Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Manastoshini Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মানসতােষিণী ।
(কয়েকটি কবিতা।)
“মলঃ কবিযশঃপ্রার্থী গমিষ্যাম্পহাস্য
প্রাংশুসভ্যে ফলে লােভাদু
* *
হেমচন্দ্র নাগ কর্তৃক
প্রণীত ও প্রকাশিত।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
কলিকাতা,
৩ নং শম্ভুচন্দ্র চাটুৰ্যের ধ্রুটসখী-লে
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ নন্দী কর্তৃক মুদ্রিত।
শকাব্দ। ১৮২৪ অগ্রহায়ণ।
মূল্য ॥ আনা }
No text on this page.
উৎসর্গ পত্র।
শ্ৰীযুক্ত বাবু রমানাথ মান্না
মহাশয় সুহৃদ্বরেষু।
প্রিয়বর,
এ জীবনে তােমার ঋণ পরিশােধ করিতে পারি,
এ আশা আমার নাই। কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ অদ্য
এই কাব্যখানি তােমার কর-কমলে অর্পণ করিলাম।
কোন গুণ না থাকিলেও ইহা যে তােমার আদরের বস্তু
হইবে, তাহা বলা বাহুল্য মাত্র।
জুজারসাহা,
তােমারই
জেলা হাওড়া।
হেম
No text on this page.
নিবেদন। ; যখন অভাগ-বিলাপ কাব্য প্রকাশ করি, মনে করিয়াছিলাম এই আমার প্রথম ও শেষ উদ্যম; কারণ বাল্যকাল হইতেই সাংসারিক নানারূপ চিন্তা এবং শারীরিক অসুস্থতা আমাকে অতিশয় ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলে। অবসর ক্রমে আমি কয়েকটি কবিতা লিখি। আমার কতিপয় সুহৃদ কবিতাগুলি পাঠে সন্তোষ প্রকাশ করিয়া পুস্তকাকারে মুদ্রিত করিতে আমাকে অনুরােধ করেন; কিন্তু নানা কারণে তাহা ঘটিয়া উঠে নাই। অন্য তাঁহাদের বিনােদনার্থে পাঠক পাঠিকার সহৃদয়তার উপর নির্ভর করিয়া আমি পুনরায় সাহিত্য-ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলাম। বাঙ্গালা ভাষার উত্তরােত্তর সমাদর বৃদ্ধিও ইহার অন্যতর কারণ। এক্ষণে কাব্যখানি পাঠে সাধারণে প্রীত কি বিরক্ত হইবেন তাহা তাহারাই বলিতে পারেন। তবে এতদ্বারা যদি কাহারও তৃপ্তি সাধন হয় তাহা হইলে সমস্ত শ্রম সফল জ্ঞান করিব। পরিশেষে সকৃতজ্ঞ হৃদয়ে স্বীকার করিতেছি যে আমার পরম বন্ধু মৌলভি মহম্মদ খােরশেদ সাহেবের যত্নে ও উৎসাহে এই পুস্তকখানি প্রকাশিত হইল। নিবেদন ইতি—১৪ই আষাঢ়, সন ১২৯৭ সাল। জুজারসাহা, হেমচন্দ্র নাগ জেলা হাওড়া ।
দ্বিতীয়বারের বিজ্ঞাপন ।
প্রথমবারের প্রকাশিত পুস্তকগুলি নিঃশেষিত হওয়ায়,
কতিপয় সুহৃদের একান্ত যত্নে কাব্যখানি বিশেষরূপে সংশােধিত
এবং পরিবর্তিত হইয়া পুনরায় প্রকাশিত হইল।. এবার কয়েকটা
নূতন কবিতাও ইহার মধ্যে সন্নিবিষ্ট করা হইয়াছে। এক্ষণে
কাব্যখানি পাঠে যদি কেহ প্রীতিলাভ করেন তাহা হইলে
সমস্ত শ্রম সফল মনে করিব। নিবেদন ইতি, ১৩ই অগ্রহায়ণ
সন ১৩০৯ সাল।
হেমচন্দ্ৰ নাগ।
সূচী পত্র পৃষ্ঠা বিষয় পশিব কেমনে পিতা গাে পাখী কে তুমি অপােবদনে ১০ ১৪ । ••• ১৭ ২১ তুমি কি আমার বাঁশীর গানে চালােকে কামিনী, কুসুম ••• ২৬ ২৯ ••• • • • ৩৩ ••• ••• • • • ৪৪ ••• ৫৯ * •• ছি ছি চিনিলে না কেন কঁাদি । কেন দেখা দিলে বিদ্যাসাগরের পরলােকান্তে আসিব না আর কি ভাবি ভালবাসা তার বিজয়া দশমী ••• ••• ••• ••• ৭০ ••• ••• : ••• ৭৫ ঈশ স্তব * * * प
No text on this page.
মানসর্ষিণী।
(কয়েকটি কবিতা)
পশিব কেমনে
পশিব কেমনে,
কল্পনা কাননে,
বাসে যেতে সুধী জনে।
দাও মা সুমতি,
নিবার দুৰ্ম্মতি,
কৃপা করি অকিঞ্চনে।
সভয়ে সেবার,
জননী আমার,
দুমিতাে সকলি জান।
মানসতােষিণী ।
ধৃষ্টজন প্রায়,
পশেছিনু তায়,
নাহি শুনি নিবারণ ।
ফুল মনােমত,
তুলি শত শত,
যতনে গাঁথিনু হার ;
ভাল বলে তায়,
সমৰ্পিণু মায়,
ভাল না লাগিল মার।
বড় দুঃখ পাই,
কারে বা জানাই,
মায়ের হ’লনা দয়া !
সেই মনস্তাপে,
আজি হৃদি কাপে,
ভাঙে অভাগার হিয়া।
করেছিনু পণ,
ও বনে কখন,
তুলিব না আর ফুল ;
যাক ভাগ্যধর,
পাবে সমাদর
যত হক চুক ভুল।
পিতা গাে !
পড়ি উপরােধে,
আইল নির্বোধে,
ভুলিয়া পূরব কথা ;
দূর কর রােষ,
হও মা সন্তোষ,
ভুলে যাই সব ব্যথা।
বিদ্রুপের ভয়ে,
কাতর হৃদয়ে,
লইনু শরণ তাের ;
শিখাও সুনীতি,
সাধু সঙ্গে প্রীতি,
ঘুচুক আঁধার ঘাের।
পিতা গাে!
তব দ্বারে আসি আজি দীন জন,
অতি ক্ষীণকণ্ঠে ডাকে ঘন ঘন ;
দুটী আঁখি হতে ঝরে বারিধারা,
তােমা হারা হয়ে আমি আত্মহারা
তােমারে ছাড়িয়া বিপথে পড়িয়া,
ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াই কাদিয়া;
.
মানসততাষিণী।
পূরব স্মরিয়া বেদনয় হিয়া,
মনের বেদন শমিব কি দিয়া।
বুঝে, না ভেবে করিয়া করম,
হতেছে ব্যথায় ব্যথিত মরম ;
মনে হলে হয় কতই শরম,
হারায়েছি আমি মনের সংযম।
কিবা কাৰ্য, কে করায়, কেন করি,
বিষম রহস্য বুঝিতে না পারি ।
বুঝি কৰ্ম্মদোষে ভুঞ্জি কৰ্ম্ম-ফল,
তুলিতে অমৃত তুলেছি গরল !
হয়েছি অস্থির বিষের জ্বালায় ;
কাতর পরাণ শান্তি নাহি পায় ;
বড় লাজ পাই বলিতে তােমায়,
কিন্তু তুমি বিনা না দেখি উপায়
নহে একবার, কত শত বার,
বিপদে পড়িলে করেছ উদ্ধার ;
নাহি ছিল শক্তি, উঠিতে কাতর,
তুলিয়া দিয়াছ প্রসারিয়া কর।
কুপথে ভ্রমণ স্বভাব আমার,
উঠিতে উঠিতে ভুলি অঙ্গীকার ;
তাই ভয় পাই যেতে বার বার,
কিন্তু গতিহীনে কেবা গতি আর।
পিতা গাে!
রাখ কিম্বা মার, যাহা ইচ্ছা কর,
চরণে শরণ লইল কিঙ্কর ;
হয়েছে অসহ্য সহিতে না পারি,
এখন ভরসা চরণ তােমারি।
তােমারি করুণা অনন্ত, অপার,
করিছে ঘােষণা অখিল সংসার ;
প্রাণের সহিত যে ডাকে তােমায়,
ঘুচে তার দুঃখ, ঘুচে তার দায়।
শিখাও আমায় ডাকিতে তােমায়,
অনুতাপে দগ্ধ হউক হৃদয় ;
ভস্ম যদি হয় ক্ষতি নাই তায়,
পাপভার আর বহা নাহি যায় ।
মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, শঠ ব্যবহার,
জীবনের ব্রত হয়েছে আমার ;
দেখাই কতই বাহিরে সাধু,
কিন্তু জান তুমি ভিতরের ব্যথা।
তুমি মাতা, পিতা, তুমি ভগ্নী, ভ্রাতা,
তুমি মিতা, দাতা, তুমি ভর্তা, ত্রাতা ;
কাতরে সভয়ে লইনু আশ্রয়,
পিতা গােয় বিতর অধমে অভয় ।
পাখী।
কে তুমিরে বল পাখি, না পােহাতে রাতি,
দেখা দেও প্রতিদিন সুদূর গগনে ;
কিবা নাম ধর তুমি, কোথায় বসতি,
যাও পুনঃ কার কাছে, কি কামনা মনে?
ক্ষুদ্রকায় পাখি, তুমি এত বল ধর,
মুহূর্তে স্বরগ-রাজ্য কর বিচরণ,
উল্লষ্মি অচল শৃঙ্গ, নদী, সরােবর ;
তীর সম গতি তব কে করে বারণ।
ছড়ায়ে অমিয়ধারা মধুর কুজনে
গায়িতে গায়িতে যবে দ্যুলােকেতে ধাও,
মধুর পঞ্চম তানে সুললিত গানে
অমনি তুমিরে পাখি, জগৎ মাতাও।
দিন দিন তুমি মােহনীয় ডাক ডেকে,
নিদ্রিত জগৎ যবে, ভাঙ্গ ঘুম তার।
নিত্যব্রত এই তব দূর শূন্য থেকে ;
স্বভাবের দাস বেশে ভ্ৰম কি সংসার?
সত্য, দাস তুমি ; কার পদে বিকাইয়া
জনমের মত, পাখি, সঁপেছ জীবন ;
স্বাধীন বিহারে মরি, জলাঞ্জলি দিয়া,
নিতি নিতি কার আজ্ঞা করিছ বহন ?
পাখী।
ওই দেখ, দেখ, পাখি, দিবা-দুতি উষা
তব সাড়া পেয়ে কত চঞ্চল কাতর।
চকিতে ছাড়িয়া দিব্য নৈশ বেশ তৃষা,
ভেটিতে চলিলা ত্বরা দেব দিবাকর।
বিরহ বিধুরা হেথা দীনা কমলিনী,
মুখ তুলি সরােবরে চাহিল চকিতে
অমনি প্রসারি কর ধরি দিনমণি,
চুম্বিলা বদনখানি হাসিতে হাসিতে।
ছাড়ি প্রেম অভিনয় তব রব শুনে,
ক্ষোভে ইন্দু ডুব দিলা সাগরের জলে ;
মুখ ঢাকি কুমুদিনী জীবন দুর্দিনে
পাতিলা নয়নজল হিমবিন্দু ছলে।
কত গুণ, পাখি, তব মধুবর্ষি গানে।
ছুটিলা জীবনস্রোত তাড়িতের প্রায়
প্রকৃতির প্রতি শিরে ; নির্জীব পরাণে
পুনঃ নব রসায়নে উৎসাহে মাতায়।
•
হাসিয়া কুসুমকুল হাসায় প্রকৃতি ;
হাসির তরঙ্গ স্রোতে জগৎ ভাসায় ;
প্রমুদিত জীবকুল কিবা ফুল্লমতি,
মােহ মন্ত্র, পাখি, তাের সকলি মজায়।
৮
মানসততাষিণী
কিন্তু পাখি, থেকে থেকে নীরব, কাতর,
কেন তুমি ; যাও কোথা, কি সুধাও ঠায় ;
সে জন কেমন, কিবা ধরম তঁাহার,
এ রহস্য তুই, পাখি, বলিবি আমায়?
থাক, পাখি, থাক্ আমার বাসনা মনে।
সত্য, জগতের কথা পশিলে শ্রবণে
অধীর হইয়া তুমি ত্বরিত গমনে
বহ তার কাছে নিত্য, নীরবে নির্জনে ?
অন্তরীক্ষে বসে পাখি দেখিছ সকল
পাপের মন্ত্রণা গৃঢ়, ধনের পীড়ন,
দারিদ্র্যের অবিরাম নয়নের জল,
‘অদৃষ্টের অস্থায়িত্ব, চিন্তার দহন ;
বিধবার মনােব্যথা, অশ্রু বিসর্জন ;
প্রণয়ীর অন্তর্দাহ, বিচিত্র বঞ্চনা ;
কপটীর লােভনীয় মধুর বচন ;
এ সব সুধাও রে, পাখিরে বলনা ?
