Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Debobroto

Bandhopadhyay, Kalikumar · 2009/09/9

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দবব্রত।
পৌরাণিক নাটক।
8B
একালীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত।
সন ১৩১৯ সাল।
মূল্য • দশ আনা মাত্র।

PRINTED BY
GOPAL CHANDRA Rox
AT THE PARAGON PRESS,
203-1-1, Cornwallis Street, Calcutta.
Nhi
PUBLISHED BY
DR. LALIT MOHAN BANERJEE,
75, Coraw&tis Street, Calcutta.

উৎসর্গ পত্র
নটর,
কবিবর,
স্বগীয় গিরিশচন্দ্র ঘােষের
পবিত্র-স্মৃতির
উদ্দেশে

No text on this page.

ভূমিকা। মহামতি ভীষ্মের অসাধারণ পিতৃভক্তির পরিচয়-প্রদানই আমার ক্ষুদ্ৰনাটকখানির মুখ্য উদ্দেশ্য ; ইহা ছাড়া এই পুস্তকের আর একটি গৌণ উদ্দেশ্য আছে। সেইটি এই ;- বাস্তবিক দেখিতে গেলে, মহাভারতের প্রধান আখ্যায়িকা ভীষ্মের জন্ম হইতেই আরব্ধ হইয়াছে। ভারতসমররূপ মহানাটকে এই বীরশ্রেষ্ঠ যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছেন, তাহা সত্যই অলৌ- কিক ও বিস্ময়জনক। চিরকৌমাৰ্যব্রতাবলম্বী এই মহাপুরুষের পবিত্র চিত্র যদি মহাভারতকার আমাদিগের সমক্ষে না ধরিতেন, তাহা হইলে তাহার মহাকাব্যের সৌন্দৰ্য্য সম্যক্ পরিস্ফুট হইত বলিয়াই আমার বিশ্বাস। কিরূপে ভীষ্মের জন্ম ও প্রতিজ্ঞা হইতে মহাভারতের প্রধান উপাখ্যানের সূচনা হইয়াছে, প্রধানতঃ মহর্ষি বেদব্যাসের উক্তিতে আমি তাহা বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছি। আর এক কথা,—মহাভারতের যে কয়েকটি অধ্যায় অবলম্বন করিয়া এই নাটকখানি রচিত হইয়াছে, তন্মধ্যে পৃথু ও দ্যু ব্যতীত অপর বসুগণের কোন নামােল্লেখ নাই। বেদ ও পুরাণাদি ধৰ্ম্ম- শাস্ত্রে অষ্টবসুর নামােল্লেখবিষয়ে অনেকস্থলে বিভিন্নতা লক্ষিত হয়। শ্রদ্ধাস্পদ শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব মহাশয় তাহার বিশ্বকোষে আপ, ধ্রুব, সােম, ধর, অনিল, অনল, প্রভাস ও প্রত্যুষ,--ঋক্ সংহিতােক্ত এই অষ্টবসুকে “এক একটি প্রকৃতি- তত্ত্বের নিবাসভূত দেবতা” বলিয়া স্থির করিয়াছেন। এই মতই সমীচীন বলিয়া আমারও বােধ হয়।

[ ২ ]
যগণের প্রতি বশিষ্ঠের অভিশাপ দেবীভাগবতেও বিবৃত
হইয়াছে, কিন্তু ঐ গ্রন্থে আমরা “দ্যু” স্থলে “ঙ্গে” দেখিতে পাই।
পুস্তক লিখিবার আমার এই প্রথম প্রয়াস ; যদি এই ক্ষু
নাটকখানি সুধীবৃন্দের মনােরঞ্জনে সমর্থ হয়, তাহা হইলে কৃতার্থ
হইব।
কলিকাতা,
ই চৈত্র, ১৩১৯।
শ্রীকালীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ।
পুরুষ।
ইজ, যম প্রভৃতি দেবগণ।
পৃথু, দ্য প্রভৃতি অষ্টবসু।
পরাশর, বেদব্যাস, বশিষ্ঠ, প্রভৃতি মুনিগণ।
কুরুবংশীয় নৃপতি।
দেবব্রত বা ভীষ্ম
শান্তনুর পুত্র।
দাসরাজ
সত্যবতীর পালক পিতা।
০ ০ ০
• ০ ০
বিদূষক, মন্ত্রী, কধুকী, রাজগণ, গ্রহাচাৰ্য, সাধু, ব্রাহ্মণবালকগণ,
ক্ষত্রিয়বালকগণ, বৈতালিকগণ, নাগরিকগণ ইত্যাদি।
সত্যবর্তী।
বসুপত্নীগণ, জলবালাগণ, অপ্সরাগণ, পুরনারীগণ,
ধীরকন্যাগণ ইত্যাদি।

শুদ্ধিপত্র ।
পৃষ্ঠা
পঙক্তি
১৮
২৪
১৪
পদ্মযােনি
দূরিতে
পদ্মযােনি
দূরিবে
যামিনীর
১৭
যা
ঐ
কেন

দেবব্রত।
প্রথম অক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,সুমেরু সন্নিহিত বশিষ্ঠের পােবন।
বসুগণ ও বসুপত্নীগণ।
( গীত )
অমর বাঞ্ছিত, নন্দনলাঞ্ছিত কামম!
চিরবসন্তকুসুমভূষি ,
চিরশ্যামলবরীরাজিত,
চিরমধুরবিহগলঝঙ্কত স্থান!
খাপদ যেহিংসা ৰজিত,
ভক্ষক প্রণমিলিত,
নহে কুয়াম চমকিতনয়ন।
বিহর সুখে সৰে নি, শান্ত তাপাে।
( পান গাহিতে গাহিতে পােবনে পরিভ্রমণ, ও নামক
বসুদেব এবং তৎপত্নী ব্যতীত সকলের প্রস্থান)

দেবব্রত। [ম অঙ্ক, ১ম গর্ভা। - দুপত্নী। হের, দেব, ভ্ৰমিছে অদূরে পীনপয়ােধরা, সৰ্ব্ব সুলক্ষণা, কি সুন্দর পে; মরি মরি বিচিত্র গঠন,—ত্রিভুবনে ইহার তুলন হেরি নাহি কভু ! বল, দেব, জান যদি তুমি, কাহার এ গাভী। শুন সুলােচনে, নন্দিনী গাভীর নাম, বশিষ্ঠের হােমধেনু। শুন পুরা কাহিনী অপূৰ্ব্ব ;- প্রজাপতি দক্ষকন্যা ছিলেন সুরভি, জগতের হিতের কারণ, সৰ্ববরদাত্রী মাতা কশ্যপঔরসে অবতীর্ণ ধরামাঝে কামদুঘা ধেনুরূপে। নন্দিনীর দুগ্ধপান করে যদি নর, অযুত বৎসর, হইয়া অজর, পত্নী। অনায়াসে থাকে সে জীবিত। অদ্ভুত কাহিনী দেব! হৃদে মম জাগে অভিলাষ, নন্দিনীর দুগ্ধপান কুরা’ব সখিরে, আছে ভূমণ্ডলে জিতবতী নামে -

১ম অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত
প্রিয়সখী মম,—উশীনররাজকন্যা,
অলােকসামান্যা রূপসী কামিনী।
পীযুষসদৃশ এই দুগ্ধ
করে যদি পান,
ব্যাধিহীন কলেবরে, সুস্থির যৌবনে
আজীবন রবে, অতুল আনন্দ
পাবে সেই নারী ; তেঁই দাসী
করে আকিঞ্চন, তাহারি কারণ
সবৎসা নন্দিনী চল যাই ল’য়ে।
সাধ্বি, উগ্রতপা বশিষ্ঠ মহর্ষি ;
শুন নাহি বিশ্বামিত্র সনে
বশিষ্ঠ বিবাদ হােমধেনু লাগি
ঋষিশাপে গাধির নন্দন
পেয়েছিল কত ক্লেশ,ভয় হয় মনে
পাছে রােষাবেশে পুনঃ ঋষি
শাপ দেয় মােরে।
হাসি পায় মনে, নাথ,
শুনিলে তােমার কথা।
মানব সে বিশ্বামিত্র
পড়েছিল ঋষিকোপে।
কিন্তু দেব, বসুদেব তুমি,
বশিষ্ঠের চেয়ে কিসে তুমি হীন
তপের প্রভাবে ? দেবতা যদ্যপি ডরে
বশিষ্ঠ মানবে, অমর কি হেতু নাম
পত্নী।

s
দেবব্রত।
[ ১ম অঙ্ক, ২য় পর্ভাঙ্ক।
বুঝিতে না পারি। আমার কারণ
বলি নাই প্রভু তােমা;-নারী আমি,
নারীজন্মে কোন বা করি নাই কভু,
প্রাণ চেয়ে ভালবাসি সখীরে আমার,
তাহারি কারণ করিয়াছি নিবেন,
যদি হে অক্ষম ধেনু লভিবারে,
কাষ নাহি ইথে,-নারীর লাগিয়া
কে কোথায় সহিয়াছে এত ক্লেশ।
ত্যজ অভিমান, সুবদনি,
যাই, ভ্রাতৃগণসহ করিগে মন্ত্রণা,
বাসনা তােমার স্বাহে হয়তাে পূরণ।
( উভয়ের প্রস্থান )
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,-রাজোদ্যান।
শান্তনু।
রাজ্যে মাের শান্তি বিরাজিত,
অশান্তির লেশ নাহি হস্তিনানগরে।
প্রকৃতিনিচয় অপত্যের প্রায় মা-
পিতৃ সম ভক্তি করে মােরে।

১ম অঙ্ক, ২গর্ভা।]
দেবব্রত।
--
মনে পড়ে স্বপনের ক্ষীণ-স্মৃতি মত,
যেন পূর্বজন্মে করেছিনু কত তপ
অক্ষয় স্বরগসুখ লভিবার তরে ;-
পুনঃ করি পুণ্যকর্ম আয়ােজন,
পরমার্থ লাভ যাহে হয়।
শাস্ত্রে বলে, গৃহস্থ যে জন,
সন্ত্ৰীক করিবে সেই ধর্ম আচরণ।
গৃহী আমি, কিন্তু স্মরি পিতার আদেশ
করি নাই অদ্যাবধি পরিণয়।
বানপ্রস্থহেতু যবে পিতা
ত্যজিলেন গেহ, কহিলেন মােরে,-
“দিব্যাঙ্গনা এক আসিবে সকাশে-
বরিতে তােমারে পুত্রলাভহেতু;
অনুবর্তী হয়ে থাকিও সতত
সে নারীর,দেবকাৰ্য্য সিদ্ধ হবে তাহে।”
রহিলাম সেই আশে অনুঢ় অদ্যাপি,
কিন্তু, কই আশা মাের হ’লনা পূরণ।
( বিদূষকের প্রবেশ।)
বিদূষক। বলি, রাজা, আইবুড়াে ছেলে ভর সন্ধ্যেবেলায় বাগানে বসে
হচ্ছে কি ? ভেবে ভেবে যে একটা মাথার ব্যায়ােম জন্মে
যাবে। একটা বেথা করে ফেলুন, সংসারী হন। শাস্ত্রে
বলে “গৃহিণী গৃহমুচ্যতে।” বাস্তবিক, মহারাজ, এই এত
বড় রাজ-অট্টালিকাটা আমার নিকট গৃহ বলেই বােধ
হয় না।

দেবব্রত।
[ ১ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
শান্তনু। আর তােমার ভগ্নকুটীরখানিই বুঝি একখানা প্রাসাদ।
বিদূষক। হু, নিশ্চয়ই। ব্রাহ্মণী যখন স্বহস্তে পাক করে থরে থরে
পায় পিষ্টক, অন্ন ব্যঞ্জন আমার এই ক্ষুধিত উদর ও তৃষিত
রসনার সম্মুখে সংস্থাপন করেন, তখন মহারাজ, বলতে কি,
আমার সেই ক্ষুদ্র কুটীর আমার চক্ষে যেন অমরাবতীর
শােভা ধারণ করে।
ধন্য তুমি দ্বিজোত্তম,
লভিয়াছ সতী সাধ্বী গৃহিণী ব্ৰাহ্মণী,
হতভাগ্য আমি, নারিনু করিতে
গৃহস্থের ধর্ম আচরণ !
বিদূষক। কেন রাজা এত দুঃখু কিসের ? কত রাজা রাজচক্রবর্তী
আপনাকে কন্যাদানের জন্য সতত উৎসুক,-আপনি একটা
মুখের কথা খসালেই সব গােল চুকে যায়, শুভকৰ্ম্মটা নির্বিঘ্নে
সমাপ্ত হয়ে যায় ; আর “মিষ্টান্ন মিতরে জনাঃ” ত’ বাঞ্ছা
করেই থাকে, আর তার উপরে আমি বয়স্য, বুঝতেই
পাছেন।
শান্তনু। দেখ বয়স্য, তােমার সকল সময়ই রঙ্গরহস্য।
বিদূষক। তবে কি মহাশয় আমাকে এই মধুর সন্ধ্যাকালে এই মনােরম
উদ্যানে গম্ভীরবদন পেচকের ন্যায় অবস্থান ক’তে বলেন।
সব পারব মহারাজ, কেবল ঐটিই পাব না। দু’দিনের
জন্য এ সংসারে এসেছি, দু’মুটো দু’সন্ধ্যে পেট ভােরে খাব,
আর দুটো গাল ভরে হাসব-তাতেও যদি মহারাজ বাম
হন, তা হলেই নাচার। আচ্ছা মহারাজ ত’ অনেক দিন
মৃগয়াতে যান নি, চলুন না একদিন মৃগয়ায় বেরােন যাক।

১ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাৰু।]
দেবব্রত।
৭
শান্তনু।
ভাল কথা বলেছ বয়স্থ,
করি নাই বহুদিন বনপৰ্যটন ;-
সাধ হয় মাঝে মাঝে,
ত্যজিয়ে প্রাসাদ
পশি গিয়া ভীষণ কান্তারে—
হেরি গিয়া প্রকৃতির ভীমকান্ত ছবি।
কোথা মত্ত মাতঙ্গ উদ্দেশে
ধাইছে শার্পল, কোথা
ভীম মহীধরশিরে ভীম মহীরুহ,
ত্রিশূলীর শিরে জটারাজী যথা,
কোথা ঝর ঝর ঝরি সুন্দর নিঝর
বাড়াইছে পাৰ্বতীয় সরিতের কায়,
কোথা দিবাভাগে ভীষণ আঁধার ।
চল, সখা, চল ত্বরা করি,
ডাক সারথিরে,
রথ লয়ে আসুক সত্বর।
বিদূষক। মহারাজের সব তাতেই বাড়াবাড়ি, সব তাতেই তাড়াতাড়ি।
যাই, আমিও সারথিকে পাঠিয়ে দিয়ে ব্রাহ্মণীর নিকট থেকে
বিদায় নিয়ে আসি।
( উভয়ের প্রস্থান)

