Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sudha-ra

Dutta,gopendrakrishna · 2010/01/10

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সুধারা ( গান ও কবিতা) শ্রীগােপেন্দ্রকৃষ্ণ দত্ত, এম-এ, প্রণীত প্রাপ্তিস্থান গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, ২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা অগ্রহায়ণ- এক টাকা

শ্রীশৈলেশকুমার দত্ত কর্তৃক প্রকাশিত,
১১৪ নং কেশব সেন স্ট্রীট, কলিকাতা
“বাক্য যেখানে শেষ হইয়াছে, সেইখানেই গানের আরম্ভ।
যেখানে অনির্বচনীয়, সেইখানেই গানের প্রভাব। বাক্য
যাহা বলিতে পারে না, গান তাহাই বলে।”-(রবীন্দ্রনাথ )
গােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত,
ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্ক
২০ ৩১/১, কর্ণওয়ালিশ ছুঁটু, কলিকাতা।

উৎসর্গ
যিনি আমাকে (যেন জন্মান্তর হতেই ) লিখেছিলেন,
“আমি চিরদিন ধরে আমার আত্মা তােমায় দিয়ে শুধু তােমার
উপর নির্ভর করে তােমার ছায়ার মতন তােমার চারিধারে ঘুরে
বেড়িয়েচি—আমি চিরদিনই তােমার সাথী-জীবনে-মরণে
তােমারি, যিনি এখন সুদূর পরপারে থেকেও তাঁর কথা
ক’টীর মর্যাদা পূর্ণমাত্রায় রক্ষা করছেন, তিনি আমার
সহধর্মিণী ; তারই নামে আমার ‘সুধা-রা’র উৎসর্গ—আজ
আমার পরম আনন্দ।
শ্রীগােপেন্দ্রকৃষ্ণ দত্ত

No text on this page.

“নহি জ্ঞানেন সদৃশং
পবিত্ৰমিহ বিদ্যতে।”
( গীতা ৪৩৮ )
উপহার
ভক্তিরনিদর্শন স্বরূপ
মেহের
“সুধা-রা” বইখানি আমি আমার
উপহার দিলাম।
ইতি শ্ৰী
সান ১৩৪
সাল
“Poetry is the breath and finer
spirit of all knowledge”.
( Wordsworth)

নিবেদন শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় আমার ‘সুধা-রা” প্রকাশিত হলাে ; আছে আমার গান ও কবিতা। আমার গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ বাঙ্গলা ও ইংরাজী পত্রে বেরিয়েছে। যে সব ছােট বড় কবিতা ‘ভারতবর্ষ' প্রভৃতি মাসিক পত্রে বেরিয়েছে তাদের কতকগুলো নিয়ে ‘সুধারায় প্রকাশ করলুম, তবে ছােটগুলােকে গান বলেই দিলুম। বাল্যকাল থেকেই আমার কবিতা লেখা অভ্যাস। রাণাঘাট পি, সি, এইচ, ই, স্কুলে পড়বার সময় প্রাতঃস্মরণীয় হেড মাষ্টার নারায়ণদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আমাকে প্রায়ই কবিতা লিখতে বলতেন; তখন আমার বয়স চৌদ্দ বছর। ‘সুধা-রা’র “বঙ্কিমচন্দ্র” কবিতাটী তাঁরই উৎসাহের ফল। এই ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ই আমার প্রথম প্রকাশিত কবিতা। জীবনের পথে চলতে চলতে দুঃখের ঘাতপ্রতিঘাতে-- অমানুষের অত্যাচারে আর মানুষের মনুষ্যত্বে অন্তরে যেখানে যে সব ভাবের উদয় হয়েছে তাদের বিকাশ হয়েছে আমার গানে বা কবিতায় ; আমি যেখানে বসে বা দাড়িয়ে যা’ লিখেছি সেস্থানের নামাদি লিখে দিইছি ; তাই প্রত্যেক গান বা কবিতার নিম্নে বামদিকে বিভিন্ন স্থানের নাম। আর একটা কথা—যে গানে যে সুরের আধিক্য আছে সেই গানে সেই সুরের নামটা দু’একজন গায়ক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে বসিয়ে দিয়েছি সুতরাং গায়ক-গায়িকারা আমার দেওয়া সুরে বিশেষ আস্থা স্থাপন না করে তাদের ইচ্ছা বা সুবিধানুযায়ী যে কোন সুরে গাইতে ঋরেন।

সে
আমার বন্ধু-বান্ধবেরা বই ছাপানাের জন্য বিশেষ উৎসাহদান করেছেন,
কেহ (নিম্নে দেখুন) *
‘সুধা-রা’র ফলাফল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
অন্তরের ব্যথা দিয়ে নানারূপে তার নাম গান করাই আমার উদ্দেশ্য ;
তাই বলেছি-
Sing shall I Thce, Love, through ecstatic cheer
In tunes of melody differently set,
Travel shall I o'er the globe far and near,
And promulgate Thy name which is so pet !
Seated Thou art in the centre of my heart,
Its door being open in fulness of mirth ;
Hearest Thou my singing in artless art ;-
May strains of God-head take a lovely birth!
Sing ever shall I amidst grief and pain ;
Thy presence shall be full in all my song,
Self-forgetfulness being result main
And profusion of tears for all the wrong.
Merge shall I, Love, into Thee in the end
Relieved of all that my breast now rend.
( A Sonnet based on the idcas of “গাইব তব নামটুকু গো
দেশ বিদেশে ঘুরে” পৃঃ ৫)
মহাপুরুষেরা বলেন, ঈশ্বরের চেয়ে ঈশ্বরের নাম বড়, অথচ সে নাম কত
ক্ষুদ্র—ওঁ, হরি, গড়, খােদা ইত্যাদি। ঈশ্বর গুণাতীত অথচ সৰ্বগুণান্বিত
নামের সঙ্গে মেশানাে তার অনন্ত বিভূতি (“নান্তোহস্তি মম দিব্যানাং
বিভূতীনাং পরন্তপ।” গীতা ১০৪০)। তার ইচ্ছায় তার বহুরূপে প্রকাশ
* কেহ প্রুফ "খে সাহায্য করেছেন। তাঁদের সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা
জ্ঞাপন করছি ।

(“তৎ ঐক্ষত বহুস্যাং প্রজায়েয় ইতি”—ছান্দোগ্য)। তিনি একে
বহু এবং বহুতে এক হয়ে সর্বব্যাপী।
কণা কণা বাষ্পে মেঘের সৃষ্টি, বিন্দু বিন্দু বারিতে সমুদ্রের উদ্ভব, অনু-
পরমাণু নিয়ে এই অনন্ত বিশ্ব। বিশ্বের জীবজগৎ তাে দূরের কথা
প্রতি ধূলিকণা—অণুপরমাণু ঈশ্বরের সত্ত্বায় ভরপুর ; তাই আমি আমার
ভাষার মধ্যে “টুকু” কথাটীর প্রয়ােগে(যেমন প্রেমটুকু, রূপটুকু,
স্মৃতিটুকু, গীতিটুকু প্রভৃতি)—বিশ্ববিধাতার বিচিত্র বৈভব ক্ষুদ্রতমাংশ
করে ধারণা করতে চেষ্টা করিছি ; কারণ, তার ঐশ্বর্যের অনন্তত
উপলব্ধি করা আমার সাধ্যাতীত, এখন পাঠক-পাঠিকারা বিচার করুন ।
‘শেলীর কথায় আমার ব’তে ইচ্ছা হয়—
"That Light whose smile kindles the universe,
That Beauty in which all things work and move,
That Benediction which the eclipsing curse
Of birth can quench not, that sustaining Love
Which, through the web of being blindly wove
By man and beast and earth and air and sea,
Burns bright or dim, as each are mirrors of
The fire for which all thirst, now beams on me,
Consuming the last clouds of cold mortality."
(Adonais)
শেষ কথা-সু-ধার’ বড় তাড়াতাড়িতে ছাপানাে হােলাে, হয়তো
এক আধটা সামান্য ভুল বা ত্রুটী পাবে ; পাঠকপাঠিকারা তা অনুগ্রহ
করে মার্জনা করবেন।
ইতি-অগ্রহায়ণ-১৩৪৫ সাল।
গােপেন্দ্র দত্ত

সূচিপত্র ধারা (গান) ২১ ২২ ৪ ২৪ ৬। ৭ ৮ ২৮ বিষয় পৃষ্ঠা ১। যুগ যুগ ধরি’ জনম লভিয়া ২। তােমার দেওয়া দুঃখের বােঝ। ২ কে তুমি? আমারে বল গো ! ৪। লুকাবে কোথা, হে ভগবান? ৫। তােমারি গান গাই আমি অন্তর জুড়ে আছে ভেসে যায় তরণী আমার ৮। বলিব হরি ৯। ভালবাসি তারে আমি ১। তােমারি লাগিয়া অঞ্জলি ভরি’ ১১। দিও না চরণে ঠেলে ১২। রাতির ভােরে ঘুমের ঘােরে চলে যে তরণী ধীরে ১৪। এস প্রিয়তম প্রাণে ১৫। (কবে) আপন করে পাওয়াটুকু ১৫ ১৬। মহাকাল দ্বার খুলেছে এবার ১৭। দেবতা জাগো, দেবতা জাগাে ১৮। যেদিন প্রথমে দেখা ত সনে ১৯। পাবদা কি তােমা, ভগবান ? ২০। চদিনী রাত, কাহার কথা বিষয় পৃষ্ঠা ২১। ( আজি) বাদলরাতে ব্যথাটুকু ২২। জীবনটুকু কে কতদিন ২৩। সুরের আলো ২৪। শিশির ঝরা গােলাপ যেন ২৫। গানটুকু মাের গেয়ে, প্রিয় ২৬। তােমারি কামনা,তােমারি ভাবনা ২৬ ২৭। স্মৃতির হাওয়া ভরিয়ে দেছে २१ ২৮। হােলি খেলায় রাঙা মেলায় ২৯। দিবস-যামিনী ভাসাে কে গাে তুমি ৩০। বাসিয়াছ তুমি ভালাে ৩১। জীবনে যদি গো দেখা নাহি দাও ৩১ ৩২। গানটুকু মাের জীবন সাথী ৩৩। আলেটী তােমার ধর ৩৪। আলাের আলাে লেগে অামার ৩৫। ভালবাসাটুকু দিও ৩৬। পূরব তােরণ-শিরে ৩৭। ভূলাে না, ভুলে না মােরে এমন বাদল ধারা (আমি) তব নাম ধ'রে ১২ ১৪ ৩৪ ১৬ ১৮ সূচিপত্র পৃষ্ঠা ৫৯ ৪১ ৬১ ৪৩ ৬৪ ৪৭ ৪৮ বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় ৪। জনমে জনমে জীবনে মরণে ৫৯। বুকের মাঝে একে যে গেছ ৪১। দিনের আলাে ফুরিয়ে গেল ৬। মিলিয়ে গেল ৪২। তুমি যে বাস গো ভাল ৪২ ৬১। জাগে স্মৃতিটুকু ৪৩। জনম জনম নিরখি’ ও রূপ ৬২। সে কেন এসেছিল ৪৪। ঘাটে বসে একা হেরি যে কত তরী ৪৪ ৬৩। হৃদয় আমার শূন্য আজি ৪৫। আমার এই ভাঙা ঘরে ৬৪। তােমায় আমি ডাকছি কত ৪৬। দাও যা তুমি নেবে মাথায় এস গাে প্রিয় ৪৭। মালাটুকু শুয়ে গেছে ৬৬। জনম জনম হেরিনু ৪৮। বস হে মুরারী (কবিতা) ৪৯। দিন যাবে রে ৬৭। বঙ্কিমচন্দ্র ৫১। তােমার স্মৃতি বুকেতে রেখে ৬৮। প্রগতি বন্যা ৫২। গন্ধ তব মিশিয়ে আছে ৬৯। অর্চনা ৫৩। কত কাল, বঁধু, ৭। কৰ্ম্মযােগ ৫৪। গাহিব তােমারি গান ৭১। আদর্শ ৫৫। প্রভাতে উঠিয়া তােমারে পূজিয়া ৫৫ ৭২। মুক্তি ৫৬। ওগাে দেবতা, ৭৩। দিল্লীস্মৃতি গেয়ে যা রে মন ৭৪। গরীব দেবতা ৫৮। অসীম আজি সসীম হ'য়ে ৭৫। অভিমান ৪৯ ৭০ ৭২ ৪ ৭৫ ৭৭ ৫৮

No text on this page.

সুধারা
গােপেন্দ কৃষ দত্ত, এম,এ,
(লেখক)

No text on this page.

No text on this page.

