Bally Sadharan Granthagar
Saptak
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সক
ইলা দেবী
শ্রীসুধাংশুকুমার হালদার
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
দেড় টাকা
মাস চাপাধ্যায় এ সলের পক্ষে ভারতৰৰ ফিটিং হতে
মেঘনা কোঙার যারা মুহিত ও প্রকাশিত
২০১১, কর্ণওয়ালিদ ইকলিকাতা
ইলা দেবী লিখিত প্রত্যাবর্তন, বিধা’ ও ‘লিপি-পঞ্চক
বিচিত্রায় ও ‘ভবিতব্য প্রবাসীতে এবং সুধাংশুকুমার হালদার
লিখিত-মানুষের জয়’ ও ‘ননীলাল যথাক্রমে বিচিত্রা ও
ভারতবর্ষে প্রকাশিত হইয়াছে। ইলা দেবী লিখিত ‘মুক্তি
গল্পটা অপ্রকাশিতপূর্ব।
No text on this page.
সপ্তক
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সপ্তক
মানুষের জয়
গ্রামে গ্রামে সেটলমেন্ট আসছে। আমরা কানুনগাের দল
তাই চলেছি নিজেদের তল্পীতল্পা বেঁধে মন্থর গােযানে। রেল ত
এ দেশে নেই, পাকা রাস্তাও নেই। ছােট্ট মার্টিন কোম্পানীর
রেল ওপারে খানিক দূর এসে থেমে গেছে, তার পরেই রয়েছে
বিরাট দামােদর নদ তার বালির জটা মেলে। কোন নিয়মকে
এ গ্রাই করে না, আইন ভাঙাতেই এর আনন্দ। কিছুমাত্র
নােটিশ না দিয়ে এ একদিন সহসা উগ্রমূর্তি ধরে। বানের তােড়ে
বাধ ভাসিয়ে অতর্কিতে গ্রামে গ্রামে তেড়ে আসে ; মাঠে মাঠে
প্লাবন জাগিয়ে এর ঘাের লাল জল নাচে, ‘গ তা থৈ থৈ, তা
তা থৈ থৈ। কত শতাব্দী ধরে কত রাজশক্তি একে বশ
করবার চেষ্টা করে এসেছে, কিন্তু এ দুৰ্য্যোধনের মত পণ করেছে
বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র পরিমাণ ভূমিও ছেড়ে দেবে না। মানসিংহ
সপ্তক উড়িষ্যা জয় করেছিলেন, কিন্তু একে জয় করতে পারেন নি। এর পশ্চিম তট হতে যে রাস্তা বরাবর কাশী পৰ্যন্ত চলে গেছে তাকে এর কবল হতে বাঁচাবার জন্যে ইংরেজ কোম্পানীর সে কী আগ্রহ, কিন্তু হঠতে হয়েছে এর কাছে। শেষে মানুষের সমস্ত এঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধি নিরুপায় হয়ে এর পূর্বপারের ঘাটে এসে থেমে গেছে, একে নমস্কার করে বলেছে, তােমার কাছে পরাভব মানলুম। কাজেই দামােদরের পশ্চিম পারে যে দেশ সে হল পরাজিত বিধবন্ত মানব সভ্যতার দেশ। সে তার অজস্র খাল বিল, অসংখ্য নদী নালা বালিয়াড়ি নিয়ে মানুষের দিকে দাঁত খিচিয়ে চেয়ে আছে। বহিঃপ্রকৃতির সঙ্গে অতি আদিম কাল হতে মানুষের যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তার ফলে প্রকৃতিকে অনেক জায়গায় পরাভব মানতে হয়েছে; মানুষ বন কেটে সহর, বসিয়েছে, পাহাড় ফুড়ে পথ বার করেছে, নদীর কোমরে সেতুর নীবীব বেঁধে তাকে সত্য করেছে। কিন্তু মানুষ যেখানে হেয়েছে প্রকৃতি সেখানে অতি উগ্রমূৰ্ত্তিতে রুখে দাড়িয়েছে প্রতিহিংসা নেবার জন্যে। এই দেশ সেই প্রকৃতির প্রতিহিংসা নেবার দেশ। মানুষ চাষ করে ফসল ফলায়, এর নদী এসে তাকে ডুবিয়ে পচিয়ে মারে। মানুষ বন কেটে আবাদ করে, বা এসে বালির চাপ দিয়ে সে আবাদের গলা টিপে দেয়। বস্থাকে আটকাবার জন্যে মানুষ বাঁধ তােলে, তারই আড়ালে ক্ষেতে ফসল ফলায় সম্পন্ন হয়, সচ্ছল হয়, সন্তান সন্ততি বাড়ায়। প্রকৃতি পরিশােধ নেয়,ঐ বজলে মশার ডিম ফুটিয়ে। ২
মানুষের জয়
বানের স্রোত যদি বা কমল’, ত ব্যাধির স্রোত এসে গ্রাম দিল
ভাসিয়ে। তারই ফলে গ্রাম যখন জনবিরল হল, হল ,
তখন আবার একদিন উগ্রমূর্তি ধবে ওধার হতে রূপনারায়ণ
এবার হতে দামােদর এসে ঐ বাধকে দিল ভেঙে। এমনি করে
প্রকৃতির প্রতিহিংসা এই হতভাগা দেশের ওপর দিয়ে চলেছে,
কতদিনে শেষ হবে কে জানে। মানুষেব শরীরের জোর কমে
এলেও সে বেঁচে থাকতে পাবে যদি বুকের জোর না কমে।
কিন্তু এই হতভাগা দেশে বর্তমান ত নেই-ই, ভবিষ্যৎ ও
অন্ধকার। এখানে মানুষের অবস্থা যেমন ভয়াবহ, এমন আর
বােধ হয় কোথাও নেই। কিন্তু এরা নিজে ত তা ভাবে না।
আমি ত দেখেছি মস্ত মস্ত এদের উদর সতত বর্ধমান প্লীহা যকৃতে
ভরপুব, চোখ হলুদ হয়ে এসেছে, কাঠি কাঠি হাত পা, শােনা
খােনা কথা। মনে হয় এদের মধ্যদেশ এখনি বেলুনের মত
ফুলে উঠে হাত পা গুলােকে নিয়ে আকাশে উড়ে যাবে, হাত
পা গুলাে প্যারাসুটের মত ঝুলতে থাকবে। কিন্তু তা সত্বেও
এরা মামলা করে, নেশা খায়, বিয়ে করে, সন্তান হয়। আমার
মনে হয় ভগবান শহুকম্পা করে এদের মনকে অচেতন করে
রেখেছেন। অতি নিদারুণ যন্ত্রণা হলে মানুষ অসাড় হয়ে যায়।
ছুরিতে হাত কাটলে বাজে, কিন্তু বন্দুকের গুলিতে হাত উড়ে
গেলে বাজেনা। এদেরও সেই দশা।
গােন চলেছে। সমুদ্রের মত ঢেউ খেলানাে রাস্তা।
পরিসর পাঁচ হাতের বেশী নয়, গভীরতা বােধ করি তার চেয়েও
সপ্তক
বেশী। দু'পাশে ধান হয়েছে, কোথাও বা বেনাবন। তলতলে
দইএর মতন কাদা, তার মধ্যে গাড়ীর চাকা দুটো ক্রমাগত
পাক খাচ্ছে। ধরিত্রীর বুকের ওপর চাকা দুটো যেন কোনও এক
বন্য জন্তুর মত ধারালাে নখ দিয়ে আঁচড় কেটে দিচ্ছে, কি লিখছে
ঐ আঁচড়ে কে জানে-বােধ হয় লিখছে—“আমি গােযান, আমি
আছি, সেইটে বােকো। শুধু কি আছি ?—বহুকাল ছিলাম
আবার বহুকাল থাকব। রামচন্দ্র যখন তীর ধনুক নিয়ে
পঞ্চবটীর অরণ্যে অরণ্যে ঘুরে বেড়াতেন তখনও ছিলাম, এখনও
আছি। ট্রেণ হ’লমােটর হল, এরােপ্লেন হ’লকিন্তু তবু
আমি তাদের অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ-আমি বেঁচে আছি; আবার
হয়ত ট্রেণ যাবে, এরােপ্লেন ধ্বংস হবে, মােটর রচনা মানুষ ভুলে
যাবে,তখনও আমি থাকব।”—এই জরাজীর্ণ অস্তিত্বের উল্লাসে,
গােযানখানির সে কী ঘন ঘন কম্পন,-তার রেড়ীর তেল ও
আলকাতরা সিক্ত ধুরাে দুটি কী কঁাকোর কঁাকোর’ কলরব।
সন্ধ্যা নামে আর কি। গায়ের লােক হাট থেকে ফিরছে।
তাদের গাঁয়ের নাম জিজ্ঞেস করলে সহজে জবাব দেবে না। বলে,
“মশায়ের নাম কি, বাড়ী কোথা, কোথায় যাবেন, কেন যাবেন,
কবে ফিরবেন। অর্থাৎ আগে তাদের পঞ্চাশ কথার জবাব
দাও, তবে তারা তোমার এক কথার জবাব দেবে। অজানা
কোনও লােক গেলে তাদের স্বভাব ভিড় করে দাড়ানাে।
‘কিউরিসিটি জিনিষটা তাদের খুব বেশ। অনেক আগন্তুক
এতে চটে যায়, দু দেবার প্রলােভনও ছাড়তে পারেনা।
৪
মানুষের জয়
মারের ভয় দেখালে এরা ‘বাবারে-মারে’ বলে ছুটে পালায়,
কিন্তু তাতে আশ্চৰ্য্য হয় না। মার খেতেই ত এদের জন্ম।
জন্মাবার আগেই এরা খেয়েছে এদের বাপ মায়ের মার, যার
ফলে এদের জন্ম। তারপর এদের মেরেছে পাঠশালার পণ্ডিত,
কাছারির গােমস্তা, আদালতের আইন। শাস্ত্রকাররা বিধান
দিয়ে দিয়ে এদের মেরে রেখে গেছে বহুশতাব্দী আগে। সমাজ
এদের মারছে কুকুরের মত। উকীল মােক্তার এদের ধনে প্রাণে
মারছে। তার ওপর প্রকৃতি এদের মারছে পিছমােড়া করে
বেঁধে, চোখে ঠুলি পরিয়ে, বন্যা দিয়ে মারছে, ব্যাধি দিয়ে
মারছে। ভগবানের চোখের জল এদের জন্যে করে কিনা
জানি না, হয়ত ঝরে, কিন্তু এমন হতভাগা এরা যে স্বয়ং ভগবান ও
এদের কিছু করতে পারেন না।
‘
কিউরিসিটি জিনিষটা এদের প্রবল, তার কারণ শিক্ষা ত
এদের চোখের সামনের ছানি কাটিয়ে দেয় নি; এরা আসে
জানে যে এদের গাঁয়ের, এদের পঞ্চায়েতের বাইরে একটা মস্ত
জগৎ আছে যেখানে একটা গাভীর তিনটে বাচ্ছা হওয়া থেকে
সুরু করে মস্ত মস্ত আজগুবি ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে যার বিবরণ
সপ্তাহে একবার করে বাংলা খবরের কাগজ থেকে গাঁয়ের
চক্রবর্তী মশায় এদের পড়ে শােনান। তাই বাইরের লােক
এলে এরা দৌড়ে যায়—জগতের অাজগুবি খবর শােনবার জন্যে।
আঁধার নেমে এলাে। গাড়ােয়ানের গায়ে শেষে বুরি
নামা বৃদ্ধ বটের তলে গাড়ী থামালাে, গরু খুললল, জাব দিলাে,
E
সপ্তক আমাদের বললাে রান্না খাওয়া করে ঠাণ্ডা হতে। বটতলায় গাড়ােয়ানের মেলা। এ অঞ্চলের এই বটতলাই হ’ল মােগল- সরাই জংশন, কেলমারের রেষ্টুরে, খােলা হাওয়ার ওয়েটিংরুম। মাটিতে গর্ত কেটে উনান করে সবাই রায় চড়িয়েছে-মােটা লাল চালের ভাত টগবগ করে ফুটছে, তাতে ছেড়ে দিয়েছে একটা কাপড়ে বাঁধা কিছু মসুর দাল, গােটা দুয়েক আলু আর পিয়াজ। জ্বলন্ত কাঠের আর ফুট ভাতের সুগন্ধে বাতাস ভরে আছে। তার পর দিন সন্ধ্যায় আমরা এলাম যেখানে সার্কল ক্যাম্প হয়েছে এখানে পড়বে সার্কল অফিসারের তাবু, আমরা কানুনগাের দল কাল রাতে যে যার নির্দিষ্ট এলাকায় ছ'সাত মাইল দূরে চলে যাবাে। গাড়ােয়ানরা কোলাহল করে কাগজ- পর নামাচ্ছে, ক্যাম্পের পেস্কার সমস্ত দেখছে শুনছে। পাশেই একটা চালা তােলা হয়েছে-তার মধ্যে একধারে পেস্কারের রসুই হবে আর একধারে আস্তাবল। আমাদের জীর্ণ দুর্বল ঘােড়াগুলােকে তার মধ্যেই ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে, বর্ষা এখনও শেষ হয়নি, বলা যায় না, এখনই আবার জল আসতে পারে। অসৎ গুমােট গরম, আমরা বারান্দায় ভাঙা মেজের ওপর কম্বল বিছিয়ে বসে আছি। কাল থেকে আপন আপন ক্যাম্পে গিয়ে আমাদের উদয়াস্ত পরিশ্রম সুরু হবে, তার আগে এই মােট একটি সন্ধ্যা। কানন-গাে’—আমাদের এ নাম কে দিয়েছিল জানি না। কি নাম যেই দিক, তার নাম করণের মানুষের জয় বেশ একটা ক্ষমতা ছিল বােঝা যাচ্ছে। কাননে যেতে হয় তাই কানন গাে। অর্থাৎ বনবাসই হল আমাদের চাকরী। কোনও এক যক্ষকে তার মনিব এক বছরের জন্য বনবাসে পাঠিয়েছিলেন, তারই দুঃখে কালিদাস লিখে ফেল্লেন অতবড় একটা মহাকাব্য। আর আমাদের এই যে নিরন্তর বনবাস এতে কই কোনও কবির সুনিদ্রার যে ব্যাঘাত ঘটেছে তা জানা নেই। আসল কথা হ’ল দুনিয়াটাই খােসামুদে। কিন্তু দুঃখ এই, হায় বাশেবি, তুমিও এই কলঙ্কের ভাগী হলে? হতাম যদি রাজার ছেলে তাহলে আজ এই বনবাসের সূত্রপাতে আসন্ন বিরহের ছায়া এই সন্ধ্যার ওপর কত কবিই না কত মহাকাব্য লিখে ফেলতেন। ইংলণ্ডের প্রিমিয়ার প্লাসফোস পরে গলফষ্টি তুলে দাড়িয়ে আছেন, তার ছবি আদর করে কাগজে কাগজে ছাপাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট হুভার ট্রেনের মধ্যে দাড়িয়ে জানালা দিয়ে মাথা বার করে টুপি তুলে বিদায় জানাচ্ছেন, তার ছবি দৈনিকে, মাসিকে আর ধরে না।কিন্তু এই যে আমি নটবর পাল গােযান-যাত্রার কালে তিনদিনের পরিপুষ্ট খোচা খোচা দাড়ি গোঁফ নিয়ে—আমার জীর্ণ কৰলে বসে আজকের এই একটি শক্তিম সন্ধ্যার কথা ভাবছি,এর ছবি তুলতে কইকাররা ত মাথাব্যথাকেছি না। যদি লিখিয়ে হতাম তাহলে বীণাপাণির এইভিজাত্য গৌরব চুর্ণ বিচূর্ণ করে সেখানে খাটি বলশেভিজমের ঝড় বহিয়ে দিয়ে যেতাম, কিন্তু হায়, এমনি দেবীর এক চোখখামি, লিখতে বসলে কলম থেকে হকা নােট, হাড়া আর কিছুই বেয়ােয় না । ৭ সপ্তক এই সব ভাবছি, এমন সময় আমাদেরই নবীন আট নম্বর হঙ্কার কানুন-গাে-হুকাতে দু’টা টান দিয়ে বললে, “না, তামাকটা ভাল লাগছে না, বােধ হয় আর এল।” ম্যালেরিয়ার এই একটি গুণ যে সে কলেরা বা প্লেগের মতন আঁ করে আসে না, তার আগমন ধ্বনি আগে হতেই অনুভব করা যায়। তামাকটা বিস্বাদ লাগা হল ঐ একটি আগমন- ধ্বনি। আরও আছে। গ্রামের শেয়ালগুলাে সব বিকট ডেকে উঠল। কাছেই এক শ্মশান থেকে ‘হরিবােল, হরিবােল শােনা গেল। আমরা হিন্দু মায়াবাদী, বিশ্বাস করি সকল মায়া। তাই কেউ যখন মরে তাকে নিয়ে দস্তুর মতন হৈ হৈ করি, চুপি চুপি সারি নে। কারণ মরাটা হ’ল মায়াবাদের একটা অকাট্য প্রমাণ,—জীবন অনিত্য। তাই আমরা যখন মড়া পােড়াতে যাই, তার আগে বেশ করে একছিলিম গাঁজা খেয়ে নিই, সারা পথ চেচাতে চেঁচাতে যাই, যেন যাবতীয় জীবিত লােকের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘােষণা করছি। হাটতলায় গেলে দু’শােবার চেঁচাই-বল হরি হরিবােল।”—নিশুতি রাত হলে যতক্ষণ পর্যন্ত না শ্মশান যাত্রার পথের দু'পাশের লােক- জনের ঘুম বেশ সুনিশ্চিত ভাবে ভাঙে ততক্ষণ পর্যন্ত চেঁচিয়ে যাই—“হরিবােল, হরিবােল।” আমাদের নবীন বলে-দেখ আমার গান পাচ্ছে,-এই বলে সে একটা গান গেয়ে উঠলাে। ম্যালেরিয়ার আর এক অভ্রান্ত আগমনধ্বনি হল এই গান পাওয়া। বড় বড় বক্তারা
মানুষের জয়
সভায় যেমন বক্তৃতার একটা urge পান, ম্যালেরিয়া রােগীও
তেমনি গান ও বক্তৃতার একটা urge পায়। এই যে অকাল
স্থায়ী urge-এর ওষুধ হচ্ছে ফিভার মিকশ্চার,—কিন্তু এই যে
বাগ্মীদের স্থায়ী urgeএর কথা বললুম ওর ওষুধ নেই। ওর
একটা ওষুধ থাকলে আমাদের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের
প্রেসিডেন্ট হতে আর কোনও সন্তানের আপত্তি থাকত না।
পুরা দমে সেটলমেন্টের কাজ চলছে। মাঠ ঘাট নদী নালা
খাল বিলের নক্সা তৈরী হয়ে গেছে। নক্সা করছে আমিনরা,
আর আমরা করছি তদারক। দুনিয়ার যত রকম কষ্ট সহিষ্ণু
জীব আছে, আমিন হল তাদের সেরা। নীচে জল, ওপরে
রােদ, এই অবস্থায় তারা মাপছে চেন লাইন, হাঁকছে নল দশ,
আর ছুঁচালাে পেন্সিল দিয়ে লাইন টেনে টেনে জমির নক্সা
তৈরী করে যাচ্ছে। কখনও পায়ের তলায় কেউটে সাপ ফেঁস
করে উঠছে, কথনও মাথার ওপর হাকিম এসে ফোস করছেন,
আর গাল দিচ্ছেন ন ভূত ন ভবিষতি। জ্বর ত লেগেই আছে,
তবু এরা দমে না। আলেকজাণ্ডার বেরিয়েছিলেন দিগ্বিজয়ে,
কিন্তু পঞ্চনদে এসেই থেমে গেলেন। আমার মনে হয় তার যদি
একদল সেটেলমেন্টের আমিন কানুনগাে সহায় থাকত তাহলে
তিনি ভারত কেন সমগ্র পৃথিবী জয় করে ফেলতে পারতেন।
খানাপুরি আরম্ভ হয়ে গেল। ধানকাটা শেষ হয়েছে, মাঠের
জল শুখিয়ে এসেছে। বড় বড় বিলের মধ্যে এখন বেশ হেঁটে
যাওয়া যায়। অনুখবিসুখ কমে এসেছে। গ্রামে গ্রামে আবার
০
হাসি ফুটে উঠেছে। আমি বােজ ভােরে বার হই, হােট আমার
বেতাে ঘােড়ায় চড়ে। বেতাে বললাম কারণ ঐ জাতীয় ঘােড়ার
আর দ্বিতীয় নাম নেই। কিন্তু কার্যক্ষম কম না। ঠিক যেন
বাঙালী কেরাণী,—সমস্ত দিন মুখ বুজে খাটে। অনেকদিন
আছে কিনা, আর এই কাজই করছে, মাঠের মাঝখানে কোথায়
আমিন আছে তা এ পণ্ড সুলত বুদ্ধিতে টের পায়, তার পর দৌড়
দেয় আমিনের টেবিলের দিকে। জানে, ঐ হল ওর নঙর
ফেলবার বন্দর। সেখানে ও ছাড়া পায়, মাঠের ঘাস আর
ডােবার জল প্রাণ ভরে খায়, কাছে কাছেই চরে, মারলেও
নড়ে না। আমার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি মােজার
গােড়ালিটা ছিড়ে গেছে, নিকষকৃষ্ণ পায়ের রঙ জুতার পিছন
থেকে উঁকি মারছে, খাকীর আধাপাৎলুনের ডাইনে বায়ে
হাজারবার হাত মােছর ছাপ, সবুজ কালি সছিদ্র ফাউন্টেন পেন
থেকে পড়ে তারই অনেক জায়গা দেগে দিয়েছে। মােজ
জামাটায় তালি দেওয়া দরকার, কোটের বােতাম দুটো ছিড়ে
গেছে—কিন্তু সারে কে? এ সব ত আর পুরুষ মানুষের কাজ
নয়। মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। তবু ভাবি, হিন্দু বলে
আমরা কী রকেই না পেয়ে গেছি। নইলে এই নির্বাসনের
চাকরীতে পতিব্রতারা ডোসানের অপরাধে কোন কালে
তালাক দিয়ে দিতেন। শ্রীর হাতে পরিয়ে দিয়েছি এক মম
লােহা,–ও থেকে তার আর নিষ্কৃতি নেই। আগে বােধ করি
বিবাহিতাদের হাতে হাতকড়া পরার রীতি ছিল। নাক ফুড়ে
মানুষের জয়
দিতাম নথ, কান ফুড়ে মাড়ি-দুই হাতে হাতকড়ি, দুই পায়ে
মলের বেড়ী। কিন্তু মেয়েদের কয়েদ করলেও আমাদের যে
শিভালরি নেই একথা বলে কে? খাটি সংস্কৃত শ্লোকে মেয়েদের
সম্মানও ত দিয়েছি বিস্তর, যদিও কয়েদ করেছি কোসে।
পাখীকে খাঁচায় পুরে তার ওপর কবিতা লিখেছি। জেলখানায়
থেকে থেকে তারা জেলকেই ভেবেছে গৃহ, বাহিরকে ভেবেছে
বিষবৎ পরিত্যজ্য। আনন্দের কথা হচ্ছে এই যে, এখন তাদের
মুক্তির প্রধান অন্তরায় হচ্ছে তারাই, তাদের পীড়নের প্রধান অস্ত্রই
হচ্ছে তারাই,-পুরুষরা নয়। পরাধীন জাতিরা নিজের থেকেই
যদি স্বাধীনতা না চায়, যদি নিজেদের ভেতরেই মারামারি করে
মরে,—সেইটাই হল সাম্রাজ্যবাদিদের চরম গৌরব। ডিপ্লোম্যা-
সিতে হিন্দু শাস্ত্রকাররাও বড় কম ছিলেন না।
বাড়ী থেকে খবর এসেছে সেই ছেলেটার অর, ছােটটার
রিকেটস হয়েছে। মেজ মেয়েটার বিয়ের চেষ্টা বিশেষ করেই
করা দরকার, বড় ছেলেদের টিউশানি গেছে এখন বেকার বসে
খাচ্ছে, আমাদের কানুনগােদের ওপর ষষ্ঠীর কৃপা খুবই
খবর ছিল সাহেব আসবেন ইনসপেকৃনে। যতদূর সম্ভব
সব ঠিকঠাক করে ফেলেছি। এই কাজে চুল পাকালুম ভুলচুক
ঢাকবার মারপ্যাচ কি আর জানা নেই ভেবেছেন? সাহেবের
আসবার পথে পথে যেখানেই কাজের একটু গােজামিল ছিল
সেখান থেকে আমিনদের সরিয়ে দিয়েছি অনেক দূরে,-আর
তাদের জায়গায় বেছে বেছে ভাল ভাল আমিন বলিরেছি।
১১
নার ওপর যেখানে যেখানে তেলকালির দাগ পড়েছিল
সেখানে কোসে পাউরুটি ধসিয়ে মেতে সাদা করে রেখেছি।
নগুলাে ধােপদন্ত ডিনার সাটের মতন চক্চক্ করছে।
সাহেব এলেন, পরীক্ষা করলেন, ফল ভালই হল। হবারই
কথা। এখন আর কিছু গণ্ডগােল না হলেই বাঁচি। উৎপাত
কোথা থেকে কখন এসে পড়ে তাকি বলা যায় ? মর্মাহত
হলাম সাহেবের কথা শুনে,-“হ্যালাে কানুনগাে, তোমার সব
ক’টি ভাল আমিনইত আমার পথের ধারে বসিয়ে রেখেছ, কিন্তু
খারাপ আমিনগুলি কোথায় ? আমি নবী বক্সকে দেখতে
চাই।” ফ্যাসাদে পড়লাম। নবী মিঞা আমিনের বয়েস
হয়েছে, কাজে বেজায় ভুল করে। তবে আমার ফাইফর্মাসটা
খাটে, আগে গিয়ে বাসাটা ঠিক করে রাখে, তাকে একটু স্নেহ .
করি। কেবলই ভাবি তাকে ছাড়িয়ে দেব, কিন্তু উপকার পাই
বলে ছাড়াতে মন ওঠে না। তাকে দিয়েছিলাম অনেক দূরে
সরিয়ে, কিন্তু সাহেব তাকে না দেখে ছাড়লেন না।
নবী আভূমিপ্ৰণত সেলাম করে বললে-আদাব। কিন্তু
কাজে বেরােল বেজায় ভুল। সাহেব বল্লেন-“তুমি এই নক্সা
তৈরী করেছ?
নবী মাথা চুলকে বললাে—‘ছার।
সাহেব বলেন,-“কই পয়েন্ট বসাও দেখি আমার সামনে,
লাইন তিনশাে পঞ্চায়, অফসেট পঞ্চান্ন ।
নবী ডিভাইডার বাগিয়ে ধরলাে, কিন্তু ঠক্ ঠক্ করে তার
১২
মানুষের জয়
হাত কাঁপতে লাগল। সাহেব এটা লক্ষ্য করলেন, বললেন,
তােমার হাত কাঁপে কেন ?
নবী মাথা চুলকে শুধু বললাে-“ছার।
সাহেব বল্লেন—“তুমি হােপূলেসলি বুড়ো হয়ে গেছ, তাই
তােমার হাত কাঁপে।
নবী চুপি চুপি আমাকে বললাে যে সাহেবকে দেখে তার ভয়
হয়েছে, তাই তার হাত কাঁপছে। আমি এ কথা জানালুম।
তিনি বললেন, “কুছপবােয়া নেই। আমি এই টেবিলের তলায়
লুকোচ্ছি। তুমি এইবার পয়েন্ট বসাও।” এই বলে টেবিলের
তলায় ঢুকে চুপ করে বসে রইলেন। নবী পয়েন্ট বসাল, সাহেব
তার নিজের যন্ত্র পাতি বার করে পরীক্ষা করে দেখলেন,
বললেন, ‘পয়েন্ট ভুল। এই বলে নবীর ম্যাপ দিলেন রবার
দিয়ে মুছে, আর আমাকে বলে দিলেন ওর হাতের কাজ শেষ
হলেই যেন ওকে বিদায় করে দেওয়া হয়।
কিন্তু নবী দমিবার পাত্র নয়, সে সাহেবের যন্ত্রের সঙ্গে নিজের
যন্ত্র মেলাচ্ছিল, এখন কাঁদতে কাঁদতে বললাে,“এই দেখুন
ছার। আমার এই আইভরি স্কেল খারাপ, সার্কেল ক্যাম্প থেকে
স্কেল দিয়েছে, তাতেই আমার কাজ ভুল হয়েছে, আমি কি করব
ছার।”—এই বলে আবার হাপুস নয়নে কান্না।
সাহেব নবীর হাত থেকে তার স্কেলটা নিয়ে পরীক্ষা করে
দেখলেন, তার পর জন্তুর মত দমে গিয়ে আমতা আমতা করে
বললেন—“তাইতাে তাইতাে, নবীর কথাই ঠিক। আমারও
নবীর ওপর দয়া হল। আহা বেচারা বিনা কারণেই দোষী
সাব্যস্ত হল। ওর ত দোষ নেই, দোষ ঐ যন্ত্রের, এবং সে যন্ত্র
আমরাই ওকে দিয়েছি। সাহেব খানিকক্ষণ কি ভাবলেন, তার
পর বল্লেন, “এস ত আমিন তােমার পকেট দেখি। পকেট
হাতড়ে আর একটা আইরি স্কেল বেরােল, সেটা একেবারে
নির্ভুল। সাহেব চোখ পাকিয়ে বললেন-স্কাউণ্ডেল।
অর্থাৎ ব্যাপারটা এই, নবী জানত নাটা তার হয়েছে ভুল।
কিন্তু তার ত একটা কৈফিয়ৎ দেওয়া চাই। তাই সে আগে
থেকে একটা খারাপ স্কেল সংগ্রহ করে রেখেছিল, ভুল ধরা
পড়লে সে ঐ খারাপ স্কেলের দোহাই দেবে। কিন্তু সাহেব তা
ধরলেন কি করে ? সাহেব বললেন প্রথমে তার একটু ধােকা
লেগেছিল, কিন্তু পরে এই কথা বলেন যে সব আমিনেই আগে ,
যন্ত্রপাতি ভাল করে পরীক্ষা করে নেয় ঠিক আছে কিনা,
নইলে তাদের কাজে ভুল হবে। নবী নিশ্চয়ই জানত প্রথম
স্কেলটা ভুল, জেনে শুনেই সে কি ঐ ভুল স্কেলে কাজ করবে ?
