Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Khanika

Thakur,rabindranath · 2010/04/24

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কলিকা
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুল্য বার আনা =

প্রকাশক
শ্ৰীঅপূৰ্ব্বকৃষ্ণ বসু
ইণ্ডিয়ান পাব্লিশিং হাউস
২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
কান্তিক প্রেস
২৩, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত।

সূচী উদ্বোধন ••• ••• ১ যথাসময় ••• ••• ••• মাতাল ••• যুগল ••• ••• ... অনবর অতিবাদ ৪ যথাস্থান ••• ••• বােঝাপড়া । ••• ২৩ ১ ।। অচেনা २७ তথাপি ••• ২৯ • কবির বয়স ও । • ••• ••• ৩২ । ••• ••• •• ৩৪ বিদায় অপটু উৎকৃষ্ট ভীরুতা পরামর্শ ••• ••• ৩৫ .. • ** ••• ৪১ ক্ষতিপূরণ ••• ৪৪ ••• ৪৭ ••• ••• সেকাল প্রতিজ্ঞা ••• ... ••• ৫৭ ? পথে । । • . জন্মান্তর + ৫ ৬১ কৰ্ম্মফল . '৬৪ ••• কবি বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী বিদায় রীতি ••• • • • ৭০ ••• ।। ••• ৭৪ নষ্ট স্বপ্ন একটি মাত্র । । । * * * সােজাসুজি . * * • অসাবধান স্বশেষ ৮ ৮৩ । এ ••• ••• •• ৮ ••• ••• কুলে যাত্রী একগাঁয়ে দুই তীরে অতিথি । । । • ৮৮ ১০ ** ••• । ১২ # ০ ০ ••• । এ বিরহ ... ... ক্ষণেক দেখা ৯৭ ৯৯ ••• + ১ ••• • ••• ** •• ••• আষাঢ় দুই বোন নববর্ষ। দুর্দিন ••• ••• ০৮ ••• ••• ••• অবিনয় কৃষ্ণকলি . ভৎসনা ১১৭ সুখদুঃখ ••• • খেলা ১২২। কৃতার্গ ••• * * * ••• ১২৪ •• ১২৭ s ( ১৬ ১২৮ স্থায়ী-অস্থায়। উদাসীন যৌবন-বিদায় শেষ হিসাব ০ ০ ০ ১৩২ ০ ০ ০ ••• এ ৫ শেষ ১৩৭ ০ ০ ০ বিলম্বিত + + . ১৪১ ••• . . ••• ••• ১৪৩ • ১৪৬ মেঘমুক্ত চিরায়মান। 'আবির্ভাব কল্যাণী ••• : ••• ১৪৮ ১৫২ ••• সমাপ্তি ••

No text on this page.

ক্ষাগকা
উদ্বোধন
শুধু অকারণ পুলকে
ক্ষণিকের গান গা’রে আজি প্রাণ
ক্ষণিক দিনের আলােকে।
যারা আসে যায়, হাসে আর চায়,
পশ্চাতে যারা ফিরে না তাকায়,
নেচে ছুটে ধায়, কথা না শুধায়,
ফুটে আর টুটে পলকে,
তাহাদেরি গান গা’রে আজি প্রাণ,
ক্ষণিক দিনের আলোকে।

ক্ষণিক।
প্রতি নিমেষের কাহিনী
আজি বসে বসে গাথিনে আর,
বাঁধিনে স্মৃতি-বাহিনী।
যা আসে আসুক, যা হবার তােক,
যাহা চলে যায় মুছে যাক্ শােক,
চেয়ে ধেয়ে যাক দ্যুলোক ভুলােক
প্রতি পলকের রাগিণী।
নিমেষে নিমেষ হয়ে যাক্ শেষ
বহি নিমেষের কাহিনী !
ফুরায় যা’ দেবে ফুরাতে।
ছিন্ন মালার ভ্রষ্ট কুসুম
ফিরে যানেক কুড়াতে !
বুঝি নাই যাহা, চাইনা বুঝিতে,
জুটিল না যাহা চাইনা খুঁজিতে,
পূরিল না যাহা কে রবে যুঝিতে
তারি গহবর পূরাতে !
যখন যা পাস্ মিটায়ে নে আশ
ফুরাইলে দিস্ ফুরাতে !
ওরে থাক, থাক্‌ কঁদনি।
দুই হাত দিয়ে ছিড়ে ফেলে দেরে
নিজ হাতে বাঁধা বাধনি!
যে সহজ তাের রয়েছে সমুখে

ক্ষণিকা
•আদরে তাহারে ডেকে নে রে বুকে,
আজিকার মত যা যা চুকে
যত অসাধ্য-সাধনি !
ক্ষণিক সুখের উৎসব আজি,
ওরে থাক, থাক্ কঁদিনি
শুধু অকারণ পুলকে
নদীজলে-পড়া আলাের মতন
ছুটে যা ঝলকে ঝলকে !
ধরণীর পরে শিথিল-বাঁধন
ঝলমল প্রাণ করি যাপন,
ছুয়ে থেকে দুলে শিশির যেমন
শিরীষ ফুলের অলকে!
মৰ্ম্মরনে ভরে ওঠ, গানে
শুধু অকারণ পুলকে!
যথাসময়
ভাগ্য যবে কৃপণ হয়ে আসে,
বিশ্ব যবে নিঃস্ব তিলে তিলে,
মিষ্ট মুখে ভুবন-ভরা হাসি
ওষ্ঠে শেষে ওজনদরে মিলে,
বন্ধুজনে বন্ধ করে প্রাণ,
দীর্ঘদিন সঙ্গীহীন একা,

৪।
ক্ষণিক
হঠাৎ পড়ে ঋণ-শােধেরি পালা,
ঋণী জনের না পাওয়া যায় দেখা,
তখন ঘরে বন্ধ হরে কবি,
খিলের পর থিল, লাগাও খিল!
কথার সাথে গাঁথ কথার মালা,
মিলের সাথে মিল, মিলাও মিল!
কপাল যদি আবার ফিরে যায়,
প্রভাতকালে হঠাৎ জাগরণে,
শূন্য নদী আবার যদি ভরে
শরৎমেঘে ত্বরিত বরিষণে,
বন্ধু ফিরে বন্দী করে বুকে,
সন্ধি করে অন্ধ অরিদল,
অরুণ ঠোটে তরুণ ফোটে হাসি,
কাজল চোখে করুণ আঁখিজল,
তখন খাতা পোড়াও ক্ষ্যাপা কবি,
দিলের সাথে দিল, লাগাও দিল।
বাহুর সাথে বাঁধ মৃণাল বাহু,
চোখের সাথে চোখে মিলাও মিল।

ক্ষণিকা মাতাল ওরে মাতাল, দুয়ার ভেঙে দিয়ে পথেই যদি করি মাতামাতি, থলি ঝুলি উজাড় করে ফেলে যা আছে তাের ফুরস রাতারাতি, অশ্লেষাতে যাত্রা করে’ শুরু পাজিপুথি করিস্ পরিহাস, অকারণে অকাজ লয়ে ঘাড়ে অসময়ে অপথ দিয়ে যাস, হলের দড়ি নিজের হাতে কেটে পালের পরে লাগা ঝোড়ো হাওয়া, আমিও ভাই তােদের ব্রত লব- মাতাল হয়ে পাতালপনে ধাওয়া । পাড়ার যত জ্ঞাণীগুণীর সাথে নষ্ট হ’ল দিনের পর দিন, অনেক শিখে’ পক্ক হল মাথা, অনেক দেখে’ দৃষ্টি হ’ল ক্ষীণ, কত কালের কত মন্দ ভাল বসে বসে কেবল জমা করি, ফেলা-ছড়া ভাঙা-ছেড়ার বােঝ। বুকের মাঝে উঠছে ভরি-ভরি,

ক্ষণিক।
গুড়িয়ে সে সব উড়িয়ে ফেলে দিক
দিক-বিদিকে তােদের ঝোড়ো হাওয়া!
বুঝেছি ভাই সুখের মধ্যে সুখ
মাতাল হয়ে পাতালপানে ধাওয়া!
হেরে সিধা কুটিল দ্বিধা যত,
নেশায় মােরে করুক্‌ দিশাহারা,
দানোয় এসে হঠাৎ কেশে ধরে
এক দমকে করুক লক্ষ্মীছাড়া!
সংসারেতে সংসারী ত ঢের,
কাজের হাটে অনেক আছে কেজো,
মেলাই আছে মস্ত বড় লােক,
সঙ্গে তাদের অনেক সেজো মেজো,
থাকুন্ তঁারা ভবের কাজে লেগে ;-
লাগুক্ মােরে সৃষ্টিছাড়া হাওয়া।
বুঝেছি ভাই কাজের মধ্যে কাজ
মাতাল হয়ে পাতালপানে ধাওয়া!
শপথ করে দিলাম ছেড়ে অজই
যা আছে মাের বুদ্ধি বিবেচনা,
বিদ্যা যত ফেলবাে ঝেড়ে ঝুড়ে
ছেড়ে ছুড়ে তত্ত্ব আলোচনা।
স্মৃতির ঝারি উপুড় করে ফেলে
নয়নবারি শূন্য করি’ দিব,

ক্ষণিক।
উচ্ছসিত মদের ফেণা দিয়ে
অট্টহাসি শােধন করি’ নিব।
ভদ্রলােকের তক্‌মা-তাবিজ ছিড়ে
উড়িয়ে দেবে মদোন্মত্ত হাওয়া !
শপথ করে বিপথ-ব্রহ নেব--
মাতাল হয়ে পাতলপানে ধাওয়া !
যুগল
ঠাকুর, তব পায়ে নমােনমঃ,
পাপিছ এই অক্ষমেরে ক্ষম,
আজ বসন্তে বিনয় রাখ মম,
বন্ধ কর শ্রীমদ্ভাগবত।
শাস্ত্র যদি নেহাৎ পড়তে হবে
গীতগােবিন্দ খােলা হােক না তবে,
শপথ মম, বােললনা এই ভবে
জীবনখানা শুধুই স্বপ্নবৎ!
একটা দিনের সন্ধি করিয়াছি,
বন্ধ আছে যমরাজের সমর,
আজকে শুধু এক বেলারই তরে
আমরা দেহে অমর, দোহে অমর।

ক্ষণিকা
স্বয়ং যদি আসেন আজি দ্বারে
মান্নাক রাজার দারােগারে,-
কেল্লা হতে ফৌজ সারে সারে
দাড়ায় যদি, ওঁচায় ছােরা-ছুরি,
বলব, রে ভাই, বেজাব কোরােনাক,
গােল হতেছে, একটু থেমে থাক,
কৃপাণ-খােলা শিশুর খেলা রাখ
ক্ষ্যাপার মত কামান-ছোড়াছুড়ি!
একটুখানি সরে গিয়ে কর
সঙের মত সঙ ন্ ঝমঝমর,
আজকে শুধু এক বেলারই তরে
'আমরা দেহে অমর দোহে অমর।
বন্ধুজনে যদি পুণ্যফলে
করেন দয়া, আসেন দলে দলে,
গলায় বস্ত্র কব নয়নজলে,
ভাগ্য নামে অতিবর্ষা সম!
একদিনেতে অধিক মেশামেশি
শ্রান্তি বড়ুই আনে শেষাশেষি,
জানত ভাই দুটি প্রাণীর বেশি
এ কুলায়ে কুলায় নাক মম!

ক্ষণিক।
ফাগুন মাসে ঘরের টানাটানি,
অনেক চাপা, অনেক গুলি ভ্রমণ,
ক্ষুদ্র আমার এই অমরাবতী
আমরা দুটি অমর দুটি অমর।
পঞ্চাশোর্ধ বনে যাবে
এমন কথা শাস্ত্রে বলে,
আমরা বলি বানপ্রস্থ
যৌবনেতেই ভাল চলে।
বনে এত বকুল ফোটে,
গেয়ে মরে কোকিলপাখী,
লতাপাতার অন্তরালে
বড় সরস ঢাকাঢাকি।
চাপার শাখে চঁাদের আলো,
সে সৃষ্টি কি কেবল মিছে ?
এ সব যারা বােঝে তারা
পঞ্চাশতের অনেক নীচে।
পঞ্চাশাের্ধ বনে যাবে,
এমন কথা শাস্ত্রে বলে,
আমরা বলি বানপ্রস্থ
যৌবনেতেই ভাল চলে।

ক্ষণিক
ঘরের মধ্যে বকাবকি,
নানান মুখে নানা কথা,
হাজার লােকে নজর পাড়ে,
একটুকু নাই বিরলতা;
সময় অল্প, ফুরায় ভাও
অরসিকের আনাগােনায়,
ঘণ্টা ধরে থাকেন তিনি
সৎপ্রসঙ্গ আলােচনায় ;
হতভাগ্য নবীন যুবা
কাজেই থাকে বনের খোঁজে,
ঘরের মধ্যে মুক্তি যে নেই
একথা সে বিশেষ বােঝে।
পঞ্চাশােৰ্দ্ধে বনে যাবে
এমন কথা শাস্ত্রে বলে,
আমরা বলি বানপ্রস্থ
যৌবনেতেই ভাল চলে!
আমরা সবাই নব্যকালের
সভ্য যুবা অনাচারী,
মনুর শাস্ত্র শুধরে দিয়ে
নতুন বিধি করব জারি-

ক্ষণিকা
১১
বুড়ো থাকুন ঘরের কোণে,
পয়সা কড়ি করুন জমা,
দেখুন্ বসে’ বিষয় পত্র,
চালান্ মালা মকদ্দমা ;
ফাগুন মাসে লগ্ন দেখে
যুবারা যা বনের পথে,
রাত্রি জেগে সাধ্য সাধন,
থাকুক রত কঠিন ব্রতে।
পঞ্চাশোর্ধ বনে যাবে
এমন কথা শাস্ত্রে বলে,
আমরা বলি বানপ্রস্থ
যৌবনেতেই ভাল চলে ?
অনবসর
ছেড়ে গেলে হে চঞ্চলা,
হে পুরাতন সহচরী
ইচ্ছা বটে বছর কতক
তােমার জন্য বিলাপ করি,
সোনার স্মৃতি গড়িয়ে তোমার
বসিয়ে রাখি চিত্ততলে,
একলা ঘরে সাজাই তােমায়
মাল্য গেঁথে অশ্রুজলে,

১২
ক্ষণিক।
নিদেন কঁাদি মাসেক-খানেক
তােমায় চির-আপন জেনেই,
হায়রে আমার হতভাগ্য!
সময় যে নেই,সময় যে নেই ।
বর্ষে বর্ষে বয়স কাটে,
বসন্ত যায় কথায় কথায়,
পকুলগুলো দেখতে দেখতে
ঝরে পড়ে যথয় তথায়,
মাসের মধ্যে বারেক এসে
অস্তে পালায় পূর্ণ ইন্দু,
শাস্ত্রে শাসায় জীবন শুধু
পদ্মপত্রে শিশির-বিন্দু,
তাদের পানে তাকাব না
তোমায় শুধু আপন জেনেই
সেটা বড়ই বর্বরতা,-
সময় যে নেই,সময় যে নেই।
এস আমার শ্রাবণ-নিশি,
এস আমার শরৎ-লক্ষ্মী,
এস আমার বসন্ত-দিন
লয়ে তােমার পুষ্পপক্ষী,

ক্ষণিক।
তুমি এস, তুমিও এস,
তুমি এস--এবং তুমি,
প্রিয়ে, তোমরা সবাই জান
ধরণীর নাম মর্ত্যভূমি !
বে যায় চলে বিরাগভরে
তারেই শুধু আপন জেনেই
বিলাপ করে কাটাই, এমন
সময় যে নেই--সময় যে নেই।
ইচ্ছে করে বসে বসে
পদ্যে লিখি গৃহকোণায়
তুমিই আছ জগৎ জুড়ে
সেটা কিন্তু মিথ্যে শােনায় ।
ইচ্ছে করে কোনও মতেই
সান্ত্বনা আর মান্বনারে,
এমন সময় নতুন আঁখি
তাকায় আমার গৃহদ্বারে,
চক্ষু মুছে দুয়ার খুলি,
তারেই শুধু আপন জেনেই,
কখন তবে বিলাপ করি?
সময় যে নেই,--সময় যে নেই

১৪
ক্ষণিকা
অতিবাদ
আজ বসন্তে বিশ্বখাতায়
হিসেব নেইক পুষ্পে পাতায়,
জগৎ যেন ঝোঁকের মাথায়
সকল কথাই বাড়িয়ে বলে,
ভুলিয়ে দিয়ে সত্যি মিথ্যে,
ঘুলিয়ে দিয়ে নিতানিত্যে,
দুধারে সব উদার চিত্তে
বিধিবিধান ছাড়িয়ে চলে।
আমারাে দ্বার মুক্ত পেয়ে
সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
আজকে আমি কোন মতেই
বলুনাক সত্য কথা !
প্রিয়ার পুণ্যে হলেম রে আজ
একটা রাতের রাজ্যাধিরাজ,
ভাণ্ডারে আজ করছে বিরাজ
সকল প্রকার অজস্রত্ব!
কেন রাখব কথার ওজন ?
কৃপণতায় কোন্ প্রয়ােজন?
ছুটুক বাণী যােজন যোজন
উড়িয়ে দিয়ে ষত্ব ণত্ব!

ক্ষণিক।
চিত্তদুয়ার মুক্ত করে
সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
আজকে আমি কোন মতেই
বলবনাক সত্য কথা !
হে প্রেয়সী স্বর্গদূতী,
আমার যত কাব্য পুঁথি
তােমার পায়ে পড়ে স্তুতি
তােমারি নাম বেড়ায় রটি
থাক হৃদয়-পদ্মটিতে
এক দেবতা আমার চিতে!-
চাইনে তােমায় খবর দিতে
আরাে আছেন তিরিশ কোটি।
চিত্তদুয়ার মুক্ত করে
সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
আজকে আমি কোন মতেই
বলবনাক সত্য কথা।
ত্রিভুবনে সবার বাড়া,
এ তুমি সুধার ধারা,
ঊষার ভালে এটি তারা,
এ জীবনে একটি আলো!

