Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mahapurush Charit Ba Jeorge Wasingtaner Jeeban-brittanta Ed.3rd

Ishanchandraghosh Sn. · 2010/01/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

জর্জ ওয়াশিংটন
৩শন শেষ
জর্জ ওয়াশিংটনের জীবন-বৃত্তান্ত।

জর্জ ওয়াসিংটন

মহাপুরুষ-চরিত
বা
জর্জ ওয়াশিংটনের জীবন-বৃত্তান্ত
হেয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক
শ্ৰঈশানচন্দ্র ঘােষ এম, এ,
কর্তৃক সঙ্কলিত,
তৃতীয় সংস্করণ।
নববিভাকর প্রেসকলিকাতা
PUBLISHED BY G. C. NATII Co.
39 Cunning Street, Calcuttı.

Calcutta ;
PRINTED BY G. C. NEOCI,
NABABIBHAKAR PRESS
114, AMHERST STREET.

বিজ্ঞাপন। আজ ইংরাজশাসন ও ইংরাজী ভাষা ভূমণ্ডলের নানা স্থানে বিস্তৃত। য সার্বভৌম আধিপত্য রােমক প্রভৃতি জাতিরও স্বপ্নের অগােচর ছিল, ইংরাজ তাহা লাভ করিয়াছেন। পৃথিবীতে এমন কেহ নাই তাহার এ আধিপত্যে বাধা দিতে পারে। বিধাতৃবিধানে এই ইংরাজ আমাদের রাজা। ইংরাজের রক্ষণাবেক্ষণে ভারতবাসীর আর বহিঃশত্রুর ভয় নাই। তৈমুরলঙ্গ বা নাদির সাহ পুন- ৰ্বার শরীর পরিগ্রহ করিয়া শতগুণে বলান্বিত হইলেও ভারতবাসীর কেশাগ্র স্পর্শ করিতে পারিবে না। ঈদৃশ রাজকুলের চরিত্রের অনুকরণ করা প্রজার একটী মঙ্গলময়ী প্রবৃত্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা অনেক সময়ে ইংরাজজাতির সদগুণনিচয়ের অনুকরণ করিতে চেষ্টা করি না। আমরা একবারও ভাবিয়া দেখি না যে, প্রকৃত মনুষ্যত্ব কেবল শারীরিক বলে বাহ্য বেশভূষায় প্রকটিত হয় না। শরীরের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তি, ধর্মভাব ও সদসজ্ঞানের উন্নতিসাধন নিতান্ত আবশ্যক। ইংরাজ যদি শুদ্ধ দৈহিক বলে বলীয়ান্ হইতেন, তাহা হইলে কখনও ‘হাসিতে হাসিতে পৃথিবী শাসিতে পারিতেন না। ইংরাজের প্রকৃত মহত্ত্ব বুঝিতে হইলে প্রধান প্রধান ইংরাজের জীবন- বৃত্তান্ত পাঠ করা কর্তব্য। এ পর্যন্ত বাঙ্গালা ভাষায় এরূপ অনেক জীবনবৃত্তান্ত প্রকাশিত হইয়াছে। আশা করি ওয়াসিংটনের জীবন- বৃত্তান্তও সেই শ্রেণীর মধ্যে স্থান পাইবে। ওয়াসিংটন আমেরিকার লােক বলিয়া কেহ যেন মনে না করেন যে, তিনি ইংরাজ নন। আমেরিকার ইয়ুনাইটেডষ্টেটশ রাজ্যের অধিবাসীরাও ৩০ ইংরাজ। তাহাদের রক্তমাংস, আচার ব্যবহার, ভাষা পরিচ্ছদ সমস্তই ইংরাজের। শতাধিকবর্ষ অতীত হইল রাজনীতি উপলক্ষে মতভেদ হওয়ায় তাঁহারা শাসনসম্বন্ধে ইংলণ্ড হইতে পৃথক হইয়াছেন সত্য ; তথাপি ইংরাজসন্তান বলিয়া পরিচয় দেওয়াই তাহাদের প্রধান গৌরবের বিষয়। ইংরাজের বিপদে তাঁহারা উদাসীন থাকিতে পারেন না। আজ ইংলণ্ড ও আমেরিকা মিলিত হইলে রুশ বল, ফরাসী বল, অপর সকলে সমবেত থাকিলেও সভয়ে কম্পিত হয়। ওয়াসিংটন অলৌকিক গুণপরম্পরায় অলঙ্কত ছিলেন। মহাকবি কালিদাসের কথায় বলিতে গেলে সুলম্বিত বাহু তঁার, উরস্ বিশাল, বৃষস্কন্ধ, কলেবর যেন দীবশাল নিজ কৰ্ম্ম-ক্ষম দেহ করিয়া ধারণ, ক্ষত্ৰধৰ্ম্ম অবতীর্ণ ধরায় যেমন । সুচারু আকার তঁার, অন্তরে যেমতি, তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি, সেইমত শাস্ত্রেতে যতন; যেমতি আগম-শিক্ষা, কায্যও তেমন, কার্যের মতন ফল লভেন সুমতি। তেজঃ শৌৰ্য্য গুণে তিনি ভয়ের কারণ, দয়াশীলতায় পুনঃ শ্রদ্ধার আধার; মকর-সঙ্কুল সিন্ধু যদিও ভীষণ, রত্নগর্ভ বলি তবু আদর তাহার। জ্ঞানে মৌনী, দানে তিনি স্নাঘা-বিরহিত, বৈনিব্যাতনক্ষম হয়ে ক্ষমাপর ;- এরূপ বিরোধ-ভাব ত্যজি পরস্পর, ৫ণচয় তাঁর দেহে ছিল সম্মিলিত । বিষয-তৃষায় মুগ্ধ নাহি ছিল মন, সর্প গুণে অলঙ্কৃত অতুল ভুবনে; ধৰ্ম্মপথে রাখিতেন মতি অনুক্ষণ, জ্ঞানে ৩ প্রবীণ তিনি বার্ধক্যবিহনে। --নবীনচন্দ্র দাস কৃত রঘুবংশের অনুবাদ।

সূচীপত্র ১ ... ••• ৮ . . । ১৪ ••• २० • • • ৫০০ মুখবন্ধ প্রথম পরিচ্ছেদ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ তৃতীয় পরিচ্ছেদ চতুর্থ পরিচ্ছেদ পঞ্চম পরিচ্ছেদ যষ্ঠ পরিচ্ছেদ সপ্তম পরিচ্ছেদ অষ্টম পরিচ্ছেদ নবম পরিচ্ছেদ দশম পরিচ্ছেদ একাদশ পরিচ্ছেদ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ । । । বংশপরিচয় কৌমার পঠশা ও পিতৃবিয়ােগ মাতৃভক্তি আমিনী। ভ্রাতৃ-বিয়ােগ দৌত্য রণশিক্ষা ও যশােলাভ বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবন ৬০ সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য ৬৬ সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতিত্ব ... দেহত্যাগ ৪২, ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৭৯ ০ ০ ০ ৯১ ০ ০ ০

No text on this page.

মুখ বন্ধ। “হােথ, আমেরিকান অ্যুয়ে, পৃথিবী গ্রাসিতে করেছে আশর, হয়েছে অধৈৰ্য্য নিজ বীর্যবলে, ছাড়ে হঙ্কার, ভূমণ্ডল টলে, যেন বা টানিয়া ছিড়িয়া ভূতলে নূতন করিয়া গড়িতে চায়।” হেমচ। চারিশত বৎসর অতীত হইল, কলম্বাস নামে এক মহাপুরুষ নূতন মহাদ্বীপের আবিষ্কার করেন। ইটালীর অন্তঃপাতী জেনােয়া নগর কলম্বাসের জন্মস্থান। তৎকালে পর্তুগালের অধিবাসীরা, আফ্রিকার দক্ষিণপ্রান্ত পরিবেষ্টনপূৰ্ব্বক, জলপথে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার নিমিত্ত প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছিলেন। কলম্বাসের সংস্কার হইয়াছিল যে পৃথিবী কদম্বকুসুমের ন্যায় গােল ; সুতরাং ক্রমাগত পশ্চিমাভিমুখে গমন করিয়া আটলান্টিক মহাসাগর পার হইতে পারিলে, আফ্রিকা, পরিবেষ্টন করিয়া, ভারতবর্ষে আসিতে পারা যায়। এই বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া পােতাদি উপকরণ সংগ্ৰহাৰ্থ তিনি ইয়ুরােপের অনেক রাজার নিকট সাহায্য-ভিক্ষা করেন। কিন্তু প্রথমে কেহই তাঁহার কথায় কর্ণপাত মহাপুরুষ-চরিত। করেন নাই। কেহ তাহাকে বাতুল বলিয়া উপহাস করিতেন, কেহ বা তদীয় প্রস্তাব ধর্মশাস্ত্রবিরুদ্ধ বিবেচনা করিয়া পারত্রিক ভয়ে সশ হইতেন; কারণ তখন লােকের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আটলান্টিক অপার। কিন্তু কলম্বাস ভগ্নোৎসাহ হইবার লােক ছিলেন না। বৎসরের পর বৎসর চলিয়া গেল, বৃথা সাহায্য-ভিক্ষায় কলম্বাসের সময় নষ্ট হইতে লাগিল, অর্থাভাবে ও মনস্তাপে তাহার দুর্দশার সীমা রহিল না, তথাপি তিনি সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিলেন না। শেষে অধ্যবসায়ের জয় হইল, কলাম্বাস সিদ্ধকাম হইলেন। স্পেনের রাজমহিষী প্রাতঃস্মরণীয়া ইজাবেলা নিজব্যয়ে কলাম্বাসকে তিনখানি অর্ণবপােত সুসজ্জিত করিয়া দিলেন, এবং তিনি তদবলম্বনে প্রায় দেড় মাস জলপথে ভ্রমণপূৰ্ব্বক কারিবসাগরীয় গুয়ানাহানা দ্বীপে উপনীত হইলেন। কলাস স্বপ্নেও ভাবেন নাই যে, এশিয়া ও ইয়ুরােপের মধ্যে ভূ- মণ্ডলের অপর স্থলার্ধ সুমেরু হইতে কুমেরু প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকিয়া তাহার গতিরােধ করিবে। তিনি দীর্ঘকাল পর্যন্ত আমেরিকার পূর্বোপ- কূলবর্তী দ্বীপসমূহকে ভারতবর্ষের সন্নিহিত বলিয়া বিবেচনা করিয়া- ছিলেন। এই ভ্রান্তিমূলক বিশ্বাসবশতঃ অদ্যাপি ঐ সকল স্থান পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ” নামে অভিহিত হইয়া থাকে। এদিকে আরও ছয় বৎসর পরে, ১৪৯৮ খ্রীষ্টাব্দে ভাস্কো ডা গামা নামক পটু গালদেশীয় প্রসিদ্ধ নাবিক আফ্রিকার দক্ষিণপ্রান্ত পরিক্রমণপূর্বক ইয়ুরােপ হইতে ভারতবর্ষে আসিবার জলপথের আবিষ্কার করেন। কলাসের আবিষ্কারবার্তা প্রচারিত হইলে ইয়ুনরাপীয় প্রধান জাতি অনতিবিলম্বে পশ্চিমাভিমুখে ধাবিত হইলেন। পটু গালবাসীরা ব্রাজিল আবিষ্কার ও অধিকার করিলেন; ইংরাজেরা লাব্রাভার উপদ্বীপে উপনীত হইয়া ক্রমশঃ দক্ষিণাভিমুখে রাজ্য বিস্তার করিলেন; ফরাসীরা বর্তমান কানাডা প্রদেশ ও মিসিসিপির দক্ষিণপা উপকূলভাগের মুখবন্ধ। কিয়দংশ আত্মসাৎ করিলেন, এবং স্পেনবাসীরা কারিবসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, মেক্সিকো ও পেরুরাজ্য জয় করিয়া বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হইলেন। আমেরিগাে ভেস্তুচি নামক একজন ইটালীদেশীয় ভদ্র লােক নবাবিষ্কৃত ভূভাগের অবস্থান করিয়া এক পুস্তক প্রকাশ করিলেন, এবং তদীয় নামানুসারে নূতন মহাদ্বীপের আমেরিকা’ নাম হইল। যে কলাম্বাস এত কষ্ট পাইয়া ইহাকে সভ্যজাতির গােছর করিলেন, তাহার নামটী পর্যন্ত ইহার সহিত সংযুক্ত রহিল না। আমেরিকার আদিম অধিবাসীরা কদাকার, অসভ্য ও নরমাংসাশী তাহারা শ্বেতকায় ইয়ুনােপবাসাদিগকে দেখিয়া প্রথমে বিবেচনা করিয়া- ছিল যে, স্বর্গ হইতে দেবতারা তাহাদের অবস্থা পরিদর্শন করিবার নিমিত্ত মর্ত্যলােকে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তাহারা বন্দুককে বদ্র, গুলি ছুড়িবার কালে যে অগ্নিশিখা বাহির হয় তাহাকে বিদ্যুৎ এবং তজ্জনিত শব্দকে বজ্রধ্বনি মনে করিত। ইয়ুরােপীয়েরা আদিম অধিবাসীদিগকে দাসত্বে নিয়ােজিত, পার্বত্য প্রদেশে বিতাড়িত বা নিহত করিয়া অধিকার বিস্তার করিতে লাগিলেন ; আদিম অধিবাসীরাও অবসর পাইলে শ্বেত- কায় লােকদিগকে সপরিবারে নিহত করিয়া প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করিতে লাগিল। কালে সবলেরই জয় হইল, এবং আদিম অধিবাসীরা ক্রমশঃ সংখ্যায় ক্ষীণ হইয়া পড়িল। যে সময়ে মহামতি আকবর ভারতবর্ষে মােগল-আধিপত্য বদ্ধমূল করিতেছিলেন, ঠিক সেই সময়েই প্রখরবুদ্ধিসম্পন্ন মহারাণী এলিজাবেথ ইংলণ্ডের সিংহাসনে সমাসী ছিলেন। যে যে কারণে ইংরাজ জাতি আজ পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, এলিজাবেথের শাসনকালেই তাহার অধি কাংশের সূত্রপাত হয়। তাঁহারই সময়ে বেকন ও সেক্সপিয়ার অত্যুৎকৃষ্ট গ্রন্থরচনা দ্বারা ইংরাজী ভাষার শ্রীবৃদ্ধি করেন, তাহারই সময়ে সার ফ্রান্সিস্ ড়ে জলপথে ভূমণ্ডল প্রদক্ষিণ করিয়া ইংরাজ নাবিকদিগের ৪ মহাপুরুষ-চরিত ~~~~ উৎসাহবৰ্ধন করেন, তাহারই সময়ে ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানি নামক বণি- সমিতি বাণিজ্যাধিকার লাভ করিয়া ভারতবর্ষে ইংরাজাধিকারের সূত্রপাত করেন এবং তাহারই সময়ে সার ওয়াল্টার রেলি আমেরিকার পূৰ্বোপ- কূলে ভার্জিনিয়া * নামক জনপদ প্রতিষ্ঠিত করিয়া বর্তমান “ইউনাইটেড ষ্টেট” বা সম্মিলিতরাজ্য-সমূহের ভিত্তি স্থাপন করেন। এলিজাবেথের মৃত্যুর পর প্রথম জেমস্ ইংলণ্ডের সিংহাসনে আরােহণ করেন। সেই সময়ে খ্ৰীষ্টানদিগের মধ্যে উপাসনা-পদ্ধতির পার্থক্যানু- সারে অনেক মতভেদ চলিতেছিল। জেম্স্ নিজে যে মত অনুসারে চলিতেন, প্রজাকেও সেই মতে আনিবার জন্য বল প্রয়ােগ করিতেন। ইহাতে ইংলণ্ডের অনেক সম্ভ্রান্ত লােকে অসন্তুষ্ট হইয়া জন্মভূমি পরিত্যাগ- পূৰ্ব্বক স্বাধীনভাবে ধৰ্ম্মচৰ্য্যা করিবার নিমিত্ত আমেরিকায় গমন করিয়া নব-ইংলণ্ড নামক জনপদের প্রতিষ্ঠা করেন। তাহাদের অধ্যবসায় ও চরিত্ৰ-বলে শ্বাপদসঙ্কুল, নরপিশাচভূমি অল্পদিনের মধ্যেই নন্দনকাননে পরিণত হয়। উপনিবেশবাসীরা কালসহকারে তেরটী ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে বাস করেন এবং ইংলণ্ডের অধীনতা স্বীকারপূর্বক উন্নতির পথে অগ্রসর হন। ইংলণ্ডরাজ প্রত্যেক প্রদেশের জন্য এক এক জন শাসনকর্তা নিযুক্ত করিয়া পাঠাইতেন; তদ্ভিন্ন শাসনসংক্রান্ত অপর সর্ববিধ কাৰ্য্য উপনিবেশবাসীরা আপনারাই সম্পন্ন করিতেন। এই পুস্তকের শিরােভাগে যে মহাপুরুষের নাম সংযােজিত হইল, তাঁহার বাল্যাবস্থায় আমেরিকা মহাদেশস্থ ইংরাজাধিকার এই তেরটী প্রদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল। উত্তরে সেলরেন্সনদপার্শ্ববর্তী কানাডা অঞ্চল এলিযেথ চিরকুমারী ছিলেন। রেলি রাজীর মনস্তুটি সম্পাদনাৰ্থ নবপ্রতিষ্ঠিত জনপদের তানিয়া” অর্থাৎ কুমারী এই নাম রাখেন। ইংরাজীতে “জানি” শব্দ কুমারী অর্থবাচক। পূর্বে প্রাচীন মহাদ্বীপে গােল আলু ও তা ছিল না। রেলি সর্বপ্রথম আমেরিকা হইতে এই দুই ব্য আনয়ন করিয়া সভ্যজাতির গােছর করেন।

মুখবন্ধ। এবং দক্ষিণে লুইসিয়ানা প্রভৃতি মিসিসিপি নদের দক্ষিণ তটবর্তী কতিপয় প্রদেশ ফরাসীদিগের অধিকারভুক্ত ছিল। কিরূপে ইংরাজেরা ফরাসী- দিগকে পরাভূত করিয়া প্রথমে এই সকল প্রদেশের আধিপত্য লাভ করেন, এবং কিরূপে পরিণামে মন্ত্রীদিগের অনবধানতাবশতঃ ইংলণ্ড-রাজ উপনিবেশবাসীদিগের সহিত বিবাদ করিয়া কানাডা ব্যতীত উত্তর আমেরিকার অপর সমস্ত স্থানের অধিকার হইতে বঞ্চিত হন, এই পুস্তকে প্রসঙ্গক্রমে তৎসমুদয় বিবৃত হইবে। শেষােক্ত ঘটনার সহিত জর্জ ওয়াসিংটনের জীবনবৃত্তান্ত বিশিষ্টরূপে সংশ্লিষ্ট। আমেরিকার সমস্তই অদ্ভুত। আমেরিকার সুবর্ণ-রজতপূর্ণ-অভ্রভেদি- পৰ্বত-শ্রেণী, বহুশতযােজনব্যাপি-সুপ্রশস্ত-নদনদী, সুপেয় সলিলপূর্ণ সাগরবং হ্রদনিচয়, সুবিশাল বৃক্ষাবলী, সুবিস্তীর্ণ প্রান্তর ও অরণ্যানী, ভীষণ আগ্নেয়গিরি ও জলপ্রপাত, সিঙ্কোনা * প্রভৃতি অমৃতােপম ভৈষজ্য, সামান্য বিস্ময়ের কারণ নহে। আমেরিকার ইংরাজ-বংশােস্তৃত শ্বেতকায় অধিবাসীদিগের বুদ্ধিকৌশল, প্রতিভা-চ্ছটা, উদ্যোগ এবং অধ্যবসায়ও অতীব বিস্ময়জনক। তাঁহাদের মধ্যে ইউনাইটেড, ষ্টেট অর্থাৎ সম্মিলিত রাজ্যসমূহের অধিবাসীরাই অগ্রগণ্য। জর্জ ওয়াসিংটন সেই সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। * ইহা হইতে হয় কুইনিন নামক মহৌষধ প্রস্তুত হয়। কোকেন, ইপিকাক প্রভূতি ভৈষও আমেরিকা-জাত।

প্রথম পরিচ্ছেদ বংশ-পরিচয় । ৯১ লণ্ডের উত্তরাংশ ওয়াসিংটন-বংশের প্রাচীন বাসস্থান। পূৰ্ব্বকালে ইংলণ্ড ও স্কটলাদেশ এক রাজার অধিকার- ভুক্ত ছিল না। সুতরাং অনেক সময়ে ইংরাজেরা স্কটরাজ্য ও স্কটেরা ইংরাজরাজ্য আক্রমণ করিতেন। আবার সময়ে সময়ে ইংলণ্ডেও রাজায় প্রজায় বিবাদ উপস্থিত হইত। এই সমস্ত যুদ্ধ-বিগ্রহের কালে ওয়াসিংটন-বংশ প্রাণপণে রাজার সহায়তা করিতেন। ফলতঃ তাঁহারা অতি প্রাচীন সময় হইতেই রাজভক্তি ও বীরত্বের জন্য প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন। খ্রষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইংলণ্ডে রাজা ও প্রজার মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ উপস্থিত হয়। অলিভার ক্রমওয়েল নামক এক ব্যক্তি প্রজার পক্ষ অবলম্বন পূৰ্ব্বক রাজার সহিত যুদ্ধ করেন এবং ক্রমে তাহাকে পরাস্ত ও নিহত করিয়া স্বয়ং ইংলণ্ডের শাসনভার প্রাপ্ত হন। ওয়াসিংটন- বংশ-পরিচয়। ৭। বংশ কুলক্রমাগত রাজভক্তি-বশতঃ এ সময়েও যথাসাধ্য রাজার সাহায্য করিয়াছিলেন; সুতরাং ক্রমওয়েলের জয়লাভের পর তাহার বিষদৃষ্টিতে পতিত হন। জন্ ও লরেন্স, ওয়াসিংটন নামক দুই ভ্রাতা ক্রমওয়েলের আচরণে বিরক্ত হইয়া জন্মভূমির মায়া পরিত্যাগপূৰ্ব্বক ১৬৫৭ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর আমেরিকার অন্তঃপাতী ভার্জিনিয়া প্রদেশে বাস করিতে যান। তৎকালে অনেক নিঃস্ব লােক ইয়ুৰােপ ত্যাগ করিয়া আমেরিকায় বাস করিতে যাইতেন। ওয়াসিংটনেরা সে শ্রেণীর অন্তর্ভূত ছিলেন না। পূৰ্বেই বলা হইয়াছে যে, ইংলণ্ডে ইহাদের বংশমর্যাদা, খ্যাতি প্রতিপত্তি, মান সন্ত্রম, যথেষ্ট ছিল। রাষ্ট্র-বিপ্লবই ইহাদের দেশত্যাগের একমাত্র কারণ। লরেন্স, ওয়াসিংটন দেশত্যাগের পূৰ্বে অক্সফোর্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে রীতিমত শিক্ষিত হইয়া ব্যবহারাজীবের ব্যবসায় অবলম্বন করিয়াছিলেন। এই দুই ভ্রাতা ভার্জিনিয়া প্রদেশে পটোমাকনদের তীরে কয়েক সহস্র বিঘা ভূমি ক্রয় করিয়া তথায় বাসগৃহ নির্মাণ করেন। কালে উভয়েরই অনেক পুত্রকন্যা জন্মে। তন্মধ্যে জনের পৌত্র অগাষ্টিন আমাদের গ্রন্থের নায়ক জর্জ ওয়াসিংটনের পিতা। অগাষ্টিনের প্রথম পত্নীর গর্ভে তিন পুত্র ও এক কন্যা জন্মে। এই পুত্র-ত্রয়ের মধ্যে লরেন্সের নাম স্মরণীয় ; কারণ পরবর্তী কয়েক পরিচ্ছেদে আমরা তাঁহার আরও পরিচয় পাইব। প্রথম পত্নীর বিয়ােগ হইলে অগাষ্টিন ওয়াসিংটন ১৭৩০ খ্রীষ্টাব্দে পুনৰ্ব্বার দার-পরিগ্রহ করেন। এই পক্ষের প্রথম পুত্র জর্জ ওয়াসিংটন ১৭৩২ খ্রীষ্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারি ভূমিষ্ঠ হন। অতঃপর অগাষ্টিনের দ্বিতীয় পত্নীর গর্ভে আরও পাঁচটী পুত্রের জন্ম হয়।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
কৌমার ।
জের বয়ঃক্রম যখন চারি বৎসর, সেই সময়ে অগাষ্টিন
রাপাহানক নদের তীরে নূতন ভূসম্পত্তি ক্রয় করিয়া
তথায় বাসগৃহ নির্মাণ করেন। তখন শ্বেতকায় পুরুষেরা
আমেরিকায় নূতন বসতি করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন।
অধিকাংশ ভূমি বনাবৃত। বন কাটিয়া ও অসভ্য আদিম
নিবাসীদিগের সহিত যুদ্ধ করিয়া কৃষিবিস্তার করিতে হইত বলিয়া, ভূমির
মূল্য অতি অল্প ছিল। সুতরাং অনেকেই দশহাজার, পনর হাজার বিঘার
তালুক লইয়া বড় বড় জমিদারের ন্যায় আড়ম্বরের সহিত বাস করিতে
পারিতেন। প্রকৃতির কৃপায় বসুন্ধরা প্রতি বৎসর প্রচুর শস্য প্রসব
করিতেন; কাহারও পানভােজনের অপ্রতুল হইত না। সুতরাং
ভূস্বামীরা বিষ দাসদাসী ও অনুচরবর্গে পরিবৃত হইয়া সুখে জীবন যাপন
করিতেন। ছােট বড় সকলেই আতিথেয় ছিলেন; কাহারও গৃহ হইতে
অতিথিকে ভগ্নাশ হইয়া প্রতিগমন করিতে হইত না।

কৌমার। রাপাহানকের তীরে তখনও ইংরাজদিগের সুন্দররূপ বসতি-বিস্তার হয় নাই। চতুর্দিকে নিবিড় বন, তাহার অতি অল্প অংশমাত্র পরিষ্কৃত ও কৃষিকার্য্যের উপযােগী। আদিম নিবাসীরা সুযােগ পাইলেই আগন্তুক- দিগকে আক্রমণ করিত এবং সময়ে সময়ে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলকে নিহত করিয়া উপনিবেশবাসীদিগের বিভীষিকা জন্মাইত। জর্জ শৈশব হইতেই এই সমস্ত অত্যাচারকাহিনী শ্রবণ করিতেন। এই জন্য তিনি আদিম নিবাসীদিগের চরিত্র-সম্বন্ধে সুন্দর অভিজ্ঞতা লাভ করিতে পারিয়াছিলেন। মাতাপিতার চরিত্রবলে ও শিক্ষার গুণেই সন্তান সচ্চরিত্র হয়। জর্জের জনক জননী উভয়ই কৰ্ত্তব্যনিষ্ঠ, পরমধাৰ্মিক, দূরদর্শী ও স্থিরবুদ্ধি ছিলেন। তাঁহারা সর্বদা সাবধান হইয়া সন্তানদিগকে সৎপথে পরিচালিত করিবার চেষ্টা করিতেন। জর্জের বাল্য-জীবন পৰ্যালােচনা করিলে দেখা যাইবে যে, তাহারা তদীয় সুশিক্ষাবিধানের নিমিত্ত কীদৃশ মনােযােগী ছিলেন। একদা অগাষ্টিন জর্জকে সঙ্গে লইয়া উদ্যানভ্রমণে গিয়াছিলেন। তখন শরৎকাল; রাশি রাশি সুপক্ক সুস্বাদ আতা বায়ুবেগে বৃন্তচ্যুত হইয়া ভূতলে পড়িয়া রহিয়াছে ; জর্জ জীবনে কখনও এত আতা এক স্থানে দেখিতে পান নাই; তাই তিনি আনন্দধ্বনি করিতে করিতে আতা খাইতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু অগাষ্টিন পুত্রকে এ সুখ অনেকক্ষণ ভােগ করিতে দিলেন না। তিনি কহিলেন, “জর্জ, তােমার কি মনে পড়ে, গত বসন্তকালে আমাদের এক জন আত্মীয় তােমাকে একটা বড় আতা দিয়াছিলেন? তুমি তাহার সমস্তই নিজে খাইবার জন্য ব্যগ্র হইয়াছিলে; শেষে আমি বার বার বলায় তুমি নিতান্ত অনিচ্ছাপূৰ্ব্বক তােমার ভাই ভগিনীদিগকে উহার অংশ দিয়াছিলে। আমি কহিয়াছিলাম যে, আমার কথা শুনিলে ঈশ্বর তােমাকে শরৎকালে প্রচুর আতা দিয়া পুরস্কৃত করিবেন।”

মহাপুরুষ-চরিত। জর্জ কোন উত্তর দিতে পারিলেন না; লজ্জায় অধােবদন হইয়া রহিলেন। নিজের নীচাশয়তার কথা মনে পড়ায় তিনি সাতিশয় অনুতপ্ত হইলেন। অগাষ্টিন আবার কহিতে লাগিলেন, “এখন দেখ, আমি যাহা কহিয়াছিলাম, তাহাই ঘটিয়াছে। বৃক্ষগণ ফলভরে অবনত হইয়াছে ; কোন কোন শাখা ভার বহন করিতে না পারিয়া ভগ্ন হইয়া গিয়াছে; আর বৃক্ষতলে এত আতা পড়িয়া রহিয়াছে যে, তুমি সমস্ত জীবনেও খাইয়া নিঃশেষ করিতে পার না।” জর্জ কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বনপূৰ্ব্বক বলিলেন, “বাবা, এবার আমায় ক্ষমা কর ; দেখিবে, আমি আর কখনও ওরূপ নীচ ব্যবহার করিব না।” অগাষ্টিন যে উদ্দেশ্যে বাগানে গিয়াছিলেন তাহা সিদ্ধ হইল। জর্জ স্বার্থপরতাকে শত্রুবৎ বিবেচনা করিতে শিখিলেন। তাঁহার মন উন্নতি- সােপানে অধিরােহণ করিল। আর এক দিন বসন্তাগমে অগাছিন উদ্যানের এক প্রান্তে ভূমিকৰ্ষণ করিয়া তন্মধ্যে যষ্টিদ্বারা “জর্জ ওয়াসিংটন” এই কয়েকটা কথা অঙ্কিত করিয়াছিলেন, এবং চিহ্নগুলির উপর কফির বীজ ছড়াইয়া মাটি দিয়া ঢাকিয়া রাখিয়াছিলেন। যথাকালে বীজ অঙ্কুরিত হইল। জর্জ একদিন উদ্যানে গিয়া দেখিতে পাইলেন, কে যেন সুন্দর সুন্দর হরিদক্ষরে “জর্জ ওয়াসিংটন” এই দুইটী শব্দ লিখিয়া রাখিয়াছে। তিনি অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া পিতার নিকট দোঁড়াইয়া গেলেন এবং কহিলেন, “বাবা, দেখে যাও, কি অদ্ভুত ব্যাপার!” অগাষ্টিন বুঝিতে পারিলেন এবং পুত্রের সঙ্গে উদ্যানে উপস্থিত হইলেন। জর্জ কহিলেন, “বাবা! তুমি আর কখনও এরূপ আশ্চৰ্য্য দেখিয়াছ কি ? এ কে লিখিল, বাবা ?” কেন গাছ গুলি ওখানে ঐ ভাবেই জন্মিয়াছে। “না বাবা, কেউ নিশ্চয় উহাদিগকে ঐ ভাবেই সাজাইয়া রাখিয়াছে। তবে কি তুমি মনে কর যে, উহা আপনা হইতে ওরূপ হয় নাই ?

