Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Gulbehesta Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
গুবেহেস্ত, নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী।
No text on this page.
গুলবেহেস্ত
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী প্রণীত
প্রথম সংস্করণ
১৩৩৬ সন
মুল্য ১ আনা
andidapar প্রকাশক- শ্ৰীনিকুঞ্জবিহারী দাশগুপ্ত পার্শনে এসিষ্টেন্ট, ইষ্ট এণ্ড হাউস, উয়ারী, ঢাকা। riparnarannan 0 D, Jagannanand ভাকা- ০ নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে, ব; শ্রীরাধাবল্লভ বসাকদ্বারা মুদ্রিত। . apedaggaganna
ভােরের অলিল চোখে লাগতে,
যার কথাটি জাগে মনে!
বিজন রাতে ঘুমের ঘােরে,
দেখা দেয় যে স্বপনে।
আমার ব্যথার ব্যথী, সুখের সাথী,
বিরহ যার চিরস্মৃতি!
যার আড়াল থেকে ভালবাসা সদাই জাগে প্রাণে,
“শুবেহেস্ত দিলেম সেই প্রিয়তম জনে!
No text on this page.
( প্রস্তাবনা)
আজি রক্ত আঙ্গুরের রক্ত মদিরা
এনেছি পিয়ালা ভরিয়া ।
পান কর বধু, তড়িৎ প্রবাহ
উঠুক ধমনী ভরিয়া ।
মৰ্ম্ম বেদনায় প্রেম অশ্রুধারা
বহুক নয়ন ভরিয়া,
রাখুক স্মৃতি প্রেম অমর
হৃদয়ে তােমার গাঁথিয়া !
No text on this page.
পাত্র পাত্রীগণ পুরুষ মিঠাইওয়ালা। ০ ০ ০ হাসান খলিফা হারুণ উলরসিদ ০ ০ ০ ইসাক ০ ০ ০ খলিফার গায়ক কবি। ঐ উজীর। ঐ জল্লাদ। ভিক্ষুকগণের রাজা। হাসানের বন্ধু। এpp | ০ ০ ss = মশরুর রফি সেলিম প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ প্রধান শান্তিরক্ষক আলি ০ ০ ০ ••• বোদ অধিবাসী, . ০ ০ ০ A অদার । উইলো। ০০০ •• দাস। জুপার ৪. ৮০০ ০ ০ ০ টস্ক আসমানীর দ্বাররক্ষক চীন দার্শনিক একজন দরবেশ প্রস্রবণের প্রেতাত্মা... ঘােষণাকারী কারাগারের প্রহরীগণ ০০০ ৫ । ही পরিবানু আসমানী ৩ ও
No text on this page.
গুলবেহেস্ত,
প্রথম অক
প্রথম দৃশ্য
(পুরাতন বােন্দাদের একটি দোকানের পিছনের একটি কক্ষ, এক
কোণে একটি বৃহৎ কটাহে চিনি জ্বাল হইতেছে, কারণ এটি মিঠাই
দোকান। কক্ষটিতে আসবাবপত্র অতি সামান্যই আছে—তবে এমন
স্থানে যা আশা করা যায় না—তেমন একটি উৎকৃষ্ট পুরাতন গালিচা
সেখানে আছে, আর আছে দেয়ালে টাঙ্গানাে নানারকম ছাপ করা পারস্য
বস্ত্র খণ্ড। একটি কাঠের বেড়ায় দোকানকে এই ঘর হইতে পৃথক
করিয়া রাখা হইয়াছে। গালিচার উপর মুখােমুখি করিয়া বসিয়া আছে
হাসান ও সেলিম। হাসানের বয়স প্রায় পয়তাল্লিশ, সে স্থূলকায়, তার
মস্ত গোঁফ, পাগড়ী আর জীর্ণ ময়লা পােক, তার বন্ধু সেলিম যুবক,
একটু অতিরিক্ত জাঁকজমকের ভাব তার পােষাকে পরিস্ফুট)
হাসান। ( দুলিতে দুলিতে) এ আল্লা! এ আল্লা!
সেলিম। হে পুনরুক্তির পিতা, এই সাইত্রিশ বার হলো
তােমার এই উক্তিটী ।
২
গুলবেহেস্ত,
হাসান। ( আরাে দুঃখপূর্ণ ভাবে) এ আল্লা! এ আল্লা!
সেলিম। তােমার কি অসুখ টসুখ হয়েছে ?
হাসান। (দীর্ষ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) এ আল্লা!
সেলিম। সরস মিঠাই বিক্রেতার অমন বিরস মুখ কেন ?
ব্যাপারখানা কি, একবার শুনিই না ?
হাসান। জানাে, সেলিম, আমি যে প্রেমে পড়েছি।
সেলিম। প্রেমে! তাহলে গালিচায় বসে বিলাপ কচ্ছ কেন ?
পণ্যশালায় গেলে আর নগদ কিছু ঠুকে দিলে
প্রেমিকের আর অভাব কি ?
হাসান। (রাগিয়া) চুপ কর, সেলিম,নইলে এখান থেকে চলে
যাও। আমি ঠাট্টা করিনি তােমার সঙ্গে ; তােমার
এই সব ইতর কথা আমার ভালাে লাগছে না। দুই
কেন আমি মিঠাই বিক্রেতা হাসান, তবু মজনুর
মত আন্তরিক ভালােবাসা আমার পক্ষে অসম্ভব নয় ;
আর বাস্তবিক যাকে আমি ভালােবেসেছি সে লয়লার
চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আল্লা! আল্লা!
সেলিম। ( বিদ্রুপের সুরে) বটে! এমন পবিত্র প্রেমটা টের না
পেয়ে, বিশেষকে সাধারণ বলে ভুল করলুম !
কিন্তু মজনুর কথা উল্লেখ না করাই ভালাে। মজনু
ছিল রাজপুত্র, তুমি হচ্ছ মিঠাইবিক্রেতা, সে ছিল
যুবক, তুমি প্রায় বৃদ্ধ, সে ছিল সুন্দর, তুমি তা নও,
তার অন্তরের দাহে শুকিয়ে শুকিয়ে সে হয়ে
গুলবেহেস্ত,
গিয়েছিল কৃশ,আর তুমি ভীষণ মােটা—নাম বলব না,
ঐ যে চা’র-পেয়েটা, তার চাইতেও। এই বয়সে
তােমার প্রেমে পড়ার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে,
তােমার মাথা বিগড়ে গেছে।
হাসান। হতে পারে। এ আল্লারই দান।
সেলিম। অন্ততঃ বল, কে সে? যত দুর্লভ বলে কল্পনা কচ্ছ,
তত দুর্লভ নাও হতে পারে সে, অবিশ্যি যদি স্বয়ং
খলিফার কন্যা এবং জিনদের রাণীর উপরে তােমার
নজর না পড়ে থাকে।
হাসান। শােন, সেলিম, বলছি আমার কথা। তিন দিন আগে
একটি রমণী আমার দোকানে মিঠাই কিনতে এসে
ছিল, পােট্রা সহ তার বাড়ী পর্যন্ত আমাকে যেতে
সে অনুরােধ করেছিল। সেলিম, সেলিম, ঘােষ্টার
তলে তার চোখ দুটী দেখেছিলুম আমি, খলিফার
বাগানের যুগল নিঝরের মত সে দুটিকে মনে হয়ে-
ছিল আমার, আর তার ঠোট দুটী ঠিক যেন গােলাপ
রঙের রসে ভরা দুটী আঙ্গুর ! কিন্তু হায়! আমার
দিকে সে ফিরেও চাইলে না। কাফেরের কাছে
যেমন স্বর্গের দ্বার বন্ধ হয়ে যায়, তেমনি আমার
মুখের উপর সে তার বাড়ীর দরজা বন্ধ করে দিয়ে
চলে গেল।
এ আল্লা! এ আল্লা! ( আবার বিলাপ
শুরু করিল)
গুবেহেস্ত,
(গান)
খােদা, কোন্ মাটিছে বানায়া ঔরৎ,
দিল হয়নি বিলকুল উমে,
স্রেফ, খুবসুরৎ!
এ বেদরূদী এ বেইমান,
তব ভি উওয়াস্তে জান হায়ণ !
কিস্তারে বাঁচে খােদা
ই তাে বড়ি আফৎ!
সেলিম। মিঠাই শুধু কিনেই নিয়ে গেল, নিজে কিছু
বেঁচলােনা সে? সেই রমণীটির বাড়ী কোথায় দেখে
এলে ?
হাসান । “দিলকুসা” সড়কে, দুই ময়ূরের নিঝরিণীর নিকটে।
সেলিম। হাসান, সাহস ধর বুকে, তোমার ভালােবাসা রােগের
ওষুধ আমি দিতে পারি হয়ত।
হাসান। আমার ভালােবাসা আরাম কৰ্ত্তে হবে না; সেলিম,
সেই স্ত্রীলােকটির উদাসীনতা আরাম কর ।
সেলিম। ( হঠাৎ ) হাঁ, হাঁ, আর এক উপায় আছে।
হাসান। কি উপায় ?
সেলিম। তুমি যাদুমন্ত্রে বিশ্বাস কর, হাসান ?
হাসান। সে কথা পরে হবে ; কিন্তু ভালো যাদু জানা লােক
কই ?
সেলিম। এলেপ্পো থেকে ইহুদী জ্যাকেরিয়া এখানে এসেছে ;
গুলবেহেস্ত,
হাটে বাজারে তার কথাইতাে শােনা যায় । সব সত্যি
হলে, সে নিশ্চয়ই ভারি আশ্চর্য্য লােক।
হাসান। কি কথা শােনা যায় ?
সেলিম। শুনেছি, বােখারায় একটি লোেক তাকে গাল দিয়েছিল
আর তার মাথায় একটা পাথর ছুড়ে মেরেছিল, এই
ইহুদী সেই পাথরকে এবং মানুষকে শূন্যে ঝুলিয়ে
রেখেছিল, সেই অবস্থায় সে সমস্ত পথিকের মাথার
উপর দিয়া বােখারা সহরে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে
বেড়াত, আর নিজের ঘরের চাল কঁক করে তাকে
ভিতরে আসতে হতাে।
হাসান। তাই নাকি।
সেলিম। আরাে বেশী আশ্চর্যের কথা—কাইরােতে সুলতানকে
আমােদ দিবার জন্যে পুরাে এক ঘণ্টা কালের জন্যে
সেখানকার সমস্ত লােকজনকে বাঁদর বানিয়ে
রেখেছিল।
হাসান। এসব আমি বিশ্বাস করি না। তবে ভালােবাসার
আড়ক দিবার মত বিদ্যা তাতে থাকতেও পারে।
সেলিম। কোনাে সন্দেহ নেই, মেয়ে মানুষকে ভালােবাসায়
এমন আড়ক রয়েছে তাদের মন যতই কঠিন
হােনা কেন। জানি, এক বােতল যাদুর আড়কের
জন্যে জ্যাকেরিয়া দশ দিনার নিয়ে থাকে ; তার
দোকানে ধনী বুড়ীদের ভিড় কত !
৬
গুবেহেস্ত,
হাসান। এ আল্লা! সেলিম, বল কি ? দশ দিনার খরচ
করার মত মূল্য কোন মেয়েলােকের আছে বলে
তো আমার মনেই হয় না।
সেলিম। কি বলছ ? এই বুঝি তােমার মজনুর প্রেম!
প্রেম-পীড়িত লােকের দশ দিনার তাে অতি তুচ্ছ !
তার তিনগুণ দিয়েছাে তুমি এই গালিচা কিনেছ।
হাসান। গালিচা গালিচাই আর স্ত্রীলােক স্ত্রীলােকই। একটা
হ’লাে বেহেস্ত, আর একটা হলাে জাহান্নাম্।
( দোকানের দরজায় প্রবল ধাক্কা শুনে হাসান দ্রুত সেখানে গেল—সে
চলিয়া যাইতেই দুই ঘরের মধ্যবর্তী বেড়ার ছোট্ট জানালা দিয়া
আসমানী ঘােষ্টা খুলিয়া কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল)
সেলিম। কি চমৎকার নির্লজ্জা সুন্দরীটি! (হাসিতে দুলিয়া)
তার ঠিকানা তাে আমি জেনে নিলুম। পয়সা দিয়ে
যাদুর আড়ক প্রেমিক পাগলেরাই কিনে থাকে।
নির্বোধ হাসান !
( ফ্যাকাশে মুখ লইয়া টলিতে টলিতে হাসানের প্রবেশ)
হাসান। সেলিম, তুমি আমার বন্ধু, এই দশ দিনার নিয়ে
সেই আড়ক নিয়ে দ্রুত ফিরে এস।
সেলিম। ( বিরক্তির ভাণ করিয়া) আল্লা! আমি কি তােমার
দূত ? নিজেই যাও ইহুদীর কাছে।
হাসান। আমাকে এখনি মিঠাইগুলি তৈরী কৰ্তে হবে, নইলে
গুলুবেহেস্ত,
৭
সন্ধ্যার আগে তাকে পাঠাননা যাবে না। নাও, ভাই,
দিনার নিয়ে আড়ক কিনে আন, বন্ধুর কাজ কর।
সেলিম। (উঠিয়া দিনার লইয়া) আড়কে কোনাে কাজ না
হলে আমাকে কিন্তু জবাবদিহি ক’বাে না। আমি
যা শুনেছি, শুধু তাই বলেছি।
হাসান। না, আমি তােমাকে দোষ দেবনা। কিন্তু তুমি তাড়া-
তাড়ি যাও। (সেলিম নিষ্ক্রান্ত-হাসান আগুন চড়াইয়া
দিয়া কড়াই ঠিক করিতে লাগিল )—এই ছেড়া তােরােজ
এসে আমার গালিচা মাড়ায়, কিন্তু আড়ক ভালাে
হলে তাকে সে জন্যে ক্ষমা করা চলে, তা সে আমাকে
বিপই করুক আর যাই করুক। কি অদৃষ্ট
আমার ! সামান্য মিঠাই বিক্রেতা হয়ে জন্মেছি,
আত্মীয় স্বজন বন্দুতেও কেউ নেই। হতুম ধনী
তাহলে আত্মার আনন্দ বিধান করা যেতে কত
রকমে ! কাব্য, সঙ্গীত, চিত্র এবং উপযুক্ত সঙ্গীগণ
নিয়ে দিবারাত্রি কি মসগুল হয়েই থাকা যেত।
যাক, এখন তার জন্যে মিঠাই তৈরী কৰ্ত্তে হবে-
এমন মিঠাই তৈরী করব যা জীবনে আমি কখন
তৈরী করিনি-স্বচ্ছ স্ফটিকের মত মিঠাই, রঙ্গিন
গােলাপের মত মিঠাই, চুনি পান্নার মত মিঠাই।
গােলাপ মিঠাই গুলােতে সত্যিকার গােলাপের গন্ধই
মাখিয়ে দেব, সে যেন চাখ বার আগে শুকে বলে-
গুলুবেহেস্ত,
“কি সুন্দর গােলাপটি !” আর প্রত্যেকটি ফুলের
মৰ্ম্মকোষে সেই ভালবাসার যাদুর একটি করে
ফোটা দিয়ে দেব।
( গান )
আজ যাদু হাম ডার দেউঙ্গি
মিঠাই কি সাথ!
দেউঙ্গি থােধ আতর গােলাপ
ক্যা বাৎ কা বাৎ!
হালুয়া লাড্ড, ওদা খানা,
আউর আউর সব মিঠাই যেন,
চুন্ চুনকে বানা দেঙ্গে ক্যা ফুৰ্ত্তি মেরি,
খাে হােগি জানি মেরা মিল্ যায়গা প্যারী।
দ্বিতীয় দৃশ্য। চাদিনী রাত্রি। “যুগল ময়ূরের” নিঝরিণীর পাশের “আনন্দ সড়ক”। রাস্তায় উভয় পাশে বারান্দাওয়ালা বাড়ী। একটি বাড়ীর সম্মুখে ছদ্মবেশী হাসান এবং দ্বাররক্ষক। হাসান। ওঁর হাতে কি পেটারার্টি পৌছেছে ? দ্বাররক্ষক। হাঁ,আমি নিজ হাতেই দিয়েছি। হাসান। তােমার কী কি বলেছেন? দ্বার। মশায়, শূন্যি ট্যাকে এত কথার উত্তর দেওয়া কি আর চলে ? হাসান। (একটি দিনার দিয়া) নাও, এই তাে ভরে দিলুম। সেই মুখ কি মধু ছড়ালাে ? বল, বল। তিনি বল্লেন-“জাহান্নামে যা সেই মােটা মিঠাইওয়ালাটা আর তার চোখের কুৎসিৎ চাওনি ! তার মুখের চাইতে তার মিঠাই দেখতে অনেক ভালো হাসান। (স্বগত) মিঠাই যদি ভালাে লেগে থাকে, সেও ভালল। (উচ্চে ) তুমি কি উত্তর দিলে? দ্বার। আমি বল্লম—“খলিফার মুকুটের চুণি পান্নার মত উজ্জ্বল এবং সুন্দর তার মিঠাইগুলাে, এবং তাদেরই মত সাচ্চা এবং পবিত্র তার মনের ভাব।” কী বল্লেম-
গুবেহেস্ত,
“তার মনের ভাব পবিত্র হতে পারে, কিন্তু তার দেহ
এবং পােষাক ময়লা।”
হাসান। তিনি কি মিঠাইগুলাে খেয়েছেন?
দ্বার। জানি না। কিন্তু কিছু পরেই আমি পেটারাটা সরিয়ে
রেখেছিলুম-তখন দেখেছি সেটি শূন্য।
হাসান। ইয়া আল্লা! তুমি জাননা। সেলাম ভাই।
দ-র। সেলাম।
হাসান। কিন্তু তােমার কত্রীর নামটি কি বলতে ?
দ্বার। তাঁর নাম হচ্ছে—আসমানী।
হাসান। এমন চঁাদিনী রাত্রির পক্ষে উপযুক্ত নামই হয়েছে।
সেলাম আলেকুম ।
দ্বার। আলেকুম সেলাম। (দ্বাররক্ষক ফিরিয়া দরজা বন্ধ করিয়া
দিল )
হাসান। ( আত্মগত) হােক না ইহুদীরা পুরােণণা জাতি,
জানুক না তারা নানারকম গুপ্ত বিদ্যা ! একি
সম্ভব ? রঙ্গিন জল খাইয়ে কি কারাে হৃদয় অধিকার
করা সম্ভব ? কে জানে ? এমন রাত্রিতে মনে হয়
সবই সম্ভব! আহা হা! কি সুন্দর জ্যোৎস্না,
ফুরফুরে হাওয়া বইছে। পাথরের বুকের মধ্যেও
যেন নিঝরের কাণাকাণির গােপন ইঙ্গিতটি গিয়ে
পৌছাচ্ছে। আঃ, আসমানী! আসমানী! আমার
মনের কথা কি তােমার হৃদয়ের দরজায় একটু ঘা
১১
গুলুবেহেস্ত,
দেবে না? (একটি একটি পদ করিয়া গাহিয়া বাঁশীতে
তাহা বাজাইতে লাগিল )
(গান)
যুগ যুগ ধরি বারির বিহনে
তৃষিত পরাণি মাের,
ধূসর বালুকা উষর এ মরু,
শ্বসিছে হুতাশ ঘাের ;
বাচাও করুণা কণা দানি
আমানী!
এ হিয়া আগারে আলােক লাগেনি
যুগান্তের তম ঢাকা,
আঁধার মগন, হিয়াটি লইয়া
কার প্রতীক্ষায় থাকা?
বাঁচাও আলােক কৃপা দানি,
আমানী !
( হাসান থামিতেই উপরের একটি জানালা খুলিয়া গেল
এবং ঘােষ্টাপরা আসমানী বাহিরের দিকে চাহিয়া
গান গাহিল )
( আম্বানীর গান
ওগগা কে তুমি অতিথি হৃদয় পুরে
মম প্রেম পাগল পান্থ !
আমায় পাইলে মিটিবে পিয়াসা ?
হৃদয় হইবে শান্ত ?
১২
গুলবেহেস্ত,
এস পতঙ্গ রূপানলে ছুটি,
পােড়াও নিজেকে মত্ত ।
এস বয়ে যায় অচির যৌবন
পিপাসু অধীর ভ্রান্ত !
আসমানী। হে গায়ক কবি, আমার নামও আসমানী বটে,
কিন্তু আমার চেয়ে বেশী সুন্দরী কোনাে আসমানীর
জন্যেই বােধ হয় তুমি এই কথার মুক্তগুলাে গেঁথে
তুলেছ ?
হাসান! আমার প্রাণে এক আসমানী ছাড়া দুনিয়াতে আর
দ্বিতীয় কোনাে আসমানী নেই।
আসমানী। এ কি মিঠাইওয়ালা হাসান ?
হাসান। হাঁ, আমি মিঠাইওয়ালা, আমি হাসান।
আসমানী। হাঁ, হাসান, তােমার কথাগুলাে তােমার মিঠাইর
চেয়ে মিষ্টি।
হাসান। মেঘের আড়ালে পরীদের যেমন দেখায়, ঘােষ্টার
আড়ালে তােমার চোখ দুটিও তেমন জ্বলছে।
সুন্দরীশ্রেষ্ঠা, তােমার ঐ মুখটি দেখবার অনুমতি
পাব কি ?
আমানী। ( দুষ্টামি করিয়া) ইসলামের কন্যাগণ অপরিচিতের
সামনে কবে থেকে ঘােষ্টা খুলতে সুরু করেছে ?
হাসান। প্রাণে প্রাণেই যদি দেখা হয়ে থাকে তবে মুখে মুখে
দেখা হ’তে আর বাধা কি ?
গুলবেহেস্ত,
১৩
আসমানী। (চোখ দুটি মাত্ৰ খুলিয়া) এই নাও, খুসি হলে ?
হাসান। কি করে খুসি হব, সবটুকু দেখলে !
আসমানী। বটে ?
হাসান। ঘােটা খুলে ফেল, আসমানী।
আসমানী। তাই খুলছি, তােমার মুখটি তাে নইলে বন্ধ
হবে না। ( খুলিয়া ) হলো তাে? খুসি হলে তাে,
বাদশা ?
হাসান। (উচ্ছাসের সহিত) ওঃ, তুমি কত সুন্দর!
আসমানী। কবিবর, এইটুকুমাত্র বার আছে তােমার !
কোনাে গানের সুর নয়, কোনাে কবিতার পদ নয়,
স্বর্গের দুয়ার খুলে গেল, অথবা আকাশে দুটী চাঁদের
আবির্ভাব হ’লাে এরূপ কোনো ইঙ্গিত নয়—শুধু
“তুমি সুন্দর”।
হাসান। হাঁ, সুন্দর! তুমি অতি সুন্দর! বেহেস্তকা
পৈরী !
(গান)
আমি হৃদয়ের ভাষা পাইনা খুজিয়ে,
আকুলি বিকুলি বুঝাব কি দিয়ে !
ভ'রে উঠে প্রাণ কম্পিত অধর।
আমি শুধু বলে উঠি--তুমি সুন্দর!
ওগাে তুমি মাের অতি সুন্দর! অতি সুন্দর!
১৪ গুবেহেস্ত, আমানী। বেশ মিষ্টি করে বলেছ, মিঠাইওয়ালা! এখন আসি তবে। হাসান। ওগগা, দাঁড়াও, আসমানী ! তােমার সৌন্দর্য্যের মুক্ততায় আমার সাহস বেড়ে যাচ্ছে। আমি কিছুই , আর তুমি হলে রাত্রির অগণিত তারার রাণী। কিন্তু তােমাকে ভালােবাসার আগুন জ্বলছে আমার মনে, আসমানী ! প্রমাণ লও, রাণী, তােমার ঐ উজ্জ্বল চোখের জন্যে আমি সব কর্তে পারি। আমি লবণ মরু পার হয়ে, জীবন সলিলের পেয়ালা রক্ষক জিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসূতে পারি, আমি পৃথিবীর সীমানায় গিয়ে হীরকের কুলায় থেকে হীরামণতােতার ডিম নিয়ে আসতে পারি। আমি সাঁতরিয়ে পার হয়ে যেতে পারি সপ্ত মহাসমুদ্র, ডিঙ্গিয়ে যেতে পারি পঞ্চ মহাদ্বীপ, মৃত্যুর নীরব মহিমার মধ্যে অজেয় অটুট হয়ে শায়িত দায়ুয়ের হাতের আংটী নিয়ে আসবার জন্যে। সেই আংটী এনে আমি তােমার আঙ্গুলে পরিয়ে দিতে পারি, করে তুলতে পারি তােমাকে বায়ু রাজ্যের অন্তরীক্ষ- চারীদের রাণী—কিন্তু তুমি কি আমাকে ভালাে- বাবে ? পাবে তুমি আমাকে ভালােবাসূতে -বাসবে কি আমাকে ভালাে, আসমানী ? আসমানী। কি বল ?
গুলবেহেস্ত,
হাসান। (আবেগভরে) ওঃ, উত্তর দাও।
আসমানী। আমাকে কে যেন যাদু করেছে; হাসান, কথা
বতে পাছি না। আজ অপরাহ্ন পৰ্যন্ত তােমার
চেহারার কথা মনে হলেই আমার মন বিরাগে ভ'রে
কিন্তু তােমার উপহৃত মিঠাইগুলাে
খাওয়া অবধিবাস্তবিক, কি সুন্দর মিঠাইগুলােই
হয়েছিল, সেই অবধি তােমার প্রতি আমার মনের
ভাব বদলে গেছে ; যাদু ছাড়া আর কিছুতে এমন
হতে পারে মনে হয় না।
উঠতাে।
(গান)
আমার এই কাঁচা বয়সে মুচকে হেসে,
কে গাে যাদু কলে মােরে !
যাদুতে তার মধু ভরা,
প্রাণ দিয়েছে উদাস করে !
যাদুর কিরে এত গুণ,
ভালােবাসা বাড়ায় দ্বিগুণ।
দেখতে নারি যারে আমি,
তারি তরে মন পােড়ে!
হাসান। (স্বগত) যাদুর জয় হােসে আমারি হয়েছে।
( উচ্চে ) আসমানী, তাহলে তােমাকে পাব আমি,
ও আসমানী !
গুবেহেস্ত, আসমানী। আমি কি বৃষ্টির অপেক্ষায় মরুর মতই হয়ে আছি ? কামনা পরিতৃপ্তির জন্যেই কি আমার সৃষ্টি হয় নাই, হাসান ? আমার বক্ষোদেশ কি চুম্বনের আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে নেই ? এই বাহুযুগ কি প্রেমের বাঁধন বাঁধতেই এমন মসৃণ ও দৃঢ় হয়ে তৈরী হয় নাই ? হাসান। তােমার ঠোট দুটি কি রসে ভরা গােলাবি আঙ্গুর নয় ? তােমার গাল দুটি প্রেমের মিষ্টি আপেল , এবং তােমার চোখ দুটি কি প্রেমের নীলােৎপল নয় ? আসমানী। হাঁ, আর এই কেশ কি প্রেমের পাশ নয় ? এই অমল ধবল সমুন্নত হৃদয় কি প্রেমিকের পক্ষে অবসাদহীন চির কারাগার নয় ? (গান) হৃদয় মালঞ্চে যৌবন কুসুম- পুলকে উঠিছে ফুটিয়া, এস এস বঁধু তপ্ত চুম্বনে দাও তার মুখ রাঙ্গিয়া ! ফেল আনি তার তৃষিত অধরে সুশীতল প্রেমবারি, শুভ্র কোমল স্ফটিক উরসে রাখ তব মুখ আনত করি। * •
গুলুবেহেস্ত,
১৭
কণ্ঠলগ্ন তব প্রেম বাহু তার
সােহাগ পাশে বাঁধিয়া
রাখিবে বঁধু পান কর মধু
নিশি দিন সুখে মাতিয়া
!
হাসান। আমি ঐ রূপের সাগরে ডুবে যাচ্ছি, আসমানী!
দরজা খােল, দরজা খােল, আসমানী, ঢুকতে দাও।
আসমানী। হায় ! তা যদি পারতুম !
হাসান। কেন নয় ?
আসমানী। হায়! যদি সেই সাহস পেতুম !
হাসান। কিসের ভয় তােমার ? এখন গভীর রাত্রি, রাস্তায়
কেউ নেই।
আসমানী। কিন্তু প্রাণের হাসান, আমি যে একা নই।
হাসান। (কাণাকাণির সুরে) একা নও? কৈ ওখানে?
তােমার মা ?
আসমানী। না, যাকে তুমি এখানে পাঠিয়েছিলে, সে ।
হাসান। আমি তাে কাউকে পাঠাই নি।
আসমানী। তােমারি একজন বন্ধু।
হাসান। পুরুষ ?
সেলিম। (জানালা দিয়া মাথা বাহির করিয়া হাসান, সেলাম
আলেকুম। এই কুসুমাস্তীর্ণ কুঞ্জের পথ দেখিয়ে
দিয়েছ বলে তােমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।
হাসান। (বিস্মিত) সেলিম।
১৮
গুলবেহেস্ত,
সেলিম। তােমারি অনুগত ভৃত্য।
হাসান। (ভীষণ ভাবে) সেলিম।
সেলিম। তােমাকে উপদেশ দিচ্ছি, হাসান, হীরামণ তােতার
ডিমের সন্ধানেই বেড়িয়ে পড়।
হাসান। সেলিম, এখানে তুমি কি কচ্ছ?
সেলিম। প্রেম! প্রেম!
হাসান। প্রেম! কি প্রেমের কথা বলছ তুমি ?
সেলিম। এই প্রেমের কথা ! (আমানীর কাঁধে হাত রাখিল )
হাসান। আল্লা তােকে বিনাশ করুন, তার শাস্তি তাের মাথায়
এসে বজের মত পড়ুক।
সেলিম। আমার অপরাধটা কি, চাচা তােমার কাছে কি
দোষ কলুম যে অভিশাপ দিচ্ছ ?
হাসান। কুকুর, ছু না ওকে, ছু না।
সেলিম। আসমানীকে ছোয়াটা কি পাপ নাকি, চাচা ?
আমার কি দোষ ? আল্ল। ওর গ্রীবাটি শ্বেত পাথরের
স্তম্ভের মত কেন গড়ে তুললেন ? (গ্রীবা জড়াইয়া
ধরিল)
হাসান। হারামজাদা! পাজি !
আসমানী। আমার বাহুযুগল কি ইস্পাতের তলােয়ারের
মতন দৃঢ় এবং শীতল এবং তারি মত রক্তপিপাসু
নয় ? (বাহুযুগ দিয়া সেলিমের গলা জড়াইয়া ধরিল )
হাসান। ওঃ! এও দেখতে হলাে।
১৯
গুলবেহেস্ত,
সেলিম। ওর চোখ দুটি কি দুটি নীলকান্ত মণির মতন জ্বলছে
না ?
হাসান। হায় কপাল! হায় কপাল!
আসমানী। আমার ঠোট দুটি কি রক্তে ছােবানাে দুটি লাল
পাথর নয় ? (সেলিমকে চুম্বন করিল)
হাসান। আল্লা, আমি যে আর দাড়াতে পারছি না।
আমানী। আর, চাচা, আমার একক জীবনের এককতা দূর
করূবার জন্যে এই যে তােমার দৃঢ়কায় ঋজুদেহ
বন্ধুটিকে পাঠিয়েছ, তার জন্যে আমি কি বলে
তােমাকে ধন্যবাদ জানাবাে বুঝতে পারছি না।
আঃ! যুবতীর একা একা কালযাপন কি দারুণ কষ্ট।
হাসান। (মাথায় হাত দিয়া ) ঝরণা, ঝরণা ! ওঃ আমার মাথা,
আমার মাথা-হাত দিয়া মাথার চুল টানিতে লাগিল)
আসমানী। আরে চাচা, এত জোরে টেনে না, হাতের মধ্যে
মাথার সব চুল উপড়ে আসূবে।
হাসান। সয়তানের সন্তানগণ, একবার যদি একটা ছুরি দিয়ে
ততাদের গলা নাগাল পেতুম !
আসমানী। (স্বগত) আমি তার আসমান—তার জীবনের
সূৰ্য্য ছিলুম, এখন হয়েছি সয়তানের সন্তান—কেন ?
পুরুষের ভালােবাসাকে আর কখনাে আমি বিশ্বাস
করব না। আমিই ছিলুম তার একমাত্র কাম্য, আর
এখন সে ছুরি দিয়ে আমার গলা কাটতে চাচ্ছে !
২০
গুবেহেস্ত,
( উচ্চে) হাসান, তুমি আমার মৃত্যু আকাঙক্ষা করূলে,
আরাে কিছু যাদুকরা মিঠাই পাঠিয়ে দিও।
সেলিম। আরে হাসান, জিনের সঙ্গে পরিহাস ত্যাগ কর।
আসমানী। আরে হাসান, ইহুদীর প্রেমের আড়ক আর
কিনাে না।
হাসান। হায় কপাল !
আসমানী। (সেলিমের প্রতি) দেখ তার
দিকে চেয়ে !
মাতালের মত যেন টছে, ঠিক হয়ে দাড়িয়ে থাকতে
পারূছে না! (হাসানের প্রতি) আরে বুড়াে, বাড়ী
যাও না।
সেলিম। বাড়ী গিয়ে কবিতা লিখতে থাক, বুঝলে ?
আসমানী। বাড়ী গিয়ে মিঠাই তৈরী কৰ্তে থাক, বুঝলে?
হাসান। আসমানী! আসমানী! আমার মাথা
আসমানী। চলে যাও, নইলে ঐ গরম মাথা আচ্ছা করে
ঠাণ্ডা করে দেব। বিরক্ত করে খেলে !
