Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Safal-swapna Ed. 1

Chakraborty, Girin · 2010/04/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সফল-স্বপ্ন
(
ফিডােক্ট প্যানফেরত এর And Then the Harvest
এর অনুবাদ)
গিরিন চক্রবর্তী
পূরবী পাবলিশার্স

প্রথম সংস্করণ
अागज का ११, शमिनाशन ननाव जितिर जान
..अब नया नियम स्मारक विक

উদয়নারায়ণপুৰ,
তরুণ সং
শক্তিসেবা,সাহিত্য বিজ্ঞ
এs
হাও;
ভারতের মুক্তি আন্দোলনের পুরোধা
কম্যুনিষ্ট পার্টির অন্যতম স্রষ্টা
কমরেড মুজফফর আহমদকে

s
চরিত্র-পরিচয়
আনুফাস্টেঙ্কার প্রথম স্বামীর ঔরসজাত কন্যা।
আমােভ, বােসি -কলাবিদ।
ইয়াকুনিন, প্যালেইট পাতাদলের নেতা, পরে বৈমানিক।
ওগনিস্টো-কিরিলের স্ত্রী।
কালিনিন, মিখাইল, আইভ্যোনােভিড়—রাশিয়ায় সর্বোচ্চ শাসন
পরিষদের সভাপতি।
কাটায়েত, কাকার কৃষিজ ট্রাক্টর ক্ষেত্রের অধিনায়ক।
বুভিয়ারকো, আনচুরকা—কী পঞ্চায়েতী খামারের অধিনায়ক।
কুয়েত, ইগর, আইভ্যানােভিচাষী, ইটপাতার কারিকর।
গুরিয়ানােত, নিকিটা—কী পঞ্চায়েতী থামারের একজন নেতা।
চ্যাশেভ, এপিতা-
প্যানােভা, কেনিয়া কিরিলের সহকারী।
পােড়নে সাজী, পেট্রোভিস্টালিনের সহকারী।
পারােনিনা, নাটা-খাদের একটা দলের নেত্রী।
বাখসানীয় সংবাদ পত্রের সম্পাদক।
বােগ্দান-ট্রাক্টর ও ধাতুর কারখানার কর্তা।
কারক-বিপ্লব বিরােধী কনিষ্ট পার্টি সভ্য।
ঝদারকিন, কিরিল—ধাতু ও ট্রাক্টর কারখানার সংগঠক ও সদর পাটি
। সম্পাদক।
দারকি, কিরিলকিরিলের ছেলে।
লিকা-কিরিলের প্রথম পক্ষের স্ত্রী।
রুবিনতু কারখানার প্রধান ইঞ্জীনিয়ার।
তালে পােসমিতিরসম্পাদক। সিসেত, নাসা-ডাক্তার।
মিন, মিটা—চাষী।
ম্পিরিনা, এলেনামিটার স্ত্রী।
নিলােজিয়েটের নেতা।
স্টেফাবিনের স্ত্রী।
।

মুখবন্ধ ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিন-স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সর্বহারা বিপ্লব জয়যুক্ত হল। সে বিজয়ে ধনতন্ত্রী জগৎ স্তম্ভিত হয়ে ভাবলাে এও কী সম্ভব? সেই সঙ্গে তারা এক যােগে শৈশবেই সােভিয়েট রাষ্ট্রকে ধবংস করবার জন্য চারদিক থেকে রাশিয়া আক্রমণ করে। সর্বহারা রাষ্ট্রের পক্ষে সে এক মহা দুর্দিন। ছয়টা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সােভিয়েট ভূমি দখল করতে এগিয়েছে। সােভিয়েট সর্বহারা শ্রেণী তখনন মহাযুদ্ধের রক্তপাতে মুহমান, দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি অথচ দুর্বার ধনতন্ত্রী সেনাদল জোর কদমে এগােচ্ছে! লেনিন-স্ট্যালিনের নেতৃত্বে তাকা একদিকে সাম্রাজ্যবাদী দস্যদের বাধা দিচ্ছে—অন্যদিকে দেশে সােভিয়েট তন্ত্রকে কায়েম করতে চাচ্ছে। প্রায় দুবছর লড়াই করে সাম্রাজ্যবাদীরা অবশেষে পরাজিত ও হতমান হয়ে সােভিয়েট ভূমি ছেড়ে পালিয়ে আসে। এসব যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে তার পরেই রাশিয়াতে দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। দেশের সম্মুখে ভেসে উঠলােকরাল মহামারীর ছায়া। প্রকৃতির পরিহাসে ও বিপ্ললবিরোধী চক্রান্তকারীদের কারসাজিতে সমাজ তান্ত্রিক সংগঠনের পথে নানা বিপ্ন এসে দাড়ায়। দূরদর্শী নেতা লেনিন রাশিয়ার তদানীন্তন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নৰ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করে কয়েক বছরের মধ্যে রাশিয়ায় আভ্যন্তরীন শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। এদিকে আর এক বিপদ ঘনিয়ে আসে। বিপ্লববিরােধী চক্রান্তকারী প্রথমে ভেবেছিল যে, শ্রমিক বিপ্লব সংঘটিত হলেও সত্যিকারের লাশ প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই লেনিন ষ্ট্যালিনের হাত থেকে নেতৃয়ে ভায় ( 9 ) নিয়ে তারাই দেশ শাসন করবে। বিপ্লবের সঙ্গে যােগ দিলেও একদল লােক প্রধানতঃ জিনােভিভ, ক্যামেনেভ, প্রভৃতি বিপ্লবের অন্তর্নিহিত সৰ্বহারা শক্তিতে আস্থাবান ছিল না। এমন কি এদের মধ্যে জিনােভিভ অক্টোবর বিপ্লবের আগে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিপ্লবের জন্য গােপনে নির্দিষ্ট দিন জাতন্ত্রী কাগজে প্রকাশ করে দেয়। এর পরে আবার তিনি কৃতকার্যের অন্য অনুশােচনা করে কমুনিষ্ট দলে যােগ দেন। কিন্তু পর পর কয়েকবার বিদ্রোহ করেও তিনি যখন কিরভ হত্যা চক্রান্তে জড়িত হয়ে পড়লেন তখন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছাড়া সােভিয়েটের অন্য কোনও উপায় ছিল না ! এরা সােভিয়েট নেতাদের নির্ভীক প্রগতিশীল কর্মপন্থায় প্রত্যেক বারই সন্দেহ প্রকাশ কবে বাধা দেয় ও দেশে অস্বাস্থ্যকর আন্দোলন চালায়। টকীর নেতৃত্বে এরা রাশিয়ার শ্রমিক ও কৃষক মিলনের পরিপন্থী কর্মপন্থা সরণ করে। তারা চায় কৃষকদের উপর খবরদারী করে শ্রমিক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা ! এখানে ট্রটীবাদের সামান্য ব্যাখ্যা দরকার! সােভিয়েট বিপ্লব সম্বন্ধে লেনিন ও ট্রটঙ্কীর দুটী বিভিন্ন মত ছিল। লেনিনের মতে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মাত্রা সমান না হওয়ায় সে সব জায়গায় কখনই বিপ্লবের পথের বাধা ধরা নিয়ম থাকতে পারে না। এবং একদল লােকের যে ধারণা সর্বহারা বিপ্লব শুধু মাত্র বস্ত্রশিল্পে অগ্রসর দেশেই প্রথমে সম্ভব তাও ভুল। কোনও বিশেষ দেশেও অবস্থা উপযুক্ত বিবেচিত হলে—বিপ্লবের বিজয় সম্ভব। এবং সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে সে দেশও ক্রমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তার মতে সর্বহারা এক নায়ক হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর পুরােধ সর্বহারা ও মধ্যবিত্ত, বুন্সিী, কৃষক প্রভূতিদের মধ্যে এমন এক শ্রেণী সংবােগ গড়া যাতে কে ও সমূলে উচ্ছেদ করে ভবিষ্যতেও যেন তারা মাথা তুলতে মাত্র তার মতো।

( • ) সােভিয়েটে অক্টোবর বিপ্লবের অন্যতম প্রধান বিশেষত্বই হচ্ছে যে সেখানে লেনিনের বক্তব্য গতে কলমে খাটিয়ে কনিষ্টরা সফল হয়েছে। আর ট্রটীর মত কি ? ১৯০৫ সাল’ নামক গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি “শ্বাশ্বত বিপ্লবের ছবি আঁকলেন। তার মতে রুশ-বিপ্লবের প্রথম বিশেষত্ব হবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকতা। কিন্তু বিপ্লব সেখানেই শেষ হবেনা। শ্রমিককে শাসন ক্ষমতা না দেওয়া পর্যন্ত বুর্জোয়া সমস্যা সমূহের কোনই সমাধান সম্ভব নয় ! এবং শ্রমিক শ্ৰেণাও ক্ষমতা হাতে পেয়ে শুধুমাত্র বিপ্লবের বুর্জোয়া সীমানার ভেতর আটকে থাকতে পারবেনা। পরন্তু শ্রমিক রাষ্ট্রকে প্রথম অবস্থাতেই সামন্ততান্ত্রিক ও বুর্জোয়া সম্পত্তি ব্যবস্থা ভাঙতে হবে। এখানেই তাকে সর্বপ্রথম এমন সব বুর্জোয়া দলের বিরুদ্ধাচরণ করতে হবে যারাই আগে তাকে সমর্থন করেছিল। শুধু তাই নয় যে কৃষক কুলের সবচেয়ে বড় অংশের সাহায্যে তারা শক্তি লাভ করেছিল সেই সাধারণ কৃষকদের ও প্রতিকূলতা করতে হবে। অর্থনীতিতে পশ্চাৎপদ দেশের শ্রমিক বাষ্ট্রের এই স্ব-বিরােধীতার সমাধান সম্ভব একমাত্র আন্তর্জাতিক শ্রমিক বিপ্লব দ্বাবা। বিশ্বের শ্রমিক রাষ্ট্র ক্ষমতা না পেলে তা সম্ভব নয়।” অর্থাৎ লেনিন যেখানে সর্বহারা একনায়কত্বের ভিত্তির প্রধান উপাদান দেখেন শ্রমিক ও কৃষকদের সহযােগীতার ভেতর সেখানে ইটী দেখেন তাদের মধ্যে প্রতিকূল সংঘর্ষের ছবি। টুটীর উপরিস্থিত নীতিতে বিশ্বাসীরাডেক প্রভৃতি বিপ্লব-বিরােধী কাজ সুরু করেছিল। বিপ্লবের প্রত্যেকটী শুয়েই টকীয় নীতির ব্যর্থতা পরিস্ফুট হলেও ট্রটরী কনিষ্ট পার্টির নীতির বিরােধীতা করতে। কাজেই বাধ্য হয়ে টুটুকীকে নির্বাসিত করতে হয়। কিন্তু দুটী পন্থীদের উচ্ছেদ তত সহজ ছিল না বিপ্লবের স্বার্থকতা ( ) সঙ্গে সঙ্গেই তাদেরও রূপ ফুটে উঠতে থাকে। আগে যা বিপ্লবের নেতৃস্থানীয় ছিল ক্রমে তারাই নানা ভাবে বিপ্লবের অগ্রগতিতে বাধা জন্মাতে থাকে। বৈদেশিক ধনতন্ত্রীদের সহায়তায় তারা রাশিয়ায় নাশকতামূলক কাজ চালাতে থাকে ও নেতৃস্থানীষ বলশেভিকদের হত্যার চক্রান্ত করে ! সেই চক্রান্তের প্রথম বলি হচ্ছে কিরভ। কিরভ হত্যায় সমস্ত রাশিয়া চঞ্চল হয়ে ওঠে। সেই সময় বহু চক্রান্তকারীকে উচ্ছেদ করা হয়। ইতিমধ্যে রাশিয়া পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্রুত যন্ত্রশিল্পের উন্নতির পথে এগােয়। তখন দেখা দেয় বুখারিনের নেতৃত্বে দক্ষিণপন্থীদের বিরােধীতা। তারা সুর উঠায় যে এত পশ্চাদবর্তী দেশ রাশিয়ার পক্ষে এক রাতে আমেরিকা হওয়া সম্ভব নয় । ষ্ট্যালিন বলেন যে শপরিবেষ্টিত রাশিয়াকে যত শীঘ্র সম্ভব স্বাবলম্বী হয়ে শত্রুকে আটকাবার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে—তখন এরা বলেন “ধীরে রাশিয়া ধীরে।” পরে প্রকাশ পায় যে এরা হিটলার জার্মানীর সঙ্গে চক্রান্ত করে এভাবে যান্ত্রিক অগ্রগতির পথে বাধা জনাছিল। ১৯৩৮ সালের বিচাবে ভয়াবহ চক্রান্ত প্রকাশ পায় যে তুকাচে স্কী প্রমুখ কয়েকজন সামরিক নেতা ও রাজনৈতিক নেতারা রুশীয় উক্রেণকে হিটলারের হাতে তুলে দিয়ে তার সঙ্গে রফা করতে চেয়েছিল। রাশিয়ার বিপ্লববিরােধী চক্রান্তকারীদের নাম থেকে অনেকের মনে হবে। বে তবে কি ষ্ট্যালিন ছাড়া সবাই বিপ্লব বিরোধী ?-তাদের জানা দরকার যে-যে বলশেভিক দল বিপ্লব ঘটায় তার নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে চক্রান্তকারীরা সংখ্যায় কয়েক জন্য মাত্র আজও মলােটা, লজোভী, ক্যাগাননাচ্চি, ভয়ােশিল, কালিনিন, লিভিন, প্রতিবেশীর ভাগ লােকই সােভিয়েটের পক্ষে অনুরক্ত! উপন্যাসটীতে এক জায়গার বুখারিনদের উল্লেখ রয়েছে। সে প্রখম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়!

প্রথম অধ্যায় (১) পথ পরিবর্তন খুব ভােরে কিরিল রূদারকিনের ঘুম ভাঙলাে। গবেষণার ফলাফল কখতে সারাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে ক্লান্তদেহে সে সন্ধ্যেয় বাড়ী ফিরেছিল। সে কোনও রকমে গা ধুয়ে সে ষ্টেঙ্কার সঙ্গে গল্প করতে করতে কথায় নে পড়েছিল ঘুমিয়ে। এখন তার মনে হচ্ছে যে টেকা নিজের শরীর তাকে কাল কি যেন বলতে যাচ্ছিলাে—দিন ঘনিয়ে আসছে, তৈরী ই রকমেরই কত কি! কিন্তু সারারাত মরার মত ঘুমিয়ে এখন সে সম্পূর্ণ সজীব। সারা শরীরে যৌবনের চাঞ্চল্য ! রাগের নীচে মহা আরামে মােড়ামুড়ি দিয়ে ফল নিজে। শরীরের দিকে তাকালাে। হঠাৎ নিজের শরীরই তার সুন্দর মনে হল। আর তখনই প্রথম সূর্যের আলাে এসে নালায় ছাড় খেলাে। সেই আলাের ছটায় কিরিলের মনে জাগলাে ছেলে লার কথা যখন ছাতের ওপর চুপ করে বসে সূর্যের প্রভাতী আলােয় সে কি এলােমেলাে কথা ভাবতাে। সব চেয়ে তার ভাল লাগছিল নিয়ম মে গের নীচে ওর য়ে ঘরের ভেতর আলাের খেলা দেখা। নিও এতে রা ভেদে কাকলী থেকে ক্রমে ক্রমে পথচারীদের কোলাহল শােনা যেতে গলে। লরীর ঘর আওয়াজে হ’লাে সারা পথ আলােড়িত। প্রৌঢ় শ্রমিকদের গলায় খুসখুস কাশির শব্দের সঙ্গে মাঝে মাঝে অত্যুহী গায়কের এক পাইল গান হয়েই পেয়ে থেমে বালি। L ২ সফলন নেই। হুড়মুড় করে উঠে পড়েকিরিল ষ্টেঙ্কার বিছানার পাশে এসে দাড়ালাে! কে ঘুমুচ্ছে। গা থেকে রাগটা যে রাতে কখন মেঝেয় পড়ে গেছে সে খেয়াল রাত-কামিজে ঢাকা পাগুলাে রয়েছে খালি হয়ে। কাঁধের কাছ থেকেও কাপড় সরে গেছে। সুগঠিত বক্ষস্থল গভীর নিশ্বাসের সাথে ওঠা- নামা করছে। কিছুক্ষণ রমণীর সেই নিদ্রিত সৌন্দর্য উপভােগ করে কিলি ডাকলাে “ষ্টেঙ্কা” তার কথা এত আস্তে বেনােলাে যে শােনাই গেল না। কিরিলের মনে হলাে এই সুঠাম নারীদেহের উপর তার সম্পূর্ণ অধিকার। মি যে বীজ উপ্ত হয়েছে তার পরিণতি হবে দানে। তাদের দু ভেতর কোনও সন্দেহ বা অবিশ্বাসের লেশমাত্র নেই। তারা । একে অন্যের কাছে সরে আসছিল। আবার স্কো” বলে ডাকতে । তার মনে হলাে এভাবে ঘুম ভাঙ্গিয়ে ছেলেমানুষী করে কি লাভ? আত্মসংবরণে অপারগ হয়ে কিরিল ঘুমন্ত স্কোকে ঘলিঙ্গনে জড়িয়ে লি তার অবাধ্য আলিঙ্গনে ষ্টোর ঘুম ভাঙতেই সে বলে উঠলল“কিরি নাকি! তার অলস হাত এসে পড়লাে কিরিলের গায়।একান্ত ছেলেমানুষে মত দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে ষ্টেঙ্কা বলতে লাগলাে—এত তােক উঠলে যে? এই না কাল শােবার আগে ধনকে ছিলে ৪ দশটারগে যেন কেউ তােমার ঘুম না ভাঙায় ?” কিলি তার কথার জবাব দিল না ক্ষু মনে ষ্টো ধীরে ধীরে কিরিলের বুকের ভেতর এ. একের কাপড় সরিয়ে রক্তিম স্তনাগ্রভাগ দেখিয়ে বললাে-“দেখছে, দুটো স্তনই ভ’নে এসেছে। আর বােধ হয় খুব দেরী নেই না? কি বল ?”—তারপ মুখের কাছে সরে এসে—তখন কি আমায় কম ভালবাসতে পারবে না কিরুিল হাসতে হাসতে তার পিঠে হাত বুলিয়ে বললাে-“এ কথা কেন? এখনাে সন্দেহ আছে নাকি? তােমায় যে কি বলে বােঝাব আনি না আর তুমিতো হবে আমার সন্তানের মা-কেন? জমে কিনিলে আরে মধ্যে টেক্কা নিজেকে ডুবিয়ে দিল। অনেকক্ষণ পরে কিঝিলের দিকে তাকি বা--আচ্ছা আমার এমন পদে পদে তােমায় হারাবার ভয় হয় কেনাে? যত তােমার সাথে থাকছি ততই তােমায় ভালবাসছি-এর বােধ হয় শেষ নেই—তবু কেন থেকে থেকে ভয় হয়, কেন বলতে পার ? দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে ভােরের আলাে নামছিল। বহুদূরে দিশ্বলয়ের প্রান্তে বন্ধুর পাহাড়ের ফাকে দেখা দিল সূর্যের দেখা যেন দু-তিনশাে মাইল এগিয়ে কে গাঢ় নীল আকাশের গায় বিরাট আগুনের গােলা লুফছে। ভােরের সেই স্নিগ্ধ আলাে হাওয়ায় কিরিলের মনে নব চেতনা এলাে। আপনা থেকেই তার মুখে বেরিয়ে এলাে-“আঃ কি আরাম। আর একটু হেল্পী করে সে একদৌড়ে জিনআঁটা ঘােড়ার পিঠে চেপে বসলাে। ঘােড়াও অভ্যেস মত তাকে নিয়ে চলাে বিদ্যুত্তরের দিকে। কিন্তু আরােহী আ তাকে অভ্যস্ত পথে না নিয়ে উল্টো পথ ধরে যেতে লাগলাে। হেমন্তর ছোঁয়া লেগেছে সারা পৃথিবীতে। ঝরে পড়া পাতায় পাতায় পথ গেছে ভ’রে আর সেই ঝরা পাতা নিয়ে খেলা করছে তােয়ের পাগল হাওয়া। নদীর ভেতর থেকে এক ঝলক হাওয়া এসে জলের গাছগুলােকে নাড়িয়ে দিয়ে কোথায় ঘাস বিচালির ভেতর আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার কোথা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে সেই হাওয়া কিরিলকে ধ’য়ছে। হাজার মাতনের সাথে মেতে উঠলাে কিরিলের মন। সে ছুটে চললল হাওয়ার সাথে যেন দুজনে কতকালের মিতালী। দেখতে দেখতে প্রকৃতির এই উছলতা গেল চারিদিকে এলাে থমথমে ভাব। মনের আনন্দে সৎকার করতে যে ফিরিল ও গেণ থেমে। পা টিপে টিপে নে এগাের। লার ভারে পায়ের নীচের শুকনাে পাতা মরমলিয়ে উঠছে তারা যেন কি বলতে চায়। কিলি স্পষ্ট অনুভব করলাে পৃথিবীর গর্ভে যেন সমস্ত কিছুই নবজীবন পরিগ্রহ করছে। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়লাে ঠোর কথা। টো ভূমির ৪ আমার হৈমন্তী’—চুপিসারে বেরিয়ে এলাে কিরিলের মুখ থেকে। পাগলের মতাে মাটিতে পড়ে সে চুমু খেতে লাগলাে ধরিত্রীকে। কি আনন্দ। পাছে কেউ দেখে ফেলে এই ভয়ে কিরিল চমকে দাড়ালাে। কি নিঃস্তব্ধ উপত্যকা কোথাও জনপ্রাণী নেই। শুধু পাটকিলে ঘােড় মিটমিট করে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কিরিলের প্রাণে আজ নব উন্মাদনা। পৃথিবীর সব জিনিষেই সে পেয়েছে প্রাণের পরশ, তার কাছে আত্মপর ভেদ নাই। ঘােড়র দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠলে “কিরে নাইবি ? যদি না ডুবে যাস্ তােকে নাওয়াতে পারি। জানিস আমি কে? কেন্দ্রীয় শাসন পরিষদের সত্য (Central Executive Committee) আরও চা। সদর সমিতির সেক্রেটারী বুঝলি? এবার যা”—এই বলে কিরিল তার গা থেকে জিন খুলে নিয়ে মারলে পাঁজরে এক ঘুষি। ছাড়া পেয়ে ঘােড়াটিও কি যেয়ে মনের সুখে গড়াগড়ি করতে লাগলাে। কিলি আস্তে আস্তে নাইবার ও জামা কাপড় ছেড়ে প্রস্তুত হলাে। শত মনে ঘােড়াটার দিকে লক্ষ্যরেখে কিলি কাপড় ছাড়ছে। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে কপালের রেখা গুলাে কুঁচকে যাচ্ছিল। ঠোট গুলাে পরস্পরের উপর এটে বসেছিল, আর সে মুখে সাধারণতঃ অদৃশ্য ‘তাতার ভাৰ ক্ৰমেই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছিল। যে কেউ সে সময়ে দূর থেকে তাকে দেখলে তাতার ও শ্লাভ রক্তের সংমিশ্রণ না বলে পারতাে না। বই বহুকাল আগে কিরিলের পূর্বপুরুষদের মধ্যে চেঙ্গিস খার রক্ত এসে মিশেছিল। সমস্ত জামা খুলে কিরিল রৌদ্র সেবন করতে চাইলাে। সুঠাম বিশাল বহল-কোথাও খুৎ নেই—শুধু ডান বুকের মাঝখানে তরবারির আঘাতের ছি। হাতদুটো যেন একটু ক্ষায় বড় এবং কঙ্গীর কাছে বড় বেশী ব্যক্তি। আপন মনে হাতদুটো উপরে তুলে সে বাঁ দিকে মােড় ফিরলল। সমস্ত পিঠের ভয় জীবন্ত মাংসপেশীর রেখা ফুটে উঠলাে।

মফস্বপ্ন তবু ভােরের নিথর নদীর প্রশান্তি তাতে কিরিলের মন সয়লােনা। গভীর চিন্তায় ডুবে অনাগত শীতের বন্দনাগীতিতে মুখৰ ধরিত্রীর মুখ পাত্র যেন সে এক চুমুকে পান করবে। সমস্ত পৃথিবী থেকে উঠছে-গাছপাথর, বাল মাটা সব; তাদের মাঝে ফিরিল চিন্তায় বিভাের। এদিকে তার সখের ঘােড়া অনেকক্ষণ নিবিষ্ট চিত্তে কিরিলকে দেখে চুপি চুপি নােয়ান বনের ফাঁকে এসে পেছন থেকে দিলে তাকে লাথি। হটাৎ ধাক্কায় চমকে কিরিল গুমরে উঠলাে “উঃ”। কিন্তু দ্বিতীয় চিন্তা অবকাশের আগেই সে ছিটকে জলে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে বােড়াটাও হলাে তার সাথী। তখন দুজনে কী খেলা! ঘােড়। যে মানুষ নয় একথা ভুলে কিরিল তার সঙ্গে খেলতে লাগলাে। কিন্তু ক্রমে যখন বােড়াটাও নিজের বিক্রম দেখাতে লাগলাে তখন কিসিল নিজেকে সামলে নি। কিছুক্ষণ পরে বেলা বেড়ে যাওয়ায় নগ্নদেহে ঘােড়ার পিঠে কিনিল নদী থেকে উঠে এলাে। (২) সে কটা দিন ছিল অস্বাভাবিক—শুধু আশঙ্কা আর উত্তেজনায় বাড়ীর সবাই ছিল উত্তেজিত। কিরিল, ষ্টো, আনুস্কা (ষ্টেঙ্কার প্রথম পক্ষের মামীর মেয়ে)। এমন কি যে কিরিলের সষের শুধু জানতাে কোথায় তাকে গাড়ী নিয়ে যেতে হবে এবং কে তাকে ডেকেছে। তারও উত্তেজনার ভেতর দিয়ে দিন কাটছি। বাড়ীক সকলে এই চাঞ্চল্যে, কিছু না বুঝলেও নিরীহ আানাে যােগ দিতে ছাড়লোনা। তবে এদের মধ্যে কিরিলের উত্তেজনাই ছিল সব চেয়ে বেশ। মুহূর্তের সঙ্গেও তার সােয়াপ্তি ছিল;

সফলশ্বর একভাবে কিছুক্ষণ বসে থাকা, কিংবা শােওয়া কিছুই তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলনা। তার চোখে দিয়ে ঠিকরে বেরুচ্ছিল যৌবনের উদ্দীপনা। মাঝে মাছে ষ্টেঙ্কা তাকে ঠাট্টা করে তুলছিল—“তুমি ঠিক এমনি ছিলে ছেলে বেলায়। পরে নির্জনে পেয়ে ষ্টেঙ্কা বলেছিল “সত্যি তুমি কি ভাগ্যবান। তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে !” “ভাগ্যবান? বটে! আর যদি তিনি সােজাসুজি আমায় উড়িয়ে দেন?” “সে কিছু নয়-ওতে তােমার কিছু হবেনা—তবুতাে তুমি তাকে দেখতে পাবে।” কেউই তাদের কথার মধ্যে এ “তিনি’র নাম উল্লেখ করছিল না। শুধু বলছিল-তিনি”,“তার কাছে”,“কর্তা”। কিরিলের এ উত্তেজনার কারণ শুধু মস্কো থেকে ডাক এসেছিল বলেই নয়; সে কিছুই বুঝতে পারছিল- -কেন তিনি তাকে ডেকেছেন। দলের পুরানাে সভ্য ও লােহার কারখানার পরিদর্শক বােন্দানভের সঙ্গে কিরিল এ বিষয়ে আলােচনা করা রি করলে। শুনছেন? আমাকে তিনি মঙ্কো ডেকেছেন তিনিটা কে?” বােগদানভ জানতে চাইলাে। “কেন? “তিনি”—আপনি যেন যেন কিছু বুঝছেন না!—ক্রেমলিনে” আঃ ।* “সে তাে বুঝলাম কিন্তু কেন ডেকেছেন কিছু বলতে পারেন ?” হয়তাে তােনার চেহারার প্রশংসা করতে”। “না! কিবে ঠাট্টা করছেন : আমায় একটু জল দিন।” এতাে মন্দ নয় আমি কেমন করে তােমায় বলব? আমিতাে গুনতে জানিনা। তবে তুমি না একটা রিপাের্ট পাঠিয়েছিলে?

সফার “সেতত কোন যুগে ?” “তবে বলতে পারিনা কিন্তু আমি হলে ঐ বিষয়টা নিয়ে কথা কইতাম। রক্তপতাকার খেতাব’ আর কেন্দ্রীয় শাসনপরিষদের সদস্যের চিহ্ন বুকে এটে ফিরিল মস্কো রওনা হল। প্রাণপন যত্নে ষ্টেঙ্কা তার জিনিষপত্র গুছিয়ে দিলাে; কিন্তু তবু তাড়াতাড়িতে কিরিলের ওভারকোটটা দিতে ভুলে গেল। যখন মনে পড়লাে তখন কিরিলের গাড়ী ছেড়ে দিয়েছে। গাড়ীর পিছনে ছুটতে ছুটতে ষ্টেঙ্কা চীৎকার করে উঠলাে বড় ভুল হয়ে গেছে, কিরিল। কিছু মনে করােনা। আমি ঠিক ওগুলাে পরে পাঠিয়ে দিচ্ছি। “আচ্ছাসে আমি ঠিক করে নেব।” এমনি ভাবে কিরিল মস্কো এলাে। কিন্তু ক্রেমলিনের ভেতর ঢুকতে যেতেই তার মনে হলাে ষ্ট্যালিনও তাে কেন্দ্রীয় শাসনপরিষদের সভ্য কিন্তু তিনিতাে কখন তার ব্যাজ ব্যবহার করেন না। ষ্ট্যালিন নিলেও তাে সৈন্যাধ্যক্ষ ছিলেন। এবং তাতে তার যথেষ্ট প্রতিভার পরিচয় পাওয়া গেছে। দু তিন দিকের সৈন্যের চুড়ান্ত মহড়া তিনি নিয়ে শত্রু ধ্বংস করবার চমৎকার ফন্দী বার করেছিলেন। কিন্তু তিনিতাে কখনাে সম্মানের প্রতীক ব্যবহার করেন না। এ কথা মনে হতেই কিরিল জামা থেকে সব সম্মানের ও সত্যের প্রতীক গুলাে খুলে ফেললাে। ধীরে ধীরে সুবিস্ত অফিস ঘরে ঢুকে কিরিল দেখলে একজন কর্মচারী টেবিলে বসে রয়েছে। সে রাগত দৃষ্টিতে কিন্সিলের দিকে তাকালাে। কিরিলেরও মনে হল যেন কি এক বেফাস কাজ সে করছে। জিগ্যেস করে দেখা যাক মনে করে কিরিল লােকটাকে তার নাম বলে। সে গভীর ভাবে উত্তর দিলে আপনার দেরী হয়ে গেছে। এখানে আপনার আসবার কথা ছিল দশটায় আর আপনি এসেছেন এগারটায় ;

এটা খেয়াল থাকা আপনার উচিৎ ছিল যে কেউ খেলা করতে আপনাকে ডাকেনি। “ঐ ট্রাম গুলাের আগেইতাে এত দেরী হয়েছে। আমার কোনও দোষ নেই। ট্রামগুলো! আপনি নিজেইতে টাম; এখন ভেতরে যান জ পাবেন ।” বলে লােট ভেতরের দরজা দেখিয়ে দিলাে। দরজা খুলে কিলি ঘরের ভেতরে পা দিয়েই চমকে গেল। এ যেন তার নিজেরই আফিল। ক্রমেই তার বিস্ময় বাড়ছিল। সে আশা করেছিল আরও বড় ঘরের ভেতরে আরও আরামের সাজসজার মধ্যে এসে পড়বে। জানালায় ও দরজায় থাকবে মােটা মােটা ভারী পর্দা। আর তার বদলে কিনা খালি চুলকাম করা দেওয়াল-একটা ছবি কি কার্পেট নেই কোথাও ! ধু এক কোণে লেনিনের আবক্ষ মূর্তি ও একটী দেওয়ালে সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাও মানচিত্র। তার নীচে রেল ইঞ্জিনের ও ট্রাক্টরের যন্ত্রপাতির নক্সা। ঘরটা নিখুত ভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন—তবে ছাদ বড় নীচু। এবং টেবিলের পেছনে বসে রয়েছে সম্পূর্ণ অঙ্গ একজন লােক ; মাথায় এক ঝাঁক কটা কোন চুল, মুখের তুলনায় বড়, তা নাক আর নাকের কাছেই বেশ বড় কাল অলি। টেবিলের উপরে দুটো টেলিফোন, এক মাস অর্ধসমাপ্ত চা, একশাে সিগারেটের একটা বাক্স, এবং তিনটা ভায়ােলেট ফুল সমেত একটা সু ফুলদানি। ঐ ঘরের তুলনায় ফুলগুলি অত্যন্ত সতেজ ও জমকালাে আর বেখাপ্পা দেখাচ্ছিল। ফুলগুলাের দিকে কিলিলের তত নজর ছিলনা। সে দেশ তার সামনে স্তালিনের বলে গত একন লােক।

সফলস্বপ্ন “এতাে সে মা একথা ভাবতে ভাবতে কিরিল গিয়ে টেবিলের পাশে বসলাে। লােকটি যেন নাি বুঝে তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো। পরে হঠাৎ এক ঝাকিতে হাতের কাছে সবুজ কাগৰে বানি সরিয়ে টেবিল ছেড়ে দাড়িয়ে ভাজা ভাজা কর্কশ সুয়ে বললাে-“সুপ্রভাত। কমরেড ষ্ট্যালিন এখন বড় ব্য, তিনি আমায় বলেছেন আপনার সঙ্গে কথা বলতে। কিরিলের সম্মুখে দাঁড়িয়েছিল সালি পেট্রোঞ্জি, পােভটেন,—যিনি গত বিপ্লবে অন্তবিপ্লবীদের দিকে লড়তে দেখে কিলিকে পার্টির সভ্য করে নেবার মনােনয়ন দিয়েছিলেন। স্মিতহাস্যে তিনি কিরিলকে বসতে বললেন। তার কথার ভাবে হতাশ হয়ে কিনিল বললাে-“তাহলে আমার সঙ্গে তার দেখা হবেনা। এতদূর কষ্ট করে এলাম-কত কথা ভাবছিলাম বলবাে বলে-* পােডটেন, তাকে বাধা দিয়ে বললেন “ঠিকইতােতার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। আমার সঙ্গে তাে তাঁর নােজই দেখা হচ্ছে কিন্তু তবু প্রত্যেক বার আমি নতুন করে মনের জোর পাই তার কথা থেকে।” আমিও তাে তাই চাচ্ছিলাম- “কিন্তু এ তােমারই দোষ! তিনি তােমার জন্যে দশটা পর্যন্ত বসে ছিলেন। সে যাই হােক, কিছু ভেবােনা—আবার হয় তাে তিনি আসবেন। তবে আমরা কাজ শুরু করেছি। তিনি কুঁড়েদের দু’চোখে দেখতে পারেন ना ।” এই বলে, তিনি টেবিলের উপর থেকে কিরিলের পাঠাননা মন্তব্য টেনে বের করলেন। “তােনার প্রস্তাব আমরা পড়েছি। এটা ষ্ট্যালিনেরও পছন্দ হয়েছে।” তার কথার ভাবে কিরিলের মনে হলাে যে এবার তরে যে বােধ হয় টাক মূর হবে।

১০ সফলস্বপ্ন কিন্তু সাজিপেট্রোচ্চি, খাতাটী সরিয়ে রেখে তাকে প্রশ্ন করতে লাগলেন কৃষকরা কেমন ভাবে জিনিষটাকে গ্রহণ করেছে এবং যাদের নিয়ে কাজ হচ্ছে তারাইবা কি রকম! তার কথার ফাকে ফাকে মনে হচ্ছিল যে বাহিরে শান্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে তিনি কি একটা যেন চাঞ্চল্য চেপে রাখতে চাচ্ছেন। “শীগগীরই বড় রকমের সংঘর্ষ বাধবে”-“হঠাৎ বলে উঠলেন তিনি এবং সঙ্গে সঙ্গেই পকেট থেকে এক গাছ মােমের বুঢ়ীওয়ালা মাল বের করলেন। তিনি স্বভাবতই একটু রগচটা ধরণের লােক বলে সামান্য ব্যাপারেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। সেই সময়ে গুনতে গুনতে অন্যমনস্ক হবার অন্য ঐ মালা গাছি সঙ্গে রাখেন। আর বলে উঠলেন “তাদের মধ্যে কেউ আবার সংস্কৃতির বড় সমজদার সাজছেন। তাদের উপর ভীষণ নজর রাখতে হবে।” কিরিল বুঝলাে কোন সংঘর্ষের কথা হচ্ছে। শুধু তাই নয়। যে নিরপেক্ষ তার ওপরও আমাদের নজর রাখতে হবে। ঝরকোভকে দেখনা কেন? সে প্রান্তীয় কমিটির সম্পাদক ছিল—কিন্তু ট্রীর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ‘নিরপেক্ষ হয়ে রইল। আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি কিরিলের লেখাগুলাে পড়তে লাগলেন। কিছুদূর এসে আবার একটা কোথাও লাল পেন্সিল দিয়ে কেটে বলে উঠলেন, “একটা বাঁধের জন্য দুইলক্ষ রুবল?” কিরিল বললাে-“এটা কাটলেন কেন? পােড়ক্লেটন তাকে বাধা দিয়ে কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় পাশের দরজা খুলে সামরিক পপাষাকে, সাদা প্যান্ট ও বুটজুতাে পরে যিনি ঘরে ঢুকলেন কোনও দিকে ক্রুক্ষেপ না করে তিনি সােজা টেবিলে এসে বলেন। পেট্রোভিচ, তাড়াতাড়ি দাড়িয়ে উঠে তাকে বসবার যায়গা করে দিলেন। কিলি কয়েক পা পেছনে সরে দেওয়াল ঠেসে দাড়ালাে। কিলিকে দেখিয়ে পেট্রোভিচ, বললেন : “কমড়ে, ঝাকি?”

ফা- ১১ ও” বলে নবাগতের চোখে মিহা খেলে গেল। সেই সঙ্গে সস ব্যঙ্গের সঙ্গে কিরিলেক অভিবাদন করে তিনি বললেন,—“যােসিফ, ষ্ট্যালিন।” সম্মুখে প্রসারিত ষ্ট্যালিনের হাতে জোরে ঝাঁকি দিয়ে কিরিল চেঁচিয়ে উঠলাে-“কি সৌভাগ্য”। “সাদর সম্ভাষণ।”বলে কিরিলের হাতখানা ওপরে তুলে সবিস্ময়ে ষ্ট্যালিন বললেন, “উঃ কি চওড়া হাত ! তােমার মা এখনাে বেঁচে আছেন?” “হা” “তােমার মত আরও ছেলে আছে নাকি তার । “না—আমিই শুধু জন্মেছিলাম।” “ভালােয় ভালােয় জন্মেছিলে তাে” কিরিল বুঝতে পারলাে না ষ্ট্যালিনের কি মনের ভাব। কেন যে তিনি ঐ সমস্ত কথা তুললেন তা দুর্বোধ্য হয়ে রইলাে ! ভবিষ্যতে যাতে দেশে যেয়ে ষ্টোদের কাছে ভাল করে গল্প করতে পারে সেজন্য কিরিল স্থিরদৃষ্টিতে ষ্ট্যালিনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে ! ষ্ট্যালিনের নীলাভ চোখের ভাব ক্রমাগত বাচ্ছিল। কখনাে বিষাদ ও অবসাদ আবার পরমুহুর্তে সেখানে নির্মম কঠোরতা ! তার পরের মুহূর্তেই হয় তত অন্য কোনও কারণে চোখ দুটো অজ্ব করে উঠবে নয়তাে চারিদিকের পারিপার্শ্বিকতা থেকে দৃষ্টি যেন কোথায় বহুদূরে চলে যাবে। হয় তাে সেই মুহূর্তে ষ্ট্যালিনের মনে ভেসে উঠে রাশিয়ার ছবি! সে এত সব বুঝলােনা। ষ্ট্যালিনের ঘাখে মুখে একটা বিশিষ্টভাব বের করবার জন্যে অনেক চেষ্টা করলাে; কিন্তু ষ্ট্যালিনের মুখে কোথাও তেমন বৈশিষ্ট্য নজরে পড়লাে না। কিরিল আরও লক্ষ্য করলো যে তার হাতের ভঙ্গী অত্যন্ত সবল ও সুষ্ঠু। কখনাে হয় তাে হাত তুলে সমস্ত আঙ্গুলগুলাে মুঠ করে বুড়াে আঙ্গুল দিয়ে বুকের ধারটা চেপে ধরেছেন—নয়তাে সমস্ত হাত টেবিলের উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন যে, কিছু নিতে চান।

১২ “না কিছুতেই এর নাগাল পাওয়া যাবেনা-চেষ্টা করলেই এর খাতির কুড়ানাে সম্ভব নয়।* এইসব নানা কথা কিরিরে মনে জাগতে লাগলাে। কি পাছে ষ্ট্যালিনের চোখে এইসব ভাবধারা ধরা পড়ে সেই চিন্তায় কিরিল অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাে। তার কপালে ঘাম দেখা গেল। রুমাল না বের করে সে হাত দিয়েই কপালের ঘাম মুছে ফেললাে। কিরিলের অপ্রস্তুত ভাব লক্ষ্য করে ষ্ট্যালিন অন্য দিকে তাকিয়ে সহজভাবে বলেন : “এবার তাহলে তুমি দেশ থেকে এলে-কি বল! তােমার মন্তব্য পড়েছি। এতদিন উত্তর দেইনি বলে কি তােমরা কিছু মনে করেছে। সব জিনিষেরই একটা সময় আছে। কিন্তু তােমাকে মস্কোয় ডেকেছি ষ্ট্যালিনকে ঠিক নিজের মত কথা বলতে দেখে, আর চুপ করে না থেকে কিরিল বলে উঠলাে। “কমরেড ষ্ট্যালিন! সার্জি পেট্রোভিচ, আমাদের টাকা দিচ্ছেন না। “কেন? ওকি কৃপণ নাকি?” পেট্রোভিচ, বাধা দিয়ে বল্লেন—“বড় একগুয়ে। “সবই কৃষকদের সগুণ! এই ধর যেমন আমাদের কৃষকেরা•• ষ্ট্যালিন তখন কৃষকদের সম্বন্ধে আলােচনা শুরু করে দিলেন। কিন্তু কখনাে তাকায় চাষা বা ঘােটলােক বলেন না। আর তিনি ঠিক কৃষকদের ভাষায়ই কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আচমকা তিনি কিরিলকে জিজ্ঞেস “কৃষকদের বিয়েতে যেয়ে কখনাে উৎসবে বােগ দিয়েছে ? “না।” “দেখুন সফলস্বর “তােমার উচিত ছিল যােগ দেওয়া। সব সময় জনসাধারণের ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ রাখা ভাল। উৎসবে যেয়ে তাদের সঙ্গে আনন্দ করতে পারবে দেখাে বেশী মদ খেয়ে অজ্ঞান হয়ােনা। আবার ষ্ট্যালিন কিছুক্ষণ থালেন। কিছুক্ষণ পরে বলে উঠলেন এ্যাকিউস নামে একজন বীরের গল্প জানাে? শুক্ৰদ্বারা যখনই তিনি পরিবেষ্টিত হতেন তখনই ধরিত্রী দেবীর কোলে আত্মগােপন করে দ্বিগুণ শক্তিসঞ্চয় করতেন। একমাত্র হারকিউলিসই তাকে ধরিত্রী দেবীর কোল থেকে টেনে এনে শূঙ্গে হত্যা করেছিল। আমাদের মা হচ্ছে অসাধারণ। অত্যন্ত আবেগভরে ষ্ট্যালিন কথা ক'টা বললেন। এরপরে কিরিলের পকে তার সাথে আলাপ করা অনেক সহজ হয়ে এলাে। এ যেন অন্য ষ্ট্যালিন- যাকে জনসাধারণ তাদের অন্তর দিয়ে ভালবাসে—যে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে জানে। তার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, “আপনি আমাদেরই। কিন্তু কেমন আটকে যাচ্ছিল বলে আর তা বলা হলাে না। ষ্ট্যালিনের কথা আমােদন করতে যেয়ে কিরিল তার খুড়ে নিকিটী গুৰিয়ানােভের উল্লেখ করলে। সে বললাে নিকিটা এমন একটা দেশের খােজে বেড়িয়েছিল যেখানে সামগ্রিক কৃষিকাজ হয়না; অবশেষে ব্যর্থ মনােরথ হয়ে ফিরে এসে বলেছিল “শতখানেক বছর বাঁচলে তবেই সামান্য শিক্ষা পেতে পারে।” “কি? কি ?—একশাে বছর বাঁচলে—“বলে ষ্ট্যালিন হো হাে করে হেসে উঠলেন।-“সার্জি পেট্রোচ্চি, ওটাই খাটী কৃষকের ভাষা ! তােমার নিকিটাকি এখন সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রে থাকছেন?” “হা। তিনি বেঁচেই আছেন আর কাজ করছেন। তিনি নাকি নূতন আনন্দ পেয়েছেন আর এত দিনে তাঁর মন শান্তি পেয়েছে।” তর মন এতদিনে শান্তি পেয়েছে। বেশ কথা; এর আগে কৃষকদের মন কিছুতেই শান্তি পেতােনা! তােমরা তাই বলে আনলে বিভােয়য়ে থেকোনা। এখনাে হয় তাে কোনদিন তােমায় খুড়ে প প্রকাশ করে বসবেন।

১৪ সফ ! “নিশ্চয়ই বলে ফেলেই ষ্ট্যালিনের সামনে আত্মশ্লাঘা করার জন্যে কিরিল লজ্জিত হ'ল। কাজেই দেখছে আমাদের সামনে এখনন কত কাজ বাকী ?* এই বলে ষ্ট্যালিন কিরিলকে মৃদু তিরস্কার করলেন কিরিলের মন্তব্য কাছে টেনে ষ্ট্যালিন মনােযােগ দিয়ে পড়তে লাগলেন। পড়তে পড়তে ‘ভূল লেখা দেখে তা শুধরে ‘ভুল’ করে নিলেন আর কিরিলকে বল্লেন, “তােমার টাইপিষ্ট, ‘ভুল বানান ভুল করে লিখেছে।” তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিৰিলের দিকে তাকিয়ে বল্লেন। কিন্তু তােমাকে বলতে হবে যে এগুলাে কি শুধু তােমারই কল্পনা না জনসাধারণও এই চায়।” “ওগুলাে জনসাধারণেরও কল্পনা,কমরেড ষ্ট্যালিন। “সত্যি।” আপনার সামনে মিথ্যে বলতে পারতাম না।” “চমৎকার।” তারপর অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলছিলনা। অন্যমনস্কভাবে ফুলগুলাের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিরিলের দেশের কথা মনে পড়তে লাগলাে। তা ষ্ট্যালিনের নজর এড়াতে পারলােনা। তিনি বললেন- “কি? ফুলগুলাে দেখছাে?” । “ওগুলাে আমার মেয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে-ইতত আমায় আদেশ দিয়ে চালাচ্ছে। বাড়ী গেলেই তার ফরমাস হবে, আজ বায়স্কোপ দেখবাে। কোন বাজে কথা শােনা হবে না, কমরেড ষ্ট্যালিন চুপ করে বস, আমি হাতল চালিয়ে বায়ঝােপ দেখাবাে। আমিও বলি, “বেশ যা বলবে তাই করছি।” আবার সেই দুরাবগাহ দৃষ্টি। এবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন- “তােমার কোনও ছেলেপিলে নেই?” “কেন? আছে নিই আয়া রয়েছে।”