দেবব্রত।
[ ১ম অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,-স্বর্গস্থিত পথ।
বসুগণ।
পৃথু।
হের আভাহীন কলেবর সবে।
অমরের দিব্য কান্তি
নাহি আর মােদের শরীরে
ঋষি-অভিশাপে
লভিতে হইবে সবে মানব-জনম।
অনিবাৰ্য ঋষিবাক্য ;
পূৰ্ব্বাপর না বিচারি মােরা,
নারী প্রয়ােচনে,
করি হরণ বশিষ্ঠের ধেনু।
হা ধিক আমারে !
আমারি কারণ,
ভ্রাতৃগণ সহিছে যে কতই যন্ত্রণা।
হায়, কাপুরুষ আমি,
নারীর কথায়,
করিলাম অধর্ম আচার।
কেন হায়, হইনু অমর,
নহে তুষানলে পশি
ত্যজিতাম এছার পরাণ।

১ম অঞ্চ, ৩য় গর্ভা।]
দেবব্রত।
৩য় বসু। যা হবার হইয়াছে,
ভাবিয়া অতীত নাহি কোন ফলােদয় ।
ভাব এবে সবে,
কোথা মােরা জন্মলাভ করিব ধরায়।
(গঙ্গার প্রবেশ)
বগণের স্তব।
কলুষহারিণী,
ত্রিলােকতারিণী,
সুরধুনী নমস্তে।
ত্ৰিপাপনাশিনী, ত্রিপথগামিনী
জস্বতা নমস্তে।
শুভদা, সুখদা, মােক্ষদা, বরদা
জগন্মাতা নমস্তে।
বিষ্ণুপাদোদ্ভবা, বিধাতৃবন্দিতা,
সরিঘরা নমস্তে।
জয় জলময়ী,
জয় ব্রহ্মময়ী
দয়াময়ী নমস্তে।
সকলমলা
জয় পুতজলা
মাতৰ্গঙ্গে নমস্তে।
*
কি হেতু বিষন্ন হেরি বসুদেবগণ,
তােমা সবে? নাহি আর পূর্বের লাবণ্য।
অশুভ কিছু কি হয়েছে ঘটন?
আমি জননী সমান,
বল, যদি প্রতীকার পারি করিবারে।

দেবব্রত।
[ ১ম অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।
মাগাে, কি আর কহিব,
তপস্বী বশিষ্ঠ দেছে অভিশাপ,
নররূপে ধরাধামে লভিতে জনম।
কেন অকস্মাৎ হেন ব্ৰহ্মশাপ?
মম পত্নী করিল কামনা
বশিষ্ঠের হােমধেনু নন্দিনী লইতে,
মােহবশে রমণীবচনে,
ভ্রাতৃগণে মিলি হরিলাম
সবৎসা নন্দিনী।
ধ্যানবলে জানি মুনি হরণবিষয়
দিলা অভিশাপ, “দুষ্ট বসুগণ,
নরজন্ম করহ গ্রহণ।”
ঋযিরােষনাশহেতু করিনু বিনয়,
পায়ে ধরে কতই সাধিনু ;
অবশেষে কহিলা বশিষ্ঠ,
“মম বাক্য হবেনা নিস্ফল।
তােমার কারণ,
অভিশপ্ত ভ্রাতৃগণ,
অতএব তােমা স্বকৃতদুষ্কৰ্ম্মফল
ভুঞ্জিবার তরে,
ধরায় রহিতে হবে যাবত, জীবন ;
কিন্তু অপর সকলে
সম্বৎসর পূর্ণ হলে শাপ মুক্ত হবে।”
কি হবে, কি হবে, মাতা, করগাে উপায়

১ম অঙ্ক, র গর্জা।]
দেবব্রত।
সামান্য মানুষীগর্ভে
নারিব লভিতে জনম ;
যদি মাতা কর গাে করুণা,
অধম অজ্ঞানে তব গর্ভে দেহ স্থান,
এই নিবেদন তব রাঙ্গা পায়।
শুন শুন বসুদেবগণ,
দেবকাৰ্য সাধিবার তরে
ধরিতে হইবে নারীরূপ
অচিরে আমারে,
কুরুবংশে শান্তনু ভূপাল
তাঁহার মহিষী হয়ে।
বঞ্চিতে হইবে কাল ; করি অঙ্গীকার,
মম গর্ভে একে একে লভিবে জনম ;
ভূমিষ্ঠ হইলে একে একে সাতজনে
বিসজ্জিব সলিলে আমার।
শুন ওহে নামক বসুদেব,
তােমা হ’তে মহাকাৰ্য্য হবে সমাহিত,
ত্রিভুবন গাহিবে সুযশ,
কীৰ্ত্তি তব অক্ষয় রহিবে,
কালপূর্ণ হলে পুনঃ আসিবে অমরা।
বগণ। জয় মাগাে পতিতপাবনি।
[ একদিকে গঙ্গার ও অন্যদিকে বসুগণের প্রস্থান।]

১২
দেবব্রত।
[ ১ম অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,–গঙ্গাতীরবর্তী বনপথ।
বিদূষক।
বিদূষক। বাপ রে বাপ, রাজরাজড়ার কি বেয়াড়া কাণ্ড! মৃগয়া কবেন
ত’ এক নিমেষেরও বিশ্রাম নেই। আবার সময় রথের
ঝাঁকুনিতেই ত’ আমার অর্ধেক প্রাণ বেরিয়ে পড়েছে।
ব্রাহ্মণের ছেলে, ও রকম রথে চড়া বড় একটা ত’ অভ্যাস
এই যে কথায় বলে “অনভ্যাসের ফোঁটা কপাল
চড়চড় করে, তাই হয়েছে আমার।
রাজাকে মৃগয়ায়
নাচিয়ে কি কুকাযই করেছি। কষা, বােদা, টোকো জঙ্গুলে
ফলগুলাে খেয়ে মাষের প্রাণ আর ক’দিন বাঁচে। যাই
দেখি, রাজাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে যদি ঘরমুখখা করতে
পারি, তবেই মঙ্গল।
নেই ।
.
(শান্তনুর প্রবেশ)
ত্যজি গহন কানন
এবে উপনীত জাহ্নবীর তীরে ;
কি সুন্দর স্থান!
সন্ধ্যা সমাগত প্রায়,
সান্ধ্য-বন্দনা করিতে
সিদ্ধ ও চারণ, গন্ধৰ্ব্বকির
আগত পবিত্র দেশে ;-

১ম অঞ্চ,
৪র্থ গর্ভাৰু।] দেবব্রত।
করিলাম পশুহত্যা কত
মৃগয়ার ব্যপদেশে,
আজি সপ্তদিন ছুটিতেছি শুধু
ৰন হ’তে বনান্তরে, নাহিক বিরাম।
( দূরে সঙ্গীতের ধ্বনি)
মরি মরি সুরলহরী
ভেসে আসে কোথা হতে!
(পটপরিবর্তন)
(গঙ্গা ও জলবালাগণের জলক্রীড়া ও সঙ্গীত )
ব সলিল, স্বচ্ছ মানস, সকলি মােরা সন্নলা।
পুরুষ কুটিল, ইলেতে কুশল, মজাতে চাহে অৰলা।
তরঙ্গ ভঙ্গে, চললো রঙ্গে,
জীবনে জীবন, জীবন মরণ, জলে করি জলখেলা।
দ্মপ-জল জীবন চঞ্চল, খেলে নাও এই বেলা।
অনিন্দ্যসুন্দরী বামাবৃন্দ
করিতেছে জলকেলি ;
সান্ধ্য-সমীরণে সঙ্গীতের ধ্বনি
মৃদু মৃদু ভেসে আসে ;-
অপূর্ব রমণী কেবা ওই
তারামালামাঝে চমা যেমতি,
দেবী না কিন্নরী,
অথবা অপ্সরী,

১৪
দেবব্রত।
[ ১ম অঙ্ক,
৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
যে হয়, সে হয়, যাই সন্নিধানে,
ললনা-ললাম রূপসী নিশ্চয়।
(জলবালাগণসহ গঙ্গার অন্তর্ধান )
–
(নদীকূলে যাইয়া) কোথা গেল বামদল?
একি ইন্দ্রজাল, কিম্বা চক্ষুভ্রম মম!
, না, হইবে অপ্সরী,
অন্তরীক্ষে হ’ল অন্তর্হিত ;
কিম্বা জলবালা,
সলিলের কায়া মিশাল সলিলে।
কিছু না বুঝিতে পারি,
কেবা সেই নারী সঙ্গিনী বেষ্টিত,
যাই, সন্ধ্যা সমাগত,
কি কায রহিয়া হেথা ?
কিন্তু ফিরে যেতে মন নাহি সরে ;
দূর হ’তে হেরিনু তাহারে
তবু যেন তার মুখখানি
ভেসে উঠে হৃদি-সরােবরে।
নয়নে নয়ন হ’ল নিপতিত,
মনে হ’ল প্রণয়-আকাঙ্ক্ষা রহিয়াছে।
অপাঙ্গেতে আঁকা ;-উদ্দেশে তাহার
ছুটে এ জাহ্নবীর কূলে,
দুর্ভাগ্য আমার,
দেখা আর হল না হল না।

১ম অঙ্ক, ৪র্থ গৰ্ভাৱ।]
(গঙ্গার পুনঃ প্রবেশ ও তরুমূলে উপবেশন )
ওই সেই বসি তরুমূলে,
দৃষ্টিভ্রম নহেক কদাপি,
পুনঃ উঠে সঙ্গীতের তান!
(গঙ্গার গীত।)
এ নব বসন্তে,
নৰ অনুরাগে
শিহরে শিহরে প্রাণ।
ফুটিল মুকুল,
ভ্রমর আকুল
গুঞ্জরে মধুর তান।
কেন এ পিয়াসা, কেন নব আশা,
কেন এ প্রকল্প হিয়া।
পরাণ সপিলে
পরাণ মিলিবে
বঁধু বিনিময় দিয়া।
আমি চাহি যারে সে কি চাহে মােরে,
কেমনে
নিব হয়।
যারে ভালবাসি, সে যদি বাসে গো,
পীরিতি-বালাই যায় ।
শান্তনু।
( নিকটে যাইয়া)
ফুল-অরবিন্দ জিনি
অঙ্গের লাবণি,
প্রেমে গড়া তনুখানি,
কে সুন্দরী তুমি বসি নিরজনে-
কেবা তুমি দেহ পরিচয় ?
কে

দেবব্রত
[ ১ম অঞ্চ, র্থ গর্ভা
ক্ষণপুৰ্ব্বে হেরিনু তােমারে
সঙ্গিনীর সহ করিতেছ জলকেলি
;
এবে বসি তরুমূলে
কাহার ধোনে বললল ললনে ?
প্রেমভাষা ভাষিছে নয়ন,
মন প্রাণ করেছ হরণ ;
সাধ হয় শশাঙ্কবদনি,
কুসুমপেলব ওই কর দুটি লয়ে
রাখি মাের করে,-সাধ হয়
এ নব-যৌবন,
তব পদে করি সমর্পণ।
আমি হস্তিনা-ঈশ্বর--
প্রতীপনন্দন, শান্তনু আমার নাম ।
তব পরিচয়দানে
বাধিত করলাে মােরে।
পরিচয়ে কিবা কাব হবে মহাশয় ?
প্রেমে বাঁধা পড়েছি দু’জনে,
দিয়াছি তােমারে প্রাণ,
দিবে তুমি প্রতিদান
কিন্তু, রাজা, কর অঙ্গীকার,
যে কাৰ্য করিব আমি, সৎ বা অসৎ,
করিবে না তাহে কভু বাধা দান,
সদা মাের অনুবর্তী থাকিবে ভূপাল ;
যদি মাের কার্যে কভু ল অসন্তো,
•

১ম অৰু, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
১৭
যদি শুনি তব মুখে অপ্রিয় বচন,
জেন হে রাজন
সেই দণ্ডে ত্যজিব তােমারে।
ইথে যদি হও গাে সম্মত,
চল, নরনাথ, যাই তােমার আলয়ে,
মহিষী হইয়ে, সুখে র’ব বারমাস।
শান্তনু।
(স্বগত) মনে পড়ে জনকের বাণী,
দিব্যাঙ্গনা এক আসিবে সকাশে,
সেই সব কথা
মিলিতেছে অক্ষরে অক্ষরে !
(প্রকাশ্যে) যে পণে বাঁধিবে মােরে তুমি সুবদনি,
সেই পণে র’ব বাধা ;
করিনু স্বীকার,
তব মনােমত কাৰ্য্যে
করিব না বিঘ্ন আচরণ।
তুমি প্রেয়সী আমার,
যদি হয় প্রয়ােজন,
এ তুচ্ছ জীবন
তােমা তরে দিতে পারি বলি।
এবে চল মনােরমে,
চল হস্তিনানগরে,
রমণীর শিরােমণি তুমি-
সিংহাসনে বসাইব বামে।

দেবব্রত।
[ ১ম অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
১৮
?
ধন্য আমি,
হেন রত্নভ ভাগ্যে ঘটিল আমার ।
গঙ্গা। চল, নাথ, ধীরে ধীরে,
নিসর্গের সৌন্দৰ্য্য নেহারি !
( বিদূষকের প্রবেশ ।)
বিদূষক। তাইত’ মহারাজ কোথায় গেলেন ? এই ত’ ঘুরতে ঘুরতে
ভাগিরথীতটে উপস্থিত হ'লেম ; দেখি কুলে কুলে একটু
অনুসন্ধান করে দেখি, যদি সন্ধ্যাবন্দনায়
দেখি, যদি সন্ধ্যাবন্দনায় নিযুক্ত হয়ে
থাকেন। ( দূরে শান্তনু ও গঙ্গাকে দেখিয়া ) মহারাজ না ?
মহারাজের পাশে হাত ধরে আসে কে ? আমি মনে করেছি
রাজা এতক্ষণ সন্ধ্যাহ্নিক করছেন! আজ কদিন ধরে
রাজার মনটা কেমন কেমন দেখছিলেম ;-মুখে বলেন বে
করব না, তার কারণ এই শৰ্ম্মা এতদিনে স্থির করতে
পেরেছেন ; ভেতর ভেতর এত বড় একটা প্রেমের অভিনয়
চলে যাচ্ছে !
বয়স্য, বয়স্ক, দেখ দেখ মৃগয়ায় এসে আমি কি দুল্লভ নারীর
লাভ করেছি।
বিদূষক। আপনি হ'লেন শিকারী রাজা; তা তা’ পারবেন নাই বা
কেন? ইনি কি আমাদের রাজমহিষী হবেন ? বিবাহটা
কি গান্ধৰ্ব্ব-মতেই হয়ে গেল না কি ?
শান্তনু।
বিবাহটা যে মতেই হ’ক না কেন, চল রাজধানীতে ফিরে
যাই, শীঘ্র শীঘ্র উৎসবের আয়ােজন করিগে। সাতদিন কেবল
“দীয়ম্, ভুজ্যতা” চলবে।

