Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Samrat O Shresthi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী
::
EHF WINITIE
3
folio by : Ay.
ust, ?,
HOWRAH.
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
ডি. এম. লাইব্রেরী
৪২নং কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
শ্রীগােপালদাস মজুমদার
ডি, এম, লাইব্রেরী
৪২ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট,
কলিকাতা।
ফান-১৩৫২
মূল্য ৩
মূদ্রক :
শ্ৰীঅজিতকুমার বসু, বি, এ,
শক্তিপ্রেস
২৭৩ বি হরিঘােষ স্ট্রীট,
কলিকাতা
n Oid Ap
R
আশা দেবীকে
দুপুরের খররৌদ্রে বরেন্দ্রভূমির রুক্ষ রিক্ত প্রান্তরের ভেতর
দিয়ে বাসে করে আসছিলাম। সেই দ্রুত গতির মুখেই
পাশাপাশি নবীপুর আর কুমারদহকে চোখে
কুমারদহকে চোখে পড়েছিল।
বাস্তবে এই দুখানি গ্রামের নাম অবশ্য স্বতস্ত্র, কিন্তু কাহিনীর
প্রয়ােজনেই আমি এদের নতুন নামকরণ করেছি।
সামান্য কিছু লেখবার পরে পাণ্ডুলিপি অনেকদিন পড়ে
ছিল। বঙ্গশ্রী’ পত্রের সহ-সম্পাদক আকৈশাের সুহৃদ রণজিৎ
কুমার সেনের তাগিদে লেখাটি শেষ করি এবং এটি ধারাবাহিক
ভাবে ‘বঙ্গশ্রী’তে প্রকাশিত হয়। মাসিক কিস্তির জন্যে তাঁর
অক্লান্ত ও অসহ্য তাগিদ না থাকলে এ বই হয়তাে কোনো-
দিনই শেষ হতনা।
প্রেসের গােলমালে ‘সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী’ প্রায় বছরখানেক
আটকে থাকলেও ডি, এম, লাইব্রেরীর কতৃপক্ষ এর পেছনে
যে উদ্যম ও উদ্বেগ ব্যয় করেছেন সেজন্যে তাঁদের ধন্যবাদ।
বইটির প্রচ্ছদপট এঁকে দিয়েছেন আমার তরুণ শিল্পী
বন্ধু কামরুল হাসান।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১লা ফান, ১৩৫২
৪৩২ আমহাষ্ট স্ট্রীট,
কলিকাতা
0 : h : , সম্রাট শ্রেষ্ঠ কথামুখ নিবিড় বিন্নাঘাসের মধ্য দিয়ে কান নদীর নীল জল যেখানে একে বেঁকে মহানন্দায় নামতে চলেছে, শেষ পর্যন্ত দলটি সেখানে এসে থেমে দাড়াল। আকাশে বর্যা-মেঘের অঞ্জন। দূরে সিংহাবাদের হিজল বন যেন একটা সবুজ প্রচীরের মতাে দাঁড়িয়ে, তার মাথায় সাদা বক ফেনার মত জমে রয়েছে। ওই হিজল গাছটায় না আছে এমন জন্তু নেই। ওখানে শ্যাওলা-ধরা সবুজ গুড়ির গায়ে হরিণেরা শিং ঘষে চলে, আর ঘন ঘাসবনের মধ্যে দু চোখে হিংসার প্রখর আলাে জ্বালিয়ে ভােরাকাটা ক্ষুধাত বাঘ তাদের পর্যবেক্ষণ করে। মেঘের গুরু মৃদঙ্গ শুনে হিজলের ডালে ময়ূরের পেখম মেলে দেয়, বকের ছানা খাওয়ার আশায় কালাে রঙের যে গাের সাপটি গাছের আগায় উঠে এসেছিল, তটস্থ হয়ে সে লুকোবার চেষ্টা করে পাতার আড়ালে। ঘাসের বন দলিত করে নক্ষত্র গতিতে একটা নীল গাই ছুটে চলে যায়, ক্রুদ্ধ শঙ্খচূড় তাকে ধরতে না পেরে নিষ্ফল আক্রোশে মাটির ওপর ঠকা ঠকা শব্দে ছােবল মারে। কাকচক্ষু জলের মধ্যে প্রকাণ্ড নরখাদক কুমীর মেঘের মতাে ভেসে বেড়ায়। চলতে চলতে যাযাবরের দল সেখানে এসে বিশ্রাম নিতে চাইল, সেখানে পুরাণাে দীঘিতে থরে থরে রক্তপদ্ম ফুটে রয়েছে, ভাঙা মন্দিরের ধ্বংসস্তুপের ওপর কষ্টিকারীর বেগুনী শােভা। মৃত্তিকার অণুতে অণুতে २ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ মিশে রয়েছে অতীত সভ্যতার বিবর্ণ ইষ্টকচুর্ণ। কাঞ্চন নদীর ওপারে প্রশস্ত বিল, শাপলায় কলমীতে জল আর চোখে পড়ে না। শীত কবে দিগন্তবিস্তৃত মাঠের ওপর থেকে তার সাদা কুয়াশার জাল সরিয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু দূরের যাত্রী বনহংসীর দল এই নির্জনতার মায়া কাটাতে পারে নি। ঢােলকলমী আর শাপলালতার মাঝখানে একেবারে তীরের কাছ ঘেসে তারা বাসা বেঁধেছে, দুপুরের রােদে চোখ বুজে বসে তারা সাদা সাদা ডিমগুলােতে তা দেয়। বিহারের অনুর্বর কাকরের দেশ থেকে যারা এখানে এসেছে, সবুজের এই.সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তারা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। এ এক অপূর্ব জগৎ। যেদিকে চাওয়া যায়, রঙের স্নিগ্ধতায় যেন চোখ পরিপূর্ণ হয়ে শােভায় দাক্ষিণ্যে পরিপূর্ণ পৃথিবী—এ যেন কল্পনার স্বর্গলােক। ঝিনুকের রেখা-আঁকা বালির তীরে বসে নদীর জলে তারা ছাতু , ভিজিয়ে নিলে। ক্লান্তি দূর হলে ঢােল আর করতাল সহযােগে উৎসব মুরু হল তাদের : “আরে বিশাখী বিশাখী করে যােয়ে সিয়া জানকীয়া- ওদিকে তিন মাইল দূরে কুমারহে রায়বমার তখন প্রবল পরাক্রমে জমিদারী করছিলেন। বক্তিয়ার খিলিজীর সপ্তদশ অশ্বারােহীর সঙ্গে মুসলমান রাজতন্ত্রের ৰে প্রবল বন্যা এসেছিল, তার জোয়ারে একদিন দেবীকোট-রাজবংশও তলিয়ে গেল। দেবীকোটের নাম হল ঘােড়াঘাট আর ঘােড়াঘাট সরকারের শাসনে উত্তরবঙ্গের একটা বিরাট অংশও নিয়ন্ত্রিত হতে লাগল। প্রাচীন ৰাজবংশ ইসলাম গ্রহণ করে আত্মরক্ষা করলে, যারা এত সহজেই ধমটাকে সমর্পণ করে নিশ্চিত হতে পারল না, তাদেরই একটি শাখা এখানে সম্রাট ও যে এসে জমিদারীর একটা খণ্ডাংশ নিয়েই খুশি হয়ে গেল। এরাই রায়বমাদের পূর্ব পুরুষ। রায়বমাদের শিরায় শিরায় পূর্বগামীদের রক্ত। কাৰতেজ বা আছে প্রজারাই তার উত্তাপ অনুভব করে। মেজাজ প্রসন্ন থাকলে তারা নির্বিকার মুখে বিশ বিঘা ব্ৰহ্মত্র লিখে দেয়, অসন্তুষ্টির কারণ ঘটলে গলায় ইট ঝুলিয়ে হাঁসমারীর খাড়িতে ডুবিয়ে মারতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে। বর্ষা-পিছল গ্রামের পথ বেয়ে জমিদার রাঘবেন্দ্র রায়বমার পালকী এসে থামল। রূপপ আর হাতীর পঁাতে পাকীর সর্বত্র খচিত। ভেতরে সবুজ মখমলের তাকিয়া, তাতে হেলান দিয়ে আলবােলা টানছেন রাঘবেন্দ্র। মাথায় জরির কাজ করা শাদা রেশমের পাগড়ি, গায়ে সােনালী পাড় দেওয়া রেশমী আচকান। আগুনের শিখার মতাে একটা দীর্ঘ দেহ তার মাঝখানে জলছিল। পাকী থেকে না নেমেই রাঘবেন্দ্র ডাকলেন-দেওয়ানজী ? দেওয়ানজী সম্মুখে এসে সন্ত্রম প্রতীক্ষায় নীরব হয়ে দাড়িয়ে রইলেন। রাঘবেন্দ্র বললেন, পিছনের পালকীতে লক্ষ্মৌয়ের সরযূ বাঈজী এসেছেন। রং মহলে তার একবার সব রকম বন্দোবস্ত করে দিন। সসংকোচে দেওয়ানজী বললেন, যে আয়ে। প্রতি বছরই রাঘবেন্দ্র একবার করে পশ্চিম ভ্রমণে যান এবং প্রতিবারেই একটি করে নারীর সংগ্রহ করে আনেন। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। নারী বীরের ভােগ্যা এ কথা রাঘবেন্দ্র জানেন। তাই সুন্দরী নারী সম্বন্ধে তাঁর লালসা এবং দুর্বলতা সীমাহীন। রাঘন্দ্রে নেমে এলেন পালকী থেকে।
সম্রাট ও তো মদ ও আলবােলা বয়ে অনুচরের দল পেছনে পেছনে এগিয়ে চলল ছায়ার মতাে, যেন স্বতন্ত্র কোনাে সত্তা নেই তাদের। তারপর দেড়শাে বছর পার হয়ে গেল। রাঘবেন্দ্র রায়বমার স্মৃতি আজ ইতিহাসের বস্তু। কিন্তু সে ইতিহাস কেউ লিখে রাখেনি, জনশ্রুতির শ্রোতপ্রবাহে নানা কল্পনায় রঙীন হয়ে সে স্মৃতি বেঁচে আছে। মারাঠা’র বিলের দক্ষিণ দিকে যে প্রকাণ্ড অশ্বখ গাছটা জটা নামিয়ে দাড়িয়ে আছে, ওইখানে ভাঙা ইট-পাথরের শুপের মধ্যে ছােট একটি থান আছে। এখন ওখানে চৈত্রমাসে রাজবংশীর দল মহা উৎসাহে গাজনের উৎসব করে, মুখােস এটে দেখায় কালীর নৃত্য। কিন্তু জনপ্রবাদ বলে, দেড় শশা বছর আগে ওখানে অমাবস্যার রাতে রাঘবেন্দ্র রায়বমা কালীপূজো করতেন। তখনও কাঞ্চন নদীর জলে এমন করে বালির পাহাড় জমে ওঠেনি, ভেলার খাল দিয়ে তখনও এমন করে জল বেরিয়ে যেত না। এই নদী তখন ব্যবসায় , -বাণিজ্যের প্রধান প্রাণপথ ছিল। সিংহাবাদের বাঁক ঘুরে, নােহণপুরের বন্দর ছাড়িয়ে নদী যেখানে মহানন্দায় গিয়ে মিশেছে, সেখান দিয়ে বড় বড় ব্যবসায়ী নৌকো ভােলাহাট, ইংরেজবাজার, মালদহ, তারপর আবােরা দূরে নবাবগঞ্জ পর্যন্ত চলে যেত। আর মারাঠার বিলের ঘন কাশবনের মধ্যে রাঘবেন্দ্র রায়বর্মার যে সব ছিপ নৌকা দিনের বেলা লুকিয়ে থাকত, রাত্রির অন্ধকারে বিলের দামঘাস ঠেলে সে সব নৌকা সােজা কাঞ্চন নদীতে গিয়ে নামত শিকারের সন্ধানে। বৈদ্যনাথপুরের দীঘিতে আজো নাকি রাঘবেন্দ্র রায়বমার টাকার সিন্দুক ভেসে ওঠে, সিদুরের মত টকটকে লাল তার রঙ। ডাকাতি করা ধন রাঘবেন্দ্র ব্যবহার করতে পারেন নি, জঙ্গলাকীর্ণ অতলস্পর্শ দীঘির শীতল কাদার মধ্যে বসে যক্ষের সঙ্গে সে ধন পাহারা দিয়ে চলেছে। কিন্তু রাঘবেন্দ্র রায়বমার কথা না হয় থাক। তারপর আবাে কয় সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ পুরুষ কেটে গেল, সমান খ্যাতি অর্জন করে না হােক, সমান অপব্যয়ের মণ পথে। ইংরেজ শাসনের আওতায় বংশকৌলীন্য ক্ষীণ হয়ে যেমন কাঞ্চনকৌলীন্য প্রধান ও মুখ্য হয়ে উঠতে লাগল, তেমনি তার সাথে সাথে, তাল রেখে দেবীকোট-রাজবংশও চলল সমানভাবে লুপ্তশ্রী হয়ে । বংশ মর্যাদাকে কে আর মূল্য দেয় এখন! দেবীকোট-রাজবংশ প্রথম এসেছিল রাজপুতানা থেকে, চিতােরের প্রতাপসিংহ তাদেরই সগােত্র, সূর্যবংশের রক্ত তাদেরই ধমনীতে খরস্রোতে বয়ে যাচ্ছে, এ সব কাহিনী আজ আর কে বিশ্বাস করবে? কুমারদহের বতমান জমিদার কুমার বিশ্বনাথ রায়বমাদের শেষ কুল- প্রদীপ। হাঁ, শেষই বলা যায় বই কি। কুলপ্রদীপ কথাটাও সমান অর্থে ই সত্য, কারণ জমিদারীর অবশিষ্ট যেটকু আছে কুমার বিশ্বনাথের বিলাসের মশাল হিসাবে হয় তত আর বছর কয়েক মধ্যেই তা জলে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপরে বিস্মৃতির অন্ধকার। পুরাণে সাতমহলা বাড়ী ভেঙে পড়েছে, ওদিকটাতে এখন অজগর জঙ্গল। সাবেকী বাড়ী ছাড়িয়ে প্রায় অনেকটা পূর্বদিকে সরে এসে নতুন বাড়ী তৈরী হয়েছে রায়বমাদের। সাধারণ ধরণের কয়েকটি দোতলা—চোখে পড়বার মতাে নয়। অথচ ওদিকে দোতলা নহবংখানার ভেতর দিয়ে অশ্বথের অসংখ্য শিকড় নামছে এখন, পিলখানায় পাথরের থামগুলােকে ঘিরে ঘিরে উইয়ের মাটি জমছে, অন্দরের দীঘিতে মানুষ প্রমাণ উচু হয়ে কচুরির দল হাওয়ায় হাওয়ায় মাথা নাড়ছে। তবু কুমার বিশ্বনাথ সত্যিকারের জমিদার। এখনও বহু ব্রাহ্মণ- পরিবার তাদের দেওয়া ব্ৰহ্মত্র ভােগ করে। জগদ্ধাত্রী পূজোয় কলকাতার সেরা যাত্রার দল, সেরা খ্যামটা, কোন কোন বার থিয়েটারেরও আমদানী হয় পর্যন্ত। যে জমিদারী নিশ্চিত ভাবে ডুবতেই চলেছে, তাকে বাঁচাবার কোনাে ব্যর্থ চেষ্টাই কুমার বিশ্বনাথ করেন না। নিভতেই সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী যদি হয়, তা হলে বুক-জালা প্রদীপের মতাে একবার অতি প্রখর আলাে ছড়িয়েই সেটা নিভে যাক। দেড়শাে বছর। কেবলমাত্র এক যুগ নয়, একটা মন্বন্তর। রায়বমারা যখন দিনের পর দিন এক রকম আত্মহত্যার মতােই নিজেদের সব পুড়িয়ে ছাই করে চলেছে, তখন পারিপার্শ্বিক পৃথিবীটাও নিষ্ক্রিয় আর নিশ্চল হয়ে বসে নেই। দেড়শাে বছর আগে কাঞ্চন নদীর পারে যেখানে যাযাবর পশ্চিমার দল এসে বিশ্রামের জন্যে ডেরা বসিয়েছিল, সে জায়গাটাকে দেখলে এখন আর চিনতে পারা যাবে না। এখন সেখানে হরিশরণ লালার প্রকাণ্ড ধানের গােলা। শুধু কি একটা ? নদীর ধার দিয়ে প্রায় পনেরো বিশটা গােলার মালিক হরিশরণ লালা। এত বড় ব্যবসায়ী এ জেলায় খুব বেশি নেই। নবীপুরের বন্দর। উত্তর-বাংলার শস্যভাণ্ডার এই জেলা। বসতি বিরল মাঠের পর মাঠ জুড়ে এখানে সবুজ ধানের ঢেউ খেলে যায়, হেমন্তের সােণালি রৌদ্রে হাজার বিঘার মাঠগুলাে সােণার জোয়ারে ভরে ওঠে। বাংলার নানা অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীদের ছোটবড় নৌকা ধান কিনবার জন্যে নবীপুর বন্দরের ঘাটে নােঙর ফেলে বসে থাকে। এইটুকু তাে নদী, অথচ ধানের সময় দুই ফুল দিয়ে প্রায় একমাইল পর্যন্ত নৌকার মাস্তুল উদ্যত হয়ে থাকে আকাশের দিকে। এই মরানদী দিয়ে হাজার হাজার মণ ধাৰনেমে যায় দিগদেশের বুভুক্ষা মেটাবার জন্যে। বর্ষার সময়ে যখন দূরের মাঠগুলাে সব তলিয়ে গিয়ে সিংহাবাদ রােহণপুর পর্যন্ত একটা আদি- অন্তহীন বিলের সৃষ্টি করে, তখন সােজাসুজি পাড়ি জমিয়ে সুদূর ভাগলপুর থেকে হাজারমণী নৌকাগুলাে অবধি ভিড়ে যায় এখানকার ঘাটে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ এই বিখ্যাত বন্দরের কেন্দ্রস্থলে বসে আছেন লালা হরিশরণ । লালা, হরিশরণ পশ্চিমা কায়স্থ। আদি নিবাস ছিল আরায়, এখন সেখানে: সম্পর্কিত জ্ঞাতি ও স্বজনেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লাঙ্গল ঠেলে ; পাটনার আদালতে কেউ সামান্য একটু চাকরী করে, আবার কেউ বা ছােট এতটুকু তালুক নিয়েই রাজচক্রবর্তী সেজে বসে আছে। তাদের কারাে সঙ্গেই আজ আর লাল। হরিশরণের তুলনা হয় না। কেবল ব্যবসার দিক থেকে ধরলে তার ঐশ্বর্যের পরিচয় পাওয়া যায় না কিছুই। হাঁসমারীর খড়িটা পার হয়ে একবার তাকিয়ে দেখ সামনে, ওই যে বিশাল ধানের জমিটা দূর চক্ৰবালে কালাে কালাে গাছগুলি পর্যন্ত একেবারে ধুধু করছে, ওর সমস্তটাই লালা হরিশরণের সম্পত্তি। সমস্তটাই। এতবড় মাঠখানার ভেতরে একদাগ জমির ওপরেও কেউ দাবী জানাতে পারে না। কেবল এখানেই ? আশে-পাশে, পূবে-পশ্চিমে, উত্তরে দক্ষিণে—কোথায় নেই লালাজীর জমি'? আট দশটা খামার থেকে গাড়ী গাড়ী ধান বােঝাই হয়ে এসে গােলায় জড়াে হয়—তারপর নৌকার খােল ভর্তি করে কোথা কোথায় যে চলে যায়, কে তার এত হিসাব রাখে? মােটের ওপর, যেদিন থেকেই বলল, অফুরন্ত টাকা আসছে লালাজীর। আর আসছে বললেই যথেষ্ট হল না, ঠিক বন্যার মতাে ধারায় আসছে। লােহার সিন্দুক থেকে উপছে ব্যাঙ্ক এবং ব্যাঙ্ক থেকে আট দশটা ব্যবসার মধ্যে