঐ দ্যাখাে লঞ্চটা ছাড়ছে। ঝুটি শব্দ করে —মন কেমন করে ওঠে—গলা বন্ধ হয়ে আসে। একদিন দুপুরবেলা মেয়েরা ইস্কুলে গেছে, মামা আপিশে, |
মাধবী র জ ষ্ট
মামিমা ঘুমুচ্ছেন নাক ডাকিয়ে। এ-জানালা ও-জানালা
করে করে হঠাৎ বুন্টির কী দুবুদ্ধি হলো, নিঃশব্দে এক সময়
দরজা খুলে বেরিয়ে এলো রাস্তায়—এদিক-ওদিক তাকিয়ে
তারপর সােজা একেবারে গহনাঘাটে।
একখানা গহনা ঘাটে বাঁধা ছিল—গা ঢাকা দিয়ে আস্তে-
আস্তে সে উঠে এলাে নৌকোতে। মাঝিরা সব খেতে গেছে
পাড়ে। পেছনের গলুইতে কর্ণধার হ'য়ে বছর দশেকের এক
ছােকরা বসেছিলাে, সে দেখতে পেয়ে বলে উঠলাে‘এই,
তুমি কেন নৌকোয় চড়ছে ?
‘আমি যাব।
‘ঈস, গেলেই হ’লল! পয়সা আছে ?
‘বাড়ি গিয়ে দেবাে।
‘দিয়াে কিন্তু’—খুব চালের মাথায় ছােকরা একবার জলের
মধ্যে পা ডুবিয়ে গম্ভীর মুখে গান ধরলাে, নইদের চাদ কুন্তীর
হইয়েছে।'—আর ঝুষ্টি সেই সুযোেগে মাঝিদের টাল করা
বিছানা বোঁচকা ঠেলে তার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে রইলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলাে মাঝিরা-আস্তে লােকজনে
ভরে উঠলাে নৌকো-ভিড় বেশি হলাে না—যদি বা কেউ
আসে এই ভরসায় নৌকো খানিক পঁড়িয়ে রইলাে, তারপর
देवास
নৌকো যখন প্রায় ছাড়ে তখন একুশ-বাইশ বছরের
চশমা-পরা সুন্দর একটি ছেলে লাফ দিয়ে উঠে এলাে নৌকোয়
এবং ছইয়ের তলায় নাব'সে একেবারে পিছনের দিকে যেখানে
মাঝিদের বোঁচকা পুটুলি রাখা আছে সেখানে পিঠ করে
বসলাে—বুল্টির একেবারে ঠিক নাকের সামনে। এতক্ষণ
ঝুন্টির লুকিয়ে এ-সব দেখতে ভারি মজা লাগছিলাে। মনটা
যেন ছাড়া পেয়েছে এতদিন পরে, কিন্তু বাক্স-বিছানার একটু
আধটু ছিদ্রপথে যে-আলােটুকু হাওয়াটুকু তার জুটছিলাে ঐ
ছেলেটির পিঠের অন্তরালে তা থেকে বঞ্চিত হয়ে ঝুটি ভয়ানক
অসন্তুষ্ট হলাে। প্রতি মুহূর্তে পালা পাঞ্জাবি ভেদ করে প্রচণ্ড
এক চিমটি কাটার ইচ্ছা হতে লাগলাে তার। তার উপর
নৌকো ছাড়তেই ছেলেটা একটা সিগারেট ধরিয়ে আরাম
ক'রে টানতে লাগলাে আর যত ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে
ঢুকতে লাগলাে ঝুন্টির নাকে। কুন্টি অনেকক্ষণ এই অন্যায়
সহ করলাে তারপর মরীয়া হয়ে সে মুখ বাড়ালাে বাক্স
বিছানা ঠেলে। গরমে সেদ্ধ হয়েছে এতক্ষণ—টুকটুক করছে
গাল-বিন্দু-বিন্দু ঘামে ভরা কপাল। হঠাৎ ছেলেটি চমকে
মুখ ফিরিয়ে অবাক হয়ে গেলাে। চোখ লাল করে বুটি
বললে, 'এই, সিগারেট খাচ্ছাে কেন ?
মা বা র জ খ ছেলেটি ভয়ানক কৌতুক বােধ করলাে। বললে, তাতে তােমার কী? ‘আমার বমি আসছে, এক্ষুনি ফেললা সিগারেট। একান্ত বাধ্য ছাত্রের মতাে সে হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেট, জলে ফেলে বললে, “এই দ্যাখাে আমি কেমন তােমার কথা শুনলাম, তুমিও এখন নিশ্চয়ই আমার কথা শুনবে। বুন্টি জবাব না-দিয়ে আবার মাথা ডােবালাে কাথার পিছনে। ‘এ কী ? “বাঃ, মেয়েদের আবার গহনায় চড়তে আছে নাকি ? “তবে চড়েছে কেন? তাই জন্যেই তাে লুকিয়ে আছি। ‘লুকিয়ে তােত তুমি শেষ পর্যন্ত থাকবে না—এক জায়গায় তাে নামবেই ? ‘তাও তো বটে’--কুন্টি এবার ভাবলে কথাটা। চিন্তিত। ভাবে বললে, “তাহলে কী করি বলাে তো? ‘আমি তাে বলি তুমি বেরিয়ে এসে এইখানে আমার পাশে বােসাে---সুন্দর হাওয়া আর কেমন পড়ন্ত রােদ- বুন্টি মুহূর্তে বোঁচকা পুটুলি ঠেলে সবেগে বেরিয়ে ১১।
देवदार
এলাে বাইরে।
সঙ্গে-সঙ্গে মাঝি-মাল্লা যাত্রীরা সবাই
স্তম্ভিত হয়ে একযােগে তাকাল ওর দিকে। হেড মাঝি
একটু ভালােমানুষ গােছের, জিজ্ঞেস করলাে ‘তুমি কে
গাে দিদি ?
‘আমি ঝুন্টি' —সহজ সরল গলায় ঝুন্টি বললো।
‘তুমি একা এসেছে। নাকি ? কোথা থেকে এসেছ?
নামবে কোথায় ?
‘নামবাে শ্রীপুরে, কিন্তু কোথা থেকে এলাম তা আমি
বলবাে না।
মাঝি হাসলাে। লুকিয়ে এসেছে বুঝি ?-যাত্রীদের
মধ্যে একজন রসিকতা করে উঠলাে ‘বাঃ, বেড়ে মেয়ে তাে।
হঠাৎ ছেলেটি চীৎকার করে উঠলাে, ‘চোপরাও রাসূকেল।
আর একটি কথা বলবে তাে মুণ্ডু ছিড়ে ফেলবে।
জনতার মধ্য থেকে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা ঘাড় লিকলিকে
এক ছােকরা রুখে উঠলাে‘তুমি কে হে—এটি কি একা
তােমার সম্পত্তি ?
ফের, বদমাস্!'—এবার ছেলেটি আস্তিন গুটিয়ে উঠে
দাড়ালাে আর সঙ্গে-সঙ্গে কে একজন বৃদ্ধ ফিসফিসিয়ে বলে
উঠলাে, “ওরে, করছিস কী তােরা—ও যে আমাদের বড়াে-
১১
शायो बस ৬ বাবুর ছেলে অরুণ। ‘সর্বনাশ’—লিকলিকে ঘাড়ওয়ালা জিভ কেটে বসে পড়লাে তক্ষুনি। মাঝি-মাল্লারাও একবার সচকিত হলাে। মূহুতে মন্ত্রাবিষ্টের মত শান্ত হয়ে গেলো সকলের স্বর হরিশবাবুব কোপে পড়ার চেয়ে যে-কোনােরকম দুঃখই তারা বরণ করতে পারে। আর এই গহনার নৌকো যে শ্রীপুরের খাল বেয়ে চলতে পারে সে তো তারই দয়ায়—প্রায় বারাে আনা পথই যে তাদের এলাকা। হুমকি ছেড়ে মাঝি বললাে, যাত্রী ভাই, তােমরা সব ভদ্দরলােক না? ভদ্দর- লােকের কি এই ব্যাভার? তারপর একান্ত বিগলিতভাবে বড়ােবাবুর পুত্রের কাছে তারা মার্জনা ভিক্ষা করলাে। কিন্তু এত সব কাণ্ড যাকে নিয়ে সে দিব্যি নিরুদ্বেগে অরুণের পাশে এসে বসলাে। বিষন্নমুখে বললাে, বাড়ি গেলে আমাকে বােধ হয় কাকি বকবে। কিন্তু ওখানে থাকার চেয়ে কাকির একটু বকুনি খাওয়া অনেক ভালাে। ‘কোথায় ছিলে তুমি ? ‘ঐ তাে বড় পােস্টাপিশের কাছে, আমার মামাকে চেনে ? তারই তাে পােটাপিশ। অরুণ হেসে ফেলল, ও, তাই নাকি ?
দৈ বা ও
‘হু, খুব গম্ভীরভাবে ঝুষ্টি জবাব দিলাে।
‘তােমার নাম বুঝি ঝুন্ট?
‘না, ঝুষ্টি-ঝুন্ট, কেবল কাকিমার জন্য।
‘আমার জন্যে না ?
বুন্টি এবার চোখ বড় করে তাকালাে ওর মুখের দিকে।
হঠাৎ ভয়ানক ভালাে লাগলাে তার সে-মুখ। তাকিয়ে রইলাে।
‘কী দেখছে ?-অরুণ হেসে বললাে।
লজ্জিতভাবে কুষ্ট চোখ নামিয়ে বললে, “তুমি যদি নেহাৎই
ও তবে ডাকতে পারাে ঝুন্টু বলে।
‘তাহলে আমাকে নিশ্চয়ই তােমার পছন্দ হয়েছে ?
বুটি সে-কথার জবাব না-দিয়ে বললে, “আর আমি
তােমাকে কী বলে ডাকবাে ?
‘অরুণ।
‘অরুণ ! কিন্তু তুমি যে আমার বড়। কাকি বলেন যে
বড়দের নাম নিয়ে ডাকতে নেই।
‘তাহলে ডেকো না।
বাঃ, তা কী হয়? কিছু তাে একটা ডাকতেই হবে।
‘তা কেন, না-ডেকেও বেশ কথা বলা যায়।'
‘কক্ষনাে যায় না'—কুন্টি সবেগে প্রতিবাদ করলাে।
১৭
गावोस
'নিশ্চয়ই যায়'—অরুণ গলার স্বর যথাসম্ভব নিচু করে
বললে, “তােমার মা কি তােমার বাবাকে কিছু বলে
ডাকেন ?
‘আমার বাবা নেই, কাকা আছেন—'
‘তাহলে তােমার কাকিমা তাকে কী বলে ডাকেন
জানাে ?
‘ধ্যেং' ঝুণ্টির গালে হঠাৎ রক্ত নেমে এলো।
লজ্জা সে জীবনে পায়নি। বিয়ের সম্বন্ধ তার বহু
এসেছে, কাকি বলে দিয়েছেন, এটা লজ্জার বিষয়—এ-কথা
কাউকে বলতে নেই--তাই সে বলে না, কিন্তু এ-লজ্জা তার
কোথায় লুকিয়ে ছিলাে? কাকা কাকিমার সম্বন্ধটা ঠিক যে
অন্যান্য সম্পর্কের বাইরে এটা সে বুঝেছিলে–মেনেও
নিয়েছিলাে, কিন্তু একজন মানুষের সঙ্গে তারও ঠিক সেই
স্বন্ধ হওয়া যে কেমন, তার একটা অস্পষ্ট অনুভূতি তার
অপরিণত বালিকাচিত্তে হঠাৎ একটা নাড়া দিলাে। চুপ
করে বসে রইলাে জলের দিকে তাকিয়ে।
একটু পরে অরুণ বললে, “কী হলাে? রাগ নাকি ?
'তুমি ও-রকম যা-তা বলাে কেন?
যা-তা কী—এমনও তো হতে পারে যে, তােমার
১১৮
দৈ বা ও
কাকিমার সঙ্গে তােমার কাকার বা সম্পর্ক, আমার সঙ্গেও
তােমার সেই সম্পর্ক হলাে।
বুন্টিকে চুপ করে থাকতে দেখে অরুণ বললে, “আমার
কথা তুমি বােৰঝানি?
‘বুঝেছি।
‘কী বুঝেছো?
বলবাে না।
বলাে না!
‘না।
বলল না লক্ষ্মীটি— অরুণ কুন্টির হাতের উপর নিজের
হাত রাখলাে।
ঝুটি হঠাৎ এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললে, “বিয়ে
আমি করবােই না কোনােদিন।
‘আমাকেও না ?
‘তাহলে তাে ভারি মুশকিল দেখছি। দুষ্ট হাসিতে
অরুণের সুন্দর মুখ ঝলমল করে উঠলাে, আর ঝুল্টি দারুণ
বিচক্ষণের মত বসে-বসে চিন্তা করতে লাগলাে, বিয়েতে
অনুমতি দেবে কিনা, এই বােধ হয় তার সমস্যা। খানিক
পায়ে ভয়ানক দুঃখের সুরে বললে, দ্যাখাে, কাকা আমাকে
বায়ােস্কোপ দেখাবেন বলে ঢাকা নিয়ে এলেন, তা তাে
দেখালেনই না, এদিকে মামাবাড়িতে ফেলে রেখে পালিয়ে
গেলেন। মন টেকে আমার? তুমিই বলােনা পারি বাইরে
বেরুতে, না পারি দৌড়তে—না ঘুড়ি, না লাট্ট-ওখানে
আমাদের শ্রীপুরে আমি কত সুখে ছিলাম। সারাদিন ঘুরে
বেড়িয়েছি, কঁচা আম খেয়েছি, কড়ি খেলেছি; আর এখানে
কী বলব তােমাকে, আমি মরে যেতুম আর দু’দিন থাকলে।
দুপুরবেলা মামা থাকেন আপিশে, সন্ধ্যা আর আরতি-দি তাে
ইস্কুলেই যায় ; এক মামিমা আর আমি—মামিমা ঘুমুতেই
দোর খুলে বেরিয়ে এসেছি। ভালাে করিনি ?
