Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Purono Premer Janye Ed.1

Ray Choudhury, Narendranarayan · 2009/10/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
>||ভoll>
ঢাকা, উয়ারী, কালচার হাউসে অভিনীত
প্রথম অভিনয় স্বজনী
২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩৭ সন
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
প্রণীত।
প্রথম সংস্করণ
মূল্য ৫০ আনা মাত্র

(
499
Asemakasse
প্রকাশক-~-
শ্ৰীনিকুঞ্জবিহারী দাশগুপ্ত
পার্শনে এসিষ্টেন্ট
কালচার হাউস, উয়ারী, ঢাকা।
sees
sausaaaaapps
ছাকা-
0
নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে,
O
শ্রীকালাচাঁদ বসাকদ্বারা মুদ্রিত।
ananadaggagar

( পাত্র পাত্রী)
পুরুষ
০০
ললিতবাবু
দেবেন্দ্র ধর
মতিলাল
অটল
প্রকাশ
উকিল।
खौ
সুপ্রিয়া দাস
কিরণ
লীলা
}
ললিতের কন্যাদ্বয়।
•••
দাসী।

No text on this page.

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
( প্রকাশ সহ রমার প্রবেশ)
প্রকাশ। ওগাে, দেবেন্দ্র বাবু তাহলে আসেন নি এখনাে,
কখন আসবেন তাও জানাে না ?
রমা কৰ্ত্তা বলতে পারবেন। কি নাম বলব?
প্রকাশ। প্রকাশ বােস্। কিন্তু দাঁড়াও একটু , তােমার সঙ্গে
কয়েকটা কথা আছে।
রমা। আমার সঙ্গে?
প্রকাশ। হাঁ। তােমার নামটি কিগা, বাছা ?
রমা। রমা।
প্রকাশ। তােমার মুখটি তত বেশ সুন্দর, রমা, আর এতে
বুদ্ধির ছাপ আছে।
রমা। শুনে যে আমার লজ্জা লাগছে, বাবু।
প্রকাশ। সে ভালাে লক্ষণ, রমা। তাতে বােঝা যাচ্ছে তুমি
মানুষটি খাটি। লজ্জা পেতে লজ্জা নেই। একি
সত্যি, দেবেন্দ্র বাবুর সঙ্গে ললিত বাবুর মেয়ের বিয়ে
ঠিক হয়েছে ?

২
পুরােণো প্রেমের জন্যে
?
রমা। হাঁ, বাবু।
প্রকাশ। আর একটি লােকের সঙ্গে যে ললিত বাবুর মেয়ের
বিয়ের কথা ছিল তিনি কেমন দেখতে?
রমা। বেশ সুন্দর।
বেশ সুন্দর। আর খুব ভালাে মানুষ।
প্রকাশ। তাই নাকি
রমা। আমাকে কতদিন বকশিষ দিয়েছেন।
প্রকাশ। তার নামটা কি ছিল ?
রমা। মাপ করবেন, পরিবারের ভিতরের কথা বলতে
নেই।
প্রকাশ। ঠিক, ঠিক। (স্বগত) কিছু চাচ্ছে, দিই। (প্রকাশ্যে )
রমা, তােমাকে আমি প্রশংসা করি। (একটা আধুলি
দিয়া) তার চিহ্নস্বরূপ সামান্য কিছু দিলুম।
ভদ্রলােকের কি নামটা বলেছিলে ?
রমা। মতিলাল বাবু।
প্রকাশ। তার অবস্থা কেমন ?
রমা। খুব ভালাে। মস্ত বড় বাড়ী ওদের।
প্রকাশ। লােকটা কি ললিত বাবুর মেয়েকে খুব ভালবাসতাে ?
রমা। ভয়ঙ্কর। দেবেন বাবুর সঙ্গে বিয়ে হবে শুনে তিনি
কেমন যেন হয়ে গেছেন।
প্রকাশ। এখনাে কি তিনি এখানে আসেন ?
রমা। খুব কম। তবে আজ রাত্রে তাঁরও নেমন্তন্ন রয়েছে
এখানে।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
দেবেন্দ্র বাবু আসছেন, তিনিও আসবেন, এটা কিছু
অদ্ভুত না?
রমা। তা ঠিক। বল্লেই যে তিনি আসবেন কেউ ভাবে নি।
লীলা দিদিমণি নিজেই একথা বলেছেন শুনেছি।
প্রকাশ। ওঃ! শুনলুম ললিত বাবুর মেয়েকে নাকি কোনু
আত্মীয় অনেক টাকা দিয়ে গেছেন ?
রমা। হাঁ, এক বুড়ী পিসী মারা গেছেন, পঞ্চাশ হাজার টাকা
দিয়ে গেছেন তাকে।
প্রকাশ। এত টাকা! ললিত বাবুকে বল্‌বে তার সঙ্গে
আমার কিছু কথা আছে।
রমা। যাই, বছি গিয়ে।
প্রকাশ। আর, রমা, রমা। (হাত ধরিয়া টানিয়া)
রমা। (তাহাকে ছাড়াইয়া নিয়া) শুধু আধুলিতে কি এতটা হয়
বাবু! (নিষ্ক্রান্ত )
প্রকাশ। খবরটি বহুমূল্য। পঞ্চাশ হাজার টাকা পেয়েছে
ললিত বাবুর মেয়ে দেবেনটার ভাগ্য ভালাে। এই
মতিলালটির সঙ্গে পরিচয় করতে হবে। কে জানে,
দেবেন ধরের খেলা যদি ফস্কে যায়, মতিলালটিকে
হাতে রাখা ভালাে। প্রকাশ বােস্ হবার ছেলে নয়।
(ললিত বাবুর প্রবেশ)
ললিত। আমার সঙ্গে কোনাে কথা আছে ?
প্রকাশ। মাপ করবেন, দেবেন বাবুর সঙ্গে আমার এখানে

৪ পুরােনাে প্রেমের জন্যে দেখার কথা ছিল, তিনি কখন আসবেন তাই জানতে চাই। ললিত। এখনি এসে পড়বে। আপনি অপেক্ষা করবেন ? প্রকাশ। না, পরে আসব আবার কখন্ সুবিধে হবে ? ললিত। আটটায় খাওয়া হয়ে যাবে; তারপরে এলেই ঠিক হবে। প্রকাশ। আচ্ছা, আমি সাড়ে আটটায় আসব। অনুগ্রহ করে তাকে বলবেন আমি এসেছিলাম। ললিত। বব। (নমস্কার করিয়া প্রকাশ নিষ্ক্রান্ত) লােকটি বেশ মজার। রকম দেখে মনে হচ্ছে উকীল হবে। দে- বেনের সঙ্গে কাজ আছে দেখা যাচ্ছে। অন্য সময়ে এলেই পারত। কি মধুর স্বপ্নটিই আমার নষ্ট করলে। রমা ডাকলে, সেই সময় কিন্তু আমি মনে মনে, যায় বাহাদুরী প্রত্যাখ্যান করছিলুম। (নিষ্ক্রান্ত) (রমা সহ অটলের প্রবেশ) মা। আপনি এসেছেন কর্তাকে বলছি গিয়ে। ( নিক্রান্ত) অটল । আমার কপালই এ রকম। কোথায় ভেবেছিলুম লীলাকে পাব এখানে। না, এই বুড়াে বাপটার ঘ্যান- ঘ্যানানি শুনতেহবে গিয়ে এখন। হায়! এদের মা নেই। তা বিয়ের পর শাশুড়ীগুলাে যতই জ্বালাতন করুক না কেন, বিয়ের আগে শ্বশুরগুলাের চেয়ে তারাই বাঞ্ছ- নীয়। চায়ের জল গরম করতে হবে, জানালা লাগা--

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
নাে দরকার, বিছানা রােদে শুকুতে দিতে হবে, ছে-
লেটা কঁদছে ইত্যাদি কত উঁতােতেই তারা মেয়েকে
ভাবী জামাইর সঙ্গে একা রেখে উঠে যান, তার ঠিক
নেই; আর বাপগুলাে হাব, বুড়ােগুলাে টের ও পায়
যে তাদের দেখতে কেউ আসে না।
(রমার প্রবেশ)
মা। কর্তা বলছেন আপনাকে লাইব্রেরীতে যেতে।
অটল। (স্বগত) নিরেট বুড়াে ভাবছে আমি নিমন্ত্রণ রক্ষা
করেছি ওর বকবকানি শুনতেই। (নিষ্ক্রান্ত)
লীলা। (উকি দিয়া) চলে গেছে, রমা ?
রমা। হাঁ, ছােট দিদিমণি।
লীলা। (প্রবেশ করিয়া) রমা, দরজার ফাকে কাণ পেতে
শােনাটা অন্যায় মনে করিস্ তুই ?
রমা। অন্যায়ই তাে।
লীলা। ঘরে একজন মাত্র থাকলে আর সে ব্যক্তি যখন আপন
মনে বকে যায় তখন শুনতে দোষ নেই। এমন
খাখা এতগুলাে ভালাে কথা নষ্ট হতে দিতে নেই।
রমা। আপন মনে বকছিল নাকি ?
লীলা। হাঁ। আচ্ছা, কোনাে নূতন ব্লাউজ এসেছে দোকান
থেকে ?
রমা। হাঁ, চমৎকার জিনীসটি।
লীলা। বাঃ,
তুই কি করে জালি?

লীলা।
লীলা।
পুরােনাে প্রেমের জন্যে
রমা। আমি খুলে দেখবার লােভ সামলাতে পারি নি।
এ তাের অন্যায়। কোথায় রেখেছিস ?
রুমা। রান্নাঘরে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছি। কে কোথেকে দে-
খতে পায় তাই।
এ কি রকম ঠাট্টা। শেষে ববি একটু গায় দিয়ে দে-
খেছিলুম।
রমা। , না, আমি না। রাঁধুনী দিয়েছিল, তার গায়
বেশ মানিয়েছিল।
লক্ষীছাড়ী
হতভাগী ! তােরা দুজনেই এর জন্য
বরখাস্ত হবি।
রুমা। তা আমি, ছােট দিদিমণি, (কাঁদিয়া উঠিল) আর এ
লীলা।
রকম কখনাে করব না।
লীলা। এক্ষনি আমার ঘরে নিয়ে রেখে আয়।
যাই, ছােট দিদিমণি। (স্বগত) রাঁধুনিটা সে দিন
ভাজাগুলাে সব একা খেলে, তার আক্কেলটা দিলুম।
( নিষ্ক্রান্ত)
লীলা।
এমন কথাও শুনেছে কেউ কোনদিন? আমি কৰ্ত্তা
হলে এক্ষনি তাড়াতুম দুটোকে।
(কিরণের প্রবেশ )
কিরণ। সুপ্রিয়া দিদি আসেন নি এখনাে, লীলা ?
লীলা। না।
কিরণ। আশ্চৰ্য্য! বলেছিলেন যে সকালেই এসে পড়বেন।

৭
পুরােনাে প্রেমের জন্যে
লীলা।
এরচেয়ে ভালাে কাজ বােধ হয় হাতে আছে কিছু।
কিরণ। লীলা, তাের হয়েছে কি ? মেজাজ যে বেঁকে আছে।
লীলা।
তা তােমায়রা বেঁকৃত, যদি রাধুনী বান্নী তােমার
নূতন ব্লাউজ গায় দিয়ে দেখতে।
কিরণ। বলিস্ কি?
লীলা।
হাঁ, তাই দিয়েছে সে, আর রমা বল্লে চমৎকার নাকি
মানিয়েছিল তাকে। (রমার অনুকরণ করিয়া)
কিরণ। কি সাহস! বাবাকে বলবাে দুটোকেই ছাড়িয়ে দিতে।
লীলা। কোনাে লাভ নেই। বাবা শুধু হাসূবেন। সে যাক্।
দেবেন বাবু কখন আসূছেন ?
কিরণ। এখনি আসবেন। (লীলাকে বাহ দিয়া জড়াইয়া) লীলা,
ভাই, কয়েক দিনের মধ্যেই যে আমার বিয়ে হয়ে যাবে
সে যেন ভাবতেই পারি না। তা দেবেন বাবুকে
যতই ভালবাসি না কেন, এই স্বাধীন কুমারী জীবন
জন্মের মত ছেড়ে যাচ্ছি এতে যেন মন কেমন করে
ওঠে। ঐ সে দিনই তাে দুটিতে মিলে আমরা কত
খেলেছি, ঝগড়া করেছি, কত গােপন মনের কথা
বলেছি।
লীলা। বেচারি মতিলাল বাবু! (দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া)
কিরণ। (রাগিয়া) ওঁর নাম কেন তুলি তুই, লীলা ?
লীলা। ওঁর জন্যে ভারি দুঃখ হয়। উনি বেশ লােক, আর
তােকে খুব ভালও বাসেন, দিদি।

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
ছেলের অসুখের সময় তিনি যা সেবাযত্ন করেছিলেন
সে আশ্চর্য্য।
অটল।
দেখে মনে হয় জীবনে তিনি অনেক দুঃখ কষ্ট
সয়েছেন। ওঁর পূর্ব ইতিহাস কিছু জানেন না ?
লীলা। কিছু না। তার অতীত সম্বন্ধে কোনো কথা উঠলেই
তিনি অন্য কথা পাড়েন।
অটল।
আপনাকে তিনি খুব ভালবাসেন মনে হয়। অবিশ্যি
সেটা খুব আশ্চৰ্য্য কিছু একটা নয় যে কেউ আপনার
সংস্পর্শে এলে আপনাকে ভালাে না বেসে পারবে না।
লীলা। আপনার ভুল।
একটি মেয়েকে জানি সে আমাকে
রীতিমত ঘৃণা করে।
অটল। আমি তাে বুঝি না আপনাকে কেউ কি করে ঘৃণা
করতে পারে।
লীলা। তাই নাকি!
অটল। আপনি—আপনি আপনার ফটো একখানা দেবেন
বলেছিলেন আমাকে।
লীলা। আর তাে আছে বলে মনে হয় না।
অটল। এলবামে যে দুটো দেখলুম।
লীলা। ওঃ!
ওগুলাে বিশ্রী দেখতে হয়েছে।
অটল। আমার তা মনে হয় না। একটা নিতে পারি ?
লীলা।
নেবেন ইচ্ছা হলে। (লীলা এলবাম্ আনিল ; উভয়ে
ঝুকিয়া দেখিতে লাগিল, লীলা ফটো তুলিয়া নিতে তার