টাকাগুলাে নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত ধারায় ছড়িয়ে পড়ছে। লাল। হরিশরণের নাম শুনলে জেলার ইংরেজ-ম্যাজিষ্ট্রেট পর্যন্ত তটস্থ হয়ে ওঠেন। কলকাতায় বিবেকানন রােডে তার বিশাল প্রাসাদের দ্বাৰােটন করেছেন বাংলার গভর্ণর স্বয়ং। কোথা থেকে কী হয়ে গেল। যেন যাদুমন্ত্র । যে যাযাবরের দল সেদিন কাঞ্চন নদীর বালুতটে বসে ছাতু ভিজিয়ে খেয়েছিল, তাদেরই } সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ গুলােতে জল উঠতে পারে না, সেই সব পরিত্যক্ত টিলার ওপর ক্রমে ঘােট ঘােট গ্রাম গড়ে উঠছে। এই সব নতুন বসতির বাসিন্দা প্রায়ই ‘দিয়াড়িয়া বা মুর্শিদাবাদের একদল ঘরছাড়া মুসলমান-হিন্দুস্থানী গােয়ালা সংপ্রদায়েরও অভাব নেই। ডুবার মধ্যে পাশাপাশি অনেক গুলাে ছােট ছােট বড় চালা তুলে এই গােয়ালারা বাস করে, মহিষ চরায়, দুধ, দই, ক্ষীর নিয়ে বিক্রী করে নবীপুরের বাজারে। আশেপাশে সাঁওতাল, তুরী, ওঁরাওঁ, ভুইমালী প্রভৃতি ব্রাত্যদের ছােট বড় কতগুলো গ্রাম ছড়িয়ে আছে ছন্দোহীনভাবে। মােটের ওপর নবীপুর বন্দর যে কেবল বাইরের প্রকৃতিরই রঙ বদলে দিয়েছে, তাই নয়, জলে স্থলে অন্তরীক্ষে সব জায়গায় নতুনের ছায়া পড়েছে। এদিকে নবীপুর বন্দরে থানা বসেছে, সরকারী ডাক্তারখানা বসেছে, বসেছে তারশুদ্ধ ডাকঘর । চারদিকের ছােট ছােট গ্রামে যারা বাস করে, তারা তাে এটাকে সহর বলেই জানে। অবশ্য মামলা- মােক মা সংক্রান্ত ব্যাপারে যাদের দু একবার ইংরেজবাজার কিংবা দিনাজপুর থেকে ঘুরে আসতে হয়েছে, তাদের কথা স্বতন্ত্র, কিন্তু বেশির ভাগ লােকই নবীপুরকে অদৃশ্য কল্পনােক কলকাতার সমতুল্য বলে ভাবতে ভালােবাসে। সময় সত্যি বয়ে চলেছে স্রোতের মতােই। তাই তার এ কূল ভাঙে ততা ও কূলে বড় বড় চড়া দেখা দেয়। ঠিক এমনিই হয়েছে নবীপুর আর কুমারহের অবস্থা। মাত্র দু তিন মাইল ব্যবধানে এত বড় দুটো গ্রাম, শ্রেষ্ঠত্বের অধিকার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্ত নেই। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা ? পচিশ বছর আগেই কি একথা কেউ ভাবতে পারত! নবীপুর অবশ্য বেড়ে চলছিল, কিন্তু কুমার বিশ্বনাথের বাবা কুমার চন্দ্রনাথের পায়ের কাছে হাত জোড় করে সারাক্ষণ বসে থাকত হরিশরণের খুড়া বিষ্ণুশরণ লালা। ওরা যখন ময়লা গদীতে বসে হলদে খাতায় দেবনাগরী হরফে হিসাব কষত, সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ তখন এদের বাডির চণ্ডীমণ্ডপে ভারতের সেরা বাঈজীর পায়ে ঝুনঝুন করে ঘুঙুর বাজত। দেবীকোট-রাজবংশের রক্ত এদের শরীরে, কুমারদহ এদের রাজধানী। তার সঙ্গে কি তুলনা চলে যাযাবর পশ্চিমাদের ওই গ্রাম, ওই নবীপুরেব ? কিন্তু দিন বদলেছে, কালের হাওয়াও বদলেছে তার সঙ্গে সঙ্গে। তাই কুমারদহ যে পরিমাণে জনশূন্য হয়ে আসছে, সেই পরিমাণেই ভরাট হয়ে উঠছে নবীপুরের অন্ত-প্রত্যন্ত। সহরের মতাে কাঠা-দরে সেখানে জমি বিক্রি হয়, অথচ কুমারদহে যে সব পােড় ভিটে দাড়িয়ে আছে, বিনা পয়সায় দিতে চাইলেও সেগুলি কেউ নিতে রাজী হবে কি না সন্দেহ। এই তত যুগ। একালের শীর্ষশিখরে বণিক বসে আছে অধিকারের বহুমুকুট পরে, নরপতির চক্ৰহীন রত্নরথ কোথায় পথের মাঝ- খানে কোন্ পঙ্ককুণ্ডে যে আবদ্ধ হয়ে রইল, তার সন্ধান কোনাে ঐতি- হাসিকই বুঝি দিতে পারে না। শ্রেষ্ঠীর লােভ-লােলুপ বাহুতে রাজদণ্ড তুলে দিয়ে সম্রাট, চলে গেল প্রব্রজ্যা নিয়ে, তার পদধ্বনি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে বিশ্বতির পরপারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
কথারত কুমারদহ আর নবীপুরের মাঝখানে শােভাগঞ্জের হাট। তিথিটা শ্রাবণ-সংক্রান্তি। হাটের ঠিক মাঝখানে ঝড়া বটগাছ, বারােয়ারী তলা। তার নীচে সিমেন্টের বেদী, আর সেই বেদীতে দেবী বিষহরী অধিষ্ঠিত। অবশ্য দেবী বিষহরী সশরীরে বসে নেই, আছে তার মৃন্ময়ী মূর্তি। রাজবংশী মেয়েদের মতাে ঘঁচে ঢালাই নিবোধ মুখ, গায়ে যাত্রার দলের সখী আর সেনাপতির মিশ্রিত পােষাক। শােলার সাপগুলাে হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। দেবীর পায়ের একপাশে একটি রাজহাঁস বসে আছে ধ্যানস্থ হয়ে, আর একপাশে কালাে রঙের প্রকাণ্ড একটা সাপ ফণা তুলে রয়েছে। সাপের মুখে ব্যাং জাতীয় কী একটা পদার্থ দেখা যাচ্ছে, তবে সেটা চিংড়ি মাছ হওয়াও আশ্চর্য নয়। এটা গ্রামের বাবােয়ারীতলা। শ্রাবণী-সংক্রান্তি উপলক্ষে এ অঞ্চলের রাজবংশীরা খুব ঘটা করেই বিষহরী পূজোর আয়ােজন করেছে। অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত একটা বিরাট জনতার সামনে চলছিল আকাপের গান। উত্তর-বাংলার পল্লীজীবনের একেবারে প্রত্যন্ত প্রদেশে বাঙালির নিজস্ব এই সব আদিম আনন্দ কোনােক্ৰমে টিকে রয়েছে এখনাে। কাপ অর্থে বঙ্গ-ব্যঙ্গ। খানিকটা অভিনয় এবং প্রচুর গানের মধ্য দিয়ে খানিকটা অমার্জিত হাস্যরস সৃষ্টি করাই আস্কাপের উদ্দেশ্য। প্রয়ােজন সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ হলে ব্যক্তিগত আক্রমণও যে কিছু কিছু না করা হয় এমন নয়। মতাে অনায়াসে জেলা-ম্যাজিষ্ট্রেটকে পর্যন্ত ব্যঙ্গ করতে এরা ভয় পায় । তবে এই সমস্ত মশক সম্বন্ধে ব্রিটীশ সিংহ কখনই খুব বেশি সচেতন নয়। দাড়ি-গোঁফ-কামানাে ভূষণ মুচি মুখে খানিকটা রঙ মেখে সেজেছিল নায়িকা। তবে কেবল নায়িকা নয়, নায়িকার শাশুড়ী এবৎ কাহিনী- বর্ণিত কোনাে বিদগ্ধা নাপিত-বধুর ভূমিকাতেও সে একাই অভিনয় করছিল। মেক-আপ’টা দেখবার মতো। কোথা থেকে পুরাণে একখানা চেলি সংগ্রহ করে এনেছে, কোনাে বিয়ে বাড়ীকে ঢাক বাজাতে গিয়ে বখশিস মিলেছে সম্ভবত। কাপড়টার রঙ জলে গেছে, সর্বত্র হলুদের ছােপ লাগা, ঝােলের দাগ হওয়াও বিচিত্র নয়। পাটের তৈরী খেপাটার আয়তন দেখে কেশবতী রাজকন্যারও ঈর্ষা জাগতে পারে। নাকের মধ্য দিয়ে প্রকাণ্ড একটা নথ চালিয়ে দিয়েছে, গােরুর গাড়ীর চাকার মধ্যেই সেটা মুখের ওপর ঝুলছিল। তিনটি বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করবার মততই সর্বজনীন মেক-আপ’ । পনের টাকায় কেনা হারমােনিয়মের ছেড়া ‘বেলাে’ দিয়ে ভস্ ভস করে হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে। তবু একজন সেটাকে টেপাটেপি করে প্যা- পোঁ শব্দে একজাতীয় সুরের সৃষ্টি করছিল। একজন মাথা দুলিয়ে যে রকম প্রচণ্ড উৎসাহে তবলা ডুগি ঠুকছিল, তা দেখে সন্দেহ হয় ও দুটোকে যে-করে-হােক ফাটাবে, এই তার স্থির প্রতিজ্ঞা। করতাল ও ঘুঙুরের বেতালা ঝমঝমানিতে কানের পর্দা ছিড়ে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু ভূষণ মুচি হারবার পাত্র নয়। যন্ত্রের এই বেসুর কোলাহলকে ছাপিয়ে উঠবার মতো বিধিদত্ত কণ্ঠস্বর নিয়ে সে অবতীর্ণ হয়েছে আসরে। চেলির আঁচলটা যাত্রার সখীদের ভঙ্গিতে ধরে সে আসরের চারদিকে বার কয়েক ক্যাঙারুর মত লাফিয়ে এল, অর্থাৎ নৃত্যকলা প্রদর্শন করলে।
সম্রাট ও তো তারপর উদারা-মুদারার পরােয়া না রেখে সােজা তারাতেই সুরু করে দিলে : “পতি হে, দুঃখের কথা কী কহিতে পারি, পরবাসে গেইলা তুমি ঘরেতে রহিনু হামি কেঁইদা মরি বিরােহিণী নারী- খ্যাদেতে হয়্যাছি শীর্ণ আহার নাই পান্তা ভির্ণ মদনের তুষানলে বুঝি জল্যা মরি—” বেশভূষা দেখে সে যে নারী সেটা স্বীকার করতেই হয় এবং বিরহিণী হওয়াও তার পক্ষে এমন কিছু অসম্ভব ব্যাপার নয়। কিন্তু সে যে খেদে শীর্ণ হয়েছে এবং পান্তা ভিন্ন তার আর কোনাে আহার নেই, চেহারা দেখে সে কথা মনে হওয়ার জো নেই কিছুতেই। নায়ক সেজে রঙ্গমঞ্চে হাবু মুচি আবির্ভূত হল । পায়ে এক জোড়া বিবর্ণ ক্যাম্বিশের জুততা, কাপড়ের কালাে পাড় দিয়ে তার ফিতে বাঁধা। কাপড়টা পরেছে মালকোচা এটে। গায়ে হাতকাটা সাদা ফতুয়া, কঁাধে একখানা গামছা। চোখে ছ আনা মূল্যের এক জোড়া ‘সান গগলস নায়কের আধুনিকত্ব সম্পাদন করছে। এল অশ্বারােহণে। বীরের পক্ষে অশ্বারােহণটাই প্রশস্ত, এখন পর্যন্ত মােটর-গাড়ীর কল্পনাটা ওদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করেনি। তাই বলে সত্যিই কিছু ঘােড়া নয়। ছােট ছােট ছেলে-পিলেরা যেমন লাঠি নিয়ে ঘােড়ায় চড়ে, তেমনি একটা লাঠিতে দড়ির লাগাম ঝুলিয়ে নিজেই লাফাতে লাফাতে এসে দর্শন দিলে। তাকে দেখে নায়িকা আর একবার রঙ্গমঞ্চের চারদিকে ক্যাঙারু- নৃত্যে ঘাঘরা ঘুরিয়ে এল। ঘােড়াটাকে একটা চেয়ারের পায়ার সঙ্গে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ বেঁধে নায়ক গান ধরলে। গান তাে নয়, নিজের প্রবাস বর্ণনা আর বিরহ- বেদনার সুদীর্ঘ ফিরিস্তি। তার ভেতর না আছে এমন ব্যাপারই নেই। মােটামুটি ভাবার্থ এই : “ওগাে প্রিয়া, তুমি তাে ঘরে বসিয়া দিব্যি ইনাইয়া বিনাইয়া গান গাহিতেছ। পান্তাই খাও আর যাই খাও ফুলিতেছ নেহাৎ মন্দ নয়। কিন্তু আমার অবস্থা তাে আর জানাে না। একে তাে বিরহ-আগুনে দিবারাত্রি শাল কাঠের মতাে ধিকি ধিকি করিয়া জ্বলিতেছি, খাইতে যােয়ান্তি নাই, শুইতে থােয়ান্তি নাই, তার উপরে আবার জমিদারের অত্যাচার। এমন হারামজাদা জমিদার ভূ-ভারতে মিলিবেনা। ধরিয়া ধরিয়া বেগার খাটায়, জমি হইতে জোর করিয়া ধান কাটিয়া লয়-জমিদারের গ্রাসে যথাসর্বস্ব গেল । সেদিন আবার লইয়া গিয়া বিশ ঘা জুতা মারিয়াছে। পিঠের আলায় তিন রাত ঘুমাইতে পারি নাই, এখানে আসিয়া তােমার বিরহ-যন্ত্রণা নিবাপিত করিব কী প্রকারে।” শুনে স্ত্রী খেদোক্তি করলে খানিকটা। অত্যন্ত সযতে স্বামীর পিঠট। দু একবার ডলে দিলে, ক্যাঙারুর ভঙ্গিতে আসরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে নেচে এল একবার। তবে নৃত্যটা এবারে দুঃখ না আনন্দের অভিব্যক্তি -সেটা ঠিক বােঝা গেল না। দর্শকদের হাততালি বেজে উঠল। বাহবা, বাহবা, সাবাস। গান থেমে গেছে কিন্তু তবলচীর উৎসাহে ভাটা পড়ে নি তখননা। অথবা ভাবে সে এতটাই বিভাের হয়ে পড়েছে যে, বাহন সম্পূর্ণ লােপ পেয়েছে তার। দু’হাতে দুম দুম করে সে তবলা ঠুকে চলেছে। কিন্তু দর্শকেরা এসেছে তামাসা দেখতেই। যে সব সমস্যার বাস্তবরূপ প্রতিদিন তাদের জীবনকে দুবহ করে তােলে, সে সব সমস্যা যে আকাপের আসরেও তাদের তাড়া করে আসবে-এ তারা চায় না। পাঁচ সাত জন চীৎকার করে বললে, “কাপ চাই কাপ, মালা।”
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ নায়ক-নায়িকা ঝুকে পড়ে সসম্ভমে অভিবাদন জানাল দর্শকদের। হারমােনিয়াম আর তবলার সুর ফিরল, প্রবল কণ্ঠে দ্বৈত-সঙ্গীত জুড়ে দিলে তারা। কিন্তু দ্বৈত-সঙ্গীতটাও মাত্র দু এক মিনিটের জন্যেই। হারমােনিয়াম, তবলা ও করতালওয়ালারাও নিজেদের কণ্ঠ-কাকলির পরিচয় দেবার এই সুবর্ণ সুযােগটির জন্যেই মুখিয়ে ছিল বােধ করি, মুহূর্তে সকলের সমবেত চীৎকারে বানােয়ারীতলা মুখর হয়ে উঠল। বেদীর ওপর শিউরে উঠলেন দেবী বিষহরী। গানটা আধুনিক কালকে ব্যঙ্গ করে : “মাথাতে লম্ফা টেরী হাতেতে বান্ধা ঘড়ি, বুকেতে ফন্ট্যানপ্যান আই এম এ জ্যাণ্টেল ম্যান এবং তারপরে “মিঠাই মােণ্ডা ঘরের ইস্ত্রী পরাণ ভরে খেতে পান, বাপে মায়ে চাইলে পরেই পয়সার বড় টা——” কটাকট করে প্রবলভাবে চারদিকে ক্যাপ পড়ে গেল। এই--এত- ক্ষণে জমেছে। এ নইলে আবার ‘কাপ। সহরের আলােক-প্রাপ্ত একজন ছিল, সে বললে, অ্যাকোর, অ্যাকোর । একপাশে একখানা চেয়ারে লালাজী বসেছিলেন। সারা জেলায় লালাজীর নাম, কলকাতার ব্যবসায়ী মহলে অসাধারণ খাতির। কিন্তু দেশে এলে তিনি ইতর-ভদ্রের সঙ্গে মিশে যান সমানভাবে। এই কারণে দেশের নােক শ্রদ্ধা করে তাকে বিশ্বাস করে অনেক বেশি। যে লােকটা তাঁর গণের জালে পড়ে ফাসে আঁটা প্রাণীর মতাে মৃত্যু-যন্ত্রণায় ছটফট করছে, আঁর হাসিমুখ দেখে সেও তাকে একান্ত সুহৃদ বলেই মনে করে। আর কেনই বা করবে না ? দিনের পর দিন চক্রবৃদ্ধির কালচক্রে তিনি সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ১৭ ইদারা। •• যাদের ভিটে মাটি উচ্ছেদ করেছেন, তাদের গ্রামেই নিজের ব্যয়ে বসাচ্ছেন মহরম থেকে শুরু করে ছট পরব পর্যন্ত, তাঁর কাছে হাত পাতলেই অক্লেশে পাঁচ দশ টাকা তুলে দেন তিনি। গানটা লালাজী উপভােগ করছিলেন। বাঙালী নন বটে, কিন্তু বাংলা দেশকে গ্রহণ করেছেন মাতৃভূমি হিসাবে। উত্তর-বাংলার এই সব নগণ্যতম গ্রাম, চাষাভূষার দৈনন্দিন জীবন, তাদের চিন্তাভাবনা, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তিনি আশৈশব পরিচিত। তাঁদের পরিবারের মধ্যে হিন্দী ভাষাটা এখনাে চলে বটে, কিন্তু সে ভাষায় আধাআধি পরিমাণ প্রাদেশিক বাঙলার খাদ মিশেছে। তার ছেলেরা কলকাতায় পড়ে, বাঙালীর মতাে করে চুল ছাঁটে, কাপড় পরে ; লালাজী আশঙ্কা করেন দশ বছর পরে তারা একেবারে বাঙালী হয়ে যাবে। অবশ্য সে জন্য তিনি খুব চিন্তিত নন। পশ্চিমে তার কেই বা আছে। জেলার কোন্ গ্রামে তার আদি নিবাস সেটা তিনি নিজেও মনে করতে পারেন না সব সময়ে। গান শুনে লালাজী বললেন, সাবাস্ ! বেড়ে গান। কোথাকার দল তােমরা ? তবলচী তড়াক করে উঠে দাড়াল। এতক্ষণে ভাল করে দেখা গেল লােকটাকে। বােঝা গেল সেই এদের দলপতি, চলতি কথায় ‘মেনেজার। গায়ে ফুলকাটা পাতলা বিলিতী ছিটের পাঞ্জাবী, তার স্বচ্ছ আবরণের তলায় গােলাপী গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে একটা, গলায় এক গাছা দূতার সঙ্গে সঙ্গে তিন চারটি মেডেল ঝুলছে, টিনের অথবা রূপাের বােঝবার জো নেই। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে নগ্ন পরীর মূতি আঁকা একখানা ছাপা রুমাল মাথা তুলেছে। তবলচী সামনে ঝুকে অসীম সন্ত্রমভরে অভিবাদন জানাল। বললে, আমরা হুজুর আইহাের দল।