১ম অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
দেবব্রত।
বিদৃষক। জিয়াজ্ঞে, তা হলেই হ’ল, তা হলেই হল। আসুন, আমি
এগিয়ে এগিয়ে আপনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাই।
( সকলের প্রস্থান।)

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক!
দৃশ্য---রাজপথ।
গ্রহাচাৰ্য ও একজন নাগরিক।
নাগরিক। আরে শুনেছ ভট্টচার্য, মহারাণীকে আমাদের ডাইনেয়
পেয়েছে।
গ্রহাচাৰ্য। তার আর হয়েছে কি ? এখনই গিয়ে আমি একটা শান্তি-
স্বস্ত্যয়ন ক’ছি,ডাইনী ছেড়ে ডাইনীর চোদ্দপুরুষ ছেড়ে যাবে।
আর এক দণ্ড, দশ পল, পনের বিপল পরে অমাবস্যা
পড়ছে, তার সঙ্গে আবার শতভিষা নক্ষত্র। আহা ডাইনী
ছাড়াবার এমন মাহেন্দ্রক্ষণ আর পাব না;-চল্লম, আমি
চলম।
A
নাগরিক। তােমার ওসব তিথিনক্ষত্র রেখে দাও এখন ;-মহারাজ
ওসবে যখন ভিড়তেন, তখন :ভিড়তেন—এখন সে রামও
নেই, সে অযােধ্যাও নাই ; মহারাজ এখন সেই ডাইনে
পাওয়া রাণীর গােলাম হয়েছেন,-রাণী ওঠালে উঠছেন,
বসালে ব’সছেন। হায়, হায়, আমাদের এমন রাজা বনে
গিয়ে একটা ডাইনী বে করে নিয়ে এলেন।

২য় অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
গ্রহাচাৰ্য। তা মহারাজের কোষ্ঠী আমি এখনই গিয়ে দেখছি, পত্নীস্থানে
যাতে শুভ হয়, তারই একটা ব্যবস্থা করিগে।
নাগরিক। আরে রাজার দেখা পেলে ত’ করবে, মহারাজ যে আজকাল
সৰ্ব্বদাই ডাইনে রাণীর আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!
(বেগে দ্বিতীয় নাগরিকের প্রবেশ।)
২য় নাগ। মশাইরা সব সরে পড়ুন—সরে পড়ুন ! ডাইনে রাণী এই
রাস্তায় আসছে গাে,--ওরে হরের মা ! তাের হ’রেকে
শীগ্যির ঘরের মধ্যে পুরে দোর বন্ধ কর !
১ম না। আরে আবার কি হল ?
২য় না। আবার কি হবে! যা বছর বছর হয়ে আসছে তাই হল।
যেই ছেলে পেট থেকে মাটীতে পড়া, অমি তাকে নিয়ে চো-চা
দৌড়! বলে, ছেলেকে গঙ্গার দিয়ে আধ। মন্ত্রীমশাই,
বিদূষক মশাই, সকলে কত করে বােঝালেন—মাগী নাছােড়
বান্দা। ছেলে নিয়ে জলে ফেলে দিতে যাচ্ছে।
১ম না। মহারাজ কেন তাতে বাধা দিলেন না ?
২য় না। কি জানি মশাই, বােধ হয় রাজাটাকে মাগী গুণ করেছে ।
নৈলে, এই ক’বার জ্যান্ত ছেলে জলে ফেলে মালে, মহারাজ
একটা কথাও কইলেন না।
গ্রহাচাৰ্য। এসব গ্রহ-বৈগুণ্য! আমি গিয়ে ভাল করে পঞ্চমস্থানটা
আর সপ্তম স্থানটা দেখছি।
২য় না। আরে রেখে দিন আপনার পঞ্চম স্থান, এখন ছেলে পুলে
নিয়ে এ স্থান থেকে প্রস্থান করতে পালেই মঙ্গল। ওরে
হ’রের মা, হ’রের মা! ডাইনী আসছে রে হ’রেকে
ঘরে পাের।
(প্রস্থান)

२२
দেবব্রত।
{ ২য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
১ম না। আমিও বাড়ী যাই, ছেলেদের সাবধান করিগে,-ডাইনীর
নজর টজর না লেগে যায় ।
( প্রস্থান)
গ্রহাচাৰ্য। বােধ হয় বারবেলাতে আজ বাড়ী থেকে পা বাড়িয়েছি।
(প্রস্থান)
দ্বিতীয়
গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,কক্ষ।
শান্তনু।
শান্তনু। বৃথা ক্ষত্র হয়ে জন্মেছি ধরায়,
জাহ্নবী-পুলিনে করিয়াছি পণ,
বুঝি আর রাখিতে নারিব।
ধন্য, ধন্য, রমণীর মায়া।
মােহিনীর মােহজালে ভুলি,
বিবেকেরে দিয়ে জলাঞ্জলি,
হইলাম কামিনীর দাস
একে একে সাত পুত্রে দিনু বিসর্জন।
শান্ত্রের বচন,
পিতৃপুরুষের পিলাভ হেতু
করিবেক উদ্বাহ-আচার।
সেই পুত্রগণে—সেই বংশধরগণে,-
;

২য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
=
আত্মা হতে যাদের জনম,-
অকালে কালের গর্ভে দিনু পাঠাইয়া।
মহাভ্রম হয়েছে জীবনে,
কুসুমের মালা বলি
ধরিয়াছি কালসৰ্পী গলেতে আমার,
তীব্র হলাহলে জর্জরিত হ’ল কায় ।
গর্ভবতী হইয়াছে মহিষী আবার ;
যদি সে পাষাণী-
পুনঃ চাহে বধিতে তনয়ে,
হ’ব তার প্রতিবাদী
ছেড়ে যাবে রাণী মােরে,
যায় যাক,-পুত্রশােক চেয়ে
পত্নীর বিরহ শতগুণে ভাল।
ওই আসিছে নিৰ্ম্মমা,
বুঝি নবজাত সন্তানে লইয়ে।
(নবপ্রসূত শিশুকে লইয়া গঙ্গার প্রবেশ)
আরে আরে পুত্রবিঘাতিনি,
সাত পুত্রে করেছিস নাশ,
তবু বুঝি হয় নাই রাক্ষসীর
বাসনা পূরণ, বুঝি চা বধিবারে
হেন সুলক্ষণ কুমারে আবার।
কে বলে নারীর হৃদি কোমলতা ভরা,
কিম্বা মায়াবিনী তুই পিশাচী নিষ্ঠুর,
কেমনে জানিবি কারে বলে স্নেহ-মায়া ?

২৪
দেবব্রত।
[ ২য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
গঙ্গা।
;
এই মম অষ্টম তনয়,
রক্ষিব ইহারে—নাহি চাহি তােরে।
মােহবশে কটুকথা কহ না রাজন,
গুন দিয়া মন,
কেবা আমি, কেবা তুমি, কেবা পুত্রগণ ।
ইক্ষাকু বংশেতে
মহাভিষ নামে ছিলে তুমি নরপতি ;
করি বহুযজ্ঞ আচরণ
স্বর্গলাভ হয়েছিল তব।
একদিন বিরিঞ্চি-সমীপে
বিক্ষিপ্ত হইল যবে মম অঙ্গবাস
সমীরণভরে, কামাতুর হয়ে
হেরেছিলে তুমি মাের আপাদমস্তক।
স্বর্গের অযােগ্য 'তােমা বুঝি পদ্মযােনি
প্রেরিলেন মর্ত্যলােকে,
লভিবে ত্রিদিব পুনঃ জীবন অন্তেতে।
যদি চাহ পূৰ্ব্বস্মৃতি ক্ষণেকের তরে,
অঙ্গস্পর্শ কর মাের,বুঝিবে কে আমি !
( শান্তনুর গঙ্গার অঙ্গে হস্তক্ষেপ )
ক্ষম দোষ, ক্ষেমঙ্করি,
পতিত-পাবনি, হরশিরােবিহারিণি !
আশ্রিত অধমে রাখ মাগাে রাঙ্গা পায় ;
অজ্ঞানে মা করিয়াছি কত পাপ,
পত্নীভাবে করেছি গ্রহণ।

২য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।] দেবব্রত। ra মাগো হিমাদ্রিনলিনি, পুত্রশােকে হইয়ে কাতর, পাষাণী বলিয়া তােমা করেছি ভৎসনা ; পুনঃ কত হইবে সহিতে তার গাে দুস্তরে নিস্তারকারিণি ! ত্যজ ভয়, কুরুরাজ, দেবকাৰ্যে লভেছি জনম দোহে ;- তব পুত্রগণ নহে সামান্য মানব- বশিষ্ঠের অভিশাপে অষ্টবসু জন্মেছে ধরায় , সপ্তবসু শাপমুক্ত এবে, আছে মাত্র এই, সযতনে পালহ ভূপাল এ কুমারে ; হবে দেবদ্বিজে ভক্ত, রাখ নাম দেবব্রত ; হইয়াছে কাৰ্য শেষ মম, চলিলাম আমি। দাড়াও দাড়াও মা, শ্রীচরণে করি নিবেদন, আর মম নাহি রাজ্য-সুখ-আশা ; গর্ভে স্থান দেছ এ নন্দনে এর পালনের ভার লইতে হইবে তােমা; জননীর করুণাব্যতীত,

দেবব্রত
[ ২য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।
গঙ্গা।
জননীর সুশিক্ষা-ব্যতীত,
নাহি হবে সন্তানের মনুষ্যত্বলাভ।
বিশেষতঃ সংসারেতে নাহি মন আর,
যাব বনবাসে,
করিব তপস্যা নিজ ইষ্টলাভ লাগি।
মতিমান্,
কর সম্প্রদান তনয়ে আমারে ;
বিধিমতে ক্ষত্ৰধৰ্ম্ম শিখাব বাছারে,-
কিন্তু রাজা, পুনঃ ফিরে আসিবে সংসারে,
করিবে আবার
অন্য কোন কামিনীর পাণি-সংগ্রহণ।
( প্রস্থান)
একি প্রহেলিকা জীবনে আমার।
(প্রস্থা
=
গর্ভাঙ্ক।
তৃতীয়
দৃশ্য-রাজপথ ।
গ্রহাচাৰ্য ও নাগরিক।
গ্রহাচাৰ্য। কিহে বাপু, তুমি না সেদিন বলেছিলে, ডাইনি ছাড়াতে
পাব না এখন দেখলে একবার ব্যাপারখানা,এমন
;

२१ ২য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।] দেবত। গ্রহগ করলুম যে ডাইনিকে একেবারে দেশছাড়া করে ছাড়লুম। কিহে, এখন যে কথা কইছাে না ? নাগরিক। এজ্ঞে, ঠাকুরমশাই, . আমি ত’ আপনাকে কোন কথা বলিনি। গ্রহাচাৰ্য। তুমি বলনি ত’, সেদিন আমি কার সঙ্গে এত বচসা-বাগ- বিতণ্ডা-তর্কবিতর্ক করলুম। নিশ্চয়ই তুমি বলেছিলে, এখন আমার ক্ষমতা স্বীকার করে যাও। নাগরিক। কাকে আপনি কি কথা বলছ ; আমি ত’ আপনাকে চিতে পাছি না। গ্রহাচাৰ্য। এখন্ চিন্‌তে পারবে কেন? এখন যে সব থেতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছি, জোতিষের প্রত্যক্ষ ফল হাতে হাতে দেখিয়ে দিয়েছি। তুমি জ্যোতিষশাস্ত্র স্বীকার ক’র কি না? খুব করি ঠাকুর মশাই। গ্রহ। তবে আমি রাজার ডাইনী ছাড়িয়েছি, একথা স্বীকার করছ কেন? তুমি বুঝি ন্যায়শাস্ত্র পড় নি। । ঐটিই অল্যাই হয়ে গেছে,—ল্যায় শান্তরখানা পড়া হয় নি। ( দ্বিতীয় নাগরিকের প্রবেশ) গ্রহ। ওহে শােন, শােন, তুমিও না সেদিন ছিলে? তুমিও বলে- ছিলে রাজার ডাইনী ছাড়াতে পারব না; এখন দেখলে । ২য় না। আপনাকে কি ও কথা নিবেদন ক’রুতে পারি, আপনি হলেন জ্যোতিষে সাক্ষাৎ মা সরস্বতী। নিশ্চয়ই তুমি বলেছিলে, এখন সে কথাটা তুমি উড়িয়ে গ্রহ। দিচ্ছ। - |

২৮
দেবব্রত।
[ ২য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাব্দ
২য় না।
১ম না।
মিথ্যে কথা কেন কই’ব ? আপনি হলেন গিয়ে ঠাকুরমশাই,
আপনার কাছে কি মিথ্যে কথা বতে পারি।
আর আমি মিথ্যে কথা বলছি। দূর হ’ বেল্লিক বেটারা-
দে আমার পথ ছেড়ে দে।
ওরে ঠাকুর ঘেঁপেছে রেখেপেছে !
তবে রে পাজী ব্যাটারা, ছুঁচো-ব্যাটারা-
( নাগরিকদ্বয়ের পলায়ন, তৎপশ্চাৎ
ছুটিতে ছুটিতে । প্রস্থান)
(জনৈক সাধুর প্রবেশ ও গীত )
গ্রহ।
।
কেন বৃথা ক্রোধ, কেন বৃথা কাম,
মােহমদে কেন মা অবিরাম,
জীবন-যৌবন, ঐশ্বর্ষা-সম্মান,
সকলই অনিত্য এ সংসারে।
ক্ষুদ্র রেণু হয়ে কর নিজ গৰ্ব্ব,
বিরাট, নিকটে কত তুমি খৰ্ব্ব,
ত্যজ অভিমান, যদি মােকধৰ্ম্ম
বাসনা তোমার, জীব, থাকেৰে।
তুমি হে সসীম, তুমি হে নশ্বর,
ভাবহে অসীম, অব্যয়, অক্ষর,
চিদানন্দময় বিভু, বিশ্বেশ্বর,
পরম পুরুষ, পরাৎপরে !
(প্রস্থান)