“নিশ্চয়ই। তা নইলে আমি কি পেতাম তােমাকে ?
‘সেই তােঝুষ্টি সায় পেয়ে একেবারে গলে গেলাে।
একটুখন চুপ থেকে আবার বললে, আচ্ছা, তুমি সাঁতার
জানাে ?”
“নিশ্চয়ই।
‘ক’ রকম জান?
‘আমি? আমি ডুব-সাঁতার জানি, মরা ভাসতে জানি,
চিৎসাঁতার জানি। শিখিয়ে দিতে পারি তােমাকে।'
सवार
‘তা আর কী করে হবে বলল। ভারি এক দুঃখের ভঙ্গী
করে অরুণ বললে, “তুমি তাে মােটে আমার কথায় রাজিই
হলে না, তা নইলে কী মজাটাই যে হতো, আমি তােমাকে
যত খুশি ছবি দেখাতুম, আর তুমি আমাকে সাঁতার
শেখাতে।”
অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে কুন্টি বললে, “কী আবার রাজি
হলাম না।'—বলে তক্ষুনি কী কথা মনে হলাে আর সঙ্গে-
সঙ্গে সাংঘাতিক জোরে অরুণের হাতের উপর এক চিমটি
কাটলাে সে।
অরুণ উহু' বলে হাত বুলুতে লাগলাে সে-জায়গায়, আর
ঝুল্টি মুখ ফিরিয়ে বসলাে তার উল্টো দিকে।
সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ। এদের গুনগুন কথায় ঈর্ষাকাতর
যাত্রীরা অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ বসেছে গিয়ে ছইয়ের
উপরে—কেউ বা মশা চাপড়াচ্ছে অধীরভাবে।
কৃষ্ণপক্ষ। সাংঘাতিক অন্ধকার। মাঝিরা একটা
কালি-পড়া লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখলাে
অরুণের মুখের
সামনে।
একটু পরে অরুণ বললে, ও মাঝি, লণ্ঠন জ্বেলেছে
কেন, খামকাই তােমার তেল খরচা হচ্ছে।
साहको
'কত নাকি অন্ধকারে রইবেন।'
‘অন্ধকার ভালাে হে, এ-আললা তুমি সরাও মুখের কাছ
থেকে।'
মাল্লা হাঁকলো, ও মাঝি ভাই, লণ্ঠন নি কারাে দরকার
আছে, জিগাও তাে’, তারপর উত্তরের অপেক্ষা না-করে
লণ্ঠনটা যথাসম্ভব কমিয়ে এক কোণে রেখে দিলাে ।
আলাে সরলে অরুণ কুন্টির হাত
ঝুন্টির হাত ছুয়ে বলল,
‘ঘুমুবে ?
‘। মাঝিদের তােরঙ্গে ইতিমধ্যেই সে মাথা এলিয়ে
দিয়েছিলো।
অরুণ নিজের স্যুটকেস খুলে খান দুই ধুতি আর পাঞ্জাবি
বার করে একটা ভােয়ালে জড়িয়ে বালিশের মতো পাকিয়ে
নিজে যথাসম্ভব কুঞ্চিত হয়ে বসে বললে, এই যে এখানে
শােও—ওখানে মাথা রেখাে না, ভারি ময়লা।
ঝন্টি ভদ্রতা জানে না—ভূমিকা না-করে হাত-পা ছড়িয়ে
শুলাে, তারপর বললাে, “দ্যাখাে, কাকি বলেন, আমার মাথায়
নাকি যত রাজ্যের নােংরা তাই জন্যে কারাে বালিশে
আমাকে মাথা রাখতেই দেন না। তা তােমার তাে এ-সব
পরবার কাপড়-'
দৈ বা ও
অরুণ হেসে ফেলল,-“তােমার কাকি তত ভারি দুষ্ট,
এমন সুন্দর পশমের মতাে চুলে নাকি আবার ময়লা
থাকে। কই, দেখি’—অরুণ ভয়ানক বেশিরকম নিচু হয়ে
অন্ধকারে চুলের ময়লা পরীক্ষা করতে লাগলাে হাত বুলিয়ে-
বুলিয়ে। আর বুন্টি আরামে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে
পড়লাে।
রাত প্রায় সাড়ে আটটায় গহনা এসে পৌঁছলে
শ্রীপুরে —স্তে ঠেলা দিয়ে তুললাে সে বুন্টিকে, তারপর
বােসের ঘাটে নৌকো রাখতে বলে নেমে পড়লে বুন্টির
হাত ধরে।
বােসের ঘাট থেকে বড় জোর মিনিট তিনেকের পথ
বুন্টিদের বাড়ি। মাঝে একটা সাঁকো পার হতে হয়।
গ্রাম এর মধ্যেই নিশুতি হয়ে গেছে। বুন্টির অন্ধকারকে
ভারি ভয়।
এত রাত্রে সে বাইরে বেরিয়েছে, এ
অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম, ভয়ে সে অরুণের হাত আঁকড়ে
রইলাে।
‘ভয় করছে ?
যদি আমি না আসতাম কী হতো?
‘রাম-লক্ষ্মণ-সীতা বলতুম।
‘তাহলে বুঝি ভয় থাকে না।
‘তা এখন বলল না।
‘তুমি তাে আছো।
‘আমি চলে যাই।
ইস্ কী, তুমি কি ভেবেছ আমি তােমার সঙ্গে তােমাদের
বাড়ি পর্যন্ত যাবে ?
যাবেই তাে।
অরুণ অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে পথ দেখতে-দেখতে
আসছিলাে--ওর কথা শুনে বাঁ হাতে ওকে কাছে জড়িয়ে
এনে বললাে, “ভারি তো আহলাদি’--তারপর টর্চ নিবিয়ে
দিয়ে থমকে দাড়িয়ে পড়ে বললে, 'তুমি তাে রথীবাবুর
বাড়ি যাবে, ঐ তত তােমাদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে,
তােমাকে বাড়ির কাছে দিয়েই আমি চলে যাবে।
‘তােমাকে দেবােই না যেতে।
অরুণ হাসলাে। বাড়ির দরজায় এসে দাড়াতেই কুষ্টি
অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে দরজা ধাক্কাতে লাগলাে, “কাকি, দোর খােলল—আমি বুন্টি- ঝপ করে দরজা খুলে গেলাে আর বাঘের মতাে ঝাপিয়ে পড়লাে ঝুটি কাকির বুকের উপর। অভিমানে সে কেঁদে ফেললাে। রথী তার মনিবপুত্রকে দেখে থ হয়ে রইলাে খানিকক্ষণ । অরুণ বললাে, “ইনি একাই আসছিলেন—আমাদের দেশ- বাসীরা তেমন ভদ্র নয় তাই আমাকে রাস্তায় এর ভার নিতে হল। আচ্ছা, আজ আসি। পা বাড়াতেই রথী অত্যন্ত কৃতজ্ঞভাবে ওর দু’হাত জড়িয়ে ধরলাে, কথা পারলে না। ব্যাপারটা তার বােধগম্য হয়েছিলাে সঙ্গে-সঙ্গেই। বলতে হরিশবাবুর একমাত্র পুত্র এই অরুণকুমার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল রত্ন। একুশ বছর বয়েস। এম. এ. পড়ছে। বাপের স্নেহের অন্ত নেই এই সন্তানের প্রতি মুক্ত হস্তে তিনি টাকা খরচ করেন মনের আনন্দে। গ্রীষ্মের ছুটিতে তার আসবার কথা—মা বাবা পথ চেয়ে দিন নছেন। পথ চলতে-চলতে অরুণের মাথায় অনেক চিন্তা
মাধবীর জন্য
ভিড় করে এলাে। কথা ছিলাে আসবার আগে টেলিগ্রাম
করে আসবে। প্রতিবারই তার মা বাবা এ-কথা লেখেন,
প্রতিবারই সে এর ব্যতিক্রম করে থাকে কেননা সে আসছে
এই যে একটা ঢাক ঢােল আর বিশেষ ব্যবস্থা এটা তার বড়ই
খারাপ লাগে। ঢাকা এসেছে সে তিন দিন আগে বন্ধুর
বাড়ি। এর আগে কখনাে এমন জনগণে মিশে সে গহনার
নৌকোর যাত্রী হয়ে আসেনি—এবার নেহাৎই একটা শখে
সে উঠে এসেছিল। কিন্তু যােগাযােগের কথাটা ভেবে
অরুণের তরুণ হৃদয় আবেশে মুগ্ধ হয়ে গেলাে।
বাড়ি পৌঁছতেই মা-বাবা অবাক হয়ে গেলেন। ভৎসনা
করলেন খবর না-দিয়ে আসবার জন্য। অরুণ হাসিমুখে
অপরাধ স্বীকার করে মাকে আদর করলো। কথাবাতায়
খেতে-টেতে অনেক রাত হয়ে গেলাে—শুতে যখন গেলাে
তখন রাত প্রায় বারােটা। কিন্তু শুতে গিয়ে অরুণের আর
ঘুম এলাে না। কী এক মধুরতায় সমস্ত মন আচ্ছন্ন
হয়ে রইলাে।
পরদিন সকালবেলা ঘুম ভাঙতে তার অনেক দেরি হয়ে
গেলাে। রােদ বেশ চ’ড়ে উঠেছে—চা খাচ্ছিলাে বসে এমন
সময় পুজো সেরে মা এলেন ঘরে-হ্যানে অরু, এ-সব কী
लवार যা শুনছি? কালকে নাকি তুই গহনার নৌকোয় ম্যানেজার- বাবুর ভাইঝিকে নিয়ে এসেছিস? সকালবেলা উঠে তাে আর কান পাততে পারছিনে। ‘কেন বলাে তাে ? ‘যা-তা বলছে লােকেরা। মেয়েটাও বাবা হয়েছে। ‘কেন, মেয়েটা তো বেশ ভালােই। ‘তুই বলিস ভাললা ? ও দস্যি মেয়ে কখনাে ভালাে হয় ? অরুণ হাসলাে। মা বললেন, মেয়েটাকে আমি দেখেছি একবার—দেখতে কিন্তু ভারি মিষ্টি। কিন্তু মা-বাপ নেই– শাসন নেই, একেবারে বুনাে রয়ে গেছে। ‘তুমি এনে মানুষ করাে না মরণ দশা! শুনেছি ম্যানেজারবাবুর স্ত্রীর নাকি ও নয়নের মণি, তাই জন্যেই তাে আহলাদে-আহলাদে ' অমন হয়েছে। তবে তাে একটু শাসন দরকার। আমি তাে ভাবছি তার ভারটা তােমাকেই নিতে বলবাে। চকিতে মা চোখ তুলে তাকালেন ছেলের দিকে। একটু পরেই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললেন, ‘খােকা, ১২।
আমি ভাবছি এবার তােকে যেমন করে পারি বিয়ে
করাবােই, আর তাের অমত শুনব না।”
‘ভালােই তাে।' অরুণ হাসলাে।
তবে তুই বিয়েতে রাজি হচ্ছিস? মেয়ে দেখবি ?
‘মেয়ে তাে দেখেছি।
কাকে দেখেছিস ?
‘কেন, সেই দস্যি মেয়েকে—যাকে শাসন করবার ভার
নেবে তুমি।
মা খানিকক্ষণ কথা বললেন না—ভালো করে ছেলেকে
নিরীক্ষণ করতে লাগলেন তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে। তাঁর ছেলের মন! .
