Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Diganta
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দিগন্ত
অনিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বি-এ
সুধী মার চট্টোপাধ্যায়
বাতায়ন পাবলিশিং হাউ
৮৫, বৌবাজার ইট, কলিকাতা
এক টাকা
বৈশাখ-১৩৪২
বাতায়ন পাবলিশিং হাউস-এর পক্ষে, ইউনিয়ন প্রেস
হইতে, দেবতাচরণ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
* ৮৫, বৌবাজার &ট, কলিকাতা *
বন্ধুর প্রেমেন্দ্র মিত্রের করকমলে-
অনিলকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিগন্ত
কাব্য-চেতনার প্রথম উদয়-কালের
অপরিহার্য কুয়াশায়
একটু
ঝাপস, কিন্তু, তবুও তাহা সুদূর
প্রসারের ইঙ্গিতে ঔৎসুক্য জাগায়,
মুগ্ধ করে। যে দৃষ্টি নিজের অক্ষমতার
চীরে ঠেকিয়া ব্যর্থ হয়, তাঁহার
দিগন্ত ইহা নহে—এ দিগন্তু
সত্যই বিস্তৃত সম্ভাবনার আকাশে
পিয়াই মিশিয়াছে।
শ্রীপ্রেমেন্দ্র মিত্র
=
দিগন্ত বিপরীত হৃদয়-সমুদ্র-তীরে জ্বলিছে যে দীপ আজি তারে চাহি’ শিশু চাঁদ কাঁদে অনন্ত নীলিমা পরে, সুবিশাল বিহঙ্গম, পড়িতে চাহিছে কীট-ফাঁদে। সুরক্ত-চন্দন-তরু ভুলি নিজ গন্ধমায়া ধূপের সৌরভে আজি মাতে, উদাসী মাঠের বাঁশী, সহসা হারায়ে পথ, সুর খোঁজে ব্যর্থ অন্ধ রাতে ! উত্তাল-সাগর উর্মি ভুলিয়া মহিমা তার চোরাবালি জলতলে নামে, খগরাজ লজ্জা পেয়ে, নাগপাশে বন্দী সম- পিঞ্জর বিহগ-দ্বারে থামে! -অনিল
রূপ-শিখা
স্বপন তুলির রঙ্গীন টানে নিত্য ফোট’ সুন্দরি
প্রাণের প্রদীপ তাইত জ্বালি আসবে বলে শবরী
তারার মালা, কণ্ঠ-ভুষা, চক্ষে তোমার দীপ-শিখা,
সেই আলােতে পরিয়ে দিতে ললাট দেশে জয়টীকা-
নিদহারা যে আঁখির পাতে রাত্রি ব্যাপি রই জাগি
একটুখানি পরশ আশে তােমার কাছে ভিখ মাগি।
ছন্দ তালে চরণ ফেল, কর্ণে শােভে মতির দুল,
সােনার কাঠির স্পর্শে তুমি মনবাগেতে ফোটাও ফুল,
হৃদয়-কারায় শৃঙ্খলিত রূপ-মহলের নন্দিনী
শঙ্কা কিসের, আজকে হতে তুমিই জীবন সঙ্গিনী।
সুধীর
দিগন্ত
আমার পৃথিবী গ্রহ
তােমার চোখের কুহেলী-মায়ায় আমার পৃথিবী-গ্রহ
ঘুরিতেছে অহরহ।
কক্ষ, আমার তােমার অ-রেখা,
সঙ্গীত তার আঁখি-বর্ষণে শেখা!
প্রকৃতি হাতের অলস-তুলির দাগে,
আমার ভুবনে ষড়ঋতু-চয় ।
স্থির হয়ে নাহি জাগে
আমার ভুবনে ষড়ঋতু-রঙ, এক সাথে এসে মেশে,
আমার গ্রহের দেশে।
তব ভ্রুকুটিতে নিদাঘ, আমার, হেমন্ত অভিমানে,
বরষা তােমার আঁখি-বর্ষণ-গানে।
শীতের মৃত্যু-কুহেলী রয়েছে তব অনাদরে ঢাকা,
মাের বসন্ত, হাস্যে তােমার, মেলেছে শুভ্র পাখা;
একটি দিনের ক্ষুদ্র সীমার ষড়ঋতু-নৰ্তিকা,
আমার ভগ্ন-গেহ-বাতায়নে জ্বালে হেম-বর্তিকা !
তব, নিমীলিত নয়নের তলে আমার পৃথ্বী কঁপে,
চকিতে তােমার ঘুম ভেঙে যায়, আমার পৃথ্বী-পাপে ;
আমার কালিমা তােমার তারায়
ভয়াল-স্বপন সমান দাড়ায়,
জাগরণে, তাই, আঁখির তারকা হেরিতেছি আরাে কালাে,
আমার পাপেও করে সুন্দর, তোমার আঁখির আলাে !
অনিল
দিগন্ত
অতীতের স্মৃতি অতীতের স্মৃতি মাঝে শতেক বেদনা, বুকে কেন জাগে সদা বললা গাে সজনী ? ভুলিবারে মনে করি, জাগে যে চেতনা, আঁখি-পাতে ঘুম নাই দিবস-রজনী জানি কবে যে দেখা কোন্ শুভক্ষণে, কবির কল্পনা-সৃত তব মুখখানি, ছায়াতলে বসি প্রিয়ে ভেবেছিলে মনে, শুনেছিলে কী আগ্রহে মম মর্মবাণী। সে দিন হয়েছে গত, তুমি নাহি আর, নিঠুর কালের কোলে লয়েছ শরণ, তাই মাের শূন্য হৃদি করে হাহাকার, নিশি দিন মাগিতেছি আপন মরণ ! মৃত্যু যদি চুপে চুপে আসে মেরি কাছে, তােমায় আমায় প্রিয়ে দেখা হবে পাছে। সুধীর- দিগন্ত
বন্দী-দেবতা
আমারে মুক্ত করিতে আসিয়া
দেবতা নিজেই বন্দী।
হায় শয়তা, কোথা তুই পেলি
স্বর্গ-নাশা এ ফন্দী ?
আমার কান্না, দেবতার তরে-
সে কী, কিরে এত নিঃস্ব?
তাহারেও তুমি করাে উপহাস
মিছে হাসে তাের বিশ্ব।
দেবতা-পরশে, মাের হাসি-গীতি,
তাতেও জাগাস মরণের ভীতি,
পঙ্কিল করাে, মাের মানসের
ভগীরথ-আনা গঙ্গা!
স্বপন, যবেরে অনন্তে লীন,
শশী-রেখা-সম হয়ে আসে ক্ষীণ,
তারাে মাঝে আননা দিনের রৌদ্র
সে কি এত ক্ষণভঙ্গ?