ক্ষণিকা
সন্ধ্যাতারা ছিলেন কে ?
সে সব কথা যাব টেকে,
সময় বুঝে মানুষ দেখে,
তুচ্ছ কথা ভােলাই ভালো।
চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
সাধুবুদ্ধি বহির্গত,
আজকে আমি কোন মতেই
বনাক সত্য কথা !
সতা থাকুন্ ধরিত্রীতে
শুষ্ক রুক্ষ ঋষির চিতে,
জ্যামিতি অর বীজগণিতে,
কারো ইথে আপত্তি নেই,
কিন্তু আমার প্রিয়ার কানে,
এবং আমার কবির গানে,
পঞ্চশরের পুষ্পবাণে
মিথ্যে থাকুন রাত্রিদিনেই !
চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
আজকে আমি কোন মতেই
বনাক সত্য কথা !
ওগো সত্য বেটেখাটো,
বীণার তন্ত্রী যতই ছটো,

ক্ষণিক।
ক আমার যতই আঁটো,
বলবাে তবু উচ্চসুরে--
আমার প্রিয়ার মুগ্ধ দৃষ্টি
করচে ভুবন নূতন সৃষ্টি
মুচকি হাসির সুধার বৃষ্টি
চচে আজি জগৎ জুড়ে।
চিত্তদুয়ায় মুক্ত রেখে
সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
আজকে আমি কোন মতেই
বনাক সত্য কথা !
ক
যদি বল আর বছরে
এই কথাটাই এম্‌নি করে
বলেছিলি, কিন্তু ওরে
শুনেছিলেন আরেকজনে-
জেনাে তবে মূঢ়মত্ত,
আর বসন্তে সেটাই সত্য,
এবারো সেই প্রাচীন তত্ত্ব
ফুটল নূতন চোখের কোণে।
চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,
আজকে আমি কোন মতেই
বলবনাক সত্য কথা !

১৮
ক্ষণিক
আজ বসন্তে বকুল ফুলে
যে গান বায়ু বেড়ায় বুলে,
কাল সকালে যাবে ভুলে,
কোথায় বাতাস, কোথায় সে ফুল ।
হে সুন্দরী তেম্‌নি কবে
এ সব কথা ভুল যবে
মনে রেখাে আমায় তবে,-
ক্ষমা করে আমার সে ভুল।
চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে
সাধুবুদ্ধি বহির্গত,
'আজকে আমি কোন মতেই
বলবনাক সত্য কথা।
যথাস্থান
কোন্ কাটে তুই বিকোতে চা
ওরে আমার গান,
কোনখানে তাের স্থান ?
পণ্ডিতেরা থাকেন যেথায়
বিদ্যেরত্ন পাড়ায়-
নস্য উড়ে আকাশ জুড়ে
কাহার সাধ্য দাড়ায়,

ক্ষণিকা চলচে সেথায় সূক্ষ্ম তর্ক সবাই দিবারাত্র- পাত্ৰাধার কি তৈল, কিম্বা তৈলধার কি পাত্র, পূথিপত্র মোই আছে মোহধ্বান্ত-নাশ তারি মধ্যে একটি প্রান্তে পেতে চাস কি আসন ? গান তা শুনি গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া কহে- নহে, নহে, নহে। কোন্ হাটে তুই বিকোতে চা ওরে আমার গান, কোন্ দিকে তাের টান ? পাষাণ-গাথা প্রাসাদপরে আছেন ভাগ্যবস্তু, মেহগিণীর মঞ্চ জুড়ি পঞ্চাজার গ্রন্থ। সােনার জলে দাগ পড়ে না, খােলন। কেউ পাতা ; আস্বাদিত মধু যেমন যূথী অনাঘ্রাতা।

২০
ক্ষণিকা
ভৃত্য নিত্য ধূলা ঝড়ে
যত্ন পূরা মাত্রা,
ওরে আমার ছন্দোময়ী
সেথায় করবি যাত্রা
গান তা শুনি কর্ণমুলে
মর্মরিয়া কহে-
?
নহে, নহে, নহে।
কোন্ হাটে তুই বিকোতে চাস
ওরে আমার গান,
কোথায় পাবি মান?
নবীন ছাত্র বুকে আছে
এক্‌জামিনের পড়ায়,
মা কিন্তু কোথা থেকে
কোন দিকে যে গড়ায়।
অপাঠ্য সব পাঠ্য কেতাব
সামনে আছে খােলা,
কর্তৃজনের ভয়ে কাব্য
কুলুঙ্গিতে তােলা;-
সেইখানেতে ছেড়া-ছড়া
এলােমেলোর মেলা,
তারি মধ্যে ওরে চপল,
কবি কি তুই খেলা ?
=

ক্ষণিকা গান তা শুনে মৌন মুখে রহে দ্বিধার ভরে, যাব-যাব করে। কোন্ হাটে তুই বিকোতে চাস ওরে আমার গান, কোথায় পাবি ত্রাণ? ভাণ্ডারেতে লক্ষ্মী বধূ যেথায় আছে কাজে, ঘরে ধায় সে, ছুটি পায় সে যখন মাঝে মাঝে। বালিশতলে বইটি চাপা টানিয়া লয় তারে, পাতাগুলি ছেড়া-খোঁড়া শিশুর অত্যাচারে,- কাজল-আঁকা সিঁদুর মাখা চুলের গন্ধে ভরা শয্যা প্রান্তে ছিন্ন বেশে চা কি যেতে ত্বরা? বুকের পরে নিসিয়া স্তব্ধ রহে গান- . - - - লােভে কম্পমান!

ক্ষণিক
কোন্ হাটে তুই বিকোতে চাস
ওরে আমার গান,
কোথায় পাবি প্রাণ?
যেথায় সুখে তরুণ যুগল
পাগল হয়ে বেড়ায়
আড়াল বুঝে আঁধার খুঁজে
সবার আঁখি এড়ায়,
পাখী তাদের শােনায় গীতি,
নদী শােনায় গাখা,
কত রকম ছন্দ শোনায়,
পুষ্প লতা পাতা,
সেইখানেতে সরল হাসি
সজল চোখের কাছে
বিশ্ববাশির ধ্বনির মাঝে
যেতে কি সাধ আছে ?
হঠাৎ উঠে উচ্ছসিয়া
কহে আমার গান---
সেখানে মোর স্থান।

ক্ষণিক
বােঝাপড়া
মনেরে আজ কই, যে,
ভাল মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।
কেউ বা তোমায় ভালবাসে
কেউ বা বাসতে পারে না যে,
কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা
সিকি পয়সা পাবে না যে।
কতকটা সে স্বভাব তাদের,
কতকট। বা তােমারে ভাই,
কতকটা এ ভবের গতিক,
সবার তবে নহে সবাই।
তােমায় কতক ফাকি দেবে,
তুমিও কতক দেবে ফাঁকি,
তােমার ভোগে কতক পড়বে,
পর ভােগে থাকবে বাকি।
মান্ধাতারি আমল থেকে
চলে আসচে এন রকম
তােমারি কি এমন ভাগ্য
বাঁচিয়ে যাবে সকল জখম।
মনের অঙ্গ কহ, যে,
ভাল মন্দ যাহাই অমুক
সত্যেরে লও সহজে।

২৪
ক্ষণিক।
অনেক ঝঞ্চা কাটিয়ে বুঝি
এলে মুখের বন্দবেতে,
জলের তলে পাহার ছিল
লাগল বুকের অন্দরেতে,
মুহূর্কেকে পাঁজর গুলো
উঠল কেঁপে আর্ভরবে,-
তাই নিয়ে কি সবার সঙ্গে
ঝগড়া করে মর্ত্তে হবে ?
ভেসে থাকতে পার যদি
সেইটে সবার চেয়ে শ্রেয়,
না পার ত বিনাবাক্যে
টুপ করিয়া ডুবে যেয়ে।
এটা কিছু অপূৰ্ব্ব নয়,
ঘটনা সামান্য খুবি,-
শঙ্কা যেথায় করে না কেউ
সেইখানে হয় জাহাজ-ডুবি।
ন
মনের তাই কহ, যে,
ভাল মন্দ যাহাই আম
সত্যেরে লও সহজে।
তােমার মাপে হয়নি সবাই,
তুমিও হওনি সবার মাপে,
তুমি মর কারো ঠেলায়,
কেউ বা মরে তোমার চাপে ;-
-

ক্ষণিক।
তবু ভেবে দেখতে গেলে
এনি কিসের টানাটানি ?
তেমন করে হাত বাড়ালে
সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি
আকাশ তবু সুনীল থাকে,
মধুর ঠেকে ভােরের আলো,
মরণ এলে হঠাৎ দেখি
মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো।
যাহার লাগি চক্ষু বুজে
বহিয়ে দিলাম অসাগর
তাহারে বাদ দিয়েও দেখি
বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর ।
মনেরে তাই কহ, যে,
ভাল মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।
প,
নিজের ছায়া মস্ত করে
অস্তাচলে বসে বসে
আঁধার করে তােল যদি
জীবনখানা নিজের দোষে,
বিধির সঙ্গে বিবাদ করে’
নিজের পায়েই কুড়ল মারো,
দোহাই তবে এ কাৰ্য্যটা
যত শীঘ্র পায়রা সারো।

ক্ষণিক।
খুব খানিকৃটে কেঁদে কেটে
অশ্রু ঢেলে ঘড় ঘড়া-
মনের সঙ্গে এক রকমে
করেনে ভাই বোঝাপড়া।
তাহার পরে আঁধার ঘবে
প্রদীপখানি জ্বালিয়ে তােল।
ভুলে যা’ ভাই কাহার সঙ্গে
কতটুকু তফাং হ’ল।
মনেরে তাই কহ, যে,
ভাল মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।
অচেনা
কেউ যে কারে চিনিনাক
সেটা মস্ত বঁাচন।
তা না হলে নাচিয়ে দিত
বিষম তুর্কি-নাচন।
বুকের মধ্যে মনটা থাকে
মনের মধ্যে চিন্তা,
সেইখানেতেই নিজের ডিমে
সদাই তিনি দিন্ তা'।

ক্ষণিক
বাইরে যা পাই সম্জে নেব
তারি আইন-কানুন
অন্তরেতে যা আছে তা
অন্তর্যামীই জানুন।
চাইনেরে, মন চাইনে।
মুখের মধ্যে যেটুকু পাই,
যে হালি আর যে কথাটাই,
যে কলা আর যে ছলনাই
তাই নেরে, মন, ভাই নে ?
বাইবে থাকু মধুব মূৰ্ত্তি,
সুধামুখের হাস্য,
তরল চোখে সরল দৃষ্টি
করব না তার ভাষ্য।
বাহু যদি তেমন করে
জড়ায় বাহু বন্ধ
আমি দুটি চক্ষু দে
রৈব হয়ে অন্ধ।
কে যাবে ভাই মনের মধ্যে
মনের কথা ধর্তে ?
কীটের খোঁজে কে দেবে হাত
কেউটে সাপের চক্তে ?

ক্ষণিক
চাইনেরে, মন চাইনে।
মুখের মধ্যে যেটুকু পাই,
যে হাসি আর যে কথাটাই,
যে কলা আর যে ছলনাই
তাই নেরে, মন, তাই নে।
মন নিয়ে কেউ বাচেনাক,
মন বলে যা পায়রে
কোন জন্মে মন সেটা নয়
জানে না কেউ হায়রে!
ওটা কেবল কথার কথা,
মন কি কেহ চিনিস্?
আছে কারো আপন হাতে
মন বলে এক জিনিষ ?
চলেন তিনি গোপন চলে
স্বাধীন তাহার ইচ্ছে।
কেই বা তারে দিচ্চে, এবং
কেই বা তঁারে নিচ্ছে।
চাইনেরে, মন চাইনে।
মুখের মধ্যে যেটুকু পাই
যে হাসি আব যে কথাটাই,
যে কলা আর যে ছলনাই
তাই নেরে, মন, তাই নে।

ক্ষণিক
২৯
তথাপি
}
তুমি যদি আমায় ভালো না বাসো
রাগ করি যে এমন আমার সাধ্য নাই
এমন কথার দেবনাক আভাসও
আমারো মন তােমার পায়ে বাধ্য নাই ।
নাইক আমার কোন গরব-গরিম।
যেমন করেই কর আমায় বঞ্চিত,
তুমি না রও তােমার সােনার প্রতিমা
রবে আমার মনের মধ্যে সঞ্চিত।
কিন্তু তবু তুমিই থাক সমস্যা যা ঘুচি।
স্মৃতির চেয়ে আসলটিতেই আমার অভিরুচি।
দৈবে স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া শক্ত নয়
সেটা কিন্তু বলে রাখাই সঙ্গত।
তাহা ছাড়া যারা তােমার ভক্ত নয়
নিন্দা তারা কতে পারে অন্ততঃ।
তাহা ছাড়া চিরদিন কি কষ্টে যায় ?
আমারাে এই অশ্রু হবে মার্জনা।
ভাগ্যে যদি এক টি কেহ নষ্টে যায়
সানার্থে হয় ত পাব চারজন।
কিন্তু তবু তুমিই থাক সমস্যা যা ঘুচি।
চারের চেয়ে একের পরেই আমার অভিরুচি।

৩,
ক্ষণিক
কবির বয়স
ওরে কবি সন্ধ্যা হয়ে এল,
কেশে তোমার ধরেছে যে পাক।
বসে বসে উৰ্দ্ধপানে চেয়ে
শুতেছ কি পরকালের ডাক ?
কবি কহে, সন্ধ্যা হ’ল বটে,
শুচি বসে লয়ে শ্রান্ত দেহ
এ পারে ঐ পলী হতে যদি
আজো হঠাৎ ডাকে আমায় কেহ।
যদি হােথায় বকুলবনচ্ছায়ে
মিলন ঘটে তরুণ তরুণীতে,
দুটি আঁখির পরে দুইটি আঁখি
মিলিতে চায় দুরন্ত সঙ্গীতে ;-
=
কে তাহাদের মনের কথা লয়ে
ৰীণার তারে তুলবে প্রতিধ্বনি,
আমি যদি ভবের কূলে বসে
পরকালের ভাল মন্দই গণি।
ર
সন্ধ্যা-রা উঠে অস্তে গেল,
চিতা নিবে’ এল নদীর ধারে,
কৃষ্ণপক্ষে হলুদবর্ণ চাদ
দেখা দিল বনের একটি পারে।

ক্ষণিক।
শৃগালসভা ডাকে উদ্ধববে
পােড়া বাড়ির শূন্য আঙিনাতে,
এমন কালে কোন গৃহত্যাগী
হেথায় যদি জাগতে সে রাতে,
যােড়হস্তে উর্দ্ধে তুলি মাথা
চেয়ে দেখে সপ্ত ঋষির পানে,
প্রাণের কূলে আঘাত করে ধীরে
সুপিসাগর শব্দবিহীন গানে,
ত্রিভুবনের গােপন কথাখানি
কে জাগিয়ে তুলবে তাহার মনে
আমি যদি আমার মুক্তি নিয়ে
যুক্তি করি আপন গৃহকোণে ?
কেশে আমার পাক ধরেছে বটে
তার পানে নজর এত কেন ?
পাড়ায় য৩ ছেলে এবং বুড়ে।
সবার আমি একবয়সী জেনো।
ওষ্ঠে কারাে সরল সাদা হাসি
কারাে হাসি আঁখির কোণে কোণে,
কারাে অশ্রু উছলে পড়ে যায়,
কারাে অশ্রু শুকায় মনে মনে ;

७२
ক্ষণিক
কেউ বা থাকে ঘরের কোণে দোহে,
জগৎ মাঝে কেউ বা হাঁকায় রথ,
কেউ বা মরে একলা ঘরের শােকে,
জনারণ্যে কেউ বা হারায় পথ।
সবাই মােরে করেন ডাকাডাকি,
কখন শুনি পরকালের ডাক?
সবার আমি সমান-বয়সী যে
চুলে আমার যত ধক্ পাক।
বিদায়
তােমরা নিশি যাপন কর
এখনাে রাত রয়েছে ভাই,
আমায় কিন্তু বিদায় দেহ
ঘুমতে যাই —ঘুমতে যাই।
মাথার দিব্য, উঠোনা কেউ
আগ বাড়িয়ে দিতে আমায়,
চলচে যেমন চলুক তেমন
হঠাৎ যেন গান না থামায়।
আমার যন্ত্রে একটি তন্ত্রী
একটু যেন বিকল বাজে,
মনের মধ্যে শুচি যেটা
হাতে সেটা আচে না যে।

ক্ষপিকা একেবারে থামার আগে সময় রেখে থামতে যে চাই ;- আজকে কিছু প্রান্ত আছি, ঘুমতে যাই-ঘুমতে যাই । - আঁধার আলােয় শাদায় কালোয় দিষ্টা ভালই গেছে কাটি, তাহার জন্যে কারাে সঙ্গে নাইক কোন ঝগড়া-ঝাটি। মাঝে মাঝে ভেবেছিলুম একটু-আধটু এটা-ওটা বদল যদি পারত হতে থাতনক কোন খোঁটা, বদল হলে তখন মনটা হয়ে পড়ত ব্যতিব্যস্ত, এখন যেমন আছে আমার সেইটে আবার চেয়ে বত। তাই ভেবেছি দিনটা আমার ভালই গেছে,-কিছু না চাই- আজকে শুধু শ্রান্ত আছি, ঘুমতে যাই-ঘুমতে যাই! ৩

৩৪
ক্ষণিক
অপট
যতবার আজ গাঁথনু মালা
পড়ল খসে খসে
কি জানি কার দোষে !
তুমি হেথায় চোখের কোণে
দেখচ বসে বসে’!
চোখ দুটিরে প্রিয়ে
শুধাও শপথ নিয়ে
আঙল আমার আকুল হল
কাহার দৃষ্টিদোষে ?
আজ যে বসে গান শোনাব
কথাই নাহি জোটে,
ক নাহি ফোটে।
মধুর হাসি খেলে, তােমার
চতুর রাঙা ঠোটে ।
কেন এমন ক্রটি ?
বলুক আঁখি দুটি।
কেন আমার রুদ্ধকণ্ঠে
কথাই নাহি ফোটে।

