Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Parnaput Ed. 3rd

Roy,kalidas · 2009/11/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পণপুট
শ্রীকালিদাস রায়
তৃতীয় সংস্করণ

হরদম
চট্টোপাধ্যায়
গুরুল
২০১৮
कर
शालिग
ঠাপাধ্যায়
ওসঙ্গr
নকতা
SONS
প্রিন্টার-শ্রীশীতলচন্দ্র ভট্টাচার্য
মানসী প্রেস
১al,
রভ বহন কৰা
প্রন্টার
খin
----+--++++---

ভ= দুর্গ
সাহিত্যাগ্রজ
শ্ৰীযুক্ত দেবকুমার রায় চৌধুরী মহােদয়ের চরণে
.গো দেব, আসিয়াছি পূজিতে চরণ;
দীনের ক্ষমিতে হবে দীন আয়ােজন।
তুমি যে নমস্ত বি,--এগাে তার লাগি,
হই নাই আমি তৰ ভক্ত, অনুরাগী।
আগে জনমে তুমি তরে লাগি নয়
সুরূপ কলপ সম লোকে তােমা কয়,
তব গৃহে ইন্দিরার পদরেণুখনি
তারাে লাগি নয়, তাও মনে নাহি গণি,
তুমি জ্ঞানী, তুমি ধনী, গুণী কবিবর,-
তায়াে লাগি তব পায় লুটে না অন্তর।
তােমার প্রেমের লাগি, প্রেমের উদখি,
তােমায় ভিন্নার লাগি, হে মাের দরদী
যেটুকু হারাও নিতি সজল নয়নে,
সেই হারামণি লাগি এসেছি চরণে।
সর্বদেবময় তুমি, হে দেবকুমার,
বৈজয়ন্তী বৈকুণ্ঠ জীবনে তােমার
অলকা কৈলাসসহ রহিয়াছে জাগি ;
আমি আসিয়াছি, বন্ধু জান কার লাগি ।

আমি আসিনিক সখা সেটুকুর তরে
কুবের বাসব যধা রাজদও ধনে,
অথবা যেটুকু তব চন্দ্র কুমার ;
দেবগুরু ধাতা যাহা করে অধিকার
তায়ো লাগি নহে। তব যে মহিমামাকে
নারদের বীণাযন্ত্র রণ রণ বাজে,
প্রেমাননে যারে ফেরে নাচে ভোলানাথ
সে দিব্য মাধুৰ্য লাগি লহ প্রণিপাত।
তব গেহ কুঞ্জে ফেলি ফুলফলগুলি
তুলসী ঐফলপত্র শিল্পে লব তুলি।
“এভাঙা” “অরুণ” তুমি “দেবদূত প্রিয়,
ছােনার ‘‘আধুরী” “খায়া” অমল মিয়।
অাখার বিদাৰি তুমি ফুটায়েই উষা
মুম্বনে সৌরভে বিখে দিলে বরভূষা ।
দুলােক আলােক বার্তা করেছ বহন,
তারে লাগি নহে মুগ্ধ মাের প্রাণমন।
নীহারের নেত্রে তব যেই টুকু আলাে।
তারি লাগি সখা তোমা বাসিয়াছি ভাল।
যাইনিক তব বিভ-মধুয়ায় বারে
ইয়ে বাস-অর্থের বিচারে।
সংসারের কুরুক্ষেত্রে আইনি সনে
সাহিত্যের বারাবতী জাগেনিক প্রাণে।
একেবারে ধরিয়াছি হৃদয়ের দেশে
*
প্রেমানন্দ, তোমা জমাখালের বেশে।
মেহং ভাতা কালিদাস।
১

ভূমিকা } পর্ণপুটের দ্বিতীয় সংস্করণ ফুরাইয়া গিয়াছে। নূতন সংস্করণে কোনো কবি- তার পরিহারবা নূতন কোন কবিতার সংযােজন করা হয় নাই। তবে কবিতা- গুলির ভাষাগত কিছু কিছু পরিবর্তন করা হইয়াছে। কয়েকটি কবিতা অনুষ্ঠানবিশেষ উপলক্ষে লিখিত হয়। তন্মধ্যে বঙ্গবাণী ১৩১৯ সালে আশ্বিন মাসে কলিকাতা ইউনিভার্সিটি ইনষ্টিটিউটের জুনিয়র স্যগণ কর্তৃক অনুষ্ঠিত গিরিশচন্দ্রের ‘জনা” নাটকাভিনয়ের প্রারম্ভে গীত হইয়াছিল, পরে কলিকাতার ৭ম বঙ্গীয়-সাহিত্য-সম্মিলনের মঙ্গলাচরণ সঙ্গীতরূপে গৃহীত হইয়াছিল। ঐ সমিতির সদস্যগণ কর্তৃকই ‘অধ্যাপক বিনয়েন্দ্রনাথ সেনের পরলােকগমনে সঙ্গীতটি সমিতির পরমহিতার্থী স্বর্গীয় অধ্যাপকের স্মৃতিসভায় ও ‘বিজ্ঞানাচাৰ্য্য প্রফুল্লচন্দ্রের প্রতি গীতটি যশােহর খুলনা সেবাসমিতি কর্তৃক অনুষ্ঠিত আচার্য্য বরের সম্বর্ধনা সভায় গীত হইয়াছিল। রবীন্দ্র প্রশস্তি’ ১৩১৮ সালে কবিরের সম্বৰ্ধনা-কলে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের সভ্যগণ-প্রদত্ত অভিনন্দন। “বর্ধমানে” কবিতা তথাকার সাহিত্য-সম্মিলনের সাহিত্য-সন্মিলনের আবাহনসঙ্গীতরূপে ও “সম্বর্ধনা নামক সঙ্গীতটি উত্তর বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের ৯ম অধিবেশনে রঙ্গপুরে সভাপতির আবাহনকল্পে গীত হইয়াছিল। ‘কৃত্তিবাস' নামক সঙ্গীতটি ফুলিয়া গ্রামে কৃত্তিবাস স্মৃতিরক্ষণ অনুষ্ঠানােপলক্ষে ও ‘গঙ্গাধরতৰ্পণ বহরমপুরে গঙ্গাধর- স্মৃতি-সভার জন্য রচিত। বঙ্গবাণীবন্দনায় গ্রন্থের উদ্বোধন। তারপর প্রথম পর্যায়ের কবিতাগুলিতে সত্যের ক্ষুদ্র ও শিবরূপের নানা বিকাশ প্রদর্শিত হইয়াছে। সত্যের সাধনা কত কঠিন--প্রেয় পদার্থকে কঠোর তপস্যায় ত্যাগ না করিলে শ্রেয় েলাভ করা যায়। না-সহ আপাতপরাভবের মধ্যেও কেমন করিয়া সত্যই শেষে জয়লাভ করে-- সত্য রুদ্ররূপে কেমন করিয়া নিত্য আমাদিগকে মায়া, মােহ, মিথ্যার স্বপ্ন হইতে রূঢ় আঘাতে জাগাইয়া তুলিতেছে এবং পরিশেষে শিবরূপে বরাভয় দলে অনিত্যের লাঞ্ছা হইতে রক্ষা করিতেছে, তাহাই এ পর্যায়ের কবিতাগুলিতে কবি হলিত করিয়াছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে পল্লীগীতি। দৈন্যদুঃখশােককারুণ্যময় বঙ্গের অন্তরাত্মার কথা। পল্লীবালা’ কবিতাটি কবির কৈশোরকালের রচিত ‘কুন’ হইতে গ্রহণ করিয়া এই গ্রন্থে সংযােজিত করা হইয়াছে। তৃতীয় পর্যায়ে প্রেমগ্নীতি। মানসীমুর্তিতে পরিণয়ের পূর্বে প্রেমিকের প্রাণে পরিকল্পিত মানসীর পবিত্ৰসুন্দর আদর্শমূৰ্ত্তি পরিণয়ের পর “বধূবরণে সেই আদর্শ প্রতিমা ও গার্হস্থ্য জীবনে নারীর কল্যাণী মুক্তির সম্মিলন। কবি-প্রিয়া, বালিকা, কিশােরী ও তরুণীরূপে কবির নয়নে বিশ্বকে নব নব আলােকে ময়ুরকণ্ঠের মত চঞ্চল সৌন্দর্য্যে প্রতিভাত করিয়া তুলিয়াছে। প্রথম মিলনজাত মােহ ও মাদকতা বিরহতপের অনলে দগ্ধ হইয়া গভীর প্রণয়ের শ্যামিকা হিরণ্যে পরিণত হইয়াছে। মােহের খদ্যোতমালা আরতির পঞ্চপ্রদীপের স্থিরতিতে গৃহদেউলে জ্বলিয়া উঠিয়াছে। কবি প্রিয়ার সৌন্দর্যে চিরসুন্দরের বিভূতি দেখিয়াছেন। চতুর্থ পর্যায়ে, চিরন্তন বৃন্দাবলগীতি। সখ্য, বাৎসল, দাস্য ইত্যাদি বিবিধ বসে বিকাশ। কবির “ব্রজবেণু” এই শ্রেণীর বহু কবিতার সংগ্রহ। পঞ্চমপর্যায়ে বঙ্গের মনীষিগণের প্রশস্তি মালিকা। ষষ্ঠ পর্যায়ে বর্ণনাত্মক কবিতা। ভারতের নানাস্থান অবলম্বন করি। কবিতা- গুলি রচিত। ধামশ্রেণী’ নামক কবিতাটি রঙ্গপুর সাহিত্যপরিষদের অধিবেশনে পঠিত হয়। খামশ্রেণী রঙ্গপুর জেলার অন্তর্গত বাহারবন্দর পরগণার একটি পবিত্র ধাম। এখানে এখনাে বাণী সত্যবতীর ভগ্ন রাজপ্রাসাদ ও তাহার প্রতিষ্ঠিত দেবতা বৰ্ত্তমান। রাণী সত্যবতী রাজা রঘুনাথের পত্নী। রাণীর প্রথম যৌবনেই স্বামী নিরুদ্দেশ হন। দ্বাদশ বৎসর রাণী হিন্দুবিরহিণীর ব্রত পালন করিয়া পরে বৈধব্যের কঠোর ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করেন। তাহার সমগ্র সম্পত্তির আয় তিনি দেবজিতিথিসেবায় ব্যয় করিতেন। রাজসিক ক্রিয়াকর্ষে ছাহার পিপাসার এপ্তি না হওয়ায় তিনি কাশীবাসিনীহইতে মনস্থ করেন। তাহার পিতা এবং গুরুদেব উভয়েই বিষয়ভার বহন করিতে অসম্মত হওয়ায়, তিনি তাহার সখী পুণ্যশ্লোক। রাণী ভবানীর হস্তে সমগ্র সম্পত্তি অর্পণ করেন। রাণী ভবানীর বাহার পরগণার সঙ্গে ইহা এখন কাশীবাজাধিপতির অধিকৃত। মহারাজই এখন থামশ্রেণীর কালীবাড়ীর সেবায়িত। এখনো এখানে রীতিমত দেবজি অতিথিসেবা হইয়া থাকে। শ্রীকৃষ্ণদয়াল বসু , ১৩৪৩ 9% পর্ণপুট

কাঞ্চন থালি
নাহি আমাদের
অন্ন নাহিক জুটে,
যা কিছু মােদের এনেছি সাজায়ে
নবীন
পর্ণপুটে।
—রবীন্দ্রনাথ।

পণপুট
বঙ্গবাণী
দ্যুশােক ভূলােক পুলকি’ আলােকে জননী আমার রাজে,
অযুত-ভক্ত-অমল-রক্ত-মৰ্ম্ম-কমল-মাঝে,
মুঞ্জরে ফুল চরণে, ভৃঙ্গ গুঞ্জরে মধুবাণী।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গাে অখিলজ্ঞানের রাণী ।
চণ্ডীদাস বি-মণ্ডিল শির মাণিকমুকুটভারে,
‘জ্ঞান’ ‘গােবিন্দ’ বৃন্দাবনের কুন্দ-কুমুদ-হারে,
‘লােচন রচিল পাদ্য, গােরার লােচন-সলিলা আনি।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গো অখিলজ্ঞানের রাণী।
দ্বৈপায়নের ভৃঙ্গার জলে অভিসিঞ্চিল কাশী
কবিরাজ আনৈ ভক্তিমুরভি হৃদিধূপধূমরাশি,
কৃত্তি জলিল বৰ্ত্তী তমসাতীর্থের হবি দানি।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গো অখিলজ্ঞানের বাণী।
কবিকঙ্কণ দিল কঙ্কণ, কনে মঙ্গলগানে,
কবিরঞ্জন রঞ্জিল পদ হৃদয়াক্ত দানে।
ভারতচন্দ্র আরতি আলােকে উজলে অঙ্গখানি।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গাে অখিলজ্ঞানের রানী।

পর্ণপুট
“প্ত” চিল প্রভাকরে টীকা দীপ্ত ললাটে জাগে।
‘রঙ্গ’ ভূষিল ক্ষত্ৰতপের তরুণ অঙ্গরাগে।
দাশরথি দিল সিত নবনীত পল্লী পরাণী ছানি।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গাে অখিলজ্ঞানের রাণী।
বহে অক্ষয় বিদ্যাসাগর নৈবেদ্যের থালা,
গৃহমন্দিরে শ্ৰদীনবন্ধু বরণগন্ধভালা।
নাহি ভূদেবের পৌরহিত্যে পূজার অঙ্গহানি।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গাে অখিল জ্ঞানের ‘মাণী।
বঙ্কিম তারি অঙ্কিল চারু কারুকজ্জল আঁখে,
নবীন ঘােষিল জয় বাণী, নব পাঞ্চজন্য শাখে।
হেমের হৈম হৃদয় বীণাটি শােতিল শুভ্র পাণি
আমার বঙ্গবাণী সে যে গাে অখিলজ্ঞানের রাণী।
মরালের মত মধু গীতরত, চরণ বেড়িয়া ভাসে,
গিরিশ হরিষে হরিচন্দন বরিষে নূপুর পাশে।
কবিরবি যার সুমেরু শিখরে বিরচিল রাজধানী।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গাে আমার জ্ঞানের রাণী ।
হাসি কান্নার হীরা পান্নার দুল দিল দ্বিজরাজ,
‘রজনী’ করেছে রজনীতে সেবা, প্রভাতে ‘প্রভাত’ আজ
কিন্নর নর-সুর জয়গানে আজিকে ঐকতানী।
আমার বঙ্গবাণী সে যে গাে অখিল জ্ঞানের রাণী।
২

বিশ্ব ও বিশ্বনাথ
বিশ্ব ও বিশ্বনাথ
তুমি ত জ ও বিশ্ব নহ তুমি যে নিজে বিশ্বনাথ,
পাগল ভােলা, একি এ লীল-দৃশ্য হেরি দিবস রাত।
জ্যোছনাজ্যোতি তারকাভাতি বিভূতিভূষা তােমার গায়,
ভাঙের ঘাের করেছ ভাের, চরণ তাই টলিয়া যায়,
বধি’পরে নদীবহরে ডমরু তুলে গভীর তান,
দোদুল-জটা জলদ-ঘটা দামিনী-ছটা দীপ্যমান।
ইন্দ্রচাপে সন্ধ্যারাগে কটিতে বাঁধা কৃত্তিপট,
ধরেছ শাপ-দুঃখ-পা - গরল গলে, রুদ্র নট ।
তােমার পাশে গৌরী হাসে বিতরি জীবে অন্নজল,
শস্যশিরে আঁচল উড়ে চরণে ফুরে কমদল।
তুমি ত জড় বিশ্ব নহ-তুমি যে নিজে বিশ্বনাথ
পাগল ভােলা, একি এ লীলা-লহরী হেরি দিবসরাত।
।
শিশিরকণামাণিক জ্বলা বনবিতান ব্রততীচয়
আনতফণ ফণীর মত জড়ায়ে তনু প্ৰণত রয়
ভীষণ তব পিনাকে ছুটে অশনি, দহি গগনবন,
ঈশানে তব বিষাণ রবে ঝঞ্চা তুলে প্রভঞ্জন।
নকরােটি তােমার করে, কণ্ঠে মহাশঙ্খহার
ধবলগিরি বৃষভ বহে শৃঙ্গে মেঘপঙ্ক ভার।

পর্ণপুট
ত্রিশূল তর ত্ৰিতাপরূপে নিখিল ব্যেপে ঘূর্ণমান,
অট্টহাসি, তুহিনরাশি তটিনী কেপটি করিছে পান।
কৃশানুময় ললাট আঁখি—নিদাঘ ভানু নিৰ্ণিমেষ,
রতিপতি ও ঋতুপতিরে দহিয়া করে ভস্মশেষ।
তুমি ত জড় বিশ্ব নহ—তুমি যে নিজে বিশ্বনাথ,
পাগল ভােলা ! একি এ লীলা-একি এ খেলা দিবস রাত!
দুর্বাসা
কোথা যাজ্ঞিক আজি অজ্ঞানে ভুলেছ নিত্যযাগ
কোথা ঋত্বিক করনি সাধন আত্মকর্মভাগ,
কোথায় শিষ্য ভুলেছ ভাষ্য মাধবীর সৌরভে,
দুর্বাসা আসে দুর্বার বেগে, অবহিত হও সবে।
কোথা ঋষিবালা পুষিছ পরাণে মােহারুণ কামনায়,
অতিথি আসিয়া ফিরে যায় তবু হয়না চেতনা তায়,
তরুলতাগুলি পায়নি পানীয়, হরিণী শম্পল
দুর্বাসা আসে দুৰ্ব্ব লয়ে, কোথায় পাদ্যজল ?
কোথা নরপতি লালসালালিত, পুষ্পবাটিকামাঝে
বিলাস ব্যসনে আছ সারা বেলা, হেলা করি রাজকাজে,
কোথা যুবরাজ ভুলেছ সমর প্রেমিকার কর ধরি ?
দুর্বাসা আসে দুর্বল চিত। জাগাে মােহ পরিহরি।
৪

মথুরার দূত
ভুলি দেবদিজপূজা, ব্ৰত, নর জনমের তিন ঋণ,
কোথা গৃহী হায় শফীলীলায় বিলসিছ নিশিদিন ?
গৃহকাজ কোথা ভুলিয়াছ ধূ বিরহের বেদনায় ?
দুর্বাসা আসে জাগাে জাগো সবে নিজ নিজ সাধনায়।
আসিছে মূর্ত রুদ্রশাসন, জকুটীকুটিল মুখ
শিরে জটাজাল নয়নে দহন, শ্মশ্রুগহন বুক।
সাধনার ভার বহ আপনার, মােহের আঁধার নাশি,
জাগ্রত রহ, উগ্র তাপস কখন পড়িবে আসি।
মথুরার দূত
বিদায় চন্দ্রাননে,
এসেছে আজিকে মথুরার দূত আমার বৃন্দাবনে।
সাঙ্গ আজিকে বঁাশীভরা গান
হলাে কলহাসি রাশি অবসান।
শেষ, অভিস্যার, মান অভিমান, উচ্ছল রসাবেগ।
যদিও যমুনা ভরা টলমল,
নীপনিকুঞ্জ চারু চঞ্চল,
ময়ূর ময়ূরী রসটলটল, গুরু গুরু ডাকে মেঘ,
তবু হায় যেতে হবে,
বারতা বহিয়া মথুরার দুত গােকুলে এসেছে যবে।

পর্ণপুট
--
বলাে সখাসখীগণ,
এসেছে নিঠুর মথুরার দূত কালার কুঞ্জবনে।
জলকেলি শেষ ঝপায়ে ঝপায়ে
কালীদহনীরে
দুকূল
কাপায়ে।
বৃথা বনফলে ভরিছ আঁচল, মিছে গাঁথ বনমালা।
ফুলের ঝুলনা লুটিবে ভূতলে
ভাবিতে নয়নে সলিল উথলে।
ষাবাে বুকে বহি বসরাসদোলঝুলনের স্মৃতিভ্রালা।
মিছে আর মায়া ভাের,
ভেসে যাক আজি যমুনার জলে সাধের বাঁশরী মাের।
বলে পাগলিনী মায়,
আজিকে তােমার প্রাণের দুলাল বাঁধন কাটিয়া যায়।
কে হরিবে আর ক্ষীরসর ননী
কে ধরিবে শিখিপুচ্ছ পচনী ?
শত অচলের গ্রন্থি টুটাতে হিয়া ফেটে শতখান।
ব’ল’ গােপীগণে-কানু গেল চলে,
বনপথে হাটে যমুনার জলে
আজি হতে হলো যত লাজ আলা যাতনার অবসান।
মিছে ডাক’ বারে বারে,
এসেছে আজিকে মথুরার দূত কানুর হৃদয় দ্বারে।
কেমনে হেথায় রহি,
মথুরার দূত এসেছে নিদয় বিদায়নিদেশ
:
বহি।

সূর্য্যমণি
ডাকিছে সত্য, বিষাণ বাদনে
জীবনমরণ—রণ প্রাঙ্গণে,
ডাকে মথুরার কাতর কাকুতি আতুরের আঁখিলের।
পাষাণ কারার আকুল রোদন
করিছে সুপ্ত তেজের বােধন,
ভাঙিতে হয়েছে রাগের স্বপন, ফাগের রঙীন ঘাের।
মিছে আর আঁখিজল
মথুরার দূত করিয়া দিয়াছে অন্তর টলমল।
সূর্য্যমণি
কুসুমসভায় উৎসবলীলা শেষ হয়ে গেছে যবে,
আবেশ আলসে লুলিত এলায়ে ঘুমায়ে পড়েছে সবে।
বুক্তকায় বাসে
তুমি জাগিয়াছ কুদ্র তাপসী
রৌদ্রবহ্নি পাশে।
তুমি চাও যারে মিলেনা তাহারে উষার সরস সুখে,
তােমার বাসকশন রচিত নহে কিশলয় বুকে,
চারিদিকে জ্বালি কৃশানুকুও ভানু পানে মেলি আঁখি
বাঞ্ছিত লাগি তােমার সাধনা বুঝিতে কি আছে বাকি ?
তুমি জানিয়াছ সার,
স্মর-বসন্তে সঙ্গী করিলে চরণ মিলেনা তঁার।

পর্ণপুট
ভয়ে কেহ হ’ল পাণ্ডুর ম্লান, আঁখি মুদি কেহ কঁপে,
গরবিনী যত সােহাগিনী ঐ ঝলসি পড়িছে তাপে।
তুমি জ্বালাময়ী স্বাহা
বহ্নিবেদনা বহিবে বক্ষে তুমি বিনা কেবা আহা।
বালারুণ হেরি যে মেলে নয়ন চাদের আলােকে যেবা
তাদের মাঝারে কে করিবে মরুমাৰ্ত্তরে সেবা ?
কেহ বা বন্দে উষা দেবতায় সন্ধ্যায়ে কোন জনা,
উষা সন্ধ্যার সে আদিনিদানে বল কার আরাধনা ?
বিনা অপােমহিমায়
কোন্ সাহসিকা তীব্ৰ তপন প্রেমচুম্বন চায়?
বিশ্বদীপন তপনে তুষিতে পট্টবসনা ধরা
অস্তিবাচন-অর্ঘ্যরচনা তােমায় করেছে ত্বরা।
তুমি আছ ধুয়া ধরে
মহাকীৰ্ত্তনে, সকলে যখন ঢলে পড়ে ঘুম ঘােরে।
হওনিক হার বহুর মাঝারে গতানুগতিকা নও,
তেজোবৈভব স্বাধীন সত্তা গৌরবে বুকে বও।
কেদারী রাগিণীমূচ্ছনা তুমি জটাবল সাজে,
জাগরমন্ত্ৰ মজ্জিত কর ততি সভামাঝে।
যবে নিরলঙ্কারা,
বসুধা সতীর সধবা-চিহ্ন তুমি সিন্দুর ধারা।

