Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Tamasa Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
a৪ 1.4 irJa: 1.।।
ত
ম
সা
=
0L] " .03.
Titl.115,
fo!
জ্যোতি
জ্যাতির্ময় রায়
জিবুক পােলিয়ন লিঃ
গরে এ এ বাদ
দিলে পেপার মিল কোং লিঃ-এর যুক্ত প্রতাপকুমার সিংহকে
এ ব ম ফ র ণ
অ=১৩৫১
এ ধরণী সেন
একাকীৰোেৰ বােৰ
দিবুক এলামিয়া লিঃ
२९, कनख्वामिगही
কলিকাতা
মিটার এযর চক্রবর্তী
কালিকাপ্রস সি
৫, ডি. এল. রায় কীট
কলিকাতা
•
Hos
P
.
Mortal!
শ্রীযুক্ত নীহাররঞ্জন রায়
রেবুE
বা
আমি
ভঙ্গুর
মাসা
কাপ গেল
এক ফালি
লাল মাটি
স্পর্শক
BHAWANIPU.] H..!.!
১
0L 63 {}
st. 11
17.
তমসা
সমাজের যে অবস্থায় জন্মেছি তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে
নিতে পারলাম না—এ আমার অপরাধ না গুণ সে-কথা থাক।
বাধানিষেধের ঝাপির ভেতর সাপুডের সাপের মতাে কুণ্ডলী
পাকিয়ে পড়ে আছি। দু'একবার ফোস করে না উঠেছি এমনও
চায়,
কিন্তু তখনই টের পেয়েছি আমার ফণার চেয়ে থাবড়ার জোর
বেশি। তার পর থেকে নারী জীবনের চলতি কতব্যই করে
চলেছি। প্রকৃতির দাবি মেনে একাধিক জীব গড়লাম কিন্তু
মনের দাবি মেনে একটি জীবন গড়া হলাে না।
মানুষ কোনাে বােঝাকেই বােঝা বলে মনে করে না যতক্ষণ
সামনে থাকে আমার হাতছানি। দুর্বহ তার কাছে একমাত্র
ভবিষ্যৎহীন ব্যর্থতার ভার। সে-ভারই আমাকে বইতে হচ্ছে।
মানলাম না, মানিয়ে নিতে পারলাম না—এ এক বিষম
বিড়ম্বনা। অবশ্য তা নিয়ে কঁদুনি গাইতে বা নালিশ জানাতে
বসিনি। মাঝে মাঝে এমন মুহূর্ত আসে যখন ইচ্ছে হয় যত
দূর দৃষ্টি চলে গত জীবনটাকে একবার খতিয়ে দেখি। বিশৃঙ্খল
সেই দেখাকে গুছিয়ে রাখতেই কলম নিয়ে বসা।
নারীজীবনের চারচারটে বড় অধ্যায়ই এ বুকের ওপর দিয়ে
পার হয়ে গেছে। পুতুল বুকে নিয়ে জীবনের সুক, বই বুকে
তা
চেপে কাটলাে কৈশাের, যৌবনে স্বামী, তারপর সন্তান। অতনি
নিবিড় ভাবে নতুন করে বুকে টেনে নেবার মতাে আর কিছুই
নেই। এর পর আর যা আসবে তা হয় আবাদিত নয় তাে
কোথাও কোনাে াক তাতে থাকবে। এ চার পর্ব পার হতে
গিয়ে অনেক কিছুই ঘটলাে। যার দৌলতে স্মৃতির কোঠা আজ
বিচিত্র ঘটনার যাদুঘর।
তিরিশটা বছর পার হলাে। আজও যখনই পেছন
ফিরে তাকাই প্রথমেই মনে পড়ে পনের বছর আগেকার কথা।
সবে তখন পনেরয় পা দিয়েছি। বাড়ন্ত গড়ন ছিলাে আমায়ু
দেহের—তার চেয়েও দ্রুত ছিলাে মনের গতি। বয়সের তুলনায়
অনেক বেশি বুঝতাম ও ভাবতাম। দ্বিতীয় শ্রেণীতে সবে উঠেছি,
ফক ছেড়ে শাড়ি ধরলাম। পরিচ্ছদে এ পরিবর্তনের মূলেও অঙ্গ
সম্পর্কে আমার অতিরিক্ত সচেতনতা। সুগঠিত পা হাঁটুর ওপর
অবধি অনাবৃত। কৈশােরের সেই নির্ভাব চামড়ায় যৌবনের
আমেজ লেগে আমন্ত্রণের আভাস জেগে উঠেছে এটা আমার
নিজের চোখেই ধরা পড়েছিলাে-যুবকদের চোখে পেলাম তার
সমর্থন। ফুক পরে আর স্বস্তি বােধ করতাম না।
দেহ সম্পর্কে অধু সচেতনই ছিলাম না, তার যত্নও নিতাম
খুব। একটা ঘটনা এখনও মনে পড়ে। স্কুলে যাচ্ছি, পেছন
থেকে কানে এল একটি ছেলের মন্তব্য। তার ভাষার উল্লেখ
করবাে না—কথাটা এই, আমি সুন্দর কিন্তু কটিদেশ থেকে
আমার শ্রোণিযুগলের উত্থানটা একটু নাকি আকস্মিক, আরাে
কমিক হলেই হতাম একেবারে নিখুত। ঐ বয়সেও এ উড়ে
মন্তব্যকে অবহেলা করতে পারি নি। বাড়ি ফিরে নিরীক্ষাতে
সমালােচককে প্রশংসাই করেছিলাম। এমনকি ভেবেচিন্তে একটা
পথও বার করেছিলাম এ ক্রটি যাতে সারানাে যায়।
অঙ্গ ও অন্তরের আলােড়ন আমাকে কিন্তু উইল করলাে
, করে দিলে স্তব্ধ। মুখে চোখে এবং সমস্ত দেহে কেমন
একটা থমথমে ভাব। যেন মহা একটা
যেন মহা একটা শক্তিকে ভেতরে বন্দী
করে রেখেছি। মনে হতাে আমার দৃষ্টিভঙ্গী-চাল-চলন সবারই
বিশেষ একটা মূল্য আছে। দিদি আমার দু’বছরের বড়, সে
ছিল ঠিক উল্টো স্বভাবের। চপল চলন, তরল তার
কথাবা। বাবা কলেজের একজন নামকরা অধ্যাপক, অতএব
বাড়িতে ছাত্রদের আনাগােনাটা ছিল নিত্যনিয়মিত। দিদি
মেতে থাকতত ওদের নিয়ে। ওর উৎসাহ পেয়ে বিজ্ঞানের
ছাত্ররাও অনেকে দর্শনশাস্ত্রে উৎসাহী হয়ে উঠলাে। ঘন
ঘন আসততা বাবার মুখে দার্শনিক ব্যাখ্যা শুনতে। সবার
দিকেই দিদি এমন চোখে চাইতাে যে দর্শনে আগ্রহ না এসে
যায় না। কাপে আমার চেয়ে খাটো হয়েও ছাতমহলে ওরই
নামডাক ছিলাে বেশি। ছাত্ররা চলে গেলে তাদের নিয়ে নানা
রকম হাসিঠাট্টা করা ছিল দিদির আর এক কাজ। যারা
একটু বেশি বুকে পড়েছে মনে করতাে তাদের সব নামকরণ
হতাে, গবেট লম্বা চালিয়াৎ-এই রকম। ওদের হাসি-কথা-
কানাের বাঁকাচোরা নকল করে বন্ধুদের নিয়ে আসর জমিয়ে
ত ম না
হাসাহাসি হতাে—সেকি উচ্চহাসি! মেয়েদের গলাছাড়া হাসি
এখন তাে রীতিমত কুৎসিত মনে হয়, তখনও আমার ভালাে
লাগতাে না। একদিন দিদি বন্ধুদের বলছিলাে, জানিস ভাই,
দু’দিন গবেটটার দিকে তাকিয়েছি আর ও ভেবে নিয়েছে আমি
ওর প্রেমে পড়ে গেছি—ঢুলুঢুলু চোখে ক্যাবলার মতাে
তাকিয়ে থাকে। এক কোণে বসে শুনছিলাম—ভারি রাগ
হলাে, বললাম, গবেটও হয়তাে বাড়ি থেকে ভেবে বেরােয়—
যাই, স্যার-এর মেয়ের সঙ্গে একটু ইয়ার্কি দিয়ে আসি গে—
দিদি ততক্ষণে গবেটের তাকানাে নকল করছে। পরিহাস
কিন্তু অমলল না। দিদি ধমকে উঠলাে, “তুই গেলি এখান
থেকে গােমরামুখী। বেরিয়ে এসে মনে হলাে দিদি যেন
দামি-দামি সব শাড়ি-কাপড় আর গয়না মেঝেয় ছড়িয়ে
পায়ের তলায় চটকাচ্ছে আর খিলখিলিয়ে হাসছে।
একে মেয়ে তাতে ঐ বয়স, বােধহয় তাই সহজ টানে শাড়ি-
গয়নার কথাটাই উপমা হিসেবে মনে এসেছিলাে।
এখানেই বলে রাখি, গােমরামুখী কথাটা শুধু দিদির
গাল নয়, ওটা আমার নামও। স্কুলের মেয়েদের মধ্যে আড়ালে
ও-নামই আমার চলতি ছিল। আমার গাম্ভীর্যের বিকৃত
ব্যাখ্যা ওটা। এক বছর আগেকার একটি ঘটনা থেকেই
এ নামের শুরু। টিফিনের সময় ক্লাসে নিজের জায়গাটিতে
বলে একটা গল্পের বই পড়ছিলাম, পাশেই দল পাকিয়ে
মেয়েরা নবাগত ছাত্রীটিকে নিয়ে হল্লা করছে। অল্প সময়ের
মধ্যেই মেয়েটি সকলের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে। শুনেছি সে নাকি ভারি সব মজার মজার রসের কথা বলে অরন্য সে-রস আমার সামনে পরিবেশন করতে কেউ কখনাে আসেনি। পড়তে পড়তে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিলাে। সেই মেয়েটি এসে দাড়ালাে আমার সামনে-পেছনে দলের অন্য মেয়েরা। সবারই মুখেচোখে একটা চাপা হাসি আর মজা দেখার ভাব। মেয়েটি প্রশ্ন করলাে, তােমার কি ভাই ‘ডিউটি ছিল কাল? স্কুল-কুমারীদের এই ফাস্টবুক ফাজলামােটাও আমার জানা ছিল না। অবাক চোখে তাকালাম মেয়েটির মুখের দিকে। মেয়েরা এ-ওকে জড়িয়ে হেসে গড়িয়ে পড়লাে। প্রথমটা বুঝলাম না এত হাসির কি আছে এতে। আমার অজ্ঞতায় উৎসাহিত হলাে প্রশ্নকারিণী। ডিউটিটা দিবাভাগে নয় সেটা জানিয়ে এমন কুৎসিত এক ইঙ্গিত করলাে শুনে মুখ- চোখ আমার লাল হয়ে উঠলাে। সজোরে এক চড় কষে দিলাম তার গালে। নরম সাদা গালে তিনটে আঙ্গুলের দাগ কি ভাবে ফুটে উঠেছিলাে এখনাে চোখে ভাসছে। এ নিয়ে কোনাে নালিশ গেল না বড়দিমণির কাছে, ওরা জানতে আমি সব কথাই বলে দেব। এর পর ও-জাতীয় অনেক স্কুল-কৌতুক আর আলােচনা ছুটোছাটা কানে এসেছে বটে কিন্তু আমাকে বিজ্ঞ বানাতে কেউ কখনাে এগিয়ে আসে নি। গােমরামুখী নাম দিয়ে সবাই আমাকে দল থেকে বাতিল করেছিলাে।
सपना
স্কুলেও একা, বাড়িতেও একা। ছেলেদের সঙ্গে মিশতে
পারি না, মেয়েদের সঙ্গে খাপ খায় না। বাড়ির সামনের
গাছে ছিল একটা দোলনা, ব'সে ব'সে তাতে দোল খেতাম।
পায়ের তলা থেকে কোমর অবধি শিরশির করে সমস্ত শরীরে
ছড়িয়ে পড়তে একটা সুখকর অনুভূতি—বেশ লাগতাে। আর
এক কাজ ছিলাে টক খাওয়া। টক খেতে খুবই ভালবাসতাম
মেয়ে মাত্রেই যা ভালবাসে। মনে প্রশ্ন জাগতাে, দোলনায়
দুলতে, টক খেতে ছেলেরা কেন ভালবাসে না—এ শিহরণ কি
তাদের দেহেজাগে না। এমন কত কথাই ব'সে ব'সে মনে হতাে।
সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করতে বাবার ছাত্ররা। কত সুদর্শন
যুবক ছুতােনাতায় আলাপ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে-
আমল দেই নি, কেমন যেন ভালাে লাগতাে না।
বসে পরিষ্কার করে ভাবতে চেষ্টা করতাম কি আমি চাই।
কি আমি চাই এ সমস্যার মীমাংসা একদিন হয়ে গেল
অপ্রত্যাশিতভাবে। সন্ধ্যার পর বসবার ঘরের একটা কোচে
বসে পা দোলাচ্ছি ছড়ি ঘােরাতে ঘােরাতে ঘরে এসে ঢুকলেন
এক লােক।
ডক্টর চক্রবর্তী বাড়ি আছেন?
হ্যা আছেন-বসুন। উঠে দাড়িয়ে বললাম। লােকটির
চোখের দিকে চোখ পড়লাে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার
দেখে নিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়ালাম।
পেছন থেকে বললেন, ‘শােনন কী, কি নাম তােমার?
ত ম না
খুকী' কথাটা আপত্তিকর শব্দের মধ্যে কানে এসে
লাগলাে। আরাে গভীর মুখে বলতে গেলাম, ক্রমতী
মতী-ট্রীমতী নয়, ডাক নাম কি বলল-ডাকনাম।
বাবলি।
বাঃ খাসা নাম, যেমনি ফুটফুটে চেহারা তেমনি সুন্দর
নাম। ছড়িটা একপাশে রেখে একটা কোচের ওপর ধপ ক'রে
বসে পড়লেন। যাও বাবাকে বলে গে মিস্টার চৌধুরী
সুকান্ত চৌধুরী এসেছেন।
ইনিই সুকান্ত চৌধুরী। আর একবার ভালাে করে দেখে
নিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাবার মুখে এর নাম আগেই শুনেছি।
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, দিনকয় হলাে এ জেলায় বদলি হয়ে
এসেছেন। খুবই নাকি বিষান আর গুণী লােক—ভালাে
গাইতে পারেন। ক'দিনের পরিচয়েই বাবা এর গুণ, বিদ্যা ও
ব্যবহারে বিশেষ মুগ্ধ হয়েছেন তার কথা শুনেই বুঝেছি।
খবর পেয়ে বাবা ছুটে এলেন। হাঁকডাক করে বাড়ির
সবাইকে এনে আলাপ করিয়ে দিলেন। আমার পালা আসতেই
সুকান্তবাবু বললেন, বাবলির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সবার আগে।
বাবা বললেন, ‘ইনি তোদের নতুন কাকাবাবু বুঝলি। বাবা
বুঝিয়ে দিলেন বটে কিন্তু এ-ডাক একবারের জন্যেও আমার
মুখ দিয়ে বেরোয় নি।
আর সবাই বেরিয়ে গেল, আমি বাবার গা ঘেঁষে বসে
রইলাম। কোনাে পুরুষ সম্পর্কে এতখানি আগ্রহ ইতিপূর্বে
তম শা
কননা বােধ করি নি। সুকান্তবাবু আমার দিকে খুব যে
একটা মনােযােগ দিচ্ছিলেন তা নয়, বাবার কি একটা প্রশ্নের
উত্তরে নিজের ঝোকেই কথা বলে যাচ্ছিলেন। খুটিয়ে
দেখবার পথে কোনাে বাধাই ছিল না। লােকটিকে
মপুরু বলা চলে না। বয়স পঁয়ত্রিশের ওপরে। মাথার চুল
সামনের দিকে হালকা হয়ে টাকের আভাস দেখা দিয়েছে, চওড়া
কপাল তাতে আরও চওড়া দেখায়। তীক্ষ উচু নাক। সবচেয়ে
বেশি নজরে পড়ে বুদ্ধিদীপ্ত চকচকে মিশকালাে একজোড়া চোখ।
বুদ্ধির দীপ্তিছাড়া সে-চোখে আরও কিছু ছিল যা প্রেমিক বা
ভাবুকের পরিচয় নয়। সে যে কি তা তখন বুঝিনি, বুঝেছিলাম
পরবর্তী জীবনে—পরিণত বয়সে আবার যখন ও-জাতীয়
চোখের দৃষ্টিপথে দাড়িয়েছিলাম।
বিদায় নেবার জন্য সুকান্তবাবু উঠে দাঁড়ালেন। আমার
চোখের ওপর তাঁর চোখ পড়লাে। মুহূর্তে তার মুখের ভাবে
একটা পরিবর্তন দেখা দিল—একটু যেন অন্যমনস্ক ভাবেই
দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
‘কাল আবার এমাে মুকান্ত' খুব ভালো লাগলে আপনি
বলতে পারেন না বাবা। বৌমা আর ছেলেমেয়ে দুটিকেও
সঙ্গে এনাে কিন্তু।
আনবাে।
সংক্ষেপে জবাব দিয়ে সুকান্তবাবু চলে গেলেন।
হঠাৎ অনুভব করলাম কেমন একটা ভালাে লাগার আবেশে
মনটা আচ্ছন্ন হয়ে গেছে, সেই সঙ্গে মিশে আছে বিশেষ একটা ব্যক্তিত্ব বােখের অনুভূতি। উপস্থিত বা ভবিষ্যতের কোনাে ভাবনাই তাতে ছিল না, বড়াে হয়ে জেগে ছিল শুধু একটা কথা-কাল আবার দেখা হবে। দেখা হলাে। শুধু পরের দিন নয়, প্রতি সন্ধ্যায়ই দেখা পেতে লাগলাম। বাবার সান্ধ্য আসরে যে-কোনাে আলােচনায়ই তিনি হয়ে উঠলেন প্রধান বক্তা। গল্পও বলতেন চমৎকার। চাকুরিজীবনের অভিজ্ঞতায় রং ফলিয়ে টুকরাে-টাকরা মজার সব ঘটনা বলতেন। বাবার মতাে রাসভারী লােককেও কথার মাঝখানে হাত তুলে অবকাশ নিতে হতে উদগত হাসিকে আয়ত্তে আনতে। বাবার পাশে আমিও একটি জায়গা করে নিয়েছিলাম, বসে বসে তার মাথায় হাত বুলােতাম আর ওর কথা শুনতাম। একদিন রাজনীতি নিয়ে আলােচনা চলছে, কথার মাঝে সুকান্ত- বাবু বলে উঠলেন, “বাবলি শুধু গল্পই শােনে না, আমাদের সব আলােচনাই বেশ মন দিয়ে শােনে দেখছি। ‘হ্যা, তােমার কথা শুনতে ও ভারি ভালবাসে। বাবা বললেন। রাতের পড়াশুননা তাে ছেড়েই দিয়েছে—আমিও তেমন চাপ দিই না, এ সব আলােচনা না বুঝেও যেটুকু বুঝবে তাতে পাঠ্য বই গেলার চাইতে কাজ বেশিই হবে।' ব'লে মুহ হাসলেন। আমার উপস্থিতি একেবারে অবহেলার বস্তু নয় তাও
তৃ ম মা
একদিন জানতে পেলাম। একটু দেরি হয়েছিলাে আসরে
যােগ দিতে, ঘরে ঢুকতেই সুকান্তবাবু বললেন, ‘এতক্ষণে এলাে
আমার প্রধান শ্রোতা-বাবলি না থাকলে দর্শনের আলােচনাও
যেন দানা বাঁধে না।' বলেই তাকালেন আমার দিকে। কথাটা
যত সহজভাবে বললেন দৃষ্টিটা তত সহজ মনে হলাে না।
কিছুদিনের মধ্যেই উনি আমাদের পরিবারের একজন
মুরুব্বি হয়ে উঠলেন। বাবাও আত্মসমর্পণ করলেন ওঁর
ব্যক্তিদের কাছে—সুকান্তের মত না নিয়ে এক পা চলেন না।
বাড়ির সকলের সঙ্গেই তাঁর স্নেহ আর শ্রদ্ধার সম্পর্ক। মাকে
সাংসারিক উপদেশ দিতেন, দিদিকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায়
হাত বুলিয়ে আদর করতেন, কেমন একটা দূরত্ব বাঁচিয়ে চলতেন
কেবল আমার বেলায়। আমার সঙ্গে যে-কটা কথা বলতেন তা
এমনভাবে ‘তুই কি ‘তুমি’ বলেন তাও বােঝবার সুযােগ
দিতেন না। অবশ্য তার ব্যবহারে এই বৈষম্য আর কারুর
চোখে ধরা পড়ত না, সূক্ষ্ম বুদ্ধির জোরেই সকলের লক্ষ্য
তিনি এড়িয়ে যেতেন।
কোথা দিয়ে কি করে যেন আমার মনে একটা ধারণা জন্মে
গিয়েছিলাে, ওর ওপর আমার বিশেষ একটা দাবি আছে।
কোনাে-কোনাে দিন সকালে আসতেন—কোটের সময় হলাে
ব'লে যখনই উঠে পড়তেন, খুবই ছেলেমানুষী উপায়ে দাবির
মাত্রাটা কবে নিতাম মনে মনে। ভাবতাম, আমি যদি ওকে
আজ কোর্টে যেতে বারণ করি তােত কিছুতেই উনি যাবেন না।
उपमा অপরীক্ষিত এই সত্যে এতখানি আস্থা ছিল যে কথাটা ভেবেই মন গর্বে আনন্দে উৎফুল্ল হতাে। এক সন্ধ্যায় তিনি এলেন না। পরের দিন বাবা খবর নিয়ে জানলেন শরীরটা নাকি তেমন ভালাে নেই। স্কুল ফেরত হঠাৎ ঝোকে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম ওঁর বাড়ির সামনে ঝিকে বলে দিলাম বাড়িতে বলতে। গাড়ি চলে যেতেই মনে হলাে না নামলেই ছিল ভালাে। এ সময় এভাবে কেন এলাম তার একটা সঙ্গত অজুহাত কিছুতেই মনে দাড় করাতে পারলাম না। লজ্জায় সঙ্কোচে পা দুটো যেন ভারি হয়ে এলাে। দ্বিধা নিয়েই ধীরে-ধীবে ভেতরে ঢুকলাম। বারান্দা পার হয়ে শাের ঘরের সামনে গিয়ে দেখলাম আরাম কেদারায় এয়ে তিনি কি একটা বই পড়ছেন। আশেপাশে আর কারুর সাড়াশব্দ নেই। হিলের খুটখুট শব্দে চোখ তুলে তাকালেন। আমি বই বুকে চেপে দাড়িয়ে পড়লাম—বই-এর তলায় ধকধক করছিলাে বুকটা। উনি আরামকেদারা ছেড়ে একেবারে উঠে পড়লেন, আরে —বাবলি যেওভাবে দাড়িয়ে ওঠার মতাে অভ্যাগত আমি নই সে-বিষয়ে সচেতন হলেন যেন। আস্তে এগিয়ে এসে একটু থেমে বললেন, কিন্তু উনি তাে বাড়ি নেই, এই মাত্র পাশের কোন বাড়ি যেন গেলেন- আমার মুখ দিয়ে কোনো কথাই সরলাে না। অস্পষ্ট এই সংকোচের অভিমা ঝেড়ে ফেলার জন্যেই হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, তারপর বাবলি, হঠাৎ-দুই ইস্কুল থেকে এখানে?
=
এই প্রথম তিনি স্পষ্ট তুই বলে সম্বােধন করলেন। দিদিকে
যে-ভাবে আদর করেন তেমনি হাত ধরে কাছে টেনে নিলেন।
আমার সর্বশরীর কাপছিলাে। বইগুলাে হাত থেকে খসে
মাটিতে পড়ে গেল, দেহটা এলিয়ে পড়লে তার বুকের ওপর।
অনিচ্ছাকৃত এ পারম্পর্যের জয়ে দু'জনের কেউ প্রস্তুত
ছিলাম না। অর্ধ চেতনের মতাে চোখ তুলে চাইলাম তার
মুখের দিকে, সে-মুখও বিবর্ণ—তিনি চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
ধীরে-ধীরে আমাকে বসিয়ে দিলেন একটা চেয়ারে। বইগুলাে
কুড়িয়ে গুছিয়ে রাখলেন টিপাই-এর ওপর, তারপর একটা
জামা গায়ে চড়িয়ে বললেন, ‘চললা বালি তােমাকে বাড়ি
পৌছে দিচ্ছি।
মনে আছে সে রাতে শুয়ে-শুয়ে খুবই কেঁদেছিলাম।
দুঃখ আর হতাশায় মনটা সেদিনই প্রথম মুষড়ে পড়লাে। কেন
কি হলাে কিছুই যেন ভালাে করে ভাবতে পারলাম
। শরীর খারাপের জের টেনে তিনিও আমাদের বাড়ি
আসা কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করলেন। যেদিন এলেন
দেখে মনে হলাে গােটা মানুষটাই বদলে গেছে—দেহে মনে
সেই সজীবতার লেশমাত্র নেই।
এদিকে আমাদের বাড়ির ঘটনাপ্রবাহের গতি হঠাৎ যেন
অভ হলাে।
দিদির বিয়ে স্থির হয়ে গেল। সুকান্তবাবু নিয়মিত
আসা বন্ধ করেছিলেন, বাবা আর রােজ কে ধরে আনতে
হলাে,
ত ম না
লাগলেন। প্রতি কাজে তার পরামর্শ চাই। তিনিও যথারীতি
কর্তব্য সেরে চলে যেতেন।
বাবা কিসের ফদ তৈরী করছেন, আমি কাছেই ব'সে
ছিলাম। সুকান্তবাবু এসে ঘরে ঢুকলেন। বাবা সাগ্রহে তাঁকে
ডেকে বসালেন। আমি উঠবাে ভাবছি এমন সময় বাবা
বললেন, বাবলি তুই একটু যা তাে মা, আমাদের একটু কথা
আছে।
কেমন একটা কৌতূহল হলাে। বেরিয়ে পর্দার পেছনে
দাড়িয়ে পড়লাম। যে-কথা কানে এলাে তাতে জমে যেন
পাথর হয়ে গেলাম। ভালাে একটি পাত্র পাওয়া যাচ্ছে,
এক সঙ্গেই কাজ সেরে ফেলবেন কিনা সে বিষয়ে ওর
পরামর্শ চাচ্ছেন। বিয়ে যখন দিতেই হবে তখন পাত্র হাত
ছাড়া করা সমীচীন নয় এ সম্পর্কে যথাসম্ভব যুক্তি দেখিয়ে
শুরু করলেন বরের পরিচয়। ছেলেটি তারই ছাত্র।
প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে রিসার্চে নিযুক্ত আছে। অদ্বৈত
ব্রাহ্মণ। বাপ গুরু পুরােহিত, বহু ঘর শিষ্য আছে। আর্থিক
অবস্থা ভালাে নয়। এসব কোন কিছুকেই বাবা বাধা বলে
গণ্য করেন না, তিনি নিজেও ছিলেন দরিদ্র ব্রাহ্মণের
সন্তান। নিজের জীবন নিজের হাতে গড়বে এমন ছেলেই
তিনি চান। সরকারী পরীক্ষায় মাথা দিলে চাকরির ক্ষেত্রে এ
ছেলে অনেক উচুতে স্থান করে নেবে সে-বিষয়ে তিনি
নিশ্চিত।
শ্রোতার মুখের ভাব দেখতে পেলাম না, তিনি বলেছিলেন
দরজার দিকে পেছন দিয়ে। অস্ফুট করে উত্তর শুনলাম,
দেখুন, আপনি যা ভালাে বােবেন—তবে কিনা বয়েসটা
বিয়ের পক্ষে খুবই কি অল্প নয়। তা ছাড়া অমন গোঁড়
পরিবার, মানিয়ে নিতে পারবে কি?