তুমি যে পরম প্রেমটুপ্রিয়।
(১)
যুগ যুগ ধরি’ জনম লভিয়া
বাসিব তােমারে ভালল;
তুমি যে পরম প্রেমটুকু, প্রিয়,
সুধা মাখাইয়ে ঢালাে।
আকাশে তােমার স্বরূপ ছড়াননা,
বাতাসে তােমার সুবাস জড়ানাে,
স্বরগে মরতে হিয়ার পরতে
জ্বলে যে তােমারি আলাে।
তােমারি স্মরণে কারণাকারণে
চোখে বারি মাের
ঝরে গাে কেন!
তাই বলি আজ, কাজ বা অকাজ
তােমারে সপিতে
পারি গাে যেন!
করুণার বারিকণাটুকু দিয়ে
ধুয়ে দিও যত কালাে।
সুর-কীর্তন
কার্তিক, ১৩৪৩,
“ভারতবর্ষ* পত্রিকায় প্রকাশিত
মাঘ১৮
কেশব সেন ঐট, কলিকাতা।

গবালা
বাঁধবে নাকি মিলটুকু?
(২)
তােমার দেওয়া দুঃখের বােঝ
বইবাে আমি মাথায় করে ;
তােমার নেওয়া রইবাে স’য়ে
ডেকে তােমায় পরাণ ভরে।
তােমার নামের নাইকো সমান,
“মানুষ” যে তা’র উজল প্রমাণ,
তােমার দেখা না পাই যদি,
তােবাে তব নামের জোরে।
হাসা কঁাদার রঙ মহলে
গাইবাে তােমার গান,
তারই সুরে উঠবে মেতে
তােমার মহৎ প্রাণ!
দেখবে তখন নানান ছলে
ডুবিয়ে আমায় চোখের জলে ;
বাঁধবে নাকি মিলনটুকু
'আপনহারা প্রেমের জােরে ?
সুর--সাহানা
“কিশলয়" পত্রিকায় প্রকাশিত
বৈশাখ-১৪ ৩,
হাওড়া স্টেশন, ই, আই আর।
আষাঢ়-১৩৩

জীবন সম্বলটুকু
গাে!
কে তুমি? আমারে বল গাে!
হৃদয়েরি বল, সাধনারি ফল,
জীবন সম্বলটুকু গাে !
সৃজন-পালন-প্রলয় কারণ
যােগী যােগবলে কহে গাে,
তব গুণ শুনি কখনাে দেখিনি
শুধু মনে জানি আছ গাে।
রবি শশী আদি যত গ্রহতারা
তােমারি নিয়ম প্রচারি’ যে সারা!
তুমি পরাপরা, বেঁচে থাকা মরা,
দিবস-রজনী-ধারা গাে।
পাপী বলে তুমি পতিতপাবন,
তাপী বলে তুমি ত্রিতাপশন,
জ্ঞানী বলে তুমি পরম বাঁধন,
আমি বলি প্রেমটুকু গাে।
সুর-ইমন মিত্র
“ভাতৰ” পত্রিকা প্রকাশিত
कारिक-७०२
মাণিকতলট, কলিকাতা।

জনম-প্রবাহটুকু আনে মরকলরব- - (৪) লুকাবে কোথা, হে ভগবান? যেখানে রহিবে তুমি, ধরিব যে পদ চুমি! নারিবে সরাতে তব প্রাণ। আকাশ বাতাস আলাে বিকশি’ মহিমা তব ছড়াইছে দিবানিশি বিভূতি গাে নব নব ! জনম প্রবাহটুকু আনে মরকলরব-- তােমাতে আমাতে ব্যবধান। তােমার সৃজনধারা, তােমারি প্রলয় রীতি, তােমারি এ ক্ষিতি হতে সুষমা সুরভি গীতি উজলি’ ধ্বনিছে আর নীরবিছে নিতি নিতি, -চরমে তােমাতে অবসান ! সুর-ভৈরব “কিশলয়” পত্রিকায় প্রকাশিত আখা-১৩৪ লিয়া, ই, আই, আর গড়-১৩

ইব তব নামটুকু গাে দেশ বিদেশে ঘুরে !
-
তােমারি গান গাইব আমি,
গাইব নানা সুরে ;-
গাইব তব নামটুকু গাে
দেশ বিদেশে ঘুরে !
হৃদয় মাঝে আসন পেতে গায়িব দ্বার খুলে,
বােসবে তুমি সেই আসনে, শুবে হেলে দুলে ;
পরশটুকু সেই দোলনে
মাতাবে মাের মন বােধনে
উঠবে বেজে রাগ-রাগিণী ভাঙ্গা জীবন পুরে!
যেথায় ব্যথা তিক্তদাহ গাইব গাে সেইখানে,
তুমিই শুধু রইবে, প্রিয়, পূর্ণ আমার গানে,
হবাে তখন আপনহারা,
নয়নে মাের বইবে ধারা;
তব প্রাণে মিশবে এ প্রাণ, ভাবনা যাবে দূরে।
সুর-ভাটীয়ালী
আশ্বিন-১৩৪৩
হাওড়া স্টেশন, ই, আই, আর

দা
আমার যেটুকু সেৱা তােমারি পরশে ঘেৱা !
অন্তর জুড়ে আছে,
দেবতা আমার।
ঢালিব তােমারি পায়ে
বােঝা বেদনার।
আমার সাধের তরী
সাজায়ে আপন করে
ভাসায়ে দিয়েছি, প্রিয়,
নয়ন-দরিয়া পরে ;
আমার বলিতে কোননা
কিছু রাখিনিকো শােননা,
ভাবিয়া তােমারি কথা সার।
এবার কি, প্রিয়তম,
জুড়াবে বুকের জ্বালা ?
পাব কি তােমার দেখা
পরাতে মিলনমালা ?
আমার যেটুকু সেরা
তােমারি পরশে ঘেরা
তুমি যা’র ভাবনা কি তার ?
।
সুর-ভৈরবী মিশ্র
কে সে এট, কলিকাতা

चा-या
সেটুকু কি পাব গো শেষে ?
ভেসে যায়
তরণী আমার,
কোথা কোন অজানা দেশে।
যাহা চায়
পরাণ আমার
সেটুকু কি পাবাে গাে শেষে ?
দরিয়া মাঝারে যেথা
ঘূর্ণি হাওয়া,
সেথা যে গাে বড় দায়
তরণী বাওয়া!
হাল ছেড়ে পাল তুলে
যাবে তরী দুলে দুলে,--
নেচে নেচে তালে তালে,-
প্রণয়া-বেশে।
কোথা কোন অজানা দেশে !
সুর-আলেয়া
আষাঢ়-
১৩৪৪
কারিন নােড়, কলিকাতা
'?

নামটুকু ল'য়ে মাতােয়াৱা হ'য়ে
করিব
যতেক
কাম !
( 8 )
বলিব শ্রীহরি,
স্মরিব শ্রীহরি,
লইব শ্রীহরি নাম ;
নামটুকু লয়ে
মাতােয়ারা হয়ে
করিব যতেক কাম।
শ্রীহরি নামের শ্রীহরি তুলনা,
শ্রীহরি পাবার নামই সূচনা,
শ্রীহরি কারণ শ্রীহরি সাধন,
হরি মােহন সাম।
হরিনাম গানে নামই আসােল,
তাই প্রাণ বলে বল হরিবােল ।
শ্রীহরি ভজিয়া, শ্রীহরি ধরিয়া,
যাব গাে শ্রীহরি ধাম।
.
আষাঢ়-১৩৪৪
কেশব সেন ৮ট, কলিকাতা।

‘ভালবাসি’ ‘ভালবাসি',—কথাটুকু মিছে না রে।
(৯)
ভালবাসি তারে আমি
বলিব গাে বারে বারে,
‘ভালবাসি ভালবাসি,
কথাটুকু মিছে নারে !
‘ভালবাসা ভালবাসা,
তােমার মহিমা খাসা,
তুমি যে গাে পরমাশা
ইহকালে পরপারে।
যমুনা পুলিনে আমি
কত যে বেসেছি ভালো,
ভালবাসা রূপ ধরে
কত ঘরে জ্বালি আলাে।
তবুও মেটেনা নেশা,-
অপরূপ ভালবাসা !
জ্বলে সে যে ধীকি ধীকি
অশেষ জীবন-তারে।
সুর-দেশ
হায়ণ-১৩৪
চিত্রয়ন এ্যাভিনিউ, কলিকাতা।

ধরাটুকু মাৰে আছ, প্রিয়তম,
(১০)
তােমারি লাগিয়া
অঞ্জলি ভরি’
এনেছি ব্যথার ডালা ;
তােমারে স্মরিয়া
নয়নেরি জলে
জপেছি দুঃখেরি মালা
দীন-অতি-দীন করেছ আমারে,
জানি না কি দিয়ে পূজিব তােমারে ।
আছে শুধু বুকে বেদনারি বােঝ,
তাই ও চরণে ঢালা !
ধরাটুকু মাঝে আছ, প্রিয়তম,
খেলিছ যে খেলা লুকোচুরি সম !
দরশনে কবে হবে গাে মিলন,
ঘুচিবে বিরহ জ্বালা!
সুর—আশাবরী
অগ্রহায়ণ-১৩৪৩
হরিন নােড়, কলিকাতা।

ভুবন-ভােলানাে রূপটুকু কবে
হেরিব নয়ন মেলে ?
(১১)
দিও না চরণে ঠেলে ।
দেবতা আমারি, সাধনা আমার,
রেখােনাকো দূরে ফেলে।
পথের মাঝারে
চলিতে চলিতে
যদি গাে ভুলেরি ভারে,-
দুঃখের তাড়নে
দূষি গাে তােমায়,
ক্ষমিও জীবনপারে।
দশদুঃখে তুমি
দশ-অবতার,
প্রাণের দেবতা,
হে প্রিয় আমার ।
ভুবন-ভােলানাে
রূপটুকু কবে
হেরিব নয়ন মেলে ?
সুর-রামকেলী
পৌষ-১৩৪৩,
হাড়া স্টেশন, ই আই, আর!

স্মরণটুকু হৃদয়ে মেখে
ঘুমায়েছি বকুল-তলে—
(১২)
রাতির ভােরে,
ঘুমের ঘােরে,
এসেছিল সে আমারি পাশে!
তখনাে ছিল
দরদ-ভরা
গলেতে মালা, জ্যোছনাকাশে;
তখনাে তরী ঘাটেরি ধারে
ছিল যে বাঁধা যেতে গাে পারে!
তখনাে আঁখি স্বপনভারে
ছিল গাে যেন দরশনাশে!
স্মরণটুকু হৃদয়ে মেখে
ঘুমায়েছি বকুল-তলে,
মরম-কোণে ছিল সে জেগে
ছড়ায়ে হাসি ফুলের দলে ;
থাকে সে কাছে, অথচ দূরে,
এ যেন ধাঁধা!-দেখে সে হাসে।
সুর-বেহাগ
বৈশাখ-১৩৪৪,
লিগ, ই, আই, আর ।

তব ছবিটুকু মরমে আঁকিয়া
করি কত ভােলাপাড়া
(১৩)
চলে যে তরণী ধীরে।
ছিড়ে গেছে পাল,
ভেঙ্গে গেছে হাল,
ভাসি আমি আঁখি নীরে ।
নিভে গেছে দীপ, নিভেছে চঁাদিমা,
চারিদিকে ঢালা বিষাদ কালিমা,
নাহিক বাতাস, নাহি বহে শ্বাস,
বুকখানা যায় চিরে ।
তব স্মৃতিটুকু
জাগায়ে রেখেছে।
আমারি চেতনা সাড়া,
তব ছবিটুকু
মরমে অকিয়া
করি কত ভােলাপাড়া !
-দেখা পাবাে বলে দুঃখের পসরা
ব’য়ে চলি নতশিরে ।
সুর-ছায়ানট
মাধ-১৩৪৩,
গ্র্যাণ্ডটাঙ্ক রোড়, সালকিয় ।

২e
তব বেদীটুকু সাজাবাে যতনে
কামনা-কুসুম ঢালি’
(১৪)
এস, প্রিয়তম, প্রাণে।
অন্তর দিয়ে
মন্দির মম
রচিয়াছি তব গানে।
তব বেদীটুকু
সাজাবাে যতনে
কামনাকুসুম ঢালি’,
তব আলােটুকু
হেরিব নয়নে
দীপশিখাটুকু জ্বালি’ ;
সারাটী রজনী
করিব আরতি,
হৃদয় খুলিয়া
জানাবাে গাে নতি,
মুখরিত হবে
গৃহ প্রাঙ্গণ
শঙ্খ-ঘণ্টা-তানে।
সুরমিত রামকেলী
কালীরাখা, দেওঘর।

( কবে) আপন করে পাওয়াটুকু
উজল হয়ে উঠবে গাে !
(১৫)
( কবে) আপন করে পাওয়াটুকু
উজল হয়ে উঠবে গাে !
( কবে) আপন ভােলা মনের মাঝে
তােমার আলাে ফুটবে গাে !
( কবে) তােমায় ভরা তােমার ছায়া
ছাইবে মম বচন কায়া,
( কবে) আমার হৃদি-বৃন্দাবনে
উজানে প্রেম ছুটবে গাে !
( কবে ) তােমার বুকে বুটী রেখে
মুখটী মধু লুটবে গাে !
( কবে) এমন করে পেয়েও তবু,
পাবার নেশা ঘুরূবে গাে !
সুর-কীৰ্ত্তন মিশ্র
ফান-১৩৪৩,
যশিডি ষ্টেশন, ই, আই, আর।

—শুনে সেটুকু বাণী প্রাণ জুড়ালাে !
(১৬)
মহাকালদ্বার খুলেছে এবার
যাবাে যে নদীপার, ধর গাে আলাে।
একে একা চলা, তাতে পথ ভােলা,
সাথে যে ভাঙ্গা ভেলা গােল বাধালো !
সুদূর পরপারে কে যে গাে সুরবালা
হাসিছে লাজভরে লয়ে প্রণয়ডালা,
ডাকে সে, “এস, প্রিয়, সাঙ্গ ভব-আলা”
শুনে সেটুকু বাণী প্রাণ জুড়ালাে ।
“বেসসা না কভু ভালাে” বলে সে গানে গানে,
“আমারে বেসে ভালাে বেদনা অভিমানে
কত যে পেলে ব্যথা আপন মন-প্রাণে!
তাহারি ফলে বুঝি, মরণ ভালাে”।
কহে সে আলাে ধরে, “এস না, প্রিয় দলে
আমারি দেয়া মাল। যা আছে তব গলে,
ভালাে যে বাসি তােমা সপিয়া পদতলে
আমার আমিটুকু ঘুচাতে কালাে”।
সুর-ভৈঁরে
অগ্রহায়ণ-১৩৪৯
হেম, কলিকাতা।