কৌমার ‘না, তাহা কখনই হইতে পারে না; দেখ না, অক্ষরগুলি কিরূপ সুন্দর ভাবে সজ্জিত; যেটীর পর যেটী হইবে, সেটা ঠিক সেইভাবে বসি- আছে, মাত্রার পর্যন্ত ব্যতিক্রম ঘটে নাই; ইহাও কি কথন আপনা হইতে ঘটতে পারে ? বাবা, তুমিই ইহা লিখিয়া রাখিয়াছ। “হাঁ জর্জ, তুমি ঠিক বুঝিয়াছ ; আমি তােমাকে একটী উপদেশ দিবার নিমিত্ত এরূপ করিয়াছি। দেখ, যখন তােমার নামের অক্ষর কয়েকটীও আপনা হইতে এরূপভাবে সজ্জিত হইতে পারে না, তখন জগতের লক্ষ লক্ষ পদার্থ,–আকাশে চন্দ্র, সূৰ্য্য ও নক্ষত্রগণ, পৃথিবীতে জলবায়ু, নদনদী, ভুচর, খেচর ও জলচর জন্তুসমূহ—কিরূপে যথাস্থানে সজ্জিত হইল ? কে আমাদিগকে দেখিবার জন্য চক্ষু, শুনিবার জন্য কর্ণ, আম্ৰাণ পাইবার জন্য নাসিকা, খাইবার জন্য মুখ, চিবাইবার জন্য দন্ত, কাজ করিবার জন্য হস্ত, চলিবার জন্য পদ, ভাবিবার জন্য মন, স্নেহ করিবার জন্য মাতাপিতা, ভালবাসিবার জন্য ভ্রাতাভগিনী দিয়াছেন ? আমরা দিনের বেলা আলােক পাইয়া প্রফুল্ল হই, রাত্রিকালে অন্ধকারে বিশ্রামভােগ করি। জলে পিপাসাশান্তি করে, অগ্নিতে উত্তাপ দেয়,এ সমস্ত কে সৃষ্টি করিয়াছেন ? তুমি কি বিবেচনা কর যে, এই সমস্ত পদার্থ আপনা হইতেই তােমার ইচ্ছা ও অভাবের পূরণ করিতেছে ?” যেমন উৰ্বর ক্ষেত্রে সুপক্ক বীজ বপন করিলে তাহা অল্প দিনেই অঙ্কু রােৎপাদন করে, সেইরূপ বুদ্ধিমান্ শিশুকে সদুপদেশ দিলে অচিরেই তাহার ফল ফলে। জর্জকে আর বলিতে হইল না, তিনি তখনই উত্তর দিলেন, “না বাবা, এ সমস্ত কখনই আপনা হইতে হয় নাই। ঈশ্বর সকল পদার্থের সৃষ্টিকর্তা। আমরা যাহা কিছু ভােগ করি, সমস্তই সেই দয়াময়ের দান।” জর্জের শৈশবের আরও একটী ঘটনা উল্লেখযােগ্য। একদিন অগাষ্টিন তাহাকে এক খণ্ড ক্ষুদ্র কুঠার দিয়াছিলেন। জর্জ কুঠার পাইয়া ?

মহাপুরুষ-চরিত আহলাদে মত্ত হইলেন, এবং বাগানে গিয়া ঘােট ঘােট গাছগুলির উপর উহার ধার পরীক্ষা করিতে লাগিলেন। অগাষ্টিন অনেক যত্নে ইংলণ্ড হইতে একটা চেরীবৃক্ষের কলম আনয়ন করিয়া রােপণ করিয়াছিলেন। জর্জ মনের সুখে উহার উপর এরূপে কুঠারাঘাত করিতে লাগিলেন যে, অল্পক্ষণ পরে গাছটীর এক দিকের বলমাত্র কাটিতে বাকী রহিল। পর দিন অগাছিন উহা দেখিতে পাইয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন, এবং গৃহে ফিরিয়া গিয়া বলিতে লাগিলেন, “কে যেন আমার সখের চেরী গাছটা নষ্ট করিয়াছে। একশত টাকা হারাইলেও বােধ হয় আমি এত কষ্ট বােধ করিতাম না। এই কথা সমাপ্ত হইতে না হইতে জর্জ কুঠারহস্তে তথায় উপস্থিত হইলেন। অগাছিন জিজ্ঞাসিলেন, “জর্জ, তুমি বলিতে পার, আমার চেরী গাছটী কে কাটিয়া ফেলিয়াছে ?” এতক্ষণ জর্জের বিবেচনা করিবার অবসর হয় নাই যে, তিনি কি অন্যায় কাৰ্য করিয়া- ছেন। এক্ষণে পিতার কথা শুনিয়া তাহার চৈতন্য হইল এবং অপরাধ- জনিত লজ্জায় ক্ষণকাল মৌনাবলম্বনপূর্বক পরে পিতার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন “বাবা, আমি মিথ্যা কথা কহিতে পারিব না। আমিই তােমার চেরী গাছটী কাটিয়া ফেলিয়াছি।” পুত্রের এবংবিধ বীরােচিত অকপট ব্যবহারে অগাষ্টিন এত মুগ্ধ হইলেন যে, কিছুকাল পর্যন্ত তাঁহার কথা কহিবার সাধ্য রহিল না। তাঁহার চক্ষুদ্বয় আনন্দাশ্রু- পরিপ্লত হইল। অনন্তর পুত্রকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, “বৎস, আজ সহস্র চেরী বৃক্ষ পাইলে আমার যে সুখ হইত, তােমার ব্যবহারে তদপেক্ষাও অধিক সুখ পাইলাম ! বালকের পক্ষে অন্যায় কাজ করা তত দোষাবহ নহে; কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, অনেকে মিথ্যা কহিয়া দোষ ঢাকিতে চেষ্টা করে। ঈশ্বর করুন, চিরদিনই যেন সত্যের প্রতি তােমার এইরূপ অনুরাগ থাকে।” এইরূপে মাতা পিতার শিক্ষাগুণে চরিত্রবলে বলীয়ান্ হইয়া জর্জ কৌমার ১৩ ক্রমশঃ পঞ্চমবর্ষ অতিক্রম করিলেন। তৎকালে আমেরিকায় ভাল বিদ্যালয় ছিল না। উচ্চ শিক্ষা পাইবার ইচ্ছা করিলে ছাত্রদিগকে ইংলণ্ডে যাইতে হইত। জর্জের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা লরেন্স, ওয়াসিংটন ইংলণ্ড হইতেই সুশিক্ষিত হইয়া আসিয়াছিলেন। জর্জকে কখনও বিদ্যাশিক্ষার্থ ইংলণ্ডে পাঠাইতে পারিবেন কি না, এ সম্বন্ধে অগাষ্টিনের সাতিশয় সন্দেহ ছিল। তিনি আপাততঃ তাঁহাকে স্থানীয় পাঠশালায় পড়িতে দিলেন ; বয়ঃক্রমের ষষ্ঠ বর্ষ হইতে জর্জের বিদ্যারম্ভ হইল। ন তৃতীয় পরিচ্ছেদ। পঠশা ও পিতৃবিয়োেগ । ঠশালার শিক্ষক হবিসাহেব পূৰ্বে সৈনিক বিভাগে কাজ করিতেন ; শেষে কামানের গােলায় এক পা উড়িয়া যাওয়ায় অকর্মণ্য হইয়া শিক্ষকের ব্যবসায় আরম্ভ করেন। তাহার বিদ্যাবুদ্ধি যৎকিঞ্চিৎ লেখা পড়া ও পাটীগণিতের প্রথম নিয়ম-চতুষ্টয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু লেখাপড়ায় অপরিপক হইলেও তাঁহার একটা প্রধান গুণ ছিল। তিনি ছাত্রদিগের চরিত্রের প্রতি সবিশেষ লক্ষ্য রাখিতেন। কেহ অসাধু আচরণ করিলে তাহার রক্ষা ছিল না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপকেরাও তাঁহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ছিলেন না। অনেক দুষ্ট বালক শিক্ষকের অল্প বিদ্যার পরিচয় পাইয়া তাহাকে অবজ্ঞা করে এবং অপদস্থ করিবার চেষ্টা করিয়া থাকে। কিন্তু জর্জের প্রকৃতি সেরূপ ছিল না। সতপ্রিয়তার ন্যায় গুরুভক্তিও তাঁহার স্বভাবের একটা প্রধান অঙ্গ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

পঠন্দশা ও পিতৃবিয়ােগ । সুতরাং অতি অল্প দিনের মধ্যেই শিক্ষক ও ছাত্র পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত হইলেন। বুদ্ধিমান্, মনােযােগী ও বিনয়ী জর্জ গুরুমহাশয়ের ভালবাসার পাত্র হইলেন; সদয়, স্নেহময় ও কর্তব্যনিষ্ঠ শিক্ষকও জর্জের শ্রদ্ধাভাজন হইলেন। শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে এরূপ ভাবের উৎপত্তি হইলে ছাত্রের উন্নতি সহজসিদ্ধ। জর্জ একাগ্রতা ও অধ্যবসায়বলে উত্তরােত্তর উন্নতি লাভ করিতে লাগিলেন। তিনি কোন কাজই অর্ধসম্পন্ন রাখিতেন না ; যাহাতে হাত দিতেন, তাহাই সৰ্বাঙ্গসুন্দর করিতে যত্ন করিতেন। তাঁহার হস্তাক্ষর সুন্দর হইল। তিনি লিখিবার সময়ে হাতে কালী লাগাইতেন , অথবা কাগজে অযথা কালীর দাগ লাগাইয়া অক্ষর শ্রীহীন করিতেন , তিনি বানান ভুলিতেন না। যখন অন্য বালকে জানালার ভিতর দিয়া পাখী বা কাঠবিড়াল দেখিত, অথবা পুস্তকের অন্তরালে মুখ লুকাইয়া পকেট হইতে মিঠাই খাইত, তখন জর্জ অঙ্গুলি দ্বারা কর্ণবদ্ধ করিয়া একাগ্রচিত্তে পাঠাভ্যাস করিতেন। গুরুমহাশয় যাহা শিক্ষা দিতে পারিতেন না, তাহা গৃহে পিতার নিকট শিখিতে পাইতেন। শীতকালে সন্ধ্যার সময়ে অগাষ্টিন অগ্নিকুণ্ডের নিকট বসিয়া গ্রীস, নােম প্রভৃতি দেশের প্রাচীন ইতিহাস গল্প করিয়া বলিতেন ; আর জর্জ সে সমস্ত খাতায় লিখিয়া লইয়া কণ্ঠস্থ করিয়া ফেলিতেন। এতদ্ভিন্ন পাটীগণিত, বীজগণিত প্রভৃতি দুরূহ বিষয়ও তিনি পিতার নিকট শিক্ষা করিতেন। সুতরাং পাঠশালার শিক্ষাপ্রণালী অসম্পূর্ণ হইলেও জর্জের তাহাতে কোন ক্ষতি হইত না। জর্জের মত ছাত্র পাইয়া হবি সাহেবের পাঠশালার যথেষ্ট উপকার হইয়াছিল। অন্যান্য ছাত্রেরা জর্জকে আদর্শজ্ঞান করিয়া তাঁহার অনু করণের চেষ্টা করিত; কেহ কোন বিষয়ে অকৃতকার্য হইলে শিক্ষক তাহাকে জর্জের দৃষ্টান্ত দেখাইতেন, জর্জের হাতের লেখা দেখাইয়া বলিতেন, “দেখ, কেমন সুন্দর লেখা; সুন্দর লেখাও যেমন সহজ কাজ, ।

; মহাপুরুষ-চরিত। .-.-.- কদৰ্য লেখাও তেমনি সহজ কাজ। জর্জ লিখিবার কালে যে তােমাদের অপেক্ষা অধিক পরিশ্রম করে তাহা মনে করিও না; কিন্তু সে তােমাদের অপেক্ষা অধিক সতর্ক, এই মাত্র প্রভেদ।” পাঠশালার সকল বালকেই জর্জকে ভাল বাসিত। তিনি কাহারও সহিত বিবাদ করিতেন না, কখনও মিথ্যা কথা কহিতেন না। অন্য বালকদিগের মধ্যে বিবাদ উপস্থিত হইলে জর্জ সাধ্যমত তাহা মিটাই দিতে চেষ্টা করিতেন। এই সকল গুণ ছিল বলিয়া সকলেই তাঁহার , মধ্যস্থ মানিত, এবং তিনি যেরূপ বলিতেন, সচরাচর তদনুসারেই পরি- চালিত হইত। তিনি মারামারিতে মিশিতেন না বলিয়া কেহ কেহ তাঁহাকে “ভীরু,” “কাপুরুষ” প্রভৃতি শব্দ প্রয়ােগ করিয়া গালি দিল কিন্তু তিনি তাহা হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন। তাহার বিশ্বাস ছিল যে, নিরর্থক কলহ করিলে সাহসের কাৰ্য্য হয় না; মিথ্যার প্রতিবাদ, বিবাদের মীমাংসাচেষ্টা এবং অন্যায়াচরণের বাধা প্রদানেই সাহসের প্রকৃত পরিচয়। সুশীল ও সুবােধ ছাত্র শিক্ষকের গৌরবের স্থল। উত্তরকালে জর্জকে উন্নতির সােপানে অধিরােহণ করিতে দেখিয়া হবি সাহেব যে কত সুখী হইয়াছিলেন তাহা কে বলিতে পারে ? ভাল হইবার নিমিত্ত যাহার আন্তরিক ইচ্ছা ও চেষ্টা, সে সকল বিষয়েই ভাল হইতে পারে। জর্জ যেমন একদিকে সর্বাপেক্ষা ভাল লিখিতে পারিতেন, সৰ্ব্বাপেক্ষা ভাল পড়িতে পারিতেন, সেইরূপ অন্যদিকে ক্রীড়াতেও সব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কুর্দন, ধাবন, উল্লম্ফন, সন্তরণ, অশ্বারােহণ প্রভৃতি যে সকল ক্রীড়ায় শরীরের বল বৃদ্ধি হয়, তাহাতেই তাহার সবিশেষ আসক্তি ছিল। কেহই তাহার ন্যায় দৌড়াইতে পারিত না। তিনি ঢিল ছুড়িলে তাহা রাপাহানক নদের অপর পারে গিয়া পড়িত। তিনি বড় বড় ভার অনায়াসে উত্তোলন ও বহন করিতে পারিতেন।

; মহাপুরুষ-চরিত। mond তাঁহার শরীর স্বভাবতঃ সবল ছিল; সুতরাং ব্যায়ামের গুণে শীঘ্রই বলিষ্ঠ হইয়া উঠিল। তাহার বয়স যখন দশ বৎসর মাত্র, তখনই লােকে তাহার সুগঠিত, সবল ও সুদৃঢ় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং সাহস ও সরলতা-ব্যঞ্জক মুখ দেখিয়া বিস্মিত হইত। তিনি দেখিতে সুন্দর ও দীর্ঘকায় ছিলেন ; বয়সের পরিমাণে তাঁহাকে অনেক বড় দেখাইত। জর্জের একজন বাল্য সহচর বলিয়াছেন যে, তিনি কৈশােরেই প্রৌঢ়ের ন্যায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মনের সবলতা লাভ করিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য যে শারীরিক ও মানসিক বলের এই রূপ সুন্দর সমাবেশ থাকাতেই জর্জ ওয়াসিংটন শেষে মানব- সমাজে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করিয়াছিলেন। যিনি শৈশবে ক্রীড়ায় অগ্রণী, তিনি প্রৌঢ়াবস্থায় সমরেও অগ্রণী হইয়াছিলেন। কৃত্রিম-যুদ্ধাভিনয় জর্জের একটি প্রধান ক্রীড়া ছিল। জর্জের বয়ঃক্রম যখন আট বৎসর, তখন কারিবসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে স্পেন দেশীয় লােকের সহিত ইংরাজদিগের বিবাদ উপস্থিত হয়। এতদুপলক্ষে উপনিবেশ বাসীরা ইংলণ্ডরাজের সাহায্যার্থ চারি দল সেনাগঠন করেন। তন্নিবন্ধন কিছুদিন প্রতি পল্লীতে সৈনিকপুরুষদিগের শিক্ষাবিধানের ধুমধাম পড়ি যায়। তাহাদের সামরিক পরিচ্ছদ, সামরিকবাদ্যের তালে তালে পাদ- বিক্ষেপ প্রভৃতি দেখিয়া জর্জের কোমলমনে অলক্ষিতভাবে যুদ্ধবাসনা উদ্দীপ্ত হইয়াছিল। লরেন্স ওয়াসিংটন ইংলণ্ড হইতে শিক্ষালাভ করিয়া ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। তিনি ইহার এক সেনাদলে উচ্চপদ লাভ করিয়া যুদ্ধার্থ চলিয়া গেলেন, আর জর্জ পাঠশালার ছাত্রদিগকে লইয়া কৃত্রিম যুদ্ধের অভিনয় করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি তাহাদিগকে ইংরাজ ও স্পেনিয়ার্ড এই দুই দলে বিভক্ত করিতেন, এবং কখনও শিক্ষাদান, কখনও বা একদল লইয়া অপর দলকে আক্রমণ করিয়া অপার আনন্দ ভােগ করিতেন। যষ্টি, যবের শীষ প্রভৃতি তরবারির কাৰ্য্য করিত এবং পাঠশালার পুনরাবর্তী ভূভাগ সমরাঙ্গনরূপে ব্যবহৃত হইত।

পঠশা ও পিতৃবিয়ােগ লরেন্স দুইবৎসরকাল নৌসেনাধ্যক্ষ ভার্ণন সাহেবের সহকারিরূপে কাৰ্য করিয়া গৃহে প্ৰতিগমন করেন। যুদ্ধকালে তিনি যেরূপ সাহস প্রদর্শন করিয়াছিলেন, তাহাতে সৈনিক বিভাগে থাকিলে নিশ্চিত তাহার পদোন্নতি হইত। কিন্তু সেই সময়ে হঠাৎ তাহার বিবাহ হওয়ায় তিনি সে সঙ্কল্প পরিত্যাগপূৰ্ব্বক পৈতৃক ব্যবসায়েই মনােনিবেশ করেন। তৎকালে ভার্জিনিয়া প্রদেশে উইলিয়ম কেয়ারফা নামক জনৈক শিক্ষিত ও সন্ত্রান্ত ব্যক্তি স্বীয় আত্মীয় লর্ড ফেয়ারফক্সের জমিদারীর তৎ বধান করিতেন। তঁাহার কন্যা এ লরেন্সের পত্নী হইলেন। লরেন্স ফিরিয়া আসিলে জর্জের যুদ্ধবিদ্যাশিক্ষার বাসনা আরও বলবতী হইল। লরেন্স, এই দুই বৎসর কাল কখন কি করিয়াছিলেন, কখন কোন্ বিপদে পড়িয়াছিলেন, কি উপায়ে তাহা হইতে উদ্ধার পাইয়াছিলেন, কিরূপে শদিগের সহিত যুদ্ধ হইয়াছিল, কিরূপে কোন্ পক্ষ কখন জয়লাভ করিয়াছিল, এই সকল কথায় জর্জের কর্ণকুহর পরিতৃপ্ত হইত। যুদ্ধ- কালে সৈনিক পুরুষেরা সচরাচর যে সকল কৌশল অবলম্বন করিয়া থাকেন, এইরূপে স্বাভাবিক প্রতিভাবলে জর্জ তাহা আয়ত্ত করিয়া ফেলিলেন। লরেন্স অনুজের যুদ্ধবিদ্যায় অনুরাগ দেখিয়া নিরতিশয় প্রত হইয়াছিলেন, সুতরাং নিয়ত সেই বাসনা উদ্দীপ্ত রাখিতে চেষ্টা পাইতেন। হবি সাহেবের পাঠশালায় পাঁচবৎসর অধ্যয়নের পর জর্জ পিতৃহীন হইলেন। অগাষ্টিন মৃত্যুর পূর্বে দানপত্র লিখিয়া স্বীয় বিস্তীর্ণ ভূসম্পত্তি পুত্রদিগের মধ্যে বিভাগ করিয়া দিয়াছিলেন। তদনুসারে পটোমাক নদের তীরবর্তী তালুক লরেন্সের এবং রাপাহানক নদের তীরবর্তী তালুক জর্জের হল। জর্জ ও তাহার সহােদবগণ নাবালগ ছিলেন বলিয়া তাঁহাদের জননীর হন্তে সম্পত্তির তত্ত্বাবধানের ভার পড়িল। লরেন্স পটোমাক-তীরে বাস করিতে লাগিলেন, এবং ভূতপূৰ্ব্ব প্রভুর নামানুসারে মহাপুরুষ-চরিত্ব। ঐ সম্পত্তির “ভার্শন শৈল” এই নাম রাখিলেন। তিনি জর্জকে পূর্ব হইতেই ভাল বাসিতেন; এক্ষণে পিতৃবিয়োেগ-নিবন্ধন সেই স্নেহ আরও গাঢ় হইল। পাঠশালার ছুটি হইলেই তিনি জর্জকে ভার্ণন শৈলে লইয়া যাইতেন এবং উপদেশ ও উৎসাহ দ্বারা তাহার উন্নতিসাধনের উপায় দেখিতেন। জর্জের জননী মেরী অসাধারণ বিষয়বুদ্ধি, কাৰ্যকুশলতা ও কর্তব্য নিষ্ঠার সহিত নাবালগ পুত্রদিগের রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষাবিধানে প্রবৃত্ত হইলেন। জর্জের বয়স এখন এগার বৎসর হইয়াছে। অগাষ্টিনের মৃত্যুর পর তাহার গৃহে শিক্ষালাভের সুযােগ গিয়াছে। সুতরাং মেরী জর্জকে হবি সাহেবের পাঠশালায় আর রাখা যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করিলেন না। তৎকালে ঐ অঞ্চলে উইলিয়ম সাহেবের বিদ্যালয়ে কিছু উচ্চ অঙ্গের শিক্ষাবিধান হইত। কিন্তু উহা জর্জের বাটী হইতে অনেক দূরে ছিল। জজের অপর এক বৈমাত্রেয় ভ্রাতা উইলিয়ম সাহেবের বিদ্যালয়ের অদূরে বাস করিতেন। সুতরাং স্থির হইল জজ তাহারই গৃহে অবস্থিতি করিয়া ঐ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করিবেন। যাইবার পূর্বে জননী জজকে কহি- লেন, “তুমি মনােযােগের সহিত পাটীগণিত ও জরিপের কাজ শিক্ষা করিও। আজ কাল জরিপের কাজ জানা নিতান্ত আবশ্যক। নিয়ত নূতন জমির আবাদ হইতেছে; নূতন লােকে আসিয়া আমাদের তালুকের জমি আত্মসাৎ করিবার চেষ্টা করিতেছে। এ অবস্থায় জরিপ জানা থাকিলে এবং নক্সা প্রস্তুত করিতে পারিলে অনেক উপকার হইবার সম্ভাবনা। এখন যেরূপ অবস্থা হইয়া দাঁড়াইল, তাহাতে আমি অধিক শিক্ষার আশা করি না; যদি নিজের তালুক রক্ষা করিয়া, চাস আবাদের দ্বারা জীবিকা-নিৰ্বাহ করিতে পার তাহা হইলেই যথেষ্ট। জজ দেখিলেন যে তাঁহাকে পৈতৃক ব্যবসায়ে লিপ্ত করাই জননীর উদ্দেশ্য। তিনি অণুমাত্র আপত্তি না করিয়া জননীর প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং পঠন্দশা ও পিতৃবিয়ােগ। কহিলেন, “ভাল, তাহাই করিব। ব্যবসায় সম্বন্ধে আমার ভাল মন্দ বিচার নাই ; যে যে ব্যবসায়ই অবলম্বন করুক না কেন, সুন্দররূপে চালাইতে পারিলে তাহাতেই তাহার শ্রীবৃদ্ধি ও সম্মান লাভ হয়।” উইলিয়ম সাহেব একজন বিচক্ষণ শিক্ষক। তিনি দেখিলেন যে, জর্জ পাটীগণিতে বিলক্ষণ ব্যুৎপন্ন হইয়াছেন। সুতরাং কালবিলম্ব না করিয়া তাহাকে জরিপ শিখাইতে আরম্ভ করিলেন। তৎকালে নক্সা প্রস্তুত করিবার জন্য অনেক আমিনের প্রয়ােজন হইত। সুতরাং জরিপের কাজ জানিলে সকলেই বিলক্ষণ অর্থোপার্জন করিতে পারিত। বিদ্যালয়ের চতুম্পার্শ্বে বিস্তর পতিত জমি ছিল। জজ হাত পাকাইবার নিমিত্ত প্রথম প্রথম তাহারই জরিপ ও নক্সা প্রস্তুত করিতে লাগিলেন। জজ শৈশবে যে সকল গুণের জন্য গ্রাম্য পাঠশালায় গুরুমহাশয়ের প্রিয় পাত্র হইয়াছিলেন, বয়ােবৃদ্ধি-সহকারে সেই সকল গুণ ক্রমশঃ পরিণতি লাভ করিয়া এই বিদ্যালয়েও তাহাকে শিক্ষকের প্রতিভাজন করিয়া তুলিল। ক্রীড়া, কৃত্রিম সমরাভিনয়, হস্তলিপি, জরিপ প্রভৃতি সমস্ত বিষয়েই তিনি সৰ্বদিসম্মত প্রাধান্য লাভ করিলেন। তিনি এয়ােদশ বর্ষ বয়ঃক্রমকালে শিক্ষার উদ্দেশ্যে জমি জরিপ করিয়া যে সকল চিঠা ও নক্সা প্রস্তুত করিয়াছিলেন, অনেক প্রবীণ ও বহুদশী আমিনও তাহা অপেক্ষা ভাল করিতে পারেন না। আমেরিকার লােকে জজ ওয়াসিংটনের পঠন্দশার এই সকল খাতা অতি যত্নসহকারে রক্ষা করিয়া- ছেন। ঐ সমস্ত দেখিলেই স্পষ্ট প্রতীত হয় যে, করণীয় বিষয় যতই জটিল হউক না কেন, তিনি কিছুতেই তাহা সুসম্পন্ন না করিয়া ছাড়িতেন না। তাহার সকল উদ্যমেই সুশৃঙ্খলা ছিল, এবং সেই জন্য তিনি যাহা ধরিতেন। তাহাতেই কৃতকার্য হইতেন। উইলিয়ম সাহেবের বিদ্যালয়েও সহাধ্যায়িগণ জর্জের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হইয়াছিল। তাহার অপক্ষপাত ও সত্যানুরাগে সকলেরই আস্থা মহাপুরুষ-চরিত। ২১ ছিল। সুতরাং কোন মতভেদ হইলে তিনি যেরূপ মীমাংসা করিয়া দিতেন, উভয় পক্ষে একবাক্যে তদনুসারে পরিচালিত হইত। জজ সাতিশয় যত্ন সহকারে একখানা খাতায় পাট্টা, কবুলতি, খত, হুঙী, দানপত্র, মােক্তার নামা প্রভৃতি বিষয়কৰ্ম্ম-সংক্রান্ত বহুবিধ দলিলের আদর্শ লিখিয়া রাখিয়াছিলেন। একদা একজন সহাধ্যায়ী উহা দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসিলেন, “জজ, ইহাতে তােমার কি উপকার হইবে ?” জর্জ কহিলেন, “আমি যখন বড় হইয়া বিষয়কৰ্ম্ম করিব, তখন এই সকল দেখিলে আর আমাকে কথায় কথায় উকীলের বাড়ী যাইতে হইবে না। জর্জ কতদূর পরিণামদর্শী ছিলেন ইহাই তাহার যথেষ্ট প্রমাণ। অনেক বালকে মনে করে যে, তাহারা চিরকালই বালক থাকিবে। বড় হইলে কি করিবে, তাহা তাহারা একবারও ভাবিয়া দেখে না। আর এক খানা খাতায় তিনি সামাজিকতা সম্বন্ধে একশত দশটী উপদেশ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। ঐ উপদেশগুলি তাহার নিজের রচনা কি না, নিশ্চিত বলা যায় না; কিন্তু সংগ্ৰহমাত্র হইলেও ব্রয়ােদশবর্ষবয়স্ক বালকের পক্ষে সামান্য বুদ্ধি ও বিবেচনার পরিচায়ক নহে। সে গুলি কত উৎকৃষ্ট, তাহা দেখাইবার নিমিত্ত নিয়ে কয়েকটীর অনুবাদ প্রদত্ত হইল :- “বিবেচনা না করিয়া কথা কহিও না। তাড়াতাড়ি কথা কই অন্যায়। উচ্চারণ সুস্পষ্ট না হইলে কেহ তাহাতে মন দেয় না। “যেখানে দশজনে আমােদ আহলাদ করিতেছেন, সেখানে দুঃখের কথা তুলিও না ; অথবা যে খানে দশ জনে দুঃখের কথা কহিতেছেন, সেখানে হাস্য-পরিহাস করিও না। “যখন দেখিবে কেহই তােমার পরিহাসে সুখবােধ করিতেছেন না, তখন পরিহাস পরিত্যাগ করিবে। অট্টহাস্য ভদ্রতা-বিরুদ্ধ। “যেখানে দশ জনে মিলিয়া কথােপকথন বা তর্ক-বিতর্ক করিতেছেন, পঠশা ও পিতৃবিভােগ সেখানে যিনি যাহা বলেন, অবহিতচিত্তে শ্রবণ করিবে। তখন পার্শ্ব লােকের সহিত বাক্যালাপ করিয়া শ্রোতাদিগের বিরক্তি জন্মাইও না। বক্তা নিজের মনের ভাব ভালরূপে প্রকাশ করিতে না পারিলেও, তুমি অযাচিতভাবে তঁাহার কাণে কাণে কথা কহিয়া সাহায্য করিতে যাইও । বক্তার কথা শেষ না হইলে তাঁহাকে বাধা দিও না, বা তাহার কথার উত্তর দিও না। “প্রবীণ ব্যক্তিদিগের সমক্ষে আকার ইঙ্গিতে বা কথাবার্তায় বাচালতা বা চপলতার পরিচয় দিও না। অশিক্ষিত লােকের নিকট দুরূহ বিষয়ের আলােচনা করিয়া পাণ্ডিত্য দেখাইও না। লােকের নিন্দাবাদ করিও না। তােষামােদ করাও দুষ্য। নিন্দা বা প্রশংসা কোন কাজেই তিলকে তাল করা বড় অন্যায়। “কেহ জিজ্ঞাসা না করিলে পরামর্শ দিও না; পরামর্শ দিবার প্রয়ােজন হইলে তাহা সংক্ষেপে দেওয়া উচিত। “যেখানে দশজনে সমবেত হইয়া কোন কাৰ্য্য বা পরামর্শ করিতেছেন, সেখানে হঠাৎ প্রবেশ করিও না। অগ্রে বিবেচনা করিয়া দেখিবে তাহারা তােমার উপস্থিতি হেতু সন্তুষ্ট না বিরক্ত হইবেন। বিরক্তির সম্ভাবনা থাকিলে সে স্থান ত্যাগ করিবে। “অন্যের গােপনীয় বিষয় জানিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিও না। যাহারা গােপনে কথা কহিতেছেন, তাঁহাদের নিকাটে যাইও না। “লােকে যে কারণেই বিপন্ন হউক না কেন, বিপদের সময় কাহাকেও বিদ্রুপ করিও না। যদি শত্রুর বিপদ ঘটে, তাহাতেও সুখবােধ করিও “ভােজর সময় খাদ্যদ্রব্যের দোষ উল্লেখ করিয়া বিরক্তি প্রকাশ করিও না।” লরেন্স একদিন জজের এই খাতা দেখিয়া স্বীয় সহধর্মিণীকে বলিয়া- মহাপুরুষচরিত। ছিলেন, “যদি অঙ্কুর দেখিয়া বৃক্ষের ভবিষ্যৎ নির্ণয় করা যায়, যদি বৈশাখে বৃষ্টিপাত দেখিয়া ভাদ্রে আশু ধান্যের আশা করা যায়, তাহা হইলে ছাত্র- জীবনের এইরূপ আরম্ভকেও কার্যক্ষেত্রে মহানুষ্ঠানের সূচনা বলিয়া মনে করা যাইতে পারে।” এইরূপে প্রতিদিন নানাবিধ জ্ঞানরত্নে বিভূষিত হইয়া জর্জ যােড়শ বর্ষ বয়সে উইলিয়ম সাহেবের বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিলেন। বর্তমান কালের বড় বড় কলেজের সহিত তুলনা করিলে হবি ও উইলিয়ম সাহেবের বিদ্যালয়কে সামান্য গ্রাম্য পাঠশালা ভিন্ন আর কিছুই বলা যায় না। কিন্তু আজ মাতা, পিতা ও ভ্রাতার সাহায্যে এবং নিজের অদম্য উৎসাহ ও অধ্যবসায়-বলে যেরূপ সুশিক্ষিত হইয়াছিলেন, কয় জন কলেজের ছাত্র সেরূপ হইতে পারেন? তাঁহার বিদ্যা অপেক্ষা চরিত্রই অধিক প্রশংসনীয় ছিল। লােকে সেই চরিত্রগুণে এমনই মুগ্ধ হইত যে, জর্জের বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিবার কালে শিক্ষক ও সহাধ্যামিবৃন্দ কেহই অ- সংবরণ করিতে পারেন নাই।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ
মাতৃভক্তি।
মা
তাপিতার প্রতি ভক্তি-প্রদর্শন, অকুণ্ঠিতচিত্তে তাঁহাদের
আজ্ঞাবহন, মানবহৃদয়ের সৰ্বপ্ৰধান ধৰ্ম্ম। যে সকল
মহাত্মা অসাধারণ কার্য সম্পন্ন করিয়া পৃথিবীতে যশস্বী
হইয়াছেন, তাঁহাদের অনেকেরই চরিত্রে এই পবিত্র
ধর্মের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। ওয়াসিংটনও এই
শ্রেণীর লােক ছিলেন। পিতৃবিয়ােগের পর তিনি
পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক অবধানের সহিত জননীর আদেশানুসারে কাৰ্য
করিতেন, যাহাতে তাহার মনে কোনও রূপ আঘাত না লাগে, যাহাতে
ঘুণাক্ষরেও তাঁহার অপ্রীতির কারণ না হয়, তাহাই তাঁহার একমাত্র
লক্ষ্য ছিল। এরূপ আজ্ঞাবহ পুত্রের মঙ্গলকামনায় স্নেহময়ী মাতৃদেবী
ভগবানের বিকট যে প্রার্থনা করেন তাহা কখনও ব্যর্থ হয় না।
* আমরা এখন হইতে জর্জ ওয়াশিংটনকে কখন ও “জর্জ”, কখনও (সাধারণত)
ওয়াসিংটন" বলি।