আগ্রহের আতিশয্যে বাবা নিজের মতের সমর্থনে অনেক
যুক্তিরই অবতারণা করলেন। তার আগ্রহ দেখে কি অন্য
কারণে জানিনে সুকান্তবাবু কিন্তু একেবারেই চুপ করে
গেলেন।
আমার কান্নাকাটি ও প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করেই কনে দেখা
থেকে শুরু করে বিয়ের দিন অবধি ধার্য হয়ে গেল।
সুকান্তবাবুর স্ত্রী এসেছেন আমাদের বাড়ী, সে-সুযােগে বন্ধুর
বাড়ির নাম করে বেরিয়ে ওর কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লাম,
এ বিয়ে আপনাকে বন্ধ করতে হবে। কোলে মুখ লুকিয়ে
পড়ে রইলাম, তিনি আমার মাথায় হাত রেখে অনেকক্ষণ
স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর থেমে থেমে বললেন, এ বিয়ে
আমি বন্ধ করতে পারতাম—এখনও হয়তো পারি—কিন্তু তা
করবে না—আমার আদেশ হিসেবেই এটা তুমি মেনে নাও
বাবলি, এতে তােমার ভালাে হবে—'আমি দুরন্তভাবে মাথা
নেড়ে উঠলাম। হালকা হাতে পিঠে চাপড় দিতে দিতে
বললেন, ‘পাগলী-আমরও অনেক কথা বলবার রইলো তােকে,
বছর চার পরও শােনবার মতাে আগ্রহ থাকে যদি তো বলবে-
g
उपना
আমার মতাে বেপরােয়া চরিত্রকে কি ভাবে যে দাবিয়ে রেখেছি
হঠাৎ থামলেন, না বাবলি, এ বিয়ে হয়ে যাক এ আমারও
ইচ্ছে-
চার বছর পরে কি তিনি বলবেন, আজকেই বা বলছেন
কেন—সেকি বুঝব না বলে, না অন্য কারণ আছে
জিজ্ঞেস করতেও ভরসা পেলাম না।
বিয়ে আমার হলাে। শুভদৃষ্টির সময় বরের পেছনে দাড়িয়ে
ছিলেন সুকান্তবাবু, তাঁর সঙ্গেই হলো প্রথম দৃষ্টি বিনিময়।
পরে সকলের পীড়াপীড়িতে আর একবার চোখ তুলে রীতি রক্ষা
করেছিলাম মাত্র।
বর দেখে সকলেই খুশি। মা বলে বেড়াতে লাগলেন
ফুটফুটে কার্তিকের মতাে বর হয়েছে। আমার চোখে কিন্তু
গৌরবর্ণ নিষ্প্রাণ একটি নিরীহ জীব ছাড়া আর কিছুই মনে হয়
নি। তখনকার জন্যে তা নিয়ে আমার মনে কোনো নালিশ
ছিল না। কারণ ঐ একটি লােক ছাড়া আর কাউকে অন্তরের
সঙ্গে গ্রহণ করবে এ ছিলাে ধারণার অতীত।
ফুলশয্যার রাতেই স্বামী টের পেলেন দুর্বহ এক বােঝাকে
তার সঙ্গে সাতপাকে জড়ানাে হয়েছে। কনাে চোখে রওনা
হলাম এর বাড়ি। দিদির কান্না তখনাে সবার কানে লেগে
আছে। আমার এই অস্বাভাবিক সকলে যেন অস্বস্তি বােধ
করতে লাগলাে। আত্মীয় বন্ধু সকলেই উপস্থিত ছিল ছিল
শুধু একজন
उपमा
দু'মাসের মধ্যে আমার দুর্ভেদ্য নীরবতা দিয়েই স্বামী শুদ্ধ
শুরবাড়ির লােকেদের ক্ষিপ্ত করে তুললাম। অপরের সঙ্গে ‘ই’
যেটুকু বা উচ্চারণ করেছি, স্বামীর প্রশ্নের বেলায় ছিলাম
পাষাণের মতাে স্তব্ধ। বেচারার জন্য দুঃখ বােধ না করেছি
এমন নয় কিন্তু কেমন একটা জেলে পেয়ে বসেছিলাে। স্বামীর
চোখে মাঝে মাঝে ফুটে উঠতে অক্ষমের অসহায় হিংস্রতা, তাতে
বিদ্রোহের ভাবটা আমার মধ্যে দেখা দিতে আরও তীব্র হয়ে।
অপরিসীম তিক্ততা নিয়ে ওরা আমাকে পৌছে দিয়ে গেলেন
পিত্রালয়ে। বলে গেলেন বৌ পায়ে ধরে অনুরোধ না জানানাে
অবধি তারা তাকে গ্রহণ করবেন না। অবিশ্যি চাওয়া মাত্র
ধরবার মতাে পদ প্রাপ্তির ভরসাটা সে ধমকের মধ্যে ছিল—
থাকার কারণ যে আমার অপরিণত বয়স সেটা জানিয়ে দিতেও
তাঁরা ক্রটি করেন নি।
পরিবারে ব্যাপ্তভাবে দেখা দিলে একটা অশান্তির ছায়া।
ভাগ্যবিপর্যয়ের মধ্যেও আমার মনে যে ক্ষীণ আলােটুকু
এলছিলাে বাড়িতে পা দিয়ে তাও দপ করে নিভে গেল।
সুকান্তবাবু হঠাৎ বদলি হয়ে চলে গেছেন দিন কয়েক আগে-
আকস্মিক এই বদলির পেছনে তার নিজেরই হয়তাে বা হাত
ছিল। অন্তর ও আবেষ্টনের এই কালাে ছায়াপাতে আমার
জেদ কিন্তু দমলাে না মােটেই। মায়ের চোখের জল, বাবার
স্তব্ধ গাম্ভীর্য, আত্মীয়স্বজনের ক্লান্তিকর উপদেশ উপেক্ষা করে
আমি বাপের বাড়িতেই রয়ে গেল।
ত ম সা
কৈশােরের এই পটভূমিতে হলে যৌবনের আবির্ভাব।
চারদিক থেকে হতাশা আর তিরস্কার করলাে তার অভ্যর্থনা।
দুঃখের চাপে দেহকে কিন্তু ভুললাম না। গােপনে তার যত্ন
নিতাম। কোথায় এই দেহ আর রূপের সার্থকতা ভাবতে
পারতাম না, তবু সুযােগ পেলেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতাম
নিজের বস্ত্রবিমুক্ত দেহের দিকে—মনে হতাে শিশিরসিক্ত
ফুলরেণুর লাবণ্য নিয়ে জেগে উঠেছে প্রতিটি রােমকূপ।
একে একে দু’বছর কেটে গেল—গেল বর্ণবৈচিত্র্যহীন ভাবে।
দিন রাত প'ড়ে প'ড়ে শুধু বই পড়তাম। বাবার লাইব্রেরির
দিশি-বিলিতি সাহিত্য প্রায় শেষ করে এনেছিলাম। ইংরিজি
সাহিত্য বুঝতাম কম পড়তাম বেশি। ভাষাটাকে জয় করার
একটা অদম্য প্রয়াস ছিল ভেতরে। দর্শনেও দাত বসাতে
চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তখন পেরে উঠিনি।
এই আঘাত পেয়েই হক বা যে কারণেই হক, শুনলাম,
স্বামী নাকি সরকারী বড় চাকরির চেষ্টা ছেড়ে ঢুকে পড়েছেন
কলকাতার একটা কলেজে দর্শনের অধ্যাপক হ’য়ে। বাড়ির
সকলের ধারণা ছিল শশুরালয়ের ধর্মনিষ্ঠা আর গোঁড়ামির
জন্যেই আমার এই বিতৃষ্ণা। হয়তাে তা হতে পারতো, কিন্তু
আমি যে অপর পক্ষের দোষগুণ খতিয়ে দেখার দরকারই বােধ
করিনি সে-কথা কেমন করে বােৰাবাে। ভালাে মানুষ হিসাবে
আমার স্বামীর ছিল বিশেষ সুনাম। সকলেই বলতাে এমন
ভালাে মানুষের সঙ্গে না বনবার কি কারণ থাকতে পারে তাঁরা
২
उधना
বােঝেন না। পরবর্তী জীবনেও এ-কথা বহুবার শুনলাম, কিন্তু
এ আমি আজও বুঝলাম না, মেয়েদের মুখ দিয়ে কথাটা কি
করে বেনােয়—ভালাে মানুষ হলেই ভালাে স্বামী হবে। ভাল
স্বামীদের কতটুকু।
স্বামীর চাকরি হয়েছে এখন অনায়াসেই তিনি আমাকে নিয়ে
কলকাতায় থাকতে পারেন—অতএব নতুন উদ্যমে শুরু হলাে
আবার আমার মধ্যে স্বামীর প্রয়ােজনবােধ জাগিয়ে তােলার।
সকলের মুখেই এক কথা, যা হবার হয়ে গেছে এখন এরই সঙ্গে
মানিয়ে নিতে হবে—তা ছাড়া উপায় কি। কেন উপায় থাকবে
? একটা জীবনকে উপায়হীন করবার কি তােমাদের অধিকার
আছে। যা মুহুতে জীবনকে করে ফেলে উপায়হীন, এমন
উপায়কে আঁকড়েই বা আছ কেন। কথাটা শােনা মাত্র আমার
দেহ-মন বিদ্রোহী হয়ে উঠতাে। বই পড়ে পড়ে মনের
নানা প্রকোষ্ঠে যেন বাতি জ্বলে উঠেছিলাে, নিজের সমর্থনে
যুক্তিরও অভাব হতাে না।
এমন সময় এক চিঠি পেলাম সুকান্তবাবুর কাছ থেকে।
এই প্রথম পত্র। বােধ হয় বাবার অনুরােধে প'ড়েই লিখেছেন।
এইটুকু সকলেই জানতাে তাঁর প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা।
খুবই হােট চিঠি। অনুরােধ বা আদেশ তাতে নেই। শেষ
লাইনে লেখা একটি মাত্র উপদেশসহ বা সাহস
যে-কোনাে একটিকে সম্বল করে এগিয়ে চলাে বাবলি, থেমে
থেকো না।
১৮
उपमा
তাইতাে। থেমে থাকবে কেন? সাধারণ নারীজীবনে
যৌবন গেলে আর রইল কি? আখের আগা আর গােড়ার মতো
আর দুটো অংশ তাে মধ্যেরই ভূমিকা আর উপসংহার-একটা
অলাে, অন্যটা রূপহীন বিকৃত রসের আধার মাত্র। স্থির করে
ফেললাম সাহসকেই আমি সম্বল করব। যেভাবেই হক
সার্থকতার পথ খুঁজে বার করতে হবে। কি সেই পথ,
কেমন করে খুজবে, ভেবে দেখার আগেই একদিন বাবা নিজে
এলেন আমাকে বােৰাতে। অন্য বারের মতাে প্রতিবাদ না তুলে
কি ভেবে যেন মৌন হয়ে রইলাম। সম্মতির প্রথম আভাস
পেয়ে বাবা চলে গেলেন কলকাতায়, ফিরে এলেন স্বামীকে
সঙ্গে নিয়ে।
সকলের স্বস্তির নিঃশাস পিঠে নিয়ে এবার আমি সত্যি-
সত্যি রওনা হলাম স্বামীর ঘর করতে। এখান থেকেই শুরু
আমার জীবন ও যৌবনের অভিযান।
বড়লােকের রূপসী মেয়েকে তুষ্ট করার ইচ্ছা যে স্বামীর
মধ্যে আছে তা কলকাতার বাড়িতে পা দিয়েই টের পেলাম।
আমাদের বাড়ির অনুকরণে ছােট্ট একটি বসার ঘর তিনি
সাজিয়ে রেখেছেন। খুব অসুবিধা বােধ করলে অভ্যাস
অনুযায়ী খাবার ব্যবস্থাটা আমি টেবিলেও করতে পারি, বাড়ি
পেীছে এ অনুমতিটাও তিনি দিয়ে রাখলেন। অর্থাৎ পারি-
বারিক গোঁড়ামিটা তার মধ্যে তেমন তীব্র নয় বা সেটা আমার
ন্য বর্জন করতে তিনি প্রস্তুত।
ত এ না অন্তরে যাঁকে গ্রহণ করবার তা করেছি, দেহটা ওরই হাতে সঁপে দেব এটা স্থির করেই এসেছিলাম। আস্তে আস্তে মনও যদি বদলায়, ভালাে। স্বামীর আদর তাই বেশ সহজ হয়েই গ্রহণ করলাম। প্রথম রাত্রির একটা ঘটনা স্মরণ হলে আজও হাসি পায়, ভাগ্যের বিড়ম্বনা দেখে সেদিন কিন্তু দুঃখও হয়েছিলাে। শারীরিক সান্নিধ্যে একটা দুর্বল মুহূর্তে মুখের কাছে মুখ নিয়েছি, দামী চমকে মুখ সরিয়ে বললেন, না, মুখে না। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, কেন? বললেন, ‘মূখ এটো হবে যে। সমস্ত স্নায়ুকে তিক্ত করার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু আমি যেন সব কিছুর জন্য তৈরি হয়ে ছিলাম—খিলখিল করে হেসে উঠলাম। লজ্জা পেয়ে বললেন, না ঠিক তা নয়, আমার দাত খুবই খারাপ কিনা বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে ওর সংস্কারের পরিচয় আমি পেতে লাগলাম। অমাবস্যা, পূর্ণিমা, ভাদ্রমাস এ সবে দাম্পত্য- জীবনের নিবিডতম সংসর্গ তিনি এড়িয়ে চলতেন নানা অছিলায়। আমি বুঝেও না বােঝার ভান করতাম। খাওয়া সম্পর্কে তার বাছবিচার ছিল নিষ্ঠাবান হিন্দুর। কিন্তু আমার রুচিতে আপত্তি তুলতে আসছেন না। সব চেয়ে সচেতন ও সতর্ক ছিলেন নারীদেহের পবিত্রতায়। পরপুরুষের ছোঁয়া লাগলেই তা কলঙ্কিত হয়ে যায় এমনি ছিল তার মনােভাব। পথ চলতে কার সনে আমার গা ঠেকে গেলেও তিনি যেন শিউরে উঠতেন। সতীদের প্রতি ওঁর এই শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসকেই একদিন আমি বেছে নিয়েছিলাম আমার মুক্তির সহায় ব'লে—সে কথা এখন থাক।
उपमा নিষ্ঠার সঙ্গে স্ত্রীর কর্তব্য করে চলেছি দেখে আত্মীয়স্বজন, এমনকি স্বামীও যখন দুষ্ট, আমার মধ্যে তখন ধীরে ধীরে জমে উঠছে একটা বিষাক্ত বিজোহ। স্বামীর হিয়ানিকে, সমগ্র পুরুষ জাতটাকে এলােপাথাড়ি আঘাত আর অপমান করতে সে উদ্যত। নিজের এই রূপ নিজের কাছে ধরা পড়বার আগেই তার ক্রিয়া শুরু হলাে। ওর এক মামাতাে ভাই আসততা আমাদের বাড়ি, প্রায় ওরই সমবয়সী। তাকে আমি কাছে টানলাম শুধু চোখের দৃষ্টি আর চালচলন দিয়ে। উনি কলেজে চলে যেতেন, আমরা দু’জনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মূখখামুখী বসে থাকতাম। একটা মাত্রায় পৌছে ও আর নিজেকে সামলাতে পারলাে না। একদিন আমায় হাত চেপে ধরে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে বসলাে। বর্ণ চোরার মতাে মুহূতে আমার মূর্তি বদলে গেল। রূঢ় ভাষায় তাকে তিরস্কার করলাম, অনাবিল কােহকে এমন কদর্য অর্থে গ্রহণ করেছে বলে। লােকটি সিক্ত চােখে পায়ে হাত দিয়ে মার্জনা চেয়ে বিদায় নিলাে। একটা পাশবিক উল্লাসে মনটা আমার নেচে উঠলাে। এর পর থেকেই শুরু হলাে এই খেলা। আত্মীয়-বন্ধু-যুবক- পৌঢ় নির্বিচারে কাছে টানতাম আর আঘাত দিয়ে সরিয়ে দিতাম। দিদির সেই খেলার রাজ সংস্করণ। যার ছিচকে রূপ দেখেই একদিন ঘণায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। যাকে আকর্ষণ করতাম, সে যখন আমার গ্রহণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিবেদন করতে উচ্চত, তখন তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে আমন্ত্রণ করতাম চা-এ ।
স্বামীর অনুপস্থিতি বুঝে সময় নির্বাচনটা হতাে ইঙ্গিতের
একটা অজ। এ গ কেউ তারা গলাধঃকরণ করতে পারে নি।
কেউ বলেছে দেবী,কেউ ক্ষোভে অপমানে মুখচোখ রক্তবর্ণ ক'রে
উঠে পড়েছে, কেউ বা দুটো রূঢ় কথা বলে বেরিয়ে গেছে। সব
অবস্থায়ই আমার উল্লাস ছিল সমান। এ অভিজ্ঞতা থেকে
এটা আমি জেনেছিলাম, কোনাে মেয়ের সচেষ্ট আকর্ষণ অবহেলা
করতে পারে এমন পুরুষের সাক্ষাৎ কদাচিৎই মেলে—আমি
অন্তত পাইনি। তবু জানি এ নিয়ে গুরুতর একটা কিছু ঘটে
গেলে আইনগত শান্তিটা পড়বে পুরুষেরই অংশে। পুরুষের
সমাজ—তাই সমগ্ৰ দায়িত্বটা সে রেখেছে নিজের ঘাড়েই।
নারী যখন বস্তু বলে গণ্য হতাে এ আইনের জম্মু তখন—যখন
তাকে নিয়ে লড়াই চলতে এবং বস্তুরই মততা সে হতে বিজেতার
করতলগত। আজ আমরা ব্যক্তি হয়ে সে আইনেরই বাঁধন
সইছি। ভেবে হাসি পেতে।
সংসারের কাজে বড় একটা হাত হোয়াতাম না। সবই ছাড়া
ছিলাে ঠাকুর চাকরের হাতে। কেবল ঐ খেলা নিয়েই কেটে গেল
আরাে তিনটে বছর। এক-এক সময় গ্লানিতে মনটারে উঠতো।
নিজেকে মনে হতাে বড় একা। সন্তানের আবির্ভাৰ ঠেকিয়ে
রেখেছিলাম সযত্ব এয়াসে—পাছে দেহের বাঁধন শ্লথ হয়ে পড়ে।
এবিষয়ে স্বামীকে বাধ্য করতে কম বেগ পেতে হয় নি। কিন্তু ঘুরে
ফিরে মনে হতে লাগলাে, কি হবে এই দেহ আর রূপ নিয়ে, কিসের
এতে এ পসরা সাজিয়ে আমি দিন গুনছি—কি আমি চাই।
उधमा
আমার এ প্রশ্নের জবাব দিতে গ্য এবারও যেন প্রত
হয়েই ছিল।
কিছুদিন হলাে স্বামীর কাছে দর্শনশাস্ত্রের পাঠ নিচ্ছিলাম,
তারই একটা বই-এর পাতা ওলটাচ্ছি, চাকর এসে একখানি
চিঠি হাতে দিলাে। জানালাে, যে বাবুটি চিঠি নিয়ে এসেছেন
তিনি বাইরের ঘরে অপেক্ষা করছেন। ঠিকানার হস্তাক্ষর
দেখেই চিনেছিলাম সুকান্তবাবুর চিঠি। তাড়াতাড়ি খুলে পড়লাম।
সংক্ষিপ্ত খবর। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে কলকাতায় এসেছেন।
অবসর মতো একবার যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি—তাড়াহুড়োর
কোনাে দরকার নেই, সে-কথাও লিখেছেন।
বহুদিনের সঞ্চিত অভিমান গুমরে উঠলাে। জীবনের
দিনগুলাে যার জন্যে একটানা অবসর দিয়ে ভরিয়ে রেখেছি
তিনি লিখছেন তাঁরই জন্যে অবসর খুঁজতে। অভিমান ঝেড়ে
উঠে বসলাম। কি অসুখ, কতদিন থাকবেন কলকাতায়
ছুটলাম বাইরের ঘরে পত্ৰবাহকের সঙ্গে দেখা করতে।
ঢুকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। যে যুবকটি উঠে দাড়ালাে,
বলে দিতে হয় না সে সুকান্তবাবুর ভাই। সব চেয়ে বেশি মিল
চোখের চাউনিতে সেই চােখ।
এবার মুহুতে এ দৃষ্টির বিশেষত্ব আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে
ধরা দিলাে। এতে কবি নেই, নেই প্রেমালুতা। শুধু সূক্ষ্ম
একটা রেখা যেন টেনে দেয় নারী আর পুরুষের মাঝখানে।
অশরীরী একটা বৈশিষ্ট্যের আভাস জেগে থাকে আর জাগিয়ে
उपमा
দেয়—তুমি নারী, আমি পুরুষ। তাতে দম্ভ বা কৃপা নেই,
নেই আবেদনের দৈন।
একে সুকান্তবাবুর ভাই তাতে আবার তাঁরই মুখের
প্রতিচ্ছবি ওঁর মুখ। লােকটিকে আপনার ভেবে নিতে সময়
লাগলাে না। নাম সুজিত। বয়স সাতাশ কি আটাশ হবে।
দৈর্ঘ্যে সুকান্তবাবুর চেয়ে সামান্য বেশি। গলা খুলে কথা বলে,
উচু গলায় হাসে। কথা বলার সময় চোখের দিকে খুব কমই
তাকায়। ওর দাদার সঙ্গে আমার আত্মিক পরিচয়ের কথাটা
স্মরণ করে পর্যায়ে একটা গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে লাগলাম।
নবাগত ভদ্রলোকের প্রাপ্য সম্মানের চেয়ে মেহের ভাবটাই
রইলাে বড়। প্রশ্নের পর প্রশ্নে বেচারাকে বিব্রত করে
তুললাম। শুনলাম, সুকান্তবাবু কঠিন হাঁপানি রােগে ভুগছেন।
খুবই কাতর অবস্থা। দীর্ঘ দিনের ছুটি নিয়েছেন—কাজে যােগ
দেবার ইচ্ছা উৎসাহ কোনােটাই নেই। সুজিত বারবারই বললাে,
দাদা কেমন নাকি হয়ে গেছেন। কোনাে বিষয়েই আর তার
আগ্রহ নেই, এমন কি স্বাস্থ্য ফিরে পাবার দিকেও না।
ব্যথায় মনটা টনটন করতে থাকে। ইচ্ছে হয় সব ভেঙ্গে-
চুরে ছুটে যাই ওঁর কাছে। তবু অপেক্ষা করতে হয় স্বামীর
অনুমতির। সুজিতকে বসিয়ে রাখলাম। অবিশ্যি জানতাম
ও অমত হবে না। সুকান্তবাবু এবীণ মানী লােক, তা ছাড়া
তিনি যে বাবার বিশেষ বন্ধু এবং আমাদের পরিবারের একজন
মুরুব্বিবিশেষ তা উনি ভালােই জানতেন।
उपना
একজন অপরিচিত যুবকের সঙ্গে বেরােতে দিতে স্বামীর
মন বুঝি সরলাে না, তিনিও সঙ্গে গেলেন পৌঁছে দিতে। কাজের
তাড়া ছিলাে,কান্তবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করেই তিনি বিদায়
নিলেন। আমি ঘরে ঢুকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম—এই সেই
দেহের রুগ্নাবশেষ! বুকে মালিশ দেওয়া হচ্ছিলাে, মনে হলাে
বুক নয় তত ছােট একটি কারখানা ঘর। যেখানে যে কলটি
নড়ছে বাইরে থেকে বলে দেওয়া যায়। মাথায় টাক পড়ে
গেছে। যে ক’গাছি চুল আছে তার বেশির ভাগই পাকা।
মালিশ বন্ধ করে স্ত্রীকে কি একটা কাজে বাইরে পাঠালেন।
বুকের ওপর চাদরটা টেনে নিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসে
বললেন, ‘কি বাবলি, একেবারে চুপ করে গেলে যে-
তবু কোনাে কথা আমার মুখ দিয়ে বেরােলাে না।
একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, 'সহজ মনে সব মেনে নিতে
পেরেছ?
মাথা নেড়ে জানলাম, না।
বড় রকমের একটা খাস টেনে নিয়ে খুব ধীরে-ধীরে সেটা
ছাড়লেন। অনেক কথাই বলতে ইচ্ছে হয়, বলে লাভ কি-
থেমে থেমে সুকান্তবাবু বলতে লাগলেন। বাে দেরিতে তােমার
সঙ্গে দেখা হয়েছিলাে বালি—তখন আর কোনাে উপায়
ছিল না—সেই উপায়হীনতার কথা। দুঃখের মধ্যে আমার
মাথা বলা করে ওঠে। ভাবতে গিয়ে যখন দেখলাম আমি
সবই করতে পারি কিন্তু অমলকে মুক্তি দিতে পারি না—'অমল
एबगा
এর স্ত্রীর নাম। সে অধিকার আমার হাতে নেই। তখন
-তখন বাধ্য হয়েই কথা শেষ না করেই থামলেন। একটু
চুপ করে থেকে ম্লান হেসে বললেন, ‘মনে ও দেহে এমন দুটো
নােগই সংগ্রহ করলাম যা শেষ করে ফেলবে না, ভােগাবে।
কোনােটার হাত থেকে রক্ষা পাবার কোনাে উপায় নেই, কেবল
চেপে রাখতে পারি মাত্ৰ-কল্প চোখে অর্থহীন দৃষ্টি মেলে
তাকিয়ে রইলেন বাইরের দিকে।
চোখের জল আর গােপন রাখতে পারলাম না। কী চেপে
আসছিলাে উচ্ছসিত কান্নয়, সামলে নিতে উঠে গেলাম
বারান্দায়।
ও-বাড়ি থেকে যখন বেরােলাম রাত হয়ে গেছে। সুজিতই
সঙ্গে এলে পৌঁছে দিতে। ট্রামের ভিড়ে গা ঢােকাতে আর
ইচ্ছে হলাে না। বললাম, “বেশি তত দূর নয়, চলুন এ পথটুকু
হেঁটেই যাওয়া যাক।
মন ক্রমে শান্ত হয়ে এলাে। দুঃখের ঘন বাপ কেটে
যেতে স্পষ্ট অনুভব করলাম, সুকান্তবাবুর দিকে যে তীব্র টান
আমার ছিল সেটা কোথায় যেন ঢিলে হয়ে গেছে। লােকটির
জতে মনের মধ্যে জেগে আছে একটি করুণার সুর। কেন
এমন হলাে? মনপ্রাণ দিয়ে যাকে চেয়েছিলাম তার সুস্থ রূপের
স্বাদ আমি পাই নি, তাই বুঝিবা তার পরিত্যক্ত এই
অবলম্বনটাকে আঁকড়ে থাকতে পারছি না। যে আমাকে টেনে
ছিল সে আজ নেই—নেই সেই মন, সেই দেহ। মধুর কোনাে
২৬
স্মৃতির শৃলেও সে আমাকে জড়িয়ে যায় নি এ কঙ্কালের সঙ্গে।
আমার মনের এত দিনকার একমাত্র অবলম্বন আজকের এই
আঘাতে যেন ধসে পড়েছে। অবসন্ন পদক্ষেপে ধীরে ধীরে
এগিয়ে চললাম সুজিতের সঙ্গে। সারাটা পথ একটি কথা
বলেছি বলে মনে পড়ে না।
বাড়ীর দরজায় পৌছে সুজিত বললাে, আমি তাহলে
আসি এখন
সঙ্গীর অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন করে সচেতন হলাম।
দাড়িয়ে বললাম, একটু বসবেন না— চোখ তুলে তাকাতেই
সুজিতের মূখ চোখে পড়লাে। মন যেন উৎসাহে উদ্দীপ্ত হয়ে
উঠলাে। এইতাে—এইতাে সে দাড়িয়ে আছে তােমার সামনে,
যাকে তুমি পাঁচ বৎসর ধরে কামনা করে আসছে। সেই চোখ,
সেই বুদ্ধি ও প্রাণের দীপ্তি।
পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইলাম সুজিতের মুখের দিকে।
সুজিত কেমন একটু অবাক হয়েইনমস্কার জানিয়ে বিদায় নিলাে।
আমি কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চল হয়ে রইলাম সেইখানে।
সুকান্তবাবুর অসুখের সূত্র ধ'রে ওদের বাড়ি নােজই
প্রায় যেতে লাগলাম। সুকান্তবাবুর শারীরিক অবস্থার খবরা-
খবর নিয়ে চলে যেতাম সুজিতের ঘরে। সুজিত চিত্রকর।
ঘরের এখানে-ওখানে সব ছবি দাড় করানাে। অল্প সময়ে
সে নামও করেছে। তার ছবিতে নাকি প্রতিভার পরিচয়
২।
৩ ম না
রয়েছে। গেলেই শুরু হতে ছবির আলােচনা। তার ব্যাখ্যার
কিছু বুঝতাম, কিছু বা শুনতাম বক্তার কথা শােনবার জন্যেই।
অজিতের চোখের দিকে যখনই চোখ পড়তে, কেবলই মনে হতাে,
এ খেলার সামগ্রী নয়। যাদের নিয়ে খেলা চলে তাদের
আমি অনেক দেখেছি। এ তাে সে-জাতের নয়। এ যান
হাত পাতবে অঞ্জলি ভরে আদায় করে নেবে। ভয়ে বুক কেঁপে
উঠতাে, আবার না গিয়েও থাকতে পারতাম না।
কি ভেবে স্বামীকে সঙ্গে নিতে শুরু করলাম। সান্ধ্য
ভ্রমণের নামে ওকে নিয়ে বেরােতাম, ফেরার পথে কতব্য
হিসেবেই যেন স্মরণ করিয়ে দিতাম সুকান্তবাবুর শারীরিক
খবরটা একবার নিয়ে যাবার কথা। স্বামী মােটই মিশুক নন,
তবু সুজিতের সঙ্গে মােটামুটি তাঁর বেশ ভাব হয়ে গেল।
স্বামীর সাজপােষাক সম্পর্কেও এ সময় আমি অকস্মাৎ
অত্যধিক সচেতন হয়ে পড়লাম। নিজে বাজার ঘুরে পছন্দ
মতাে তঁার ধুতি-পাঞ্জাবি-জুতাে-রুমাল সব কিনেকেটে আনলাম।
চুল আচড়ানন থেকে সামান্য চলনটির প্রতি রইলাে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
সুজিতের সামনে ওর নিষ্প্রাণ শান্ত প্রকৃতি আর সেকেলে
হাবভাব নিয়ে নিজেকে বড়ই লাঞ্ছিত বােধ করতাম। অহেতুক
এক-এক সময় স্বামীর উচ্চ ডিগ্রির উল্লেখ করতাম সুজিতের
সামনে থেকে থেকে একটা দৈন্য বােধ কেবলই পীড়া দিতাে।
স্বামী খুশিই হতেন তাঁর প্রতি আমার এই যত্ন ও নজর দেখে।
অবিশি আকস্মিক এই পরিবর্তনের কারণ বুঝতে না পারার
ত ৰ
অস্বস্তি তাতে থাকতাে। মাঝে-মাঝে বলতেন, ব্যাপার কি
বলাে তাে? তুমি যে আমাকে নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছ, বাবু না
বানিয়ে ছাড়বে না দেখছি।
কিন্তু কিছুতেই নিজেকে রােখা গেল না। স্বামীয়ের দুর্ভেদ্য
প্রাচীর ভেদ করে যে তরল বয়ে গেল, তা সুজিতের মনেও
আলােড়নের সৃষ্টি করেছে আমার চোখে গােপন রইলাে না।
শুরু থেকেই সুজিত সচেষ্ট একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলছিলাে,
স্বামীর সঙ্গে বন্ধু হতে তার মাত্রা আরাে বাড়িয়ে দিলাে।
তার এই কত ব্যবুদ্ধি অপমান করতে আমার অন্তরাত্মাকে।
সেদিন দুপুরে একা চলে গেলাম ওদের বাড়ি। গিয়ে নিরাশ
হলাম, সুজিত বাড়ি নেই। হঠাৎ কি খেয়াল হলাে, টেবিল
থেকে লাল পেসিলটা নিয়ে ওর শিথানের একটু নিচে বিছানার
চাদরের ওপর লিখলাম স্যরি', তারপর একখানা বইএর তলায়
ললাটা চাপা দিয়ে বাড়ি চলে এলাম।
কিছুক্ষণ পরেই এলাে সুজিত। আপনি আমার বিছানায়
কি সব আঁকিবুকি ক'রে এসেছেন। হাসতে হাসতে বললাে।
‘আমি—না তাে। অবাক হবার ভান করলাম। বসুন।
সুজিত বসলাে। সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল তার মুখের
ভাৰে। আচ্ছা, আমার সঙ্গে দেখা না হলে সত্যি আপনি
খিত হন?
নয়তাে কি মিথ্যে লিখে এসেছি। স্থির দৃষ্টি মেলে
তাকালাম ওর চোখে। এই প্রথম সুজিতও নিষ্পলক চেয়ে
তম সা রইলাে চোখে চোখ রেখে। তারপর ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিলাে। ওর মুখেচোখে ফুটে উঠলে সেই ভাৰ—কিন্তু উপায় নেই। এ কথার আভাসেও আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। মনের আলা চেপে রেখে বললাম, আপনি হাত দেখতে জানেন, দেখুন তাে আমার হাতটা। বাঁ হাতখানা বিছিয়ে ধরলাম ওর সামনে। এক গণক আমার হাত দেখে কি বলেছে জানেন—বিশ বছর বয়সে আমার জীবনে নাকি একটা ওলটপালট কাণ্ড হয়ে যাবে, এমন কি বিবাগীও হয়ে যেতে পারি—দেখুন তাে সত্যি কিনা। এ বিদ্যে আমার জানা নেই। বিবর্ণ হেসে সুজিত বললাে। ওর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ উঠে দাড়িয়ে বললাে, আমি এখন যাই- সুজিত চলে গেল। স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। যৌবনের প্রান্ত থেকে যে-মানুষ কামনা করে আসছি এই তাে সেই মানুষ। তাকে বেঁধেও বাঁধতে পারছি কই-মাঝখানে উপায়- হীনতার দুস্তর। সে-বাধা লঙ্ঘন করার সাধ্য ও সাহস ওর মতাে পুরুষের আছে-কিন্তু আমার, আমিও তাে সাহসকে সম্বল করবে ব'লেই বেরিয়েছিলাম। পরের দিন দুপুরেই আবার দেখা হলাে। আমি গিয়ে উপস্থিত হলাম ওর ছবি আঁকার ঘরে। অসমাপ্ত একটা ছবির সামনে সুজিত বসে আছে তুলি হাতে। কি ভাবছিলাে সেই জানে। আমি যেতেই তুলি রেখে উঠে দাড়ালাে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। ধরা গলায় সুজিতই প্রথম সুরু করলাে,
उधना
আপনাকে আপনাকে একটা কথা বলবাে নিজে একটা
চেয়ারে বসে বললাে, বসুন-কাল থেকে কি ভাবে যে আমার
সময় কেটেছে
সুজিতের মুখচোখ আর কণ্ঠস্বরের স্বাদ পেয়ে হঠাৎ আমার
মধ্যেকার সেই খেলােয়াড়টা জেগে উঠলাে। একটু আঘাত
করার লোভ সামলাতে পারলাম না। মুখের ভাব যথাসম্ভব
স্বাভাবিক করে নিয়ে বললাম, আপনি সেন্টিমেন্টাল হয়ে
পড়ছেন মনে হচ্ছে।
মুহূতে সুজিতের মুখ লাল হয়ে উঠলাে। একটু দম ধরে
থেকে বললো, হ্যা, সেন্টিমেন্টালই বলতে পারেন—এটা প্রকাশ
করে আপনাকে সম্মানিত করলাম। একটু থেমে ব্যঙ্গের সুরে
বললাে, আপনার তরফটা যদি অস্বীকার করেন তাে বলতেই
হবে, প্রেম আপনার কাছে প্রাণের বস্তু নয়, নিছক আর্ট মাত্র।
‘কোনাে কিছুকে আর্ট করে তােল তাে কৃতিত্বেরই কথা।
একটু হাসলাে। আর্ট চলে খাবার তৈরিতে, খাদ্যে
নয়—গােটা খাদ্যটাই যদি আর্ট হয়ে ওঠে, তাতে স্বাদই থাকবে
প্রাণ, থাকবে না, তেমনি—থাক এ নিয়ে আলাচনা করতে
আমার প্রবৃত্তি নেই। তার মুখে দেখা দিলে বিতৃষ্ণা।
আপনি অতিথি, আপনাকে যেতে বলতে পারি না, আমিই
যাচ্ছি— সুজিত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
এ কি করে বসলাম। ছুটে গিয়ে ওর পথ আগলে
দাড়ালাম। মুখ তুলে চেয়ে রইলাম ওর চোখের দিকে। একটু
বুৰি কঁপছিলামও। গলা চেপে আসছিলে, অস্ফুট স্বরে বললাম, বাধা দেওয়া যে আমার কর্তব্য, সেটুকুও বােঝ না ফিরে এসে ধপ করে নিজের আসনটায় মুখ গুজে বসে পড়লাম। সুজিত একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাে। দুজনের মাঝে একটা টিপয়। তাতে দুটো কনুই রেখে সুজিত চেয়ে রইলাে আমার দিকে। আমি মুখ তুলতেই চোখােচাখি হলাে। দুজনেই স্থির হয়ে রইলাম। ওর কপালের শিরাগুলাে স্ফীত হয়ে উঠেছে উত্তেজনায়। মনে হলাে বিরাট একটা শক্তি স্তব্ধ হয়ে আছে আমার সামনে, বাঁধটা সামান্য একটু ভেঙে দিলে মুহূর্তে আমাকে ভাসিয়ে নেবে। টিপয়ের ওপর একটা খড়কে পড়ে ছিল। তার এক মাথায় সামান্য লালচে পানের দাগ। ইচ্ছে করেই ওটা তুলে ধরলাম মুখে দেবার মতাে করে। সুজিত বললাে, এটা আমি মুখে দিয়েছি ওর কথা যেন কানেই যায় নি এমনি ভাব নিয়ে খড়কেটা মুখে পুরে উঠে দাড়ালাম। আমি যাই—'পা বাড়াতেই সুজিত এগিয়ে এসে তার সব শক্তি নিংড়ে আমাকে তার বুকের ওপর জড়িয়ে ধরলাে। পরের দিন খুবই সেলেছিলাম মনে আছে। আঁটো ছোেট জামার ওপর নেট-এর একটা ব্লাউস, জর্জেট-এর ঝুলে পড়া শাড়ির গা বেয়ে ফুটে উঠেছে দেহের প্রতিটি বক্ররেখা- আঁচলটাকে গুটিয়ে বুকের ওপর দিয়ে টেনে নিয়েছি বেল্ট-
এর মতাে :
ঘষা-মাথায় চুলগুলাে কপালের সামনে অলক
হ'য়ে উড়ছে। সুজিতের শিল্পী-চোখ যে মুগ্ধ হবে সে বিষয়ে
আমি নিশ্চিত ছিলাম।
সুজিতের ঘরে ঢুকলাম। দু’হাত বাড়িয়ে আমার দুটো কাঁধ
চেপে ধরে বিহাল দৃষ্টিতে সে চেয়ে রইলাে। তার আঙ্গুলগুলাে
আমার কাঁধের নরম মাংসের মধ্যে ক্রমে যেন ডুবে যাচ্ছিলাে।
স্নায়বিক উত্তেজনাকে ছাপিয়ে উঠলাে শারীরিক ক্লেশ। হঠাৎ
তার হাতের হিচকে টানে শাড়ির আঁচলটা খসে পড়লাে।
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলাে একটা চাপা আর্তনাদ-ব্যথাকে
অস্বীকার করে এতক্ষণ যা গলায় আটকে ছিল। দু’হাত বুকে
চেপে বসে পড়লাম।
কিন্তু সুজিতের শক্তির কাছে হার মানতে হলাে। পাড়
করিয়ে দিয়ে আদেশের সুরে বললাে, 'বাধা দিও না বলি।
আকস্মিক এই আক্রমণে আমার সভ্য মন ছিছি ক'রে উঠলাে।
কিন্তু পুরুষ-কামনার বর্বর প্রকাশের প্রতি নারী মনের গুপ্ত
লােভটা ভয়-ভাবনার তলায় বসেও বেশ যেন খুশি হলাে।
লুণ্ঠনের এই অবিমিশ্র আগ্রহে নারীত্বের যে স্বীকৃতি কোনাে
শঙ্কার বাইরে নারী হয়ে তাকে বুঝিবা অৰীকার করা যায় না।
নিমোক মুক্ত কম্পিত দেহে আমি তখন শুধু ভাবছিলাম এর
পরের স্তরে নিজেকে আমি বাঁচাই কি করে।
। হঠাৎ কি ভেবে সুজিত একটু দূরে সরে গেল। তী দৃষ্টি
বুলিয়ে নিলাে আমার সকল অঙ্গের ওপর দিয়ে। ক্রমে তার মুখ
থেকে কামনার ছায়া কোথায় সরে গেল। যেমন দাড়িয়ে আছ তেমনি থাকে। বাবলি। বলেই সে তুলি নিয়ে বসলাে। ওর রত- মাংসের মানুষটা এমন করে হার মানলাে ওর শিল্পী মনের কাছে, বিষয়টা আমার নারী-চরিত্রের কোথায় গিয়েকটার মতবিধলাে। ক্রমে দু’জনের পরিচয় সান্নিধ্যের শেষ সীমায় গড়িয়ে গেল। অতি গােপন সত্যও তার আভাসছড়িয়ে দেয় পারিপার্ষিকে। স্বামীর মনে গুরুতর সন্দেহ দেখা দিলাে। বাধ্য হয়েই নকল আদরে তাকে আচ্ছন্ন করে রাখলাম। এটা আমি দেখেছি প্রেমের ব্যাপারে পুরুষকে প্রতারণা করা সহজ। অবিশ্বাস করায় যে আত্মাৰমাননা সেটা ওর সইতে পারে না, বিশ্বাস করতে পারলেই যেন বেঁচে যায়। কিন্তু প্রেমই হলাে আমাদের প্রাণ—তাই তার অস্তিত্বে আঘাত পড়লে মানসম্মান ভুলে আমরা মরিয়া হয়ে উঠি। এই গােপন জীবন হয়তাে চলতে পারতাে আরাে কিছুকাল। একদিন সুজিত বললাে, আর নয় বাবলি, এ লুকোচুরি আর সহ্য হয় না নিজের ওপর নিজে এদ্ধা হারাচ্ছি। ‘কি করতে চাও? শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলাম। সকলের চোখের সামনে আমাদের এ সম্পর্ক স্বীকার করতে চাই—সাহস থাকে এগিয়ে এসাে, নয়তাে এখানেই হেদ টেনে দাও। অন্তরে আমি উল্লসিত হয়ে উঠলাম। এই তাে এসেছে যোেগ, অবাঞ্ছিত বন্ধনে চরম আঘাত হানবার। নিজের সাহস
উপলব্ধি করে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, কিন্তু
পালিয়ে আমি যাব না—মূখের সামনে বলে-কয়ে বিদায়
নবা।'
‘ত পারবে না বাবলি—তােমার স্বামী তােমাকে ছাড়বে
না। সবাই চারদিক থেকে ঘিরে দাড়াবে সাত-পাকের সম্মান
বাঁচাতে।
‘তুমি জান না আমার স্বামীর গোঁড়ামির মাত্রা—একবার
যদি আমাদের সম্পর্কের সীমা জানতে পারেন তাে আমাকে আর
আঙুল দিয়েও তিনি ছোঁবেন না—আমি বলে-কয়েই আসবে।
পরের দিন রাত ন'টার মধ্যে শেষ বিদায় নিয়ে জিতের
সঙ্গে এসে মিলবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলাম।
দরকারী কথার নাম করে স্বামীকে সেদিন বিকেলে বেরুতে
দিলাম না। আমার মুখের অবস্থা দেখেই চিনি ভড়কে
গিয়েছিলেন, বার-বার জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, কি কথা। ঘরে
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। উনি উঠে বাতিটা বলতে
গেলেন, আমি আপত্তি জানালাম। আবছা অন্ধকারে বসে
ব্যক্ত করলাম আমার জীবনের সত্য। স্বামীর মূখ ভালাে
দেখতে পেলাম না। তিনি উঠে ঘরের মধ্যে অনেকক্ষণ
পাইচারি করলেন। কাছে এসে রুদ্ধস্বরে বললেন, যা হবার
হয়ে গেছে, সব ভুলে যাও—এখন থেকে নতুন জীবন শুরু
করতে চেষ্টা করে কথা দাও আমাকে, তা-ই করবে-কাছে
এসে সজোরে হাত চেপে ধরলেন।
আমার দেহ ও মন থরথর করে কাঁপছিলাে। তা হয় না
-আমাকে যেতেই হবে—এর পরও তুমি আমায় গ্রহণ করবে?
করবে।
লােকর কাছে এর আগের সংস্কারও হার মেনে
গেছে—ভীরুতা দেখে অশ্রদ্ধায় মন ভরে গেল। কি ভাবে
সময় পার হলাে টেরও পাই নি। ঢং ঢং করে নটা বাজলাে।
আবিষ্ট স আঘাত খেয়ে জেগে উঠলাে। দাড়িয়ে বললাম,
আমি যাই
স্বামী জড়িয়ে ধরলেন। উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে।
আমার নিজের সর্বনাশ না করে ছাড়বে না বুঝি—তুমি কি
পাগল হ'লে। ঘন নিশ্বাস পড়ছে তাঁর। চেপে চেয়ারটায়
বসিয়ে দিলেন।
মাথা ঘুরছে—অনেক চেষ্টায় চেতনাকে আঁকড়ে রইলাম।
সময় পার হয়ে গেছে তারে পরেও ব'য়ে গেল অনেকক্ষণ।
আমি যে কথা দিয়েছি—যেতে আমাকে হবেই। পরাজয়ের
অপমান বরং ভালাে—সংগ্রামে টি রাখলে নিজের মনকে
বুঝাব কি দিয়ে। মরিয়া হয়ে নির্মম অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ
করলাম। ওর সন্তান আমার শরীরে—এর পর নিশ্চয়ই
জিভ জড়িয়ে আসছিলাে, মুখ থেকে আর কথা সরলাে না।
ক্রোধ মেশানাে অসহিষ্ণু স্বরে স্বামী বলে উঠলেন তোমাকে
যখন নিচ্ছি সবই আমি মেনে নেব, এখন থাক ওসব কথা।
হঠাৎ স্বামী দেবতা হয়ে ওঠেন নি আমি জানি। এ তাঁর
মহত্ব নয়, শুধু মান বাঁচান। ভয়ের এই নােংরা রূপ দেখে
ঘৃণায় মনটা মােচড় দিয়ে উঠলাে।
কিছু একটা বলবার চেষ্টা করছি এমন সময় দরজায় কড়া
নড়লাে। বাইরের ঘরেই আমরা ছিলাম। সেখানে কাউকে
আসতে দেবার মতাে অবস্থা তখন নয়। দরজা খুলে উনি বাইরে
গেলেন, ওঁর গা ঘেঁষেই একটি লােক ঘরে ঢুকলাে—ঢুকেই
আলােটা জেলে দিলো। দেখি সুজিত।
স্বামী ছুটে এসে দু’জনের মাঝখানে দাড়ালেন। বিমূঢ়র
মতাে গকিয়ে রইলেন সুজিতের দিকে।
না অনেকক্ষণ বেজে গেছে, তাই জানতে এলাম কোনো
কারণে মত তুমি বদলেছ কিনা। শান্ত স্পষ্ট কণ্ঠে সুজিত
জিজ্ঞেস করলাে।
আমার সমগ্র সত্তা কেঁপে উঠলাে। এতক্ষণ বুঝিবা মেরু
দণ্ডহীন স্বামীকে আঘাত করছিলাম মাত্র। এবার সত্যি সৰ
ছাড়তে হবে। বাতি জন ও জীবনের মুখােমূখী দাড়িয়েও মনের
গভীরতম তলদেশ থেকে একটা আবেদন উঠে মনের মধ্যেই
ছড়িয়ে পড়লাে—ওগাে আমাকে তােমরা ধরে রাখে, একে
অগ্রাহ করার ক্ষমতা আমার নেই। মুখে বললাম, মত আমার
বদলায় নি'বহু শতকের শক্ত মুঠোয় ক্ষীণ একটু আকর্ষণের
মতােই স্তিমিত কণ্ঠ থেকে বেরােলাে, ‘চলো।
স্বামী হাতটা চেপে ধরলেন। সুজিত তেমনি দাড়িয়ে
রইলাে।
ভ ম সা
নিজেকে আর একবার সামলে নিয়ে অনেক কষ্ট বললাম,
‘তুমি যাও—অপেক্ষা করে, আমি ঠিক আসবাে
সুজিত বেরিয়ে গেল। চোখ বুজে বসে পড়লাম।
চাকরকে আড়ালে ডেকে স্বামী কি বললেন জানি না। একটু
পরেই দরজায় মােটর থামার শব্দ হলাে। স্বামী হাত ধরে
টেনে তুললেন, হাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে বললাম, না, আমি
কোথাও যাবে না-জোর করে তােত চিৎকার করবে।
বেশ তাই করাে, তবু যেতে হবে। হিচড়ে টেনে নিয়ে
চললেন।
চিৎকার কিন্তু আমি করলাম না
ট্যাক্সি ছেড়ে দিলাে। চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার
হয়ে আসছিলাে। মাথাটা ঝুলে পড়লাে একপাশে। আবছা
শুনতে পেলাম, স্বামী বলছেন, শেষে যে-কথাটা বললে
অজিত তা জানে?