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
হাতে অটলের হাত লাগিল, তারা ভীষণ ভাবে চকিয়া
উঠিল।
(ললিতবাবুর প্রবেশ)
ললিত। অটল, তুমি এত দেরী করছ কাগজটা নিয়ে যেতে ?
অটল। কোথাও পেলুম না, আজ্ঞে। সব ঘরেই খুঁজে
দেখলুম।
ললিত। তােমার দৃষ্টিশক্তি তাহলে খুব খারাপ বলতে হবে।
আমি তাে পাশের ঘরে টেবিলে পড়ে আছে
দেখলুম।
অটল। ভারি আশ্চৰ্য্য তাে! (স্বগত) আমার কপালই এই
রকম, ঠিক সময়টিতে এসে উপস্থিত। ভাবছিলুম
বল্।
(রমার প্রবেশ)
রমা। সুপ্রিয়া ঠাকরুণ এসেছেন, ছােট দিদিমণি। (নিষ্ক্রান্ত)
লীলা। আমি চম। ( নিষ্ক্রান্ত)
ললিত। চল, লাইব্রেরী ঘরে যাওয়া যাক, এখানে বড়
গােলমাল হয়।
অটল। যেমন খুসি আপনার। (ললিত নিষ্ক্রান্ত) বেশীক্ষণ ঐ
ছােট্ট কুঠুরীতে আমাকে আটকে রাখলে মাথাধরার
ছল করে উঠে আসতে হবে। (নিষ্ক্রান্ত)

১২
পুরােণাে প্রেমের জন্যে
(কিরণের প্রবেশ)
কিরণ। কেউ নেই এখানে। দেবেনবাবু এখন এলে হতাে।
গাড়ী খুব দেরী করূছে আজ। আশাকরি—আশাকরি
তার কিছু হয়নি। রেলে কত দুর্ঘটনা হয়। সারাদিনটা
আমার কেমন যেন ভয় ভয় করছে, একাধটা খারাপ
কিছু হবে। এ সব মনে আনা বােকামি জানি,
কিন্তু ঠেকাতে পাছি না। কে যেন আছে। হয়ত
তিনিই হবেন।
( রমার প্রবেশ)
রমা। মতিলালবাবু এসেছেন।
( মতিলালের প্রবেশ ; রমা নিষ্ক্রান্ত )
মতিলাল।
কেমন আছ, কিরণ ? দেরী করে এসেছি তার
জন্যে ত্রুটী স্বীকার করছি, তবে
কিরণ।
ওঃ দরকার নেই।
দেবেনবাবুও তাে এখনাে
আসেননি। আপনি তাে আগেই এসেছেন।
বসূবেন কি ? (তাহারা বসিল) আপনি যে বিয়ের
উপহার পাঠিয়েছেন তা দেখে সকলেই খুব প্রশংসা
করলে।
মতিলাল। খুসি হলুম শুনে। পুরােনাে বন্ধু ভাবে আমি
এই প্রার্থনা করছি, তােমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের
হােক, কারণ বিয়ের পর ছাড়া আমার সঙ্গে হয়ত
তােমার দেখা হবে না।

পুরােণণা প্রেমের জন্যে
কিরণ। বাঃ । বিয়েতে থাকবেন না ?
মতি। পারব না থাকতে, সহরে বিদ্যুৎবারে কাজ রয়েছে।
কিরণ। এমন কি কাজ, পরে করলে হয় না?
মতি। সে হয় না। আর শরীরে না তােক মনে আমি এখানে
উপস্থিত থাকব। জানি তুমি একটি আদর্শ স্ত্রী হবে,
আর দেবেন বাবুও হয়ত তােমার উপযুক্ত স্বামী
হবেন।
কিরণ। হয়ত কেন ? নিশ্চয় হবেন বছেন না যে?
মতি। সে নিশ্চয় করে কি বলা যায় ।
কিরণ। মতিবাবু, এমন ভাবে কথা বলা আপনার অন্যায়।
অবিশ্যি দেবেন বাবুকে আপনি পছন্দ করেন না সে
আমি জানি, তবে তার বিরুদ্ধেও তত আপনার কিছু
জানা নেই। এ অভদ্রতা, নিষ্ঠুরতার কাজ।
মতি। কিরণ, আমি সব করতে পারি, তােমাকে বাথা দিতে
পারি না, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় আমার কর্তব্য হচ্ছে
পরিষ্কার করে সব কথা তােমাকে বুঝিয়ে বলা।
তােমাকে আত্মীয় ভাবি বলেই তােমাকে সাবধান করে
দেওয়া আমার উচিত, তুমি ভাবে ঈৰ্যার বশবর্তী
হয়ে আমি বলছি, কিন্তু দেবেন্দ্রবাবুকে ঠিক মত
চিলে তুমি বুঝতে পারবে, তাকে বিয়ে করার চেয়ে
তােমার মৃত্যু ভালাে।
কিরণ। মতিবাবু, আপনি সব বিস্মৃত হচ্ছেন।
হচ্ছেন। আমাদের

১৪
পুরােণাে প্রেমের জন্যে
পুরােণাে বন্ধুতার কথা মনে করেই আমি-
আমি-
মতি। আমাকে বের হয়ে যাওয়ার দরজাটা দেখিয়ে দিচ্ছ না।
দেখ, কঠোর কর্তব্যের দায়েই আমি আজ এখানে
এসেছি, এখনাে আমি আশা করছি এই বিয়ে ঠেকাতে
পারব।
‘কিরণ। সে কিছুতেই পারবেন না। ওঁর বিরুদ্ধে আপনার কি
বলার আছে ?
( জানালায় দেবেন্দ্রর আবির্ভাব ; সে চুপি চুপি প্রবেশ করিয়া
পর্দার আড়ালে লুকাইয়া রহিল।
মতি। আমি জানি সে জোচ্চোর।
কিরণ। কি করে ?
মতি। এ ঠিক কথা, কিছু দিন আগেই তাকে এক মেস্ থেকে
চুরি এবং প্রবঞ্চনার অপরাধে বের করে দেওয়া হয়।
কিরণ। আর কিছু ?
মতি। এই কি যথেষ্ট নয় ?
কিরণ। হাঁ, সত্য হলে, তবে এ সত্য নয়। যাক্, এই কথা
বব তাঁকে।
মতি। সে তা অবিশ্যি অস্বীকার করবে ।
দেবেন্দ্র। (অগ্রসর হইয়া) না, করবে না।
কিরণ। ( চকিয়া) ওঃ, চম্‌কে উঠেছি একেবারে।
দেবেন্দ্র। মতিবাবু ঠিক খবর দিয়েছেন, এক মেস থেকে চুরি ও

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
প্রবঞ্চনার অপরাধে বাস্তবিক আমাকে বের করে
দেওয়া হয়।
মতি।
কিরণ। ওঁর কথা শুনবেন না। আপনি যে এসেছেন সে তাে
আমি জান্তুমই না।
দেবেন্দ্র। না, নইলে এ ভদ্রলােক আমার নামে কলঙ্ক রটনা
করছে এ আপনি কখনাে কাণ পেতে শুতেন না।
মাপ করবেন, সত্য বলা আর কলঙ্ক রটনা এক নয়।
দেবেন্দ্র। এক হিসাবে মাত্র একথা সত্য। আমাকে বের করে
দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু চুরি কিম্বা প্রবঞ্চনা আমি
করিনি।
মতি। অনুগ্রহ করে বুঝিয়ে বলবেন আশাকরি।
দেবেন্দ্র। বুঝােবার নেই কিছু। যাদের সঙ্গে আমার ঝগড়া
হয়েছিল তারা বড় লােকের ছেলে, তাদের কথাই
সকলে বিশ্বাস করলে।
কিরণ। ছিঃ ছিঃ ! কি লজ্জার কথা !
মতি। এই কথাই কি আমরা বিশ্বাস করব ?
কিরণ। আমি করি।
দেবেন্দ্র। দেখুন, ডুয়েলে আহ্বান আমাদের দেশের প্রথা নয়,
নইলে
কিরণ। থাক, থাক্।
মতি। (স্বগত) বােকা বনেছি—ওকে সাবধানও করে দিয়েছি।
এখন একটু ছলনা চালানাে দরকার। (প্রকাশ্যে )

১৬
পুরােনাে প্রেমের জন্যে
দেবেন বাবু, আমি দুঃখিত হলুম, হয়ত আপনি যা
বল্লেন তাই সত্য।
দেবেন্দ্র। আপনি সত্য বলে বিশ্বাস করেন কিম্বা না করেন
তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।
কিরণ। এ থাক্‌ এখন। মতি বাবু, অনুগ্রহ করে বাবাকে
জানাবেন যে দেবেন বাবু এসেছেন ?
মতি। যাচ্ছি। (দরজায় গিয়া স্বগত) আমাদের আরাে হবে
মশায়, এই শেষ নয়। (নিষ্ক্রান্ত)
দেবেন্দ্র। বাস্তবিক, মিস্ রায়, এ রকম মানুষের বানানাে গল্পে
আপনি যে কাণ দিচ্ছেন এই আশ্চৰ্য। আমার
বিশ্বাস ছিল আমরা পরস্পর পরস্পরকে এতটা জানি
যে কারাে বিরুদ্ধে কিছু শুনবামাত্রই তা বিশ্বাস করে,
ফেলব না।
কিরণ। আমি তাে কখনাে এ কথা বিশ্বাস করিনি।
দেবেন্দ্র। আপনার ভবিষ্যৎ স্বামী ছাড়া আর কারাে সঙ্গে এ
সব গােপন কথাবার্তা আপনার কেন হয় তাতে,
বুঝি না।
কিরণ। উনি আমাদের পরিবারের পুরােনাে বন্ধু
দেবেন্দ্র। সেই কারণেই তাে আমার আপত্তি। দেখলুম তার
সঙ্গে আলাপ করছেন, তাই তাে লুকিয়ে কাণ পেতে
রইলুম।
কিরণ। ঈৰ্যার কি আছে এতে?
কিনা।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
১৭
দেবেন্দ্র। আছে বৈ কি।
কিরণ। ঝগড়ার সুর দিয়েই সুরু করেছেন, একটিও তত
ভালাে কথা বলেন নি এ পর্যন্ত।
দেবেন্দ্র। (আদর করিয়া) মাপ কর, কিরণ,কিন্তু তুমিও স্বীকার
করবে বিরক্তির কারণ ঘটেছে। এ গল্প যদি ঘােষণা
করে বেড়ায় তাে কেমন হয় ?
কিরণ। না, না, তা করবে না, সে আমি দেখব।
দেবেন্দ্র। সে সব চেষ্টার দরকার নেই। আমার নিজের ভার
আমি নিজেই নিতে পারব।
কিরণ। আপনি রুক্ষ স্বরে কথা বলবেন না।
দেবেন্দ্র। আমার রাগ দেখতে না চাইলে আর একথা তুলল
। আর কেউ আসছে আজ নেমন্তন্নে ?
কিরণ। অটল বাবু আর মিসেস্ দাস ছাড়া কেউ না।
দেবেন্দ্র। (একটু চকিয়া) মিসেস্ দাস।
(তৎক্ষণাৎ সামলাইয়া লইয়া)
কিরণ। হাঁ, তার কথা অনেক দিন বলেছি আপনাকে।
দেবেন্দ্র। না, মনে নেই। (স্বগত) নিশ্চয় সে নয়। না, এ
হতে পারে না।
কিরণ।
একজন বিধবা স্ত্রীলােক খারাপ অবস্থায় পড়েছেন,
মেয়েদের পড়ান। ওঁকে নিশ্চয় আপনার ভালাে
লাগবে।

১৮
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
দেবেন্দ্র। (স্বগত) সে কে জানে। যদি সেই হয়, আমাকে
প্রস্তুত হতে হবে। (প্রকাশ্যে ) বুড়াে বয়সের ?
কিরণ। না, না—আমাদের চেয়ে একটু বড় হবে, বেশ সুন্দরী।
আমার ত ভয় (হাসিয়া) পাছে আপনি তার সঙ্গে
প্রেমে পড়ে যান।
দেবেন্দ্র। সে আশঙ্কা নেই।
কিরণ।
কে জানে-পুরুষেরা ভারি লঘু প্রকৃতি।
দেবেন্দ্র। ( আদর করিয়া) তােমার মত রত্ন পাওয়ার পরেও নয়।
(স্বগত) পঞ্চাশ হাজার টাকা যার মূল্য !
কিরণ। বেশ তাে বলেছেন। ওসব কথা বেরােয়নি বলেই
এতক্ষণ আমার ভালােই লাগেনি।
দেবেন্দ্র। এখন থেকে শুধু এ রকমই বেরুবে। আমি আসি,
পাশের বাড়ীতে একটু কাজ আছে, এখনই ফিরব।
কিরণ। দেরী হবে না তাে?
দেবেন্দ্র। এই ত এলাম। (নিষ্ক্রান্ত)
কিরণ। মতি বাবুর কথা শোেনা আমার পক্ষে অন্যায় হয়েছে।
তার জন্যে নিজের উপর আমার রাগ হচ্ছে এখন।
উনি কেমন রেগে উঠেছেন—তা ঠিকই হয়েছে।
মতি বাবু অমন ভাবে ওঁর সম্বন্ধে বলতে আরম্ভ
করতেই আমার ঘর ছেড়ে যাওয়া উচিত ছিল।
( লীলা ও সুপ্রিয়ার প্রবেশ) এস, এস, সুপ্রিয়া দিদি,
তােমাকে দেখে কত সুখী হলুম।

১৯ পুরােণণা প্রেমের জন্যে সুপ্রিয়া। দেবেন্দ্র ধরটি কোথায়? কিরণ। এখনি আসবেন। সুপ্রিয়া। (বসিয়া) তাঁকে দেখতে অস্থির হয়ে আছি। ভালাে কথা, কিরণ, তুমি তাে এখনাে বলনি কি করে তােমাদের প্রথম পরিচয় হয়। কিরণ। গত বৎসর বড় দিনের ছুটিতে কলকাতা গিয়েছিলুম, সেখানে অবিনাশ বাবুর বাড়ীতে নিমন্ত্রণে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তারপর থিয়েটার, বায়ােস্কাপ, সার্কাস, কত জায়গায় গেছি তার সঙ্গে। সুপ্রিয়া। বিয়ের সময় যে পঞ্চাশ হাজার টাকার মালিক হবে তুমি, সেকি তিনি জানেন? ‘কিরণ। ( তিরস্কারের সুরে) সুপ্রিয়া দিদি। সুপ্রিয়া। রাগ করাে না। দুর্ভাগ্যের বিষয় পুরুষদের সম্বন্ধে আমার খুব উচ্চ ধারণা নেই। লীলা। সুপ্রিয়া দিদি, তােমার নিজের কথা সব বল না আমাদেরে। সুপ্রিয়া। অন্য সময় হবে। আচ্ছা, কিরণ - কিরণ। বাবাও ছিলেন সে সময় কলকাতায়। কতদিন দিন- রাত মেলামেশার ফলে আমাদের ভালবাসা হয়। তিনি বাবার কাছে প্রস্তাব করলে বাবারও মত হয়। সুপ্রিয়া। ওকে কি তুমি সত্যি সত্যি খুব ভালবাস?