১৮ मयाबी —আইহাে? মুচিয়া ? তবলচী আপ্যায়িত হয়ে ঘাড় নাড়ল। —কত টাকায় বায়না নিয়েছ এখানে ? ০০ -মােটে সাত টাকা হুজুর। ম্যানেজারের সুরে নৈরাশ্য : আলকাপ কবির সে সব দিন আর সেই। শহরে বায়স্কোপ, থিয়েটার। এই বিষহরী-পূজোর সময়টা কিছু কাজ থাকে, তা ছাড়া সারা বছরে তাে কোনাে কারবার নেই আর। —সাত টাকা!—লালাজী সহানুভূতির স্বরে বললেন, তা হলে ভাগে তােমাদের কী থাকে? —কিচ্ছ, না হুজুর, কিচ্ছ, না—ম্যানেজার উৎসাহিত হয়ে উঠল । এখন দল টিকিয়ে রাখাই কঠিন। এই মালদা জেলায় যে দু'চারটে দল আছে, দু’ এক বছরের মধ্যেই সব উঠে যাবে। আর আগে-আগে হুজুর, বড় বড় সায়েবরা অবধি আকাপের গান শুতে আসতেন। লালাজী পকেট থেকে সােনার সিগারেট-কেস বের করলেন একটা। সেটা খুলে তিনি ম্যানেজারের দিকে বাড়িয়ে দিলেন, নেবে না কি ? ম্যানেজার জিভ কেটে পিছিয়ে গেল তিন হাত। এত বড় একটা ঘটনা সে বিশ্বাস করতে পারছে না। লালা হরিশরণ, সারা দেশ জুড়ে যার নাম, যার গােয় হাজার হাজার মণ ধান মজুত থাকে, স্বয়ং লাট- সাহেবের সঙ্গে যার ‘খানাপিনা, তার হাত থেকে সিগারেট নেবে সে, আইহাের নগণ্য দোকানদার ব্ৰজহরি পাল ! লালাজী হাসলেন, নাও। আজ্ঞে, এ-এ- -লজ্জা কিসের? তুলে নাও না। কাপা হাতে জহরি একটা সিগারেট টেনে নিলে, অনেকটা যেন সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী স্পর্শ দোষ বাঁচিয়েই। জ্বলন্ত মােমের মত আবেগে গলে গিয়ে শুধু বললে, এ-এ-এ- কিছু চার-পাশের জনতা দাড়িয়ে রইল স্তব্ধ হয়ে। তারা আরাে অঘটনের প্রত্যাশা করছে। লালাজীর বাক্স থেকে বার্ডসাই তুলে নিয়েছে লােকটা, আকাশ থেকে স্বর্গীয় পুষ্পকরথ নেমে এসে তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেলেও এতটা বিস্মিত হত না কেউ। নির্ঘাত শেয়াল বয়ে রেখে সে বেরিয়েছিল, নইলে লালজীর এমন অনুগ্রহ ! একটা তীক্ষ্ণ ঈর্ষাবােধ পাজরের মধ্যে খোঁচা মারছিল তাদের। দলের অন্যান্য সবাই, বিশেষ করে ভূষণ মুচি রীতিমত মানসিক বিক্ষোভ বােধ করছিল। ঝাড়া তিন ঘণ্টা নাচে-গানে সে আসর মাং করে দিলে, আর বাহাদুরি যা কিছু সব জুটল ম্যানেজারের ভাগ্যে ! লালাজী একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, তারপর, আর কোথাও বায়না আছে নাকি তােমাদের? যেমন করে গাঁজার কলকেতে টান দেয়, তেমনি ক'রে দু’হাতের মধ্যে সিগারেটটা নিয়ে ম্যানেজার ব্ৰজহরি একটা টান মারলে আর সেই টানে সিগারেটটা পুড়ে এল প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত। ওটা তার অভ্যাসে দাড়িয়ে গেছে। ধোয়াটা গিলে সে খানিকক্ষণ বুদ হয়ে রইল, অমন দামি সিগা- রেটের আস্বাদটাকে সহজেই মুখ থেকে ছেড়ে দিতে চায় না। গদগদ স্বরে বললে, আজ্ঞে, আছে বই কি-কুমারদ’য়। তিন-রাত গাইতে হবে। কুমারদ’য় ?—লালাজী দুটোকে সঙ্কুচিত করলেন একবার । কত করে দেবে সেখানে ? —আর সাত টাকা এখানে? ম্যানেজার হাওয়াটা অনুমান করেছিল আগেই, সুযােগ বুঝে এবার সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী আত্মপ্রকাশ করলে। বললে, এ-এ হুজুর, নিজেই বুঝে দেখুন না, আপনি থাকতে-গাঁয়েরও অপযশ হয়ে যায় একটা। —অপযশ হয় বই কি।-লালাজী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার আসর আর একবার জনতার দিকে তাকালেন। মাথার মধ্যে মতলব খেলছে একটা। কিছুদিন থেকেই দেবীকোট রাজবংশের সঙ্গে বােঝাপড়া করবার বাসনা বােধ করছেন তিনি। —সাত রাত গান গাইতে হবে এখানে। এই বাবােয়ারী-তলায় । পনের টাকা করে পাবে, রাজী আছে ? —পনের টাকা!-শুধু ব্ৰজহরি নয়, দলশুদ্ধ সকলে একসঙ্গে প্রতিধ্বনি করে উঠল। সাত রাত পনরাে টাকা হিসাবে, উঃ, সে যে অনেক টাকা। তার পরিমাণ ভাবলেও যে কূল-কিনারা পাওয়া যায় না । ম্যানেজারের চোখ চক চক করতে লাগল : আজ্ঞে হুজুর, রাজী বই কি, নিশ্চয় রাজী। কুমারদ’র বায়নাটা সেরে এসেই লালাজীর ঠোঁটের কোণে সিগারেটটা দুলে উঠল একবার। বললেন, না, কুমারদ’র বায়না সেরে নয়, এখানেই গাইতে হবে। কাল থেকে সাত রাত্তির । ম্যানেজার দমে গেল। অতখানি উৎসাহ তার কণ্ঠস্বরে আর প্রকাশ পেল না। বললে, রাজবাড়ীর গান হুজুর, আগাম বায়না দিয়ে গেছে বায়নার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে এস। ম্যানেজার চুপ করে রইল, সমস্ত দলটাও রইল মাথা নত করে। এমন প্রস্তাব মেনে নেওয়া অসম্ভব। কুমার বিশ্বনাথকে তার। চেনে। রাঘবেন্দ্র রায়বমার রক্ত তাঁর শরীরে। এতবড় অপরাধ তিনি সহজে ক্ষমা করবেন না এবং তার ক্রোধের পরিণাম যে কী সেটাও অনুমান করা অসম্ভব নয় তাদের পক্ষে। আর-আর-বায়নার টাকা ফিরিয়ে দিতে পারে, এতবড় সাহসীই বা কে আছে ! কার ঘাড়ে দশ দশটা মাথা।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ? তারা ছ-পােষ সংসারী মানুষ, স্ত্রী-পুত্রকে অনাথ করলে তাদের চলবেনা। দামী সিগারেটের মিঠে ধোয়াটা ম্যানেজারের মুখে তেতাে আর বিস্বাদ হয়ে গেল। অস্পষ্টস্বরে বললে, না হুজুর, পারব না। লালাজী সোজা হয়ে উঠে বসলেন : পারবে না ? কেন পারবে না? -রাজবাড়ীর বায়না হুজুর। খেলাপ করলে ঘাড়ে মাথা থাকবে না। —ঘাড়ে মাথা থাকবে না? লালাজীর দৃষ্টি ধ ধ করে জ্বলে উঠল মুহূতে। কিন্তু গলার স্বরে কিছু টের পাওয়া গেল না, ব্যবসায়ী জীবনে সংযম জিনিষটাকে আয়ত্ত করেছেন তিনি। বললেন, ইংরেজের রাজত্ব। এ নবাবী আমল নয় যে ইচ্ছে করলেই হাতে মাথা কেটে আনা যায় । আমি বলছি তােমাদের, বায়নার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে এস। সিগারেট পেয়ে ম্যানেজার যে পরিমাণ স্ফীত হয়ে উঠেছিল, একটা কাটার খোচায় যেন তার দ্বিগুণ চুপসে গেছে। ক্ষীণস্বরে আবার বললে, মাপ করুন হুজুর, ওখান থেকে ফিরে এসে গাইব। রাজবাড়ী । রাজবাড়ী ! লালাজীর মুখ অপমানে কালাে হয়ে গেল। বুকের ভেতর যেন বিষাক্ত সাপে ছােবল মেরেছে একটা। শূন্যগর্ভ একটা নাম, রাজ্যহীন রাজবাড়ীর এত প্রতাপ যে তার আওতায় তিনি শুদ্ধ চাপা পড়ে গেলেন। অথচ কুমারদ’র রাজবংশের আজ যে কী অবশিষ্ট আছে, সে কথা তাঁর চাইতে ভালো করে আর কে জানে। কিস্তিতে কিস্তিতে একখানি করে মহাল লাটে ওঠে, দেনার দায়ে একটু একটু করে যায় বিকিয়ে। বিশ্ব- নাথের মদ আর রেসের বিল, শােধ করতে ওই বাড়ীটাও যে একদিন বিক্রি হয়ে যাবে সে খবর লালাজী কি রাখেন না? তবু ওই নামটা যেন লােকের মনের ওপর যাদুমন্ত্র বিস্তার করে আছে। রাজার নাম শুনলেই তাদের অভ্যস্ত মাথা ভয়ে সন্ত্ৰমে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। অথচ তার পাশে রায়বমারা ! ইচ্ছা করলে অক্লেশে ওরকম আট দশটা জমিদারকে তিনি ।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ কিনতে পারেন, তাতে তার ব্যাঙ্ক-ব্যালান্সের পায়ে আঁচড়ও লাগবে না। রাজবাড়ী ! কথাটাকে স্বগতােক্তির মতেই একবার উচ্চারণ করলেন তিনি। ওই রাজবাড়ীকে একবার দেখে নিতে হবে। কুমারদহ এতদিন যথেষ্ট রাজমর্যাদা ভােগ করে এসেছে, রাজ্যহীন রাজার নামমাত্র কপালে হাত ঠেকিয়েছে বিমূঢ় প্রজার দল। লালাজী সেদিকে দিপাত করেন নি কোনাে রকম। তখন তার সময় ছিল না। ব্যবসাকে বাড়াতে হবে, বড় করতে হবে, বড় বড়, আরাে বড়। পৃথিবীব্যাপী ঐশ্বর্যের যে খরস্রোত বয়ে চলেছে, তার তীরে কেবল দর্শক হয়ে দাড়িয়ে থাকাই চলবেনা। কাজেই জীবনে কুড়িটা বছর এদিকে তিনি চোখ তুলে তাকাবার সময় পান নি। কিন্তু আজ আসন্ন বার্ধক্যে কমোদ্যম হ্রাস হয়ে এসেছে ; ব্যবসার কাজকর্ম দেখা-শােনা করে ছেলেরাই, এখন লালাজী ভালাে করে বাইরের দিকে চোখ তুলে চাইবার সময় পেয়েছেন। যশ চাই তার, সম্মান চাই। বিশাল ব্যবসা তাকে যে সােনার সিংহাসনে তুলে বসিয়েছে সেই স্বর্ণাসনকে সমস্ত পৃথিবী এখন প্রণাম করুক। লালাজী বললেন, কুড়ি টাকা করে দেব। কুড়ি টাকা। ম্যানেজার ঠোট চাটল। দলের অন্যান্য সকলের চোখ- গুলাে বিস্ফারিত হয়ে কোটরের বাইরে ঝুলে পড়ার উপক্রম করছে । নীলামের ডাকের মত দর চড়ছে। কুড়ি টাকা করে আলকাপের বায়না! কিন্তু কিন্তু-রাজ-বাড়িকে অপমান করে— ম্যানেজার শুকনাে ভীত গলায় বললে, আমরা—আমরা ঠিক করে আপনাকে জানাব হুজুর। তাই জানিয়ােলালাজী উঠে দাড়ালেন হঠাং। তারপর ছেড়া কাগজের টুকবাের মতাে দশটাকার একখানা নােট মুঠো করে ম্যনাে- সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ। জারের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারলেন। বরকন্দাজকে বললেন, চল, শিউপাড়ে। বিস্মিত অভিভূত জনতা কোন কথা বলতে পারল না। আর রাজবংশীর নির্বোধ মুখ নিয়ে সেনাপতির সাজ-পরা দেবী বিষহরী নিস্পলক নিবোধ চোখে তাকিয়েই রইলেন . .. । ... ... ... .. siki, परले HOWHAT রাঘবেন্দ্র রামমরি রংমহল। লক্ষ্ণৌয়ের সরযু বাঈজীর পায়ের ঘুঙুর নিস্তব্ধ হয়ে গছে বহুকাল আগেই। বিচিত্র পেশােয়াজের স্বচ্ছ আবরণের তলায় নগ্নপ্রায় দেহবল্লী নেশ জাগাত চোখে ; হাজার ডাল ওয়ালা ঝাড়-লণ্ঠনের আলােয় ছুরির আগার মতাে ঘন তরল চোখ ঝক ঝক্ করে উঠত, সময় রেখাঙ্কিত, সুরায় বিহ্বল। পুরুষের শিরায় শিরার টগবগ করে ফুটত রক্ত, ঝাড়-লণ্ঠনের আলাে আগুন হয়ে গলে পড়ত। বাঘের মতাে মানুষগুলাে যেন আদিম আর আরণ্য কামনায় উদ্দাম হয়ে উঠত, সুরাপাত্রের আচম্কা আঘাত লেগে ঝন্ ঝন্ করে নিভে যেত ঝাড়-লণ্ঠন। তারপর কালাে অন্ধকার। তারপরেই কালাে অন্ধকার। সুরা পাত্রের শেষ আঘাত ঝাড়-লণ্ঠনে কবে এসে লেগেছিল কেউ জানে না। কিন্তু সেই থেকে আর আলো জ্বলেনা রংমহলে। ছিন্নবিচ্ছিন্ন কাশ্মীরী কার্পেট একপাশে রাশি রাশি ধূলাের মধ্যে জড়াে হয়ে রয়েছে, কতগুলাে তারছেড়া যন্ত্র বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে এককোণে। দেওয়ালের গায়ে যেসব ছবি লালসার ইন্ধন দিত, তারা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে, আর তাদের ওপর কঠিন তুলির আঁচড় কাটছে ফাটা ছাদ দিয়ে চুইয়ে নামা বর্ষার জল। * সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ রংমহলে রং নেই, তবু কুমার বিশ্বনাথ এখনাে এর মায়া কাটাতে পারেন নি। ভাঙ্গা দেউড়ী মুমূর্ষর মতাে বুকে রয়েছে, সাত মহলা বাড়ীতে সাপের রাজত্ব। কিন্তু আজো এই রংমহলেই কুমার বিশ্বনাথের আসর বসে। হুইস্কির পয়সা না জুটলে ধেনাে মদ আসে, সরযূ বাইজীরা দুর্লভ হলেও ওঁরাওঁ মেয়েরা অপ্রাপ্যা নয় এখনাে । অবশ্য ওঁরাও মেয়েরা রূপবতী নয়, কিন্তু তাদের যৌবন আছে। হিংস্র, তীক্ষ্ণ যৌবন। আর, আর অন্ধকারে সেই যৌবনটাই সত্য হয়ে ওঠে, রূপের প্রশ্ন তখন অবান্তর। এই রংমহলে যখন কুমার বিশ্বনাথের ঘুম ভাঙল, তখন বেলা অনেক অনেকখানি উঠে এসেছে। জানলার ভাঙা সার্সীর ভেতর দিয়ে অনেক খানি ঝলমলে রােদ ছড়িয়ে পড়েছে তার চোখে-মুখে। রােদের আলােয় চোখ জ্বালা করছে। অসীম বিরক্তি নিয়ে পাশ ফিরলেন বিশ্বনাথ । সমস্ত দেহে জড়তা। স্নায়ুগুলাে এখনাে শিথিল হয়ে আছে, ইচ্ছার দাসত্ব তারা মানতে চায় না। শেষ রাত্রি পর্যন্ত উন্মত্ত জাগরণ এখনাে প্রভাব ছড়িয়ে রয়েছে। অলস কণ্ঠে ডাকলেন, মতিয়া। গড়গড়া নিয়ে মতিয়া ঘরে এল। সকাল থেকে সে তিনবার তামাক সেজেছে এবং তিনবারই সে তামাক নিজেই টেনে শেষ করেছে। এর জন্য তাকে অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। ঘুম ভাঙবার সঙ্গেই প্রভুকে তামাক দিয়ে আসতে হবে এবং এমন দৈবজ্ঞও সে নয় যে, ঠিক কোন মুহূর্তটিতে প্রভু তঁার সুখনিদ্রা থেকে জেগে উঠবেন সেটা আন্দাজ করে নিতে পারে। গড়গড়ায় টান দিয়ে বিশ্বনাথ বললেন, মেলায় লােকজন আসছেরে ? আসছে হুজুর। এবার বােধ হয় জাঁকিয়ে বসবে। সােনাদীঘির পাড়ে অনেকগুলি গাড়ি তাে জড়াে হচ্ছে সকাল থেকেই। —জাঁকিয়ে বসবে। তিন বছর থেকে তাে ফাকাই যাচ্ছে এক রকম। -সব ওই রূপাপুরের কামারদের জন্যে হুজুর। বড় হামা করে সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী ওরা। ওদের ভয়েই মেলায় মানুষ আসতে চায় না। সে-যার আট দশটা দোকান লুট করে নিলে। পুলিশকে পরােয়া করে না, জেল-ফেরত দাগী সব। -রূপাপুরের কামারেরা! বিশ্বনাথের চোখ হঠাৎ ঝকঝক করে উঠল। দেবীকোট রাজবংশের রক্ত ফেনিয়ে উঠল শরীরে। –ওরা কিন্তু দিব্যি তাজা আছে এখনো। ঝিমিয়ে মরে যায়নি। ওদের পােষ মানাতে পারলে মস্ত একটা কাজ হয়, না-রে মতিয়া ? মতিয়া চুপ করে রইল খানিকক্ষণ । –না হুজুর, বুনাে বাঘের জাত ওরা। পােষ মানেনা । পােষ মানে না?—বিশ্বনাথ সােজা হয়ে উঠে বসলেন । কিন্তু কুমা- রদয়ের রায়বর্মীরা তাে চিরকালই বুনন বাঘকে পােষ মানিয়ে এসেছে। আমার ঠাকুর্দা কুকুর পুষতেন না, শিকলে বাঘ বেঁধে নিয়ে বেড়াতে বেরাে তেন। এবার কি মেলায় আসবে ওরা ? -কে জানে হুজুর। ওদের মতলবের ঠিক-ঠিকানা নেই কিছু। বিশ্বনাথ সামনে দেওয়ালটার দিকে তাকালেন। ছাতের পাশে পাশে যেখানে রঙ-বেরঙয়ের নক্সার বাহার ছিল একদিন, আজ সেখানে সবুজ শ্যাওলা জমে উঠেছে। রংমহলে কতদিন যে রঙ পড়েনি। আর রঙ দিয়েই বা কী হবে। এত বড় বাড়িটার সমস্ত ভিত্তিমূলই ঋীর্ণ হয়ে গেছে, আঙুলের চাপ লাগলে ঝুরঝুরূ করে নেমে আসে চুন-সুড়কি, এক একটা কার্নিশ থেকে ইট খােসে পড়ে। আর বেশিদিন এর পরমায়ু নয়। সমস্ত জমিদারীর দশাই তো এই রকম। লাঠিয়াল যারা ছিল, তারা ম্যালেরিয়ায় ভুগে ভুগে অস্থি আর প্লীহাসার হয়ে দাড়িয়েছে, এই রংমহলের নড়- বড়ে বড় বড় থামগুলাের মতােই। গড়গড়ার নীল ধোঁয়াটা বঙ্কিম রেখার ঘরময় খেলা করতে লাগল। এক জায়গায় টিকটিক করে উঠল টিকটিকি।