প্রহ্লাদ
শিশুটিরে ফেল্লে যখন জলে,
ডুবল না সে, ভাসলাে কমলদলে,
বিস্ময়ে তাই হেরলে হাজার আঁখি-
ঢেউয়ের পরে আসছে হেলি দুলি
ফেল্লে যবে হিংস্রগণের পায়,
হর্ষে তারা খেল্লে নিয়ে তায়,
সিংহ তাহার চাটুল চরণ রাঙা
হস্তী তারে পৃষ্ঠে নিল তুলি।
তে তায় ফেল্লে অবােধ যত,
আগুন 'নভে জলধনুর মত
তােরণ হয়ে জাগল তাহার শিরে
হরে নিল গায়ের যত মল।।
সত্য,-এষে প্রলাদ অবতার
জল্লাদে তার করবে কিবা আর ?
আলাদে সে গাইবে হরির নাম
যতই কেন রােধ তাহার গলা।
মাণিক্যময় স্তম্ভ ভেঙ্গে চুরে,
নৃসিংহদেব জাগবে দানবপুরে,
মিথ্যানুরের সব মায়াজাল ছেদি
করাল প্রখর রাঙা নখর বহি।

পপুট
. ভ্রান্তি দ্বিধা দ্বন্দ্ব ধরি ধরি
চিরবে জঠর রেখ জানুর’ পরি ;
কৃতাঞ্জলি দেখবে চেয়ে চেয়ে
* শেষকালে সেই সত্য হবে জয়ী।
উত্তম যায় ভাবছ মােহ ঘােরে,
বসায়ে আজ আদরে তায় ক্রোড়ে,
তাড়াচ্ছ যে ধ্রুবেরে হায় বনে,
ধ্রুবের সাথে বিদায় নিবে শুভ।
অধ্রুবেরে চিত্তে ভজি’ ভজি’
সুরুচিতে নিত্য বুয়ে মজি,
সুনীতিরে করবে কর দূর ;
দুঃখ কি তার পুত্রটি যার ধ্রুব।
ধ্রুব আপন কঠোর সাধন বলে
উঠবে জিনে হরির পদতলে
সুনীতি যে হবেই শ্রেয়ােমাতা
সবার উচু পুণ্য ধ্রুবলোকে।
ভােগের মােহে মরীচিকার জালে
মিটবেনাক তৃষ্ণা কোন কালে
চাইতে হবে ধ্রুবলােকের পানে
অশ্রু অকুণ কাতর করুণ চোখে
১৮

ধ্রুবের তপঃ সত্য, বিনা তাই
ভ্রান্ত তােমার মুক্তিপস্থা নাই,
বের আলােক ভিন্ন ভবার্ণবে
নাবিক তুমি হবেই পথহায় ;
ভােগলালসার তপ্ত তৃষার জ্বালা,-
হাজার হাজার দীপ্ত জোনাক মালা,
নিশান্তে হায় নিভবে তাদের আয়ু
অনন্তকাল বলবে ধ্রুবতারা।
-
পরিক্ষার পরিজন
গৃহসুখ সিংহাসন
মৃগশিশু, তােরে ভালবেসে
শতশত বরষের
যত তপ যাগ জপ
হায় হায় যায় অই ভেসে।
খেয়ে নিস্ তুই সব
লিকুল কুশ যুব
কোশাকুশী হতে গঙ্গাজল।
সাজানাে সমিধ পরে ঘুমাইবি অকাতরে
আলি আমি কেমনে অনল?
যবে আহুতির তরে
মন্ত্র পড়ি লই হব
হাত হতে তুই নিস্ কাড়ি।
ধেমানে বসলে তুই
হেন করিবি দেই
স্পন্দহীন নাহি হতে পারি।

টে আয়ত নম্বনে চেয়ে ভুলাইবি শ্ৰতিপাঠ দাতে ধরে’, টানিবি বাকল ; উগ্র তাপসের তপ নষ্ট করি রে নিষ্ঠুর, শেষে কিয়ে করিবি পাগল ? বিসর্জিয়া সৰ্জরস, কপুর, কুঙ্কুমচর্চা কালাগুক্ত, উশীর, চন্দন, নিখিল বিলাসামােদ ছেড়ে এসে শেষে মাের মৃগমদে মজিলরে মন। রূপতৃষা, বসতৃষা জয়তৃষা, যশঃতৃষা সর্ব তৃষা গর্বে জিনি হায় কান্তারে প্রান্তরে ঘুরি হারাইনু পন্থা মাের মরুভ্রান্তি মৃগতৃষ্ণিকায় । সব ছাড়ি’ বনে আসি ওরে মাের মায়ামৃগ তাের লাগি এই অপােগতি, প্রকৃতির প্রতিহিংসা নিদারুণ, অকরুণ । ভগবন্! দাও স্থির মতি। থা। দুই অশরণ অঙ্কে মম, শুল্ক হােক চতুৰ্ব্বগ ফলের পাদপ। জীবন্তু সবার চেয়ে স্নেহ প্রেম শিশুগুলি হত্যা করি’ করিব কি তপ ? এম, রসরম সঞ্চালিত শরীরীর অন্তরে ধমনী শিরায়,

সর্বত্যাগ বিমান
চিত্তগত হৃৎপিণ্ড
সে রস সে রক্ত বিনা
স্তব্ধ হবে, স্পন্দিবেনা হায়।
রাত্রিদিন পক্ষ ভরে
ঘুরিলে গগন পরে
প্রেমগুক বাচিবে কোথায়?
সব ঠাই হতে পারে
তাড়াইলে বারে বারে
মৃগবক্ষে বধিবে কুলায় ।
সৰ্ব্বত্যাগী
বিশ্বরাজ
কেমনে চিনিব তােমা তুমি নাকি বিশ্বের ভূপাল ?
একমুষ্টি অন্ন লাগি ভিক্ষা মাগাে, হে রাজকাঙাল।
চিতাভস্ম,-অঙ্গরাগ, পরিধানে হেরি গজাজিন
কুণ্ডলিত জটাজালে সর্পফণা,-কিরীট নবীন।
নিতান্ত বাতুল পেয়ে বৃষভে বসায়ে অবশেষে
কে তােমারে সাজাইল ও অপূর্ব ভূপেরে বেশে?
বন্টিয়া অকুণ্ঠ করে সর্বজনে অমৃত ধবল
শিতিক কি আনন্দে কণ্ঠে নিলে অসিত গরল?
বিলায়ে মন্দার, কুন্দ, অরবিন্দ, তুলসী মধুরা,
নলে মহাশঙ্খকষ্ঠী, বিল্বপত্র, বিষাক্ত ধূতুরা।
তেয়াগি লাবণ্যতা রাজকন্যা তারুণ্যঅরুণা
ব্রতজীর্ণ। তপঃশর্ণা অপর্ণারে করলে করুণ।
হে রাজেন্দ্র তব রাজ্যে তুমি শুধু চির অকিঞ্চন
সকলে যা বিসজ্জিল করিলে তা মােলির ভূষণ।

পর্ণপুট
হে বৈরাগী সৰ্ব্বত্যাগী বিশ্বপতি, হেরিয়া তােমার
হতদর্প, নতশীষ, বিশ্বলােক লজ্জায় কুণ্ঠায় ।
সৰ্ব্ব ভােগ্য ত্যজি রাজা, যদি রও শ্মশানে কান্তারে
কেমনে সৌভাগ্য গর্বে রবে প্রজা ভােগের সংসারে
বিশ্বনাথ আজো তুমি ফিরিলেনা তব সিংহাসনে,
ছুটিছে নিখিল ভব তাই তব শ্মশানসদনে !
জীবন-মরণ
মরণ মােহন বঁধু অইরে ডেকেছে অই
পশেছে বশীস্বরলহরী কাণে।
‘কোথায় জীবন মম কইরে জীবন কই’
বাঁশরী ডাকিছে ঐ শিহরি প্রাণে।
ভবনদী নিরবধি কলকল রবে চলে
চলিনু গাগরী কাখে সলিল আনার ছলে,
কালােরূপে আলাে করে নীপ মূলে হােথা সই
উতলা করেছে প্রাণ মুরলী তানে।
মরণ মধুর বঁধূ ওই লাে ডেকেছে অই
মরমে বিধেছে স্বর পশিয়া কাণে।
জ্বলিছে বিরহ জ্বলা, নয়ন তৃষিত হায়,
বুকে কোটি বরষের অসীম ক্ষুধা,
মরণ চরণে প্রেম অমর হইতে চায়
মরণ শরণে আছে মিলন সুধা ।

রূপ ও ধুপ
মানিনাক সংসার, সমাজ শাসন তব
শােভন লােভন ভূষা কিছু সাথে নাহি লব,
হবে অভিসার মাের আজি ঘন বরষায়
মানা না মানিতে চায় জীবন রাধা
ননদী শ্বাশুড়ী হয়ে মায়ানমাহ পায়-পায়
নাথের মিলন পথে হােেনা বাধা।
রূপ ও ধূপ
ওগাে রূপ অপরূপ,
তােমার দেউলে দহিয়া মরিল কত না সুরভি ধূপ !
অটল নিঠুর, চরণের মূলে,
তবু একবার চাহিলে না ভুলে।
পড়িল না ক্ষীণ রেখা, রসহীন অশান পাষাণ বুকে।
দন্ত তােমার লুটায়েছে ভূমে।
দগ্ধ দেহের গন্ধিত ধূমে
মলিন কালিমা দেছে ধূপ তব কপট উজল মুখে।
ওগাে রূপ অপরূপ,
তব মন্দিরে মরণে বরিছে কত যে জীবম-ধূপ।
কও কও কথা একবার ডাকি
মেল’ ও ইন্দ্রনীলমণি আঁখি,
কত যে ভক্ত লােচন-রাজীব তুলি’ শরে, দিল পায়,

পপুট
হলােনা ও দেহে কৃপা শিহরণ
হানিল বক্ষে কেড়ে প্রহরণ,
ভব হােমানলে পূর্ণাহুতিতে সপিল যে আপনার।
ওপাে রূপ, অপরূপ,
মেল একবার অন্ধলোচন, দহে মলো কত ধূপ।
দধীচি
কোথা তপােবনে যজ্ঞকুণ্ডে পড়েনি পূর্ণাহুতি,
দেবের প্রসাদ আসেনি নামিয়া, থামিয়া গিয়াছে শ্রুতি
আহিতাগ্নিক, হয়ােনা নিরাশ দধীচি সপিছে প্রাণ,
অস্থি শােণিত-ইন্ধন ঘৃত দিতে হােমে বলিদান।
বৃষ্টি বিহনে রৌদ্র দহনে কোথা দেশ ছারখার,
ধূ ধূ করে মাঠ, হু হু করে প্রাণ, গৃহে গৃহে হাহাকার
কৃষকবর, হয়ে না কাতর, দধীচি সপিছে প্রাণ,
শাবানন্দে বারিদমন্ত্রে নামে ইন্দ্রের দান।
তে
সুরােক কোথা রসাতলে যায় অসুরের করতলে,
গিরিগুহা বনে, ঘুরিছে গোপনে দেবতারা দলে দলে,
উঠ দেবরাজ, ত্যজ দীনসাজ, হীনলাজ অবসান,
মােগাসনে ঐ বসেছে দধীচি করিতে অস্থিদান।

ধৰ্ম্ম জগতে বিপ্লব কোথা কলুষের উপচয়,
সত্যের গ্লানি, পুণ্যের স্লানি, নিরীহের নিতি ভয়।
সাধু মহারাজ, উঠ উঠ আজ দধীচি সপিছে প্রাণ
কুশে যাগে রণে মেরু-মরু-বনে তাহারি আত্মদান।
বঙ্গবন্ধু
-
আজি বন্ধু তােমাদের শুভ নব বাসরের রাতি,
বৎসর চারিটি পরে পুন জ্বলে উৎসবের বাতি।
সে যেন অনেক দিন, যবে দু’হু কৈশাের যৌবন
মিলিল প্রিয়ার অঙ্গে, গেলে তারে তেয়াগি তখন।
তারপর হতে নিতি দ্বিখণ্ডিত মৃণালের প্রায়
অবলম্বি’ তন্তুটুকু প্রাণরক্ষা আশায় আশায়।
মাঝখানে কত গিরি মরু হ্রদ নদী ব্যবধান,
বিরাট অজ্ঞেয় সিন্ধু ভরয়াছে রহস্যে পরাণ।
বর্ষার দুৰ্যোগ রাতে চমকেছে চপলার সনে
যেন এই উৰ্মিলার প্রাণান্ত গিয়াছে কাননে।
নিশিদিন কত নদী সন্তরেছে পিয়াসী অন্তর
নিরন্তর পার হলাে একা কত বিজন প্রান্তর।
উড়িল কল্পনা তার বারবার তােমার উদ্দেশে
অশ্রুসিন্ধুনীরে পড়ি ক্লান্তপক্ষ নিমজ্জিল শেষে।
স্বদেশ প্রত্যাগত জয়যুক্ত বান্ধবের প্রতি পুনর্মিলনদিনে

পর্নপুট
বসন্ত নিশান্তে কত স্বপ্ন দেখে হয়েছে বিল
হারাই-হারাই শুধু আশঙ্কায় আঁখি ছল ছল।
যেচেছ কল্যাণ তব, দেরতায় নিত্য সন্ধ্যাপ্রাতে
পূজাপুশে দিন গণি শুভ্র শঙ্খবিমণ্ডিত হাতে।
নিত্য গৃহ কৰ্ম্মমাঝে নানাছলে উন্মন চঞ্চল
তােমারি বরণডালা সাজায়েছে তােমারি কমল।
কবরীভূষার লাগি কোনদিন তুলেনিক ফুল
লিপির আশিস বিন মাসান্তেও বাধেনিক চুল।
আশাবন্ধে করি ভর কোনরূপে যাপিয়াছে দিন
রজনীগন্ধার মত ক্ষীণ বৃন্তে রহি সমাসীন।
ধূসর বসনাবৃতা মূর্তিমতী বিরহ বেদনা,
করেছে যে তপােব্ৰত এতদিনে তার উদ্যাপনা।
নিত্য নিত্য লক্ষ পােত ভিড়িয়াছে তার চিত্ততটে
ধরিতে পারেনি এলে কোন্ পােতে সহসা নিকটে।
সংসারপ্রাঙ্গণ তলে এস বন্ধু, ষােড়শ কলায়
অশ্রুহিমধৌত ইন্দু উদি’ হেথা অমিয়া বিলায়।
যােল মধু পূর্ণিমার ফুল ফুলে যত্নে গাঁথা হার
আজি বন্ধু লহ কণ্ঠে,-পদে নমে ষােড়শী তােমা।
হে প্রাজ্ঞ, হে সহৃদয়, আজি অজ্ঞা বঙ্গবালিকায়
হেরিতে হইবে শান্ত কৃপানেত্রে স্নেহের ছায়ায়।
ক্ষমিতে হইবে তার ক্রেটীময় প্রিয়বিনােদন
ভাষায় ভূষায় ভাবে ভঙ্গিমায় দীন আয়ােজন ।

'বঙ্গবন্ধু
p
কমে তার লজ্জাকুণ্ঠ, সজ্জাহীন, দীন উপচার,
মৃন্ময় ভাজনে ধূপ, ক্ষীণ দীপ, বনফুলহার।
কুড়ায়ে লইতে হবে ভূমি হতে দিতে গিয়ে পায় •
পুলকপ্ৰকম্পে অর্ঘ্য কর হতে যদি পড়ে যায় ।
চিত্তরূপ পূর্ণ তার পুণ্যথন প্রেমের সুধার,
কলা কৌশলের ফেনবুদ্বুদের ঠাই নাহি তায়।
শিখেনি বনের পাখী কোনাে বুলি সংসার অঙ্গনে
হৃদয় কুলায়ে রাখি ক্ষমমা তার স্বভাবকূজনে।
গুরুগুরু সুখমন্দ্রে ঘনন্দে দুরু দুরু বুক
স্বিন্ন তনু তনিমায় বিলসিছে রােমাঞ্চ কধুক ;
সে আজিকে প্রাবৃটের কম্পমানা কদম্বের শাখা
ধীরে দিও পদ ভার, ওগাে শিখি, ধীরে মেলে পাখা ।
ভুলুন্ঠিতা লতিকার সৰ্ব্বকুণ্ঠা দূর করি, প্রিয়,
নােওয়াইয়া ভুজশাখা জড়াইয়া বুকে তুলে নিও।
উপলব্যথিত তন্বী তটিনীটি উপকণ্ঠে যদি,
মূরছিরা পড়ে, তবে কণ্ঠে টেনে নিও প্রেমােদধি।
প্রেমাবেশে আত্মহারা, যদি নারে কহিবারে কথা
নব বাগ্মিতা তার ক্ষমা কর’ স্তব্ধ কাতরতা।
ভাবাবেগে রুদ্ধ কুম্ভমুখে কবি সুন
অসম্বদ্ধ অসন্নদ্ধ অর্ধস্ফুট বাণী তার ক্ষম।
ক্ষমিও লুলিত দুটী মৃণালের ক্লান্তি অবসাদ
তরঙ্গপ্রহত অখিউৎপলের শতেক প্রমাদ।

পুট
নির্মেঘ নিৰ্মলাকাশে জাগাে তুমি প্রভাত তপন
নম্মছলে কমলের মকোষ কর উদ্ভেদন।
জগতের কর্মক্ষেত্রে হও.গিয়ে সহস্র কিরণ
দিগ্বিজয়া দীপ্ততেজ জ্ঞানােজ্জল মধ্যাহ্ন তপন।
হে বরেণ্য হে তাপস, প্রেম তব পবিত্র সুন্দর
ব্রহ্মচর্য্যপূত শুচি শাপমুক্ত অমল ভাস্বর।
প্রেমকুশণ্ডিকামন্ত্রে গাহপত্যে আজি নব যায়।
নিষা শুদ্ধি জ্ঞানে দেহে রচিয়াছ গৃহের প্রয়াগ।
দাও পুণ্য মিলনের বিগলিত আনন্দাশ্রুজল
অভিষেক করি তাহে গৃহে বসি লভি তীর্থ ফুল।
পল্লীবালা
পড়িছে ঝলস’ কুন্দ অতসী জাতীযূথী
মাধবী গন্ধরাজ।
শেফালি চামেলি ঝরেছিল বড় পিয়াসায়,
খরতাপে আহা শুকায় বিফল নিরাশায়।
শ্রীফলপত্র আজি দেব-পূজা উপচার
তুলসীমাত্র সাজ।
গৃহের লক্ষ্মী দুলালী গিয়াছে পরঘরে
এ গৃহ অাধার আজ।
ঠাকুরের সেবা হয়ে গেছে আজ চুপি-চুপি,
সেটা নাহি বটে বাকী।
২৮

লীলা
সরসীর পথে কলসী বাজেনি খনখন
কোশাকুশী টাটে উঠেনিক ঘাটে ঝনরন।
প্রসাদী কুসুম না পেয়ে বাছুর আসে ফিরে
নামায়ে কাতর আঁখি।
পিতা নিজে রচে পূজা আহ্নিক আয়ােজন
চোখ মুছি থাকি থাকি ।
থােকাখুকীদের হয়নিক আজ নাওয়া খােওয়া
কে তাদের ডাকি পুছে ?
ঘরে ঘরে আজ বাজেনিক মল ঋণ ব্রণ,
ভিখারী আসিয়া ফিরিয়া যেতেছে ঘন ঘন।
হরিনামঝােলা হয়না সেমাই ঠাকুমার
সূতা নাহি যায় সূচে,
খুকীটির গালে দাগ হয়ে আছে আখিজল
কেবা দেয় বলাে মুছে ?
ধুলায় ধূসর ধবলী ফিরিছে দ্বার-দ্বার
গােঠ হতে এসে ফিরে ।
কাকে মাছ নয়, ছাগে খেয়ে যায় চাল ধান
পায়নিক দাদা আঁচাবার জল, সাজা পান
ভুলাে পুষী মেনী ঘুরে ঘুরে কেঁদে হলে খুন,
গা’র লােম দুখে ছিড়ে ;
খাচার ময়না পায়নিক আজ বুট জল
গলা গেল তার চিরে।

পর্ণপুট,
বসেনি বাড়ীতে বেণী বিনানর বৈঠক
আসেনি পড়ার দল
বালিশের তুলা, আকাচা কাপড় ঘরময়
বাসন পাত্রে জিনিসপত্রে নয়ছ,
আঙিনার তরু পায়নিক আজ বৈকালে
একটা ফোঁটাও জল।
শিউলিছােপান শাড়ীখানি হেরি মার চোখে
ব্যথা ঝরে অবিরল।
ঠাকুরের ঘরে পা দেবার জল, আলো নাই
পুরুত লাগায় ধূম
খােকাখুকীদের আনে নাই কেহ পূজোবাড়ী
শীতলপ্রসাদ-বিতরণে নাই কাড়াকাড়ি
চাদের কপালে টি দিয়ে না যায় ‘চাদা মামা
চোখে নাই কারাে ঘুম।
কঁাদে তারা আজ সারাদিন তাদে’ বুকে চাপি
খায়নি যে দিদি চুম।
লত কোমল ছোট দুটী কর মুঠি বটে
কম কি ক্ষমতা তার?
তারে পরকর। লােকে বলেছিল দায়-সারা
ভাবেনিক কেহ এ গৃহ অচল সেই ছাড়া ;
সংসার পাতা শিখিবার ছলে নিল সে যে
বহু জীবনের ভার।

পল্লী-বধূ
আজি এ গৃহের শিশু পশু পাখী তরু লতা
করিতেছে হাকার।
আহা সেযে কোন্ অপরিচয়ের মাঝখানে
বন্দিনী দিবা রাতি।
তথা গৃহ ভরা হাস্যোৎসব কলরােলে
আহত নিয়ত ফুল সম নদীকল্লোলে।
অশ্রু মুছিছে অবগুণ্ঠন অঞ্চলে
নাহিক ব্যথার সাথী।
মা-হারা এ গৃহ কঁাদে হেথা হয় লুটে লুটে
নিয়ে ঘরের বাতি।
পল্লীবধূ
না ধরিতে প্রাচী অরুণ বরণ, না ডাকিতে সব পাখী,
গ্রাম পথে ঘাটে না পড়িতে সাড়া, না মেলিতে ফুল আঁখি,
কেগে ঐ জাগি শয্যা তেয়াগি, দ্বারে দ্বারে ঢালে জল ;
গােময় মাড়লি লেপনে জাগায় সুপ্ত তুলসী তল?
উঠান ছাড়িয়া না উঠিতে রােদ ঘরের পৈঠা পরে
কল ভরিয়া জল লয়ে কেবা স্নান করে ফিরে ঘরে ?
বাড়িতে বেলা দেব দেউলের দুর করি মলিনতা
করে আহ্নিক-রন্ধন তরে গুরুজনে সহায়তা।
লজ্জাসম সজ্জাপম অন্তর ভরা মধু,
অবিরত সেবা সাধন নিরত। এ যে গাে পল্লীবধূ।
৪

পট
গুরুজনদের ভােজনের শেষে অতিথি ভিখারী তুষি’
ছেলেপুলেগুলি নাওয়ায়ে থােয়ায়ে খাওয়ায়ে করিয়া খুশী,
পাতের ভাতে কে ক্ষুধা করি দুর এটোকাটা খুঁটে তুলি
হাঁস-ঝটপট খিড়কির ধীটে ঘােয় ঘটীবাটী গুলি ?
সূচ সূতা লয়ে সারি’ শত কাজ, কতকাজ ঝটপাটে
পাড়ার মেয়ের খোঁপা বেঁধে দিয়ে চলে কে দীঘির ঘাটে ?
গৃহ পারাবতে আহারে তুষিয়া খোপে খোপে কেবা থুয়ে
সাজ দীপগুলি তেলসলিতায় রেখে দেয় মুছে ধুয়ে।
লজ্জাসরম সজ্জা পরম, অন্তর ভরা মধু
অবিরত সেবা সাধনামগনা এ যে গাে পল্লীবধূ।
সাজের বাতিটি জ্বলিয়া তাহায় বাঁচায়ে অচল আড়ে
তুলসীর মূলে দেবের দোউলে ঘুরে কে গাে দ্বারে দ্বারে ?
উপকথা বলি খেয়ে চুম, গেয়ে ঘুমপাড়ানিয়া গান,
কোলের কুলায়ে আনে কে থামায়ে শিশুদের কলতান?
শুরশ্বপদ সেবা করি লভি শুভাশিস শিরে
সবার ভােজন শয়ন অন্তে চলে কে শুইতে ধীরে ?
শ্রান্ত শয়নে সেবারতা কেবা কান্তের পাদ মূলে
ক্লান্ত নয়নে গভীর নিশীথে ঘুমধােরে পড়ে ঢলে?
লজ্জাসরম সজ্জাপম, অন্তর ভরা মধু
অবিরত সৈৎ সাধনা নিয়ত। এ যে গাে পল্লীবধু।
উচ্চ হাসিটি শােনে নাই কেহ, নাই রাগ অভিমান,
জাণি পট তুলে নয়নের জলে সব বাধা অবসান।