হাসান। আসমানী ! আসমানী! (বাহু বাড়াইয়া দাঁড়াইল )
(গান-ডুয়েট)
হাসান। হয়ে জুদাইমে তেরে বেখুদ
তুছে হামারা খেয়াল ক্যা হায়
ইসি তামান্নামে মরমিটে হাম
কভি না পুছা ক্যা হাল ক্যা হায়।
না ছােড় যাওঙ্গি দরকে তেরে,
তােমারি দিলমে খেয়াল কা হায়।
:
গুলবেহেস্ত,
২১
আসমানী। দুনিয়া দেওয়ানা হামকো লাগি
তােমারি হাল ক্যা পুছেঙ্গে ম্যায় ।
দেখাে মরতা হয় এক আলম
তুহি মার তাে কামাল ক্যা হায়।
আসমানী। (কথায় ) হে আমার বুল বুল,তােমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা
এখনি নিবিয়ে দিচ্ছি। (এক পাত্র জল হাসানের উপর
ফেলিয়া দিল এবং সশব্দে জানালা বন্ধ করিয়া দিল। হাসান
যেখানে দাড়াইয়াছিল সেখান হইতে এক চুলও নড়িল না)
হাসান। দুৰ্বত্ত কুকুর সেলিম,আর তুই ঘৃণ্য স্ত্রীলােক, বাজারে
বাজারে তােদেরে বেতিয়ে নিয়ে ফিরলে তবে ঠিক
হয়! ওঃ, আমার মাথা ঘুরছে। তুই শূকর, তুই
জাহান্নামে পড়ে চিরকাল চীৎকার কর—তুই, তাের
জাদু আর তাের ইহুদী সব। (দরজায় প্রবল ঘা দিয়া )
আমি বাড়ী ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকব। আমি তােদেরে
খুন করব। আল্লা, একি করলে? না, এতাে
আমারি দোষ, স্বপ্ন দেখার এবং যাদুতে বিশ্বাস
করার ফল ফলেছে। আঃ! আল্লা, আমি মরে
যাচ্ছি। ওঃ, আসমানী, তুমি এত সুন্দর অথচ এত
ঘৃণ্য ! ওঃ, তুমি আমাকে মেরে ফেলেছ! যাই।
( নিঝরিণীর ছায়ায় পড়িয়া গেল। সব নীরব। পাশের
বাড়ীতে একটি আলাে দেখা গেল, সেখানে মৃদু সঙ্গীত
সুরু হইল, আকাশে ভােরের আলাের সামান্য একটু স্ফুরণ
দেখা গেল )
গুলবেহেস্ত
(খলিফা হারুণ-উল-রশিদ, তার উজীর জাফর, রক্ষী মশরুর
(নিগ্রো) আর ইসাক্-এক যুবক কবি, সকলেই বণিকের
ছদ্মবেশে প্রবেশ করিল—অদৃশ্য সঙ্গীত থামিল)
খলিফা। ইসাকু, আমার মনটি বড় ভারাক্রান্ত বােধ হচ্ছে,
রাত্রি এখাননা শেষ হয় নাই, এখনাে আমরা
পাচাননা রাস্তার পাকে পাকে ঘুছি, এখন পর্যন্ত
কোথাও কোনাে আমােদের সন্ধান পেলুম না, এখনাে
শুভ্র চাদ আকাশ হ’তে স্নিগ্ধ কিরণ বিতরণ কচ্ছে।
ইসাক। ওঃ খলিফা, বিজ্ঞের কাছে এই শুভ্র চঁাদের স্নিগ্ধ
কিরণের মধ্যেই, এই নিঝরের স্বপ্নাতুর ঝির ঝি
শব্দের মধ্যেই, জ্যোৎস্না-স্নাত ঘুমন্ত সবুজ বৃক্ষগুলির
মধ্যেই কি যথেষ্ট আনন্দের কারণ সঞ্চিত নেই ?
(যে সঙ্গীত এতক্ষণ থামিয়াছিল তাহা আবার আরম্ভ হইল)
(অদৃশ্য নৃত্য-গান)
নিশি শেষ—ম্লান দীপের কিরণ,
মায়া ঘােরে কত অলিক স্বপন
রচিব আমরা রচিব!
উষার বাতাসে-ক্লান্ত আবেশে,
পুনঃ তা ভাঙ্গিয়ে দিব।
আশার মদিরা-কল্পনার ভ্রান্তি
মিলিয়ে রচিব দুরাশার শান্তি !
ক্ষণিক জীবনে ক্ষণিকের গান
গাও সবে মিলে ভরিয়ে প্রাণ।
গুবেহেস্ত,
জাফর।
খলিফা। কিন্তু সঙ্গীত শুছি যে, আলােকও দেখা যাচ্ছে।
এস, এস, এই সময়েও এই অভিশপ্ত রাত্রির কবল
হ’তে কিছু আনন্দ ছিনিয়ে নিতে পাব আশা হচ্ছে।
হুজুর, রাত্রি প্রায় ভাের হয়ে এল, এখনাে আপনি
ঘুমােননি। এখন আর আমােদের সন্ধান করা ঠিক
নয়।
খলিফা। জাফর, সব বিষয়েই তােমার দোকানদারী বুদ্ধি
ছাড়তে পার না।
ইসাক। ঐ তাে তার গুণ, খলিফা। ইনি রাজ্যের দোকানদার,
সমস্ত প্রদেশের রাজস্ব ইনি বিক্রী করেন আর
মানুষের জীবন কিনে নেন্।
খলিফা। যথেষ্ট, যথেষ্ট। ওদেরে ডাক,
দেখ,
আমাদেরে ঢুকতে দেয় কি না।
জাফর। ওগাে ভদ্র গৃহস্থগণ, শুনছেন ?
একজন। (জানালা হইতে অদৃশ্য ভাবে) কে ডাকছে ?
জাফর। মশায়, আমরা চারজন বণিক কাল রাত্রে বা
থেকে এসেছি।
একজন। ( ভিতর হইতে ) তাহলে তােমরা বােন্দাদের লােক
নও?
জাফর। না, মশায়, বার।
একজন। বােদাদী হলে, খলিফার ভাণ্ডারের সমস্ত ধনরত্ন
দিয়াও এখানে ঢুকতে পারূতে না।
জাফর ;
২৪
গুবেহেস্ত,
খলিফা। তাহলে যখন বাস্রাবাসী তখন ঢুকতে পারি, আশা
করি ?
একজন। ঢুকূলে তােমরা আমার ক্ষমতার মধ্যেই এসে পড়বে।
এসে যদি তােমরা আতিথ্যের অপব্যবহার করাে,
তাহলে তােমাদের মৃত্যু দণ্ড হবে জেনে রেখাে।
কিন্তু কেউ তােমাদের ঢুকতে বাধ্য কচ্ছে না।
বাবাসিগণ, শান্তিতে চলে যাও।
খলিফা। (স্বগত) বেশ এক বিপদসঙ্কুল আনন্দের সন্ধান
পাওয়া গেছেতাে ! এতাে ছাড়া যায় না। (উচ্চে )
আতিথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা সত্ত্বেও আমরা
ঢুকতেই চাচ্ছি এবং দরজার অনুসন্ধান কচ্ছি।
একজন। হে বন্ধুগণ, এখান থেকে অনেক দূরে আমাদের দরজা,
তােমরা বিদেশী, কি করে তা খুঁজে পাবে ? তবে
তােমাদের এখানে উত্তোলনের একটা উপায় কচ্ছি ।
খলিফা। জাফর, এই রাস্তার দরিদ্র জনপদে এত বড় একটা
বাড়ী আছে তাতাে আমি জান্তুম না ! বাইর থেকে
এটাকেও অন্য বাড়ীর মতই বােধ হয়, তবে তফাৎ
এই, এর দরজা নেই; কিন্তু এটা যদি বাড়ীর
পশ্চাদ্দিক হয় তাহলে এ বাড়ীর ভিতরটা বেশ প্রশস্ত
এবং তাতে কোনাে গােপন রহস্য আছে বলে মনে
হচ্ছে। আজ রাত্রে একটা কিছু আবিষ্কার করব,
জাফর।
গুলুবেহেস্ত, ২৫ জাফর। হুজুর, বিপদের ইঙ্গিত পেয়ে আমাদের সাবধান হওয়া চিত। (একটা ঝুড়ি নীচে নামিয়া আসিল) খলিফা। বিপদ ? কে ডরায় বিপদকে ? (ঝুড়িতে বসিয়া পড়িল, ঝুড়ি উপরে উঠিয়া গেল ) জাফর। আঃ, মশরুর, ঘুমুতে পারুলে হত। মশরুর। খলিফা শুনলে স্বর্গে গিয়ে আপনাকে জাগতে হ’তাে, উজীর সাহেব। (জাফরের গলার কাছে মশরুর দ্রুত কৌশলে তার তলােয়ার খেলাইয়া দিল। জাফর। (ঝুড়ি নামিতে দেখিয়া তাহাতে বসিয়া উপরে উঠিতে উঠিতে, মঞরের তলােয়র দেখাইয়া) স্বর্গের রাস্তাটি খুব সংকীর্ণ এবং ঝকঝকে দেখতে পাচ্ছি, মশরুর ! মশরুর। (তলােয়ারের অর্থপূর্ণ ভঙ্গী করিয়া) , উজীর সাহেব, একেবারে সােজা রাস্তা। (জাফরের পর মশরুর উঠিল, পরে ইসাকের জন্য ঝুড়ি নামিয়া আসিল) ইসাক । ( একা) যাও–যাও ইলামের মালিক, নব নব আনন্দের অভিযানে ছুট, আমি আর তােমার সঙ্গে যাচ্ছি না এখন। ঊষার অরুণ রাগ এবং নিঝরিণীর ঝ ঝ জাগরণ ধ্বনির মধ্যেই আমার জন্যে যথেষ্ট আনন্দ,রয়েছে। যাও, হারুণ, এই গৃহ দীপ এবং সংগীতের রহস্য, এই দ্বারহীন বাটী এবং আতিথ্য- বিমুখ গৃহস্থের রহস্য বের কর গিয়ে, যাও—কোনাে অনুরাগ অথবা বিরাগের ইতিহাস খুঁড়ে বের কর,
২৬
গুবেহেস্ত
তারপর শপথ ভঙ্গ করে সমস্ত বােদাদে সেই কাহিনী
প্রচার কর এবং তাকে মুঠো মুঠো সােণা বিলাও
আর স্বপ্ন দেখতে থাক যে নূতন একটি বন্ধু করে
নিয়েছ। হে আমার মুক্তহস্ত বন্ধু, এই যে মুঠো মুঠো
সােণা এক রাত্রির জন্যে কোনাে নৰ্ম্মসহচরীকে, একটি
বাক্যের জন্যে কোনাে কবিকে, আনন্দের মজলিস্
বসাবার জন্যে কোনাে ধনী বন্ধুকে, কিংবা শুধু
খেয়ালের জন্যে কোন ভিক্ষুককে বিলাও—এই সব
কি দেশের রাজস্ব থেকে নয়—দরিদ্র প্রজার হৃদয়-রক্তে
নিরিয়ে কি এসব আদায় করা হয় না? কিন্তু
প্রজাদের মিলিত দীর্ঘশ্বাস তােমার বাগানের একটি
তরু-পত্রকেও যে বিচলিত করে না। আর আমি
আমিও তােমার অনুগ্রহ লাভ করেছি; আমি ইসাক,
পাহাড়ের মুক্ত অরণ্য এবং বাতাসে যার জন্ম
সেও আজ রাজপ্রাসাদে বাসা নিয়েছে এবং তা যে
কারাগারেরই নামান্তর মাত্র তা সে ভুলে গেছে। সে
আজ কথার পর কথা বুনে তােমার অনুগ্রহের দাস
হয়ে আছে, ভুলে গেছে সেটা তার কবিত্বের লজ্জা,
তার মনুষ্যত্বের অসম্মান, সে ভুলে গেছে তাদেরে, যারা
চাষ করে এবং শস্য বুনে, ভুলে গেছে সেই কুটীর
যেখানে তার জন্ম।
গুলবেহেস্ত,
(গান)
অনন্ত সুন্দর বিশ্ব প্রকৃতি,
মুগ্ধ নয়নে আঁকি তব ছবি ।
আঁকি হৃদয়ের ভাব অগণন,
অশ্রু হাসি প্রেম বিরহ মিলন !
করি সৌন্দর্য্য রচনা মিটাই পিয়াসা,
রচিয়া জগতে প্রকাশের ভাষা !
নিয়ে যাও মােরে চির নন্দনে।
জ্ঞান সুন্দর প্রেম ত্রিবেণী সঙ্গমে।
রূপ রস গন্ধ সুরে মানসী
ফুটাব ভাষায় আমি তব কবি
(হাসানকে দেখিয়া ) এ্যা! ছায়ায় যে একটা মানুষ
পড়ে আছে। রাস্তায় আজকাল মৃতদেহের বেশ
ছড়াছড়ি দেখা যায়। বিষ, ছুরি, উপবাস-মৃত্যুর
কারণেরও অভাব নেই। কিন্তু তুমি তাে ভাই
উপবাসে মরনি, আর তােমার মুখে এমন একটা কিছু
আছে যা আমাকে বিশেষরূপে আকর্ষণ করেছে।
পােষাক দেখে মনে হয় কোনাে সাধারণ লােক হবে-
কোনাে মুদী কিম্বা রুটিওয়ালা—শরীরটি ময়লা এবং
কুৎসিৎ, কিন্তু কপাল দেখে মনে হয় নেহাৎ সাধারণ
লোকও নয়। মনে হয়-
জাফর। ( উপর হইতে) ইসাক, উপরে আছেন কি ?
২৮
ইসাকু। (চীৎকার করিয়া) একটু অপেক্ষা করুন, আমি যাচ্ছি।
(আত্মগত ভাবে) এই তিক্ত ঘৃণার রেখাটি ওর মুখে
পরিস্ফুট রয়েছে কেন? লােকটি কুৎসিৎ বটে, কিন্তু
এর মুখে একটা শ্ৰী আছে। একি ? একটা বাঁশী ?
আমাদের এই ব্যবসা যে, ভাই। তুমিও সংগীত
ভালােবাসতে, তুমি জনসাধারণের গান গেয়ে
ফিরুতে—তেমন গান তাে আমি গাইতে জানি না,
দাদির কাছ থেকে শিখেছিলুম, এখন সব ভুলে গেছি।
( যন্ত্রের মত ভগ্ন বাঁশীটি লইয়া) আঃ! বাঁশীটি যে ভাঙ্গা।
( হাসানের হাত ধরিল) ভাই, তােমার হাতটি যে
এখনাে গরম আছে, বুকটিও যেন নড়ছে ; তুমি তাে
মর নি। (ঝর্ণা হইতে জল আনিয়া চোখে মুখে ছিটা দিল)
তােমার মুখে এই ঘৃণা বিরক্তির রেখাটি কোথেকে
এল, তা পরে জেনে নেব।
খলিফা। (উপর হইতে) ইসাক, ইসাক, আমরা অপেক্ষা করে
আছি।
ইসাক। (স্বগত) একটু একা একা ঊষার সৌন্দৰ্য্যটিও কি
ভােগ কর্তে দেবেনা। আঃ! (হাসানের শরীরটি বহিয়া
লইয়া সে ঝুড়ির নিকট গেল) { উচ্চে } এই তত যাচ্ছি,
হুজুর! (হাসানকে ঝুড়ির মধ্যে রাখিয়া তাহার প্রতি।
আমার স্থানটি গ্রহণ করে তােমার অদৃষ্ট পরীক্ষা
কর, ভাই! আমি এখনকার মত স্বাধীন, অন্ততঃ
গুবেহেস্ত,
২৯
একটি ঊষা সম্ভোগের জন্যে পাহাড়ের উপরকার
মুক্ত বায়ুর মত স্বাধীন। (হাসানকে যখন উপরে
টানিয়া ভােলা হইতেছে তখন ইসা দ্রুত সেখান হইতে
সরিয়া গেল )
(গান)
আজ উষার বাতাস লাগাব গায়ে
মুক্ততার মাঝে রব মুক্ত হয়ে।
যাবনা প্রাসাদে রহিবনা বসে
দীপাবলী জ্বালা বদ্ধ বাতাসে।
মুক্ত প্রকৃতি—মুক্ত আকাশ
খুলে গেল প্রাণ আজি তার মাঝ !
চাদ ডুবে যায় গগনের কোণে,
জ্বলে শুকতারা শুভ্র কিরণে,
ফুল পরিমলে মন্দ সমীরে,
আলস্যে সহাসে জেগে উঠে ধীরে
তরুণ অরুণ-প্রভাতি গেয়ে
আজ উষার বাতাস লাগাব গায়ে !
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
একটি প্রশস্ত কক্ষ। বামদিকে তিনটি তােরণ পার হয়ে একটি বারান্দা •••
সেখানে খলিফা, জাফর, মশরুর আর গৃহস্থ রফি। কক্ষের
ভিতরটা আলােকে উজ্জ্বল, কিন্তু শূন্য। কক্ষের স্থাপত্য
রীতিটি
অদ্ভুত, চারিদিকের নিম্নতেরণগুলি মাঝখানে
একটি সমচতুষ্কোণ স্থান অধিকার করিয়া রাখিয়াছে।
কক্ষের আসবাবপত্রের মধ্যে যতটা সম্পদের
ততটা সুরুচির পরিচয় নাই।
খলিফা। ইসাক, ইসাক, আমরা অপেক্ষা করে আছি।
জাফর। ইসাক, ইসাক । হয়ত চেতনা হারিয়েছে।
খলিফা। চেতনা হারিয়েছে ।
জাফর। নীচে গিয়ে দেখে আসি কি করছে। কথা বলছে
শুনতে পাচ্ছি যেন।
খলিফা। ছায়ার সঙ্গে কথা বলছে। আজ হয়ত তাকে আবার
ভূতে পেয়েছে, থাক্ তার কথা! সে আমাদের
বন্ধুত্বের দাবী করে কিন্তু আমাদের প্রাপ্য সম্মান
দেখাতে ভুলে যায়। আমি প্রভু, আমি কর্তা তা কি
জাফর। ( তাড়াতাড়ি ) আমরা তাে এখন বাজায় নই, সে
কথা মনে রাখবেন—কিন্তু ঐ দেখুন, দড়িতে টান
পড়েছে, ( মশরুর প্রতি ) টেনে তুল।
গুলবেহেস্ত,
( খলিফার দিকে দড়ি অগ্রসর করিয়া দিয়া) হে বাস্-
বাসী, আল্লা তােমার হাতে কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে
দি। (অজ্ঞান অবস্থায় কাদামাখা পােষাকে ঝুড়ির মধ্যে
হাসানের আবির্ভাব।) এ আল্লা! এ আল্লা! কোন্
নর্দামায় পড়ে মরেছে এটা ? এই কি তােমাদের
সঙ্গী, বণিক ভাই সব ?
জাফর। ( বিস্মিত) গৃহস্বামী, এ আমাদের সঙ্গী নয়, একে
অাগে আমরা কখনাে চোখেও দেখিনি।
রফি। তাহলে এটা কি ?
খলিফা। আমাদের বন্ধু আমাদের উপর এক খেলা খেলেছে
দেখছি। নিজের বদলে এই মৃত দেহটা পাঠিয়ে
দিয়েছে। চল এটাকে তুলে রাস্তায় ফেলেদি।
( হাসানের নাড়ী পরীক্ষা করিয়া) দাড়াও, লােকটি তাে
মরেনি। হে,আদার !
রফি।
(ছােট্ট সুন্দর বালক অদারের প্রবেশ)
অল্।
হুজুরে হাজির ।
হো, উইললা ।
রফি।
(উইলাের প্রবেশ)
উইলাে। ( আরাে ছােট) প্রভুর আদেশ শিরােধার্য।
জু পার !
রফি।
গুলবেহেস্ত,
(জুপারের প্রবেশ )
রফি।
জুপার। হুজুরের পায়ের দাস।
টস্ক।
(টস্কের প্রবেশ)
টম্। কি আদেশ দাসে ?
খলিফা। (জাফরের প্রতি জনান্তিকে) বাস্তবিক, ভারি চমৎকার
ত! সুরুচি ও শিষ্টতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রফি। হে আমার দাসগণ, এটিকে মানুষে পরিণত করে দাও।
একে বাঁচিয়ে তােল, স্নান করাও,সাবান মাখাও, গন্ধ
লাগাও, মাথার চুল আঁচড়িয়ে দাও, তারপর রীতিমত
কাপড় চোপড় পরিয়ে নিয়ে এস আমাদের কাছে।
অল্। আমরা শুলুম।
উই। আমরা মাথা নােয়ালুম।
জু। আমরা কেঁপে উঠলুম।
টম্। আর আদেশ পালনে চলুম। ( বালক চারিটী নিষ্ক্রান্ত)
খলিফা। ( বাড়ীর বড় ঘরে প্রবেশ করিয়া) হে গৃহস্বামী,
আপনার বাড়ীটি প্রকাণ্ড এবং ইহার স্থাপত্য রীতিটি
অদ্ভূত ! এমন তুচ্ছ সাধারণ রাস্তায় এত বড় বাড়ীটা
থাকাই আশ্চর্য্য!
রফি। এটা একটা পুরােণাে বাড়ী, জীবন্ত চামড়া ছুলে
মাবার আগে ম্যালিকি নামীয় কাফেরের দল
গুবেহেস্ত,
এখানে তাদের সভা জমাতাে। এটাকে চলন্ত
দেয়ালের বাড়ী বলা হয় ।
খলিফা। এ নাম কেন ?
রফি।
সে আমি জানি না।
খলিফা। সঙ্গীত শুনছিলুম, তা যে নীরব হয়ে গেল ?
রফি। অতিথিগণ, আমার যৎসামান্য আনন্দ বিতরণের চেষ্টার
আগে আপনাদের অনুমতির অপেক্ষাই কচ্ছিলুম।
সঙ্গীত-হো, নর্তকীগণ ! (হাততালি দিল )
(সঙ্গীত আরম্ভ হইল! রফি কক্ষে প্রবেশ করিয়া ইঙ্গিতে
তার অতিথিগণকে নীরবে বসিতে বলিল)
(অদৃশ্য সঙ্গীত)
রিক্ততা সম্পদে গর্বিত আমরা
চাহিনা সঙ্কল্পে ভরেছি প্রাণ,
কদৰ্য্য, হীনতা, পতাকার তলে
গাও মিলে সবে বিজয় গান।
রােগ শােক তাপ দুঃখ লাঞ্ছনা
পারেনা দমিতে মােদের প্রাণ,
গাও সবে মিলে ভরিয়ে প্রাণ
সম্মিলিত কণ্ঠে বিজয় গান।
খলিফা। আশা হচ্ছে, এইটুকু ভূমিকার পর এই বিচিত্র
প্রাসাদে স্বর্গরাজ্যের উপযুক্ত নর্তকীদের দেখা পাব।
জাফর। আল্লা করুন, তাই হােক, হুজুর।
৩ঃ
গুলবেহেস্ত,
খলিফা। (জাফরের প্রতি) চুপ, আমি নৃত্যশীল পায়ের ধ্বনি
শুনছি। প্রত্যাশার মদ আমার শিরা উপশিরায়
নেচে বেড়াচ্ছে। ও জাফর, কি রকম হুরীগণ আজ
আমাদের চক্ষে আনন্দ দান কবে কে জানে? কি
গােলাপী বক্ষঃস্থল, কি রূপালি স্কন্ধদেশ, কি সুঠাম
পদরাজি, কি সুবলয়িত বাহুপাশ !
(সঙ্গীতের তালে তালে নাচিতে নাচিতে একদল ভিক্ষুকের
প্রবেশ। তাহাদের চেহারার এবং পােষাকের কদৰ্য্যতা
অবর্ণনীয়। তাহাদের দলপতির চেহারাটি ভালােই, কিন্তু
তাহার পােষাকের কদৰ্যতা এবং ছিন্ন ভিক্ষুকের দলপতির
তুল্যই )
রফি।
ওহে, দুই পায়ের সকল মালিক,
নাচহে গাও, ঘুর সব ঠিক ঠিক,
এক পা দেড় পা যার-দেখি আজ নাচ তার
পা-হীনে শুধু গানে যােগ দিয়ে নিক।
সকলে। হাঁ, হাঁ।
রফি। পা-হীনে শুধু গানে যােগ দিয়ে নিক।
দেখাও তােমাদের গলিত ক্ষত,
দেখাও রে অঙ্গ বিকল যত,
অপরূপ যত হবে ঝুলি ভরি তত লবে,
কুশ্রী যত কৃপা লভিবে তত।
সকলে। ঠিক, ঠিক।
গুলবেহেস্ত,
রফি। কুশ্রী যত কৃপা লভিবে তত।
ঠোট দাত হীনেরা এসে পড় এস্তে,
কুষ্ঠী-মৃগী রােগী উন্মাদ গ্রন্তে,
অন্ধেরা নাচো সব মিলি কর কলরব,
পায়ে বুকে মাথায় কেউ নাচো হস্তে।
সকলে। আরে বাঃ বাঃ!
রফি। পায়ে বুকে মাথায় কেউ নাচো হস্তে।
( সকলের গান)
বােদাদী ভিখিরী মােরা ভিখিরী,
কিবা কোথা পাওয়া যায় তারি ফিকিরী।
ভূগর্ভে আছে কোঠা, সােণ। তায় লােটা লােটা,
রাত দিন তাহারি সন্ধানে ফিরি।
আরে হাঁ, হ—
রাত দিন তাহারি সন্ধানে ফিরি,
বােদাদী ভিখিরী মােরা
বােদাদী ভিখিরী।
একজন। কারাে পেশা ভিক্ষা, কারাে বা চুরি।
অন্য একজন। কেউ পায়ে ধরে, কেউ চালায় ছুরি।
অন্য একজন। আঁধারে আলােকে তারা
অপর একজন।
চলে যত নাম হারা,
অপর একজন। ঠিক নেই পেশার, ফকিরী বা ফিকিরী।
সকলে। বােগাদী ভিখিরী মাের।
বােগাদী ভিখিরী।
গুবেহেস্ত,
(গৃহস্বামী হাত তুলিল। সকল ভিক্ষুকেরা উপুর হইয়া
মাটিতে শুইয়া পড়িল)
( ডানদিকে একদল গৌরবর্ণা সুন্দরী ও বামদিকে একদল
কৃষ্ণবর্ণা সুন্দরীর প্রবেশ ও গান)
মন খুসিদের দল (তােরা) আয়রে দুলে দুলে,
পায়ে পায়ে ছড়িয়ে আয় পল্লবে ৪ ফুলে,
জোনাকিরা ঝিক্ মিক্ বেণু শাখা চিক্ চিক,
বুলবুলি তান ধর হেনা শাখার তলে ।
(গৌরী)। চিক্ মিক্ তরুপর চঁাদের চারুকর,
(কৃষ্ণা)। ছায়াটি পথ পর লুটিয়া পড়ে।
(গৌরী)। হাসিছে নতল, চমকে তার দল,
(কৃষ্ণা)। মেঘেরা ছল ছল আবেগ ভরে।
(গৌরী)। চাদে মেঘে বলাবলি, আলাে ছায়া গলাগলি।
(কৃষ্ণা)। আজি দাও কোলাকুলি হৃদয় পরে।
(উভয় দলে আলিঙ্গন।
( সকলে)। মন খুসিদের দল (তােরা) আয়রে দুলে দুলে,
পায়ে পায়ে ছড়িয়ে আয় পল্লবে ও ফুলে,
জোনাকিরা ঝিমিক, বেণু শাখা চিক্ চিক্,
বুলবুলি তা ধর হেনা শাখার তলে।
( ভিক্ষুকদিগের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া সকলে তাহাদিগকে
ঘিরিয়া নাচিতে লাগিল )
গৌরী প্রাধানা। কোথেকে এল এই ভিক্ষুক দল,
কে তৈরী কল এ কদৰ্যে, বল্ !
কৃষ্ণা। কম রজনীর ভালে আজি কেবা কালী ঢালে,
গুলরেহেস্ত,
৩৭
গৌরী। অমৃত সরসে এ গ্লানির গরল ।
কৃষ্ণা। ভগ্নীরা ছুটে চল, কে হেথা থাকে,
চুসনে গাে তােরা কেউ চুসনে পাঁকে।
( ভিক্ষুকদের প্রধান কৃষ্ণার পা ধরিয়া ফেলিয়াছিল, কৃষ্ণা তাহা
ছাড়াইয়া লইল)
ভিক্ষুক প্রধান। পঙ্কেতে যদি এবে পদ্ম ফুটে,
সুন্দরী তবেও কি যাইবে ছুটে ?
কালাে ভেদ করি যদি ফুটে আলাে,
তাহলেও চলে যাবে বলাে সখি বলাে ?
( এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ভিক্ষুকপ্রধান দাড়াইয়া
উঠিল এবং সঙ্গে সঙ্গে তার ছিন্ন চীরের মলিন বেশ খসিয়া
পড়িল এবং তার গায়ে উজ্জ্বল বেশ ঝলুসিয়া উঠিল)
চির দাস যদি চারু চরণে লুঠে,
{সকল ভিক্ষুকদল উঠিয়া পড়িয়া মিলিত কণ্ঠে এই পদটি গাহিবার
সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের জীর্ণ মলিন পােষাক খসিয়া গেল এবং
সুন্দর বেশে মণি-মুক্তা ঝসিয়া উঠিল)
সকলে। চির দাস যদি চারু চরণে লুঠে,
সুন্দরী তাহলেও কি যাইবে ছুটে ?
( সকলে এক একটি সুন্দরীর পায়ে পড়িল )
মেয়েরা সকলে। মন খুসিদের দল...••••••
..ইত্যাদি।
(রফি তাহার হাত তুলিয়া ধরিল। সকলে তমুহূর্তে
একসঙ্গে দাড়াইয়া উঠিল।
একজন। (কথা) চুপ, রাজা কি বল্ছেন।
রফি।
গুলবেহেস্ত,
অপর একজন। ভিক্ষুকদের রাজা।
অন্য একজন। রাজা।
ভিক্ষুক প্রধান। ভিক্ষুকদের রাজা, অবিশ্বাসীদের খলিফা,
রৌপ্য পথের ময়ূর, বােন্দাদের প্রভু!
জাফর। (স্বগত—বিস্মিত) ভিক্ষুকদের রাজা।
মরুর। (*
*) বােন্দাদের প্রভু !
খলিফা। (* ) অবিশ্বাসীদের খলিফা ? আল্লা! আচ্ছা,
পরিহাস তাে !
(উপরের পােষাক ফেলিয়া দিয়া সশস্ত্র রাজবেশে আবির্ভূত
হইয়া) আমার প্রজাগণ আর অতিথিগণ, আমাদের
সেই দিনের সূচনা পূর্বাকাশে ফুটে উঠেছে। এখন
যখন আমাদের ষড়যন্ত্র পাকা হয়ে উঠেছে, আয়ােজন
সব প্রস্তুত, তখন আর তােমাদেরে কি বলব, হে
আমার ভক্তগণ ? বলব কি, বুকে সাহস ধর ? তার
দরকার নেই, তােমরা সিংহ শিশু। বব কি, খলতা
অবলম্বন কর ? তার দরকার নেই, খলতায় তােমরা
সৰ্প। বব কি, রক্তপিপাসু হয়ে উঠ? তারে,
দরকার নেই, রক্ত পিপাসায় তােমর ব্যাঘ্র।
দেখ, যে বােদাদে কয়েক মুহূর্ত পরে অগ্নিকাণ্ড
ঘটবে, তা এখনাে ঘুম ঘােরে স্বপ্ন দেখছে! তােমরা
ভিক্ষা করেছ, এখন তােমরা আদায় করবে ; তােমরা
তােষামােদ করেছ, এখন তােমরা লড়বে। তােমরা
চেয়ে
;
গুলুবেহেস্ত,
ষড়যন্ত্র করেছ, এখন তােমরা লুঠ করবে। তােমর
পায়ে ধরেছ, এখন গলায় ছুরি চালাবে। কি সমুচ্চ
নাসিকাধ্বনি করেই ওরা ঘুমুচ্ছে ! এই শূকরের
দলের সমস্ত নাকগুলাে আজ টুকরা টুকরা করে
ফেলতে হবে। তারা তামা ছুড়ে দিয়েছে আমাদের
দিকে, আমরা ফিরিয়ে দেব ইস্পাত-ডামাস্কাসের
প্রথম শ্রেণীর ইস্পাত, যা বেশ সরু, গভীর হয়ে গিয়ে
বুকে বসে। আর সেই ময়ূরের ময়ূর, লাম্পট্টের
প্রতিমূৰ্ত্তি সেই খলিফাকে আমি জীবন্ত কবরে পুর,
নিজ হাতে পূব। তার বাগান, ঝরণা, গ্রীস্মাগার
আর প্রাসাদ, তার ঘােড়া, গাধা, উট আর হাতী,
তার বসােরার গােলাপ আর ফেরঙ্গি স্থানের মদ,
তার মিশরের খোজা আর বােখারার গালিচা, তার
সােণা রূপা আর মণিমুক্তা সব তােমাদের
স্ত্রীলােকগণ—সব বাছা বাছা সুন্দরী স্ত্রীলােকগণ
তােমাদেরই হবে—তবে যার সম্বন্ধে সাবধান করে
দিয়েছি, শুধু সেটি ছাড়া—সেটি হচ্ছে আমার, ঘােন্টা
খুলে খলিফাদের সিংহাসনে সে-ই আমার সঙ্গে বস্বে
-তখন তােমরা সবে জয়ধ্বনি করে উঠবে
চীৎকার করে বলবে-
ভিক্ষুকগণ। (চীৎকার করিয়া) “খলিফা মরেছে, শেষ হয়েছে।
নূতন রাজার জয় হােক্ !”
;
৪০ গুলবেহেস্ত, জাফর। (রাগিয়া ) এতাে ভালাে নয়, এমন পরিহাসও সহ করা চলে না। রফি। ওহে অতিথি ! সাবধান ! অশিষ্টতা প্রকাশ করে ! রফি। জাফর। অশিষ্টতা! গৃহস্বামীর পক্ষে কি তাহলে কোনাে শিষ্টতার দরকার নেই? অতিথিদের সামনে এরূপ ভাবে কথা বলা সুরুচির পরিচায়ক নহে। আমাদের তাহলে এখান থেকে সরে পড়াই ঠিক। রফি। তা যাও, কিন্তু প্রতিজ্ঞা করে যাবে, খলিফার দেহ- রক্ষীদের সর্দারকে কোনাে কথা বলবে না। জাফর। প্রতিজ্ঞা কচ্ছি ; আমরা ভদ্রলােক। চোর হলে তােমাদেরে বিশ্বাস কৰ্ত্তম, কিন্তু ভদ্র- লােক বলে তা কর্তে পারি না। কিন্তু ঠেকে বিদ্রোহীর কাছে যে প্রতিজ্ঞা করলে, তােমাদের ভদ্রতা জ্ঞানই সেই প্রতিজ্ঞা ভেঙ্গে খলিফার দরজার দিকে তােমাদেরে নিয়ে যেতে শিক্ষা দেবে। জাফর। পরিহাসই হােক আর যাই হােক, আমি আপনাকে অনুরােধ কচ্ছি, ঐ সব কথা আর বলবেন না। শীঘ্রই সকাল হবে ; আমাদের চলে যেতে হবে। আমাদের জরুরি কাজ রয়েছে ; আমাদের গ্রাহকগণ অপেক্ষা করে আছে। রফি। অতিথিগণ ! তাদের নাম বল, দেখবে তাদের স্বর্ণ
বেহেস্ত,
.৪১
রফি।
রফি।
রফি।
;
এবং মৃতদেহ একত্রে তােমাদের পায়ের কাছে এসে
গড়াগড়ি যাবে।
জাফর। না, আমরা আর এখানে কিছুতেই থাকতে পাচ্ছি না।
বণিকগণ, একটা কথা বলে যাও ! বস্র বন্দরে
খুব সুন্দর সুন্দর বাটীতে কি তােমরা থাক ?