অচেতন অবস্থায় গলা দিয়ে বেরােলােনা—
স্বস্তির খাসের মতাে একটা শব্দ কানে এলাে—অগাধ
অন্ধকার তখন আমাকে ঘিরে ফেলেছে।
সে কি অন্ধকার—যেন আঁজলা ভ'রে তুলে নেওয়া যায়।
এত মুক্তিৱেলনা
আমি
ভালাে করে আলাে দেখা দেয় নি। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের
সকালে একটি দু’টি লােক এসে জড়সড় অবস্থায় দাড়াতে থাকে
একটি বন্ধ দরজার সামনে। একের পেছনে আর একজন ক্রমে
নরনারী গঠিত এক মানুষ পুরু একটি রেখা ফুটপাথ ধ'রে দীর্ঘ
হতে দীর্ঘতর হয়।
শীতের সকালে শীতবস্ত্রহীন মানুষগুলাে সােজা পাড়াতে
পারে না। কেউ গুটিসুটি মেরে বসে পড়ে, কেউ জড়সড়
অবস্থায় হেলান দিয়ে দাড়ায় দেয়ালে। একটু একটু করে
দিনের আলাে স্পষ্ট হয়। রাস্তায় শুরু হয় লােক চলাচল। পং-
চারীরা ঘাড় ফিরিয়ে দেখে সরকারের বাঁধাদরে চাল কেনায়
খদ্দেরের মজার ভিড়। দেখবার লােক আরও আছে-
আশপাশের বড়-বড় বাড়ির ঝুলবারান্দায় প্রাতরাশ সেরে যে-
সব স্ত্রী-পুরুষ এসে দাড়ায় তারা শুধু দেখে না, রীতিমতাে
উপভােগ করে। লাইনটা যেদিন যত বেশি লম্বা হয় দৃশ্যটা
হয় ততই উপভােগ্য। একেবারে লেজের দিকের লােকগুলে,
দূরদের জন্য মুখ যাদের স্পষ্ট দেখা যায় না, তাদের হয়ে
দু'চারটা সহানুভূতির কথা না বলে এমনও নয়। কারণ তারা
দেখেছে শেষের লােকটিকে পর্যন্ত শেষ অবধি ঠায় দাড়িয়ে
उपना
থাকতে হয়। ত্যক্ত হয়ে সরে কেউ পড়ে না। পড়া বােধ
হয় সম্ভবও নয়—এততা আর ফুটবল বা সিনেমার টিকিট নয়।
এ হলাে সঞ্চয়হীন গৃহের নিত্যখােরাক।
লােকগুলাের বিড়ম্বনা আয় বেড়ে গেল। অসময়ে আকাশটা
ছিল মেঘলা করে। টিপটিপে বৃষ্টি নামলাে। লােকগুলো
নড়েচড়ে উঠলাে। কয়েকটা পুরােনাে ছাতা পটাপট খুলে
গেল লাইনের এখানে-ওখানে। এই নড়াচড়ার সময় কে একজন
ঢুকে পড়েছে লাইনের মাঝখানে-পেছনের জনকয় মিলে তাকে
বের করে দিতে চায়। লােকটাও ভারি বেয়াড়া, সে কিছুতেই
বেরুবে না। একটা গণ্ডগােল বাধিয়ে
দেওয়াই যেন তার
ইচ্ছে—তাতে হয়তাে আরও কিছুটা সামনে স্থান করে নেওয়া
সব হবে।
শীতের শেষরাতে উঠে যারা লাইনে দাড়ায় চাল কিনতে,
ঠায় দাড়িয়ে থাকতে হয় যাদের বেলা বারােটা অবধি, যাদের
লাইনের এখান-ওখান ভেদ করে ভিন্ন দোকান থেকে চড়া দরে
চাল বেরিয়ে যায় মণে-মণে, কোনাে কারণেই যে ক্রোধ তাদের
উদ্দীপ্ত হতে পারে ভাবা যায় না। কিন্তু দেখা গেল রাগ
তাদেরও হয়। এরই মধ্যে থেকে দুচারজন মারমূখ হয়ে
ওঠে। বেধে যায় বড় রকমের একটা হট্টগােল আর ঠেলাঠেলি।
সামনের লােকগুলাে পেছনে পড়ার ভয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে
গিয়ে বন্ধ দরজাটার গায়ে। সবারই মুখে ক্রোধের স্পষ্ট ছাপ।
দরজার উপর যারা পড়েছে আপ্রাণ চেষ্টায় তার পেছনের ধাক্কা
पादि সামলায়-দরজা ভেঙে গেলে যে পড়বে গিয়ে চালের আড়তে ক্রোধে তারা বুদ্ধিভ্রষ্ট হয় না, শুধু কোলাহল করে। উল্টো দিকের একটা পুরােনাে দোতলা বাড়ির জানালায় দাড়িয়ে বিভুপদ দাত খিচিয়ে আপন মনেই বলে ওঠে, ভেড়ার বাচ্চা শালারা-না খেয়ে মরবে তবু গুতেবে না' রু উত্তেজনায় বিষিয়ে ওঠে তার সমস্ত দেহটা। বিড়বিড় করে বকতে-বকতে জানালার সান্নিধ্য থেকে সে স’রে এলাে। হাতল- ভাঙা চেয়ারটা সশব্দে টেনে নিয়ে ধপ করে তাতে ব'সে পড়লাে। মনে পড়লাে, একটু পরে তাকেও গিয়ে দাড়াতে হবে এমনি একটি লাইনের অঙ্গ হয়েসের কয় কয়লার অপেক্ষায়। সে-অপেক্ষা সফল হবে তারও কোনাে নিশ্চয়তা নেই। বিরক্তিতে গা'টা তার রি-রি করে ওঠে। মেজাজের উচ্চতম পর্দা যদি সপ্তম হয়ে থাকে তবে তার মেজাজ তখন সপ্তমে। সব রাগ গিয়ে কেন্দ্রীভূত হতে চাইলে চাকরটার ওপর। কিন্তু পুরো মনটা সায় দিলাে না, ও বেটা গিয়ে দাড়িয়ে থাকলে আর সব কাজ সামলাবে কে। চাপা ক্রোধটা বিরক্তির অসংখ্য ছিদ্রপথ খ’রে ছড়িয়ে গিয়ে তিক্ত করে তুললাে সব কিছু। ইতিমধ্যে এক পেয়ালা চা আর একটা ডিস-এ খান তিন বিস্কুট চাকরটা রেখে গেছে। ডিটার দিকে চোখ পড়তেই জ্ব দুটো তার কুঁচকে গেল। বিস্কুট আর ডি-এর মাঝখানে দোকান থেকে জড়িয়ে দেওয়া কাগজটা। বেটা ইডিয়ট—কদিন যাবৎই সে দেখছে, আজ আচ্ছা করে সমঝিয়ে দেবে—এই ৪১
उपना
সাধারণ বুদ্ধিটা পর্যন্ত ঘটে নেই। কাগজটা টান মেরে সে
হাতে তুলে নিলাে—সেই ম্যাট্রিকুলেশন-এর ইংরেজীর
নােট থেকে আর এক পাতা। কদিন ধরে রােজ সকালে
একঘেয়ে একপাতা করে আসছে—উ, কদিন খেয়ে এই বইটা
সে ফুলবে! গত দু’দিনকার দুটো পাতা তখনাে ঘরের মেঝেয়
পড়ে আছে, চাকরটার ওপর ঝাল ঝাড়বার আর একটা কারণ
জুটলাে—দু’দিন যাবৎ বেটা ঘর ঝাট দিচ্ছে না। বিভুপদ
পাতা দুটো কুড়িয়ে আনলাে। নম্বর মিলিয়ে দেখলাে মানের
গােটাচারেক পাতা মােটে নেই। কী দোকান—তিন দিনে সে
ছাড়া আর চারটি খদ্দের মাত্র জুটেছে। আর জুটবেই বা কি
করে, লোকের কি আর বিস্কুট খাওয়ার মতাে পয়সা আছে।
যে বিস্কুট ছিলাে পয়সায় চারখানা তারই একখানা বিকোচ্ছে
আজ এক পয়সায়। বিকোবেই বা না কেন—যেখান দিয়ে পারছে
মানুষ মানুষের টুটি টিপে ধরছে। অনুবই জুটছে না—আর
বিস্কুট-ব্যাবসায়ীদের হৃৎপিণ্ডটা খুড়ে দেখতে ইচ্ছে হয়
বিভুপদর, সেটা কি বস্তু দিয়ে তৈরি।
ঠাণ্ডা চা—এক চুমুকে বিভুপদ গিলে ফেললো। শুকননা
চওড়া চোয়ালের বিকৃত ভঙ্গিতে বিস্বাদটা মূর্ত হয়ে উঠলো তার
মুখে। চোখ তুলতেই নজরে পড়লাে বাতির ওপর জড়ানাে
দৈনিক কাগজটা-তাপে আর ধুলােয় তামাটে হয়ে গেছে।
যে কোণটা চোখের সামনে ঝুলছে তাতে গলিতকুষ্ঠের বিজ্ঞাপন।
চেয়ারে দাড়িয়ে সরােধে কাগজটায় মারলাে এক টান। ব্যারি
R
थांवि
ব্ল্যাকআউট-আলাে ফেলে অন্ধকারে বসে থাকা, আজ থেকে
সে মােমবাতি বালবে।
কয়লার কথাটা মনে পড়ে-হেঁচকা টানে জামাটা নিয়ে
গায় চড়িয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে। কয়লা নেই,
চাল নেই, নেই জামাকাপড—এমন কি ঘরের বোটাও নেই,
বােমার ভয়ে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে পিত্রালয়ে—নিখরচায় রাখার
একমাত্র আশ্রয়। ছােটছেলে নম্ভর মুখটি মনে পড়ে, বিরক্তিতে
বিষিয়ে ওঠা মনটা হঠাৎ যেন একটু ঠাণ্ডা হয়ে আসে।
ঘুরেফিরে আবার সে এসে দাড়ালাে জানালার কাছে।
সামনের বড় বাড়িটার দোতলায় থাকে এক রিটায়ার্ড অফিস।
বি-এ পাশ মেয়েটি তার যােগ দিয়েছে মেয়ে-সৈনিকের দলে।
খাকি শাড়ির ওপর খাকি কোত। চড়িয়ে গটমটিয়ে উঠলে গিয়ে
মিলিটারি বাস-এ। বিভুপদর দীর্ঘ মেরুদণ্ডটা ঝুঁকে পড়লাে
সামনের দিকে—আগ্রহে না ভাবনার ভারে বােঝা যায় না।
তেতলার বারান্দায় ছিপছিপে বৌটি গা ছেড়ে পাইচারি করছে,
মাঝে-মাঝে বাঁ পাশ ফিরে দু'হাত উচিয়ে চুল বাঁধে—উল্টো
দিকের চোখগুলাে যেন চোখেই পড়েনি। শাড়ির সামনের
কোচাটা সামান্য তুলে ধরার জন্যে আলতাে করে হাতটা এমন
ভাবে রাখে, দেখে বিভূপদর মাথায় যেন আগুন ধরে যায়।
তার অনুপস্থিতিতে তার বৌও এমনি সব হাবভাব করে নাকি।
দড়াম করে জানালাটা সে বন্ধ করে দিলাে। না কোন
দিক দিয়ে সুখ শান্তি আস্থা আনন্দ কিছু নেই।
उबगा বাড়িঘর ঝাপিয়ে দুরন্ত শব্দে ট্রামটা বেরিয়ে গেল, দু’কান বন্ধ করে বিভূপদ উঠে দাড়ালাে। এক টুকরাে চট মুতে নিয়ে কুদ্ধ পদক্ষেপে সে বেরিয়ে গেল কয়লার উদ্দেশে। বাপ কি ভিড় দোকানের সামনে! মানুষের চাপে কয়লা হীরে হয়ে গেছে। আর এক দরজা দিয়ে ট্রাকের পিঠে বা কুলির মাথায় চড়ে মণে-মণে কয়লা বেরিয়ে যাচ্ছে বেয়ারা চাপরাসির সঙ্গে। গলদঘর্ম হ'য়ে পাঁচ সের কয়লা নিয়ে ফিরলাে বিপদ। ধপাস করে পুটলিটা ফেলে ছুটে গেল স্নান করতে—দশটা বেজে গেছে, আজ আর রক্ষা নেই। আপিসে যেতেই ডাক পড়লাে ম্যানেজারের ঘরে। ম্যানেজার ঘড়ি দেখিয়ে বললাে, ‘ক’টা বাজে, চাকরি করার ইচ্ছে আছে না নেই—যত সব ইরেসপনসিবল আ কয়লার কথা হচ্ছে আপিসে আসা নিয়ে, আপনি বলছেন কয়লা শিয়ার ননসেন্স- ম্যানেজার-এর এমন অভ্যাস দাড়িয়ে গেছে তার কথায় সায় পড়লেই সে ভয়ানক চ’টে যায়। টেবিল চাপড়ে বলে উঠে ‘কি, চুপ করে রইলেন যে? কি বলতে পারে বিভুপদ? তার কি স্বীকার করতে হবে, হ্যা তার কথাগুলাে অসঙ্গত অর্থহীন। ‘ইজ নট ইট ফুলিশ? ল কুদ্ধ দৃষ্টিতে ম্যানেজার তাকায়। উত্তর তার একটা চাই-ই।
पावि
বিভুপদর ইচ্ছে হলাে লােটাৰ ব্ৰহ্মতালুতে একটা কিল
বসিয়ে দিয়ে সরে পড়ে, কিন্তু মুখ দিয়ে বেরুলাে আজ্ঞে হ্যা
ম্যানেজারের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দু'হাতে মাথা রেখে
কিছুক্ষণ সে উপুড় হয়ে রইলাে লেজারের ওপর। শিক্ষিত
ভলােক সে, অট পরে আপিসে আসে, দোকানের সামনে
হােটলােকদের লাইনে দাড়াতে তার লজ্জা হয়-আরাে কতশত
লজ্জা বাঁচানাের জন্যে প্রাণান্ত—কিন্তু সত্যি কে সেকেউ নয়।
কিছুই সে নিজে করছে না, সকাল থেকে সন্ধ্যা চড় মেরে-মেয়ে
তাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হচ্ছে কেবল। শুধু বেঁচে থাকার
জতে অসংখ্য লানা স'য়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনাে পার্থকতা
নেই তার সত্তর। ভাবতে ভাবতে এরই মধ্যে সে অভ্যাস
মগে অঙ্ক কষতে সুরু করলাে।
টিফিনের সময় কিছু করার নেই বলেই সে চুপচাপ বসে
ছিল। বেয়ারা এসে জানালাে কে একটি বাৰু ডাকছে।
মতাে করে বিভুপদ বলে উঠলাে, কে-কে ডাকছে-
খুবই বিরক্তি নিয়ে উঠে গেল বিপদ।
গিয়ে দেখে তার ভাগ্নে সুনীল। ক্রু কুঁচকে বললাে, কি রে,
কি চাই ।
‘এই এদিকে এসেছিলাম, এলাম একবার দেখা করতে।
‘দেখা করতে কেন দেখা করবার দরকারটা কি—এদিকে
এসেছিলি তাই, না-
মামার মেজ দিন-কে-দিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে তার
T
৫
उबगा পরিচয় সুনীল ইতিপূর্বেও পেয়েছে। কথার মােড় ফেরাবার জতেই সে বললাে, ট্রাউজারের বােতামটা খসে পড়ছে কোমরের নিচেই সামনের একটা বােতামের সেলাই দিলে হয়ে গেছে। একবার দেখে নিলাে বিভুপদ। বেশ হয়েছে- হবে না, কোনাে খবর তাে রাখিস নে— তিক্ততা ফুটে উঠলাে তার মুখচোখের ভাঁজে ভাঁজে। বােতমের উল্লেখটা এতখানি গুরুতর হবে সুনীল ভাবতে পারে নি। একটা বােম ঢিলে হবার পেছনে জ্ঞাতব্য একটা ইতিহাস আছে বেচারা জানবে কি করে। আরও বিব্রত হয়ে সে তাকালাে মামার মুখের দিকে। ‘বােতাম——কিসের মধ্যে আছি জানিস? তেমনি ধমকের সুরেই বিভূপদ বলতে লাগলাে। এদিকে এসেছিলি তাই এলি খবর নিতে। খবর নিতে হলে বাড়ি যেতে হয়। পর পর বিপদ লেগেই আছে। এই তাে সেদিন পাইখানায় তাের মামীর পাটা পিছলে পড়লাে প্যান-এর মধ্যে হঠাৎ গলার স্বর নিচু হলাে। প্যান ভেঙে পা-এর মধ্যে এতটা ঢুকে গেছে—বাড়িওলা এখনও টের পায় নি, জানলে হয়তাে প্যান- এর দামই আদায় করে ছাড়বে-যত ঝামেলা বাড়িওলা শুনতে পাবার কোনােই সম্ভাবনা নেই, তবুও কথাগুলাে বলে বিভুপদ চাপা গলায়। চিন্তিত হয়ে সুনীল বললাে, ‘প্যান-এ পা কেটে যাওয়া তাে ভালাে নয়।
थाथि
‘কে বললাে ভালাে আমি বলেছি। দেখতে দেখতে পা
তত ফুলে ঢাক-একশাে তিন অর—' বিহুপদর চোখে ভয়ের
অভিব্যক্তি। তার ওপর নন্তু, আমাশয়, এদিকে আমার
সর্দির। দিন চারেক হলাে ভাত খেয়েছি—চেহারা দেখে
বুঝতে পারি না?
মাথা নেড়ে সুনীল জানায় সে বুঝতে পেরেছে। মামীকে
তাে তক্ষুনি একটা ইনজেকশান দেওয়া উচিত ছিল—নত আছে
কেমন? আজই একবার যেতে হবে। এ জানলে কি আর
আজ গিয়ে আর কি হবে। তাের মামীকে পাঠিয়ে দিয়েছি
তার বাবার কাছে—ওরা কেউ নেই এখানে।
এখন কেমন আছে খবর পেয়েছ?
খবর আবার পাবাে কি—ভালাে না থাকলে এতদূরে
পাঠালাম কি করে। বেশ শান্তভাবে বিভুপদ বললাে। ওঃ
তার ওপর মন্তু কাজ জুটেছে, কিউতে দাড়িয়ে কয়লা কেনা—
কথাটা স্মরণ হ'তেই তার সর্বাঙ্গের স্নায়ুগুলাে বিরক্তিতে আবার
মােচড় মেরে উঠলাে।
দুশ্চিন্তার পরিবতে এবার কৌতুক বােধ করলাে সুনীল।
মীরার বিয়েতে যাচ্ছ তাে তুমি নিশ্চয়ই? সে জিজ্ঞেস করলাে।
আমার ওপর যে কত কাজ চাপিয়েছে-
মীরার বিয়ে, বিভুপদ কোন খবরই পায় নি। মীরাদের
সঙ্গে সুনীলের আত্মীয়তা তারই সম্পর্কের সূত্র ধরে কিন্তু খবরের
বেলায় সে-ই পড়েছে বাদ।
‘যাব কি, বিয়ের খবরই আমি জানি নে। ওরা আমার
খোঁজ নেবে কেন বেছে বেছে খোঁজ নেবে তাদের, যাদের টাকা
আছে। পত, সব পদের নামও আর উচ্চারণ করিস নে
আমার সামনে-আমি কেউ নই কার বিতৃষ্ণায় সে মুখ
ফেলল। হঠাৎ বলে উঠলো, ‘শােন সুনীল, বাড়ি গিয়ে
তৈরি হয়ে নে, আজই তাের যেতে হবে ফরিদপুর-তাের
মামীকে নিয়ে আসতে হবে।
‘এখন সবাই কলকাতা ছেড়ে যাচ্ছে, এখন ফিরিয়ে আনা
আর কয়েকটা দিন দেখা উচিত নয় কি?
‘লে ভাবনা তাের ভাবতে হবে না। সে আমি বুঝি।
আজই যেতে হবে—কি, যেতে পারবিনে?
আবার একটা ঋকি খাবার আশঙ্কায় সুনীল ভয়ে-ভয়ে
বললাে, পারবাে।
সুনীল জানে মামা-মামীর মধ্যে খুব একটা বনিবনা নেই।
দিনরাত খিটিমিটি লেগেই আছে। মামা দিনের ভিতর বহুবার
ঘােষণা করে, এই স্ত্রীলােকটিই তার জীবনের সব শান্তি মাটি
করেছে। সেই মামীকে ছেড়ে কটা দিনও মামা কাটাতে
পারছে না বােধ হয় কলহ করবার লােক জুটছে না বলে।
সাময়িক মুখের হাসিটা মুলতুবি রাখে সুনীল।
দিন কয়েক পরেই মেঘাচ্ছন্ন মুখ নিয়ে কণিকা ফিরে এলাে
বাপের বাড়ি থেকে।
কণিকা ফিরে আসার পর বাড়ির আবহাওয়াটা কি রকম
E
चामि দাড়িয়েছে তা আমরা অনায়াসে করতে পারবাে স্বামী-স্ত্রীর বাক্যালাপের এই সামান্য অংশটুকু থেকেই। আপিস যাবার মুখে বিভুপদ বলছে, “কি, অমন মুখগােড় করে আছ কেন—কথা কইলে জবাব দাও না, জিভটা কি বাপের বাড়ি রেখে এসেছ? ‘শান্তিতে থাকা আমার সইবে কেন যেমন আমার কপাল- মুখ ঝাষ্টা দেবার জন্যে হিচড়ে টেনে আনা হলে দু’দিন না যেতেই। বাপের বাড়ি থাকার যখন এতই সখ, আমি মরি তারপর পাকাপােক্তভাবে গিয়ে বাপের ঘাড়ে চেপাে—আর মধ্যেও শিগগিরই তােমার মধ্যে একটা মেয়েমানুষ যার বাড়ে চাপে তার না ম'রে উপায় আছে— চোখের জল ফেলে কণিকা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রাস্তায় পা বাড়িয়ে বিভুপদ দেখতে পেলাে ফুটপাশে দাড়িয়ে জটলা করছে পাড়ার ছেলের দল। একজনের হাতে একটা খাতা আর কলমপাড়ার বারোয়ারি সরস্বতী পুজোর চাদা দুলছে। গলা ছেড়ে বলাবলি করছে কে কত মােটা চাঁদা দিয়েছে, এখন যাবে আর কার কাছে—ইত্যাদি। বিভূপদ পাশ দিয়ে হেঁটে যায় একবার তারা চোখ তুলেও চায় না। বিরক্তিতে বিভুপদর ভেতরটা ভাল করে ওঠে। কেন ওরা কি তাকে মানুষ হিসেবে আমলেই আনাে নাকি। তার অবস্থা অনুযায়ী সে না হয় চার আনা দেবে, তা বলে ছােকরারা আসবেই না তার কাছে কেন,
उपमा
সেও তাে পাড়ার একজন বাসিলে। ঢলঢলে ছেড়া প্যান
আর মুড়িতে মুড়িতে ভােলা কোট পরে বলে তাকে গণ্যই
করবে না এ কেমন কথা! এসে একবার দেখতে তার কাছে,
হয়তাে বা একটা টাকাই সে দিয়ে দিতে ইচ্ছে করলেই
পারে সে অমন একটা টাকা ছুড়ে দিতে। এসব ফাজিল
ছােকরাদের ধ'রে কষে চড়িয়ে দিতে হয়। এই সামান্য
কাজটুকু পর্যন্ত সবদিক বজায় রেখে করতে জানে না। বারােয়ারি
ব্যাপারে এই যে একটা টাকা কম সংগ্রহ হলাে এ জন্যে রীতি-
মতাে এদের শাস্তি হওয়া উচিত।
সেদিন আপিসে ছুটির একটু আগে ঢুকতে হলে তাকে
ম্যানেজারের ঘরে-একটা সই নেওয়া দরকার। কাগজপত্র
সু লেজারটা খুলে ধরলাে সামনে। ম্যানেজার কথা বলছে
এক ভদ্রলােকের সঙ্গে। কথা সে ব'লেই চললল, সঙ্গে সঙ্গে
গদাইলস্করি চালে কলমটা নিলাে হাতে, তারপর ধীরেসুস্থে
খুললাে টুপিটা, ক্রমে সে টুপি কলমের পেছনেও সওয়ার হলাে
কিন্তু তারপর হাতের কলম হাতে রইলাে—তিনি কথাই বলছেন।
ভীমাকৃতি অতবড় একটা ভারি বই—বিভুপদর হাতের
শিরাগুলাে টনটন করতে থাকে। কিন্তু বইটা বন্ধ করতেও সে
ভরসা পায় না, হয়তাে তক্ষুণি হাত বাড়িয়ে ধমকে উঠবে।
রাগে ভেতরটা তার মােচড়াতে থাকে।
সই হলাে প্রায় আধঘণ্টা পরে।
বাইরের জগৎ যতই শত্রুতা করুক হাত দুটোর সম্ভাব নষ্ট
पादि হয় নি এখনাে—একে অজ্ঞকে দলাইমলাই করে যথাসম্ভব সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগলাে। ট্রামে চাপলে বিপদ। রাগটা তখনও ভেতরে ভেতরে পাক খাচ্ছে। মনে-মনে সহস্র বার ম্যানেজারের ভুড়ির ওপর পা রেখে কৰে তার কান মলে দিলাে। ট্রাম থেকে নেৰে গলির মুখে ঢুকতেই কে একজন পাশ থেকে বলে উঠলাে, “কি মশাই সুট প'রে সুট করে সরে পড়ছেন যে—যেন দেখতেই পান নি-আমার টাকা ক’টা— সস্তা রসিকতায় অপমানের বালাটা আরাে যেন তীব্র হয়ে ওঠে। খুব কয়েকটা কড়া-কড়া কথা বিভূপদর জিভের ডগায় এসেই থেমে গেল। বাবার সময় বললাে, “দেব মশাই- দিনকাল পড়েছে দেখতেই তাে পাচ্ছেন। ‘দিনকালটা তল মশাই আপনার একার নয়। বিভুপদ জবাব না দিয়ে এগিয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে তখন সে লােকটাকে পাওনার চেয়ে দশটাকা বেশি ফেলে দিয়ে তারপর কড়া হাতে ভদ্রতা শেখাচ্ছে। বাঁকা দেহটা আর একটু বেঁকে পড়লাে বিভুপদর। ফুট- পাথের ওপর চোখ রেখে দিলে পদক্ষেপে লে এগিয়ে চললাে। যৌবনের মৃত আশা-আকাকাগুলাে মনের প্রেতলােকে ঘুরে- ফিরে কেবলই বলতে থাকে—তুই কে—কেউ না বিভূপদ বাড়িতে ঢুকতেই কণিকা রান্নাঘর থেকে ডেকে বললাে, এই রাম, বাবু এসেছেন, হাত মুখ ধােবার জল দে।”
ত ম লা
এ কটা দিন একক জীবনযাপনের কথাটা
আজ হঠাৎ যেন বিভুপদর কানে বেজে উঠলাে অপ্রত্যাশিত
ঘােষর মতাে-বাবু এসেছেন, হাত মুখ যাবার
সারাদিনের গ্লানিলিপ্ত অন্ধকার পটভূমিকায় অকস্মাৎ তার
অস্তিত্ব যেন বিঘােষিত হলাে আলাের আখরে। কীত হয়ে
ওঠে তার বুভূক্ষিত ব্যক্তি-বিভুপদ এসেছেন—বিভুপদ কর্তা
-পা ফেলতে গিয়ে তার পুরােনাে জুতাের গােড়ালিটাই
যথাসম্ভব শব্দ করে ওঠে।
ঘরে ঢুকেই দেখে নত কাদছে। গলা ছেড়ে বিভুপা হাঁক
দিল, কই কোথায়-আঃ, বাড়ি ফিরে যে একটু শান্তি পাব
তারও উপায় নেই।
কণিকা ছুটে এসে সরিয়ে নিয়ে গেল নকে। আড়ালে
গিয়ে চাপা গলায় ধমক দিল ছেলেকে, চুপ, বাবা এসেছেন,
কাঁদলে বকবেন কি-
খট খট পা ফেলে খানিকক্ষণ পাইচারি করলাে বিপদ
ঘরের মধ্যে। শত আঘাতে সংকুচিত নিজেকে মনে হতে
লাগলাে অনেকখানি বিস্তৃত। এই পুরােনাে আসবাবপত্র, স্ত্র,
পুত্র, ভূত, মায় ভাড়াটে-বাড়ি, সবারই মধ্যে দিয়ে ব্যক্ত হচ্ছে
তারই সত্তার মহিমা।
হাতমুখ ধুয়ে শিরদাড়া খাড়া করে বিপদ চা পান করে।
হঠাৎ যেন বড় বেশি রাশভারি হয়ে গেছে।
पाधि
একটু হালুয়া মুখে তুলেই ডিসটা হাত দিয়ে গভীর ভাবে
ঠেলে দেয় কেবল, বিকৃত মূখে ঝাঝি মেরে ওঠে না।
‘কি, সরিয়ে রাখছে যে, খাবে না? কণিকা জিজ্ঞেস
করলাে।
‘খা হলে তাে খাব।
‘বােসস, আবার ক'রে আছি।' কণিকা মানমুখে
বলাে।
কণিকার মুখটা বেশ উপভােগ্যই মনে হয় বিভুপদর
কাছে।
বাবার সময় কোথায়-বসে থাকলে যদি চলতাে, কথাই
ছিল না—গভীরভাবে বিভুপদ উঠে দাড়ায়।
দু’খিলি পান মুখে পুরে সে বেরিয়ে পড়ে। চিবােনাের
প্রতি চাপে ব্যক্ত হয় দিনাতের গ্লানিহীন তৃপ্তি
অনেক দিন পরে আজ সে এগিয়ে চলে ব্রিজ খেলার
আড়ার উদ্দেশে।
সে , ,
ভঙ্গুর চল্লিশ টাকার ভাড়াটে বাড়ির সঙ্গে আর সককিছুই ঠিক- ঠিক মানিয়ে গেছে, মানায় না শুধু সজীব ও নির্জীব মূর্তি কয়টি। সজীবের মধ্যে সপরিবারে দুর্গানারায়ণ আর নিজীবের মধ্যে তার প্রপিতামহের একটি প্রস্তর-মূর্তি। পরিবেশে মানুষ কয়টিকে যদিই বা সহজ ভাবে গ্রহণ করা যায়, প্রস্তর মূতিটির প্রতিবাদ অগ্রাহ করার উপায় থাকে না। মূর্তিটি দাড় করানাে রয়েছে দুর্গানারায়ণের শােবার ঘরে। যেখানে আসবাব বলতে যুক্ত দুটা তাপােশ, টেবিল, আলনা, চেয়ার, গুটিকয় বাসস সুটকেস-এ ধরনের অতি সাধারণ কয়েকটি নিত্য- ব্যবহার্য বস্তু। তারই একপাশ ঘেষে গড়িয়ে আছে কোননা এক নিপুণ শিল্পীর হাতেগড়া এই পাথরের মূর্তি। মাথায় তার মহামূল্যের পাগড়ি—যার মাঝখানে ঝুলছে একটা মূল্যবান পাথর-পরিচ্ছদের সনে সঙ্গতি রেখে ভাবতে গেলে হীরে বলেই মনে হয়, গায় কেডের কাজ করা আচকান, পরনে যােধপুরী পাজামা, বাঁ পাশে একটা বাঁকা তলােয়ার-হাতলটা যার মুঠো
র
করে ধরা। তলােয়ারের নিচের অংশটা এখন আর নেই,
স্থানান্তরিত করতে গিয়েই হয়তাে বা ভেঙ্গে গেছে। নিখুত
ভাস্কর্য। পাথরের স্কুল অব্যাহত রেখে প্রতিটি রেখা তার স্পষ্ট
ও সুন্দর হয়ে ফুটে উঠেছে।
দুর্গানারায়ণ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন শুধু ঐশ্বর্যের
ইতিহাস আর সেই সঙ্গে সম্পদের শেষ চিহ্ন এই প্রস্তর মূর্তি।
এই মূর্তিটিও হয় তাে বা টিকে গেছে ব্যক্তিবিশেষের প্রতিকৃতি
বলেই। যে কারণেই হােক শেষ অবধি এটা ছিল এক কোণে
প'ডে ধূলিমলিন অবস্থায়। ভাস্কর্য না পুরােনাে দিনের শেষ
নিদর্শন হিসেবে এটাকে দুর্গানারায়ণ সঙ্গে এনেছিলেন বলা
যায় না।
দুর্গানারায়ণ কাজ করেন একটা সওদাগরী আপিসে।
পদমর্যাদাও কিঞ্চিৎ আছে। আপিসে বা বাইরে কোথাও
কারুর সঙ্গে বড় একটা মেলামেশা নেই। মুখেচোখে অস্তমান
গৌরবের স্তিমিত দীপ্তি ও গাম্ভীর্য। পারিবারিক লুপ্ত
গৌরব ফিরিয়ে আনার একটা দৃঢ় সংকল্প তার মনের তলায়।
সন্ধ্যায় দুই পুত্রকে দু’পাশে নিয়ে গল্প বলেন—বিগত ধনৈশ্বর্য
আর বংশমর্যাদার গল্প। পাথরের মূর্তিটার উপর চোখ রেখে
দুর্গানারায়ণ বলে চলেন, সেই ধন-দৌলত, সেই প্রতাপ আজ
কোথায়! ইনি হাঁক ছাড়লে হাজারাে প্রজা এসে জড়ো হতে
বাড়ির সামনের ময়দানে। একবার একটা গ্রাম-কে-গ্রাম
স্বালিয়ে দিয়েছিলেন অবাধ্য এক প্রজাকে তারা ধরিয়ে দেয়নি
उपना
বলে। অন্যায়ে যেমন ছিলেন নিষ্ঠুৰ তেমনি আবার দু
দারিদ্র্যে দয়ারও তার অন্ত ছিল না। তিনি কি বলতেন জানি,
বলতেন, আমরা না দিলে ওরা বাঁচবে কি করে—এরই বংশে
আট বছরের ছেলে দিব্যেন্দু স্তব্ধ হয়ে শােনে। পাথরের
মুর্তিটা যেন সজীব হয়ে ওঠে তার চোখে। এই রাজার মতো
লােকটি তার ঠাকুর্দাদের একজন ভাবতে গর্বে আর আনন্দে ভার
রােমাঞ্চ হয়।
এরই রক্ত বইছে তােদর দেহে, বড় হয়ে তার মর্যাদা
রাখতে হবে।'
ছােট ছেলে মণি রক্তের কথা শুনে বলে ওঠে, আজ পেরেক
ঠুকতে আঙ্গুলটা কেটে গেলাে বাবা, অনেক রক্ত পড়েছে।
‘চুপ মণি, বােকর মতাে কথা বলিস নে। দিব্যেন্দু
ধমক দেয়।
মণি গুম হয়ে থাকে। তার সবচেয়ে রাগ হয় মূতিটার
উপর। না-হয় হলেই বা একটা বড় পুতুল, তবু তা নিয়ে
নােম রােজ ঐ একই রকম কথা শুনতে তার ভালাে লাগে না।
তা ছাড়া অনেক কথাই তার বােধগম্য নয়, কেবল মারপিট বা
দাঙ্গার গল্পগুলাে সুরুতে খুব ভালােই লাগতাে। মারপিটের
কথা মনে হলেই ভাতা ভলােরটায় মণির চোখ পড়ে ভারি
তাে ভাঙা একটা তলােয়ার, আষক না, তার হকিস্টিকের প্যাচ
মেরে বুঝিয়ে দেবে মজাটা।
দুর
দুর্গানারায়ণ ভরসা রাখেন দিব্যেন্দুর উপর। ছেলেটার
চালচলনে একটু গুরুত্ব আছে। মণির মতাে পাড়ার আজেবাজে
ছেলেপুলেদের সঙ্গে জুটে পড়বার ঝোক নেই। মণি হবে যেন
একটু হালকা ধরনের পারিবারিক মর্যাদা রাখতে হলে হয়তাে
বা রাখবে দিব্যেন্দুই। তাই দিবুর অভিজাত রক্তে মান-মর্যাদায়
ইতিহাসটা দুর্গানারায়ণ মিলিয়ে-মিশিয়ে এক করে দিতে চান।
ভবিষতের অনেক চিত্রই তিনি আঁকেন দিব্যেন্দুকে নিয়ে, কিন্তু
লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজতে গিয়ে দৃষ্টিটা যেন তার
ঝাপসা হয়ে আসে। তারই মধ্যে আশার কিছুটা আলে তিনি
দেখতে পান যে-কোনাে একটা বড় চাকুরিতে—দিবুর পড়া-
শােনার প্রতি দুর্গানারায়ণের দৃষ্টি ভীতর হয়।
দুর্গানারায়ণের সবটুকু মনােযােগ কেড়ে নেয় দিব্যেন্দু। সে
মনযােগ সাধক করে বছরের পর বছর পড়াশােনায় প্রথম
স্থান অধিকার করতে থাকে। মণির গতি সেখানে মন্থর,
নামডাক তার খেলাধুলােয়।
উপৰূিতের তীব্র তাগিদে দূরবিগত তেমন আর স্পষ্ট হবার
পথ পায় না। ক্রমে সাকালীন মুখর ইতিহাস মুক্ত হয়ে
মিশে যায় মূর্তির গায়, ধীরে ধীরে ধূলা জমে তার সর্বাঙ্গে। তার
সতিহীন পর্বিত অস্তিত্বটাও চোখে যেন সহজ হয়ে আসে।
মূর্তির ভাগ্য আবার প্রায় হলাে দিব্যেন্দু কলেজে ঢােকার
এবার সসম্মানে সে স্থান পেলাে বাইরের ঘরে
পাঁচমেশালি পুরােনাে চেয়ার এড়াে ক'রে দিব্যেন্দু যেটাকে
বসবার ঘর বানিয়েছে। মূর্তিটা শুধু যে অন্দর মহল থেকে
মুক্তি পেলে তা নয়, রীতিমতাে একটা মুক্তিনও হলাে ভার।
বালতি বালতি জল ঢেলে ঘষে-মেজে দিব্যেন্দু তাকে সাফ
করেছে, খেত মর্মরের অটুট শুভ্রতা এখন তত করছে
তার সর্বাঙ্গে। মূর্তিটাকে মণি ডাকে ‘গ্রেট গ্র্যানপা। গ্রেট
গ্র্যানপার উপর দাদার দরদ দেখে সে হাসে।
দিব্যেন্দু তার সহপাঠী বন্ধুবান্ধব, এমন কি স্বল্প পরিচিতদের
নিঃসংকোচে এখন আমন্ত্রণ করে তাদের বাড়ি আসতে। কোনাে
ধনী অভ্যাগতের উপস্থিতিতেও আসবাবের দৈন্য নিয়ে অস্বস্তি
বােথ করে না। তা ছাড়া এমন সব প্রশ্ন ওঠে যার জবাব
দিতে গিয়ে বিস্তর তথ্য উদঘাটন করার সুযােগ দিব্যেন্দু পায়।
কত বড় শিল্পী ডেকে কত হাজার টাকা ব্যয়ে এ মূর্তি গড়াননা
হয়েছিলাে, আর্টের কি আন্দাজ সমজদার ছিলাে তাদের পরিবার,
কেমন ছিলাে সে দিনের হালচাল—ইত্যাদি কত কি। ক্রমে
আশৈশবের পরিচিত এ মূর্তিটির সঙ্গে কি এক নিগুঢ় সূত্রে
দিব্যেন্দুর বন্ধন দিনের-পর-দিন নিবিড় হতে থাকে। এরই
নির্দেশিত কোনাে এক আদর্শে পেীছবার উদ্দেশ্যেই
সে যেন বছরের-পর-বছর পরীক্ষার পাহাড়গুলাে ডিঙিয়ে
যায়।
মণি ম্যাটিকের কোঠাও পার হতে পারে নি। নিজেই
যােগাড়যন্ত্র করে ঢুকে পড়েছে একটা গ্যারাজে-এ-বলে,
মােটর ইঞ্জিনিয়ারিং শিখছি। হাফশার্ট আর সট চড়িয়ে