সে-মন যা গ্রহণ করে তাতে তার বিশ্বাস ছিলাে।
সেদিনই বিকেলবেলা তিনি দাসীকে দিয়ে খবর
পাঠালেন ; কাছারিতে ম্যানেজার যেন যাবার আগে অবশ্য
তঁার সঙ্গে একবার দেখা করে যান।
রথী ব্যস্ত হয়ে তক্ষুনি উঠে দাড়ালাে। বুক কাপতে
লাগল তার। সে জানে যে সামাজিক অপরাধে তার কন্যা
অপরাধী, এর শাস্তি অবধারিত। কাছারিতে আসতেই
আজ তার ভয় করছিলাে কিন্তু ভাগ্যক্রমে হরিশবাবু আজ
বিশেষ প্রয়ােজনে গ্রামান্তরে গেছেন, রাত্রের আগে ফিরবেন
১২
না, কিন্তু অন্দর থেকেও যে আগুন জ্বলে উঠবে এটা সে
ভাবেনি। মনে-মনে নিজের স্বপক্ষে সে জবাব ঠিক করতে-
করতে কুণ্ঠিত পদে দাসীর সঙ্গে অন্দরে এসে দাড়ালাে।
ঘরের দরজার কাছে আসতেই অরুণের মা মাথার
কাপড় ঈষৎ টেনে দিলেন।
মৃদুস্বরে বললেন, “আসুন
ভিতরে।
রথী ভিতরে এসে বসতেই তিনি দাসীকে ইঙ্গিত করলেন।
দাসী সরে গেলে বললেন, ‘ম্যানেজারবাবু, বিশেষ প্রয়ােজনেই
আপনাকে ডেকেছি। শুনেছি আপনার একটি পিতৃমাতৃহারা
ভাইঝি আছে, তাকে নিয়ে পাড়ায় নানারকম জনরবও শুনি,
মেয়েটিকে আমি একবার দেখতে চাই।
‘অবশ্যই নিয়ে আসবাে। রথী বিনয়ে লজ্জায় হাতে হাত
ঘষতে লাগলাে, তারপর একটু সামলে নিয়ে বললে, “আপনি
হয়তাে কালকের ঘটনা শুনেছেন, অরুণবাবুর দয়ায় আমার
মেয়ে আমি ফিরিয়ে পেয়েছি—সে-ঋণ আমি সমস্ত জীবন
শশাধ করতে পারবাে না।”
‘হ্যা, আমি শুনেছি সে-কথা, আপনি পারলে আজকেই
একবার নিয়ে আসবেন তাকে।
অবশ্যই আপনার আদেশ আমার শিরােধার্য।
:২১
১
রথী নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিয়ে বাড়ি এলাে। বাড়ি
এসে দেখলাে উষা ট্রাঙ্ক গােছাচ্ছে, আর কুন্টি অত্যন্ত
মনােযােগ সহকারে দেখছে। রথী উৎফুল্ল মুখে এসে বললাে,
‘উষা, ব্যাপার কী বুঝলাম না-জমিদারগিন্নি একবার ঝুন্টিকে
দেখতে চেয়েছেন। সুন্দর করে সাজিয়ে দাও তো, আমি
চা খেয়েই নিয়ে যাবে।
উষা বিমর্ষমুখে বললাে, “দ্যাখাে, আজকে আমাদের খাবার
জল রিজার্ভ ট্যাঙ্ক থেকে আনতে দেয়নি—ও-জল আমরা
ছুতে পারব না—আমি তাে কালই চলে যাচ্ছি ঝুষ্টিকে
নিয়ে, কিন্তু তােমাকে ওরা কী করবে কে জানে।'
“তুমি কিছু ভেবাে না—তােমাদের তােমার বাপের বাড়ি
পাঠিয়ে আমি একবার এদের দেখে নেবাে। তুমি চপ
ওঠো তাে।
বাসের ডালা বন্ধ করে উষা উঠে পড়লো।
বুন্টিকে নিয়ে বেরুতে-বেরুতে সন্ধ্যা লেগে গেলাে।
জমিদার বাড়ির দেউড়িতে ঢুকতেই দেখা হয়ে গেলাে অরুণের
সঙ্গে, আরে, আপনারা যে-- অরুণ বিস্মিত হয়ে গেলাে।
আড়চোখে তাকালে ঝুন্টির দিকে—রথী বললাে, বেরুচ্ছেন
নাকি? আপনার মা একবার আসতে বলেছিলেন।
অরুণ ঠোট কামড়ালাে এবার। মা-কে সে জানে।
বললাে, না, এই একটু ঘােরাঘুরি
এই একটু ঘােরাঘুরি করছিলাম—চলুন
আপনারা।
তাদের বসিয়ে অরুণ তার মা-কে ডেকে নিয়ে এলাে। মা
এসেই হাত বাড়ালেন কুন্টির দিকে, ‘এসে তাে মা।
কাকার শিক্ষামতাে ঝুন্টি এগিয়ে গেলাে কাছে-প্রণামও
করলাে লক্ষ্মী মেয়ের মতাে। মা বললেন, ও মা, এ তো দেখছি
বেশ লক্ষ্মী মেয়ে—এসসা তাে আমার সঙ্গে একটু’
একটু’—অরুণের
দিকে তাকিয়ে বললেন, 'অরুণ, তুমি একটু কথা বলল
ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে, আমি আসছি।
অরুণ বুঝলাে, মা এবার নাড়ি-টেপা ডাক্তারি করবেন ।
ছেলের পছন্দের যাচাই আরকি। মনে-মনে প্রার্থনা করলাে,
পরীক্ষায় যেন ঝুন্টি উত্তীর্ণ হয়। মা-কে জয় করাই সব।
বাবা যে অন্দরে একান্তই মা-র ছায়া এ-কথা সে জানে।
ঝুন্টিকে নিয়ে অনেকক্ষণ পরে মা ফিরে এলেন প্রফুল্ল-মুখে
—তারপরে এলাে খাবার-এবং আদর-আপ্যায়নে রথীকে
অভিভূত করে ফেলে অবশেষে বললেন, ম্যানেজার বাবু,
আমার ছেলেটির কাছে তাে আপনি ঋণী—ঋণ শােধ করবার
একটা উপায় আছে-আপনার মেয়েটি আমাদের দিন।
‘সে কী! রথী প্রথমটা বুঝতেই পারলাে না কথাটা বিস্ময়ে আনন্দে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো অরুণের মা-র দিকে। অরুণের মা বললেন, “বেশ মেয়ে আপনার, আমার তাে মেয়ে নেই—আপনার ছেলে নেই’--অরুণের মা অত্যন্ত সহজভাবে বললেন। অরুণ মা-র ঔদার্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাে। ইতিমধ্যে একটা কাণ্ড ঘটে গেলাে। অরুণের মা-র। একটা বেজি ছিল--কোথা থেকে সেটা ছাড়া পেয়ে পিল- পি করে এসে লাফ দিয়ে উঠলাে গিন্নির কোলে, আর মুহূতে ঝুন্টি কাকা-কাকিমার সমস্ত শিক্ষা ভুলে আনন্দে হাততালি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাে ওটা ধরবার জন্যে বেজিটা ভয় পেয়ে তক্ষুনি নেমে ছুটলাে ভিতরের দিকে ; সঙ্গে-সঙ্গে ঝুন্টিও বিদ্যুৎবেগে ছুটলো তার পিছন পিছন । রথীর মুখে দুর্ভাবনার ছায়া নামলাে, আর অরুণের মা-র মুখ ভ'রে গেলাে আনন্দে। এই দাপাদাপি তিনি কতকাল ভুলে আছেন। ছেলে তার অকালপক্ক—মনেই পড়ে না কবে সে এমন করে শেষ হুটোপুটি করেছিলাে—সস্নেহে বললেন ‘পাগলি।” ১৩২
लवार
অরুণ এবার লজ্জা ত্যাগ করে উঠে দাড়ালাে, আমি
দেখিগে মা, ওটা আবার কাড়ে না দেয়।
ঘরে ঢুকেই সে ছুটন্ত ঝুন্টিকে খপ করে ধরে ফেললে,
সঙ্গে-সঙ্গে ঝুন্টি একহাত জিব বের করে ভয়ানক অপরাধীর
মতাে বললে, এ মা, কী হবে?'
‘কী হলাে?
‘একদম ভুলে গিয়েছিলাম। কাকি বলে দিয়েছেন
এখানে এসে লা করতে
‘কী আর হবে—কিন্তু আমাদের পুকুর দেখেছে? এবার
আমাকে সাঁতার শেখাবে তত ?
‘ধ্যেৎ!' বুন্টি মুহুতে লাল হয়ে উঠলাে।
‘শােনাে’—অরুণ ওকে হাত ধরে টেনে যথাসম্ভব কাছে
এনে বললে তুমি খুশি হয়েছে? না, বলল, বলতে ইহবে-
ঝুন্টির সলজ্জ মুখ সে তুলে ধরলাে।
ও-ঘর থেকে মা ডাকলেন, “ওরে তােরা করছিস্ কী।
ম্যানেজারবাবু এখন যাবেন।
?
No text on this page.
পরিশেষ
মাধুরীকে দেখে হঠাৎ অরবিন্দ থমকে গেলো। দেখলে
বােধ হয় আট বছর পরে, কিন্তু চিনতে তার এক পলকের
বেশি প্রয়ােজন হলাে না। মাথাটা যথাসম্ভব নিচু করে সে
যেন নিজেকে একটু আড়াল করবার চেষ্টা করলাে।
বিয়ে বাড়ি। প্রকাণ্ড চকমিলাননা দালানের চৌকো
উঠোনে শামিয়ানা টাঙানাে হয়েছে। ঝলমল করছে
আলােতে। মাঝখানে হাত তিনেক ফঁক রেখে লম্বালম্বি
টেবিল আর ভেনেস্তা চেয়ার ফেলে দুদিকে খাবার ব্যবস্থা,
একদিকে মেয়েরা, একদিকে পুরুষেরা। অরবিন্দর অনেকক্ষণ
থেকেই মনে হয়েছে যে যে-মেয়েটি তার দিকে পিছন ফিরে
খেতে বসেছে তার হাতির দাঁতের মতাে শুভ্র মসৃণ ঘাড়ের
উপরকার ঢেউ-খেলানাে চুলের অবিন্যস্ত ঢিলে খোপাটি সে
যেন চেনে। হঠাৎ মেয়েটির মুখ ঘুরলাে এদিকে। সঙ্গে-সঙ্গে
অরবিন্দ স্পষ্ট দেখতে পেলাে সত্যি-সত্যিই সে মাধুরী। মনের
মধ্যেটা একটু কেমন করলাে যেন একটু বিবেকের দংশন
হয়তাে—পরমুহূতে ই সামলে নিলে নিজেকে।
১৩।
মাধবীর জন্য
খেয়ে উঠে সে আর দেরি করলাে না—শুভরাত্রি জ্ঞাপন
করে বেরিয়ে পড়লে সেখান থেকে। তারপর পানের
দোকান থেকে দু’খিলি পান এক প্যাকেট সিগারেট কিনে
সামনে যে-বাস্ পেলে তাতেই চ’ড়ে অনির্দিষ্টভাবে ঘুরে ফিরে
বাড়ি ফিরলাে রাত বারােটায়।
মেমসাহেব নিশ্চয়ই এতক্ষণ জেগে নেই। আর থাকলেও
তার সঙ্গে দুটো কথা বলে শান্তি পাবার আশা করা নিতান্ত
মূঢ়তা। ফ্ল্যাটের দরজায় আস্তে সে টোকা দিলল, কলিং বেল
টিপলে ফল হ’তত বেশি, কিন্তু যদি অ্যানির ঘুম ভাঙে তবে
আজ রাত্রে মল্লযুদ্ধ। প্রায় দশ মিনিট টোকা দেবার পরে বয়
এসে আস্তে দরজা খুলে দিলাে। অরবিন্দ নিঃশব্দে নিজের
শােবার ঘরে ঢুকে নিঃশব্দে পােষাক ছেড়ে শুয়ে পড়লাে।
ঘুম এলাে না অনেকক্ষণ-আর তারপর যখন ঘুমুলাে তখন
বাকি রাতটুকু সে এমন সব স্বপ্ন দেখলে যা থেকে নিঘুম
রাত্রিও মানুষের পক্ষে অনেক কাম্য।
দোষ আর কার। সমস্ত দোষ অরকিরই তাে।
অরবিন্দ যখন ভাইয়ের পয়সায় চার বছর মেম পুষে-পুষে
ফতুর হয়ে দেশে ফিরলো তখন তার মাথার কোযে-কোষে
শয়তানি বুদ্ধি জাল ফেলেছে। দেশে থাকতে তার সুনাম
১৩
विजय ছিলাে। লেখাপড়ায় ব্রিলিয়েন্ট না-হলেও ভালাে ছেলে ব’লেই সকলে জানতােবি. এ. পাশ করবার পরে তার হঠাৎ ঝোঁক চাপলাে বিলেত যাবে। ব্যারিস্টরি পড়বে। অরবিন্দর দাদা অনন্তবাবু তখন রাঙামাটির সিভিল সর্জন। তিনি ভাইয়ের ইচ্ছাকে সদিচ্ছা বলেই মনে করলেন এবং বিনা আপত্তিতে চোখের জল সামলে রাজি হলেন। অরবিন দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। তার স্বাস্থ্য, তার রং, তার চালচলন কথাবাত। সমস্তই নিখুতভাবে সুন্দর এবং বিলেত গিয়ে এই সৌন্দর্যই তার কাল হলাে। সেখানে গিয়ে অত্যন্ত সহজেই মেয়েদের মনােহরণ করলাে এবং শেষ পর্যন্ত শস্তা মেয়েদের পিছনে ঘােরাটাই পেশা করে চার বছরে ভাইয়ের রক্ত-জল- করা সঞ্চিত সমস্ত অর্থ খুইয়ে-ফতুর হয়ে দেশে ফিরে এলো। ফিরে আসার তার একেবারেই ইচ্ছে ছিলো না। যে-রসে সে ডুবে ছিলো সে-রসের বড় আঠা, সাধ্য কী তা থেকে এত সহজেই সে বিচ্ছিন্ন হয়, কিন্তু তবু তাকে আসতে হলাে— মনের মধ্যে নানারকম প্যাচ এটে সে লক্ষ্মী ছেলের মতাে ঘরে ফিরে এলো। অনন্তবাবু ভাইয়ের অধঃপতন সমস্তই বুঝলেন কিন্তু কিছুই বললেন না। দিনকয়েক অরবিন্দ ভাইয়ের একান্ত অনুগত থেকে হঠাৎ একদিন ব্যবসা করবে বলে ১৩
মাধবীর জ
।
হাজার পাঁচেক টাকা চেয়ে বসলো, ব্যবসা বিষয়ে তার কী
পর্যন্ত জ্ঞান তার তালিকাও সে ঘণ্টা তিনেক ব’সে ভাইয়ের
কর্ণগােচর করালাে, কিন্তু অনন্তবাবু নিঃশব্দে বসে পাইপ
টানতে লাগলেন, জবাব দিলেন না।
সেদিন রাত্রেই তিনি শুয়ে-শুয়ে স্ত্রীকে বললেন, “দ্যাখাে,
অরবিন্দর কিন্তু আবার পালাবার মতলব, এখন যে করেই
হােক ওকে বাঁধতে হবে।
‘কেন ? কী করে বুঝলে?
‘বয়স তাে হলাে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে, কাজেই বুঝতে
দেরি হয় না।
স্ত্রী অন্নপূর্ণা একটু চুপ করে থেকে বল্লেন, ‘বাঁধতে হলে
তো বিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় দেখি না।
‘আমি তাে তাই বলি।
“দ্যাখাে ভালাে করে ভেবে--‘অন্নপূর্ণা চিন্তিতভাবে পাশ
ফিরলেন।
অনন্তবাবু অনেক্ষণ পাইপ টেনে আবার বল্লেন—“অরবিন্দ
আমার সন্তানের অধিক। আমার সন্তান নেই এ-কথা
আমার কখনাে মনে হয় না। সেই অরবিন্দ চোখের উপর
এমন ভেসে যাবে ?