সফলন “তােমরাও তা হলে একটা মেয়ে রয়েছে ।” “সে আমার স্ত্রীর আগের পক্ষের স্বামীর মেয়ে। কিন্তু সে আমারও মেয়ে। আমিও তাকে খুব ভালবাসি। আমারও আগের পক্ষের একটা ছেলে আছে।” “তুমি তাহলে খুব বিয়ে ভাঙ্গছছ? কেমন? “ন, ঠিক তা নয়। আমার প্রথম বিয়েটা মােটেই সুখের হয়নি।” “আমি কিন্তু তােমায় খারাপ বলছি না। তবে আমাদের এমন সংসার পাতা দরকার যাতে তার গর্ব করতে পারি।” কিরিল বলতে যাচ্ছিলাে—“ষ্টেঙ্কা আর আমিত তেমনি একটা সংসার পাততে চাচ্ছি। কিন্তু অহঙ্কার দেখানাে হবে বলে কিরিল চুপ করে গেল। একটু থেমে সে আবার উত্থাপন করলাে যে সার্জি পেট্রোভিচ তাকে টাকা দেয়নি। কথাটা তুলেই তার মনে হল যে ঠিক হয়নি। কারণ বােঝা উচিত ছিল যে ষ্ট্যালিন টাকার কথাটাতে তেমন কাণ দেননি। সে অরে নিতে গেল—কিন্তু তখন দেরী হয়ে গেছে! ষ্ট্যালিন কঠোর ভাব ধারণ করবেন। শুনােভাবে বললেন-“টাকা?” সকলেই টাকা চায়। খালি টাকা, টাকা, আর টাকা এবং তাও দুটো চারটে নয়। তােমার মন্তব্যে লিখেছে দেড়লাখ, দুইলাখ, তিনলাখের কথা। বাবা! এই আবার ছয়লাখ টাকা। কি ভাবছে? আমরা কি সকলেই এখানে গাধা? নিজেকে নিতান্ত সাধারণ বিবেচনায় কিরিল উত্তর দিলে—“কখনাে না” “বিরাট দেশ, আর প্রচুর টাকা আছে, কাজেই ঝাড়া দিলেই টাকা পড়বে, কেমন ?” ষ্ট্যালিন ব্যঙ্গ করে উঠলেন। তারপরে কিরিল যাতে ভেঙ্গে না পড়ে সেজন্য একটু মােলায়েমভাবে বুঝিয়ে বল্লেন, এটা তাদের বােঝা উচিত যে কোনও প্রদেশেই শুধু সরকারী টাকায় গড়ে উঠতে পারে না। তারা যে ১৬ সফল-স্বপ্ন নিজেরা নানারকমে না একেছে—সেজন্য সকলেই গর্বিত হবে; তাদের উচিত হচ্ছেওটা নিজেদের সামর্থ্যে গড়ে তােলা। ষ্ট্যালিনের উপদেশ শুনে আমতা আমতা করে কিলি বল্লে, “তা বেশ, আমরা নয়তাে নিজেরাই গড়ে তুলবাে। কিন্তু আমাদের তাে কোনও যন্ত্রপাতি নেই।” “বেশ কথা বলে। আমাদেরই কি নিজেদের যন্ত্রপাতি আছে? এসব তাে জনসাধারণের। আবার কিরিলের মনে হলাে যে ষ্ট্যালিন ঠিকই বলেছেন। কিন্তু তার চিন্তাস্রোতে বাধা দিয়ে ষ্ট্যালিন বললেন, “তােমাদের বাইরে যেয়ে কিছুদিন শিক্ষা নিয়ে আসা ভাল। ওদের সব জিনিষই খারাপ নয়।” বিষ্মিত কিকি উত্তর করলাে,"কিন্তু তা আমি তাে কোনাে বিদেশী ভাষা জানিনা।” “ওসব বাজে কথা শুধু তিলকে তাল করা।” এসবের পরে কিরিল যেন ভুলে গেল যে সে ষ্ট্যালিনের সঙ্গে কথা বছে। তার মনে হচ্ছিল সে যেন বােগদানভের সঙ্গে আলােচনা করছে। সে মাঝে মাঝে ষ্ট্যালিনের মতের বিরুদ্ধে কথা কাটাকাটিও করছিল। ষ্ট্যালিন বেশ ধীরভাবে কথাগুলাে শুনে অবশেষে তার মতের প্রতিবাদ করলেন। ষ্ট্যালিনের প্রতিবাদে কিরিল না দমে বরঞ্চ নবীন উৎসাহ-ই পেল। ষ্ট্যালিন বলে যেতে লাগলেন “আমাদের দেশ বিরাট এবং সমস্ত দেশবাসীর আমাদের উপর আস্থা আছে। কাজেই প্রত্যেকটি কাজ করবার আগে হাজারবার ভেবে চিত্তে সব কাজে হাত দিতে হবে। কিন্তু একবার কাজ আরম্ভ করলে তাকে ছাড়তে পারবে না। যেমন করেই হােক সে-কাজ শেষ করতে হবে। কাজের মাঝখানে যদি ভাবনা চিন্তা কর তাহলে জনসাধারণও তােমাদের দেখে কাজ না করে ফাকি দেবে।” আবার কিরিলের মনে হল, এ-ষ্ট্যালিন যেন ঠিক আগের মত নন। উঙেজিত হয়ে সে ঘাম মুছবার এতে পকেট থেকে মাল বের করলাে। সেই সময় পকেট থেকে “রক পতাকার খেতাব ছিটকে পড়লাে।

সফ ১৭ তাই দেখে ষ্ট্যালিন বললেন, “তুমিতাে দেখছি খেতাব পেয়েছে ওটা পড়হােনা কেন?” বলেই কিরিল তােলবার আগে মারা থেকে স্ট্যালিন সেটা কুড়িয়ে নিলেন। ট্যালিনের হাত থেকে খেতাব নিয়ে কিরিল আবেগের সঙ্গে বলে উঠলাে-“যদি আগে আমি সুখী না হয়ে থাকি তল এখন আমার কোনও আক্ষেপ থাকবে না। এখন আমি গর্ব করতে পারি যে আপনার হাত থেকে খেতাব পেয়েছি।” ‘সে তুমি যত ইচ্ছে গর্ব করতে পারাে” বলেই তিনি নিজের মনে হাসতে লাগলেন। তারপর তিনি সার্জি পেট্রোভিচের দিকে তাকিয়ে বললেন-“কি বল সাঞ্জি তােমার কি মনে হয়না যে কিরিলের এবার কপা বদলানাে দরকার । “আমার তাে তাই মনে হয়-শালি বললেন। । -- ষ্ট্যালিনের সামনে হতচকিত ভাব ক্রেমলিনের বাইরে এসে কেটে গেলে কিরিল আপন মনে বলে উঠলাে- “এই হলাে প্রকৃত নেতার মত কথা। তার মনে একই প্রশ্ন উঠতে লাগলাে-“আবার কি ঐখানে আসা ভাগ্যে ঘটবে? নিশ্চয়ই। আমায় আবার এখানে আসতেই হবে। কিন্তু ষ্ট্যালিনের কথাগুলাের সব স্পষ্ট অর্থ তার মাথায় ঢুকছিল না। কি উদ্দেশ্যে যে ট্যালি কর্মপন্থ বদলাতে বললেন তার বােধগম্য হচ্ছিল না, তবু কিরিলের মনে হলো- “থাকগে, আমায় তিনি যেভাবে ইজে খাটিয়ে নিতে পারেন-পুণভাবে তার উপর আমার আস্থা আছে।” ক্রেমলিন থেকে বেড়িয়ে বীরদর্পে কিরিল চললাে পথ ধরে, তার সমস্ত তলী থেকে ফুটে বেরােচ্ছিল-“ট্যালিনের সঙ্গে দেখা করে এলাম- একবার সবাই তাকিয়ে দেখাে আমার।”

১৮ সফ-স্বপ্ন . (৪) সে রাতে কিলি আর বােগদানভ দু’জনে একটা পুরােনাে অট্টালিকার পাশে উচু বাঁধের ধারে বেড়াচ্ছিল। বাঁধের ধারটা তখন নিস্তব্ধ ; এবং কোনও নূতন কাজের ছক কবার সময়েই বােগদানভ ওখানে নির্জনে-যেয়ে চিন্তা করতাে। কোনও কথা না বলে দু’জনে চছিল ; তাদের কপালে ও কাঁধে আমার উপর তুলাের মত রাশ রাশ বরফ জমা হচ্ছিল। মাঝে মাঝে কিরিল যেন কি বলবার জন্য সমস্ত শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠছিল। বাকিতে সারা গা থেকে ঝড়ে পড়ছিল পরাতের পর পরাত বরফ। কিন্তু কেমন করে ও কোথা থেকে কথা শুরু করতে হবে ঠিক করতে না পেরে তার কথা বলা হচ্ছিল না। রাজনীতিক্ষেত্রে কিরিল তখনাে নুতন। সেজন্যে অনেকের মত সেও কমুনিষ্টদলের ভেতরের ঘটনাবলীতে হতবুদ্ধি হচ্ছিল। কিরিলের মত অনেক নবীন কমুনিষ্ঠ-সংঘের সভ্যই বুখারিন, কামেনিভ, জিনােভিত, এবং বাইক, কে লেনিনের মন্ত্রশিষ্য বলে মনে করতাে এবং নেতা বলে তাদের সদম্ভে প্রচার করতাে। কিন্তু তারা দেখলে যে সেই সব নেতারাই নিজেদের খেয়ালমত কর্মপন্থা হাজির করেছে যা তাদের কাছে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণের অযােগ্য বলে মনে হচ্ছিল। তাদের যে ঐ সব কর্মপন্থার উদ্দেশ্য কী, সেটা কিলি বুঝতাে না। তারা কি চায় সমস্ত দেশব্যাপী যে বিরাট শিল্প প্রচেষ্টা চলছে তা থেমে যাক? আর ভাঙ্গা রাস্তা, জীর্ণ ফ্যাক্টরী ও ঘােড়ায় টানা লাঙ্গল নিয়েইসব রাশিয়ার লােক কাজ করবে ? কিরিল ইতিমধ্যে বিদেশ ঘুরে এসেছে। সে দেখেছে তাদের ফেরে-কংক্রীটের বড় বড় রাস্তা, চাষের জমিতে প্রকাও প্রকাও ট্রাক্টর, এরােপ্লেন এবং লক্ষ লক্ষ মােটর গাড়ী। ঐসব নেতাদের কথামত কাজ করতে গেলে তাদের পুরানেজারের রাশিয়ায় ফিরে যেতে হবে যে রাশিয়াকে তারা পেছনে ফেলে এসেছে অনেক দিন।

সফলঃ ১১ চুপ করে থাকতে না পেরে কিরিল অবশেষে কঁকিয়ে উঠলো এসবের মাথামুণ্ড আমি কিছু বুঝিনা-সমাজতন্ত্রবাদ গড়ে তােলা আর বেঁচে থাকার পার্থক্য কোথায় ? বােগদানভও এতক্ষণ পরে কাদের গালাগালি করে উঠলাে-“হতভাগার কোথাকার! তারা ভুলে যাচ্ছে যে পাটিরও একটা অতীত ইতিহাসে আছে- যা আমাদের মনে থাকে। পাটি বেশ করে মনে রেখেছে ১৯১৭ কামেনি কেমন করে রোমানদের স্বাগত জানিয়েছিল। কেমন করে অক্টোবর বিপ্লবের সংবাদ সে এবং জিনােভিভ, দু’জনে শত্রুপক্ষীয়দের হাতে দিয়েছিল এবং কেমন করে বুখারিন লেনিনের বিরুদ্ধে যেয়ে তাকে ধরিয়ে দিতে চেয়েছিল।—এসব জিনিষ হঠাৎ হয় না।” “কিন্তু ওরা সত্যি কি চায় ?-কিরিল তাকে বাধা দিলাে। “তারা চায় পালিয়ামেন্ট। দেখােনা কেমন বক্তৃতাবাগীশের মত চেহারাগুলাে সব।” “এ কথাগুলাে ঠিক যুক্তিসঙ্গত নয়—* কিরিল আপত্তি করলো- “এগুলাে হ’ল ঈর্ষাপ্রসুত। আমায় বুঝিয়ে দিন তারা কি চায়।” “তাবা লেনিনের নামের আড়ালে নিজেদের বাঁচাতে চায়, কিন্তু তলে তলে থাকে তার বিপক্ষে। জনসাধারণের কথা নিয়ে তারা মােটই মাখা আমায় না। কামেনিত, এদের গরু-ভেড়ার পালের মত বােকা মনে করে, জিনােভিভ মনে করে শুধু অনুচরের মত; আর বুখারিন। বুখারিন ওদের চেয়ে বেশী চালাক। সে লােকদের বলছে যে তােমাদের দোকান শিল্পদ্রব্য এবং আরও নানা জিনিষে ভরে দেব। সে গম্ভীর ভাবে বলবে, “বড়লােক হও সকলে” কুলাকদের বােঝাবে-“শান্তভাবে ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রে পৌছােও!” কুলাক প্লাকুন্ডেকে তত খুব ভাল করে চেনাে। সে কেমন চমৎকার আস্তে আস্তে নিঝখাটে সমাজতন্ত্রে পৌছেছিল মনে পড়ে। ন্যানিকা উপত্যকায় যে বিদ্রোহ সে খাড়া করেছিল, সেকথা কি ভুলে গেছ।

সফলন বুখারিন র্গের গল্প দেখা-অথচ তার পেছনে রয়েছে রক্তের সমুদ্র! আর —স্বীকার করুক আর না-ই করুক—তারা সকলেই চাঙ্গে মুছে-যাওয়া ধনবাদকে রাশিয়ার বুকে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু তা করলে আমাদের চলবে! ইস্পাতের মত শক্ত হতে হবে আমাদের।” এইবলে দুই হাতে পায়ের কাপড় তুলে ধরে বােগদানভ অভ্যেসমত দৌডুতে সুরু করলাে। সেই সময় সে বললাে, ষ্ট্যালিন দেবে তেমনি সবাইকে ঠাণ্ডা করে,—“কি না দেশ আর চলতে পারছে না! খাটতে খাটতে দেশের মুখ থেকে রক্ত উঠছে। কে ট্যালিন এবং তাঁর সহকর্মীরা কেউ একথা জানেনা বা বােঝনা যে দেশ পরিশ্রান্ত এবং তারও বিশ্রাম চাই! এটা তারা খুব ভাল করেই জানেন। তবে এর চাইতে বহুগুণে বেশী প্রয়ােজনীয় জিনিষ আরও আছে ভাববার। আমাদের চারদিকে শত্রু! দেশের বাইরেও যেন দেশের ভিতরেও তেমনি। যতই দিন যাচ্ছে তারাও ততই শক্তিশালী । যদি আমরা শীগগীর আপ্রাণখেটে নিজেদের প্রবল ক্ষমতায় না করতে পারি তাহলে নির্ধাত সকলে এর প্রবল নিশষণে পিষ্ট হয়ে মারা যাবাে। চারদিকের ধনতান্ত্রিক দেশগুলাে সব আমাদের রক্তগ বইরে দেবে। বহু, তারা কখনাে এতটুকু দয়া দেখাবে না। কাজেই ঢালিন ঠিকই করছেন—'আপাতত কোমর বেঁধে কেন আমরা এগিয়ে যেতে পারি। তুমি ঐ পাট কনফারেন্সে যাও-যেয়ে তােমার মনের কথা বলে এসো তত তারা তাতে লজা পেতেও পারে। তারপর একটু থেমে ই হার সনে সে বলে চলে, কিন্তু মনে থাকে যেন, মস্কো সখিনীতে যেয়ে খাট কী শুধু কথাই বলেনা, কাজও করে। অনেকেই বােকাত মনে করে যে সন্মিলনীতে গেলে বলশেভিক কথা ছাড়া আর কি কলেনা। সেটা খুব ভুল ধারণা ! তারা কাজও করে। কি বলতে চাচ্ছি উ বুঝলে কি বন্ধু! যতবার পার সৰিীতে যাও, খালি হাতে সে বিরল।

সফল পাটির ভেতরে যখন দক্ষিণ ও বামপন্থীদের গােলযােগ চরমে পৌছেছে, সেই সময় কিরিল দ্বিতীয়বার মস্কোতে এলাে! পাটির সেই সংঘর্ষে সমস্ত দেশ যােগ দিয়েছে। ষ্ট্যালিন সােভিয়েট রাশিয়াকে নতুন মন্ত্র দিয়েছেন “পুরােদমে এগিয়ে চল—আর কোনও পথ নাই।” কেন্দ্রীয় পরিচালক সমিতির সদস্য হিসাবে নিমন্ত্রিত একজনের পাশে বসে কিরিল বললাে-“কর্তা ঠিক কাজের কথা বলেছেন, না লেম্ । বাহাদুর বটে! সবাই যখন কাজের ভয়ে কোঁকাচ্ছে তখন কিনা ইনি বলছেন “পুরােদমে চললা?” একটা চলতি প্রবাদ বাক্যের উল্লেখ করে লেম্ বললাে “বাহাদুর ঠিকই বলেছেম! ভ্যাড় হিসেবে হয় তাে ভ্যাড়া শক্তিশালী হতে পারে কিন্তু যাড়ের তুলনায় সে কিছু নয়।” কিরিল বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। আর মনে মনে বক্তাদের কথা ভাবলাে—কি সবলােকগুলে! সবাই:কৃষকদের দোহাই দিচ্ছে কিন্তু ওরা চাষীদের সম্বন্ধে জানে কতটুকু?” সে তার পাশের লােকটিকে বেশ ভাল করে নিরীক্ষণ করে জিগ্যে করলাে “তুমি কি বলতে চাচ্ছ তা ঠিক বুঝতে পারলাম না।” সেই মুহূর্তে বুখারিন বক্তৃতামঞ্চে এগিয়ে এসেছেন। মুখে ছোেট একটু দাড়ি, মাথা-জোড়া টাক; কিন্তু তবু যৌবন সুলত ঔজ্জ্বল্য ছিল তার মধ্যে। তাকে দেখে কিরিল বলে উঠলাে “বাঃ বেশ তত ছিপছিপে মেয়েলী ধরনের? কি বলেন? উনি কি চান? উনিও কি লড়ছেন?” আলােচনায় রাজনৈতিক পটভূমির জন্য মুখ দেখুন।

২২ সফ-স্বপ্ন “ওর মাথায় কিছু মগজ আছে” একটু জোর দিয়ে লেম কথা ক’টি বললাে। “ইনিই হচ্ছেন বর্তমানে দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মার্ক্সবাদী।” “তা বটে! তুমি কিন্তু আবার ভুল করলে” কিরিল কেরে উঠলাে। এমন সময় ষ্ট্যালিনের সেক্রেটারী সার্জি পেট্রোভিচ, পােড়ক্লেটনকে দেখে কিরিল উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু না উঠে সে লেমের কাছে নীচু হয়ে বললাে “আমাদের টাকার দরকার, বুঝলেন? আমি আবার এসব কাজ তেমন করিনি কিনা তাই বাধ-বাধ ঠেছে। বােগদানভেরও অসুখ করেছে। তুমি কারুর সঙ্গে কথা কইতে পারে না?” কিরিলকে সম্পূর্ণভাবে থামতে না দিয়েই লেম্ সুরু করলাে “ওটাই তাে আসল কথা। আমাদের বলা হচ্ছে যেন সবাই জোর কদমে চলি—অথচ আমাদের যে ঢাল তরােয়াল কিছুই নেই।” বিরক্ত হয়ে ফিরিল উঠে গেল । = প্রথম দু'একদিন সভায় তুমুল গরম গরম আলােচনা চলছিল, আর সবাই তা’ মন দিয়ে শুনছিল। জিনােভিভ, কিছু বলতে এলেই সবাই চুপ করে যাচ্ছিল। বিরাট উস্কোখুস্কো মাথায় জিনােভিতকে মােটই রাজনীতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছিল না। তার মাথা দেখে স্বতই মনে হবে যে শরীরটা অনুপাতে বড়। কিন্তু তা নয়। ঠুনকো পা আর লিকলিকে দুই হাত হচ্ছে তার সম্বল। তাঁকে বক্তৃতা করতে দেখে কিরিল আরও আশ্চর্য হয়ে গেল! বহুক্ষণ তিনি বক্তৃতা করলেন-দেশের কথা, জনসাধারণের কথা এবং বিশেষ করে চাষীদের কথা। বক্তৃতার মধ্যে বহুবার তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে অনুতাপ করছিলেন। তাই তার কথা শেষ হতে না হতেই কে যেন ঘরের এক কোণ থেকে বলে উঠলাে “জিনােভিভ নিজেই নিজেকে পারে।”

সফল-স্বপ্ন ২৩ জিনােভিভের পর উঠলােকামেনিভ। তিনি হােট গ্রাম্য মুদীর মত দেখতে, মুখে ধুসর দাড়ি, বেঁটে ও মােটা—ঠিক যেন শয়তানী-করলে- ঘুসিয়ে-দাত-ভেঙ্গে-দেবার মত। তিনিও অনেকক্ষণ ধরে খুব উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা করলেন। কিন্তু কিরিল তার বক্তৃতার বিন্দু বিসর্গও বুঝলাে না। অত্যান্য বক্তাগণ কামেনিভকে ভয়ানক সমালােচনা করতে লাগলাে। তার পরে এলেন বুখারি। মাঝে মাঝে তার বক্তৃতা বােঝাবার জন্যে তিনি কার্ল মাক্স, লেনিন ও ফ্রীডরিণ, এঙ্গেল থেকে মুখস্থ বলছিলেন। তার বক্তৃতায় যে শুধু অনেকে বিস্মিয়াবিষ্টই হ’ল তা নয়—বহু যুবক ক্যুনিষ্ট সত্যিই দুঃখিত হ’ল! কারণ এদের মধ্যে যারা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়েছে তারা নিশ্চয়ই বুখারিনের বই পড়েছে। আর আজ সমস্ত দেশ যখন এগিয়ে চলেছে তখন কিনা ইনি তার লাগাম টেনে ধরতে চান। কিরিলদের মত নবীন কনিষ্টরা তাই বুখারিনের বক্তৃতা শুনতে শুনতে ভাবছিল “এতদিন এর উপর কেমন করে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম? না, এরা ঠিক আমাদের দলের নেতা বলে মনে হচ্ছেনা। প্রথম দু’দিন বিরােধী দলের বক্তৃতায় অনেক লােক হত। কিন্তু তার পর থেকেই বুখারিনের দল বক্তৃতা করতে এলেই ঘর খালি হয়ে যেতাে। সম্মেলনের সভ্যেরা দু’জন চারজন করে ঘরের বাইরে পায়চারী করতাে। কিরিলের মত যাদের বক্তৃতা করবার পালা ছিল শুধু তারাই থাকতত ঘরে। অবশেষে তাদেরও ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটায় তারাও বেরিয়ে এলাে। বারান্দায় তখন সকলে নানারকম কাজের কথা আলােচনা করে চলছিল। কেউ “কমরেড হিসেবে ট্রাকটর চাচ্ছিল, আবার কেউ চাচ্ছিল বিদেশ থেকে অবশ্য-প্রয়ােজনীয় যন্ত্রপাতি এবং আরও অনেকে ঐ “ করেড হিসেবেই তাদের উদ্যোগ সফল করতে অর্থ সাহায্য চাচ্ছিল। এই সম্মেলনীতে কিরিলের আসবার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ষ্ট্যালিনের পন্থার অমােদনে বক্তৃতা করা। কিন্তু এখানে এসে সে দেখলে যে পার্টির কর্মপন্থা অনেক ২৪ সফলশ্বর আগেই নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। যারা সত্যিকারের কাজের সঙ্গে জড়িত মানে ফ্যাক্টরীর কর্তা, সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রের অধিনায়ক, পাটির সেক্রেটারী, এরা সকলেই অপেক্ষা করছেন-কখন স্টালিন কাজে নামবেন। এদের কাছে কোনও বিশেষ দেশে সামাজত গড়ে তােলাটা আর সমস্যা নয়, ঠিক ক্ষুধার্তের কাছে যেমন খেতে বসা আর না বসাটা ভাববার জিনিষ নয়। পাছে তার আগে অন্য সকলে সব আদায় করে নেয় এই ভয়ে কিরিল এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলো—কাকে দিয়ে নিজেদের টাকার প্রস্তাব উঠাতে পারে। এমন সময় পােড়নেভকে অন্যমনস্কভাবে লােকের ভীড়ের মধ্য দিয়ে যেতে দেখে সে তার দিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে নমস্কারে বাহুল্য না করেই সে বলে উঠলাে= “সার্জি পেট্রোচ্ছি! আমায় আপনি সাহায্য করবেন না?” “কি চাও? আবার খাওয়া দাওয়া ফুর্তি করতে ?” “কেন? না, আমি চাচ্ছি আমাদের কাজের জঙ্গ জিনিষপত্র।” “কিন্তু তােমাকে তত মিনিট খানেকের মধ্যে বক্তৃতা করতে যেতে হবে।” “আচ্ছা! বক্তৃতা পরে করলেও চলবে। কিন্তু যদি আমি জিনিষপত্র, যত্রপাতি একটা কিছু পেতাম••••••! “একটা কিছু-কেমন? বেশ, তা বেশ বলেছে। এই বলে কিরিলের হাত ধরে পােড়ক্লেটন ভেতরে নিয়ে যেয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন “এর নাম কিলি ৰদারকি; ইনি গ্রাম থেকে আছেন।” বলেই তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন “তুমি কৃষকের ভূমিকায় অভিনয় কর।” কিরিল এদিক-ওদিক তাকালাে! কেউ হঠাৎ বড় নদীতে পড়ে গেলে যেমন হাবুডুবু খায় কিরিলের অবস্থাও তেমনি হ’ল। কিন্তু সে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে গােটা সম্মেলনের চারপাশ ভাল করে দেখে নিলাে। তখন বেন কে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা ছিলেন। তার শেষ করতে আরও দেরী সফ-স্বপ্ন হবে মনে করে কিরিল আবার বারান্দায় বেরিয়ে এলাে। হঠাৎ তার সঙ্গে হ’ল ট্যালিনের মুখােমুখি ! ষ্ট্যালিনের হাতে তখন একগােছ ফাইল ও নথি পত্র। চঞ্চলচরণে বুখারি তার পাশেপাশেই চলছিল। বুখারিন একটু বেঁটে বলে কথা বলতে ষ্ট্যালিনের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। কিরিলকে ষ্ট্যালিন হঠাৎ হেসে বললেন“এই যে আমাদের “বিদেশী”, তােমাদের কর্মপন্থা বদলানাের কি হল?” “খুব খারাপ নয়’ কমরেড ষ্ট্যালিন! আমরা ধীরে ধীরে এগােচ্ছি।” “বুখারিন তাে ওরকমভাবে আস্তে আস্তে চলে। কিন্তু তােমরা?” কিরিল ঠাট্টা করে বললাে “তা বটে, তবে বুখারি নিঝঙ্কাটে সমাজতন্ত্রে পৌছুতে চান। আমাদের ওখানে একজন বুখারিনের পরিচিত বন্ধু আছেন। তার নাম ইনিয়ারিয়ানভ। তিনি ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রে পৌছুতে চান। তার কথা হল “ছােট ঘােট জমিজমা থেকে কমুনে!” কিন্তু পরে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন।” মৃদু হেসে বুখারিনের দিকে তাকিয়ে ষ্ট্যালিন বলেন “শুলে বুখারিন, দেশ কি বলে?” বুখারি একটু চমকে উঠে নিজেই সঙ্কুচিত হলেন ! অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গেই তিনি বলে ফেল্লেন “আমাদের সঙ্গে কিন্তু তুমি বড় কর্কশ ব্যবহার করছে। এ কথাটি বলেই তিনি সভাপতিদের ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। তাকে যেতে দেখে স্ট্যালিন বললেন বেচার বড্ড মুষড়ে গেছে।” পরে কিরিলের হাত ধরে নিজের মনেই বলে চল্লেন “সবাই চাচ্ছে বুখারিকে দল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে।” কিরিলের প্রথমে ধারণা ছিল যে ষ্ট্যালিন বােধ হয় প্রস্তাবের বিপক্ষে। তাই প্রথমটা ভয়ে ভয়ে পরে একটু সাহস সঞ্চয় করে সে বললাে “করে, ষ্ট্যালিন, আমচাশিআপৰি অব লৰ বুৰবেন, কিন্তু জাগBি সম জোত আটকা পারেন কি ?...বুখানি, চাহেন..তাই......

২৬ সফল-স্বপ্ন বুখারিনের চাল শেষ হয়ে গেছে। এই যে সব এখানে রয়েছে ( বারান্দায় সবাইকে দেখিয়ে) এরা সবাই বহু আগেই ষ্ট্যালিনের পক্ষে ভােট দিয়ে রেখেছে। বুখারিনকে তাড়াতেই হবে।” কোনও উত্তর না দিয়ে ষ্ট্যালিন চলে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন “আমি ভেতরে যাচ্ছি। শেষ বক্ত তার সময় হয়ে এসেছে।” ষ্ট্যালিনের পেছনে পেছনে সবাই হুড়মুড় করে ঘরে চলে এলাে। সেদিন ষ্ট্যালিন চমৎকার বক্তৃতা করেছিলেন এবং তাই পরে সমস্ত দেশকে আলােড়িত করে। বুখারিনকে বিতাড়িত করার জন্য পার্টির কেন্দ্রীয় পরিষদের প্রস্তাব পড়ার সময় এ সমস্ত কথা কিরিলের মনে পড়লাে। “আচ্ছা ষ্ট্যালিন যেন সেদিন আমাকে আরও কি কি বলেছিলেন কেমন? তিনি জিগ্যেস করলেন যে বােগদানভ, কেন এলােনা। কিরিল উত্তর করেছিল তার অসুখ করেছে। ষ্ট্যালিন উত্তর করেছিল “তােমরা তাকে ভাল করে দেখনা কেন? কারুর সাথে বিয়ে দিয়ে দাওনা ওকে?” কিরুিল হাসতে হাসতে বলেছিল “বেশ, ওর বিয়ে দিয়ে দিলে খুব মজা হবে।” তারপর কিরিল জাৰ্মানী, ফ্রান্স, ইটালী প্রভৃতি নানা যায়গায় গিয়েছিল আর ফিরে এসে সেই নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে সহরের পাটি পরিষদের সম্পাদক হিসেবে একটা লােহা লক্করের কারখানা স্থাপন করেছিল। নানা যায়গায় ঘুরে এসে তার কাছে ষ্ট্যালিনের বিরাটত্ব আরও প্রকট হচ্ছিল। ঘােড়ায় চড়ে কিরুিল পার্বত্য পথে মােড়ে এসে দাড়ালাে। সম্মুখে যতদূর সৃষ্টি চলে—তাতে ভেসে ওঠে, শুধু আলাই নদীর উপত্যকা; আর তাতে আঁকা রয়েছে ক্ষুদে ক্ষুদে ফোটার মত গ্রামের পর গ্রামের সাড়ি আর লাইন ভরা পাহাড়ের ছবি। কারখানা গড়ে তােলবার এত বিপুল শ্রমিক সমাজের শাবলের আঘাতে পৃথিবীর বুক চিরে ধুলাে উড়ছে আকাশে পােটা সফলস্বর উপত্যকা জুড়ে! কিরিলের মনে হল যেন সে এটুকুর মধ্যেই রাশিয়ার বিরূপ দেখছে। গােটা রাশিয়া মেতে উঠেছে কর্মের প্রেরণায় ! সে দাপটে কাঁপছে সারা দুনিয়া! সমস্ত তৃণভূমি, বিল, তুহিন-শীতল তুলার ওপরে ভেসে চলেছে ধরিত্রীর আর্তনাদ! সতর কোটি নাগরিকের পদ বিকেপে বসুন্ধরা চঞ্চল! দলে দলে তারা চলেছে, কেউ সহরে, কেউ বুজনিটজে, সাইবেরিয়ায়, ম্যাগনিটোগােরঙ্কে কিংবা ভঙ্গানদীর উপত্যকায় যেখানে এককালে ষ্টেসকা রাজিন প্রভুত্ব করতাে। এদের ভিতর এসেছে নূতন প্রাণের স্পন। তাই যেমন তারা নির্বিকারভাবে কুজনিটজে চলছে কিংবা বৈকাল হদের দিকে ছুটেছে তেমনি শর্টভ ওগল, ( Sortoy Ogol) উপত্যকায় হানা দিচ্ছে। তাদের অনেকেরই ধারণা নেই যে হয়তাে আর বছর দুই-এর ভেতরেই ঐ নির্জন পথ সব ফেরাে কংক্রীটে বাধা পড়বে কিংবা যেখানে কোটী কোটা মশার ঝাঁক উড়ছে সেখানে চমৎকার পার্ক হবে, সুন্দর সুন্দর বাড়ী উঠবে আর এই গােটা উপত্যকাটি শূন্যে বিলীন হয়ে যাবে। ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে বিরাট কারখানা! কিন্তু তবু তারা আসছে! সমস্ত পৃথিবীর বুক খুড়ে তারা দুঃশাসনের রক্ত-নেশায় মাতােয়ারা। দলে দলে কাঁধে কাঁধ মিশিয়ে পৃথিবীর রূপই পালটে দিচ্ছে। স্বাধীন পাখীর মত ডানা মেলে উড়ছে। সমাজতন্ত্রবাদের ভিত্তি গড়তে এই বিরাটবিপ্লব—এই ক্ষুধিত অভিযান। বুড়াের দল তাদের নিজেদের ভাবনা চিন্তায় বিজড়িত থেকে আশ্চর্য হয়ে দেখছে এই সব তরুণ কমিউনিষ্টদের। সকলের মুখে এক কথা “কি অদ্ভুত লােক এরা। এমনভাব করছে সব যেন কোথায় গেল খেতে যাবে।” আঠার বছরের প্যাভে ইয়াকুনি; সংসারের কোনও ভাবনা নেই বাপের মত ভুরু কোঁচকান অভ্যাসও তার ছিলনা। তাৰু থেকে সফখ তাবুতে দৌড়ে, বা গান করে, নেচে, মজার গল্প করে সজীব ভঙ্গীতে কাজের মধ্যে দিয়ে তার জীবন কাটতাে। তার সামনে এলে বৃদ্ধেরাও না হেসে পারতাে না—এমনি মধুর ছিল প্যাভেলের স্বভাব। অন্যেরা যেমন তাকে ভালবাসততা প্যাভেল তেমনি নাটালা পােননিনাকে একটু বেশ নেহ করতাে। নাটাশ সাইবেরিয়া থেকে এসেছেনবীন কনিষ্ট, প্রথম দিন তার সঙ্গে আলাপ হতেই সে বলেছিল পা, আমি ক্যালডােনিয়া থেকে এসেছি।” “তুমি তাহলে ক্যালভােনীয়ান” বলেই প্যাভেল তাকে টেনে নিয়ে নাচতে চললল। নাটাশার নীলাভ চোখ-উল নীল। পাতলা ঠোট- যেন বােঝাই যায় না। ওপরের ঠোট একটু বাঁকানাে—আর তা সব সময়েই নড়ছে। সেও প্যাভেলের সঙ্গে নাচের মধ্যে এসে পাভেলের কাঁধের উপর হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে নিলাে। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে নাচতে নাচতে একবার ছিটকে বেরিয়ে এলে প্যাভেল বললাে “তােমায় আটকানাে কঠিন নাটা।” এবং আরও কাছে টেনে নিয়ে রাখলাে। “কিন্তু তুমি আবার বড় জোরে আকড়ে ধরছে পাশা!” কিন্তু সেজন্য প্যাভেলকে দূরে সরিয়ে দেবার কোন প্রচেষ্টাই দেখালো না। মেয়েটা আস্তে আস্তে সুরু করলাে “আমি মার কাছে থেকে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু তাই বলে একেবারে চলে আসিনি। হাত ঘুরিয়ে মাকে বললাম “মা, আমাকে ছাড়াই তােমার চলবে, আমি নিজের ভাগ্যান্বেষণে বেচ্ছি। তবে এখানে এসে মাঝে মাঝে মায়ের কথা মনে পড়ে খুব খারাপ লাগে! হয়তাে আমি ফিরে আসবাে ভেবে সারা দিনরাত জানালার ধারে অপেক্ষা করে থাকেন! কে জানে!” প্যাভেল না জিগ্যেস করতেই নাটাশ সেদিন এত কথা বলে গেল। কিন্তু ক্রমে দেখা গেল যে নাটার সব কথা শুনতে প্যাভেলের উৎসাহই বাড়ছে। নিজের কাছেই সফলঃ ২৯ সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সে যেন দলচ্যুত হয়ে পড়লাে! দলবল ছেড়ে প্যাভেল আর নাটা দু’জনে এখন সন্ধ্যে থেকে সকাল পর্যন্ত তাঁবুর বাইরে জেবেল কুয়ে কাটাতে। ঘুম ভেঙ্গে নিজেদের ঐ অবস্থায় দেখে তাদের নিজেদেরই অনেক সময় সঙ্কোচ হতাে। এমি করেই তারা এটত গুগলের কাছাকাছি এসে পড়লে সেখানে তাদের ভাগ্যে কি আছে কে বলতে পারে ? কয়েকদিন পরে তাদের সঙ্গে এসে যােগ দিল ইগর কুভারে, বুরদাইস্কাতে ষ্টোভ, তৈরী করা ছিল তার ব্যবসা। প্রকৃতি তার অদ্ভুত। একটু মদ আর ফুর্তি পেলেই সে আর কিছু চাইতাে না। একবার গ্রামের পুলিশের গায় থুথু দিয়েছিল বলে সকলে তাকে বিদ্রোহী বলত। নিজের ভাঙ্গা কুঁড়ে বিক্রী করে সে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ছে। যেখানে যেতাে সেখানেই ষ্টোত মেরামত করে জীবিকার সংস্থান করতাে। পেটে অফুরন্ত গল্পের ভাণ্ডার থাকায় সবাইকে মা দেখাতে তার মত আর কেউ ছিল না। ফলে যেখানে যেতে সেখানেই ইগর মাতবর হয়ে পড়তাে। সবাই তাকে ভালবাসতাে। ( ৬ ) প্রত্যহ কিরিল সেই গিরিবন্ধের দিকে একবার করে যেতাে। উ। ছিল ঐ সমস্ত কারিগরদের ভেতর থেকে উপযুক্ত লােক বেছে বােগনভ ও সে দুজনে তাদের যথাযােগ্য কালে বসিয়ে দেবে। এইভাবে তারা শ্যাভেজ ইয়াকুনিনকে বেছে নিয়ে তাকে দিয়ে নবীন কনিষ্ট বাহিনী গঠন (ইয়ং কনিষ্ট ব্রিগেড) করবার প্রভাব করলাে। সেই সংঘের স এক উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে তাদের চুঙ্গী বানাতে লাগিয়ে দেওয়া লে। প্রথম প্রথম তাদের কাজে বােগদান প্রমুখ সকলেই যায়নি সফল করত। কিন্তু শীগগীর দেখা গেল যে ঐ কাজে তারা অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। প্যাভেলের মত নাটালিয়া পারােনিনাকেও দ্বিতীয় সংঘের নেত্রী করে দেওয়া হলাে। কিরিলের লক্ষ্যই হল নবীন নবীনাদের দিয়ে কাজ করান। কিন্তু বােগদানভের সে ব্যবস্থা তত মনঃপুত হতনা। তিনি বলতেন “এইসব ছেলে ছােরাদের দিয়ে যে কাজ করাচ্ছ একদিন শেষে তােমায় পাতে হবে এজন্যে।” কিরিল তার জবাব দেয় “ও কিছু নয়, ওদের সতেজ বুদ্ধি আছে তােতা’হলেই ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।” এবং সে আগের মতই তরুণদের খুব দায়িত্বপূর্ণ পদেও প্রতিষ্ঠিত করতে থাকলাে ! ষ্টোকে কিরিল মাঝে মাঝে বলতাে “জানাে, আমি ঠিক শিকারী কুকুরের মত, খরগােষের গন্ধ পেয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই আর হাতের কাছে পেলেই খপ করে ধরে ফেলি। একবার কাউকে ধরলে আর তার রক্ষা নেই।” “খরগােষেও সময় সময় খুব চালাক হয়। অনেক সময় দৌড়েও তাদের নাগাল পাওয়া যায় না।” “সে-রকম লােক আছে সত্যি। আবার ইগর কুয়েত-এর মত লােকও আছে। তাদের সবাইকেই কাজে লাগাতে হবে।” কিরিল একটা লাইন-টানা খাতায় সব খাটিয়েদের নাম ধাম টুকে রাখতে। প্রত্যেক শ্রমিকদের রােজকার কাজ দেখে সেই খাতায় মন্তব্য লেখা হতাে। হয়তাে কারও স্ত্রীর মেজাজ খারাপ কিংবা কেউ সােভিয়েট সরকারকে গালাগালি দিলাে! তখন কিরিল কোনও ভাল কম্যুনিষ্ট মেয়েকে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে পােধরাবার জন্য। এছাড়া অন্যদিকেও তাকে নজর রাখতে হতাে। এবং এরকম তদ্বির তদারক করার ফলেই দেখতে দেখতে চারটি দালান ভােলা হল। সেখানে সব ইনিীয়ার মিত্র ও বাহিনী-নেতাদের থাকবার বলো করে দেওয়া হল। নিজের ঘাড়ে সফল মধ্যে, শ্রমিকদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, রােগীর সেবা প্রভৃতি খুচরাে কাজ রেখে কিরিল বােগদানভকে দিয়ে শুধু কারখানার কাজ করিয়ে নিতে সুরু করলাে। কিরিল বাইরে বাইরে থাকতে বলেই খুব জনপ্রিয় হলাে। কোনােখানে গেলেই ছােট ছেলেরা হয়তাে ঘিরে চীৎকার করতে “কিরিল কাকা, আমাদের খেলবার জায়গা নেই।” কিরিলকে তখনি প্রতিজ্ঞা করতে হতে যে শীগগীরই তাদের খেলার যায়গা হবে। এসব দেখাশােনা ছাড়া কিরিলের নিজের অন্যান্য কাজও ছিল। ধাতু ও ট্রাক্টরের কারখানায় চল্লিশ হাজার লােক কাজ করছিল। তাদের অনেকেই টাকা রােজগার করতে এসেছে। তারা লােভে পড়ে বাক্সের মেয়েদের জামার ভেতরে টাকা লুকিয়ে রাখতাে। অন্য অনেকে আরও ভাল কাজ করতাে, তারা লেনিনগ্রাড, মঙ্কো প্রভৃতি স্থান থেকে আসততা। এছাড়া দলের সদস্যও ছিল অনেকে। কিরিল আর বােগদানভের শুধু সময় মত কাজ শেষ করবারই দায়িত্ব ছিল না। এতগুলি লােকের সম্পূর্ণ দায়িত্বও তাদের উপর। ওখানে সকলের খাবার ভাল যায়গা ছিল না। কিরিল আস্তে আস্তে বহু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন খাবার ঘরের বন্দোবস্ত করে দিল। সেখানকার ছেলেরা পাহাড়ে দৌড়ে ঢিল ছুড়ে চারিদিকে ক্ষতি করছিল দেখে কিরিল মস্কোতে খবর দিয়ে জনস্বাস্থ্য বিভাগকে দিয়ে পাশের ডােবা ভরাট করে সেখানে চমৎকার খেলার বন্দোবস্ত করে দিল। তখন তারা আর পাহাড়ে পাহাড়ে বেড়াতাে না ! কিন্তু এতেও কিরিলের মন উঠছিল না। সমস্ত শ্রমিকদের দিয়ে আরও যেন কি করাতে হবে। সে অনেক মাথা ঘামিয়ে বার করলে যে এদের মধ্যে উত্তাবনী শক্তির বিকাশ না করা পর্যন্ত তার কর্তব্য শেষ হবে না। তার এ আদর্শ সফল করতে নাতোকেই সৰ উপযুক্ত মনে হল। চারিদিকের কাগজে কাগলে তখন প্যালের উচ্চ সফল প্রশংসা। একদিন কিরিল পাভেলকে ডেকে বললাে “প্যাভেল, তুমি তত বেশ কাজ করছে। কিন্তু আমি এতেই সন্তুষ্ট নই। আমি চাই যে তুমি চেষ্টা করে আরও বড় হবে। তােমার উপর যতটা কাজের ভার দেওয়া আছে তার চাইতে অনেক বেশী কাজ করে দেখাতে হবে।” কিরিলের সব চেয়ে মুস্কিল হচ্ছিল ইগর কুয়েভের মত অহঙ্কারীদের নিয়ে। এরা কার কথা মানতে চাইতাে না—নিজের নিজের খেয়াল মতাে চলত। কুয়েতের নামের পেছনে তাই তিনি লিখলাে “ইগর কুয়েত পাহাড়ে দেশ থেকে এসেছে। তার মনে মনে অফার যে সে একজন ভবিষৎ দ্রষ্টা।” (৭) কিরিলের কথা শোেনবার পর থেকে ক'দিন প্যাভেল কিসের উন্মাদনায় যেন পাগলের মত হয়ে গেল! কেমন করে ভাল ভাবে কম খেটে বেশ স্যাকা যায় তাই বের করবার উদ্দেশ্যে দিনরাত সে খাটছে। কিন্তু তবু ঐ আনা গুপ্তহতের সন্ধান পাচ্ছেনা। প্যাভেলের বাবা যে-রে থাকে সেরটিই ভাগাভাগি করে প্যালে নিজের গবেষণা করে। কত যে ভাঙ্গা- গড়া চললল তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তবু প্যাভেলের আশা সফল বলে না। এমন সময় একজন প্রবাসী কীয় সাহিত্যিক তাদের কাজ দেখতে প্রত্যেক সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে অভ্যর্থনা করা হলো। কি তিনি সখি মন নিয়ে সব দেখা না করিলেন। এখন শটি বিপ্লবীনিকে তিনি দেখতে চাইলেন। প্যাভোকে দেখিয়ে দেওয়া হলাে। তিনি পাভেলকোহলেই জিগ্যেস করলেন। “কতে ইয়াকুনিন ! কিসের আশা তােষ এত খাটছে?