কৃষাণীর ব্যথা
গৃহ কোণে সদা শুভদা বরদা কেহ না জানিতে পান,
কুটীরে কুটীরে লক্ষ্মী অচলা, তবু রটে গােটা গায়।
কল্যাণ জপে মৌন মহিমা অবগুণ্ঠন তলে,
ননদীর গালি তাড়নায় তার ধ্যান গরিমা না টলে,
গৃহকাজে কর হয়েছে কঠোর ক্ষয় হয়ে গেছে শাখা।
হলুদ কাজলে সিদূর তৈলে সতীর মহিমা মাখা ।
লজ্জা সরম সজ্জা পরম, অন্তর ভরা মধু
অবিরত সেবা সাধন নিতা বঙ্গ-পল্লীবধূ।
কৃষাণীর ব্যথা
সুখের এ ঘর গড়িয়া তুলিয়া বুকের রক্ত দিয়া,
আজ কোথা তুমি চলে গেলে হায় সংসার আঁধারিয়া ?
ধানে ধানে আজ উঠান ভরেছে, ঠাইটুকু নাই আর
মঙ্গল। আজি ঢালিতেছে দুধ বাছুর হয়েছে তার।
মাচান ছাপিয়ে লাউলতাগুলি ভুয়ে লুটে লুটে পড়ে
পালঙের শীষে শাকের চাকড়া আগাগােড়া গেছে ভরে
সন্ধ্যামনিতে আলো হয়ে আছে সারা আঙিনাটি ঐ
আজ সংসারে সবি ভরপূর, হেনদিনে তুমি কই ?
দুবেলা পাওনি পেটভরে খেতে গিয়েছিল দেহ ভেঙে,
লুকিয়ে চোখের জল মুছে তুমি ভিক্ষা এনেছ মেঙে।
একমুঠো চাল চিবাতে চিবাতে রুইতে গিয়েছ চলি,
• উপােষ করিয়া রাত কাটায়েছ ক্ষুধা নাই মােরে বলি।
গ।

পর্ণরুট,
দুপুরের তাতে বাদলের ছাটে খেটে খেটে দিনরাত
মাঠে মাঠে ঘুরে ককনেজাড়ে করেছ পরাণপাত ।
সাঁঝের বেলায় হেঁটে হুটে এসে এলায়ে পড়ে ঘুমে
ব্রান্তির শেষ না হতে আবার চলেছ থােকারে চুমে।
খাজনার লাগি জমিদার বাড়ী সহেছ যাতনা কত
মহাজন, দেনা সুদের লাগিয়া গঞ্জনা দেছে শত।
চুপ করে সবি সয়েছ, আহা রে! দুটিহাত জোড় করে
সকলের কাছে সময় নিয়েছ হাতে পায়ে ধরে পড়ে
বােগে পড়ে থেকে সংসার নিয়ে কতই দিয়াছি জ্বালা
ক্ষুধায় কাঁদিয়া করেছে ছেলেরা কানদুটো ঝালাপালা।
যাতনা দুঃখ কতনা সয়েছ কথাটি ছিল না মুখে
ফিরে এস আজ ঘরটি তােমার ভরিবে সােণর সুখে।
ঘনায়ে আসিছে সাঁঝের আঁধার নাহি মাের কোন কাজ
এ ঘর দুয়ারে পড়েনিক ঝটি জলেনি এখনো সাজ।
চালের বাতায় ঝি ঝি পােকাগুলাে বুক চিরে চিরে ডাকে
উঠিতে বসিতে টিটিকি পড়ে ফাটা দেওয়ালের ফাঁকে।
. ঐখানে আহা পীড়ের উপর শুইতে গামছা পাতি,
ঝুলিতেছে ঐ লাঠি, চোঙ, মই, মাথাণী, তালের ছাতি।
ঘাটের ধারের বাঁশবন পানে সারারাত চেয়ে কাদি,
ঐখান হতে নিঠুর'ধাধনে লয়ে গেছে তােমা বাধি ।
তেমনি পড়েগো কাল’ ছায়া ঐ ভরিয়া বকুল তল
বৈকালে যেথা এলানাে শরীর চাহিতে ঠাণ্ডা জল।
৩৪

কৃষকের ব্যথা
সবো ভােরে সেই পাখীগুলো ডাকে প্রাণ আনচান করে,
বেলা হয় তবু গােরু গুলো সব বাধা রয়ে যায় ধরে।
পথ চেয়ে হায় বসে থাকি য় জলেনা দুপুরে চুলো,
আপন ছেলেরাে নাম ভুলে যাই মনটা হয়েছে ভালো।
মালতী তােমার ফিরিয়া এসেছে শ্বশুরের ঘর থেকে
থােক যে তােমার হাটিতে শিখেছে, একবার যাও দেখে :
এত সব ফেলি। জন্মের মত চলে যাওয়া কিগো সাজে?
তবে কিগো তুমি প্রবাস গিয়েছ আমাদের কোন কাজে ?
বাবুদের আর গদাই পালের অত্যাচারের ভয়ে
চলে গেলে কিগাে মনের দুঃখে কিছুই না বলে কয়ে ?
তাই যদি হয় ফিরে এস তুমি, তােনারে সসে পেলে।
খােকারে লইয়া পলাইয়া বাই বাড়ীঘর সব কেলে।
ভিক্ষা মাঙিব কাঠ কুড়াইব, ফিরিব না আর বাড়ী
আঁচলের গিঁঠে বাধিয়া রাখিব, তিলেক দিব না ছাড়ি।
কৃষকের ব্যথ
এমন করে, কেমন করে অস্ত্র হার
তােমায় ছেড়ে রইব গামি নিয়ে তোমার ভার ?
দুয়ারে নাই জলের ছুড়া—উঠানে নাই বাটি
বিহানে আর গােয়াল ঘরে করে না কেউ পাট।

পণপুট
গাইয়ের দুধ শুকায় বাঁটে হয়না আজি দোয়া
খামার ক্ষেতে তােমার ধান খড় যৈ যায় খােয়।
গােয়ালে নাই সজাল ধোঁয়া, পড়েনা ঘরে সজ
মাদুর পেCে কে দেখে ? শুই গামছা পেতে আজ।
বারেক ফিরে এসে
লক্ষ্মী মাের লহগাে ভার তােমার ঘরে, হেসে।
একটী বাছা কঁাধে যে কঁাদে আরটি রয় কঁাখে,
তিলে পিছু ছাড়েনা খুকী, মাঠে৪ সাথে থাকে ।
ক্ষেতের ধারে খােকাটি হয় নালায় গড়াগড়ি,
সকল কাজে অবুঝ মেয়ে ঘাড়েই রয় পড়ি।
টোকায় করি বিহানে তারা পায়না মুড়ি লাড়,
নাইক নাওয়া সময়ে খাওয়া, ঘুমটি নাহি কারু।
দুপুর রাতে উপুর হয়ে কঁদিয়া তােমা চায়,
উদুম গায়ে কাপে যে জাড়ে দোলাই নাহি পায়,
বারেক ফিরে এসে
তােমার ছেলে লওগাে কোলে বদন চুমি’ হেসে।
জমিতে আ’ল বাঁধিতে গিয়ে উদাস হয়ে যাই
কাজেও আর নাইক মন, আরামে সুখ নাই ।
তােমার সেই কাজল চোখ মনে যে উঠে জ্বলি,
ধানের চারা উপড়ে ফেলি আগাছ কাটা বলি ।
বাড়ীতে ফিরে জিরানাে নাই, চড়াতে হয় হাড়া,
যে-কাজ শুধু তােমারে সাজে আমি কি তাহা পারি ?

কুড়ানী
হারাই হুস্ হেঁসেল ঘরে কিছু না খুজে পাই
ফেনে যে ঢালি নুনের সরা, ডালে যে ঢালি ছাই
বারেক ফিরে এসে
হলুদপােছ শাড়ীটি পরি হাতটি ধরাে হেল।
শান্তিপুরে তােমার ডুরে আঁকড়ি চাপি ধরি
চোখের জলে এ-বৃক ভাসে মেঝেয় বই পড়ি।
কাহারে আজ পরায়ে দেব সে আটবেঁকী গোট
যার লাগিয়ে আর-ফাগুনে ধরিয়াছিলে খােট
মনে যে আসে রােগের মাঝে সকল-সহা মুখ
পায়ের-ধুলাে-মাথায় লওয়া, গুমরে উঠে বুক।
বাদলে ভিজে হাঁটিয়াছিলে উঠানে মাের লাতি
ফুটিয়া আছে পায়ের দাগ গােলার পাশে জাগি।
বাকে ফিরে এসে
আন্ত পরে মুখটি মেজে খােপাটি বাধে হেসে।
কুড়ানী
কুয়াশায় ভরা পােষের বিষম হাডকনে জাড়ে,
রহিম চাচার খামারে মােরগ না ডাকিতে একবারে,
চটাই ছাড়িয়া উঠি তাড়াতাড়ি ছেড়া কঁাথা গায়ে দিয়ে
মাঠপানে যাই কুড়াইতে ধান ছােট্ট ঝুড়িটি নিয়ে।

পর্ণপুট
ক্ষেতে ক্ষেতে ঘুরি শামুকে করিয়া খুটে খুটে তুলি ধান
গােটা শীষ যদি দেখি ভূয়ে পড়ে উথলিয়া ওঠে প্রাণ।
হানিয়া হাঁটিয়া এমনি করিয়া সারা হয় ধান খোজা,
নিয়ে যায় ঘরে পাড়ার লােকেরা অটি-আঁটি বােঝা-বােঝা?
পিছু পিছু যাই ঝুড়িটি লুকায়ে বা’র করি মাের ঝুলি
যেটি ভূয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি গিয়ে সেটি খুঁটে লই তুলি।
ঠোট মুখ গাল জাড়ে জরজর পাদুটা গিয়াছে ফাটি
ছুটে আসি যাই কি করিবে বল মাঠের কুচল না ?
ছে। বাড়িটি হয় চুর-চূর, ভরে যায় মাের ঝোল।
লােকে কয় “চাষে কি করিবি তােরা? কুড়ানী বাঁধিবে গােল!
1.
ত যায়-যায়, ক্ষেতে নাই ধান, ধূ ধূ করে সারা মাঠ,
মর মর করে শুকনো পাতায় গাছতলা পথ ঘাট।
ছােট্ট ঝুড়িটি রাগিয়া এবার বড় ঝুড়ি লই কঁাখে
শুনা পাতায় উঠানে আমার ঠাইটুকু নাহি থাকে ?
দুপুরে গােবর ঝুড়িটি লইয়া ফিরি রাখাণের পাছে
বাজে কথা কয়ে’ ঘুরি ফিরি গােরু বাছুরের কাছে কাছে ।
বিকালে বেরুই কুড়াইতে কাঠ বনে বনে ঘাটে মাঠে
পড়সারা কয় ‘ধতি কুড়নী—সারাদিনটাই খাটে।
বাদল লাগিলে পথে ঘাটে কাদা, নিভে আসে খরতাপ
তালের পাতায় বাঁধা চালাটিতে জল পড়ে টুপটাপ ।
কাঠখড়ি কিছু মিলেনা কোথাও জ্বলেনা কাহারাে আখ,
আমার দুয়ারে আসেন সবাই হাতে লয়ে ঝুড়ি ঝাঁকা।

নালীর জলেতে জালিটি পাতিয়া বসে থাকি আমি ঠায়
চুননা পুটী দুটী আঁচলে গিঠিয়ে ফিরি কাদামাখা গায়।
বর্ষা ফুরায় লাউ কুমড়ায় গােটা চাল যায় ভরে
ডডাবায় ডােবায় কলমী শুশুনী তুলে আনি ঝুড়ি করে।
নালাটি শুকায়, কাকড়া লুকায়, মাছ ঢুড়ে মরমিছে
গুগলি শামুক কুড়ায়ে বেড়াই জেলেদের পিছে পিছে।
তালটি বেলটি কুড়ালে লােকেরা হাঁ হুঁ করে আসে ছুটে
মাের ভােগে তাই লোকে যা না ছোঁয়, নিতে হয় যা খুটে।
এমনি করিয়া তিলটি কুড়ায়ে তালটি করিয়া জড়,
'কুড়ানো ভাতে এ পেটটি পূরিয়া হইয়াছি এত বড়।
খোঁড়া মা আমার ঘরে পড়ে আছে, বাপ-মর মনে নাই
ঘরটি পড়িলে পাড়াপড়সীরা দেয়নিক কেহ ঠাঁই।
কাচা আ’লে কারো দেই না পা ভুলে, পাকা ধানে কারাে মই
চাকরী করিনা ভিখ,ও মাগিনা এমনি করিয়া রই।
অনেক বকেছি কুঙানী বলিয়া ডেকনাক মিছে পিছু
মাঠেতে হাঁটিলে ঝুড়িটি ভরিবে ঢুড়িলে মিলিবে কিছু।
হ-ঘরে
তা-ঘরে ঐ ঘুরে বেড়ায় সঙ্গে করে গৃহস্থালী
জীবনজোড়া পুজি তাহার বাক ঝুলানাে দুটী ডালি,-
কোলের ছেলে সাপের ঝাপি, ভাতের হাঁড়ি মাটীর থালা
ডুগডুগি আর তেলের চোঙা সবুজ কাচের কণ্ঠমালা।

প্রণপুট
আকাশ,তাহার ঘরের চালা রবি শশীর আলােকলা
মাঠ-মরু তার বাড়ীর উঠান প্রমােদভবন গাছের তলা।
ঝোপের ভিতর জন্ম তাহার পান করে জল দীঘির ঘাটে
সেই খানে তার রাতের ডেরা যথায় রবি বসেন পাটে।
কোনাে রাজার নয়ক প্রজা দীনদুনিয়ার মালিক বিনে
মুখ চেয়ে সে রয়না কারাে থাকে না সে কারাে ঋণে।
সকল বাঁধনহারা সে যে জানেনাক সমাজ রীতি
জীবন পথে লক্ষ্যহারা,—মানেনাক স্বাস্থ্যনীতি।
আজকেরই তার মাত্র পুজি কালকেয়াে নাই ভাবনা তবু
ঝাবাদল ভায়ের মতন জড় জগতের যেন প্রভু।
যায়না কোনাে সদাব্রতে যায়না ধনীর দেউড়ি ঘরে
তরুতলের অতিথ গায়ে তাও শুধু এক তিথির তরে।
একটী দিবস গাছের ডালে ঝােলে তাহার ভাতের হাড়ী
গাঁয়ের ছেলে দেখতে জমে একটি দিনের হার বাড়ী।
ভালুক তাহার হুকুম পেলে কেঁ। কে করে জ্বরটি আনে
সাপটি ফণা নত করে’ লুকায় ঝাঁগির মধ্যখানে।
,
জানেনাক ভিক্ষা মাগ। চাকরি চুরি প্রবঞ্চনা
প্রাণের অভাব সব চুকে যায় পেলে পরে একটী কণা।
জীবিকা তার সাপ খেলানাে নানান রকম বাজীর খেলা
মনে পড়ায় বাজীর ছলে বিশ্ববাজিকরের মেলা।
৪০

মানসীপ্রতিমা
কোনাে শাসন রুক্ষনয়ন পারেনিক বাধতে তারে
সকল আইন হদ্দ হয়ে বন্দী হলো তাহার দ্বারে।
সহচরের পতন হেরি থামেনাক যাত্রাপথে
যুধিষ্ঠিরের মতন চলে স্বর্গে অটল চরণ রঙে।
মানসী-প্রতিমা
মাধুরী জাগি মঞ্জরিয়া
রচিল তনুলতিকা
পুঞ্জীভূত কুঞ্জশােভা নয়ানে,
উঠিল প্রেম গুঞ্জরিয়া লইয়া মধু গীতিকা
ফুটিল হয়ে মঞ্জুভাষা বয়ানে।
বিনয়, চারু চরণ হয়ে লুটিছে চুমি ধরণী--
ফুটিছে ভূমিকমলে কোন্ মায়াতে
শান্তি কেশকলাপ হয়ে
দুলিছে বনবরণ
শরণ মাগে নিখিল তার ছায়াতে।
রুচির শুচি পুণ্যরুচি
দুগ্ধ ফেন উথলি,
ভাতিছে বিধুবদনে স্মিত হসনে
লাজ শােণিমা অধর রূপে বিরাগে উজলি,
সুষমা রচে কুসিত দশনে।
শুভ বাসনা লাক্ষাক্ষীরে লভিয়া সিত-শােণিমা
কপােলরূপে শিহরে কিবা পুলকে।
সরল শিব সমুদারতা
বহিয়া গুণ গরিমা
জাগে ললিত বিধুললাট ফলকে।

পুট ক দৃঢ়তা রাঙ্গে নাসিকা হয়ে, ধীরতা হলাে রসনা শীলতা জাগি জলতা হয়ে বিলসে, দু’কর হয়ে, নয়নবারি দুরিয়া, সেবা সাধনা . ভুবন মাঝে জীবন সুধা বরষে। লােচন দুটি হইয়া ফুটি করুণা, ছলছলিয়া তাপিত জনে পিছে সুধা বিলায়ে ঋজুতা চারু চিবুক হয়ে রয়েছে ঢল ঢলিয়া সৌম শম কষ্টে আছে মিলায়ে । মঙ্গল -অঙ্গ ভরি, ভঙ্গি হয়ে ভূষিয়া প্রসাদভরা মাধুরী ধারা বিতরে স্বর্গ তব সত্তা হয়ে তােমাতে আছে মিশিয়া পীযূষপ্রেমানন্দ ভরে নত রে। চিৎকুসুমসুষমা দিয়ে গঠিল শত সতীমা শতেক দলে তােমার হৃৎ কমলে সকল শুভ পাবন-গুণ- মিলনে নব প্রতিমা, বিধিমানসংহিতা অমি অমলে। তােমারি সেবা পূজার যাগে সুকৃতি নিতি আহরি, কুসুম ধূপ, যােগায় সুখ বেদনা, ততামারি প্রেমকল্পবনে বিহরি তপ আচহি, দেবতা অয়ি আমার ধ্রুবসাধনা। 8२

বনয়
বধূবরণ
কনককুন্ত ভরি আনাে তুমি সতীতীর্থের জলে,
মণিমঞ্জুষা ভরি আনাে দেবি অধিবাসমঙ্গলে।
তুলসীর লাগি আনাে দীপমালা, অশথের ঝারানীর
গােধনের তরে নীবার শম্প দেবশিলা লাগি ক্ষীর।
অরুন্ধতীর প্রসাদী পুণ্যে ভরিয়া সেবার থালা,
তমসাতীরের তপােবনফুলে সাজাও পূজার ডাল।
বটতরুমূলজড়িত দেউলে আরতি বাজেনা হায়,
জাগ্রত কর নবকলেবরে নিদ্রিত দেবতায়।
অয়ি শুচিশীলে, চম্পকবনে তুলসীলতার মত
লৌহবলয়ে করহ পাবন কাঞ্চনভূষা যত।
সতী রমণীর অনুমরণের চিতানল শিখা সম
সীথিভরা আনাে সিন্দুরজ্যোতি বিদূরি দুরিততম।
শত জনমের শুভমিলনের শতেক শুভ্রতা
শাঁখার আকারে বেড়ি লও করে হে দেবি যজ্ঞাহুতা। •
দেহে শােভে হেমে-রমার গরিমা, শঙ্খে বাণীর ভাতি
গেহে লভে যেন কমলা ভারতী দীপারতি দিবারাতি
অবগুষ্ঠিত কুণ্ঠার মাঝে তেজের মহিমা রাখ’
হাসি দিয়া শত গৃহকর্মের ক্লান্তিবেদনা ঢাক’
দিনের সাধনা ফুটায়ে তুলিও যশের গন্ধে ভরা
কথাগুলি যেন তােমার বলিয়া মধুরসে যায় ধরা।
৪৩

পট
চরণপরশ ভবনাঙ্গন কর পঙ্কজময়,
সুরভি পরাগ হউক, তাহার ধূলি কঙ্করচয়।
বিতর কাতর আতুরে শান্তি তুষিয়া ভিখারীদলে
শোকে কয় যেন গােলােক তেয়াগি এসেছেগাে কোন ছলে
কুসুম-শয়ন
আজি সখি, আমাদের কুসুম শয়ন।
মধুগন্ধে ভরপূর
বায়ু বহে ফুর-ফুর,
হিয়া দুটি দুর-দুর, অলস নয়ন।
আজি সখি আমাদের কুসুম শয়ন।
আজি যেন সৃষ্টিছাড়া,
সৰ্ব্ববাধা বন্ধহারা,
রসাবেশে মাতােয়ারা এলায়িত তনু,
ভুলি সব দুখ জ্বালা চৌদিকের ঝালাপালা
অলির শিঞ্জিনী দিয়া রচ’ ফুলধনু।
কাটা যদি বহে ফুলে
ব্যথা তার যাও ভুলে
কাননে কাঙাল করি করলাে চয়ন।
আজি প্রিয়ে আমাদের কুসুম শয়ন ।
এ নিশীথে রঙ্গভরে
জ্যোছনা তরঙ্গপরে
কুসুম-তরীতে দেহে হরিষে আরােহি’
কল্পসুষমার দেশে
চল সখি যাই ভেসে
অনুসৰি মন্দারের গন্ধ মনােমমাহী।
১৪

কুসুশন
আফিম ফুলের চুম
লভিয়া ঘনাবে ঘুম
পরীরা পাখার বাসে উড়াবে অলক,
বুলায়ে শিরীষ ফুল,
ভুলাবে তার ভুল,,
নয়ন পলাশে পুনঃ জাগাবে পলক।
বকুলমালিকা টুটি
করে উপাধান করিবে বহন।
আজি সখি আমাদের কুসুম শয়ন ।
তুলে রবে শির দুটা
মানস কুমুদবনে
চলে যাবাে সন্তরণে,
সােমকান্তমণিস্বিপ্ন সলিল সায়রে
তীরে পাপিয়ার স্বরে
চলুমল্লী যাবে ঝরে
বউকথা-কও গাবে সুরভি বায়রে।
হেসে হেসে কুটিকুটি তারাকুঞ্জে লুটোপুটি
বিধুপরিবেশ পরি, পড়িব গড়ায়ে,
পুষ্পসবফেনময়
হবে পাত্র বিনিময়,
আকাশ কুসুম দিব ছড়ায়ে ছড়ায়ে।
ত্যজি ধরণীর সাজ :
এস সখি এস আজ
মুকুলদুকূল দিব করিয়া বয়ন।
আজি সখি আমাদের কুসুম শয়ন ।
৫৫

পণপুট
বালিকাধধু
{
আমার মালিকা-বধূ
অঞ্চলভরা সৌরভ তার অন্তরভরা মধু।
ফুটেছে শুভ্র যুথীর মতন,
মৌন মধুর সৌম্য শােভন
আলােকে নীহারে নােক মুকুতা টুল টুল করে বায়।
নীপের মতন নাহি শিহরণ
নহেক উগ্র চম্পা যেমন
বকুলের মত ব্যগ্ৰ অধীর করেনাক মদিরায়।
আমার বালিকা-বধু
অঞ্চলভরা পরিমল তার, অন্তরভরা মধু।
বালিকা সখীটি মম
সঙ্কোচমুঠি তার কর দুটী পঙ্কজ কলিসম ।
ললিত লতিকা লজ্জানােচনা
ঢল ঢল নীল কুসুমলােচনা..
পেশল তরল তনিমা ভরিয়া সরল গরিমা ভায়।
সে যে চির-অবলম্বমশীলা
জানেনাক ছল কৌশল লীলা
তরুর শাখাটি জড়ায়ে লতায়ে ঘুমায়ে পড়িতে চায়।
আমার বালিকা জায়া,
কঙ্কণপরা করদুটী তার পঙ্কজময়ী কায়া।
;
৪ ৬