২০
পুরােণে প্রেমের জন্যে
;
কিরণ। নিশ্চয়। কি যে বল তুমি !
লীলা।
বােধ হয় খুবই ভালবাসে। এক সময় দিদির আহারে
খুব রুচি ছিল, এখন কিছুই খায় না, তার ক্ষতি
পূরণ করে ওর চিঠি পড়ে।
কিরণ।
ওর কথা শুনাে না; সুপ্রিয়া দিদি ! দেখা যাবে ও
নিজে প্রেমে পড়লে।
সুপ্রিয়া। আমি শুধু এইটুকু কামনা করি, কিরণ, যে তােমার
দাম্পত্য জীবন আমার চেয়ে সুখের হােক, আর
সময় গেলে তােমার দেবতা যে মাটি খড়ে নিৰ্ম্মিত,
তা যেন বেরিয়ে পড়ে না।
লীলা। সুপ্রিয়া দিদি, তােমার আজ হয়েছে কি ?
সুপ্রিয়া। আমার মনের কথা বেরিয়ে গেল বলে ক্ষমা করাে।
(উঠিল)
কিরণ। কি যে বল। ক্ষমা করবার কি আছে। তুমি যে
আমাকে সাবধান করে দিচ্ছ সে বন্ধুভাবেই তা কি
আমি বুঝি না? তবে এস্থলে তােমার সন্দেহের
কোনাে স্থান নেই। উনি আমাকে কেমন আন্তরিক
ভালবাসেন তা জানলে তুমি এ সন্দেহ প্রকাশ করতে
।
( ললিত, অটল এবং মতিলালের প্রবেশ; অটল গিয়া
লীলার পাশে সােফায় বসিয়া ছবির এলবাম দেখিতে
লাগিল )

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
কেমন আছেন, মিসেস্ দাস ? সুখী হলুম আপনাকে
দেখে, আজকে আপনাকে চমৎকার দেখাচ্ছে-
আজকের দিনটির মতই উজ্জ্বল—মুখের আভাটুকু
দিনান্তের রক্তচ্ছটার মতই মধুর। হাঃ হাঃ হাঃ।
মাপ করবেন—আমার অভ্যাস উপমা দেওয়া।
সুপ্রিয়া। আপনার প্রশংসা বাণীতে খুসি হলুম। আপনাকেও
দেখে মনে হচ্ছে যে আপনাকে শীগগীর জরায়
আক্রমণ করবে না।(সরিয়া গিয়া জানালার নিকট বসিল )
ললিত। হাঃ! হাঃ! হাঃ! নিবারণ বাবু যে কেন আপনাকে
ছাড়তে চান না সে বেশ বােঝা যায়। (সুপ্রিয়ার
নিকট গিয়া বসিল)
লীলা। (অটলের প্রতি অটলবাবু, আপনি বােধ হয় বাবার
সঙ্গে খুব রাজনীতি চর্চা করে এলেন ?
অটল। হাঁ, খুব। তিনি তাে আমাকে প্রায় কাউনসিলের
ভক্ত করে তুলেন।
লীলা। বাবা বেশ লােক, না ?
চমৎকার।
লীলা। জানতুম তাই বল্‌বেন আপনি, নইলে যে অভদ্র হবে।
অটল। কিন্তু আমার মনের কথাও তত তাই।
লীলা। অবিশ্যি, অবিশ্যি ! পুরুষদের মনের কথা এবং মুখের
কথা প্রায় সব সময় একই হয়। হাঁ, আপনার কি
রকম বােধ হচ্ছে জানিনা, আমার তাে বড্ড ক্ষুধা
পেয়েছে।
অটল।

২২
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
অটল ।
অটল।
অটল। আপনার কাছে থাকলে আমার ক্ষুধা বোধ থাকে না।
লীলা। ওঃ! সুখে তাহলে আপনার আহারে অরুচি জন্মে ?
আমি, আপনি হলে কিন্তু খাবার সময় অসুখী হতেই
চেষ্টা করতুম।
সে আমি হই।
লীলা। কেন ?
আমাদের বামুনের রান্না মুখে দেওয়া যায় না।
লীলা। তাহলে আজকের সুখটা আপনার বােধ হয় সুপক্ক
রান্নার আশায়।
অটল। আমার মনে তা নেই—আপনি জানেন। আপনার
নিকটে থাকলেই আমি সুখী। আমি
লীলা। চুপ! ঐ দেবেনবাবু এসেছেন ! (ললিত সরিয়া
আসিলেন। দেবেনের প্রবেশ, সকলকে নমস্কার করিয়া
জানালার দিকে উপবিষ্ট সুপ্রিয়ার দিকে চাহিল ; উভয়ে
ভীষণ ভাবে চকিয়া উঠিল)
সুপ্রিয়া। (স্বগত) হা ভগবান! সে এখানে !
দেবেন্দ্র। (স্বগত) ভারি ফঁাসাদ দেখছি।
ললিত। দেবেন, আমার পরিবারের বিশেষ একটি বন্ধুর সঙ্গে
তােমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
দেবেন্দ্র। খুব সুখের কথা।
ললিত। মিসেস্ দাস, ইনিই হচ্ছেন শ্রীমান দেবেন্দ্র ধর।
( সুপ্রিয়া উঠিয়া অত্যন্ত আড়ষ্ট ভাবে নমস্কার করিয়া
জানালার কাছে আবার বসিল)

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
দেবেন্দ্র। (সুপ্রিয়ার দিকে গিয়া) খােলা জানালায় বসে আপনার
সর্দি লাগবে যে, (জনান্তিকে) আমাকে ধরিয়ে দিলে
তােমারাে লজ্জা বেরিয়ে পড়বে।
ললিত। (অগ্রসর হইয়া সুপ্রিয়ার প্রতি। চলুন, খেতে যাওয়া
যাক। (সকলে অগ্রসর হইল লীলা ও অটল পিছনে
ফকেমি করিতে করিতে অগ্রসর হইল)

দ্বিতীয় অঙ্ক
লীলা।
লীলা।
দ্বিতীয়
দৃশ্য
(দুই ঘণ্টা চলিয়া গিয়াছে। সুপ্রিয়া বসিয়া আছে।
অদুরে কিরণ ও লীলা)
ওদের কথাবার্তা এখনাে ফুরােয় না, আশ্চর্য ! বাবা
এত বকাও বতে পারেন। নিজের শরীরটা পর্যন্ত
মাটি করে ফেছে, একটু যে কথা ফেলে বাড়ী ছেড়ে
বেরুবে সেটির যাে নেই।
কিরণ।
তাতে কি হতাে?
ওর স্বাস্থ্য এবং পরিবারের লােক সকলের উপকার
হতাে।
সুপ্রিয়া। কি রকম?
লীলা। কি রকম কি! সব সময় বাড়ীতে চেপে বসে থেকে,
পারিবারিক সমস্ত ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করা ছাড়া
পুরুষদের আর কি কাজ ?
সুপ্রিয়া। বিয়ে হলে স্বামী সম্বন্ধে এ কথা কিছুতেই বলবে না,
সে বেচারি একটু বেশীক্ষণ বাইরে থাকলে তখন
বকুনির আর অন্ত থাকবে না।
কিরণ।
তােমার স্বামী সম্বন্ধে তােমার কি রকম অভিজ্ঞতা
হয়েছিল, সুপ্রিয়াদি ?
সুপ্রিয়া। সে দিয়ে কি হবে ?

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
২৫
লীলা। (নিকটে আসিয়া ) না, না, বলতে হবে-একদিন বলবে
বলেছিলে সব। ( নিকটে আসিয়া ঝুকিয়া)
কিরণ। লীলা, তুই ভুলে যাচ্ছিস,অতীত সম্বন্ধে কিছু না বলার
কারণ থাকতে পারে সুপ্রিয়াদির।
সুপ্রিয়া (লীলার প্রতি) সব কথা বলব, লীলা, কারণ আমি
বল্লে হয়ত অন্যের কাছ থেকে তােমরা অন্য রকম
ভাবে শুনতে পাবে। আমার মা আমার ছেলে-
বেলাতেই মারা যান। আমার পিতার কিছু টাকা
পয়সা ছিল ব্যাঙ্কে। আমাদের দিন একরকম সুখেই
কাটছিল। পিতার একমাত্র আদরের মেয়ে ছিলুম
আমি। আমি বড় হলে এক আত্মীয়ার বাড়ীতে
দেবেন্দ্র দাস নামে এক যুবকের সঙ্গে আমার পরিচয়
হয়, পরে আমার সঙ্গে এবং বাবার সঙ্গেও ওঁর
ঘনিষ্টত জন্মে। আমাদের—অন্ততঃ আমার ভালবাসা
হয়। উনি বিয়ের প্রস্তাব করলে বাবার মত হয়।
বিয়ের কিছুদিন পর আমি আমার স্বামীর কাছে
চলে গেলেই বুঝতে পারলুম
তিনি আমাকে বিয়ে
করেছিলেন শুধু
অর্থের লােভে। এ দিকে বাবা
সরল মানুষ, কয়েকজন দুষ্ট প্রকৃতির লােকের সঙ্গে
ব্যবসা ফেঁদে, তার সঞ্চিত টাকা ধীরে ধীরে সব
খােয়ালেন ; প্রতি মাসে আমাদের খরচের জন্যে দু’শ
করে টাকা আছিল এখন তা বন্ধ হয়ে গেল-বাবা
..
:

পুরােণাে প্রেমের জন্যে ঋণ জালে জড়িত হয়ে এক দিন আত্মহত্যা করে মারা গেলেন। কিরণ। ওঃ ! কি ভয়ঙ্কর। সুপ্রিয়া। একদিন সে এসে এই খবর দিলে। তখন আমার পূর্ণ গর্ভাবস্থা। আমি শুনে অজ্ঞান হয়ে গেলুম- তিন দিন সে অবস্থায় ছিলুম—তারপর আমার অর্ধ অচেতনাবস্থায় আমার একটি সন্তান ভূমিষ্ট হয়। ভালাে করে আমার যেদিন জ্ঞান হলাে সে দিন দেখলুম আমার স্বামীও নেই, সন্তানও নেই। যে মেয়েলােকটি আমার কাছে ছিল সে বল্লে এক মড়া মেয়ে হয়েছিল। আমার কিন্তু এখনাে সন্দেহ যায় , জন্মের পর তার কান্না আমার কাণে গিয়েছিল, এখনাে তা বুকে ভীষণ ব্যথা হয়ে বাজছে। যাক, সপ্তাহের পর সপ্তাহ যায় আমার স্বামীর আর দেখা নেই। আমার সামান্য যা পুঁজি ছিল তা ফুরিয়ে এল, গ্রাসাচ্ছাদনের কোনো উপায় রইল না। শেষে সেলাইর কাজ আরম্ভ করলুম, পাশের বাড়ীর গিরীশ বাবু নামে একটি ভদ্রলােক, সেই সব সেলাইর কাজ বিক্রী করবার বন্দোবস্ত করে দিলেন, তাঁর সঙ্গে এই সূত্রে পরিচয় হলাে। দু’বছর তাঁরি দয়ায় অতিকষ্টে কেটেছিল। দু বছর পর হঠাৎ একদিন আমার স্বামী উপস্থিত হয়ে গিরীশবাবু ও আমার নামে মিথ্যা

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
অপবাদের কথা বলে, অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিয়ে
বলে গেলেন, তার সঙ্গে আমার আর কোনাে সম্বন্ধ
নেই। তারপর থেকে আমিও সেই ভাবেই জীবন
চালিয়ে এসেছি। অন্তরে বাহিরে বহু দিন থেকে সেই
সম্বন্ধের সূত্র ছিন্ন হয়ে গেছে। সে স্থান থেকে
নিবারণ বাবুর মেয়েদের শিক্ষায়িত্রী হয়ে এলুম, তার
পরের খবর তােমরা সব জানাে ।
লীলা। (সুপ্রিয়াকে আলিঙ্গন করিয়া) ওঃ! কি কষ্ট তােমার,,
সুপ্রিয়া দি !
সুপ্রিয়া। তােমারা আমাকে নির্দোষ বলে মনে কর তাে ?
লীলা। কি যে বল-নিশ্চয় করি।
সুপ্রিয়া। ভয় ছিল তােমরা পাছে আমাকে ঘৃণা কর।
কিরণ। তােমাকে ঘৃণা করব? কখখনাে না! এমন দুবৃর্তের
হাতে যে পড়েছিল তার জন্যে কষ্টে আমাদের বুক
ফেটে যাচ্ছে !
তােমার সন্তান সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস্ করেছিলে তােমার
স্বামীকে ?
সুপ্রিয়া। করেছিলাম, সেই একই উত্তর—মড়া মেয়ে। হায় !
সে থাকলে আমার সব কষ্ট আমি সইতে পারতুম।
লীলা। আগে তােমার জীবনের কথা আমাদেরে বলনি কেন ?
সুপ্রিয়া। দরকার বােধ করিনি কিন্তু এরমধ্যে এমন ঘটনা
ঘটেছে যাতে বলা দরকার হয়ে পড়েছে। আমার
স্বামীকে আজ আমি দেখেছি।
লীলা।

২৮
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
কিরণ। কি আশ্চর্য! কোন্ সাহসে সে
সুপ্রিয়া। সাহস তার সব রকম আছে, এখন তােমরা প্রতিজ্ঞা
কর আমি যা বলেছি তা কাউকে বলবে না।
কিরণ এবং
প্রতিজ্ঞা করছি
লীলা।
সুপ্রিয়া। চুপ! কে আসছে।
( অটল এবং দেবেন্দ্রের প্রবেশ)
লীলা। তাহলে আপনারা গল্পের মােহ ত্যাগ করে উঠে
আসূতে পেরেছেন?
দেবেন্দ্র। হাঁ, বড় মােহ এখানে উপস্থিত জেনে। (কিরণের
পাশে শােফায় বসিল)
লীলা। অটল বাবু, দেবেন বাবুর কাছ থেকে শিখে নিন,
কে জানে আপনি কবে অমন সুন্দর সুন্দর কথা
বল্‌বেন।
অটল।
(লীলার কাছে গিয়া) আমি সে চেষ্টা করব না।
(লীলার প্রতি জনান্তিকে) সেটা গুণ বলে আমি মনে
করি না। নিশ্চয় বলতে পারি ওটা ওর মনের কথা
নয়। (বসিল)
লীলা। কি বলছেন দিদি যেন না শুনে।
অটল। তা শশানাৰ না। কাল থিয়েটারে যাবেন বলছিলেন।
কার সঙ্গে ?