তবু হ’ল তব জয়,
মুছে গেল তব অট্ট হাসিতে দেবতার বরাভয়।
তা’র রাঙা হাত-খানি,
তােমার অশুভ পাণি,
ঢেকে দিল আজ হায়!
দেবতা, আমার হলেন বন্দী, অসীম মৌনতায়।
-অনিল
দিগন্ত
প্রিয়ার পরশ
তােমার সাথে, শেষ হয়েছে মন-বাগেতে ফুল ফোটা
কৃষ্ণ কলির তরল হাসি, ভােমরা বঁধুর চুম্ লােটা!
দখিন বায়ে জাগবেনা আর যাদুকরের মন্ত্রেতে
ভবে না গাে আকুল পরাণ গন্ধরাজের গন্ধেতে।
সাত রাজার ধন, মাণিকতন, গলায় তােমার দুলবে না,
নীল গগনের দোয়া তলে, আর তাে তুমি আসবে না !
পাগল করা, রূপের শিখা, চরণ ফেলা ভঙ্গীতে,
জানিয়ে দিতে, প্রাণের কথা, নানান রকম ইঙ্গিতে।
নীলাম্বরে ঢাকৃতে তনু, নীল যে চোখের তারা গাে
বিশ্ব-ভুবন খুজছি তবু, পাইনা তােমার সাড়া গাে!
তাই তাে আমার মন-বাগেতে, কঁাদন জাগে ফুলকলির
দোয়েল, শ্যামার শিস দেওয়া আর বন্ধ হ’ল বুলবুলির!
মহাকালের বাহুর পাশে, আজকে তুমি বন্দিনী-
সঙ্গী-হারা কঁছি আমি, কোথায় জীবন সঙ্গিনী।
লুপ্ত হ’ল তােমার ধারা, এই দুনিয়ার দেলখােসে,-
কণ্ঠ-বাণী, স্তব্ধ আজি, বিশ্ব তােমার রূপ ঘােষে!
সেই রূপেতেই পাগল আমি, উড়াও তােমার রূপ-নিশান,
ভাগীরথীর পুণ্য সলিল, গাহু আজি বিজয় গান্!
দোহার মিলন হবে কী সই, স্বর্গলােকের যেথায় দ্বার
সেই তত আমার পরম প্রিয়, প্রিয়ার পরশ যেথায় তার।
-সুধীর
দিগন্ত
মেরুপ্রান্তে
আমার দুঃস্বপ্ন দিয়ে ছেয়ে গেছে বিশ্বের আকাশ,
দখিনা বাতাস তাই উদাসী চঞ্চল,
ফাল্গুনের পুষ্প-বনে, অলি-পক্ষ-পুটে এ কী অগ্নির আভাস
বিষ হ’ল প্রেয়সীর অনুতপ্ত নয়নের জল।
বাতাসে বাজেনা বেণু, পক্ষী-কণ্ঠে কোথা সুধা-ধার
জ্বলন্ত গ্রহের পিণ্ড ঘুরিতেছে চৌদিকে আমার !
আলাের দীপিকা মাের নয়নে কাজল শুধু টানে
রূপের দেউলে মাের কঙ্কাল-প্রহরী সদা জাগে,
দেবতার উচ্চাসন আপন রূপের গর্বে যে বা কাছে আনে,
সে আজি ধরার ধূলি, ভূষণ করিতে বুঝি মাগে!
=
এই ভালাে, জীবনের শেষ সীমা, মেরু-প্রান্তে বাস,
সমুদ্রের নীল জলে, ক্ষণেক লভিব নব সৃষ্টির আভাস।
দিগ
এ পৃথিবী মনে হবে, বুঝি এই অবিশ্রান্ত জলের নৰ্ত্তন,
পৃথিবীর ব্যাপ্তি বুঝি এই নৃত্যে নাচে,
মানবের শত চিন্তা, কর্ম-শ্রোত মাঝে তার মহা আবর্তন
এই গীতে, মহা মুক্তি যাচে!
মুক্তি কামী, আসিয়াছি তাই আজি মেরু প্রান্ত দেশে,
একটি তরঙ্গ হয়ে মিলাইতে চাহি তা’হে আকুল আবেশে।
শুনিতে চাহিনা আজ অনুতপ্ত পৃথিবীর কোনাে পিছু-ডাক্
আমার বিমাতা সে তত চিরদিন করিয়াছে হেলা ;
কুন্তী-স্নেহ-বঞ্চিত-সে-কর্ণ তাই হয়েছে নির্বাহ্ন
সিংহাসন লােভে সে তো ফিরিবেনা এই সন্ধ্যা বেলা।
আদিম মুহূর্তে যা’র প্রাণ কলি দগ্ধ হয় তীব্র রবি-দাহে,
সহস্র রশ্মির খেলা, তরুণ বসন্ত দিনে, শিহরণ জাগায় কী তাহে।
-অনিল
দিগন্ত
শ্রাবণ
ধারা সম
আঁখির জলখার
শ্রাবণ ধারা সম আঁখির জলধার,
আঁধার দশদিশি সুদূর পারাবার।
মেঘের ফাকে ফাকে বিজলী চমকায়,
হৃদয় ব্যথা সখী গুমরি উঠে হায় ।
আজি এ গৃহ কোণে কেমনে থাকি বল
উদাস আঁখি তারা উতলা হৃদিতল,
আপন হাতে গাঁথা এ প্রেম ফুলহার,
নিঠুর গেল কোথা দিব যে গলে তার ।
-
ভাল যে বাসি তারে এই ত’ জানি হায়
তবুও কেন সখি ঠেলিছে মােরে পায় ?
ভুলিব মনে করি ব্যথা যে জাগে মাের,
তাহারি তরে সদা ঝরিছে আঁখিলাের।
—সুধীর
চকে তােমার বনায় কুয়াশা মাের জীবনের কাহিনী শুনিতে- করুণ কাহিনীটুক- অনুরােধ কেন বালা ? মাের জীবনের ঘটনাগুলিতে ও-তব কোমল-বুক মিছেই সহিবে ভূজগ-দশন জ্বালা। আকাশে, আমার যে বাণী হারাললা ভাষা পথের ধূলায় যে ফুল হারাল বাস, অসীম শূন্যে, ধুলার রেণুতে, সে বাণীর কোন্ আশা এখনাে ফেলিছে অশরীরিরূপে তপ্ত বুকের শ্বাস! মিছে তার খোঁজ কেন কর আজ রাণি ? হয়তাে তাদের অতীত কাহিনী তােমারও মর্মবাণী । যা সহেছি আর সহিবারে যাহা বাকী আমার চোখের অগ্নি-আঁখরে বুঝে নাও তার দাহ তৃষিত-অধরে তরল মদিরা ধরিয়াছে কোন্ সাকী অনাদরে, তবু কেন ঠেলি তারে, যদি বুঝিবারে চাহ মাের বাগিচার কিশলয়-ঘেরা, শিশু-কলিকারে ছিড়ি নিঠুর হস্তে, ভালােবেসে যার অলকে পরা ধীরে মােরে উপহাসি—মায়াবিনী সে যে নাচে আমারেই ঘিরি সাইরেনরূপে কান্না ঝরায় পাগলা-ঝােরার-নীরে। দিগন্ত
আমার হৃদয়ে পাষাণ স্তবক স্তরে স্তরে সজ্জিত
ক্ষিপ্র বাণীর আলাপী ভাষার হীনতায় প্রাণ কাঁদে,
অসীম-নিঠুর প্রস্তরচয় তারি চাপে লজ্জিত
হৃদয়ের সুর, সে ভিড় ছড়ায়ে অধরে করুণা সাধে!