বললেই ত বদলে পেত। কাজেই বােধ হ’ল তার কাছে একটা
ভাল স্কেল আছে। তৎক্ষণাৎ নবীর চাকরী গেল।
ইনসপোন পর্ব শেষ হতে সাহেব বললেন,
দামােদরের এক খাল দিয়ে স্বচ্ছ জল কুলকুল করে চলেছে
ঐখানে গান করবেন। আমি লােকজন সরিয়ে দিলাম।
সাহেব পােক ছাড়তে লাগলেন। আমি বললাম, “এমন দুর্গম
জায়গা আর দৈখিনি। ইংয়ের রাজত্বে কোলকাতার এত কাছে
যে
১৪
মানুষের জয় এমন জায়গা যে থাকতে পারে তা চোখে না দেখলে বিলাস হয় না।” সাহেব বলেন, “ইংরা রাজত্বের দোষ দিওনা বাপু। এখানে আছে কি যে এখানে পয়সা খরচ করে রাস্তা বানাতে যাবে? নইলে যদি সােনা পাওয়া যেত ত এ অঞ্চল ও ছার- ইংরেজ চন্দ্রগ্রহে যাবারও পথ বার করত। কোডিষ্ট্রিক্টে- কখনও গেছ? দেখবে সেখানে কত দুর্গম পাহাড় জাল ভেদ করে রাস্তা ও রেল রাস্তা বানানাে হয়েছে। সেখানেও এই দামােদর আছে, তার ওপর কি চমৎকার পােল, দেখেছ? তুমি জাননা বােধ হয় সে পপাল আমারই পিতামহের কীর্তি। এ কথা জানতাম না। ওই যে বিরাট দামােদর নদ ওর পরাভব ঘটেছে এরই পিতামহের হাতে। দামােদর কি একথা জানে? আমরা অবিশ্বাসী, নদীর আত্মা আছে বিশ্বাস করিনে। তবু এই দামােদরের স্ফীত উদ্দাম মূর্তি আমি দেখেছি, এর ক্রুদ্ধ হিংস্র গর্জন আমি শুনেছি। তখন মনে হয়েছে এ যেন এর পরাভবের গ্লানিতে ক্ষিপ্ত, এর অবমাননাকারী মানুষকে দলে পিষে ডুবিয়ে পচিয়ে মারতে যবন সেনার মত এ যেন হৈ হৈ করে ছুটে চলেছে। সাহেবকে গানের অবসর দিয়ে—আমি খালের পার দিয়ে উত্তর দিকে চললাম নিকটের এক গ্রামে কাজ দেখতে, গ্রামে ঢুকতেই একজন লােকের মুখে শুনলাম এ অঞ্চলে ভয়ানক কলেরা হচ্ছে, মৃতদেহ পােড়াবার পর্যন্ত লােৰু নেই। এই একটু আগেই দুটো কলেরার মড়া এইখানে গিয়ে দিয়ে চলে
সপ্তক
গেছে, দাড়িয়ে পড়লাম! দক্ষিণের দিকে চেয়ে দেখি দূরে খালে
সাহেব স্নান করছেন, আর তাবই কাছে ঐ দু'টো কালাে কালাে
ও কী!-মড়াইত। সর্বনাশ, কলেরার মড়, জলের ওপর, অত
কাছে। প্রাণপণে ছুটলাম চেঁচাতে চেঁচাতে—“উইন উঠুন,
এখনি উঠে পড়ন।”
বেলা তিনটে হ'তে সাহেবের ভেদবমি শুরু হ’ল। পাগলের
মত সাইজে ছুটেছেন, মাঝে মাঝে নামছেন, বমি করছেন, আবার
উঠছেন—আসন্ন মৃত্যুর সঙ্গে সে কী লড়াই। চোখ দুটো
বেরিয়ে আসছে, হাত দুটো প্রাণপণ বলে সাইক্লের গ্রিপ্ ধরে
আছে, থেকে থেকে কেবল জিগেস কর্ডেন—আর কতদুর আর
নিকটতম রেল ষ্টেশন যেখান
ষ্টেশন যেখান থেকে মার্টিন
কোম্পানির রেল শুরু হয়েছে-সে হল এখনও ষােল মাইল,
কিন্তু তা বলতে প্রবৃত্তি হচ্ছে না, মিছে করে বলছি, আর চার
মাইল, এই এসে গেল বলে। তার পা আর চলেনা,
বললাম পার্কীতে চলুন। পাল্কীতে চড়বেন
চলুন। পাক্কাতে চড়বেন না, বড় আস্তে
চলে।
একবার বমি কবার জতে সেই যে
নামলেন আর উঠলেন না, হাত পায়ে খিল ধরতে লাগল।
আমি দৌড়ে গিয়ে পান্ধী ডেকে নিয়ে এলাম, তঁাকে তাতে তুলে
বেয়ারদের বললাম, চল যত জোরে পারিস। মূল্যবান প্রাণ
বাচিয়ে দে। এমন বক্শি পাবি যা জীবনে প্রত্যাশাও করতে
পারতিস না। পাকী-বেয়ারারা উখালে ছুটল।
কি কামােদরের এতিশােধ। এখানকা আবহাওয়াও
কতদূর।
৩
মাযের জয়
বিষাক্ত বলে বােধ হ'তে লাগল। সেই বেনা বৰ, সেই
বালিয়াড়ি, সেই খাল, বিল, জঙ্গল, আমাদের দিকে চেয়ে বিজ্ঞাপ
করছে। বুনাে ভাটফুল তার ঘৃণিত সাদা সাদা কেশর দুলিয়ে
নাচতে লাগল। শেয়ালগুলাে চীৎকার করতে লাগল অসভ্য
হােটেটটদের মানুষ খাবার বিজয়ােল্লাসের মত। বিকট
হেঁৰাল গাছের দল তাদের জটা দুলিয়ে আমাদের পথ রােধ করে
দাড়াতে লাগল, অন্ধকার বাঁশবনে সে কী চাপা হাসির ফিস ফিস
শব্দ! কানানদীর খাত দিয়ে চলবার সময় গভীর বালি
আমাদের পায়ে দিল বেড়ি পরিয়ে। বিছুটির বন মারল শপাৎ
শপাৎ করে চাবুক। আজ সমস্ত প্রকৃতি যেন এক সাথে রুখে
দাড়িয়েছে আমাদের ওপর প্রতিশােধ নেবার জন্যে।
এই ক’টি মানুষ তাদের সমস্ত শক্তি নিয়োেগ করল কেবল
চলার দিকে। মন থেকে আর সব অনুভূতি মুছে গেছে, শরীর
ক্লান্ত, স্বেদসিক্ত-সেদিকে হৃক্ষেপ নেই খালি একমাত্র কথা-
‘চল চল। পতঙ্গ যেমন আগুনের দিকে চলে, কচ্যুত তারা
যেমন মহাশূন্যে চলে, আর কোনও ধ্বনি নেই, চুল নেই,
কেবলই চলা। মনে কোনও স্মৃতি নেই, সম্বিৎ নেই, শরীর
ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছে কেন যে চলেছি তাও যেন ভুলে
গেছি। হঠাৎ পাকী বেহারাদের কথায় চমকে উঠে দেখি
ষ্টেশনে এসে পৌছেটি। পাকীর ভেতর বুকে নে•ি•প্রকৃতি
তার বলিদান আদায় করতে ছাড়ে নি, আরােহীর কেহ শাড়
নিস্পন্দ, হাত মুষ্টিব, চোখ দুটা বেরিয়ে এসেছে, গত দু'পাটি
১৭
কামড়াতে আসছেআমরা ক’টি মানুষ যেন চাক খেয়ে
লাফিয়ে উঠলাম।
কিন্তু যে মানুষের ধারা সৃষ্টির আদিম কাল থেকে বিশ্বকে
আয় করতে বেরিয়েছে সে মানুষ চাবুক খেয়ে দমবে না। তার
যে অস্থিমাংসের শরীর—তাকে লাগে, কিন্তু তার যে আয়া সে
আবাতেও দুর্গম, পরাজয়েও অনমনীয়। যেখানে বাধা এসে
তার পথ আটক করে, সেখান থেকেই তার মনুষ্যত্ব বিকাশের
পথ খােলা দুরু হয়, যেখানেই সমস্যা এসে বাধ তুলে দাঁড়ায়
তারই তলে তলে তার চিন্তার ধারা তরঙ্গায়িত হয়ে ফুলে ওঠে
একদিন ঐ বাঁধ চুর্ণ করবার জন্যে। যেখানেই মৃত্যু এসে ভয়
দেখায় সেখানেই জন্ম হয় অফুরন্ত প্রাণের। চেয়ে দেখলাম
দামােদরের বিকট বা হলদে ছাতলা পাত বার করে হা-
কয়ে হাসছে। আজকে এই মানায়া প্রদোষে এই যে কটি
মানুষের নিদারুণ পরাজয় ঘটল,ঠিক জানি এ ব্যর্থ হবে না।
রই বার্তা যাবে বাংলাদেশের মানব সভার দ্বারে দ্বারে
ডেকে আনবে অপরাজেয় নির্ভীক অন্তহীন মানুষের ধারাকে,
যারা সদ্যনাগিনীর ফণায় চড়ে নাচবে, যারা আপন অদম্য
শক্তির তেলে চূর্ণ করে দেবে প্রকৃতির এই মিল রকে।
ফের কুঠারের গায়ে মহাম খণ্ড খণ্ড হয়ে উড়ে যাবে, বনভূমি
বলে পুড়ে ৩ মে যাবে-তারা এসে এই হতভাগা দেশের
জাগ খিসিরে ঘােচাৰে বাৰে পথে আমরা না
বা পে আঘাত পেয়ে সেই পথ দিয়ে ছুটবে তীরবেগে
মানুষের জয়
মানুষের রথ—এই বন্যাক্রান্ত দেশের দিকে দিকে উঠবে মানুষের
জয়ের গান। সেই অনাগত বিজয় বার হয়ত আমার কানে
পশবে না, আমি হয়ত চলে যাবাে এই পরাজয়ের কলঙ্ক কাহিনী
নিয়ে—কিন্তু তবুও বলি,জয় মানুষের জয়।
ভবিতব্যতা
বিয়ে বাড়ীর আলাের মালার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আকাশে
মেঘের মেলা সেদিনে; বেতপদ্মের আলপনা-আঁকা চন্দনকাঠের
আসনে রক্ত-বসনা বধু একা বসে ভাবছে,—বাহিরের কোলাহলে
তার মন নেই,—উদ্বিগ্ন নয়নে আকাশভরা আঁধারের পানে চেয়ে
কী সে ভাবছিল।
বিবাহােপলক্ষ্যে দেশের পরিচিত নীড় হতে অনভ্যস্ত নগরীর
নারীর বদ্ধ বক্ষপুটে প্রবেশ করে অবধি সুনন্দার অস্বস্তির শেষ ছিল
; চারিদিকের অপরিচিতের মাঝে একমাত্র পরিচিত শুধু তার
পিতা,সে তার কাছেই ঘেঁসে থাকত। মাকে সুনন্দার মনে
পড়ে না, কোন শিশুকালে তিনি তাকে ছেড়ে গেছেন; পিতার
কাছেই পালিত সে। চন্দ্রনাথের বয়সের সঙ্গে শরীর ভেঙে
আসায় তিনি বিষয়কৰ্ম্ম দেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার
পুত্ৰ উমানাথ এখন জমিদারী পরিচালনা করেন। তিনি
অধিকাংশ সময় কলকাতায় থাকলেও মহল পরিদর্শন থেকে
মকর্লামা তদ্বির করা প্রভৃতি সমস্ত ভারই অর্পিত ছিল তার
ওপর। চলনাথ দেশকে ছাড়তে পারেন নি। মায়াপুরে
বনেদি ধরণের বৃহৎ অট্টালিকা,পূর্বের জৌলস নেই, পুর্বের
২০
ভবিতব্যতা
আয়তন এখনাে বজায় আছে। কয়েকজন জালী-পরিচারক
আশ্রিত নিয়ে পিতাপুত্রীর সেই গ্রামের বিজনে দিন কাটে।
বিবাহের দু'দিন আগে সুনন্দাকে নিয়ে চন্দ্রনাথ কলকাতায়
এলেন। উমানাথই সব আয়ােজন করেছিলেন, তিনিই
কর্মকর্তা। কিন্তু চন্দ্রনাথের আসার পরদিনই উমানাথকে
কলকাতা পরিত্যাগ করতে হল। পূৰ্বসীমার মহলে পাশ্ববর্তী
জমিদারের সঙ্গে কি নিয়ে দাঙ্গা বেধেছে খবর পেয়ে তিনি
তদারক করতে ছুটলেন। চন্দ্রনাথের ওপর এতবড় আয়ােজনের
ভার পড়ায় তিনি বিব্রত হয়ে উঠলেন; অপরিচিত লােকজন
নিয়ে এ সমস্ত সামলাননা তার পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাড়াল।
বহুদিন হতে নির্লিপ্ত শান্তির মাঝে বাস করে এসব সাংসারিক
ঝাটে তিনি এখন অনভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বিয়ের দিন
সকাল হতে চন্দ্রনাথ অসুস্থ বােধ করছিলেন তবু কোন মতে
যথাকৰ্তব্য করে গেলেন; সারাদিনের উপবাসে পরিশ্রম সহ
হল না। সন্ধ্যাবেলা তিনি মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
খবর শুনে সুনন্দা উৎকণ্ঠায় দিশেহারা হয়ে গেল—এ সব
উৎসব-সজা টেনে ফেলে দিয়ে চেতনাহীন চন্দ্রনাথের শয্যাপার্কে
মন তার ছুটে যেতে চাইল,—বাধা পেয়ে সে বিবাহটার পরেই
সুক হয়ে উঠল,—বিবাহের আয়ােজনগুলাে তার কাছে একান্ত
বিরক্তিকর, সমস্ত অনুষ্ঠান অর্থহীন লাগতে লাগল।
চন্দ্রনাথের অসুস্থতায় কাজকর্ম সব বিশৃখল হয়ে পড়ল।
আত্মীয় অনাত্মীয়ের সংখ্যা নগণ্য, কিন্তু সকলেই বিবাহােপলক্ষ্যে
সপ্তক
দুদিনের জন্যে এসেছে নানা জায়গা থেকে-মায়াপুরে নিঃসঙ্গ
জীবনে অধিকাংশকে না দেখেই নি কখনাে, যাদের বা
দেখেছে তাদের সাথেও স্ব-পরিচ। কিন্তু বিবাহ স্থগিত
থাকতে পারে না,-কৰ্ত্তাহীন কর্ম কোনাে মতে এগিয়ে চলল।
একলা ঘরে বসে বসে বাহিরের কোলাহল শুনে অনলার
মায়াপুরের সে শান্ত নীরবতা মনে পড়ছিল।—নিত্য তােরে
যখন জলের মত স্বচ্ছ টলটলে আকাশে গােলাপী আভা ছড়িয়ে
যায়, সুনন্দা উঠে দেখত মন্দিরের ত্রিশূলে আলাে পড়েছে
বেণুবনের মাথায় মাথায় আলাে এসে লেগেছে, দীঘির আঁধার
জলে রঙের কাপন জেগেছে-সুন্দর কাজে অকাজের সারা-
দিনের ছন্দটি যেন নীরবে বেজে উঠল এদের মাঝে তার
আঠারটি বছরের স্মৃতির লিপিকায় সে দীঘি, দেবালয়, মুকুলিত
আশাখা, মর্মরিত বেণুবন প্রতি দিনে কত মধুৰিন্দু জমিয়ে
গেছে। বিদ্যুৎকে চমকে দিয়ে মেঘ ডেকে উঠল—মেন্ধকার
আকাশকে দেখে সুনন্দার মনে জাগল-সেই পল্লীভ্যোৎস্না ;
উত্তপ্ত শ্ৰীম-দিনের শেষে অলিন্দে শীতলপাটি বিছিয়ে চন্দ্রনাথ
তাকে নিয়ে বসতে; আমের মুকুলের গন্ধে বাতাস মাতাল,
বকুল বটের মসৃণ পপুরে জ্যোৎস্যা ঝরে পড়ছে, ঢাগেল’র
যেৎলাসিক্ত এর থেকে থেকে জেগে উঠত; পিতাপুত্রীর
আলােচনার মুগভীর অন wেংল্যানী রাতের সাথে
মিশে যেত। না চাইতেন সুনার বা কোথাও যেন
ব্যাহত না হযমে আলাের মাল তার একাশ বােক।
ভবিতব্য
উমানাথের এসবে বিশাল ছিল না, তিনি ছিলেন অন্য প্রকৃতির।
সুনন্দকে এতদিন অবিবাহিতা রাখায় তাঁর বােয়তর আপতি
ছিল। তিনি বহুবার তার বিবাহের সান্ধ এনেয়ে কি
চন্দ্রনাথ প্রতিবারেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। এবারে নানা
সম্বন্ধ আনলেন কোন রাজবাড়ী থেকে ভারী বমিয়াদি বংশ
নাকি, হাতীশালে এখনাে হাতী বাধা আর ষােড়াশালে বােড়।
পা অত্যধিক বিধান শিক্ষিত নাই বা হল,—তাদের ও এর
চাকরী করে খেতে হবে না। বাপের অবর্তমানে অত বড়
জমিদারির সেই এখন মালিক। এত বড় ঘরে কুটুৰিত করা
বড় সােজা কথা নয়। এতেও চন্দ্রনাথ সম্মত না হলে উমানাথ
যে ভগ্নীর আর কোনাে বিষয়ে থাকবেন না এ কথাটা পু পুন
বলে দিলেন।
চন্দ্রনাথ মত করতে পারলেন না। মেয়েকে এবার যখন
পরের ঘরে পাঠাতেই হবে তখন নর্থক দেরী করে এমন পাঞ্জ
হাতছাড়া করে কি লাভ। উমানা সােলা কলকাতায়
ফিরলেন কথাবার্তা পাকা করে ফেলতে। কয়েক দিন পরে
জানালেন তার বিয়ের সমস্ত স্থির করে ফেলেন। ঘরের
এক মামা সুনন্দাকে আশা করতে নাই মায়াপুরে যায়,
সেই সঙ্গে আর এফও যাবে মালতীকে আদি করতে।
তাদের আশ্রিতা বিবা খুল্লতাত-পত্নীর ফন্যা মালতী, মাতার
কথাও ভােলে নি।এসই তিনিইকো দুটিয়ে
কিন্তু তাদের পণ দিতে হবে না, পাঞ্জ পলি ।
।
উমানাথ হিসেৰী লােক, বুদ্ধি করে ঠিক করেছেন মালতীর বিবাহও সুনন্দার সঙ্গে একরাত্রে সেরে ফেলা যাবে, খরচপত্র প্রভৃতি নানা দিক দিয়ে এতে মস্ত একটা সুবিধা, এমন কোনাে মতে দুটি করিয়ে পাত্রটিকে নিয়ে এসে বিয়েটা সেরে ফেলতে পারলেই বাঁচা যায়। কক্ষের একপ্রান্তে আর একটি কনেকে কখন বসিয়ে দিয়ে গেছে। সঙ্কুচিতা শ্যামা মেয়েটি, চন্দ্রের আকর্ষণে উচ্ছ্বসিত সমুদ্রের মত নানারকম ফিতে জড়ানাে চক্রাকার খোপাটির আকর্ষণে চুলগুলি সব নিঃশেষে সামনে থেকে সরে পিছনে এখছে এসে। কপালে তার কাচ পােকার টিপ, নাকে নােলক। এত গােলমালে বেচারা আরাে আড়ষ্ট জড়সড় হয়ে বসে আছে। বরের কথা শিশুকাল হতে সে কত না অনেছে -তার বরটি কেমন হবে? গঙ্গাজলের বরের মত তাকে সেই পাখী-আঁকা কাগজে যদি চিঠি দেয়। ভাবতে ভাবতে এক এক- বার তার দুলুনি আসছে। ঘন ঘন শধররালে বরের আগমন প্রচারিত হল, বারিধারার প্রবল বর্ষণে উলুধ্বনি ক্ষীণ হয়ে গেল। শঙ্খ শুনে সুনন্দার মন বর্তমানে ফিরে এল,বিবাহ, চন্দ্রনাথের অসুস্থতা সব ভিড় করে জেগে উঠে তাকে পুনর্বার অশান্তিতে ভরিয়ে দিলে। শর্কের কে একজন সুনন্দাকে রাজকুমারের হাতে এমন করলেন। সভায় চারিদিকের বিশৃধা লাকে আয়ে বিট করে নিলে। সবগুনে আর হয়ে সে নিস্তব্ধ ২৪
ভবিতব্যতা
ভাবে বসে রইল, বিবাহের কোনাে মন্ত্র তার মনকে ধুতে পারল
না। শুভদৃষ্টির সময় স্বল্পপরিচিত ও অপরিচিতা পুরনারীদের
চেয়ে দেখার নানারকম অনুবােধ তাকে শুধু ক্ষিপ্ত করে তুলল,
পানপত্রের আড়ালে বিনত নয়ন তার চন্দ্রনাথের রােগ-কাতর
মূর্তি স্মরণ করে বারবার জলে ভরে উঠছিল কেবল। জীআচার
শেষে বাসর ঘরে প্রবেশ করে সুনন্দা আর অপেক্ষা করতে
পারল না। গাঁটছড়া-বাবা ওড়না খসিয়ে রেখে চন্দ্রনাথের
কক্ষে চলে গেল,—পশ্চাতে অসন্তোষ বিরক্তির যে ঝর উঠল
তা শােনার ধৈৰ্য্য তার ছিল না।
পরদিন রাতে বরকনে বিদায়ের সময় পর্যন্ত অসময়ের
অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি বিদায় নেয় নি। ভুক্তপত্রের রাশিতে কাকের
চীৎকার, দাসীপরিচারকদের ক্লান্ত কোলাহল, আত্মীয়
অভ্যাগতের অকারণ কলরব, ডাক্তারদের আনাগােনা, চারি-
ধারের অগােছাল জিনিষপত্রের অপরিচ্ছন্ন ভাব ও মহামান্য
বরপক্ষীয়দের কল্পিত অবমাননার আন্দোলনের মাঝে বকনে
বিদায়ের ব্যাপার উৎকট গােলােযােগ সৃষ্টি করলে।
অবগুণ্ঠিতা সুনন্দা চক্ষনাথের শষ্যাপার্শ্ব হতে উঠে এল,
আত্মীয়স্বজনের দল ঠেলাঠেলি করে তাকে যে মােটরে উঠিয়ে
দিল, সে কোনমতে সেই মােটরে উঠে বসল। ভরা চিজকে
তার উলে করে কত প্রশ্ন যে গহি-আয়ের নেংনীড়
ছেড়ে কোথায় সে চলল?—এক কানার হাতে ভাগ্য সমর্পণ
করা, সে কি মনের তারে সঠিক সুরে গাত দিতে নৰে?•••
২৫
এমনি করে কতদিনে কত মেয়ে সুসংশয়-শঙ্কিত মৰে পিতৃ
গৃষরে অক্ষরেখা রচনা করে গেছে-সুনন্দার বাধনহারা
অশ্রুধারা সে চিরন্তন চিহ্নতে মিলে যেয়ে তাকে আর একটু স্পষ্ট
করে দিলে।
অমিতাভের মা ও বেশ পরা, সৌম্য তার চেহারা
-উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন না জানি ছেলে কেমন বধু আনে। জাতি
কুটু দিয়ে তার সব আয়ােজন করান, তাদের মুখে বধূর বা বর্ণনা
শুনেছিলেন তাতে তিনি তৃপ্ত হতে পারেন নি; সুনাকে দেখে
মুগ্ধ বিস্ময়ে কেবলই বলেন, “আমার অমিতের ভাগ্য ভাল, ওমা
এমন সুন্দর বৌ হয়েছে।” কন্যাপক্ষে আচৰিত অসুস্থতায় সষ বিশৃঙ্খল
হয়ে গেছে শুনে তিনি দুঃখিত হলেন, কিন্তু তখুনি যেয়ে খোঁজ
খবর নেবার সময় কারাে ছিল না,-অমিতাভকে কর্মোপলক্ষ্যে
মধ্যপ্রদেশের যেখানে থাকতে হয় সেই দিনই তাকে সেখানে
ফিরতে হবে, ট্রেণের সময় বয়ে যায়, বরবধূকে যাত্রা করাতে হবে,
সকলের ব্যস্ততার অন্ত নেই, দ্রুত কাজ সেরে ফেলার চলতা
চারিদিকে।
সুনন্দাকে অমিতাভের সঙ্গে আজই দূরে যেতে হবে একথা
সে পূর্বে শােনে নি-কোন কথাই বা সে শুনেছে। আর যা
গােলমােল পরপর ঘটেসৰই বােধ হয় তাতে ওলট পালট হয়ে
গেছে। বাড়ীর মায়ের সম্ভাবনায় সে সচকিত হয়েছিল
খানের সাধারণ মণ মেলে কিন্তু বিনিত হলেও।
যেতে বলে। অতিতের মায়ের সহজ সম ব্যবহার
৪
২৬
ভবিতব্যতা
অনাড়ম্বর অভিব্যক্তি সুনন্দার সংক্ষুব্ধ মনে অনেকখানি শান্তি
ঢেলে দিলে। বিক্ষিপ্ত উদ্বিগ্ন মনে বেশ কিছু তলিয়ে দেবার
তার শক্তিও ছিল না।
অনুষ্ঠানে আচারে বধু দেখার তাড়াহুড়ায়গা কোথা
দিয়ে কেটে গেল। পুনৰ্ব্বাব বরবধু বিদায়ের পালা, আবার সেই
যাত্রা করা। অবশেষে কোনমতে ট্রেণে উঠে তবে যেন সুনশা
নিঃশাস ফেলার সময় পেলে ; প্রচুর গােলমালের মাঝে তী
বাশ বাজিয়ে গাড়ী ছাড়ল। এতক্ষণে এবার একটু সুনন্দা
হাত পা ছড়াবার সময় পেলে।
এতক্ষণ ধরে বারবার ‘অমিতাভের আহ্বানটায় কি একটা
চেনা সুর সুনন্দার মনে পড়ছিল যেন।•••শীতের অগম মধ্যাহ্নে
মায়াপুরের আলােছায়ার আলপনা-আঁকা দীঘির ঘাটে বসে সে
কতদিন দেখেছে ঘন নীল আকাশের পাতা জলে ঠিকরে পড়েছে,
নারকেল সুপারিপাতা আলােয় ঝিলমিল করছে একটুকরাে
জাপাের মত মাছ লাফিয়ে উঠল, একটা নাহাঙা এপতির
মত গলা কাপিয়ে জলের ঠিক ওপরে ক্ষণেক উড়ে সজনের পাশে
স্থির হয়ে বসল—তার গ্রীবার মুক্তি পালক আলােয় মাণিকের
মত জ্বলে উঠল, একমুঠো মুক্তোর মত সজনে এলে ঝরে
পড়ল। দীঘির যে এত মনে এসেছে সেখানে ওনার মাকে
শারদলীর চরণ চিহ্ন একটি শালুক এনে ছুটে-তারে
ঘিরে সেই যে কয়েকটি মৌমাছির গুঞ্জন কোন লে ধূমপুরী হতে
তেলে আসা কি যেন না বােঝ সুমিত নামটা সেই
২৭
০
সুয়েই মনকে টানে না? বিবাহের পূর্বে এ নামটা ত তাকে
কেউ বলে নি। মনে হতে সুনন্দার ওষ্ঠপুটে একটু হাসি
জগল,-কোন্ কথাটাই বা তাকে বলা হয়েছিল!•••জানালার
কাছে মুখ রেখে বাহিরের অপসৃয়মান দৃশ্যপটের দিকে শান্তভাবে
সুনন্দা তাকিয়েছিল,—আরও কতদুর—কোথায় গিয়ে যাত্রা
তাদের শেষ হবে! চন্দ্রনাথ কেমন আছেন কে জানে!
চনাথের কথা মনে হতেই তার চোখ ভিজে এল, জানালা
থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে। কঙ্গে আর দু’জন যাত্রী ছিল,
তাদের সামনে অমিতাভ তার দিকে চেয়ে আছে দেখে
অনভ্যাসে সুনন্দা বিব্রত হয়ে উঠল।
অমিতাত বলল
“দেশ ছেড়ে যেতে ভারি খারাপ লাগে না? আমারও প্রতি
বার মন খারাপ হয়ে যায়। হেসে বলল-“এবারে
ছাড়া অব।”
অমিতাভের মনে একটা বিস্ময় থেকে থেকে জেগে উঠছিল,
সে একদৃষ্টে সুমন্দার পানে চেয়ে আত্মবিস্মৃত হয়ে কি ভাবছিল।
সুনন্দাকে চাইতে দেখে বললে “উপবাসে আর গােলমালে
মানুষের চোখও মানুষকে ঠকায়। কাল রাতের অন্ধকারে
তােমার যা মুখ দেখেছি—আজ মনে হছে তার চেয়ে কত সুন্দর
তুমি মানুষের চারিপাশের আবেষ্টন এমন ধাধার সৃষ্টি করে।
নইলে কালকের নিশীথের দেখা সেই আড়ষ্ট যন্ত্রের পুটলির
মাৰে এই অগ্নিশিখার বৃথরগ লুকিয়েছিল?
সুনকে নিদ্রাতুর দেখে অমিত শয্যার বন্ধন মুক্ত করে
২৮
ভবিতব্যতা চৰ্মাসনের ওপর বিছিয়ে দিলে। সুনন্দাকে বললে একটু খুলে ভাল হত-যা হৈ হৈ গেছে।” এমনভাবে অপরিচিত আবাসে নিদ্রা যেতে সুনদা সম্পূর্ণ অনভ্যস্ত, অমিতাভ বললেও সে শুধু খানিকটা হেলান দিয়ে বসল। গাড়ীর গতির দোলায় কখন সুনন্দা গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়ে গেছল জানতেও পারেনি। পরদিন প্রভাতে ভােরের আলাের রঙীন অঞ্জলি সারা দেহে ছড়িয়ে যেয়ে জাগিয়ে দিল তাকে। তথনও অন্য সকলে ঘুমিয়ে। অমিতাভের শালটা নিজের গায়ে জড়াননা দেখে সুনন্দার কুণ্ঠা লাগল,-অমিতাভের উপাখানটাও পিঠের দিকে ঠেসিয়ে দেওয়া। পাশের চৰ্মাসনে অমিতাভ বাহুর ওপর ললাট রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। একটি আলাের রেখা তিক ভঙ্গীতে তার মুখে এসে পড়েছে, বাতালে কয়েক গুচ্ছ চুল উড়ছে। উদিত সূর্যের দীপ্ত আলাের মাঝ দিয়ে সুনন্দা তাকিয়ে দেখল কি সন্ত্রমতরা সুন্দর মুখ এই-এ মুখের দেখা কি সে পেয়েছে আগে ?-জানান্তে সিক্ত কেশে শুচী বন্ধে সে যখন শুভ্র শিব সুন্দরের পূজা করেছে তখনই কি এ মুখের ছবি তার অন্তরে অঙ্কিত হয়েছে ?-তাই কি অতি আপনার বলে মনে হয় এ মুখ ? গােধূলির গেরুয়া আকাশ দিয়ে যখন বকের দল নীড়ে উড়ে গেছে, আমলকীবনের আড়াল দিয়ে চাঁদ দেখা দিয়েছে, তুলসীতলায় প্রদীপ শিখাটি কেঁপে কেঁপে উঠেছে- তখন তার আপনভােলা মন কি এই স্বপ্ন দেখেছে। গৃহ- ২৯
এত্যাগামী গােছর সাথে রাখালের পূরবীর বাশ, বােলয়ের
বিলীয়মান ঘণ্টাধ্বনি, পল্লীবালার সাথে মিলিয়ে যাওয়া
সুর তার মনে ত এরই আগমনী বাজিয়েছে!—কতদিনের রঙ
বােলানাে মনের আকাশে অমিতাভ কি আজ আলাের রূপে
এল? এতদিনের ছন্দে বাধা চিত্তবীণায় এবার কি সে সুর
লাগালাে ?•••
অমিতাভ চোখ মেলে সুনশা তার দিকে চেয়ে আছে দেখে
হেসে উঠে বসল।
গৃহে পৌছলে দেশীয় দাসী ভৃত্যেরা হাসিমুখে সুনন্দাকে
অভ্যর্থনা করে নামালে। তাদের ভাষা, তাদের দেশ সবই
সুনন্দার রহসুন্দর লাগছিল।
অমিতাভের ব্যস্ততার সীমা ছিল না, সুনন্দাকে কোথায়
যাবে, কি করবে সে যেন ভেবেই পাচ্ছিল না। বেশীক্ষণ
কাছে যাবার অবসরও নাই, অথচ কাছে পাওয়ার আগ্রহ
অসীম। তার অতিরিক্ত ব্যগ্রতায় কুষ্টিত হলেও সুনন্দা মনে
মনে পুলক পাচ্ছিল। সারা প্রিহরটা সে আপন মনে ঘুরে
বেড়াল। আকাশের সীমাছোয়া তৃণবিল মাঠ, কত দূরে
সীলাত একটা পাহাড়, তালীবনের মাঝদিয়ে বিশীর্ণ নদীর
বালুকে জলের রূপালি রেখা। একদিকে ফুলের আগুনলাগা
সমৰে তে কপিলেতে গরু দিয়ে জল টেনে দেওয়া।
নামে উলী পর আপনমনে কোথায় চলে গেছে, মঙীন
শাড়ী পরা সুদে মেয়েদের সে পথে আনাগােনা, চলার তালে
ভবিতব্যতা
তাদের কোচার ফুল ফেঁপে উঠছে, সুনন্দা বিমােলয়কে
তাকিয়ে দেখছিল।
অমিতাভ সমস্ত দিন বাদে সেইমাত্র গৃহে ফিরেছে, সুনন্দা
তখন জানালার কাছে দাড়িয়ে দেখছিল, হঠাৎ বলে উঠল, “একি
দাদা আসছেন যে”। উমানাথ উদ্যান পথে জোরে হেঁটে
আসছেন। অমিতাভ তার পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হয়ে তাকে
এগিয়ে আনতে নেমে গেল।
সুনন্দা শফায় পাং হয়ে গেল, চরনাথ কেমন আছেন
ভাবতেও তার সাহস হচ্ছিল না। উমানাথ প্রবেশ করতেই
তক জিজ্ঞাসা করল, “বাবা কেমন আছেন?
তার বিকৃত সুরে উমানাথও একটু চমকে উঠেছিলেন,
তারপর বলে উঠলেন, “বাবা, ও বাবা কতকটা সামলেছেন। ও
অসুখ কি আর সারবে, কিন্তু তােমায় এখনই আমার সঙ্গে চলে
আসতে হবে।” শেষের দিকে খরটা তার ভয়ানক গম্ভীর
আদেশমূলক শােনাল।
অমিতাভ জিগগেস করল, “কেন?”
খেকিয়ে উঠে উমানাথ বললেন, “কেন। এণে বিগগেস
করার ফুরসৎ হ'ল, কেন! তােমার বিয়ে হয়েছে আমার কাকার
মেয়ে মালতীর সঙ্গে তা কি জান না। ন্যাকা। আর এই নেশা
আমার বােন, তার বিয়ে হয়েছে জগৎপুরের কুমারের সঙ্গেও কি
তােমায় বলে দিতে হবে? বর-কনে বিদায়ের সময় সুনন্দাকে
ওরা ভুল করে তােমার গাড়ীতে তুলে দিয়েছে তার মালতীকে
मरक
দিয়েছে জমিদার বাড়ির গাড়ীতে। তােমার কলকাতার বাসায়
তােমায় না পেয়ে বরাবর এখানে চলে আসছি আর কেন! এর
ওপর আর কিছু বলার দরকার আছে?
সুনন্দা ও অমিতাভ দুজনে বাহতের মত বিমূঢ় হয়ে
দাড়িয়ে রইল।
বিবাহ সম্বন্ধে অমিতাত কতকগুলো নিজস্ব মতামত
গড়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে মেয়ে দেখতে গিয়ে তাকে প্রশ্ন
করার প্রথা তার মনে অত্যন্ত বিরাগ জাগাত। এসম্বন্ধে
কিছু বললে বন্ধুরা উত্তর দিত ‘বারে! যাকে বিয়ে করব তাকে
দেখে শুনে নিতে হবে না। অমিতাভ বলত, “মেয়েদের
কি দেখে-শুনে নেবার সুযােগটা দিয়েছ ?-আগে
মেয়েরাই হত স্বয়খরা, অটুট ধনু ভাঙিয়ে, অসম্ভব লক্ষ্য •
বিষিয়ে শােৰ্য্য বীৰ্য্য পরীক্ষা করিয়ে নিত, বন-অরণ্য সন্ধান
করে বণরথ পরিচালনা করে আপন ভাগ্য আপনি চিনে
নিত। আর আজ বন্ধুরা বলত, আচ্ছা দেখা যাবে নিজের
বেলা কি কর।
পণ নেবনা বলেও প্রাণপণে শােষণ করা দেখে দেখে
অমিতাভ ভাবত সে যদি বিয়ে করে, এমন ঘরে করবে যাদের
শােষণােপযােগ সংস্থানও নেই।
মালতীর সঙ্গে বিবাহের যখন সম্বন্ধ আসে, মাতার
অনিচ্ছাতেও সে রাজী হয়। মেয়ে দেখতে যাওয়া ইত্যাদি
সন্ধে প্রথম হতেই সে অসম্মতি জানিয়ে দিয়েছিল। এ রকম
ভবিতব্যতা
দেখে শুনে বিয়ে করেও এমন বধু হয়েছে দেখে অমিতের
মাতার আনন্দের শেষ ছিল না।
উমানাথ পুনরায় আরম্ভ করলেন, যেখানে আমি না থাকব
সেখানেই অঘটন ঘটবে। নইলে এমন ভুলও হয়! এমন একটা
লােক ছিলনা যে বর কনেকে দেখে শুনে বিদায় করে। বর
পদের দোষ দেওয়া যায় না, তারা ত কনেদের চেনে না,
তা ছাড়া কনেরা ছিল ঘােমটায় ঢাকা, কিন্তু আমাদের বাড়ীর
লােকগুলা কি! যত সব অপদার্থ বারের দল।
অমিতাভ সুনন্দার কাছে একটা আসন এগিয়ে দিয়ে
জানালার ধারে সরে দাড়াল।
উমানাথ বললেন, “আর সঙের মত দাড়িয়ে থেকে দেরি
করাে না বলছি, চল। ওদিকে কত কাজ পড়ে রয়েছে।
ওদের বুঝিয়ে হাতে কিছু বড় রকমের নগদ ধরে দিয়ে দেখি কি
বলে। আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা ত করতে হবে।
এতক্ষণে সুনন্দা কথা বললে,-“আর মালতী ?
“ওঃ, তাকে তারা সেই দিনই ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। তখন
থেকেই ত হৈ চৈ শুরু হয়েছে। মালতীকে অবিশ্যি আমরা
এখানে পাঠাতে পারি যদি ঐ অমরেশ না কি ওর নাম তাকে
নিতে রাজী হয়, আর না নেয় ত সে যেমন ছিল আমাদের কাছে
তেমনি থাকবে আর কি। মেয়ে মানুষ,-খেতে পরতে পাবে,
—তার আবার দুঃখুটা কিসের। দরকার হলে একটা প্রায়শ্চিত
করান যাবে না হয়।
ত
সপ্তক
পশিতা মালতীর কুমারী নামটা ত ঘুচে গেছে। তাহলেই
হল। কিন্তু সুনন্দা, জমিদার ঘরের একমাত্র মেয়ে, তার কথা
স্বতন্ত্র। কত সন্ধানে এতবড় ঘরে বিয়ে দেওয়া গেল, তাকে
সেখানে না পাঠাতে পারলে সবই বৃথা। সমাজপতিদের মস্তক
যথেষ্ট পরিমাণে তৈলসিক্ত করলেই ব্যাপারটা অনেক মসৃণ হয়ে
যাবে বৈষয়িক উমানাথের সেকথা বুঝতে বিলম্ব হয়নি। তিনি
বললেন, “চল বেরই। যার হাতে তােমায় সম্প্রদান করা
হয়েছে সেই তােমার স্বামী। এ বাড়ীতে থাকার তােমার ত
অধিকার নেই।
অমিতাভ দাঁড়িয়ে ভাবছিল লক্ষ্মীছাড়ার ভাগ্যে এমন লক্ষ্মীকে
লাভ করা সম্ভব কি! তার এ দীনগৃহে লক্ষ্মীর স্বর্ণালন কি
প্রতিষ্ঠিত হয় কখনন! উমানাথের কথায় বিচলিত হয়ে বলে
উঠল, ‘তা বলবেন না, ওঁর উপযুক্ত ঘর আমার নেই, কিন্তু
আমার এ সামান্যকে উনি নিজের বলে ভাবলে ভাগ্য বলে
মানব।
উমানাথ ধমকে উঠে বললেন, “
রাখে রাখাে,-তােমার
ওসব নাকে কাদা শিভালরি আমার ঢের শােনা আছে।
তিনজনে নীরব।
সব মিথ্যা, সুনন্দার সব মিথ্যা। আবহমানকালের শুনে
আসা রীতি এমন করে তার মিথ্যা হল। অতি-অপরিচিত
অজানা একব্যক্তি একসন্ধ্যার মন্ত্রবলে জন্ম জন্মান্তরের নিকটতম
হয়ে উঠবে এই চিরন্তন প্রথাকেই ত সে মেনে নিয়েছিল। তাই
৩৪
ভবিতব্য
ত জীবনের এ নব অধ্যায়ের অতিথিকে যখন সে চােখ মেলে
দেখলে তখন এমন সহজে তাকে গ্রহণ করতে পারলে। তার
কুমারী জীবনে যে পথিকের আগমন-আশার প্রদীপ জ্বেলেছে,
বিবাহের তলগ্নেই তাকে সে পাবে, বিবাহের বরজায় যার
আগমন সেই তার জন্মতােরণে হারিয়ে যাওয়া জন-অরণ্য হতে
খুঁজে পাওয়া জন্মান্তরের পরিচিত,–এর মাঝে ত সংশয় জাগে
নি। অমিতাভকে এই যে তার ভাললাগা,—সে জেনেছে এটা
হ’ল বিবাহের মন্ত্রশক্তির প্রভাবে। সে ধারণা এত ভ্রান্ত, এত
মিথ্যা হল আজ! এমন করে তাকে প্রতারিত করলে।
আচ্ছাশনে সে অধর দংশন করলে। প্রতারণাকে প্রতারিত
করবে সে। তার হৃদয়ের নিভৃত কন্দরয়ী দেবতা তাকে দিয়ে
যার গলায় বরমাল্য পরিয়েছেন, তাকেই সে বরণ করে নেবে,
আজন্মের সংস্কার বিবাহের বাহ অনুষ্ঠান তার পক্ষে ব্যর্থ হােক
গ্রাহ করবে না।
উমানাথ ডাক দিলেন, ‘চলনা সুনন্দ!
আমি যাব না।
বঞ্জ পড়লেও উমানাথ এত চমকে উঠতেন না। তােক
করে তিনহাত লাফিয়ে উঠে বললেন,‘কি।
অমিতাভ বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত
চমকে ফিরে সুনন্দার মুখের দিকে চাইলে।
সুনন্দা বললে, 'আমি যাবনা।
এতদিন সে সকল সংস্কারকে নির্বিচারে মেনে এসেছে। আজ
সপ্তক
দেখেছে প্রতারণার রূঢ় আঘাত বুকে এসে বাজল। আজও কি
তার নিজে পথ দেখে চলার সময় হল না! এ নবজীবনের পথ
তার জ্যোৎস্না-সরস হবে না নিশ্চয় করে ললাট নেরে বহির
আলােয় যাত্রা তাদের সুরু, আকাশে তার রঙের লীলা নাই বা
রইল, মহাসন্ন্যাসীর বাঁধন-খসা জটার জটিলতা সেখানে দেখে
সে ত ফিরবে না!সে এরই মাঝে সত্যের সন্ধান পেয়েছে,
সংস্কার আর কি তাকে বাঁধতে পারে।
বাকশক্তি ফিরে পেয়ে উমানাথ গর্জন করে উঠলেন—“কি
বললে, আসবে না ! জান, ওর সঙ্গে তােমার বিয়ে হয়নি।
সুনন্দা মাথা হেলাল।
কতবড় রাজবাড়ীতে তােমার বিয়ে হয়েছে জান তুমি?
তাদের নামে বাঘে গরুতে একঘাটে জলখায়, জান?
দরকার নেই জানবার !
না, তা কেন দরকার থাকবে। শুধু ভুল করে এই যে
এখানে চলে আসা এতেই আমাদের কত মাথা হেঁট হয়েছে,
কত গুণােগার লাগবে এ শােধরাতে, জন। আমাদেরই ত
গর, ওদের আর কি!একটা ছেড়ে দশটা বিয়ে করতে
পারে। এখনি চলে এস বলছি।'
না।
ওদের গরজ যদি এত সহজেই শেষ হয়ে থাকে তার গরজও
তবে শেষ হয়েছে। দুর্যোগ নিশার অন্ধকারের অপরিচয়ে
একজনের সঙ্গে সুনন্দা ময়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, তার
৩৬
ভবিতব্যতা
পরদিন প্রাতে যার সাথে পরিচয় তাকে নয়ন মেলে দেখে গ্রহণ
করে নিলে। এখন শােনে ভুল হয়েছে, রাত্রের অন্ধকারে
মন্ত্রের সম্বন্ধে সম্বন্ধ হ’ল যার সঙ্গে এ সে নয়! নাই হােক,
—আজ অকুণ্ঠ আলাের আভায় যার সঙ্গে পরিচয় তারই
আবির্ভাব একান্ত সত্য সুনন্দার জীবনে। রাত্রের অন্ধকারে
মন্ত্রের পরিচয় দুঃস্বপ্নের মত মিথ্যা হয়ে গেছে এখন।...তাদের
এই মিলনে সাহানার সুকোমল সুর বাজবে না, নিন্দা অপবাদের
রক্তিম ভৈরে। রাগে হবে তাদের পরিচয়। সমাজ তাকে
এড়িয়ে যাবে। জন-অরণ্যে এই স্বেচ্ছাকৃত নির্বাসন তাকে
কাটার মত বিধবে। বিধুক তা।•••
ক্রোধে কম্পিত হয়ে উমানাথ বললেন, ‘না! বটে! তুমি
রাজবধু হতে চাও না, তুমি আমাদের ত্যাগ করে, সমাজ ত্যাগ
করে এখানে এই স্বেচ্ছাচারে থাকতে চাও?