২৯
পুরােণাে প্রেমের জন্যে
লীলা। নাম বলব না।
অটল। কেন ? তার সঙ্গে বিয়ের আলাপ সালাপ হয়নি
লীলা। ঠিক তা নয়, তবে তিনি মনে মনে আমাকে বিয়ে
করতে প্রস্তুত হয়ে আছেন।
অটল। বােধ হয় চিনি তাকে।
লীলা। কে ?
অটল। সেই আত্মম্ভরী বােকা রমেশটা।
লীলা। তাকে আত্মম্ভরী বলে মনে করেন ? আমার তাে মনে
হয় বেশ মানুষ।
অটল। তা হবে, তার সঙ্গে যখন বিয়ে হচ্ছে।
লীলা। বিয়ে হচ্ছে ! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! ওর কথা বলছিলুম
মােটেই আমি। সে ভদ্রলােকটি এখনাে সাবালক
হয়নি।
অটল। বয়সটি তার কত শুনতে পারি কি ?
লীলা। আগামী জন্মদিনে তের হবে।
অটল। কি অদ্ভুত। আপনি ভারি দুষ্ট! কি সুন্দর ছােট্ট
হাতটি আপনার !
লীলা। ব্যক্তিগত মন্তব্য করা অভদ্রতার পরিচয়।
অটল। ক্ৰটী স্বীকার করছি। (ঘড়ী দেখিয়া) এত দেরী হয়ে
গেছে ভাবিনি, এখনি যেতে হবে আমাকে।
লীলা। এখনি কি যাবেন, আটটা মাত্র বেজেছে।

পুরােণণা প্রেমের জন্যে
?
অটল। বিশেষ দরকার।
লীলা। কি মুস্কিল! আপনাকে আমার কয়েকটা নূতন ছবি
দেখাব মনে করেছিলুম।
অটল। আচ্ছা, একটু থেকে সেগুলাে দেখে যাওয়া যাবে।
লীলা। (স্বগত) কার সঙ্গে এর দরকার। একা পেলে ওঁর
কাছ থেকে কথা বের করে নেওয়া যাবে। ( নিষ্ক্রান্ত)
অটল। (স্বগত) কি দুঃখের কথা যে আজ চলে যেতে হচ্ছে
এত শীগগীর। ( নিষ্ক্রান্ত)
‘দেবেন্দ্র। বেশ লােক এই অটল বাবুটি
কিরণ। হাঁ। লীলার প্রতি ওঁর ভাবটা লক্ষ্য করেছেন
দেবেন্দ্র। তা করেছি। আমারি অবস্থা আর কি!
(সুপ্রিয়ার চোখে ঠোটে ভঙ্গী)
ললিত। ( বাহিরে ) কিরণ।
কিরণ। বাবা !
ললিত। আমার চশমাটা নিয়ে আয়ততা, মা। টেবিলের
উপর রেখে এসেছি। (কিরণ চশমা লইয়া নিষ্ক্রান্ত)
দেবেন্দ্র। ভালােই হয়েছে, তােমার সঙ্গে একা দু একটা কথা
বলার সুযােগ পাওয়া গেছে, প্রথম দেখা হওয়ার সময়
তাে ভেবেছিলাম একটা গােল বাঁধিয়ে বসবে। তা
করলে তােমার কোনাে লাভ হবে না নিশ্চয় বলতে
পারি, ক্ষতিই হবে।
সুপ্রিয়া। তুমি কি তাহলে সত্যি সত্যি এই মেয়েটিকে বিয়ে
করতে চাচ্ছ ?

পুরােণাে প্রেমের জন্যে ৩১ ; দেবেন্দ্র। নিশ্চয়। সুপ্রিয়া। সে তােমার অতীত জীবনের কথা কিছু জানে ? দেবেন্দ্র। সে কি সম্ভব ? যে স্ত্রীলােককে আমি এক সময় প্রাণাপেক্ষা ভালবাসতুম সে অবিশ্বাসিনী হওয়ায় আমি যে যন্ত্রণা ভুগেছি একথা বলে তাকে দুঃখ দেব কেন ? সুপ্রিয়া। এমন সময় ছিল তােমার এসব কথা শুনে আমার রাগ হতাে, এখন ঘৃণাই হয় ; তুমি কে এবং কেমন লােক আমার মুখ থেকেই সে শুনবে, দেবেন্দ্র দাস। দেবেন্দ্র। সে অভিনয় দেখতে আমারাে ইচ্ছা হয়, তােমার থিয়েটারে যােগ দেওয়া উচিত। তুমি করুণরসের জন্ম অভিনেত্রী। সুপ্রিয়া। হতে পারি, কিন্তু তুমি নিজেই কেন যাচ্ছনা ? দুবৃর্তের পাঠ তােমাকে দিয়ে চমৎকার হবে, আর তাতে তােমার অভিনয়ও করতে হবেনা। দেবেন্দ্র। চুপ কর বছি। সুপ্রিয়া। মেজাজ নষ্ট করে কিছুমাত্র লাভ নেই। দেবেন্দ্র। তাহলে তুমি অনেক বদলে গেছ, সুপ্রিয়া। এমন সময় ছিল যখন- সুপ্রিয়া। অতীতকে স্মরণ করবার তােমার অধিকার নেই। যা বল্বার আছে সংক্ষেপে বলে যাও। দেবেন্দ্র। এই বিয়ে সম্বন্ধে। আমাদের মধ্যে এক সময় যে ।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
সম্বন্ধ ছিল কিরণকে যদি সে কথা বল আমি তা সম্পূর্ণ
অস্বীকার করব। তুমি কিছুই প্রমাণ করতে
পারবে না, লাভের মধ্যে সকলের ঘৃণার পাত্র হবে।
সুপ্রিয়া। তাই নাকি। আমার মত, সম্পূর্ণ বিভিন্ন। আমাকে
যে চিঠিগুলাে লিখেছিলে সেগুলাে কি ? আমার
কাছে তো সে সব রয়েছে।
দেবেন্দ্র। তাতে নাম আছে দেবেন্দ্র দাস।
সুপ্রিয়া । হাতের লেখা ?
দেবেন্দ্র। ঘটনাচক্রে পড়ে হাতের লেখা এবং নাম আমাকে
বলে নিতে হয়েছে। খুব ওস্তাদ লােকও দেবেন্দ্র
দাস এবং দেবেন্দ্র ধরের লেখার মধ্যে কোনাে সাদৃশ্য
বের করতে পারবে না।
সুপ্রিয়া। আমার অনেক বন্ধু বান্ধব ছিল তােমাকে জান্তাে-
এখনাে তারা চিবে তােমাকে।
দেবেন্দ্র। তাদের আগে বের করবে, পরে তাে প্রমাণ দেবে।
সুপ্রিয়া । অনেক চিঠিতে তােমার ইংরাজী নামের আদ্যক্ষর
রয়েছে—D-D..এখনো তাই—সেটার কি কারণ
দেখাবে ?
দেবেন্দ্র। সেটা আমার অনুকূলেই যাবে। নামই যদি বদূলালুম,
বেমালুম পরিবর্তন করাই আমার পক্ষে স্বাভাবিক
ছিল।
সুপ্রিয়া। এসব যুক্তিতে কুলােবে না, তােমাকে আমি ধরিয়ে

পুরােণণা প্রেমের জন্যে
অনিষ্ট তুমি
দেব। তুমি ভাবছ আমাকে ভয় দেখিয়ে দেবে, সে
তােমার ভুল।
দেবেন্দ্র। দেখ, সুপ্রিয়া, ঝগড়া করে আমাদের কোনাে লাভ
হবে না, এসব নাটকীয় দৃশ্য আমি ভালবাসি
না। তার প্রতি তােমার স্ত্রীজনসুলভ আকর্ষণ
থাকতে পারে। সত্যকার কোনাে
আমার না করতে পারলেও অনেকখানি অপ্রীতি-
জনক কাণ্ড ঘটাতে পার—সে আমি চাই না। এ
সম্বন্ধে তুমি কিছু বলল না কিরণকে, বিয়ে হয়ে গেলে
আমি তােমাকে খােরপােষ বাবৎ মাসে মাসে কিছু
কিছু দেব।
সুপ্রিয়া। ( বিদ্রুপের সুরে) হে দয়ার অবতার, আপনার সুমহৎ
প্রস্তাবের জন্যে ধন্যবাদ। তবে আমি আপনার দয়ার
ভিখারী নই। না, দেবেন দাস, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে
খেয়ে মরব তবু তােমার একটি পয়সা দানও আমি
গ্রহণ করব না। এখনাে পর্যন্ত সব রকম ধূর্ততায়
তুমি সফল হয়ে এসেছ, কিন্তু এখন স্রোত উন্টে
গেছে, যে মেয়ের জীবন তুমি নষ্ট করে দিয়েছ সেই
এখন তােমার পথের বাধা হয়ে উপস্থিত হয়েছে।
দেবেন্দ্র। (তার হাত চাপিয়া ধরিয়া) আমাকে রাগাচ্ছ কি শেষে
তােমাকে খুন করে ফেলতে ?
সুপ্রিয়া। তােমার মত ভীরুকে দিয়ে সে হবে না জানি। আর
তা ছাড়া খুনেকে কিরণ বিয়ে করবে না।
-

৩৪
পুরােণাে প্রেমের জন্যে
,
দেবেন্দ্র। (স্বগত) ও আমাকে পাগল করে ছাড়বে।
হয়েছে—আমাদের সন্তান। মনে মনে ওর বরাবর
ধারণা রয়েছে আমাদের সন্তান বেঁচে আছে—আর
বেঁচে আছে ঠিকই—অনাথাশ্রমে রেখে দিয়েছি
মেয়েটাকে,কখন্ কোন্ দিকে কি কাজে লাগবে তাই
ভেবে। এখন কাজে লেগেছে দেখছি। (প্রকাশ্যে)
আমি দেখতে চেয়েছিলুম তােমার সাহস কতখানি।
আমার ভয় দেখানাে এ শুধু মুখের কথা। তুমি
দেখছি আমাদের পূর্ব সম্বন্ধের কথা বলেই দেবে—তা
দাও, তবে মনে থাকে যেন তোমার মেয়েকে আর
জীবনে দেখতে পাবে না -কারণ, সে বেঁচে আছে।
সুপ্রিয়া। ( আবেগের সহিত) বেঁচে আছে, বেঁচে আছে। ওঃ!
আমার মনে মনে তাই ধারণা ছিল বরাবর। কোথায়
-কোথা সে ?
দেবেন্দ্র। বটে, বটে! তুমি আমাকে যা-তা বলবে আর আমি
তােমাকে মেয়ের খোঁজ দিয়ে দেব
সুপ্রিয়া। ওগাে, যা ইচ্ছা কর তােমার-যা খুসি, শুধু আমার
মেয়েকে দিয়ে দাও।
দেবেন্দ্র। ওঃ, এখন দেখছি সুর বলে গেছে। এখন তােমার
পা ধরে সাধবার পালা এসেছে।
সুপ্রিয়া। ওঃ! তাকে ফিরিয়ে দাও আমাকে। তার প্রতি
তােমার স্নেহ নেই জানি। (জানুপাতিয়া) তুমি

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
এতটা পাষণ্ড হতে পারনা যে মায়ের বুক থেকে
চিরকাল মেয়েকে দূরে রাখবে। তুমি আমার সব
নিয়েছ, সব শেষ করেছ, জীবনের সুখ শান্তি কিছুই
রাখনি, এই সবের পরিবর্তে এই একটি মাত্র অনুগ্রহ
ঠিক।
দেবেন্দ্র। এক সৰ্ত্তে তা করতে পারি।
সুপ্রিয়। বল, কি সৰ্ত্ত ।
দেবেন্দ্র। কথা দাও যে এই বিয়েতে তুমি বাধা দিবে না।
সুপ্রিয়া। তা কেন দেব ? কিরণ আমার কে? তার জন্যে
কেন আমি নিজের মেয়ে থেকে বঞ্চিত হব ? ওকে
বিয়ে করলে সে কিরণের নির্বুদ্ধিতা, আমার কি !
( আত্মগত ভাবে )
দেবেন্দ্র।
এখন বুদ্ধিমানের মত কথা বলছ দেখে
সুখী হলুম। এখন ভেবে দেখ।
সুপ্রিয়া। (কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া জানুপাতা অবস্থা হইতে
উঠিয়া—স্বগত) না, এ হতে পারে না। কৰ্ত্তব্যের
পায় নিজের সুখ আমি বলি দেব। ভগবান,
এ প্রলােভন জয় করবার মত শক্তি দাও আমাকে
( প্রকাশ্যে ) আমার সংকল্প স্থির হয়েছে।
দেবেন্দ্র। তা হলে কথা দিচ্ছ তাে ?
সুপ্রিয়া। এমন পাপের ব্যাপারে আমি সহায় হতে পারিনা।
আমি চুপ করে থাকলেও তােমার পাপে সাহায্য

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
করা হয়, তাতে আমার মনের শান্তি সারাজীবনের
মত নষ্ট হয়ে যাবে।
দেবেন্দ্র। (স্বগত) থেয়েছে। প্রকাশ্যে ) তুমি যা পার করাে,
কেউ তােমাকে বিশ্বাস করবে না।
সুপ্রিয়া। বিশ্বাস করাবার উপায় আছে আমার কাছে।
দেবেন্দ্র। কি সেটা?
সুপ্রিয়া। তােমার মুখাকৃতি।
দেবেন্দ্র। ওঃ, এই লকেটে আছে বুঝি। (সুপ্রিয়াকে ধরিয়া
ছিড়িয়া নিতে চেষ্টা) এইবার ঠক্‌লে।
থাকলে এ কথা আমার মনেই থাকতােনা।
সুপ্রিয়া। ছাড়, ভীরু কোথাকার, নইলে বাড়ীর সমস্তকে
ডাকব।
(দেবেন্দ্র সুপ্রিয়ার মুখ চাপিয়া ধরিল, এবং তাহাকে জোর করিয়া
বসাইয়া লকেট ছিড়িয়া লইতে উদ্যত হইল সেই সময় পায়ের
শব্দ শােনা গেল দেবেন্দ্র সুপ্রিয়াকে তুলিয়া ধরিয়া সরিয়া
পড়িল, সুপ্রিয়া একটা চেয়ারে বসিয়া পড়িল, কিরণের
প্রবেশ। সুপ্রিয়া লকেট জামার নীচে
লুকাইয়া ফেলিল)
চুপ করে
কিরণ। এরি মধ্যে দুজনে ঝগড়া আরম্ভ হয়ে গেল! চড়া
কথা শুনে এলুম। ঝগড়ার কারণ?
দেবেন্দ্র। দেশের কথা। মিসেস দাস ইংরাজকে এত বেশী
গাল দিচ্ছিলেন যে আমি তা সইতে পারি নি।

পুরােণণা প্রেমের জন্যে
৩৭
কিরণ। সুপ্রিয়া দিদি যে এত দেশ ভক্ত তাতত জান্তুম না।
দেবেন্দ্র। (সুপ্রিয়ার প্রতি জনান্তিকে) তােমার প্রতিহিংসা
নেওয়াটা কয়েক মিনিট স্থগিত রাখ, যা চাও দেব।
সুপ্রিয়া। (কিরণের প্রতি জানাে ততা, ভাই, আমি তর্কের
মধ্যে একটু সহজেই উত্তেজিত হয়ে যাই।
কিরণ। যাই বাবার কাছে, চশমা নিয়ে যেতেই কাউনসিলের
বক্তৃতা পড়া আরম্ভ হলাে, মতি বাবুর সঙ্গে আমাকেও
শুনতে হবে।
দেৰেন্দ্ৰ। তাড়াতাড়ি এসে পড়াে।
কিরণ। তা আসব। বাবার কাছেতে। আর বেশীদিন
থানা, তাই ওঁর সব
তাই ওঁর সব ইচ্ছাই রাখতে হয়।
(দরজার কাছে গিয়া) আর ঝগড়া হয় না
যেন।
সুপ্রিয়া দিদি শেষে আপনাকে বদূমেজাজী মনে করে
ববেন, যদিও আমি যতদূর জানি আপনাকে, তিনি
ততটা জানেন না। (নিষ্ক্রান্ত)
সুপ্রিয়া। (স্বগত) জানে না বৈকি! বেচারি, তােমার
জানা তাে এতদূরই। (দেবেন্দ্রের দিকে। এখন
তুমি কি বলতে চাও আমাকে বল।
দেবেন্দ্র। আমি বলতে চাই আমি তােমর প্রতি অত্যন্ত
অন্যায় ব্যবহার করেছি, তুমি প্রতিশােধ নিতে ক্ষান্ত
হলে আমি এই বিয়ে ভেঙ্গে দিতে প্রস্তুত আছি।
সুপ্রিয়া। এ আবার কি নূতন চাল ?