।
বালিকা-বধু.
বালিকা কান্তা মাের,
শুভ্ররুচির অন্তর বেলা, শুচি তার আঁখিলাের।
নব নিদাঘের ভাগীরথী সমা
বহিয়া নিভৃতে মায়া দয়া ক্ষমা,
শুভ সংসারসৈকতে শােভে পুণ্যের মহিমায়।
নাহি উদ্বেল আবিল প্লাবন,
শীতল শান্ত স্বচ্ছ জীবন
ধরি ধরি যেন কুলু কুলু বয় ঝিরি ঝিরি মলয়ায়।
দরদী দয়িতা মোের,
লসিত রুচির হসিত তাহার, শুচি তার অথিলাের।
আমার বালিকা প্রিয়া
কণ্ঠ তাহার তুষে জনে জনে পােষ মানে তার হিয়া।
শারিকার মত নহে সে মুখরা,
কোকিলার মত সে নহে প্রখরা,
ময়ূরীর মত রূপগৌরবে টলে টলে নাহি যায়।
সে যে মাের শ্যামা বনের পাখিটি
কানে দেয় শিস্ প্রাণে দেয় শিটি,
চায় এ হৃদয়কুলায়নিলয়ে লুকাইতে আপনায়।
আমার বালিকা প্রিয়া
কণ্ঠ তাহার বন্টে অমিয়া, পােষ মানে তার হিয়া।
৪৭

প্রত্যাবর্তন
তােমার সাথে মিলতে হেথও কিশােরী, তােমার তরে
আবার আমি এলাম ফিরে ছেলে বেলার খেলার ঘরে।
কথায় কথায় মান অভিমান,
অল্পেতে বয় দুই চোখে বান
কাদতে গিয়ে হেসে ফেলি তেমনি আবার লীলা ভরে
কাজের বােঝা হালকা হ’লল আবার তােমার খেলা ঘরে।
**,
যৌবনের এই শৈলপথে বছর দশেক এসে নামি
ধূলাখেলায় হেলাফেলায় তোমার পাশে গেলাম থামি।
অভিজ্ঞতার গুঝবাধা
জটিলতার গােলক ধাঁধা,
বিদ্যাজ্ঞনের আলােকলতার বাঁধন ছিড়ে কেটে আমি
তােমায় লয়ে খেলতে প্রিয়ে বছর দশেক এলাম নামি।
সুখের স্বপন ফিরল আঁখে জুড়াইল সকল জ্বালা,
দোলাইলে আমার গলে আবার কুমুদ-মৃণাল মালা,
কুণ্ঠাদ্বিধা চিন্তাবিহীন
সরল মধুর ফিরল সে দিন,
পিছন হতে চোখ টিপে মাের ধরলে যেদিন চপল বালা
আবার কিশাের-কোকনদে ভরল সফল জীবন ভালা।
৪

প্রতীক্ষা
প্রতীক্ষায়
অই মৃদু চরণের ধ্বনি
পরের সােপানে সােপানে,
চমকিত পরশন দিয়ে
মুহৰ্ম্মহঃ রােমাঞ্চন আনে,
দুরু দুরু মনেমঞ্চে লাস্যলীলা হর্ষসমাকুল,
আর নহে ভুল।
ঝয়ােখার ফাক দিয়ে অই
যে আলােক আসিল ঝলকি’
অন্তরের গােপন গুহাও
চপলায় তুলিল চমকি।
উৎকণ্ঠার নাট্যশালা অকস্মাৎ হলাে আমেয়,
একি ভ্রান্তি হয় ?
রুনুঝুনু প্রাণে অনুরণে
প্রাঙ্গণের ভূষণশিন,
বাজাবে চাবির রিঙ ঠিক
এমনিটি বিশ্বে কোন জন?
শ্রুতিমূলে ঐক্যতানে বাজে বেণু মন্দির সেতার।
নিশ্চয় এবার।
s

পর্ণলট:
দ্বারহৃদি কর পরশনে
মুকতির ছেড়েছে নিশ্বাস,
জড়গৃহ উঠিছে শিহরি
কেন আর না করি বিশ্বাস ?
সরিল অলােক করে যবনিকা-রঙীন কল্পনা।
এ নহে বনা।
প্রথম বিরহ
শূন্য এ গৃহ আজ
শয্যা আজিকে হয়নিক ভােলা, পড়ে আছে গৃহকাজ।
কুন্তলবনসৌরভে তব এখনাে এ গৃহ ভরা,
জাগিছে তৈল আলতায় তব দেওয়াল চিত্র করা।
সিদূর টীপের কৌটা আরসী সব খােল আছে পড়ি,
চুলের দড়িটি চিরুনী তােমার ভূয়ে যায় গড়াগড়ি।
তব পদরেখা আঁকা
এ আঙনে প্রতি অণুকণাতেই তুমি রহিয়াছ মাখা।
আজি তুমি গৃহে নাই,
পায়ের শব্দ শুনিলে তবুও চমকি ফিরিয়া চাই,
দূরে রুনঝুনি শুনি শুনি যেন চারি দিকে তােমা খুজি
মনে হয় সৰি এলােমেলাে হেরি এখনি ফিরিবে বুঝি।

কিশােরী জিয়া
জড়ের অঙ্গে এমন করিয়া জীবন সপিয়া গেলে,
আমারি সঙ্গে খসিয়া খসিয়া তারাও অশ্রু ফেলে।
কেমনে বল গাে রই
তােমার চরণচিহ্নে পাবন এ ভবনে তােমা বই ?
তব স্মৃতি গৃহময়,
গৃহ ছাড়ি তাই, বাহিরেও আরাে মন টিকে নাহি রয়
আজি মনে হয় কত অবসর বৃথায় গিয়াছে চলি,
বলা হয় নাই কত কথা হায় করিয়াছি বলি-বলি।
কপােতকুজনে গৃহখানি যেন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে,
হহ করে উঠে ধুধু মনােম ঘুঘু যত ডাকে ছাদে,
গৃহের লক্ষ্মী মম ।
এ গৃহ পূজার পরদিনে যেন ব্যথিত দেউল সম।
কিশােরী প্রিয়া
আমার কিশােরী প্রিয়া পলিত ধরারে যেন
করেছে কিশােরী।
উল্লাসে সে আজি যত অবান্ন জরাব্যথা
গিয়াছে পাশরি।
অরে মাধুরী অঙ্গে হাসে রঙ্গে শাপমুক্ত।
কুর মতন।

পর্ণট
সবি যেন রাঙা-রাঙা কচি-কচি ঢলঢল
পেলব চিকন।
রােঞ্চে সুরভিসোমাঞ্চল জড়াইয়া
জাগিল পাষাণ,
আমার জীবনধারা বন্যায় উথলি উঠি
বহিল উজান।
নবীন আলােকে হেরি জড়তা জীর্ণতা, নৰ
লাবণ্যে মল,
একগাল হাসি হেসে পরি টিপ ধরা যেন
বঁধিয়াছে চুল।
কৈশােরের বেণুবীণে ভৈরবী বােধন, শুভ
বিভাসী মুছনা,
জাগাল পূজার অৰ্যে বনগিরি প্রান্তরের
অন্তর বর্ণনা।
চললান্যে কলহাস্যে ভরে গেল, বিশ্বময়
তটিনী কানন,
নয়নে ধনা’ল নব উষার আলােক, যেন
মদির স্বপন।
সহসা জীবন-লী জাগাছিল দিশি দিশি
মুকুল যৌবন
পিপাসিত রসাবেশে বেপথু পুলকে আজি
ভরিল তীবন।

বয়ঃসন্ধি
নেমে এসে প্রেমে গিরি-প্রকৃতি মালিকা করে
সীমন্তে সিন্দুর
আজি যেন মাের পাশে দাড়ায়েছে সালঙ্কার
হাসিয়া মধুর।
বয়ঃসন্ধি
কৈশোরকোরক হতে সহসা কখন
যৌবনের সম্পদে হলে বিকশিত,
কবে গেল পলাশের কুষ্ঠিত কুন
সর্ব অঙ্গ কণ্টকিয়া হলো হরষিত ?
হৃদয় গহনে তব, পুষ্পধনু ধরি,
সহসা পশিল কবে প্রথম নিষাদ ।
তুলিল তুমুল রােল তপােবন ভরি
একসঙ্গে বিহঙ্গেরা ঘােযিল সংবাদ ।
কুসুমের বক্ষে কবে গৃঢ় কক্ষতলে
ফলের সূচনা হলাে পরাগের দলে ?
বহি ইয়ুধপরে জানিনা কখন
বর্ণ হতে বর্ণান্তরে করেছ প্রয়াণ।
সন্ত হয়ে এলো তনুর বসন
সংযত হইয়া এলাে কলহাতান।

পট
চরণের চপলতা কোন্ শুভক্ষণে
হণ করিল অখি, পারিনি ধরিতে,
মুল বিতান কবে উন্মদ পবনে
মল বল হলাে হৃদয় তরীতে?
পন হলাে কবে ক্ষীণ, ধনী হলো, দীন
একতারা কবে হলাে সাততারা বীণ
বুঝি সে ফাগুন রাতি, দক্ষিণ সমীরে
উড়িয়া পড়িয়াছিল বক্ষের অঞ্চল,
নবপ রাজ্যে তব প্রবেশিল ধীরে
কৈশােরের সিংহাসন যাহে টলমল ;
বিনা রণে পেল তার কবচ কৃপাণ
সশষ্ট প্রকৃতিবর্গ দাড়াল সরিয়া ।
অন্তপুরে সঙ্কুচিতা করিল প্রয়াণ
কৈশােসজনী যত গুণ্ঠন পরিয়া।
ধরিতে নারিনু আমি, চোরের মতন
মৰ্ম্মের সুড়ঙ্গ পথে পশিল যৌবন
যে দিন বৈশাের তব লইল বিদায়
চিত্তরাজ্যে দৃশ্য আহা হইল কেমন?
উঠিল কি হাহাকার বিরহ ব্যথার
শ্যামহারা বৃন্দাবন বিধুর যেমন!
সেদিন কি নেত্রে তব ফুটেছিল জল?
লস কি হয়েছিল খাস-দুরুদুরু?
৫৪

পাহাড়িয়া প্রিয়া
রচিতে রচিতে নব বরণমঙ্গল
সুখে দুখে হতেছিল মন উড়ু উড়?
জানি না কখন কবে কৈশােরের মধু
যৌবনের সীধু হলাে, অয়ি প্রাণবন্ধু।
পাহাড়িয়া প্রিয়।
ও গাে পাহাড়িয়া প্রিয়া,
হেথায় গৃহের কুঞ্জে কি দিয়ে তুমি তােমার হিয়া?
কোথা বীরতরু নিচুল নমেরু দেবদারু চাৰু নীপ ?
পলাশীর ললাটের পরে কোথা সে চাদের টিপ
শিরীষবালার অলক দুলায়ে পবন হেথা না ফুরে,
মহুয়ার বনে মাতিয়া মাতিয়া মৌমাছি নাহি ঘুরে।
বনদেবী হেথা শৈলসােপানে এলায়না তার বেণী
কোথা দিগন্তে তরঙ্গায়িত গিরি পর গিরিশ্রেণী ?
হেথা শিলাজতু গলায়ে ঝরেনা গেরুয়া উৎসবারি।
সিকতাহৃদয় বিদারি এখানে ভরেনাক কেহ ঝারি,
কোথায় উদার অবাধ জীবন অদ্রি পাদমূলে।
চপল চরণে কোথা ছুটাছুটি গিরিনদী কূলে কূলে ?
ও গাে পাহাড়িয়া প্রিয়া
হেথায় ভবন-অঙ্গনে তব কি দিয়ে তুষিব হিয়া ?

.
ও গাে পাহাড়িয়া বালা,
বল্পীবলয় ভুজে তব, গলে কূটমল্লিকা মালা।
একতি হেথায় কল্যাণীরূপে বেঁধেছে কুটীরখানি
আলিপনাআঁকা আঙিনার তলে এস গিরিবরাণী
শতেক বাঁধনে জড়ায়ে হেথায় গৃহকাজ বেড়ি রবে
সংসার-গেহ-স্নেহছায়াতলে তুষ্টি লভিতে হবে।
ফুলপল্লব-ভূষণ তেয়াগি ভবন ভূষণ পর
টান শির’ পরে লাজ গুণ্ঠন, শঙ্খবলয় ধর।
আঁক সীমন্তে সিদূর-লেখা বাঁধ কুন্তল রাশি
হােক অচপল চরণযুগল, সংষত হােক হাসি।
পিঞ্জরে হেথা পড়িয়াছ বাধা কুঞ্জবনের পাখী,
হরিণ নয়নে ঘেরিয়া বেড়িল শতেক মানব-আঁখি।
ও গাে পাহাড়িয়া বধূ
সজীব পর্ণপুটে আনাে বন প্রকৃতিহৃদয়মধু।
মুগ্ধ আবাহন
ওগাে-মহুয়াবনের সাকী,
এস-মুখমদিরায় মুকুলে মধুপে মাতায়েবকুল শাখী।
কাপােল-পিয়ালা ঢল ঢল ভায়
গােলাপী সব টল টল তায়,
তব তুল-ভুলে আঙুর-আঙুলে মুদাও আমার আঁখি।

মুখ হন
ওগাে-বারুণীপুরীর সাকী।
তব রূপসীধু পিছে পিয়ে প্রিয়া
রভসে অবশ হাের মম হিয়া,
তব প্রেমনবাক্ষা কুঞ্জে ঢলে পড়ে যেন থাকি।
এস-দ্রাক্ষা বনের সাকী।
ওগাে-শৈলকূটের রাণী
আনাে ও বাহুর অটল অটুট শিলার নিগড় খানি।
পাষাণি, উরস পাষাণ কারায়
চন্দনশীত উৎস ধারায়
বন্দী যেন গাে আপনা হারায়, না শুনে মুক্তি বাণী
ওপােপাষাণ দেশের রাণী।
বীরবালা আজি রণ অবসান,
চরণে সপিনু কবচ কৃপাণ
বিদ্রোহী পায়ে পড়িছে লুটায়ে চির পরাজয় মানি,
ওগো-শৈলপুরীর রাণ।
ওগাে-কাজল দেশের প্রিয়া,
এস খঞ্জন-আঁখির ভুরুর অঞ্জনলতা নিয়া।
দূর দিগন্ত, ধনবন গিরি
চুয়ে কালদীঘি, কুহেলিকা চিরি,
নিচোলে চিকুরে উজল কাজল রাখিয়াছ সফিয়া

পণপুট
ওগাে–অঞ্জনকেশা প্রিয়া,
আঁকলে ইন্দ্রনীলশলাকায়
রস-অঞ্জন আঁখির পাখায়,
শপনে ঢালাও যাদুকরি, মায়া-অনুরজন দিয়া।
ওগাে–নিকষ দেশের প্রিয়া।
ওগাে-স্বপনপুরীর পরী,
এস লতি ইন্দ্রধনুর মালিক হস্তে ধরি।
তারার কুসুম ছড়াতে ছড়াতে,
ছায়াপথ বেয়ে নামগাে ধরাতে,
সােপার প্রদীপে জোনাকিফিনকি পড়ে যাক্ ঝরি ঝরি
ওগাে-স্বপ্নলােকের পরী,
পূজালাচা লঘুসঞ্চার
প্রজাপতিখচা দুটী পাখনার
ছায়ায় হাওয়ায় মােহন মায়ায় চেতনা লহগাে হরি।
ওগাে-কল্পবনের পরী।
.
আত্মসমর্পণ
[ হাফেজ হইতে।
বাঁধিতে হরিণহিয়া
কোথা হতে এল প্রিয়া
তােমার অলকে এত ফাস।
তােমার নয়ন ছায়ে
স্বপনের গায়ে গায়ে
চেতনা হরিতে করে বাস

অসমর্পণ
তােমার চাচর চুলে চমেলি ফুটিয়া উঠে,
আদীনপ্রবালগুলি ও রাঙা, অধরে লুটে,
সুরার উজল শিখা শিরায় শশাণিতে ছুটে,
মদালস তৰ মৃদুহাস।
শীতবায়ুচঞ্চল
বিতরিছে আতরের বাস
তােমার তােরণ তলে ধূসর ধুলির মাঝে •
রবি শশী শির দুটা লুকা লুটাক লাজে,
দিবস হউক ম্লান
জ্যোছনা মায়মান
হােক রাঙা গােলাপ হতাশ।
মিছে আভরণ ফেলি
পিছে আবরণ ঠেলি
কর তনিমা প্রকাশ।
তােমার পথের পরে পাতি দেই এই হিয়া,
তােমার চরণরেণু রুমালে মুছায়ে নিয়া,
তােমার কপােল কুপে পরাণ সপিয়া দিয়া
নিবারিবে মরুভূপিয়াস।
সকলি ঢালিয়া পায়
দাস, বিনিময়ে চায়
প্রিয়ে তুৰ বাহুনাগপাশ।

পর্গট
মুক্তি
(১)
এস সখি মুক্তিলােকে রুদ্ধ গৃহমাঝে
বাহিরে খুলিয়া যত সংসার শৃঙ্খল,
হেথা এস মুক্ত শ্লথ সুষমার সাজে
বিগলিয়া কৰ্ম্মক্লান্ত যৌবন তরল।
এলায়ে গুষ্ঠিত কুণ্ঠা মুকুলিত লাজ
ফুটে উঠ কণ্ঠবৃন্তে চম্পার মতন।
রাখি উপাধান তলে সৰ্ব্ব ভূষা সাজ
পর প্রেমকল্পতরুসজাত ভূষণ।
হেথা হেমসিকতায় মাণিক্য-সন্ধানে
মন্দাকিনীতটে খেলা রভসে হরষে
কভু অঙ্গের ভূষা রাখিয়া সােপানে
অবিশ্রান্ত জলকেলি অচ্ছেদ সরসে।
ইহ স্মৃতি হারাইয়ে, গৃহের নন্দনে
এস প্রিয়ে, লভ মুক্তি নিবিড় বন্ধনে

মুক্তি
মুক্তি
(২)
উঠ সখি জাগ’ জাগ পােচ্ছায় রজনী
মৃদঙ্গে উঠিছে দূরে কুঞ্জভঙ্গগান।
ভােরের বৈরাগী পথে বজায়ে খনী
টহল গাহিয়া দিল চমকিয়ে প্রাণ।
নগ্ন সুষমার সুখ-স্বপ্নপুরী হতে
গৃহাঙ্গনে ফিরে এস, ওগাে মায়াময়ি,
ভিড়াও মানসতরী কৰ্ম্মতটপথে
চমকি জাগিয়া উঠি অসহ্তা অয়ি।
ধীরে খােললা তনুষেরা পরীর পালক,
এলায়িত যৌবনেরে বাঁধ চেতনায়,
মুছি তালস আঁখি, গুছায়ে অলক
আপনা সরি তােল লাজরক্তিমায়।
ধীরে ফেলি পাদযুগ লাজসঙ্কুচিত
অলিন্দ অঙ্গন পুনঃ কর পজিত।

ศศ์ตร অপরাধ কার মিছে সখি খয়রা অপরাধ। না চাহি আপনা পানে মিছিমিছি অভিমানে দোষ ধরি রােষ করি ঘটাও প্রমাদ। জান নাকি, কোন দিন নহে অলি লােভহীন, তপ আচরিতে সেত ঘুরেনাক বনে ? মধু গন্ধে পুলকিয়া রূপভাতি ঝলকিয়া কমল ফুটালে কেন অমল আননে? যেন পৰু বিম্বফল রসভরা ঢল ঢল কেন এত মনোেহর অধররতন ? শুকের কি উপবাস ? শুধু কি তৃষিত শ্বাস ক্ষুধা যে জীবনধৰ্ম তাহা কি নূতন ? পড়িয়া জলের কাছে এ মন কেমনে বাঁচে? সে কথা জানিয়া সখি কেন কর ছল ? আঁখিপুটতটভরা শান্তিজালাক্লান্তিহরা ঘনকৃষ্ণ শান্তিবারি কেন টল মল? এটা সখি কার ভুল ? রায়ে তারুণ্য ফুল লাবণ্যে আনিলে কেন বারুণীর বান? যদি তায় অবশেষে এ নদী যায়গাে ভেসে কেন দোষ ধর’! তার কতটুকু প্রাণ? .

ভূষণ - মিছে দূষ’ প্রমত্ততা, কেন তব বালতা সাতপাকে জড়াইল এ তরুর গায় ? সির জ্যাছনা রাশি বিখভরি আসে ভাসি চকোর বাঁচিবে সখি পলায়ে কোথায় ? নিয়ত ঝঙ্কিয়মান বাণী, বীণাবেণু তান মানস কুরঙ্গ সেত অবােধ সরল, যদি কটাক্ষের শর ঝরে পুস তারপর কেমনে এড়াবে বলে আখির গরল ? পায়ে পায়ে যদি লুটে কেবল গােলাপ ফুটে বুল বুল আঁখি মুদে বসিবে কি তপে ? রূপের অনল যদি জ্বলে শুধু নিরবধি পতঙ্গ কেমনে বাঁচে পরাণ না সপে ? দুৰ্বল দীনের ঘরে এসব কিসের তরে? লিপ্লর অপ্সরােলীলা কেন অনুক্ষণ? পদে পদে অপরাধ নিতি যদি পরমাদ তবে কেন অকুণ্ঠিত মুগ্ধ আমােজন ? ভূষণ চেয়েছিলে ভূষণ, প্রিয়ে, ভূষণ সবি সঙ্গে আছে। একে একে পরিয়ে দিলে তবে আমার প্রাণটা বাঁচে। আজকে বুকের শােণিত দিয়ে আল দিব পরাইয়ে সােহাগে সই দুলিয়ে দেব চুমার নােলক নাকের কাছে ।

পট
সচিব হার একটা করে,
মেখলাটি, অন্তে পরে
তোমার কাণে প্রেমের গানে রচিব দুল নূতন ছাঁচে,
পায়ে দিব হিয়ার নুপুর
বাজবে প্রিয়া ঝুমুর ঝুমুর
ভূষণ পরে দেখবে বয়ান আমার দুটী ননকাটে।
কাকী-সিন্ধু।
তােমায় কোথা ভূষণ দিব সুন্দরি,
অঙ্গল গন্ধশােভায় আছেই সদা মুরি।
আলতা কোথা পরবে তুমি?
ধরণী ও চরণ চুমি,
ভরে উঠে ভূই-চাপাতে, ভ্রমর ছুটে এৰি।
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
বিধরার বিধরে তালরস সয় কি কেহ?
অঙ্গরাগের ঠাইটি কোথা ? গুলো যেতােমার দেহ
হিরণ ক্ষোতে হবেই মাটী
হােনা কাচা হােনা খাটা
কুণ্ঠা লাজে কাকন চুড়ি কঁদবে দিবা শর্বরী।
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
.