মহাপুরুষ-চরিত। ~~~~~ ওয়াশিংটনের জননী মেরীর অনেক অসাধারণ গুণ ছিল। তাঁহার ধ্রুব বিশ্বাস ছিল যে, গুরুজনের আজ্ঞাপ্রতিপালনই গার্হস্থ্য জীবনের প্রধান কর্তব্য। যে গুরুর আদেশ মানে না, তাহার নিকট ঈশ্বরের আদেশও গ্রাহ নহে; সুতরাং তাদৃশ পাষণ্ডের পক্ষে কোন দুই অকরণীয় নয়। যে গুরুজনের অবহেলা করে, সে পরিজনের শক্ত, দেবতার শত্রু, সুতরাং জগতের শত্রু। এই মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া তিনি এক দিকে যেমন নিজে অনন্তমনে পতিসেবা করিয়া প্রীতিলাভ করিতেন, সেইরূপ অন্যদিকে পুত্রকন্যা ও ভৃত্যদিগের পূজনীয় হইয়া সুখী হইতেন। তাহার কথাবার্তা, আচার অনুষ্ঠান, সমস্তই আড়ম্বরশূন্য অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ ছিল। তাহার প্রকৃতিতে যেন এমন কি একটী অনন্যসাধারণ ভাব ছিল যে, সকলেই তাহাকে ভয় করিয়া চলিত, - পাছে তিনি বিরক্ত হন, পাছে কোন রূপ চপলতা বা অসৌজন্য দেখিয়া তাহার অসন্তোষ জন্মে, সেই চিন্তায় সশক থাকিত। অথচ তিনি কাহারও সহিত কর্কশ ব্যবহার করিতেন না; কাহাকেও রূঢ় কথা কহিতেন না। তিনি বিপদে ধীরা, কর্তব্যে অবিচলিত, ধর্মে নিষ্ঠাবতী এবং অন্যের অনুগ্রহগ্রহণে পরায়ুখী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক আত্মীয় স্বজন সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণার্থ তাঁহার সাহায্য করিতে অগ্রসর হইয়া- ছিলেন। কিন্তু তিনি তাহা গ্রহণ করিতেন না, বলিতেন, “ঈশ্বর আমার ঋন্ধে যে ভার অর্পণ করিয়াছেন তাহা আমিই বহন করিব ; তন্নিমিত্ত অপর কাহাকেও কষ্ট দিব না। আপনারা আমাকে যখন যে সৎ পরামর্শ দিবেন, তাহা সানন্দচিত্তে গ্রহণ করিব; কিন্তু এতদ্ভিন্ন অন্য কোনও রূপে আমি আপনাদিগের গলগ্রহ হইব না।” একাগ্রচিত্তে মাতৃসেবা করায় জর্জ ওয়াসিংটন, কালে এই সমস্ত গুণের অধিকারী হইয়াছিলেন। একদিন জর্জ কতিপয় বাল্যসহচরের সহিত বাটীর সম্মুখের মাঠে বেড়াইতেছিলেন, এমন সময়ে একটা আরবদেশীয় অশ্ব তাহাদের সম্মুখে মাতৃভক্তি। উপস্থিত হইল। ঐ অশ্বটী মেরীর গাড়ি টানিত ; কিন্তু কাহাকেও পৃষ্ঠে উঠিতে দিত না। কেহ কেহ উহার চাল চলন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রভৃতির প্রশংসা করিতেছেন দেখিয়া জজ হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, “আমার এই ঘােড়াটায় চড়িতে ইচ্ছা হয় ; যদি কেহ আমাকে উহার পিঠে উঠাইয়া দিতে পারে, তাহা হইলে একবার চেষ্টা করিয়া দেখি।” ইহা শুনিয়া সহচরগণ তাহাকে চড়িতে অনুরােধ করিলেন। কিন্তু তখনই জননীর কথা মনে পড়ায় জজের চিত্ত দোলায়মান হইল। তিনি কহিলেন, “ঘােড়াটার দুষ্ট প্রকৃতির পরিচয় পাইয়া মা সকলকেই উহার উপর চড়িতে নিষেধ করিয়া দিয়াছেন। এক্ষণে আমি চড়িতে চেষ্টা করিলে তাহার কথার অন্যথাচরণ হইবে।” কিন্তু বন্ধুগণ কিছুতেই ক্ষান্ত হইলেন না। তাহারা কহিলেন, “তুমি যদি একবার চড়িয়া ঘােড়াটার স্বভাব ফিরাইতে পার, তাহা হইলে তােমার মা বরং সন্তুষ্টই হইবেন।” এইরূপে পুনঃ পুনঃ অনুরুদ্ধ হইয়া শেষে জজ তাঁহাদের প্রস্তাবেই সম্মত হইলেন। পরদিন প্রাতঃকালে জজ ও তাহার বন্ধুগণ সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া ঘােটক ধরিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন এবং অনেক ছুটাছুটির পর উহার মুখে লাগাম পরাইলেন। অনন্তর ঘােটক মাঠের মধ্যস্থানে আনীত হইল, এবং ওয়াসিংটন বিদ্যুদবেগে উহার পৃষ্ঠে উঠিয়া লাগাম ধরিলেন। তাহার এই ক্ষিপ্ৰকারিতায় অশ্ব ও দর্শকবৃন্দ সকলেই তুল্যরূপে বিস্মিত হইল। বন্ধুরা চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন, “জজ, সাবধান হও, নচেৎ পড়িয়া যাইবে।” এ দিকে অশ্ব কখনও পশ্চাতের দুই পায়ে ভর দিয়া সম্মুখের দুই পা উপরে উঠাইতে লাগিল; কখনও পশ্চাতের দুই পা উন্ধে তুলিতে লাগিল, কখনও কিয়দ্র নক্ষত্ৰবেগে ছুটিয়া হঠাৎ থামিতে লাগিল। ফলতঃ আরােহীকে ফেলিয়া দিবার নিমিত্ত যত রূপ উপায় আছে সমস্তই অনুষ্ঠিত হইল, কিন্তু জজ কিছুতেই আসনচ্যুত হইলেন না। বারংবার বিফল-প্রযত্ন হইয়া শেষে অশ্ব ভয়ঙ্কর শ্রুতবেগে মহাপুরুষ চরিত। ধাবমান হইল। সঙ্গীরা ভয়বিহবলচিত্তে নিস্তব্ধভাবে অবলােকন করিতে লাগিলেন। তাহাদের ভয় হইল জজ পড়িয়া গেলে তাঁহার মস্তক চূর্ণীকৃত হইয়া যাইবে। কিন্তু কিয়ৎক্ষণ পরে অশ্বই পড়িয়া গেল, সঙ্গীরা দৌড়াইয়া গিয়া দেখেন জজ তখনও উহার পৃষ্ঠে সমাসীন। তিনি কহিলেন, “কাজটা বড় অন্যায় হইল, ঘােড়াটা মরিয়া গেল; এখন দেখিতেছি না চড়িলেই ভাল হইত। মা শুনিলে কি মনে করিবেন ? বাস্তবিকই লম্ফঝম্প করিবার কালে মুখে লাগাম লাগিয়া অশ্বের একটা শিরা কাটিয়া গিয়াছিল, এবং তাহা হইতে রক্তস্রাব হওয়ায় উহার মৃত্যু ঘটিয়াছিল। অনন্তর আহারের সময় বালকেরা গৃহে সমবেত হইলে মেরী জিজ্ঞাসি লেন, “তােরা আজ বেড়াইবার কালে সেই দুষ্ট ঘােড়াটা দেখিয়াছি কি?” জজ কহিলেন, “মা, সে ঘােড়াটা মরিয়া গিয়াছে।” মেরী অতিমাত্ৰ বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “মরিয়াছে ? বলিস্ কি, কি রকমে মরিল ?” তখন জজ আনুপূর্বিক সমস্ত বৃত্তান্ত বৰ্ণন করিলেন এবং কহিলেন “মা, আমি নিতান্ত অন্যায় কাজ করিয়াছি; তাহার জন্য যথেষ্ট অনুতাপও ভােগ করিতেছি। তুমি এবার আমায় ক্ষমা কর ; আমি আর কখনও তােমার কথার অবাধ্য হইব না।” পুত্রের কথা শুনিয়া মেরীর আনন্দের পরিসীমা রহিল না। তিনি বাষ্পগদগদকষ্ঠে কহিলেন, “বাবা, তােকে ক্ষমা করিব না? তুই যে আমার নিকট প্রকৃত কথা কহিলি, ইহাতেই আমার সকল দুঃখ ঘুচিল। আমি তােকে ক্ষমা করিলাম। আশা করি অদ্যকার ঘটনায় তাের শিক্ষালাভ হইবে; তুই আর কখনও আমার কথার প্রতিকূলে চলিবি না।” ওয়াসিংটনের জীবনে এই একবার মাত্র তিনি জননীর আদেশের বিরুদ্ধাচারী হইয়াছিলেন। কিন্তু এবারও জননীকে অবহেলা করা মাতৃভক্তি ; তাহার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি ভাবিয়াছিলেন একটা দুষ্ট ঘােটককে সুশিক্ষিত করিতে পারিলে মেরী সুখী হইবেন। উইলিয়ম সাহেবের বিদ্যালয় ত্যাগ করিবার পর ওয়াসিংটন কিছুদিন ভার্ণনশৈলে লরেন্সের নিকট গণিত ও জরিপের কাজে আরও পরিপকতা লাভ করিয়াছিলেন। লরেন্সের ভূতপূর্ব সমর-সহচরগণ মধ্যে মধ্যে ভার্ণনশৈলে গিয়া তদীয় আতিথ্য গ্রহণ করিতেন। ওয়াসিংটন তাহাদের সহিত আলাপ করিতেন এবং সাগ্রহচিত্তে যু-সংক্রান্ত গল্পাদি শুনিতেন। সুতরাং অল্পদিনের মধ্যেই তাঁহার হৃদয়নিহিত সুপ্ত প্রায় সমরবাসনা পুনর্বার জাগরূক হইল। লরেন্স এই ইচ্ছার অনুকূল ছিলেন ; সুতরাং তাঁহার চেষ্টায় ওয়াসিংটন ইংলণ্ডেশ্বরের রণতরী-বিভাগে একটা পদ পাইলেন। মেরী প্রথমে অনেক আপত্তি করিয়াছিলেন, বলিয়াছিলেন এরূপ কাজে চরিত্রদোষ ঘটিবার সম্ভাবনা; সম্পত্তি বা সম্মান অপেক্ষা চরিত্রই অধিক মূল্যবান্ ; সুতরাং আমি জর্জকে সামরিক ব্যবসায়ে প্রবিষ্ট হইতে দিব না।” কিন্তু শেষে লরেন্সের সনির্বন্ধ অনুরােধবশতঃ তিনি নিতান্ত অনিচ্ছাপূৰ্ব্বক সম্মতি দিলেন। ওয়াসিংটন মহানন্দে গমনের উপযােগী দ্রব্যাদি ক্রয় করিয়া জাহাজে তুলিলেন এবং জননীর নিকট বিদায় লইবার নিমিত্ত গৃহে গমন করিলেন। কিন্তু তাঁহাকে দেখিবামাত্র মেরীর হৃদয়ে ভাবান্তর উপস্থিত হইল; তিনি ভাবিলেন, “জজ রণতরীতে গেলে হয় ত আর ফিরিয়া আসিবে না। সুতরাং অসংবরণ করিতে না পারিয়া কহিলেন, “বাছা! আমি তােকে কিছুতেই যাইতে দিব না।” “সে কি মা? আমি যে চাকরী লইয়াছি, আর জাহাজে জিনিষ পত্ৰ তুলিয়াছি ?” “না জজ; যদি তুই তাের অভাগিনী মাকে বধ করিতে না চাস, তবে এখনই তাের চাকরী ত্যাগ কর, আর জিনিষ পত্র ফিরাইয়া ; মহাপুরুষচরিত। wan আন্।” ওয়াসিংটন আর সহিতে পারিলেন না। তিনিও কান্দিয়া ফেলিলেন এবং কহিলেন “মা, তুমি যখন এত কষ্টবােধ করিতেছ, তখন আমি ক্লান্ত হইলাম ; তুমি যাহা বলিতেছ তাহাই করিব।” ওয়াসিংটন স্বেচ্ছানুবর্তী হইয়া সামরিক ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইলে যে সুখ বােধ করিতেন, আজ জননীর মনন্তুষ্টিসম্পাদনার্থ লব্ধ পদ ত্যাগ করিয়া তদপেক্ষা শতগুণে অধিক বিমলানন্দ ভােগ করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহা বলিয়া যখন দেশের হিতসাধনার্থ যুদ্ধের প্রয়ােজন হইয়া- ছিল, তখন মেরী পুত্রকে সৈনিক বিভাগে প্রবেশ করিতে নিষেধ করেন নাই। উক্ত ঘটনার কিছুদিন পর উপনিবেশগুলির রক্ষার নিমিত্ত ফরাসী দিগের সহিত ইংরাজদিগের বিবাদ উপস্থিত হইল ; উপনিবেশবাসীরা ইংরাজদিগের সাহায্যার্থ সেনা যােগাইতে লাগিলেন এবং ওয়াসিংটন সৈনিকব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইলেন। মেরী কহিলেন জর্জ, তুমি দেশের মঙ্গলার্থ যুদ্ধ করিতে যাইতেছ; এ সময়ে আমি বাধা দিয়া পাতকিনী হইব না। যাও, ভগবান্ যাহা করেন তাহাই ঘটিবে। আমি একাগ্র- মনে তােমার মঙ্গলকামনায় তাহাকে ডাকি।” আরও কতিপয় বর্ষ পরে, যখন ওয়াসিংটন অসামান্য রণপাণ্ডিত্যদ্বারা উপনিবেশসমূহকে ইংলণ্ডের অধীনতাপাশ হইতে বিমুক্ত করিয়া, অমল-বীর-যশে বিভূষিত হইয়া, সমস্ত সভ্যজগতের বরণীয় হইয়াছিলেন, তখনও কেহ মেরীর নিকট তাহার গুণকীর্তন করিলে তিনি কহিতেন, “মানুষের সাধ্য কিছুই নহে; সমস্তই ভগবানের ইচ্ছা, সুতরাং তিনিই ধন্যবাদের পাত্র। আমি জজকে শৈশবাবধি সৎপথে থাকিতে শিক্ষা দিয়াছি। সেই শিক্ষায় যে ফল ফলিয়াছে তাহা ভগবানেরই কৃপা।” ইংলণ্ডের সহিত আমেরিকার ছয় বৎসরকাল ঘাের যুদ্ধ চলিয়াছিল। এই দীর্ঘকালে মেরী একদিনের জন্যও পুত্রের মঙ্গলার্থ ঈশ্বরকে ডাকিতে ভুলেন নাই। ইংরাজদিগের সহিত যুদ্ধ শেষ হইলে ওয়াসিংটন মাতৃচরণদর্শনার্থ মাতৃভক্তি একাকী পদব্রজে গৃহে প্রতিগমন করেন। দীর্ঘকাল পরে বিজয়-শ্রীলাহিত পুত্রবরকে ক্রোড়ে করিয়া জননীর বক্ষঃস্থল আনন্দাশ্রু-পরিপ্লুত হইল। কিয়ৎক্ষণ পর্যন্ত তিনি কোন কথাই কহিতে পারিলেন না। অনন্তর বাক্যস্ফুৰ্ত্তি হইলে বলিলেন “জজ,ঈশ্বর আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছেন; আজ তাহারই কৃপায় আমি পুনৰ্ব্বার তােমার মুখ দেখিতে পাইলাম।” সুপ্রসিদ্ধ ফরাসী সেনাপতি লাফেট, উপনিবেশবাসীদিগের সাহায্য করিয়াছিলেন। তিনি একদা মেরীর সঙ্গে দেখা করিয়া মুক্তকণ্ঠে ওয়াসিংটনের গুণগ্ৰাম বৰ্ণনপূর্বক বীর-জননীকে অভিনন্দন করিতে লাগিলেন। কিন্তু ততটা প্রশংসা মেরীর ভাল লাগিল না। তিনি কিয়ৎক্ষণ শুনিয়া বলিলেন “মহাশয়! জজ যাহা করিয়াছে, তাহাতে আমি বিস্মিত হইবার কোনও কারণ দেখি না। সে কখনও আমার কথার অবাধ্য হয় নাই।” মেরীর বয়স যখন তিরাশী বৎসর, সেই সময়ে ওয়াসিংটন জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিতরাজ্য-সমূহের সভাপতির পদে বরিত হইলেন। নিতান্ত অনিচ্ছা থাকিলেও তিনি দেশহিতার্থ এই পদ গ্রহণ না করিয়া থাকিতে পারিলেন না। যাইবার পূর্বে জননীকে কহিলেন “মা! আমি এ সম্মানে সুখী হই নাই। তােমার যেরূপ বয়স হইয়াছে, আর আমার শরীরের যেরূপ অবস্থা, তাহাতে এক্ষণে গৃহে থাকিতে পারিলেই ভাল হইত। কিন্তু কি করি, কিছুতেই এড়াইতে পারিতেছি না। তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে অনুমােদন করিলেই আমি কাৰ্য্যস্থানে গমন করিতে পারি।” মেরী কহিলেন, “বাছা, ঈশ্বর তােমাকে যে পথে চালাইতেছেন, সেই পথে অগ্রসর হও; আমি কিছুতেই তােমাকে তাহা হইতে ফিরাইব না। আমি আর অধিক দিন বাঁচিব না সত্য; হয়ত তুমি ফিরিয়া আসিয়া আমাকে আর ইহলােকে দেখিতে পাইবে না; কিন্তু যখন সকলে একবাক্যে তােমার সাহায্য প্রার্থনা করিতেছে, তখন নিজের সুখের মহাপুরুষ-চরিত। জন্য তােমাকে গৃহে আবদ্ধ রাখিলে নিতান্ত স্বার্থপরতার কাৰ্য্য হইবে। তুমি যাও, বিশ্বস্তভাবে কৰ্তব্যপালন কর; ঈশ্বর তােমাকে সিদ্ধকাম করিবেন।” জননীর এই বীরস্বভাবপূর্ণ বিদায়বাক্য শুনিয়া শতক্ষেত্রে রণজয়ী, সপ্তপঞ্চাশববয়স্ক ওয়াসিংটনের হৃদয় বিগলিত হইল; জননীর পরিণাম ভাবিয়া, কৌমারের সেই স্নেহ মমতা, জ্ঞানগর্ভ উপ- দেশাবলী স্মরণ করিয়া, তিনি বালকের ন্যায় ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। ওয়াসিংটন গৃহে প্ৰতিগমন করিয়া জননীকে আর দেখিতে পাইলেন । ১৭৭৯ খ্রীষ্টাব্দে শীতিবর্ষ বয়ঃক্রমকালে মেরী অনন্তধামে চলিয়া গেলেন। ১৮৩০ অব্দে নবইয়র্ক নগরের সাইলাস ব্যানােস নামক এক ধনকুবের নিজ ব্যয়ে তাহার সমাধিস্থানের উপর মর্মর প্রস্তরের এক প্রকাণ্ড স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাইয়া দিয়াছেন। সম্মিলিতরাজ্য-সমূহের তদানীন্তন সভাপতি জ্যান স্বয়ং উহার ভিত্তি স্থাপন করেন। উক্ত স্তম্ভের পাদদেশে বড় বড় অক্ষরে কেবল এই কয়েকটী কথা লেখা আছে - ওয়াসিংটনের মাতা মেরী। এরূপ অল্প কথায় এতদপেক্ষা হৃদয়গ্রাহী কোন বাক্য কখনও কোন সমাধিমন্দিরের উপর অঙ্কিত হইয়াছে কি না সন্দেহ। যাহারা জানেন জর্জ ওয়াসিংটন কিরূপ অলৌকিক গুণপরম্পরায় অলঙ্কত ছিলেন এবং ঐ সকল গুণের জন্য তিনি স্বীয় গর্ভধারিণীর নিকট কতদুর ঋণী ছিলেন, তাঁহারাই বুঝিবেন “ওয়াসিংটনের মাতা” বলিয়া পরিচিত হওয়াতে মেরীর কত গৌরবের কারণ হইয়াছে।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। আমিনী। জ ও লরেন্সের মধ্যে অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল। জজের পবিত্র চরিত্র, তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও সবলদেই দেখিয়া লরেন্স নিশ্চিত বুঝিয়াছিলেন যে, উত্তরকালে এই বালক এক জন অসাধারণ লােক হইবে। সুতরাং তাহার মনােবৃত্তি সমূহকে আরও পরিমার্জিত করিবার নিমিত্ত লরেন্স যথাসাধ্য যত্ন করিতে লাগিলেন। ঐ উদ্দেশ্যে তিনি জজকে প্রায় সর্বদাই নিজের নিকট রাখিতেন। জর্জের জননী প্রথম প্রথম ইহাতে আপত্তি করিয়াছিলেন; কারণ হার আশা ছিল যে জর্জ বিদ্যালয়- পরিত্যাগের পর গৃহে থাকিয়া বিষয়কার্যে মনােনিবেশ করিবেন এবং পৈতৃক ব্যৱসায় অবলম্বনপূৰ্ব্বক সংসারযাত্ৰানির্বাহের উপায় দেখিবেন। কিন্তু লরেন্স তাঁহাকে বুঝাইয়া দিলেন যে “জর্জের মত লােক কখনই সামান্য অবস্থায় জীবন কাটাইবেন না; তাঁহার যেরূপ লক্ষণ দেখা যায় আমিনী তাহাতে কালে তিনি এক জন বিলক্ষণ বড় লােক হইবেন; সুতরাং এখন হইতেই তাঁহার রীতি নীতি ও শিক্ষাবিধান তদুপযােগ হওয়া আবশ্যক। জর্জকে নিয়ত তাঁহার নিজের তত্বাবধানে না রাখিলে ঐ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে না। তাহার বাটীতে সর্বদা গণ্যমান্য ভদ্র লােকের গতিবিধি থাকায় জর্জ তাহাদের সংস্রবে অনেক প্রয়ােজনীয় বিষয়ে অভিজ্ঞতালাভ করিতে পারিবে।” লরেন্সের এই সমস্ত যুক্তিসঙ্গত কথা শুনিয়া মেরীর আর আপত্তি রহিল না ; জর্জ অত্যন্ত আহলাদের সহিত অগ্রজের গৃহে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। জর্জের শিক্ষাবিধান সুন্দররূপেই চলিতে লাগিল। লরেন্স নিজে তাঁহাকে গণিত, ইতিহাস প্রভৃতি বিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগিলেন এবং তরবারিচালন ও বহরচনা শিক্ষ। দিবার নিমিত্ত দুই জন স্বতন্ত্র শিক্ষক নিযুক্ত করিয়া দিলেন। লরেন্সের শ্বশুর উইলিয়ম ফেয়ারফক্সের কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। তিনি, তাঁহার পুত্রকন্যাগণ এবং তাহার আত্মীয় লর্ড ফেয়ারফক্স, ইহারা সকলেই সুশিক্ষিত, সুরুচিসম্পন্ন ও সচ্চরিত্র ছিলেন। ওয়াসিংটনের চরিত্রে এমনই মাধুৰ্য ছিল যে তাঁহার সহিত একবার আলাপ করিলে সকলেই তাহার গুণে মুগ্ধ হইত এবং তাহাকে মনে প্রাণে ভালবাসিত। ফেয়ারফাক্স-গােষ্ঠীর সহিত তাঁহার আলাপ হইল এবং তাহারা সাদরে তাহাকে আপনাদিগের গৃহে লইয়া যাইতে লাগিলেন। এই মার্জিতরুচি ভদ্ৰপরিবারের সহিত ঘনিষ্ঠতা হওয়াতে তিনি অল্পদিনের মধ্যেই একজন সুন্দর সামাজিক লােক হইয়া উঠিলেন। তাহার কথা বার্তা, আচার ব্যবহার, রীতি নীতি সর্বথা গ্রাম্যদোষ- বিবর্জিত হইল। লর্ড ফেয়ারফক্সের প্রকৃতি অতি সুন্দর ছিল। তিনি বিদ্যাচর্চা, ব্যায়াম, অশ্বারােহণ, মৃগয়া প্রভৃতি নির্দোষ বিষয়ে ব্যাপৃত থাকিয়া জীবনযাপন করিতে ভাল বাসিতেন। সুতরাং যখন দেখিলেন যে ৩ মহাপুরুষ-চরিত ওয়াসিংটনও বিদ্যানুরাগী, বিনয়ী, অশ্বারােহণপটু ও মৃগয়ানিপুণ, তখন তিনি তাঁহাকে পুত্রবং স্নেহ করিতে লাগিলেন। প্রায় সকল কার্যোই ওয়াসিংটন তাঁহার নিত্যসহচর হইয়া উঠিলেন। লর্ড ফেয়ারফক্সের বহুযােজনব্যাপী জমিদারীর পশ্চিমাংশে তখনও উপনিবেশবাসীরা কৃষিবিস্তার করিতে সমর্থ হন নাই। সে অঞ্চলের অধিকাংশ নিবিড় বনে সমাচ্ছন্ন ছিল ; তথায় ভীষণ বন্য জন্তু এবং ভীষণ- তর আদিম নিবাসীরা নিঃশঙ্কচিত্তে বিচরণ করিত। মধ্যে মধ্যে কোন কোন নিঃস্ব শ্বেতকায় লােকে ঐ সকল বনের মধ্যে গােপনে বাসস্থান নিৰ্মাণ করিত বটে, কিন্তু তাহারা ভূস্বামীকে কর দিত না; কর চাহিলেই নানাবিধ ছল অবলম্বনপূর্বক জমিদারের সহিত বিবাদ করিত। আবার ফরাসীরাও তৎকালে এই অঞ্চলে আপনাদিগের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করিতেছিলেন। এই সমস্ত কারণে ফেয়ারফক্স দেখিলেন যে, জমিদারীর ঐ অংশের সীমা নির্ধারণ করা নিতান্ত আবশ্যক হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু মানচিত্র বা চিঠা না থাকিলে সীমানির্ধারণের কোন উপায় থাকে না, এই জন্য তিনি প্রথমে উহা জরিপ করাইবার সঙ্কল্প করিলেন। ওয়াসিংটন জরিপের কাৰ্যে অভিজ্ঞ হইয়াছেন, একথা তাঁহার পূর্বেই জানা ছিল। সুতরাং একদিন তিনি ওয়াসিংটনকে আমিনের পদে নিযুক্ত করিবার প্রস্তাব করিলেন। মেরী ও লরেন্স কেহই ইহাতে অসম্মতি প্রকাশ না করায় ওয়াসিংটন পদস্বীকারপূর্বক কতিপয় অনুচরের সহিত ফেয়ারফক্সের জমিদারী জরিপ করিবার নিমিত্ত যাত্রা করিলেন। একে বনাবৃত স্থান, তাহাতে আবার অজস্র বৃষ্টিপাতে পথ আরও দুর্গম হইয়াছিল । শীত দুরন্ত ; থাকিবার নিমিত্ত ভাল স্থান দুর্ঘট; শয়ন ভােজন সকল বিষয়েই অত্যন্ত কষ্ট। অথচ পরিশ্রম সমধিক ও বিপজ্জনক ;-বনের হিংস্র প্রাণী ও নৃশংস আদিম নিবাসী প্রতিপদেই প্রাণনাশ করিতে পারে; শ্বেতকায় ঔপনিবেশিকেরাও আমিনী। যেখানে অনধিকার প্রবেশ করিয়া বাস করিতেছে, সেখানে জরিপ-দ্বারা তাহাদের স্বার্থনাশের কোন সম্ভাবনা হইলে আমিনের বিপদ ঘটিবার আশঙ্কা। ঘােড়শবষবয়স্ক বালকের পক্ষে এরূপ বিপৎসঙ্কুল কাৰ্যে ব্রতী হওয়া অসমসাহসিকতার কার্য্য। এই সময়ে ওয়াসিংটন স্বহস্তে যে রােজনামচা লিখিয়াছিলেন, তাহা দেখিলে জানা যায় যে, তিনি কোন কোন দিন অনাহারী থাকিতেন, কোন কোন দিন বৃক্ষতলে তৃণশয্যায় রাত্রি যাপন করিতেন ; কোন কোন দিন বৃক্ষতলও জুটিত না, তাঁহাকে অসভ্য আদিম নিবাসীদিগের সহিত একই শয্যায় শয়ন করিতে হইত। একদিন তাঁহার শয্যার তৃণে অগ্নি লাগিয়াছিল, দৈবগুণে অকস্মাৎ নিদ্রাভঙ্গ না হইলে তাহাকে নিশ্চিত জীবিত অবস্থায় ভস্মীভূত হইতে হইত। এত কষ্ট সহ্য করিয়াও ওয়াসিংটন প্রাণপণে প্রভুর কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিলেন। সমস্ত ভূমির সীমা, ক্ষেত্রফল, উর্বর পরিমাণ ও উৎপন্নদ্রব্য, নদীর দৈর্ঘ্য, বিস্তার ও গভীরতা, পৰ্ব্বতের উচ্চতা প্রভৃতি নির্ণয় করিয়া তিনি ফেয়ারফক্সের বিস্তীর্ণ জমিদারীর এরূপ সুন্দর চিঠা প্রস্তুত করিয়া দিলেন যে, লােকে তাহা দেখিয়াই ভূমির দোষগুণ অবধারণ করিতে সমর্থ হইল এবং উপযুক্ত মূল্য দিয়া স্ব স্ব প্রয়ােজনানুসারে ভূমি ক্রয় করিতে লাগিল। ওয়াসিংটনের জরিপের প্রশংসা ক্রমে ভার্জিনিয়া প্রদেশের শাসন- কাদিগের কর্ণ-গােচর হইল, এবং তিনি তর্দেশীয় ব্যবস্থাপকসভা- কর্তৃক রাজকীয় আমিনের পদে নিযুক্ত হইলেন। তিনি এত সাবধান হইয়া কাজ করিতেন, এত সূক্ষ্ম ভাবে ক্ষেত্রফলাদির গণনা করিতেন, এত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তাহার যাথার্থ্য পরীক্ষা করিয়া দেখিতেন, যে কেহ কখনও তঁহার চিঠায় কোন ভ্রম দেখিতে পান নাই। ভূমির সীমা লইয়া তর্ক উপস্থিত হইলে অর্থী প্রত্যর্থ উভয় পক্ষেই ওয়াসিংটনের চিঠাকে প্রামাণ্য বলিয়া স্বীকার করিত।