জাফর। আমাদের বাটীগুলি একেবারে তুচ্ছ নয়।
কক্ষগুলি কি খুব প্রশস্ত এবং ভালাে আসবাবপত্রে
পূর্ণ?
জাফর। তা কতকটা তাে বটেই।
আরাে কিছু বল ; সেই সব ঘরের মেঝেতে কি কোমল
গালিচা পাতা আছে ?
জাফর। তা, গালিচা আছেই তােত।
রফি। পারস্য এবং আফগানের বহুমূল্য শ্রেষ্ঠ কোমল
গালিচা ?
জাফর। হাঁ।
রফি। কোমল গালিচা তাে পায়ের পাতাও কোমল করে
রাখে, আর যাদের কোমল পায়ের পাতা আছে তারা
ততা চিরকাল বিনয় নম্রতার রাস্তায়ই চলাফিরা করে।
মশরুর। (তলােয়ার খুলিয়া) আমাদেরে কি তুমি ভয় দেখাচ্ছ ?
তা দেখাচ্ছিই তাে, ঘৃণ্য কালাে আমী কোথাকার!
বুদ্ধি বিবেচনার সঙ্গে তােমার চিরকাল ছাড়ছািড়ি
হয়ে আছে দেখছি। তাহলে আমার অতিথিয়,
রফি।
৪২
তােমাদেরে কি সব খুলে বলব ? বলছি, শােন, আর
এক বারটি যদি কোনােরকমে ভয় দেখাও, এড়াবার
চেষ্টা কর কিম্বা আর কোনাে প্রশ্ন কর, তাহলে
তােমাদের মাথা আর ঘাড়ে থাকবে না তা বলে
দিচ্ছি।
( চমৎকার পােষাক পরা হাসানকে লইয়া নৃত্যকারীদের শ্রেণীর
মধ্য দিয়া চারিটি বালকের প্রবেশ )
রফি।
হাসান। ( বিলাপ করিয়া) এ আল্লা, এ আল্লা!
এই তাে, আমাদের চতুর্থ অতিথিটি !
অদার। আমরা ওকে স্নান করিয়ে দিয়েছি ; ওর তা দরকার
ছিল।
উইলাে। মাথা আঁচড়িয়ে দিয়েছি, তার প্রয়ােজন ছিল।
জুপার। পােষাক পরিয়ে দিয়েছি, তা আমাদের কর্তব্য।
টরস্ক। গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছি, তাতে আমাদের আনন্দ।
হাসান। (পূর্বের মত) এ আল্লা! এ আল্লা ! হাসান গেছে,
হাসান আর নেই। সে মরেছে। তার কবর হয়েছে ।
সে এখন একটা হাড় ছাড়া কিছু নয়। এ আল্লা!
কি হাসান-—তাই তােমার নাম বােধ হয়—এরা কি
তােমার সঙ্গে ভালাে ব্যবহার করে নি ? বল,
যদি কিছু খারাপ ব্যবহার করে থাকে,
থাকে, আমি
তাদের
রফি।
গুবেহেস্ত,
৪৩
রফি।
হাসান। ওগাে হুজুর, কারাে মাথা ঘাড় থেকে ফেলােনা,
আর সর্বোপরি আমার জীবনটি নিয়াে না,
প্রভু।
রফি।
আমার কথা শুনতে পেয়েছ দেখছি! কোনাে ভয়
নেই। আমি আমার অতিথিদের কাছ থেকে শুধু
ভদ্র ব্যবহার চাই।
হাসান। এ্যা। এই লােকেরা কে ?
বােন্দাদের ভিক্ষুকগণ ! রাস্তায় রাস্তায় আমার
ইঙ্গিতের অপেক্ষায় এমন দশ হাজার আছে। কয়েক
মুহূর্তের মধ্যেই তারা ঘুমন্ত রাজরক্ষীদের উপর গিয়ে
বিস্ময়ের মত পড়বে, বােগদাদ দখল করবে,
খলিফাকে হত্যা করে আমাকে রাজা করবে।
হাসান! ( বিস্মিত ) আজ রাত্রে আমার হ’লল কি ! জেগে
এমন স্বপ্নতো আর কখন দেখিনি।
হাসান, তুমি ঠিক সময়েই এসেছ। আমাদের
আমােদের নিশাটি কাৰ্যের দিবালােকে গিয়ে মিশে
যাচ্ছে। আজকের কাজ আমাদের জয়যুক্ত হােক,
এক পেয়ালা মদ খেয়ে সকলে সেই শুভাশীৰ্বাদ কর,
আর এখানে শুয়ে বােদাদ ধ্বংসের দূরাগত ধ্বনি
শােন। গৃহস্বামী তােমাদের চমৎকার মদ খেতে
দিয়েছে, অন্ততঃ এটুকু তােমরা বলবে।
রফি।
৪৪
রফি।
গুবেহেস্ত,
(বালক চারিটি মদের পেয়ালা অগ্রসর করিয়া দিতে লাগিল,
খলিফা খাইল না)
(খলিফার প্রতি) মশায়, আপনি খান না ?
খলিফা। না, ধৰ্ম্ম শাস্ত্রে নিষেধ আছে।
রফি।
আরবের মরুভূমিতে কিম্বা পারস্যের বালুকা পে
যদি সিরিয়া কিম্বা দ্বীপ সকলের মত রসে ভরা দ্রাক্ষা
কুঞ্জের চাষ হত, তাহলে ধৰ্ম্ম শাস্ত্রে হয়ত ঐ মদ
নিবারণী শ্লোকটীর অন্ততঃ স্থান হতাে না।
জাফর। শােন গৃহস্বামী ! আমি তােমাকে শুভাশীৰ্বাদ কচ্ছি।
এক সঙ্গে যারা মদ খায় তারা, খুনীই হােক আর
চোরই হােক, তাদের চিরবন্ধুত্ব হয়ে যায়।
মশরুর। (স্বগত) গৃহস্বামী, যে দিন তােমার ঘাড় কেটে
রক্তপাত করব সেই দিন সেই রক্ত কিছু পানও করব,
আজকের এই মদ খাওয়ার কথা মনে করে।
( প্রকাশ্যে ) দাও ! (পান করিণ)
রফি। ( বিজপের সুরে) বেশ অমায়িক প্রকৃতির তিনটি
আমুদে লােক দেখছি তােমরা। (পান করিল)
হাসান। আমিও পান কচ্ছি একটি স্ত্রীলােককে ভুলতে, কিন্তু
এই ছােট্ট পেয়ালাটিতে কি হবে ?
যদি ভালােবেসে থাক তাহলে এ রকম দশটি কিম্বা
দশ সহস্রটিতেও কিছু হবে না। আজ রাত্রে আমার
ভুলে যাওয়ার পেয়ালা বােন্দাদের খলিফার রক্তে
রফি।
গুলবেহেস্ত,
৪৫.
পূর্ণ করব। ভাই, সেই বড় পেয়ালাটিতে
হবে কি ?
হাসান। (ভয়ে ) ভীষণ লােক তুমি, আমাকে ভাই বলে
ডেকো না। ইসলামের পবিত্রতম রক্ত পাত করবার
দুঃসাহস কার ? কেন তুমি এমন ভীষণ কার্যে ব্রতী
হয়েছে ?
মরুর। কেন তুমি তাকে জীবন্ত কবরে পুততে চাও ?
কাহিনীটা শুনি ।
জাফর। বল, যদি তােমাকে পাগল কিম্বা ভাঁড় মনে না,
করাতে চাও আমাদেরে ।
খলিফা। স্ত্রীলােকটির কথা বল শুনি। আমরা তাে তেমাির
মুঠোর মধ্যেই আছি, বলে কোনাে অনিষ্টের
সম্ভাবনা নেই।
( একটু দ্বিধার পর) হাঁ, অনিষ্ট আর কি হবে ? আমার
মনের ভারই কিছু কতে পারে। শােন তাহলে।
আমার নাম রফি। মশুলের ওদিকে পাহাড়ে আমার
বাড়ী ছিল। পরিবানু নামে একটা সুন্দরী
এবং বুদ্ধিমতী স্ত্রীলােকের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক
হয়, কিন্তু বিয়ের আগের দিন মশুলের শাসনকর্তা
আমার দেশ আক্রমণ করেন। লুঠতরাজ কিছুই
বড় নাই, শুধু পরিবানু একা পাহাড়ের পথে
বেড়াচ্ছিল, তাকেই ধরে নিয়ে গেল। আমি
রফি।
৪৬ গুবেহেস্ত, হয়েছে। যখন শুনলুম্ তৎক্ষণাৎ ঘােড়ায় চেপে মশুলের শাসন- কৰ্ত্তাকে যেরূপেই হােক একা বধ করতে ছুটলুম। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনলুম, পরিবানুকে অন্যান্য দাসগণ সহ টাইগ্রিস নদী দিয়ে বােদাদে পাঠাননা তা শুনে ছ’জন জোয়ান লােক নিয়ে, আমি দাড় চালালুম। তৃতীয় রাত্রির শেষে আমরা ৰােদাদে পোঁছলুম। আমি নৌকা হ’তে বাঘের মত লাফিয়ে পড়লুম এবং রাস্তায় রাস্তায়—“দাস বিক্রয়ের বাজার কই,” “দাস বিক্রয়ের বাজার কই” বলে পাগলের মত ঘুরতে লাগলুম।হঠাৎ একটা মােড় ফিরতেই আমি সেই বাজারে এসে পৌছলুম। বাজারটি যেন একটি বাগান! রঙ, বেরঙের পােক পরে সুন্দরী যুবতীরা ফুলের মত চারিদকে ফুটে আছে, কেউ কেউ ফুলের মতনই নগ্ন। আমি ছুটে পরিবানুকে তাদের মধ্যে খুঁজতে লাগলুম, সকল যুবতীরা আমার দিকে চেয়ে নিষ্ঠুর হাসি হেসে উঠলাে। হঠাৎ দেখলুম, সে সামনে দাড়িয়ে ; ঘােমন্টা আগে সে কখনাে দিত না, কিন্তু এখন তার দেখলুম ঘােষ্টা রয়েছে—সমস্ত অবগুণ্ঠনহীনাদের মধ্যে। আমি তাকে তার হাত দুটির সৌন্দর্য দেখেই চিলুম এবং চীৎকার করে হেঁকে উঠলুম-“ও বিক্রেতা, এই অবগুণ্ঠনবতী স্ত্রীলােকটির জন্যে হাজার
সকল
গুবেহেস্ত,
৪৭
দিনার লও।” বিক্রেতা বিজপের হাসি হেসে উঠলাে
এবং দু’হাজার চাইলাে। আমি সােণার বদলে
আমারি হৃদয় রক্ত ক্রয় করলুম, সে তার ঘােষ্টা
খুলে ফেলে আনন্দে চীৎকার করে আমার বুকে
এসে পড়ল, তা দেখে সমস্ত দাসযুবতীরা হাততালি
দিয়ে উঠলাে। কিন্তু সেই মুহূর্তে একটি কাফ্রি
খােজা এসে বাজারে ঢুকলাে, সে এত দীর্ঘ এবং
কুৎসিৎ যে সূর্যের আলােকও ম্লান হয়ে গেল,
গাছে গাছে পাখীরা ভয়ে ডাকতে লাগলাে।
বিক্রেতা এবং দাসগণ তার কাছে মাথা নােয়ালাে।
আমার বিক্রেতার কাছে এসে সে বলল-“খলিফা
তার পছন্দ করবার আগে তুমি দাস বিক্রী কচ্ছ
কেন ?” তারপর পরিবানুর দিকে ফিরে বল্লো,-
“তােমার স্থানে ফিরে যাও।” আমি বল্লম—“তাকে
আমি ক্রয় করেছি” কিন্তু খােজা বল্লে—“চুপ কর,
আমি তাকে খলিফার জন্যে নিয়ে যাচ্ছি।”
তৎক্ষণাৎ দু’জন রক্ষী পরিবানুকে ধরে ফেলে,
আমি তলােয়ার বের করে খােজাকে হাজার টুকরায়
কেটে ফেলতে উদ্যত হয়েছি, তখন পরিবানু চোখে
ইঙ্গিত করূল, আমি চেয়ে দেখি বহু সৈন্য এসে
আমাকে ঘিরে দাড়িয়েছে। তারা তাকে নিয়ে যাচ্ছে
তখন পরিবানু আমাদের দেশের ভাষায় বলে গেল
ক
৪৮: গুলবেহেস্ত. “আমি মরব, তথাপি কেউ আমাকে অপবিত্র কৰ্ত্তে পাবে না; জীবিত বা মৃত, শীঘ্র কিম্বা বিলম্বে, খলিফার উপর তােমাকে প্রতিহিংসা নিতে হবে।” এই আমার কাহিনী, এরি জন্যে খলিফাকে আমি জীবন্ত কবরে পুততে চাই। খলিফা। (আতঙ্কে ) জীবন্ত কবরে ! সয়তান! মশরুর। কাহিনীর এই সব ? জাফর। একটি যুবতীর মান অপমানের জন্যে তুমি কি সম্রাটকে মারতে চাও? খলিফা। (রাগের সহিত) তােমার তুচ্ছ ভালােবাসার সমান মূল্যবান মনে কচ্ছ ইল্লামের গৌরব ? রফি। এই হারুণটা কি ইস্লামের গৌরব নাকি ? তার সাম্রাজ্যের ঐশ্বৰ্য্য, তার অন্তঃপুরের গােলাপী দাস- যুবতী, তার সুখ সৌভাগ্য, তার রৌপ্য নিঝরের মৎস্য—এই কি ইস্লামের গৌরব নাকি ? জাফর। আল্লা তােমার সমস্ত ষড়যন্ত্র পণ্ড করবেন। যাবে। বিদায়, অতিথিগণ! পরিবানুর প্রতিশােধ নিতে এবং বােন্দাদকে রক্তে স্নান করাতে রফি। চলুম আমি। জাফর। আর আমাদের কি হবে ? রফি। তােমরা আমার অতিথি হয়ে এসেছ, সে ভালােই হয়েছে ; তােমরা ধনী এবং গর্বিত, মৃত্যুই তােমাদের ;
গুলুবেহেস্ত,
৪৯
উপযুক্ত শাস্তি। তবে লােহার খাচায় যেমন,
এখানেও তেম্নি নিরাপদেই থাকবে তােমরা ; আর
দূর থেকে স্বপ্নের মত অত্যাচারের প্রতিমূর্তির পতন
শব্দ শুবে।
খলিফা। (তাহাকে বাধা দিতে বেগে ধাবিত হইয়া) আমি শপথ
কচ্ছি, এখান থেকে তুমি যেতে পারবে না আর
আমরাও এখানে থাকব না।
সাবধান, চুয়ােনা আমাকে।
(রফি লাফ দিয়া দূরে সরিয়া গেল। ভিক্ষুকেরা এবং
স্ত্রীলােকেরা এখন কক্ষের দেয়াল ঘেষিয়া শ্রেণীবদ্ধ ভাবে
দাঁড়াইয়া আছে, অতিথিরা আগা হইয়া কক্ষের মধ্যস্থলে
আছে। প্রত্যেক স্তম্ভের আড়াল হইতে তখন একটি করিয়া
সৈন্য চকিত অতিথিদের দিকে লক্ষ্য করিয়া মুক্ত তরবারি
হস্তে প্রবেশ করিল।
রফি।
( ভিক্ষুক এবং নৃত্যকারিণীদের
গান)
':
নূতন প্রভাত ফুটিছে গগনে
নূতন অরুণ রাগে।
গিরি নিঝ রে এ শুভ লগনে
নূতন আলােক লাগে ।
পুরাতন আজ হয়ে যাবে শেষ
পিছনে চিহ্ন না থাকিবে লেশ,
৪
গুবেহেস্ত,
রফি।
ধরিবে নগরী যে যুক্তিম বেশ,
তাহারি সূচনা জাগে।
হারুণ রক্তে ধুইয়া নগরী,
নূতনেরে লও অন্তরে বরি,
নূতন রাজায় অভিষেক করি
মাখ রক্তের ফাগে !
(হাত নাড়িয়া সঙ্গীত বন্ধ করিয়া অতিথিদের প্রতি ) কেউ
একথা জিজ্ঞেস্ করেছিল না, এ বাড়ীকে কেন চলন্ত
দেয়ালের বাড়ী বলে ?
খলিফা। আমিই এ প্রশ্ন করেছিলুম।
(তােরণের প্রবেশ পথগুলি বন্ধ করিয়া সশব্দে চারিদিকে
লােহার দেয়ালের পতন। চারিজন অতিথি
দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়িল)
রফি, ভিক্ষুক
এবং ( একসঙ্গে চীৎকার করিয়া) উত্তর পেলে ?
স্ত্রীলােকগণ
জাফর। ভয়ঙ্কর অবস্থা যে !
( ভিক্ষুকের যুদ্ধ সঙ্গীতের ধুয়া ধরিল)
নূতন রাজায় অভিষেক করি
রাখ রক্তের ফাগে !
জাফর। (দেয়ালে কাণ পাতিয়া শুনিয়া) তারা কক্ষ ছেড়ে গেছে
সব। অন্ততঃ আমরা এখন একা। চলুন, চীৎকার
গুলবেহেস্ত,
করা যাক, রাস্তা থেকে লােকেরা তবে শুনতে
পাবে।
মশরুর। (দেয়ালে সশব্দে ধাক্কা দিয়া) কে আছ, বােদাদবাসী,
কে আছ ? খলিফার বিপদ! খলিফা কারাগারে।
চলে এস সবে। খলিফাকে রক্ষা কর, রক্ষা কর
মানবের প্রভুকে, পৃথিবীর বিজেতাকে—
(নীরব)
খলিফা। কোনাে সাড়া শব্দ কারাে পাওয়া যাচ্ছে না তাে!
জাফর। রাস্তা থেকে এ ঘর কত উচু, ভুলে গেছি! এ বাড়ীর
দুদিকে আবার শূন্য বাগানও রয়েছে !
(খলিফা, জাফর এবং মশরুর চারিদিকে বাহির হইয়া
যাইবার পথের সন্ধানে বেগে ধাবিত হইতে লাগিল এবং
দেওয়ালে ধাক্কা দিতে লাগিল। হাসান গালিচায় বসিয়া
পড়িল)
খলিফা। আল্লা ! চিন খেলুনার মতন ওটা যেন ঘরের মধ্যে
আর ওদিকে ভােরের ঘুমের জড়তার মধ্যে ঐ
লােকটা আমার রাজপ্রাসাদ লুঠ করে বােগদাদে
রক্তনদী বইয়ে দেবে। আমাকে চিনে ফেলে,
পরে জীবন্ত কবরে পুবে।
জাফর। হুজুর! কি করূৰ এখন ?
খলিফা। তুমি কুকুর !
গােবরের
স্তুপ! আবর্জনার
পাহাড়! উজীরকে আমি বেতন দিই পরামর্শ
গুবেহেস্ত,
জিজ্ঞেস্ কর্ভে, না, পরামর্শ দিতে? ভেবে বের কর
আমরা কি করব। তুমি আমাকে ফাদে পা ফেতে
দিয়েছ, আর এখন উটের পিঠ বােঝাই খড়ের পিছন
দিক্টার মত শুধু কাঁপছ, আর কাঁপছ আর বছ—
কি করব এখন! আমার সাম্রাজ্য দ্বাদশ প্রদেশ থেকে
তিনটিতে এসে ঠেকেছে। কিন্তু যাক, এর মধ্যে একটি
আছে ঘাতক, যদি এক্ষণি বেরুবার উপায় না বের
কর্তে পার তাহলে তােমার ঘাড় থেকে মাথা আঙ্গা
হয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে বেশী সময় লাগবে না।
জাফর। যা হবে তা হবে। কিন্তু এই একজন ভাবনায় ডুবে
আছে, সকল বিষয় থেকে আগা হ’য়ে। তাকে
পরামর্শে ডাকা যাক।
খলিফা। কি হে হাসান! কি ভাবছ তুমি ?
হাসান। আমি গালিচার চিত্রগুলি পরীক্ষা কচ্ছি। এটা
সস্তা জিনস, এতে বাজে রং এবং চিত্র সব রয়েছে।
খলিফা। তুমি কি গালিচা বিক্রেতা ?
হাসান। না, মশায়, আমি মিঠাই বিক্রেতা।
খলিফা। আর, আমি খলিফা।
হাসান। আমার মনও তাই বলেছে, হুজুর। ( যথারীতি কুর্ণিশাদি
করিয়া )
খলিফা। এখান থেকে মুক্তির কোনাে উপায় বালাতে পারাে,
হাসান ? যদি না পার তাহলে মশরুর আমাদের
গুলবেহেস্ত,
সবের মাথা কাটবে, তােমার মাথাই সকলের আগে।
ঐ লােকটার হাতে জীবিত অবস্থায় ধরা পড়তে
সাহস হয় না আমার।
হাসান। কিন্তু আমার হয়। আমাকে রক্ষা করুন, রক্ষা করুন।
আচ্ছা, আমাকে যে বাইর থেকে ঝুড়িতে উঠিয়ে
দিয়েছিল সেকই ? সে তাে জাবে আমরা সব কোথায়
আছি, সে আমাদের উদ্ধারের জন্যে আসতেও পারে।
খলিফা। কোন লাভ নেই, কোনাে লাভ নেই। আমি বরং
রফির দয়ার উপর নির্ভর কর্তে পারি তবু ইসাকের
খেয়ালের উপর নয় ; মশরুর, তরবারি খােল।
কোনাে আশা নেই।
হাসান। ভৃত্যকে ক্ষমা করুন, আশা আছে।
আলো! (বারান্দার দিকে লােহার দেয়াল এবং মেঝের
ফাঁক দিয়া আগত আলাে দেখাইল )
খলিফা। তাতে কি হবে ?
হাসান। একটা খবর পাঠানাে যাক।
ঐ দেখুন
খলিফা।
খবর ?
হাসান। কাগজে কিছু লিখে, রাস্তায় ফেলে দিতে হবে।
খলিফা। জাফর, এই লােকটির কাছে তুমি একটি আস্ত বােকা।
কলম খুলে লিখ। সৈন্যাধ্যক্ষকে সাবধান করে দাও।
শান্তি রক্ষকদেরে সাবধান করে দাও। আমাদের
অবস্থাটা লিখে দাও। যে কাগজ কুড়িয়ে পাবে
৫৪
গুলবেহেস্ত,
তাকে কোনাে প্রদেশের শাসন ভার দেওয়া হবে,
জানিয়ে দাও। পরিষ্কার করে লেখ, আরাে
তাড়াতাড়ি। সময় চলে যাচ্ছে। লিখে দাও
আমাদের মুক্তির জন্যে, বােন্দাদের রক্ষার জন্যে,
লিখে দাও ইসলামের মঙ্গলের জন্যে।
ওঃ, হাসান,
মিঠাই বিক্রেতা হাসান, যদি এ যাত্রা রক্ষা পাই
তাহলে তােমার মুখ সােণায় ভরে দেব।
( জাফর তাড়াতাড়ি একটা দীর্ঘ কাগজে সব লিখিল
এবং সকলে তাহা ছিদ্র দিয়া নীচে নিক্ষেপ করিল)
হাসান। না, এই কোণে, এখানে বারান্দা নেই, দেয়াল নীচ
পর্যন্ত রাস্তায় নেবে গেছে। (মশরুর তার তলােয়ারের
খেচা দিয়া কাগজ নীচে ফেলিয়া দিল।
খলিফা।
এখন আমাদের মুক্তি পর্যন্ত কি ভাবে সময়
কাটানাে যায় ?
জাফর। মনুষ্য জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব সম্বন্ধে আমি ভাবতে
থাব।
মশরুর। আমি আমার উরুদেশে আমার তরবারি শান
দিতে থাকব।
হাসান। আর আমি এই গালিচাটির আশ্চর্য্য কদৰ্য্যতার
কারণ সম্বন্ধে ভাবব।
খলিফা। হাসান, আমিও তােমার সঙ্গেই যােগ দেব ; তােমার
সুরুচি আছে।
;
দ্বিতীয় দৃশ্য
(প্রথম অঙ্ক শেষ দৃশ্য দেখ )
আবার বাড়ীর বাহিরের রাস্তা, সেই যুগল নিঝরের রাস্তা,
তার দুই বিপরীত দিকে রফি এবং আসমানীর বাড়ীর বারন্দা।
উষার অস্পষ্ট আলাে। ঝরণার সিড়ীতে দুইটি ক্লান্ত ফকির
ঘুমাইয়া আঝে। একজন ধীরে ধীরে চক্ষু মুছিতে মুছিতে
চারিদিকে চাহিল। একটা কাগজ উপর হইতে নীচে ভাসিয়া
আসিল। একটি ক্লান্ত লােক হেলা ভরে তাহা ধরিল।
১ম ব্যক্তি। ঐ, স্বর্গ থেকে একটা লিখন নেবে আসছে।
২য় ব্যক্তি। ওতে কি কিছু লেখা আছে নাকি, আব্দ?
আব্দ। হাঁ, লেখা আছে, আলি।
আলি।
পড়–কি লেখা।
আব্দ। আমি তাে পড়তে পারিনা। আমি তাে আর
স্কুলের শিক্ষক নই।
( কাগজ ভাঁজ করিয়া কাপড়ে গুজিয়া আবার ঘুমাইতে
প্রস্তুত হই। নানা বেশধারী দুই চারিটী পথিক একে
একে রাস্তা দিয়া চলিয়া গেল )
আলি। আব্দ!
আব্দ। আমি ঘুমুচ্ছি।
আলি। আমি পড়তে পারি ; কাগজটা আমাকে দাও।
আক। আমি ঘুমিয়ে পড়েছি; তুমি উঠে এসে আমার
কাপড় থেকে খুলে নিতে পার, ইচ্ছা করলে। আমার
গুলবেহেস্ত,
সারা শরীর ঘুমে অবশ হয়ে এসেছে, এই বুঝলি
কিনা, শীতের কচ্ছপের মত।
আলি। আরে আব্দ, আমাররা যে নড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না।
থাকগে, কাল কি পরশু পড়া যাবে এখন।
আব্দ। কাকে কি পরশু আমি জেগে তােমাকে দিয়ে দেব
কাগজটা। (কিছুক্ষণ উভয়ে চুপচাপ, আরাে কয়েকজন
পথিক চলিয়া গেল)
আলি। (হঠাৎ কি মনে হওয়ায়) আরে আব্দ, ফু দিয়ে দাও
কাগজটা আমার দিকে। (আব্দ, কাগজটা ফু দিয়া
উড়াইয়া দিল। আলি তাহা ধরিয়া অত্যন্ত কষ্টের সহিত
একটি একটি করিয়া বানান করিয়া পড়িতে লাগিল।
{ কিছুক্ষণ মনে মনে পড়িয়া চকিয়া } এ্যা, আব্দ
কোত্থেকে এল এটা ? ঘুমের ভাণ করােনা, উত্তর
দাও।
আব্দ। আকাশ থেকে। কোত্থেকে এসেছে, আমি কি করে
জাব ?
আলি। দেখি আকাশের দিকে চেয়ে। (গড়াইয়া চিৎ হইয়া
শুইয়া উপরের দিকে তাকাইয়া) নিশ্চয় বছি, আব্দ,
কেউ ঠাট্টা করে ঐ বারান্দা থেকে কাগজ ফেলেছে।
আব্দ। সেই ব্যাটা, তার কলম, আর তুমি—সব জাহান্নামে
যাও। শান্তিতে একটু ঘুমুতেও পারলুম না। ( পাশ
ফিরিয়া শুইল)
এখানে লেখা আছে-শুন্ছ আব্দ? লেখা ভারি
আলি।
গুলুবেহেস্ত, আশ্চর্য্য কথা, লেখা-“যে কেহ এই কাগজ কুড়াইয়া পাইবে, তাহাকে জানাইতেছি যে, উপরের বাড়ীতে খলিফা তার বন্ধুগণ সহ কারাগারে আসন্ন বিপদ অপেক্ষা করিয়া আছেন। বিপদ সমস্ত বােগদাদ- বাসীর—সারা রাজ্যের। গােপনে দ্রুত উদ্ধারের উপায় করিতে হইবে। লােহার দেয়ালগুলাে নীচ হইতে তুলিতে হইবে। হে সৌভাগ্যশালী ব্যক্তি, এখনি সৈন্যাধ্যক্ষকে বােগদাদের ভিক্ষুকদের বিরুদ্ধে রাজ প্রাসাদ রক্ষা করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে বলিবে ; তােমার এই কাৰ্য্যের পুরস্কারস্বরূপ কোনাে প্রদেশের শাসন ভার তােমাকে দেওয়া হইবে। স্বাক্ষর উজীর জাফর।” (সশব্দে হাসিয়া উঠিয়া) হােত! হেঃ! প্রদেশের শাসন ভার ! বাজে কথা! গরীব বেচারী আলিকে নিয়ে কে মজা কচ্ছে ! (একটু পরে নিম্ন স্বরে) আচ্ছা, আব্দ, খলিফা আর তার বন্ধুগণ যদি বাস্তবিকই এই বাড়ীতে বন্দী অবস্থায় থেকে থাকেন ? কে আমার কথায় বিশ্বাস করবে ? খলিফাকে উদ্ধার করুবার আমি কে? রাজ রাজড়ার ব্যাপারে আমি কখনাে হাত দিই না। আব্দ। তােমরা সকলে মিলে চুলােয় যাও। একটু ঘুমুতে দিলে না। এ! এ আবার কারা আসছে ? শান্তি- রক্ষক দেখছি। জাহান্নামে যাক্।
৫৮
গুলুবেহেস্ত,
(ইসাকের সঙ্গে প্রধান শান্তিরক্ষকের প্রবেশ)
ইসাক। আমি ঠিক করে বলতে পাছি না কোথায় তাদেরে
রেখে গেছি। তখন রাত্রি ছিল। এখানেই কোথাও
হবে। হয়ত এই বারান্দাতেই তারা উঠে গেলেন,
ঐটাও হতে পারে – কিন্তু বারান্দার তাে এদিকে অন্ত
নেই দেখছি। একটা ঝরণার উপর ছিল—কিন্তু
ঝরণাও তো অজস্র রয়েছে। আশঙ্কার কি আছে ?
খলিফার রকমই তাে এই।
প্রশা। রাজপ্রাসাদে ফিরে যেতে খলিফা এত দেরী তাে আর
কোনাে দিন করেন নি। একেবারে ভাের হয়ে
গেছে যে !
ইসাক। আমি বলছি আপনাকে, তাকে খুঁজে বের করূলে
কোনাে তারিফ পাবেন না ! মােসূলেম সাম্রাজ্যের
অধিপতিকে তার সর্বশেষ দাস-যুবতীর আলিঙ্গন
থেকে কিম্বা তার অনিচ্ছুক হস্তকে তার সর্বশেষ
আনন্দের পেয়ালা হ’তে বিচ্যুত কবার দুঃসাহস
আপনার কেন হলাে?
প্রশা। আমি বলছি তােমাকে, পণ্ডিত, তাকে খুঁজে বের
কৰ্তে না পারলে তােমার বিধিমত শাস্তি হবে।
(তাকে ধরিল)
ইসাক। হাত সরাও-পশ্বধম, পাজি, পাষণ্ড, পন্নগ, পামর
প্র:শা। এ আল্লা! কবিরা দেখছি কথাও কয় মিল দিয়ে।
গুলবেহেস্ত,
আলি। (উঠিয়া সেলাম করিয়া অগ্রসর হইল ) হুজুরগণ, আমার
একটা অনুরােধ।
প্রশা। আরে ব্যাটা ঘােটলােক ! কোন্ সাহসে তুই এসে
আমাদেরে সম্বােধন করিস্ ?
আলি। হুজুর, একটা অনুরােধ
তােকে অনুরােধ, তুই স’রে যা ব্যাটা, নইলে বেতিয়ে
চামড়া আস্ত রাখব না।
ইসাক। প্রধান শান্তিরক্ষক মশায়, দেখছেন না ওর হাতে একটি
কাগজ আছে আর আপনার ব্যবহারের চেয়ে ওর
ব্যবহার ভদ্র ? (আলির প্রতি) দেখি তােমার কাগজটা,
(কাগজ হাতে লইয়া) এ, কোথায় পেলে এটা?