—স্বৱগটুকু পাবাে মরণে।
(১৭)
দেবতা জাগাে, দেবতা জাগাে,
আমার হৃদিবৃন্দাবনে ;
পুণ্যতােয়া যমুনাধারা
বইবে তবে কলম্বনে।
সকাল সাঁঝে বাজবে বাঁশী,
আপনা ভুলে হবাে উদাসী,
তীর্থকরা গয়া বা কাশী
পূর্ণ হবে মাের জীবনে।
পুজার আগে সাজাবাে ডালা,
আরতিক্ষণে পরাবাে মলি,
ঘুচিবে যত মরম জ্বালা,
স্বরগটুকু পাবদা মরণে।
-
সুর-নায়কী কানাড়া
জ্যৈষ্ঠ-১৩৪৩,
চিত্তরঞ্জন এ্যাভিনিউ,
কলিকাতা।
২

পােরা
ওইটুকু নিয়ে চলি’ ধীরে ধীরে
দাঁড়াবাে নীরবে সাগরের তীরে ।
(১৮)
যেদিন প্রথমে দেখা তব সনে
ক’হেছ সে দিনে “আমি যে তােমারি” ;
শুধায়েছ আরাে “এতখানি সুখ
স’বে কি বরাতে,র’বে কি আমারি ?”
-এই কথা কটী শ্রবণে যে বাজে
দিবস যামিনী অবসরে কাজে,
আর মুখটুকু উজলি’ যে রাজে!
জাগে কত ব্যথ মরম বিদারি।
সেদিন প্রভাতে যেতে যেতে সাথে
ঢেলে দিলে পীযূষেরি ধারা ;
আজ তারি স্মৃতি ভাসে ভাঙ্গা বুকে,
হয়ে যাই যেন আমিহারা ।
-ওইটুকু নিয়ে চলি’ ধীরে ধীরে
দাড়াবাে নীরবে সাগরের তীরে।
তুমি এসে মােরে নেবে বাহু ঘিরে,
বিরহেরি জ্বলা নিভিবে দোহারি ।
সুর-সুরট মিশ্র
কাক-১৩৪৩.
লিলুয়া, ই, আই, আর

আমিটুকু ভেঙ্গে গড়ে
গাহিছ আপন জয় !
(১৯)
পাবাে কি তােমারে, ভগবান ?
পাব কিহে, প্রিয়তম,
হৃদয়দেবতা মম ?-
ধ্বনিবে কি হৃদে তব গান ?
আমার আমিটা নিয়ে হয়ে আছো আমাময়,
আমিটুকু ভেঙ্গে গড়ে গাহিছ আপন জয় ;
আমি যে আমারি কারা,
তাই তাে পাগল-পারা!
অন্তর করে সমাধান।
আমার এ দেহটুকু তােমারি আছে তা জানা,
আমারি এ মনােমাঝে তােমারি ভাবনা নানা ;
অনাদি অসীম ‘আমি’
তােমারি শরণকামী-
জনমে মরণে প্রণবান!
সুর—মিশ্র ভৈরবী
ভাদ্র--১৩৪৪,
বেলুড় ষ্টেন, ই, আই, আর ।

প্রাণটুকু যে আছাড় খেয়ে
মাখছে গায়ে অনন্ত ।
( ২০ )
চাদিনী রাতে কাহার কথা
র’য়ে র’য়ে মনে পড়ে
জাগেরে কত গােপন ব্যথা।
ফোটা ফুলের গন্ধ লয়ে
দখিণ বায়ু যায় রে ব’য়ে!
পালভরা ঐ নেয়ের তরী
চলছে ধীরে ওপার যথা।
অশ্রুমাখা চোখের কোলে
বুকচাপা মাের বেদন ভার
কে যেন রে ভাসিয়ে তােলে।
গায় তটিনী করুণ সুরে,
বিহগ গাহে গগনপুরে,
প্রাণটুকু যে আছাড় খেয়ে
মাখছে গায়ে অনন্ত।
সুর--মান্দবিহাগ
চৈত্র -১৩৪২
হেদুয়ার ধার, কলিকাতা।

(আজি) বাদলৱাতে ব্যথাটুকু যে জাগে !
(২১)
( আজি) বাদলরাতে
ব্যথাটুকু যে জাগে !
বুকে বিঁধিয়া সে যে
মরমে লাগে।
(তবু) মােহনসুরে
মাের মানস-পুরে
কে যেন গাহে গান
( হের )
( ওই )
প্রণয়-রাগে !
ঝর ঝর ঝরিছে বরষাবারি
থর থর কঁপিছে হৃদি যে ভারী ;
তটিনী বহিয়া জল
-কল কল! ছল ছল্ !!
দরদী সাগর-দেহ
পরশমাগে;
(হায় )
অশ্রু বেদনা শুধু
আমারি ভাগে !
সুর—মিশ্ৰবাহার
শ্রাবণ-১৩৪৩
আওতােষ দে লেন, কলিকাতা

জীবনটুকু কে কতদিন
রাখতে পারে এ দুনিয়ায় ?
( ২২ )
জীবনটুকু কে কতদিন
রাখতে পারে এ দুনিয়ায় ?
রজনী-দিন-ভেদ ঘােচে রে !
মরণ যদি না থাকে তায়।
আঁধারে তাই আলােয় প্রীতি,
বিরহে তাই মিলন-স্মৃতি,
মরণে তাই নিতুই নব
জীবনরাজে এ বসুধায়।
সুখের পরে আছে দুঃখ,
দুঃখের পরে সুখ ;-
প্রকৃতির এ বিরাটধারা
ছােটে সাগর-মুখ ;
তাকাসনে রে পিছন ফিরে,
কৰ্ম্ম নিয়ে চলরে ধীরে,
সঞ্চিত যা কিছু রে তাের
লাগবে কাজে পারে খেয়ায়।
সুর—মিশ্র গজল
শ্রাবণ-১৩৪৩,
আশুতােষ দে লেন, কলিকাতা।

লয়টুকু কি ফিবে না রে ?
( ২৩ )
সুরের আলাে
জ্বালবাে আজি
আমার ভাঙ্গা খাটের পাবে,
মূরছনা যা’
উজল হবে
লয়টুকু কি ফিরবে নারে ?
বকুলতলে
গােড় বাে এবার
গানের গাঁথা অর্চনাঘর ,
বসাবাে তায়
প্রেমের ঠাকুর,
চাইবাে হৃদি-প্রার্থিত বর
ধূপটী কভু জােবাে কোণে,
ভক্তি কভু রােইবাে মনে,
অর্ঘ্য কভু সামনে থেকে
হেরবাে আমার দেবতারে।
সুর--সিন্ধু মিত্র
বৈশাখ-১৩৪৪
কেশব সেন গুট, কলিকাতা ,

গগনটুকু উপকুলে
সাজিয়ে খোপা আলাের ফুলে-
শিশিরঝরা গােলাপ যেন
ফোটে সে মাের মন বাগিচায় ।
সুরভি তা’র দিক্‌ আমােদে,
মেতে গাে যায় প্রাণ মদিরায় ।
আবেশভরে পরিয়ে মালা,
মৃণালভুজে সাজিয়ে ডাল,
কয় সে “প্রাণের দেবতাগাে,
মিটাও তৃষা বদন-সুধায়”।
জ্যোৎস্নাঢালা নিঝুমরাতে
তন্দ্রাঢাকা দরিয়াপার,
বাজায় বুকে
বিদায়বীণা,
ভাসায় চোখে শতেকধার!
গগনটুকু উপর-কূলে
সাজিয়ে খোপা আলাের ফুলে
দরদমাখা অাঁচল-বায়ে
মুছায় নয়ন এ নিরালায়।
সুর-সাহানা মিশ্র
ফাগুন-১৩৪২,
হেদুয়া, কলিকাতা।

গানটুকু মাের গেয়ে, প্রিয়,
বাজিয়ে যাব জীবনবীণা ;
}
গানটুকু মাের গেয়ে, প্রিয়,
বাজিয়ে যাবাে জীবনবীণা ;
তােমায় শুধু শুনিয়ে যাবাে,
জাবেনাকো শুচো কিনা।
যে জন আমায় নিন্দা করে
‘ভালই কর’ বােবাে সরে ;
সেটা যে মাের দেহাভরণ
সােণার গায়ে যেমন মিনা ।
যে জন আমায় নিঠুর প্রাণে
বিদ্ধ করে কথার বাণে,
বন্ধু সে যে,-সজাগ রাখে।
-ঘুমাই পাছে বচন বিনা!
যে জন অপমানের গরল
ঢালবে মুখে করে তরল,
বাস্বাে ভাললা তারেই বেশী,
অভাব তারি তােমায় চিনা!
সুর-লগ্নীমিশ্র
ফান-১৩৪৪,
হাওড়া স্টেশন, ই আই আর

মােগীযােগটুকু তােমারি লাগিয়া ( ২৬ ) --- তােমারি কামনা, তােমারি ভাবনা, তােমারি সাধনা সার ! তুমি যে, বঁধুয়া, পরম রতন- জীবনমরণাধার ! যােগীযােগটুকু তােমারি লাগিয়া, জ্ঞানীর যে জ্ঞান তােমারে ভাবিয়া, যেখানে যা হেরি সাজানাে তােমারি, তুমি সবে—সবাকার ! কতদিন কত মাস ও বরষ কাটায়েছি বুকে তােমারে পেয়ে ! তােমারে যে পায়, দুঃখ তারি যায়, তুমি থাক তার পরাণ ছেয়ে, তােমারি আশায় আছি গাে ধরায়, ডাকি তোমা শতবার ! সুর-কীৰ্ত্তন মিশ্র বৈশাখ-১৩৯৪, কেশব সেন স্ট্রীট, কলিকাত।

এবারে তাই বাবাে ভালাে
সেইটুকুই যা’ ভগবান
( ২৭ )
স্মৃতির হাওয়া ভরিয়ে দেছে
আমার প্রাণে ব্যথার গান,
সেই গানেরি সুরের ধারায়
ছুটছে যে গাে দুঃখের বান।
হারিয়ে তারে পরাণ কঁদে,
লিখিগাে তাই করুণ ছাঁদে,
ভাবিনি, হায়, এমন হবে
আমার দিনের অবসান ।
বাসবে ভালাে অতি-অধিক
ফল হবে গাে জীবনে ধিক্।
এবারে তাই বাবাে ভালো
সেইটুকুই যা ভগবান ।
সুর-মিশ্র পূরবী
হায়ণ-১৩৪২,
হেদুয়া, কলিকাতা

শান্ত হবে
হৃদয়টুকু,
( ২৮ )
হােলি খেলায় রাঙা মেলায়
রঙিয়ে দেবাে বঁধুর গাল ;
আবীর গাঙে ডুব টী দিয়ে
লুকিয়ে রবাে কতককাল।
আকাশগায়ে সন্ধ্যাতারা
করবে মােরে পাগলপারা!
রাত টী যবে আসবে ধীরে
হােলির রঙে কোবাে লাল।
হােলির হাটে বেচিব মাের
বুকের ব্যথা,
মনের কালাে,
কিনবে যে গাে ব্যথার ব্যথী,
ধরণী যার
আলােয় আলাে !
শান্ত হবে হৃদয়টুকু,
ঘুচবে যত দুঃখের হাল।
সুরবাহার মিশ্র
ফাগুন-১৪২
হারিসন রােড, কলিকাতা

প্রতিটুকু মাঝে মায়ার বরুণা—
( ২৯ )
দিবসমিনী
ভাসাে কে গাে তুমি
কাজে অবসরে মন-পারাবারে।
চিনি মনে করি,
চিনিতে না পারি,
শুধু জানি তাররা অকূল পাথারে।
কভু জায়া হয়ে বাঁধগাে প্রণয়ে,
কভু পতি হয়ে ধর গাে হৃদয়ে,
কভু পিতা, মাতা, কভু ভয়ত্ৰাতা,
কাননে ভূধরে এপারে ওপারে।
দুঃখ দেখে কভু তুমি যে করুণা,
প্রতিটুকুমাঝে মায়ার বরুণা,
কভু তব দেয়া, কভু কেড়ে নেয়া,
আলােক আঁধার তােমার বিচারে।
সুর-কেদার মিশ্র
কার্ত্তিক-১৩৪৩,
হেদুল, কলিকাতা

দৱদটুকু যে ঢালল !
( ৩০ )
বাসিয়াছ তুমি ভালাে।
আপনা ভুলিয়া পরাণ খুলিয়া
দরদটুকু যে ঢালাে।
কতজনমের পরে, প্রিয়তম,
পেয়েছি পরশ তব,
কত মরণের স্রোত-মুখে ভেসে
পেয়েছি জীবন নব,
কত ঘুম ঘােরে
কত ভাঙ্গা স্মৃতি।
‘তুমি’-‘আমি’-ঘেরা
কত মধু-গীতি
কত যে গেয়েছি
তােমাতে আমাতে
—আঁধারে আজি সে আলো !
সুর-সুরট মিশ্র
ভ-১৩৯৪,
কেশব সেন স্ট্রাট, কলিকাত।

স্বপনের মত ভাতিবে যেন গাে
স্মৃতিটুকু ঘুমভারে !
( ৩১ )
জীবনে যদি গাে দেখা নাহি দাও,
দেখা দিও, প্রিয়, মরণে ;
যতদিন দেহে রহিবে পরাণ,
রাখিব তােমারে স্মরণে।
সারাটী রজনী প্রদীপ জ্বলিয়া
রহিব দিবসকরম সারিয়া,
বীণাটি অরুণ-উদয়ে সাধিয়া
মাতাইব তােমা বরণে।
ভেসে যাবে ভাঙ্গা
তরীখানি মাের
সুদূরের পরপারে !--
স্বপনের মত
ভাতিবে যেন গাে
স্মৃতিটুকু ঘুমভারে !
-এরি মাবো তুমি হবে যে উজল !
লুটাবাে রাতুল চরণে।
সুর—ইমন পূরবী
আষাঢ়-১৩৪*,
হারিসন রােড, কলিকাতা।
!