দীর্ঘ-পথের দূর্গম-চলা তারি অবকাশতলে
দেহের রক্ত কণিকার মাঝে, সে সুর হারায় তাপ,
দরদীর কানে, আমার কাহিনী, বেদন বিধুর জ্বলে,
না জাগায় মায়া, মাের ভাষাতলে রুদ্রের অভিশাপ !
=
চক্ষে তােমার ঘনায় কুয়াশা অশ্রু জমিবে চোখে ?
দুষিবে জগৎ কোমল-হৃদয়া বলি’-
এসেছ যখন, সকলের মত মিলাও শূন্য-লােকে,
সাইরেন সম ক্ষণেকে মিলাও, ক্ষণেকে মিলাও ছলি!
সে দলের নহ—জানি বালা, জানি, তবু তা জগৎ চাহে,
মরণের ফাঁদ আছে জানি কোনাে কৃষ্ণ নদীর জলে,
নির্বোধ কোনাে নাবিক তাহাতে কভু কি তরণী বাহে ?
শ্যামলী পৃথী, তার মায়া ভুলি কে নামে পাতলতলে ?
তবু, শুনিলে না, ঝরিল শিশির, ঝরিল বিন্দুটুক
তোমার কাজল চোখে,
দিবসের তাপে মিছে কেন দহে শীতল নিশার বুক,
পৃথিবীর দিঠি মিলায় সূৰ্য্যলােকে।
-অনিল
বিগত
রের রেশ
আজি হৃদয়বীণা বাজে বিরহীরে-
তাই নয়নপাতে বহে শ্রাবণ ধারা,
ভাসে আকাশ গাঙে আজি ঐ যে দূরে
তাই ধবল মেঘে ঐ তটিনী হার।
কঁদে দিবস শেষে ঐ বিরহী প্রিয়া
তার করুণ হাসি এ কী নিঠুর খেলা!
তাই গুমরি ওঠে তার তরুণ হিয়া,
ওই শেষের খেয়ায় বুঝি, গেল রে বেলা।
তাই দিবস শেষে ঐ বিরহী বঁধু
দেখে রঙিন স্বপন ভাসে আঁখির জলে,
তারে ফিরতে নারে, ভাবে বসেই শুধু
হায় ফিরাবে বলল, তারে কিসের ছলে।
ঘন আঁধার এলাে ঐ দিবস শেষে,
তাই বাদল ঝরে ঐ মাদল বাজে;
তার হারাল শােভা, ঐ ভোমরা কেশে,
হায় বুকের মাঝে, তার ব্যথা যে রাজে।
কেন পাগল বাতাস আজি উতলা করে
কোথা নবীন সাথী, গেল যামিনী বেলা
হায়
ফুলের শাখে, ঐ
মধুর পরে
সখি যুগল রূপে, হের করে যে খেলা।
১২
তব করুণ অাখি দেখি পাগল পারা
কেন বসন সখি, আজি ফেলগাে দূরে
দেখি বিরাম হারা, ঝরে অাখির ধারা,
সখি থামালে, গতি, আজি হৃদয় পুরে
-
যদি এখনও সখি, মনে বােঝাতে নারাে
মন আপন কাজে যদি, মানা না মানে ;
কবে আসিবে প্রিয় যদি বলিতে পারে
তবে প্রিয়ের বাণী তব পশিবে কানে।
যদি ভাঙেগগা আশা, যদি নাই বা আসে,
তায় ক্ষতি কিবা হায় পাবে স্বরগ দ্বারে
ধ্রুব তারারি সম, জ্বলে হৃদি আকাশে
সেথা, সাজাবে সখি, তােমা মিলন হারে।
সেথা মিলন শুধুই সখি, নাহিক জ্বালা
ঝরে সুধার ধারা সখি বিরাম হারা।
সেথা বাজায় বাঁশি, তব হৃদয়-কালা
সেথা বহেগাে সখি, নব সুরের ধারা!
-সুধীর
দিকে দিকে লিখিতেছি প্রাণ-ভরা অবিশ্রান্ত চিঠি
আমারে ঘেরিয়া তারা নাচে যেন মৌমাছির দল।
প্রতিদানে পেয়েছি কী কণামাত্র করুণার দিঠি ?
সে কথা ভাবিয়া মিছে ফেলিব না ব্যর্থ আঁখি-জল।
প্রাণ কাঁদে, ফেটে পড়ে, প্রাণের প্রাচুর্য বেগভরে
লেখনীর মুখে তাই বাণী মাের গুঞ্জরিয়া ওঠে,
চৈত্র সন্ধ্যারাতে যথা কৃষ্ণ মেঘ ঝড়ে,
হাজার বকুল দল ধরণীর ধূলি শীর্ষে ললাটে।
কাগজের বুকে কলমের নিষ্ঠুর আঘাত
কঠিন-শিলার বুকে অতর্কিত মেঘ হ’তে যেন বজ্রপাত!
লেখনীর নত শিরখানি
নামায় সমুদ্র তীরে যেন,
তার শেষ প্রণামের বাণী !
ওগাে! তাই হােক!
আমার বাণীর ভারে ছেয়ে যা মধ্যাহ্ন-আলােক !
উত্তর মাগিনি আমি, উত্তর চাহিনি কোনােদিন,
তারা মাের কাছে কিছু করেনিতো ঋণ,
দাবী তাই নাই কোনাে কালে,
অনাদর পঙ্ক-লেখা, চিরদিন জ্বলে মাের ভালে।
তবুও
জীবন মোর চারিদিকে লিপি দিয়া গুঞ্জরিতে চাই
সঙ্কীর্ণ ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রাণের প্রাচুৰ্য ব্যথা, কেমনে
ঢাকিয়া রাখি ভাই?