প্রেমেরতি
কাজল তুমি পাবে কোথ, সে কি তােমায় সাজবে ভালো?
কাজল হতে উজল আনা যুগল ভুরু অনেক কালে।
চাচ, চিকন চুলে তােমার
ঝাপটা সীথি মানায় কি আর ?
নারীর ভূষণ পরবে কি গাে কল্পলােকের অঞ্জরি?
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি।
প্রেমের স্মৃতি
কিশাের কালের প্রণয়শ্বতি লুপ্ত হয়েও লুধু নয়,
জেগে উঠে যখন তখন, হিয়ার মাঝে সুপ্ত বয়।
পেয়রা গাছের ফাঁকে ফাঁকে,
পায়রা গুলাের ঝাঁকে ঝাঁকে,
পল্লীপথের বাঁকে বাঁকে, বকবাতাবীর কুলবনে
পিউতানে, যুইশিউলিবাগে সে প্রেম জাগে গুরণে।
কিশাের প্রাণের প্রেমের স্মৃতি লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়,
লতায় পাতায় পাড়ার পথের যথায় কথায় গুপ্ত ;
সাজ পূজুনীর শখের ডাকে,
নােলক নাকে, চপল আখে,
লুকোচুরি খেলতে থাকে দীঘির বাঁধা ঘাটটি’পরে
ছুটাছুটি খেলা ধূলায় পাড়ার মাঠের বাটটি ভরে।

ফুলে-আলাে অশােকতলায় হােলর দিনে রাসবাড়ীতে
পাথর পূজার পৌরহিত্যে, শিশুপাঠের মাষ্টারীতে,
পূজার দিনে আটচালাতে
দীপালিত দীপ জ্বালাতে
সাঁজে ভােরে জলঢালাতে যে বীজ বুকে উপ্ত হয়,
অঙ্কুরিত রূপটি তাহার লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়।
বিফল আয়ােজন
আজিকে হয়েছে ভগ্নপূর্ণকুন্ত দুটা,
দুয়ারের পাশে বস্তাবৃক্ষ শুকায়ে পড়েছে লুটি।
এলেনা দেবতা মন্দির মাঝে,
বৃথা আমােজন ব্যথা হয়ে বাজে,
ফুলমঞ্জরী তােরণ মাল্যে ঝলসি ঝরিছে টুটি।
কুম চুয়া চন্দনলেখা ম্লান হয়ে হলাে মসী,
দহে মলে ধূপ পিয়াসে হুতাশে নিরাশায় শ্বসি’ শ্বসি।
শুভ যৌবনে শােভা সম্ভার
ভাষায় যায় যােড়শােপচার
বিফল হয়েছে দেবতা আমার, শিথিল অর্ঘ্যমুঠি।

নিহতপের নৰ বিরহতুপের শেষ “সে দিন ফানে যবে মদল পিয়ে অরণ্য জাগিল, ত্যজি মেঘন খাল, রসাল মুকুল মূলে চম্পক বকুল ফুলে • দুটিল করীর কুম্ভে মদিয়া উচ্ছাস। সেদিন এলেনা বঁধু সুরভি কবীমধু গড়ায়ে পড়িল ঝরি ধরণীর বুকে, বনঞ্জকপােল পরে বসন্তের বিধরে চুম্বৰ উঠিল ফুটি অশােকে কিংশুকে। তােমারি আশায় আমি খেলিং এ অঙ্গে আমি হােলীরঙ্গ দিবা যামী লাবণ্যের ফাগে, যতনে জ্বালিঃ দীপ পরি রতনটীপ, অধর করিনু রাঙা তাম্বুলের রাগে। জাগিনু জ্যোছনা রাতি রাখিনু মালিকা গাঁথি নিচোল আঁচলে, পল্লবিনী বল্লীসমা ফুলতনুমনােরমা , তরু আলিঙ্গন মাগি লুটিনু ভূতলে। যৌবনের ভরাকুলে মাধুরীতরঙ্গ দুলে তনু নােমাঞ্চিত কেলিকদম্বের প্রায়, সেদিন এলেনা প্রিয়, দেহকান্তি কমনীয় হয়ে নীল হলাহল দহিল আমায়। কুম শয়ন পাতি .

অকস্মাৎ এলে যবে
ভস্ম করি মনোভবে
পুন ধ্যাননিমীলিত রুদ্রের নয়ান
জীর্ণ পর্ণে মর্মরিত
বহুদি জর্জরিত
বলসিয়া শুষ্ক শীর্ণ ধরার বয়ান ।
অশ্রুসিক্ত ছিন্নবাস,
ধূসরিত কেশপাশ
উড়ে যেন গৃধিনীর রুক্ষ পক্ষজাল
যেন ধু ধু বালুকায়
নিদাঘতটিনীপ্রায়
নাহি রসকান্তি, সার করােটি কঙ্কাল।
ােৈমর করুণা লাগি বিরহ যামিনী জাগি
অরুণ কোটরগত খঞ্জননয়ন।
অশাষা রসাবেশ, ধূপায়িত, পাংশুশেষ,
অঙ্গার করেছে মর্ম মুৰ্ম্মর দহন।
সহসা আসিলে বঁধু, নাহি সুধা, নাহি মধু,
নাহি কোনাে আয়ােজন ভাষায় ভূষণে,
গৃহে নাহি দীপজালা
গাঁথা নাহি বনমালা
নাহি রসগন্ধভালা বরিব কেমনে?
বিরহ তপের শেষ,
এস এস হৃদয়ে
এস নীলকণ্ঠ মাের, মন্মথমথন,
আজি ভস্ম সৰি মম,
দহনে উল তম
শুধু হৃদে আছে প্রেম-হেম-সিংহাসন।
"

বলােপ
স্পর্শ
উত্তর চরিত হইতে অনূদিত)
ক দিল ঢালিয়া হরিচন্দনপল্লবরস সঙ্গে
নঙাড়ি ইন্দুরিণাঙ্কুর মরি মরি মাের অঙ্গে।
কে দিল মানসপরিতপণ জীবনৌষধিবিত্ত ?
সুধায় সিক্ত করিল তিক্ত তাপজৰ্জর চিত্ত
সঞ্জীবন এ পরিমােহন যে পুরাপরিচিত স্পর্শ,
অঙ্গে অঙ্গে প্রেমতরঙ্গে' জাগায় নবীন হর্ষ।
সন্তাপজাত মূচ্ছ। ঘুচায়ে পরমানন্দবা,
বিবশ করিছে, আনি পুন নবজড়তা পুলকন্যা।
দ্বন্দ্বনােপ
দুই হয়ে কিবা প্রয়ােজন ?
রাত্রি দিন ব্যবধান,
বাঁধাবাঁধি সাবধান,
প্রচণ্ড প্রয়াসে শুধু আংশিক মিলন।
নয়নের বাতায়ন
বসি শুধু দুই জনে
নিতি মিলিবার লাগি প্রাণপ্রসারণ!
দুইটী খাঁচায় থাকি
ছট ফট দুটী পাখী
শুধু ব্যর্থ ডাকাডাকি চক্ষু বিদারণ।
মাংস অন্থিপঞ্জরের
বন্ধুহীন ভূধরের
গাত্রে প্রতিহত দুটী নদীর নর্তন,
দুই হয়ে কিবা প্রয়ােজন ?

পর্ণপুট
এক হলে খাচে দুটী, প্রাণ
দুইই তৃষা, দুই-ই জল
দাউ দাউটল মল
মৃগতৃষা বল জ্বল সারা দিনমান।
দুটা প্রাণ ধারা লয়ে
এক মহানদী হয়ে
সকল ব্যাকুল জালা করুক নির্ধা,
কল ক গভীর
আত্মানন্দোচ্ছল নীর
ত তার তটসম হােক মজ্জমান।
মহামে সিন্ধুপানে
ছুটুক অলক্ষ্য টানে
পূর্ণ চিদানন্দে হােফ দ্বন্দ্ব অবসান।
এক হলে বাঁচে দুটী প্রাণ।
সম্পূর্ণতা
গগনে কোটি তারকা হয়ে তােমার পানে চাহিয়া বই,
পরাণ ভরি নিরখি কোটি নয়নে,
গহনে কোটি কোক হয়ে ক্ষুব্যখা নীরবে সই,
তােমার তরে রচিতে ফুলশয়নে।
1F
অযুত নদীলহরী লয়ে চরণে লুটি তাথৈ—এই
চিকন চাৰু চিকুর হই ও শিয়ে।
তােমারি স্বেদ অপনােদনে মধু-পবনজীবন বই,
ততে অনুলেপন হই উশীরে।

অশ্রু হয়ে গণ্ডে দুলি, হাশ্যে ফুটি অন্তে এই
পুলকে উঠি ককিয়া হবে,
ঘুমালে তুমি স্বপন হয়ে জাগিয়া তােৰা যেরিয়া লই
আবেশ মােহে মূরছি বই উরসে।
তাের প্রতি অনুটি চাই,ইহজীবনে লভিনু কই?
শরীরী হয়ে তােমারে, সতি, লভি নি,
বাসনা তাই তনুটি জৰ ভূষিতে পুজ হই
মরিয়া লভি করিয়া তােমা যােগিনী।
15
কুণ্ঠিতা
তুমি জ্ঞানী গুণবান,
ভব সখী হতে নাই যে শক্তি তাই কাদে ধুপ্রাণ।
আমি বুঝিনাক তােমাৰ গৰিম বুঝিনে তােমার ভাষা,
বচনদৈন্তে বুঝতে পারি না হৃদয়ের ভালবাসা।
ভােয়ার যা প্রিয় প্রাণের সাধনা, মাের তা অন্ধকার
কি কথা শুধালে কি কথা যে বলি অর্থ পাওনা তার।
করুণা-নয়নে চেয়ে চেয়ে যৰে অলকে বুলাও কর
লজ্জা দীনতা সঙ্কোচে মাের, কুষ্ঠিত অন্তর।
মামি এ আয়ােধ নারী-
তােমার চরণে লুটেপড়া ছাড়া আর কি করিতে পারি ?
৭১

পূর্ণ
তুমি যে কর্মবীর,
উন্নতু বপু, উদার হৃদয়, শান্ত দান্ত ধীর।
ক্ষুধিতে তুষেছ যােগায়ে অল্প, তাপিতে ছত্র ধরে,
হে ত্যাগি! কতই লাইনা তুমি সয়েছ আমার তরে।
হৃদয়শােণিতে শ্রমজল করে রাখিয়াছ সংসার
ঝঞ্চাক্ষুব্ধ তটিনীবক্ষে অটল কর্ণধার!.
বুদ্ধির দোষে জঞ্জালজাল যতই জড়ায়ে তুলি
নিশিদিন জাগি হাসিমুখে তুমি একে একে দাও খুলি
আমি এ অবলা নারী-
তব চরণের দাম হওয়া ছাড়া কি আর করিতে পারি।
তুমি যবে গাও গান,
আমি শুধু শুনি বুঝিনাক তার বসতাল লয়মান।
নদীস্রোতসম কতদুর হতে শ্রোতা চলে আসে ছুটে,
মুগ্ধ মানসে অর্থপুঞ্জ বহি অঞ্জলিপুটে।
দেশ-বিদেশের কত অজ্ঞাত হৃদি গুলি লও জিনি,
আমার মাথায় যে মাণিক জ্বলে আমিই তাহা না চিনি,
মাের নাম ধরে কত গান গাও, আমি তাহা নাহি বুঝি,
গৌরবে গলা নয়নের জলে আপনা না পাই খুজি।
আমি এ অবােধ নারী
নীরবে চরণচুম্বন ছাড়া কি আর করিতে পারি?
१२

তোমার হয়
তুমি ভালবাস কত
এক কণা পেলে ভরে যায় প্রাণ, ঢালল বরষার মত।
রােগের শিয়রে অরুণ নয়নে জাগিয়াছ সারারাতি
পালকে আমারে আচ্ছাদি সবি নিয়ে বক্ষ পাতি।
অতিরুণায় দিয়াছ লজ্জা, সজ্জা করি না তাই
আপন দীনতা হীনতা স্মরিয়া কুণ্ঠায় মরে যাই।
লােহার আঘাত সহিয়া অঙ্গে বুলালে কনক কর
প্রতিদান দিতে ক্ষণেকের তরে দিলে কই অবকর?
আমি দীন হীনা নারী।
কেশ দিয়ে তব পদধূলি মুছি, আর কি করিতে পারি?
তােমার প্রভাব
এ কুরূপে এ কুৎসিতে, হে সুন্দরি, করেছ সুন্দর,
অঙ্গে অঙ্গে ছুটাইয়া মাধুর্যের আনন্দ নিঝর।
পরশ মাণিক্যম্পর্শে মণ্ডিয়াছ হিরণ্য আলােক,
অনুরাগ চন্ধিকাল, রক্তচুলে পরীর পালকে।
শাভিয়াছি পদ্মকোকে রেণুমাখা মধুপের প্রায়
লজাৰুণ গগু’পরে কালাে আঁখি যেমন মানায়।
৭৩

হে কমলা, এ নিধনে করিয়াছ রাজরাজেশ্বর
তােমার মধ্য হতে স্বর্ণরেণু ঝরে নিরন্তর।
এ নিদেরে শিখায়েছ উট পদে তুচ্ছ গণিবারে,
বিভাতীত নিত্যধনে চিনায়েছ দৈন্তের ধারে।
ঢালিছ প্রবাল হেম মুক্তা হীরা, অহাসে ভাবে
এ কুটীরে কোথা রাখি । দিশেহারা করিলে যে দালে।
তপস্তা বাণী মাের, মম ধ্যান ধারণার ছবি
মূর্তিমতী এ মন্দিরে, এ মূর্থের করিয়াছ কবি।
এৰি উঠিল প্রাণ, কিংশুকেও অর্পিলে সৌরভ,
কল্পলতা। বরফিছ কুসুমিত কবিত্ব বৈভব।
আজিকে জীবন যেন অনুপ্রাসঝঙ্কত মুনা
তােমারি মঞ্জীরশিয়ে করে ছন্দ তােমারি অর্চনা।
হে নিৰ্মল পূতশীল, এ পৱিলে করেছ নির্মল,
সংহত সংযত নত করি মাের যা ছিল চপল।
শনে সন্ধ্যাদীপে তব শুভ কৰুণ নিৰুনে
পুণ্যের বােধন হলাে অন্ধ গৃহে কল্যাণের সনে।
পবিত্র মহিমাভরা জ্যোতির্ময় তােমার নন
প্রতি পদক্ষেপে মাের সাথে থাকি করিছে শাসন।
৭

চিরতরু
চিরতরুণী
কে মাজে তােমার মাঝে অসীম সুষমা সাজে
বলগাে প্রিয়া,
কোন্ সে অপরিমিতি নবরূপে তব নিতি
ফুটায় হিয়া?
তােমার স্বরূপে সখি শেষ যে নাহি
অবাক হইয়া শুধু রহিগাে চাহি,
অবিরত মধু করে, আলসে এলায়ে পড়ে
অলি সে পিয়া।
সেই মুখ হাসিশি সেই ভালবাসাবাসি
মানসহর,
একই সেই তনুমন একই কথা অনুখন
কাকুতি ভরা,
মনে হয় তবু যেন নূতন সবি
হেন তখনি তাই যখন লভি,
নানা ছলে সারাবেলা কে করে এ ফুলখেলা
তােমায় নিয়া?

পাপুট
প্রিয়া
(উত্তররাম চরিত হইতে)
কুন্দকোকদন্তশােভন সুন্দর মুখখানি,
যেনৱা মূৰ্ত মহাউৎসব কমনীয় তব পাণি ;
কণ্ঠ জড়ালে, যেনবা চন্দ্রকান্ত মণির হার
ইন্দু কিরণে নীহারবিন্দু নিচিত অঙ্গে যার।
বাণী তব, ম্লান জীবকুসুমের বিকাশসাধিকা, প্রিয়া,
তৃপ্ত করিছে কর্ণকুহর সুধাধার বষিয়া,
অৰ্পণ করি ইন্দ্রিয়চয়পরিতৰ্পণ প্রাণ,
অবসাদহত চিত্তে সতত রসায়ন করে দাম।
তােমার দৃষ্টিদুগ্ধসরিতে নিত্য করাও স্নান
করি কমলের কুটালনিভ প্রণামাঞ্জলি দান,
নেত্ৰ যুগলে অমৃত বৰ্ত্তী, লক্ষ্মী স্বরূপা গেছে
জীবন আমার দ্বিতীয় হৃদয়, কৌমুদীসুধা দেহে,
বর্যোপলের মতন শীতল চারু অঙ্গুলি তব
যেনবা ললিত সিত সুকুমার ললীক নব
সাত্ত্বিক প্রেমরসের পরশে সুন্দর সুশােভিত
মৃদুচঞ্চল, স্বেদ রােমাঞ্চ স্পন্দনে পুলকিত,
পরমানন্দ মধুর তনু তব মনােম,
প্রাবৃট পবনে ধীর কম্পিত ফুট নীপশাখাসম।

ঘাটে
সখি,-গুরুজনেগিয়ে বলল,
অভাগী রাধার গায়ে বড় জ্বালা, তাই সে ঘাটেই বলে।
পাখী ফিরে নীড়ে ঐ ঝাঁকে ঝাঁকে,
উদিয়াছে চাদ তমালের ফাঁকে,
ঘরে ঘরে দীপ করে টিপ টিপ যদিও সন্ধ্যা হলো
যমুনার জলে আজি বলে রাধা গুরুজনে গিয়ে বলল।
.
সখি,-এখন কি ফিরা যায় ?
পথ নির্জন ফিরেছে গােধন ধুলি উড়াইয়া পায়।
কেহ নাই ঘাটে বাটে নদীতীরে
মাঠে যারা ছিল গেছে তারা ফিরে
বন্ধ হয়েছে খেয়া পারাপার। ছাড়ি এত সুবিধায়
ছাড়ি জনহীন সাঝের যমুনা, এখনকি ফিরা যায় ?
.
সুখি—কেন কৌতুক হাসি।
শুনিছনা কাছে কদম তলাতে ঘন ঘন বাজে বাঁশী।
ঘাটের কাজটি তােমাদের মত
আমারত সখি,সােজা নয় অত।
ছাড়তে যে হবে, চুলে আর হারে গলায় লেগেছে ফাঁসি
কলস ভরা কি এতই সহজ? কেন কৌতুক হাসি ?
৭৭

পর্ণপুট
সখি-বড় জ্বালা দেহম,
বলল গুরুজনে আজিকে রাধার কি জানি কিইবা হয়।
আজি কালিন্দী কল্লোলে সই
দেহ ভরা দাহজালা যায় কই ?
একগলা জলে আছি, বাকী আর একটু বইত নয়
বলাে ফিরে এসে গৃহে গুরুজন বেশী যদি কিছু কয়।
অন্ধকার বৃন্দাবন
ক
নন্দপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার ;
চলে না চল মানিল বহিয়া ফুলগন্ধভার।
জ্বলেনা গৃহে সন্ধ্যাদীপ,
ফুটেনা বনে কুল নীপ
ছুটেনা, কলকণ্ঠসুধা পাপিয়াপিকচন্দনার।
নপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার।
ছোঁয়না তৃণ গােঠের ধেনু
ব্ৰজের বনে বাজে না বে
করেনা শ্যাম রাধিকা লয়ে শারিকাগুক দ্বন্দ আর,
সজল ঢল আয়ত আঁখি
পিয়াল স্কুল পরাগ মাখি’
লেহন করে হরিণী আজি চরণ সুধাস্য কার ?
নন্দপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার।
৭
**

শিখীরা আর মেলিয়া পা
করেনা আলােতমালশাখা,
কমল কলি ফুটে না, অলি লুটে না মকরন্দ অয়।
যায়না চুরি নবনী ক্ষার
বরষে তাই নয়ন নীর,
করেনা দধি মন্থ গােপী নাচায়ে চারু চন্দ্রহায়।
নন্দপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার।
সলিলকেলি ফেনির জলে,
তটিনী আর নাহিক চলে,
পাটনী কাদি তণী বাঁধি করেছে খেয়াবন্ধ তার।
নূপুর হার হারান’ ছলে
বধুরা সাঁজে যমুনা জলে
করেনা"দেরী আজিকে হেরি হাসিটি স্কমচন্দ্রমার।
নন্দপুরচন্দ্ৰবিনা বৃন্দাবন অন্ধকার।
বাতাসে খুসি বেতসবন
হুতাশে মরে হতাশ মন,
রচেনা রাসঝুলনদোলে মিলনপ্রেমানন্দহার,
গােধূলিধূলিধূসর দেশে
সখারা শােকবিবশ বেশে
এসেছ ভুলে কুসুম তুলে, কোথা সে ধন বন্দনার।

গােপাঙ্গনা চেতনাহীনা
মলিনাননা দৈন্য।
আঁখির জলে বাড়ায় শােকবন্যা ভাসুনন্দনার,
চিৎকুমুদী ঢুলিছে মুদি
থেমেছে গীত কণ্ঠ রুধি
গগাকুল মৃৎপিণ্ড হলাে চলে না হৃৎস্পন আক্ত।
নন্দপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার।
রাখালরাজ
অবুঝ কানু কার মায়াতে ভুলে
গােকুল ছেড়ে চলে গেলি ভাই ?
সেথায় কেবল হাতী ঘােড়র মেলা
তাের ত সেথা খেলার সাথী নাই।
কোথায় সেথা দুর্বাশ্যামল গােঠ
রাখাল দলে খেলার হেন জোট,
ননীর মতন কোমল ধবল দেহ
কোথায় সেথা এমন দুধল গাই!
এমন রাখালরাজ্যপানি ফেলে
কেমন করে আছিস কানাই ভাই ?

ময়ুরনাচা এমন পাখীডাকা
হরিণচরা কোথায় সেথা বন ?
মাটীছোঁয়া কোথায় তরুশাখা
ঝুলবি কোথা দুলবি সারাক্ষণ ?
ফুলবনে নাই ফুলের ছড়াছড়ি
ফুলের ডােরে কোথায় জড়াজড়ি ?
গুজতে কাণে মুকুল কোথা পাবি?
খুঁজতে গিয়ে আকুল হবে মন।
অবুঝ রাজা এমন বাঁশীরাজ।
সবুজ তাজা কোথায় সেথা বন ?
দুপুর রােদে সেথায় তরুতলে
কোথায় পাবি মধুর মৃদু হাওয়া?
কোথায় সেথা কালিন্দীনি নীরে
কলকলিয়ে সাঁতার কেটে নাওয়া?
সেথায় কিরে গভীর কালীদ’য়
কমল কুমুদ নিত্য ফুটে রয়?
গামের ঘামেও ঘনায় ঘুমের ঘোের
কোথায় এমন ঘুমে নয়ন ছাওয়া ?
রােদের তাতে তাতলে তনু তাের
গাছের ছায়ায় কোথায় পাবি হাওয়া?