১৪•
পৰি শেষ
অন্নপূর্ণা নিঃশ্বাস টেনে বল্লেন,
কথাই।
অনন্তবাবুর বহুকাল পারে মনে পড়লাে মাত্র পাঁচ বছর
বয়সে তিনি মাকে হারিয়েছিলেন। স্পষ্ট মনে আছে তার
ঠিক বাইশ বছর বয়সে যখন প্রৌঢ় পিতা আবার অরবিন্দর
মাকে বিয়ে করে নিয়ে এলেন ঘরে। তখন পিতার দুর্মতিতে
লজ্জায় ঘৃণায় মর্মাহত হয়ে সে গৃহত্যাগ করে চলে
গিয়েছিলো, কিন্তু এই অরবিন্দর মা, ঐটুকু আঠারাে বছরের
মেয়ে–ফিরিয়ে আনলে তাকে ঘরে, বিয়ে দিয়ে সংসার
পাতলল। তারপর ঠিক মায়ের মতাে স্নেহে যত্নে কত্রীত্বে
সত্যিকারের মা হয়ে উঠলাে দু’দিনেই। তিনি যখন মারা
যান অরবিন্দ তখন সাত বছরের একফোটা ছেলে। অনন্তবাবুর
চোখে অরবিন্দর সেই সাত বছর বয়সের পুষ্ট চেহারা ভেসে
উঠলো
স্পষ্ট হয়ে।
কী ভালােই তিনি বেসেছিলেন
ভাইকে-মুখ ফিরিয়ে স্ত্রীকে বললেন, “তােমার মনে পড়ে,
আনু—অরবিন্দর মায়ের মৃত্যুর কথা ?
‘তা আর পড়ে না। একফোটা তখন অরবিন্দ—আমার
হাত ধরে উনি কেঁদে ফেল্লেন, “বৌমা, আজ থেকে তুমিই এর
না,”—অন্নপূর্ণার মুখ করুণ হয়ে উঠলাে বলতে-বলতে।
মা ব র অ ন্য
অনন্তবাবু বিষন্নভাবে আধ-শােয় অবস্থায় বসে রইলেন
অনেকক্ষণ তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন।
তারপরেই অরবিন্দর বিবাহপর্ব। মাধুরীর বাবা মৃত্যুঞ্জয়
মিত্র অরবিন্দকে দেখে একেবারে ভুলে গেলেন, মাধুরী তখন
আই. এ. পড়ে বেথুনে। আঠারাে বছরের মেয়ে। কাঠের
কারবারে, লক্ষপতি মৃত্যুঞ্জয় মিত্র বিনা দ্বিধায় অরবিন্দর সঙ্গে
মাধুরীর বিয়ে দিলেন। বিয়েতে তিনি হাজার দশেক টাকা
খরচ করলেন, তা ছাড়া মেয়েকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত মুড়ে
দিলেন সােনা দিয়ে। বিয়েতে মাধুরীর একান্ত অমত ছিল।
বেচারা এমনিতেই ছেলেমানুষ, তার উপর নতুন-নতুন
কলেজের স্বাদ পেয়েছে, এ রকম হুট করে বিয়ে করাটা
তার ভালাে লাগলাে না। কিন্তু বিয়ের পর অরবিন্দকে তার
সত্যিই ভালাে লেগেছিলাে। তার মধুর কথাবার্তায় ব্যবহারে
সকলেই মুগ্ধ। মৃত্যুঞ্জয়বাবু স্ত্রীকে বললেন, ‘কত তােমার ভয়
ছিলাে—একটা মেয়ে, তাকে আমি জলেই ফেললাম বুঝি।
খোঁজ-খবর ছাড়া বিয়ে, দেখছো তাে এখন কেমন জামাই?
মাধুরীর মা তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, “থাক থাক, আর
গর্ব করতে হবে না—মাত্রই তাে আজ
আজ দশ দিন বিয়ে
হয়েছে।”
১৪
এদিকে অরবিন্দর বৌদিও মাধুরীকে দেখে একেবারে
আত্মহারা হয়ে গেলেন। তাঁর সমস্ত রুদ্ধ মাতৃস্নেহে যেন
প্রবাহ বইলাে মেয়েটির কাচা মুখখানির দিকে তাকিয়ে।
দশ দিন পরে যখন বিবাহের যাবতীয় অনুষ্ঠান শেষ করে
অরবিন্দ ফিরে এলাে শ্বশুরবাড়ি থেকে, অনন্তবাবু একটু
আড়াল বুঝে স্ত্রীকে বল্লেন, “অরবিন্দকে কেমন উজ্জ্বল
দেখাচ্ছে দেখেছো ?”
অন্নপূর্ণা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
এবার ভাই আমার আর পালাবার নাম করবে না।
“তা তােমারি তত ভাই। তারপরে দু’জনেই চোখে
চোখ রেখে একটু হাসলেন।
অরবিন্দ মাধুরীকে দেখে একটু অবাক হয়েছিলাে সত্যিই।
জীবনে বহু মেয়ে দেখবার তার সুযােগ হয়েছে কিন্তু ঠিক
মাধুরীর মত যেন সে কাউকেই দেখেছে মনে হলাে না।
অদৃষ্টকে ধন্যবাদ দিতে হয় বইকি! কিন্তু একখানা সুন্দর
মুখ নিয়েই তাে অরবিন্দর কারবার নয়, তাতে তার আশও
মেটে না, কাজে-কাজেই মনকে সে প্রশ্রয় দিলাে না। প্রেমই
বলল যা-ই বলল ও-সব তাে সাময়িক একটা উত্তেজনা ছাড়া
কিছু নয়--মনে-মনে অরবিন্দ বিবেককে বােঝালাে-আর
নাৰী আৰু
জীবনে উত্তেজনা যদি ভােগই করতে হয় তবে একাধিক
স্ত্রীলােক ছাড়া সেটা সম্ভবই নয়। আর সে-প্রমােদস্থল হচ্ছে।
ইওরােপ। অতএব দিন কুড়ি পরে একদিন রাত বারােটার
সময় সে নিঃশব্দে উঠে বসলাে বিছানায়। মাধুরী নিরুদ্বেগে
ঘুমুচ্ছিলাে বালিশে মাথা রেখে—বড় সুন্দর ওর ঘুমন্ত মুখ ।
ক্ষণিকের জন্য অরবিন্দর মুখ নেমে এসেছিলো ওর মসৃণ শাদ।
কপালের উপর কিন্তু তক্ষুনি সংযত হয়ে মনকে শাসালো,
ছিঃ। নীল শেড়, দেওয়া টেবল-ল্যাম্পের মৃদু আলােকে
সে অনায়াসেই ঘরের সব কিছু দেখতে পায়, বালিশের তলা
হাতড়ে বের করলো আলমারির চাবি—তারপর অত্যন্ত
মৃদু পদক্ষেপে এগিয়ে এলো আলমারির কাছে।
গহনা, মায় অরবিন্দর মৃত মায়ের চিহ্ন মুক্তার কঠিটি পর্যন্ত
পুটুলি বেঁধে সে যখন আলমারি বন্ধ করে বালিশের তলায়
চাবি রাখলােতখন থরথর করে পায়ের তলাটা একটু
কেঁপে উঠলো
তার,
কিন্তু সে মাত্র একটা পলক-তার পরেই
নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লাে রাস্তায়।
তার পরের ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত। যথারীতি খোঁজ খবর
টেলিগ্রাম সমস্তই হলাে এবং অবশেষে মাধুরী ফিরে এলাে
তার পিত্রালয়ে। অনন্তবাবু এ-আঘাতের পরে খুব বেশিদিন
সমস্ত
প রি শে।
বেঁচে ছিলেন না। তাঁর মৃত্যুর পরে অন্নপূর্ণার কী গতি হ'লে
মাধুরী কোনাে খবরই নিলাে না। মাস ছয়েক পরে সিথির
সিদুর নিজের হাতে ঘষে-ঘষে তুলে শাখা নােয়া খুলে ফেলে
সে আবার মাধুরী মিত্র নাম নিয়ে কলেজে ভর্তি হল।
অমঙ্গল আশঙ্কায় তার মা আপত্তি তুলেছিলেন প্রথমে কিন্তু
ও এমন ভাবে তাকালাে মায়ের দিকে যে মা আর দ্বিতীয়
কথা বলতে সাহস পেলেন না। তারপর এই আট বছরে
যা পরিবর্তন হয়েছে তা এই যে মাধুরীর বাবা মারা গেছেন,
মাধুরী এম. এ. পাশ করেছে এবং তার বয়স হয়েছে।
ছাব্বিশ ।
ভােরের দিকে অরবিন্দর
ঘুমের
একট।
মধুর আমেজ
এসেছিলাে কিন্তু অ্যানির সরু তীক্ষ্ণ কণ্ঠের চীৎকারে তা
ভেঙে গেলাে। ভায়ে-ভয়ে উৎকর্ণ হয়ে সে ড্রেসিং গাউন
জড়িয়ে উঠে বসলো বিছানায়, মনে-মনে নিজে থেকেই
কৈফিয়ৎ প্রস্তুত হতে লাগলাে-কালকে অত রাত্তিরে
ফেরার অপরাধের। এর মধ্যেই দরজায় অ্যাানির টোকা
শুনে সে যথাসম্ভব হাসিব মুখে এনে লাফ দিয়ে দরজা
খুলে বললে, গুড মনিং।
১০।
মা। ধীর |
=
‘গুড মর্নিং, অ্যানির গম্ভীর স্বর বেরুলাে। অরবিন্দ
চেয়ার টেনে ওকে বসতে অনুরােধ করে সিগারেট ধরালো,
তারপর নিজে থেকেই বললাে, ‘কালকে বিয়ে-বাড়ি থেকে
ফিরতে বড়ই রাত হয়ে গেলো, তাই আর তােমাকে বিরক্ত
করিনি—তুমি ঘুমিয়েছিলে, তাই
‘চুপ করাে’—অরবিন্দর পক্ষে রক্ত-জল-করা সুরে আনি
বললাে--তারপর হলদে রংয়ের গাউনটা অনর্থক এপাশ থেকে
ওপাশে দু’একবার নেড়ে-চেড়ে রূঢ় স্বরে বললে, “আর কতদিন
এ-রকম ভাবে চলবে ঠিক করেছে ? তােমার সঙ্গে যখন স্বামী
ছেড়ে বেরুই তখন কি এই কথা ছিলাে? তােমরা ভারতীয়
কালাে চামড়ার মানুষ সুতরাং বিশ্বাসঘাতকতা যে তােমরা
করবেই এ বুদ্ধি তখন আমার ছিলাে না ভেবে আমি এখন
অনুতপ্ত।
‘কেন, আমি কি তােমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি?
“নিশ্চয়ই’---অ্যানি এত জোর দিয়ে কথাটি উচ্চারণ
করলে যে অরবিন্দর বুক কেঁপে উঠলাে—“আমি তােমাকে
অর্থবান ভেবেছিলাম, তুমি বােধ হয় বুঝতেই পেরেছিলে
যে তােমার রূপ আমাকে তিলমাত্র আকর্ষণ করেনি
করেছিলাে তােমার টাকা, আর তুমিও আমায় সেই প্রলােভন
১ঃ
দেখিয়েই বিয়ে করেছিলে—আশা করি সে-কথা তােমার
মনে আছে।
‘আছে।
‘তুমি লম্পট! তুমি জোচ্চোর ! তাই ভান
তােমার এতটুকু আটকায়নি। কোথায় গেলে সেই অর্থ ?
বম্বে থাকতে তবু কিছু রােজগার ছিলাে—আর এই দু’মাসে
কলকাতা এসে মাসে চার-পাঁচশাে টাকার অধপয়সা
বেশি হয় না। তাও তাে আদ্দেকের উপরে আমার নিজের
উপার্জন।
‘খরচও তত তােমারি সব। অরবিন্দ অনেক সাহস
সঞ্চয় করে কথাটা বললাে। কিন্তু উত্তরে অ্যানি এমনভাবে
তাকালে যে অরবিন্দর সমস্ত সাহস ফুংকারে নিবে গেলো :
‘আমি চাই টাকা'—অ্যানির ভদ্রতার মুখােস আর
রইলাে না-বুঝতে পেরেছে, টাকা! আমেরিকা থাকতে
ফ্যাক্টরিতে যখন কাজ করতে তখন বহু মেয়েমানুষ তােমাকে
পুষতে দেখে প্রলোভনে পড়েছিলাম, কিন্তু এখন দেখছি
মেয়ে ভাগানােই ছিলো তােমার ব্যবসা। তাছাড়া একবার
তুমি দেশে বিয়ে করে আবার আমায় বিয়ে করেছে কেন?
তােমাকে আমি জেল খাটাতে পারি, জানাে? তিরিশ হাজার
মাধবীর জন্য
---
টাকার দাবিতে আমি ডিভােস আনবব; তারপর তােমাকে
পথে-পথে ভিক্ষে করতে দেখে দেশে ফিরে যাবাে। জাননা
তাে আমি শাদা চামড়ার মেয়ে ? বলতে-বলতে অ্যানি
তার শাদা বাহু অরবিন্দর দিকে প্রসারিত করে দিলাে
‘আর দেখছো আমার রূপ-যে-কোনো যুবককে আমি একটি
ইঙ্গিতে এখনাে ঘুরিয়ে দিতে পারি। অরবিন্দ নিঃশব্দে
বসে রইলো বিছানায় একটি শব্দ আর উচ্চারণ করলো
। অ্যানি চেয়ার ছেড়ে উঠে বললো, আমি
তােমাকে বিরক্ত করতে চাই না, তবে আর একটি মাস
আমি তােমাকে সময় দিলাম-এর মধ্যে তুমি আমার
ইচ্ছেমতাে যদি ভালােভাবে চলো এবং তােমার উপার্জন
যদি বাড়ে তত ভালাে, নয়তাে আমি আর তােমার সঙ্গে
থাকবে না। অ্যানি বেরিয়ে গেলে ঘর থেকে আর অরবিন্দ
বসে রইলাে স্থাণুর মতাে।
খানিকক্ষণ পরে নেপালি বয় ট্রেতে করে তার ঘরেই
ছােটা হাজারি এনে হাজির করলাে।
‘কেন এনেছিস? অরবিন্দ রুখে উঠলো বিছানায় বসেই।
বয়টাকে একটু ঘাবড়াতে দেখা গেলাে না, মেমসাহেব
যখন বেরিয়ে গেছেন তখন আর ভাবনা কী--অরবিন্দকে
পরিশে য
সে ভয় পায় না কিন্তু ভালােবাসে—খুব ভালােবাসে কেননা
সে বুঝেছে বাইরের অরবিন্দ তার একটা খােলস মাত্র—
ভিতরের মানুষটি অত্যন্ত ভীরু, কোমল। মেমসাহেব
অরবিন্দকে যখন নির্যাতন করে তখন তার মনে
কোমরের পেটি থেকে কুরি খুলে তার শাদা বুক লাল
করে দেয়—কিন্তু তার কাপুরুষ মনিব নিঃশব্দে কুকুরের
মতাে হজম করে।
অরবিন্দর ধমকের পরেও সে চুপ করে দাড়িয়ে
রইলাে-অরবিল চায়ে চুমুক না-দেওয়া পর্যন্ত সে যাবে না।
একটু
অরবিন্দ আবার বললে,
“দাড়িয়ে
পরে
আছিস যে ?