অমিতাভের ললাট লাল হয়ে উঠল। সে নিজেকে সামলে
রাখলে।
সুনন্দা অতি সংক্ষেপে জবাব দিলে, ‘আমি এখানেই থাকব।
কয়েক মুহূর্ত বিমূঢ় থেকে উমানাথ চেঁচিয়ে উঠলেন,-হবে
! মেয়েকে ধেড়ে-কেষ্ট করে রাখবার ফল ফলবে না।
তখনি আমি পইপই করে বাবাকে বলেছি,-এবার এই স্বাধীন
স্বেচ্ছাচারিণী মেয়েকে বাবা সামলান। ছি ছি, কি কেলেঙ্কারি।
আমি কিছু জানি না। তারপর সহসা সুর কোমল করে
বললেন, ‘লক্ষ্মী বােন, এখনাে বলছি চলে এস দিদি।
সপ্তক
না দাদা।
উমানাথ আবার জ্বলে উঠে বললেন, 'তােমার মুখদর্শনেও
পাপ! আমাদের কাছে আজ থেকে তুমি মরে গেলে। কখনাে
যেন তােমার মুখ দেখতে না হয়।
হােটখাট একটা ঘূর্ণীর মত ক্ষিপ্তভাবে উমানাথ বেরিয়ে
গেলেন।
ক নিস্তব্ধ।
অমিতাভ এতক্ষণ নীরব হয়েছিল। তাহার ক্রোধের কোনাে
প্রকাশ শুধু সুনন্দা থাকায় করতে পারে নি।
এগিয়ে এসে ধীরে বললে, “সুনন্দা, কিসের জন্যে সব
ছাড়লে? সারা জীবন ঝড়-ঝাপটে যুকে চলতে পারবে কি ?
সুনন্দা হীরের মত দীপ্ত দুটি চোখ অমিতাভের মুখের ওপর
রাখলে। প্রলয় ঝঙ্কাকে সে ভয় করবে না। যিনি প্রলয়ঙ্কর,
তিনি তাকে পথ দেখালেন, রিক্ত হয়ে সে যাত্রী হল, এ যাত্রা
কি ধ্রুব হবে না? আস্তে থেমে বললে, “তুমি আমায় সাহায্য
করবে ?
অমিতাভ নত হয়ে বললে, ‘এত বাধাকে জিতে তুমি আসবে,
একি কখনাে স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম! তুমিই আমার সাহায্যে
হাত বাড়ালে সুমনা, কতদিনের কর্মশুদ্ধির পর আমি পৌছাব
তােমার কাছে সে কি বলতে পার ? সে তার বিস্ময় সমভরা
দুটি চোখ সুনন্দার অনিন্দ্যসুন্দর মুখের ওপর রেখে স্থির হয়ে
দাড়িয়ে রইল।
০
৩,
ভবিতব্যতা
তালীবনের ফাক দিয়ে অস্তসূর্যের শেষরশ্মি তাদের ললাটে
স্বর্ণচন্দন একে দিয়ে চলে গেল।•••
কয়েকদিন পরে চন্দ্রনাথের একখানা চিঠি এল। তিনি
সুনন্দাকে লিখেছেন, আমরা গড়েছিলাম এক, বিধাতা তাকে
এই ভুল দিয়ে ভেঙে গড়লেন অন্য। তুমি তার এই নুতন
গঠনকেই গ্রহণ করে নিলে; লােকাচারের নিয়ম তুমি মানলে
, নিজের জীবনপথ নিজে নির্বাচন করে নিলে। আমার কিছু
বলবার নেই মা। তবে মানুষের আশীর্বাদের যদি কোনাে অর্থ
থাকে তাহলে আমার আশীর্বাদ, যে-সত্যকে গ্রহণ করলে তাকে
পালন করবার শক্তি যেন তােমাদের অটুট থাকে চিরদিন
অসাংসারিক চন্দ্রনাথ কন্যাকে আশীর্বাদ করেই ক্ষান্ত হলেন।
সাংসারিক উমানাথও ভগিনীর হিতৈষী ছিলেন। সুনন্দাকে
চিঠি লিখে তিনি জানিয়ে দিলেন কেমন করে অমিতাভের সহিত
তার মিলন আইন সঙ্গত বিবাহ হতে পারে।
কিন্তু মালতীর কি হবে ?
মুক্তি
( Chirikofএর অনুসরণে )
মাঠের মাঝে ছােট্ট ষ্টেশনটি ; দুখানি টিনের ঘরকে ছেয়ে
বেগুনে-ফুলে ভরা লতাটি উঠেছে, কঁকর সরিয়ে শীর্ণ দুটো
পাতাবাহারের গাছ।
ষ্টেশনের কাছে লাইনের ধারে স্কুল-মাষ্টারের খড়ে ছাওয়া
বাড়ী; রােত সেখানে অপরাহ্নে সুরতি সব কাজ ফেলে গবাক্ষর
ধারে দাঁড়ান এসে; কলকাতা থেকে ট্রেণ আসে—সুরভি
উৎসুক হয়ে দেখতে থাকেন—দু চারজন লােক ওঠা-নামা
করলে, পানওয়ালা একটানা সুরে হেঁকে যায়, একটি লােক
শেষ মুহূর্তে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে লণ্ঠন, সরাই সব হুড়মুড়
করে গাড়ীতে ফেলে সচল পুটলির মত অবগুণ্ঠনবতী পত্নীকে
শিশুসহ ঠেলে ফুলে উঠিয়ে দিলে, ঘণ্টা বেজে উঠল-একরাশ
ধোয়া আকাশে ছড়িয়ে ট্রেণ চলে যায়— হ'তে ক্ষুদ্রতর
হয়ে বকের আড়ালে লুকিয়ে যায়। সুরভির চোখ অশ্রুতে
ঝাপসা হয়ে আসে, যার সঙ্গে এ সাগ্রহ প্রতীক্ষা, কোথায় সে
ছেলে তাঁর ! নীলবাসপরা একজন খালাসী সবুজ পতাকা
৪০
মুক্তি
দুলিয়ে সেদিক দিয়ে চলে যায়, সুরভি তাকে ডাক দেন-“ গা
বাছা, এই ত কলকাতার গাড়ী গেল ?”
“হা বুড়ীমা, এই ত।”—সে চলে যায়।
সুরভি আশা ছাড়তে পারেন না—র কি চোখের তেজ
আছে—লােকের ভিড়ে সে আড়ালে পড়েছিল হয়ত, সামনের
পথে এতক্ষণ এসে পড়েছে বাড়ীতে ;-এথনি হয়ত বাপে ছেলেয়
রাগারাগি হবে, বাপেরই ত অন্যায় বাপু, ছেলেমানুষ মাথার
ঠিক রাখতে পারে নি, তা বলে অত রাগ করলে চলে? তিনি
তাড়াতাড়ি সামনে যান দেখতে,উনানে চড়ান ডাল ধরে উঠল
সে খেয়ালও থাকে না।
বাইরে পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণের একধারে একটা বকুল গাছের
.তলে জীর্ণ কাষ্ঠাসনে বসে এক বৃদ্ধ হুকোটা হাতে ধরে ক্ষীণদৃষ্টি
সামনের পথে প্রসারিত করে আছেন, এক একবার হাতের
কোটায় টান দিয়ে আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন।
সুরতির পদশকে ফিরে চেয়ে গলাটা ঝেড়ে বললেন, “কি ?
এল না ত ?
ট্রেণের শূন্য লৌহপখ শেষ সূর্যের আলােয় তাম্রবর্ণে জ্বলছে,
দুজনে সেইদিকে করুণ চোখে চেয়ে থাকেন।
বৃদ্ধ উঠে পুরাতন চটিতে পা ভরতে ভরতে বললেন, “আমি
ত বলেই ছিলাম ; দেখাে, এখন প্রাণে বেঁচে আছে কি না।
ছেলে ছােকরারা কি যে হয়ে গেল আজকাল! লাঠিটা তুলে
নিয়ে তিনি ডাক্তার বাবুর বাড়ীর উদ্দেশে বেরিয়ে যান—কোমরে
৪১
জোর নেই, কুঁজো হয়ে চলতে হয়। একটা পা বাতে পঙ্গু,
টেনে টেনে কোনমতে যান।
ডাক্তার বাবু গ্রামের ঔষধদাতা, সঙ্গে সঙ্গে সাধারণকে
পরামর্শটাও তিনি বিনামূল্যে বিতরণ করে থাকেন। তাঁর
ভাই সেক্রেটেরিয়েটের কর্মচারী, লােকে জানে সরকারি
খবরাখবর সেহেতু তার নখদর্পণে। রােজ ডাকে তার একখানা
করে সংবাদপত্র আসে। তাতে তিনি বাস্তব অবাস্তব
নানা ঘটনার সংবাদ শুনিয়ে তার অসাধারণ জ্ঞানের পরিচয়ে
গ্রামবাসিদের অবাক করে দেন। ডাক্তার বাবু দয়ালের বাড়ী
প্রায়ই আসেন, ধূমায়িত চায়ের পেয়ালাটি নিয়ে আঁকিয়ে
বসে বলেন, “শুনেছ হে আজ কাগজে কি লিখেছে ?
কয়েদিদের নাকি ধুলােতে বালিতে মিশিয়ে খেতে দেবে এবার।”
তারপর তিনি সংবাদপত্রের বিবরণের সঙ্গে অন্ধকূপ হত্যার বিবরণ
মিলিয়ে ফেলে নিজের নানা কল্পনা জুড়ে দিয়ে তার সঙ্গে এমন
সব লােমহর্বণ ব্যবহারের কাহিনী রচনা করে বলেন যা শুনে
বারের অন্তরালে সুরভি শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করেন, দয়াল
ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করেন—তার ছেলে যেন প্রাণে বেঁচে থাকে।
এই সব বিভীষিকাময় স্বপ্ন দেখে সারারাত বৃদ্ধ দম্পতি চমকে
চমকে জেগে ওঠেন।
দয়াল চলে গেলে সুরভি দূর দিগন্তে দৃষ্টিমেলে ভাবছিলেন
ওই যে নীড়ে ফেরা পাখীর দল উড়ে চলেছে ওই দিক পানেই
কি কলকাতা ?—যেখানে তাঁর দেহের বিধি আছে? সূৰ্যাস্ত
৪২
রঙীন আকাশ, বিসর্পিত রাঙা পথে ঘরে ফেরা গরুরলতার
সামনে হ'তে সব মিলিয়ে যেয়ে জেগে ওঠে এক শিক্ষার্থী যুবার
মুখ। গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে তিনি সন্ধ্যাপ্রদীপ আলতে
যান।
সেদিন দয়াল কাজে বেরিয়ে যাবার পর সুরভি তরকারি
কুটছিলেন ব’সে। ধূলি-ধূসরিত একটা চৰ্মাধার নিয়ে পার্থ
দাড়াল এসে -বিশুষ্ক মুখে বিপৰ্যন্ত কেশ এসে পড়েছে ।
চর্যাপারটা নামিয়ে রেখে সুরভিকে এসে প্রণাম করল। সুরভির
হাত হতে অকর্তিত তরকারি খসে পড়ল ; প্রথমে যেন এ বিশ্বাস
করতে পারছিলেন না। ছেলেকে বুকে চেপে তার চোখে
কেবলই জল ঝরতে লাগল, রুদ্ধস্বরে বললেন-“এসেছ বাবা
ফিরে।”
তাঁর প্রশ্ন আর শেষ হয় না। কেমন ছিলে’, ‘কবে ছাড়া
পেলে’, ‘কখন এসে পৌছালে’-আমাদের ভাবনার কি আর
শেষ ছিল'—আবার যে তােমায় দেখব এ আশা কি আমরা
করতে পেরেছিলাম। পার্থের গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন,
“আহা বাহারে, মুখ যে একেবারে শুকিয়ে গেছে। পােড়াকপাল
আমার, কেবল বকেই মরছি। যাও বাবা হাত মুখ খােও গিয়ে,
আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
ম্লান হেসে পার্থ ঘরে গেল। সুরভির ব্যস্ততায় সে বিব্রত
বােধ করছিল। ক্লান্ত দেহ আসনে এলিয়ে সে চারিদিকে চেয়ে
দেখল—শৈশবে যেমন দেখেছে আজও তেমনি,-পরিচ্ছন্ন কক্ষে
৪৩
সপ্তক
পরিপাটি শয্যা, এককোণে ঝকঝকে পিলসুজে প্রদীপ রাখা,
বারান্দায় চন্দনার খাঁচাটি ঝুলছে, পরিষ্কার প্রাঙ্গণের প্রান্তে
পুষ্পিত করবীর কুঞ্জ, চামেলির ঝাড়টি, প্রাচীর বেয়ে ঝুমকো লতা
উঠেছে; জানালা দিয়ে শূন্য মাঠের সীমাহীন প্রসার, জনহীন
পথে একটা কুকুর বসে ঝিমচ্ছে, পুকুরে হাঁসের কলরব;
ছেলেবেলায় পার্থ হাস তাড়িয়ে পুকুরে নিয়ে যেত, এই ত
সেদিনের কথা যেন সে সব। পেয়ারা গাছের শাথে একটা
খামা উড়ে এসে লেজ নাচাচ্ছে। পার্থ উঠে জানালায় দাড়াল।
মেঠো পথে একজন দোলাই জড়িয়ে মুড়ি চিবতে চিবতে চলেছে।
পার্থর মন সহসা প্রত্যাগমনের পুলক হারিয়ে উদাস হয়ে
উঠল ;-পুষ্করিণীর বদ্ধ জলের মত কী গতিহীন জীবন এদের,
বাহিরের জগতের কর্মময় প্রাণস্রোত এখানে এসে স্থবির হয়ে
গেছে। পার্থর জীবনে দুধারার আবর্ত এ-কর্মমুখর সেই
অবসরহীন দিন যেয়ে এতদিন, এখন এখানের এই শান্ত শূন্যতা
তার গতিরােধ করল।
সুরভি এসে বললেন, “ওমা, এখনও মুখ ধােনি-যাও
শিগগির, আমার ত লুচি ভাজা হয়ে গেল। নারকেল নাড়ু
খাবে ত? আগে যে তুমি খুব ভালবাসতে!” পুত্রের প্রিয়
খাদ্যটি তিনি সযত্নে সংগ্রহ করে রাখতেন, কোন দিন সে এসে
পড়বে বলে।
পার্থকে খেতে বসিয়ে সুরভি বললেন, “খাও একটু ভাল
করে, যা চেহারা হয়েছে বাবা! কেন যে এমন জি হয়
৪৪
মুক্তি
তােমাদের।” মাছি তাড়াতে তাড়াতে বললেন, “দেখ বাবা,
তােমার বাবার কথায় রাগ করাে না। বুড়োমানুষ, সব সময়
মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন কি ? তােমার ওসবে যােপ দেওয়া
শুনে বড় রেগে আছেন, দুটো কড়া কথা বললে তুমি চুপ করে
যেও। বয়েস হয়েছে, ক’দিনই আর বাঁচবেন বল, বাতে
ত পঙ্গু।”
“এত ভুগছেন, কই শুনি নি ত?”
আর বল কেন বাবা, শরীর ক্রমেই ভেঙে যাচ্ছে। আমিও
আর পারি না।”
পার্থ তার মার দিকে তাকাল।—চুলে পাক ধরেছে, মুখে
বলিরেখা, শীর্ণ শিবহুল হাতদুটি—সে একটা নিশ্বাস ফেলল।
অপরাহে দয়াল ফিরলেন। পুত্রের আগমন সংবাদ আগেই
শুনেছিলেন, গম্ভীর ভাবে গৃহে প্রবেশ করলেন। পার্থের
প্রত্যাগমনে তার আন্তরিক আনন্দটা বাইরে প্রকাশ করা
দুর্বলতা বলে তার ধারণা, আর বিপথগামী সন্তানকে কিছু
শাসন করাও প্রয়ােজন।
পার্থ এগিয়ে এসে প্রণাম করল; তিনি তার মাথায়
হাত দিয়ে কিছু নির্লিপ্ত ভাবে বল্লেন, “এই যে, কখন এলে?”
কিন্তু তার অঙ্গুলির কম্পন তার মৌখিক নির্লিপ্ততার অনুকুল
ছিল না।
পার্থ বললে, আজ সকালে।”
“খাওয়া দাওয়া হয়েছে তা”—যেন পার্থ কুটুম্ব এসেছে।
৪৫
সপ্তক
সুরভি এতক্ষণে দয়ালকে দেখতে পেয়ে বেরিয়ে এলেন।
ব্যাপারটা সহজ করে নেবার জন্ঠে তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন,
“দেখছ, পার্থর কি চেহারা হয়ে গেছে, যাক বাপু, এসেছে যে
এই ঢের ; তুমি তােমার সে সব স্বপ্ন দেখে আমায় যা ভয়
দেখাতে,-কত ঠাকুর দেবতার দরজায় যে ধর্ণা দিয়েছি। চল
তুমি খাবে চল। পা খােবার জল রেখেছি। যা ধূলাে রাস্তায়।”
দয়াল কোনও কথা বললেন নাসুতির ব্যস্ততার অর্থ
তিনি বুঝেছিলেন। পিতাপুত্রে নীরবে খেতে বসলেন। খানিক
পরে দয়াল বললেন-“তুমি আমাদের কাছছেড়ে আর কোথাও
যাবে না এই কড়ারে তােমাকে ছাড়ল, না ?”
“ই।”
“তা এখন কি করবে ঠিক করেছ?”
“পড়া শােনা আরম্ভ করব ভাবছি।”
দয়াল গম্ভীর হয়ে বললেন, “একটি বছর ত নষ্ট করলে।
কলেজে তােমার নাম কাটা গেছে, সেখানেও আর নেবে না।
পরিবেষণ করতে করতে সুরভি বললেন,-“তা না নেয় না
নিক, বাড়ীতে বসে পড়াশােনা করবে-
“তা তাে করবে, গিমী,এই বুড়ো হাড় কখানা শেষ হলেই
এখন আমি বাঁচি। ছ',-পার্থ, তুমি যে এমন করবে এ আমি
স্বপ্নেও ভাবিনি। কি লজ্জা, কি কেলেঙ্কারি।”
“কেলেঙ্কারি।”
দয়ালের ধৈৰ্য্যচ্যুতি হল। রুভাবে বললেন, “না, বড়
৪৬
; মুক্তি গৌরব! জেলের ঘানি ঘুরিয়ে পিতৃপুরুষের খুব মুখ উজ্জ্বল করেছ। আমি যে এই এতদিন ধরে তােমায় খাইয়ে পরিয়ে ইস্কুল কলেজের মাইনে গুণে মানুষ করলাম, খুব ফলটা হ’ল তার ; ভেবেছিলাম তুমি একদিন আমায় করে খাওয়াবে, কিন্তু দেখছি সে আর এ জন্মে নয়।” ছেলের রঞ্জিত মুখের দিকে চেয়ে সুরভি কথাটা উলটে দেবার জন্যে তাড়াতাড়ি বললেন, “ছেলেকে মানুষ করতে সকলেই টাকা খরচ করে, ছেলের টাকায় বসে খাবে এমন লােত যারা করে তারাই ঠকে শেষে।” দয়াল একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “না, না আমি বলছি- শুধু ওরই ভালর জন্যে ত ;-আমরা আর কদিন ? আমরা চোখ বােজর আগে ও যাতে সংসারে দাড়াতে পারে সেই জন্যেই বলা,—ও যাতে মুখী হয়।” শান্তভাবে পার্থ বললে, “সকলের সুখের পরিমাপ ত সমান নয় সংসারে। তােমার যাতে সুখ আমার তাতে সুথ নাও হতে পারে। এ রকম অনৈক্যকে জোর করে এক করবার চেষ্টাই ত অনর্থের মূল জগতে।”—পার্থ আসন ছেড়ে উঠে পড়ল। সুরতি ব্যস্ত হয়ে বললেন—“ওকি, উঠলে যে! কিছুই খেলে না, কোথায় যাচ্ছ বাবা?” পার্থ বলল, “আর কত খাব না, যাই একটু ঘুরে আসি।” সে বেরিয়ে যাওয়ামাত্র সুরতি দয়ালকে ঝাঁঝাল ধরে বললেন- ৪৭ সপ্তক “ছেলেটা ফেরামাত্ৰ বুঝি তাকে বাড়ীছাড়া না করলে চলছে ?—শাসনটা না হয় একটু পরেই হত।” দয়াল ইকোটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে বিব্রত ভাবে বললেন, “তা আমি কি এমন বলেছি বল ? অন্যায়টা কি বলা হ’ল বাপু?” পার্থ নিবিষ্টমনে ভাবতে ভাবতে মাঠের পথ দিয়ে গ্রাম ছাড়িয়ে এল; পথের পাশে কাটা ফুলের ঝােপ শাখা এলিয়ে পথকে ক্ষীণতর করে তুলেছে। ভাটবন ফুলে সাদা;—একটা সোঁদাল গাছের শাখায় শাখায় ফুলের ফুলঝুরি দুলছে। গ্রামের বাহিরে এসে থেমে পার্থ ফিরে তাকাল ; দুর গ্রামের কুটির হতে ঘন ধোয়া ধূসর হয়ে উঠছে। বিলীন দিবার বিরহব্যথায় বিবাগী আকাশের গায়ে গেরুয়া রং লেগেছে,-পূৰ্বৰ্গগনে সন্ধ্যাতারার স্নিগ্ধ সমবেদনার দৃষ্টি। বার ডালে একটা ঘুঘু অনাগত সাথীকে সকরুণ আহ্বান জানাচ্ছে। এই স্তিমিত- জ্যোতিঃ সন্ধ্যায় দূর দিগন্তের পানে চেয়ে পার্থর মন আবার অবসাদে ছেয়ে গেল,-কী নির্লিপ্ততার দেশ এ! জীবনের উত্তেজনার তপ্ত তরঙ্গর নিক্ষিতা টোটাতে পারে না, বাহিরের চিন্তাধারার শতস্রোত এখানে প্রবেশের পথ খুঁজে পায় না। এরই জড়তা ভাঙাবার জন্যে, এরই উদ্বােধনী সঙ্গীত, গাইতে, এরই কল্যাণের কামনায় কত যােগীর কঠোর সাধনা, কত ব্ৰতীর কঠোর ত্যাগ,—অথচ অহিফেনসেবীর অর্ধচেতন মনের মত এর জীবনযাত্রা এখনও আবেগশূন্য, অলস।••• ৪৮
মুক্তি
হাটশেষে ফেরা গরুরগাড়ীর সারি চক্রমুখরিত হয়ে চলেছে।
পার্থ ফিরে চলল।
“পেন্নাম হই, দাদাঠাকুর।”
পার্থ মুখ তুলে দেখে বলল, “এই যে বলাই, সব ভাল ত?”
শৈশবে দুজনে একত্র খেলেছে। পার্থর খেলার নৌকার সে ছিল
কর্ণধার, পার্থর বনভােজনে সে হত রন্ধনকার।
বলাই বলল, “সব ভালই দাদাঠাকুর। তােমাদের আশীর্বাদে
দুটি ছেলে হয়েছে।”
পার্থ বলল, “সে কিরে ? পড়াশােনা ছেড়ে দিলি এত
শিগগির ?”
বাই একটু নিবুদ্ধির হাসি হেসে বলল, “এজ্ঞে, বাবা বললে
দোকানে ঢুকে পড়, ন্যাকাপড়া করে আর কি হবে, ঢের
হয়েছে। তা, দোকানও বেশ চলছে।”
বলাই তার দোকানের, তার সংসারের সংবাদ সবিস্তারে
শােনাতে শােনাতে গ্রামে পৌছে বলল, “একদিন আমাদের
দোকানে এসাে না দাদাঠাকুর।”
“আচ্ছা যাব এখন।”
বলাই চলে গেল। পার্থর মনে পড়ল শৈশবে নবপঠিত
আরব্য-উপন্যাস হতে গল্প শুনিয়ে সে বলাইকে বলত “জানি,
আমিও বড় হয়ে মস্ত একটা জাহাজে করে বাণিজ্যে যাবে।”
বলাই সােৎসাহে বলত, “আমিও যাবাে সঙ্গে।”—তারপর
দুজনে কল্পনায় কত সর্পসমাকুল পর্বত হতে মণি-আহরণ করে
৪১
৪
সপ্তক
কত বিকটাকার দৈত্য বধ করে অসহায়া রাজকন্যার উদ্ধারসাধন
করে আনত।আজ বলায়ের কল্পনা তার দোকানের প্রাচীর
অতিক্রম করে না, বৃহত্তর জগতের স্বপ্ন সে আর দেখে না। তার
চোখের দৃষ্টি সঙ্কুচিত হতে হতে শেষে এই পল্লীর গণ্ডীর মধ্যে
মিলিয়ে গেছে। অনাহারে অর্ধাহারে নিত্যকার ঘৃণ্য কলহে
দরিদ্রেরা বাচে এখানে, সম্পন্নেরা চণ্ডীমণ্ডপে পরচর্চায় পরম
আলয়ে কাল কাটায়, আত্মার সকল রকম চেতনা চিরদিন
নিরুদ্ধ এদের দ্বারে।••গােধুলির সােনা মিলিয়ে গেছে—রাতের
অন্ধকারে পার্থ গৃহে ফিরল।
দিন কয়েক পরে দয়ালের সঙ্গে পার্থর আর এক চোট মনাে-
মালিঙ্গ হয়ে গেল। অপরাহে ভ্রমণ হতে ফিরে পার্থ দেখল
প্রদীপের আলােয় চশমা লাগিয়ে বসে দয়াল একখানা খাতার
পাতা ওল্টাচ্ছেন।-বিরক্ত তার মুখ ; কাছে বসে তার মা
সুপারি কাটছিলেন, তার সন্ত্রস্ত ভাব, দেখেই পার্থ বুঝল তাকে
নিয়ে তাদের আজ একটা তর্কাতর্কি হয়ে গেছে। সুরভি তাকে
দেখে বললেন, “এসাে বাবা, কোথায় গেছলে ?”
পার্থ বলল, “এই নদীর ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, মা।”
দয়াল মুখ না তুলে বললেন, “বড়ই পরিশ্রমের কাজটা করা
হচ্ছিল।”
পার্থর মুখ তপ্ত হয়ে উঠল; সুরভি যেন শশানেন নি, এমনি
ভাবে বললেন-“যাই রুটিগুলাে সেঁকে ফেলি, রাত হয়ে
যাচ্ছে।”
কেউ কোন কথা বলল না। খানিকক্ষণ অস্তিকর
নীরবতা কাটার পর দয়াল খাতাটা ফেলে রেখে বললেন,
“তােমায় আমি কতবার থানায় হাজিরা দিতে বলেছি বল
দিকি বাপু? আজ পুলিসের নােটিশ এসেছে। তােমার
মৎলবটা কি ?—আমায় এই বুড়াে বয়সে হাতে দড়ি পরাতে
চাও ?
পার্থ কি বলতে যাচ্ছিল, দয়াল রুস্বরে বললেন, “থাক
থাক, আমায় আর শেখাতে হবে না, নিজের চরকায় তেল
দাও। রােজ তােমায় বলি, যাও একবার দাবােগা বাবুর বাড়ী,
যেয়ে দেখা করে এসাে, ছেলেবেলায় একসঙ্গে পড়েছি দুজনে,
ধরতে গেলে তােমার কাকার মত,তা একদিন তুমি গেছ ?
কাপের কথা শুনবে কেন ? তাহলে যে দেশােঙ্কার হবে না।
বাইরে গলার আওয়াজ শােনা গেল; ডাক্তারবাবু বললেন,
“কি হে, কিসের গােলমাল ?*
এমন অযাচিতভাবে ডাক্তারবাবুর এসে পড়ায় সুরভি হাফ
ছেড়ে সানন্দে তার জন্যে চা করতে গেলেন। দয়াল বলে
উঠলেন, “এস এস ডাক্তার, এই ছেলে নিয়ে হাঙ্গমে পড়েছি
ভায়া, বলছিলাম দারােগাবাবু তােমার কাকাই হন বলতে গেলে,
মাঝে মাঝে যেয়ে দেখা করলে দোষটা কি, তা ও যাবে? ওর
মানের হানি হয় যে তা হলে।
চিমসে চেহারায় চামচিকের মত কঁাচকেঁচে গলার স্বরে
ডাক্তারবাবু বললেন, “তাত বটেই ত, আরে ওরা হ’ল সব
সপ্তক
স্বাধীনচেতার দল, ওদের কথাই আলাদা। তিনি হাসতে যেয়ে
কেশে ফেললেন। এখনি উপদেশ অনুরােধের ধারা বর্ষণ চলবে
জেনে পার্থ উঠে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল।
নিজের ঘরে যেয়েও সে স্থির হতে পারছিল না। বাইরের
কালাে আকাশের নিকৰে অসীমের রহস্যলিপি নক্ষত্ররেখায়
লেখা। প্রদীপ নিভিয়ে পার্থ বাতায়নের পাশে এসে বসল,
মনে হচ্ছিল শৈশবের আশ্রয় তার এমন অপরিচিত হয়ে উঠল
কি করে ? পরিপক ফলের পরিণতি বোঁটা হতে তার বিযুক্ত
হওয়ায়,—পুনর্বার তাকে বোটায় জোড়বার প্রয়াস বিড়ম্বনা
শুধু। চোখে তার ঘুম এল না সে রাতে। বিগত দিনের নানা
স্মৃতির সাথে বিশেষ করে একটি দিনের কথা বারবার তার মনে
জগছিল—সেদিনের স্মৃতিটি তার সকল চেতনাকে সমস্ত বেদনাকে
নিবিড় মধুতে ভরিয়ে রেখেছে-পার্থর মনের নিভৃত মণিকোঠায়
রাখা আছে সে মণি ; গভীর ব্যথায় কখন সে রঙীন হয়ে
ওঠে, পরম পুলকে কখন সে আপনার মত অলতে থাকে তার
অন্তরে।•••
কারার নির্জন অবরােধে পার্থর দিন আর কাটে না-মনে
হয় একটা পাষাণ প্রাচীরের মাঝে চিরদিনের তরে তার জীবন্ত
সমাধি হ’ল বুঝি এ। এমন দিনে খবর এল, কে এসেছে
দেখতে তাকে। পার্থ ভাবল, কে এল, তার মা ? তিনি কি
করে জানবেন, কেমন করেই বা আসবেন? তার কোনও
বন্ধু। তারাও ত অধিকাংশ অবরুদ্ধ,—আর তাদের সাথে
সাক্ষাতের অনুমতিও হবে না নিশ্চয়। জিজ্ঞাসা করল, “কে এসেছে ? জেলার বাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “কে এসেছে দেখলেই বুঝতে পারবে। বাজে কথা বলার হুকুম নেই।” পার্থ নীরবে বেরিয়ে এল, প্রহরী তার হাত শৃঙ্খলিত করে দিল। জেলার বাবু চলতে চলতে কি ভেবে তার দিকে ফিরে বললেন, “তােমার স্ত্রী বােধ হয়।” পার্থ প্রথমে অবাক হয়ে তার পর হেসে উঠল। জেলার বাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন-“জেলখানা হাসিতামাসার জায়গা নয়। হাসিঠাট্টা বারণ । পার্থ হাসি থামিয়ে বললে, “বােধহয় ভুল হয়েছে।” বাহিরের দপ্তরের ঘরে জানালার ধারে একটি মেয়ে দাড়িয়ে। ঘরে ঢুকে পাৰ্থ এই তন্বী তরুণীর পিছনফেরা দেহের পানে চেয়ে বিস্ময়ে পুলকে নির্বাক হয়ে গেল। নন্দিনী তার কলেজের সহপাঠিনী, সে যে তাকে মনে করবে,তাকে দেখতে এ কারায় আসবে, সে কি স্বপ্নেও ভেবেছে? বলার মত কিছুই বলা হ’ল না, শুধু জিগেস করল,-“আপনি। আপনি এখানে এলেন।” নন্দিনী ফিরে চেয়ে তাকে দেখে মৃদু স্নিগ্ধ হাসল, বলল, আপনাকে ধরেছে শুনলাম, তাই দেখা করতে এলাম, লােক- জনের সঙ্গে দেখা হলে আপনার ভাল লাগতে পারে ভেবে- প্রবালের মালাটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে সে নীরব হয়ে গেল। নন্দিনীর কথায় পার্থর মনে হ’ল শুধু ভাল লাগবে তার ? ৪
সপ্তক
মাটির বুকে মেঘ যখন গলে ঝরে পড়ে,-রিক্ত তপ্ত মাটির সে
কি শুধু ভালাে লাগা ?
নন্দিনী পুনর্বার বলল, “কেমন আছেন? খুবই খারাপ
লাগে কি?”
পার্থ সম্বিৎ পেয়ে বলল, “না খুব বেশী খারাপ আর কি ?
তবে ভারি একলা লাগছিল”—ভাবলে এই শূন্যতার মাঝ দিয়ে
পরিপূর্ণতার আবির্ভাব তার জীবনে।
নন্দিনী বলল, “একলা লাগে, বইটই পড়তে পান না?”
পার্থ জেলার বাবুর দিকে চাইল। তিনি এতক্ষণ গম্ভীর
ভাবে সব শুনছিলেন, বললেন, “হুকুম আনতে হয় প্রথমে, এটা
জেলখানা, লাইব্রেরী নয়।”
নন্দিনী বলল, “হঁচতে কাশতে হকুম,—কারণ এটা,
জেলখানা, বিলক্ষণ বােঝা গেছে।”—সে হেসে উঠল ; বুলবুলের
শীষের মত সংক্ষিপ্ত মধুর সে হাসি, নিরানন্দ জেলখানার প্রাচীর
ঘেরা অবাদের ভিতর যেন এক ফোটা সূৰ্য্যরশ্মি। এবার ইচ্ছা-
সত্বেও জেলার বাবু আর নিয়মমাল্লেখ করতে পারলেন না।
নন্দিনী বলল,-“রােদের আলােরও এখানে আসবার হুকুম
নেই বুঝি? বাইরে এখন শরতের কি মিষ্টি রােদের ছড়াছড়ি,
আর আপনাদের এখানটা এত অন্ধকার।”
তার কর্ণর মণির আভাটি গালের যেখানটা রাঙিয়ে
রেখেছে সেখানটায় দৃষ্টি রেখে পার্থ বলল, “আপনাদের বাগানের
সে শিউলি গাছে ফুল ফুটছে বােধহয় ?
;
৫৪
মুক্তি
পার্থ বলল,
“ওঃ, ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। এবার যখন আস নিয়ে
আসব আপনার জন্যে।”
“যা দিয়ে গেলেন এবার
কোনও ফুলের চেয়ে তা মিষ্টি হয়ে রইল মনে ধীরে সে
থেমে গেল।
প্রেমালাপের স্থান জেলখানা নয়—এই নিয়মটা মনে করিয়ে
দেবার জন্যে জেলার বাবু ঘন ঘন কেশে উঠলেন। নন্দিনীর
গালটা একটু লাল হ’লসে কি বলতে যাচ্ছিল এমন সময় ঘড়ি
দেখে জেলারবাবু বললেন—“সময় উৎরে গেছে।”
সমবেদনা-সুন্দর দুই চোখ তুলে নন্দিনী একবার পার্থের পানে
চাইল, তারপর বলল, “পারি যদি ত রবিবার আসব আমি।”
শৃঙ্খলিত দুহাত কপালে চুইয়ে ম্লান হেসে পার্থ বলল,
“আসুন”। একটু থেমে নন্দিনী বলল, “যেখানেই থাকবেন,
আপনার বন্ধুরা আপনার কথা সব সময় মনে করে, জানবেন।”
পার্থর চোখ দীপ্ত হয়ে উঠল। প্রহর বাজল, প্রহরী তাকে
নিয়ে চলে গেল।
কারাককে ফিরে এসে পার্থ প্রথমে খানিক বন্ধ হয়ে বসে
রইল। নন্দিনীর অস্তিত্ব ফুলের সুবাসের মত মনকে তার তখনও
জড়িয়ে আছে। তারপর চঞ্চল হয়ে সে গেয়ে উঠল,-“গায়ে
আমার পুলক লাগে চোখে ঘনায় ঘাের”। বাহির হতে কড়া
সুরে কে বলে উঠল, “হাল্লা মাৎ করাে।
নিষেধ স্বত্বেও পার্থের গান সেদিন উপচে পড়তে লাগল।
সপ্তক
নানা গানের টুকরাে ক্ষণে ক্ষণে গুঞ্জন করে অত্যন্ত চঞ্চলতায়
কাটল তার দিনটা। বক্ষণ নিযুক্ত প্রহরী একবার উকি দিয়ে
দেখে আপন মনে বলল, “য্যায়সা সাদিমে যাতা আজ,বাবু
বাউরা ভইন কা, বা?”
সেদিন সন্ধ্যায় দুর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুনে পার্থের কেবল
মনে পড়তে লাগল তার ছেলেবেলার কথা—তার মা, তাদের
গৃহ, সন্ধ্যার সেই শঙ্খধ্বনি, তুলসীতলায় সকন্দ্র সে দীপশিখা
স্নিগ্ধ সকরুণ সে সব দিনের স্মৃতি। এক ঝলক নিস্তেজ
আলাে শয্যাপ্রান্তে পড়েছে এসে, ক্ষুর গবাক্ষ পথে মেঘে মাজা
একটুকরা আকাশ দেখা যায়, দু একটা পায়রা সেখানে ডানা
ছড়িয়ে ভাসছে,গতির ছন্দে উচ্ছল তাদের দেহ। পার্থর
মনে পড়ল মুক্তির আনন্দ। রাত্রেও সে বারবার জেগে,
উঠল,নয়ন-ভুলান’ এল যে তার! তার অন্তরের সকল ধারা
যে সুন্দরের সন্ধানে ছুটেছে এতদিন, আপন হ’তে সে সুন্দর
মূর্তি নিয়ে এল আজ। তার অতল কালাে দুই চোখে, ক্ষীণ
কঙ্কণ জড়ানাে ললিত নিখুত দুই হাতে, তনুদেহের দাড়াবার
ভঙ্গীতে–লীলার ঝরণা ঝরেছে;—তার বসন পরার ধরণে, বিপুল
কবরীর বন্ধনে কী মায়া চেছে সে- পার্থ যেন নিজের
জীবনটাকে একটা গানের মত বেঁধে তার নিরুপম চরণে নুপুর
করে জড়িয়ে দিতে চায়।
রবিবার এল; শরতের খেয়ালি মেঘে বর্ষার মত বাদল
লেগেছে সেদিন ; বিবর্ণ আকাশের পানে ব্যথিত চোখে চেয়ে
মুক্তি
চুপ করে বসেছিল পার্থ। প্রহরী তার অভুক্ত আহাৰ্য্য ফিরিয়ে
নিয়ে গেল। কতবার পাৰ্থ জিগগেস করল, কেউ এল কিনা,
কোনও উত্তর পেল না।
রাত্রে জেলারবাবু প্রাত্যহিক পরিদর্শনের সময় পার্থর ঘরে
যেয়ে তাকে নীলাভ ধূসর একটা খাম দিলেন। থামােনা গ্রহণ
করতে পার্থর সবল হাতটা অধীরতায় কেঁপে গেল—বিধারে
জিগগেস করল, “কেউ এসেছিল কি?”