সফলঃ প্যাভেল একটু অপ্রস্তুত হয়ে অস্পষ্টভাবে যে কি বললাে তা ভাল করে বােঝা গেলনা। তাকে উৎসাহ দেবার জন্য কিরিল বললাে “বশনা পাণাবল কি তােমার বক্তব্য।” “সমাজতন্ত্র গড়ে তােলা” প্যাভেল উত্তর দিল। “আর বলশেভিকদের উপযুক্ত উত্তরাধিকারী হওয়া।” লেখক বিরক্তিসহকারে বললাে “কিন্তু সৈন্যরাওতাে সমাজতন্ত্র গড়ছে।” “তা ঠিক”, প্যাভেল উত্তর দিল। সৈন্যরাও সমাজতন্ত্র গড়ে তুলছে- “কাগজে তাই নিয়ে লেখালেখি চলছে।” সংবাদ পত্র পড়তে পড়তে প্যাভেল অধৈৰ্য্য হয়ে ভাবে “কি সেই গােপন তথ্য । যেমন করে হক আমি তা আবিষ্কার করবই করব। রাতের পর রাত প্যাভেল নিজের ঘরের এককোণে গবেষণা করতে লাগলাে সেই গুপ্ত তথ্য আবিষ্কারের জন্য । সামান্য কয়েক টুকরাে কাঠ থেকে সে নানা রকম জিনিষ গড়ে তুলে গবেষণা চালাচ্ছে। সে সব যন্ত্রপাতির ভাঙাগড়ার অন্ত নেই। প্যাভেলের উদ্দেশ্য কি? সে প্রচুর সম্মান পেয়েছে। তার দল তরুণদের নিয়ে গঠিত হলেও তারা স্কুনভ’এর দলের চেয়ে বেশী কাজ করে। সে তাে স্বচ্ছনে শুধু নাটাবাকে নিয়ে সিনেমা থিয়েটারে গেলেই পারে। প্যাভেলের পাহাড় ভাল লাগে, আর নাটালারও তাই। সে তাে অবসর সময়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরতে পারে। তা না করে সে নাটাকে নিয়ে ঘণ্টার পর বটা ধরে আপন মনে কাজ করে যায়। এমনিভাবে কাজ করতে করতে একদিন প্যাভেল গােপন তথ্য আবিষ্কার করে ফেলে! নিজেরই কিছুতে বিশ্বাস হচ্ছিল না যে ৩৪ সফল-স্বপ্ন সত্যিই সে আবিষ্কার করতে পেরেছে। সে রাতে মােটেই ঘুমােত পারলােনা প্যাভেল। সন্ধ্যায় পরিশ্রান্ত নাটাশা দেখা করতে এসে বললাে “প্যাভেল, আমি আর পারছি না, হাত পা অবশ হয়ে গেছে।” প্যাভেল উত্তর দিল “আমাদের ওসব কাজ শেষ হয়ে গেছে। গর্তে গর্তে খাটা মানেই প্রচুর পরিশ্রম করা। শুধু শরীর খাটিয়ে কাজ করা মানে মৃত্যুকে কাছে ডেকে আনা। ওসব ঠিক নয়। আমাদের বুদ্ধি খাটাতে হবে।” “সে যাই হক। আমি ব্যারাকে চাম আজকের রাতের মত।” নাটাশা থাকে সব মেয়ে কর্মীদের জন্যে নির্দিষ্ট ব্যারাকে। তবে তার আশা আছে যে শীগগীরই সে পাভেলকে নিয়ে সংসার বাঁধলে ঘােট বাড়ী পাবে। তার যাবার কথা শুনে প্যাভেল বললে। “না তুমি আজ যেয়ােনা, এখানেই থাক।” “কিন্তু আমার যে মাথা ছিড়ে যাচ্ছে ?” “বেশ, তাহলে তুমি ওইখানে শুয়ে ঘুমােও” বলে প্যাভেল তাকে বিছানা দেখিয়ে দিলাে। শুতে-শুতেই নাটাশা গভীর নিদ্রায় অভিভূত হলাে। কোণায় বসে বসে প্যাভেল নিজের কাজ করছিল। সারারাত কাজ করে, ভাের হতেই প্যাভেল নাটাশাকে তুলে দিয়ে বলল “নাটা, এসাে আমায় আজ চুল্লী তৈরী করতে সাহায্য করবে।” আর আমার কাজের কি হবে ?” কিন্তু প্যাভেলের কথায় নাটাশার মনে হল যে আজ তার সঙ্গে যেয়ে চুল্লী তৈরী করা উচিত। প্যাভেল বললো “আমার একটা ভয় হচ্ছে—যদি কিছু না হয়। তা হলে তাে আমার কাজ শেষ। মমথের প্রথম অভিনেতার মত আমার বুক দুরুদুরু করছে?” দুরের সফ-স্বপ্ন অপর কোণ থেকে বাবাকে ডেকে তুলে নাটাশার হাত ধরে প্যাভেল বেরিয়ে এলাে। এদের বেরিয়ে যেতে দেখে প্যাভেলের বাবা ভাবলল “ওকে কিছু বলতেও সাহস হয় না, আজকাল ও-ই আমার কর্তা হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু ও-মেয়েটীর সঙ্গে যখন এত খাতির তখন তাকে সে বিয়েই বা করে না কেন?” আস্তে আস্তে হাতমুখ ধুয়ে সে ও কাজে বেরিয়ে গেল। (৮) ভবিষ্যৎ ইস্পাতের কারখানার জায়গা ভরে রয়েছে আবছা কুয়াশা, পাশের আটাকা হ্রদের স্বচ্ছ জলের উপব চলেছে সূর্যের খেলা, কিন্তু কারখানার ভিতের ওপর সেই ভােরেই যন্ত্রের কাজ শুরু হয়েছে। বিরাট কঁকড়ার মত দুই দাড়া বের করে যন্ত্রটা কিছুক্ষণ হাওয়ায় দুলতে থাকে, তারপর সটান নেমে মাটী কামড়ে তুলে নিয়ে ওপরে উঠে পড়ে। সেই ভােলা মাটী আবার অন্য একটা গাড়ীতে বােঝাই করে তবেই তার নিস্তার! “চমৎকার যন্ত্রটা” প্যাভেল , বললাে। নাটাশা উত্তর দিল—“কিন্তু মানুষ আরও বেশী ভাল খুঁড়তে পারে। আমাদের জল দেবার যন্ত্রটাও ওর চেয়ে ভাল। সময় পেলে আমাদের কারখানায় এসে দেখাে কেমন সুন্দর কাজ হয় তাতে ! একটু দাড়াও আমি সবাইকে কাজের কথা বলে দিয়ে আসছি” বলেই নাটা একদৌড়ে সার্বজনীন বাড়ীর দিকে ছুটে গেল। সহরের সৃষ্টি তখনাে হয়নি। গােটা পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকা থেকে সফলস্বপ্ন ডিনামাইটের ভীষণ আওয়াজ উঠছে হাজার হাজার মানুষের কলরব বৈদ্যুতিক হাতুড়ীর কর্কশ শব্দ ! একটু পূবে অর্ধসমাপ্ত পাথরের বাস ই ! সহরের অস্তিত্ব ছিলনা সত্যি। কিন্তু ঘাস যেমন নােজ সূর্যের আওতায় সজীব হয়ে বেড়ে ওঠ—ঠিক তেমনি সকলের চোখের সামনে সহরটা ধীরে ধীরে রূপ পরিগ্রহ করছে। আর সমস্ত পাহাড়ের গা ঘেঁষে আধাবন্ধ মাটীর কুঁড়ে ব্যাঙের ছাতার মত ছেয়ে ফেলছে। দলে দলে লােক এসে ভীড় করছে সেই সব কুঁড়েয় ! ভােরেও ছেলের বাইরে ছুটোছুটা করছে। আশেপাশে কয়েকজন মাতাল নালায় পড়ে রয়েছে। অদ্ভুত ঘটনা সব ঘটছে এই পাহাড়ে। প্যাভেলের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে নাটা জিগ্যেস করলাে- “থাকবার জায়গাগুলাে দেখছে বুঝি? শুনেছে যে কালও আর একটা মেয়েকে কে ছােরা মেরে খুন করেছে? একে নিয়ে এবার তিন তিনটে খুন হ’ল। সারা গায়ে এর চাবুকের দাগ। ডাক্তারের ধারণা যে এখানে নিশ্চয়ই কোনও স্যভিষ্ট আছে।” “ভিষ্ট কাকে বলে ? চোর না ডাকাত ? “দুর তা নয়—কি বােকা। ডিষ্ট মানে•••তার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলাে-“আমার বলতে বাধছে...সে মেয়ে মানুষ দেখলেই আক্রমণ করে বদলে তাদের ছােরা মেরে খুন করে ফেলে!” “কি সাংঘাতিক? তাদের এখনাে ধরা হয়নি।” “না এখনাে ধরা পড়েনি।” তবে কাল আমরা সব একত্র হয়ে বলেছি তরুণ কম্যুনিষ্টয়া, পাহাড়ের উপর তােমাদের নজর দিতে হবে। সবাই রাজী হয়ে ওপরে উঠে গেল! কিন্তু আমার সাহস হলােনা। আমার অবস্থা •••••ত জানই।” “না যেয়ে ভালই করেছ!”বলেই প্যাভেল আপন মনে এগিয়ে সফলস্বর ৩৭ গিয়ে তার দলের মধ্যে দাড়ালাে ! সেখানে নবাবিষ্কৃত পদ্ধতিতে কাজ শেখানাে হ’ল তার উদ্দেশ্য। প্যাভেলের দলের সবাই এসে জড় হয়েছে; দলের নেতার আদেশ-অপেক্ষায় সকলে স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে—যেন কাজ শুরু হতে একটুও দেরী না হয়। তাড়াতাড়ি প্যাভেল যেয়ে যথারীতি নিজৰ মাচার ওপর উঠে পড়লাে ! কিন্তু আজ তখুনি কাজের আদেশ না দিয়ে সে নিল হয়ে দাড়িয়ে রইলাে ! উচু মাচা থেকে সবাইকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! গােটা দলের মধ্যে মাত্র দুজনকে বেখাপ্পা দেখাচ্ছে—তার বাবা আর বাবার বন্ধু! এখনাে চুল দাড়ি কামিয়ে ছিমছাম থাকলে তার বাবাকে মন্দ দেখায়না কিন্তু কিছুতেই সে তা করবেনা ! নীচে থেকে অধীর আগ্রহে সবাই চেচিয়ে উঠলাে “প্যাভেল দেরী করছে। কেন? আমরা কাজ করবে না ?” “একটু দাড়াও—আজ আমরা নতুন কায়ায় কাজ করবে!” প্যাভেলের কথায় কর্মীদের মনে নবীন উৎসাহের সঞ্চার হলাে। তারা গােল করে প্যাভেলকে ঘিরে দাড়িয়ে বললাে : “বেশ তাই ভাল।” নীচে নেমে প্যাভেল কর্মীদের নুতন ভাবে কাজ করবার জন্যে লাইন একটু বদল করে সাজিয়ে দাড় করালাে। এবারকার ইট তৈরীর কায়দা সম্পূর্ণ নূতন—তাই কাজের ঢংও আলাদা। সবাইকে সাজিয়ে নিয়ে প্যাভেল আবার মাচায় উঠলাে। উঠবার সময় নাটাশার কানে কানে বললো-“নাটা আমার হাত পা কাপছে...” প্যাভেলের ইবিতে এবার কমীরা কাজ শুরু করলাে। প্রথম প্রথম কাজ একটুও এগােচ্ছিনা। কিন্তু তাতে কেউ হতাশ হয়নি। প্যাভেলের ওপর তাদের অগাধ বিশ্বাস ; কাজেই তারা ধৈৰ্য্য ধরে নূতন ভাবে কাজ করতে সফল-স্বপ্ন লাগলাে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল তারা সফল হয়েছে। প্যাভেলের মুখ সাফল্যের আনন্দে উদ্ভাসিত। এমনি সময় অদূরের একটা মৃদু গুঞ্জনে প্যাভেলের দলের কাজের ছলে তাল কেটে গেল! কি হয়েছে দেখবার জন্যে প্যাভেল দৌড়ে নেমে এলাে। নীচে একদল মেয়ে ইটের চালান বন্ধ করে দাড়িয়ে রয়েছে। প্যাভেলকে দেখে তাদের অনেকে আবার লজ্জিত হয়ে নিজেদের কাজে যােগ দিল । দিলনা কেবল একটা মেয়ে। প্যাভেল তার দিকে এগিয়ে এসে জিগ্যেস কবলে। “তােমার কি কষ্ট হচ্ছে ? কাল রাতে ভাল ঘুম হয়নি বোধহয়না? আচ্ছা আমি তােমার কাজটা করছি-তুমি নয়তাে ততক্ষণ জিরিয়ে নাও!” উত্তরে সে মেয়েটা কেড়ে উঠলো!—প্যাভেল বুঝলাে যে এই হচ্ছে যত নষ্টের গােড়। তার পরিচয় জিগ্যেস করে শুনলাে-সে কিরিলের প্রথম পক্ষের স্ত্রী-জিঙ্কা! কিন্তু প্যাভেল মন স্থির করে ফেলেছে। সে তাকে প্রাপ্য টাকা দিয়ে তৎক্ষণাৎ বিদায় করে দিল। দলে অবাধ্য ও অকর্মণ্যকে না রাখাই ভাল। কিন্তু পাভেলের দলের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই। তারা আবার ততক্ষণে সবাই নবীন উদ্যমে কাজ শুরু করেছে। অবশেষে উল্লাসভরে প্যাভেল নাটাশাকে বলে উঠলাে-“আমরা সফল হয়েছি-নাটাশা শীগগীর যাও। কমরেড় ঝদারকিন ও বােগদানভকে খবর দাও; রা দেখে যান আমরা কেমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। আমরা সৃষ্টি করেছি-হা-সৃজনের নেশাই আমাদের ছিল--আর সেই বিদেশী হতভাগা বলছিল কিনা—আমরা বড়লােক হবার জন্যে খাটুছি!” ০ সফ-স্বপ্ন ৰূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইগর কুয়েভ, অনেকক্ষণ থেকে প্যাভেলের দলের কাজ দেখছিল। ঐ বিরাট তরুণদলকে কাজ করতে দেখে তারও এক এক সময় ইচ্ছে হচ্ছিল দৌড়ে তাদের সঙ্গে যােগ দিতে। একান্ত আত্মম্ভরিতার জন্য সে ঐদলে যােগ দিতে পারছিল না। তার ধারণা ছিল যে বুড়াে ইয়াকুনিন ঐ দলের সর্দার। এবং সে প্রতি মুহুর্তেই আশা করছিল যে ইয়াকুনিন তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে দলে টেনে নেবে। দাড়িয়ে দাড়িয়ে ইগর গোফে তা দিয়ে অস্ফুট ঘৃণার সঙ্গে গােমরাচ্ছে -এই সব ফচকে ছোড়াদের দিয়ে কাজ করা, ফুঃ তােমার টাকা-খুব করে ওরাও সােভিয়েট রাজ—যত পার! ইটপাতার কাজেই ইয়াকুনিনের সঙ্গে তার অনেক আগে পরিচয়। তাদের দুজনের একসঙ্গে বসে মদ খাবার কথা সে ভুলতে পারে না। একের পর এক পঁচিশ টাকার ভড়কা খেয়ে তবে ইয়াকুনিন থামতাে! পরে হােটলে ফিরে হাসতে হাসতে সবাইকে গল্প করতে—তার বউ ইগােরােভনার কথা। “জানিস্ এমন বউ সহজে জোটেনা; হাজার বছরও তার সঙ্গে থাকলে মন খারাপ হয়না।” কিন্তু বাড়ী করবার পর থেকেই ইয়াকুনিন পােন্ডােমা- সােল থেকে আর বেরােয়নি। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ইয়াকুনিনের দৃষ্টি আকর্ষণ না করতে পেরে সে নিয়েই এগিয়ে যেয়ে বুড়ো ইয়াকুনিনকে টেনে নিয়ে এলাে। কিন্তু তরুণ প্যাভেল দলের নেতা শুনে সে দম্ভভরে এগিয়ে এসে বললাে “এই শুনছো-আমি খুব ভাল কাজ করতে পারি।” বুড়ো ও অভিজ্ঞ মজুরদের নিয়ে কাজ করায় প্যাভেলের একান্ত অনিচ্ছ। কারণ তাদের স্বভাব, কর্মপদ্ধতি সবই থাকে পুরানাে ধরণের ৪০ সফলশ্ন এবং তারা সহজে সে সব অভ্যেসও বদলাতে পারে না। কিন্তু পিতার অনুরােধে প্যাভেল নিমরাজী হয়ে কুয়েকে ভর্তি করে নিল। এবং এই সঙ্গে তাকে বুঝিয়ে বললাে-“নতুন করে সব শিখতে হবে—তা নইলে চলবে না।” কুয়েভ কিন্তু কারুর নির্দেশ মত না চ'লে নিজের খেয়ালমত কাজ করে যেতে লাগলাে। কাজ শেষ হবার সময় কাটায় কাঁটায় আটটার সময় বােগদানভ তদারক করতে এলো। তার পেছনে এলাে কিরিল ঝদারকিন ও প্রধান ইঞ্জিনীয়ার রুবিন। তাদের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক বাখ, ও এলো। সমস্ত কাজের পরিমাণ মেপে দেখা গেল যে প্যাভেলের মুতন পদ্ধতিতে কাজ প্রায় শতকরা ২৫০ গুণ বেশী হয়েছে। তখন দলের উল্লাস দেখে কে ? তারা চীৎকারে আকাশ ফাটিয়ে প্যাভেল ও নাটাকে ঘিরে ধরলােলা। কিন্তু নাটার ভয়ে তারা প্যাভেলকে মাথায় নিয়ে আমােরাসে বেরুতে পারলােনা। প্যাভেলের বই রকমের ফটো নেওয়া হল। এবং বােগদানভ, কিরিল, রুবিন, সবাই তাকে অতি- নন্দিত করলাে। ঠিক সেই সময়ে ইগর কুয়েভকে নিয়ে বিষম হট্টগােল শুরু হল। তার ইট পাতা ঠিক হয়নি দেখে পরিদর্শক সেগুলো ভেঙ্গে ফেলতে বলেন। এতে কুয়ে, মাথা ঠিক রাখতে না পেরে, তাদের কদৰ্যভাষায় গালাগালি করতে লাগলাে। বােগন এসে কুয়েতের কাজের ক্রট ধরিয়ে বেশ ভাল করে বুঝিয়ে বললেও সে নাছােরবান্দা। “কি বলছ? এটা ভাঙতে হবে কেন?” “কারণ ভাঙতে হবে।” শিক ইটগুলোয় পা দিয়ে বলেন।

সফল ৪১ কুভায়েভ চীৎকার করে উঠলাে-“কি? ভাঙতে হবে ? কেন ? খালি ফিতে হাতে করে মাপতেই শিখেছে। আগে নিজে হাতে ইট তৈরী করতে শেখ—তারপরে ভাঙতে বললা-ভাঙা বুঝি এতই সােজা কেমন ? পূরাে মায়নাটা আগে দিয়ে তবে ভাঙো, অত সস্তা নয় !” এমন সময় কিরিল তাদের মধ্যে এসে পড়ে। কুয়েতের ইট পরীক্ষা করতে যেয়ে কিরিল দেখতে পেলাে—একটা সরু কাঠের টুকরাে থাকায় তার ইট পাতা ঠিক হয়নি। সেই কাঠের টুকরাে নিয়ে তারা ইগরকে বােঝালাে- “ইটের পাঁজায় আগুন দিলে এটা জ্বলে উঠতে—তাতে যে গ্যাস হতাে- তা বেরিয়ে যেতে পাঁজা ভেঙে। তখন সবটা কাজই আবার নূতন করে করতে হতাে। তার চাইতে প্রথমেই ভেঙ্গে সাজা কি ভাল নয়?” “ধ্যেৎ—যত সব সােভিয়েট জোচ্চোরের কারবার বলে সে খেকিয়ে উঠলাে। কথাটা শেষ করতেই এর গুরুত্ব তার বােধগম্য হ’ল কিন্তু তখন সে অসহায় ভাবে শুধু গালাগালি করতে লাগলাে! তাকে ধমকে তাড়িয়ে দিয়ে কিরিল নাটালার কাছে যেয়ে বললাে- “নাটাশা পাভেলকে নিয়ে যেয়ে সােজা দুদিন শুইয়ে রাখ। ওর সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। তারপর আমরা এমন চমৎকার নাচগানের আয়ােজন করবাে যা সমস্ত ইউনিয়নের মধ্যে হবে অভিনব !” কিরিলেব নির্দেশে নাটাশা প্যাভেলকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। তখন রাত অনেক হয়েছে চারদিকে ঘন অন্ধকাব! পথে বেড়িয়ে প্যাভেল বললাে -“নাটা চল আমরা পাহাড়ে যাই।” “বেশ, তুমি যাবে ? পাশা?” “চিরদিন আমি পাহাড় ভালবাসি। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ঘুরে বেড়াতে কি ভাই যে লাগে।” “অমনি করতে গিয়ে কবে যে হাত পা ভেঙ্গে পড়ে থাকবে তাই আমার ভাবনা। এস পার্কের বেঞ্চিতে বসে একটু বিশ্রাম করে নিই।

উদয়নারায়ণপুর, হাওড় ৪২ সফল-স্বপ্ন তারপরে দুজনে পাহাড়ে উঠবে।” “আজ কিন্তু আমার••••••চাই” নাটা প্যাভেলের কানে কানে বললাে। “ঠিক সেই রাত্তিরের মত••••••যেদিন প্রথম আমরা একসঙ্গে ছিলাম! তােমার মনে পড়ে?” হটাৎ তাদের মাথার ওপরে ঘ ঘন আওয়াজ হতেই তারা তাকিয়ে দেখলাে যে ঠিক পার্কের রেডিয়াের নীচেই তারা বসে রয়েছে। রেডিয়াে বলছে : “হালাে, হলাে, হালনা, কারখানার অধ্যক্ষ বােগদানভ এবার কথা বলছেন!”..••• কিছুক্ষণ পর বােগদানভ বলতে লাগলেন—“কমরেড, ও বন্ধুগণ, আজ আমাদের ও তােমাদের এবং তােমাদের মধ্যে যারা এখনাে সংবাদ পাওনি তাদের সকলেরই পক্ষে উৎসবের দিন। কিসের উৎসব ? তার কারণ পাভেল ইয়াকুনিন, একটা ইটের দলের অধিনায়ক-নূতন আবিষ্কার করেছে। প্যাভেল কে ? সে তরুণ গ্রাম্য যুবক কিন্তু আজ সে সৃজন কর্তা নিজের ভেতরের শক্তিকে সৃষ্টির রূপ দিয়ে সে বিখ্যাত হয়েছে। সেই অন্ধকারেই প্যাভেল আত্মপ্রশংসায় সঙ্কুচিত হতে লাগলাে। তরুণ সংঘ শনিবসাহিত্য বিভাগ ২ অগ্নি পরীক্ষা (১) কিরিলেব পায়ের শব্দ থেমে যেতে ষ্টো আবার ঘুমিয়ে পড়বার চেষ্টা করলাে। কিন্তু কিরিল চলে গেলে তার ভাল ঘুম কখনই হয় না!—সেদিন যেন আরও কেন কিছুতেই ঘুম আসছিল না। ভেবে ঘুম থেকে উঠে সে জল আনতে বলে গা ধােবার জন্যে তৈরী হলাে। তার নিজেরই হিসেব মত এতদিনের কামনা সফল হতে এখনাে কয়েকদিন দেরী কিন্তু তবু কেন ধৈৰ্য ৰধা মানছেনা? অবাক হয়ে ষ্টেঙ্কা আয়নায় নিজের ছবি দেখতে লাগলাে। কই তার কাধ তাে একটুও কুঁজো হয়নি বরঞ্চ গর্বোনতই রয়েছে। এবং সৌন্দৰ্যও একটুও কমেনি। এখনাে তার শরীরের বাঁধন অনেক তথীকে লজ্জা দেবে। আনমনে ষ্টেঙ্কা আস্তে আস্তে কিরিলেব ঘরে যেয়ে “চিত্রকলার ইতিহাস নাড়াচাড়া করতে লাগলাে। মাইকেল এ্যাঞ্জেলাের “শেষ বিচার” দেখতে দেথতে ষ্টেঙ্কা তন্ময় হয়ে পড়লাে। এতদিন যীশুকে শিশুর মত সরল ভঙ্গীতে দেখতেই সে অভ্যস্ততার মাথায় থাকে জ্যোতি। কিন্তু এ সম্পূর্ণ বিভিন্ন। নগ্ন, বলিষ্ঠ ও কঠোর পুরুষমুর্তি রয়েছে তার সম্মুখে। সে ছবিতে কাঠিন্য ফুটে উঠছে পরিষ্কার ভাবে! “ঠিক কিরিলের মত—এরই মত কঠোর।”—ষ্টেঙ্কা ভাবছে! ভাবনার কোনও বগা নেই-যদি ওই রকমই ছেলে হয় আমার? তাহলে কি মজা যে হবে কিন্তু যদি মেয়ে হয় ?-না আমি মেয়ে চাইনা মেয়েতাে একটা রয়েছে -আনুকা * আনুষ্কা তার প্রথম বিবাহের সন্তান। তখন ষ্টোর ভয় হত যে হয়তাে কিরিল অঙ্ক সবাইর মত আনুষ্কাকে আদর যত্ন সবই করবে কিন্তু ভালবাসতে ৪৪ সফলস্বপ্ন পারবেনা। কিন্তু সে ভয় ছিল অযথা! আনুষ্কা, তারচেয়েও কিরিলকেই ভালবাসে বেশী। আশ্চৰ্য যে আনুষ্কা কিরিলের নাম ধরেই ডাকে। কিরিলের প্রত্যেকটা কাজই তার নকল না করলে চলে না। ষ্টোর নিজেরই মনে হলাে আমার চেয়ে সুখী আর কে আছে?” তার চোখের সামনে ভেসে উঠল অন্যান্য বিবাহিত তরুণদেব ছবি। তারা কি বেশী সুন্দর ? ষ্টেঙ্ক। পুপুঙ্খরূপে নিজের সৌন্দৰ্য্য বিচার করে। পীনােয়ত স্তনযুগ নিয়ে কিরিল কতই না আদর করেছে। শুধু কিরিল কেন অনেকেই প্রশংস মান দৃষ্টিতে স্কোর গতি পথে তাকিয়ে থাকে। তার সৌন্দর্য্যের ভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছে সে কিরিলকে। মুহূর্তের জন্য ষ্টেচ্চার ইচ্ছে হ’ল সব আবরণ ফেলে দিয়ে ইভের সঙ্গে নিজের তুলনা করে। ইভের চেয়ে সে নিশ্চয়ই বেশী সুন্দরী। এই বলে সে ইভের ছবি দেখতে লাগলাে। কোথায় যেন ইভের সঙ্গে তার সাদৃশ্য ঠিক! ইভের শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঙ্গে ষ্টোর মিল আছে। ইভ সুন্দরী—কিন্তু তার চেয়েও সুন্দরী জগতে অনেক আছে। এই ভেবে বই বন্ধ করে ষ্টেঙ্কা গা ধুতে চলে গেল। গা ধােওয়া শেষ হবার আগেই আনুষ্কা ঝড়ের মত স্নানের ঘরে ঢুকে কিরিলের খোঁজ করতে লাগলাে। তারপরে হঠাৎ ষ্টেঙ্কার নগ্ন শরীরের দিকে নজর পড়তে সে ইতস্ততঃ করতে লাগলাে। কিন্তু থাকতে না পেরে জিগ্যেস করলাে : “মা আজ তুমি বােধ হয় খুব খেয়েছছ না? তা নইলে তােমার পেট এত মােটা কেন?” আকাকে নিজের কাছে টেনে এনে ষ্টো বললে-“বােকা মেয়ে এখানে যে আমার থােকা রয়েছে। তােমার ভাইটী। “সে কি মা?” এবার টেকা বিপদে পড়লাে! আনুষ্কার এই বয়সে সব কথা তাকে বলা রয়েছে।

সফখ ৪৫ যায় কিনা—তাই তার ভাবনা। অনেক চিন্তার পর ষ্টেফা আনুষ্কাকে সব বুঝিয়ে বলাই স্থির করলাে। তাতে ফল ভাল ছাড়া খারাপ হবে না। গা ধূয়ে বেড়িয়ে এসে ষ্টেঙ্কা কিরিলকে টেলিফোন করলাে। কিরিল তখনই মাত্র কামরায় হাজির হয়েছে। “তুমি যে এত ভােরেই সদর সমিতিতে এসেছে? “কে? ষ্টেঙ্কা—এত ভােরে আসতে হ’ল—কারণ আমায় যে জরুরী তলব করা হয়েছিল। বােগ দানভ আমায় ডেকেছে।” “শীগগীরই সন্ধ্যে হবে, না কিনিল?” হায়! কট। সন্ধ্যেই বা তারা এক সঙ্গে কাটাতে পেরেছে? কখনাে হয়তাে উচ্ছাসভরে কিরিল দৌড়ে এসেছে। এসে তাকে কত আদর করেছে, দুজনে বারান্দায় এসে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তখন কত গল্প হত। একটু পরেই ষ্টেঙ্কা সবুজ কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতাে-আর কিরিল পড়াশুনা করত। তাদের যুক্তি ছিল যে যেদিন সন্ধ্যেয় কিরিলের বাইরের কাজ থাকবেনা সেদিন সে বাড়ীতে ফিরে পড়াশুনা করবে। ভূল করে ষ্টেফা গল্প করতে গেলে-কিরিলের তিরস্কার হতাে-মৃদু হাত দিয়ে। “কি সন্ধ্যে?-খুব বােধ হয় দেরী নেই—এখনি সে ভাবনা কেন- কালকের আগে কিছু হচ্ছে না? সে ভয় নেই !” (২) আর উপায় ছিলনা, ইগর কুয়েত কেও বাধ্য হয়ে অন্য সকলের মতই নুতন ভাবে কাজ করতে শুরু করতে হল। ইগর কাজ করে, আর ভাবে। চারদিকে কৌতুহলী কারিকরের উৎসুক হয়ে লক্ষ্য করে তার কাজ। কেমন করে আত্মরিতা বজায় রেখে সে কাজ করবে তাই হল তার একমাত্র চিন্তা।

সফল-স্বপ্ন এসংবাদ দেখতে দেখতে চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে পড়লাে। আর সবাই ইগরকে উপহাস করে। প্রথমতঃ ইগর তাদের ঠাট্টা গায়ে মাখতাে না ! এবং তার আকাঙ্খার কথা কাউকে বলতাে না। কিন্তু গ্রামে ফিরে যাবার কল্পনাতেও তার ভয় হতে লাগলাে। ফিরে যেয়ে সে সবাইকে কি বলবে ? “চাকার মত বিরাট টাকা সে কেমন কবে দেখাবে ? তখন তাে তাকে কেউ আস্ত রাখবেনা। অবশ্য সে তাদের বলবে যে “সােভিয়েট জোচ্চোরা কি আর ভাল কারিকরের সম্মান রাখতে পারে?-“কিন্তু তাতে বিশেষ ফল হবে বলে মনে হয় না। কারণ তার গ্রামেরই আরও কয়েকজন এখানেই কাজ করে। এ অন্তদ্বন্দের ফলে ইগব মুশুড়ে পড়লাে। এমনকি বেশভূষার ওপরেও তার কোনও আকর্ষণ বইলাে না! দাড়ি সে বহুদিন কামায়নি। তার একগাল দাড়ি দেখে মেয়ে কাবিকরেরা ঠাট্টা করতে “তােমার বাড়িতে শশা বুনে দেওনা কেন ইগব, বেশ ভাল ফলন হবে?” কিন্তু তাদের কথায় কান না দিয়ে ইগব নিজের মনে কাজ করে যেতাে। একদিন না থাকতে পেরে প্যাভেল ইগরকে নিয়ে ভাল কারিকরেব কাছে যেয়ে কাজ শিখতে বলল । সেখানে ইগর অনুভব করলাে নে যারা কাজ করছে তারা সবাই তার চেয়ে বেশী জানে। তাদের সবারই উৎসাহ ও বেশী ।... —সেদিন ইগর না কেঁদে পারেনি। তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগে! কিন্তু সেটা বরঞ্চ শাপে বরই হ'ল। কদিনের চেষ্টায় ইগব সত্যিই চমৎকার কাজ শিখে ফেললাে!-কিরিল তাকে রাজমিস্ত্রীদলের সর্দার করে দিয়েছে। এবং সেও কাজের দিকে অন্য সবাইকে হারিয়ে নূতন রেকর্ড স্থাপন করেছে। একদিন সন্ধ্যায় ইগর পার্কে বেড়াতে গেল। অন্যমনস্ক ভাবে ঘুরতে ঘুরতে সে পার্কে টাঙ্গানন বলিষ্ঠ কশ্মীদের ফটোর কাছে এল। সামনেই । প্যালে ইয়াকুনিনের ছবি, কিন্তু তার পাশে? নাটা ও অন্যের মধ্যে সফ-স্বপ্ন ৪৭ ওটা কার ছবি ? কুয়েভ চমকে গেলতার নিজের ছবি ওখানে দেখে। এবং ভাবাবেগ দমন করতে না পেবে সে মূৰ্জিত হয়ে পড়লো। সকলে ধরাধরি করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। কেউ কিছু বলতে পারছিলনা কেন তার হঠাৎ অমন মূৰ্ছা হ’ল। সে নিজে ছাড়া কেউ জানতােনা কেন সে আচমকা অজ্ঞান হয়ে পড়লাে। কিরিলের কাছে কথাটা বলতে পারলে সে কিছু স্বস্তি পেত। কিন্তু তাও তার সাহস হচ্ছিলনা। কাজেই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সে সারারাত হাসপাতালে পড়ে রইলাে। ভােরের দিকে আর থাকতে না পেরে সে কিরিলকে খবর দেবার জন্য ডেকে পাঠালাে। ক্লিরিল তখন সদর সমিতিতে চলে যাওয়ায় সে অগত্যা প্যাভেলকেই খবর দিতে বললাে। “প্যাভেলকেই খবর দাও-হ্যা—প্যাভেল ইয়াকুনিন—আমাদের নেতা।” বিকেলের আগে প্যাভেল এর সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারলােনা। সে এসে ইগরের বিছানার পাশে দাড়িয়ে জিগ্যেস করলাে-“কি চাও ইগর আইভ্যানােভিচ ?” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ইগর সুরু করলাে- “পাশা, জগতে আমার কেউ নেই। আমি একা! ছেলে নেই। বউ? বহু বউ ছিল আমার কিন্তু তাদের কেউ আমার সঙ্গে ঘর ক পারেনি। কাজেই আমি একান্ত নিঃসঙ্গ একা।” “কেন? তুমি একা হবে কি দুঃখে? এখানে সবাই তােমায় জানে- তােমার কত নাম? তবু তুমি একা?” “কিন্তু আমার ছেলে থাকলে তােমাদের মত করে তৈরী করতাম।” “কি বলতে চাচ্ছো তুমি? তােমর সব বুড়ােনাই চাও ফরমাস মাফিক ছেলেদের তৈরী করতে। ছেলেরা কি জামা জুতাের মতই তােমাদের অস্থাবর সম্পত্তি যে যেমন ইচ্ছে অর্ডার দিয়ে তৈরী করবে?” “না, না, তা হবে কেন? আমি সে কথা বলছিনা! দেখতে পারছেনা যে আমার অতীত জীবনের অন্য কোন অনুশােচনা হচ্ছে।”

৪ সফ-স্বপ্ন তার আগের জীবনের একটা ঘটনার কথা মনে পড়লো! ভাঙা মদের দোকানে তখন ছিল আড্ডা। একদিন মাতাল হয়ে নর্দমায় পড়ে থাকবার সময় তার অস্পষ্ট অনুভূতি হ’ল যেন কে যত্ন করে তাকে তুলে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল কুঁড়ে ঘরে! পাদ্রীর পােষাক পরা একজন লােক তার বিছানার পাশে এসে দাড়িয়েছিল। সেই কুঁড়েয় আরও অনেকে বসে ছিল। তাদের মধ্যে ইগর কিরিলের প্রথম পক্ষের স্ত্রী জিঙ্কাকে চিনতে পারলাে। সে বেড়িয়ে আসতে চাইলাে-এমন সময় পাত্রীটি তাকে বাধা দিয়ে বললাে-“কি চাই ব্রাদারহুড়কা ?” তারপর তারা সারারাত মদ খেয়ে ঘূৰ্ত্তি করেছিল ! মদের নেশার ফাকে ফাকে তারা বলাবলি করছিল—“আমাদের প্রতিশােধ নিতে হবে- এ প্রতিশােধে সমস্ত জগতের লোকই আমাদের সাহায্য করবে।” এর পরেও কুয়েত অনেক দিন সেখানে গেছে! মাতলামীর চরম পৰ্যায়ে একদিন সেই পাত্রী তার হাতে ট্রেণের লাইন তােলবার একটা যন্ত্র দিয়ে ট্রেণ ধ্বংস করতে পাঠায়। ইগব তার কর্তব্য যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করে—একটা বিরাট মালগাড়ী সে রাতে লাইন থেকে উল্টে পড়ে যায়। কিন্তু প্যাভেলকে সব কথা সে বলতে পারলাে না। শুধু “খারাপ” সঙ্গীদেরই উল্লেখ করলাে। প্যাভেল কিন্তু বেশ বুঝতে পারলে যে কোথাও গলদ রয়েছে। কথার ফাকে তাদের নাকে বিকট পােড়া গন্ধ এলাে...“খাদে কি আগুন লাগলাে?” কুয়েভ চমকে প্যাভেলকে নিয়ে কারও বাধা না শুনে দৌড়ে বেড়িয়ে গেল কিরিলে খেলে।

সফর ৪১ তাদের ঐভাবে হস্তদন্ত হয়ে দৌড়তে দেখে মাস সিভাসে খুব চমকে গেল। সে শুধু বুঝলাে যে যাই হকনা কেন তা কিরিলের জানা দরকার। তাই কিরিলকে সে টেলিফোন করলাে। তাকে সদর পাটা আফিসে না পেয়ে সে ষ্টেঙ্কাকে ফোন করলাে। ষ্টেঙ্কার তখন সবে প্রসব ব্যথা উঠেছে। ঘড়ি ধরে ষ্টেঙ্কা সময় দেখলাে রাত ৪টা। টেলিফোন করেই মাস ষ্টেঙ্কার কাছে এসে তার প্রসবের বন্দোবস্ত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাে। আশ্চৰ্য্য, তখন পর্যন্ত তার কোনই বন্দোবস্ত হয়নি। সকলেই ভেবেছিল যে প্রসবের সময় স্কোর তেমন কষ্ট হবে —তাই তার জন্যে তেমন বন্দোবস্ত করা হয়নি। ষ্টেঙ্কারও বিশ্বাস ছিল সে রকম। প্রথমে সেজন্যে সে ঘরের এক কোণা থেকে আর এক কোণা পায়চারী করছিল। কিন্তু ব্যথা বাড়বার সাথে সাথেই সে চক্রাকারে ঘুরতে লাগলাে। তার চোখগুলাে লাল হয়ে গেল—সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাে না! প্রলাপের মত সে আস্তে আস্তে বলতে লাগলাে “কিরিল—আমার কিরিল! প্রিয়তম তােমার জন্যেই—তুমি তুমি••••••” হঠাৎ সে অনুভব করলাে যেন কে তার কোমরে একটা প্রচও লাথি মেরেছে-সেই সঙ্গেই কিরিলের নামও তার চেতনা জগৎ থেকে লুপ্ত হয়ে গেল। সমস্ত শরীর একটা চাপা ব্যথায় ভরে গেল আর সংযম রাখা অসম্ভব হ’ল। ষ্টো পাশেই প্রস্তুত বিছানাতে এলিয়ে পড়ে দুহাত দিয়ে পেট চেপে ধরলাে। তার পেট ক্রমশই ফুলছিল। আর মনে হচ্ছিল যেন কে সমস্ত শরীরে লক্ষ লক্ষ পেরেক বিষিয়ে তাকে ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে দিচ্ছে। শুধু গর্ভের যাতনাই নয়—একটা ছােরা মারার মত তীক্ষ্ণ ব্যথা সমস্ত শরীরে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ছিল। এক সময়ে কমে গেলেও আবার দ্বিগুণ বেগে ব্যথা হচ্ছিল। থাকতে না পেরে টেক্কা ককিয়ে উঠলাে— “ওঃ ওঃ—আমার চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে গেল! মাসা! আমার পা গেল—আমি আর বাঁচব না—আমার পা কোথায়? :

সফ-স্বপ্ন সারা শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছিল, কিন্তু ক্রমে তা শুকিয়ে গেল। তখন তারু ঠোট শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। চোখ দুটো ভীষণ গর্তে বসে পড়লাে কপালের রেখা কুঁচকে গেল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটলাে-তবু কিছুই হল দেখে মাস হাসপাতালে টেলিফোন করলাে ডাক্তার আনবার জয়ে! [ ৪ ] সেদিন নদীতে ছিল আশ্চয্য প্রশান্তি। সেদিকে দেখিয়ে কিরিল ইঞ্জিনীয়ার রুবিনকে বললাে “কি সুন্দর দেখেছছ?" রুবিন যেন কি ভাবছিল—সে তাই প্রত্যুত্তর দিল না। একটু পরে বললাে-“ঠিক কথা! আমাদের জীবনও এমনি-কখনাে শান্ত পরমুহূর্তে আবাব তা ফেনিল তরঙ্গ সঙ্কল!” কিরিল বললাে “আমি কিন্তু অশান্ত জীবনই বেশী পছন্দ করি।” রুবিন চোখ ঘুরিয়ে বললাে “নদীও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে—কিন্তু তার ফল ভাল নয়।” কথাটীতে দুজনেই হেসে উঠলো। কিরিল লক্ষ্য করলে যে রুবিন যেন তাকে কি বলতে চাচ্ছে কিন্তু বলতে সংকোচ করছে। তাই সে বললাে- “কি বলতে চাচ্ছ একেবারে বলেই ফেল না কেন—রুবিন ?” “আচ্ছা” বলেই রুবিন আবার কিছুক্ষণ থামলাে। তারপরে সুরু করলে “এ সংসার যেন একটা বিরাট জলাভূমি—কারও সাধ্য নাই যে এথেকে কিছু করে !” কিরিল উত্তর দিলাে-“কিন্তু আমরা তাে এই জলাভূমিই শুকিয়ে ফেলতে চাই। তারপরে অনুবীক্ষণের ভেতর ফেলে দেখবে—এদিয়ে কি করা যায় । বােগদানভের ল্যাবরেটরীতে যাওনি?—যেয়ে দেখাে !” “সে তত খুব ভালকথা কিন্তু প্রত্যেকেরই তাে আর অনুবীক্ষণ যন্ত্র নেই-তা?”

সফ-স্বপ্ন যে ‘একদল লােক তাে আছেই সব নষ্ট করতে তাদের কেন ভেতরে যেতে দেওয়া ?” কথা বলতে বলতে কিরিলের মনে হলাে যেন রুবিনের কোথায় গলদ আছে। সাবধানে সে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাইলাে। কিন্তু সেই সময় নদীতে একটা পাইন গাছের গুড়ি ভেসে আসতে দেখা গেল। সেই দিনই সকালে আটাকা নদীর উপর দিক থেকে ভয়ঙ্কর খবর এসেছে। ট্রাক্টর ও লােহার কারখানার জন্য জমা করা ছিল বহু কাঠ। তা থেকে বহু কাঠ ভেসে আসছে নদীর স্রোতের সাথে। অবস্থা অত্যন্ত সাংঘাতিক। কারণ সব কাঠগুলাে ভাসতে আরম্ভ করলে—তাদেৰ গতি ঠিক থাকবে না। যেদিকে ইচ্ছে ভাসবে। এবং তাদের পথে বা পড়বে তাই ধ্বংস হতে বাধ্য। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের কথা হচ্ছে যে ওগুলাে ভাসতে ভাসতে এসে বিরাট ৩৬১ মিটার লম্বা বাঁধের গায় ধাক্কা দিলে বাঁধ বাঁচান অসম্ভব। চালককে দিয়ে জোরে গাড়ী হাঁকিয়ে কিরিল সেই জমাকরার যায়গায় এসে পড়লাে। বহুলােক সমানে ব্যস্ত হয়ে ঘুরছে। কিরিল তাদের ভেতর যেয়ে নিজ জলে নামতে প্রস্তুত হয়ে অন্যদের ডাকলাে। তবে জলে নামবার আগে তারও বুকটা কেঁপে উঠলাে। জোর কবে সে নেমে পড়লাে—কিন্তু কেউ তাকে অনুসরণ করলাে না। তাই দেখে কিরিল গর্জে উঠলাে-“কাপুরুষ কোথাকার! কনিষ্টরা কই?” সে ডাকে কমুনিষ্টরা সাড়া দিল। তারা কিরিলের সঙ্গে মিলে সমস্ত দিন সে কাঠ গুলাে তীরে আনতে চেষ্টা করলাে। সন্ধ্যার অন্ধকার হলেও সে কাজ সাঙ্গ হল না। এমন সময় আঁধার ভেদ করে কিরিলের বন্ধু জাকার কাটায়েভ এসে বলাে : “কিরিল শীগগীর বাড়ী যাও এতক্ষণ হয় তাে সব শেষ হয়ে গেছে।” “কি?” কিরিল ব্যস্ত হয়ে জিগ্যেস করলাে। ষ্টেঙ্কার কথা বলছি এতক্ষণ হয় তত তােমার ছেলে কি মেয়ে কিছু একটা হয়েছে। তােমার সফ-স্বপ্ন এখন বাড়ী থাকা একান্ত দরকার।” তার কথা শুনে কিরিল বাড়ী যাবার ব্যবস্থা করছিল। কিন্তু এমন সময় বিশাল গর্জন করে বিরাট কাঠের গুড়ি গুলি আবার ছিটকে পড়লাে। হতাশ হয়ে কিরিল বললাে- “তুমি বলছছ বাড়ী যেতে—কিন্তু এসব ফেলে কেমন করে যাব ?” বলেই সে যেদিক থেকে আওয়াজ হচ্ছিল সেদিকে দৌড়ে গেল। [ ৫ ] তারপরে স্বপ্নের মত সব ঘটতে লাগলাে। একলাফে কিরিল পারে এসেই গাড়ী চালিয়ে দিলাে। রাত্তিরের নৈশ তব্ধতা ভেদ করে গাড়ী চললাে বিদ্যুতের মত ছিটকে। গাড়ীর তালে তালে কিরিল বলে চললে-ষ্টেঙ্কা,! ষ্টেঙ্কা! প্রিয়তমে- আমার ওপর অভিমান করাে না!—বিবক্ত হয়ে না সত্যি এসব ছেড়ে আসা আমার পক্ষে অসম্ভব কিছুতেই আসা যায় না!—তলের ওপর বুকে পড়ে কিরিল গাড়ীর গতি বাড়িয়ে দিল। কারখানার মাইল পঞ্চাশেকের কাছে এসেই অধৈৰ্য্য কিরিল এ্যাক্সিলারেটার চেপে গতি আরও বাড়িয়ে দিলাে। হাঁফাতে হাঁফাতে গাড়ী চললে তাকে নিয়ে! হঠাৎ পাশ থেকে একটা খরগোেষ পালাতে যেয়ে সেই তীব্র ধাবমান গাড়ীর তলে পড়ে চেপ্টে গেল। নিজের ফ্লাটে উচুতে যেয়ে গােটা বাড়ীর নিস্তব্ধতায় কিরিল চমকে গেল! টুপী খুলতে গিয়ে সে লক্ষ্য করলাে যে তার আঙ্গুলের ডগাগুলাে কাপছে। অন্য সময় সে এটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতে কিন্তু এখন এই পারিপার্শিকতায় তার বুকের ভিতরটা জমে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় সে থাকবে কি চলে যাবে-কিরি তা স্থির করতে পারছিল না। একবার মনে হচ্ছিল সফলশ্ন ৫৩ যে সে ঐ দৃশ্য সহ করতে পারবে না! আবার মনে হচ্ছিল যে পালিয়েই বা যাবে কেন ? অবশেষে দ্বিধা সত্ত্বেও কিরিল ভারী বুটের আওয়াজ করতে করতে ভেতরে চললাে!—সে আওয়াজে সন্ত্রস্ত হয়ে আসা সিভাসে বলল “কে। কিরিল নাকি?” কিরিল প্রথমে তাকে ঠিক চিনতে পারে নাই। সে তখন শুধু ষ্টোর কথাই ভাবছিল। অবসন্ন সুরে মা বললাে-“অনেকক্ষণ ষ্টোর ব্যথা উঠেছে ; কি কষ্ট যে পাচ্ছে বলা যায় না। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে বসে থেকে আমি আর পারছি না।”—তারপর কিরিলকে ষ্টেঙ্কার ঘরের দিকে যেতে দেখে পথ আটকে রাখলাে-“না না কিরিল তােমার ওদিকে বাওয়া হবে না” কিন্তু জোর করে দরজা খুলে কিরিল ষ্টোর ঘরের ভিতর ঢুকে পড়লাে। স্কো মেঝেয় পড়ে রয়েছে। দূর থেকে কিরিল শুধু তার ফোলা পেটটাই দেখতে পেলাে। সমস্ত রগগুলাে নীল হয়ে কুঁকড়ে থাকায় পেটটাকে উচু ঢিপির মত দেখাচ্ছিল। আস্তে আস্তে ষ্টে চোখ খুলে অনেক কষ্টে অস্পষ্ট সুবে বললাে- “কিরিল! প্রিয়তম।”—কিরিল কাছে আসতেই সে দুহাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলাে। ষ্টেঙ্কার কানের কাছে মুখ নিয়ে কিরিল বললাে “কাদ ষ্টেঙ্কা-খুব চীৎকার করে কঁদ!” তার স্বান্ত্বনায় ষ্টেস্কার কান্না বেরুলল।—কি হৃদয় বিদারক সে কায়া ! দুটো পা-ই যেন তার শরীর থেকে ছিড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে-সেই অসহ ব্যথায় প্রকাশ পাচ্ছে ষ্টেঙ্কার কাদায়সে কায়ার বিরাম নাই। কার, সাথে সাথে তার সমস্ত শরীর কুঁচকে দলা পাকিয়ে খিল ধরছে! দেখতে দেখতে তার শরীর কাঠের মত শক্ত হয়ে পড়লাে—আর সে দুহাত দিয়ে প্রানপণে কিরিলের গলা জড়িয়ে ধরলাে।

৫৪ সফল-স্বপ্ন কতক্ষণ তারা এভাবে ছিল কিরিলের সে খেয়াল ছিল না। হঠাৎ ষ্টেঙ্কা থেমে গেল এবং পরক্ষণেই আবার দ্বিতীয় চীৎকার—রাগ, ক্ষোভ-আর ব্যথা মেশানন ! কিরিলের গলা থেকে ষ্টেঙ্কার হাত দুটো খসে পড়লাে—সমস্ত শরীর নির্জীব হয়ে এলিয়ে পড়লাে। মাসা চেঁচিয়ে উঠলাে-“কিরিল ! দেখ—তােমার ছেলে হয়েছে যে!” আশ্চর্য হয়ে কিরিল মাসার দিকে তাকালাে। সে তার কথা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। মাসা নবজাতককে ন্যাকড়া দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে বললাে সত্যি কিরিল, তােমার ছেলে হয়েছে-দেখ ! অবসাদ জড়িত চোখে ষ্টেঙ্কা জিগ্যেস করলাে চোখের রং ? মাসা উত্তর দিলো-“প্যাশনে ঠিক কিরিলের মত হয়েছে কেমন?” হয়েছে অভিভূতের মত কিরিল ষ্টেঙ্কার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাে। সে হাতখানা অবসন্ন ষ্টেঙ্কা আস্তে আস্তে মুখের কাছে তুলে ধরে চুমু খেলাে!—সে কস্তু চুম্বনের স্পর্শে কিরিলের মনে হলাে-“আমার সমস্ত জীবন তােমায় প্রাণ দিয়ে ভালবাসবো—স্কো। মাসা তখন ছেলেটিকে কিরিলের হাতে দিল আদর করতে। কিরুিল তার ছেলেকে হতে নিতেই টেলিফোনের বণ্টা বাজতে লাগলাে। মামার হাতে ছেলেকে দিয়ে ফোন তুলেই বােগদানভের তীক্ষ্ণ স্বর শুনতে পেলাে —এখানে আগুন লেগেছে।” র আরও চড়িয়ে বােগদানভ বললাে- “চতুর্থ বিভাগে আগুন লেগেছে—এখানে অনেক লােক রয়েছে—আর আশ্চর্য! তুমি বাড়ীতে বসে ফুর্তি করছো?" বােগ্দানভের ব্যবহারে কিরিল বিরক্ত হয়ে ষ্টেঙ্কার কাছে এসে বললো “আমি কখখােনাে যাবে না। তােমায় এখন এভাবে ছেড়ে আমি কেমন করে যাবাে ?”