‘চুয়া পানি ঠাণ্ডা ভৈ গয়’
‘ভৈ গয় তাে তাের কী ? তুই যা।
‘বাবু চুয়া পিও’—অত্যন্ত স্নেহের সুর বেরুলাে নেপালির
গলা থেকে। অরবিন্দর মনের মধ্যে হঠাৎ ধাক্কা লাগলাে।
দ্বিতীয় কথা না-বলে সে আস্তে চা ঢাললাে পেয়ালায়
মনে হলাে কতকাল পরে তার কোনাে প্রিয়জন কাছে
ব'সে খাওয়াচ্ছে। খেতে-খেতেই বাইরের ঘরে লােকজনের
খসখস শােনা গেলাে-বয় তাড়াতাড়ি গেলে তাদের বসাতে
১০
মাহীর এ ন্য আর অরবিন্দ এন্তে চা সেরে কাপড় চোপড় বদলাতে উঠে এলাে। অরবিন্দ যে কাজ করে সেটা একটু অভিনব। কুৎসিত মানুষ সুন্দর করা, মােটাকে বােগা করা, সােজা চুল কোঁকড়া করা—এ সমস্ত কথাই তার সাইনবাের্ডে লেখা আছে। বম্বেতে এসে সে এই ব্যবসা করে যথেষ্ট উপার্জন করেছে দু’বছরে—কিন্তু তার পরই তার বুজরুকি আর লােলাকে বিশ্বাস করতে চাইলাে না। বুদ্ধিটা অবশ্য অ্যানির, এজন্য তাকেই ধন্যবাদ দিতে হয়--আর সে সত্যি পারেও এ-সব কাজ- → চাছা, চোখ টান করা, চামড়া শাদা করা, ঠোট ধনুকের মতো করা—কিন্তু অরবিন্দর এ-সব ঠিক আসে না—তাছাড়া যে-সমস্ত কথা বললে ব্যবসাতে লােক জমানাে যায় সে-সমস্ত সে আয়ত্ত করতে শেখেনি। কতকাল আর থাকা যায় জোচ্চুরি করে—অরবিন্দ ট্রাউজসের মধ্যে শার্ট ঢােকাতে- ঢােকাতে ভাবলাে—এবার সে নিশ্চয়ই এ-সব ছেড়ে দেবে, কোনাে ইস্কুলে মাষ্টারি-বীমার দালালি—যা হােক একটা চোখ বুজে সে- চিন্তায় বাধা পড়লােবয় এসে তাড়া দিলাে বাইরে যাবার জন্য। হঠাৎ অরবিন্দর কী হলাে, নিমেষে টান ।
প রি শেষ
মেরে গা থেকে খুলে ফেললাে শার্টটা তারপর ধপ করে
বিছানায় বসে পড়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা সুরে বললে, বলে দে
আজ সাহেবের অসুখ-কাজ বন্ধ। তারপর বসে-বসেই
সে অনুভব করতে লাগলাে বাইরের ঘরের অস্পষ্ট চলা-
ফেরার শব্দ আর দু'একটা কথার টুকরাে। অনেক শিকার
গেলাে, যাকগে। অলসভাবে উঠে অরবিন্দ একটা সিগারেট
ধরিয়ে টানতে লাগলাে।
বেলা প্রায় এগারােটায় অ্যানি ফিরে এলাে কোথা
থেকে—আজকাল তার বন্ধু জুটেছে অনেক। জুটুক, অরবিন্দর
আপত্তি নেই--ও যদি কারাে সঙ্গে চলে গিয়ে তাকে
মুক্তি দিত তবে সে মাথা মুড়িয়ে গােবর খেয়ে
প্রায়শ্চিত্ত করতে পারত। কিন্তু অ্যানি যে বড় ধূর্ত।
অরবিন্দ ততক্ষণে দাড়ি কামিয়ে স্নান সেরে দরকারি
চিঠিপত্র লিখতে বসেছে—অ্যানি এসে সােজা তার ঘরেই
ঢুকলাে।
‘কেমন লােক হয়েছিলাে আজ ?
‘একজনও না
‘একজনও না! স্কাউণ্ডেল, মিথ্যে কথা বলছে।
‘মিথ্যে কথা বলাই তো আমাদের ব্যবসা-
১১
মাধবীর জন্য অ্যানির মুখ লাল হয়ে উঠলাে রাগে –‘ও সমস্ত চলবে না, যা পেয়েছে সব দাও।” ‘সত্যি কিছু পাইনি। ‘ফের মিথ্যে কথা বলছো? ‘মিথ্যে কথা কেন বলববা, ভারতীয়রা মিথ্যে কথা বলে না। “রােগ-অ্যানি ক্ষেপে গেলাে। পাছে অরবিন্দ ঠিক-ঠিক মতো সব না দেয় এজন্য খদ্দের চলে না-যাওয়া পর্যন্ত অ্যানি কক্ষনাে বেরােয় না বাড়ি থেকে আজ ক'দিন থেকে অবিশ্যি বেরুচ্ছে কিন্তু ফিরে এলে অরবিন্দ কড়ায়-ক্রান্তিতে তাকে সমস্ত দিয়ে দেয়। আজকে অরবিন্দর মতিগতি দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে গেলাে। ঝড়ের মতো সে তক্ষুনি আবার বেরিয়ে গেলাে বাড়ি থেকে। আর অরবিন্দ পরম নির্বিকার- ভাবে বসে অর্ধসমাপ্ত চিঠি শেষ ক'রে ব্যাঙ্কের বই খুলে দেখতে লাগলাে কত আছে তার হাতে। অরবিন্দর এত সাহস হলাে কী করে সে-কথা সে নিজেই বুঝলাে না —অ্যাানির সঙ্গে প্রকাশ্য ঝগড়া করে তার এ-কথা একবারও মনে হলো না। এর পরে কী হবে। চেয়ার ছেড়ে উঠে শিব, দিতে-দিতে সে সমস্ত ঘর ঘুরতে লাগলাে, আর কেমন একটা উত্তেজনায় কপালের শিরাগুলাে দপদপ করতে লাগলাে । ১৫।
পৰি শেষ সমস্ত দিন কিন্তু অ্যানি ফিরলাে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে অরবিন্দ যখন খেতে বসলো তখন অ্যানির জন্য কেমন যেন তার মমতা হ'লাে । আহা-কত দূর দেশ থেকে সুদ্ধ, এই টাকার লােভে মেয়েটা এসেছে তার সঙ্গে-সত্যিই তো আশানুরূপ সে কী পেলো? আমেরিকা থাকতে অরবিন্দ দু’হাতে উপার্জন করেছে। বাড়ি করেছিলাে, গাড়ি করেছিলাে, মন টিকলাে কই তবু? শেষের বছরটায় তার দেশে ফেরবার জন্য পাগল হতে বাকি ছিল। কোথা থেকে জুটলো এই মেয়েটা ? শেষের দিকে অরবিন্দর আর স্পৃহা ছিলাে না মদে মেয়েমানুষে—কিন্তু এই মেয়েটা আবার ভালো তাকে। কেন সে মজলাে ? অরবিন্দ কাটা-চামচে নিয়ে করতে লাগলাে প্লেটের মধ্যে। আজ ফিরে আসুক অ্যানি- অ্যানি যা চায় সব দিয়ে সে তাকে ঠাণ্ডা করে বিদায় দেবে---সমস্তই তাে প্রায় গেছে—যা আছে তাও যাক- সব যাক তারপর আবার সেই বারো বছর আগেকার অরবিন্দ। বারাে বছর আগেকার অরবিন্দ, বারাে বছর আগেকার অরবিন্দ—কথাটা বারেবারে মনের মধ্যে নাড়া- চাড়া করে ভারি ভালাে লাগলাে তার। বেলা চারটে পর্যন্ত ঘন-ঘন ঘড়ি দেখে-দেখে অরবিন্দ ১৫
মাধবী র জ স্থ
ক্লান্ত হলো তবু আনি ফিরে এলাে না। মনটা একটু
কেমন বিষন্ন লাগলাে যেন। চারটের পর সে বেরুলো।
কেন বেরুলাে, কোথায় যাবে কিছু তার মনে হলাে না।
ধরমতলা দিয়ে এসপ্লানেডে এসে সে কালিঘাটের ট্রামে
চ’ড়ে এগিয়ে এলো গড়ের মাঠের পাশ দিয়ে। ফুরফুরে
হাওয়া—অরবিন্দর সমস্ত শরীর মনে এক আশ্চর্য মুক্তির
আনন্দ। জগুবাবুর বাজারের কাছে এসে সে নেমে পড়লাে
লাফ দিয়ে, তারপর রাস্তা পার হয়ে দেবেন্দ্র ঘােষ বােড
দিয়ে সােজা এসে দাড়ালাে হরিশ মুখার্জি রােডের উপর।
ভিতরে-ভিতরে এই রাস্তাটিই যে তাকে সমস্তটা দিন
ধরে এক দুর্নিবার আকর্ষণে টেনেছে এটা সে এতক্ষণ পরে
বুঝতে পেরে হঠাৎ যেন থমকে গেলাে। নিঃশ্বাসটা কেমন
ভারি বােধ হ'লাে-স্তব্ধ হয়ে বােকার মতাে দাড়িয়ে
রইলো অনেক্ষণ—তারপর আবার ধীর পায়ে দেবেন্দ্র ঘােষ
রােড দিয়ে ফিরে এলে বড় রাস্তায়। লাল রংয়ের একটি
দোতলা বাড়ির ছবি তার মনে হ’লাে চকিতে—মনে হলাে
আট বছর আগেকার আঠারাে বছরের একটি মেয়ে। আর
তারপর সেই কালকের দেখা মাধুরী-ঐ যে ট্রাম যায়—
অরবিন্দ টপ করে উঠে পড়লাে লাফ দিয়ে কিন্তু বসতে
১৫
প সি শে ব
গিয়েই যাকে দেখলে তাকে দেখে সে আর বসতে পারলে
না—অদ্ভুত এক উত্তেজনায় কাঁপতে লাগলাে ভিতরটা
ট্রামের দরজার হাতলটা ধরে দাড়িয়ে রইলাে মূঢ়ের
মতাে।
মাধুরী কি দেখেনি
অরবিন্দকে? দেখেছে।
দেখেছে, আজও দেখছে। তাছাড়া চিনতেও তার একটি নিমেষ
ক্ষয় করতে হয়নি। কালকে দেখে তার সমস্ত রক্ত বােধ হয়
মাথায় উঠে এসেছিলাে, আর আজকে দেখেও তার কান
জ্বালা করতে লাগলাে। মনে হলাে এই মুহূতে নেমে যায়
ট্রাম থেকে। ভিতরে ভিতরে তার কেমন একটা যন্ত্রণা হতে
লাগলাে, কিন্তু অসহায়ভাবে বসে রইলাে সে চুপ করে। তার
নিজের উপর রাগ হ’লাে। কেন, কেন এই লােকটা সম্বন্ধে
সচেতনতা ? এ লােকটা তার কে? সে মাধুরী মিত্র, তার
হাতে শাখা নেই, তার কপালে সিঁদুর নেই—কখনাে তার
বিয়ে হয়নি—তবু এই লােকটার অস্তিত্বে তার এই যন্ত্রণা
কেন? উৎকণ্ঠিতভাবে সে অপেক্ষা করতে লাগলাে এলগিন
রােডের মােড়টুকুর জন্য। কী কুক্ষণে আজ সে বেরিয়েছিলাে--
এলগিন রােডে এসে পৌছতে দেরি হলাে না। মাধুরী নিঃশ্বাস
ফেলে উঠে দাড়ালো। রাস্তা ছেড়ে যথাসম্ভব সঙ্কুচিত হয়ে
মাযী । জয়
T
সরে দাড়ালো অরবিন্দ, আর অরবিন্দর ঠিক বুকের পাশ দিয়ে
নিঃশব্দে নেমে এলাে মাধুরী। অরবিন্দ আস্তে এসে মাধুরীর
পরিত্যক্ত আসনে বসে তাকিয়ে রইলাে বাইরের দিকে--আর
থেকে-থেকে শিরশির করতে লাগলাে। বুকের ভিতরটা।
বাড়ি ফিরে শুনলাে মেমসাহেব ফিরেছেন—অরবিন্দ
তক্ষুনি অ্যানির ঘরে টোকা দিয়ে ঢুকলো। দেখলাে ঘর
অন্ধকার-পুবের
দিককার খােলা জানালার আবছা
আলােয় দেখা গেলো অ্যানি একটা ইজি-চেয়ারে শুয়ে
আছে কপালে হাত রেখে। অরবিন্দ অত্যন্ত ঘনিষ্ট হয়ে
কাছে এসে বললাে, ‘অ্যানি, সমস্ত দিন তুমি কোথায়
ছিলে ?
অ্যানি জবাব দিলাে না।
‘তুমি রাগ করেছে?'—অরবিন্দর স্বভাবমধুর স্বর বেরুলো
এবার—“রাগ কোরাে না তুমি যা চাও তাই হবে। অ্যানি
এবার নড়ে-চড়ে বসলো—“তুমি সকালে আমাকে ঠকালে
কেন? কথার স্বর ভাঙা-ভাঙা--অরবিন্দর মনে হলাে অ্যানি
কেঁদেছে—আস্তে অ্যানির একখানা হাত চুম্বন করে সে
বললে, “আমি সত্যিই ঠকাইনি ভােরে আজ আমি একটি
খদ্দেরও গ্রহণ করিনি—সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
প নি শেষ
‘কেন? অ্যানির স্বর রূঢ় শােনালাে।
‘কেন আর কী—এমনি ! আমি ভেবেছি এ-রকম লােক
ঠকিয়ে উপার্জন আর করবাে না।
ও—এতদিনে বুঝি বিবেক গজালাে ? আমার ব্যবস্থা?