আকাশের পূর্ণচন্দ্র রহে ঠিক স্থানে,
সমুদ্র অস্থির তবু কেন কেহ জানে?
—অনিল
দিগন্ত
১৪
মাত-মুর্তি
হৃদি-পটে আঁকা আছে তােমার মূরতি
আজিকে কেমনে তুমি পালাইবে বলে;
ভকতি-কুসুমে তােমা, করি যে আরতি
নিশি দিন কেন দেবি, আমারে গাে ছলে ?
আধারের মাঝে আমি কেঁদে হই সারা,
পরাণ মথিয়া উঠে বেদনার সুর,
দু’টি চোখে বহে মাের বাদলের ধারা;
আছ বটে কাছে, কিন্তু মনে হয় দূর ;
বাস্তবে দেখিব বলে করেছি যে অশি
বরাভয়রূপে আসি দাও দরশন,
হৃদয়ের ব্যথা আর, দুঃখ করাে নাশ
চিও মাঝে সদা যেন জাগে হরষণ।
শাশ্বত, সুন্দর জ্যোতি
সম্মুখেতে ধরি,
আলােকের পথে আমি ভাসাইব তরী।
-সুধীর
দিগন্ত
পৃথিবীর ঋণ
খােকা, মা’কে ডেকে বলে,-“ছছ ওগােমাগাে,
বাড়ীর সকল আগাছাদের কাইবে নাকি তুমি ?
ধাঙর ডেকে আনবে কী কাল ?—সেটা হবে নাগাে-
জঙ্গলা হয়েই থানা মাগাে ছােট্ট উঠানভূমি!”
“পৃথিবী, মা, একটু যদি রঙ, লাগিয়ে থাকে,
ব্যথা-ভরা দীর্ণ-বুকের ফঁাকে,
মুছে দিলে সেই সে রঙের ফালি,
মা আমাদের মুখ যে হবে কালি !
আকাশে, মা রঙ, ধরেছে রঙি মেঘের ফাঁকে
মুছতে কী তায় পাবে দু’টি হাতে
দীঘির জলে ঢেউ উঠেছে আজকে সবার আগে,
আষাঢ়-মেঘের কাজল-কালাে-রাতে।
পৃথিবী,-মা, সাজছে এমন কোরে,
কভু সঁঝে, কভু সকালে,—ভােরে,
কুন্তলে, সে মাখছে কভু কৃষ্ণ-মেঘের গুড়া,
মুক্ত-বেণীর 'পরে কভু সাজায় কৃষ্ণচূড়া;
শিশিরকণার হিম-জলেতে সাজায় শ্রবণতল,
কেমন কোরে মুছ বি এসব বলু মা মােরে বল।
দিগন্ত
আকাশ পরে হাত ওঠেনা তাই বলে কী হায়!
কঠিন করে করুবাে আঘাত এই পৃথিবীর গায়?
মানুষ, কি মা, পাষাণ-সম হীন ?
শ্যামল-বুকে জন্মি ভােলে শ্যামলতার ঋণ ?
বলছো, তুমিঝােপটা গেলে বাড়বে কিছু আলাে,
বলছি না-মা, তা’ হবেনা, আঁধারই মাের ভালাে;
ভেক-সাপেরা লুকিয়ে যদি থাকে,
ওরি বুকের ফঁাকে
এই তাে তােমার ভয় ?
হয় থােকা, সবার আগে,
দংশনেরি রক্ত-রাগে,
রাঙিয়ে নিয়ে অবশ তনু-
করবে মরণ-জয়!
মরণ, সে তাে নয়কো মাগো, শােনাে,
ফুল হয়ে যে ফুটবদা মাগাে কোনন,
দুর্বাদলের শীর্ণ শিখর পর,
শুবাে প্রজাপতির গীতি
গাঙ-শালিখের খেলার নীতি-
পৃথিবী, মা প্রবাস নহে শুবাে প্রথম-বাণী
সে, যে আমার সাত পুরুষের ঘর!
-অনিল
দিগন
১৭
খি
অভিমান
মাির এ গাখি জল, জানি সখি জানি
আজিও তােমারে প্রিয়ে পারেনি বাঁধিতে
ব্যর্থ করি দিলে মাের শত অনুরােধ
অন্তর রহিল শুধু কেবলি কাদিতে!
তাই মৌন সন্ধ্যাকাশে আমি চেয়ে থাকি
বেদনায় ভরে ওঠে ব্যর্থ হিয়াখানি;
নয়ন বহিয়া পড়ে শত জলধার,
কর্ণ আর পশেনা যে সানার বাণী !
জীবন-প্রভাতে তুমি বেসেছিলে ভালো
আজি কেন গেলে চলি’, দলি দু’টি পায় ;
পরাণ কাঁদিছে যে গাে পরাণ লাগিয়া
মরম-বেদনা হায়, মরমে লুকায় !
অর্ঘ্য-থালি ভরিয়াছি বক্ষ-রক্ত দিয়া
চরণের প্রান্তে তােমা দিতে উপহার :
এখনও কী ভাঙিবেনা অভিমান তব
শীর্ণ বক্ষ, দীর্ণ হয়ে যাবে অনিবার?
-সুধীর
হতে পরাজয়
জীবনে, বন্ধুতা সখি, কে জানিত এতই ভয়
অল মিনতিতে ভেঙে যায় !
জীবন-রথের চাকা, কে জানিত এতই ময়
স্ব-আঘাতে থেমে যায় !
পুষ্প, সখি ! কে জানিত এতই দুব,
অন্ধ-পােকা, তারে করে গাস !
আলােক, গাধার মুখে, চিরদিন কেন ছোটে
বড় হয়ে ক্ষুদ্র ক্রীতদাস।
বৃহৎ চাঁদের হাট নিমেষে আঁধার হয়
একখানি মেঘে হলে ঢাকা,
আলাের সাধনা তার নিমেষেই ব্যর্থ হয়,
সকল অতীত ভারি হয়ে আসে ফঁাকা !
শিশুর তরল হাসি, নিমেষেই ঢেকে দেয়
প্রবীণের বিজ্ঞতার ক্রোধ,
দেবতার রাজ্যখানি, তারে ঘেরি’ নিত্য চলে
দানবের ক্রুদ্ধ অবরােধ!
রাতের সুখের স্বপ্ন, নিমেষে ভাঙিয়া যায়
বাহিরের অহেতুক ডাকে,
বসন্ত প্ৰাচুৰ্য 'পরে, নিদাঘ দৈত। ক্ষয়ে
পিক-বঁধু মিছে চেয়ে থাকে ।
---অনি
দিগন্ত
বিরহিনী
চোখের জলেতে দৃষ্টি হারাল আঁখি
বলার আগেতে ফুরাল সকলি হায় !