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ বাইরে কোথায় এই সাতসকালেই সাপে ব্যাঙ ধরেছে, একটা কাতর গােঙানি থেকে থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল আকাশে। ম্যানেজার ব্যোমকেশ লঘু চরণে এসে দেখা দিলে। কাপ্তান চেহারার লােক, পাকাচুলে লম্বা সিথি কাটা। চেহারার কোন বৈশিষ্ট্য নেই, শুধু যেন কিসের একটা আচমকা ঘা লেগে নাকের অনেকখানি মুখের ভেতর সেধিয়ে বসেছে। তাই তার কথাবার্তায় চন্দ্রবিন্দুর প্রকোপ একটু বেশী । ব্যোমকেশ বললে, লালাজী চিঠি পাঠিয়েছেন। মুখ থেকে গড়গড়ার নল সরিয়ে বিশ্বনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, কী লিখেছেন? -টাকা দেবেন। তবে থামলে কেন ? -একটা সত আছে। অনেক টাকা তাে বাকী পড়ে গেছে, সুদে আসলে কিছুই দেওয়া হয়নি। তাই বলেছেন সােনাদীঘির মেলাটা পাঁচ বছরের জন্যে ওকে লিখে দিলে তবেই টাকা দিতে পারেন, নইলে নয়। -সােনাদীঘির মেলা। বিশ্বনাথ চমকে উঠলেন এক মুহুতের জন্যে। দু’বছর থেকে দেশে দেখা দিয়েছে অজন্ম। বছরে একটি মাত্র ফসল হয় এই অঞ্চলে, পর পর দু'বছর ধরে সেই ফসলের অর্ধেকও ঘরে তুলতে পারেনি লােকে। বৃষ্টি হয় না। জলকর কিছু কিছু আছে। কিন্তু মহানন্দায় এবার তেমন করে বান ডাকেনি বলে তার অবস্থাও খারাপ। যে কৃষ্ণ-কালীর বিল পাঁচ হাজার টাকার ডাকে উঠত, সে বিলের দর এবার দেড়হাজার টাকার বেশ ওঠেনি ব্যোমকেশ চিন্তিত মুখে বললে, সােনাদীঘির মেলা গেলে সবই গেল। সারা বছর ধরে ওরই ওপরে যা কিছু ভরসা। লালাজী তাে সবই জানেন। - সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী অবস্থা দাড়িয়েছে কী বুঝতে পারছেন? সাপের মতাে পাক কষছেন লালাজী, তারপর সবশুদ্ধ এক গ্রাসে সাবাড় করে দেবার মতলব। বিশ্বনাথ বললেন, হু।—ঘরের সমস্ত বাতাসটা যেন ভারী হয়ে উঠেছে পাষাণের মত। রংমহলের ফাটল ধরা বন্ধ পথে অশথের বীজ কবে পড়েছিল কে জানে, দেওয়াল বেয়ে জালের মতাে শিকড় নামছে অসংখ্য। বাইরে সাপের মুখে ব্যাঙটা তখনাে কাদছে অন্তিম আক্ষেপে। লালাজী সত্যি সত্যিই সাপের মতাে প্যাচ কষিয়ে চলেছেন। তীব্র—একটা অতি তীব্র শারীরিক আর মানসিক অস্বস্তি বিশ্বনাথকে যেন পীড়ন করতে লাগল । -মতিয়া ! —হুজুর,-মতিয়া সামনে এসে দাড়াল। দ্যাখ তাে সাপে ব্যাঙ, ধরেছে কোথায়। মেরে আসবি সাপটাকে। একটা লাঠি নিয়ে মতিয়া বেরিয়ে গেল । ব্যোমকেশ বললে, অথচ টাকা যে করেই হােক দরকার। ডিগ্রী তিনদিন পরেই বেরিয়ে যাবে, আজকালের মধ্যে সহরে টাকা না পাঠালে লাটে উঠে যাবে সমস্ত। লালাজী লিখেছেন অনুমতি পেলে তিনিই হুজুরের কাছে এসে দেখা করবেন। ব্যোমকেশের শেষে কথাটায় শ্লেষের সুর বাজল। আশ্চর্য বিনয় লালা হরিশরণের। তাঁর পূর্বপুরুষ কুমারদহের অশ্নেই মানুষ, একথা লালাজী কখনাে ভুলে যান না। বিশ্বনাথকে দেখলে তিনি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন, ভক্তিতে তার সর্বাঙ্গ তরল হয়ে ওঠে। অর্থ, সম্মান, প্রতিপত্তি যত বাড়ছে, তারই সঙ্গে সঙ্গে তাল রেখে বেড়ে চলেছে লালাজীর বিনয়, দেবীকোট রাজবংশের প্রতি তার অতুলনীয় রাজভক্তি। অথচ এই ভক্তির অন্তরালে নিঃশব্দে একখানা ছুরি যে দিনের পর দিন শানিয়ে উঠছে, ব্যোমকেশের বিষয়ী মন তা অবচেতন ভাবেই অনুভব করতে পারে।
২৮ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী করজোড়ে যখন হুজুরের সামনে লালাজী তার বক্তব্য সবিনয়ে নিবেদন করেন, তখন তার দু'চোখে মাঝে মাঝে ঝলক দিয়ে ওঠা আগুনের আলাে ব্যোমকেশের দৃষ্টি এড়ায় না। বিশ্বনাথ একথা ববাঝেন কিনা কে জানে, কিন্তু বুঝতে রাজী নন তিনি। লালা হরিশরণের ঐশ্বর্য যত অভ্রভেদীই হয়ে উঠুক না কেন, রাঘবেন্দ্র রায়বমার ঘােড়াকে চাল শেখাত রামসুন্দর লালা; সেদিনকার সেই সামাজিক মর্যাদার এতটুকুও তারতম্য এ পর্যন্ত ঘটেনি। বানরকে রাজার পোষাক পরালেই সে রাজা হয় না। অথচ রাজা প্রতাপসিংহের ক্ষত্রিয় এখনাে দেবীকোট রাজবংশের শিরাপথে বয়ে চলেছে, রাজ্য না থাকলেও তারা চিরদিনই রাজা। ব্যোমকেশ বললে, লালাজীকে আসবার জন্যে খবর দেব কি ? কী ভেবে বিশ্বনাথ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, না, আমিই যাব। ঘােড়া ঠিক করতে বলুন। ব্যোমকেশ সবিস্ময়ে বললে, আপনি কোথায় যাবেন ? -নবীপুর । ব্যোমকেশ কথাটা বিশ্বাস করতে পারল না। কুমার বিশ্বনাথ নিজে ঘােড়। হাঁকিয়ে চলেছেন লাল হরিশরণের সঙ্গে দেখা করতে। অভিজা- ত্যের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয় এবং একমাত্র সঞ্চয়—শেষে সেও এই ভাবে পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল বণিকের ! ব্যোমকেশ ইতস্তত করে বললে, যদি যেতেই হয় আপনি আর কষ্ট করবেন কেন? আমরাই তাে আছি, আর খবর দিলে লালাজী নিজেই -না—কথাটাকে সংক্ষেপে শেষ করে দিয়েই বিশ্বনাথ বললেন, ঘােড়া ঠিক করতে বলুন। কালাে ঘােড়াটা, যেটা দূনে চলে। ব্যোমকেশ সনিশ্বাসে বললে, আঙ্কে ঠিক করছি। .
রূপাপুরের কামারের। একসঙ্গে হাতুড়ি ঠুকে চলেছিল। ঠক্ ঠক্ ঠনঠ। গনগনে আগুনে টকটকে রাঙ্গা ইস্পাতগুলাে লােহার আঘাতে মুহূতে রূপান্তর নিচ্ছে। গড়ে উঠছে দা, বঁটি, কাস্তে, কোদাল। যাদের হাত ভালাে, তারা ছুরি কাচি তৈয়ারী করে। সেগুলি বিক্রী হয় বাজারে। তা ছাড়া আরও অনেককিছুই তারা তৈয়ারী করে, কিন্তু সেগুলাে সূর্যের আলােয় মুখ দেখায় না। সিদ কাঠি, ফাস, দু'হাত লম্বা হাসুয়া। তাদের কাজ রাত্রির কালাে অন্ধকারে। রূপপুরের কামারেরা একটা বিশিষ্ট শ্রেণীর জীব । বাংলা দেশের বাসিন্দা বটে, কিন্তু পুরােপুরি বাঙালী নয়। কথাবার্তায় এবং আচার ব্যবহারে স্পষ্ট বিহারের ছাপ। ওদের চেহারা থেকে পণ্ডিতেরা অনার্য রক্তের সন্ধান খুঁজে বার করতে পারেন। ওরা সেই সব মন্ত্রহীন ব্রাত্যের দল—যাদের তলােয়ারের মুখে আর্য-সংস্কৃতির যাত্রারথ বার বার থমকে থেমে দাড়ি- য়েছে। তারপর কালক্রমে ভারতবর্ষের মহামানবের মহাসাগর ওদের গ্রাস করে নিয়েছে। বিশাল হিন্দুসমাজের একটা খণ্ডাংশ ওর।। তবু ওদের জীবনযাত্রায় অনার্য-সংস্কার আজ অবধি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রয়েছে, ওদের পেশল সুস্থ শরীরে আসুরিক বলশালিতা। ঠক্ঠক্-ঠনঠঠ। একসঙ্গে কুড়িটা হাতুডির ঐকতান বাজছে। হাজার হাজার ফাটা ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা মৃত্যু-নিশ্বাসের মতাে শব্দ করছে হাপরগুলাে। উনুনে খাঁ খাঁ করে জ্বলছে কাঠ কয়লার আগুন, ওদের আয়নার মতাে উজ্জ্বল চোখগুলাে থেকে আগুনের দীপ্তি পিছলে পড়ছে। কজী থেকে কঁধ পর্যন্ত পেশীগুলােয় দোলা লাগছে—যেন। দুলে দুলে ফুলে ফুলে উঠছে শক্তির তরঙ্গ। সােনাদীঘির মেলা লাগবে কাল থেকে। এ তল্লাটে এত বড় মেলা আর নেই। এক মাস ধরে মেলায় কেনাবেচা চলে, তেসরা ভাদ্র থেকে তেসরা আশ্বিন পর্যন্ত। নবাবী আমলে কোন এক ফকির এসে দরগা বানিয়ে, } সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ বসেছিলেন, দীঘি কাটিয়েছিলেন। আজও সেই সােনা ফকিরের স্মৃতি অক্ষয় হয়ে আছে এই সােনাদীঘির মেলায়। একটা মাস তার ভাঙা দরগায় সিন্নী পড়ে, সহস্র চূর্ণ সমাধির ওপর মিট মিট করে চেরাগ জলে। সিদ্ধপুরুষ ছিলেন সােনা ফকির। তার মন্ত্রবলে গাছপালা মাটি থেকে উঠে উধাও হয়ে যেত, আর সেই গাছে বসে তিনি দেশদেশান্তর পরিভ্রমণ করে বেড়াতেন। তাঁব আদেশ পেলে পশুপাখী মানুষের ভাষায় কথা কইতে পারত; তার অনুগ্রহে প্রতিবছর পনেরােই ভাদ্র দরগার দীঘির জল দুধ হয়ে যেত। আর সেই দুধ একবার পান করলে যা কিছু জটিল যােগ নিঃশেষে ভালাে হয়ে যেত, সারাজীবনে আধিব্যাধির বিড়ম্বনা বহন করতে হত না। তারি স্মৃতি উপলক্ষে সােনাদীঘির পাড়ে মহাসমারােহে মেলা বসে এখননা। দরগার দীঘির জল এখন আর অবশ্য দুধ হয় না, অবিশ্বাসী যুগের আওতায় তার গুণ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু লােকের বিশ্বাস শিথিল হয় নি। নানা দূর দেশ থেকে জটিল ব্যাধিগ্রস্ত অসংখ্য লােক এখনাে চৈত্রসংক্রান্তির দিনে সােনাদীঘির জল খেতে আসে, ঘড়ায় করে নিয়ে যায়। আর সেই উপলক্ষে প্রায় দু’ মাইল জায়গা জুড়ে মেলা বসে। সহর থেকে দোকানদার আসে, যাত্রা আসে, গণিকা আসে; বায়েসের দল আসে। গিলটির গয়না থেকে-গােৰু, ঘােড়া অবধি বিক্রীর জন্যে আসে। পঁচিশ বছর আগে হাতী পৰ্য্যন্ত আসত, মেলার একটা অংশ এখনও হাতী- হাটা নামে পরিচিত। রূপপুরের কামারদের হাতুড়ী বেজে চলেছে একটানা দ্রুতছন্দে। আর সময় নেই। আজ সন্ধ্যার মধ্যেই কাজ শেষ করে ওরা বেরিয়ে পড়বে মেলার উদ্দেশ্যে। সেখানে এক মাস ধরে কাজ চলবে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। তিরিশখানা চালা নিয়ে দোকান খুলে বসবে ওরা। বিক্রী করবে লােহার যন্ত্রপাতি, কাসার ফুটো কী আর ভাঙ্গা বাটি । সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ঝালাই করে দেবে। হালের বলদ আর এক্কার ঘােড়র পায়ে লােহার মাল পরিয়ে দেবে, গেরুর গাড়ির চাকা ধাঁধিয়ে দেবে পাতলা ইস্পাতের পাত দিয়ে। আর একটা মাস ধরে পরিতৃপ্ত করবে বৈচিত্র্যহীন বৎসরের তৃষ্ণাত সম্ভোগের স্পৃহা। যাত্রা আসবে, খ্যামটা আসবে পানের দোকান আসবে, জুয়া আসবে ; আর মদের দোকানের দু’পাশে বসবে “খােপরা পট্টি”-সুলভপ্রাপ্য নারী-মাংসের সদাব্রত। আশে-পাশের সমস্ত অঞ্চল থেকে তিনদিন যাবৎ লােকযাত্রা শুরু হয়েছে মেলার অভিমুখে। আধিব্যাধির শান্তিকামী তীর্থযাত্রীর দল চলেছে, আর ওদের পেছনে অনুসরণ করে চলেছে একদল লোেক-- তাদের দৃষ্টি গলার হার আর কানের মাকড়ীর দিকে স্থিরনিবদ্ধ । রকমের লােকই যে চলেছে তার সীমাসংখ্যা নেই। গাের-গাড়ীর সামনে কালাে শাড়ীর পর্দা ঝুলিয়ে চলেছে মুসলমান পুরমহিলা, পর্দার ফাকে ফাকে বােরখা ঢাকা এক একটা ভৌতিক মূর্তির মতাে চোখে পড়ছে। খঞ্জনী বাজিয়ে চলেছে একদল বৈষ্ণব; তাদের পেছনে চলেছে পাঁচজন বৈষ্ণবী ; কপালে সকলি, চোখের দৃষ্টি তির্যক আর চটুল। কানে সােনার আংটা, সােনা দিয়ে দাত বাঁধানাে, বাসন্তী রঙের কাপড় আর পাগড়ী-পরা একদল হিন্দুস্থানী ধাঙড় চলেছে, অহেতুক উল্লাসে ডুম ডুম্ করে ঢােল বাজাচ্ছে, থেকে থেকে চীৎকার করে উঠছে এক একটা অশ্লীলতম গানের কলি ; রঙীন শাড়ী পরা বলিষ্ঠগঠনা সঙ্গিনীদের তাতে কিছু মাত্র সঙ্কোচ নেই, সমান উৎসাহেই তারা সে রসিকতায় যােগ দিচ্ছে, উচ্ছল হাসিতে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। ছােটখাটো ব্যবসায়ীর৷ ঘােড়ার পিঠে দোকান নিয়ে চলেছে, শীর্ণ আর খর্বকায় টাটুগুলাে বােঝার ভারে ভেঙে পড়বার উপক্রম করছে। মাথায় বােঝা নিয়ে চলেছে অর্ধবৃত সাঁওতাল আবু রাজবংশী মেয়েদের দল ; সাঁওতাল মেয়েরা এক টুকরাে কাপড় দিয়ে পিঠের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে শিশুকে, ;
; সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ বােদের ঝঝকে আলােয় তাদের গলার হাঁসুলী আর পায়ের রূপাের খাড় ঝিমি করছে। ছােট ছােট ছেলে-মেয়েদের হাত ধরে চলেছে সাধারণ গ্রামের লােক, কাঁচা চামড়ার জুতাে জোড়া হাতে তুলে নিয়ে কেউ বা হাঁটছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। একটা পুরানাে সাইকেল চালিয়ে কোথা থেকে হাফ-প্যান্ট আর টুইলের সাট পরা জুট অফিসের একজন কেরাণী এসে দর্শন দিলে ; সাঁওতাল মেয়েদের দিকে তাকিয়ে দেখলে লােলুপ দৃষ্টিতে, ধাঙড মেয়েদের সঙ্গে একটু রসিকতা জমাবার চেষ্টা করলে, তারপর দ্রুত সাইকেল চালিয়ে বৈষ্ণবীদের দলটাকে ধরবার জন্যে এগিয়ে গেল । আর সঙ্গে সঙ্গে গোরুর-গাড়ীর মিছিল চলেছে নিরবচ্ছিন্ন স্রোতে। ব্যবসায়ীদের গাড়ী, জোতদারের গাড়ী, মালটানা গাড়ী, খালি গাড়ী। জ্ঞাতিগােত্রহীন গােটাকয়েক কুকুরও এই বিরাট জনতার সহযাত্রী হয়েছে, এতগুলো লােক একসঙ্গে দেখে কাছাকাছি কোথাও একটা উৎসব-ব্যাপার বােধ করি অনুমান করে নিয়েছে তারা। রূপাপুরের তলা দিয়ে ছােট রাস্তাটা ধূলােয় অন্ধকার। হাতুড়ি ঠুকতে ঠুকতে কামারেরা আড় চোখে লক্ষ্য করে জনতা। মেলায় খুব লােক হবে এবার। কয়েক বছর আগে বড় গােছের একটা দাঙ্গা হয়ে যাওয়ায় কিছুদিন মেলায় লােক আমদানি কমে গিয়েছিল। আস্তে আস্তে সে ভাঙন আবার জুড়ে উঠেছে। এবার আবার জাকিয়ে মেলা বসবে। হাতুড়িটা রেখে রামনাথ এতক্ষণে সােজা হয়ে উঠে বসল। বয়স অনেক হয়েছে রামনাথের। প্রায় পাঁচহাত লম্বা মানুষটা। অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যের জন্যে মেরুদণ্ডের কাঠামােটা একটুখানি বেঁকে নেমেছে আজকাল। হাত-পায়ের হাড়গুলো অস্বাভাবিক মােটা, হাতের কজী- দুটোকে মুঠো করে ধরা যায় না। কালাে কপালের ওপর টলটলে ঘামের বিন্দুকে বাঁ হাতের পিঠ দিয়ে মুছে ফেলে রামনাথ বললে, এবার মেলায় কী রকম লােক আসছে, দেখেছিস!