ভৃত্যকে ক্ষমা কবেন ; ঐ বারান্দা থেকে পড়েছে।
প্র-শা। ( পড়িয়া) বটে ! তাহলে তাে দরজা ভেঙ্গে ফেতে
হবে।
ইসাক। কোনাে দরজা নেই। কিন্তু আগে প্রাসাদরক্ষীদেরে
খবর পাঠান।
প্রশা। (একজন সৈনিকের প্রতি) আলি ! (অপর আলি “হুজুর”
বলিয়া নিকটে আসিলে তার প্রতি আরে, তুই না,
বােকা ! আল্লা বুঝি তােকেই একমাত্র “আলি”
করে সৃষ্টি করেছেন ? তুই কে যে তােকে আমি
ডাব ? বােদাদে এমন দশ হাজার আলি আছে ;
আর, “আলি” ডাকলে তুই আসিস্ ধেয়ে, কীটন্য কীট
আলি।
;
৬০ গুলবেহেস্ত, কোথাকার! (সৈনিকের প্রতি) এই আমার আংটী। এই কাগজটা নাও, যথাসাধ্য দৌড়ে গিয়ে প্রাসাদ- রক্ষীদের অধ্যক্ষকে দাও। সৈনিক। যে আজ্ঞা, হুজুর। (কাগজ ও আংটী লইয়া বেগে বােয়ানা হইয়া যাইতে উদ্যত ) ইসাক। (তাহাকে থামাইয়া) পঁাড়াও ! প্রশা। আমার লােককে থামাবার কি অধিকার আছে আপনার, কলমধারী কৰি কোথাকার ? ইসাক। আরে, কলমধারী কবির মগজে যা খেলে, গােময়- মস্তিষ্ক শান্তিরক্ষককে দিয়ে তা সম্ভব নয়। ( আলির প্রতি) আলি, তাদেরে ব’লাে, কয়েকজন লােক যেন খন্তি, সাবল এবং মৈ নিয়ে আসে। প্রশা। কবি ঠিকই বলেছে ; দৌড়ে যাও, আলি। ( আলি নিষ্ক্রান্ত) আলি। ইসাক। আর, তুমি অপর আলি, যে কাগজ দিয়েছ ? হুজুর ? ইসাক। কতক্ষণ হ’লাে এই কাগজ পড়েছে বারান্দা হতে ? কতক্ষণ কি করে বলি ? তবে ধরুন, বাজারে গিয়ে একটা ফুটি কিনতে যতক্ষণ সময় লাগবে ততক্ষণ হয়েছে বলা যায়। শা। নিশ্চয় এই হাড়িমুখখ ব্যাটা যণ্টাখানিক হলাে আলি।
৬১
গুলুবেহেস্ত,
এই কাগজ পেয়েছে। আরে ব্যাটা পাজি, নচ্ছার,
প্রাসাদরক্ষীদের কাছে দৌড়ে যাসনে কেন এটা
নিয়ে ?
আলি। আমার ভয় কচ্ছিল, ভাবছিলুম বুঝি কেউ ঠাট্টা
করেছে।
প্রশা। ঠাট্টা করেছে ! তুই ব্যাটা উজীরের শালা কিনা।
ঠাট্টা করেছে, বােদাদের খলিফার জীবন নিয়ে ঠাট্টা
করেছে! সাম্রাজ্য রক্ষা নিয়ে ঠাট্টা করেছে ! তাের
মুখ দেখেই বুঝেছি তুই বিশ্বাসঘাতক। ঠাট্টা করা
বুঝাচ্ছি তােক। ভয় করা বুঝাচ্ছি তােকে।
কইরে, মহম্মদ, জিয়া, রুস্তম, ওর মাখাটা নীচু করে
পা দুটো উপরে তুলে ধরূঙ্গে। (লােকজন অগ্রসর
হইয়া আসিল)
আলি। আরে আব্দ, কাগজ তত তুমিই প্রথম পেয়েছ, এতে
তােমারই। কাগজ এবং তার পুরস্কারের দাবীটা
করনা এসে ! হায়! প্রদেশের শাসনকর্তার এই
আব্দ।
রাজ রাজড়ার ব্যাপারের মধ্যে আমি কি কখনাে
থাকি ? বেশ করে বেত চালান হুজুর, ও নীরিহ
পথিকের ভারি শান্তি-ভঙ্গ করে, তবে ওর চীৎকারে
এখন আমার ঘুম নষ্ট হবার আশঙ্কা আছে, আমি
একটু সরে গিয়ে ঘুমােই। (দৌড়িয়া নিষ্ক্রান্ত)
গুলবেহেস্ত,
(লােকজন আলিকে উল্টাইয়া বেত দিবার বন্দোবস্ত করিতে লাগিল,
ঠিক সেই সময় প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষের প্রবেশ, তাহাকে
দেখিয়া লােকজন থামিল )
{ আসমানীর বারান্দায় আসমানীর আবির্ভাব }
আসমানী। দেখ, দেখ, সেলিম ! একটা লােককে বেত দেবার
বন্দোবস্ত কচ্ছে।
সেলিম। ভিতরে চলে এস তাড়াতাড়ি ! কোনাে গােলমাল
হয়েছে। এসে দরজা জানালা বন্ধ করে দাও।
আসমানী। বিপদে মেয়েদের উপযুক্ত রক্ষকই তুমি! (তাহারা
জানালাতেই দাড়াইয়া রহিল )
প্র-সৈ। (প্রশা-কে) মহাশয় !
প্রশা। মহাশয় !
প্র—সৈ। (সেলাম করিয়া) আপনার ভৃত্য, বিজয়ী সৈন্যের
প্রধান অধ্যক্ষ সেলাম জানাচ্ছে !
প্রশা। (সেলাম করিয়া ) ভৃত্য, শান্তি রক্ষকদের প্রধান অধ্যক্ষ
প্রতি-সেলাম জানাচ্ছে।
প্র-সৈ। ( মাথা নােয়াইয়া) আমি সম্মানিত হলুম।
প্রশা। (**) আমি সম্মােহিত হলুম।
ইসাক। মহাশয়গণ, এই সব শিষ্টাচার ছেড়ে এখন কাজের
কথায় মন দিতে।
প্রশা। মহাশয়, কাজের লােকের যখন পরস্পর সাক্ষাৎ হয়
তখন কলমবাজের স্থান হয়েছে দোয়াতের মধ্যে।
গুবেহেস্ত,
সৈ। এই তত আরম্ভ করছি! তার আগে, প্রধান শান্তি-
রক্ষক, আমি জানতে চাই এই লােকটিকে শাস্তি
দেওয়া হচ্ছে কেন ?
প্রশা। মহাশয়, যখন জিজ্ঞেসই করলেন, তখন বলতে হচ্ছে,
কারণ আছে।
প্র-সৈ। কারণ খুবই গুরুতর হবে নিশ্চয়, তা না হলে খলিফা
যে বাড়ীতে বন্দী, তারি সম্মুখে এত বড় একটা
শান্তিভঙ্গ করূতে যেতেন না। কিন্তু আপনি
বুঝছেন না, তাড়াতাড়ি খলিফার উদ্ধারের উপায়কেও
আপনি গুরুতররূপেই নষ্ট কচ্ছেন।
প্রশা। (তরবারি খুলিয়া কয়েক পঁাচ খেলিয়া) কোন্ কচুপােড়া,
মাথামােড়া, পাগড়ীজোড়া সৈনিকের সর্দার এসে
আমার শান্তি রক্ষায় বাধা দিতে চায়রে ! সে আর
তার সৈনিকেরা জানে না যে তাকে আমি শান্তি
ভঙ্গের অপরাধে বন্দী কর্তে পারি ?
প্র—সৈ। আরে, তলােয়ার নামাও, পেটমােটা, ভুইফোটা,
বাক্যছােটা শান্তিবাগীশ ! শান্তিরক্ষার বহর
দেখাওগে নিরীহ দোকানী, ভিক্ষুক আর ছেলে
ছােড়ার উপর ! সৈনিককে অপমানের মজা
দেখাচ্ছি তােমাকে।
ইসাক। ( উভয়ের মাঝে আসিয়া পড়িয়া) এই কি কলহের সময় ?
তাড়াতাড়ি, কই, মই কই ?
৬৪
গুলুবেহে
(আলিনামীর সৈনিকের প্রবেশ)
সৈনিক। আসছে। (দুইটা মই আনা হইল )
প্রশা। (শান্তিরক্ষকদের প্রতি) মই লাগাও।
প্র-সৈ। (সৈনিকদের প্রতি) মই লাগাও।
( প্রত্যেকে তাহার মই একই সময়ে লাগাইল, কয়েকজন
লৌহ দেয়ালে জোরে ঘা দিল, ভিতর হইতে তার উত্তর
আসিল। খন্তি সাবল ইত্যাদি অনা হইল ; সেগুলির
সাহয্যে লৌহ দেয়াল তােলা হইল, তখন দেখা গেল
খলিফা ও সঙ্গীগণ মুক্তির অপেক্ষা করিয়া বসিয়া আছে,
বাতি তখনাে সেখানে জ্বলিতেছে )
প্রশা। হুজুর !
প্র-সৈ। প্রভু!
উভয়ে। (এক সঙ্গে ) আমি আপনাকে রক্ষা করেছি, প্রভু।
( প্রত্যেকে খলিফাকে ধরিতে চেষ্টা করিল)
প্রশা। ধন্য শান্তিরক্ষকের দল।
প্র-সৈ। ধন্য সৈন্য সম্প্রদায়।
প্রশা। এই কীটানুকীটের পরম সৌভাগ্য যে দুনিয়ার
আলােককে সে রক্ষা করূতে পেরেছে। আমিই
তাঁকে মাথায় করে নীচে নিয়ে যাব।
প্র-সৈ।
হে পরযশাপহারী অশান্তি-সর্দার, আমিই প্রথম মই
বেয়ে উপরে উঠেছি, আর ইস্লামের সূর্যের উজ্জ্বলতা
যদিও আমি আমার মলিন হস্ত দিয়ে স্নান কৰ্ত্তে গিয়ে,
বেহেস্ত, L, আমি কম্পিত হচ্ছি, তবু একথা মানতেই হবে যে আমার দাবী অগ্রগণ্য। ( মশরুর তাহাদিগকে দুইদিকে সরাইয়া দিয়া মই দিয়া নামিতে খলিফাকে সাহায্য করিল। জাফর এবং হাসান পরে নামিল। রাস্তায় সমবেত লােকজন হাঁকিয়া উঠিল- “জয় খলিফার জয়-জয় হারাণউলরসিদের জয়”। সৈনিকেরা সমর সেলাম জানাইল। খলিফা হাত তুলিল। সকলে নীরব ) খলিফা। রাজবাটী নিরাপদ তাে ? মশরুর। হুজুর, আমরা তাই আশা করি। খলিফা। আর আমার প্রজারা ? জাফর। হুজুর, আপনার চারদিকেই রয়েছে। আসমানী। (তার বারান্দা হইতে) একি! হাসান যে খলিফার সঙ্গে। খলিফা। আমরা রক্ষা পেলুম সবে ? মশরুর। সবে, আল্লার মজ্জিতে। জাফর। অরি হাসানের বুদ্ধিতে। খলিফা। রক্ষীদেরে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে ? প্র-সৈ। সকলকে প্রস্তুত করে ঠিক ঠিক জায়গায় রাখা হয়েছে, হুজুর। খলিফা। আল্লা, আমার শত্রুদেরে তাদের হাত দিয়ে নিপাত কর। হাসান, এসততা আমার সামনে। হাসান। (সটান শুইয়া পড়িয়া) হুজুর ! ।
গুবেহেস্ত,
খলিফা। (তাহাকে তুলিয়া) ওঠ হাসান। এই হাসান-কালকে
কে তাকে চিন্তাে, আজ তার বুদ্ধি এবং কৌশলে
আমার জীবন রক্ষা করেছে এবং আমার মৃত্যুর চেয়েও
বড় বিপদ, এই সাম্রাজ্যের ধ্বংস নিবারণ করেছে।
সমবেত লােকগণ। সে দিন বহু দূরবর্তী থাক্।
খলিফা। সেই জন্যে সকলের সম্মুখে আমি হাসানকে আমার
রাজ সভায় স্থান দিলুম, আজ থেকে তার সম্মান
আমার প্রধান উজীর জাফর ছাড়া আর কারাে চাইতে
কম নয়।
আসমানী। (সেলিমের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়াইয়া ছিল ) ও আল্লা!
সমবেত লােকগণ। হাসান সাহেবের জয় হােক। জয় হােক
হাসান সাহেবের।
হাসান। হুজুর, আমি বাজারে মিঠাই বিক্রী করে থাকি।
জাফর। এখন থেকে প্রার্থীদেরে অনুগ্রহের মিষ্টি বিতরণ
করবে।
ইসাক। (হাসানের প্রতি ) কি, হাসান ! তুমিই না সেই
ভাঙ্গা বাঁশীওয়ালা মানুষ ?
খলিফা। এ কি ইসাকের স্বর।
ইসাক। যে স্বরে আপনাকে অনেক গান শুনিয়েছে, এ তাই।
খলিফা। তুমি আমাকে ত্যাগ করে রাত্রির আঁধারে পালিয়ে
গেছিলে কেন, ইসাক ? জানি না তােমাকে ক্ষমা
করব কিনা।
গুবেহেস্ত,
৬৭
ইসাক। খলিফার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে আমার ক্লান্তি ধরে গিয়ে-
ছিল।
খলিফা। আর, তােমার সম্বন্ধে আমারাে যদি ক্লান্তি ধরে ?
ইসাক। সে একদিন ধরূবেই, আর সে দিন আমার মৃত্যু সে
আমি জানি।
খলিফা। আজ যে দিনের ঊষা পূর্বাকাশে উদিত হয়েছে, সে
দিন যদি এই হয় ?
ইসাক। তাহলে আজই এই প্রভাতের অরুণ লেখার মধ্যে
চক্ষু নিবদ্ধ রেখে মৃত্যুকে বরণ করে নেব।
খলিফা। তাই নাও, ইসাক, জানু পতি।
( আকাশে রক্ত রশ্মি ফুটিয়া উঠিল ; মশরুর তলােয়ার খুলিল)
ইসাক । (শান্ত ভাবে জানু পাতিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া )
;
(গান)
আকাশে ফুটে উঠে রক্ত আলাে,
তাতেই এ প্রাণের রক্ত ঢালল।
পদ্ম মাঠে মাঠে খুলিছে আঁখি,
প্রভাত রঙে নেয় পরাণ আঁকি।
নিঝর প্রপাতে তটিনী বুকে,
গগন মগন হ’লাে মিলন সুখে।
নিশার চোখ-মুদা আঁধার পরে,
আলােতে ধরা হিয়া তুলিয়া ধরে।
গুলবেহেস্ত
ফুটিছে দিকে দিকে জীবন সাড়া
বহিছে নানা মুখে কৰ্ম্ম ধারা।
মাটির হিয়াখানা উঠিল ফুটি,
আকাশ তারিপরে পড়িল লুটি।
ভেঙ্গে ফেল দেহ-ভাণ্ড কালাে,
প্রভাতে প্রাণে হবে মিলন ভালো।
খলিফা। মশরুর, তরবারি খাপে বন্ধ কর। তুমি কি আমার
বন্ধুকে মারূবে ?
মরুর। হুজুরের আদেশ শিরােধার্য্য।
খলিফা। আমাকে তাড়াতাড়ি রাজপ্রাসাদে যেতে হবে।
ইসাক, যাকে তুমি ঝুড়িতে তুলে উপরে পাঠিয়ে-
ছিলে, যে আজ বােগ দাদ রক্ষা করেছে, তার ভার
তােমার উপর রেখে যাচ্ছি। তাকে রাজ সভার
শিষ্টাচার এবং রীতিনীতি শিখিয়ে নেও। আমার
যান ঠিক আছে ?
( খলিফা কুর্শির মত একটি বানে বসিল। কয়েকজন
ধরাধরি করিয়া তাহাকে লইয়া গেল। ধীরে ধীরে
ইসাক ও হাসান ছাড়া অন্য সকলেই নিস্ক্রান্ত হইল )
আস্মানী। ( বিপরীত দিকের বারান্দায়, সেলিমের কাণ টানিয়া ) ,
যাও, বােকা, আমার কাছ থেকে দূর হও। রাগে
আমার শরীর কাঁপছে। তুমি আমাকে দিয়ে
হাসানকে অপমান করেছ, এখন সেই হাসানই রাজ
সভায় যাচ্ছে ।
গুলবেহেস্ত
সেলিম। ( বিস্মিত ) আঃ, আসমানী, সে আমি জানব কি
করে ?
ইসাক। ওহে ভাঙ্গা বাঁশীর মালিক, আমি তােমাকে ভুলিনি
ভাই !
হাসান। ভাঙ্গা বাঁশী ? ভাঙ্গা বাঁশী ?
ইসাক। এইখানে মৃতের মতন তুমি ঝরণা তলায় পড়েছিলে।
হাসান। এখানেই কি ? এই বারান্দা? তুমি কে ? তুমি
আমাকে বিক্রপ কচ্ছ কেন? তুমি কি জান ?
ইসাক! শান্ত হও, বন্ধু, শান্ত হও, আনন্দে তােমার মাথা
বেঠিক হয়ে আছে ।
হাসান। আনন্দে ? সত্যি মিথ্যা কিছু বুঝছিনা। আমি
জেগে আছি কি স্বপ্ন দেখছি তারাে ঠিক পাচ্ছিনা।
সত্যি হলে খলিফাও কি আমাকে নিয়ে বিদ্রুপ
কচ্ছেন ?
আনন্দের কথা বলে না ? আনন্দের
আশায় আমার মনটিতে ঐ বারান্দার দিকেই ফিরছে
কিন্তু ওদিকে আমার চাইতে সাহস হয় না, সে হয়ত
ওখানে আছে। হা, হ, এইতাে সে।
(আসমানীর গান)
পথ ভুলে নাগর আমার
কোথা হতে এলে?
খােপার ফুল মারব ছুড়ে,
দেব নাকো যেতে চলে!
৭০
গুলবেহেস্ত
আড় নয়নে মুচকে হেসে,
টেনে আন্ বাহু পাশে।
পােষ না মেনে যাবে কোথা,
নাই কি মধু এ কমলে?
{ আমানী তার চুল হইতে একটি গােলাপ খুলিয়া হাসানের
দিকে ছুড়িয়া মারিয়া ভিতরে চলিয়া গেল।
ইসাক। আরে হাসান, তুমি তাে জীবনে যেমন, ভালােবাসার
ব্যাপারেও তেমনি সৌভাগ্যশালী দেখছি। কিন্তু
এসে পড়, উচ্চ রাজসভাসদের যােগ্য আচরণ নয় এটা;
অনেকেই এখন তােমার আচরণ লক্ষ্য করে দেখবে।
হাসান। যাচ্ছি। গােলাপটা বিষাক্ত।
ইসাক। কি বন্ধু, প্রেমিকের মুখে কি একথা সাজে ?
হাসান। তুমি কি আমার বন্ধু ? তুমি ইসাক, তুমি হলে
ইস্লামের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত রচয়িতা ! তুমি যদি আমার
বন্ধুই হও, আগে যারা আমার বন্ধু ছিল তাদের মতনই
কি তুমি ?
ইসাক। গতরাত্রে এই জানালার নীচে একটা বিশ্রী মৃতদেহের
মত তুমি পড়েছিলে; কিন্তু তােমার বাঁশী এবং
তােমার চেহারা দেখে আমি বুঝতে পেরেছি তুমি
আমারি মত একজন কবি, তাই তুমি মরেছ ভেবে
আমার ভারি দুঃখ হলাে ।
হাসান। কবি ? আমি ? আমি যে মিঠাই বিক্রেতা।
শুবেহেস্ত,
৭
(গীন)
• ১
বুঝেছি তুমি কেমন
এক সুরে বাঁধা আছে
তােমার আমার মন !
সম প্রাণ এক নজরে
বুঝে নেয় এ উহারে,
লাগলে আঘাত প্রাণের তারে,
দুইয়ের চোখে অশ্রু ঝরে।
হাসূলে হাসে মধুর হাসি,
আমি তােমায় ভালােবাসি,
প্রাণটী তােমার প্রেমের ছবি,
সখা তুমি নীরব কবি।
ইসাক। তুমি আমার বন্ধু, হাসান।
হাসান। তাহলে এ গােলাপটার কথা ভাব, এই গােলাপ
বিষের চেয়েও ভয়ানক। জানাে বন্ধু, এই গােলাপ
ছুড়ে না মালে আমি ভাব,তুম সে অন্যকেই
ভালবাসে—তাতে কোনাে দোষ ছিল না। ভালবাসা
কিম্বা ঘৃণা করার ধিকার তার আছে। কিন্তু এখন
বলতাে আমাকে, তুমি তাে আমার বন্ধুই বছ,
তােমরা কবিরা কি সব মিথুক ?
ইসাক। হাঁ, হাসান, তবে আমাদের মনােহর মিথ্যাগুলি পার্থির
সত্যের চেয়েও বড়।
৭২
গুলবেহেস্ত,
হাসান। তােমরা কেন সৌন্দর্য্যের গুণ গান কর ? কেন বল
, সৌন্দৰ্য্য সারহীন ফঁাপা জিনস ? কেন তােমরা
বল না, সৌন্দৰ্য্য বিক্রী হয় ?
ইসাক। একটি সুন্দরী তােমার দিকে একটি গােলাপ ছুড়ে
মেরেছে বলেই সৌন্দৰ্য্য সম্বন্ধে তোমার মনের সব
মােহ কেটে গেল ?
হাসান।
গত রাত্রে আমি চিনি জ্বাল দিতুম, তখন সে আমার
দিকে জল ছুড়ে দিয়েছিল ; আজ সকালে আমি সােণা
জ্বাল দিচ্ছি, এখন সে আমার দিকে গােলাপ ছুড়ে
দিল। শূন্য, শূন্য, বন্ধু, আমি বছি তােমাকে, এই
নীল আকাশ সব শূন্য !
ইসাক। ভুলে যাও তার কথা, চলে এস। রাজসভার আনন্দে
তােমাকে আমি দীক্ষা দেব।
হাসান। ভুলে যাব-ভুলে যাব ? হে সকাল বেলার, হে
সন্ধ্যে বেলার গােলাপ, তুমি বৃথাই আমার জন্যে
ফুটবে আর শুকোবে। এই গােলাপটি শুকিয়েছে,
এই গােলাপটি বিষতিক্ত, এরি মত সমস্ত জগৎ আজ
আমার কাছে বিষতিক্ত।
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
{ খলিফার প্রাসাদ সংলগ্ন বাগান। খলিফা, মূল্যবান পােষাক পরিহিত
হাসান, তার পাশে সম্মানসূচক তরবারি )
খলিফা। হাঁ, হাসান, প্রধান খোঁজা যা বলেছে তােমাকে তা
সত্যি। ভিক্ষুকদের রাজা তারি ঘরের ছাদে লুকিয়ে
ছিল, সেখানেই সে ধরা পড়েছে। আজ রাজসভায়
তার বিচার হবে, সেই রাজ সভাতেই যথাবিহিত
পােষাক পরিচ্ছদ পরে আজ তােমার প্রথম আবির্ভাব
হবে এবং রাজোচিত সম্মানে আমার দক্ষিণের স্থান
অধিকার করে ববে।
হাসান। হে পারস্য সূৰ্য্য, আপনার ভৃত্য অতি সামান্য লােক
এবং তার আকাঙ্ক্ষাও অতি কম। আমি সেই
প্রাচীন কবির উপদেশ মেনেই চলি। রাজসভায় মুখ
খেলার মতন, অথবা সম্মানসূচক পােষাক পরে
সভাসদদের মধ্যে বেড়ানাের মতন লােক আমি নই।
হুজুর, এসব আমাকে মাপ করবেন। আমি শুধু
মাত্র আপনার অনুগ্রহের ভিখিরী ; যে অবস্থায় থাকি
কেন, আপনার অনুগ্রহের সূৰ্যালােক এসে আমার
উপর পড়ুক, এসব জটিলতার মধ্যে আমাকে জড়াবেন
•
৭৪
গুবেহেস্ত,
। কিন্তু সন্ধ্যে বেলায় যখন বিধাতা আকাশে
গােলাপ ছুড়ে মারবেন, বুবুল যখন আনার বাগে
তান ধরূবে, সেই সময় উদ্যানে কিম্বা প্রান্তরে আপনার
পাশে আমাকে ডাকবেন, তখন ইসাকে আদেশ
দেবেন গানের পর গান গেয়ে যেতে, তখনই আপনি
যে দুনিয়ার মালিক আর আমি যে নীচ দোকানী সে
কথা ভুলে যাব, আমরা ডুবে যাব আকাশের আলােতে,
সৃষ্টির সত্তার মাঝে ; তখনই বুঝতে পারব আমরা,
তারায় তারায়, আকাশে মাটিতে, সাগরে ভূধরে কোন্
নীরব ভাষায় দিন রাত কাণাকাণি হচ্ছে ; বুঝতে
পাব উদ্যান তরুর পাতায় পাতায় কি বার্তা বইছে।
বুঝতে পারব, আমরা বাশাই হই আর ভিক্ষুকই
হই-উজীরই হই আর প্রজাই হই, প্রাণে প্রাণে,
মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে সুখ দুঃখ আশা আকাঙ্ক্ষার কোলে
আমরা সেই একই হাসি কান্নার জীব—মানুষ মাত্র !
খলিফা। ভয় নেই। আমি যেখানে তােমাকে থাকতে দেব
সেখানে টুট শান্তিতে তুমি দিন কাটাতে পারবে ।
যে পৰ্যন্ত না তােমার দাড়ী মাটীতে শিকড় গেড়ে
বসবে সেই পৰ্য্যন্ত বিনা বাধায় ধ্যানে মগ্ন থাকতে
পারবে। কিন্তু এই ব্যাপারে তুমি একজন সাক্ষী,
কাজেই আজ রাজ সভায় তােমাকে উপস্থিত থাকতেই
হবে, পরে আর থাক না থাক। সেইখানে আমি
গুবেহেস্ত, পারস্যের রাজা, কিম্বা দুনিয়ার মালিক কিম্বা আর যা খুসি তােমাদের, কিন্তু এই উদ্যানে তুমি হাসান, আর আমি তােমার বন্ধু হারুণ, এবং সেই বন্ধু ভাবেই আমাকে তােমার সম্বােধন কৰ্তে হবে। হাসান। (খলিফার হস্ত চুম্বন করিয়া) ও হুজুর, আপনি কোমল ভাবে কথা বলছেন, কিন্তু আমার ভয় যে আরাে বেড়েই যাচ্ছে। খলিফা। কিন্তু কেন ? আমি তাে নির্দয় লােক নই। আমি . সব কিছুতেই সাদা সিধা ভাব এবং সরলতা ভালল- বাসি, সে মানুষের ব্যবহারেই হােক কিম্বা আমার প্রাসাদের সাজ সজ্জাতেই হােক। প্রাসাদে আমার মেঝে দেখেছ--একটি মাত্র গালিচা পাতা এবং সে শ্যামল শস্পাবৃত মাঠের মত; সেখানে দেয়াল দেখেছ —তাতে একটি মাত্র পর্দা টাঙ্গানাে এবং সে পর্দায় আঁকা আছে সমুদ্রের উপর সূৰ্যাস্ত ; সেখানে আমার শুভ্র কক্ষগুলি দেখেছ—সব নগ্ন মৰ্ম্মর পাথরে তৈরী, তারা ময়ূরের মত পােষাক পরা রাজ সভাসদের অপেক্ষা করে আছে। কাজেই, মেঝে এবং দেয়াল সম্বন্ধে যদি আমি কদৰ্য্য জটিলতা বর্জন করে থাকতে পারি, হৃদয়ের ব্যাপারে কি তা আমি পারব না ? শুধু তােমার বন্ধুটি হয়ে কি আমি থাকতে পারব না, হাসান ? ;
গুবেহেস্ত,
হাসান। প্রভু, আপনার বন্ধুত্বটি আপনার প্রাসাদের তুল্যই
আমি বুঝতে পারছি, তাতেও সৌন্দর্য্যের সমস্ত মােহ
এবং বিস্ময়ের সমস্ত যাদু মাখানাে আছে। জানেন
তাে, বােগ্দাদের রাস্তার ভিখিরী আমি, সেখান থেকে
লােকে বলে—“ইয়া আল্লা, খলিফার প্রাসাদ ! তার
দেয়াল গুলাে যে সােণায় পেটানাে, তার ছাদ রূপায়
তৈরী, তার নর্দামাগুলো দিয়ে দিনরাত আতর
গােলাপের ধারা বইছে।” হুজুর, একটি মাত্র
বােখারার ভালাে গালিচা আমার ঘরের দেয়ালে
টাঙ্গানাে, এক বৎসর চিনি জ্বাল দিয়ে তবে ঐ
গালিচাটা কিনতে পেরেছি আমি।
খলিফা। গান এবং গালিচায় ভাের হ'য়ে আছ, তুমি আশ্চৰ্য্য
লােক। যখনি কোনাে গালিচায় তােনার পা পড়ে
তখনি তােমার চোখ নীচে নেবে গিয়ে তার কারু-
কাৰ্য দেখে ; যখনি কোনাে গান তুমি শােন তখনি
তােমার চোখ বুজে আসে। এমন মিঠাইওয়ালা কে
কোথায় দেখেছে ? হৃদয়-বন্ধু আমার, কাব্য কোথায়
শিখলে, ভাই ?
হাসান। সেই বড় শিক্ষালয়ে“বােগদাদের বাজারে। হে
দুনিয়ার মালিক, তােমার কাছে কাব্য হচ্ছে একটি
রাজোচিত সখ, কিন্তু আমাদের কাছে সে হচ্ছে নরক
থেকে মুক্তি। আল্ল। কাব্যকে কিতে সস্তা এবং
গুবেহেস্ত,
৭৭
বুঝতে সরল করেই সৃষ্টি করেছেন। যেন দিনেও
স্বপ্ন দেখতে পারে, আল্লা সেই ভেবেই মানুষকে
রাত্রিতে স্বপ্ন দিয়েছেন। যারা বেশী খাটে এ স্বপ্নের
দরকার তাদেরই বেশী। সারা বােগদাদ নগরীটি
কাব্যের জন্যে ব্যাকুল, হুজুর।
প্রতি সন্ধ্যায়
আস্সারির গান শুতে রাস্তায় রাস্তায় কি
ভিড় জমে যায়, জানেন তাে ? আমি দেখেছি
তা শুনে মুটেরা কেঁদেছে, মেথরেরা হাতে মুখ
লুকিয়েছে !
খলিফা। তা কি আমি জানি না, ভাই ? আর এও কি জানি
যে এরি মধ্যে ইস্লামের শক্তির গােপন রহস্যটি
রয়েছে ? গান, কথা ও কাহিনীর মধ্যেই তাে এই
নগরীর স্মৃতিটী অমর হয়ে থাকবে, যখন আমি
ধূলায় মিশে যাব, যখন বেয়ীনরা আমার বাগানে
তাদের কুটীর তুলবে এবং আমার প্রাসাদের ধ্বংসের
মধ্য দিয়া তাদের লাঙ্গল চালাবে এবং সমস্ত
বােগদাদ মাটিতে মাটি হয়ে যাবে তখনাে কাব্যের
মধ্যেইতাে সমস্ত বেঁচে থাকবে। আমাদের সময়ের
আরবের কাহিনী, উপন্যাসের ন্যায় রােমাঞ্চকর
শ্রুতি জগতের কাণে চিরদিন জাগিয়ে রাখবে, তুমি
তােমার সৌভাগ্যের জোরে খলিফার জীবন রক্ষা
করেছ হাসান, কিন্তু তােমার মুখের কথা দিয়ে
৭৮
গুলবেহেস্ত,
হারুণের বন্ধুত্ব অর্জন করেছ। বাস্তবিক কিন্তু
এমন মুগ্ধ হয়ে তুমি কি দেখছ ?
হাসান। কি সুন্দর ঝরণাটি, আর তার রূপালি জলজীব আর
নগ্ন বালকটি
খলিফা। আমার পিতা খলিফা এমাধির সময়ে একজন
গ্রীসের অধিবাসী এখানে এসেছিল, সে-ই এ ঝরণা
তৈরী করেছে। ঝরণা তৈরী হলে আমার পিতা
খুব খুসি হয়েছিলেন এবং শিল্পীকে জিজ্ঞেস্
করেছিলেন সে এরূপ আরাে তৈরী কর্তে পারে
কিনা। কাফের আনন্দে বলে উঠলে—“শত শত”।
তা শুনেই আমার পিতা হেঁকে উঠলেন—“কুত্তা
দিয়ে খাওয়াও এই শুকরকে।” তৎক্ষণাৎ
তাই করা হলাে, এবং তাতে এই ঝরণাটিই পৃথিবীর
সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে রইল।
হাসান। (ব্যথার সহিত) ও ঝরণা, তােমার মৰ্ম্মদেশ হতে
কি কখনাে রক্তস্রোত বয় না ?
খলিফা। কি হে, কি হ’লল, হাসান ?
হাসান। হে দুনিয়ার মালিক, আপনি এক অত্যাচার এবং
মৃত্যুর কাহিনী বললেন।
খলিফা। ( হঠাৎ অত্যন্ত রাগিয়া) একটা নগণ্য কাফের, তাকে
মারার জন্যে তুমি আমার পিতাকে অত্যাচারী
বলছ ?
৭১ বেহেস্ত, হাসান। (উপুর হইয়া পায়ে পড়িয়া গিয়া) আমি কোনাে দোষ মনে করে বলিনি। আপনার পায়ের কাছেই আমার জীবন। কিন্তু আপনিইতাে আদেশ দিয়েছিলেন আপনার সঙ্গে বন্ধুর মত কথা বলতে। খলিফা। ইসাক তাে আমার বহুদিনের বন্ধু, সেও আমার কাছে এমন ভাবে কথা বল্তে সাহস কর্তো না। (হােঃ হােঃ করিয়া হাসিয়া উঠিয়া) ওঠ হাসান। তােমার ধৃষ্টতারও বেশ একটা অপরূপ প্রচণ্ড সৌন্দৰ্য্য আছে, ঠিক হাতীর পিছন দিকটার সৌন্দর্যের মত। হাসান। ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন। খলিফা। সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা কচ্ছি। তবে, তােমাকে উপদেশ দিচ্ছি, ললিত কলার বাগান ছেড়ে কৰ্ম্মের রাজ- প্রাসাদের দিকে এগিয়ে এসাে না। রাজ রাজড়ার অত্যাচার নিয়ে তােমার মাথা ঘামিয়ােনা, শেষে জটিলতার বাতাসে তােমার মাথায় সর্দি ধরে যাবে। তােমার গান ও গালিচা নিয়েই থাক, হাসান, রাজনীতি চর্চায় মন দিয়ােনা। হাসান। (ম্লান ভাবে) মাথা পেতে মেনে নিলুম, হুজুর। খলিফা। একথা ভুলে যাও, আনন্দদায়ক জিনসের উপর মনস্থির কর। যার সামনে বসে আমরা এতক্ষণ কথা বলেছি, যা বাগানের এক প্রান্তে এনে ভােলা হয়েছে সেই ক্ষুদ্র শিবিরটী দেখেছ ? এটি তােমারি
;
৮০
গুলুবেহেস্ত,
আবাস, হাসান ; রাজনৈতিক কুটিলতার বহুদূরে এটি
তােমার জন্যে ঠিক করে রাখা হয়েছে।
হাসান। আমারি জন্যে ?