মহাপুরুষ-চরিত। কয়েক বৎসর আমিনের কাৰ্যে ব্যাপৃত থাকায় ওয়াসিংটনের অনেকগুলি উপকার হইয়াছিল। তাহার সবল শরীর নিয়ত পরিশ্রমে আরও বলশালী হইল; এবং শীতাতপ, অনশন ও অনিদ্রা সহ্য করিতে তাঁহার অভ্যাস জন্মিল। দেশস্থ ভূম্যধিকারিগণ তাঁহার গুণগ্রামের পরিচয় পাইলেন এবং তদীয় বুদ্ধি বিবেচনা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও কাৰ্যপরতা দেখিয়া সকলেই তাঁহাকে শ্রদ্ধা করিতে লাগিলেন। অনেক সময়ে আদিম নিবাসীদিগের সহিত বাস করিয়া তিনি তাহাদের চরিত্র পরিজ্ঞাত হইলেন এবং অনুক্ষণ দৈর্ঘ্যবিস্তারাদির নির্ণয় করিতে গিয়া দুরত্ব সম্বন্ধে তাহার এরূপ অভিজ্ঞতা জন্মিল যে, শেষে রীতিমত পরিমাণ না করিয়াও কেবল অনুমান বলে কোন্ স্থান কত দূরে, কোন্ স্থান কত উচ্চে, তাহা অবধারণ করিতে সমর্থ হইলেন। সম্মিলিত রাজ্যসমূহের ভাবী প্রধান সেনাপতির পক্ষে এ সমস্ত শিক্ষা যে কত দূর উপকারী হইয়াছিল, তাহা অনায়াসেই বুঝা যাইতে পারে। বলা বাহুল্য লর্ড ফেয়ারফক্সই ওয়াসিংটনের এই উন্নতির একমাত্র মূল। ফেয়ারফক্স স্বপ্নেও ভাবেন নাই যে তাহার এই যত্ন-পরিবর্ধিত যুবক পরিণামে স্বদেশে ইংরাজাধিকারের উচ্ছেদ সাধন করিবেন। প্রবাদ আছে যে ওয়াসিংটনকর্তৃক ইংরাজেরা পরাভূত হইয়াছেন এই কথা শ্রবণ করিয়া ফেয়ারফক্স এতই শােকাভিভূত হইয়াছিলেন যে, জীবনের অবশিষ্ট কালের মধ্যে তিনি একদিনও সুখী হইতে পারেন নাই। ওয়াশিংটনের আমিনী পদ সংক্রান্ত একটা ঘটনা সবিশেষ উল্লেখ যােগ্য। একদা তিনি কোন নদীর ধারে জরিপ করিতেছেন এমন সময়ে কিয়রে একজন স্ত্রীলােকের আর্তস্বর শুনিতে পাইলেন। যাইয়া দেখেন হতভাগিনীর একটী অল্প বয়স্ক পুত্র নদীমধ্যে নিমগ্নপ্রায় হইয়া স্রোতেবেগে ভাসিয়া যাইতেছে। তখন বর্ষা কাল, আমিনী। • ; ভীষণ মূর্তি ধারণ করিয়া, দুইকুল প্লাবিত করিয়া তীরবেগে ছুটিতেছে ; আর মধ্যে মধ্যে মগ্নশৈলে প্রতিহত হইয়া ভয়ঙ্কর আবর্ত জন্মাইয়া দর্শকের মনে ভীতি সঞ্চার করিতেছে। স্ত্রীলােকটা এক একবার নদীগর্ভে ঝম্প দিবার জন্য অগ্রসর হইতেছে, আর দর্শকেরা তাহাকে বলপ্রয়ােগে সেই ভীষণ সঙ্কল্প হইতে নিরন্ত করিতেছে। ওয়াসিংটন দেখিলেন মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব হইলে বালকটী সম্মুখবর্তী আবর্তে পড়িয়া জীবন হারাইবে। তিনি এ দৃশ্য দেখিতে পারিলেন না; তৎক্ষণাৎ নদীগর্ভে ঝম্পপ্রদান- পূৰ্ব্বক নিজের প্রাণ পৰ্য্যন্ত পণ করিয়া বহুকষ্টে বালকটীকে আসন্নমৃত্যুর গ্রাস হইতে রক্ষা করিলেন। হারানিধি ক্রোড়ে করিয়া জননী প্রাণ খুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন ‘মহাভাগ, আপনি রাজা হউন”। প্রবাদ আছে যে, একটী হরিণশিশুর প্রতি দয়া দেখাইয়া সবুক্তগিন গজনীরাজ্যের সিংহাসনে অধিরােহণ করিয়াছিলেন। সুতরাং এবংবিধ পরহিতৈষণার জন্য ওয়াসিংটনও যে পরিণামে সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতির আসন প্রাপ্ত হইয়া, ভূমণ্ডলস্থ প্রধান প্রধান রাজচক্রবর্তীর তুল্যকক্ষ হইয়া- ছিলেন, ইহা আশ্চর্যের বিষয় নহে।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ভ্রাতৃ-বিয়ােগ । র্জিনিয়ার পশ্চিমে ওহিয়ােনদের তীরবর্তী নিবিড় বনাবৃত ভা প্রদেশের অধিকার লইয়া তৎকালে ইংরাজ ঔপনিবেশিক দিগের সহিত ফরাসীদিগের বিবাদ, ঘটিবার উপক্রম হইয়াছিল। ফরাসীরা বলিতেন যে “তাহারাই সর্বপ্রথম ঐ ভূভাগের আবিষ্কার করিয়াছেন; সুতরাং ন্যায়ানুসারে উহা তাহাদেরই প্রাপ্য।” ইংরাজেরা বলিতেন যে “সে মিথ্যা কথা; তাহারা আদিম নিবাসীদিগের নিকট উহার স্বত্ব ক্রয় করিয়াছেন; অতএব উহাতে ফরাসীদিগের কোন অধিকার নাই।” এদিকে আদিম নিবাসীরা বলিত যে “দেশ তাহাদেরই ; ইংরাজ, ফরাসী উভয়ই নবাগত। তাহারা চিরকালই ঐ দেশে বাস করিতেছে; কখনও কাহাকে ভূমি দান বা বিক্রয় করে নাই; সুতরাং তাহারা ভিন্ন অন্য কেহই ভূমির অধিকারী হইতে পারে না।” এ বড় বিষম সমস্যা, আর এ সমস্যার মীমাংসাও সহজ নহে। এরূপ স্থলে অন্যত্র যাহা হয়, এ ক্ষেত্রেও তাহাই হইল , সকলেই বুঝিতে পারিলেন “জোর যার মুলুক তার।” ইংরাজ ও ফরাসী উভয় পক্ষেই যুদ্ধের নিমিত্ত প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। তাহারা উৎকোচাদি দিয়া ভ্রাতৃবিয়ােগ। আদিম নিবাসীদিগকে স্ব স্ব পক্ষভুক্ত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। উভয় পক্ষই তাহাদের কোন না কোন সম্প্রদায়ের সহিত সখ্যসূত্রে বদ্ধ হইলেন। ধুদ্ধের আশঙ্কায় ভার্জিনিয়ার যুবকবৃন্দ সামরিকশিক্ষায় প্রবৃত্ত হইল। তত্ৰত্য ব্যবস্থাপক সভা সমগ্র প্রদেশকে চারিটী সুবায় বিভক্ত করিয়া প্রত্যেক সুবার জন্য এক একজন সেনানী (সুবাদার) নিযুক্ত করিলেন। সেনানীগণ স্ব স্ব সুবার যুদ্ধক্ষম যুবকদিগকে সমরশাস্ত্র শিক্ষা দিতে লাগিলেন। লরেন্স ইতিপূর্বে যুদ্ধকাৰ্য্যে সুখ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি সাদরে সুবাদারের পদে বরিত হইলেন। কিন্তু কিয়দ্দিন কাৰ্য্য করিবার পর তাঁহার স্বাস্থ্যভঙ্গ হইল। পূর্ব হইতে যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা দিয়াছিল ; এক্ষণে রাগ ক্রমশঃ প্রবল হইয়া তাঁহাকে শয্যাগত করিয়া ফেলিল। তিনি একদিন ওয়াসিংটনকে কহিলেন “ভাই, আমার শরীর ক্রমেই অপটু হইতেছে। সুতরাং আমি সুবাদারী পরিত্যাগ করিব মানস করিয়াছি। ইচ্ছা হয় তােমাকে ঐ পদে নিয়ােজিত করিবার নিমিত্ত একবার চেষ্টা করিয়া দেখি।” ‘আমার বয়স অল্প ; উনিশ বৎসর মাত্র। হয়ত সেই জন্য গবর্ণর সাহেব আমাকে অনুপযুক্ত মনে করিবেন।” কিন্তু তােমার কাৰ্যদক্ষতার বিষয়ে কাহারও তিলমাত্র সন্দেহ নাই। সেই জন্যই আমার আশা হয় যে তােমার নিয়ােগসম্বন্ধে কোন আপত্তি হইবে না। আমি পদত্যাগ করিবার পূর্বেই গবর্ণরের নিকট তােমার কথা উত্থাপিত করিব। “ঐ পদ পাইলে আমাকে কি কি কাজ করিতে হইবে ? “যােদ্ধাদিগকে কুজ কাওয়াজ শিখাইতে হইবে; তাহাদের অস্ত্র শন্ত্রের দিকে লক্ষ্য রাখিতে হইবে এবং যাহাতে যুদ্ধকালে তাহারা সুশিক্ষিত সেনার ন্যায় আচরণ করিতে পারে, তাহার উপায় দেখিতে হইবে। ;

মহাপুরুষ-চরিত সুবাদারের দায়িত্ব বিস্তর; যােদ্ধাদিগের কোনও ত্রুটি হইলে লােকে তােমাকেই দোষ দিবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস তুমি এ কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিতে পারিবে। এ পদের বেতন বার্ষিক ১৫০০ টাকা। “আমি এরূপ কার্যে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ; এ জন্য ভয় হয়, পাছে শেষে লাঞ্ছনার ভাগী হই।” “তাের নিয়ােগ-সম্বন্ধে আমি পূর্ব হইতেই সঙ্কল্প স্থির করিয়া রাখিয়াছি। আমার বিবেচনায় এ অঞ্চলে তুমি ভিন্ন অন্য কেহই এ পদের উপযুক্ত নহে। দেখা যাউক এখন চেষ্টা করিয়া কতদূর কৃতকাৰ্য্য হইতে পারি। প্রথমে কাহারও কোন কাজে অভিজ্ঞতা থাকে না, কাজ করিতে করিতেই লােকে অভিজ্ঞ হয়।” ওয়াসিংটন আমিনী কাৰ্যে যেরূপ দক্ষতা দেখাইয়াছিলেন, তাহাতে গবর্ণর প্রভৃতি রাজপুরুষগণ সকলেই প্রীত হইয়াছিলেন। সুতরাং লরেন্স প্রস্তাব করিবামাত্র তাঁহারা ওয়াসিংটনকে সুবাদারের পদে নিযুক্ত করিলেন। অতঃপর লরেন্সের অবস্থা আরও শােচনীয় হইয়া পড়িল। শীতকাল সমাগতপ্রায় ; ভার্জিনিয়ায় শীতের প্রখ্য ভয়ঙ্কর, সুতরাং যক্ষ্মাগ্রস্ত লােকের পক্ষে নিশ্চয় মারাত্মক। সকলে বলিতে লাগিলেন যে শীতকালটা কোনও উষ্ণতর স্থানে অতিবাহিত করিতে পারিলে ভাল হয়। সুতরাং লরেন্স কারিবসাগরীয় বার্বাভােস দ্বীপে যাইতে মানস করিলেন। ওয়াসিংটনও কিয়দ্দিনের জন্য অবকাশ গ্রহণ করিয়া অগ্রজের শুক্রবার নিমিত্ত তাহার অনুগামী হইলেন। কিন্তু স্থান পরিবর্তনে লরেন্সের উপকার হইল না; তিনি বুঝিতে পারিলেন যে ব্যাধি অসাধ্য। লাভের মধ্যে ওয়াসিংটন প্রকস্মাৎ বসন্ত রােগাক্রান্ত হইলেন; কিন্তু ভগবানের কৃপায় চিকিৎসা ও সুশ্রুষার গুণে আরােগ্যলাভ করিলেন। এদিকে তৈলশূন্য প্রদীপের ন্যায় লরেন্সের জীবনবর্তিকা ক্রমশঃ ক্ষীণ ভ্রাতৃবিয়ােগ। ১১ হইতে লাগিল। তিনি স্বদেশে পরিজনের মধ্যে দেহ ত্যাগের নিমিত্ত ব্যাকুল হইয়া গৃহে প্রতিগমন করিলেন এবং ভ্রাতৃবৎসল ওয়াসিংটনের ক্রোড়ে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া চিরশান্তি লাভ করিলেন। মৃত্যুর পূর্বে দানপত্র লিখিয়া তিনি নিজের প্রচুর সম্পত্তি সম্বন্ধে এই ব্যবস্থা করিয়া গিয়াছিলেন, যে ভার্ণন শৈল প্রথমে তার নবজাতা কন্যার এবং তদভাবে ওয়াসিংটনের প্রাপ্য হইবে। লরেন্সের ইচ্ছানুসারে ওয়াসিংটন সমস্ত সম্পত্তির তত্বা- বধায়ক নিযুক্ত হইলেন। কিছুকাল পরে লরেন্সের কন্যা অকালে কাল- গ্রাসে পতিত হইলে, ওয়াসিংটনই ভার্ণন শৈলের অধিকারী হইলেন।

=== সপ্তম পরিচ্ছেদ। দৌত্য। তিপূৰ্বে ফরাসীরা ওহিও-তটে একটী দুর্গ স্থাপন করিয়া- ছিলেন। এক্ষণে তাহারা তথা হইতে আরও দক্ষিণে রাজ্যবিস্তারের উপায় দেখিতে লাগিলেন। কোন ইংরাজ বণিক আদিম নিবাসীদিগের সহিত বাণিজ্য করিবার নিমিত্ত ভার্জিনিয়ার সীমা অতিক্রম করিয়া গেলেই ফরাসীরা হয় তাহাকে আপনারা কারারুদ্ধ করিতেন, নয় আদিম অধিবাসীদিগের দ্বারা উৎপীড়িত বা নিহত করাইতেন। ভার্জিনিয়ার ইংরাজ ঔপনিবেশিকগণ এই অত্যাচার নিবারণের জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। কিন্তু প্রকাশ্যভাবে শত্রুতাচরণ আরম্ভ করিবার পূর্বে একবার ফরাসীদিগের আচরণে প্রতিবাদ করা ও তাঁহারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া কোন প্রতীকার করেন কি না তাহা দেখা কৰ্তব্য, এই বিবেচনায় গবর্ণর ডিউইডি সাহেব ওহিও-তটবর্তী দুর্গের ফরাসীদিগের নিকট দূত প্রেরণ করিবার সঙ্কল্প করিলেন। তৎ- কালে জিষ্টনামক জনৈক ইংরাজ ভার্জিনিয়ার পশ্চিম-প্রান্তস্থিত বন্ত প্রদেশে অনেকবার ভ্রমণ করিয়া পথ ঘাট ও আদিম নিবাসীদিগের চরিত্র সম্বন্ধে বিলক্ষণ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন। গবর্ণর সাহেব দৌত্য পাঠাইবার কথা উত্থাপন করিলে জিষ্ট কহিলেন, “মহাশয়, এ বড় কঠিন কাজ; ফরাসীদিগের দুর্গ এস্থান হইতে প্রায় দুই শত ক্রোশ দূরে; পথে ভয়ঙ্কর বন, বন্ধুর পার্বত্য প্রদেশ, জলাবৃত নিম্নভূমি। আদিম- নিবাসীরা অনেকেই ফরাসীদিগের অনুগত, সুতরাং ইংরাজদিগের পরম শত্রু। আমার বিবেচনায় কেহ এ দৌত্য স্বীকার করিলে তাহার জীবন পর্যন্ত নষ্ট হইতে পারে। গবর্ণর সাহেব অনেক দিন চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কেহই এ গুরুভার গ্রহণ করিতে অগ্রসর হইলেন না। অনন্তর এক দিন তিনি হতাশ হইয়া বসিয়া আছেন, এমন সময়ে সুবাদার ওয়াসিংটন তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কহিলেন “মহাশয়, আমি আপনার আদেশানুসারে ফরাসীদিগের দুর্গে যাইতে প্রস্তুত আছি। যদি আমাকে এ কাজের উপযুক্ত মনে করেন, তাহা হইলে অনুগ্রহপূর্বক নিয়ােগপত্র প্রদান করুন।” গবর্ণর সাহেব এই অভাবনীয় প্রস্তাবে নিরতিশয় আনন্দিত হইয়া আর দ্বিরুক্তি না করিয়া ওয়াসিংটনকে দূত নিযুক্ত করিলেন এবং জিজ্ঞাসিলেন “আপনি কবে রওনা হইবেন? শীঘ্রই শীতকাল উপস্থিত হইবে; সুতরাং বিলম্ব যত অল্প হয়, ততই ভাল।” ওয়াসিংটন দীর্ঘসূত্রতা কাহাকে বলে কখনও জানিতেন না। তিনি কহিলেন, “আপনি যখন কহিবেন আমি তথনই যাইতে পারি। কেবল একবার মাতৃদেবীর নিকট বিদায় লইবার নিমিত্ত আমার দুই তিন দিনের বিলম্ব সম্ভাবনা।” গবর্ণর সাহেব ওয়াসিংটনের হস্তে একখানা পত্ৰ দিয়া কহিলেন “আপনি ফরাসী গবর্ণরকে এই পত্ৰ দিয়া উত্তরের জন্য এক সপ্তাহকাল অপেক্ষা করিবেন। যদি এই সময়ের মধ্যে কোন উত্তর না পান, তাহা হইলে আর কালবিলম্ব না করিয়া ভার্জিনিয়ায় ফিরিয়া আসিবেন। জিষ্ট প্রভৃতি আট জন সাহসী ও সুচতুর লােক ওয়াসিংটনের সহচর নিযুক্ত হইলেন। মনে সুখী না হইলেও ওয়াসিংটনের জননী এ কাৰ্যে বাধা দিলেন না।

৪৪ মহাপুরুষ-চরিত। না; তিনি কহিলেন, “জর্জ, তােমার ন্যায় অল্পবয়স্ক যুবকের পক্ষে এ অতি কঠিন কাৰ্য। আশা করি ঈশ্বরের কৃপায় কাৰ্য্য সুসিদ্ধ করিয়া প্রশংসা ভাজন হইবে।” এইরূপে জননীর আশীৰ্বাদ লাভ করিয়া ওয়াশিংটন ১৭৫৩ অব্দের ৩১শে অক্টোবর এই ভয়ঙ্কর কর্তব্য-পালনার্থ অনুচরবর্গসহ ভার্জিনিয়া হইতে যাত্রা করিলেন। দশ দিন চলিবার পর তাহারা আদিম নিবাসীদিগের একটা রাজ্যে প্রবেশ করিলেন। তত্ৰত্য অধি- বাসীরা ফরাসীদিগের রাজ্যবিস্তার চেষ্টায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়াছিল ; এক্ষণ ওয়াসিংটনের কৌশলে ইংরাজ-পক্ষ অবলম্বন করিতে প্রতিশ্রুত হইল। ওয়াসিংটন ও তাহার অনুচরগণ এ প্রদেশের রাস্তাঘাট ভাল জানিতেন তাঁহারা আদিম নিবাসীদিগের মধ্য হইতে কয়েকজন পথ-প্রদর্শক লইলেন এবং অবিরামবৃষ্টিপাতজনিত অশেষ কষ্টভােগ করিয়া ১২ই ডিশেম্বর ফরাসীদিগের দুর্গে উপনীত হইলেন। অত্ৰত্য গবর্ণর সাহেব চিঠির কি উত্তর দিবেন স্থির করিবার নিমিত্ত সচিবদিগের সহিত পরামর্শ করিতে লাগিলেন; ইত্যবসরে ওয়াসিংটন তাঁহার দুর্গের অবস্থান, নিৰ্মাণ-কৌশল, সেনাবল প্রভৃতি প্রয়ােজনীয় বিষয় অবগত হইয়া স্বীয় দৈনন্দিন বৃত্তান্তে লিখিয়া লইলেন। ফরাসী গবর্ণর দুই দিন পরেই পত্রের উত্তর দিলেন। তখন তুষার পড়িয়া পথ আরও দুর্গম হইয়াছিল, প্রবলবেগে ঝটিকা বহিতেছিল, সুতরাং ওয়াসিংটন দেখিতে পাইলেন যে গৃহে ফিরিবার কালে তাঁহাকে পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক কষ্ট ভােগ করিতে হইবে। এদিকে ফরাসীরা আদিম নিবাসীদিগকে তাঁহার পক্ষচ্যুত করিবার নিমিত্ত নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করিলেন, কিন্তু ওয়াসিংটন অতি তীব্রভাবে তাঁহাদের এই অন্যায়াচরণে প্রতিবাদ করায় শেষে লজ্জায় নিরস্ত হইলেন। পথের দুর্গমতা-নিবন্ধন তাঁহারা কিয়দ্র নৌকায় যাইতে মানস করিলেন। কিন্তু তাহাতেও কষ্টের কিছুমাত্র লাঘব হইল না। কখনও দৌত্য। ৪৫ মগ্নশৈলে আহত হইয়া নৌকা নিমগ্নপ্রায় হইত; তখন সকলে অবতরণ করিয়া সেই দুঃসহ শীতে এক ঘণ্টা বা ততােহধিক কাল জলমধ্যে থাকিয়া নৌকা বাঁচাইতেন। এক স্থানে নদীর উপরিভাগ জমিয়া এরূপ অগম্য হইয়াছিল যে তাহারা প্রায় অর্ধ ক্রোশ পথ ভূমির উপর দিয়া নৌকা টানিয়া লইয়া গিয়াছিলেন। এইরূপে একশত ক্রোশ চলিতে না চলিতেই ডিশেম্বর মাস প্রায় অতিবাহিত হইয়া গেল। আর অল্পদিন পরেই ভার্জিনিয়ার ব্যবস্থাপক সভা শীত উপলক্ষে অবসর গ্রহণ করিবেন। তাহার পূর্বে ফরাসী গবর্ণরের উত্তর সভ্যদিগের হস্তগত না হইলে অনেক দিন পর্যন্ত কেহই উহার মর্ম জানিতে পারিবেন না। সুতরাং ওয়াসিংটন স্থির করিলেন যে জিষ্টকে সঙ্গে লইয়া তিনি সােজাসুজি বনের ভিতর দিয়া ভার্জিনিয়ায় প্রতিগমন করিবেন, আর অপর সহচরগণ অশ্বদিসহ যে পথে গিয়াছিলেন সেই পথেই যত দিনে পারেন ফিরিবেন। ইহা অবগত হইয়া জিষ্ট বলিলেন যে এরূপ অবিবেচনার কাৰ্য্য করিলে তাহারা দুইজনে বনমধ্যেই প্রাণ হারাইবেন। কিন্তু ওয়াসিংটন ভয় না পাইয়া কহিলেন, আমি ইহা বলিতেছি না যে আমরা বিনা কষ্টে পৌছিতে পারিব। কিন্তু আমরা দুইজনে কেহই কষ্টকে কষ্ট জ্ঞান করি না ; সুতরাং আমাদের পক্ষে ইহা কিছুতেই অসাধ্য নহে। জিষ্ট দেখিলেন যে ওয়াসিংটন প্রধান কর্মচারী, অতএব তাহার ইচ্ছার প্রতিকূলাচরণ করা রীতিবিরুদ্ধ। সুতরাং আর আপত্তি করিলেন না। অনন্তর প্রয়ােজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে লইয়া উভয়ে দলত্যাগপূৰ্ব্বক বনের মধ্য দিয়া ধাবমান হইলেন। উভয়ের হস্তে বন্দুক ও পৃষ্ঠে বস্ত্রাদির তল্পী। প্রথম দিন ৯ ক্রোশ চলিয়া তাহারা এক আদিম নিবাসীর কুটীরে আশ্রয় লইলেন। ওয়াসিংটন এতকাল প্রায় অশ্বারােহণেই চলিতেন; অদ্য পদব্রজে গমন করায় নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। তথাপি অধিকক্ষণ বিশ্রাম না করিয়া তাহারা রাত্রি দুইটার সময় আবার ০ মহাপুরুষ-চরিত। চলিতে আরম্ভ করিলেন। সূর্যোদয় হইলে পথে একজন আদিম নিবাসীর সহিত তাঁহাদের সাক্ষাৎ হইল। জিষ্ট তাহাকে পূৰ্বে একবার ফরাসীদিগের শিবিরে দেখিতে পাইয়াছিলেন। সুতরাং এক্ষণে তাহার কোন দুরভিসন্ধি আছে এই সন্দেহে প্রথমে অধিক বাক্যালাপ করিলেন ; কিন্তু আদিম নিবাসী নানাবিধ কথা পাড়িয়া তাঁহাদের উদ্দেশ্য ও গন্তব্যস্থান জানিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। জিষ্ট সাবধান হইয়া উত্তর দিতে লাগিলেন; কিন্তু ওয়াসিংটন লােকটাকে সােজা পথ দেখাইবার নিমিত্ত অনুরােধ করিলেন। আদি নিবাসী অম্লানবদনে তাহাদের পথ- প্রদর্শন ও তল্পী বহনের ভার গ্রহণ করিল। ওয়াসিংটন ক্লান্ত হইয়াছিলেন, সুতরাং এরূপ একজন সঙ্গী পাইয়া আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করিলেন। কিয়দ্র অগ্রসর হইলে জিষ্ট বুঝিতে পারিলেন যে ধূৰ্ত্ত তাহাদিগকে বিপথে লইয়া যাইতেছে। পুনঃ পুনঃ প্রশ্ন করায় সে হঠাৎ জিষ্টকে লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুড়িল; কিন্তু সৌভাগ্য ক্রমে জিষ্টের শরীরে কোন আঘাত লাগিল না। আদিম নিবাসী আবার বন্দুকে গুলি পূরিতেছিল এমন সময়ে জিষ্ট ও ওয়াসিংটন তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন। জিষ্ট তাহাকে মারিবার নিমিত্ত বন্দুক তুলিয়াছেন দেখিয়া ওয়াসিংটন বাধা দিয়া কহিলেন “না ভাই ; ইহাকে মারিয়া ফেলিলে ইহার জ্ঞাতিবন্ধুগণ প্ৰতিশােধ লইবার নিমিত্ত আমাদিগকে আক্রমণ করিবে এবং তাহা হইলে আমরা নিশ্চয় মারা যাইব।” জিষ্টও বিবেচনা করিয়া দেখিলেন যে ওয়াসিংটনের কথাই যুক্তিসঙ্গত। সুতরাং তাহারা সমস্ত দিন সেই আদিম নিবাসীকে সঙ্গে সঙ্গে লইয়া রাত্রি ৯ টার সময় তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন, এবং সে দিন আর বিশ্রাম করা অসঙ্গত মনে করিয়া আবার চলিতে লাগিলেন। সমস্ত রাত্রি এবং পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যটন করিয়া তাহারা এক সুপ্রশস্ত নদীর তীরে উপনীত হইলেন। নদীর উপরিভাগ তখনও জমিয়া যায় নাই; সুতরাং তাঁহারা উহা পার হইবার ;

দৌত্য। ০ কোন উপায় দেখিতে পাইলেন না। জিষ্ট কহিলেন “কেমন,এখন? এখন দেখিতেছি অসভ্যটার হাতে প্রাণ গেলেই আমাদের পক্ষে ভাল হইত।” ওয়াসিংটন। ব্যাপার গুরুতর বটে; কিন্তু চেষ্টার অসাধ্য কাৰ্য্য নাই। এস, একখানা ভেলা প্রস্তুত করিয়া নদী পার হই। জিষ্ট। ভেলা! দেখিতেছ না, কত বড় বড় বরফপিণ্ড দ্রুতবেগে ভাসিয়া যাইতেছে ! উহার আঘাতে ভেলা কেন, নৌকাও চূর্ণ হইয়া যাইবে। আর এখানে ভেলা প্রস্তুত করিবারই বা পন্থা কি ? ওয়াসিংটন। আমার নিকট কুঠার আছে; এস, চেষ্টা করিয়া দেখি। যদি না পারি তাহা হইলেও লােকে বলিবে যে আমরা নিতান্ত কাপুরুষের ন্যায় বিনা চেষ্টায় মরি নাই। জিষ্ট। তবে তাহাই করা যাউক। তুমি যাহা বলিবে আমি তাহাই করিব। যদি কোন লােকে এই নদী পার হইতে পারে, তবে সে তুমি ভিন্ন আর কেহই নহে। বাস্তবিক ওয়াসিংটনের অকুতােভয়তা ও উদ্যমশীলতা দেখিয়া জিষ্ট অতীব বিস্মিত হইয়াছিলেন। তিনি জীবনে আর কখনও এমন উদ্যোগী পুরুষ দেখেন নাই। পরদিন ভেলা প্রস্তুত করিতে অতিবাহিত হইল। অনন্তর তাহাতে দ্রব্যাদি তুলিয়া তাহারা সন্ধ্যার প্রাক্কালে নদী পার হইবার জন্য অগ্রসর হইলেন। ভেলা নদীর মধ্যভাগে উপস্থিত হইলে একটা বৃহৎ বরফপিণ্ড আসিয়া উহার সহিত সংঘৃষ্ট হইল। ওয়াসিংটন ভেলা রক্ষা করিতে গিয়া নদীগর্ভে পতিত হইলেন এবং শরীরে অসাধারণ বল ছিল বলিয়াই সন্তরণ দ্বারা পুনর্বার ভেলায় উঠিতে পারিলেন। তিনি বস্ত্রের জল নিপীড়িত করিয়া ফেলিবার সময়ে জিষ্টকে উৎসাহিত করিবার নিমিত্ত কহিলেন “ভয় নাই ; কয়েকদিন স্নান হয় নাই; আজ শীতল জলে স্নান করিয়া তৃপ্তিলাভ করিলাম।”

৪ মহাপুরুষ-চরিত। বড় আশ্চর্যের বিষয় যে তুমি ডুবিয়া যাও নাই। এরূপ অবস্থায় পড়িলে সচরাচর লােকের যেমন আতঙ্ক উপস্থিত হয়, তােনার তেমন হইলে আজ রক্ষা ছিল না। ওয়াসিংটন। বাটীতে মাতৃদেবী আমার মঙ্গলের নিমিত্ত যত দিন ভগবান্‌কে ডাকিবেন, ততদিন কোন ভয়ের কারণ নাই। এদিকে সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছিল। জিষ্ট দেখিলেন তাহারা কিছুতেই সে দিন নদীর অপর পারে উপনীত হইতে পারিবেন না। অন্ধকার গাঢ় হইলে নদীগর্ভে আরও আশঙ্কার কারণ হইবে। সুতরাং নদীমধ্যস্থ একটা ক্ষুদ্র দ্বীপের দিকে লক্ষ্য করিয়া সেই স্থানেই রাত্রি যাপন করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। ওয়াসিংটন সম্মতি প্রকাশ করিলে তাহারা বহুকষ্টে প্রদোষকালে তথায় উপস্থিত হইলেন। একে শীতপ্রধান দেশের পৌষের শীত ; তাহাতে অনাবৃত স্থানে জলসিক্ত বস্ত্রে রাত্রিযাপন। এ রাত্রিতে ওয়াসিংটন ও তদীয় সহচরের যে কি কষ্ট গিয়াছিল তাহা অনুমান করাও সহজ নহে। তাহারা ভেলা হইতে অবতরণ করিবার পর শীতের প্রাথৰ্য্য আরও বৃদ্ধি হইল। জিষ্ট কহিলেন ইহা অপেক্ষা জলে থাকিলেও যেন ভাল হইত। আমার হাত পায়ের রক্ত জমিয়া গিয়াছে ; বােধ হয় আর দুই এক ঘণ্টা পরে সমস্ত শরীরেরই ঐ দশা ঘটিবে; আর সেই সঙ্গে চিরকালের জন্য ভবযন্ত্রণারও অবসান হইবে। ওয়াসিংটন। মরিতে হয় মরিব ; কিন্তু তাহা বলিয়া বাঁচিতে চেষ্টা করিব না কেন? এখানে দৌড়াদৌড়ি, ছুটাছুটি করিবার যথেষ্ট স্থান আছে ; তাহা করিলে শরীর গরম হইবে এবং রক্ত জমিবার সম্ভাবনা থাকিবে না। এ অবস্থায় নিদ্রা গেলেই মরণ। জিষ্ট। এখন নিদ্রা গেলে সে নিদ্রা অচিরে মহানিদ্রা হইয়া দাড়াইবে। কিন্তু শীত ক্রমেই বাড়িতেছে; যতই পরিশ্রম কর না কেন, এ যাত্রা আর পরিত্রাণের উপায় নাই। ;

