Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Jharnadhara

Biswas ,jatindranath · 2009/12/21

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

dণ
যতীন্দ্রনাথ বিশ্বাস বি-এ,
বিদ্যাভূষণ
বিজলী পাবলিশিঙ হাউস
৬১ হৰি ঘোৰ টি,
কলিকাতা।

প্রকাশক-শ্ৰীব্রজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস
বিকলী পাবলিশিং হাউস
৩৬১ হরি ঘােষ স্ট্রীট, কলিকা।
দাম ১২ টা
গ্রিটার-রাধারমণ দাস
ফাইন মার্ডপ্রেস
• বিডন স্ট্রীট, কলিকাতা।

=মানসীকে

ঝর্ণাধারায় রঙ, ফলেছে
হঠাৎ দেখি দিনের শেষে,
এলিয়ে বেণী চল ছুটে
পাগলকরা মােহন বেশে
পথের পথিক দেখছে চেয়ে,
পাহাড়ীদের শ্যামলী মেয়ে
তৃষ্ণা মিটায়—শীকর ছিটায়
বনহরিণীর মতন এসে।
দিনের আলাে আসছে নিবে
আয়, মানসী, আয় গাে আয়
খুখারাপী রঙের নেশা
ধারায় ধারায় লুটিয়ে যায়।
বুকূচেরা এই ঝর্ণা-ধারে
তােরে) মানায় কি না দেখব না রে ?
তাের হাসিতে ফুল শােভা
দেখব নাকো কেমন তায় ?
আয়, মানসী, আয় গাে আয়
১লা আবাঢ়, ১৩৩।
সােমবার

No text on this page.

No text on this page.

।।
. *
,
A
* }}
,
বাবা:

No text on this page.

—সূচি আমার কবিতা অক্ষম ধুতুরার প্রতি । ! প্রথম বরষায় ৬ ১০ ১১ ১৪ ফুলের নূপুর বাজে অপ্রকাশিত কথায় আমার আগমন ভূমিকম্পে গগাকুলে বাঁশী বাজে নাক আর সে যদি হ’ জগৎ আজো নীরব হল না তুমি আমার ১৯ ২ ২২ ২ ভাঙা ঘাট •• ••• ২ কালবৈশাখীর ঝড় ব্যথার পাথারে নাম-বিনিময় মরুর বালা তুমি নাইবা ভালবাসলে If • : ••• ৩৬ আমি হব মুখতা ৪১ ভগবানের মার সার্থকতা ১২ আয়ােজন ৪৩ ৪৪ চলিতে চমণে বাজে ১৫ ৪৭ সদ্যেবিধবা মাতার প্রতি ৪৮ মনের মানুষ ৫• : ফুল-জনম তার হাতের লেখা ৫৪ ৫৬ আমার ভালবাসা ৫৮ ভাষার রূপদান :: { এমন হয় ৬০ যেটুকু লুকান আছে চুম্বনের পার্থক্য ••• ৬৩ অভিলাষ বিদায় প্রার্থনা •••

ঋণাধারা
আমার কবিতা
যেটুকু রাখিতে নারি হৃদয় মাঝারে মাের লুকায়ে সবারে,
সেইটুকু ছন্দে গানে সযতনে ছড়াইয়া দিই চারিধারে।
কেহ বা আদরে লয়, কেহ শুধু ভাবে মােরে, কেহ দেয় গালি,
কেহ বা থামাতে চায় বেদনার কণ্ঠ মাের করি’ চতুরালি।
নিভৃত নির্জন কোণে আমার কবিতা পড়ি’ কেহ ভালবাসে,
কেহ বা শুনিয়া গান মনে মনে করে ঘৃণা মুখে শুধু হাসে।
আমি দেখি সবি চেয়ে, অন্তরেতে বুঝি সব—তবু গেয়ে যাই,
কি জানি কাহারে হায় হৃদয়ের ব্যথারাশি জানাবারে চাই।
বনের কলরব একদিন থেমে যাবে—থেমে যাবে গান,
সেদিন বুঝিবে নাকি আমার কবিতা মাঝে আমারি এ প্রাণ ।
সেদিন কি আঁখিজলে ভাসিয়া যাবেনা মুখ মাের কল্পিতার,
সেদিন কি ভুলিবে না রুদ্ধজ্বালা প্রতি বাণী মাের কবিতার !
বুঝিতে যদি না পারে জন্মান্তরে যেন গাই এই গীত গান,
তুলে
দিও ধীরে ধীরে মাের করে সযতনে ত্যক্ত বীণখান।
আমারি রচিত সুর সকলি পড়িবে মনে মৃত্যু পরপারে,
এমনি গাহিয়া যাব ছন্দে সুরে শত গান বিশ্বের মাঝারে।

ঝর্ণাধারা-
অক্ষমতা
মনের বীণায় যে সুর বাজে গ,
পারিনি তাহারে ফুটাতে আজ ;
হৃদয়বৃন্তে যে ফুল ফুটে গাে,
পারিনি দানিতে তাহাতে সাজ।
যে কথা বলিতে পরাণ চাহে গাে,
পারিনি দানিতে তাহাতে বাণী ;
যাহারে হৃদয় চাহিছে সতত
পারিনি তাহারে সাজাতে রাণী।
চাদের কিরণে নদীর সুতানে
যে কথা শিখেছি জীবন ধরে,
বাণীর বিহনে সে কথা আজিকে
জানাই সবারে কেমন করে!
অন্তরে মাের উঠেছে লহরী,
হৃদয়ে আমার উঠেছে ঢেউ ;
আপন আবেগে পারিনা বুঝাতে,
আপন গরজে বুঝে না কেউ।
গগনে আমার ফুটেছে যে তারা
পারিনা তাহারে দেখাতে সবে ;
রাতের আঁধারে জ্বলে নিভে যায়
এ জ্বালা পরাণে ভুলিব কবে।
( ২ )

. বর্ণাধারা-
প্রেমেতে আমার যাহারে বেঁধেছি
কেমন করিয়া দেখাই তারে;
আজো যে পারিনি ফুটাতে সে মুখ
আমার আঁখির বরষাধারে।
অক্ষম আমি সকলে জেনাে গাে,
পারিনি বলিতে মনের কথা;
নির্জনে তাই বসে বসে কঁদি-
নির্জনে তাই ছড়াই ব্যথা।
(৩)

ঝর্ণাধারা-
ধুতুরার প্রতি
নেয় নিক কেহ তােরে—অভিমানে কঁদিয়া
সেধেছিলি কারে তুই নিশিদিন জাগিয়া ।
শঙ্কর তাই আসি
নিল তােরে ভালবাসি ;
নীরবেতে ধরাবাসী রহিল যে চাহিয়া।
কাননের বেলফুল, মল্লিকা, কেতকী,
তাের মত গরবেতে টলে ঢলে যেত কি?
অনাদরে আঁখিজল
ফেলে নাই অবিরল ;
তাের মত ভুলে তারা সেধেছিল এত কি?
স্বর্গের দেবতারা তােরে ভালবাসিতে
আসে নাই তাের কাছে তাের ব্যথা নাশিতে
তাের ফুল বিষময়,
তাই মনে ছিল ভয় ;
চুমে নাই তােরে তাই মুখভরা হাসিতে।
আঁখিধারা ধুয়ে দিল তাের শত মলারে,
তাই তােরে তুলে নিল আদরেতে ভােলারে
বিষ হল সুধা আজ
লাঞ্ছনা ঘৃণা লাজ
সকলের ঘরে ঘরে রহিল যে তােলারে।
• •
( ৪ )

-ঝর্ণাধারা
তুরা যে বনফুল সেই হল গরবী
হিংসায় জ্বলে পুড়ে কেঁদে মল করবী;
টগরের হল ব্যথা,
কদমের জাগে কথা ;
পেল না ত এত প্রেম হল শুধু সুরভি,
যে বনফুল সেই হল গরবী।
(৫)

ঝর্ণাধারা-
প্রথম বরষায়
আজি প্রথম বরষা,
ধরণী আজিকে বাদল ধারায়
হলরে সরসা।
গগনে মাদল বাজিছে সঘনে,
মেঘের কাজল পরিয়া নয়নে
আকাশ গলিয়া ঝরিয়া পড়ে যে-
নাহিক ভরসা;
আজি প্রথম বরষা।
আজি
কুসুম কাননে
কে ছড়াল জলধারা ধীরে ধীরে
ফুলের আননে।
কদম উঠিল বাদলে শিহরি’,
ময়ূর পেখম খুলেছে আমরি,
যুঁথীর সুবাস টলিয়া ঢলিয়া
নাচিছে পবনে ;
আজি কুসুম কাননে।
আজি বিজলী ঝলকে
বাদলের গীতি গাহিছে কে যেন
আকুল পুলকে।
ধরণী ফুলিয়া চাহে যে উঠিতে,
গগন ঝরিয়া চাহে যে লুটিতে;
( ৬ )

-ঝর্ণাধারা-
মিলন বাঁধন আজিকে দোহার
কেবল চমকে ;
আজি বিজলী ঝলকে।
আজি ব্যাকুল হরষে
বিরহীর হিয়া কণ্টকি উঠে
বাদল পরশে ;
কোন্ বিরহিণী ব'সে বাতায়নে,
মিলনের গীতি গাহে মনে মনে ;
মিশে যাক্ মাের অন্তর সেথা
যুগল রভসে ;
আজি ব্যাকুল হরষে।
( ৭
৭)