খলিফা ! তােমার মন বুঝে আমি এটি পছন্দ করে রেখেছি।
এখানে রাজপথ কিম্বা রাজপ্রাসাদ কিম্ব। রাজনীতি
কোনাে কিছুরই ভয় নেই—একেবারে পরিপূর্ণ
নির্জনতা সম্ভোগ—তবে শুধু রাজাটি তার দণ্ড মুকুট
ফেলে মাঝে মাঝে এসে হাজির হতে পারেন।
সান! ( উচ্ছাসের সহিত ) আমার এই ছোট্ট আলয়টি ?
আমার এই সুগন্ধি পুষ্পলতা বেষ্টিত তােরণটি ?
খলিফা। এতে ঘা দিয়ে দেখ না।
{ হাসান দরজায় ঘা দিল। দরজা খুলিয়া গেল এবং
অন্দার, উইলাে, জুপার এবং টম্স্ক, আবিভূত হইল।
সকলের ছােট টস্কের স্বর কতকটা ইঁদুরের মত }
ত। (উপুর হইয়া পড়িয়া খলিফার প্রতি হে বিশ্বাসীদের আমীর।
উই। (,
} হে অন্যায়ের দমনকারী।
জুপার। (স
,) হে ঈশ্বরের পার্থিব
প্রতিনিধি।
টম্। (,
১) হে পৃথিবীর ময়ুর !
অল্। (উপুর হইয়া পড়িয়া হাসানের প্রতি) প্রভু।
(,
,,) প্রভু! ..
।
গুলবেহেস্ত, ৮১ ১) O . জুপার। (, ,,) প্রভু! ট। ( ১) প্রভু! (তাহারা দাড়াইয়া হাতজোড় করিয়া রহিল) হাসান। কিন্তু এরা তাে ভিক্ষুকদের রাজার দাস। এরাই আমাকে স্নান করিয়ে গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছিল, এবং যে প্রাণ একটি স্ত্রীলােকের জন্যে দেহ ছেড়ে গিয়েছিল তা আবার ফিরিয়ে এনেছিল। খলিফা। এদের শিষ্ট, মার্জিত আদবকায়দা দেখে এদেরে আমি মারিনি, তােমারি জন্যে রেখেছি, কারণ এদের সেবার তােমার দরকার হতে পারে এবং তুমি তা পছন্দও করবে। হাসান। তাহলে আমার নূতন আবাসে আমাকে অভ্যর্থনা করে নিচ্ছে যারা, তারা আমার একেবারে অপরিচিত নয়। (জানু পাতিয়া খলিফার হাত চুম্বন করিল) খলিফা। কোনাে কথা বলাে না, কারণ আনন্দের লেখনী তােমার মুখের উপরেই কৃতজ্ঞতার গাথা লিখে দিয়েছে। ( দাসদের প্রতি) সব প্রস্তুত ? আঁক করিয়া) প্রস্তুত, হে ইস্লাম উদ্যানের মালী। উই। প্রস্তুত, হে ইসলাম গগনের - খলিফা। যথেষ্ট হয়েছে। তােমাদের প্রভুকে ঘরে নিয়ে যাও এবং ভিতরে যা আছে সব দেখাও, তার সেবা কর। যাও তাদের সঙ্গে, হাসান ; কথাবার্তার রসেই মন অল্। ৬
৮২
গুলুবেহেস্ত,
ডুবে ছিল, কিন্তু ওদিকে উজীর জাফর ঘণ্টা দুই
ধরে অপেক্ষা করে আছে। (হাসান সটান শুই
পড়িতে যাইতেছে, তখন খলিফা তাকে ধরিয়া তুলিয়া ) না,
হারুণ তার বন্ধুদের কাছ থেকে অন্য ভাবে বিদায়
নেয়।
( হারুণ হাসানকে আলিঙ্গন করিয়া চলিয়া গেলেন।
হাসান চিন্তান্বিত-তাহাকে দেখা যাওয়া পর্যন্ত সেদিকে
চাহিয়া রহিল। তারপর সে ঝরণার কাছে গিয়া মুহূর্তের
জন্য তাহা লক্ষ্য করিয়া দেখিল, তারপর শিবিরের দরজার
কাছে গেল ; অদার ও উইলাে তার জন্য দরজা খুলিয়া
ধরিল )
অল্। আপনার প্রবেশ সৌভাগ্যশালীর প্রবেশ হােক।
উইলাে। এখানে আপনার অবস্থিতি সুখের হােক!
জুপার। আপনার দিনগুলি শান্তিতে কাটুক !
টম্। আপনার রাতগুলি আপনাকে আনন্দ দিক।
দ্বিতীয় দৃশ্য
( শিবিরের মধ্যে ভিতরের কক্ষ। একটি বিছানা, .
চমৎকার আস্বাবপত্র। বাগানের দিকে একটি জানালা
খেলা। হাসানের প্রবেশ ; পিছনে তার দাসগণ )
হাসান। তাহলে ঐ ঘরে আমি আমার অতিথিদেরে অভ্যর্থনা
কব। কিন্তু এই ঘরে কাকে ?
অল্। যে সব সুন্দরীদেরে আপনার অনুগ্রহ বিলােতে ইচ্ছা
হবে।
হাসান। হা, হা! দাস যুবতীদের বাজার ঘুরে দেখতে হবে।
(মেঝের দিকে চাহিয়া চকিয়া) এটা কি ?
টম। গালিচা, হুজুর।
হাসান। ইস্পাহানের আশ্চৰ্য্য সুন্দর একটি নূতন গালিচা
শিকারের দৃশ্য আঁকা। রাজা, তার
সঙ্গীগণ। চিতাবাঘ, হরিণ আর তিনটা বাঘ, একটা
হাতী—শুধু তার মাথাটা। ওঃ, চমৎকার গালিচা।
সব জায়গায় লাল ফুল ফুটে রয়েছে। ওঃ, আশ্চৰ্য্য
গালিচা ! এমন লাল রংতত কোথাও দেখিনি।
{ হঠাৎ প্রকাশিত আন্তরিকতার সহিত ) বল না,
তােমরা তার দাস ছিলে ?
অল্। হুজুর।
হাসান। বেশ, বেশ, এ সম্বন্ধে কথা থাক্। ঝরণা হতে
জল পড়ার কি মধুর শব্দ হচ্ছে বাইরে।
দেখছি।
৮৪
গুলবেহেস্ত,
অল্। হুজুরে নিবেদন কচ্ছি। হাতীর দাতে আঁটা এই
আয়নাটিকে বিশেষ করে দেখতে বলেছেন খলিফা।
হাসান। (আয়নাতে নিজের আকৃতি দেখিয়া ) এ আল্লা! আমি
যে একেবারে নূতন মানুষ হয়ে গেছি।
উইলাে। খলিফা আশা করেছেন এই সুন্দর আসনটি
আপনার দৃষ্টিপথ এড়াবে না।
জুপার। খলিফা আশা করেছেন এই সব সজ্জিত প্রসাধনের
সামগ্রী আপনার প্রশংসা আদায় কর্তে সক্ষম হবে।
টম্। খলিফা আশা করেন এই সূক্ষম বেত্ৰদণ্ডটি আমাদের
সংশােধনের জন্য আপনি ব্যবহার করূবেন।
হাসান। বেত্রদণ্ড ? সুন্দর দাসগণ, তােমাদের সংশােধনের
জন্যে ? আল্লার সৃষ্ট সৌন্দর্য্যের গায় আমি কি
কালী লেপন করব ?
অল্। আপনি খুসি হয়েছেন, হুজুর?
হাসান ! খুসি ? জানালা দিয়ে ঐযে বকুল গাছটি দেখা
যাচ্ছে তার দিকে চেয়ে দেখ, কোনাে রাত্রে এটি
তার শাখা বাহু বিস্তার করে তার জ্যোৎস্নাললাকিত
পুষ্পরাজি আমার পায়ে অঞ্জলি দেবে। কিন্তু একা
কাটাবার স্থানতো এ নয়, আমাকে বাজারে যেতেই
হচ্ছে। যাকে আশ্ব তার বয়স খুব কম হওয়া চাই,
তারকক্ষের সব জিনস তাে এখনাে দেখা হয়নি।
এই তিনটি সিন্দুকে কি রয়েছে ?
৮৫
গুলুবেহেস্ত,
অল্। এই সিন্দুকে আছে আপনার নূতন পােক। একটি
মণিমুক্তা খচিত ।
হাসান। এমন দয়া কেউ কোথাও দেখেছে।
উইলাে। এই সিন্দুকে আছে পর্দা, গদি, এই সব।
হাসান। বেশ ! বেশ!
জুপার। এই সিন্দুকে আছে আপনার শয্যার জন্যে ধােলাই সব
রকমারি ঢাদর। সব কটিতে আপনার নাম আঁকা
আছে।
হাসান। আমার নাম আঁকা! আর তােমার কি বলবার
আছে, টমরক্স ?
টম্। ঐ শয্যা
হাসান। ঐ শয্যা তে সিন্দুক নয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে ওতে
পাতা চাদরটিতেও আমার নাম আঁকা আছে ?
টম্। ঐ শয্যায় একটি সুন্দরী নারী আছে।
হাসান। (লাফাইয়া উঠিয়া ) কি ?
টেম্। একটি চমৎকার সুন্দরী নারী। তিনি বল্লেন আপনার
সঙ্গে তার দেখা কর্তেই হবে, তার জন্যে তিনি
আমাকে দশ দিনার দিয়েছেন।
আসমানী। (হাসান শয্যার মশারি তুলিতেই) হাসান! ( তার
মুখে ঘােষ্টা)
হাসান। কার স্বর ?
আসমানী। হাসান। (ঘােষ্টা খুলিল)
গুলুবেহেস্ত,
হাসান। তুমি!
আসমানী। আমি এসেছিলুম, আমি লুকিয়েছিলুম, আমি
debted অপেক্ষা করেছিলুম।
হাসান।
কেন ?
আসমানী। পুরুষের শয্যায় নারী কেন লুকিয়ে থাকে ?
হাসান। ( ভীষণ ভাবে ) কোন্ সাহসে এলে তুমি !
( দাসগণের প্রতি) নির্বোধগুলাে, যা এখান থেকে।
( দাসগণ নিষ্ক্রান্ত) (আসমানীর প্রতি) কোন্ সাহসে
এলে ?
আসমানী। সুন্দরী নারীর কবার সাহস নেই, এমন কি
আছে ?
(গান)
খুপসুরৎ মুখের আবার
ভয় কি আছে কোন খানে ?
আড় নয়নে মুচকে হেসে
জয় করে সে ত্রিভুবনে।
মুখের মিষ্টি ছড়িয়ে দিলে,
ছুটে আসে সব দলে দলে !
আবার কেঁদে মান করিলে,
নিমেষ মাঝে পাথর গলে।
সাতখুন তাদের মাপ
ঠিক তুমি জেনাে মনে!
৮৭
গুলবেহেস্ত,
হাসান। কিন্তু এই নির্লজ্জত। বিশ্রীহীন। যাও তুমি,
সেলিমের কাছে ফিরে যাও।
আসমানী। আমি সেলিমকে ছেড়ে এসেছি।
হাসান। আমার কাছে আসবে বলে ?
আসমানী। সেলিম ভীরু, নিৰ্ব্বোধ। তােমাকে বুঝতে পারলুম—
রুচিসম্পন্ন, সৎসাহসী। আগে কি করে জান্ব
আমি বল ? কিন্তু তাতে কি হয়েছে ? ঐশ্বৰ্য্য
এবং ক্ষমতাকে অনুসরণ করবার মতন যথেষ্ট সুন্দরী
কি নই আমি ?(বাহু দুটি বিস্তৃত করিয়া) আমার এই
রূপলাবণ্য কি সেলিমের জন্যে ?
(আসমানীর গান)
এই সােণা মুখের মিষ্টি হাসি,
কারে বল বিলিয়ে দি ?
পটলচেরা চোখের আমার,
নজর হাব দিকে কার !
সুগােল এই বাহু দিয়ে,
বাঁধব কারে এ হৃদয়ে !
(জেনাে) আমার আছ তুমি বঁধু,
তােমার আছি আমি শুধু !
হাসান। আর কিছু বলে দরকার নেই, ফিরে যাও তার
কাছে। আমার চোখের সামনে দুনিয়াকে তুমি
কালাে করে তােল। সে যদি নির্বোধ, ভীরু হয়,
৮৮
গুবেহেস্ত,
তুমিও গণিকা ছাড়া কিছু নয়। যাও, নইলে আমার
দাসেরা তােমার মাথা নীচু করে তােমাকে সিড়ী
দিয়ে গড়িয়ে নীচে ফেল্বে।
আসমানী। আমি সেলিমকে ছেড়ে এসেছি কারণ দেখলুম সে
ভীরু, বােকা, গরীব, প্রতিপত্তিহীন। আমি তােমার
কাছে এসেছি কারণ তুমি ধনী, বিখ্যাত এবং সুরুচি-
সম্পন্ন। যেদিন তুমি রাজানুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হবে—
সেদিন বহু দূরবর্তী থাক্-সেদিন অবিশ্যি তােমাকেও
নিশ্চয় ছেড়ে যাব। সেদিন পর্যন্ত আমি তােমার
কাছে বিশ্বাস হারাব না। আমাকে যা বল তুমি
আমি তাই, কিন্তু আমি তােমার জন্যে সৌন্দর্যের
পণ্য সম্ভার নিয়ে এসেছি।
(গান)
জেনাে আমি সুখের পায়রা !
সাজিয়ে এনে রূপ পসরা,
দাড়িয়েছি তােমার কাছে,
বেচতে চাই নিজে যেচে !
যতদিন তব থাকবে কিছু,
ততদিন রব তােমার পিছু!
বুঝলে তাে আমার ধারা,
জেনাে আমি সুখের পায়রা !
হাসান। ধন্যবাদ, রূপবিক্রয়ােপজীবিনী! কলঙ্কিত রূপ আমি
বেহেস্ত,
ক্রয় করি না। তােমাকে অনুরােধ কচ্ছি, তুমি অন্য
কোথাও যাও, শীগগীর যাও।
আসমানী। (মুখ ঘষিয়া উঠিয়া) আমার রূপে যে কলঙ্ক পড়েছে
সে তাে জান্তুম না ! মুকুর তাহলে আমাকে
প্রবঞ্চিত করূছে বলতে হবে। কিন্তু পণ্যদ্রব্যের
হীনতা প্রতিপন্ন করতে আগে তাকে ভালাে করে
পরীক্ষা কৰ্তে হয়—দেখতে হয়, ছুতে হয়।
দেখবে, ছুবে ?
হাসান। (সরিয়া গিয়া) ওঃ, দূর হও, দূর
হও। আমাকে কেন
খুজে বের করূলে ? আমারি কথা আবার আমার
মুখের উপর ফিরিয়ে দেবার জন্যে ? অথবা নূতন
কোনাে সেলিমের আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে অঙ্কের পর
অঙ্ক দেখাতে চাচ্ছ ? আর যাই হােক, বালার
জলটা আমার উপর ফেললা না। আমার আগুন
নিবানাের অপেক্ষা রাখে না।
আসমানী। (ভূমিতে জানু পাতিয়া) ক্ষমা কর। খলিফার বন্ধুর
পক্ষে ক্ষমা করাটাই শােভন হবে। তােমার ঈর্ষাই
যদি জাগিয়ে থাকি তাহলে এখন নগ্ন আত্ম নিবেদনে
কি তার সমুজ্জ্বল প্রায়শ্চিত্ত কৰ্তে আমি উদ্যত নই ?
হাসান। ওঠ, ক্ষমা করেছি, চলে যাও। আবার বলতে হবে ?
আচ্ছা, অর্থের দরকার হয়ে থাকে, দাসগণ জরজায়
তা দেবে তােমাকে।
গুলবেহেস্ত,
আসমানী। ওঃ! তুমি কি পাথর ?
হাসান। তুমি নির্লজ্জা।
আসমানী। আমি সাহসিকা। যাই, বিদায়, বুঝলুম তুমি
প্রেমিক নও।
হাসান। বিদায়। তােমার ঐ কলঙ্কিত ঠোটে “প্রেম”
কথাটিকে আর অপবিত্র করােনা।
আসমানী। (দরজায় দেরি করিয়া) এ কথা ঠিক জেনাে,
প্রেমের ভাষা আমার কিছুই অজ্ঞাত নেই। যখন
পাপিয়া রাত্রিতে তােমার জানালার বাইরে বাতাসে
মৃদু আন্দোলিত বৃক্ষশাখায় বসে ডাকে এবং চঁাদের
গা থেকে গড়িয়ে তােমার মেঝেতে ছায়ালােকের
আলিঙ্গন খেলে যায়, তখন তােমার কোলে বসে
বুলবুলির চেয়েও মিঠা গান তােমাকে শুনাতে
পারতুম, চাদের মধ্যেও যা সম্ভবে না তা তােমাকে
দেখাতে পারতুম, তেমনি রূপালি শুভ্রতা।
হাসান। আঃ-যাও।
(গান)
আসমানী।
আমি বিলাস সাগরে লালসা তরণী,
বাহিয়ে তােমায় অসীমে নেব।
তােমার আপন হৃদয় শােণিতে
তােমারি মদিরা পিয়াল ভরিব
গুলবেহেস্ত,
৯৮
সুখের প্রদাহ—অতৃপ্ত পিয়াসা,
রাখিব জ্বালায়ে, না পূরিবে আশা !
জানি না প্রেম-দিব না তােমায়
সে কি দেয় সুখ ? সে যে গাে কাদায় !
সুখে মাতােয়ারা নাচিব গাইব,
তীব্রতম সুখে তােমায় মাতাব!
আসমানী। (কথায় ) আমি নিষ্ঠুর ছিলুম বলেই কি কোনাে
দিন আমার মন গলতে পারে না? যাও হাসান,
দাস যুবতীদের বাজারে, নিয়ে এস তােমার মনমত
একটি; কিন্তু একদিন বলবে—“হায় ! আসমানীর
প্রেমের ভাণ যে এই বােকার আন্তরিকতা থেকে
ঢের ভালাে ছিল।”
;
(গান)
ওগাে জেনে রাখ বুঝবে কখন
আমি তােমার চোখের আলাে ;
এমন রতন পায়ে ঠেলে
কাজ করনি তুমি ভালাে !
সতী প্রেমের প্যান্ প্যানানী
শুনে হবে জান হয়রাণ,
বলবে তখন ডাক ছেড়ে
কোথায় আমার তুমি আমান !
নকল চাটুনি চাবে তখন
(যবে) আসল হজম হয়না ভালাে!
১২
গুবেহেস্ত,
হাসান। আঃ! ছেড়ে যাও আমাকে।
আমানী। মাঠে মাঠে হাজারো পদ্ম আছে। বাগানে বাগানে
হাজারাে গােলাপ আছে—কিন্তু দুনিয়ায় আমার মত
ঠিক একটিই আছে। দুনিয়ায় মাত্র একটি এইরূপ
জোড়া ভুরূ আছে, যার নীচ থেকে এই রকম চাওনি
ঝলসে উঠছে, একটি মাত্র নাক আছে যা এই ভাবে
সােজা এসেছে, মাত্র এক জোড়া ঠোটই এই ভঙ্গিমায়
দুটিতে এসে মিশেছে। আমানের নীচে এমন
কিছু নেই যাতে ফুটে এমন হাসি রেখাটি, প্রেমিকের
মূর্তিমান মােহের মত গালে এই টোলটি, আর
প্রেমিকের চির আকাঙিক্ষত স্বর্গ আমার এই কুসুম
কোমল সমুন্নত বক্ষস্থল—তার কি কোথাও তুলনা
আছে ? (উপরের আবরণটি ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া)
দেখবে, ছুবে ? ( অগ্রসর হইয়া) হাসান ! দেখবে,
ছুবে ? (বাহু দিয়া হাসানকে জড়াইয়া) কেমন, ছুবে ?
(গান)
সুরভি কমল আননে আমার,
চাঁদের জোছনা অমিয়া মাখা।
ফুলশর ধনু ভুব্ধযুগ মম,
হরিণী নয়নে কাজল আঁকা।
রসে ভরা মাের রাঙ্গা ঠোট দুটি।
দশন মুকুতা হাসি রহে ফুটি,
গুলুবেহেস্ত,
৯৩
নিটোল কপােলে ফুটায়ে টোল,
প্রেমিক আদর চুম্বন পাগল!
হের সরস উরস ভূপতি শিথান!
স্পন্দিত, কোমল অতল স্বপন!
হের বাহুলতা জড়াতে তােমায়
আকুল অধীর—দিবে না কি তায়
পরশ তােমার?—এস এস এস
দেহ লহ প্রিয় বাঞ্ছিত পরশ।
হাসান। (চীৎকার করিয়া তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া) দাসগণ, সরাও
এই স্ত্রীলােকটাকে। (মুহূর্তে দাসগণ আবিভূত হইয়া
আসমানীকে সরাইয়া দিল )
আসমানী। ওঃ! তােমার দাসগুলাের দয়ামায়া নেই।
হাসান। (দাসগণের প্রতি ) ধরে রাখ এরে !
আসমানী। আমাকে যেতে দাও।
হাসান। যেতে দেব না।
আসমানী। বুঝলুম তুমি ভারি বেরসিক লােক, আমােদ
প্রমোেদ তােমার জন্যে নয়। যেতে দাও আমাকে।
(পলাইতে চেষ্টা )
হাসান। ধরে রাখ। ( দাসগণের প্রতি)
(অন্দার এবং উইললা প্রত্যেকে অমানীর এক একটি
বাহু চাপিয়া ধরিয়া রাখিল। আসমানী দাঁড়াইয়া আছে।
উপরের আবরণের নীচে যে ওড়না ছিল তাহা এখন
খসিয়া পড়িল। তার পারস্য ধরণে কাপড় পরা; নগ্ন
কোমড় দেখা গেল )
গুবেহেস্ত,
}
আসমানী। আমাকে কি করবে তুমি? তুমি তাে আমাকে
ক্ষমা করেছ।
হাসান। (আসানীর প্রতি) হুঁ, সেই অপমান এবং লজ্জা
সমস্ত আমি ক্ষমা করেছিলুম। আল্লার মর্জি হলে
তােমার যা ব্যবসা তা তিনি ক্ষমা করূবেন। কিন্তু
তুমি তােমার ঐ কদৰ্য্য শরীরটা আমার শরীরে
চাপিয়েছ—আমার গণ্ডদেশে তুমি তােমার নিশ্বাসের
বিষ উদগীরণ করেছ এবং বুকের চারিদিকে তােমার
ঐ সৰ্প বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরেছ। এখন তুমি মরুতে
প্রস্তুত হও, কারণ পৃথিবীর রাস্তায় রাস্তায় আর
ঘুরে বেড়াবে-মানব জাতীর পক্ষে তা নিরাপদ নয়।
আসমানী। (শান্ত ভাবে, কিন্তু ভয়ে) মরুতে ! কি বলছ তুমি!
, না ! খুন করবে, ওঃ !
হাসান। ঐ বারণার শব্দ শুনছ –ঝির ঝির করে ফোঁটা ফোঁটা
করে জল পড়ছে ? তােমার রক্তও তেমনি করে
পড়বে এবং আমার গালিচায় রক্ত পুষ্পের সংখ্যা
বাড়িয়ে তুলবে।
আমানী। ( নিজকে সামলাইয়া লইয়া) আমি ভয় করি না।
হাসান। তুমি কি দয়ার আশা রাখ ? দয়া আমি আমার
মিঠাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে এসেছি। এতদিন আমি
সাধারণ লােক ছিলুম, আমার প্রকৃতিও ছিল কোমল—
যে রকম মানুষকে সারা পৃথিবী এবং স্ত্রীলােক ঘৃণা
গুলুবেহেস্ত,
৯৫
করে। কিন্তু এখন আর আমি সকলের কাছে নিরীহ
বােকার মত থাকছি না। এখন সারা বােগদাদ
জাবে এবং বল্বে—“আমরা হাসানকে নিরীহ
গােবেচারা ব'লে জান্তুম, কিন্তু এখন ক্ষমতা
পেয়েই, যে আসমানী তাকে অপমান করেছিল, সে
তার মাথা কেটে ফেলেছে।” এ আল্লা, হাসানের
গাড়ী রাস্তা দিয়ে চল্লে এখন যে সকলের জানু আপনা
থেকেই ভেঙ্গে আসবে। আসমানী, শরীর শক্ত
কর, চোখ বুজ।
আসমানী । তলােয়ার দিয়ে নয়, তলােয়ার দিয়ে নয়।
হাসান। ক্ষমতার মদ আমাকে পান করতে দাও। আমি
এখন সর্বাঙ্গে জীবনের পূর্ণতা অনুভব করূতে চাই।
আমাকে তাদের একজন হতে দাও যারা জয় করে
তুড়ি মেরে চলে, কোনাে কিছুরই তােয়াক্কা রাখে না।
( তলােয়ার খুলিল, আসমানী চীৎকার করিয়া উঠিল) তুমি ।
আসমানী-গরীব, সুন্দরী, গর্বিত আসমানী; আমি
হাসান-ধনী, মত্ত, ক্ষমতাসম্পন্ন হাসান, তুমি
আমাকে আঘাত দিয়েছ, আমিও তােমাকে আঘাত
দেব, খেলার এই নিয়ম, এবং দুনিয়ার রীতিও তাই।
আমি কি তােমাকে ঘৃণা করি ? জানি না, জাম্বার
দরকারও নেই। আমি কি তােমাকে ভালােবাসি ?
তাহলে সেই ভালােবাসা এই ইস্পাতটিকে একেবারে
;
গুলবেহেস্ত,
তােমার মৰ্ম্মে নিয়ে পৌছিয়ে দেবে। তুমি হলে
দুনিয়ার গণিকার প্রতিনিধি ; আমি তােমার দেই
দুভাগ করব। (ঘা দিবার পূর্বে তলােয়ার আস্ফালন
করিল)
আসমানী। (একই সঙ্গে ভীত এবং বিজয়সূচক চীৎকার করিয়া)
আমি চোখ বুজ বনা! আমি তােমার দিকে চেয়ে
থাকব। আমার চোখের দিকে চেয়ে ঘা দিতে তােমার
সাহস হবে না ! ( হাসান অবাির তলােয়ার ঘুরাইল)
আমার চোখের দিকে চেয়ে এ কৰ্ত্তে তােমার সাহস
হবে না।
(হাসান ঘরের মেঝেতে তলােয়ার ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া
হাতে মুখ ঢাকিয়া শয্যায় লুটাইয়া পড়িল)
হাসান। আরে মিঠাইওয়ালা হাসান, তুই যা তাই যে রয়েছি।
( আমানী হাসানের নিকট আসিল। বালকেরা নীরবে
নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেল । হাসান আসমানীকে তারদিকে
আকর্ষণ করিয়া লইল এবং অসীম স্নেহাতুর কণ্ঠে বলিল)
আসমান!
তৃতীয় দৃশ্য
(রাজপ্রাসাদের প্রশস্ত কক্ষ। কক্ষটি সাদাসিধা, শুত্ৰ মৰ্ম্মর
প্রস্তরে তৈরী। রাজসভার পােষাক পরিয়া ইসাক
একা । প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ এবং শান্তিরক্ষক সহ
সৈনিকগণের প্রবেশ। সৈনিকেরা যুদ্ধ সঙ্গীত
গাহিতে গাহিতে প্রবেশ করিল)
দুর্জয় অরি জয় মাের করি মােরা পারস্য সৈন্য,
ব্যাঘ্রের মত ভীষণ আমরা ভালুকের মত বন্য।
পাহাড়ে পাহাড়ে চলি সারে সারে পার হয়ে যাই সিন্ধু
শত্রুরে মােরা সমূলে বিনাশি নাহিক করুণা বিন্দু।
ভারত হইতে স্প্যেনে মিশরে চালাই মােদের বাহিনী,
রক্ত আঁখরে জাতির ললাটে লেখা সে অতীত কাহিনী।
রক্ত বদলে বহাই রক্ত তাইতো আমরা গণ্য,
দুর্জয় অরি•••
• ইত্যাদি।
রেশমী আরাম জড়াইয়া মাের করিনা স্বদেশ রক্ষে,
বিপদেরে মােরা লইহে বরিয়া বাধন মুক্ত বক্ষে ।
মাথার উপরে আকাশের ছাদ কঠিন পৃথী শয়নে,
উজ্জ্বল দীপ জ্বলিছে সেখানে চন্দ্র তারকা তপনে,
সঙ্গিনী শুধু শানিত এ অসি শিয়রে সেবার জন্য
দুর্জয় অরি
ইত্যাদি।
অসি ধারণের শকতি রয়েছে পেশীবহুল এ হস্তে,
ক্ষমতা রয়েছে নিয়ে চলিবার ঋজু ঘাড় পরে মন্তে ;
ube
গুলবেহেস্ত, পূর্ণ জীবন সম্ভোগ বল রয়েছে এ দেহে চিত্তে, জীবন দিবারাে শক্তি রয়েছে নাচিয়া মরণ নৃত্যে । খােদাতাল্লা আর খলিফা ভিন্ন না মানি কাহারে অন্য, দুর্জয় অরি••• ইত্যাদি। সৈনিকগণ। আল্লা হাে আকবর ! খলিফাকি জয় । প্রশা। হে কাফেরের হাড়ভঙ্গকারীগণ, তােফা গানটি গেয়েছ তােমরা ! তবে, গৌরবহীন এই শান্তি রক্ষক একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস কর্তে চাচ্ছে—কোন্ দুর্জয় অরিকে জয় করে আজ এই বিজয় গানটি গাইলে? আমার অজ্ঞতা এম্নি অনন্যসাধারণ যে খলিফার সৈন্যগণ যে কখন বােগদাদ ছেড়ে গেল আর এল সেই খবরই পেলুম না! প্র-সৈ। বাগদাদ ছেড়ে আমরা যাইনি সত্য, কিন্তু হয়ত তাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছি, কারণ খলিফার শান্তিরক্ষকেরা যখন বিদ্রোহীদের ষড়যন্ত্র এতদিন নিরাপদে পেকে উঠতে দিয়েছে তখন ষড়যন্ত্র- কারীদেরে কেটে ফেলা আমাদের কর্তব্য বােধ করুলুম। সত্যি আমরা শুধু ভিক্ষুকদেরে দমন করেছি, কিন্তু যুদ্ধ ভিক্ষাই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য এবং তার জন্যে তারা প্রস্তুতও হয়ে উঠেছিল। তাদের আধাআধি আমরা হত্যা করেছি, বাকী অর্ধেককে বন্দী করেছি। আর শান্তিরক্ষকেরা যখন
গুলবেহেস্ত,
চাক্ষুষ প্রমাণ ছাড়া আর কোনাে প্রমাণকে প্রমাণই
মনে করে না, তখন তাদেরে দেখিয়ে দিলুম, জয়লাভ
করূলে যুদ্ধজয় গানটা অশােভন নয়।
প্রশা। আল্লা, এমন গান ! আমি ভেবেছিলুম বুঝি
. কাইরা দখল করে এসেছে।
প্র—সৈ। কাইররা দখল করার চেয়ে বােগদাদ রক্ষা করবার
মূল্য অনেক বেশী।
প্রশা। (বন্দী ভিক্ষুকদেরে দেখাইয়া) বিজিতদের বুৰ্ম্মচর্মের
দিকে একবার চেয়ে দেখ ।
প্র-সৈ। এটি একটি পুরানাে গান, জাতীয় গৌরবের গান, এই
গানকে বিদ্রুপ করে নিজেদের শিক্ষার অভাবই
সূচিত করা হচ্ছে।
ইসাক। এই কি পারস্য রাজসভার উপযুক্ত কথাবার্তা নাকি,
প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ ? আপনারা বােগ দাদ রক্ষা
করেছেন ?: বােগদাদ আর রক্ষা করবার উপযুক্ত
নয়।
{ ঘোষণাকারীর প্রবেশ, সে ঘোষণা করিয়া এক
একজনকে ঢুকাইতে লাগিল আর ইসাক
তাহাদিগকে অঙ্গুলি নির্দেশে যথাস্থানে বসাইতে
লাগিল }
ঘােষণাকারী। দরবারে সব লােক এসেছেন। আবুসৈদ
বসুরার রাজা। ফহরদ্দিন—ডামাস্কাসের রাজা।
গুলুবেহেস্ত,
অল্ মুছটানসির-কোনিয়ার রাজা। তাহির ধুল
যমিনায়স-খােরাসানের শাসনকর্তা। টুকীর বিখ্যাত
পালােয়ান জুরগীজ খান, যার উরুদেশের ব্যাস তিন
হস্ত পরিমিত। আবু নােয়াজ-খলিফার বিদূষক।
চীনদেশের প্রধান দার্শনিক হাং উয়াং এ স্থানের
অধিবালীদের রীতিনীতি পৰ্যবেক্ষণ কৰ্তে এসেছেন,
তার বয়স একশ’ দশ বছর। ভ্রমণশীল দরবেশ
আবুল আসল এখানে এসেছেন রাজাদেরে মনে
করিয়ে দিতে যে তারা শুধু ধূলােমাটি।
ইসাক। তবে দরবেশদের মামুলি বুলিতে রাজারা আর ধূলি
হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রাখে না।
ঘােষণাকারী। ঘাতক মশরুর এসেছে এখানে, কয়েকজন
ভিক্ষুককে ধূলি সমষ্টিতে রাজাদের সঙ্গে সমতা দিবার
জন্যে।
ইসাক। হেঁড়া কাপড়ে বেচারীরা বাতাসে কাঁপছে।
ঘােষণাকারী। হাসান বেন হাসান অস, বােদাদী-খলিফার
বন্ধু।
সৈনিকগণ। জয় হাসান বেন, হাসান বােদাদীর জয় ।
ইদাক। (হাসানকে একপাশে নিয়া) এখানে এস, খলিফার বন্ধু ।
ভুলে যেয়াে না যে তুমি ভাঙ্গা বাঁশীর মানুষ।
হাসান। বন্ধু কাকে বলে ?
ইসাক। অনুগ্রহ পাওনি তুমি ? খলিফা তােমাকে শেখান নি ?
তুমি তাে রাজবন্ধু।
গুলুবেহেস্ত,
১০১
হাসান। তিনি দাতা, তিনি দয়ালু, তিনি অন্তরঙ্গ। তিনি
আমার বাহুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছেন, আমাকে
আলিঙ্গন করেছেন এবং আমাকে বন্ধু বলে
ডেকেছেন, কিন্তু তার চোখের সামনে আমি কেঁপে
ইসক। তুমি বুঝে নিয়েছ। কোনাে মানুষই কোনােদিন
তার বন্ধু হতে পারে না।
হাসান। তার কারণ তিনি মনুষ্যজাতির অনেক উপরে।
ইসাক। তা নয় ; তার কারণ তিনি তার ক্ষমতা ব্যবহার করে
থাকেন মানুষের জীবন নিয়ে শিল্পীর খেলা খেতে।
হাসান। কি বলছ তুমি, ইসাক ?