প্রভাত-শিশিরে সিক্ত হ’ল যে শাখী,
তাই সে যে নিরুপায়, নিরুপায় !!
দিনের আলােতে ভাসিল যখন ধরা
পাপিয়া ধরিল ভান্!
বিরহ-ব্যথায় হৃদিখানি তার ভরা
তাই সে যে মিয়মান !!
সােনার স্বপনে, কাহার ছবিটি রাজে,
হৃদয় মাঝারে কাহার মূরতি আঁকা।
প্রিয়হীন হয়ে বাঁচিতে ধরণী মাঝে
বৃথাই তাহার থাকা, এ মরতে থাকা !!
নারী জনমের গুমরি বেদনা বুকে
করুণ ব্যথায় কঁদে যৌবন হায়!
ফাগুন সমীরে আগুন নিবাতে নারে
মরণ-শিখায় অর্পিল আপনায় ।
এ জগতে তুমি পেলেন যাহারে সখি—
ধ্রুব জেনাে সে যে ধ্রুবলােকে আছে জাগি
বিরহী-প্রাণের জ্বালা মুছাতে আপন করে
অনিমেষ সেথা, সে দয়িত আছে জাগি।
ঘুমাও, ঘুমাও মেয়ে, ঘুমে তব ভরে যা চোখ,
আঁখিতে ভরিয়া ভােলা মৃত্যু-আনা আফিঙের নেশা;
ও-তনু প্রদীপ পরে জ্বলিয়া উঠুক শিখা, স্বর্গ-মর্ত্য মেশা,
ঘুচে যাক্ ব্যর্থ গ্লানি, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, শােক!
তােমার ঘৃণিত কবি, আজিকে রহিবে জাগি তব শয্যাপাশে
নেহারিবে জ্যোৎস্নালােকে, তব পাণ্ডু অধরের গ্লানিমার ছায়া
শুনিবে কাহার নাম, অজ্ঞাতে ফুটিবে সেথা কারে এত মায়া
হেলিত, ঘৃণিত কবি, লজ্জাহীন বাস রবে শুধু সেই আশে !
সহসা চাতক এক জানালার পাশে যায় ডাকি
তুমিও চমকি উঠি বারেক নয়ন মেলি পুনঃ ঢাকো
পল্লব প্রচ্ছায়
সন্ধ্যাগমে পদ্ম যথা, তন্দ্রাবেশে করে বন্ধ অলির কায়ায়,
তেমনি আঁখির পদ্মে, নিমেষে আমার তনু যত্নে নিলে ঢাকি।
সহস, একটি হাত বিদ্রোহের বশে যেন উঠিল চমকি
পড়িল আসিয়া মাের ক্ষীণায়িত কবন্ধের প্রস্ফুট মায়ায়
চুমিনু ক্ষণেকে তারে তন্দ্রাঘাের সে রাত্রি-ছায়ায়,
কত কথা পাগলের মত মিছে কয়ে গেনু বকি।
সহসা পড়িল ঢুলে, ঘুমে তব মদির নয়ন,
ঘুমায়ে পড়ি কবে নাহি জানি হাতে হাত রাখি,
প্রভাত আসিল ফিরে, জানালার ধারে ডাকে পাখি,
কৰি, অৱ করিতেছে, স্বপনের রক্ত-রাঙা কুম-চয়ন!
-অনিল
১
প্রার্থনা মােরে বজের মত কঠোর কর’গাে কোমল ধরণী সম, পুষ্পের মত শুভ্র কর’গাে সুন্দর হৃদি মম। আকাশের মত বিরাট করগাে বারিধির মত্ত গতি জোছনার মত সুষমা ছড়াতে পারি যেন নিসপি। শামি চন্দ্রের মত উজলি গগনে ঢালিব সােহাগ রাশি, সূর্যের মত দীপ্ত হইয়া লইব তিমির নাশি। জননীর মত স্নেহ পারাবার সতত বহিবে বঙ্গে, উল্কার মত ছুটিব গাে বেগে অগ্নি জ্বালিতে চক্ষে। প্রদীপের বুকে শিখাটা জ্বালাতে পুড়াব আপন বক্ষ, সতী আর ওই সীতার মতন হবে যে আমার লক্ষ্য। বিশ্বের বুকে আঁকিয়া রাখিতে পতি সােহাগিনী আমার নাম কুল উজ্জল হবে অমর ধাম ! দষতা দানিবে আশিস্ অপার বিশ্বপারের তটিনী ক্ষীণ হইবে মৃত্যু লভিতে অমর বিশ্বের বুকে হব না লীন। -সুধীর উজ্জল উজ্জল হবে
যাত্রা-শেষ
ধরণীর ভাই বােন্ সবে,
একদিন, তােমাদের ছেড়ে যেতে হবে
ধরণীর কলঙ্কিত ধূলিরাশি ঝারি
উতল-প্লাবিত-গাঙে দিতে হবে পাড়ি।
সেদিন তাে বাচিবনা, বাঁচিবেনা আমার গৌরব,
গন্ধের আবর্তে যদি ঘনীভূত নাহি হয় নিঃস্বের
এ-কবিতা-সৌরভ!
আমার জীবিতকালে, দেখাে নাই বন্ধু
གt
আমার এ জীবনের বহ্নিরূপালা,
আমার মৃত্যুর পরে, আমার কবিতা মাঝে
দেখা দিবে সেই অগ্নিমালা।
আমারে জীবনে বন্ধু, দেখিয়াছ কাদিতে অনেক,
কেন কঁাদি উত্তর পেয়েছ কিছু তার?
হৃদয়ের নীল-বনে, দেখিবে আগুন ভাই জ্বলিছে আরেক
দেহের সমীধে সেথ, পঙ্গু প্রাণ চিত হয়ে
জ্বলিছে আবার।
২০
মৃত্যু-শেষে, জ্বলে দেহ; প্রাণ মাের হয়ে যায় চন্দনের স্নেহ
আমার কবিতা মাঝে, কী গন্ধ লুকায়ে আছে আম্রাণ
লইবে জানি কেহ।
জীবন-মালঞ্চে বসি, করুণ উদাস স্বরে, যে গানে
ভরিনু বাঁশিখানি
সে সুর অসত্য করে, হয়তাে রাত্রির ছায়ে ধুলাতে
মিশাবে হারমানি
-তবু নাহি বন্ধু ! মাের ভয়
এককণা অশ্রু মাের রহিবে অক্ষয়,
রজনীর কৃষ্ণপক্ষতলে ;
আমার শেষের বাণী
প্রভাত সূর্যের পাণি
শিৱ পাতি লবে অশ্রুজলে !