ক্ষণিকা
রেখে দিলাম মাল্য বীণা,
সন্ধ্যা হয়ে আসে।
ছুটি দাও এ দাসে।
সকল কথা বন্ধ করে
বসি পায়ের পাশে।
নীরব ওষ্ঠ দিয়ে
পারব যে কাজ প্রিয়ে
এমন কোন কৰ্ম্ম দেহ
অকর্মণ্য দাসে।
উৎসৃষ্ট
মিথ্যে তুমি গাঁথুলে মালা
নবীন ফুলে,
ভেবেছ কি কণ্ঠে আমার
দেবে তুলে ?
দাও ত ভাই, কিন্তু জেনাে
হে নির্মলে,
আমার মালা দিয়েছি ভাই
সবার গলে।
যে কটা ফুল ছিল জমা
অর্ঘ্যে মম

ক্ষণিক
উদ্দেশেতে সবায় দিমু
•
নমাে নমঃ।
কেউ বা তারা আছেন কোথা
কেউ জানেনা,
কারো বা মুখ ঘষ্টা-আড়ে
আধেক চেনা,
কেউ বা ছিলেন অতীত কালে
অবন্তীতে,
এখন তারা আছেন শুধু
কবির গীতে।
সবার তনু সাজিয়ে মাসে
পরিচ্ছদে
কহেন বিধি -তুভ্যমহং
সম্প্রদদে।
হৃদয় নিয়ে আমকি প্রিয়ে
হৃদয় দেবে ?
হায় ললনা সে প্রার্থনা
ব্যর্থ এবে।
কোথায় গেছে সেদিন আজি
যেদিন মম
তরুণকালে জীবন ছিল
মুকুল সম ;

ক্ষণিকা
সকল শােভা সকল মধু
গন্ধ যত
বক্ষোঝে বদ্ধ ছিল
বন্দী মত।
আজ যে তাহা ছড়িয়ে গেছে
অনেক দুবে,
অনেক দেশে অনেক বেশে
অনেক সুবে।
কুড়িয়ে তারে বাঁধতে পারে
একটি স্থানে
এমনতর মােহন মন্ত্র
কেই বা জানে!
নিজের মনত দেবার আশা
চুকেই গেছে,
পরের মনটি পাবার আশায়
রৈনু বেঁচে।

৩৮
ক্ষণিক।
ভীরুতা
গভীর সুরে গভীর কথা
শুনিয়ে দিতে তেবে
সাহস নাহি পাই।
মনে মনে হাবি কিনা
বুঝব কেমন করে ?
আপনি হেসে তাই
শুনিয়ে দিয়ে বাই ;
ঠাট্টা করে’ ওভাই সখি
নিজের কথাটাই।
হাল্কা তুমি কর পাছে
হাল্কা করি ভাই
আপন ব্যথাটাই।
সত্য কথা সরলভাবে
শুনিয়ে দিতে তােরে
সাহস নাহি পাই।
অবিশ্বাসে হাসবি কিনা
বুঝবে কেমন করে ?
মিথ্যা ছলে তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই ;

ক্ষণিক।
উল্টা করে বলি আমি
সহজ কথাটাই।
ব্যর্থ তুমি কর পাছে
ব্যর্থ করি ভাই
আপন ব্যথাটাই।
সোহাগভরা প্রাণের কথা
শুনিয়ে দিতে তােরে
সাহস নাহি পাই।
সােহাগ ফিরে পাব কিনা
বুঝব কেমন করে ?
কঠিন কথা তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই।
গৱঁছলে দীর্ঘ করি
নিজের কথাটাই।
ব্যথা পাছে না পাও তুমি
লুকিয়ে রাখি তাই
নিজের ব্যথাটাই।
ইচ্ছা করে নীরব হয়ে,
রহিব তোর কছে,
সাহস নাহি পাই।
মুখের পরে বুকের কথা
উথলে ওঠে পাছে।

৪০
ক্ষণিকা
অনেক কথা তাই
শুনিয়ে দিয়ে যাই
•
কথায় আড়ে আড়াল থাকে
মনের কথাটাই।
তােমায় ব্যথা লাগিয়ে শুধু
জাগিয়ে তুলি ভাই
আপন ব্যথাটাই।
ইচ্ছা করি সুদূরে যাই
না আমি তাের কাছে।
সাহস নাহি পাই।
তােমার কাছে ভীরুতা মাের
প্রকাশ হয় রে কাছে।
কেবল এসে তাই
দেখা দিয়েই যাই ;
স্পাতলে গােপন করি
মনের কথাটাই।
নিত্য তব নেত্রপাতে
জ্বালিয়ে রাখি ভাই
আপন ব্যথাটাই।

ক্ষণিকা
৪১
পরামর্শ
সূৰ্য্য গেল অপারে,
লাগল গ্রামের ঘাটে
আমার জীর্ণ তরী।
শেষ বসন্তের সন্ধ্যা হাওয়া
শস্যশূন্য মাঠে
।
উঠল হাহা কৰি।
আর কি হবে নূতন যাত্রা
নূতন
রাণীর দেশে
নূতন সাজে সেজে ?
এবাব যদি বাতাস উঠে
তুফান জাগে শেষে
ফিরে তাৰি নে যে!
অনেকবাব ত হাল ভেঙেছে
পাল গিয়েছে ছিড়ে
ওরে দুঃসাহসী।
সিন্ধুপানে গেছিস্ ভেসে
অকূল কালো নীরে
ছিঃ রসারসি।

ক্ষণিকা
કર
এখন কি আর আছে সে বল ?
বুকের তলা তাের
ভরে উঠছে জলে।
অশ্রু সেচ চবি কত
আপন ভরে ভাের
তলিয়ে যাবি তলে।
এবার তবে ক্ষান্ত হরে
ওরে শ্রান্ত তরী।
রাখরে আনাগোনা !
ব-শেষের বাশি বাজে
সন্ধ্যা-গগন ভরি,
ঐ যেতেছে শোন।
এবার ঘুমে কূলের কোলে
বটের ছায়াতলে
ঘাটের পাশে মহি;
ঘটের ঘায়ে যেটুকু ঢেউ
উঠ তটের জলে
তারি আঘাত সহি।
ইচ্ছা যদি করি তবে
এপার হতে পাবে
যাবে খেয়া বেয়ে।

ক্ষণিকা
৪৩
আনবে বহি গ্রামের বোঝা
ক্ষুদ্র ভারে ভারে
পাড়ার ছেলে মেয়ে।
ওপারেতে ধানের খােলা
এই পারেতে হাট,
মাঝে শীর্ণ নদী,
সন্ধ্যা সকাল কবি শুধু
এঘাট ওঘাট,
ইচ্ছা করিস যদি।
হায় রে মিছে প্রােধ দেওয়া,
অবোধ তরী মম
আবার যাবে ভেসে।
কর্ণ ধবে’ বসেছে তার
যমদূতের সম
স্বভাব সর্বনেশে ।
ঝড়ের নেশা ঢেউয়ের নেশা
ছাড়বেনা আর,
হায় বে মরণ-লুভী।
ঘটে সে কি বৈবে বাধা,
অদৃষ্টে যাহার
আছে নৌকাডুবি।

৪৪
ক্ষণিক।
ক্ষতিপূরণ
তোমার ভবে সবাই মােরে
করচে দোষী
হে প্রেয়সী।
বলচে-কবি তােমার ছবি
আকচে গানে,
প্রণয়গীতি গাচ্চে নিতি
তােমার কানে ;
নেশায় মেতে ছন্দে গেঁথে
তুচ্ছ কথা
ঢাচে শেষে বাংলা দেশে
উচ্চ কথা।
তােমার তরে সবাই মােবে
করচে দোষী
হে প্রেয়সী।
সে কলঙ্কে নিন্দা-পঙ্কে
তিলক টানি
এলেম রাণী ।

ক্ষণিক ফেলু মুছি’ হাস্য-ওচি তােমার লেচন বিশ্বসুদ্ধ যতেক ক্রুদ্ধ সমালােচন। অনুরক্ত তব ভক্ত নিন্দিতেরে কর ক্ষে শীতল বক্ষে বাহুর ঘেরে। তাই কলঙ্কে নিন্দা-পঙ্কে তিলক টানি এলেম রাণী । আমি নব ব মহাকাব্য সংরচনে ছিল মনে, ঠেকল কখন তােমার কঁাকন- কিঙ্কিনীতে কল্পনাটি গেল ফাটি হাজার গীতে। মহাকাব্য সেই অভাব্য দুর্ঘটনায়

ক্ষণিক।
পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে
কণায় কণায়।
আমি নাবৰ মহাকাব্য
সংরচনে
ছিল মনে।
৪
হায় রে কোথা যুদ্ধ কথা
হৈল গত
স্বপ্ন মত।
পুরাণ-চিত্র বীর-চরিত্র
অষ্ট সর্গ,
কৈল খণ্ড তোমার চণ্ড
নরন:স্বজন।
রৈল মাত্র দিবারাত্র
প্রেমের প্রলাপ,
দিলেম ফেলে ভাবী কেলে
কীর্তিকলাপ।
হায় রে কোথা যুদ্ধ কথা
হৈল গত
স্বপ্ন শত।

ক্ষণিক
৪৭
সে সব ক্ষতি
পূরণ প্রতি
দৃষ্টি রাখি।
হরিণ-আঁখি।
লোকের মনে সিংহাসনে
নাইক দাবী,
তােমার মনো-গৃহের কোনো
দাও ত চাৰী।
মরার পবে চাইনে ওরে
অমর হতে।
অমর হব আঁখির তব
সুধার স্রোতে।
খ্যাতির ক্ষতিপূরণ প্রতি
দৃষ্টি রাখি।
হরিণ-আখি।
সেকাল
আমি যদি জন্ম নিতেম
কালিদাসের কালে,
দৈবে হতেম দশম রত্ন
নবরত্নের মালে,

৪৮
ক্ষণিক।
একটী শ্লোকে স্তুতি গেয়ে
রাজার কাছে নিতাম চেয়ে
উজ্জয়িনীর বিজন প্রান্তে
কানন ঘেরা বাড়ি।
রেবার তটে ঠাপার তলে
সভা বত সন্ধ্যা হলে,
ক্রীড়া-শৈলে আপন মনে
দিতাম কণ্ঠ ছাড়ি।
জীবনতরী বহে যেত
মন্দাক্রান্তা তালে,
আমি যদি জন্ম নিতাম
কালিদাসের কালে।
চিন্তা দিতেম জলাঞ্জলি,
থাক্তনাক ত্বরা,
মৃদুপদে যেতেম, যেন
নাইক মৃত্যু জরা।
ছ’টা ঋতু পূর্ণ করে’
ঘটত মিলন স্তরে স্তরে,
ছ’টা সর্গে বার্তা তাহার
মৈত কাব্যে গাঁথা

ক্ষণিক।
ততদিনে দৈবে যদি
পক্ষপাতী পাঠক থাকে
কর্ণ হবে রক্তবর্ণ
এ িকটু বলব তাকে।
যে বইখানি পড়বে হাতে
দগ্ধ করব পাতে পাতে,
আমার ভাগ্যে হব আমি
দ্বিতীয় এক ধূম্রলােচন।
আমায় হয় ত করতে হবে
আমার লেখা সমালােচনা
বলব, এসব কি পুরাতন।
আগাগােড়া ঠেচে চুরি।
মনে হচ্ছে, আমিও এমন
লিখতে পারি ঝুড়ি ঝুড়ি।
আরো যে সব লিখব ক খ।
ভাবতে মনে বাচে ব্যথা,
পরজন্মের নিষ্ঠুরতায়
এ জন্মে হয় অনুশােচন।
আমায় হয় ত করতে হবে
আমার লেখা সমালোচন

ক্ষণিক।
৪
তােমরা, যাদের বাক্য হয় না
আমার পক্ষে মুখরােচক,
তোমরা যদি পুনর্জন্মে
হও পুনর্বার সমালােচক -
আমি আমায় পাড়ব গালি,
তােমরা তখন ভাববে খালি
কলম কসে’ বসে বসে
প্রতিবাদের প্রতি বচন।
আমায় হয় ত করতে হবে
আমার লেখা সমালােচন।
লিখব, ইনি কবি সভায়
হংস মধ্যে বকো যথা।
তুমি লিখবে-কোন্ পাষণ্ড
বলে এমন মিথ্যা কথা।
আমি তােমায় বলব-মুঢ়,
তুমি আমায় বলবে—রূঢ়,
তার পরে বা লেখালেখি
হবে না সে রুচি-রোচন।
তুমি লিখবে কড়া জবাব
আমি কড়া সমালোচন।

ক্ষণিক।
কৰি
আমি যে বেশ সুখে আছি
অন্তত নই দুঃখে কৃশ,
সে কথাটা পদ্যে লিখতে
লাগে একটু বিসদৃশ।
সেই কারণে গভীর ভাবে
খুজে খুজে গভীর চিতে
বেরিয়ে পড়ে গভীর ব্যথা
স্মৃতি কিম্বা বিস্মৃতিতে।
কিন্তু সেটা এত সুদূর
এতই সেটা অধিক গভীর
আছে কি না আছে, তাহার
প্রমাণ দিতে হয় না কবির
মুখের হাসি থাকে মুখে,
দেহের পুষ্টি পোষে দেহ,
প্রাণের ব্যথা কোথায় থাকে
জানেনা সেই খবর কেহ।
কাব্য পড়ে যেমন ভাব
কবি তেমন নয় গো

ক্ষণিক
আঁধার করে রাখেনি মুখ,
দিবারাত্রি ভাঙছে না বুক,
গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব
হাস্থ মুখেই বয় গো।
ভালবাসে ভদ্র সভায়
ভদ্র পোষাক পরতে অঙ্গে,
ভালবাসে ফুল্ল মুখে
কইতে কথা লােকের সঙ্গে।
বন্ধু যখন ঠাট্টা করে,
মরে না সে অর্থ খুঁজে,
ঠিক যে কোথায় হাসতে হবে
একেক সময় দিব্যি বুঝে।
সামূনে যখন অন্ন থাকে
থাকে না সে অন্য মনে ;
সঙ্গীদলের সাড়া পেলে
রয় না বসে ঘরের কোণে।
বন্ধুরা কয়, লােকটা রসিক,
কয় কি তারা মিথ্যামিথ্যি ?
শত্রুরা কয়, লােকটা হাল্কা,
কিছু কি তার নাইক ভিত্তি ?
কাব্য দেখে যেমন ভাব
কবি তেমন নয় গো।

ক্ষণিক
৯
চাদের পানে চক্ষু তুলে
রয়না পড়ে নদীর কূলে,
গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব
মনের সুখেই বয় গাে।
সুখে আছি লিখতে গেলে
লােকে বলে, প্রাণটা ক্ষুদ্র ।
অশাটা এর নয়ক বিরাট,
পিপাসা এর নষক রুদ্র।
পাঠকলে তুচ্ছ করে,
অনেক কথা বলে কঠোর ;
বলে, একটু হেসে খেলেই
ভরে যায় এর মনের জঠর।
কবিরে তাই ছন্দে বন্ধে
বানাতে হয় দুখের দলিল।
মিথ্যা যদি হয় সে, তবু
ফেলে। পাঠক চোখের সলিল।
তাহার পরে আশিষ কোরো
রুদ্ধ কণ্ঠে ক্ষুব্ধ বুকে,
কবি যেন আজন্ম কাল
দুখের কাব্য লেখেন সুখে।
কাব্য যেমন, কবি যেন
তেমন নাহি হয় গো ।

৭.
ক্ষণিক।
বুদ্ধি যেন একটু থাকে,
স্নানাহারের নিয়ম রাখে ।
সহজ লােকের মতই যেন
সরল গদ্য কয় গে।।
বাণিজ্যে বসতে লক্ষনীঃ
কোন্ বাণিজ্যে নিবাস তােমার
কহ আমায় ধনী,
তাহা হলে সেই বাণিজ্যের
করব মহাজনী।
দুয়ার জুড়ে কাঙাল বেশে
ছায়ার মত চরণদেশে
কঠিন তব নূপুর ঘেষে
আর বসে না রৈব।
এটা আমি স্থির বুঝেছি
ভিক্ষা নৈব নৈব।
যাবই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তােমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে ত পাবই।

ক্ষণিক।
সাজিয়ে নিয়ে জাহাজখানি,
বসিয়ে হাজার দাড়ি,
কোন্ নগবে যাব, দিয়ে
কোন্ সাগরে পাড়ি।
কোন্ তারকা লক্ষ্য করি’
কূল-কিনারা পরিহরি,
কোন্ দিকে বে বাইব তরী
আকূল কালাে নীরে।
মরুবনা আর ব্যর্থ আশায়
বালু মরুর তীরে।
যাবই আমি যাবই, ওগাে,
বাণিজ্যেতে বাবই।
তােমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে ত পাবই।
সাগর উঠে তরঙ্গিয়া,
বাতাস বহে বেগে ;
সূৰ্য যেথায় অন্তে নামে
ঝিলিক মারে মেঘে

৭২
ক্ষণিকা
দক্ষিণে চাই উত্তরে চাই
ফেণায় দেণ, আর কিছু নাই,
যদি কোথাও কূল নাহি পাই
ভল পাবত তবু।
ভিটার কোণে হতাশ মনে
রৈবনা আর কভু।
যাবই আমি যাবই, ওগাে,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তােমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে ত পাই।
নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ
প্রবাল দিয়ে ঘেরা,
শৈলচূড়ায় নীড বেঁধেছে
সাগর-বিহঙ্গেবা।
নারিকেলের শাখে শাখে
ঝোড়ো বাতাস কেবল ডাকে,
ঘন বনেব ফাকে ফাকে
বইচে নগ-নদী।
সােনার রেণু আব ভরি
সেথায় নামি যদি।

ক্ষণিক।
যাই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তােমায় বাদ না পাই, তবু
আর কারে ত পাবই।
অকূল মাঝে ভাসিয়ে তরী
যাচ্ছি অজানায়।
আমি শুধু এল। নেয়ে
আমার শূন্য নয়।
নব নব পবনভরে
যাব দ্বীপে দ্বীপান্তরে,
নেব তরী পূর্ণ করে’
অপূৰ্ব্ব ধন যত।
ভিখারী তোর ফিরবে যখন
ফিরবে রাজার মত।
যাবই আমি যাবই, ওগো,
বাণিজ্যেতে যাবই।
তােমায় যদি না পাই, তবু
আর কারে ত পাই।