ইসক। হাসান, ছেলেপিলেরা যেমন মাটির খো ভেঙ্গে
ফেলে, খলিফার খেয়ালে সেইরূপ অনেক নিরুপায়
মানুষের জীবন যেতে দেখেছি আমি; তিনি ক্ষমতা
ও লালসার রক্তিমা দিয়া জীবনকে অনুরঞ্জিত করে
তুলতে ভালবাসেন।
হাসান। তিনি এমন উদার, অত্যাচারী তিনি কি করে
হ'তে পারেন ? মানুষের যন্ত্রণায় তার আনন্দ হতে
পারে এ তাে আমার মনে হয় না !
ইসাক। কুর্দিস্থান থেকে আনা নূতন সিন্দরী রঙে চিত্রকরের
যেমন আনন্দ, হৃদয়-যন্ত্রণায়ও খলিফার তেমনি
আনন্দ। তার কাছে হৃদয়-যন্ত্রণার রঙটিও খুব
১০২
গুলবেহেস্ত,
সুন্দর। কিন্তু এত বড় শিল্পী বিরুদ্ধতার সৌন্দৰ্যটিও
সম্ভোগ না করে পারে না। এ দৃশ্য খলিফাকে
দিয়েই সম্ভব হয়ে উঠতে পারে; আর তা হয়েছে
এই কক্ষেই আমি দেখেছি।
হাসান। কিন্তু তুমি তাে তার বন্ধু।
ইসাক। তুমি যেমন। সম্রাটের পক্ষে নীচে নেবে আসাটা
দেখতে বড় সুন্দর ; সম্রাটের পক্ষে মানুষের সঙ্গে
সাদাসিধে মানুষ হয়ে কথা কওয়ার মধ্যে একটা!
সৌন্দৰ্য্য আছে। বিরুদ্ধতার সৌন্দৰ্য্য সম্ভোগ এবং
রাজসভার মামুলী রীতিনীতির হাত এড়িয়ে যাওয়ার
মধ্যে সম্রাটের পক্ষে শিল্পীণতার পরিচয় আছে।
কিন্তু ঐ আসছেন খলিফার অগ্রগামীটি, যিনি মহৎ
অথচ যাঁর আবেগ নেই, যিনি বুদ্ধিমান অথচ যাতে
প্রতিভার প্রেরণা নেই এবং কৃপণের মদের মতন
যিনি একেবারে ফিকে।
ঘােষণাকারী। পারস্য শাসনতন্ত্রের দক্ষিণ হস্ত, পারস্য সূর্যের
চন্দ্রবিশেষ—উজীর জাফর।
সৈনিকগণ। জয় উজীর সাহেবের জয়।
ঘােষণাকারী। আমার ছাড়া সকলের মুখ বন্ধ হােক।
( তার দণ্ড তুলিয়া) পবিত্র, সুবিচারক, সমুচ্চ বংশজাত,
সর্বশক্তিমান, ইসলাম মালঞ্চের মালাকর, রাজকীয়
অরণ্যানীর সিংহ, নিষ্কলঙ্ক অশ্বের আরােহী, সােণালী
গুলবেহেস্ত,
*•.
পাহাড়ের দেবদারু,
দেবদারু, ভল্লবর্শার প্রভু, অন্যায়ের
প্রতিবিধানকারী, রক্তপায়ী, দুনিয়ার ময়ুর, খােদা-
তাল্লার পার্থিব ছায়া, স্বধর্মীদের সৈন্যাধ্যক্ষ, খলিফা
হারুণ অল রসিদ বেন মহহ্মদ, ইবন্ আবদুল্লা ইবু
মহহ্ম ইন্ আলিবেন্ আবদুল্লা, ইবন্ আব্বাস।
সৈনিকগণ। জয় খলিফার জয়-জয় হারুণ অল রসিদ বেন
মহহ্মদ ইবন্ আবদুল্লা কালিফের জয়।
দরবেশ। (মানভাবে) মাটির ঢেলা, খেলানা, ছায়াসম অসত্য
খলিফা। দুনিয়াতে খােদাই একমাত্র সত্য-আর
সব মিথ্যা।
(গান)
না ঘর মেরা না ঘর তেরা
চিড়িয়া বসন্ সার !
কঙ্কর পাথর চুন্ চুন সব
বানায়া কাহা মেরা ঘর !
কাহাছে আয়া, যাওগে কাহা,
কব, কুচনেই ঠিকানা।
বাদা গরীব সবিকে। ইহাল ।
কিসিকো ইছে নেই বাচ না !
দোরােজক্যা দুনিয়াদারি
বহুরূপীকা সং যেয়ছা।
যব তক রহে খাটি রহহ
ভজন কর পরমাত্মা।
;
• -
০৪
গুলুবেহেস্ত,
মুখ বন্ধ
খলিফা। রাজসভা আরব্ধ হইল, আমার মুখ ছাড়া সকলের
বন্ধ থােক। তলােয়ারের আঘাতের মত
আমাদের বিচার আজ দ্রুত নিষ্পন্ন হবে। “শাসকদের
বিজ্ঞ” নামক পুথিতে আছে-“ষড়যন্ত্রের তরু
সমূলে
উৎপাটিত করিবে, কারণ ইহার বীজ
বহুদূরে ছড়াইয়া পড়ে।”
সকলে। কেরামৎ ! কেরামৎ!
খলিফা। তােমরাই ভিক্ষুক ?
ভিক্ষুকগণ। আমরা বােগদাদের ভিক্ষুক।
খলিফা। মুখপাত্র, এদিকে এস। তুমি আমার সিংহাসন
এবং ইলামের বিরুদ্ধে কেন ষড়যন্ত্র করেছিলে ?
মৃত্যুর এবং মৃত্যুর পরের ভয় কি তােমার ছিল না ?
ভিকুক। দুনিয়ার মালিক, কখনাে গরীব হয়ে দেখেছেন,
ক্ষুধার্ত হয়ে দেখেছেন ? রাজবাটীর দেয়ালের বাইরে
পড়ে উপবাসী লােকের মাথায় কি সব কল্পনা
আসতে পারে পরীক্ষা করে দেখেছেন?
খলিফা। তুমি কি ষড়যন্ত্র অস্বীকার কচ্ছ?
ভিক্ষুক। আমি ষড়যন্ত্র করিছি।
খলিফা। তােমরা কেউ ষড়যন্ত্র অস্বীকার কচ্ছ? (সকলে
নীরব ) মঞ্জুর, ষড়যন্ত্রকারীদের
মৃত্যুর আদেশ
হ’লল। নিয়ে যাও এখান থেকে। (ভিক্ষুকদের
লইয়া মশুরুর নিষ্ক্রান্ত) ভিক্ষুকদের রাজা বলা হয়
গুলুবেহেস্ত,
যাকে, তাকে কারাগার থেকে আনা যাদের কর্তব্য,
তারা সেই কর্তব্য পালন করুক। আর তাকে
জীবন্ত বন্দী করার সম্মান যার তিনি এগিয়ে আসুন
সম্মুখে।
প্রশা। (অগ্রসর হইয়া) দুনিয়ার মালিক, আমি অধম ভৃত্য।
প্র-সৈ।
( অগ্রসর হইয়া) দুনিয়ার মালিক, আমি দাসানুদাস।
খলিফা। তাকে বন্দী করাতে কি তােমাদের দুজনের কৃতিত্ব
প্রকাশ পেয়েছে ? তােমাদের উপর আমার অনুগ্রহ
দ্বিগুণিত হ’লল, এখানে আমার সিংহাসনের দুটি
সম্মানের পােষাক আনা হােক।
প্রশা। হুজুর, এখানে সাময়িক লােকটির উপস্থিতির কোনাে
কারণ আমি বুঝছিনা। ভিক্ষুকদের রাজাকে যখন
আমি তার ছাদ থেকে টেনে বের করি তখন এ ব্যক্তি
দর্শকমাত্র ছিল।
প্র-সৈ। হুজুর, লােকটির আবরাম লাথি বৃষ্টি সত্ত্বেও আমি
সাহস করে তার পা জড়ায়ে ধরি আর এব্যক্তি
শুধু তার কাপড় চোপড় ধরে টানাটানি করেছে।
প্র-শা। কাপড় ধরে টানাটানি, ব্যাটা হতচ্ছাড়া! এই
হংলাপপাড়া কাঠটিতে দুচার ফেঁটা রক্ত থাকলে
লজ্জায় তা তাের গালে উঠা উচিত ছিল।
প্র-সৈ। ব্যাট। শােথরােগী, হাতী!
খলিফা। যথেষ্ট হয়েছে ! বীরের কথাই আমি শুনতে ইচ্ছা
গুলবেহেস্ত,
করি, আর নয়! পরিস্কার বােঝা যাচ্ছে, গৌরব :
ভাগ হয়ে গেছে। একটা পােষাক দাও আমাকে,
আর রাজ দড্ডিকে ডেকে দাও।
রাজদর্জি। (অগ্রসর হইয়া সটান পড়িয়া গিয়া) হে দুনিয়ার,
মালিক—হে সাহান্ শা বাশা!
খলিফা। এই পােষাকটিকে দুভাগ করে দাও তাে।
রাজদজ্জি। (কাটিতে কাটিতে বিলাপ করিয়া) এ আল্লা! এমন
সুন্দর পােষাকটি—এমন বহুমূল্য রেশম !
খলিফা। দুজনেই এখানে এস।
প্র-সৈ। (সরিয়া দাঁড়াইয়া) গৌরব এক। শান্তিরক্ষকেরই।
এ সম্মান একা আমার বন্ধুরই প্রাপ্য।
খলিফা। (জি করিয়া) দুজনেই এস এখানে। (খলিফা উভয়েরই
গায়ে এক একটি অৰ্দ্ধ পােষাক পরাইয়া দিল—সকলের,
হাসি)
সৈনিকগণ। খলিফা যাদের সম্মানিত কলেন, তাদের জয়
থােক।
খলিফা। এখন ভিক্ষুকরাজকে নিয়ে এস। ( হাতে পায়ে-
শিকল দেওয়া ভিক্ষুকরাজকে নিয়া আসা হইল—এখনো,
তার রাজপােষাক ) গত রাত্রির আতিথ্যপরায়ণ
গৃহস্বামীকে সেলাম।
রফি। সেলাম, বারার অধিবাসী। সঙ্গী বণিককে প্রধান
উজীরের পােষাকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সেই
গুবেহেস্ত,
কাফী, সেই কদৰ্য কাফ্রীটা যেন অনুপস্থিত।
হাসানকে তার উন্নতির জন্যে আমি আনন্দ জ্ঞাপন
কচ্ছি।
খলিফা। এখন তুমি রাজার মত ধৃষ্টতার সহিতই কথাবার্তা
বছ, কিন্তু তােমার প্রজাগণ এখন তােমার হাতছাড়া
হয়ে গেছে, তারা শীগগীরই দেয়ালের পাশে দেবদারু
বনের কালাে কাক হয়ে যাবে।
রফি। হে বাজাবাসী, যাকে লােকে খলিফা বলে অভিহিত
করে থাকে, কাল রাত্রে যদি তােমাকে চিতুম,
হে ভালাে লােকের হত্যাকারী, যদি চিতুম
তােমাকে, হায়! যদি চিতুম !
প্রশা। ওর জিষ্টা কেটে ফেল্ব ?
খলিফা।
ওকে কথা বলতে দাও। অন্তত একজনকে পেয়েছি
যে আমাকে তােষামােদ করেনা। ওর চোখে
পরিস্ফুট ঘৃণার ছবিটি আমি লক্ষ্য করে দেখতে
চাই।
রফি। দুনিয়ার সিকি অংশকে কুশাসিত করেও তােমার তৃপ্তি
নেই, ঘৃণ্য অত্যাচারী, হীন বণিক, পশু-হৃদয় গুপ্তচর
কোথাকার!
জাফর। হুজুর, এই লােকটাকে আর প্রশ্রয় দেওয়া মােটেই
শােভা পায় না। এখনি এর মাথা কেটে ফেলা
হােক।
১০৮
গুবেহেস্ত,
খলিফা।
সময়মত হবে। ( রফির প্রতি) তােমার ধৃষ্টতায়
তােমার কোনাে সুবিধা হবে না, রফি। দুৰ্বিনয়ের
জিভকে বিবেচনার দণ্ড দিয়ে চেপে ধরনা কেন ?
রফি। মৃত্যুর সম্মুখে এসে যে পঁড়িয়েছে, আমি সেই।
খলিফা। হাজারাে পথ আছে মৃত্যুর-কেউ যায় সােজা পথে,
কেউ বাঁকা পথে ।
রফি। মার, কাট, পুড়—যা খুসি তােমার। উদ্দেশ্য মহৎ
হলে তাতে অকৃতকাৰ্য্যতাও কম গৌরবের নহে।
যাদের নিষ্ঠুর মৃত্যুর কারণ আমি হয়েছি, তাদের
প্রত্যেকের যন্ত্রণা পৃথক ভাবে আমি যেন ভােগ করি।
চীন দার্শনিক। আমার একশ’ দশ বছর বয়স হয়েছে, এমন
মহৎ উক্তি জীবনে আমি কখনাে শুনিনি।
খলিফা।
কিন্তু তােমাকে সেই নিষ্ঠুর মৃত্যু
দিবার আগে এই পৃথিবীতে এবং পরে তােমার
বিবেক যাতে পরিতৃপ্ত থাকতে পারে, সেই জন্যে
তােমাকে জিজ্ঞেস্ করছি, উত্তর দাও;
উত্তর দাও; আমার
ভৃত্যগণের তৎপরতা তােমার আলিঙ্গন হতে যাকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেছিল, সেই যুবতীটিকে কি তুমি
ভুলে গেছ ?
রফি। সয়তান! আমি ভুলে যাব ? তােমারি ভুলে যাওয়া
কি আমি সর্বান্তঃকরণে চাইনি ?
খলিফা। সাহসী প্রেমিক কি তার সুন্দরী দয়িতাকে ভুলে
গুবেহেস্ত,
১০৯
যেতে পারে ? যার জন্যে ইসলামের কেন্দ্রীয় দুর্গকে
তুমি ভূমিসাৎ কৰ্তে চেয়েছিলে, তাকে আমরা
দেখতে চাই। (অনুচরদের প্রতি। সুন্দরী পরিবানুকে
নিয়ে এস।
রফি। (বিনীত অনুনয়ে) ও, দুনিয়ার মালিক! ওঃ, মানবের
ভাগ্যবিধাতা!
খলিফা। সুর যে বড় হঠাৎ বলে গেল, কিন্তু এখন আর
তাতে লাভ নেই।
রফি। হে ইসলাম সূৰ্য, আমার ক্রোধ এবং মৃত্যুর আড়ালে
পড়ে তার কথা সকলের মন থেকে দূর হয়ে যাবে
সেই আশা করেছিলুম আমি।
খলিফা। অশিষ্টতার বেশ অজুহাতটি হাজির করা হয়েছে। যে
অত্যাচারীকে জীবন্ত কবর দেবার মতলব করেছিলে
তার কাছে কি এখন ভদ্র ভাবে কথা বলবে ?
রফি। আল্লা আমাকে অন্ধ করে দিন যেন তাকে আমি
দেখতে না পাই।
খলিফা। কেন? এখনাে কি তাকে তুমি ভালােবাসনা ? যে
তৃষ্ণায় ময়ূতে যাচ্ছে তার কাছে ঝরণার ছবিটি যেমন,
আসন্নমৃত্যু লােকের কাছে তার প্রিয়তমার ছবিটিও
কি তেমনি লােভনীয় নয় ?
হাসান। (স্বগত) কিন্তু সেই ঝরণায় যদি জলের বদল রক্ত
বইতে থাকে ?
১১০
গুলুবেহেস্ত,
রফি। তুমি, তুমি তাকে তােমার বাহুদিয়ে আলিঙ্গন করেছ।
ওঃ আল্লা, আর যন্ত্রণা দিও না।
খলিফা। কিন্তু এ জেনেও তুমি তার প্রতি আকাঙক্ষা ত্যাগ
করনি, তার চোখের একটি দীপ্ত চাওনির জন্যে
তুমি বােগদাদ ধ্বংস করতে যাচ্ছিলে।
রফি। কিন্তু আগে যার কবলে পড়েছিল সে, তার রক্তে স্নান
করিয়ে তার অপবিত্রতা দূর করে নিতুম।
খলিফা। তুমি ভারি হাস্স্কর মানুষ দেখছি ! রঙ্গিন ধোঁয়ার
ভিত্তির উপর দেখছি তুমি তােমার অপরাধের প্রাসাদ
তুলতে যাচ্ছিলে। তুমি কি মনে কর আমি আমার
বাগানের সমস্ত ফলই চেখে দেখেছি ?
রফি। আল্লার নামে শপথ করে সত্য কথা বল, খলিফা।
খলিফা। আমার উৎসাহী কৰ্ম্মচারীরা যে সব দাস যুবতীরে
ধরে আনে তার প্রত্যেকটিকে কি আমি চিনি ?
আমার জানামতে তে তােমার এই যুবতীটিকে আমি
চক্ষেও দেখিনি।
ঘােষণাকারী। কুমারী পরিবানু।
খলিফা। আমার সম্মুখে আন তাকে।
(পরিবানুকে খলিফার সম্মুখে অনা হইল )
পরিবানু। ( যথাবিহিত সম্মান দেখাইয়া) ওঃ, দুনিয়ার মালিক।
খলিফা। ধৰ্ম্মপুস্তকে রয়েছে, রাজার সামনে স্ত্রীলােকের
ঘােষ্ট। খুলতে পারে, তাতে কোনাে দোষ হয় না।
বেহেস্তু,
পরিবানু। কিন্তু, হুজুর, শুধু ঈগল পাখীই সূৰ্যের দিকে
চাইতে পারে।
খলিফা। তােমার উক্তিটি খুব গর্বিত বলতে হবে; পরিবানু,
আর আমার সন্দেহ নেই, বিপদের ঝলসানাে আলাের
সম্মুখেও তােমার আঁখিযুগল আশ্চৰ্য্য স্থির হয়েই
আছে—সেই আঁখি দুটি আমি দেখতে চাই। ঘােটা
খুলবার আদেশ দিতেই হবে আমার।
পরিবানু। হায়, দুনিয়ার মালিক, বহুদিন মণিখচিত খাঁচায় বদ্ধ
থাকার দরুণ সে চোখে কালী:পড়েছে, আর আমার
প্রাণের ডানা আড়ষ্ট হয়ে আছে। আকাশের তরুণ
সূর্যেরে আলয় যেখানে, সেই আমার দেশের সমুচ্চ
পাহাড়েই শুধু আমার স্বজাতি মেয়েরা ঘােটা খুলে
বেড়ায় ।
ইসাক ।
( আত্মগত ভাবে, অৰ্দ্ধগানের সুরে) পাহাড়, পাহাড়--
তরুণ সূর্যের আলয়, পাহাড়।
খলিফা। (পরিবার প্রতি। ঘােষ্টা খুলতে তােমাকে আমি
আদেশ দিচ্ছি।
পরিবানু। আপনি যদি আমার মুখ থেকে জোর করে ঘন্টা
খুলে ফেলেন তাহলে আপনার চোখের সামনেই
আমি নখে আমার চোখ উপড়ে ফেলব।
রফি। না, না !
পরিবানু। কে তুমি বল্ছ “না, না?” কে তুমি শৃঙ্খলাবদ্ধ
হাতে মুখ লুকোচ্ছ ?
গুলবেহেস্ত,
রফি। একজন বন্দী।
পরিবানু। স্বর লুকোচ্ছ ?
রফি। একজন বন্দী মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে।
পরিবানু। ছুতে কেঁপে উঠছ ?
রফি। একজন ভীত লােক।
পরিবানু। (উল্লাসের স্বরে) তােমার জন্যে আমার ঘােষ্টা
খুলছি; এবং হে বন্দী, তােমারি অদৃষ্টের ভাগ নেব
ব'লে অপেক্ষা করে আছি।
হাসান। ওঃ, ইসাক ! সুন্দরীর হৃদয় নিহিত অগুন।
রফি। স’রে যাও আমার কাছ থেকে, পরিবানু ! আমার
পথে এসে দাড়িয়াে না, জানােনা আমার জন্যে কি
ভীষণ দণ্ড অপেক্ষা করে আছে।
পরিবানু। ভীষণ দণ্ড ? ভীষণ দণ্ড ? রফি, এখন তােমাকে
দেখেছি। এখন হাজারাে বৎসর ভীষণ দণ্ড সইতে
পারি আমি।
রফি। তােমাকে মুক্ত কর্তেই আমি খলিফার রাজত্বের বিরুদ্ধে
ষড়যন্ত্র করেছি। আমার দোষেই তাতে কৃতকাৰ্য্য হইনি,
আমার দোষেই আমার হাজার হাজার ভক্ত আজ মৃত।
পরিবানু। আমার জন্যে তুমি ষড়যন্ত্র করেছিলে ? আমার
জন্যে-আমার জন্যে ?
রকি। আবার তােমার ঠোটে চুমাে খেতে আমি বােগদাদ
সহরকে রক্তে স্নান করাতুম।
বেহেস্ত,
পরিবানু। ও আমার প্রেমিক।
রফি। (তার শৃঙ্খলাবদ্ধ হস্ত দেখাইয়া প্রেমিকই বটে-শৃঙ্খলাবদ্ধ
প্রেমিক।
পরিবানু। হে আমার প্রিয়তম, চারিদিকে সহস্র চক্ষু রয়েছে,
কিন্তু তাতে কি ? আমি রাজপ্রাসাদের ক্রীত দাসী,
তুমি আমার প্রেমিক-শৃঙ্খলাবদ্ধ বন্দী। (তাহাকে
আলিঙ্গন করিয়া) আমরা চিরন্তনের ডাক শুনেছি,
চারিদিকের ক্ষণস্থায়ী অবাস্তবকে আমাদের লজ্জা
নেই। হে প্রেমিক আমার, সহস্রের মধ্যে শুধু
তােমার ওষ্ঠ দুটিই আমি দেখছি, সহস্রের মধ্যে
তােমার চক্ষু দুটাই আমার চোখে পড়ছে, আর সব
স্বপ্ন, সব অস্তিত্বহীন, সব ছায়া।
রাজসভাসদ। এ নেহাৎ বিধর্মীর মত কথা হলাে। আমাদের
ধৰ্ম্মেতে এ বলে না।
ইসা। চুলােয় যা তােমার ধর্ম।
জাফর। এ যে কুফী মতু, রাজ্যের পক্ষে ভারি বিপজ্জনক।
হাসান। তাহলে চুলােয় যাক্ রাজ্য।
খলিফা। পূর্ণ রাজসভায় তুমি প্রেম কচ্ছ—এ পৃথিবীর শব্দ
কি তােমার কাণে পেঁৗছবে ?
পরিবানু। ওহে রফি, তুমি পৃথিবীর অবাস্তব স্বপ্নজালে যখন
কতকটা জড়িত হয়ে পড়েছ তখন আপাতপ্রতীয়মান
তােমার কোনো কোনাে কাৰ্য্য সম্বন্ধে আমি কয়েকটা
১১৪ গুলবেহেস্ত, প্রশ্ন কর্তে চাচ্ছি। প্রথমতঃ, তুমি কি অস্বীকার কৰ্ছ যে তুমি নিজে “অবিশ্বাসীদের খলিফা” এই নাম নিয়েছ এবং নিজ ধৰ্ম্মকে আশার সম্মুখে এবং আমার সঙ্গীগণের সম্মুখে নিন্দা করেছ ? রফি। আমার অস্বীকার করবার কিছুই নাই। খলিফা। দ্বিতীয়তঃ, বিশ্বাসীদের খলিফাকে জীবন্ত কবর দিবে এবং বােগদাদ অধিকার করবে এই প্রতিজ্ঞা করেছিলে তা কি অস্বীকার করছ ? রফি। কিছুই অস্বীকার করছি না। খলিফা। তৃতীয়তঃ, একটি স্ত্রীলােকের জন্যে তুমি এই ভীষণ ষড়যন্ত্র করেছিলে তা কি অস্বীকার কচ্ছ ? সব স্বীকার কচ্ছি। খলিফা। রফি, তুমি স্বীকার কলে তুমি স্বধৰ্ম্মদ্বেষী, বিশ্বাস- ঘাতক, বিকৃতমস্তিষ্ক পাগল। এখন তােমার শাস্তি সম্বন্ধে বিচার করা যাবে। যেমন খুসি দাও। খলিফা। তুমি সাহসী কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, অবাস্তব লৌহশলাকার খোঁচাও বেশ বিধবে তােমাকে। কিন্তু তােমার উপযুক্ত শাস্তি এক রকমের মৃত্যু নয়, হরেক রকমের ! ভাবছি, আমি ষড়যন্ত্রের জন্যে যদি তােমাকে শূলে চড়াই, তাহলে ধৰ্ম্মবিদ্বেষের জন্যে পােড়াব কি করে ? তােমার দুনিয়ের জন্যে যদি রফি। রফি।
গুলুবেহেস্ত,
১১৫
তােমার শরীরের চামড়া
খুলে ফেলি, তােমার
নিলজ্জতার জন্যে তােমাকে বেত মারব কি করে?
রফি। যন্ত্রণা দেওয়ার শিল্পে খলিফার বেশ দক্ষতা আছে ।
দেখছি।
খলিফা। যে মৃত্যুর বিভীষিকা আমার সামনে তুলে ধরেছিলে
তার সামনে এ সব মৃত্যু কিছুই নয়।
রফি। (অধৈর্যের সহিত) আমার কি শাস্তি ?
খলিফা। পাগলামির জন্যে শূল, ষড়যন্ত্রের জন্যে কুকুর দিয়ে
জীবন্ত অবস্থায় খাওয়ানাে, ধৰ্ম্মবিদ্বেষের জন্যে জীবন্ত
অবস্থায় শরীরের চামড়া ছুলে ফেলা।
পরিবানু। আঃ! (এই ভীষণ শাস্তির নামে বিভীষিকা ও তৃপ্তির
গুঞ্জন শুনা গেল চারিদিকে)
রফি। আল্লার যেরূপ অভিরুচি।
পরিবানু। (খলিফার পায় পড়িয়া গিয়া) রক্ষা কর, রক্ষা কর,
হে দুনিয়ার মালিক।
খলিফা। তুমি কি মনে কছ তােমার অনুনয় শুনেই ওকে
ছেড়ে দেব ?
পরিবানু। দয়া কর ! ওগাে, দয়া কর !
খলিফা। “দয়াকর” বলে আমার পা জড়িয়ে ধছ কেন?
যন্ত্রণাটা স্বপ্ন এবং পৃথিবী অলীক মায়া নয় !
পরিবানু। (উঠিয়া) এই পৃথিবী নরক কিন্তু যারা আরাে
গভীর করে খুড়ে তারা যা খোঁজে সেই নরকের
নীচের নূরকেরই সন্ধান পাবে।
গুলবেহে,
খলিফা। দর্শনে বেশ অধিকার আছে দেখছি কিন্তু ন্যায়শাস্ত্রে
কোনাে অধিকার আছে কি ? একটা যুক্তি বের
কর তাে, একটি ছােট সূক্ষম যুক্তি এই লােকটাকে দয়া
দেখানাের স্বপক্ষে।
পরিবানু। আঃ—যুক্তির কথা শুবে তুমি ?
খলিফা। আমার এ সুবিচার হয়নি ?
পরিবানু। সুবিচার পেতে চাইবে তুমি ?
খলিফা। ওর সামনে যদি আমি বন্দী অবস্থায় দাড়াতুম, সে
শুন্তত আমার কাতর প্রার্থনা ?
পরিবানু। প্রতিশােধ নিতে চাচ্ছ তুমি ?
খলিফা। তােমার ঐ কৃষ্ণ চক্ষু দুটির খাতিরে আমি কি সব
যুক্তি ঠেলে দেব, বিচার উল্টিয়ে দেব এবং প্রতিশােধ
ঠেকিয়ে রাখব ভাবছ ?
পরিবানু। আমার উপর নাও সেই প্রতিশােধ।
খলিফা। সুন্দরী, তুমি কি যথার্থ ৰছ, না এই কথা বলে শুধু
একটু দয়ার উদ্রেক করাতে চাচ্ছ ? উত্তরের দরকার
নেই, মৃত্যু আসন্ন জেনে।
পরিবানু। (বাহু বিস্তৃত করিয়া) তাহলে কথা দাও। আমার
চক্ষুর সানে ওর শৃঙ্খল খুলে ফেলা হােক, তারপর
আমাকে যে ভাবে খুসি মারূতে আদেশ দাও।
পরিবানু !
খলিফ। মায়া! মায়! তুমি মায়াবাদী এ দেহও মায়া।
যন্ত্রণা কিসের—মি অস্বীকার করছি।
রফি।
রফি।
গুবেহেস্ত,
১১৭
পরিবানু। (রফির প্রতি) হায় ! আর কি করূতে পারি !
রফি।
আমাকে মরুতে দাও! তােমাকে আবার দেখেছি
আমি। এখন মরা কিছু নয়।
পরিবানু। কিন্তু রফি, রফি—ওরা কি ভীষণ ভাবেই মারূবে
তােমাকে ।
তুমি নিজেও তাে সেই রকম মৃত্যুই বরণ করূতে চেয়ে-
ছিলে, আর আমি ভয় পাব ?
পরিবানু। ( খলিফার প্রতি) আমি সামান্য একটু দয়া চাচ্ছি।
পরিষ্কার মৃত্যু দেওয়া হােক তাকে।
খলিফা। এতে সামান্য দয়া চাচ্ছনা। যে আমার রাজ্যশুদ্ধ
কঁপিয়ে তুল্ল সে কি সাধারণ চোরের মত অতি সহজে
অনন্তে প্রয়াণ কৰ্তে পারে ! বড় অপরাধ যার, যন্ত্রণাও
তার বেশী হওয়া উচিত।
পরিবানু। যন্ত্রণার ভয় নেই রফির।
খলিফা। তার অর্থ এ নয়, তার যন্ত্রণার অনুভব শক্তি লােপ
একটি সহজ,
পেয়েছে ।
পরিবানু। হে দুনিয়ার মালিক, অবস্থাবিশেষে মন ও শরীর
তার যন্ত্রণার অনুভব শক্তি লােপ কর্তে সমর্থ হয়-এ
আমার কল্পনা নয়। হে ইল্লমের পিতা, তােমার
যে চক্ষু ফুল ভালােবাসে তাই কি মানুষের দেহকে
বিশ্রী ভাবে টুকরা টুকরা করবার দৃশ্য ভালােবাসতে
পারে? তােমার যে কাণ ইসাকের সঙ্গীতে মুগ্ধ হয়,
১১৮
গুলবেহেস্ত,
তাকি মরণােম্মুখের ভীষণ আর্তনাদ শুনবার ইচ্ছা
রাখতে পারে ?
খলিফা। আমি রফিকে আমার উপস্থিতি দিয়ে সম্মানিত করূতে
চাচ্ছি না ; দৃশ্য এবং শব্দের বহু দূরে থাকবাে আমি।
পরিবানু। ওঃ!
খলিফা। সারা জীবন আমি ঘাতকদেরে আদেশ দিয়ে আসছি।
আজকেও তাই দিচ্ছি। আজ এক চিন্তা ছাড়া
আমার আর কিছুই নেই। সে হচ্ছে আমাকে জীবন্তে
কবরে পোঁতা হচ্ছে, খােলা চোখের উপর মাটি চাপা
দেওয়া হচ্ছে, মাটি চেপে মরণােন্মুখের আর্তনাদের
শাস রােধ করা হচ্ছে।
পরিবানু। রাগে অজ্ঞান হয়ে সে বলেছিল এই সব ; কিন্তু
তুমি খলিফা—শান্ত ভাবেই তার উপর বিচারে
বসেছ। সে হয়েছে দশজনের একজন, কিন্তু তুমি
দুনিয়ার মালিক, ঈশ্বরের পার্থিব প্রতিনিধি, ইলামের
একমাত্র পুরােহিত। মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের যে
মূৰ্ত্তি আছে তা নিজ হাতে ধ্বংস করােনা।
খলিফা। তাহলে মানুষের সৌন্দর্য্যের খাতিরে তাকে ছেড়ে
দিতে বলুছ আমাকে? বরং মানুষীর সৌন্দর্যের
খাতিরে তা পারি, পরিবাণু।
পরিবানু। ( ইঙ্গিত বুঝিয়া সঙ্কুচিত হইয়া) যারা সৌন্দর্য্যের পূজক,
কামনাকে তারা চিরকাল দূরে ঠেকিয়ে রাখে।
১১১
গুবেহেস্ত,
খলিফা। আর, সৌন্দৰ্য থেকে কামনাকে তুমি যত দূরেই
ঠেকিয়ে রাখ, আমার কামনা থেকে
সৌন্দৰ্য্যকে দূরে ঠেকিয়ে রাখতে পাবে না।
পরিবানু। আমি তােমার অন্তঃপুরের ক্রীতদাসী বটে, কিন্তু
আমার অশরীরি সৌন্দৰ্য্য তােমাকে দাস খত দেয়নি,
দিবেওনা।
খলিফা। শরীরিটী দিলেই হলাে।
পরিবানু। তার আগেই তা শূন্যে মিলিয়ে যাবে, তার আগেই
আমি মরব।
খলিফা। ( কোন ভাবে ) কেন সুন্দরী ? তার চেয়ে কাম্য
কি কছু নেই পৃথিবীতে, না আমি তা তােমাকে
দিতে পারি না, বা তুমি আমাকে দিতে পার না?
পরিবানু। কখনাে নয় তােমাকে, অত্যাচারী ।
খলিফা। (কোমল ভাবে ) তােমার প্রেমিককে ছেড়ে দিলেওনা?
পরিবানু। নির্লজ্জ ! এই রাজসভায়ও কি তােমার লজ্জা নেই ?
এই বিচার বুদ্ধি নিয়ে তুমি শাসন কর্তে বসেছ !