ত সশব্দ ব্যস্ততায় বেরিয়ে যায়, আবার তেমনি করেই এসে ঢাকে। অজস্র ভুল ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলে যায়—এমন কি দিব্যেন্দুরই সামনে, যে এবার ইংরেজিতে এম-এ দিচ্ছে সংকোচের বালাই নেই। দুর্গানারায়ণের পুত্র দিব্যেন্দুনারায়ণ আর মণীন্দ্রনারায়ণ, কিন্তু মণি লিখতে আরম্ভ করেছে মণি বােস'। মণির এসব বব নােচিত ব্যবহারে দিব্যেন্দু একটা শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করে, ওর সংস্পর্শ সে অসাবধানে বাঁচিয়ে চলে। নিষ্ফল জেনে দুর্গানারায়ণও কোনাে প্রতিবাদ করেন না—মানুষ যে হবার নয় সে এমনি করেই যায়। দিব্যেন্দু পড়ছে, মণি ঘরে ঢুকে বললাে, ‘দিবুদা, তুমি রাজি হলেই হয়, বাবাকে বুঝিয়ে বলা কিছু কঠিন হবে না। পড়েই তাে রয়েছে, গ্রেটগ্রানপা-র মূর্তিটা দাও না আমাকে। বেশ ভাল একজন পারচেজর পেয়েছি—আর্টফাট কলেকশানের হাবিট আছে। মােটা এ্যামাউন্ট পাওয়া যাবে। টাকাটা চাচ্ছি কেন জানাে? পুরােনাে কতকগুলাে মােটার পার্টস বিক্রি হচ্ছে, কিনে রাখতে চাই। যুদ্ধ যে-রেটে এগিয়ে যাচ্ছে, একদিন হয়তাে টু'হানড্রেড পার্সেন্ট প্রকিট পেয়ে যাবে—তখন চাই কি নিজেই একটা কাম স্টার্ট করতে পারবে। কি বলে— হাতের পাশা গড়িয়ে দিয়ে বাহিত সংখ্যাটির আশায় খেলােয়াড় যেমন আগ্রহে বুকে পড়ে, মণিও তেমনি টেবিলের উপর কনুই রেখে সাগ্রহে তাকালাে দিব্যেন্দুর মুখের দিকে।
उपना
দিব্যেন্দু নিজেই বুঝিবা 'মে পাথর বনে গেছে। কিছুক্ষণ শুরু
হয়ে থেকে সে বাইরের দিকে আঙুল দেখিয়ে গভীর কণ্ঠে
বললাে যাও-এখান থেকে যাও
ওয়েল’-মণি কাঁধে একটা ঝাকুনি দিলাে। বই গিলে যা
ঘরে আনবে, আই নাে ছাট। বলতে বলতে গটুম শব্দে ঘর
ছেড়ে দে বেরিয়ে গেল।
এ পর্যন্তও বুঝিবা মাত্রার গা ঘেঁষেই চলছিলাে তাই
প্রতিবাদটা তেমন তীব্র হয়ে দেখা দেয়নি। কিন্তু মণি যেদিন
হাতের চামড়ায় উকি দিয়ে লতাপাতা কাটা নাম লিখিয়ে এলাে,
সেদিন যেন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেল। বাড়ির
আবহাওয়াটাই হয়ে গেল থমথমে। দুর্গানারায়ণ ঘরে পাইকারি
করতে লাগলেন, দিব্যেন্দুর মুখে রা নেই। কাজটা কতখানি
রুচিৰহিত মণির মা সেটা জানেন না বলেই হয়ত এতটা
মর্মাহত হন নি।
আভিজাত্যের স্বভাবসিদ্ধ সংযমে উত্তেজনাকে দুর্গানারায়ণ
আয়ত্তে আনেন। কি হবে এখন প্রতিবাদ জানিয়ে, যত দিন
মণি বাঁচবে তার হাতেই লেখা থাকবে তার রুচির পরিচয়
সেই সঙ্গে জড়িত থাকবে ব-বংশের নাম।
রতের এই
অধােগতি তিনি কি করেই বা কখতে পারেন।
দিব্যেন্দু সারাটা দিন চুপ থেকে সন্ধ্যায় পিতাকে জানিয়ে
দেয়, মণির সঙ্গে সম্পর্ক তার এখানেই শেষ, ভবিষ্যতে ভাই বলে
স্বীকার তাকে করবে না। সে-রাত্রে পড়ায় তার মন বসে না,
,,
খােলা বই সামনে রেখে পলকহীন চোখে দিব্যেন্দু তাকিয়ে থাকে
শুভ্র বেতমর্মরের মূর্তিটার দিকে।
জাপানী আক্রমণে বম। বিধ্বস্ত-সমগ্ৰ কলকাতা জুড়ে
পালাই-পালাই। দুর্গানারায়ণের আপিস উঠে গেল লকে।
মেয়েদের সাথে সরানাে দরকার, দুর্গানারায়ণের সন্ত্ৰীক লক্ষে
যাত্রাই স্থির হলাে। দিবু আর মণির কলকাতার বাইরে যাওয়া
চলবে নামণির অনেক কাজ, দিবুর চলছে কাজের চেষ্টা।
বাবা মা চলে গেলেন। ব্যয়-সংকোচের জন্য বাড়িটা
ছাড়তে হবে, অতএব মেল ছাড়া গত্যন্তর নেই। মণি উল্লসিত
কিন্তু দিব্যেন্দুর অসহায় বােধের অন্ত থাকে না। অসুবিধার কথা
যদি বা ভুলতে পারে, এতবড়াে অবনভিকে মেনে নিতে কিছুতেই
তার মন সরে না। মেসের লোেক কথাটা যে গালিরই শামিল।
মণি জিজ্ঞেস করলাে, মূর্তিটার কি করবে, এটা দিই পাঠিয়ে
হােট মামার ওখানে, ওরা ত বাডিটা রেখেই যাচ্ছেন।
নানা দুর্ভাবনায় মূর্তির কথাটা দিব্যেন্দু যেন ভুলেই গিয়ে
ছিল, মনে পড়তেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। গা
ঝাড়া দিয়ে সে উঠে বসে। কিন্তু গা ঝাড়া দিলেই তা আর
সক্রিয় হয়ে ওঠে না, শেষ পর্যন্ত অস্বীকৃত ভ্রাতৃক্ষের কাছেই
আবেদন জানাতে হয়—বলে, মূর্তি নিয়ে তাের ভাবতে হবে না,
ওটা আমার সরে যাবে। তুই আর খরচের একটা পরিচ্ছন্ন
মেস মা আমার ।
সঙ্গে যাবে—মেসে! অবাক চোখে মণি প্রশ্ন করলাে।
তুমি কি খেপলে নাকি—ম্যাড-ম্যাড'উচ্চহাশ্যে ঘরদোর কাপিয়ে মণি বেরিয়ে গেল। মণির হাসি দিব্যেন্দুকে স্পর্শ করে না। মেস-এ উঠছে বলে মূল্যবান জিনিস ফেলে যেতে হবে নাকি! বারােভূতের সঙ্গে হরেদরে এক হয়ে যেতে দেয়না এমন জিনিস সলে নেওয়াই ভাে ভালাে। আনাড়ি দৃষ্টিতে যেখানে মূল্যবিচার, আদত হীরের অঙ্গে সেখানে মােটা অঙ্কের টিকিটটা আঁটা থাকার দরকার আছে। মেস ঠিক করা থেকে ঠেলা যােগাড় সবই করতে হয় মণির। আটটা কুলি নেওয়া হলাে মুর্তিটাকে মেসের উপরতলায় তুলতে। মেসের মেম্বররা সব জড় হয়ে দেখে, কেউ বা উপদেশ দেয় কি ভাবে তুলতে সুবিধে হবে। সিড়ি বেয়ে উঠানাের সময় পিছন থেকে মণি হুসিয়ানির হাঁক ছাড়ে। অকস্মাৎ নিচের দিককার একটা ফুলির পা গেল ফসকে, অন্য কুলিরাও পারলাে না তার ঝোঁক সামলাতে, ধপাস করে প'ড়ে মূর্তিটা তিনখণ্ড হয়ে গেল। মেম্বররা সকলে হায়-হায় করে উঠলাে। মশির কুদ্ধক- নিঃসৃত আওয়াজ শােনা গেল—“উল্লুক তােমলােগকো শিরবি হাম তোেড় দেখা। কুলিগুলাে কপাল চাপড়ে আপসােস জানাতে লাগলাে- এমন একটা আচ্ছা চিজ আজ তাদের হাতে নষ্ট হয়ে গেল। কার দোষ, কেমন করে হলাে, কি করলে হতাে না, এসবের মিলিত হট্টগােলের মধ্যে একমাত্র স্তব্ধ হয়ে রইলাে দিব্যেন্দু।
মণি বললাে, যাকগে, ব্যাটাদের কেটে ফেললেও তাে আর এর দাম উঠবে না—আ জিনিসটা ছিল কিন্তু ভারি সুন্দর, বিক্রি করলে কতকগুলাে টাকা পাওয়া যেতাে। মােটার- পার্টসগুলাে সখেদে মণির স্মরণ হয়। এখন কি করবে বলে তাে? ওপরের টুকরােটা রাখতে পারে। পাগড়ি আর নাকের খানিকটা ভেঙেছে, নয় তাে মােটামুটি ঠিকই আছে। না সব কটা টুকরােই থাকবে। কথাটি বলে দিব্যেন্দু গিয়ে তার ঘরে ঢুকলাে। জিনিসপত্র গুছিয়ে দিয়ে দিব্যেন্দুকে ‘চিয়ার আপ করে মণি বিদায় নিলাে। দিব্যেন্দু তেমনি স্তব্ধ হয়েই বসে রইলাে। তার মনে হতে থাকে, এখন থেকে সাধারণের চোখে তার পরিচয়—একজন বেকার, মেস-এ থেকে চাকরির চেষ্টা করছে, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
তামাসা
ডম বেজে ওঠে। ডিমি ডিমি ডিমি টরুম টরকম—
দেবাদিদেব মহাদেবের হাতে নয়, পাগলা সাধুর হাতে।
তার সঙ্গে নাচও চলে, কিন্তু সেনাচ প্রলয়ের কোলে নটরাজের
নৃত্য নয়, কলকাতার ফুটপাথে গলামের নৃত্য-গঙ্গারাম একটা
বানর।
পাগলা সাধু কে, কি তার নাম, কি তার জাতি—কেউ জানে
। জানার দরকার হয় না। জীবনের কোনাে জটিলতায়
যারা নেই তাদের নাম না জাতের প্রয়ােজনটা কি। যেমন
ওসবের দরকার হয় না ভিকিরিদের, শুধু কানা-খোঁড়া-বেটা-
বেটিতেই চলে যায়। পাগলা সাধু নামটাও তেমনি গুণবাচক।
চালচলন পাগলের মতাে, পােষাকের রং গেরুয়া, তাই যার
ডাকতে হয় ডাকে পাগলাধু বা সাধু। গায়ে তার বিভিন্ন
বর্ণের তালিমূক্ত কথার আলখাল্লা, কাঁধে থাকে সেই রকমই
একটা কথার তৈরি ঝুলি। ঝুলিটাকে একপাশে রেখে ব'সে
গেছে ফুটপাথে। ঘিরে দাড়িয়েছে একপাল ছেলেপুলে,
তা না না
এদিক-ওদিকের বারান্দায় মেয়েরাও বুকে রয়েছে। সাধু হাঁক
ছাড়ে-আরে গাৰাম, তুহি সাধি কোরবে। গঙ্গারাম মাথা
নেড়ে সম্মতি জানায়। দর্শকরা হেসে ওঠে। সাধু ডেকে
বলে—হা রে বুড়হি, তােম রাজি। হােট বানরটা তার কানের
কাছে মুখ তুলে ঠোট নাড়ে। সাধু বলে ওঠে-গহনা, শাড়ি
আওর গাড়ি দেও তাে বুড়হি রাজী। গঙ্গারাম গালে হাত
দিয়ে ভাৰতে বলে। ভঙ্গি দেখে আবার সবাই হাসে। ভালুকটা
আচমকা হি হি করে কাঁপতে থাকে, সাধু তার পিঠ চাপড়ে
বলে-ফিকির না কনাে ভােলা, বাটি-বাটি মধু মিলবে রে
বেটা, বাটি-বাটি
মধু
আকাশ জুড়ে উড়ােজাহাজের গােঙনি, ছেলেপুলেরা ফিরেও
তাকায় না; মাটির ওপর চলেছে লােদর ভাল্লুক আর বানরের
নাছ, হাঁ করে তা-ই দেখে—সঙ্গে বাজে ডমরু ডিমি ডিমি ডিমি
উরুম টম।
হঠাৎ রব উঠলাে সাইরেন' ‘সাইরেন'। যে-যার বাড়ির
ভেতর ঢুকে পড়লাে। পথচারীরা আশ্রয় নিলাে পাকা পর্দার
আড়ালে। সাধুকেও পাততাড়ি গােটাতে হলাে—নাচের
মজুরিটা হয় তাে আর মিললাে না। কতক্ষণ চলবে কে জানে।
সেও গিয়ে কালাে একটা পাকা পর্দার আড়ালে, তার গা ঘেঁষে
রইলাে ভােলা গঙ্গারাম আর বুড়ি।
চারদিকে দমাদম জানালা-কপাট বন্ধ করার শব্দ। প
এ-আর-পির লােকের ধমকানি। ফুটপাথের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে
আছে নােয় একটা কাঠের ঠেলাগাড়ি, মধ্যে একটা গলিত
কুষ্ঠ-পয়সাহীন রাজ্যে পয়সার ভিকিরী। এ-আর-পির লােক
হকি ছাড়ে, এই, তােমরা আদমি কিধার? কিধার ও
জানে, বসিয়ে দিয়ে কোথায় চলে গেছে। লােকটাকে নিরাপদ
আশ্রয়ে পাঠানাের জন্যে কর্মচারীটি ছুটোছুটি করতে থাকে।
গাড়িটা হোবে কে, কেউ রাজি হয় না। দেয়ালের পেছনে
জমায়েত হয়েছে যারা, লােকটির কাণ্ড দেখে তারা হাসে। নিছক
মাতববরি, না হয় এ নিয়ে এতটা ব্যস্ত হবার কোনােই যে কারণ
থাকতে পারে না, সবাই বােকে সেটা—বােমা ওর ঘাডে
পড়লে ওর বা পৃথিবীর ক্ষতিটা কি।
শেষ পর্যন্ত কর্মচারীটি নিজেই একটা ছাতা নিয়ে তার
বাঁকা দিকটার সাহায্যে গাড়িটাকে টানতে লাগলাে। সাধু
হা হা করে হেসে উঠলে উলটো দিকের দেয়ালের পাশ থেকে।
ডেকে বললাে, “দেখ, গঙ্গারাম, মজা দেখ বেটা। গঙ্গারাম
সত্যি সত্যিই গলা বাড়িয়ে দেয়, সঙ্গে বুড়িও। ভোম্বলদাসের
কোনােকিছুতেই তেমন উৎসাহ নেই, সেটা হি হি করে কাপছে,
এই মাত্র আবার তার বর উঠলো।
যে দেয়ালের পিছনে গাড়িটাকে ঢােকানাে হলে সেখানটা
দেখতে দেখতে প্রায় খালি হয়ে গেল। সাধু আবার হেসে
উঠলাে, এবার খুশির ঝোকে সে ডমরুটাকেই বাজিয়ে দিলাে
বার দুইটরুম টরুম। কে একজন ধমকে উঠলল, এই
কেয়া কয়? সাধু তার দিকে তাকায়, ঝাঁকড়া চুল আর
जवाना
দাড়ি-গোঁফে আচ্ছন্ন মুখের উপর অললে একজোড়া গাে। সে
চোখের দৃষ্টি কেবল তীই নয়, বেশ যেন গভীর। ধমক যে
দিয়েছে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
সাধু ব'সে কাশে—গাঁজা-খেকো গলার কাশি। চেয়ে চেয়ে
দেখে লােকগুলােকে—কি চমৎকার, মুহুর্তে কেমন কাপড়
পাতলুন-শাড়ি-নেংটি-গেরুয়া-টুপি-থামা মিলে-মিশে একই
আশ্রয়ে এসে মাথা গুজেছে। মৃত্যুভয় যেন মানুষ করে
দিলাে মানুষগুলােকে কিছুক্ষণের জন্য। একটি মেয়ে এক
পাশে দাড়িয়ে আছে বুকে বই চেপে, তার মুখের দিকে চেয়ে
থাকে সাধু। এমনি একটি মেয়ের কথা মনে পড়ে—ভার
বােন ।
ভদ্ৰমেয়ের উপর বর্বর লােকের এই চোখখােলা দৃষ্টি
একটি যুবকের সহ হয় না, মেয়েটিকে সে আড়াল করে
দাড়ায়।
সাধু একটি বিড়ি ধরিয়ে ভােম্বলের গায় হেলান দিয়ে চোখ
বুজলে। নানা কথা কানে আসে। ঐ কুষ্ঠ ভিকিরীটার সূত্র
ধরেই আলােচনা চলছে। ভিক্ষুকদের নিয়েও ভাববার নাকি
সময় এসেছে, তাণের অভাবে তারাই বিপদে পড়েছে
সবচেয়ে বেশি—ইত্যাদি। নামটা সাধু ঠিক মতাে শুনতে
পায়নি কিন্তু পরের কথাটা কানে আসতেই সােজা হয়ে বললে।
একজন বলছে বালিগঞ্জে নাকি প্রত্যেক ভিক্ষুককে এক টাকা
করে দান করবে–পয়সার অভাবে ওর যে-আন্দাজ কষ্টে
उपमा
পড়েছে তার কিছুটা অন্তত লাঘব করার চেষ্টা। সাধু মনে
মনে স্থির করে সেও যাবে গঙ্গারামদের রেখে। একটা টাকা
বেশ কিছুদিনের গাঁজার খরচটা ট্যাকে আসবে। কে
একজন বলে, সে যে অজস্র টাকার দরকার মশাই—লােকটার
দিল আছে বলতে হবে। আর একজন বলে ওঠে, “আরে রাখুন
মশাই বিল-ফিল—এসব মন্ত্রী হবার ফিকির-কন্দি। খানিকটা
পপুলারিটি দরকার, তাই—পলিটিকস মশাই পলিটিকস।
পলিটিকস-কথাটা সাধুর মনটাকে পরিবেশ থেকে এক
টানে ছিনিয়ে নিয়ে যায় পনেরাে বছর পিছনে। উপস্থিত
কথাবার্তার একটা শব্দও আর কানে পৌছয় না। এক এক
করে মনে পড়ে সব বিপর্যয়কারী ঘটনাগুলি। সেই তাদের
দল, তাদের দেবেশদা—দেবেশদার কথা স্মরণ করতেই মন
এন্ধায় ভরে ওঠে। ডাকাতি করার প্রশ্ন যেদিন প্রথম উঠলাে,
পরের অর্থ ছিনিয়ে আনায় তার নিজের সমর্থন ছিলাে না, কিন্তু
দেবেশ হাজরার আদেশই যে-কোনাে কাজকে উচিত বলে মেনে
নেবার পক্ষে ছিলাে যথেষ্ট। শান্ত সেই শুরু করে একটা কথা
আজও স্পষ্ট শরণ আছে, অর্থ সম্পদ যেখানেই জমে উঠে
থাক তা দেশের, দেশের প্রয়ােজনে তা না পাই তাে ছিনিয়ে
আনতে হবে। তারপর রাতের পর রাত মূখােশ-আঁটা মুখের
নির্মম দাবি—সিন্ধুকের গৰি চাই।
অলংকারঅর্থ সবই এনে ঢেলে দেওয়া হতাে মন্মথ সমান্দারের
হাতে। সন্দেহের স্পর্শ বাঁচানাের উদ্দে সমাজারকে বাইরের
यांना
কোনাে কাজেই টানা হতাে না। ধীরস্থির লােকটি দিনরাত
বসে থাকতে বইয়ের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে। সাহস আর ব্যক্তিকে
দেবেশ হাজার তুল্য না হলেও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় আর পাণ্ডিত্যে
বলতে গেলে সে-ই ছিলাে সেরা। নিজে করি, তাই দারিদ্র্যের
উপর ছিলাে তার অপরিসীম ঘৃণা।
অবশেষে সামাজিক জীবনের অবসানকারী অন্ধকার রাত্রির
রােমাঞ্চকর ঘটনাগুলি ধীরেধীরে তার মনের সামনে ভেসে ওঠে।
সিলিমপুরের উচু-নিচু মাঠের উপর দিয়ে সে দৌড়চ্ছে কাঁধে
বিভূতি। বিভূতির রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার গা বেয়ে। চৌধুরী
বাড়ির দেউড়ি থেকে যে লােকটা বিভূতির গায়ে বর্শা ছুড়েছে
তাকেও সে জ্যান্ত রেখে আসেনি। টান দিয়ে বর্শাটা খুলবার
সময়ই সে টের পেয়েছিলাে আঘাত গুরুতর। তারপর সেই
সামান্য দু-চারটি কথা। বিভূতি বলছে, ঐ লােকটাকে না
মারলেই হতাে—এ্যাসিডের শিশি কি-' সে হাঁপাতে হাঁপাতে
জবাব দিয়েছে, হ্যা আছে আমার সঙ্গে একটা। আমার
মুখটা ঝলসে দিয়ে তুই পালা অমূল্য, আমি বাঁচব না।
বিভূতির মাথা তার ঘাড়ের উপর এলিয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত
বিভূতির কথামতাে কাজই তাকে করতে হয়েছে কিন্তু তবু
পালাতে সে পারলাে না, ধরা তাকে পড়তে হলাে। তাঁর
ধারণা ছিলাে, সে-ই শুধু আটক পড়েছে কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই
সে-ভূল তার ভাঙলাে। যে ক'জন গিয়েছিলাে, সিলিমপুরের
সীমানা কেউ পার হতে পারেনি, সবাই ধরা পড়েছে-পুলিস
उपना
নাকি আগে থাকতেই খবর পেয়েছিল। কি করে পেলাে, কে
দিলাে অ নিয়ে অনেক গবেষণাই তাদের মধ্যে হয়েছে কিন্তু সে
আলােচনায় যােগ দেয়নি ৩ দেবেশ হাজরা। মােটা মােটা
সংখ্যার বৎসরের রায় ঘাড়ে নিয়ে কোর্ট থেকে বেরুবার সময়
সে শুধু বলেছিলাে, তাের তা লম্বা পাড়ি অমূল্য, আর ফিরবি
কিনা কে জানে—নিশ্চিন্ত থাকিল, মন্মথর বিচারটা আমি
বেরিয়েই করব।
দেশ ছেড়ে কোথায় কোন্ দ্বীপে গিয়ে পচে মরতে হবে
ভাবতেও অমূল্য মাথা যেন খারাপ হয়ে যায়। আগ্রহের
আতিশয্যে সেঅসাধ্য-সাধন করলাে জেল থেকে সে পালালাে।
তারপর একাদিক্রমে তিন বৎসর ইদুরের মতাে গােপনচারী
জন্য জীবন। সে হাঁপিয়ে ওঠলাে। অবশেষে একদিন সমাজের
বাইরে পার্বত্যসন্ন্যাসের মুক্ত হাওয়ায় হাঁপ ছেড়ে সে বাঁচলাে।
ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসতে লাগলাে গত জীবনের
স্মৃতিগুলি।
হরিদ্বারে বন্ধু হলাে এক তামাসাওয়ালার সঙ্গে। লােকটা
বেদম গাঁজাখাের, তার কাছে দীক্ষিত হলাে গাঁজায়।
সে সন্ন্যাসী বেশে ভিক্ষে করে বেড়ায়। নেশার মাথায় লােটা
বেশ ভালাে ভালাে কথা বলতে, নিৰ না শােনা কথা বােঝা
যেতাে না। প্রায়ই বলতাে, “ভিখ, নিৰিও না দিবিও না'—দয়া
নাকি দাবানাে-মানুষদের হাতে রাখার এক মহৎ যন্তর।
তারই কাছে থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই তিনটি
৭০
जागा
জীব, যা নিয়ে এখনও সে দেশে দেশে খুরে বেড়াচ্ছে। বাংলা
দেশে এসে ঢুকেছে দীর্ঘ পনের বছর পর। আজ আর তেমন
করে ভাবতেও পারে না যে একদিন সে এদেরই একজন
ছিলাে। সুবেশী একটি বাঙালী ছেলেকে সম্বােধন করতে গিয়ে
তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, বাবুলী অপ’ বা বাৰু আপনি।
তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা দাবি করার সহজ মরেছে, সমাজ
এবং শ্রেণী-বহির্ভূত রাস্তার ভিকিরীগুলােকেই একমাত্র মনে
করতে পারে আপনার জন।
গঙ্গারামের টানাটানিতে তার চিন্তার নেশা ছুটে গেল।
বিপদমুক্তির ধ্বনি পেয়ে লােকজন কখন সরে গেছে সে জানতে
পারে নি। সাধু উঠে দাড়ালাে। ডমরুটা ভােলার মধ্যে
ঢুকিয়ে বললাে, “চল গঙ্গারাম ঘর চল—ঘর বলতে পার্ক শেড
এর আস্তানা।
দানের খবরটা সত্য, দেখতে দেখতে সমস্ত শহর ছেয়ে
গেছে—মন্মথ সমান্দায় ছেলের অন্নপ্রাশনে কলকাতার ভিকিরী-
দের প্রত্যেককে এক টাকা করে দান করবেন। চারদিকে খ
ধ। ভিকিরীরা শুভ দিনটির আশায় দিন গুণছে—দর্শকরাও।
নামটা কানে ঢাকা মাত্র সাধুর মাথায় গুরু আঘাতের একটা
অনুভূতি জাগে। গাঁজায় খুব কড়া রকম একটা দম দিয়ে সে
বেরিয়ে পড়ে লােকটাকে দেখতে হবে সে-ই কি না।
বাড়ির খোঁজ নিতে অসুবিধা নেই, ভিকিরী মাত্রেই আজ
অ ম তার বাড়ি চিনতে উন্মুখ। সাধু ঘুরে বেড়ায় দেউড়ির আশে- পাশে। বিরাট একটা গাড়ি বেরিয়ে গেলো দেউড়ি দিয়ে, ভেতরে যে লােকটি বসে আছে তাকে দেখা মাত্র সাধুর চােখ দুটো বলে উঠলাে আগুনের ফুলকির মতাে। সমাদ্দারের সঙ্গে সাক্ষাৎ একবার করতেই হবে কিন্তু কি ভাবে তা সম্ভব, তার পথ খুঁজে পায় না সাধু। সাক্ষাৎ তে দূরের কথা সামনের আঙিনায় প্রবেশ করাই যে অসম্ভব। তার সঙ্গে কোনাে কালে এর পরিচয় ছিলনা বললে চাকর-বাকর হেসেই উড়িয়ে দেবে সন্দেহ নেই—মানুষ হয়ে জন্মানােটাই যে-কোনাে মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবার কারণ হতে পারে না। নিষ্প্রদীপ নগরীর অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে এসেছে, কৃষ্ণ- সায়রে একমুঠো হলদে গুড়াের মতাে মাঝে মাঝে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে আছে লাইটপােস্টের ক্ষীণ আলাে। সাধু গিয়ে দাড়ালাে সমাদ্দারের বাড়ির সামনে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাে বিরাট বাড়িটার দিকে। সামনে পিছনে অনেকটা করে জমি। সামনের বাগানটা নিচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা, পেছনে অনেকটা উচু দেয়াল, ভেতর দেখা যায় না। বাইরের ঘরে আলাে জ্বলছে, জানালা দিয়ে দেখা যায় সমান্দায় বসে আছে টেবিলের উপর বুকে—একা। সাধু দেয়াল টপকে আস্তে-আস্তে এগিয়ে গেল। ‘কে—কে তুমি, কি চাই? ভীত ও বিস্মিত হয়ে সমাদ্দার বলে উঠল। R
जबांना
০
‘আমি অমূল্য-অমূল্য গুপ্ত
মন্মথ সমান্দার মুহুর্তের জন্য বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকায়,
তারপর হঠাৎ চঞ্চল হয়ে ওঠে। উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ
করে, এদিক ওদিক তাকিয়ে দু-একটা জানালার পরদাও
টেনে দেয়।
‘া বসাে।
বসতে বাংলাে অমূল্যর। চেয়ারে বসা ও অভ্যাস নয়,
ধারণারও বাইরে চলে গেছে-তার উপর এই গদি-আটা
কৌচে। দু-একবার বিধার পর অমূল্য বসলাে।
ই—তারপর হঠাৎ এতকাল পরে কোথা থেকে, কি
মনে করে—
‘আমাদের সেই টাকাগুলাের কি করলে জানতে এলাম।
কোন ভূমিকা না করে অনেকটা যেন জোর করেই কথাটা অমূল্য
বলে ফেললাে।
‘অ—টাকার হিসেব চাইতে এসেছ, যদি না দিই?
দিতে আপনি বাধ্য। আমরা জীবন দিয়ে এ টাকা সংগ্রহ
করেছিলাম আপনার বিলাসের জন্যে নয়- বিভূতির মৃত
দেহটা যেন কাঁধের উপর অনুভব করে অমূল্য। এ অপরাধের
শান্তি আপনার পাওনা আছে। স্থানকাল ভুলে উত্তেজিত কঠে
অমূল্য ব'লে ওঠে। পনেরো বছরের পুঞ্জীভূত গ্লানির প ভেদ
করে বিগত দিনের বিপ্লবী মনটা হঠাৎ যেন মাথা ঝাড়া দিয়ে
উঠলাে আজ।
ফোন-এর রিসিভ-এ হাত রেখে মন্মথ সমান্দার ধীরে
ধীরে বলে, তােমার মাথার অবস্থা সুস্থ বলে মনে হচ্ছে
না অমূল্য—ভুলে গেছ বােহ হয় তােমার জীবন হালকা
সূতোয় ঝুলছে—আর কিছু ভােমার বলবার আছে। তীক্ষ্ণ
দৃষ্টিতে অমূল্যর উপর নজর রাখে মন্মথ সমান্দার।
বাস্তব বুদ্ধি ফিরে এল অমূল্যর। গলার সুরটা নরম
করে বললাে, কর্তব্য মনে করেছি খোজ নিতে এলাম, ইচ্ছে
হয় ধরিয়ে দিতে পারেন, না দেন—দয়া, স্মরণ রাখবাে-
হ্যা, দেবেশদার কোনাে খোঁজ রাখেন?
‘দেবেশ জেল থেকে বেরিয়েই আমার সঙ্গে দেখা করে-
ছিলাে, তাকে আমারই একটা বিজনেস কনসান-এ ম্যানেজার
করে দিয়েছি—মাইনে তিনশাে। তােমার জন্যে ওরকম কিছু
করার যে উপায় নেই, না হয় করতাম নিশ্চয়ই—চাও তাে
টাকা দিতে পারি কিছু।
দেবেশ হাজরার খবর শুনে অমূল্য স্তব্ধ হয়ে ছিলাে, শেষের
কথাটা কানে আসতেই বললাে, না, টাকার আমার দরকার নেই
—আর নিতেই যদি হয় সেদিন এসে হাত পেতে নেব, আপনি
যেদিন দান করবেন। একটু চুপ থেকে বললাে, আমার
একটা অনুরােধ রাখুন, আপনার এই দানটা বন্ধ করুন।
‘আবার উপদেশ দিচ্ছ অমূল্য—যাক, দান বন্ধ হবে না,
কিন্তু কেন, এ সৎ ব্যয়ে তােমার আপত্তি কিসের?
সৎ ব্যয়। এ তাে নিছক ইয়ার্কি উপহাস। এ দানে
৭০
মা না আপনার স্বার্থসিদ্ধি হতে পারে, ওদের লাভ কতটুকু। ওদের কোনাে ভবিষ্যৎ নেই মন্মথবাবু—ওদের মরতে দিন। ভিক্ষা- বৃত্তিটা মনে এমন কোন কাজে খরচ করুন টাকাটা, তবু কিছুটা সানা পাবে। ‘তােমাকে সানা দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। ওসব কথা আমার কাছেই শিখেছিলে—এখনকার দিনের নতুন কথাগুলাে জান না নিশ্চয়ই-আচ্ছা- মন্মথ সমাদ্দার উঠে দাড়ালাে। বাড়ির আঙিনা পার হয়েই অমূল্য চট করে মিশে পড়ে অন্ধকারে লােকটাকে বিশ্বাস নেই। মনে মনে সে স্থির- প্রতিজ্ঞ হয়েই বেরিয়ে এসেছে—একে দণ্ড দেওয়াই তার জীবনের শেষ কর্তব্য। দেবেশ হাজরা বিকিয়ে গেছে, কিন্তু সে আছে, আঘােয়তির পাথেয় এই দানের মহিমা তাকে সে অর্জন করতে দেবে না—এটা বন্ধ করতেই হবে—এমন কি, তার চেয়েও বেশি কিছু কিন্তু কেমন করে তা সম্ভব। বাড়ির পিছনের ময়দানে বিরাট হােগলার ছাউনি বাঁধা হয়েছে, তাতে রঙিন কাপড়ের গেট, চার পাশে রঙিন কাপড়ের সজ্জা। সমস্তটা দুপুর গেছে অসংখ্য নিমন্ত্রিতের ভিড়। দুর্লভ পেট্রোল পেটে নিয়ে রাস্তার দু'পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সব মােটর গাড়ি। নিমন্ত্রিতদের অনেকেই রয়ে গেছে দান দেশে ফিরবে ব'লে। ৭৫ সকাল থেকেই শতসহস্র ভিক্ষুক এসে জমায়েত হয়েছে বাড়ির চারপাশে। অমূল্যও এসেছে। তার গেরুয়া আলখাল্লা গায়ে নয়, ছেড়া নেংটি পরে-লাঠির মতাে করে ধরা হাতে লম্বা একটা লােহার শিক। একপাশে দাড়িয়ে সে সমাজের এই জ্যান্ত আবর্জনাগুলোর কাণ্ড ও কলহ দেখছিলাে। এক-একদল আসছে, মানুষ তাে নয় কর্পোরেশনের এক-এক গাড়ি আবর্জনা। জাত-ধর্ম রীতিনীতি নারী-পুরুষ রােগ-খাদ্য—সব কিছুর বাছ- বিচারহীন এক অদ্ভুত জীবন! এদের এভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করার নাম দয়া। ধনীর সমাজ-মুখে এরা যেন গোপ দাড়ি না গজালে মাকুন্দো, তার বৈশিষ্ট্যে আঘাত লাগে; গজাতেও হবে, কাটাও পড়বে। ভিকিরীদের ডাক পড়ে। শত শত একসলে ধাওয়া করে ময়দানের দিকে। হাতে হোওয়া অসম্ভব-বেচ্ছাসেবকেরা লাঠির সাহায্যে লােকগুলিকে ঢুকিয়ে দেয় ময়দানে। কয়েক সহস্র ঢুকবার পর স্থানাভাবে আরও অনেকে বাইরে অপেক্ষা করে দ্বিতীয় দফার জন্যে। গেট বন্ধ হয়ে গেলাে-অমূল্য ঢুকতে পারলাে না। গােময় পিণ্ডের মতাে মাঠময় গদিয়ে বলে গেছে ভিকিরী- গুলি। একপাশে একটা মঞ্চের উপরে মন্মথ সমাদ্দার বসেছে হাজার হাজার টাকা নিয়ে। একজন করে তার হাত থেকে একটি টাকা নিয়ে বেরিয়ে যাবে উলটো দিকের গেট দিয়ে। গেটের কাছে মন্ত একটা বালতি ভরা পাকা র, বেরুবার সময় হাতটা তাতে তা মা লা ডুবিয়ে দেয়—দুবার ঢুকে দুটো টাকা না নিয়ে যায়। এ ব্যবস্থা পরে করা হয়েছে—একবারে স্থান সংকুলান হয়নি বলে। গেটের ফাঁক দিয়ে অমূল্য তাকিয়ে আছে—অমানুষিক হিংস্রতায় বলছে তার চোখ দুটো। হঠাৎ তার মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে-মনের তলা থেকে কে যেন চুপি চুপি বলে—আগুন। কিন্তু কেবল তাে মন্মথ সমান্দার নয় আরও যে রয়েছে অজস্র নরনারী। সঙ্গে-সঙ্গে যুক্তি ওঠে-মরণ কোথায় সে-তে মুক্তি- আগুন—আগুন—দীন আর দয়াল, দাতা আর দরিদ্র উভয়কে ঘিরে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে দিব্য পাবক। ধোয়ার সঙ্গে উধ্বে ওঠে অসংখ্য ভিকিরীর প্রাণের আকুতি। ক্রমে আগুনের চেয়ে থোয়াই ওঠে বেশি। নগ্নদেহীর গায়ে আগুন তেমন জোর ধরে না, যেমন জোর ধরেছিলাে সেদিন কলকাতার মধ্যবিত্তদের গায়ে, যেমন সােল্লাসে এলেছিলাে সে যােস্টন প্রমােগৃহের বিলাসীদের অঙ্গে। আসে ফায়ার-ব্রিগেড। হােজ পাইপের মুখ থেকে ছিটকে গিয়ে লাফিয়ে পড়েন গঙ্গাদেবী তার সহস্র সন্তানের অর্ধদগ্ধ মৃতদেহে। পরের দিন সম্পাদকদের কলম কাঁদতে কাঁদতে ছুটে চলে মহাত্মা মন্মথ সমান্দারের শােকগাথায়-সঙ্গে আরও দু-দশ- জনের। কিন্তু নাম-গােত্রহীন শতসহস্র নরনারীর কথায় এসে ত ম না কে কলম থেমে পড়ে—কি কারণে শােক, সমাজের চিকিৎসা- বহিভূত গলিত অঙ্গের খানিকটা পচে গলে না পড়ে হঠাৎ কেন কাটা পড়লল—তাই। এতগুলাে মানুষের এমন অমানুষিক পদ্ধতিতে সরবার কথা নিয়েই লেখা হলাে দু-চার লাইন—অবশেষে আত্মার শান্তি কামনা। রাস্তায় কাগজওয়ালা হাঁকে ভীষণ অগ্নিকাতে মহাত্মার জীবনান্ত। থেকে থেকে আকাশ জুড়ে নামে উড়োজাহাজের গােডানিসমাদ্দারের বাড়ির পথ দিয়ে চলতে চলতে সাধু চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ভােল নাচে, বুড়ি নাচে, নাচে গঙ্গারাম- ডিমি ডিমি ডিমি টরুম টরুম!