৭ঃ
ক্ষণিকা
বিদায় রীতি
হায় গো রাণী, বিদায় বাণী
এম্ন করে শােনে?
ছি ছি ঐ যে হাসিখানি
কাপচে আঁখিকোণে।
এতই বারে বারে কিরে
মিথ্যা বিদায় নিয়েছি রে,
ভাবছ তুমি মনে মনে
এ লােক টি নয় যাবার,
দ্বারের কাছে ঘুরে ঘুরে
ফিরে আসূবে আবার।
আমায় যদি শুধাও তবে
সত্য করেই বলি
আমারাে সেই সন্দেহ হয়
ফিরে আসব চলি।
বসন্তদিন আবার আসে,
পূর্ণিমা-রাত আবার হাসে,
বকুল ফোটে রিক্ত শাখায়,
এর ও ত নয় যাবার।
সহস্রবার বিদায় নিয়ে
এরও ফেরে আবার।

ক্ষণিকা একটুখানি মােহ তবু মনের মধ্যে রাখো, মিথ্যেটারে একেবারেই জবাব দিয়ােনাকে।। ভ্রমক্রমে ক্ষণে কতরে এনো গো জল আঁখির পরে, আকুল স্বরে যখন কব- সময় হ’ল যাবার। তখন না-হয় হেসে, যখন ফিরে আসব আবার। নষ্ট স্বপ্ন কালকে রাতে মেঘের গরজনে, রিমিঝিমি বাদল-বরিষণে, ভাবতেছিলাম একা একা স্বপ্ন যদি যায় রে দেখা আসে যেন তাহার মূৰ্ত্তি ধরে বা রাতে আধেক ঘুমঘােরে। মাঠে মাঠে বাতাস ফিরে গতি। বৃথা স্বপ্নে কাল সারারাতি।

ক্ষণিক
হায় রে, সত্য কঠিন ভারী,
ইচ্ছামত গড়তে নারি ।
স্বপ্ন সে ও চলে আপন মতে ।
আমি চলি আমার শূন্য পথে।
কালকে ছিল এমন ঘন রাত,
আকুল বারে এমন বারিপাত,
মিথ্যা যদি মধুরূপে
আত কাছে চুপে চুপে
তাহা হলে কাহার হয় ক্ষতি ?
স্বপ্ন যদি ধরত সে মূরতি ?
একটি মাত্র
গিরিনদী বালির মধ্যে
যাচ্চে বেঁকে বেঁকে,
একটি ধারের স্বচ্ছ ধারায়
শীর্ণ রেখা একে।
মরু-পাহাড় দেশে
এক বনের শেষে
ফিরেছিলেম দুই প্রহরে
দগ্ধ চরণতল,
বনের মধ্যে পেয়েছিলেম
এটি আঙুর ফল

কণিকা
রৌদ্র তখন মাথার পরে,
পায়ের তলায় মাটি
জলের তবে কেঁদে মরে
তৃষায় ফাটি ফাটি
পাছে ক্ষুধার ভরে
তুলি মুখের পরে,
আকুল ঘ্রাণে নিইনি তাহার
শীতল পরিমল।
রেখেছিলেম লুকিয়ে, আমার
একটি আঙুর ফল।
বেলা যখন পড়ে’ এল,
রৌদ্র হ’ল রাঙা,
নিশ্বাসিয় উঠল হুহু
ধূধূবালুর ডাঙা ;-
থাকতে দিনের আলো,
ঘরে ফেরাই ভালো,
ক
==
তখন খুলে দেখুনু চেয়ে
চক্ষে লয়ে জল,
মুঠির মাঝে শুকিয়ে আছে
একটি আঙুর ফল।

৭৮
ক্ষণিকা
সােজাসুজি
হৃদয়পানে হৃদয় টানে,
নয়নপানে নয়ন ছোটে,
দুটি প্রাণীর কাহিনীটা
এইটুকু বই নয় মােটে।
শুক্লসন্ধ্যা চৈত্র মাসে,
হেনার গন্ধ হওয়ায় ভাসে,
আমার বাঁশি লুটায় ভূমে,
তােমার কোলে ফুলের পুজি,
তােমার আমার এই যে প্রণয়
নিতান্তই এ সােজাজি
বসন্তী-রং বসনখানি
নেশার মত চক্ষে ধরে,
তােমার গাঁথা যুথীর মালা
স্তুতির মত বক্ষে পড়ে।
একটু দেওয়া, একটু রাখা,
একটু প্রকাশ, একটু ঢাকা,
একটু হাসি, একটু সরম,
দু’জনের এই বােঝাবুঝি।
তােমার আমার এই যে প্রণয়
নিতান্তই এ সােজাসুজি

ক্ষণিক
৭৯
মধুমাসের মিলনমাঝে
মহান্ কোন রহস্য নেই,
অসীম কোন অবােধ কথা
যায় না বেধে মনে-মনেই।
আমাদের এই সুখের পিছু
ছায়ার মত নাইক কিছু,
দোহার মুখে দোহে চেয়ে
নাই হৃদয়ের খোঁজাখুঁজি।
মধুমাসে মােদের মিলন
নিতান্তই এ সােশাসুজি।
ভাষার মধ্যে তলিয়ে গিয়ে
খুজিনে ভাই ভাষাতীত,
আকাশপানে বাহু তুলে
চাহিনে ভাই আশাতীত।
যেটুকু দিই, যেটুকু পাই,
তাহার বেশি আর কিছু নাই,
সুখের বক্ষ চেপে ধরে,
করিনে কেউ যােঝাবুঝি।
মধুমাসে মোদের মিলন
নিতান্তই এ সােজাসুজি।

ক্ষণিক
শুনেছিনু প্রেমের পাথার
নাইক তাহার কোন দিশা,
শুনেছিনু প্রেমের মধ্যে
অসীম ক্ষুধা অসীম তৃষা ;
বীণার তন্ত্ৰী কঠিন টানে
ছিড়ে পড়ে প্রেমের টানে,
শুনেছিনু প্রেমের কুঞ্জে
অনেক বাঁকা গলি খুঁজি।
আমাদের এই দোহার মিলন
নিতান্তই এ সােজাসুজি
অসাবধান
আমায় যদি মনটি দেবে,
দিয়ো, দিয়ো মন।
মনের মধ্যে ভাবনা কিন্তু
রেখে সাবাক্ষণ।
খোলা আমার দুয়ার খান,
ভােলা আমার প্রাণ,
কখন যে কার আনাগােনা,
নইক সাবধান।

ক্ষণিক
৪
বিচ্ছেদ(ও) সুদীর্ঘ হত,
অশ্রুজলের নদীর মত
মগতি চলত রচি’
দীর্ঘ করুণ গাথা।
}
আষাঢ় মাসে মেঘের মতন
মন্থরতায় ভরা
জীবনটাতে থাকতনাক
কিছুমাত্র ত্ববা ।
অশােক কুঞ্জ উঠত ফুটে
প্রিয়ার পদাঘাতে;
বকুল হ’ত ফুল্ল, প্রিয়ার
মুখের মদিরাতে।
প্রিয়সখীর নামগুলি সব
ছন্দ ভরি’ করিত রব,
রেবার কুলে কলহংসের
কলধ্বনির মত।
কোনো নামটি মন্দালিকা
কোনো নামটি চিত্রলিখা,
মঞ্জুলিকা মঞ্জরিণী
ঝঙ্কায়িত কত।

০
ক্ষণিকা
আত তারা কুঞ্জবনে
চৈত্র-জ্যোৎস্না-রাতে,
অশােক শাখা উঠত ফুটে
প্রিয়ার পদাঘাতে।
৪
কুরবকের পরত চূড়া
কালো কেশের মাঝে,
লীলং-কমল রৈত হাতে
কি জানি কোন্ কাজে।
অলক সাজত কুন্দফুলে,
শিরীষ পরুত কৰ্ণমুলে,
মেখলাতে দুলিয়ে দিত
নব-নীপের মালা।
ধারাষন্ত্রে মানের শেষে
ধূপের ধুয়া দিত কেশে,
লোফুলের শুভ্র রেণু
মাথত মুখে বালা
কালাগুরু গুরু গন্ধ
লেগে থাক্ত সাজে,
কুরবকের পরত মালা
কালাে কেশের মাঝে।

ক্ষণিকা
কুঙ্কুমেরি পত্রলেখায়
বক্ষ রৈত ঢাকা,
আঁচলখানির প্রান্তটিতে
হংস-মিথুন আঁকা
বিরহেতে আষাঢ় মাসে
চেয়ে রৈত বঁধুর আশে,
একটি করে পূজার পুষ্পে
দিন গণিত বসে।
বক্ষে তুলি বীণাপানি
গান গাহিতে ভুলত বাণী,
রুক্ষ অলক অচোখে
পড়ত খসে খসে।
দুটি বাঁকা ;
মিলন-রাতে বাজত পায়ে
নূপুর
কুঙ্কুমেরি পত্রলেখায়
বক্ষ রৈত ঢাকা।
প্রিয় নামটি শিখিয়ে দিত
সাধের শারিকারে,
নাচিয়ে নিত ময়ূরটিরে
কঙ্কণ-ঝঙ্কারে।

২
ক্ষণিক।
কপােতটিরে লয়ে বুকে
সােহাগ কৰ্ত্ত মুখে মুখে,
সারসীরে খাইয়ে দিত
পদ্মকোরক বহি।
অলক নেড়ে দুলিয়ে বেণী
কথা কৈত শৌরসেনী,
বলত সখীর গলা ধরে’
হলা পিয় সহি।
জল সেচিত আলবালে
তরুণ সহকারে।
প্রিয় নামটি শিখিয়ে দিত
সাধের শারিকারে।
নবরত্নের সভার মাঝে
রৈতাম একটি টেরে,
দূর হৈতে গড় করিতাম
দিঙনাগাচার্য্যেরে।
আশা করি নামটা হত
ওরি মধ্যে ভদ্রমত,
বিশ্বসেন কি দেবদত্ত
কিম্বা বসুভূতি।

ক্ষণিক।
সুন্ধরা কি মালিনীতে
বিম্বাধরের স্তুতিগীতে
দিতাম রচি’ দুটি চারটি
ছােটখাটো পুঁথি।
ঘরে যেতাম তাড়াতাড়ি
শ্লোক-রচনা সেরে,
নবরত্নের সভার মাঝে
রৈতাম একটি টেরে।
৮
আমি যদি জন্ম নিতেম
কালিদাসের কালে
বন্দী হতেম না জানি কোন্
মালবিকার জালে।
কোন্ বসন্ত-মহোৎসবে
বেণুৰীণার কলরবে
মঞ্জরিত কুঞ্জবনের
গোপন অন্তরালে
কোন্ ফাগুনের শুক্ল নিশায়
যৌবনেরি নবীন নেশায়
চকিতে কার দেখা পেতেম
রাজার চিত্রশালে ।

৪৪
ক্ষণিক।
ছল করে তার বাত আঁচল
সহকারের ডালে।
আমি যদি জন্ম নিতেম
কালিদাসের কালে।
হায় রে কবে কেটে গেছে
কাসিদাসের কাল !
পণ্ডিতেরা বিবাদ করে
লয়ে তারিখ শাল।
হারিয়ে গেছে সে সব অব্দ,
ইতিবৃত্ত আছে স্তব্ধ,
গেছে যদি, আপদ গেছে,
মিথ্যা কোলাহল।
হায় বে গেল সঙ্গে তারি
সেদিনের সেই পৌরনারী
নিপুণিকা চতুরিক।
মালবিকার দল।
কোন্ স্বরূগে নিয়ে গেল
বংমাল্যের থাল!
হায় রে কবে কেটে গেছে
কালিদাসের কাল।

ক্ষণিক
যাদের সঙ্গে হয়নি মিলন
*
সে সব বরাঙ্গনা
বিচ্ছেদের দুঃখে আমায়
করচ গমনা।
তবু মনে প্রবোধ আছে
তেনি বকুল ফোটে গাছে,
যদিও সে পায় না নারীর
মুখমদের ছিটা ।
ফাগুন মাসে অশোক ছায়ে
অলস প্রাণে শিথিল গায়ে
দখিণ হতে বাতাসটুকু
তেমনি লাগে মিঠা ।
অনেক দিকেই যায় যে পাওয়া
অনেকটা সান্ত্বনা,
যদিও রে নাইক কোথাও
সে সব বরাঙ্গনা ।
এখন যারা বর্তমানে,
আছেন মর্ত্যলােকে,
মন্দ তারা লাত না কেউ
কালিদাসের চোখে।

ক্ষণিক।
•
পরেন বটে জুতা মোজা,
চলেন বটে সােজা সােজা,
বলেন বটে কথাবার্তা।
অন্য দেশীর চালে,
তবু দেখ সেই কটাক্ষ
আঁখির কোণে দিচ্চে সাক্ষ্য,
যেমনটি ঠিক দেখা যেত
কালিদাসের কালে।
মরুব না ভাই নিপুণিকা
চতুরিকার শােকে,
তারা সবাই অন্যনামে
আছেন মর্ত্যলোকে
আপাতত এই আনন্দে
গৱেঁ বেড়াই নেচে,
কালিদাস ত নামেই আছেন
আমি আছি বেঁচে।
তাহার কালের স্বাদগন্ধ
আমি ত পাই মৃদুমন্দ,
আমার কালের কণামাত্র
পানি মহাকবি।

ক্ষণিক
বিদূষী এই আছেন যিনি
আমার কালের বিনােদিনী
মহাকবির কল্পনাতে
ছিল না তার ছবি।
প্রিয়ে তোমার তরুণ আঁখির
প্রসাদ যেচে যেচে,
কালিদাসকে হারিয়ে দিয়ে
গর্ষে বেড়াই নেচে।
প্রতিজ্ঞা
আমি হবনা তাপস, হবনা, হবনা,
যেমনি বলুন যিনি।
আমি হবনা তাপস, নিশ্চয় যদি
মেলে তপস্বিনী।
আমি করেছি কঠিন পণ
যদি
না মিলে বকুল বন,
যদি
মনের মতন মন
পাই জিনি,
হবনা তাপস, হবনা, যদি না
পাই সে তপস্বিনী।

৫৮
ক্ষণিক।
আমি
যদি
যদি
ত্যজিব না ঘর, হব না। বাহির
উদাসীন সন্যাসী,
ঘরের বাহিরে না হাসে কেহই
ভুবন-ভুলানো হাসি।
উড়ে নীলাঞ্চল
বাতাসে বিচঞ্চল,
বাজে কঁাকন মল
রিণিঝিনি
হবনা তাপস, হবনা, যদি না
পাই গো তপস্বিনী :
মধুর
যদি
আমি
আমি হবনা ভাপস, তোমার শপথ,
যদি সে তপের বসে
কোন নূতন ভুবন না পারি গড়িতে
নুতন হৃদয় তলে।
যদি জাগায়ে বীণার তার
কারো টুটিয়া মরম দ্বার,
কোনো নূতন আঁখির ঠার
লই চিনি।
হবন। তাপস, হবনা, হবনা,
না পেলে তপস্বিনী।

ক্ষণিক
পথে
গায়ের পথে চলেছিলেম
অকারণে;
বাতাস বহে বিকালবেলা
বেণুবনে।
ছায়া তখন আলাের ফাকে
লতার মত জড়িয়ে থাকে,
একা একা কোকিল ডাকে
নিজমনে।
আমি কোথায় চলেছিলেম
অকারণে!
জলের ধারে কুটীরখানি
পাতা-ঢাক,
দ্বারের পরে নুয়ে পড়ে
নিম্বশাখা।
ঐ যে শুনি মাঝে মাঝে-
না-জানি কোন নিত্য কাজে
কোথায় দুটি কঁাকন বাজে
গৃহকোণে।
যেতে যেতে এলেম হেথা
অকারণে!