তুমি যে রকম চাও।
‘আমি যা চাই তা তুমি মেটাতে পারবে ?
‘চেষ্টা করবাে।
অ্যানি চুপ করে রইলো।
অরবিন্দ সস্নেহে বললে—“আমি তােমাকে সত্যিই
ঠকিয়েছি-তুমি তো রাগ করতেই পারে, তবে আমি ভেবেছি
—আমার কাছে যা-কিছু আছে সমস্ত কুড়িয়ে-কাচিয়ে হাজার
পনেরাে হয়তো হবে--দু’এক হাজার আমি রেখে সমস্তই
তােমাকে দিয়ে দেবাে-তাছাড়া এই বাড়ির আসবাবপত্র
বেচেও কিছু পাবে নিশ্চয়—সব নিয়ে তুমি দেশে ফিরে যাও,
ইচ্ছেমতো বিয়ে করে আবার সুখী হও।”
‘ওঃ, এত দয়া তােমার।
অ্যানি যেন হঠাৎ স্বপ্ন দেখে কথা ক'য়ে উঠলাে।
পরের দিন থেকে অ্যানির স্বভাব দেখে ভৃত্যমহল অবাক
হয়ে গেলাে। বিলিতি মেয়ের যতখানি ভদ্রতা জানা থাকে
১।
মাধবী। এ সমস্তই অকৃপণভাবে অরবিন্দর উপর প্রয়ােগ করলাে। রাত্রির মধ্যে যেন একটা ভােজবাজি হয়ে গেলাে। তারপর পনেরাে দিন সমানে ঘুরে-ঘুরে অরবিন্দ এক বীমার আপিশে দেড়শাে টাকা মাইনের এক কাজ পেলাে এবং আর পনেরো দিনের মধ্যে বাড়ির আসবাবপত্র বেচে শ’ পাঁচেক টাকা এবং চোদ্দ হাজার টাকা নগদ দিয়ে অ্যানিকে জাহাজে তুলে দিয়ে এসে জীবনের মতাে নিশ্চিন্ত হলাে। এবার মনে হলাে তার বৌদির কথা। দাদার মৃত্যুর খবর সে বিলেত থেকেই জানতে পেরেছিলাে, তারপরে অভাগিনী বৌদি যে কোথায় কার আশ্রয়ে কী ভাবে আছেন তা সে কিছুই জানতে পারেনি। শ্যামবাজারে বৌদির এক দাদা ছিলেন এ-কথা সে জানতো। কিন্তু এতদিন তারা সেই একই বাড়িতে আছেন কিনা এ- বিষয়ে অরবিন্দর সন্দেহ হ’লল। তবুও একদিন সন্ধেবেলা যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে সেই বাড়িতে গিয়েই উপস্থিত হ'লাে। আশ্চর্য, এখনাে দাদার সাইনবাের্ডটি ঝােলানাে আছে সামনের দরজায়। অরবিন্দ সসঙ্কোচে ভিতরে গিয়ে বে টিপতেই একটি চাকর বেরিয়ে এলাে। নগেনবাবু বাড়ি আছেন। ‘না, কত। বাইরে গেছেন।
প বি শে
অরবিন্দ বললে, নগেনবাবুর এক বিধবা বােন এখানে
থাকেন জাননা?
চাকরটি ঈষৎ চিন্তা করে বললে, “কে, বড় পিসিমা ?
আন্দাজেই অরবিন্দ বললাে, হ্যা, হ্যা, বড় পিসিমাই-যার
ছেলেপুলে নেই।
“তিনি আছেন।
অরবিন্দ হাতে স্বর্গ পেলে। এক্ষুনি তঁাকে ডাকো, বলাে
যে তার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন। আমার তাকেই
দরকার।
এমন অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে অরবিন্দ কথাটা
বললাে যে চাকরটি পর্যন্ত একটু অবাক হ’লল। যাই হােক,
ভিতরে গিয়ে সে খবর দিতেই অন্নপূর্ণাকে খানিক পরে দরজার
সামনে দেখা গেলাে । অরবিন্দ অনেকক্ষণ পর্যন্ত চোখ তুলে
তাকাতে পারলো না, তারপর এক সময় নতমুখে উঠে এসে
পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললাে, “বৌদি, আমাকে ক্ষমা
করে। অন্নপূর্ণার দু চোখ ভরে জল এলাে নতুন করে
মনে পড়লাে তার সমস্ত কথা। নিঃশব্দে তিনি অরবিন্দর
মাথায় হাত ছোঁয়ালেন।
অরবিন্দ যে কী কথা বলবে ভেবে পেলাে না। শাদা
ধবধবে থান কাপড়ে আর অলঙ্কারহীন শূন্য হাত দু’খানায়
১৫
তাকে যে কী অদ্ভুত লাগলো অরবিন্দর চোখে, অনেকক্ষণ
সে কথা বলতে পারলাে না।
অন্নপূর্ণা জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছো?
‘ভালােই। তােমার শরীর ভালাে আছে ? নগেন-দা
কোথায় ? অরবিন্দ সহজ হবার চেষ্টা করলাে।
‘দাদার তাে ঐ দাবার নেশা—তুমি দাড়িয়ে রইলে কেন ?
বােসাে। কবে এতে ?
এসেছি অনেকদিন, এতদিন তােমার কাছে আসবার মত
অবস্থায় ছিলাম না। এখন আমি একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট নিয়ে
একা আছি ধরমতলায়, তােমাকে নিয়ে যাবে বলে এলাম।
‘আমাকে ?-অন্নপূর্ণা কেমন অদ্ভুতভাবে হাসলেন, একটু
থেমে বল্লেন, যিনি তােমার কাছে থাকতে পেলে এখনাে
সংসারে বেঁচে থাকতেন তিনিই গেছেন।
“বৌদি, তুমি আমার মা, তুমি আমাকে ক্ষমা করাে।
অরবিন্দর গলা ধরে এলাে। সহসা দরজার অন্তরালে
একখানা হাসিখুশি চেহারার আভাস পাওয়া গেলো এবং
অনতিবিলম্বেই একটি মহিলা এসে সেখানে উপস্থিত হলেন।
বছর চল্লিশেক বয়স, ফর্সা ধবধবে, কপালের উপর এত বড়
সিদুরের ফোটা, আধা-ময়লা একখানা লাল পাড়ের শাড়ি
.
মা ব র জ ষ্ট
পরনে। লক্ষ্মীতে ঝলমল করতে-করতে সেখানে এগিয়ে
এলেন। “দিদি, অরবিন্দ এসেছে আমাকে বললানি যে ?
আমি গলা শুনতে পেয়েই বুঝতে পেরে ছুটে এলাম।
তারপর, অরবিন্দ, কবে এলে তুমি? আনন্দমিশ্রিত বিস্ময়ে
অপরূপভাবে হাসতে লাগলেন তিনি। “আরে বৌদি যে,
কেমন আছো?' অরবিন্দর স্বাভাবিক প্রফুল্ল স্বর আপনা
থেকেই বেরিয়ে এলো এবার নগেনদার স্ত্রীকে দেখে‘বা
তুমি দেখছি একটুও বুড়াে হওনি’—নত হয়ে সে পায়ের
নিতে এলাে। হৈমন্তী খপ করে ওর দু’হাত চেপে
ধরলেন, কয়রা কী, কয়রা কী—সাহেবমানুষ প্রণাম-ট্রনাম
করে না, এমনিতেই সুখে থাকো। কবে এলে তুমি? খবর
কী তােমার? বােসসা বােসাে-চা খাবে না? হৈমন্তী
ঠিক সেই রকমই আছেন। অরবিন্দর ভিতরটা ফুটতে
লাগলাে আনন্দে।
‘চা তাে নিশ্চয়ই খাবাে কিন্তু তার আগে তুমি বােসস।
তাে একটু-বৌদি, তুমিও বসছে না কেন?
‘না, তােমরাই বােসস। আমি বরং চায়ের ব্যবস্থা করে
আসি। অন্নপূর্ণা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
‘অরবিন্দ, তুমি আগের মতাে চায়ের সঙ্গে পেঁয়াজকুচো,
১১
শুকনাে লঙ্কা আর আলু দিয়ে চিড়েভাজা খেতে ভুলে
গেছে নিশ্চয়ই।
‘একটুও না-ভেজেই সেটা পরীক্ষা করে
আজ।”
তবে যাই আমি ভাজি গিয়ে। হৈমন্তী চেয়ার ছেড়ে
উঠলেন।
‘চলল আমিও যাই।
‘তুমি যাবে রান্নাঘরে ? না বাপু, তুমি সাহেবমানুষ,
এখানেই বসে থাকো।
অরবিন্দ মৃদু হেসে হৈমন্তীর পিছন-পিছন বাড়ির
ভিতরে এলাে। এ বাড়ি তার নখদর্পণে ।
বৌদির সঙ্গে কতবার সে এখানে এসেছে, কত জ্বালিয়েছে
এদের হল্লা করে। ছেলেমানুষের মতাে কৌতূহলী দৃষ্টি দিয়ে
সে ঘুরে-ঘুরে বাড়িটি দেখতে লাগলাে।
খানিক পরেই নগেনদা এলেন। অবাক হয়ে গেলেন
তিনি। হাসিতে গল্প গুজবে রাত দশটা পর্যন্ত কাটিয়ে
অরবিন্দ নতুন জীবন নিয়ে ফিরে এলাে বাড়িতে।
যাবার সময় অরবিন্দ অনেক সংকোচ, অনেক ভয়, অনেক
১
উৎকণ্ঠা নিয়ে গিয়েছিলাে কিন্তু সেখানে, কেউ তার সম্বন্ধে একটি কথা জিজ্ঞাসা করলো না এবং যে-নামটির আদ্যাক্ষর উচ্চারণ করলেও তার হৃৎকম্প হ'তে সেই মাধুরীর সম্বন্ধেও কেউ সেখানে টু শব্দ করলাে না। তাঁদের এই কৌতূহলহীন সভ্য মনের পরিচয়ে অরবিন্দ কৃতজ্ঞ হয়ে উঠলাে। এটুকু সে বুঝলাে যে এর মধ্যে বৌদির ইঙ্গিত রয়েছে। বৌদির চিরসংযমী স্বভাবের কাছে বহুবারের মতাে আবার নতুন করে সে মাথা নােয়ালাে। অরবিন্দর-যে চাকরি তাতে ছুটির বালাই নেই। সাড়ে ন’টায় প্যান্টের উপর কোট চাপাতে-চাপাতে ছােটে আর ফেরে আলাে জ্বললে। সেই নেপালি চাকর পহালমন আছে তার সঙ্গে। সেবায় যত্নে সে তাকে আগলে রাখে মায়ের মতো। ফিরে এলে দেরির জন্য অনুযােগ করে আর শরীরের দিকে নজর দিতে উপদেশ দেয়। রবিবার ভােরে উঠেই অরবিন্দ বললে, “এই পহলমন, আজ আমার বৌদি আসবে, তুই ঘর- উরুগুলাে কিন্তু সুন্দর করে সাজিয়ে রাখবি।' পলমনের ফোলা-ফোলা নেপালি চোখ ছােটো হয়ে এলাে ।বিস্ময়ে, ‘কিক। বহু ? আপকো ? আপকো সুহাসিনী ? ১৩
মা ও বী। এ
অরবিন্দ হেয়ে ফেললো, “আরে বহু নয়, বৌদি-বড়
ভাইকা সুহাসিনী-ব্যাটা জংলি, এতদিন বাংলা মুলুকে
আছিস বাংলা জানিস না।
‘হামি?'—পহালমনের দাত বেরিয়ে গেলো এবার—‘হামি
তাে বাংলাই : সালে সরবদা। মাইজি কব, আয়গা বাবু?
‘আজই! এক্ষুনি আমি তাকে আনতে যাচ্ছি—কাপড়
চোপড় ঠিক করে দে।'
‘লােপহলমন লাফাতে-লাফাতে বেরিয়ে গেলাে
ঘর থেকে।
আটটা বাজতেই অরবিন্দ গিয়ে হাজির হলাে নগেনদার
বাড়ি। নগেনদা তখন দ্বিতীয় প্রস্থ চায়ে মশল।
আরে
এসাে এসাে-কোথায় গেলে-ডাকে। ना তোমার
বৌদিকে নগেনদা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
‘আপনি বসুন না, আমি নিয়ে আসছি ডেকে। কিন্তু
ভাকতে হলো না, তিনি গলা পেয়ে নিজে থেকেই এলেন—
‘বাববা, চমৎকার মানুষ ভাই তুমি—'এসেই তিনি অরবিন্দকে
অনুযােগ করলেন—সেই গেছে বুধবার রাত্তিরে আর এলে
রােববার সকালে, এর মধ্যে আর তােমার অবসর হলাে না
==
নাকি ?
অরবিন্দর বৌদিও এলেন, এতদিন আমােনি কেন?
মৃদুকণ্ঠে তিনি বললেন।
‘আমার অবসর কোথায় ? কী গােলামি আমি করি
তা তুমি নিজের চোখেই দেখবে’খন, এই তো রােববারটুকু
যা ছুটি। তারপর নগেনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললে,
নগেনদা, আমি কিন্তু আজ বৌদিকে নিয়ে যেতে এসেছি।
নগেনবাবুর মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলাে। তুমি কি পাগল,
অরবিন্দ ?
‘কেন, এতে পাগলামির কী রয়েছে ?