পট
তুলবেংকে বেলের কাটা দিয়া
কুশের আঁতুর বিধলে রাঙা পায় ।
পড়লে খসে নুপুর ধড়া চূড়া
আবার কেবা পরিয়ে দেবে হায় ?
তমাল তলে মেলে মেলি পা,
বাছুরটী আর চাটবেনাত গা !
ক্লান্ত হলে চাইবি করে জল
কার কোলে তুই এলিয়ে দিবি গায়।
ক্ষুধা পেলে আনৰে কেবা ফল
ঘামলে ও মুখ মুছিয়ে দিবে তায়?
.
সেথাও যদি উপদ্ৰবই করিস
তারা কি তাের সইবে আচরণ ?
সেথাও যদি মাখন দধি হরি
তােয় যে কটু কইবে অকারণ!
বেণু যদি ৰাজাস রাখালরাজ
কেমন করে করবে তারা কাজ?
বকবেনাত তাের বাঁশরীরবে
যদি বা হয় পরাণ উচাটন।
কলস যদি হরি খাটে, তবে
হবে কিরে তথায় বন্ধুগণ।
৮২

মথুরার ধারে
রাজা হওয়া যদিই এত সখ
রাজা তুতােয় করেছিলাম মােরা ;
ছিত তাের মন্ত্রী পারিষদ,
গােন মৃগ,তারাই হাতী ঘােড়া।
উইয়ের ঢিপির সিংহাসনের পরি
মাথায় দিলাম পাতার মুকুট গড়ি,
কণ্ঠে দিলাম গুঞ্জাফলের মালা
হন্তে বাঁধি রাঙা রাখীর ভােরা।
হেথায় ফেলি রাখালরাজের লীলা
কেমনে তুই থাকবি মাখনচোরা ?
মথুরার দ্বারে
চরণে মিনতি প্রহরি তােমার, তাড়ায়ােনা রাজপথে,
মােরা তােমাদের রাজারে হেরিতে এসেছি গােকুল হতে।
ছেড়া ধড়া পরা, পথধূলি ভরা শরীরে ঘামের রেখা ;
তাই বলে কিরে যেতে হবে ফিরে, পাব না কার লেখা?
তুমি জাননা প্রহরি তােমার রাজাটি মােদের কে।
এই ধুলিমাখা বুকে মাথা রেখে মানুষ হয়েছে সে।
আমরা কাঙাল, আমরা গােয়াল, সে আজ অনেক বড়।
ও চ ধরি তােরণ প্রহরি, তাড়ায়ােনা, দয়া কর।

আমাদের কামু তার কাছে যেতে তাে-র পায়ে সাধাসাধি।
চোখে আসে জল মুখে আসে হাসি তাইত হাসি কি কাঁদি।
উড়াইয়া ঠায় দ্বারে ধূলা পায়, কানু শুনে তাই যদি
কত ব্যথা মরি পাবে সে প্রহরি আঁখিনীরে ব’বে নদী।
রাজার দণ্ড ধরেছে কানাই ছেড়েছে মােহন বাঁশী
সেই হতে তার বুঝি মুখ ভার, নাই খেলাধুলা কাসি।
আহাসে কতনা পেয়েছে যাতনা কেঁদেছে মােদের ছাড়ি।
অমন করিয়া দিওনাক ঠেলি, কুটী করােনা দ্বার।
কালীদহ হতে এনেছি তুলিয়া তার তরে শতদল।
যে বনে বেড়াত চড়াত গােধন সে বনের পাকা ফল,
শাঙলীর দুধে মথিয়া নবনী ধবলীর দুধে ক্ষীর,
এনেছি মালতীফুলে মালা গাঁথি যমুনার কালাে নীর।
এনেছি পাঁচনী শিখিচুড়া ননী কোচান রঙীন ধড়া,
বাঁশবন ঢাড়ি এনেছি বাঁশরী যতনে-ছিদ্র-করা।
গােটা গােকুলের আঁখি জলে ভেজা এসেছি আশিস নিয়ে
ভাঙা হৃদিভার রাঙা আঁখি আর,একবার বল গিয়ে।
বলিস তাহার রােপিত লতাটি আজি ফুলে-আলােকরা
ঘেরি শীপতল আসিয়াছে জল যমুনা দুকূল ভরা।
যা ছিল মুকুল এখন তা ফল চারা বাঁধিয়াছে ঝাড়
আদরের বধু হইয়াছে বড় শিঙ উঠিয়াছে তা।
=

পাদমেকং ন গনি
কোথা রবে তার রাজসভ দ্বারি, রবেনা সে গৃহকোণে,
বুকে এসে ছুটে পড়িবে সে লুটে একবার যদি শােনে।
নয়ন রাঙায়ে দিওনা তাড়ায়ে প্রহরী নিঠুর-হিয়া
দিব ক্ষীর সব বনফুল তােরে, একবার বল গিয়া।
পাদমেকং ন গচ্ছামি
ব্ৰজের সখী, ব্রজের সখা, কাঁদছ কেন আকুল প্রাণে?
আমার গােকুল ছেড়ে আমি যাইনি ত আর কোনখানে।
ধরে আমায় শিরায় শিরায় শিহরিল ব্ৰজের তনু
আমার প্রাণে সঞ্জীবিত তাহার প্রতি কণা অণু ।
ব্ৰজের বাটে, ব্ৰজের ঘাটে, ব্রজের গােঠে, মাঠের মাঝে
শম্পলতায় পুষ্পপাতায় আছি হেথায় নানান সাজে।
কাঁদছ মিছে, নয়ন মুছে দেখ চেয়ে,-এই যে আমি ।
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা দমেকং ন গচ্ছামি ।
জলে
বরণ আমার মিশে গেছে ব্ৰজের শ্যামল দুৰ্বাদলে
শাঙণ গগন মগন করি যমুনার ও কালাে লাে জলে।
ময়ুর নাচা মাল বনে সংশয়ে চাও মাঝে মাঝে ;
সত্যই মাের চারু চাচর চিকুর চুড়া হােথায় রাজে।
গােপাঙ্গনার অঙ্গটে আলিঙ্গিতে আলাদিয়া
গলে গলে নামলে গিয়া কালিন্দীতে আমার হিয়া।

পট
ব্রজধামের গুক শারিকা করছে আজো আমার নামই
বৃন্দাবন পরিত্যজ্য পাদমেকং ন গচ্ছামি।
বেণুর বনে বাজে বাঁশী চমকে উঠ, চেন নাকি?
কালীদহের নীলােৎপলে দেখনিকি আমায় আঁখি ?
কৃষ্ণসারের চণপাতে থমকে দাড়াও চাওযে পিছে,
আমার চরণশব্দ সে তা একেবারে নয় মিছে।
বন্ধুজীবে রক্ত অধর, কিসলয়ে নখর-রুচি
পদ্মদলে চরণ দুলে কুল ফুলে হাস্য শুচি।
চিনি চিনি চিনতে নার’ চমকে উঠে চাওযে আমি
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি।
পাটলঅশােকপলাশবাগে ফানে মাের রঙের মেলা,
পরাগরাগের হােলির ফাগে উচিত আমায় চিনে ফেলা।
বকুলডালে বেতস বনে বাদল বায়ে ঝুলন করি,
ব্যাকুল চোখে চেয়েও থাকে। যেন আমায় ফেল্লে ধরি।
দেখছনা ঐ চলছে আমার রাসের লীলা চুপে চুপে
হাজার ঢেউয়ে পৌৰ্ণমাসীর পূর্ণ শশীর হাজার রূপে।
উদাস বায়ুর পরশ দিয়ে বিবশ করি দিবস স্বামী
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি ।

নন ব
নবীন বঙ্গ
রছিল ধর্ম-ত্রিবেণীতীর্থ তব ভগবান পরমহংস,
শ্রুতির বার্তা শুনাইল পুন তব রায়, সেন, ঠাকুরবংশ।
বাড়বােজ্জল করুণাসাগর ভরিল অঙ্ক রঙ্গপুঞ্জ,
বঙ্কিম নব শুভ সংসার রচিল তােমার মাধবী কুঞ্জে।
লুটি মাগাে তব চরণ ধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ,
জ্ঞানবিজ্ঞানললিতকলায় শােভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
দত্ত মিত্র গুপ্ত বসুর অর্থে পদারবিন্দে দীপ্তি,
গিরিশ নবীন হেম মধু করে সুধাদানে জ্ঞানক্ষুধার তৃপ্তি,
মতি সুরেন্দ্র মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত করে অযুত শিষ্যে
ব্ৰতী ব্রজেন্দ্ৰ ব্ৰহ্মবিদ্যাবর্তিকালোেক বিতরে বিশ্বে।
লুটি মাগাে তব চরণ ধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ
জ্ঞানবিজ্ঞানললিতকলাম শোভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
*..
নী দানবীর রাসবিহারী কণ্ঠে ধ্বনিত গায়ের বি;
স্বর্ণ তারক মহশীন মণি বলির ধৰ্ম্মে হয়েছে নিঃ।
রাজনীতিরণক্ষেত্রে ধ্বনিল রথী শ্রীকৃষ্ণদাসের শ,
শােভে আশুতােষ মৈত্র ত্রিবেদী অলিসম তর কমল।
৭

লুটি মাগাে তব চরণ ধুলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ
জ্ঞানবিজ্ঞানললিতকলায় শশাভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
ঋষি মহেন্দ্র গঙ্গাধরের ভৃঙ্গার জলে বাঁচিল সৃষ্টি,
হােত প্রফুল্ল নব রসায়নহােমানলে করে হবির বৃষ্টি।
বহে গুরুদাস অগুরুপাত্র, অবনীর করে প্রাচীনছত্র,
যােগী জগদীশ তাড়িতাক্ষরে লিখিল তােমার বিজয় পত্র।
শুটি মাগাে তব চরণধুলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ,
জ্ঞানবিজ্ঞানললিতকলায় শশাভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
তব অপত্য দূরভুখণ্ডে লভিল শৌর্য সৈনাপত্যে,
তােমার চিত্ত জিনিয়া বিত্তে চিনিল নিত্যে,—চরম সতত্য।
দুহিতারা তব জাগ্রত করে রমণীগরিমা তিমিরলুপ্ত,
সেন সরকার শাস্ত্রী তােমার করে প্রবুদ্ধ কীৰ্ত্তি সুপ্ত।
লুটি মাগাে তব চরণ ধুলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ
জ্ঞানবিজ্ঞানললিতকলায় শােভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
সত্বরজের মিলন মন্ত্র ঘােষিল বিশ্বে বিবেকানন্দ,
দিগ জয়ী কবি সিন্ধুর কূলে গায়িল সাম্যসামের ছন্দ।
শরচ্চন্দ্র-মরীচিমালায় কল্পসুষমা তােমার অঙ্গে,
তর বন্দনা কুজে আনন্দে কাব্যকুঞ্জে কোটি বিহঙ্গে।
লুটি মাগাে তব চরণ ধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ,
জ্ঞানবিজ্ঞানললিতকলায় শশাভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।

রীতি
ধেয়ানস্তব্ধ যােগনিরুদ্ধ মুদিত তােমার হৃদয়বিল,
কোটি ভক্তের দুর্জয় তপে তােমার আননে দ্যুতি অনিন্দ্য
পু তােমার আর্কের তরে বুরিছে শীর্ষে অশনিব,
দেশের কর্মে সেবার ধর্মে যাদের আত্মত্যাগের হর্ষ।
লুটি মাগাে তব চরণধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ
জ্ঞানবিজ্ঞানললিতকলায় শােভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
রবীন্দ্র-প্রশস্তি
হে সুন্দর অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্ষের অশ্রান্ত বিকাশ,
লভেছি তােমার মাঝে অনন্তের মঙ্গল আভাস।
তােমার অমেয় আত্মা অভ্রভেদী ছুটেছে দ্যুলােকে,
তব রূপনীলাম্বরে আঁখি-পাখী ডুবিল আলােকে।
মূরছি পড়িল ধ্যান তব জ্ঞানসিন্ধুসিকতায়
বসবাউৰ্ম্মি মাঝে মৰ্ম্মতট লুকালাে কোথায়।
সীমা নাই ভুমানন্দে, হেবিরাট সব যাই ভূলে,
স্পন্দহীন নিশি দিন, কৃতাঞ্জলি তব পাদমূলে।
হে আনন্দ। আসিয়াছ ছলে গন্ধে কার কাত্তারে
প্রভাতের কলরঙ্গে, কুসুমের সুষমা সম্ভারে,
তরঙ্গের চল ভঙ্গে, বিহঙ্গের সঙ্গীতের সুরে,
প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধে, মেঘমন্ট্রে, ইত্ৰায়ুধপুরে,

পট
হে মঙ্গল। আসিয়াছ শম্বনে উটজ প্রাঙ্গণে,
লাজবর্ষে হাস্যে হর্ষে স্বর্ণশস্যে ভবনে ভবনে,
বল্পীভােরে, মল্লীমাল্যে, পূজামন্ত্রে, উশীরচলনে,
শিশুর দেয়াল মাৰে, কাঙালের করুণ ক্রন্দনে।
হে মােহন। এলে যদি এসে তবে আরো সন্নিকটে,
ভিড়াও সােনার তরী অয়ােৰূঢ় মম চিত্ততটে,
স্পর্শমণিময় কল্পমনালের পক্ষপুটে বাহি,
জয়বৈজয়ন্তী তুলি ভারতের পুণ্যসাম গাহি।
রাখ তব পাদপদ্ম লক্ষ ভক্তিতরঙ্গলীলায়,
এ অল পিশ করি ভৃঙ্গ হয়ে রেণু মাখি তায়।
ভক্ত-মৰ্মমর্মরের আরােহণী বাহি উঠি ধীরে,
নব তীর্থ রচ বঙ্গে সঙ্গীতের রসগঙ্গাতীরে।
কতদূরে! কত উচ্চে। হে রাজৰি, তবু কত প্রিয়,
প্রাংলভ্য, তবু দীন বামনের পরম আত্মীয়।
গােপদের জলে জাগে পূর্ণ চারু চন্দ্রমার ছবি,
নীর বিন্দুর বুকে ধরা দেয় গগনের রবি।
রথ হতে নেমে এস দাঁড়ায়োন ইন্দ্রিয়দুয়ারে।
অন্তরের অন্তঃপুরে চলে যেতে হবে একেবারে ।
উজলি কিরীটজে অন্ধকার প্রাণের কুটীর
এসাে রাজ-অধিরাজ। ভক্ত তব আকুল আর।

ছিত্রে প্রয়াণে
;
গন্ধর্বদলােক হতে চিত্ৰসেনদত্ত চিত্ররথে,
এস নামি সপ্তর্ষির আশ্রমের পুণ্য ছায়াপথে ;
বঙ্গবীর তন্ত্রী হতে এস নামি মূর্ত ব্ৰহ্মরাগ,
হে দেবতা হৃদয়ের সােমাত্তে লই আজভাগ।
খৃষ্ট সম স্নিগ্ধকণ্ঠে ডাক সবে স্নেহছায়াতলে,
দুগ্ধ দৃষ্টিদানে স্নাত করি মুগ্ধ শিশু দলে
বরিষ’ ভৃঙ্গার হতে হে দেবর্ষি, আশীৰ্বাদধারা,
তােম। দেরি নৃত্য করি ফুল্লচিত্তে হয়ে আত্মরা।”
দ্বিজেন্দ্রপ্রয়াণে
* **
ওগাে দ্বিজরাজ কোথা গেলে আজ? সুকাল জোছনাহাসি ।
রবির কিরণ জাগে না প্রাচীতে ধু যে ভমরাশি।
এখনাে নিশীথ রয়েছে যে বাকী
চলেছে পেচক শির পরে ডাকি।
কার পানে এবে চেয়ে রবে আঁখি অশ্রুতে যায় ভাসি,
ওগাে দ্বিজরাঙ্গ কোথা গেলে আজ নিয়ে পৌর্ণমাসী ?
অর্চিলে মায় শূরশােণিতের সুরধুনী-কূলে কূলে,
তব সঙ্গীত শ্রুতিমূলে তাঁর কুণ্ডল হয়ে দুলে।
গড়ি মীর কনক জীবনে
পরালে বঙ্গভাষার চরণে,
তােমার কণ্ঠ-কর নাদে জাগিল গৌড়বাসী।
মন্দির ত্যজি কোথা গেলে আজি ঘুচায়ে মায়ের হাসি।

পট
জাগায়ে হাস্য মৃতকল্পের পাণ্ডুর স্লান মুখে,
গহন কাননে ফুটালে কুসুম কাটার বোটার বুকে
ফুটায়ে কমল গরল সায়রে
বসালে বাণীরে তুমি তার পরে।
ওপাে নটরাজ ফণীর ফণায় বাজালে মােহন বাঁশী,
কোথা গেলে কলফুল্লকণ্ঠ, কোথা গেলে উল্লাসী?
মৃত্যুশয্যায় রজনীকান্ত
হে কিন্নর! কণ্ঠে কণ্ঠে বণ্টি বঙ্গে সঙ্গীতমাধুরী,
কণ্ঠ তব কুষ্ঠিত নীরব।
আজি মাধুকরী-বেশে দাড়ায়েছ রাজরাজেশ্বর -
বিলাইয়া সকল বিভব।
মণ্ডিয়া মাণক্যহারে বিশ্বজনে, মহাশঙ্খমালা
আজি নিঃস্ব, পরিয়াছ গলে
হাস্যস খুলে দিয়ে আজি তুমি নেমেছ সিনানে
বিদায়ের নয়নের জলে।
নিয়েছ সকল দংশ বক্ষ পাতি, করি বিভরণ
মকর কারুণ্যতরল,
যত দুখব্যথা মথি বিতরিয়া অমৃত সবারে
কণ্ঠে নিলে মরগরল।

মৃত্যুশয্যায় অলীকান্ত
এ বঙ্গ-প্ররণ্য মাঝে তুমি ছিলে হে মােহন
শান্ত সৌম তরু অভিরাম।
শ্যামা ধাত্ৰীমাতৃপদে নেয়াইয়া শাখা বার বার
আজীবন করেছ প্রণাম।
তোমাতে কোকিল গাহি’ প্রমুদিত করিল নিখিলে
দোয়েল গায়িল কত গান,
তােমার ছায়ায় আসি লভিয়াছে শান্তির বিশ্রাম
কত শত দাবদগ্ধ প্রাণ।
আজি তব ভগ্ন শাখা, শুফ পত্র, মূল হীনবল
অদৃষ্টের অশনিসম্পাতে
শেষ বিন্দু রক্ত তাও দিয়া তবু ফুটাতেছ
ছােট ফুল গলিত শাখাতে।
-
হে মুক্ত সাধক, আজি দাড়ায়েছ প্রশান্ত গৌরবে
সীমাহারা অনন্তের কুলে,
কলকল রাঙাজল পদতলে আসে ছুটে ছুটে
লুটে লুটে পড়ে ফুলে ফুলে।
একখানি তরী তাহে তটে বাধা, করে টলমল
বসি তাহে অকূল-কারী,
অমৃতের দেশ হতে বার্তা বহি আনে ক্ষণে ক্ষণে
উৰ্ম্মিমালা দিগন্তু বিহারী।
ভক্তবৃন্দপরিবৃত দাঁড়াইয়া আছ তুমি কুলে
শিরে শিরে আশীষ বিতরি
.
.

পণপুট
তারা আজি ফিরিবেনা, উত্তরীয় বসন অঞ্চল
বক্ষে চাপি ধরেছে আঁকড়ি।
বিশ্বসনে ইন্দ্রিয়ের পরিচয় হইয়াছে শেষ
জাগে শিরে অতীন্দ্রিয় দ্যুতি,
দিগন্তের পরপারে জাগিয়াছে সম্মুখে তােমার
সান্ত্বনার ত্রিদিব বিভূতি।
উদ্ধেদেছ প্রসারিয়া অবসন্ন কর্মক্লান্ত, তব
রােগশােকতাপখিল্প পাণি,
নেমে আসে ছায়াপথে জ্যোতির্ময় বরাভয় বাই
নিতে তােম। দিব্যলােকে টানি।
উপলব্যথিতগতি শ্রান্ত তব জীবন তটিনী
খুজে ফিরে জুড়াবার ঠাই,
জোয়ারে উদ্বেলি সিন্ধু আগাইয়া অই আসে ছুটে
বুকে করে লইবারে তাই।
,
মরণে বলেছ সখা, স্কন্ধে তার দিয়া বাহুভর
ফিরিতেছ গৃহে আপনার।
আধি ব্যাধি ভৃত্য সম আলাে লয়ে বার আগে আগে,
বনপথ দুৰ্গম আধার।
ব্যথা তৰ কোরকের ফুটনের উৎসুক ব্যগ্রতা
নিঝরের উৎসার প্রয়াস,

মৃত্যুশয্যায় রূজনীকান্ত
দেহের পিঞ্জরদ্বারে বসি আত্মাবিহকমত,
মূক্তিবর্ষে হেরে নীলাকাশ।
তুমি প্রসাদের মত গঙ্গাজলে আক দাঁড়ায়ে
গাহিতেছ শেষেঙ্গীত,
মােরা স্তব্ধ স্পন্দহীন হেরিতেছি অপলক আঁখে
উর্ধে তব অভয় ইজিত।
হে যাজ্ঞিক! যজ্ঞে তব পূর্ণাহতি আসিছে নিকটে
হুহু এলে হােমহতাশন,
কৰিব না কলুষিত মন্দীভূত সে অনলশিখা,
বৃথা অঞ করি বরিষণ।
তব শরশয্যা পাশে আসিয়াছি আজি শুরবর
লভিতে আশীষ কোলাকুলি,
লােকোত্তর বার্তা কহ জানিয়াছ যাহা ধ্যানযােগে
শিরে দাও তব পদধুলি।
করিয়া বিভুর পদে আপনারে সম্পূর্ণ সন্যাস,
ম্য জীব নহ তুমি আর,
আজি মহা সন্ধিক্ষণে শিষ্যে তৰ দীক্ষামন্ত্র দাও
জপি গিয়ে তাই বার বার।

বরণ
(বিজ্ঞানাচাৰ্য্য শ্ৰীযুক্ত প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের)
তােমারে গড়িল বিধি” তার পাদপখের পরিমলে,
রাখালরাজের অঙ্গে রজে নিমায়ের আঁখিজলে।
তােমার মাঝারে ধ্রুবের সাধনা
জনকের জ্ঞানগরিমার কণা
সকের পরাভক্তি উজলি ভীষ্মের তেজ জ্বলে।
হােমানল পাশে গুরুকুলবাসে কোন নৈমিষে পশি,
নিয়ে এলে জ্ঞান হে সুধী মহান, ঋষি-পদতলে বসি।
বিগত জনমে কোন ব্রজধামে
রাখালের দলে ছিলে কোন নামে ?
ত্যাগের মন্ত্র শিখে এলে তুমি কোন্ বােধিমতলে ?
সম্বৰ্ধনা
(স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায় মহােদমের)
দেশ জননীর দিগজয়ী সুত বঙ্গবাণীরে সঙ্গে করি,
পশপাশ হতে তুলে নিলে রথে সষতনে যারে হুস্তে ধরি।
বুঝেছ হে বুধ কি মহিমা রাজে
নিজ জননীর ক্ষুদকণা মাঝে ;
গৌরব নাহি পােষ্যতের শূন্য দম্ভে হৰ্ম পরি।
১৬

মহামিলনের রচিয়াছ সেতু,
পুরে জনপদে উড়ে জয়কেতু,
বিশ্ববাণীর মন্দিরে ভেরীদুন্দুভিনাদে বঙ্গ ভরি।
দাড়াও মূৰ্ত্ত তপঃফলসুম
সিদ্ধ সাধক নমােনমােনমঃ
দশের বন্ধু, দেশের ইন্দু, তমসাসিন্ধুতরণে তরী।
ইহাগচ্ছ
(অধ্যাপক বিনয়েন্দ্রনাথ সেনের শােকসভায় )
ওগাে পুরােহিত ফিরে এস হেথা বাণীর দেউলতলে,
বেলা বয়ে যায়, ধুপ দহে যায়, ঘৃত দীপ বৃথা জ্বলে।
জাগিতে উষা তেয়াগি শয়ন
ভকত করেছে কুসুম চয়ন
আশাপথ চাহি অযুত নয়ন চঞ্চল পলে পলে।
**
পিল হলাে হােমের অনল হবির পিয়াসা বহি,
পবনে-ক্ষুধিত মাল ফেলে শাল বহি হি।
দু’করে কুসুম চিনজল
ঈড়য়ে দুধারে সাধকের দল,
এত আয়ােজন করাে না বিফল ভাসায়াে না আঁখি জলে।
,
.