ঝাধারা-
ফুলের নূপুর বাজে
আমার মায়ের কমল পায়ে ফুলের নূপুর বাজে,
শুতে গােরা পাস্না বলে তর্ক তুলিস্ বাজে ;
শুতে
যদি
ইচ্ছা থাকে নিরবধি,
প্রাণ দিয়ে সব শােরে বসে মনের কুঞ্জমাঝে ;
আমার মায়ের কমল পায়ে ফুলের নূপুর বাজে।
নূপুরধ্বনি
বাতাস শুনে ঘুমিয়ে পড়ে, কোকিল মৌন মূক,
অলির গানে সুর জাগে না—জগৎ ভােলা সুখ ;
চাদের হাসি উছলে পড়ে,
চাপবে বল কেমন করে
সৃষ্টিধরের ভুল হয়ে যায় বিশ্বসৃজন কাজে,
আমার মায়ের কমল পায়ে ফুলের নূপুর বাজে।
আঁধার সে যে থম্‌কে পঁাড়ায় কাজল অমারাতে,
যােগীর ধ্যানে চমক লাগে শুনলে ধ্বনি তাতে ;
তারার আলাে চলুকে নামে
অমারাতের প্রতি যামে;
গ্রহে গ্রহে সেই ধ্বনিতে মুখের বেদন রাজে;
আমার মায়ের কমল পায়ে ফুলের নূপুর বাজে।
( 8 )

বর্ণাধারা-
পাগল ভােলা পাগল হ’ল সেই ধ্বনিতে যে গাে,
উদাস হয়ে লুটিয়ে প’ল ওই চরণে সে গাে ;
ঢুলু ঢুলু আঁখির তারা
তালে তালে দিচ্ছে সাড়া;
আপন নাটে আপনি নাচে রয়না সরম লাজে ;
আমার মায়ের কমল পায়ে ফুলের নূপুর বাজে।
(৯)

ঋণাধারা-
অপ্রকাশিত কথায়
ফুলের যত মনের কথা ফুল পারে না কইতে,
আধেক কথা প্রকাশ করে আধেক থাকে বইতে।
মৌমাছি ওই আধেক শুনে পাগল হয়ে যায় রে,
সকল কথা শুলে পরে কত কি সে হায় রে !
কুলু কুলু গানের ভাণে
নদী সকল কয় না,
গােপন কথা লুকিয়ে রাখে সৈকতে তা রয় না।
যেটুক পেল শুতে কথা তাইতে দুকূল মত্ত,
সকল কথা শুন্ত যদি থাক্ত কি তার স্বত্ব।
বনের পাখী প্রাণের কথা সকল কি গাে কইবে,
বনের বীণার তারে তারে সব কথা কি রইবে।
পাখীর গানের যেটুক বাণী শুনতে কানন পায় রে,
সংজ্ঞাহারা তাতেই থাকে উছলে বাকী যায় রে।
আমার কথা তেমনি ওরে আমার সকল কর্মে,
আধেক আমি বলতে পারি আধেক থাকে মৰ্ম্মে।
আধেক আমার কণ্ঠে থাকে, আধেক থাকে চক্ষে,
নয়নজলে আধেক থাকে, আধেক থাকে বক্ষে।
(১০ )

-ঝর্ণাধারা-
আমার আগমন
আমি বহুদিন মেঘপথে ছিন্ন
বাতাসে বাতাসে ঘুরিয়া হায় ;
পুষ্কর হতে কালাে মেঘ এল
পুলকে মিশিয়া গেলাম তায়।
বজ্র আলােকে করিনু ভ্রমণ
ভালবাসা হ’ল বজ্রসাথে ;
চিকুড়ে চিকুড়ে কোলাকুলি করি’
সুন্দর হনু আমি গাে তাতে।
বরষার রাতে নেমে এসেছিনু
শ্রাবণ ধারার অশ্রু বেয়ে ;
পৃথিবীর মাটী পুলকিত হ’ল
নির্মল পূত আমারে পেয়ে।
বহুদিন ছিনু মেদিনীর নীচে
রসে রসে তার জাগিল প্রীতি
অনুভূতি মাের উপজিল শেষে,
শিখিনু কত না মাটির রীতি।
তারপর দেখি ফুটিয়া উঠি
কুসুমের বুকে হলাম রেণু;
বাতাস আসিয়া শুনাতে লাগিল
বাজায়ে তাহার মােন বেণু।
(১১)

-ঝর্ণা
সৌরভে মূক ছিনু বহুদিন
পুলকে ছিলাম আত্মহারা ;
গুঞ্জনে অলি নিয়ে গেল মােরে
ভাঙিয়া মােহন ফুলের কারা।
মধুর চক্রে মধু হয়ে গেনু
শুনিনু কত না মধুপগান ;
প্রেমেতে তরল হইতে শিখিনু
জগৎ মাতাতে শিখিল প্রাণ।
তারপর এনু মানবের ঘরে
মানব আমারে করিল পান ;
মানবদেহের শােণিতে শােণিতে
ঘুরিনু গাে নিশি দিবসমান।
তারপর এক সুন্দর প্রাতে
নয়ন মেলিনু জগতে আসি' ;
পূরবে অরুণ চিনিল আমায়,
থাকিতে নারিল উঠিল হাসি।
তাইত আমারে চেয়ে চেয়ে দেখে
নীলাকাশ হ’তে মেঘের মালা ;
বজ্র আমারে চিকুড়ে চিকুড়ে
তাইত তেমনি করিছে আলা।
(১২)

ঝর্ণাধারা-
শ্রাবণের ধারা গায়ে এসে পড়ে
সে যেন জাগায় পূরব স্মৃতি ;
চমকিয়া তাই চেয়ে চেয়ে দেখি,
বুঝিতে পারি না তাহার প্রীতি।
ধরণীর বুকে শিহরণ খেলে
যখনি যেথায় চলিয়া যাই ;
কুসুমের মুখে হাসি ফুটে ওঠে
আমারে নয়নে দেখিয়া তাই।
গুঞ্জন তুলি অলি চলে যায়
শুনায়ে শুনায়ে আমারে গান ;
মধুর গন্ধে নেচে ওঠে তাই
অন্তর হিয়া এ মন প্রাণ।
মানব জগতে বাঁচিয়া রয়েছি
মানবের ভাষা হয়েছে মাের ;
ভালবাসা আছে যাহাদের সনে
রহিবে সে ভাব জীবন ভাের।
(১৩)

কর্ণাধারা-
ভূমিকম্পে
(১লা মাঘ সন ১৩৪• সােমবার ভারতবর্ষে যে ভীষণ ভূমিকম্প হয় সেই উপলক্ষে।)
এতদিনে জেগেছে মেদিনী,
লক্ষকোটি পদাঘাতে এতদিনে জেগেছে নাগিনী।
জেগেছে ভারত দেখি না ফেলিতে নয়ন পলক,
মহাপাপে অত্যাচারে বাসুকীর নড়েছে টনক।
কেঁপেছে হিমাদ্রিশির চির শুভ্র তুষার কিরীটী,
সহসা বিশ্বের পানে রুদ্রনেত্রে চেয়েছে ধূর্জটি।
তাণ্ডবে নেচেছে গঙ্গা কল কল করতালি দিয়া
সে তালে ঠুকিতে তাল দিবালােকে দীৰ্ণ ধরাহিয়া।
কেন কাঁপে বিশাল ধরণী,
কেন নাচে পাতালেতে মহারােষে অগণিত ফণী ?
কেন ফাটে পাষাণের দৃঢ় বক্ষ এতদিন পরে,
কেন পঙ্ক, বালু, জল পৃথিবীর কণ্ঠ চেপে ধরে ?
বিহার শ্মশান কেন একদিনে হল তােরা বল,
মুহূর্তে প্রলয়লীলা কেন টানে এত অশ্রুজল ?
ভূমিকম্প নহে মূল ভেবে দেখ, অবােধ অজ্ঞান ;
চিররম্য ভারতের মৃত্তিকায় কঁাদে কার প্রাণ।
কেবা নারে সহিতে অন্তরে
লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, জ্বালা পদাঘাত বুকের পঞ্জরে।
কেবা চায় মুক্ত হতে চূর্ণ করি' পাষাণের কারা;
কেবা সেথা অপমানে ধীরে ধীরে ফেলে আঁখিধারা।
(১৪)