বড় ভাগ্যধর তুমি কিন্তু শাখিবর ;
বিমােহিল যে তােমারে গাও গুণ তার।
তার লাগি তব সম হইয়া কাতর,
শিখিব গামিতে গান, দুরাশা আমার!
পাখী।
গায়িতে গায়িতে পাখি চকিতে অলক্ষ্যে,
তাকে কি দেখিতে যাও? দেখিয়া আবার,
উল্লাসে বিলাও সুধা বসি অন্তরীক্ষে
ধন্য পাখি, জন্ম তব, শক্তি চমৎকার।
;
অনিশ নেহার পাখি, প্রিয় প্রাণাধার ;
জানি সে রূপখানি কতই সুন্দর !
প্রেমগাথা সুধামাখা গাও বার বার,
কাপাও ললিত তানে ভূধর প্রান্তর।
থাকিত রে পাখা যদি তােমার মতন,
ছাড়িয়া পিঞ্জর এবে যাইতান উড়ে,
তব সনে ওই দেশে; তাহলে এখন
ঘাের চিন্তানলে চিত যেতনারে পুড়ে!
হিংসি আমি তব সুখ, তুমি ভাগ্যধর।
নিত্য-সুখ-সিন্ধু-কুলে পশিয়া কখন
আত্মার নাশিব তৃষা, জুড়াব অন্তর,
হবে কি আমার ভাগ্যে সুদিন এমন ।
কে তুমি অপােৰনে ?
কে তুমি আনত মুখে আজি একাকিনী,
তিতিয়া নয়ন-জলে তিতিছ মেদিনী?
গগনে উঠিছে তারা,
আঁধারে পূরিছে ধরা,
রজনী হতেছে ক্ৰমে তিমির বরণী ;
এমন সময়ে হেথা কে তুমি রমণী ?
কপােলে রাখিয়া কর অবনত মুখে,
নীরবে কাদিছ কেন মরমের দুঃখে ;
দুঃখের দুরন্ত তাপে
সঘন হৃদয় কাঁপে
হৃদয়-আবেগ তাই পড়িছে উথলে,
উথলে যেমতি সিন্ধু প্রতিঘাত-বলে ।
বদন কমলে নাহি রে লাবণ্য-রাগ,
কেঁদে কেঁদে পড়িয়াছে কালীমার দাগ ;
অনল শিখার সম,
বিচিত্র দহন ক্ষম,
থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলিছে রমণী,
শিহরি উঠিছে তাহে অমনি ধরণী।
দেহের সরস ভাব, সােণাতে সােহাগ,
কোথা গেল, কে হরিল লাবণ্যের রাগ !
১১
কে তুমি অপােবদনে ?
ললাম লতিকা অঙ্গে,
ভাতিত যে দীপ্তি রঙ্গে,
শুকায়েছে দুঃখাতপ দারুণ দহনে,
ললিত লতিকা সম নিদাঘ পীড়নে।
সহাস বদন, নাহি সহাস নয়ন,
নাহি দৃষ্টি সুধামাখা সন্তাপ হরণ ;
বিবর্ণ বিরস দেহ,
আঁখি বিগলিত লােহ,
হৃদয়ের দুঃখ ভার করিছে বহন ;
বিষাদ বিমগ্ন মন, নীরস জীবন।
কি ভাবনা শুভে, কেন বিজনেতে বসি,
অসহায় একাকিনী ; ক্রমে ঘােরা নিশী।
শ্রম পরে ক্লান্তমতি,
দিনান্তে প্রকৃতি সতী,
শান্তি সুধা সিন্ধুনীরে শরীর ভাসায় ;
কি চিন্তা বিষম স্রোত তােমাতে খেলায় ?
কিশাের বয়স তব, নবীন যৌবন,
ভাবনার অধিকার নাহিত এখন।
ভালবাসা ফুল ফুলে,
গাঁথি হার প্রিয় গলে,
দোলাইবে সুখাবেশে সুচারু হাসিনি
বিষাদ ৰিমনা কেন বিশদ বরণি ?
১২
মানসততষিণী ।
তুমি কোন অভাগিনী বিধবা রমণী,
মন দুঃখে বনে বসি কঁাদ একাকিনী ?
দিবসে মনের মত,
মরমের দুঃখ যত,
দেখাতে পারনা, বঙ্গালয়ে দাসী তুমি ;
তাই আঁখিনীরে মুকতিছ বনভূমি ?
ক্ষম শুভে অপরাধ, ক্ষম অপরাধ,
অবিবেকি আমি ; সীমন্তিনী চিরসাধ,
বিশাল ললাট ভাগে,
দীপিছে উজল রাগে,
সুলাল সিন্দুর দাগ ; তুমি পতিবতী।
বললল ললনে কেন, মনের এ গতি ?
কিম্বা হারাইয়া বুঝি, হায়রে, অকালে
প্রাণের প্রতিমা পুত্র, পশি বনস্থলে,
জুড়াতে জীবন জ্বালা,
হেথা গতি তব বালা?
তাওতত সম্ভব নয় ; নবীনা যােড়ী ।
কহ তব দুঃখ বার্তা, এ ভিক্ষা রূপসি ।
কিম্বা কোন পাপাশয় লম্পট দুর্জন,
হরিতে সতীত্ব রত্ন, সতীর জীবন,
প্রকাশিল নিজ বল ।
তাই পাতি আঁখি জল,
কে তুমি অােবদনে ?
করিয়াছ সাধ, হেথা পাতিতে জীবন?
কিন্তু পতি পাশে একি সম্ভব কখন ?
;
অথবা তােমার পতি প্রকৃতি বিহীন,
পাশবিক আচরণে নিৰ্ম্মম কঠিন
তাই কি বিজনে বসি,
মনের মালিন্য মসি,
আঁখি জলে প্রক্ষালিতে করেছ মনন ?
তাহলে সম্ভব বটে নির্জনে রােদন।
বলিতে হবেনা আর ; দীর্ঘ উষ্ণশ্বাস
অনলের শিখা সম, করিলা প্রকাশ
নিগূঢ় মনের কথা।
স্মরি তব মৰ্ম্ম ব্যথা,
হৃদয় কঁদিল দুঃখে, কাদিল নয়ন ;
আহা কি বিষম দৃশ্য হৃদি বিদারণ ।
;
ধিক্ তায়, ধিক্ তায়, হেন ব্যভিচার
স্বভাব সৌন্দর্যে মুগ্ধ নহে মন তার ।
নিজের অবস্থা ভুলি,
অমনি বদন তুলি,
রক্তিম নয়নে সতী ভ্রুকুটি করিল ;
হৃদয়ের অন্তস্তর চকিতে কাপিল।
মুহূর্তে সে স্থান ত্যজি করিল প্রয়াণ ;
কেমনে সহিবে সতী পতি অপমান,
১৪
মানসততাষিণী ।
পতিতা আৰ্যনারী,
পতিপদ হৃদে স্মরি,
যাপয়ে শৰ্বরী একা বিপিনে বিজন।
আহা কি অমল ছবি সতীর জীবন
আকাশ।
সুদূর শূন্যেতে থাকি তুমি হে আকাশ,
অসীম, অনন্ত, কিবা পাইছ বিকাশ।
সীমাহীন তব দেহ করে নিরুপণ,
ঐশীক এমন শক্তি কে করে ধারণ ?
যে দিকে ফিরাই আঁখি, দেখিবারে পাই,
লােভনীয় রূপ তব, তুমি সৰ্ব্ব ঠাই
সৰ্বব্যাপী তুমি ব্যোম, বিশ্বরূপ ধর ;
নিগূঢ় রহস্য তব বুদ্ধি-অগােচর।
লাল, নীল, শ্বেত, কৃষ্ণ, কতই বরণ,
অন্তহীন তব দেহে হয় উদ্দীপন।
কত সুখ, তব রূপ নিরখি নয়নে,
উপজয় প্রতি ক্ষণে কল্পনার সনে।
বহুরূপী তুমি ; কতু ঢাকি কলেবর
বিশদ ভুষায় সাজ সন্ন্যাসী প্রবর ;
আকাশ •
১৫
কভু প্রেমােন্মাদে পরিবেশ নীলাম্বর
বিলাসব্যঞ্জক সাজে সাজ নটবর।
কভু লাল, কভু কাল, পলকে প্রলয়,
তােমার রহস্য তুমি বুঝ লীলাময় ।
অবাক্ হইয়া দেখি বুঝিবারে নারি,
মােহ কলুষিত আঁখি সদাই আমারি ।
থেকে থেকে নব রূপে বিকাশ তােমার ;
নব অভুদয়ে তব, ভাবুক জনার
ভাবস্রোত যুগপৎ উঠি উথলয়ে,
সাগর সলিল সম সুধাংশু উদয়ে।
অক্ষয় ভাণ্ডার তব, অতুল সম্পত্তি,
প্রত্নরাজি অগণন কিবা ধরে জ্যোতি।
কেবা করে সংখ্যা সব হেন শক্তিধর,
পারে কি করিতে সংখ্যা ত্রিদিব অমর ।
দিবসে তােমার ভালে একটী রতন,
কে পরায়ে দেয় করি কতই যতন ;
রতনে উজল ভাতি করি উদিগরণ,
স্বভাবের মুখে হরে কালীম বরণ।
সন্ধ্যাগমে কেবা পুনঃ আসি ধীরে ধীরে,
সাজায় রতন লয়ে এক এক করে,
কমনীয় অঙ্গ তব স্বর্গীয় শশাভায় ;
অনুপম কি আনন্দ হৃদয়ে খেলায় ।
মানসততাষিণী।
গাথিয়া চিকণ মালা.ত্রিদিব রতনে
গাঁথা স্নিগ্ধ দীপ্তিমান চূর্ণ হতাশনে,
গলায় পরায়ে দেয় ; নীল বক্ষোপরে,
তারাফুলে গাঁথা হার কিবা শােভা ধরে।
এত যে বিভব, কিন্তু কতই উদার,
শান্তি বিরাজিত প্রকৃতি তােমার।
চরমে পরম শান্তি, একি সেই রেখা
তব দেহে সমুজ্জ্বল স্বর্ণাক্ষরে লেখা ?
সত্য বল ব্যোম, ওই রতন নিচয়
বিশাল ভাণ্ডারে তব, রত্ন নাকি নয় !
প্রকাণ্ড ব্রহ্মাণ্ড সব বাখানে বিজ্ঞান,
তােমার বিশাল বক্ষে পাইয়াছে স্থান।
শব্দবহ নাম শুনি করহে ধারণ ;
বহিবারে বার্তা যত তােমার সৃজন।
এ নহে স্বরূপ তত্ত্ব, হেন লয় মন,
তাহলে জগৎ কেন কাঁদিবে এমন।
তুমি কি আমার ?
‘তুমি কি আমার প্রিয়ে, সুধাই তােমারে ;
আমার হইলে পরে,
হাসায়ে দুদিন তরে,
ভাসায়ে আঁধারে,
কোন্ দেশে ফেলি গেলে, কোথা হেন দেশ?
সত্য সেই দেশে নাহি মমতার লেশ।
অনিশ নয়ন করে অশ্রু বিসর্জন
একি হ’ল ভাল বাসি,
জ্বলন্ত অনল রাশি,
করিছে দহন !
নাহি সুখ নাহি শান্তি ; বিষম বিকার
জীবন দুর্দিনে হৃদি করে অধিকার।
চিন্তার অতীত নিরাশার নির্যাতন,
দারুণ আঘাত করে,
ব্যথা দিবে মৰ্ম্মোপরে
সুদূর স্বপন ;
আশার কুরাগ এবে কোথা মিলাইল,
সহ সুখের হাসি কোথায় ডুিবল ?
১৮
মানসততাষিণী।
হাসাতে হাসাতে বিধি কেন কঁদাইলি,
নির্মম নিঠুর অতি,
পর দুঃখে এত প্রীতি,
সুখে ছাই দিলি ।
শঠতা ব্যবসা তাের বুঝি নিশ্চয় ;
শঠ প্রেমে কোন কালে কেহ সুখী নয়।
জীবন-পাদব পাশে যৌবনেতে হেরি,
মােহনীয় বেশ ধরে,
এ হৃদয় আললা করে,
উঠিল বল্লরি,
প্রণয় লতিকা নাম; হায়রে অকালে,
শুকাইল লতা নিয়তি নিগ্রহানলে !
সুখের স্বপন কত স্বতঃ উদয়িল।
নাচিল হৃদয় তন্ত্রী,
সপ্তসুরা লয়ে যন্ত্রী,
যেন বাজাইল
সহসা ছিড়িল তার, ঘুচিল নৰ্ত্তন
আকাশ কুসুম সম সে সুখ স্বপন।
;
ভেবেছিনু আমি যবে সংসার বেলায়,
ঘুরিয়া অবশ দেহ ;
লভিব, পশিয়া গেহ,
বিরাম ছায়ায় ;
= -
তুমি কি আমার?