গানটুকু মাের জীবন-সাথী,
(৩২)
গানটুকু মাের জীবনসাথী,
গান গাহি তাই ব্যথার ঘােরে ;
আকাশ বাতাস কাঁপছে গানে,
গান করেছে পাগল মােরে !
গায় তটিনী লহর তুলে,
গায় পাপিয়া পরাণ খুলে,
গানের সুরে সুর দিয়ে গাে
বকুল কুঁড়ি পড়ছে, ঝােরে !
গান গেয়ে যায় নেয়ের মাঝি
প্রেমের আলাে জ্বালিয়ে দেরে !-
আলাের আলাে উঠবে জ্বলে
ভুবনটাকে পূর্ণ হেরে,
গানের হাওয়া উঠেছে তাই
আমার ভাঙ্গা-ঘাটের দোরে ।
সুর-গজল মিশ্র
চৈত্র-১৩৪৩,
হারিসন রােড়, কলিকাতা।

বসে আছি একা স্মৃতিটুকু নিয়ে
আলােট তােমার ধর।
আঁধারে চলিতে
নারি যে গাে, প্রিয়,
হৃদি কঁপে থর থর।
বসে আছি একা
স্মৃতিটুকু নিয়ে
তটিনীর ভাঙ্গাকুলে,
পরপার হতে
দুলে দুলে এসে
নেবে মােরে বুকে তুলে ;
আললাধরা কাজ না রবে তােমার,
ঘুচে যাবে যত বেদনা আমার ;
হিয়ার মাঝারে হিয়াটী রাখিয়া
ভেসে যাবাে তর তর !
সুরভীমপলশ্র মিশ্র
ফাগুন-১৩৪৩,
কর্ণওয়ালিশ ঐট, কলিকাতা।

—তখন সে যে আলােকটুকু
আমার আগে ধরেছে !
(৩৪)
আলাের আলাে লেগে আমার
পরাণ আলাে করেছে ;
সেই আলােতে স্নান করে সে
আমায় ভালবেসেছে।
আঁধার পথে গহিন রাতে
চলছি যবে শূন্য হাতে,
তখন সে যে আলােকটুকু
আমার আগে ধরেছে,
সেই গাে আলাে, সেই গাে আলাে,
হৃদয় যা’রে বাসূছে ভালাে ;
সে আলো আজ উজল হয়ে
ভুবন আলাে করেছে।
সুর-সিন্ধু মিত্র
জ্যৈষ্ঠ-১৩৪২,
হনুমান রােড, নিউদিল্লী।

ভালবাসাটুকু দিয়াে ! ( ৩৫ ) ভালবাসাটুকু দিয়াে। যা কিছু আমার সকলি তােমার বােঝাপড়া করে নিয়ে। তুমি মম, প্রিয়তম, কাঙালেরে তুমি বুকে তুলে লও- তােমারে গাে কোটী নম। কভু তুমি আলাে, কভু বা আঁধার, কভু তুমি জাল বিরাট ধাঁধার । তব গতিবিধি বুঝি বা না বুঝি বুঝি যেন তুমি প্রিয়। সুর-মিশ্র বেহাগ পৌষ-১৩৪৩, বৈদ্যনাথধাম ষ্টেশন, ই, আই, আর।

यात्रा
বিরহ-মেঘের কোলে
বিজলীটুকু যে দোলে ।
( ৩৬)
পূরব তােরণ-শিরে
অরুণ উদিছে ধীরে।
জাগাে, প্রিয়তম, জাগাে,
আমি যে তােমারি দ্বারে ।
সারাটী রজনী একা
কঁদি, নাহি তব দেখা
তাই আসি নিতি, প্রিয়,
শুধু তােমা হেরিবারে।
যাতনা লাঘব লাগি’
ও দেহ পরশ মাগি,
ঘন ঘন মুখচুমি
ঘিরি’ তােম চারিধারে।
বিরহ-মেঘের কোলে
বিজলীটুকু যে দোলে !
তবে কেন চোখে বারি ?
মিলন হবে যে পারে।
সুর—ইমন মিশ্র
মাঘ১৩৪২,
জুনবাধ, বৈদ্যনাথধাম।

(তুমি) জীবনটুকুর দানে,
দিয়েছ আমায় মায়া ভালবাসা
( ৩৭ )
ভুলাে না, ভুলাে না মােরে।
হে প্রিয় দেবতা,
আমার বারতা
=
)
শুন গাে যতন করে।
(তুমি) জীবনটুকুর দানে,
দিয়েছ আমায়
মায়া ভালবাসা
শুধু কি খেলারি ভাণে ?
এ যে নহে খেলা,
এ তব বিকাশ !
এ যে তব রচা
কামনা-নিকাশ ।
পূরাবে
কি মাের
শেষ অভিলাষ
বাঁধিয়া প্রণব-ডোরে ?
সুররামকেলী
পৌষ-১৩৪৩,
মধুপুর ষ্টেশন, ই, আই, আর ।

ভেসে
ওঠে আজ
চাঁদমুখটুকু
( ৩৮ )
এমন বাদল ধারা।
ভেসে ওঠে আজ চাদমুখটুকু উজলি’ হৃদয় সারা !
রক্তিমরাগরঞ্জিতমুখ
দর্শনে মাের হােততা কত সুখ !
ভুলিতাম যত জীবনের দুঃখ, বুক হােত প্রেমভারা!
নাহি আজ আলো-রেখা।
কুটীর আঙিনা সুদূরবনানী
নিকষ তিমিরে লেখা!
দুনিয়ার বুকে আজ ফঁকা ফাঁকা
দেখছি রে পথ কত একা বাঁকা!
ধুধুকরা যেন মরীচিকা আঁকা!
হই যে রে দিশেহারা।
আনাে আলােটুকু নেয়ে ;
-তরীখানা ভাঙ্গা! চায়না তাে যেতে
অাধারের পারে ধেয়ে !
-
প্রাণ থেকে মােরে কে যেন রে বলে,
‘আরাে কিছু পথ ধীরে যা’রে চলে,
পাবিরে খুঁজিয়া পাবিরে তাহলে
জীবনে যা ধ্রুবতারা।
সুর--মিশ্র ভৈরবী
আষাঢ়-১৩৪৩,
“কিশলয়” পত্রিকায় প্রকাশিত,
আশুতােষ দে লেন, কলিকাতা।
আশ্বিন-১৩৪৩।

রবাে বুকে করে শুং
স্মৃতিটুকু
( ৩৯ )
(আমি) তব নাম ধরে
কত যে ডেকেছি,
তবু কেন সাড়া
দিলে না, দিলে না !
( আমি ) তব প্রেম-রেণু
কত যে মেখেছি।
তবু হৃদে তুলে
নিলে না, নিলে না।
অপরাধ যদি
তব নাম করা,-
তবে, প্রিয়তম,
দিওনাকো ধরা ;
থেকে দূরে সরে,
রবাে বুকে করে
শুধু স্মৃতিটুকু,
-মিছে না, মিছে না
সুর-ভৈরবী-মিত্র
ভা-১৩৪৪,
কেশব সেন স্ট্রীট, কলিকাতা

ওরা
গা’বে নদনদী সারাটা দুনিয়া বুঝি’ প্রেমটুকু-রীতি
(৪০ )
জনমে জনমে জীবনে মরণে
গাহিব তােমারি গীতি ;
তােমারি প্রেমের পূজারী সাজিয়া
পূজিব তােমারে নিতি।
গাহিব প্রভাতী
অরুণ আলােকে,
করম-প্রেরণা
খেলিবে ভূলােকে,
সে সুর পুলকি’
ছুটিবে দুলােকে,
বাড়িবে বুকের প্রতি।
গা’বাে তব নামে
পরাণ খুলিয়া,
গা’বে তরুলতা
বাতাসে দুলিয়া,
গা’বে নদনদী
সারাটি দুনিয়া
বুঝি’ প্রেমটুকু-রীতি।
সুর—মি কীৰ্ত্তন
-১৩৪৪,
কেশব সেন ঐট, কলিকাতা

সত্য পরম-আহ্লাটুকু
(৪১)
দিনের আলাে ফুরিয়ে গেল,
আঁধার হােলাে ঘরসাধনা,
আকাশ ঘনঘটায় ভরা,
ডুবলো রাতে সব জ্যোছনা
রূপ-শিখা যে রঙিয়ে দিল
উজল আভা আমার প্রাণে,
স্বরটুকু যে শুনিয়ে দিল
সােহগে সুর আমার কাণে।
নিঝুম রাতে কে যেন এসে
বসে থাকে গাে শিয়র দেশে,
হৃদয় আমার হর্ষে নাচে,
ভুলে গাে যাই সব যাতনা।
মলয়ানিল উদাসভরে,
উড়িয়ে আনে কতই কথা,
মধুঘােষের মধুর রবে
উথলে ওঠে বুকের ব্যথা!
ক্ষণেক পরে চাইলে অাঁখি
দেখি, ধরায় সকল ফঁাকি।
সত্য পরম-আত্মাটুকু, মিথ্যা কেবল আনাগােনা।
সুর--মিশ্র কালেংড়া
পৌষ-১৩৪২,
হেদুয়া, কলিকাতা

দ্বারা
দরদমাখানাে সুরটুকু ত’রে প্রণয়-মদিৱা ঢালাে
(৪২)
তুমি যে বাসগাে ভালাে ;
দরদমাখানাে
সুরটুকু ভ'রে
প্রণয়-মদিরা ঢালল।
গভীর নিশীথে
হেরিব তােমার
ভুবনভােনাে হাসি,
আলােটুকু লয়ে
সামনে দাড়ায়ে
কবে মােরে ভালবাসি
ময়ুর-পুলকে
•
নাচিবে হৃদয়,
স্বরগে মরতে
ঘটিবে প্রলয়,
এরি মাঝে রবাে
তােমা পানে চেয়ে!
মুছে যাবে যত কালাে।
সুর—মিশ্র ছায়ানট
পৌষ-১৩৪৩,
হাওড়া স্টেশন, ই, আই, আর

তব প্রেমটুকু গলিয়া গলিয়া পড়ে যেন শতবারে !
( ৪৩ )
জনম জনম
নিরখি’ ওরূপ
মিটিল না মম আশা ;
যেদিকে তাকাই
নেহারি তােমায়,
তােমারি যে ভালবাসা !
হিয়ার মুকুরে
হিয়াটী ধরিয়া
হেরি তােমা
বারে বারে,
তব প্রেমটুকু
গলিয়া গলিয়া
পড়ে যেন
শতধারে !
শিহরণে নিজে ভুলে যাওয়া,
কভু যেন তব পরশন পাওয়া
কভু মনে হয়, তান মান লয়
আমাতেই পরকাশ!
সুর-কীৰ্ত্তন
ফান-১৩৪৩,
লিলুয়া, ই, আই, আর

ধা
se
প্রেমনিধিটুকু ফিরে কি আসে না রে ?
(৪৪)
ঘাটে বসে একা
হেরি যে কত তরী!
ভাসে জলে শুধু
যেতে পাে পরপারে !
আনমনা হয়ে
গাঁথি যে কত মালা
ডুবে আপনাতে
ব্যথা গাে ভুলিবারে!
আকাশে ধিকি ধিকি
জ্বলে যে কত
তারা !
জ্যোছনামাখা সবি।
নয়নে বহে
ধাবী।
বিফল মালা গাঁথা,
বিফলে গাহি গাথা !
প্রেমনিধিটুকু
ফিরে কি আসে না রে ?
সুর-গৌরী মিশ্র
চৈত্র-১৩৪৩,
হ্যারিসন রােড, কলিকাতা

আশাটুকু যা’ বুকে আছে,
(৪৫)
আমার এই ভাঙ্গা ঘরে
সুখবাসর আর রচে না।
প্রেমের আলাে
নিভে গেছে,
আঁধারে তাই
মন বসে না।
যারা মাের সঙ্গী এল,
তারা যে সব চলে গেল,
আমিই শুধু রইনু বাকি,
দুঃখেও যে গাে
দিন চলে না !
দিনের পর দিনটি আসে,
কাল-স্রোতে ভাসিয়ে নে’ যায়,
কেউ যে তারে ধ’তে না রে,
কারাে কথা শুনতে না চায়,
আশাটুকু যা’ বুকে আছে !
-ফুল ফোটে তাে
ফল ধরে না।
অর-গজল
আষাঢ়-১৩৪২
হনুমান রােড, নিউ দিল্লী

৬
এবারে তাই মনটুকু দে
সাব তােমা-কাঁদবাে না
( ৪৬ )
দাও যা’ তুমি নেবাে মাথায়,
কখনও ‘না’ বােল্ববা না ;
ব্যথা জ্বালায় স্রোবাে, তবু
কখনও ‘র’ তুলবাে না।
তােমার আশায় চেয়ে আছি
তােমার ভাষায় গান গেয়ে,
দেখবে নাকি মাের যাতনা ?
শুনবে নাকি এ মুখ চেয়ে ?
ভুবনটা যে কেমন ধারা
দেখতে গিয়ে হ’লাম সারা।
এবারে তাই মনটুকু দে
সাধবাে তােমা—কঁদবাে না।
সুর—মিশ্র সাহানা
মাঘ-১৩৪৩,
এ্যাণ্ডটাঙ্ক রােড, সালকিয়া