দৌত্য। ৪১ ওয়াসিংটন। অত হতাশ হইতেছ কেন? শীতের আধিক্য আমার বিবেচনায় সুলক্ষণ; কারণ নদীর উপরিভাগ শীঘ্রই জমিয়া কঠিন হইবে, সুতরাং কল্য আমরা হাঁটিয়া নদী পার হইতে পারি। আর যতক্ষণ এখানে থাকিব ততক্ষণ অসভ্যেরাও আমাদিগকে গুলি করিয়া মারিবে না, কারণ এখানে হঠাৎ কেহ আসিতে পারিবে না। জিষ্ট। নদী জমিয়া যাইবে আর আমাদের রক্ত জমিবে না। যাহা হউক, আমি তােমাকে নিরাশ হইতে বলি না। কন্তু ওয়াসিংটনের কথাই সত্য হইল। তাহারা সমস্ত রাত্রি অঙ্গ সঞ্চালন দ্বারা শরীরের তাপ রক্ষা করিলেন এবং প্রভাত হইলে দেখিতে পাইলেন যে নদীর উপরিভাগ কঠিন হইয়াছে। এই রূপে আসন্ন মৃত্যুর গ্রাস হইতে অব্যাহতি পাইয়া যথাসাধ্য দ্রুতবেগে ভ্রমণপূৰ্ব্বক তাহারা ১৬ই জানুয়ারি ভার্জিনিয়ার প্রধান নগর উইলিয়মসবর্গে প্রতিগমন করিলেন। গবর্ণর সাহেব ফরাসী শাসনকর্তার উত্তর এবং ওয়াসিংটনের দৈনন্দিন বৃত্তান্ত পাইয়া সাতিশয় প্রীত হইলেন। ব্যবস্থাপক সভার শীতাবকাশের আর অধিক বিলম্ব ছিল না। সভ্যগণ দৌত্যের বিবরণ সবিস্তার জানিতে পারিবেন এই অভিপ্রায়ে গবর্ণর সাহেব দৈনন্দিন বৃত্তান্ত খানি শীঘ্র শীঘ্র ছাপাইয়া এক এক খণ্ড তাঁহাদিগকে প্রদান করিলেন। এ কাৰ্য্য এত সত্বর সম্পন্ন হইল যে ওয়াসিংটন উহার সংশােধন পৰ্যন্ত করিতে পারিলেন না। তথাপি ইহা এত সুন্দর হইয়াছিল যে সকলেই ইহা সবিশেষ আগ্রহ ও আনন্দের সহিত পাঠ করিয়াছিলেন। উপনিবেশ ও ইংলণ্ডের তদানীন্তন প্রধান প্রধান সংবাদপত্রের সম্পাদকেরাও স্ব স্ব পত্রে উহার অনেক অংশ মুদ্রিত করিয়া ওয়াসিংটনের ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। ৪ অষ্টম পরিচ্ছেদ রণশিক্ষা ও যশােলাভ। ; রাসী গবর্ণবের উত্তর ও ওয়াশিংটনের রােজনামচা পাঠ ফ করিয়া সকলেরই প্রতীতি জন্মিল যে ওহিয়ে-নদ-পার্শ্বে ফরাসীদিগের রাজ্যবিস্তার-চেষ্টা বিনা যুদ্ধে নিরস্ত হইবার নহে। ইংলণ্ডেশ্বর দ্বিতীয় জর্জ ফরাসীদিগকে বাধা দিবার নিমিত্ত আদেশ দিলেন; উপনিবেশ-সমূহে সেনা সংগ্রহ ও রণ-কৌশল শিক্ষার ধূম পড়িয়া গেল ; ভার্জিনিয়া প্রদেশের সেনাগঠনের ভার ওয়াসিংটনের হস্তে ন্যস্ত হইল। কিন্তু সাধারণ যােদ্ধা- দিগের জন্য যে বেতনের হার নির্দিষ্ট হইল তাহা নিতান্ত অল্প বলিয়া প্রথম প্রথম বলিষ্ঠ, পরিশ্রমী, কৃষিজীবী সম্প্রদায় সেনাদলে প্রবিষ্ট হইতে চাহিল না। যারা নিঃস্ব, যাহাদের গৃহ ছিল না, আহার জুটিত না, এমন লােকেই সৈনিক শ্রেণীভুক্ত হইবার নিমিত্ত আবেদন করিতে লাগিল। এরূপ উপাদানে গঠিত হইলে সে সেনা কোন কাজেরই হইবে না ভাবিয়া ওয়াসিংটন নিতান্ত ভগ্নোৎসাহ হইলেন এবং গবর্ণর সাহেবের নিকট প্রকৃত অৱস্থা বিজ্ঞাপনপূর্বক প্রতিবিধানের প্রার্থনা করিলেন। তাঁহার আশঙ্কা অমূলক নহে বিবেচনা করিয়া গবর্ণর সাহেব প্রচার করিলেন যে যাহার। ফরাসীদিগের সহিত যুদ্ধ-কালে ইংলণ্ডেশ্বরের সহায়তা করিবে, রণশিক্ষা ও যশােলাভ। ওহিয়াে-নদ-পার্শ্ববর্তী ভূভাগ হইতে তাহারা ছয় লক্ষ বিঘা উৎকৃষ্ট ভূমি পারিতােষিক পাইবে। এই ঘােষণা-পত্র দ্বারা ওয়াসিংটনের অভীষ্ট সিদ্ধ হইল, কারণ পুরস্কার পাইবার লােভে বহুসংখ্যক কর্মঠ লােক সৈনিক পদের প্রার্থী হইয়া দাড়াইল, ওয়াসিংটন জনসাধারণের প্রিয়পাত্র, সুতরাং গবর্ণর সাহেব সকলের মনস্তুষ্টি সম্পাদনের নিমিত্ত তাঁহাকেই প্রধান সৈনাপত্যে অভিষিক্ত করিবার সংকল্প করিলেন। কিন্তু এরূপ ঘটিলে কর্ণেল ফ্রাই নামক এক জন প্রবীণ ও বিচক্ষণ সৈনিক পুরুষকে অন্যায়রূপে উপেক্ষা করা হয় বিবেচনা করিয়া ওয়াসিংটন নিজেই ঐ পদ গ্রহণ করিতে অসম্মত হইলেন। তিনি বলিলেন আমার বয়স অল্প, যুদ্ধ বিষয়ে অভিজ্ঞতা অতএব ফাই সাহেবের অধস্তন পদে নিযুক্ত হইলেই আমি আপনাকে কৃতার্থ মনে করিব। ওয়াসিংটনের ন্যায় নিরহঙ্কার, সুবিবেচক লােকের পক্ষেই স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে এরূপ স্বার্থত্যাগ সম্ভবপর। স্বার্থশূন্যতার ন্যায় অটল সহিষ্ণুতাও ওয়াসিংটনের চরিত্রের একটা প্রধান অলঙ্কার ছিল। যে সময়ের কথা হইতেছে তখন একদিন ঘটনা- ক্রমে পেইন নামক এক ব্যক্তির সহিত ওয়াসিংটনের সামান্য কারণে বাগবিতণ্ডা হয়। পেইন কথায় না পারিয়া হঠাৎ এরূপ উত্তেজিত হইয়া উঠেন যে এক আঘাতেই ওয়াসিংটনকে ভূমিশায়ী করেন। তদ্দর্শনে ওয়াসিংটনের আত্মীয়গণ পেইনকে প্রহার করিতে উদ্যত হইলে তিনি বাধা দিয়া বলিলেন, আপনারা নিরস্ত হউন, ইহার কোন দোষ মাই ; আমার অন্যায় কথাতেই ইনি এত ক্রুদ্ধ হইয়াছেন।” ওয়া- সিংটনের এবংবিধ ব্যবহারে দশকবৃন্দ অতিমাত্র বিস্মিত হইলেন। অনন্তর তিনি গৃহে গিয়া পেইনের সহিত দেখা করিবার নিমিত্ত পত্র লিখিলেন। তৎকালে দুই ব্যক্তি বিবাদ করিলে সময়ে সময়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতেন। পত্র পাইয়া পেইন ভাবিলেন ওয়াসিংটন বুঝি তাঁহাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধার্থই মহাপুরুষ-চরিত। আহ্বান করিতেছেন। এই আশঙ্কায় তিনি সশস্ত্র হইয়া তাঁহার সহিত দেখা করিতে গেলেন। কিন্তু ওয়াসিংটন তাহাকে সাদরে অভ্যর্থনা করিয়া কহিলেন “মহাশয়, কল্যকার ঘটনায় আমি নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছি। অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে ক্ষমা করুন।* ধন্য ওয়াসিংটন। ধন্য তােমার সহিষ্ণুতা ! প্ৰতীকারের শক্তি থাকিতেও যিনি ক্ষমা প্রদর্শন করিতে পারেন তিনিই প্রকৃত ক্ষমাশীল। আর পেইন সাহেব —তিনি লজ্জায় মরিয়া গেলেন ; ওয়াসিংটন শতবার প্রহার করিলেও বােধ হয় তাহাকে এত মৰ্ম্মযাতনা ভােগ করিতে হইত না। এদিকে ফরাসীদিগের সহিত যুব্ধ করিবার নিমিত্ত যে আয়ােজন হইতেছিল, তাহা সম্পন্ন হইল। কর্ণেল ফ্রাই ও ওয়াসিংটন অনুচরবর্গসহ সীমান্ত প্রদেশ রক্ষার নিমিত্ত যাত্রা করিলেন। তথায় উপস্থিত হইবার অল্প দিন পরেই কর্ণেল ফ্রাই মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন; সুতরাং সৈনা- পত্যের ভার ওয়াসিংটনের স্কন্ধে পড়িল। ফরাসীরাও নিশ্চেষ্ট ছিলেন না; তাহারা সীমান্ত প্রদেশে আপনাদিগের আধিপত্য অক্ষুন্ন রাখিবার নিমিত্ত একদল সেনা প্রেরণ করিলেন। কিন্তু ওয়াসিংটন অনায়াসে ইহাদিগকে পরাভূত করিলেন এবং বন্দীদিগকে গবর্ণর সাহেবের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। এই ওয়াসিংটনের প্রথম যুদ্ধ। যিনি শত যুদ্ধে জয়ী হইবেন, বিজয় লক্ষ্মী প্রথম হইতেই তাহার প্রতি অনুগ্রহ দেখাইলেন। ফরাসীরা শীঘ্রই এই অপমানের প্রতিশােধ লইবার চেষ্টা করিবেন ভাবিয়া ওয়াসিংটন একটা দুর্গ সুরক্ষিত করিতে লাগিলেন। এতদিন তিনি রাজকোষ হইতে বেতন পাইতেছিলেন। এক্ষণে বিবেচনা করিলেন যে স্বদেশের কল্যাণ-সাধনার্থ কোন কাজ করিতে হইলে তাহার ন্যায়ু সঙ্গতিপন্ন লােকের পক্ষে পারিশ্রমিক গ্রহণ না করাই কর্তব্য। ইহা স্থির করিয়া আর বেতন লইবেন না বলিয়া তিনি গবর্ণর সাহেবকে পত্র লিখিলেন।

রণশিক্ষা ও যশােলাভ। কিছুদিন পরে ফরাসীরা একদল পরাক্রান্ত সেনা লইয়া ওয়াসিংটনের দুর্গ আক্রমণ করিলেন। ফরাসীদিগের তুলনায় ওয়াসিংটনের সৈন্যসংখ্যা নিতান্ত অল্প ছিল; সুতরাং অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াও শেষে তাঁহাকে শক্তহস্তে দুর্গ অৰ্পণ করিতে হইল। কিন্তু পরাজিত হইয়াও তিনি মৰ্য্যাদা হারাইলেন না। তিনি সুশৃঙ্খলভাবে সমস্ত অনুচর ও যুদ্ধোপকরণ সহ ভার্জিনিয়ায় প্রতিগমন করিলেন। তথায় সকলেই এক- বাক্যে তাহার স্বদেশ-হিতৈষণা ও রণ-নৈপুণ্যের প্রশংসা করিতে লাগিল। অতঃপর গবর্ণর সাহেব ফরাসীদিগের অধিকারস্থ দুর্গ আক্রমণ করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া জ্ঞানবৃদ্ধ ওয়াসিংটনের পরামর্শ চাহিলেন। উপনিবেশসমূহের তদানীন্তন সেনাবল ও সৈনিকপুরুষদিগের যুদ্ধানভিজ্ঞতা বিবেচনা করিয়া ওয়াসিংটন এ প্রস্তাবের অনুমােদন করিলেন না। কিন্তু গবর্ণর সাহেব তাঁহার সহিত একমত না হইয়া, ইংলণ্ড হইতে সুশিক্ষিত সেনা আনাইবার ব্যবস্থা করিলেন এবং তৎসঙ্গে ইংলণ্ডেশ্বরের নিকট হইতে এরূপ আদেশও বাহির করিলেন যে, ইংলণ্ড হইতে আগত সৈনিক পুরুষদিগের পদমর্যাদা আমেরিকাবাসী সৈনিকপুরুষদিগের পদমর্যাদা অপেক্ষা উচ্চতর হইবে। ওয়াসিংটন এই ব্যবস্থায় নিতান্ত অসন্তুষ্ট হইয়া পদত্যাগ পূর্বক ভার্ণনশৈলে চলিয়া গেলেন। এই সময়ে ইংরাজ ও ফরাসীতে ইয়ুরােপেও ভয়ানক যুদ্ধ চলিতেছিল। গবর্ণর সাহেবের অনুরােধ অনুসারে উপনিবেশসমূহের রক্ষার নিমিত্ত ইংলণ্ড হইতে ব্রাড়ক নামক একজন বিখ্যাত সেনানী দুই দল পরাক্রান্ত পদাতিক সহ আমেরিকায় প্রেরিত হইলেন। ওয়াসিংটনের গুণগ্রাম ব্রাডকের অবিদিত ছিল না। তিনি তাঁহার পদত্যাগের কারণ অবগত হইয়া বলিলেন “ওয়াসিংটন উচিত কাৰ্য্যই করিয়াছেন; এরূপ আদেশ প্রচার করা ইংলণ্ডের পক্ষে অসঙ্গত। গবর্ণর। যাহা হউক, এক্ষণ কি কৰ্তব্য তাহাই স্থির করা যাউক। ;

ঃ মহাপুরুষ-চরিত আপনার সেনা সুশিক্ষিত ; ইহারা নিশ্চিত ওয়াসিংটনের অশিক্ষিত সেনা অপেক্ষা অধিক ফল দেখাইতে পারিবে। ব্রাউক। আমার প্রথম কৰ্তব্য, 'ওয়াসিংটনকে পুনর্বার সৈনিকবিভাগে আনিবার চেষ্টা। তিনি অশিক্ষিত সেনা লইয়া এত সুকৌশলে যুদ্ধ করি- য়াছেন বলিয়া আরও প্রশংসার পাত্র। তাঁহার মত লােক সর্বতােভাবে ইংলণ্ডীয় সেনাদিগের সহিত সমান মর্যাদা পাইবার অধিকারী। গবর্নর। তিনি পুনৰ্ব্বার স্বপদে প্রতিষ্ঠিত হইলে আমি সুখী হইব; জনসাধারণেও সুখী হইবে। সকলেই তাঁহাকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করে। তিনি যে সাহসী, রাজভক্ত ও বিচক্ষণ তাহাতে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। ব্রাডক তখনই ওয়াসিংটনকে পুনর্বার সৈনিক বিভাগে প্রবিষ্ট হইবার নিমিত্ত অনুরােধ করিয়া স্বহস্তে এক পত্র লিখিলেন। ওয়াসিংটন এ অনুবােধ উপেক্ষা করিতে পারিলেন না। তিনি একটা সম্মানাহ পদ পাইয়া এবং জননীর আশীৰ্বাদরূপ কবচে সুরক্ষিত হইয়া ব্রাডকের সহিত যােগ দিলেন। ব্রাডক সাহসী, উদারচেতা ও বহুদর্শী সেনাপতি; কিন্তু আমেরিকার ন্যায় দুর্গম বনাবৃত দেশে কি প্রণালীতে যুদ্ধ করিতে হয়, তাহা জানিতেন । এই সময়ে অনেক আদিম অধিবাসী ইংরাজ-কর্মচারীদিগের প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়া ফরাসীপক্ষ অবলম্বন করিয়াছিল। ইহারা পথিমধ্যে লুক্কা- ঠিত থাকিয়া অতর্কিতভাবে অব্যর্থসন্ধানে শক্ৰসংহারে যে কত পটু তাহাও ব্রাডকের জানা ছিল না। ইয়ুরােপীয় সভ্য জাতিদিগের মধ্যে যুদ্ধ ঘটিলে কোন অসদুপায়ে শত্রুদমনের চেষ্টা হয় না, বিজেতারা শুদ্ধ নর- শােণিতপিপাসায় পরাজিত শত্রুর প্রাণসংহার করে না, এত কাল তিনি ইহাই দেখিয়াছিলেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন যে উপস্থিত ক্ষেত্রে ফরাসীদিগেরই সহিত তাহার যুদ্ধ ; সুশিক্ষিত ও পরাক্রান্ত সেনা লইয়া অনায়াসেই এ যুদ্ধে জয়ী হইতে পারিবেন। এই বিশ্বাসে গবর্ণর সাহেবের রণশিক্ষা ও যশােলাভ। অভীপিত ফরাসী দুর্গ অধিকার করিবার নিমিত্ত তিনি অনুচরবর্গসহ মহাড়ম্বরে যাত্রা করিলেন। পথে জনপ্রাণীও তাঁহার গতিরােধের চেষ্টা করিল না। অল্পদিনের মধ্যে ইংরাজসেনা নির্বিঘ্নে মনাঙ্গাহেলা নদী পার হইয়া ফরাসী দুর্গের চারি ক্রোশমাত্র দূরে উপস্থিত হইল। তখনও শত্রুপক্ষের কোন চিহ্ন দেখিয়া ওয়াসিংটনের মনে সন্দেহ জন্মিল। তিনি আশঙ্কা করিতে লাগিলেন যে শত্রুরা তাঁহাদের সর্বনাশ সাধনের জন্যই আপাততঃ দূরে দূরে অবস্থান করিতেছে, শেষে সুযােগ পাইলে এরূপ অতর্কিতভাবে আক্রমণ করিবে যে তাঁহাদের পক্ষে আত্মরক্ষা করা কঠিন হইবে। এই ধারণায় পুরােভাগে কোথাও আদিম অধিবাসীরা পথপাশ্বে লুকায়িত আছে কি না, নির্ণয় করিবার নিমিত্ত তিনি ব্রাডকের অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। ব্রাডক সহাস্যে বলিলেন “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, কোন ভয় নাই। আমার সুশিক্ষিত সেনার নিকট বৰ্ব্বরেরা কতক্ষণ তিষ্ঠিতে পারে ? অগ্নিতে তুলারাশির ন্যায় মুহূৰ্ত্তমধ্যে বিনষ্ট হইবে।” ওয়াসিংটন ইহার প্রতিবাদ করিলেন না, কিন্তু তাহার আশঙ্কাও অপনীত হইল না। অনন্তর তাহারা আরও কিছু দূর অগ্রসর হইয়াছেন এমন সময়ে এক দল আদিম অধিবাসী ভীষণ চীৎকার করিতে করিতে ইংরাজসেনার উপর গুলি চালাইতে আরম্ভ করিল। হঠাৎ আক্রান্ত হইয়া এবং আদিম অধিবাসীদিগের বিকট চীৎকার শুনিয়া সুশিক্ষিত ইংলণ্ডীয় সেনা ভয়- বিল ও ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল; ব্রাড়ক আহত হইলেন; ওয়াসিংটন সেনানীত্ব গ্রহণ করিয়া আততায়ীদিগকে নিরস্ত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাঁহার বিশাল দেহ শত্রু পক্ষের প্রধান লক্ষ্য হইল। দুইটী অশ্ব উপর্যুপরি বিদ্ধ হইয়া তাঁহাকে বহন করিতে করিতে প্রাণত্যাগ করিল ; চারি পাঁচটা গুলি লাগিয়া তাঁহার পরিচ্ছদের নানা স্থান ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হইল ; একটার আঘাতে তাহার বক্ষস্থলে প্রলম্বিত ঘটিকাযন্ত্রের ; ;

মহাপুরুষচরিত। চাৰি উড়িয়া গেল ; কিন্তু তিনি সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করিয়া অক্ষতদেহে সেনা পরিচালন করিতে লাগিলেন। বােধ হইতে লাগিল যেন কোন অদৃশ্য কবচ তাঁহার দেহরক্ষার নিমিত্ত শত্রুপক্ষের গােলাগুলি দুরে সরাইয়া দিতেছে। ইংলীয় সেনাদল পৃষ্ঠভঙ্গ দিল। ওয়াসিংটন না থাকিলে সম্ভবত তাহারা সকলেই নিহত হইত। তিনি তাহাদিগকে সুশৃঙ্খলভাবে র ক্ষেত্র হইতে ফিরাইয়া আনিলেন। পথিমধ্যে ব্রাডকের প্রাণবিয়ােগ হইল। আসন্নকালে তিনি ওয়াসিংটনের উপদেশ-লঘন হেতু অনুতাপ প্রকাশ করিয়াছিলেন, এবং ওয়াসিংটনেরই ক্রোড়ে মস্তক রাখিয়া নিজের প্রিয় যুদ্ধাশ ও বিশ্বস্ত ভৃত্য বিশপকে তদীয় হন্তে প্রীতি উপহার স্বরূপ প্রদান করিয়া চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হইয়াছিলেন। ওয়াসিংটন ভার্জিনিয়ায় প্রতিগমন করিলে সকলেই অতি সমাদরে তাহার অভ্যর্থনা করিল। মনাঙ্গাহেলা নদীর তীরে তিনি যে অদ্ভুত বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছিলেন তাহা কাহারও অবিদিত ছিল না। সুতরাং সকলেই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিল যে তিনি সহায় না হইলে ব্রাডকের অনুচরবর্গের এক প্রাণীও যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিতে পারিত না। ফলত সেই যুদ্ধে শত্রুপক্ষ তাঁহার প্রাণবিনাশের জন্য যেরূপ চেষ্টা করিয়া- ছিল তাহা মনে করিয়া অনেকে তাঁহাকে দৈবানুগৃহীত বলিয়া বিবেচনা করিতে লাগিল। তাহাদের ধারণা হইল ধে ঈশ্বর তাহা দ্বারা কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত করিবেন বলিয়াই এরূপ বিপদ হইতে রক্ষা করিয়াছেন। ইহার কয়েক বৎসর পরে যখন ফরাসীরা ওহিয়ােনদের পার্শ্ব হইতে সম্পূর্ণ রূপে বিতাড়িত হইয়াছিলেন, তখন উপনিবেশের যােদ্ধাদিগকে গবর্ণর সাহেবের অলীকৃত ছয় লক্ষ বিঘা ভূমি পুরস্কার প্রদত্ত হয়। ভূমি বাচিয়া এইবার জন্য ওয়াসিংটন ঐ অঞ্চলে গমন করিলে একদিন তথায় এক প্রাচীন আদিমনিবাসীর সহিত তাঁহার আলাপ হয়। মনাঙ্গাহেলার তীরে ৮ রণশিক্ষা ও যশােলাভ। যে সমস্ত আদিম অধিবাসীরা লুক্কায়িত থাকিয়া ব্রাডকের সেনা নষ্ট করে, এই লােকটা তাহাদের একজন। ওয়াসিংটনের পরিচয় পাইয়া সে তাহাকে এই কথাগুলি বলিয়াছিল—“আমি আদিমনিবাসীদিগের এক জন অধিনেতা; এ অঞ্চলে অনেকেই আমার আজ্ঞা লম্বন করিতে পারে না। আমার অনেক বয়স হইয়াছে; চিরকালই যুদ্ধে কাটাইয়াছি। মনাঙ্গাহেলার তীরে আপনি যে বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছিলেন তাহা আমি জীবনে ভুলিব না। তদবধি একবার আপনার সঙ্গে মিত্রভাবে আলাপ করিবার জন্য আমার বড়ই ইচ্ছা ছিল। সেই ইচ্ছার বশবর্তী হইয়াই আপনি এ দেশে পদার্পণ করিয়াছেন শুনিয়া, আমি অনেক দূর হইতে আপনাকে দেখিতে আসিয়াছি। সে দিনের যুদ্ধব্যাপার যেন এখনও আমার চক্ষুর সম্মুখে রহিয়াছে। আপনার দেহ বিদ্ধ করাই সে দিন আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। আমরা শত শত লােকে আপনার দিকে গুলি চালাইলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য্য । যাহাদের সন্ধান চিরকাল অর্থ, তাহারা আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারিল না ; যেন কোন দৈবশক্তি সযত্নে আপনার রক্ষাবিধান করিতে লাগিল। আমি আর অধিক দিন বাঁচিব না। মৃত্যুর পূর্বে আপনার সম্বন্ধে একটী ভবিষ্যদ্বাণী বলিলেও আমার তৃপ্তি হইবে না। যাহার অবিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হয় করুন, আমি দিব্য চক্ষুতে দেখিতেছি, যুদ্ধে আপনার পতন নাই; স্বয়ং ভগবান্ আপনার রক্ষাকর্তা। আপনি জাতি-সমূহের পরিচালক হইবেন এবং উত্তরকালে লােকে আপনাকে এক মহাপরাক্রান্ত রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া পূজা করিবে।” ব্রডকের নিধনের পর আদিম নিবাসীরা সীমান্ত প্রদেশে আরও উপব আরম্ভ করিল। তাহারা পল্লীসমূহ লুণ্ঠনপূর্বক গৃহাদি ভস্মীভূত করিত এবং বালবৃদ্ধবনিতা যাহাকে পাইত নিষ্ঠুররূপে নিহত করিয়া ফেলিত। ফরাসীয়া ইহাদের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। কিন্তু এই সময় মহাগুরুষ-চরিত মহামতি পীট ইংলণ্ডের প্রধান মন্ত্রী হইয়া এরূপ সুকৌশলে ফরাসীদিগের সঙ্গে যুদ্ধ চালাইতে লাগিলেন যে, অল্পদিনের মধ্যেই পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ইংরাজদিগের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইল। ইংরাজসেনাপতি উষ্ণ কানাডা প্রদেশ অধিকার করিয়া আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে ফরাসী প্রাধানের মূলােচ্ছেদ করিলেন। এদিকে ভার্জিনিয়া প্রভৃতি প্রদেশের সুশাসনের জন্য গবর্নর ডিষ্টইডি সাহেব পদচ্যুত এবং সীমান্ত প্রদেশের রক্ষাবিধানাথ এবারক্ৰম্বি নামক জনৈক ইংরাজসেনানী প্রেরিত হইলেন। এবারক্ৰম্বি সাহেব ওয়াসিংটনের পরামর্শানুসারে ফরাসী দুর্গ অধি- কারের উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। ওয়াসিংটনও তাঁহার সঙ্গে যােগ দিলেন। তাহার ধারণা ছিল যে এই দুর্গের পতন হইলেই ফরাসীদিগের ক্ষমতা-সম্বন্ধে আদিমনিবাসীদিগের বিশ্বাস অন্তর্হিত হইবে এবং তাহারা অনায়াসে ইংরাজদিগের আনুগত্য স্বীকার করিবে। এই সময়ে একদিন ওয়াসিংটন অনুরােধে পড়িয়া কোন পরিচিত ভদ্রলােকের বাটীতে আতিথ্য স্বীকার করেন। তথায় ভােজন-কালে মার্থা নাম্নী এক যুবতী বিধবা রমণীর সহিত তাঁহার পরিচয় হয়। প্রথম আলাপেই উভয়ে পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত হন, এবং স্থির করেন যে ফরাসীদিগের হস্ত হইতে দুর্গ অধিকৃত হইলে উভয়ে পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হইবেন। এবারক্ৰম্বি সাহেব সেনাদল দুই অংশে বিভক্ত করিয়া চলিলেন ; তিনি স্বয়ং পুরােভাগের অগ্রণী ; অপর দলের অধিনায়ক ওয়াসিংটন্ পশ্চাতে রহিলেন। এবারও আদিম অধিবাসীরা পুরােবৰ্ত্তী দলকে হঠাৎ আক্রমণ করিয়া ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলিল। যাহারা প্রাণে বাঁচিল, তাহারা ওয়াসিংটনের দলে গিয়া আশ্রয় লইল। প্রধান সেনাপতিকে পুনৰ্বার অগ্রসর হইতে অসম্মত দেখিয়া ওয়াসিংটন প্রস্তাব করিলেন যে তিনি নিজেই কিয়ৎসংখ্যক যােদ্ধা লইয়া দুর্গ অধিকারার্থ যাত্রা করিবেন। এই প্রস্তাব অনুমােদিত হইলে ওয়াসিংটন্ পরদিন দুর্গে উপস্থিত হইয়া রণশিক্ষা ও যশােলাভ। দেখেন যে তথায় জন প্রাণী নাই; ফরাসীরা কানাডার পতনসংবাদ, পাইয়া গৃহাদি ভস্মীভূত করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। ওয়াসিংটন দুগোপরি ইংলণ্ডের বিজয়ধ্বজা উত্তােলন করিয়া প্রধান মন্ত্রীর নামানুসারে উহার নাম পীট দুর্গ” রাখিলেন, এবং কিয়দ্দিন পরে প্রধান সেনাপতির সঙ্গে ভার্জিনিয়ায় ফিরিয়া আসিলেন (১৭৫৮)। ইহার পর ফরাসীরা ওহিয়াে- নদের তীরে আর কখনও রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করেন নাই। আদিম অধিবাসীরা দলে দলে ইংরাজদিগের বশ্যতা স্বীকার করিল এবং সর্বত্র শান্তির পুনরাবির্ভাব হইল। ওয়াসিংটনও কিছুদিনের জন্য গার্হস্থ্য সুখভােগের আশায় ভার্ণন শৈলে ফিরিয়া গেলেন। • • । ++ ;';

Arri নবম পরিচ্ছেদ। বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবন। ; ণে জয় হইয়াছে, ওয়াসিংটন ফরাসীদিগের দুর্গ অধিকার করিয়াছেন। সুতরাং মার্থা মহানন্দে তাহাকে পতিরূপে বরণ করিলেন। ১৭৫৯ অব্দের প্রারম্ভে ষড়বিংশবর্ষ বয়সে ওয়াসিংটন উদ্বাহসূত্রে বদ্ধ হইলেন। ভার্জিনিয়ার সমস্ত সম্রান্তলােক সন্ত্ৰীক বিবাহসভায় উপস্থিত হইয়া উৎসবে বােগ দিলেন। মার্থা পরম সুন্দরী ও গুণবতী ; ওয়াসিংটন সুশ্রী, বলিষ্ঠ, সাহসী ও কর্তব্যপরায়ণ। এই তুল্যগুণ বধূবরের সম্মিলন দেখিয়া দর্শকবৃন্দের নয়ন মন পরিতৃপ্ত হইল। বিবাহান্তে ওয়াসিংটন ভার্জিনিয়ার ব্যবস্থাপক সভার অন্যতম সভ্য নিযুক্ত হইলেন। তিনি প্রথম দিন উপস্থিত হইলে অন্যান্য সভ্যেরা তাঁহার গুণগ্রামের উল্লেখ করিয়া এত প্রশংসা করিতে লাগিলেন যে, তচ্ছু বণে ওয়াসিংটন অতিমাত্র লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। ভদ্রতার অনুরােধে এরূপ ক্ষেত্রে নবাগত ব্যক্তিকেও দুই চারিটা কথা বলিতে হয়; কিন্তু ওয়াসিংটন কি বলিবেন কিছুই স্থির করিতে পারিলেন বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবন। ; আসন হইতে উঠিয়া অতিকষ্টে কেবল দুই একবার “মহাশয়গণ, “বন্ধুগণ বলিয়া সভ্যদিগকে সম্বােধন করিলেন। তাঁহার সর্বশরীর ঘৰ্মা হইল, মস্তক ঘূরিতে লাগিল। মনাঙ্গাহেলা অপেক্ষা অধিকতর বিপৎ-সঙ্কুল যুদ্ধ ক্ষেত্রেও যে প্রকৃতির বিপর্যয় ঘটিত না, তাহা আজ নিজের প্রশংসা বাদ শুনিয়া আত্মহারা হইল। অনন্তর সভাপতি মহাশয় তাহার ঈদৃশী অবস্থা দেখিয়া বলিলেন “আপনি আসন গ্রহণ করুন, আমরা বিলক্ষণ জানি যে আপনি যেমন সাহসী, তেমনই বিনয়ী”। বস্তুতঃ বিনয়ের আতিশয্য-নিবন্ধনই ওয়াসিংটনের বাক্য-স্মৃৰ্ত্তি হইতেছিল না। ব্যবস্থাপক সভার কার্ষ শেষ হইলে ওয়াসিংটন সস্ত্রীক ভার্ণনশৈলে ফিরিয়া গেলেন এবং তথায় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও কৃষিকার্যে মন দিলেন। কৃষিকার্যে তিনি সমধিক সুখ পাইতেন। তৎকালে ভার্জিনিয়া প্রদেশে অন্য কাহারও তাহার ন্যায় ভূসম্পত্তি ছিল না। এই বিস্তীর্ণ সম্পত্তির সমুচিত তত্ত্বাবধান করিতে হইলে শারীরিক ও মানসিক উভয়- বিধ পরিশ্রমেরই প্রয়ােজন। ওয়াসিংটন পরিশ্রমবিমুখ ছিলেন না, প্রত্যুত পরিশ্রমই তাহার সুখের নিদান বলিয়া মনে করিতেন। তিনি অতি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করিতেন, দাসদাসীদিগের নিদ্রাভঙ্গ না করিয়া নিজেই প্রদীপ জ্বালিতেন; প্রাতঃকৃত্য সমাপনানন্তর লেখাপড়া করিতে বসিতেন; বেলা চারি ছয় দণ্ড হইলে যৎকিঞ্চিৎ জলযােগ করিয়া অশ্বারােহণে ক্ষেত্র পরিদর্শনে যাইতেন এবং প্রয়ােজন হইলে স্বহস্তেই হলচালন পর্যন্ত করিয়া শ্রমজীবীদিগের সাহায্য করিতেন বা তাহাদিগকে কাজ শিখাইয়া দিতেন। গৃহে অতিথি অভ্যাগতের অভাব ছিল না। তাঁহাদের সম্বর্ধনা, দাসদাসীদিগের তত্ত্বাবধান, অশ্বগবাদির রক্ষণাবেক্ষণ, জমিদারীর উন্নতি সাধনার্থ নানাবিধ উপায়বিধান, কোন কাজেই তিনি ঔদাসীন্য দেখাইতেন ; হিসাবপত্ৰ পৰ্য্যন্ত নিজ হাতে রাখিতেন। অথচ তাঁহার সময়ের অভাব হইত না; মৃগয়া, নৌকা-পরিচালন প্রভৃতি তাঁহার নিত্য:কার্টের মহাপুরুষচরিত মধ্যে পরিগণিত ছিল। খ্রীষ্টধৰ্ম্ম-নির্দিষ্ট সন্ধ্যাবন্দনাদি যথারীতি অনুষ্ঠিত হইত; বিষয়কার্যে ব্যস্ত বলিয়া তিনি ঈশ্বরচিন্তা ভুলিতেন না। দাসদাসী ও কর্মচারীর সংখ্যা এক সহস্রের কম ছিল না। একশত গাভীতে দুধ দিত, অশ্ব ও বলাবদ্দ প্রভৃতির সংখ্যাও গাভীর অনুরূপ ছিল; মেষ এত পুষিতেন, যে, তাহাদের পশমে এই সহস্র লােকের পরিধেয় ও শীত বস্ত্র প্রস্তুত হইত। মেষলােম হইতে সূত্র প্রস্তুত করিবার জয় যােলটী চরকা নিয়ােজিত ছিল। প্রতিবৎসর বিক্রয়ার্থ প্রায় দশ হাজার মণ ভুট্টা ও আট হাজার মণ গােধূম ইংলণ্ডে প্রেরিত হইত। ওয়াসিংটনের ন্যায়নিষ্ঠা সম্বন্ধে লােকের এমনই বিশ্বাস ছিল যে কোন বস্তার উপর “জর্জ ওয়াসিংটন” নাম অঙ্কিত দেখিলে লােকে আর ভিতরের জিনিস পরীক্ষা করিয়া দেখি না, মনে করিত উহা ভালই হইবে। এই বৃহব্যাপারের সুব্যবস্থা-সাধনার্থ মার্থাও ওয়াসিংটনের সহায় ছিলেন। অনেক রমণী ঐশ্বৰ্যমদে মত্ত হইয়া নিজে কোন কাজ করেন না ; দাসদাসীদিগের স্কন্ধে সমস্ত ফেলিয়া ভােগবিলাসে রত থাকেন। কিন্তু মাথা সে প্রকৃতির স্ত্রী ছিলেন না; অতিথিদিগের অভ্যর্থনা, পরিজনবর্গের সেবা শুশ্রুষা, খাদ্য ও পরিচ্ছদের তত্ত্বাবধান প্রভৃতি সমস্ত সাংসারিক কাৰ্যই স্বচক্ষে দেখিতেন। তাঁহার ব্যবহারের গুণে কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা বা অপরিচ্ছন্নতা হইতে পারিত না তাহার সদয় ব্যবহারে দাসদাসীরা নিয়ত প্রফুল্লচিত্তে স্ব স্ব কার্য সম্পাদন করিত। তৎকালে আমেরিকার অনেক বড় লােকেরই বিস্তর নিগ্রো দাস দাসী থাকিত। ইহারা ভূতিভু নহে, ঐতি; ইহাদের সন্তান সন্ততি প্রভূর সম্পত্তি বলিয়া গণ্য ছিল। নিগ্রোর পশ্বাদির ন্যায় ক্রীত বিক্রীত হইত; এবং অনেকে তাহাদের প্রতি পশ্বাদির, ন্যায়ই ব্যবহার করিত। কিন্তু ওয়াসিংটন ও মার্থা নিগ্রো দাসদিগকে অপত্যনির্বিশেষে । ;