দূরিব সন্তাপ স্নিগ্ধ শীতল পরশে,
নবীন জীবন পাব, ভাসিব হরষে ;
ভাবনা-বিকারে কভু হইলে বিভাের ;
উন্মত্ত কাতর যবে,
তৃষায় আকুল হবে,
এ চিত্ত চকোর ;
পুলকে পিয়িব সুধা লতিকা প্রসুনে,
বিদূরিত হবে তৃষা, আহা, তারি গুণে।
কিন্তু ভাগ্য দোষে হায়, এ পােড়া প্রাক্তনে,
কোমল কুসুমাগার,
কাটে কীট দুরাচার,
পশিয়া কুক্ষণে ;
কোথারে সুষমা তার, কোথায় সৌরভ,
বিবর্ণ, বিরস, আজি বিহীন বিভব।
কত দিন ধরে অর্পি সােহাগ মুসার,
ললিত লতিকা মুলে,
মিশায়ে যতন জলে,
করি আবদার।
বিফল যতন আজি, বিফল প্রয়াস,
সাধেতে বিষাদ হ’ল, কেবল আয়াস।
কতদিন, কতনিশি, বিরলেতে বসি,
কত ভাব মনে মনে,
২।
মানসতােষিণী।
উপজিল প্রতিক্ষণে,
স্মরি মুখশী !
আহা সে সুখের কথা, সুখদ সে স্থান,
স্মরিয়া শিহরে হিয়া, উচাটন প্রাণ।
চলে গেছ তুমি, কিন্তু ছবি তব সখি,
হৃদয় রেখেছে আঁকি,
জুড়াইতে পােড়া আঁখি,
বিজনে নিরখি ;
মােহন মূরতি তব, প্রাণের ভিতর,
প্রতিক্ষণ দেখা দেয় কাঁপায়ে অন্তর।
আমার কথায় যদি বিশ্বাস না কর,
অকাতরে বুক চিরে,
ধরে দিই আঁখি পরে,
রবে নিরুত্তর।
পর ভাবি পরিহার কৈলা অকারণ,
যাবৎ জীয়িব কিন্তু ভাবিব আপন।
পর ভাব ক্ষতি নাই, রেখ কিন্তু মনে ;
প্রিয়ে, তব প্রেম লাগি,
হইয়াছি সৰ্ব্ব ত্যাগি,
এ ছার জীবনে।
পয় ভাব ক্ষতি নাই, ভাবি আমার,
তাহাতেও পাব প্রিয়ে, আনন্দ অপার।
বাশৱীৰ গানে।
সখিলে,
কে দাড়ায়ে ওই দেখ কদম্বের তলে।
কিবা অনুপম,
কাল রূপ কম,
নব নীল ঘন যেন শােভিছে ভূতলে।
এমন মােহন রূপ নয়নরঞ্জন,
এ জীবনে আর কভু হেরেনি নয়ন।
ন
আমরি,
রাজিছে অধরে কিবা সুমধুর হাসি ;
কাদম্বিনী কোলে,
শােভে হেলে দুলে,
উজল বিভায় স্থিরা বিজলী বিকাশি।
পুলক কদম্ব জিনি তনু পুলকিত,
সহাস বদনে পূর্ণ ইন্দু বিকসিত।
ঢল ঢল আঁখি দুটী ভাসে প্রেমজলে ;
সােহাগ অঞ্জনে,
অপূৰ্ব্ব রঞ্জনে,
সুষমা কেমন সখি পড়িছে উথলে ;
নিশির শিশির বিন্দু দুৰ্ব্বাদল দলে,
কি ছার ইহার কাছে তুলনা তুলিলে !
২২
মানসতােষিণী ।
সখিলে,
কি হলাে কি হ’লল আজি ও রূপ নিরখি;
মন্ত্রেীষধি বলে,
অহিরে বশীলে,
যেমতি তাহার দশা হয় প্রিয় সখি।
জানিতাম আগে যদি রূপে মন টলে,
কে আসিত তবে আজি যমুনার জলে!
নিবার,
নিবার পুরুষবরে বাজাতে বাঁশরী ;
বাঁশরীর গানে,
অবলার প্রাণে,
লাগিলে আঘাত বল কেমনে সম্বরি।
ওই দেখ, দেখ, সখি, অবলা মজাতে,
চতুর রসিক বাঁশী লাগিলা বাজাতে।
ওই দেখ, দেখ, সখি, বাঁশরী বাজিল।
একি অকস্মাৎ,
হেরি যুগপৎ,
গভীর কল্লোল স্রোত কোথায় মিশিল
বহিল সর্বত্র শান্তি স্রোত সুধাময়,
স্থাবর জঙ্গম বাঁশী-গানে মুগ্ধ রয় ।
;
এই না বিহগকুল কল কল রে,
কাপায়ে ভূধর,
বাঁশরীর গানে।
কপায়ে প্রান্তর,
কঁপাইলা চরাচর কঁপাইলা জীবে ;
উড়িতে উড়িতে সহসা বাঁশীর গানে,
বিস্তম্ভিলা, দেখ দেখ সুদূর গগনে !
ওই যে সুন্দর গাভী বৎস হারা হয়ে,
গভীর কঁাদিলা,
গভীর নাদিলা,
কেমনে রহিলা স্থির বিলাপ ত্যজিয়ে
ওই যে হরিণশিশু ছাগশিশু সনে,
সুখেতে খেলিতে ছিলা সুন্দর নৰ্ত্তনে,
রহিল, আছিল যথা, আঁকা ছবিমত।
ওই পথ ধারে,
খল বিষধরে,
মুখেতে আহার, কিন্তু কেন চিত্রার্পিত ?
অন্তক মুখেতে ওই মণ্ডুক কঁদিলা,
ভুলিয়া প্রাণের জ্বালা সেও নিরবিলা ।
সখিলল,
শুনিলা
অদূরে
এইতাে কানন মাঝে,
ক্ষুধায় আকুল,
গর্জিল শাল,
কিন্তু অকস্মাৎ সেও বাঁশীগানে মজে।
२४
মানসতােষিণী ।
পুলকে আমরি হেরি কদম্বের পরে,
স্তম্ভিত বাঁশীর গানে শাখী পুচ্ছ ধরে।
দেখলাে,
দেখ সখি, উছলিলা যমুনার জল ;
বারীশ বাসনা,
সখিলাে বলনা,
পুলকে ফুলিয়া কিবা করে ঢল ঢল।
তা দেখি পবন ভাসায়ে রসের ভেলা,
যমুনার বুকে বসি করে কত খেলা।
আপন গরব ভরে দেখ উদ্ধা শিরে
সখি যে অচল,
সে ঐ পদ তল,
ধীরে ধীরে প্রক্ষালিছে সুখ অশ্রুনীরে।
সম্মুখে পাদপ ওই গানেতে ভুলিলা,
নীরবে, আনন্দে, পদে পুস্পঅর্ঘ্য দিলা।
কি হলাে,
উছলিয়া হৃদি বহিলা বাসনা নদী
তরঙ্গ আঘাতে,
প্রতিকুল বাতে,
কি হবে, বলনা ধৈৰ্য্য বাঁধ ভাঙ্গে যদি।
কি জ্বালা ঘটিল সখি, বাঁশরীর গানে,
জলন্তু শায়ক যেন পরাণে কে হানে।
{
বাঁশরীর গানে।
২
ধরলাে,
অবশ হইল অঙ্গ জুটিল আবেশ।
কি করি এখন,
চলে না চরণ,
বিমুগ্ধ নয়ন বিলােকি মােহন বেশ ;
বিমুগ্ধ পরাণ শুনিয়া বাঁশীর গান
সখিলাে, কি হ’ল আজি, মনশূন্য প্রাণ।
v
করিয়া মিনতি, সখি, ধরিয়া চরণ,
বলে শ্যাম চঁাদে,
অভাগিনী কাঁদে,
অবিরাম অশ্রুজল কর নিবারণ ;
এ ঘাের প্লাবনে আজি না দেখি উপায়,
কুল দানে কুল রাখ, ওহে নটরায় ।
4
বললাে,
নহিলে রূপের রজ্জ, বাঁধিয়া গলায়,
পশিয়া অতল,
যমুনার জল,
জুড়াব জনম মত জীবন জ্বালায় ।
মিনতি করিয়া শেষে ব’ললাে হায়,
এমন করিয়া যেন বাঁশী না বাজায় ।
চন্দ্রালােকে।
সরস বসন্তকাল নিশীথ সময়,
বহিল চিন্তার স্রোত উথলি হৃদয়।
কাতর, অস্থির, চঞ্চল মতি,
সহসা কেন এ বিকৃত গতি ;
অনিদ্ৰ নয়ন,
মলিন বদন,
বাহিরিনু ধীরে ব্যথিত অতি ।
বিকচ পূর্ণিমা নিশি, প্রফুল্ল হৃদয়,
রজত বরণ শশী গগনে উদয় ;
মৃদুল পবন মৃদুল বয়,
সন্তপ্ত শরীর শীতল হয় ;
যায় যায় যায়,
সুগন্ধ বিলায়,
সৌগন্ধে সকলি সুরভিময় ।
তারাফুলে গাঁথা হার পরিয়া গলায়,
শরীর সুষমা শশী গরবে দেখায় ;
সুচারু আননে মানস লােভা,
ফুল ফুল-দলে ঢলে কি বিভা
সাধ হয় মনে,
বসিয়া নির্জনে,
নেহারি কেবল বিকচ শােভা।
নাচিয়া নাচিয়া সুখে কৌমুদী খেলায়,
বিশদ হাসিয়া কিবা জগতে হাসায়।
চন্দ্রালোকে।
২৭
D
তরঙ্গ আলী সরসী কোলে,
চন্দ্রমার হার পরিয়া গলে,
আমােদে ফুলিয়া, ঢলিয়া ঢলিয়া,
থেকে থেকে পড়ে সরসী কোলে ।
নেহারি নয়নে হেথা দিনান্তে কান্তারে,
ঘােমটা খুলিয়া মুখ তুলে সরােবরে,
বিধুর বাসনা বিধুর পানে,
সতৃষ্ণে চাহিল অনন্য মনে ;
যুগ যুগান্তরে,
পাই প্রাণেশ্বরে
সতী যথা চাহে প্রাণেশ পানে।
তা দেখি অমনি সুদর্শন সুধাকরে,
ধরে ধীরে প্রেয়সীরে সুধামাখা করে ;
সুধাংশুবদনী সুধাংশু কোলে,
উল্লাসে কঁপিয়া পড়িলা চলে।
মধুর চুম্বনে,
বধূর আননে,
সঞ্জীবনী রস দিলা রে ছেলে।
নীলাম্বরে অঙ্গ ঢাকি, রতনে কবরী,
যথাকালে প্রাণনাথে ভেটিল শর্বরী
চতুর পতির ধরম হেরি,
সতীর নয়নে ঋরিল ৰারি ;
মুখে নাহি বাক,
হইয়া অবাক,
অনকে ধিক্কার সে রক হেরি।
২৮
মানসততাষিণী।
বিধুরে দেখিয়া চকোর চকোরী ধায়,
ঘায় যায় চাদপানে ঘন ঘন চায় ;
বাসনা চাদেরে উপাড়ি এনে,
ভূমেতে ফেলিয়া ধরিয়া টেনে,
বুকেতে বসিয়া,
পরাণ ভরিয়া,
সুধাধারা পিবে একান্ত মনে।
;
বিকট শবদে উড়ে পেচক আকাশে,
থর থর কঁপে চকোর মিথুন ত্রাসে ;
দম্পতি ভ্ৰময়ে মনের সুখে,
পড়িল কি বাজ দুষ্টের বুকে।
পরের দেখিয়া, বেদনয় হিয়া ;
জগতের ধর্ম অবাক দেখে।
রমণীর মন,
কঠিন
বিয়ােগ কাতর এক বিহগ রতন,
কূলে বসি প্রেয়সীরে ডাকে ঘন ঘন ;
প্রাণের জ্বালায় রােদন করে,
বিহগিনী হায় চায়না ফিরে ;
এমন,
কি দৃশ্য বিষম আঁখির পরে।
হেন অভিনয় মাঝে অদূরেতে শুনি,
মধুর কোমল কণ্ঠে প্রেমের কাহিনী।
নিশীথে বিজন সঙ্গীত শুনে,
সহসা কি ভাব হইল মনে ;
কামিনী, কুসুম।
ভাবেতে মগন,
চলে না চরণ,
কে যেন বাঁধিল মন্ত্রের গুণে।
দেখিনু রূপসী এক কুটীর প্রাঙ্গণে,
তুধিছে পতির প্রাণ প্রেম আলাপনে ;
গলা ধরে দোহে প্রেমের ভরে,
চাদের কিরণে বিহার করে ;
বিধির যতন,
প্রণয় রতন,
কুটীর প্রাসাদ একই করে।
চন্দ্রমা কিরণে আজি প্রেম অভিনয়,
দেখিলাম আঁখি ভরে ভুলিবার নয়।
সংসার শ্মশান প্রণয় বিনে
ধিরে জীবন এ ধন হীনে!
চাদের কিরণে, প্রেমের নৰ্ত্তনে,
নাচিতে বাসনা হয়না মনে?
কামিনী,কুসুম।
কুসুম-কামিনী কানন মাঝে
বিশদ সজ্জায় অমল সাজে ;
বিধির তুলিতে সৃজন পটে,
বিচিত্র রচনা জগতে রুটে।
৩০
মানসতােষিণী।
সংসার কাননে কামিনী ফুল
কানন কুসুমে হয় না তুল?
নয়ন রঞ্জন, মানস লােভা,
পবিত্র আলােকে ভুবন-শােভা।
কোমলতা কিবা কুসুম অঙ্গে ;
রমণী হৃদয়ে বিরাজে রঙ্গে।
সংসার মরুতে রসের খনি,
আঁধার জগতে উজল মণি।
লাগিলে আতপ ফুলের গায়,
দেখিতে দেখিতে শুকায়ে যায় ;
লাগিলে আতপ অবলা গায়,
নহে বৃন্তচ্যুত কুসুম প্রায় ?