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
দেবেন্দ্র। তােমার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছি তার পর তােমার
এই সন্দেহ অস্বাভাবিক নয়। (নম্রভাবে )
সুপ্রিয়া। আমার সন্তান আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে তােমার
আন্তরিকতার প্রমাণ দাও।
দেবেন্দ্র। দেব।
সুপ্রিয়া। তুমি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এ বাড়ী ছেড়ে যাবে, আর
এখানে ঢুকতে পারবে না।
দেবেন্দ্র। যাব।
সুপ্রিয়া। বিশ্বাস করিনা, তােমার অনুতাপ বড় আকস্মিক।
আমাকে অসাবধান করে দেবার
নূতন
দেবেন্দ্র। এক সময় তুমি আমাকে—আমাকে শ্রদ্ধা করতে,
আমার কথায় বিশ্বাস করতে।
সুপ্রিয়া তুমি এখানে আমার সম্মুখে আছ সেই কি আমার
যথেষ্ট অপমান নয়, যে আবার সে সব মনে করিয়ে
ফন্দী এ।
দিচ্ছ?
দেবেন্দ্র। ভালােবাসা জানি অতীতকালের জিনস হয়ে গেছে,
তবে সেই পুরােণাে ভালােবাসার জন্য একবার
আমাকে বিশ্বাস কর।
সুপ্রিয়া। বেশ, তাই হােক। আমার মেয়ে কোথায় বল,
এ বাড়ী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে যাও, আমি কিছু
বলব না কাউকে।
দেবেন্দ্র। তাই ঠিক। (একটা কার্ড দিয়া) এই ঠিকানা।

৩৯
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
সুপ্রিয়া (পড়িল) “দেশবন্ধু অনাথ আশ্রম, অধ্যক্ষ শ্ৰীমতী
বিরাজবালা দাসী।” এটা ঠিক তা কি করে জাব ?
দেবেন্দ্র। এই শ্ৰীমতী বিরাজবালার চিঠি। (চিঠি দিল)
সুপ্রিয়া। (পড়িল। “শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্র চন্দ্র ধর সমীপেষু,
আপনার প্রেরিত মেয়ে সুনন্দার অসুখ করেছিল
ঠিকই, এখন সেরেছে। ইতি—শ্রীবিরাজবালা দাসী।”
দেবেন্দ্র। এখন বিশ্বাস হলাে ?
সুপ্রিয়া। আমাকে মেয়ে দিতে তুমি একটা চিঠি দিবে এর
সঙ্গে। (দেবেন্দ্র টেবিলে গিয়া একটা চিঠি লিখিল)
(স্বগত) এ কি সম্ভব আমি আমার মেয়েকে আমার
বুকে ধরতে পারব। এত সুখের কথা যে সত্য
বলে মনে করতে পারি না।
দেবেন্দ্র। (উঠিয়া চিঠি দিয়া) এই নাও, এতেই হবে। কখন
যাবে আন্তে ?
সুপ্রিয়া। কাল।
দেবেন্দ্র। কি প্রমাণ যে তুমি তােমার প্রতিজ্ঞা রাখবে।
সুপ্রিয়া। যে মিথ্যাকে ঘৃণা করে তার মুখের কথাই প্রমাণ।
দেবেন্দ্র। বেশ, পুরােণাে প্রেমের কথা মনে করে আমি
তোমাকে বিশ্বাস করব।
সুপ্রিয়া। এ কথার আর পুনরুক্তি করােনা। তােমার মুখে
বিজপের মত শােনায়, মনে থাকে যেন আগামী কল্য
রাত্রির পূর্বে তুমি না চলে গেলে আমাদের চুক্তি

৪০
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
রইল না, তখন কিরণ সব জেনে ফেলবে। হ’লল,
আর আমাদের সাক্ষাতের দরকার নেই।
( নিক্রান্ত )
দেবেন্দ্র। ঠকেছ, চালাক মেয়ে, ঠকেছ। পুরুত হাতে আছে।
কালই যে ভাবে হােক বিয়েটা শেষ করে ফেলতে
হবে। কিন্তু ওদের মত, করাব কি করে তাই
ভাবছি! ফটোটা হাত করতে হচ্ছে। সেটা ওর
হাতে যতদিন আছে আমি নিরাপদ নই।
রমা।
( রমার প্রবেশ )
প্রকাশ বাবু নামে এক ভদ্রলোেক আপনার সঙ্গে দেখা
করতে চাচ্ছেন।
দেবেন্দ্র। (স্বগত) একে দিয়েই কাজ সিদ্ধি করতে পারব।
( প্রকাশ্যে ) এখানে আসতে বল, রমা। (রমা নিষ্ক্রান্ত)
প্রকাশ উকীল নিশ্চয়ই একটা উপায় বের করতে
পারবে।
( প্রকাশের প্রবেশ)
প্রকাশ। কি হে ভায়া, কেমন আছ?
বেশ আছি।
সেই ‘বিল’টা সম্বন্ধে এসেছ বােধ
হয় ?
প্রকাশ। ঠিক, ভায়া, তােমার সূক্ষম বুদ্ধি—অন্ততঃ প্রকাশ
উকীলের তাই মত,।

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
৪১
দেবেন্দ্র। সেই গগনের ব্যাপারের খবর কি ?
প্রকাশ। অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিল সময় তার পকেট থেকে
তােমার সেই হাজার টাকার নােট নেওয়ার কথা
বলছ বােধ হয়। মুস্কিল হয়েছে এই যে, যে পরিমাণ
লডেনাম তাকে খাইয়েছিলে তাতে বেচারির মৃত্যু
ঘটে, কাজেই এখন চোর ধরা পড়লে, তার বিরুদ্ধে
খুনের অভিযোেগও হবে।
দেবেন্দ্র। (অস্থিরভাবে চারিদিকে চাহিয়া ) চুপ, চুপ, কে আবার
শুনতে পাবে।
প্রকাশ। আরে, প্রকাশ উকীল এত কঁাচা ছেলে নয়।
শােন, খুনেকে ধরবার জন্যে পুরস্কার ঘােষণা করা
হয়েছে, কাজেই যত শীঘ্র পার দেশ ছেড়ে পালাও।
দেবেন্দ্র। তাই তাে হবে, অবিশ্যি যদিও আমি তাকে খুন
করতে চাইনি মােটেই। একটা কিছু উপায়
ঠাওরাতে পার ?
প্রকাশ। তা পারি বােধ হয়। এখনি রেঙ্গুন থেকে একটা
টেলি পেয়েছি।
দেবেন্দ্র। তা দিয়ে কি হবে ?
প্রকাশ। দেখ না। একটা পেন্সিল দাও। (দেবেন্দ্র পেন্সিল
দিল ; প্রকাশ পকেট হইতে রাবার খুলিয়া লেখা মুছিয়া
আবার লিখিল) এখন পড়।
দেবেন্দ্র। (পড়িল) “From Benod Dhar 426126 Street

৪২
পুরােণাে প্রেমের জন্যে
Rangoon. To Deben Dhar. Clo Prakash
Bose, 8, Atabagan Lane, Calcutta. Your
mother dangerously ill, come at once.”
চমৎকার ! আমি ওদেরে বলেছিলুম আমার মা
বিদেশে আছেন। বিনােদ ধরকে আমার কাকা
বলব।
প্রকাশ। এই টেলি দেখিয়ে তাদেরে বল তােমার কালই
রেঙ্গুনে রােয়ানা হয়ে যেতে হবে—বিয়ে এখন
মুলতুবি রাখার কোনাে মানে নেই—তােমার মায়ের
বৌ দেখার সাধ ছিল-মৃত্যুর আগে তাকে দেখিয়ে
দিতে হবে—বিয়ে করে নিয়ে দাও চম্পট। এখন
কি বল প্রকাশ উকীলকে ?
দেবেন্দ্র। বুদ্ধি আছে। কিন্তু সত্যি সত্যি আমাকে রেঙ্গুনে
যেতে বল ?
প্রকাশ। নিশ্চয় ; আমিও যাব সঙ্গে।
দেবেন্দ্র। তার তাে কোনাে কারণ দেখছি না।
প্রকাশ। আমি দেখছি। দেখ, প্রকাশ উকীলকে ঠকাতে
চেষ্টা করাে না, সেটা মস্ত ভুল হবে।
দেবেন্দ্র। কি যে বল ! কিন্তু সেখানে গিয়ে কিরণকে কি
বলব ?
প্রকাশ। সে সহজেই বন্দোবস্ত হবে। তােমার হােটেলে গিয়ে
এক চিঠি পাবে, তাতে এই খবর থাকবে তােমার

পুরােনো প্রেমের জন্যে
৪৩
মা মারা গেছেন-নানা কাজে তােমাকে সেখানে
থাকতে হবে—অর্থাৎ গগনের ব্যাপারটা মিটে না
যাওয়া পর্যন্ত। (একটা ‘বিল’ পকেট হইতে বাহির
করিয়া দেবেন্দ্রকে দিল। তা ভায়া, এতে তােমার নামটা
সই করে দাও।
দেবেন্দ্র। বাঃ! পাঁচশ লিখেছ যে! কথা তো ছিল দু’শর।
জুলুম করাে না। ভেবে দেখ তাে গত দু’মাসে
তুমি হাজার নিয়ে টান দিয়েছ।
প্রকাশ। তার কাজ পাওনি তুমি ? অবিশ্যি তুমি তা মনে না
করলে তােমার আইন উপদেষ্টার কাজ আমি ছেড়ে
দিচ্ছি, তুমি তােমার নিজের কাজ নিজেই দেখ।
দেবেন্দ্র। থাক, থাক্। (সই করিয়া বিল’ দিল) নাও, কিছু
দিনের মত এতেই আশা করি চুপ করে থাকবে।
হাঁ, ভালাে কথা, আমি বড় মুস্কিলে পড়েছি। সুপ্রিয়া
এই বাড়ীরই পরিচিতরূপে দেখা দিয়েছে, সব বের
করে দেবে ভয় দেখাচ্ছে।
প্রকাশ। (শিষ, দিয়া) তবে তাে মুস্কিলই--কি করেছ তুমি ?
দেবেন্দ্র। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এ বাড়ী ছেড়ে যাব এবং মেয়ে
ফিরিয়ে দেব প্রতিজ্ঞা করেছি—সেই সৰ্ত্তে সে চুপ
করে থাকবে। কাল সকালে সে মেয়ে আতে
যাচ্ছে। ফিরে আসবার আগেই আমাকে যা কিছু
করতে হবে।

৪৪
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
প্রকাশ। মেয়েটাকে তত গছিয়ে দিলে, সেই মন্দ কি?
মেয়েটাকে মার কাছে রাখনি কেন আমি বুঝিনি
কোনােদিন।
দেবেন্দ্র। ভেবেছিলুম এইরকম অবস্থায় একদিন পড়তে হবে,
হাতে রাখলে সুবিধা করে নেওয়া যাবে।
প্রকাশ। সাবাস! মাথা কিছু আছে দেখছি।
দেখছি। প্রকাশ
উকীলের তা একচেটে নয়।
দেবেন্দ্র। শোন, ওর কাছে আমার ফটো শুদ্ধ একটা লকেট
রয়েছে। সেটা কি করে পাওয়া যায় ?
প্রকাশ। তার ঠিকানা জান ?
দেবেন্দ্র। না, তবে রমার কাছ থেকে সহজেই তা নেওয়া যায়।
প্রকাশ। তাহলে বাড়ীর দাসীকে ঘুষ দিয়ে আমি লকেট হাত
করে নেব।
দেবেন্দ্র। সাবধানে কাজ করাে।
প্রকাশ। প্রকাশ উকীলকে সে উপদেশ দিতে হবে না।
দেবেন্দ্র। এখন অন্যত্র যাও, কেউ এসে দুজনকে একসঙ্গে
দেখে ফেল্‌বে।
প্রকাশ। প্রকাশ উকীলের সঙ্গে আছ বলে লজ্জিত হচ্ছ ?
দেবেন্দ্র। তা নয়। তবে আজ রাত্রে নিজকে না দেখা দেওয়াই
ভালাে তােমার। ভুলে যাচ্ছ, সুপ্রিয়া তােমাকে
একবার দেখেছে। চিনে ফেলে ভাববে ষড়যন্ত্র
করছি। (উভয়ে নিষ্ক্রান্ত)

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
৪৫
(ললিত এবং মতিলালের প্রবেশ)
মতি।
মতি।
ললিত। মেয়েরা সব কোথায়? এত দেরী করে এলুম তাই
ক্ষেপে আছে দেখব মনে করেছিলুম।
মতি। তারা কোথায় উধাও হয়ে গেল?
ললিত। জানি না। আচ্ছা, আবার ফিরে গিয়ে আমাদের
আললাচনাটা শেষ করলে কেমন হয় ?
(স্বগত) খেয়েছে। প্রকাশ্যে) একটু অপেক্ষা করে
কেউ আসছে কিনা দেখে গেলে হয় না?
ললিত। তাই হােক। আচ্ছা, মতি, দেবেন্দ্রকে কেমন লাগে ?
বেশ লােক, না ?
আমি তার খুব ভক্ত নই।
ললিত। সে আর কি করে হবে? হাঃ হাঃ! হাঃ।
(সুপ্রিয়া, কিয়ণ ও লীলার প্রবেশ) এতক্ষণে ফিরলে
তােমরা। অপেক্ষা করে করে হয়রাণ হয়ে গেছি।
লীলা। বাবা, অবাক করে দিলে, এইমাত্র যে এলে তােমরা
সে বুঝি আমরা টের পাইনি ?
ললিত। এইমাত্র ! কি যে বলিস্। কি বলেন মিসেস্ দাস ?
আপনাদের জন্যে আমাদের অপেক্ষার মুহূর্তটিই কি
মাসকের সমান নয় ?
সুপ্রিয়া। আপনার যৌবন যে ফিরে আসছে। কিন্তু দেবেন
বাবুটি কোথায় ?