সফশন কিরিল আশা করেছিল যে ষ্টেঙ্কা হয়ত কথাটা শুনে খুব খুশী হবে। কিন্তু তা না হয়ে তার মুখ অন্ধকার হয়ে পড়লল! কিরিল তাই জিগ্যেস করলাে “রাগ করলে ষ্টেঙ্কা? কিন্তু বােগদানভ তত জানে না যে এখানে কি হয়েছে ? আদর করে দুহাতে কিরিলের গলা জড়িয়ে ষ্টেঙ্কা বললাে-“কিন্তু তােমার তাে এখানে থাকলে চলবে না।” তারপরে আর কিরিল আপত্তি করতে পারবে না। সে গাড়ীতে চড়ে সফেয়ারকে প্রথমে ৪র্থ বিভাগে চালাতে বললাে। আবার পর মুহূর্তই বলে উঠলােনা ! দ্বিতীয় বিভাগেই চল । [ ৬ ] কারখানার পাশেই উপত্যকায় প্রায় তিনশাে মাইল নিয়ে খুব ভাল মাটা আছে। বাইরে থেকে অভিজ্ঞ চোখে এ মাটীর দাম ধরা পড়ে না। কিন্তু কলেজে পড়বার সময়েই বােগদানভ এটা আবিষ্কার করেন। তারপর থেকে কখনই তিনি এর চিন্তা ছাড়তে পারেন নি। জেলে—কিংবা সাইবেরিয়া নির্বাসনে থেকেও তিনি শুধু ভেবেছেন কি উপায়ে এই অফুরন্ত সম্পদ মানব সমাজের কাজে লাগানাে যায়। অবশেষে গত দু এক বছরে ফেনিয়া প্যানোভা নামের অসামান্য প্রতিভাশালিনী রাসায়নিকের সাহায্যে তিনি ঐ মাটী পরিত করে তা থেকে তৈল আবিষ্কার করতে পেরেছেন—এবং ঐ থেকেই আরও প্রয়ােজনীয় জিনিষ তরল দাহ পদার্থ বের করেছেন। কারখানা তথনাে শেষ হয়নি। কিন্তু ঐ মাটীতে বিরাটভাবে কাজ তখনই শুরু হয়েছিল। ভাের হতে হতেই কিরিল নাটাশা পারােনিনার বিভাগে এসে পৌছিল। দুটো বিরাট যন্ত্র তখন কাজ করছিল। তাদের প্রত্যেকটা থেকে একটা প্রবল বারিধারা মাটীতে পড়ে সেগুলােকে কাদায় পরিণত করছিল।

ফলন সেই অর্ধ তরল কাদা আবার নল দিয়ে শুষে নিয়ে বিশেষ ভাবে তৈরী করা যায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। সেগুলাে শুকিয়ে গেলে মেয়ে শ্রমিকেরা কা কাটবার মত করে সেগুলাে কেটে কেটে বস্তাবন্দী করে। বােগ্দানভও একটা নিজৰ পন্থ। বের করেছিল। সেটা অবশ্য এ সবের চাইতে পুরানাে ধরণের-তবু তার পন্থায় খরচ প্রায় অদ্ধেক কম হয়। কিন্তু একটা ভয় সব সময় থাকতাে। বস্তাবন্দী হয়ে গেলে অনেক সময় ওগুলাে থেকে আপনা আপনি আগুন জ্বলে ওঠে। কেন, তা কেউ বলতে পারে না। নাটা পাৰােনিনার বিভাগে খুব অল্পদিন হ’ল বােগ্দানভের পন্থায় কাজ করা হচ্ছিল। একথা মনে হতেই কিরিল বুঝতে পারলে কেমন করে আগুন ধরেছে। সেখানে এসে কিরিল নাটাশাকে জিগ্যেস করলাে- “নাটাশা কখনাে কি তােমাদের বন্যায় আগুন ধরেছিল।” নাটা উত্তর দিলাে-“না! কেন বলুন তাে? একদিন অবশ্য একটা বস্তায় আগুন ধরছিল--আমরা তাড়াতাড়ি সেটা নিভিয়ে দিয়েছিলাম।” “যদি তুমি না দেখতে ?” হাসতে হাসতে নাটা বললাে-“তাহলে আগুন ধরে যেত।” “ঠিক বলেছে—ঠিক বলেছে”—অন্যমনস্ক ভাবে কিরিল এ কথাগুলাে বলে গেল। হঠাৎ তার নজরে পড়লাে নাটার ধীদেহে! কিরিলের মনে হ’ল যেন নীল ফুকের নীচে নাটাশার পেট ঈষৎ মােটা দেখাচ্ছে। আগের মত আর সে তত চঞ্চল নয়। আগে যেমন সে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে—এখন তার বদলে সে বেশ সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে চলে। প্যাভেল ও নাটাশার কথা কিরিল নতত। তাই অনেক আগেই সে ঠিক করেছিল তাদের একটা ফ্লাট দিতে। কিন্তু সংকোচের জন্য এতদিন সে ওটা করে উঠতে পারেনি। আজ সে না বলে পারলাে না। “নাটা! প্যান্ডেলকে একটা আলাদা ফ্লাট দেবার বন্দোবস্ত করছি।”

ফ- সে যেমন ভেবেছিল—তেমন রাগ বা লজ্জা প্রকাশ না করে নাটা উত্তর দিল- “বা! তা বেশ হবে।” “তােমাদের দুটো ঘরে হবে না—না? তিন ঘর ওয়ালা ফ্লাট চাই— কেমন?” “হ্যা—দেখুন•••• ” নিজের অজ্ঞাতসারেই নাটা গায়ের কাপড় ঠিক করে নিল। “বুঝেছি”-বলে কিরিল দুহাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে কপালে চুমাে খেয়ে বললো “ওব যত্ন করােনাটা-আশ্চর্য হয়ে না--জগতে এর চাইতে আনন্দের জিনিষ আর কিছু হতে পারে না। আজই আমারও একটা ছেলে হয়েছে-বুঝলে?” নাটা কিরিলের এই আদর প্রকাশে অভিভূত হয়ে গেল কিন্তু বাইরে তখন সবাই একসাথে মিলে ভীষণ হট্টগােল করছে। সেই চীৎকার কানে যেতে ভ্যাসিলি বললাে “বাইরে আগুন লেগেছে—আমরা সব জীবন্ত পুড়ে মরবাে।” বলেই বাইরেব গােলমাল কমাবার জন্য দৌড়ে বেরিয়ে গেলাে। আগুনের শিখা দেখতে দেখতে চারদিকে ছড়িয়ে গেল। প্রতি মুহূর্তে ভাসিলিব মনে হচ্ছে যে সমস্ত শ্রমিকরাই হয়তাে ইদুবের মত পুড়ে মারা যাবে। কিবিল, বােগ্দানভ ও নাটা একটা গাড়ীতে করে ঝড়ের মতাে সেই আগুনের দিকে এগিয়ে এল। পথের মাঝেই তারা যুক্তি করে ঠিক করলাে যে যেমন করেই হক না কেন সবাইকে খেদিয়ে হ্রদের জলে নামিয়ে দিতে হবে। যতক্ষণ না আগুন নেবে—সবাই একগল। জলে দাড়িয়ে থাকবে। এদিকে-একগাড়ী বােঝাই করে মেয়ে শ্রমিকদের নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত হয়েছিল। কিরিল তা দেখে চমকে গেল। দূরে থেকে এক হা আগুন এগিয়ে আসছিল তাদের দিকে। এরমধ্যে কাঠের গাড়ীতে করে খাওয়া মানেই নিশ্চিত মরণকে আহবান করা। কিরিল চীৎকার করে সফল-স্বপ্ন সবাইকে জলে নেমে যেতে বললো। কিন্তু এঞ্জিন চালক তার কথার অর্থ বুঝতে না পেরে সােজা গাড়ি চালিয়ে দিল। কিছুদূর এগিয়েই সে আগুনে আর গাড়ী চলতে পারলাে না। দেখতে দেখতে গাড়ীতেও আগুন ধরে গেল। কিরিল, নাটাশা দৌড়ে সেদিকে এগিয়ে এলাে। আগুন ধৰতেই সব মেয়েরা আমতা আমতা করে বললাে : “সত্যি আপনি কি দয়ালু। জানেন—আপনাকে আমরা কত ভালবাসি? কখনাে আমরা কেউ আপনাকে ক, দারকিন বলে ডাকি না—সব্বাই কিরিল বলি !••• তার কথা তখনাে শেষ হয় নাই এমন সময় একদল শ্রমিক ‘ধাপ্পাবাৰী’ ধাপ্পাবাজী’ চীৎকার করতে করতে তাদের দিকে এগিয়ে এলাে। তার সবাই চতুর্থ বিভাগের শ্রমিক। এই বিভাগের অধ্যক্ষ ভ্যাসিলি শিভিনেজ, থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিক পৰ্য্যন্ত সকলে এক চিন্তা নিয়ে কাজ কবছিল- “কি করে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কাজ শেষ করবে।”••••••তাদের কাজও শেষ হয়ে এসেছিল। একদিন রাতে ভ্যাসিলি এবং এঞ্জিনীয়ার দুজনে মিলে সারা বছবের হিসাব তৈরী করছিল—কিরিল ও বােগানকে দেখাবার জয়ে। মনে তাদের অফুরন্ত আনন্দ বে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই তাদের বিভাগের কাজ শেষ হবে। সমস্ত শ্রমিকরা বাড়ী যাবার জন্যে ব্যর্থ হয়ে পড়েছে। এম্নি সময় আগুন ধরে গেছে। আগুন নেবার কল আসবার আগেই চারিদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণের ভয়ে লােকজন সব বাইরে বেরিয়ে এসে যে যেদিকে পারলে লাফিয়ে পড়লাে। কিন্তু গাড়ীর নীচে সমস্ত বায়গাটা লাল ছাইয়ে ভরেছিল। দূরে থেকে তাকে ভয় করবার কিছু ছিল না—কিন্তু সেগুলো হচ্ছে সাক্ষাৎ যম! তাতে পড়বামাত্রই মেয়েদের করুণ চীৎকারে আকাশ ভরে গেল—সবাই সেই আগুনের সুদে পড়ে কুঁকড়ে সিদ্ধ হয়ে পড়লাে। ভয়ে নাটাশ করিল! কিরিল!” বলে চেঁচিয়ে উঠলো। আর ফল- ৫১ ঐ হতভাগ্য মেয়েদের বাঁচাবার জন্যে কোনও কিছু না ভেবেই নাটাশা সেই আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাে ! মুহূর্তের মধ্যে নাটানার শরীরে আগুন ধরে গেল। কোনও রকমে উঠে দাড়িয়েই সে কিরিলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলাে। কিন্তু সেই সময়েই আর একটা আগুনের শিখা তাকে গ্রাস করে ফেললাে । ( ৭ ) শুধু দুজন লােক সেই আগুনের মাঝ থেকে পালিয়ে এলাে। কখনাে কাটায় ভবা বনবাদাবের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে, কখনাে পাইনবনের আঁকে বাঁকে কিংবা না জেনে হঠাৎ কাদায় তাদের কোমর পর্যন্ত যাচ্ছিল ডুবে। মাঝে মাঝেই তাদের বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল—কিন্তু তখনই আগুনের লেলিহান শিখা এগিয়ে এসে করছিল উপহাস! সারা ডােবর জল শুকিয়ে বন পুড়িয়ে কুদ্ধ ষাড়ের মত গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসছে সেই সর্বগ্রাসী আগুন। তবু তাবই ভেতর থেকে দুজনে পালিয়ে আসছিল আর তাদের অনুসৰণ কৰছিল বনের যত জীব জন্তু। তাদেব দিগবিভ্রম হয়েছিল-চঞ্চল শেয়ালেরা যেদিকে পারছে দৌড়চ্ছে, খরগােসগুলাে উদ্ধশ্বাসে ছুটছে নেকড়ে পালাচ্ছে—যেন এইমাত্র সার্কাসের বাক্স ভেঙ্গেছে। দুরে একটা ভালুক আসছ-কুঁজো হয়ে হয় তােত তার পিঠ গেছে ভেঙ্গে। সামনের পাইন গাছে উঠেই সে পেছনে তাকাচ্ছে করুণভাবে আগুনের দিকে আবার তাকে নামতে হবে ভাের হয়ে আসছে। বােগদানভ অবসন্ন হয়ে পড়লাে ! আর চলা তার পক্ষে অসম্ভব। তাকে উৎসাহ দিতে কিরিল বলো— “আপনি বড় শীগগীর হাল ছেড়ে দিচ্ছেন।” বলেই নীচু হয়ে সে বােগদানভকে কাধে তুলে নিতে চাইলাে। তখন সে মরিয়া হয়ে বললাে “না সফল আমি নিজেই পারবে। কিন্তু নড়বার তার ক্ষমতা ছিল না। উঠতে যেতেই সে নেতিয়ে পড়লাে ! “কিরিল—তুমি একাই যাও—যেয়ে কাউকে পাঠিয়ে আমায় নেবার বন্দোবস্ত করাে।” “আচ্ছা”-বলেই কিরিল চলতে সুরু করলাে। কিন্তু তখনই তার মনে হলাে -বােগদানভকে ওভাবে ফেলে রাখা মানেই ধ্রুব মৃত্যুর কোলে ছুড়ে দেওয়া। তাই বােগ্দানভের শত আপত্তি সত্ত্বেও সে তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে রওনা দিলাে। সারাদিন এভাবে চলে-অবশেষে সন্ধ্যের মুখে মুখে তাবা জ্বলন্ত চিতা থেকে বেরিয়ে এলাে। সামনেই শুকনাে মাটা! আনন্দে আত্মহারা হয়ে বােগ্দানভ তাতে গড়াগড়ি দিতে লাগলাে। “মাটা—আমরা মাটীতে এসে দাড়িয়েছি! এরােপ্লেনে অনেকক্ষণ চলবার পর মাটীতে নামলে এমিই মনে হয়!” কিরিল বলাে। কিলিও বােগদানভের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে যাচ্ছিল—কিন্তু হঠাৎ একটু দূরে একজন অর্ধনগ্ন স্ত্রীলােককে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে সে এগিয়ে গেল। দেখে মনে হলাে যে মেয়েটী হোঁচট খেয়ে পড়বার সময় দু হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরেছিল । কাছে এসে তাকে দেখেই কিরিল স্তম্ভিত হ’ল।-বােগদাভ, দেখ ! দেখ। এযে জিকা ! তােমার মনে পডে••• “আশ্চৰ্য! সে এখানে এলে কেমন করে?” “দেখে মনে হচ্ছে যেন মাটা কাটার কাজে ও ব্যস্ত ছিল—এমন সময় আগুনের ভয়ে এই গােটা বিল হাতড়ে বেড়িয়ে এসেছে। দেখনা—সমস্ত জামা কাপড় কেমন ছিড়ে গেছে।” কথাগুলাে বলতে বলতেই কিরিলের ধারণা হল যে নিশ্চয়ই একটা অস্বাভাবিক কিছুর জন্যে জিঙ্কা এখানে এসে পড়েছে। আস্তে আস্তে তাকে ঝােপের কাছে টেনে নিয়ে কিরিল নিজের গায়ের কোট দিয়ে তার শরীর ঢেকে দিল। আর এইখানেই প্যালে ইয়াকুনিনের নেতৃত্বে অনুসন্ধানকারী তরুণ সফ-স্বপ্ন কনিষ্টরা তাদের খােজ পেল। তাদের সঙ্গে ইগর কুয়েভও ছিল। জিকাকে ওখানে ঐভাবে পড়ে থাকতে দেখেই সে কাঁপতে লাগলাে=ঠিক পার্কে তার নিজের ছবি দেখে যেমন হয়েছিল। আপনমনে সে বিড়বিড় করতে লাগলােমমেয়েতে কিছু প্রকাশ করতে পারবে না।” কিরিল ও বােগদানভকে পেয়ে উল্লাসভরে সব তরুণ কমুনিষ্টরা তাদের দিকে দৌড়িয়ে গেল। শুধু প্যাভেল একটু দূরে দাড়িয়ে চারিদিকে কি যেন দেখছিল। কিরিল তাকে কাছে ডেকে দুহাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরলাে। সে আস্তে আস্তে জিগ্যেস করলাে- “সত্যি ?” কিরিল প্যাভেলের চোখের দিকে তাকাতেই সে বুঝতে পারলাে ! তার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে—প্যাভেল অতি ধীরে ধীরে চলে গেল! ঠিক সেই সময় একদল কিশাের কমুনিষ্টদের নিয়ে আনুস্কা সেখানে যেয়ে হাজির হল। সে যেয়ে কিরিলকে নিয়ে চলে এল ফ্লাটে। কিরিলের বুটের শব্দে ষ্টেঙ্কা বুঝতে পারলাে যে সে আসছে। সে একদৃষ্ট্রে কিবিলের দিকে তাকিয়ে রইলাে। কিরিলও আপন মনে ঐ ময়লা-কাদায় ভরা পােষাকেই—যেয়ে তার কোলে মাথা রেখে শুইয়ে পড়লাে ! সে বলতে চাচ্ছিলাে “ষ্টেঙ্কা-আমিতাে নিজেকে নিয়ে এলাম, কিন্তু আরও কত প্রাণের মর্মভেদী হাহাকার আকাশ ভেদ করে বেরােচ্ছে—কি বলব! প্রাণের সে দাগা কিসে যাবে মানি না। এমন সময় ছােট আনুস্কা তিরস্কার করে উঠলাে—“কি একগাদা কাদা নিয়ে এসেছে ঘরে। দেখতে তােমার জুতােয় কী ভীষণ কাদা!” কি করতে হবে আমায়-তাহলে?” আনুস্কা উঠে গভীর ভাবে বললাে- “আমরা বায়স্কোপ দেখবাে-কিন্তু মা তুমি আমি সকলে যেন দেখতে পাই।

ত্রান্ত প্রকাশ ( ১ ) প্রথম পঞ্চবার্ষিকী সংকল্পের তৃতীয় বছর যাচ্ছে। সমস্ত দেশময় কৰ্ম্ম- প্রবণতাদেশ গড়ে উঠছে-পাশ্চাত্য মন্ত্রে দীক্ষিত হচ্ছে—চারিদিকের সবাইকেই পেছনে ফেলে তাদের এগিয়ে যেতে হবে। দূরে আলাউ পর্বতমালার মধ্যে টোমা নদীর বা ধারে হচ্ছে সােরিয়া। একদিন যেখানে ডগুয়েভ স্কা নির্বাসনে কাল কাটিয়েছিলেন আজ সেখানে বিরাট ইস্পাতের কারখানা। আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে। মহাত্মা পিটারের রাজত্ব কালে উরাল প্রদেশে যে নূতন জীবন দেখা দিয়েছিল সােভিয়েট আমলে আবার তা পুনরুজ্জাবিত করা হচ্ছে। পাইন জঙ্গ পরিষ্কার করে স্বার্ডলঙ্কের নীচে সমগ্র রাশিয়ার গৌরব “উরাল যান্ত্রিক কারখানা” দাড়িয়েছে। একদিন যে চেলিয়াবয়ের চারপাশে শুধু কুঁড়ে ঘর আর মুরগীর আড্ডা ছিল, কাদার যন্ত্রণায় যেখানে মাথা গলানাে ছিল অসম্ভব, আজ সেখানে পিচঢালা চওড়া রাস্তা, মােড়ে মােড়ে পার্ক ফুলের বাগানবড় বড় দালান আর বিরাট ট্রাক্টর-কারখানা ! টিউমেন, খাড়রি, উফা, পেরম—প্রভৃতি সব নায়গাই নতুন করে সৃষ্টি করা হচ্ছে। পূর্বতন জনহীন যায়গা, ধৰ্মালম—সব নতুনযুগের মানুষেরা হৈ চৈ করে দখল করে সমাজের সমষ্টিগত উন্নতিতে কাজে লাগাচ্ছে। এক কালে যেখানে দলে দলে জীর্ণবাস নিয়ে পুণ্যপ্রার্থীরা ভিড় করে দাড়াতে, পুরুত পাওদের আধিপত্য ছাড়া যেখানে আর কিছু ছিল না—আর যার চারিদিকে বিরাজ করতে বিরাট স্তব্ধতা—আজ সেখানে ফাটছে ডিনামাইট- দিকে দিকে ভূতত্ববিদেরা ছুটছে নুতন খনিজদ্রব্যের সন্ধানে। সন্ধানীদের হাত থেকে কাজাকিস্থান, ইয়াকুটিয়া, কালমিকিয়া কিছুই বাদ যায় নাই।

সফ- লেনিনগ্রাড়, আর্কেজেল, মঙ্কো-প্রত্যেক যায়গাতেই নিত্য নতুন কলকার- খানা গড়ে উঠছে। এদের যায়গা করে দেবার জন্যে নিয়ােজনীয় গীর্জা- গুলাে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। বড় বড় রাস্তার মাঝখানে যেসব পেট মােটা গম্বুজ দাড় করানাে থাকে সেগুলে ভেদে পার্ক, রাস্তা আর জনসাধারণের বাসস্থান করা হচ্ছে। লক্ষ লােকে মস্কোকে নূতন আকার দিতে লেগেছে- মাটা খুড়ে নতুন রাস্তা পাতা হচ্ছে, সহরের সমস্ত পুরাণে অংশ চুরমার করে—নতুন নক্সায় পুনর্গঠন হচ্ছে ! গােটা সহর কংক্রীটে ভরে গেছে। শুধু মস্কো নয় গােটা দেশটাই পূর্ণোদ্যমে গঠনকাৰ্যে লেগেছে। মঙ্গোতে ডাকবার পর থেকে কিরিল ঝদারকিন প্রায় দেড়বছর মফস্বলে যায় নাই। মস্কো থেকে তাকে বিদেশে পাঠাননা হয়। সেখান থেকে ফিরে এসে শেবকি বুমেরাকে যেয়ে ট্রাক্টর কারখানার দায়িত্ব গ্রহণ করতে গেলেই প্রান্তীয় সমিতি তাকে জানিয়েছিল যে নতুন ইস্পাতের কারখানার কাছে যে সহর গড়ে উঠছে সেখানের কনিষ্ট পাটা তাকে সম্পাদক মনােনীত করেছে। তার স্থানে জাকার কাটায়েভ ট্রাক্টর কারখানায় নিযুক্ত হয়েছে। ঐভাবে করেছে তারা কিরিলের “গতি পরিবর্তন”। তখন থেকে সে সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রের বিষয় খু খবরকাগজ ও প্রত্যক্ষ দশীব মারফত সংগ্রহ করেছে। প্রায়ই সমস্ত কাগজে থাকে শতকরা হারের হিসাব-দশ, কুড়ি, চল্লিশ, ষাট, আশি, নববই, নিরানব্বই। সমস্ত দেশ যেন প্রাণপণবেগে ছুটে চলেছে এক অজানা দেশের সন্ধাৰে-আজ কারও সাধ্য নাই সে গতি মােধ করে দাড়ায় ! উরাল প্রদেশে প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশটী গ্রাম নিয়ে সমস্ত গােটা মহকুমাই পরিণত হয়েছে এক বিশাল কৃষি কমুনে-রক্তকু”। দেখতে দেখতে এরকম হাজার হাজার কন গড়ে উঠছে সমস্ত সােভিয়েট জগতে।

৩৪ সফলসুম রাশিয়ার আলামীতে কৃষি ও শিল্পকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। অমনি যেখানে যত লাজমী আছে সবখানেই কৃষি ও শিল্পের মিলিত কারখানা মাথা তুলতে লাগলাে-সাইবেরিয়ায়, কাজাকস্থানে, বাস্কিরিয়া-ভলগা উপত্যকা সবখানে•• • বােগদানভকে তাই কিরিল বললে— কে জানে কি হচ্ছে। কিন্তু থামা চলবে না।” বােগদানত ভারী গলায় বলে উঠলাে “ গােটা দেশটাই চলতে শুরু করে দিয়েছে। সে যাই হক তুমি দয়া করে কারখানার কথাটাই বেশী করে ভাবাে। কৃষি প্রতিষ্ঠানের দিকে তােমার তাকাবার প্রয়ােজন নাই।” এক এক সময় কিরিলেরও মনে হয়েছে যে সত্যি দেশের অগ্রগতির হার বড় বেশী হচ্ছে কিনা ! থাকতে না পেরে সে একদিন বােগ্দানভকে কথাটা জিগ্যেস করলাে সেদিনও সে বােগ্দানভের কাছ থেকে অস্পষ্ট ধমক ছাড়া কিছু পেল না। জনসাধারণের ভেতরকার ক্ষমতার পূর্ণ প্রকাশ সম্বন্ধে এখনাে আমাদের কোনও ধারণা নেই। কে বলতে পেরেছিল যে প্যাভে ইয়াকুনিন এত বিখ্যাত হয়ে পড়বে ?” সকলের মুখেই তখন এক কথা—কি আশ্চৰ্য্যভাবে কোটা কোটা লােকের মনে নবজাগরণের ভাব এসেছে। এই সব হট্টগােলের মধ্যে একদিন জাকার কাটাতে হতদন্ত হয়ে কারখানায় এসে সােজা কিরিলের ঘরে ঢুকে পড়লাে। “এদের সবাইকে একটু বাইরে যেতে বল-তােমার সঙ্গে গােটাকতক সরকারী কথা আছে।” কিনিল সবাইকে বের করে দিল-কার তাকে বললাে যে গােটা পােতােমায়ােত গ্রাম ধ্বংস হতে বসেছে। “কি কারা করছে এসব?” জাকার কাটােেভর কথায় প্রকাশ পেল যে ঝাতের মত কয়েকজনই এর অঙ্গ দায়ী। কিরিল সে সংবাদে আচ হ'ল-কার বারকোত, কি আগে পাচাঁর প্রান্তীয় সমিতির সম্পাদক। তবে ঢাকার স বিরােধের সময় তার মত স্থির করতে দেরী দেখে তাকে ঐ পর থেকে খুব অল্পদিন আগেই অপসারিত করা হয়েছে। কিন্তু এই সময়ে বােগ্দানভ তত বিচলিত হয় না। সেই দিন সন্ধ্যে বেলাই সাজি প্রেট্রোজি, কিলিকে টেলিফোনে ডেকে পােমােনােকা গ্রামে তক্ষুনি যেতে বললেন। তিনি আরও জানিয়ে দিলেন যে হয়তাে তাদের পথেই দেখা হতে পারে। কিনিল সানন্দে এই প্রস্তাবে রাজী হল—বিশেষতঃ সে এনেছিল যে তার কাকা নিকিটা গুরিয়ানভ পােলােমালােভােতেই যেন কোথায় থাকে। ( ২ ) জাকার কাটামেভের সঙ্গে ঝগড়া করে নিকিটা গুরিয়ানত শোক বুয়েরকের কাজ ছেড়ে দিয়ে পােমােশােভােগতে চলে এসে ইয়াকুনিনের পরিত্যক্ত ঘর দখল করে রয়েছে। তার অনেক দিনের সাংবানভাবে মৌমাছির চাষ-এবার পূরণ করবার ইচ্ছা হয়েছে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে সে দুর্ভিক্ষের কবলিত হয়ে পড়লাে। সারা জগতে নিকিটার আশ্রয় কতে কেউ ছিল না। তার স্ত্রী গত বসন্ত কালে মারা গেছে, ছেলে, মেয়ে মাইরা তাকে ছেড়ে উরাল অঞ্চলে কাজ করছে। তার কাছে ছিল মাত্র নয় বছরের মেয়ে সুরকা ও আধ বস্তা রাই। আর সুরকাকে নিয়েই নিকিটা তার তাছাড়া এর আলােচনা করে। “আনিস আমরা শীগগীরই এত মধু পাব যে খাবার পরেও অনেক বাড়বে। তখন কত মুখে থাকবাে আমরা। হতভাগালে বাকল সামগ্রিক নেত্রে কাজ করুক। বােলল তেৰেছে আমি আকারের সঙ্গে সফলস্বপ্ন ঝগড়া করে কাজ ছেড়েছি-ওরাতাে জানে না যে আমার ও কাজ পােষাবে বলে ছেড়ে দিয়েছি।” ঠিক বলেছ বাবা—এ-সব আমাদেরই।” আর তার কথা শুনে নিকিটা হতে পুলকিত ! কিন্তু এ সুখস্বপ্ন আর ফললাে না। দেখতে দেখতে তাদের সঞ্চয় গেল ফুরিয়ে। ছােট্ট মেয়েটা ক্ষিদেয় কাদলে তখন নিকিটা খেকিয়ে ওঠে—আর নানা কথায় ভােলা ! কাদিস না! দেখিস এক্ষুনি একটা শেয়াল এক টুকরাে রুটী মুখে করে এনে তােকে দিয়ে যাবে—আর একটা খরগোেষ তাের জন্যে দুধ আনবে। ওঠ—আর কঁদিস না!” সে বাইরে যেয়ে রাইয়ের খালি বলয় বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতাে-বিরাট বিরাট রুটীর স্তুপ এবং সে যেন দৌড়ে ওগুলাে খেতে যাচ্ছে! ঘুম ভাঙলে তার শেবকী বুয়েরাকের কথা মনে হত। একএকবার ইচ্ছে হচ্ছিল সেখানে ফিরে যেয়েজাকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে আবার কাজে ভর্তি হওয়া। কিন্তু পথে বেরিয়েই তার সাহস উবে গেছে—সে ঘরে ফিরে এসেছে। ক্রমে ক্রমে নিকিটার অবস্থা হল সঙ্গীন, উদ্যম গেল ফুরিয়ে। কাদা বন্ধ করলে সে মাঝে মাঝে কয়েক মুঠো খাবার তার মুখে দুড়ে দিতে। তখন তার পেতাে কান্না! সুরকা হয়তাে তা মুখেও দিতে না--সে প্রলাপের ঘােরে ডাকতে “মা! মা!” তথন নিকিটা থাকতে পারতাে না—রাগে কম্ কস করতে করতে বলতো-“হতভাগী আবার মা মা করছিস কেন? মা টাতাে ছিল পাজীর পা ঝাড়া—তবু মা! মা! করা বন্ধ হচ্ছে না। বেশ তুই খাবি- নাতো আমিই এগুলাে খেয়ে ফেলবে—তাের মতাে কেউ আটকাতে পাবে না!” বলেই দেশগুলাে নিজের মুখে পুরে দিল, সফর ৬। পরদিন সুরকা গেল মরে। নিকিটা তাকে এক নামিয়ে আনে। মুরকার পায়ে কিছু ছিল না, পরনে ছিল মাত্র একখানা এমন পালি-আর সারা গায়ের চামড়া,ফাটা—এবং তা থেকে কলানি বেনােচ্ছ। তার দুহাত ধরে বরফ জমা রাস্তা দিয়ে পাগলের মত ধরা গলায় চীৎকার করতে করতে নিকিটা টেনে নিয়ে যেতে লাগলাে। অথচ কেউ তার দিকে লক্ষ্য করলাে না। কিন্তু পূর্বাকাশে যেখা দিল আঁকাবাকা ম্লান মেঘের ছায়া। গােটা আকাশ ছেয়ে যেতে আন্তে সমস্ত সমতলভূমি কুদ্ধ আক্রোশে ঢেকে ফেলে গ্রামের ওপর দিয়ে যেতে লাগলাে ।হঠাৎ নিকিটার মনে হল যে সেখানে দাড়িয়ে রয়েছে- সব নির্জন--ওপরে মলিন মমঘ। সে মাথাতুলে চীৎকারে আকাশ ফাটাতে লাগলাে!-ওই বরফ জমা জমীতে পড়ে সে বলে উঠলাে- “হে ধরিত্রী ! তােমায় আমি সবই দিয়েছি—আমায় তুমি মেরে ফেলেছে!” চারিদিকে তখন বরফ পড়ছে। রাস্তা ঘাট জমে শক্ত হয়ে গিয়েছে। তার ওপর দিয়ে কিরিলের নােটর চলেছে অপ্রতিহত বেগে। সেই পিচ্ছিল বরফের ওপর গাড়ী সামলানাে হচ্ছিল কঠিন। পথের দুধারে সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্র দেখতে দেখতে তারা চলছিল। আর চলতে চলতে তার মনে হচ্ছিল যে জাকার কাটায়েভের আশঙ্কা গুলাে সম্পূর্ণ অমূলক। কোথাও তেমন বিশৃঙ্খলা তাদের নজরে পড়লাে না। কিন্তু পােলােমাসােতাের কাছে আসতে আসতেই তাদের ধারণা বদলাতে শুরু করলাে। কোথাও পড়ে রয়েছে মড়া ঘােড়ার লাস-নয়তাে ভাঙা স্লেজের টুকরাে। আবার কোথাও আরও ভয়াবহ দৃশ্যে কিলিই শিউরে উঠছে জের ধার করে ২ার করবার তীতে হয় তাে কেউ মাথা নুইয়ে হাঁ করে রয়েছে-তার মুখ ৫ কফে অর! পরেও বােধ হয় এর সাড়া নেই। অজানা ভরে এর কিরি গাড়ী না থামিয়েই সােল চলতে লাগলাে। প্রাণপণে গাড়ী চালিয়ে কিফিল পূর্ব পরিচিত ব্যয়ৰুতের বাড়ীতে এসে উঠলাে। সেখানে বা খায় দেশের অবস্থা আবিক আলােচনা হ’ল। ঝাভের কথা হল যে সু মাত্র এই সামান্য ত্যাগেই আতঙ্কিত হলে লবে না ! সােভিটে অন্যান্য পাত্য দেশ সমূহ থেকে অন্ততঃ দেড়শাে বছর পেছিয়ে রয়েছে। ষ্ট্যালিনের নির্দেশ মতাে মাত্র দশ বছরে তাদের তাল ধরতে হলে এ কেন—এর চাইতে অনেক বেশী বার্থত্যাগ দেশের লোেককে করতে হবে। কিন্তু কিরিল তার কথা সবটা মেনে নিতে পারলাে না। অন্যান্য দেশের সঙ্গে চলতে হলে রাশিয়াকে প্রচুর ত্যাগ করতে হবে ঠিক-কি তাই বলে চারিদিকে সড়কের হাহাকার আর এ বীভৎসতা কেন? কিরিল বুঝতে পারে না! ষ্ট্যালিনের দোহাই দিলেও ঝারকোতের যে কোথাও গলদ রয়েছে এটা কেবলই কিরিলের মনে হতে লাগলাে কারণ সে ষ্ট্যালিনকে আন—স্ট্যালিন কখনই ঠিক এ আদেশ দিতে পারেন না। আর দ্বিরুক্তি না করে তাই কিরিল পােলােমাসােভােতে গাড়ী হাঁকাতে বললাে। কিন্তু সেখানে এসেই তার মাথা খারাপ হয়ে যাবার উপক্রম হল। গােটা গ্রামের মধ্যে রাস্তাঘাট বলতে কিছু তার নজরে পড়লাে না। সব বাড়ীর জানালার কাচ তা—আর তাদের গেট গুলাে হাঁ করে থােলা কমেছে। গায়ের ওপর বিরাজ করছে গভীর নিস্তব্ধতা-জনমানবের সাড়া নেই লেখাও। রাস্তার একপাশে মৃত সুরকার শরীর ঢেকে বৃদ্ধ নিকিটা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় পড়ে রয়েছে। মুদাফরাস এসে তাকে মেরে তুলে নিয়ে যেয়ে করে ফেলে দিতে ব্যস্ত। তাকে দেখে কিনিল আন্তে আস্তে মুকার পাশ থেকে তােলবার চেষ্টা করলাে। কিন্তু সে কিলিকে দেখে আরও খেকিয়ে উঠলাে! কিরিলের মাথায় তখন রােখ চেপেছে। সে দুরকার কাছ থেকে, যাচকাটানে নিকিটাকে সরিয়ে এনে দুজনকে একা জেল চড়িয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিল। সেখান থেকে দৃকপাত না করে কি িােেলা এ লেজিয়েটের আফিসে চলে এল। হঠাৎ সােভিয়েট সভাপতির কলার ধরে এক কাকিতে গাড়ীতে টান দিয়ে কিরিল তাকে পুলিশে নিয়ে যেতে আদেশ ছিল। সভাপতিকে আটক করে কিরিল লম্বা পা ফেলে সার্বজনীন বাগৃহে সমূখে দাড়ালাে। সাৱা পথ তার মনে হতে লাগলো ভালিনের কাছে শােনা এটিউসের গল্প! বহু চেষ্টায় কিরিল আত্মসরণ করে রইলাে। সার্বজনীন বাসগৃহের বাইরে জমাট শীতে লােকেরা ভীড়করে গড়িয়েছিল। তাদের বিবেচনা শক্তি যেন রহিত হয়ে গেছে শুধু তাদের মধ্যে একজন বুড়ো সামান্য পা নাড়াতে নাড়াতে দূরে বাড়ীর বারান্দায় একটা লােকের বা শুনছিল- “গৌরবােল সেই ১৯১৭ সালের কথা স্মরণ করাে। যেদিন এই সর্বহারা বিপ্লব সংঘটিত হ’ল—যেদিন রক্তপিপাসু নিকোলাইএর হাত থেকে ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা শ্রমিককৃষকরা কেড়ে নিয়ে তাদের নিজ রক্তপকার বিজয় বৈজয়ন্তী উড়িয়েছিল—ভয়াবহ অন্তবিপ্লব, মহামারী ও দুর্ভিক্ষের মধ্যেও তখনই এমিকশ্রেণী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে কুলাকরাই এ সমাজের চরম শত্রুতা করবে। আর আজ, সেই কুলাকদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে তােমরা নিজেদেরই রচা সমাজ ধ্বংস করতে এগােচ্ছে।” বুড়াের কাছে বক্তার সব কথার অর্থ হৃদয়ঙ্গম হচ্ছিল না, তাই সে যেন ছটফট করছিল। কিরিল তখন থাকতে না পেরে এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলাে যে বক্তার ওখানে কি কাজ এবং সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রের কৃষকরা উপযুক্ত শস্য পেয়েছে কিনা? উত্তরে বক্তা জানালাে যে সে একজন বৈজ্ঞানিক। কৃষিক্ষেত্রের গবেষণা বিভাগে কাজ করে। কিরিল তাকে ধমকে বক্তৃতামঞ্চ থেকে নামিয়ে দিলাে।

সপ্ন [ ৪ ] শেকী বুরাের পথে আসতে আসতেই কিরিল বহু লােককে গ্রেপ্তার করলাে। তার গ্রেপ্তারের হিড়িক দেখে লেম বলেছিল “কি পুলিশ জুলুম চালাচ্ছে। তুমি।” কিরিল তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে উত্তর দিলাে-তােমাকেও দেখবাে তারপর থেকে নের ঝোকে কিলি কাজ করে যেতে লাগলাে । সব সময় মুক্তি দিয়ে সে তার কাজের সাফাই গাইতে পারতাে না। তবু তার মনে হচ্ছিল যে সে ঠিক পথেই চলছে। একদিকে যেমন সে লােক গ্রেপ্তার করছিল—তেমনি আবার অনেককে সে মুক্তিও দিচ্ছিল। পােমােসােতাের প্রায় বাড়ীতেই সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রের চাষীদের ভীড়। কিরিলের প্রধান কাজই হল তাদের ছেড়ে দিয়ে বাড়ী পাঠাননা! সােভিয়েট কৃষিক্ষেত্রের পাশ দিয়ে যাবার সময় এক মর্মন্তুদ দৃশ্য কিরিলের চোখে পড়লাে। দুপায়ে সামনের বেড়ার ওপর ভর দিয়ে শূয়ােরর বাচ্চারা ক্ষিদের জ্বালায় বিকট চীৎকার করছে। এবং তাদের খেতে দেবাব ভয়ে সব চাষীরা যে যার ঘরে এসে ঢুকে রয়েছে। কিরিল সােজা সেই কৃষিক্ষেত্রের অধ্যক্ষ আকুলােভের দরজায় গাড়ী দাড় করালাে। অকুলােভ তখন পানপাত্র তে করেছে। কিরিলকে দেখে সে টলতে টলতে দাড়িয়ে অভ্যর্থনা করলাে। কিন্তু এক ধাক্কায় তাবে সরিয়ে দিয়ে 'কিরিল বললো- এসবের মানে কী?” এসবের কি মানে কেমন? টেবিলের উপর সজোরে আওয়াজ করে সে উত্তর দিল—“বাইরে যেয়ে হাওয়ার সঙ্গে লড়াই কর। দেখতে পাচ্ছ না- সৰ হতভাগারা না খেতে দিয়ে শুয়ােরগুলােকে মারবার যুক্তি করেছে ? তার কাছ থেকেই কিরিল সংবাদ পেল যে শূয়ােরের খাবার সােভিয়েট সফলন গুদামে জমা,আছে কিন্তু মস্কোর আনে না পেলে তাে তার কি তে পারে না—তাই দিতে পারছে না। তা শুনে কিরুিল গর্জে উঠলাে তাদের অমতেই নিচ্ছ না কেন?” “ভয় নাই—আমায় এর মধ্যেই চারবার উপরকার ধমক খেতে হয়েছে। যাও না-নিজেই বার করতে চেষ্টা কর! কাজেই কি কাবােবাধ্য হয়ে মদ খেতে শুরু করেছি।” পাগলের মত কিরিল সেখান থেকে সােভিয়েটের গুদামে ছুটে এল। এক ধাক্কায় প্রহরীকে ঠেলে দিয়ে সে তালা ভেঙ্গে তৎক্ষণাৎ সমস্ত শস্য য়ােরদের ভেতরে বিলি করে দিতে আদেশ করলাে। যেখান দিয়ে কিরিল যাচ্ছিলাে সেখানেই লােকে ভীড় করে তাকে ঘিরে দাড়াচ্ছিলে-সেও ততই তাদের আশ্বাস দিচ্ছিল—“ভয় নাই। আমরা কখনােই তােমাদের মরতে দেবাে না। তােমাদের সঙ্গে মিশে রয়েছে আমাদের শরীর। একই রক্তে আমরাও মানুষ। কেউ তােমাদের না খেতে দিয়ে মারতে চাইলে তাকে হাঁকিয়ে দেবে! অন্তবিপ্লবের যুগের কথা মনে রাখবে।” সােজা রাষ্ট্রিক শস্য গুদামে যেয়ে কিরিল আদেশ দিলে তৎকাণাৎ সবাইকে শস্য বিলিয়ে দিতে। সেখান থেকে ফেরবার পথে জাকার কাটায়েভের সঙ্গে দেখা! সে কিরিলের গাড়ীতে বসে বললাে যে সাক্ষী পেট্রোভিচ আলাই গ্রামে এসে তার সঙ্গে দেখা করতে চায়।” ( ৫ ) কিরিলের আসবার আগেই সমস্ত বড় ঘট সহরের পাটি সদস্যরা ভরে ফেলেছে। তাকে আসতে দেখেই সব হঠাৎ চুপ করে গেল! পরে তাদের আলোচনা শুরু হল। প্রধান বিষয় হচ্ছে কিরিলে জুলুম। লেমই কিরিলের প্রধান প্রতিপক্ষ। তার বক্তব্য হচ্ছে যে, যে যতই বলুক না কেন সেই ৭২ সৰ উৰ কিনিলয় বলে আলােচনা করা। কিরিলে এ যে ডে এনে দি ঐ ব্যবহার করে তাহলে তো ম হবে। কিনা নিজেই তার কথার প্রতিবাদ করলাে-কিরিল যে কেউ ন—সে ফেীর পরিচালক সমিতির বিশিষ্ট সাত এবং প্রায় সমিতির এতিনিধি। বু দেম দমার নয়। সে বললাে—সেইজই তাে আমরা তার কাছ থেকে আরও বেশী সয়িত্ব আশা করতে পারি। কিরিলের এ দলে দলে লােককে পুলিশে ধরেছে—এমনকি পাটির লােকও বাদ যায় নাই। ফিরিল জোর গলায় তার প্রতিবাদ করেছিল। কিছু পরে তাদের বাদানুবাদ থামিয়ে দিয়ে সার্জী সুরু করেছিল । “শান্তির সময় যদি কেউ অযথা গােলাগুলি ছোড়ে—তত আমরা তাকে শায়েস্তা করেছি। কিন্তু লড়াইয়ের মধ্যে যদি কেউ ওভাবে লক্ষ্যভেদ করে তাহলে তাকে আমরা প্রশংসা করি। যদি শূয়ােরের খােয়ারের সামনে দিয়ে আসতে আসতে কিরিল চুপ করে থাকতো তাহলে সে অন্যায় করতে আমাদের এই বিরাট দেশে প্রত্যেকেরই মাথা খাটাতে প্রবে। শুধু উপরওয়ালার আদেশের ভরসায় থাকলে চলবে না। কিরিল তার শ্রেণী সংস্কার দিয়ে স্পষ্টই বুঝতে পেরেছিল যে কে প্রকৃত শক্ত! যদি নিজেদের লােক ধরা পড়ে থাকে—তাতে লজ্জা কি? আমরা স্বাচ্ছলে তাদের কাছে মাপ চাইবে ! তারাও হাসিমুখে ক্ষমা করবে। কিন্তু আজ এই সহরকে না খেতে দিয়ে কারা মেরে ফেলছিল। তারাই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত শত্রু। তাদের ধংস করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। আমাদের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই তারা এসে ঢুকেছে। আজ যদি তাদের শেকড় না উপড়ে দাও তাে তারাই তােমার ধবংস করবে -হতাে আমাদের মধ্যেই রয়েছে।”