রমণীর রূপে ভুবন ভুলে ;
রমণীর রূপে মানস টলে ;
নিস্তব্ধ, মরুত বিমুগ্ধ হ'লে ;
কঠিন হলেও পাষাণ গলে।
রূপের সাগরে লাবণ্য জল,
প্রেমের হিল্লোলে মধুর চল ;
রূপের হাসিতে জগৎ হাসে,
হাসির অভাবে আঁধারে ভাসে।
কামিনী, কুসুম ।
গােলাপ, চামেলি, মল্লিকা, যুথি,
মালতি প্রভৃতি কতই জাতি,
ফুটিয়া কাননে দিবস রাতি,
গরবে জ্বালায় রূপের বাতি।
প্রফুল্ল কুসুম আঁখির’পরে,
রূপের চটকে চেতন হরে ;
নয়ন ভরিয়া আবেশ ভরে,
মূঢ় হেন কেবা দেখে না ফিরে।
ফুলের
সৌরভ যখন ছুটে,
লাখে লাখে অলি আসিয়া জুটে ;
ঘুরিয়া ফিরিয়া কুসুম বঁধু,
বধূর অধরে পিয়ে গাে মধু।
গুন্ গুন্ গুন্ ললিত তানে,
মধুর গায় গাে বধূর কাণে;
হাসিয়া কুসুম লুটিয়া পড়ে,
চতুর নাগর পলায় উড়ে।
কামিনী কুসুম যখন ফুটে,
মধুর সৌরভ স্বরগে ছুটে ;
সৌরভে আকুল মানস ভৃঙ্গ,
নিতিই দেখায় কতই রঙ্গ।
অমিয় ঝরে,
কামিনী কুসুমে
এত সুধা আর কোথায় ধরে।
মানসতােষিণী।
পাগল জগৎ সুধার তরে,
পাগল শঙ্কর, পাগল মরে।
দেবের অর্চনা কুসুমে হয়,
বিলােক জুড়িয়া এ খ্যাতি রয়।
কুসুম তুলিয়। হরষ মনে,
সাধনা করেন তাপসগণে।
হার গাঁথি কেহ প্রসূন তুলে
চিকণিয়া চারু দোলায় গলে ;
কেহ রাখে সুখে মাথায় তুলে,
কেহ বা ধিরে চরণে দলে।
কামিনী কুসুমে ধরম হয়,
সংসার সুখদ, সম্পদময় ;
পুণ্যতােয় খেলে জগন্ময়,
নীরস জীবন সরস হয়।
কামিনী কুসুমে গাঁথিয়া হার,
পরিতে বাসনা হয় না কার ?
কামিনী কুসুম শুকালে পরে,
তবুও তাহাতে অমিয় ঝরে।
মশান।
একি সেই স্থান, সাধুর নয়নে
মিসর্গের শােভা যেখানে খেলায় ।
স্বরণ আদর্শ বাখানে যাহারে
একি সেই স্থান পবিত্রতাময়।
একি সেই, সেই শান্তি নিকেতন,
পারে পশিতে যেখানে কল্লোল ;
একি সেই স্থান, বিরাম আধার
খেলায় যেখানে অমিয় হিল্লোল ?
একি সেই স্থান বিকার বর্জিত,
মরলােকমাঝে অমর নিবাস ;
একি সেই স্থান, সগুণে, নিগুপে,
যেখানে সমান স্নেহের বিকাশ ?
একি নিরপেক্ষ্য সে বিচার-ভূমি,
বিষমতা যথা নাহি পায় স্থান ;
এই কি শ্মশান, শােভা পায় যার
বিশাল উরসে ন্যায়ের নিশান ?
এখানে আসিলে সব মিলে যায় ;
থাকেনা লঘিমা, থাকেনা গরিমা
জগতের স্পর্ধা হেথা চূর্ণ হয় ।
আহা ! বলিহারি স্থানের মহিমা।
মানসততাষিণী।
বিদ্যার আলােক, জ্ঞানের প্রতিভা,
গুণের গরিমা, যশের সৌরভ,
পদের মর্যাদা, আত্ম-অহমিকা,
প্রায় বিপর্যয় এখানেই সব।
রূপের গরব, বিলাসের স্পৃহা,
ঐশ্বর্যের দম্ভ, আশার মহত্ব,
দারিদ্র্য আগুণ অনন্ত অসহ,
এখানে বিলয় অদৃষ্ট আবর্ত।
সাধুর সারল্য, শঠের কাপট্য,
সত্যের সাহস, অনৃতের ত্রাস,
বিলয় এখানে ; এখানে বিলয়
কৃতঘ্ন মনের দুরন্ত হুতাশ।
শিশুর চাঞ্চল্য, যুবার উৎসাহ,
বৃদ্ধের নৈরাশ্য, যােগীর উদাস,
বীরের উল্লাস, ভীরুর আতঙ্ক,
পশিলে হেথায় নিশ্চয় বিনাশ।
মাতার কদর, পিতার যত্ন,
ভ্রাতার সৌহৃদ্য, ভগ্নীর আদর,
ভালবাসা স্ত্রীর, আর সুহৃদের
সৰ্ব্বতাগী সদা সরস অন্তর ;
শশান।
বালার বদনে হাসি কুমার,
শিশুর অস্ফুট মধুর বন,
যুবতী নৰ্ত্তন যৌবন গরবে,
পতির চরণে সতীর শরণ;
এই সেই স্থান, নিয়ন্তা নিদেশে
নিত্য নিত্য হেথা হতেছে সংহার;
অনিত্য জগতে নিত্য কিছু নয়,
শ্মশান সদনে হয় চুরমার।
তবে কেন তুমি কপট প্রবর,
মুখে বল এক কাজে আর করা ;
অমৃত বলিয়া অজ্ঞানে ভুলা’য়ে
নিরয়ের পথে হও অগ্রসর ।
কুহকে, কৌশলে, ধরমের ভাণে
স্বকার্য সাধন ব্যবসা তােমার ;
তােমার দুষ্কৃতি, তােমার শঠতা
আসিলে হেথায় রহিবে কি আর ?
ধনলিপু, তুমি দুরন্ত রাজন
উন্মত্তের প্রায় করিছ শশাষণ ;
দরিদ্র-শােণিতে পূরিছ উদর
তথাপি পিপাসা হয়না বারণ ?
মানসততাষিণী
কিন্তু এক ন্নি থাকে যেন মনে
ত্যজিতে "সকল বৃতন ;
ঘুচিবে আস্পর্ধা শ্মশান সদন ;
চিনিবে না কেহ কে প্রজা, রাজন!
তুমি ধনি, আজি আপন গরবে
বিমান হইতে কৈলা কষাঘাত
অনাবৃত তনু ভিক্ষুকের পৃষ্ঠে,
স্নান মুখ পানে নাহি দৃকপাত !
অবিচারে ঘাের সর্বস্ব হরিয়া
কাদাইলা যায় করিলে ভিখারী;
পুত্র কন্যা তার পথে পথে ফিরে,
হেরিয়া হেরনা ধিরে চাতুরি।
আজ অভিমানে পরশিতে যায়
সঙ্কুচিত এত, হায় এক দিন
যাবে অভিমান, ধনের গরিমা,
একত্রে মাটিতে হইলে বিলীন।
তুমি দুরাচার কৃতঘ্ন পামর,
ক্ষীণ তনু প্রাণ করিয়া পােষণ
যার অন্নে আজি প্রাণবন্ত তুমি ;
সাজে কি তােমার দুষ্ট আচরণ ?
'
;
পরিণামে হায়, পৰ্বিহারায়
করিতে সরম হলনা তােমার ?
পবৃত্তি তব বর্বর দুর্জয়,
এক দিন হেথা হইবে সংহার।
আর ধিক্ তুমি অবিশ্বাসী না ;
প্রভু না তােমার, ধরি দুটী করে
অর্পিলা সৰ্ব্বস্ব অন্তিম সময়ে !..
হরিলা কেমনে দিন দুই পরে?
ক্ষুধায় কাতর করিছে রােদন
অনাথ বালক ; দেখি নিরুপায়
অভাগিনী মাতা আজি তুৰ দ্বারে ;
দীনদশা হেরে বুক ফেটে যায়।
চিনিতে নারিলে ভাগ্যবান তুমি,
পাদুকা যাদের বহেছ মাথায়।
উত্তপ্ত শােণিত ধমনী মাঝারে
• হবেনা শীতল আসিলে হেথায়?
দুশ্চারিণি তুমি, সােণার সংসারে
দিয়া জলাঞ্জলি দিতেছ সাঁতার
অনন্ত নিয়ে ; কিন্তু পরিণামে
প্রচণ্ড ভাব রবে কি তােমার ?
মানসতােষি ।
তুমি দীনবালা, আজি নতমুখে
নীরবে কাদিছ, হানিছ কপালে
স্মরি নিজ দশা; তব নির্যাতন,
আসিলে হেথায়, প্রশমিবে কালে।
তুমিলল ললনে, হাসিছ মধুর
প্রেম আলাপনে পতি লয়ে সনে;
তুমিও হাসিছ যুবক চঞ্চল
প্রেমসিন্ধু-নীরে তুলিয়া রতনে।
হায়রে কদিন ; ক্ষণিক আবৰ্ত্ত,
হবে প্ৰক্ষালিত হইলে প্লাবন
সময়ের স্রোতে ; কোথা ভেসে যাবে
দম্পতীর সুখ, সুহাসি, নন।
আর তুমি, একে একে হারাইয়া
নয়নের মণি যত, পাগলিনি
এ দশা রবেনা রবেনা নিশ্চয়,
শান্ত হবে হিয়া তব, উন্মাদিনি।
আমার আমিত্ব ইহাও রবে না;
যাবে অন্তুর্দাহ; হবে সুশীতল
বিদগ্ধ পরাণ ; আহুতি দিবেনা
অখিজল তায়—কি সুন্দর ভূল !
ছি ছি চিনিলে না !
স্বতঃসিদ্ধ এই বিধান তাহার ।
কেন অহমিকা তবে মূঢ় মন ?
ত্যজ দম্ভ, স্পর্ধা, আত্ম-অভিমান,
চরমে লভিবে যদি শান্তি ধন।..
ছি ছি চিনিলে না ।
কই ভগ্নি কোথা, সুচারুভাষিণি,
রাজিত অধরে সুমধুর হাসি ।
নাচিয়া নাচিয়া এস প্রিয় সখি,
যৌবন নৰ্ত্তনে নাচিয়া রূপসি !
আজি তব পতি প্রবাস কাতর,
জুড়াতে এসেছে হিয়া কাতরিত
দুস্তর প্রান্তর করি অতিক্রম,
ছায়ামূলে যথা পথিক তাপিত।
প্রেম-সূত্র দিয়া সুচাৰু বন্ধনে
বাঁধি রাখ দৃঢ় হৃদয়ে হৃদয়।
যুগল রূপের ঘন সম্মিলনে
নবীন রূপের হবে অত্যুদয়।
মানসতােষিণী।
;
সমুছিত আজি ভৰ সুখ শশী
প্রেমের সাগরে শপীর উদয়ে
উঠিল উজান ; উজানের সঙ্গে
নাচ দেখি রঙ্গে ভােমরা উভয়ে।
কিবা সুপ্রভাত আজিললা তােমার !
সৌভাগ্য অরুণ দেখলাে উদিল ;
কিরণ হিল্লোলে প্রণয় কমল
খে দেখি সখি কেমন ফুটিৰ।
।
আজিলাে তােমার সুখের সুদিন
হৃদয় আকাশে ঘুচিল আঁধার।
রসের সাগরে তােমরা দম্পতি,
আমরা নিরখি, দাওগাে সাঁতার।
হৃদয় খুলিয়া হৃদয়ের ব্যথা,
প্রাণের যাতনা অসহ, অনন্ত
দেখাও প্রাণেশে ; ব’ল দাসী বলে,
সাজে কি এ হেন কাঠিন্য হে কান্ত?
বিচ্ছেদ নিদাঘে প্রাণের পিপাসা ;
সুধা পানে আজি শম বিনােদিনি ;
সুধারে অধরে সুধাধার বুরে
দহন না রবেনা লাে ধনি। •
ছি ছি চিনিলে না।
মধুরে মধুর নৰ অত্যুদয়ে
কাহার নয়নে প্রীতিকর নয় ?
পতির সােহগে সতীর যতনে
দেখাও কি শােভা সন্নিহিত রয়।
মধুর ষিয়া, মধুর হাসিয়া
হাসাও পতিরে দর্শন কাতর ;
নবীন যৌবনে যুবতীর হাসি
তােষে না কাহায়, ময় কি অমর ?
হৃদয় রতনে ধরলে হৃদয়ে
রমণীর প্রিয় চির প্রিয় ধন ;
সাজলাে, সুন্দরি, অমল শােভাম,
আমরা নিরখি জুড়াই নয়ন।
কিন্তু অকস্মাৎ একি ভাব তব ;
কি চিন্তা তরঙ্গ বিষম প্রপাত
উদ্বেলিল, সখি, হৃদয় তােমার,
ঘন ঘন ঘন করিয়া আঘাত ?