;
অনিল
গিত
২৪
-
ব্যথার সুখ
যে জন তােমারে দলিছে পায়েরি তলে
তারি তরে তুমি ভাবিতেছ অবিরত,
যে জন তােমারে কঁদায় চোখেরি জলে,
তারি কাছে তুমি করিতেছ মাথা নত ।
শয়ন শিয়রে যাপিতেছ কত নিশি,
মধুর হাস্যে উজলি রেখেছ গেহ ;
আলো আঁধারের মাধুরিমা তাতে মিশি
উজল করেছে তােমার সারাটি দেহ!
ক্ষীণ তনুখানি ঘেরিয়া বাড়িছে রূপ
চরণের তলে শত চঁাদ মূরছায় ;
মঙ্গলতরে জ্বালিছ পূজার ধূপ
ইষ্ট দেবতা, তুষ্ট সে সাধনায়!
এমনি করিয়া সহিতেছ কত দুখ,
কায়, মন, প্রাণ, সবি দেছ তারি লাগি
বিনিময়ে, তুমি চাহনা একটু সুখ,
বিশ্বের মাঝে হতেছ দুঃখভাগী ।
নারী জনমের শতেক বেদনা সহি
নির্ভীক তেজে চলিতেছ নিতি, নিতি
কবি, আজি আনে, ফুল চন্দন বহি
গৌরবময়ি! গাহিতে তােমারি গীতি।
-সুধীর
দিগ
বিবসনা
তােমারে লিখিব যবে প্রেম-লিপি খানি
ভীরু লিপি খানি মাের সঙ্কোচে মলিনা,
এতই নিঠুরা তুমি, তখন কী জানি?
নিজ-লুপ্তি সাথে, তুমি হারাইলে নিজের ঠিকানা
একদিন এ প্রেমিক ভুলিয়া গেছিল তা’র আকাশের নাম,
গর্বে না নাচিত বুক লভিলেও ক্ষুটোন্মুখ পদ্মের প্রণাম।
আকাশের চন্দ্ৰে চাহি ভুলিয়া গেছিল রিক্ত কোন্ তিথি আজ
তা’র অমা-পৌণ-মাসি, সকল রশ্মিহারা হ’ল তব মাঝ!
তবু, তুমি বুঝিলেনা, বুঝিতে চাহনি, তার আঁখির
তিয়াস
বুঝিলে, পুরুষ-প্রেম, সেততা শুধু ক্ষণিকের
যৌবনের চাঞ্চল্য-বিলাস
তােমার ঠিকানা নিভা! পাইনিকো তবু আজো জানি,
পদ্ম-পত্রে, হিম-কণা তারি মাঝে জমে গেছে তব দুই
অকরুণ পাণি।
তবু জানি, নিঠুরা আমার
তােমার কুন্তল-স্পর্শে, নিতি নামে নেত্ৰ-পক্ষে, রজনীর
পক্ষের বিস্তার।
দিগ
২৬
তবু জানি পলাতক! মাের স্বপ্নজায়া- প্রতিটি রমণী অঙ্গে, ছড়াইয়া গেছে আজ তােমারি ও লাবণির মায়া। স্বপ্নে তাই অধর কঁপিয়া যদি ওঠে, তবু, সে তোমার নাম কণ্ঠে নাহি ফোটে বুঝিয়া লইও নিভা ! তােমার সে ছদ্মনাম, তারি আবরণ সহসা খসিয়া গেছে, খুলে ফেলে দেছে তার সব আভরণ- পত্র-লেখা, ফেলে দেছে শকুন্তলা, কুরঙ্গ-নয়না, ছিন্নমস্তা সাজিয়া সে, জাগায় প্রলয় ভীতি- হয়ে বিবসনা। -অনিল । দিগন্ত ২৭
কল্পনা
আজকে আমি ভাবছি যারে,
সেই ত’ আমার আপনজন ;
সেই ত’ আমার ধ্যানের ছবি,
তারেই পাবার আকিঞ্চন।
নিদ-মহলের রাণি সে যে
স্বপ্ন-লোকের কল্পনা ;
তারি তরে হৃদয় আমার
সদাই করে জল্পনা !
তারি কাছে চল ছুটে
আজকে আমার অধীর মন,
সেই ত’ আমার ধ্যানের ছবি
তারেই পাবার আকিঞ্চন।
--সুধীর
দিগন্ত
বেদুইনে মিছে ভালােবাসা ‘তােমারে লইনি সাথে ?'—করিতেছ মিছে অনুযােগ- ‘হৃদয়, কাপট্য-ভরা বলি মােরে করিছ লাঞ্ছনা; বলিয়াছ জীবনের পুণ্য-ক্ষণে, জানিনা সম্ভোগ,- তাপসের ব্রত মাের, জীবনেরে করিতে বঞ্চনা। হায় সখি ! সত্য সবি এ বঞ্চনা বহু যুগ ধরি’- দহিয়াছে প্রাণ মাের, পদে পদে দেখায়েছে রােষরক্ত আঁখি ; হৃদয়ের রক্তে, রক্তে, অস্থি দিয়া যারি মূর্তি গড়ি-- স্বপন ভাঙিতে দেখি, শূন্যে ধায় শতরূপ, মােহমুক্ত-পাখি। তুমি কিন্তু ডড় নাই, বাষ্পাকারে ঢাকো নাই আপনারে পলাতক-বেশে, আমার সকল গন্ধ ঘনীভূত হয়েছিল তব কালাে কেশে ; তােমারি মাধুৰ্য্য পিয়ে পৃথিবীর সবি কিছু বুঝি সুন্দর! নেমেছিলে, ধুলি পরে দেবী তুমি, মাের ভাগ্যে, বিধাতার বর ! দিগন্ত ২৯
তােমারে লইনি সাথে, অকস্মাৎ চলে এনু গিরি-সানুদেশে
রাঙা-মাটী-পথ মােরে, ক্ষণে ক্ষণে, করিতেছে উদাসী চঞ্চল
কোকিলের মুগ্ধ গানে, তােমারি ললিত কণ্ঠ আসিতেছে
উসরীর নীল জলে, সহসা চমকি’ উঠি' হেরি তব মুগ্ধ
নীলাঞ্চল।
অভিমানে কাজ নাই, বেদূইনে মিছে ভালােবাসা
দিন নাই, রাত্রি নাই, পথই যার পাথেয় সম্বল,-
তাহারে বাঁধিতে প্রিয়ে ! মুগ্ধ-প্রেম, সে যে সর্বনাশা,
চক্ষে যা’র অগ্নি-দৃষ্টি, বক্ষে তবু ঝরে যা’র অনন্তবাদল।
৩
অনিল
দিগন্ত
মিলনে
দখিণ পবনে ফুটিল যতেক কলি,
দলে, দলে আজ ধরে না তাদের হাসি ;
কোন্ কথা তারা করে ওগাে বলাবলি
সকলি যে আজ উঠিলরে পরকাশি।
ভ্রমর আসিয়া জুটিল মধুর লােভে,
কলি আজ দিল আপন দ্বারটি খুলি,
তারকার মালা দুলিছে সারাটি নভে,
তাই আজি গেছে আপনারে সে যে ভুলি
মনটি তোমার দুলিছে কাহার তরে,
সে তাে নহে তব চির-পরিচিত জন,
আজি সে নিবে গাে তােমারে আপন কোরে-
প্রেমের পরশে পুলকিত হবে মন!