তপণ
( ঋষিকল্প গঙ্গাধর কবিরাজের স্মৃতিসভায় )
বাগেতার মানসতনয় পথ ভুলে এসেছিলে ভবে,
এই মহীমাঝে রেখে গেছ জ্ঞানবৈভবে গুরু গৌরবে।
দেহ আত্মার লাগি দুইকরে,
আনিলে ভেষজ ব্যাধিতের তরে,
একাধারে তুমি উদগাতা হােত জ্ঞানসলেরি উৎসবে।
সরজের পুণ্যমিলন,‘তােমারি জীবন ক্ষেত্রে,
রুশিবের শুভসঙ্গতি তােমার মানস নেত্রে।
জটাজালে ঝরে জাহ্নবী বারি
দেহ আত্মার পরােগহারী।
জলিল তােমার নয়নে বহ্নি জড়চেতনের মহাহবে।
দাশরথি
প্রাচ্যপ্রতীচ্যের আদিসঙ্গমের স্থলভবনে
দেশ পণ্ডিতেরা যবে ইলাে হােত জ্ঞানের হবনে,
দুয়ারে কাঙালী যারা জুটেছিল মলিনবদন,
তাদের বিদায়ভার কে তখন করিল গ্রহণ।
বিদেশী ভূষায় যবে যিমণ্ডিত ভারতী ইন্দি,
মন্দিরে বিকাতেছিল বিজাতীয় সাহিত্যদি,

মৃৎপাত্রে গােরসসুধা পল্লীবক্ষে কে করি দোহন
তাদের ভােগের লাগি পথে পথে করিল বহন ?
"নগরের সভামঞ্চে নবমন্ত্রে জয়জয়কার,
বৈষ্ণবক্তের দ্বনে পল্লীভুমি খায় ছারেখার,
তাহাদের রণক্ষেত্রে কে তুলিয়া সন্ধির পতাকা
অপূৰ্ব গীতার মন্ত্র বিধােযিল সখ্যশান্তিমাখা।
যত জ্ঞানগর্বিগণ অভিজাত্যসমুচ্চ সােপানে,
যখন রচিতেছিল শিক্ষাশালা ভিক্ষাঅভিমানে,
বঙ্গে মহামানবের আচার্যের দর্ভাসনখানি
কে তখন অধিকারি’ শুনাইল পরাতত্ববাণী ?
সেই তুমি মহাকবি,-এ বঙ্গের অন্তরঙ্গ কবি,
কাঙ্গালের কৃষকের অন্তরের আঁধারের রবি।
শত শত গুহকেরে দাশরথি, তুমি দিলে কোল
চামার চণ্ডাল সঙ্গে এক কণ্ঠে বলি হরিবােল।
কৃত্তিবাস
আজিকে তােমার ভক্তগণের এ শুভমিলনে তােমারে অনি,
তােমার খড়ম ফিরে পেলে আজ নৃত্য করি গাে শীর্ষে বরি।
হে কবিসাধক কোটিকোটি চুমে
পরমতীর্থ তব বাসভূমে
ধুতি পদরেণ, লুটাই এ তনু বিচরিলে তুমি যে ভিটা পরি।

বল্মীক গিরি হতে নরলােকে
ঝরিল গঙ্গা আদিকবি চোখে
আনিলে তা’হতে শাখাভাগীরথী বঙ্গে শ্যামলজীবনে ভরি।
জানিনাক তিস্মৃতিসংহিতা
বুঝিনা তন্ত্র দর্শন গীতা
চিনি শুধু • গুরু তােমারি পন্থা, তােমারি মন্ত্র বক্ষে ধরি।
নিত্য ঘূরিছ কুটীরে কুটীরে,
মুঢ় ভক্তের নয়নের নীরে,
মোদের সমাজসংসারগেহ চিরপূত করি রেখেছ গড়ি।
বাঙালী নারীর সতীসিতিমায়
নিষ্ঠা ভক্তি প্রীতিপ্রতিমায়
তােমার অমল কীর্তিগরিমা তুমি রেখে গেছ অমর করি।
নীলকণ্ঠ
জনমেছ মল্লীবনে, বল্লীবেণী পল্লীমা’র উল্লাসী দুলাল,
তব লীলানিকেতন অই পল্লী বৃন্দাবন। কদম্ব তমাল
প্রাবৃট অষুদপুঞ্জ, ফুল্লকুঞ্জ, ফুটাথুজ শ্যামসরােবর
তােমারে করেছে কবি, কুজনগুঞ্জনম নদীর
শিখাল গাহিতে তােমা। নগরের জনসংঘে চাওনি আসন
আদেশ ইঙ্গিতে রাজসংসদে করনি কভূ সারঙ্গ বাদন
তবু তুমি শ্রেষ্ঠ কবি। দেশবন্ধু বঙ্গমার অন্তরঙ্গ জন
অন্তরের প্রতিবাসী আড়ম্বরশূন্য কবি একান্ত আপন।
৩০

নীল.
যােগায়নি ভৃত্য তব নিত্য নিত্য কবিত্বের বৈচিত্র্যসম্ভার
তােমারি অনতলে চিরমুক্ত নিসর্গের সুষমা ভাণ্ডার।
নহ তুমি শিল্পীমাত্র, অনুশীলনের ফল করনি সঞ্চ,
মােমের কুসুম নহে গীতি তব, মেঠোফুল, সে যে মধুময়।
বিশ্বের ললাট ঘেরি কতবার ঘনঘটা ছেয়েছে প্রবল
চমকেনি তবু কভু তব কাব্যনভােনীল-চির অচঞ্চল।
জগতের জ্ঞানসত্রে মন্তোৎসবে করনিক তুমি যােগদান
একতারা করে ধরি নদীতীরে করিয়াছ হরিনাক গান।
মান’নি ভঙ্গি কোননা, ভজি তব ছন্দোরীতি অলঙ্কারহারা
অমণ্ডিত অঙ্গে তার তরঙ্গিত নৈসর্গিক মাধুরীর ধারা।
নাহি চন্দ্ররাজ্ঞীগণসম অঙ্গে অগণন ভূষণের ভার
নীলকণ্ঠপ্রিয়াসম আছে পূত সতীতেজোদৃপ্ত রূপ তার।
মহাসমিতির মাঝে গীতি তব শতকণ্ঠে হয়নি উদগীত
পাঠশালা, নাট্যশালা, রঙ্গমঞ্চ, তবকাব্যে হয়নি ধ্বনিত,
তবু তুমি শ্রেষ্ঠ কবি। শুনি মােরা ভক্তিভরে দিবস নিশীথে ,
তব গীতি বাটে মাঠে গােপীষন্ত্রে রাখালের বাঁশের বাঁশীতে,
পল্লীগােঠে হাটে ঘাটে ইক্ষুক্ষেত্রে জেলেদের তালডিজি’পরে
ওগাে কত? কণ্ঠ তব ছুটে চলে গ্রামান্তরে কাতারে প্রান্তরে।
কৰ্মশ্রান্ত কৃষকেরা ও গীতায়রে হয় ক্লান্তিশ্ৰান্তিহারা,
মাঠ হতে তব গানে পল্লীর প্রেমিক দেয় প্রেমিকারে সাড়া ।
সর্ব ভীতিহরা গীতি গাহি পান্থ প্রানপথে জানায় প্রবেশ
ভিখারীসম্বলধন দুরিল অন্তর হতে চিন্তাচেষ্টালেশ।

৫
ওগাে কণ্ঠ, কণ্ঠ তুমি বঙ্গমা’র, অকুণ্ঠিত মাল্যমণ্ডিত,
সহজ সরল পথ অন্তরের ক্ষরে বাহে আনন্দ অমৃত।
সমগ্র এ বঙ্গভূমে করিয়া রেখেছ চির চারু বৃন্দাবন,
কণ্ঠে কণ্ঠে নেচে ঘুরে বেণুকর নীলমণি নদের নন্দন।
নীলকণ্ঠ, মণ্ডিয়াছ শিখণ্ডকে শ্রীকৃষ্ণের মােহন চুড়ায়,
তােমার বিতত শিখাছত্র ছায়ে বঙ্গভূমি সতত জুড়ায়।
হে বিশ্বরাজার সভাগায়ক, চারণ কবি, অর্চি ও চরণ,
তােমার ক্ষয় সুরে শুনি আমি এ বলের বক্ষের পলন ?
শ্রীক্ষেত্ৰমঙ্গল
মহামিলনের ক্ষেত্র
হৃদকুমুদ ফুটে উঠে হেথা বিসয় আননেত্র।
অসীমের সনে অসীম মিশেছে, চেতন মিশেছে জড়ে,
দেউল মিলেছে গগনের গায় দেবতায় বুকে ধরে ॥
সি আকাশে অবিশ্রান্ত দিগন্তে কোলাকুলি,
মিলিয়াছে গেহ সন্ন্যাস সনে হৃদয় দুয়ার খুলি।
তপন নীরবে তেলোগৌরবে, মিশিছে লহরী বুকে,
ত্রিদিব নামিয়া বসুধা উঠিয়া চুমে হেথা মুখে মুখে।
মহামিলনের ক্ষেত্র
অনন্তে ছুটে অন্তর হেথা দিগন্তে ছুটে নে।
***
পরম প্রেমের রাজ্য
তানভক্তিতে হেথা মাখামাখি মিলে অর বাহ।

ঐক্ষেত্র অযুত কঠে বিবিধছন্দে একই মহাবাণী ছুটে হৃদয়ে হৃদয়ে হেথা নিমায়ের চরণকমল ফুটে। দীন-ধনবান নাহি ব্যবধান, মিলিতেছে গলাগলি, চাল দ্বিজ করিছে ভােজন, রচি প্রেমমণ্ডলী। সংসাহেথা প্রকৃতির সাথে প্রেমসঙ্গমে জুটে, বিবুধনরের মধুর মিলনে আনন্দগান উঠে। পরম প্রেমের রাজ্য মিলনােল্লাসে উৎসব করে হেথা অন্তরবাহ। খা নাহি সঙ্কোচবন্ধ- বাজিছে হৃদয়শখে শখে মুক্তিহরষছন। নহে কুষ্ঠিত। হিন্দুরি অবগুণ্ঠন ফেলি। বিলাসী হেথায় ব্যসন-বিরাগী ভূষণ রেখেছে ঠেলি। জড় জরা হেথা শৈশব সনে হয়েছে ঐকতানী হেথা যৌবন মুদিছে নয়ন যুক্ত করিয়া পাণি। ভক্তি এখানে মহাকীৰ্ত্তনে নাচিছে আপনহারা নিষ্ঠায় প্রেমে লুটিয়া পড়েছে নাস্তিক ছিল যারা। নাই যত বাধাব- সৃত নত হয় হেথা হৃদি শির নাহি অহমিকা গন্ধ। সকল দম্ভ চূর্ণ- আপন হীনতা দীনতার জ্ঞানে অন্তর পরিপূর্ণ।

পালট
ভুবনেশ্বর
.
( মন্ধির )
শান্ত তুজ হে দিব্যা দেবমন্দির,
জেগে আছ কত কাল তুলি উচ্চ শির।
তুমি বুঝি ছিলে আগে অনুচ্চ চঞ্চল
দেবতার ছত্ৰসম কোমল ধবল ?
কোটি কোটি সন্ধ্যারতি মঙ্গল বাজনা
পূজামন্ত্র, পুস্পাঞ্জলি, পুণ্য আরাধনা
তােমা ঘেরি ঘেরি লভি শিলার আকার
গড়িয়া তুলেছে চূড়া তােরণ প্রাকার।
ধ্যানমগ্ন শান্ত শত যােগর মহিমা
দেছে তােমা স্তব্ধ স্থির প্রশান্ত গরিমা।
ঘনীভূত ভক্তিপুঞ্জ অটল সুন্দর
করিয়াছ অবিচল সৌম্য মনােহর।
প্রাঙ্গণের তল তব যত হলাে ক্ষয়
লভিল ও দিব্যদেহ তত উপচয়।
.
( বিন্দুসরােবর)
বিমল সাত্বিক রসে পুণ্যপুলকিত
সাধকের অশ্রুবিন্দু হইয়া সঞ্চিত,
কত যুগ যুগ হতে ওগাে সরােবর
রচিয়া তুলেছে তােমা বিরাট সুন্দর।

गनायो
কোটি কোটি তীর্থযাত্রী করি প্রণিপাত
খনিয়া তুলেছে তােমা ওগাে পুণ্যখাত।
লক্ষকোটি সাধকের অর্ঘ্যপুসব
মধুর করেছে তােমা দিয়াছে সৌরভ।
সাধুর অমল রক্ত হৃদয় কোমল
প্রতিবিম্বে ফুটায়েছে রক্ত শতদল।
সতীর অলকস্পর্শে জেগেছে শৈবাল
তার শুভ্র শীতে ছুটেছে মরাল।
পুঞ্জ পুঞ্জ পুস্পাঞ্জলি অর্থনিবেদন
তব বক্ষে মন্দিরের করেছে সৃজন।
".
প্যালামৌ
২৫
ঐ যে গিরির পরে শােভিছে গিরি
তমাল পিয়াল বনে রয়েছে ঘিরি ।
উঠে যেন দিক শেষে
ধোয়ার মতন ভেসে
লােক দেশের পথে সাজান সিড়ি।
স্বপনপুরীটি উহা মায়ার গড়া,
পালকদুলানাে শত পরীতে ভরা।
কাছে ভাবি যাও যত,
আরো দূর দূর কত
পথিকলােপচিঠিপাগলকরা

পট
যেখানে আঙুল দিয়ে বালুক খুড়ে
জলপান করে লােক আঁজুল পূরে।
বে নদী কানাে মরা
দেখিবে দুকূপভরা
পার হয়ে কিছু পরে আসিতে ঘুরে।
পাষাণ চিরিয়া যথা ফোয়ারা ঝরে,
কোলবালা সাজে যথা সিনান করে।
একামরে দুহাত দিয়ে
নারী ফেরে জল নিয়ে
তিনটা গাগরী রাখি মাথার পরে।
কালাে পাথরের ছবি নিখুত হেন
কিশােরী চলেছে ছুটে যমুনা যেন,
কে বলিবে ঝোপে ঝাড়ে
উজান বহাতে তারে
বাঁশরীটি বারে বারে বাজিছে কেন?
আপনার বাহুবল, প্রাণের প্রভু,
তরুণী এ দুটী সার ভুলেনা কভু,
পতিরে বিঁধিবে যাহা
বুক পাতি লয় তাহা
প্রেম সে মাতাল বটে অটল তবু।
বল্পীৰলয় পরে বালক বাল.
গলে শােভে ণীল স্ফটিকমালা।
পাখীর পালক চুলে,
বনমালা বুকে দুলে
মহুয়ার ছায়াতলে নাট্যশালা।
.

প্যানে
মহুয়ার মদে চোখ ঘােরালাে ভারি
চলেছে কোলের যুবা ধনুকধারী
ভালুকে রিয়া কাণে
গুহা হতে টেনে আনে
• বালক ঝাঁপায়ে পড়ে পৃষ্ঠে তারি।
চকিত চটুল মৃগ আয়ত আঁখি
ছুটেছে পিয়ালরেণু গায়েতে মাখি।
রঙীন স্বপন আঁকা
শিথীরা ছড়ায় পাখা
একসাথে ধরে তান হাজার পাখী।
মহুয়ার ফুলে সুরা চুয়ে পড়ে
মাদলে শিরীষ ফুল বাদল ঝরে।
দাড়ালে বকুল মূলে
পা’দুখানি ডুবে ফুলে
রূপঅভিমানে নীপ শিহরি মরে।
;
জ্যোছনা তটিনী তটে ফিনিক ফুটে,
মাণিক উজলে বনরাণীর মুঠে;
এলায়ে চিকন চুল :
দু’কানে রতন দুল
জোনাকীচুমকি দেওয়া আঁচল লুটে।
ঐযে গিরির পরে শােভিছে গিরি
ভাসাভাসা ধোয়া ধোয়া কুহেলি ঘিরি,
নাগবালাদের দেশে
নিয়ে যায় দুতী এসে
ঐ খানে আছে তার সুড়ং সিড়ি।
১৯

বর্ধমানে
হেথা, কাশীরাম অমৃত সমান প্রচারিল মহাজতেমা,
বাঙালী জাতির একাধারে শ্রুতি ইতিহাস অতিপুরাণতন্ত্র
হেথা দাশরথি কবি মহামতি পল্লীগীতার ললিত ছন্দে,
শক্তিভক্তিউপাসক দলে যুক্ত করল মিলনবন্ধে,
প্রেমের গোঁসাই ঠাকুর নিমাই লভিল হেথায়ই বিরাগ দীক্ষা,
লােচন কণ্ঠ ভাবগদগদ পথে করে অবমােচন ভিক্ষা।
কবি নরহরি গােবিন্দ সতরঙ্গে ডুবাল বলে,
ভক্তিপাগল কমলাকান্ত নৃত্যে মাতিল খামার সঙ্গে।
এল সুবীগণ এ মিলনমঠে বঙ্গমাতার পুণ্যক্ষেত্রে
চাহ ভারতীর আরতিআলােকে ভকতিয়ত নলিননেত্রে।
বঙ্গবাণীর দারুতখানি সােণা করি দিল ভারতচন্দ্র,
দিল মুকুল কামরে ঝাঝরে সন্ধ্যাঙ্গাতে আরতি মন্ত্র।
হেথা রঘুনাথ চুতনা আর না রচিয়া খামাভজন নিত্য,
কবি বনাম দিল ধর্মমঙ্গল গানে অমৃত বিত্ত।
হরিকীর্তনে পুলকঞ্চিত হেথাকার প্রতি বিটপী বল্লী
অযুত কুবির ক মুখ ফিরসভা নগরপল্লী।
সাধুদরবেশ কোটি বাউলের পদধূলি হেথা করল সখ্য,
নরপতি হেথা বিত্তের মাঝে ছাড়েনি নিত্য বলে লক্ষ্য।
এ সুধীগণ এ মিলনমঠে বঙ্গমাতার পুণ্যক্ষেত্রে,
চাহ ভারতীর আরতিআলােকে ভকতিয়ত নলিননেত্রে।
.
১৯

মহানৱী তীরে
ছিল একদিন রমার চরণে ঝরিত হেথায় রতন চু,
সােনাফলা ক্ষেত, মণিভরা খনি, পয়স্বিনীতে গোগৃহ পূর্ণ।
নােগে শােকে আজ দৈন্য দুঃখে দহে রাক্ষসী জীবন হী,
অত্যুতে বিজড়িত তবু বুকু হতে আজো ছাড়িনি তন্ত্রী।
এসহে মনিষি, কবি জ্ঞানী ঋষি, একপরশে জাগায়ে সুপ্তে,
বাঁচায়ে আবার বাহার মন্ত্রে ভস্মগুপ্তে, নিহিত লুপ্তে।
আজিকে কাঙাল বিছরের গৃহে লভি আতিথ্য নীবার মুক্তি
ভক্তবিরাগী ভিখারীর দেশে লভিতে হইবে অপার তুষ্টি
এস সুধীগণ এ মিলনমঠে বঙ্গমাতার পুণ্যক্ষেত্রে
চাহ ভারতীর আরতিআলােক ভকতি আয়ত নলিন নেবে।
মহানদী তীরে
":
(নিদাঘে )
বড় আশা করে আজি আসিয়াছি চিরহমাদুর,
মহানদী, তব জলে তৃঞ্চান্না করিবারে দর।
বড় সাধ ছিল এই রুক্ষ আঁখিযুগ ফিরে ।
অশেষ অপরিমেয় বারিরাশি তব, নিৰ পিরে।
কত পিপাসিত নিশি কল্পনায় ভেঙেছি গড়েছি
অকুল সাগর সম চিপটে চিত্রিত করেছি।
গী মধ্যে রাজীগণ্যা মহামান্য তুমি মহানবী
ভেবেছিঃ তপ্ততৃষা বাবে চলে দেখা পাই যদি।

পুট
কিন্তু দেবি একি দেখি ধুধু শুধু বালুকার রাশি,
তৃষ্ণাহয় কোথা শান্তি কোথা তব শোৰ্য্য কান্তি হাসি?
মূর্তিমতী তৃষ্ণা তুমি গুফকা ধ্রুব ভিখারিণী,
দাউ দাউ জ্বলে জ্বালা-মৃগতৃষা অনলবাহিনী
সর্বগ্রাসী সিন্ধুশােষী তৃষা তব, অগস্ত্যের তৃষ',
কোথা আসিয়াছি আমি দেশে দেশে ঘুরি দিবানিশা।
বড় আজ দিনু লাজ প্রার্থী হয়ে ওগাে মনস্বিনি,
এবে নিঃস্থ তপস্বিনী তুমি দেৰি আগে তা জানিনি।
অতিদানরিক্ত তুমি ফিরাবেকি তুমি প্রার্থিজন ?
মৃৎপাত্রে আতিথ্য বয়ে আনিবেনা রঘুর মতন।
তুমি অন্নপূর্ণ, শুনি আসিলাম তোমার সকাশ
কিন্তু একি মূৰ্ত্তি তব ? এ ক্ষুধিতে করিলে হতাশ।
শ্মশানবাসিনী তুমি, অট্টহাস্য মুখে থল থল
কালভস্মমুষ্টি ভিক্ষা দিতে তােমার সম্বল।
ধামশ্রেণী
পাটের দেশে মাঠের মাঝে পুণ্যপীঠে শান্তিমঠ,
ধূ-ধুকরা রৌদ্র মাঝে হেথায় হেরি বিবট।
বংশৰেতসবনের দেশে হেথায় জাগে তুলসীবন
চম্পাজবা অশােকশিরে ভক্তিদেবীর সিংহাসন।
নজরা ক্লেপৰু মাঝে হেথায় ফুটে পদ্মচম,
পাটের পূতিগন্ধ ছাপি’ হেথায় ধুপের গন্ধ বয়।
---
;
১১২

আজকে হেথায় ভাঙাদেউল নাই কলরব কোলাহল,
নিত্য দানসত্ৰ কোথা শাস্ত্র বিচার অনর্গল ?
তবু হেথায় কে রেখেছে নরদেবীর পুণ্য নাম।
এখনাে
কে জানায় এ যে গজ্যাতিষের তীর্থধাম।
অনলজলে কাননবাসে হয়নি যেমন পরাভূত,
হবিগুণগানের গরব ছাড়েনিক রাজার সুত,
কালের প্রখর বজ্রমুখ কাটল হাজার ঝঙ্কারাতি
আজো হেথায় শঙ্খ বাজে, অলছে পূত বিয়ের বাতি।
দেড়শো বছর আগে হেথায়, না-না, তারাে অনেক আগে,
দেবীর বােধনমন্ত্রে হেথায় প্রথম জগদম্বা জাগে।
ভক্তহাজার জুটত রাজার দেব দেউলের উঠান মাৰে,
পুণ্যারতির বাজনা শুনে পড়ত লুটে বিহান সাজে।
পণ্ডিতেরা দান পেয়েছে পরগণাকে-পরগণা
জুড়ায়েছে দৈন্যখিন্ন অভাবের যন্ত্রণা।
হাজার দ্বিজের চরণধূলি এই আঙ্গিনার ধুলির সাথে
পবিত্রতার জন্মভূমে রােমাঞ্চিছে দিবস রাতে।
হাজার দ্বিজ পেত হেথায় চিত্ত ভরি নিত্যসেবা
হাস্যবদন ছাড়া হেথায় ফিরেছিল প্রার্থী কে ?
উঠত হাজার ধেনুর দুধের দোহনমুখর মূচ্ছনা
বৈতালিকে সন্ধ্যাতে গাইত দেবীর বন্দনা।
সন্ন্যাসীরা,হেথায় এসে ধুনী জেলে কত ডেরা,
দুয়ার দুয়ার ফিরত না আর দেশের যত ভিক্ষুকেরা।

পর্ণ
বারাে মাসে তের পরব হতো,হেথায় মহােৎসবে;
একশ’ ঢাকে কঁপাইত দিগদিগন্ত বস্ত্র রবে।
দ্বিজের পাতের প্রসাদ পেয়ে, লক্ষ জীবন রইত জিয়ে
রুগ্নজনে নীরােগ হকো দেবীর পদামৃত পিয়ে।
বিত্ত মাঝেও চিত্ত তােমার সত্যধনে চিনূলাে সতী,
নিত্যভূমানন্দময়ী তাই তুমি ম সত্যবতী।
প্রসাতলে রয়েও তুমি ধ্রুবের প্রসাদ ভিখাবণী ।
ভূধররাজের কন্যা যেন ফঠোর তপের তপস্বিনী !
ভােগের কুসুম কানন মাঝে রইলে তুমি তুঙ্গী হয়ে
বিষয়-বিষের সায়র হ’তে কুন্তে সুধা আলে ব’য়ে।
লক্ষ্মী হয়ে ভিক্ষা মাগ’ দক্ষায়ণীর চরণতলে।
ভাসলাে রজত গজপতি তােমার নয়নগঙ্গাজলে।
ই গাহে নান্দী তােমার শাশ্বতসবিন্দু মাগি
বন্ধবসন সার করেছ সর্বত্যাগী প্রিয়ের লাগি।
কবে তােমার হারটি হীরার হলাে হজপের মালা ?
রতন লয় হলাে কবে অপরাজিতার লতার বালা?
জানি না কোন্ অরুণ তেজে পঙ্কমাঝে উঠলে ফুটি
কবে ধনের তুঙ্গমে সিন্ধুজলে পড়লোলুটি।
কবে তুমি মেললে অাখি প্রথম তপস্বিনীর সাজে,
সীতা যেমন মেললাে নয়ন সঙ্কুচিত অগ্নিমাঝে।

ধামশেণী
কবে তােমার চিকন চিকুৰ চমকিল জটার পাকে?
মায়ের চরণ-অরুণ-কিরণ পড়লাে বাতায়নের ফাকে।
কবে তুমি প্রথম, দেবি নিলে সব ভবন বাতি
খামা-মায়ের সেবার লাগি করলে জীবন আমারাতি।
অমানিশার দীপান্বিতায় জলছে যবে অনিত্যতা,
তােমা সখী খামামায়ের সঙ্গে তখন কই কথা।
তারা দেবীর বেদীর পাশে দাড়াবে কোন্ বীরাঙ্গনা?
গটি তার আলিন্সিয়া সইবে কে তার উন্মাদনা ?
ভােগবিলাসের উরস পরে নৃত্য করে এলােকেশ,
পিয়ে রুধির ছিড়ছে অধীর লােল লালসার মাংসপেশী ।
বক্ষে ধরে অট্টহাসের বজ্রজাল বিদ্যুতেরে,
ভয়ের আশীষ তুমি হাত হতে তার নি কেড়ে।
পুত্রহীনা অনাথমাতা-মাতা তুমি সবার ঘরে,
নয়নতারা নিদ্রাহারা লক্ষ মুতের শিয়র পরে।
পূণ্য বুকের স্তন্য তব দুইটি মুখে হয়নি সারা
হরজটারণ্য হতে ঝরল যেন গঙ্গাধারা ও
বশিষ্ঠেরই মতন গুরু-ধন্য গুরুর শিষ্যা তুমি
তােমার বিভব-দানের ভয়ে সার করে যে কাননভূমি।
জনক তােমার জনক যেন-বিগত যার বিষয় তৃষা
রঘুনাথের হৃদয়রবিশ্বজনে দেখাও দিশা।
পতির কানন বাসে তুমি পাওনি দেবী থাকতে সাথে,
মিলন তব তাঁহার সাথে হল নাক এই ধরাতে।