জেলারবাবু উত্তর না দিয়ে একটু হেসে চলে গেলেন।
আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে খামটা খুলে পার্থ দেখলে নেতিয়ে পড়া
শেফালির একগাছি মালা গন্ধে আকুল হয়ে আছে।
}
তাের না হতেই দয়াল পার্থর ঘরের সামনে চটি টানতে
টানতে এসে বললেন—“পার্থ উঠেছ ? আজ তােমাকে থানায়
যেতে হবে।”
একটু পরেই সুরভি বললেন, “উঠলে বাবা, আজ যে তােমার
থানায় যাবার দিন।”
প্রভাত হওয়া মাত্র তাড়নার আরম্ভ দেখে পার্থ তিক্ত চিত্তে
উঠে বসল। থানা পুলিস আর দারােগা কাকার উল্লেখের
আভাসেই সে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠত আজকাল, আনত এখনি
খানিকটা অসন্তোষের সৃষ্টি হবে।
বারান্দার একধারে বসে দয়াল চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন, পার্থ
বেরিয়ে এলে ছেলেকে উদ্দেশ করে বললেন—“চুলগুলাে ত রুক্ষ
সপ্তক কাগের বাসা করে রেখেছ, ঐ বুঝি আজকালকার ক্যাশান- বাবােগা-টায়ােগার সঙ্গে কথা কইতে হবে, চটের মত কাপড়খানা হয় বদলালেই আজ। আর দেখ বাপু, দারােগাবাবুর সঙ্গে আমার অনেক দিনের আলাপ। তােমার জন্যে যেন চটাচটি না হয়, বলে দিচ্ছি। একটু নরম হয়ে থেক।” তিনি গজগজ করতে করতে বাইরে চলে গেলেন। পার্থকে চা এনে দিয়ে সুরভি বললেন, “দেখত বাবা চিনি ঠিক হয়েছে কি না। কাল তুমি কোথায় গেছলে পার্থ, দেরী দেখে আমরা ভয়ে মরি; তােমাকে খুঁজতে লােক পাঠাব, তােমার দারােগা কাকার কাছে যেয়ে বলা হবে, কিছুই আর ভেবে পাই না।” পার্থ অধীর হয়ে বলল, “আমার কি নড়া-চড়াও বারণ মা প্রতিপদে থানা আর দারােগা,-আমায় দেখছি পাগল করে ছাড়বে।” “কিন্তু বাবা, তােমার বাবাকে যে জবাবদিহি করতে হবে, তিনি যে তােমার জন্যে দায়ী। এসব কি যে তােমার মাথায় ঢুকেছিল! কবে যে ঠাকুর তােমায় সুমতি দেবেন তা তিনিই জানেন।”—সুরতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পার্থ বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার মতিগতি বদলাবার নয় মা ; তা নিয়ে দুঃখ করে আর কি হবে।” সুরভি বললেন, “সাব রেজিস্ট্রার বাবুর ছেলে,—সেই যে তােমার সঙ্গে পড়ত-কলকাতায় কোৰ আপিসে চাকরী পেয়েছে, ৫৮
মুক্তি
পঁচিশ টাকা মাইনে, উপৰিও আছে। ছুটিতে বাড়ী এসেছে।
তুমি এসেছ শুনে দেখা করতে এসেছিল কাল। কেন দিব্যি
বউটি তার। তিনটি ছেলেও হয়েছে এরি মধ্যে! তােমায়ই এমন
দশা এখনও! বউয়ের মুখ দেখা কি আর আমার কপালে
আছে।”—সনিঃশ্বাসে তিনি চুপ করলেন।
পার্থ হেসে বললে, “কে আমায় বিয়ে করবে না ?
আমার ত পচিশ টাকা মাইনের চাকরী নেই, উপরি ত
দূরের কথা।
সুরভি বললেন, “ওমা, শােন ছেলের কথা। বাংলা দেশে
আবার মেয়ের অভাব! এই ত দারােগা বাবুরই কেমন একটি
ডাগর মেয়ে রয়েছে লেখা-পড়া, কুরুবােনা সব জানে।
তা তুমি রাজী হলে ত বাছা।”
তিনি একটু মুখ ভার করে রইলেন।
পার্থ উঠে পড়ে বলল, “থানায় চলাম মা; আপাততঃ
দাবােগাবাবুর সঙ্গে শশুর জামাই সম্পর্ক ত নেই, দেরী হলে
হাঙ্গাম হতে পারে।”
সুরভি তার সঙ্গে অঙ্গনের দুয়ার পর্যন্ত এসে বললেন,
ভালয় ভালয় ফিরে এসাে বাবা, দুর্গা দুর্গা থানায় যাওয়াটা
প্রায় যুদ্ধে যাবার মতই বিরাট ব্যাপার তার কাছে।
থানায় যেয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করবার পর রােগাবাবুর
ডাক এল। ঠাণ্ডা স্যাৎসেতে ঘর, দেয়ালের কোণে কোণে
সূতত্ত্ব নিদ্বন্দে ঘন হয়ে চলেছে; একা বসে বসে বাপের
সপ্তক
উপদেশ, মায়ের নিঃশ্বাস মনে পড়ে পার্থ অবসাদে ক্লিষ্ট
হয়ে যাচ্ছিল।
একরাশ কাগজের উপর ঝুকে পড়ে দারােগাবাবু লিখে
যাচ্ছিলেন, মুখ না তুলে পার্থকে বসতে ইঙ্গিত করলেন।
দারােগা বাবুর প্রশ্নোত্তর পার্থ যথারীতি শেষ করল। দাবােগা
বাবু বললেন, “তারপর, এখন কি করা হচ্ছে? তােমার বাবা
আমার অনেক দিনের বন্ধু জান ত?” পার্থর দৃষ্টি অনুসরণ
করে বললেন, “ওটা ইদুর কল, না পাতলে রক্ষে আছে, এই
সেদিন একটা দরকারি কাগজ ইদুরে খেয়ে একদম শেষ
করেছে।”
পার্থ একটু হেসে বললে, “এখানকার কাগজপত্তর পর্যন্ত
খুব সস দেখছি, ইদুরে খেয়ে ফেলে।
দারােগাবাবু চোখ তুলে তাকে দেখে বললেন—“কি বললে?
হু-তা তােমার মাথা এখন ঠাণ্ডা হয়েছে ত? স্বরাজ স্বরাজ
করে জেলে যেয়ে লাভটা কি হবে বােঝাও দিকি বাপু?”
পার্থর বােঝাবার কোনও চেষ্টা দেখা গেল না। দারােগাবাবু
চোখ বুলিয়ে একবার চারিদিক দেখে নিয়ে বললেন, “ওসব
হুজুগ-ফুজুগ ছেড়ে দাও, বুঝলে? তুমি দয়ালের ছেলে, তাই
আমার বলা। স্বাধীনতা! আরে বাপু, আমাদের সময় আমরাও
ওসব ঢের করেছি-দিশী চিনি খেয়েছি, স্বদেশী নেতার গাড়ী
টেনেছি, ফের যখন জ্ঞানবুদ্ধি হ’ল তখন সমস্ত ধরে নিতেও
পেরেছি। এই নেতাদের কথায় আর নাচানাচি কর না।
মুক্তি তাদের কথায় নেচে তােমরা গরীব বেচারীরা মার খেয়ে মর, জেলে গিয়ে ঘানি টানাে, আর নেতারা ততক্ষণ মােটরে চড়ে ফুলের মালা গলায় দিয়ে বক্তৃতা করে বেড়ান। দু'একজনের জেলও হয়—তবে সে জেল আর তােমাদের জেল ঢের তফাৎ- তারা থাকেন রাজার হালে, ইলেকটিক লাইট ফ্যান, মাসে মাসে হাজার টাকা করে পেন্সন,—জান ত সবই! আবার শরীর খারাপ হলে দার্জিলিং, সুইজারল্যাণ্ড ! বেশ করে বুঝে দেখ। তুমি যা করবার তা ত করে ফেলেছ, এখন ওসব বােকামি না করে যাতে একটা চাকরী-বাকরি জোটে সেই চেষ্টা করে দেখ। বুড়াে বাপ মা, তারা তােমার মুখ চেয়েই ত রয়েছেন। ওসব বাজে কাজে হৈ হৈ করে বেড়ালেই ত আর পেট ভরবে না। কচি থােকাটিও নও, গোঁফ, দাড়ী গজিয়েছে, এতদিনে বুদ্ধিসুদ্ধি হওয়া উচিত।” বক্তৃতার শ্রোতে পার্থ হাপিয়ে উঠল। উঠে পড়ে বলল, “মাপ করবেন, আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি আসি।”- একটা নমস্কার করে সে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। দারােগাবাবু কুটি করে চেয়ে পুনর্বার কাগজে মন দিলেন।•••••• নির্মেঘ আকাশের হাসি আলাের ধারায় ছড়িয়ে গেছে, নরম ঘাসে শিশিরের চুম্বন চুমকি হয়ে জ্বলছে; মালতী লতার সারা দেহে ফুল ফোটাবার ব্যাকুলতা-ময়ূরকণ্ঠী রঙের দুটো মধুচুষকি পাখীর মধু আহরণের কি ব্যস্ততা।-পার্থ ঘর ছেড়ে ;
সপ্তক
বেরিয়ে পড়ল দীঘির ধারে যেখানে বিরল বেণুবনে উত্তরে হাওয়ার
মর্মরাণি জেগেছে। তটের পরে দীর্ঘ ঘন শরঘাস শীতের বাতাসে
নত হয়ে পড়ছে ; হেলান দেহ বাবলার শাখা হতে হলদে ফুল
সােণার ফোটায় চুয়ে পড়ছে জলে; হেলা ফুলের পাতায় পা
ফেলে ফেলে ডাহুক হেলার বদ্ধ কুঁড়িকে ঠুকরে ফিরছে; চারি-
ধারের তালস নীরবতা ডাহুকের আচকা ডাকে ব্যখিয়ে উঠছে
থেকে থেকে। পার্থ এই নিরালায় বসে শােনে প্রকৃতির
মনের গােপন কথাটি আকাশে আলাের বীণায় বাজছে—মৃদু
হাওয়ায় গুঞ্জিত হচ্ছে নিত্য। ঘরে থাকলে সেই অফুরন্ত অনুযােগ
অনুক্ষণ,-পার্থ বাপ মার কোনও কাজে লাগল না, কোনও
আশা পূর্ণও করল না, সকলে কেমন ঘর-করণা করছে, পার্থর
দ্বারা কোনও সাধ মিটল না। সুরতি নিঃশ্বাস ফেলে নীরব
থাকেন, দয়াল অদৃষ্টকে দোষ দেন। পার্থকে পড়তে দেখলে,
দয়াল হাত উলটে বলেন, পড়াশােনা করে তাে সবই হল,
হুঃ।” একপয়সা ত সে আজও ঘরে আনতে পারল না।
পার্থর গান শুনলে বলেন,—“ওই হচ্ছে কেবল, আর আমি এই
বয়সে গাধার খাটুনি খেটে মরছি !” পার্থর সব কাজই তার
চোখে অন্যায় হয়ে লাগে। পুত্রের প্রতি অজস্র স্নেহ ধারণার
ভুলে উগ্রতায় পরিবর্তিত হয়ে প্রকাশ পায়,-ভ্রান্ত সন্তানকে
সুপথে আনতে এই সব শ্লেষের বাণই ব্যর্থ বলে তার বিশ্বাস।
পার্থর থানায় সেদিনের ব্যবহার শুনে তিনি আরও উঠে পড়ে
লাগলেন তার চৈতন্য বিধান করতে।
মুক্তি
সেদিন দারােগাবাবুর সঙ্গে বাজারে দয়ালের দেখা হল,
দাবােগা বললেন, “কই হে, তােমার ছেলের চুলের টিকিটিও ত
দেখা যায় না,চুপি চুপি বসে সে বােমাটোমা তৈরী করছে
ত ?”
কুণ্ঠায় দয়ালের প্রায় মাথা কাটা গেল—ছেলেটাকে তিনি
অন্ততঃ হাজারবার বলেছেন দারােগার বাড়ী যেতে ; ভদ্রলােকের
কাছে তাকে অপ্রস্তুত না করে ছাড়বে না সে। সত্যিই তার
কাজটা কি ?—মাঝে মাঝে গেলেই ত পারে-দারােগাবাবুকে
সন্তুষ্ট রাখা তসবদিকেই সুবিধের। দয়াল মাথা চুলকে বললেন,
“তার মার শরীরটা তেমন ভাল নেই কি না, কোথাও
তাই যেয়ে উঠতে পারে না।” ছেলের হয়ে আরও একটু
ওকালতী করলেন,
“আর ভায়া, একটা অন্যায়
করে ফেলেছে, তােমাদের কাছে যেয়ে দাড়াতে একটু লজ্জাও
ত হয়।”
দারােগাবাবু প্রশান্ত হাসি হেসে বললেন, “আরে সে যা হবার
হয়ে গেছে, তার ত আর চারা নেই। তাকে আসতে বলাে
দেখি কোনও হিল্লে করে দিতে পারি কি না।”
দয়াল কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে উঠলেন।-রােগা বাবু
যেন মাটীর মানুষ। এমন কথা কোন দাবােগায় বলে বল
দেখি! তাঁর ছেলে নেহাৎই বােকা, তা না হলে একে দিয়ে
কত কাজ বাগিয়ে নিতে পারত। খুসীর আতিশয্যে তিনি
এয়ােজনাতিরিক্ত একগাদা বাজার করে ফেললেন। সুরভি
কাজ
সপ্তক
সেদিন দয়ালের প্রসন্নতা দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন, দয়ালের
মেজাজ ঠাণ্ডা দেখে সুরভির মনও হালকা হয়ে উঠল।
মধ্যাহ্নে খেতে বসে দয়াল রহস্য করে বললেন, “গিন্নী
তুমিও নুন তৈরীর দলে যােগ দিয়েছ না কি ?-ডালে যে
কেবল নুন!” পার্থকে বললেন, “দাবােগা বাবু আজ বললেন
-ওকি থামলে কেন, খাও, এ তােমার দিশী মুন, খেলে জাত
যাবে না।” বলে খানিকটা হাসলেন।
পার্থ নীরব রইল।
দয়াল বললেন, “দারোগা বাবু কত দুঃখু করছিলেন, তােমায়
এতবার বলি, একবার যেতে পারলে না তার বাড়ী। আজ
যেও দিকি একবার।” পুরাতন কালাে পােষাকের ওপর মলিন
চাদরখানা জড়িয়ে স্কুলে যেতে যেতে তিনি স্থির করলেন ছেলে,
গেলে তিনিই না হয় আজ একবার দারােগার ওখানে হয়ে
আসবেন।
বিকেলে কর্ম হ'তে ফিরে এসে দয়াল ডাকছিলেন—“গিন্নী,
শুনে যাও, তােমার ছেলের বিয়ের যে সম্বন্ধ এসেছে,-কি
খাওয়াবে আমায় বল দিকি ?”
সুরতি বেরিয়ে এসে বললেন, “সে কি গাে ? কোথা থেকে ?”
একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “এমন দিন কি ঠাকুর দেবেন?”
বিয়ের সম্বন্ধ এলেই যে পার্থ সম্মত হযে-সে বিষয়ে দয়াল নিশ্চিন্ত
থাকলেও সুরভির মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।
দয়াল ডাকলেন, “পার্থ শুনে যাও ! দেখ, একেই বলে
৬৪
;
মুক্তি
কপাল, গিন্নী, দাবােগাবাবু নিজে থেকে তার মেয়ের সঙ্গে পার্থর
বিয়ের কথা তুললেন, এমন মানুষ কি হয়। পার্থর একটা
চাকরীও সুপারিশ করিয়ে দেবেন, কত বড় বড় সায়েবের সঙ্গে,
হাকিমদের সঙ্গে জানাশােনা, সহজ কথা ত নয়।”
পার্থ বই রেখে উঠে এসেছিল, তার দিকে চেয়ে বললেন,
“তুমি এখন এই কাগজটায় একটা সই করে দিলেই হয়; একটা
কেরাণীর কাজ কোথায় খালিও আছে, দারােগা বাবু চেষ্টা করে
তােমায় সেখানে ঢুকিয়ে দেবেন।”
দয়াল যতক্ষণ সুরভিকে ওপরওয়ালাদের কাছে দাবােগাবাবুর
অসাধারণ প্রতিপত্তির কথা বিশদভাবে বর্ণনা করছিলেন, ততক্ষণে
পার্থ কাগজখানার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলে। কৃতকর্মের
জন্য নানা অনুতাপের পর এবার হতে সকল রকমে প্রথমভাগের
গােপালের মত সুশীল সুবােধ হবার স্বীকারপত্র,-পার্থ দেখে
নিয়ে কাগজ নামিয়ে রাখল।
পার্থর মুখ দেখে এতক্ষণে দুয়ালের একটু খেয়াল হল,
তিনি কিছু স্থির হয়ে বললেন, “দেখলে ত? দারােগা বাবুও ওতে
তােমার হয়ে লিখে দেবেন। তারপর শুভকাজটি হয়ে গেলেই
তােমায় চাকরীতে ঢুকিয়ে দেবেন। তুমি এখন সইটা করে
দাও।”
পার্থ শান্তভাবে বলল, “ওতে আমি সই করতে পারব না
বাবা। তােমরা আমার বিয়ের জন্যে ব্যস্ত হয়াে না, চাকরীর
লােভে বিয়ে করাটা এমন কিছু গৌরবের নয়।”
সপ্তক
কয়েক মুহুর্ত শুদ্ধ থেকে দয়াল সক্রোধে বললে—“আর
ব'সে ব'সে বাপের অন্নবংস করাটা ভারী গৌরবের, না ?
বলতে লজ্জা হয় না? আমি হ'লে গলায় দড়ি দিতাম।
পার্থর তপ্ত মুখ আগুন বরণ হয়ে উঠল, কী সে বলতে
যাচ্ছিল, সুরতি মিনতির সুরে বললেন,—“চুপ কর পার্থ।”
দয়ালকে বললেন, “থাম তুমি! রাগলে আর কোন কথা
মুখে আটকায় না, না ?”
দয়াল গজাতে লাগলেন, “দারােগাবাবু নিজে থেকে যেচে
বিয়ের প্রস্তাব আনলেন, সে বিয়ে লাটসায়েব উনি করবেন না।
ভারী লায়েক হয়েছেন কিনা! অতবড় মুরুব্বি, অমন চাকরী,
সে সব ওঁর মনঃপুত নয়! গুণের জাহাজ একেবারে! বিয়ে
করবে না ত করবে কি শুনি?”
“ওখানে বিয়ে করা অসম্ভব আমার ওষ্ঠে ওষ্ঠ চেপে
পার্থ বেরিয়ে গেল বাইরে, পাছে উদ্যত ক্রোধটা সামলাতে না
পারে। নদীর ধারে এসে সিক্ত ঘাসে সে বসে পড়ল। শীতের
সকরুণ সন্ধ্যা ধীরে নেমে আসছে, দীপ্ত মণিপুঞ্জের মত রক্তসূৰ্য্য
আকাশে জলে রঙ ঢেলে নদীর বাঁকে লুকিয়ে গেল; রাত্রের
অভিসার অপেক্ষায় নির্জন নদীতীর থমকে রইল। দূরের পানে
দৃষ্টি মেলে পার্থ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল—মন তার কোন অজানায়
ভেসে গেছে সেই কি তা জানে ?—কতদূরে কোনখানে, কোন
দেশের পানে, যেখানে থাকে তার মানসী—সেই যেখানে নির্জন
বাগানে নিবিড় তরুবীথির বুকে রক্তধারার মত রাঙা পৎ, গৃহের
মুক্তি গা জড়িয়ে গােলাপলতা উঠেছে, শেফালির ফুলে ছাওয়া মূলে বেত্রাসন রাখা রয়েছে ;-কক্ষে দীপের মিয়া আলােয় পাঠ এক তরুণী-সন্ধ্যাবায়ে নীলবাস তার উড়ে উড়ে পড়ছে, কালাে চুলে রক্তমণির মত এক গােলাপ জলছে, কালাে হয়ে আসা এই নদীজলের মত গভীর কালাে দুই চোখে কিসের আলাে ঝলসে উঠছে। পার্থর মনে পড়ল কোন্ স্বপ্নে শােনা সে বাণী, —আপনার বন্ধুরা আপনার কথা ভাবে’—ধ্যানধূসর এই সন্ধ্যায় সন্ধ্যাতারার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে সে কি ভাবে কখন এক ভাগ্য- হীন যুবার কথা? পার্থর ওষ্ঠ ব্যথায় কেঁপে উঠল, অতি করুণ সুরে ধীরে সে গান ধরল- “তুমি উষার সােনার বিন্দু প্রাণের সিন্ধু কুলে শরৎপ্রাতের প্রথম শিশির প্রথম শিউলি ফুলে। ইন্দ্রলােকের ইন্দ্রধনু ধরার পরে নেওয়া নন্দনেরি নন্দিনী গাে চন্দ্রলেখায় চোয়া- প্রতিপদের চলে স্বপন, ধরায় এলে ভুলে- তালবনের আড়াল দিয়ে চাদ উঠল, আঁধার নদী আলােয় গলে সাদা হয়ে গেল, পার্থর গান জ্যোৎস্নায় সিক্ত হয়ে সিদ্ধ হয়ে “তুমি কবির ধেয়ান ছবি পূৰ্বজনম স্মৃতি তুমি আমার কুড়িয়ে পাওয়া হারিয়ে যাওয়া গীতি চুর্ণরজতের মত লসিকতায় সে সুর গড়িয়ে যেয়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে নদীর তটে লােটাতে লাগল, আকাশে জ্যোৎকা-ধারার তারে ৬৭ সপ্তক বেজে উঠল, মৃদু হাওয়ায় মিশে যেয়ে স্বচ্ছ মেঘের গা ঘেঁসে কোন বাতায়ন-বৰ্ত্তিনীর উদ্দেশে ভেসে চলল- “যে কথাটি যায় না বলা, কইলে চুপে চুপে তুমি আমার মুক্তি হয়ে এলে বাঁধন রূপে- কবি তার মনের গােপন কথাটি কেমন করে জানলেন, কেমন করে তাকে রূপ দিলেন! যা সে ভেবেছে কত গহন অন্ধকারের রাতে, নিভৃতে-যে নীরব গান বেজেছে তার মনের বীণার তারে কত সঘনগগনের অবিরাম অবর্ষণের মাঝে, তাকে কবি কোন মায়াবলে এ অপরূপ রূপ দিলেন। পার্থ তন্ময় হয়ে গাইতে লাগল।••• “এই যে, হেঁ হেঁ, গান হচ্ছে বুঝি, হেঁ হেঁ—ডাক্তার বাবু বকের মত পা ফেলে সামনে এসে দাড়ালেন। আকাশে, আলােয় বাতাসে জলে মিলিয়ে এক অশরীরী ঐন্দ্রজালিকের মায়ার বীণার সুরে যে স্বপ্নরাজ্য এতক্ষণ গড়ে উঠেছিল হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে তা চুরমার হয়ে ভেঙে গেল। ভয়ানক চমকে পার্থ চুপ করল। “থামলে কেন, গাওনা, দাওরায়ের গান ত ওটা, ওসব আমিও একটু আধটু বুঝি, হেঁ হেঁ। ছেলেবেলায় সখের থিয়েটারে আমাকে সখী সাজিয়ে গান করাতে কতবার ঘরে নিয়ে যেত। ডাক্তার বাবু পার্থের পাশে বাগিয়ে বসে বললেন,—“তারপর সব খবর কি? দারােগা বাবুর সঙ্গে দেখা করতে থানায় গেছলে ত? তা তিনি কি বললেন?” ৩৮
মুক্তি
পার্থ ছিটকে উঠে পড়ল,—“দূর হােল্ক গে যা আপনাদের
থানা আর দারােগা বাবু! আপনাদের সকলের কি আমার
জন্যে রাত্রে সুনিদ্রা নেই।”—ক্ষিপ্র গতিতে সে গাছের আড়ালে
মিলিয়ে গেল।
এরকম ব্যবহারে বেজায় থতমত খেয়ে ডাক্তার বাবু বললেন,
“”—একটু বিমূঢ় হয়ে থেকে বললেন,—“ভাল বললে মন্দ
হয়, হু ঃ।”—আস্তে আস্তে তিনি বাড়ী ফিরে চললেন।
অনেক রাতে পার্থ যখন বাড়ী এল, সুরভি দীপ জালিয়ে
জেগে বসে ছিলেন। পার্থ অবসন্ন দেহে শয্যায় শুয়ে পড়ল
যেয়ে। সুরভি এসে শিয়রে বসলেন। মাতাপুত্রে বহুক্ষণ নীরব।
পার্থ বলল,-“এখানে আমি থাকতে পারি না, আমায় যেতে
হচ্ছে মা।”
সুরভি ব্যাকুল হয়ে বললেন,-“তুমি চলে যাবে, কোথায়
যাবে বাবা? আর তােমার বাবা যে জামিন হয়েছেন, তুমি
এখান থেকে চলে গেলে যে তাকে ধরবে।”
বেতের আঘাতের মত এই সত্যটা পুনর্বার পার্থ উপলব্ধি
করল—কাটার বাঁধনে আবদ্ধ সে, যেদিকে নড়বে, কণ্টকে দীর্ণ
হবে। তপ্ত ললাটটা উপাধানে চেপে সে পড়ে রইল।
সুরতি অনুনয় কাতর কণ্ঠে বললেন, “এ সব ছেড়ে দাও
বাবা, তােমার বাপ যা বলেন শােন, তােমারই তাতে ভাল
হবে পার্থ।” একটু থেমে বললেন, “মেয়েটি দেখতে শুনতে
ভাল, সব ধারেই সুবিধে হয়, কেন অমত করছ বাবা।”
সপ্তক পার্থ ধীরে বলল, “সে হয় না মা, আমায় অনর্থক অনুরােধ করাে না।” “কেন হবে না পার্থ ? দারােগা বাবু নিজে বলেছেন, তার কথা না রাখলে তার অপমান হবে। তাকে চটিয়ে আমরা এখানে টিকতে পারব কি ?—কুমীরের সঙ্গে বিবাহ করে জলে বাস করা চলেনা বাবা।” পার্থ একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। আবার কাটার বাঁধন। সুরভি বললেন,—“বুঝতে ত পার সব, কাল দারােগা বাবু আসবেন, তাকে কি ‘না’ বলে ফেরান যায় ? এই সব ভেবে দেখ বাবা, উপায় ত নেই।” পার্থ রুদ্ধ স্বরে বলল, “না মা, কোনও উপায় নেই, মুর ছাড়া দেখছি আমার মুক্তি নেই।” সুরভি বলে উঠলেন, “বালাই, ও কি কথা!” তাঁরও স্বর রুদ্ধ হয়ে এল। দুজনেই নীরব। পুত্রের বেদনায় মাতার সম- বেদনা অশ্রু হয়ে ঝরতে লাগল পার্থর কেশের পরে। কতক্ষণ পরে পার্থকে নিদ্রিত ভেবে সুরতি নিঃশব্দে উঠে গেলেন। খানিকক্ষণ বিছানায় পড়ে থেকে পার্থ উঠে এসে জানালাটা খুলে দিলে, বাহিরের শিশির-ভরা হাওয়ার পরশে তার আলাখরা মাথাটা একটু স্নিগ্ধ হ'ল। চঁাদ অন্ত গেছে বড় বড় কয়েকটা তারা আঁধার আকাশে দপদপ করছে; নীচের জগৎ যখন রাত্রির অবগুণ্ঠনে নিজেকে অপরিচয়ে রাখতে চায় ওপর হ'তে ওই কটা তারা কোন্ অজানার আলাে দেখায়, ৭০
মুক্তি
কোন অচেনা পথের প্রদীপ হয়ে জলে, কোন বন্ধুর কল্যাণ
দৃষ্টির মত ! সে বন্ধু কি সত্যিই তার কথা ভাবে?-পার্থ
অনিমেষে তাকিয়ে থেকে অবশেষে শয্যায় ফিরে এল। তার
মা আফিমের পাত্রটা বিছানায় ফেলে গেছেন, স্থির দৃষ্টিতে
পার্থ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল, কি ভেবে হঠাৎ সেটাকে
তুলে নিল হাতে। সুন্দরের মাঝে অসুন্দর যখন জাগে, ছন্দ
তার নির্মম হ'য়ে বাজে জীবনে; নিষ্ঠুর তার প্রকাশ,নিদারুণ
তার জয়। আলােহীন রাত, অন্ধকার চারিখার, অন্ধকার পার্থর
জীবন। তার বাণীতে যে অজানা আলাের আহ্বান জ্বলছে,
সে কী সাড়া দেবে না তাতে ? আজ তার বাঁধন হেঁড়ার সাধন
বাইরের আকাশে ওই যে তারা অলছে, কাল সমুদ্রে আলাের
যাত্রী, ওর বাতায়ন দিয়ে এল সেই তরঙ্গের ডাক,—বক্ষের
পরতে পরতে বেজে উঠল তার বজ্ৰভেরী,
—সে কী সাড়া দেবে না
তাতে! পার্থর দুই চোখ ঝলসে উঠল, ওষ্ঠের পরে ওষ্ঠ কঠিন
করে সংবদ্ধ করল, শিথিল মুষ্টি তার শক্ত হয়ে পাত্রটাকে চেপে
ধরল, সে মুষ্টির শিরা উপশিরা এক অতিচঞ্চল রক্তস্রোতে
স্ফীত হয়ে উঠল। ••••
পরদিন প্রভাতে দয়ালের গৃহে পাড়াপ্রতিবেশীর ভিড় জমে
উঠল। দাবােগাবাবু এলেন, বললেন, “তাইত, ছেলেটা এমন
মাথাপাগলা ছিল হে।” ডাক্তারবাবু এলেন, বললেন, “তা
আর বলতে, কাল রাতে ওর রকম সকম দেখেই আমি বুঝে
নিয়েছি। আমরা হলাম ডাক্তার, আমাদের কাছে শরীর আর
৭১
সপ্তক
মনের অবস্থা লুকিয়ে রাখা কি সােজা কথা, হেঁ হেঁ।” দয়াল
পাগলের মত ছুটাছুটি করতে লাগলেন।
পার্থর ঘরে সুরভি পাথরের মত নিস্পন্দ স্তব্ধ হয়ে বসে
ছিলেন। পার্থর বুকের কাছ হতে একটা বিশুদ্ধ শেফালির
মালার ক্ষীণ সুগন্ধ নিঃশব্দ সান্তনার মত ঘরময় ভেসে বেড়াতে
লাগল।
সুরভি অতি ধীরে শুষ্ক শেফালির মালাটি পার্থর মৃত্যুমলিন
কণ্ঠে জড়িয়ে দিয়ে তার কপালে একটি ক্ষুদ্র চুম্বন রেখে বললেন,
“আজ তাের মুক্তি হল।”
তার চোখে অশ্রু ছিল না।
৭২
লিপি-পঞ্চক
বৈদিক যুগ
“আমি তােমাকে বার্তাবহ নির্বাচন করলাম—জ্ঞানসম্পন্ন
ভায়মান—তুমি অশ্বিনীনন্দনের প্রজাপতি-প্রদত্ত রাসভবাহিত
রথের ন্যায় বৎগামী ; আশ্রম ঋষিমণ্ডলী তােমার গুণাবলী
পরিদর্শনে তােমাকেই দূতরূপে নিযুক্ত করেন।
“এই কুশ-তৃণনিৰ্ম্মিত আসন পরে উপবেশন করে মৎপ্রদত্ত
মধুর সােমরস পান কর; আশীর্বাদ-পূত এই সােমরস পানপূর্বক,
ভায়মা, তুমি পরিতৃপ্ত হও।
“অতঃপর মদ্ভাৰ্য্যা শশ্বতী সন্নিধানে তুমি গমন করে আমার
এই নবরচিত বাণী মধুর ছন্দে তাহার শ্রবণগােচর করাও।
“উগ্রদেব তােমায় সম্বােধন করে,-অনিন্দিতা শশ্বতী,তার
স্থিরীকৃতচিত্তবিন্যাসিতা বাণী, যাহা ধাবমানা স্রোতস্বিনীর
ন্যায় স্বতঃনিস্থত, তাহাই ব্যক্ত করছে।”
রজনীর মালি মােচন করে হেথায় জ্যোতিভূষণা উষার
আবির্ভাব হয়েছে। ক্ষৌরকার যে ভাবে কেশকর্তন করে, শুভ্রা
উষা এখন সেইরূপ পুঞ্জীভূত অন্ধকারকে ছেদন করছেন; গাে-
মাতা যে ভাবে দেখাকে দুগ্ধ দান করেন, আলােকোজ্জ্বলা উষা
সপ্তক তদ্রুপ মুক্ত বক্ষ হতে আমাদের আলােক বিতরণ করছেন। আমরা তমােজ পার হয়ে এসেছি, স্বর্গসুতা আমাদের আনন্দবিধানের জন্য অন্ধকারকে গ্রাস করেছেন। “উজ্জ্বলা উষা সূৰ্য্যরশ্মিবিভূষিত হয়ে এক্ষণে জরাঘােষর মত প্রতিভাত হয়েছেন; শতী,—উষা যেরূপে সূৰ্য্য আগমনে সূর্যদেহে মিলিত হয়েছেন, আমার প্রত্যাগমনে, শুচিস্মিতে, আমার দেহে তুমি ঐরূপ লীনা হয়য়। গৌতমবন্দিতা উষাকে আমি প্রণাম করি, তিনি তােমার ব্রত উদযাপনের সহায় হােন, তােমার গেহ ধাধনে পূর্ণ করুন। “দীপ্তিমান সূৰ্য্য আকাশে ভাস্বর হয়ে উঠেছেন এবার, তার তেজোময় শুভচিহ্নিত প্রশংসনীয় অবকল আকাশমার্গে দ্রুতগতিতে ধাবিত হয়েছে; সূর্যের ঔজ্জ্বল্যকে আমি বরণ করি, সূর্যোদয়ের সাথে, নিষ্পপা—আজকের দিবস তােমার মঙ্গলময় হােক, দেবগণ তােমায় অত হ'তে ত্ৰাণ করুন। “অনন্তর উদেব স্বর্গমৰ্ত্তকে বন্দনা করছে, তােমরা শশ্বতীর মণ কর। “আমি অগ্নিকে ঘৃতাহুতি প্রদানপূর্বক বন্দনা করি, যিনি দীপ্তিমান, অসীম তেলোময়, সত্যকে যিনি নিত্য আলােকিত করেন, যজ্ঞক্ষেত্রে যিনি দেবগণের ইব্যবাহী, যার রক্তবর্ণ অখ- সমন্বিত রথ বৃষতসম গর্জনপূর্বক অরণ্য ধূমধ্বজে আচ্ছন্ন করে দেয়, সেই শুদ্ধবৈশ্বানর যেন তােমার প্রতি তুষ্ট থাকেন,পুণ্যচরিতা, তােমায় যেন সৌভাগ্য দান করেন। পিতার নৈকট্য পুত্রের ৭৪
লিপি-পঞ্চক
;
যেমন সহজলভ্য, পবিত্র পাবক যেন সেইরূপ তােমার সহজলভ্য
হন, তােমায় রক্ষা করেন।
“উগ্রদেব শ্রদ্ধাসহ ইন্দ্রকে সােমরস নিবেদনান্তে স্তবগান
করছে; তিনি বৃত্ৰকে যেভাবে বধ করেছিলেন সেইভাবে শশ্বতীর
তপােবনের অহিসকল বিনাশ করুন। সুজাতা শতী,
মহাশক্তি মেঘবাহন তােমার প্রতি প্রসন্ন হােন্।
“অশ্বিনীকুমারদিগকে আমি বন্দনা করি, যন্ত্রণাত্ৰাতা দেবতা
দ্বয় তােমায় চিরযৌবনা রাখুন ; তারা যেরূপে ঘােষা, চ্যবন
প্রভৃতি ভক্তগণকে বরদান করেছিলেন, শুভে,, তােমাকেও
সেইরূপে বরদানে ধন্য করুন।
“অগ্নি ইন্দ্র অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও বিশ্বদেব সকল, আমার হৃদি-
বন্দিতা শশ্বতীকে যেন আনন্দের পথে নিত্য পরিচালিত করেন,
বায়ু যেন তােমার সুফল আনয়ন করে, নদী যেন তােমার মধুর
বারি বহন করে, বনস্পতি যেন তােমায় মধুময় ফল প্রদান করে,
তােমার নিশা, তােমার উষা মধুর হােক; তােমার জগৎ
কল্যাণভাষিণী শশ্বতী, মধুময় থােক।
সূৰ্য্য তােমার এতি
মাধুৰ্য্যময় হাে, রক্ষণকারী স্বর্গ আমাদের প্রতি মধুবর্ষণ করুক।
“প্রশংসনীয় ভায়মান,—বায়ুর মত লঘুগতিতে নিজেকে
সঞ্চারিত করে, উগ্রদেব-যােবা শশতী সমীপে এই বার্তা বিবৃত
করে এস।”
৭৫
