Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Hindudharmer Nabojagoran Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
স্বামী বিবেকানন্দ
জী
দ্বিতীয় সংস্করণ
বৈশাখ-১৩৩৬
উদ্বোধন কাৰ্যালয়
কলিকাতা
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
( মূল্য • আনা
প্রকাশক
ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথ,
উমােখন কাৰ্যালয়,
১নং মুখার্জি লেন, বাগবাজার,
কলিকাতা।
COPY-RIGHTED BY
THE PRESIDENT, RAMAKRIBHNA MATH,
Belur, Howrah.
এগোয়া প্রেস,
বিটার-মরেশ মমার,
১ নং মির্জাপুর , কলিকাতা।
স্বামী বিবেকানন্দের পুস্তকগুলির মধ্যে অধিকাংশই
বক্তৃতাকারে প্রদত্ত হইয়াছিল, লেখার ভাগ অপেক্ষাকৃত
অল্প। বর্তমানে তাহার চারিটি ইংরাজী রচনার বঙ্গানুবাদ
‘হিন্দুধর্মের নবজাগরণ নাম দিয়া প্রকাশ করা
গেল।
তাঁহার আমেরিকা গমনের প্রায় এক বৎসর পরে
মাত্ৰাজবাসিগণ এক সুবৃহৎ সভায় সমবেত হইয়া তাঁহার
তথায় হিন্দুধর্ম প্রচারের অদ্ভুত সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ
করিয়া এক অভিনন্দনপত্র প্রেরণ করেন। তদুত্তরে তিনি
প্রাচীন ও আধুনিক শাস্ত্র ও সম্প্রদায়-সমুহের সংক্ষিপ্ত
বিশ্লেষণ করিয়া হিন্দুধৰ্ম্মের যথার্থ স্বরূপ বিবৃত করিয়া,
শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্যগণ-প্রচারিত তত্ত্ব-সমূহের সহিত উহার
সামঞ্জস্য সাধন করিয়া এবং ভারতবাসী, বিশেষতঃ
বাঙ্গালী যুবকগণকে এই সনাতন ধর্ম প্রচার জন্য
বদ্ধপরিকর হইবার নিমিত্ত ত্যাগ ব্ৰত গ্রহণে উৎসাহিত
করিয়া যে পাণ্ডিত্য, অভিজ্ঞতা ও উদ্দীপনাপূর্ণ সুবৃহৎ
ইংরাজী পত্র প্রেরণ করেন, প্রথমটি তাহারই বঙ্গানুবাদ।
দ্বিতীয়টিতে খেতড়িরাজের অভিনন্দনের উত্তরে
হিন্দুধর্মের ক্রমবিকাশের পরিচয় দিয়া ও বর্তমানকালে
[ ২ ]
ভগবান্ শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রচারিত সময়ের উল্লেখ করিয়া
উক্ত রাজাকে সনাতনধৰ্ম্মের রক্ষণার্থ আহ্বান করা
হইয়াছে। তৃতীয় ও চতুর্থ রচনাটি মাদ্রাজে প্রকাশিত
ব্রহ্মবাদিন্ পত্রের সম্পাদককে লিখিত ভারতহিতৈষী
অধ্যাপক ম্যাক্সমুলার ও ডয়েসন সম্বন্ধীয় পত্রদ্বয়।
মূল ইংরাজীর ভাষা এরূপ জীবন্ত যে, অনুবাদে
তাহার কিছুই প্রকাশ পায় নাই বলিলেও চলে।
পূর্বে প্রথম তিনটির অনুবাদ ‘উদ্বােধন’পত্রে প্রকাশিত
এক্ষণে যাহাতে এইগুলি বহু প্রচারিত হয়,
তদুদ্দেশ্যে কিছু কিছু সংশােধন করিয়া ও শেষ লেখাটির
অনুবাদ করাইয়া পুস্তিকাকারে প্রকাশ করা গেল।
কারণ, সকলেরই, বিশেষতঃ বাঙ্গালীর পক্ষে জানিবার
অনেক মূল্যবান্ তথ্য ইহাতে আছে। যাঁহারা ইংরাজী-
ভাষানভিজ্ঞ, তাহারা এতৎপাঠে সংক্ষেপে স্বামিজীর
হিন্দুধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় মতসমূহের সহিত পরিচয় লাভ
করিলে এবং ইংরাজীভাষাভিজ্ঞগণের স্বামিজীর মূল
লেখার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হইলে এই উদ্যম সফল
জ্ঞান করিব। ইহাতে কয়েকটি পাদটীকাও সংযােজিত
হইয়াছে।
চৈত্র, ১৩৩৫
*
প্রকাশক
No text on this page.
No text on this page.
হিন্দুধর্মের নবজাগণ হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা ॥ মদ্ৰাজ-নিবাসী স্বদেশী স্বধর্মাবলম্বী বন্ধুগণ, হিন্দুধর্ম প্রচারকার্যের জন্য আমি যৎকিঞ্চিৎ যাহা করিয়াছি, তাহা যে তােমরা আদরের সহিত অনুমােদন করিয়াছ, তাহাতে আমি পরম আহলাদিত হইলাম। এই আনন্দ, আমার নিজের এবং সুদূর বিদেশে আমার প্রচার কার্য্যের ব্যক্তিগত প্রশংসার জন্য নহে। আমার আহলাদের কারণ এই ;-তােমরা যে হিন্দুধৰ্ম্মের পুনরুত্থানে আনন্দিত, তাহাতে ইহাই স্পষ্ট দেখাইতেছে যে, যদিও হতভাগ্য ভারতের মস্তকের উপর দিয়া কত- বার বৈদেশিক আক্রমণের ঝঞ্ঝাবাত গিয়াছে, যদিও শত শত শতাব্দী ধরিয়া আমাদের নিজেদের উপেক্ষায় এবং আমাদের বিজেতৃগণের অবজ্ঞায় প্রাচীন আর্যাবর্তের মহিমা স্পষ্টই ম্লান হইয়াছে, যদিও শত শত শতাব্দীব্যাপী বন্যায় হিন্দুধৰ্ম্মরূপ সৌধের অনেকগুলি মহিমময় অবলম্বনন্ত, অনেক সুন্দর সুন্দর খিলান ও অনেক * মজাজ-নিবাসিগণের অভিনন্দন-পত্রের উত্তর (১৮৯৪)। ১
}
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
অপূর্ব পার্শ্বপ্রস্তর ভাসিয়া গিয়াছে, তথাপি উহার ভিত্তি
অটলভাবে এবং উহার সন্ধিপ্রস্তর অটুটভাবে বিরাজমান
যে আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর হিন্দুজাতির ঈশ্বরভক্তি ও
সৰ্ব্বভূতহিতৈষণারূপ অপূর্ব কীৰ্ত্তিস্তম্ভ স্থাপিত, তাহা
পূৰ্ব্ববৎ অটুট ও অবিচলিত ভাবে বর্তমান। তাঁহার
অতি অনুপযুক্ত দাস আমি, ভারতে ও সমগ্র জগতে
যাঁহার বাণী প্রচারের ভার প্রাপ্ত হইয়া ধন্য হইয়াছি,
তােমরা তাহাকে আদরপূর্বক গ্রহণ করিয়াছ ; তােমরা
তােমাদের স্বাভাবিক অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক শক্তি বলে
তাহাতে এবং তাঁহার উপদেশে সেই মহতী আধ্যাত্মিক
বন্যার প্রথম অস্ফুট ধ্বনি শুনিয়াছ, যাহা নিশ্চিত অনতি-
দীর্ঘকালে ভারতে দুর্দমনীয় বেগে উপস্থিত হইবে, অনন্ত
শক্তিস্রোতে যাহা কিছু দুর্বল ও দোষযুক্ত, সব ভাসাইয়া
দিবে আর হিন্দুজাতির শত শত শতাব্দী ধরিয়া নীরব
সহিষ্ণুতার পুরস্কারস্বরূপ, তাহাদিগকে অতীত হইতেও
উজ্জ্বলতর গৌরবমুকুটে ভূষিত করিয়া তাহাদের বিধি-
প্রাপ্য স্বত্ব স্বরূপ, উচ্চপদবীতে উন্নীত করিবে এবং
সমগ্র মানব জাতির সম্বন্ধে উহার যে কাৰ্য অর্থাৎ
আধ্যাত্মিকপ্রকৃতিসম্পন্ন মানবজাতির বিকাশ, তাহাও
সম্পাদন করিবে।
দাক্ষিণাত্যবাসী তােমাদের নিকট আৰ্য্যাবৰ্ত্তবাসিগণ
২
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা বিশেষ ঋণী, কারণ, ভারতে আজ যে সকল শক্তি কাৰ্য করিতেছে, তাহাদের অধিকাংশেরই মূল দাক্ষিণাত্য। শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকারগণ, যুগপ্রবর্তনকারী আচাৰ্য্যগণ, যথা- শঙ্কর, রামানুজ ও মধ্ব, (১) ইহারা সকলেই দাক্ষিণাত্যে জন্মিয়াছিলেন। যে মহাত্মা শঙ্করের, নিকট জগতের প্রত্যেক অদ্বৈতবাদীই অমােচ্য ঋণজালে আবদ্ধ ; যে মহাত্মা রামানুজের, স্বর্গীয় স্পর্শ, পদদলিত পারিয়াগণকেও আলওয়ারে (২) পরিণত করিয়াছিল ; সমগ্র ভারতে শক্তিসঞ্চারকারী আর্যাবর্তের সেই একমাত্র মহাপুরুষ শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যের অনুবর্তিগণও যে মহাত্মা মধ্বের শিষ্যত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন, তাহাদের সকলেরই জন্মস্থান দাক্ষিণাত্য। বর্তমানকালেও বারাণসীধামের শ্রেষ্ঠ গৌরব- স্বরূপ মন্দিরসমূহে দাক্ষিণাত্যবাসীরই প্রাধান্য, তােমাদের ত্যাগই হিমালয়ের সুদূরবর্তী চূড়াস্থিত পবিত্র দেবালয়- (১) রামানুজ বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ও বেদান্তদর্শনের উপর ঐ মতসঙ্গত ব্যাখ্যাযুক্ত ভাষ্যের রচয়িতা। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ মতে চিৎ (জীব) অচিৎ (জড়) ও তাহাদের অন্তর্যামী ঈশ্বর এই তিন তত্ব আছে। মাচাৰ্য দ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। (২) দাক্ষিণাত্যের চণ্ডালতুল্য অস্পৃশ্য নীচ জাতিবিশেষকে পারিয়া বলে। আলওয়ার শব্দের অর্থ ভক্ত। বিশিষ্টাদ্বৈতবাী ভক্তগণকে আলওয়ার বলে।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
সমুহকে শাসন করিতেছে। অতএব মহাপুরুষগণের
পূতশােণিতে পূরিতধমনী, তথাবিধ আচাৰ্যগণের
আশীর্বাদে ধন্যজীবন, তােমরা যে ভগবান্ শ্রীরামকৃষ্ণের
বাণী সর্ব প্রথম বুঝিবে ও আদরপূর্বক গ্রহণ করিবে,
তাহাতে বিস্ময়ের বিষয় কি আছে ?
দাক্ষিণাত্যই চিরদিন বেদবিদ্যার ভাণ্ডার, সুতরাং
তােমরা বুঝিবে যে, অজ্ঞ হিন্দুধৰ্ম্ম-আক্রমণকারী সমা-
লােচকগণের পুনঃ পুনঃ প্রতিবাদসত্বেও এখনও শ্রুতিই
(১) হিন্দুধৰ্ম্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মেরুদণ্ড স্বরূপ।
জাতিবিদ্যাবিৎ বা ভাষাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতদিগের নিকট
বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণভাগের (২) যতই মুল্য হউক,
‘অগ্নিমীলে’, ‘ইযেহাের্জেত্ব’, ‘শয়ােদেবীরভীষ্টয়ে', (৩)
(১) বেদ।
(২) চতুর্বেদের প্রত্যেকটিতে তিনটি করিয়া অংশ আছে।
যথা—(ক) ভিন্ন ভিন্ন দেবগণের উদ্দেশ্যে স্তোত্ৰাত্মক মন্ত্ৰসমূহের
নাম সংহিতা ; (খ) এই সকল মন্ত্র কোন যজ্ঞে কিরূপে প্রয়ােগ
করিতে হইবে, তাহার বর্ণাত্মক বেভাগের নাম ব্রাহ্মণ ; (গ)
অরণ্যে ঋষিগণরা আলােচিত তসমূহের নাম আরণ্যক।
উপনিষৎসমূহ এই আরণ্যকের অন্তর্গত।
(৩) এই তিনটি যথাক্রমে ঋক, যজুঃ ও অথর্ববেয়ের প্রথম
শ্লোকের অংশস্বরূপ।
৪
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা প্রভৃতি বৈদিকমন্ত্র উচ্চারণ সহকারে ভিন্ন ভিন্ন রূপ বেদীযুক্ত বিভিন্ন যজ্ঞে নানাবিধ আহুতি দ্বারা প্রাপ্য ফলসমুহ যতই বাঞ্ছনীয় হউক, সমুদয়ই ভােগৈকফল ; আর কেহই কখন এগুলি মােক্ষজনক বলিয়া তর্কে প্রবৃত্ত হয় নাই। সুতরাং, আধ্যাত্মিকতা ও মােক্ষমার্গের উপদেশক জ্ঞানকাণ্ড, যাহা আরণ্যক বা শ্রুতিশির বলিয়া কথিত হয়, তাহাই ভারতে চিরকাল শ্রেষ্ঠ আসন অধিকার করিয়াছে ও চিরকাল করিবে। সনাতন ধর্মের নানামতমতান্তররূপ গােলকধাধায় দিগভ্রান্ত, একমাত্র যে ধৰ্ম্মের সার্বজনীন উপযােগিতা, তৎপ্রচারিত ‘অপােরণীয়া মহত মহীয়ান ব্রহ্মের অবিকল প্রতিবিম্বস্বরূপ—পূর্বভ্রান্তসংস্কারবশবর্তী হইয়া তদ্ধৰ্ম্মমৰ্ম্মবােধে অক্ষম, জড়বাদসর্বস্ব জাতির নিকট ঋণসূত্রে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিকতার মানদণ্ডাবলম্বনে অন্ধকারে অন্বেষণপরায়ণ, আধুনিক হিন্দুযুবক বৃথাই তাহার পূর্ব- পুরুষগণের ধর্ম বুঝিতে চেষ্টা করেন এবং হয় ঐ চেষ্টা একেবারে পরিত্যাগ করিয়া ঘাের অজ্ঞেয়বাদী হইয়া পড়েন অথবা স্বাভাবিক ধৰ্ম্মভাবের প্রেরণায় পশুজীবন- যাপনে অসমর্থ হইয়া প্রাচ্যগন্ধী বিবিধ পাশ্চাত্য জড় বাদের নির্যাস অসাবধানে পান করেন এবং শ্রুতির এই ভবিষ্যদ্বাণী সফল করেন :- = s হিন্দুধর্মের নবজাগরণ পরিষন্তি মুঢ়া অন্ধেনৈব নীয়মানা যথাহ্মঃ। (১) তাঁহারাই কেবল বাঁচিয়া যান, যাঁহাদের আত্মা সদ- গুরুর জীবনপ্রদ স্পর্শবলে জাগ্রত হয়। ভগবান্ ভাষ্যকার (২) ঠিকই বলিয়াছেন, দুর্লভ ত্রয়মেবৈতৎ দেবানুগ্রহহেতুকম্। মনুষত্বং মুমুক্ষুত্বং মহাপুরুষসংশ্রয়ঃ । (৩) পরমাণু, দ্বণুক, ত্রসরেণু প্রভৃতি সম্বন্ধীয় অপূর্ব সিদ্ধান্তপ্রসূ বৈশেষিকদের (৪) সূক্ষম বিচারসমূহই হউক, অথবা নৈয়ায়িকদের জাতিদ্রব্যগুণসমবায় ৫) প্রভৃতি (১) কঠোপনিষ। অন্ধের দ্বারা নীয়মান অন্ধের ন্যায় মূঢ়েরা নানা দিকে ঘুরিয়া বেড়ায়। (২) শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য্য। (৩) বিবেকচূড়ামণি, ৩। এই তিনটি অতি দুর্লভ, দেবানু- গ্রহেই লাভ হইয়া থাকে,—মনুষ্যজন্মলাভ, মােক্ষের প্রবল ইচ্ছা ও মহাপুরুষের আশ্ৰয়লাভ। (৪) দ্বাণুক = দুইটি অণুর সম্মিলিত অবস্থা। এসরেণু তিনটি ধণুকের সম্মিলিত অবস্থা। (বৈশেষিক) হিন্দুদর্শন প্রধানতঃ ছয়টি ১। বৈশেষিক-কণাদপ্রণীত, ২। ন্যায়—গৌতমপ্রণীত, ৩। সাংখ্য-কপিল প্রণীত, ৪। যােগ—পতঞ্জলিপ্ৰণীত, ৫। পূর্ব- মীমাংসা (ইহাতে বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ডের মীমাংসা আছে ) জৈমিনিপ্রণীত, ৬। বেদান্ত বা ব্যাস—ব্যাসপ্রণীত। (৫) দ্রব্য-ন্যায়মতে দ্রব্য নয়টি, যথা,—পৃথিবী, জল, তেজ, হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা বস্তুসম্বন্ধীয় অপূৰ্ব্বতর বিচারাবলীই হউক, অথবা পরিণামবাদের জনস্বরূপ সাংখ্যদিগের তদপেক্ষা গভীরতর চিন্তাগতিই হউক, অথবা এই বিভিন্নরূপ বিশ্লেষণাবলীর সুপক্ক ফলস্বরূপ ব্যাসসূত্রই হউক, মনুষ্যমনের এই সকল বিবিধ সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণের একমাত্র ভিত্তি শ্রুতি। এমন কি, বৌদ্ধ বা জৈন- দিগের দার্শনিক গ্রন্থাবলীতেও শ্রুতির সহায়তা পরিত্যক্ত হয় নাই, আর অন্ততঃ কতকগুলি বৌদ্ধ- সম্প্রদায়ে এবং জৈনদের অধিকাংশ গ্রন্থে শ্রুতির প্রামণ্য সম্পূর্ণরূপে স্বীকৃত হইয়া থাকে ; তবে তাহারা শ্রুতির কোন কোন অংশকে ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক প্রক্ষিপ্ত বলিয়া ‘হিংসক’ শ্রুতি আখ্যা দেন—এবং সেগুলির প্রামাণ্য স্বীকার করেন না। বর্তমান কালেও স্বগীয় বায়ু, আকাশ, দিক, কাল, আত্মা ও মন। জাতি—কতকগুলি বস্তুর সাধারণ ধর্ম, যাহা দ্বারা শ্রেণী বিভাগ করা যাইতে পারে, যেমন পশুত্ব, মনুষ্যত্ব। গুণন্যায় মতে গুণ বলিতে—রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সংখ্যা, পরিমিতি, পৃথকত্ব, সংযােগ, বিভাগ, পরত্ব, অপর, বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ, গুরুত্ব, দ্রবত্ব, স্নেহ, সংস্কার, অদৃষ্ট ও শব্দ, এই কয়েকটিকে বুঝায়। সমবায়—যেমন ঘটে ও যে মৃত্তিকায় উহা নিৰ্ম্মিত, তাহাদের মধ্যে সমবায় সম্বন্ধ।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
মহাত্মা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীও (১) এতদ্বিধ মত
পােষণ করিতেন।
যদি কেহ জিজ্ঞাসা করেন, প্রাচীন ও বর্তমান সমুদয়
ভারতীয় চিন্তাপ্রণালীর কেন্দ্র কোথায়, যদি কেহ
নানাবিধ শাখাপ্রশাখাবিশিষ্ট হিন্দুধর্মের প্রকৃত মেরুদণ্ড
কি, জানিতে চান, তবে অবশ্য ব্যাসসূত্রকেই এই কেন্দ্র,
এই মেরুদণ্ড বলিয়া প্রদর্শিত হইবে।
হিমাচলস্থিত অরণ্যানীর হৃদয়স্তব্ধকারী গাম্ভীর্যের
মধ্যে স্বর্ণদীর গভীর ধ্বনিমিশ্রিত অদ্বৈতকেশরীর অস্তি-
ভাতি-প্রিয়রূপ (২) বগম্ভীর রবই কেহ শ্রবণ করুন,
অথবা বৃন্দাবনের মনােহর কুঞ্জসমূহে ‘পিয়া পীতম্ (৩)
কূজনই শ্রবণ করুন, বারাণসীধামের মঠসমূহে সাধু-
দিগের গভীর ধ্যানেই যােগদান করুন, অথবা নদীয়া-
(১) আৰ্যসমাজের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠাতা। ইহার
যত
পঞ্জাবে খুব প্রচলিত। ব্রাহ্মদের সঙ্গে হঁহারা অনেক বিষয়ে
একমত।
(২) অদ্বৈতকেশরীঅদ্বৈতবাদরূপ সিংহ অর্থাৎ সমতশ্রেষ্ঠ
অদ্বৈতবাদ। অস্তি, ভাতি ও প্রিয় =সৎ, চিৎ, আনন। এই
তিনটি শব্দ পঞ্চদশীতে ব্যবহৃত হইয়াছে।
(৩) ভাৰুক বৈষ্ণবেরা, বৃন্দাবনের কুঞ্জমধ্যে বিহঙ্গগণের গতি-
মধ্যে এই ধ্বনি শুনিতে পান-অর্থ, রাধাকৃষ্ণ।
হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা
বিহারী শ্রীগৌরাঙ্গের ভক্তগণের উন্মাদনৃত্যে যােগদানই
করুন, বড়গেলে তেঙ্গেলে (১) প্রভৃতি শাখাযুক্ত
বিশিষ্টাদ্বৈতমতাবলম্বী আচাৰ্যগণের পাদমূলেই উপবেশন
করুন, অথবা মাধ্ব সম্প্রদায়ের আচাৰ্যগণের বাক্যই
শ্রদ্ধাসহকারে শ্রবণ করুন, গৃহী শিখদিগের ‘ওয়া
গুরুকি ফতে’ (২) রূপ সমরবাণীই শ্রবণ করুন,
অথবা উদাসী ও নির্মলাদিগের গ্রন্থসাহেবের (৩)
উপদেশই শ্রবণ করুন, কবীরের সন্ন্যাসী শিষ্যগণকে
সৎসাহেব (৪) বলিয়া অভিবাদনই করুন, অথবা
(১) প্রথমােক্তটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত শাস্ত্র অর্থাৎ প্রাচীন
বেদ বেদান্ত প্রভৃতি ও আধুনিক ভাষ্য প্রভৃতিকে অধিক
প্রামাণ্য জ্ঞান করেন। দ্বিতীয়ােক্তেরা দিব্যপ্রবন্ধ নামক তামিল
ভাষায় রচিত গ্রন্থের বিশেষ পক্ষপাতী। আরাে অনেক অনেক
বিষয়ে উভয়ের মতভেদ আছে।
(২) গুরুর জয় হউক।
(৩) উদাসী ও নির্মলা দুইটি নানকপন্থী সম্প্রদায়। প্রথমটি
নানাকের পুত্র চাদ কর্তৃক স্থাপিত ; দ্বিতীয়টি গুরুগােবিল
স্থাপিত। গ্রন্থ সাহেব-নানকপন্থীদের ধর্মগ্রন্থ। ইহাতে নানক
হইতে গুরুগােবিল পৰ্য্যন্ত দশগুরুর উপদেশ লিখিত আছে।
শিখেরা এই গ্রন্থকে দেবতার ন্যায় পূজা করিয়া থাকে। সাহেব
শব্দের অর্থ মাননীয়।
(৪) পূজনীয় সাধু।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ সখীসম্প্রদায়ের ভজনই শ্রবণ করুন ; রাজপুতানার সংস্কারক দাদুর অদ্ভুত গ্রন্থাবলি বা তাহার শিষ্য রাজা সুন্দরাদাস ও তঁাহা হইতে ক্রমশঃ নামিয়া বিচারসাগরের বিখ্যাত রচয়িতা নিশ্চলদাসের গ্রন্থই (ভারতে গত তিন শতাব্দী ধরিয়া যত গ্রন্থ লিখিত হইয়াছে, সকলের অপেক্ষা এই বিচারসাগরগ্রন্থের ভারতীয় জনসমাজে প্রভাব অধিক) পাঠ করুন, এমন কি, আর্যাবর্তের ভাঙ্গীমেথরগণকে তাহাদের লালগুরুর উপদেশ বিবৃত করিতেই বলুন, তিনি দেখিবেন, এই আচাৰ্যগণ ও সম্প্রদায়সমূহ, সকলেই সেই ধৰ্ম্মপ্রণালীর অনুবর্তী, শ্রুতি যাহার প্রামাণ্য গ্রন্থ, গীতা যাহার ভগবদ্ব বি- নিঃসৃত টীকা, শারীরক ভাষ্য (১) যাহার সুপ্রণালীবদ্ধ বিবৃতি আর পরমহংস পরিব্রাজকাচাৰ্যগণ হইতে লাল- গুরুর বৃণিত মেথর শিষ্যগণ পৰ্য্যন্ত ভারতের সমুদয় বিভিন্ন সম্প্রদায়, যাহার বিভিন্ন বিকাশ। অতএব দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, অদ্বৈত, এবং আরাে কতকগুলি অনতিপ্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাযুক্ত এই প্রস্থানত্রয় (২) (১) শ্ৰীশঙ্করপ্রণীত বেদান্ত ভাষ। (২) উপনিষদ, গীতা ও বেদান্ত। সন্ন্যাসিগণ এই প্রস্থানত্রয় শিক্ষা করিতে বাধ্য।
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা হিন্দুধর্মের প্রমাণ্য গ্রন্থস্বরূপ, প্রাচীন নারশংসীর (১) প্রতিনিধিস্বরূপ পুরাণ উহার উপাখ্যানভাগ এবং বৈদিক ব্রাহ্মণভাগের প্রতিনিধিস্বরূপ তন্ত্র উহার কর্মকাণ্ড। পূর্বোক্ত প্রস্থানত্রয় সকল সম্প্রদায়েরই প্রামাণ্যগ্রন্থ, কিন্তু প্রত্যেক সম্প্রদায়ই পৃথক পৃথক পুরাণ ও তন্ত্রকে প্রমাণস্বরূপে গ্রহণ করিয়া থাকেন। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, তন্ত্রগুলি বৈদিক কৰ্ম্ম- কাণ্ডেরই একটু পরিবর্তিত আকারমাত্র, আর কেহ উহাদের সম্বন্ধে হঠাৎ একটা অসম্বন্ধ সিদ্ধান্ত করিবার পূৰ্বেই তাঁহাকে আমি ব্রাহ্মণ ভাগ, বিশেষতঃ, অধ্বর্য- ব্রাহ্মণ ভাগের সহিত মিলাইয়া তন্ত্র পাঠ করিতে পরামর্শ দিই; তাহা হইলে তিনি দেখিবেন, তন্ত্রে ব্যবহৃত অধিকাংশ মন্ত্রই অবিকল ব্রাহ্মণ হইতে গৃহীত। ভারতবর্ষে তন্ত্রের প্রভাব কিরূপ, জিজ্ঞাসা করিলে বলা যাইতে পারে যে, শ্রৌত ও স্মাৰ্ত কৰ্ম্ম ব্যতীত হিমালয় হইতে কন্যাকুমারী পৰ্য্যন্ত সমুদয় প্রচলিত কৰ্ম্মকাণ্ডই তন্ত্র হইতে গৃহীত আর উহা শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়েরই উপাসনাপ্রণালীকে নিয়মিত করিয়া থাকে। অবশ্য, আমি এ কথা বলি না যে, সকল হিন্দুই (১) সংহিতা।
হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ
সম্পূর্ণভাবে তাঁহাদের স্বধর্মের এই সকল মূল সম্বন্ধে
অবগত আছেন। অনেকে, বিশেষতঃ নিম্নবঙ্গে, এই
সম্প্রদায় ও প্রণালীসমূহের নাম পর্যন্ত শুনেন নাই;
কিন্তু জ্ঞাতসারেই হউক বা অজ্ঞাতসারেই হউক, পূর্বোক্ত
তিন প্রস্থানের উপদেশানুসারে সকল হিন্দুই
চলিয়াছেন।
অপর দিকে, যেখানেই হিন্দী ভাষা কথিত হয়, তথা-
কার অতি নীচজাতি পৰ্য্যন্ত নিম্নবঙ্গের অনেক উচ্চতম
জাতি হইতে বৈদান্তিক ধর্মসম্বন্ধে অধিক অভিজ্ঞ ।
ইহার কারণ কি?