ওঃ !
৪৬
পুরোণাে প্রেমের জন্যে
ললিত। জানি না তাে। আধঘণ্টার মধ্যে তার সঙ্গে দেখা
নেই।
সুপ্রিয়া। (স্বগত ১ এরি মধ্যে চলে গেল ? (দেবেন্দ্রের প্রবেশ ;
সে খুব উত্তেজিত এইরূপ ভাণ করিল) (স্বগত) না, সম্ভব
নয়। এখন যেন কেমন তাকে বিশ্বাস হচ্ছে না।
কিরণ। কি হয়েছে? আপনাকে অমন দেখাচ্ছে কেন ?
দেবেন্দ্র। এইমাত্র একটা খুব খারাপ খবর শুলুম।
কিরণ।
ললিত। বিশেষ খারাপ কিছু ঘটেনি তাে, দেবেন?
দেবেন্দ্র। (টেলি দিয়া) আমার মা মৃত্যু শয্যায়।
ললিত। (টেলি দেখিয়া ) খারাপ খবর।
দেবেন্দ্র। আমার-আমার আশঙ্কা হচ্ছে বিয়েটা স্থগিত রাখতে
হবে। কালকেই আমাকে বােয়ানা হয়ে যেতে হবে।
ললিত। এটা কখন পেলে?
দেবেন্দ্র। আমার উকীল এইমাত্র নিয়ে এলেন। কলকাতা
থেকে এইজন্যেই তিনি এসেছেন।
কিরণ। বেশ, ভালাে কাজ করেছেন। যাননি তত তিনি ?
দেবেন্দ্র। এইমাত্র চলে গেলেন, তবে সকালে আসবেন আশা
করি। কি করতে বল আমাকে ?
কিরণ। এখনি রােয়ানা হয়ে যান। সেই তাে আপনার কর্তব্য।
দেবেন্দ্র। ষ্টীমার কখন যায় খোঁজ নেব এবং সেইমত বন্দোবস্ত
করব।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
"৪৭
ললিত। কতদিন হবে তােমার ফিরতে?
দেবেন্দ্র। জানি না। মাকে কেমন গিয়ে দেখি তার উপর তা
নির্ভর করছে।
ললিত। আশা করি তিনি এ যাত্রা ভালাে হবেন।
দেবেন্দ্র।
সে আশা নেই। এক সপ্তাহ আগে কাকার এক
চিঠি পেয়েছিলুম, তাতেই জেনেছিলুম তিনি খুব অসুস্থ,
তাই চলে আসবার সময় আমার উকীল প্র—আমার
উকীলকে বলে এসেছিলুম আমার নামে সব টেলিগ্রাম
পাওয়া মাত্র পাঠিয়ে দিতে।
সুপ্রিয়া। (ঘড়ীর দিকে তাকাইয়া) এত দেরী হয়ে গেছে ভাবিনি।
আসি এখন, ললিত বাবু। আসি দেবেন্দ্র বাবু,
আপনার সমুদ্র যাত্রা সুখের হােক, আপনার মাকে
গিয়ে ভালাে দেখুন এই প্রার্থনা।
দেবেন্দ্র। ধন্যবাদ। (সুপ্রিয়ার প্রতি জনান্তিকে) দেখছে তাে,
আমি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করছি।
(সুপ্রিয়া দরজা হইতে ফিরিয়া দেবেন্দ্রের দিকে তাকাইল।
কিরণ কাদিয়া ফেলিল। মতিলাল সুপ্রিয়া ও দেবেন্দ্রকে
লক্ষ্য করিয়া দেখিতে লাগিল।

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
(পরদিন। লীলা জিনীসপত্র গুছাইতেছে।
লীলা। আজকেই বিয়ে, আজকেই তারা চলে যাচ্ছে।
দেবেন্দ্র বাবু এমন হঠাৎ বিয়েতে যে শেষে কি করে
বাবাকে মত্ করালাে তাই ভাবি। অটল বাবু যদি
এসে বলেন—“লীলা, এখনি তােমার সঙ্গে আমার
বিয়ে” —আমি তাতে কি এমন হঠাৎ রাজি হয়ে পড়ব,
—কখখনাে না। কিন্তু তিনি তা বলেন কই। ভারি
লাজুক মানুষ। পেটে আছে তবু মুখ দিয়ে কথাটি
বের হয় না। জিনীসপত্র গুছানাে তে প্রায় ঠিক
হয়ে গেল, এখন বিয়েটা হয়ে গেলেই ওরা রােয়ানা
হয়ে যাবে। দিদির বিয়েতে কত আমােদ করব মনে
ছিল, তা আর হলাে না। রমা, রমা! (রমার প্রবেশ)
এই লেবেলগুলাে মালগুলােতে এটে দেতাে।
( রমা লেবেল আঁটিয়া নিষ্ক্রান্ত)
(মতিলালের প্রবেশ )
মতি।
কেমন আছ আজ, লীলা ? আমার পানের কেইটা
ফেলে গেছিলুম কাল রাত্রে। দেখে নিয়ে যেতে
এসেছি।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
৪৯
লীলা।
তা নিয়ে যান না। খবর শুনেছেন আশা করি ?
মতি। কি খবর?
লীলা।
দেবেন্দ্র বাবুর সঙ্গে দিদির আজই যে বিয়ে, শুক্রবারে
নয়।
মতি। তুমি আমাকে আশ্চৰ্য্য করে দিতে চাচ্ছ। সে কি
করে হয় ?
লীলা।
দেবেন বাবু কালকেই চলে যাচ্ছেন রেঙ্গুন, সকলের
মত্ করিয়ে নিয়েছেন—বিয়ে হওয়া মাত্রই দিদিকে
নিয়ে এখান থেকে রােয়ানা হয়ে যাবেন।
মতি। তােমার বাবাও মত দিয়েছেন ।
লীলা। হা, দিয়েছেন। আপনি এবং সুপ্রিয়া দিদি চলে
গেলে অনেকক্ষণ সে আলােচনা হয় আমাদের মধ্যে।
প্রথমটা বাবা কিছুতেই মত্ দেন নি, শেষে দিতে
হলাে। দেবেন বাবু সব বন্দোবস্ত
বেরিয়েছেন।
মতি। ললিত বাবুর সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।
লীলা। যাই, বলি গিয়ে। (নিষ্ক্রান্ত)
মতি। এখন আরাে পরিষ্কার ধারণা হচ্ছে এই লােকটা একটা
আস্ত জোচ্চোর। কিন্তু আমি খুঁজেও কোনাে প্রমাণ
বের করতে পারলুম না এই তাে মুস্কিল। অবিশ্যি
এখন আমার চেষ্টার কোনাে ফল হবে না, তবু
দেখতে হচ্ছে ললিত বাবুকে বলে কয়ে বিয়েটা
৪

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
পিছিয়ে দেওয়া যায় কি না। কিরণ এমন জোচ্চোরের
স্ত্রী হবে সেটা সহ্য করা যায় না।
(ললিতের প্রবেশ)
ললিত। মতি, তুমি এসেছ, সুখী হলুম। বিয়ে পর্যন্ত থেকে
যেতে হবে। লীলা নিশ্চয় তােমাকে সব বলেছে।
সে বল্লে আমার সঙ্গে নাকি তােমার কি কথা আছে ?
মতি। এই বিয়ে সম্বন্ধেই। এত তাড়াতাড়ি একটা কিছু করে
ফেলাটা ভুল হচ্ছেনা ? ইংরাজীতে একটা প্রবাদ
আছে--তাড়াতাড়ি বিয়ে করলে ধীরে সুস্থে অনুতাপ
করতে হয়।
ললিত। কিন্তু অবস্থাটা ভেবে দেখ।
মারা যাবেন, তাহলে বছরখানেক বিয়ে হবেন, হয়ত
কোন দিনই না হতে পারে। তারপর বুড়ীর সাধ
বৌ দেখে যায়। ইত্যাদি নানা কথা ভেবে দেখলুম
দুদিন পর যখন বিয়ে হবে ঠিক আছে—তা দুদিন
আগেই হয়ে গেল। তবে আমােদ করা গেল আত্মীয়
স্বজনকে ডাকা গেল না, এই যা দুঃখ।
মতি।
দেখুন, এসব ফঁাকিও হতে পারে—বিয়েটা তাড়াতাড়ি
সেরে নেবারি কৌশল না কি কে জানে ?
ললিত। কি বলছ তুমি.?
দেবেন্দ্র বাবু সম্বন্ধে যা শুনেছি তাতে এসব মনে
করাটা কিছুই আশ্চৰ্য্য নয়।
মতি।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
মতি।
ললিত।
ওঃ। তুমি বােধ হয় তাকে সেই মেস্ থেকে
তাড়ানাের কথা বলছ। সে নিজেই তাে আমাকে
সে কথা বলেছে। দেখ, মতি, তুমি তার সম্বন্ধে
অন্যায় ধারণা করে রেখেছ।
এক সময় আমিও তাই ভাবতুম; কিন্তু এখন তা
ভাবি না। তা ছাড়া মিসেস দাসকে আমি যতই
প্রশংসা করি না কেন, ওঁর আর দেবেন বাবুর মধ্যে
একটা গােপন বােঝাপড়া রয়েছে বলে মনে হয়।
প্রথম সাক্ষাতের সময় যে ভাবে দুজনই চমকে
উঠেছিল তার অর্থ রয়েছে।
ললিত। যাও! যাও! আমিই তত পরিচয় করিয়ে দিয়ে-
ছিলুম, আমি তাে কিছুই লক্ষ্য করিনি। নিশ্চয়
বলতে পারি তাদের পূর্বে পরিচয় ছিল না।
আমি নিশ্চয় বলতে পারি ছিল।
ললিত। কি যে বল হা! হা! হাঃ! তােমার মাথাই ঠিক
নেই।
একটু চোখ খুলে রাখলেই আপনার পক্ষে এবং
আপনার পরিবারের পক্ষে মঙ্গল হয়।
( রাগিয়া
নিষ্ক্রান্ত)
ললিত। ছোড়ার ঈর্ষা হয়েছে, কিরণকে বিয়ে করতে পারলে
না তাই। যাক, এর সঙ্গে বক বক করে কাগজ
পড়বার সময় নষ্ট করছি। (রাগিয়া নিষ্ক্রান্ত)
মতি।
মতি।

পুরােণণা প্রেমের জন্যে
(রমা ও অটলের প্রবেশ ; অটলের হাতে একটা বই ও ফুলের তােড়া)
ছােট দিদিমণিকে বলব আপনি এসেছেন। (স্বগত)
কাণ পেতে শুনব কি বলে ওরা। (নিষ্ক্রান্ত)
অটল। এ ভাবে আর চলছেনা। অদৃষ্টে কি আছে জানতে
হবে আজই। কালকে দুবারই বব বব মনে করে-
ছিলাম কিন্তু বলা হলাে না। একবার রমাটা ঠিক
সময়ে এসে ওকে ডেকে নিয়ে গেল। কাল তােল
সাহস ছিল, কিন্তু আজ যেন আর সাহস হচ্ছে না।
কি বলব ? আচ্ছা, যদি বলি-লীলা, আমি
তােমাকে প্রাণাপেক্ষা ভালবাসি, তােমাকে না পেলে
আমার জীবন ব্যর্থ”—তাহলে কেমন হয় ? সে হয়ত
হাসবে। (দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া) না, না, কথা আগে
থেকে ঠিক করে রাখা কিছু নয়, তখন যা মনে আসে
তাই ব ।
(লীলার প্রবেশ )
লীলা।
নমস্কার, অটল বাবু। এত সকালে আসার কারণটা
জিজ্ঞেস্ করতে পারি কি ?
অটল। আমি—আমি সেই বইটা এনেছি, কাল রাত্রে যেটা
চেয়েছিলেন আপনি।
বেশ, বেশ। আমি তাে ভুলেই গেছিলুম।
(স্বগত, কাঁদ কাঁদ ভাবে) খুব উৎসাহজনক-ভুলেই
গেছিল। (প্রকাশ্যে আসবার সময় এই ফুলের
লীলা।
অটল।

পুরােণণা প্রেমের জন্যে অটল বাবু। অটল। লীলা। অটল। তােড়াটা পেয়ে কিনে নিয়ে এলুম-আপনি ফুল খুব ভালবাসেন কিনা। লীলা। (তােড় লইয়া) ধন্যবাদ, বাস্তবিক আমি ফুল খুব ভালবাসি। ( আবেগের সহিত) যদি ফুল হতুম ! তাই হতে চান্ নাকি ? এই বয়সেই মনুষ্য জীবনটা বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। কয়দিনেই এগুলাে মরে যাবে। ( শুকিল । কি চমৎকার! (তােড়াকে আদর) দাতার কোনাে আদর নেই। লীলা। ওঃ! ভুলেই তাে গেছিলুম-আপনি তাে জানেন আজই যে দিদির বিয়ে। এ্যা! কি করে ? লীলা। দেবেন বাবু টেলি পেয়ে রেঙ্গুনে তার মাকে দেখতে যাচ্ছেন, দিদিকেও সঙ্গে নিয়ে যাবেন। অটল। আশ্চর্য মনে হচ্ছে। লীলা। আসবেন কিন্তু। অটল। তা আব বৈকি। (নীরব। লীলা। আজ দিনটি বেশ করেছে, না ? অটল। হ। আকাশটি বেশ পরিষ্কার, না ? লীলা। হাঁ, খুব। অটল। একটুও মেঘ নেই। এতটা সূক্ষম ভাবে আমি আকাশ পৰ্যবেক্ষণ করিনি। অটল। লীলা।