বৌদ্ধ যুগ “নালন্দার চিত্রশিল্পী সুনন্দ উদ্যান-পালিকা অমিতার কুশল শুধাচ্ছে; অপগব্যাধি হয়ে সে সুবিহার করুক এই বক্তব্য। আরও এই বক্তব্য যে, সুনন্দ ‘অাতিয়াণি বর্ষাণি তােমা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে- হে দেবি,তােমার স্মরণ পথে উদিত হবার সৌভাগ্য তার হয় কি আজো ? “ভগবান বুদ্ধের পূজার জন্যে, হে অমিতা, পূত-প্রভাতে যখন উদ্যান-দীর্ঘিকায় সদ্যবিকশিত পদ্মদল চয়ন করতে আসতে, এক ব্যক্তি তােমায় দুর হতে পবিত্র নীলপদ্ম আহরণ করে দিত, তার কথা কি মনে পড়ে আজো ?-তােমার সে পুষ্পচায়ক প্রতি প্রভাতে হেথায় মুক্ত কানন মাঝে শিক্ষাদাতা ও অন্তেবাসীর সাথে ভগবানের বন্দনায় তােমার আবােগ্য ইচ্ছা করছে। “পূজা সমাপনান্তে গৃহকর্মে ব্যাপৃত হয়ে কক্ষে চলনবারি সিঞ্চন কর যখন, হে কল্যাণী,কক্ষগাত্রের চিত্ৰপরে তােমার মেহগিন্ধদৃষ্টি স্থাপিত হয় কি ক্ষণতরে?-আজ সে চিত্রকর এই সুদুর বিদ্যাপীঠের ভবন-গাত্রের চিত্রলেখায় তােমারই রূপশ্রী ফুটিয়ে তােলে অজানিতে, তার চিত্র তুলিকার টানে। “অগ্নিবী গ্রীষ্মমধ্যাহে ক্লান্ত কপােত যখন আশ্রয় নেয় অলি মাঝে, তােমার উদ্যানে যখন সমাপ্ত হয় পুষ্প বিক্রয়, ৭৬ লিপি-পঞ্চক শীতল হপরে শয়ন করে, ওগাে পরিশ্রান্তা, কী মধুর চিন্তায় চিত্ত তােমার ভরে ওঠে ? উদ্যানমুখী গবাক্ষপথে সেই যে পলাশ তরুর পরিচিত পুষ্পিত শাখাটি বাহু বাড়িয়েছে, পিপীলিকাগুলি সারি দিয়ে যাতায়াত করছে, রক্ত-পুষ্প দু’একটি পাষাণ হৰ্মতলে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে, সেই দিক পানে চেয়ে মনে পড়ে কি তােমার কোনও প্রণয় স্মৃতি?—তােমার প্রেমিক, হে ভাবালনয়না, পল্লববিপুল এই আবৃক্ষছায়ে অভীক্ষং তােমার প্রণয় চিন্তায় মগ্ন আছে। “স্নিগ্ধসন্ধ্যায় ভগবানের শিলাস্তুপে যখন আরতিপ্রদীপ জ্বলে ওঠে, হে গৃহলক্ষ্মী, এ প্রবাসীর কুটীরে তখন তুমি দীপাধারে সন্ধ্যাদীপ জ্বালিয়ে দাও, ধূপাধারে তােমার কল্যাণহত্তপ্ৰজলিত ধূপ হতে নীল ধুম সৌরভে মুখর হয়ে ওঠে, তােমার প্রস্ফুটিত মল্লিকার বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র হতে অতি মধুর মিগ্ধ সুবাস সন্ধ্যাকাশকে সুরভিত করে বুঝি এখানেও ভেসে আসে,আমার মন সে উদাস করে দেয়। “কান্ত রাত্রির আগমন সাথে, লিপিবাহক দীর্ঘপথ তার অতিক্রম করে লিপি তােমায় প্রদান করবে যখন, হে সঙ্গী- বিহীনা অমিতা,-পরদেশী সুনন্দের কিঞ্চিৎ চিন্তা চিত্তে তােমার জেগে ওঠে যেন তখন,-যে সুনন্দ পাষাণকক্ষের কম্পিত দীপ- শিখায় স্বকৰ্ত্তিত ভূজপত্রে এই লিপি লিখিত করে দিচ্ছে। বতবিয় ইতি।” ৭৭ কালিদাসের যুগ “বিদিশা নগরী হতে বিরহিণী মনিকা, অবন্তী-অবস্থিত জীর্ঘায়ুঃ ভর্তাকে প্রণাম নিবেদন পূর্বক প্রণয়সহ জ্ঞাপন করছে যে তােমার বিরহে সে বড়ই বিকল। “স্বর্গসুন্দর এই বর্ষায় সকলেই মিলিত হয়েছে; বণিকগণ নীলসাগরে পাড়ি দিয়েছে বধুর কাছে ফেরার তরে, ক্ষেত্ৰজীবীগণ কৃষকবন্ধুর বিরহ দূর করতে কেকাধ্বনি-মুখরিত কেতকী-সুরভিত আপনাপন কুটীরে প্রত্যাগমন করছে;—ওগাে আৰ্যপুত্র, শুধু তােমার প্রণয়ের কী এ রীতি? স্বয়ং প্রকৃতি আজ মেঘবল্লভের আগমনে ঘন নীল নীচোলাবরণ সহ শ্যামল মেখলায় সজ্জিত হয়েছেন; দূরে সেই অয়ষ্কানি পাহাড়-সারি,—শিখরে যার মহাকাল মন্দির, মেঘের আলিঙ্গনে সে পাহাড় আজ বারে বারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মেঘের লঘুনীলে পাহাড়ের ঘন-শ্যামল বরণ মিলে গিয়ে, রাধার নীলবাসের সাথে শ্রীকৃষ্ণের শ্যামলীর মিলন মনে জাগাচ্ছে। গ্রামের ময়ুরাক্ষী তটিনী মােদের, যাকে দেখে গেছ তুমি উপল আঘাতে ব্যথিত গতিতে বিশীর্ণ দেহে বাধাভরে বয়ে চলেছে, অম্বুবাহের প্রণয় ধারায় পরিপুষ্ট হয়ে সে আজ নৃত্যতালে দুলে উঠেছে। আমার দ্বারপ্রান্তের নীপবৃক্ষ ৭৮ লিপি-পঞ্চক পুষ্পভারে নুয়ে পড়েছে, শাখায় তার স্বর্ণশিকলযুক্ত শিখী আমার নৃত্যসহ কেকাতান তুলেছে। “আকাশ যেন বিরহিণী সীতার মত আজ অশ্রু ঝরাচ্ছে অনিবার; উদ্দাম বাতাসকে, দেখে মনে হয় সে আমার বিরহানুভব করে মেঘকে আমার দুঃখের অভিজ্ঞানস্বরূপ সাথে নিয়ে তােমার পানে উড়ে চলেছে। হে নিষ্ঠুর আর্যপুত্র, কবে তুমি দর্শন দিয়ে তােমার প্রিয়াকে অনুগৃহীত করবে ? “চৈত্ররাত্রের এক মধুনিশায়, ওগাে প্রিয়, কাণে আমার গুঞ্জন করে বলেছিলে তুমি, অয়ি প্রিয়ে, তােমার সাথে হিন্দোলায় দোলার অভিলাষী আমি।'—গ্রামপ্রান্তস্থিত কাননে আজ স্নিগ্ধনীল ফলে ভরা জন্ধুবৃক্ষে চনহিন্দোলা দুলিয়ে রেখেছি আমি ; তােমার আগমনে বুন্দের অভাবে আমি নিশিগন্ধা পুষ্প ধূপ-সংস্কারিত কেশে ধারণ করে বেণীর বাঁধন এলিয়ে দেব, কনককাঞ্চি কটির খসিয়ে সদ্য-রােমাঞ্চিত নীপমালা মেলায় সাজিয়ে দেব; মুখর মঞ্জীর মুক্ত করে বৃতিকাকেতকীর কোমল কেশরগুচ্ছ জড়িয়ে দেব লাক্ষারসরঞ্জিত চরণে; বর্ষার আকাশের মত ঘনমি অঞ্জন দেব নয়নে, বর্ষাকাত খামধার মত শ্যামল কালাগুরুর গন্ধবাসিত বসন শুক্লাপাজের বই অঙ্কিত করে ধারণ করৰ চন্দন-লিপ্ত দেহে। এইভাবে প্রসাধন সমাপ্ত করে মহা- কালের ডমরুনির্ঘোষের মত গভীর মেঘমন্ত্রিত তিমিররজনীতে যাত্রা করব তােমার অভিসারে। আমাদের দুজনার প্রণয়বাণী ছাড়া জগতের যাবৎলনি মিলিত হবে বারিধারার মল্লার রাগিনী-
সপ্তক
মাঝে, গাঢ় মেঘের গভীর গর্জনে অঙ্গ আমার পুলকিত হবে,
বর্ষামালতী যেমন পুষ্পশুত্র শালতরুকে জড়িয়ে ধরে আমিও
আলিঙ্গন করব তােমায় তেমনি করে। হে আৰ্যপুত্র, তুমি
আমার জীবনের আনন্দস্বরূপ; হে প্রিয়, সত্বর হও তুমি,
কর প্রিয়াকে তােমার।
“স্বহস্তচিত্রিত বসনে আবৃত এই পত্রের সাথে মণিময় কাতরণ
আমার অভিজ্ঞানম্বরূপ অবলােকনা তােমার, প্রেরণ করলাম
বিশ্বস্ত অনুচর হস্তে। ইতি মনিকা।”
মােগল যুগ
“ফতেপুর
“মেরে মুয়াজ্জির, পেয়ারে।
“সেলামা-
“তােমার তবিয়ত, তন্দুরস্থ, আছে কিনা জানতে আমি ব্যর্থ
হয়েছি; বহুদিন হতে হালাত, হতে তােমার বঞ্চিত হয়ে, মেরে
পেয়ারে, আমার মনে কিছুমাত্র সুখ নেই; খােদার মর্জিতে
শীঘ্র যেন তােমার তন্দুরন্থ, তবিয়তের হালত পাই।
“শুধু তােমার চিন্তায়, অয়ে রৌশে-আরা, আমার মন
মসগুল হয়ে আছে হওয়া; দুরে যখন শীষ দিয়ে যায় বুলবুল,
লিপি-পঞ্চক
পেয়ারে, তােমার গুলবাগিচার বুলবুলের প্রেমালাপ জেগে ওঠে
মনে আমার সে বাগিচার সর্বশ্রেষ্ঠ গুলটিও, গয়ে আমার
সুন্দরীশ্রেষ্ঠা, তােমার রূপের রােশনায়ে স্নান হয়ে যায় ।
বুলবুল যেমন পাতার ঢাকনা সরিয়ে গােলাপের মুখ দর্শন করে,
তেমনি ঐ স্বচ্ছ ওড়না উমােচন করে তােমায় এক নজর দেখার
জতে জী-মেরা অধীর হয়ে থাকে।
পথে চলার বেলায় নজরে পড়ে যখন নিবিড় মেহেদীকুঞ্জ,
তখনি আমার ইয়াদ হয় হেনা-রঞ্জিত করপুট তােমা, জরীর
চটীর মাঝে মেহেদিরাগ-রক্তিম চরণ দুখানি। কবির ভাষায়
আমারও দিল বলে ওঠে-
‘দনেহা কুম্ জাহির গরুচে রঙ্গে নেজাকাম
রঙ্গে মন দম নেই। চু-রঙ্গে সুর অন্দ দিলান্ত।
“অয়ে পেয়ারে, শিরাজী দেখে সুর্মাটানা আঁখি তােমার মনে
পড়ে; যে মধুর সরাব পান করেন সাহান শা’ বাদসা, তার
চেয়েও মদির-করা নেশা জমা আছে ঐ দুটি নীল নয়নে
তােমার ; মেরে রৌশন-আরা, বেহস্তের হুরী যেন তুমি,
এই গরীবের গরীবখানার দৌলত হয়ে আছ।
তােমার প্রণয়-জজিরে বন্দী হয়ে গেলাম ব’নে আছে
চিরদিন।
“সফেদ এই কবুতরটি আমার দূত হয়ে যাচ্ছে তােমার
পাশে ; মেরে পেয়ারে, তুমি মেহেরবাণী করে দেয়া তলিফ
সপ্তক
ফমাক এর কী হতে আমার এই বার্তা খুলে নিয়ে পাঠ
করে।
“জিয়াদা তােমার জিয়ারত, কা-খাহা।
নিয়াজম, তােমার কবীর খা।”
কোম্পানীর যুগ।
“শ্রীশ্রীদুর্গা
সহায়
কাঞ্চনপুর
২২শে কার্তিক
চরণকমলে,
প্রণামশতকোটি নিবেদনমিং পরে বহুদিন যাবৎ আপনার
কোন পত্রাদি না পাওনে অধিনী নিতান্ত উদ্বিগ্ন বটে, সত্বর
তবীয় কুশল সংবাদ প্রদানে এ দাসীর চিন্তা লাঘব করহ।
এবং বিদেশে অতি সাবধানে থাকিবেন। যদিস্যাৎ মহাশয়ের
কোন রূপ বিপ বিপত্তি ঘটে, সেই ভয়ে আপনার এ দাসীর
মন সতত সন্ত্রস্ত হইয়া রহিয়াছে। যেদিন আপনি নির্বিঘ্নে এ
বাটীতে আসিয়া পৰ্পণ করিবেন, সে দিবস এ দাসী সাতটা
সরিষা দিয়া স্নান করিবেক, কুলাইচণ্ডীর বাড়ী গুয়া-পান
২
লিপি-পঞ্চক দিবেক ও সুবচনীর পূজা করিবেক। সত্যনারায়ণ এখন মনস্কামনা সিদ্ধ করিতে হয়। “গ্রামের যারা সকলে বলে সুতানুটিতে ফিরিঙ্গীয়া কুঠি করিয়াছে; সেখানে মুন্সীর কদর অধিক বটে। পাঁচটার কথায় আপনাকে যাইতে দিয়াছি। পাঁচটার যে মত সেই কর্তব্য। “এ বাটীর সমস্ত কুশল জানিবেন। কিন্তু গ্রামে কেহ কারও ভাল দেখিতে পারেনা। ভালথাকীরা আমার হিংসায় নিয়ত অলিতেছে জানিবেন। পরম পূজনীয়া শ্ৰীযুক্তা খশ্র মাতা- ঠাকুরাণী বাত-ব্যাধিতে নিতান্ত কাতর হওনে অধীনী দেউল- পােতার জাগ্রত ঠাকুরের দোর ধরিয়া নিৰ্মাল্য যাচিঞা করিয়া তাহাকে ধারণ করাইয়াছে জানিবেন এবং তেঁহ এক্ষণে আপাতত নীরােগ আছেন। “লােক পরম্পরায় শ্রুত হইয়াছি যে সুতানুটিতে কোম্পানীর কুঠিয়ালগণ জাহাজ ভরিয়া নানারূপ দ্রব্য সকল আনিয়া থাকে। ও পাড়ার বিমলাঠাকুরঝী আমাকে প্রায়শঃই বলিয়া থাকেন- তুমি যেরূপ রামায়ণ পড়হ তােপ সুশ্রাব্য পড়ন প্রায়শঃই না যায় না। মহাশয় বিমলাঠাকুরঝীর জন্য একটি অল্পমূল্যের দর্পণ আনিবেন,-আহা ঠাকুরব্বীর বুদ্ধি বিবেচনা উত্তম বটে। দত্ত- বাড়ীর হারু ঠাকুরপাে কোন কুঠিতে কৰ্ম্ম পাইয়াছে বলিয়া শ্রুত হইয়াছি। তাহারই সহায়তায় কাছারী বাটী হইতে কাগজ কলম প্রভৃতি আনায়ন করতঃ এই পত্ৰখও আপনাকে লিখি, নতুবা অধীনী নারীজাতি বিধায় কাগজ কলম কুণায় =
সপ্তক
পাইবেক। ঠাকুরপাের মারফতেই ইহা মহাশয়ের চরণে
পাঠাইলাম। এমত অবস্থায় তাহাকে কিছু না দিলে উত্তম দশায়
। এই কারণে লিখি যে আপনি তাহাকে সাধ্যমত কিঞ্চিৎ
অর্থ সাহায্য করিবেন। এবং সর্বশেষে লিখি যে শহরে নাকি
একপ্রকার কাচ নির্মিত চুড়ীর জামদানী হইয়াছে, তাহার নাকি
লাল নীল নানাপ্রকার বর্ণ বটে। অধীনীর ঐরূপ চুড়ী পরিতে
একান্তই বাসনা হইয়াছে। যদি অপরাধ না লয়েন তাহা হইলে
আসিবার কাশীন ঐ প্রকার দুই জোড়া চুড়ী সঙ্গে আনিবেন।
ও পাড়ার ক্ষেমঙ্করী পিসি নথের অহঙ্কারে মাটীতে পদার্পণ করেন
না। চুড়ী পাইলে তেঁহকে একবার দেখাই।
“অধিক আর কি লিখিব। আপনি নিকট হইলে যে সকল
কথা বলিতে পারি পত্ৰখণ্ডে সে সকল লিখন যায় না, কিরুপ
লজ্জা লজ্জা করে। এবং মাগাে যদি কেহ দেখিয়া ফেলেছি।
“আমার শত সহস্র প্রণাম নিবেন
ইতি প্রণতা দাসী-
লমতী নৃত্যকালী দেবী।”
৮৪
দ্বিধা অস্তোম্বুখ মেঘমুক্ত সূর্যের সােনালি হাসি বৃষ্টিধােয়া ফুলে পাতায় ছড়িয়ে পড়ে বিদায় জানিয়ে যাচ্ছে। প্রকাও দোতালা বাড়ীর চারি পাশে পরিপাটি বাগান। রুচির একটা বেতের সাজি হাতে ফুল কেটে ভরছে তাতে। ডাল পালা হতে টুপটাপ করে দু-একটি বৃষ্টি-কণা কেশে কবরীতে ঝরে পড়ে হীরের মত অলছে ; মাথা হেলান’র সাথে গাল পর্যন্ত নামা কণাভরণ তার ঝলমল করছে মাঝে মাঝে। কয়েক গুচ্ছ পুষ্প চয়নের পর লনে একটু ঘুরে রুচিরা নদীর পথে অগ্রসর হল,-এটা বাড়ীর পশ্চাৎ দিকে, বড় বড় গাছে ঢাকা পথ। গাছের তলায় তলায় রজনীগন্ধার দীর্ঘ পুষ্পশীর্ষ, ঘন বন গন্ধে উদাস হয়ে আছে—উপরে নীড়ে ফেরা পাখীর দল কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে তখন। পত্র-বহুল বৃক্ষের ঘনায়ে সন্ধ্যার গাম্ভীৰ্য্য এরই মাঝে ঘনিয়ে আসছে। লাল কাকর-ঢালা পথ সাদা পাথরের দুটি বেদীর পায়ে এসে দাড়িয়েছে। একটা ফুটন্ত রজনীগন্ধার গুচ্ছ ছিড়ে নিয়ে রুচিরা গেট খুলে বাহিরে তাকালে। মাঠের বালা বন নিস্তব্ধ হয়ে আছে; পত্ৰ-হীন আঁকা-বাঁকা ডালের ফঁাকে গলিত রজত-ধারার মত নদী দেখা যাচ্ছে। ওপার ঝাপসা হয়ে গেছে; এপারে মেঘের স্তুপে মাণিক জ্বালিয়ে সন্ধ্যা এগিয়ে আসছে ;-নদীর ৮৫ সপ্তক . 'পরে শুয়ে পড়া পশ্চিমাকাশ বৃন্দাবনের কোন এক হােলির স্মৃতিতে লালে লাল হয়ে উঠেছে। রুচিরা প্রাচীরে হেলে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইল ; দিনের পর রাত, রাতের পর দিন দিয়ে অদৃশ্য শিল্পী যে বিনি- সূতার মুক্তাহার গেঁথে চলেন, তার মাঝে দিন রাত্রির রঙীন মিলনক্ষণের অপূর্ব এই মুহূর্তগুলি মধ্যমণির মত জ্বলে উঠে, কতটুকু সময়ের জন্যে? স্বল্প এই সময়টুকুকে এত শুত মনে হয় কেন? শতদলবাসিনী সরস্বতী কি এমনই কোন স্নিগ্ধ ক্ষণে কবিকে বাণী দান করেছিলেন ;-পদ্মাসনা ইন্দিরা তার মঙ্গল- কলস হতে জগতে সুধাধারা ঢেলেছেন কি এই শুভ মুহূর্তে ? সেই মালিকের স্মৃতিতেই সুন্দর বুঝি আজও এ গােধূলি লগ্ন ! পদশকে রুচিরার দিবাস্বপ্ন টুটে গেল। ফিরে তাকিয়ে দেখলে একজন যুবক বাড়ীর দিক হতে গেটের পানে আসছে। অপরিচিতের প্রত্যাশিত আগমনে অবাক হয়ে বিশাল নয়ন দুটি পূর্ণদৃষ্টিতে তার মুখে স্থাপন করলে; যুবকের বিস্ময়-প্রশংসা চাহনিতে অপ্রতিত হয়ে রুচিরা দৃষ্টি ফিরিয়ে রজনীগন্ধার গুচ্ছটা আনমনে অধরে চেপে ধরলে,—তারপর ধীরে ধীরে বাড়ীর পানে ফিরে চল্প। মনের মাঝে গুনগুনিয়ে কেবলই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরতে লাগল,কে এ, এ কে।” যদি সে ফিরে তাকাত, একজোড়া মুগ্ধ-উজ্জ্বল চোখে ওই এই ফুটে উঠেছে দেখতে পেত। যুবক রুচিরার চলে যাওয়ার পানে কয়েক মুহূৰ্ত্ত তাকিয়ে ৮৬ দ্বিধা মাঠে নেমে পড়ল একমনে ভাবতে ভাবতে,মূর্তিমতী সান্ধীর মত ওকে? বাতাস-লাগা রজনীগন্ধার ফুশীর্ষের মত লীলায়িত গতিভঙ্গী ও-কার ? মেঘচ্ছায়ার মত মেদুর দৃষ্টি কার ও? কযুগ আগে মৃগয়ান্বেষী রাজা নাম-না-জানা তপােবন-পালিতার কথা এমনি করেই ভেবেছেন হয়ত; চিত্রশালার চঞ্চল-নেত্রার চকিত চাহনিতে তরুণের মন সেদিনও এমনি প্রশংসমান হয়ে উঠেছিল, অগুরু-বাসিত ধূপধূসর তপােবনের যুগে জল-সেচিকার বঙ্গরীর মত বঙ্কিম ভঙ্গী, পুষ্প-চায়িকার শারদ মেঘের মত সাবলীল তনুর সহজ তনিমা তরুণের মনকে তখনও মুখ কৌতুহলে ভরিয়ে দিয়েছে। কালের স্রোতে কুলে কুলে পলি পড়ে চলে বহির্জগতে,—কিন্তু অন্তরের অলকানন্দা সেই আদি গঙ্গোত্রী হতে একইভাবে উৎসারিত হয় বােধহয় চিরদিন। যােগানন্দ মুখােপাধ্যায়ের বাড়ীতে রুচিরা এসেছে প্রায় দু’মাস হবে। যােগানন্দ সারা জীবনের নিরলস পরিশ্রমে ব্যারিষ্টারিতে উপার্জন করেছেন বিস্তর। তার পী বহুদিন হল গত হয়েছেন, কোনও সন্তানাদিও নেই। যােগানন্দ জন্ধু অবসরটা কর্মের ভিড়ে এমনই ভরিয়ে রেখেছেন যে সমস্ত জীবনে একটিও প্রগাঢ় বন্ধুত্ব তাঁর গড়ে ওঠেনি। সে জন্য বিশেষ ক্ষোত তার ছিলনা কখন, নিজের কাজ কর্মে নিমগ্ন থাকাটাই তার গম্ভীর প্রকৃতির অনুকূল ছিল। অধিক মেলামেশা আলাপ- আপ্যায়নের ব্যাট তাঁর একেবারে অসহ। নির্জনতা-প্রিয় স্বভাব বলে নিস্তব্ধ নদীতীরে মনােমত ভবন নির্মাণ করিয়ে ৮৭ সপ্তক ছিলেন। দ্বিতীয় বার বিবাহ করাটা আর ঘটে ওঠেনি। একান্ত করণীয় এই কাৰ্যটি করার জন্যে তাড়া দেবার মত যােগানন্দের গৃহে কেহই ছিল না, অত্যন্ত রাশভারি স্বল্পবাক্ স্বভাবের জন্টে বাহিরের লােকও ঘনিষ্ঠতার সুযােগ পেত না। যােগানন্দের নিজের দিক হতে বিবাহের বিশেষ প্রয়ােজন ছিল না; সমস্ত জীবনটা ধরা বাধা নিয়মের মাঝে এমন গুছিয়ে বেঁধে নিয়ে- ছিলেন যে পত্নীর অভাব অনুভব করার যথেষ্ট অবকাশ তার মিলত না। অনবরত পরিশ্রম-নিরত থাকলেও পঞ্চাশ-উদ্ধ বয়েসের পক্ষে যােগানন্দের দেহ যথেষ্ট সবল,-এখনও ঋজু। তার ঈষৎ শুভ্র কেশ, বলিরেখাহীন মুখ, বলিষ্ঠ দেহ দেখলে বােঝ যায় এক সময় তিনি সুপুরুষ ছিলেন। দিন নিঝঞ্চাটে কাটছিল। বিপদ বাধালেন যােগানন্দের অশীতিপর বৃদ্ধা মাতা। বয়সের আধিক্যহেতু বৃদ্ধার সংসারের সাথে বিশেষ সম্পর্ক ছিল না, জপের মালা ও লাঠিটি নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন এ ঘর ও ঘর, আর দিনের মাঝে বার কয়েক উকি মেরে দেখে নিতেন তার ছেলেটি হারিয়ে গেছে কিনা। একদিন সহসা পক্ষাঘাতের আক্রমণ তাকে অচল করে দিলে, সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিভ্রংশও হতে লাগল। যােগানন অরে তখন শয্যাগত। বৃদ্ধার পরিচর্যার কেউ নেই দেখে ডাক্তার একজন নার্সের বন্দোবস্ত করলেন, কিন্তু বৃদ্ধা যে আর উঠতে পারবেন না ও বারাে মাসই পরিচর্যার প্রয়ােজন হবে এ কথাও জানিয়ে দিলেন। বিব্রত যােগান- ডাক্তারকে একজন স্থায়ী সেবিকার ৮৮ দ্বিধা অনুসন্ধানের অনুরােধ জানালেন। ডাক্তার রুচিরাকে নিয়ে এলেন তখন। রুচিরার পিতা ছিলেন মহামহা পণ্ডিত ও মহামহা অমিতব্যয়ী। উপার্জনের সাথে ব্যয়ে তার কুণ্ঠা ছিল না। রুচিরা তার বড় আদরের প্রথম সন্তান। তাকে দুরে বাের্ডিংএ রাখতে পারবেন বলে প্রচুর ডিগ্রীধারী ও প্রচুর বেতন-ভােগী কয়েকজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করে দিলেন; পশ্চিম হতে প্রসিদ্ধ দুজন ওস্তাদ আনিয়ে দিলেন রুচিরার কষ্ট ও যন্ত্রসঙ্গীত শিক্ষার জন্যে। শিক্ষক থাকা সত্বেও নিজে অতি যত্নে কন্যাকে ফরাসী, ল্যাটিন ও সংস্কৃত শিক্ষা দিতেন। হঠাৎ তার মৃত্যু হলে দেখা গেল সঞ্চয়ের পাতা সম্পূর্ণ শূন্য, ঋণের বােঝা ভারী হয়ে আছে। বিধবা মাতা ও অসহায় ভাই বােনের একটা উপায়ের জন্যে রুচিরাকে কর্মের সন্ধান করতে হল। রুচিরার পিতার অনেকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব ছিল, ডাক্তারও তার মাঝে একজন। তার কাছ হতে সন্ধান পেয়ে রুচিরা সাগ্রহে যােগানন্দের গৃহের কর্ম গ্রহণ করণ। সন্ত্রান্ত গৃহের আদরে পালিত এই তরুণীকে সাধারণ সেবিকা- রূপে নিয়ােজিত করতে যােগানন্দের সঙ্কোচ লেগেছিল অনেক খানি। রুচিরার সকল রকম সুবিধার ব্যবস্থা তিনি আগ্রহের সাথে করে দিলেন। যােগানন্দের মত রাশভারি লােকের রুচিরার প্রতি সন্ত্রম ব্যবহার দেখে সকলে তাকে বেতন-ভােগী সেবিকার অনেক উচেই স্থান দিলে। শােক ও ভাবনার ঝড় সপ্তক ঝাপ্টা হতে নবপ্রাপ্ত কর্মের আশ্রয়ে এসে কচিরার দিনগুলো কতকটা স্বস্তির মাঝে কেটে যেতে লাগল। মােগানন্দের একলা-চলা জীবনে রুচিরার আবির্ভাব অনেক থানি নূতনত্ব আনলে। তার কমনীয় মধুর ভাব অনেকদিনের হারিয়ে যাওয়া গৃহলক্ষ্মীর অভাব তার মনে জাগিয়ে দিলে সহসা। জটিল বৈষয়িক কর্ম ও ব্রীফের স্তুপ হতে একটি তরুণীর সরস সঙ্গ যে অধিক তৃপ্তি দায়ক একথা অত্যন্ত অস্বস্তির সাথে স্বীকার করতে হল তাঁকে। কর্মে সমাহিত জীবনের নূতন এ বিক্ষোতে চঞ্চল হয়ে উঠলেন তিনি—জীবনে যখন ভাটার টান, অন্তরে জোয়ার কেন আর! কিন্তু যুক্তি জুটল ক্রমে। বয়স তার অধিক হলেও এখনও ত সবলকাম রয়েছেন। অর্থের অভাব তার নেই। রুচিরার অমিতব্যয়ী পিতার অবর্তমানে তাকে পথে বসতে হয়েছে, যােগানন্দের অবর্তমানে তাকে পথে বসতে হবে না। আর যােগানন্দ না হয় পঞ্চাশ পেরিয়েছন, রুচিরাও ত শিশু নয়।••• ভাবনা চিন্তার পর একদিন প্রভাতে প্রাতরাশের সময় রুচির যখন চা ঢেলে দিচ্ছিল, যােগানন্দ গম্ভীর মুখে বিবাহের প্রস্তাবটা জানিয়ে দিলেন। প্রবল বিস্ময়ের ঢেউয়ে রুচিরার হাত হতে ছকে পড়ে সােনালি চা শুভ্র আবরণকে মলিন করে দিলে খানিকটা। এই বয়সে উচ্ছ্বাস প্রকাশে নিজেকে হাস্যাস্পদ না করে তােলার জ্ঞান যােগানন্দের ছিল, তিনি তাই সংক্ষেপে নিজের মনের যুক্তিগুলাে প্রকাশ করলেন, প্রস্তাবটা চিরাকে ভাল করে বিবেচনা করে উত্তর দিতে বলে নীরব হয়ে গেলেন।
দ্বিধা রুচিরা হিমে জমে যাওয়া মূর্তির মত স্তব্ধ ভাবে বসে রইল, আলাে পড়ে যােগানন্দের রূপালি কেশ ঝিকমিক কয়ছিল যেখানটায় সেই দিক পানে চেয়ে। যােগানন্দকে উত্তর দিতে হবে,—রুচিরা দিনের কর্ম ভুলে চিন্তায় তলিয়ে যায়। রাতের নিদ্রা হারিয়ে ভাবনার ভরে ভেঙে পড়ে। বিবাহে সম্মতি দেবার সপক্ষে কোন সাড়া সে নিজের মাঝে খুজে পায় না, যােগানন্দের যুক্তিগুলাে নিয়েই নাড়া চাড়া করতে থাকে। এতদিন তার কেটেছে পুস্তকের স্তুপে, কাব্য ইতিহাসের পাতায় লুপ্ত নগরীর মাঝে মাঝে-ধ্বংস রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া রাজার সন্ধানে; কত না-জানা না-চেনা দেশের দেখা পেয়েছে—চত্রের ইয়ারম্ভে চঞ্চল সমুদ্রের ঢেউ লেগেছে তার মনে-কত তুষার-ভরা মেরুপথের হরিণটানা রথ, কত অলন্ত তপ্ত মরুবালিতে উটের শ্রেণী, কত নীলনদ-তটে দ্রাক্ষালতায় ছাওয়া মৰ্ম্মর হর্শে মিশর নন্দিনীর সন্ধানে, কৃষ্টির সর্বোচ্চ শিখরে ভারতের সমুজ্জ্বল মূর্তি, গ্রীসের গৌরব যুগ ;- আরাে আগে সেই প্রাণীহীন, বাণীহীন বসুন্ধরা,-একটি বৃক্ষ একা যখন মাথা জাগিয়েছে, তার পর হতে কত যু, কত মৃত্যু, কত জয় পরাজয়,—দিনের পর রাতও কেটেছে কত,রুচিরার প্রদীপ জ্বালান অধ্যয়নে। ••••• এখন তাকে আত্মনির্ভর হতে হয়েছে; অল্প এ কদিনে সে যেন অনেকখানি বেড়ে গেছে মনে হয়। এরই মাকে বহুদিনের দেখা স্বপ্নের মত ভেসে আসে সে সব দিনের স্মৃতি। যােগানন্দের সপ্তক বয়স তার তুলনায় এমনই কি আর অশােতন এখন। যােগানন্দের যৌবনের চাঞ্চল্যহীন মূৰ্ত্তিরও এক ধরণের গৌরব আছে অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেছেন অর্থের অভাবে তাকে পড়তে হবে কখনও। যা খেয়ে রুচিরা দেখেছে বাস্তব জগতে অর্থের প্রয়ােজন নেহাৎ অল্প নয়। রুচিরা কার প্রতীক্ষাতেই বা অপেক্ষা কবে ?সে ত কাউকে চেনে নি।•••কিন্তু কর্মহীন দ্বিপ্রহরে যথন জানালা দিয়ে দেখা যায় নদীর জল জ্বলে উঠেছে হীরের মত,পাল-তােলা নৌকার সার মন্থর গতিতে বেয়ে চলেছে, নিস্তব্ধতার মাঝে টিটিভের তীক্ষ্ণধ্বনি করুণ হয়ে ভেসে আসে, তখন সেই না-দেখা অচেনার চিন্তা মনকে আনমনা করে দেয় কেন? ওই আকাশছোঁয়া মাঠে বালা ডালের ফাকে দুয়ােরাণীর দুলালের দেখা কি মেলে না? বক্রোজ্জ্বল নদী বেয়ে রাজপুত্রের সােনার ময়ুরপঙ্খী এ ঘাটে কি লাগেনা? যােগানন্দের মাতার আর্তনাদে স্বপ্ন ভেঙে যায়, মনে পড়ে সে রূপকথার রাজকন্যা নয়, তাকে জীবিকার্জন কতে হয়। মীমাংসার কোন কুল আর মেলে না ;-ক্লান্ত হতাশ হয়ে সে যােগানন্দকে সম্মতি জানিয়ে দিলে,—আর ত অনিবার ভাবতে পারা যায় না। যােগানন্দ প্রসন্ন হলেন, বিবাহ কয়েক মাস পরে হবে স্থির হল। বিবাহের সংবাদে কেউ হাসলে, কেউ বা অনুতাপ করলে। রুচিরা এখনও সেবিকা রূপে রইলেও গৃহে বাহিরে সকলে তাকে যােগানন্দের ভাবী পত্নীরূপে দেখতে লাগল।
দ্বিধা
;
আজ তিনি
চাদের আলাের ৩ ধারাটি আলাপনকক্ষের বাতায়নপথ
দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, বাতায়নের কাছে একটা ডাইভানে হেলে-
বা রুচিরার চরণে বসন সুটচ্ছে, অন্ধকারে বলে আবােরা
আকাশের পানে চেয়ে আনমনে সে কি ভাবছিল। এ সময়
কুচিরার অবসর বিশেষ থাকে না; যােগানন্দের মাতার ধারণা
অল্পক্ষণ পূর্বে তিনি যে আহার সমাপন করেছেন সেটি দাসীদের
রচা কথা,—তারাই আহাৰ্য্যটা পরিপাক করে তার নামে
দোষারােপ করছে। এই নিয়ে নিত্য তিনি ঘােতর গােযােগ
বাঁধিয়ে তােলেন, রুচিরা গিয়ে তাকে শান্ত করে।
নিদ্রামগ্ন হওয়ায় সে ছাড়া পেয়েছে। চাদের দিকে চেয়ে চোখ
জ্বালা করে, তবু রুচিরা দৃষ্টি ফেরাতে পাছিল না; ও যেন এক
মায়াদর্পণ, কত দিনের কত প্রিয় মুখ ওতে আসে জেগে উঠে,
কত হারিয়ে যাওয়া ফিরে পাওয়া বন্ধু আবার মিলিয়ে
যায়। জগতে সবই ত অমনি মিলিয়ে যায়, মুছে যায়।
...বৈজ্ঞানিক বলেন তবু নাকি হারায় না কিছুই! তুচ্ছ
একটি বাণী, ক্ষুদ্র একটি কাজ
কাজ এরাও যদি অক্ষয় হয়ে
বাজছে অনন্তে অবিরত, তবে হারিয়ে যাওয়ার কেন এ অনিবাৰ্য্য
হাহাকার! ভাণ্ডার ভাই আছে, তবু তা হতে বিযুক্ত থাকার
আনন্দ,মহারাজর্ষির তের এ নিত্য দীক্ষা মানব-মন কি গ্রহণ
করতে পাছে ? যােগানন্দের কথার সাড়ায় রুচিরা একটা
নিশ্বাস ফেলে উঠে বসল। সঙ্গে সঙ্গে যােগানন্দ ঘরে ঢুকলেন।
“একি অন্ধকার যে” বলে সুইচ, টিপে দিলেন। রুচিরাকে
সপ্তক • দেখে বল্লেন, “এই ধ্রুব এসেছে, সাধের আগন্তুকের পানে ফিরে বলেন,—“ইনি রুচিরা। রুচিরার মন একটা প্রশ্নের উত্তরে ও অনেকখানি বিস্ময়ে ভরে উঠল; ঈষৎ হেসে সে প্রতিনমস্কার জানালে। ধ্রুবর আগমন সংবাদ এনেছিল সে; কিন্তু কেমন করে জানবে কক্ষগাত্রের ছবির ওই ডিগডিগে রােগা কিশােরটি ইস্পাতের তরবারের মত তেজোদৃপ্ত এই দীর্ঘকায় যুবা। ধ্রুবর দিক হতেও বিস্ময়ের শেষ ছিল না। তার জ্যেষ্ঠ- তাতের আগামী বিবাহের সংবাদে সে ভেবেছিল ও বেতের মত নীরস কোন শিক্ষয়িত্ৰী অথবা আয়ােডােফর্মের গন্ধে আকুল এক লেডী ডাক্তারকে দেখবে যেয়ে; কিন্তু বসন্তে বিকশিত মালতী মঞ্জরীর মত এই তরুণী। নিজেকে সংবরণ করে ধ্রুব বল্পে, বাগানে আপনাকে দেখে মমাটেই চিন্তে পারিনি, আমি ভাবিনি কি না—” কী যে ভাবেনি সেটা আর বলা হল না। কুচিরা বলে, “আপনি ত অনেকদিন বাদে এখানে এলেন, । দিনকতক থাকতে পারবেন বােধ হয় ? ইচ্ছে ত আছে। জ্যাঠামশায়ের এ জায়গাটা ভারি ভাল লাগে আমার।” আরও দু একটা কথার পর রুচিরা যােগানদের মার কাছে চলে গেল। যােগানও কাগজ পত্র দেখতে উঠে গেলেন। মঞ্জরিত হাহানার একটা শাখা নালা পৰ্যন্ত উঠে এলে তোমার পটে আঁধার রেখা টেনে দিয়েছে। ধ্রুব ১৪ দ্বিধা জানালার ধারে যেয়ে সেইদিকে তাকিয়ে খানিক স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইল, তার পর রুচিরার পরিত্যক্ত আসনটায় বসে পড়ে দীর্ঘকেশগুলাকে টানতে টানতে ভাবতে লাগল। যােগানন্দের শূন্য অন্তরে এই ভ্রাতুস্পুত্রটির প্রতি কতটা মমতা জমা ছিল; ধ্রুবও সে স্নেহ উপেক্ষা কতে পারে নি। যােগানদের নিরালা গৃহে প্রায় তাকে আসতে হতাে। জ্যেষ্ঠ- তাতের সম্পত্তির প্রার্থ সে ছিল না কোন কালে; নিজের পৈতৃক বিষয় যথেষ্ট ছিল; পিতার উপার্জিত সম্পত্তি আলস্যে ভােগ করার তার একটা আন্তরিক ঘৃণা থাকায় ধ্রুব বার্মিংহামে প্রবাসী হয়ে কয়েক বছর এঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়ন করে সম্প্রতি ফিরেছে; উপার্জনও মন্দ করছে না। শিশুকাল হতে আনাগােনায় নিঃসঙ্গ যােনলের প্রতি ধ্রুবর মনে অনেকখানি শ্রদ্ধার ভাব গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ তরুণী ও বৃদ্ধের এই সংযুক্ত ছবি তার মনে কী এক বিপ্লব জাগিয়ে কিছুতেই পুর্বের সহজ সম্বন্ধটি বজায় রাখতে দিচ্ছিল না; এক হাতে কপালটা চেপে নত মস্তকে বহুক্ষণ সে ভাবলে বসে;-নিঃশেষিত আয়ুঃ প্রাচীন বৃক্ষের হেলেপড়া কর্কশ কাণ্ডে জড়িয়ে যাবে এই নববর্ষার বন-বেলার ব্রততী ?••• ০ এক পক্ষ কেটে গেছে। রুচিরা অত্যন্ত আনমনা আজ- কাল, বক্র-কৃষ্ণ পতলে তার বিশাল চোখ দুটি সর্বদা ক্লান্ত
সপ্তক
সকরুণ। যােগান- আজকাল পূর্বাপেক্ষা গম্ভীর, অকারণ
কর্মে ব্যস্ত। গাম্ভীর্যের হাওয়া বরও লেগেছে বােধ হয়,
তাকেও অধিকাংশ সময় চিন্তামগ্ন দেখায়। গৃহের এ ভারাক্রান্ত
আবহাওয়া, শুধু যােগানন্দের মাতার কোন পরিবর্তন হয় নি,
তিনি পূর্বের মতই আহারের সময় আব্দার, নিদ্রার সময় বােদন
এবং সকল সময়ই আহার নিয়ে তুমুল গােযােগে ব্যস্ত
থাকেন। তাতে ভারাক্রান্ত নিস্তব্ধতা আরও ভয়াকুল হয়।
নির্জন মধ্যাহ্নে আলাপন-কক্ষে বসে রুচিরা সবুজ একটা
বইয়ের পাতা ওল্টাছিল। ধ্রুব কক্ষে প্রবেশ করলে ; রুচির
অন্তরে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলে; ধ্রুবর প্রতি প্রথম দিনের সহজ ভাব
কেমন করে কবে সে হারিয়ে ফেলেছে।
ললাটের স্বেদ রুমালে মুছে ধ্রুব বল্লে,-“কী গরম।”
“বেড়াতে গেছলেন?”