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ জ্বলন্ত একখানা দাকে বাটের মধ্যে ঠুকতে ঠুকতে তরুণ সূর্য জবাব দিলে, হাঁ, দাঙ্গার পরে এত লােক আর মেলায় আসে নি। দাঙ্গার নামে রামনাথ কুঞ্চিত করলে, অপ্রসন্নতার ছায়া মুখের ওপর ঘনিয়ে এল তার। —সব তােদের জন্যে। মারামারির নামে তাে আর মাথা ঠিক থাকে না। কথা নেই, বাত নেই, লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়লি, কাপড়- পটিতে আগুন লাগিয়ে দিলি । -না, লাগাব না। সূর্য ঝলসে উঠল : পাড়ার সামনে এসে গােৰু কাটবে, আর চুপচাপ বসে থাকব। -তাই বলে তােরা তার বিহিত করতে যাবি না কি। জমিদারের মেলা, তার কাজ সে বুঝবে, তােরা খামােক যা খুশি তাই গণ্ডগােল পাকিয়ে বসবি, না ? সূরয বললে, রেখে দাও তােমার জমিদার । ও শালারা মানুষ না কি! চর্বির ঢিবি সব, পেস্তা বাদাম খায়, বােতল টানে, আর হাতীর বাচ্ছার মত ফোলে। জমিদারের ভরসায় বসে থাকলে প্রজার মান- ইজ্জং থাকে না। —কথা খুব শিখেছিস দেখছি। রূপপুরের কামারেরা এবার যে অধঃপাতে যাবে তার লক্ষণ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি। সূর্য অকৃত্রিম প্রসন্নতায় হেসে উঠল হাে হাে করে । রামনাথকে চটাতে ভারী ভালাে লাগে তার। এত বয়স হয়েছে, এমন প্রকাও জোয়ান, সমস্ত রূপাপুর গ্রামের সে মাথা। যৌবনে সে লাঠির ঘায়ে বুনো জানােয়ার শিকার করেছে, তালুকদারবাড়ীতে হানা দিয়ে একা ডাকাতি করে এসেছে। দশ বছর আগেও সুলতানগঞ্জের মরা নদীতে বানের জলে কুমীর আসত, সেই কুমীর রামনাথের পা আঁকড়ে ধরায় রামনাথ টেনে সেটাকে পারে এনে ফেলেছিল, আর সরকার থেকে ৩ঃ সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী একশাে টাকা পুরস্কার পেয়েছিল। সেই রামনাথ ভয় করে জমিদারকে, ভয় করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা মারামারিকে। এমন শক্তিমান্ পুরুষের এই জাতীয় মানসিক দুর্বলতা অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হয় সূযের কাছে। সূর্যের হাসিতে রামনাথ চটে উঠল।—কী যে বােকার মত হাসিস ফ্যাক ফাক করে, ভালাে লাগে না। এবার মেলায় গিয়ে কেউ যদি এতটুকু বদমায়েসী করবি, তা হলে ভালাে হবে না এই বলে রাখলাম। বলে দিস সবগুলােকে। সূর্য বললে, আমি বলে দিলে কি শুনবে ওরা। সেবার জুয়াের আড়াতে ওরা যখন টিকিধারীর মাথা ফাটিয়ে এল, তখন আমি বার বার নিষেধ করছিলাম। কিন্তু কথা শুনবে না-আমি তার কী করব বলল। রামনাথ বললে, আর ভালাে মানুষ সাজতে হবে না। তােমাকে আর আমি চিনি না যেন। মায়ের পেট থেকে এই তাে সেদিন পড়লি, এর মধ্যেই খুব চালাক হয়ে উঠেছিস। সব নষ্টামীর গােড়াতেই তুই কামারপাড়ার হতভাগাগুলাে তাের কথাতেই নেচে বেড়ায় সে আমি জানি। সূষ জিভ কেটে বললে, রাম রাম। সত্যি তাউই, আমার ওপর এ তােমার অন্যায় রাগ। আমি তােমার নতুন বউয়ের দিব্যি দিয়ে বলছি- রামনাথ সামনে থেকে একটা বড় হাতুড়ি উঠিয়ে নিলে। -চুপ কর ফড় কোথাকার। দেখছিস তত ? মাথা গুড়িয়ে দেব একদম। সরষের হাসিটা এবার সমস্ত কামারশালায় সংক্রামিত হয়ে গেল। হাতুড়ি পিটতে পিটতে এতক্ষণ যারা কথার গতি লক্ষ্য করছিল, তারা এইবার একসঙ্গে হাসতে সুরু করে দিলে উচ্ছসিত ভাবে। কর্কশ হাসির প্রচণ্ড তরঙ্গে লােহার কঠিন শব্দ তলিয়ে গেল।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ রামনাথ হাতুড়িটা ফেলে দিয়ে নিরাশ কণ্ঠে বললে, নাঃ, তােদের দিয়ে কিছু হবে না। তােদর আলাতেই বউকে নিয়ে আমার দেশ ছাড়তে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আর এক দফা হাসির জোয়ার তরঙ্গিত হয়ে উঠল। ব্ৰহ্মাস্ত্র ব্যবহার করেছে সূর্য। নতুন বউয়ের কথা উঠলেই তৎক্ষণাৎ মুখ বন্ধ হয়ে যায় রামনাথের। আর তার সমস্ত দুর্বলতার মূল এইখানেই প্রচ্ছ। জেলার এই অঞ্চলটা ক্রিমিন্যাল বা অপরাধমূলক এলাকা। রূপাপুরের কামারেরা আবার সেই সব ক্রিমিন্যালদের অগ্রবর্তী। বয়স্ক পুরুষদের প্রায় সকলেই থানায় দাগী বলে উল্লিখিত। আশে পাশে খুন জখম চুরি ডাকাতি কিছু একটা ঘটলেই এই সব চিহ্নিত অপরাধীদের নিয়ে টানাটানি পড়ে, বাড়ী খানাল্লাস হয়, হাজত থেকে দুচারদিনের জন্যে মুখ বদলে আসতে হয়। কিন্তু রূপাপুরের কামারেরা আজকাল আর সত্যিই তেমন ক্রিমিন্যাল নয়, রক্তের নামে আজকাল আর ওদের মাথার রক্ত চন চন করে ওঠে না। সে সব বরং ঘটত দশ পনের কুড়ি বছর আগে। রূপপুরের কামারেরা তখনাে যাযাবর, মাটির মায়া ছিল ন', ঘর বাঁধবার তাগিদ ছিল না। চলতে চলতে গ্রামের হাটখােলার পাশে ছাউনি গড়িত, দু একদিন লােহা পিটত, তারপর তৃতীয় রাত্রিতে কারাে বাড়ীতে চড়াও হয়ে যথাসর্বস্ব লুটে পুটে নিয়ে অন্ধকার দিগন্তে উধাও হয়ে যেত। ক্রমে ক্রমে সেই পথ চলার ওপর ঘনিয়ে এল শ্রান্তির অতি গভীর অবসাদ । মাটির বুক চিরে যে ঘনশ্যামল চিকণ ফসল প্রাণের জোয়ারে জেগে ওঠে, হেমন্তে রবিশস্যের মাঠে যে রঙের আগুন চোখে নেশা ধরিয়ে দেয়, আর বাঁশবনের ছায়ায় আমের বনের ঘনান্ধকারে জোনাকির আলােয় যে গ্রাম তন্দ্রাতুর হয়ে ঘুমিয়ে থাকে, তাদের অদৃশ্য শৃঙ্খল এসে পাকে পাকে জড়াতে লাগল ওদের। রূপকথার বাংলা, কবিগানের বাংলা, আত্মতৃপ্তির সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ফুলে উঠেছে অলস বাংলা। সেই বাংলা তার ঘুমভরা আঁচল জড়িয়ে ওদের বুকের তলায় টেনে নিলে, তার উচ্ছলিত স্তনক্ষীরে পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে রইল রূপপুরের কামারের। তবু মাঝে মাঝে ঘুমের ঘােরে চমকে উঠেছে ওরা। হাতের মাংসপেশী, বুকের মধ্যে শুনতে পেয়েছে নিদ্রিত অজগরের চকিত জাগরণের গজরানি, আদিম রক্তের কলধ্বনি। খুসিমত ডাকাতি করেছে, দাঙ্গা করেছে, নিজেদের মাথা ফাটিয়েছে, শত্রুর কঁাধে ফারসা বসিয়েছে, ছাঁচ তৈরী করে স্বদেশী সীসের টাকার পাল্লা চালিয়েছে সরকারী রূপাের টাকার সঙ্গে। রামনাথ সেই যুগের প্রতীক। তার প্রথম বউ মরেছে আজ কুড়ি বছর আগে। কী হয়ে মরেছে কেউ জানে না। শুধু একদিন সকালে উঠে তাকে আর কেউ দেখতে পায় নি। গভীর রাত্রে রামনাথের ঘরে কেউ কেউ নাকি একটা অস্পষ্ট গােঙানির শব্দ শুনতে পেয়েছিল, কিন্তু কারো মনে কিছুমাত্র কৌতূহলের উদ্রেক হয়নি তাতে। অমন কত হয়। তারপর থেকে রামনাথের বউকে আর কেউ দেখে নি। জিজ্ঞাসা করবার এতটুকু প্রয়ােজনও বােধ করেনি কেউ। জীবনের মূল্য তখন অত স্পষ্ট আর প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে নি ওদের কাছে। সমুখের মাঠে তখনাে সবুজের শীষ তােলে নি প্রথম ফসল। কাল থেকে কালান্তর। কত নদ-নদীতে চড়া পড়ে, মরা দীঘির শুকিয়ে আসা ফাটল-ধরা মাটিতে নামে লাঙলের আঁচড়। সেই চড়া জেগেছে রামনাথের রক্তে, সেই লাঙলের আঁচড় পড়েছে বুকের ভেতর। রােদে পােড়া পােড়ো জমিতে ফসলের স্বপ্ন-কামনা। কুড়ি বছর পরে রামনাথ বিয়ে করেছে আবার। নতুন বউ, নাম তার কামিনী। ছিপছিপে লম্বা চেহারা, গায়ের উজ্জ্বল কালাে রঙ যেন বার্নিস লাগানাে বলে ভ্রম হয়। পাশের গ্রামের মেয়ে, ছোটবেলা সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ। থেকেই রামনাথ তাকে দেখে এসেছে, কখনাে চোখে পড়ে নি। কিন্তু প্রথম বর্ষার জল নেমেছে তখন, লাঙল-দেওয়া লালমাটি ধারাবর্ষণে মাখনের মত কোমল আর নরম হয়ে গেছে, আর সেই মাটিতে বীজ রুইতে এসেছে গ্রামের মেয়েরা। পথ চলতে রামনাথের সেই সময় আচমকা চোখে পড়েছিল কামিনীকে। ঝুকে পড়ে মাটিতে কাজ করবার সময় আঁচল সরে গিয়ে পূর্ণায়ত স্তনী আত্মপ্রকাশ করেছে, কালো মুখে লাল মাটি শুকিয়ে রয়েছে গােরােচনার তিলক চিহ্নের মতাে। সেদিকে তাকিয়ে প্রায় ভুলে যাওয়া কী একটা অনুভূতিতে রামনাথের হৃৎপিণ্ড দুটো দোল খেয়ে উঠেছিল কয়েকবার। মনে পড়েছিল ঘরটা অত্যন্ত নিজন—শীতের রাত্রে চাটাইয়ের বিছানাটা অতিরিক্ত আর অস্বাভাবিক শীতল। বিয়ের পরে কামিনী সােজাসুজি জিজ্ঞাসা করেছিল, তুমি কি আমাকেও খুন করে ফেলবে? বিস্মিত হয়ে রামনাথ বলেছিল, খুন করতে যাব কেন তােকে ? -লােকে তাে তাই বলে। আমার সতীনকে নাকি তুমি গলা টিপে মেরে ফেলেছ, তাই- -পাগল ! রামনাথ ঘন করে কামিনীকে টেনে এনেছিল বুকের মধ্যে : তার ছায়া হয়েছিল । -তা হােক। রামনাথের বলিষ্ঠ ঘর্মাক্ত বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে অস্ফুট স্বরে কামিনী জবাব দিয়েছিল, আমার ভয়ানক ভয় করে। গভীর স্নেহভরে কামিনীর জটাবাধা চুলগুলাের ভেতর হাত বুলিয়ে দিয়েছিল রামনাথ। বলেছিল, তােকে আমি এত ভালােবাসি, তাের ভয় কিসের। মিথ্যে বলেনি রামনাথ। নতুন বউকে সত্যিই সে ভালােবাসে, পাগলের মতাে ভালােবাসে। এই ভালােবাসাই আজ সব দিক থেকে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী তাকে পঙ্গু করে রেখেছে। তাই দাঙ্গার নামে সে ভয় পায়, তাই যে- কোন উচ্ছঙ্খলতার কল্পনাতেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে তার চেতনা; প্রেমের কাছে পও আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। সূরয আবার বলে, মেলায় তাে যাবে তাউই, কিন্তু সাবধানে থেকো। ভিড়ের মধ্যে তােমার বউ আবার হারিয়ে না যায় । তিরিশটা হাপরের পেছন থেকে তিরিশ বকম কর্কশধ্বনি আবার বেজে উঠল এক সঙ্গে। আর ঠিক সেই মুহুতে দেখা গেল দূরে মাঠের ওপারে একটা কালাে ঘােড়। নক্ষত্ৰবেগে উড়ে আসছে কুমার বিশ্বনাথের ঘােড়া। তিন আলকাপের আসর যখন ভাঙল, রাত তখন বারােটার কাছাকাছি। বারােয়ারী তলায় একখানা চালাঘরেই ওদের থাকবার জায়গা। ঘর- খানার তিনদিক খােলা, পেছনে একটা মাটির নােনাধরা দেওয়াল । হাটের দিনে এখানে মরিচের দোকান বসে, অন্যসময় রাতচরা গােৰু মহিষ, কখনাে বা গাড়ির বলদ স্বেচ্ছাসুখে রােমন্থন করে রাত কাটায়। রাশি রাশি শুকনাে গােবর ও গুবরে পােকার ওপর চাটাই আর চট বিছিয়ে আলকাপ দলের থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছে। অবশ্য এ ব্যবস্থায় ওরা আপত্তি করেনা। বাংলা দেশের নিতান্ত অজ পাড়াগাঁগুলিতে এর চাইতে ভালল অভ্যর্থনা আশা করাই অসঙ্গত। হাটের চৌহদ্দি পেরিয়ে চারদিকে ঢালু মাঠ । শ্রাবণের ভরা বর্ষাতে মাঠগুলাে প্রায় সবই তলিয়ে গেছে। আকাশ ভরা তারা ঝকমক করছে কালাে জলের ওপর হঠাৎ দেখলে মনে হয় সামনে যেন দুলে উঠছে সমুদ্র আর দূরে দূরে তালের বনের নীচে ঘুমন্ত গ্রামগুলাে এক একটা দ্বীপ মাত্র। ছাগলের মতাে গলা কাপিয়ে সােণা ব্যাং ডাকছে, সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ অন্ধকারে উড়ছে অসংখ্য পােকা, আধভােবা শ্যাওড়া গাছের মাথায় রাশি রাশি আলাের ফুলের মত জোনাকি জ্বলছে। শুধু একদিকে সরকারী রাস্তা, তার ওপরে বর্ষার জল ওঠেনি, বাঁধের তলা দিয়ে হু হু করে ফেনিল আর প্রখর স্রোত নেমে যাচ্ছে। কারা যেন লণ্ঠন জ্বালিয়ে কোচ দিয়ে সেই বাঁধের নীচে মাছ মারবার চেষ্টা করছে, আর টিমটিমে আলাে দুলিয়ে তিন চারখানা গােরুর গাড়ী চলেছে কুমারদহের দিকে বােধ করি সােণাদীঘির মেলায় । গায়ে কাপড়ের খুটটা ভালো করে জড়িয়ে ব্ৰজহরি বললে, উহুহু, বড্ড শীত ধরেছে রে। এক ছিলিম তামাক সাজ না রে ভূষণা। ভুষণা চটের বিছানায় লম্বা হয়ে পড়েছিল। বললে, এখন আর আমি উঠতে পারব না খুড়াে। সারাদিন নাচানাচি করে হাতে পায়ে ব্যথা ধরে গেছে। তা ছাড়া অন্ধকারে কে এখন হুকো খুঁজে বেড়াবে। তার চে একটা বিড়ি ধরাও বরং। —আচ্ছা দে, বিড়িই দে। উবু হয়ে বসে ব্ৰজহরি বিড়ি ধরাল একটা। -মাইরি, এ কি ল্যাঠায় পড়লুম বল দেখি? ভূষণার শীত করছিল। ছেড়া চাদরের ফাকে ঠাণ্ডা আটকায় না মাঠের ভিজে বাতাস যেন মাঘের হাওয়ার মতাে তীব্র আর তীক্ত হয়ে এসে হাড়ের ভেতরটা অবধি কাপিয়ে তুলছিল। আরাে ঘন হয়ে হাঁটুটাকে বুকের কাছ অবধি টেনে নিয়ে ভূষণ বললে, হাঁ, ল্যাঠা বইকি। আচ্ছা, সেই গানটা তােমার মনে আছে খুড়াে? ‘শিববা হে, এ কি ল্যাঠাত ফেলিলে হামারে হে, ভাং-ধুতুরা তুমি খিবা, কুচনীর বাড়ীত, যিবা, কেমনে হে পূজিব তুম্হারে