ক্ষণিক।
দীঘির জলে ঝলক্ বলে
মাণিক হীরা,
শর্ষেক্ষেতে উঠচে মেতে
মৌমাছিরা।
এ পথ গেছে কত গাঁয়ে,
কত গাছের ছায়ে ছায়ে,
কত মাঠের গায়ে গায়ে
কত বনে।
আমি শুধূ হেথায় এলেম
অকারণে ।
আরেক দিন সে ফাগুন মাসে
বহু অাগে ।
চলেছিলেম এই পথে, সেই
মনে জাগে।
আমের বােলের গন্ধে অবশ
বাতাস ছিল উদাস অলস,
ঘটের শানে বাজচে কলস
ক্ষণে ক্ষণে।
সে সব কথা ভাৰ চি বসে
আকারণে।
দীর্ঘ হয়ে পড়ছে পথে
বাক। ছায়া,

ক্ষণিক।
গােষ্ঠ ঘরে ফিরচে ধেনু
শ্রান্তকায়।
গোধূলিতে ক্ষেতের পরে
ধূসর আলো ধূধূ করে,
বসে আছে খেয়ার তরে
পান্থ জনে।
আবার ধীরে চলচি ফিয়ে
অকারণে!
জন্মান্তর
আমি
আমি
ছেড়েই দিতে রাজি আছি
সুসভ্যতার আলােক,
চাইনা হতে নববঙ্গে
নবযুগের চালক ;
নাই বা গেলেম বিলাত,
পেলেম রাজার খিলাৎ,
পরজন্মে পাই রে হতে
আমি
নাই বা
যদি
ব্ৰজের রাখাল বালক।
নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে
সুসভ্যতার আলােক।

২
যারা
যারা
যারা
নিত্য কেবল ধেনু চরায়
বংশিবটের তলে,
গুঞ্জ। ফুলের মালা গেঁথে
পবে পরায় গলে ;
বৃন্দাবনের বনে
শ্যামের বাঁশি শোনে,
যমুনতে ঝাপিয়ে পড়ে
শীতল কালো জলে।
নিত্য কেবল ধেনু চরায়
বংশিবটের তলে।
সদাই
যারা
যারা
ওরে
বিহা হল জাগরে ভাই
ডাকে পরস্পরে।
ঐযে দধি-মন্থ-ধ্বনি
উঠল ঘরে ঘরে।
মাঠের পথে ধেনু
উড়িয়ে গো-খুর রেণু,
আঙিনাতে ব্ৰজের বধূ
দুগ্ধ-দোহন করে
বিহান্ হল জাগরে ভাই
ভাকে পরস্পরে।
চলে
ওরে

ক্ষণিক ৪ ওরে hts শাঙন মেঘের ছায়া পড়ে কালাে তমাল মুলে, এপার ওপার আঁধার হল কালিন্দীরি কূলে। গােপাঙ্গনা ডরে খেয়া তরীর পরে, কুঞ্জবনে নাচে ময়ূব কপালখানি তুলে। শাঙন মেঘের ছায়া পড়ে কালো তমাল মুনে। কঁপে ওরে মােরা কোথা নব-নবীন ফাগুন রাতে নীল নদীর তীরে যাব চলি অশােকবনে শিখিপুচ্ছ শিরে। দোলার ফুল-রশি নীপশাখায় কসি’ দখিন বায়ে বাশির ধ্বনি উঠবে আকাশ ঘিরে, রাখল মিলে করব মেলা নীল নদীর তীরে। দিবে যবে ।

ক্ষণিক।
আমি
হবনা ভাই নববঙ্গে
আমি
যদি
নবযুগের চালক,
জালানা আঁধার দেশে
সুসভ্যতার আলােক
ননী-ছানার গায়ে
অশােকনীপের ছায়ে
কোনজন্মে পারি হতে
ব্রজের গোপবালক
চাই না হতে নববঙ্গে
কোথাও
আমি
তবে
নবযুগের চালক।
কৰ্ম্মফল
পরজন্ম সত্য হলে
কি ঘটে মাের সেটা জানি।
আবার আমায় টানবে ধরে
বাংলা দেশের এ রাজধানী।
গদ্যপদ্য লিখনু ফেদে,
তারাই আমায় আনবে বেঁধে,
অনেক লেখায় অনেক পাতক,
সে মহাপাপ করব মােচন।
আমায় হ ত করতে হবে
আমার লেখা সমালোচনা

ক্ষণিক
৮১
পথের ধারে বাড়ি আমার,
থাকি গানের ঝোকে,
বিদেশী সব পথিক এসে
যেথা-সেথাই ঢোকে।
ভাঙে কতক, হারাম কতক
যা আছে মাের দামী
এমনি করে একে একে
সর্বস্বান্ত আমি।
আমায় যদি মনটি দেবে—দিয়ে, দিয়াে মন।
মনের মধ্যে ভাবনা কিন্তু রেখো সারাক্ষণ ।
আমায় যদি মনটি দেবে,
নিষেধ তাহে নাই
কিছুর তরে আমায় কিন্তু
কোবোনা কেউ দায়ী।
ভুলে যদি শপথ করে
বলি কিছু কবে,
সেটা পালন না করি ত
মাপ করিতেই হবে।
ফাগুন মাসে পূর্ণিমাতে
যে নিয়মটা চলে,
রাগ কোরােনা চৈত্র মাসে
সেটা ভঙ্গ হলে।
'

৮২
কোন দিন বা পূজার সাজি
কুসুমে হয় ভরা,
কোন দিন বা শূন্য থাকে,
মিথ। সে দােষ ধরা।
আমায় যদি মনটি দেবে-নিষেধ তাহে নাই ;
কিছুর তরে আমায় কিন্তু কোরােনা কেউ দায়ী
৫
আমায় যদি মনটি দেবে
রাখিয়া যাও তবে ;
দিয়েছ যে সেটা কিন্তু
ভুলে থাকতে হবে।
দুটি চক্ষে বাজবে তােমার
নধরাগের বাঁশি,
কণ্ঠে তােমার উচ্ছ সিয়া
উঠবে হাসিরাশি
প্রশ্ন যদি শুধাও কভু
মুখটি রাখি বুকে,
মিথ্যা কোন জবাব পেলে
হেসে সকৌতুকে।
যে দুয়ারটা বন্ধ থাকে
বন্ধ থাকতে দিয়ে।
আপনি যাহা এসে পড়ে
তাহাই হেসে নিয়ে।

ক্ষণিক
আমায় যদি মনটি দেবে-রাখিয়া যাও তবে ;
দিয়েছ যে সেটা কিন্তু ভুলে থাকতে হবে।
স্বল্পশেষ
অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,
কিছু নেই।
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
যা ছিল তা শেষ করেছি
একটি বসন্তেই।
আজ যা কিছু বাকি আছে।
সামান্য এই দান
তাই নিয়ে কি রচ দিব
একটি ছোট গান?
একটি ছােট মালা, তােমার
হাতের হবে বালা,
একটি ছােট ফুল, তােমার
কানের হবে দুল;
একটি তরুতলায় বসে
একটি ছোট খেলায়
হারিয়ে দিয়ে যাবে মােরে
একটি সন্ধেবেলায়।
অধিক কিছু নেই গাে কিছু নেই,
কিছু নেই।

৮৪
ক্ষণিকা
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
ঘাটে আমি একলা বসে রই,
ওগো আয়!
বর্ষা নদী পার হবি কি ওই ?
হায় গাে হায়!
অকূল মাঝে ভাসবি কেগো
ভেলার ভরসায় ?
অামার তরীখান
সৈবে না তুফান ;
তবু যদি লীলাভরে
চরণ কর দান,
শান্ত তীরে তীরে, তোমায়
বাইব ধীরে ধীরে ;
একটি কুমুদ তুলে, তােমার
পরিয়ে দেব চুলে।
ভেসে ভেসে ওবে বসে
কত কোকিল ডাকে
কূলে কূলে কুঞ্জবনে
নীপের শাখে শাখে।
ক্ষুদ্র আমার তরীখানি—সত্য করি’ কই,
হায় গাে পথিক হায়,
তােমায় নিয়ে একলা নায়ে পার হব না ওই
আকুল যমুনায়।

ক্ষণিকা
কূলে
আমাদের এই নদীর কূলে
নাইক স্নানের ঘাট,
প করে মাঠ।
ভাঙা পাড়ির গায়ে শুধু
শালিস্ লাখে লাখে
খোপের মধ্যে থাকে।
সকাল বেলা অরুণ আলো
পড়ে জলের পরে,
নৌকা চলে দু’একখানি
অলস বায়ুভরে।
আঘটাতে বসে রৈলে
বেলা যাচ্চে বয়ে ;
দাও গো মােরে কয়ে’
ভাঙন-ধরা কূলে তােমার
আর কিছু কি চাই ?
সে কহিল, ভাই,
নাই, নাই, নাই গাে আমার
কিছুতে কাজ নাই।
আমাদের এ নদীর কূলে
ভাঙা পাড়ির তল,
ধেনু খায় না জল।

ক্ষণিক।
দূর গ্রামের দু’একটি ছাগ
বেড়ায় চরি চরি
সারাদিবস ধরি।
জলের পরে বেঁকে-পড়া
খেজুর শাখা হতে
ক্ষণে ক্ষণে মাছবাঙাটি
ঝাপিয়ে পড়ে স্রোতে।
ঘাসের পরে 'অশথতলে
যাচ্চে বেলা বয়ে ;
দাও আমারে কয়ে’
আজকে এমন বিজন প্রাতে
আর কারে কি চাই ?
সে কহিল, ভাই,
নাই, নাই, নাই গো আমার
কারেও কাজ নাই।
আছে, আছে স্থান!
একা তুমি, তােমার শুধু
একটি আঁটি ধান।
না হয় হবে ঘেঁষাঘেঁষি,
এমন কিছু নয় সে বেশী,

ক্ষণিক।
.
না হয় কিছু ভারি হবে
আমার তরীখান,
তাই বলে কি ফিরবে তুমি ?
আছে, আছে স্থান!
এস, এস নায়ে!
ধূলা যদি থাকে কিছু
থাকুন। ধূলা পায়ে।
তনু তােমার তনুলতা,
চোখের কোণে চঞ্চলতা,
সজলনীল-জলদ বরণ
বদনখানি গায়ে।
তােমার তরে হবে গাে ঠাই
এস, এস নারে।
যাত্রী আছে নানা।
নানা ঘাটে যাবে তার।
কেউ কারো নয় জানা।
তুমিও গাে ক্ষণেকরে
বসবে আমার তরী পরে,
যাত্রা যখন ফুরিয়ে যাবে
মাবে না মাের মানা
এলে যদি তুমিও এস,
যাত্রী আছে নানা।

স ক্ষণিক ? কোথা তােমার স্থান ? কোন গােলতে রাখতে যাবে একটি আঁটি ধান ? বলতে যদি না চাও, তবে শুনে আমার কি ফল হবে ; ভাবব বসে খেয়া যখন করব অবসান- কোন পাড়াতে যাবে তুমি, কোথা তােমার স্থান == একগাঁয়ে আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ। তাদের গাছে গায় যে দোয়েল পাখী তাহার গানে আমার নাচে বুক। তাহার দুটি পালন-করা ভেড়া চরে বেড়ায় মােদের বটমূলে, যদি ভাঙে আমার ক্ষেতের বেড়া, কোলের পরে নিই তাহারে তুলে। আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা, আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা,

ক্ষণিক
৮৯
আমার নাম জানে গাঁয়ের পাঁচজনে,
আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা।
দুইটি পাড়ায় বড়ই কাছাকাছি,
মাঝে শুধু একটি মাঠের ফাক।
তাদের বনের অনেক মধুমাছি
মমাদের বনে বাঁধে মধুর চাক।
তাদের ঘাটে পূজার জবামাল।
ভেসে আসে মোদের বাধাঘাটে,
তাদের পাড়ার কুসম ফুলের ডাল।
বেচতে আসে মােদের পাড়ার হাটে।
আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা,
আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা,
আমার নাম জানে গাঁয়ের পাঁচজনে,
আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা ।
আমাদের এই গ্রামের গলি পরে
আমের বােল ভরে আমের বন।
তাদের ক্ষেতে যখন তিসি ধরে,
মােদের ক্ষেতে তখন ফোটে শন ।
তাদের ছাদে যখন ওঠে তার।
আমার ছাদে দখিন হাওয়া ছােটে।
তাদের বনে ঝরে শ্রাবণ ধারা
আমার বনে কদম ফুটে ওঠে।

ক্ষণিকা
আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা,
আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা,
আমার নাম জানে গাঁয়ের পাঁচজনে,
আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা।
দুই তীরে
আমি ভালবাসি আমার
নদীর বালুচব,
শরৎকালে যে নির্জনে
চকাচকির ঘর।
যেথায় ফুটে কাশ
তটের চারি পাশ,
শীতের দিনে বিদেশী সব
হাঁসের বসবাস।
কচ্ছপের ধীরে
রৌদ্র পােয় তীরে,
দু একখানি জেলের ডিঙি
সন্ধেবেলায় ভিড়ে।
আমি ভালবাসি আমার
নদীর বালুচর,
শরৎকালে যে নির্জনে
চকাচকির ঘর।

ক্ষণিকা
*
তুমি ভালবাসি তােমার
ঐ ওপারের বন,
যেথায় গাঁথা ঘনচ্ছায়
পাতার আচ্ছাদন।
যেথায় বাকা গলি
নদীতে যায় চলি,
দুইধারে তার বেণুবনের
শাখায় গলাগলি।
সকাল সন্ধেবেলা
ঘাটে বধূর মেলা,
ছেলের দলে ঘাটের জলে
ভাসে, ভাসায় ভেলা ।
তুমি ভালবাস তোমার
ঐ ওপারের বন,
যেথায় গাঁথা ঘনচ্ছায়া
পাতার আচ্ছাদন।
তোমার আমার মাঝখানেতে
একটি বহে নদী,
দুই টেরে এক(ই) গান সে
শােনায় নিরবধি।

৯২
ক্ষণিক
আমি শুনি, শুয়ে
বিজন বালু ভূঁয়ে,
তুমি শোন, কখের কলস
ঘটের পরে থুয়ে।
তুমি তাহার গানে
বােঝ একটা মানে,
আমাৰ কূলে আরেক অর্থ
ঠেকে আমার কানে।
তোমার আমার মাঝখানেতে
একটি বহে নদী,
দুই চেয়ে এক(ই) গান সে
শােনায় নিরবধি।
অতিথি
ঐ শােন গো অতিথ, বুঝি আজ,
এল আজ।
ওগাে বধূ রাখ তোমার কাজ,
রাখি কাজ!
শুচ না কি তােমার গৃহদ্বারে
রিনিঠিনি শিকলটি কে নাড়ে,
এমন ভরা ঝ।

ক্ষণিক
পায়ে পায়ে বাজিয়ােক মল,
ছুটোনাক চরণ চঞ্চল,
হঠাৎ পাবে লাজ।
ঐ শােন গো অতিথ, এল আজ,
এল আজ।
ওগাে বধূ রাখ তােমার কাজ,
রাখ কাজ।
•য় গাে কভু বাতাস এ নয় নয়,
কভু নয়।
ওগো বধূ মিছে কিসের ভয়,
মিছে ভয়।
আঁধার কিছু নাইক আঙিনাতে,
আজকে দেখ ফাগুন-পূর্ণিমাতে
আকাশ আলােময়।
না-হয় তুমি মাথার ঘােটা টানি
হাতে নিয়ে ঘরের প্রদীপখানি,
যদি শঙ্কা হয়।
নয় গো কভু বাতাস এ নয় নয়,
কভু নয়।
ওগো বধু মিছে কিসের ভয়,
মিছে ভয়।

ক্ষণিক
-হয় কথা কোয়ােনা তার সনে,
পান্থ সনে।
সঁড়িয়ে তুমি থেকে একটি কোণে,
দুয়ার-কোণে।
প্রশ্ন যদি শুধায় কোনকিছু
নীরব থেকে মুখটি করে নীচু
নম্র দু নয়নে।
কাকন যেন ঝঙ্কারে না হাতে,
পথ দেখিয়ে আনবে যবে সাথে
অতিথি সজ্জনে।
না-হয় কথা কোয়ােনা 'তার সনে,
পান্থ সনে।
দাড়িয়ে তুমি থেকো একটি কোণে,
দুয়ার-কোণে।
৪
ওগাে বধূ হয়নি তােমার কাজ?
গৃহ-কাজ?
ঐ শােন কে অতিথ এল আজ,
এল আজ।

ক্ষণিকা
সাজাওনি কি পূজারতির ডালা ?
এখনাে কি হয়নি প্রদীপ জ্বালা
গোষ্ঠগৃহের মাঝ ?
অতি যত্নে সীমন্তটি চিরে
সিঁদুর-বিন্দু আঁক নাই কি শিবে?
হয়নি সন্ধ্যাসাজ ?
ওগো বধূ হয়নি তােমার কাজ?
গৃহকাজ ?
ঐ শোন কে অতিথ এল আজ,
এল আজ।
সম্বরণ
আজকে আমার বেড়া-দেওয়া-বাগানে,
বাসটি বয় মনের-কথা-জাগানে।
আজকে কেবল বউ কথা কও ডাকে
কৃষ্ণচূড়ার পুষ্প-পাগল শাখে,
আমি আছি তরুর তলায় পা মেলি,
সামনে অশােক টগর চাপা চামেলি।
আজকে আমার বেড়া-দেওয়া-বাগানে,
বাতাসটি বয় মনের-কা-জাগানে।

ক্ষণিক।
এনিতর বাতাস-বওয়া সকালে
নিজেরে মন হাজারাে বার ঠকালে।
আপনারে হায় চিত-উদাস গানে
উড়িয়ে দিলে অজানিতের পানে,
চিরদিন যা ছিল নিজের দখলে
দিয়ে দিলে পথের পান্থ সকলে।
আজকে আমার বেড়া-দেওয়া-বাগানে,
বাতাসটি বয় মনের-কথা-জাগানে।
ভেবেছি তাই আজকে কিছুই গাবনা,
গানের সঙ্গে গলিয়ে প্রাণের ভাবনা,
আপনা ভুলে ওরে ভাবােন্মাদ,
দিনে ভেঙে তাের বেদনা বাঁধ,
মনের সঙ্গে মনের কথা গাঁথা সে।
গাবনা গান আজকে দখিন বাতাসে।
আজকে আমার বেড়া-দেওয়া-বাগানে
বাতাস টি বয় মনের-কথা-জাগানে।

ক্ষণিক
বিরহ
তুমি যখন চলে গেলে
তখন দুই পহর।
সূর্য তখন মাঝ গগনে
দ্রে খরতর।
ঘরের কৰ্ম্ম সাঙ্গ করে
ছিলেম তখন একলা ঘরে,
আপন মনে বসে ছিলেম
বাতায়নের পর ।
তুমি যখন চলে গেলে
তখন দুই পহর।
২
চৈত্র মাসের নানা ক্ষেতের
নানা গন্ধ নিয়ে,
আসতেছিল তপ্ত হওয়া
মুক্ত দুয়ার দিয়ে।
ঘুঘু
সারাটা দিন
ডাকতেছিল শ্রান্তি-বিহীন,
একটি ভ্রমর ফিরতেছিল
কেবল গুনগুনিয়ে।
চৈত্র মাসের নানা ক্ষেতের
নানা বার্তা নিয়ে।
৭

ক্ষণিক
তখন পথে লােক ছিল না,
ক্লান্ত কাতর গ্রাম।
ঝাউ শাখাতে উঠতেছিল
শব্দ অবিশ্রাম ।
আমি শুধু এল। প্রাণে
অতি সুদূর বাঁশির তানে
গেঁথেছিলেম আকাশ ভরে
একটি কাহার নাম।
তখন পথে লোক ছিল না,
ক্লান্ত কাতর গ্রাম।
৪
ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া,
আমি ছিলেম জেগে।
আবাধা
চুল উড়তেছিল
উদাস হাওয়া লেগে ।
তটতরুর ছায়ার তলে
ঢেউ ছিল না নদীর জলে,
তপ্ত আকাশ এগিয়ে ছিল
ও ভ্ৰ অলস মেঘে।
ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া,
আমি ছিলেম জেগে