বেতের চেয়ার একটা রুচিরার কাছে টেনে নিয়ে বসে ধ্রুব
বলে, “হাঁ, কিন্তু যা রােদ। কি পড়ছেন এটা? কালকের
বইখানা শেষ হয়ে গেছে ?”
*Babbit ? হাঁ, সেটা শেষ হয়ে গেল।”
“কেমন লাগল Sinclair Lewis-এর লেখা ?”
“কাতায়কে অগ্রাহ করার একটা সহজ ভঙ্গী মনের ওপর
ছায়া না ফেলেই যায় না। Sinclair Lewis কিন্তু যেন অত্যধিক
cynic, অতটা আপনার সব হয়?”
ধ্রুব একবার রুচিরার পানে চাইলে, তারপর বৃষ্টি ফিরিয়ে
৫
১৬
দ্বিধা
বলে, “যার অনুভব করার শক্তি অধিক, তার cymic হয়ে যাবার
সম্ভাবনাও অতিরিক্ত। অন্যায়কে অনুভব করলে তাকে পরিপাক
করা আরাে যে অশােভন।
কচিরা চমকে উঠে বর দিকে তাকালে। তার মনে উচিত
অনুচিতের যে বৰ অহর্নিশি চলছে, ধ্রুব কি তারই সার কথাটি
বলে দিচ্ছে? হাতের বইটা নামিয়ে রেখে সে একটু সরে
বসলে।
রুচিরাকে নীরব দেখে বইটা তুলে নিয়ে ধ্রুব জিজ্ঞেস করলে,
“কতটা পড়লেন এ বইটার ? ভাললেগেছে 'Forsyte
saga'?"
রুচিকে উত্তর দিতে হল। বল্লে, “এটা আমি অনেক বার
পড়েছি। ভাল মন্দ লাগার বাইরে ও বইটা, মনে হয়।”
আশ্চর্য হয়ে ধ্রুব বলে, “এতবড় ভাবেন এটাকে ?
“বড় ত ভাবি না। ও যেন চিরন্তন মনের দুঃখ দিয়ে
তৈরী, একান্ত অন্তরের কথা। দেখুন—যে ভাবে, সে দরদীও
হতে পারে।”
নিরন্তর সংঘর্ষে রুচিরার মনের দুয়ার কতটা আল্গা হয়ে
গেছে কিছুই সে জানে নি, কথাগুলাে কোন্ ফঁাকে বেরিয়ে এল।
ধ্রুবের মনে চাঞ্চল্যের বিদ্যুৎ খেলে গেল—রদের অধ্য তুমি
গ্রহণ করবে কি? ব্যগ্র পুলকে কি যেন সে বলতে যাচ্ছিল,
একজন দাসী এসে রুচিরাকে বৃদ্ধার কাছে ডেকে নিয়ে চলে গেল।
অধর দংশন করে ধ্রুব নীরব হয়ে রইল।••••••
১৭
সপ্তক
মৃদু বৈকালী আলােয় বেদীতে বসে রুচিরা দেখছিল কবীর
একটা সুয়েপড়া শাখে দুটো শালিক স্ফীতপক্ষ হয়ে আলাপে
ব্যস্ত; কয়েকটা কাঠবেলি ঝরাপাতার মাঝে চঞ্চলচরণে
নেচে বেড়াচ্ছে। ওপারের নৌকা হতে মাঝিদের ভাটিয়ালি
সুরের মধুর মুনা—কতদূরের পাখীডাকা ছায়াঢাকা বটমূল,
কাকচক্ষু দীঘির জল, জ্যোৎস্নাঘােয় মাঠের ক্ষীণ পথশেষে ঘন
তালবন, পল্লীবালার প্রদীপ-প্রজ্জ্বলিত গ্রামের শান্ত আর স্বপ্ন মনে
জাগিয়ে দিচ্ছে। পাশে কতকগুলাে ফুল পড়ে, হাতে একটা
সেলাই নিয়ে রুচিরা অলসভাবে মাঝে মাঝে বুনছে। এ কয়দিন
রুচিরার অন্তরে যে সাড়া জেগেছে, তাকে স্বীকার করতে নিজেই
সে সাহস পায় না। ধ্রুবকে সে প্রাণপনে পরিহার করে চলতে
চেষ্টা করে। রুচিরার পানে চাইলে ধ্রুবর নক্ষত্রের মত
স্বদোজ্জল নয়নে যে আলাে ঝলসে ওঠে—তা দেখে আঘাত
লাগা সেতারের তারের মত রুচিরার চিত্ত কেঁপে ওঠে;-সমস্ত
শক্তিকে সংহত করে সে আকর্ষণ হতে নিজেকে বিছিন্ন করে
দেয়। যােগানন্দের বাগদত্তা বধু সে-এতই কি লঘু চিত্ত তার?
“কতক্ষণ এলেন এখানে ?”
মাঠের পথ দিয়ে ধ্রুব এসে উদ্যানারে প্রবেশ করলে।
প্রতিন্নি দৃষ্টি তুলে রুচিরা বলে,-“নদীর ধারটা ভারি
সুন্দর, না? বেদীর একপ্রান্তে বসে পড়ে ধ্রুব বলে, “মা, তাই
একবার ভাল করে ঘুরে এলাম, কাল সকালে চলে যাচ্ছি
কি না।”
দ্বিধা
রুচিরার হাত হতে সেলাইটা খসে পড়ল। দুজনে খানিক
নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
নদীর গা ঘেঁসে একদল হাঁস উড়ে চলে গেল কোন দূরতম
প্রবাসে। ধ্রুব সেই দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে ছিল।
আপন মনে বলে, এখানে আমার আসা আর হবে না
কন।
“কেন?”—অতর্কিতে কথাটা বেরিয়ে এল। এ সব প্রশ্ন
করবার সাহস রুচিরার কিছু মাত্র ছিল না।
দৃষ্টি ফিরিয়ে ধ্রুব অচঞ্চল চোখে রুচিরার দিকে চাইলে,
তারপর বল্লে, “আর দেখা আপনার নাও পেতে পারি; একটা
কথা তাই জিজ্ঞেস করতে সাহস করছি, ক্ষমা করবেন।”
একটু থেমে বলে, “আচ্ছা, জ্যাঠামশায়কে বিয়ে করতে সত্যি
কি আপনি রাজী হয়েছেন?”
যে চিন্তাটাকে সে সর্বদা চেপে রাতে চায়, ঠিক এই
লােকটি তাকে জাগিয়ে দিলে চিত্ত যে তার উদ্বেল হয়ে ওঠে।
যে উৎস পাথর চাপা দিয়ে আপনাকে লুকিয়ে রাখতে চায়,
পাথরে ঘা পড়লে সে যে শত সহস্র ধারায় ধরণীর বুক ফেটে
বেরিয়ে আসে।
স্বপ্নালস দৃষ্টি সুরে মেলে কোন মতে রুচিরা বলে,-“ওঁর
কাছে আমার অনেক ঋণ ; অকৃতজ্ঞ হতে ত পারি না।”
ধ্রুবর চোখ জ্বলে উঠল-সােজা হয়ে বলে, “আপনি কি
বলতে চান জীবনটা কৃতজ্ঞার দেনা শুধতে শুধু? অন্য সব
॥
অনুভূতিকে মুছে ফেলে কৃতজ্ঞতাকে আঁকড়ে থাকাই জীবনের
চরম লক্ষ্য ?
“সেও একটা কাজ করা।” এ প্রশ্ন কেন আর, সংশয়ের কি
শেষ হয় নি। মন্দ কি মিটবে না এ জীবনে ?
এ কাজে জয় হবে অন্যায়ের। মনকে বিয়ে দেনা
পাওনাকে বড় করেছেন,—সুদ লাগবে যে সারা জীবনটির।
কথার আঘাতে বাতাসে বাশপাতার মত কাপন আগে
রুচিরার যুক্তি সংকল্পে ; কী বলবে সে?
তাকে নীরব দেখে গিয়কণ্ঠে ধ্রুব বলে, “জিনিষের একদিকে
অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলে চোখে এমন ধাঁধা লাগে,—সে দিকটাই
একমাত্র সত্য হয়ে দাড়ায়। এর মাকে ভ্রান্তিও ত থাকতে
পারে।”
“আমি ত অনেক ভাবলাম; এ সল্প আমার কেবলই কি
ভ্রান্তি ?—দীর্ঘ চিন্তাপথ পারে এতক্ষণে কি দেখতে হবে ভ্রান্তির
নেশায় তার দিন কেটেছে?
অনুনয়-নম্র কণ্ঠে ধ্রুব বলে, “নির্ভুল আমরা ত কেউ নই—
কত তার গতির ছেড়ে অন্যদিক হতেও একবার দেখুন,
অন্যায়ের পক্ষে আর যুক্তি খুঁজে পান কি ?”
দূরের পানে চেয়ে রুচিরা নীরব হয়ে রইল। কি উত্তর আছে
তার ?
খানিক অপেক্ষা করে খুব বলে, “কৃতজ্ঞতার খাতিরে অনেক
কাজ করা চলে, কি বিয়ে করতে, সংসার চালাতে ওর চেয়ে
দ্বিধা
ঢের বেশী আরাে চাই যে।” রুচিরার দিকে প্রদীপ্ত নয়নে চেয়ে
বল্লে, “ন্যায়ের দিকে চেয়ে ভালবাসাটাকে ভুলেছেন আপনি,
কিন্তু দেখবেন ওটাই সব থেকে বড় সত্য জগতে,—ওর অভাবে
সবই ফাকি।”
রুচিরার শুভ্র মুখ আরাে সাদা হয়ে গেছল। দুলে ওঠা
ডাল হতে বৃষ্টিফোটার মত অনেক বিনিদ্র রজনীর গড়ে তােলা
সঙ্কল্প তার নিঃশেষে ঝরে পড়ল এবার, কিন্তু বাঁধন যে সে
গ্রহণ করেছে—উপায় কোথায়,-হতাশ-করুণ সুরে সে বলে,
“কী আমার করবার আছে আর এখন?”
—“সবই ত রয়েছে”—ঝুঁকে পড়ে আগ্রহ-নিরুদ্ধ স্বরে ধ্রুব
বলে,—ও ভুল পথ ছেড়ে দাও রুচিরা, আসতে পারবে আমার
সঙ্গে? ভুলকে ভেঙে দিয়ে চলে আসতে পারবে কি?”
দীর্ঘ নীরবতার পর রুচিরা একটা করবীর পাপড়ী খসিয়ে
ছিন্ন করতে করতে অতি ধীরে বল্লে,-“পারব বােধ হয়”
তারপর বলে, “জ্যাঠা মশায় তারি রাগ করবেন কি আপনার
ওপর।
উচ্ছ্বসিত আনন্দে ধ্রুব সহাস্যে বল্লে, “তা করুন। সমস্ত
জগৎটার রক্তচোখ উপেক্ষা করা যায় যার গুণে সেই মাণিকের
সন্ধান যে আজ পেয়েছি।”
১০১
প্রত্যাবর্তন তাল মধ্যাহ্নে নির্জন সােপান বেয়ে দুটি তরুণ-তরুণী কামাখ্যা পাহাড়ে উঠছে। চারিপাশে অথই ঘন অরণ্য, কাটা- ভরা বেত আর চক্রাকৃতিপত্র বন্য-পামের নিবিড় আলিঙ্গনবদ্ধ কুঞ্জ হ'তে মণি-মাণিক্যের টুকরাের মত প্রজাপতির ঝাক শরৎকালের লঘু মেঘের নিঃশব্দ গতিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘুমের দেশের পরী যে, গতি কিন্তু বাণীহারা। দূর হতে কাঠ- ঠোর কর্ম-নিষ্ঠার সঙ্গীত কোমল হয়ে ভেসে আসছে, ঘুঘুর হিল্লোলিত উদাস উচ্ছাস আকাশকে উদাসী করে তুলেছে। কোন খানে এক নাম-না-জানা গাছে একগাছ বনফুল সবুজের বুকে রঙের প্রদীপ জ্বালিয়ে ফুটে আছে। দীর্ঘপত্রের অন্তরালে বন্য কদলীর গুচ্ছ ভারে ভারে নত হয়ে আছে, নিশীথরাতে বনের ঐরাবত নিমন্ত্রণ নিতে আসে সেখানে। কালাে পাথরের 'পরে কোথাও আমল শেওলা ভরে আছে, কোথাও পার্বত্য সর্প অঙ্গ এলিয়ে পুঞ্জিত ঘৃণার মত জমে রয়েছে। বর্ষার বিদায়ের বৃষ্টি-চুম্বন তখনও বক্ষে পল্লবে শাখায় শাখায় সজল হয়ে লেগে আছে। তপঃশর্তা অপর্ণার মত বর্ষাতে ক্ষীণা ঝরণার অদুরে সবুজ আঁধারকে ১০২
প্রত্যাবর্তন
উজ্জ্বল করে এক একবার চমকে উঠছে। এই নিবিড় অরণ্যের
ওড়নার আড়ালে পাহাড়টি যেন কোন এক রহস্য-জগতে ডুবে
রয়েছে, বনের ঘন অন্ধকারে বিশাল বৃক্ষলতায় কী যেন এক
গােপন মন্ত্রের নীরব অপন অহর্নিশি চলছে,-তারই আবেশে
সারা দেশ মূৰ্ছাতুর স্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে।
তরুণ তরুণীর হাতে হাত জড়িয়ে নিয়ে বললে,-“কী
সুন্দর.•••••।” শিপ্রা তার অনুপম চোখের আধেক দৃষ্টি ফিরিয়ে
জিজ্ঞাসা করলে,-“কোটা অত মন ভােলালাে ?”
সন্দীপ বললে, “ঘুমজড়ানাে দিনের এই দেশটা;এসব
'নিঃশব্দ বন-জঙ্গলের সঙ্গে দিনটাও কী আশ্চর্য খাপ খেয়েছে
দেখছ ? সবারই একটা ঘুমন্ত ভাব, না?”
“না, তুমি নেহাৎই কবি হয়ে উঠছ—
সন্দীপ বললে, “ হয়ে উপায় কি? যে প্রেরণা রয়েছ
তুমি সঙ্গে।”
শিপ্রা বললে, “আহা, সত্যের অপলাপ কর কেন? কবিত্বের
খােরাক দিচ্ছে তােমায় এই বিকট জঙ্গল,-আমি নয় গাে! আমায়
আর ঠাট্টা কেন বাপু? আচ্ছা, তুমি ছােটবেলায় আর একবার
এখানে এসেছিলেনা? তখনও কি এমনই প্রেরণা সব পেয়েছিলে?
সন্দীপ বলে, “নিশ্চয়, তা আর পাইনি। অনাগত তােমার
ঝেরণা থেকে কি আমি ফাক্ পেয়েছিলাম ভাব’ ?”
শিপ্রা বলে, “ও বাবা, এ যে আমায় চোখে দেখার আগে
আমার স্বপন চোখে লাগল দেখছি।”
০
मरक
সন্দীপ বললে, “ঠিক বলেছ তুমি! ওটি আমারই নিজস্ব
ভাব। আমি প্রকাশ করব করব করছিলাম এমন সময় দেখি
কবি ওটা একাশ করে ফেলেছেন।”
শিপ্রা বলে, “করে ফেলে আমায় বাঁচিয়েছেন। নইলে কবি-
সম্রাটের সম্মান লােকে যদি তােমায় দিয়ে ফেলত তা হলে
গর্বে কি আর তুমি আমার সঙ্গে কথা কইতে, ভাব’ ?•••আচ্ছা
তুমি আগেও যখন এসেছিলে, তখনও এ সব এমনি ছিল নাকি?”
সন্দীপ বললে, “হাঁ ঠিক এই রকমই ছিল। পরিবর্তনের
কোন চিহ্ন এর গায়ে দাগ ফেলে না, আর এর একটা আকর্ষণী
ক্তি আছে। সেবার মনে আছে যেন একটা প্রচণ্ড শক্তি
আমায় কোথায় বনের মাঝে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
দুষ্টামির হাসি হেসে শিপ্রা বললে, “ওঃ, তা হলে তােমার
একটা প্রচ্ছন্ন অতীত রয়েছে বল? সেই জন্যই সময় সময়
তােমাকে একটু আন্না দেখি।”
সন্দীপ ঈষৎ গভীর হয়ে বললে, “ঠাট্টা নয় শিলা, সে যে
কী একটা অস্বাভাবিক অনুভূতি তা বােঝান যায় না। কোথায়
হারিয়ে গেছলাম কিছু মনে নেই—যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
শেষে যখন ঘুম ভাঙলাে তখন সঙ্গের লােকজন দেখিনি।
একটা পা বাড়ী পৌছে দেয়।
শিপ্রা অন্তরে শিউরে উঠল। একটু সরে এসে উল
চোখের নিখ বৃষ্টি সন্দীপের মুখের 'পরে রেখে জিজ্ঞাসা করলে,
“সত্যি তুমি হারিয়ে গেলে এখানে?
১৪
প্রত্যাবর্তন
গাে।
সন্দীপ তার চাঞ্চল্য লক্ষ্য করে শধু সুরে বললে, “হ
কিন্তু এবার আর হারাবার জো নেই; তােমার
যে কঠিন বন্ধন, তা কাটতে পারে এমন ইজান
দেখিনে?”
শুষ্ক হেসে শিপ্রা বলে, “তবু সাবধানে থাকাই ভাল।
জান ত কামাখ্যায় এলে মানুষ ভেড়া হয়ে যায়। শেষে কি
ভেড়া চরাতে চরাতে আমায় হায়রাণ হতে হবে।”
খানিক দূরে যেয়ে একটা সাদা ফুলে-ভরা গাছ দেখে সন্দীপ
উল্লাসে বলে উঠল, “বাঃ, এটি আজও তেমনি রয়েছে, যেমনটি
আমি দেখে গেছলাম।”
শিপ্রা তাড়াতাড়ি গােটাকতক ফুল তুলে নিয়ে বললে,
“পাড়াও, তা হলে গাছটাকে ভাল করে চিনে নিই। ও যে
আমার ‘ভর্তুর্মিং'—*
কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই। ধুমপুরীর রাজকন্যার মত
নীরব নিথর অরণ্য তার ঘনকুন্তল খররৌদ্রে এলায়িত করে
নিদ্রামগ্ন হয়ে আছে। নিলয় নীল আকাশ হতে দীপ্ত
সূর্যের রশ্মিধারা ঝরে পড়ে নিদ্রিতা সুন্দরীর সারা আল
সন্তর্পণ চুনে ছেয়ে দিয়েছে। মধ্যাহ্নের অলসবাতাস পুষ্পভরা
বন্ধুরীতে দোলা দিয়ে, পরবতরা শাখায় কাঁপন লাগিয়ে আপন
মনে গােপন বাণী গুন করে যাচ্ছে।
নীলিমায় কল-রেখার মত অতিদুরে দু একটি শঙ্খচিল আলাের
ঝলকে কেঁপে উঠছে। দিনটা যেন রঙীনদেহ কতিপক্ষ
সপ্তক মদিরগুঞ্জন-রত ভ্রমরের মত বনে বনান্তে আপনার মূৰ্চ্চনার আবেশে উদাস হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। আলাের প্রণয়ে পাগল প্রকৃতির রূপের লীলায় আকৃষ্ট হয়ে শিপ্রা সন্দীপ খানিক নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। সন্দীপ অতি আদরে শিপ্রাকে জড়িয়ে ধরে আরাে কাছে টেনে নিয়ে বলে, জীবনটা কি আলােয় ভরা শিপ্রা ।” তার সুন্দর কেশে জ্যোৎস্রধারার মত আঙুলগুলি একবার চুইয়ে উদাস সুরে শিখা বললে, “কি জানি, আলাের পাশেই ত আঁধারের আভাস।” সন্দীপ কোমল স্বরে বলল, “কিন্তু অনাগত আঁধারের উদ্দেশে আগত আলােককে আলােককে উৎসর্গ করার সার্থকতা ত নেই কিছু।” প্রকৃতির এই উদাস সৌন্দর্য্যের সন্ধানে সন্দীপ আজ একেবারে পুলকে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। তার কৈশােরের একটুখানি স্মৃতির পরশ-লাগা এই স্থানটি এতদিন তার যৌবন- জীবনের কল্পলােকে কুহেলিকা-গড়া অনেক মায়া-স্বপন রচেছে, ভেঙেছে। আজ পুনৰ্বার শিপ্রাকে সাথে নিয়ে সেই স্থানটিতে আসতে পারায় তার উৎসাহের অন্ত ছিল না, গর্বও যেন খানিকটা ছিল। সামান্য এই পাহাড়টার এতখানি বর্ণনা যে সে করছিল শিলার কাছে, মুগ্ধ হবার মত দৃশ্যও তাতে আছে নেক। শিলা কিন্তু তার বিপরীত এক অকারণ পদ্ধতিতে অনিচ্ছ-
প্রত্যাবর্তন
সত্বেও ম্লান হয়ে পড়ছিল। এই পাহাড়, বনানীর নীরবতা,
বাতাসের ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস, আলাে-আঁধারের আলপনা সবই
তার কাছে অস্বাভাবিক, অমুদার, সৌন্দৰ্যবিহীন লাগছিল।
মনে হচ্ছিল দিনটা যেন নিতান্তই রুক্ষ রিক্ত শূন্যতায় ঘুলিয়ে
রয়েছে। অনাগত বিপদূতের চঞ্চল চরণধ্বনি কি আগে হতেই
শিপ্রার বুকে বেজেছিল ? কে জানে।
আরও খানিক উঠে এসে ক্রমে মন্দির দৃষ্টিগােচর হলাে-
পর্বত-বক্ষে খানিকটা সমতল স্থান, কয়েকখানা নিরালা গৃহ
পশুর আবাসে মানুষের নিদর্শন বজায় রেখেছে। শুষ্ক কদলী-
পত্র, পরিত্যক্ত কীটষ্ট ফলমূলে একটি স্থান ছেয়ে রয়েছে—
সেখানে সদ্য হাট ভেঙেছে, মানুষের ভিড় কমে গেছে।
একটা অস্বচ্ছ জলে-ভরা সবােবর খানিকটা পাষাণ-আবৃত
অঙ্গন-মাঝে অনতিবৃহৎ মন্দির।
পরিচ্ছন্ন দেখে একটা বৃহৎ প্রস্তরের ওপর বসে পড়ে
শিপ্রা জুতা-মােজা খুলতে লাগল। সন্দীপ বললে, “শী নাও,
ওপরের পাহাড়টা এখনও দেখতে বাকী! আমাদের ফিরতে
দেরী হলে বেবী গােলমাল করবে হয়ত।”
শিপ্রা বললে, “খুব গিয়ী হয়েছ গাে,এখন এস মন্দিরে
যাওয়া যাক।
মন্দির দেখে বাহির হবার সময় শিপ্রার ভত্তির আতিশয্যে ও
দর্শনীর মাত্ৰাধিক্যে পরম পরিতৃপ্ত পুরােহিত শিপ্রার গৌর
ললাটে অতিরিক্ত বৃহৎ একটা সিদুরের টিপ একে দিলে।
১০৭
সপ্তক
পরিত্যক্ত গাত্রবর্ণের মােজা পরুতে পতে সে নানা গল্প
জমিয়ে তুল্পে পুরােহিতের সঙ্গে। বহুকাল আগে সেই কোন
এক যুগে কে এক নাকি রাজা ছিল, তার ছিল এই রাণ,
রূপবতী হােটরাণীর প্ররােচনায় বড়রাণীকে রাজা দিল নির্বাসন
এই কামাখ্যার পাহাড়ে। মনের খেদে অতৃপ্ত বাসনা বুকে
নিয়ে রাণী তার দীর্ঘকেশের কঁাসি গলায় জড়িয়ে কলে
আত্মহত্যা। সেই হতে কত দিন কত বর্ষ কত কাল ধরে
এক অতৃপ্ত অশরীরী আত্মা এই পাহাড়ে-পর্বতে ঘুরে বেড়ায়,
সতেজ সুন্দর মানবকে সে ডাক দিয়ে ফেরে, কেউ, স্পষ্ট জানে
, তবে কখন কখন নাকি অপার্থিব একটা আলাে,
অপরূপ কী এক ক্ষীণ ঝঙ্কার, অতি মদির তীব্র কি একগন্ধে
বনস্থল দীপ্ত, ঝঙ্কত, আমােদিত হয়ে ওঠে,এইটুকুতে তার
আভাস মেলে। আর এ পাহাড়ে নাকি একটা ভয়াবহ
বালাও আছে। গৌরীর বিচ্ছেদে শােকোন্মত্ত শঙ্করের দারুণ
ক্ষোভের একটা ক্ষুলি বিষ্ণুর সুদর্শনে কর্তিত গৌরী-অঙ্গের
সঙ্গেই এই পর্বতশিরে এসে পড়েছিল, সেই ক্ষোভ এর আকাশে
বাতাসে মিলিয়ে আছে। কামাখ্যা এলে মানুষ ভেড়া হয়ে
যায় বলে যে কিন্তী আছে তার সাথে এসবের একটা
যােগও মেলে।
তিনজনে খানিক নির্বাক হয়ে রইল। একটা অচ্ছন্দ্যের
ছায়ায় বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠছিল। জড়তা কাটিয়ে সন্দীপই
সব নামে ডাক দিয়ে বললে, “ও শিখা, যত রানের
১৮
প্রত্যাবর্তন
গাঁজাখুরি গল্প ত খুব শােনা হ'ল, এবার ওঠে। পুরােহিত
মশায়ের কারণের ঘনঘটা আজ জমবে ভাল!-আগে হতেই
বােধ হয় আমেজ এসেছে তার।”
শিপ্রা অলস ভাবে বললে, “বেলা যে গেল।ওপরে
আর নাই বা গেলে। পুরােহিত বললে ওপরে নাকি
সন্দীপ অধৈর্য হয়ে শির হাত ধরে টানাটানি করে
বললে, “তুমি কি পাগল হলে শিরা? পুরােহিতের কাছে
সর্বত্রই সর্বপ্রকার ভয়। যত রাজ্যের ভূতুড়ে গড়ে তােমার
বিশাস হল কবে থেকে? কত সাধাসাধি করে এতদিন বাদে যদি
বা এলে, অর্ধেক দেখেই ফিরবে? তা কি হয়? ওপরে কতকি
দেখাব চল, ঐ যে প্রকাণ্ড গাছটা—ওর তলায় পাথরে শেওলা
কেটে নাম লিখে গেছলাম সেবার, চল গিয়ে দেখি এখনও আছে
কি না।”
সন্দীপের আগ্রহ দেখে শিার আর বাধা দিতে ইচ্ছা হল
। দু’জনে ধীরে ধীরে উঠতে আরম্ভ করলে। দিনের
প্রখরতা-ক্লান্ত আকাশ তখন সায়াহের স্নিগ্ধতার আরতির সূচনা
করছিল। দিগন্তে সূর্যের শতশিখার নৃত্যসভায় প্রদীপ নিভে
আসছে। অরণ্যের অলস জ্বাচ্ছন্ন চোখে ক্লান্তির গাঢ় নিদ্রার
কালাে ছায়া ঘনিয়ে উঠছে, উর্ধে অরণ্য আরও গভীর হয়ে
উঠেছে, চারিদিক এত নিস্তব্ধ-নিঃশব্দ—নিশ্বাস-গ্রহণেও যেন
সঙ্কোচ লাগে। কুটিকুটিল অরণ্যনিবিড় খ্যানগভীর গিরিয়াজ
১০১
সপ্তক
শরের মত মহা-যােগাসনে সমাসীন,-নন্দীর হেমবেত্রতলে
বিশ্বচরাচর যেন স্পন্দনহীন গতিহীন হয়ে পড়ে আছে। চারি-
পার্শ্বের এই একান্ত নীরবতার ছোঁয়াচ বােধ হয় পথিক দুজনার
মনেও লেগেছিল, তারাও ভাষা হারিয়ে নীরবে চলেছিল। সহসা
দু’জনেই চমকে উঠল অকারণে,—আরও কাছে সরে এসে
পরস্পরের হাতে হাত জড়িয়ে ধরল, নয়নে নয়ন বুলালাে
একবার।
সন্দীপ শিপ্রার নীরব অন্তি মনে মনে অনুভব করে তাকে
সহজ করে তােলার জন্য লঘুসুরের কথাবার্তা আরম্ভ করল,
“এত চুপচাপ কেন শিা, ভূতের ভয়টা মনে জাগছে বুঝি
এখনও ?”
ঈষৎ হেসে শিপ্রা বললে, “ভূত নয় গাে, ভূত নয়-পেত্নী।”
তাকে সস্নেহ-আলিঙ্গনে বেঁধে সন্দীপ বললে, “আমি অভয়
দিচ্ছি,-মাভৈঃ!”
শিপ্রা কাছে সরে এসে মৃদুকণ্ঠে উর্ধমুখে সন্দীপের চোখের
পানে তাকিয়ে বললে, “আমার ভয় কচ্ছে.. •..
সন্দীপ তার সফল বাহু দিয়ে শিকে চেপে ধরল, মুখে কিছু
বললে না। পৃথিবীর সমস্ত বিপদ হতে শিলাকে রক্ষা করতে
পারে এই বাহু দুটি সেইটাই সন্দীপ মৌন ভাষায় জানিয়ে
দিলে। পরে বললে, “এ যাত্রায় তােমার বুঝি ঐ রূপকথাটাই
সবার চেয়ে চিত্তাকর্ষক লাগল?”
শিপ্রার মনে তখন কিসের একটা বল বেধেছে সেই জানে।
.
১১০
প্রত্যাবর্তন
সে বললে, “আচ্ছা নেপলস-এ থাকতে ভিসুভিয়ালে ওঠা
তােমার মনে আছে ত?—আমার মনে হয় এই পাহাড়টার সঙ্গে
কোথায় তার একটা মিল আছে।”
সন্দীপ বললে, “অবাক করলে তুমি শি! কোথায় সেই
ভন্মের ভূপ—অগ্নিময় ভিসুভিয়াস, আর কোথায় এই শ্যামসুন্দর
কামাখ্যা। তােমার কল্পনাশক্তি যে খুব প্রচণ্ড তাতে সন্দেহ করি
না, নইলে তুমি এ দু'য়ে মিল দেখতে পাও?”
চিন্তিতভাবে শিপ্রা বললে, “কি জানি—ঠিক ধরতে পারছি
। তবে
তবে ভিসুভিয়াস আর কামাখ্যা দুটোই সমান কদৰ্য্য
এটা ঠিক।
শিপ্রার উপমায় কল্পনাটা সত্যিই যে অতিরিক্ত দূর-বিস্তৃত
হয়ে গেছল সে বিষয়ে অবশ্য সন্দেহ ছিল না। ভিসুভিয়াসের
সাগর-পারে সরলভাবে দাঁড়ানাে রুক্ষ অপরিচ্ছন্ন মূর্তিসবুজের
শেষ চিনুটুকুও তার দেহ হতে মলিন হয়ে মুছে গেছে,অলক্ত
তরবারির আঘাতে যেন ধরার শ্যামল অঞ্চল উনােচিত হয়ে
গেছে সে দেহ হতে। প্রস্তরীভূত খণ্ড খণ্ড গন্ধকে আবৃত গাত্র,
যেন আদিমকালের অতিকায় অস্পৃশ্য একটা কন্টকদেহ কঙ্কাল!
সহসা দেখলে মনে হয় শান্ত বুঝি, কিন্তু অতর্কিতে আগুনের
বিদ্যুৎ অণ্ডত উচ্ছ্বাসে যখন বেরিয়ে এসে খানিকটা চুর্ণ প্রস্তর
বর্ষণ করে আকাশে মিলিয়ে যায়, তখন বােঝা যায় কত বড়
অশান্ত ও, কী অনির্বাণ অগ্নি ওর বুকে দিবারাত্রি ফণা মেলে
গর্জে উঠছে। তার সাথে কামাখ্যার এই যামল বনানীর
০
১১১
সক
কী সাধনা কঠিন।•••••••••ৰু শিখার আজ কেবলই
মনে পড়ছিল সেই মক্ষি-গুরিত কলাকানন পেরিয়ে “গ”
রেলওয়ের গ্যালারি দেওয়া কারায় বসে ভিসুভিয়াসের গা
বেয়ে ওপরে ওঠা, গন্ধকের গন্ধময় বাতাসে অস্বাচ্ছন্দ্যে নিশ্বাস
নেওয়া, দ লাভার জামা-ছড়ানাে বাতলের প্রলেপ-লাগানাে
অত্রির ওপর দিয়ে কেটারের কাছে রেলিংএ হেলে
ভিসুভিয়াসের বুকের ধকৃথকামি শােনা ;-উৎসাহের মাঝে
কী আত সেদিনে। বিগত যুগের বিয়ােগব্যথায় সে অদ্রির
বুকের ছন্দ নাচে-কত সুন্দরের সমাপ্তি-বেলায়, কত মধুরের
ধ্বংসলীলায় বুকের সে আগুনের স্পন্দ বাজে। রু যেন র’য়ে
র’য়ে অসহ রাগে অনল আঙুলে আপন বক্ষ বিদীর্ণ করে
অগিরক্তে রাঙা হয়ে উঠছে। শিপ্রার মনে হচ্ছিল সেই অমঙ্গলের
রাজা অরণ্যখন বাবর-নাড়ালে এখানেও কোথায় যেন বসে
আছে—উপকথার রাক্ষসীর মত বিষাক্ত রসনা মেলে নির্বাক
অচপল হয়ে। ভিসুভিয়াসে যে উত্তেজনায় উন্মত্ত, উৎক্ষিপ্ত পরি-
স্কুট-এখানে সেই ভয়ঙ্কর এখনও আড়ম্বরে গম্ভীর, আয়ােজনে
ভিসুভিয়াসে সে ক্রোণে পাগল হয়ে অগ্নিনৃত্যে
অনলশিয়ায় আত্মপ্রকাশ করছে, আর এখানে কামাখ্যায় সেই
রুদ্র নির্বিকার যাদুকররূপে তার অনিবাৰ্য মায়াজাল গিরিদেহে
বন-বনান্তরে বিস্তৃত করে একান্ত নিশ্চলতার সবুজ ছদ্মবেশ
প’রে অন্তরালে অপেক্ষা করছে—বনরাজির অন্তস্তল সেই সুদুর
আগ্নেয়গিরির বুকের মতই রহদে আজ আসন্ন হয়ে আছে।
প্রত্যাবর্তন
পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরে অবশেষে তারা উঠল এসে।
সন্দীপ বললে, “যাক, অতিকষ্টে তােমায় টেনে আনা গেছে।
কী সুন্দর নীচেটা দেখাচ্ছে চেয়ে দেখাে। না এলে এমন
দৃশ্যটি ত আর দেখা হত না।” শিপ্রা মৃদু হাসলে শুধু। সন্দীপ
বললে, “এ মন্দিরে ত কাউকে দেখছি না। তুমি এখানে দাড়াও
ত, আমি এগিয়ে একটু ডাক দিয়ে দেখি ; না বলে কয়ে
মন্দিরে ঢুকলে যদি চোর বলে শেষে ?”