মিথিলাভূমি হইতে নবদ্বীপে আনীত, শিয়ােমণি,
গদাধর, জগদীশ প্রভৃতি মনীষিগণের প্রতিভায় সযত্নে
লালিত ও পরিপুষ্ট, কোন কোন বিষয়ে সমগ্রজগতের
অন্যান্য সমুদয় প্রণালী হইতে শ্রেষ্ঠ, অপূর্ব সুনিবদ্ধ
বাকশিল্পে রচিত, তর্কপ্রণালীর বিশ্লেষণস্বরূপ বঙ্গদেশীয়
স্যায়শাস্ত্র হিন্দুস্থানের সর্বত্র শ্রদ্ধার সহিত পঠিত হইয়া
থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বেদের চর্চায় বঙ্গবাসীর
যত্ন ছিল না, এমন কি, কয়েক বর্ষ মাত্ৰ পূৰ্বে পতঞ্জলির
মহাভাষ (১) পড়াইতে পারেন, এমন কেহ বঙ্গদেশে
(১) পাণিনি-ব্যাকরণের ভাষ। বেশিক্ষা করিতে হইলে
পাণিনির বিশেষ আবশ্যক হইয়া থাকে।
; হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা ছিলেন না বলিলেই হয়। একবার মাত্র এক মহতী প্রতিভা সেই ‘অবচ্ছিন্ন অবচ্ছেদক’ (১) জাল ছেদন করিয়া উখিত হইয়াছিলেন—ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। একবার মাত্র বঙ্গের আধ্যাত্মিক তন্দ্রা ভাঙ্গিয়াছিল ; কিছু দিনের জন্য উহা ভারতের অপরাপর প্রদেশের ধর্ম- জীবনের সহভাগী হইয়াছিল। একটু বিস্ময়ের বিষয় এই, শ্রীচৈতন্য একজন ভারতীর নিকট সন্ন্যাস লইয়াছিলেন, সুতরাং ভারতী (২) ছিলেন বটে, কিন্তু মাধবেন্দ্রপুরীর শিষ্য ঈশ্বরপুরীই প্রথম তাঁহার ধৰ্ম্মপ্রতিভা জাগ্রত করিয়া দেন। বােধ হয় যেন পুরীসম্প্রদায় বঙ্গদেশের আধ্যাত্মিক জাগাইতে বিধাতা কর্তৃক নির্দিষ্ট। ভগবান্ শ্রীরামকৃষ্ণ তােতাপুরীর নিকট সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণ করেন। শ্রীচৈতন্য ব্যাসসূত্রের যে ভাষায় লিখেন, তাহা হয় নষ্ট হইয়াছে, না হয়, এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। তাহার শিষ্যেরা দাক্ষিণাত্যের মাধ্বসম্প্রদায়ের সহিত (১) ন্যায়ে ব্যবহৃত শব্দদ্বয়অবচ্ছিন্ন শব্দের অর্থ বিশিষ্ট, যাহা দ্বারা সীমাবদ্ধ করে, অবচ্ছেদকের অর্থ—যে বিশিষ্ট করে। (২) শঙ্করাচার্যের শিষ্যগণ দশটি সন্ন্যাসী সম্প্রদায় স্থাপন করেন। ইহাদিগকে দশনামী বলে। যথা, গিরি, পুরী, ভারতী, বন, অরণ্য, পর্বত, সাগর, তীর্থ, সরস্বতী, আশ্রম।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ যােগ দিলেন। ক্রমশঃ রূপসনাতন ও জীবগােস্বামী প্রভৃতি মহাপুরুষগণের আসন বাবাজীগণ অধিকার করিলেন। তাহাতে শ্রীচৈতন্যের মহান্ সম্প্রদায় ক্রমশ ধ্বংসাভিমুখে যাইতেছিল, কিন্তু আজকাল উহার পুনর- প্রানের চিহ্ন দেখা যাইতেছে। আশা করি, উহা শীঘ্রই আপন লুপ্তগৌরব পুনরুদ্ধার করিবে। সমুদয় ভারতেই চৈতন্যের প্রভাব লক্ষিত হয়। যেখানেই লােক ভক্তিমার্গ জানে, সেখানেই তাঁহার বিষয় লােকে আদরপূর্বক চর্চা করিয়া থাকে ও তাঁহার পূজা করিয়া থাকে। আমার বিশ্বাস করিবার অনেক কারণ আছে যে, সমুদয় বল্লভাচাৰ্যসম্প্রদায় (১) শ্রীচৈতন্য সম্প্রদায়ের শাখাবিশেষ মাত্র। কিন্তু তাহার তথাকথিত বঙ্গীয় শিষ্যগণ জানেন না, তাহার প্রভাব এখনও কিরূপে সমগ্র ভারতে কাৰ্য্য করিতেছে। কিরূপেই বা জানিবেন ? শিষ্যগণ গদিয়ান হইয়াছেন, কিন্তু তিনি নগ্নপদে ভারতের দ্বারে দ্বারে বেড়াইয়া আচণ্ডালকে ভগবানের প্রতি প্রেমসম্পন্ন হইতে ভিক্ষা করিতেন। যে অদ্ভুত ও অশাস্ত্রীয় কুলগুরুপ্রথা, বঙ্গদেশ এবং অধিক পরিমাণে বঙ্গদেশেই প্রচলিত, তাহাও উহার, (১) বৈষ্ণবসম্প্রদায়বিশেষ। বল্লভাচাৰ্য বিষ্ণুস্বামীর শিষ্য। এই সম্প্রদায় বােম্বাই অঞ্চলে খুব প্রবল। ১৪
হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা
ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ধৰ্ম্মজীবন হইতে পৃথক
থাকিবার আর একটি কারণ। সর্বপ্রধান কারণ এই
যে, বঙ্গদেশ এখন পর্যন্ত যাঁহারা সর্বোচ্চ ভারতীয়
আধ্যাত্মিক সাধনের প্রতিনিধি ও ভাণ্ডারস্বরূপ, সেই
মহান্ সন্ন্যাসিসম্প্রদায়ের জীবন হইতে কখন শক্তিপ্রাপ্ত
হয় নাই।
বঙ্গের উচ্চবর্ণের ত্যাগ ভালবাসেন না, তাহাদের
ঝোঁক ভােগের দিকে। তঁাহারা কিরূপে আধ্যাত্মিক
বিষয়ে গভীর অন্তর্দিষ্টি লাভ করিবেন ? ‘ত্যাগে-
নৈকে অমৃতত্বমানশু, (১) অন্যপ্রকার কিরূপে সম্ভব
হইবে ?
অপর দিকে, সমুদয় হিন্দীভাষী ভারতের মধ্যে
ক্রমান্বয়ে অনেক সুদূরব্যাপিপ্রভাসম্পন্ন মহা মহা
ত্যাগী আচাৰ্য্যগণ বেদান্তের মত প্রতি গৃহে প্রবিষ্ট
করাইয়া দিয়াছেন। বিশেষতঃ পঞ্জাবকেশরী রণজিৎ
সিংহের রাজত্বকালে ত্যাগের যে মহিমা প্রচারিত হয়,
তাহাতে অতি নিম্নশ্রেণীর লােকেও বেদান্তদর্শনের
উচ্চতম উপদেশ পর্যন্ত শিক্ষা পাইয়াছে। প্রকৃত গর্বের
সহিত পাঞ্জবী কৃষকবালিকা বলিয়া থাকে তাহার চরকা
পৰ্যন্ত সােহহং সােহহং ধ্বনি করিতেছে। আর আমি
(১) একমাত্র ত্যাগের দ্বারাই অমৃতত্ব অর্থাৎ মুক্তিলাভ হয়
. হিন্দুধর্মের নবজাগরণ হৃষীকেশের (১) জঙ্গলে সন্ন্যাসিবেশধারী মেথরত্যাগী- দিগকে বেদান্ত পাঠ করিতে দেখিয়াছি। অনেক গর্বিত উচ্চবর্ণের লােকও তাহাদের পদতলে বসিয়া আনন্দের সহিত উপদেশ প্রাপ্ত হইতে পারেন। কেনই বা না করিবেন ? ‘অন্ত্যাদপি পরােধর্মঃ। (২) অতএব উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও পঞ্জাববাসীরা, বঙ্গদেশ, বােম্বাই ও মাদ্রাজের অধিবাসিগণ হইতে ধর্মবিষয়ে অধিক শিক্ষিত। দশনামী, বৈরাগী, পন্থী (৩) প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ত্যাগী পরিব্রাজকগণ প্রত্যেকের দ্বারে দ্বারে গিয়া ধর্ম বিলাইতেছেন। মূল্য এক টুকরা রুটিমাত্র। আর তাঁহাদের মধ্যে অনেকে কি মহৎ ও নিঃস্বার্থচরিত্র ! কাচুপন্থী সম্প্রদায়ভুক্ত (স্বহারা প্রচলিত কোন সম্প্রদায়ের সহিত মিশিতে চান না) (১) হরিদ্বার হইতে ১২ মাইল দূরে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত সাধুদের তপােভূমি। এখানে নানা সম্প্রদারের সাধু কুটীর বাঁধিয়া বর্ষাকাল ব্যতীত ৮ মাস সাধনভজন শান্ধপাঠাদি করেন। (২) নীচ ব্যাক্তিগণের নিকট হইতেও শ্রেষ্ঠধর্ম গ্রহণ করিবে। (মনুসংহিতা)। (৩) বৈষ্ণবসাধুগণকে বৈরাগী বলে। পন্থী, যথা,-কবীর- পী, নানকলী প্রভৃতি।
হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা
একজন সন্ন্যাসী আছেন। (১) তিনি উপলক্ষ্য হইয়া
সমুদয় রাজপুতানায় শত শত বিদ্যালয় ও দাতব্য আশ্রম
স্থাপন করিয়াছেন। তিনি জঙ্গলের ভিতর হাসপাতাল
খুলিয়াছেন, হিমালয়ের দুর্গম গিরিনদীর উপরে
লৌহসেতু নির্মাণ করাইয়াছেন, কিন্তু তিনি কখন মুদ্রা
স্পর্শ করেন না; তাহার একখানি কম্বল ছাড়া
সাংসারিক সম্বল আর কিছুই নাই, এই জন্য তাহাকে
লােকে কলী স্বামী বলিয়া ডাকে—তিনি দ্বারে দ্বারে
মাধুকরী দ্বারা আহার সংগ্রহ করেন। আমি তাহাকে
কখন এক বাড়ীতে স্কুলভিক্ষা করিতে দেখি নাই, পাছে
গৃহস্থের কোন ক্লেশ হয়। আর এরূপ সাধু তিনি একা
নহেন, এরূপ শত শত সাধু রহিয়াছেন। তােমরা কি
মনে কর, যত দিন এই ভূদেবগণ ভারতে জীবিত
থাকিয়া তাহাদের দেবচরিত্ররূপ দুর্ভেদ্য প্রাচীর দ্বারা
সনাতন ধর্মকে রক্ষা করিতেছেন, তত দিন এই প্রাচীন
ধর্মের বিনাশ হইবে ?