মলিন ঝন, নাহি হাসি মুখে,
নাহি প্রফুল্লতা দেহের সুরাগ ;
আহা কি বিচিত্র দেখিতে দেখিতে
কোথা সে চাঞ্চল্য যৌবন সােহাগ।
মানসততাষিণী ।
নাহি বাক মুখে ; কেন লাে নীরব,
নীরব যেমতি ছবি চিত্রাঙ্কিত ;
বিষাদ রাহুর বিষম ছায়ায়
তব সুখ রবি হ’ল কি নিহিত ?
জীবন, যৌবন ক’দিনের তরে।
নশ্বয় সংসারে সকলি নশ্বর।
যাইলে সময় ফিরিবে না পুনঃ ;
তবে কেন বৃথা ভাব নিরন্তর।
সংসারে আসিয়া সংসারে থাকিয়া
পাগলের মত মুখ তরু মূলে
হানিছ কুঠার ; হেন সুসময়ে
আত্মহারা হয়ে থেক না লাে ভুলে।
‘সংসার বন্ধনে নাহি সাধ মাের
বাঁধিতে জীবন’ ছাড় হেন পণ।
ধরলাে বচন করিলাে মিনতি
‘সুখ নাই বিনা সংসার বন্ধন।
হের, পতি তব বিষগ্ন কাতর,
অধােমুখে আজি বসিয়া বিজনে,
মরমের দুঃখে জীবন্তে মরণ ;
দারুণ আঘাত সাজে কি ললনে ?
ছি ছি চিনিলে না !
পতি শক্তি, মুক্তি, পতি ধ্যান, জ্ঞান,
সহায়, সম্পদ, রতন পরম,
দুঃখ, সুখ, পতি জীবন অনন্ত,
পতিপদ-সেবা চরম ধরম।
শুন, সহচরি, শুন মন দিয়া
অবলার গতি পতি বিনা নাই।
ছি ছি চিনিলে না এ হেন পতিরে,
নিরখি আমরা দুঃখে মরে যাই।
কার তরে ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম, বার, ব্রত,
কষ্ট, উপবাস, এ দেহ ধারণ ;
নহে কি উদ্দেশ্য, চির অভিপ্রেত
পতির মঙ্গল একান্তে সাধন।
পরোক্ষে তাহাতে কল্যাণ তােমারি,
তােমারি অনন্ত সুখের সংস্থান ;
সিদ্ধ চিরতরে সার্থক জনম
হবে পরিণামে, এ হেন বিধান।
সীভা, দময়ন্তী, সত্যের সাবিত্রী,
পাণ্ডব ললনা পাঞ্চাল-কিশােরী;
ভীম বিননাদিনী চিতাের-পদ্মিনী,
দেখ পুরাবৃত্ত আর কত নারী ;
৪৪
মানসততাষিণী ।
তুষিতে পতিরে অসাধ্য করম
কত যে সাধিলা, বর্ণিব কেমনে ;
তাই বলি সখি, জীবনে কি ফুল,
জীবন না দিলে পতির চরণে।
হও রূপবতী, গুণবতী তুমি,
গুণের গৌরব, রূপের আদর,
কোথা রবে বল, বল সহচরি,
পতিরে তুষিতে হইলে কাতর?
কেন কাদি
কেন কঁদি আমি? নিবার কঁদিতে?
হায় আজি তুমি পার না দেখিতে
আমাদের নেত্রে সলিল সরিতে ;
কামা আমাদের সম্বল জগতে।
;
দারুণ আঘাত গরমে করিয়া
নিবার কাদিতে সরমে খাইয়া
অন্তৰ্দাহ ঘাের রাখে নিবারিয়া,
কে আছে সুহৃদ প্রবােখিয়া হিয়া।
কেন কাদি?
৪৫
কেন, কাঁদি কেন, তুমি কি জান না?
জাননা হৃদয়ে বিষম যাতনা ।
সত্য তােমাদের ব্যবসা বঞ্চনা ;
নহিলে এখন এমন জল্পনা।
‘কেঁদনা কেঁদনা ও নিঠুর বােলে
দিওনা আহুতি জলন্ত অনলে ;
মনের আগুণে মরিতেছি জলে,
দেখ না তাহাতে কিবা ফল ফলে।
মধুবর্ষি তােমাদের মিষ্ট কথা,
ভাবিছ, চালিছে কতই মমতা;
কিন্তু শুন বর্ণে বর্ণে শেল ব্যথা
বাজিছে মরমে, সরমের কথা !
চাহিনা শুনিতে মধুর বচন,
হউক তাহাতে মধু বরষণ ;
মধুপানে সত্য হয় কি মনন
হৃদয়ে আবেগ বিষম যখন ?
ধরি পায়, যাও যাও যাও সরে
দেও গাে কঁদিতে আজি প্রাণ ভরে।
কেঁদে কেঁদে প্রাণ বায়ু যা সরে
কি ফল ফলিবে প্রতিরােধ করে।
৪৬
মানসততাষিণী।
‘অদৃষ্টের ফল’ ‘অদৃষ্টের কথা,
প্রাণতাে শুনেনা ও হেন বারতা ;
কে শিখাল ওই অমঙ্গল কথা ;
ওই বােলে খেলে আমাদের মাথা।
কি ছার অদৃষ্ট! অদৃষ্ট মানি না
অদৃষ্ট দোহাই শুনিতে চাহি না ;
অদৃষ্ট বাদিত্ব অনৃত জল্পনা,
জটিল মনের কুটিল কল্পনা।
তােমরা অদৃষ্ট, বিধি-চক্র ধর,
আর্যনারীভাগ্যে অঙ্কপাত কর ;
স্বার্থ তােমাদের জীবনের সার,
বৃথা কেন দাও দোষ বিধাতার।
আসন্ন শমন যাহার শিয়রে,
দিন দুই পরে লৈলা কেশে ধরে ;
রাক্ষসের প্রায় নৃশংস আচারে
ধনলিপ্সা বশে সমর্পিলা তারে।
এই তত কপাল ; এখন বুঝিলে
যাহার লােহায়ে সব পাসরিলে।
মুখপানে হায় ফিরি না চাহিলে,
দারুণ আঘাত মরমেতে দিলে।
কেন কাঁদি?
ওরি নাম বিয়ে আগেতে জানিলে,
তখনি আহুতি দিতাম অনলে
পরাণ আমার ; নয়নের জলে
ওগাে ভাসিতাম আজ কি তা হলে।
পরাণ দিতাম তখন বুঝিলে,
পশিয়া অতল গঙ্গার সলিলে
পাষাণ বঁধিয়া অনায়াসে গলে ;
দেখিতে তােমরা বসে থাকি কুলে।
আজি গাে যৌবনে প্রবৃত্তি উদয় ;
বাসনার গতি কভু রােধ নয় ;
অদৃষ্ট দোহাই শুনিতে না চায়
কাতর পরাণ ; কি হবে উপায় !
আছে যে উপায় ঠেল তায় পায়,
মেয়াে না মেরাে না ধরি ওগাে পায় ;
রাখ রাখ পায়, নহে প্রাণ যায়,
প্রাণ গেলে বাচি তাও কই যায় ।
যে আপা প্রাণের বলিতে পারি না ;
স্বপনেতে তাহা হয় না ধারণা।
সহজে আমরা অবলা ললনা ;
সাজে কি এ হেন অসহ যাতনা ।
৪৮
মানসতােষিণী।
কঠিন তােমরা দিন দুই পরে,
প্রাণের প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে
প্রাণ পাও, বিধি দেয় দেশাচারে ;
শােভা পায় সব পুরুষেরি করে।
পলেক তােমরা সহিতে পার না ;
কি কর, নিঠুর, ভাবিয়া দেখ না।
ফুকারে বলিতে বচন সরে না ;
নিলাজ পুরুষ কেনরে মরে না।
রক্ত, মাংস আছে সকল শরীরে,
তাদের ধরম কথাতে কি ফিরে ?
নিসর্গের গতি কেবা রােধ করে,
কেবা এ সংসারে হেম বল ধরে ?
দেবের অসাধ্য ; ধিক্ থাক নরে,
প্রবৃত্তির দাস পাশৰ আচরে !
কিন্তু যে শকতি মােদের শরীরে,
দেবে কিম্বা নরে স্বপ্নসম হেরে।
অবলা আমরা, কান্না মাত্র খল ;
দাও গাে কঁদিতে ফেলি আঁখি জল ;
ঘাের অন্তর্দাহ হউক শীতল ;
. মাহি কেহ দিতে বিন্দুমাত্র জল।
কেন কঁদি
অবলা বলে.কি এত অপরাধী।
কোন পাপে বিধি হৈলা নারীবাদী।
ক্কি দোষ বিধির ; দোষী নিরবধি
নহে কি পুরুষ আত্ম স্বার্থ সাধি?
ধিক দেশাচার, ধিক দেশাচার।
সহে না সহে না দুষ্ট ব্যবহার।
পুরুষের হয় বিয়ে বার বার,
হয় না কি বিয়ে পুনঃ বিধবার?
শান্তু অসম্মত ? রাখ শাস্ত্র তুলে
কিম্বা টান শারি ফেলি দেও জলে,
অথবা পােড়াও জ্বলন্ত অনলে ;
ও শাস্ত্র অশাস্ত্র, অধৰ্ম্ম নিলে।
যদি শাস্ত্র মান, দেখ পরাশর ;
বিবাহ বিধান আছে বিধবার।
‘নষ্টে মৃতে ইতি’ বিধি করি সার
কেননা দলিছ দুষ্ট দেশাচার ?
কলিতে এ ধৰ্ম্ম নহে শাস্ত্রাচার,
সত্য ত্রেতা আদি যুগের ব্যাপার ।
যুগে যুগে শাস্ত্রে হয় রূপান্তর ;
কালি শাস্ত্র, আজি অস্ত্র, খরতর।
মামসতােষিণী ।
জটিল কুটিল ফুটতর্ককারী
টায় কতই কুটতর্ক করি ;
বচন জ্বালায় প্রাণেতে শিহরি ;
বিদার বসুধা, এ জালা সম্বরি।
শাস্ত্র ছেড়ে আজ অন্য কথা কও;
সহজ বুদ্ধিতে কি বলে সুধাও;
বলিবে কখনাে বিধবা জ্বালাও,
বিধবার বুকে পাষাণ চাপাও ?
কি করিতে কি করি’ছ দেশাচার,
পাপস্রোতে দেখ ডুবিছে সংসার ।
গেলরে গেলরে না দেখি নিস্তার,
চৌদিকে ঘেরেছে কি কাল পাথার।
কত শত দ্রুণ হত্যা দিনে দিনে
হ’তেছে নিয়ত আৰ্য্য নিকেতনে ;
শাণিত শুকায় কথা হ'লে মনে ;
কি দৃশ্য কুদৃশ্য ভারত ভবনে।
ডুবিলে অতল সাগরের জলে
; রবে এ কলঙ্ক ভারতের কোলে ;
ঘুচিবে না দাগ পুড়িলে অনলে,
ভরাশি হতে উঠিনেরে জলে।
কেন কাদি?
এ পাপের ফল ভারত পীড়ন,
ভারতের দুঃখ হবে না মােচন।
ভারতের তরে অশ্রু বিসর্জন
কভু কি করিবে কাহার নয়ন।
রবি, শশ, গ্রহ, ত্রিদিব অমর,
দেখিছ তােমরা গন্ধৰ্ব্ব, কিন্নর,
দেখিছ তােমরা মৰ্ত্তবাসী নর,
ভারতের কিবা দুষ্ট ব্যবহার।
অনন্ত নিয়ে ভারত ডুবিবে;
নিরয় পাবকে ভারত পুড়িবে ।
পুড়িবে, তথাপি ভস্ম নাহি হবে ।
ভস্ম হলে অহহ প্রাণালা যাবে।
কত দিন আর বিধায় সহিবে,
দেখিতে দেখিতে ভারত মজিবে।
মজিবে নিশ্চয় ভবিষ্ণু দেখিবে,
পাপের এ ফল অবশ্য ফলিবে।
আমরা দেখিব, আননে হাসিব,
অন্তরীক্ষ হতে করতালি দিব ।
তার সঙ্গে সঙ্গে গরবে নাচিব,
নাচিতে নাচিতে
মধুর
গায়িব।
মানসততাষিণী।
ভারতের কথা কেহতে কবেনা,
ভারতের নাম মুখেতে লবেনা;
ও নাম করিয়া দুষিবে রসনা
হেন জন কেহ জগতে রবেনা।
সময় থাকিতে কর প্রতিকার,
নহিলে ভারত হইবে সংহার ;
ডুবিলে অতলে, করিবে উদ্ধার
অল্পশক্তি নর, কি সাধ্য তােমার ?
. =
তুমি হে সাগর, কত দিন রবে ?
তোমার সলিল সময়ে শুকাবে।
নামের মহিমা রেখে যাও ভবে,
নহিলে ভারত একেবারে যাবে।
ডুবাও অতল অতল জলেতে
পাপ দেশাচারে দিও না উঠিতে ;
তর পুণ্য তােয় নাচিতে নাচিতে
খেলিবে সর্বত্র পাপ ভস্ম ধুতে।
কুতর্ক হিল্লোলে সাগর টলিলে,
ঘুষিবে কলঙ্ক জগতে সকলে ;
আমরা কাঁদিগগা বসি তব কূলে,
দেখ যেন প্রাণ যায় না অকুলে।
কেন কাদি ?