২য় অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভা।]
দেবব্রত।
২৯
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,---বশিষ্ঠাশ্রমের সম্মুখবর্তী স্থান।
বেদব্যাস।
বেদব্যাস।
শুনিনু ত্রিদিবে,
জন্মিবেন নারায়ণ দ্বাপরের শেষে ;
দেখিতেছি সূচনা তাহার,
হইতেছে ক্ষত্রগণ অধৰ্ম্ম-আচারী
করিবারে দুষ্কৃত নিধন,
সাধুগণ পরিত্রাণ,
অবতীর্ণ নারায়ণ হবেন ধরায়।
নবধর্ম হইবে স্থাপিত ;
সে ধৰ্ম্ম-মহিমা ঘােষিতে হইবে মােরে।
শুনেছি প্রাচীন গাথা,
যুগে যুগে যবে,
নরদেহ ধরেন মাধব,
দেবগণ নিজ অংশে লভেন জনম
ধরণী মাঝারে,-কেহ পূর্বে, কেহ পরে ;
কিন্তু এই আৰ্যাবৰ্ত্তে, অদ্যাবধি
সেরূপ মানব পড়ে নাই দৃষ্টি-পথে।
বশিষ্ঠ-আশ্রম হেরিতেছি অবিদূরে,
জিজ্ঞাসি কুশল তার।
ক

দেবব্রত।
[ম অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক
বশিষ্ঠ।
( বশিষ্ঠের প্রবেশ)
স্বাগত হে মহর্ষিপ্রধান।
কোথা মম শিষ্যগণ,
মুনিবরে করহ বন্দনা
এসেছেন ব্যাসদেব,
মানবের হিতের কারণ,
ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথৰ্ব্ব,
এই চারি ভাগে
করেছেন যিনি বেদের বিভাগ।
(দেবব্রতের প্রবেশ ও বেদব্যাসকে প্রণাম )
তপোধন,
হেরিতেছি অদ্ভুত কুমার !
সৰ্বসুলক্ষণে বিভূষিত অঙ্গ ;-
কোন্ বংশ হইয়াছে ধন্য
ইহার জনমে ? উন্নত ললাট,
আয়ত উরস,, আজানুলম্বিত বাহু ;
হের আঁখি, জিনি ইন্দীবরদল
করে ঢল ঢল,
হের ভীমকান্ত বপুঃ মনােহর
হের মুখের ভঙ্গিমা,
বেদব্যাস।
সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা
৬।
লেখা যেন অক্ষরে অক্ষরে
মনে হয় শাপভ্রষ্ট দেবতা নিশ্চয়।
ঋষিবর, হেন শিষ্য পেলে তুমি কোথা?

২য় অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।] দেবব্রত। ৩১ বশিষ্ঠ। দেবব্রত। বশিষ্ঠ। কহিতেছি দ্বৈপায়ন কেবা এ বালক। দেবব্রত, সতীর্থের সনে কর গিয়ে পাঠাভ্যাস। যথা আজ্ঞা গুরুদেব । ( প্রস্থান) যা’ কহেছ, সত্য বেদব্যাস শাপভ্রষ্ট দেবতা বালক ; ছিল বসুদেব, মম শাপে নররূপ লভেছে ভূতলে ; জাহ্নবী জননী, কুরুরাজ শান্তনু ইহার পিতা। করিয়াছি বহু অধ্যাপন, কিন্তু এহেন মেধাবী বালক হেরি নাহি কভু; সুরগুরু বৃহস্পতি, কিম্বা শুক্র অসুর-আচাৰ্য,- বিদ্যাবুদ্ধি বলে, কোন অংশে বুন নহে তাহাদের চেয়ে। ভাবিয়াছি যাহা, অসংশয় স্থির তাই। অবধান মহর্ষিপ্রধান, ধ্যানে বসি একদিন ভাবিতেছি, জন্মিবেন কবে নারায়ণ ভূভার-হরণ-হেতু; হেরিলাম ধ্যানযােগে ভবিষ্যৎ ছবি, বেদব্যাস।

দেবব্রত।
[ ২য় অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
বশিষ্ঠ।
জামদগ্ন্য ভৃগুরাম,
নারায়ণ অংশে জনম যাহার,
যেই বীর একবিংশবার
নিঃক্ষত্রিয়া করেছে মেদিনী--
ক্ষত্রহন্তে যেই দিন হবে পরাজিত,
সেই দিন নবযুগ উদিবে ধরায়।
দেখিলাম বালকের বীরত্ব লক্ষণ ;
মনে লয় রাম-গৰ্ব খর্ব হবে
এই বীর হতে ;-নাহিক বিলম্ব আর,
পূর্ণরূপে অবতীর্ণ হবেন কেশব।
যা’ কহিলে সত্য সব ;
শুনিয়াছি অই কথা ধাতার সমীপে ;
শুনিয়াছি আরও দেব,
শান্তনুর অধস্তন তৃতীয় পুরুষ,
ভারতবংশের বীর উপলক্ষ্য করি,
স্থাপিবেন হরি
নবধৰ্ম্ম এ ভারতে ;
কিন্তু মাতা সুরধুনী কহিলেন মােরে,-
“আমার বাছনি
চিরকাল রহিবে কুমার,
করিবে না বিবাহ কখন।”
হােথা শান্তনুভূপতি
করিতেছে মহাতপ স্বর্গলাভ লাগি ;
মনে নাহি লয়,

২য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।।
দেবব্রত।
পুনরপি পরিণয় করিবে নৃপতি ;
তবে হে দ্বৈপায়ন! হে মহাতপােধন।
কুরুবংশ কিসে রক্ষা পাবে ?
নর-নারায়ণ অপূৰ্ব্ব মিলন
কেমনে হে হবে সংঘটিত ?
বেদব্যাস। হেথা জ্ঞানচক্ষু আবরিত মম।
যাই পিতা পরাশর পাশে,
সন্দেহ-ভঞ্জন যদ্যপি হে হয়।
নমস্কার দেব বেদব্যাস।
বেদব্যাস। নমস্কার ব্রাহ্মণচরণে।
( উভয়ের প্রস্থান )।
বশিষ্ঠ।
-
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,বশিষ্ঠাশ্রম সন্নিহিত কানন।
দেবব্রত, ব্রাহ্মণবালকগণ ও ক্ষত্রিয়-বালকগণ।
দেবব্রত। হের দূরে সতীর্থ-মণ্ডলি,
মনােরম মৃগ এক করিতেছে ক্রীড়া ,
গুরুর প্রসাদে করিয়াছি অস্ত্রশিক্ষা,
দিব তার আজি পরিচয়।
৩

৩৪ দেবব্রত। [ ২য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক। দেখ মাের শরের সন্ধান, করিনু প্রতিজ্ঞা, মারিব নিশ্চয় মৃগে। হের কুরঙ্গম চলিল ছুটিয়া, যাই আমি উহার উদ্দেশে। (প্রস্থান) ব্রাহ্মণ বা । ক্ষত্রিয় ব্য। ব্রাহ্মণ বা (ব্রাহ্মণ বালকগণ ও ক্ষত্রিয় বালকগণের গীত) শমদম অাচরণ করিব জ্ঞান অর্জন, আমরা যে ব্রাহ্মণ সন্তান। দুষ্টে করিব দমন, শিষ্টে করিব পালন আমরা যে ক্ষত্রিয় সন্তান। ক্ষমা বলে বলীয়া হ’ব মুনি মতিমান আমরা যে ব্রাহ্মণসন্তান। লভি শোৰ্য, লভি বীৰ্য্য, হইব জগৎ পূজ্য আমরা যে ক্ষত্রিয়সন্তান। জয় জয় বশিষ্ঠ, জগতে বরিষ্ঠ, আশীষ দেব করহ দান। ক্ষত্রিয় বা। সকলে। ১ম ক্ষত্রিয় বালক। – মৃগের পশ্চাতে দেবব্রত ছুটে গেছে বহুক্ষণ, নাহি জানি বিলম্বকারণ, চল যাই তার অন্বেষণে। (দেবব্রতের প্রবেশ) দেবব্রত। এস, এস বন্ধুগণ, দেখিবারে চাহ যদি অদ্ভুত ব্যাপার! লক্ষ্য করি কুরঙ্গমে ছুটিলাম প্রাণপণে তাহার পশ্চাতে,

১ম অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
উপনীত হনু ক্রমে ভাগিরথী-তীরে ;
অন্য দিকে নাহি হেরি পথ,
সভয়ে কুরঙ্গ জলে দিলা ঝাঁপ ;-
স্মরি মনে মনে শ্রীগুরুচরণ,
স্মরি মনে মনে জাহ্নবী মাতারে,
শােষকাস্ত্রে শুষিলাম বারি মুহূর্তেকে ;
ল’য়ে অন্য শর,
হইয়ে সত্বর, মারিয়াছি মৃগে,-
পালিয়াছি প্রতিজ্ঞা আমার।
তটিনীর গতিরােধ
দেখিবারে চাহ যদি, চল মাের সাথে।
( সকলের প্রস্থান)
( বিদূষকের প্রবেশ )
বিদূষক। বাবা, আমাদের রাজার সবই বেয়াড়া কাণ্ড ! বে ক’ব না-
বে করব না করে—কোখেকে একটা ডাইনী মাগীকে বে
করে নিয়ে এলেন। ডাইনী যদি বা রাজাকে ছাড়ল রাজা
তাকে ছাড়তে চায় না, সেই ডাইনী মাগীর দুঃখে একেবারে
বনে এসে তপস্যায় বসে গেলেন। অমন সােনার চাদ ছেলে,
তাকে সেই মাগীটার হাতে সপে দিলেন ; তবে শুছি নাকি
কুমার এক্ষণে বশিষ্ঠাশ্রমে আছে। যাই হক আগে ছেলেকে
রাজ্যে অভিষিক্ত কর, তারপর বানপ্রস্থ নাও;-যে রকম
মান্ধাতার আমল থেকে চলে আসছে সেই রকম কর, না
সনাতন পদ্ধতি একেবারে সব উল্টে দিলে। দেখি, খুঁজে

[ ২য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।
বলি।
পেতে দেখি,-একবার রাজার দেখা পেলে সব কথা বুঝিয়ে
ওঃ কি জঙ্গল, পথ পাবার যােঃ নেই।
( শান্তনুর প্রবেশ )
অদ্ভুত ঘটনা হেরিনু অদূরে,
দৃষ্টপূৰ্ব নহেক কদাপি ;-
লােকাতীত কাৰ্য্য করিল বালক।
দেখিয়াছি ক্ষত্ৰবীৰ্য্য
বহুবার জীবনে আমার,
কিন্তু হেন শিক্ষা হেরি নাহি কভু।
দেখিয়া বালকে
হ’ল মনে বাৎসল্য উদয়,
মনে হ’ল দেবব্রত আমার তনয়,-
হেরি নাই বহুদিন তারে,
যাই, পরিচয় জিজ্ঞাসি তাহার।
( সঙ্কীর্ণ বনপথ মধ্যে বিদূষকের উপর শান্তনুর পতন )
বিদূষক। কে হে মশাই আপনি! পথ দেখে চলতে পারেন না? এই
রকম করে কাটাবনে ঠেলে ফেলে দিতে হয়। দেখুন দেখি
ব্ৰহ্মরক্তপাত হল।
বয়স্য ! বয়স্য ! ক্ষমা কর।
বিদূষক। মহারাজ! মহারাজ!
(উভয়ের আলিঙ্গন)
পাইয়াছি বন্ধুদরশন ;-
নাচিতেছে পুনঃ দক্ষিণ নয়ন,

২ । অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
পুভ্রদরশন পাইব নিশ্চয়।
চল, সখা, যাই পুত্রের উদ্দেশে।
বিদূষক। মহারাজ প্রলাপ বকছেন নাকি ? এই ঘাের অরণ্য মধ্যে
ভাগ্যবশে আপনার সহিত সাক্ষাৎ হয়েছে, এখানে আপনার
পুত্র কোথায় ?
হেরহ ব্রাহ্মণ
অদূরে জাহ্নবী-তীরে।
(পট পরিবর্তন)
(গঙ্গাজল দ্বিধা বিভক্ত,—মধ্যে শরবিদ্ধ কুরঙ্গ,
তীরে দেবব্রত ও বালকগণ)
কেবা তুমি অদ্ভুত বালক ?
অলক্ষ্যে তােমার,
হেরিয়াছি তব শরের সন্ধান।
বলহ ধীমান,
কিবা তব নাম, কেবা তব পিতা ?
(জলমধ্য হইতে গঙ্গার দিব্যমূর্তির আবির্ভাব)
শান্তনু রাজন,
আপন নন্দনে নারিলে চিনিতে।
এই তব অষ্টম তনয়,
মহাভাগ দেবব্রত,
শিখিয়াছে সর্বশাস্ত্র বশিষ্ঠসকাশে।
মহাবীর তনয় আমার,
আখগুল সম বলীয়া;
;

ত
দেবব্রত
[ ২য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।
জামদগ্ন্য রাম
শিখিয়াছে ধনুর্বেদ যথা,
তথা মাের শিখেছে কুমার ;-
রাজধর্মে ক্ষত্ৰধৰ্ম্মে হয়েছে নিপুণ।
এবে পুত্র সহ যাহ রাজা
হস্তিনানগরে,
যৌবরাজ্যে অভিষেক করহ ইহারে।
দেবব্রত, যাও পিতৃসনে,
বৎস, স্মরিবে যখনই মােরে
পাবে মম দরশন।
বিদূষক। তুই ডাইনী ন’ ত’ ডাইনী কে ? বােজ হাজার হাজার মড়া
খাস, তাতেও বুঝি তাের পেট ভরে নি, তাই নিজের জ্যান্ত
ছেলেগুলাে থেলি ! মা, মা, তুই ত সকলের প্রতি করুণা-
নয়নে চাইলি, এখন অন্তে আমার হাড় ক’খানা যেন তাের
গর্ভে স্থান পায়, এই বরটা দিয়ে যা মা!
স্বধৰ্ম্ম-আচারী হে ব্রাহ্মণ !
বহুপুণ্য-ফলে, নর-কলেবরে,
পেয়েছ দর্শন মম ;
বর্ণাশ্রমধর্মে আছে তব মতি,
হিতাকাঙ্ক্ষী তুমি সতত রাজার,
অন্তে তুমি পাইবে আমায়।
( জলবালাগণের প্রবেশ ও গীত )
জয় জয় হিমগিরিনন্দিনী।
জয় ধূর্জটি-মূৰ্দ্ধজ-বিহারিণী।
.
==

২য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভা।
দেবব্রত।
রজতবরণ, কলকাষন,-
জয় কলুহম, বরাভয়করা,
জয় পতিতপাবনী ।
আনন্দদায়িনী নমাে মন্দাকিনী,
জয় ভাগিরথী সুরধুনী।
( সকলের প্রস্থান)

তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য—পরাশর মুনির আশ্রম।
পরাশর ও বেদব্যাস।
---
বেদব্যাস। পিতা, সংশয় উঠেছে চিতে ;-
শুনিলাম বশিষ্ঠের পাশে,
আজীবন দেবব্রত রহিবে কুমার !
কারে পুনঃ শান্তনু ভূপাল
ভাৰ্যারূপে করিবে গ্রহণ,
করিলে পুনঃ পুত্র উৎপাদন,
হবে ব্যর্থ বিধির বচন।
শুনিলাম, জাহ্নবী-আদেশে,
এসেছেন ফিরে রাজা হস্তিনানগরে,
কিন্তু,
নাহি হেরি হেন ভাগ্যবতী নারী-
বরিবে তাহারে, বরেছিল যারে
আপনি জাহ্নবী দেবী মুনী-বন্দিতা।
পরাশর। শুন দ্বৈপায়ন,
সৃষ্টিকর্তা ধাতা মিথ্যা নাহি কহে,
==

৩য় অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
৪১
•
চন্দ্রবংশ ধ্বংস নাহি হবে এবে ;
যার গর্ভে জনম তােমার,
তাঁর কথা ধ্যানে তব হয়নি উদয়
তব মাতা সত্যবতী,
বিধাতৃ-নির্দেশে,
হইবেন শান্তনু-ঘরণী,
নাহি আর অপর রমণী,
প্রতীপ-তনয়-প্রণয়ভাগিনী
হতে পারে যেই।
বেদব্যাস। একি লীলা, লীলাময়, তব,
বুঝিতে না পারি ; পিতা, কর আশীৰ্বাদ,
পারি যেন বর্ণিবারে
ভারতবংশের পবিত্র কাহিনী।
পরাশর। মনীষী তনয়,
মনস্কাম পূর্ণ হবে তব।
বেদব্যাস। পদাম্বুজে প্রণাম আমার।
( প্রস্থান)
।
পরাশর। যােগবলে করিয়াছি আকর্ষণ,
আসিতেছে সত্যবতী সমীপে আমার।
(সত্যবতীর প্রবেশ ) :
সত্যবতী। কেন নাথ করেছ স্মরণ,-
দাসী বলে পড়েছে কি মনে?
মনে পড়ে সেই চঁাদিনী যামিনী,

৪২
দেবব্রত।
[ অ অঙ্ক, ১ম গর্ভা।
পূর্ণ শশধর হ’তে রজতের ধারা
পড়েছিলা কালিন্দীর কাল জলে,
মিশেছিল উজ্জ্বলে সুন্দর ;-
মনে পড়ে সেই নিস্তব্ধ নিশায়
যমুনার বুকখানি ক্ষেপণি-আঘাতে
কেঁপেছিলা থরথরি
-
-তরণী উপরে
মাের ক্ষুদ্র হৃদিটুকু দুরু দুরু করি
তরঙ্গের তালে তালে উঠিল নাচিয়া ;
বুঝিনু প্রণয়ের প্রথম সন্তাষে
আনন্দ কি ভয়! তার পর কত নিশি
কাদিয়াছি শুধু সেই মিষ্ট আলাপন
শুনিব বলিয়া, কিন্তু নাথ,
পরাধীনা আমি
পরাশর। মম দোষ নাহিক, ভামিনি
তােমার লাগিয়া দাসরাজে
করিয়াছি কত অনুরােধ,
প্রত্যাখ্যান তব পিতা করিলা আমারে।
শুন সুলােচনে,-
কি কারণ করেছি স্মরণ এবে ;
উদ্ভিন্ন যৌবন পরিপূর্ণ তব,
ত্যজি মম আশ, বর অন্য বরে।
সত্যবতী। হেন কথা ঋষিরাজ ক’হনা আমারে
যদিও এদাসী ধীবরের কন্যা,
কিন্তু ধন্যা আমি, একদিন পাইয়াছি
;

৩য় অঙ্ক, ১ম গাঙ্ক।
দেবব্রত।
.
ও পদরাজীব ; ছিনু মৎস্যগন্ধা
জুগুষ্পিতকায়া, এবে পদ্মগন্ধা
ও পদ প্রসাদে ; তােমা বিনা অন্যজনে
স্বপনে কি জাগরণে ভাবি নাহি কভু ;-
যদি, প্রভু, বেসে থাক ভাল মােরে
তিলেকের তরে, হেন আজ্ঞা
ক’রনা দাসীরে।
পরাশর। সত্যবতি, কহি হিত শুনহ তােমার,-
তপের প্রভাবে মম
পুনরপি কন্যাবস্থা লভিয়াছ তুমি,
অন্যে পরিণয়ে
ধৰ্ম্মহানি হবেনা তােমার।
হস্তিনার অধীশ্বর শান্তনু রাজারে
পতিভাবে করহ গ্রহণ;
দেবাদেশে কহি তােমা,
তােমা হতে দেবকাৰ্য হবে সমাহিত।
সত্যবতী। বুঝিয়াছি নাথ,
দাসীরে পরীক্ষা হেতু কহিছ এ কথা ;-
চাহ ভুলাইতে রাজ্য-প্রলােভনে !
অধিক কি ক’ব,অজ্ঞা আমি দাস-কন্যা ;
কিন্তু করি নিবেদন,
তােমা ছাড়ি তপােধন,-
সুরাসুর গন্ধৰ্ব্ব কিন্নর,
নাহি চাহি অন্য পুরুষেরে ;

৪৪
দেবব্রত
[য় অঙ্ক, ১ম
নাহি জানি ধৰ্ম্ম কথা,
পড়ি নাই পুরাণ-কাহিনী,
তবে সার জানি,
পতিমাত্ৰ গতি অবলার ;-
ঠেলিওনা মুনিবর দাসীরে শ্রীপদে।
দরিদ্রের কন্যা আমি
নাহি চাহি রাজ্য-সুখ ;-
তােমার আশ্রমে
স্বর্গ-মুখ লভিব মহর্ষি ।
তব ইষ্ট পূজা লাগি বনে বনে ভ্রমি
আহরিব কুসুম-নিচয়,
পুষ্পধারে থরে থরে রাখিব যতনে।
তব উপদেশে,
নারীধৰ্ম্ম শিখিব বিশেষে।
এর চেয়ে,
রাজরাণী হয়ে কি সুখ লভিব?
পরাশর। ধৈৰ্য্য ধর ব্যাসের জননি
দেবকাৰ্য
হেতু
করেছিনু অনুরােধ,
যথা ইচ্ছা করগাে কল্যাণি।
সত্যবতী। নারি রাখিতে এবে তব উপবােধ।
(প্রস্থান)
পরাশর। না বুঝিয়া মনােব্যথা দিলাম সতীরে।
( প্রস্থান)

৩য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
৪৫
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-রাজসভা।
ক
;-
শান্তনু, বিদূষক, মন্ত্রী, কঞ্চুকী প্রভৃতি।
বিদূষক। মহারাজ, আপনি ত’ অনেক দিন রাজত্ব করলেন
কেন ভূতের বােঝা ঘাড়ে করে বেড়ান, কুমার দেবব্রতকে
এখন যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করে দিন কতক হাঁপ ছেড়ে
বাঁচুন।
সত্যই, বয়স্ক, করিয়াছি স্থির,
শুভদিন দেখি দেবব্রতে যৌবরাজ্যে
করি অভিষেক, লভিব বিশ্রাম আমি।
পৌরজানপদগণ পুত্ৰ গুণ-গ্রামে
সকলি মােহিত ;-
ওহে অমাত্য-প্রধান,
অভিষেক-আয়ােজন করহ সত্বর।
যথা আজ্ঞা, মহারাজ।
( প্রস্থান)
কথুকী কোথায় ?
আন পুত্রে সমাঝে।
( কথুকীর প্রদান।
শান্তনু।
দেবের প্রসাদে লভিয়াছি দেবব্রতে,
বড় ভাগ্য মম ;-হে ব্রাহ্মণ,
যাহ তুমি বশিষ্ঠ সমীপে,--
মন্ত্রী।

দেবব্রত।
[ ৩য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
বন্দি চরণারবিন্দ তার,
জানাবে বারতা,
সশিষ্য মহর্ষি যেন আসেন হস্তিনা।
বিদূষক। মহারাজ, আবার এই বুড়াে বামুনকে জঙ্গলের মধ্যে পাঠাচ্ছেন।
যাই, একবার গিয়ে মার দেখা পেয়েছি, এবার মার দিব্যমূর্তি
দেখতে না পাই, মার শীতল জলে ডুব দিলেও সব জ্বালা
জুড়িয়ে যাবে।
(প্রস্থান)
(দেবব্রতের প্রবেশ।)
দেবব্রত। পিতৃপদে প্রণাম আমার।
শান্তনু। হও চির-আয়ুষ্মন্,
অগ্রগণ্য বীর বলি বীরেন্দ্রসমাজে
হও চির-বরণীয়।
হে গাঙ্গেয়, উপযুক্ত পুত্র তুমি মম,
রাজনীতি, ধৰ্ম্মনীতি, অর্থনীতি,
সৰ্ব্বশাস্ত্রে বিশারদ তুমি ;
তাই করিয়াছি অভিলাষ,
যৌবরাজ্যে অভিষেক করিব তােমায়,
পুত্রসম পালিবে প্রজায়,
জ্ঞানবৃদ্ধ তুমি,কি আর কহিব তােমা।
দেবব্রত। পিতা, তব আজ্ঞা বেদ সম গণি
যথাশক্তি কর্তব্য আমার
করিব পালন, তব প্রতিনিধিরূপে।
যেই শিক্ষা এত দিন লভিয়াছি, দেব,

৩য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
৪৭
মন্ত্রী।
কার্যে তাহা দেখাব এবার,-
ভ্রম যদি দেখহ আমার,
নিজগুণে করিও মার্জনা।
পরিতুষ্ট বচনে তােমার।
( মন্ত্রীর প্রবেশ ।)
কহিলেন পুরােহিত,
কালি প্রাতে অত শুভক্ষণ,
অভিষেক-আয়ােজন এখনি করিতে।
মন্ত্রিবর, হও হে তৎপর,
চল যাই করি আয়ােজন।
(দেবব্ৰত ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
দেবব্রত। নিতে হবে গুরুভার,-
কোথ৷ মা জাহ্নবি,
বল দাও তনয়ে তােমার।
(প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-অভিষেক-মণ্ডপ।
দেবব্রত ও মাঙ্গলিক দ্রব্যাদি হস্তে পুরনারীগণ।
(পুরনারীগণের গীত।)
তােমার কুমার
শিরেতে, জননি,
ঢালিগো তােমার বারি।
শুভ অভিষেকে
আশীষ কর মা,
সব নিবারি।

৪৮ দেবব্রত। [ ৩য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক। - অত মঙ্গল, ধান্যদুৰ্বাদল, দেবী-অর্ঘ্য ধর শিরে। সতত বিজয়, সতত অভয়,- দেহি অভয়া কুমারে। (পুরনারীগণের প্রস্থান।) ( বশিষ্ঠের প্রবেশ।) বশিষ্ঠ। দেবব্রত, যৌববাজ্যে তােমা অভিষিক্ত হেরি আজি, কি আনন্দ অন্তরে আমার বর্ণিতে না পারি ! করি আশীৰ্বাদ, কর সুখে ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য পালন। করেছি মানস, অদ্যই হস্তিনা ছাড়ি করিব প্রস্থান। দেবব্রত। গুরুদেব, করি আকিঞ্চন, কিছু দিন আর থাকি হস্তিনানগরে তত্ত্ব-উপদেশ কর মােরে দান, যাহে অন্তে পাই হে নিৰ্বাণ, চিরশান্তি জীবাত্মার। বশিষ্ঠ। বৎস, যুবরাজ তুমি এবে, পিতা তব এখনও জীবিত, তাহার আদেশ পালিবে যতনে, শ্রেয়ােলাভ হইবে তােমার ;- কায়মনােবাক্যে শান্তনুকুমার পিতৃসেবা করিবে সতত।

৩য় অ, ৩য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
৪১
আধ্যাত্মিক তত্ত্ব শিখিবার
আছে হে সময়,–এবে কর তার পুজা,
প্রত্যক্ষ দেবতা যিনি।
“পিতা স্বর্গ পিতা ধর্মঃ পিতা হি পরমন্তপঃ।
পিতরি প্রতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।”
ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র,
পিতৃসত্যরক্ষাহেতু, রাজ্য ত্যজি
দ্বাদশ বৎসর করিল অরণ্যবাস,
হইল ভুবনপূজ্য স্বার্থ তেয়াগিয়া।
দাশরথি রাম,
ভক্তিতে আদর্শ যেন হয় গাে তােমার।
দেবব্রত। শুনি, গুরুদেব, লােকশিক্ষা হেতু
রামরূপ ধরিলা শ্রীহরি ;-
কিবা ভাগ্য করিয়াছি আমি,
পিতৃভক্তি-পরিচয় দিব সেইরূপ।
বশিষ্ঠ।
নহ তুমি সামান্য মানব,
দেব-অংশে জনম তােমার,
ত্রেতাযুগে ঘটেছিল যাহা,
ততােহধিক ঘটিবে দ্বাপরে,-
কীৰ্ত্তিমা হবে মতিমান্ !
যাই আমি আশ্রমে আমার।
( প্রস্থান)
দেবব্রত। কিছু না বুঝিতে পারি,
কেবা ছিনু আমি,
.
৪

৫০
দেবব্রত।
[ ৩য় অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
মাতা সুরেশ্বরী
গর্ভে মােরে দেছে কেন স্থান।
কি কায ভাবিয়া ?
আছে বহু কৰ্ত্তব্য আমার,
যাই রাজকার্যে করি মনােযােগ।
( প্রস্থান)
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,যমুনানদীর তীর।
সত্যবতী ও ধীবর-কন্যাগণ।
( ধীবর-কন্যাগণের গীত।)
মারে ঘাই মস্ত রুই, জাল ছিড়ে না পালিয়ে যায়।
চুনাে পুটী নয়কো এটি, ডাঙ্গায় তােলা বিষম দায়।
শক্ত সুতােয় জাল বুনেছি,
তাইত এই রুই ধরেছি,
হ'লে পরে অপর জাল,
কতই হত সে জঞ্জাল,
করতে হত সামাল সামাল, অবশেষে হায় হায়।
১মা ধী। কি গাে দাসরাজ-কন্যে, অমন করে চুপটি করে দাড়িয়ে
কেন?