ঝাপসা চোখ
নগর-সভ্যতার এক অনিবার্য ব্যবস্থা—এই মেল-এর
জীবন।
এ জীবনের সঙ্গে মােটেই পরিচয় ছিল না, লড়াইয়ের
কল্যাণে সেটা হয়ে গেল। ইভ্যাকুয়েশনের ধাক্কায় পারিবারিক
জীবন দ্বিখণ্ডিত হলাে। পরিহার্য নাগরিক হিসেবে স্ত্রী
চিন্তাকুল চিত্ত নিয়ে চলে গেলেন পিত্রালয়ে—অপরিহার্য
নাগরিক আমি, বােমভীতি ঘাড়ে নিয়ে পড়ে রইলাম
কলকাতায়।
ঘাড় থাকলেই তার সঙ্গে একটা আয়ের প্রয়ােজন
খুঁজে পেতে একটা মেস বার করা গেল। এ মাসে যিনি
ম্যানেজার তারই ঘরে একটা সিট খালি। চারটে ঘর, আটটা
সিট—আমিই অষ্টম ব্যক্তি।
ভিড় বাড়বার সম্ভাবনা নেই জেনে উৎসাহ বােধ
করলাম।
ম্যানেজার ভদ্রলােকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কেউ
গান গায় কি-সিনেমার গানটান
প্রশ্নের তাৎপর্ষটা তিনি বুঝেছেন তারই অভিব্যক্তি হিসেবে
মৃদু একটু হেসেই আবার গভীর হয়ে গেলেন। রাসভারী গলায়
उधना
বললেন, 'তা হলে কি আর আমিই এখানে থাকতাম, সব সময়
পড়াশুনাে নিয়ে থাকতে হয়।
পড়াশুনাে তিনি করেন তার প্রমাণস্বরূপ কতক মােটা-
বইও রয়েছে টেবিলের ওপর। এরই সঙ্গে এক ঘরে থাকতে
হবে-একবার লক্ষ্য করে দেখে নিলাম। কালাে ছােটোখাটো
লােকটি, চোখে পুরু পেবলস-এর চশমা। দৃষ্টির ক্ষীণতার জন্যেই
হয়তাে জ্ব-কুঁচকে এমন তীভাবে তাকান প্রথমটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টি
বলে ভুল হয়। চুলগুলাে পেছন দিকে ঠেলে দেন কিন্তু
তেমন নমনীয় নয় বলে ফেটে দু’তিন ভাগে ভেঙে পড়ে।
কথাবার্তায় বেশ একটু একনােখা এবং অতিরিক্ত আত্মশ্রদ্ধা-
সম্পন্ন বলেই মনে হয়। পরিচয় বিনিময়ে জানা গেল নাম
যােগেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কোনাে এক স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
যােগেশবাবু স্কুলের জন্যে তৈরি হলেন-জামাটা গায়ে
চড়িয়ে বললেন, ‘দু'একটা দিন একটু অসুবিধে হবে, গত কাল
চাকরটা ভেগেছে। এমন পাজি এই সারভেট ক্লাস আর বলবেন
-স্টুপিডগুলাে সব গরু-ভেড়ার মতাে পালাচ্ছে। চাকর
জোটানােও হয়ে পড়েছে মুশকিল। অবিশ্যি আমি একটু সময়
করতে পারলে এরই মধ্যে একটা ব্যবস্থা হয়ে যেত, কিন্তু
যােগেশবাবুর কথা শেষ না হতেই একটি লােৰু এসে
জোড়হস্তে দরজায় দাঁড়ালাে। রােগা ঢেঙা শরীর, কাঁদুটো
সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অতিরিক্ত চওড়া চোয়াল, চোখ
দুটো ঘােলাটে, দৃষ্টিটা মনে হয় অর্থহীন।
বা প পা চোখ
তার কর্কশ ক যথাসম্ভব বিনীত করে বললাে, আরে
অনলাম আপনাদের চাকরের দরকার আছে
যাক বাঁচা গেল ভৃত্যহীনতা নিয়ে একটু ভাবিত না
হয়েছিলাম এমন নয়। একে মেস তার ওপর আজই প্রথম
দিন, চাকর ছাড়া কি করে কি করবে ভেবে পাচ্ছিলাম না।
আমার ভাগ্যেই হােক আর উমেদারের নিজ ভাগ্যেই হােক
এখন বহাল হলেই হয়—যদিও যােগেশবাবুর মুখের ভাটা
বিশেষ আশাপ্রদ মনে হলাে না।
যােগেশবাবু লােকটির আপাদমস্তক তীক্ষ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ
করে গভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, 'নাম কি?
‘আজ্ঞে নিবারণ।
‘নিবারণ—ই—এর আগে কোথায় চাকরি করতে, কি
ক'রে জানলে এখানে চাকর নেই?
চলতি প্রশ্নের মামুলি জবাব পেয়েই যােগেশবাবু সন্তুষ্ট
হলেন। বললেন, জামা কাপড় এত নােরা কেন?' আবার
তাকালেন। ওঃ হরীল—না না এমন নােংরা লােক আমি
রাখবাে না।'
শেষ পর্যন্ত লােকটাকে বিদায় করেই দিচ্ছেন দেখে
ইংরিজিতে বলতে গেলাম, “যদিন না একটা ভালাে লােক
জুটছে—
কথা তিনি শেষ করতে দিলেন না। কূটনৈতিক চালে
হাতের সামান্য একটু ইঙ্গিতে আমাকে থামিয়ে দিলেন।
২১
ত ম সা নিবারণ জোড়হন্তে জানায়, চার পয়সা মূল্যের একটি মেটে সাবান পেলেই এ ক্রটি সে সংশােধন করে নিতে পারবে। একে মাগগিগণ্ডার বাজার, তাতে চাকরি নেই—তার ওপর যা শীত-একখানা কাপড় আর একটা মাত্র জামা, ভেজানাে আর হয়ে ওঠে না—ইত্যাদি অনেক কথাই সবিনয়ে নিবেদন করে নিবারণ। আগ্রহটা তার অনুনয়বিনয়ের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে—চাকরি একটা তার একান্ত প্রয়ােজন। মাইনে থেকে শুরু করে এটা-ওটা নানা কথা নিয়ে আধঘণ্টা বকাঝকার পর যােগেশবাবু রায় দিলেন, আচ্ছা যাও কাজে লেগে যাও, দু'চারদিন দেখে পছন্দ হয় রাখব নয় তাে না। অস্থায়ীভাবে নিবারণ বহাল হলাে। বেরুবার মুখে যােগেশ- বাবু বললেন, তখন আপনাকে থামিয়ে দিলাম কেন বুঝতে পেরেছেন? আশ্চর্য হয়ে মাথা নেড়ে জানালাম, না। বুঝবার মতাে কিছু ছিল বলে এখনও মনে করতে পারলাম না। যােগেশবাবুর মুখে একটু অর্থপূর্ণ হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। আবার গম্ভীর হলেন। ‘এ সব চাকর- বাকরের ব্যাপার——যাক, আমার আবার সময় হয়ে গেল। ধীর পদক্ষেপে তিনি বেরিয়ে গেলেন। চাকর-বাকরের ব্যাপারের মধ্যে রহস্যজনক এমন কি থাকতে R
বা পসা চো খ
পারে যা আমি বুঝলাম না। এমন কি বললে বুঝবে কিনা সে
বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি প্রস্থান করলেন। সকলের
ওপরেই একটা শিক্ষকসুলভ অনুকম্পা। অবিশ্যি পরে তার এই
অর্থপূর্ণ মৃদুহাস্যের সঙ্গে বহুবারই পরিচয় ঘটেছে। যে-কোনো
আলােচনায় দু'চার কথা বলেই তিনি থেমে যান, ঠোঁটের কোণে
দেখা দেয় এই হাসি। ভাবটা এই, এ বিষয়ে বলতে গেলে
বলার শেষ নেই—আমার কিন্তু বরাবর মনে হয়েছে বলা তাঁর
শেষ হয়ে যায় বলেই তিনি থামেন। কিন্তু এই হাসির
দৌলতে বিজ্ঞলােক বলে মেম্বরদের মধ্যে একটা প্রতিষ্ঠা
অর্জন করেছিলেন সে কথাও সত্যি।
পাঁচটা বাজতে ওপর-নিচ থেকে সমানে ডাক শুরু
হলাে, নিবারণ-নিবারণ। চা-পিপাসীদের বৈকালিক
আর্তনাদ।
যােগেশবাবুও হাঁক ছাড়লেন। এল নিবারণ। হুকুম
করলেন পেয়ালা নাবিয়ে আনতে। ঘরের এক কোণে একটা
কেরােসিন কাঠের ব্ল্যাক, তার দুটো গতে ঢােকানাে রয়েছে
দুটো কাচের গ্লাস, দুটো হুকে ঝুলছে দুটো পেয়ালা।
নিবারণের চোখ সেদিকে পড়লাে না। সে খুদ-কুড়ােনাে
দৃষ্টি নিয়ে টেবিলের এখানে-সেখানে হাত বাড়াতে
লাগলাে।
‘এখানে নয়, ঐ যে দেয়ালের গায় ব্যাক-এ। যােগেশবাবু
ধমকের সুরে বললেন।
৮
নিবারণ তার অর্থহীন দৃষ্টি মেলে বার দুই তাকালে দেয়ালের দিকে, তারপর এগিয়ে গেল। অনেকটা হাতড়েই একটা পেয়ালাকে সে ধরলাে। যােগেশবাবু ধমকে উঠলেন, ‘চোখে দেখতে পাস না নাকি, এ্যানিশ্চয়ই চোখে কম দেখিস আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, “দেখুন, একে দেখেই আমার মনে হয়েছিলাে ওর আইলাইট খারাপ—না, কানা নিয়ে তাে কাজ চলবে না। কানাকানা কেন হতে যাৰ বাবু। ঐ কোণটা অন্ধকার ডাই- ‘চোখে কম দেখি বলেই অন্ধকার ঠেকছে তাের কাছে। আমি বলছি তুই চোখে কম দেখিসবল সত্যি করে ? “না বাবু চোখে কম দেখতে যাব কেন পেয়ালা নিয়ে নিবারণ বেরিয়ে গেল। যােগেশবাবু সেদিকে এমন ভাবে তাকিয়ে রইলেন, বুঝা গেল কথাটা স্বীকার করে না যাওয়ায় তিনি যথেষ্ট অসন্তুষ্ট হয়েছেন। ঘরটায় আলাে ঢােকে কম, ঐ কোণটায় আরাে কম, তবে কিনা দেখতে না পাওয়ার মতাে নয়। লােকটির চোখে দােষ আছে সন্দেহ নেই। যােগেশবাবু সকলের শেষে খান, আমিও গেলাম তারই নিবারণ কলসি কাত করে দু’গেলাস জল গড়িয়ে আনলাে।
আ প না গে
হাত ধুতে গিয়ে দেখি আদ্ধেক গেলাস অল। বললাম, এ কি
গেলাস ভরে দাও নি কেন?
যােগেশবাবু তখনও গেলাসে হাত দেন নি, শােনামাত্রই
তাকালেন গেলাসের দিকে। বলেছি বেটা চোখে কম দেখে।
কতটা গড়াচ্ছে আন্দাজ পায় না আর কি— তীব্র দৃষ্টিতে
চাইলেন নিবারণের দিকে। ‘কি আদ্ধেকটা জল ভরেছিস
কেন ?
খান না, লাগে তাে আবার দেখুন।
‘সে-কথা হচ্ছে না—চোখে দেখতে পাস না হতভাগা সেটা
বলিস না কেন, আঁ?”
‘চোখে দেখতে পাব না কেন বাবু, খুব পাই, খালি খালি
আপনি এক কথা বলছেন।
নিবারণও কিছুতেই স্বীকার পাবে না। নিশ্চয়ই তার ভয়
এ কথা স্বীকার করার পর চাকরি তার ছুটে যাবে।
যােগেশবাবুর মুখচোখ গম্ভীর হলাে। ভারি গলায় বললেন,
‘এখনও সত্যি কথা বল বলছি, মিথ্যে বললে কালকেই তােকে
তাড়াবে।
কথাটা নিবারণ বিশ্বাস করে না নিশ্চয়ই। সে জানে সত্য
কথা বলায় যেটুকু গুণ প্রকাশ পাবে তার চেয়ে অনেক বড়
দোষ প্রমাণিত হয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গেই। চাকরি একার পক্ষে
যেটা একেবারেই অনুকূল নয়।
তাই নিবারণও হ্যা বলে না
কিছুতেই।
অনেক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল কাশির আওয়াজে
-নিবারণ কাশছে। অমন কাশির আওয়াজ কখনাে শুনিনি।
যেন বিলিতি করতাল ঠুকছে-ঝম্ করে একটা শব্দ এক
মিনিট।
শুনছেন মশায়, জেগে আছেন না ঘুমুচ্ছেন— যােগেশবাবু
ডাকলেন।
বললাম, জেগেই আছি, বলুন।
টের পেলাম যােগেশবাবু উঠে বসলেন। শুনছেন কাশির
শব্দকোনাে রকম ব্যাড টাইপের নয় তো? শঙ্কিতভাবে
প্রশ্ন করলেন।
“কি করে বলব বলুন, হতেও বা পারে।
হতেও বা পারে, বলেন কি-ব্যাটাকে তাে তাড়াতে হচ্ছে।
সকালে উঠেই ডাকলেন নিবারণকে। ‘কি, তোর কোনো
কাশির ব্যায়াম আছে।
বাৰু কাশির ব্যায়াম থাকবে কেন, কটা দিন ঠাণ্ডা
লেগেছিল তাই
এ তাে ঠাণ্ডার কাশি নয়।
‘হা বাবু ঠাণ্ডার কাশি-ডাক্তার বললে ঠাণ্ডার কাশি-
আপনার যেন বাকিতে পেত্যয়ই হয় না।
আঁ, আবার কেতাবি ভাষা বলা হচ্ছে, বাকিতে পেত্যয়ই
হয় না— বিকৃত স্বরে বলে উঠলেন যােগেশবাবু। ডাক্তারকে
দেখিয়েছিলি তা হলে?
॥ প স গে খ
উবুও নিবারণ
আরে গা।
ডাক্তারের কথা শুনে যােগেশবাবু যেন খানিকটা নিশ্চিন্ত
হলেন।
বেরিয়ে যেতেই জানিয়ে দিলেন
ওকে বিয়ে করা সম্পর্কে তিনি স্থির সংকল্প। লােক জুটছে
বলে নিবারণ কিন্তু থেকেই গেল। নিবারণের থাকাটা
বাহনীয় নয় কারুর কাছেই—এমন লােক দিয়ে কাজ চলতে
পারে না। সদরের কড়া নেড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়,
তেতলার রান্নাঘর থেকে একটি একটি সিড়ি বেয়ে নাবতেই
তার দশ মিনিট। এমনিতে বেশ বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, এই চোখের
জন্যেই হয়তাে কোথাও চাকরি টেকে না।
সেদিন তাে আমারও মেজাজ রীতিমতাে খারাপ হয়ে গেল।
কড়া নেড়ে কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকা যায়। ব'সে-বসে নাবলেও
ততা এর আগে পেীছননা উচিত। কড়া একটা ধমক দিয়ে
ওপরে চলে গেলাম।
পবের দিন সকালে দেখা গেল নিবারণের বাম জ্বর
পাশে বড় রকমের একটা আঘাতের দাগ—তার ওপর চুন
হলুদ চাপাননা, আশপাশে চাপ-চাপ রক্ত শুকিয়ে আছে।
চোখে পড়তেই যােগেশবাবু জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি
হয়েছে, কপাল ফাটলে কি করে?
‘আজ্ঞে কাল বাবুকে দরজা খুলে দিতে গিয়ে ডাণ্ডাটা ছিটকে
এসে লাগলাে-
ই, ওটায় স্প্রিং আঁটা রয়েছে কিনা ছিটকে গিয়ে লাগলাে
৭
তম পা
তাের কপালে—ব্যাটা এমন বজাত তবু সত্য কথা বলবে না।
আরে মশাই চোখে দেখতে পায় না, নাতে গিয়ে কোথায়
কপাল ঠুকে গেছে দরজার রডটা কখনাে গিয়ে এভাবে লাগতে
পারে।
লাগলাে তাে বাবু বিড়বিড় করে আরও কি যেন বলতে
বলতে নিবারণ বেরিয়ে গেল।
‘আচ্ছা আপনিই বলুন, ব্যাটার আইসাইট খারাপ নয়?
আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।
কি জানি হয়তাে হবে—
হয়তাে নয়, আই এ্যাম সিওর
তার কথার সমর্থনে কোনােই উৎসাহ প্রকাশ করলাম না।
এমন একটা মােটা ব্যাপারকে প্রমাণ করতে এতটা উঠেপড়ে
লাগবার কি আছে! আর লােকটাকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে
নেবারই বা প্রয়ােজনটা কি?
সেদিন খেতে বসে রীতিমতো একটা গােলযােগ বেধে
গেল।
যােগেশবাবু খাবার সময় উরুতে কনুই রেখে একেবারে
ঝুকে পড়েন থালার ওপরে। মুখ আর খাদ্যবস্তুর ব্যাবধানটা
যথাসম্ভব কমানােই এর উদ্দে না দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণভাই এর
কারণ বলা কঠিন। বেশ মানােযােগর সঙ্গে খাচ্ছেন, হঠাৎ হাঁক
ছাড়লেন, নিবারণ
কি ব্যাপার। হাই দিয়ে থালা মালা হয়েছে তারই
}
॥ প স চোখ খানিকটা তখনও লেগে আছে খালার গায়। যােগেশবাবু ভয়ানক রকম রেগে উঠে গালাগালি করতে লাগলেন। কানা চোখে দেখতে পাস না সেটা বল—এমন সব কাণ্ড করবে ত হারামজাদা সত্য কথা বলবে না- এতে বাবু চোখে দেখা না দেখার কি আছে—তাড়াতাড়ি ধুয়ে আনতে কথা শেষ হলাে না, যােগেশবাবু দাড়িয়ে পড়ে সজোরে এক চড় কষিয়ে দিলেন তার গালে। নিবারণ কিন্তু কুদ্ধ হবার পরিবর্তে যােগেশবাবুর পায় হাত দিয়ে বার বার বলতে লাগলাে, 'এমন অঙ্গায় আর হবে না বাবু, এবারটি মাপ করুন। তবু ব্যাটা স্বীকার করবে না যে চোখে দেখতে পায় না। যােগেশবাবু শান্ত হয়ে বসে থালা পালটে দেবার হুকুম করলেন। ঘরে এসে আমাকে বললেন, দেখলেন তাে, এই যে গালাগাল আর মার খেলাে তবু কিন্তু কাজটি ছাড়তে চাইলে নাব্যাটা আসল বাত- মার দেওয়াটা মােটেই সমর্থন করতে পারিনি, মনে মনে একটু কষ্ট হয়েছিলাম। অসন্তুষ্টি গােপন না করেই বললাম, এতে বজাতির কি আছে—ঘরে ভাত নেই বলেই চড় খেয়েও চাকরি করতে হয়। যােগেশবাবুর মুখে সেই হাসি। বাড়ির চাকরকে একটা জোর ধমক মেরে দেখবেন তাে, তক্ষুণি সেও মেজাজ দেখিয়ে চাকরিতে ইস্তফা দেবে। ওদের আবার আনএমপ্লয়মেন্ট প্রবলেম আছে নাকি। মেস-এর চাকরের চুরির রেট কষার একমাত্র উপায় হলাে বকাঝকা, যত বেশি সইবে ততই বুঝবেন জোর হাত চলছে—তাই বলছিলাম ব্যাটা আসল বজ্জাত- জ্যামিতিক পদ্ধতিতে কথাটা প্রমাণ করেও আবার বিশদ ব্যাখ্যায় বুঝিয়ে বললেন—হয়ত এ বিষয়ে বক্তব্য একটা কিছু আছে বলেই শুধু মৃদু হাসি নিয়ে দুর্বোধ্য হয়ে রইলেন না। এর পর দিনদুই কেটে গেছে। আপিস ফের ঘরে ঢুকতে যাব, জানলা দিয়ে নিবারণের কাণ্ড দেখে থেমে গেলাম। রবার সােল জুতাে নিয়ে নিঃশব্দে এসে ঢুকেছি, আমার অস্তিত্ব নিবারণ টের পায়নি। নিবারণের চোখে যােগেশবাবুর চশমা। হাত বাড়িয়ে এটা সেটা ধরছে। চোখেমুখে একটি প্রসন্ন হাসি। একটা বই খুলে চেয়ে রইলাে কিছুক্ষণ, বুঝলাম পড়ছে—বাংলা লেখা- পড়া সামান্য জানে তার প্রমাণ ইতিপূর্বে হিসেবে চিরকুট থেকেই পেয়েছিলাম। আর বাড়তে দেওয়া ঠিক নয়—ওরই ভালাের জন্যে ওকে সাবধান করে দেওয়া উচিত। ধরা পড়ে আবার একদিন মারধর খাবে যােগেশবাবুর হাতে। ঘরে ঢুকে পড়লাম। আমাকে দেখেই এন্তে চলমাটা নাবিয়ে রাখলাে টেবিলে। কিছু বলতে যাব এমন সময় যােগেশবাবুও সশব্দে বেরিয়ে এলেন বা প শ চোখ বাথরুম থেকে। আর বলা হলাে না—ভীত নিবারণও চটপট, সনে পড়লাে ঘর থেকে। কিছুক্ষণ পরে চা দিতে এসে সে বুঝতে পারলাে যােগেশ- বাবুকে আমি কিছু বলিনি। সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে সে বেরিয়ে গেল। যােগেশবাবু চা খেয়ে পেয়ালাটা নাবিয়ে রাখলেন মেয়ে। নিবারণ ঘর ঝাট দিতে এল। হঠাৎ তার ঝাটার টান লেগে সশকে পেয়ালাটা গড়িয়ে গেল। যােগেশবাবু চৌকি থেকে লাফিয়ে উঠলেন। পেয়ালাটা অক্ষতই রয়েছে তবু যােগেশবাবু কুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, হারামজাদা তবু বলবে ও দেখতে পায়—পেয়ালাটা ভাঙলে আজ তােমার মাথাও আমি ভাতাম ‘গাল দেবেন না বলছি বাবু-ই-সেদিন যে নিবারণ মার খেয়েও পা ধরেছিলাে আজ সে রীতিমতাে শিরদাড়া খাড়া করে রুখে উঠলো। না রাখতে হয় না রাখবেন, হিসেব চুকিয়ে দিন কালই চলে যাব। নিবারণের এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে প্রথমটা যােগেশবাবু যেন একটু থমকে গেলেন। তারপর সামলে নিয়ে গভীরভাবে বললেন, ‘ভারি যে তেজ বেড়েছে দেখছি। ভেবেই আমাদের লােক জুটছে না—উ? কাল সকালেই তােকে বিয়ে করব -নেই মাঙতা ভাের মাে কানাখোঁড়া-লায়ার- ‘বেশ তাই করবেন। গাল খেয়ে চাকরি করতে পারব নাই- নিবারণও বেশ মেজাজের ওপরই কথা কটা ব'লে বেরিয়ে গেল। ঠিক বলছি, কাল বিদেয় করার সময় দেখবেন পায় ধরে কাদবে-হারামজাদা ব্যাটাদের আমি চিনি না—ভেবেহে লােক জুটলে তাে তাড়াবে। যােগেশবাবু বললেন। পরের দিন সত্যি সত্যিই যােগেশবাবু নিবারণের হিসেব চুকিয়ে দিলেন। নিবারণ কিন্তু মােটেই আপত্তি করলাে না—অনুরােধ- উপরােধ তাে দূরের কথা। যােগেশবাবু অবাক তাে হলেনই, একটু লজ্জিতও বােধ করলেন। তার হিসেবে ভুল। আমার দিকে আর চোখ তুলে ভালাে করে তাকালেন না। খাওয়া-দাওয়ার পরই নিবারণ চলে যাবে। যােগেশবাবু সবাইকে ভরসা দিলেন বিকেলেই তিনি চাকর এনে হাজির করবেন—ভাবনার কোনােই কারণ নেই। অতএব অন্যান্য মেম্বরদের তরফ থেকেও আর কোনাে আপত্তি উঠলাে না। স্নান সেরে ঘরে ঢুকে যােগেশবাবু টেবিলের এদিক-ওদিক হাতড়াচ্ছিলেন, আমি ঘরে ঢুকতেই বললেন, আমার চশমাটা পাচ্ছিনে মশাই বললাম, “ভালাে করে ধুয়ে দেখুন এখানেই আছে, চশমা আর যাবে কোথায় কোথায় রেখেছিলেন ? এই তো এখানে রেখে এই মাত্র স্নান করতে গেছি। ।
বা প স গে ধ টেবিল বিছানা এখান-ওন চনচ করেও পাওয়া গেল চশমা। ‘চশমাটা যাবে কোথায় মশাই চিন্তিত মূখে যােগেশ- বাবু বললেন। হঠাৎ গত স্যার ঘটনাটা মনে পড়লাে। বললাম, ‘নিবারণ নিয়ে পালায় নি তো? রাইট ও—ঠিক বলেছেন। যােগেশবাবু হাঁক ছাড়লেন, ‘নিবারণ—নিবারণ কোথায় নিবারণ! নিবারণ পালিয়েছে। খবর শােনা মাত্র সকলেই নিজ নিজ জিনিসগুলাে একবার মিলিয়ে দেখলাে -কার তৃণটুকুও খােয়া যায়নি, গেছে শুধু যােগেশবাবুর চশমাটি। যােগেশবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। এই যুদ্ধের বাজারে একটা চশমার দাম চাইবে তিরিশ টাকা টাকার দুঃখকে ছাপিয়ে সহসা তাঁর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলাে। কেমন বলেছিলাম কিনা লােকটার আইলাইট খারাপ ঠোঁটের কোণে দেখা দিল সেই বিজ্ঞতার হাসি।
এক ফালি
গলিটা শুধু বয়সেই পুরােনাে নয়, আকৃতিতেও নিতান্ত
পুরােনাে। সংকীর্ণ অপরিচ্ছন্ন রাস্তার একপাশে বস্তি-কুৎসিত
হল ঘরগুলি একে অন্যের কোমরে বা কাঁধে ভর করে দাড়িয়ে
আছে। চারদিক থেকে গা বাঁচিয়ে দিব্য একখণ্ড ঘাসের
গালচের উপর দর্পভরে মাথা তুলে দাড়াবার ক্ষমতা বা স্পর্ধ।
এদের নেই। যৌথশক্তি নিয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপক্ষে
লড়াই করে টিকে থাকতে হয় এদের। আশেপাশে একতলা
ও দোতলা অনেকগুলাে বাড়ি। হাওয়ার তরফ থেকে চলাচলের
জন্যে জোরজুলুমে কয়েক ফুট জমি ছিনিয়ে নেবার মতাে ক্ষমতার
অস্তিত্ব এদের জন্মকালে ছিলাে না, তাই দু বাড়ির মধ্যবর্তি এক
চুল জমিরও অসদ্ব্যবহার হয়নি। ঘেষাঘেঁষি এই বাড়িগুলাের
অতি জীর্ণ একটা দোতলার নিচের তলায় একখানা ঘরে কয়েক
দিন হলাে রণেশ এসে উঠেছে—শুধু রণেশ নয়, এ রণেশ,
বি-এ।
অন্তত এই সে বলে ও লেখে। লােকে হাসে-বি-এ তো
ঘাটেপথে, ও আবার জাহির করা। ব্যানার্জি, বােস এসবই বা
এমন কি কচিং ঘটনা। শ্ৰেণীবাচক পদবিটা তাই নিরর্থক
বােখে ছেটে ফেলেছে। যুগের ব্রাহ্মণ্য বােঝাতে যে পদবির
এক ফালি
প্রয়োজন শুধু সেটিই জুড়ে দেয় নামের পেছনে। আধুনিক
কেতায় নামটিকে পর্যন্ত হীন করা সে সমর্থন করে না।
এ লুপ্ত হয়েছে জীবনের সব দিক থেকে, শুধু তার চিহ্নটুকু টিকে
আছে নামের আগে—রণে সেটা বড় হরফে লেখে, জোরের
সঙ্গে উচ্চারণ করে।
এম-এ পড়ার আগ্রহ আছে, সামর্থ্য নেই। চাকরির ধান্দায়
ঘুরে বেড়াতে হয়। ব্যর্থ হয়ে ঘুরেফিরে অনেক রাতে বাডি
ফেরে। আজ একটা পেরেক সংগ্রহ করে এনেছে। এসে
পর্যন্ত ঘরের মধ্যে জামা ঝুলিয়ে রাখার মতাে একটা অবলম্বন
খুজে পায় নি-শােবার আগে অসুবিধাটা বােধ করে। জামাটা
হাতে নিয়ে এখানে ওখানে চেষ্টার পর টিনের স্যুটকেসটার উপর
স্তুপ করে রেখেই শুয়ে পড়তে হয়।
পেরেকটাকে দেয়ালের গায়ে বসিয়ে তার মাথায় মাল
জড়িয়ে নেয় রণেশ। পেরেক তাে দূরের কথা, পুরােনাে জামা
ব্যাকে রাখা পর্যন্ত নিরাপদ নয়। পিসীমার বাড়ি সেদিন
একটা জামার ঘাড় ফুড়ে র্যাকের সুডৌল মাথাটা বেরিয়ে
এসেছিলাে।
রণেশ শুয়ে পড়ে। চিন্তাগুলাে যেন ছারপােকার সঙ্গে
বালিশের তলায় লুকিয়ে থাকে, মাথা রাখতেই কিলবিলিয়ে নানা
দিক থেকে আক্রমণ করে। ছারপােকা ছিলাে না মােটে,
এসেছে পিসীমার ঐ গােমস্তার বিছানা থেকে-বড় নাের
লােকটা।
ত ম না
হাতল-ভাঙা পেয়ালায় চা পান করে বেকার অবস্থাটা
পিসীমার বাড়ি হয়তাে মন কাটতাে না। কিন্তু অত পেয়ালা
থাকতে হাতাল-ভাঙাটা সকলের মধ্যে বিশেষ করে তাকেই
দেওয়া কেন—রণেশের লজ্জা করতাে, হাসি পেতাে, রাগ হতাে।
ভােজ্যবস্তুতে বৈষম্যের না হয় মানে হয়—পিসীমার এ অহেতুক
ক্ষুদ্রতা বা বড়মানষি প্রকাশের পথটা বন্ধ করতে গােপনে
পেয়ালাটা পকেটে পুরে নিয়ে রাস্তায় ডাস্টবিন-এ ফেলে দিলাে।
পরের দিন রণেশের চা পান আধ ঘণ্টার জন্য স্থগিত। বাড়িময়
পেয়ালাটার খোঁজ পড়ে গেল। ভাঙা ভাগ্যের কল্যাণে ভাঙা
বস্তর কি ভাগ্য।
হঠাৎ মনে পড়া ঘটনার মধ্যে রণেশ এক ফাকে সত্য কথাটা
পিসীমাকে বলে বসলাে। ছেলেদের মধ্যে কেউ মুখটিপে
হাসলাে, পিসীমা যা মুখে আসে বলতে লাগলেন। ফলে রণেশ
সাত টাকা ভাড়ায় একটি ঘর নিয়ে ফেললাে-মেস-এ থাকা
সে বরদাস্ত করতে পারে না।
পিসীমার অভাবটা বড়ো স্কুল। পিসতুত বােন বীণার
মধ্যে শিক্ষার সামান্য সূক্ষ্মতা আছে, কিন্তু মূলত দুই-ই সমান।
বীণা বলে, কিছু হবে না রণেশদার, জানে কেবল পাক-পাকা
কথা বলতে।' কথাগুলাে ভালাে লাগে নিশ্চয়ই। কিছু হয়
কি না হয় দেখতেই পারে। কেন হবে না।
সে শুধু পাশই
করেনি, পড়াশােনা করেছে বিস্তর, বুদ্ধি আছে, সর্বোপরি
আছে একটা অ্যামবিশন। অ্যামবিশন কথাটা তেমন জোর
५ का नि
ধরে না। বিশেষত্বহীন, ভলােক মাত্রেরই উত্তরাধিকার সূত্রে
পাওয়া। সাফল্যের প্রতীক্ষায় পুত্র-প্রপৌত্রে চলতে থাকে।
মধ্যবিত্তের ঘরে জন্ম-লটারির টিকেট, নিলেই আশা করার
অধিকার আয়।
অসহ্য হারপােকা। বার বার উঠে আলাে জ্বলতে ইচ্ছে
হয় না। আক্রমণের ক্ষেত্রটা রণেশ হাত দিয়ে ঘষে দেয়, দুর্গন্ধ
নাকে আসে, সাময়িক নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বেজে। পাশের
ঘরের লােকটির নাসাগর্জন শােনা যাচ্ছে—লােকটা এরই মধ্যে
অঘােরে ঘুমিয়ে পড়েছে। বেশি ঘুম স্কুল প্রকৃতির বা সুস্বাস্থ্যের
লক্ষণ, সূক্ষ্মাতিসম্পন্নের নয়, ঘুম সেখানে সন্ত্রস্ত ও সংকুচিত।
ধীমান লোকের ধূম যেখানে-সেখানে যেমন-তেমন ভাবে আসে
না-ণেশ নড়েচড়ে পাশ ফিরে শােয়।
একত্রিশ দিনে মাস। ঘর ভাড়ার বিষয়ে আরও একুশ দিন
নিশ্চিত। পেমেন্ট’-এর জন্যে ‘ফাস্ট উইক’-আরও সাত দিন,
ইতিমধ্যে কিছু একটা জুটে যাবে। আজ শেষ বইখানা বিক্রি
করা হয়েছে, এর পর দৈনিক খরচা সংগ্রহ এত সহজ হবে না।
ধার পাওয়া সব চাইতে মুস্কিল। বন্ধুবান্ধব সবারই মুখে এক
কথা, এককালে কথায় কথায় টাকা দিয়েছে, অনেক ঠেকে
ও ঠকে নাকি শিক্ষা হয়েছে। কারুর কাছে শিক্ষাদাতাদের
একজন হবার সৌভাগ্য হলাে না—রণেশের দুঃখ হয়। টাকা-
পয়সা সম্পর্কে নিজের বিচারবুদ্ধি এবং অপরের সাধুবুদ্ধির
ওপর লােক আস্থা হারিয়েছে। বিষাসহীন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়
কম। বালক বা স্ত্রীলােকের কাছে অচল দু’আনিটি পর্যন্ত
চালানাের জো নেই, দশবার বাজিয়ে দশজনকে দেখিয়েও
সলেই ঘােচ না। জিতের পথ বন্ধ করে তবে তােক ঠকার
হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। শুধু হাতে ব্যবসার কথা কাদলে
শুধু সন্দেহের চোখে তাকায়। চাকরি ছাড়া উপায় নেই।
সুরুতে দরখাস্ত ছাড়লেই আশায় মন ভরে থাকতাে, অধুনা
বিকারহীন হয়েছে। সবকটা দরখাস্তই নিরুত্তর। কিন্তু
চাকরি একটা চাই-ই। অনিল অপেক্ষা করে আছে, প্রথম
সুযােগেই কাজটা সেরে ফেলতে হবে। উচ্চতর জীবনযাত্রার
লােভে ‘বিশেষরূপে বহন’ কাৰ্যটা মুলতুবি রাখা বিশেষ মূখতার
কাজ। গৃহলক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে স্বর্ণাসনের নির্মাণ চলতে থাকে,
যেদিন সমাপ্ত হয় তাকে অপরিসীম আগ্রহে অভ্যর্থনা করার
লােকটির সন্ধান আর মেলে না—গৃহেরীর সেই আসনের
ভলায় তখন সে সমাধিস্থ।
অনিলার আগ্রহের অন্ত নেই। শুনতে ভালাে শােনায় তাই
বলে, দু'জনে না হয় গাছতলায় দিন কাটাব। নিজের বাড়ির
উদ্যান সংলগ্ন বৃক্ষতল হলে প্রস্তাটা নেহাৎ মল ছিল না।
দক্ষিণ প্রান্তের বাড়িগুলাের কি অপরূপ গঠন—আধুনিক
স্থাপত্যের উৎকর্য দেখে মুগ্ধ হতে হয়। আভ্যন্তরীণ
ব্যবস্থাটা সব চেয়ে বড় কথা। অনিলার সখ একটি বাথরুমের।
বন্ধুর বাড়ির বাথরুম বােৰাতে গিয়ে রীতিমতাে একটা নাই
একে ফেলেছিলাে। সর্বাঙ্গীন সুন্দর বাথরুম তাে চাই-ই, তা
এক ফালি
ছাড়া দক্ষিণে থাকবে বিস্তর চওড়া একটা বারান্দা, সান্ধ্য চা-এর