একের পর এক সবাইকে সাতখন সে করতে লাে- “সিলভ, তুমি-না, বেশ! তানেজার টানিও নও- তবে ব্যরত তুমি? চুপ করে রয়েছে কেন? একমুহূর্ত ঝরক চুপ করেছিল—তাগরে বললাে—এসবের ব্যাথা কিছুই বুঝছি না—এ সব কি ব্যাপার? সা লেগে গেল—এসব তাহলে ছেলেখেলা মনে কর নাকি? গােয় যাক তােমার ছেলেখেলা।” হঠাৎ রকভ পকেটে হাত দিয়ে ব্রাউনিং রিভলভার বের করলাে। কিরিল বিতের মত ঝরভের হাতে ধাক্কা দিয়ে সেটা ফেলে দিল। সকলে চেঁচিয়ে উঠলাে*এবার ধরা পড়েছে।” ( ৬ ) সদর পাটি সমিতিতে বসে বসে কিরিল ঝারতের স্বীকারােক্তি পড়ছিল। কী ভয়াবহ ষড়যন্ত্র গড়ে তুলেছিল এরা, কিরিল অবাক হয়ে তাই ভাবছিল। কারকেভের দীকারােক্তি বলছে : “নিকোলাই বুখারিণের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব সুত্রে অনেক দিনের পরিচয়। এমন কি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের আগে থেকেই আমরা পরিচিত। কিন্তু ট্রটস্কির সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তার চেয়ে আমি বেশী দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছি। আমি জানতাম যে টুটস্কি, জিনােভিভ, প্রভৃতি যাদে সঙ্গেই আজ লড়িনা কেন-একদিন আসবেই যখন স্বয়ং ষ্ট্যালিনের সজে আমাদের বােয়াপড়া করতে হবে এবং ছলে বলে কৌশলে যেমন করেই হক-ষ্ট্যালিনকে ধবংস করাই হবে আমাদের লক্ষ্য। সেই উলে—যে আমাদের কাছে আসতে তার মতামতের অপেক্ষা না দেখেই আমরা তাদের সাহায্য করতাম।”

ঝায়কতে চক্রান্তের লােকেরা সােভিয়েট কৃষি জগতে উচু পদ দখল করে বলেনি। এবং তারা তদানীন্তন আমেরিকায় প্রচলিত “হা লাল” খার নিয়ম অসারে চাষ করার প্রচলন করছিল। ফলে পরবছর পরে বদলে দেখা গেল মেতে অ আগাছ! এবং এই সমস্ত গ্রামকেই আমরা প্রথমে অপরাধী তালিকাভুক্ত করে নিলাম। এবং সেখানকার সমস্ত কমুনিষ্টদের বাধ্য করলাম শাদি আমাদের কাছে বিক্রি করতে। এই ভাবেই পােল্ডামাসােভােকে অপরাধী তালিকাভুক্ত করা হয়।” ঝরভের দলের লােকেরা চাষের ঘােড়াগুলাের কাণে সবষে ভরে দিত। তারপরে সে ঘোড়াগুলাে লাফালাফি করলে পাগল হয়ে গেছে বলে গুলী করে তাদের মেরে ফেলতাে। তারপর *এইভাবে আমরা গ্রামের প্রায় সব ঘােড়া মেরে ফেলেছিলাম। আশে পাশের গ্রামের ভীতি সঞ্চারেব উদ্দেশ্যে আমবা মাঝে মাঝে বুভুক্ষু ও মুমূর্ষ কৃষকদের কোনও কাজের অছিলায় সেই সব গ্রামে পাঠাতাম। তারাহর তাে পথেই মরে থাকতাে•••• সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রকে আমরা বিশেষভাবে উৎসাহিত করতাম তাদের উত্ত ফসল আমাদের হাতে দিতে। যে যত বেশী বাড়তি ফসল আমাদের দিতে আমরা তাদের তত বেশী প্রশংসা করে “রক্ত পতাকা পুরস্কার দিতাম যে দিত না তাদের দিতাম “কৃষ্ণ পতাকা”। এছাড়া ব্যক্তিগত বিভীষিকা আমবা বাদ দেই নাই। অনেককেই আমাদের হাতে নিহত হতে হয়েছে। আমাকে জিগ্যেস করা হয়েছিল “তুমি কি আবার ধনতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা করতে চাও?”- আমার উত্তর হচ্ছে-“হা! বিপ্লবের প্রথমযুগে আমরা সর্বহারাদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে এগিয়ে গেছি। কিন্তু বলশেভিকরা যা সূষ্টি করলো আমাদের আদর্শের সঙ্গে তার অাকাশ পাতাল তফাৎ। কাজেই বাধ্য হয়ে আমাদের বেকে দাড়াতে হল। আমি ধরা পড়ে গেছি, ও আমার भरून-वयं বক্তব্য শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক জীবনের আকা আমার আর নেই তবে প্রার্থনা করি যে শ্রমিকরাষ্ট্রের এক কোণে যে আমায় থাকতে দেওয়া হয়।” তার স্বীকারােক্তির পাশেই--সার্জী পেট্রাভিচের মন্তব্য “সাবধান, একটা জিনিষ লক্ষ্য করতে হবে যে সে তার দলের অন্য কারও নাম উল্লেখ সে কান্নাকাটি করে আমাদের অনুকম্পা প্রার্থনা করেছে কিন্তু আর নয়। অনেক সহ করা হয়েছে।” কিরিলের কাছে এখন সহজ হয়ে গেল কেন আলাই নদীর তীরে মানুষ খুন হয়েছিল এবং মাত্র কয়েক দিন আগেই ঘােড়ায় চড়বার সময় তার গলায় ফাস লাগাবার চেষ্টা হয়েছিল । করেনি। ( ৭ ) রহস্য এমেই ঘনীভূত হতে থাকলাে। সেই প্রচণ্ড আগুনে সমস্ত পাহারাদাবদের মধ্যে মাত্র দুই জন অবশিষ্ট ছিল। তাদের বক্তব্য হচ্ছে যে আগুনের একমুহূর্ত আগেও সমস্ত খাদ বেশ শান্ত ছিল—আগুনের কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। গভীর রাতে আগুন শুরু হয়েছিল। তখন তাদের অস্পষ্ট মনে হয়েছিল যে কে যেন আগুন নিয়ে জঙ্গলে ছুটোছুটি করছে- তবে সেটা হয় তাে তাদের উদ্ভট কল্পনাও হতে পারে। সমস্যা খুবই জটাল—কোনই সমাধান হচ্ছে না। আগুনের তথ্য আবিষ্কারের জন্য যে দল নিযুক্ত হয়েছে তাদের মত হচ্ছে যে এটা আপনা আপনি লেগেছে এবং এজন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী হচ্ছে কিরিল এবং বােগ্দানত। তাদের কথামত খা েএত সাংঘাতিক বিপ মাথায় নিয়ে কাজ হতে বলেই সেদিন আগুন ধরেছিল।

দিকিনিনি সে কথা মানতে পারছিল না। অথচ অঙ্গ মত হয় কেন এ তার ছিল না। সে নুিদিন ঐ সমিতির রিপাের্ট চাপা নি রাখলাে কিন্তু তবু কোনও ফল হল না। অবশেষে হতাশ হয়ে কিনি ভাবছিল নিজেদের পরিণতির কথা। যদি এই সমিতির পিপাট গ্রাই হয় তাহলে তাকে সম্পাদকের পদে ইস্তফা দিতে হবে এবং পাটির সভ্য পদও। এমন সময় হঠাৎ তার মাথায় এলাে যে জিকাকে তখন জলে কেন পড়ে থাকতে দেখা গেছিল। কথাটা মনে হতেই কিরিল লাফিয়ে উঠে জিকাকে ডেকে পাঠালাে। জিকা কিরিলেই আগের পক্ষের স্ত্রী। জিকা আসতেই কিরিল প্রথমে কঠোর ভাবে জিগ্যেস করলাে যে সে আগুনের সম্বন্ধে কি জানে। তাতে কোনই ফল না পাওয়ায় তিনি তার হৃদয়কে আঘাত দিয়ে প্রশ্ন করলাে ঠিক আগের মত পাশের চেয়ারে জিকাকে বসিয়ে আস্তে আস্তে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কিরিল সবকথা জিগ্যেস করলাে। এবার জিকা থাকতে পারলাে না। সে করলাে : সে যে কে তার নাম জানি না—তবে সে বড় সাংঘাতিক লােক। সেই গে সমস্ত মেয়েদের মেরে ফেলতাে। লােক ভয় পেয়ে বলতে যে কে স্যাভিষ্ট আছে এখানে। কিন্তু তা নয়। সে ভয় দেখানাের জন্যেই এমন করত। এই লােকেরই কথায়ই সে একটা মশাল জ্বালিয়ে সারা রাত্তিরে তাদের পাশের জলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এবং কিরিলরা যখন গাড়ীতে মেয়েদের ভর্তি করে পাঠিয়ে দিচ্ছিল-তখন সে পেছন থেকে তাদের গায়ে পেট্রল ঢেলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তার দরকার হয়নি। তার পর সে আগুনের ভেতর দিয়ে পালাতে গিয়ে তার জ্ঞান হারিয়ে যায় তখন সেই লােকটা তাকে কঁাধে করে ঐখানে ফেলে রাখে। তার ডাকনাম হয়তাে ক্রিপল।”

৭৭ জিনার জবানবন্দীতে কিলি আশার আলাে দেখতে পেলাে! শর্তে বােগানতে আহ্বান পার্টি মিটিএ যেয়ে ফিজি জিকাকে বিয়ে সবখার পুনরাবৃত্তি করিয়ে তাদের নিয়ত করলো। কিন্তু তবু শেষ হল না। গ্রামে ধরপাকড়ের সময় কিলি যদিও জিকেও বলি কিন্তু সে কিছুতেই নিজের দোষ স্বীকার করছিল না। সেই সময় কুয়েকে ক্রিপলের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হল। তার ও অন্যান্য নানা সূত্র থেকে কিছুটা সত্য আবিষ্কার করা গেল। তারই জেরে ক্রিপকে শীকার করতে বাধ্য হতে হ’ল যে সেই কর্ণেল পােড়ভােলােটক্ষী হয়ে কোলচাৰু সামরিক অখানে অংশ গ্রহণ করেছিল। বােগদানভ ও তাকে পরীক্ষা করতে এসে বললাে যে এ মুখ তার চেনা। সে স্বীকার করেছিল যে গ্যালিসিয়াতে তার জন্ম এবং ইউক্রেনীয় সামরিক দলের সে একজন নেতা। কী- এই আন্দোলনের প্রধান আজ্ঞা এবং পােল্যাণ্ড থেকেই প্রধানতঃ এদলের সভ্য সংগ্রহ হত। এদের উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে এই দলের শাখা-প্রশাখা বিস্তার এবং সুযােগ বুঝে দেশের মধ্যে সশস্ত্র বিপ্লব সংঘটন। সেজন্য দেশের সমস্ত প্রধান প্রধান স্থানে ও উচ্চপদে এদের নিজেদের দলের লােক বসান হয়। কনিষ্ট ইন্টারন্যাশনালেও এদের লােক রয়েছে। কিলি হঠাৎ জিগ্যেস করলােকোভকে কেমন করে চিনলে? সে বলেছে যে তােমরা দুজনে তাে একসঙ্গে দলিলপত্র দেখতে তার আধিলে।” বােগদানভও আশ্চৰ্য্য হয়ে গেল-কাৰণ ৰারকোভ মােটেই সে কথা বলেনি। কিন্তু এ প্রশ্নের অদ্ভুত ফল হল। ক্রিপল খীকার করলাে :- “ঠিক! আমরা দুজনে তার অফিসে বসে অনেক দলিল পত্র দেখা ােনা করতাম এবং সেগুলাে বাহিরেও পাঠিয়েছি।

কিনি আবার বলল আমরা তােমার সম্বন্ধে সৰ আনি। এই যেমন তুমিই বছর দুই আগে জেলা পাটির সম্পাদককে খুন করেছিলে—কিংবা ভ্যাসিলিসক ও সেনা একই লোেক-ঢের হয়েছে, তুমি যেতে পার।” কি যাবার আগে ধরা পড়ে গেছে বুঝতে পেরে ক্রিপল আরও একজনের নাম করে গেলসে হচ্ছে বাথ, ! বাথ, নাকি ট্রটীপন্থী । কালবিলম্ব না করে বাকে গ্রেপ্তার করেই প্রৌঢ় লেমএর কাছে চলে এলাে। তার কাছে এসে কিরিল ক্রিপলের জবানবন্দী থেকে পড়তে থাকলাে- “আমি পােডভােলােস্কী বলছি যে প্রায়ই আমি লেমের কাছে যেতাম। বােলশেভিকদের মধ্যে অনেক রকমের শােক আছে। একদল একয়ে আর চালাক। তাদের মেরে ফেলা ছাড়া উপায় নাই। দ্বিতীয় দল হচ্ছে বুদ্ধিজীবী। তারা শুধু পড়াশুনাই করেছে। তাদের তত ভয় নাই : আর একদল হচ্ছে তােষামােদপ্রিয়। তাদের সহজেই হাত করা যায়।” এমন সময় কিরিলকে একটু অন্যমনস্ক হতে দেখে লেম পকেট থেকে রিভলভার বের করেই নিজের বুকে দুবার গুলী ছুড়লাে! মরবার আগে সে কিরিলকে ডেকে পাঠিয়ে বললাে-“ক্ষমা করাে-আর তিনিও যেন আমার ক্ষমা করেন- কিলি বুঝলাে—বে “তিনি দিয়ে লেমম্ ষ্ট্যালিনকে বােঝাচ্ছে!

সঙ্কট সময় ( ১ ) গােটা দেশটাতে একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে লাগলাে। ইস্পাতের ট্রাক্টর-মােটর-জাহাজের-রাসায়নিক কারখানা—আরও কত কি! প্রত্যেক নতুন কারখানা প্রতিষ্ঠিত হবার সঙ্গে সঙ্গে গােটা দেখে আনন্দের লহর খেলে গেলাে। প্রকৃত কারখানা থেকে যে যতই দূরে থাকনা কেন— তারা সকলেই ঐ সব কারখানাকে নিজের বলে মনে করতাে। আর কাগজের পাতায় পাতায় তার ছবি, বেতারে সারা জগৎকে সেকথা জানান হচ্ছে—সূলে, গ্রামে—সবখানেই শুধু তার কথা। একটা কারখানা প্রতিষ্ঠার আনন্দ শেষ হতে না হতেই নতুন একটা কারখানা স্থাপিত হচ্ছে। এবার সমস্ত কাগজে থােষণা করেছে যে কয়েকদিনের মধ্যেই সটভ ওগলের উপত্যকায় নতুন ইস্পাতের কারখানা বসেছে। কয়েকদিন আগেই কিরিল তার এক বন্ধুর কাছ থেকে ইংরাজী ও ফরাসী পত্রিকা থেকে তাদের কারখানা সম্বন্ধে কয়েকটি প্রবন্ধ হাতে পেয়েছে। সেগুলি পড়তে কিরিলের বেশ মজা লাগছিল-সাধারণতঃ কাগজগুলাে যেমন আজগুবি কথা লেখে—এতেও তার তারতম্য নেই। তারা লিখছে যে ফ্যাক্টরীর আশে-পাশে প্রায়ই পাটকিলে ভালুক বেড়িয়ে বেড়ায় । নেকড়ে বাঘ সার কারখানায় ঘুরে বেড়ায় এবং কয়েকদিন আগেই নাকি একজন বৈদেশিক বৈজ্ঞানিককে নেকড়ে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। এত সব হীন প্রচার সত্ত্বেও এটা বেশ বােঝা যায় যে তারা কিরুিলদের কাজকে হিংসে করছে। অনিচ্ছা সহকারে কাগজগুলাে বলশেভিকদের প্রশংসা ০ সফলঃ করে। কিলি ও বােগন নাকি অন্য দেশে এলে লােকের মত লােক হতে পারতো—আয়াতে গরীবদের সাথে থাকতে যেয়ে তারা প্রতিভার পরিচয় দিতে পারছেনা ! এ সব পড়ে কিমিলের উৎসাহ আরও দ্বিগুণ বেড়ে উঠে। কিন্তু বােগদানভ কখনও কানা কাজ করতে রাজী নয়। সে মেপে মেপে পা বাড়ায়। আজই কিনি আর একটি নতুন কারখানা প্রতিষ্ঠার উৎসবে যােগ দেবে। শেরকী বুয়েরাকে বুড়ো নিকিটা গুরিয়ানভের সাথে সে দেখা করতে চলেছে। নিকিটা এখন কি সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রে সপ্তম দলাধিপতি। সে কয়েক দিন আগেই মস্কোর সামগ্রিক কৃষকদের সম্মেলনে যােগ দিয়ে এসেছে। সেখানে উৎসাহভরে নিকিটা ষ্ট্যালিনকে জানিয়ে দিয়েছে যে প্রত্যেক বিধায় সে তিরিশ মণ করে ফসল তুলবে। ষ্ট্যালিনও তার কথায় আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল এবং ঝাকে ঝাকে সংবাদ পত্রসেবীরা তাকে ঘিরে বিরক্ত করছিল। কিন্তু নিকিটা সবাইকে হাঁকিরে দিয়েছিল। গ্রামে এসে সে সবাইকেই উৎসাহ দিয়েছিল যে কেন তিরিশ মণ পাওয়া যাবে না—ভালভাবে জীতে খাটলে নিমই পাওয়া যাবে। কিরিলেরাও প্রথমে নিকিটার কথায় সন্দেহ ছিল। কারণ তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী মাত্র ২৩ মণ করে ফসল পাওয়া গেছে বিধায় ! তবু সে নিকিটাকে নিরুৎসাহ করলাে না। তাই তাকে উৎসাহ দিতে ও সমস্ত দেশটা এখন কেমন হয়েছে দেখবার জন্য কিরিল নিকিটার কাছে আসছিল। কিন্তু সেদিন তার মন ভাল ছিল না। ষ্টোর সাথে চারবছরের সম্বন্ধ। এর ভেতরে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে নাম না লেখালেও একই বাড়ীতে পর খে থেকে এসেছে। । তাদের ছােট ছেলেটি আধাে আধাে কথা বলতে শিখেছে। ভগরে কিলি বেড়িয়ে যেতে লাগলেই সে চেটি শােও বলছি আসে কোথাকার।”

সফল-স্বপ্ন ৮১ আনুষ্কাও বার বছরের মেয়ে হয়েছে। সে সমানে বড়দের সঙ্গে হাসিঠাট্টা ও নতুন শেখা-পুরাণে রসিকতা করে ! কিরিলের সঙ্গে মত না মিললেই সে বলে “তােমার দেখছি পেটী বুর্জোয়া ভাব হয়েছে।” কিরিল হয়তাে হাসতে হাসতে বলেছে “পেটা বুর্জোয়া আবার কি রকম পাখী?” সে-ও তৎক্ষণাৎ উত্তর দেয়- “লেনিনের লেখা পড়-তাহলেই বুঝবে। তুমি তাে সদর পার্টি কমিটির সম্পাদক, তােমাব তাে জানা উচিত মাক্স, লেনিন, ষ্ট্যালিনের সব লেখা।” আর ষ্টেঙ্কা । সে তাে কিরিলকে পেয়ে ভীষণ গর্বিতা! কে বাইরে কাজ করতে যেতে হয় না! সে বাবেই বা কেন? কিরিল তত তাকে খাওয়াতে পারে ; সে শুধু ছেলে মেয়েদের লালন পালন করবে। তাদের দুটি ছেলে হয়েছে কিন্তু আর একটি মেয়ে হলে যেন ভাল হয়। অনেক সময় তার পাশে শুয়ে কিরিল একথা বলেছে ! ষ্টেঙ্কা শুধু চুপ করে হেসেছে সে কথা শুনে। রােজ তাই বেড়িয়ে যাবার সময় কিরিল লক্ষ্য করে ষ্টেঙ্কার শৰীবের কোনও পরিবর্তন হয়েছে কিনা। কিন্তু আজ তাব সংগে কিরিলের প্রথম ঝগড়া হয়েছে। প্রথম ঝগড়া বলেই তা এত বেদনাদায়ক। অথচ তার মূলে কিছুই না! অত্যন্ত তুচ্ছ ব্যাপার! বেরােবার সময় ষ্টেঙ্কাও বায়না ধরে তার সংগে যেতে। কিরিল আপত্তি করে যে তাহলে ছেলেমেয়েদের কে দেখবে ! গাড়ীতে বসেই কিরিলের মন তাই খুব ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লাে ! সে ঠিক করলাে যে যেয়েই গাড়ী ফেরৎ দিয়ে ষ্টেঙ্কাকে নিয়ে যাবে। আর সারা গাড়ী সে তুলনা করতে লাগলাে অন্যদের বিবাহিত জীবনের কথা। কিছুদিন আগেই একটা দম্পতী তার কাছে উপদেশ চেয়েছিল। স্বামীটা চুল ছাটাই করে আর পাচ বছর ধরে স্ত্রী ইনিয়াং প'ড়ে এখন কাঞ্জ করছে। কিন্তু স্বামী এত সন্দিগ্ধ যে সে আঠার মত স্ত্রীর পেছনে কি! ৮২ সপ্ন লেগে থাকে। এত ঈর্ষাপরায়ণ আশী যে স্ত্রীকে পরীক্ষা করবার অ নানারকমের নাকে দিয়ে নানারকম কুৎসিৎ এব তার কাছে করে পাঠাতাে। বাধ্য হয়ে তাদের বিবাহ ভাঙতে হবে। এই রকমই কত তবে এদের মধ্যে নাটা পারােনিনা ও প্যাভেল ইয়াকুনিনের কথা তার মনে পড়লাে। ওরা দুজনে বেশ সুখী ছিল নিশ্চয়ই। সেবারকার অগ্নিকাণ্ডে নাটাবার মৃত্যু হয়। প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল যে হয়তাে প্যাভেলের খুব আঘাত লাগেনি। কিন্তু একদিন পাভেলের সঙ্গে হােটেলে থেকে তার সে ভুল ভেঙ্গেছে ! সেখানে ভােরের বেলা পাশের ঘর থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে গিয়ে কিরিল দেখে যে পাভেল বালিশে মাথা গুজে ফোপাচ্ছে ! কিরিল বেরিয়ে যাবার পর টেরও মন খারাপ হয়ে গেল। তাব অনুশােচনা হল কিরিলকে আঘাত দিয়ে-তাই মনস্থির করে একটা টেলিগ্রাম লিখে পাঠালাে :- “কিরি আমার ক্ষমা করাে। শীগগীর ফিরে এসাে । আবা বসে আছি।” এবার তার মন হাল্কা হয়ে গেল! দেখতে দেখতে টেক্কা দৈনন্দিন কাজের মধ্যে ডুবে গেল। বাড়ীর ঝিকে বাজারে পাঠিয়ে দিল। ফিরে এলে দরজা দিয়ে চলে না যাওয়া পর্যন্ত হিসেব মেলােনা পাছ সে মনে দুঃখ পায়। সারাদিন ধরে বসে বসে সে কিনিলের খাবার তৈরী করবে ঠিক করলাে। তারপরে আতে আনে কিলির ঘরে এসে ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করলাে। সেখানে এক ফিরিয়ে সিগারেটের টুকরাে। ফিলিল সিগারেট খেতে শিখেছে তাই সে প্রায় দৈনিক একশাে সিগারেট ফ-স্বপ্ন ৮৩ শেষ বরে। আর সারা ঘরময় পড়ে থাকে তার ছাই। কিরিল যে কত বই পড়ে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু টো অনেক চেষ্টা করেও তার একবর্ণ বুঝতে পারে না। কিছুদিন আগেই কিলি পড়েছিল “নতন্ত্রী পাশ্চাত্যের সিণ্ডিকেট ও ট্রাষ্ট—কিন্তু ষ্টেঙ্কা তার এক লাইনেরও মানে বােঝেনি। তাই ষ্টেঙ্কা প্রায় গল্প উপন্যাসই পড়তােসময় সম কিরিলকে পড়তে দেখলে যদি জিগ্যেস করতাে তাহলে কিরিল বলতে : “রাত এগারটার পর হচ্ছে আমার সময়। তাথেকে দয়াকরে আর সময় চুরি করােনা! খাবার সময় যত পার জিগ্যেস করাে। চিরদিনই কি নিজের বিয়ে পার পায় ?” বাড়ীর সমস্ত কাজ শেষ করে ষ্টেঙ্কা কিরিমেতে অপেক্ষা করতে লাগলাে। রােজ সন্ধ্যে ৬টার সময় থেকে ষ্টেঙ্কার মনে অদ্ভুত অবসাদ আসে! সমস্ত দিন কিরিলের অদর্শনের ফলে সন্ধ্যেয় সে অধৈৰ্য হয়ে যায়। কিন্তু কিরিলকে এসব কথা বলতেও তার সাহস হয় না। তাই বিরিলকে সেদিন আসতে না দেখে ষ্টেঙ্কা এলিয়ে পড়লাে। অথচ কিরিলের দোষ নেই ! তাকে সেদিন শেরকী বুয়েরাকের লােকেরা কিছুতেই ছাড়ছিলােনা! সেদিন তাে যাওয়া হ’লইনা—পরপর কয়েকদিন তারা কিরিলকে ওখানে আটকে রাখলাে ! এরমধ্যে কিনিলের মনে হয়েছে যে ফিরে যাওয়া দরকার কিন্তু ঘটনাচক্রে তার পক্ষে পুরাে পাচ দিনের আগে ফেরা সম্ভব হলনা । ( ৩ ) ঝাকে ঝাকে অত পাখী আকাশে দেখে সৰ্টত ওগলের লােকেরা অবাক হয়ে গেল। আয় বাটে পার্কে সবখানে লােকেরা ভীড় করে গড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কী ভীষণ আওয়া।

৮৪ সফল-স্বপ্ন সবাই চুপ। এমন সময় দিগন্তের শেষে ছােট ছােট মৌমাছির মত এক ব্যাক কালাে দাগ—ক্রমে তা স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হচ্ছে। কিছুদুব এলে দেখা গেল সেগুলাে পারাসুট! ছাতার মত খুলে যেয়ে তা নিয়ে লােকে লাফিয়ে নামছে। তার সঙ্গে যােগ দিয়েছে শত শত বােমা এরােপ্লেন। ছো মারার মত তারা একের পর এক ফ্যাক্টরীর মাথা ছুয়েই উপরে উঠে যাচ্ছে। ক্রমে সব তাদের গা সওয়া হয়ে গেল—আবার সহজ জীবন ফিরে এল সেখানে কিন্তু দূরে আকাশের গায় অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা রক্তবিন্দু ! নিঃশব্দে আকাশের বুকে সেটা দুলছে যেন পপীর পাপড়ি। খেলাচ্ছলে গােটা আকাশ চক্রাকারে ঘােরাই যেন এর কাজ। একি, হঠাৎ ঘুরতে ঘুরতে যেন কী হল। ঠিক কাটা পাখীর মত ঝট-পট করতে করতে সেটা লুটোপাটী খেতে খেতে নীচে নামছে। কখনাে সূর্যের আলােয় এব ডানা-কখনাে পুচ্ছ চঞ্চ করে উঠছে! নক্ষত্রপাতের মত তীরবেগে সেটী নামছে পৃথিবীর দিকে। তার গতিরােধ করে কার সাধ্য! নাচের সবাই সবাই বুঝলে যে এবার এর ধ্বংস অবধারিত! সকলেরই মুখপেকে অজ্ঞাতসারে তীব্র কোতের আওয়াজ বেরিয়ে এল ! এই বুঝি ওটা তাদের মাথায় এসে পড়ে। কিন্তু না! শেষমুহূর্তে এরােপ্লেনটা টাল সামলে গেল—একেবারে মাটা ছুয়েই আবার সটান সােজা ওপরে উঠে এয়ােপ্লেনটা পাহাড়ের বুকে অদৃ হয়ে গেল দর্শকবৃন্দ তখন নিজেদের অযথা আশঙ্কার এ লজ্জিত হয়ে যে বার কাজে চলে গেল। ঠিক কটা দুই আগে নিকিটা রিয়ানােত শহরে এসেছে। রেণে সে দ্বিতীয় শ্রেণীতে এসেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর গদী আঁটা বেঞ্চিতে বসে সামনে লেখার সরঞ্জাম দেবে সে বিভ্রান্ত হয়ে গেল। বােধহয় অত্যন্ত নয় বলে আবার তার মনে পুরাণে ধুতে ভাব ফিরে এল। সে যেন কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারছিল না। গাড়ীতে বসে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে নিকিটা তাই সফর ৮৫ তর্ক করছিল যে—তাদের দেশে আবার এত যন্ত্রপাতির কি দরকার। যন্ত্রের তাে মনের কোনও বালাই নেই—অথচ নিজের হাতে কাজ করার তাদের কত আরাম ছিল। কিন্তু অন্য কারুর কাছেই সে তেমন উৎসাহ পেলনা! গাড়ী থেকে নেমে কিরিলদের কারখানার দিকে যেতেই নিজের অজ্ঞাতসারে নিকিট। একবার জুতাে জোড়া মুছে নিল—এত সুন্দর ঝকঝকে কালাে পীচের রাস্তা। রাস্তার ওপরে যেন মুখ দেখা যায়। আবার সেই পুরানাে নিকিটা চাইছিল গােটা রাস্তায় থুথু ফেলতে—কিন্তু ঐ রাস্তায় থুথু ফেলা যে কোনও লােকের পক্ষেই অসম্ভব। ( ৪ ) কিরিলদেব কারখানা খোলাৰ উৎসবের অনুষ্ঠান ব্যবস্থা সব ছক কষে করা হয়েছে। কাঁটায় কাঁটায় বাবটার সময় শােভাযাত্রা ও সভা হবে ইস্পাতের কারখানায়। প্রথম বক্তা হবেন মিখাইল আইত্যানােচ্চি কালিনিন। তার জন্যে নির্দিষ্ট বিশেষ গাড়ীতে করে সেদিনই সকালে মিখাইল এসে অপ্রত্যাশিত ভাবে সেখানে পৌছেচেন। কেউ তাকে দেখবার আশা করেনি কিন্তু সমগ্র সোভিয়েট রাষ্ট্রের বাষ্ট্রপতিকে তাদের মধ্যে পেয়ে সবাই আননে আত্মহারা হয়ে গেল। একটার সময় তার বক্তৃতা শেষ হলে কারখানার বাঁশী বেজে উঠবে। সেই সঙ্গে সমন্ত সর্বহারা সন্তানদের মাথার ওপরে উঠে এবােপ্লেন আশীর্বাদ বর্ষণ করবে। ফেনিয়ার পরে এর সৰ বন্দোবস্তের ভাব পড়েছিল। কেনিয়ার মত ছিল শুধু শুধু সভা না করে আরও নানা উৎসব আয়ােজনের বন্দোবস্ত করা। তাই এরােপ্লেনের খেলা দেখানাে। এরােপ্লেনের খেলা হয়ে গেলে কিরিল কিংবা বােগানজকে বক্তৃতা করতে হবে। কিন্তু বােগদান অস্বীকার করায় কিরিলের বারেই সে দায়িত্ব পড়লাে । তারপর কৃষকদের সফল পক্ষথেকে কার কাটায়েভ এবং শ্রমিকদের পক্ষথেকে ইগর কুয়েত বলবে। এরে হর গেলে আবার এরােপ্লেন উড়বে। কিন্তু এবার মাত্র প্যাভেলের ও অত কয়টা এয়ােপ্লেনের খেলা হবে। শােভাযাত্রা ঠিক দশটার চলতে শুরু করলো এবং তরুণ-তরুণী, কৃষক, শ্রমিক, ইনিয়ারদের নিয়ে বিরাট শোভাযাত্রা সাড়ে এগারটার সময় কারখানায় ঢুকলাে। তাদের দেখে ফেনিয়া আশু হলাে। আর সব কাটায় কাঁটায় ঠিক করা রয়েছে। সে তাই কিরিলকে বক্তৃতা ঠিক করে নিতে বললাে ! কিন্তু কি করে যে কি হল বলা যায় না-বেলা বারটার সময় সব ওলট পালট হয়ে গেল। তিনি নিজেই পনর মিনিট দেরী করে এলেন-এবং তারপরে তাকে দেখে সর্বহারা শ্রমিক সাধারণের হর্ষধনি হল পাচমিনিটের যায়গায় আরও অনেক ক্ষণ বেশ। মিখাইল আইভ্যানােভিচর এ নিতে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। তাদের যে অঙ্গ কোনও কাজ আছে তা ভুলে যেয়ে কালিনিনকে নিয়েই তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লাে। তিনি অনেক চেষ্টা করলেন বক্তৃতা করতে—কিন্তু তাদের সে উন্মাদনার ভেতর কথা বলা সম্ভব। কিন্তু তার ব্যবস্থার অল-বদল হওয়ায় ফেনিয়ার মুক শুকিয়ে গেল। এখন আর ব্যবস্থা রদ করবার কোনও উপায় ছিল না !-তাই কালিনিনের বতার ঠিক মাঝখানে-যখন সবাই উৎ হয়েছে, তখন হঠাৎ একসঙ্গে সব বাণী বেলে উলে! ফেনিয়ার মাথা ঘুরে গেল। সে কোনও মতে বিরিকে ধরে আন্তু সম্বরণ করলাে। দেখতে দেখতে ঠিক আগের বন্দোবস্ত বারী ঝাকে ঝাকে এরোপ্লেন আকাশে উড়তে লাগলাে। আবার সব ভেঙে গেল। নেতার উসবনিতে আকাশ বাতাস ভরে গেল।

৮৭ সভামঞ্চ থেকে কালিনিন এইসব কাণ্ড দেখে বিরক্ত হয়ে কিরিলকে জিগ্যেস করলেন যে কার বুদ্ধিতে এসব হয়েছে। কিরিল কেনিয়াকে দেখিয়ে বললাে-এই যে অপরাধী।” এর ওপরে এত বড় কাযের ভার দিয়েছে!” বিরক্তি সহকারে কালিনিন বললেন। কিন্তু বলেই বােধহয় তার মনে হয়েছে যে না এসব সামান্য ভুল চুক তাে হবেই—তাই তিনি আর কিছু না বলে চুপ করে গেলেন। ফেনিয়ার তখন কি অবস্থা ! সে কাতর দৃষ্টিতে কালিনিনের কাছে ক্ষমা চাইল! অবশেষে ফেনিয়াকে কাছে ডেকে পিঠ চাপড়ে তিনি বললেন “তুমিই বুঝি এসব করেছে।” হঠাৎ কেন জানি কালিনিনের কাছে এসে ফেনিয়ার সাহস বেড়ে গেল। সে বললাে “কিন্তু এসব আপনারই দোষে হয়েছে মিখাইল আইভ্যানােভিচ, আপনিই ১৫ মিনিট দেরী করে এসেছেন—তার ফলতাে ভােগ করবেন।” “ই। তােমরা সব দোষ এই সব বুড়োদের ঘরেই চাপাও জানি। যাও ঘাবড়িওনা—এর চেয়ে বে আরও খারাপ কিছু হয় নি তাই রে ! সমস্ত জগৎ তােমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, তােমাদের এই এ সমশু, এসব তােমাদেরই ! বলতে বলতে ভাবাবেগে কালিনিনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লে ! তখন সব থেমে গেছে। আবার কালিনিন তার বক্তৃতা সুরু করলেন। তারপরে কিরিলের পালা। আবার দেখতে দেখতে ফেনিয়ার ব্যবস্থা মত তিনটা বাজতে না বাজতেই এবােপ্লেনে করে প্যাভেল ইয়াকুনিনের সার্কাস দেখানাে হাজারে হারে লােক সেদিন ট্যালিন সহরে নতুন ট্রাক্টর কারখানার উদ্বােধন দেখলাে—সর্বহারাদের নূতন সম্পদ বৃদ্ধিতে সাই গর্বিত।

bob সফ-স্বপ্ন ধীৰে ধীরে কিরিলের পারিবারিক জীবনে ব্যবধানের প্রাচীর গড়ে উঠছে। সৃষ্টির উন্মাদনায় কিরিল পাগল হবে গেছে। নতুন কারখানা উদ্বোধনের সময় শ্রমিকদের কাছে অভ্যর্থনা পেয়ে কিরিল চঞ্চল হয়ে পড়েছে। তার চোখে ভাসছে বিরাট শ্রমিকরাজত্বের ভবিষ্যৎ—যেখানে লক্ষ লক্ষ সর্ব- হারার হাতে বিরাট বিরাট ফ্যাক্টরী পাটছে। ভালকরে পােষাক পরা না হতেই কিরিল ঘরের ভেতর পাহচারী করতে কবতে নিকিটাকে লক্ষ্য করে বললাে-“দ্যাখো-কী চমৎকার ইস্পাত বেরিয়েছে আমাদের কারখানা থেকে। সাম্রাজ্ঞী কাথেরিনের সময় থেকেই এখানে ইস্পাতের কারখানা খােলবার মতলব হয়েছিল। সেজন্যে শু পাকার ফাইল ও নক্সা জমে রয়েছে। কিন্তু কাজে কিছুই হয়নি। আর আজ যেখানে পাশাপাশি দুটি কারখানায় ইস্পাত বানানাে হচ্ছে। ঘরের এক কোণে বসে ষ্টেঙ্কা তার উচ্ছাসভরা কথা শুনছিল। কিরিল। তাকে বাদ দিয়েই কারখানার উদ্বোধনে গিয়েছিল। তাই ষ্টো মনক্ষুঃ ; সে ভেবেছিল যে কিরিল হয়তাে তাকে একটু সান্ত্বনা দেবে। অনেক কষ্টে আত্ম- সম্বরণ করে তাই সে বললে— “কিন্তু কাল কি তােমাব খাওয়া জুটেছিল? সাবাদিন গেটে খেটে অবসন্ন হয়ে পড়েছিলাম—তাই তােমার জন্য দেবী না কবেই আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। তুমি বােধ হয় লক্ষ্য করেছে যে আমার পােষাকও বদলান হয় নি।” এখনাে ষ্টেক আশা করছিল । কিরিল তার অভিমানের কারণ বুঝবে। কিরিলের মন কী এতই কঠিন হয়ে গেছে? কি বৃথা। কিরিলের মাথায় তখন ঘুরছে সম্পূর্ণ আলাদা চিন্তা। অনেক কষ্টে তার মনে পড়লে গত দিনের কথা।—সে বাড়ী ফিরেই দেখে বিছানার কোণায় ষ্টেক ঘুমুছে আর তার খাবার তৈরী। খাবার ইচ্ছে সফলস্বর ছল না বলেই কিরিল না খেয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু ষ্টেঙ্কার এত তৈরী খাবারের জন্য সামান্য ধন্যবাদ ও না দিয়ে কিরিল সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন করলো- “তােমায় এত বিশা দেখাচ্ছে কেন?” ষ্টেঙ্কা মিথ্যা কথা বললাে- এখন মুখ হাত ধুইনি।” কিন্তু তার বুকে উথলে উঠছে—কিরিল তুমি কি অন্ধ? দেখতে পাচ্ছে না আমার মনে কি দুঃখ, আমাকে তুমি কেন সঙ্গে নিলে না? তাতে কি তুমি লজ্জাপেতে ? কিন্তু কিরিল তখন সম্পূর্ণ অন্য জগতে। সে বলে চলেছে কালকের ঘটনাব কথা । কেমন আগ্রহভবে সব শ্রমিকরা তাদের অভ্যর্থনা করলাে- এবং তাই বা কি করে তাদের উত্তর দিল। স্কোর সমস্ত অভিমান পণ্ড হ'ল। ( ৬ ) T মশই কিরিলেব মনে হচ্ছিল যে সে ষ্টেঙ্কা থেকে দূরে সবে বাচ্ছে। কিন্তু কেন—তা সে নিজেই জানে না। সে ততই ষ্টেঙ্কাকে ভালবাসতে চায় জোর করে এবং নিজের মনের সঙ্গে কবে সংগ্রাম। ওপরে ওপরে তাদের সম্পর্কে কিছুই পরিবর্তন হয় নি। ঠিক আগের মতই ষ্টেঙ্কা রোজ সকালে এগিয়ে এসে তাকে বিদায় দেয়; রােজই কিলি ফিরে এসে দেখে যে পড়বার ঘৰ তকতকে ঝকঝকে করা হয়েছে। বিবাহিত জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ উপভােগও নে অভাসে দাড়িয়ে গেছে তাতে প্রাণের স্পর্শ নেই। এইভাল না লাগার কথা মনে হতেই সে ষ্টেঙ্কার বিছানা থেকে উঠে নিজের বিছানায় পড়ে গড়াগড়ি দিতে--জিজ্ঞেস কবলে বলতাে-কারখানায় একটা গােলবােগ ঘটেছে!” কথনন স্কোকে সে মনের সংঘাতের কথা বুঝিয়ে বলে নি! সে যদি জিদ করে জিজ্ঞেস করতাে তাহলে কিরিল পেরে উঠতে--এসবে তােমার দরকার নেই—খালি যত বাজে খােজ সফলশ্ন করার অভ্যেস্।” দেখতে দেখতে দু'জনের মধ্যে তখন ঝগড়া লেগে যেত। কে হয়তাে যা মুখে আসতত তাই বলে গালাগালি দিতাে-সেবার্থপর বহু স্ত্রী সম্ভোগী—এমনকী অকনিষ্ট !-কিরিল উত্তর করতে আমি কনিষ্ট কি না তা বিচারের ভার তােত তােমায় কেউ দেয় নি। কিন্তু এটা ঠিক যে তােমার মত পেটা বুর্জোয়া বােকামী দিয়ে আমি কনিকে ঢেকে রাখি না” বলেই তার মনে হয়েছে যে ষ্টেঙ্কার সঙ্গে এভাবে ঝগড়া করা অধ্যায়। কিন্তু তবু রাগের মাথায় সে থামতে পারতাে না! সত্যিততা ষ্টেঙ্কা খারাপ নয় ! সেদিন সকালে কিরিল ষ্টেঙ্কাকে বললাে যে কোনও কাজ না করে শুধু শুধু বসে থাকা কি ঠিক? হােট ছেলেটাও তত ক্রমে বড় হয়ে উঠেছে। উত্তরে-ষ্টেঙ্কা বলেছিল—“কিন্তু তুমিই একদিন বলেছিলে তােমার কাজ কার কি দরকার? আমি কি এতই অকর্মন্ত যে তােমায় দুমুঠো খাওয়াতে পারব না। মনে পরে সে কথা? আমি সব বুঝতে পেরেছি—এখন কোনও রকমে আমায় তাড়াতে পাড়লেই তুমি বাচ—আমি কখনাে কিছু করবাে না। উত্তরে কুৎসিৎ ভাষায় কিলি তাকে গালাগালি করে কাজে বেড়িয়ে গেল। কিন্তু সব সময় তার মনে তােলাপাড়া করতে লাগলাে দশত্য জীবনের সংঘর্ষের কথা। কিরি বুঝতে পারে না কোথায় গলদ! অথচ টেক সুন্দরী—তবু যেন কিৰিলের কাছে সে সৌন্দর্যের আকর্ষণ নেই— টেন্যার প্রত্যেকটা কাজেই কোন না কোনও ধুং ধরা পরে। প্রথম প্রথম ল থেকে ফিরে টেকাকে সাধারণ পােৰু পড়ে থাকতে দেখলেই কিলির ভাল লাগতাে—কিন্তু এখন তাতে তার গা রি রি করে ওঠ- নােংরা ত্যস!”