• •
ঋণাধারা-
রুদ্ধ ব্যথা এতদিন ছিল কার লুকায়ে অতলে ;
ক্ষুদ্র দীর্ঘশ্বাসে কেবা ছড়াইল সে-জ্বালা গরলে।
স্ফীতবক্ষে কে জানা’ল কঁপাইয়া বিশ্ববাসী জনে,
মৃত্তিকার কারাগারে বন্দী রহি সজল নয়নে।
পার নাই বুঝিতে সে সব ?
রজনীতে শুন নাই দুর্ভাগীর রুদ্ধ কলরব ?
সুখসুপ্ত প্রেয়সীরে বুকে লয়ে ছিলে ত শয়নে ;
কেমনে বুঝিবে ৰল জ্বলিতেছে কেবা সে যাতনে ?
মােহনিদ্রা ঘুচে নাই—ঘুচিবে না তাহা কোন কালে ;
তাই মাতা দোলা দিল অকৃতজ্ঞ সন্তানের পালে।
সে দোল সহিল নারে—মহানিদ্রা জাগ্রত না হ'তে
সবারে ধরিল কোলে ধাত্রীরূপে এ মর মরতে।
বুঝেছে জননী,
এতদিনে
নিজ মান রক্ষা হেতু তাই হেরি উদ্যত ধমনী।
পুত্ৰমুখ পানে হায় চেয়ে থাকা শুধু বিড়ম্বনা,
তাই সাড়া দিল নিজে অভাগিনী আঁধার-মগনা।
নেপাল কঁপিল ডরে, হিমাদ্রির তুষার উষ্ণীষ
মাতৃরােষ-বহ্নিপদে গড়াইয়া করিল কুর্ণিশ।
মুঙ্গের শ্মশান হল, বিহারেতে ধ্বংসের বিহার,
ভূমিকম্প নহে ইহা এ ত নহে কালের প্রহার।
কিংবা বুঝি জন্মিল মুরারি
অধম্মের অভ্যুত্থান চারিধারে নয়নে নেহারি'।
বুঝি কোন্ শক্তি এল চির দৃঢ় কংস-কারাগারে,
সহিতে নারিল ধরা তাই কঁপি উঠে বারে বারে।
(১৫)

ঝর্ণাধারা-
মধ্যাহ্নে প্রখর রবি ; চুপে চুপে এল কে দেবতা
দিকে দিকে তাই কিরে বিঘােষিল সকম্প বার ?
শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম চতুভুজে করিয়া ধারণ,
নাশিতে ধরার ভার তুমি কিগাে এলে নারায়ণ ?
জেগে ওঠ দলিত ধরণি,
মৃতকল্প পুত্রদলে চেপে ধর বুকেতে জননি।
শ্লথবেণী বিবসনা রণরঙ্গে নেচে চল শ্যামা ;
উন্মুক্ত কৃপাণ করে বিশ্বমাঝে ধেয়ে চল বামা।
শঙ্কর ডম্বৰু ধরি’ রুদ্ৰতালে নাচাক তােমায়,
রঞ্জিত করুক ফণী দংশি’ দেহ গরল-আভায়।
ভীত ত্রস্ত পঙ্গুজীব মহাপাপী যা রসাতলে ;
ভূমিকম্পে ভস্ম হ'ক পূর্ণ বিশ্ব জ্বলন্ত অনলে।
যতক্ষণ বেঁচে থাকি দেখা মাগাে নব জাগরণ,
দৃশ্য হেরি’ তৃপ্ত হােক মন।
(১৬)

ঝর্ণাধারা-
গােকুলে বাঁশী বাজে নাক আর
গােকুলে বাঁশী বাজে নাক আর,
থামিয়া গেছে গীতি যমুনার ;
কদম তরুমূলে
আসে না কেহ ভুলে,
আঁধারে ভরে গেছে চারিধার;
গােকুলে বাঁশী বাজে নাক আর।
গােপীর হিয়া উঠে না চমকি',
যমুনাজলে চাহে না থমকি’
গাগরী-ভরা-ছলে
কেহ না ব্রজে চলে,
গুমরি’ কোথা করে হাহাকার ;
গােকুলে বাঁশী বাজে নাক আর।
শ্যামের প্রিয়া কোথা ব্রজরাণী,
লুকাল কোথা তার প্রেমবাণী ?
কঁাকন-কন-কন
নূপুর-রণ-ঝন
থামিয়া গেছে আজিকে সবার ;
গােকুলে বাঁশী বাজে নাক আর ।
রাখালী ছেলে মাঠে নাহি
গােঠেতে ধেনু তেমন না চায় ;
নবনী ভারে ভারে দেখি না কোথা হা রে !
সকলে যেন বহে ব্যথাভার ;
গােকুলে বাঁশী বাজে নাক আর ।
(১৭)

কর্ণাধারা-
তেমন করি' ফুটে নাক ফুল,
নীরব হেরি যমুনারি কূল ;
দখিন সমীরণে
তেমন শিহরণে
নাচে না শিখী মেলি’ পাখা তার ;
গােকুলে বাঁশী বাজে না আর।
চাদিনী রাতে দোলে না ঝুলন,
রাসের দিনে নাহি সে মিলন
কি হল অজভূমে
আছে কি শ্যাম ঘুমে?
ভাঙাবে বল কে বা ঘুম তার ?
গগাকুলে বাঁশী বাজে নাক আর।
(১৮)

ঝর্ণাধারা-
সে যদি হত
সে যদি হ'ত কুসুমকলি হায়,
নয়নধারা ঢালিয়া দিন যামী
মােহন করি’ তাহারে ফুটাতাম--
সকল ব্যথা অমনি যেত থামি।
সে যদি হত দখিন সমীরণ,
পরশ লভি’ উঠিত শিহরিয়া ;
কোকিল সম কূজিত সুগােপনে
পুলকে মাতি’ আমার জড় হিয়া ।
সে যদি হত আকাশে মেঘরাজি,
তাহারে হেরি’ মেলিয়া নীল পাখা
ময়ূরসম নাচিয়া বেড়াতাম
আপনা ভুলি’ আবেশে মধুমাখা।
সে যদি হত চঁাদের জোছনা গাে,
লুটায়ে ধরা দিতাম গড়াগড়ি ;
ধূলায় মাখি’ চাহিত হৃদি মাের
জোছনাটুকু রাখিতে বুকে ধরি।
সে যদি শুধু যমুনা হ’ত হায়
শ্যামল তীরে খুলিয়া বাসখানি
তাহার জলে ডুবিয়া মরিতাম
বুকের মাঝে লহরী মালা টানি'।
(১৯)

ঝর্ণাধারা
জগৎ আজো নীরব হল না
জগৎ আজো’ নীরব হ’ল না,
তাইত আমার মনের মাঝে জাগল বেদনা ;
ভেবেছিনু বম্ব কথা,
থাম্‌লে সবার কাতরতা-
মুখ বুজিয়ে তাইত ছিনু লুকিয়ে চেতনা
জগৎ আজো' নীরব হল না।
•
এঁচেছিনু থালে নদীর গান,
গলা ছেড়ে গাইব বসে মাতিয়ে সবার প্রাণ ;
নদী আজও গেয়েই চলে,
জানি না সে কী যে বলে
আমার মনে রইল শুধু উতল বাসনা ;
জগৎ আজো’ নীরব হল না।
বনের পাখী শূন্যে উড়ে
বলছে কত আবল তাবল এদিক ওদিক কেবল ঘুরে ;
হ’ল না সে কণ্ঠহারা,
আমি যে গাে হলাম সারা ;
আমার কথা রইল বুকে জাগিয়ে যাতনা ;
জগৎ আজো’ নীরব হ’ল না।
( ২০ )

ঝর্ণাধারা
ফুলের কলি, গাছের পাতা
আপন মনে বলছে শুনি আছে মুখে তাদের যা’ তা ;
বাতাস বলে তাহার বাণী,
অর্থ তাহার কিছু না জানি
আমার কথা বলব কবে ফবে সাধনা ;
জগৎ আজো নীরব হ'ল না !
রাতের আঁধার, দিনের আলাে-
তাদের কথা শুনে শুনে লােকে কত বলছে ভালল;
কণ্ঠে নিয়ে প্রাণের গীতি,
সভার মাঝে বসছি নিতি ;
পাই না সুযোগ হয় না গাে মাের সুরের সাধনা ;
জগৎ আজো নীরব হল না।
/
সবাই যে গাে এমনি করে
আকাশ বাতাস সাগর ভুবন কোলাহলে তুলছে ভ’রে ;
আমি ভাবি থামলে সবে,
গাওনা আমার সুরু হবে-
বীণা হাতে রইনু বসে-বিফল কামনা;
জগৎ আজো নীরব হল না।
( ২১)

ঝর্ণাধারা
তুমি আমার
তুমি আমার বােশেখ মাসে রােদের ফাকে হাল্কা হাওয়া,
তুমি আমার চঁনী রাতে গঙ্গাবুকে পাল্সী বাওয়া।
তুমি আমার বাদল দিনে কাজল নভেমরি গান,
তুমি আমার সজল বায়ে চুমকি হেনে মাতাও প্রাণ।
তুমি আমার শরৎকালে সবুজ ক্ষেতে ধানের ঢেউ,
তােমার মতন আমার আপন এই মরতে নেই কেউ।
তুমি আমার শীতের দিনে মিষ্টি মধুর রােদের পরশ,
তুমি আমার বক্ষে নিতি জড়িয়ে থাকা প্রাণের হরষ ।
তুমি আমার ফাগুনমাসে দখিন বায়ে কোকিল গান,
তুমি আমার আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে ধর উজল প্রাণ।
তুমি আমার আঁধার রাতে নীল সায়রে ছােট্ট তারা,
তুমি আমার জোছনা রাতে চকোর পাখীর স্পষ্ট সাড়া।
তুমি আমার অঙ্গনেতে ছড়িয়ে পড়া চঁাদের হাসি,
তুমি আমার বাসর ঘরে আমােদ করা ফুলের রাশি।
তুমি আমার শিউলি ঝােপে মানিয়ে থাকা জোনাই আলা,
তুমি আমার তুলসীমূলে সন্ধ্যাবেলা প্রদীপজ্বালা।
তুমি আমার হাস্নাহানা গােলাপমুখে অলির চুম,
তুমি আমার প্রিয়ার কোলে পাগলকরা মাতাল ঘুম।
তুমি আমার প্রথম চুমাে বধূর রাঙা কোমল গালে,
তুমি আমার প্রথম বাণী লজ্জানত প্রেমের কালে।
তুমি আমার বেল চামেলী গন্ধরাজের গন্ধ গাে,
তুমি আমার কবির মুখে আকুল করা ছন্দ গাে
(২২)