এই দেশে (আমেরিকায়) পাদরিগণ বৎসরের মধ্যে
ছয় মাস মাত্র প্রতি রবিবার দুই ঘণ্টা ধৰ্ম্মপ্রচারের জন্য
৩০,০০০, ৪০,০০০, ৫০,০০০, এমন কি, ৯০,০০০ টাকা
পর্যন্ত বেতন পাইয়া থাকেন। আমেরিকাবাসিগণ
(১) ইনি ইহার কয়েক বর্ষ পরে দেহরক্ষা করিয়াছেন।
১৭
২
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ তাহাদের ধর্মরক্ষার জন্য কত লক্ষ লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করিতেছেন আর বাঙ্গালী যুবকগণ শিক্ষা পাইয়াছেন, কলি স্বামীর ন্যায় এই সকল দেবতুল্য সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ব্যক্তিগণ অলস ভবঘুরে মাত্র! ‘মদ্ভক্তানাঞ্চ যে ভান্তে মে ভক্তত মতা। (১)। একটি চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত লও—একজন অতি অজ্ঞ বৈরাগীর কথা ধর। তিনিও যখন কোন গ্রামে গমন করেন, তিনিও তুলসীদাস (২) বা চৈতন্যচরিতামৃত হইতে যাহা জানেন, অথবা দাক্ষিণাত্যে হইলে আল- ওয়ারদিগের নিকট হইতে যাহা জানেন, তাহা শিখাইতে চেষ্টা করেন। ইহা কি কিছু উপকার করা নহে? আর এই সমুদয়ের বিনিময়ে তাহার প্রাপ্য এক টুকরা রুটি ও একখণ্ড কৌপীন। ইহাদিগকে নির্দয়ভাবে সমালােচনা করিবার পূর্বে, ভ্রাতৃগণ, তােমরা চিন্তা কর, তােমাদের স্বদেশবাসিগণের জন্য কি করিয়াছ, যাহাদের ব্যয়ে তােমরা শিক্ষা পাইয়াছ, যাহাদিগকে (১) আদি পুরাণের এক শ্লোকের অংশ। আমার ভক্তের যাহারা ভক্ত, তাহারাই আমার শ্রেষ্ঠ ভক্ত, এই আমার মত। (২) স্বনামখ্যাত সাধু। ইহার রচিত রামায়ণ হিন্দুস্থানীরা অতি ভক্তিপূৰ্ব্বক পাঠ করিয়া থাকেন। ইহার লোহাগুলিও অতি গভীর উপদেশপূর্ণ। ১৮
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা
শশাষণ করিয়া তােমাদের পদগৌরব রক্ষা করিতে হয়,
ও ‘বাবাজীগণ কেবল ভবঘুরে মাত্র এই শিক্ষার জন্য
তােমাদের শিক্ষকগণকে, বেতন দিতে হয়।
আমাদের কতকগুলি স্বদেশী বঙ্গবাসী হিন্দুধর্মের
এই পুনরুত্থানকে হিন্দুধর্মের ‘নূতন বিকাশ’ বলিয়া
তাহার সমালােচনা করিয়াছেন। তাঁহারা উহাকে
‘নূতন’ আখ্যা দিতে পারেন। কারণ, হিন্দুধর্ম সবে
মাত্র বাঙ্গলা দেশে প্রবেশ করিতেছে; এখানে এতদিন
ধৰ্ম্ম বলিতে কেবল আহার বিহার ও বিবাহ-সম্বন্ধীয়
কতকগুলি দেশাচারমাত্রকেই বুঝাইত।
রামকৃষ্ণ-শিষ্যগণ হিন্দুধর্মের যে ভাব সমগ্র ভারতে
প্রচার করিতেছেন, তাহা সৎশাস্ত্রের অনুমােদিত কি না,
এই ক্ষুদ্র পত্রে সেই গুরুতর প্রশ্নের বিচারের স্থান নাই।
তবে আমি আমার সমালােচকগণকে কতকগুলি সঙ্কেত
দিব, যাহাতে তাহারা আমাদের মত বুঝিতে অনেক
সাহায্য পাইবেন।
প্রথমতঃ আমি কখন এরূপ তর্ক করি নাই যে, কৃত্তি
বাস ও কাশীদাসের গ্রন্থ হইতে হিন্দুধৰ্ম্মের যথার্থ ধারণা
হইতে পারে, যদিও তাহাদের কথা অমৃতসমান’ এবং
যাঁহারা উহা শুনেন, তাহারা পুণ্যবান্। হিন্দুধৰ্ম্ম বুঝিতে
হইলে বেদ ও দর্শন পড়িতে হইবে এবং সমুদয় ভারতের
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ প্রধান প্রধান ধর্মাচাৰ্য্য এবং তাহাদের শিষ্যগণের উপদেশাবলি জানিতে হইবে। ভ্রাতৃগণ, যদি তােমরা গৌতমসূত্র হইতে আরম্ভ করিয়া বাৎস্যায়ন ভাষ্যের আলােকে ‘আপ্ত (১) সম্বন্ধে তাহার মত পাঠ কর, শবর ও অন্যান্য ভাষ্যকারগণের সাহায্যে যদি মীমাংসকগণের মত আলােচনা কর, অলো- কিক, প্রত্যক্ষ ও আপ্ত সম্বন্ধে এবং সকলেই আপ্ত হইতে পারে কিনা এবং এইরূপ আপ্তদিগের বাক্য বলিয়াই যে বেদের প্রামাণ্য, এই সকল বিষয়ে তাঁহাদের মত যদি অধ্যয়ন কর, যদি তােমাদের মহীধরকৃত যজুর্বেদভাষ্যের উপক্রমণিকা দেখিবার অবকাশ থাকে, তবে তাহাতে দেখিবে, মানবের আধ্যাত্মিক জীবন ও বেদের নিয়মাবলি সম্বন্ধে আরও সুন্দর সুন্দর বিচার আছে। তাহারা তাই সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, বেদ অনাদি অনন্ত। ‘সৃষ্টির অনাদিত্ব’ মত সম্বন্ধে বক্তব্য এই, ঐ মত, কেবল হিন্দুধর্মের নহে, বৌদ্ধ ও জৈনধৰ্ম্মেরও উহা একটি প্রধান ভিত্তি। এক্ষণে, ভারতীয় সমুদয় সম্প্রদায়কে মােটামুটি জ্ঞান- মাগী বা ভক্তিমাগী বলিয়া শ্রেণীবদ্ধ করা যাইতে পারে। (১) যিনি পাইয়াছেন—যিনি আত্মতত্বের সাক্ষাৎ করিয়া- ছেন। মনুষ্যস্বভাবসুলভ দুর্বলতাবিমুক্ত পুরুষ। » . হিন্দুধর্মের সর্বভৌমিকতা যদি তােমরা শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য্যকৃত শারীরক ভাষ্যের উপ- ক্রমণিকা পাঠ কর, তবে দেখিবে, তথায় জ্ঞানের ‘নিরপেক্ষতা সম্পূর্ণভাবে বিচারিত হইয়াছে আর এই সিদ্ধান্ত করা হইয়াছে যে, ব্ৰহ্মানুভূতি ও মােক্ষ কোনরূপ অনুষ্ঠান, মত, বর্ণ, জাতি বা সম্প্রদায়ের উপর নির্ভর যে কোন ব্যক্তি সাধনচতুষ্টয়সম্পন্ন, (১) সেই ইহার অধিকারী! সাধনচতুষ্টয় সম্পূর্ণ চিত্তশুদ্ধিকর কতকগুলি অনুষ্ঠানমাত্র। ভক্তিমার্গসম্বন্ধে বক্তব্য এই, বাঙ্গালী সমালােচকগণও বেশ জানেন যে, কতকগুলি ভক্তিমার্গের আচাৰ্য্য বলিয়াছেন, মুক্তির জন্য জাতি বা লিঙ্গে কিছু আসিয়া যায় না, এমন কি মনুষ্যজন্ম পৰ্যন্ত আবশ্যক নহে; একমাত্র প্রয়ােজন—ভক্তি। করে না। (১) ১। নিতানিত্যবস্তুবিবেক-ব্ৰহ্ম নিত্য ও জগৎ অনিত্য—এই তত্ত্বের বিচার। ২। ইহামুত্রফলভােগবিরাগ সাংসারিক সুখে ও পারলৌকিক স্বর্গাদিভােগে বিতৃষ্ণা। ৩। শমাদি সম্পত্তি (ক) শম-চিত্তসংযম (খ) দম—ইন্দ্রিয়সংযম (গ) উপরতি -সন্ন্যাস ও চিত্তবৃত্তির উপরম (ঘ) তিতিক্ষাপ্রতীকার ও চিন্তা- বিলাপশূন্য হইয়া সমুদয় দুঃখসহন (ঙ) শ্রদ্ধা-গুরুবেদান্তবাক্যে বিশ্বাস (চ) সমাধান—ব্রহ্মে চিত্তের একাগ্রতা। ৪। মুমুক্ষুত্ব- মােক্ষলাভের জন্য, প্রবল ইচ্ছা। বে , ১ম অ, ১ম পা, ১ম পুত্রের শারীরক ভাষ্য দেখ।
**
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
জ্ঞান ও ভক্তি সর্বত্র নিরপেক্ষ বলিয়া প্রচারিত
হইয়াছে। সুতরাং কোন আচাৰ্যই এরূপ বলেন নাই
যে, মুক্তিলাভে কোন বিশেষ মতাবলম্বীর, বিশেষ বর্ণের
বা বিশেষ জাতির অধিকার। এ বিষয়ে ‘অস্তরা চাপি
তু তদ্দষ্টে’ (১) এই বেদান্তসূত্রের উপর শঙ্কর, রামানুজ
ও মধ্বকৃত ভাষ্য পাঠ কর।
সমুদয় উপনিষদ্ অধ্যয়ন কর; এমন কি, সংহিতা
পর্যন্ত অনুসন্ধান কর ; কোথাও অন্যান্য ধর্মের ন্যায়
মােক্ষের সঙ্কীর্ণ ভাব পাইবে না; অপর ধর্মের প্রতি
সহানুভূতির ভাব সর্বত্রই রহিয়াছে। এমন কি,
অধ্বৰ্যবেদের সংহিতাভাগের চত্বারিংশৎ অধ্যায়ের
তৃতীয় বা চতুর্থ শ্লোকে আছে, যদি আমার ঠিক
স্মরণ থাকে) ‘ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কৰ্ম্মসঙ্গিনাং।
(২) এই ভাব হিন্দুধৰ্ম্মের সর্বত্র রহিয়াছে। ভারতে
কেহ কি কখন নিজ ইষ্টদেবতা নির্বাচনের জন্য অথবা
(১) বেদান্তসূত্র ৩৪৩৬। ইহার অর্থ এই শাস্ত্রে দেখা
যায়, অনেক ব্যক্তি কোন আশ্রমবিশেষ অবলম্বন করিয়াও জ্ঞানে
অধিকারী হইয়াছিলেন।
(২) গীতাতেও আছে। ৩য় অ, ২৬ শ্লোক। অর্থ—যাহারা
কর্মকেই শ্রেষ্ঠ বলিয়া মনে করিয়া কর্মে আসক্ত, সেই অজ্ঞগণকে
জ্ঞানের কথা বলিয়া জ্ঞানী ব্যক্তি তাহাদের মতি বিচলিত
করিবেন না।
২২
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা নাস্তিক বা আজ্ঞেয়বাদী হইবার জন্য নিগৃহীত হইয়াছেন, যতদিন তিনি সামাজিক নিয়ম মানিয়া চলিয়াছেন ? সামাজিক নিয়মভঙ্গাপরাধে সমাজ যে কোন বাক্তিকে শাসন করিতে পারেন, কিন্তু কোন ব্যক্তি, এমন কি, অতি নীচ পতিত পৰ্য্যন্ত কখন হিন্দুধৰ্ম্মমতে মুক্তির অধিকারী নহে। এই দুইটি একসঙ্গে মিশাইয়া গােল করিও না। ইহার উদাহরণ দেখ। মালাবারে একজন চণ্ডালকে, একজন উচ্চবর্ণের লােকের এক রাস্তায় চলিতে দেওয়া হয় না, কিন্তু সে মুসলমান বা খ্রশ্চিয়ান হইলে তাহাকে অবাধে সর্বত্র যাইতে দেওয়া হয়, আর এই নিয়ম একজন হিন্দুরাজার রাজ্যে কত শতাব্দী ধরিয়া রহিয়াছে। ইহ একটু অদ্ভুত রকমের বােধ হইতে পারে, কিন্তু অতিশয় প্রতিকূল অবস্থার ভিতরও অপরাপর ধৰ্ম্মের প্রতি হিন্দুধৰ্ম্মের সহানুভূতির ভাব ইহাতে প্রকাশ করিতেছে। হিন্দুধৰ্ম্ম এই এক বিষয়ে জগতের অন্যান্য ধর্ম হইতে পৃথক, এই এক ভাব প্রকাশ করিতে সাধুগণ সংস্কৃত- ভাষার সমুদয় শব্দরাশি প্রায় নিঃশেষিত করিয়াছেন যে, মানুষকে এই জীবনেই ব্ৰহ্ম উপলব্ধি করিতে হইবে আর অদ্বৈতবাদ আর একটু অগ্রসর হইয়া বলেন ২৩ . হিন্দুধর্মের নবজাগরণ যে, “ব্ৰহ্মবিদ ব্ৰহ্মব ভবতি’—আর কথা খুব যুক্তি- সঙ্গতও বটে। এই মতের ফলস্বরূপ প্রত্যাদেশের অতি উদার ও মহান্ মত আসিতেছে ; ইহা শুধু বৈদিক ঋষিগণ বলিয়াছেন, তাহা নহে; শুধু বিদুর, ধৰ্ম্মব্যাধ (১) ও অপরাপর প্রাচীন মহাপুরুষেরা ইহা বলিয়াছেন, তাহা নহে, কিন্তু সে দিন সেই দাদুপন্থীসম্প্রদায়ভুক্ত ত্যাগী নিশ্চলদাসও নির্ভীকভাবে তাঁহার ‘বিচারসাগর’ গ্রন্থে ঘােষণা করিয়াছেন, “যাে ব্রহ্মবিদ ওই ব্ৰহ্ম তাকু বাণী বেদ। সংস্কৃত ঔর ভাষামে করত ভ্ৰমকি ছেদ।” যিনি ব্রহ্মবিৎ, তিনিই ব্রহ্ম ; তাহার বাক্যই বেদ। সংস্কৃত অথবা দেশপ্রচলিত যে কোন ভাষায় তিনি বলুন কেন, তাহাতেই লােকের অজ্ঞান দূর হয়। অতএব দ্বৈতবাদানুসারে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করা এবং অদ্বৈতবাদমতে ব্রহ্মভাবাপন্ন হওয়াই বেদের সমুদয় উপদেশের লক্ষ্য, আর অন্য যে কিছু শিক্ষা বেদে আছে তাহা সেই লক্ষ্যে পৌছিবার সােপানমাত্র। আর ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্যের এই মহিমা যে, তিনি নিজ- (১) মহাভারত, বনপর্ব দেখ।
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা প্রতিভাবলে ব্যাসের ভাবগুলি অদ্ভুত ভাবে বিবৃত করিয়াছেন। নিরপেক্ষ সত্যহিসাবে ব্ৰহ্মই একমাত্র সত্য ; আপেক্ষিক সত্য হিসাবে এই ব্রহ্মের বিভিন্ন প্রকাশের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় বা ভারতবহির্ভূত প্রদেশস্থ সমুদায় সম্প্রদায়ই সত্য। তবে কোন কোনটি অপর- গুলি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, এই মাত্র। মনে কর, কোন ব্যক্তি বরাবর সূৰ্য্যাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তাহার প্রতি পদবিক্ষেপে তিনি সূর্যের নূতন নূতন দৃশ্য দেখিবেন। যতদিন না তিনি প্রকৃত সূর্যের নিকট পঁহুছিতেছেন, ততদিন সূর্যের আকার, দৃশ্য ও বর্ণ প্রতিমুহূর্তে নূতন হইতে থাকিবে। প্রথমে সূৰ্য্যকে তিনি একটি বৃহৎ গােলকের ন্যায় দেখিয়াছিলেন। তার পর উহার আকৃতি ক্রমশঃ বর্ধিত হইতেছিল। প্রকৃত সূৰ্য্য বাস্তবিক কখন তাঁহার প্রথমদৃষ্ট গােলকের মত বা তার পর পর দৃষ্ট সূৰ্য্যসমূহের ন্যায় নহে। কিন্তু তথাপি ইহা কি সত্য নহে যে, সেই যাত্রী বরাবর সূৰ্য্যই দেখিতেছিলেন, সূৰ্য্য- ব্যতীত অপর কিছু দেখেন নাই ? এইরূপ, সমুদয় সম্প্রদায়ই সত্য ; কোনটি প্রকৃত সূর্যের নিকটতর, কোনটি বা দূরতর। সেই প্রকৃত সূৰ্যই আমাদের ‘একমেবাদ্বিতীয়।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
আর যখন এই সত্য নির্বিশেষ ব্রহ্মের উপদেষ্টা
একমাত্র বেদ-অন্যান্য ঐশ্বরিক ধারণা যাঁহারই ক্ষুদ্র ও
সীমাবদ্ধ দর্শনমাত্র, যখন ‘সৰ্বলােকহিতৈষিণী শ্রুতি
সাধকের হাত ধরিয়া ধীরে ধীরে সেই নির্বিশেষ ৰন্ধে
যাইবার সমুদয় সােপানগুলি দিয়া লইয়া যান, আর
অন্যান্য ধর্ম যখন ইহাদের মধ্যে কোন একটি রুদ্ধগতি
ও স্থিতিশীল সােপান মাত্র, তখন জগতের সমুদয়
ধৰ্ম্ম
এই নামরহিত, সীমারহিত, নিত্য বৈদিক ধর্মের
অন্তর্ভুক্ত।
শত শত জীবন ধরিয়া চেষ্টা কর, অনন্তকাল ধরিয়া
তােমার অন্তরের অন্তস্তল অনুসন্ধান
অন্তস্তল অনুসন্ধান করিয়া দেখ,
তথাপি এমন কোন মহৎ ধর্মভাব আবিষ্কার করিতে
পারিবে না, যাহা এই আধ্যাত্মিকতার অনন্ত খনির
ভিতর পূর্ব হইতেই নিহিত নাই।
তথাকথিত হিন্দু পৌত্তলিকতাসম্বন্ধে বক্তব্য এই,
প্রথমে গিয়া দেখ, ইহা কিরূপ ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ
করিতেছে; প্রথমে জান গিয়া, উপাসকগণ কোথায়
প্রথমে উপাসনা করেন, মন্দিরে, প্রতিমায় অথবা
দেহমন্দিরে।
প্রথমে, নিশ্চয় করিয়া জান, তাহারা কি করিতেছে
- শতকরা নিরনব্বই জনের অধিক নিন্দুকই এ সম্বন্ধে
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা
সম্পূর্ণ অজ্ঞ ) তখন উহা বেদান্তদর্শনের আলােকে
আপনিই ব্যাখ্যাত হইয়া যাইবে।
তথাপি এ কৰ্ম্মগুলি অবশ্য কর্ত্তব্য নহে। বরং মনু
খুলিয়া দেখ—উহা প্রত্যেক বৃদ্ধকে চতুর্থাশ্রম গ্রহণ
করিতে আদেশ করিতেছে, আর তাহারা উহা গ্রহণ
করুক বা না করুক, তাহাদিগকে সমুদয় কৰ্ম্ম অবশ্যই
ত্যাগ করিতে হইবে।
সর্বত্রই ইহা পুনঃ পুনঃ বলা হইয়াছে যে, এই সমুদয়
কৰ্ম্ম জ্ঞানে সমাপ্ত হয়—“জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে। (১)
এই সকল কারণে, অন্যান্য দেশের অনেক ভদ্রলােক
অপেক্ষা একজন হিন্দুকৃষকও অধিক ধৰ্ম্মজ্ঞানসম্পন্ন।
আমার বক্তৃতায় ইউরােপীয় দর্শন ও ধর্মের অনেক
শব্দ ব্যবহারের জন্য কোন বন্ধু সমালােচনাস্থলে
অনুযােগ করিয়াছেন। সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করিতে
পারিলে আমার পরম আনন্দ হইত। উহা অপেক্ষা-
কৃত সহজ হইত, কারণ সংস্কৃত ভাষাই ধৰ্ম্মভাব প্রকাশের
একমাত্র সম্পূর্ণ উপযােগী। কিন্তু বন্ধুটি ভুলিয়া
গিয়াছিলেন যে, পাশ্চাত্য নরনারীগণ আমার শ্রোতা
ছিলেন, আর যদিও কোন ভারতীয় খ্রশ্চিয়ান মিশনারী
বলিয়াছিলেন যে, হিন্দুরা তাহাদের সংস্কৃত গ্রন্থের অর্থ
(১) গীতা, ৪র্থ অ, ৩৩ শ্লোক।
২৭
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
ভুলিয়া গিয়াছে, মিশনরীগণই উহার অর্থ আবিষ্কার
করিয়াছেন, তথাপি আমি সেই সমবেত বৃহৎ মিশনারী-
মগুলীর মধ্যে একজনকে দেখিতে পাইলাম না, যিনি
সংস্কৃত ভাষার একটি পংক্তি পর্যন্ত বুঝেন, কিন্তু তাহাদের
মধ্যে অনেকে বেদ, বেদান্ত ও হিন্দুধর্মের যাবতীয় পবিত্র
শাসম্বন্ধে সমালােচনা করিয়া বড় বড় গবেষণাপূর্ণ প্রবন্ধ
পাঠ করিয়াছিলেন।
আমি কোন ধর্মের বিরােধী, এ কথা সত্য নহে।
আমি ভারতীয় খ্রশ্চিয়ান মিশনারীদের বিরােধী এ কথাও
তপ সত্য নহে। তবে আমি আমেরিকায় তাহাদের
টাকা তুলিবার কতকগুলি উপায়ের প্রতিবাদ করি।
বালকবালিকার পাঠ্য পুস্তকে অঙ্কিত ঐ চিত্রগুলির
অর্থ কি ? চিত্রে অঙ্কিত রহিয়াছে, হিন্দুমাতা তাহার
সন্তানগণকে গঙ্গায় কুন্তীরের মুখে নিক্ষেপ করিতেছে।
জননী কৃষ্ণকায়া, কিন্তু শিশু শেতাঙ্গরূপে অঙ্কিত ;
ইহার উদ্দেশ্য, শিশুগণের প্রতি অধিক সহানুভূতি
আকর্ষণ ও অধিক চঁাদাসংগ্রহ। ঐ ছবিগুলির অর্থ কি ?
একজন পুরুষ তাহার স্ত্রীকে নিজ হস্তে একটি কাষ্ঠস্তন্তে
বাঁধিয়া পুড়াইতেছে—উদ্দেশ্য সে ভূত হইয়া তাহার
স্বামীর শত্রুগণকে পীড়ন করিবে ?