মিনতি, সাগর, তুলিয়া তরঙ্গ
দেখাও শাস্ত্রের নব নব রঙ্গ;
দেখিয়া অরাতি যত দিক ভঙ্গ,
হাসিগাে আমরা ঘুচাও আতঙ্ক।
বিজন সঙ্গীতে বিজন কন্দর
বমুখিছ তুমি, মহর্ষি প্রবর;
দুষ্কর জানিয়া বিধবা উদ্ধার,
ত্যজেছ কি, দেব, সােণার সংসার।
কুমারিকা হতে হিমাদ্রি শেখর
বিদরিছ অহােরাত্র, শাবির
কিন্তু বিধবার ঘাের হাহাকার
অতলে ডুবায় ধরম প্রচার।
যাবৎ জীয়িবে পাপ দেশাচার,
যাবৎ ঝরিবে আঁখি বিধবার,
হক ইন্দ্র, চন্দ্র, কত শক্তি কার,
হেরি স্বপ্নময় ভারত উদ্ধার ।
রেখে দাও আজ সমাজ সংস্কার,
পগু হবে সূত্য শ্রম সবাকার।
ভাবি দেখ সুধিগণ একবার
শিথিল বন্ধনে কাৰ্যসিদ্ধি কার ?
-
মানসততাষিণী।
শিক্ষিত উন্নত হে যুবক দল,
কোথা ওজস্বিতা, মানসিক বল ;
কোথা তােমাদের উচ্চশিক্ষা ফল,
অমৃতে উঠিল, সত্য কি গরল ।
ভাবি তােমরা আমাদের বল,
তােমরা মুছাবে নয়নের জল ;
ভীত, সঙ্কুচিত, কেন হীন বল,
পার না দলিতে কি অরাতি দল?
তােমরা নীরব ; দেখিয়া অবাক,
লাজে, দুখে মুখে নাহি সরে বাক!
আমাদের প্রাণ যা কিম্বা থাক,
ছি ছি ছি তােমরা আজি গাে নিৰ্বাক্।
শুনেছি কবিরা বীণার ঝঙ্কারে
পারে গো করিতে দেবে যা না পারে ;
আজি বুঝি. কেহ এই বঙ্গাগারে
সেরূপে পারে না বাজাতে বীণারে।
আমরা শুনেছি বীণার বাদনে
প্রাণ পায় নাকি নির্জীব পাষাণে ;
মজে বিষধরে সুললিত তানে
মানবের মন মজে না সে গানে ?
;
=
কেন কাদি?
৫৫
বৃত্রাসুরে তুমি সংহারি সমরে,
অভয় দানিলা ত্রিদিব অমরে ;
অবলা বলে কি চাহিলে না ফিরে ?
এ দশা হেরিলে পাষাণণা বিদরে।
পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করে
নিঃশত্রু তুমি কি ভাবিছ অন্তরে ?
দেখ আশে পাশে কত শক্ত ফিরে,
বিনাশ তাদের সম্মুখ সমরে।
মৃণালে বাঁধিয়া রাজহংসবরে
বিমুন্ধিলে দেব, মর্ত্যবাসী নরে ;
বঙ্কিম নয়নে কটাক্ষ গাে করে,
দেও গাে অভয় জিনিয়া সমরে।
বীর হও যদি এস গাে সমরে,
বীর যারা সমরে কি ভয় করে ?
বিজয়ী তােমরা খর অসি করে।
ত্রাস কায়, কেবা হেন বল ধরে ?
সংগ্রাম নিপুণ বীর অগণন
আসি যােগ দিবে অমনি তখন ;
দুন্দুভির ধ্বনি করিলে শ্রবণ,
কৃপাণ করেতে করিবে ধারণ।
মানসততাষিণী।
চমু শত শত করি দৃঢ় পণ
হাসিতে হাসিতে আসি দিবে রণ ;
হেন নেতৃবর্গ করি দরশন
উৎসাহে নাচিবে অখিল ভুবন।
আঁখি পালটিতে হইবে নিধন
ঋপুদল ; মহা বিজয় স্বনন
উঠিবে অমনি ভেদিয়া গগন
এস দুরা, কেন ভয় কর রণ?
আত্ম-সুখে মত্ত বঙ্গবাসীগণ ;
পর দুঃখে তারা কাতর কথন!
আমাদের আশা, সুদূর স্বপন;
সত্য কি নােদন ললাট লিখন!
হ'ত কি কাঁদিতে আজি গাে এখন,
রাজাজ্ঞা না যদি করিত বারণ
জ্বলন্ত আগুণে সতীর দাহন ;
হয় না কি পুনঃ সে বিধি স্থাপন?
ছাড়িয়া মমতা আগুণে পশিয়া,
মৃত পতিপদ শিরেতে ধরিয়া
মুহূর্তের মধ্যে যেতাম পুড়িয়া ;
প্রাণ-বায়ু কোথা যাইত উড়িয়া।
! কেন কঁাদি? ;
আগুণে আহুতি দিতাম পরাণে,
দহন যাতনা অবসিত ক্ষণে ;
চিন্তানলে চিত জ্বলে নিশিদিনে ;
অশিব হলেও মঙ্গল মরণে।
ধরিগগা জননি, ধরি তব পায়,
রাখ দয়াবতি, এই ঘাের দায় ;
যদি পার গাে করিতে উপায়,
দাও দাও বিধি পুড়ি পুনরায়।
পরধর্মে মাগো, হাত কি দাও না,
যেখানে সেখানে এ হেন ঘােষণা।
সতীদাহ পুণ্যকর্ম আছে জানা ;
কেন গাে জননি কর তায় মানা ?
-
কিন্তু শাস্ত্রে আছে বিয়ে বিধবার,
নহে ত অশাস্ত্র, করগাে প্রচার
বিবাহ আবার ; ঘুষিবে সংসার
যাবৎ প্রলয় সুকীৰ্ত্তি তােমার।
যে যাতনা হায় জানতে জননী,
বর্ণিব কেমনে হার মানে বাণী।
হিন্দু নারী মােরা জনম দুঃখিনী,
কার অভিশাপে চির অভাগিনী।
মানতােষিণী ।
লােম বিহণ নিঠুর দর্শন,
জ্বলন্ত অনলে সতীর দহন ;
তাই কি করেছ জননী বারণ?
স্বতঃই সরস রমণীর মন।
ঐণহত্যা নহে নৃশংস দর্শন,
নহে সত্য সত্য হৃদি বিদারণ।
কিন্তু কত শত অকালে শমন,
দিন দিন মাগাে করিছে ভক্ষণ ।
আরাে বলি মাগাে এ ক্ষীণ নয়ন,
অনিশ করিছে অশ্রু বিসর্জন ;
হৃদয় হুতাশ, হৃদয় বেদন,
করে না জননী শােণিত শােষণ।.
কত কাল আর করিব রােদন।
কাঁদিয়া কাঁদিয়া কলুষ নয়ন ;
হায়রে কে বুঝে অসহ যাতন
কতই প্রাণের, কত নির্যাতন।
কোথা দীননাথ বিপ ভঞ্জন,
শিব সর্বময় সন্তাপহরণ ;
কি না জান তুমি অন্তরবেদন।
লও প্রাণ, পদে করি অরপণ।
কেন দেখা দিলে?
শেষে এই ভিক্ষা করি চরণে,
নারী নাম পিতঃ ভারত ভবনে।
কর লােপ ; দেখুক পুরুষগণে
কি যাতনা প্রাণে নারী ধন বিনে
কেন দেখা
দিলে ?
প্রিয়তমে, কেন দেখা দিলে,
সুষুপ্ত অনল পুনঃ কেনলাে জলিলে ?
নিবাইতে যে অনলে,
অতল বিস্মৃতি জলে,
বিসর্জিনু প্রতিমায়, কেন স্মৃতি তায়
দেখায়ে মুহূৰ্ত্ত তরে কাদালি আমায়।
মাথা রাখি সুষুপ্তির কোলে,
সুষুপ্ত জগৎ ভাসে আনন্দ-সলিলে ।
শান্তি স্রোত সুধাময়,
নীরবে সর্বত্র বয় ;
বহিল হৃদয়ে মম ঘােরতর ঝড়,
বহিল চিন্তার স্রোত করি তড় তড়।
মানসততাষিণী। বিষ সম মরমের জ্বালা, এই তাে ঘুমায়ে থেকে পরাণ ভুলিলা ; নিদ্রাভঙ্গে অকস্মাৎ সেই সব যুগপৎ- সেই চিন্তা, অন্তৰ্দাহ, হৃদয় বেদনা, বিষম হুতাশ সেই, অসহ যাতনা। কেন প্রিয়ে এত প্রবঞ্চনা ? সরলা ললনা নাকি জানে না বঞ্চনা। এই কি গাে সরলতা, এরি নাম কোমলতা, বঙ্কিমতা, কঠিনতা বুঝাও আমায়, কেমন তাদের ধর্ম, নিবাস কোথায় । ভাবি দেখ দেখি সুবদনে, করে ধরি কতবার, বিনীত বচনে, হৃদয়ের গূঢ় কথা, মরমের ঘাের ব্যথা, কহি কাতরে যবে, কি উত্তর দিলে? আমি কি আমাতে রই সে কথা স্মরিলে। ‘ফিরে যাও যুবক চঞ্চল, শুনিবারে নাহি চাই প্রেম কোলাহল ; যাও যাও যাও ফিরে, আসিও না ফিরে ঘুরে,
কেন দেখা দিলে ?
অদৃষ্টের চক্রে আমি একাই ঘূরিব,
আন্সিয়াছি একা আমি, একাই যাইব
প্রিয়ে, কেন তবে দেখা দিলে ?
ভুঞ্জিবে অদৃষ্ট ফল একাকী বিরলে।
তব চক্রে ঘাের তুমি,
মম চক্রে ঘুরি আমি,
চক্ৰ হ’তে চক্রান্তরে কেনলাে আইলে ;
আসিয়া আবার বল কোথা লুকাইলে ?
দেখাইলি কেন রে স্বপন,
জালাইলি বিস্মৃতিরে কেন অকারণ?
কি হেরিল এ নয়ন ।
শূন্য গৃহ, ত্রিভুবন,
শূন্য প্রাণ, শূন্য মন, শূন্য সমুদয় ;
গভীর আঁধারে সব নিমগন রয় ।
বিদ্যাসাগরের
পরলােকান্তে।
একি বাণী অসম্ভব করি রে শ্রবণ ।
‘সাগর’ জীবন হীন, সত্য কি স্বপন।
হেরিতেছি ঘরে ঘরে,
নর নারী সমস্বরে,
অধীরে আকুল প্রাণে করিছে রােদন ;
হৃদয়ে দুরন্ত বেগ কে করে ধারণ।
কুপ্রভাত আজি কিবা, একি অমঙ্গল।
ভারতগৌরব রবি পশে অস্তাচল।
প্রকৃতি মনের দুঃখে,
রহিয়াছে অধােমুখে ;
হায় হায় অকস্মাৎ একি বিপর্যয় ;
হৃদয়ের অন্তস্তর বিগলিত হয়।
সদাই ছিলেন তিনি মঙ্গলেতে রত ;
জীবের মঙ্গল ইচ্ছা তাঁর সদাব্রত।
কেবা কোন্ অনুযােগে,
বঞ্চিল ভারত ভােগে,
অমর প্রতিম সেই ঈশ্বর দয়ালে ?
গ্রহের বৈগুণ্য অহহ এ পােড়া কপালে ।
পরলােকান্তে।
অয়ি দেবি ভাগীরথি নগেন্দ্র-নলিনি
জগৎ উদ্ধারে তব আগমন শুনি।
দুর্বিষহ পাপ ভার,
পারি বহিতে আর,
লয়েছ কি তুমি সেই দয়ার সাগর,
বহিবারে তােমা সনে সে বিষম ভার ?
অভ্রভেদি দেব আত্মা দেব হিমাচল !
জান কোথা পশিয়াছে মনীষি অটল ?
নত শির কভু যার
হেরি নাই, গিরিবর।
হায় কে ভাঙ্গিল সেই মহত্ত্ব আধার,
সদা সমুন্নত শির আছিল যাহার ।
রত্নাকর নাম ধর তুমি হে সাগর ।
হয়েছে কি রত্নহীন তােমার ভাণ্ডার ?
নাহি যদি অপ্রতুল,
কেন হয়ে প্রতিকুল,
কাঙ্গালের সবে ধন করিলে হরণ ?
রত্নগর্ভে হেন রত্ন ছিল না কখন?
শুন হে শশাঙ্ক ! শুন, মিনতি চরণে,
ভারত নির্মল শশী হেরেছ নয়নে ?
কোন দুষ্ট রাহু এসে,
অকলঙ্ক শশী গ্রাসে।
মানসতোষিণী।
সিদ্ধ হ’ল মনস্কাম, কলঙ্কি, তােমায় ;
নিৰ্ম্মল “ঈশ্বরচন্দ্র” না উদিবে আর।
মাের দিব্য বল সত্য ওহে সমীরণ,
দীপ্তিমান শিখা কেবা করিল নিৰ্ব্বাণ ।
নাম তব সদাগতি,
ত্রিলােকে সর্বত্র গতি,
জ্ঞান-পথে বিচরিতে না শুনি কখন ;
সেই ক্ষোভে জ্ঞান দীপে নিবা’লে পবন ?