‘তা তাে তােমার নিজেরই বােঝা উচিত। নগেনবাবু
চায়ের পেয়ালায় মুখ ডােবালেন, আর অরবিন্দর কান
গরম হয়ে উঠলাে—ইঙ্গিত বুঝে। সহসা জবাব দিতে
পারলাে না। সেদিন রাত্রের ব্যবহারে তার মনে একটা
সূক্ষ্ম আশা বাসা বেঁধেছিলাে, সে যে মেম নিয়ে এসেছে এটা
বােধ হয় এরা কেউ জানেন না। ওঁরা যে সেদিন চেপে
ছিলেন সে কথা ভেবে সে ভিতরে-ভিতরে ঘেমে উঠলো।
‘আমি অনেক অন্যায় করেছি—কিন্তু তাই বলে বৌদির কাছেও
কি ক্ষমা নেই নগেনদা ?'—কথাটা সে সহজভাবেই বলতে
চেয়েছিলাে কিন্তু কী-রকম করুণ শােনালাে।
অন্নপূর্ণা চুপ করে বসেছিলেন, অরবিন্দর দিকে তাকিয়ে
তাঁর চোখে জল এলাে। ক্ষমা আবার কী ভাই, তুমি যে
সত্যিই ফিরে এসেছে নিজের ঘরে, তা আমি তােমার চোখ
দেখেই বুঝেছি। কিন্তু তুমি তাে জানাে বিধবা মানুষের
‘বিধবার সমস্ত নিয়ম তুমি পালন করতে পারবে, বৌদি
সেখানে আমি একা,'—অরবিন্দ অন্নপূর্ণার মুখ থেকে যেন
কথাটা কেড়ে নিয়ে বলতে লাগলাে, বিশ্বাস করাে, সেখানে
আমি একা। পরিপূর্ণ শান্তির সঙ্গে সে এ-কথা উচ্চারণ
করলে যে সে একা।
তবে যে শুনলাম'—নগেনদা অর্ধেক বলেই হৈমন্তী ও
অন্নপূর্ণার দিকে তার বিস্মিত দৃষ্টি মেলে দিলেন।
“ঠিকই শুনেছিলেন, কিন্তু সে-সব বালাই আর নেই এখন।
নগেনদা কথাটা বিশ্বাস করলেন এবং শেষ পর্যন্ত অরবিন্দর
আগ্রহকে আর উপেক্ষা করতে পারলেন না।
অন্নপূর্ণা স্বামীর মৃত্যুর পরেই ভাইয়ের বাড়ি চলে এসে-
ছিলেন—টাকা-পয়সা অনন্তবাবু কিছুই রেখে যেতে পারেননি
-একা অরবিন্দই তাকে সর্বস্বান্ত করেছিলাে—তবু মৃত্যুর
পরে বিশ হাজার টাকার একটি লাইফ-ইনশিওরেন্স পাওয়া
১০
পরি শেষ
গেলাে। নগেনবাবু সমস্ত টাকা অন্নপূর্ণার নামে ব্যাঙ্কে জমা
রেখেছিলেন। অরবিন্দর কাছে আসবার দিন পাঁচেক পরে
অরবিন্দ যখন শুতে যাবে অন্নপূর্ণা তাকে ডেকে বল্লেন,
‘অরবিন্দ—টাকা ক’টা বরং তােমার নামেই বদলে রাখাে।
‘ক্ষেপেছো?'—অরবিন্দ সাত হাত পিছিয়ে গেলো—
এততেও তােমাদের শিক্ষা হয়নি নাকি? ওসব ঝামেলা
আমি আর নেবে না কিছুতে।
অন্নপূর্ণা তাকে নিজের বিছানার প্রান্ত দেখিয়ে বললেন,
‘বােসস একটু কথা আছে তােমার সঙ্গে। অরবিন্দ পা
ঝুলিয়ে বসতেই তিনি বললেন, ‘তােমাকে যখন ভয় ছিলাে
তখন সে-ভয় কাটাবার জন্যেই একটা গুরুতর অন্যায়
করেছিলাম, এখন আর ভয় নেই, টাকাটা তােমার কাছেই
রাখখা, আর আমার একটা শেষ অনুরােধ যে মাধুরীর একটু
খোঁজ নাও। মেয়েটার সর্বনাশের জন্যে আমরাই দায়ী
তােমার দাদার আত্মা শান্তি পাবে না নয়ত। অন্নপূর্ণার
গলা ধরে এলােকেশে নিয়ে বললেন, 'যদি তুমি অনুমতি
দাও আমি নিজে যাই তাকে আনতে।
“সে কি আসবে? অরবিন্দর জবাবটা বিষন্ন শােনালাে।
‘আসবে না? বলল কি—হিদুর মেয়ে, স্বামী ডাকলে কি না
১০
এসে পারে। আর তা ছাড়া ওরা আছেও ভারি কষ্টে।
হরিশ মুখার্জী রােডের অত বড় বাড়ীটা মৃত্যুঞ্জয় মিত্র মারা
যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই নাকি বিক্রী হয়ে গেছে। এতটুকু একটু
নিচতলার অংশ নিয়ে ওরা আছে। দাদার কাছে শুনলাম
ভদ্রলােক ব্যবসায়ে যেমনি উঠেছিলেন—প’ড়েও গেছেন
তেমনি ধাঁ করে। মাধুরী বােধ হয় চাকরি করে।
‘কিন্তু আমার মনে হয়'—অরবিন্দ পরিপূর্ণ বিশ্বাসে মাথা
নেড়ে বললাে, “ওখানে গেলে তুমি অপমানিত হয়ে
আসবে।
‘পাগল! অন্নপূর্ণা অবিশ্বাসের হাসি হাসলেন। আর
সত্যি-সত্যি নগেনবাবুকে খবর দিয়ে আনিয়ে একদিন
তিনি মাধুরীদের বাড়ি গিয়ে হাজির হলেন। মনে-মনে
তাঁরও যে দ্বিধা না ছিলাে তা নয়—কেননা মাধুরী যে
তাদের সম্পর্ক একেবারেই অস্বীকার করেছে একথা তিনি
লােক-পরম্পরায় শুনেছিলেন কিন্তু মনের সে-দ্বিধাকে তিনি
আমল দিলেন না। হাজার হােক, স্বামীর ডাক তাে।
অরবিন্দ আপিশে গিয়েছিলাে, সে কিছুই জানতো না। বাড়ি
ফিরে সে বৌদির ঘরে গিয়ে দেখলো যে তিনি অতিশয় বিষন্ন
মুখে গালে হাত রেখে বসে আছেন বিছানায় ।
विनर
‘এ কী বৌদি, তুমি বিছানায় বসে আছে যে সন্ধেবেলা?
অন্নপূর্ণা চোখ তুলে তাকালেন, জবাব দিলেন না ।
কী হয়েছে তােমার ?
‘সেখানে গিয়েছিলাম।
‘সেখানে?—বলেই অরবিন্দ কথাটা বুঝতে পেরে চুপ
করে গেলাে।
‘তােমার কথাই ঠিক অরবিন্দ—মাধুরী আমাদের
অস্বীকার করেছে।
‘তাই তাে উচিত'—অরবিন্দ গলার স্বরে ফাজলেমির
ভাব আনবার চেষ্টা করলো।
‘কেন—উচিত বললে কেন?
‘বাঃ, উচিত বলবাে না—ওর সঙ্গে আমাদের আর
সম্পর্কটা হলো কবে ?
‘কেন, তুমি কি তাকে নারায়ণ সাক্ষী করে বিয়ে
করনি ?
‘বিয়ে করলেই কি পতিদেবতা হয়ে বসা যায় নাকি,
বৌদি? তােমাদের যুগ আর নেই।
‘আমাদের যুগ না-থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাে
সধবা মেয়ে আর কুমারী হয়ে যেতে পারে না।
মাধবী জ
‘হিন্দু বিবাহে যে ডিভােস নেই—এটা একটা মস্ত খুত
তা নইলে সে-বেচারা এতদিনে দিব্যি বিয়ে করে সুখী হতে
পারতাে।
কে জানে বিয়েই হয়তো করবার জন্য কুমারী সেজেছে-
তােমাকে বলবাে কী অরু-সিথিতে পর্যন্ত এক ছিটে সিদুর
রাখেনি মেয়েটা। আমাকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে
রইলাে, তারপর মাকে ডেকে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। অরবিন্দ
এবার বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালেও যদি বিয়ে করে,
বৌদি, আমি কিন্তু একটুও বাধা দেবাে না।’--ব’লে সে বেরিয়ে
এলো ঘর থেকে ।
পরের দিন সন্ধেবেলা আপিশ থেকে ফিরেই হাতমুখ ধুয়ে
আবার পরিপাটি করে পােষাক পরতে বসলো অরবিন্দ।
‘এ কী, এক্ষুনি আবার যাচ্ছে কোথায় ?
ধুতির কেঁচাটা বার দুই মুড়ে অরবিন্দ মুখ তুলে বললাে,
‘মনেই ছিলাে না—একটা নেমন্তন্ন রয়েছে যে আজ পাঁচটার
সময়-বাজলাে তাে প্রায় ছ'টা।
‘চায়ের ?
।
‘কোথায় ?
পৰি শে ২
‘বালিগঞ্জে।
অরবিন্দ দ্রুত হাতে চুলে দু’বার বুরুশ বুলিয়ে বেরিয়ে
গেলাে। রাস্তায় বেরিয়েই সে সর্বপ্রথম দু'খিলি পান কিনে
গালে পুরলাে—এটা তার অভ্যেস। বিকেলের দিকে সে
প্রায়ই বেরােয় না, আপিশ থেকে ফিরতেই তাে রাত হয়ে
যায়, কতকাল যে বিকেল দেখে না তার ঠিক নেই। ভারি
ভালাে লাগলো তার। বিলিতি গানের কলি আওড়াতে-
আওড়াতে সে হেঁটে এগুতে লাগলাে। কিন্তু এখন তাে তার
দেরি করবার সময় নেই, যেতে হবে সেই বালিগঞ্জে। আচ্ছা,
বাস্-এ গেলে হয় না? অরবিন্দর মন সায় দিলাে না। ছােঃ,
বাস্-এ চড়ে নষ্ট করবে নাকি এই অমূল্য বিকেলটি—ট্রামে
গড়ের মাঠের পাশ দিয়ে—ভাবতেই কী আরাম। অরবিন্দ
ট্রামে উঠে বসে সিগারেট ধরালাে।
সুপ্রকাশের সঙ্গে অরবিন্দর লণ্ডনেই প্রথম আলাপ।
ছিপছিপে সুন্দর এক ছােকরা—দেখলেই ভালাে লাগে।
বাপ বিহারের মস্ত উকিল—বিস্তর টাকা—নানা দিক থেকেই
অরবিন্দর ওর সঙ্গে ভাব জমাবার একটা তীব্র ইচ্ছা হয়েছিলাে,
আর বন্ধুতা গভীর হতেও সময় লাগেনি বেশি। কিন্তু
মাধবী ও
এই বছর পাঁচেক যাবত তাদের আর দেখাশােনা হয়নি।
হঠাৎ কর্পোরেশন স্ট্রীটে পরশু দিন দেখা হয়ে গেলো।
অরবিন্দ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাে ওকে দেখে।
‘এ কী! তুমি ?
‘আরে অরবিন্দ যে’—পিঠে চাপড় খেয়ে পিছন ফিরে
সুপ্রকাশ অবাক হয়ে গেলােকবে ফিরলে তুমি ?
‘এই তত বছর আড়াই, কী আশ্চর্য—তুমি কলকাতায়
আছছ অথচ এই প্রথম দেখা হলাে। কী করছাে তুমি,
কোথায় আছে?
‘আছি বালিগঞ্জে, করি কলেজের রাখালি।-সুপ্রকাশ
মিষ্টি করে হাসলাে‘আর তুমি ?
‘আমার আর খবর !’-অরবিন্দও হাসলাে।
সুপ্রকাশ আন্তরিকভাবে বললে, ‘আমার বাড়িতে
চলো না।
‘আজ? এখন ? ঈষৎ চিন্তা করে অরবিন্দ বললে, না,
আজ যাবে না বরং অন্য একদিন—তােমার ঠিকানা কী ?
সুপ্রকাশ শুধু ঠিকানাই দিলাে না, বাঁ হাতের তেলােতে
ডান হাতের নখ দিয়ে ছবি একে একে বােঝাতে লাগলো।
বাড়িটা ঠিক কোথায়।
১২
প বিশেষ
‘বিয়ে করেছ? অরবিন্দ জিজ্ঞাসা করলাে।
মধুর হাসিতে সুপ্রকাশের মুখ ভরে গেলাে‘ভেবেছিলাম
ও-হাঙ্গামায় আর কাজ নেই কিন্তু সম্প্রতি মনে হচ্ছে বিয়ে
ব্যাপারটা তত খারাপ নয়—যত খারাপ বলে অন্তত আমার
ধারণা ছিলাে।
‘কেন বলল তাে?—অরবিন্দ প্রচণ্ড এক ঝাঁকানি দিয়ে
বললে, “নিশ্চয়ই প্রেমে পড়েছে।
উঃ, লাগে-
“তবে বলল। শিগগির—তিনি কোন ভাগ্যবতী যিনি
শিবের তপস্যায় বাধা দিলেন।
‘তিনি ভাগ্যবতী কিনা জানি না—তবে আমি যে
ভাগ্যবান হবে তাকে পেলে এ-কথা নিঃসংশয়েই মনে করতে
পারাে।
“তাই নাকি? তবে তামার এঞ্জেলটিকে একদিন দেখাও
।”
‘বেশ তােপ আমার বােনের জন্মদিন—উনিও
আসবেন, তুমিও যেয়াে।আর শােনন-এ-সব নিয়ে কিন্তু
কোনাে ইঙ্গিত কোরাে না।
‘কেন ?