ক্ষণিক।
তুমি যখন চলে গেলে
তথন দুই পহর।
শুষ্ক পথে দগ্ধ মাঠে
রৌদ্র খরতর।
নিবিড়-ছায়া বটের শাথে
কপোত দুটি কেবল ডাকে,
একলা আমি বাতায়নে,
শূন্য শয়ন ঘর।
তুমি যখন গেলে তখন
বেল! দুই পহর।
ক্ষণেক দেখা
চলেছিলে পাড়ার পথে
কলস লয়ে কঁাখে,
একটুখানি ফিরে কেন
দেখলে ঘােমটা ফাকে ?
ঐটুকু যে চাওয়া,
দিল একটু হাওয়া
কোথা তােমার ওপার থেকে
আমার এপার পরে।
অতি দূরের দেখাদেখি
অতি ক্ষণেক তরে।

ক্ষণিক।
আমি শুধু দেখেছিলেম
তোমার দুটি আঁখি।
ঘােমটা-ফদা আঁধার মাঝে
এস্ত দুটি পাখি।
তুমি এক নিমিখে
চেয়ে আমার দিকে
পথের একটি পথিকেরে
দেখলে কতখানি,
একটুমাত্র কৌতূহলে
একটি দৃষ্টি হানি ?
যেমন ঢাকা ছিলে তুমি
তেমনি রৈলে ঢাকা।
তােমার কাছে যেমন ছিনু
তেনি রৈনু ফাঁকা।
তবে কিসের তরে
থালে লীলাভরে
যেতে যেতে পাড়ার পথে
কলস লয়ে কঁাখে ?
একটুখানি ফিরে কেন
দেখলে ঘােমটা-ফাকে

ক্ষণিক
অকালে
ভাঙ' হাটে কে ছুটেছিস
পসরা লয়ে ?
সন্ধ্যা হ’লঐ যে বেলা
গেল রে বয়ে।
যে-যার বােঝা মাথার পরে
ফিরে এল আপন ঘরে,
একাদশীর খণ্ড শশী
উঠল পল্লীশিরে।
পারের গ্রামে যারা থাকে
উচ্চকণ্ঠে নৌকা ডাকে,
হাহা করে প্রতিধ্বনি
নদীর তীরে তীরে।
কিসের আশে উদ্ধশ্বাসে
এমন সময়ে
ভাঙা হাটে তুই ছুটেছিস
পসরা লয়ে ?
সুপ্তি দিল বনের শিরে
হস্ত বুলায়ে,
কাকা ধ্বনি থেমে গেল
কাকের কুলায়ে।

ক্ষণিক।
বেড়ার ধারে পুকুর পাড়ে
ঝিল্লি ডাকে ঝােপে ঝাড়ে,
বাতাস ধীরে পড়ে এল,
স্তব্ধ বাঁশের শাখা।
হের ঘরের আঙিনাতে
শ্রান্ত জনে শয়ন পাতে,
সন্ধ্যাপ্রদীপ আলােক ঢালে
বিরম-সুধা-মাখা।
সকল চেষ্টা শান্ত যখন
এমন সময়ে
ভাঙা হাটে কে ছুটেছি
পসরা লয়ে?
আষাঢ়
নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে
তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগাে আজ তোরা যানে, ঘরের
বাহিরে।
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,
আউষের ক্ষেত জলে ভয়-ভর,

ক্ষণিক
কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার
ঘনিয়েছে, দেখ চাহি রে।
ওগো আজ তােরা যাতে ঘরের
বাহিরে ।
২
ওই ডাকে শোন ধেনু ঘনঘন,
ধবলীরে আন গােহলে।
এখনি আঁধার হবে, বেলাটুকু
পােহালে।
দুয়ারে দাড়ায়ে ওগো দেখ, দেখি
মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি
রাখাল বালক কি জানি কোথায়
সারা দিন আজি খােয়ালে।
এখনি আঁধার হবে, বেলাটুকু
পোহালে।
শােন শোন ওই পারে যাবে বলে
কে ডাকিছে বুঝি মাঝি রে ?
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে।
আজিরে।
পূবে হাওয়া বয়, কূলে নেই কেউ,
দুকুল বাহিয়া উঠে পড়ে ঢেউ,

১০ ঃ
ক্ষণিক
দরদরবেগে জলে পড়ি জল
ছলছল উঠে বাজি রে।
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে
আজিরে।
ওগো আজ তােরা যানে গো তাের
যাসনে ঘরের বাহিরে।
আকাশ আঁধার, বেলা বেশী আর
নাহিরে।
ঝরঝরধারে ভিজিবে নিচোল,
ঘটে যেতে পথ হয়েছে পিছল,
ওই বেণুবন দুলে ঘনঘন
পথপাশে দেখ চাহি রে।
ওগো আজ তোরা যানে ঘরের
বাহিরে।

ক্ষণিকা
দুই বােন
দুটি বােন তারা হেসে যায় কেন
যায় যবে জল আনতে ?
দেখেছে কি তারা পথিক কোথায়
দাড়িয়ে পথের প্রান্তে ?
ছায়ায় নিবিড় বনে
যে আছে আঁধার কোণে
তারে যে কথন
কটাক্ষে চায়
কিছু ত পারিনে জাতে।
দুটি বােন তারা হেসে যায় কেন
যায় যবে জল আন্‌তে ?
দুটি বােন তারা করে কাপাকাণি
কি না জানি জল্পনা।
গুঞ্জনধ্বনি দূব হতে শুনি,
কি গােপন মন্ত্রণা?
আসে যবে এইখানে
চায় দোহে দোহাপানে,
কাহারাে মনের কোন কথা তারা
করেছে কি কল্পনা ?
দুটি বােন তারা করে কাণাকাণ
কি না জানি জল্পনা।

ক্ষণিকা
এইখানে এসে ঘট হতে কেন
জল উঠে উচ্ছলি ?
চপল চক্ষে তরল তারকা
কেন উঠে উজ্জ্বলি ?
যেতে যেতে নদীপথে
জেনেছে কি কোনমতে
কাছে কোথা এক আকুল হৃদয়
দুলে উঠে চঞ্চলি ?
এইখানে এসে ঘট হতে জল
কেন উঠে উচ্ছলি ?
দুটি বােন তারা হেসে যায় কেন
যায় যবে জল আনতে?
বটের ছায়ায় কেহ কি তাদের
পড়েছে চোখের প্রান্তে ?
কৌতুকে কেন ধায়
সচকিত দ্রুত পায় ?
কলসে কঁাকন ঝলকি ঝনকি
ভােলায় রে দিভ্রান্তে।
দুটি বােন তারা হেসে যায় কেন
যায় যবে জল আনতে?

ক্ষণিকা
নববর্ষা
হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে
ময়ূরের মত নাচে, রে
হৃদয় নাচে রে ।
শত বরণের ভাব-উচ্ছাস
কলাপের মত করেছে বিকাশ
আকুল পরাণ আকাশে চাহিয়া
উল্লাসে করে যাচে রে।
হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে
ময়ূরের মত নাচে রে।
গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি
গরজে গগনে গগনে
গরজে গগনে।
ধেয়ে চলে আসে বাদলের ধারা,
নবীন ধান্য দুলে দুলে সারা,
কুলায়ে কাপিছে কাতর কপােত,
দাদুরি ডাকিছে সঘনে।
গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি
গরজে গগনে গগনে।

১০৮
ক্ষণিক
নয়নে আমার সজল মেঘের
নীল অঞ্জন লেগেছে
নয়নে লেগেছে।
নব তৃণদলে ঘনবনছায়ে
হরষ আমার দিয়েছি বিছায়ে,
পুলকিত নীপ-নিকুঞ্জে আজি
বিকশিত প্রাণ জেগেছে।
নয়নে সজল স্নিগ্ধ মেঘের
নীল অঞ্জন লেগেছে।
ওগো প্রাসাদের শিখরে আজিকে
কে দিয়েছে কেশ এলায়ে
কবরী এলায়ে ?
ওগাে নবঘন-নীলবাসখানি
বুকের উপরে কে লয়েছে টানি ?
তড়িৎ-শিখার চকিত আলোকে
ওগো কে ফিরিছে খেলায়ে ?
ওগো প্রাসাদের শিখরে আজিকে
কে দিয়েছে কেশ এলায়ে ?
ওগাে নদীকূলে তীর-তৃণতলে
কে বসে’ অমল বসনে
শ্যামল বসনে ?

ক্ষণিক।
সুদূর গগনে কাহারে সে চায় ?
ঘাট ছেড়ে ঘট কোথা ভেসে যায় ?
নবমালতীর কচি দলগুলি
আনমনে কাটে দশনে।
ওগো নদীকূলে তীর-তৃণতলে
কে বসে’ শ্যামল বসনে ?
ওগো নির্জনে বকুল শাখায়
দোলায় কে আজি দুলিছে
দোদুল দুলিছে ?
ঝরকে ঝরকে ঝরিছে বকুল,
আঁচল আকাশে হতেছে অকুল,
উড়িয়া অলক ঢাকিছে পলক
কবরী খসিয়া খুলিছে।
ওগো নির্জনে বকুল শাখায়
দোলায় কে অজি দুলিছে ?
বিকচকেতকী তটভূমি পরে
কে বেঁধেছে তার তরণী
তরুণ তরণী ?
রাশি রাশি তুলি শৈবালদল
ভরিয়া লয়েছে লােল অঞ্চল,
বাদল-রাগিণী সজল নয়নে
গাহিছে পরাণ-হরণী।

ক্ষণিক
বিকচকেতকী তটভূমি পরে
বেঁধেছে তরুণ তরণী ।
হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে
ময়ূরের মত নাচে রে
হৃদয় নাচে রে ।
ঝরে ঘনধারা নবপল্লবে,
কঁপিছে কানন ঝিল্লির রবে,
তীর ছাপি নদী কল-কল্লোলে
এল পল্লীর কাছে রে।
হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে
ময়ূরের মত নাচে রে।
দুর্দিন
এতদিন পরে প্রভাতে এসেছ
কি জানি কি ভাবি মনে।
ঝড় হয়ে গেছে কাল রজনীতে
রজনীগন্ধার বনে।
কাননের পথ ভেসে গেছে জলে,
বেড়াগুলি ভেঙে পড়েছে ভূতলে,
নব ফুটন্ত ফুলের দণ্ড
লুটায় তৃণের সনে।
এতদিন পরে তুমি যে এসেছ
কি জানি কি ভাবি মনে।

ক্ষণিক
হের গো আজিও প্রভাত-তরুণ
মেঘের আড়ালে হারা ।
রহি রহি আজো ঘনায়ে ঘনায়ে
ঝরিছে বাদল ধারা।
মাতাল বাতাস আজো খাকি থাকি
চেতিয়া চেতিয়া উঠে ডাকি ডাকি,
জড়িত পাখায় সিক্ত শাখায়
দোয়েল দেয় না সাড়া।
আজিও আঁধার প্রভাতে অরুণ
মেঘের আড়ালে হারা।
এ ভরা বাদলে আর্দ্র আঁচলে
একেলা এসেছ আজি,
এনেছ বহিয়া রিক্ত তােমার
পূজার ফুলের সাজি।
এত মধুমাস গেছে বারবার,
ফুলের অভাব ঘটেনি তােমার
বন আলাে করি ফুটেছিল যবে
রজনীগন্ধারাজি।
এ ভরা বাধলে আর্জ আঁচলে
একেলা এসেছ আজি।

ক্ষণিক
৪
আজি তরুতলে দাঁড়ায়েছে জল,
কোথা বসিবার ঠাই ?
কাল যাহা ছিল সে ছায়া সে আলো
সে গন্ধগান নাই।
তবু ক্ষণকাল রহ ত্বরাহীন
ছিন্ন কুসুম পঙ্কে মলিন
ভূতল হইতে যতনে তুলিয়া
ধুয়ে ধুয়ে দিব তাই।
আজি তরুতলে দাড়ায়েছে জল,
কোথা বসিবার ঠাই ?
এতদিন পরে তুমি যে এসেছ
কি জানি কি ভাবি মনে।
প্রভাত আজিকে অরুণবিহীন
কুসুম লুটায় বনে।
যাহা আছে লও প্রসন্ন করে,
ও সাজি তোমার ভরে কি না ভরে,
ঐ যে আবার নামে বারিধার
ঝরঝর বরষণে।
এতদিন পরে তুমি যে এসেছ
কি জনি কি ভাবি মনে।

ক্ষণিক।
১১৩
অবিনয়
হে নিরুপমা,
চপলতা আজ যদি কিছু ঘটে
করিয়ো ক্ষম।
এল আষাঢ়ের প্রথম দিবস,
বনরাজি আজি ব্যাকুল বিবশ,
বকুল বীথিকা মুকুলে মত্ত
কানন পরে।
র;
নব কদম্ব মদিরগন্ধে
আকুল করে।
হে নিরুপমা,
আঁখি যদি আজ করে অপরাধ,
করিয়ে ক্ষম।
হের আকাশের দূর কোণে কোণে
বিজুলি চমকি ওঠে খণে খণে,
বাতায়নে তব দ্রুত কৌতুকে
মারিছে উকি।
বাভাস করিছে দুরন্তপনা
ঘরেতে ঢুকি।
হে নিরুপমা,
গানে যদি লাগে বিহাল তান
করিয়াে ক্ষম।
ঝরঝর ধারা আজি উতরােল,

১১৪
ক্ষণিক
নদী কূলে কূলে উঠে কল্লোল,
বনে বনে গাহে মৰ্ম্মর স্বরে
নবীন পাতা ;
সজল পবন দিশে দিশে তুলে
বাদল গাথা।
হে নিরুপমা,
আজিকে আচারে ত্রুটি হতে পারে,
করিয়ো ক্ষমা।
দিবালােকহারা সংসারে আজ
কোনখানে কারো নাহি কোন কাজ,
জনহীন পথ ধেীন মাঠ
যেন সে আঁকা।
বর্ষণ-ঘ শীতল আঁধারে
জগৎ ঢাকা।
হে নিরুপমা,
চপলহা আজি যদি ঘটে তবে
করিয়ো ক্ষমা ।
তােমার দুখানি কালো আঁখি পরে
শ্যাম আষাঢ়ের ছায়াখানি পড়ে,
ঘনকালো তব কুঞ্চিত কেশে
যুথীর মালা।
তােমারি ললাটে নববরষার
বরণডালা।

ক্ষণিকা
কৃষ্ণকলি
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গায়ের লােক।
মেঘূ দিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালাে হরিণ-চোখ।
ঘােমটা মাথায় ছিল না তার মােটে,
মুক্তবেণী পিঠের পরে লােটে।
কালো? তা সে যতই কালো হােক
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হ’ল দেখে
ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটীর হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশপানে হানি’ যুগল ভুরু
শুলে বারেক মেঘের গুরু গুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হােক
দেখেছি তার কালাে হরিণ-চোখ।
।
পূবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে,
ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।

ক্ষণিকা
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে
আমিই জানি আর জানে সে মেয়ে।
কালাে? তা সে যতই কালো হােক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ !
এম্‌নি করে কালো কাজল মেঘ
জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।
এম্‌নি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ় মাসে নামে তমাল বনে।
এম্‌নি করে’ শ্রাবণ রজনীতে
হঠাৎ খুসি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হােক
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
আর যা বলে বলুক অন্য লােক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালাে হােক
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

ক্ষণিক।
১১।
ভৎসনা
মিথ্যা আমায় কেন সরম দিলে
চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে ?
আমি তােমার পাড়ার প্রান্ত দিয়ে
চলেছিলেম আপন গৃহদ্বারে।
যেথা আমার বাঁধা ঘাটের কাছে
দুটি চাপায় ছায়া করে আছে,
জামের শাখা ফলে আঁধার করা
স্বচ্ছগভীর পদ্মদীঘির ধারে।
তুমি আমায় কেন সরম দিলে
চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে ?
२
।
আজ ত আমি মাটির পানে চেয়ে
দীনবেশে যাইনি তােমার ঘরে।
অতিথ, হয়ে দিইনি দ্বারে সাড়া,
ভিক্ষাপাত্র নিইনি কাতর-করে।
আমি আমার পথে যেতে যেতে
তোমার ঘরের দ্বারের বাহিরেতে
ঘনশ্যামল তমাল তরুমূলে
দাড়িয়েছি এই দণ্ড দুয়ের তরে।
নতশিরে দুখানি হাত ঘুড়ি
দীনবেশে যাইনি তােমার ঘরে।

১১৮
ক্ষণিক
আমি তােমার ফুল্ল পুষ্পবনে
তুলি নাই ত যূথীর একটি দল।
আমি তােমার ফলের শাখা হতে
ক্ষুধাভরে ছিড়ি নাই ত ফল!
আছি শুধু পথের প্রান্তদেশে,
দাড়ায় যেথা সকল পান্থ এসে,
নিয়েছি এই শুধু গাছের ছায়া
পেয়েছি এই তরুণ তৃণতল।
আমি তােমার ফুল্ল পুষ্পবনে
তুলি নাই ত যূথীর একটি দল।
৪
শ্রান্ত বটে আছে চরণ মম,
পথের পঙ্ক লেগেছে দুই পায়।
আষাঢ় মেঘে হঠাৎ এল ধারা
আকাশ-ভাঙা বিপুল বরষায়।
ঝােড়ো হাওয়ার এলােমেলাে তালে
উঠল নৃত্য বাঁশের ডালে ডালে,
ছুটুল বেগে ঘন মেঘের শ্রেণী
ভগ্নরণে ছিন্ন কেতুর প্রায়।
শ্রান্ত বটে আছে চরণ মম,
পথের পঙ্ক লেগেছে দুই পায়।

ক্ষণিক
১১৯
কেমন করে জাব মনে আমি
কি যে আমায় ভাবলে মনে মনে ?
কাহার লাগি এক্সা ছিলে বসে
মুক্তকেশে আপন বাতায়নে ?
তড়িৎশিখা ক্ষণিকদীপ্তালােকে
হাতেছিল চমক তােমার চোখে,
জাত কেবা দেখতে:পাবে তুমি
আছি আমি কোথায় যে কোন্ কোণে।
কেমন করে জান্ব মনে আমি
আমায় কি যে ভাবলে মনে মনে ?
বুঝি গাে দিন ফুরিয়ে গেল আজি,
এখনো মেঘ আছে আকাশ ভরে।
থেমে এল বাতাস বেণুবনে,
মাঠের পরে বৃষ্টি এল ধরে।
তােমার ছায়া দিলেম তবে ছাড়ি,
লও গো তােমার ভূমি-আসন কাড়ি,
সন্ধ্যা হ’লদুয়ার কর রােধ,
যাব আমি আপন পথপরে।
বুঝি গাে দিন ফুরিয়ে গেল আজি,
এখনো মেঘ আছে আকাশ ভরে।