হে” } ৪০ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ বিরক্ত কণ্ঠে ব্ৰজহরি বললে, থাম বাপু, ইয়াকী এখন ভালাে লাগে । ব্যাপারখানা বুঝছিস তাে? এক কোণে শুয়ে কালীবিলাস কুণ্ডু কাশছিল। কালীবিলাস আলকাপের দলে পনবাে টাকার হামোনিয়ামটা বাজায়, গৌরবে বলে, আর্গিন। বয়স হবে পঞ্চাশের কাছাকাছি। যৌবনের প্রথম দিকটায় বাড়ী থেকে পালিয়ে কিছুদিন বরিশালের চারণ মুকুন্দ দাসের সাঁকরেদী করেছিল। সেই সময় ফরিদপুরের নড়িয়াতে যে ‘ইংরাজে প্রাণের ভাইদের হত্যা করল পাঞ্জাবে, সে ইংরাজের মধুর রবে ভােলে কোন্ পিচাশে’ (পূর্ববঙ্গে পিশাচকে পিচাশ বলা হয় ) গানটি গেয়ে তিন মাস জেল খেটে এসেছিল পর্যন্ত। এই জন্য দলে তথা সমাজেও তার কিছু প্রতিপত্তি আছে। কিন্তু অদৃষ্টের এমনি বিড়ম্বনা যে দেশের জন্য ‘সহীদ হতে গিয়েও জেল থেকে কালীবিলাস গাঁজা খাওয়া শিখে এল। দীর্ঘ এবং একনিষ্ঠ গঞ্জিকা সেবনের ফলে দুবছর থেকে কাশি দেখা দিয়েছে। আজকাল মাঝে মাঝে রক্ত আসে, কাশির আস্বাদটা অস্বাভাবিক মিষ্টি মনে হয়। সমস্ত মাথাটা ভার, একটু জরও হয়েছে যেন। একটা ছেড়া ব্যাপার বার মাস ত্রিশ দিনই সঙ্গে থাকে, সেইটেই ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে গভীর গলায় কালীবিলাস বললে, টাকাই সব নয়। আগে কথা রাখতে হয়। ব্ৰজহরি বলিল, কিন্তু এক এক রাত কুড়ি টাকা করে। আলকাপ ততা আলকাপ, ওর সঙ্গে আর পাঁচ টাকা জুড়ে দিলে হারাধন সাউয়ের যাত্রার দল এসে আপখখারাকী গেয়ে যাবে । জ্বর হলেই স্নায়ুগুলাে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। মাথার শিরগুলাে দপ জপ করে। রক্তের মধ্যে যে জালা ধরে, সেটা যেন কালীবিলাসে চিন্তা- ধারাতেও সংক্রামিত হয়। তার সঙ্গে গাঁজার প্রভাব মস্তিষ্কের মধ্যে এখনাে ঘনীভূত হয়ে আছে। এই অশ্লেষা আর মঘার একত্ৰ সঘটন সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ৪১ ঘটলেই কালীবিলাস তার আদর্শ মানব মুকুন্দ দাসের ওজস্বিতায় অনুপ্রাণিত বােধ করে। —টাকা। টাকার পেছনে গােলামী করেই না দেশটা উচ্ছরে গেল । সেই জন্যেই তাে অধিকারী মশায় ( কালীবিলাস মাথায় হাত ঠেকাল ) বলতেন : সােনার পিঞ্জরের পক্ষী সুখে নিন্দ্রা যায়, সাদা ইন্দুর আইয়া রে তাের ঘরের আধার খায় ওরে হায় হায় হায় কালীবিলাসকে সকলে মান্য করে বটে, কিন্তু তার কথাগুলােকে বিশেষ মূল্য দেয় না। বাস্তব জগতে চলা-ফেরা করবার পক্ষে তাদের বিশেষ কোননা দাম নেই। তারা মুকুন্দদাস নয়, দেশকে স্বাধীন করবার মহতী ব্রতও তারা নেয়নি। সংসারী মানুষ, একান্ত ভাবে শান্তপ্রিয় এবং নির্জীব । সুতরাং ব্ৰজহরি এমন ভাবে কথাটাকে উড়িয়ে দিলে যেন শুনতেই পায়নি। -হাবু যে কথা বলছিস না? হাবু মুচি ভূষণ মুচির মামাতাে ভাই এবং দলের চিরন্তন হিরাে। ছাড়া গানের মাষ্টার। সুতরাং তার মতামতের একটা আলাদা এবং গুরুভার ওজন আছে। নিজের এই বিশিষ্টতা সম্বন্ধে হাবুও যথেষ্ট সচেতন, সুতরাং সে সহজে মুখ খােলে না বটে, কিন্তু যখন খােলে তখন একেবারে মােক্ষম। আপ্তবাক্যের মতাে এক একটি সারগর্ভ বাণী উচ্চারণ করে বিরাট হিমালয়ের মতাে নীরব আর নিশ্চল হয়ে যায়। হাবু বললে, ব্যাপার যা দেখছি তাতে আর টা-ফে করে দরকার নেই, চাটিবাটি তুলে সােজা চম্পট দিলেই সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। -চম্পট ? চম্পট কিসের ভয়ে?-উত্তেজিত হয়ে কালীবিলাস কী একটা বলবার আপ্রাণ চেষ্টা করলে। কিন্তু কথা এল না। উদগত ০২ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ একটা কাশির প্রবল উচ্ছাসে সমস্ত চাপা পড়ে গেল। বুকে হাত দিয়ে কালীবিলাস কাশতে সুরু করে দিলে অমানুষিকভাবে। সামনেই নিম গাছে একটা বাদুড় এসেছিল নিম ফলের আশায়, কাশির শব্দে চমকে ঝটপট করে উড়ে গেল। কাশতে কাশতে বেদম হয়ে কালীবিলাস শুয়ে পড়ল চিৎ হয়ে । ভূষণাকে গানে পেয়েছিল। গুণ গুণ করে সে তখনাে গেয়ে চলেছে । শিববা হে, ভস্ম বিভূতি মাখ, আঁদাড়ে পাঁদাড়ে থাক- ক্ষেপে গিয়ে ব্ৰজহরি হাতের কাছ থেকে ডুগীটা তুলে নিয়ে এল। বাঘাটে গলায় বললে, থামলি, থামলি হারামজাদা ? আর একটা টাই মেরেছিস কি এই ডুগী তাের মাথায় ফাটিয়ে দেব। আমি মরছি নিজের জালায় আর ইদিকে- ভূষণ চিমটি কাটলে।—গান ভালাে লাগছে না?' একখানা নাচ গম্ভীরার একখানা ডােম কালীর নাচ ? ডুগী উদ্যত রেখেই মেঘমন্দ্ৰ ব্ৰজহরি বললে, তা হলে তাের বুকে উঠে চড়ালে কালীর নাচ নাচতে শুরু করে দেব আমি। ভূষণা বললে, থাক থাক । পায়ে গেঁটে বাত দিয়ে অত কষ্ট তােমায় করতে হবে না, ফুলে শেষটায় ঢােল হয়ে যাবে । রাখ ফড়ি রাখ।-হতাশ কণ্ঠে ব্ৰজহরি বললে, ওরে ব্যাটা ভূযুণ্ডী, একটা বুদ্ধি বাতলে দে না। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে—মরুক গে কিন্তু আমরা উলুখড়েরা যে গেলাম। লালাজীর বায়না না নিলে এ তল্লাটের কাজকর্ম এই ইস্তক সব কাবাড়। ও দিকে কুমারদ’র: বায়না ফিরিয়ে দিতে গেলে হাবু সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে সুনিশ্চিত অভিমত জানালে, বেশী কিছু হবে না, শুধু মাথাটা ফাটিয়ে সােনাদীঘির পাকের তলায় পুতে দেবে। ব্ৰজহরি পাল উত্তেজনায় হঠাৎ রুদ্রকান্ত সিংহ হয়ে গেল। মাথার দেখিবে দেব ?
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ৩৬ = ঝাঁকড়া বাবরী দুলে উঠল জটার মতাে। ডম্বক্ষর বদলে ডুগী দুলিয়ে বললে,-যায, যা-যাঃ!.এ হচ্ছে ইংরেজদের রাজত্ব। মাথা ফাটিয়ে পাঁ থু থু ওয়াক। একটা উড়ন্ত গুবরে পােকা গােবরের গাদ। ভ্রমে ব্ৰজহরির গর্জমান ব্যাদিত মুখের মধ্যে অনধিকার প্রবেশ করছিল। সফুৎকারে সেটাকে ভূষণার দিকে নিক্ষেপ করে ব্ৰজহরি বললে, থু, থ, শা–। ঢােকার আর জায়গা পেলে না। ঠেলে বমি আসছে মাইরি থ, থ- পাশে শিবু নাথ ঘুমুচ্ছে অকাতরে। মুখে বিজাতীয় তরল তার স্পর্শ অনুভব করে নিদ্রাজড়িত স্বরে বললে, আঃ, থু, থু ফেলছে কোন্ শা? হিংস্রভাবে শিবুকে একটা ধাক্কা দিয়ে ব্ৰজহরি বললে, ওয়াক। আরে ওঠনা ব্যাটা গাড়ােল। ইদিকে সর্বনাশ হয়ে গেল, আর- -ধ্যাৎ-শিবু আড়মােড়া ভেঙে পাশ ফিরল । ভূষণা বললে, ঘুমুচ্ছে ঘুমুক না। এই মাঝরাত্তিরে সবাইকে উদ্বাস্তু করছ কেন? —হু, ঘুমুচ্ছে। আমি চোখে অন্ধকার দেখছি আর এরা যেন শ্বশুর বাড়ীর রাজশয্যেয় গদীয়ান হয়েছেন। তবু তাে রাজকন্যে জোটেনি। , যা থাকে কপালে, কালই চলে যাই কুমারদয় । হাবু বললে, যাও। কিন্তু লালাজীর খালি টাকা নয়, লাঠিও আছে। ফিরবে কোন্ পথ দিয়ে শুনি। হদিডাঙার মাঠের মাঝখানে ঠেঙ্গিয়ে যদি আটা বানিয়ে দেয় ব্ৰজহরি প্রায় কেঁদে উঠল। কী করা যায় তা হলে? -কিছুই করা যায় না। শেষ রাত্তিরে উঠে সিধে আইহাের রাস্তা -বেলা উঠবার আগেই মামুদপুরের টাল পাড়ি দেওয়া। মানে মানে ঘরের ছেলের ঘরে ফিরে যাওয়াই ভালো। } ৪৪ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী —তবে তাই। সােডার বােতল ভাঙ্গার মতাে শব্দ করে এক দমকা ঝড়াে হাওয়ার মতাে বুকফাটা খানিকটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ব্ৰজহরির : কিন্তু কুড়ি টাকা করে দিতে এক এক রাত্তিরে। ভূষণ বললে, আর খুড়ি যে বিধবা হত। টাকা দিয়ে শেষকালে আমরা তােমার শ্রাদ্ধ করব নাকি। ব্ৰজহরি আবার রুখে উঠল, তুই হতভাগা কেবল কুডাক ডাকবি। আমি মরলে আমার শ্রাদ্ধ খাবি এই আশাতেই নােলা শানিয়ে বসে আছিস। —বালাই ষাট ষাট। খুড়ী পাকা চুলে সিদুর পরুক, মুড়াে চিবুতে গিয়ে নড়া দাতগুলাে খসে যাক । কিছুক্ষণ সবাই নীরব আর নিস্তব্ধ হয়ে রইল। কালাে রাত যেন ঝমঝম করছে। ছাগলের মত শব্দ করে সােণা ব্যাং ডেকে চলেছে একটানা। শনশনে হাওয়ায় মাঠ ভরা কালাে জলে তরঙ্গের দোলা লেগেছে। জেলা বােডের বাঁধের তলা দিয়ে খরস্রোতে জল নেমে চলেছে কলকল করে। একটু দূরে বারােয়ারী তলায় বিষহরির বেদীর নীচে মিটমিট করছে প্রদীপ। কোন্ সুদূর দিগন্তে গােদাগাড়ী লাইনের একখানা রেলগাড়ী বেরিয়ে গেল, নিস্তব্ধ রাত্রির ইথারে জলভরা মাঠের ওপর দিয়ে গমগম করে ভেসে এল তার তার অস্ফুট প্রতিধ্বনি। কালীবিলাস আবার উঠে বসল। কাশির ধমক কিছুটা শান্ত হয়েছে এতক্ষণে। উত্তেজিত গলায় বললে, পালানাের মধ্যে আমি নেই কিন্তু। কথা দিয়েছ, রাখতে হবে। মরদকা বাত, হাতীকা দাত ! কুমারদয়েই গান গাইব আমরা। বিরক্ত হয়ে ব্ৰজহরি বললে, বাজে কথা কোয়ােনা বুড়োদা। আমরা তােমার মুকুন্দ দাস নই। জেলখাটা পােষাবে না, লাঠি খেতেও পারবনা।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ৪৫ উদ্দীপ্ত স্নায়ুগুলাের মধ্যে চালাধরা রক্ত চনচন করে উঠল কালীবিলাসের। -খবদ্দার বেজা । আমাকে যা খুসি তাই বলবি, কিন্তু অধিকারী মশায়কে ( কালীবিলাস কপালে হাত ঠেকাল ) অপমান করিসনে। ব্ৰজহরি ভেংচে বললে, ধ্যাত্তোর অধিকারী মশাই। তাকে নিয়ে তুমি ধুয়ে খাওগে, আর সঙ্গে আমাদের কোন্ সাতপুরুষের সম্পর্কে ? কালীবিলাসের চোখ মুখ দিয়ে আগুনের বিন্দু ঠিকরে বেরিয়ে পড়তে লাগল। তীব্র হয়ে উঠল গলার স্বর, তুই কি মনে করিস যে দশটাকা মাইনের জন্যে এত অপমান সয়ে তাের এখানে পড়ে থাকব ? নানা দুশ্চিন্তায় ব্ৰজহরির মাথা ঠিক ছিলনা, সমস্ত বিরক্তি আর অসন্তোষ যেন কালীবিলাসের ওপরেই গিয়ে পড়ল। তিক্ত কণ্ঠে বললে, থাকো যাওনা চলে। পায়ে ধরে সাধছেনা কেউ। একটা ভালাে পরামস্সাের নামে খোঁজ নেই, সব কথায় কেবল ওই মুকুন্দদাসের ফাকড়া! কালীবিলাস গজে বললে, খবদ্দার বলছি খবদ্দার। তাের দল ছেড়ে আমি চলে যাব কালকেই। কিন্তু তুই অধিকারী মশাইকে অপমান করলে একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড হয়ে যাবে। ভূষণা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললে, থামােনা খুড়াে। কেন খামােকা, ক্ষ্যাপাচ্ছ বুড়ােকে ? -না মাইরি, ভালাে লাগে না। কেবল মুকুন্দদাস আর মুকুন্দদাস। অতই যদি, তা হলে বেশতাে বাপু সােজা তার কাছেই চলে যাওনা। আমাদের খামােক এত ভােগাও কেন । কালীবিলাস কী বলতে যাচ্ছিল, বলতে পারল না। অসহ্য উত্তেজনা আর দুবার একটা কাশির উচ্ছাসে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। গলা দিয়ে জলের মতাে খানিকটা উত্তপ্ত তরল জিনিস বেরিয়ে এল, কাপড়ের ৪৬ সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী খুঁটে কালীবিলাস মুছে ফেলল সেটাকে। অন্ধকার না থাকলে তার চোখে পড়ত সেটা আর কিছুই নয়, টাটকা তাজা খানিকটা রক্ত মাত্র। আইহাের পথ ধরে চলতে চলতে দলটির সঙ্গে যখন প্রথম সূর্যের দেখা হল, তখন ওরা নবীপুর আর কুমারদহের এলাকা পেরিয়ে এসেছে। তিনদিকে ডুবার জল ভরা বর্ষায় মহাসাগরের মতাে ফুলে উঠছে, ফেনিয়ে উঠেছে,-নদী-নালা-জঙ্গল সব একাকার হয়ে গেছে। দূরে ডুবার বুকে মহাজনী নৌকার পালে সােনালি বােদ জ্বলছে। ভিজে ঘাস, পচা পাতা আর রাশি রাশি জলের অপূর্ব সুগন্ধি-বিলের অজস্র তরঙ্গে কলধ্বনি, যেন গন্ধ আর ধ্বনির একটা বিচিত্র ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়েছে। বাতাসে উড়ন্ত জলকণাগুলাে এসে লাগছে চোখে-মুখে, যেন নির্মল নিমেঘ আকাশ থেকে গুঁড়ােয় গুড়ােয় ঝরছে বৃষ্টির ছিটে। একটু দূরেই দিয়াড়িয়াদের গ্রাম মামুদপুর, ওখান থেকে একখানা নৌকা কেরায়া করে নিয়ে এই বিল পাড়ি জমাতে হবে। ব্ৰজহরি বগলের তবলা বায়া দুটো নামিয়ে একটা আমগাছের গুড়ির ওপরে বসে পড়ল। বললে, নে ব্যাটা মুচির পাে, চিড়ের পুটলিটা বের কর। বা-ব্বা, হাঁফ ধরে গেছে। আর দ্যাখ, বুড়ােদাকে চাড্ডি বেশি করে দিস। রাত থেকে বুড়ােদার মাথা গরম হয়ে আছে, ক্ষিদেও নিশ্চয়—কিন্তু বুড়ােদা কই ? কালীবিলাস নেই। শেষ রাত্রিতে তাড়াহুড়াের সময় কালীবিলাসও উঠেছিল, তার পোঁটলাও গুছিয়েছিল ; তারপরে এক সঙ্গে রওনাও যে দিয়েছিল তাও ঠিক। কিন্তু এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কালীবিলাস সঙ্গে অসেনি। ভূষণ ভীত হয়ে বললে, বােগা মানুষ, পথের মাঝখানে পড়ে-উড়ে নেই তাে?