৩য় অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাস্ক।]
দেবব্রত।
২য়া ধী। ওগাে বড়মানুষের মেয়ে, কথা কওনা কেন? তােমার বাবা
ত’ মিনি শুল্কে যমুনায় পারাপার করে আমাদের খেয়ার
সর্বনাশ করলে। বলি আজ একবার ডিঙ্গিতে চড়িয়ে
আমাদের একটু যমুনার হাওয়া খাইয়ে নিয়ে এস।
সত্যবতী। আমার মনটা আজ বড়ই খারাপ আছে ; আর একদিন
তােমাদের নৌকা করে বেড়িয়ে নিয়ে আসব।
৩য় ধী। ওলল শশান্ শশা,-সত্যবতীর মন খারাপ কেন জানি ?
হাজার হক ত’ সােমত্ত মেয়ে,-বাপ, মা কি চোখের মাথা
খেয়ে বসে আছে ; চির কালটা আইবুড়ী থুবড়ী করে
রাখবে!
সত্যবতী। তােমরা অযথা আমার পিতামাতার নিন্দা করছ কেন? তারা
ত’ আমার জন্য কত সম্বন্ধ স্থির করেছিলেন, কেবল আমিই
সম্মতি দিই নি বলে হয় নি।
২য়া ধী। ওলাে ও বিলি, কেন বে করূতে রাজি নয় জানি? সেই
যে জটাজুট মাথায় ঋষিমশাই বর দিয়ে ওর গায়ের অসটে
গন্ধ ঘুচিয়ে দিয়ে গিছল, (মৃদুস্বরে) কানাঘুষােয় শুনছি সত্যি
নাকি তার জন্যে একেবারে পাগল হয়েছে।
১মা ধী। না ভাই, আমি চলুম-সেই মুনি ঠাকুরকে দিয়ে যদি আমা-
দের শাপ দেওয়ায়,—আজকাল তাকে এই পথে প্রায় যেতে
আস্তে দেখি।
৩য়া ধী। চ‘চ’ পালাই চ’! ঐ বুঝি এল রে।
(সত্যবর্তী ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
সত্যবতী। বাম অঙ্গ মম
কাপে ঘন ঘন,-

দেবব্রত।
[ ৩য় অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভা।
সুলক্ষণ বলে সর্বজন
কিছু না বুঝিতে পারি,
কেন সেই ঋষিশ্রেষ্ঠ দেব পরাশর
হেন আজ্ঞা দিলেন দাসীরে
নাহি জানি কি দোষ করিয়াছি আমি
পদে তাহার --হ’য়ে মম পতি
অনায়াসে কহিলেন বরিতে অন্যেরে ।
যাঁর করে সপেছি নবীন যৌবন,-
যারে মম ইষ্টদেব জানি অহরহ,-
ভুলিতে হইবে তারে ?
তাঁহার আদেশ
করি নাই জীবনে লঙ্ঘন ;-
দাসী বলে ক্ষমা কর নাথ,
যদি হই অবাধ্য তােমার ;
কেমনে কহিলে,
ধৰ্ম্মে নাহি হব গাে পতিত।
শুনিয়াছি সাবিত্রী-চরিত,
সত্যবানে মনে মনে বরেছিলা বলি
অবহেলি পিত্ৰাদেশ,
হ’ল তার ধর্মপত্নী,--
ধৰ্ম্মরাজে ধর্মশিক্ষা দিল সেই সতী।
আর পরাশর,
তব পুত্ৰ ধরি জঠরে,
তুমি কিনা কহ এবে,

৩য় অঙ্ক, ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
দেবব্রত।
ধর্মভ্রষ্ট হ’ব না কখন
হই যদি শান্তনুঘরণী।
শুনিলে তব কথা কষ্ট হবে তুমি ?
কর রােষ, দেহ অভিশাপ,
তবু হে মহর্ষি,
কখন এ দাসী
তােমা ভুলে রবে না এ ভবে। (প্রস্থান)
(শান্তনু ও বিদূষকের প্রবেশ।)
শান্তনু। কোথা হতে আসে সখা অপূর্ব সৌরভ।
মৃদুল বাতাস, ছড়ায় সুবাস,
জ্ঞান হয় শত পারিজাত
ফুটিয়াছে কোথা, মর্ত্যে যাহা অসম্ভব।
বুঝি কোন দেববালা
নন্দন হইতে আনি মারের দল
যমুনার নীরে করিয়াছে জলখেলা ;
সৌরভে আবেশ প্রাণ,
চল সখা করিগে সন্ধান,
কোথা হতে হেন গন্ধ পশিছে নাসায়।
বিদূষক। মহারাজ যা বলছেন তা ঠিক বটে। আমরা বানের ছেলে,
বনে বনে ফুল তুলতে এসে কত রকমের আম্রাণ পেয়েছি,
কিন্তু এমন মনমাতানাে গন্ধ ত’ কখনও শুকিনি, আঃ--
আঃ-প্রাণটা যেন ত হয়ে উঠছে। আমার বােধ হয়
কোন অপদেবতা টপদেবতা। এই স্থান দিয়ে গেছেন, তার
পেছু নিয়ে আমাদের আর লাভ কি হবে ?
-

৫
দেবব্রত।
[ ৩য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।
শান্তনু। কিবা ভয়, ব্রাহ্মণ, তােমার ?
ভুলেছ কি গায়ত্রী মাতারে ?
কর তাঁর জপ, ভূত প্রেত ৰাবে দূরে ;
মম করে আছে হে কামুক,
কোন্ ভয়ে হইব বিমুখ ?
চল, সখা, যাই অন্বেষণে।
বিদূষক। মহারাজ, গায়ত্রীর উপর আমার যতটা বিশ্বাস থাকুক বা না
থাকুক, আপনার বাহুবল আর ধনুর্বাণের উপর আমার যথেষ্ট
বিশ্বাস আছে। আপনি যদি অভয় দেন, তাহলে যমের মুখেও
ছুটে যেতে পারি।
( উভয়ের প্রস্থান।)
পঞ্চম
গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য—দাসরাজের
দাসরাজ।
দাসরাজ। তাই ত’ করি কি ? মেয়েটা ত’ আর কাকেও বিয়ে ক’রুতে
চায় না। সেই বিটলে ঋষিটা একে কি গুণ করে গেল গা।
আমি সাত পৃথিবী ঘুরে ঘুরে এমন কার্তিকের মত সােণার
চাদ রাজপুত্তরদের সঙ্গে সম্বন্ধ নিয়ে এলুম, মেয়েটার তাতে
পছন্দ হ’ল না। কি করব, মেয়েটার বরাৎ মন্দ,—যাই

৩য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
হক শীগগির একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে;-( দ্বারে
করাঘাত) কে অঃ ? বলি দরজা ঠেলে কে? এত রাত্তিরে
কিসের দরকার হে বাপু? কে নিধিরাম না কি ?
(নেপথ্যে) না, আমি।
দাসরাজ। আরে “আমি” বলে, চিব কি করে ? তুমি কে তাই
জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।
( নেপথ্যে) আমি হস্তিনাধিপতি শান্তনু।
দাসরাজ। আঁা, করিছি কি ?
( দ্বারােদঘাটন ও শান্তনুর প্রবেশ।)
মহারাজ, মহারাজ, ক্ষমা করবেন। আমি না জেনে
আপনার উচিত অভ্যর্থনা করতে পারিনি। আজ দাসের
কুটীর পবিত্র হ’ল—বংশ পবিত্র হ’ল। মহারাজ, এরূপ
অসময়ে একাকী এখানে আবার কারণ ব’তে আপনার
যদি কোন বাধা না থাকে, অনুগ্রহ করে আমায় বলুন ;-
আমার কিম্বা আমার স্বজাতীয় কাহারও দ্বারা যদি মহারাজের
বিন্দুমাত্র উপকার হয়, তাহলে কৃতার্থ হ’ব।
শান্তনু।
দাসরাজ, তােমার সৌজন্যে আমি যথেষ্ট প্রীত হয়েছি।
এক্ষণে কোন অপার্থিব সামগ্রীর আকাঙ্ক্ষায় তােমার নিকট
এসেছি,—সেই মহাৰ্হ রত্ন আমাকে দান করে আমার বাসনা
পূর্ণ কর।
দাসরাজ। মহারাজ, আপনি কি বলছেন, কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমার এমন কি সামগ্রী আছে, যাতে মহারাজের মনােরঞ্জন
হতে পারে ?

দেবব্রত।
[ ৩য় অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।
G
অদ্য সন্ধ্যাকালে কালিন্দীকূলবর্তী অরণ্যমধ্যে ভ্রমণ করতে
করতে কি এক স্বর্গীয় সৌরভে আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয় অবশ
হয়ে উঠল ; সেই মধুর সুগন্ধের কারণ অন্বেষণ ক’তে
ক’তে সহসা এক নীলনলিনয়না দেববালাসদৃশী রমণী
আমার নয়নপথে পতিত হ’ল। দাসরাজ, ব’ব কি, যখন
বুঝলেম, সেই অনবদ্যাঙ্গী তরুণীর দিব্যকলেবর হ’তে সেই
সুচারু সৌরভের উদ্ভব হচ্ছে, তখন আমি আত্মহারা হয়ে
তাকে পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেম। দাসরাজ, সেই রমণী
তােমার দুহিতা ও অদ্যাবধি অনূঢ়া ; এখন সেই অমূল্য রত্ন
রাজকরে সমর্পণ করে নিজেও ধন্য হও, আর আমাকেও ধন্য
;
দাসরাজ। রাজ, আমি কন্যার পিতা ;-যাহাতে কন্যা সৎপাত্রে প্রদত্ত
হয়, পিতার তাহা প্রধান কর্তব্য। আপনার ন্যায় গুণবান্,
জ্ঞানবান্, ঐশ্বৰ্য্যশালী নরপতি যদি এই কন্যাকে ধর্মপত্নীরূপে
গ্রহণ করেন, ইহা অপেক্ষা সুখের বিষয় আর কি আছে ?
কিন্তু আমার একটি সামান্য অভিলাষ আছে, মহারাজ ইচ্ছা
করলেই তাহা পূর্ণ ক’তে পারেন। যদি আপনি আমার
সেই বাসনাটুকু পূর্ণ করূতে সম্মত হন, তাহলে সত্যবতীকে
অবিলম্বে আপনাকে সম্প্রদান করছি।
শান্তনু। ধীবরশ্রেষ্ঠ, তােমার বাসনার বিষয় অগ্রে আমাকে জ্ঞাপন
কর,-সে বিষয় না শ্রবণ করেই তােমার অভিলাষ পূর্ণ
কব, এরূপ অঙ্গীকার আমি কিরূপে করতে পারি ?
দাসরাজ। নরনাথ, আপনার ঔরসে এই কন্যার গর্ভে যে পুত্র জন্মগ্রহণ
কবে, আপনার রাজ্যত্যাগের পর সেই পুত্রই যেন ভবিষ্যতে

৩র অঙ্ক, ৫ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
শান্তনু।
হস্তিনার সিংহাসনে আরােহণ করে, ইহাই আমার একমাত্র
প্রার্থনা।
দাসরাজ, তােমার এ অন্যায় প্রার্থনা ; কারণ আমার পুত্র
দেবব্রত এক্ষণে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত ;-সনাতন রাজধৰ্ম্মানু-
সারে সেই পুত্ৰই ভবিষ্যতে রাজ্যের একমাত্র অধিকারী
অতএব কি করে আমি তােমার কথায় সম্মত হতে পারি।
যদিও আমি সত্যবতীর পাণিগ্রহণ-লালসায় তােমার দ্বারস্থ
হয়েছি, তথাপি আমি সেই সৰ্বগুণসম্পন্ন পুত্রকে তার
ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত ক’তে পারি না। ধীবর, আমি
তােমার বাসনা পূর্ণ ক’তে সম্পূর্ণ অক্ষম,আমি চল্লেম।
( উভয়ের ভিন্ন দিকে প্রস্থান)

চতুর্থ অঙ্ক।
-:-
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,-রাজবাটীর কক্ষ।
শান্তনু ও বিদূষক।
বিদূষক। মহারাজ, রাগই করুন, আর যাই করুন, একটা কথা আজ
আপনার মুখের ওপর ব’ব। এই যারা প্রথম বয়সে বে
করব না, বে ক’ব না করে, শেষ বয়সে তারাই আবার
মেয়েমানুষ দেখলে হামলে পড়ে। তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে স্বয়ং
আপনি। আপনি দেবানুগৃহীত নরপতি,-সাক্ষাৎ সুরধুনীকে
পত্নীরূপে পেয়েছিলেন, এখন একটা মেছের মেয়েকে দেখে
ভুলতে পারূছেন না। কুমার দেবব্রতকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত
করেছেন ; কোথায় দেখে শুনে তার একটা বিবাহ দেবেন,
নিজেই এই বুড়ােবয়সে মেয়েমানুষের জন্য পাগল।
শান্তনু। সত্যই উন্মত্ত আমি ;
কত করে বুঝাই মনে,
পােড়া মন না মানে প্রবােধ
থেকে থেকে মনে পড়ে,
সরলতা-মাখা সেই মােহিনী প্রতিমা,--
মনে পড়ে,

৪র্থ অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
সেই ইন্দীবর-নিন্দি লােচন-যুগল !
যেন থেকে থেকে,
ভেসে আসে দূর সমীরণ ভরে
অঙ্গের সৌরভ, শুধু পুত্ৰমুখ চেয়ে
দাসরাজ-অনুরােধ নারি রাখিতে।
বিদূষক। মহারাজ, আপনি কল্পনার রাজ্যে কবিত্বের সিংহাসনে বসে
আরাম করতে থাকুন, আমি এখন এখান থেকে সরে
পড়ি।
(প্রস্থান)
শান্তনু। যবে ত্যজিয়া আমায়,
সুরেশ্বরী চলিলেন আপন আবাসে,
কহিলেন, “পুনঃ তুমি করিবে বিবাহ।”
আজ মনে পড়ে সেই বাণী—-
নিশ্চয় অদৃষ্টে আছে দ্বিতীয় বণিতা,
নহে হেন কথা
কেন দেবী কহিবেন মােরে ?
যাই, কহি গিয়া দাসরাজে,
“অভিলাষ তব করিব পূরণ,
কর সমর্পণ
সুন্দরী যােজনগন্ধা তােমার তনয়া।”
মনে লয়,
কভু নীচকূলে জন্ম তার নয় ;
মীনগর্ভ হতে পেয়েছে ধীবর তারে,
অদ্ভুত রহস্য!
যদিও নীচের কন্যা হয় সে ললনা,