বড়বড় রথ রাশিরাশি মনুষকে চাপিয়া মারিয়া
২৮
হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা কেলেতেছে—এ সকল ছবির অর্থ কি ? সে দিন এখানে (আমেরিকায় ছেলেদের জন্য একখানি পুস্তক প্রকাশ শিত হয়। তাহাতে একজন পাদরি ভদ্রলােক তাহার কলিকাতা দর্শনের বিবরণ বর্ণন করিয়াছেন। তিনি বলেন, তিনি কলিকাতার রাস্তায় একখানি র কতক- গুলি ধৰ্ম্মোন্মত্ত ব্যক্তির উপর দিয়া চলিয়া যাইতে দেখিয়াছেন। মেমফিস নগরে আমি একজন পাদরী ভদ্রলােককে প্রচারকালে বলিতে শুনিয়াছি, ভারতের প্রত্যেক পল্লীগ্রামে ক্ষুদ্র শিশুদের কঙ্কালপূর্ণ একটি করিয়া পুষ্করিণী আছে। হিন্দুরা খ্ৰীষ্টশিষ্যগণের কি করিয়াছেন যে প্রত্যেক খ্রশ্চিয়ান বালকবালিকাকেই হিন্দুদিগকে দুষ্ট, হতভাগা ও পৃথিবীর মধ্যে ভয়ানক দানব বলিয়া ডাকিতে শিক্ষা দেওয়া হয় ? বালকবালিকাদের রবিবাসরীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার এক অংশই এই ;-খ্রশ্চিয়ান ব্যতীত অপর সকলকে, বিশেষতঃ হিন্দুকে ঘৃণা করিতে শিক্ষা দেওয়া, যাহাতে তাহারা শৈশবকাল হইতেই মিশনে তাহাদের পয়সা চাঁদা দিতে শিখে। সত্যের খাতিরে না হইলেও অন্ততঃ তাহাদের সন্তান- হিন্দুধর্মের নবজাগরণ গণের নীতির খাতিরেও খ্রশ্চিয়ান মিশনারীগণের আর এরূপ ভাবের প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। বালক- বালিকাগণ যে বড় হইয়া অতি নির্দয় ও নিষ্ঠুর নরনারীতে পরিণত হইবে তাহাতে আর আশ্চর্য কি? কোন প্রচারক যতই অনন্ত নরকের যন্ত্রণা এবং তথাকার জ্বলমান অগ্নি ও গন্ধকের বর্ণনা করিতে পারেন, গোঁড়াদিগের মধ্যে তাঁহার ততই অধিক প্রতিপত্তি হয়। আমার কোন বন্ধুর একটি অল্পবয়স্কা দাসীকে ‘পুনরুত্থান সম্প্রদায়ের (১) ধর্মপ্রচার শ্রবণের ফলস্বরূপ, বাতুলালয়ে পাঠাইতে হইয়াছিল। তাহার পক্ষে জ্বলন্ত গন্ধক ও নরকাগ্নির মাত্রাটি কিছু অতিরিক্ত হইয়াছিল। আবার মাদ্রাজ হইতে প্রকাশিত, হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে লিখিত গ্রন্থগুলি দেখ। যদি কোন হিন্দু খ্রীষ্টধৰ্ম্মের বিরুদ্ধে এরূপ এক পংক্তি লেখেন, তাহা হইলে মিশনারী- গণ স্বৰ্গমৰ্ত্ত তােলপাড় করিয়া ফেলেন। স্বদেশবাসিগণ, আমি এই দেশে এক বৎসরের অধিক হইল রহিয়াছি। আমি ইহাদের সমাজের প্রায় সকল অংশই দেখিয়াছি। এখন উভয় দেশের তুলনা করিয়া তােমাদিগকে বলিতেছি যে, মিশনারীরা জগতে আমা- (১) যে সম্প্রদায় খ্রষ্টীয় ধর্মের প্রাচীন ভাব বলিয়া অনুদার মতসমূহের পুনঃস্থাপনে প্রয়াসী। আমেরিকার খৃষ্টীয় সম্প্রদায়বিশেষ।
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা
দিগকে যে দৈত্য বলিয়া পরিচয় দেন, আমরা তাহা নহি,
আর তাহারাও নিজেদের দেবতা বলিয়া ঘােষণা
করিলেও প্রকৃত পক্ষে তাহারা দেবতা নহেন। মিশনারী-
গণ হিন্দুবিবাহপ্রণালীর দুর্ণীতি, শিশুহত্যা ও অন্যান্য
দোষের কথা যত কম বলেন, ততই ভাল। এমন অনেক
দেশ থাকিতে পারে, যথাকার বাস্তবিক চিত্রের সমক্ষে
মিশনারীগণের অঙ্কিত হিন্দুসমাজের সমুদয় কাল্পনিক
চিত্র নিষ্প্রভ হইয়া যাইবে। কিন্তু বেতনভুক নিন্দুক
হওয়া আমার জীবনের লক্ষ্য নহে। হিন্দুসমাজ সম্পূর্ণ
নির্দোষ, এ দাবী আর কেহ করে করুক আমি ত কখন
করিব না। এই সমাজের যে সকল ত্রুটি অথবা শত
শত শতাব্দীব্যাপী দুর্বিপাকবশে ইহাতে যে সকল দোষ
জন্মিয়াছে, তাহার সম্বন্ধে আর কেহই আমা আপেক্ষা
অধিক জ্ঞাত নন। বৈদেশিক বন্ধুগণ, যদি তােমরা
যথার্থ সহানুভূতির সঙ্গে সাহায্য করিতে আইস, বিনাশ
তােমাদের যদি উদ্দেশ্য না হয়, তবে তােমাদের উদ্দেশ্য
সিদ্ধ হউক, ভগবানের নিকট এই প্রার্থনা।
কিন্তু যদি এই অবসন্ন পতিত জাতির মস্তকে
অনবরত, সময়ে অসময়ে ক্রমাগত গালিবর্ষণ করিয়া
স্বজাতির নৈতিক শ্রেষ্ঠতা দেখান তােমাদের উদ্দেশ্য
হয়, তবে আমি স্পষ্টই বলিতে পারি, যদি একটু ন্যায়-
৩১
- হিন্দুধর্মের নবজাগরণ পরতার সহিত এই তুলনা করা হয়, তবে হিন্দুগণ, নীতিপরায়ণ জাতি হিসাবে জগতের অন্যান্য জাতি হইতে অনেক শ্রেষ্ঠ আসন পাইবেন। ভারতে ধৰ্ম্মকে কখন ক্ষুদ্র গণ্ডির ভিতর আবদ্ধ করিয়া রাখা হয় নাই। কোন ব্যক্তিকেই তাহার ইষ্ট- দেবতা, সম্প্রদায় বা আচাৰ্য মনােনয়নে বাধা দেওয়া হয় নাই; সুতরাং ধর্মের এখানে যেরূপ উন্নতি হইয়াছিল, অন্য কোথাও সেরূপ হইতে পায় নাই। অপর দিকে আবার, ধর্মের ভিতর এই নানাভাব বিকাশের জন্য একটি স্থিরবিন্দুর আবশ্যক হইল— সমাজ এই অচল বিন্দুরূপে গৃহীত হইল। ইহার ফলে সমাজ কঠোরশাসনেপূর্ণ ও একরূপ অচল হইয়া দাঁড়াইল। কারণ, স্বাধীনতাই উন্নতির একমাত্র সহায়। পাশ্চাত্য প্রদেশে কিন্তু সমাজ ছিল বিভিন্নভাব বিকাশের ক্ষেত্র এবং স্থির বিন্দু ছিল ধৰ্ম্ম। প্রতিষ্ঠিত চার্চের সহিত একমত, ইউরােপীয় ধর্মের মূলমন্ত্র—এমন কি, এখনও তাহাই আছে আর যদি কোন সম্প্রদায় প্রচলিত মত হইতে কিছু স্বতন্ত্ররূপ হইতে যায়, তাহা হইলেই তাহাকে শােণিতসাগরের মধ্য দিয়া অতি কষ্টে হাঁটিয়া তবে একটু সুবিধা লাভ করিতে হয়। ইহার হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা ফল হইয়াছে একটি মহৎ সমাজসংহতি, কিন্তু তাহাতে যে ধর্ম প্রচলিত, তাহা স্থূলতম জড়বাদের উপর কখনও উঠে নাই। আজ পাশ্চাত্য দেশ আপনার অভাব বুঝিতেছে। এখন উন্নত পাশ্চাত্য ঈশ্বরতত্বান্বেষিগণের মূলমন্ত্র হইয়াছে—‘মানুষের যথার্থ স্বরূপ ও আত্মা। সংস্কৃত দর্শন অধ্যয়নকারী মাত্রেই জানেন, এ হাওয়া কোথা হইতে বহিতেছে, কিন্তু তাহাতে কিছুই আসিয়া যায় না যতক্ষণ ইহা নূতন জীবন সঞ্চার করিতেছে। ভারতে আবার নূতন নূতন অবস্থার সংঘর্ষে সমাজ- সংহতির নবগঠন বিশেষ আবশ্যক হইতেছে। বিগত শতাব্দীর তিন-চতুর্থাংশ ধরিয়া ভারত সমাজসংস্কারসভা ও সমাজসংস্কারকে পূর্ণ হইয়াছে। কিন্তু হায় । ইহার মধ্যে সকলগুলিই বিফল হইয়াছে। ইহারা সমাজ- সংস্কারের রহস্য জানিতেন না। ইহারা প্রকৃত শিখিবার জিনিষ শিখেন নাই। ব্যস্ততাবশতঃ তাঁহারা আমাদের সমাজের যত দোষ, সব ধৰ্ম্মের ঘাড়ে চাপাইয়াছেন। প্রবাদবাক্যে যেমন আছে, ‘মশা মাত্তে গালে চড়, তেমনি তাহারা সমাজের দোষ সংশােধন করিতে গিয়া সমাজকেই একেবারে ধ্বংস করিবার যােগাড় করিয়াছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এ ক্ষেত্রে তাহারা
হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ
অটল অচল, গাত্রে আঘাত করিয়াছিলেন, শেষে উহার
প্রতিঘাতবলে নিজেরাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইলেন। যে সকল
মহামনা নিঃস্বার্থ পুরুষ এইরূপ বিপথে চেষ্টায় অকৃতকার্য্য
হইয়াছেন, সেই সকল ব্যক্তি ধন্য। আমাদের নিশ্চেষ্ট
সমাজরূপ নিদ্রিত দৈত্যকে জাগরিত করিতে সংস্কা-
নােন্মত্ততায় এই বৈদ্যুতিক আঘাতের বিশেষ প্রয়ােজন
হইয়াছিল।
আমরা ইহাদিগকে আশীর্বচন প্রয়ােগ করিয়া
ইহাদের অভিজ্ঞতা দ্বারা লাভবান্ হই আইস। তাহারা
ইহা শিক্ষা করেন নাই যে, ভিতর হইতে বিকাশ আরম্ভ
হইয়া বাহিরে তাহার পরিণতি হয় ; তাহারা শিক্ষা করেন
নাই, সমুদয় ক্রমবিকাশ পূর্ববর্তী কোন ক্রমসঙ্কোচের
পুনর্বিকাশ মাত্র। তাহারা জানিতেন না, বীজ উহার
চতুঃপার্শ্বস্থ ভূত হইতে উপাদান সংগ্রহ করে বটে, কিন্তু
নিজের প্রকৃতি অনুযায়ী বৃক্ষ হইয়া থাকে। হিন্দুজাতি
একেবারে ধ্বংস হইয়া নূতন জাতি যতদিন না
তাহার স্থান অধিকার করিতেছে, ততদিন সমাজের
এরূপ বিপ্লবকর সংস্কার সম্ভব নহে। যতই চেষ্টা কর
কেন, যতদিন না ভারতের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হইতেছে,
ততদিন ভারত কখন ইউরােপ হইতে পারে না।
ভারতের কি অস্তিত্ব বিলুপ্ত হইবে ? সেই ভারত,
৩৪
হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা
যাহা সমুদয় মহক, নীতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রাচীন
জননী, যে ভূমিতে সাধুগণ বিচরণ করিতেন, যে ভূমিতে
ঈশ্বরপ্রতিম ব্যক্তিগণ এখনও বাস করিতেছেন ? সেই
গ্রীসীয় সাধু ডায়ােজিনিসের লণ্ঠন লইয়া হে ভ্রাতৃগণ,
এই বিস্তৃত জগতের প্রত্যেক নগর, গ্রাম, অরণ্য অন্বেষণ
করিতে তােমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইতে রাজি আছি,
অপর স্থানে যদি এরূপ লােক পাও, ত দেখাও।
প্রবাদ ঠিক যে, ফল দেখিয়া গাছ চেনা যায়। ভারতের
প্রত্যেক আম্রবৃক্ষের তলে বসিয়া বৃক্ষ হইতে পতিত
ঝুড়ি ঝুড়ি কীটদষ্ট অপক্ক আম কুড়াও, ও তাহাদের
প্রত্যেকটি সম্বন্ধে একশত করিয়া খুব গবেষণাপূর্ণ গ্রন্থ
রচনা কর। তথাপি তুমি একটি আসম্বন্ধেও সঠিক তত্ত্ব
লিখিতে পারিবে না। একটি সুপক্ক, সরস, সুমিষ্ট আম্র
পাড়িয়া তাহার বর্ণনা করিলেই বুঝিব, তুমি আস্রের
প্রকৃত গুণ বিদিত হইয়াছ ও তাহার প্রকৃত বর্ণনা
করিয়াছ।
এই ভাবেই এই ঈশ্বরকল্প মানবগণই হিন্দুধৰ্ম্ম কি,
* ডায়ােজিনিস সিনিক সম্প্রদায়ভুক্ত একজন মহাত্মা ছিলেন।
ইহার বিশ্বাস ছিল, জগতে প্রকৃত সাধু ব্যক্তি অতি অল্প। এই
ভাবটি প্রকাশ করিবার জন্য তিনি দিবাভাগে একটি লণ্ঠন
জ্বালাইয়া সহর ঘুরিয়া বেড়াইতেন।
হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ
তাহা প্রকাশ করেন। যে জাতিরূপ বৃক্ষ শত শত
শতাব্দী ধরিয়া পুষ্ট ও বর্ধিত, যাহা সহস্ৰ বৰ ধরিয়া
ঝাবাত সহ করিয়াও অনন্ত তারুণ্যের অক্ষয় তেজে
এখনও গৌরবান্বিত হইয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছে, ইহাদের
জীবন দেখিলেই তাহা স্বরূপ, শক্তি ও গূঢ়নিহিত
তেজের বিষয় জানা যায়।
ভারতের কি বিনাশ হইবে ? তাহা হইলে জগৎ
হইতে সমুদয় আধ্যাত্মিকতা চলিয়া যাইবে; চরিত্রের
মহান্ আদর্শ সমুদয় নষ্ট হইবে, সমুদয়
ধৰ্ম্মের প্রতি মধুর
সহানুভূতির ভাব বিনষ্ট হইবে, সমুদয় ভাবুকতা নষ্ট
হইবে; তাহার স্থলে কাম ও বিলাসিতারূপ দেবদেবীর
রাজত্ব হইবে; অর্থ হইবেন—তাহার পুরােহিত ; প্রতারণা,
পাশববল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হইবে—তাহার পূজাপদ্ধতি
আর মানবাত্মা হইবেন, তাহার বলি। এরূপ কখন হইতে
পারে না। কাৰ্য্যশক্তি হইতে সহ্যশক্তি অনন্তগুণে শ্রেষ্ঠ।
ঘৃণাশক্তি হইতে প্রেমশক্তি অনন্তগুণে অধিক শক্তিমান।
যাঁহারা মনে করেন, হিন্দুধর্মের বর্তমান পুনরুত্থান
কেবল দেশহিতৈষিতাপ্রবৃত্তির একটি বিকাশমাত্র,
তঁাহারা ভ্রান্ত।
প্রথমত, আমরা এই অপূৰ্ব ব্যাপার কি, তাহা
বুঝিবার চেষ্টা করি আইস।
---
হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা
ইহা কি আশ্চৰ্য্য নহে যে, একদিকে যেমন আধুনিক
বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রবল আক্রমণে পাশ্চাত্য স্বমতান্ধ
ধৰ্ম্মসমূহের প্রাচীন দুর্গসমূহ ধূলিসাৎ হইতেছে
একদিকে যেমন বৰ্তমান বিজ্ঞানের হাতুড়ির চোটে
বিশ্বাস অথবা চাচঁসমিতির অধিকাংশের সম্মতিই যাহার
মূল, সেই সকল ধৰ্ম্মমতরূপ মৃৎপাত্রকে গুড়াইয়া ছাতু
করিয়া ফেলিতেছে ; একদিকে
একদিকে যেমন আততায়ী
আধুনিক চিন্তার ক্রমবর্ধনশীল স্রোতের সহিত আপনাকে
মিলাইতে পাশ্চাত্য ধৰ্ম্মমতসকল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া
পড়িতেছে ; একদিকে যেমন অপর সমুদয় ধর্মপুস্তকের
মুল গ্রন্থগুলি হইতে আধুনিক চিন্তার ক্রমবর্ধনশীল
তাড়নায়, যথাসম্ভব বিস্তৃত ও উদার অর্থ বাহির করিতে
হইয়াছে, আর তাহাদের অধিকাংশই ঐ চাপে ভগ্ন হইয়া
অপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যের ভাণ্ডারে রক্ষিত হইয়াছে;
একদিকে যেমন অধিকাংশ পাশ্চাত্য চিন্তাশীল ব্যক্তি
চার্চের সঙ্গে সমুদয় সংস্রব পরিত্যাগ করিয়া অশান্তিসাগরে
ভাসিতেছেন ; অপর দিকে তেমনি যে সকল ধৰ্ম্ম সেই
বেদরূপ জ্ঞানের মূলপ্রস্রবন হইতে প্রাণপ্রদ জল পান
করিয়াছে অর্থাৎ হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্মেরই কেবল
পুনরুত্থান হইতেছে ?
অশান্ত পাশ্চাত্য নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী কেবল
;
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
গীতা বা ধৰ্ম্মপদেই (১) স্বীয় আশ্রয় পাইয়া
থাকেন।
অদৃষ্টচক্র ঘুরিয়া গিয়াছে। আর যে হিন্দু নৈরাশ্যা
পরিতনেত্রে নিজ বাসভবনকে আততায়িপ্রদত্ত
অগ্নিতে বেষ্টিত দেখিতেছিলেন, তিনি এক্ষণে বর্তমান
চিন্তার প্রখর আলােকে ধূম অপসারিত হইবার পর
দেখিতেছেন, তাহার গৃহই একমাত্র নিজ বলে দণ্ডায়মান
রহিয়াছে আর অপরগুলি সব হয় ধ্বংস হইয়াছে, নয়
হিন্দু আদর্শ অনুযায়ী পুনর্গঠিত হইতেছে। তিনি
এক্ষণে তাহার অশ্রুমােচন করিয়াছেন আর দেখিতে
পাইয়াছেন, যে কুঠার সেই “উর্দ্ধমূল অধঃশাখ অশ্বথের”
(২) মূলদেশ কাটিতে চেষ্টা করিয়াছিল, তাহাতে
বাস্তবিক অস্ত্রচিকিৎসকের ছুরীর কাৰ্য্য করিয়াছে।
তিনি দেখিতেছেন, তাহার ধৰ্ম্মরক্ষা করিবার জন্য
তাহার শাস্ত্রের বিকৃত অর্থ অথবা অন্য কোনরূপ
কপটতা করিবার আবশ্যকতা নাই। শুধু তাহাই নহে,
তিনি তাঁহার শান্ত্রের নিম্নাঙ্গগুলিকে নিম্নই বলিতে
(১) বৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠ নীতিশাস্ত্র।
(২) কঠোপনিষদ ও গীতা হইতে গৃহীত—অর্থ—এই
সংসাররূপ অথবৃক্ষের মূল উর্ধে (ব্ৰহ্ম) আর নিম্নে শাখা প্রশাখা
গিয়াছে। এখানে হিন্দুধর্মকে বুঝাইতেছে।
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা পারেন,, কারণ, তাহা অরুন্ধতীদর্শনস্যায়মতে (১) নিম্নাধিকারিগণের জন্য বিহিত। সেই প্রাচীন ঋষি- গণকে ধন্যবাদ, যাঁহারা এরূপ সর্বব্যাপী, সদাবিস্তারশীল ধৰ্ম্মপ্রণালী আবিষ্কার করিয়াছেন, যাহা জড়রাজ্যে যাহা কিছু আবিষ্কৃত হইয়াছে ও যাহা কিছু হইবে, সবই সাদরে গ্রহণ করিতে পারেন। তিনি সেইগুলিকে নূতন ভাবে বুঝিতে শিখিয়াছেন এবং আবিষ্কার করিয়াছেন যে, যে সকল আবিস্ক্রিয়া প্রত্যেক সীমাবদ্ধ ক্ষুদ্ৰ ধৰ্ম্ম- সম্প্রদায়ের পক্ষে এত ক্ষতিকর হইয়াছে, তাহা তাহার পূৰ্বপুরুষগণের ধ্যানলব্ধ তুরীয় ভূমি হইতে আবিষ্কৃত সত্যসমূহের—বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়জ্ঞানের ভূমিতে পুনরাবিষ্কার মাত্র। এই কারণেই তাহার কিছুই ত্যাগ করিবার আবশ্যক নাই অথবা অন্য কোন স্থলে অন্য কিছু খুজিবার জন্য তাঁহার যাইবার কোন প্রয়ােজন নাই। যে অনন্ত ভাণ্ডার তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহা (১) অরুন্ধতী অতি ক্ষুদ্র নক্ষত্রবিশেষ। কাহাকেও এই নক্ষত্র দেখাইতে হইলে প্রথমে উহার নিকটবর্তী বৃহৎ কোন নক্ষত্রকে দেখাইয়া তাহাতে চক্ষু স্থির হইলে তবে অরুন্ধতী দৃষ্টিগােচর হয়। সেইরূপ ধর্মের সূক্ষ্মভাব বুঝিতে হইলে প্রথমে স্কুলভাবের সাহায্য লইতে হয়।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ হইতে কিয়দংশ লইয়া নিজ কাজে লাগাইলেই তাঁহার পক্ষে যথেষ্ট হইবে। তাই তিনি করিতে আরম্ভ করিয়াছেন, ক্রমশঃ আরাে করিবেন। ইহাই কি বাস্ত- বিক এই পুনরুত্থানের কারণ নহে? বঙ্গীয় যুবকগণ, তােমাদিগকে আমি বিশেষ করিয়া আহ্বান করিয়া বলিতেছি, ভ্রাতৃগণ! লজ্জার বিষয় হইলেও ইহা আমরা জানি যে, বৈদেশিকগণ যে সকল প্রকৃত দোষের জন্য হিন্দু- জাতিকে নিন্দা করেন, তাহার কারণ আমরা। আমরাই ভারতের অন্যান্য জাতির মস্তকে অনেক অনুচিত গালি বর্ষণের কারণ। কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা ইহা সম্পূর্ণ জানিতে পারিয়াছি আর তঁাহার আশীর্বাদে আমরা শুধু আপনাদিগকেই শুদ্ধ করিব, তাহা নহে, সমুদয় ভারতকেই সনাতন ধর্ম প্রচারিত আদর্শানুসারে জীবন গঠন করিতে সাহায্য করিতে পারিব। প্রথমে আইস, প্রকৃতি ক্রীতদাসের কপালে সদাই যে ঈর্ষারূপ তিলক অঙ্কিত করেন, তাহা মােচন করি। কাহারও প্রতি ঈর্ষান্বিত হইও না। সকল শুভকৰ্ম্মানুষ্ঠায়ীকেই সাহায্য করিতে সর্বদা প্রস্তুত থাক। ত্রিলােকের প্রত্যেক জীবের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা প্রেরণ কর। আমাদের ধর্মের এক কেন্দ্রীভূত সত্য—যাহা হিন্দু, ৪০