৪৭
Insc
Apu ২
মারপাড়ার নীচে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী
ব্ৰজহরির অনুতাপ হচ্ছিল। বললে, তাই তাে। একট, খুঁজে
আয় না রে।
ভূষণ খুঁজতে গেল। কিন্তু বৃথা। যতদূর চোখ চলে, ফাঁকা
মাঠের মাঝখানে কালসরক চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেল না।
চার
মার বিশ্বনাথের ঘােড় এসে
থামল।
তখন বেলা উঠেছে অনেক। মাথার উপরে দুপুরের সূর্য জ্বলছে।
ঘােড়ার চ্যাপটা আর কালাে কালো ঠোটের কোণে ফেনার বিন্দু দেখা
দিয়েছে, ক্ষুধায় আর তৃষ্ণার হিংস্র ভাবে কড়মড় করে চিবুচ্ছে মুখের
লাগামটাকে। হাঁট, অবধি ধূলাে আর কাদা। কুমার বিশ্বনাথের মুখের
ওপরেও ধূলাের একটা পুরু আবরণ পড়েছে, মাথার অসংযত চুল গুলাে
নেমে এসেছে কপালে । চোখের দৃষ্টিতে ক্লান্তি আর উত্তেজনা।
কামারের উঠে দাড়াল শশব্যস্ত হয়ে। বিশ্বনাথকে তারা ভালাে করেই
চেনে, ওই ঘােড়াটাও তাদের পরিচিত। তেজী টাঙ্গন ঘােড়া, ঘাড়ের
ওপর সিংহের মতাে কেশরগুচ্ছ। কদম চালে যেন হাওয়ার মুখে উড়ে
চলে যায়। অমন ঘােড়া এ তল্লাটে আর কারাে নেই।
রূপপুরের কামারেরা বিশ্বনাথের প্রজা নয়। তবু তারা সাদরে
অভ্যর্থনা জানাল বিশ্বনাথকে। রামনাথ হাতজোড় করে সামনে এসে
দাড়াল।
-কোন্ ভাগ্যে এখানে পায়ের ধূলাে পড়ল হুজুরের ?
বলছি।
৪৮ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ কিন্তু বিশ্বনাথ রূপাপুরের আসবার আগে আরাে একট, ভূমিকা আছে। পথে যেন উঠছে। ছােট বড় কুমারদহ থেকে ঘােড়া ছুটিয়ে নবীপুরে পৌছলেন বিশ্বনাথ। এতদিন কিছু মনে হয়নি, কিন্তু আজ আসবার কুমারদহের সঙ্গে নবীপুরের স্বাতটা তাঁর বিশেষভাবে চোখে পড়তে লাগল। নবীপুর বেড়ে উঠছে, অবিশ্বাস্যভাবে বেডে দু বছর আগে যেখানে ফাকা মাঠে ঘনশ্যামল ধানের শীষ মাথা তুলত, আজ সেই সব জায়গায় নতুন নতুন পাড়া বসেছে। কঁচা ঘর, কোঠা ঘর । ঘরের দরজায় ঘােড়া বাঁধা, খচ্চর বাঁধা। রাশি রাশি দোকান; পানের দোকান, বিড়ির দোকান, মনােহারী দোকান—এমন কি চায়ের দোকান পর্যন্ত। বাসিন্দারা অধিকাংশ হিন্দু- স্থানী, বালিয়া আর আরা জেলার আমদানী। হঠাৎ দেখলে মনে হয় পশ্চিমের একটা শহরকে কে যেন রাতারাতি উড়িয়ে এনে বাংলা দেশের এই প্রকাণ্ড ঢালু মাঠের মাঝখানে বসিয়ে দিয়েছে। হাঁ, নবী- পুরকে এখন কলকাতার কাছাকাছিই বলা যায় বই কি। আর সকলের ওপরে মাথা তুলে রয়েছে লালা হরিশরণের প্রকাণ্ড তেতলা বাড়ীটা। চিলে কোঠার ওপরে রেডিয়াের তার—সেই তারের ওপরে উড়ে উড়ে জটলা করছে এক ঝাঁক কবুতর—সৌভাগ্যের প্রতীক ওরা। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল কুমারদহের কথা। কুমারদহ! একটা ভাঙাচুরাে এলােমেলল কঙ্কাল। রাস্তার দু পাশে ছড়িয়ে পড়েছে বিচুর্ণ কোঠা বাড়ীর ইট পাথর। অসংলগ্ন জঙ্গলের মাঝখানে এক একটা জরাজীর্ণ বাড়ী—যেন অসুস্থতা আর বাধ’ক্য সবঙ্গে বহন করে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। বড় বড় দীঘিতে কমী-দাম , এক হাত পুরু হয়ে পানা জমেছে, আর সেই পানার ওপর একরাশি নীল রঙের ডিম নিয়ে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ও ; কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে আলাদ-গাের। ঐশ্বর্য নেই, আছে অরণ্য মানুষ নেই, আছে ফেনায়িত বিদ্বেষ আর হিংসা। নিজের অজ্ঞাতেই কখন দাঁতের চাপ এসে নীচের ঠোটটার ওপর পড়েছিল। হঠাৎ ঘােড়ার পায়ে আচমকা কিসের একটা টক্কর লাগতেই সঙ্গে সঙ্গে একটা দাত সােজা বসে গেল মাংসের ভেতর। যন্ত্রণাবিকৃত মুখের রক্ত রুমাল দিয়ে মুছে ফেলে ঘােড়র রাশ টানলেন বিশ্বনাথ । সামনেই লালা হরিশরণের গদী। রাম রাম। আইয়ে রায়জী, আইয়ে। দু' পাশ থেকে দু’জন লােক এসে বিশ্বনাথের ঘােড় ধরলে। সিড়ির সামনেই লালাজীর ভাইপাে রামগােপাল দাড়িয়ে বিড়ি টানছিল। বিড়ি ফেলে দিয়ে সসম্মানে অভিবাদন করে বললে, নমস্তে, আইয়ে, আইয়ে। প্রতি অভিবাদন জানালেন বিশ্বনাথ। কিন্তু কিসের একটা সঙ্কোচে তিনি যেন চোখ তুলে রামগােপালের দিকে তাকাতে পারছিলেন না। যে কুমারদহের জমিদার বাড়ীতে একদিন হরিশরণের পূর্বপুরুষ পদসেবা করে অন্নসংস্থান করত, আজ সেই হরিশরণের কাছেই আশ্রয়প্রার্থী হয়ে আসতে হয়েছে তাকে। তিনি—কুমার বিশ্বনাথ । মনে হতে লাগল চারদিক থেকে অসংখ্য অবজ্ঞা আর অনুকম্পার দৃষ্টি এসে তার গায়ে সূচের মতাে বিধছে। প্রকাণ্ড গদী বাড়ী। প্রায় পুনােযােখানা বড় বড় সিড়ি পার হয়ে উঠতে হয় দোতালাসমান উচু বারান্দায়। ওপরের দিকে সিড়ি যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে সিড়ির মাথায় দু’ দিকে দুটি শ্বেত পাথরের মূর্তি-একটি সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশ আর একটি গন্ধমাদনবহনরত মহাবীর। মূতি দু’টিই সিদুরে বিচৰ্চিত। নকল মার্বেল বাঁধানাে মেজে, ফুলের কাজ করা। বারান্দার এক পাশে প্রকাণ্ড একটা লোহার দাড়ি- ৪ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ পাল্লা, দু’জন লােক সেখানে ধান মাপছে। আর এক পাশে আট দশটা কাপড়ের গাঁট আছে পাকার হয়ে। সাদা দেওয়ালের গায়ে মেটে সিদুর দিয়ে লেখা ‘লাল শুভ’ ‘লাল শুভ'। কোথা থেকে বেনেতি মসলার খানিকটা উগ্র মিশ্র গন্ধ ভেসে আসছিল । বারান্দা পেরিয়ে লম্বা একখানা ঘর—এই গদী। ঘরে পুরু জাজিম পাতা, তার উপর ধবধবে সাদা চাদর। তিন চারটে বিরাটকায় গিদ। বালিশ এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। এমনি একটা বিরাটকায় বালিশে নিজেকে প্রসারিত করে দিয়ে গড়গড়া টানছেন লালা হরিশরণ । পরণে সুস্ব খানের কাপড়, গায়ে পাতলা আদ্ধির পাঞ্জাবী। লালজীর ঠিক পেছনেই দেওয়ালের গায়ে ছােট একটা কুলুঙ্গি ; সেখানে লাল রঙের আর একটা ক্ষুদ্রকায় গণেশ মূর্তি, রূপাের প্রদীপ, রূপাের ধূপদানী। তার ওপর একট। দেওয়ালঘড়ি আর দেওয়ালঘড়ির দু'পাশে দু’খানা বড় আকারের ছবি–মহাত্মা গান্ধী আর পণ্ডিত জওহরলাল। লালাজী গড়গড়া টানছেন আর ফরাসের উপর ভিড় করে বসেছে তার কর্মচারী, মােসাহেব আর প্রসাদাকাহ্মীয় দল। ঠিক পাশেই নীল রঙের একটা গডরেজ সিন্দুক, একজন লােক তার ভেতর থেকে একতাড়া নোট বের করে গুনছিল। বিশ্বনাথকে ঘরে ঢুকতে দেখেই লালাজী সােজা উঠে দাড়ালেন, তারপর এগিয়ে এসে এবং বিশ্বনাথ কিছু বলবার আগেই দু হাতে তার পায়ের ধূলে নিলেন। বললেন আসুন রাজাসাহেব, কির,পা করকে গরীব খানেমে পা ধারিয়ে। সাপের কামড় খাওয়ার মতাে বিশ্বনাথ চমকে দু পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, ছিঃ, ছিঃ, এ কী করছেন আপনি। লালাজী হাসলেন—হাসিতে যেন শ্রদ্ধা আর বিনয়ে বিগলিত হয়ে —জী। সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী গেলেন তিনি। বললেন, না, না, তাতে কী হয়েছে। আমরা তাে আপনার চাকর, আপনার খেয়েই তাে আমরা মানুষ। লালাজীর গদীতে যারা বসেছিল, তারা তাকিয়ে আছে বিস্ময় বিমূঢ় দৃষ্টিতে—যেন কী একটা বিচিত্র অভিনয় দেখছে তারা। কিন্তু বিশ্বনাথের দু’ কান লাল আর গরম হয়ে উঠল। কপালের উপর ফুটে উঠল ঘামের বিন্দু। জামার আস্তিনে কপালটা মুছে ফেলে বিশ্বনাথ বললেন, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে লালাজী। --কথা আছে- বিলক্ষণ ! আসুন, আসুন, আমার বসবার ঘরে আসুন। এই রামদেইয়া, রাজাবাবু কো কো ওয়াস্তে চা লাগাও জলদি রাম দেইয়া বেরিয়ে গেল তটস্থ হয়ে। —মাপ করবেন, চা আমি এখন খাব না। -চা খাবেন না, এও কি একটা কথা হল। গরীরের মােকামে যখন কষ্ট করে এসেইছেন,“লালাজী হাসলেন : তখন আর একটু তলিফ – গরীবের মােকাম—তাই বটে! কলকাতায় বিবেকানন্দ রােডে আকাশ ছোয়া প্রাসাদ তুলেছেন লালাজী। বাংলার গবর্ণর স্বয়ং তাঁর প্রাসাদের দ্বারােদঘাটন করেছেন। বিরাট ব্যবসা, বিশাল কারবার, লক্ষ লক্ষ টাকার তিনি মালিক। সে ঐশ্বর্যের চিহ্ন এই গ্রাম্য বাড়ীর সর্বত্রই সােণালি রঙে ঝলমল করছে। ড্রাই ব্যাটারী দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে, ঘরে ঘরে ইলেকটিকের আলাে আর পাখা। পুরু পাশী কার্পেট। মনে পড়ল ধ্বংসশেষ কুমারদহের অপসৃয়মান রাজপ্রতাপ। লােভনীয় বসবার ঘরটি। লালাজীর গদী থেকে একেবারে আলাদা। গদীর প্রয়ােজন ব্যবসায়িক, তার ব্যবহার স্থল এবং সবজনীন। কিন্তু এ একটা বিভিন্ন জগৎ। কাচের শেলফে বাঁধানাে দামী ইংরেজী, হিন্দী, সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ বাংলা বই ঝকমক করছে। সােফার ওপর হরিণ আর চিতাবাঘের চামড়া বিছানাে, লালাজী নিজের হাতেই এদের শিকার করছেন। কালাে আবলুস কাঠের ফ্রেমে দামী ক্লক। মেহগিনীর টেবিলে ফুলের তােড়া । লালাজী সবিনয়ে বললেন, বৈঠিয়ে । বিশ্বনাথ বসলেন। কিন্তু অকারণে, অত্যন্ত অকারণে তাঁর সমস্ত চোখমুখ ঘর্মাক্ত হয়ে উঠতে লাগল। লালাজী টেবিল-ফ্যান খুলে দিলেন। তবু বিশ্বনাথের মনে হতে লাগল, শরীরের ভেতর থেকে যেন অসহ একটা উত্তাপ বাষ্পের রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসছে, যেন তাঁর নিঃশ্বাস- প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। লালাজীর মুখে অসীম বিনয়—চোখদুটি বিনয়ে ছল ছল করছে। কোমল কণ্ঠে বললেন, ফরমাইয়ে। বিশ্বনাথ একবার শুষ্ক ও লেহন করলেন। পিপাসায় যেন গলার ভেতরটা শুকিয়ে উঠেছে, এখন একপাত্র মদের প্রায়ােজন। নিজে না এলেই বােধ করি ভালাে হত। কিন্তু এখন আর ফেরবার জো নেই কোনাে দিক থেকে। বললেন, মেলা সংক্রান্ত সেই কথাটা বলবার জন্যেই লালাজী বললেন, রাম রাম। সেজন্যে এত কষ্ট করে কুমার বাহাদুরের আসবার দরকার ছিল কী। কোনাে আমলাকে পাঠিয়ে দিলেই তাে হত। এই দুপুর বােদে এতখানি ঘােড়া ছুটিয়ে আসা কী রাজা রাজড়ার সুকুমার শরীরে কখনাে সুম ! —রাজরাজড়া, কুমারবাহাদুর!—কথাটা যেন কানের মধ্যে গিয়ে আঘাত করতে থাকে। যেন ইচ্ছে কবেই লালাজী তার গায়ে বিদ্রুপের চাবুক মারছেন। কিন্তু লালাজীর মুখে কোনাে ভাবান্তর নেই, এতটুকু সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ বৈলক্ষণ্য নেই কোথাও। একরাশ মাখনের মতাে নরম আর কোমল প্রশান্ত মুখশ্রী, উদ্বিগ্ন শুভার্থীর মতাে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। রুমালে মুখ মুছে বিশ্বনাথ বললেন, মেলাটা কি আপনি নিতেই চান ? লালাজী হাসলেন। সােনার সিগারেট কেস খুলে এগিয়ে দিলেন বিশ্বনাথের দিকে। বললেন, রাজাবাবুর মেলা আমি নিতে পারি এত- বড় কথা বলব কী করে। বছর পাঁচেক মেলাটা গোলামের তবে থাকুক, এই আর্জি। মনিবের সম্পত্তি তাে চাকরেই দেখা শােনা করে, তাতে অন্যায় কিছু নেই। ব্ৰজহরি পালের সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত দামী দুলভ বার্ডসাই’ কিন্তু বিশ্বনাথ স্পর্শও করলেন না। তার শিরাগুলাে যেন একটা আকস্মিক বিস্ফোরণে জ্বলে উঠেছে। কিন্তু সমস্ত উত্তেজনা আর উগ্রত'কে গলার নীচে ঠেলে রেখে তিনি শান্তস্বরে বললেন, মেলা না পেলে কি আপনি টাকা দিতে পারবেন না? কী করে দিই। আরাে কোমল, অনেকটা অনুনয়ের ভঙ্গিতেই জবাব এল । আমারও বাস্-বাচ্ছা আছে। তাদের একটা ব্যবস্থাও তাে করা দরকার। কুমারবাহাদুর নিজেই বিবেচনা করুন। উত্তেজনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ফ্যানের বাতাসেও শরীরের সবত্ৰ প্ৰধুমিত উত্তাপ এতটুকু শান্ত হতে চায় না। বিশ্বনাথ রুমালে আবার চোখ মুছলেন। গলার কাছে কী একটা আটকে ধরেছে, কথা বলতে কষ্ট হয়। -বেশ, তবে তাই। কণ্ঠের প্রশান্তি সত্ত্বেও বিশ্বনাথের চোখ জ্বলতে লাগল আর লালাজীর চোখ হাসতে লাগল কৌতুকে। বিশ্বনাথ বললেন, কাগজপত্র তৈরী থাকে তত দিন। আমি সই করে দিই।