৪৭
মালাটুকু শুকায়ে গেছে
-
(৪৭)
মালাটুকু শুকায়ে গেছে ।
আজি তাই
সকলি অসার!
ব্যথা মাের লুকায়ে আছে-
ওঠা নাবা
করে শতবার।
যেটুকু কেন্দ্র করি’
ওঠে মাের তান,
সেটুকু যে পারে গেছে
ভেঙ্গে হৃদিখান ;
সে ছিল অাঁধারে
আলাে,
ছিল তার সবি
ভালাে,
আজি সে জুড়িয়া হৃদি
হয়ে নিরাকার।
—অসারের
মাঝে যেন সার।
সুর--কানাড়া মিশ্র
আষাঢ়-১৩৪৪,
হাওড়া স্টেশন, ই, আই, আর ।

s
মানুষ যেজন ডাকে অনুক্ষণ
নামটুকু-রসে মগন হয়ে ;
( ৪৮ )
বল হে মুরারী, স্মর হে মুরারী,
কর হে মুরারী সার।
মুরারী জীবন, মুরারী মরণ,
মুরারী ত্রিগুণাধার ।
ঢাল হে পরাণ মুরারী পূজিয়া,
জনম-বাঁধন যাবে গাে টুটিয়া,
পর হে গলায় আপনা ভুলিয়া
মুরারী-নামের হার।
মানুষ যেজন ডাকে অনুক্ষণ
নামটুকুরসে মগন হয়ে ;
দুঃখজ্বালা তার যায় রে চলিয়া,
নাম-ধা-স্রোতে যায় সে ব’য়ে !
তাই, হে মুরারী,
হৃদয়বিহারী,
নমাে নমাে কোটী বার।
সুর-কীৰ্ত্তন
আষাঢ়-১৩৪৪
হাওড়া স্টেশন, ই, আই, আর।

চিরন্তনের সত্যটুকু
( ৪৯ )
দিন যাবে রে
সুখে বা দুঃখে!
ভেবেই বা কি হবে বল,-
বলেই বা
কি হবে মুখে!
বুকের বাঁধন
হঠাৎ যদি
অসময়ে
ছিড়ে রে যায়,
ছুটবে যে তায়
রুধির ধারা-
সেটা যে রে
থামান দায় !
বুক বেঁধে ফের চবি,যাতে
ডাতে পারি তায় দু’হাতে,
চিরন্তনের সত্যটুকু
বলে শুধু
এইটী রুখে।
সুর—বাগে মিশ্র
শ্রাবণ-১৩ঃ৩,
আশুতােষ দে লেন, কলিকাতা।

আমার ব্যথাটুকুর বাণী
( ৫ )
গানের সুরে
গাঁথবাে, প্রিয়,
আমার ভাঙ্গা হৃদয়খানি;
সেই সুরেতে
যুগিয়ে দেবাে
আমার ব্যথাটুকুর বাণী।
ফুলের আলাে
জ্বালিয়ে দেবাে
আমার মনের আঙিনাতে;
প্রণয়ানিল
বইবে ধীরে,
মাতবে মানুষ দুনিয়াতে ;
কারাে গীতি আর গাবদা না,
কারাে নীতি আর চাবাে না,
চাইবাে শুধু তােমায়, প্রিয়,
উঠবে নাকি সুরের রাণী ?
?
সুর—গজল মিশ্র
ফান=১৩৪৪,
হাওড়া স্টেশন, ই, আই, আর ।

cথা-
পরশটুকু বুলিয়ে গায়ে সহায় হােয়াে
ভুল ভাজিতে
;
(৫১)
তোমার স্মৃতি বুকেতে রেখে
মাতববা আমি
তােমার গীতে
যদি গাে দেখ বিপথগামী
ফিরিয়ে নিও
আপন চিতে।
যদি কভু হয় মতিভ্রম,
ভুলি তব রূপ অনুপম,--
এস গগ, প্রিয়,
সামনে ধেয়ে
ওরূপটুকু
স্মরিয়ে দিতে।
মানুষ আমি, নই দেবতা,
প্রতিপদে যে ভুলের কথা !
পরশটুকু
বুলিয়ে গায়ে
সহায় হােয়াে
ভুল ভাঙ্গিতে।
সুর-গজল
পৌষ-১৩৪২
হেদুয়া, কলিকাতা।

শেষ আশা যে বাঁবে বাসা অমৱটুকুর জ্ঞানে।
(৫২)
গন্ধ তব মিশিয়ে আছে
আমার মনের ধ্যানে ;
তােমার স্মৃতি পায় গাে বাণী
তাই তাে আমার গানে !
আমার মাঝে
তােমার ছায়া,
তােমার মাঝে
আমার কায়া ;
ছায়ায় কায়ায়
এক হয়ে যায়
মিলন-মধুর তানে।
তােমার আশা ভরিয়ে বুকে
কছি কত যাওয়া-আসা,
তােমার প্রেম-কুসুম দিয়ে
গাঁথছি কত তােমার ভাষা;
শেষ আশা যে বাঁধবে বাসা
অময়টুকুর জ্ঞানে !
সুর-খাম্বাজ মিশ্র
কাত্তিক-১৩৪৫
সাইয়াট সেন স্ট্রীট, কলিকাতা

-
স্মৃতিটুকু তা’র মরমে জাগে না ?
(৫৩)
কতকাল, বঁধু,
আছ গাে ভুলিয়া,
সেটা কিগাে তব
মনেতে আসে না ?
কত ভালবাসা
দিয়েছিলে ঢেলে !
স্মৃতিটুকু তার
মরমে জাগে না?
আছ তুমি মাের
ভিতরে বাহিরে,
আমাময় যথা
আমার ‘আমি’ রে !
তবে যে বিরহ
কেন অহরই,
একথা যে প্রাণ
জানিয়া জানে না।
সুর-মালকোষ
আষাঢ়-১৩৪৪
হারিসন রােড, কলিকাতা।

ধারা
প্রেমদীপটুকু জ্বালি’ ধিকি ধিকি
আমােদিব প্রাণে প্রাণ
( ৫৪ )
গাহিব তােমারি গান ;
তব নিরমল
প্রণয়েরি সুধা
করেছি যে, প্রিয়, পান!
তােমারি নয়নে নয়ন রাখিয়া,
তব রূপ-জ্যোতি ছাঁকিয়া বাছিয়া
—যদিও আজিকে বিদায়ের ব্যথা-
বাজাবাে জীবন-তান।
প্রীতিভরা ধূপ
জ্বেলে দেবে আজি
হৃদয়-কুটীর-কোণে,
তােমারি মধুর
সুরভি ভরিবে
আমারি এ দেহ মনে ;
আছে যত মাের কথা আর গীতি,
রবে চিরদিন মেখে তব স্মৃতি ;
প্রেমদীপটুকু জ্বালি’ ধিকি ধিকি
আমােদিব প্রাণে প্রাণ।
সুর-কালেংড়া মিত্র
চৈত্র-১৩৪৪,
লিলুয়া, ই, আই, আর।

( ওই) নামটুকু পিয়ে, আপনারে দিয়ে
মিটাবাে আমার বুকেরি ক্ষুধা
(৫৫)
প্রভাতে উঠিয়া তােমারে পূজিয়া
লাগিব তােমারি কাজে ;
তুমি যে আমার ইহপরকাল!
তুমি বিনা সবি বাজে।
তব প্রেম-ফুল-পরাগ মাখিয়া,
তব স্মৃতিমালা গাঁথিয়া গাঁথিয়া,
পরিব গলায়, পরাব সবায়,
যাতে তব নাম রাজে।
আকাশে বাতাসে আলােকে আঁধারে
ঝরে যেন, প্রিয়, নামেরি সুধা ।
( ওই) নামটুকু পিয়ে, আপনারে দিয়ে,
মিটাবাে আমার বুকেরি ক্ষুধা ;
(তাই) হাসিয়া দিয়া তােমারে ডাকিয়া
সাজিব গাে নানা সাজে।
সুর-কীৰ্ত্তন
আষাঢ়-১৩৪৫
আমহাষ্ট ঐট, কলিকাতা।

এ দেহটুকু, বঁধু, হারি
( ৫৬ )
ওগাে দেবতা, মাের হৃদি দেবতা,
ওগাে দেবতা গাে,
শােননা মম বারতা।
তােমারে ডাকি, তুমি পরাণ-পাখী,
ছেড়াে না আমারে যদি
থাকে মমতা !
এ দেহটুকু, বঁধু, তুহারি,
এরি মাঝে গাে আমি পূজারী,
আকাশে বাতাসে ভাসে
তােমারি কথা!
( শুধু) তােমারি কথা !
গগন-তলে গ্রহ-তারকা-মালা-
মনে হয়, প্রিয়, তব হাসি ঢালা ।
আমি তােমাতে হারা
তুমি সুধার ধারা !
মরণে তােমারে পেয়ে
জুভাবাে ব্যথা !
(ওগাে) জুড়াবাে ব্যথা!
সুরছায়ানট মিশ্র
অগ্রহায়ণ-১৩৪৪
কেশব সেন স্ট্রীট, কলিকাতা।

—তাতি’ সুরটুকুৱাণী
হাসিবে আসিবে নাচিবে উজলি’
(৫৭)
গেয়ে যা’রে, মন, গান !
গানের সমীরে পাটী তুলিয়া
তরণী বহে উজান।
আকাশের তলে আছে যত ভালো,
মানুষের মনে আছে যত কালাে,
গানের আলােকে হবে সবি আলো
উথলিবে প্রাণে প্রাণ।
রূপে-রসে-রঙে-রঞ্জিত হয়ে
ফুটিবে গানের বাণী,
শ্যাম-শােভা-ঘেরা ভরা-নদী-কূলে
ভাতি’ সুরটুকুরাণী
হাসিবে ভাসিবে নাচিবে উজলি’
জাগায়ে সে ভগবান !
সুর-আলাইয়া মিশ্র
আষাঢ়-১৩৪৪
হ্যারিসন রােড, কলিকাতা

সুন
=
পরশটুকু মনের প্যানে
( ৫৮ )
অসীম আজি সসীম হয়ে
মিশিয়ে যে গাে আমার গানে !
—বায়ু যেমন মেশানাে ঠিক
অলক্ষ্যে ঐ সবার প্রাণে।
ফুলে যেমন গন্ধ ভরা,
আলাে যেমন যায় না ধরা,
সত্ত্বা তব তেমনি তর—
পরশটুকু মনের ধ্যানে।
‘আমি’ ‘আমার’ কেবল বুলি,
তােমার কথা যাই যে ভুলি!
আমার ‘আমি’ ছাড়া যে দায়!
–ছাড়ে শুধুই যােগের বানে !
সুর-আড়ানা বাহার
বৈশাখ-১৩৪৩,
কালীমাখা, দেওঘর

ध्या-जा
বিরহ-জ্বালা গাঁথে যে মালা
কথা-টুকুরি সাধনা-শেখা
( ৫৯ )
বুকের মাঝে একে যে গেছ
করাল-কাল-চরণ-রেখা !
কঁদে গাে হিয়া ব্যথায় ভরি’,-
ছিল যে এত বরাতে লেখা!
তােমারি তরে কত যে আশা,
বুকেতে বাঁধা কত যে বাসা,
কি দাগা দেগে, গেলে গাে বেগে,
বিলীন করে নয়নে দেখা!
ভাবি গাে তােমা নীরব রাতে,
ঝরে যে বারি আঁখির পাতে,
বিরহ-জালা গাঁথে যে মালা
কথা-টুকুরি সাধন-শেখা।
সুর-সিন্ধু খাম্বাজ
ভা-১৩৪২,
লিলুয়া, ই, আই, আর

—আর যেটুকু বাকি ছিল
জাহ্নবী তা’ ভাসিয়ে নিল,---
( ৬০ )
মিলিয়ে গেল, মিলিয়ে গেল,
পঞ্চভূতে রে !
দেখনু বসে রে, নদীর ধারে রে ।
পৃথী তারে বক্ষে নিল,
সলিল তারে নাইয়ে দিল,
অগ্নি তারে পুড়িয়ে দিল
ভস্ম করে রে !
আর যেটুকু বাকি ছিল
জাহ্নবী তা’ ভাসিয়ে নিল,
মরুৎ শেষে উড়িয়ে নিল
আকাশ মাঝে রে !
সবটুকু মাের চলে গেল,
আমার কথা ফুরিয়ে এল,
কাজ থাকে তাে চুকিয়ে ফেল
ডাকি’ সে জনে রে।
সুললিত মিশ্র
ফানুন-১৩৪২,
গঙ্গাতীর, কলিকাতা

(শুনি) অকুলটুকুতে কুলটুকু তুমি
(৬১)
জাগে স্মৃতিটুকু,
ভাসে প্রীতিটুকু,
রাজে রূপটুকু তার।
সুখটুকু লাগি
প্রাণটুকু দিয়ে
গাঁথি গীতিটুকু-হার।
কামনাটুকু সে করম-স্মরণে,
সম্পদটুকু সে যে গাে মননে,
ভজন-পূজনটুকু সে মরণে,
ধরমটুকু যে সার !
(ওগাে) আলােকটুকু যে গিয়েছে স’রে !
আঁধারটুকু যে ঘিরেছে মােরে !
(তাই) আলােটুকু হীন
গৃহটুকু নিয়ে
বহি আমিটুকু ভার !
( শুনি) অকূলটুকুতে
কূলটুকু তুমি,
কর দুঃখটুকু পার।
সুরকীর্তন
কার্তিক-১৩৪৩,
এ ওটাঙ্ক রােড, সালকিয়া।