শিপ্রা সামনের দিকে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে গড়িয়ে
রইল, আকাশে অরণ্যে যেন সৌন্দর্য্যের তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। নিয়ে
পাহাড়ের পাদমূলে গৌহাটি যাবার পথখানি শুকনাে পাতার
রাশ ঠেলে একে বেঁকে চলে গেছে। পথের পাশে এক এক
স্থানে ভীমমূৰ্ত্তি কিরাতের দল কদাকার শুকরের পাল চরাচ্ছে,
দুর হতে তাদের কর্দম পুত্তলির মত ক্ষুদ্র অথচ বিকট দেখাচ্ছে।
দুরে গৌহাটি সহর সন্ধ্যার স্নিগ্ধ ছায়ার স্বপ্নময়ায় সুন্দর হয়ে
উঠেছে। চারিপাশের কামলতার সাগর-মাঝে গৃহের চিঃ
শিল্পীর তুলির টানের মত এখানে ওখানে লেগে আছে। আর
এক পাশে ব্ৰহ্মপুত্ৰ শেষবার আবেগভরা উচ্ছ্বাসে সূৰ্যান্তে
রাঙা হয়ে নৃত্যতালে চলেছে—দুর হতে তার তরঙ্গচাঞ্চল্য
অস্পষ্ট হয়ে অগভ দেহখানি দেখা যাচ্ছে শুধু।
সন্দীপ তাকিয়ে দেখলে কী মৌন চারিদিক। মন্দিরের
দরজা শিকল দিয়ে বন্ধ, কেউ কোথাও নেই। একবার শির
পানে তাকিয়ে সন্দীপ গাছের অন্তরালে এগিয়ে গেল ; শীতের
৮
সক
দিনে সিক্ত সনাবৃত দেহে শীতল হাওয়া যেমন শিহরণ ছড়িয়ে
দিয়ে যায়, সহসা একটা অতি মৃদু সুর অচঞ্চল অরণ্যের বুকে
তেমনি ঈষৎ শিহরণ তুলে ভেসে এল বহুদূর দূরান্তর হতে,
আয়, আয়, চলে যায়।
সন্দীপ চমকিত চক্ষু মেলে ঝাপসা বনের আকার অন্তরে
তাকালে•••কে ডাকে অমন করে ?••এত নেশা কোথা হতে
এসে পলকে তাকে জড়িয়ে ধরল।•••এ কি সেই চিরন্তন সুর, যে
সুরে উষা দিবসকে ডাক দিয়ে যায়, আয়, আয়, আয়!•••যে
সুরে গ্রহ উপগ্রহকে ডাকে, মহাসাগর তটিনীকে ডাকে, ‘আয়,
আয়, আয়।”•••ওরে, সে কি এতদিন এই ডাকের অপেক্ষাতেই
দুরে মরছিল?••এই ডাকেই তার জীবনতরু ফুল্ল হ’ল? উদাস
আকাশ কি এই সুরে অলস মধ্যাহকে ডাক দিয়ে বলে,
‘নীলাগলানাে সুধা নিবি আয়।•••ওরে, আর কি বন্ধনে থাকা
যায়?•••এই রহস্যময় সুরেই অসীম যে যুগে যুগে মানবকে কবি
করেছে, কী করেছে, সন্ন্যাসীর সাজে বাহির করে নিয়ে
গেছে।...কী তন্দ্রায় এতদিন তার চিত্ত ডুবে ছিল রে ! মিত্যকার
সীমাবন্ধনের মাঝে যে অসীমের ডাক বার বার আঘাত জানিয়ে
গেছে, জাগাে, জাগাে, তবু সন্দীপ ত জাগে নি, শুধু স্বপ্নই
দেখেছে।•••ওরে, এইবার ঐ ডাক শুনে তার পায়ের বেড়ী,
হাতের শিকল ঝমঝম করে খুলল রে। এতদিনে কি তার
আগা জেগেছে, কিন্তু কি তাই সাড়া দিয়ে বলে, বুঝি সময়
১১৪
প্রত্যাবর্তন
সন্দীপের মনে হল, কালের মালা হতে এই আর্থিব
অপূর্ব মুহূর্তটি হঠাৎ যেন খসে পড়ল বিকীর্ণ জ্যোতি মণির মত ।
আবেষ্টন নেই, বন্ধন নেই, যুগযুগান্তরের পুঞ্জিত সৌন্দৰ্য্য শুধু
মহাশূন্যে উল্কাপ্রদীপের মত উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে, এখনি নিতে
যাবে নিঃশেষে হয় । আনন্দলােকের নিশানার এই ত
ইসারা জানায়।•••এবার তবে ঐ অনাস্বাদিত আনন্দের লেলিহান
বহিমাঝে ঝাঁপ দিয়ে পড়া যাক•• সৃষ্টিবিধ্বংসী এক প্রচণ্ড
ঘূর্ণাবর্তের আলােড়নে সন্দীপের সমস্ত অতীত চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে
কোথায় ধ্বসে পড়ল, বর্তমান কোন মহা নিফলতায় ভেসে
গেল,ভবিষ্যতের রঙীন আকাশ বনতিমির প্রলেপে কোথায়
অবলুপ্ত হয়ে গেল। দানবীয় একটা আকর্ষণ শক্তি তাকে
‘প্রবল পরাক্রমে টেনে নিয়ে অরণ্য-মাঝে উদ্দামগতিতে কোথায়
মিলিয়ে গেল,তার চিহ্নের লেশটুকুও অবশিষ্ট রইল না।
আফ্রিকার মাংসভােজী উদ্ভিদের মত জীবন্ত মানবকে গ্রাস করে
বিপুল অরণ্য আবার স্থির শান্ত অনুসময় হয়ে দাড়িয়ে
রইল।
শিপ্রা অনেকক্ষণ আনমনে দাড়িয়ে ছিল, দেরী দেখে তার
চমক ভাল। ফিরে তাকিয়ে সন্দীপকে দেখতে পেলে না।
সে উদ্বেগে অধীর হয়ে দ্রুত মন্দিরের দিকে ছুটে গেল, চারিদিকে
তাকিয়ে দেখল—কোথায় সন্দীপ.••? এই আসর অমঙ্গলের
আভাসেই আকুল এন্তর বুঝি তার বারম্বার চমকে উঠেছিল।
ব্যগ্রব্যাকুল কঠে সে ডেকে উঠল, “ওগাে, কোথায় গেলে,
সপ্তক কোথায় তুমি ?” পর্বতে করে সে ধ্বনির কানাকানি উঠল শুধু—কোথায় তুমি, কোথায় তুমি ? নৃত্যপুলক-গীতিমুখর প্রশস্ত গঙ্গার পারে একখানি শুভ্র দ্বিতল গৃহ। ভাঙনের টানে গঙ্গা ক্রমেই এগিয়ে এসে উদ্যানের সীমাদেশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। তারই তটপ্রান্তে উদ্যান-মাঝে উন্নত ঝাউ আর অস্কুল শুপারী গাছের তলে বেত্রাসন পাতা রয়েছে। পদ্মের পাপড়ির মত পঞ্চমীর ক্ষুদ্র এক টুকরাে চাদ কুষ্টিত চরণে ঝাউগাছের ঝির ঝিরে পাতার কঁক দিয়ে ভীরু নয়নে তাকিয়ে আছে। তার মৃত্ব চুম্বনে নদী তরঙ্গ ঝম করছে,—গৃহখানি ও পুষ্পতরুগুলি তার রূপালি স্নেহে সুন্দর হয়ে উঠেছে। বোসন পরে একজন শুভ্রকেশ বৃদ্ধ হেলে ব'সে হস্তস্থিত সিগারে এক একবার টান দিচ্ছেন। তার পাশে পুরু ঘাসের উপর রঙীন শাড়ীর আঁচল লুটিয়ে বসে এক তন্বী তরুণী সেতারে মৃদু মৃদু ঝঙ্কার দিচ্ছে। বৃদ্ধ তার পানে স্নিগ্ধ নয়নে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু মন তার অজানা কোন্ লােকে উধাও হয়ে গেছে, কে জানে। মাঝপথে সেগর সহসা থেমে গেল। বৃ বললেন, “থামলে যে”। ১১৬
প্রত্যাবর্তন
“তরুণী বললে, “ভুল হয়ে গেল যে দাদু-তুমি কিছু
শুনছ না।”
শুনছি না কিরে? এমন জলজ্যান্ত বসে কাঠের মত
নির্বাক বিস্ময়ে শুনছি, তবু তােমার শােনা হল না ?”
“সেতার শুনে বুঝি তুমি কাঠ হয়ে গেলে দাদু! তুমি
নেহাৎ বেরসিক। কোথায় গদগদ-চিত্তে বলবে, “মৌন ভাঙি
গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর, তা নয়, কাঠ হয়ে গেলে। থাকত যদি
ওমর খৈয়াম।”
“তােমার ওমর খৈয়ামই ত বৃদ্ধরাজ্য হতে সব কবিত্ব লুটে
নিয়ে একচেটে করে রেখেছে। আমার জন্যে বাকী রেখেছে
কিছু ?”
“তা হলে আমার এই বেরসিক দাদুটিকে দেখছি বয়কট
করতে হল।
“তরুণী-রাজ্য হ'তে বুড়ােনা অনেকদিনই ত বয়কট হয়েছে
ভাই! তােমাদের স্তাবকতা করতে খৈয়ামের নবীন এডিসন
অনেক মিলবে।”
খঞ্জনয়নের চঞ্চল কটাক্ষ হেনে তরুণী লঘু হাস্যসহ বললে,
“আহা, তা হলে আমার দাদুর একটি প্রবীণ প্রণয়িনীর
অভিযানে আমাকে এখনই যেতে হয়।
সিগারটায় শেষটান দিয়ে যেন গভীর হতাশ-রে ফেলে
দিয়ে বললেন, “লে আশাও নেই দিদি। সেই রাজপুত্রীর গল্প
জান ত ?-এথম বয়সে বিয়ের জন্য কত রাজপুত্র তাঁর দুয়ারে
১১৭
.
সপ্তক
লুটালে, তিনি হেঁকে বললেন, ‘দেবপুত্র চাই। আর একটু
বয়স হল, রাজপুত্র আর আসে না; মন্ত্রীপুত্র ধন্না দেয়, তখন
রাজকুমারী বলেন, “আচ্ছা, রাজপুত্র হলেও চলবে। শেষে
রাজপুত্রীর কালাে কেশে যখন শার মেঘের ছায়া পড়তে
সুরু হ’লতখন মন্ত্রীপুত্র ত কোন্ ছার, কোটালপুত্রের দল ও
ধা দিয়ে ফিরে গেছে। রাজপুত্রী কিন্তু বলছেন ‘কোটালপুত্র
হলেও চলবে। এমনি করে তার আর বিয়ে করা হ’ল না।
আমাদেরও সেই দশা।-প্রবীণরাও ঘেঁসতে চান না।
এলাহা অত হতাশ হ’য়ােনা দায়!
তার কাশ শুভ্র হাসি হেসে বৃদ্ধ বললেন, “হতাশ হব কিরে,
প্রণয়িনীর গভীর আহ্বান আমি যে এবার স্পষ্ট করে শুনতে
পাচ্ছি; তাই ত আবার বহুকালের ভুলে যাওয়া কথাগুলাে,
তাের উপর দিয়ে ঝালিয়ে নিচ্ছি, বুঝতে পারিস না?”
“আহা দাদু, তাই বল। তােমার পাকাচুল তাই বুঝি
দিন দিন এত এ ধারণ কৰ্ছে? আর তাই বুঝি কাল খবরের
কাগজে চুলের কলপের বিজ্ঞাপনটার ওপর অত করে চোখ
দিচ্ছিলে? ভয় নেই, তােমার বিরহিণী নিশ্চয় কোন মণিহৰ্ম্যে
একাকিনী অশ্রু ঝরাচ্ছেন। তােমার যদি আর ধৈৰ্য্য না থাকে
ত তার সন্ধানে না হয় অভিযান আয়ত্ত কর না ?”
‘অভিমানের দেরী নেইমার। আপাতত তুমি যার জন্যে
নেলীলা হয়ে নাহ তার আগমন হ'লেই, আমি আস্তে
গায়ে ধোকা কি বেঁচে আমার সেই ওপায়ের প্রণয়িনীর
১১
প্রত্যাবর্তন উদ্দেশে মহাযাত্রা করব,-কলপের আর দরকার হবে না, সে দেশে যে খরা নেই। “দাদু- গভীর অনুযােগর ছলছল নেত্রে তরুণী বন্ধে পানে তাকালে। বয় তার দিকে হপ্ত প্রসারিত করে অতি জিয় কোমলম্বরে বললেন, “পরে আয় শুক্লা।” সেতারটাকে তৃণশয্যায় শায়িত করে শুক্লা সরে যেয়ে বৃদ্ধের জানুর ওপর মুখ রেখে পায়ের তলে বসল। তিনি গভীর স্নেহে তার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। বজের অতীত জীবনের লুপ্ত ইতিহাস সুপ্ত অন্তরের মুক্তার পথে আবার যেন প্রকাশ পেল। তার একমাত্র পুত্র সন্দীপের অস্বাভাবিক তিয়ােধানে তিনি হতাশ না হয়ে অদম্য উদ্যমে, একান্ত প্রচেষ্টায় ও অজস্র অর্থব্যয়ে তাকে ফিরে পাবার আশা করলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে সন্দীপের লেশ মাত্ৰ সন্ধানও শােনা না, শােনা কতকলি আষাঢ়ে গল্প। শিপ্রার পানে চেয়ে বৃদ্ধকে শােক সংযত করে সঁছাতে হল, কিন্তু সমীপের তিরােধানের পর থেকে শিকার মুখে কেউ আর হাসি দেখেনি। সে যেন নিশান্তের মিলন- বাসরের ঝরে পড়া ফুলাৰদীপান্বিতা রাত্রিশেষের ক্ষীণ- জ্যোতিঃ প্রদীপের মত। বন জানতেন সংসারের কোন বাধাই তাকে আর ধরে রাখতে পারবে না, তাও নয়। তাই একদিন সূৰ্য্যাত-অঙন আকাশের তলে শিলার চিতা- িযখন রে ধীরে নিতে গেল, বৃদ্ধ গভীর শােকের মাঝেও একটা পরিমাণের ১১
সপ্তক
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ভাবলেন, হতভাগিনী জুড়িয়ে গেল! তারপর
অষ্টাদশব কেটে গেছে, শুক্লা বেড়ে উঠেছে তার মায়েরই
প্রতিমূর্তির মত,—উপলচুৰিত ঝর্ণাধারার মত অকু করলহরী ও
বাদল দিনের কাজল মেঘের আঁধারে রচা চোখ দিয়ে বৃদ্ধকে
সান্তনা দেবার জন্য।••••••আজ সকালের ডাকে কে একজন
পুরানাে পরিচিত বন্ধু যেন সংবাদ দিয়েছে সন্দীপকে নাকি
পাওয়া গেছে••••••সে নাকি যেখানে অন্তর্হিত হয়েছিল সেই
খানেই ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। এমন সন্ধান ত কতবারই
এসেছে। কত নিদ্রাহারা রজনী, কত কৰ্ম্মভােলা দিন যে এমনি
আশায় কেটেছে। বাতাসের নিশ্বাসে বাইরে ছুটে আসা, চ্যুত
পত্রের পতনে চমকে কেঁপে ওঠা•••তবু সে ত আসেনি। তথাপি
থেকে থেকে বৃদ্ধের মনে হচ্ছিল যদি আবার সন্দীপ সত্য সত্যই
ফিরে আসে? যখন সময় ছিল, যখন এলে ঘরে মঙ্গল-শখ বেজে
উঠত, বুকের রক্ত আনন্দে নাচত, তখন সে ত আসেনি। আজ
সে যদি আসে স্মৃতির শ্মশানে, যেখানে তার জীবনের সম্পদ নেই,
কামনার ধন নেই, শুধু নদীতীরে একটি স্তম্ভের নীচে একমুঠা
ভ পড়ে আছে।•••ওরে, আজ যে শিপ্রা নেই।•••
লাল কাকরঢালা পথে কার প্রবেশের আভাস সহসা দেখা
দিল। বৃক্ষের ছায়া-আলিঙ্গন হতে মুক্ত হয়ে পথখানি যেখানে
বেঁকেছে, সেখানে এলে পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নায় আগন্তুকের অবয়ব
শষ্ট হয়ে উঠল। বা চকিত নয়নে তার দিকে তাকালেন,
ওই গর্বিত ভলীয় পদক্ষেপ, ওযে তার রক্তের সাথে চেনা।
১২০
প্রত্যাবর্তন
সন্দীপ সােজা এসে বৃদ্ধের সম্মুখে দাড়াল। মৌন বিয়ে
তাকে দেখে বললে, ‘তুমি!•••এত বুড়াে হয়ে গেছ।
বৃদ্ধ ভীতি বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে দেখলেন অষ্টাদশ বর্ষের
জরাভার তার পুত্রের কেশাগ্রটুকুও স্পর্শ করেনি। কোন
রুদ্ধজরা ঘুমপুরীর দেশ হতে ফিরে এল এ! বহুদিবসের নিরুদ্ধ
অশ্রুজল আজ বৃদ্ধের আর বাধা মানল না ; দুই হাতে বুক চেপে
ধরে তিনি ভয়কণ্ঠে ডাকলেন, “সন্দীপ, সন্দীপ... তারপর
মূৰ্ছিতের মত মাটিতে বসে পড়লেন।
সহসা শুক্লাকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সন্দীপ এগিয়ে
যেয়ে গাঢ় স্নেহে তার হাত ধরে ডাকলে—“শি।...কিন্তু এ ত
শিপ্রা নয়, অথচ তারই মত! সন্দীপের মনে হল, এ কী
প্রহেলিকা-মাঝে ভগবান তাকে ফেলেছেন! শিপ্রা যে ছিল
আলাে•••এ যেন এখনও আভা; শিপ্রা ছিল বসন্তের মদির
চুম্বনে বৃক্ষার মুক্ত করে সহা-বিকশিত কুসুম মঞ্জরী-আর এ
যেন আজিও বৃক্ষের বক্ষের নিহিত কামনা। সন্দীপ অধীর কণ্ঠে
ডাকলে, শিপ্রা কোথায় গেল?•••এ কে ?”
শুক্লা এতক্ষণ বিপুল বিস্ময়ে, উদ্বেগে, ভয়ে থেকে থেকে কেঁপে
উঠছিল; বৃদ্ধের কাছে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল, ভয়ে ভয়ে
জিজ্ঞাসা করলে, দাদু, দাদু, এ সব কি।”
বৃদ্ধ আস্তে আস্তে উঠলেন, আস্তে আস্তে বিমূঢ়তার পাশ
হ'তে মনটাকে সবলে মুক্ত করলেন, তারপর গম্ভীর ঘরে
বললেন, “সন্দীপ, আজ হতে আঠারাে বছর আগে তুমি এলে
১২১
ভিতর হারিয়ে গেলে।•••এ ৩া, তখন ছিল শিশু, না বড়
হয়েছে। শিপ্রা-নেই।...”
সহ অঃস্থিত খি-লাবর্তের ভয়াবহ আসােড়নে আগ্নেয়-
গিরিয় মূল হতে গলিত লাভার বাশি যেমন শ্যামল শস্যপূর্ণ
ভূমিকে এক মুহূর্তে ভন্মরাশিতে পর্যবসিত করে, তেমনি একটা
অন্তর্ভেদী ভীষণ আলােড়ন সন্দীপের সতেজ যৌবন-শ্রীকে মুহূর্ত
মধ্যে বিলুপ্ত করে অষ্টাদশ বর্ষের নিরুদ্ধ করার প্রস্রবণ যেন তার
সকল অঙ্গে ছাপিয়ে দিলে।
সেই বিপুল ভারে তার উন্নত দেহ নুয়ে পড়ল, তার মুখ হতে
রক্তের শেষ চিহ্ন মুছে গিয়ে মৃত্যু মলিন পাণ্ডুরতা ধারণ করল,
পুঞ্জিত ক্ষোভে দুঃসহ নিকলতার অগ্নিদাহে তার সকল দেহ
যেন বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। অদৃষ্টের নির্মম বিধানের ওপর,
তার চিত্ত বিদ্রোহী হল, তার অস্থি পঞ্জর চূর্ণ করে বিপুল
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার অন্তিম বাণী,-“এ কথা-
মিথ্যা•••মিথ্যা...”। পশ্চিম আকাশে হেলে পঞ্চমীর পার চাদ
তার দীর্ঘপ্রসারিত শুত্র কর শিপ্রার সমাধির পরে নির্দেশ
করে তখন সন্দীপের অন্তিম অবিশ্বাসের মৌন প্রতিবাদ
জামিল।
••••••তারপর বহুদিন গেছে। আজিও সেই গঙ্গার কোলে
নিভৃত উমের মাঝে দমকা হওয়ায় কেঁপে কেঁপে পমীর
খাত্রে নেই আল কাউ পড় মারলে এক একবার গভীর
শনিস ফেলে যায়।
নীলাল
অবিনাশ তাদের দলের নাম রেখেছিল লক্ষ্মীছার জল।
মানুষের বেলা যা সচরাচর হয়ে থাকে, দেবতাদের বেলা বােধ
হয় তার অন্যথা হবার জো নেই, তাই লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুই
সপত্নীর মনােমালিন্য যাবার নয়। ওরা হল বাথর ভক্ত,
সপত্নীকাসেবী,কমলা তার কমল-আনন ফিরিয়ে নিয়েছেন
ওদের দিক থেকে। কিন্তু তাই বলে ওরা দমে যাবার পাত্র
মােটই নয়; বরং এ নিয়ে একটু গৌরব অনুভব করে।
শরীরটা অনশনে যে পরিমাণ লঘু হয়ে যায়, মনটাকেও ওরা
সেই পরিমাণে হাল্কা করে ফেলে। ওরা বলে আকাশে ওড়ার
পক্ষে সােনার পাখার চেয়ে অ্যালুমিনিয়ামের পাখার সাহায্যটা
হল বেশী। যাকে আমরা পাঁচনে জানি জীবন যাত্রার সরঞ্জাম
ব’তে, ওরা তাকে বলে ভার। এ ভার করে কমে ওদের
টুথব্রাশে এসে ঠেকেছে। এখন সেটাকে পকেটে পুরে ওরা
বলে বাসা বদল করে বেড়ায়। কারণ, হাল্কা জিনিষের তেলে
বেড়ানই নিয়ম; কোন জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকা এদের
কুষ্টিতে লেখে নি। অবিনাশ হল । মলের পাও, মন্ত
সাহিত্যিক। তার সংস্কারমুক্ত স্বাধীন চিন্তায় আওয়া
সপ্তক
কখনাে-কখনাে মনের আকার ধারণ করে অনেকগুলাে
সনাতন খোয়াড় উড়িয়ে নে যাবার প্রয়াস পেয়েছে। তাতে
করে খেয়াড়ওলাদের গালাগালি বর্ণিত হয়েছে ওর ওপর যাকে
বলে কবির ভাষায় ঠিক্ শ্রবণের ধারার মত। বিষয়ী হবার
মত এতটুকু বুদ্ধিও ভগবান ওকে দেন নি, বরং বিষয়কে যা নষ্ট
করে দিয়েছেন সেই প্রলয়ঙ্করী বুজি। সেটি প্রমাণ হবে ওর
জীবনের এক সামান্য ঘটনা থেকে। অবিনাশ যখন প্রথম
শ্রেণীতে এম-এ পাশ করল, তার বাপ তাকে ধরে নিয়ে গেলেন
এক মার্চেন্ট অফিসে। পুরানাে দিনের মনিবদের সুপারিশে
ছেলের জন্যে একটা চাকরী সেখানে প্রায় ঠিক হয়েই ছিল।
অফিলে অবিনাশ, ম্যানেজার সাহেব ও তস্য বড়বাবুতে মিলে যে
দৃশ্য-কাব্যটি রচিত হল, আমার এক নাট্যকার বন্ধুকে দিয়ে
অনেক সাধ্য সাধনার পর সেটা এমনি ভাবে ড্রামাটাইজ করে
নিয়েছি।
বড়বাবু। বিনাইন সার তােমাকে এগজামিন করতে চান।
অবিনাশ। হে মা ধরণি, তুমি দ্বিধা হও।
ম্যানেজার সাহেব। Read this (এই বলে তার নিজের
হাতের গ্রাফট করা একটা চিঠি অবিনাশকে পড়তে দিলেন।
অবিনাশ সেটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে গভীর ভাবে
লাহেবকে ফিরিয়ে দিল।
বাড়বাবু। কই, পড়লে না?
অবিনাশ। এমন কিছু মহাকাত তােমার বিলাই মার
১২৪
ননীলাল
লেখেন নি যে জগৎসংসারকে তা উচ্চৈঃস্বরে ঘােষণা করতে
তা ছাড়া ঐ দশ লাইন লেখার মধ্যে তিনটে বানান
হবে।
বড়বাবু। বড় বড় সাহেব বােদের লেখায় ও রকম বানান
ভুল হয়েই থাকে।
(ম্যানেজার সাহেব জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বড়বাবুর দিকে
তাকালেন। বড়বাবু
তাকে ব্যাপারটা যতই বােঝতে
লাগলেন, ততই তার মুখ চোখ লাল হ’তে লালতর হতে
থাকল)।
বড়বাবু। তােমার ওপর বিনাইন সার বড় চটেছেন।
অবিনাশ। মুখ মাত্রেরই ঐ আর এক গুণ।
বড়বাবু। এ রকম করলে তােমার চাকরি কি করে হবে
বাপু?
অবিনাশ। তা কি করতে হবে ?
বড়বাবু। (আবার সাহেবের সঙ্গে খানিক পরামর্শ করে )
বিনাইন সার বলছেন তুমি যদি তার কাছে মাপ চাও তা হলে
তিনি দয়া করলেও করতে পারেন।
অবিনাশ। (তার হাতের চেটোটি সাপের ফণার মত করে
বাকিয়ে) তােমার বিনাই সারকে বক দেখাও।
ম্যানেজার সাহেব। (চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে।
What's that! (স্তম্ভিত বড়বাবু যতক্ষণে সাহেবকে ওর মানে
বােঝাবার ব্যর্থ প্রয়াস করেছেন,-ব্যর্থ প্রয়ার কারণ, ও
জিনিষটার ইংরেজি তরজমা হয় না,—ততক্ষণে বিনাশের
সবেগে প্রস্থান)।
সেই হ’তে অবিনাশ হল তার বাপের ত্যজপুর।
কিন্তু বড়াই করে বলে বেড়ায় ওর বাপ ওকে জবরান্তি করে
কেরাণী করতে গিয়েছিল বলে সেই রাগে ও বাপকে ত্যজ্য-পিতা
করে দিয়েছে।
অবিনাশ পর্ব শেষ করে এবার নিবারণের কথা বলা চলতে
পারে। সে হল ওদের আর এক পাণ্ডা, আজকাল লিখছে
গদ্য-কবিতা। দেখতে কবিতার মত কিন্তু ঠিক কবিতা নয়,
মিল নেই। আমরা পাঁচজনে যাকে বলি ছন্দ, তাও নেই। ও
বলে গদ্য-কবিতার একটা নিজস্ব ছন্দ আছে, শােনবার মত কান
যাদের তাদের কানেই বাজে। ওর মতে মিল জিনিষটা আদিম
সভ্যতার ক্রমবিকাশের অভিযানে প্রথম কৃত্রিমতার ধ্বজা,
যেমন বস্তু। বন্ত্রের মধ্যে মানবের প্রম পাপ ও প্রথম লজ্জার
কাহিনী টানাপােড়েনে বােনা আছে, তেমনি মিলের মধ্যেও।
কবিতা হল রূপ, মিল হল তাকে আকর্ষণ করবার তন্ত্র, অর্থাৎ
প্রসাধন। খাঁটি সোেণার একটা নিজৰ সৌন্দৰ্য আছে, তার
ওপর এনামেল করলে তার আ যায়। শকুন্তলার মৃণাল
বাহুতে শীলা-কমলই সাতে, কনককঙ্কণ সাজে না। ক্রিটিকের
দলকি রেগে বলে ওটা হল কবিয়ানার বার্ধক্যের চোর
যেমন ওরংজীবের জিজিয়া কর। জের পক্ষে হয়ত মানীয়
কিন্তু তরুণের পক্ষে নয়। রক্তের তেজ কমে এলে এপৃষ্ঠের
ননীলাল চেয়ে নরম গদি হয় লােভনীয়। তারই সঙ্গে তাল রে েকাব্য- রচনার ব্যাপারে গদ্য-কবিতাই কাব্য হয়ে পড়ে, কারণ তাতে মিল-ছন্দের ঝঞ্চাট যায় বেঁচে। সেই কারণে নিবারণের জিটিকের দল ওটার নতুন একটা নামকরণ করেছে—“পদ্য-গদিত। নিবারণের মেশাে জীবনে কখনাে কাব্য-চর্চা করেন নি, কারণ তার ছিল মােটা মােটা টাকার সুদ-বন্ধকী কারবার। মেশাের ছেলে পুলে নেই। নিবারণকে বললেন, এস আমার কারবারে। নিবারণ তার জবাবে মেশােকে এক চার পৃষ্ঠার গদ্য-কবিতা লিখে পাঠাল, তাতে অনেক রকম উচ্ছাসের মাঝে মেশাের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রতি একটু সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। পড়ে মেশাে নিবারণকে এমন একটা দারুণ অভিশাপ দিয়ে বসলেন যা ভাগ্যিস ফলে নি তাই, নইলে নিবারণকে আজ স্বর্গে বা মর্ত্যে কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। এমনি আর এক পাণ্ডা হল ধনঞ্জয়। সে হচ্ছে ঔপন্যাসিক। তার কথা যথাস্থানেই বলা যাবে, তাকে নিয়েই ত গল্প। আরও কত যে আছে এই বলে, কেউ নাট্যকার, কেউ বা ভার, কেউ বা চিত্রকর, কত নাম করব। সেদিন ভারি দুৰ্যোগ, কলকাতার রাস্তায় জলের স্রোত চলেছে। গভীর বর্ষায় বৈষ্ণব কবিদের নায়িকার মনে পড়ে সােদিনকি বাত। বৈষ্ণব নায়িকার সঙ্গে কলকাতার এক বিষয়ের সাদৃশ্য দেখা যায়-বর্ষার দিনে কলকাতা নগরী সে দিনকা’ সুতানুটি হয়ে যায়। থেমে যায় তার মােটর ১২৭
ট্রামের ঘর, তার বিরামহীন কর্মস্রোতের কোলাহল; কোন
অ যাদুকরের মায়ামন্ত্রে নিমেষে ফিরে আসে তার অতীত
দিনের পায়ে পায়ে হাঁটা, তার জল-থৈ-থৈ সুর।
অবিনাশ তার নীল খাতাটাতে এই কথাটা বােট করছে
এমন সময় সিড়ি বেয়ে এসে দাঁড়াল নরেন, সে হল চিত্রকর,
তার ‘বর্ষার কলকাতা’ ছবিটার উপাদান সংগ্রহ হয়েছিল এই
অপরাহের অভিযানে। খানিক কথাবার্তার পর নরেন বলল,
ধনঞ্জয়টা একটা হেঁয়ালি হয়ে দাঁড়াল শেষে।
অবিনাশের কাণে কথাটা বেসুরাে বাজল। বলল,-“তুমি
ছবি আঁক, কথা ত গাঁথ না বন্ধু, তাই কোন কথায় কি প্রয়ােগ
তা জান না। ধনঞ্জয় একটু রােগা হয়ে গেছে বলতে পার, তাই
বলে সে কি হেঁয়ালি হল?
‘তা জানি না বন্ধু কথার অত শত মা প্যাচ। সেদিন তার
সঙ্গে দেখা, বলে ভাই কিছু ধার দিতে পার, দুদিন থেকে
অনাহার। জান ত ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্কে চেক্ কাটবার অবস্থা
আমার নয়, তবে সেদিনথােসামুদি করে পাঁচসিকায় আমার একটা
ছবি বিক্রী করেছিলাম, তারই চার আনা দিলাম ধনঞ্জয়কে।
অবিনাশ বলল, সাধু, বন্ধু, সাধু।
‘ধনঞ্জয়টা কি করলে জান? আমি একটু আড়াল হতেই
দেখি সেই পর আনার সব্যবহার করে টিকিট কিনে এমার
সিনেমাতে ঢুকে পড়ল। উপােস করে শুকিয়ে মরছে, তবু তার
সিনেমা দেখা চাই, এ রকম মারাত্মক নেশা দেখেছ কি ?
১২৮
बनीमान
অবিনাশ বলল, “বটে, এ তদন্তর মত ভয়ের কথা দেখছি।
হাঁ, হাঁ, এখন মনে পড়ছে বটে ধনঞ্জয়টাকে দুচারদিন আগে
আমিও ঐ এয়ারল্ড, সিনেমার ঘােরে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি।
নরেন বলল, ‘পরে জানলুম আমিই তার একমাত্র মহান
নয়। যার তার কাছ থেকে হাে হাে ক'রে যা তা ধার করছে
আর সিনেমা দেখে ওড়াচ্ছে। ওর মাথা খারাপ হয়েছে নিশ্চয়।
অবিনাশ বলল, ‘ভেব না বন্ধু, আমি শীঘ্রই এর বিহিত
অবিনাশের মুখে নিবারণ সব শুনে বলল, ‘চল একবার
দেখি ব্যাপারটা কি। মনে হচ্ছে সিনেমার অশরীরী ছায়ামূর্তি
ওর স্কন্ধে ভর করেছে। আমাদের উচিত একটু ওঝাগিরি করা।
দুই বন্ধুতে মিলে ধনঞ্জয়ের বাসায় গিয়ে হাজির হল।
পাঁচতলার বাড়ীর সব উপর তলায় একটি ছােট্ট পায়রার খােপের
মত ঘর, বিমানহৰ্ম্মের কোন লক্ষণই তাতে নেই, অভ্রের লােখর
বদলে কাঠের পার্টিশন করা। সতরঞ্চিটাতে হাজার কালির
ছাপ, তারই ওপর রাশি রাশি কাগজপত্তর বিছিয়ে শীর্ণ নয়
উদাস হয়ে বসে আছে। তার পায়ের তলায় একগাদা কিসের
পাণ্ডুলিপি চেপে চটকে গেছে।
অবিনাশ বলল, এই দুর্যোগে বিরহের আইডিয়াটা বােধ
করি ঘনিয়ে উঠেছিল ভাল। তােমার চিন্তাধারার প্লাবনে
ব্যাঘাত আলাম বন্ধু।
ধনঞ্জয় বলল, 'না, না, এস এল। সত্যি কথা বলতে কি
১২৯
ভাই, তােমরা এলে তাই বলে, তােমাদের কাছে আর লজ্জা
কি, চার পাঁচ দিন একরকম অনাহারেই কাটছে। বিরহের
চেয়ে আরাে একটা বড় উপসর্গ যে আছে তা আর অন্ত্রে অন্ত্রে
অনুভব করছি। এই বলে ও একেবারে সরাসরি হাত পাতল,
‘তা তােমরা যদি কিছু ধার দিতে।
নিবারণ ও অবিনাশ পরম্পর অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল।
নিবারণ বলল, ‘মহা মুস্কিলের কথা বন্ধু, আমার হাতে এখন
সিকি পয়সাও নেই। অবিনাশকে জিগেস কর। কেমন
অবিনাশ ?
অবিনাশ বলল, খাঁটি সত্যি কথা। আমারও ঐ অবস্থা,
কেমন নিবারণ ?
নিবারণ বলল ‘খাটিতর সত্যি। তবে দমে যেও না বন্ধু,
চল আমার বাসায়। ভােজ্য যা আছে, ভগ্ননিদ্র, কুম্ভকর্ণের
পক্ষে তা পর্যাপ্ত না হলেও, আশা করি ভােমার পক্ষে যথেষ্ট
হবে।
ধনঞ্জয় বলল, না ভাই, তার চেয়ে যদি অন্ততঃ চার আনাও
খার জিতে, খুব সুবিধে হত।
অবিনাশ গম্ভীর হয়ে বলল, 'কিছু মনে ক ব এর মধ্যে
তােমার যে সূক্ষ্ম জালাকিটুকু আছে তা আর গােপন থাকছে না।
উপবাসীর কাছে খাদ্যং খনং ন চ বর্ণ ধনং। তােমার বেলায়
তা হল উল্টা, মানে তােমার একটু কু-মৎসব আছে।
ধনঞ্জয় থতমত খেয়ে বলল, “
কুৎলব? কই না! তােমাদের
ननीनान
বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি উপবাসী। দেখ দিকি আমার এই
হাত,একেবারে বাখারির মত সরু হয়ে গেছে।'—এই বলে
তার শীর্ণ হাতখানা বার করে দেখান।
নিবারণ ধমক দিয়ে বলল, ‘অমন করে আসল কথা পা
দিও না। যা জিগগেস করছি তার জবাব দাও।
অবিনাশ বলল, তুমি কথা গােপন করছ। আমরা তােমার
বন্ধু; অভয় দিচ্ছি, সমস্ত খুলে বল, তােমার বিরুদ্ধে চার্জ হচ্ছে
ধার করে সিনেমা দেখে বেড়াচ্ছ। দোষী না নির্দোষ ?
ধনঞ্জয় হতাশ হয়ে বলল, সবই যখন আনতে পেরে তখন
আর জিগগেস করে বৃথা কষ্ট পাচ্ছ কেন? তােমাদের এই
উকিলি কােৱা নামি গােড়া থেকেই অপছন্দ করছি।
অবিনাশ বলল, অর্থাৎ দোষী। কত বন্ধুকে এতারণা
করে, তােমার লজ্জা হয় না ?
ধনঞ্জয় রেগে বলল, ‘প্রতারণা কি রকম! কোন কথাটা
আমার মিথ্যে হল শুনি? উপবাসী আছি সেটা কি মিথ্যে?
উপবাসী বলে ধার করি, সিনেমা দেখব বলে খরচ করি। সে
আমার খুশী। আমি যদি না খাই, তােমাদের তাতে কি?
অবিনাশ বলল, আমাদের আর কি, তাের নিয়েই
কতি। তােমার ভালর আগেই বলছি, কি বল নিবারণ ?