ঝর্ণাধারা-
তুমি আমার এলিয়ে পড়া প্রিয়ার সুনীল বসনখানি,
তুমি আমার বাঁশীর স্বরে চমকে-ওঠা ব্ৰজের রাণী।
তুমি আমার মিষ্টি মুখের তুষ্ট করা দুষ্ট হাসি,
তুমি আমার বৃন্দাবনের প্রাণ মাতানাে কালার বাঁশী।
তুমি আমার অতল দীঘির বিমল কূলে সচল জল,
তুমি আমার তাইতে যেগগা সাঁতরে-যাওয়া কাতলা চিতল।
তুমি আমার চিতার আগুন লক্ষ শিখায় ধরবে জানি,
জীবন নদীর
কূলে যেদিন তােমার সাথে মিশব, রাণি।
( ২৩ )

ঝর্ণাধারা-
ভাঙা ঘাট
আমি যে গাে ভাঙা ঘাট,
পাঁজরে পাঁজরে এখন আমার ধরেছে জটিল ফাট।
সিড়িগুলাে সব ভেঙে পড়ে গেছে সুষমা তাহার নাই,
এপাশে আমার ফেলে হাঁড়িকুঁড়ি ওপাশে ছড়ায় ছাই।
একদিন ছিল শ্যাম বটছায়ে আমার বুকেতে আসি,
রাখাল বালক মাঠিয়ালি সুরে
কেবলি বাজাত বাঁশী
একদিন ছিল পল্লীবধূর চপল চরণঘায়,
মূচ্ছনা মাের জাগিত হৃদয়ে পুলকিত বেদনায়।
একদিন ছিল গ্রামের জনতা অমিত আমার বুকে,
পালে পার্বণে হত কোলাহল কত না মধুর সুখে।
মনে আছে কত হ’ত পরিহাস রসিকা বধূরে লয়ে,
মনে আছে কত বালিকা ব্রতের ছড়াপাঠ গেছে হ'য়ে।
দশমী দিবসে মনে আছে হেথা ভাসায়ে প্রতিমা মার,
আবালবৃদ্ধবনিতা সকলে মুছেছে অশ্রুধার।
মনে আছে সেই ঘােষেদের মেয়ে যেদিন বিধবা হ’ল
এই ঘাটে এসে শাখা বালা খুলে কেঁদে কেঁদে কত ম’ল।
আমার মাটিতে সিন্দুর মুছি’ বিধুরা হইল শশাকে,
মনে আছে ওগাে-মনে আছে তারে বুঝাল কত না লােকে।
তারপর একা কতদিন এসে কেঁদে কেঁদে গেছে হেথা,
তারি সাথে হায় কত না কেঁদেছি ভুলিতে পারিনি ব্যথা।
(২৪)

বাণাধারা-
মনে আছে ওগগা মনে আছে সব সেদিন গিয়াছে চলি,
মনে হয় আজ একে একে যত গােড়া থেকে খুলে বলি।
কোথা গেল তারা কোথা গেল সেই অশ্রু-হাসির খেলা,
কালের প্রহারে ধীরে ধীরে হেরি ভেঙে গেল শত মেলা।
শ্মশান ছিল না নিকটে আমার এখন হয়েছে ওই,
চিনল যবে জ্বলে ওঠে সেথা আমনে চেয়ে রই।
শবদাহ করে শবদাহকারী এখন নিয়ত আসে,
আমার এ বুক ভরিয়া ওঠে গাে তাদের দীর্ঘশ্বাসে।
অতীতের স্মৃতি আছে বুকে বাঁধা অতীতের খেলা নাই,
অনাদরে মাখা ভাঙা ঘাট আমি আদরে পড়েছে ছাই।
(২৫)

ঋণাৱা
কাল বৈশাখীর ঝড়
কাল বৈশাখীর ঝড় হের ওই নেমেছে ধরায়,
গুরু গুরু মেঘরবে রুদ্ৰশঙ্খ কেবলি বাজায়।
এলায়ে পড়েছে তার মােহর্ষে জটাজুটজাল,
বিদ্যুৎ-বহ্নিতে ওই শােভিয়াছে ধূসর কপাল।
আনিয়াছে মন্ত্রবাণী জাগাবারে মূচ্ছিতা ধরণী
কমণ্ডলু-জলধারা মুখে তার সিঞ্চিছে দেখনি?
মুগ্ধা পৃথ্বী এতদিনে কমবক্ষে ধরিয়াছে আশা,
আঁখি মেলি’ চেয়ে দেখে জাগাইতে এসেছে দুর্বাসা।
ঢেকে দেছে সূৰ্যমুখ হােমাগ্নির ঘনকৃষ্ণ ধূমে,
চঞ্চল সাগর বক্ষ মহাগৰ্বে তারি পদ চুমে।
উন্মত্তা প্রকৃতি হের সাজিয়াছে কালী করালিনী ;
সাক্ষ্য করি তারে আজ দীক্ষা লবে প্রথম মেদিনী।
ধরণীর শিশু আমি, রুদ্ৰকল্প হে সাধু সন্ন্যাসী,
আমারে কি দিলে তুমি বৈশাখের ঝড়েতে প্রকাশি’ ?
আশীৰ্বাদ মাগি শুধু, মাের শিরে ঝড়ের চামর
বারেক বুলায়ে দাও-জাগরণে নাচুক অন্তর।
( ২৬)

ঝর্ণাধারা- ব্যথার পাথারে . আমারে আজি ডুবায়ে দেহ আমার আঁখিজলে, দেখিব সেখা কি ধন আছে ব্যথার নদীতলে। মাণিক যদি কুড়াতে পারি কুড়াব একা সেথা, কাহারে সাথে নিব না আমি ক'ব না কারে কথা। লেগেছে ভাল মনেতে আজি ব্যথার কলতান, শুনিনি কভু জীবনে মম এমন মধু গান। কে যেন সেথা লুকায়ে থাকি বাজায় মৃদু বাঁশী, কাহারে যেন সেখানে সদা প্রাণেতে ভালবাসি। কাহারে যেন খুজিয়া মরি জনম হ’তে মাের, কাহারে যেন লভিব সেথা মথিয়া আঁখিলাের। (২৭)

ঝর্ণাধারা-
হউক মম
রাধার হৃদি
সাগর হক ব্যথা,
শ্যামের তরে
যেন গাে আজি
ডুবিয়া মরি সেথা ।
নয়ন জলে
কি সুখ আছে
বুঝেছি আজি প্রিয়,
আমারে তাতে
ডুবায়ে দেহ
প্রাণেশ পূজনীয়।
( ২৮ )

ঝনাধান নাম বিনিময় অনেক লােকে অনেক করে অনেক রূপে হৃদয় বিনিময়, সেটুক যেন হয় গাে মনে শুনিয়ে কথা হচ্ছে অভিনয়। নতুন কিছু করতে চাই- ভালবাসার নতুন কলতান; সবার পথে চলব নাক, সবার গাওয়া গাইব নাক গান। আঙটি বদল নয়ক প্রিয়ে, দেখিয়ে হাসি নয়ক চুমাে চুরি ; বাহুলতায় জড়িয়ে গলা বলব নাক-তুমিই প্রাণেশ্বরী'। আজকে যেটুক তােমায় দোব ফিরিয়ে সেটুক নিচ্ছি নাক জেনাে ; অদল বদল করূব যেটুক বিন ভরে সত্য সেটুক মেনন। আমার এ নাম তােমায় দিনু, তােমার নামটি আমায় দিও প্রিয়ে ; নাম বিনিময় করতে হ’ল শুধু প্রণয় চলছে নাক নিয়ে। ( ২৯ )

বণ ধারা-
আজকে থেকে বলে যাব
নামটি দিয়ে এমন সঙ্গোপনে;
তুমি প্রিয়ে সাজবে পুরুষ
সাজব নারী তােমার আলিঙ্গনে।
(৩০)