৬২
—তা'রি যে মুখটুকু আছে এ হৃদি ছেয়ে !
(৬২)
সে কেন এসেছিল
জীবন-নদী বেয়ে,
অকালে চলে গেল
কত যে ব্যথা পেয়ে !
সে কেন বেসেছিল
আমারে এত ভালাে
আগুলি রেখেছিল
গৃহটী করে আলাে !
সে কেন দিয়েছিল
আমারি গলে মালা,
চলিয়া যাবে যদি
সুদূর পারে ধেয়ে !
বেদও গীতা বলে
মরণ “নাহি নাহি”,
তবে এ কঁাদা কেন
যাতনা-ভারবাহী ?
আছে সে পরপারে, পাব গাে পাব তারে !
তারি যে মুখটুকু আছে এ হৃদি ছেয়ে !
সুর—বিভাস মিশ্র
আষাঢ়-১৩৪৩,
বিবেকানন্দ নােড়,
কলিকাতা

সারা
শুন্যটুকুর বুকের মাঝে
শূন্য শেষেই একা রে !
(৬৩)
হৃদয় আমার শূন্য আজি,
শূন্য আমার লেখা রে !
শূন্য আকাশ, শূন্য বাতাস,
শূন্য চোখের দেখা রে !
শূন্য আমার
সাধের বীণা,
শূন্য আমার
ঘর আঙিনা
শূন্য আশায়, শূন্য ভাষায়,
শূন্য কথাই শেখা রে !
শূন্য ভুবন, শূন্য জীবন,
শূন্য হােলাে মধুর মিলন,
শূন্যটুকুর বুকের মাঝে
শূন্য শেষেই একা রে !
সুর-মিত্র রামকেলী
পৌষ-১৩৪২,
কালীরাখা, দেওঘর।

প্রাঙা
—আপাত-কঠোর শাসনটুকু
মধুর-কোমল যে পরিণাম !
(৬৪)
তােমায় আমি ডাছি কত !
-শুনেও তুমি শােনােনাকো,
ভগবান, হে ভগবান।
প্রণে আমার কত যে জ্বলা !
-জেনেও তুমি জানােনাকো-
ভগবান, হে ভগবান!
যতই বুকে আঘাত দেবে,
ততই কাছে টেনে যে নেবে ;
—আপাত-কঠোর শাসনটুকু,
মধুর-কোমল যে পরিণাম।
ভগবান, হে ভগবান।
দুঃখ যে দাও নাইকো ক্ষতি,
দাও সাথে তা বইতে রতি
হােক দুঃখেরি জীবনধারা;
ভাবনা কিসে? গাই তব নাম।
ভগবান, হে ভগবান!
•
সুর-পরজ মিশ্র
কার্তিক-১৩৪৩,
মধুপুর ষ্টেশন, ই, আই, আর ।

কেগাে তখন সােহাগভরে
পরাণটুকু জুড়ায়, স্বামী ?
(৬৫)
এসগাে প্রিয়, এস দেবতা,
এস দরদী, আমার আমি'।
তুমি যে মম হৃদয়মণি—
চির নূতন-কত যে দামী!
আজিও দিনে তেমনি আলো,
আজিও নিশি তেমনি কালাে,
আমিও বাসি তেমনি ভালাে,
-তাইতাে তর শরণকামী।
যখন তুমি দিনের বেলা
কাজ করগাে বুক ধরিয়া,
ভেবেছ কভু, ওগাে দয়িত,
কাল কাটে মাের কি করিয়া?
আবার রাতে আঁধার ঘরে
যখন তব নয়ন ঝরে,
কেগাে তখন সােহাগভরে
পরাণটুকু জুড়ায়, স্বামী?
---
সুর মিশ্র ভৈরে
আষাঢ়-১৩৪৩,
কেশব সেন ঐট, কলিকাতা।

তুমি আনাগােনা, স্নেহ, ভালবাসা,
রূপরসটুকু মিলন-পিয়াসা !
( ৬৬ )
জনম জনম হেরিনু তােমারে,
জানিনা তবুও কে তুমি আমার !
কামনা সাধনাযা’ কিছু বলনা
করে সবি তব মহিমা প্রচার।
রােগে, শশাকে, তাপে, জনমের জালে,
আলােকে, আঁধারে, ইহপরকালে,
করমে, মননে, প্রণয়-কথনে-
আছ তুমি সবে হয়ে একাকার।
ত্রিগুণ-আধার, ত্রিভুবন-সার,
ক্ষিতি-অপ-তেজ-বায়ু-ব্যোমাকার !
তুমি যে নিয়তি, ঘটনার গতি,
ভাঙ্গাগড়া যত সকলি তােমার।
তুমি আনাগােনা, স্নেহ, ভালবাসা,
রূপরসটুকু-মিলন-পিয়াসা।
তােমারি কারণ, শরীর ধারণ,
লয়েছি শরণ, যাবাে ভবপার।
সুর—মি আশাবরী
কার্তিক,১৩৪২,
লিলুয়া, ই, আই, আর ।

৬৭
বঙ্কিমচন্দ্র
(১)
সাহিত্য-জগতে বিভাবসু তুমি, উঠিলে ভারত-গগন-গাত্রে,
লেখনী-প্রসূত মধুময় ভাবে ঢালিলে অমিয় হৃদয়-পাত্রে।
ডাকিল অদূরে পিক্‌ কুহুরবে, কলসী কক্ষে চলিল রােহিণী,
রিণিঝিণি-করি’ সুমতি কুমতি কঁপালাে তাহার হৃদয়-মােহিনী।
চমকিত চিতে সস্মিতমুখে যখনি চাহিমু মুগ্ধনয়নে,
তখনি বুঝি উঠিয়াছে আজি বঙ্কিমরবি ভারত-গগনে।
গাহিয়া তটিনী মৃদু কলতানে ছুটিল মিশিতে অসীম পাথারে,
তরণী-যাত্রী ফেলিয়া চলিল নবীন যুবকে কানন-মাঝারে ;
পরম পুরুষ পরমেশ,যর সত্ত্বা জুড়িয়া সারাটা ধরণী,-
দেখালাে পথিকে সঙ্কটকালে করুণা-মূরতি অভয়া রমণী !
চমকিত চিতে•••••
| ০ ০ ০ ০
বালবিধবার মর্মব্যথায় কঁদিল করুণ হৃদয় যাহার,
মুছালাে তাহার বিজয়-পতাকা আঁখিজল সব বিধবা-বালার ;
বঙ্গসমাজ-অঙ্কন তরে হইল বিষের বৃক্ষ সৃষ্টি,
ফুটিল সে ডালে কুলকুসুম,-কোটী কামনার নীরব দৃষ্টি।
চমকিত চিতে...
* লেখকের বাল্য রচনা।

ন
আপন হারা সে প্রেমের প্রতিমা, জগতে তাহার কি দিব তুলনা ।
নিবিড়-নীরব-নিথর প্রেমে সে বাসনা বিহীন,কহিছে ‘ভুলনা,
করুণামাখানাে সরলতাভরা অসীম তাহার হৃদয়-কান্তি,
দেবী কি মানবী, বােঝা নাহি যায়, জাগালাে জীবনে প্রধান ভ্রান্তি।
চমকিত চিতে•••
০ ০ ০ ০ ০
একটা বৃন্তে দুটী ফুল ফুটি’ ছিন্ন হইল,—বিধির বিধান !
একটা প্রবল বায়ুর তাড়নে ছাড়িয়া চলিল ধন কুল মান ;
অন্যটী তায় রক্ষা করিল নিজের স্বার্থ করিয়া ব্যর্থ,
দেখালাে জগতে ত্যাগের গরিমা, আত্মার বলি পরম-অর্থ
চমকিত চিতে..
সাম্যের গানে, বিজয়-বাদ্যে, বাঙ্গালী লইল ত্যাগের দীক্ষা,
বাঙ্গালী আবার করিল প্রচার বন্দেমাতরম্”-মন্ত্রশিক্ষা।
এস বঙ্কিম, উঠ দুর্দিনে, জাগাও পুনঃ সে মােহন মন্ত্র ;
দুঃখ ও দৈন্য দূর হয়ে যাক্‌; বাজাও বাঙ্গালী হৃদয়যন্ত্র।
চমকিত চিতে••••••
“ভারতবর্ষ” পত্রিকায় প্রকাশিত,
ফাগুন-১৩৩২।
।

প্রগতিবন্যা
(২)
এসগাে মানব-প্রগতিবন্যা, ভাসাও বঙ্গনগরপল্লী,
টেনে নিয়ে যাও কলুষ-কালিমা ধৌত করিয়া কাননবল্লী।
বঙ্গ-অস্থি-মজ্জা-মাঝারে রয়েছে পূতির ক্লেদ যে লিপ্ত !
ভাসাও সকলি তােমার প্রবাহে শৌর্য্যমহিমা করিয়া দীপ্ত।
আনিও সঙ্গে অয়, শান্তি, দানিও হৃদয়ে অগাধ ভক্তি,
হরিও নােগ ও যাতনা পীড়ন, দূরিও হীনতা জাগায়ে শক্তি।
ভাসাও আমায় প্রবল প্রবাহে আঘাতিয়া মাের মনমৃদঙ্গ,
সাম্যবাদ্যে নবঝঙ্কারে বাজিয়া উঠুক নবীনবঙ্গ ;
কঠোর কালের কুটিল রঙ্গ ধুয়ে মুছে যা তােমারি স্পর্শে,
বিপুলবঙ্গ ভরিয়া উক্ দীপ্তপ্রতাপে গভীর হর্ষে।
আনিও সঙ্গে অন্ন শান্তি, দানিও হৃদয়ে অগাধ ভক্তি,
হরিও রােগ ও যাতনা পীড়ন, দূরিও হীনতা জাগায়ে শক্তি।
সুখালােকটুকু ফুটিয়া উঠুক, পা’ সে বাঙালী আসনাদর্শ,
উজলি’ বাঙলা নামের গরিমা গাহুক আবার নূতন বর্ষ ।
শঙ্কিত চিত কুণ্ঠা তেয়াগি’ উঠুক পুনঃ সে নবীনগৰ্ব্বে,
স্নিগ্ধ মধুর প্রেমের তুফান নাচুক হিয়ার পর্বে পর্বে।
আনিও সঙ্গে অন্ন শান্তি, দানিও হৃদয়ে অগাধভক্তি,
ওরােগ ও যাতনা পীড়ন, দুরিও হীনতা জাগৃয়ে লি।..
“কিশলয় পত্রিকায় প্রকাশিত,
৫৩।

বা-মা
অর্চনা
( ৩ )
আসছিস্ তো মা প্রতি বৎসর,-আসার ফলটা হবে কি পূর্ণ?
সন্তানে শুধু চেতনা জাগালি,আশাটুকু মাগাে হয় যে চূর্ণ!
দেখছি না মা কতটা হীনতা, কতটা দীনতা, কত অশান্তি
ঘিরেছে সপ্তকোটী সন্তানে!-এটা কি মিথ্যা? এটা কি ভ্রান্তি ?
ম্যালেরিয়াদির ভীষণ পেষণ লেগে তো আছেই তাদের বক্ষে!
এতেই যে মাগাে শরীর জীর্ণ, তুই বিনে আর কে করে রক্ষে।
তাের যদি মাগাে মামুলি ধাঁচের আসাই কেবল শ্যামল বঙ্গে,
ব্যর্থ হবে যে মােদের জীবন, দুনিয়ার লােক হাসিবে রঙ্গে।
নিঠুর কালের কঠোর কুটী—এ যে অসহ্য! এযে মা তিক্ত!
তার চেয়ে মাগাে যাই যমালয়ে, যদি অদৃষ্ট না হয় দীপ্ত !
যদি তুই মাগাে না দিবি ভক্তি,-না দিবি শক্তি, না দিবি বিত্ত,
কেমনে রচিব পূজার অর্ঘ্য ? ক্ষুব্ধ সদা যে রহিবে চিত্ত।
দশ হাতে তাের দশ প্রহরণ, পদতলে ভীম মহিষ দৈত্য।
এটা কি সখের শােভাসম্পদ ? এটা কি শৌর্যে ঢালিতে শৈত্য।
।
Tw
“ভারতবর্ষ” পত্রিকায় প্রকার জলে ফুলে ফলে তাের ছেলেরা পুষ্ট,
বল? পূজা পেয়ে তুই হােস্না তুষ্ট?
ফাগুন-১৩।

হয় তুই জাগ, না হয় জাগা মা, যেমনে পারিস্ পাগলা রুদ্রে,-
টম করে নড়ক বিশ্ব, উঠুক তুফান জন-সমুদ্রে !
ঘােচা মা আঁধার, অকাল নিদ্রা, জ্বেলে দে বীৰ্য-বহ্নি হর্ষে
প্রাণভরে গাহি জীমূত-মন্দ্রে নৃত্য-ছন্দে এ নব বর্ষে !
যদি মা বঙ্গে রােগের বীজাণু হয় বিনষ্ট তােরই পুণ্যে,
তাের নামে মাগাে বাজবে ডঙ্কা, বাঙালী নাষ্টা রবেনা শূন্যে।
আদ্যাশক্তি। জগদ্ধাত্রি! জাগা মা শক্তি বিজয় গর্বে
অৰ্চনা আজ কোরূবাে সাঙ্গ বুকের রক্তে তাের এ পর্বে।
“বসুমতী” পত্রিকায় প্রকাশিত,
শারদীয়া সংখ্যা, অশ্বিন-১৩৪৪।

ধারা ৭ কৰ্ম্মযােগ (৪) বিশ্ব যখন ছিল গাে সুপ্ত ছিল শুধু ঘাের অন্ধকার । মাঝে ছিল যে তার একটী বীণা, বাঁধা ছিল তায় পাঁচটী তার । সেতারে বাজালাে যে মহামানব- অনাদি অসীম মধ্যহীন! রূপ-রস-আদি-সুরের লহরী উঠিয়া হইল ভােগেতে লীন। ছিল না মানুষ, ছিল নাকো জীব, ছিল না বৈরী, ছিল না কেউ ; স্বীয় ছাঁচে ঢেলে সৃজিল দেবতা পুরুষ-প্রকৃতি-মিলন-ঢেউ ; সেই ঢেউমুখে জন্মেছি মােরা নামেতে মানুষ, কাজেতে নয় ; মানুষের মত মানুষ’ তাহারা, যারা জেগে নাহি ঘুমায়ে রয়। সন্ন্যাসী তুমি? থাক তবে দুরে, তােমারে সাধিতে সময় নাই ; সংসারী তুমি? ওঠো তবে আজ, জ্যান্ত যে তুমি মানুষ ভাই!