৫৪ অটল। লীলা। অটল। লীলা। অটল। পুরােণাে প্রেমের জন্যে ,তা অবিশ্যি আমিও করিনি-আমি বলতে চাচ্ছিলুম, যতদূর লক্ষ্য করিছি আকাশে মেঘ ছিল না। (স্বগত) কি যে বলি ভেবে পাইনে। (নীরব। আশা করি- আশা করি আপনার কোনাে কাজের বাধা জন্মাচ্ছিনা ? না, এখন আমার বিশেষ কোনাে কাজের তাড়া নেই। খুসি হলুম ; কথাবার্তা এমন জমে আসছিল—এখন সে মাটি হতে থাকলে (হাসিয়া) খুব জমে আছিল বুঝি! কি সম্বন্ধে না আমাদের কথাবার্তা হচ্ছিল ? কি সম্বন্ধে—কি সম্বন্ধে ঠিক মনে হচ্ছে না। (স্বগত) এখন বলে ফেলি। ( প্রকাশ্যে ) এর পর বােধ হয় আপনার পালা আসবে বিয়ে করবার ? সে বিয়ে ঠিক হলে তবে কথাবার্তায় সময় পাওয়া যাবে। বিয়ে ঠিক হয় তা চান আপনি? সে অবস্থা বিশেষের উপর নির্ভর করে। আমি—আমি তােমাকে খুব ভালবাসি, লীলা; তুমি তা হয়ত বিশ্বাস কর না। হাঁ, করি তাে। তাহলে আশা করতে পারি কি যে তুমি একদিন আমার স্ত্রী হবে? লীলা। অটল। লীলা। অটল। ; লীলা। অটল।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে ৫৫ লীলা। অটল। লীলা। আপনি যে আমাকে একেবারে আশ্চৰ্য্য করে দিয়েছেন। চিরকুমারী থাকব বলেই তো মনে করে- ছিলুম আমি। জানি, আমি তােমার উপযুক্ত নই। আমাকে ক্ষমা করবে তাে ? আপনাকে কি জন্যে ক্ষমা করতে হবে সে তত ভেবে পাচ্ছি না। তবে যদি খুসি হন বল্লে তবে বলুম-হাঁ, ক্ষমা করব। (উভরে নীরব) আপনার মত বােকা দেখিনি আমি। অটল। জানি, বােকাই বনেছি। (দরজার দিকে গিয়া) আসি তবে, বিদায়, এখানে আর আসা হবে না কখনাে। বেশ। (প্রস্থানােত অটলকে পুনঃ বাধা দিয়া) অটল লীলা। অটল। লীলা। বাবু! ( আসিয়া-সাহসের সহিত) বল। অটল বাবু, তুমি আমার প্রিয়তম! বুঝলে কিনা। ( কাণাকাণি করিয়া) প্রিয়তম। সত্যি ? অটল। লীলা। অটল। হাঁ, সত্যি। (লীলাকে আলিঙ্গন করিয়া) সত্যি সত্যি ভালবাস আমাকে ? এর পরও এই প্রশ্ন করতে হবে ? ওঃ! আমার চেয়ে সুখী কে ? (লীলাকে চুম্বনের চেষ্টা ) লীলা। অটল।

পুরােণণা প্রেমের জন্যে লীলা। অটল। লীলা। অটল। লীলা। ,না,বাবার অনুমতি না নিয়ে এতটা সাহস ভালােনয়। ওঃ! ভুলেই গেছিলুম। কি ভুলে গেছিলেন ? তােমার বাবার যে সম্মতি দরকার। আচ্ছা, তিনি যদি মত, না দেন ? (বাহু দিয়া লীলাকে জড়াইয়া) তাহলে নিজের মাথার খুলি নিজে উড়িয়ে দেবেন এই ভয় দেখাবেন-পকেট থেকে পিস্তল বের করে আপনি সত্যি সত্যি যে তা করতে চান দেখাবেন। কিন্তু সম্মতি পেতে কোনাে মুস্কিল হবে বলে তাে মনে হয় না। (ললিত বাবুর প্রবেশ) ললিত। এ! তােরা— লীলা দৌড়িয়া পলাইল) অটল। আমার-আমার এই আচরণের জন্যে ক্ষমা চাচ্ছি। ললিত। হাঁ, আমিও তাে অবাক হয়ে গেছি। তােমাদের যে দেখছি খুবই খাতির জমে গেছে। হাঃ! হাঃ! হাঃ! (গ) যাক, মেজাজ ভালােই আছে। ( প্রকাশ্যে ) আমি-আমি আপনার জামাতা'হতে পারলে নিজকে নিজকে সৌভাগ্যশালী মনে করব। ললিত। করবে নাকি ? এস লাইব্রেরী ঘরে-এ সম্বন্ধে আলাপ হবে। (নিষ্ক্রান্ত) আশা হচ্ছে, কোনাে গােল হবে না বােধ হয় (নিষ্ক্রান্ত। অটল। অটল।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
(প্রকাশ ও রমার প্রবেশ)
রমা। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন, দেবেন বাবু এলেই
আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব।
প্রকাশ। বেশ, রমা। দুটি টাকা উপার্জন করবে, রমা ?
রমা।
কি করব?
প্রকাশ। বলি, দুটি টাকা উপার্জন করবে ?
রমা। তা করব বৈকি, বাবু, আপনাদের অনুগ্রহ থাকলে।
প্রকাশ। (চিঠি দিয়া) এই চিঠি নাও, আমি যখন এক গ্লাস
জলের জন্যে তােমাকে ডাকব, তখন বুঝবে এই চিঠি
দিতে হবে।
রমা। আচ্ছা, বাবু।
প্রকাশ। মনে থাকে যেন জল না চাওয়া পর্যন্ত চিঠি দেবে না।
এই নাও টাকা। (দিল )
বুমা। থাকবে মনে। ( নিষ্ক্রান্ত)
প্রকাশ। এতক্ষণ তত ভালােয় ভালােয়ই গেল। শ্ৰীমন্ যদি
আমার প্রাপ্য না দেন তাহলে আচ্ছা করে প্রতিশােধ
নিতে হবে; সেই ফটোগ্রাফের ব্যাপারটা বেশ ভালো
করেই সমাধা করা গেছে। ওর বাড়ীতে গিয়ে দাসীকে
কিছু দিয়ে হাত করলুম, আরাে দেব বল্লম, আজ
সকালে সে ফটো এনে দিলে। সুপ্রিয়ার কাছ থেকে
কি করে বাগালে তা জিজ্ঞেস করেছিলুম, কিচ্ছু বলে
। এই তাে সেটি
পকেটেই রয়েছে কে জানে

পুরােণণা প্রেমের জন্যে
কখন্ কাজে লেগে বসূবে। কিন্তু শ্রীমাকে
তা বলছিনে। প্রকাশ উকীল তেমন কাচা
ছেলে নয়।
(দেবেন্দ্রের প্রবেশ)
দেবেন্দ্র। ঠিক সময়ে এসেছ দেখছি।
প্রকাশ। তাই এসে থাকি, ভায়া। সব ঠিক তো ?
দেবেন্দ্র। হাঁ, কোনাে গােল নেই। একেবারে অভাবিত
পূর্ব। ফটো হাত করেছ ?
প্রকাশ। হাঁ।
দেবেন্দ্র। চমৎকার ! কোথায় সেটা ?
প্রকাশ। ভুলে হােটেলে আমার কোটের পকেটে রেখে
এসেছি।
দেবেন্দ্র। ওঃ! খারাপ করেছ। সেটি নিজ হাতে না পাওয়া
পৰ্যন্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করতে পারছি না
নিজকে। শীগগীর নিয়ে এস সেটি।
প্রকাশ। তা এখনি যাচ্ছি—আমাদের কাজটা সারা হলেই।
দেবেন্দ্র। কি কাজ ?
প্রকাশ। (কাগজ দিয়া) এই ছােট্ট কাগজটিতে তােমার নাম
সই করে দেওয়া মাত্রই যাব আমি।
দেবেন্দ্র। এটা কি ? বিয়ের তিন মাসের মধ্যে তােমাকে দশ
হাজার টাকা দেওয়ার এগ্রিমেন্ট দেখছি।
প্রকাশ। তাই, তাহলে রেঙ্গুন পর্যন্ত আমার সঙ্গের কষ্টটা

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
তােমাকে আর সইতে হবে না। আর journeyটাও
আমার পছন্দ হচ্ছে না।
দেবেন্দ্র। তুমি কি ভাবছ যে আমি এতই বােকা যে এই
এগ্রিমেন্টে দস্তখত করব ?
প্রকাশ। (ভয় দেখাইয়া) আর তুমি কি এতই হাবা যে দস্তখত
করবে না ?
দেবেন্দ্র। ভেবে দেখ ওর টাকার পঞ্চমাংশ এটা।
প্রকাশ। তােমার জন্যে যা করেছি তার তুলনায় কিছুই নয়।
তােমাকে খুব সস্তায়ই ছাড়ছি।
দেবেন্দ্র। ( বিদ্রুপের সুরে) তা তাে বটেই। অর্ধেক চাইলেন
যে সেই তাে আমার ভাগ্যি।
প্রকাশ। আরাে বেশী বকালে তাই চাইব।
দেবেন্দ্র। (কাগজে নাম সই করিয়া প্রকাশকে দিয়া) এই নাও।
প্রকাশ। বেশ। এখন গিয়ে ফটো নিয়ে আসছি।
দেবেন্দ্র। বেশী দেরী করাে না।
প্রকাশ। এই তাে এলুম বলে। (নিষ্ক্রান্ত)
দেবেন্দ্র। যে ভাবেই হােক এই লােকটাকে দূর করতে হবে।
রেঙ্গুন নিয়ে যাওয়াই ভালাে একে। সেখানে গিয়ে
ওকে একটা কিছু করা সহজ হবে। আমার এত
কথাই সে জানে যে ওকে বাঁচতে দিলে আমি মনে
কখনাে শান্তি পাব না। সুপ্রিয়া ফিরে এসে বিয়ে
হয়ে গেছে দেখলে গােল বাঁধাবে, কিন্তু ততক্ষণে

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
আমরা রােয়ানা হয়ে যাব আশা করি। প্রকাশটা
যদি বিশ্বাসঘাতকতা করেনা, সে হয়ত তা করবে
। নিজেরই তাতে ক্ষতি। (নিষ্ক্রান্ত)
(ললিত ও অটলের প্রবেশ)
ললিত। তাহলে অটল, এ ঠিক হয়েই রইল। লীলাকেও তুমি
নিয়ে যাও—আমি একা পড়ে থাকি। আঠার মাস
যাবৎ বিপত্নীক অবস্থায় আছি, এ অবস্থায় আর চল্‌বে
না। মিসেস দাসের কাছে বিয়ের প্রস্তাব করে
ফেব ভাবছি।
অটল। আপনি বােধ হয় ঠাট্টা করছেন।
ললিত। ঠাট্টা! মােটেই নয়। আমাকে গ্রহণ করবে বলে
মনে করনা ?
অটল। কি করে বলি ?
ললিত।
প্রত্যাখ্যান করলে “প্রজাপতির নিবন্ধ” আফিসে
বিজ্ঞাপন দিয়ে দেব ভাবছি।
অটল। সে কি ঠিক হবে ?
ললিত। নয় কেন ?
অটল। (স্বগত) ব্যাপার দেখে মনে হচ্ছে বেশী দিন শাশুড়ী
ছাড়া থাকুব না আমি।
ললিত। মিসেস্ দাস ফিরে আসা মাত্রই বিয়ের প্রস্তাব করব।
বেশ মেয়েটি, আমাকে পছন্দ করে বলেও মনে হয় ।
অটল। কোনাে কোনাে স্ত্রীলােক বুড়ােদের পছন্দ করে।
.

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
অটল।
ললিত। আমাকে তুমি বুড়ো বল্‌ছ কোন্ হিসেবে ?
আপনাকে তাে বলিনি। আমি একটা সর্বজনবিদিত
সাধারণ সত্য কথা বলেছিলাম।
ললিত। ষাট বৎসর বয়স হয়েছে বলেই বুড়াে হয়ে গেলুম !
অটল। না, না। আপনি মধ্যবয়স্ক।
ললিত। ঠিক, আমি মনে করি আমার এখন যাকে বলে-
prime of life.
( কিরণ এবং লীলার প্রবেশ)
কিরণ।
কেমন দেখাচ্ছে আমায়, বাবা ?
ললিত। বেশ, মা। (অটলের প্রতি ) কেমন, অটল, বেশ
দেখাচ্ছে না? (সরিয়া গেল।
চমৎকার।
লীলা। আমার দিদির প্রশংসা করে আমার ঈর্ষা জন্মাবেন না
বছি। আমাকে ভালাে দেখাচ্ছে বলে তাে কোনাে
দিন প্রশংসা করেন নি।
অটল। না, সে ভ্রম আমার হয়নি। না, (জিব, কাটিল) তা ছাড়া,
সব সময়ই তােমাকে এমন ভালাে দেখতে যে বিশেষ
কোনাে এক সময়ে প্রশংসার কোনাে মানে থাকে না।
কিরণ। আমার পক্ষে খুব প্রীতিকর কথাটি।
অটল। না, না, আমি তা বল্ ছিনে, আমি
লীলা। ওঃ! বুঝলুম, শিক্ষা নেই বলে কথাটা গুছিয়ে বলতে
পাচ্ছে না দেখছিনা ?
অটল।

৬২
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
(দেবেন্দ্রের প্রবেশ
দেবেন্দ্র। অটল বাবু যে ! শুনেছেন হয়ত, আর যেতে
পারছেন না।
অটল। বাঃ! আমি যে মােটেই প্রস্তুত হয়ে আসিনি।
লীলা। বিয়ের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার আপনার আলাদা পােষাক
আছে নাকি ?
অটল। বিয়ে করতে তা দরকার না হলেও বিয়ে দেখতে তাে
তা দরকার।
সুপ্রিয়া ও মতিলালের প্রবেশ)
সুপ্রিয়া। সব ঠিক হয়েছে শুনছি। কিন্তু আমার দুই একটা
কথা আছে।
ললিত। বাঃ! আপনি যে যে চলে গেছেন, শুনেছিলুম।
কেমন, দেবেন?
দেবেন্দ্র। ।
(স্বগত) ওঃ! যায় নি। ( প্রকাশ্যে )
রােয়ানা হওয়ার সব বন্দোবস্তের কিছু বাকী রয়েছে।
সে বিষয়ে সকলের মনোেযােগ দরকার। মিসেস্
দাসের দু একটা কথা কাকে হলেই হবে।
ললিত। হাঁ, তা ঠিক। আমাদের সময় নেই। এর মধ্যে
বিয়ের বন্দোবস্তও করা চাই।
দেবেন্দ্র। আসু, অটল বাবু
সুপ্রিয়া। থামুন সবে। বিয়ের বন্দোবস্তের দরকার নেই
কিছু। বিয়ে হতে পারবে না।