১২০
ক্ষণিকা
৭
মিথ্যা আমায় কেন সরম দিলে
চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে ?
আছে আমার নতুন-ছাওয়া ঘর
পাড়ার পরে পদ্মদীঘির ধারে।
কুটীরতলে দিবস হলে গত
জ্বলে প্রদীপ ধ্রুবতারার মত,
'আমি কারাে চাইনে কোন দান
কাঙাল বেশে কোন ঘরের দ্বারে।
মিথ্যা আমায় কেন সরম দিলে
চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে ?
সুখদুঃখ
বসেছে আজ রথের তলায়
মানযাত্রার মেলা।
সকাল থেকে বাদল হল
ফুরিয়ে এল বেলা।
আজকে দিনের মেলামেশা,
যত খুসি, যতই নেশা
সবার চেয়ে আনন্দময়
ঐ মেয়েটির হাসি।
এক পয়সায় কিনেছে ও
তালপাতার এক বাঁশি।

ক্ষণিকা
বাজে বাঁশি, পাতার বাঁশি
আনন্দস্বরে।
হাজার লােকের হর্ষধ্বনি
সবার উপরে।
ঠাকুরবাড়ি ঠেলাঠেলি
লােকের নাহি শেষ।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ধারায়
ভেসে যায় রে দেশ।
আজকে দিনের দুঃখ যত
নাই রে দুঃখ উহার মত,
ঐ যে ছেলে কাতর চোখে
দোকান পানে চাহি ;
একটি রাঙা লাঠি কিবে
একটি পয়সা নাহি।
চেয়ে আছে নিমেষহারা
নমুন অরুণ।
হাজার লােকের মেলাটিরে
করেছে করুণ।

১২
ক্ষণিক
খেলা
মনে পড়ে সেই আষাঢ়ে
ছেলেবেলা,
নালার জলে ভাসিয়েছিলেম
পাতার ভেলা।
বৃষ্টি পড়ে দিবসতি,
ছিল না কেউ খেলার সাথী,
একলা বসে’ পেতেছিলেম
সাধের খেলা।
নালার জলে ভাসিয়েছিলেম
পাতার ভেলা।
হঠাৎ হ’ল দ্বিগুণ আঁধার
ঝড়ের মেঘে,
হঠাৎ বৃষ্টি নাম্ল কখন
দ্বিগুণ বেগে।
ঘোলা জলের স্রোতের ধারা
ছুটে এণ পাগলপারা,
পাতার ভেলা ভুল নালার
তুফান লেগে।
হঠাৎ বৃষ্টি না যখন
দ্বিগুণ বেগে।

ক্ষণিক
সেদিন আমি ভেবেছিলেম
মনে মনে,
হ’ত বিধির যত বিবাদ
আমার সনে।
ঝড় এল যে আচম্বিতে
পাতার ভেলা ডুবিয়ে দিতে,
আর কিছু তার ছিল না কাজ
ত্রিভুবনে।
হ’ত বিধির যত বিবাদ
আমার সনে।
আজ আষাঢ়ে একলা ঘরে
কাল বেলা,
ভাবতেছিলেম এতদিনের
নানা খেলা।
ভাগ্যপরে করিয়া রোষ
দিতেছিলেম বিধিরে দোষ।
পড়ল মনে নালার জলে
পাতার ভেলা।
ভাবতেছিলেম এতদিনের
নানান খেলা ।

১২৪
ক্ষণিক
এখনো ভাঙেনি ভাঙেনি মেলা,
নদীর তীরের মেলা।
এ শুধু আষাঢ়-মেঘের আঁধার,
এখনাে রয়েছে বেলা।
ভেবেছিনু দিন মিছে গােঙালেম,
যাহা ছিল বুঝি সবি খােয়ালেম,
আছে আছে তবু আছে ভাই, কিছু
রয়েছে বাকি।
আমারো ভাগ্যে আজ ঘটে নাই
কেবলি ফাঁকি।
বেচিবার যাহা বেচা হয়ে গেছে
কিনিবার যাহা কেনা ;
আমি ত চুকিয়ে দিয়েছি নিয়েছি
সকল পাওনা দেন।
দিন না ফুরাতে ফিরিব এখন ;
প্রহরী চাহিছ পসরার পণ ?
ভয় নাই ওগো আছে আছে, কিছু
রয়েছে বাকি।
আমারো ভাগ্যে ঘটেনি ঘটেনি
কেবলি ফাকি।

ক্ষণিক
কখন বাতাস মাতিয়া আবার
মাথায় আকাশ ভাঙে
কখন সহসা নামিবে বাদল
তুফান উঠিবে গাঙে।
তাই ছুটাছুটি চলিয়াছি ধেয়ে ;
পারাণীর কড়ি চাহ তুমি নেয়ে ?
কিসের ভাবনা, আছে আছে, কিছু
রয়েছে বাকি।
আমারো ভাগ্যে ঘটেনি ঘটেনি
কেবলি ফাঁকি।
৪
ধানক্ষেত বেয়ে বাঁকা পথখানি,
গিয়েছে গ্রামের পারে।
বৃষ্টি আসিতে দাড়িয়েছিলেম
নিরালা কুটীর দ্বারে।
থামিল বাদল, চলিনু এবার ;
হে দোকানী চাও মূল্য তােমার ?
ভয় নাই ভাই আছে আছে, কিছু
রয়েছে বাকি।
আমারো ভাগ্যে ঘটেনি ঘটেনি
সকলি ফাঁকি।

ক্ষণিক
পথের প্রান্তে বটের তলায়
বসে আছ এইখানে-
হায় গাে ভিখারী চাহিছ কাতরে
আমারো মুখের পানে !
ভাবিতেছ মনে বেচাকেনা সেরে
কত লাভ করে’ চলিয়াছে কে রে !
আছে আছে বটে আছে ভাই, কিছু
রয়েছে বাকি।
আমারো ভাগ্যে ঘটেনি ঘটেনি
সকলি ফাঁকি।
আঁধার রজনী, বিজন এ পথ,
জোনাকি চমকে গাছে।
কে তুমি আমার সঙ্গ ধরেছ
নীরবে চলেছ পাছে ?
এ ক’টি কড়ির মিছে ভার বওয়া,
তােমাদের প্রথা কেড়েকুড়ে লওয়া
হবেন। নিরাশ, আছে আছে, কিছু
রয়েছে বাকি।
আমারো ভাগ্যে ঘটেনি ঘটেনি
কেবলি ফাঁকি।

ক্ষণিক।
৭
নিশি দু’পহর পঁহুছিনু ঘর
দু’হাত রিক্ত করি ।
তুমি আছ একা সজল নয়নে
দাঁড়ায়ে দুয়ার ধরি।
চোখে ঘুম নাই, কথা নাই মুখে,
ভৗত পাখী সম এলে মাের বুকে।
আছে আছে, বিধি, এখনো অনেক
রয়েছে বাকি।
আমারে ভাগ্যে ঘটেনি ঘটেনি
সকলি ফাঁকি।
স্থায়ী-অস্থায়ী
তুলেছিলেম কুসুম তােমার
হে সংসার, হে লতা,
পরতে মালা বিধল কাটা
বাল বুকে ব্যথা।
হে সংসার, হে লতা !
বেলা যখন পড়ে এল
আঁধার এল ছেয়ে,
দেখি তখন চেয়ে
তােমার গােলাপ গেছে, আছে
আমার বুকের ব্যথা।
হে সংসার, হে লতা !

১২৮
ক্ষণিকা
আরাে তােমার অনেক কুসুম
ফুটবে যথা-তথা,
অনেক গন্ধ অনেক মধু
অনেক কোমলতা।
হে সংসার, হে লতা!
সে ফুল তােলার সময় ত আর
নাহি আমার হাতে।
আজকে আঁধার রাতে
আমার গোলাপ গেছে, কেবল
আছে বুকের ব্যথা।
হে সংসার, হে লত!
উদাসীন
হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি,
ছুটিনে কাহারো পিছুতে,
মন নাহি মাের কিছুতেই, নাই
কিছুতে।
নির্ভয়ে ধাই সুযােগ-কুযোগ বিছুরি,
খেয়াল-খবর রাখিনে ত কোনকিছুরি,
উপরে চড়িতে যদি নাই পাই সুবিধা
সুখে পড়ে থাকি নীচুতেই, থাকি
নীচুতে।

ক্ষণিক।
হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি
ছুটিনে কাহারো পিছুতে,
মন নাহি মাের কিছুতেই, নাই
কিছুতে।
२
যেথা-সেথা ধাই, যাহা-তাহা পাই
ছড়িনেক ভাই ছাড়িনে।
তাই বলে কিছু কাড়াকাড়ি করে
কাড়িনে।
যাহা যেতে চায় ছেড়ে দিই তারে তখুনি,
বকিনে কারেও, শুনিনে কাহাবো বকুনি,
কথা যত আছে মনের তলায় তলিয়ে
ভুলেও কখনাে সহসা তাদের
নাড়িনে।
যেথা-সেথা ধাই, যাহা-তাহা পাই
ছাড়িনেক ভাই ছাড়িনে।
তাই বলে কিছু তাড়াতাড়ি করে
কার্ডিনে।
মন-দেয়া নেয়া অনেক করেছি,
মরেছি হাজার মরণে,
নূপুরের মত বেজেছি চরণে-
চরণে।

ক্ষণিকা আঘাত করিয়া ফিরেছি দুয়ারে দুয়ারে, সাধিয়া মরেছি ইহারে তাহারে উহারে, অশ্রু গাঁথিয়া রচিয়াছি কত মালিকা, রাঙিয়াছি তাহা হৃদয়-শােণিত- বরণে। মন-দেয়া-নেয়া অনেক করেছি, মরেছি হাজার মরণে, নূপুরের মত বেজেছি চরণে- চরণে। ৪ এতদিন পরে ছুটি আজ ছুটি মন ফেলে তাই ছুটেছি। তাড়াতাড়ি করে’ খেলাঘরে এসে জুটেছি। বুক-ভাঙা বােঝ নেবনারে আর তুলিয়া, ভুলিবার যাহা একেবারে যাব ভুলিয়া, যার বেড়ি তঁারে ভাঙা বেড়িগুলি ফিরায়ে বহুদিন পরে মাথা তুলে আজ উঠেছি। এতদিন পরে ছুটি আজ ছুটি মন ফেলে তাই ছুটেছি। তাড়াতাড়ি করে খেলাঘরে এসে জুটেছি।

ক্ষণিক
কত ফুল নিয়ে আসে বসন্ত
আগে পড়িত নানয়নে,
তখন কেবল ব্যস্ত ছিলাম
চয়নে।
মধুকর-সম ছিনু সঞ্চয়-প্রয়াসী,
কুসুম-কান্তি দেখি নাই, মধু-পিয়াসী,
বকুল কেবল দলিত করেছি আলসে,
ছিলাম যখন নিলীন বকুল,
শয়নে।
কত ফুল নিয়ে আসে বসন্ত
আগে পড়িত না নয়নে,-
তখন কেবল ব্যস্ত ছিলাম
চয়নে।
দূরে দূরে আজ ভুমিতেছি আমি
মন নাহি মাের কিছুতে,
তাই ত্রিভুবন ফিরিছে আমারি
পিছুতে।
সবলে কারেও ধরিনে বাসনা-মুঠিতে,
দিয়েছি সবারে আপন বৃন্তে ফুটিতে ;

১৩২
ক্ষণিক।
যখনি ছেড়েছি উচ্চে উঠার দুরাশা
হাতের নাগালে পেয়েছি সবারে
নীচুতে
দূরে দূরে আজ ভ্রমিতেছি আমি
মন নাহি মাের কিছুতে,
তাই ত্রিভুবন ফিরিছে আমারি
পিছুতে
যৌবন-বিদায়
ওগো যৌবন-ভরা,
এবার বােঝাই সাঙ্গ করে’, দিলেম বিদায় করি।
কতই খেয়া, কতই খেয়াল,
কতই না দাড়-বাওয়া,
তোমার পালে লেগেছিল
কত দখিন হাওয়া।
কত ঢেউয়ের টলমলানি,
কত স্রোতের টান,
পূর্ণিমাতে সাগর হতে
কত পাগল বান।
এপার হতে ওপার ছেয়ে
ঘন মেঘের সারি,

ক্ষণিকা
শ্রাবণ দিনে ভরা গাঙে
দু’কূল-হারা পাড়ি।
অনেক খেলা অনেক মেলা,
সকাল শেষ করে
চল্লিশেরি ঘাটের থেকে
বিদায় দিমু তােরে।
ওগো তরুণ তরী,
যৌবনের শেষ ক’টি গান ধিনু বোঝাই করি।
সে সব দিনের কান্না হাসি,
সত্য মিথ্যা ফাঁকি,
নিঃশেষিয়ে যারে নিয়ে
রাখিসনে আর বাকি।
নােঙর দিয়ে বাঁধিসনে আর,
চাহিনে আর পাছে,
ফিরে ফিরে ঘুরিনে আর
ঘাটের কাছে কাছে।
এখন হ’তে ভাটার স্রোতে
ছিন্ন পালটি তুলে,
ভেসে যারে স্বপ্ন সমান
অস্তাচলের কূলে।
সেথায় সােনা-মেঘের ঘাটে
নামিয়ে দিয়ে। শেষে
বহু দিনের বােঝ তােমার
চির-নিদ্রার দেশে।

১৩৪
ক্ষণিক
ওরে আমার তরী,
পারে যাবার উঠল হাওয়া ছােটরে ত্বরা করি
যে দিন খেয়া ধরেছিলেম
ছায়া বটের ধারে,
ভােরের সুরে ডেকেছিলেম
কে যাবি আয় পায়ে।
ভেবেছিলেম ঘাটে ঘাটে
করতে আনাগােনা
এমন চরণ পড়বে নায়ে
নৌকো হবে সােনা
এবারের পারাপারে-
এত লোকের ভিড়ে
সােনা-করা দু’টি চরণ
দেয়নি পরশ কিরে?
যদি চাপ পড়ে থাকে
কোন এক্টী বারে
যারে সােনার জন্ম নিয়ে
সােনার মৃত্যু পারে।

ক্ষণিক
শেষ হিসাব
সন্ধ্যা হয়ে এল, এবার
সময় হ’ল হিসাব নেবার।
যে দেবতারে গড়েছিলেম,
দ্বারে যাদের পড়েছিলেম,
আয়ােজনটা করেছিলেম
জীবন দিয়ে চবণ-সেবার,
তাদের মধ্যে আজ সায়াহ্নে
কেবা আছেন এবং কে নেই,
কেই ৰা বাকি, কেই বা ফাকি,
ছুটি নেব সেইটে জেনেই।
নাই বা জালি হায়রে মুখ ।
কি হবে তাের হিসাব সূক্ষ্ম !
সন্ধ্যা এল, দোকান তােল,
পারের নৌকা তৈরি হল,
যত পায় ততই ভাল
বিফল সুখের বিরাট দুঃখ ।
জীবনখানা খুল্লে তোমার
শূন্য দেখি শেষের পাতা ;
কি হবে ভাই হিসেব নিয়ে,
তােমার নাক লাভের খাতা ।

ক্ষণিক
আপনি আঁধার ডাকচে তােরে,
ঢাচে তােমায় দয়া করে।
তুমি তবে কেনই জ্বাল
মিটমিটে ওই দ্বীপের আলো,
চক্ষু মুদে থাকাই ভালো
শান্ত, পথের প্রান্তে পড়ে।
জানাজানির সময় গেছে,
বােঝাপড়া করে বন্ধ।
অন্ধকারের স্নিগ্ধ কোলে
থারে হয়ে বধির অন্ধ।
৪
যদি তােমায় কেউ না রাথে,
সবাই যদি ছেড়েই থাকে,-
জনশূন্য বিশাল ভবে
একলা এসে দাঁড়াও তবে,
তােমার বিশ্ব উদার রবে,
হাজার সুরে তােমায় ডাকে।
আঁধার রাতে নিণিমেষে
দেখতে দেখতে যাবে দেখা,
তুমি এক জগৎ মাঝে,
প্রাণের মাঝে আরেক একা।

ক্ষণিক
১৩
ফুলের দিনে যে মঞ্জরী,
ফলের দিনে যা সে ঝরি।
মরিসূনে আর মিথ্যে ভেবে,
বসন্তের অন্তে এবে
যারা যারা বিদায় নেবে
একে একে যারে সরি
হাে রে তিক্ত মধুর কণ্ঠ ;
হােক্ রে রিক্ত কল্পলতা
তােমার থাকুক পরিপূর্ণ
একলা থাকার-সার্থকতা।
শেষ
থাকব না ভাই থাকব না কেউ,
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে বাও রে চলে
কালের পিছু পিছু।
অধিক দিন ত বইতে হয় না
শুধু একটি প্রাণ।
অনন্ত কাল একই কবি
গায় না একই গান।

ক্ষণিক।
মা বটে শুকিয়ে মরে,
যে জন মালা পরে
সেও ত নঃ অমর, তবে
দুঃখ কিসের তরে ?
থাকব না ভাই থাকব না কেউ,
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে যাওরে চলে
কালের পিছু পিছু।
সব(ই) হেথায় একটা কোথাও
কৰ্ত্তে হয় রে শেষ,
গান থামিলে তাইত কানে
থাকে গানের রেশ।
কাটলে বেলা সাধের খেলা
সমাপ্ত হয় বলে,
ভাবনাটি তার মধুর থাকে
আকুল অশ্রুজলে।
জীবন অস্তে যায় চলি, তাই
রংটি থাকে লেগে,
প্রিয়জনের মনের কোণে
শরৎ-সন্ধ্যা-মেঘে।
থাকব না ভাই থাকব না কেউ,
থাকবে না ভাই কিছু।