ত্যাগ-তপস্যা-ধ্যান-ধারণাদি-
যে গুলােকে বলে ধৰ্ম্ম-সার,
:
সেগুলাে এখন তুলে রেখে দাও,
ধার যদি যুগ-ধৰ্ম্ম-ধার।
শঙ্কর, রামানন্দ, নিমাই,
বুদ্ধ, কবীর, ত্রিলঙস্বামী
সন্ন্যাস-পরাকাষ্ঠা প্রকাশি’
করিল রে সবে স্বৰ্গকামী!
কোথা সে স্বর্গ জড়বাদী যুগে?
তােমাতেই সে যে বিরাজমান
যােগ-বলটুকু,-যা দেয় স্বর্গ,
সেটা যে কর্মাসক্ত প্রাণ।
ধর্ম-খােলােস পরা গেছে ঢের,
এস মােরা যুগ-বৰ্ম্ম পরি;
জপ তপ সব দূরে ফেলে রেখে
কৰ্ম্ম-যােগীকে স্মরণ করি।
এস দাশরথি, এস রামানুজ,
এস, এস ত্রেতাবীরপুঙ্গব ;
এস বৃকোদর, কর্ণার্জুন,
এস হে দ্বাপর-যুগ-বৈভব।
এস চাণক্য-দীক্ষিত-রাজ এস হর্ষ, এস বিক্রম,
এস হে বিজয়, সুরেশ, প্রতাপ, শিবাজী, বিবেক, মান-সম্ভ্রম।
।

সুধাৱা
কৰ্ম্ম-প্রেরণা,
-
নিস্তেজ মােরা, নাড়ী দেহে ক্ষীণ,
কৰ্ম্ম-প্রেরণা নাই রে নাই,
হীনতা-পঙ্কে ডুবে আছি মােরা,
তােমাদের আজ ডাকি গাে তাই।
-কৰ্ম-সাধনা-
কম্মেতে আজ লইব দীক্ষা,
বিশ্বরূপে যা বিশ্ববিধাতা
ধনঞ্জয়েরে দিল গাে শিক্ষা।
এগােয় জাপানী, ব্রিটন, ফরাসী—
আর যত সব মানুষ’-জাতি ;
আমরাই খালি সাধি আর কঁদি,
কাজ করি নাকো বক্ষপাতি।
ধৰ্ম্মে ও জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ যে জাতি-
সে যদিরে আজ কর্মহীন,
তবে সে যে আজ চলিছে মরিতে
তা’র মত আর কে আছে দীন!
জয় পরাজয় থাকিবে ধরায়, কর্মহীনতা ঘৃণ্যবা।
এত দেখে যদি না জাগে রে সাড়া, মানুষ’ নামটা উঠিয়া যাক।
তাই বলি আজ, বাজাও শঙ্খ, বাজাও দামামা, বাজাও ভেরী;
বুকে বাঁধ বল,জাগাে, ওঠো, শেখাে, পারাবার-পার-মানবেহেরি'।
* কশলয়” পত্রিকায় প্রকাশিত,
কার্তিক-১৩৪৩।

সুধারা
আদর্শ
( ৫ )
-
ওগাে মাের প্রাণ-পুণ্য-প্রতিমা, বক্ষের তুমি অস্থি, মজ্জা,
কর্মক্ষেত্রে উদ্যম-স্পৃহা, বিপদে ধৈৰ্য, গৃহের সজ্জা!
সাধনার মাের পরমাদর্শ, কামনার তুমি যােগ্য বিত্ত,
ধাতা তােমা তাই সুধাটুকু করি’দানিল আমায়,—ভরিল চিত্ত !
ধ্রুবতারা মম, সতী ও সাধ্বী, বিদ্যামুগ্ধা, চিরসঙ্গিনী,
চালাতেছ মােরে মহাজন-পথে, জীবনে মরণে সহধর্মিণী ।
রূপ-রস-আর-গন্ধ-স্পর্শ—শব্দময়ী হে কৰ্ম্মতরণী,
ধৰ্ম্ম-অর্থ-কাম-ও-মােক্ষ—সত্য-শিব-ও-সুন্দরখনি !
পূৰ্ব্ব-জন্ম-সংস্কার-স্রোত—প্রবাহিতা তুমি ললিতা-বল্লী,
জড়ালে বাল্যে বৃক্ষ-শেখরে’ ফুটায়ে আপন-প্রণয়-মল্লী
অন্তঃসলিলা ফন্তুর মত ভালবাসা তব ভরা যৌবনে
কল্যাণ-করে ডালি দিলে মােরে আপনা ভুলিয়া উপঢৌকনে।
জানকী’র তুমি মৰ্ম্ম-বেদনা, ‘চিন্তা’র তুমি চিন্তনঝরা,
শঙ্কর জায়া ‘সতী’-দেহ তুমি, সাবিত্রী-সমান স্বয়ম্বরা ;
‘গান্ধারী’ তুমি তেজ-গৌরবে, প্রণয়-প্রসারে ‘নলরাজরাণী’,
বিদ্যায় তুমি ‘খ’ বা ‘গার্গী’, সঙ্গীতে তুমি দেবী বীণাপাণি ;
ঋণপরিশােধে তুমি যে ‘শৈব্যা’, সন্তান-স্নেহে জগদ্ধাত্রী,
রন্ধনে তুমি চাদ-কুলবধু, শিল্পে লক্ষ্মী, অণিমা’-পাত্রী;
মন্দাকিনী’র সদৃশা স্বর্গে, মর্তের তুমি ‘অলকানন্দা,
পাতালপুরের ‘ভােগবতী’ তুমি, সৰ্ব্বশাস্ত্রসার যা’ ‘না’ ;
•
•

; পুণ্যের তুমি ‘ত্রিবেণী-তীর্থ, আহ্নিকে কাশী-মণিকর্ণিকা, যােগ-যুগ-ধ্যান-ধারণা-শক্তি, সত্য-ধৰ্ম্ম-জ্ঞানবর্তিকা ; ভ্রান্তিনাশিনী, শূন্য-নীলিমা, হৃদি-পিঞ্জর-বাঁধা-পতত্রী, সুর-মূচ্ছনা-সুধা-রঙ্গিণী, শৈলেশ’-মুখ-ভরা-গায়ত্রী। লাখ লাখ যুগ জন্ম লভিয়া হেরিনু ওরূপ-স্বরূপ-জ্যোতিঃ, তবু না তৃপ্তি মিলিল জীবনে,সতত রহিল হেরিতে মতি। তুমি আজ দূরে অথচ নিকটে, এ প্রেম-বাঁধন অটুট-শক্ত, পূর্ণ এ প্রাণ, গাহি তব গান, আমি যে তােমার পরম ভক্ত। তুমি গাে যন্ত্রী, আমি গাে যন্ত্র, পূর্ণ যে গানে হিয়ার পর্ব। রাগ-রাগিণীর ঝণা ছােটে গাে জলধি গর্ভে ভাসায়ে সর্ব ! জন্ম, মৃত্যু, হাসি ও কান্ন-বিধির বিধান ! শাসনতন্ত্র ! মৰ্ম্ম-গ্রন্থি-ভেদি’ ওঠে আজ ওঙ্কারটুকু পাবার মন্ত্র। পৌষ-১৩৪২ হেদুয়ার ধার, কলিকাতা।

૧૧ মুক্তি মানব-জনমে করেছ আমায় স্বর্ণ-খণ্ড, পরমানন্দ, আগুনে পােড়াও, ছেকে বেছে লও, কোবাে নাকো দ্বিধা, মিটাও স ফেল যদি মােরে ভীষণ হাপরে,- জ্বলে পুড়ে মরি অগ্নি-দাহনে,- সে যে হবে মাের পরম শুদ্ধি। খাঁটী সুবর্ণ হবাে সে কারণে। মণি-মাণিক্য-খচিত করিয়া যদি গাে সাজাও আমার অঙ্গ, সে যে হবে মাের পরম তৃপ্তি, সে যে তব দান হাসি বা রঙ্গ । দেবতা আমার, সাধনা আমার, নাচাও আমায় যেমন বাসনা, নেবাে মাথা পেতে তােমার যা কিছু, অন্তরে সহি’ শতেক যাতনা । জীবন, মরণ,-বেদনা, শান্তি, - তােমারি কাম্য শাসন-যুক্তি ! প্রাণ বলে তাই পাবাে একদিন- পাব, পাবদা সেইটুকু যা’ মুক্তি “কিশলয়” পত্রিকায় প্রকাশিত ; আষাঢ়-১৩৪৪। ===

সুধারা
দিলীষ্মতি
(৭)
M
দিল্লী নগরী, দিল্লী নগরী, নমি গাে তােমায়, তুমি রাজধানী,
তােমার হৃদয়ে গ্রথিত রয়েছে রাশি রাশি কত যুগ-যুগ-বাণী।
কোথা যুধিষ্ঠির, অর্জুন, ভীম, -কোথা যত সব বীর পাণ্ডব ?
কোথা গেল তারা তেয়াগি’ তােমায়, আরাে কত শত মহাবৈভব?
কোথা অভিমানী কৌরব-দল? কোথায় তাদের অহমিকাভার ?
হয়েছে কি তারা মহাকালে লীন তব ধুলিকণা করিয়া গাে সার?
প্রাচীন কালের প্রাচীন বারতা পরাণে পশিয়া জাগায় ধমনী,
ঘৃণা-বিতৃষ্ণা-ক্রোধ-আদি যত উঠে ফণা তুলে,-যেন শতফণী ।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ মিটিল, কত রাজাপ্রজা নিয়তির জালে
জড়ালাে! তাদের অনুপরমাণু মেশানাে যে আজ তব মহাভালে!
রাজা প্রজা কেন? যত প্রাণী আছে দুনিয়ার মাঝে
সকলে সমান,
সকলেই খায়, সকলেই গায়, হাসে কঁাদে করে সে মহাপ্রয়াণ।
দিল্লীনগরী, তুমি আছ ঠিক, সত্যের মত স্থির তব নাম,
যদিও তােমার বক্ষমাঝারে সত্যাসত্য যােঝে অবিরাম।
=
দিল্লী, তােমারে বড় ভালবাসি, ভালবাসি তব খােলা প্রান্তর,
ভালবাসি তব উদার ললাট, বক্ষ মহান, বিরাটান্তর,
পুরাণােস্মৃতির নিঠুরতা গেছে ; নৃত্য-মুখর-নবীন-ছন্দে
দুলিছ যেন গাে স্বপ্নরাজ্যে! কবিকুল তাই তােমারে বলে।

===
তােমার আকাশ, তােমার বাতাস, তব কথা, আলাে,
গান ও গন্ধ,
চিন্তন-স্রোতে বহে যে আমার !-নারি যে তাদের করিতে বন্ধ ।
তব গিরিপথ, সমতল ভূমি, জিজ্ঞাসে মােরে জন্মতত্ত্ব,
স্বপ্ন কি তবে মানব-জীবন ? এর মাঝে চাপা আছে কি সত্য?
সদা মনে হয় তোমার জীবনে জড়ানাে আমার কত যে শান্তি !
বাক্যেতে তাহা হয় না ব্যক্ত-লেখায়াে ফোটেনা
তাহে যে কান্তি !
গগনস্পর্শী অচলের মত শােভিছে অদূরে
কীর্তি ‘মিনার,
মুক্তা-মালিকা-সদৃশ বিরাজে তােমার কণ্ঠে যমুনা-বিহার।
নূতন দিল্লী রক্ষে যত্নে হিন্দুর মেধা যন্ত্র-মন্ত্র ;
সমাধি-কেল্লা-জুম্মাদি-মাঝে ঘােষে ইসলাম শক্তি-তন্ত্র।
নবীন প্রাচীন মিশেছে রঙ্গে,-অতীত বর্তমানের নৃত্য।
মৃত্যু যেন গাে লভেছে জন্ম!—সব দেখি যেন কৰ্মভৃত্য।
তােমার স্মরণে ঝঙ্কারে প্রাণে,—নাইকো মরণ, নাইকো ধ্বংস।
অজর, অমর, ওঙ্কারটুকু, দেশ, কাল আর মানব-বংশ!
যুগে যুগে লভি’ বাঙ্গালী জন্ম ভুমিব তােমার জীবন-কুঞ্জে,
প্রাণঢেলে গাবাে গীত-গগাবিন্দ ; ভরে যেন হৃদি মিলন-পুঞ্জে !
তােমার বক্ষে কাটানাে সাতটী বছর আমার পারিজাত ফুল,
ছেড়েছি তােমায়, হারায়েছি, হায়, জীবনের মাের সম্পদ-মূল !
শ্রাবণ-১৩৪২,
মিন্টো রােড, নিউদিল্লী।