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
কিরণ। সুপ্রিয়া দিদি, কি বলছ তুমি ?
সুপ্রিয়া। আমি বলছি যে এই লােকটা দেবেন্দ্র ধর নামে যে
আপন পরিচয় দিচ্ছে, দেবেন্দ্র দাস নামে সে একদিন
আমাকে বিয়ে করেছিল।
দেবেন্দ্র। মিথ্যা কথা। এই স্ত্রীলােকটিকে কয়েক বৎসর
আগে আমি জানতুম।
আমাকে
ভলবাসতো, আমি সেই ভালবাসার প্রতিদান করিনি
বলে তা কালক্রমে ঘৃণায় পরিবর্তিত হয়ে গেছে, এই
সুযােগে সে প্রতিশােধ নিতে চাচ্ছে। আমার স্ত্রীই
যদি হবে তবে নাম পরিবর্তন করে সে মিসেস্ দাস
নামে পরিচিত হলাে কেন ?
সুপ্রিয়া। নাম পরিবর্তন করা যার দরকার সেই করেছে, আমি
করিনি।
ললিত। নি, নি! নিশ্চয় কোনাে ভুল হয়েছে।
সুপ্রিয়া। কোনাে ভুল হয় নি।
ললিত। আপনার কোনাে প্রমাণ আছে ?
সুপ্রিয়া। হাঁ।
ললিত। কোথায় ?
সুপ্রিয়া। (লকে দেখাইয়া) এখানে। এতে যে ফটো রয়েছে,
ওর বিয়ের দিন সে আমাকে তা দেয়। দেখুন না।
বাঃ! (লকেট খুলিয়া) কোথায় গেল ! কেউ চুরি

৬৪
পুরােণণা প্রেমের জন্যে
দেবেন্দ্র। ওঃ, পাগল দেখছি।
সুপ্রিয়া। না, পাগল নয়। শুনুন সকলে আমার কথা।
বহুবৎসর পর কাল রাত্রে ওর সঙ্গে আমার এখানে
দেখা। তাকে ধরিয়ে দেব বলে ভয় দেখিয়েছিলুম,
কিন্তু সে আমাকে আমার মেয়ে ফিরিয়ে দেবে এবং
এই বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে এস্থান চিরকালের মত আজই
ত্যাগ করে যাবে এই সৰ্তে আমি চুপ করে থাকতে
রাজি হই। সে আমাকে আমার মেয়ের ঠিকানা
দিয়েছিল, ভেবেছিল আমি আজই তাকে আনুতে
রােয়ানা হয়ে যাব, এবং আমার অনুপস্থিতিতে সে
কিরণকে বিয়ে করে তাকে নিয়ে পালাবে।
কথা রাখবে সে সম্বন্ধে আমার খুবই সন্দেহ ছিল,
তাই আমি আজ যাইনি। আমি আজ মতি বাবুর
কাছে খোঁজ নিয়ে জানলুম সে যায় নি, তিনিই
আমাকে বিয়ের খবর দিয়েছেন।
কিরণ। তােমাকে বিশ্বাস করতে পারি না, করবও না বিশ্বাস।
সুপ্রিয়া। মূঢ় মেয়ে, কি বলছ তুমি জান না। সারা জীবনটি
নষ্ট করে দেবার আগে একটু থেমে ভেবে নাও!
ললিত। মিসেস্ দাস, আপনি দেবেন্দ্রের বিরুদ্ধে সাংঘাতিক
অভিযােগ এনেছেন, এ মিথ্যা বলে প্রমাণিত না
হওয়া পর্যন্ত আমি এই বিয়ে হতে অনুমতি দিতে
পারছি না।

পুরােণ প্রেমের জন্যে
দেবেন্দ্র। এ যে মিথ্যা তা সহজেই আমি প্রমাণ করতে পারব।
আমার বন্ধু প্রকাশ উকীল এখনি আসবেন এখানে,
তিনি আমার সব কথায় সাক্ষ্য দেবেন।
(প্রকাশের প্রবেশ )
প্রকাশ। (স্বগত) মিসেস্ দাস দেখছি, তবেই হয়েছে-সব
ভণ্ডুল !
দেবেন্দ্র। এর কথাই বলছিলুম আমি।
প্রকাশ। একটু পরে। বড় তেষ্টা পেয়েছে। (জোরে )
আমাকে এক গ্লাস জল এনে দেবে কেউ ?
দেবেন্দ্র। প্রকাশবাবু, আপনি আমাকে দেবেন্দ্র ধর ছাড়া আর
কোনাে নামে পরিচিত হতে দেখেছেন কখনাে ?
(রমার প্রবেশ )
প্রকাশ। এক গ্লাস জল দাও ত রমা। (রমা নিষ্ক্রান্ত। এই
প্রশ্নের আমি জবাব দিতে চাই না।
সুপ্রিয়া। এ কি দেখছি ? এ ব্যক্তিই আমার স্বামীর উকীল।
প্রকাশ। ঠিক, ঠিক।
(স্বগত) শ্ৰীমান্ ফঁাসাদে পড়েছেন।
আমি এখন পরিষ্কার অন্য দিকে চলে যাই।
কিরণ। তাহলে আপনি বলতে চান যে দেবেন্দ্ৰধরই
প্রকাশ। দেবেন্দ্র দাস।
ললিত। ঠিক বলছেন?
প্রকাশ। ঠিক ? ঠিক নয় আমার ! প্রকাশ উকীলকে
বিশ্বাস করতে পারেন।

পুরােণে প্রেমের জন্যে
দেবেন্দ্র। আমি বিশ্বাস করে নির্বোধের কাজ করেছি।
( প্রকাশের প্রতি জনান্তিকে) এর শাস্তি পাবে তুমি।
প্রকাশ। সে দেখা যাবে। দেখুন সকলে, একটি নির্দোষ
মেয়ের আত্মবলিদান আমি পছন্দ করছি না বলে
সে আমাকে শাসাচ্ছে।
দেবেন্দ্র। আমি আপনাদেরে আর কষ্ট দেব না। সকলেই
এই কাহিনী বিশ্বাস করতে সংকল্প করেছেন দেখছি।
আসি আমি। (নিষ্ক্রান্ত)
প্রকাশ। (স্বগত) থানা পাশের রাস্তার মােড়েই, রমা এতক্ষণে
আমার চিঠি নিয়ে দিয়েছে নিশ্চয়। এক্ষনি এসে
পড়তে লিখেছি—আসতে
আর দেরী হবে না
তাদের। (প্রকাশ্যে ) বেশী দূরে যেতে হবে না তাকে।
সুপ্রিয়া। কি বছেন আপনি?
প্রকাশ। একটা চুরি এবং একটা খুনের অভিযােগ আছে তার
বিরুদ্ধে।
সকলে। খুন! (কিরণ পতনােম্মুখ ; লীলা তাহাকে ধরিল )
লীলা। এস, দিদি, একটু শুয়ে থাক এসে।
(কিরণ ও লীলা নিষ্ক্রান্ত)
ললিত। মিসেস্ দাস, আপনার নিকট আমি কৃতজ্ঞ, এ ঋণ
জীবনে শােধবার নয়। আপনি বাধা না দিলে এই
দুবৃর্ত্তের স্ত্রী হয়ে যেতাে আমার মেয়ে।
সুপ্রিয়া। আমার কাছে কোনাে ঋণ নেই আপনার। আমার

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
৬৭
।
মতি।
মতি।
কৰ্ত্তব্য আমি করেছি। কিরণ
হৃদয় অর্জন করেছে, এই আঘাত কাটিয়ে উঠলে
সেদিকে তার চাইবার অবসর হবে।
ললিত। (নতমস্তক মতিলালের প্রতি) মতি, আমি তােমার ক্ষমা
প্রার্থনা কচ্ছি—আমি-
আর বলবেন না। সব ভুলে হয়েছে।
ললিত। এস তা হলে আমার সঙ্গে, এ বিষয়ে আলােচনা
করে-
(কঁাদ কঁাদ ভাবে) রাজনীতি ?
ললিত। না, উদ্বাহনীতি। (ললিত ও মতি নিষ্ক্রান্ত )
অটল। আমি দেখে আসছি ওদেরে। (নিষ্ক্রান্ত)
প্রকাশ। (হাত ঘষিতে ঘষিতে ) মিসেস্ দাস, এখন তাে আর
আপনার ভয় নেই। আপনার স্বামী গ্রেপ্তার হয়ে
গেলে আপনার নির্দোষিতার প্রমাণ আমি দেব।
সুপ্রিয়া। ধন্যবাদ, আপনার সাহায্য ছাড়াই সে আমি পারব।
নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারেন কিনা
দেখুন গিয়ে। (নিষ্ক্রান্ত)
প্রকাশ। এর মানে কি ? কিছু জানে নাকি? না, না, ভয়
দেখিয়েছে শুধু ! (পকেট হইতে এগ্রিমেন্ট, বাহির
করিয়া) তবু এটা নষ্ট করে ফেলাই ভালাে। এখন
ততা আর মূল্য নেই, আমার কাছে পাওয়া গেলে
বিপদ ঘটতে পারে। ( বাহিরে কোলাহল) একি ?

পুরােণাে প্রেমের জন্যে
গেছি !
( কাগজ পকেটে পূরিল এবঃ বেগে বারান্দায় গেল )
শ্ৰীমান্ যে !
এ দিকেই দৌড়ে আসছে। দরজা
লাগিয়ে পুলিশ না আসা পর্যন্ত লুকিয়ে থাকি।
( সমস্ত দরজা দ্রুত লাগাইয়া পর্দার আড়ালে গেল। দেবেন্দ্র
ভীষণ ভাবে বেগে প্রবেশ করিয়া একে একে সব দরজায়
ধাক্কা দিয়া দেখিল সব বন্ধ )
দেবেন্দ্র। ঐ পাজি প্রকাশটা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমি
যে জালে ধরা পড়েছি এ থেকে আর
নিষ্কৃতি নেই। পুলিশ আসছে। পর্দার আড়ালে
লুকোই। (পর্দার কাছে গিয়া প্রকাশকে দেখিল—তার
গলায় চাপিয়া ধরিয়া) ওরেরে বিশ্বাসঘাতক কুকুর!
প্রকাশ। না, না, আমি কিছু করিনি, আমি
দেবেন্দ্র। আরে মিথুক ! দরজার চাবি দাও—তাড়াতাড়ি।
( প্রকাশ চাবি দিল ; ডিটেটিভের প্রবেশ ; দেবেন্দ্র
গলায় ধরিয়া প্রকাশকে ঘুরাইয়া ডিটেটিভের হাতের মধ্যে
ফেলিয়া দিল। প্রকাশ একটা দরজায় গিয়া তাহা খুলিয়া
পলাইতে উদ্যত কিন্তু তার সম্মুখে একজন পুলিশ অসিয়া
উপস্থিত হইল) গেছি! যাক, জীবিত নিতে পারবে
। (পকেট হইতে একটা শিশি বাহির করিয়া পান
করিল; ডিটেকটিভ, তার হাতে হাতকড়ী লাগাইল)
(ললিতের প্রবেশ)
ললিত। এসব গােলমাল কিসের ? আমার বাড়ী কি পুলিশ
কোর্ট হয়ে উঠল ?

পুরােনাে প্রেমের জন্যে
ডিটেকটিভ। আপনাকে বিরক্ত করলুম বলে দুঃখিত। এই
ভদ্রলােকটিকে গ্রেপ্তার করতে আসতে হলাে।
প্রকাশ। ললিতবাবু, নিশ্চয় বলতে পারি পুলিশের কোননা
দোষ নেই।
দেবেন্দ্র। ( প্রকাশকে দেখাইয়া) এই ব্যক্তি আমার সহচর।
ওকে খানাতল্লাস করুন, প্রমাণ পাবেন।
প্রকাশ। ওঃ! নিজের উকীলের উপর এই অভিযােগ ?
ডিটেটিভ,। মশায়, মাপ করবেন, আপনার পকেট দেখান।
প্রকাশ। কখনাে নয়। এ অপমান কিছুতেই সইব না।
ডিটেকটিভ,।(পুলিশের প্রতি) খানাতল্লাস কর। (পুলিশ প্রকাশের
পকেটে হাত দিয়া কাগজ বাহির করিয়া ডিটেটিভকে
দিল) (কাগজ নেখিয়া) এতেই যথেষ্ট হবে। প্রকাশ
ব, আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করলুম। (হাতকড়া
লাগাইল)
প্রকাশ। আমাকে গ্রেপ্তার ? আপনি পাগল হয়েছেন।
প্রকাশ উকীল সদ্যোজাত শিশুর মতই নির্দোষ।
( সুপ্রিয়ার প্রবেশ )
দেবেন্দ্র। সুপ্রিয়া ।
সুপ্রিয়া । দেবেন্দ্র দাস, এতদিনে তােমার শাস্তির দিন এসেছে।
দেবেন্দ্র। শােন, আমি মরূতে যাচ্ছি, তােমার প্রতি অবিচার
করে যাবনা।
সুপ্রিয়া। মরতে যাচ্ছ !

: ৭০
পুরােণাে প্রেমের জন্যে
ললিত। কি বলছ তুমি ?
দেবেন্দ্র। আর কয়েক মিনিট মাত্র আছি। বিষ খেয়েছি।
সকলে। বিষ।
দেবেন্দ্র। হাঁ, আমি—আমি ( সুপ্রিয়ার প্রতি) তােমার
সম্বন্ধে যা কুৎসা রটিয়েছিলুম তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
(টলিতে লাগিল, ডিটেকটিভ, হাতকড়া খুলিয়া ফেলিল)
ললিত।
ডাক্তার ডেকে পাঠাচ্ছি।
দেবেন্দ্র। লাভ নেই। আর কয়েক মূহুৰ্ত্ত আছি। সুপ্রিয়া,
ক্ষমা করতে পারবে—পুরােণো প্রেমের কথা মনে
করে ? (তার হাটু ভাঙ্গিয়া পড়িল)
সুপ্রিয়া। তােমাকে একদিন ভালােবেসেছিলুম, তারি স্মৃতি
মনে নিয়ে নিজেও ভগবানের কাছে যেমন ক্ষমা
চাই, তােমাকেও তেমনি ক্ষমা করলুম।
( দেবেন্দ্র বহু কষ্টে সুপ্রিয়ার কাছে গিয়া তার হাতটি ধরিল,
তাহ চুম্বন করিল এবং পরে চীৎকার দিয়া উঠিল ; তার
প্রাণহীন দেহ এলাইয়া পড়িল )
যবনিকা

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Purono Premer Janye Ed.1

Author
Ray Choudhury, Narendranarayan
Title
Purono Premer Janye Ed.1
File name
Purono Premer Janye Ed.1
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/10/13
Publisher
Nikungabihari Dasgupta,dhaka
Language
Sanskrit
Pages
78
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Rama
DLI number
513118
Barcode
4990010020126.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
hEXwStJGj4e
Download PDF

Purono Premer Janye Ed.1