-ঝর্ণা
মরুর জ্বালা
জ্বলে গেল বুক, (ওগাে) জ্বলে গেল বুক
হৃদয় দহনে ফাটিছে যে গাে;
বিন্দুবারির বিহনে আমায়
তৃষ্ণার জ্বালা দিয়েছে কে গাে।
সকল অঙ্গে ছড়ায়ে রেখেছে
তপ্ত বালুর অযুত কণা,
কার অভিশাপ দংশিছে যেন
নিত্য নিয়ত লক্ষ ফণা।
করবল্লমে সূৰ্য বেঁধে গাে
ছড়ায় অনল ঊৰ্ধ হতে,
আমি যেন তার প্রধান বৈরী
পাব নাক ত্রাণ কোনও মতে।
জ্বলিতে জ্বলিতে দহন আমার
হবে নাক হায় এমন সাজা,
মরিতে মরিতে হবে না মরণ
জীবন পাবনা তেমন তাজা
দীর্ঘনিশাসে যেটুকু যাতনা
রহিয়া রহিয়া করি গাে বার,
আমারি বুকের উপরে রহে তা'
ঘুরিয়া ঘুরিয়া চারিটি ধার।
(৩১)

ঝর্ণাধারা-
প্রান্তরে মাের কোথা কিছু নাই
যেদিকে তাকাই কেবলি ধু ধু,
আমার শ্মশানে আমি দেখি নিতি
আমার চিতাটি জ্বলিছে শুধু।
ছলনায় রবি তথাপি কঁদায়
অদূরে দেখায়ে জলের ধারা,
তৃষিত কণ্ঠে ছুটে যাই সেথা
পাই নাত বারি তৃষ্ণাহারা,
দেখি চেয়ে চেয়ে—সৌর কিরণ
হাসিছে তখন জলের ভাণে,
আমারে শুনায়ে কভু বা সে গায়
পরাণ ফাটান বাদল গানে।
.
নীরবে সহিয়া থাকি এ বেদনা
বরষার ধারা গােপনে মাগি,
নীলনতােগায়ে দেখি চেয়ে মেঘ
দেখা দিল কিনা আমার লাগি
জলদকান্তি যখন হেরি গাে
আশায় এ বুক ফুলিয়া ওঠে,
তৃষিত নয়ন-পিছনে আমার
বঞ্চিত হৃদি কেবলি ছােটে।
তারপর ওগাে কেটে যায় রঙ,
বাদল হাওয়ার পরশ দিয়া,
সূৰ্য্য তখন নিঠুর হাস্যে
ছড়ায় চূর্ণ গরল নিয়া।
( ৩২)

ঝর্ণাধারা-
অপমানে মুখ নত করে রাখি
গঞ্জনা লই সকলি মাথে,
গুমরি গুমরি’ কেবলি মরি গাে
লাঞ্ছিত হেয় জীবন সাথে।
আদর সােহাগ কিছু নাহি পাই
আসে নাক কেউ আমার বুকে,
আমি মরুভূমি রয়েছি পড়িয়া
বিশ্বের ঘৃণা লভিয়া দুখে।
বিন্দুবারির আশায় আশায়
দিবস যামিনী কাটিছে মাের,
তৃষ্ণার জ্বালা ভুলি নাই, ওগাে,
নেভে নাই আজো দহন ঘাের।
অন্তরে জ্বলি বাহিরেতে জ্বলি
আমারে এমন আলায় কে গাে,
সকল দুখের অবসান করে
আমার জ্বলন থামায়ে দে গাে
জ্বলে গেল বুক, (ওগাে) জ্বলে গেল বুক,
তৃষ্ণায় ছাতি কাটিয়া যায় ;
বদ্ধ নিঝর কোথা’ কে আছিস
আমার বুকেতে নামিয়া আয়।
(৩৩)

-ঝর্ণাধারা
তুমি নাইবা ভালবাসলে
তুমি নাইবা ভালবাসূলে,
তেমন করে বুকের কাছে
নাইবা আমায় ডাকলে।
আমি তােমায় বাবাে ভালাে,
অগােচরে আবাে আলাে-
সেই আলােতে দেখবাে এ মুখ
নাইবা কাছে থাকূলে !
তুমি নাইবা ভালবাসলে।
তুমি নাইবা কথা শুনলে,
আড়াল দিয়ে এড়িয়ে চলে
নাইবা কাছে আসলে ;
মন চেয়েছে গাইতে গীতি,
আপন সুরে গাইব নিতি-
তােমার নামে গাঁথব মালা
গানটি আমার থালে ;
তুমিনাইবা ভালবাসলে।
তুমি নাইবা খবর রাখলে,
কাজের ফাঁকে একটুখানি
নাইবা আমায় ভাবলে ;
হাওয়ায় তােমর পুছৰ বাণী,
অন্তরেতে দেখব, রাণি,
( ৩৪ )

কণাধারা।
মনের দোলায় দোল দোব গো-
ভােমার ঝুলন নামূলে;
তুমি নাইবা ভালবাসলে।
তুমি নাইবা আমায় দেখলে,
আমার বারে বারে ভিক্ষা মাগা
নাইবা কাণে
তুলে ;
রিক্ত ঝুলি ভব না ত,
এম্‌নি খালি রাখব তাত
এমনি বুকে জড়িয়ে নব
চরণআঘাত লাগলে ;
তুমি নাইবা ভালবাসলে।
তুমি নাইবা আদর করূলে,
অভিমানের অশ্রুজলে
আমার আঁখি
ভরলে,
নাইবা আদর করূলে।
তােমার ধ্যানে, তােমার গানে,
থা আমি বিভাের প্রাণে ;
নিস্বপনে কাব বসে
তােমার স্বপন ভাঙলে ;
তুমি নাইবা ভালবাসলে।
(৩৫)

ঝর্ণাধারা
কবে ?
আমার আঁখিজল
তােমার আঁখিজলে
মিশিবে কবে বল
মােহন প্রেমছলে।
আমার ভাগীরথী
তােমার যমুনাগাে,
মিশিয়া যাবে কবে-
লভিব করুণাগাে।
আমার বাহুলতা
তােমার বাহুপাশে,
লয়ে যাবে কবে
প্রণয়-প্রীতিআশে।
আমার বাঁকা দিঠি
তােমার দিঠি মাঝে
বাঁধিয়া যাবে কবে
আপন-ভােলা লাজে।
আমার মধুবাণী
তােমার বাণী সাথে,
জড়ায়ে যাবে কবে
ব্যাকুল বেদনাতে।
( ৩৬)

ঝর্ণাধারা
আমার হৃদিতল
তােমার হৃদিতলে,
মিলিয়া কবে হবে
পূরণ প্রতিপলে।
আমার যাহা কিছু
তােমার সকলেতে
বিলয় কবে পাবে
এ পথে যেতে যেতে!
( ৩৭ )

ঝর্ণাধারা-
আমি হব
আমি হব পরলােকে কৃষ্ণের বাঁশীরে,
শ্যামকর-পরশন বড় ভালবাসিরে ;
আমার সে বেণুরবে
গােকুলেতে প্রেম ব’বে,
মধুগীতি গাবে সবে ছুটি’ ছুটি’ আসিরে ;
আমি হব পরলােকে কৃষ্ণের বাঁশীরে।
আমি হব কৃষ্ণের শিঞ্জিনী চরণে,
শ্যামপদ মুখরিব রিনি ঝি নিগমনে;
আমার সে ধ্বনি শুনি
সচকিবে ঋষি মুনি,
ঝর ঝর প্রেমধারা ঝরিবে দুনয়নে ;
আমি হব পরলােকে শিঞ্জিনী চরণে।
আমি হব পরলােকে কৃষ্ণের মালারে,
দিবারাতি শ্যামহৃদি করিব গাে আলারে,
আমারি সে সৌরভে,
দিক্‌ ভরি’ গৌরবে
নেচে নেচে যাবে সবে যত গােপবালারে ।
আমি হব পরলােকে কৃষ্ণের মালারে।
( ৩৮ )

ঝর্ণাধারা-
আমি হব পরলােকে কৃষ্ণের যমুনা,
শ্যামতট-বিহারিণী প্রবাহিত বরুণা;
আমার সে নীলজলে,
প্রেমকেলি হবে ছলে,
শ্যামতনু ধরি’ বলে বুকে লব করুণা ;
আমি হব পরলােকে কৃষ্ণের যমুনা।
(৩৯)

ঝর্ণাধারা
মুখতা
মরণ জীবনে টানে জীবন বুঝে না তাহা হায়,
প্রতি পলে তাই কঁপি মরণেরে ঠেলিবারে চায়।
রবির কিরণ দেখি চায় সদা ছায়ারে চুমিতে,
ছায়া তাহা বােঝে নাক তরুপাশে ধায় লুকাইতে।
রাহু কেতু চন্দ্রে সূৰ্যে অবিরত এত ভালবাসে,
গ্রহ তারা দূরে গেলে বক্ষে নিতে ছুটে ছুটে আসে।
বুঝে নাক তারা তাহা মূখতায় তুলে কোলাহল,
রাহু কেতু সরে যায় নতমুখে সরমে কেবল।
তােমারে তেমনি আমি ভালবাসি দিবস শর্বরী,
তােমারে ধরিতে বুকে তেমনিত ছুটে ছুটে মরি।
তুমি তাহা বােঝ নাক ভয়ে ভয়ে দূরে চলে যাও,
গুমরিয়া মরি লাজে—একি হায় মূখতা দেখাও ?
(৪০ )