সফলপ্ত কিরিলের মনে হল যে এর একমাত্র কারণ হতে পারে জানে সর্বদা এক সঙ্গে থাকে। দূরে দূরে থাকলে বােধ হয় এতটা খারাপ লাগবে না। সেদিন আটাকা নদীর ধার ঘেঁসে কিলি, বােগদান, ফেনিয়া তিনজনে ঘােড়ায় চড়ে নতুন স্থাপিত দুটী লােহাব খনি পরিদর্শন করতে যাচ্ছিল। যায়গায় যায়গায় তাদের নী পার হতে হচ্ছিল। দুএক স্থানে নদীতে সামান্য বেশী জল থাকায় ছােড়ার ঘাড়ে পা তুলে দিয়ে থাকতে হচ্ছিল আর ঘােড় বেচারা কোনও রকমে সাঁতরে যাচ্ছিল। সে দৃশ্যে ফেনিয়ার কি হাসি। কিরিল সকলের পেছনে যাচ্ছিল। কিছুদূর এগিয়ে তার নজরে পড়লাে-রাস্তার ধারে একটা খাতা সেটা কুড়িয়ে নিয়ে কিরিল পড়তে শুরু করে দিল। এখানে রয়েছে- “বাবা তাকে উলা বলে ডাকে। আমার ভাল লাগে বলে—আমি করেছি উলাই। কিন্তু সাহস করে তাকে কিছু বলতে পারিনি। তাকে দেখে আমার মােপর একটা চরিত্রের কথা মনে হয়েছে। তাকে ঘনিষ্ট ভাবে চিনলে অব তা মনে হবে না। “আশ্চর্য—কিন্তু সত্যি আমার ভাবতে লজ্জা করে যে তাকে ভালবাসি। ভয় হয় পাছে সে এখন যতটুকু শ্রদ্ধা করে কিংবা বন্ধু ভাবে মেলামেশা করে তাও হারিয়ে ফেলি। কারণ তার চেয়ে আমি ৩২ বছরের বড়। না- আমি কিছুতেই হাঙ্গাস্পদ হতে চাই না—উপর কারখানার সর্বেসর্বা হয়ে এভাবে এগোতে না হয়।•••••• এতক্ষণে কিলি বুঝতে পারলাে যে খাতাটা বােগাতে। সেখান পকেটে পুরে সে আবার যাত্রা শুরু করলাে। কিন্তু এগিয়ে কিরিল পথ হারিয়ে ফেললাে। সেখানে পথ পরিদর্শক ছাড়া কেউই একা যেতে পারে ১২ সফ-স্বপ্ন । তার ওপর নদী পার হতে যাবার সময় ঘােড় পিছলে পড়ে কিরিলকে ফেলে দেয়। তখন নীচু হয়ে জুতাে থেকে জল বার করতে যেতেই কিরিস চমকে গেল। একী দেখছে সে? নদীর পাশে ছােট্ট একটুখানি ঝােপের ভেতর সম্পূর্ণ নগ্নদেহে ফেনিয়া ইততঃ চলাফেরা করছে। প্রথমে কিলি ভেবেছিল যে ফিরে যাবে—কিন্তু কি ঝঞ্চাট—প্রথমেই বােগদানভের ডায়েরী তার পরেই নগ্নদেহে কেনিয়াকে জানে কিরিলের দিন আজ কেমনভাবে কাটবে! তবু নিজের অজ্ঞাতেই ফেনিয়ার দেহ সৌষ্ঠবের কিরিল মনে মনে প্রসংসা করলাে ! ভেতরে মৃদু আলােয় ফেনিয়ার সমস্ত শরীর দিয়ে গােলাপী আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। অবিকল সংস্কৃতের গো- -“মধ্যে ক্ষমা চকিত হরিণী প্ৰেক্ষণা••• নিম্নতি ভোক নম্র শুন!.. ফেনিয়ার নগ্নসৌন্দর্য্যে কিরিল এক অভূতপূর্ব আনন্দের রেশ পেল। এতদিন তাকে সে জানত শুধুমাত্র চমৎকার তরুণ কনিষ্ট কৰ্ম্মী হিসাবে। কিন্তু আজ সে অভাবে ধরাপড়লাে। সে ভাবছিল সে কিছু হয়নি এমনিভাবে সামনে দিয়ে চলে যাবে কি না। ঠিক তখনি ফেনিয়া ভালাে “কিরিল—আর একটু দেরী—আমি কাপড় পরেই যাচ্ছি। সেও একটু রসিকতা না করে পারলো না—“শগগরি করো—তা নইলে আমিও বেশ ভাল করে দেখে সবাইকে বলে দেবে তােমার এই কীর্তির কথা। “তাহলে তারা কিন্তু সবাই হিংসেয় মরে যাবে।” পেছন থেকে তখনই বােগদানভ এগিয়ে এলাে! কিরিল তার খাতা তাকে দিয়ে বললাে শুধু সামনের পৃষ্ঠাই পড়েছি। কিন্তু আপনার প্রেয়সীটা কে?- সফ-স্বপ্ন ৯৩ কিছু পরে আবার তারা চলতে শুরু করলাে। ফেনিয়া তাদের মাঝখানে। কিরিল এবার যতই ফেনিয়ার দিকে তাকাচ্ছে ততই তার দেহ সৌষ্ঠবের প্রশংসায় মন ভরে উঠছে। (৭) নুতন আবিষ্কৃত লােহার খনিগুলাে বিশাল জঙ্গলে পরিবৃত পাহাড়ের মধ্যে—ইস্পাতের কারখানা থেকে প্রায় একশাে মাইল দূরে অবস্থিত। সেখানে যাতায়াতের তেমন কোনও উপায় নেই। অনেক আগে যখন ঐখানে ইস্পাতের কারখানা বানান হয় তখন কোন বৈজ্ঞানিক মত প্রকাশ করেছিল যে ঐ অঞ্চলে কখনো লােহ পাওয়া যাবে না। তাতে বােগ্দান আপত্তি করেছিল। এই নতুন খনি দুটো আবিষ্কারের পেছনে একটু মজার কথা আছে। একদিন বােগ্দানভ তার আফিসে বসে কাজ করছিল এমন সময় একটা শােৱীয় জাতীয় যুবক তার কাছে যেয়ে কতগুলাে লোহার পিণ্ড সামনে ছুড়ে ফেলে বলেছিল-“কর্তা—আপনার জন্যে কতগুলাে লােহার টুকরাে এনেছি। এর বদলে আমায় গাছে ওঠবার জন্যে ছােট ঘােট লােহার আংঠা করে দিতে হবে। কাঠবিড়ালী ধরবার জন্যে আমাদের ওগুলাে দরকার হয়।” তখন থেকেই বােগদানভের ইচ্ছে ছিল সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে লােহা তােলা ! ফেনিয়া ছাড়া সেখানে যাবার রাস্তা ফিরিল কিংবা বােগদানভের কারুরই জানা নেই। কাজেই ফেনিয়া তাদের পরিচালিত করে নিয়ে চলেছে। যেতে যেতে পথের দুধারে লৌহপিণ্ড পড়ে থাকতে দেখে তারা আচাৰ্য হয়ে গেলাে। ক্রমে আর থাকতে না পেরে বােগ্দানভ বলে উঠলাে “এখানেও আমাদের একটা কারখানা খুলতে হবে। ধু ট্যাক্টরের ১৪ সফ-স্বপ্ন কারখানায় এত লােহা কাজে লাগান সম্ভব। এখানে একটা মালগাড়ী চালানাের কারখানা খুলতে হবে। তখন সেই মালগাড়ীতে করে পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছ, যত ট্রাক্টর খুসী পাঠান যাবে। চলতে চলতে তৃতীয় দিনে তারা গন্তব্যস্থানে এসে পৌছােলল ! সেখানে তারা প্রধান কর্মকর্তার বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটাবার মতলব করলাে। ( ৮ ) কুয়াশা আচ্ছন্ন পার্বত্য সঙ্কোয় তারা তিনজনে বেড়াতে বেড়াতে একটা সুন্দর মাঠের মধ্যে বসে আগুন পােহাতে লাগলাে। সেই আগুনের পাশে তারা শুরু করলে। গান করতে! বােগদানতও বাদ গেল না। সেখানে কেনিয়ার অনুরােধে কিরিল প্যারিসের গল্প বলতে লাগলাে। প্যারিসে কপালনে আমার পুরানো বন্ধু আরনতের সঙ্গে দেখা ! তাতে আমার খুব সুবিধে হয়। সে ঠিক ফরাসীদের মতই ফরাসী ভাষায় কথা বলতে পারে আর আমাকে দেশ দেখাবার ভারও রইলাে তার ওপর। প্যারিসের কথা ঠিক সেখানে না গেলে বােন যায় না! ধর একদিন আমি রাস্তায় আসতে আসতে দেখি একদল ছাত্র চীৎকার করে বই উড়তে ছুড়তে যাচ্ছে। পিছনে একজন পুলিস মটর সাইকেল নিয়ে আসছে। হঠাৎ মনে হবে যেন কোনও শােভাযাত্রা! দূরে এক দম্পতী বেড়াতে যালি। ছেলের দল তাদের মধ্যে মেয়েটিকে কেড়ে নিয়ে চুমু খেতে খেতে চললাে! পথের পাশের একজনকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় সে বলে-“ওরা সেদিন পরীায় পাশ করেছে-তাই এ উস। কেনিয়ার কৌতুহল ক্রমেই বাড়ছিল। সে ভাল করে বললাে !

সফ-প কিলি বলছে—তাদের মােটেই লজ্জা নেই, কেনিয়া, ভাবতে পারে যে তারা সদর রাস্তার ওপরেই একে অন্যকে চুমু খায়? সিগারেট-খাবার মতই চুমু খাওাতে কারাে কোনাে দৌর্বল্য প্রকাশ পায় না। “সেকি ? তাতে কেউ কিছু বলে না?—ফেনিয়া উত্তর দিলাে—“আচ্ছা প্যারিস সহরটা কেমন ? সে কথা বলা কঠিন। প্রত্যেক রাস্তাই কাফে ও রেস্তোরাতে বােঝাই। সেগুলো ছাড়া যেন চলা অসম্ভব! সাংবাদিক, কবি, লেখৰ-এদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা হােটেল। পকেট কাটা ও সােডােমাইটদেরও কাফে আছি! কিরিল প্রথমে ভেবেছিল যে সােডােমাইটদের হােটেলের কথা বললে হয়তাে ফেনিয়া বিব্রত বােধ করতে পারে—তাই সে কথাটি চেপে যাওয়াই স্থির করে। কিন্তু হঠাৎ কথাটা বেরিয়ে যায়। এবং ফেনিয়ার সনির্বন্ধ অনুরােধে কিলিকে সব বলতে হল - “বন্ধু আরণভােভের সঙ্গে প্যারিসের বিলাস অঞ্চল সজেলিজ অজ্ঞাত সৈদের কবর দেখে আমরা ঐ সমাজের দরিদ্রদের অঞ্চল দেখতে চাই। বন্ধু আমাকে বীর মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে চললাে সেখানে পাতি চোরের হােটেল-কোকেন খােরের আজ্ঞাবড় পকেটমারদের রেস্তোরা। তারপরে সে একটু ফাকা যায়গায় আমায় টেনে নিয়ে গেল। সুন্দর চেহারার বয়স্ক লােকেরা সব বসে রয়েছে—কিন্তু শুধু পুরুষ ! সেখানে কফি খেতে খেতে বঙ্কেরা তরুণদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে! থেকে থেকে তাদের কেউ একজন তরুণকে কফি খাইয়ে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে চলাে! “বন্ধু আমায় বুঝিয়ে দিল যে এটা সােডােমাইটদের আড্ডা।কিন্তু আমার বিশ্বাস না হওয়ায় এ করলাম—অসম্ভব। অতৰ-এলিজাবে একা ওসব কাজ চলতে পারে না! কি আরােভঙঠি চাপড়ে ১৩ সফ-স্বপ্ন বললাে-“বড়াচ্ছে কেন? কেন? চলনা আরও কত জিনিষ রয়েছে প্যারিসে।” দুজনে মিলে একটা বন্তীর দিকে দুয়াের আটা বাড়ীর সামনে এলাম। কিন্তু ভিতরে ঢুকেই কিরিল হতভম্ব। সেখানে সারির পর সারি অকালপক্ক প্রৌঢ়, যুবক ও পুলিশ ভীড় কবে দাড়িয়েছে। তাদের সামনে ঠিক তেমনি ভীড় করা নগ্ন মেয়ের দল। সবাই ছুটোছুটা করে লােক ধরতে চাইছে। তাদের বাড়ীউলি এসে আমাদেরও জিগ্যেস করলো কেমন মেয়ে চাই। সে বললাে-“সবাইকে আমি গ্রাম থেকে আনিয়েছি। তবে এরা কোনও কাজের নয়-একবছর পরে আব এদের দিয়ে কোনও কাজ হয় না।” • এই সব কথা শুনছি—এমন সময় সেখানে আরণল্ডােতের পরিচিত , একজন বিখ্যাত ফরাসী লেখক এলাে ! সে প্যারিসের নিষ্পেষিতদেব নিয়ে বই লিখছে। মেয়েরা তাকে ছেকে ফেললল—কিন্তু আমার ভীষণ লজ্জা হচ্ছিল-কোনও রকমে একপাশে গুড়িমুড়ি মেরে দাড়ালাম, আর বন্ধুটি আমায় ঠাট্টা করতে লাগলাে। পবিচয় হতেই সে প্রথমে ঘৃণার সঙ্গে অভিবাদন করলাে। তারপরে আরণেেভর মারফৎ তাকে বললাে ঐ সব মেয়েদের কাউকে নিয়ে উপরে যেতে সেখানে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলা ঘর আছে! আমি তাে রেগে আগুন। এরাই আবার গৌরব করে—ফরাসী বিপ্লবের! আরণােভের বন্ধুটি জিগ্যেস করলাে—নিজের ই সঙ্গে তুমি বিসধাতকতা করতে পারে? আমি বললাম-“না—তবে যখন তাকে হয়তো আর ভালবাসব না- তখনই আমি অন্য মেয়েকে নিয়ে থাকতে পারি। কিন্তু যতদিন সে আর আমি পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসবে ততদিন অন্য মেয়ের কাছে যাওয়া আসব ? সেই লােকটি বলে উঠলাে-“চমৎকার !”

সফল-বপ্ন ১৭ এমনকি আরণভেও চমৎকৃত হ’ল। সে আমার কানে কানে বললাে- সত্যই তুমি মহান কিরিল—আমি বাজে খবর পেয়েছিলাম যে তুমি নাকি কত বউ বদলালে তার ইয়ত্তা নেই।” বদলানাে নয়, বিচ্ছেদ।” আমি শুধরে দিলাম। । “সেটা সম্পূর্ণ আলাদা। তার কারণ আমরা দুজনে দুজনকে আর আগের চোখে দেখতাম না। কিন্তু আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে ঐ লােকটা বুদ্ধিজীবি হয়েও কেমন করে ভাড়া করা মেয়ে নিয়ে সঙ্গ সুখ উপভােগ করবে ? সে তার উত্তর দিয়েছিল—“বিয়ে করবার মত কিছু না থাকলে বাধ্য হয়েই এদের কাছে আসতে হবে।” সমস্ত প্যারিসের সভ্য সমাজ ঘুমুচ্ছে। সীন নদীর নিস্তব্ধ বুকের ওপর চাদের শীতলতা! তপনাে দরিদ্র প্যারিস ঘুমােয়নি। তারা ফুটপাথে, পার্কে, বেঞ্চে শশার বন্দোবস্ত করছে। জুয়াচোর, চোর, মেয়ের দালালরা তখন আবছা আঁধারে ঘাের ফেরা করছে। বড় বাজারের কাছে এসে দেখলাম বহুলােক একসঙ্গে জড়াজড়ি করে শুয়ে রয়েছে। আরণল্ডােভকে জিগ্যেস করায় সে বললো-“এরা বেকাব। রাতে সব এখানে কিংবা পুলের নীচে শুয়ে থাকে।” কিরিলের কথা শেষ না হতেই ফেনিয়া উঠে দাড়ালাে-“কিরিল এসব গল্প করে ভালই করলে।” তারপরেকম্পিত স্বরে-“তবু, সত্যিই কিরিল তুমি কিছুই করনি?” “কি?” আন্দাজে কিরিল বুঝলো-“না আমার পক্ষে তা অসম্ভব!” বলেই সুরু করলে—“কি আশ্চর্য ! দেখাে এসব কথা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে-না, আমার মিথ্যে লজ্জার ভাব এখনাে কাটেনি।”

।
ar
সফ
( ৯ )
রাতে বােগ্দানভ ও কিরিল পাশাপাশি ঘরে শুয়েছিল। তাদের পাশে
অন্য একটা ঘরে থাকতত ফেনি। বােগদানভ ও কিরিলের ঘরের ভেতর
দরজা ছিল।
গভীর রাতে বােগদানভ কিবিলের বিছানার পাশে এসে বললাে-“উলাই
কে জানাে ?”
“কেন তুমিইত বলেছে সে স্বপনপুরীব বাজকন্যা—যাকে ধরা ছোঁয়া
যাবেনা?”
আবার বােগ্দানভ চুপ !
“সেই ফেনিয়া”—অবশেষে থাকতে না পেরে সে বললাে!
এই অপ্রত্যাশিত সংবাদে কিরিল চমকে উঠলো—“কি বললে?” তার
মনে হলো—“ভাগ্য ভাল-যে বােগ্দানভ কথাটা বললে। তা না হলে হয়তাে
একদিন আমাদের মধ্যেই মনান্তর ঘটতে। আমার উচিৎ এখন সরে পড়া।”
কিন্তু সে সব কিছু না বলে সে শুধু বললাে “এই ব্যাপার বল ! এ আমি
আগেই জানতাম।”
“কেমন করে জানতে?”-বোগদানভ জিগ্যেস করলো।
“না-এমনি, কথনাে কখনাে মনে হয়েছে-” বলেই কিরিল তাকে
এড়িয়ে গেল।
কিন্তু উচ্ছাসভরে বােগদানভ ফেনিয়ার প্রশংসা করে যেতে থাকলাে।
আর কিরিল তাকে রাগিয়ে দেবার জন্যে কবছিল ঠাট্টা।
অবশেষে বােগদানভ কিরিলের কাছ থেকে খুব উৎসাহ না পেয়ে নিজের
ঘরেই ফিরে এল।

ষ্টেঙ্কার সংকল্প ( ১ ) বোগদানভের কথা শােনার পর থেকেই কিরিলের মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। সে জোর করে ষ্টেঙ্কার কথা মনে করতে চেষ্টা করে—কিন্তু পারেনা। তাব দুঃখ হয়—ঠিক ষ্টেঙ্কার জন্য হয়তো নয়--তার মুমু প্রেমের জন্যেই বেশ ! আশ্চৰ্য্য–কেট কাউকে না ভালবাসতে সুরু করলে কত খুতই না বের করে অন্য পক্ষের। কমুনিষ্ট কিরিল তা করবেনা। ০ মন স্থির করার জন্যে সে ডায়েরী লেখা ধরলাে। প্রায় রাত্তিরেই তারা তিনজনে পাহাড়ে পাগড়ে ঘুরে বেড়ায়। ফেনিয়াই তাদের চালিয়ে নেয়। তাৰ সাহচর্য্যের মধ্যে একটা মাদকতা আছে যাতে প্রত্যেকেরই জীবনে নবীনতা আনে! প্রৌঢ় বােগদানভ তখন মােটেই গভীর থাকতে পারেনা—যখন ফেনিয়া বলে- “আমি কাঠবিড়ালীর মত গাছে গাছে বেড়াবাে-আর আপনি ভালুক হয়ে আমায় ধরতে চাইবেন।” উপায় নাই । বেচারা বােগদানভ সানন্দে তাই করে ! কিরিল লক্ষ্য করে যে চলতে চলতে বােগ্দানভ একটু থেমে সকলের অলক্ষ্যে নিশ্বাস নিচ্ছে। বােধ হয় এত জোড়ে এবং এই পরিমাণ চলাফেরায় বেচারার কষ্ট হচ্ছে ! একদিন বােগদানভ কিরিলকে বলে পারলােনা- “কিরিল, জানাে-ফেনিয়ার কাছে এলে আমি নতুন জীবন লাভ করি?” কিন্তু কিরিল রূঢ়ভাবে উত্তর দিলো-“তাকে শয্যাসঙ্গিনী করতে পারলে আরাে ভালাে লাগতােনা?” বােগ্দানভ বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। তখন কিলি মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করে বােগানভদের দুজনের ১০০ সফল-স্বপ্ন সম্পর্কের কথা। আচ্ছ ফেনিয়া কি বােগদানভকে ভালবাসে? ফেনিয়া নিশ্চই বােগদানভকে ভালবাসেনইলে বলবে কেন—“দেখ কিরিল তিন জন না হলে আড্ডা ভালভাবে জমেনা ! বােগ্দানভ এলে বেশ হতাে?” মাঝে মাঝে বােগদানভের মুখের গানও তত ফেনিয়ার কাছে শােনা যায়। কিরিল ভাবে বে ভালই তারা দুজনে দুজনকে ভালবেসে সুখী হ’ক—সে সরে বাবে নয়তত বােগ্দানভের সঙ্গে ফেনিয়ার জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা উচিৎ হবেনা! বােগদানভ একদিন সন্ধ্যেবেলা কিরিলের কাছে পরামর্শ চাইলে কেমন করে ফেনিয়ার কাছে প্রস্তাব পাড়বে ! তারা দুজনে অনেকক্ষণ ভেবেও কিছু ঠিক করতে পারলোনা। ফেনিয়া তো সাধারণ মেয়ে নন যে দুটো উপহার নিয়ে যেয়ে বলা যাবে আমি তােমায় ভালবাসি ! এতে হয় তো সে রেগেই উঠবে!—অবশেষে বোগদানভ অধৈয্য হয়ে উঠে ফেনিয়াকে ডেকে নিয়ে বেড়াতে বেরুলো ! কিরিলকে না দেখে ফেনিয়া জিগ্যেস করলো— “কেন কিরিল এলােনা?” বােগ-দানভ মিথ্যে উত্তর দিলে—“না সে ষ্টেঙ্কাকে চিঠি লিখছে-বেচারার মন খারাপ! শীগগীরই সে আসবে !” তাদের আড্ডা দেবার যায়গায় এসে আগুন ধরিয়ে বসে বােগদানভ সুরু করলো- “আমি একটা অদ্ভুৎ স্বপ্ন দেখেছি জানাে-বহুদূর উত্তরে যেন আমি চলে গেছি। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ। জনমানবের লেশ নেই। সেখানে যেন আমি অনন্ত কাল ধরে আছি—আমার মাথার চুল বড় হয়ে গেছে এবং যুগ যুগান্তের অনভ্যাসে কথা বলবার ক্ষমতাও লােপ পেয়েছে ! আমার একমাত্র কাজ ছিল—সেই বরফমালার ভেতর দিয়ে উত্তর মেরুতে যাবার রাস্তা খােদাই। তখন মনে হত যে একাজটুকুও না পেলে আমি কি করে দিন কাটাতাম! সময় সময় নিতান্ত একা মনে হতো অনেক সময় আমার পেছনে, অনেক দূরে আমারই গড়া রাস্তায় লােকের গলার আওয়াজ পেতাম-তাদের হাসির মহড়া শুনে আনন্দ পেতাম।কিন্তু তবুতে আমি সঙ্গীহীন একা।''হঠাৎ সফ-স্বপ্ন ১০১ একদিন দেখি বরফের ওপরে চিহ্ন!-আমার আগেও তাহলে কেউ এসেছিল সেখানে। দেখতে দেখতে সেই বরফের ভেতর থেকে অস্পষ্ট মানুষের মৃত্তি ফুটে উঠলাে—দেখলাম ফুটন্ত গােলাপের মত একটা মেয়ে ! সে বললে- আমার নাম উলাই ; হাজার হাজার বছর আমি রয়েছি বন্দিনী হয়েকেউ বরফ সরিয়ে আমায় মুক্তি দেয়নি। অবশেষে তুমি এলে। তখন আমার মনে হ’ল—যে এই উলাইকেই আমি সারা জীবন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি—আমি তাকে বললাম-“তুমি যদি আমার পাশে এসে দাড়াও—তাহলে আবার আমার জীবন সুখের হবে—আমি আবার বাচবে!” কিন্তু তার কথা শেষ হতে না হতেই ফেনিয়া পড়ার অজুহাত দেখিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। বােগদানভ পাথরের মত নিশ্চল হয়ে বসে রইলােও ফেনিয়া একদৌড়ে কিরিলের ঘরে এসে ধমকে উঠলাে—“নিশ্চয়ই আপনি পাঠিয়ে ছিলেন—কিন্তু কেন? কেন এমন করে অপদস্ত করেন ? আমি তাকে নিরাশ করেছি”-বলেই সে চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে গেল! ফেনিয়া বেরিয়ে গেলে কিরিলের যেন সমস্ত গুলিয়ে গেল—সে ফেনিয়া, ষ্টেঙ্কা, বােগদানভের কথা ভাবতে লাগলো। এমনি সময় অন্ধকারে ফেনিয়া এসে তার পাশে দাড়ালাে.. তার সেই একই অনুযােগ—“কেন এমন করলে? বলতে হবে কেন তুমি এমন করলে।” কিরিল বাধ্য হয়ে সব খুলে বললাে। তথন তার মুখ থেকে বেরােলে—“আঃ”। সে কিরিলের আস্তিন ধরে টানতে টানতে চাপ গলায় বল্লে “চলে এসাে—যাই হক-না কেন”। সেই অন্ধকার আঁকা- বাঁকা পথে বােগ্দানভের ঠিক উল্টোদিকে কিলিকে নিয়ে চললল ফেনিয়া । কিছু পরে সে বললাে-“এইবার মাথা নীচু করে লাগেনা যেন”। তার আগে আগে ফেনিয়া নীচু হয়ে একটা গুহায় যেয়ে ঢুকলে কিরিলকে আশ্চৰ্য্য হতে দেখে সে বললাে-“এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই—এখানেই তাে আমাদের অফিস—বন্ধুদের সঙ্গে আমিতাে এখানেই আসি।”

১২ সফল-স্বপ্ন “হা-মিথ্যে কথায় কি লাভ?” নানা কথা ভাবতে ভাবতে কিরিল একটা সিগারেট ধরালো। তার দেখা দেখি ফেনিয়াও একটা ধরিয়ে নিল। সিগারেটের আলােয় কিরিল দেখলাে-ফেনিয়ার চোখে মুখে জীবন্ত বুভুক্ষার ছাপ। সে ক্ষুধিত দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে কিরিলের দিকে আর তার দৃষ্টিতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে তিরস্কারের আভাষ। কিরিল আত্মসম্বরণ করতে পারলাে না-ঘনালিঙ্গনে ফেনিয়াকে টেনে নিয়ে তার সারা দেহ চুম্বনে সিক্ত করে দিল। তার বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে ফেনিয়া শুধু কঁপছে—আর আস্তে আস্তে হাতখানা নেড়ে দিচ্ছে। কিরিলের চুম্বনের অবসরে সে বলে উঠলে-“যদি তাই হয় তবে আজই এখানে শেষ হয়ে যাক আমার কুমারী জীবন।” কিরিলের মাথাটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে ফেনিয়া প্রগাঢ় চুম্বন দিলাে। তার পবে গুহার এক কোয় এলিয়ে পড়ে কিরিলকে কাছে টেনে নিয়ে এল—“কাউকেই আমি দেহ দান করি নাই-কিরিল–শুনছাে?” “হা, জানি”—বলে সংযম হারা কিরিল সেই অন্ধকারেই ফেনিয়ার পাশে সরে গেল.. • । ( ২ ) প্রাচীরের উপর পা দুলিয়ে ফেনিয়া বসেছে আর কিরিল নীচে দাড়িয়ে রয়েছে। দুরে এক হরিণ দম্পতীর অভিসার দেখে ফেনিয়া বললাে “দেখাে কিরিল—কাল ঐ হরিণী -সাহস পায়নি দরিতের কাছে যেতে পালিয়ে গেছিল—আর আজ সে কেমন সাহস করে এগোচ্ছে।” কিরিল উত্তর দিল-“আশ্চৰ্য্য ফেনিয়া তােমার মত এই মনােভাব নিয়ে কজন মেয়ে এসব দৃ দেখে।'-” বলেই পাছে ফেনিয়া দুঃখিত হয় আশঙ্কা করে তার ঝােলান পায়ে মাথা ঠেকিয়ে রাখলাে।

সফ-স্বপ্ন ১০৩ ফেনিয়া কিরিলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-“কেন আমিকি পর্দানশীন মেয়ে। আমার মনে কোনও পাপ নেই। এ সব আমি খুবই স্বাভাবিক মনে করি—আর সত্যি কি সুন্দর এ দৃশ্য ! দেখনা ওদের দুজনে কেমন ভাল হচ্ছে।” কিরিল এবার ফেনিয়াকে খোঁচা দিল—“কিন্তু এথেকে তাে তােমার মতটাই ভুল প্রমান হচ্ছে। এরা হরিণ হরিণী কেমন চমৎকার একসঙ্গে থাকছে—আর তুমিতাে তা চাওনা।” “তুমি কি তাই বলে মানুষ আর পশুতে কোনই পার্থক্য মানবেনা? মানুষের বিবাহিত জীন দেখে দেখে আমার বিতৃষ্ণা ধবে গেছে। আমি কখনােই বিবে কবে বব সংসার করতে পারবােনা। আমি এও চাইনা যে তুমি এই মুহূর্তেই ষ্টেঙ্কাকে ছেড়ে দিয়ে আমায় নিয়ে জীবন কাটাবে। তােমাব তরফ থেকে কোনও ত্যাগই আমি কবতে দিতে চাইনা। তুমি স্বার্থ ত্যাগ করলেই আমায়ও তার বদলে সেবা করতে হবে। আর এখন তার কোনই প্রয়ােজন নেই এমন। আমার মনে হয় যে সেবা দেয়া নেয়ার সম্পর্কে ভেতব প্রেম কখনই দানা বাঁধতে পারেনা। প্রেমের পথে কোন শৃঙ্খলই থাকবে না। তা হবে ঠিক এই রকম-” বলেই ফেনিয়া কিরিলকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে আদর করে সারা মুখ চুমােয় ভরিয়ে দিল ! আর যদি প্রেমের ভেতরে ঘুন ধরে কখনাে—তাহলে সে কিরিলকে ঠেলা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল !—“কিন্তু আর নয় এবার চলে কারখানায় বাবার দিন এসে গেছে। এমনিতেই একদিন দেরী হয়েছে আমাদের বােগদানভ হয়তাে রেগে গেছে! কিন্তু কিরিল তাকে নীলউপত্যকা-ঝরনা আর উদার আকাশের দিকে দেখিয়ে বল্লে- “না ফেনিয়া তােমায় নিয়ে এসবের মধ্যে থাকতেই বেশী ভাল লাগছে।” * কি হয় -পাগল ! এখানে থাকবে শুধু তারাই যারা জীবনের ১০৪ সফলস্বপ্ন উপর বীতশ্রদ্ধ ! আমাদের কাছে তাে কর্মজগৎই জীবন। এখন চল যাই।” কথাগুলাে বলে ফেনিয়া নামতেই কিরিল তাকে জড়িয়ে ধরলাে। ফেনিয়াও সেই সবল পরুষ দেহে নির্ভর রেখে শান্তি পেলাে ! কিরিল তাকে দুহাতে শূন্যে তুলে নিয়ে চললে আঁকা বাঁকা পথ দিয়ে পাহাড় ঘুরে ঘুরে ! মাঝ পথে হঠাৎ থেমে হয়তাে সে বলতে সুরু করল--“দূরে ঐ যে আবছা কুয়াশা দেখছে—ফেনিয়া আমাদের প্রত্যেকের জীবনও অমনি অপ্রকাশ। ভবিষ্যতে কি আছে আমাদের জন্যে জমা হয়ে তাকে বলতে পারে? আমি সামাজিক ভাবে সকলের কথা বলছিনা-বলছি ব্যক্তিগত ভাবে। কে জানতে—যে আমি আজ তােমায় জড়িয়ে এমনি ভাবে চলবে। আজ যেন মনে হচ্ছে তুমি আমার অবিচ্ছেদ্য এব অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। অথচ দুদিন আগে তা কল্পনাও করতে পারিনি।” ইস্পাতের কারখানার ইঞ্জিনীয়ারের স্ত্রী ষ্টেফা এক অদ্ভং মেয়ে। আগে মস্কোতে থাকবার সময় সে স্বাৰ্ডলভ শ্রমিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ কবে। কথায় বার্তায় তাকে প্রথম প্রথম বেশ বুদ্ধিমতী মনে হবে। কিন্তু একটু পরেই বােঝা যাবে যে সে অন্যের কথাই মুখস্ত বলছে, হয়তো সব জিনিষই বােঝে কম! কুবিনকে বিয়ে করবার আগে সে আরও চাববার বিয়ে করেছে! সত্যি কথা বলতে গেলে তাকে ও অঞ্চলের সকলে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু রুবিনকে সবাই ভালবাসে বলে তাকেও সহ্য করতে হয়। প্রত্যেকের বাড়ীর হাড়ির খবর রাখাই হচ্ছে ফোর কাজ। এ বিষয়ে তার অপূর্ব দক্ষতা। কেমন করে সে যেন টের পেয়েছে কিরিলদের বাড়ীতে ভাঙন ধরেছে! একদিন সে সত্যিই কিরিলদের বাড়ী চললো।

সফলশ্ন ১০৫ সেদিনই কিরিল ও ষ্টেঙ্কার মধ্যে এক প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেছে : দুজনে আলাদা ঘরে শুয়েছিল। ষ্টেঙ্কা সারারাত জানালার ধারে বসে কেঁদেছে। ভােরে এসেই কিরিলের পাশে বসে সে অনুযােগ করবে ঠিক করলাে। হঠাৎ তাকে কিরিলের চোখে বড় খারাপ লাগলো। অথচ এই ষ্টেঙ্কাই যখন প্রথম তার মোটর চালাত তখন সম্পূর্ণ আলাদা চোখে তাকে দেখতে! আজ এমন কি হয়েছে যাতে সে অসহ্য হয়ে দাড়িয়েছে। কিরিল জোর কবে ভালবাসতে চেষ্টা করে ষ্টেঙ্কাকে। তাই ষ্টেঙ্কাকে খুব ধমক দিয়েই তার অনুশােচনা হ’ল! সে উঠে গিয়ে আস্তে আস্তে ষ্টেঙ্কাকে আদর করতে করতে বললো- “তােমার কি হয়েছে স্কো বল—আমরা দুজনেই তাহলে এত দুঃখ পাইনা।” ষ্টেঙ্কা ভেঙে পড়লাে—“আমায় ক্ষমা কর কিরিল—তুমিই বলে দাও আমি কি করবাে। যা বলে দেবে আমি করবো—তুমি তাে এখনও আমায় ভালবাসাে !” ‘কেন বাসবােনা কিরিল উত্তর দিল—কিন্তু তার বলবার সাহস হলনা “হঁ্যা, তােমায়তাে ভালবাসিই।” ঠিক এমনি সময় কিরিলের মা এসে খবর দিলো যে ষ্টেফা এসেছে তাদের সঙ্গে দেখা করতে। খবর পেয়েই কিরিল বিগড়ে গেল! ষ্টেঙ্কা বেড়িয়ে যেতেই কিরিল বললাে “আমি কিন্তু আজই মস্কো যাচ্ছি কেন্দ্রীয় পরিচালক সমিতিব বৈঠকে। তাহলে আমাদের বিদায় নেওয়া হ’লনা”—ষ্টেঙ্কা গত রাতে পৃথক ঘরে শােবার উল্লেখ করে কথাটা বললাে ! ফোর সঙ্গে কথায় কথায় ষ্টেঙ্কা আত্মসংস্বরণ করতে পারছিলনা। সে উচ্ছাসের সঙ্গে বললাে-“সত্যি বলবে ষ্টেকাবিনকে বিয়ের পর তুমি

১০৬
সফল-স্বপ্ন
তাকে ছাড়া
সে সব কথা গুছিয়ে বলতে পারছিলে না! কিন্তু ষ্টেফা
বুঝলে। সে ষ্টেঙ্কাকে ফিরিস্তি দিয়ে গেল—“আব্রামকে মনে পড়ে?
সেই যে লােকটী আগুন সম্পর্কে খোঁজ করতে এসেছিল? সে ছিল
একজন! আভাকুমকে চেনন? এবােডড্রামের পরিচালক? ছােক
ডেভিডভকে মনে আছে? কাবায়াকিনও তাে একজন।
“ঢের হয়েছে বলে ষ্টেঙ্কা তাকে থামিয়ে জিগ্যেস করলাে-“কিন্তু
তােমার কোনও বিবেকের দংশন হয়নি?”
“কেন হবে? আমার ববঞ্চ ভালই লাগতাে আর......এরা সবাই
পাটির লােক• •••” বলে সে এমন অঙ্গভঙ্গী করলাে নেন এতে তার কোনই
দোষ নেই। সে নির্দোষ।
“আর তুমি কি মনে করাে তােমার একেবারে যুধিষ্ঠির?”
ষ্টো চমকে উঠে জিগ্যেস করলাে-
কেন?—বল না কিরিলের সম্পর্কে চারদিকে কি গুজব রটছে।”
বিজয়িনীর মত ষ্টেফ বললাে--“যাওনা তাকে জিগ্যেস করে এসাে, তার
কীঘড়ি কোথায়--তাহলেই সব প্রকাশ পাবে।
( ৪ )
কিরিল মস্কো চলে গেলে ষ্টেঙ্কা শুধু বসে বসে ভেবেছে—কিরিল তাকে
আর আগের মত ভালবাসছেনা । সংসারের সব কাজেই তার শৈথিল্য দেখা
দিল । কখনাে কখনো তার মনে হয়েছে যে হয়তাে কিরিল অন্য কোনও
মেয়েকে ভালবাসে—কিন্তু সে চিন্তা ষ্টেঙ্কা সহ করতে পারেনা। म
ধু নিজের দোষ খুজতে চায়—নিশ্চয় সেই কোনও দোষ করে কিরিলকে
রাগিয়ে দিয়েছে। হয়তাে কিরিল তাকে নিতান্ত পেঁয়াে ভাবছে। যত
দিন যাচ্ছে ততই কিরিল নূতন নূতন বই পড়ছে—তন নূতন কাজে জড়িয়ে
পড়ছে। আর সে শুধু তুচ্ছ সংসার নিয়েই ব্যস্ত। তাই হয়তাে কিরিল

সফল বিরক্ত হয়। আবার পরক্ষণেই একটা ভাল পত্রিকায় লেখা প্রবন্ধের কথা মনে পড়ে!‘মাতৃত্বের দাবী নিয়ে কর্মমুখর স্বামীর সংসার গুছিয়ে রাখাই নাকি রমণীর শ্রেষ্ঠ কাৰ্য। ষ্টো বিভ্রান্ত হয়ে যায় ! এরমধ্যে একদিন স্টেফ। এসে আবার তাকে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল । ষ্টেফা খালি প্রমান করতে চায় যে কিরিল অন্য মেয়ের প্রেমে পড়েছে। ষ্টেঙ্কা উত্তর দেয়—তা আমি জানি! সন্দেহ নয়—সব খবরই জানি। একদিন কিরিলের ঘড়ি আনতে যেতেই সব কথা প্রকাশ হয়েছে ! ফেনিয়াকে টেলিফোন করায় সেও স্বীকার করেছে। সে কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে সব বলেছে। ষ্টেঙ্কাকে সহানুভূতি দেখা। ছলে ষ্টেফা উপদেশ দিল—“তােমার উচিত ঠিক ওর উল্টো টা করা। তুমি কিরিলকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে থাকো--। সে যদি তােমাকে ভাল না বাসে তবে তােমার এত মাথা ব্যাথা কেন?”—দরদ মিশিয়ে তারপরে “আর যদি চাও তত আমিই লােক জোগাড় করে দিতে পারি—বেশ সুন্দর সুশ৷ এবং তরুণ।••• বলতে বলতেই ষ্টেঙ্কার টেলিগ্রাম পেয়ে কিরিল মস্কো থেকে এসে পড়ে। ষ্টেঙ্কা তাকে জানিয়েছে যে তাদের প্রেমের সমাধি হযেছে? কিরিলকে দেখেই ষ্টেফা বেরিয়ে গেল। কিরিল সােজা ষ্টেঙ্কার কাছে এসে হাত ধরে বলতে যাচ্ছিলো—“সত্যি আমার কোনও কথা বলবার নেই—কিন্তু ষ্টেঙ্কা খেকিয়ে-সরে এলাে—“যাও যাও” সাধু সাজতে হবেনা-লম্পট কোথাকার।” “ওটাও প্রশংসা হলাে আমার পক্ষে। সত্যিকারের লম্পট নই বলেই কথাটা বুকে বাজছে—তুমি নিজেই জান যে আমি লম্পট বা বদমায়ে কিছুই নই।” কথার মাঝখানেই সে খেই হারিয়ে ফেললল—“সারাদিন কাজ করে অবসর পাইনা বড় পরিশ্রান্ত হয়েছি দাড়াতে পারছিনা”। বলেই কিরিল ধপ করে স্কোর সামনে হাটুগেড়ে বসে-শুধু বললাে-“আমায় ক্ষমা কর !”

১০৮ সফল-স্বপ্ন তার সেই কাতর আহ্বানে ষ্টেঙ্কার মন গলে এসেছিল। কিন্তু অবহেলিত নারীর আত্মাভিমান তখন তার ভেতরে গর্জে উঠেছে। কিরিল যতই তাকে বােঝাতে চাইল সে ততই অধৈর্য হয়ে পড়ছে।-কিরিল এতক্ষণে অনুভব করলাে যে ষ্টেঙ্কার প্রতি তার প্রেম এখনাে অবিচল, সে ষ্টেঙ্কাকে হারালে বাঁচতে পারবেনা। পাগলের মত তাই সে তাকে জড়িয়ে ধরলল- “স্কো—ষ্টেঙ্কা-সত্যি এত করে হয়ােনা” এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে ফেলে ষ্টেঙ্কা চেঁচিয়ে উঠলো—যেন অপবিত্র কিছু ছুয়েছে— “না না তুমি আমায় ছুয়ােনা—ছেড়ে দাও আমি যাব-” কিন্তু কিরিল তখন পাগল হয়ে গেছে। সে ষ্টেঙ্কার কোন কথায় কান দিলােনা। তাদের ধ্বস্তাধ্বস্তিতে সে ঘবের চেয়ার টেবিল সব ইতস্ততঃ ছড়িয়ে পড়ছে—সেদিকেও তাদের দৃকপাত নেই! সেই ধাক্কায় টেবিলের উপরের বাতি পড়ে ভেঙ্গে গেল। সমস্ত ঘর ভয়াবহ আঁধারে গেল ভরে। কিরিল ষ্টোকে দুহাতে জড়িয়ে ধবে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল ! তার সঙ্গে জোরে না পেরে ষ্টেঙ্কা কাঁদতে লাগলাে “লক্ষ্মী—কিরিল—না!-না ! আমায় ছেড়ে দাও—তুমি মানুষ না পশু?” ধ্বস্তাধ্বস্তি করে অবসন্ন ষ্টেঙ্ক। কয়েক মিনিট পর চুপ কবে পড়ে রইলাে...... কিরিলের তখন চৈতন্য ফিরে এসেছে। সে আবার ঘরে আলাে জ্বাললাে। বিস্তভাবে ষ্টেঙ্কার সামনে দাড়িয়ে তার মনে হল কি জঘণ্য কাজ সে করেছে। সে বেশ বুঝলাে যে কোন নারীই তাকে এরপরে ক্ষমা করতে পারবেনা! কিন্তু তার বেশী ভাববার ক্ষমতা ছিলনা। সে সেখানেই তখনি ঘুমে এলিয়ে পড়লাে। সে ঘুমিয়ে পড়লে-ষ্টো ক্রমে আত্মসংবরণ করে—চিঠি লিখে তাকে ছেড়ে চলে এলো- সফল-স্বপ্ন ১০৯ “কিরিল—প্রিয়তম—এতদিন তােমাকে ছাড়া কিছু জানিতাম না। কিন্তু আর নয়। আমি শেরকী বুয়েরাকে নিজের গ্রামে যেয়ে আবার নতুন জীবন সুরু করবাে- তুমি যেন আমায় ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করােনা-ব্যর্থকাম হতে হবে।” ( ৫ ) ৷ বাড়ী থেকে বেড়িয়ে ষ্টেঙ্কা ষ্টেশনে এসেই সেরকী বুয়েরাকের বাড়ীতে গদী আঁটা চেয়ারে না বসে কাঠের বেঞ্চের গাড়ীর টিকিট কিনলাে। সঙ্গে ছােট্ট কিরিল। সারাটা পথ তার মনে তােলপাড় করেছে গত রাত্রের বিসদৃশ ঘটনাব স্মৃতি। কিরিল তার মন প্রাণ জুড়ে রয়েছে—অথচ সে গতরাত্রের ঘটনাও মন থেকে দূর করতে পারছেনা। কী বীভৎস দেখাচ্ছিল কিরিলকে—সে যখন জোর করে••• •• ষ্টো মন স্থির করে ফেললাে ! দেশে ফিরেই জাকার কাটায়েভকে, বলে সে আগের মতই মােটর চালানাের ভার নেবে ; বসে থাকবেনা নিশ্চয়ই। কিন্তু গ্রামে এসেই মন ব্যাথায় জ্বলে উঠলাে—চারিদিকেই কিরিলের স্মৃতি। গােটা গ্রাম জুড়ে যেন করছে কিরিলের জয়গান—আর ষ্টেঙ্কার স্থান কোথায় ? জাকার কাটায়েভের সঙ্গে দেখা করে ষ্টেঙ্কা প্রস্তাব করলাে মােটর চালানাের কাজের। কিন্তু সে উৎসাহ দিল ষ্টেঙ্কাকে এক সম্পূর্ণ নুতন নারী-ট্রাক্টর বাহিনী গঠন করে তার নেতৃত্ব গ্রহণ করতে। সামান্য মােটর চালকের কাজ তার অযােগ্য। জাকার কাটায়েভ কিরিলের এক টেলিগ্রাম দেখালাে-

১১০
সফল-স্বপ্ন
“ষ্টেঙ্কা এলে তােমার সাধ্যমত সাহায্য করবে-কিরিল
এখানেও কিরিল! ষ্টো বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছিল—কিন্তু জাকার
কাটায়েভ তাকে বুঝিয়ে রাজী করলােদলের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে। আফিল
থেকে বেড়িয়ে আসবার সময় তার মনে হল
“আবার নতুন জীবন শুরু করবো—দেবী ধরিত্রী—তুমিই আমায়
বাচিমাে।”

বসত সমাগম ( ১ ) সারা দেশে বসন্ত বিল। নীলাভ আকাশের গভীর নিস্তব্ধতা থেকে শুরু করে শান্তভােয়া নদীর বিস্ফীতি—সবই বসন্ত সমাগম জানিয়ে দিচ্ছে। ভোরের হাওয়ায় প্রকৃতি নূতন প্রাণে সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে। গােটা দেশের জমীতে তখন ফলছে অফুরন্ত শস্য সম্ভার। যেমন প্রকৃতিতে তেমন মানুষের সংসারেও—নিত্য নূতন অতিথি সমাগম হচ্ছে। বিস্ময়ের পর বিস্ময় স্তুপীকৃত হয়ে রয়েছে। গ্রাম্য সােভিয়েটের সম্পাদক মারাফা কিছুতেই জন্ম তালিকা লিখে শেষ করতে পারছেনা। সে গলদঘৰ্ম্ম হয়ে পড়েছে। যে নারীকে সবাই বন্ধ্যা বলে জানে—কি যাদুমন্ত্রবলে যেন সেও সন্তানের জননীত্ব লাভ করছে। এই যেমন—আনচুরকা কুড়িয়ারকোভার গর্ভে নিকিটা গুরিয়ানভের সন্তানের জন্ম! আনচুরকার বয়স প্রায় পঁৱতাল্লিশ বছরের ওপর আর নিকিটা তাে ষাট বছরের বুড়াে ! কিন্তু এর পরে যা ঘটলাে—তার তুলনায় এও তুচ্ছ! তাতে সমস্ত সােভিয়েট জগৎ চঞ্চল হয়ে ওঠে। নিটকা স্পিরিণের স্ত্রী এলেনা প্রথম সন্তান প্রসব করলে মিকা উল্লসিত হয়ে তার বিছানার কাছে গিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছিল-“কিছু ভাবিসনা --ছেলে হয়েছে—পরে ও কাজে আসবে!” একটু পরেই খবর গেল যে এলেনার দ্বিতীয় সন্তান হয়েছে। মিটকা আশ্চয্য হয়ে বললাে-“ঠিক বলছে—তােমার ভুল হয়নি। দুটো ছেলে—কি বলছে?” কিন্তু তৃতীয় সন্তান হলে পড়ে সে পাগলের মত হলাে—তার গা দিয়ে বাম ঝড়তে লাগলাে এদের সে খাওয়াবে কি করে? বাইএর কথা তার কানেই গেলনা যে চতুর্থ সন্তান এই মাত্র প্রসব হয়েছে। সে হতভম্ব হয়ে ভাবছিল- ?