উপলক্ষে সেখানে বসবে জমাট একটি আডড়া।
সাত টাকার ঘরে সাতাশ হাজারের খসড়ায় গা ঢাকা দিয়ে
ঘুম এসে মেঝেয় বিছানাে বিছানাকে আশ্রয় করে।
চর-পট-পট, উডিন্যাসীর হস্তে নগর-পথের গঙ্গাস্নান
এরু হলাে।
হােজ-পাইপের গতটা ঠিক জানালার নিচে,
রণেশের ঘুম ছুটে যায়। সাত রাস্তাদিয়ে আনার্থীদের
যাতায়াত অার কথাবার্তা কানে আসে। নিজাদেবীর
প্রত্যাবর্তনের পালা চলতে থাকে, সম্পূর্ণ না হতেই দম বন্ধ
ক'রে উঠ বসতে হয়। কয়লার ধোয়ায় ঘরটা ভরে গেছে
কলকাতায় প্রতিবেশীদের একমাত্র আদান-প্রদান। রণেশ
উঠে জানালাটা বন্ধ করে দেয়।
বেশ বেলা হয়েছে। শয্যা ত্যাগের ভাড়া নেই। হাতে
জল লাগার পূর্বাবস্থাটা নাকি হস্তরেখা বিচারের পক্ষে প্রশস্ত
-অভ্যাস মতাে হাতের তেলােটাকে রণেশ চোখের সামনে
বিছিয়ে ধরে। সূ নজরে সুলক্ষণ আবিষ্কারের চেষ্টা চলে।
মুঠো খুললে ভরসা করার মতাে সম্বল বলতে দেখা দেয় গুটিকয়
রেখা—নির্ভর না করে উপায় নেই। উরেখাটা বাড়তির
মুখে আর একটু যেন স্পষ্ট হয়েছে। বিয়ের ব্যাপার হাত
দেখে বলা কঠিন, ভালাে দেখিয়েরাও স্বীকার করে।
রাশিচক্রটা সঙ্গে নেই, থাকলে মন্দ হতাে না। আর তার
কাটির সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তার কথা ভাবতে গেলে বিশ্বয়
ভ ম স লাগে। বিশ্বের বিধিবদ্ধ ঘটনা স্রোতে মানুষের জীবন বস্তুরই মতাে ঘটনাধীন, না মেনে উপাই নেই। মনের অবস্থা আজ একটু অতিরিক্ত দার্শনিক। শেষ বই- এর শেষ পয়সা খরচ হয়ে গেছে। নিষ্ক্রিয় অবস্থায় শয্যায় শুয়ে অর্থকরী সক্রিয়তার বিবিধ পন্থা নিয়ে মনের মধ্যে আলােচনা চলছে। কাজ সম্পর্ক অত বাছবিচার বলেই না কাজ জোটে না-দেহ মন নিয়ে কাজ, বিচারহীন হাওয়াও সম্ভব নয়। নড়বডে ঘাড়ের ডগায় মূল্যবান সব মস্তিষ্ক নিয়ে ক্রেতাহীন বাজারের অসংখ্য ফেরিওয়ালা। দেশীছিট কাপড়েওয়ালা লেস-ফিতা-কাটা চাই’-তুচ্ছ বস্তুর ব্যাপারী, তাচ্ছিল্যপূর্ণ দৃষ্টি তাদের ওপর। শ্রমিক ও কৃষকের নামে মধ্যবিত্তের কলম কাগজের বুকে ডুকরে কঁাদে ; ব্যথার উৎস নিজের বুকে-সহানুভূতি নয়, স্বানুভূতি। রগেশবাবু ঘরে আছেন। পাশের ঘরের লােকটির গলা। জানালায় উকি দিয়ে বললেন-দশটা বাজে এখনাে বিছানায় শুয়ে । আপনার একখানা চিঠি কাল এসেছে, দিতে স্মরণ ছিল না। বলে, ফাক দিয়ে ছুড়ে দিলাে। চিঠি পড়ে রণেশ চিন্তিত ও চঞ্চল হলাে। লােকটা কি রকম দায়িত্বজ্ঞানশূরণ ছিল না বললেই যেন সব ল্যাঠা চুকে গেল। চিঠিটা কাল পেলে কোনােই অসুবিধা ছিল না, কিন্তু এখন কি করা যায়। একটা দরখাস্তের জবাবে আজ ५ कानि এগারোটায় সাক্ষাতের জন্য উপস্থিত থাকতে লিখেছে। একটি তাম্রখও পকেটে নেই, যােগাড় করারই বা সময় কই। জামা কাপড় ময়লা, দিন চার-পাঁচ হলে মুখ কামানাে হয় নি। একটা কাচের গেলাস পেলে নখকাটা ব্লেডটায়ই না হয় বার ভােলার চেষ্টা করা যেত। তিন পয়সার জন্যে এতটা পথ হাঁটতেও মন সরে না। জুতাের যা অবস্থা অতটা পথ চলার আগেই হয়তাে হাস্যকর চেহারা নেবে। পাশের ঘরের লােকটির ওপর মন তিক্ত হয়ে ওঠে। ওর কাছ থেকেই ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে—সময় মতাে ভাড়া না দেবার যেন একটা যুক্তি হাতে আসে। চিন্তিত অবস্থায় রণেশ ঘরের মধ্যে পাইচারি করতে লাগলাে। পাশা—শিলি ওল কাগ–অ একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিতে সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত। ঘরের কোণে নজর পড়ে। বাকিতে দু’রকম কাগজই চলছে, ইংরিজি আর বাংলা। —এই কাগজ- চটের মত্ত থলে কাধে লােকটি এসে দরজায় দাড়ালাে। —কত করে নিচ্ছিস? —দেখি বাবু কি কাগজ। আনন্দবাজার-ও বাবু দুপয়সা। —যা, যা, চার পয়সা হরদম বিক্রি হচ্ছে। -চার পয়সা বাৰু টেমেন। অমৃতবাজার।
ত ম স —তিন পয়সা দেব দিন, কখানাই বা আছে কাগজ- ওজন ও হিসেব সেরে কোমর থেকে ময়লা সরু লম্বা একটা থলে বার করে। মূলধন থেকে পাঁচটি পয়সা গুণে দিলাে। যাবার পথ খরচাটা জুটে গেল। -ও জুতোটা আর চলবে না বাবু দিয়ে দিন তিন পয়সা দিচ্ছি। হেড়া জুতােও আবার কেনে নাকি। কিন্তু জুতাের যে দরকার। কিনে আর ক’দিনই বা চলবে ? দেখা সেরে কখন বেরােনাে যাবে ঠিক কি—অভুক্ত যাওয়া উচিত হবে না। জুতােটার কোন মূল্য স্বীকার করতে সংকোচ হয়। দাম বাড়ানাের চেষ্টা না করে বললাে, আচ্ছা নিয়ে যা। আরও তিন পয়সা গুণে দিয়ে লোকটি চলে গেল। ঘরে নিজের কাছেই লজ্জা বােধ হতে থাকে-লােকচক্ষুর অন্তরালে আবার লজ্জা। অপরের এমন কত না তার কাছে ঢাকা পড়ে আছে। ডান জুতাের গােড়ালির ঠোকর লেগে মাঝে-মাকে বাঁ পায়ের গিঠটা ছড়ে যায়; অন্যদেরও এমন হয় বলে জানা ছিলাে না। হঠাৎ কথা উঠে পড়ায় বন্ধুরা বলেছে তাদেরও অমন হয়ে থাকে। গােপন করার মতাে কারণ থাকলেই আর জানা হতাে না—সবাই চেপে যেত। পরিচ্ছদের মালিকা যথাসম্ভব ঢাকা দিতে বাক্স থেকে সিকের চাদরটা বার করে গায় জড়িয়ে নিল। ইনটারভিউ ১
पद का नि
দেবার মত পরিচছন বটে—উচ্চ মনােভাব নিয়ে রণেশ হাসে।
এতে যদি চাকরি না আটকায় তাে ভবিষ্যতে গর্ব
করা যাবে। এমন কি মানুষ হতে হলে, অর্থাৎ কিনা চাকরি
পেতে হলে কত কৃচ্ছসাধন করতে হয় তার নজির হিসেবে
উল্লেখ করে উপদেশ পর্যন্ত দেওয়া যাবে। ইংরিজি কাগজটা
বগলে চেপে রাস্তায় নেমে পড়লাে-লাঠি ও চাদরের মতাে বগলে
ইংরিজি কাগজও ব্যক্তিকে একটা গুরুত্ব আরােপ করে।
এরই মধ্যে ফুটপাথ গরম হয়ে উঠেছে। পায়ের তলায়
যেন ঘুচ ফুটিয়ে দেয়। রণেশ বাড়িগুলির পাশ ঘেসে হাঁটতে
থাকে। পাইসহাটেলের চেয়েও সস্তায় খাবার জায়গা সে
আবিষ্কার করেছে। পাইজির হােটেলে চার পয়সার ভাত নিলে
তরকারি আর ডালটা মেলে বিনি পয়সায়। মােডের পাঞ্জাবী-
দোকানে আহার সেরে ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠে বসলাে।
এইটুকুতেই পায়ের তলা দুটো জ্বালা করছে। ভর দুপুরে গলা
পিচের ওপর দিয়ে রিক্সাওয়ালা মাইলের পর মাইল দৌড়ােয়
—মানুষ না আর কিছু।
ঠং ঠং ঠং-লাইনের উপর গরুটা স্থির হয়ে আছে। ট্রাম
নিকটস্থ হােলে লাইন ছেড়ে দাড়ায়। গ্রামের গরু হােলে
হকচকিয়ে একটা কাণ্ড করে বসততা, শহরের গরু থ্যাবড়া নাকে
হেলে একটা কিছু ভাবতে নিশ্চয়ই। পাশের সিটে কতকগুলাে
যাত্রী হট্টগােল করছে, কথাবার্তা থেকে বােঝা যায়
স্ট্রাইকার। কাজ কেবল ওরা পায় না, দাবি না মেটালে
১০
ত ম সা ছেড়ে দেয়। নেতা মূবকটি কাছেই বসে আছে। নেতৃত্ব ছাড়া অন্য কাজ জোটাতে পারেনি নিশ্চয়। নিচে থেকে টেনে ভােলা, ওপর থেকে টেনে নাবানন, দু'কাজের ভারই মধ্যবিত্তের হাতে-হাত খালি কিনা। আরও এক শতাব্দী আগে মার্কস সাহেবের জন্ম নেওয়া উচিত ছিল। তবে হয়তাে এ যুগে ব'সে তার দানের স্বাদ গ্রহণ করা যেত। ভদ্রলােক অভাবে পড়ে কোট বাঁধা দিয়েছিলেন—রণেশের খালি পা দুটো সগর্বে সামনের সিটে উঠে পড়ে। মার্কসের মা বলতেন, ছেলে আমার যে আন্দাজ ক্যাপিটাল লিখছে তার শতাংশের একাংশ উপার্জন করলে সকলে খেয়ে বাঁচতাম। দারিদ্র্য আর দুঃখই তাে উন্নতির সােপান-অবিশ্যি গন্তব্য স্থানে বিদেহী নামটা শুধু পৌছবে মনে হলে পাড়ি দেবার উৎসাহ আর থাকে না। কর্মব্যস্ত ডালহৌসি স্কোয়ার। বিরাট বাড়িগুলাে গাে- গ্রাসে কেরাণী গিলছে, সন্ধ্যায় নিঃসার ক'রে উগরে দেবে। পরশ্রমজীবীর উচ্ছিষ্ট পেয়ে বহু বুদ্ধিজীবীর জীবন সার্থক হয়েছে, তাদের গাড়ির ভিড়ে গা বাঁচিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী রণেশ এগিয়ে চলে। ফুটপাথে ফলের দোকানে জলেঘােয়া কাটা-ফল সাজান। মেড়ােদের খাদ্য। কেরাণীবাবুরা চা ও চপ খেয়ে টিফিন করেন। পােটিকোর নিচে লােহার ভাণ্ডে কাঠকয়লার আগুন, তাতে তিনটে ভুটা সেঁকা হচ্ছে—হােটলােকদের ভিটামিন। আশ- পাশে কত কুখাদ্য, হজম করার লােকের অভাব নেই।
এক ফালি
ফুটপাথ জুড়ে খাড়া হয়ে আছে একটা অতিকায় ষাঁড়।
পথচারী মাড়ােয়ারী গায়ে হাত বুলিয়ে নমস্কার জানায়।
অমন স্থান থেকে স্নেহ ভক্তি না পেলে এমন স্বাস্থ্য হয়। কি
দুরন্তু স্বাস্থ্য, একেবারে স্তব্ধ হয়ে আছে।
পােষাক দেখে হাঁকিয়ে না দেয়। দু'একটা প্রশ্ন করবে
নিশ্চয়ই। তা করুক। বিদ্যায় বুদ্ধিতে ছাপিয়ে যাবে এমন
কি একটা লােক। এই তাে নম্বর। কাটা হাতের আঙুল
দিয়ে আপিসের প্রবেশ পথ নির্দেশ করা হয়েছে।
এমন একটা কাণ্ড রণেশ আশঙ্কা করে নি। আপিসের
দরজার সামনে লম্বা এক ফালি জায়গা, প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশটি
যুবক সেখানে ভিড় করে আছে। সকলের পরিচ্ছদই সযত্বকৃত।
জনকয়েক পরেছে কাট, দু'একটা বেশ দামী। দিশি ব্যাঙ্কের
পঞ্চাশটাকা মাইনের চাকরি, শেয়ার বিক্রিয় জন্যে লােক সংগ্রহ
করতে হবে, বেতনটা নাকি নির্দিষ্ট।
বণেশের ব্যবহারে দেখা দিল একটা তাচ্ছিল্যপূর্ণ গাম্ভীর্য ।
শিক্ষা সংস্কৃতি আর আভিজাত্যকে যেন খোঁচা-খোঁচা দাড়িওয়ালা
মুখে প্রকটিত করে তুলতে চেষ্টা করে। সকলেই দাড়িয়ে,
কেউ এরই মধ্যে পায়চারি করার চেষ্টা করছে, রণেশ গিয়ে
বেয়ারার বেঞ্চিটায় বসে পড়লাে। এ সবই যেন অত্যন্ত তুচ্ছ
ব্যাপার—তবুও মনের তলায় অস্বস্তি আর সংকোচ বােধ একটা
থেকে যায় বৈকি।
ম্যানেজারের ঘরে একজনের ডাক পড়লাে। সকলেই
उभगा নড়েচড়ে উঠলল একবার। এখন একে একে ডাক পড়বে। দামী কাট পরা একটি লােক তিন কদম পরিসরে এদিক-ওদিক করছিলাে, হঠাৎ রণেশের সামনে এসে বললাে, আরে রণেশ- বাবু যে! কলেজের সহপাঠী, সুন্দরের ওপর বােকা চেহারা। পাঠ্যাবস্থায় রণেশ কোনাে দিনই আমল দেয় নি, নামও ভুলে গেছে। একটা কিছু বলবার জন্যেই বলে, এখানে কি মনে -কিছু না, এমনি। —কিছু না করার জন্যে এমন সময় এখানে? উপস্থিত অনেকেরই মতাে যুবকটির চোখেমুখেও একটা চাপা উৎকণ্ঠার ভাব। এই মাত্র একটা সিগারেট শেষ হয়েছে, কেস থেকে আর একটা বার করলাে। আঙুলের ডগাগুলাে কাপছে। মধ্যমা আর বুড়ােআঙুলের চাপে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিগারেট থেকে কিছুটা তামাক ফেলে দিল-দেড় পয়সায় কিছু কম দিলেও পারে কোম্পানি। বুড়ােআঙুলের নখে বার দুই ঠুকে ঠোটে বুলিয়ে দিল। বড়ই অন্যমনস্ক, মনে মনে বােধহয় প্রশ্ন আর জবাবের মহড়া দিচ্ছে। রণেশের পােষাকটা হঠাৎ যেন ভালাে ক'রে নজর করলাে, বললাে, কোনাে মিসহ্যাপ হয়েছে বুঝি? -না। কিন্তু একদশা চলছে, লঘুদশা যে নয় সে তো দেখেই আঁচ করেছেন। কথাটা ধরতে না পেরে মুখখানা অনর্থক করুণ করে রাখলাে।
५.का नि
পরিচ্ছদটা সবশুদ্ধ এতটা অর্থপূর্ণ হয়েছে রণেশের ধারণা ছিল
। একে দাড়িটা কামানাে হয় নি, তার ওপর পায়ে নেই জুতে।
বেশটা বজায় রাখতে হবে। এ গুরুদশা কেটে গেলে শৌচন্তে
শুচি হয়ে তবে পায়ে বরণ। বেকার হতে বরযাত্রী বনে
য,ওয়া কঠিন কথা নয়। আর্জেন্ট’ জামা-কাপড় দিন কুড়ি
যাবৎ স্টীম-লণ্ডিতে পড়ে আছে, তিন আনা পেলেই ছাড়িয়ে
আনা যায়। পাটভাঙা কাপড়, স্যান্ডেল আর মুখে আধ-পয়সা
দামের একটা সিগারেট ঝুলিয়ে দিলে উপস্থিত এয়াই মনে
করতাে, বেশ আছে লােকটা।
একে একে সাক্ষাৎ সেরে বেরিয়ে আসছে। কারুর
মুখে নিরাশার ছাপটা স্পষ্ট। অভ্যন্তদের মুখ দেখে মনে হয়,
ছাড়ানাে চীনেবাদামের দানাটা হাত থেকে হড়কে গেল, নতুন
উদ্যমে আবার লেগে পড়বে। বড়াে বেশি দেরি হচ্ছে,
বার দুই দ্বিধার পর সেই সুবেশ সাহেব রণেশের পাশে
ব'সে পড়লাে। রুমালে মুখ ও ঘাড় আচ্ছা করে ঘষে নিয়ে
অযাচিত ভাবেই শুরু করলাে, বুঝলেন রণেশবাবু, এ চাকৰিটা
তেমন কিছু নয়। দু'মাস পরেই হয়তাে বলবে, বিক্রি হচ্ছে না,
নেই মাঙত। এরকমই করে ওরা। একটা ইনসিওরাল
কোম্পানিতে আছি, মেরিটের রেকগনিশন নেই মশাই,
লােকের কদর বুকে সুযােগ-সুবিধে কেউ দেবে না।
আসনটি বাবুদের নীচস্থ হওয়ায় বেয়ারা পাশেই দাড়িয়ে
ছিলাে। বলে উঠলাে, যা বলেছেন বাবু লাখ কথার এক
उपमा
কথা। লােকের কদর বুঝলে কি আর এই টুলে বসে হুজুর
হুজুর করতে হয়। এই দেখুন না—
ঠুং ঠু
—হজের
কদর না বােঝা পর্যন্ত উপায় নেই।
বেয়ারাটা সমজদার হওয়ায় যুবকটি মনে মনে অসন্তুষ্ট হয়।
রণেশ ঘটনাটা উপভােগ করে। সে দেখছে মেরিটের রেকগনিশন
নেই বললে সকলেই নিজের তরফ থেকে কথাটা সমর্থন করে।
কাট-পরা যে লােকটি বরাবর সামনে চেয়ে খটু-খ হিল
ইকে বেরিয়ে গেলেন, বেয়ারার কাছ থেকে জানা গেল তিনিই
ম্যানেজার। জরুরী-কাজে বেরিয়ে যাচ্ছেন। বাকি বাবুদের
আবার কাল এগারােটায় আসবার হুকুম হয়েছে।
দুটো বাজে। রণেশের মেজাজ রীতিমতাে তিক্ত হয়ে
উঠলাে। তােড়জোড় করে আসা কি সহজ কথা! আজ
হেঁটে ফিরতে হবে। রাগের কথা বলে ভবিষ্যৎ নষ্ট করে
লাভ নেই—কাগজটা বগলে চেপে রণেশ উঠে দাড়ালাে।
মূবক প্রশ্ন করলাে, আপনিও ক্যানডিডেট ?
-হু, ব'লে রণেশ তার মেরিটের রেকগনিশন দিল।
রাস্তায় নেবে রণেশ দাড়ালাে। গলাটা শুকিয়ে গেছে।
সামনেই হিন্দুস্থানী পানের দোকান, বাকি পয়সার অর্ধেক
খরচ করে একটা পান কিনলাে। পেছন দিয়ে গলা-খয়ের
চুইয়ে পড়ছে, পরিচ্ছদ বাঁচাতে গলাটা বাড়িয়ে দিতে হয়-
১০৮
এক ফালি
ক্রমান্বয়ে এভাবে হিন্দুস্থানী দোকানের পান খেলে ডাইনের
থিওরি অনুযায়ী গলাটা না জিরাফের মতাে লম্বা হয়ে যায়।
রােদে হাঁটার কষ্ট কিছুটা লাঘব করার পক্ষে মূখে একটা
পান পুরে দেওয়া মন্দ নয়। রাতটা অসৎব গরম হয়ে,
পায়ে ফোস্কা পড়বে নিশ্চয়। অবশ্য পশ্চিম দিককার ফুটপাথে
ছায়াটা এখন ক্রমেই বাড়বে।
চাকরিটা তেমন সুবিধের হবে বলে মনে হয় না। তবু
কেরানীগিরির চেয়ে ভালাে। জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয়ে
গেলে আর রইলো কি। নিজেকে বাতিল করে ভবিষ্যতের
চিত্র আঁকতে হয় সন্তানকে অবলম্বন করে। চাকরিটা পেলে
ভালােই। এরই মধ্যে কত সম্ভাবনা রয়েছে। পারিপার্শ্বিক
অবস্থা অনুকূল হলে সবই সম্ভব—from insurance agency
to ministry। রােগ হবে ব্লড-প্রেসর, মৃত্যু হবে বাথরুমে।
অনিলার সেই আধুনিক বাথরুম।
পঞ্চাশ টাকা বেতন শুনলে
অনিলাদের বাড়ি থেকে ছুটে আসবে নিশ্চয়ই। কলকাতায় কিন্তু
বেশ-বরের আগে টোপর পরানাে হয় বাড়ির মাথায়—বাসর
রাত্রিটা সকলের জীবনেই হয়তাে একটা স্মরণীয় দিন। -
পথ চলার বিস্বাদে চিন্তার চাইনি—তবু অনেক দূর
চ'লে পা যেন ভেঙে আসে। একটু জিরিয়ে নিতে রণেশ একটা
পার্কে ঢুকলাে। দরিদ্র ভদ্রলােক যারা হাঁড়ির খবরের ভয়
রাখে, কলকাতা তাদের পক্ষে চমৎকার স্থান। পার্কে বসেই
দিনকে-দিন রাতকে-রাত কাটিয়ে দাও।
ত ম সা
একটু বিশ্রামের পর আবার চলার পালা। বিশ্রামের
আয়েসে পা দুটোকে যেন অকর্মণ্য করে ফেলেছে, টেনে চলা
কিছুক্ষণ অসম্ভব মনে হয়। গাড়িওয়ালা কোনাে বন্ধুর সাক্ষাৎ
পেলে বাঁচা যেত। কলকাতায় গাড়ি কেনা কি-ই বা এমন
ব্যাপার। পাঁচ-সাত লাে হলেই গাড়ি মেলে। অনিলা বেশ
‘টম বয় টাইপের, সুযােগ পেলে ড্রাইভিং অনায়াসেই শিখতে
পারবে-
হেদুয়া-সুদীর্ঘ পথটা কি ভাবে কেমন করে যেন কেটে
গেল।
জীবনটাও বুঝি বা এভাবেই কেটে যায়।
रंग
এ বাডিটায় আমি নবাগত।
কলকাতায় মনের মতাে একটি বাড়ি পাওয়া কঠিন।
মনের মতাে বলতে বাড়ির আঙ্গিক গঠন বা আভ্যন্তরীণ
ব্যবস্থার চেয়ে আমি বেশি জোর দিচ্ছি তার পারিপার্ষিকের
ওপর। নাগরিক কোলাহল বা ট্রাম-বাসের ঘরঘরানির হাত
যদিই বা এড়ানাে যায়, অসংখ্য গ্রামগাফোন আর রেডিওর অসহ
রস-চর্চা থেকে কান দুটাকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। যেটা
ছেড়ে এলাম তাতে জুটেছিলল আর এক নতুন উপসর্গ। ঠিক
আমার ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতে এক মদ্র পরিবার। রাত দশটার
পর মিনিট দশ-পনের হামানদিস্তায় কি ঠুকতে ওরাই জানে,
কিন্তু মাথার ওপরকার সেই দুব-দুব-ঘটাঙ-ঠং-এর জ্বালায় এক
মাসের মধ্যেই ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে বাড়ি ছাড়তে হলাে।
এ বাডিটি মােটামুটি ভালাে বলেই মনে হচ্ছে। যান্ত্রিক
কোলাহল নেই, সুরচর্চা বিরল, এমন কি আশেপাশের
মেয়েরাও গান গায় কম ও কদাচিৎ। এ-বাড়ি সে-বাড়ির
আধুনিক গানের হা-হুতাশে হাঁপিয়ে উঠতে হয় না। আমার
মাথার ওপর এবং পায়ের তলায় কারা থাকেন জানিনে।
যারাই হােন লােক ভালাে, কোনাে হৈ চৈ হল্লা নেই।
১১১
তম সা
মস্তিষ্কের কাজ করতে হলে নীরবতা সম্বন্ধে সচেতন না
হয়ে উপায় নেই। রাত জেগে পড়া বা লেখা অনেক কেলে
অভ্যাস, আংশিক উপজীবিকাও বটে।
কয়েক দিন হলাে জরুরী একটা লেখার তাগিদ মাথায়
ঝুলছে, করি-করছি করে সময়টা পার হয়ে গেল। কাল না
দিলেই নয়।
মনে মনে খুবই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার
প্রতিশ্রুতি নিয়ে সান্ধ্য বৈঠকে যােগ দেওয়া সত্ত্বেও বাড়ি
এসে যখন ঢুকলাম রাত তখন দশটা বেজে গেছে। আহারাদি
সেরে কাগজকলম নিয়ে বসলাম, তখনও কে জানতাে যে আজ
আমার ভালাে বাড়ির ভাললাকে একটা ছেদ পড়বে।
লেখা কতক দূর এগিয়েছে, শুধু তাই নয়, বিষয়বস্তুটা
মনের মধ্যে এমন একটা পরিচ্ছন্ন রূপ নিয়েছে যে গড়িয়ে এগিয়ে
যেতে পারবাে মনে করে বেশ আনন্দ হচ্ছে, এমন সময় ওপরতলা
থেকে একটা শব্দ শুরু হলাে—বিড়বিড় করে কে যেন কি
পড়ছে।
চিন্তা স্রোতে বাধা পড়লাে। সমাপ্তির আশায় খুড়িয়ে
খুঁড়িয়ে এগােতে লাগলাম—বিদ্যাভ্যাস শেষ তােক তারপর
শান্তিতে দ্রুত চালে চলা যাবে। কিন্তু শেষ হওয়া দূরের কথা
বারােটার পর থেকে শুরু হলাে আর এক নতুন উৎপাত।
খসখস একটা ঘষা আওয়াজ ঠিক আমার মাথার ওপরকার
মেঝেয়, তার সনে সেই বিড়বিড়। স্যান্ডেল ঘষে পাইকারি
করে পড়া হচ্ছে, পাইচারিটা ঘুমের প্রতিষেধক নিশ্চয়ই।
ইস
ভয়ানক একটা অস্বস্তি নিয়ে কলম উন্টে বসে রইলাম।
মধ্য রাত্রির স্তব্ধতায় একটানা এই খসখস খস আর
বিড়বিড় স্নায়ুতে যেন বিষ ঢেলে দিতে লাগলাে। कष
অসােয়াস্তিটা রাগ ও ত্যক্ততায় মিশে একটা অসহ অনুভূতি
নিয়ে সর্বদেহে ছড়িয়ে পড়লাে।
লেখা তাে দূরের কথা চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে পড়লাম।
ক্রোধের প্রকাশ হিসেবে কাজ বন্ধ রেখে উঠে পড়ার মতাে
প্রতিবাদ একটার পর একটা করে গেলেও উৎপাতের কোনাে
প্রতিকার হবে না সে-ও জানি। কিন্তু কি-ই বা করা যায়?
একবার ইচ্ছে হলাে সরাসরি ওপরে গিয়ে বলে আসতে,
কিন্তু এত রাতে হাঁকডাক করে দরবারটাও সমীচীন মনে
হলাে না। নিরুপায় হয়ে ঘরে বসেই ছটফট করতে লাগলাম।
এ দেশের লােকের ‘সিভিক সেল'-এর অপরিমিত অভাব সম্পর্কে
মনটা অতি মাত্রায় সচেতন হয়ে উঠলাে; বেড়ে একটা প্রবন্ধ
লেখবার সংকস এসে গেল মনে।
হঠাৎ শব্দটা থামলাে। হাঁপ ছেড়ে গিয়ে চেয়ারে বসলাম।
লেখাটা রাতের মধ্যেই শেষ করা চাই। কাগজ বেরুবার আর
কয়েকটা দিন বাকি, কাল সকালে না দিতে পারলে রীতিমতো
অপদস্থ হবার কথা। ঠাণ্ডা হয়েটাকে একটু গুছিয়ে নেবার
চেষ্টা করছি ঠিক এমনি আবার শুরু হলো
শুরু হলাে সেই খস -
সঙ্গে সঙ্গে বিড়বিড় পরুশব্দ। মাঝের ছেলা সমাপ্তি নয়,
সাময়িক বিশ্রাম।
;
এid1
उपना রাত্রির নীরবতায় বিবিধ শব্দের এই একঘেয়ে মিলন সব রকম মনােযােগর মুখ জুড়ে যেন গরাদের দরজার মতাে দাড়িয়ে গেল—তার ভেতর দিয়ে দৃষ্টি যদিও বা কিছুদূর চালানাে যায়, মনকে চিন্তার বিস্তৃত পরিসরে মুক্ত করা চলে না। বিশেষ করে বিড়বিড় শব্দটা মনযােগের চেষ্টাকে যেন খোঁচা মেরে মেরে মনের গর্তে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলাে। ক্রমে সর্বাঙ্গের সমস্ত রাগ ও ত্যক্ত মাথায় চড়ে গেল। হাতের কাছে ল একটা লাঠি পেলে ছাদ- টাকে হয়তাে বা বেদম জোরে ঠুকে দিতাম। আবার চেয়ার ছেডে উঠে ছটফট করে বেড়াতে লাগলাম। লেখা তাে চুলােয় যাক সহ করাই অসম্ভব হয়ে উঠলাে। ঘুমের চেষ্টা করা বৃথা—এই মেজাজ, অসমাপ্ত কর্তব্যের অসােয়াক্তি, তার উপর এই শব্দ। শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী যে-ইহােক,সেএবং তার অভিভাবককে কাল সকালে উঠেই ‘সিভিক সে সম্বন্ধে তীক্ষ্ণ ভদ্র ভাষায় কি বলে অপদস্থ করে দেওয়া যায় মনে মনে তারই একটা মুসাবিদা করতে লাগলাম। প্রায় তিনটে নাগাদ শব্দও থামলাে, ক্লান্ত তিক্ত দেহ-মন নিয়ে আমি বিছানায় গা ছড়িয়ে দিলাম। সকালে আচমকা একটা পড়ার আওয়াজে বিছানায় উঠে বসলাম। নিদারুণ পড়িয়ে, এরই মধ্যে উঠে মুক্ত কণ্ঠে সুরু করে দিয়েছে। তড়াক করে উঠে পড়লাম। এক্ষুণি গিয়ে আচ্ছা রকম সমবিয়ে দিয়ে আসবে। ১১ঃ
জেলার সিড়িতে পা দিয়েছি পেছন থেকে ডাক শুনলাম,
শুনছেন মশাই, দেখুন
ঘুরে দাঁড়ালাম। কাকে বলছেন, আমাকে?
আজ্ঞে হ্যা। আমরা একতলায় থাকি বলে কি আর মানুষ
নই সারা রাত মাথার উপর খটখট খটখট করলে লােকে
ঘুমােয় কি করে বলুন তাে? আপনাদের মতাে শিক্ষিত লােকের
এটুকু খেয়াল থাকা উচিত।
চকিতে দৃষ্টিটা নিজের পায়ের উপর দিয়ে একবার ঘুরে এল।
স্যাণ্ডেলের স্টাপটা ছিড়ে গেছে, পরিবর্তে পুরােনাে ‘নিউকাট’-
টাই চলছে—সেটা নিয়েই কাল সারারাত ধরে ছটফট ক'রে
বেড়িয়েছি।
ত্রুটি স্বীকার করে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম, অন্তত
তখনকার জয়ে আর ভেলায় যাওয়া হলাে না।
লাল মাটি
খুবই সাধারণ একটা বাের্ডিং-হাউসে কিছু দিনের জয়ে থাকতে
হয়েছিলাে সেখানকারই দু'চারটে ঘটনা। যাকে কেন্দ্র করে
ঘটেছিলাে সে লােকটি আজও আমার মনে স্পষ্ট হয়ে আছে।
বাের্ডিংএ যেদিন প্রথম ঢুকলাম, ম্যানেজার তাঁর সবচেয়ে
ভালাে ঘরখানা দেখাতে নিয়ে গেলেন দোতলায়
। দেখে নেহাৎ
অপছন্দ হলাে না। দক্ষিণে বড় বড় দুটো জানালা, যদিও
সেখান দিয়ে তেমন হাওয়া খেলবে আশা করা গেল না
দুটোরই সামনে জুড়ে রয়েছে একটা তেতলা বাড়ি। তবে কিনা
পূর্ব দিকের খােলামেলা ভাব দেখে আশা হলাে। ঘরে আসবাব
বলতে তক্তাপােশ, চেয়ার, টেবিল আর একটি আলনা।
ঘরের এদিক-ওদিক তাকিয়ে মনে হলাে উপস্থিত যিনি
এখানে আছেন সৌন্দর্যচর্চা তিনি মােটেই করেন না, কিন্তু
স্বাস্থ্যচর্চা করেন প্রচুর। এক কোণে গা-ঘেঁষাঘেষি দাড়িয়ে
আছে বিপুলদেহী দুই গদা। এ দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যার চতুর্দিকে
ঘুরপাক খায়,সে-দেহের পরিমাপ এবং পুষ্টি সম্বন্ধেও বেশ কিছুটা
আঁচ করা যায়। টেবিলে কলাই করা ডিসে কিছু ছােলা
ভেজানো পড়ে আছে, আলনায় দুখানা কাপড় আর একটি
नाम या
পাঞ্জাবি, বিছানা বলতে শুধু পাটিতে অতি মলিন একটা বালিশ,
সব কিছুতেই লালমাটির দাগ। বােঝা গেল, ভদ্রলােক যে-ই
হােন আমাদের মত চুলের ডগা থেকে পায়ের তলা অবধি
মাটির বিপক্ষে জেহাদ ঘােষণা করেননি।
এখানে তাে কে যেন থাকেন দেখছি? ম্যানেজরকে
জিজ্ঞেস করলাম।
আজ্ঞে হ্যা। তা ওর ব্যবস্থা আমি কালকের মধ্যেই
অন্যত্র করে দেব। শুধু আজকের দিন আর রাতটার জন্যে
অনুগ্রহ করে মাপ করতে হবে। ম্যানেজর সবিনয়ে
নালেন।
মাপ করতে সম্মত হয়ে চেয়ার টেনে বসলাম।
ম্যানেরবাবু তাঁর বাবু-কেঁাচাকে বামুন-কেঁচা করে নিজেই
কাজে লেগে গেলেন। বালিস সমেত পাটিটাকে টেনে নিয়ে এক
কোণে দেয়ালের গা ঘেঁষে বিছিয়ে দিলেন। জামাকাপড়গুলােকে
হাত বাঁচিয়ে ধরার ভঙ্গিতে আলনা থেকে নিয়ে পাটির ওপর ফেলে
রেখে বললেন, ‘কি নােংরাই থাকেন বীরেনবাবু! এই সেদিন
অবনীবাবুর সঙ্গে ঝগড়া করে বাের্ডিং ছেড়ে চলে গেলেন।
যাবার সময় বললেন, চললাম কালীবাবু আপনার এখান থেকে,
যত সব হােটলােক এনে জুটিয়েছেন। কত ডাকলুম, জবাবই
দিলে না—জুতাের শব্দ পেয়ে কালীবাবু থেমে পড়লেন, কে
একজন বারান্দা দিয়ে চলে গেল—তিনি ফের শুরু করলেন,
‘মশাই গতকাল এসে বলেন কিনা, কালীবাৰু টাকা ফুরিয়ে
গেছে, থাকবে, খাবাে, টাকা এলেই বাড়ি চলে যাবাে-আর
ভালাে লাগছে না এখানে। কি করি বলুন, ‘না’ বলতে পারিনে।
ছেলেটার অসুখের সময় কি করাটাই না করেছেন, বলতে গেলে
ওরই জলে এ যাত্রা রক্ষা পেয়ে গেছে। বিপদে পড়লে লােক
চেনা যায় মশাই, দিমুবাবুর কাছে বিশটা টাকা অগ্রিম চাইলুম
— সুর বদলে বললেন, ‘বারও বলতে পারেন—তা মুখ ফিরিয়ে
রইলাে, হ্যা না একটা জবাব পর্যন্ত দিলে না! এই তাে শুনলুম
চাকরি নিয়ে কি কি গণ্ডগােল বেঁধেছে, এখন দেখা যাবে-
ভগবান কি আর নেই। এই ঘটনা দ্বারা যার অস্তিত্ব নিঃসন্দেহে
প্রমাণিত হয়ে গেল বােধ হয় তাঁরই উদ্দেশে ছােট্ট একটি নমস্কার
জানিয়ে আবার বলে চললেন, এই ঘরের ভাড়া বেশি, তাই
মেম্বার জোটে ক মাঝে-মাঝে এমনি খালি পড়ে থাকে। তাই
ভাবলুম যে কদিন তােক না আসে থাকুন উনি এখানে। তা
আপনি কিছু ভাববেন না, কালকের মধ্যে আমি ব্যবস্থা একটা
করে ফেলবাে ?