খলিফা। সে লজ্জা না কবার দৃষ্টান্ত তত তুমিই আগে
দেখিয়েছ। বল, তােমার প্রেমিককে মুক্ত করে
দেব কি ?
পরিবানু। তুমি আমাকে ছুলে আমার শ্বাসরােধ হবে। ওঃ,
কি লজ্জা! কি লজ্জা! তুমি হাসছ! বিধাতার
বজ্ৰ যে এই হাসিশুদ্ধ মুখকে গুড়িয়ে দিচ্ছে না এই
আশ্চর্য! কিন্তু—থা–থাক, তুমি তো তাকে
মুক্ত কর্তে পারাে, আঃ, দেবে কি তাকে মুক্ত করে ?
আমি তােমার দাসী-আমি তােমার দাসী! দড়ি,
ছুরি-মরুবার সব উপায় আমার কাছ থেকে দূরে
রেখে দিও, যদি দাও তাকে মুক্ত করে। আমি
তােমার দাসী, আর কি করার আছে আমার ?
খলিফা। দাসীর ব্যবহার কিম্বা হৃদয় নয় তােমার। তুমি
স্বাধীন হয়ে জন্মেছ, জোর করে তােমাকে আমার
অন্তঃপুরে আনা হয়েছে, আমার দাসী তুমি হতে
পার না। সমস্ত রাজসভার সম্মুখে আমি তােমাকে
স্বাধীন ঘােষণা করে দিচ্ছি। তুমি ইচ্ছামত আসতে
যেতে পার, এখানে থাকা না থাকা, বিয়ে করা কিম্বা
মরা তােমার স্বাধীন ইচ্ছার উপরই নির্ভর করছে,
তুমি যা ইচ্ছা বেছে নিতে পার।
পরিবানু। যা ইচ্ছা বেছে নিতে পারি ? কি বেছে নিতে
পারি ? তার মৃত্যু এবং আমার অপমান এ দুইয়ের
মধ্যে ?
খলিফা। না, প্রেম এবং জীবন এই দুইয়ের মধ্যে।
পরিবানু। বুঝিয়ে বল, হে দুনিয়ার মালিক!
খলিফা। যন্ত্রণা সহ দুইটি মৃত্যু এবং ছাড়াছাড়ি হয়ে দুটা
জীবন-এই উভয়ের মধ্যে। প্রেমের একদিন এবং
সারা বাকী জীবন—এই উভয়ের মধ্যে।
গুলুবেহেস্ত,
১২১
পরিবানু। বুঝলুম না।
খলিফা। আমি এই বিষয়ে ভেবে দেখেছি এবং সংকল্প স্থির
করেছি। পরিষ্কার করেই বলছি সব। ( উঠিয়া )
এই আমার শেষ বিচার, এর আর কিছুমাত্র নড়চড়,
হবেনা। পরিবানু এবং ভিক্ষুকদের রাজা রফিকে
আমি বেছে নেবার সুযােগ দিচ্ছি। সূর্যাস্ত পর্যন্ত
তাদেরে সময় দেওয়া গেল, তারা একত্রে তাদের মন
ঠিক করূবে। তারা দুজনেই বাঁচবে এই সৰ্তে—
সুন্দরী পরিবানু আমার আইনমতে বিবাহিতা স্ত্রী
হ’তে স্বীকৃত হয়ে আমার অন্তঃপুরে চলে যাবে,
সেখানে তার রূপগুণ এবং পদমর্যাদার অনুরূপ
সম্মান সে পাবে। আর ভিক্ষুকদের রাজা বােগ দাদ
ছেড়ে যাবে, মৃত্যু পর্যন্ত তাদের আর কোনাে দিন
দেখা সাক্ষাৎ হতে পারবে না। কিন্তু যদি তারা
এই সৰ্তে অস্বীকৃত হয়, এইরূপে ছাড়াছাড়িতে
তাদের মত না থাকে, বাকী সারাজীবন বেঁচে না
থাকতে চায়, তাহলে তাদেরে আমি প্রেমের
একদিন দান কচ্ছি—আজ সূর্যাস্ত থেকে কাল
সূৰ্যাস্ত পর্যন্ত একদিন। এই সময় তারা শৃঙ্খলিত
থাকবে না, আত্মহত্যা নিবারণের জন্যে, সামান্য দুই
একটি প্রহরী ছাড়া আর কেউ থাকবেনা তাদের
কাছে। কিন্তু সেই দিনটি শেষ হওয়া মাত্রই তারা
১২২
গুলুবেহেস্ত,
দুজনে হৃদয়হীন যন্ত্রণায় একত্রে মরবে। এখন পরম
করুণাময় আল্লার নাম নিয়ে রাজসভা ভঙ্গ করে
দিলুম।
চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
( ভিক্ষুকের রাজা যেখানে বন্দী তার বাইরে কিন্তু
প্রাসাদের ভিতরে হাসানের প্রবেশ)
হাসান। কোন্ পথে ? কোন্ পথে ? এই অন্ধকার পথে
কিছুই ঠিক পাচ্ছিনা, আমার স্বর কক্ষে কক্ষে গিয়ে
প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এ শব্দটা কিসের ? কোননা
সৈন্য সামন্ত আসছে নাকি? না, সমস্ত বন্দীরা রাগে
মার্টিতে পদাঘাত কচ্ছেন, কেউ হাটছে শুধু ?
কে লােকটা? সে যদি এসে জিজ্ঞেস্ করে আমি
এখানে কি কৰ্তে এসেছি তাহ'লে কি বলব ? এই
অন্ধকারে কেন এলুম আমিই কি তা জানি ?
ইসাক। (অন্ধকার হইতে) কে ওখানে ? কি কচ্ছ ? কি
দরকার তোমার এখানে ?
হাসান। কে ডাকে ? আমি হাসান, বন্দীশালা পৰ্যবেক্ষণ
করে দেখছি। তুমি কে?
গুলবেহেস্ত, ইসাক। আমি কে? ভাই হাসান, এই প্রশ্নের জবাব দিতে বড় বড় পণ্ডিতেরাও পারেন নি। হাসান। ইসাক! কাছে এস, ইসা। কি কচ্ছ তুমি এখানে ? ইসাক। হে বন্দীশালার পর্যবেক্ষক, আমি ব্যাঙের ছাতি কুড়ােচ্ছি। হাসান। তুমিও এসেছ ? আমি কেন এলুম তা জানি না। ভাবছিলুম—জানিনা কেন এসেছি, কিন্তু আমাদের হৃদয় দুটি বন্ধু হৃদয়ের মত এক ভাবেই স্পন্দিত হয়ে উঠেছে মনে হয়। ওদের জন্যেই কি এসেছ তুমি এখানে ? ইসাক। হাঁ, দেখতে এসেছি প্রেম ও জীবনের মধ্যে কোটি ভারি সাব্যস্ত হয়। হাসান। তাই দেখতে এসেছ ? কি নিষ্ঠুর! ইসাক। মানুষের মর্মযাতনা যা শিক্ষা দিতে পারে, কবিকে তা শিখতেই হবে। হাসান। তাহলে কবি না হওয়াই কি ভালাে নয় ? ইসাক। (তিক্ত ভাবে) আল্লা যখন আমাকে কবি এবং হৃদয়ের বিশ্লেষণকারী করে সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তিনি আমাকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস্ করেননি। এই আমার ব্যবসা, মানবীয় গালিচার শিল্পী, পৃথিবীর শাসন- কৰ্ত্তা—আমার প্রভুকেই আমি অনুসরণ করি। তিনি
১২৪
গুবেহেস্ত,
যদি এরূপ নাটকীয় সম্বন্ধাবস্থানটি ঘটিয়ে তুলে
থাকেন তাহলে তার চরিত্রগুলি আমি পৰ্যবেক্ষণ
করূব না কেন? খলিফাকে বােধহয় তুমি এতদিনে
কিছুটা বুঝে উঠতে আরম্ভ করেছ।
হাসান। তার কথা বলছ কেন? সব মানুষই পশু-তুমি,
তিনি এবং আমি। আমি ভাৰতুম আমি বুঝি অন্যের
চেয়ে দয়ালু বেশী—কিন্তু আসলে আমি অন্যের চেয়ে
বেশী ভীরু। আমার উন্নতির এই প্রথম দিন, এই
দিনের সুরু করেছি একটি স্ত্রীলােক প্রায় হত্যা করে,
আর এর শেষ কচ্ছি, দুটি দুঃখীর উপর গুপ্তচরগিরি
ইসাক। ভাই হাসান, নৈতিক সমস্যা নিয়ে আর মাথা
ঘামিয়াে না। ঘটনার দীপের চারিদিকে কৌতুহলের
কীট উড়ে বেড়াবেই। ঐ রক্ষীরা আসছে, তারাই
আমাদিগকে পথ দেখিয়ে নিবে। (দুইটী রক্ষীর প্রবেশ)
{ রক্ষীদের প্রতি } হে, সেনিক, কোথায় ?
১ম রক্ষী। ,
(সেলাম করিয়া) ভিক্ষুকরাজের কুঠুরীতে, হুজুর,
আমাদের পাহারার পালা এখন।
ইসাক। কি, তােমরা কি কুঠুরীর ভিতরে থাকবে ?
১ম রক্ষী। হাঁ, হুজুর, ভিতরে।
ইসাক। লজ্জার কথা ! প্রেমিক যুগলকে এ ভাবে পাহারা
দেওয়া লজ্জার কথা। ওরা তাে আর ছাদ উড়িয়ে
দিয়ে পালাবে না !
গুবেহেস্ত,
১২৫
১ম রক্ষী। হুজুর, বন্দীদের রীতি আমাদের জানা আছে।
অনেক সময় আমরা বেত চালাবার জন্য মৃতদেহ এনে
হাজির করে মরুরের নৈরাশ্য উদ্রেক করিছি।
(২য় রক্ষীর প্রতি ) কেমন, করিনি, মহহ্মদ ?
২য় রক্ষী। (অত্যন্ত ম্লান সম্মানসূচক স্বরে) , অনেকবার
নিরাশ করেছি।
ইসাক। তাহলে সে তােমাদেরই দোষ, ভাইসব, তােমরাই
দড়ি কিম্বা ছুরি তাদের কাছাকাছি রেখে দিয়েছ
কিম্বা থাকতে দিয়েছ।
১ম রক্ষী। হুজুর, বন্দীদের চালাকি আপনারা জানেন না।
ওরা দেয়ালে মাথা ঠুকেও মরূতে পারে। (২য় রক্ষীর
প্রতি) কেমন, পারে না, মহহ্মদ ?
২য় রক্ষী। (ইসাকের প্রতি) , হুজুর, অনেক সময়েই তা
তারা করে থাকে।
ইসাক। শিকল থাকলেও ?
১ম রক্ষী। শিকল থাকলেও অনেক সময় তারা মাথা ঠুকে
মরে। (মহহ্মদের প্রতি ) কেমন, মরে না, মহােদ ?
২য় রক্ষী। (ইসকের প্রতি) হাঁ, হুজুর, অনেক সময়ই তা মরে।
ইসক। কিন্তু এদের বেলায় সে সব তো হবে না। জানাে তাে,
যন্ত্রণাপ্রদ মৃত্যু এবং ছাড়াছাড়ি হয়ে জীবন, এই
দুইয়ের একটিকে তাদের বেছে নিতে হবে। জীবনই
তারা বেছে নেবে নিশ্চয়, কাজেই তাদের উপর
পাহারা দেওয়ার কোনাে দরকার হবে না।
১২৬
গুবেহেস্ত,
১ম রক্ষী। তা হয়ত ঠিক, কিন্তু বন্দীদের কথা কিছুই বলা
যায় না। ওরা ভারি গোঁয়ার, বিশেষতঃ স্ত্রী বন্দীরা।
( মুহহ্মদের প্রতি ) কেমন, না মহহ্মদ ?
২য় রক্ষী। (ইসাকের প্রতি) হাঁ, হুজুর, স্ত্রী বন্দীরা বরাবরই
ভারি গোয়ার হয়ে থাকে।
ইসাক। মনস্থির কর্ডে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় কারাে দরকার
হয় না। কেমন, হয় কি ?
১ম রক্ষী। না, হুজুর, অন্ততঃ মশরুরের হাত চতে যে
দেখেছে তার তত নয়ই।
ইসাক। কিন্তু তারা যদি প্রেমের একটি দিন যাপনই বেশী
বাঞ্ছনীয় মনে করে তাহলে খলিফার কথামত তাদেরে
কি একটু স্বাধীনতা দেওয়া হবে না? তবুও কি
তােমরা তাদের কুঠুরীতে পাহারা চালাবে ?
১ম রক্ষী। না, তাহলে আমরা দরজার বাইরে থেকে কাণ
পেতে থাকব। (দুষ্টের হাসি হাসিয়া )
ইসাক। দরজাটি যদি দেখিয়ে দাও তাহলে আমরাও ঠিক তাই
কৰ্তে চাই এখন।
১ম রক্ষী। তা ঠিক কৰ্তে দিতে পারি কিনা জানি না।
ইসাক। (তাকে অর্থ দিয়া) তােমরা সব বীর, যতদূর জানি
তােনাদের কাজের উপযুক্ত বেতন তােমাদেরে দেওয়া
হয় না।
১ম রক্ষী। ভারি বিশ্রী কাজ আমাদের, হুজুর।
গুলুবেহেস্ত,
১২৭
২য় রক্ষী। (অর্থ লইয়া) বেতন বৃদ্ধিরও কোনাে আশা
দেখছি না।
১ম রক্ষী। এদিকে, হুজুর। (তাহাদিগকে নিয়া দরজা দেখাইয়া
দিল )
দ্বিতীয় দৃশ্য
একটি কুঠুরী। লৌহ শলাকার ভিতর দিয়া
সূর্যালোেক প্রবেশ করিয়াছে। একটি প্রকাণ্ড
দরজার মধ্যবর্তী একটু ফাক রহিয়াছে। রফিকে
শিকল দিয়া দেয়ালের সঙ্গে গাঁথিয়া রাখা হইয়াছে
কিন্তু পরিবানুকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয় নাই।
দরজার দুইদিকে দুইটী রক্ষী অবিচলিত অবস্থায়
দাড়াইয়া আছে।
রফি। এই শেষবার পাহারা বদল হলো ; একঘণ্টার মধ্যেই
সূৰ্যাস্ত হবে।
পরিবানু। তােমার মুক্ত হাত দুটি আমাকে জড়িয়ে ধরতে যে
এখনাে অনেক দেরী। হে অলস সূৰ্য, দেয়ালে
তােমার ছায়া আলাের খেলা দেখতে দেখতে আর
তাে ভালাে লাগছে না। এখনাে দীর্ঘ একঘণ্টা।
এখনাে আমাদের দণ্ডের পূর্বে একটি রাত্রি এবং
একটি দিন রয়েছে।
পরিবানু। তােমার স্বরটি এত দুঃখপূর্ণ কেন ? তােমার
রফি।
গুলবেহেও
সঙ্কল্পের সঙ্গে তােমার কথা যেন সমান তালে তালে
চলতে পারছে না !
রফি। কি সঙ্কল্প করেছি আমি ? তুমি নিকটে এলে, তােমার
আত্মার পাখা তােমার চারিদিকের আকাশ আলােড়িত
কচ্ছে দেখলুম। তুমি আমার গলায় রূপার শৃঙ্খল
জড়িয়ে দিলে, এই লােহার শিকলের কথা আমি
ভুলে গেলুম; তােমার কেশের সুগন্ধ দিয়ে তুমি
আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, এই কুঠুরী হয়ে
উঠলাে একটি পুষ্পোদ্যান, তুমি আমার দিকে ফিরালে
তােমার চক্ষু, সেই চক্ষুর রাত্রির মধ্যে সপ্ত সমুদ্র
তাদের মজ্জিত তারকারাজিকে ঝলসিয়ে তুল্লে এবং
বিনা ভাষায় তােমার সমস্ত শরীর হতে এই জিজ্ঞসা,
ফুটে উঠলাে, “প্রেমের জন্য তুমি মরূবে ?”
পরিবানু। তুমি কি অনুতাপ কচ্ছ? সেই কথা কি তুমি এখন
ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছ ?
রফি। তােমার ঠোট দুটি আমার ঠোটে চেপে সেই ফিরিয়ে
নিতে চাওয়াও বন্ধ করে দাও।
পরিবানু। তােমার আবেগ জাগিয়ে তুলে আমি ভুল করেছি।
আমি দেখছি তুমি মনে মনে এখন অনুতাপ কচ্ছ।
এক মুহূর্তের পাগলামি যে তােমাকে আবদ্ধ রাখবে
সে আমি চাই না। শান্তভাবে তুমি তোমার
হৃদয়কে জিজ্ঞেস্ কর। যুক্তি মেনে চল।
বেহেস্ত,
১২১
রফি। এ ! শান্ত ভাবে জিজ্ঞেস কর—যুক্তি মেনে
চলার কথা বলছ তুমি পরিবানু ?
নিজের দেহে
মনে আগুন জ্বালিয়ে তুলে সেই আগুন ছড়িয়ে
দিয়েছ আমারাে দেহে মনে, আর এখন তুমি চাচ্ছ
শান্ত ভাব আর তুহীনশীতল যুক্তি! প্রেমাবেগে
আমাকে অন্ধ করে দেবার দরুণ আল্লার অভিশাপ
নামুক তােমার মাথায়।
পরিবানু। আঃ রফি।
রফি। চুপ কর, চুপ কর ! তােমার স্বরটি হয়েছে শেষ রাত্রির
পাপিয়ার কলকণ্ঠের মত! মােহকর—উন্মাদকর।
ভুলে যাও তােমার স্বপ্ন, তােমার আগুন, তােমার
বিদ্যুৎ, তােমার আত্মার আলাের ছটা, তারপর
উত্তর দাও এই আবেগহীন প্রশ্নের—তােমার প্রেমিক
কেন মরূতে যাবে, আর এরূপ মৃত্যু ?
পরিবানু। আমি শুনছি।
রফি। আমি যুবক মাত্র। বেঁচে থাকলে আমি কি চিরকাল
হাসি ভুলে থাকূব ? সারাজীবন কি তােমার জন্যে
আমি হা হুতাশ করে কাটাব ? আমি কি আমার
দেশে ফিরে যাব না, আমাকে যারা জন্ম দিয়েছে
তাদের হৃদয়কে সান্ত্বনা দেব না? আমার কি সুন্দর
ঘরবাড়ী, পুস্তকাদি এবং বন্ধু বান্ধব নেই ? ফুল
ফলের বাগান নেই ? পরিবানু কাছে নেই বলে
১৩০
গুলবেহেস্ত,
আমার বাগানের পাশ দিয়ে পার্বত্য তটিনী কি
তেনি কলনৃত্যে ব’য়ে চলবে না? প্রেম ম্লান হয়ে
যায়, কিন্তু মরে না বটে, আমি সেই প্রেমের সােণালি
স্মৃতি নিয়ে পুস্তক হাতে সেই তটিনীর তীরে গিয়ে
বস্ব। পুস্তক পড়তে পড়তে যখন ক্লান্ত হব
তখন শ্যামল তৃণের উপর শুয়ে আকাশের মেঘের
দিকে চেয়ে থাকব। সেই মেঘের মধ্যে তােমার
মুখখানা আমি দেখতে পাব এবং মনে করতে থাকব
তুমি চিরকাল স্বপ্নই ছিলে, মনে করব তােমার
সুলয়িত শুভ্র বাহুযুগলের বেষ্টন পাহাড়ের গায়
কুয়াসার আবরণের চেয়ে বেশী সত্য কখনও
ছিল না।
পরিরা। (বর্ধিত ক্রোধের সহিত ) এইরূপ মধুর কল্পনায় মগ্ন
থেকে তুমি ভুলে যাবে সেই নারীকে যাকে তুমি
অত্যাচারীর কাছে বিক্রী করে এসেছ ? এই ভাবে
আমি যখন দেশ এবং আত্মীয় স্বজন থেকে বহু দূরে
আপন লজ্জার মাঝে বন্দীর জীবন কাটাব তখন
তুমি কেবল স্বপ্ন, কেবল স্বপ্ন দেখেই দিনের পর দিন
কাটাতে থাকবে ?
রেখে দাও লজ্জা! তুমি হবে খলিফার স্ত্রী। সারা
ইসলাম জগতে স্ত্রীলােকের কাছে এর চেয়ে বড়
আকাঙক্ষা আর কি হতে পারে ? একটা কদৰ্য্য
রফি।
বেহেস্ত,
কাফ্রি এসে শরীরের চামড়া খুলে ফেলার চেয়ে এতে
কি বেশী লজ্জা ? লজ্জা ! অপমান! বিক্ৰী ।
এসব হচ্ছে স্ত্রীলােকের বৃথা আত্মাভিমান। তােমার
আত্মাভিমানে ইন্ধন যােগাবার জন্যে আমাকে কি
এই ভীষণ যন্ত্রণার মৃত্যুকে বরণ কৰ্ত্তে হবে ? তােমাকে
যদি আমি নাই পাই তাহলে যার খুসি তার স্ত্রী হও
কেন তুমি, তাতে আমার কি ? আমি তােমাকে
মনে করে রাখব, এখন যা আছি, মূক মেদিনীর
মৰ্ম্মদেশ থেকে উৎসারিত নিঝরের পবিত্র জলের মত।
পরিবানু। হৃদয়হীন ভীরু, তুমি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছ ?
রফি। আল্লার নাম নিয়ে বছি, ঠিক আমি মৃত্যুকে ভয়
কচ্ছি। মৃত্যুকে যে ভয় করে না, হয় সে বদ্ধ পাগল,
নয় নিরেট বােকা ! মৃত্যুতে ভয় করবার জন্যে
যদি তুমি আমাকে ঘৃণা কর, তাহলে বেশ, তােমার
মনােমত পথে তুমি চলে যাও, এই ভীরুকে ত্যাগ
কর। আঃ! না, না, আমাকে ছেড়ে যেয়ােনা
পরিবানু। আমাকে ক্ষমা কর। আমার প্রতিজ্ঞা
এখনাে আমি ফিরিয়ে নিইনি।
আমি তােমার
সঙ্গেই ময়ূব। আমি মরব, আমি মরব ! মৃত্যুর
চেয়ে হাজারােগুণ ভীষণ যে যন্ত্রণা তা আমি
পেতে নেব, যে যন্ত্রণার কথা মনে করুলেই বুক
শুকিয়ে যায়, যা
রফি।
১৩২
গুবেহেস্ত,
পরিবানু। ধিক্ তােমাকে ভীরু, দুৰ্বল প্রেমিক! যন্ত্রণা
আমাদের কি করূতে পারে!
রফি। তুমি দেখছ না-দেখছ না! তােমার ঐ হাত দুটির
দিকে চেয়ে দেখ, এ দুটিকে ছিড়ে ফেলবে—আঃ!
এর কথা মুখে ত আনতে পাছি না। সাদা ঝরণা
থেকে রক্ত স্রোতের মতন তােমার ঐ শুভ্র দেহ
থেকে যখন রক্তের ধারা বইবে তখনাে আমাকে তা
চোখে দেখতে হবে-ওঃ !
পরিবানু। আমাদের যুক্ত জীবনের কাহিনী সেই রক্তের
অক্ষরেই অমর হয়ে লিখা থাকবে।
হায়, তুমি এখনাে স্বপ্ন দেখছ, তুমি এখনাে আবেগে
অন্ধ হয়ে তাছ; এখনাে উপমা দিয়ে কথা কইছ !
তুমি দেখনি, তুমি শােননি কোনােদিন অত্যাচারিতের
সমুচ্চ করুণ বুকফাটা চীৎকার, দেখনি তাদের
দেহের আকৃতি যখন তাদেরে কবরে নিক্ষেপ করা
হয়। নিকটে এস, পরিবানু। জানো, তােমাকে
তারা কি করবে ? নিকটে এস, উচ্চে তা বলা যায়
। ( পরিবানু নিকটে আসিল) ওঃ, তােমাকে বল্তে
সাহস হয় না-বলতে সাহস হয় না !
পরিবানু। পরিষ্কার করে বল। (রফি পরিবানুর কাণের কাছে
বলিল ) { হাতে মুখ ঢাকিয়া } আঃ আল্লা এরকম করবে !
ছ! না, না ; আমাকে তা করবে না তারা।
গুলবেহেস্ত,
রফি।
রফি।
হায়!
নিৰ্ম্মমের মতন করবে।
পরিবানু। ( ভীষণ ভাবে ) তাই করবে! ছিঃ ! কি লজ্জা!
তাই করূবে—ওঃ ! কি ভীষণ যন্ত্রণা! আমি দেখছি
সব ! শুছি ! অনুভব কচ্ছি ! ওঃ, আমাকে
রক্ষা কর, রফি।
কেন তােমাকে একথা বলুম !
পরিবানু। এ যে সহ্যের অতীত, এ যে কদৰ্য্য ! একথা মনে
করলেই যে আমার শিরাগুলাে ফেটে পড়তে চায়।
এদিকে লজ্জা, ওদিকেও লজ্জা,দুই লজ্জার মাঝে এসে
পড়েছি আমি, নিষ্কৃতি নেই ; কিন্তু, অন্ততঃ তােমাকে
তা করবে না, রফি। চুপ, আস্তে কথা বল ;
সৈনিকেরা যেন না শুনে। (রক্ষীরা কানাকানি
করিতেছিল, তাদের দিকে চাহিয়া) তুমি এখন মরূবে
কি আমার হাতে ? কোনাে যন্ত্রণা হবে না।
রফি।
( চাপা গলায়) তাড়াতাড়ি ! কি করে ময়ূব ? প্রহরী
রয়েছে—ছুরি আছে ?
পরিবানু। আমায় বাহু বেষ্টনের মধ্যে—বলিনি প্রিয়তম,
আমার হাতে ?
রফি। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।
একজন রক্ষী। (পরিবানু তার প্রেমিকের গলা চাপিয়া ধরিতেই খােল
তলােয়ার লইয়া প্রবেশ করিয়া পরিবানুকে ঠেলিয়া দিয়া )
সরে যাও, খলিফার নাম নিয়ে বলছি।
১৩৪
গুবেহেস্ত,
রফি।
রফি।
রফি।
রফি।
পরিবানুর প্রতি) ওর তরােয়ালের উপর লাফিয়ে পড়।
পরিবানু।( রক্ষীর তরােয়াল হইতে সঙ্কুচিত হইয়া কয়েক পা হটিয়া
আমি পারব না।
তাড়াতাড়ি—তাড়াতাড়ি ! তরােয়ালের উপর লাফিয়ে
পড়ে সকল লজ্জার হাত এড়াও।
পরিবানু। আমার ভয় হচ্ছে। ( মাটিতে পড়িয়া গিয়া) সব মাটি
করেছি—তােমার মৃত্যু, আমার মৃত্যু—সব খুইয়েছি।
তুমি ভয় পেয়েছ।
পরিবানু। তলােয়ারের আগা ছিল আমার বুকে, সব শেষ করে
দিতে পাৰ্ত্তম।
ভয় পেয়ে গেছ।
পরিবানু। একেবারে বুকে বিঁধত গিয়ে। হাজার হােক—আমি
স্ত্রীলােক ।
এত কিছুই নয় ; ইস্পাতের একটু খোঁচা।
পরিবানু। কিছু নয় বছ তুমি ? এ যে বরফের মতন, কেমন
তীক্ষ্ণ এবং ঠাণ্ডা, আমি ভারি ভীরু।
উভয়েই ভীরু আমরা, তুমি এবং আমি। দেয়ালের
উপর সূর্যের আলাে সাদা থেকে সােণালিতে পরিণত
হচ্ছে, অপরাহ্ন হয়েছে। আমাদের সময় এসেছে।
আমরা কি জীবন বেছে নেব ? বেছে নেব আকাশ
আর সাগর, পাহাড়, নদী আর প্রান্তর ? বেছে নেব
ফুলের গন্ধ আর পাখীর কাকলি ? বেছে নেব হাসি
রফি।
রফি।
গুলবেহেস্ত,
১৩৫
এবং অশ্রুজল, দুঃখ এবং কামনা, কথা এবং নীরবতা,
পাহাড়ে পাহাড়ে মানুষের কথার প্রতিধ্বনি?
পরিবানু। শূন্য, শূন্য, তােমার হৃদয় ছাড়া সব শূন্য! (কাঁদিতে
লাগিল )
রফি। মৃত্যুর মত শূন্য—পরিবানু, মৃত্যুর মত শূন্য ।
পরিবানু। দেয়াল লাল হয়ে উঠছে! শেষ মূহুৰ্ত্ত এসেছে।
আমাদের বেছে নিতে হবে।
রফি। আমার হয়ে বেছে নাও; আমি সেই মতই চলব।
জীবনের কথা বলেছিলুম না আমি ? তােমার জন্যে
কামনায় আমার হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমাকে যদি
তুমি চলে যেতে বল তাহলে তােমাকে ছাড়া আমি
বাঁচবনা। আমার হয়ে বেছে নাও আর ঠিক বেছে
নিও।
যন্ত্রণার বিভীষিকা ! যন্ত্রণার বিভীষিকা ?
একবার শুধু তােমাকে আমার বাহুবেষ্টনে ধরুতে
দাও, তারপর প্রেমের এই একদিন অনন্তের মধ্যে
বিস্তৃত হয়ে যাক। কে জানে ? পৃথিবী আজ ধ্বংস
হয়ে যেতে পারে অথবা সূৰ্য্য খ’সে গিয়ে তার কবরে
কে জানে আগামী কল্য সমস্ত
ধ্বংস লীলার শেষে থাকতে পারি শুধু তুমি আর
আমি, থাকতে পারে শুধু আলিঙ্গনবদ্ধ দুটি অমর
আত্মা!
পরিবানু। ( ধীরে ধীরে মাটি হইতে উঠিয়া এবং তার হাত তার
ঢুকতে পারে।
?
গুবেহেস্ত,
প্রেমিকের কাধে রাখিয়া ) ওগো, চল আমরা মরি।
আমার কোনাে অসম্মানের জন্যে নয়, রফি। তােমার
কাছে বা আমার কাছে আমার অসম্মানের মূল্য কি,
প্রিয়তম, বালিকার কৌমার্যের লজ্জারই বা মূল্য কি?
এই আমার মাটি (দেহ দেখাইয়া) বােধহয় খুবই
সুন্দর কিন্তু ঈশ্বর সকলের সঙ্গে একই ছাঁচে তা টেলে
তুলেছেন।
তাহলে আমার প্রেমের জন্যে মর তুমি-এক রাত্রি
এবং এক দিনের প্রেমের জন্যে মর !
পরিবানু। আমি তােমার প্রেমের জন্যে মরতে যাচ্ছি, রফি।
দেখ, তােমার চার দিকে তােমার আত্মার দ্যুতি বিকীর্ণ
হচ্ছে ; তাঁর সঙ্গে তুমি যে এক হয়ে গেলে ; সেই
চরম, সেই চিরন্তন তােমার চোখে আজ ঝলসে
উঠছে, তােমার ঠোটে ছায়া ফেলেছে ; তােমার
সারা দেহ যে সেই আলােতে আলােময় হয়ে
রফি।
;
উঠেছে।
রফি।
আমাকে সান্ত্বনা দাও, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও।
আমি যে তােমার স্বপ্নের নাগাল পাচ্ছি না।
পরিবানু।( উদ্দীপনায় তার বাহু দুটি শক্ত হইয়া আসিতে লাগিল )
ঐ জানালা দিয়ে স্রোত বইছে তালাের—চিরন্তনের
মধ্যে ক্ষণিক ডুবে গেল। তােমার সঙ্গে মৃত্যু, তােমার
জন্যে মৃত্যু, তােমাকে পাবার জন্যে মৃত্যু, হে প্রেমিক,
গুলুবেহেস্ত,
১৩৭
আর তারপর অন্তহীন উদ্যান, অার নিঝরিণীর
কলস্বন্ আর পাশাপাশি হাত ধরে বেড়ানাে
আত্মায় আত্মায় প্রগাঢ় আলিঙ্গনবদ্ধ চির মিলন।
রফি। হে আমার জীবনের জীবন, আমার প্রাণের প্রাণ,
এই উন্মাদের স্বপ্নই কি তােমাকে শেষ করে দেবে ?
পরিবানু। হে চিরশান্তি, হে চির আনন্দ, হে চির মিলন, আমরা
তোমারি জন্যে মরছি! প্রিয়তম, যে আগুন আমাদের
ভিতর জ্বলছে তার জন্যে, যে বায়ু আমাদের চারদিকে
বইছে তার জন্যে, আমাদের দেশের জন্যে, আমাদের
দেশের পাহাড়ের ফাকে ফাকে দেবদারু বনের ভিতর
দিয়ে বহমান পুলকের জন্যে তুমি এবং আমি
যন্ত্রণাকে বরণ করে নিচ্ছি এবং আমাদের শেষ
পরিণামের সম্মুখীন হচ্ছি। দুনিয়ায় সেবার জন্যেই
আমাদের অবসান হােক। ঐ শােন, ঐ শােন
তরঙ্গায়িত সিন্ধুর স্বর শােনা যাচ্ছে, বলছে—“ভুগে
যাও যাতে আমার ঢেউগুলি চিরকাল বিলাপ কর্নে
পারে।” আকাশের তারকারা গেয়ে উঠছে,
বছে—“সাহস ধর যাতে যুগ যুগ ধরে আমরা
উজ্জ্বল হয়ে কিরণ দিতে পারি।” এখন পর্যন্ত
অজাত শিশুদের আত্মারা আমাদের চারদিকে ভিড়
করে কাণাকাণ করে বলছে—“স’য়ে যাও যাতে
আমরা জয়ী হতে পারি।”
গুলবেহেস্ত, রফি। পরিবানু। পরিবানু। পরিবানু। ঐ শােন। ঐ শােন! আমি পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি, গ্রহ নক্ষত্র বেয়ে নেমে আসছে চিরন্তনের ভেরী নিনাদ—মর, প্রেমের যজ্ঞে আত্মার আহুতি দাও- ভেসে আছে সেই অমৃতময় বাণী—এস এস, মৃত্যুর ভিতর দিয়ে প্রেমের চির অমরত্ব লাভ কর- অন্ধকারের ভিতর দিয়ে চির আলােকের স্বর্গে প্রবেশ কর! পার্থিব চির বিচ্ছেদের ভিতর দিয়ে স্বর্গীয় চির-মিলন লাভ কর ! মর তাহলে, পরিবানু, তােমার এই লােকাতীত উদ্দীপনা নিয়েই মর ! আমিও তােমার অনুসরণ করব ! ঘােষণাকারী। (প্রবেশ করিয়া ) তােমরা কি স্থির করুলে, খলিফা জানতে চাচ্ছেন। মৃত্যু। হাসান। (হঠাৎ ঢুকিয়া) না, না। হা, আল্লা! ইসক। (হঠাৎ ঢুকিয়া) ঠিক বেছে নিয়েছে। (ঘােষণাকারী নিষ্ক্রান্ত—পরিবানুর মধ্যে এখনাে উদ্দীপনার ভাব বৰ্ত্তমান) রফি। রফি।
পঞ্চম অক
প্রথম দৃশ্য
( পর দিবস--সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়। খলিফার বাগান। (৩য় অঙ্ক
-১ম দৃশ্য ) হাসান তার শিবির হইতে প্রবেশ করিল। অন্যদিক
হইতে অনুচরগণ সহ খলিফার প্রবেশ )
খলিফা। আমরা তােমাকে খুজতে তােমার আলয়েই যাচ্ছিলুম,
হাসান, কিন্তু তুমি আগেই এসে পড়েছ। বুলবুলিরও
আগে তুমি তােমার ঘর ছেড়ে এলে কেন ? তুমিও
কি চাঁদ উঠার সঙ্গে সঙ্গে গান ধরূবে নাকি? তাই
যদি, শুনিয়ে দাও আমাদেরে।
হাসান। হে দুনিয়ার মালিক, বুলবুলির সময় এখনাে হয়নি।
আপনাকে সারাদিন আমি খুজে ফিরেছি, হুজুর,
পাইনি। রাজসভা কলেন, শিকারে গেলেন, খেতে
বলেন, এখন তাে সময় প্রায় হয়ে এল, হে দুনিয়ার
মালিক ।
খলিফা। কিসের সময় ?