সত্য কি কপট তুমি, দেব অংশুমালি ?
রাখিলে জগতে ভাল কলঙ্কের ডালি ।
যাহার জ্ঞানের জ্যোতি
নিন্দিত তােমার ভাতি,
হরিলে তাহার তেজ হয় কি কুক্ষণে।
ভারত আঁধারে ভাসে জ্ঞানালােক বিনে।
বল রে কৃতান্ত কীট! আজি কোন্ পাপে
করিলি রে শােভাহীন ভারত পাদপে ?
গত বহু শত দিন,
ফুটে ছিল যে প্রসূন,
অর্ধমৃত ভারতের বন্ধু শাখা’পরে,
হইল কি লাভ তায় বৃত্তচ্যুত করে ?
পরলােকান্তে।
কাঙ্গালিনী বঙ্গভাষা ঋণী তব পদে ;
করিল কি দোষ, প্রভু, পদ-কোকনদে ।
অন্ন জল দিয়া হায়,
পুষ্ট কৈলে যার কায়,
অমাথিনী করি তায় কর পলায়ন ;
কাতরে করিছে দেখ কতই ক্রন্দন।
অপ্রমিত দানে, প্রভু, ভারত ভিতরে
হইত পালিত যারা অপত্য আদরে,
হেরিয়া তাদের মুখ,
ফাটিবে কাহার বুক ?
হয়েছে অনাথ সব কাদিয়া বিহল ;
অনাথা, বিধবাবালা কোথা পাবে স্থল।
অক্ষয় সুকীৰ্ত্তি তব মেট্রোপলিটান,
ব্যক্তিগত ক্ষমতার জ্বলন্ত নিশান।
সেই কীৰ্ত্তি রক্ষিবারে,
তােমা ভিন্ন অঙ্গে পারে,
সাবধানে যথাযােগ্য সুবিধি বিধানে ;
নাহি হয় এ বিশ্বাস কভু, প্রভু, মনে ।
ছাত্রগণ ওই দেখ করে হাহাকার
স্মরি গুণরাশি তব, গুণের আধার।
পাষাণে বাধিয়া হিয়া,
পুত্রমেহ পাসরিয়া,
মানসততাষিণী ।
কোন্ দেশে গেলে চলি, কোথা হেন দেশ;
সত্য কি নাহিক তথা মমতার লেশ।
!
থাক যথা ইচ্ছা তথা দয়াল ঈশ্বর
আমরা আশীষপ্রার্থী তােমার কিঙ্কর।
চির দিন রেখ মনে,
ভুল’না সন্তানগণে;
এই ভিক্ষা পদে, প্রভু, পুরে যেন আশ ।
ঈশ্বর সকাশে আজি ঈশ্বরের বাস।
;
বৃথা করি অনুতাপ মােরা মূঢ় জন ;
লীলান্তে গেলেন প্রভু স্বকীয় সদন।
জীবের মঙ্গল আশে,
বিহরিয়া মৰ্ত্তাবাসে,
গেলেন অমরাবাসে আপন ইচ্ছায় ।
দেব অংশে জন্ম তার হেন জ্ঞান হয়।
,
আসিব না আর
যাই তবে প্রিয়জমে, এই শেষ দেখা ;
দেখিবার সাধ হলে,
নিভৃতে হৃদয় খুলে,
নয়ন ভরিয়া
দেখিব ও চারু রূপ প্রাণের প্রতিমা,
চিত্তপটে আহা কিবা বিকাশে সুষমা !
জন্মশােধ দেখা এই, এই প্রিয়তমে ;
এই দেখ যাই প্রিয়ে,
সাধে জলাঞ্জলি দিয়ে,
জনমের মত ।
ইচ্ছা হলে অবিলম্বে মুদিয়া নয়ন
দেখিব হৃদয় মাঝে হৃদয়ের ধন।
এই শেষ দেখা, আশার নির্বাণ এই
আত্মসুখ আশা করে,
আঘাতিব মর্মোপরে,
প্রসূন মার্দব ?
তােমার ঝরিবে আঁখি সম্মুখে আমার,
ধিক ভালবাসা, ধিক আমি, শতবার।
৩৮
মানসতোষিণী।
থাক থাক থাক প্রিয়ে, ব্যথা যদি পাও;
বাজিবে হৃদয়ে তব,
কিরূপে সুস্থির রব,
হৃদয় হৃদয় ।
পাষাণ হইলে গলে থাক্ অন্য কথা,
মানবের মন স্বতঃ জড়িত মমতা।
হাড়িয়া মমতা, মায়া, যাই তবে চলে ;
এই দেখা শেষবার,
দেখিতে আসিব আর,
আর প্রিয়তমে ?
বহিবে ষাৰৎ রক্ত ধমনী মাঝার,
আসিব না আর, প্রিয়ে, করি অঙ্গীকার।
সংসার ছাড়িয়া আমি পশিব কানন ;
নাহি তথা কোলাহল,
আহা কি সুন্দর স্থল,
শান্তি বিরাজিত
নিত্য প্রেমসিন্ধু তথা বহে উছলিয়া
দূরিব প্রাণের তৃষা শান্ত হবে হিয়া।
v
একাকী বিপিনে না যদি থাকিতে পারি,
তােমার প্রতিমা করে,
রাখিব নয়ন’পরে,
লাে নয়নতারা ;
আসিব না আর।
আমলে হেরিব আমি ফুল্ল মুখশশী,
হাসিব প্রাণের হাসি বিরলেতে বসি।
কাননে কুসুম তুলি মনের মতন,
চিকণিয়া বিরচিব
কম অঙ্গ সাজাইব,
নির্জনে একাকী;
শােভিবে অমল কিবা মানসমােহিনী,
নবীন যৌবনে হবে নবীনা যােগিনী।
আর কেন, যাই তবে, যাই প্রিয়তমে ;
মনেতে মনের কথা
রহিল একত্রে গাঁথা
একটী একটী
দেখা হলে পুনরায় সুধাংশুবদনি ;
সুধাইব সহরষে সে সব কাহিনী।
সাধ ছিল মনে মনে দুজনে মিলিয়া,
গভীর নিশীথে যবে
জগৎ ঘুমায়ে রবে,
ডাকিব বিভুরে ;
থাক থাক আশা আজি থাক মনে মনে ;
হইব সফল কাম মুখের সে দিনে।
মানসতােষিণী।
যাইবার কালে এই এই শেষ ভিক্ষা,
আগে যদি যাও চলে,
থেকনা আমায় ভুলে
প্রেমের পুতলি ;
রেখ মনে প্রাণময়ি, মিনতি আমার ;
আলোেক মাঝারে যেন না হেরি আঁধার
কি ভাবি?
এই তার পরিণাম, এই পরিণাম,
তুলিয়াছি সুধা ভ্রমে কেবল গরল !
বুঝিতাম যদি, কোন মূঢ়, ধিক্ তায়,
পতঙ্গের মত তবে পশিত অনল?
হায়, ছলে, বলে, কত কুহকে, কৌশলে,
পাপ প্রলােভনে করি আত্ম বিসর্জন ;
নাহি সংজ্ঞা, নাহি জ্ঞান, মনের সংযম,
মােহাঞ্জনে কলুষিত নিয়ত নয়ন।
সুখ অন্বেষণে বৃথা ঘুরিয়া ঘুরিয়া
তৃষিত, কাতর অতি, হৃদে শান্তি নাই ;
তথাপি লালসা বলে আরাে আগে চল ;
মিলিবে রতন পিছে নাহিরে বালাই।
কি ভাবি ?
তৃষিত পথিক প'ড়ে ঘাের মরুভূমি মাঝে,
জল ভ্রমে যথা মরীচিকা পানে ধায় ;
তৃষিত হৃদয় লােভের মন্ত্রণা শুনে
সুধা বােধে বিষ পানে তেমতি তাকায়।
;
রিপুগণ ষড়যন্ত্রে আজি বন্দী আমি
দুর্ভেদ্য ব্যুহের মাঝে ; না জানি নির্গম।
আমার দুর্দশা হেরে অট্ট অট্ট হাসে,
নাহি দয়া লেশ মাত্র, নিঠুর, নির্মম।
যৌবনে প্রবৃত্তি যত অস্থির, উন্মত্ত ;
শম, দম, সত্য আদি সদ্গুণ নিচয়
প্রবােধিল কত ; কল্পনার ক্রিয়া বােধে
হৃদয়ে উদ্ভব মাত্র হৃদয়ে বিলয় ।
ধৰ্ম্ম উপদেশ, জ্ঞানের গম্ভীর কথা,
শুনিল না প্রাণ ; বদ্ধ হই মােহজালে ;
লুতন্তু মাঝে হায়, যথা উর্ণনাভ
করমের দোষে হয় বদ্ধ নিজ নালে ।
ভাবনা তিমির আজি দৃষ্টিপথ মাের,
রােধিয়াছে দৃঢ় ; নিঃসহায়, নিরুপায়,
যেমতি অন্ধের দশা নয়ন বিহীনে
বুঝি বা অকালে বিপাকে জীবন যায়।
৭২
মানসতােষিণী ।
সংসার সাগরে পড়ে জীবন তরুণী
ভেসে চলে যায়, তরঙ্গে তাড়নে ঋন ;
সদা শঙ্কা জীর্ণ তরী হয় চুরমার;
কে হবে কাণ্ডারী আজ, কোথা হেন জন ?
ভাবিয়া আকুল, হেরি বিপুল তরঙ্গ
পৰ্বত প্রমাণ ; তার মাঝে ক্ষুদ্র তরী ;
টলিছে তরণী ; হাল ছেড়ে চলে গেছে
ছিল যে কাণ্ডারী; তাই আতঙ্কে শিহরি।
এখন বুঝিলে কেন ভাবি, কি ভাবনা,
কি বিকার অহর্নিশ করে কলুষিত ;
করিয়া আঘাত ঘন ঘন কি তরঙ্গ,
শিথিলিত চিত বেলা করে উদ্বেলিত।
শুনে বারণ করিয়াছি কত পাপ ;
জীবনের রক্তে যদি করিলে তর্পণ
হয় প্রায়শ্চিত্ত, না হব কাতর তায় ;
শমিবে প্রাণের জ্বালা, আত্মার দহন।
থাকিতে কাণ্ডারী তুমি পাপীদের ত্রাতা,
জীর্ণ হতে জীর্ণ তরী ডুবিবে অতলে ?
ক্ষমা করি হাল ধরি তুলে দেও পারে,
দিশাহারা হয়ে ভাসি নয়নের জলে।
ভালবাসা তার।
পলেক ছাড়িলে পরাণ কাঁদে,
পড়েছি বিপদে বিষম ফঁদে ;
কি জানি কেমন, না হেরে যায়,
আঁধারে সকল ভাসিয়া যায়।
তার প্রাণে প্রাণ মিলায়ে রাখি,
তাহাতে বিভাের নিয়ত থাকি,
নিতি এই সাধ ; মিনতি বিধি,
বঞ্চিত ক’রনা কাঙ্গালে নিধি।
সে রূপ তরণী সােহাগ জলে,
দুলে দুলে দেখ কেমন চলে।
হৃদয় কাণ্ডারী চাপিয়া তায়,
প্রণয় হিল্লোলে বাহিয়া যায় ।
সে মুখ তুলনা কেমনে তুলি,
গগনের চাঁদে যাওরে ভুলি ;
কালিমার রেখা মুখেতে যার,
হইবে কেমনে তুলনা তার ?
৭৪
মানসততাষিণী ।
•
কিসলয় রাগ জিনিয়া বিভা,
অধরে রাজিত সুহাসি কিবা
মৃদু মৃদু তায় অমিয় ঝরে,
শীতল পরশে সন্তাপ হরে।
কোকিলের ধ্বনি ললিত অতি,
বসন্তে কেবল তাহার প্রীতি।
সে কাকলী কিন্তু বসন্তে, তাতে,
মাতায় উল্লাসে শরতে, শীতে।
আঁখি দুটী তার রসের খনি ;
উজল বিভায় লাঞ্ছিত মণি ;
প্রেমসুধা তায় সদাই ঝরে,
তৃষিত হৃদয় শীতল করে।
ধরণী চুম্বিত লম্বিত কেশ,
গৌর অঙ্গে তার মােহন বেশ ;
গঙ্গাতে যমুনা যায়রে ভাসি,
আঁধারে আলােতে যেন রে মিশি
কুসুম মাৰ্দব মৃণাল করে,
নাগপাশ জিনি শকতি ধরে ;
পরিলে গলায় সে ভুজ হারে,
দহন যাতনা নিমেষে বারে।
,
বিজয়া দশশী ।
ভালবাসা তার, হৃদে মা ধরে,
নিয়ত ঝরিছে অঙ্গর ঝরে ;
সন্তপ্ত পরাণে সে বারিধারা
মনে হয় যেন শান্তি কারা ।
সরলতা মাখা মাধুরী তারি
অবিরাম বর্ষে প্রেমের বারি ;
দুঃখে সুখে হাসি, সন্তোষ মুখে,
কণ্ঠহার আমি তাহারি বুকে।
বিজষ্মা দশমী।
কি উৎসব আজি, কেন আনন্দ কল্লোল ?