দেবব্রত।
[ ৪র্থ অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।
হীন-বর্ণ রমণীর সনে পরিণয়ে
ক্ষত্ৰ-ধৰ্ম্মে হানি নাহি হবে,
কে কোথায় কবে, রত্নে অবহেলে,
পাংশু-আচ্ছাদনে রহে যদি তাহা।
এক বাধা দেবব্রত,
বুঝাব কুমারে-
পুত্র মম পিতৃভক্ত অতি।
( বিদূষকের পুনঃপ্রবেশ)
বিদূষক। মহারাজ, এখনও কল্পনার নেশায় বোঁ হয়ে রয়েছেন।
মনে করেছিলেম, আপনার সুখে বাধা দেব না। কিন্তু
মহারাজ, দু’পা না যেতে যেতেই আপনার মুখখানা মনে
পড়ে গেল,-আপনার হাহুতাশ-—দীর্ঘশ্বাস আমার বুকের
রক্ত অবধি শুকিয়ে দিতে লাগল ; তাই আবার আপনার
কাছে ছুটে এসেছি,যদি অপরাধ করে থাকি, মহারাজ
তার মাপ করবেন।
( দেবব্রতের প্রবেশ )
দেবব্রত। চিন্তাকুল কেন তােমা হেরি হে রাজন,
পুত্র বলি স্নেহ-সম্ভাষণ
কিহেতু ক’র না আর পিতা ?
কহ মােরে কিবা মনোব্যথা,
যথাসাধ্য করিব লাঘব।
রাজ্যমধ্যে নাহি অকুশল ;-
সামন্তভূপতি যত

৪র্থ অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।]
মহারাজে করদান করিছে সকলে;
প্রজাবৃন্দ মহানন্দে যাপিতেছে কাল ;-
-
কিন্তু হে ভূপাল,
হেরি তব ভাব ব্যথিত হৃদয় মম।
পাণ্ডুবর্ণ গণ্ডদেশ,-মলিন বদন,
নয়নে কালিমা মাখা;-
কৃশ হতে কৃশতর কলেবর ক্রমে।
নাহি আর পূর্বের উদ্যম,
অশ্বপৃষ্ঠে পৰ্যটনে ছিল কত সাধ,
এবে কোন সাধ নাহিক তােমার।
ব্যাধিক্লিষ্ট হও হে যদ্যপি,
আছে বহুরাজবৈদ্য, -করিলে আদেশ
প্রতীকার তারা করিবে এখনি।
শান্তনু। উৎকণ্ঠা কিহেতু মম শুনহ তনয়,
কুরুবংশে একমাত্র বংশধর
তুমি দেবব্রত ;-
ভেবে দেখ এ সংসারে সকলি নশ্বর ;
তব অমঙ্গল ঘটে যদি কোন,
এ ভরতকুল হইবে নিৰ্ম্মল।
কিন্তু জানি আমি,
তােমা হেন পুত্রলাভ
শত পুত্র চেয়ে ভাল ;
শত শত তারা যে তিমির
নাশিতে না পারে,
==

দেবব্রত।
[ ৪র্থ অঙ্ক, ১ম গাঙ্ক।
।
একমাত্র শশধর করে তাহা দূর।
তাই বৃথা পুনঃ দার-পরিগ্রহে
নাহি সরে মন আর ;
কিন্তু কহেছেন ধৰ্ম্মবাদিগণ,
এক পুত্র যার,
অপুত্রক মধ্যে গণ্য সেই পিতা।
তব অকল্যাণ-শান্তি যাহে হয়,
করিতেছি কত হেন স্বস্ত্যয়ন ;
কিসে তুমি দীর্ঘজীবী হবে,
কিসে মম বংশরক্ষা হবে,
ভাবিতেছি দিবানিশি।
মম রােগ চিন্তার বিকার,
কিসে তার হবে প্রতীকার,
বুঝিতে না পারি ।
বিদূষক। যুবরাজ, দেখছ কি,-মহারাজের ভীমরতি হয়েছে । উনি
কল্পিত বিপদের অনুধ্যানে একেবারে আকুল হয়ে পড়েছেন।
যাই হক, তুমি মন্ত্রী মশায়ের সহিত পরামর্শ করে একটা
বিহিত ব্যবস্থা করগে।
দেবব্রত। দ্বিজবর, যাই আমি অমাত্য-সমীপে ;-
জানি না কেমনে,
জনকের অশান্ত পরাণে
শান্তি দিব পুনরায়।
( প্রস্থান)
বিদূষক। মহারাজকে আগে বেশ সরল, স্পষ্টবক্তা লােক বলে আমার
ধারণা ছিল; কিন্তু এখন দেখছি, আপনার মনের কাছে

৪র্থ অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
জিলিপির প্যাচ কোথায় লাগে। স্পষ্ট করে বল্লেই হত,
মদনঠাকুরের বাণের ঘায় শরীর জরজর হয়েছে।
শান্তনু। হে ব্রাহ্মণ,
মােরে আর দিও না ধিক্কার।
ভালমন্দ বিচারিতে অক্ষম এক্ষণে।
( প্রস্থান )
বিদূষক। যাই, দেখি গিয়ে কোথাকার জল কোথায় মরে।
(প্রস্থান
দ্বিতীয়
গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,-প্রান্তর।
বেদব্যাস।
বেদব্যাস। বিধিবাক্য হইবে অসত্য,
অসম্ভব! অসম্ভব!
চারি বেদ যাহার নিশ্বাস,
তাহার রসনা মিথ্যা কভু নাহি ভাষে ।
দাসরাজে কুরুরাজ কতই যাচিলা,
মাতা সত্যবতী হেতু।
কিন্তু কেন সে ধীবর
হ’ল অন্যমত, বুঝিতে না পারি।

দেবব্রত।
[ ৪র্থ অঙ্ক, ২য় গর্ভা।
যেই সূত্র
।
হেথা জননী আমার
নাহি পারে ভুলিবারে পিতার প্রণয়।
কেমনে ঘটিবে তবে এই পরিণয়,
উপলক্ষ্য করি,
পরের মহাধৰ্ম্ম হবে প্রচারিত।
( প্রস্থান)
(সত্যবতীর প্রবেশ)
সত্যবতী। ওই মম যাইছে তনয় ;
পতিপুত্র মম রয়েছে জীবিত,
পতি মম পরাশর পরম মনীষী,
পুত্র মম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন,
আমা সম ভাগ্যবতী কেবা ?
কিন্তু, যে অবধি শুনিয়াছি,
নাথের সমীপে নিদারুণ বাণী,
প্রাণ মম হয়েছে আকুল।
সকলের অলক্ষ্যে থাকিয়া,
শুনিলাম কিবা কথা কহে রাজা
পিতৃ-সন্নিধানে ;
ধন্য তুমি শান্তনু নৃপতি।
ভুল নাহি কৰ্তব্য তােমার,
রমণীর প্রলােভনে।
(গঙ্গার প্রবেশ)
কে তুমি গাে, মহাদেবি, সম্মুখে আমার?
আলােকিত দশদিশি রূপের প্রভায়,
==

৪র্থ অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
নখের ছটায়, শশী লাজ পায়,
করুণার ধারা যেন বহিছে নয়নে।
যে হও, সে হও, মাতা,
প্রণিপাত চরণে তােমার !
গঙ্গা। করি আশীৰ্বাদ,
শান্তনুর পত্নী যেন হও, বরাননে!
সত্যবতী। নহে আশীৰ্বাদ,অভিশাপ তব !
তুমি দেবতা নিশ্চয়,
বুঝিতেছ মনােভাব মম ;
নাহি জানি পূর্বজন্মে করিয়াছি
কত পাপ, হেন শাপ
তাই দিতেছ, জননি!
ভেবেছিনু, পুত্ৰমুখ চাহি,
শান্তনু নৃপতি ভুলিয়াছে মােরে।
কাপুরুষ রাজা, কামের পীড়নে,
করিয়াছে বুঝি মতান্তর,
পিতা হয়ে করিছে কামনা
সন্তানের অকল্যাণ !
গঙ্গা।
আমিও কি মাগিতেছি পুত্র-অকল্যাণ ?
শুন লাে কল্যাণি,
সেই পুত্র মম গর্ভজাত,
গঙ্গা মােরে কহে সবে,
গঙ্গাধর-শিরে মাের স্থান ;
শাপভ্রষ্ট অষ্টবসু উদ্ধারের তরে
=
=

দেবব্রত।
[ ৪র্থ অঙ্ক, ২য় গর্ভাব্দ।
ক
হয়েছিনু শান্তনু-মহিষী আমি
আর তুমি,তব ইষ্টদেব
পরাশর করিল আদেশ,-
পতি-আজ্ঞা ঠেলিবারে চাহ।
মাের কথা ধর,
শান্তনুরে বর,
তােমা হতে দেবকাৰ্য্য হবে সমাহিত।
সত্যবতি, জীবন তােমার
উৎসর্গ করিও পরার্থের হেতু,-
মহাস্বার্থলাভ হবে তাহে ;
পরহিতে আত্মহিত দিবে জলাঞ্জলি,
চাহ যদি আত্মার কল্যাণ
সত্যবতী। ত্রিলােকতারিণি জননি আমার,
তনয়ারে কর গাে মার্জনা !
তব বাক্যে অজ্ঞান-আঁধার
বিদূরিত এবে মম।
জীবের দুরিত দূরিতে বলিয়া,
ব্ৰহ্ম-কমণ্ডলু ত্যজি,
প্রবাহিত ধরিত্রীতে শতমুখে মাতা।
কিন্তু, দেবি, বুঝিতে নারিনু,
ঘৃণ্যা দাসকন্যা আমি,
কেন আমি দেবকাৰ্যে হ’ব নিয়ােজিত।
গঙ্গা। দাসরাজ পালক জনক তব ;
চেদীশ্বর বসুরাজ,
-
-

৪র্থ অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক। ]
দেবব্রত।
দেবরাজ প্রীত যাঁর প্রতি,
তব জন্মদাতা পিতা।
শাপভ্ৰষ্টা অপ্সরা অদ্রিকা
মীনরূপে ধরেছিল জঠরে তােমায়,
মীনগন্ধা তাই ছিলে, সত্যবতি।
এবে তুমি ভগিনী সমান,
করি আশীৰ্বাদ,
সুখে থাক পতির সােহাগে।
সত্যবতী। নারী-জন্ম ধন্য মম আজ!
( উভয়ের ভিন্নদিকে প্রস্থান)।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,
-অলিন্দ।
বৈতালিকগণ।
গীত।
জয় শান্তনু-ভূপ শান্তনু !
তনুজ তব মহাগুণযুত,
দেবব্রত দেবসম পূজিত,
জয় মহারাজ ! জয় যুবরাজ !
হের পূরৰগগণ উদ্ভাসিত অরুণ-কিরণে,
মঙ্গল-গীতি গাহিছে বিহগ সুমধুর তানে,
মুখরিত আশ্রম সামগানে ;--
অলস-শয়নে কেন অচেতন,
প্রজার রঞ্জন কর হে প্রভু!
(প্রস্থান)

দেবব্রত।
[ ৪র্থ অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।
দেবব্রতের প্রবেশ)
দেবব্রত। সকল-আশ্রম-সার গাহস্থ্য আশ্রম,
কহেছেন মনু ;কিন্তু গৃহস্থের
কিবা সুখ বুঝিতে না পারি !
ছিনু যবে গুরুগেহে হয়ে ব্রহ্মচারী,
মনে হয় সেই শাস্তি
নাহি কভু দ্বিতীয় আশ্রমে।
কেন পিতা ম্রিয়মাণ হেন,
কেম মম অমঙ্গল করেন আশঙ্কা,
কালি রাতে এ চিন্তায় নিদ্রা নাহি হ’ল
তাবেশে—যা শেষে
হেরিনু স্বপন,
যেন কেন ঘাের আবর্তন
হবে মম অদৃষ্ট-চক্রের।
কালি পিতা বুঝালেন যবে নিজ
কুচিন্তা-কারণ, মনে হল,
মনােভাব কিছু করিলা গােপন।
আসিছেন অমাত্য-প্রধান,
তার সহ করিয়া মন্ত্রণা,
করি যাহা উচিত ব্যবস্থা।
(মন্ত্রীর প্রবেশ)
মন্ত্রী। যুবরাজ, রাজকাৰ্য্য-আলোচনাকাল
হ’তেছে অতীত,বুঝি তব
অসুস্থ শরীর, ম্লান মুখ হেরি তাই।

৪র্থ অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
দেবব্রত। মন্ত্রিবর, মাের তরে নহে এ বিষাদ,-
জনকের হেরি অবসাদ,
দুশ্চিন্তার হেতু তাঁর নিণিতে না পারি,
নিরন্তর এ অন্তর হতেছে অশান্ত।
বল মােরে, জান যদি তুমি,
কেন রাজা বিষন্ন-বদন।
মন্ত্রী।
-
।
গঙ্গার নন্দন,
বিষাদ-কারণ আমি অবগত ;
বলিয়া তােমায়,
শ্রেয়ােলাভ হবেনা জানিয়া
বলি নাই এতদিন।
তবে যদি শুনিতে বাসনা,
শুন মন দিয়া,
যমুনার তীরে বাস করে দাসরাজ,-
কন্যা সত্যবতী তার,
রূপবতী গুণবতী অতি ;
নেহারি তাহারে পিতা তব,
মদনপীড়ায় উন্মত্তের প্রায় ;
অন্য ব্যাধি নাহি কিছু আর।
দেবব্রত। বুঝিলাম এতক্ষণে ;-
ধীবর কিনহে হে সম্মত
রাজ-করে দুহিতৃ-অর্পণে?
মন্ত্রী। সে বিষয় অবিদিত আমি।
উপযুক্ত পুত্র তুমি,

দেবব্রত।
[ ৪র্থ অঙ্ক, ৩য় গর্ভা।
s
*
তব বিবাহের কাল উপনীত এবে,-
বুঝি তাই লােক-লজ্জা-ভয়ে
মহারাজ বিমুখ বিবাহে
অন্য কোন নিগূঢ় কারণ
আছে কিনা নাহি জানি ;-
পুত্র তুমি,
এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ কেমনে করিবে ?
দেবব্রত। যাও তুমি সভামাঝে,
যেতেছি পশ্চাৎ আমি। (মন্ত্রীর প্রস্থান)
কি কৰ্তব্য, অকৰ্তব্য কিবা,
নাহি পারি করিতে নির্ণয়,
শুধুই আঁধার হেরি যে সম্মুখে,
বিবেক-আলােক দেখিতে না পাই।
যথাসাধ্য করিব প্রয়াস,
যাহে জনকের মুখে ফিরে আসে পুন,
সেই সুখ-হাসি ;-কোথা মা জাহ্নবি,
এ ঘাের সঙ্কটে শঙ্কা কর দূর,
বলে দাও কৰ্তব্য আমার।
( দৈববাণী)
যাও, বৎস, রাজগণসহ
দাসরাজ পাশে অবিলম্বে ;
যদি চাহ আপন কুশল,
যদি চাহ রাজ্যের মঙ্গল,
হে গাঙ্গেয়, জাহ্নবী-আদেশে কহি তােমা,