ঝর্ণাধারা-
ভগবানের মার
এবুকে আমার যাহারে ধরেছি
সেই দিয়ে গেছে আঘাত শত,
এ চোখে আমার যাহারে দেখেছি
তারি অপমানে নয়ন নত।
দুয়ারে দুয়ারে ছুটে ছুটে গেছি
লাঞ্ছিত হেয় জীবন লয়ে ;
করে নাই কেহ তেমন আদর
আমার পরম আপন হয়ে।
ভাল মুখে কথা কহিয়া পেয়েছি
শতেক লােকের নিঠুর গালি,
সরল হাসির বিনিময়ে সবে
অপমানে দূর করেছে খালি।
নয়নের ধারা ফেলেছি লুকায়ে
কহি নাই তবু প্রাণের কথা;
সুখের সাগর মথিয়া তাদের
তুলি নাই মাের গরলব্যথা।
যারে ভেবেছিনু দরদী আপন
সেই হল পর জগৎ মাঝে,
পরিহাসে আজ কঁদায় কেবল
উপহাসে তার বেদন রাজে।
বিশ্ববাসীর কোন দোষ নাই
অপরাধী তারা কেহ ত নয় ;
ভগবান্ যারে মেরে রাখে ভাই,
তারি দশা ভবে এমনি হয়।
(৪১)

ঋণাধারা:
সার্থকতা
দুঃখের তাপে শুদ্ধ করেছ
জীবন আমার যখন, নিঠুর, তােমার বিশ্বমাঝারে,
হরষের রস যখন হরেছ
পূর্ণ এ মাের হৃদয়ের সাথে নিঙাড়ি নিঙাড়ি তাহারে।
নীরস দারুর প্রয়ােজন আছে
বুঝিবা তখন দুৰ্বল জাতি সবলে গড়িতে গরবে,
আমার এ বুকে বুঝি তাল দিবে
শুনাতে তােমার জাগরণবাণী গুরুগম্ভীর আরবে।
নিষ্ঠুর রূঢ়
তাই বুঝি মােরে করিয়াছ হেন
কর্কশ দৃঢ় লক্ষ আঘাত প্রদানি',
তাই বুছি মােরে শিখাতেছ নিতি
নব নব জ্বালা বেদনার প্রীতি মৰ্ম্ম তাহার বাখানি।
জ্বলিবে হয়ত বুঝি কোন দিন
শুষ্ক নীরস জীবনকাণ্ড সৰ্ব্বদহন পুলকে,
উজ্জল করি হয়ত দিবে এ
আঁধার বিশ্বনাট্য তােমার বুঝিবা কখন আলােকে।
তাই যদি হয়, ধন্য মানিব—
দুঃখের তাপে শশাষণ আমার সার্থক হবে জেন গাে,
তাই যদি হয় এত আঁখিজল
মুছায়ে আবার বক্ষে এ মাের ক্রুদ্ধ আঘাত হেন গাে।
(৪২)

ঋণাধারা
তুচ্ছ আয়ােজন
আমার যে ফুল নেয়নি কেহ বুকে,
অনাদরে দূর করেছে হায় ;
সেই ফুলেতে পূজব তােমায় সুখে
সেই ফুলেতে ধরব পূজা পায়।
আমার যে গান কেউ শােননি, ওগাে,
থামিয়ে দেছে যে সুর আমার সবে ;
সেই সুরেতে গাইব সে-গান জেনাে,
শুনিয়ে তােমায় বিভাের কলরবে।
যে ভাষা মাের গুপ্ত ছিল মনে,
চায়নি কেহ শুনতে যাহার কথা;
সেই ভাষাতে গাঁথব আমার বাণী,
তােমার গলায় ঝুলিয়ে দিতে ব্যথা।
সারা দিনের যেটুক সময় মাের,
চায়না কেহ তাদের কলতানে ;
সেটুক সময় তােমার ধ্যানে, প্রিয়,
করব যাপন আমার প্রেমের গানে।
ভালবাসার যেটুকখানি মাের
ছোঁয়নি কেহ ঘৃণ্য অযতনে ;
সেই টুকুগাে তােমায় দেবাে খালি
সেই টুকুতে বাসব ভাল মনে।
দুখ, নিওনা সুখী হ'য়াে, ওগাে,
আমার এসব তুচ্ছ আয়ােজনে ;
আপন বলে সাহস করি দিতে,
পর হ'লে ত ভাবতে হত মনে।
(৪৩)

ঝর্ণাধারা-
যে স্রোত বহিয়া যায়
সে কি আর আসে রে,
যে ফুল ঝরিয়া গেল
সে কি আর হাসে রে।
যে কথা বলিয়া ফেলি
সে কি আর ফিরে রে,
যে বায়ু বহিয়া গেল
সে কি ব’বে ধীরে রে ।
যে নিশা কাটিয়া যায়
সে কি আর পাব রে,
যে গান গাহিয়া মরি
সে কি আর গাব রে।
যে পাতা ছিড়িয়া যায়
উঠে কি সে ফুটি” রে,
যে বঁধু চলিয়া গেল
ফিরিবে কি কুটীরে ।
(৪৪)

ঝর্ণাধারা
চলিতে চরণে বাজে
একি শৃঙ্খল জড়ালি প্রেমের বলিতে পারিনা লাজে,
ঘুরিতে ফিরিতে উঠিতে আমার চলিতে চরণে বাজে।
তাের কাছে কত ছুটে ছুটে যাই,
পরাণবেদনা নিয়ত জানাই,
সেদিকে কখন দিস্ না ত কাণ-ব্যস্ত থাকিস্ কাজে,
প্রেমের শিকল এদিকে আমার চলিতে চরণে বাজে
শৃঙ্খলধ্বনি শুনিয়া হাসি—এমনি পাষাণ প্রাণ,
তারি তালে তালে গাহিয়া জানা প্রাণের মধুর গান ;
আমি কেঁদে মরি পায়ে কত ধরি,
না শুনে সে কথা যা ধীরে সরি’,
বুঝে না বুঝি শৃঙ্খলদাগে কি ব্যথা সেথায় রাজে,
দিবসে নিশীথে এদিকে আমার চলিতে চরণে বাজে
বন্দীর মত কাটাই জীবন তাের প্রেম-কারাগারে,
শৃঙ্খলভার পরাণ আমার আর কি বহিতে পারে ?
কাছেতে রবিনা দূরে দূরে যাবি,
আমারে টানিয়া কেবল বেড়াবি ;
একি তাের খেলা বুঝিতে পারি না সরল হৃদয়মাঝে,
উঠিতে বসিতে এদিকে শিকল চলিতে চরণে বাজে।
(৪৫)

ঝর্ণাধারা-
খুলে দে বাঁধন খুলে দে শিকল বহিতে পারি না আর,
ওরে ও পাষাণি চেয়ে দেখ, পদে ঝরিছে রক্তধার;
প্রেমের শিকল রুধিরে ভিজেছে,
তাই হেরি’ কি রে হরষ জেগেছে ?
আপনা ভুলিয়া তাই কি ছুটিস্ সাজিয়া মােহন সাজে,
সাথে সাথে যে রে এদিকে শিকল চলিতে চরণে বাজে।
( ৪৬)

-ঝর্ণাধারা
দুরাশা
আমি জানি তােমারে পাবনা,
তবু আশা তবু চেয়ে থাকা ;
আমি জানি দিবেনা সান্তনা,
তবু রহে অশ্রুজলে ডাকা ।
এ যে মাের অনন্ত দুরাশা,
ওগাে নাথ, ওগাে প্রিয়তম,
এ যে দেখি তব ভালবাসা
মরুমাঝে পূতবারি সম।
চেয়ে চেয়ে আঁখি জ্বালা করে,
বুঝি নাক মরুর ছলনা;
জানি নাক কতদিন পরে,
ভেঙে দিবে এমন বঞ্চনা।
ওগাে প্রিয়, সাঙ্গ কর তব
প্রাণ লয়ে নিদারুণ খেলা ;
ওগাে দেব, আর কত সব
এ জীবনে শত অবহেলা।
( ৪৭ )

ঝর্ণাধারা-
সন্তোবিধবা মাতার প্রতি
তুই কেন মা অমন করে এ বসে থাকি,
চোখের জলে ভিজিয়ে দিঠি কার কথাটি ভাবিস্?
কার তরেতে আকুল প্রাণে,
কেঁদে মরিস্ ব্যাকুল টানে,
দীর্ঘশ্বাসে নীরব সুরে আজকে কারে ডাকি,
তুই কেন অমন করে এলা বসে থাকিস্।
রঙিন সাড়ী পরিস্ নাক বল্ মা কেন আর,
মুখের হাসি পাঠিয়ে দিলি কোন্ সে বনের ধার ?
হাতের চুড়ি ফেলি খুলে,
নাকের নােক রাখলি তুলে,
পরিস্ না মা আর ত ভুলে পেরুজা-পতির হার,
বাবার দেওয়া গয়না যত ভুললি কথা তার ।
5
সিথের সিদূর মুছলি কেন গঙ্গামাটি দিয়ে,
ভাঙলি কেন হাতের শাঁখা শিলের নােড়া নিয়ে ?
চুলের রাশি বাঁধিস্ নাক,
জ ধরেছে দেখি নাক,
চিরুণ কাটা রইল কোথা খোঁজ নিবি না গিয়ে,
তেমন করে সাজবি না মা আতা পায়ে দিয়ে।
( ৪৮ )