৩
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা
বৌদ্ধ, জৈন সকলেরই সাধারণ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য,
তাহার উপর দণ্ডায়মান হই আইস। সেই কেন্দ্রীভূত
সত্য এই মানবাত্মা, অজ, অবিনাশী, সর্বব্যাপী, অনন্ত
মানবাত্মা, যাহার মহিমা স্বয়ং বেদ প্রকাশ করিতে অক্ষম,
যাঁহার মহিমার সমক্ষে অনন্ত
সূৰ্য্য চন্দ্র তারকা ও
নীহারময় নক্ষত্রপুঞ্জ বিন্দুতুল্য। প্রত্যেক নরনারী, শুধু
তাহাই নহে উচ্চতম দেব হইতে তােমাদের পদতলস্থ
কীট পর্যন্ত সকলেই ঐ আত্মা, হয় উন্নত, নয় অবনত।
প্রভেদ-প্রকারগত নহে, পরিমাণগত ।
আত্মার এই অনন্ত শক্তি, জড়ের উপর প্রয়ােগ
করিলে ভৌতিক উন্নতি হয়, চিন্তার উপর প্রয়ােগ
করিলে মনীষার বিকাশ এবং আপনার উপর প্রয়ােগ
করিলে মানুষকে ঈশ্বর করিয়া তুলে।
প্রথম আমরা ব্ৰহ্মত্ব লাভ করি আইস, পরে অপরকে
ব্ৰহ্ম হইতে সাহায্য করিব। আপনি সিদ্ধ হইয়া অপরকে
সিদ্ধ হইতে সহায়তা কর, ইহাই আমাদের মূলমন্ত্র
হউক। মানুষকে পাপী বলিও না। তাহাকে বল, তুমি
ব্রহ্ম। যদিও শয়তান কেহ থাকে, তথাপি আমাদের
ব্ৰহ্মকেই স্মরণ করা কর্তব্য-শয়তানকে নহে।
যদি গৃহ অন্ধকার থাকে, তবে সদা ‘অন্ধকার
‘অন্ধকার’ বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিলে অন্ধকার দূর হইবে
৪১
চৈতন্য ।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
না। আলাে লইয়া আইস। জানিয়া রাখ যাহা কিছু
অভাবাত্মক, যাহা কিছু পূর্ববর্তী ভাগগুলিকে ভাঙ্গিয়া
ফেলিতেই নিযুক্ত, যাহা কিছু কেবল দোষদর্শনাত্মক, তাহা
চলিয়া যাইবেই যাইবে; যাহা কিছু ভাবাত্মক, যাহা
কিছু গড়িতে চেষ্টা করে, যাহা কোন একটি সত্য স্থাপন
করে, তাহাই অবিনাশী তাহাই চিরকাল থাকিবে। এস
আমরা বলিতে থাকি, আমরা সৎস্বরূপ, ব্ৰহ্ম সৎস্বরূপ,
আর আমরাই ব্ৰহ্ম, শিববাহহং শিবােহহং—এই বলিয়া
অগ্রসর হইয়া যাই, চল। জড় আমাদের লক্ষ্য নহে,
যে কোন বস্তুর নামরূপ আছে, তাহাই
নামরূপহীন সত্তার অধীন। শ্রুতি বলেন, ইহাই সনাতন
সত্য। আলােক লইয়া আইস, অন্ধকার আপনি চলিয়া
যাইবে । বেদান্তকেশরী গর্জন করুক, শৃগালগণ
তাহাদের গর্তে পলায়ন করিবে। ভাব চারিদিকে
ছড়াইতে থাক ; ফল যাহা হইবার, হউক। বিভিন্ন
রাসায়নিক পদার্থ একত্রে রাখিয়া দাও; উহাদের মিশ্রণ
আপনা আপনিই হইবে। আত্মার শক্তির বিকাশ কর ;
উহার শক্তি ভারতের সর্বত্র ছড়াইয়া দাও; যাহা কিছু
প্রয়ােজন, তাহা আপনা আপনিই আসিবে।
তােমার আভ্যন্তরিক ব্ৰহ্মভাব পরিস্ফুট কর, সমুদয়ই
উহার চারিদিকে সামঞ্জস্যভাবে বিস্ত হইবে। বেদে
৪২
হিন্দুধৰ্ম্মের সার্বভৌমিকতা
বর্ণিত ইন্দ্ৰবিবােচনসংবাদ (১) স্মরণ কর। উভয়েই
তাহাদের ব্ৰহ্মত্বসম্বন্ধে উপদেশ পাইলেন। কিন্তু অসুর
বিনােচন নিজের দেহকেই ব্ৰহ্ম বলিয়া স্থির করিলেন,
কিন্তু ইন্দ্র নিজেকে দেবতা বলিয়া বুঝিতে পারিলেন,
বাস্তবিক আত্মাকেই ব্ৰহ্ম বলা হইয়াছে। তােমরা
সেই ইন্দ্রের সন্তান ; তমরা সেই দেবগণের বংশধর।
জড় কখন তােমাদের ঈশ্বর হইতে পারে না, দেহ কখন
তােমাদের ঈশ্বর হইতে পারে না।
ভারত আবার উঠিবে, কিন্তু জড়ের শক্তিতে নহে,
চৈতন্যের শক্তিতে, বিনাশের বিজয়পতাকা লইয়া নহে,
শান্তি ও প্রেমের পতাকা লইয়া—সন্ন্যাসীর বেশসহায়ে।
অর্থের শক্তিতে নহে ভিক্ষাপাত্রের শক্তিতে। বলিও
, তােমরা দুর্বল ; বাস্তবিক, সেই আত্মা সর্বশক্তি-
রামকৃষ্ণের শ্রীচরণের দেবম্পর্শে যে ঐ কয়েকটি
মুষ্টিমেয় যুবকদলের অভ্যুদয় হইয়াছে, তাহাদের দিকে
দৃষ্টিপাত কর। তাহারা আসাম হইতে সিন্ধু ও হিমালয়
হইতে কুমারিকা পৰ্যন্ত তাহার উপদেশামৃত প্রচার
করিয়াছেন। তাহারা পদব্রজে ২০,০০০ ফুট উদ্ধবৰ্ত্তী
হিমালয়ের তুষাররাশি অতিক্রম করিয়া তিব্বতের রহস্য
ভেদ করিয়াছেন। তাহারা চীরধারী হইয়া দ্বারে দ্বারে
(১) ছান্দোগ্যোপনিষদের শেষাংশ দেখ।
৪৩
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
ভিক্ষা করিয়াছেন। কত অত্যাচার তাহাদের উপর
দিয়া গিয়াছে—এমন কি, তাহারা পুলিস দ্বারা অনুসৃত
হইয়া কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইয়াছেন, অবশেষে যখন
গভর্ণমেন্ট তাহাদের নির্দোষিতার বিষয়ে বিশেষরূপ
প্রমাণ পাইয়াছেন, তখন তাঁহারা মুক্তি লাভ করিয়াছেন।
এক্ষণে তাহারা বিংশতি জন মাত্র। কালই যেন
এই সংখ্যা দ্বিসহস্রে পরিণত হয়। হে বঙ্গীয় যুবকবৃন্দ,
তােমাদের দেশের জন্য ইহা প্রয়ােজন, সমুদয় জগতের
জন্য ইহা প্রয়ােজন। তােমাদের আভ্যন্তরীণ ব্ৰহ্মশক্তি
জাগরিত কর ; উহা তােমাদিগকে ক্ষুধাতৃষ্ণা শীত উষ্ণ
সমুদয় সহ্য করিতে সমর্থ করিবে। বিলাসপূর্ণ গৃহে
বসিয়া, সর্বপ্রকার সুখসম্ভোগে পরিবেষ্টিত থাকিয়া
একটু সখের ধৰ্ম্ম করা অন্যান্যদেশের পক্ষে শােভা
পাইতে পারে, কিন্তু ভারতের অস্থিমজ্জায় ইহা
হইতে উচ্চতর ভাব জড়িত। সে সহজেই প্রতারণা
ধরিয়া ফেলে। তােমাদিগকে ত্যাগ করিতে হইবে।
মহৎ হও। স্বার্থত্যাগ ব্যতীত কোন মহৎ কাৰ্যই
সাধিত হইতে পারে না। পুরুষ স্বয়ং জগৎসৃষ্টি করিবার
জন্য আপনার স্বার্থত্যাগ করিলেন, আপনাকে বলি
দিলেন। তােমরা সর্বপ্রকার আরাম, সুখস্বচ্ছন্দ, নাম
যশ অথবা পদ, এমন কি, জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়া
হিন্দুধর্মের সার্বভৌমিকতা
মানবরূপ শৃঙ্খলগঠিত এমন একটি সেতু নির্মাণ কর,
যাহার উপর দিয়া লক্ষ লক্ষ লোেক এই জীবনসমুদ্র পার
হইয়া যাইতে পারে।
সর্বপ্রকার মঙ্গলকর শক্তিকে একত্রীভূত কর।
তুমি কোন্ পতাকার নিয়ে থাকিয়া যাত্রা করিতেছ, সে
দিকে লক্ষ্য করিও না। তােমার পতাকা নীল, হরিৎ
বা লােহিত, তাহা গ্রাহ করিও না, কিন্তু সমুদয় রঙ
মিশাইয়া প্রেমরূপ শ্বেতবর্ণের তীব্র জ্যোতির প্রকাশ
কর। আমাদের আবশ্যক-কাৰ্য্য করিয়া যাওয়া—ফল
যাহ, তাহা আপনা আপনি হইবে। যদি কোন সামা-
জিক নিয়ম তােমার ব্রহ্মত্বলাভের প্রতিকূল হয়, তাহা
আত্মার শক্তির সম্মুখে আর টিকিবে না। আমি ভবিষ্যৎ
কি হইবে, তাহা দেখিতে পাইতেছি না, দেখিবার জন্য
আমার আগ্রহও নাই। কিন্তু আমি যেন দিব্যচক্ষে
দেখিতেছি যে, আমাদের সেই প্রাচীনা মাতা আবার
জাগরিত হইয়াছেন, পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক মহামহিমান্বিতা
হইয়া পুনর্বার নবযৌবনশালিনী হইয়া তাহার সিংহাসনে
বসিয়াছেন। শান্তি ও আশীর্বাণী প্রয়ােগ সহকারে
তঁাহার নাম সমগ্র জগতে ঘােষণা কর।
কৰ্ম্ম ও প্রেমে চিরকাল তােমাদেরি
বিবেকানন্দ।
৪৫,
হিন্দুধর্মের ক্রমাভিব্যক্তি ।
“যখনই ধৰ্ম্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুত্থান হয়,
তখনই আমি ধৰ্ম্ম পুনঃ স্থাপনের জন্য আবিভূত হই।
হে মহারাজ, এ কথাগুলি পবিত্র গীতাশাস্ত্রে সেই সনাতন
ভগবানের বাক্য ; এই বাক্য জগতে আধ্যাত্মিক শক্তি
প্রবাহের সনাতন উত্থান পতন নিয়মের মূলমন্ত্রস্বরূপ।
এই সকল পরিবর্তন বার বার নূতন তালে, নূতন
ছন্দে জগতে প্রকাশিত হইতেছে আর যদিও অন্যান্য
মহান্ পরিবর্তনের ন্যায়, তাহাদের কাৰ্যক্ষেত্রের মধ্যগত
প্রত্যেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রতম বস্তুর উপর তাহারা প্রভাব
বিস্তার করিতেছে, তথাপি অনুকূল স্থানেই তাহাদের
কাৰ্যকারিতা অধিক প্রকাশ পায়।
সমষ্টিভাবে যেমন জগতের আদিম অবস্থা ত্রিগুণের
সাম্যভাব, (এই সাম্যভাবের চ্যুতি ও তাহা পুনঃ
প্রাপ্তির জন্য সমুদয় চেষ্টা লইয়াই এই প্রকৃতির বিকাশ
বা ব্ৰহ্মাণ্ড; যতদিন না এই সাম্যাবস্থা পুনরায় আসে,
ততদিন এই ভাবেই চলিতে থাকে। ব্যষ্টিভাবে তেমনি
* রাজপুতানার অন্তর্গত খেতড়ির মহারাজের অভিনন্দনপত্রের
উত্তর (১৮৯৫)।
+:৪৬
v
.
হিন্দুধর্মের মাভিব্যক্তি
আমাদের এই পৃথিবীতে যতদিন মনুষ্যজাতি বৰ্তমান
আকারে থাকিবে, ততদিন এই বৈষম্য ও তাহার নিত্য
সহচর এই সাম্যলাভের চেষ্টা দুই পাশাপাশি বিরাজ
করিবে। তাহাতে সমুদয় পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন জাতির
ভিতর, জাতির উপরিভাগগুলির ভিতর ও এমন কি
প্রত্যেক ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, প্রবল বিশেষত্ব থাকিবে,
যাহাতে একটি হইতে আর একটি পৃথকরূপে জানা
যাইবে।
অতএব নিরপেক্ষভাবে যেন তুলাদণ্ডে পরিমাণ
করিয়া সকলকে সমান শক্তি প্রদত্ত হইলেও প্রত্যেক
জাতিই যেন কোন বিশেষ প্রকার শক্তিসংগ্রহ ও
বিতরণের উপযােগী এক একটি অদ্ভুত যন্ত্রস্বরূপ আর সেই
জাতির অন্যান্য অনেক শক্তি থাকিলেও সেই বিশেষ
শক্তিটিই সেই জাতির বিশেষ লক্ষণরূপে উজ্জ্বলভাবে
প্রকাশ পায়। মনুষ্যপ্রকৃতির কোন বিশেষ ভাবের
বিশেষ বিকাশ ও উদ্দীপনা হইলে, তাহার প্রভাব অল্প
বিস্তর সকলেই অনুভব করিলেও যে জাতির উহা
বিশেষ লক্ষণ এবং সাধারণতঃ যাহাকে কেন্দ্র করিয়াই
উহা উৎপন্ন হয়, তাহা সেই জাতির অন্তরের অন্তস্তল
পর্যন্ত আলােড়িত করে। এই কারণেই ধৰ্ম্মজগতে কোন
আন্দোলন উপস্থিত হইলে, তাহার ফলে ভারতে অবশ্যই
৪৭,
.
•
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
নানাপ্রকার গুরুতর পরিবর্তন হইতে থাকিবে, যে
ভারতরূপ কেন্দ্র হইতে বহুবিস্তৃত ধৰ্ম্মতরঙ্গসমূহ বারম্বার
উথিত হইয়াছে, কারণ, ধৰ্মভূমি বলিয়াই ভারতের
বিশেষত্ব।
প্রত্যেক ব্যক্তি তাহাকেই কেবল সত্য বলে, যাহা
তাহার উদ্দেশ্যসিদ্ধির সহায়তা
করে। সংসারিক
ভাবাপন্ন ব্যক্তিগণের নিকট যাহা কিছুর বিনিময়ে টাকা
হয়, তাহাই সত্য; যাহার বিনিময়ে টাকা হয় না, তাহা
অসত্য। প্রভুত্ব যাহার আকাঙক্ষা, যাহাতে সকলের
উপর প্রভুত্ব করিবার বাসনা চরিতার্থ হয়, তাহার নিকট
তাহাই সত্য, বাকি কিছুই নয়। এইরূপে যাহা কোন
ব্যক্তির জীবনের বিশেষ প্রিয় আকাঙক্ষারূপ হৃদয়ধ্বনির
প্রতিধ্বনি না করে, তাহাতে সে কিছুই দেখিতে পায়
।
যাহাদের একমাত্র লক্ষ্য, জীবনের সমুদয় শক্তির
বিনিময়ে কাঞ্চন, নাম বা অপর কোনরূপ ভােগসুখের
অর্জন, যাহাদের নিকট সমরসজ্জায় সজ্জিত সৈন্যদলের
যুদ্ধযাত্রাই একমাত্র শক্তি বিকাশের লক্ষণ, যাহাদের
নিকট ইন্দ্রিয়সুখই জীবনের একমাত্র সুখ, তাহাদের
নিকট ভারত সর্বদাই একটা প্রকাণ্ড মরুর ন্যায় প্রতীয়-
মান হইবে; তাহারা যাহাকে জীবনের বিকাশ বলিয়া
৪৮
হিন্দুধৰ্ম্মের ক্রমাভিব্যক্তি
বিবেচনা করে, উহার এক বায়ুপ্রবাহই যেন তাহার
পক্ষে মৃত্যুস্বরূপ।
কিন্তু যাঁহাদের জীবনতৃষ্ণা ইন্দ্রিয়জগতের অতি দূরে
অবস্থিত অমৃতনদীর সলিলপানে একেবারে মিটিয়া
গিয়াছে, যাঁহাদের আত্মা সর্পের জীর্ণকমােচনের ন্যায়
কাম, কাঞ্চন ও যশঃস্পৃহারূপ ত্রিবিধ বন্ধনকে দূরে
ত্যাগ করিয়াছে, যাঁহারা চিত্তস্থৈৰ্য্যের উন্নত শিখরে
আরােহণ করিয়া তথা হইতে, ইন্দ্রিয়বন্ধনে আবদ্ধ
ব্যক্তিগণ দ্বারা ‘ভােগ’ নামে নির্দিষ্ট মাকাল ফলের
জন্য নীচজনােচিত কলহ, বিবাদ, দ্বেষহিংসার প্রতি
প্রীতি ও প্রসন্নতার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, যাঁহাদের সঞ্চিত
পূর্ব সৎকর্মের ফলে চক্ষু হইতে অজ্ঞানের আবরণ
খসিয়া পড়িয়াছে, এবং তাহাদিগকে অসার নামরূপ
ভেদ করিয়া প্রকৃত সত্য দর্শনে সমর্থ করিয়াছে, তাহার
যেখানেই থাকুন না কেন, আধ্যাত্মিকতার জননী ও
অনন্তখনি স্বরূপ ভারতবর্ষ তাহাদের নিকট ভিন্নারে—
মহিমময় উজ্জ্বলতর ভাবে—প্রতীত হয়, ছায়াবাজী-
প্রায় জগতে যিনি একমাত্র প্রকৃত সত্তা, তাহার
অনুসন্ধানপরায়ণ প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট উহা আশার
আলােকরূপে প্রতীত হয়।
অধিকাংশ মানবই তখনই শক্তিকে শক্তি বলিয়া
৪
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
বুঝিতে পারে, যখন উহা তাহাদের অনুভবের উপযােগী
হইয়া স্থূল আকারে তাহাদের সম্মুখে প্রকাশ পায়।
তাহাদের নিকট প্রবল সমরােৎসাহ লুণ্ঠনাদিই, খুব
স্পষ্টতঃ প্রত্যক্ষ শক্তির বিকাশ বলিয়া প্রতীত হয়; আর
যাহা কিছু ঝড়ের মত আসিয়া সম্মুখে যাহা কিছু পায়
তাহাকেই উলটিয়া পাটিয়া দেখ না, তাহাই তাহাদের
দৃষ্টিতে মৃত্যুস্বরূপ। সুতরাং শত শত শতাব্দী ধরিয়া
কোনরূপ বাধা দিবার চেষ্টাশূন্য হইয়া বিদেশী বিজেতৃ-
গণের পদতলে পতিত, একতাহীন, স্বদেশহিতৈষণা
লেশশূন্য ভারতবর্ষ তাহাদের নিকট গলিত অস্থিপূর্ণ ভূমি
বলিয়া, প্রাণহীন পচনশীল পদার্থরাশি বলিয়া প্রতীত
হইবে।
কথিত হয় যে, যােগ্যতমই কেবল জীবনসংগ্রামে
জয়ী হইয়া থাকে। তবে সাধারণ ধারণানুসারে যে
জাতি সৰ্ব্বজাতির মধ্যে অযােগ্যতম, সে জাতি দারুণ
জাতীয় দুর্ভাগ্যচক্রে নিষ্পেষিত হইলেও কেন তাহার
বিনাশের কিছুমাত্র চিহ্ন দেখা যাইতেছে না? তথা-
কথিত বীৰ্যশালী ও কর্মপরায়ণ জাতিসমূহের শক্তি
যেমন একদিকে প্রতিদিন কমিয়া আসিতেছে, তেমনি
এদিকে দুর্নীতিপরায়ণ (?) হিন্দুর সর্বাপেক্ষা অধিক
শক্তির বিকাশ হইতেছে, ইহা কিরূপে হয়? যাহারা
হিন্দুধৰ্ম্মের ক্রমাভিব্যক্তি
এক মুহূর্তের মধ্যে জগৎকে শােণিতসাগরে প্লাবিত
করিয়া দিতে পারেন, তাহারা খুব প্রশংসা পাইবার, যােগ্য
বটেন, যাঁহারা জগতের কয়েক লক্ষ লােককে সুখে
স্বচ্ছন্দে রাখিবার জন্য পৃথিবীর অর্ধেক লােককে শুকা-
ইয়া মারিতে পারেন, তাহাদেরও মহৎ গৌরব প্রাপ্য
বটে কিন্তু যাঁহারা অপর কাহারও অন্ন না কাড়িয়া লইয়াই
শত শত লক্ষ লােককে শান্তি ও সুখস্বচ্ছন্দে রাখিতে
পারেন, তাহারা কি কোনরূপ সম্মান পাইবার যােগ্য
নহেন ? শত শত শতাব্দী ধরিয়া অপরের উপর
বিন্দুমাত্র অত্যাচার না করিয়া লক্ষ লক্ষ লােকের অদৃষ্ট
চক্রকে পরিচালনা করাতে কি কোনরূপ শক্তির বিকাশ
লক্ষিত হইতেছে না ?