৪র্থ অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।
দেবব্রত।
৭১
কর যাহে পিতা তব করেন বিবাহ
দাসরাজ-দুহিতারে।
কালি প্রাতে শুভযাত্রা কর, মহারথ !
(দেবব্রতের প্রস্থান)

পঞ্চম অক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য,-প্রান্তরমধ্যবর্তী পথ।
( আকাশপথে দেবগণ, বসুগণ, বসুপত্নীগণ প্রভৃতির গমন)
বেদব্যাস।
বেদব্যাস। সুরবৃন্দ, গন্ধৰ্ব্ব, অপ্সর,
সিদ্ধসাধ্যগণ, আদিত্য, কিন্নর,
পত্নীসহ সপ্তবসুদেব,
চলিতেছে অন্তরীক্ষে হেরিবে বলিয়া
দেবব্রতকাৰ্য অলৌকিক।
শুভতারাগত তারাপতি আজি,
মেঘমুক্ত নীলাম্বর,
দূরে কালিন্দীর বারি
ছুটিতেছে মহাননে বৃন্দাবন-পানে;
বুঝেছে যমুনা, অবিলম্বে সে যে
কদম্বের মূলে, রাধা রাধা বলে
শুনিবে বাঁশরী-তান!
দেবগণ নিজ-অংশে জন্মিছে ধরায় -
অচিরে ভারতধৰ্ম্ম হবে প্রবর্তিত ;
s

৫ম অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
আজি তার হইবে সূচনা,
দেবব্রত-পণসূত্র ধরি।
( বশিষ্ঠের প্রবেশ )
বশিষ্ট। কোথা যাও ত্বরাগতি দেব বেদব্যাস?
বিমল আনন্দজ্যোতিঃ
হেরিতেছি বদনে তােমার!
বেদব্যাস। ঋষিবর, চলহ সত্বর সঙ্গে মম,
কিবা কাৰ্য্য করিবে গাঙ্গেয় আজি
তব শিষ্য, দেখিবারে চাহ যদি।
ধন্য তুমি মহামুনি,
ধন্য তব শিক্ষার প্রভাব !
সেইদিন,-যেইদিন হেরেছিঃ
তব তপােবনে শান্তনুনন্দনে,---
সেইদিন বলেছিনু তােমা,
এ বালক হবে মহাশক্তিমান্,
আজি তার পরিচয় পাইবে মহর্ষি।
ধন্য তব প্রজ্ঞাবল।
যাঁর কাৰ্য্য করেছেন তিনি,
আমি মাত্র নিমিত্তের ভাগী।
দিয়াছিনু বসুদেবে অভিশাপ আমি,
করিয়াছি তারে অধ্যাপন!
লীলাময়-লীলামাত্র জানি নিশ্চয়,
চল, যাই মহানন্দে শ্রীহরিরে স্মরি।
( উভয়ের প্রস্থান।) :
বশিষ্ঠ।

৭৪ দেবব্রত। [ ৫ম অঙ্ক, ২য় গর্ভা। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। দৃশ্য,—দাসরাজের কুটীরের সম্মুখবর্তী প্রাঙ্গণ। দাসরাজ। দাসরাজ। শুনছি, শান্তনুকুমার দেবব্রত রাজগণ-সমভিব্যাহারে আমার কুটীরে আসছেন ;- উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই, পিতার জন্য সত্যবতী প্রার্থনা। ইনি যেরূপ বিক্রমশালী অমর্ষশীল যুবক,—কি রূপে এর কাছে আমার বাসনার বিষয় ব্যক্ত করব তা বুঝতে পাছিনি। যদি সহসা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেন, তাহলে মানুষের কথা দূরে থাকুক, স্বয়ং মৃত্যুঞ্জয়ও আমাকে বাঁচাতে পাবেন কি না সন্দেহ। ( দেবব্রত ও রাজগণের প্রবেশ) আতে আজ্ঞা হয়, যুবরাজ ! দেবব্রত। দাসরাজ, আমি পিতৃদেবের জন্য তােমার কন্যা সত্যবতীকে প্রার্থনা করছি ; তার পাণিগ্রহণের জন্য মহারাজ একবার তােমায় অনুরােধ করেছিলেন ; জানিনা, কেন তুমি সে সময় তার প্রস্তাবে সম্মত হওনি। শুনতে পাই কি, দাসরাজ, এরূপ শ্লাঘ্য সম্বন্ধে তােমার অমত কেন ? দাসরাজ। হে ভরতভ, ঈদৃশ সম্বন্ধ পরিত্যাগ করতে কে না দুঃখিত হয় ? স্বয়ং দেবরাজও বােধ হয় মহারাজকে কন্যা দান করতে দুঃখিত নন। সত্যবতী যার ঔরসে জন্মগ্রহণ করেছে, সেই চেদীশ্বর বসুরাজ আপনার পিতার গুণ- বলীতে একান্ত মুগ্ধ হয়ে বলেছেন যে, সেই ধৰ্ম্মজ্ঞ নৃপতিই

ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।।
দেবব্রত।
সত্যবতীর স্বামিত্বগ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি। আপনার পিতা
আমার নন্দিনীর জন্য যেরূপ উৎসুক, মহর্ষি পরাশরও
সেইরূপ উৎসুক হয়েছিলেন, কিন্তু আমি সেই মুনীরে
প্রার্থনাতেও অসম্মত হয়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি।
বরবৰ্ণিনী সত্যবতী আমার স্নেহপালিতা দুহিতা,সুতরাং বড়ই
আদরের সামগ্রী; তার ভবিষ্যৎ কল্যাণের আকাঙ্ক্ষায় একটা
কথা আপনাকে বলতে ইচ্ছা করি।
দেবব্রত। দাসরাজ, তুমি অসঙ্কোচে তােমার মনােভাব ব্যক্ত কর।
দাসরাজ। কুরুসত্তম, আপনি যুবরাজ, ও ভবিষ্যতে রাজ্যের অধিকারী।
যদি এই বিবাহ সম্পন্ন হয়, তাহলে কালে ভ্রাতৃবিবাদ
উপলক্ষ্য করে ভীষণ বৈরানল প্রজ্জ্বলিত হতে পারে।
সুরাসুর যক্ষরক্ষঃ গন্ধৰ্ব্ব প্রভৃতি কেহই যুদ্ধে আপনার
সমকক্ষ নয়। আপনি ক্রুদ্ধ হলে অতিকুল যে অচিরে
নির্মূল হবে, সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নাই। সুতরাং
রাজকুমার, যাতে ভবিষ্যতে এরূপ ভয়ঙ্কর অমঙ্গলের আশঙ্কা
আছে, সেরূপ কাৰ্যে আমি কি করে হস্তক্ষেপ করতে
পারি ?
দেবব্রত। শুন, শুন, সমাগতরাজগণ,
শুন, দাসরাজ, মম প্রতিজ্ঞাবচন,-
সত্যব্রত, দেবব্রত আমি,
কহিব যে কথা, অন্যথা না হবে কভু।
তব দুহিতার কল্যাণের হেতু,
যে কাৰ্য্য করিতে মােরে বলিবে ধীবর,
সেই কাৰ্য, করি অঙ্গীকার,

দেবব্রত।
[ ৫ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
করিব নিশ্চয় ;-শুন মম পণ,
মাতা সত্যবতীগর্ভে যেই পুত্র
লভিবে জনম, ভারতবংশের
ভাবী রাজা হবে সে কুমার,
নাহি চাহি রাজ্যভার আমি,
মহানন্দে সিংহাসনে বসাইব তারে।
( আকাশ হইতে পুষ্পবৃষ্টি )
দাসরাজ। যুবরাজ, রাজ্যের কল্যাণ-কামনায় আপনি অতীব ভীষণ
প্রতিজ্ঞা করেছেন। আপনি অঙ্গীকার করেছেন, আমি
দুহিতার হিতার্থ আপনাকে যেরূপ কাৰ্য্য করতে বলব,
আপনি সেইরূপই করবেন। মহাশয়, আমার আর একটি
কথা আপনাকে রাখতে হবে ; অবশ্য, এরূপ প্রস্তাবে
আপনি আমাকে বাতুল কিম্বা বালক বলে বিবেচনা করতে
পারেন, কিন্তু কি করব, অপত্য-স্নেহ স্বভাবতই ভাবী
অমঙ্গলের আশঙ্কা করে থাকে। আপনি রাজগণ-সমক্ষে যেরূপ
প্রতিজ্ঞা করেছেন, তাহা আপনার দেবচরিত্রের অনুরূপই
হয়েছে আপনার উপর আমার বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই,
কিন্তু মহাভাগ, ভেবে দেখুন, আপনার পুত্র-সন্তান কি
নির্বিবাদে হস্তিনার সিংহাসন অপরকে ভােগ করতে দেবে?
দেবব্রত। হে দাসরাজ ! হে নৃপতি-মণ্ডল।
ভীষণ প্রতিজ্ঞা মম গুন পুনৰ্ব্বার,-
মেরু যদি নড়ে মক্ষিকার ভরে,
কক্ষচ্যুত কভু যদি হয় এ মেদিনী,
=

[ ৫ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
দেবব্রত।
পূৰ্ব্বদিক্‌ ত্যজি পশ্চিম আকাশে
কভু যদি উদে ভানু,
ব্রাহ্মণ যদ্যপি ভুলে গায়ত্রী মাতারে,
নিজ কাৰ্য্য যদি ভুলে ধৰ্ম্মরাজ,
জননী যদ্যপি আপন সন্তানে
নাহি করে স্তন্যদান,
হে ক্ষত্রিয়গণ,
তবু মম পণ রহিবে অচল ;
রাজ্যতাগ করিয়াছি আমি-
করিতেছি প্রতিজ্ঞ। আবার,
অদ্যাবধি আজীবন রব ব্রহ্মচারী,
এ জীবনে বিবাহ না করিব কখন।
দাসরাজ। যুবরাজ, আপনার প্রতিজ্ঞ-বাক্য শুনে আমার আর আনন্দ
রাখবার স্থান নেই ; এক্ষণে আপনার পিতাকেই আমি
কন্যাসম্প্রদান করছি।
( পট-পরিবর্তন )
দেবগণ, বসুগণ, বসুপত্নীগণ, অল্পবােগণ
বশিষ্ঠাদি মুনিগণ ইত্যাদি।
দেবব্রতের উপর পুষ্পবৃষ্টি করিতে করিতে, ও দুন্দুভিধ্বনি
করিতে করিতে অবােগণের সঙ্গীত।
পুলকে পূরিল আজি ধরা
দেবতা বিস্মিত হয়ে আসিল ছাড়ি অমা।

৭৮
দেবব্রত।
[ ৫ম অঙ্ক, ২য় গর্ভা
সত্যব্রত দেবব্রত,
কীৰ্ত্তি তব হ’ল খ্যাত ;-
কুম সবে কর বরষণ,
দুন্দুভি সবে বাজাও সঘন,-
কোথ। মা গঙ্গে কলুষহরা,
আশীষ সস্তানে, এস মা ত্বরা।
দেবব্রত, জীবনেতে মহাব্ৰত আজি
করিলে অবলম্বন ;
শান্তনুরে শান্তিদান তরে
করেছ ভীষণ পণ,
“ভীষ্ম” নামে তােমা করি সম্বােধন।
পিতৃভক্তি তব
চিরতরে রহিবে আদর্শ।
যম।
ধৰ্ম্মরাজ আমি, কহি তােমা,
অপুত্রক যদিও রহিবে,
পুন্নাম-নরকভােগ না হবে তােমার।
জীবনান্তে অক্ষয়স্বরগলাভ
করিবে হে মহাভাগ ।
যতদিন রবে আর্যগণ,
তর্পণেতে জলাঞ্জলি দিবে হে তােমায়।
দেবব্রত। ধন্য আমি,
লভিলাম দেব-আশীৰ্বাদ ।
( শান্তনু ও বিদূষকের প্রবেশ )
বিদূষক। মহারাজ, এ যে একেবারে দেবতাদের হাট বসে গেছে ।

৫ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।]
দেবব্রত।
বশিষ্ঠ।
দাসরাজ, দুহিতারে তব
লয়ে এস সভামাঝে।
(গঙ্গা ও সত্যবতীর প্রবেশ )
গঙ্গা। এই আসিতেছি আমি,
এস লাে ভগিনি,
মহারাজে নিজে আমি করিব অর্পণ।
(দেবগণ ও মুনিগণের স্তব )
জয় দেবী পতিতপাবনী,
হরিপদরজোবিহারিণী,
ভাগিরথী প্রবাহিণী।
জয় মাতা মুনীন্দ্র-বন্দিতা,
জয় সুরাসুর-নিষেবিতা,
কুলুকুলুনিনাদিনী।
জয় দেবী শান্তনুতােষিণী,
জয় জয় ভীষ্ম প্রসবিনী,
মােক্ষদাত্রী সুরধুনী।
গঙ্গা।
আমা হতে কোন সুখ পাওনি জীবনে।
এবে ধর্মপত্নীরূপে করহ গ্রহণ
সত্যবতী ভগিনীরে।
এস বােন্,
হাতে হাতে সপে দিই তােমারে এখনি।
(গঙ্গাকর্তৃক শান্তনু ও সত্যবতীর পাণিসংযােগকরণ ;
শঙ্খধ্বনি ও হুলুধ্বনি।)
মহারাজ,

দেবব্রত।
[ ৫ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
(দেবব্রতের প্রতি)
আমার বাছনি দেবব্রত,
দেবের অসাধ্য কাৰ্য্য করেছ ধরায়,
করি আশীৰ্বাদ,
অটুট রহিবে প্রতিজ্ঞা তােমার।
দেবব্রত। সকলই তােমার লীল,
মাত্র উপলক্ষ্য আমি।
শান্তনু। বৎস, ভীষ্ম, দেবব্রত !
পিতৃভক্তি-পরিচয় দেছ অলৌকিক,
ইচ্ছামৃত্যুবর আমি দিলাম তােমায়।
দাসরাজ। মা সত্যবতি, তােমায় আমি সার্থক পালন করেছিলেম,
ধীবরের ভাগ্যে যে এমন ঘটবে, তা স্বপ্নেরও অগােচর!
যবনিকা-পতন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Debobroto

Author
Bandhopadhyay, Kalikumar
Title
Pouranik Natak
File name
Debobroto
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2009/09/9
Publisher
Lalit Mohon Banerjee,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
94
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Satyabati
DLI number
512584
Barcode
4990010019645.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
gRHom3OxML7
Download PDF

Debobroto