খালা *
গরীব দেবতা *
( ৮ )
দীন-অতি-দীন, কুঁড়েঘরবাসী, “সাধু তুকারাম মােরে”,
যাহা পায় তায় কাটায় সে দিন মুহুরীর কাজ করে।
পত্নী তাহার খাটে খােটে খুব, নাহিক বিরাম তার,
আধপেটা তবু খেয়ে থাকে তারা, জোটেনাকে বেশী আর।
কিন্তু তাহার সদাই বিরাগ, মাঝে মাঝে মুখ নাড়া,
ভাগ্যের দোষে সাধু আজ দুঃখী, তাই তার নাহি সাড়া।
ছিল তার সব, ছিল না অভাব, সুখে গেছে তার দিন;
পুরাতন কথা জাগায়ে হৃদয়ে করেনাকো তনু ক্ষীণ।
আছে শুধু তার পর্ণকুটীর, মুহুরীর কাজ, জায়া,
পাঁচকাঠা জমি আর আছে তার বুকভরা দয়া মায়া ;
ঘটী বাটী তার সকলি মাটীর, শতেক ছিদ্রঝরা,
কিছুতে তাহার হৃক্ষেপ নাই,—পরাণে শান্তি ভরা।
*,
দিনমণি এল আকাশ-মাঝারে—তবু নাহি কাজ আসে।
সাধু তাই আজ গালে হাত দিয়ে ভাবে আর মনে হাসে।
গৃহিণী তাহার আশাপথ পানে চাহি’ বসে একা ঘরে—
কি হবে উপায়, বােঝা নাহি যায়,—সাধু আজ কি যে করে।
•
* সত্য ঘটনাবলম্বনে লিখিত ; পরম সাধু তুকারাম মােয়র জীবনীপাঠে ইহা
জানিতে পারা যায়।

পশ্চিমাকাশে রবি গেল হেলে হেরি’ সাধু ওঠে ধীরে,
চলে আমনে কুঁড়ে ঘর পানে ডেকে আঁরে অাঁখিনীরে।
ঘরণী তাহার ক্ষুধার জ্বালায় হারায়ে ধীরতা-জ্ঞান,
কুটীর ভিতরে পড়ি’ একধারে সদা করে আশ্চান্।
পতিকে দেখিয়া ওঠে ধড়মড়ি'—বলে, “আজ কিগাে পেলে?
ওমা, শুধু হাত! কিছু পাওনিকো! তবে কেন ঘরে এলে?
দূর হয়ে যা’, ওরে মুখপােড়া, বিয়ে করেছিলি কেন?
হাড়ে নাড়ে খেলি, গলে দড়ি তাের, মুখ দেখানে যেন”।
সাধু ডাকে মনে, “কাঙালের নাথ, দাও তব পদে ঠাই”
আর হেসে বলে,“আমি যে গাে স্বামী, নাহি তব জ্ঞান ছাই ?”
একটু কি ভেবে সাধু চট্ করে বা’র হােললা দেখে জোরে
গৃহিণী কহিল, “কোথা যাও তুমি,” চোখ দুটী জলে ভরে।
সাধু ধীরে বলে, “মনে পড়ে গেল, আখ আছে সেই ক্ষেতে,
তাই এনে আজ খাওয়াব তােমায়, দেরি হবে নাকো এতে।”
ক্ষেতে গিয়ে সাধু দেখে তিনখানা আখ পড়ে একধারে ;
কচা-কচ করে কেটে বেঁধে ফেরে নিয়ে আখ-আঁটাটারে।
গির্জার ঘড়ি ঢঙ ঢঙ করে বেজে গেল চারবার,
তাই শুনে সাধু আমনে বলে, “বেলা নেই যে কো আর?”
পথে যেতে যেতে মার কোলে শিশু কেঁদে বলে, “আখ খাব ;
দাও, মাগাে, মােরে একগাছা আখ, আমি তাহলে না যাব”।
লােদনের ধ্বনি শুনিয়া সাধুর হৃদয় গলিতেছিল,
একগাছা আখ খুলি’ ক্ষণপরে “নাও” বলে তা’রে দিল।

-
কিছু দূরে দেখে বৃদ্ধা রমণী গলিত-পলিত-কেশা
অতি গুড়ি গুড়ি চলিয়াছে পথে,যেন তার তৃষা নেশা!
সাধুর হস্তে আখ দেখে বলে, “আখ রস যদি পাই,
তেষ্টায় মাের ছাতি ফেটে যায়, তাহলে একটু খাই।”
বৃদ্ধার কথা সাধুর শ্রবণে ঢালিল অমৃত ধারা;
বাঁচিবে না বুড়ী বেশীদিন আর, এই ভেবে সাধু সারা !
“পত্নী আমার উপবাসে আছে, পেয়েছি তিন আখ,
একগাছি গেছে বালকেরে দিতে, আর গাছি দেওয়া যাক্ ;
বাকি একগাছা বাড়ী নিয়ে যাব, বৌকে তা’ দেবব খেতে,
আমি আজ কিছু নাই বা খেলাম, দোষ নেই আর এতে !”
এই সব ভেবে সাধু তুকারাম বৃদ্ধাকে আখ দিয়ে
আশীষ কুড়ায়ে হন্ হন্ করে চলে বাকি আখ নিয়ে।
পাঁচ বেজে গেছে ; গৃহিণী কাতরা বসি’ বাতায়ন ধারে
কঁদে আর ভাবে, “কেন গালি দিনু, আর বুঝি ফেরে নারে ?”
দরজার কাছে সাধুকে হেরিয়া ছুটে গেল আখ নিতে,
একগাছি তার হাতে দেখি’ কাপে থরথরি’ ক্রোধ-চিতে।
আখখানা খপ করে কেড়ে নিয়ে লাগালাে সাধুর শিরে,
“ওগাে বাবা” বলি সাধু বসে পােলােতাহা দেখে হঠে ধীরে।
একখানা আখ হইল দু’খান, উঠে হেসে সাধু সরে
বলে, “বেশ হােললা, ভাগে মিলে গেল, একখানা দাও মােরে”,
জায়া তা’র ছুটে এসে পড়ে পায় ; বলে, “গরীবের ঘরে,
স্বরগের তুমি দেবতা আমার, আসিলে কেমন করে ?”
বৈশাখ-১৩৩৬
সমক প্রেস, নিউদিল্লী।

অভিমান ঘনঘটা-জাল ধরি ধরি আসি’ ঘিরিল চতরা, বিজলীর আললা খেলিছে গগনে ধাঁধিয়া ধরণী সারা, বরষার ধারা, অশনিপতন, দূরে শােভে রামধনু ; কঁপিছে জগৎ, কঁপিছে মানব, কঁপে অনুপরমাণু। ভাবিছে শরৎ আপনার মনে, করিয়াছি বড় ভুল- যার তরে হৃদে এত ঝড় বহে নাহিক তাহার তুল; প্রকৃতির এই তাণ্ডবলীলা ঘটেনিকো ভুল-ফলে, দগ্ধ হয়নি প্রকৃতি হৃদয় নারীর বনানলে, উঠিতে বসিতে খাইতে শুইতে বড় বাজে মাের প্রাণে, আজ আমি রােগে বিছানায় পড়ে কেহ নাহি এইখানে। মাতা পিতা কবে ছেড়ে গেছে মােরে স্মরণে আসে না তাহা, আজ যদি সেই পথে চলে যাই কঁদিবে না কেহ, আহা! ভেবেছিনু মনে গয়া কাশী আর যত যা’ তীর্থ আছে, পতি ও পত্নী মিলনে হবে তা পূর্ণ মােদের কাছে। মনের বাসনা মনে লয় পেলল, দেখি সকলি বাজে । ‘ভালবাসা’ শুধু আকাশ-কুসুম—লাগেনাকো কোন কাজে। ছিল মাের সব, বিরাট বিভব, বড়বাড়ী, জমিদারী, গিয়েছে শুধিতে পৈতৃকঋণ, করি শুধু মাষ্টারী, বড়দিদি মােরে করিল পালন, শেষে ধ'রে দিল বিয়ে, তা’র ফলে এই দাড়াই প্রথম বংশে চাকুরী নিয়ে !

কোথা নারায়ণ, শ্রীমধুসূদন, কোথা ভৰকাণ্ডারী,
লও তব পায় দূরি’ ভবদায়, সহিতে যে আর নারি।
“ভালবাস ধনী পিতার আলয়, থাক তবে সেইখানে,
গরীবের ঘর, মাষ্টারী-গিরি ভাল না লাগে তাে প্রাণে”—
কহিনু সে দিন মাের ঘরণীরে খিচে গিয়ে রাগভরে,
গেল সে তাে চলে!-স্বজনবিহীন পড়ে আছি একা ঘরে।
পত্নী অরুণা পিতার আলয়ে দিন যাপে অভিমানে,
হিতে বিপরীত হয়ে গেল দেখে কাতরা হইল প্রাণে ;
অপরাধ তার কিছু ছিল না কো, হায়, যাহা বলেছিল
ভাল হবে তাতে স্বামীর জীবন এই তত সে ভেবেছিল ।
অরুণা তাহার নিজের ভাগ্যে ছি ছি ধিক্কার দিয়া
ভাবে, কটা দিন কাটাবাে হেথায় বাঁধিয়া আপন হিয়া।
শারদীয় পূজা, নবমী সে দিন, ভারী জাক, সমারােহ ;
কেহ করে কাজ, কেহ গায় গান, চারিদিকে প্রীতি-মােহ ;
বড় বড় সব নামজাদা লােকে ভরে গেছে বড় বাড়ী ;
আহারাদিশেষে কেহ হেসে বসে, কেহ ফেরে তাড়াতাড়ি ;
বড় ডাক্তার ভবনাথ রায় ; তাঁর ছেলে শশধর
অরুণার সব কথা জেনে নিয়ে করিয়াছে তায় ভর ;
শরৎশ্যালক সরােজভূষণ বন্ধুর সাথে আসি’
পূজার সে দিন করিল প্রচার অহং জ্ঞানের রাশি।
অবশেষে সবে নিজ নিজ কাজে লিপ্ত হইয়াছিল,
সেই সুবিধায় শশধর এক শিশুরে ডাকিয়া দিল

কুৎসিত ছবি অরুণার তরে—“তুমি গাে আমার রাধা,
আমিও তােমার”-নাম ধাম লেখা রেশমী কাগজে বাঁধা।
শিশু সযতনে সেটী লয়ে গেল, পিছিমা ডাকিল ধীরে ;
কঠোর কণ্ঠে অরুণা কহিল, “তাের হাতে এটা কিরে?”
ভীতি-ব্যঞ্জকস্বরে ‘ভুলু সব বলিল পিসির কাছে,
অরুণা তখনি আপনারে বলে,-“বরাতে কতনা আছে।
এত অপমান, এত হেনস্তা ভাবিনি স্বপনে-মনে,
-কেন ছেড়েছিনু বাজে অভিমানে নিজ স্বামী-ঘর-ধনে।
শ্বশুরকুলের কুঁড়ে ঘর আর যত দীন হাে স্বামী,
চির-ঈপ্সিত সে যে গাে নারীর—সবচেয়ে বেশী দামী”।
অরুণা উঠিয়া অতি দ্রুতগতি চলে ক্ষোভে রােষভরে ;
পিতার সকাশে শেছে কহিল, “চলিনু শ্বশুর ঘরে।
কাজ আছে এক, মণি ঝি চলুক মাথুর গাড়ীতে পথে,
আর ভাবে মনে, হেথায় জীবনে আসিব না কোনমতে।
পত্নী চলিল পতির আলয়ে জাগে কত স্মৃতি মনে!
মাঝে মাঝে ভাবে, এত অপমান করে অমানুষ জনে!
==
সাঁঝ হয়ে গেছে, লােক জন সব ধায় নিজ নিজ কাজে,
গঙ্গার তীরে দেব-মন্দিরে কাসর ঘন্টা বাজে।
অন্তর ভরি’ তঁাকে গড় করি’ পৌছে অরুণা দ্বারে
দেখিল, দুয়ার-তালা-চাবি দেয়া ! আঁখি বহে শতধারে ;
মণি ঝি নামিয়া শুবালােপাড়ায়, “কোথায় জামাইবাবু ?”
প্রতিবেশী কহে, “হাসপাতালেতে রেখে যে এসেছে হাবু”।

এই কথা শুনি’ অরুণাহৃদয় ভাঙিয়া চুর্ণ হােলাে ;
মণি ঝি কহিল গাড়ীর চালকে, “মাথুয়া ইধার চোলাে।”
বুকফাটা দুঃখে গুমরি’ অরুণা স্বামীর চরণতলে
পড়িয়া কহিল, “কেন এলে হেথা অভাগীরে নাহি বলে ?
কোনদিন আমি জ্ঞানতঃ তােমায় দূষিনি দেবতা, স্বামী,
তুমিই দিয়েছ আস্কারা মােরে জানে অন্তর্যামী
তা’র প্রতিফল পেয়েছি ভীষণ, বুঝেছি তা হাড়ে নাড়ে,
বকো আর ঝকো, অরুণা তােমায় আর কভু নাহি ছাড়ে।”
•
ফান-১৩৪১,
হনুমান রােড, নিউদিল্লী।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sudha-ra

Author
Dutta,gopendrakrishna
Title
Sudha-ra
File name
Sudha-ra
Text
OCR done
Citation
1938
Published
2010/01/10
Publisher
Shaileshkumar Dutta, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
108
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Dutta,Gopendrakrishna
DLI number
511494
Barcode
4990010018634.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
gNPqSpVaQME
Download PDF

Sudha-ra