এ যাবৎ দাড়িয়ে কথা বলছিলেন, হঠাৎ ফু দিয়ে চৌকির
কোণটা বেড়ে বসে পড়লেন। আমােজনক'রেবসেবলবার মতাে
তাঁর আরও অনেক কিছু আছে ভেবে অস্বস্তি বােধ করলাম।
এতটুকুতেই বুঝেছিলাম কালীবাবু সেই জাতের লােক যারা কথা
বলবার আগে নতুন লােক পেলে উল্লসিত হয়ে ওঠে, এবং
শ্রোতার আগ্রহ বা অনিচ্ছার ধার না পেরে নিজের ঝোকে কথা
বলে চলে। তিনি বলতে লাগলেন, বীরেনবাবু নাকি লােক
১১
লা ল না টি
অতি ভালাে, তবে কিনা মেজাজটা একটু খারাপ, এক-এক সময়
কারণে-অকারণে খপ করে ভয়ানক চটে যান, ইত্যাদি।
নিষ্প্রয়ােজনে একজন অপরিচিত ভদ্রলােকের মেজাজ
সম্পর্কে বিস্তারিত বিবৃতি শােনার মতাে মেজাজ তখন আমার
ছিল না। বললাম, “চাকরটাকে পাঠিয়ে দিন, ঘর সাফ করে
বিছানাপত্র ঠিক করে দিয়ে যাক।
‘এই এক্ষুণি পাঠাচ্ছি।ব'লে, যেতে যেতে কালীবাবু জানিয়ে
গেলেন, বীরেনবাবুকে তিনি বিশেষভাবে বুঝিয়ে বলবেন যাতে
একদিনের মধ্যেই আবার আমার সঙ্গে একটা রাগারাগি না
করে বসেন।
ভৃত্য এসে তার কর্তব্য সেরে চলে গেল।
ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলাম তখন সবে ন'টা বেজেছে।
কয়েকখানা জরুরী চিঠি লিখবার ছিল—চেয়ার টেনে টেবিলের
ওপর বুকে চিঠি লিখতে বসে গেলাম।
একখানা চিঠির খানিকটা লিখেছি এমন সময় পায়ের শব্দে
পেছনে চেয়ে দেখলাম বই হাতে নিয়ে এক ভদ্রলােক এসে
ঢুকলেন। পরিচয় না নিয়েই চিনলাম ইনিই ম্যানেজরবাবু
বর্ণিত মানুষ ভালাে, মেজাজ খারাপ’ বীরেনবাবু। ঘরে ঢুকে
আমার সম্পর্কে কোনাে কৌতুহলই তিনি প্রকাশ করলেন না।
বােধহয় পূর্বেই জেনে এসেছেন, ব্যবস্থার পরিবর্তনটাও বেশ
সহজভাবে মেনে নিলেন বলেই মনে হলাে। কারণ পেছনে
তাকিয়ে বুঝতে পারলাম তিনি শুয়ে পড়লেন। একটু
পরেই বইয়ের পাতা ওল্টানাের শব্দ আর গুণ-গুণ গানের সুর
ক্রমে সেই সুর স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হলাে, আমার মাথা
নত করে দাওহে তােমার ইত্যাদি। বড়ই কৌতুক বােধ
করলাম। চিঠি লেখা বন্ধ করে বসে রইলাম। গানটা তিনি
বহুবার শুনছেন নিশ্চয়ই, তাই মাঝে মাঝে প্রচলিত সুরের রেশ
বিকৃতভাবে এসে তাঁর সুদানের মৌলিকত্বে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিলাে।
চিৎ হয়ে শুয়ে এক হাতে গীতাঞ্জলি নিয়ে অন্য হাতে মেঝেয়
তাল ঠুকছেন আর একের পর এক পাতা উল্টে গেয়ে চলেছেন।
গাইতে গাইতে হঠাৎ থামলেন, বােধ হয় খেয়াল হলাে হাতের
বাটা ঠিক আওয়াজ দিচ্ছে না, মুখে বলে উঠলেন, ‘টাক টাক
ডুম ত্রাক
তবলের আওয়াজ শুনে হাসির আওয়াজটা চাপতে পারলাম
, নিজের অজ্ঞাতেই বেরিয়ে পড়লাে।
‘আপনি বুঝি আমার গান শুনে হাসছেন। বীরেনবাবু
বললেন। সুর বােধহয় সবটার ঠিক হয় না।
একটা বােধহয়’ যখন বলেছেন একেবারে স্বরজ্ঞান শূন্য
ভাবতে পারলাম না।
আমার তরফ থেকে কোনাে উত্তরের অপেক্ষা না করেই
করলেন, আপনি এ ঘর নিলেন? কদিন থাকবেন এখানে।
উত্তরে জানালুম, বিশেষ একটা কাজে কলকাতায় এসেছি,
দু-তিন মাসের বেশি থাকবার প্রয়ােজন সম্ভব হবে না। এর
পর আমার নাম আর বাড়ি কোথায় বলা শেষ হওয়া মাত্র আচ্ছা
লা ল মা টি
আপনি চিঠি লিখুন। ব'লে এমনভাবে বেরিয়ে গেলেন, মনে
হলাে এমন যার নাম এবং অমন স্থানে যার বাড়ি অধিকক্ষণ
ব'সে অধিক কথা তার সঙ্গে তিনি বলতে চান না।
এক বন্ধুর বাড়ি নিমন্ত্রণ ছিল ফিরতে একটু রাত হলাে।
এসে দেখি অদ্ভুত এক মশারি ততােধিক অদ্ভুতভাবে খাটিয়ে
তিনি শুয়ে আছেন। সকালে যে-পাঞ্জাবিটা আলনায় দেখে
ছিলাম, দড়ির অভাবে সেটা এক হাতে মশারির কোণ আর অন্য
হাতে জানালার শিক ধ'রে ট্রাফিক পুলিশের মতাে প্রসারিত
হন্ত নিয়ে এক পাশে ঝুলছে। কুস্তির সময় সভ্যতার শেষ-চিহ্ন
বরূপ যেটি তার অঙ্গে টিকে থাকে অন্য একটি টানা বােধ হয়
সেই বস্তুটির সাহায্যেই দেওয়া হয়েছে। দেখে হাসি পেল। যা
এত আয়ােজন করে খাটানাে হয়েছে তার প্রয়ােজন সম্পর্কে
লােকটি কতই না উদাসীন। কারণ ওটাকে মশার অরি না
বলে নিঃসন্দেহে মশার বন্ধু বা বাডি বলা চলে।
শুয়ে পড়লাম। একটু পরেই ঘােষিত হলাে তিনি নিদ্রিত।
সেই ঘােষর নির্ঘোষে আমার ঘুমের কিন্তু বিষম ব্যাঘাত হতে
লাগলাে। একটু নড়তে গেলে তাপােশটা আর্তনাদ করে ওঠে,
অত্যন্ত গরম, তার ওপর ঐ নাসিকা গর্জন, সারাটা রাত
অনিদ্রায় কাটিয়ে শেষরাত্রির দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সবে মাত্র প্রাতরাশ সেরে বেরুবে মনে করছি, বীরেনবাবু
এসে কুশল প্রশ্ন করলেন। উত্তরে জানালু, গত রাত্রে ভালাে
বুম হয়নি, শরীরটা ভালাে বােধ হচ্ছে না।
ত ম না
‘যা গরম বিস্তৃত বক্ষে সস্নেহে হাত বুলােতে
বুলােতে বীরেনবাবু বললেন। ‘আমারও মােটেই ঘুম
হয়নি।
আপনার না হলে আমার হতে বােধ হয়। একটু হেসে
বললাম।
কথাটা ধরতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।
মেজাজের যে প্রকার ইতিহাস শুনেছি প্রথমটা একটু ভয় হলাে,
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৌতুক করার ইচ্ছাটা চাপা গেল না। একটু
আভাস দিতেই বুঝলেন। সে কি হাসি! শুনলেই বােঝ
যায় এ হাসির মূলে প্রাণের প্রাচুর্য, আমার কৌতুক শুধু
একটা উপলক্ষ মাত্র।
হাসিটা হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার ঘুম বুঝি খুব
হালকা, কোনাে শব্দ হলে ঘুমােতে পারেন না?
তা আর বলি কি করে। আসবার সময় ট্রেনে তাে বেশ
ঘুমিয়েছি। যেকোনাে শব্দই হােক একটা সমতা রেখে চললে
কানে সেটা সয়ে আসে।
বীরেনবাবু অত্যন্ত লজ্জিত ও দুঃখিত হলেন। তাঁর জন্যে
আমার ঘুম হবে না, এ হতেই পারে না। আজই তাে এখান
থেকে চলে যাচ্ছেন, একান্ত যদি যাওয়া না-ই হয়, সারা রাত
বসে কাটাবেন তবু আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবেন না। বেশ
বােঝা গেল কথাগুলাে বলতে হবে বলেই বললেন না। দু-
একটি কথার ভেতর দিয়ে লােকটির সহজ সরল ভাব লােজ
असा
এসে মনকে স্পর্শ করে। তাকে বললামরণে তিনি এখান
থেকে চলে গেলে সত্যি কি বিশেষত হবে।
এক সপ্তাহ পরের কথা। বীরেনবাবু এখন আমার বীরেনদা
হয়েছে। আজ কাল করে নানা অসুবিধায় স্থানান্তরে যাওয়া
তার হয়ে ওঠেনি। আমিও আপত্তি করা দুরের কথা বরং থাকতে
অনুরোেধই করেছি। সম্পূর্ণ একটা পুরুষালী স্বভাবের সাহচর্য
মনে যেন বেশ একটি নিশ্চিতা আনে।
এক-এক জন লােক আছে যাদের হঠাৎ কেন অতি পরিচয়েও
‘তুমি’ বলতে বাধে। নিজেকে আমি সেই পর্যায়েরই মনে
করতাম। কিন্তু বীরেনদা যেদিন বিনানুমতিতে আপনি ছেড়ে
তুমি' বলতে সুরু করলাে, প্রথমটা একটু অস্বাভাবিক ঠেকছিলাে
বটে, অসঙ্গত বলে মনে করতে পারিনি।
বীরেনদার কথা শুনে মনে হয় তাদের আর্থিক অবস্থা মন্দ
নয়। হােমিওপ্যাথি শিক্ষা উপলক্ষ করে এখানে আছে।
রােগ না খবতে পারলেও রােগী ধরবার চেষ্টাটা তার মধ্যে প্রবল,
ইতিমধ্যে আমাকেও হানিমান-এর দু’এক ফোটা গেলানাের চেষ্টায়
ত্রুটি রাখেনি। হানিমা-এর নামের উল্লেখমাত্র জোড়হস্তে নমস্কার
জানায়। হানিমান-এর একখানা বড় ছবিও দেখেছি তার
কাছে। বাঁধিয়ে রাখবে বলেই এনেছিলাে কিন্তু তা আর হয়ে
ওঠেনি। অধুনা ভাঙাচোরা মলিন অবস্থায় বইয়ের এক
ত
থেকে সে-ফাকে ঘুরে বেড়ায়। বীরেনদা এখনও এটিকে বাঁধানাের
বাসনা রাখে। আঙুলের টিপে চোখের সামনে ঝুলিয়ে সেদিনও
আলােচনা করেছে, কি কেন দিলে মানাবে ভালাে।
একদিন বােডিং-এ ফিরে দেখি বীরেন মহামনােযােগের
সঙ্গে একটার পর একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠি কালাচ্ছে।
এ কি হচ্ছে? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
পয়সা পয়সা দাম নিয়ে এলাম গােটা চারপাঁচ-ফস ফস
বালাতে বেশ লাগে। অত্যন্ত সহজভাবে বীরেনা উত্তর দিল।
ভাবলাম, এত স্বল্প খরচায় বেশ লাগার ব্যবস্থা করতে পারলে
জীবনের অনেক নালিশ ঘুচে যেত। সেদিক দিয়ে নিজেকে
দুর্ভাগা মনে করা ছাড়া উপায় নেই।
যাবে। এই সামনের হাউসে ভালাে একটা ছবি হচ্ছে ।
না। সংক্ষেপে বীরেন। জানালাে।
আমার জিজ্ঞেস করাই ভূল হয়েছে, হাতের কাছেই যার
ভালাে লাগার ব্যবস্থা রয়েছে সে বাইরে যাবে কেন। আর
কোনাে কথা না বলে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
ছবি শেষ হবার আগে থেকেই জোর বৃষ্টি নেমেছে,
বডিংএ ফেরা নিয়ে ভাবনা হলাে। বাইরের বারান্দায় এসে
দেখি দুই বগলে দুই ছাতা নিয়ে বীরেনদা দাড়িয়ে আছে।
একি! তুমি এখানে।
জানি ছাতা সঙ্গে আলােনিচলল।
পরের দিন সকালে বীরেনদাকে জানালাম, একা একা ঘুরতে
স
লা ল মা টি
ভালাে লাগে না, সে সঙ্গে গেলে সই হবে। বীরেন
আপত্তি করলাে না।
পদযুগলের সহজপ্রবেশের জন্যেই হয়তাে ক্যানভাসের
জুতাে জোড়ার গােড়ার দিকটা মুড়ে নেওয়া হয়েছে,
চটির মতো
চটপটু সেটায় পা ঢুকিয়ে পাঞ্জাবিটা গায়ে চড়িয়ে সে বেরিয়ে
পড়লাে। ফেরবার পথে বীরেনদাকে সঙ্গে নিয়েই গেলাম
মাসীমার বাড়ি, উদ্দেশ্য দেখাসাক্ষাতের কর্তব্যটা সেরে
যাওয়া। বাড়ির সবাই এসে জুটলাে বাইরের ঘরে। ভাই
বােন সকলের সঙ্গেই বীরেনদার পরিচয় করিয়ে দিলাম।
মেয়েদের সামনে পড়ে বীরেনদার মতাে অত বড়াে মানুষটা যেন
এতটুকু হয়ে গেল।
মাসীমা দুজনকেই বললেন খাওয়াদাওয়াটা সেখান থেকে
সেরে যেতে। জুবুথুবু অবস্থায় বসে থেকে বীরেনদা হাঁপিয়ে
উঠেছিলাে, চুপিচুপি জানালাে, সে থাকতে পারবে না, এখনি
চলে যাবে। বেচারার অবস্থা দেখে আমারও করুণা হলাে-
মাসীমাকে বুঝিয়ে বললাম, গোঁ যখন চেপেছে ওকে রাখা যাবে
। বীরেনদাকে বিদায় দিয়ে আমি রয়ে গেলাম।
বিকেলের দিকে বােডিংএর দরজায় পা দিয়েই বুঝলাম
ভেতরে ভয়ানক একটা চটাচটি আর গণ্ডগােল চলছে। শঙ্কিত
মনে ওপরে উঠলাম। যা আশা করেছি তাই, বীরেনদাই প্রধান
ভূমিকা অভিনয় করছে। ছাতে ওঠার দরজাটার উভয় ওষ্ঠ
করে মন্ত একটা তালা ঝুলানাে আর তারই সামনে বীরেনা
১৫
ত ম স
একটা কাঠের কল হাতে বীরের মত দাড়িয়ে আছে। অনেকটা
ব্যবধান বাঁচিয়ে অতি মেধররা কোলাহল করছে। যুবকদের
তড়পানির সঙ্গে বয়স্কদের বকবকানি মিশে বেধে গেছে মহা এক
হট্টগােল। বীরেনদা কিন্তু মুখে কিছুই বলছে না।
আমাকে দেখামাত্র মেম্বরদের মধ্যে থেকে জনক
এমন ভাব নিয়ে এগিয়ে এল যেন মীমাংসাটা আমার
জন্যেই স্থগিত রয়েছে, না হয় এতক্ষণে একটা হেস্তনেস্ত হয়ে
যেত।
একজন বলে উঠলাে, এখনাে সামলান আপনারবীরেনদাকে,
হয় ফলটা ভালাে দাড়াবে না বলে দিচ্ছি।
বীরেনদাকে সামলানাে দরকার সেটা আমারও মনে হয়েছে।
সামলালে মন্দ সামাল দেওয়াটা কোন তরফের দুর হবে
আমার অজানা ছিল না। বীরেনদার ভাব দেখে কিন্তু মনে হল
এ সৰ কথা তার কানেই যাচ্ছে না। এমনকি যে লােকটি এত
তর্জন করছে তার দিকে একবার সে চেয়েও দেখছে না; তার
আড়ালে যে সুঞ্জ যুবকটি দাড়ানাে, বীরেনদার শান্ত কঠোর দৃষ্টি
স্থির হয়ে ছিল তার ওপরে।
বীরেনদার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কি
ওখানে অমন করে দাড়িয়ে আছ কেন?
উত্তর দিল সেই লােকটি। দেখুন না মশাই কি অন্যায়,
পাশের বাড়ির মাতালটা ওকে নাকি বলেছে আমাদের হাত থেকে
ঐ হাতে কে চিঠি ছুড়ে দিয়েছে। নে এসে আমাদের
मान यानि
বললেই হতাে, না, বলা নেই কওয়া নেই তিনি এসে হাতের
সিড়িতে এক তালা লটুকে দিলেন
তালা দেওয়া মানে বাের্ডিং শুদ্ধ সবাইকে ইসলট করা।
একটি যুবক বলে ওঠে। তা, খুলতে গেছি ঐ দাড়িয়েছে দেখুন
-বলে, এস কে খুলবে।
যে লােকটি বেশি তর্জন করছিলাে সে আরাে গলা চড়িয়ে
দিলাে। বেটা মাতাল, রাতদিন বেশ্যাবাড়ি পড়ে থাকে, ওর
কথায় আবার বিশ্বাস—চিঠি পেয়েছে তাে করুক না প্রমাণ
কে ছুড়েছে।'
এদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা নিরর্থক। বীরেনদাকে নিয়ে নিজের
ঘরে চলে এলাম।
খুলতেই হবে—যা গরম,আদ্ধেক লােক আমরা ছাতেই।
কে একজন বললাে পেছন থেকে।
জোর গলায় বলাবলি চলতে লাগলাে। ম্যানেজর উপস্থিত
নেই, ফিরলেই নাকি একটা এসপার-ওসপার হয়ে যাবে।
এমন লােককে না তাড়ালে সবাই তারা এ বােডিং ছেড়ে
দেব।
গায়ের জোরে পাড়াপড়শীর নৈতিক চরিত্রের অভিভাবক
হয়ে দাড়ানােটা আমার নিজের কাছেও ভালাে মনে হয় না। এ
সকল ব্যাপারে যাওয়ার জন্যে যতটুকু মন্দ বলা উচিত বললাম।
বীরেনদা কোনাে কথারই কোনাে উত্তর দিল না, চুপচাপ এসে
যেমন বলে ছিল তেমনি বসে রইলাে।
২৭
বললাম, তালাটা খুলে দিয়ে এস, ওরা সবাই ছাতে শােবে
বলছে-
তখন খুলে দেওয়া যাবে। দিনে ওটা বন্ধই থাকবে।
বীরেনদা জোরের সঙ্গে বললাে। তুমি জান না, ঐ যে সুন্দর
মতাে হােকরা, ব্ৰজেশ, চুপচাপ দাড়িয়ে ছিল—মিটুকে শয়তান,
দিনের মধ্যে দশবার হাতে যাওয়া আসা করে, আমি নিজে
দেখেছি। বেশি বাড়াবাড়ি করবে তত এক-একখানা করে
হাড় ভেঙে দেবাে।
এখন বিশেষ টানােনা উচিত হবে না বুঝে চুপ করে
গেলাম।
ঘরে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। দু’জনেই চুপচাপ বসে
আছি। হঠাৎ বীরেনদা বললাে, ‘চা খেলে না—আনতে
বলবাে?
উত্তরে জানালাম, মাসীমার বাড়ি থেকেই ওটা সেরে এসেছি।
জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, সবাইকে ছেড়ে ও-বাড়ির লােকটি
তােমার কাছে নালিশ জানাতে এল কেন?
‘মুখচেনা আছে, বােধ হয় তাই। মদ খেয়ে সব উড়িয়ে
দেয়, কখনাে এসে বলে, হাত খালি, বড় বিপদে পড়েছি,নয়তাে
বৌএর অসুখ—দিয়ে দিই যা পারি। বলে ধার, কিন্তু শেষ
আর দেয় না।
কথা তনে বীরেনদাকে আর নিছক নীতিরক্ষক মনে করতে
পারলাম না।
স
লাল মা টি বেশ কিছুক্ষণ কাটলাে অন্ধকারে চুপচাপ। পাশের বাড়ি থেকে আচমকা একটা নারীকন্ঠের চিৎকার কানে এসে পৌছলাে। তিন-চার হাত মাত্র ব্যবধান ব্যাপার কি বুঝবার জন্যে জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালাম। বােঝা গেল স্বামী তার নিজের চরিত্রচর্চাটা স্থগিত রেখে স্ত্রীর চরিত্র সংশােধ- নের চেষ্টা করছে। আঘাতের শব্দগুলাে স্পষ্ট শােনা যাচ্ছে- সঙ্গে স্ত্রীর চাপা কাতরােক্তি, ‘ওগাে আর যাব না, এবারটি মাপ করাে-মাগাে, মেরে ফেললাে গাে- ইচ্ছে হলে ছুটে গিয়ে লােকটার টুটি চেপে ধরি। বৌটিকে দিনের মধ্যে অনেকবারই দেখতে পাই জানালার সামনে দিয়ে চলাফেরা করছে। পাতলা লম্বা শরীর, মুখখানা সুন্দরই বলা চলে কিন্তু তা যেন আলগা একটা বিষন্নতার তলায় চাপা পড়ে আছে। মানুষটিকে চোখে দেখেছি বলেই দুঃখটা যেন একটু বেশি বােধ করলাম—রাগও হলাে খুবই। হঠাৎ লোকটা নিজেই চিৎকার করতে করতে নিচে নেমে গেল—বাড়িময় একটা বিরাট গণ্ডগােল, স্ত্রী পুরুষের চেঁচামেচি। বুঝতে পারলাম না কি হলাে। খানিকক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম। গণ্ডগােলটা সরে গেল রাস্তার দিকে। কে একজন পেছন থেকে বললাে, যান না, আপনার বীর- ‘লাকে যে পুলিশে দিচ্ছে। ১১
তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে বাতিটা বললাম—সত্যি বীরেনদা
তাে ঘরে নেই।
দেরি না করে ছুটে গেলাম রাস্তায়। গিয়ে দেখি বহু লোেক
বীরেনদাকে ঘিরে দাড়িয়েছে। তার ডান গালের খানিকটা
ছড়ে গিয়ে রক্ত পড়ছে। আমাদের বােডিংএরও প্রায়
সকলকেই সেখানে দেখা গেল। সবাই কিছু-না-কিছু বলছে,
এরই মধ্যে একটি লােক নিজের মাথায় হাত বুলোচ্ছে আর
কেবলই চেঁচাচ্ছে মাথাটা ঠুকে ঠুকে একেবারে ফুলিয়ে দিয়েছে
মশাই, দেখুন না—
ইনিই হবেন সেই স্বামী দেবতা।
এক ভদ্রলোেক ভারিকি চালে বললেন, ‘ট্রেসপস্ এও এসল্ট,
কেস সিরিয়স—
বােধ হয় উকিল।
কিছু করা গেল না, কে আমার কথা শুনবে। পরােপকারী
লােকের অভাব নেই—কে একজন এরই মধ্যে পুলিশ এনে
হাজির করেছে।
বীরেনদার ওপর কারুর সহানুভূতি আছে বলে মনে হলো
না। বােডিংএর দু'তিন জন মেম্বর তাে সঙ্গে থানায় গেল শুধু
মজা দেখে আসতে। তাদেরও আক্রোশটা তখন পর্যন্ত টাটকা।
মনটা অতিশয় খারাপ হয়ে গেল। বাের্ডিংএ ফিরে
কেবলই মনে হতে লাগলাে, অন্যায় অবিচার যে সহ করতে
শিখলাে না সে মানুষের সমাজে বাস করবে কি করে! অন্যায়ের
माया कि
বিরুদ্ধে শিরা-উপশিরা যার এভাবে রুখে দাড়ায় প্রতিপদে
লাঞ্ছনা তার অনিবার্য।
বাের্ডিং-এর বারান্দায় এ নিয়েই আলােচনা চলছে। ছুটো-
ছাটা কথা কানে আসতে লাগলাে। বুঝলাম, পাশের বাড়ির
প্রতি একটা দুর্বলতা এরা বীরেনদার চরিত্রে আরােপ করতে
চাচ্ছে। হাতের সিড়িতে তালা দেওয়া, এই মারপিট সবই
সেই ঈর্ষা থেকে এটাই তাদের প্রতিপাদ্য।
কথাগুলাে শুনে আমারও মনটা খচ, ক'রে উঠলাে।
কিন্তু কেমন যেন শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস হতে চাইলাে না।
যাই হােক, বেশিক্ষণ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারলাম না। পুরােনাে
এক বন্ধু পুলিশবিভাগে উচ্চপদস্থ, তাকে গিয়ে ধরে পড়লাম,
যত সত্বর এবং যেমন ক'রেই হক এর একটা বিহিত করতে
হবে। অঙ্গয়ের দণ্ড দিতে গিয়ে যে অন্যায় হয়েছে তার দণ্ড
হিসেবে যথাসম্ভব অর্থ ঢালতে প্রস্তুত, সেটাও জানিয়ে দিলাম।
বন্ধুর ক্ষমতার গুণে একে-ওকে তুষ্ট করে ব্যাপারটা মিটিয়ে
ফেলতে বেশি বেগ পেতে হলাে না।
লে
হাতের সামনে গিয়েদেখিবীরেনদাভেতরে মহামনোযােগের
সঙ্গে উঠ-বস করছে—জানি এটা তার মন খারাপের প্রতিষেধক।
এত রাতে আবার এখানে কেন? আমাকে দেখে প্রক্রিয়াটা
বন্ধ রেখে বীরেন জিজ্ঞেস করলাে।
শেকল শুদ্ধ তালা খােলার শব্দই তার কথার জবাব দিল।
পরের দিন সিড়ির তালা খােলা নিয়ে একটা গােলবােগ
ত ম না
কিন্তু চলতেই লাগলাে। মেম্বরদেরও এ নিয়ে একটা জেদ
দাড়িয়ে গেল, বীরেনদাও দিনের বেলায় কিছুতেই দরজা খুলে
দিল না। এই অন্যায় গোঁয়ারতুমিতে আমার মেজাজটা
তিক্ত হয়ে উঠলাে বীরেনদার ওপর। বললাম, “দু’চার দিনের
ভেতরেই এ বাের্ডিং আমি ছেড়ে যাচ্ছি।
বীরেনদা বললে সে তা হলে চলে যাবে।
কালীবাবু এসে ধ'রে পড়লেন বীরেনবাবুকে একটু বুঝিয়ে
সুঝিয়ে দরজার ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে। মেম্বররা নাকি
নােটিশ দিচ্ছে ছেড়ে যাবার। কাজটা
কাজটা হয়তাে বীরেনবাবু
ভালাের জন্যেই করেছেন, কিন্তু তার যে ব্যবসা। তাকে জানিয়ে
দিলাম দু'চার দিনের মধ্যে আমরা দুজনেই এখান থেকে
চলে যাচ্ছি, অতএব এ নিয়ে আর ঘাটাঘাটি না করাই ভালাে।
পাশের বাড়ির বৌটিকেও আর দেখতে পাই না। এদিককার
জানালাগুলাে তাদের পাকাপাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একটা ভালাে বাের্ডিং বা মেস খুঁজে বার করবার জন্যে
যােরাফেরা শুরু করলাম। বীরেনদা থাকতাে সঙ্গে। আমার
সঙ্গে বােরাটা এরই মধ্যে তার প্রায় অভ্যাসে দাড়িয়ে
গিয়েছিলাে।
দিন দুই পরের কথা। নানা কাজ সেরে আমাদের ফিরতে
বেশ একটু রাত হলাে। বাের্ডিং-এর সামনের গেট বন্ধ হয়ে
গেছে। পাশের দরজাটা বেশি রাত অবধি ভােলা থাকে, দুই
বাড়ির মাঝখানকার গলি দিয়ে তার পথ।
मान बाहि
সেই গলিতে ঢুকতেই পাশের বাড়ির খিড়কিতে দাঁড়ানাে
একটি স্ত্রীলােক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল ভেতরে, আর একটি লােক
দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাের্ডিং-এর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাে।
দুটি প্রাণীকেই আমি যখন চিনতে পেরেছি বীরেনদাও
চিনেছে নিশ্চয়ই। এর পর কি ক্যাসাদ বাধাবে কে জানে-
সমস্ত মনটা অতিমাত্রায় শঙ্কিত হয়ে উঠলাে। ভয় থেকেই এল
বিরক্তি। বীরেনদার সঙ্গে নিজেকে এতখানি জড়িয়ে ফেলেছি
বলে নিজের ওপরই রাগ হতে লাগলাে।
ঘরে ঢুকে বাতি জ্বলতেই বীরেনদা তার বালিশের তলা
থেকে কি একটা নিয়ে বেরুতে যাবে, তার হাত চেপে ধরলাম,
এ ঘর থেকে এখন তুমি বেরুতে পাবে না—আবার যদি
কোনাে গােলযােগ বাধাও তাে আর কি বলব ভেবে
পেলাম না।
তার হাতের কজি আমার হাতের মুঠোয় ধরছিলাে না।
হাতটা সেভাবেই রেখে শান্ত কণ্ঠে বীরেনদা বললাে, হাত
ছাড়াে–ভয় নেই, আমি কাউকে কিছু করতে যাচ্ছিনে।
হাত ছেড়ে নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না, সঙ্গে গেলাম।
বীরেনদা প্রথমেই গিয়ে সিডির তালাটা খুলে দিল,
তারপর গিয়ে দাড়ালাে জেশের দরজায়। ভয়ে দেশের
মুখচোখ বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলাে, তালাচাবিটা তার সামনে ফেলে
রেখে বীরেনদা ফিরে এল—
এসে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লে তার বিছানায়।
पत्रक
কলকাতা। আধুনিক কেতায় সাজানো একটি বসবায় । এলেন সজা থেকেই
বােঝা যায় স্বামীর অবস্থা সচ্ছল। ঘরের একপাশে পীকৃত কোন শাড়ি আর
খুতি। গৃহকর্তা ৰেনের বয়স তিনি কি বত্রিশ, দীর্ঘ ঋজু দে, মুখে চােখে বুদ্ধির
দীপ্তি। কত শাড়ি এবং ধুতি সে দু'ভাগে ভাগ করে দিচ্ছে। পাশে দাড়ানাে মূৰীৰ
আর বাৎলাসাম্যবাদী তর তরণী।
রমন
পনের খান শাড়ি আর আটাশ খান। ধুতি, গুণে নিয়েছ
ততা সুধীর, ব্যাস, এখন চটপট রওনা হয়ে পড়। চললে যে,
শােনন, চাল ওজন করে নিও কিন্তু অধমণ।
সুধীর
আমি যাচ্ছি জ্যোৎস্নাদি।
জান্না
এস ভাই।
[ সুধীর বেরিয়ে গেল।
মমন
এগুলাে আপনার জ্যোৎস্নাদেবী বুঝে নিন—কী কর্তব্যই
যে ঘাড়ে চাপিয়েছেন, দিনের অর্ধেক সময় কেটে যায় এর
পেছনে-ব্যবসাপর দেখাশােনা বলতে গেলে ছেড়েই দিয়েছি।
কোং
ঘাড়ে চেপে আছে যদি মনে করেন সেফিরিয়ে দিন, আমার
১৩
স্পর্শক
ঘাড় পাতাই রয়েছে। অতগুলাে করে টাকা দিচ্ছেন সেটাই ,
যে একটা মস্ত দেওয়া—আনন্দ যদি না পান তত সময়টা
দেবেন কেন?
যমন
আনন্দ পাইনে এ-কথা আজ আর বলতে পারিনা জ্যোৎস্না-
দেবী, এ কাজেরও একটা নেশা আছে-একটা আকর্ষণ
আছে। কিন্তু প্রথম যেদিন অর্থ সাহায্য চাইতে এসেছিলেন
সেদিন এগিয়ে গিয়েছিলাম কিসের আকর্ষণে সে কথা আমি
গােপন করিনি—সে কোনাে আদর্শের নয়, আদর্শের এই অপরূপ
আশ্রয়টির। এ কথা স্বীকার করতে সংকোচ আমার নেই
এটাও সত্যি, এ ক'দিনের মধ্যেই কাজের প্রেরণার সঙ্গে
কাজকেও যে কখন সমান ভাবেই ভালবেসে ফেলেছি তা নিজেও
জানিনে; কিন্তু পাবার সময় কাজকেই শুধু কাছে পেলাম,
প্রেরণার সঙ্গে আজও দেবী’র দূরত্ব আপনি’র আড়াল।
জ্যোৎ
[ যথাসম্ভব সহজভাবে ] ‘তুমি বললেই জানতে পেতেন
বলার পথে কোনাে বাধা নেই, দেবী’তেই বা দরকার কি?
রণ
মানুষটিই যদি দূরে রইলে সম্বােধনকে সমান টেনে
লাভ কি। কাজ আর কাজ, কাজের বাইরে পড়লেই
আপনি এমন স্তব্ধ হয়ে যান কারুর কোনাে কথাই বুঝিবা
আপনার কানে পৌঁছয় না। এই স্তব্ধতার আড়ালে কি কথা
১
ত ম না
লুকিয়ে আছে কে জানে! আপনার পরিচয়ও বিশেষ কিছু
আমি জানিনে-জানতেও চাইনে। শুধু জানি আপনি মেয়ে-
স্কুলের শিক্ষয়িত্রী, জীবনে সম্বল বলে গ্রহণ করেছেন যুগের
শ্রেষ্ঠ আদর্শ। যদি মনে করে থাকেন আমি আপনার সেই
আদর্শের পথে বাধা হবাে-
জ্যোৎস্না
[ রুদ্ধ আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে ] না না, কোনাে ভালাে কাজের
পথে আপনি বাধা হতে পারেন না যে আমি জানি—কিন্তু
কিন্তু হাত-পা আমার বাঁধা, এবার উপায় নেই—থাকলে
থাক সে কথা। শুধু এটুকু জেনে রাখুন আমিও কম কষ্ট
পাচ্ছিনে নিজেকে এভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে
রমেন
তবে আমাকে জানতে দাও জ্যোৎস্না কি সেই বাধা—এমন
কি থাকতে পারে যা আমরা পার হয়ে যেতে পারবাে না।
বোকা
, তা হয় না—একদিন আপনাকে সব কথাই বলব, এখন
আমি যাই; কতগুলাে পরিবার আমার পথ চেয়ে বসে আছে
আপনি জানেন।
অমেন
এক দিন-একটা ঘণ্টা, তােমার কাজের চেয়ে আমার
অনুরােধের মূল্যটা কি বেশি দিতে পার না জ্যোৎস্না।
বােলাে একটু
স্পর্শক
(बाट
কাজ তাে আমার একার নয়, এ কাজ আমার, আপনার,
সকলের।
[ এমন সময় ডাযন্টিটা বার বেজে উঠলাে। কাপড়গুলাে তুলে নিয়ে জ্যোৎজা
অদিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। রমেন উঠে সামনের সরকার কাছে যেতেই
এগিয়ে এলেন এক প্রোচ ভলােক। হাতে একটা ব্রিফকেস, মূখে চোখে বিরক্তি
মূর্ত হয়ে আছে-গেখের চাউনিতে কিঞ্চিৎ অগৰিকদের আভাসও যেন
পাওয়া যায়।]
রমন।
কি চাই আপনার ?
ভলােক
[ রুষ্টভাবে ] কিছু না, কিছুই চাইনে, তােমার কাছে লােকে
কি শুধু চাইতেই আসে যে প্রথমেই এ প্রশ্ন। অবাক
কাও তো
মনে
অবাক কাণ্ড বৈ কি, এ চলতি প্রশ্নটা আপনাকে বুঝিয়ে
বলতে হচ্ছে। আমি জানতে চাচ্ছি কাকে আপনি চান, কি
আপনার দরকার ?
ভলােক
দরকারটা দরজায় দাড়িয়েই সারতে হবে নাকি? বসবার
একটু জায়গা জুটবে না—দরকার কিছু আছে বৈকি, বিনি
দরকারে অপরিচিত লােকের বাড়ি কেউ হানা দেয়। তুমিই
রমেন তাে?