বিবাহ ও গার্হস্থ্য-জীবন। ভাল বাসিতেন; তাহারা পীড়িত হইলে রীতিমত চিকিৎসা ও পথ্যের ব্যবস্থা করিয়া দিতেন; নিজেরা যাহা খাইতেন, তাহারাও তাহাই খাইত। এই জন্য একশত গাভাতে দুধ যােগাইলেও তাঁহাদিগকে সময়ে সময়ে বাজার হইতে গব্য দ্রব্য ক্রয় করিয়া আনিতে হইত। অনেক নিঃস্ব ইয়ুরােপীয় আমেরিকায় গিয়া উঞ্ছবৃত্তি অবলম্বন করিত। ইহাদের জীবিকা-নিৰ্ব্বাহের কোন নির্দিষ্ট উপায় ছিল না; কেহ ভিক্ষা করিত, কেহ চুরি করিত, কেহ বা গােপনে বনের ভিতর জঙ্গল কাটিয়া চাস আবাদ করত, খাজনা দিবার ভয়ে ভূস্বামীকে জানাইত না বা পাট্টা লইত না। দৈবাৎ ধরা পড়িলে ইহারা বল প্রয়ােগ করিতেও কুণ্ঠিত হইত ; তন্নিবন্ধন মধ্যে মধ্যে দাঙ্গাহাঙ্গামা হইত। একদা এই শ্রেণীর কতিপয় লােক ওয়াসিংটনের এলাকায় প্রবেশ করে। সংবাদ পাইয়া ওয়াসিংটন গিয়া দেখেন যে তাহারা সুরাপানে উন্মত্ত হইয়া যথেচ্ছ আচরণ করিতেছে। চলিয়া যাইতে বলিলে তাহারা নানাবিধ দুৰ্ব্বাক্য প্রয়ােগ করিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু ওয়াসিংটন নিজের মর্যাদা হারাইবার লােক ছিলেন না, তিনি অল্পদিনের মধ্যে তাহাদিগকে নিজের অধিকার হইতে দূর করিয়া দিলেন। আর একদিন তিনি একাকী অশ্বারােহণে যাইতেছেন এমন সময়ে, কিয়রে বনের ভিতর বন্দুকের শব্দ শুনিতে পাইলেন। শব্দানুসরণে তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন এক ব্যক্তি নৌকায় বসিয়া জলচরপক্ষী শিকার করিতেছে। পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে লােকটা ওয়াসিংটনকে ভয় দেখাইবার জন্য বন্দুক তুলিল। কিন্তু যিনি আদিম অধিবাসী,দগের অব্যর্থসন্ধান হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছেন, তিনি বন্দুক দেখিয়া ভীত হইবেন কেন ? ওয়াসিংটন নিমিষের মধ্যে নদীতে পড়িয়া লােকটার হাত হইতে বন্দুক কাড়িয়া লইলেন এবং নৌকা টানিয়া উপরে তুলিলেন। অনন্তর “এ জমীদারী আমার ; আমি কখনও দুৰ্বত্ত লােকের প্রশ্রয় দিব না” বলিয়া এরূপ দৃঢ়ভাবে শিকারীর গ্রীবাদেশ ধরিলেন যে সে গত্যন্তর না ;

মহাপুরুষ-চরিত। দেখিয়া দীনভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করিল, এবং আর কখনও অনধিকার প্রবেশ করিবে না এই অঙ্গীকার করিয়া নিষ্কৃতি পাইল। একদা ওয়াসিংটনকে কোন কাৰ্যোপলক্ষে নিউইয়র্ক নগরে যাইতে হইয়াছিল। তখন তথায় ইংলণ্ড হইতেকতিপয় বলিষ্ঠ, দীর্ঘকায় ও সুগঠন যােদ্ধা আসিয়াছিলেন। নিউইয়র্কের গবর্ণর সাহেব কথা প্রসঙ্গে এই সকল যােদ্ধ,পুরুষের আকৃতির প্রশংসা করিতে আরম্ভ করিলে, একজন সন্ত্ৰাস্তবংশীয়া রমণী কহিলেন ‘মহাশয়, আমি আপনাকে ইহাদের অপে- ক্ষাও সৰ্বাংশে সুন্দর পুরুষ দেখাইতে পারি। ইচ্ছা হয় বাজি রাখুন; পারিলে আমি দণ্ড দিব।” গবর্ণর সাহেব বাজি রাখিলেন। পরদিন ইংলণ্ডেশ্বরের জন্মদিনােৎসব উপলক্ষে রাজপথে জনতা হইল; নবাগত সৈনিক পুরুষেরা সামরিক বেশভূষায় সজ্জিত হইয়া সামরিক বাদ্যের তালে তালে চলিতে লাগিলেন; গবর্ণর সাহেব মুক্তকণ্ঠে তাহাদের রূপ বর্ণনা করিয়া মহিলাকে শুনাইতে লাগিলেন। কিন্তু মহিলাটী কোন কথাই বলিলেন না। অনন্তর অশ্বপৃষ্ঠে ওয়াসিংটন দেখা দিলেন এবং গবর্ণর সাহেবের চক্ষুদ্বয় নিনিমিষভাবে তাঁহার দিকে আকৃষ্ট হইল। তদ্দর্শনে মহিলা কহিলেন ‘মহাশয়, আমি যাহার কথা কহিয়াছিলাম, দেখিতেছি আপনি তাহাকে চিনিয়া ফেলিয়াছেন”। গবর্ণর সাহেব অকপটভাবে উত্তর দিলেন ‘ভদ্রে, আমি হারিয়াছি; যখন বাজি রাখিয়াছিলাম, তখন জানিতাম না যে ওয়াসিংটন এ নগরে আসিয়াছেন।” এই সময়ে ওয়াসং- টনের শরীরের দৈর্ঘ্য ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি অর্থাৎ চারি হাতেরও কিছু অধিক ছিল, এবং সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দৈর্ঘ্যের অনুরূপ সুডৌল ছিল। ওয়াসিংটন প্রায় পঞ্চদশবর্ষকাল নিৰ্ম্মল গার্হস্থ্যসুখভােগে অতিবাহিত করিয়াছিলেন। তিনি ভাবিয়াছিলেন যে তাঁহার জীবনস্রোত এইরূপ শান্তভাবেই প্রবাহিত হইবে। কিন্তু ক্রমে রাজনীতির আকাশে প্রলয়- মেঘের উদয় হইতে লাগিল; তিনি জানিতেন না যে তাহা হইতে পরি- বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবন। নামে ভয়ঙ্কর ঝটিকাব সমুভূত হইয়া পুনরায় তাহাকে সমরতরঙ্গে উপ- প্লত করিবে। পরবর্তী পরিচ্ছেদে আমরা এই মহাবিপ্লবের পরিচয় পাইব। 141*141*11 ]] "! ০ .. 1 :প:fra tili। * 'In runn : 01 Tm Warsawmi দশম পরিচ্ছেদ সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য রাসীদিগের সহিত যুদ্ধ উপলক্ষে ইংরাজজাতির বিস্তর অর্থ ও রক্তক্ষয় হইয়াছিল। সাক্ষাৎসম্বন্ধে উপনিবেশসমূহের উপকারসাধনই এই যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য। তদুপলক্ষে উপনিবেশবাসীরাও সেনা যােগাইয়াছিলেন সত্য; কিন্তু ইংলণ্ড হইতে যে সেনা আসিয়াছিল তাহারই ব্যয় অধিক। এই সময়ে ইংরাজেরা আরও অনেক যুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন বলিয়া ঋণজালে জড়িত হইয়াছিলেন। যুদ্ধান্তে ঋণ পরিশােধের কথা উঠিলে পালি- মেন্টের অনেক সত্য বলিতে লাগিলেন যে উপনিবেশবাসীরা সঙ্গতিশালী, আমেরিকার যুদ্ধবিগ্রহে তাহাদেরই স্বার্থ রক্ষিত হইয়াছে, সুতরাং ঐ যুদ্ধে যে ব্যয় হইয়াছে, তাহার অধিকাংশ তাহাদের নিকট হইতেই গ্রহণ করা কর্তব্য। রাজপুরুষেরা এই প্রস্তাবের অনুমােদন করিয়া উপনিবেশ- সমূহের নিকট হইতে নূতন কর আদায়ের ব্যবস্থা করিলেন। এদিকে ঔপনিবেশিকেরা বলিতে লাগিলেন, “ইংরাজজাতির রাজ- নীতির মূলসূত্ৰই এই যে প্রজারা প্রতিনিধিদ্বারা রাজকোষের অবস্থা বিবেচনাপূর্বক কর নির্ধারণ করেন এবং প্রজার প্রতিনিধিরাই রাজ্যের মঙ্গলােদশে সংগৃহীত অর্থের ব্যয়ের ব্যবস্থা দেন। তাহারাও যখন ইংরাজ, তখন তাঁহারাই বা কেন এ অধিকারে বঞ্চিত হইবেন ?

সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য। ইংলণ্ডের পালিমেন্ট সভায় আমেরিকার কোন প্রতিনিধি নাই, সুতরাং ঐ সভা আমেরিকার নিকট কোন কর আদায়ের আদেশ দিতে পারেন না। বিশেষতঃ ফরাসীদিগের সহিত যুদ্ধে শুদ্ধ যে আমেরিকাই উপকৃত হইয়াছে এমন নহে; সমগ্র ইংরাজজাতিরই সম্মান রক্ষা ও অধিকার বিস্তার হইয়াছে। অধিকন্তু উপনিবেশবাসীরা যে পরিমাণে উপকৃত হইয়াছেন, নিজেরা সেনা দিয়া এবং ঐ সেনার ব্যয় বহন করিয়া তৎপরিমাণে ক্ষতিগ্রস্তও হইয়াছেন। তাহারাও যেমন নিজের ব্যয় নিজে চালাইয়াছেন, ইংলণ্ডের পক্ষেও সেইরূপ নিজের ব্যয় নিজে চালান উচিত।” কোন পক্ষের কথাই নিতান্ত অযৌক্তিক নহে; তবে একটী গূঢ় প্রশ্নই সমস্ত তর্ক বিতর্কের মূল। প্রশ্নটী এই যে, যখন ইংলণ্ডের পালিমেন্ট সভায় আমেরিকার কোন প্রতিনিধি নাই, তখন ঐ সভা আমেরিকার নিকট কর আদায় করিতে পারেন কি না? এ প্রশ্ন না উঠিলে বােধ হয় আমেরিকার লােকে ইংলণ্ডকে কিছু অর্থ দিয়া ঋণ-মুক্ত করিতে কুণ্ঠিত হইত না। ইংলণ্ডের ভূতপূৰ্ব্ব প্রধান মন্ত্রী পীট এবং আরও কতিপয় বিখ্যাত লােক আমেরিকানদিগের অনুকুলেই মত প্রকাশ করিলেন। কিন্তু ইংলণ্ডের তদানীন্তন অধীশ্বর তৃতীয় জজ ও প্রধান মন্ত্রী গ্রেবিল সাহেবের যেন কেমন একটা প্রতিজ্ঞা হইল, তাহারা পার্লিমেন্টের সর্বতােমুখী ক্ষমতা প্রতিপন্ন করিবেন এই নিমিত্ত ১৭৬৫ অব্দের মার্চ মাসে নিতান্ত অশুভক্ষণে “ইষ্টাম্প আইন জারি করিলেন। এতদ্বারা নিয়ম হইল যে অতঃপর আমেরিকায় খত, কোবালা প্রভৃতি সমস্ত দলিল নির্ধারিত মূল্যের ইষ্টাম্প কাগজে লিখিতে হইবে। ইষ্টাম্প কাগজ ইংলণ্ড হইতে প্রেরিত হইবে এবং উহার বিক্রয়জাত অর্থ ইংলণ্ডের রাজকোষে যাইবে। * এখন হইতে আমেরিকা বলিলে আমরা সম্মিলিত রাজ্য-সমুহকেই বুঝি।

মহাপুরুষ-চরিত ইতিপূর্বে ইংলণ্ড হইতে উপনিবেশবাসীদিগের উন্নতির প্রতিষেধক আরও কতকগুলি ব্যবস্থার প্রণয়ন হইয়াছিল। তাহারা স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করিতে পারিত না, ইংরাজের ভিন্ন অন্য কোন জাতির জাহাজে মাল আমদানি করিতে পারিত না, ইংলণ্ডের শিল্পজাত দ্রব্যের সহিত প্রতিযােগিতা ঘটে এমন কোন ব্যবসায়েও প্রবৃত্ত হইতে পারিত না। এই সমস্ত কারণে পূৰ্ব্ব হইতেই ইংলণ্ডের সহিত আমেরিকার মনাে- মালিন্যের সূত্রপাত হইয়াছিল ; এক্ষণে ইষ্টাম্প আইনে সেই অসন্তোষের মাত্রা পূর্ণ হইল ;-প্রতপ্ত বারুদ-গৃহে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রবেশ করিল। এদিকে ইংলণ্ডেশ্বর কেবল ইষ্টাম্প আইন বিধিবদ্ধ করিয়াই ক্ষান্ত হইলেন না। উপনিবেশবাসীর নীরবে ও অবনত মস্তকে তাহার আদেশ প্রতিপালন না করিয়া প্রতিবাদ করিতে অগ্রসর হইয়াছে, এ ধৃষ্টতা তাহার অসহ্য হইল। তিনি তাহাদিগকে শিক্ষা দিবার জন্য আরও কতকগুলি কঠোর উপায় অবলম্বন করিলেন। তন্মধ্যে আমে- রিকার উৎকট অপরাধীদিগকে বিচারার্থ ইংলণ্ডে পাঠাইতে হইবে, এই আদেশটা সর্বাপেক্ষা কঠোর হইয়াছিল। সুতরাং অল্পদিনের মধ্যেই আমেরিকার জনসাধারণ অত্যন্ত উত্তে- জিত হইয়া উঠিল ; নগরে নগরে, গ্রামে গ্রামে ইংলণ্ডেশ্বরের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ হইতে লাগিল ; বােষ্টন নগরের অধিবাসীরা ইষ্টাম্প- বিক্রেতার মূর্তি গড়াইয়া ভস্মীভূত করিল, তাহার আফিসের দরজা জানালা ভাঙ্গিয়া ফেলিল। যাহাদের পূৰ্বপুরুষেরা শতবর্ষ পূর্বে স্বাধীনতার জন্য জন্মভূমির মায়া ছাড়িয়া আমেরিকায় আশ্রয় লইয়া- ছিলেন, তাঁহারা যে এক্ষণ স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষাৰ্থ এইরূপে বদ্ধপরিকর হইবেন, ইহা আশ্চর্যের বিষয় নহে। কিন্তু প্রথমে কেহই ইংলণ্ডের অধীনতা-পাশ উচ্ছিন্ন করিয়া স্বতন্ত্র হইবার সঙ্কল্প করেন নাই। সকলেই ভাবিয়াছিলেন যে ধীরভাবে পালি- • সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য। মেন্টের আচরণের অযৌক্তিকতা প্রতিপাদন করিলে রাজপুরুষেরা নিশ্চিত তাহাদের অন্যায় আদেশের প্রত্যাহার করিবেন। এই উদ্দেশ্যে তাহারা বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন নামক একজন প্রখরবুদ্ধিসম্পন্ন বিচক্ষণ ব্যক্তিকে ইংলণ্ডের রাজসভায় প্রেরণ করিলেন। এই মহাত্মার জীবন-বৃত্তান্ত অতি অদ্ভুত। পিতার অসঙ্গতিনিবন্ধন শৈশবে তাহার সুশিক্ষা-বিধান হয় নাই ; সুতরাং অল্প বয়সেই তাহাকে জীবিকানিৰ্বাহাৰ্থ একটী মুদ্রান্ত্রে সামান্য বেতনের কাৰ্যে নিযুক্ত হইতে হয়। তিনি এখানে যাহা পাইতেন, তাহা হইতে অতি কষ্টে কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ সঞ্চয় করিয়া তদ্বারা পুস্তকাদি কিনিতেন এবং যখন অবকাশ পাইতেন, তখনই একাগ্রচিত্তে লেখা পড়া করিতেন। এইরূপে অসাধারণ অধ্যবসায়বলে ফ্রাঙ্কলিন অল্প দিনের মধ্যে নানাবিধ জ্ঞানরন্নে ভূষিত হইলেন এবং রাজনীতি, বিজ্ঞান প্রভৃতি অতি জটিল বিষয়সমূহেও বিলক্ষণ পাণ্ডিত্য লাভ করিলেন। তিনিই সর্ব প্রথম তাড়িতের প্রকৃতি পৰ্যালােচনা করিয়া যে পরিচালন-দণ্ডের আবিষ্কার করেন, তাহা আজ সমস্ত সভ্যজনপদের প্রাসাদোপরি মস্তক উত্তোলন করিয়া বজ্রপাত নিবারণ-পূৰ্ব্বক তদীয় প্রতিভার পরিচয় দিতেছে। ফ্রাঙ্কলিনের চেষ্টা নিতান্ত বিফল হইল না। ইংরাজেরা উপনিবেশ- বাসীদিগের মনের ভাব বুঝিতে পারিয়া ইষ্টাম্প আইন উঠাইয়া দিলেন (১৭৬৬); কিন্তু পালিমেন্টেব ক্ষমতার নিদর্শন-স্বরূপ চা প্রভৃতি কয়েকটা আমদানি দ্রবোর উপর এক নূতন শুল্ক স্থাপন করিলেন। সুতরাং বিবাদের মূল কারণ রহিয়া গেল। আমেরিকার অন্যান্য অধিবাসীর ন্যায় ওয়াসিংটনও ইংলণ্ডের এবংবিধ আচরণে মর্মাহত হইলেন। তিনিই উদ্যোগী হইয়া অনেক বিখ্যাত লােকের দ্বারা প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করাইলেন তাহাতে এই কথা লিখিত ছিল যে যতদিন শুল্ক আদায়ের ব্যবস্থা রহিত না হইবে, ততদিন তাহারা মহাপুরুষ-চরিত। শুল্কভারগ্রস্ত কোন দ্রব্যই ব্যবহার করিবেন না। অচিরে সমস্ত উপনিবেশ-বাসীরাই এই প্রতিজ্ঞানুসারে চলিতে লাগিল ; কিছুদিনের মধ্যে ইহার ফলও ফলিল। আমেরিকায় রপ্তানি কম হওয়ায় ইংলণ্ডের ব্যবসায়ীদিগের ক্ষতি হইতে লাগিল ; তাঁহারা পার্লিমেন্টের আচরণে বিরক্তি প্রকাশ করিলেন, সুতরাং মন্ত্রিসভা চা ব্যতীত অপর সর্ববিধ দ্রব্যসম্বন্ধে শুল্ক গ্রহণের সঙ্কল্প ত্যাগ করিলেন; কেবল নিজেদের সমরক্ষার নিমিত্তই চার সম্বন্ধে এরূপ উদারতা প্রদর্শন করিলেন না। সুতরাং বিবাদের মূল পূৰ্ব্ববৎ অক্ষুন্ন রহিল । যাহারা জানেন শীতপ্রধান দেশে চা-পান কত আবশ্যক, তাহারা বুঝিতে পারিবেন উপনিবেশবাসীরা চা-ত্যাগ করিয়া কিরূপ স্বদেশ- হিতৈষণার পরিচয় দিয়াছিলেন। ইংলণ্ড হইতে যে সকল জাহাজ চা লইয়া আসিয়াছিল, তাহারা মাল বিক্রয় করিতে পারিল না। বােষ্টন নগরের কয়েকজন অধিবাসী একদিন আদিম নিবাসীদিগের ন্যায় সজ্জিত হইয়া একখানা চার জাহাজে প্রবেশপূৰ্ব্বক সমস্ত দ্রব্য সমুদ্রে ফেলিয়া দিল। ইহাদিগকে ধরিবার জন্য রাজপুরুষেরা অনেক চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কৃত- কাৰ্য্য না হইয়া শেষে সমস্ত নগরবাসীদিগেরই দণ্ড বিধানের আয়ােজন করিলেন। তাঁহারা আদেশ দিলেন যে বােষ্টননগরের বন্দরের সহিত রাজ্যের অপর সমস্ত বন্দরের বাণিজ্য স্থগিত হইবে। এই আদেশ কাৰ্য্যে পরিণত করিবার জন্য ইংলণ্ড হইতে কতিপয় রণতরিও প্রেরিত হইল। ইংলণ্ডের উগ্ৰমুক্তি দেখিয়া উপনিবেশবাসীরা বুঝিতে পারিলেন যে যুদ্ধ অনিবার্য। তাহারা কর্তব্য-নির্ধারণাৰ্থ ১৭৭৪ অব্দে সমস্ত উপনিবেশ হইতে প্রতিনিধি আহ্বান করিয়া ফিলাডেলফিয়া নগরে কংগ্রেস নামক এক মহাসমিতি গঠন করিলেন। এদিকে বােষ্টনবাসীদিগের দণ্ডবিধানার্থ ইংলণ্ডীয় রণতরী হইতে নগরের উপর গােলাবৃষ্টি হইতে লাগিল। এই সংবাদ পাইয়া বৃদ্ধ পীট চার শুল্ক উঠাইয়া দিবার নিমিত্ত ইংলণ্ডের ৭১ সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য। পার্লিমেন্ট সভায় তেজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা করিতে করিতে মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। সেই মুচ্ছাই কিছুদিনের মধ্যে তাঁহার মহানিদ্রায় পরিণত হইল। পৈত্রপ্রিয় পীটের চেষ্টাতেই ফরাসীরা উপনিবেশসমূহের অনিষ্ট করিতে পারেন নাই। অদূরদর্শী রাজপুরুষদিগের আচরণে যত্নের ধন সেই উপনিবেশ সমূহ ইংলণ্ডের হস্তস্খলিত হইতে চলিল ইহা ভাবিয়াই যেন তিনি সময় থাকিতে ধরাধাম পরিত্যাগ করিয়া গেলেন। ইংরাজেরা ক্রমশঃ অধিকতর উগ্রভাব অবলম্বন করিলেন;-অল্পদিনের মধ্যে আরও সাত সহস্র যােদ্ধা বােষ্টন নগরে উপস্থিত হইল। তাহা দেখিয়া উপনিবেশবাসীরাও যুদ্ধায়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন। ১৭৭৫ অব্দের এপ্রিল মাস হইতে ইংলণ্ড ও আমেরিকার মধ্যে রীতিমত যুদ্ধ আরম্ভ হইল। এ যুদ্ধ সমানে সমানে,-ইংরাজে ইংরাজে—পুরাণ-বর্ণিত ই- উপেন্দ্রের যুদ্ধের ন্যায় তুল্য প্রতিদ্বন্দ্বী। দুই পক্ষেরই তুল্য বল, তুল্য বীরত্ব, তুল্য অধ্যবসায়। শেষে ইন্দ্র উপেন্ত্রের যুদ্ধের ন্যায় ইহাতেও পরিণামে নবীনেরই জয় এবং প্রবীণের পরাজয় হইল। আমেরিকার লােকে যে কিরূপে আগ্রহের সহিত এই মহাসমরে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহা নিম্নলিখিত একটা ঘটনা হইতেই বুঝিতে পারা যাইবে। সর্বপ্রথম ইংরাজ ও আমেরিকানদিগের মধ্যে কর্ড নামক স্থানে একটী যুদ্ধ হয়। ইশ্রেল পুটুনা নামক এক ব্যক্তি হল কর্ষণ করিতেছিলেন, এমন সময়ে ঐ যুদ্ধের সংবাদ পান। পুটুম্ তৎক্ষণাৎ হলবাহী একটী অশ্বকে বন্ধনমুক্ত করিয়া তাহার পৃষ্ঠে আরােহণপূর্বক পার্শ্বস্থ পুত্রকে কহিলেন, “তােমার গর্ভধারিণীকে বলিও যে আমি যুদ্ধ করিতে চলিলাম ; এক্ষণে গৃহে গিয়া তাহার নিকট বিদায় লইতে হইলে বৃথা কালক্ষেপ হইবে।” ইহা বলিয়াই অতি দ্রুতবেগে অশ্বচালনা-পূৰ্ব্বক পুটুনা স্বদেশরক্ষাৰ্থ ধাবমান হইলেন। উপনিবেশ-সমূহের অধিকাংশ লােকেই যে তাহার ন্যায় স্বদেশহিতব্রতে দীক্ষিত হইয়াছিলেন, তাহাতে মহাপুরুষ-চরিত। সন্দেহ নাই। যে ব্যাপারের প্রারম্ভ এরূপ উৎসাহ-পূর্ণ, তাহার ফলও আশাপ্রদ। ওয়াসিংটন সৰ্ববাদিসম্মতরূপে প্রধান সৈনাপত্যে নিযুক্ত হইলেন ; তাহার মাসিক বেতন ৫০০ ডলার * নির্দিষ্ট হইল। ওয়াসিংটন অতি বিনীতভাবে পদ গ্রহণ করিলেন, কিন্তু বেতন গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন না। বলিলেন “এরূপ গুরুতর ভার বহন করিতে হইলে আমাকে গার্হস্থ্য সুখ ও শান্তির আশা ত্যাগ করিতে হইবে। স্বদেশ সেবার ইচ্ছা ভিন্ন অন্য কিছুই এই মহাত্যাগের কারণ হইতে পারে না। সুতরাং আমি বেতন লইব না; তবে সাধারণের হিতার্থ আমাকে যাহা ব্যয় করিতে হইবে তাহার রীতিমত হিসাব রাখিব । আপনারা তাহা দিলেই যথেষ্ট হইবে।” ওয়াসিংটন তখন ফিলাডেলফিয়া নগরে কংগ্রেস সভায় কাজ করিতেছিলেন। সৈনাপত্য গ্রহণের পর ভার্ণন শৈলে গিয়া জননী ও সহধর্মিণীর নিকট বিদায় লইয়া আসিতে হইলে অনেক সময় যাইবে আশঙ্কা করিয়া তিনি তাহাদিগকে পত্ৰদ্বারা নিজের অবস্থা জানা- ইলেন; এবং অতি শীঘ্র বােষ্টন অভিমুখে ধাবিত হইলেন। যদি যুদ্ধে তাহার পতন হয় তাহা হইলে সম্পত্তি-সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা হইবে তাহাও ঐ পত্রে বিবৃত ছিল। বুদ্ধ অতি ভয়ঙ্কর ব্যাপার ; আর কখনও যে জননীর পাদপদ্ম বা পন্নীর মুখচন্দ্র দেখিতে পারিবেন, ইহা জানিতেন না বলিয়াই ওয়াসিংটন পত্র-দ্বারা হাদের নিকট এইরূপে বিদায় চাহিয়া- ছিলেন। ওয়াসিংটন বােষ্টনে পৌঁছিবার পূর্বেই ইংরাজ ও আমেরিকানদিগের মধ্যে বাকাস শৈল নামক স্থানে আর একটী যুদ্ধ হইয়া গেল আমেরি- কানেরা পরাস্ত হইলেন বটে, কিন্তু তাঁহাদের অসাধারণ সাহস দেখিয়া ; * বর্তমান সময়ের ১৫৬২ টাকা। ১ ডলার = ৪ সিলিং ২ পেন্স। সিলিং • অনা।

সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য। ৭৩ ইংরাজেরা বিস্মিত হইলেন। ওয়াসিংটনও বুঝিতে পারিলেন যে ইহারা রীতিমত শিক্ষা পাইলে ইংরাজদিগকে পরাভূত করিতে পারিবে। বােষ্টন হইতে ইংরাজ সৈন্য দূর করাই ওয়াসিংটনের প্রথম লক্ষ্য হইল। তাঁহার সেনা অশিক্ষিত ; অনেকে হল ছাড়িয়া তরবারি ধরিয়াছে। ইংরাজ সৈন্য সুশিক্ষিত ও যুদ্ধ-বিশারদ। তাহার পক্ষে যুদ্ধোপকরণ নাই, অস্ত্র-শস্ত্রের অভাব ; ইংরাজ সৈন্য সৰ্ব্ববিধ যুদ্ধোপকরণে সুসজ্জিত। ওয়াসিংটন সর্বাগ্রে সৈনিক পুরুষদিগের সুশিক্ষা-বিধানে মন দিলেন। তার ব্যবস্থার গুণে শীঘ্রই ইহারা উন্নতি লাভ করিল। ওয়াসিংটনের ধ্রুব বিশ্বাস ছিল কেবল শারীরিক বলে কোন কাজ হয় ; নৈতিক উন্নতিই সর্ববিধ সৌভাগ্যের প্রধান সােপান ; যাহার চরিত্র পবিত্র, ঈশ্বর তাহার সহায়। তিনি যােদ্ধাদিগকে ধর্মপরায়ণ করিতে চেষ্টা করিতেন ; কাহাকে মদ্যাসক্ত বা অন্য কোনরূপ পাপাচারে রত দেখিলে তাহার কঠিন শাস্তি দিতেন। সকলকেই প্রত্যহ রীতিমত ঈশ্বরোপাসনায় যােগ দিতে হইত। ওয়াসিংটন নিজেও সামান্য যােদ্ধাদিগের ন্যায় পরিশ্রম করিতেন। একদা তিনি সেনাকটক পরিদর্শনে বহির্গত হইয়াছেন এমন সময়ে দেখিতে পাইলেন যে একজন সুবাদার অধীন যােদ্ধাদিগকে একটা বড় কাঠ তুলিবার জন্য উৎসাহিত করিতেছেন। তাহারা প্রাণপণে চেষ্টা করি- যাও উহা তুলিতে পারিতেছে না ; তথাপি সুবাদার সাহেব নিজে উহাতে হাত না দিয়া কেবল দূর হইতে “জোরে, আরও জোরে, তােমরা নিতান্ত অকর্মণ্য,” ইত্যাদি বাক্য বর্ষণ করিতেছেন। ওয়াসিংটন তাহাকেও কার্যে ব্রতী হইবার কথা কহিলে তিনি নিতান্ত বিস্ময়বাঞ্জকস্বরে বলিলেন “বলেন কি! আমি যে সুবাদার ! আপনি কি আমাকে ছােট লােক মনে করিয়াছেন? ভদ্র লােকের সহিত সাবধানে কথা কহিবেন।” বলা বাহুল্য লােকটা ওয়াসিংটনকে চিনিতে পারে নাই। অনন্তর ওয়াসিংটন নিজেই ৭৪ মহাপুরুষ-চরিত। কাঠ তুলিতে গেলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে উহা যথাস্থানে স্থাপন করিয়া এই বলিয়া প্রস্থান করিলেন “সুবাদার সাহেব, আপনি নিজে না পারিলে প্রধান সেনাপতিকে সংবাদ দিবেন। তিনি কোন কাজেই অপমান বােধ করেন না। আমার নাম জর্জ ওয়াসিংটন।” এইরূপ শিক্ষার গুণে অস্ত্রাদি যুদ্ধোপকরণের অভাব থাকিলেও উপনিবেশসমূহের সৈনিকগণ অচিরে সংযত, সুশৃঙ্খল ও রণনিপুণ হইয়া উঠিল। পক্ষান্তরে ইংলণ্ডীয় সেনা সুচাৰু পরিচালনার অভাবে মদদ্ধত ও বল-গরিমায় গর্বিত হইয়া পড়িল। সুতরাং প্রথম হইতেই আমেরিকার জয় ও ইংলণ্ডের পরাজয় একরূপ অবধারিত হইয়া রহিল। ওয়াসিংটন আত্মবল বুঝিতে পারিলেন এবং বােষ্টন নগর অবরােধ করিলেন। যে সকল ইংরাজ এই সময়ে তঁাহার হস্তে বন্দী হইতে লাগি- লেন, তিনি তাহাদের প্রতি অতি সদয় ব্যবহার করিয়া সৌজন্যের পরাকাষ্ঠা দেখাইলেন। দীর্ঘকাল অবরােধের পরও যখন ইংরাজদিগের কোন অনিষ্ট করিতে পারিলেন না, তখন ওয়াসিংটন নগর আক্রমণ করিয়া অধিকার করিবার সঙ্কল্প করিলেন। বােষ্টনের বহির্ভাগে দুইটা উন্নত শৈল আছে; তিনি এক রাত্রির মধ্যে তদুপরি বুরুজ নিৰ্মাণ করিয়া পরদিন সূর্যোদয়ের সময় হইতে ইংরাজ কটকে গােল চালাইতে লাগি- লেন। ইংরাজ সেনানী দেখিয়া অবাক্ ; অন্য কোন সেনা এক সপ্তাহেও যে বুরুজ নির্মাণ করিতে পারিত কি না সন্দেহ, বিদ্রোহীরা এক রাত্রিতেই তাহা সম্পন্ন করিয়াছে। তিনি বুরুজ অধিকারের চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু অকৃতকার্য হইয়া নগর ত্যাগ করিয়া যাওয়াই যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করিলেন (১৭৭৬)। বােষ্টৰ অধিকার করিয়া ঔপনিবেশিকদিগের উৎসাহ বাড়িল বটে, কিন্তু আশু তত সুবিধা হইল না। তাঁহারা ইতিপূর্বে কানাডা অধি- কার করিবার জন্য যে সেনা পাঠাইয়াছিলেন, তাহা পরাভূত হইল ;

সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য। এদিকে গৃহশও দেখা দিল। কেহ কেহ স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইংলণ্ডের পক্ষ অবলম্বন করিলেন, কেহ বা ওয়াসিংটনের প্রাণনাশের জন্য ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন। বিচারে কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীর প্রাণদণ্ডাজ্ঞা হইল। এদিকে ইংরাজেরা নুতন সেনাবল লইয়া নিউইয়র্কনগর অধিকারার্থ অগ্রসর হইলেন। ঔপনিবেশিকেরাও আপনাদিগকে স্বাধীন বলিয়া ঘােষণা করিলেন। উপনিবেশগুলি “সম্মিলিত রাজ্যসমূহ” এই নামে অভিহিত হইল। ওয়াসিংটন ইংরাজদিগকে বাধা দিবার জন্য নিউইয়র্ক অভিমুখে যাত্রা করিলেন (১৭৭৬)। তথায় উপর্যুপরি সাতদিন ইংরাজদিগের সহিত যুদ্ধ করিয়া তিনি পরাভূত হইলেন এবং নগর অধিকারের আশা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পশ্চাতে হঠিয়া গেলেন। ইংরাজেরাও তাঁহার অনুসরণ করিতে লাগিলেন। ক্রমশঃ ইংরাজের জয় ও আমেরিকানদিগের বলক্ষয় আরম্ভ হইল। তদ্দর্শনে আমেরিকার পক্ষভুক্ত অনেকেই হতাশ হইয়া পড়িলেন। কিন্তু সম্মুখ যুদ্ধে পরাস্ত হইলেও ওয়াসিংটন এরূপ কৌশলে সেনাচালন করিতে লাগিলেন যে তাঁহার একটী কামানও শত্ৰুদিগের হস্তগত হইল না, সেনার মধ্যে কোনরূপ বিশৃঙ্খলা ঘটিল না। বাতাবিক্ষুব্ধ মহাসাগরের মধ্যে পৰ্বত যেমন অটল,—হেলায় তরঙ্গাঘাত সহ্য করে, ইংরাজ সৈন্যের জয়ােল্লাসের মধ্যে ওয়াসিংটনও তােপ স্থিরসঙ্কল্প,-অক্লেশে আক্রমণ নিবারণ করিতে করিতে আত্মরক্ষায় তৎপর। তাহার রণপাণ্ডিত্যে সমস্ত ইয়ুরোপ স্তম্ভিত হইল ; ফ্রান্স, পােলণ্ড প্রভৃতি দেশ হইতে অনেক বিখ্যাত লােক নিজ ব্যয়ে আমেরিকায় গিয়া ওয়াসিংটনের সেনাদলে প্রবিষ্ট হইতে লাগিলেন। এই বীরপুরুষদিগের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ সুপ্রসিদ্ধ ফরাসী বীর লাফেটের নাম সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য। ফ্রান্সরাজ তখনও আমেরিকাকে স্বাধীন রাজ্য বলিয়া স্বীকার করেন নাই; সুতরাং, লাফেট আমেরিকায় যুদ্ধ করিতে যাইতেছেন শুনিয়া তাঁহাকে নিষেধ করিলেন। কিন্তু লাফেট সে নিষেধ না মানিয়া গােপনে আমেরিকায় উপস্থিত মহাপুরুষ-চরিত। হইলেন। লাফেট সম্ভ্রান্ত-বংশীয়; এয়ােদশবর্ষ বয়সে পিতৃহীন হইয়া সৈনিক বিভাগে প্রবিষ্ট হন এবং বুদ্ধি ও সাহসবলে অল্প দিনের মধ্যে খ্যাতি প্রতিপত্তি লাভ করেন। আমেরিকায় গিয়া তিনি বেতন সন নাই; কোন রূপ পুরস্কারেরও আশা করিতেন না ; দুৰ্ব্বলের সাহায্যরূপ উচ্চ সঙ্কল্পই তাহাকে এই কাৰ্যে ব্ৰতী করিয়াছিল। ওয়াসিংটন তাহাকে পাইয়া বলিয়াছিলেন “ভালই হইল, ফরাসীদেশের একজন প্রধান বীরপুরুষের নিকট আমরা অনেক শিখিতে পারিব।” লাফেট উত্তর করিয়াছিলেন “শিখিতে আসিয়াছি, শিখাইতে আসি নাই।” ক্রমে উভয়েই উভয়ের গুণে আকৃষ্ট হন এবং তাঁহাদের মধ্যে এরূপ সৌহাদ্দ জন্মে যে আজীবন কেহ কাহাকেও ভুলিতে পারেন নাই। ১৭৭৭ অব্দে ব্রান্ড ওয়াইন নদের তীরে আমেরিকানের আবার পরাস্ত হইলেন এবং ইংরাজের ফিলাডেলফিয়া নগর অধিকার করিলেন। কিন্তু ইহার পর হইতেই ভাগ্যলক্ষ্মী ইংৰাজদিগের প্রতি বিরূপ হইলেন। ইংলণ্ডেশ্বর বার্গয়েন নামক সেনানীকে কতকগুলি জৰ্মাণদেশীয় ভৃতিক সৈন্ত সহ আমেরিকায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইহারা সারাটোগা- নগরে শিবিরসন্নিবেশ করিলে উপনিবেশবাসীর উহা আক্রমণ করে এবং কতিপয় দিনের মধ্যে বায়েন সসৈন্যে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হন। তিনি ও তাঁহার অধীন সেন আর কখনও ইংরাজপক্ষে যুদ্ধ করিবেন না বলিয়া অঙ্গীকার করিলে আমেরিকানের দিগকে ইয়ুরােপে ফিরিয়া যাইবার অনুমতি দেন। এই সময়ে ওয়াশিংটনের অনুচরগণ শীতে ও অনাহারে বড়ই কষ্ট পাইয়াছিল। দীর্ঘকাল যুদ্ধ করিয়া উপনিবেশসমূহ ক্রমশঃ অবসন্ন হইয়া পড়িতেছিল; অর্থাভাবে সকল সময়ে রসদ সরবরাহ হইয়া উঠিত না। এরূপ অবস্থায় যােদ্ধাদিগের মনে অসন্তোষ জন্মিবারই কথা। কিন্তু ওয়াসিংটন নিজেও সামান্য যােদ্ধাদিগের ন্যায় কষ্টভােগ করিতেন এবং সম্মিলিত রাজ্যসমূহের প্রধান সৈনাপত্য। ৭৭ যথাসাধ্য সকলেরই দুঃখ দুর করিবার চেষ্টা করিতেন; সুতরাং কেহই তাঁহার ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করিতেন না। নিম্নবর্ণিত একটা ঘটনা হইতেই তাঁহার সদয় ব্যবহারের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাইবে;-একদা ওয়াসিংটন ভােজনাগার হইতে বহির্গত হইয়া দেখিলেন যে একজন শাস্ত্রী বিমর্ষভাবে দ্বারদেশে দাড়াইয়া আছে। দেখিয়াই বােধ হইল লােকটার সেদিন আহার জুটে নাই। ওয়াসিংটন তাহার নিকটে গিয়া কহিলেন “ভ্রাতঃ, আমার রন্ধনশালায় বাও, এবং ইচ্ছামত ক্ষুন্নিবৃত্তি শান্ত্রী। কিরূপে যাইব; আমি প্রহরীর কাৰ্য্য করিতেছি; যতক্ষণ অন্য কেহ আমার স্থান গ্রহণ না করিবে, ততক্ষণ আমার যাইবার উপায় নাই। ওয়াসিংটন। যদি শুদ্ধ ইহাই তােমার অন্তরায় হয়, তবে আমার হস্তে তােমার অস্ত্র শস্ত্র দেও; তুমি যতক্ষণ না ফিরিবে, আমিই তােমার হইয়া প্রহরীর কাৰ্য্য করিব। কথায় যাহা কাৰ্য্যেও তাহা ! ওয়াসিংটন শান্ত্রীর কাৰ্য্য করিতে লাগিলেন; শান্ত্রী আহার করিতে গেল। ১৭-৮ অব্দে লাফেটের সনির্বন্ধ অনুরােধে ফ্রান্সরাজ আমেরিকার পক্ষ অবলম্বন করিলেন এবং আমেরিকার উদ্ধারসাধনার্থ কতকগুলি রণতরি ও যােদ্ধ। পাঠাইলেন। ফিলাডেলফিয়া নগরস্থ ইংরাজের নিতান্ত বিপন্ন হইয়া ঐ স্থান পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক নিউইয়র্ক অভিমুখে যাত্রা করিলেন। আমেরিকানেরা তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ অগ্রসর হইতে লাগিলেন। অতঃপর যদিও প্রায় দুই বৎসর ইংরাজ ও আমেরিকানের মধ্যে কোন প্রকার সম্মুখ যুদ্ধ ঘটিল না, তথাপি শত্রুতারও বিরাম হইল না পরিশেষে ১৭৮১ অব্দে ওয়াসিংটনের পক্ষে মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীরপতনের এক চমৎকার সুযােগ উপস্থিত হইল। লর্ড কর্ণওয়ালিশ নামক বিখ্যাত ৭৮ মহাপুরুষ-চরিত। ইংরাজ সেনানী সাত সহস্র সৈন্যসহ ইয়র্ক টাউন নামক নগরে অবস্থিতি করিতেছিলেন। তাঁহাকে বন্দী করিতে পারিলে ইংলণ্ডের অত্যন্ত ক্ষতি ও উৎসাহ-ভঙ্গ এবং উপনিবেশসমূহের প্রতিপত্তিলাভ হইবে বিবেচনা করিয়া ওয়াসিংটন ঐ স্থান অবরুদ্ধ করিবার সঙ্কল্প করিলেন। তিনি অতি সঙ্গোপনে নৈশ অন্ধকারে নগরের বহির্ভাগস্থ এক উন্নত ভূখণ্ডে কতিপয় বুরুজ নির্মাণ করিয়া রাত্রি শেষ হইবার পূর্বেই সেগুলি সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত অবস্থায় পরিণত করিলেন। ইংরাজেরা সমুদ্রপথে পলা- ইতে না পারেন এ নিমিত্ত ফরাসীরণপােতসমূহ নগরের পুরােভাগে আসিয়া নঙ্গর করিল। প্রত্যুষে উঠিয়া কর্ণওয়ালিশ নিতান্ত বিস্ময়াপন্ন হইলেন; আরবব্যাপন্যাসবর্ণিত প্রদীপ-বশীভূত দৈত্য ভিন্ন আর কেহ যে এরূপ কাৰ্য এক রাত্রিতে নিৰ্বাহ করিতে পারে, ইহা তিনি স্বপ্নেও জানিতেন না। সূর্যোদয় হইলে ঐ সকল বুরুজ হইতে ইংরাজ কটকের উপর অজস্র অগ্নিবৃষ্টি হইতে লাগিল। প্রায় এক পক্ষকাল এই আক্রমণ সহ্ করিয়া কর্ণওয়ালিশ বুঝিতে পারিলেন যে আর কিছুতেই নগর রক্ষা করিতে পারা যাইবে না। স্থলে আমেরিকার সেনা, জলে ফ্রান্সের রণতরি ; কোন দিকেই তঁাহার বাহির হইবার উপায় নাই। সুতরাং 'অনন্যোপায় হইয়া তিনি আত্মসমর্পণের প্রস্তাব করিয়া পাঠাইলেন। আমেরিকা ও ফ্রান্সের সেনা শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দুই পার্শ্বে দণ্ডায়মান হইল এবং ইংরাজসেনা তাহার ভিতর দিয়া অস্ত্র শস্ত্র শহন্তে সমর্পণপূৰ্ব্বক নগর হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। * ইনি উত্তরকালে ভারতবর্ষের গবর্নর জেনারল হইয়া মহীশুর রাঙ্গ টিপু সুলতানকে পরাভূত এবং বাঙ্গালা ও বিহার প্রদেশের রাজস্ব আদায়-সং চিয়া (শসালা) বন্দোবস্ত সুসম্পন্ন করেন।

• in একাদশ পরিচ্ছেদ। সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতিত্ব। ওয়ালিশ পরাভূত হইলেন বটে; কিন্তু যুদ্ধের আশঙ্কা গেল । ইংলণ্ডেশ্বর যে আর কোন চেষ্টা না করিয়া আমে- রিকার ন্যায় একটা সুবিস্তীর্ণ অভ্যুদয়শীল রাজ্য আপনার হস্তম্মলিত হইতে দিবেন ইহা কেহই বিশ্বাস । কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এই সময়ে ইংলণ্ড হইতে কারলটন্ নামা একজন বিচক্ষণ, দূরদর্শী, শান্তিপ্রিয় সৈনিক পুরুষ ইংরাজ সেনার নেতৃত্ব গ্রহণপূর্বক আমেরিকায় উপনীত হইলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে আর যুদ্ধ করা বৃথা ; আমেরিকার স্বাধীনতা অপরিহার্য। এই আট বৎসরের যুদ্ধে ইংলণ্ডের প্রায় বিশ কোটি টাকা ব্যয় এবং লক্ষাধিক লােকের প্রাণসংহার হইয়াছে। আমেরিকার ক্ষতিও অল্প হয় নাই সত্য; কিন্তু ইংলণ্ডের তুলনায় আমেরিকা তখনও বিলক্ষণ পরাক্রম- শালী। সুতরাং আরও কিছুকাল যুদ্ধ চলিলে ইংলণ্ডের অনিষ্টাশঙ্কাই অধিক ; আমেরিকার কষ্ট হইলেও পরাজয়সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। অধিকন্তু যে পক্ষেরই জয় হউক না কেন, এরূপ জ্ঞাতিবিরােধে এঙ্গো- সাক্সন জাতিরই বলক্ষয়। ইংলণ্ডের পার্লিমেন্ট মহাসভাও নিস্তর তর্ক বিতর্কের পর কারলটনের মতেরই অনুমােদন করিলেন এবং ১৭৮২ অব্দের ৩০শে নবেম্বর তারিখে, অর্থাৎ সমরারম্ভের প্রায় আট বৎসর পরে, মহাপুরুষ-চরিত ফ্রান্সের রাজধানী পারিশ নগরে আমেরিকার স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিয়া উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি হইল। ইংলণ্ড-রাজ সম্মিলিত রাজ্যসমূহ হইতে স্বীয় সেনাবল উঠাইয়া লইলেন এবং আর সশস্ত্র থাকা অনাবশ্যক বিবেচনা করিয়া ওয়াসিংটনও আপন সমরসহচরদিগকে স্ব স্ব গৃহে প্রতি- গমন করিতে অনুমতি দিলেন। যাহাদের সহিত এত কাল রণক্ষেত্রে বাস করিয়াছিলেন, যাহাদিগকে তিনি এতদিন আপন পরিজনবর্গের ন্যায় ভাল বাসিতেন, যাহারা তাহাকে পিতার ন্যায় ভক্তি করিত, আজ তাহাদের নিকট বিদায় লইবার কালে তাহার মেহসিন্ধু উদ্বেলিত হইয়া উঠিল। তিনি একে একে সকলের করমর্দন করিয়া বাষ্পগদ্গদকঠে কহিতে লাগিলেন, “আমি যে তােমাদিগকে কত ভালবাসি, আমি যে তােমাদের নিকট কত কৃতজ্ঞ, তাহা কথায় ব্যক্ত করিবার সাধ্য নাই। ঈশ্বর করুন, তােমরা এতদিন অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শনপূর্বক যেরূপে স্বদেশের গৌরববর্ধন করিয়াছ এবং সকলের প্রীতিভাজন হইয়াছ, অতঃ পর যেন শান্তির পথে বিচরণ করিয়া সেই রূপে সুখ ও সম্পত্তির অধিকারী হও।” তৎকালে এন্নাপলিশ নগরে মহাসভার অধিবেশন হইতেছিল। সৈনিক গণ বিদায় গ্রহণ করিলে ওয়াসিংটন স্বয়ং সৈনাপত্য হইতে অবসর লইবার নিমিত্ত নিউইয়র্ক হইতে এন্নাপলিশে যাত্রা করিলেন। পথে লােকে তাঁহাকে দেবতার ন্যায় পূজা করিতে লাগিল। স্ত্রী পুরুষ, বালক বৃদ্ধ সকলেই ইংলণ্ড-বিজয়ীর মুখ দেখিয়া নয়ন চরিতার্থ করিবার নিমিত্ত ধাবমান হইল ; অধিবাসীরা স্ব স্ব গ্রাম নগর প্রভৃতি পতাকাপুষ্পমালায় পরিশােভিত করিয়া তাহার সম্বর্ধনা করিতে লাগিল, চতুর্দিকে তােপ- ধ্বনি হইতে লাগিল এবং গান বাদ্য ও ঘন্টারবে দিঙ,মণ্ডল নিনাদিত হইয়া উঠিল। মহাসভার সভ্যগণ মহাসমাদরে তাহার অভ্যর্থনা করিলেন। তিনি পদ-পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন “মহাশয়গণ, আপনারা আমাকে সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতিত্ব। যে কার্যে নিয়ােজিত করিয়াছিলেন, ভগবানের কৃপায় এতদিনে তাহ সুসম্পন্ন হইয়াছে। এখন আমার পদমর্যাদা এবং তৎসস্তৃত ক্ষমতানিকর আপনাদের হস্তে পুনরর্পণ করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলাম। আপনারা আমার প্রতি নিয়ত যেরূপ সদয় ব্যবহার করিয়াছেন, তাহা আমি সকৃতজ্ঞহৃদয়ে চিরদিন স্মরণ রাখিব।” পদত্যাগের পর ভার্ণন শৈলে বাস করিয়া ওয়াসিংটন পুনৰ্ব্বার তথাকার বিস্তীর্ণ ভূসম্পত্তির তত্ত্বাবধান এবং কৃষিকাৰ্য্য দ্বারা উহার উন্নতি সাধনে মনােনিবেশ করিলেন। তাঁহার সুব্যবস্থায় অল্পদিনের মধ্যেই উহার বিলক্ষণ শ্রীবৃদ্ধি হইল। ইহাতে শুদ্ধ যে তাঁহার নিজের অর্থাগমের উপায় হইল এমন নহে; প্রতিবেশিগণও তাহার অনুসরণ করিয়া নূতন নূতন উন্নতির পথ দেখিতে পাইল। লােকে কখনও কেবল শরীরের বলে স্বাধীন হয় না। মনের বল, হৃদয়ের বল না থাকিলে যতই পরাক্রমশালী হউক না কেন, কেহই দীর্ঘ- কাল স্বাধীনভাবে চলিতে পারে না। সুতরাং স্বাধীনতা চিরস্থায়ী করিতে হইলে ধর্মভাব ও শিক্ষার বিস্তার অত্যাবশ্যক। এই দুই বিষয়ের উন্নতিকল্পে ওয়াসিংটন সৰ্ব্বদা সচেষ্ট ছিলেন। কোন ব্যবসায়-সমিতি, যাহাতে দেশের ধনাগমের পথ প্রশস্ত হয় এমন কার্যে প্রবৃত্ত হইলে, তিনি সর্বান্তঃকরণে তাহার সহায়তা করিতেন। একদা এইরূপ একটি সমিতি ওয়াসিংটনের পরামর্শে লাভবান্ হইয়া তাহাকে লক্ষাধিক মুদ্রার অংশ দিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু ওয়াসিংটন তাহা স্বয়ং গ্রহণ না করিয়া একটী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার্থ নিয়ােজিত করিয়া দিয়াছিলেন। দরিদ্রের সাহায্যার্থ তিনি সব্বদা মুক্তহস্ত ছিলেন। যাহাতে দরিদ্রগণ পরিশ্রম করিয়া জাবিকানির্বাহ করিতে পারে, তিনি সাধ্যানুসারে তাহার উপায়বিধান করিয়া দিতেন। তদীয় বাসভবনের নিকট পটোমাক নদে তিনি এক খানা নৌকা রাখিয়া দিয়াছিলেন ; নিকটবর্তী ২ মহাপুরুষ-চরিত অনেক দুঃখী লােকে ঐ নৌকায় আরােহণ করিয়া মৎস্য ধরিত এবং তাহা বিক্রয় করিয়া যাহা পাইত, তারা আপন আপন সংসার চালাইত। তাহার জমিদারীর স্থানে স্থানে শস্য-ভাণ্ডার ছিল। শস্যোৎপত্তির কালে তিনি উহা পূর্ণ করাইয়া রাখিতেন এবং যখন লােকের অন্নকষ্ট হইত, তখন শস্য বিতরণ করিয়া তাহাদের জীবন রক্ষা করিতেন। একবার ভয়ানক দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হইয়াছিল ; শস্যের মূল্য এত চড়িয়াছিল যে অনেকে কিনিতে পারিত না। তখন ওয়াসিংটন শুদ্ধ পূৰ্ব্বসঞ্চিত শস্য বিতরণ করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই; আরও শস্য ক্রয় করিয়া তদ্বারা ক্ষুধার্ত লােকের প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন। ওয়াসিংটনের দরিদ্র-বাৎসল্য-সংক্রান্ত অনেক কিংবদন্তী প্রচলিত আছে ; তন্মধ্যে নিম্নে দুইটা লিপিবদ্ধ হইল। একদা জন্ন্ নামক জনৈক ভদ্রলােক স্বাস্থ্যোন্নতির নিমিত্ত ভাজি- নিয়া প্রদেশের উষ্ণ প্রস্রবণে স্নান করিতে গিয়াছিলেন। তৎকালে তথায় এত লােকের সমাগম হইয়াছিল যে, জন্ কোন ভাল বাসস্থান না পাইয়া এক রুটি ওয়ালার দোকানে আশ্রয় লইয়াছিলেন। তিনি দেখিতেন যে প্রতিদিন শত শত নিগ্রো তথা হইতে রুটি লইয়া যাইত ; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কেহই মূল্য দিত না। ইহা দেখিয়া একদিন তিনি রুটি ওয়ালাকে জিজ্ঞাসিলেন “ভাই, তােমার এ ব্যবসায়ে কি কিছু লাভ হয় ?” প্রশ্ন শুনিয়া রুটি ওয়ালা কিছু বিস্মিত হইয়া কহিল, “কেন মহাশয়, আপনার এরূপ সন্দেহ হইবার কারণ কি ? আমি ত প্রতিদিন অনেক টাকার রুটি বিক্রয় করি।” “তা সত্য বটে, কিন্তু তুমি কিছু বেশী ধার দেও।” ‘পায় ! কই, আমি ত একখানা রুটি ও ধারে বেচি না।” “সে কি ? আমি যে রােজই দেখিতে পাই, শত শত দুঃখী লােকে তােমার দোকান হইতে রুটি লইয়া যায়; কিন্তু অনেকেই ত মূল্য দেয় না।”

সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতিত্ব। -৩ “তাহাতে ক্ষতি কি? উহারা আমাকে একদিনে সব টাকা বুঝিয়া দিবে।” “বটে, এক দিনে দিবে ? সে দিন বুঝি এ জীবনে নয়! তুমি কি মনে কর যে, ধর্মরাজ উহাদের জামিন হইতেছেন ; আর পরকালে এক কথায় তােমার সব পাওনা শােধ করিয়া দিবেন ?” “না, না, তা নয়। তবে ব্যাপারটা এই যে ওয়াসিংটন তাহার নিজ হিসাবে খরচ লিখিয়া এই সকল দুঃখী লােককে রুটি দিতে আদেশ করিয়াছেন। তঁাহার ইচ্ছা নহে যে ইহারা তাহার নাম জানিতে পারে ; নচেৎ তিনি নিজের লােক দিয়াই রুটি বিতরণ করিবার ব্যবস্থা করিতেন।” রুবে রুজি নামক এক ব্যক্তি ওয়াসিংটনের নিকট বিশ হাজার টাকা ধার লইয়াছিলেন। যথাসময়ে ঋণশােধ না করায় ওয়াসিংটনের প্রধান কর্মচারী তদীয় অজ্ঞাতসারে রুজির নামে নালিশ করিয়া তাহাকে কারারুদ্ধ করাইয়াছিলেন। রুজি কারাবাস হইতে অব্যাহতি পাইবার নিমিত্ত ওয়াসিংটনের নিকট আবেদন করিলেন। ওয়াসিংটন কালবিলম্ব না করিয়া রুজিকে কারাবন্ত্রণা ও ঋণদায় হইতে মুক্তি দিলেন, এবং কৰ্ম্মচারীকে নিষ্ঠুর ব্যবহারের নিমিত্ত ভৎসনা করিয়া পত্র লিখিলেন। কাল-সহকারে রুজির উপর কমলার কৃপাদৃষ্টি পড়িল ; তিনি সুদে মূলে সমস্ত ঋণ পরিশােধ করিবার জন্য ওয়াসিংটনের সকাশে উপস্থিত হইলেন। ওয়াসিংটন তাহার অভিপ্রায় অবগত হইয়া কহিলেন,“কেন, তুমি ত বহু দিন হইল ঋণমুক্ত হইয়াছ?” রুজি তাহার উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিয়া কহিলেন “প্রভু, আমি ও আমার পরিজনবর্গ আপনার নিকট যে ঋণে আবদ্ধ তাহা এ জীবনে পরিশোেধ করিবার' নহে। তবে আমার নিতান্ত অনুরােধ যে আপনি এই টাকাগুলি গ্রহণ করুন।” ওয়াসিংটন টাকা গ্রহণ করিয়া তৎসমস্ত রুজির সন্তানদিগকে দান করিলেন।

৪ মহাপুরুষ-চরিত। মহাকবি কালিদাস রঘুবংশীয় মহারাজ দিলীপের গুণকীর্তন করিবার সময়ে বলিয়াছেন যে তিনি সকলের প্রভু ছিলেন; কিন্তু কদাচ ক্ষমা- পথের বহির্ভূত হইতেন না ; অসামান্য বদান্য হইয়াও আত্মশ্লাঘার লেশমাত্র প্রদর্শন করতেন না।” ওয়াসিংটনের চরিত্র পর্যালােচনা করিলে দেখা যায় যে তিনিও এ সম্বন্ধে মানবজাতির আদর্শ-স্বরূপ ছিলেন। ইতিপূৰ্বে উদ্ধতস্বভাব পেইন সাহেবের প্রতি তদীয় উদারা- চরণের কথা বলা হইয়াছে। সমরাবসানে এক দিন পেইন ওয়াসিংটনের দর্শনলালসায় ভার্নন শৈলে গমন করিয়াছিলেন। পাছে ওয়াসিংটন পূর্বের কথা স্মরণ করিয়া তাহার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন ইহা ভাবিয়া পেইন কিছু ভাত হইয়াছিলেন। কিন্তু ওয়াসিংটন পরমসমাদরে তাহার অভ্যর্থনা করিলেন এবং সহধম্মিণীর নিকট লইয়া গিয়া কহিলেন “প্রিয়ে, ইনি সেই পেইন সাহেব। বােধ হয় তােমার মনে আছে যে, ইনি একদিন আমার এই বিশাল শরীরে আঘাত করিতে সাহসী হইয়াছিলেন । আমি এখন ও মুক্তকণ্ঠে ইহার সাহসের প্রশংসা করি ; আর আশা করি তুমিও ইহার প্রতি সমুচিত সম্মান দেখাইতে কাতর হইবে না।” যুদ্ধের সংস্রব পরিত্যাগ করিবার পরে ও ওয়াসিংটনের পরিশ্রম- শীলতার কিছুমাত্র হাস হইল না। তিনি প্রত্যহ রাত্রি চারিটার সময় শয্য। ত্যাগ করিতেন এবং রাত্রি নয়টার সময় নিদ্রা যাইতেন। সমস্ত পূৰ্ব্বাদু কাল বিষয় কাৰ্য্যে নিয়ােজিত হইত। গৃহে অতিথি অভ্যাগত আসিলেও ইহার কোন ব্যতিক্রম ঘটিত না। তিনি আগন্তুকদিগকে সময় কাটাইবার নিমিত্ত পুস্তক, বাদ্যযন্ত্র, ক্রীড়ােপকরণ প্রভৃতি দিয়া স্বয়ং বিদায় লইতেন এব” ভূত্যবর্গের কাৰ্য পৰ্যবেক্ষণ করিয়া বেড়াইতেন। কি ওয়াসিংটন এ সুখ দীর্ঘকাল ভােগ করিতে পারিলেন না। ১৭৮৭ অব্দে কংগ্রেস মহাসভার জন্য একজন সভাপতি নিযুক্ত করিবার প্রয়ােজন হইল, এবং জনসাধারণে ওয়াসিংটনকে ঐ পদে বরণ সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতিত্ব। ৮ ; করিল। সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতি, আর ইংলণ্ড, জার্মাণি প্রভৃতি দেশের রাজার পদ-মর্যাদা ও কার্যের গুরুত্ব প্রায় তুল্যরূপ। জীবনের সন্ধ্যাকালে এরূপ গুরুতর ভার গ্রহণ করা ওয়াসিংটনের একান্ত ইচ্ছা- বিরুদ্ধ ছিল। কিন্তু তিনি স্বদেশের হিত-কামনায় কখনও নিজের ইচ্ছার বশবর্তী হইয়া চলিতেন না; শত অসুবিধা হইলেও যাহাতে জন্মভূমির পরিচৰ্য্যা হয় তাহাই তাহার প্রধান লক্ষ্য ছিল। সুতরাং তিনি অম্লান- বদনে সভাপতির পদ গ্রহণ করিয়া পুনৰ্ব্বার রাজনীতি-ক্ষেত্রে অবতরণ করিলেন, নিজের কষ্ট ও অশান্তির প্রতি ক্ষেপ করিলেন না। তৎকালে নিউইয়র্ক নগরে কংগ্রেসের অধিবেশন হইতেছিল। ভার্ণন শৈল হইতে নিউইয়র্কে গমন করিবার সময়ে ওয়াসিংটন জনসাধারণ- কর্তৃক যেরূপ অর্চিত ও সংবর্ধিত হইয়াছিলেন, ভূমণ্ডলের অতি অল্প- সংখ্যক রাজা বা সম্রা সেরূপ হইয়াছেন। পথপার্শ্বে সমবেত জনতার মধ্যে একটা বালক তাহার পিতার স্কন্ধে চড়িয়া ওয়াসিংটনকে দেখিয়া বলিয়াছিল “বাবা, ইনিই কি ওয়াসিংটন ? ইনিও ত আমাদেরই ন্যায় একজন মানুষ বৈ নন।” বস্তুতঃ ওয়াসিংটনের অসামান্য কাৰ্যকলাপের কথা শুনিয়া অনেক অজ্ঞ লােকেই তাঁহাকে একটী অলৌকিক আকার- বিশিষ্ট দেবতা বলিয়া স্থির করিয়া রাখিয়াছিল। ইতিপূর্বে ট্রেন্ট নগরে ইংরাজ সেনাকর্তৃক পরাভূত হইয়া ওয়াসিংটন হঠিয়া গিয়াছিলেন; এক্ষণে রাজ্যতরীর কর্ণধার হইয়া ঐ স্থান দিয়া যাইবার সময়ে পৌরগণ প্রত্যুদগমনপূর্বক মহাসমারােহে তাহার অভ্যর্থনা করিল; একপার্শ্বে কুমারী ও অন্য পার্শ্বে পুরন্ধীগণ পুষ্পভার মস্তকে লইয়া দণ্ডায়মান হইলেন; ওয়াসিংটন আগমন করিবামাত্র শত শত বামাকন্ঠ একতানে মিশিয়া তাহার মহিমাকীৰ্ত্তন করিতে লাগিল :- ; ৩ ;