কেন এ উৎসাহ ধ্বনি ;
প্রতি কণ্ঠে কণ্ঠে শুনি ;
স্বভাবের মুখে পুনঃ শুনি প্রতিধ্বনি;
কঁপে নদ, নদী, সর, ভূধর, মেদিনী।
ভূত, প্রেত, যক্ষ, রক্ষ, গন্ধৰ্ব্ব, কিন্নর,
মিলি সবে দলে দলে,
নৃত্য করে কুতূহলে;
মুখে বলে জয় শিব শশাঙ্ক শেখর ;
বলে মুখে ওই কথা কৈলাশ ভূধর।
মানসতােষিণী ।
অপ্সরা, কিন্নরী হাসে, হাসে বিদ্যাধরী
অমল মধুর হাসে
শুভশােভা পরকাশে ;
হাসির হাসিতে পুনঃ গিরিবর হাসে ।
গিরি দেহ যেন রজত তরঙ্গে ভাসে।
মৃগরাজ সনে বৃষ, বৃষভে শালে,
শিখীসনে বিষধরে
অপরূপ কেলি করে ;
স্বতাবে অভাব আহা কি মন্ত্রের বলে।
অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম কৈলাশ অচলে।
পাদপনিচয় হাসে অচল উরসে ;
পল্লব, কুসুম, কল,
মুকুল, মঞ্জরী দল
শােভে বৃক্ষে বৃক্ষে কিবা শাখায় শাখায় ;
ভুবি অতুলন স্থান কৈলাশ আলয়।
হীরা, মুক্তা, মণি, মাণিক, প্রবাল আদি
রত্নরাজি অগণন,
তরুশির সুশােভন ;
বিচিত্র এ কিরে গত কল্পনা সৃজন!
কল্পতরুরাজীপূর্ণ কৈলাশ কানন।
বিজয়া দশমী।
মন্দার কুসুম হাসে, হাসে পারিজাত
আর ফুল নানা জাতি
ছড়ায়ে অমল ভাতি,
বিকাশে রজতময় অচল উরসে
মধুর সৌরভ ছুটি দিগন্ত পরশে।
•
জুটিল দ্বিরেফকুল সৌরভে আকুল ;
নৃত্য গীত অভিনয়
দেখিয়া কৈলাশময়,
প্রিয়াসমে কুতূহলে নাচে প্রেমভরে,
ভুলিয়া আসব পান মত্ত মধুকরে।
বরষে মধুর ধারা মধুবর্ষি গানে,
কুজনি বিহগ দলে
বৃক্ষোপরে কুতূহলে ;
কুজনিছে পিকবর সুললিত স্বরে,
ঢালিছে অমিয় ধারা শ্রবণ বিবরে।
ব্যজনিছে মন্দ শীতল সুরভি বায়ু ;
ভাসায়ে রসের ভেলা,
পবন রহস্য খেলা,
আমরি আমরি কিবা ভুবন ভুলান !
মুহূর্তে হইল মুগ্ধ কৈলাশ পরাণ ।
মানসতােষিণী।
খুলিলা স্বর্গের দ্বার দেখিনু বিস্ময়ে ;
শত বৈদ্যুতিক আলাে
উজলিল নভঃ স্থল,
সুকোমল দর্শনীয় নয়ন-নন্দন ।
অথবা সহস্র শণী ভাতিল গগন।
যে রূপের ছটা চারু রাজিল আকাশে,
নহে বিজলি প্রকাশ
কিম্বা শশাঙ্ক বিকাশ ;
আসিছে অমরগণ কৈলাশ ভবন,
কৈলাশে আজি কি উৎসব সুপাৰ্বণ।
হংসপৃষ্ঠে পদ্মযােনি আপনি বিধাতা ;
নীল অম্বুরাশি ছেড়ে
স্বাগত কৈলাশ পুরে,
চতুম্মুখে উচ্চৈঃস্বরে গায়ি বেদগান
মুগ্ধ হ’ল চরাচর, পাতাল, বিমান।
আইলা বৈকুণ্ঠনাথ বিশ্ব-বিধারণ ;
বামে লক্ষ্মী বিনােদিনী,
রমেশ হৃদয়-মণি,
মঙ্গল উৎসবে মাতি মুখে মৃদু হাসি
সুধাং উদয়ে যেন ক্ষৈলা ক্ষীর রাশি।
৭৯
বিজয়া দশমী।
আইলা সুরেন্দ্র ইন্দ্র, সহস্র লােচন,
আইলা ইন্দ্রাণী শচী
বাসবের চির-রুচি,
দুলায়ে মােহন হার গাঁথা পারিজাতে,
উৎসাহের সঙ্গে রঙ্গে নাচিতে নাচিতে।
স
বরুণ, কুবের, যম, আসে পােকপাল ;
দ্বাদশ আদিত্য আসে;
চন্দ্রে ঘেরি আশে পাশে
দক্ষকন্যাগণ আসে হাসিতে হাসিতে
নাগলােক হ’তে নাগ বাকি সহিতে।
দেবর্ষি নারদ আসে নাচিয়া উল্লাসে ;
বীণার তার সনে
অঙ্গুলির পরশনে
নেচে উঠে উল্লাসেতে ; নাচে প্রতিধ্বনি;
নাচে সঙ্গে সঙ্গে রঙ্গে প্রকৃতি রমণী।
অঙ্গিরা, বশিষ্ঠ আদি সপ্ত ঋষিগণ,
যােগ ত্যজি ধীরে ধীরে
আইল কৈলাশ পুরে ;
মধ্যে শােভে অরুন্ধতি বশিষ্ট গৃহিণী
আইল মাতৃকা যত ভূভার ধারিণী।
মানসততাষিণী।
উছলিল ঘাের বােলে মহােৎসব উৎস
বহিয়া বহিয়া যায়,
কাপায় ;
নদ, নদী, সরােবর, আকাশ, পাতাল,
গন্ধর্ব, কিন্নর কঁপে, কঁপে দিকপাল।
কি শােভা কৈলাশ ধামে শােভে অপরূপ।
ত্রিদিব
সস্তৃত শােভা,
নাগলােক চারু বিভা,
একত্রে মিশিয়া কিবা পাইছে বিকাশ ;
আহা কি সুন্দর সাজে সাজিছে কৈলাশ।
বিজয়া দশমী আজি ; হিমাচল-সুতা,
মহেশের মনােরমা
জগত জননী উমা,
স্বাগতা কৈলাশ ধামে ; মহােৎসব তাই ;
অমর সমাজে আনন্দের সীমা নাই ।
;
শঙ্করী শঙ্কর বামে শােভিল আবার ;
আঁখি নিমিলিত হর,
পরশে মধুর কর,
উমা সমাগম জানি চাহিলা উল্লাসে ;
উদিলা অসংখ্য শশী কৈলাশ আকাশে।
বিজয়া দশমী।
৮১
অমনি উঠিল মহা বিজয় স্বনন ;
প্রতিধ্বনি বক্ষে করে
ধরিয়া মুহূর্তে তারে,
ঘুরিলা মুহূৰ্ত্ত মধ্যে অখিল ভুবন ;
রটিলা সর্বত্র শুভ উমা আগমন।
হর নাচে, হরি নাচে, নাচে সৃষ্টিধর,
দেবগণ সুখে নাচে,
দেবর্ষি নারদ নাচে,
মাতৃকা সকল নাচে, বাসব বাসনা,
নাচে অরুন্ধতি ঘেরি ভবেশ ভাবনা।
দুহিতা বিচ্ছেদে হেথা অধীর হিমাদ্রি ।
ওইরে মনের দুঃখে,
মেঘেতে বদন টেকে,
নীরবে আঁধার মাঝে কঁদিছে পাষাণ,
বিচিত্র অপত্য স্নেহ গলায় পাষাণ!
বহিছে শােকের ঝড় মেনকা হৃদয়ে ;
কেমনে বর্ণিব হায়,
কত বল রসনায়,
উমার বিদায় কালে কি দশা ঘটিল ;
মেনকার সুখ-সূৰ্য্য অতলে ডুবিল ।
মানসতােষিণী।
নাহি সংজ্ঞা, নাহি জ্ঞান, অচেতন প্রায় ;
আঁখি বিগলিত লােহ,
ভাসায়ে পাষাণ দেই,
কি বিচিত্র, সিন্ধুরূপে অহহ পরিণাম ;
ধন্য স্নেহ জননীর স্থিতি স্বর্গধাম ।
না পারি ধরিতে বেগ কাদিলা সাগর ;
উত্তাল তরঙ্গ ছলে,
আছাড়িয়া পড়ে কুলে,
প্রতিঘাত ফেলি দেয় অকুলে আবার ;
মৰ্ম্ম বিঘাতক কিবা বিচিত্র ব্যাপার।
উত্তরে হিমাদ্রি দে, দক্ষিণে সাগর ;
নরনারী সম স্বরে,
কঁদে সবে ঘরে ঘরে,
শােক সিন্ধু উছলিয়া ভারত ভাষায় ;
আকুল ভারত মাতা ভাবি নিরুপায়।
;
শিশু, যুবা, বাল, বৃদ্ধ,
কঁদিছে সকলে
শূন্য মনে, শূন্য দেহে,
বিষাদে ফিরিছে গেহে;
নিম চিত, নাহি সে উৎসাহ হায় ;
কে যেন দেগেছে মুখ কালীম লেখায়।
বিজয়া দশমী।
বিবর্ণ ভারত, নাহি সে লাবণ্য রাগ ;
যথা চারু পবন,
পশি উন্মত্ত বারণ,
হরিলে কুসুম রাগ দলিয়া চরণে,
পঙ্কিলে আবর্তে ঘাের অমল জীবনে।
নাহি নৃত্য, নাহি গীত, নাহি বাদ্যয়ােল ;
নাহি বাক্য কার মুখে,
নীরব, নিস্তব্ধ দুঃখে ;
নাহি ভাতে দীপমালা সৌধ শির’পরে,
নিবিড় তিমির স্রোত খেলে ঘরে ঘরে।
দিনত্রয় মাত্র সুখে হাসিল ভারত;
যথা ক্ষণপ্রভা হাসি
ক্ষণমাত্র পরকাশি,
মেঘেতে মিশিল ; কাদিল ভারত দুখে ;
আবার পড়িলা ছাই ভারতের মুখে।
অধীন ভারত পরপদ নিপীড়নে
বিষম প্রাণের জ্বালা,
এই ক্ষণেক ভুলিলা ;
জাগিলা আবার সেই সুপ্ত হতাশন ;
আবার হৃদয়ে সেই ঘাের নির্যাতন।
ঈশ হব।
কে রচিল এই বিশ্ব, কিবা তার নাম,
কিবা রূপ, কিবা গুণ, কোথা তাঁর ধাম,
কিবা কৰ্ম্ম, কিবা ধৰ্ম্ম, প্রকৃতি কেমন,
বিষয় বিভব কত, কত পরিজন ?
বিশ্বরূপধারী তিনি, স্থিতি সৰ্ব্ব ঠাই ;
তিনি ভিন্ন জীবে অন্য গতি আর নাই ;
দয়ারূপ, দয়াগুণ, দয়া কৰ্ম্ম গার,
বিশ্বই বিভব তঁার, বিশ্ব পরিবার।
সকলের রাজা তিনি, রাজরাজেশ্বর,
র আজ্ঞা শিরে ধরি চলে চরাচর ;
সৃজন, ধারণ, তিনি বিলয় কারণ,
সকলের হন তিনি অনন্য শরণ।
ভূচর, খেচর, আর যত জলচর,
রবি, শশী, গ্রহ আদি নক্ষত্র নিকর,
তরু, লতা, ফল, ফুল, নদী, সরােবর,
প্রকাশে মহিমা তার ভূধর, সাগর।
সর্বশক্তি তিনি, নাহি অস্ত, নাহি ক্ষয় ;
তিনি পূর্ণ পবিত্রতা, নিত্য জ্ঞানময় ;
ঈশ শুব।
পূর্ণানন্দে পরিপূর্ণ, মঙ্গল আলয়,
অনুরাগ সৰ্ব্বভূতে অবিরাম রয়।
ন্যায় দণ্ড করে তঁার, তিনি ন্যায়বান্ ;
অন্যায় তাহার রাজ্যে নাহি পায় স্থান ;
দণ্ড দুস্কৃতির, সুকৃতির পুরস্কার,
স্বতঃসিদ্ধ চির এই বিধান তঁাহার।
সৰ্ব্ব জীবে প্রেম তার, ব্যাপ্ত সৰ্ব্ব ঠাই,
সমভাব সকলেতে, ভিন্ন ভাব নাই।
অন্তর, বাহির তিনি দেখেন সদাই,
তিনি সত্য সনাতন, নিদ্রা তার নাই।
নাহি অপ্রতুল তঁার, অক্ষয় ভাণ্ডার ;
সৰ্ব্ব জীবে নিত্য নিত্য যােগান আহার ;
বিপদে সম্পদে সদা তিনি মিত্র সার
তেয়াগিলে ঠায় কিন্তু নাহি ত্যাগ তার।
;
একমনে ভক্তিভাবে ডাকিলে তাহায়,
সকল বন্ধন হ'তে জীবে মুক্তি পায় ;
দাও শক্তি, দাও ভক্তি, বিশ্বাস আমায়,
যাই শান্তি নিকেতনে ত্যজিয়া মায়ায়।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.