সারাটি বিশ্ব তােমারি মিলন লাগি’
নিহারা চোখে অনিমেষ আছে জাগি !
—সুধীর
দিগন্ত
পিছন ডাকে যাবার বেলা কাজল কালো, দুইটি আঁখি কেনরে আজি পিছন-ডাকে ? রাহুর মত অশুভ দিঠি, পথের 'পরে আগুন সম বিছায়ে রাখে। সরসী-জলে নিজেরি ছায়া, হেরিয়া আজি চমকি’ উঠি কি যেন ভাবি’- অগাধ জলে, মরণে জিনি কেন যে তারে আবেগ ভরে ধরিতে নারি। মনের মাঝে পথের মাঝে বকুল রাশি, পড়িছে ঝরি নিশাসে মম আগুন-সম, আকাশে বাজে দিবস রাতে, প্রণয়-বাণী গীতের সুরে, “হে প্রিয়তম!” দিগন্ত হতেছে মনে আজিকে যেন কাতর বাহু পথের বাঁকে বিফল-মনে পরশ-হারা, রােধিতে গতি মৃণাল-সম জড়ায়ে থাকে ।
উদাস-স্বরে পাহাড়-গুহা, উঠিলে ধ্বনি সিংহ-সম নিজেরি ডাকে-- আমার আঁখি সে চোখে হেরি ভরিয়া ওঠে সহসা আজি জলের ভাবে ! মনেতে ভাবি হারায়ে পথ, শালের বনে প্রেয়সী মম ফুকারি’ হাঁকে! কোকিল বঁধু রঙিন-চোখে, আমের শাখে লুকায়ে রহি মুকুল-ঝারে দিকের শেষে, পারের খেয়া আপন-মনে কী জানি কেন, বহিতে থাকে- উদাস-মন, ফুকারি কঁদে , হেলিত-চোখে, বুঝিতে পুনঃ চেনেনি যাকে! -অনিল
পর্থের নেশা
খাম বনানীর অতুলরূপে
ভুলাে না মাের মন,
সুদূর পানে তাইতাে চলি
খুঁজতে আপন জন।
গৃহ ছাড়ি’ গেহের আশে
যাত্রা করি শুরু,
হৃদয় কেন কঁপছে রে সই--
আজকে দুরু দুরু ।
আকা, বাঁকা পথের রেখা,
কতই গেছে মিশে,
তাহার মাঝে চরণ ফেলি,
দাড়িয়ে ও ভাই কে, সে
চিনি, চিনি, চিনতে নারি,
হারাই কেবল দিশা
নয়ন জলে বয়ান ভাসে
স্তব্ধ গভীর নিশা।
দিক হার। যে পথিক আমি,
পথের নাহি শেষ,
চোখের 'পরে সদাই ভাসে
গিরি, মরুর দেশ।
আপন বলে কেউত মােরে--
নিলে নাক কোলে,
সংশয়েতে তাইতাে আমার
হৃদয় কেবল দোলে
তাইতাে আমি হেথায় কেবল
খুজি আপন জন,
গ্রাম বনানীর অতুল রূপে
ভুলাে না মাের মন
ছবি
ছবির মাঝে মূর্তি তােমার এতই আকস্মিক
বুঝতে গিয়ে নিমেষ মাঝে, হারাই দিকবিদিক
নয়নের চোখের তারা মুগ্ধ গতিহীন,
আমার চোখের একতারাতে খেলছে নিশিদিন।
বুঝতে নারি কোন্ অতীতের স্বপ্নে-হেওয়া বা
ধূপের ধোঁয়ার গন্ধে ভরায় চোখের পাতাখানি
অলক ভারে সন্ধ্যা নামে প্রলয় মেঘের প্রায়
যুথীর মালা, বিজলী যেন, আষাঢ়-আকাশ গায়।
তােমার চোখের ক্লান্তি দেখি’ ক্লান্তি নামে চোখে,
আঁখির জ্যোতিঃ কবে কী শেষ অজানিতের শােকে ?
রঞ্জনেরি রশ্মিতলে, কার সে ফুটো-হাড়-
তােমার চোখে পাঠিয়ে দেছে সপ্তসাগর পার ?
শুভ্র-হাতের কজি দুটী শিথিল হ’ল খুলে,
একটী কুসুম ভূমি হতে দেখতে পারাে তুলে!
স্বপ্ন কী-সে তােমার দেহে বাংলাে বাসা আজ?
সশরীরে তুমিই গেছ বিরাট স্বৰ্গমাঝ !
হেথায়, তােমার জ্বলছে মনে দীপের চেতনা,
পুষ্পে সেথায় উঠছে জেগে, তােমার বেদনা।
ঠোটের কোণে বলতে গিয়ে থমকে যাওয়া বাণী,
পথ-চলা মাের থামিয়ে যে দেয় প্রতি পদেই রাণি !
চোখের কোণে সেদিন তােমার মধুর তিরস্কার
সামনে ছিল সেইতাে আমার চরম পুরস্কার
আজকে রাণি ! হায় যে দেখি, তিরস্কারই বেয়ে
অ-জলের বন্যা নামে নয়ন দু’টি ছেয়ে!
অস্তরাগে, ফুটলে, তুমি বিস্মরণীর কুলে,
রাতে, ঘুমের আগেই দেখি, তােমার ছবি খুলে।
—অনিল
বসন্তের পবন হিল্লোলে
দুরন্ত স্বপনে
এমাে মাের প্রিয়া ।
হাসিয়ে মধুর হাসি
লও তুলে অর্ধরাশি
কাড়ি লও হিয়া।
আমার এ শুমালা আচম্বিতে উইক বিকশি
নব অনুরাগে;
মল্লিকা যূথীর সাথে,
গেঁথেছি গাে মালাখানি
আসিবার আগে।
শত জন্ম বসে, বসে
গেঁথেছি এ ফুল-মালা
আছে তাহা আছে,
নিভৃতে গড়েছি মালা
হৃদয়ের অশ্রু ঢালা
তাহে মিশে গেছে।
কত নিশি জাগি আমি গেঁথেছি গাে মালাখানি
তুমি না জানিবে।
কত অশ্রু মিশে গেছে
মালা-নে, শুনে
তুমি না বুঝিবে!