সকল প্রাচীন জাতির পুরাণেই বীরগণের উপাখ্যানে
দেখা যায়, তাহাদের প্রাণ সঁহাদের শরীরের কোন
বিশেষ ক্ষুদ্র অংশে আবদ্ধ ছিল। যতদিন উহার উপর
হাত পড়ে নাই, ততদিন তাহারা অজেয় ছিলেন।
এইরূপ বােধ হয়, যেন প্রত্যেক জাতিরই এইরূপ বিশেষ
বিশেষ স্থানে জীবনীশক্তি সঞ্চিত আছে ; তাহাতে হাত
পড়িলে কোন দুঃখবিপদেই সেই জাতিকে নাশ
করিতে পারে না।
ধৰ্ম্মই ভারতের এই জীবনীশক্তি। যতদিন না হিন্দু
৩০
হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ জাতি তাহার পূর্বপুরুষগণের নিকট উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান বিস্মৃত হইতেছে, ততদিন জগতে এমন কোন শক্তি নাই, যাহা উহাকে ধ্বংস করিতে পরে। যে ব্যক্তি সর্বদাই স্বজাতির অতীত কার্যকলাপের অলােচনা করে, আজকাল সকলেই তাহাকে নিন্দা করিয়া থাকেন। তাহারা বলেন, এইরূপ ক্রমাগত অতীতের আলােচনাতেই হিন্দুজাতির নানারূপ দুঃখ- দুর্বিপাক ঘটিয়াছে। কিন্তু আমার বােধ হয়, ইহার বিপরীতটিই সত্য যতদিন হিন্দুজাতি তাহার অতীতের গৌরব, অতীতের ইতিহাস ভুলিয়া ছিল, তত দিন উহা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়িয়াছিল। যতই অতীতের আলােচনা হইতেছে, ততই চারিদিকে পুনরুজ্জীবনের লক্ষণ দেখা যাইতেছে। ভবিষ্যৎকে এই অতীতের ছাঁচে ঢালিতে হইবে, অতীতই ভবিষ্যৎ হইবে। এতএব হিন্দুগণ যতই তাহাদের অতীত ইতিহাসের আলােচনা করিবেন, তাঁহাদের ভবিষ্যৎ ততই উজ্জ্বলতর হইবে আর যে কেহ এই অতীতকে প্রত্যেক ব্যক্তির আয়ত্ত করিবার চেষ্টা করিতেছেন, তিনিই স্বজাতির পরম হিতকারী। আমাদের পূর্বপুরুষগণের আচার ও নিয়মগুলি মন্দ ছিল বলিয়া ভারতের অবনতি হয় নাই হিন্দুধর্মের ক্রমাভিব্যক্তি কিন্তু এই অবনতি হইবার কারণ এই যে, ঐগুলির যেরূপ স্যায়তঃ পরিণাম হওয়া উচিত ছিল, তাহা হইতে দেওয়া হয় নাই। ভারতেতিহাসের প্রত্যেক বিচারশীল পাঠকই জানেন, ভারতের সামাজিক বিধানগুলি যুগে যুগে পরিবর্তিত হইয়াছে। প্রথম হইতেই এই নিয়মগুলি কালে ধীরে ধীরে ক্রমাভিব্যঞ্জমান এক বিরাট উদ্দেশ্যের তদানীন্তন সমাজে প্রতিফলনের চেষ্টাস্বরূপ ছিল। প্রাচীন ভারতের ঋষিগণ এত দূরদর্শী ছিলেন যে, জগৎকে তাহাদের জ্ঞানের মহত্ত্ব বুঝিতে এখনও অনেক শতাব্দী অপেক্ষা করিতে হইবে। আর তাহাদের বংশধরগণের, এই মহান্ উদ্দেশ্যের পূর্ণভাব ধারণার অক্ষমতাই ভারতের অবনতির একমাত্র কারণ। প্রাচীন ভারত শত শত শতাব্দী ধরিয়া তাহার সর্ব- প্রধান ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় দুই জাতির—উচ্চাভিলাষপূর্ণ অভিসন্ধি সাধনের যুদ্ধক্ষেত্র ছিল। একদিকে ব্রাহ্মণগণ, সাধারণ প্রজাগণের উপর ক্ষত্রিয়গণের অবৈধ সামাজিক অত্যাচার নিবারণে বদ্ধ পরিকর ছিলেন—এই প্রজাগণকে ক্ষত্রিয়গণ আপনাদের ধৰ্ম্মসঙ্গত খাদ্যরূপে নির্দেশ করিতেন। অপর দিকে, হিন্দুধর্মের নবজাগরণ ক্ষত্রিয়গণই ভারতে একমাত্র শক্তিসম্পন্ন জাতি ছিলেন, যাঁহারা ব্রাহ্মণগণের আধ্যাত্মিক অত্যাচার ও লোেক- গণকে : বন্ধন করিবার জন্য তাহারা যে ক্রমবর্ধমান নূতন নূতন ক্রিয়াকাণ্ড প্রবেশ করাইতেছিলেন, তাহার বিরুদ্ধে চেষ্টা করিয়া কিয়ৎপরিমাণে কৃতকার্য হইয়া- ছিলেন। উভয় জাতির এই সংঘর্ষ অতি প্রাচীন কাল হইতেই আরম্ভ হইয়াছিল। সমুদয় শ্রুতির ভিতরেই ইহা অতি সুস্পষ্টভাবে লক্ষিত হইতে পারে। লক্ষিত হইতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য এই বিবােধ মন্দীভূত হইল, যখন ক্ষত্রিয়দল ও জ্ঞান- কাণ্ডের নেতা শ্রীকৃষ্ণ উভয় দলের সামঞ্জস্য কিরূপে হইতে পারে, দেখাইয়া দিলেন। তাহার ফল গীতার শিক্ষা, যাহা ধৰ্ম্ম, দর্শন ও উদারতার সারস্বরূপ। কিন্তু বিরােধের কারণ তখনও বৰ্তমান ছিল সুতরাং তাহার ফল অবশ্যম্ভাবী। সাধারণ দরিদ্র মূখ প্রজার উপর প্রভুত্ব করিবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূর্বোক্ত দুই জাতিরই বৰ্তমান ছিল সুতরাং আবার প্রবলভাবে বিবােধ জাগিয়া উঠিল। আমরা সেই সময়কার যৎসামান্য সাহিত্য যাহা প্রাপ্ত হই, তাহা সেই প্রাচীনকালের প্রবল বিরােধের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি মাত্র কিন্তু অবশেষে ক্ষত্রিয়ের জয় হইল, জ্ঞানের জয় হইল, স্বাধীনতার জয় হইল আর ৫৪ হিন্দুধর্মের ক্রমাভিব্যক্তি কর্মকাণ্ডের প্রাধান্য রহিল না, কর্মকাণ্ডের অধিকাংশ একেবারে চিরকালের জন্য চলিয়া গেল। এই উত্থানের নাম বৌদ্ধ সংস্কার। ধর্মের দিকে উহাতে কৰ্ম্মকাণ্ড হইতে বিমুক্তি সূচনা করিতেছে আর রাজনীতির দিকে ক্ষত্রিয়গণের দ্বারা ব্রাহ্মণপ্রাধান্য বিনাশ সূচিত হইতেছে। ইহা বিশেষ লক্ষ্য করিবার বিষয় যে, প্রাচীন ভারতে যে সর্বশ্রেষ্ঠ দুইজন ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহারা উভয়েই ক্ষত্রিয় ছিলেন—কৃষ্ণও বুদ্ধ-ইহা আরাে বেশী লক্ষ্য করিবার বিষয় যে, এই দুই অবতারই লিঙ্গ- জাতিবর্ণনির্বিশেষে সকলকেই জ্ঞানের দ্বার খুলিয়া দিয়াছিলেন। বৌদ্ধধর্মের অদ্ভুত নীতিবলসত্বেও উহার অধিকাংশ শক্তিই ধবংসকাৰ্য্যে নিয়ােজিত হওয়াতে উহাকে উহার জন্মভূমিতেই মৃত্যুলাভ করিতে হইল আর উহার যাহা কিছু অবশিষ্ট রহিল, তাহাও, উহা যে সকল কুসংস্কার ও ক্রিয়াকাণ্ড নিবারণে নিয়ােজিত হইয়াছিল, তদপেক্ষা শতগুণ ভয়ানক কুসংস্কার ও ক্রিয়াকাণ্ডে পূর্ণ হইয়া উঠিল। যদিও উহা আংশিক ভাবে বৈদিক পশুবলি নিবারণে কৃতকাৰ্য্য হইয়াছিল, কিন্তু উহা সমুদয় দেশকে মন্দির, প্রতিমা, যন্ত্র ও সাধুগণের অস্থিতে পূর্ণ করিয়া ফেলিল।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ বিশেষতঃ, উহার দ্বারা আৰ্য, মঙ্গোলীয় ও আদিম নিবাসী জাতির যে একটি কিস্তৃত কিমাকার মিশ্রণ হইল, তাহাতে অজ্ঞাতসারে কতকগুলি বীভৎস বামাচার সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হইল । প্রধানতঃ এই কারণেই সেই মহান্ আচার্যের উপদেশাবলীর এই বিকৃত পরিণতিকে শ্রীবুদ্ধ ও তাঁহার সন্ন্যাসিসম্প্রদায়কে ভারত হইতে তাড়াইতে হইয়াছিল। এইরূপে মনুষ্যদেহধারিগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক পরিচালিত সঞ্জীবন শক্তিপ্রবাহও পূতিগন্ধ- ময় রােগবীজপূর্ণ ক্ষুদ্র আবদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হইল এবং ভারতকেও অনেক শতাব্দী ধরিয়া অপেক্ষা করিতে হইল, যতদিন না ভগবান্ শঙ্কর এবং তাহার কিছু পরেই রামানুজ ও মধ্বাচার্যের অভ্যুদয় হইল। ইতিমধ্যে ভারতেতিহাসের এক সম্পূর্ণ নূতন পরিচ্ছেদ আরম্ভ হইয়াছিল। প্রাচীন ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতি অন্তর্হিত হইয়াছিলেন। হিমালয় ও বিন্ধ্যের মধ্যবর্তী আৰ্যভূমি, যাহা কৃষ্ণ ও বুদ্ধকে প্রসব করিয়া ছিল, যাহা মহামান্য রাজর্ষি ও ব্রহ্মর্ষিগণের ক্রীড়াভূমি ছিল, তাহা নীরব রহিল ; আর ভারত উপদ্বীপের সর্ব নিম্নদেশ হইতে, ভাষা ও আকারে সম্পূর্ণ বিভিন্ন জাতি হইতে, প্রাচীন ব্রাহ্মণগণের বংশধর বলিয়া গৌরবকারী
হিন্দুধর্মের ক্রমাভিব্যক্তি
বংশসমূহ হইতে, বিকৃত বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া
আরম্ভ হইল।
আর্যাবর্তের সেই ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়গণ কোথায়
গেলেন ? তাহাদের একেবারে লােপ হইল, কেবল
এখানে ওখানে ব্রাহ্মণত্ব বা ক্ষত্রিয়ত্বাভিমানী কতকগুলি
মিশ্র জাতি রহিল। আর তাঁহাদের ‘এতদ্দেশপ্রসূত
সকাশাদগ্রজম্মনঃ। স্বং স্বং চরিত্রং শিক্ষের পৃথিব্যাং
সর্বমানবাঃ। (মনু)-এই এই দেশ ( ব্ৰহ্মবৰ্ত্ত বা
ব্ৰহ্মর্নিদেশ) প্রসূত ব্রাহ্মণগণের নিকট হইতে পৃথিবীর
সকল মানুয আপন আপন চরিত্র শিক্ষা করিবে, এইরূপ
অহষ্কৃত, আত্মশ্লাঘাময় উক্তি সত্বেও তাহাদিগকে অতি
বিনয়ের সহিত দীনবেশে দাক্ষিণাত্যবাসিগণের পদতলে
বসিয়া শিক্ষা করিতে হইয়াছিল। ইহার ফলস্বরূপ
ভারতে পুনরায় বেদের অভ্যুদয় হইল—বেদান্তের যে
পুনরুত্থান হইল, এরূপ বেদান্তের চর্চা আর কখন হয়
নাই, গৃহস্থেরা পর্যন্ত আরণ্যকপাঠে নিযুক্ত হইলেন।
বৌদ্ধধর্ম প্রচারে ক্ষত্রিয়েরাই প্রকৃত নেতা ছিলেন।
এবং দলে দলে তাহারা বৌদ্ধ হইয়াছিলেন। সংস্কার ও
ধৰ্ম্মান্তরকরণের উৎসাহে সংস্কৃত ভাষা উপেক্ষিত হইয়া
লােক প্রচলিত ভাষাসমূহের চর্চা প্রবল হইয়াছিল।
আর অধিকাংশ ক্ষত্রিয়ই বৈদিক সাহিত্য ও সংস্কৃত
হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ
শিক্ষার বহির্ভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন। সুতরাং
দাক্ষিণাত্য হইতে যে এই সংস্কারতরঙ্গ আসিল, তাহাতে
কিয়ৎপরিমাণে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণগণেরই উপকার হইল ।
কিন্তু ভারতের অবশিষ্ট লক্ষ লক্ষ লােকের পদদেশে
উহা পূৰ্ব হইতেও অধিক শৃঙ্খল পরাইল।
ক্ষত্রিয়গণ চিরকালই ভারতের মেরুদণ্ড স্বরূপ
সুতরাং তাহারাই বিজ্ঞান ও স্বাধীনতার সনাতন রক্ষক।
দেশ হইতে কুসংস্কার তাড়াইবার জন্য চিরকাল তঁাহারা
বজ্রবাণী উচ্চারণ করিয়া গিয়াছেন আর ভারতেতিহাসের
প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত তাহারা ব্রাহ্মণকুলের অত্যাচার
হইতে সাধারণকে রক্ষা করিবার অভেদ্য প্রাচীরস্বরূপ
হইয়া দণ্ডায়মান আছেন।
যখন তাঁহাদের অধিকাংশ ঘাের অজ্ঞানে নিমগ্ন
হইলেন আর অপরাংশ মধ্য এসিয়ার বর্বর জাতির
সহিত শশাণিতসম্বন্ধ স্থাপন করিয়া ভারতে পুরােহিত
গণের অপ্রতিহত শক্তি স্থাপনে তরবারি নিয়ােজিত
করিলেন, তখনই ভারতের পাপের মাত্রা পূর্ণ হইয়া
আসিল আর ভারতভূমি একেবারে ডুবিয়া গেল,কখনও
আর উঠিবেও না, যতদিন না ক্ষত্রিয় নিজে জাগরিত
হইয়া আপনাকে মুক্ত করিয়া অবশিষ্ট জাতিগণের চরণ
শৃঙ্খল উন্মােচন করিয়া দেন। পৌরােহিত্যই ভারতের
৫৮
হিন্দুধৰ্ম্মের ক্রমাভিব্যক্তি
সর্বনাশের মূল। মানুষ নিজ ভ্রাতাকে হীনাবস্থ করিয়া
স্বয়ং কি কখন হীনভাবাপন্ন না হইয়া থাকিতে পারে ?
জানিনে, রাজাজী, আপনার পূর্বপুরুষগণের দ্বারা
আবিষ্কৃত সত্যসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য—এই
ব্রহ্মাণ্ডের একত্ব। কোন ব্যক্তি কি আপনার কিছুমাত্র
অনিষ্ট না করিয়া অপরের অনিষ্ট করিতে পারে। এই
ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়গণের অত্যাচারসমষ্টি চক্রবৃদ্ধির নিয়মে
তাহাদের মস্তকে এই সহস্রবর্ষব্যাপী দাসত্ব ও অবনতি
আনয়ন করিয়াছে তাহারা অনিবাৰ্য কৰ্ম্মফলই ভােগ
করিতেছেন। আপনাদেরই একজন পূৰ্বপুরুষ বলিয়া
ছিলেন, ‘ইহৈব তৈজ্জিত সর্গো যেং সাম্যে স্থিতং
মনঃ। যাহাদের মন সাম্যভাবে অবস্থিত, তাহারা জীব
দশাতেই সংসারজয় করিয়াছেন। তাহাকে লােকে
ভগবানের অবতার বলিয়া বিশ্বাস করিয়া থাকে, আমরা
সকলেই ইহা বিশ্বাস করি। তবে কি তাহার এই বাক্য
অর্থহীন প্রলাপমাত্র? যদি না হয়, আর আমরা জানি
তাহা নয়, তবে জন্ম, লিঙ্গ, এমন কি গুণ পর্যন্ত বিচার
না করিয়া সমুদয় সৃষ্ট জগতের এই সম্পূর্ণ সাম্যের বিরুদ্ধে
যে কোন চেষ্টা, তাহা ভয়ানক ভ্রমপূর্ণ আর যতদিন না
কেহ এই সাম্যজ্ঞান লাভ করিতেছে, ততদিন সে
কখনই মুক্ত হইতে পারে না।
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
অতএব হে রাজ, আপনি বেদান্তের উপদেশাবলী
পালন করুন,—অমুক ভাষ্যকার বা টীকাকারের ব্যাখ্যা-
সারে নহে, আপনার অন্তর্যামী আপনাকে যেরূপ
বুঝাইয়াছেন, সেইরূপ ভাবে। সর্বোপরি এই সর্বভূতে,
সৰ্ববস্তুতে সমজ্ঞানরূপ মহান্ উপদেশ প্রতিপালন করুন
—সৰ্ব্বভূতে সেই এক ভগবান্কে নিরীক্ষণ করুন।
ইহাই মুক্তির পথ ; বৈষম্যই বন্ধনের পথ।
ব্যক্তি বা কোন জাতি বাহ একত্ব জ্ঞান ব্যতীত বাহ
স্বাধীনতা লাভ করিতে পারে না, আর সকলের মানসিক
শক্তির একত্বজ্ঞান ব্যতীত মানসিক স্বাধীনতা লাভ
করিতে পারে না।
অজ্ঞান, ভেদবুদ্ধি ও বাসনা, এই তিনটিই মানব
জাতির দুঃখের কারণ, আর উহাদের মধ্যে একটির
সহিত অপরটির অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ। একজন মানুষের
আপনাকে অপর কোন মানুষ হইতে, এমন কি, পশু
হইতেও শ্রেষ্ঠ ভাবিবার কি অধিকার আছে ? বাস্তবিক
ত সর্বত্রই এক বস্তু বিরাজিত। ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি
ত্বং কুমার উত বা কুমারী,—“তুমি স্ত্রী, তুমি পুরুষ,
তুমি কুমার আবার তুমিই বুমারী।
অনেকে বলিবেন, এরূপ ভাবা সন্ন্যাসীর শােভা
পায়, তাঁহাদের পক্ষে ইহাই ঠিক বটে, কিন্তু আমরা
হিন্দুধৰ্ম্মের ক্রমাভিব্যক্তি
যে গৃহস্থ। অবশ্য গৃহস্থকে অন্যান্য অনেক কর্তব্য করিতে
হয় বলিয়া সে ততটা এই সাম্যভাবে অবস্থিত হইতে
পারে না, কিন্তু তাহাদেরও ইহা আদর্শ হওয়া উচিত।
এই সমত্বভাব লাভ করাই সমুদয় সমাজের, সমুদয়
জীবের ও সমুদয় প্রকৃতির আদর্শ। কিন্তু হায়, লােকে
মনে করে, বৈষম্যই এই সমজ্ঞান লাভের উপায়। এ যেন
অন্যায় কাজ করিয়া ন্যায় পথে পঁহুছানর মত হইল।
ইহাই মনুষ্যপ্রকৃতির ঘাের দুর্বলতা, মনুষ্যজাতির
উপর অভিশাপস্বরূপ, সকল দুঃখের মূলস্বরূপ—এই
বৈষম্য। ইহাই ভৌতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক
সর্ববিধ বন্ধনের মূল।
‘সমং পশন্ হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বর।
ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততাে যাতি পরাং গতিম্ ॥
‘ঈশ্বরকে সর্বত্র সমভাবে অবস্থিত দেখিয়া তিনি
আত্মা দ্বারা আত্মাকে হিংসা করেন না, সুতরাং পরম
গতি লাভ করেন।
এই একটি শ্লোকের দ্বারা, অল্প কথার মধ্যে মুক্তির
সার্বভৌমিক উপায় বলা হইয়াছে।
রাজপুত আপনারা প্রাচীন ভারতের গৌরবস্বরূপ।
আপনাদের অবনতি হইতে আরম্ভ হইলেই জাতীয়
অবনতি আরম্ভ হইল। আর ভারত তাহা হইলেই
৬১
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
কেবল উঠিতে পারে, যদি ক্ষত্রিয়গণের বংশধরগণ
ব্রাহ্মণের বংশধরগণের সহিত সমবেত চেষ্টায় বদ্ধপরিকর
হন, লুণ্ঠিত ঐশ্বৰ্য্য ও ক্ষমতা ভাগ করিয়া লইবার জন্য
নহে, অজ্ঞানগণকে জ্ঞানদানের জন্য ও পূর্বপুরুষগণের
পবিত্র বাসভূমির বিনষ্ট গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য।
আর কে বলিতে পারে, ইহা শুভ মুহূর্ত নহে?
আবার কালচক্র ঘুরিয়া আসিতেছে, পুনর্বার ভারত
হইতে সেই শক্তিপ্রবাহ বাহির হইয়াছে, যাহা অনতি-
দীর্ঘকালমধ্যে নিশ্চয়ই জগতের চরম প্রান্তে পৌছিবে।
এক বাণী উচ্চারিত হইয়াছে, যাহার প্রতিধ্বনি প্রবাহিত
হইয়া চলিয়াছে, প্রতিদিন অধিক হইতে অধিকতর
শক্তিসংগ্রহ করিতেছেন, আর এই বাণী ইহার পূর্ববর্তী
সকল বাণী হইতেই অধিক শক্তিশালী, কারণ, উহা
উহার পূর্ববর্তী বাণীগুলির সমষ্টিস্বরূপ। যে বাণী একদিন
সরস্বতীতীরে ঋষিগণের নিকট প্রকাশিত হইয়াছিল,
যাহার প্রতিধ্বনি নগরাজ হিমালয়ের চূড়ায় চূড়ায়
প্রতিধ্বনিত হইতে হইতে কৃষ্ণ, বুদ্ধ ও চৈতন্যের ভিতর
দিয়া সমতল প্রদেশে নামিয়া দেশ প্লাবিত করিয়া
ফেলিয়াছিল, তাহা আবার উচ্চারিত হইয়াছে। আবার
দ্বার উদঘাটিত হইয়াছে। সকলে আলাের রাজে"
প্রবেশ করার আবার উদঘাটিত হইয়াছে।
৬২
হিন্দুধৰ্ম্মের ক্রমাভিব্যক্তি
আর হে প্রিয় মহারাজ, আপনি সেই জাতির
বংশধর, যাহা সনাতন ধর্মের জীবন্ত অবলম্বনস্তস্বরূপ
এবং ইহার অঙ্গীকারবদ্ধ রক্ষক ও সাহায্যকারী ;
আপনিই কি ইহা হইতে দূরে থাকিবেন ? আমি জানি,
তাহা কখন হইতে পারে না। আমার নিশ্চয় ধারণা,
আপনারই হস্ত আবার প্রথমেই ধৰ্ম্মের সাহায্যার্থ
প্রসারিত হইবে। আর যখনই, হে রাজা অজিৎ সিং,
আমি আপনার সম্বন্ধে চিন্তা করি, যাঁহাতে আপনাদের
বংশের সর্বপরিচিত বৈজ্ঞানিক শিক্ষার সহিত এমন
পবিত্র চরিত্রের (যাহা থাকিলে একজন সাধুও
গৌরবান্বিত হইতে পারেন ), এবং সর্ব মানবে অসীম
প্রেমের যােগ হইয়াছে, যখন এইরূপ ব্যক্তিগণ সনাতন
পুনর্গঠন করিতে ইচ্ছুক, তখন আমি উহার মহা-
গৌরবময় পুনরুদ্ধারে বিশ্বাসী না হইয়া থাকিতে পারি
। চিরকালের জন্য আপনার উপর ও আপনার স্বজন
গণের উপর শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ বর্ষিত হউক আর
আপনি পরের হিত ও সত্য প্রচারের জন্য দীর্ঘকাল
জীবিত থাকুন, ইহাই সর্বদা বিবেকানন্দের প্রার্থনা।
ধৰ্ম্ম
ভারতবন্ধু অধ্যাপক ম্যক্সমুলার
‘ব্ৰহ্মবাদি’ সম্পাদক মহাশয়,
যদিও আমাদের ‘ব্রহ্মবাদিনের পক্ষে কৰ্ম্মের আদর্শ
চিরকালই থাকিবে, ‘কৰ্ম্মণ্যেবাধিকারন্তে মা ফলেষু
কদাচন, ‘কৰ্ম্মেই তােমার অধিকার, ফলে কখনই
নয়,—কিন্তু কোন অকপট কশ্মীরই কর্মক্ষেত্র হইতে
অবসর গ্রহণের পূর্বে এমন একেবারে হয় না যে,
লােকে তাঁহার কিছু না কিছু পরিচয় পায়।
আমাদের কার্য্যের আরম্ভ খুবই মহৎ হইয়াছে আর
আমাদের বন্ধুগণ এ বিষয়ে যে দৃঢ় আন্তরিকতা দেখাইয়া-
ছেন, তাহার শতমুখে প্রশংসা করিলেও পৰ্যাপ্ত বলা
হইল বলিয়া বােধ হয় না। অকপট বিশ্বাস ও সৎ
অভিসন্ধি নিশ্চয়ই জয় লাভ করিবে আর এই দুই অস্ত্রে
সজ্জিত হইয়া অতি অল্পসংখ্যক ব্যক্তিও নিশ্চয়ই সব
বিষ্মকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে।
কপট অলৌকিক জ্ঞানাভিমানিগণ হইতে সর্বদা
দূরে থাকিবে। অলৌকিক জ্ঞান হওয়া যে অসম্ভব,
তাহা নয়, তবে এই জগতে যাহারা এইরূপ জ্ঞানের
দাবী করে, তাহাদের মধ্যে পনের আনার কাম কাঞ্চন
৬৪
ভারতবন্ধু অধ্যাপক ম্যক্সমুলার যশঃস্পৃহারূপ গুপ্ত অভিসন্ধি আছে, আর বাকি এক আনার মধ্যে তিন পাই লােকের অবস্থা ডাক্তার কবি- রাজের বিশেষ আলােচনার বিষয় বটে, কিন্তু দার্শনিক- গণের নহে। আমাদের প্রথম ও প্রধান প্রয়ােজন-চরিত্র গঠন যাহাকে প্রতিষ্ঠিত প্রজ্ঞা বলা যায়। ইহা যেমন প্রত্যেক ব্যক্তির আবশ্যক, ব্যক্তির সমষ্টি সমাজেও তদ্রুপ। জগৎ প্রত্যেক নূতন উদ্যমের উপর, এমন কি, ধৰ্ম্মপ্রচারের নূতন উদ্যমের উপরও সন্দেহের চক্ষে দেখিয়া থাকে বলিয়া বিরক্ত হইও না। তাহাদের অপরাধ কি ? কত বার কত লােকে তাহাদিগকে প্রতারিত করিয়াছে। যতই সংসার কোন নূতন সম্প্রদায়ের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে, অথবা উহার প্রতি কতকটা বৈরিভাবাপন্ন হয়, "উহার পক্ষে ততই মঙ্গল। যদি এই সম্প্রদায়ে প্রচারের উপযুক্ত কোন সত্য থাকে, যদি বাস্তবিক কোন অভাব- মােচনের জন্যই উহার জন্ম হইয়া থাকে, তবে শীঘ্রই নিন্দা প্রশংসায় এবং ঘৃণা প্রীতিতে পরিণত হয়। আজ কাল লােকে প্রায় ধৰ্ম্মকে কোনরূপ সামাজিক বা রাজ- নৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের উপায় স্বরূপে লইয়া থাকে। এ বিষয়ে সাবধান থাকিবে। ধর্মের উদ্দেশ্য ধৰ্ম্ম। যে ধৰ্ম কেবলমাত্র সাংসারিক সুখের উপায় স্বরূপ, তাহা আর হিন্দুধর্মের নবজাগরণ যাহা হউক, ধৰ্ম্ম নহে। আর অবাধে ইন্দ্রিয়-মুখভােগ ব্যতীত মনুষ্য জীবনের অপর কোন উদ্দেশ্য নাই, ইহা বলিলে ধৰ্ম্মের বিরুদ্ধে, ঈশ্বরের বিরুদ্ধে এবং মনুষ- প্রকৃতির বিরুদ্ধে ঘােরতর অপরাধ করা হয়। সত্য, পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থপরতা, যে ব্যক্তিতে এই- গুলি বর্তমান, স্বর্গে, মর্ত্যে, পাতালে এমন কোন শক্তি নাই যে, উহাদের অধিকারীর কোন ক্ষতি করিতে পারে। এইগুলি সম্বল থাকিলে সমুদয় ব্রহ্মাণ্ড বিপক্ষ হইয়া দাড়াইলেও এক ব্যক্তি তাহাদের সম্মুখীন হইতে পারে। সর্বোপরি সাবধান হইতে হইবে, অপর ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের সহিত আপােষ করিতে যাইও না। আমার এ কথা বলিবার ইহা উদ্দেশ্য নহে যে, কাহারও সহিত বিরােধ করিতে হইবে, কিন্তু সুখেই হউক, দুঃখেই হউক, নিজের ভাব সর্বদা ধরিয়া থকিতে হইবে, দল বাড়াই- বার উদ্দেশ্যে তােমার মতগুলিকে অপরের নানারূপ খেয়ালের অনুযায়ী করিতে যাইও না। তােমার আত্মা সমুদয় ব্রহ্মাণ্ডের আশ্রয়, তােমার আবার অপর আশ্রয়ের প্রয়ােজন কি ? সহিষ্ণুতা, প্রীতি ও দৃঢ়তার সহিত অপেক্ষা কর; যদি এখন কোন সাহায্যকারী না পাও, সময়ে পাইবে। তাড়াতাড়ির আবশ্যকতা কি ?