১২ সফল-স্বপ্ন “লজ্জায় মাথা মাটাতে নুইয়ে পড়লাে—এ কী কাণ্ড। লােকে বলবে কী আমাকে? তিন তিনটা ছেলে?” এলেনাকেই এসবের জণ্ঠ দায়ী করে সে ক্ষেপে গেল। “এসব কী করছিস? শয়তানের সঙ্গে রাত কাটিয়েছিলি নাকি হতভাগিনী ? একঝাক পঙ্গপাল বিয়ােচ্ছি যে?” চারিদিকে নানা কুৎসা রটনা হয়ে গেল। যার যা ইচ্ছে গুজব রটাতে লাগলো—কেউ বলছে যে মােটেই চারটে ছেলে হয়নি—একই ছেলের চারটা মাথা। কেউ বলে—কোনটার এক চোক কোনটার মাথায় শিং কোনটার পায়ের বদলে মাছের লেজ। গ্রামথেকে তাই চারজন বিধবাকে পাঠানাে হ’ল সত্য ব্যাপারটা জানবার জন্য। মিটার ঘুম গেছে ! সে পাগলের মত হয়ে পড়েছে কোন কাজে মন বসাতে পারছেনা। ভাবতে ভাবতে মাথার চুল গেছে সাদা হয়ে। অবশেষে থাকতে না পেরে আবাব এলেনার ওপর তন্বী করে—এসব কখনােই মানুষের ছেলে হতে পারেনা একজনের চারটে ছেলে, তুই নিশ্চয়ই শয়তানের সাথে রাত কাটিয়েছিলি। তুই সামগ্রিক চাষের ক্ষেতে না। সেটাই তাের উপযুক্ত যায়গা। বছর বছর গরু ঘােড়র মত দলে দলে ছেলে বিয়ােবি। তাের জন্যে তার আলাদা খােয়র করে দেবে। তাদের পঞ্চবার্ষিকী সংকল্প আছে। আর তা এক বছরেই পূর্ণ করতে হবে তাই বছর বছর অন্ততঃ পাঁচটী কবে ছেলে না বিয়ােলে তাের চলবে কেন? এখনি থামলি কেন? “এমি করলে কিন্তু তিনটের গলা টিপে খালি একটাকে বাঁচিয়ে রাখবাে তখন দেখবে মজা......” “ওদের গলা টিপে মেরে আমাকে জেলে পাঠাবি কেমন? তা হবেনা- বিইয়েছিস বখন তখন তােক পালতে হবেই.. কাঁদতে কাঁদতে এলেনা বলে—“ওদের মারতেও পারবােনা—খাওয়াতেও পিরবােনা•••••• কিন্তু একদিন সিসেভ এসে 'ভােরে তাকে ভালাে-“কইগাে আলাদা চাষী—ত দাও দেখি।* মিটকা আচ রে কারণ খোঁজে... কই তােমার ছেলেদের দেখাও—কেমন হয়েছে সব আমার ছেলে—তাতে আপনার কী? ঐ ওর কাছে যান বলেই এলেনাকে দেখিয়ে দিল। এলেনার কাছে এগিয়ে এসে সিসে বললো “তােমার মত আমেরিকায় একজনের পাঁচটা ছেলে হয়েছে আনন? সিসেতের কথায় মিট কার বুকে সাহস এলাে-তাহলে সেই একা এত যাতনা সহ করছেনা। “আমেরিকায় তারা আমাদের মত সেই পাঁচটা ছেলেকে বেয়া করেনা। বরঞ্চ তাদের নিয়ে কেমন সুন্দর সুন্দর ছড়া কেটেছে। আমরাও এবার দেখবাে। যাও তাে আমার ঘােড়ার পিঠে থেকে বস্তাটা নামিয়ে নিয়ে এসাে— তারপরে মিটকা বস্তা আনতে গেলে-এলেনার পাশে বসে “রাস্তা ঘাট একট, পরিষ্কার হলেই আমরা এদের নার্সিং হােমে পাঠাবে। আমরাই তােমার ছেলেদের যত্ন করবে। একজন ফটোগ্রাফার পাঠিয়ে এদের ফটো নেব। তারপরে সেগুলাে কমরেড ট্যালিনকে পাঠিয়ে দেব। তিনি কি বলেন জানাে—আমাদের একটি আইন করা দরকার যে প্রথম দুই ছেলে কবে মায়ের সান্ত্বনা-কি তৃতীয় ছেলে হলেই সরকার তিন হাজার টাকা দেবে তার জনে। চতুর্থ সন্তান হলেই সে সরকারের কাছ থেকে অন্তত পাচ বাজার টাকা পাবে।” সি'সেভের কথা শুনে এলেনা আনলে বিগলিত হয়ে পড়লাে। তাকে নিজের দুঃখের ও অন্য সকলের বিপের কথা একে একে সব বলে চলল। সিসেতও তাকে যথােপযুক্ত সান্ত্বনা দিলে। মিটুকা বা নিয়ে এলেলিসেত তাথেকে চাটে কল—বিছানার চাদর নতুন পােষাক বের করে তাদের দিলাে। মিটার এগেও এক নতুন সার্চ নেওয়া হলাে।

১১৪ “তােমাকে ছেলের লারপাটি করি তাের এইসৰ উপর নিয়ে এই নাও-এলো দুইশাে টাকা—এদিয়ে আপাতত চও!” ( ১ ) কাতান্নতি মিটা বিখ্যাত হয় পড়লাে! মস্কোর খবর কাগতে শেষ পৃষ্ঠার প্রকাশিত হলাে যে এসেলে চারটা শিশু প্রসব করেছে। তাথেকে সমস্ত জেলায় তাদের খবন্ধু কাগজে ফটো উঠল। তখন গ্রামের সবাই তাদের সমীহ করতে শুরু করলাে। “কি কি করে তােমরা তাদের সব দেখা শােনা করে বিস্মিত গ্রামবাসীরা জিগ্যেস করে। “কেন?—এলেনা তখন নরম বিছানায় শুয়ে থাকে। ছেলেদের জন্যও তেমনি কার বলোবস্ত হয়েছে। আমরা একটা ভাল বাড়ীও পেয়েছি থাক- বার হ। আগে এখানে সব বড়লােকেরাই থাকত ?” সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের সহানুভূতিতেই যে আজ সে এত ভাগ্যবান এটা বুৰেই মিটা মনে মনে ঠিক করলাে আর খুতভাবে কাজ না করে সেও সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রে যােগ দেবে। তাই সে তার ঘােড় নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে হাজির হল। কি দুর্ভাগ্যের বিষয় কৃষিক্ষেত্রের সভাপতি গ্রিক ঝেনকিনতার ঘোড়াটাকে ততটা আমল দিলনা। তবে তারা একেবারে মিটাকে নিরাশ না করে তার ঘােড়াটাকেও নিয়ে নিল। সেদিন বিকেলেই উসজরে মিটকা দুটে গেল এলেনার সঙ্গে দেখা কতে। এলেনার কাছে যেয়ে ব্যাপারটাকে একটু রংচঙি বেশ ফলাও । । এনাে তাকে জিগ্যেস করলাে যে সে তাহলে কোন কে যােগ দিয়েছে।

১১
নিকিটা ওরিয়ানতে-মাইরি বলছি সে নিজেই আমায় ডেকে
নিয়েছে।”
“কি তাৰলে ধু শুধু কীড়া কাটছাে কেন?”
এবার মিটা একটু চমকে গেল। ঐ মাতৃসদনে আবার পরও
সিলেজের সঙ্গে দেখা হওয়া থেকে এলো যেন গড়াটে হয়ে উঠেছে।
মিটার প্রত্যেক কাজেই এখন সে কৈফিয়ৎ চায়। বাধ্য হয়ে মিটক
উত্তর দেয়-
“ও কিনা-এমনিই বেড়িয়ে গেল। কিন্তু বেশ বােঝা যায় যে
সে মনে মনে এলেনাকে ভয় করতে সুরু করেছে।
“অত সােজা নয়—কীড়া এমনি এমনি মুখ থেকে বেরােয় না!•••
-কুঁকে এলেনা জানালাে !
“ত হবে-আমি তাহলে নিকিটার লে না যেতে পারি। কোন
শালা মিথ্যে কথা বলে তারা আমায় একটা দলের ভার দেবেননা
তার বলবার ভঙ্গীতে এলেনা গেল রেগে—সে খেকিয়ে উঠলাে,
তারা তােমার দুই পকেট ভরে দেবে—আমি কিন্তু সামগ্রিক কৃষি ক্ষেতে
যােগ দিতে পারবােনা।” বলেই সে বােম টপে নাসকে ডেকে পাঠালাে।
নাস এলে তার সাথে মিটাকেও বাইরে পাঠিয়ে দিন তবে এলো
শান্ত হল।
মিটা চলে গেলে—এলেনার মনে ভেসে ওঠে সময় অতীতের স্পষ্ট ছবি।
যতবারই মিটকা এসেছে—ততবারই এরকম অব ! সে হয়তাে ফিরে
এসেই মাতমীর ঘােরে জিগ্যেস করতে
“কে বাড়ী কর্তা রে শালী?-*
“তুমি মিটুরী!
“তবে-আমায় জিগ্যেস না করেই কেন অমুক কাজ করেছিল বলেই
এত দুমাহন এনােকে মারতে শুরু করত!, কখনাে কখনো তার হক

১১ থেকে বাঁচবার অমে এলেনা বাপের বাড়ী পাৰি যেতাে কি তাতেও সে কাফে পেতাে না। পেছনে পেছনে সিটকাও সেখানে যেতে! এলো বাবা হয়তাে জামাইএর সঙ্গে ভড়কা খেতে খেতে বলতাে-মিরী এলোকে তােমায় ভগবান দান করেছেন। তুমিই ওর কর্তা-একে বাড়ী নিয়ে যেয়ে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিও। শুধু মোেেনা না যেতে চাইলে গাড়ীতে বেঁধে নিয়ে যেময়।” মিট্ৰীও তাই করতাে। তার পর থেকে এলেনা নিরীহ জীবের মত থাকতাে। এর আগে তাদের কয়েকটা ছেলে হয়েছিল কিন্তু তার একটাও বাঁচেনি। এবার তাকে প্রতি আগারে আনা হয়েছে। বড় বড় সাজানাে সব খােলা ফেলা! প্রচুর আলাে বাতাস। কয়েকদিন আগেই-তরুণ পাইয়ােনিয়াবা এসে সাম্যবাদী মাতা’কে ফুলের তােড়া দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে গেছে!... ক্রমেই এলেনার চোখে নতুন জগৎ খুলে যাচ্ছে। আগের সমস্ত কদৰ্য্য ভাব লােগ পাচ্ছে। তার যায়গায় দেখা দিচ্ছে মাতৃয়ের গান গর্বনিমের ওপর প্রগাঢ় আকাশ! সেই বসন্তেই মিটকা যােগ দিল সামগ্রিক কৃষিত্রে। বীজ বপনের সময় এসেছে। সকলে তাই নিয়ে বাস্ত। ষষ্ঠ দলের নেতা এপিথা চ্যান্টসেত কাউকে না বললেও নিজে মনে মনে ঠিক করেছে যে অন্তত নিকিটার চাইতে বেশী ফসল করতে হবে। অনেক অমীতেই তখন বীজ বপন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু নিকিটা তখনও বীজ বপন না করে অমী চছে। কেউ তাকে উপদেশ দিতে গেলে সে যায় রোগ “দেখাে আমায় রাগিয়ােনা। ষ্ট্যালিনের সঙ্গে তামাসা করবার এ আমি বলে আসিনি যে বিধায় তিনি এ ফল ফলাবাে! আমাকে নিজের মন কাম করতে দাও। আমি দেখেছি পরীক্ষা করে যে গান এনে ঠা। এখন এখন ল ভাল হতে পারেনা। সে তাই ের।

১১ পৃথিবী আচ্ছ! নিটোল তী প্রথম শীলের পর শেন বসরে এলিয়ে পড়ে বিছানায়—পৃথিবীও যেন তেমনি বিল! সে যেন নিকিটাকে আনান করছে ইজিতে।•• D অনেক আগে কিলি ভেবেছিল আলই নদীতে একটা বাঁধ দিয়ে কৃষি ত্রে এ যেন ভাল বলোবা করার কথা। লােকে তখন তার যুক্তিতে বেশ আস্থা স্থাপন করেনি। তবে আজ আর সেটা এ পরিকল্পনা নয়—এৰাজনীয় হয়ে পড়েছে। আগে যেটা পড়ে চাবীর অাই ছি—আজ সেখানে বিরাট কলকারখানা গড়ে উঠেছে। হায় হাজার লােক খাটছে! একটু দূরেই চমৎকার উড়ো জাহাজের আজ্ঞা করা হয়েছে। তার পাশেই ইলিম সংয়ে বড় সিলেটের কারখানা। সামগ্রিক কৃষি েত্রের উৎপন্ন ফল মূলের ক্রেতার সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাই, কমিক্স কর্তাদের নজর দিতে হচ্ছে বেশী উৎপাদনের দিকে। আর উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি করতে গেলে আলাই নদীর বাঁধ বিশেষ প্রয়ােজন। তাই আবার সকলে উঠে পড়ে লেগেছে নদী বাঁধতে। কি তাতে প্রচুর খরু। অন্তত তিন হাজার শ্রমিককে খ, শাল, কোদাল নিয়ে কাল করতে হবে। এছাড়া, ঘােড়া, সিমেন্ট ইট-পাটকেল তাে থাকবেই। মােট কথা সরকারী সাহায্য না পেলে সামগ্রিক কৃত্রি নিয়ে থাকে এ দায়িত্ব নিতে পারেনা। - তাই নয়। নানা ডি গলে সবাই আবার এমতও নয়! ৰা লােমী ফার্ণ কত গজ কে নিয়ে কাজ করে তারা দেখলে যে বলি তারে মনে না যায়গা নষ্ট হবে। তারা তাই চায় পুরুষ নয়। দু ত্রি বা বল বিক্রীত সেই সামগ্রিক চাই ৰাৰ দেয় !

১১ লঃ কিছুই সিলেতের নজর এড়ায়নি! সে তাই সমস্ত চাষীদের ধরে নানা রকমে বােতে চেষ্টা করছি-নে এ খাত দেওয়া ভাল। বলে এসে জমে হেলে বুড়ো সকলেই বীর পক্ষে মত লি। সকলের সমবেত চেষ্টায় সেই বাঁধ দেওয়া হয়ে গেলে সেখানে দেখতে খেতে । সাতটা ল গড়ে উঠলাে। কেউই আর তাতে আপত্তি করলােনা। তুল আপত্তি উঠলাে কি থিয়েটার ঘর করা নিয়ে। এভাৰ ছিল প্রায় তিন হাজার লােকের বসবার উপযুক্ত স্থান নিয়ে থিয়েটার ঘর করা হবে। এবং খিটার ধর করা সম্বন্ধে কোনও মততে ছিল—তবে কোন গ্রামে করা হবে তাই নিয়ে হচ্ছে বিরােধের মুল। সকলেই চায় তার গ্রামে হওয়া। সিভাশেভের বাড়ীর সভায় হতে পােতমাযারে এতিনিধি বলছে- আমাদের গ্রামের অতীত ঐতিহের দিকে নজর রাখলে সেখানেই এটা করা উচিৎ ! পারতের শাহ আমারা আমাদের গ্রামের উপর দিয়ে গেছিলেন। শুধু তাই নয়—এখানের গা পাহাড়ে ভাল মাটা পাওয়া গেছে। শীগগীরই এখানে বড় শিল্প গড়ে উঠবে তখন এর প্রতিপত্তি আরও বেশী হবে।” তখন হয়তাে আলাই এর প্রতিনিধি উঠে বলতে-নাদি কাল থেকে এই হচ্ছে বাজারের আজ্ঞা। এখানে সকলকেই আসতে হবে। এখানে শিল রয়েছে এবং এটাই সব যায়গায় কেন্দ্রে অবস্থিত। অতএব এখানেই বিনেটর ঘর হওয়া বা নী! এছাড়াও আইএর অতীত ঐতিহআছে।” অবে এশিখা উঠে সৰ সমাৰ সমাধান করেছিল। থিয়েটার এর কতে করা ইক। আমাদের অতীত ঐতিহের দরকার নাই। বিপ্লবী ইতিহাসে কীৰ দাৰ বেণী। সেখানে চমৎকার পার্ক রয়েছে। যায়গাও ভাল। মূল গ্রামের লােকেরা মােটরে, বাসে যাতায়াত করবে-তাহলেই চলবে। ফলে বিচার এর সাতে হল। সীর হল রুইয়া- লােগো বলেন প্রধান নগরীর সাথে তার তুলনা চলতে পারে।

চিলম
( ১ )
* প্রেম কাকে বলে? অগালী সূর্বের স্নানান অমি থেকে
আহত প্রেম কণা দিয়ে পূর্ণ : আমার বিরাট উন্নায় প্রেম উপহার দিচ্ছি
তােৰ। বরার মত নিট, যার শত —এ এম।”•••
-লে গান গেয়ে গেয়ে নদী বেয়ে খালি! গার থেকে রােজ
গান গাইতে শুনলেই ঠো বেড়িয়ে আসতে মােহাবিষ্টের মত! ভার
প্রেমেরই বর্ণনা করছে যেন জেলে! গেলে তাকে পাগল করে দেয়।
তার টে যেতে ইচ্ছে করে ঐ দূরের নীলাভ, কালের মধ্যে—যেখানে
গাছে গাছে ধরেছে অফুরন্ত ফুলশাখে শাখে ডাকে পাখী! ঠে
নিন সহ করতে পারেনা। তার ভয় হতাে যে হােট কিনিকে ইতাে
পাড়ার ছেলেরা পিতৃ-পরিত্যক্ত বলে জানাবে! কি সুখের বিষয়
তাতে হয়নি সেই সকলের নেতৃত্ব করতে শুরু করেছিল। একদিন
সবাই তাকে জিগ্যেস করার কি?
ছােট্ট কিলিও ঘাড় উঠিয়ে উত্তর দিলাে
সেই তে ফ্যাসিষ্টদের মাথা!” তাছাড়া ফিৰিলের গল্প করবারও
ক্ষমতা ছিল অত। সন্ধ্যে বেলা হয়তাে তার পর মা ছেলের
নানা গল্প নিয়ে এমন গল করে রাখতে যে কিসিল না হলে তার এক
ও চলা আর মন ভালাে ।
টোকেও কেউ কোনওদিন অন করেনি। অথচ এখমে টার কত
ভ ছিল যে বােধ সকলে ী পরিত্যক্ত বলে তাকে উপ কৰে।
বর পাড়ার সব মেয়েরা তার কাছে সকালে নিলে না রবে

উপদেশ নিতে আসততা! কেবলমাত্র ট্রাক্টর চালকদের দৃষ্টির সামনে টেকা
এই চিত হত। একদিন সে নিজের কানে এলাে--কে যেন পেছন
স্থা এৰি সুৰীয় পেছনে যাের যায়—একে নিয়ে আমিরাত
কাটাতে বা!ি..”
কি আমি একজন তাকে ধমকে উঠলাে-
“চুলও তােদর কাটা নয়! কাটা হচ্ছে সব পুরুষদের রী
লাগানাে মেয়ে ! মুখে কোনও কথা আটকায়না-কারণে অকারণে হাসে।
একদিন তো কোনাে
“কি করছো তুমি কাটকা? মাতালের মত এমন করে বেড়াচ্ছ কেন?
এন এর মেয়ে।
সে তার উত্তরে কিছু না বলে পটাপট রাউজের বােম খুলে তা
বের করে দৌড়ে চলে গেল ট্রাক্টর চালকদের ময়ে!—বলে গেল—“আমাদের
কোনও তা নেই।
“না নিয়েই আমরা এক নই.. টেকা মনে মনে ভাবলাে
কি সেই সেলের গান। তাতে ঠো তুলতে পারছেনা।
( ২ )
হঠাৎ একদিন
বড় মশা সাদা হয়ে গেল। সেই বাকে
চল ত চ র তের এমন ক্ষতি করলা যে তা বলা।
সে বিএড নিয়ে ক্যাটারপিলার টাই দিন অশী চৰা
। কি না তব গল ভাবে সামলেনামায় দে আরও
িিফন দেয় না শান্ত করলাে।

এখন আর আগের মত প্রত্যেকের জমীয় আলাদা আনা
সীমানা নেই। সব আল ভেঙে নো হে; সু তখনাে বা
ভাগে বিভক্ত হয়েছে সমস্ত নীটা। এখন শীতে ঢুকতে যেতেই সাইন বাের্ড
টানা-অমুক বিগ্রেজে এলা!
তারপরে বরফ গলতে শুরু করলে টেকা মাথায় মাল হে তায়
দলবল নিয়ে চললল ফেতে! সেই অমাট শীতের মধ্যে ট্র্যাক্ট চালানাে
সােজ কথা নয়; তবু টেকার মনে হচ্ছিল যেন এই জীবনই এখন সে চায়—
তার প্রথম জীবনের সষের বৃত্তি-জায় এখনকার ট্রাক্টর চালানাের মাঝে
কয়েকটা দিন যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। গ্নের ভেতর দিয়ে কেটে গেছে
সে দিনগুলাে। এখনই সে তব করছে জীবনের বিরাট সার্থকতায়
উন্মাদনা!
ঠো চলে যাবার একটু পরেই কিন্নিলের কু ভাঙলে। অসমত
ঘুমের ঘােরেই সে ষ্টেঙ্কাকে জড়িয়ে ধরতে যেয়ে হতাশ হয়ে জেগে উঠল।
তননা সে ভাবছিল যে তাে টেকা পাশের বরে ভয়ে রয়েছে। কি
টেবিলের ওপর চিঠি পেয়ে আর কোনও সন্দেহ রইলাে না। কিনি খুব
মনােযােগ নিয়ে পড়লে চিঠিখানা !
“তবে ফেনির সঙ্গে অবৈধ মেলামেশা বির কাগ করেনি।
তুমি এমন করলে?—সত্যিই তাে আমি হলেও কালকায় অপরাধ জীবনে
না করতে পারতাম না।
টেন্ত থেকে নিজের ছবি শৰ্য সরিয়ে ফেলছে। সেখানে রয়েছে
ফিরিদের টি-শার তার চে লে—এখনাে তােমার চাৰা
ফিলি।”

১২২
‘সত্যিইতাে কিনিলে তেমকার চা বােৰ এনাে আগেরই মত।
না, এভাবে বেনাৰীনে ধংস করতেই হবে- কিলি ভাবে।
কিন্তু তবু কিনিলে সােতি নেই। এক সময় নাতি আনি
প্রবল হয়ে উঠছে কিলি কারও কাছে ছােট হবেনা কোনও দিন!”
আবার মনে হয়েছে কেন এত দূরে চলে গেলে তাের ছেড়ে থাকা
যে কত কঠিন তাতে আনন!
আয় রে এসে কিলি দেখলে যে সে লেপমুড়া দিয়ে হয়ে গেছে।
বিম্বিলের আসা টের পেয়েই পাকা গিন্নীর মত আকা বলে উঠলাে
তােমারইতাে না তার মার কাছে চলে গেলেন। আমরা তােমায় কত
ভালবাসি আয় তুমি কি করনা ! তুমি পেটা বুলো নিশ্চয়ই!”
ফিলি তকে বােয়া-না পাগলী তা নয়—এর আগে আমি বা তাের
মা কেউই দায়ী নই।
অলিয়ে আত্মকা উত্তর দেয়—তাহলে কি কোন ভগবান?” ঠাকুরমা
“
যে সব সময় তার কথা বলেন।
তার চাইতেও খারাপ-কিরিল উত্তর দেয় ।
-আমি কি বিয়ের সময় সােলা চুক্তি করে নেবকেউ কাউকে
খাটাতে পারবেনা। কেউ যদি টায় তবে তাকে বিদায় দিতে হবে—-ওসব
চালাকি চলবেনা!”
কার বর থেকে বেরিয়ে ফিরি বোয় মন গেল! মন ভাল করবার
উপায় না থাকায় সে বি। কােরে কাজ করা ঠিক করলাে।
তার হাতে তখন একটা কাজ ছিল। কয়েকদিন আগেই সহ পরিষ্কার
কৰ পৰিকল্পনা করা এবং অ্যানিসিপ্যালিটীর ইনীয়ার যে সমস্ত
পরিকল্পনা উপাণিত করে তাতে অনেক টাকার মার। কিলি তাই সব
বায়নের এক বৈঠক ডাকিয়েছিল। সেখানে নিয়ে খুব ফিটফাট হয়ে
লে যায়। বেশীর ভাগ নারই নােকা কাপড় চোপড়, বড়ি না

সন কামিয়ে এলে জিয়! কিফিল তাদের সবাইকে কঠিন বিপ বাণে বিদ্ধ করে দেবার তা আলা আপনি সৰ বাতটি শরিয়তে থাকে! ইনিয়ারের পরিবার এবানই হয়না। কাজের মধ্যেই বিলি শান্তি পেল! ভাগ্যক্রমে বােগান তখন তে যায় কিরিলের আরও সুবিধা হল। সে দিন রাত কাৰে দূৰে থাকলাে। এমন কি কেনিয়াকে দেখলেও সে এড়িয়ে যেতে লাগল তার সামনে পড়লে কিরিমের নিজেকে অপরাধী মনে হয়। একদিন কেনিয়া কার্নের অবকাশে কিমিলকে সানা নেবার ছলে নিয়েছিল- “দরকার হলেই আমি তােমার পাশে দাড়াবে—ফিরিল তুমি কি ভেবােনা—আমায় জলেই আসবে।” কি কিরিল তাও চায়না! (৪) ঠিক সেই সময় চিত্রকর আরণােত সেখানে এলাে! সত রাশিয়া কুড়ে তার জয়গান! তাকে নিয়ে কয়েকদিন কিরিলের বেশ কেটে গেল । কিন্তু তারপরে আবার অবসাদ! একদিন আরান্ডােতের ঘরে যেয়ে কিরিল বলল। সে তখন ছিল। পাহাড় ঘেরা বনের পথে কয়েকটা ন কমণী চিত্র ! সবাই খালের উপর মে রয়েছে। এক একজন এক এক অনীতে আছে—আয় খুব ভীষণ ভাবে কোনও বিষয় বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছে। একটু ঘুরে একটা আরাম খেলার এক অপষ্ট চিত্র। সে ছবিসােয়তাব ফিরিয়ে বহু চেনা ন - “কেনিয়া না। তাকে তুমি দেখলে কেমন করে?

১২
সফর
তাকে নেছি নদীর ধারে। নিয়ে অনেক দেই না। তিনি
বখন নাতে এলে নামবেন ঠিক করে পাড়ে একটু ভয়ে বিশ্রাম করছিলেন
সেই সময় আমার নজর পড়ে যান। তাই অপূর্ব সুবােগা না হরি
সনে মনে মনে করে রেখেছি। তাকে দেখে আমি তাকে এগিয়ে যাই
কিন্তু তিনি ললিত না হয়ে আমার দিকে বাড় বেকির ঠিক এমনি করে
তাকালেন। সে দৃষ্টি কিন্তু আমার এ হি। যার প্ন তিনি
সেলিন-তার খা বতে ভাবতে তিনি আমার দিকে তাকালেন।
অপূর্ব সুন্দরী-কি কেমন যেন নিজীব! বােহ আজ পৰ্যন্ত কোনও
যাহরের দেখা পাননি যে তার মনের ঠোর ছুতে পেরেছে।
হতে পারতৰে আমিতাে জানি তার কুমারী নেই।
“তা লাইবা!—প্রথম প্রণয় পাই সব সময় জীবন সঙ্গী নাও
হতে পারে!
সে যাকগে আরাম কেদারায় কে?
ও হবে কোনও মামা বুঝলে?
“ঠিক না-
“দেখছােনা এত বিজ্ঞৰ-বংস টাইকান, দুর্ভিক্ষের চাপে পড়ে আমরা
ভুলে গেছি যে রাজনৈতিক মত ছাড়াও মেয়েদের অ এত ছে—
গত-মেয়ে সবচের সেরা কর্তব্য।
ও ওটা যে তােমার অটো ইনিজের মত কথা হল?
“ন-ঠিক তা নয়—সে বলে যে মেয়ে মাত্রেই পুরুষের চেয়ে হন তাই
তা সে ন এর ঘর ঝাড়া, ক আয় মীর যৌন
তোলে! কিনি তা কনি। তােমার মন নাই। বােমে মে
খালাকের ভেতর কে যেখনি তাতে তার মেয়ে যাবে
কিতি করতো। এতে এ সব জিনিষের চেয় নৌ দুখি ছিল

উচুস্তরেয় জিনিষ। সেটাই আমাদের আর্শ! আমি চাইনে অ সব জিনিষের সঙ্গে মেয়েদের মাতৃক্ষের পূজা-এই মাতৃথই তাদের সুর বেড়াল থেকে তফাৎ করে। আমি এই ছবিটা ভালাে গভিনী মাতায়। বুর্জোয়া সমাজে গর্ভবতীকে সবাই দেখে বীভৎস দৃষ্টিতে। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সৌন্দর্য্যের ধারনাও বদলায়! আমাদের সাম্যবাদী সমাজে গর্ভবতীই হবে সুন্দরী ••••তবে আমি এখনাে ঠিক তেমন মেয়ে দেখিনি—যাকে কল্পনা করে ছবি আঁকৰে। অনেক গর্ভবতী মহিলাকে দেখেছি—তবু তাদের ভেতর আমি যা চাই তা পাইনি !” কিরিলের মনে পড়লাে ষ্টোর কথা। বন্ধু তুমি সােজা সেরকী বুয়েরাকে যাওসেখানে ট্রাক্টর পািলকের কাছে চিঠি দিয়ে দেব। সে তােমাকে কয়েকটা চমৎকার মেয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে।” মারণােত তাই করলাে। } (৫): আরণােত সেরকী বুয়েকে চলেছে। মঝে থেকে অট্টাখানে খাবার সও ফিট চওড়া রাস্তা। দুপাশে আল ভাঙা গমন শত কাে- বাধা বন্ধ হারা ! কি অপূর্ব দৃৎ! শিল্পীর চোখে শাশ্বত সৌন্দৰ্য্য। কিছুদিন আগেই মস্কোর বিতর্কের কথা তার মনে পড়লাে। সেই সঙ্গে ইয়োফ এর উপদেশ পালাও এদের বন্ধুতার কাছ থেকে মেয়ে দেশের সামগ্রিক কবি কেলকারখানা-মাঠ আট থেকে কার আৰী ৰােগার কর! এখানে থাকলে মারা বাৰে ।-- তাই যুক্তি নিয়ে সে বেড়িয়েছে। দেখতে দেখতে আণােত সে বুয়েকের কৃত্রি এলে পড়লো।

টক এটা বিরাট স্টালিনাইট ট্রাক্টর চালাছে!আরভেকে
নেই তার নাম বেড়ে গেল।-কাটা তাকে ডেকে পাশ
যােত গ্যিস করলো-
কন্দিন তুমি টাক্টর চালাচ্ছে?
ক্যাথা নােড় অবস্থা থেকেই।”
মানে?
মানে বুঝলেন না-মায়ের দুধ যখন থেকে খাচ্ছি তখন থেকেই আমি
ট্রাক্টর চালাই-এবার বুঝলেন ?বলেই কাটকা হেসে উঠলাে। কিন্তু
আণলােভ ঐ হাসিতে যােগ দিলনা। একটা অন্য জিনিষের ওপর তার দৃষ্টি।
কাটার নজর তা এড়ালেনা••
“ঠিক নজর করেছেন দেখছি! এইতাে আমাদের ব্রিগেড নেত্রী!
বেশ টাটকা মাল অনেক দিন মানুষের ছোঁয়া খায়নি—মাননা একহাত
দেখুন গিয়ে।”...
“কি অসত্য তােমার কথা গাে?”
আমি খারাপ তাতে আপনার কি? আপনি ও তাে চাচ্ছেন এক
নেও সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে মজা করতে? সত্যি না? যাননা তবে এর
কাছে বেশ টাটকা।”..
ষ্টে তখন পুরুষের পােবাকে পুরুষালী ঢঙে পথ দিয়ে এগােচ্ছিল।
আৰনােত থাকতে না পেরে এগিয়ে যেয়ে অভিনন্দন করলাে কিন্তু
এখন প্রায় বানাতে যেয়ে যেমন ঋণী থারিয়ে ফেলে, বাবড়ে যেয়ে
বাতে কালে সেও পেনি অবাক হয়ে চেয়ে মইলাের তার মনে হতে
লাগল—এই আমার ছবির মা হবে। এতেই আছে মাত্র। এই

১২৭ (৬) , ঠো চলে যাবার পর থেকে কিসিলের মা ট্রোয় সব কিছু নেবার চেষ্টা করলাে। বাড়ীটাতে অনেক বার হওয়ায় বুড়ো বয়সে তিনি সব দিক সামলাতে পারছিলেন না। ক্রমে ক্রমে ফিলিলের মে নানা এনীয় জিনিষের ভীড় কমতে থাকে। গােটা বাড়া যেন কেমন অপরিহর আকার নেয়। তবু কিমি সাহস পায়না বাইরের কাউকে তেকে কা করাতে। তার ভয় হয় পাচ্ছ সে যেন তাদের গোপন কথা সবাইকে লে হাকাশ করে তােল! নতুন কাজের চাপ কমে গেলে কিরিলের জীবন দুর্বহ হয়ে উঠলাে আনুষ্কাকেও এখন বাড়ীতে পাওয়া ভার। সে তার তরুণ পাইওনীয়ার কাল নিয়ে ব্যস্ত। চোরা কিনিকে বাধ্য হয়ে মনমরা দিন কাটাতে হচ্ছে। একদিন সে বসে খবর কাগজ পড়ছে। চারিদিকে সােভিয়েট ইউনিয়নে যেন প্রতিবােগীতায় মহড়া লেগে গেছে। লগা উপত্যকায় ব্রিগেড নেতা পােলান সতেরশাে বিঘা জমী চাষ করেছে এক ট্রাক্টর দিয়ে। কে বিদায় তিনশাে কুড়িমণ ফসল ফলিয়েছে এই সব ! তাদের সবাইকে ছাড়িয়েছে নিকিটা গুরিয়ানভ। সে করেছে তিন তেতালিশ মণ। একটু ওটাতেই নজরে পড়লাে ষ্টোর প্রশংসা। সেও অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। গােটা সােভিয়েট রাষ্ট্র থেকে তার প্রশংসা হচ্ছে। এমনকি সেও সেই সমস্ত প্রশংসা পত্রের উত্তর দিয়েছে! এক আর্মেনিয়ান সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রের নারীর চিঠির উত্তর দিচ্ছে টো- “অন্য সবাইর মত আমিও মানুষ। সকলেই আমার মত কিংবা চয়ে বেশী খাটতে পারে। আমিও আ সবাই মত পাতা, ক্যুনিজমের ভালবাসি। আমার একটা ছেলে আর এক আমি সংসারও করি এবং কাজও করি তাই দেশের ১২ সান করছে। কাজের মধ্যে দিয়েই আমরা জীবনকে অনুভব করতে চিঠি পড়ে কিনিলে মন খারাপ হয়ে গেল। সে বুঝল যে এ ষ্টোকে ফেমাননা অসম্ভব। তবু সে তাকে ভুলতে পারে না। হঠাৎ কাগজের কোণের একটা খবরে তার মনটা অন্য দিকে ফিরলাে- প্যালে ইয়াকুনি, নিকিটা বেল ও আইভান সিলােডিল তিনজনে মিলে বহুদুর এবােপ্লেনে সফর দেবে। তাতে নতুন করে পাভেলের কথা মনে পড়লাে। নাটশা মারা যেতে প্যাভেল পাগলের মত হয়ে পড়েছিল। সেই সময় কিরিলের সঙ্গে দেখা হয় হােটেলে।—তখন প্যাভেল বলেছিল- “একবার কোনও বক্তৃতায় এক সাহিত্যিক প্রেমের কথা তুলতেই আমি তাকে থামিয়ে দিয়েছিলাম যে এটা বুর্জোয়াে সমাজের ধ্বংসাবশেষ ; কিন্তু এখন আমি অনুভব করছি অঙ্গ তিনি। নাটাকে আমি ভুলতে পারছিনা—এটাকি অন্যায় হচ্ছে আমার? আমায় চুী দিন—আমি একটু আকাশে উড়বাে।-- কিলি সেই অনুরােধ রেখেছিল। তাই প্যাভেল লেনিনগ্রাডে কি নিয়ে আজ দূরপাল্লায় উড়তে যাচ্ছে। কিলি তৎক্ষণাৎ তাকে টেলিগ্রাম “প্যানে যাবার আগে নিজের দেশে এসাে ঠিক তখনি ইগার কুয়েভ এসে তাকে কি বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সে ইতস্তত করছে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর সে বললে যে পরদিন জিকা সঙ্গে তার বিয়ে। তাতে কিনিকে না থাকলে চলবেনা। কিরিল রাত হল। কিন্তু সে চলে গেলে কিলি ভাবতে লাগলাে আগতে তাে সবাই সব নতুন সবার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলো-সে কেন তা পারছেনা। ফিরিল জাবে ফেনিকে যে কিরকম—কি মন থেকে সাড়া পায় না।

নিবিৰ কিরিইনের বি এ হামলা ও বই লােক এসেছে সে বিয়ে। ঘরের এক কোন ফি ও হয় বলে । ভাল লাল পােষাকে বিকাকে কে সেদিন। সেই কােফিলিটে ভরে শ খেল। তারপরে গাড়ীতে উঠে এলােকে অনেক চল! কিছুক্ষণ পরে আবার বললে নাসের বুলােকেই বলেই সে সােলর বসলাে গাড়ীতে!••••• ( ৭ ) বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের পিপল কমিশার কর্তৃক প্রদত্ত উপহার দেওয়া সেই বড় নীল গাড়ীখানা করে অন্ধকারের বুক চিড়ে কিলি সেক্স, বুকের পথে চলেছে। ঐ পথেই প্রথম পিটারের সময় ক্যাপ্টেন তাতিসচেত যােডায় চড়ে যাতায়াত করতো। এখন পিটার যখন রাশিয়াকে পালিয়ে নতুন করে গড়তে চাচ্ছিলেন, তখন এই কাপ্টেন তাতিশচেভ এখানে এসে এক তামার কারখানা খুলেছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল যে উপযুক্ত বেতন রীতিমতলবে পাওয়া সতেও সমত সৈন্যরা তামার কারখানার কাজ ছেড়ে দিয়ে ডাকাতি শুরু করে দেয়। তখন ক্যাপ্টেন তাতিচেভ তাদের ধরে হাঁ শান্তি দিতে কালি দিয়ে। নার ভয় দেখাতেন আরও ভয়ঙ্কর পারি-খা নাক কান খেটে মা মানুষকে মাটীতে পুতে ফেলা। সেদিন্ত কারখানা করতে দেয় না। ধুতে ধুতে অগণিত মানুষের হাড় বেড়িয়ে জার আদেয় নি অত্যা- জকে কী লি । নিল এই সময়ই ভাবছিল অপু নিজের ভেতরের অলিশ:সেই চিন্তা ষ্টোর কথা চাপা দিতে। কিন্তু সে যাই..ভা না কৰি

সৰ
ক না কেন-ফুয়ে ফিরে সেই রে ভাবনাতে তাকে আসতেই হয়।
এনাে তার মনে হল একবার যদি ঠোর দেখা পাই যতদূর থেকেই
না কেন তাতে তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবােই। সে কথা মনে
হতেই ফিরিনের এনা পা মেলে। সেনা করে যে টোকে পাশ
বপিইেলে গাড়ী চালাচ্ছে।
বাৰা শখর ওপর দিয়ে কিরিলে পা চলেছে। পেছন থেকে
এ গিয়ে তার উপর গাড়ীতে চাকায় শো শো এ শোনা যাচ্ছে।
তােরে এখার কেটে যাতে নাতে দিনের আলাে দেখাচ্ছে। দূরে
একলা লাশী উড়ে এলে পায়ে বিলে বসলাে! আর সামনেই বিশাল
বিক্রি হয় জিগ্যেস করলাে সফর-এ কোথায় নিয়ে এলে
“কেন? সেরকী বুয়েকের পথে। সামনের এটা যে আলাই নদীর
ও বাখ বেল হে!
তাই বল—এটা তাে আমারই যুক্তি-কিলি মনকে অবােধ দেয়।
সেই ধারে চড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য পাখী! ফিনিল শিকারের
পাগল হয়ে উঠলাে। কিন্তু উপায় নেই।
আশে পাশে কেউ কখনাে এতবড় গাড়ী পথ দিয়ে যেতে
দেখেনি! তাও এত জােরে, সবাই তাই ভাবছিল—কে এমন পাগলের মত
গান চালাচ্ছে।
কিরিল জনতােনা যে সে ভয়েই
কিকি জানােনা যে সে ভয়েই ফেলে আবার গান ধরেছিল-কেমন
করে মিত বি এসেছিল তার কাছে। সে তখন আল টেনে অবশ হয়ে
পড়ে এসে পড়েছে আয় দয়িত আসছে সেই সময়ে। প্রিয়ায় পদাঘাতে যুটে
উঠেফুল- সৌমত।

ঠেকা তায় পুরুষালী পােবা ছেড়ে তরী শীয় কোমল ক পরেছে।
ঢের মত চুপি চুপি সে অঙ্গিয়ে চলেছে গানের তালে! মনে মনে
৩ন করছে-
“সি। আমার কোন দোষ নেই—তবে? কিলিকা
দুটো নামই তার মনে এগিয়ে যায় ঐ লে নৰাত কি
সর্বনেশে গান গেয়ে যাচ্ছে। এক পাগলঃ যাচ্ছে। যা টেক
চলেছে! সামনে ফেলা যায়গায় চেয়ী গাছের এক একটা বুক
সেখানে রয়েছে এতে। কালই সেটাকে বলেছে তােমার মত
মেয়ে কোথাও নজরে পড়েনি-আমি তােমাকে দিয়েই মাত্র প্রতিমূর্তি
বাে।”
সে তাকে আরও কত কথা বলেন, বিয়ে কত গান।
।
আরণমােতর গল্প শুনতে শুনতে না নিয়ে গলিয়ে ফেলেছে। গল্পের
ঝোকে দুজনে চলতে আর করলে এতে হল না পেয়ে আৰু
টোর একটা আঙ্গুল হাতের মুঠোয় নিয়ে আছে। আর ঠো ভেবেছে
“কি না ।
আর কি চমৎকার ভেবেছে কারণ।
তারপর তারা কিবিনের গল্প বলে। ষ্টো তার ভেতর দেখতে
গৎ জানা লােকের প্রতিচ্ছবি! মেলে কঠোরের পুত ক্ষণি
যে তাকে নিজের পায়ে সমান করে দেখে। সে আমের পূ করতে
সুরু করলেই কতবার ঠোর মনে হয়েছে তার মাথাটা বুকের কাছে
টেন নিয়ে আর করতে!
কি এখন সে তার কাছে যাচ্ছে কেন? দােলিবকে ধু বার করতে
তার খেলা বেশী না হওয়াই ভাল। কারণ কে জানে কখন
কোথা থেকে কি রে পাড়ায়

সফল দুরে ভলগার পার ধরে কে যেন এগিয়ে আসছে। প্রথম প্রত্যঙ্গী আলাে পড়েছে তার গায়! টেকা দৌড়ে গেল তারদিকে এগিয়ে-বেসিফ। আরতােভ! তুমি তাহলে ঘুমােওনি?” না—ঐ ছেলেটীর গান শােন, তেঁাষ্টেঙ্কার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে ধরে সে গান শুনতে লাগলাে। ষ্টোর অজ্ঞাতে অ হাত দিয়ে সে তাকে জড়িয়ে ধরলাে ! ঠিক সেই সময় নীচে বিরাট নীল গাড়ীটা এসে মুহূর্তের জন্য থেমেই আর হুশলে বেড়িয়ে চলে গেল! সেই দৃশ্য কিৰিলের মনে একে রইলাে চিরদিনের জন্য। পাগলের মত কিলি কারখানার কাছে এসে ঘােড়ায় চড়ে পাহাড়ের বারে চলে গেসেখানে যেয়ে আগের অভ্যেস গত বােড়া সমেত পাহাড়ের চুখেৰুে নীচের নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লাে!•••••• ( ৮ ) অতর্কিতভাবে লাফ দেওয়ায় ঘােড়ার পর ছেলে সে মারা গেল। কিজিল ও অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর তাকে পুরাে সাতদিন বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। তখন সারা সােভিয়েট রাষ্ট্র থেকে সহানুভূতি এসেছে। মস্কোয় সরকারী দপ্তর জানতে চেয়েছে যে ভাল ডাক্তারের সাহায্য প্রয়ােজন কিনা! তাহলে উড়ে জাহাজে করে ডাক্তার পাঠান হব। রুশ পাইয়ােনীয়ারদের নিয়ে আনুষ্কা এসেছে কিরিলকে ' ধমকাতে। কেনিয়াও এসেছিল তাকে দেখতে। সে ঠাট্টা করেছে কিরিলের লাগলামকে। এসবের কিছু দরকার ছিলনা সে বলে! আমি ষ্টেঙ্কাকে টেলিগ্রাম করে দিয়েছি আসবার !”