নিবারণ বলল, “বি,ি অবিশ্যি। ধনঞ্জয়, তােমাকে ধমকাতে
আসিনি।
অবিনাশ বলল, ‘আয় তমাকে মে দিয়ে বাঁচাতে চাই।
তােমার প্রতি আমাদের যে কী গভীর সেই তা তুমি জান না, কি বল নিবারণ ? নিবারণ বলল, “মেই বলে নেই, রেখেছ বাঙালী করি, মানুষ করনি,—সেই স্নেহ।” অবিনাশ বলল, “সিনেমা-স্টার হবার মৎলব বুঝি ? তােমার অবগতির জন্যে বলা দরকার তােমার চেহারা ভ্যালে- টিনাের চেয়ে সেই যে ‘বিবাহে চলিলা বিলােচন এর ছবি আছে তাকেই বেশী মনে করিয়ে দেয়।” ধনঞ্জয় এবার দস্তুরমত চটে বলল, চেহারার এত বর্ণনা তােমাকে কে করতে বলছে। নিবারণ বলল, “তবে তােমার কল্পনার পুজি ফুরিয়েছে বুঝি, তাই সিনেমায় উপন্যাসের সস্তা প্লট খুজতে যাও।” ধনঞ্জয় অভিমানের সুরে বলল, আমার প্রতিভাকে এমনি করে অপমান করতে তােমাদের বাধল না। অবিনাশ বলল, “তবে সিনেমায়-সিনেমায় ঘুরে বেড়াও কিসের এতে ? ধনঞ্জয় বলল, “সিনেমায় সিনেমায় ঘুরে বেড়াই কে বলল? কেবল একটি ফিলম দেখি,-নন্দরাণী। অবিনাশ চোখ কপালে তুলে বলল, “এও শুনতে হল! হে কর্ণ দুমি বধির হও! ধনঞ্জয়, তােমার অত্যাধুনিক রুচির শেষে এই পরিণাম! সেই নন্দৰাণী, চিত্রজগতে বটতল- নিবারণ বলল-অর্থাৎ বটতলা- ১৩২
ননীলাল
অবিনাশ ব’কে চলল, “তুমি তাই দেখতে হােট! তুমি
পাগল হলে নাকি।
নিবারণ বলল, “পড়ছিলাম বটে নন্দরাণীর সমালােচনা।
দুটো দৈত্য, কি বলে যে তাদের নাম,-একটার আবার মাথায়
শিঙ, গজিয়েছে,তারা এল পুতনা রাক্ষসীর সঙ্গে। কৃষ্ণের
মায়ায় দৈত্য দুটো গেল ঝপাৎ করে জলে পড়ে। সেখানে
তারা কী কসরৎই দেখাল। একহাতে সাঁতার কাটছে আর
এক হাতে ঢাল ঘােরাচ্ছে-
অবিনাশ বলল, না ঘুরিয়ে উপায় নেই, কারণ ঢালটা হল
কাগজের, জলে ভিজে যাবে যে।
নিবারণ বলল, “সহসা আলােকের অক্ষরে ফুটে উঠল
দৃশ্যপটের ওপর কবির জাজ্বল্যময়ী ভাষা—তার পর গেছে কেটে
কত শত যুগ।”
অবিনাশ বলল, “না, না, ম্লান হয়ে গেছে কত উৎসুক
উন্মুখ ভালবাসা।”
নিবারণ বলতে লাগল, “দৃশ্যপটের ওপর আবার কত যুদ্ধ
কত মৃত্যু, কত পতন-অভ্যুদয়-বরপন্থা হল উদঘাটিত, তারপর
চট করে ফুটে উঠল সেই ছবি, সেই যে দুটো দৈত্য সাঁতার
কাটছিল তারা অনন্ত কাল ধরে সাতারই কাটছে
অবিনাশ বলল, এবং এতাবৎ কাল তারা অবিরাম ঢাল
ঘুরিয়েই যাচ্ছে। খানিক থেমে বলল, ‘তা যাক, কিন্তু নয়,
বিশ্বাস হয় না, তুমি কি ঠাট্টা করছ। সত্যি করে বল চিকি—
সপ্তক
ধনঞ্জয় বলল, “সত্যিই বলছি। আমি একেবারে অধঃপাতে
গিয়েছি। ঐ নন্দরাণী আমি বােধ হয় পঁচিশবার দেখেছি,
এখনও আশা মেটেনি। আমি যে কী কষ্টে আছি, কী ব্যথা যে
এই বুকে বা,ে কী অস্থির যে হই, তা তােমরা ত যােঝ না
কেউ, কেবল ঠাট্টা কর।
নিবারণ গভীর সমবেদনার স্বরে বলল, খুব বুঝি বন্ধু, খুব
বুঝি। তােমার কোনাে ভয় নেই আমরা প্রাণপণে তােমার
চিকিৎসা করব। ঐ যে ব্যথাটার কথা বললে ওটা কখন টের
পাওরাত্রে না দিনে, খাবার পর না খাবার আগে ? মাঝে
মাঝে একটু স্মৃতিবিভ্রম হয়, না?
অবিনাশ বলল, “আর ঐ সঙ্গে হজমের গােলমাল একটু
ধনঞ্জয় বলে উঠল, ও সব বন্ধুরে কথা রেখে দাও। শরীর
আমার ভালই আছে। আমার কাছে আর তােমানের ঘােড়ার
ডাক্তারি করতে হবে না।
অবিনাশ বলল, 'আহা চট কেন? যে লােক পঁচিশবার
নার দেখেছে তার মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া ছাড়া যে আর
গতর সেই বন্ধু।
ধনঞ্জয় চটে বলল, আমি নন্দরাণী দেখতে যাই, কে বলল?
অবিনাশ বলল, “নাও, এবার জিবিভ্রম আরও ল।
হিসে বলল, “আরে না, না। মানে নয়া
ফিলল আমাকে আকর্ষণ করে না।
১৩৪
নলীলাল
অবিনাশ জিগগেস করল, “তবে কে আকর্ষণ করে?
গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধনঞ্জয় বলল, “ওরই ভেতর এক মেয়ে,
সে যশােদার অভিনয় করেছে।
অবিনাশ বলল, “বল কি হে, তাকে দেখতে তুমি যাও ?
ধনঞ্জয় বলল, “হাঁ, তাকে দেখতেই ত যাই। আমি তন্ময়
হয়ে কেবল তাকেই দেখি। কেন জান? সে আমার হতে
পারত, হল না, চলে গেল। শুধু সে রেখে গেছে চরণ রেখা
গাে। তাই দেখতেই যাই।
অবিনাশ চোখ কপালে তুলে ধীরে ধীরে বলল, হে মাের
দুর্ভাগা দেশ! এ যে প্রেম।
নিবারণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “তাই বল সােনা, তাই বল।
শুনে দেহে প্রাণ এল। তার সঙ্গে তােমার মে হয়েছিল ?
তাই তার ছবি দেখতে সিনেমায় যাও? আমি ভেবেছিলাম
তুমি বুঝি উন্মাদ হয়ে গেছ। তা এতে ত পাগলামির কিছু নেই।
বা গেল।
অবিনাশ বলল, তা তােমার প্রিয়া কি এখন পরলােকে ?
ধনঞ্জয় বলল, “এায় তাই, মানে গােবরডাঙায়
অবিনাশ বলল, “বেচে আছেন। তা সেই তজী তরুণীর
নামটি কি?
ধনঞ্জয় এল উয়াল চেপে ধীরে বলল, “তার নাম আয়
নাম নীলাল। জন, সে যখন হালে তখন কল-বনে কমল
ফোটে ?
০
সপ্তক
অবিনাশ বলল, ‘তা ফুটুক। কমল-বনে যত খুসী কমল
ফুটুক আপত্তি নেই। কিন্তু ননীলাল! সে কি হে! নামটি ত
ঠিক্ কমল ফোটার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখছে না। একটু যেন কেমন
পৌরুষ ভাব রয়েছে মানতেই হবে।
নিবারণ বলল, “তুমি যা বােঝ না অবিনাশ তাতে কথা
কয় না। ননীর মত কোমল আর কমলের মত লাল ইতি
শ্ৰীমতী ননীলাল। কি বল ধনঞ্জয়, এতে পৌরুষের কি আছে ?
ধনঞ্জয় সলজে বলল, “না, না, তার নাম ননী। আমি তাকে
ইয়ে, মানে আদর করে ননীলাল বলে ডাকতাম।
অবিনাশ বলল, ‘আদর করে তাকে ননীলাল বলে ডাকতে ?
বেশ করতে।
নিবারণ বলল, এখন ব্যাপারটা সমস্ত খুলে বল দিকি।
ধনঞ্জয় বল, সে ত এক লা ইতিহাস।
অবিনাশ বলল, “তা হােক, তা হােক, আমরা সবটা শুনব।
ধনঞ্জয় বলতে শুরু করল, আমি তখন নেবুতলার মেসে
থাকি। তিন মাসের ভাড়া বাকি ছিল বলে এক রাতে ম্যানেজার
বেটা আমায় বার করে দিল।
অবিনাশ বলল, ‘ম্যানেজার মাত্রেরই ঐ এক দোষ।
বনায় বলতে লাগল, রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে দেখি হেদোর
বারে এসে পড়েছি। একটা বেঞ্চে শুয়ে পড়লাম, ভাবলাম
রাতটা ওখানেই কাটান যাবে। ”
নিবারণ বলল, 'আর ছাড়াও লাগবে না।
SON
ननोमान
ধনঞ্জয় বলে চলল, “কিছুক্ষণ যায়, এমন সময় দেখি পাশের
বেঞ্চের কাছে একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল। আমায় দেকে ভয়
পেয়ে চলে যাবার যােগাড় করছে দেখে আমি বললাম, ‘খাবেন
, ভয় নেই। যার উপন্যাস বাংলার সকল মালিক পত্রের
প্রত্যাখ্যান-গগৗরবে মণ্ডিত আমি সেই সুবিখ্যাত ঔপন্যাসিক
ধনঞ্জয় চাটুৰ্যে। শুনে মেয়েটি হাসল।”
অবিনাশ বলল, “আর তখন কমল-বনে কি হল?
ধনঞ্জয় গ্রাহ না করে বলে চলল, ‘আমি বললাম আমার
পরিচয় ত পেলেন, এখন আপনার পরিচয়টা? মেয়েটি বলল,
তার নাম ননী, সে সম্প্রতি কলকাতায় এসেছে, কোন বাড়ীতে
গভর্ণেসের কাজ করে। সে দিন তার ছুটি মিলেছিল একটু
দেরিতে। তার বাসা হল আমবাজারের ওদিকে, কিন্তু অত
রাত্রে বে, একলা যেতে সাহস করেনা, তাই সকাল
হওয়া পর্যন্ত এই বেঞ্চে বসে কাটাবে ঠিক করেছে।
আমি বললাম মাভৈঃ, আমি আপনাকে পৌছে
দিয়ে আসছি চলুন, কিন্তু মেয়েটি বলল, না থাক, এইখানেই
বসি।
অবিনাশ বলল, “তােমার সরু ডিগডিগে চেহারায় তােমাকে
হারকিউলিস বলে ভুল করার সম্ভাবনা ছিল না, তাই মেয়েটির
সাহস হয়নি।
নিবারণ বলল, এ থেকে বােঝা যাচ্ছে মেয়ের বেশ বুদ্ধি
শুদ্ধি আছে।
H
এনে
১৩৭
ধনঞ্জয় বলতে লাগল, খানিকক্ষণ তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে
জানলাম সে আমারই মত বী।
অবিনাশ জিগগেস করল, মানে, তার লেখা উপন্যাসও
বাংলার সব মাসিকে প্রত্যাখ্যান করেছে না কি ?
ধনঞ্জয় বলল, “মা, না, মানে শৈশবে তার বাপ মরেছে,
সৎমায়ের কাছে মানুষ। তারই গঞ্জনায় বাড়ী ছেড়ে এসেছে
কলকাতায়, অন্নের সংস্থান করতে চাকরি নিয়েছে; কী তেজ।
নিবারণ বলল, “এই তেজ তাই হল লাল। অথচ রাত্রে
তয়ে একলা চলে না, তাই হল ননী। পুরাে নামটি তাই
ননীলাল। বলে যাও।
ধনঞ্জয় বলতে লাগল, “সকাল হলে মেয়েটিকে তার বাসায়
পৌছে দিলাম। বিদায়ের কালে সে আমার দিকে চেয়ে হাসল ।
যেন শরতের সােনালি বােদ ভরাহীর ওপর টলটলিয়ে পড়ল।
চলে আসতে আমার পা ওঠে না, কি ছিল মেয়েটির চোখে।
যাই হােক মেয়েটির কল্যাণে আমার সেদিন কিছু নােগার হল।
এক পলিশার আমার একটা উপন্যাস ছাপাকেপাবে করছিল।
সেদিন তাকে না-ছােড়বান্দা করে ধরলাম, সুইসাইডের ৩য়
পর্যন্ত দেখালাম, তাতে সে একশাে টাকা দিয়ে পাণ্ডুলিপিখানা
কিনল। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে দিল। বাকি পঞ্চাশ টাকা বিশি
আজ অবধি দেয় নি। ভঁড়ার্ভাড়ি করছে। আমি তখনি গিয়ে
মেয়েটিকে বললাম আপনার কল্যাণে আর আমার কি লাভ
হয়ে গেছে। ও গর্ভনেলি চাকরিটা কিন্তু নয়। আসুন আপনার
ননীলাল উপযুক্ত একটা চাকরির সন্ধান করিগে। তাকে ধরে নিয়ে গেলাম ঐ এমার, কোম্পানীর ম্যানেজারের কাছে। যেটা আকান্টিম্যান, সহজে কি আমল দেয় হে, কেবল বলে বেশ। ভেট প্রভৃতিতে আমার পঞ্চাশটি টাকাই খরচ হয়ে গেল, তখন মেয়েটিকে একটা ভূমিকা দিলে নন্দরাণী ফিলমে। নীলালের সে কী কৃতজ্ঞতা। আমি কিন্তু এতেও সন্তুষ্ট হতে পারলাম । আমার নীলালের যে রকম প্রতিভা, তার পক্ষে এমার, সিনেমা কিছুই নয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আর এক সিনেমা ম্যানেজার ননীবালকে বেশ মাইনে জিতে রাণী হল। কথা দিল। নন্দরাণী ফিলম তৈরী হয়ে গেলে সে ও চাকরি ছেড়ে দিল। কিন্তু সেই নতুন ম্যানেজারটা আজ নয় কাল নয় করে অনেক ভঁড়াভঁাড়ি করে শেবে পষ্ট জবাব দিয়ে বসল আর নতুন লােক নেবে না।” অবিনাশ বলল, “সে কি, তুমি বেটাকে আইনের ভয় দেখাও নি? ধনঞ্জয় বলল, “দেখালাম ত, তা বেটা ভয় পেল কই! আমি বললাম, আন, তুমি আইন মতে তােমার চুক্তি রাখতে বাধ্য। বেটা বলল, “বেশ ত, বেশ ত, চুক্তি পত্রখানা নিয়ে আমার সনে দেখা কর একদিন, তখন না হয় বিবেচনা করা যাবে।'—ণ- লেখি ত ছিল না কিন্তু কি আর করি বল। বেটা এমন দোচোর তা কি আগে জানি হে। ননীলাল ঝাতে ঝাতে তার সৎমায়ের বাড়ী সেই গােবরডাঙ্গায় ফিরে গেল,-আমিই
সপ্তক
ও
ধরতে গেলে তার কারণ। আমার কথাতেই ত সে চাকরি
ছেড়েছিল। সে যখন চলে গেল, তার কী কান্না, ওঃ—সে দৃশ্য
দেখলে পেটেন্ট ষ্টোও গলে যেত।”
নিবারণ টপ করে তার চোখের জল পাঞ্জাবীর আস্তিনে
মুছে ফেলল।
ধনঞ্জয় সুগভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “নীলাল আমাকে
ঠিক বিয়ে করত। কিন্তু ঐ ম্যানেজারটা কোথা হতে এসে
আমার জীবনটাকে একেবারে মরুভূমি করে দিয়ে গেল।
হাে, হাে, বেটা ‘দাগ দিয়েছে মর্মে আমার গাে, গভীর হৃদয়
ত। এখন ননীলের ছবি দেখে বেড়ান ছাড়া আর আমার
কোন সানা নেই—” এই বলে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল।
অবিনাশ বলল, ‘সব বুঝেছি, আর বলতে হবে না; ধনঞ্জয়
কেঁৰ না, নিবারণ, সােজা হয়ে বস।
নিবারণ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, কান্নার সময়
গিয়েছে।
এখন চাই প্রতিহিংসা। এস বহি, এল বিদ্যুৎ,
কি বল অবিনাশ?
অবিনাশ বলল, আমিও ঐ কথাই বলি। ধনঞ্জয়, তােমার
হৃৎপিণ্ডে গভীর ক্ষত, তুমি বলেছ ঠিক, বেটা ‘দাগ দিয়েছে
মর্গে তােমার গগ। এর প্রতিশােধ নেব তবে আমাদের নাম।
এই নাও আট গণ্ডা পয়সা। কুবািরণের পক্ষে আশা করি
এই যথেষ্ট হবে। ওঠ নিবারণ, এখনি পরামর্শসভা ডাকতে
হবে। সময় নেই।
১৪০
ননীলাল
এই বলে অবিনাশ ও নিবারণ উর্ধগালে পরামর্শ সভা ডাকতে
ছুটে গেল।
ওদের দলের নিয়মই এই, যা করতে হবে তড়িৎ ঘড়িৎই করা
চাই। কাজেই দুঘণ্টার মধ্যে অবিনাশের ঘরে নব্য-সাহিত্যিকদের
মস্ত এক সভা বসে গেল। সবায়ের মত, হল সেই ম্যানেজারের
কাছে লােক পাঠাতে হবে একটা বােঝাপড়া করবার জন্যে।
তখন হঠাৎ খেয়াল হল যে তাড়াতাড়িতে ম্যানেজারের নাম
ঠিকানা ধনঞ্জয়ের কাছে জিগগেস করতে ভুল হয়ে গেছে।
তখনই নিবারণ ছুটল ধনঞ্জয়ের বাসায়। খানিক পরে সে এসে
খবর দিল ধনঞ্জয় সেই আট আনার সদ্ব্যবহার করে আবার
নন্দরাণী দেখতে দৌড়েছে। অতি কষ্টে তার কাছ থেকে নাম
ঠিকানা যােগাড় করা গেছে। সেই ম্যানেজার-কুল-কলটার
নাম গােবন দোলুই।
তারপর দিন নিবারণ আর সুরেন বলে এক উদীয়মান
ভাস্কর গেল গােবর্দ্ধন দোলুই-এর সঙ্গে বােঝাপড়া করতে।
সুরেন বুদ্ধি করে কার কাছ থেকে একটা পুরানাে চাপকান
ধার করে এনে পরেছে, মাথায় এটেছে মন্তু কালাে এক
শামলা, যাতে তাকে উকিল-উকিল দেখায়। নিবারণ পরেছে
গলাবন্ধ কোট আর কালাে রঙের পালুন, অতিসন্ধিটা যেন
তাকে এ্যাটার্ণ বলে মনে হয়। আর ওরা সঙ্গে নিয়েছে এক
চামড়ার হাতবাক্স, যেন ওর মধ্যে মামলার অনেক দলিল দস্তাবেজ
আছে। এই রকম বেশভূষা করে ওরা দুজনে দোলুই সন্দর্শনে
১৪১
যাত্রা করল। অবিনাশ অবিচি গুদের সব শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে, আর বার বার করে বলে দিয়েছে বেশ মাথা ঠাণ্ডা রেখে কথাবার্তা কইতে। ম্যানেজার পােবন দেই তখন কি একটা কাজে ব্যস্ত, দুদিন বাদেই তার নতুন সিনেমা ঘর খুলবে,—ঠকাঠ আওয়াজ হচ্ছে চারিদিকে। তার চেহারা দেখে ওরা গেল দপ্তর মত ভড়কে। ভীষণ মােটা এবং বেঁটে, হাতীর মত মুখ, তাতে দুটো হােট ঘােট চোখ অত্যন্ত অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল পুরু ঠোটের নীচে আতার বীচির মত কালাে কালাে দাঁত। গগাবর্ধন ওদের দেখে বলল, “কি হে ছােকরারা কি মনে করে? চাদা-ফাদা যদি হয় ত সরে পড়। তােমাদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করবার আমার ফুসৎ নেই। সুরেন যতদূর সম্ভব গম্ভীর হয়ে বলল, “শুনুন গােব- বাবু, হাইকোর্টের সময় হয়ে আসছে, ফুসৎ আমাদেরও নেই। আমরা এসেছি মতী ননীলালের Case-এ- পােবন দােলুই হা হা করে অট্টহাসি হেসে বলল, শ্রীমতী ননীলাল! বলি, তিনি হন কে? সুরেন চটে গিয়ে বলল, “হাসবার কথা নয়। এমতী ননীকে আপনি আপনার সিনেমাতে নিযুক্ত করবেন বলে চুক্তি করেছিলেন কি না? ম্যানেজার আকাশ থেকে পড়ল-মি! কই না। নিবারণ. বলল, ‘দুলে যাচ্ছেন মশাই; অত সহজে ভুলতে ১৪২
ননীলাল,
চলবে না। আপনার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল বলে আমাকে মনে
মতী ননীলাল তার আগের কাজে ইস্তাফা দেন। কিন্তু
আপনি সে চুক্তি ভেঙেছেন। অতি ইতরতার সঙ্গে ভেঙেছেন।
তাই নিয়ে একটা বােঝা পড়া করবার জন্যেই আমাদের এই
কন্যওকালতনামা পত্ৰমিদং কাৰ্যঞ্চাগে, বুঝেছেন। এই কাজ
করে করে চুল পাকালাম। সেদিন ঠিক এই নিয়েই ভি,
সাহেবের এজলাসে এক বেটার তিন মাস জেল দিইয়ে দিলাম।
তা যাক, আপনার নামে ক্ষতিপূরণের দাবী করে নালিশ রুজু
করবার instruction রয়েছে।
গােবন দোলুই আবার অট্টহাস্য করে বলল, “রয়েছে না
কি! তা তােমার ডিক্রুজ সাহেব আমায় ঋণী দেবেন তা হলে।
শুনে এই দেখ, আমি তােমাদের সামনে ভয়ে কাঁপছি-ঠক
ঠক্ ঠক্!’ .এই বলে ব্যঙ্গ করে তার হাতীর মত শরীর কঁপাতে
লাগল।
সুরেন বলল, আপনি ত অতি ভয়ঙ্কর লােক মশাই! যদি
সহৰে কিছু না করেন তাহলে বাধ্য হয়ে আমাদের আদালতে
যেতে হবে। তাতে ফল আপনার ভাল হবে না। তার চেয়ে
একটা আপােষে রফা করে ফেলুন না কেন?
নিবারণ বলল, “তাই করুন বুঝলেন। কেন পার মিছিমিছি
হাদাম করেন। আপনিও অবােক আমরা তােক,
আপােষ করে ফেলুন।
গােবন দেলুই বলল, আপােযটা করতে তােমারে
১৪৩
সপ্তক
দেখছি ভারি উৎসাহ যে হে! তাতেই বােঝা যাচ্ছে তােমরা
উকিল-টুকিল কি নও, উকিলে কখনও আপােষ করে ? তারা
মামলা বাড়িয়ে দেয়। আর চুক্তি খেলাপ করলে বুঝি ফৌজদারী
কেস হয়? কোন পুরুষে উকিল নও, উকিল সেজে আমার
সঙ্গে ধাপ্পাবাজী করতে এসেছ। দেব এখনি intimidationএর
চায়ে ফেলে।
সুরেন চীৎকার করে বলল, এ তােমার মত হােটলােকের
উপযুক্ত কথাই বটে। ইচ্ছা করছে দুই ঘুসি মারি তােমার
পিঠে।
ম্যানেজার তাড়াতাড়ি পিছু হঠতে হঠতে বলল, ‘হু দুটো
ডোপপা ছোড়া এসেছেন গােবন দোলুইএর সঙ্গে চালাকি
খেলতে। ওঁরা আবার উকিল, ওদের আবার মকেল, ওঁদের
আবার হাইকোর্টের বেলা হচ্ছে। এই তােদের আর তােদর
মকেলকে আমি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাচ্ছি, যা কি করতে পালি
করগে যা-
নিবারণ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “দাও গােবর বেটাকে
এই নামায় ডুবিয়ে!
গগাবর্ধন দোলুই তাড়াতাড়ি তার কামরায় ঢুকে পড়ে বলল,
‘বেবােও এখান থেকে, নইলে পুলিলে ফোন করব।' এই বলে
সঙ্গম করে দরােজা বন্ধ করে দিল।
নিবারণ ও সুরেন ব্যর্থ ক্রোধে খুব খানিক হাত পা ছুঁড়ল।
সুরেন বলল, ‘জানাে নিবারণ, একেই বলে লড়াই! কুটির
১৪৪
নীল,
এ মিশে, এর মনে-এই বলে দুর রেজায়
বুলি মাল।
বিবরণ ফল, ই ইল করে পণ, হয় ঐ গাে
আমাদের লীলাকে করি নেবে, নয়ত এ সাত
ক।'—এই বলে মাটিতে খুব মােরে গত কাল।
এমনি খানিক চেঁচিয়ে ওদের উন্মা এ মলে নেন
নিবারণকে বলল, “কি অবিনাশ আমার রাগারাগি করুত
মন রে দিয়েছিল।
বিবার লল, মা ও রাগ করিনি। লেঃ গ
বেছি? রাগ করেছে ত ই গাে টো।
সুয়েন বলল, ঠিক। আর কই রাগ করলাম। কিন্তু
শি, হচ্ছে, আর আমাদের এখানে গাড়ি থেকে পু
ধান রে কি হবে?
নিবারণ কলা, লে । এখানে গড়িয়ে থাকাটা
ঠিন শের আমরা সত্যি সত্যি নেমে যেতে পারি।
ঙ্গি গাে যেটা পুলি ভাকবে বলে শালিয়ে গেছে। এ
আমরা পুৰু পরামর্শ সভা বিগে। যেমন ফ বি গো
টোকে করতে হবে, তাতে যত খর লালে। এর
যদি মাত্রা কমায়া তায়।
সুরে বলল, বি ও তাই। সরকার হলে আমার এই
জুতো লেড়াটা প্য ক আ জ বলে দিলাম।
১৫
সপ্তক
এই ঘটনার ঠিক দুদিন পরে। গােবন গােনুইয়ের নতুন
সিনেমা ঘর সেদিন খুলেছে। সিনেমা সুরু হবার কিছু আগেই
অন কুড়ি লােক হৈ হৈ করে ঢুকে পড়ল। তারা সেই দারুণ
গ্রীয়ে পরে এসেছে গম ওভারকোট, কেউ বা জড়িয়েছে
গায়ে মােটা ভুটিয়া কম্বল, কারাে গলায় মাফলার বাঁধা, কারাে
বা কষ্টে বেলেভােনার প্রলেপ। সিনেমা শুরু হল। খানিক
এ ছবি সে ছবি দেখার পর স্ক্রীনের ওপর কর্পোরেশনের
নােটিশ উঠল,-ইনফ্লুয়েঞ্জা ও তাহার প্রতিকার। বাংলায় ও
ইংরাজিতে লেখা নােটিশ; ইনফ্লুয়েঞ্জা যে কী ভয়াবহ, কী
ছোঁয়াচে এই সমস্ত সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে
নাগরিকদের সাবধান করে দেওয়া হচ্ছে তারা যেন ঠাণ্ডা
স্যাৎসেঁতে ঘর এবং সর্দি-কাশি-গ্রস্ত লােকদের সমান ভাবেই
পরিত্যাগ করেন।
দর্শকরা রুদ্ধ নিখানে পড়ছে, কারণ
কলকাতায় তখন খুব ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ, সবাই সন্ত্রস্ত
হয়ে আছে—এমন সময় ঘরের কুড়ি দিক থেকে কুড়িটি ভীষণ
হাঁচির আওয়াজ শােনা গেল। সে কী ভীষণ শ,মনে হল
যেন কুড়িটি টায়ার একসঙ্গে ফেটে গেল। তারই সঙ্গে সঙ্গে
শুরু হল সে কি ঘন ঘন কাশি,-অবিরাম। কে একজন নার
একজনকে খুব ভারি গলায় বলল, “মশাই, এখানটা দেখছি
ভারি স্যাৎসেঁতে, নয়? আমার ত ভীষণ সর্দি হয়ে গেল।
অপর একজন ওদিকার কাকে বলল, “কি ঠাই লেগেছে
বশাই, হে, হাে, বােথা একেবারে দাড়াতে পাচ্ছিলা।
১৪৬
ननोमान
এমনিতর কথাবার্তার মৃদু গুঞ্জনে সিনেমা ঘর একেবারে মুখর
হয়ে উঠল।
একজন প্রবীণ গিন্নী তার স্বামী, তার আড়াই ডজন
পুত্রকন্যা, এক ভজন জামাতা ও প্রায় সেই সংখ্যক নাতি-নাতনী
নিয়ে স্ক্রীনের বাম দিকের একেবারে চার পাঁচটি রাে জুড়ে
বলেছিলেন। গিন্নীটি প্রথমে কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপন চেঁচিয়ে
চেচিয়ে পড়লেন (স্ক্রীনে যা লেখা ফুটে ওঠে ল চেঁচিয়ে পড়াই
হল অনেক দর্শকের অভ্যাস), তার পর হাঁচি কাশির আওয়াজ
শুনলেন, আর ঐ যে গুঞ্জন উঠল তারও কতক কতক কর্ণগােচর
হল। চিরকাল কৰ্ত্তা এবং ছেলেমেয়েদের রক্ষণাবেক্ষণ করে
তার গৃহিণীসুলভ ইনসটিংকট খুবই পাকা হয়ে গিয়েছিল। তিনি
তৎক্ষণাৎ বাড়িয়ে উঠে তারস্বরে সাবধান করে দিতে লাগলেন,
“ওগাে শুনছ, বলি ওদিকে হাঁ ক'রে কি দেখছ?—তােমার
গলাটা ঢাকো। অরে অ নবীন, তাের কোটের বােতামগুলাে
এটে দে বাবা। ও মধুরি, তাের কাধে হাওয়া লাগছে না ত?
বলিস কি বল! আমি দেখতে পাচ্ছি হাওয়া লাগছে, আর
তুই না বলেই হল। ও নিখিল, নিখিল, তােমার চাদরটা গলায়
বেশ করে গড়িয়ে নাও ত বাবা। ও কালীচরণ, তুমি
আমার কাছে চলে এল ত দাদু, তােমার পাশে ঐ কল-জড়ানাে
লােকটা কী ভীষণ হচছে গো। তা তুমি বাছা এই সর্বনেশে
হাঁচি কাশি নিয়ে কেন এখানে এসেছ বলত! তােমার আকেল
বলে কি জিনিষ নেই বাছ! এত সর্দি-কাশিতে মানুষ
১৪৭
বাইরে ব্যয় হয়। বাইস্কোপ ত আয় পালিয়ে যাচ্ছিল না,
না হয় দুদিন পরেই আসতে'—এই বলে সেই ফল ভালো
সম্পূর্ণ অপরিচিত লােকটিকে খুৰ খানিফ বকুনি দিয়ে দিলেন।
সােকার পা গলার আওয়া। সে কি হাসছে কি কাছে
বােঝা গেল না। ওখানে একটি বৃদ্ধ লােফ তার পাঁচটি
নাতিনাতীকে তেমনি করে হেঁটে হেঁকে সাবধান কমতে
সিনেমা আর দেখবে কে? সবাই ইনার ছোঁয়াচ
লাগায় ভয়ে তটস্থ হয়ে রইল। এমনি খানিকক্ষণ কাটবার পর,
হাঁচি কাৰি উত্তরােত্তর বেড়েই চলেছে দেখে পূর্বোক্তা গিয়টি
বললেন, ওগো শুনছ, ওঠো,-ছেলে মেয়েদের সব ডাকো,
শিশিরকে গাড়ী নিয়ে আসতে বল, আর এখানে থাকা নয়।
কর্ণা একটু মৃদু আপত্তি নিয়ে বলে, “মা, মা, ও কিছু
নয়।
গৃহিণী কার দিয়ে বললেন, 'ও কিছু নয় ! তােমার
এক র কথা, ও কিছু নয়। শুনলে হাড় জলে। শেষে একটা
সর্দি কাশি করে বস।
কর্তা বলিলে, 'আহা দেখই না খানিকটা বলে। রাগ
কর কেন ?
গৃহিণ এর এক পর্দা সুর চড়িয়ে বললেন, আমি অমন
তােমার মতন অনেষ্য রাগ করি না। তা কি তুমি এখানে
বলে, বাইস্কোপ ত আর দেখনি কোন জন্মে। যা দেখেন
১৪৮
ননীলা
তাতেই মাথা ঘুরে পড়েন।
বললুম নিয়ে চল ভাল একটা
সিনেমায়, তা সেখানে না গিয়ে নিয়ে এলেন এই একটা
হতভাগা ৰাইকোপে, মাগো, একেবারে ইনফুলুয়ায় আ। কে
এক গােরা মানুই, তায় আবার বাইস্কোপ। কাকে আবার
প্যাম। তুৰি ৰা ৰাও না যাবে, যা এখানে বলে। আমি
ছেলে মেয়েদের মেরে ফেলতে ত পারি না। এ নবীন, ও মী,
ও বাবা নিলি, ও কালীচরণ- এই বলে তিনি তাঁর বয়
গােষ্ঠির প্রত্যেক পরিজনের নাম ধরে ডাকি বার করে
দিলেন। তাদের সকলকে গুছিয়ে নিয়ে মনে হলাে খুলে
বেরিয়ে গেলেন। বলা বাহুল্য কাউকে সেই অরণ্যে
একাকী হেড়ে গেলেন না। ওদিকের সেই বন্ধ অতি সাবধানী
ভলােক ও তার শাচটি নাতি-
নালী সহ সুগৃবির গান্ত
অনুসরণ করলেন। দেখতে দেখতে সিনেমার প্রায় খালি হয়ে
এল। সকলেরই প্রাণের ভয় আছে।
তার পরদিন আবার অন যুক্তি লােক এমৰিয়া মুড়ি-মুড়ি
দিয়ে ঐ সিনেমায় ঢুকে পড়ল। কর্পোরেশনের হুকুম এতি
সিনেমাতেই বিজ্ঞাপনটি দেখাতে হবে। যেমন বিজ্ঞাপন উঠল,
অমনি সমবেত হটি। সেদিনও করা সিনেমা ছেড়ে মে
ক্রমে সরে পড়ল। গােন নুইএর উকিটের দাম ফেরত
দেওয়া উচিত এমনি ধারা কথা এক ন দর্শকের মুখ থেকে
শােনা গেল। এমনি নাের চলতে লাগল।
এর ফলে ওপাড়ায় দোলুই মশায়ের সিনেমার তারি একটা
১১
দুর্নাম রটে গেল। ঘরটা নাকি ভীষণ স্যাৎসেতে, যে যায়
তারই ঠাণ্ডা লাগে। এটা ব্যবসার পক্ষে কম ক্ষতিকর নয়।
এক সপ্তাহ পরে সিনেমায় ভিড় এক রকম নেই বললেই হয়।
সেদিনও জন কুড়ি লােক অমনিরা গরম কাপড় মুড়ি দিয়ে
যেমন ঢুকূতে যাচ্ছে অমনি গােবন দোলুই স্বয়ং এসে পথ
আগলে দাড়াল। দোলুইএর হাতীর মত দেহ রাগে আরও ফুলে
উঠেছে। ঘুসি পাকিয়ে বলল, “পালী বদমায়েস স্য, চেন নি
এখনাে গােবর্ধন দোলুইকে।
নিবারণ, মানে ওটা হল নিবারণদেরই দল কি না, সে
বলল, বিলক্ষণ চিনি! অমন নবজলধরাম বপু, ও কি ভােলবার?
দোলুই বলল, ‘চালাকি করতে এসেছ আমার সিনেমায়!
নিবারণ বলল, “না, টিকিট কিনে তােমার সিনেমা দেখতে
এসেছি। আমরা দর্শক।
দোলুই বলল, “দর্শক না গুষ্ঠির পিণ্ডী! এসেছ দল বেঁধে
ফ্যা ফ্যা করে হেঁটে আমার খদ্দের ভাগাতে।
নিবারণ বলল, “তা যদি আমাদের হাঁচি পায় হাঁচব না? এত
ভারি জুলুম।
দোলুই বলল, ‘বােকা বােঝাতে এসেছ! হাঁচি পায়! কুড়ি
মনের মনি এক সতে হাঁচি পায়। জানাে, এর জন্যে তােমাদের
সােল রে চালান করে দিতে পারি।
নিবারণ বলল, ‘পার না কি! দেখ এই আমরা কঁপছি
ভয়ে ঠক ঠক ঠক—তুমি যেমন করে কেঁপেছিলে।'—এই বলে
ননীলা তারা কুড়ি নেই দোলুইকে ঘিরে ঘন ঘন কাপতে লাগল। দোলুই এতে যা চটল তা আর কহতব্য নয়। বলল, তােমার সবাইকে পুলিশে দেব। নিবারণ বলল, “চার্জ-টা কি ? দোলুই বলল, “জান না। সবাই যেন ন্যাচর। নিবারণ বলল, তােমার সিনেমায় বসে হাঁচি, এই ত চা? দোলুই বলল, ‘তা নয় ত কি! খদ্দের ভাগিয়ে গিয়ে সিনেমা প্রায় উঠে যাবার জোগাড় হয়েছে, এটা কম চার্জ হল। নিবারণ বলল, “মস্ত চার্জ! ফাসী হয়ে যাবে। এই বলে তারা কুড়ি জন লােক হাে হাে করে হেসে উঠল। মােনুই তার নিজের নিক্ষিপ্ত শর তার নিজের প্রতি ফিরে আসছে দেখে হতবুজি হয়ে রইল। অবশেষে একেবারে হতাশ হয়ে বলল, তার চেয়ে একটা পাপােষ- ওরা সবাই হা করে বলে উঠল-পথে এল দাদা। মহাসমারােহে ধনঞ্জয়ের সঙ্গে নীলালের বিবাহ হয়ে গেল। নিমন্ত্রিতদের আদর অভ্যর্থনা করছিলেন গােবর্ধন দেলুই গং। বিবাহস বসেছিল তারই সিনেমা-গৃহে। চিজগৎ’এর মহা গণ্যমান্য সম্পাদক মশায় ভুরী-জােনে আপ্যায়িত হয়ে বললেন ‘ই, তিন শাে তিপ্পাল্পটি বক্তৃতা আর প্রায় সাড়ে চার হার
কবিতা পাঠ এনে পায়ে ঝিনঝিনি পরে গেছে পায়, অনেকের
ই উঠেছে বটে কিন্তু কই কাকেও ত হাঁচতে শুনি নি। সিনেমা
ঘরের ব্যবস্থাগুলাে যা করেছেন মশাই, একেবারে চমৎকার।
কালই লিখব আমি মস্ত একটা প্যারা। বােধ করি কোন
নিন্দুকে এর বদনাম রটিয়ে থাকবে।
তার পর গােবন দোলুই-এর সিনেমার আর কোনাে বদনাম
গােনা যায় নি।
Leonard Merrickএর একটি গল্পের ছায়া অবলম্বনে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.