ভারতবন্ধু অধ্যাপক ম্যমূলার মহৎ কাৰ্য্যের আরম্ভের সময় উহার অস্তিত্বই যেন বুঝা যায় না কিন্তু তখনই বাস্তবিক উহাতে যথার্থ কাৰ্যশক্তি সঞ্চিত থাকে। কে ভাবিয়াছিল যে, সুদূর বঙ্গীয় পল্লীগ্রামের একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণতনয়ের জীবন ও উপদেশ—এই কয়েকবর্ষের মধ্যে এমন দূরদেশের লােকে জানিতে পারিবে, যাহার কথা আমাদের পূর্বপুরুষেরা স্বপ্নেও কখন ভাবেন নাই ? অমি ভগবান্ রামকৃষ্ণের কথা বলিতেছি। শুনিয়াছ কি, অধ্যাপক ম্যাক্সমুলার ‘নাইনটী, সেঞ্চুরী’ পত্রিকায় শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে এক প্রবন্ধ লিখিয়াছেন এবং যদি উপযুক্ত উপাদান পান, তবে আনন্দের সহিত তাহার জীবনী ও উপদেশের আরাে বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত একখানি গ্রন্থ লিখিতে প্রস্তুত আছেন ? অধ্যাপক ম্যাসমূলার একজন অসা- ধারণ ব্যক্তি। আমি দিন কয়েক পূর্বে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলাম। প্রকৃত পক্ষে বলা উচিত, আমি তাঁহাকে তাহার প্রতি আমার ভক্তি নিবেদন করিতে গিয়াছিলাম। কারণ, যে কোন ব্যক্তি শ্রীরাম- কৃষ্ণকে ভালবাসেন, তিনি স্ত্রীই হউন, পুরুষই হউন, তিনি যে কোন সম্প্রদায়, মত বা জাতিভুক্ত হউন না কেন, তাঁহাকে দর্শন করিতে যাওয়া আমি তীর্থ যাত্রা ৬৭ হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ তুল্য জ্ঞান করি। “মদ্ভক্তানাঞ্চ যে ভাস্তে মে ভক্তমা মতাঃ,-“আমার ভক্তের যাহারা ভক্ত, তাহারা আমার সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত। ইহা কি সত্য নহে? অধ্যাপক প্রথমে স্বর্গীয় কেশবচন্দ্র সেনের জীবনে হঠাৎ গুরুতর পরিবর্তন কি শক্তিতে হইল, তাহাই অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হন, তাহার পর হইতে রাম- কৃষ্ণের জীবন ও উপদেশের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট হন ও উহাদের চর্চা আরম্ভ করেন। আমি বলিলাম, “অধ্যাপক মহাশয়, আজকাল সহস্র সহস্র লােকে রামকৃষ্ণের পূজা করিতেছে।” অধ্যাপক বলিলেন, “এরূপ ব্যক্তিকে লােকে পূজা করিবে না ত কাহাকে পূজা করিবে ?” অধ্যাপক যেন সহৃদয়তার মূৰ্ত্তিবিশেষ। তিনি ষ্টার্ডি সাহেব ও আমাকে তাঁহার সহিত জলযােগের নিমন্ত্রণ করিলেন এবং আমাদিগকে অক্সফোর্ডের কতকগুলি কলেজ ও ও বােডলিয়ান পুস্তকাগার (Bodleian Library) দেখাইলেন। রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত আমাদিগকে পৌছাইয়া দিয়া আসিলেন, আর আমাদিগকে এত যত্ন কেন করিতেছেন জিজ্ঞাসা করিলে বলিলেন, “রামকৃষ্ণ পরমহংসের একজন শিষ্যের সহিত ত আর প্রত্যহ সাক্ষাৎ হয় না।” এ বাস্তবিক আমি নুন কথা শুনিলাম। সুন্দর উদ্যানসমন্বিত সেই মনােরম ভারতবন্ধু অধ্যাপক ম্যকসমূলার ক্ষুদ্র গৃহ, সপ্ততিবর্ষ বয়ঃক্রম সত্বেও সেই স্থিরপ্রসন্নান, বালসুলভ মসৃণ ললাট, রজতশুভ্র কেশ ঋষি-হৃদয়ের কোন নিভৃত অন্তরালে গভীর আধ্যাত্মিকতার খনির অস্তিত্ব সূচক সেই মুখের প্রত্যেক রেখা, তাহার সমুদয় জীবনের সঙ্গিনী সেই উচ্চাশয়া সহধর্মিণী, ( যে জীবন প্রাচীন ভারতের ঋষিগণের চিন্তারাশির প্রতি সহানুভূতি আকর্ষণ, উহার প্রতি লােকের বিরােধ ও ঘৃণা অপনয়ন এবং অবশেষে শ্রদ্ধা উৎপাদনরূপ দীর্ঘকালব্যাপী কঠোর কার্যে ব্যাপৃত ছিল) তঁাহার সেই উদ্যানের তরুরাজি, পুষ্পনিচয়, তথাকার নিস্তব্ধ ভাব ও নিৰ্ম্মল আকাশ এই সমুদয় মিলিয়া কল্পনায় আমায় প্রাচীন ভারতের সেই গৌরবের যুগে লইয়া গেল ; যখন ভারতে ব্ৰহ্মর্ষি ও রাজর্ষিগণের, উচ্চাশয় বানপ্রন্থি- গণের, অরুন্ধতী ও বশিষ্ঠগণের নিবাস ছিল। অমি তাহাকে ভাষাতত্ত্ববিৎ বা পণ্ডিতরূপে দেখিলাম , দেখিলাম যেন কোন আত্মা দিন দিন ব্রহ্মের সহিত আপন একত্ব অনুভব করিতেছেন, যেন কোন হৃদয় অনন্তের সহিত এক হইবার জন্য প্রতি মুহূর্তে প্রসারিত হইতেছে। যেখানে অপরে শুষ্ক অপ্রয়ােজনীয় তত্ত্ব- সমূহের বিচাররূপ মরুতে দিশাহারা হইয়াছে, সেখানে তিনি এক অমৃত কূপ খনন করিয়াছেন। তাহার ৬৯
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
হৃদয়ধ্বনি যেন উপনিষদের সেই সুরে সেই তালে
ধ্বনিত হইতেছে, “তমেবৈকং জানথ আত্মানম্ অধ্যা বাচো
বিমুঞ্চথ,”—সেই এক আত্মাকে জান, অন্য বাক্য ত্যাগ
কর।”
যদিও তিনি একজন ব্রহ্মাণ্ড আলােড়নকারী পণ্ডিত
ও দার্শনিক, তথাপি তাহার পাণ্ডিত্য ও দর্শন তাহাকে
ক্রমশঃ উচ্চ হইতে উচ্চে লইয়া গিয়া আত্মসাক্ষাৎকারে
সমর্থ করিয়াছে, তাহার অপরা বিদ্যা বাস্তবিকই তাহাকে
পরাবিদ্যা লাভে সহায়তা করিয়াছেন। ইহাই প্রকৃত
বিদ্যা। বিদ্যা দদাতি বিনয়ং। জ্ঞান যদি আমাদিগকে
সেই পরাৎপরের নিকট না লইয়া যায়, তবে জ্ঞানের
আবশ্যকতা কি ?
আর ভারতের উপর তাহার কি অনুরাগ! যদি
আমার তাহার শতাংশের একাংশও থাকিত, তাহা হইলে
অমি ধন্য হইতাম। এই অসাধারণ মনস্বী পঞ্চাশ বা
তততাধিক বৎসর ধরিয়া ভারতীয় চিন্তারাজ্যে বসবাস
ও বিচরণ করিয়াছেন; পরম আগ্রহ ও
ভালবাসার সহিত সংস্কৃত সাহিত্যরূপ অনন্ত অরণ্যের
আলাে ও ছায়ার বিনিময় পৰ্যবেক্ষণ করিয়াছেন, শেষে
ঐ সমুদয় তঁাহার হৃদয়ে বসিয়া গিয়াছে এবং তাহার
সর্বাঙ্গে উহার রঙ ধরাইয়া দিয়াছে।
হৃদয়ের
৭০
ভারতবন্ধু অধ্যাপক ম্যসমূলার ম্যাক্সমুলার একজন একজন ঘাের বৈদান্তিক। তিনি বাস্তবিক বেদান্তের সুর বেসুর ভিন্ন ভিন্ন ভাবের ভিতর উহার প্রকৃত তানকে ধরিয়াছেন। বাস্তবিক পক্ষে, বেদান্ত সেই একমাত্র আলােক, যাহা পৃথিবীর সকল সম্প্রদায় ও মতকে আলােকিত করিতেছে, উহা সেই এক তত্ত্ব, সমুদয় ধৰ্ম্মই যাহার কার্যে পরিণতি মাত্র। আর রামকৃষ্ণ পরমহংস কি ছিলেন ? তিনি এই প্রাচীন তত্ত্বের প্রত্যক্ষ উদাহরণ, প্রাচীন ভারতের সাকার অবয়ব- স্বরূপ ও ভবিষ্যৎ ভারতের পূর্বাভাসস্বরূপ—সকল জাতির নিকট আধ্যাত্মিক আলােকবাহকস্বরূপ। চলিত কথায় আছে, জহুরীই জহর চেনে। তাই বলি, ইহা কি বিস্ময়ের বিষয় যে, এই পাশ্চাত্য ঋষি ভারতীয় চিন্তাগগনে কোন নূতন নক্ষত্রের উদয় হইলেই, ভারত- বাসিগণ উহার মহত্ত্ব বুঝিবার পূর্বেই উহার প্রতি আকৃষ্ট হন ও উহার বিষয়ে বিশেষ আলােচনা করেন ? আমি তাঁহাকে বলিয়াছিলাম, “আপনি কবে ভারতে আসিতেছেন ? ভারতবাসীর পূর্বপুরুষগণের চিন্তারাশি আপনি যথার্থ ভাবে লােকের সমক্ষে প্রকাশ করিয়াছেন, সুতরাং তথাকার সকলেই আপনার শুভাগমনে আনন্দিত হইবে।” বৃদ্ধ ঋষির মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, তাহার নয়নে এক বিন্দু অশ্রু নির্গতপ্রায় হইল—মৃদুভাবে শির ৭১ হিন্দুধর্মের নবজাগরণ সঞ্চালিত হইলধীরে ধীরে এই বাক্যগুলি বাহির হইল, “তাহা হইলে আমি আর ফিরিব না; তােমাদের আমাকে সেখানে দাহ করিতে হইবে।” আর অধিক প্রশ্ন মানব-হৃদয়ের পবিত্র রহস্যপূর্ণ রাজ্যে অনধিকার- প্রবেশের ন্যায় বােধ হইল। কে জানে, হয় ত কবি যাহা বলিয়াছিলেন, এ তাই- “তচ্চেতসা স্মরতি নূনমবােধপূৰ্বম্। ভাবস্থিরানি জননান্তরসৌহৃদ্যানি।” ‘তিনি নিশ্চয়ই অজ্ঞাতভাবে হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে নিবদ্ধ পূর্বব-জন্মের বন্ধুত্বের কথা ভাবিতেছেন। তাহার জীবন জগতের পক্ষে পরম মঙ্গলস্বরূপ হইয়াছে। ঈশ্বর করুন, যেন বৰ্তমান শরীর ত্যাগ করিবার পূর্বে তাহার বহু বহু বর্ষ যায়। ইতি ৬৩, সেন্ট জর্জের রাস্তা, আপনার ইত্যাদি লণ্ডন, দক্ষিণ-পশ্চিম, বিবেকানন্দ। ৬ই জুন, ১৮৯৬। ৭২ ডাঃ পল ডয়সেন। # দশবর্ষের অধিক অতীত হইল, কোন অনতিস্বচ্ছলা- বস্থাপন্ন পাদরির আটটি সন্তানের অন্যতম জনৈক অল্প- বয়স্ক জাৰ্ম্মন ছাত্র একদিন অধ্যাপক ল্যাসেনকে একটি নূতন ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে—ইউরােপীয় পণ্ডিতবর্গের পক্ষে তখনকার কালেও সম্পূর্ণ নূতন ভাষা ও সাহিত্য অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষা সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে শুনিল। এই বক্তৃতাগুলি শুনিতে অবশ্য পয়সা লাগিত না, কারণ, এমন কি, এখন পর্যন্তও কোন ব্যক্তির পক্ষে কোন ইউ- রােপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিখাইয়া অর্থোপার্জন করা অসম্ভব—অবশ্য যদি বিশ্ববিদ্যালয় তাহার পৃষ্ঠ- পােষকতা করেন তবে স্বতন্ত্র কথা। অধ্যাপক ল্যাসেন জাৰ্ম্মনির সংস্কৃত বিদ্যা আলােচনা- কারিগণের অগ্রণীবর্গের—সেই বীরহৃদয় জাৰ্ম্মন পণ্ডিত দলের একরূপ শেষ প্রতিনিধি। এই পণ্ডিতকুল বাস্ত- বিকই বীরপুরুষ ছিলেন—কারণ, বিদ্যার প্রতি পবিত্র ও নিঃস্বার্থ প্রেম ব্যতীত তখন জাৰ্ম্মন বিদ্বদ্বর্গের ভারতীয় সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণের অন্য কি কারণ বিদ্যমান , ব্ৰহ্মবাদিন্ সম্পাদককে লিখিত (১৮৯৬) হিন্দুধর্মের নবজাগরণ ছিল? সেই বহুদশী অধ্যাপক শকুন্তলার একটি অধ্যায় ব্যাখ্যা করিতেছিলেন। আর সেদিন আমাদের এই যুবক ছাত্রটি যেরূপ আগ্রহ ও মনোেযােগের সহিত ল্যাসনের ব্যাখ্যা শুনিতেছিল, এরূপ আগ্রহবান্ শ্রোতা আর কেহই তথায় উপস্থিত ছিল না। ব্যাখ্যাত বিষয়টি অবশ্য অতিশয় হৃদয়গ্রাহী ও অদ্ভুত বােধ হইতেছিল, কিন্তু সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত সেই অপরিচিত ভাষা—উহার অপরিচিত শব্দ- গুলি—অনভ্যস্ত ইউরােপীয় মুখ হইতে উচ্চারিত হইলে উহার ব্যঞ্জনবর্ণগুলি যেরূপ কিম্ভুতকিমাকার মূর্তি ধারণ করে, তদ্রুপভাবে উচ্চারিত হইলেও—তাহাকে অদ্ভুত- ভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করিয়াছিল। সে নিজ বাসস্থানে ফিরিল, কিন্তু সে রাত্রির নিদ্রায় সে যাহা শুনিয়াছিল, তাহা ভুলাইতে পারিল না। সে যেন এতদিনের অজ্ঞাত অচেনা দেশের চকিত দর্শন পাইল, এদেশ যেন তাহার দৃষ্ট অন্য সমুদয় দেশ অপেক্ষা বর্ণখেলায় অধিক সমুজ্জ্বল, উহার যেমন মােহিনীশক্তি, এই উদ্দাম যুবক-হৃদয় আর কখনও তদ্রুপ অনুভব করে নাই। তাহার বন্ধুবর্গ স্বভাবতই সাগ্রহে আশা করিতে- ছিলেন যে, কবে এই যুবকের স্বাভাবিক প্রবল শক্তি- গুলি সুপরিস্ফুট হইবে—তাহারা সাগ্রহে সেই দিনের প্রতীক্ষায় ছিলেন, যে দিন সে কোন উচ্চ অধ্যাপক- ৭৪ ডাঃ পল জয়সেন পদে নিযুক্ত হইয়া সাধারণের শ্রদ্ধা ও সম্মানভাজন হইবে, সর্বোপরি উচ্চ বেতন ও পদমর্যাদার ভাগী হইবে। কিন্তু কোথা হইতে মাঝে এই সংস্কৃত আসিয়া জুটিল ! অধিকাংশ ইউরােপীয় পণ্ডিত তখন ইহার নামও শুনেন নাই—আর উহাতে পয়সা হইবে? আমি পূর্বেই বলিয়াছি, সংস্কৃত ভাষায় পণ্ডিত হইয়া অর্থোপার্জন পাশ্চাত্য দেশে এখন অসম্ভব ব্যাপার। তথাপি আমা- দের আলােচ্য যুবকটির সংস্কৃত শিখিবার আগ্রহ অতি প্রবল হইল। দুঃখের বিষয়, আধুনিক ভারতীয় আমাদের পক্ষে বিদ্যার জন্য বিদ্যা শিক্ষার আগ্রহটা কিরূপ ব্যাপার, তাহা বুঝাই কঠিন হইয়া দাড়াইয়াছে। তথাপি আমরা এখনও নবদ্বীপ, বারাণসী এবং ভারতের অন্যান্য কোন কোন স্থানেও পণ্ডিতগণের ভিতর, বিশেষ সন্ন্যাসীদের ভিতর বয়স্ক ও যুবক উভয় শ্রেণীর লােকেরই সাক্ষাৎকার লাভ করি, যাহারা বিদ্যার জন্য বিদ্যা জ্ঞানের জন্য জ্ঞানলাভের এইরূপ তৃষ্ণায় উন্মত্ত। আধুনিক ইউরােপীয় ভাবাপন্ন হিন্দুর বিলাসােপকরণশূন্য, তাহাদের অপেক্ষা সহস্রগুণে অধ্যয়নের অল্প সুযােগ- বিশিষ্ট রাতের পর রাত তৈল প্রদীপের ক্ষীণ আলােকে হস্তলিপি পুথির প্রতি নিবদ্ধদৃষ্টি, (যাহাতে অন্য কোন জাতির, ছাত্রের চক্ষুর দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হিন্দুধর্মের নবজাগরণ হইতে পারিত ) কোন দুর্লভ হস্তলিপি পুথি বা বিখ্যাত অধ্যাপকের অনুসন্ধানে শত শত ক্রোশ ভিক্ষামাত্রোপ- জীবী হইয়া পদব্রজে ভ্রমণকারী, বৎসরের পর বৎসর যতদিন না কেশ শুভ্র হইতেছে ও বয়সের ভারে শরীর অক্ষম হইয়া পড়িতেছে—নিজ পঠিতব্য বিষয়ে অদ্ভুত- ভাবে দেহমনের সমুদয় শক্তি প্রয়ােগপরায়ণ—এরূপ ছাত্র ঈশ্বরকৃপায় এদেশ হইতে এখনও একেবারে লুপ্ত হয় নাই। এখন ভারত যাহাকে নিজ মূল্যবান্ সম্পত্তি বলিয়া গৌরব করিয়া থাকে, তাহা নিশ্চিতই অতীত কালে তাহার উপযুক্ত সন্তানগণের এতাদৃশ পরিশ্রমের ফলস্বরূপ আর ভারতীয় প্রাচীন যুগের পণ্ডিতগণের পাণ্ডিত্যের গভীরতা ও সারত্ব এবং উহার স্বার্থগন্ধহীনতা ও উদ্দেশ্যের—ঐকান্তিকতার সহিত আধুনিক ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষায় যে ফললাভ হইতেছে তাহার তুলনা করিলেই আমার উপরােক্ত মন্তব্যের সত্যতা প্রতীয়মান হইবে। যদি ভারতবাসিগণ তাহাদের ঐতিহাসিক অতীতযুগের মত অন্যান্য জাতির মধ্যে নিজ পদগৌরব প্রতিষ্ঠিত করিয়া আবার উঠিতে চায়, তবে আমাদের দেশবাসিগণের জীবনে যথার্থ পাণ্ডিত্যের স্বার্থহীন অকপট উৎসাহ ও খাটি অকপট চিন্তাশক্তি আবার প্রবলভাবে জাগরিত হওয়া
ডাঃ পল ডয়সেন
অবশ্য
আবশ্যক। এইরূপ জ্ঞানস্পৃহাই জাৰ্ম্মনিকে তাহার বর্তমান
পদবীতেজগতের সমুদয় জাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ না
হউক, শ্রেষ্ঠগণের অন্যতম পদবীতে-উন্নীত করিয়াছে।
এক্ষণে যাহা বলিতেছিলাম—এই জাৰ্ম্মন ছাত্রের
হৃদয়ে সংস্কৃতশিক্ষার বাসনা প্রবল হইয়াছিল।
এই সংস্কৃতশিক্ষা করিতে দীর্ঘকাল ধরিয়া অধ্যবসায়
সহকারে পাহাড় চড়াইএর মত কঠোর পরিশ্রম করিতে
হয়। আর এই পাশ্চাত্য বিদ্যার্থীর ইতিহাসও অন্যান্য
সফলকাম বিদ্যার্থিগণের জগৎপ্রসিদ্ধ ইতিহাসের মত
তাহাদের ন্যায় এই যুবকও কঠোর পরিশ্রম করিয়া
অনেক দুঃখকষ্ট ভােগ করিয়া অদম্য উৎসাহের সহিত
নিজব্রতে দৃঢ়ভাবে লাগিয়া থাকিয়া পরিণামে বাস্তবিকই
যথার্থ বীরজননাচিত সাফল্যের গৌরবমুকুটে ভূষিত
হইল।
আর এখন শুধু ইউরােপ নহে, সমগ্র ভারতই
এই কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনধ্যাপক পল ডয়সেন