অ ম না
রমেন
আছে হা।
ভলােক
ব্যস, তােমাকেই চাই, এখন বােসস দেখি একটু ঠাণ্ডা হয়ে
[ নিজে বসলেন ]-বাঃ, ঘরটিতে বেশ সাজানাে-গুছােননা,
দেখে খুশি হলুম।
রমেন
আপনার মুখ দেখে সে রকম মনে হচ্ছে না কিন্তু।
ভদ্ৰলােক
কেন আমার কথায় তােমার বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি—খুশি
হলেই তা মুখেচোখে ফুটিয়ে তুলতে হবে নাকি?-হ্যা শােননা,
তুমি নিশ্চয়ই ভাবছে কে এ লােকটা—আমার নাম মহেন্দ্রনাথ
চট্টোপাধ্যায়। তােমার বাবা ছিলেন আমার বিশেষ বন্ধু, তার
মুখে আমার কথা শুনেছ নিশ্চয়ই।
রমেন
আজ্ঞে হ্যা শুনেছি।
মহে
শুনতেই হবে—কিছুদিন আগেও মস্ত লােক ছিলাম হে,
মন্ত লােক ছিলাম। লাখ লাখ টাকার ব্যবসা ছিলাে বর্ষাতে,
[ভাঙা গলায়] সব ফেলে শুধু প্রাণটুকু নিয়ে পালিয়ে এসেছি
তাও শুধু নিজের-যাক যাক সে সব কথা—এখন আমার
পরিচয় এই ‘একজন ভদ্রলােক, নাম মহেন্দ্র চ্যাটার্জি
১৩
স্পর্শক একটি- [ দীর্ঘশ্বাস ফেলে] আর সম্পদ বলতে [ থামলেন ] মমেন বলতে বাধা থাকলে না-ই বা বললেন। মহে না, বাধা কিসের, বলবাে বলেই তো এসেছি। থাকতে বলে ফেলাই ভালো, কি বলাে। কি কথায় কি কথা উঠে পড়বে, তখন হয়তাে মনেই থাকবে না। মিলি তাে আমায় বারবার সাবধান করে দিয়েছে, কাজের কথাটা না ভুলি। [ হতাশার সুরে ] মিলিও আজকাল আমাকে বিজ্ঞের মতাে উপদেশ নয়, শাসন করে—অ, তুমি তাে মিলি কে, তাই জান না, পরিচয় না দিয়েই নাম করে যাচ্ছি। মিলি হলাে আমার মেয়ে-পাকা একটি সােসাইটি লেডি, তার হাল- চাল কথাবার্তায় চোখ তােমার ঝলসে যাবে, এমনি সে মেয়ে। আমার ধনসম্পদ আর দত্তের উৎকট ছায়া আজ কেবল একে অবলম্বন করেই বেঁচে আছে। মিলিকে দেখিয়ে আজও আমি প্রমাণ করতে পারি কি আমি ছিলাম। মনে আপনার শেষ সম্বলের কথা কি বলবেন বলছিলেন— আমাকে বলবেন বলেই নাকি এসেছেন। মহে ঠিক ঠিক স্মরণ করিয়ে ভালাে করেছ, এই দেখ না এরই
মধ্যে আবার গুলিয়ে গিয়েছিলাে। আমার শেষ সম্বল হলাে
তােমার বাবার দেওয়া একটি হাওনােট। ত্রিশ হাজার টাকা
তাকে ধার দিয়েছিলাম সে প্রায় দশ বছরের কথা। গত বছর
মৃত্যুর আগে অবধিও সে তার সুদ যুগিয়ে গেছে।
রমেন
[বিবর্ণ মুখে] বাবার সব দেনাই আমি এই দেড় বছরের
মধ্যে শােধ করে দিয়েছি—অবিশ্যি সেগুলাে এমন বড় ব্যাপারও
কিছু ছিল না—কিন্তু এত বড় একটা দেনা রয়েছে এ যে
আমার ধারণার অতীত-বাবাও তাে কখনাে কিছু বলেন নি।
মহেন্দ্র
[উত্তেজিতভাবে] তােমার ধারণার অতীত বলেই এটা মিথ্যে
হয়ে যাবে নাকি। প্রমাণ চাও তাে এক্ষুণি দেখাচ্ছি [ব্যাগটা
টেনে নিয়ে] এই ব্যাগের মধ্যেই আছে সেই সব কাগজপত্র।
রমেন
না প্রমাণ আমি চাচ্ছি নে—আপনি মিছিমিছি একটা
মিথ্যে বলতে এসেছেন এ আমি ভাববাে কেন।
মহে
আমি মিথ্যে বলার লােক নই তুমি ঠিক ধরেছ রমেন।
তুমি বড় ভালাে ছেলে, দেখেই কেমন মায়া ব'সে গেছে।
[একটু নরম সুরে] কথাটা শুনে বড়ই ভাবিত হয়ে পড়লে, না
হেসে তাে হবারই কথা— দেখ টাকাটা আমি দাবি না
করলেও পারি, সুদ থেকেই প্রায় আসল উঠে এসেছে।
১৪০
রমেন
তা কেন হবে, আপনার পাওনা টাকা আপনি দাবি
করবেন বই কি।
মহে
মিলিও ঠিক এই কথাই বলে, আমাদের পাওনা টাকা
আমরা ছাডবাে কেন। মিলি আরও বলছিলে তুমি নাকি যুদ্ধের
বাজারে ব্যবসায়ে অনেক টাকা রােজগার কছে, আমাদের
পাওনা মেটাবার ক্ষমতাও নাকি আছে।
রমেন
সে ক্ষমতা আমার নেই—কিন্তু আপনার মেয়ে আমার
সম্পর্কে এত খবর জানলেন কি করে?
তা আমি কি করে বলবাে। ইয়ঙ গারল একজন
‘ইয়ঙ, ম্যান’-এর খবর রাখবে, তাতে অবাক হবার কি আছে?
হয়ত তুমিও তাকে চেন, নাম জান না। ও তাে বর্ষায়
থাকতাে না, এখানে থেকেই পড়তাে, এবার এম, এ পাশ
করেছে—যাই বলল ইংরিজিটা কিন্তু আশ্চর্য রকম
রমেন
শুনুন মহেন্দ্রবাবু, বাবার দেনা যখন রয়েছে, পরিশােখ
আমি করবাে কিন্তু সে জন্যে বেশ কিছু সময় আমাকে দিতে
হবে। আমার যা আয় তা থেকে অত টাকা চার-পাঁচ বছরে
পরিশােধ করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
১১
মহে
না সময়টময় দিতে আমি পারবাে না। কেন, তােমার
বাড়িটাই তাে রয়েছে, এটা বিক্রি করলেই দেনা চুকিয়ে
দিতে পার। অবিশ্যি আর একটা পথও আছে—তুমি ছেলে
হিসেবে তাে চমৎকার—মিলিকে যদি বিয়ে করে তাে ঐ
হাওনােট তােমাকে আমি যৌতুক হিসেবেই দিয়ে দিতে পারি।
[হঠাৎ মুখচোখ উজ্জ্বল করে] এ একটা চমৎকার বুদ্ধি মাথায়
এসে গেছে, কি বলে?
রমেন
তা হয় না। সেটা আমার পক্ষে সম্ভব নয় আর তিনিই
বা রাজি হবেন কেন ?
রাজি হবে না? কেন হবে না তনিমুক্তি দেখাক কেন
হবে না—ঐ তাে একটা ছােকরার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, মিঃ ডে
না কি, হােকরাকে দেখলে আমার আপাদমস্তক জ্বলে যায়
[হঠাৎ শাড়ি-কাপড়ে নজর পড়ায় একটু থেমে]- আরে একি,
অত শাড়ি আর ধুতি এনে মজুত করেছ কেন? অ-কাপড়ের
ব্যাতে যুদ্ধের বাজারে বেশ দু’পয়সা কামিয়ে নিচ্ছ বুঝি
তা বেশ বেশ
আজ্ঞে না। এ হলাে অর্জিত অর্থ প্রাণ খুলে খরচ করার
একটা পথ মাত্র।
১২
par
o
শক্তি
P
মহে •
ndio
তার মানে।
যেন
মানে তেমন কিছু নয় একটি সমিতি গড়েছি
দুঃস্থ সব ভদ্র পরিবারের সাহায্যকরে। ছেলেমেয়েরা গােপনে
তাদের অভাব-অভিযােগের কথা জেনে এসে গােপনে পৌছে
দেয় কাপড় গ'ল যেখানে যেমন দরকার।
বাঃ বাঃ খুব ভালাে কাজ করেছ—খুব ভালাে [ একটু
থেমে ] না—তেমন একটা ভালাে কাজই বা বলি কি
করে। দুই ভদ্রলােকদের একমাত্র ভাগ্য তারা তােমাদের
শ্রেণীভুক্তভদ্রলােকজের মান বাঁচাতে গিয়ে তাদের প্রাণ না
হােক মান বাঁচাননা তােমাদের দরকার। ছোটলোকরা সবাই
ছােট ভাই কেউ কাউকে ধরে রাখতে পারলাে না। গােটা
শ্রেণীটাই এসে গড়িয়ে পড়লাে তােমাদের পথের ধুলােয়
অর্থাৎ দেশের ভিটে ছেড়ে শহরের ফুটপাথে। তাতে আরও
ভালাে হলাে, লঙ্গরখানা খুলে বড়লােকের মাহাত্ম্য বাঁচলে,
উদরাময়ে ওয়াও উদ্ধার পেল চিরতরে-হাঃ হাঃ হাঃ—[একটু
থেমে ঠিক ঠিক ভালাে কথা মনে পড়েছে। তুমি যখন এসক,
জনসেবা-টেবার কাজে রয়েছ তুমি হয়তাে বা খবরটা দিতে
পারবে। শুনেছিলাম বর্মা থেকে পালিয়ে সে কলকাতাতেই
এসেছিলাে—সেও তাে এসব কাজই করে বেড়ায়, এখানে
।
১৪৩
उपमा
থেকে থাকলে দেশের এ দুর্দিনে চুপ করে বসে নেই
নিশ্চয়ই।
রমেন
লােকটি কে, কি নাম তার ।
মহেন্দ্র
নাম, নাম তার মাধুরী, চেন মাধুরী নামে কোন
মেয়েকে। ছিপছিপে একহারা শরীর, সুন্দর মুখে উজ্জ্বল
দুটি চোখ-ধীর, স্থির, শান্ত। তাকে আমার বড়ো প্রয়ােজন।
রমেন
মাধুরী নামে কোনাে মেয়েকে আমি চিনিনে। কিন্তু
বলতে আপনার কোনাে আপত্তি আছে কি, আপনার সঙ্গে কি
তার সম্পর্ক, কেনই বা সে পালিয়ে এসেছিলাে ?
মহেন্দ্র
বলা কি আমার উচিত হবে—তা তােমার কাছে বলা যেতে
পারে, তােমাকে বিশ্বাস করতে কেমন যেন মনে কোথাও
আটকাচ্ছে না। কিন্তু কথা দিতে হবে, মিলিকে ঘুণাক্ষরে
জানতে দেবে না আমি মাধুরীকে খুজে বেড়াচ্ছি। শুনলে
সে আর রক্ষে রাখবে না।
রমেন
মিলিদেবীকে আমি যে চিনিই না।
মহেব।
চিনতে কতক্ষণ—আমাদের তাে এক সঙ্গেই এখানে আসবার
স্পর্শক
কথা ছিলাে, আমি চুপচাপ আগে বেরিয়ে পড়েছি বলে।
জানে এরই মধ্যে হয়তাে এসে হাজির হবে। ওর ধারণা টাকার
তাগিদটা তেমন জোরালাে করে আমি দিতে পারবাে না।
রমেন
ধারণা তাঁর সত্যি, সে আপনি পারেন নি। সে কথা
যাক, মাধুরী সম্পর্কে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন আমি
তাকে কিছু বলবাে না।
মহে
বেশ, শােন তবে তার পরিচয়। মাধুরী আমার পুত্রবধূ।
রমেন
[বিস্মিত হয়ে] আপনার পুত্রবধূ—তিনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে
এলেন কেন ?
মহেন্দ্র
পালিয়ে তার উপায় ছিলাে না, আমরা পিতা-পুত্রে তার
প্রাণ অতিষ্ঠ করে তুলছিলাম।
রমেন
তার অপরাধ?
মহেএ
অপরাধ সে আমাদেরই তুচ্ছ এক কর্মচারীর মেয়ে।
তুমি জিজ্ঞেস করবে এত বড় মালিকের ঘরের বৌ সে হলাে
কেমন করে। অনিবার্য কারণে—তখন মাধুরীর বয়স বিশ
১৫
उपना
কি একুশ হবে, ওখানকার শ্রমিক সরে ছিলাে সে একজন
মের। একদিন চদা চাইতে এলাে আমার ছেলে বিমলের
কাছে। মেয়েদের সম্পর্কে বিমলের চরিত্র ছিলাে খুবই দুর্বল
ফুটফুটে চেহারা দেখেই চাঁদার হার তার বেড়ে গেল—শুধু
তাই নয়, ভবিষ্যতের ভরসটাও হয়তাে সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিতে
যাতে আবার তাকে আসতে হয়। হাজার-দু’হাজার টাকা
চাদাও সে দিয়েছে। সদ্যের প্রয়ােজনেই মাধুরী আসতাে,
নয়তাে টাকার জন্যে নিজেকে বিলিয়ে দেবার মতাে মেয়ে সে নয়,
তার পরিচয় আমি পেয়েছি। অবশেষে এমন অবস্থা দাড়ালাে,
বিমল বিয়ে না করলে মাধুরীর জাত বাঁচে না—অবিশ্যি বিমলের
জাত মারতে পারে এমন ক্ষমতা কোনাে কিছুরই ছিলাে না,
কারণ সে হলাে লক্ষপতি। কিন্তু মাধুরীর সঙ্ঘের শাসানিতে
ভয় পেয়েই বিমল তাকে গ্রহণ করলে—মাধুরী অব্রাহ্মণ অতএব
বিয়ে হলাে তিন আইনে—সমাজে আমাদের মাথা কাটা গেল,
সকলেই বললাে মেয়েটার উদ্দেশ্যই ছিলাে এই। তারই প্রতিবাদে
মাধুরী আমাদের বাড়ির কোনাে বিলাসকে কখনাে পা দিয়েও
স্পর্শ করে নি। তারপর হলে তার সেই সন্তান—সে সন্তানও
বাঁচলাে না—বা বিমল তাকে বাঁচতে দিলাে না—বেশ তো
বলছিলাম, হঠাৎ কেমন যেন সব গুলিয়ে যেতে চাচ্ছে, রােসস
একটু স্থির হয়ে নিই।
রমেন
এখন তাঁকে আপনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন কেন?
১৪.
মহে
খুঁজে বেড়াচ্ছি ক্ষমা চাইবাে বলে। যেদিন জানলাম
আমারই কারখানায় ধর্মঘট চলছে আমারই টাকায় আর সে
টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে মাধুরীর হাত দিয়ে, সেদিন কি অত্যাচারটাই
তার দেহের ওপর দিয়ে গেছে সে তুমি কল্পনা করতে পারবে না।
মজুরদের আশীর্বাদ তার সকল শরীরে চাবুক হয়ে ছিটকে
পড়েছিলাে বিমলের হাত দিয়ে। কপালের বাঁ পাশটা কেটে
ঝরঝর করে রক্ত গড়াচ্ছে—আজও চোখে ভাসে। কে জানে
হয়তাে এখনও আমাদের সেই কলঙ্কের দাগ তার কপালে
রয়েছে।
রমেন
[ চিন্তিত ভাবে ] কপালের বাঁ দিকে দাগ—আচ্ছা মাধুরী
ছাড়া তার কি অন্য কোনাে নাম আছে ?
থাকতে পারে, আমি জানিনে—কেন ওরকম দাগওয়ালা
কোনাে মেয়ে তােমার চোখে পড়েছে, চেন তুমি তাকে
[এমন সময় দরজার ডাক-ঘটিটা আবার বেজে উঠলাে]
মহে
[চমকে] দেখতে মিলি এল নাকি?
ৰিমেন উঠে গেল। তার সঙ্গে এসে ঢুকলে মিলি]
মিলি
বাবএভােমার ভারি অধ্যায়, আমাকে ফেলে চলে এলেকেন?
उपमा
হেএ
[চটে উঠে এসেছি বেশ করেছি, সে জন্যে তাের কাছে
কৈফিয়ৎ দিতে হবে নাকি?
মনে
আপনি চটছেন কেন?
মং-এ
[ আরাে চটে উঠে ] আরে গ্যারি চটলাম কোথায়
মনে
[ হেসে] না না আপনি চটেন নি, আমারই বুঝতে
ভুল হয়েছে, এখন বসুন তাে এখানটায় স্থির হয়ে
বসুন মিলিদেবী।
মহে
তুমি ঠিকই বলেছ রমেন, আমি একটু চটেই উঠেছিলাম।
কি জান ইট ইজ ব্যাড লিভর', যকৃতের ব্যাপার। মিলি
ভাবে স্ত্রী, পুত্র, সম্পদ সব হারিয়ে আমার মেজাজটাই
বিগড়ে গেছে। এমন কি মাথায়ও সামান্য দোষ ঘটেছে বলে
সন্দেহ করে—কিন্তু আমি জানি তা নয়, আমি সব সইতে পারি,
অপরিসীম আমার সহগুণ—‘ইট ইজ অল ডিউ টু ব্যাড লিভর।
[ উৎসাহের সুরে ] তুমি লক্ষ্য করে দেখাে রমেন রুগ্ন হৃদযন্ত্র
করে গম্ভীর, ফুসফুসে লােগ ঢুকলে হয় লােক স্ফুর্তিবাজ আর
যকৃত বিগড়ােলে বিগড়ােয় মেজাজ খিটখিটে তােমায় হতেই
১
শক
মিলি
ল রট'—আচ্ছা বাবা বলে বসে এতক্ষণ এসব বাজেই
বলে না কাজের কথাটাও বলেছ ?
মহেন্দ্র
[ কুদ্ধস্বরে] ছুটে এসেছ যখন নিজেই বলাে না, আমার
বলায় কি তােমার বিশ্বাস আছে ? টাকা টাকা করে ক্ষেপে
উঠেছে, কিছু টাকা হাতে না পড়লে মিঃ ডি-কে নিয়ে নেচে
বেডানাের সুবিধে হচ্ছে না বুঝি—তুমি এখানে বসে টাকা
আদায়ের পথ দেখ আমি চম-যত সব
[ ব্যাগ ফেলেই কুদ্ধ পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলেন ]
पिनि
‘হােয়াট এ পিটি, স্যানিটি’ ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রমেন
হ্যা, সুস্থ মস্তিষ্কে সত্য কথাগুলো এত স্পষ্ট করে বলা
সম্ভব নয়, মাথার দোষ একটু ঘটেছে বলেই মনে হয়।
মিলি
এতক্ষণ এখানে বসে উনি বাছা বাছা সব সত্য বলছিলেন
বুঝি? আর আপনি তা এনজয় করছিলেন, না-
রমেন
এনজয় করিনি, সশ্রদ্ধভাবে শুনেছি।
১৪)
[ সুধীরের প্রবেশ ]
সুধীর
জ্যোৎস্নাদি আরও কিছু কাপড় আর চাল নিতে পাঠালেন।
রমেন
নিয়ে নাও ওখান থেকে।
সুধীর
একটা সুখবর দিচ্ছি রমেনদা, জ্যোৎস্নাদি আজ বেরিয়েই
পাঁচশাে টাকা চাঁদা আদায় করেছেন এক মাড়ােয়ারীর কাছ
থেকে—দু’গাঁট কাপড় দেবে বলেও সে কথা দিয়েছে।
রমেন
তাই নাকি, খুবই আনন্দের কথা। [ ধীরে চিন্তিত ভাবে ]
আচ্ছা সুধীর, তােমার জ্যোৎস্নাদির কপালের বাম পাশে আবছা
একটা কালাে দাগ আছে না—তােমার নজরে পড়েছে কখননা।
সুধীর
অত লক্ষ্য করে তাে দেখিনি, আছে বলেই যেন মনে
হচ্ছে-কেন বলুন তাে?
মনে
, এমনি জিজ্ঞাসা করছিলাম—হঠাৎ কেমন মনে হলাে
দাগ একটা দেখেছি—আবার স্পষ্ট মনে পড়ছে না। মনে
করতে গিয়ে না পারলে কেমন একটা অস্বস্তি বােধ হয় না
তাই—আচ্ছা তুমি কাপড়গুলো গুণতি করে নাও, যাবার সময়
বলে যেও কোনটা কখানা নিলে।
১৫০
স্পর্শক
সুধীর
আচ্ছা। [ সুধীর কাপড়ের স্তুপের কাছে এগিয়ে যায় |
মিলি
অ-হ-আপনারও সােল সারভিস' করার রােগ আছে
দেখছি -এর কথা শুনে মনে হলাে মেয়ে ওয়ারকারস’-ও
আছে আপনাদের মধ্যে।
রশেন
তা আছে। একজন দু'জন নয়, বেশ কিছু।
মিলি
[ ভ্যানিটি কেস থেকে পাউডার-পাটা নিয়ে মুখে লাগাতে
লাগাতে ] তা থাকবে না, এ যে মেয়েদের মধ্যে একটা ফ্যাশন
হয়েছে-‘সােস্যাল সারভিস করা, কম্যুনিস্ট হওয়া—চাদা
তােলার নাম করে বড় বড় লােকের বাড়ি হানা দেবে, আর
বড়াে বড়াে ধরতাই বুলি আওড়াবে-আসলে সবই হলাে ছেলে
পাকড়াও করার ফন্দি।
রমন
ছেলে পাকড়াও করাই যদি উদ্দেশ্য হবে, তবে আপনাদের
এই জোরালাে ফন্দি ফেলে কম্যুনিস্ট' হতে যাবে কেন?
সাধারণ একখানা শাড়ি আর রােদে পােড়া চামড়ার চেয়ে,
আপনাদের এই ঝকমকে শাড়ি আর টকটকে ঠোটের টানটাই
তাে যৌবনের পক্ষে জোরালাে—এ তথ্যটা, আপনি যাদের
কথা বলছেন, সেই সমাজসেবী মেয়েরাও জানে নিশ্চয়ই।
ত ম
मिनि
ও এদিক দিয়ে ওসব মেয়েরা ভারি সেয়ানা। ওরা ঠিক
টের পেয়েছে, আজকালকার অধিকাংশ ছেলেই ইডিওলজি’র
।
আপনার কথায় মনে হচ্ছে, দেশের ছেলেরা রীতিমতাে
মানুষ হয়ে উঠেছে, তাই আপনারা আর পেরে উঠছেন না।
धिनि
মানুষ হয়েছে না ছাই। আপনিও তাে ওদেরই দলের
‘বার্ডস অব সেম ফেদার’—তাই সুযােগ পেয়ে খুব একটা খোঁচা
দিয়ে নিলেন। যাই বলুন, ওসব ভড়ং আমি সইতে পারিনে।
বেশ তাে, মজহুরদের সঙ্গে জুটেছিল, সেই রকমই থাক
ছােটবার সময় ছুটছে দেখবেন বড়লােকের পেছনে।
রমেন
ভালােই তাে। বড়লােকদের যে টাকাটা খরচা হতে
শাড়ি-গয়না, সিনেমা আর কসমেটিকস-এর পেছনে, সেটা
তার চেয়ে বড়াে কাজে ব্যয় করার উৎসাহ যােগাতে পারবে।
মিলি
‘ওয়েল মিস্টার সেন, ইউ হ্যাভ ফলস রিগার্ডস ফর ইওর
কমরেডস'। বিয়ের পর ভােল বদলে যায়। আমি দেখুন
এসব ব্যাপারে ভারি ক্যানডিড', বাবাকে খােলাখুলি বলে
দিয়েছি, হেলের রূপ-গুণ যেমনই থাক, টাকাটি থাকা চাই-ই।
স্পর্শক তিন মাইল ট্রামে চডে, তৃতীয় শ্রেণীতে সিনেমা দেখে আসবে, সে আমাকে দিয়ে হবে না। রমেন হয় না বলেই তাে যত না আপনারা পরীক্ষা পাশ করুন, যত না পথে বিপথে একা একা ঘুরে বেড়ান, আর যতই পুরুষের সঙ্গে সমানাধিকার দাবি করুন, আমরা আপনাদের বিলাসের সামগ্রী ভিন্ন আর কিছুই ভাবতে পারিনে। তাই আপনাদের মতাে মেয়েদের জন্যে আমরা ভিড় ঠেলে পথ ক'রে দিই, ট্রামে-বাসে সিট ছেড়ে উঠে দাভাই, সুযােগ পেলেই অর্থ খরচ করে আমােদের ব্যবস্থা করি। কিন্তু আপনার কথিত ঐ কম্যুনিস্ট মেয়েদের ধাতে এ সম্মান সয় না, পুরুষের এ-বিলাস সসম্মানে তারা প্রত্যাখ্যান করে। বন্ধুরে বেলায়ও পুরুষের কাঁধে ভর করবে বলেই তারা এগিয়ে আসে না, তাই তার আর্থিক অবস্থা নিয়েও শুরুতেই ভাবিত হয়ে পড়তে হয় না—অবশ্য অর্থ থাকে ভালাে মিলি খুব তাে লম্বা একটা বক্তৃতা দিলেন ওসব মেয়ের পক্ষ নিয়ে, ভাববেন না ও জাতের মেয়েদের আমি চিনি নে। আপনাদের এই এমিক যে মেয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের পরিবারের যথেষ্ট আছে। ও পরিবারটার সর্বনাশ করতে উঠে পড়ে লেগেছিলাে—আজও ওর কথা মনে হলে ঘেন্নায় আমার গা কেমন করে ওঠে। টেরটা আপনিও পাবেন- তাে শুনলাম জ্যোৎস্না না কে যিনি মােটা চাদা আদায় করেছেন, যাঁর কপালের কালাে দাগ আপনার চোখে ভাসছে-দেখুন, জোটবার সময় এসে জুটেছে আপনার মতাে লােকের সঙ্গে, যার হাতে কাঁচা পয়সা আছে-ঘায়েলও ক'রে এনেছ, কপালের কালাে দাগ নিয়েই যখন অত ভাবনা সুধীর [ পেছন থেকে এগিয়ে এসে কুদ্ধ স্বরে ] কে এই মহিলাটি রমনা, এখানে বসে এসব যা তা কথা বলছেন- রমেন যাও সুধীর তুমি তােমার কাজ করগে যাও, এসব কথায় তােমার কান দেবার দরকার নেই। [ একটু থেমে ] কপালের দাগের কথাটা যখন জিজ্ঞাসা করি তখন খেয়াল ছিলাে ইনি উপস্থিত, আবার এতক্ষণ ধরে কথা বলবার সময় মনেই ছিলনা তুমি পেছনে বসে কাপড় গুণছে—আজ আমার মাথাটাই যেন কেমন হয়ে গেছে [ সুধীর সরে গেল ] মিলি আপনার এই কমরেডদের অন্য শিক্ষার সঙ্গে ভদ্রতাটাও একটু শেখাবেন—একেবারে ‘এটিকেট’ জ্ঞান নেই। আমরা কথা বলছি তাতে ওর ইন্টারফিয়র’ করতে আসা উচিত নয়। ১৪
স্পর্শক
রমেন
অপায়ের মাত্রাটা অতিরিক্ত হয়ে পড়লে ভদ্রতার মুখ চেয়ে
চুপ করে থাকতে সকলে পারে না মিলিদেবী।
মিলি
অ-এর ব্যবহারটা আপনি সমর্থন করছেন। অন্যায়টা
হলে বুঝি আমার, স্টেন’! আলোচনা উঠে
আপনিও বলছেন আমিও বলছি, আপনিও আমাকে ‘পিচ
করতে কম করেননি—একজন মহিলাকে বাড়ি পেয়ে অপমান
করায় কোনাে পৌষ নেই জানবেন—‘লেট আস কাম টু
বিজনেস', কাজের কথা বলতে এসেছি সেটাই বলা যাক, এসব
বাজে কথার দরকার কি।
উঠে পড়লাে,
ময়মন
এটুকু আর কিছুক্ষণ আগে বুঝলেই ভাল হতো, বলুন
কি আপনি বলতে চান।
মিলি
আমাদের টাকাটার কি করছেন বলুন-বড়জোর একমাস
সময় আপনাকে দিতে পারি।
[ ব্যন্ত ভাবে জ্যোৎস্নার প্রবেশ ]
তোমা
[ মিলিকে লক্ষ্য না করে] আচ্ছা সুধীর, কি করছাে তুমি
এখানে বসে-এখনাে হলাে না তােমার ?
ত ম লা
অধীর
এই হয়ে গেছে জ্যোৎস্নাদি—এঁদের কথায় কান দিতে
গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেল।
মিলি
[ অবাক চোখে তাকিয়ে ] একি—বৌদি।
बामा
[ দুরে দাড়িয়ে ] কে—মিলি—তুমি, তুমি এখানে
মিলি
[ বিস্ময় কেটে গিয়ে মুখে দেখা দিলে ব্যঙ্গের ভাব
—তুমিই জ্যোৎস্না-বাঃ বেশ নাম ভাড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছলাে।
পােষাক দেখে মনে হয় না দাদার মৃত্যুর খবরটা পেয়েছে।
জ্যোৎস্না
[ কঠোর কণ্ঠ ] পাইনি—পেলেও পােক আমার
বদলাতাে না।
মিলি
‘ইনহিউম্যান, সিম্পলি হার্টলেস’! খবরটা শুনে সামান্স
একটু দুঃখ পেলে বলেও মনে হচ্ছে না।
জ্যোৎস্না
কিন্তু দুঃখ আমি পেয়েছি, কাজটা নিজের হাতে করতে
পারিনি বলে—পশু হত্যায় পাপ নেই।
মিলি
ওহােয়াট এ ভাইল উয়ােম্যান'।
সুধীর
আপনি স্ত্রীলােক নইলে একটি একটি করে হাড় আপনার
ভেঙে দিতুম।
বোমা
চুপ করে সুখী, তুমি যাও তাে এখান থেকে—যাও
ভাই বলছি।
সুধীর
যাচ্ছি।
মিলি
ওকে ভাগিয়ে দিলে কেন, পেছনে লেলিয়ে দিলেই তাে
পারতে? গুণ্ডা লেলিয়ে দেওয়াই তাে তােমার কাজ
দাদার পেছনেও শুনেছি তা লাগিয়েছিলে।
জ্যো
রমেনবাবু, এর সঙ্গে কি আপনার সম্পর্ক, কেন এখানে
এসেছে, আমি জানি না, কিন্তু এটা আপনাকে জানাচ্ছি,
এ থাকলে আর মুহূর্তও এখানে দাড়ানাে আমার পক্ষে সম্ভব
নয়—আমি যাচ্ছি
মনে
তুমি—তুমি যাবে কেন জ্যোৎস্না [ হাত ধরলাে।
জ্যোৎস্না
[ আদেশের অরে] তবে তােমাকেই যেতে হবে মিলি
যাও বলছি-
১৫।
पिनि [কোচ থেকে ফিনিক দিয়ে উঠে দাড়িয়ে ] যাবই তো, তােমার মতাে থাকতে আমি আসি নি এখানে-বাঃ রমেনবাবু, অতিথির অপমানটা দাড়িয়ে বেশ উপভােগ করছেন তাে- জ্যোৎস্না এর পরও এখানে দাড়িয়ে কথা বলছে। তােমাকে বাড়ি থেকে বার করে দিতে বাধ্য কোরো না আমাকে। মিলি যার বাড়ি নিয়ে অত বড়াই করছে, তােমার সেই ‘প্যারামারটিকে আমি ভিটে ছাড়া করতে পারি, এটা হয়তো তুমি জান না [ যেতে যেতে ] আর করবােও তাই—এই বলে গেলাম। [ দমক মেরে বেরিয়ে গেল ] রমেন তােমার সকল শরীর কাঁপছে জ্যোৎস্না-এস, এই সােফাটায় ব’সে একটু স্থির হতে চেষ্টা করে। জ্যোৎস্না [ ক্লান্তভাবে সােকায় এলিয়ে পড়ে চাপা ভাঙা গলায় } যাক ভালােই হলাে—তােমাকে কোনাে কথাই খুলে বলতে পারছিলাম না, সে বাঁধ আপনা থেকেই ভাঙলাে। আজ- আজ সবই বলব,তারপর রমেন কিছুই তােমাকে বলতে হবে না জ্যোৎস্না, সবই আমি ১৫৮
স্পর্শক
শুনেছি, তবে কিনা তােমর কাহিনী মনে করে শুনিনি, শুনেছি
মাধুরী নামে একটি মেয়ের দুঃখের আর ধৈর্যের ইতিহাস।
জ্যোৎস্না
[ বিস্ময় মেশানাে ভাঙা গলায় ] সে-নামের ইতিহাস তুমি
শুনেছকার কার কাছ থেকে নলে।
মনে
মহেন্দ্রবাবুর মুখে।
জ্যোৎস্না
[ ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে ] সেও এখানে এসেছিলাে! এরা
কেনই বা এখানে এসেছে—মিলি যাবার সময়ই বা কি সব
বলে গেল, কিছুই বুঝলাম না।
রমেন
তুমি কি করে বুঝবে জ্যোৎস্না, এ ঘটনার আগে অবধি
আমিই যে কিছু জানতাম না। মহেন্দ্রবাবু ছিলেন বাবার বন্ধু,
বাবা তার কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন,
ওঁরা এসেছিলেন তারই তাগিদ দিতে। শােধ দেওয়া সম্পর্কে
কিছুটা সুবিধা হয় তাে বা পাওয়া যেত, এর পরে আর সে-আশা
করা বৃথা
তো
কিন্তু কিন্তু অত টাকা তুমি এখন পাবে কোথায় ?
তােমাকে যে পথে দাড়াতে হবে।
बना
রমেন
[ আবেগ মিশ্রিত চাপা গলায় ] সে-পথে তুমি আমার
পাশে থাকবে তাে জ্যোৎস্না ?
বো
[ আচ্ছন্ন ভাব নিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে ] আমি-আমি থাকবাে
বই কি—আমি তাে পথেরই মানুষ, পথে আমার ভয় কিসের?
[ ব্যস্ত-সমভাবে মহেন্দ্রবাবুর প্রবেশ ]
মহেশ
এই দেখ কি কাণ্ড করেছি, ব্রিফকেসটাই ফেলে গেছি
এখানে। [ ব্যাগটার দিকে এগিয়ে গেলেন ] ওরই মধ্যে
রয়েছে সব দলিলপত্র। এমন ভুলাে-মনই হয়েছে বলে
কেন—[ ব্যাগ খুলে কাগজপত্র দেখে নিয়ে ] এই তত সব ঠিকই
আছে—তােমার বাবার হাশুনােটটি পর্যন্ত যথাস্থানে। তুমি
ভালাে লােক বলে তাই না—যাদের দেওয়া হাওনােট তাদের
বাডিই ফেলে গেছি—তেমন দুষ্ট লােক হলে কি সর্বনাশটাই
হতাে বলাে দেখি—[ হঠাৎ জ্যোৎস্নার দিকে চোখ পড়ায় ]
একি—একি দেখছি—বৌমা-মাধুরী—তুমি-আমি তােমাকেই
যে খুঁজে বেড়াচ্ছি-
| জ্যোমা
[ কঠোরঝরে ]কেন, আমাকে দিয়ে আপনার কি প্রয়ােজন
-একটা অসহায় মেয়ের ওপর অত্যাচার করার সাধ কি আজও
আপনাদের মেটে নি ?
স্পর্শক মহেন্দ্র তােমার মুখে-চোখে ঘৃণা ফুটে উঠেছে বোমা—ওঠাই স্বাভাবিক—এই তাে আমার পাওনা—কিন্তু আজ তােমাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি প্রাণ খুলে একটিবার ক্ষমা চাইবাে বলে— জ্যোৎস্না [ বিস্ময়ের সুরে] ক্ষমা—আমার কাছে আপনি ক্ষমা চাইবেন- মহে অবাক হবারই কথা—একদিন আপ্রাণ চেষ্টা করেও যে-কথাটা বুঝিয়ে আসতে পার নি, সর্বস্ব খুইয়ে সে-সত্য আমি জেনে এসেছি। যেদিন সব সম্পদ ছেড়ে পথের ধুলােয় নেবে দাড়াতে হলাে দশজন সাধারণের মাঝখানে, সেদিন জানলাম কতখানি মেকি মূল্যে নিজেকে ফাপিয়ে রেখেছিলাম—কি যেন, জীবনকে ঢেলে সাজতে হল এমনি একটা বিপর্যয়ই হয়তােবা দরকার। কি এক আবর্তের সামান্ত ঘেঁয়া লেগে কোথা থেকে কোথায় ছিটকে এসে পড়লাম, উঠে দেখি আগেকার বিচারবুদ্ধিও সব গেছেউলটে পালটে—যাক, যাক সেসব কথা—আজ তােমার ওপর আমার শেষ অত্যাচার, আমাকে তােমায় ক্ষমা করতে হবে। [ জ্যোৎস্না এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করলাে] মহে [ বিস্মিত হয়ে ] তুমি আমাকে প্রণাম করছে বৌমা তাহলে তুমি আমাকে সত্যি ক্ষমা করতে পেরেছ! আজ ম আর আমার কোনাে ক্ষোভ রইলাে না—তবে এখন তুমি তােমার ঘরে ফিরে চলল বৌমা, আর রাগ করে দূরে সরে থেকো না- ত্যা এটাই যে আমার ঘর বাবা। ১২ [ অবাক চোখে তাকিয়ে ] এটাই তোমার ঘর । হ্যা, এটাই ওর ঘর—আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন। যহে আশীর্বাদ করবাে-আশীর্বাদ করবাে আমি—তাইতাে [ হঠাৎ যেন স্থির করে ] হ্যা করবাে বই কি, আশীর্বাদ, করবে বই কি [ ক্ষীণকঠে] তােমরা সুখী হও—সার্থক হও ফুল দাড়িয়ে ভাৰী পৰেণে ৱে-ৰীয়ে জয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। জ্যোন্য আর মনে করে তাকিয়ে রইলাে তাঁর নিস লক্ষ্য করে—মনােৰ ঠাৎ আবার ফিরে দাড়ালেন। এই দেখ, শুধু হাতে আশীর্বাদ করে ফিরে যাচ্ছি—আমি- আমি হলাম মহেন্দ্র চ্যাটার্জি, আমি শুধু হাতে আশীর্বাদ করবে [ ব্যাগ খুলে] এই—এই সেই হাওনােট [ ছিড়ে টুকরো করতে করতে] বসব-যাক চুকলাে ল্যাঠা-জান মা, আজকাল মাথাটা আমার মাঝে মানে যায়- যাক মুহু মুহূর্তে কাজটা সেরে গে[ একটু অপ্রকৃজিবে চাপা গলায় তােমরা দু'জনে কল অবাক হয়ে কয়েছ কেন আমার দিকে-না, না- আমি যাই-
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.