1 “না সে আসবেনা” কিলি সর্বজ্ঞ মত এবাৰ ! কেনি চলে গেলে কিলি তার মাকে জিগ্যেস করো তুমি বাবাকে ভালবাসতে “তা না তাে কি। সে যে তাের বাবা! না মা আমি তা বলিনি, আচ্ছা তুমি কি বাবাকে এত ভালবাসতে যে তাকে না দেখলে একদিনও থাকতে পারতে না?” মুহুর্তের মধ্যে তার মার চেহারা বদলে গেল। তিনি অতীতের স্তন জগতে প্রবেশ করে লুকানাে জিনিষ বের করে আনছেন! দুই হাঁটুতে রয়েছে দুই হাত! দূরে কার সঙ্গে যেন কথা কইছেন “কি হয়েছিল আনিস—তাের বাবা ছিলেন সৈনিক! গােটা গাঁয়ের ভেতর তার নাম ডাক! সব মেয়েরাই তাকে বিয়ে করতে চায়। আমরা তখন দুখাকার সাথে একই ঘরে থাকতাম। তাের বাবা সেখানে আমার কাছে যেতনা,'তারপরে তিনি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব করলে আমি আপত্তি করিনি।” কিরিল বললাে-“তা হবে—তখন মন বলে কিছু তাে ছিল না। টাকা ধার দিয়ে মন কেনা বেচা হত। এবার সে ঠিক করলাে যে আর এভাবে থাকলে চলবেনা। প্যাভে। আসছে। তার জন্য চড়ুই ভাতির বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সেখানে সে খাবে। তাই বিকেলে সেখানে যাবার কম কিনিল প্রস্তুত হতে লাগলাে। এমন সময় দরজা খুলে আরণতোষ গুরে ঢুকলো! আচ, আর তাকে দেখে কিরিলের একটুও ভাবান্তর হল না। সে বেশ সহজ ভাবেই তাকে অভ্যর্থনা করে। অথচ এই হাত দিয়েই সে তার ঠেকাকে ফিরে হয়েছিল। তবু সম্পূর্ণ সহজ ভাবে সে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলােE “তােমায় দেখে সত্যি খুব খুশী হলাম। ।

১৩ উত্তরে আয়ােত যে বাগাড়ম্বর না রে তার নতুন আঁল ছবি একের পর এক কিলিকে দেখিয়ে চলে। কিরি মায়ের মত তাই দেখছিল। দেখা হয়ে গেলে দুজনে কি ছবি সম্বন্ধে আলােচনা করলো। তারপর আরণতাে সেরকী বুয়েকের গল্প করেফি কিরিল দেখে সে টেকার কথা এড়িয়ে যাচ্ছে। সে চায় কিরিল তাকে জিজ্ঞেস করুক। আর কিরিল ভাবছে রণােতই কথাটা পারুক। কথাটা কারণভাভেরও মনে উঠেছে। সে তাই নিজের কাছেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। সে ক্রমাগতই কিরিলের কাছ থেকে আত্মগােপন করছে। “আমার কি দোষ? সে যে কালবৈশেখী! সে ঝড়ের তাড়নে কে কোথায় গিয়েছে কে জানে। সবারই জীবনে এ কালবৈশাখী এসেছে- ৰুে তাতে বাধা দিতে পারে? বলি বলি করেও সে কিলিকে সব কথা বলতে পারেনি। অবশেষে কিরিল তাকে ডেকে নিয়ে পাভেলের চড়ুইভাতিতে বােগ দিতে গেল। শরণটাতের সঙ্গে পথে যেতে যেতে কিলি বললাে- দেখােব আমরা বাঁচতে সানি ঠিক করে, আমরা কি যৰে এত এ কাজই করবে? কাজ, কত আয় কাজ !আরও পরিপূর্ণভাবে, আমরা বাচতে চাই। তাই না করে দূর করতে এসে আশা ৮ নেই কাজে গল্প! ‘ানিও তত তাই লে! একবার এক লেখকের ন্য টানিকে নেখেছিলাম। তিনি পী-গাঁথা গেয়ে গেয়ে দূর্তি ছিলেন- দিন তিনি পান করতে করতেই মান্য করছিলেন এবার যে ইনচালা—তাকে নামাতে চেষ্টা কৰে সে ক্ষেপে গিয়ে-

সল-লয়
সুতরাং দেখলে তিনি জুরি সময়ও দেশের কথা ভােলন না! কিনি
কোনও উভয় কােলা।
তারা ধীরে ধীরে এক ক্যাশ কালের পাশে এল। সেখানে সব
মেয়েরা টলা করছিল। তারা কিরিলকে দেখেই উতরে এগিয়ে
এল। কিরিল অনেক কষ্টে তাদের কবল থেকে এগিয়ে
গেল
পুরুষের কাছে! সেখানেও হৈ চৈ। সেখান থেকেও উঠ আস্তে আতে
কিরিল প্যাভেলের দিকে চললল! দূর থেকে তারা দেখতে পেল যে
একটা বিরাট সােভিট রাষ্ট্রের ম্যাপ নিয়ে প্যান্সে ফেনিয়াকে বােঝাতে
কেমন করে কোনদিক দিয়ে সে তার হওয়াই সফর শুরু করবে।
আর ফেনিয়া আবিত হয়ে তা শুনছে! আনহােত এদৃয়ে চল হয়ে
কললাে-“এবায় কেনিয়া লেগেছে। তারা এগিয়ে এল তাদের দিকে।
তখন ভােৱ হব হব হয়েছে। প্যাভেনশনা তার গো-
ভারনের মত সে ট্রাটোসফিয়ারে যাবে এবারের সফর শেষ করে। তার
আবেগময়ী বতায় সবাই যেন সব ফৰছিল তারা আর এ লগতের মানুষ
নতাও তত গানে রাজ্যে চলে গিহে।
ফেনায় চোখ দুটো চেয়ে আলাে হে! প্যানে
করলে তার ভেতরে যেন কিসের এ ধিকি ধিকি । এত
অলি-বিল এখন তা লেখিন শিখা মেটা ভেবে সে
কেনি, হাত রে উঠগে উপত্যকায় পথে! দুনে সেখানে বেড়াতে
কালাে! কালাে মত ফেনি হে ম নেয় না ।
নিবে মনে হলে এ ৰে নাই।
কেনিয় গভীম নিল জে ডালে-গ্যালয় ।
পযে কােনাে লাগালে। সে কতে পালাল।
বস ২ শ শ ণয়।

‘্যালোেনাে-দুমি আমার সব কল্পনা আয় মতবাদ ভেঙে টুকরো টুকলাে করে দিয়েছে। এখন আমি চাই•••ঝুঁকেছে?••••••আচ্ছা নিই- ভাবে স্পষ্টই তােমায় জানাচ্ছি••••আমায় তুমি উপহার দাও•••••ছােট এক খােক”তায় চোখ মুখ থেকে যেন বেয়ােচ্ছ। সে দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। হতেই পাতোকে টেনে নিয়ে সেখানে তাদে পদ•••••• অনেকক্ষণ পরে প্যাতে বললাে-“এবার আমি যাই কেমন। আমার সৰু হয়ে গেছে! তুমি কিন্তু সাবধান-এখন আর এলাচী নও। কেনিয়া তার চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে দিতে দিতে বললাে-“তুমিও কিন্তু জুলােনা যে এখন একলাটী নও—এখন তিনজনে মিলে আমাদের সংসার।”

( ১ ) আমােলাসে গােটা ঘর ভেঙ্গে পড়বার জোগাড়! শে জনসমুস্ত্রের উন্ন পনি যে কখনাে থামবে তা মনে হলনা! ট্যালিনকে দেখে বিরাট হাততালিকায়ধবনিতে কান ঝালাপালা হয়ে ওঠে। সভাপতি মণ্ডলীয় টেবিলের পেছনে তিনি বাড়িয়েছিলেন। পিপলস কমিসার ভরােশিলভের পেছনে তিনি মাথা নীচু করে দাড়িয়ে ছিলেন। অগণ্য লােকের জয়ধবনি থেকে যেন আত্মরক্ষার জন্যে ভােশিলতে পেছনে এসে দাড়িয়েছেন। কিন্তু ভরােণিলভ নিজেই হাততালি দিচ্ছিলেন। ষ্ট্যালিন পিছনে দাড়িয়েছেন জানতে পেরেই তিনি এক পাশে সরে দাড়ালেন তখন সেই জনসমুদ্র থেকে গগণভেদী জয়ধ্বনি উঠলাে- ‘জয় ষ্ট্যালিনের জয়। কিছুক্ষণ পরে জনসমুদ্র একটু শান্ত হলে আন্তর্জাতিক” গান সুরু হল। কিন্তু পরমুহুর্তেই আবার সেই জয়ােল্লাস! ষ্ট্যালিন দুই হাত উচু করে সবাইকে শান্ত করতে চাইলেন। প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক গাইবার প্রচণ্ড চেষ্টা করছেন। কিন্তু সবই বিফল। অনেকক্ষণ পরে ট্যালিন এগিয়ে এসে পকেট থেকে ঘড়ি বের করে সবাই দিকে ধরলেন সময় বয়ে যাচ্ছে কালার করা যাক। নিফিটা গুরিয়ানভ ও ষ্টোর আসতে একটু দেরী হয়েছিল। তারা এসে দেখে যে সমস্ত ঘরের লােকই অবনিতে মুখ। তারা দুজনেই তালি দিতে সুরু করলো। নিফিটা তাে এমন আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল বেহাল ১৩ নাম যখন তা হল সভাপতি মওলয় সত্য হতে—তখনাে সে হাততালি হে! টো তাকে সাবধান করে !ি নিকিটা এগিয়ে যাচ্ছিল সেই সময় বার ও ডাক পড়লা- আমরা সমস্ত সােভিয়েট রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ ট্রাক্টর চালিকা পানি ঠেক নােনা ওগনিতাকে সভাপতি মণ্ডলীর সভা করলাম। তারা দুজনেই তখন সভাপতি মীর জন্য নির্দিষ্ট চেয়ার দখল করে বসলাে ! কি দেরী করা তাদের পেছনের সারিতে বসতে হল। নিকিটায় তা পছন্দ না হওয়ায় সে এগিয়ে গেল। সেই সময় সার্জী পেট্রোভিচ, পােড়রুটনাভ তার হাত ধরে ট্যালিনের কাছে এনে দাড় করিয়ে দিল ইনিই হচ্ছেন আমাদের সেরা কৃষক। তার পিঠচাপড়ে দিয়ে টালিন रजन খা মি একে চিনি-এনে বসাে” বলেই তিনি তাকে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন! নিকিটা একটু পরেই বলে উঠলাে- তিাে বি চ িশ ল দিয়েছি। আপনাকে বিশ শণের কথা বলেছিলাম-সেখানে চল্লিশ মণ করেছি। এবার কি পুরস্কার নেবেন। পুরা? এ সবই তাে তােমাদের, যাচ্ছে না তবু প্রায় ভেজা চই বইটি? “ বেশ চালিৰ মতে হাসতে বললেন তােমার সঙ্গে এগি का नाममा किमिय। তাকে চিনে কেন করে ?- আর নিকিটা জিজ্ঞেস समारामिज ना अनिवाकलन- “তাের মত সবাইকে না মিলল কি আমি লতে পারি। এপিকে নিয়ে কােন পালনে ?

দূর থেকে কোন কালাে ট্যালিন এবং কালিনিন দুজনেই কেন
নিৰিটাকে কি বলছে। এমন সময় হঠাৎ মা ।
বেশ তাই হৰু-আমিই সভাপতি করব—নিকিটা ভুলে গেছিল
যে মাইক্রোফোনে তার ছােট খাটাই গােটা করে নােক শুনতে পাবে।
সে বিব্রত না হয়ে সােলা টেবিলে এসে বসলাে-
“নাগরিকগণ, বেতের বন্ধুরা এবং অন্যান্য সকলে! মিখাইল ইত্যানাে-
জি কালিনিনের অনুরােধে আমি সভাপতির গুরু দামি গ্রহণ করলাম।
এবার কনস্টানটাইন পেট্রোভিচ কাবলে বলবে।”
কলটানটাইনের বয়স মাত্র উনিশ কি কুড়ি বছর। সে গােটা দিন ভেবে
এসেছি কি বলবে। কিন্তু এত লােকের ভীড় দেখে তার সব গুলিয়ে গেল।
যে কথা সবার শেষে বলবে ঠিক করেছিল তাই দিয়ে সে সুরু করলো--
“শেবরেণ্য নেতা কমরেড মলােটাভ, কমরেড স্তালিন—এদের সবাইকে
আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। চারিদিক থেকে সকলে তাকে
সাহল দিয়ে উঠলাে। নিকিটা উৎসাহ দিলে—“বেশ বলে যাও-কোনও
ভয় নাই-আম সবাই তাে নানা শােনা—ব মত !”
সে তখন শুরু করলো—কেমন করে যে কষ্টের ভেতর দিয়ে চাষবাস করে
এখন বিখ্যাত হয়েছে। আগে লােকে তার সঙ্গে কেন বৰ, কতাে
শার এখন সবাই কেমন তাকে সমীহ রে—এই সবের গনি।
গােটা ঘর তার বক্তৃতা করে সমর্থন নালি। একে একে আরও
নেকে তা করলাে। কি টো নে রে-এ নেতাকে
জছেন? সে কি এতই যে?”
সেই কেকে তাকালে
“কায় কড় গনিত
উ দেখতে শনি লোট কে। তার মনে ল যে নেই
আলেশীয়ান কী মায় চিত্র উলে বিলিয়ে দেয়।
।
৫
1

১• সফল করতে এসেছে। কিন্তু মাথা তুলেই সে চমকে গেল। সামনে টালিন সহ গাড়ি। টালিন তার পাশে বসে লিলেন- “এখানে একা একা এভাবে বসে রয়েছে নে? ল তুমিও কি বলবে! তােমার কথা শােনবার জন্য সারা দেশ উগ্রীব!” টেকা দাবড়ে গেল। চারিদিকে ফটোগ্রাফারেরা তখন তাদের দুজনের ফটো নিতে ব্যস্ত। ষ্ট্যালিন বলে চলেছেন আমাদের মেয়েদের কাছে তুমিই আদর্শ! তুমিই দেখিছোে কি করে মেয়েরা স্বচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে। তাই দেশে এখনাে তর্ক চলেছে যে মেয়েদের নাকি অধিকার নেওয়া উচিৎ কিনা! কত বৈনিক মাথা ঘামাতে এ নিয়ে ! আর আমরা তাই কাজে দেখাচ্ছি। আগের দিনে লােকেরা জানতাে না যে মেয়েদেরও প্রাণ আছে। আমরাই দেখালাম যে মেয়েদের প্রাণেরও দাম ছে। অ একজন এসে ষ্ট্যালিনকে তখন ডেকে নিয়ে গেল। কিন্তু ইতিমধ্যেই ষ্টেঙ্কা বিখ্যাত হয়ে পড়েছে। তাকে প্রথম সারিতে নিকিটার পাশেই বসান হল। ক্রমে মিটিং বন্ধ করে নিকিটা কালিনিনের বাড়ীতে চা খাবার বলোবা করে নিন। ( ২ ) নেক আশা করে নিকিটা কালিনিনের সঙ্গে চা খেতে বসলাে। কিন্তু বেচারা নিকিটা! সে দেখে যে বহু লােক অপেক্ষা করছে কালিনিনের । সে বিরক্ত হয়ে বলল- “আপনার কি নিজের বলতে এতটুকু সময় থাকতে নেইগৰ সময় কেন সবাই বি কমনে?” “ফল কাটার সময় হয়েছে কিনা তাই” নিটিা বুঝতে পারেনা। কার ফসল কাটার সময় তােত চলে গেছে। কালিনিন বুঝিয়ে বলে-

সফ-স্বপ্ন
১৪
মানুষ ফসল—বুঝলে? এতদিন আমরা আমাদের পরিশ্রমের
পাচ্ছি। ষ্ট্যালিনকে দেখছে না কেমন সি হাসি ভাব নিয়ে পাইপ
টানছে। এতদিনে যে আমাদের স্বপ্ন সফল হতে চলেহ।” বলেই গেল
না করে কালিনিন বিদায় নিলেন।
নিকিটাকে তাই বাধ্য হয়ে চলে আসতে হল। অধিবেশনে টা মিলই
সে তােরে উঠে মস্কোর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে। তখন ক্রমে ক্রমে
দুএক জনের সঙ্গে তার আলাপও হলাে! কিন্তু অধিবেশনে তার বক্তৃতায়
পালা আসতেই সে সব ভুলে যাবার উল করলাে। কোনও রকমে
মরিয়া হয়ে শুরু করল
সমাজ কাকে বলে জানাে । আমরা তােমরাই সমাজ! আগের
রাশিয়ার সঙ্গে এখনকার তুলনা করলেই বুঝৰে সমাজত কাকে বলে?
আগে আমরা যতই খাটিনা কেন—তার ফল ভােগ করতে বড় লােকেরা।
আর আজ আমরাই চিরযুগের স্বপ্নকে সার্থক করেছি?”
“ঠিক কথা- ষ্ট্যালিন মন্তব্য করলেন।
“শােনা যায় যে শয়তানী ক্যাথেরাইনের আমল থেকেই নীপার নদীতে
বাঁধ দেবার পরিকল্পনা হয়েছিল। আর এ পর্যন্ত নাকি নয়শাে মণ কাগই
খরচ হয়েছে সরকারী দপ্তরে ঐ পরিকল্পনার পেছনে। অথচ সেই অল্প
সার্থক করলাে কে? এই আমাদের কমরেড ষ্ট্যালিন।
"কিংবা আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কিলি ঝকিনকে দেখনা কেন?
সটভ ওগল উপত্যকাকে সে কিসে দাড় করিয়েছে। কত বড় বড় ফ্যাক্টরী
সেখানে সে সৃষ্টি করেছে। আগের যুগের লােকেরা বলতাে-সামগ্রিক
কথা আ কুনুন মাত্র। আর মন গায়ের রক্ত ল কর তাকে
সত্যে পরিণত করেছি।চারিদিকে ফলিতে কনে তা পার
উপক্রম হল! অবশেষে থামতে ঘামতে নিকিটা বসে পড়লাে,--

১৪২
ফ-a
॥
সেদিন পাড়ের ওপর থেকে পানি পড়া ছাড়া কিনিলের গত্য
যিনা। আর তার ফলও ভালই হল। এক এক সময় ঐ ছেলে
কথা ভেবে কিনি পেতে এটাও ঠিক যে ও ছাড়া আর
কোনও উপায়ও ছিলনা। যখনই কোন দুই রাজনৈতিক সমতার মুখে সে
পড়ে তখনই এ বােগনতনয় অকেউশয়তাে অবশেৰে বং
ষ্ট্যানির সনে সে পরামর্শ করেছে। কিন্তু এসব তে সূন্ন মনত
নিয়ে সে কার সনে আলােচনা কৰে? তার ওপর তখনকার দিনে
সবাই যা নিয়ে এত যত বে ঐ সৰ তুচ্ছ ৫) মনােভাক সেই উড়িয়ে
হি! কার কাছে ফিরিল এৰিয়ে কুতি পাবেনা! এগৰ সৰ
কাের বিলে তাকে হয়তাে ঠাট্টা করবে পেটা বুয়া বুদ্ধিজীবি বলে।
তাই সে একা একাই শত শত নীরবে সই করে যায়। যখন সেটা
একেবারেই কমেছিল তখনই সে নিয়ে পড়েছি। তারপর থেকে
কিন্তু সে আবার অনেকটা গর্বিক অবস্থা পেয়েছে।
আবার কিলি কাজে আনল পাচ্ছে। নিত্যনতুন কাজে হাত না দিলে
তার ভাল লাগেনা ! কি করে চারপাশের জনসাধারণের নানা বিষয়ে
উপকার হবে তাই নতুন নতুন আবিষ্কার করতেই সে ব্যস্ত। এই
সেদিনও তাই সে একটা সমিতি স্থাপন করলে তাতে যােগ দেবে অপু
যত বড় বড় কর্মকর্তাদের অনা। ঠেকাতে কা হল অলিরিক এবং
ফেনি হল তার সহকারী।
এতে অনেক মই অব ফিলিলকে কে গালাগালি করলাে। কি
মেয়েরা সব যেন নতুন জীবনের স্বাদ পেল। মেয়েরা নিজেরা চটরে
বলব গৰে সংস্কৃতিমূলক কা করলাে। তারা নিজেদের হাতে
শিরে শিক্ষার ভার নি। ছােট ছেলেদের কার বন্দোবস্ত প্রভৃতি
নানা কাজে গ্রহণ করলাে। দেখতে দেখতে সােজিমেইষ্ট্রে

=
চারিদিক থেকে এ আন্দোলনের প্রশংসা উঠলাে! আয় ফিরিয়ে
রােজ একতাড়া করে টির অব লিখতে হতো।
সে সব চিঠির উত্তর দেবার সময় কিলি স্পষ্ট বুঝতে পারি ঠেকায় কাছে
তার অপরাধ কি! তার সৃষ্ট ধারণা হল যে কেনিয়াকে নিয়ে থাকা বা
বাবার আগের দিন জোড় করে ঠোর সম ভােগ—এসব কিছুই
বির প্রধান কারণ ! সব চেয়ে বড় কারণ হয়ে যে সে কে
এয়ের কোলে আটকে রেখেছিল। তাকে বায়ালের ঝি দি কিনিল
বশী করেনি বলেই আজ সে ধান উপাতি লেগেছে।
এসব ক মনে হতেই কিনি কেন মা হয়ে গেল। তার মনে
তবে টোকে এৰি কৰা ওল বলতে পারে নাই সে আয়
করে থাকবেনা। এবার সে পমিকার করে সব কথা বলতে পারবে।
এখন সে বুঝেছে যে তার এই ব্যবহারের পেছনে অতীত সৰে
একটু ৰেছিল। আবার নতুন করে ভাই কিনি , এঙ্গেল লেনিন,
ষ্ট্যালিনের নরনারীর শর্ক সরে সব লেখা পড়তে লাগলাে।
ইতিমধ্যে ষ্টোয় সঙ্গে ট্যালিনের দেখা সেই সময় ঠেকায় তা
সমত খবর ফিয়িল গেল। ষ্টালিনের সেক্রেটারী পােডট তাকে
টেলিফোনে জানালে—“আজ ঠো বত করলাে! চমৎকার কত?
তােমার সাংসারিক খবর আমি পেয়েছি। তাই সব মিটমাটের যে
করছি। কিন্তু ভেবােনা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
डोमिन यांब
অভিনন্দন নাহেন।
-এই এখন ট্যালিনের অলিনেও কিরিলের মান হল! সে
তন্ময় হয়ে কোন কথা বতে লাগলাে। আনলের কাজিয্যে কিনি
আরডারে রে চলে গেল! ফিলিমে ঢুতেই তাৰি কয়।
সে বলে উঠলাে-“সত্যি যে এক মেয়ে। কিন্তু তার ম স
তাদের কোনও আলােচনা নাটোসছে।
* *

১৪ भरून-वन h (৪) কয়েকদিন আগেই প্যাভেলের খবর পাওয়া গেছে। একন বেত টলিগ্রাফ ছাপা হয়েছিল আজ আমরা আর্কটিকের কষ্ট বুঝতে পারছি। কিন্তু আমরা ষ্ট্যালিন- নির্দিষ্ট কাজ করবােইত কই আসুক-ব বা আমরা অতিক্রম করাে * সেদিন কেনিয়াকে চেনা যাচ্ছিনা। চোখ দুটো যেন গর্ভে ৰসে গেছে আর কেমন উন্নি চাষী। কিলিলের পরে এসেই সে জেলে পড়লাে “কিরুিল •••••আমিতাে আর পারছিনা। “কেন কি হয়েছে কিলি জিজ্ঞাসা করে। একটু এগিয়ে কিলি তাকে ধরে সানা দিতে লাগলাে। কালো রে ফেনিয়া বললাে- “প্যাভেলের এরােপ্লেন বরফে ভরে গেছে জাননা।” “তাতে কি হয়েছে? তুমি ছুি অ পেয়ােনা-আজই তাে খবর পেলাম যে তারা পরিকল্পনা মতই অগ্রসর হচ্ছে।” “ভাত হল—তবু প্যাডেল আমায় সব খবর সত্যি জানাবে বলেছিল এই তার চিঠি—এর পরও তুমি কি আমায় মিথ্যে ভােলাৰে ? এই বলে ফেনিয়া গ্যাভেলের বেতার টেলিগ্রাম দেখালে “আমরা নীচ নামছি! সমস্ত এরােপ্লেনটা বরকে ভরে ভারী হয়ে গেছে। সামনেই অনন্ত আর্কটিক মহাসমুদ্র ও বরফের তীব্র ঝড়! আমরা তবু চলেছি-সব তুচ্ছ করে! যদি সফল হই তাহলে সমস্ত রাষ্ট্রের যে আমরা বিখ্যাত হয়ে পড়বে। তােমার ভেতরে যে রয়েছে তার ধত্ব করতে ভুলেনা ” সেদিন কিলি তাকে সারা দিয়েছিল। কিন্তু ফেনিয়াকে দেখে তার ক্রমাগতই মনে হয়েছিল-রণভাতের ধা। তাতেই তার যৌবন সফলস্বপ্ন ১৪৫ পৰি করিয়েছ! আজ তার সমস্ত চেতনা মুখর হয়ে উঠেছে—একই গ ! আশ্চৰ্য্য! মানুষের সমগ্র চেতনার বিকাশ হলে বােধহয় কোনও শাকেনা! ( ৫ ) প্রাভ দা পত্রিকায় প্রকাশিত ষ্টেঙ্কার গােটা বক্তৃতাটুকু কিরিল মন দিয়ে পড়লাে ! ষ্টেস্কা বলেছে “আমাদের মেয়েদের মন গড়া হয়েছে মেহ ভালবাসা দিয়ে ! স্বামী, পুত্র, পরিবার এদের কেন্দ্র করেই আমাদের স্নেহের গণ্ডী! আমাদের এ মেহের আকর্ষণ প্রচণ্ড—তাতে সারা পৃথিবীর টনক নড়িয়ে দেওয়া যায়। তবে মাঝে মাঝে—এসবের ভেতরেও আমরা একটু মমতা বােধ করি আমাদের স্বামীর জতের সঙ্গে সমস্ত জীবন আমাদের ওতপ্রােত ভাবে জড়িত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা—সেই মমত্ববােধের ফলে আমরা শুধু নিজেদেরই ক্ষতি করিনা সমস্ত সমাজেরও ক্ষতি করি অনেক সময় ••• “আমি আজ সব মেয়েদের বলছি—আমরা চাই গৃহিণী হতে হতে —চাই উপযুক্ত স্ত্রী হতে। কিন্তু তারজন্য সামাজিক কর্মক্ষেত্র ছেড়ে ঘরের কোণে ঢােকবার কোনও প্রয়ােজন নেই। এ দুটো জীবন আমরা পাশাপাশি রাখতে পারি। অন্য সব ধনী সমাজে যা সম্ভব নয়—আমরা তাে সেই অধিকার এখানে পরিপূর্ণভাবে উপভােগ করি !” ষ্টোর বক্তৃতা পড়ে কিরিলের খুব ভালাে লাগলে এর ভেতরে সে তার সত্য প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। বক্তৃতায় তাকে প্রচ্ছন্ন তিরস্কার করা কমেছে সত্যি-কিন্তু সে এতে দমে যাবে না!

১৪৬ সং- (৬) প্যাভেলের বেতার টেলিগ্রাম দেখে দেখে বৃহৎ শিল্প বিভাগ ক্রমশাই শঙ্কিত হয়ে উঠছিল। আর্কেৰূেলের কাছে গিয়ে প্যাভেল তার পাঠালাে। “আমরা উড়ছি কিন্তু এরােপ্লেন বরফে ভরে গেছে।” পিপলস কমিশর উত্তরে আদেশ দেন। 'তােমাদের জীবন আমাদের কাছে রেকর্ডের চেয়ে অনেক বেশ মূল্যবান। ওড়া থামিয়ে এখন নেমে পড়! সমস্ত দেশ তােমাদের জয়গা মুখরিত। সেদিন পাঁচটায় তাদের মস্কো নামবার কথা। সমস্ত মঙ্কো জুড়ে প্রবল উত্তেজনা। পাঁচটা বাজতে না বাজতে সমস্ত মস্কোর লােক রাস্তায় জুটেছে। প্যাভেল ষ্ট্যালিনকে জানালাে “কমরেড, ষ্ট্যালিন—আমরা রাজধানীতে ফিরে আসছি—আমাদের জীবন দেশের কাজে উৎসর্গ করলাম।” কি টেলিগ্রাম করেই তার মনে হল ফেনিয়ার কথা। সে তখনি তার পাঠালাে “ফেনিয়া-মস্কোর ওপর একটু ঘােরর অনুমতি নিয়ে আমাদের জানাও।” তার উত্তর এলাে—ইচ্ছেমত তােমরা মস্কোর ওপরে ঘুরতে পার কিন্তু ঠিক পাচটার সময় এখােড্রোমে এসে নামতে হবে।” প্যাভেল মস্কোর ওপর চক্রাকারে ঘুরতে লাগলাে! উড়ােজাহাজ থেকে এই বিরাট সহর কতটুকু দেখাচ্ছে! নীচে যানবাহনের চলাচল—অগণিত নরস্রোত পিপড়ের সারির মত! ক্রেমলিনের ওপর দিয়ে প্যাভেল ঘুরলাে ! রেড স্কোয়ারে এসে তারা নতি জানালাে ! নামবার সম এতক্ষণে শ্যাভেলের হাত কেঁপে উঠলাে ! নেমেই দেখতে পেলাে সারবাধা মােটর গাড়ী তাদের অভ্যর্থনা আবার তা রয়েছ!

স্বপ্ন ১৪৭ . ষ্ট্যালিন এগিয়ে এসে প্যাভোকে জড়িয়ে ধরলেন ! পকেট থেকে একতাড়া রিপাের্ট বের করে প্যাভেল কি যেন বলতে গেল। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে ষ্ট্যালিন বললেন- “এখন ও সবের দরকার নেই। যাও খুব ভাল করে বিশ্রাম করগে। পরে রিপাের্ট পাঠালেই চলবে।” ষ্ট্যালিন চলে যাবার একটু পরে ফেনিয়া এগিয়ে এল প্যাভেলের কাছে। তার হাতে ছিল চমৎকার একটা ফুলের তোেড়া। কিন্তু কাছাকাছি যেয়ে আর সেটা দেবার কথা মনে হল না! সে বিহবল হয়ে তাকিয়ে রইল প্যাভেলের মুখের দিকে। তাঁর ঠোট কঁপছিল। তাকে জড়িয়ে সবার সামনেই একটা গভীর চুমাে খেয়ে প্যাভেল জিগ্যেস করলাে- “কেমন আছ ফেনিয়া। “তােমার কথাই শুধু মনে হয়েছে”—ফেনিয়া আস্তে আস্তে বললো। আর কিছু চাইনা—চল তােমার জন্যে এ ফুলগুলাে এনেছিলাম। “তাহলে তুমিই রাখ—আমি সকলের সঙ্গে দেখা করে আসছি। আমার খোজ করাে।” (৭) শুলগার তীর ধরে টেগা বেড়াচ্ছিল। মাথায় নীল রুমাল বাতাসে উড়ছে। মাথাটা সামনে সামান্য বুকে পড়েছে। সে গভীর চিন্তামগ্ন!... ষ্টেল প্রায় সব সময়েই আপলােভের কথা ভাবছে। এক এক সময়ে তার নে হয়েছে যে হাতত সে সত্যি আরণভােকে ভালবাসে। তাকে ছাড়া বোধ হয় ষ্টো বাচবে না-থচ প্রত্যেক বারই একটা অজানা বা এলে তাদের ভেতয়ে গড়িয়েছে। টেকা কিছুতেই আরণােভের কাছে সেই সমর্পণ করতে পারেনি। এমন কি মধ্যে থাকতে প্রত্যেক দিনই ১৪ সফল-স্বপ্ন তার মনে হয়েছে আরণল্ডােভকে চিঠি লেখার কথা—অথচ একদিনও সে লিখতে পারেনি। ষ্টেঙ্কা বিশ্লেষণ করতে বসে নিজের মনকে। কেন আরণতেকে তার ভাল লাগে ! সে সুন্দর-সুপুরুষ ! চোখে তার জ্বলন্ত প্রতিভা! কিন্তু তাতে অনেকেই থাকে। তবে কি তাকে এতে আকর্ষণ করছে ? আজ ষ্টেদ্যা বুঝতে পারলে তার সম্মুখে দুইটা বিরাট সমস্যা—কাকে গ্রহণ করবে সে-আরণভেকে না—কিরিলকে। ইদানীং কিরিল যেন কেমন রুক্ষ মেজাজী হয়ে পড়েছে। কিরিলের সামনে নিজেকে সে সঙ্কুচিত মনে করতাে। কোন কথাই ঠিক মত জবাব দিতে পারতাে না। তাতে আবার কিরিও রেগে যেতাে। কিন্তু তবু ষ্টে নিজেকে আরণজ্ঞােভের অঙ্কশায়িনী রূপেও কল্পনা করতে পারে না। যদিও আরণজ্ঞােভের কাছে সে অনেক স্বাধীন আচরণ করতে পারে—তবু তার মনে হয় না যে ঠিক কিরিলের মতই সে আরণভের আদরে আত্মসমর্পণ করতে পারে! এই দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের মাঝে ষ্টেঙ্কা আহ্বান পেল কিরিলের কাছ থেকে। “অন্ততঃ দু-তিন দিনের জন্যে তুমি আর ছােট কিরিল এখানে এসাে। কয়েকদিনের ভেতরেই আমি মস্কো রওনা হব। যতদূর মনে হয় বলখাস কারখানা গড়বার ভার বােধ হয় আমাকেই নিতে হবে।” কিরিলের গাড়ী করে আরণভেই তাকে নিতে এলাে ! ( ৮ ) ষ্টেঙ্কা তার পুরােনাে সংসারে ফিরে এসেছে। সেখানে সবই বিল। কিরিল সাহস করে তার সামনে দাড়ায়নি। সব সময় আড়ালে থেকেছে। সেই বর, সেই আসবাব পত্র; সব যেমনকার তেমনি আছে—কি শ্রীহীন। ষ্টোর বুক কেঁপে উঠলাে ! কিন্নিলের ঘর গােটাটাই তার ছবিতে বােঝাই !

সফ-স্বপ্ন ১৪১ বাড়ীর সবাইকে নিয়ে ষ্টো লেগে গেল প্রথমে সব পরিষ্কার করে গােহাতে। গােটা দিনটাই প্রায় ঐভাবে কেটে গেল। আরণােতও তাকে প্রতি কাজে সাহায্য করছে। ক্রমে রাত্তিরে খাবার সময় হল। টেবিলের একপাশে বসেছে ষ্টেঙ্কা, তার ডান দিকে আরণভ। বা দিকে আনুষ্কা। অন্য ধারে বসেছে কিরিল। তার দুপাশে ছােট্ট কিরিল আর বােগদানভ ! খেতে খেতে ষ্টো লক্ষ্য করলাে-কিরিল একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অনুশােচনা মেশানাে সে দৃষ্টি থেকে প্রচণ্ড ভালবাসা ঠিকরে বেরুচ্ছে। কি করুণ আবেদন!... ষ্টো ভাবলে—“আমি কি করবাে ? যার কাছে কিছুতেই যেতে পারছি না তাকে কেমন করে ভালবাসবাে-আমার কি দোষ ?” নিজের মনের সংঘৰ কিরিলের কাছে গােপন রাখবার জঙ্গেষ্টেঙ্কা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বােগদানভের সঙ্গে গল্প করতে লাগলাে। পরের দিন তারা কিরিলের নতুন বাড়ীতে গেল। সেলিগার দের পাশে সে বাড়ী। সেখানেও কিন্তু কিছুই ষ্টেকার নজর এড়ালাে না। যতদূর সম্ভব তার আগমনের জয়েই যেন কিরিল বাড়ী ঘর তার পছন্দমত করতে চেয়েছে! গােটা বাড়ীতে সাদা রং মাখানাে—সামনে চওড়া বারান্দা। মাঠে টেনিস ও আরও নানা রকম খেলার বন্দোবস্ত। কিন্তু যতই সে কিরিলের আকর্ষণ অনুভব করছিল ততই তার মন বিরূপ হচ্ছিল। অনাহুত পুরুষের অপ্রয়ােজনীয় ব্যস্ততাতে শুধু বিরক্তিই জন্মায়-বােয় নারী হৃদয় তা দিয়ে জয় করা যায়না ! তার ইচ্ছে হচ্ছিল সেখানে আরণতােভ আর আনুস্কারে নিয়ে সে থাকে। এখানে সে রােজ আরণভােভের 'অপেক্ষা করে। তার সঙ্গে গল্পে গল্পে ষ্টো নিজেকে ভুলে যেত। আৰণতে কখনাে তার ছবি আঁকতে ! একদিন সে বলেছিল ষ্টেঙ্কাকে সূনতম পােক পড়তে যেন শরীরের প্রতিটি রেখা চিত্রকরে তুলিতে ।

সফল { থৱা পড়ে। ষ্টেঙ্কাও আত্মহারা হয়ে বসেছিল আরণতোভের সামনে। কিন্তু অনেকক্ষণ পরে হটাৎ যেন কি হল সে পাশ থেকে শালা নিয়ে সমস্ত হে জড়িয়ে একদৌড়ে চলে গেল ! অথচ নােজ স্কোর মনে হয়েছে যে ইডিয়ােতে এসে আরােভের কথায় সম্পূর্ণ নগ্ন দেহে শিল্পীর তুলির দাসী হতে পারে! আশ্চর্য ! .... )। . কিরিল তার পড়বার ঘরে বসে রয়েছে। অক্টোবর বিপ্লবের বিংশ বার্ষিকী উৎসবের আগের দিন সে ঠিক করেছে পূনরাপুরি বিশ্রাম করতে ! তবু একেবারে চুপ করে থাকা যায় কি? কতদিকে তাকে মাথা খেলাতে হচ্ছে। সাশী পেট্রোভিচ বলেছে উৎসবের দিন সেখানে আসবে। জানালা থেকে দেখা যায় যে নীচে ষ্টেঙ্কা আর আরণােভ টেনিস খেলছে। কিরিল যেন নিজের বাড়ীতেই অতিথি ! না, এভাবে চলতে পারেনা। এ ব্যবধান দূর করতেই হবে। ছােট কিরিল এসে নানা প্রশ্নে তাকে বিব্রত করে তুলল। ষ্টেঙ্কার গল্প, যােসিফ কাকার গল্প, কিছুই যেন শেষ হয়না! থাকতে না পেরে বিলি তাকে জিগ্যেস করলাে : “আচ্ছা কাল বােসিফ কাকা আর মা ঐ ঘরে ছিলনা ?” “হ্যা-আমি তাে কতক্ষণ কাকার সঙ্গে খেলাম। আমরা বিলিয়ার্ড খেছিলাম। যে বাজী হেরে যাবে—তাকেই টেবিলের নীচে চারপায়ে টতে হবে! কতবার যে কাল হেরেছে তার ঠিক নেই—আর মার কি হাসি-আনন? তাকে কাছে টেনে নিয়ে কিরিল জিগ্যেস করলাে- “আর কী কথা তা বলছিল রে?”

গণ
১৫১
পাড়াও হাতনেড়ে কিলি বললাে-“কি একটা ঘড়ির কথা! তুমি
নাকি একটা ঘড়ি কাকে দিয়েছিলে তাতে মার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”
ছােট কিরিল চলে গেলেই তার আবার মন খারাপ হয়ে গেল।
টোর ভালবাসা আবার আত্মণডােভকে ঘড়ির কথা বলায় ঘৃণা এবং নিজেরই
ছেলেকে খুটীয়ে সব জিগ্যেস করায় এক অদ্ভুতভাৰ কিরিলকে পেয়ে
বসলাে !
ষ্টেঙ্কাদের খেলবার যায়গায় গিয়ে কিনিল বসলাে! কেমন অবসন্ন ভাব।
দেখলেই বােঝা যায়। উেষ্ণা তাই জিগ্যেস করলাে-
“তােমায় বড় পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছে -খুব খেটেছাে বােধহয় না?”
তার কথার জবাব না দিয়ে কিরিল বললাে-
“চল তােমার সঙ্গে একটু কথা আছে ষ্টেঙ্কা বড় জরুরী!
আরণন্ডােভের দিকে তাকিয়ে ষ্টেঙ্কা উত্তর দিলাে
“তা বেশ বাড়ীর কর্তা যখন বলছেন তখন আর অন্যথা করি কেমন করে,
চল।” বলেই ষ্টেঙ্কা কিরিলের পাশে বেড়াতে বেড়াতে পাইনঝড়ের
দিকে চলে।
কিন্তু তার কথার ভঙ্গীতে কিরিলের আর কোনই সন্দেহ রইলােনা যে
ষ্টেঙ্কা তার নাগালের বহুদূরে চলে গেছে। এ ষ্টেঙ্কা সম্পূর্ণ অপরিচিত ।
দুজনে অনেকক্ষণ চলবার পরেও কিরিল কিছু বতে পারছিলনা। অবশেষে
এক রকম মরিয়া হয়েই সে বলল
“আচ্ছা ষ্টো, সত্যিই কি তুমি ওকে ভালবাস?
“কাকে?”
বিষম রেগে গিয়ে কিবিল বলে “কে কেমন? বুঝতে পারছােনা-না?
ঐ তােমার আলােকে-আর কাকে? এখন সােজা জি স্পষ্ট
কথা বলবার সময় এসেছে। আমি তাে তখন তােমায় সব সত্যি করে
বলেছিলাম।”

সফল-স্বপ্ন তার কথায় ষ্টেঙ্কার যেন চমক ভাঙলাে কিন্তু তবু সে নুতন চিন্তস্রোতে ডুবে গেল। অনেকক্ষণ পরে ঘাড় নেড়ে উত্তর দিল- “হ্যা তাকে তত আমি ভালবাসিই”-বলে কয়েক পা দূরে সরে গেল। কিরিলের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল। সমস্ত মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। ষ্টেস্কার দিকে এগিয়ে এসে সে করুণ সুরে বললাে- “সত্যি ? তাহলে আমাদের মধ্যে এই শেষ-সব শেষ হয়ে গেছে। আবার স্কোর বাঁকা কথা—“কিসের শেষ ? : কিলি ফেটে পড়লাে-“কেন? এর পরেও কি তুমি ভাব যে আমরা দুজন একসঙ্গে থাকতে পারবাে?” আবার পরক্ষণেই রুক্ষতার জন্যে অনুশােচনা হচ্ছে তার মনে কেন শুধু শুধু চটে উঠছি বলে কিরিল নিজেকেই ধমকালাে! “কিন্তু কেন তা হবেনা? আমি তাে তাকে ভালবাসি—মানুষ হিসেবে।” এবার কিরিল অপ্রস্তুত হবেনা ! সে বােকার মত জিগ্যেস করলো- “তা তুমি তাকে যেভাবেই ভালবাস সেও কি তােমাকে ভালবাসে? পরশুদিন দেখলাম—সে তােমার ঘাড়ে হাত দিয়ে চলছে—তার মানে কি ?” “ও! সে কিছুও বড্ড সরল কিনা-আমার তাে সে কথা মনেও নাই।” “আমি কি তাহলে মিথ্যে কথা বলছি ?” এবার কিরিল আবার রাগছে। “ভুলও তত হতে পারে! মিথ্যেই যে হবে তার কি মানে?" “কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখলাম—তােমার চোখ দুটোও জ্বলে উঠলাে সে স্পর্শে ?” “কি জানি মনে পড়ছেনাক, অন্য কিছু বলবার থাকলে বল।” ষ্টোর সেই অনাসক্ত ভাবে কিরিল রাগে আগুন হয়ে গেল—অথচ নিরুপায় সে। এক একবার তার মনে হচ্ছিল-টেকার গালে প্রচও চড় মারতে কিন্তু সে অনেক কষ্টে আত্ম সংবরণ করে জিগ্যেস করলাে- সফলস্বপ্ন “তুমি ওর সঙ্গে থাকতে পারে ?” “কেন পারবােনা? একা তােমাকে সামলাতে পারবােনা বলেই তাে তাকেও এত কাছে রাখছি।” হঠাৎ কিরিল ভেঙ্গে পড়লাে—সে বলে উঠলাে- “না না ষ্টেঙ্কা আমার সঙ্গে ঠিক ওভাবে বাঁকা কথা বলােনা—আমি একটু সান্ত্বনা চাই—অযথা দুঃখ দিওনা...” “কিন্তু আমি তাে দুঃখ দেবার জন্যে কিছু বলিনি? ওটা আত্মরক্ষারই একটা কৌশল। আমার বক্তব্য না শুনেই তুমি যেমন ক্ষেপে উঠলে তখন আর আমার গত্যন্তর রইলােনা। তুমি গর্ব করে উঠলে—“আমি তাে তখন সব বলেছিলাম।” “কিন্তু আমি সে কথা বললে তখন আমার কি দশা হতোকমরেড ঝদারকিন?—চুপ করে কেন? উত্তর দাও।” বলে ষ্টেঙ্কা একটু চুপ করে আবার শুরু করলাে—এবার সত্যি কথাটা মােননা “আমি সত্যই ওকে ভালবাসি।” বলেই সে দ্রুতপদে এগিয়ে গেল। কিরিল অন্যমনস্কভাবে তার পথের দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলাে। • ( ১০ ) সেদিন অনেক রাত্তিরে কিরিল বাড়ী ফিরলাে। সে মনস্থির করে ফেলেছে—আর কখনাে রাগ করবেন। কিন্তু যতবারই সে প্রতিজ্ঞা করে তা রাখতে পারে কই ? বাড়ী ঢুকতেই দেখে দূরে বারান্দায় আলাে জ্বলছে—আর তার সামনে সবাই বসে রয়েছে আলতােভকে ঘিরে ফেনিয়া—প্যাতে—ষ্টেঙ্কা বােগদানভ ! একটা ছবি নিয়ে তারা গভীর আলােচনায় মগ্ন। কিঝিলের আসা কেউ জানতেই পারলােনা-তখন বােগনভ বলছে- ১৫৪ সফণ-প্ন “শিল্পীরাই শুধু সৃষ্টিকর্তা নয়! আমরা সবাই এক। ষ্টেঙ্কার কথা থর-সেও কি নুতন সৃষ্টি করে নাই ব্রিগেৎ... ফিরিল-প্যাভেল ? এদের কার সৃষ্টি কম ? সবার ও সেই তাে নিত্য নুতন প্রতি সৃষ্টি করছে। মা শুধু স্বপ্নই দেখেছেন লেনিন সে সৃষ্টি সুরু করে যান—তা পরিপূর্ণ করব। পড়ে ষ্ট্যালিনের উপর। কমরেড আরণতে! তােমার ছবি সত্যিই চম সত্যকার জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জন্যেই এর এত দাম।” কিরিল দূরে দাড়িয়ে ষ্টোকে লক্ষ্য করছিল। সে যেন অমনস্ক!” সে তাদের এড়িয়ে যাচ্ছিল—এমন সময় ষ্টেঙ্কা ভালাে “কিরিল এসেছে” “সবাই ফিরে তাকালো। বােগ্দানভ চেঁচিয়ে উঠলাে-“কিগাে ব দেবতা কোথায় ছিলে—সারা গা যে কাদায় ভরা ?” ষ্টেঙ্কা একপাশে সরে এসে আস্তে আস্তে বললাে-“তখন তুমি অমন করে চলে গেলে কেন? ওটা তাে একেবারে শেষ কথা নয়। এস চা খাও অনেক রাত হয়েছে।” কিরি কথা ঘােরাবার জন্যে বললাে- “আমি প্রস্তাব করছি যে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আমরা সবাই শিকারে বেরােবােকে কে যাবে?” আৰণতে সবার আগে বললাে—আমি রাজী’ পরে বােগদানভ ও ষ্টেঙ্কা সকলেই যেতে রাজী হল। তারা ধীরে ধীরে প্যাভেল ও কেনিয়াকে বাড়ী পৌছে দিয়ে শিকারে চলে সেই বাঁধের কাছের বিলে। নিশীথ অশান্তি কেটে দূরে দিয়ে ভােরের আলাে দেখা দিচ্ছে। সেই আলাে-আঁধারিতে আকাশে এক ঝাঁক হাঁস উড়ে লাে তাদের মাথার ওপর দিয়ে। কিরিলের বন্দুক গর্জে উঠলাে। একেবারে সে গুলি বৃথা গেলনা। একটি হাঁস ছিটকে পড়লাে তার পায়ের কাছে।

সফলস্বপ্ন ঙ্গেই বােগ্দানভের দিক থেকে আওয়াজ শােনা গেল। দিকের কোনও আওয়াজ তার কানে এলনা ! আরণতেও স্টু পরেই আবার আওয়াজ শােনা গেল। তখন সবাই উম্মত্তের মারছে। গক্ষ্য করলাে দুরে পাহাড়ের ধারে বােগদানভ বসে রয়েছে। সামনে . গড়ার ভেতর দিয়ে কিরিলের মাথা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আরণােেভ ৮ সেজে দূরে পায়চারী করছে। তার বােধহয় সর্দি লাগবার ভয় ৮ হঠাৎ তাদের মাথার ওপর দিয়ে এক গৰু স্টারলিং পাখী উড়ে চললো। .:এলের অব্যর্থ সন্ধানে একটা মাটীতে লুটিয়ে পড়লাে—কিন্তু আর একটা পাখীর ভাল মত না লাগায় সে ঝটপট করতে করতে উড়তে লাগলাে। ষ্টো ভেবেছিল যে হয়তাে কিরিল আবার গুলী করবে। কিরিল মােটেই গুণী করলাে না। সে হেসে উঠলাে-“না ওকে আর মারবােনা বড় সুন্দর দেখায়।” টেকার মনে হল-এ সেই আগেরই কিরিল। তখন থেকেই উেকা একদৃষ্টিতে কিরিলের প্রত্যেকটী গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলাে। কিরিল তখন আস্তে আস্তে সব মরা পাখী কুড়ােচ্ছে। দূরে একটা পাখী কুড়ােতে যেয়ে কিরিল যেমন পা দিয়েছে—অমনি চোরা বালিতে তার পা দুবে যাচ্ছিল! ষ্টেঙ্কা ভয় পেয়ে গেল। কিরিল না থেমে একমনে এগিয়ে যাচ্ছিল —হটাৎ আর তার পা চছিলনা—সে অদৃশ্য হয়ে গেল কোর দৃষ্টিতে ! “কিরিল” বলে ষ্টেঙ্কা ভয়ে চীৎকার করে উঠলাে । সে কাদার চাপ থেকে অনেক কষ্টে কিলি উদ্ধার পেয়ে নৌকায় চড়ে কাপড় ছাড়তে লাগলাে ! কেউ যে আশে পাশে রয়েছে সেদিকে তার নজর নেই। সম্পূর্ণ নগ্ন দেহে কিরিল সূর্যের দিকে মুখ করে দাড়ালাে। “কী সুন্দর বলিষ্ঠ দেহ” ঠো ভাবলাে! সমস্ত কাপড়চোপড় ভাল .

'১৫৬ করে' নিঙড়ে নিয়ে কিরিল আবার পােষাক পরে নৌকা থেকে ও নামলো। সেই নল খাগড়ার ভেতর দিয়ে কিরিল নৌকা টানতে লাগলাে। সমস্ত শরীরের পেশীসমূহ কুঞ্চিত হয়ে উঠলাে! ঠিক সেই সময় মাথার ওপর আর এক ঝাঁক পাখী! কিরিল দেরী না করেই গুলী করলাে! সে গুলীতে দুটো পাখী পড়লো! তাদের আনবার জন্ঠে কিরিল সেই হাঁট জলেই আঁতরে চললাে! ষ্টেঙ্কা চীৎকার করে উঠলাে— “কিরিল! কিরবি?” সে ডাক হঠাৎ কিরিলের কানে গেল। সে থেমে পড়লাে। এতে শুধু চীৎকার নয় ! এযে কাতর আহ্বান! সে ডাকের উত্তর দেবার জন্যে কিরিল টলতে টলতে ফিরে এলাে—সােজা ষ্টেঙ্কার কাছে। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ষ্টেঙ্কা শুধু বলল-“পাগল কোথাকার!” একটু পরে দূরে হ্রদের পাশে বাঁশী বেজে উঠলাে! কিলিও অমনি বন্দুক ভেঙ্গে নলের ভেতর দিয়ে সেই বাণীর আওয়াজের উত্তরে জানিয়ে দিলাে যে তারা সামনে রয়েছে। বাশী বাজিয়ে সার্জী পেট্রোভিচকে অভিনন্দিত করা হ’ল ! অসীম সােভিয়েট রাষ্ট্রের সেদিন অবর-বিপ্লবের বিং বার্ষিকী।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Safal-swapna Ed. 1

Author
Chakraborty, Girin
Title
Safal-swapna Ed. 1
File name
Safal-swapna Ed. 1
Text
OCR done
Published
2010/04/20
Publisher
Purabi Publishers,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
172
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Chakraborty, Girin
DLI number
515190
Barcode
4990010016822.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
gJPWvIw83Ea
Download PDF

Safal-swapna Ed. 1