নামক ব্যক্তিকে জানে। আমি আমেরিকা ও ইউরােপে
অনেক সংস্কৃত শাস্ত্রের অধ্যাপক দেখিয়াছি—তাঁহাদের
মধ্যে অনেকে বৈদান্তিক ভাবের প্রতি অতিশয় সহানু-
ভূতিসম্পন্ন। আমি তাঁহাদের মনীষায় ও নিঃস্বার্থ কার্য্যের
উৎসর্গীকৃত জীবন দেখিয়া মুগ্ধ। কিন্তু পল ডয়সেন
(অথবা ইনি যেমন সংস্কৃতে নিজে দেবসেনা বলিয়া
৭৭
হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ অভিহিত হইতে পছন্দ করেন। এবং বৃদ্ধ ম্যাক্স- মূলারকে আমার ভারতের ও ভারতীয় চিন্তাপ্রণালীর সর্বাপেক্ষা অকৃত্রিম বন্ধু বলিয়া ধারণা হইয়াছে। কিল নগরে এই উৎসাহী বৈদান্তিকের নিকট আমার প্রথম যাত্রা, তাহার ভারতভ্রমণের সঙ্গিনী মধুরপ্রকৃতি সহ- ধর্মিণী ও তাহার হৃদয়ানদায়িনী বালিকা কন্যা, জার্মানি ও হল্যাণ্ডের মধ্য দিয়া আমাদের একত্রে লণ্ডনযাত্রা এবং লণ্ডনে ও উহার আশেপাশে আমাদের আনন্দজনক মিলনসমুহ-আমার জীবনের অন্যান্য মধুময় স্মৃতির সহিত উহাদের অন্যতম অংশরূপে চিরকাল হৃদয়ে গ্রথিত থাকিবে। ইউরােপের প্রথম যুগের সংস্কৃতজ্ঞগণের সংস্কৃতচর্চার ভিতর সমালােচনাশক্তি অপেক্ষা কল্পনাশক্তি অধিক ছিল। তাহারা জানিতেন অল্প, সেই অল্প জ্ঞান হইতে আশা করিতেন অনেক, আর অনেক সময় তাঁহারা অল্প- স্বল্প যাহা জানিতেন, তাহা লইয়াই বাড়াবাড়ি করিবার চেষ্টা করিতেন। আবার, সেই কালেও শকুন্তলাকে ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের চরম সিদ্ধান্ত বলিয়া মনে করা রূপ পাগলামীও একেবারে অজ্ঞাত ছিল না। ইহাদের পরেই স্বভাবতঃই একদল স্থূলদর্শী সমালােচক সম্প্র- দায়ের অভ্যুদয় হইল—তাহাদিগকে প্রকৃত পণ্ডিতপদ- ৭৮
ডাঃ পল ডয়সেন
বাচ্যই বলা যাইতে পারে না—প্রথমােক্ত দলের প্রতি-
ক্রিয়া স্বরূপেই ইহাদের অ্যুদয়।
ইহারা সংস্কৃতের কিছু
জানিতেন না বলিলেই হয়ত সংস্কৃত চর্চা হইতে কোনরূপ
ফললাভের আশা করিতেন না, বরং প্রাচ্যদেশীয় যাহা
কিছু সমুদয় লইয়াই উপহাস করিতেন। প্রথমােক্ত
দলের—যাঁহারা ভারতীয় সাহিত্যে কল্পনার চক্ষে কেবল
নন্দনকাননই দর্শন করিতেন তাহাদের বৃথা কল্পনা-
প্রিয়তার ইহারা কঠোর সমালােচনা করিলেন বটে,
কিন্তু ইহারা নিজেরা আবার এমন সকল সিদ্ধান্ত করিতে
লাগিলেন যে, বেশী কিছু না বলিলেও উহাদিগকেও
প্রথমােক্ত দলের সিদ্ধান্তের মতই বিশেষ অসমীচীন
ও অতিশয় দুঃসাহসিক বলা যাইতে পারে। আর এ
বিষয়ে তাঁহাদের সাহস স্বভাবতঃই বাড়িয়া যাইবার
কারণ এই যে, এই ভারতীয় ভাবের প্রতি সহানুভূতি
লেশশূন্য ও না ভাবিয়া চিন্তিয়া হঠাৎ সিদ্ধান্তকারী
পণ্ডিত ও সমালােচকগণ এমন শ্রোতৃবর্গের নিকট
তাহাদের বক্তব্য বিষয়গুলি বলিতেছিলেন, যাঁহাদের ঐ
বিষয়ে কোনরূপ মতামত দিবার অধিকার ছিল কেবল
তাহাদের সংস্কৃত ভাষাসম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা। এইরূপ
সমালােচক পণ্ডিতগণের নিকট হইতে নানারূপ বিরুদ্ধ
সিদ্ধান্ত প্রসূত হইবে, তাহাতে বিস্ময়ের বিষয় আর
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ কি আছে ? হঠাৎ হিন্দু বেচারা একদিন প্রাতঃকালে জাগিয়া দেখিল, যাহা তাহার ছিল, তাহার কিছুই নাই —এক অপরিচিত জাতি তাহার নিকট হইতে তাহার শিল্প কাড়িয়া লইয়াছে, আর একজন তাহার স্থাপত্য বিদ্যা কাড়িয়া লইয়াছে, আর এক তৃতীয় জাতি তাহার প্রাচীন বিজ্ঞান সমুদয় কাড়িয়া লইয়াছে, এমন কি, তাহার ধৰ্ম্মও তাহার নিজের নহে, উহাও পহলবজাতীয় প্রস্তরখণ্ডের অঙ্গে ভারতে আসিয়াছে! এইরূপ মৌলিক- গবেষণাপরম্পরারূপ উত্তেজনাপূর্ণ যুগের পর এখন অপেক্ষাকৃত ভাল সময় আসিয়াছে। এখন লােকে বুঝিয়াছে, বাস্তবিক কিছু সংস্কৃত গ্রন্থের সহিত কতকটা সাক্ষাৎ পরিচয় ও আলােচনাজনিত পাকা জ্ঞানের মূলধন না লইয়া কেবল হঠকারিতা সহকারে আন্দাজি কতকগুলি যা তা সিদ্ধান্ত করিয়া বসা, প্রাচ্যতত্ত্বগবেষণা ব্যাপারেও হাস্যোদ্দীপক অসাফল্যই প্রসব করে আর ভারতে যে সকল কিম্বদন্তি, বহুকাল হইতে প্রচলিত আছে, সেগুলিকেও সদম্ভ অবজ্ঞাসহকারে উড়াইয়া দিলে চলিবে না। কারণ, উহাদের মধ্যে এমন অনেক জিনিষ আছে, যাহা লােকে স্বপ্নেও ভাবিতে পারে না। সুখের বিষয়, ইউরােপে আজকাল একদল নূতন ধরণের সংস্কৃত পণ্ডিতের অভ্যুদয় হইতেছে—শ্রদ্ধাবান ৮০ ডাঃ পল ডয়সেন সহানুভূতিসম্পন্ন ও যথার্থ পণ্ডিত। ইহারা শ্রদ্ধাবান্, কারণ, ইহারা অপেক্ষাকৃত উচ্চদরের লােক আর সহানু- ভূতিসম্পন্ন, কারণ, ইহারা বিদ্বান্। আর আমাদের ম্যাক্সমুলারই প্রাচীনদল রূপ শৃঙ্খলের সহিত নূতন দলের সংযােগগ্রন্থিস্বরূপ। হিন্দু আমরা পাশ্চাত্যদেশীয় অন্যান্য সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের অপেক্ষা অবশ্য ইহারই নিকট অধিক ঋণী, আর তিনি যৌবনাবস্থায় তদবস্থােচিত উৎ- সাহের সহিত যে সুবৃহৎ কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়া বৃদ্ধাবস্থায় সাফল্যে পরিণত করিয়াছিলেন, তাহার কথা ভাবিতে গেলে আমার বিস্ময়ের অবাধ থাকে না। ইহার সম্বন্ধে একবার ভাবিয়া দেখ—হিন্দুদের চক্ষেও অস্পষ্ট লেখা প্রাচীন হস্তলিপি পুথি লইয়া দিনরাত ঘটিতেছেন— উহা আবার এমন ভাষায় রচিত, যাহা ভারতবাসীর পক্ষে আয়ত্ত করিতেও সারাজীবন লাগিয়া যায়; এমন কোন অভাবগ্রস্ত পণ্ডিতের সাহায্যও পান নাই, যাঁহাকে মাসে মাসে কিছু দিলে তাহার মাথাটা কিনিয়া লইতে পারা যায় ; আর ‘অতি নূতন গবেষণাপূর্ণ’ কোন পুস্তকের ভূমিকায় যাহার নামটির উল্লেখ মাত্র করিলে বইখানির কদর বাড়িয়া যায়। এই ব্যক্তির কথা ভাবিয়া দেখ— সময়ে সময়ে সায়ন ভাষ্যের অন্তর্গত কোন শব্দ বা বাক্যের যথার্থ পাঠোদ্ধারে ও অর্থ আবিষ্কারে দিনের পর দিন ৮১
হিন্দুধর্মের নবজাগরণ
ও কখনও কখনও মাসের পর মাস কাটাইয়া দিতেছেন
{ তিনি আমাকে স্বয়ং এই কথা বলিয়াছেন), এবং
এই দীর্ঘকালব্যাপী অধ্যবসায়ের ফলে পরিশেষে বৈদিক
সাহিত্যরূপ জঙ্গলের মধ্য দিয়া অপরের পক্ষে চলি-
বার জন্য সহজ রাস্তা প্রস্তুত করিয়া দিতে কৃতকাৰ্য্য
হইয়াছেন। এই ব্যক্তি ও তাহার কাৰ্য্য সম্বন্ধে ভাবিয়া
দেখ, তার পর বল, তিনি আমাদের জন্য বাস্তবিকই
কি করিয়াছেন। অবশ্য তিনি তাহার বহু রচনার মধ্যে
যাহা কিছু বলিয়াছেন, আমরা সেই সকলের সহিত
সকলে একমত না হইতে পারি, এইরূপ সম্পূর্ণ একমত
হওয়া অবশ্যই অসম্ভব। কিন্তু ঐক্যমত হউক বা নাই
হউক, এ সত্যটিকে কখন অপলাপ করা যাইতে পারে
যে, আমাদের পূর্ব পুরুষগণের সাহিত্য রক্ষা, উহার
বিস্তার এবং উহার প্রতি শ্রদ্ধা উৎপাদনের জন্য আমাদের
মধ্যে যে কেহ যতদূর করিবার আশা করিতে পারি, এই
এক ব্যক্তি তাহার সহস্রগুণ অধিক করিয়াছেন, আর
তিনি এই কাৰ্য্য অতিশয় শ্রদ্ধা ও প্রেমপূর্ণ অন্তরের
সহিত করিয়াছেন।
যদি ম্যাক্সমুলারকে এই নূতন আন্দোলনের
প্রাচীন অগ্রদূত বলা যায়, তবে ডয়সেন নিশ্চিতই উহার
একজন নবীন নেতৃপদবাচ্য, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই।
৮২
re
ডাঃ পল ডয়সেন আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রখানিতে , যে সকল ভাব ও আধ্যাত্মিকতার অমূল্য রত্নসমূহ নিহিত আছে, ভাষা- তত্ত্বের আলােচনার আগ্রহ অনেক দিন ধরিয়া তাহা- দিগকে আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে রাখিয়াছিল। ম্যাক্সমুলার তাহাদের কয়েকটিকে সম্মুখে আনিয়া সাধারণের দৃষ্টিগােচর করিলেন এবং শ্রেষ্ঠতম ভাষা- তত্ত্ববিৎ বলিয়া তাহার কথার যে প্রামাণ্য, তদ্বলে তিনি উহাতে সাধারণের মনোেযােগ বলপূর্বক আকর্ষণ করি- লেন। ডয়সেনের ভাষা-তত্ত্ব আলােচনার দিকে আগ্রহ- রূপ কোন ঝোক ছিল না। বরং তিনি দার্শনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত ছিলেন—তাহার প্রাচীন গ্রীস ও বৰ্ত্তমান জাৰ্মান তত্ত্বালােচনাপ্রণালী ও সিদ্ধান্তসমূহ বিশেষ জানা ছিল—তিনি ম্যাক্সমুলারের ধুয়া ধরিয়া আত সাহসের সহিত উপনিষদের গভীর দার্শনিক তত্ত্বসাগরে ডুব দিলেন, দেখিলেন, উহাতে কোন গলদ নাই বরং উহা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়ের দাবি সম্পূর্ণ চরিতার্থ করে—তখন তিনি আবার তদ্রুপ সাহসের সহিত তদ্বিষয় সমগ্র জগতের সমক্ষে ঘােষণা করিলেন। পাশ্চাত্য পণ্ডিতবর্গের মধ্যে একমাত্র ডয়সেই বেদান্তসম্বন্ধে তাহার মত খুব স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন। অধিকাংশ পণ্ডিত যেমন অপরে কি বলিৰে হিন্দুধৰ্ম্মের নবজাগরণ এই ভয়ে জড়সড়, ডয়সেন তপ কখনও অপরের মতামতের অপেক্ষা রাখেন নাই। বাস্তবিক এই জগতে এমন সাহসী লােকের আবশ্যক হইয়াছে, যাঁহারা সাহ- সের সহিত প্রকৃত সত্যসম্বন্ধে তাহাদের মতামত প্রকাশ করিতে পারেন। ইউরােপসম্বন্ধে একথা আবার বিশেষ ভাবে সত্য—তথাকার পণ্ডিতবর্গ এমন সকল বিভিন্ন ধর্মমত ও আচার ব্যবহারের কোনরূপে সমর্থন ও তাহাদের দোষভাগ চাপা দিবার চেষ্টা করিতেছেন, যেগুলিতে সম্ভবতঃ তাহাদের অনেকে যথার্থভাবে বিশ্বাসী নহেন। সুতরাং ম্যাক্সমুলার ও ডয়সেনের এইরূপ সাহসের সহিত খােলাখুলিভাবে সত্যের সমর্থনের জন্য বাস্তবিক তাহারা বিশেষরূপ প্রশংসার ভাগী। প্রার্থনা করি, তঁাহারা আমাদের শাস্ত্রসমুহের গুণভাগ প্রদর্শনে যেরূপ সাহসের পরিচয় দিয়াছেন, তক্রপ সাহসের সহিত উহার দোষভাগ—পরবর্তিকালে ভারতীয় চিন্তা প্রণালীতে যে সকল গলদ প্রবেশ করিয়াছে, বিশেষত আমাদের সামাজিক প্রয়ােজনে উহাদের প্রয়ােগ সম্বন্ধে যে সকল ত্রুটী হইয়াছে—তাহাও সাহসের সহিত প্রদর্শন করুন। বর্তমানকালে আমাদের এইরূপ খটী বন্ধুর সাহায্য বিশেষ প্রয়ােজন হইয়া পড়িয়াছে, যাঁহারা ভারতে যে রােগ দিন দিন বিশেষ প্রবল হইয়া ৮৪
ডাঃ পল ডয়সেন
উঠিতেছে, অর্থাৎ একদিকে দাসবৎ প্রাচীন প্রথার
অতি চাটুবাদী দল—যাঁহারা প্রত্যেক গ্রাম্য কুসংস্কারকে
আমাদের শাস্ত্রের সার সত্য বলিয়া ধরিয়া থাকিতে
চান, আবার অপরদিকে পৈশাচিক নিন্দাকারিগণ
যাঁহারা আমাদের মধ্যে ও আমাদের ইতিহাসের মধ্যে
ভাল কিছু দেখিতে পান না এবং পারেন ত এই ধৰ্ম্ম ও
দর্শনের লীলাভূমি আমাদের প্রাচীন জন্মভূমি সমুদয়
আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে এখনই
ভাঙ্গিয়া চুরিয়া ধূলিসাৎ করিতে চাহেন, এই উভয়দলের
চূড়ান্ত একদেশী ভাবের গতিরােধ করিতে পারেন।
৮৫
No text on this page.
উদ্বােধন . • স্বামী বিবেকানন্দ-প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ-মঠ-পরিচালিত মাসিক পত্র। অগ্রিম বার্ষিক মুল্য সডাক ২৫ টাকা। উদ্বোধন-কাৰ্যালয়ে স্বামী বিবেকানন্দের ইংরাজী ও বাঙ্গলা সকল গ্ৰন্থই পাওয়া যায়। উদ্যােথন গ্রাহকের পক্ষে বিশেষ সুবিধা নিয়ে অষ্টব্য :- সাধারণের উধেন-গ্রাহকের পক্ষে বাংলা রাজােগ (১ম সংস্করণ) জ্ঞানযােগ ১ম ঐ ) ভক্তিযােগ (১ম ঐ ) কৰ্ম্মযােগ (১১শ ) পত্রাবলী (পাঁচ খণ্ড) প্রতি খণ্ড •• ভক্তি-রহস্য (৫ম ঐ ) চিকাগো বক্তৃতা ( ৬ষ্ঠ ঐ) ভাববার কথা ( ৬ষ্ঠ ঐ) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য (৮ম ঐ) পরিব্রাজক (এম ঐ) ভারতে বিবেকানন (ঐ) ১৭ বর্তমান ভারত ( ৭ম ঐ } মদীয় আচায্যদেব (৪র্থ ঐ) বিবেক-বাণ(৭ম সংস্করণ) পওৱী ৰাৰা ( ৪র্থ ঐ) হিন্দুধর্মের নব জাগরণ (২য় ঐ) • মহাপুরু এসঙ্গ ( ঐ) দেববাণী ( চতুর্থ সং) ndo বীরবাণী (৮ম সং) ধৰ্ম্মবিজ্ঞান (৩য় সং) কথােপকথন (৩য় সং) শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ উপদেশ পকেট এডিশন) (১২শ সং) স্বামী ব্ৰহ্মান-সঙ্কলিত। মুল্য।• আনা ভারতে শক্তিপদা-স্বামী সারদান-প্রণীত (৫ম সংস্করণ) সুন্দর বাধাই মূল উদ্বোধন-গ্রাহক-পক্ষে • আনা। উদ্বোধন কাৰ্যালয়ের অন্যান্য গ্রন্থ এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ও স্বামী বিবেকানন্দের নানা রকমের ছবির তালিকার জন্য উদ্বােধন কাৰ্যালয়ে পত্র লিখুন। . . . • y পীতাতত্ত্ব স্বামী সারদানন্দ এই বক্তৃতাগুলি ১৩০৯ সাল হইতে (আরম্ভ করিয়া) কলিকাতা বিবেকানন্দ সমিতি, রামকৃষ্ণ মিশন সভা প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে প্রদান করেন, তাহা প্রবন্ধাকারে উদ্বোধনে নিবন্ধ ছিল, অধুনা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হইল। গীতা- ভাব-ঘন-মূর্ত-বিগ্রহ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অপূর্ব দেব-জীবনের মধ্য দিয়া গীতাতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়া বক্তা সকল মানবকে বীৰ্য্য ও বলসম্পন্ন করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। আশা করি মনসাধারণ এই গ্রন্থ পাঠ করিয়া আনন্দ ও চিত্তপ্রসাদ লাভ করিবেন। উত্তম বাঁধাই, এন্টিক কাগজে ছাপা, মূল্য ১০ আনা। উদ্বোধন-গ্রাহক-পক্ষে ১• আনা। বিবিধ প্রসঙ্গ সারদানন স্বামিজীর বক্তৃতা-সংগ্রহের দ্বিতীয় পুস্তক। এখানিও সুধী-সমাজে যথেষ্ট সমাদর লাভ করিবে—ইহাই আমাদের বিশ্বাস। মূল্য • আনা মাত্র। উদ্বোধন গ্রাহকপক্ষে ॥• আনা। শ্রীশ্রীমায়ের কথা (সংশােধিত দ্বিতীয় সংস্করণ) শ্রীশ্রীমায়ের সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ সন্তানগণ তাহার নিকট আসিয়া যে সব কথাবার্তা শুনিতেন তাহা অনেকেই নিজ নিজ ‘ডাইরীতে লিখিয়া রাখিয়াছেন। তাহাদের, কয়েকজনের বিবরণী ‘ঐশ্রীমায়ের কথা’ শীর্ষক নিবন্ধে উদ্বোধনে ধারাবাহিককপে প্রকাশিত হই ছিল। সাধারণের কল্যাণকর বিবেচনায় উহাই পুনমুত্রিত হইয়া পুস্তকাকারে বাহির হইয়াছে। ছয়খানি ছবি-সম্বলিত-বাধাই ও ছাপা সুন্দর, ৩৩ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ। মূল্য ২ টাকা মাত্র। প্রাপ্তিস্থান-উদ্বোধন কাৰ্যালয়, বাগবাজার, কলিকাতা।
No text on this page.
ער השורה
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.