নহাপুরুষ-চরিত। এস, এস, বীর, এস পুনশ্বর, পূজয় মনের সাথে, চরণ তােমার। নাই আর শত্রুভ, কাপাইতে এ হৃদয়, আতঙ্ক অশান্তি যত, নাই হেথা আর, এস হে, পুৰি সবে চরণ তােমার। অমর। অবলা, দেব, তব কৃপাবলে, নিঃশঙ্কহৃদয়ে এবে রয়েছি সকলে। উই সবে সনে, প্রীতির নিকুঞ্জবনে, ভক্তিরসে পাদপদ্ম সিঞ্চিব তােমার, পথেতে ঢালিব তর কুসুমের ভার । সভাপতি হইবার কিছুদিন পরে ওয়াসিংটনের একটা দুষ্টব্রণ হয়। ইহাতে তাহাকে প্রায় ছয় সপ্তাহকাল শয্যাগত থাকিতে হইয়াছিল। পীড়ার উপশম হইলে চিকিৎসকগণ বায়ু-পরিবর্তনের পরামর্শ দিলেন ; এদিকে নিউইংলণ্ড অঞ্চলের অধিবাসীরাও সভাপতিকে দেখিবার নিমিত্ত বড় ব্যগ্র হইলেন। সুতরাং ওয়াসিংটন তথায় গমন করিতে সঙ্কল্প করিলেন। ওয়াসিংটন সময়ের বিলক্ষণ সদ্ব্যবহার করিতেন মুহূর্তকাল বৃথা নষ্ট করিতেন না; যখন যে কাজটা করিবেন বলিয়া স্থির করিতেন, এক পল, এক বিপলের জন্যও তাহার ব্যতিক্রম হইত না। নিউ ইংলণ্ডে ভ্ৰমণ করিবার সময়ে তিনি পুনঃ পুনঃ এই অভ্যাসের পরিচয় দিয়াছিলেন। বােষ্টন নগরে একদল অশ্বারােহী সেনা শরীর-রক্ষক হইয়া তাঁহার অনুগমন করিবে বলিয়া স্থির হইয়াছিল। প্রাতঃকালে আটটার সময়ে অশ্বারােহীদিগের আসিবার কথা ; ঘড়িতে আটটা বাজিল, অশ্বা- রােহীরা আসিল না ; ওয়াসিংটন একাকীই বহির্গত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে অশ্বারােহীরা ছুটিতে ছুটিতে তাহার নিকট উপস্থিত হইল। তাহাদের অধিনেতা পূর্বে ওয়াসিংটনের একজন অধস্তন কর্মচারী ছিলেন। ওয়াসিংটন তাঁহাকে দেখিয়া কহিলেন “সুবাদার সাহেব, আপনি আমার সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতিত্ব। • সহিত এতকাল কাজ করিয়াছেন, তথাপি আটটা কখন বাজে শিখিতে পারেন নাই।” এইরূপ নিয়মনিষ্ঠা ওয়াশিংটনের চরিত্রের একটী অঙ্গ ছিল। চক্ষুলজ্জা বা অন্য কোন হৃদয়দৌর্বল্যের বশীভূত হইয়া তিনি কখনও এ নিয়ম লঘন করিতেন না। গৃহে দশ জন ভদ্রলােক নিমন্ত্রণ করিলেন তাহাদিগকে আহারের সময় বলিয়া দিলেন ; যেমন সময় উপস্থিত হইল, অমনি নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ সকলে সমবেত হউন, আর নাই হউন, ওয়াসিংটন ভােজনারম্ভ করিলেন। কেহ তাহার পরে উপস্থিত হইলে ওয়াসিংটন কহিতেন, “মাপ করিবেন ; আমরা যথাসময়ে আহারে প্রবৃত্ত হইয়াছি।” একদা তিনি জনৈক অশ্ববিক্রেতার নিকট দুইটী অশ্ব ক্রয় করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন; এবং অশ্ব দেখাইবার নিমিত্ত একটা সময় নির্দেশ করিয়া দিয়াছিলেন। ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট সময়ের দশ মিনিট পরে আগমন করিয়া দেখেন যে সভাপতি তখন কাৰ্যান্তরে ব্যাপৃত। অতঃপর ওয়াসিংটনের দর্শন লাভ করিতে ব্যবসায়ীকে সপ্তাহকাল চেষ্টা করিতে হইয়াছিল। বলা বাহুল্য ব্যবসায়ী এই ঘটনায় সময়ের সদ্ব্যবহারসম্বন্ধে বিলক্ষণ শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। ওয়াসিংটনের একজন সহকারী প্রায় প্রতিদিন যথাসময়ে কাৰ্য্যস্থলে উপস্থিত হইতে পারিতেন না; কোন দিন এক মিনিট, কোন দিন দুই মিনিট বিলম্ব হইত। ওয়াসিংটন একদিন তাঁহাকে সাবধান করিয়া দিলেন; কিন্তু তাহাতে সহকারীর অভ্যাস-দোষ দূর হইল না; তিনি দুই এক দিন পরেই আবার বিলম্ব করিয়া আসিলেন। ওয়াসিংটন বিরক্তি প্রকাশ করিলে সহকারী কহিলেন ‘মহাশয়, বােধ হয় আমার বিলম্ব হয় নাই; দেখুন আমার ঘড়িতে নির্দিষ্ট সময়ের এখনও কিছু বাকি আছে।” ইহাতে ওয়াসিংটন আরও বিরক্ত হইয়া কহিলেন,“আর অধিক কথায় প্রয়ােজন নাই; এখন হইতে হয় আপনি একটী ভাল ঘড়ির মহাপুরুষ-চরিত যােগাড় করুন ; নয় আমি একজন কর্তব্যনিষ্ঠ সহকারী পাইবার পথ দেখি।” সভাপতির পদ চারি বৎসরের জন্য স্থায়ী। চারি বৎসর পরে জন- সাধারণে আবার নূতন সভাপতির নির্বাচন করে। ওয়াসিংটন যেরূপ দক্ষতার সহিত প্রথম চার বৎসর এই কার্যের ভার বহন করিয়া আসিতেছিলেন, তাহাতে সকলেরই নিতান্ত ইচ্ছা হইল যে তিনি আরও চারি বৎসর ঐ পদ অলঙ্কত করেন। ওয়াসিংটনের বন্ধুবৰ্গও তাঁহাকে পুনৰ্ব্বার সভাপতি করিবার নিমিত্ত এরূপ নিৰ্বাতিশয় দেখাইতে লাগিলেন, যে তিনি কিছুতেই তাঁহাদের অনুরােধ উল্লজন করিতে পারিলেন না; সুতরাং ১৭৯৩ অব্দের মার্চ মাসে আবার সম্মিলিত রাজ্য- সমূহের সভাপতি-পদে বরিত হইলেন। এবারেও তিনি পূৰ্ব্ববৎ আগ্রহের সহিত জন্মভূমির পরিচর্যা করিতে লাগিলেন। ইংলণ্ড, ফ্রান্স, ও স্পেনের সহিত আমেরিকাবাসীদিগের মনােমালিন্য ঘটিয়াছিল ; ওয়াসিংটনের যত্নে তাহা দূরীভূত হইল। আমেরিকার আদিবাসীদিগের সহিতও সখ্যস্থাপন হইল এবং তাহারা শত্রুতা পরিহারপূর্বক শান্তভাবে বাস করিতে লাগিল। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য প্রভৃতি শান্তির সুশীতল ছায়ায় দিন দিন পরিবর্ধিত হইয়া উঠিল এবং সমগ্র সভ্যজাতির সহিত মৈত্রীসূত্রে বদ্ধ হইয়া সম্মিলিত রাজ্যসমূহ উন্নতির পথে ধাবমান হইল। দ্বিতীয় বারের সভাপতিত্বের সময়ে ওয়াসিংটন দক্ষিণ জনপদসমূহ পরিদর্শন করিতে গিয়াছিলেন। এতদুপলক্ষে তাহাকে রাজধানী হইতে ৯৫০ ক্রোশ দূরে গমন করিতে হইয়াছিল। এবারেও লােকে তাহার সময়ানতিক্রম-স্বভাবের ভূরি ভূরি প্রমাণ পাইয়া সাতিশয় চমৎকৃত হইয়াছিল। রাজধানী হইতে যে দিন যে মুহূর্তে যে স্থানে পৌছিবেন বলিয়া ঘােষণাপত্র বাহির করিয়াছিলেন, ভ্রমণকালে কখনও তাহার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটে নাই। ঘােষণাপত্র দেখিয়া পৌরগণ তাঁহার আগমনকাল ৮৯ সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতিত্ব। জানিয়া লইত, অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করিত। যখন আগমনকাল উপস্থিত হইত, তখন গােলদাজগণ যেমন বর্তিকা জালিয়া তােপ দাগিবার নিমিত্ত কামানের নিকট দাড়াইত, অমনি সভাপতির শ্বেত শকট ঘর্ঘর শব্দে নগর মধ্যে প্রবিষ্ট হইত। সময়ের এইরূপ মৰ্যাদা রক্ষা করিতেন বলিয়াই ওয়াসিংটন অল্প সময়ের মধ্যে অধিক কার্য সম্পাদন করিতে পারিতেন। একদা তাঁহার জনৈক বন্ধু কহিয়াছিলেন, “মহাশয়, আপনি একাকী এত কাজ করেন যে ভাবিয়া আমাদের বিস্ময় জন্মে।” ওয়াসিংটন বিনীতভাবে উত্তর দিয়াছিলেন, “বিস্ময়ের বিষয় কি ? আমি রাত্রি চারিটার সময় শয্যা হইতে উঠি। সুতরাং যখন অনেকে ঘুমাইয়া থাকে, আমি তখন আমার কাজ শেষ করিয়া লই।” কৰ্ম্মচারি-নিয়ােগ সম্বন্ধে ওয়াসিংটন অসাধারণ কর্তব্যনিষ্ঠা ও নির- পেক্ষতার পরিচয় দিতেন। তিনি নিয়ত প্রার্থীদিগের বিদ্যাবুদ্ধি ও অভি- জ্ঞতার দিকে দৃষ্টি রাখিতেন, কদাচ আত্মীয়তা বা অনুরােধ উপরােধের বশবর্তী হইতেন না। কোন সময়ে একটী পদের জন্য তাহার নিকট দুই জন প্রার্থী উপস্থিত হইলেন। একজন তাঁহার প্রিয়বন্ধু ; প্রায় প্রতিদিন তাঁহার গৃহে নিমন্ত্রিত হইতেন; কিন্তু তিনি বিষয় কার্যে অৰ্বাচীন। অপর জন তাহার রাজনীতির বিরােধী, অথচ বহুদর্শী ও বিচক্ষণ। অনেকে বিবেচনা করিয়াছিলেন যে ওয়াসিংটনের বন্ধুই ঐ পদ লাভ করিবেন। কিন্তু ওয়াসিংটন তাহার বিপরীতাচরণ করিলেন দেখিয়া তাহাদের বিস্ময়ের সীমা রহিল না। এক ব্যক্তি সভাপতিকে কহিলেন “মহাশয়, এ কাজে আপনার বন্ধুকে নিযুক্ত না করা বড় অন্যায় হইয়াছে।” ওয়াসিংটন কহিলেন “না মহাশয়, তাঁহাকে নিযুক্ত করিলেই অন্যায় হইত। তিনি আমার সুহৃৎ ; তাহাকে আমি ভালবাসি ; তাহার সহিত কথা কহিলে, তাহার সঙ্গে আহার করিলে আমার তৃপ্তি বােধ হয়, আর তাঁহার কষ্ট মহাপুরুষ-চরিত ; দেখিলে আমি দুঃখ অনুভব করি। সৌহার্দের সীমা এই পর্যন্ত। কিন্তু তাঁহার বিষয়বুদ্ধি নাই; সুতরাং তাঁহাদ্বারা এরূপ কাৰ্য্য সুচারুরূপে নিৰ্বাহিত হওয়া অসম্ভব। পক্ষান্তরে তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মক্ষম, পরিশ্রমী, ও বুদ্ধিমান্; সুতরাং তাহাদ্বারা কাৰ্য সুসম্পন্ন হইবে এরূপ আশা করা যায়। যখন আমি আপনাকে শুদ্ধ জর্জ ওয়াসিংটন বলিয়া মনে করি, তখন আমি বন্ধুকে সর্বস্ব দিতেও কুণ্ঠিত হই না; কিন্তু যখন বিবেচনা করি যে আমি সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সভাপতি, এবং এই পদের আনুষঙ্গিক ক্ষমতা পরিচালনার নিমিত্ত মনুষ্য ও ঈশ্বরের নিকট দায়ী, তখন আমি বন্ধুত্বের অনুরােধে সদগুণের অবজ্ঞা করিয়া রাজকার্যের বিঘ্ন ঘটাইতে পারি না। ১৭৮৯ অব্দে ফরাসীদেশে রাষ্ট্র-বিপ্লব উপস্থিত হয়। সেই বিপ্লব- তরঙ্গে লাফেট স্বদেশ হইতে বিতাড়িত হইয়া জাৰ্ম্মাণিতে কারারুদ্ধ হন। ১৭৯৩ অকে এই সংবাদ ওয়াসিংটনের কর্ণগােচর হইলে তিনি নিরতিশয় মনবেদনা পাইয়াছিলেন এবং লাফেটের মুক্তির নিমিত্ত বিধিমত চেষ্টা করিয়াছিলেন। এতদ্ভিন্ন তদীয় পরিজনবর্গের সাহায্যার্থ ওয়াসিংটন নিজের আয় হইতে প্রায় বিংশতি সহস্র মুদ্রা দান করিয়াছিলেন। ১৭৯৩ অব্দে ওয়াসিংটনের দ্বিতীয় সভাপতিত্বের কাল পূর্ণ হইল। এবারও লােকে তাহাকে পুনৰ্বার নির্বাচিত করিবার নিমিত্ত চেষ্টা করিতে লাগিল; কিন্তু তিনি কিছুতেই সম্মত হইলেন না। তিনি স্বদেশ বাসীদিগকে রাজনীতি সংক্রান্ত বহুবিধ সারগর্ভ সুযুক্তিপূর্ণ উপদেশ দিয়া কাৰ্য্যক্ষেত্র হইতে অবসর গ্রহণ করিলেন। ;

019 দ্বাদশ অধ্যায়। দেহত্যাগ। খ্ৰী ষ্টীয় ১৭৯৭ অব্দের মার্চ মাসে ওয়াসিংটন সভাপতির পদ পরিত্যাগ করেন। এতকাল তাহার ভাগ্যে বিশ্রাম- সুখ ঘটে নাই; কঠোর স্বদেশহিতব্রতে কখনও সমরাঙ্গনে, কখনও বা রাজপদে,-অনাহারে, অনিদ্রায়, দুশ্চিন্তায়, উৎকণ্ঠায় প্রায় সমস্ত জীবন যাপন করিয়া ছেন; সুতরাং তাঁহার বড়ই সাধ ছিল যে জীবনের অবশিষ্ট কাল পরিজন- বর্গের মধ্যে শান্তি-সুখ-ভােগে অতিবাহিত করিবেন। কিন্তু বিধাতা অন্যরূপ ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছিলেন; তিনি পূর্ণ দুই বৎসর কালও এই সুখ ভােগ করিতে পারিলেন না। ১৭৯৯ অব্দের ডিশেম্বর মাস। আর কয়েকটা দিন গেলেই, বৎসর, সেই সঙ্গে সঙ্গে শতাব্দীও কাটিয়া যায়; কাল-সমুদ্রের অপর একটা মহােম্মি আসিয়া পড়ে। কিন্তু বিধাতৃ-বিধানে ওয়াসিংটনের আর এ কয়েকটা দিন কাটিল না; নববর্ষ আসিবার পূর্বেই তিনি ইহলােক ত্যাগ করিয়া গেলেন। ১২ই ডিশেম্বর ভয়ঙ্কর দুদ্দিন। একে হিমপ্রধান দেশের শীতকাল ;

মহাপুরুষ-চরিত। তাহাতে আবার দিঙমণ্ডল ঘনঘটায় সমাচ্ছন্ন ;-বায়ুর প্রবল বেগ, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে অল্প অল্প বৃষ্টি ও তুষারপাত। ওয়াসিংটন প্রতিদিন প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া ভৃত্যদিগের কার্য পরিদর্শনার্থ বাহিরে যাইতেন। আজও সেই উদ্দেশ্যে সজ্জিত হইতেছেন দেখিয়া মার্থা কহিলেন “আমি ত এরূপ দুর্দিনে কিছুতেই ঘরের বাহির হইতে সাহস করি না। আমার ভয় হইতেছে পাছে হিম লাগিয়া আপনার কোন অসুখ হয়। এ বয়সে ঝড় বৃষ্টির সময়ে বাহিরে না গিয়া গৃহে অগ্নিসেবা করাই আপনার পক্ষে সঙ্গত।” ওয়াসিংটন বলিলেন “বাগানে ভূতেরা একটা নূতন কাজ আরম্ভ করিয়াছে ; আনি স্বয়ং উপস্থিত হইয়া পর্যবেক্ষণ না করিলে তাহারা উহা সুসম্পন্ন করিতে পারিবে না। বিশেষতঃ ঝড় বৃষ্টি ও তত বেশী হইতেছে না; সুতরাং অল্পক্ষণের নিমিত্ত বাহিরে গেলে অসুখ হইবার কোন আশঙ্ক; নাই।” .মাথা দ্বিরুক্তি করলেন না; ওয়াসিংটন গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন এবং বহুক্ষণ বাহিরে থাকিয়া মধ্যাহ্নভোজনের প্রাক্কালে ফিরিয়া আসি- লেন। তখন তাহার পরিচ্ছদ জলসিক্ত হইয়াছে এবং কেশে বরফ জমিয়া রহিয়াছে। মার্থা বেশ-পরিবর্তনের জন্য অনুরােধ করিলেন, কিন্তু ওয়াসিংটন তাহা শুনিলেন না, কহিলেন, “তুমি ইহার জন্য এত ব্যস্ত হইতেছ কেন ? কিছুক্ষণ আগুণের কাছে বসিলেই কাপড় শুকাইয়া যাইবে।” প্রতিদিন সায়ংকালে পরিজনবর্গ অগ্নিকুণ্ডের চতুর্দিকে সমবেত হইত ; ওয়াসিংটন স্বয়ং কোন না কোন উৎকৃষ্ট গ্রন্থ পাঠ করিতেন এবং সকালে তাহা শ্রবণ করিত। আজও তিনি পূর্বের ন্যায় পাঠ করিলেন ; কিন্তু শ্রোতাদিগের বােধ হইল যেন অন্যান্য দিন অপেক্ষা তাঁহার স্বর কিছু 'ভারী হইয়াছে। • দেহত্যাগ। ; • পরদিন ঝটিকার বেগ আরও বাড়িল ; ওয়াসিংটন একটু সর্দি বােধ করিলেন; সমস্ত দিন দ্বার রুদ্ধ করিয়া গৃহে রহিলেন; কিন্তু সন্ধ্যাকালে পুস্তক পাঠ করা বন্ধ করিলেন না। কেহ কেহ তাহাকে ঔষধ খাইতে অনুরােধ করিলেন; কিন্তু তিনি ঔষধ খাইলেন না, কহিলেন “আমি সর্দিতে ঔষধ খাই না; এ রােগ আপনা হইতেই সারিয়া যায়।” রাত্রি ৩ টার সময় ওয়াসিংটনের নিদ্রা ভঙ্গ হইল, কম্প দিয়া জ্বর আসিল, কিন্তু পাছে মার্থার কোন অসুখ হয় এই আশঙ্কায় তিনি তাহাকে জাগাইলেন না; স্বয়ং একজন ভৃত্যকে ডাকিয়া অগ্নি জ্বালাই- লেন এবং রক্ত-মােক্ষণের নিমিত্ত বৈদ্য আনাইলেন। তৎকালে রক্ত- মােণ দ্বারা রােগ দমন করা চিকিৎসাপদ্ধতির একটী প্রধান অঙ্গ ছিল। ওয়াসিংটন ভাবিলেন কিছু রক্ত নিঃসারিত করিলেই রােগের উমশম হইবে। বৈদ্যরাজ এতকাল নিগ্রোদাসদিগের, রক্তমােwণ করিয়াছিলেন । আজ ওয়াসিংটনের শরীরে নিজের বিদ্যার পরিচয় দিতে প্রথমে তত সাহস করিলেন না। এদিকে মার্থাও জাগিয়াছিলেন; তিনি সনির্বন্ধব রক্তমােক্ষণে বাধা দিতে লাগিলেন ; কহিলেন “পীড়া হইলে রােগীর বলাধানের চেষ্টা করাই উচিত; রক্তাত দ্বারা বলক্ষয় করিলে উপকারের আশা দূরে থাকুক, অপকার হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা কিন্তু রক্ত- মােক্ষণের উপকারিতা সম্বন্ধে ওয়াসিংটনের ধ্রুব বিশ্বাস ছিল ; তিনি মার্থার কথায় কর্ণপাত না করিয়া বৈদ্যকে কহিলেন, “আপনি ভয় পাইতেছেন কেন ? ছিদ্রটা যেন বড় হয় ; নচেৎ বেশী রক্ত বাহির হইবে না।” কিন্তু রক্তমােণ বিফল হইল,—অথবা উহার বিষময় ফল ফলিল ; ওয়াসিংটন শীঘ্রই অবসন্ন হইয়া পড়িলেন। প্রত্যুষে একজন ভাল চিকিৎসক আনিবার জন্য লােক প্রেরিত হইল ; এদিকে ওয়াসিংটন তাঁহার মুহুরী লিয়ার সাহেবকে কহিলেন, “আমি আর অধিকক্ষণ বাঁচিব না, প্রথম হইতেই বুঝিতে পারিয়াছি এবার আমায় যমে ধরিয়াছে। ; ; } ৯৪ মহাপুরুষ-চরিত • এই কথা শুনিয়া মুহুরী অতিমাত্ৰ বিস্মিত হইয়া কহিলেন “সে কি প্রভু! ভগবানের কৃপায় আপনি শীঘ্রই রােগমুক্ত হইবেন। চিকিৎসক আসিতেছেন ; দুই একবার ঔষধ খাইলেই আপনার যন্ত্রণা কমিয়া যাইবে।” কিন্তু ওয়াসিংটন ঈষৎ হাস্য করিয়া তাহাকে হিসাব পত্র ঠিক করিতে আদেশ দিলেন। ক্রমে তিন জন সুবিজ্ঞ চিকিৎসক আনীত হইলেন; কিন্তু তাহারা বহুবিধ চেষ্টা করিয়াও কিছু করিতে পারিলেন না। ওয়াসিংটন তাঁহা- দের যত্নে নিতান্ত মুগ্ধ হইয়া কহিলেন “আপনারা আমার জন্য বড় কষ্ট পাইলেন; কিন্তু আমার এ পীড়া সারিবার নহে; বােধ হয় মৃত্যুর আর অধিক বিলম্ব নাই; অতএব অনুরােধ করি যেন অন্তিম কালে ঔষধ প্রয়ােগে আমার শাস্তির বিঘ্ন না ঘটে। রাত্রি আটটার সময় বাকলােধ হইল; কিন্তু জ্ঞানের বিকৃতি জন্মিল না। তিনি পার্শ্বস্থ শুশ্রুষাকারীদিগের প্রতি সকৃতজ্ঞভাবে দৃষ্টিপাত কমিতে লাগিলেন। মৃত্যুর অব্যবহিত পূৰ্ব্বে ওয়াসিংটন কথা কহিবার জন্য বারংবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন এবং অতিকষ্টে লিয়ার সাহেবকে কহিলেন “আর বিলম্ব নাই দেখিবেন যেন তিন দিনের মধ্যে আমার দেহ সমাহিত করা না হয়। অনন্তর হঠাৎ যেন রােগের উপশম হইল ; প্রশ্বাসের কষ্ট দূর হইল; রােগীর প্রশান্ত মুখমণ্ডলে যমমন্ত্রণার কোন চিহ্নই দেখা গেল না। তিনি নিজের নাড়ী পরীক্ষা করিতে লাগিলেন। ক্রমে হস্ত অবসন্ন হইয়া শয্যাতলে পড়িয়া গেল ; লিয়ার উহা উত্তোলন করিয়া নিজের বক্ষঃস্থলে সংস্থাপিত করিলেন; একজন চিকিৎসক তাহার চক্ষুদ্বয় নিমীলিত করিয়া দিলেন ; ওয়াসিংটন বিন যন্ত্রণায় ভবলীলা সংবরণ করিলেন। তাঁহার সহধৰ্ম্মিণী এতক্ষণ নিঃশব্দে পতির পদতলে বসিয়াছিলেন । এক্ষণ জিজ্ঞাসিলেন “জীবিতেশ্বর কি ইহলােক ত্যাগ করিলেন ?” কেহই • ;

প্রতি নগরে, দেহত্যাগ। wie warmierorum এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিলেন না। তখন শশাকের বেগ এত প্রবল, যে কাহারও কথা কহিবার শক্তি ছিল না। লিয়ার উর্ধদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া ইঙ্গিত করিলেন যে ওয়াসিংটন স্বর্গারােহণ করিয়াছেন। মার্থা অতি ধীরভাবে কহিতে লাগিলেন, “তা ভালই হইয়াছে ; আমিও শীঘ্র তাহার অনুগমন করিব। আজ আমার সব ফুরাইল ; যে কয়েক দিন বাঁচিব এরূপ যন্ত্রণা আর ভােগ করিতে হইবে না।” তখন রেল ছিল না; তার ছিল না; তথাপি অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই শােক-সংবাদ সম্মিলিত রাজ্য-সমূহের প্রতি গ্রামে প্রতি লােকের কর্ণগােচর হইল। সকলেই ওয়াসিংটনের বিয়ােগে নিতান্ত অভিভূত হইলেন; সকলেই মনে করিতে লাগিলেন যেন তাঁহার পিতৃহীন হইয়াছেন। এতদুপলক্ষে মহাসভার সভ্যগণ তদানীন্তন সভাপতি এডাম্ সাহেবকে যে পত্র লিখিয়াছিলেন, নিম্নে তাহার কিয়দংশ উদ্ধত করা গেল ; “এরূপ বিপত্তিতে ক্রন্দনই মনুষ্যত্ব ওয়াসিংটনের ন্যায় মহাপুরুষের লােকলীলাসংবরণে শুদ্ধ এদেশ কেন, সমগ্র ভূমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। তবে এরূপ ভয়ঙ্কর দুঃখসাগরে ক্ষিপ্ত হইয়াও আমরা এই ভাবিয়া সান্ত্বনা পাইতেছি যে মানব-জীবনে সৎকাৰ্য্যসম্পাদন দ্বারা যতদূর যশাে- লাভ হইতে পারে, আমাদের ওয়াসিংটন পূর্ণমাত্রায় তাহার অধিকারী হইয়া গিয়াছেন। যদি “কীৰ্ত্তিৰ্ষস্ত স জীবতি” এই মহাজনবাক্যে অণুমাত্র সত্য থাকে তাহা হইলে ওয়াসিংটন মরিয়াও জীবিত আছেন। তাহার নিষ্কলঙ্ক যশোেরাশি ও পবিত্র চরিত্র কল্লান্ত পর্যন্ত মানবমণ্ডলীর উৎসাহের আকর বলিয়া গণ্য হইবে। তিনি স্বর্গারূঢ় হইয়াও মুৰ্ত্তবাসী- দিগের সৎকাৰ্যসাধনে প্রবৃত্তি জন্মাইবেন।” ডিশেম্বরের ১৮ই তারিখে শব সমাধিস্থ হইল। চতুষ্পর্শ্বের বহু যােজন দূর হইতে বিস্তর লােক একবার চিরকালের জন্য এই নরদেবের মহাপুরুষ-চরিত। .... মুখ নিরীক্ষণ করিবার নিমিত্ত ভার্ণন শৈলে সমবেত হইলেন। সার্ক- যােজন দূরস্থিত সেকেন্দ্রিয়া নগরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সমগ্র অধিবাসী নয়টা কামান এবং একখানা জাহাজ লইয়া ওয়াসিংটনের আবাসস্থলে আগমন করিলেন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়ে এই জাহাজ হইতে মুহুর্মুহু শােকসূচক তােপধ্বনি হইতে লাগিল। সম্মিলিত রাজ্যসমূহের সমস্ত সভাসমিতি, বিদ্যালয়, বিচারালয়, বাসগৃহ ও পণ্যশালা শােকচিহ্নে মণ্ডিত হইল। কেবল সম্মিলিত রাজ্য কেন, ইয়ুরােপবাসীরাও ওয়াসিংটনের মৃত্যুসংবাদ শুনিয়া সমুচিত শােকচিহ্ন ধারণপূৰ্ব্বব মহাপুরুষের পূজা করিলেন। ইংলণ্ডের রণতরীসমূহের পতাকা শােক- ভারে অবনত হইয়া ইংরাজ জাতির হৃদয়ের গৌরব ঘােষণা করি। লাগিল ; ফরাসী সাধারণতন্ত্রের অধিনেতা ভুবনবিখ্যাত নেপােলিয়ান স্বকীয় কর্মচারীদিগকে দশ দিন কৃষ্ণ পরিচ্ছদে মণ্ডিত হইতে আজ্ঞা দিলেন। যিনি বীর, তাহার নিকটই বীরত্বের আদর ; যিনি মহৎ, তিনিই মহৎকে সম্মান করিতে গিনেন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mahapurush Charit Ba Jeorge Wasingtaner Jeeban-brittanta Ed.3rd

Author
Ishanchandraghosh Sn.
Title
Jeorge Wasingtaner Jeeban
File name
Mahapurush Charit Ba Jeorge Wasingtaner Jeeban-brittanta Ed.3rd
Text
OCR done
Citation
1904
Published
2010/01/22
Publisher
G.c. Nath And Co. Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
114
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Jeorge Wasingtaner Jeeban
DLI number
512881
Barcode
4990010019912.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
gn8B9KTq2Qb
Download PDF

Mahapurush Charit Ba Jeorge Wasingtaner Jeeban-brittanta Ed.3rd