-ঝর্ণাধারা-
সাদা কাপড় মানায় নাক পরিস্ কেন থান,
গুল-বসান কাপড়খানা এতই কি হয় টান ?
বুড়ীর মতন দেখায় তােকে,
কেমন কেমন ঠেছে চোখে,
সেমিজ সায়া পরুনা মাগাে নাচুক আমার প্রাণ,
তেমনি করে শােনাই তােরে শিখিয়ে-দেওয়া গান।
( ৪৯ )

ঝর্ণাধারা
মনের মানুষ
পর হল ভানুর
তাইত দেখি ভােরের বেলা,
বঁধুর আলাে অঙ্গে মেখে
করূলে সুরু মােহন খেলা।
কুমুদ হল চাঁদের রাণী
তাইত দেখি সন্ধ্যা এলে,
চাইবে ধীরে তারির পানে
টানা টানা চক্ষু মেলে।
ভ্রমর হল ফুলের প্রিয়
বসিয়ে তারে ধরূবে বুকে,
অধরসুধা তারেই দেবে
আকুল-করা অতুল সুখে।
ময়ুর নাচে মেঘটি দেখে
ছড়ায় পাখা তারির ডাকে,
প্রাণের প্রিয় সেই যে তারি
প্রণয় আশে কেবল হাঁকে।
চাতক পাখী উর্ধে চেয়ে
বলছে ঘেঁকে-ফটিক জল।
একটি ফোঁটা তারির প্রিয়
শীতল হবে হৃদয়তল।
(৫০ )

বর্ণাধারা-
আগুন-ঝরা ফাগুন এলে
কোকিল সুরে মধুর গায়,
তারির গানে বিড়ােল প্রাণে
বইবে ধীরে দখিন বায়।
এম্‌নি তর যে যার ভবে
বেছেই নেছে আপন ধন,
এমনি তর তাদের সাথে
মিশিয়ে আছে পরাণ মন।
কবির প্রিয় কোথায় কেগাে
কেমন করে আজকে বাঁচি,
লুকিয়ে বুকে ভাবটি বলে,
‘এই যে আছি-এই যে আছি।
(৫১)

ঋণাধারা
ফুলজম
ফুলের মতন দিয়াছি বিলায়ে সব,
ফুলের সমান সহেছি সকল আলা ;
অলির মতন তুলিনি কভু ত রব,
অলির সমান গাঁথিনি গানের মালা।
ফুলের মতন ফুটিয়া ছিনু ত বনে,
ফুলের সমান বিকায়ে দিয়েছি হৃদি ;
অলির মতন হরিনি সঙ্গোপনে,
অলির সমান লুটিনি পরের নিধি।
ফুলের মতন আদরে ধরেছি সবে,
ফুলের সমান করেছি অমিয় দান
অলির মতন আসিনি চটুল রবে,
অলির সমান করিনি পীযূষ পান ।
ফুলের মতন নীরবে ঝরেছি তলে,
ফুলের সমান ফুরায়ে গিয়াছে মধু ;
অলির মতন ছলিনি কাহারে ছলে,
অলির সমান সাজিনি নিঠুর বঁধু ।
ফুলের মতন চরণআঘাত সহি,
ফুলের সমান ধূলাতে লুটাই আজ
অলির মতন উড়িনা পুলকে কহি',
অলির সমান ধরিনা মােহন সাজ।
(৫২)

বাণাধারা
ফুলের মতন শুকায়ে যেন গাে যাই,
ফুলের সমান ধূলিতে হইব ধূলি;
অলির মতন যেন না শুনায়ে গাই,
অলির সমান হৃদয়ে যেননা ভুলি।
(৫৩)

ঝর্ণাধারা-
তার হাতের লেখা
সে নেই,
আছে তার সেই
মধুর হাতের মধুর লেখা।
আমার অনেক শেখা
সেইটুকুতে হয়—
হাতে করে যখন নাড়ি কয় সে কথা কয়।
.
হায়, কতদিনের কথা।
একটু তফাৎ হয়েছিল বলে,
কেঁদে কেঁদে আঁখির জলে
ভাষার মধ্যে জানিয়েছিল ব্যথা।
পড়ি—পড়ি—চিঠিগুলাে কেবল পড়ি,
বেদপুরাণের সকল বাণী যেন রয় সেথা ছড়াছড়ি
ওগাে, পরের কাছে তুচ্ছ তা ;
আমার কাছে এসব চিঠি ফালত বাজে কিছুই না।
আজ সে গেছে চলে,
সকল বাঁধন এড়িয়ে গেছে ছলে ;
কতদূরে কোন্‌খানে,
মন তাহা নাহি জানে।
( ৫৪ )

" ঋণ- যখন পড়ি লেখার বাণী, মনে হয় ডাক্‌ছে যেন সে ওরির মাঝে দিয়ে হাতছানি। বেশ দেখতে পাই, আকুল হয়ে ধরূতে যখন চাই, হেসে হেসে ধীরে ধীরে লেখার মাঝে মিলিয়ে যায় সে। দিয়ে হাতছানি এমনি করে লেখার মাঝে ডাবে সে গাে জানি; কইবে কথা- বুব না তা। রেখে গেছে যেটুক স্মৃতি হাতের লেখা দিয়ে, সেইটুকুতে টানবে আমায় বুকের ব্যথা নিয়ে। চিঠিগুলাের মূল্য কত অঙ্ক কষে ঠিক পাবে না; রাজকোষে নাই রত্ন তত। অতি যত্নে রেখেছি তাই ; তার কাছেতে যাবার আমার এ ছাড়া আর প্রবেশ পত্র নাই। (৫৫)

ঝর্ণাধারা-
আমার ভালবাসা
আমার মত তত ভাল কেউ কি বেসেছ ?
মনের বনে ঘুরতে তারে কেউ কি দেখেছ ?
গােপন ধ্যানে লুকিয়ে নিয়ে,
প্রেমের মধুর পরশ দিয়ে
পাগল হয়ে বিশ্বজগৎ কেউ কি ভুলেছ ?
আমার মত তােমরা ভাল কেউ কি বেসেছ।
বিরহে তার কেঁদে কেঁদে এখন হেসে ফেলি,
মনের আঁধার মণিকোঠায় হয় যে শত কেলি ;
আমার প্রেমের ঝর্ণাধারায়
অঙ্গসুবাস তার যে গড়ায়,
একটুখানি নিশানা তার কেউ কি পেয়েছ?
আমার মত তত ভাল কেউ কি বেসেছ ?
কথার ঝুমুর
আমার মুখে জোগায় বাণী ভাবের রাশি তার,
বাজিয়ে চলে ছন্দে বারংবার ;
আমায় নিয়ে ঘােরায় ফেরায়,
হাট বাজারে নাচায় বাজায় ;
একটুখানি সুরের বাহার কেউ কি শুনেছ ?
আমার মত তােমরা ভাল কেউ কি বেসেছ?
( ৫৬ )

ঝর্ণাধা-
আমার চোখের অশ্রুজলে যখন ভিজে যায়,
মাের দীর্ঘশ্বাসে সিক্ত বেণী শুকাতে সে পায়।
স্বপনে মাের ঢাকা থাকে,
মাঝে মাঝে জাগাই তাকে ;
অভিসারের সাজটি তাহার কেউ কি দেখেছ ?
আমার মত তত ভাল কেউ কি বেসেছ ?
আমার আমি তলিয়ে গেছে লহরে তার আজ,
তারে দিয়ে আমায় তুলি এইত এখন কাজ ;
চুমােয় চুমােয় কোলাকুলি,
শিহর শুধু উঠছে দুলি’ ;
এনিতর চমক নিয়ে কেউ কি গেঁথেছ ?
আমার মত তত ভাল কেউ কি বেসেছ ?
আমার মন-মৃগশিশু ছুটে ছুটে মরে,
তাই দেখে সে দৌড়ে এসে আমায় কোলে করে ;
জীবন নদীর কূলে কূলে,
আমায় বুকে নেয় সে তুলে ;
এমনিতর মধুর খেলা কেউ কি খেলেছ ?
আমার মত তাো ভাল কেউ কি বেসেছ?
(৫৭)

ঋণ- ভাষার রূপদান সীতার বিরহে রাম কেঁদেছিল রাজ প্রাসাদের নিভৃত কোণে, কবির ভাষায় শুধু পড়ে গেছ কোন দিন তাহা জাগেনি মনে। অশােক-কাননে জনক-তনয়া গুমরি গুমরি' দিল যত, কবির বাণীতে শুধু জেনে আছ দেখনি অশ্রুপ্রবাহ শত। বাল্মীকি মুনি তাইত আমারে সৃজিয়া পাঠাল ধরার মাঝে, কলির মানবে বুঝাতে এমন ব্যথার উৎস হৃদয়ে রাজে। আমার নয়নে ঝরে আঁখিজল চির বিরহের বিধুর নামে, (মাের) দখিন নয়নে কঁদিতেছে রাম, জনক-তনয়া কঁদিছে বামে। কবির ভাষায় রূপ প্ৰদানিতে কাদিতে দিতে এসেছি ভবে, জীবন ভরিয়া কাঁদিয়া যাইব তবেত ভাষার অর্থ হবে। ( ৫৮ )