ক্ষণিকা
সেই আনন্দে যাও রে ধেয়ে
কালের পিছু পিছু।
ফুল তুলি তাই তাড়াতাড়ি
পাছে ঝরেই পড়ে ।
সুখ নিয়ে তাই কাড়াকাড়ি’
পাছে যায় সে সরে।
রক্ত নাচে দ্রুতচ্ছন্দে
চক্ষে তড়িৎ ভায়,
চুম্বনেরে কেড়ে নিতে
অধর ধেয়ে যায়।
সমস্ত প্রাণ জাগে রে তাই
বক্ষ-দোলায় দোলে,
বাসনাতে ঢেউ উঠে যায়
মত্ত আকুল রােলে।
থাকব না ভাই থাকব না কেউ,
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে চল্‌ রে ছুটে
কালের পিছু পিছু।
কোন জিনিষ চিব যে রে,
প্রথম থেকে শেষ,

ক্ষণিক।
নেব যে সব বুঝে পড়ে-
নাই সে সময় লেশ।
জগতটা যে জীর্ণ মায়া
সেটা জানার আগে
সকল স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে
জীবন-রাত্রি ভাগে।
ছুটি আছে শুধু দু’দিন
ভালবাসার মত,
কাজের জন্যে জীবন হলে
দীর্ঘজীবন হত।
থাকব না ভাই থাকব না কেউ,
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে চল্‌ রে ছুটে
কালের পিছু পিছু।
আজ তােমাদের যেমন জাচি
তেনি জাতে জাতে,
ফুরায় যেন সকল জানা
যাই জীবনের প্রান্তে।
এই যে নেশা লাগল চোখে
এইটুকু যেই ছােটে,
অনি যেন সময় আমার
বাকি ন রয় মােটে।

ক্ষণিকা
১৪১
জ্ঞানের চক্ষু স্বর্গে গিয়ে
মায় যদি যা খুলি,
মর্তে যেন না ভেঙে যায়
মিথ্যে মাগুলি।
থাকব না ভাই থাকব না কেউ,
থাকবেন ভাই কিছু।
সেই আনন্দে চরে ধেয়ে
কালের পিছু পিছু।
বিলম্বিত
অনেক হল দেরী,
আজো তবু দীর্ঘ পথের
অন্ত নাহি হেরি।
তখন ছিল দখিন হাওয়া
আধ-ঘুমো আধ-জাগা,
তখন ছিল শর্ষে ক্ষেতে
ফুলের আগুন লাগা;
তখন আমি মালা গেঁথে
পদ্মপাতায় ঢেকে
পথে বাহির হয়েছিলেম
রুদ্ধ কুটীর থেকে।

১৪২
ক্ষণিকা
অনেক হ’ল দেরী,
আজো তবু দীর্ঘ পথের
অন্ত নাহি হেরি।
বসন্তের সে মালা
আজ কি তেমন গন্ধ দেবে
নবীন সুধা-ঢালা ?
আজকে বহে পূবে বাতাস,
মেঘে আকাশ জুড়ে,
ধানের ক্ষেতে ঢেউ উঠেছে
নব-নবান্ধুরে।
হাওয়ায় হাওয়ায় নাইক রে হায়
হাল্কা সে হিল্লোল,
নাই বাগানে হাস্যে গানে
পাগল গণ্ডগােল।
তানেক হল দেরী,
আজো তবু দীর্ঘ পথের
অন্ত নাহি হেরি।
হ’ল কালের ভুল,
পূবে হাওয়ায় ধরে’ দিলেম
দখিন হাওয়ার ফুল।

ক্ষণিক।
১৩
এখন এগ অন্য সুরে
অন্য গানের পালা,
এখন গাঁথ অন্য ফুলে
অন্য ছাদের মালা।
বাজচে মেঘের গুরু গুরু,
বাদল ঝরঝর,
জলবয়ে কদম্বন
কাপচে থর থর।
অনেক হল দেরী,
আজো তবু দীর্ঘ পথের
অন্ত নাহি হেরি।
মেঘমুক্ত
ভাের থেকে আজ বাদল ছুটেছে,
আয় গো আয় !
কঁচা রােদখানি পড়েছে বনের
ভিজে পাতায়।
ঝিকিঝিকি করি কাঁপিতেছে বট,
ওগো ঘাটে আয়, নিয়ে আয় ঘট,
পথের দুধারে শাখে শাখে আজি
পাথীরা গায় ।

১৪৪
ক্ষণিক
ভাের থেকে আজ বাদল ছুটেছে,
আৰু গো আয়!
;
তােমাদের সেই ছায়াঘেরা দিঘি,
না আছে তল
কূলে কূলে তার ছেপে ছেপে আজি
উঠেছে জল।
এ ঘাট হইতে ওঘটে তাহার
কথা-বলাবলি নাহি চলে আর,
একাকার হ’ল তীরে আর নীরে
তাল-তলায়।
আজ ভাের হতে নাই গাে বাদল,
আয় গো আয়!
ঘাটে পইঠায় বসিবি বিরলে
ডুবায়ে গলা ;
হবে পুরাতন প্রাণের কথাটি
নূতন বলা ।
সে কথার সাথে রেখে রেখে মিল
থেকে থেকে ডেকে উঠিবে কোকিল,
কানাকানি করে’ ভেসে যাবে মেঘ
আকাশ-গায়।

ক্ষণিক
১৪৫
আজ ভাের থেকে নাই গাে বাদল,
আয় গাে আয়!
তপন-আতপে আতপ্ত হয়ে
উঠেছে বেলা ;
খঞ্জন দুটি আলস্যভরে
ছেড়েছে খেলা।
কলস পাকড়ি আঁকড়িয়া বুকে
ভরা জলে তােরা ভেসে যাবি সুখে,
তিমির-নিবিড় ঘনঘাের ঘুমে
স্বপন প্রায়।
আজ ভাের থেকে নাই গাে বাদল,
আয় গাে আয় ।
মেঘ ছুটে গেল নাই গাে বাদল,
আয় গো আয়!
আজিকে সকালে শিথিল কোমল
বহিছে বায়।
পতঙ্গ যেন ছবিসম আঁকা
শৈবাল পরে মেলে আছে পাখা,
জলের কিনারে বসে আছে বক
গাছের ছায়।
আজ ভাের থেকে নাই গাে বাদল,
আয় গো আম।
১৮

১৪৬
ক্ষণিক।
চিরায়মানা
যেমন আছ তেনি এস
আর কোরো না সাজ!
বেণী না হয় এলিয়ে রবে,
সিথে না হয় বাকা হবে,
নাই বা হল পত্ৰলেখায়
সকল কারুকাজ।
কঁচল যদি শিথিল থাকে
নাইক তাহে লাজ।
যেমন আছ তেমনি এস,
আর কোরো না সাজ।
এস দ্রুত চরণ দুটি
তৃণের পরে ফেলে।
ভয় কোরাে না, অলক্তরাগ
মােছে যদি মুছিয়া যাক,
নূপুর যদি খুলে পড়ে
না হয় রেখে এলে।
খেদ কোরাে না, মালা হতে
মুক্তা খসে গেলে।
এস দ্রুত চরণ দুটি
তৃণের পরে ফেলে।

ক্ষণিক।
১৪৭
হের গাে ঐ আঁধার হল
আকাশ ঢাকে মেঘে।
ওপার হতে দলে দলে
বকের শ্রেণী উড়ে চলে,
থেকে থেকে শূন্য মাঠে
বাতাস ওঠে জেগে।
ঐরে গ্রামের গােছ
মুখে
ধেনুরা ধায় বেগে।
হের গো ঐ আঁধার হল
আকাশ ঢাকে মেঘে।
প্রদীপখানি নিবে যাবে,
মিথ্যা কেন জ্বালো?
কে দেখতে পায় চোখের কাছে
কাজল আছে কি না কাছে ?
তরল তব সজল দিঠি
মেণের চেয়ে কালো।
অাঁখির পাতা যেমন আছে
এনি থাকা ভালো।
কাজল দিতে প্রদীপখানি
মিথ্যা কেন জ্বালে ?

১৪
ক্ষণিক।
এস হেসে সহজ বেশে
আর কোরো না সাজ !
গাঁথা যদি না হয় মালা,
ক্ষতি তাহে নাই গাে বালা,
ভূষণ যদি না হয় সারা
ভূষণে নাই কাজ।
মেঘে মন পূৰ্ব্ব গগন,
বেলা নাই রে আজ।
এস হেসে সহজ বেশে
নাই বা হ’ল সাজ।
আবির্ভাব
বহুদিন হ’ল কোন্ ফানে
ছিনু আমি তব ভরসায় ;
এলে তুমি ঘন বরষায়।
আজি উত্তাল তুমুল ছন্দে,
আজি নবঘন বিপুল মন্দ্রে
আমার পরাণে যে গান বাজাবে
সে গান তােমার কর সায়।
আজি জলভরা বরষায়।

কণিকা
১৯
দূরে একদিন দেখেছিনু তব
কনকাঞ্চল আবরণ,
।
নব-চম্পক আভরণ
কাছে এলে যবে হেরি অভিনব
ঘাের ঘননীল গুণ্ঠন তব,
চল চপলার চকিত চমকে
করিছে চরণ বিচরণ।
কোথা চম্পক আভরণ!
সেদিন দেখেছি খণে খণে তুমি
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে বনতল,-
মুয়ে নুয়ে যেত ফুলদল।
শুনেছিনু যেন মৃদু রিনিরিনি
ক্ষীণ কটি ঘেরি বাজে কিঙ্কিণী,
পেয়েছিনু যেন ছায়াপথে যেতে
তব নিশ্বাস-পরিমল,
ছুয়ে যেতে যবে বনতল ।
আজি আসিয়াছ ভুবন ভরিয়া,
গগনে ছড়ায়ে এলােচুল ;
চরণে জড়ায়ে বনফুল।
'ঢেকেছে আমারে তোমার ছায়ায়,
সঘন সজল বিশাল মায়ায়,

ক্ষণিকা
আকুল করেছ শ্যাম সমারােহে
হৃদয় সাগর-উপকূল ;
চরণে জড়ায়ে বনফুল।
ফাল্গুনে আমি ফুলবনে বসে
গেঁথেছিনু যত ফুলহার
সে নহে তােমার উপহার।
যেথা চলিয়াছ সেথা পিছে পিছে
স্তবগান তব আপনি ধ্বনিছে,
বাজাতে শেখেনি সে গানের সুর
এ ছােট বীণর ক্ষীণ তার ;
এ নহে তােমার উপহার।
কে জানিত সেই ক্ষণিকা মূরতি
দূরে করি দিবে বরষণ,
মিলাবে চপল দরশন ?
কে জানিত মােরে এত দিবে লাজ
তােমার যোগ্য করি নাই সাজ।
বাসর ঘরের দুয়ারে করালে
পূজার অর্ঘ বিরচন ;
একি রূপে দিলে দরশন !

ক্ষণিক।
ক্ষমা কর তবে ক্ষমা কর মাের
আয়ােজনহীন পরমাদ ;
ক্ষমা কর যত অপরাধ।
এই ক্ষণিকের পাতার কুটীরে
প্রদীপ আলোকে এস ধীরে ধীরে
এই বেতসের বাঁশিতে পড়ক
তব নয়নের পরসাদ ;
ক্ষমা কর যত অপরাধ।
আস নাই তুমি নব ফানে
ছিনু যবে তব ভরসায় ;
এস এস ভরা বরষায়।
এস গাে গগনে আঁচল লুটায়ে,
এস গো সকল স্বপন ছুটায়ে,
এ পরাণ ভরি যে গান বাজাবে
সে গান তোমার কর সায় ;
আজি জলভরা বরযায়।

১৫২
ক্ষণিকা
কল্যাণী
বিরল তােমার ভবনখানি
পুষ্পকানন মাঝে,
হে কল্যাণী নিত্য আছ
আপন গৃহকাজে।
বাইরে তােমার আম্রশাখে
স্নিগ্ধরবে কোকিল ডাকে,
ঘয়ে শিশুর কলধ্বনি
আকুল হভরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তােমার তরে
२
প্রভাত আসে তােমার দ্বারে,
পূজার সাজি ভরি ;
সন্ধ্যা আসে সন্ধ্যারতির
বরণ ডালা ধরি।
সদা তােমার ঘরের মাঝে
নীরব একটি শঙ্খ বাজে,
কাকন দুটির মঙ্গল গীত
উঠে মধুর স্বরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তােমার তরে

ক্ষণিকা
রূপসীয়া তোমার পায়ে
রাখে পূজার থালা,
বিদূষীরা তােমার গলায়
পরায় বরমালা।
ভালে তােমার আছে লেখা
পুণ্যধামের রশ্মিরেখা,
সুধাস্নিগ্ধ হৃদয়খানি
হাসে চোখের পরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তােমার তরে।
তােমার নাহি শীতবস,
জরা কি যেন।
সৰ্ব্বঋতু সর্বকালে
তােমার সিংহাসন।
নিভেনাক প্রদীপ তব,
পুষ্প তোমার নিত্য নব,
অচলা তােমায় ফেরি
চির বিরাজ করে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তােমার তরে

১৫৪
ক্ষণিক।
নদীর মত এসেছিলে
গিরিশিখর হতে,
নদীর মত সাগরপানে
চল অবাধ স্রোতে।
একটি গৃহে পড়চে লেখ।
সেই প্রবাহের গভীর রেখা,
দীপ্ত শিরে পুণ্যশীতল
তীর্থ সলিল ঝরে।
সর্বশেষের গানটি আমার
আছে তােমার তরে।
তােমার শান্তি পান্থজনে
ডাকে গৃহের পানে,
তোমার প্রীতি ছিন্ন জীবন
গেঁথে গেঁথে আনে।
আমার কাব্যকুঞ্জবনে
কত অধীর সমীরণে
কত যে ফুল, কত আকুল
মুকুল খসে পড়ে।
সর্বশেষের শ্রেষ্ঠ যে গান
অাছে তোমার তরে।

ক্ষণিক।
অন্তরতম
আমি যে তােমায় জানি, সেত কেউ
জানেনা।
তুমি মাের পানে চাও, সেত কেউ
মানেনা।
মাের মুখে পেলে তোমার আভাস
কত জনে কত করে পরিহাস,
পাছে সে না পারি সহিতে
নানা ছলে তাই ডাকি যে তোমায়,
কেহ কিছু নারে কহিতে ।
তোমার পথ বে তুমি চিনয়েছ
সে কথা বলিনে কাহারে।
সবাই ঘুমালে জনহীন রাতে
একা আসি তব দুয়ারে।
স্তব্ধ তােমার উদার আলয়,
বীণাটি বাজাতে মনে করি ভয়,
চেয়ে থাকি শুধু নীরবে।
চকিতে তােমার ছায়া দেখি যদি
ফিরে আসি তবে গরবে।

ক্ষণিক
'।
প্রভাত না হতে কখন আবার
গৃহকোণমাঝে আসিয়া,
বাতায়নে বসে বিহ্বল বীণা
বিজনে বাজাই হাসিয়া।
পথ দিয়ে যেবা আসে যেবা যায়
সহসা থমকি চমকিয়া চায়,
মনে করে তারে ডেকেছি।
জানেনা ত কেহ কত নাম দিয়ে
এক নামখানি ঢেকেছি।
ভোরের গোলাপ সে গানে সহসা
সাড়া দেয় ফুলকাননে,
ভােরের তারাটি সে গানে জাগিয়া
চেয়ে দেখে মাের আননে।
সব সংসার কাছে আসে ঘিরে,
প্রিয়জন সুখে ভাসে আঁখিনীরে,
হাসি জেগে ওঠে ভবনে।
যে নামে যে ছলে বীণাটি বাজাই
সাড়া পাই সারা ভুবনে।
নিশীথে, নিশীথে বিপুল প্রাসাদে
তোমার মহলে মহলে,
হাজার হাজার সােনার প্রদীপ
জ্বলে অচপল অনলে।

ক্ষণিক।
মাের দীপ জ্বেলে তাহারি আলােক
পথ দিয়ে আসি হাসে কত লােক,
দূরে যেতে হয় পালায়ে,
তাই ত সে শিখা ভবনশিখরে
পারিনে রাখিতে জ্বালায়ে।
-
বলিনে ত কারে, সকালে বিকালে
তোমার পথের মাঝেতে,
বাঁশি বুকে লয়ে বিনা কাজে আসি
বেড়াই ছদ্ম-সাজেতে।
যাহা মুখে আসে গাই সেই গান,
নানা রাগিনীতে দিয়ে নানা তান,
এক গান রাখি গােপনে।
নানা মুখপানে আঁখি মেলি চাই,
তােমা পানে চাই স্বপনে।
সমাপ্তি
পথে যতদিন ছিনু, ততদিন
অনেকের সনে দেখা।
সব শেষ হল যেখানে সেথায়
তুমি আর আমি একা।

১৫৮
'ক্ষণিকা
নানা বসন্তে নানা বরষায়
অনেক দিবসে অনেক নিশায়
দেখেছি অনেক,সহেছি অনেক
নিখেছি অনেক লেখা ;
পথে যতদিন ছিনু, ততদিন
অনেকের সনে দেখা।
কথম্ যে পথ আপনি ফুরাল,
সন্ধ্যা হ’ল যে কবে,
পিছনে চাহিয়া দেখিনু, কখ
চলিয়া গিয়াছে সবে।
তােমার নীরব নিভৃত ভবনে
জানিনা কখন্ পশিমু কেমনে।
অবাক রহিনু আপন প্রাণের
নূতন গানের রবে।
কখন্ যে পথ আপনি ফুল,
সন্ধ্যা হ’ল যে কবে।
চিহ্ন কি আছে শ্রান্ত নয়নে
অশ্রুজলের রেখা ?
বিপুল পথের বিবিধ কাহিনী
আছে কি ললাটে লেখা ?

ক্ষণিক।
১৫৯
রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন,
বিছান রয়েছে শীতল শয়ন,
তােমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলােকে
তুমি আর আমি একা।
নয়নে আমার অশ্রুজলের
চিহ্ন কি যায় দেখা ?

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Khanika

Author
Thakur,rabindranath
Title
Khanika
File name
Khanika
Text
OCR done
Citation
1903
Published
2010/04/24
Publisher
Indian Publishing House,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
174
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Kabir Boyes
DLI number
510347
Barcode
4990010016273.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
gnSovRA6tEX
Download PDF

Khanika