হাসান। বুলবুলির সময় ; যে সময় আকাশের রূপালি তোলে
সূৰ্য্য ও চন্দ্রকে ওজন করা হয় এবং সূর্যের সঙ্গে
সঙ্গে আপনার বিচারের তেলটি নীচের দিকে নেবে
যায়।
খলিফা। নিশ্চয় তােমার মাথায় কিসব খেয়াল ঢুকেছে আর
১৪০
গুবেহেস্ত,
মেজাজ বিগড়ে আছে। তােমার কথার অর্থ মাথা-
মুণ্ডুতো কিছুই বুঝছি না। ।
হাসান। (খলিফার পায়ে পড়িয়া গিয়া) হে দুনিয়ার মালিক,
পরিবানু ও রফিকে দয়া কর ।
খলিফ।। কি—ঐ দুটোকে ? তারা নিজেরাই নিজেদেরে দয়া
করুক। শুনলুম তারা মৃত্যুই বেছে নিয়েছে।
স্ত্রীলােকটা আমাকে বিয়ে করার চেয়ে রফির সঙ্গে
মৃত্যুই শ্রেয়ঃজ্ঞান করে আমাকে খুব সম্মানিত
করেছে!
তারা দুটিতে বেশ মধুর একটি দিন
কাটিয়েছে ; চমৎকার খাদ্য সব তাদের কাছে রাখা
হয়েছিল, পাহারাও শ্লথ করে দেওয়া হয়েছিল।
এখন অপরাহ্নটি আর তেমন মধুর ভাবে কাটবে না
তাদের।
হাসান। মেয়েটিকে যেন যন্ত্রণা দেওয়া না হয় ; তাকে দয়া
করুন, হুজুর।
খলিফা। আরে ওঠ, খেয়ালী। যারা নিজেরাই মৃত্যু বেছে
নেয় তাদেরে দয়া করতে বল তুমি কোন্ সাহসে ?
হাসান। যদি শুনতেন তাদের কথা—যখন তারা সংকল্প স্থির
করলো তখন আমার মত যদি তাদেরে লুকিয়ে
দেখতেন তাহলে ভুলে যেতেন আপনি বিচার,
প্রতিশােধ এবং সুবিধা অসুবিধার কথা, শুধু শুনতেন
তাদের মৰ্ম্ম-বেদনায় হৃদয় বিদারক ধ্বনি।
প্রবেহেস্ত,
১৪১
খলিফা। আমার সন্দেহ আছে।
হাসান। তারা ঠিকই বেছে নিয়েছে। এত অল্প বয়স তাদের।
এমন প্রেমপূর্ণ চিত্ত তাদের ! আমি ঘুমােইনি, খাইনি,
হুজুর। আমার বাড়ীতে বাগানে কোনাে আনন্দ :
নেই। আমার দেয়ালে আমি রক্ত দেখি, গালিচায়
রক্ত দেখি, নিঝরে রক্ত দেখি, আকাশে রক্ত দেখি।
খলিফা। বেশ, বেশ, এই প্রীতিকর স্বপ্নই তুমি দেখতে থাক।
আবু নওয়াজ আমার জন্যে একটি কুর্ডি মেয়ে এনেছে,
সে এক পা গলায় জড়িয়ে চমৎকার নাচতে পারে,
সেকেন্দরশার গান তার মুখস্থ আছে। আমি বুঝতে
পাছি এখন আপরাহ্নিক আমােদের উপযুক্ত সঙ্গী
হবে না তুমি।
হাসান। যন্ত্রণার জন্যেই আমি কথা বছি ; মেয়েটির জন্যেই
শুধু অনুরােধ কচ্ছি। মুখের একটি কথা দিন, সূৰ্য্য
শীঘ্রই অস্ত যাবে।
খলিফা। (রাগিয়া) তুমি এবং ইসাক, জাফর এবং সমস্ত
প্রদেশের শাসনকর্তারা যদি একসঙ্গে এসে পায়ে
পড়তে তবুও মশরুরের কৃষ্ণ হস্তের একটি আদর
থেকে তাকে নিষ্কৃতি দিতুম না।
হাসান। ( হঠাৎ লাফাইয়া উঠিয়া খলিফার দিকে অগ্রসর হইয়া )
অত্যাচারী ! ভীষণ নারকী!
খলিফা। (শান্তভাবে—রক্ষীরা হাসানকে ধরিয়া ফেলিয়াছে দেখিয়া)
১৪২
গুলবেহেস্ত,
তুমি আমাকে বিস্মিত করে দিলে। মিঠাইওয়ালারা
কবে থেকে তাদের ব্যবহারে এমন ভীষণ হয়ে
উঠেছে ?
হাসান। ( ভীত হইয়া) কি বলিছি আমি। কি করিছি!
খলিফা। ঐ আবার মিঠাইওয়ালার গলার আওয়াজ শােনা
গেল।
হাসান। মিঠাইওয়ালা হ’তে আমার লজ্জা নেই, ভীরু হতে
লজ্জা আছে।
খলিফা। নিরাশ হ’য়ােনা, হাসান। তােমাকে সতর্ক করে
দিয়েছিলুম, তুমি তা মেনে চলনি, ললিত কলার উদ্যান
ছেড়ে কৰ্ম্মের রাজপ্রাসাদে অনধিকার প্রবেশ করেছ
তুমি, রাজ রাজড়াদের অত্যাচার নিয়ে মাথা ঘামিয়েছ,
জটিলতার জালে ইচ্ছা করেই নিজকে জড়িয়ে
তুলেছ। এই আবাসটি তুমি হারালে, এই বাগান
থেকে নির্বাসিত হলে, কারণ রাজার বন্ধু হওয়ার
উপযুক্ত নও তুমি। তবে গত রাত্রে আমার অনেক
উপকার করেছ, তােমাকে ছেড়ে দেওয়া হলাে,
রাজপ্রাসাদের সমস্ত মিঠাইর ফরমাস তােমার
দোকানেই দেওয়া হবে এখন থেকে।
হাসান। হুজুর, এই দয়ারজন্যে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
খলিফা। তােমার চরিত্রের মধ্যে যে পাগলামির আমেজ,
আছে তা আমি জানি। পরিবানু এবং রফি সম্বন্ধে
১৪৩
গুলবেহেস্ত,
তুমি যে হৃদয়তা দেখালে তার প্রতি আমার
সহানুভূতি জেনো, সে জন্যে তােমার প্রতি আমার
অনুগ্রহের চিহ্নস্বরূপ তাদের মৃত্যুর দর্শকদের মধ্যে
তােমারও একটি স্থান থাকবে।
হাসান। আঃ, না, না !
আঃ, না, না! সে আমি দেখতে পারব না।
খলিফা।
তােমার প্রতি আমার অনুগ্রহের বিশেষ চিহ্নস্বরূপ
তোমাকে আর মৃত্যু দৃশ্য দেখতে সেখানে যেতে
হবে না, এখানে তােমার চোখের সামনেই তা নিয়ে
আসবে। তুমি স্বপ্ন দেখেছিলে তােমার দেয়ালে
রক্তের ধারা বইছে। আমি সেই স্বপ্ন সফল করে
দেব।
হাসান। আর কখনাে ঘুমুতে পারব না আমি !
খলিফা। (অনুচরের প্রতি) আমার আংটী নাও আর মশরুরকে
জানিয়ে দাও সে যেন শব সহ এখানে আসে, এই
শিবিরের মধ্যে যে গালিচা পাতা আছে তার উপরই
বিলম্বিত মৃত্যু অনুষ্ঠিত হবে।
হাসান। হুজুর ! হুজুর! এই কি যথেষ্ট নয়? আমার
ব্যবসা এবং বাজারের কদৰ্য্যতার মধ্যে আবার আমি
ফিরে যাব, আবার আমি গরীব হব, গরীব লােকের
হাসির জিনস হব—এই কি যথেষ্ট নয় ? আমাকে
দেখিয়ে সকলে বল্বে—“দেখ হাসানকে, সে বড়লােক
হয়েছিল ; এই নােংড়া কাপড়পরা হাসানটাকে দেখ,
১৪৪
গুলবেহেস্ত,
সে সােণাদানা জড়িয়েছিল, দেখ ওকে যে খলিফার
বন্ধু হয়েছিল, আর তার থেকে এইটুকু শিক্ষা কর যে
কিছুই স্থায়ী নয় পৃথিবীতে।” কিন্তু আমি তাদের
বিপে কাণ না দিয়ে নিজের কাজ করে যাব, আর
অবসর সময় মনে করব আমার এই আনন্দের দিনের
কথা, এই গর্বের দিনের কথা, মনে করূব এই
চিরশান্তির উদ্যানকে, এই চির-সৌন্দর্য্যের ঝরণাকে,
ধরার নন্দনের মত এই শিবিরটিকে ; মনে করব
একদিন কবিদের সঙ্গে আমি কাব্যের কথা কয়েছি
এবং তাদের নামেরই অনুরূপ সুন্দর দাসসকল আমার
ছিল ! রক্ষা কর, রক্ষা কর, হে দুনিয়ার মালিক,
আমার দুঃখের মরুভূমির মধ্যে এই সবুজ স্মৃতির তাল--
কুঞ্জটীকে রক্ষা কর । এ স্থানটিকে রক্তে কলঙ্কিত
করােনা। যে সব তরুলতা গতকল্যই তুমি আমাকে
বন্ধু বলে ডেকেছ শুনেছে, মূক মর্মপীড়ায় তাদের
মাথা নুইয়ে দিয়ে না; যে চৌকাঠ আমি মাড়িয়েছি
তা রক্তরঞ্জিত করে তুলো না। ওগে, রক্ষা কর,
রক্ষা কর ; যার প্রতিধ্বনি চিরকাল আমার স্মৃতিকে
ভূতের মত তাড়া করে বেড়াবে তা আমাকে শুনিয়ে
না-শুনিয়াে না ঐ শুভ্রকায়। সুন্দরীর মৃত্যুর
কারােক্তি ।
খলিফা। (রক্ষীদের প্রতি ) শেষ না হওয়া পর্যন্ত একে
গুলবেহেস্ত,
১৪৫.
ছেড় না। আর দেখাে এর চোখ দুটি যেন বেশ
খােলা থাকে এবং তাদের পরিপূর্ণ আনন্দ ভােজ
গ্রহণ করে।
{ অনুচরগণসহ খলিফা নিষ্ক্রান্ত)
হাসান। সূর্য অস্ত গেছে। রক্ষীগণ, ওহে রক্ষীগণ ! (কোনো
উত্তর নাই) { অন্দার, উইলো, জুপার, টস্কের প্রবেশ }
এখন প্রার্থনার সময়, তােমরা প্রার্থনা কর না ?
একটি ছােট রত্ন আমার এখনাে আছে। (রক্ষীর।
কোনাে কথা বলিল না) তােমরা কি বােবা? (রক্ষীর
মাথা নাড়িল। কিন্তু তােমরা কালা হলে না কেন?
( রক্ষীরা তাদের জিহ্বা দেখাইয়া দিল) ওঃ । তােমাদের
জিভ, ছিড়ে ফেলা হয়েছে! (রক্ষীরা শিবিরের জানালা
দেখাইয়া দিল) কি দেখাচ্ছ তােমরা ? ..ওঃ,
আসমানী!
আসমানী। আমি আড়াল থেকে সব দেখেছি এবং শুনেছি।
হাসান রাজার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, ক্ষমতা
হারিয়েছে।
হাসান। (পাগলের মত ) বেশ, বেশ হয়েছে, চমৎকার হয়েছে।
তুমি জানালায়, আমি রাস্তায়। এটি হচ্ছে ওটির
প্রতিচ্ছবি। হাঁস যেমন দুটি হয়ে জলে ভাসে
তেমনি ভেসে আসে আমাদের জীবনের ঘটনাবলী ।
বল, বল ; এখন একটি মধুর মিথ্যা ঐ ঠোট
১০
১৪৬ গুলবেহেস্ত, ! দিয়ে বের করে দাও, আসমানী! তুমি আমাকে কেমন ভালবাসাে, ফুটাও সে কথা মুখে । অঙ্গের পর অঙ্গ তােমার সৌন্দর্য্য দেখিয়ে দাও—তারপর নিয়ে এস, নিয়ে এস তােমার নূতন প্রেমিককে আমাকে বোকা বলে পরিহাস কর। বােকা, বােকা আমি—সেই চিরকেলে বােকা আসমানী। এখনাে হাসানকে আমি বােকা বছি না। ক্ষমতা হারিয়েছে কিন্তু সম্পদ হারায় নি। রাজ- মিঠাইওয়ালা হাসান এখনো বােগ দাদের সব চেয়ে ধনী বণিক হতে পারে। হাসান। গণিকা! গণিকা! গণকা! আসমানী। তুমি রাগলে কেন ? তােমাকে কি আমি অপমান করূলুম ? হাসান। ওঃ, একেই যদি তারা নিয়ে মাতাে, একেই মারুতাে ! আসমানী। (বাগানের দিকে চাহিয়া, হাসানকে ভুলিয়া) এতদিনে, এতদিনে ! বিলম্বিত মৃত্যুর মিছিল! এতদিনে আবার সব দেখা যাবে ! (বাগানের পিছন দিকটা সূর্যাস্তের শেষ আলােয় রাঙ্গিয়া উঠিল। শিবিরের দরজার দিকে বিলম্বিত মৃত্যুর মিছিলের কালাে ছায়াগুলি বহিয়া চলিতে লাগিল—এই ভাবে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া। মশরুর-নগ্ন হাতে খােলা তলােয়ার। চারিজন সাহায্যকারী, কৃষ্ণবর্ণ কাপড় পরা। নানারূপ অস্ত্র শস্ত্র হাতে দুইটি রক্ত বাস পরিহিত লােক একটি দৌহদণ্ডে
গুবেহেস্ত,
১৪৭
উজ্জ্বল একটি বাতি ঝুলাইয়া লইয়া যাইতে লাগিল। পরিবানু
এবং রফি অর্ধনগ্ন, পায়ে মােটা শিকল। তাদের প্রত্যেকের
পিছনে উত্তোলিত তলােয়ার সহ এক একটি সৈনিক।
মরুর শিবিরের দরজায় ঘা দিল ; দাসগণ দরজা খুলিয়া
দিয়া ভয়ে পলাইয়া গেল। বাতিটী জানালা দিয়া আলাে
বিকীর্ণ করিতে লাগিল, পরিবানু এবং রফির পিছনে
দাড়ানাে সৈনিকেরা তাহাদের পায়ের লৌহ শিকল খুলিয়া
দিল এবং তাহাদের গলায় হাত দিয়া ভিতরে ঢুকাইরা দিল।
তারপর শিবিরের চারটি দাস আবিভূত হইল-বেতওয়ালা
লােকটির রক্ষকতায়। তারা হাসানকে জোর করিয়া
ঢুকাইয়া দিল। রঙ্গমঞ্চ প্রায় অন্ধকার হইয়া গেল, শুধু
জানালা দিয়া অস্পষ্ট আললা আসিতে লাগিল। নীরবতার
মধ্যে নিঝরের কলধ্বনি শােনা যাইতে লাগিল! এবং
সঙ্গে সঙ্গে কাড়া বাজিতে লাগিল। সেই শব্দের আড়ালে
মর্মভেদী কাতর চীৎকার অর্ধচাপা পড়িয়া গেল। অবশেষে
চন্দ্রের রূপালি আলাের জোয়ার বাগান প্লাবিত করিয়া দিল।
রক্ষীরা ঠেলিয়া হাসানকে শিবিরের দরজায় আনিল। তার
মুখ ভীষণ ফঁাকাসে ; সে টলিতে টলিতে কয়েক পা
অগ্রসর হইয়া মুর্ভূিত হইয়া নিঝরের ছায়ায় পড়িয়া গেল।
মিছিলের যা অবশিষ্ট ছিল এখন তা বিপরীত ক্রমে চলিল।
মশুরুর দরজার কাছে দাঁড়াইয়া রহিল, আসমানী তার
বাহু ধরিয়া টানিতেছে) মশরুর, কালাে মঞর !
মশরুর। আল্লা—মাগীটা ।
আসমানী। তােমার গায়ে কেমন রক্তের গন্ধ !
.
১৪৮
গুবেহেস্ত,
কি ?
মর। আর তােমার গায়ে গােলাপের।
আসমানী। ওরা যন্ত্রণায় মােচড়াচ্ছিল দেখে আমি
হাসছিলুম-পর্দার আড়াল থেকে দেখে
হাসছিলুম। তুমি আবার ওর রক্তপান করূতে গেলে
কেন ?
মরুর। প্রতিজ্ঞা ছিল।
আসমানী। আমারাে রক্ত কি তুমি পান করবে ?
মরুর। আমার বাহু দুটি দিয়ে তােমাকে জড়িয়ে ধরূৰ
আসমানী। তােমার বাহু দুটি হচ্ছে কাল চক্চকে পাথরের
দেয়াল, তােমার বুকটি হয়েছে অন্ধকারের দুর্গ ।
মশরুর। ছােট্ট সাদা পােকাটী, তােমাকে আমার বুকে পিযে,
মারব। (আসমানীকে জড়াইয়া ধরিল )
আসমানী। ( একটু পরে তার আলিঙ্গন হইতে মুক্ত হইতে চেষ্টা করিয়া,
আকস্মিক ভীতিসূচক চীৎকার করিয়া) ওঃ, আমাকে
ছেড়ে দাও। শুনছ কিছু ? শুন্ছ ?
মরুর।
রাত্রির অস্ফুট শব্দ ছাড়া আর কি শুস্কার আছে ?
আমানী। ( লাফাইয়া সরিয়া গিয়া ) ফুলগুলি কথা কচ্ছে, বাগান
জীয়ে উঠেছে। (সে পড়িয়া গেল )
মরুর।
( তাহাকে তুলিয়া লইয়া মুইয়া) মেয়েটা রক্ত ভালবাসে
আর জ্যোৎস্না দেখে ভয় পায় ! কি চমৎকার সাদা
এবং মোলায়েম ! নিয়ে যাই বাড়ী।
( প্রস্থান)
বেহেস্ত,
১৪৯
( হাসানকে খুজিতে খুজিতে ইসাকের প্রবেশ
ইসাক। হাসান—কোথায় পড়ে আছে সে ? হাসান, ও
হাসান! হারুণ, তার কোমল হৃদয়টি তুমি ভেঙ্গে
দিয়েছ আর আমি ভেঙ্গে দিলুম আমার বাঁশী ; আর
তােমার জন্যে বাঁশী বাজাচ্ছিনা। সে হয়ত রাস্তায়
রাস্তায় মৃত্যুর মতন ঘুরে বেড়াচ্ছে আর নিজের চোখ
দুটি উপড়ে তুলে ফেলতে চাচ্ছে। হাসান, ও হাসান।
এই তাে সে! আগে যেমন দেখেছিলুম তেনি পড়ে
আছে সে নিঝরের ছায়ায়—চাঁদের দিকে মুখ করে।
তার জীবনে গানের মতই মিল আছে। জীবন কি
একটা মুকুর যাতে ঘটনা সব দ্বিগুণ হয়ে দেখা
দেয় ?
হাসান। (মুচ্ছা হইতে অর্ধ জাগ্রত হইয়া) যে হাঁসেরা ভেসে
যায়-
ইসাক।
(তাহাকে তুলির জন্য তার উপর ঝুকিয়া বন্ধু, তােমার
গলার স্বর শুনে সুখী হলুম। ওঠ, ওঠ, ভারি দুঃখের
অবস্থা তােমার ।
হাসান। (ক্ষীণ ভাবে ) আমাকে শুয়ে থাকতে দাও। এই
স্থানটি নির্জন, মাটি সুশীতল। কবরে রাখবার
জন্যে যেন শুধু আমাকে ভােলা হয়, তারপর আমি
নদী দিয়ে ভেসে চলে যাব সাগরে।
১৫?
গুবেহেস্ত,
ইসাক। তুমি জীবিত, কেউ তােমাকে কিছু কবে না—কথা
শােন, নৈরাশ্য দূর কর।
হাসান। সেই সাগরে কোনাে লাল মাছ নেই।
ইসাক। ওঠ, ওঠ, সাহস ধর ; জানি তুমি ভুগেছ।
হাসান। মেয়েটি সাহসী ছিল! ওঃ! তার হাত দুটি, তার
হাত দুটি !
ইসাক। আমাকে ঐ কাহিনী বলল না।
হাসান। তুমি কবি। তারা তার প্রেমিকের গলা কেটে তার
চোখে নিয়ে রক্ত ঢালে।
ইসাক। চুপ কর। তোমাকে আজ সয়তানে পেয়েছে। আমি
বছি তােমাকে, এ সত্য নয়। স্বপ্ন দেখা বন্ধ কর ;
আমার চোখের দিকে চেয়ে দেখ ; শােন! ( বাগানের
বাইরে অনেকগুলি ঘণ্টার ধ্বনি শােনা গেল ) শুছ ?
চন্দ্রের ফটকের দিকে উট সব তাড়া করে নেওয়া
হচ্ছে। মধ্য রাত্রে যাত্রীরা সব সুদূর উত্তর-পূর্বদিকে,
ধরণীর স্বর্গ বােখার ও সমরখণ্ডের দিকে রােয়ানা
এ মরুভূমির পথ, উজ্জ্বল সমুদ্র তীরের মত
পীতবর্ণ এপথ, তাই সকলে একে বলে থাকে সােণালি
যাত্রা।
হাসান। কিন্তু এই সমরখণ্ডের সােণালি যাত্রায় তােমার
আমার কি ?
ইসাক। আমি ছেড়ে যাচ্ছি এই অত্যাচারের.-এই রক্তের
হবে।
গুলুবেহেস্ত,
বােগ দাদ। আমি আমার বাঁশী ভেঙ্গে ফেলেছি,
রাজাদের প্রশংসায় তা আর কখনাে বাজবে না।
এবার আমি মরুভূমির পথেরই পথিক হব এবং
পৃথিবীর শূন্যতার স্বরের জন্যে কাণ পেতে থাকব।
(গান)
আজ গেছে ভেঙ্গে বাশী, গেছে মাের প্রাণ ভাঙ্গিয়া
মােহের বাঁধান, অলীক স্বপন, গেছে মাের অজি কাটিয়া।
রাজ হতল এসেছি ছাড়িয়া,
নীলাকাশ তলে আবাস রচিয়া ?
সম্পদের মােহ, ক্ষমতা গরিমা,
নন্দন নরক, রক্ত কালিমা,
এসেছি ছাড়িয়া প্রকৃতির কোলে,
মুক্ত আনন্দ নিঝরের তলে
স্বাধীনতা মাঝে- যথায় বিরাজে
বিশ্ব দেবতার পরশ অমিয়া
সীমা ছেড়ে তাই সীমাহীন মাঝে
বিরাট বিশ্ব লয়েছি বরিয়া!
( কথায় ) আর তুমি থাকবে আমার পাশে।
হাসান। আমি ?
ইসাক। উঠ।
হাসান। ( ইসাকের সাহায্যে উঠিয়া) বাঞ্ছিত মৃত্যুর হাত থেকে
কেন আমাকে বাঁচালে ? তােমার কাছে কিম্বা আর
কোনাে জীবিত মানুষের কাছে আমি কে? কেন
গুবেহেস্ত
অদৃষ্টের মত এসে আবার তুমি আমাকে জীবনের
পথে টেনে নিচ্ছ ?
ইসাক। কারণ আমি তােমার বন্ধু এবং তােমাকে আমার
দরকার আছে।
হাসান। ওঃ, ইসাক ! কবি ইসাক ।
ইসাক। যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হও।
হাসান। আমার তো সঙ্গে নেবার কিছু নেই।
ইসাক। ওঃ! তুমিই তাে তাহলে যাত্রী, প্রকৃত তীর্থযাত্রী।
আমার কিছু স্বর্ণ দিনার রয়েছে। প্রয়ােজনীয়
জিনীসের অভাব হবেনা আমাদের। ফটকে গিয়ে
এই আরামের এবং কুঁড়েমির রেশমী পােষাক বলিয়ে
আমরা পরিশ্রমের মােটা পােষাক পরে নেব।
তােমার ঘর থেকে কিছু নেবার নেই, একটি জিনসও
নয় ?
হাসান।
(গান)
ক্যা সওদা ভাই মজুদ কিয়াে সাথে লেনেকে
যব যাওগে দুনিয়া ছােড় কে যাহা মােকাম তুমকো ?
দোলং এমারত, দোস্ত পিয়ারী
যি যিস্ পর তােম আসক্ ভারি,
কোই নেই তােমার সাথ, যায়গা,
একেলা তােমারি যানা হােগা,
দুনিয়া কি খেল সমঝে সব ভেল,
হরদম্ দিমে রাখখ ইবাত কো!
গুলবেহেস্ত,
(কথায়-কাঁপিয়া উঠিয়া) এই ঘরে কিছু নেই, কিছু
নেই, কিন্তু একটি পুরােণণা গালিচা আছে এখনাে
আমার দোকানে। তার ফুলগুলাে তে কাটায়
কলঙ্কিত করেনি। কিন্তু তার সন্ধানে যেতে সাহস
হয় না।
ইসাক। আমি নিয়ে আসব । তুমি তােমার সান্ধ্য প্রার্থনা
করবার সময় মরুভূমির উপর তা মেলে দেবে, ঊষর
বালুকার সীমাহীনতার মধ্যে সেই হবে কোমল
ঘাষের একটি ছােট্ট মাঠ।
হাসান। (হঠাৎ ভয়ে ইসাককে ধরিয়া) আমার কাছে থাক,
আমাকে ছেড়ে যেয়াে না। রাত্রিটা ভীষণ হয়ে
উঠছে !
ইসাক। মাথা নষ্ট হতে দিয়ােনা। এতে শুধু তার। আর
চাদ আর জ্যোৎস্নার স্বপ্নে মগ্ন বাগানের ছবি।
হাসান। বাতাস ছাড়াই গাছগুলাে নড়ছে, ফুলগুলাে কথা
বল্ছে, তারাগুলাে বড় হয়ে উঠছে।
ইসাক। শান্ত হও, কিছুতে নয়।
(ঝরণার জল লাল হইয়া উঠিল)
হাসান। ঝর্ণা ঝরণা!
ইসাক। ওঃ! ঝরণা থেকে যে রক্তের ধারা বইছে! চলে
এস।
হাসান। বাগান জীয়ে উঠেছে।
১৫৪
গুবেহেস্ত,
ইসাক। চলে এস ; ভূতের উপদ্রব! চলে এস, চলে এস।
।
ঐ ঘণ্টার ধ্বনি শুনে চল!
(ভয়ে উভয়ে নিষ্ক্রান্ত )
( নিঝরের শিল্পীর প্রেতাত্মা খুব ফিকে রঙের বিদেশী
পােষাকে নিঝর হইতে বাহির হইয়া আসিল)
নিঝরের প্রেতাত্মা। বাগান এখন প্রেতাত্মাদের। চলে এস,
নূতন ভাই আর বােন। পৃথিবীর স্কুল প্রভাব
তােমাদের উপর থাক্তে থাকতে চলে এস, কথা
বতে এবং দেখা দিতে চলে এস। চলে এস, যারা
গেছে এবং যারা আছে তারা সকলেই তােমাদের
সঙ্গে নৃত্য করবে।
রফির ও পরিবানুর প্রেতাত্মা। (রফির গলার স্বর, রফির পােষাক,
রফির ভগ্ন শৃঙ্খল, কিন্তু সব মৃত্যুর মত ফিকে রঙের )
হে নিঝরের প্রেতাত্মা, আমরা এখানেই।
নি-প্রে। তােমাকে এবং তােমার শুভ্রকায় সঙ্গিনীটিকে এই
এই প্রেত রাজ্যে অভ্যর্থনা করে আছি। ইচ্ছামত
তােমরা এখানে আনন্দ কর, ভ্রমণ কর। পৃথিবীর
অত্যাচার আর তােমাদেরে স্পর্শ কৰ্ত্তে পাবে না।
প্রেম অবিনশ্বর, প্রেমিক প্রেমিকার পরীক্ষা হয়
যথেষ্ট কিন্তু তাদের প্রকৃত মৃত্যু বা বিচ্ছেদ নেই।
যাও, আনন্দে অবস্থান কর।
দ্বিতীয় দৃশ্য বােগদাদ সহরের চাদনি ফটক। উজ্জল চন্দ্রালােক। বণিকগণ, উটচালক এবং তাহাদের উটগণ, তীর্থযাত্রী, ইহুদি, স্ত্রীলােক, হরেক রকমের লােক। লৌহ শলাকাবিশিষ্ট ফটকে প্রকাণ্ড একটি চাবি লইয়া প্রহরী দাড়াইয়া আছে। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে হাসান এবং ইসাক তীর্থ- যাত্রীর বেশে রহিয়াছে। বণিকগণ। (একত্রে) (গান) চল সম্মুখে চল সম্মুখে চল হে তিমির যাত্রী, চল হে বােন্দাদী বণিকের দল চল হে পেরিয়ে রাত্রি। প্রধান পােশাক বিক্রেতা। আছে কাশ্মীরী কৃষ্ণ গালিচা, আছে পারস্যের পাগড়ী, চোগা আচকান উষ্ট্র বােঝাই আছে হিন্দুস্থানী ঘাগড়ী। গন্ধ বিক্রেতা। গােলাবী আতর আছে চন্দন, আছে অগুরুর গুরু গরিমা, তেল মশলার গন্ধ বাহার আছে মৃগনাভির মহিমা। প্রধান ইহুদীগণ। ময়ূরী ঢঙের আছে পুথি যত, ডামাস্কাসের পুরাতন লিখা, আঁয়ে কুমীর আঁকা তলােয়ার, কণ্ঠের হার ও রত্নটাকা।
গুলুবেহেস্ত,
যাত্রীদলের সর্দার।
কিন্তু তােমরা শুধু ইহুদী তাে ?
প্রধান ইহুদী। অধিকার আছে বাঁচিতে তাবরা।
যাত্রীদলের সর্দার।
কিন্তু তােমরা কে, জীর্ণতায়
যারা কারাে কাছে নাহিক হারাে ?
ইসাক।
মােরাও দুজনে তীর্থ যাত্রী,
তরিতে চাই হে সাগর নীর,
নীল পাহাড়ের ওপারে সুদূরে
তাইতো রেখেছি নয়ন স্থির।
গৃহের আরামে জড়াইয়া হিয়া
কাটা যে চায় শয়নে রাত্রি।
(গান) দূর দুর্গম সমর খণ্ডের
আমরা সােণালি পথের যাত্রী।
প্রধান বণিক। চল সম্মুখে, চল সম্মুখে
একজন স্ত্রীলােক। ওহহ, গৃহ ছাড়ি যাবে কোন্ দুঃখে,
গৃহই সবার জীবন ধাত্রী।
বণিকগণ। (একসঙ্গে কোরাস্ না, না-
(গান) দূর দুর্গম সমর খণ্ডের
আমরা সােণালী পথের যাত্রী।
একটি বৃদ্ধা।
ফুলবালা আর ফুলমালা ঘরে
নাই তােমাদের যা রাখিবে ধরে?
নাই গেহে হিয়া-অধিষ্ঠাত্রী ?
বণিকগণ। ( একত্রে) না, না-
(গান) দূর দুর্গম সমর খণ্ডের
আমরা সােণালি পথের যাত্রী।
হাসান। ঘরের মায়ার কুহেলি ঘােটা
গুলুবেহেস্ত,
খসিয়া গিয়াছে হৃদয় হতে,
বিরাট বাহিরে লইমু বরিয়া
দিগন্ত ঘেড়া বালুকা পথে।
ইসাক। মৃপতি নগর হেঁয়াচ লেগেছে,
যে বাঁশীতে তা গিয়েছে টুটি,
খােদার হাতে এ দেহ বশীটি
উঠুক এখন ফুকারি ফুটি।
যাত্রীদলের সর্দার।
হে প্রহরী, এবে খুল হে ফটক।
প্রহরী।
এই দিনু খুলি, ঘুচিল আটক ?
দেখ হে এখনো রয়েছে রাত্রি।
বণিকগণ। (একত্রে) তা থাক্-
(গান) দূর দুর্গম সমর খণ্ডের
আমরা সােণালী পথের যাত্রী।
(যাত্রীদল ফটক পার হইয়া গেল)
( দূর হইতে বণিকগণের মিলিত কণ্ঠ শােনা গেল।
(গান) চল সম্মুখে, চল সম্মুখে
চল হে তিমির যাত্রী,
দূর দুর্গম সমর খণ্ডের
আমরা সােণালি পথের যাত্রী।
৫ঠeos
3c
069
যবনিকা
%৩০০০%
®®ose
০০০০০%
No text on this page.
No text on this page.