দৈহিকতার সব আয়োজন সমপিলে তার নামে
একেবারে মিলে গিয়ে ধরার পারে গােলােকধার্মে।
লক্ষ তােমার দুঃখী মুতের ভার দিলে যে সখীৱ কৰে,
ঐহিকতায় নিঃস্পৃহতা তার মত কার আত্মা:ধরে,
তপনসুত আপন ধরা দিল যেমন জাহবীরে।
জাগরু পাবন দানের সত্র যুক্তবেণীর তীরে তীরে।
ঐ মিলনের তীর্থ-প্রয়াগ বঙ্গভূমি শীর্ষে বয়,
বঙ্গবাসী পুণ্য নীরে আজো নেয়ে ধন্য হয়।
ত্রিস্রোতার এই ওফ তীরে গড়লে নূতন বারাণসী,
অহির বনে হরের ভালৈ উজলিলে খণ্ডশশী।
মা, তােমাদের পুণ্যবলে এখনাে দেশ বেঁচে আছে।
সকল দেশের নারীর মাথা প্রণত ওই পায়ের কাছে।
সুরুচিরা দেখুক চাহি ধ্রুবমাতার তপের বল
কাদম্বরী দেখুক আহা মহাশ্বেতার জপের ফল।
মিথ্যা ভােগের মােহের কূপে দেখুক যত ভাগ্যবতী
সত্যনিধি বক্ষে কর সাধ্বী সতী সত্যবতী।
আজো ভাঙা এই দেউলে জাগছে জপের প্রতিধ্বনি,
শিকার তলে আছে বুঝি শুচিশীলার পুণ্যখনি।
এই রজসে প্রেম হরষে তুমি যে মা পড়লে লুটে।
এই আঙিনার পঙ্কে তােমার চরণ কমল রইত ফুটে।
পারিজাতের গন্ধ যেন পাইগাে হেথা পথে পথে
এখনো কি দেবতার সব আনাগােনা করেন রথে।
১১৬

শ্রেণ
ফেলতে চরণ ভক্তিভয়ে, শিউরে কেন উঠি ভরে
তড়িৎ ছুটে শিরায় শিরায় রােমাঞ্চনে অঙ্গ ভরে।
এ আমে ব্যাধের হাতে পড়েছে খসে ধনুর্বাণ ।
দৈত্য-হৃদি ভক্তিভরে করছে নমি আত্মদান!
পাষণ্ডের এ পাষাণ চোখে মলয়জের রসটা কেন ?
ক্ষণেক তরে শিথিল হ’ল স্মৃতির মােহপাশটা যেন।
ক্ষণকালের ঘনিষ্ঠতায় পশুর বুকে এত মায়া ?
এ কি ক্ষণিক মরীচিকা? মরুর মাঝে তরুর ছায়া
পুত্রহারা প্রসূতির এ ক্ষণিক সুস্থ স্বপন না কি?
শশাকের পাথার আসবে ফিরে মেললে পরে আবার আখি ?
মিথ্যাকে জন্ম লভি মিথ্যাটাতেই মজল মতি ;
সত্যটাকেই মিথ্যা ভাবি, হায় জননী সত্যবতী!
।
আয় রে হেথা আয় ছুটে আয় হায়রে বিষয়-বিষের কীট,
ফেলে মাথার পাটের বােঝা কয়লা লােহ পাথর ইট,
আয়রে পথিক পাড়া হেথায় নাগকেশরের শীতল ছায়,
ভূষণ খুলি ধূসর ধূলি মাখরে হেথা সকল গায় ;
সতীর পায়ে শান্ত শীতল হেথায় প্রতি পরমাণু,
নিষেতরে নিভা হেথায় ততৃষার সব কৃশানু
প্রসাদলের জলের সাথে মিশারে তাের চক্ষুল
মেলরে সাঁঝের শয়তানে কুঞ্চিত তাের রক্ষোদল !
করুশ জাখির অ হেথায়, তরুণ অরুণ জবা ফুটে,
আত্মহারা আবেগ হেথায়, ধূপের সুৰা শিখায় উঠে।

পর্ণল
হেথায় কিছু হারায়নাক, স্বর্গপথে সবার গতি
হাত দুখানি বাড়াইয়া রয়েছে মা পুণ্যবতী।
চিকাঙাল আয়রে নৃপাল আয়রে ধনের অভিমানী
বিদ্যামদে মত্ত পুরুষ, আরে পরুষহৃদয় জ্ঞানী।
ধন্য হরে হেরে হেথায় ত্রিদিবধরার পুণ্যসেতু,
হিন্দুসতীর চরণতলে লুটা তােদের বিজয়কেতু।
ধৰ্ম্মক্ষেত্র
অঙ্গ যাহার চিমন্দির, দেবদেবীবেদী অদ্রি রাজি,
পূজার পাদ্য নদীর কোশায়, কেদার কানন অর্ধসাজি।
কুজনে গুঞ্জে জীমূতমন্ত্রে কীচককুঞ্জ বন্ধু রবে-
সদা সিন্ধুর দুন্দুভি-নাদে যে করে আরতি মহােসৰে?
গৃহ প্রাঙ্গণ ঘাট বাট ভরা শুষ্ক প্রসাদী ফুলের শুপে,
চন্দনবসুধাৱা, আলিপনা, দর্ভারী, দগ্ধধূপে।
যাগ যােগ জপে, জ্ঞানধ্যান তপে প্ৰতি রেণুকণা পাবনীত,
যাহার মাটিতে হাঁটিতে সতত ভৰভয়ে ত কণ্টকিত।
সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র ভারতমাতার কর্মভূমি
ধন্ঠ জনম যাহার জীবন-মরণশরণয়ণ চুমি।
গােনথায় রেখেছে বঁাচারে তাপসের তপ, দেবের বাগ,
নৃপের ঋদ্ধি-ননীর রূপে লতেছে শ্রদ্ধা সে ভাগ।
১১৮

पटिया
নীবার দর্ড লভিয়া শ্বাপদ যজ্ঞ প্রহরী হয়েছে বনে,
আশ্রমশিশু বিক্ৰমে দমি যথা সিংহের দশন গণে।
বংশীধারীরে নাচিয়া নাচায় ফণী আপনার ফণার পরে
রচে দেবতার কৃত্তি-মেখলা, সিন্ধুশয্যা, ছত্র ধরে।
‘শাখামৃগ যথা সতীর ভক্ত, রথীর রথের চুড়ায় রহে
দেবীপাদপীঠ কেশরীর শির, মকর পতিতপাবনী বহে।
সে যে গাে আমার ধৰ্ম্মক্ষেত্র ভারতমাতার কর্মভূমি
ধন্য জনম যাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি।
দেবের ব্যজনে সাধের পুচ্ছ দিয়াছে যথায় চমরবধূ
তুচ্ছ জীবন করেছে উচ্চ মধুমক্ষিকা বিতরি মধু।
মধুমৃগমদগন্ধবিনােদে বলে দেবীরে গন্ধসায়,
দ্বিরদ কুম্ভ, শুক্তি মৰ্ম্ম, বিদারি দিয়াছে মুক্তাহার।
দিল কুঙ্কুম সিন্দুররাগ পাষাণ মৰ্ম্মট ভেদি
কুশশমী নিজ হৃৎপঞ্জরে পিঙ্গল করে যজ্ঞবেদী।
কীট কোথা দিয়া হৃদয়তন্তু ভূষিয়াছে মায়ে চীনাংশুকে,
চরণামুজ, বঙ্গোধির-লাক্ষাধারায় রক্তে সুখে।
সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র ভারতমাতার কর্মভূমি
ধন্য জনম যাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি।
“কৃষ্ণ কৃষ্ণ নাম রাম* বিনা শুকমুখে নাই অন্য বুলি,
ক্রৌঞ্চ আপন বক্ষের ক্ষতে রামায়ণী ধারা দিয়াছে খুলি।
তিভিরি কোথা বসি আশ্রমে উপনিষদের বার্তা কয়
কৃতকপুত্র কলাপী করেছে শিশুর চিত্ত হয়।

অটবী পেলেছে যােগী সন্ন্যাসী অশােক বি বটের ছায়
হােমধুমজালে ললাট মলিন, কুসুমলােহিত লােচনে চায়।
যথা বলে অক্ষ মালায় ভৃঙ্গারে রহে বৃক্ষ সাজি’,
ক্ষণে ক্ষণে যার তনু রােমাঞ্চে পুলকাঞ্চিত মুকুল রাজি।
সে যে গাে আমার ধৰ্ম্মক্ষেত্র ভারতমাতার কর্মভূমি,
যন্ত জনম যাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি।
দারু তৃণ চারুশিলায় মিলিয়া যথা দিল দেবে গন্ধরস,
দেবতাদেউলে দহি। ভেছে ধূপগুগগুলু অমর যশ।
গােময় করেছে নিরাময় শুচি লক্ষ্মী-মায়ের আঙিনাতল,
দেবশােভা লাগি কোথা ফুটে ফুল দেবসেবা লাগি জনমে ফল।
আশীষ কোথায় দূর্বার মঙ্গলমৃৎ মৃগয়ােচনা ?
ধায় কোথায় ইন্দিরা মার অঞ্চলঝরা কণক-কণা?
বৈশাখী ঝারা গঙ্গার ধারা তৰুদেবতার অঙ্গে ঢালে,
তুলসী-কুঞ্জ শুভাশিষ-বাণী গুঞ্জরে মহাযাত্রাকালে।
সে যে গাে আমার ধর্মকে ভারতমাতার কর্মভূমি
থষ্ণ জনম বাহার জীবন মরণ শরণ চরণ চুমি।
রেগের ঘাটে নিতি খেয়া দিতে সুরধুনীমায়ে রেখেছে কেবা?
কোথায় সিনানে মােক্ষলা সরযু, কাবেরী, তমসা, রেবা।
আলােকাম জড়ের শীর্ষ ঋষির চরণে ছোঁয়ায় শিলা,
"জগজ্জননী করে লিকুটমনঃশিলায় তনয়ালীলা।

সার্বিক মসে পুলকাঙ্কুরসঞ্চার সম ভক্ত দেহে
শতেক তীর্থ, মঙ্গল পীঠ জাগিয়া উঠিল কাহার গৃেহে ?
অস্তাধিকার ককণ্ঠে সন্ধ্যা প্রভাতে ঘােখিছে জয়,
ৰাগসম্ভব অম্বুদ কোথা ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে বন্দী রয়।
সেযে গাে আমার কর্মক্ষেত্র ভারতমাতার রুম্মভূমি
ধন্ত জনম যাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি।
ব্রাহ্মী উষায় জাগিয়া কোথায় মঙ্গলারতি শতানে,
নমে নরনারী ভক্তিবিভাের রক্ত তরুণ অরুণ পানে।
মানপথ হতে সিক্ত বসনে ডেকে আনে গৃহী অনাথজনে।
অর্পণ করে পণবারি স্বৰ্গত যত পিতৃগণে।
পঞ্চযজ্ঞ সমাপিয়া কোথা অতিথি দেবতা তুষিয়া নিতি
দিবসের শেষে আমিষশূন্য হবিষাগ্রহণ রীতি?
সাধিয়া নিত্য সন্ধ্যাকৃত্য সুপ্তি কোথায় ক্লান্তিহরা?
নৃপ পালঙ্কে স্বপ্নে নেহারে জটাবদ ধরা।
সে যে গাে আমার কর্মক্ষেত্র ভারত মাতার কর্মভূমি
বন্য জনম যাহার জীবনমরণশর চরণ চুমি।
নিশাতমঃ দুর আরতি আলােকে ভােজ্য কোথায় পূজার ভােগ
দেউলসোপান শষ্যা কোথায় চরণামৃত বিনাশে রােগ।
হরিনাম লেখাতিলই ভূশ, তীর্থের ধুলি অঙ্গরাগ ।
গাহপত্য মরণের চিতা সেই অনলেই নিত্য যাগ।
পূজাফুলে দিন গণে বিরহিনী হরি বলি মেলে দীর্ঘশ্বাস,
তনয়ের নাম রাখে কোথা গৃহী বিন্দুর চরণ, মায়ের দাস

পাট
জননী কোথায় অন্নপূর্ণা জনক শ্মশানে বিরাগী যোগী,
কোথা অপত্য ইহ পরত্র মহামিলনের সুফল ভােগী।
সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র ভারতমাতার কর্মভূমি
জন্য জনম যাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি।
মঠ-মন্দির প্রতিমা গঠনে পরিকল্পিত শিল্প যার,
ভক্তি অনীহার ধৌত যার সঙ্গীতকুসুমহার।
যার সাহিত্য সতীর সতের সত্যশূরের করেছে সেবা,
ধ্রুববাণী ছাড়া অন্য বারতা ইতিহাসে লিখে রাখেনি ষেবা।
গৃহীর ভক্তি সাধুর সাধন মিলিয়া যােগীর জ্ঞানের সাথে
শিলা বিগ্রহে দারু-পুত্তলে জাগ্রত করে জগন্নাথে।
জননী জানিয়া গৃহে গৃহে গৃহী পূজে নির্ভয়ে রুদ্রানীরে,
হেরি রুদ্রের দক্ষিণ মুখ, শিহরেনা ডরে, দাঁড়ায়ে ঘিরে।
সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র ভারতমাতার কর্মভূমি
ধন্ত জনম যাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি।
কৰ্ম্মে যাহার শুধু অধিকার বিভুপদে সপা কৰ্ম্মফল।
মরণ-মিথ্যা, অমত্মার সেত নববাস পরার ছল।
মােহ-মেঘে প্রেম রহিলে মগন নিখিল-ভুবন বিরিয়া,
অভিশাপ আসে উদ্যত জটা বিদুচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া।
পতির চিতায় যথা শােয় নারী নিখিল পয়রে মা হয়ে জাগে
ব্রহ্মচারিণী ব্ৰহ্মবাদিনী শাশ্বত বিনা কিছু না মাগে।
এ নরজন প্রােষিত জীবন, ভােগসুখ, পুতি পিশিতক্লেদ,
গৃহদাহে দ্বিজ আসব ফেলি খুজে ফিরে নিজ যজুর্বেদ।
১২২
w

সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র ভারত মাতার কর্মভূমি, ধন্য জনম যাহার জীবনমরণশরণ চর চুমি। •ধর্মাচরণে পরিণয় কোথা উজলিতে কুল কোথায় গত বর্জন করে অর্জন কোথা, আন মার্জনা, হইতে পুত? কৰ্ম্মবলের লাগি যৌবন অতিথির তরে কোথায় গেহ ? পুনর্জন্ম জিনিতে জনম, আত্মার লাগি কোথায় দেহ। যােগের লাগিয়া স্বাস্থ্য স্বস্তি তপের লাগিয়া কঠোর বােগ শুধু প্রবৃত্তি পরিপাক তরে নিবৃত্তিমুখী অভির ভােগ। পৰ্জ্জুন্যের প্রসাদের লাগি হমানলে দেয় আহুতি হােত- তরুণশক্তি লভি জন্মিতে ইচ্ছামরণবরণ কোথা? সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র ভারত মাতার কর্মভূমি ধন্য জনম যাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি। যথা তপঃকশ ঋষি শিষ্যের ক্ষীণ তর্জনী লেন ভরে, বুথীর কিরীট উদ্ধতবাজি উদ্যত অসি নমিয়া পড়ে। আর্ভে তরিতে সত্যে সেবিতে ক্ষাত্রশক্তি অস্ত্র ধরে, শির হতে পারে বড় গণি প্রাণ সপে প্রাণাধিক ব্রতের 'ত। নৃপতি যথায় প্রকৃতির পিতা, জনক শুধুই জন্ম হেতু। প্রাসাদ অটৰী এপার ওপার মাঝখানে চির ত্যাগের সেতু। যথা ভিখারীর ক্ষুদের লাগিয়া বাধা ভগবান কুটীয় রে, দৈন্য যথায় মধ্যমাণিক লক্ষ নিধির কণ্ঠহারে। সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র ভারত মাতার কর্মভূমি ধন্য জনম যাহার জীবনমরণশৱ চরণ চুমি।

দুধল নিগ্ধ দিঠিতে কে করায় নিতি মােদের স্নান,
কূলেকুলে ভরা মেহ তটিনীর কুলুলু তানে জুড়ায় কাণ?
শুন্যের সহ কে দেয় কণ্ঠে পাপতাপহর হরির নাম,
আশিস কাহার বরের সমান করে গাে পুর্ণ মনস্কাম।
শিখায় ক্ষমিতে চির বৈরীরে, বীরবৈরী নমিতে পায়।
তীর্থপথের ধূলি তুলি লয়ে কে দেয় মাখায়ে সবার গায়?
অঞ্জলি দেয় কুসুমে ভরিয়া প্রণিপাতে দেয় নােয়ায়ে শির,
বঙ্গ ভরায় মােক্ষ আশায় চক্ষে ঝরা ভক্তিনীর।
সে যে গাে আমার ধর্মক্ষেত্র, ভারত মাতার কর্ম ভূমি
ধন্য জনম বাহার জীবনমরণশরণ চরণ চুমি।
১২৪

শ্ৰীযুক্ত কালিদাস রায় প্রণীত গৃস্থাবলী সম্বন্ধে কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথ বলেন- “তােমার কবিতা বাংলাদেশের মাটির মতই স্নিগ্ধ ও শ্যামল। বাংলা দেশের প্রতি গভীর ভালসায় তােমার মনটি কানায় কানায় তা—সেই ভালবাসার উচ্ছলিত ধারায় তােমার কাব্য-কানন সরস হইয়া কোথাও বা মেদুর কোথাও বা প্রফুল্ল হইয়া উঠিয়াছে। তােমার এই কাব্যগুলি পড়িলে বাংলার ছায়াশীতল নিভৃত আঙিনার তুলসীমঞ্চ ও মাধবীকুঞ্জ মনে পড়ে। ঋতুমঙ্গল। মূল্য ॥d-বাঁধা ১১ পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই, এ পরীক্ষায় পাঠ্যরূপে নির্দিষ্ট। প্রবাসীর মন্তব্য ষড়ঋতুর বিচিত্র বিলাসলীলা, রূপবৈচিত্র্য ও সম্পদ সম্ভারের বিশেষত্ব অবলম্বন করিয়া বহু খণ্ড কবিতার সমষ্টি এই ঋতুমঙ্গল। কৰি বিচিত্র ছন্দের কবিতায় প্রকৃতির ষড়ঋতুর বিশেষত্বের সহিত বঙ্গবাসীর হৃদয়ের যােগ সাধন করিয়া দিয়াছেন। যারা প্রকৃতির বিচিত্রতার মধ্যে মানব মনের ভাব ঐশ্বর্যের ওতপ্রােত আদান প্রদান অনুভব করিতে চান তারা ঋতুসংহার রচয়িতা মহাকবি কালিদাসের চুরণাঙ্কামুসারী এই কৰি কালিদাসের ঋতুমঙ্গল পাঠ করিয়া আনন্দিত হইবেন। প্রবাসী, বল্লী মুল্য ॥ বাধাদ কবির ‘কুন্দ’ ও ‘কিসলয় একত্রে ২য় সংস্করণে বল্লরী। প্রবাসীর মন্তব্য—খুব দক্ষ কারুকর ভিন্ন এই শ্রেণীর Epigrammatic poem সাফল্য লাভ করিতে পারে না নবীন। কবি এই কঠিন পরীক্ষায় সগৌরবে উত্তীর্ণ। অধিকাংশ কবিতাই কবিত্বসংযােগে রসমধুর।” ভারতীর মন্তব্য- কবিতাগুলির অধিকাংশই ভাবে নিগ্ধ, ভাষায় সুন, ঝঙ্কারে রমণীয়, ছন্দের অপূর্ব লীলায় মনােহর। শব্দচয়নেও লেখকের দক্ষতা অপূর্ব। এই তরুণ কবির কলঝঙ্কারে এমন একটা আন্তরিকতা আছে যে প্রাণের তার সে ঝঙ্কারে সঘন স্পন্দিত হইয়া উঠে। বসুমতী-বল্লরী সম্বন্ধে কবিয় কথাতেই বলি- ‘মুক্তামালার ফাঁকে ফাঁকে যেন নীলমণিগুলি বাজে, ইন্দীবনের শােভা যেন শ্বেতপদ্মের মাঝে মাঝে। যেন ছায়ালীন চন্দ্র আলোেক আঁধার বক্ষে আঁকা, হরিচন্দন রচনার সাথে যেন কালাগুরুমাখা।” ব্রজবেণু-মুল্য ॥• আনা, বাঁধা ১১ কৰিবর শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ রায় চৌধুরী বলেন- তােমার বেণু মরমে পশিল গাে আকুল করিল মাের প্রাণ।” আধুনিক কবিকুলে তুমিই একমাত্র ব্রজকবি, তােমার বিশেষত্ব,-তুমি বুকের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড দেখিয়াছ। ধর্মকে এমন কর্মজগতের উপযােগী সরস সরল স্বাভাবিক করা প্রথম শ্রেণীর কবির কাজ—তুমি তাই। এতে শুধু আমাকে মাল করে নাই—অবাক করিয়াছে।” “ভারতবর্ষ।”

অর্চর মত—লেখক মুঙ্গের কলেজের অধ্যক্ষ শ্ৰীকালীপদ মিত্র এম, এ, বি, এল) ব্রজবেণু আমার ভিতরে যে সঙ্গীতের প্রতিবনি জাগতি করিয়াছে তাহাতে কোথাও কোথাও বিহবল হইয়া পড়িয়াছি—পঙক্তিগুলি পড়িতে পড়িতে একটা বাষ্প জমিয়া উঠিয়াছে—গলা ভারি হইয়াছে-নেপঞ্জক বিন্দু বিন্দু অকণায় ভরিয়া উটিয়াছে।” পর্ণপুট সম্বন্ধে মতামত ভারতবর্য-কবিতাগুলিতে সার আছে—সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের সমাবেশে হৃদয়গ্রাহী। ছন্দের ঝকারও ঝড় মিঠে। পাঠকবর্গকে অনুৰােধ, তাহারা কবিতাগুলি মনে মনে না পড়িয়া যেন আবৃত্তি করেন, তাহ হইলে ছন্দোমাধুর্য্যে ও ভাষাচাতুৰ্য্যে চমৎকৃত হইবেন। যাঁহারা তরুণ তাহারা প্রেমগীতিগুলি পড়িতে পারেন। সে গুলিতে মাধুৰ্য আছে, কিন্তু তীব্রতা বা উদ্দামতা নাই। পরিশেষে বক্তব্য, পুস্তকের ছাপা কাগজ মলাট সবই পরিপাটী। মুদ্রাকপ্রমাদ বড় একটা দেখিলাম না। তবে পুস্তকখানির নাম পরিচ যেন একটু খটকা বাধিল--পর্ণপুট-না-স্বর্ণপুট ? অধ্যাপক ললিতকুমার বিদ্যারত্ব এম, এ,। দেশমান্য যুক্ত অশ্বিনীকুমার দত্ত-কবিতাগুলি পড়িয়া সত্য সত্যই মুগ্ধ হইয়াছি। একবার মনে হইয়াছিল, এমন পুস্তকের নাম পর্ণগট না রাখিয়া স্বর্ণপুট রাখা হইল না কেন? আবার মনে হইল অগতের চিত্তহারিণী মাধুরী স্বর্ণে ?-না—পর্ণে বিশেষ পল্লীকবিতাগুলি পড়িয়া পপুট নামই যথার্থ মনে হয়, আর বলিতে ইচ্ছা হয়।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Parnaput Ed. 3rd

Author
Roy,kalidas
Title
Parnaput Ed. 3rd
File name
Parnaput Ed. 3rd
Text
OCR done
Citation
1936
Published
2009/11/8
Publisher
Haridas Chattopadhayay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
136
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Roy,Kalidas
DLI number
513037
Barcode
4990010020053.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ghYn26ajLWT
Download PDF

Parnaput Ed. 3rd