বসন্ত গিয়াছে কত
কত নিশি হ’ল গত
প্রেম আলাপনে,
ভেবেছি কত গাে আমি জানিবেনা তাহা তুমি
বসি নিরজনে।
নিরালার মাঝে যবে
ডেকেছিলে তুমি মােরে
শুনি নাই আমি তব কথা
গাঁথি নাই মালা আমি আসি নাই তােমারে বরিতে
বুঝি নাই তব মৰ্ম্ম ব্যথা।
আমি, আমি মালা গেঁথে বসে আজি তব তরে
এস মাের, এস মাের প্রিয়ে,
শুঙ্গ মালা আচম্বিতে উঠুক বিকশি
আজি তােমা, নিতে গাে বরিয়ে।
সুধীর
উনদীর চর পথের শেষে, গ্রামের ধারে উত্রি-নদীর চর, শীর্ণ-নদীর ক্ষী-মালা, দুলছে ওরি 'পর। ঐ চরেরি বালুর ফাকে হাজার চরণ চিহ্ন আঁকে ক্লান্ত কৃষাণে- কাজল তাদের কঠিন কায়া বাড়িয়ে তােলে মাটীর মায়া, চোখের নিশানে ! চরের শেষে শালের বনে, ঝড় মাতিছে সান্ধ্যরণে, কৃষাণ-ধু মরণ জিনি সেথায় বাঁধে ঘর! বন্য পর হাতে, হাতে মিত্ৰতারি সূত্র গাঁথে, আকাশ পারের স্বপ্ন-আনে, কাল-বােশেখীর ঝড়! চাদের কিরণ বালির 'পরে যেন কুসুম শয়ন গড়ে, নগর বুকে কেঁদেই মরে প্রাসাদ-সেবী নর। উদাস পথিক বাশির গানে, এই চরেতেই স্বর্গ আনে, বালুর সাথে মিশাতে চায় ক্ষির কলেবর- পথের যে গ্রামের ধারে উজ্জী-নদীর চর ! -অনিল ,
সারাটা জনম ঘুরিয়াছি আমি
তােমারি অন্বেষণে-
কত গিরি নদ, কত পর্বত
কত শত উপবনে।
তবুও মেলেনি দেখা।
হে মাের দেবতা, বলিতে পার কি-
কী আছে ভাগ্যে লেখা?
সান্ধ্য-গগনে পরায়েছি টীপ
যৌবন হলে গত
কেমনে ধরিয়া রাখিব এ হিয়া
আজি আমি আশাহত ?
নয়নের জলে ভাসায়ে বই
তােমারে ডেকেছি প্রভু
নিবেদিতে পায় মরম বেদনা
এখনাে ভুলিনি তবু!
জীবনের আজি, সান্ধ্যগগনে
ডাকিতেছি আশাহত।
আমার অচেনা, পথের রেখাটি
বলে দাও দূরে কত !
-বীয়
-
হায় প্রেয়সী রাগ কেন তায়—
।
হায় প্রেয়সী রাগ কেন তায়
তােমার কবি, আরেক জনায়,
বাসেই যদি ভালাে?
রাতের কমল রবির প্রাণে,
যাত্রা করে স্বপ্নে, গানে,
নিলাজ-শশী চানা মুখে,
ছোঁয়া না তার আলাে।
লক্ষ্য আমার একক আছে,
বন্ধনীরই সােহাগ যাচে,
আবেষ্টনীর মধুরতার ছবি,
এরাই তােমার মনের ধামে,
সােনার সিড়ি ডাইনে বামে,
এই ভেবে হায় একটু ভালাে
বাসে তাদের কবি।
এদের দুখের প্রদীপ শিখায়,
পড়ি তােমার মনের লিখায়
তােমার রূপে প্রায় দিয়ে হায় জ্বালি।
তাদের মনের স্বপ্ন-বিনা-
তােমার ছবি নয়-কী দীনা
তাদের মনের কুসুম তুলি’
ভছি তােমর ডালি।
?
-অনিল
দিগন্ত
৪১
স্রোতের ফুল
বান্ধবী গাে রাগ করেছে।
দু’জনাকেই বাস ভালাে
তােমার মুখেই পাইনি কেন
জীবন-ভরা পূর্ণ আলাে ?
ভুল বুঝেছ বান্ধবী মাের--
তৃপ্তিহীনের এ প্রেম নহে
এ প্রেম আমার ঘাটের তরী
ঘাটে, ঘাটেই নিত্য বহে।
জোয়ার ভাটার স্রোতের টানে
ইচ্ছাহীনের চলাফেরা
অশুভ কোন্ গ্রহের দিঠি
তার রেখাতেই জীবন-ঘেরা
স্রোতের টানেই তােমার কূলে
জোয়ার স্রোতে আশ্ন ভেসে
এ ফুল তুমি কুড়িয়ে নিলে
সজল চোখেভালােবসে।
তিগত
আর একদিনে ভাটার টানে
অজানা কোন ঘাটের কূলে
কোন্ প্রেয়সী বাঁচিয়েছিলাে
সে স্রোত হ’তে আমায় তুলে-
একটু তাহার পেলেই খবর
রোষ কেন হায় হে রাজরাণি !
তােমার জনেই বাঁচিয়েছিলো
বুঝেই দেখাে সে কলাণী !
তুমি আমার সাঝের তারা
সে ছিল মাের ধ্রুব-জ্যোতি।
তুমিই আমার রাতের কমল
সাগর-তলের উজল মতি।
অনিল
দিগও
বিদায়
সেদিন ভরা সাঁঝে চলিয়া গেলে তুমি,
কঁদিছে হিয়া তাই তােমারি স্মৃতি চুমি,
দেহের সব দিয়া
তুষিলে মােরে প্রিয়া,
তােমারি দেহভারে ব্যথিল মন-ভূমি !
আজিও প্রতি সাঝে,
হৃদয় মরে লাজে,
চপলা হরিণীরে বাঁধিতে পারিল না,
হৃদয়ে কণা মধু,
থাকিত যদি,বঁধু
তাহলে ভরা-সাঝে
এ ভাবে ছাড়িত না!
যে গেছে চলে যাক, ভাবিয়া কাজ নাই,
আমার কাছ-ছাড়া, তা’র যে ঠাই-নাই;
আবার কোন্ দিন
প্রিয়ার হৃদি-বীণ,
ব্যথিবে কোন্ সাঝে, করিবে---“যাই” “যাই”-
আমার কাছ-ছাড়া, তা’র যে নাহি ঠাই।
অনিল
দিগন্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.