১৭
মামীর গ ‘পাগল ! এটা একান্তই আমার নিজের মনের কথা। ‘ভালাে! ভালাে।'—অরবিন্দ বেপরােয়াভাবে খানিকক্ষণ ওর পিঠ চাপড়িয়ে বিদায় নিলাে। একদল প্রায় সাড়ে-সাতটার সময় অরবিন্দ গিয়ে সুপ্রকাশের ওখানে পৌছলাে। সুন্দর একতলা বাড়ি—সামনে সবুজ কম্পাউণ্ড, গেট থেকে লাল সুরকির প্রশস্ত রাস্তা গােল হয়ে বেঁকে গিয়ে গাড়ি-বারান্দায় ঠেকেছে। বাড়িটি দেখা গেলাে ঝকঝক করছে আলােতে, অরবিন একটু ইতস্তত করে আবার নম্বরটা মিলিয়ে ঢুকে পড়লাে বাড়ির মধ্যে । অতিথি বােধ হয় ফিরে যাচ্ছিলেন-সুপ্রকাশ আর উনিশ- কুড়ি বছরের একটি মেয়েকে দেখা গেলাে বিদায়সূচক নানারকম ভদ্রতা করে তাদের বিদায় দিচ্ছে। গাড়িটা হেডলাইট আলিয়ে তার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো বেঁ করে— সঙ্গে সঙ্গেই সুপ্রকাশের আন্তরিক কণ্ঠস্বর শােনা গেলাে, 'এই যে অরবিন্দ। অবশেষে এলে তাহলে ??—সুপ্রকাশ দ্রুত এগিয়ে এলাে—এই যে আমার বােন সুমিত্রা-এর উপ- লক্ষ্যেই আজ অরবিন্দ যুক্তকরে। অভিবাদন জানালো। সুমিত্রা হেসে বললে, “আসুন।' সুমিত্রা একটু এগিয়ে যেতেই ১৭৪
পরি শেষ
সুপ্রকাশ অনুচ্চারিত স্বরে বললে, “তুমি একটা সিলি—
‘এত দেরিতে এলে যে কারাে সঙ্গেই তােমার দেখা হলাে
। আমার এঞ্জেলটিও তো পালাবার উপক্রম করেছিলেন,
নানা অছিলায় ধরে রেখেছি।
‘তা হলেই যথেষ্ট।
অরবিন্দকে নিয়ে সুপ্রকাশ ড্রয়িংরুমে ঢুকলাে। ঘর প্রায়
শূন্য। এখানে-ওখানে দু’চার জন স্ত্রীপুরুষের স্বল্পতম ভিড়
কিন্তু জানালার দিকের সেটি-তে যে-মেয়েটির পাশে গিয়ে
সুমিত্রা দাড়ালো এবং তাকে বসবার অনুরােধ জানালে
তাকে দেখে অরবিন্দর হৃৎপিণ্ডটা ধ্বক করে উঠলাে। সুমিত্রা
মাধুরীর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলাে বটে কিন্তু অরবিন্দর
গলা দিয়ে একটি কথাও বেরুলাে না আর মাধুরী বিবর্ণ মুখে
সেটি-র কোণে বসে ঘামতে লাগলাে দৈবের নিষ্ঠুরতা স্মরণ
সুমিত্রা উঠে গিয়ে চা নিয়ে ফিরে এলাে। অরবিন্দ
দু’চারবার কেশে চেষ্টা করলাে আলাপ জমাতে—কিন্তুবারে-
বারেই ব্যর্থ হয়ে চুপ করে গেলাে। সুপ্রকাশ এলাে ভিতর
১৭
মাধবী। এ
থেকে, “আরে অরবিন্দ, তুমি যে একেবারে ভদ্রলােক হয়ে
আছছ। কথাটথা বলো।
অরবিন্দ যেন খেই পেলো সুপ্রকাশকে দেখে, কোথায়
গিয়েছিলে তুমি ?
“এই তো এদিকে’-মাধুরীর দিকে তাকিয়ে বললাে-এর
সঙ্গে আপনি আলাপ করুন, দেখবেন অদ্ভুত আমুদে মানুষ
আমার বন্ধুটি ।
মাধুরী অতি কষ্টে একটু হাসলো এবং একটু
পরেই বললে,
‘আমার এবার যাওয়া
সুপ্রকাশবাবু।
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, আমি নিজে গিয়েই তাে আপনাকে
পৌছিয়ে দিয়ে আসবাে কথা দিয়েছি। একটু অপেক্ষা করুন
দয়া করে। দাসেদের পৌছিয়ে দিয়ে এক্ষুনি ফিরে আসবে
আমার গাড়ি।
‘গাড়ির দরকার কী, আমি স্বচ্ছন্দে ট্রামে চলে যেতে
পারবাে।'
না, সে কী হয়। একটু বসুন দয়া করে।
‘এত ব্যস্ত হয়েছিস কেন, বােস্ না আর-একটু’—বলে
সুমিত্রা বসে পড়লাে তার পাশে। অরবিন্দর দিকে তাকিয়ে
১
विल
বললে, ‘মিঃ দত্ত, ইনি আমার সহপাঠিনী ছিলেন, এখন
সহকর্মিণী।
অরবিন্দ বােকার মতাে হাসলাে।
‘কিছুই খাচ্ছেন না আপনি’—সুমিত্রা আবার অনুযােগ
করলাে ।
“না, না, খাচ্ছি বইকি–খাওয়া বিষয়ে আমি একান্ত
নিলজ্জ। বলতে-বলতে সে হঠাৎ তাকালে মাধুরীর দিকে।
মাধুরী নিমেযে চোখ নামিয়ে ফেললাে তার মুখ থেকে
এবং পরমুহূর্তে ই সােজা দাড়িয়ে বললে, না ভাই, আমার
আর দেরি করা চলে না—আমি ট্রামেই যাই।
“আর-একটু, আর-একটু’—সুপ্রকাশ অনুনয়
বললাে।
সুমিত্রা মৃদু হেসে বললে, তুমি আজকে আমাদের মাননীয়
অতিথি, তােমাকে পেীছিয়ে দেবার সম্মানটুকু অন্তত
আমাদের দাও।”
মাধুরী নিরুপায়ভাবে চুপ করে বসে পড়লো। আর
অরবিন্দ তক্ষুনি চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললে, “সুপ্রকাশ,
আমিও কিন্তু ভাই আর বসবাে না আজমিস্ কর, অত্যন্ত
দুঃখিত যে আপনার জীবনের এই শুভ-দিনটিতে আসতে পাবার
১৭
মাখার মত
সৌভাগ্য লাভ করেও আমি আরাে খানিকক্ষণ আপনাদের
সুমধুর সাহচর্য লাভ করতে পারলুম না’বলতে-বলতে
অরবিন্দ উঠে দাড়ালাে--‘অত্যন্ত অভদ্রতা, অত্যন্ত অসভ্যতা
হচ্ছে বুঝেও আমি নিরুপায় হয়েই আপনাদের কাছে বিদায়
নিতে বাধ্য হলাম হাতের ঘড়ির দিকে ব্যস্তভাবে চোখ
বুলিয়ে—“নিশ্চয়ই আমাকে মার্জনা করবেন।
‘ও কী, এই তাে এলে’, সুপ্রকাশ অবাক হয়ে তার দিকে
তাকালাে, সঙ্গে সঙ্গে মােটরের হন বাজলাে গাড়ি-বারান্দায়।
উকৰ্ণ হ'য়ে সুপ্রকাশ এগিয়ে এলাে একবার দরজার
সামনে—তারপরেই ফিরে এসে বললে, “আচ্ছা, চলাে।
‘আমি—আমি কেন
“নাও নাও, আর ভদ্রতা করতে হবে না, সুপ্রকাশ তাকে
ঠেলে এনে গাড়িতে ঢুকিয়ে দিলাে-মাধুরীও এগিয়ে এলাে
নিঃশব্দে। ‘আপনাকে অনেক কষ্ট দিলাম মিস মিত্র,
সুপ্রকাশ ভদ্রতা জানাতে-জানাতে ড্রাইভারকে নামিয়ে
নিজেই ড্রাইভ করতে বসলাে সামনে। ভিতরে মাধুরী আর
অরবিন্দ অন্ধকারে পরস্পর পরস্পরের অস্তিত্বে নির্বাক হয়ে
বসে রইলাে।
গাড়ি রাসবিহারী এভিনিউ পার হয়ে যখন রস রােডে
পৰি শৰ এসে পৌছলে, অরবিন্দ অত্যন্ত আস্তে, প্রায় কানে-কানে বলার মতাে করে ডাকলাে, মাধুরী। মাধুরী কাঠ হয়ে গেলাে অরবিন্দের ডাক শুনে। আমি বলছিলাম কী-- অরবিন্দ বিপন্নের মতাে বললাে, আমাকে তুমি ভুল বুঝাে না, কালকে যে বৌদি গিয়েছিলেন তােমাদের ওখানে সে-কথা আমি জানতাম না। মাধুরী নিঃস্পন্দ। অরবিন্দ-যাতে শােনা না যায় এ-ভাবে সুপ্রকাশের দিকে লক্ষ্য রেখে বললাে, “তােমাদের এনগেজমেন্টের কথা শুনলাম- ‘এনগেজমেন্ট।'—মাধুরীর গলা চিরে শব্দ বেরুলাে। ‘কী হলাে? সুপ্রকাশ চালাতে-চালাতে মুখ ফেরালে। সে কথাটা শুনতে পায়নি, কিন্তু অদ্ভুত ভাঙা আওয়াজটা শুনেছিলাে। ‘কিছু না, ধন্যবাদ, মাধুরী হাসি টেনে বললে। অরবিন্দ একটু অপেক্ষা করে আবার নিচু স্বরে বললে, ‘হ্যা, এনগেজমেন্ট না হয়ে গেলেও তােমরা উভয়ে যে বিবাহে ইচ্ছুক এ-কথা আমি শুনেছি। তুমি একটুও দ্বিধা কোরাে না, মাধুরী। আইনত বলপ্রয়ােগ করে তােমার উপর আমি দাবি
জানাতে পারি, কিন্তু আমাকে ততটা বর্বর যদি মনে করে।
তাহলে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। এতটুকু কেলেঙ্কারিও আমি
করবে না এই নিয়ে। তােমার বিয়েতে আমি সত্যি সুখী
হবাে, বিশ্বাস কোরাে।' অরবিন্দ
চুপ করলাে।
মাধুরী
কিছুই বুঝতে পারলাে না ওর কথার তাৎপর্য। বিবাহের
কথাটা ইনি কোথা থেকে সংগ্রহ করলেন? একবার বিবাহ
করেই কি তার যথেষ্ট শিক্ষা হয়নি? দু’বার তার ঠোট
নড়লাে অরবিন্দকে কোনাে কথা বলবার জন্য, কিন্তু বলা
হলাে না।
মাধুরীর বাড়ির দরজায় গাড়ি এসে থামতেই সুপ্রকাশ,
নেমে দরজা খুলে দিয়ে হেসে বললে, ‘নিন, এইবার আপনার
শান্তি।
‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। মাধুরী একটু ভদ্রতা
করেই জিায় জানালাে। সুপ্রকাশ আবার গাড়ি ছােটালাে
অরবিন্দর বাড়িত্ব দিকে।
বাড়ি ফিরে অরবিন্দর যে কী হ’লল, ভালাে করে খেতে
পারলাে না, ঘুমুতেও পারলাে না রাত্তিরে। তিন দিন পরে
আপিশে গিয়ে পুরু এক খামে মাধুরীর লেখা এইটুকু এক
চিঠি পেলাে।
निल
মাননীয়েষু-আপনি যা শুনেছেন তা যে একান্তই মিথ্যে
কথা তা জানাবার জন্যই আমাকে আজ এই চিঠিখানা
লিখতে হলাে।
মাধুরী মিত্র।
অরবিন্দ একবার, দু'বার, তিনবার, বােধ হয় লক্ষবার ঐ
কথা কয়টি পড়লে তারপর চিঠিখানা অতিশয় সযত্নে ভাঁজ
করে বুক-পকেটে রেখে কাজে মন লাগাবার চেষ্টা করলাে।
আপিশের মধ্যে দশটা থেকে ছ'টা পর্যন্ত সময় যে তার কী
ক'রে কেটেছিলাে তা সে নিজেও জানে না—এক সময়।
প্রকৃতিস্থ হয়ে নিজেকে সে মাধুরীদের হরিশ মুখার্জি রােডের
দরজার কড়া নাড়তে দেখে অবাক হয়ে গেলাে। ঘন-ঘন
পকেট থেকে রুমাল বার ক'রে কপাল মুছলাে, ঘাড় মুছলাে
এবং ব্যাকুল-ভাবে মাথার চুলের মধ্যে দিশাহারা হয়ে
আঙুল চালাতে লাগলাে।
দরজা খুলে দিয়ে অরবিন্দকে দেখে মাধুরী একেবারে
স্তম্ভিত হয়ে গেলাে। মিনিটখানেক নিঃশব্দে দাড়িয়ে থেকে
বললে, “কাকে চান ?
‘তােমার মা বাড়ি নেই, মাধুরী ? অরবিন্দ ক্ষীণ গলায়
বললাে।
১)
‘এ’-একটু চুপ করে থেকে অরবিন্দ বললে, “তার স
দেখা হয় না?
‘না’–একটু থেমে--কথা থাকলে আমাকেও ব’
যেতে পারেন।
‘রাস্তায় দাড়িয়ে বলবো? হঠাৎ যেন সহজ সুর ফি
এলাে অরবিন্দর গলায়। অনুমতির অপেক্ষা না-করে
ঘরে এসে বসলাে সে। আমাকে যদি অস্বীকারই করা
পারাে, মাধুরী, তবে আচরণটা একটু ভদ্রভাবে করাই তে
উচিত।
মাধুরী নতমুখে দাড়িয়ে রইলো দেয়াল ঘেষে।
‘বােসােনা, বাঃ—তারপর একান্ত স্বাভাবিক হ’র
বললাে, ‘শােননা, সত্যি বলতে তােমার মার সঙ্গে আমার কিন্তু
একটুও দরকার নেই—আর আমি যে এখানে কেন এসেছি
কার কাছে এসেছি তাও বলা শক্ত। আপিশ শেষ করেই
কালিঘাটের ট্র্যামের ভিড়ে বাদুড়ের মত ঝুলতে-ঝুলতে
চলে এলাম। এক গ্লাশ জল খাওয়াবে?
‘চা খাবেন?—মাধুরীর মৃতের মতাে রক্তহীন ঠোট ফাক,
হয়ে কথা বেরুলাে।
১৮
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.