বর্ণধার
যদি এমন হয়
যদি কখনাে আমারে দেখ গাে দয়াল
চলেছি অহঙ্কারে,
তুমি কঠিন ডাঙসে তখনি এ শির
নুয়ে দিও বারে বারে।
যদি আপন গরবে কখনাে দেখ গাে
স্ফীত এ বক্ষতল,
তুমি চরণআঘাতে চেপে দিও
বুক
ফেলিব না আঁখিজল।
যদি আপনার মনে গেয়ে যাই দেখ
আমারি ব্যথার গান,
তুমি কণ্ঠ চাপিয়া দিও গাে থামায়ে
তখনি শতেক তান।
যদি নিখিল বিশ্বে বঞ্চনা করি
ক্ষুদ্র হৃদয় নিয়া,
তুমি রক্ত চক্ষু দেখায়ে তখনি
কম্পিত ক’র হিয়া।
যদি তােমার সাথেতে চলিতে চলিতে
চপল চরণ ফেলি;
তুমি আঘাতে আঘাতে তখনি শিক্ষা
দিও গাে নয়ন মেলি'।
(কিন্তু) যদি সরল পরাণে প্রতারণা পাই
যাতনা তাহারি সাথে,
তুমি অন্তর দিয়া পূরায়ে দিও গাে
ভালবাসি’ দিনরাতে।
( ৫৯ )

-ঝর্ণাধারা-
যেটুকু লুকান আছে
বজ্রআঘাতে কোমলতা আছে,
সেটুকু ধরিলে ফুলের পাশে,
কুসুমসুবাস ম্লান হয়ে যায়,
গরব তাহার নমিয়া আসে।
ফুলের বুকের কঠোরতা টুকু
যখন দাড়ায় চক্ষু মেলি',
বজ্র তখন নত হয়ে পড়ে
পারে না দাড়াতে তাহারে ঠেলি'।
পুরুষের হৃদে কোমলতা যবে
জেগে ওঠে ধীরে কাজের মাঝে,
নারীর বুকের পেলবতা টুকু
লুকায় তখন নীরব লাজে।
নারীহৃদয়ের নিঠুরতা যবে
নিৰ্ম্মমরূপে দাড়ায় কাছে,
পুরুষ তখন ভয়ে কেঁপে মরে
ভস্ম সে হয় অনলে পাছে।
( ৬০ )

ঋণাধারা
চুম্বনের পার্থক্য
ফুলকলি দেখে চেয়ে প্রভাতে কমল
ধীরে ধীরে আঁখি মেলে রবির চুম্বনে ;
আবার ঢলিয়া পড়ে স্বপন-বিহ্বল,
সূৰ্য্য যবে অস্ত যায় বিদায় লগনে।
কলির জাগিল সাধ, ওই মত হায়
চুম্বনে চুম্বনে নিত্য জাগিরে ঘুমাবে ;
অলির পাশেতে তাই প্রার্থনা জানায়,
অলি যেন তার আশা সকলি পূরাবে।
মধুলােভে মত্ত অলি স্বার্থপর হিয়া,
ভুলাইল ক্রুর ছলে ফুলকলিপ্রাণ ;
মহানন্দে কলিমুখ চুমিয়া চুমিয়া
দলিতে লাগিল হৃদি নিঠুর সমান।
দিবারাত্র চাহি’ চাহি’ ক্লান্ত ফুল শেষে,
ঘুমাইতে চায় সদা অলির চুম্বনে ;
অলি আসে-মরে ফুল তারে ভালবেসে,
পারে না মুদিতে আঁখি পূর্ণ জাগরণে।
চুম্বনে চুম্বনে অলি আপন কামনা
পূরাইয়া চলে সুখে দলি’ ফুল হিয়া ;
কুসুমের বুকে জাগে করুণ যাতনা,
নীরবে কাঁদিয়া মরে চাহিয়া চাহিয়া।
(৬১)

শাখাৱা-
এদিকেতে রবিকরে প্রভাতে সন্ধ্যায়
পদ্ম জাগে, ঢলে পড়ে চুম্বনে শিহরি;
চেয়ে চেয়ে দেখে ফুল গােপন ব্যথায়,
রূপহীন সৌরভেতে রাখে তা’ আবরি।
একদিন ঝরে ফুল-সাধে পড়ে ছাই,
বাতাসে তাহার বাণী ভাসে অতঃপর ;
‘যে-চুম্বনে ব্যথা জাগে অলি জানে তাই,
যে-চুম্বনে সুখ আছে জানে তা ভাস্কর।
(৬২)

-ঝর্ণাধারা-
অভিলাষ
যদি শ্যামের মত রসিক নাগর বঁধু
মাের জীবন ব্ৰজে খুঁজিয়া কভু গাে পাই,
আমি গােপীর মত সাজিয়া গােপন বধূ
তার কুঞ্জমাঝে যাপিতে যামিনী যাই।
যদি শ্যামের মত বাজায়ে মধুর
বাঁশী
কদমমূলে অমনি দাড়ায়ে থাকে,
আমি গােপীর মত তেয়াগি’ সরমরাশি
সদা ছুটিয়া চলি নয়নে দেখিতে তাকে।
যদি শ্যামের মত যমুনাপুলিনে হায়
মােহন বেশে নূপুর বাজায়ে চলে,
আমি গােপীর মত মরমে মরিয়া প্রায়
সেথা
বসিয়া থাকি গাগরী-ভরণ-ছলে।
কেহ
যদি শ্যামের মত মধুর প্রেমিক হিয়া
আনিয়া ভ্রমে আমার আঙিনাপাশে,
আমি
গােপীর মত কুলেতে
কালিমা দিয়া
তারে জড়ায়ে ধরি অসীম সুখের আশে।
1
যদি গ্রামের মত অধরপরশে আজি
চুমিতে চাহে আমারে ধরিয়া বুকে,
আমি গােপীর মত এখুনি তাহাতে রাজী
মাের সকল মান ডুবাতে শিহরসুখে।
(৬৩)

ঋণ ধারা-
যদি শ্যামের মত দরদী বঁধুয়া জনে
মাের জীবনব্রজে কখনাে কাহারে পাই,
আমি গােপীর মত মিলিতে তাহার সনে
শত হরষভরে ছুটিয়া চলিয়া যাই।
( ৬৪ )

ঝর্ণাধারা বিদায় প্রার্থনা বন্ধু, আসিয়াছি ত জ দিয় ন ডি- দিবে না বিদায়। আজো কিগাে আঁখি জলে বাঁধিয়া রাখিবে মিলনকারায় ? হয়েছে ত বহু খেলা, বহু রাগারাগি মােদের মাঝারে, কত মান অভিমান হইয়াছে হায় কথার প্রহারে। গলা ধরে খােলা হাসি তাও হাসিয়াছি আছে সবি মনে ; আজো সুখশিহরণ ভুলি নাই, সখা, অধরচুম্বনে। আজ যাব, চলে যাব-র’ব নাক আর তােমার সভায়, অনুমতি মাগি শুধু সজল নয়নে বিদায় বিদায়। . . । ভালােবাসা যেটুকু দিয়াছি-সেইটুকু মনে রেখাে ভাই, অনাদর অযতন যদি করে থাকি ভুলাে তা’ সদাই। জীবনের কোলাহলে শত কটু কথা হয়ত কহেছি, খেলাছলে গালগাল দোহে দুজনায় হয়ত দিয়েছি। (৬৫) ,, ' সখা বলি ক্ষমা কর রেখাে না তা মনে মিনতি আমার । করজোড়ে ভিক্ষা মাগি এইটুকু আজ কাকােতে তােমার। আজ খেলা ভেঙে গেছে—সুদূরের ডাক ডাকিছে আমায় ; হাসিমুখে দাও, সখা, সরল পরাণে বিদায়—বিদায়। ওঠে দুলি। এই বুকে দাও, প্রিয়, শেষ আলিঙ্গন লভিয়া তা যাই ; এই মুখে দাও, সখা, বিদায়চুম্বন- আর দেরী নাই। থাক সুখে সংসারেতে করি এ প্রার্থনা দুখ জ্বালা ভুলি’, মাঝে মাঝে শুধু যেন মাের স্মৃতিটুকু বুকে জীবনের পরপারে যদি দেখা হয় শুধাব কুশল ; এমনি বুকেতে ধরি’ তােমারে তখন কহিব সকল। লক্ষ্মীছাড়া মাের স্থান ভােমার পাশেতে শােভা নাহি পায়; অনুমতি দেহ, সখা, আজি চলে যাই- বিদায় -বিদায়।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Jharnadhara

Author
Biswas ,jatindranath
Title
Jharnadhara
File name
Jharnadhara
Text
OCR done
Citation
1936
Published
2009/12/21
Publisher
Bijoli Publishing House,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
82
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Biswas ,Jatindranath
DLI number
511120
Barcode
4990010018297.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
hRLWQeXE2jS
Download PDF

Jharnadhara