3 সম্রাট ও যে রাম রাম সীতারাম।লালাজী সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হয়ে গেলেন : তাও কি হয়। গরীবের বাড়ীতে এসেছেন, চা-পানি খান, একটু বিশ্রাম করুন। কাগজ পত্র আর টাকা আমি কাল নিজেই লােক দিয়ে রাজ- বাড়ীতে পাঠিয়ে দেব। বিশ্বনাথ সােজা হয়ে উঠে বসলেন। চোখের দৃষ্টিকে স্থির আর দৃঢ় করে রাখলেন লালাজীর মুখের ওপর : আর সে টাকা যদি আমি কেড়ে রাখি ? যদি দলিল সই না করে ছিড়ে ফেলে দিই ? লালাজী আবার হাসলেন : তা হলে সে টাকা আমি কুমারসাহেবের নজরানা বলেই ধরে নেব। কথাটা এসে পড়লে যেন কঠিন একটা মুষ্ট্যাঘাতের মতাে। স্তব্ধ হয়ে রইলেন বিশ্বনাথ, কোনাে উত্তর মুখে জোগাল । লালাজী টেবিলে কনুইয়ের ভর রেখে অনুসন্ধিৎসু চোখে বিশ্বনাথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। টেবিল-ফ্যানটা অশ্রান্তভাবে কট কট করতে লাগল আর বাইরে থেকে শােনা যেতে লাগল ধান মাপার সুর : রামে রামে দো- দো-দো তিন, তিন তিন চার, চার-চার- প—- ঠিক এমনি সময় চা নিয়ে ঘরে ঢুকল রামদেইয়া। সঙ্গে সঙ্গে যেন জমাট অস্বস্তির একটা কালাে দমকা হাওয়া হু হু করে দরজা দিয়ে বার হয়ে গেল। এক নিশ্বাসে চায়ের পাত্র নিঃশেষ করে এবং খাদ্যদ্রব্যের একটি কণাও স্পর্শ না করে বাইরে এসে বিশ্বনাথ ঘােড়ায় উঠলেন। সশকে চাবুক পড়ল, তার পরেই ঘােড়া দ্রুতবেগে উড়ে চলল সােজা রূপাপুরের পথে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী রূপপুরের মজলিস শেষ করে বিশ্বনাথ যখন উঠে দাড়ালেন, তখন বেলা দুপুর। ঘােড়ার লাগাম ধরে দাড়িয়ে বললেন, মনে থাকবে? সূজের হাতের পেশী ফুলে উঠেছে, দুলে উঠেছে সমস্ত বুকখানা। কালাে কঠিন হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জবাব দিলে, থাকবে। রামনাথ দাড়িয়েছিল মাথা নীচু করে। বিশ্বনাথ এবার তাকেই সম্ভাষণ করলেন। -তুমি কী বলছ ওস্তাদ ? রামনাথ মুখ তুলল। ক্লান্ত কণ্ঠে বললে, আপনার হুকুম আমরা মানব। -হ। মেলা ভেঙে দিতে হবে। যেমন করে থােক। আগুন লাগিয়ে, দাঙ্গা বাধিয়ে—যেমন করে হােক। ধাক্কা সামলাতে আমি আছি। আর টাকা--সে তাে আগেই বলা আছে। -তাই হবে।কিন্তু মনের দিক থেকে রামনাথ কোনাে প্রেরণা পেলনা। দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবার বয়স বা উৎসাহ কোনােটাই তার আর নেই। সেদিনের উত্তপ্ত রক্ত গেছে শীতল হয়ে, যাযাবর জীবন আমের বনের ছায়ায় নিভৃতে এসে আশ্রয় নিয়েছে ; ফসল কাটবার সময় অনেক আশা আর স্বপ্ন ভবিষ্যতের মােহ মায়া বুলিয়ে দিয়ে যায় । তারপর রাত্রে কামিনী যখন বুকের মধ্যে একান্ত ঘন আর নিবিড় হয়ে আসে- তখন প্রেমে, পূর্ণতায় আত্মতৃপ্ত পাশবিক জীবন। মারামারি, হাঙ্গামা অনিশ্চয়তাকে মেনে নেবার অনুপ্রেরণা কোথায় ? তবু রামনাথ বললে, তাই হবে। রূপপুরের তলা দিয়ে জনস্রোতের বিরাম নেই। অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলেছে, ধূলােয় কাদায় কোলাহলে পথ মুখরিত করে চলেছে। বিশ্বনাথ আবার ঘোড়ায় চাবুক বসালেন, তারপর শেষবারের মতাে মুখ ফেরাতেই সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ রামনাথের ঘরের দাওয়ায় দেখলেন ভানীকে। একবার দুবার, তিনবার ফিরে ফিরে দেখলেন তিনি। মাথার ওপর বােদ ঝলকাচ্ছে, অনেকক্ষণ থেকে একপাত্র মদ পেটে পড়েনি। তবু—বিশ্বনাথ চকিতের জন্যে ঘােড়ার রাশ টানলেন; তারপরেই আবার হাওয়ার মতাে ছুটিয়ে দিলেন তাঁর তেজী টাঙ্গন ঘােড়াটা। ভানী কে? তার পরিচয় যথাসময়ে দেব । পাঁচ প্রায় চল্লিশ ঘর কামারের বসতি গ্রামে। আরাে বেশি হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু কুড়ি বছরেও বাঁধা ঘরবাড়ী ওদের মূলটাকে মাটির মধ্যে বেশিদূর থিতিয়ে দিতে পারে নি। আর পাশাপাশি ভাবে ঘরবাড়ী করে বাস করবার ইচ্ছা থাকলেও তার কি জো আছে আজকাল। একটু বেশি সঞ্জীব হয়ে যারা বাঁচতে চায়, প্রতি পদে পদে বাইরের সংঘাত এসে খব করতে চায় তাদের। চুরি ডাকাতি করলে ইংরেজের আইন চার দিক থেকে বাহ বাড়িয়ে আসে, খাজনার গােলমাল করলে জমিদারের রক্তচক্ষু আত্মপ্রকাশ করে নানা খুঁটিনাটি অত্যাচারের বন্ধু পথে। খাঁচার ভেতরে বন্দী সিংহ যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে, ততক্ষণ তাকে নিয়ে কোননা সমস্যা দেখা দেয় না; কিন্তু রক্তের মধ্যে যখন তার অরণ্যের আহ্বান মমরিত হয়ে ওঠে আর তার প্রচণ্ড শক্তি লােহার গরাদগুলােকে ভেঙে চুরমার করবার মতলব করে, তখন তার জন্যে অন্য ব্যবস্থা করা ছাড়া উপায়ান্তর থাকে না। তরুণী, শ, কোেলাল–আরাে কতজন। কেউ জেলে, কেউ ।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ দ্বীপান্তরে, কেউ কেউ বা এখনাে ফেরারী। ওই সব ফেরারীদের সন্ধানে পুলিশ মাঝে মাঝে রূপপুরে এসে হানা দিয়ে যায়। বিশেষ করে কেশােলাল। দু দুটো খুনে মামলার সে আসামী। ডাকাতি করতে গিয়ে বাড়ির কতার গলাটাকে সে পোঁচিয়ে পেঁচিয়ে কেটেছিল, যেমন করে লােকে মুর্গী জবাই করে অনেকটা সেই রকম। তারপর তাকে ধরতে এল চৌকীদার। চৌকীদারের নাম আলী মহম্মদ, দশাসই জোয়ান, দশটা বাঘে তাকে খেতে পারে না। দুবার সে নিছক বাহু- বলে জাপটে চোর-ডাকাত ধরে ফেলেছে। কিন্তু নিতান্ত কুক্ষণেই সে কেশােলালকে ধরবার জন্যে এগিয়ে এসেছিল । অব্যর্থ লক্ষ্যে কোেেলাল ল্যাজা ছুড়ল। আলী মহম্মদ মাটিতে পড়ল, আর উঠল না। তার পর থেকে কেশােলাল নিরুদ্দেশ। পুলিশের রাগ তার ওপরেই সব চাইতে বেশি ; তার মাথার ওপর ঝুলছে হাজার টাকার পুরষ্কার। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে ধরা পড়েনি। কেউ বলে সে নাকি জাহাজের খালাসী হয়ে বিলেত চলে গেছে, কেউ বলে নাগা সন্ন্যাসী সেজে সে হিমালয়ে ধ্যান ধারণায় মন দিয়েছে। কিন্তু এর কোনােটাই যে সত্যি নয়, রূপপুরের কামারেরা তা জানে। কেশােলালের মতাে মানুষ তাে চুপ করে থাকবার পাত্র নয়। জীবনকে সে রূপান্তর দিয়েছে নিশ্চয়, কিন্তু সে জীবন স্তিমিত ধ্যান-ধারণায় নয়, জাহাজের খালাসী হয়ে কয়লা ঠেলায়ও নয়। সাত আট বছর পেরিয়ে গেল, রূপাপুরের কামারেরা কেশােলালকে প্রায় ভুলতে বসেছে। কিন্তু রামনাথ ভােলে নি। তার সার্থক মন্ত্র- শিষ্য ছিল কেশােলাল। সুরযের মধ্যে সে রক্ত মাঝে মাঝে দোলা দিয়ে ওঠে কিন্তু তাই বলে কি কেশােলালের সঙ্গে তার তুলনা চলে। একবার সখ করে অনেকখানি কাচা মাংস চিবিয়ে খেয়েছিল সে। কষ বেয়ে টপ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ; টপ করে পড়ছে রক্ত, রক্তাক্ত দাতের সঙ্গে মাংসের ছিবড়েগুলাে জড়িয়ে রয়েছে—প্রকাণ্ড মুখখানায় আকৰ্ণ রক্তিম হাসি হেসে কেশােলাল বলে- ছিল—একবার মানুষের মাংস খেয়ে দেখতে হবে, স্বাদ কেমন লাগে। সেই কেশােলাল। আর একজন তাকে ভােলে নি, সে তার বউ ভানী। বিশ বাইশ বছর হবে ভানীর। মােটা খাটো চেহারা ; সমস্ত শরীরে মেদ নয়, মাংসের প্রাচুর্য । পুরুষের মতাে গঠন—অসুরের মতাে খাটে, রাক্ষসের মত খায়। কোনাে মেয়ে যে এক সঙ্গে এই পরিমাণ খেতে পারে এ যেন নিজের চোখে দেখলেও বিশ্বাস হয় না। হাসলে গালের দুপাশে মাংসের পিণ্ড গােল হয়ে ফুটে ওঠে আর তাদের আড়ালে ছােট ছােট চোখ দুটো প্রায় তলিয়ে যায় তার। পায়ের পাতা দুটো অস্বাভাবিক বড়, ভারী শরীর নিয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে ভানী যখন চলতে থাকে, তখন মনে হয় যেন হাতী আসছে । বেশি কথা বলে না, বােঝেও না। অর্থহীন খানিকটা হাসি দিয়েই সচরাচর সব কথার জবাব দিতে চায়। নিঃসঙ্গ ঘরে একলা দিন কাটায়, অন্য কামারদের খুঁটিনাটি কাজকর্ম করে দেয়, খেতে পায়। স্বামীর বিরহে সে যে খুব বেশী মর্মপীড়া বােধ করছে না—তাকে দেখলেই সে কথা মনে হয়। প্রচুর স্বাস্থ্য এবং আকণ্ঠ আহারে নিজের ভেতরেই সে সব সময়ে পরিতৃপ্ত হয়ে আছে। কাজকর্ম না থাকলে ঘরের দাওয়ায় বসে গলার নানা রকম সুর করে, কোকিল ডাকে, শিস্ দেয়, বলে ‘বউ কথা কও!’ খামােক একটা কুড়ুল নিয়ে কাঠের গুড়ি চ্যালা করতে লেগে যায়। স্নান করতে গিয়ে অন্য বউঝিদের ধরে চুবিয়ে দেয়, ডুব দিয়ে এসে পা ধরে টানে, শুকনাে কাপড়ে পাক ছিটিয়ে দেয় । মেয়েরা রাগ করে।—অত যে হাসিস, লজ্জা করে না।
সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী
লজ্জা? কিসের লজ্জা? ভানীর হাসি তাতে বন্ধ হয় না। মাংসের
টিবির আড়ালে প্রায় তলিয়ে যাওয়া চোখ দুটো মিটমিট করে বলে,
কেন ?
-সােয়ামীর পাত্তা নেই সাত বছর, কোন সুখে আছিস তুই ?
ভানীর চোখ-মুখে ছায়া পড়ে, হাসির রেখাটা হ্রস্ব হয়ে আসে ক্রমে।
বলে, সাত বছর পাত্তা নেই থাকল, আসবে তত একদিন ।
–ছাই আসবে। এতদিনে সে কবে
আর একজন বাধা দিয়ে বলে, এলেই বা। তােকে কি আর ঘরে
নেবে ভেবেছিস তুই।
নাঃ ঘরে নেবে না ? কে তবে রেধে দেবে শুনি? কে পাখার
বাতাস দেবে, পা টিপে দেবে কে? রাগ হলে লাথি মারবে কাকে ?
এর পরে যে কথাটা মনে আসে মেয়েরা তা বলতে পারে না। দুঃখ
হয়, সংকোচ হয়, লজ্জা হয়। ভানী কিন্তু নির্বিকার।
-তােদের সােয়ামীর চাইতে আমার সােয়ামী আমাকে ঢের বেশি
ভালােবাসে।
বুদ্ধিহীন সরলতা অন্য মেয়েদের মনে সহানুভূতির প্রতিক্রিয়া আনে।
একজন বলে, বাসেই তো।
ভানী বলে, তার সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে।
মেয়েরা মনে মনে বলে, যমালয়ে। প্রকাশ্যে জবাব দেয়, নিশ্চয়।
পুকুরপাড়ে আমগাছে কোকিল ডাকছে। ভানী উৎকর্ণ হয়ে শশানে
তার পরেই তার শিশুর মতো অস্থির আর চঞ্চল মনটা চলে যায় সেই
দিকেই। উচু কণ্ঠে সাড়া দিয়ে বলে—কু-উ-উ।
কোকিলটা চটে গিয়ে আরাে ওপরে স্বরগ্রাম তােলে, ভানীর গলাও
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ তার সঙ্গে পর্দায় পর্দায় চড়ে। বলে—কামিনী দি, এবার আমি একটা কোকিল পুষব। মেয়েরা মনে মনে আবার বলে, মরণ। তারপর কলসীতে জল ভরে নিয়ে যে যার ঘরে চলে যায় ; বেলা বাড়ছে, মরদগুলাে ভােব না হতেই হাপরে বসেছে। ক্ষিদের সময় ভাত ঠিক মতাে না পেলে হাতুড়ি পিটিয়ে ওদের মাথাগুলােকে ভেঙে দেবে। ভানীর মতাে মনের আনন্দে কোকিল ডাকলে ওদের চলে না। তবু মেয়েরা রাগ করে না ওর ওপরে। করুণা হয়, সহানুভূতি হয়। কী চমৎকার আত্মতৃপ্ত হয়ে আছে ভানী ! নির্ভয়, নিঃসঙ্কোচ, নিঃসন্দেহ। নিজের ভালােমন্দ, নিজের মান-সম্মান কোনাে কিছুই তলিয়ে বুঝবার মতাে ক্ষমতা ওর নেই। কেশােল কোনাে দিন ফিরবে না, ফিরলে তার ফাঁসি অনিবার্য। আর যদি এমন হয়, কোন দিন চুপি চুপি সে ফিরেও আসে, তা হলেও সে ভানীকে কোনমতে ঘরে নেবে না। নিজের ক্ষতির কথা ভানী বুঝতে পারেনি বটে, কিন্তু ওরা তত সবই জানে। জবানবন্দী দেবার জন্যে পুলিশের লােক এসে তাকে ধরে নিয়ে গেল থানায়। তখন ভানীর বয়স অল্প—চৌদ্দ-পনেরাে বছরের বেশী হবে না। জবানবন্দী সে কী দিয়েছিল কেউ জানে না, কিন্তু তিন চার দিন পরে যখন সে ফিরে এল, তখন দশমাইল দূরের থানা থেকে হেঁটে আসবার ক্ষমতা তার ছিল না, তাকে আনতে হয়েছিল গাড়ীতে এবং দুদিন যাবৎ সে অচৈতন্য হয়ে ছিল। থানার দারােগা থেকে দারােগার গাড়ীর গাভােয়ান পর্যন্ত কেউই তার নিরুপায় দেহটার ওপর পাশবিক চঞ্চুপাত করতে ছাড়ে নি। সকলে মনে করেছিল—ভানী বাঁচবে না কিন্তু শরীরের প্রচুর প্রাণ- শক্তিই তাকে বাঁচিয়ে তুলল। আর শুধু শারীরিক ভাবেই নয় ;
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ স্বাভাবিক অপমান এবং ঘৃণায় রূপাপুরের কামারের মেয়েরা পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে পারত—অন্তত একটা অসহ আত্মগ্লানিতে আচ্ছ হয়ে থাকত তাদের চেতনা, সে অপমান, সে গ্লানি অনায়াসেই কাটিয়ে উঠেছে, অপরিমেয় একটা জীবনী শক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামান্য কালির ছিটার মতাে যে দাগ তার গায়ে লেগেছিল, অত্যন্ত সহজেই তা ধুয়ে মুছে নিমল হয়ে গেছে,শারীরিক একটা দুর্ঘটনার মতােই সে মেনে নিয়েছে সেটাকে । তাই ভানীর হাসিতে কখনাে এতটুকু ছন্দোপতন ঘটে না, তাই সে বুঝতে পারে না কোন্ অপরাধে কেশােলাল ঘরে নেবে না তাকে। কিন্তু অন্য মেয়েরা তার মতাে নির্বোধ নয়। ভানীর অদৃষ্ট ভেবে তাদের দীর্ঘশ্বাস পড়ে। কত বড় সব নাশ যে তার হয়ে গেছে, সে কথা বলতে গিয়েও ওরা থমকে থেমে যায়—থাক না ! ভুলেই যদি আছে, তা হলে আর মনে করিয়ে দিয়ে কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কী। পুরুষেরা অবশ্য সবাই সে দৃষ্টিতে ভানীকে দেখে না। কারাে সহানুভূতি হয়, কেউ কেউ দুঃখ করে ; আবার ভানীর অসংযত চলা- ফেরা, নিজের সম্পর্কে অসতর্ক অচেতনা, কারো কারাে মাথার মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। মাংসল পরিপূর্ণ দেহটার দিকে তাকিয়ে তরুণ সম্প্রদায় মাঝে মাঝে চঞ্চল হয়ে ওঠে—ভানী তাে রাতে একাই থাকে। কিন্তু বছর দুই আগে একটা কাণ্ড ঘটে গেছে, তারপর থেকে ভানীর ঘরে কেউ আর ঢুকতে সাহস করে না। সারাদিন ঢেকি কুটে এক সের চালের ভাত খেয়ে কুম্ভকর্ণের মতাে ঘুমােচ্ছিল ভানী। অনেক রাত্রে ঝাঁপের দড়ি কেটে কে তার ঘরে ঢুকল। চকিত স্পর্শে ভানীর গভীর নিদ্রা দূর হয়ে গেল, মাথার কাছ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ থেকে পিতলের একটা ঘটি তুলে নিয়ে সজোরে অন্ধকারের মধ্যে একটা প্রচণ্ড আঘাত বসিয়ে দিলে । কুড়ল ধরা, জতাভাঙা কঠিন হাত-উত্তেজনার আধিক্যে আঘাতটা মারাত্মক হয়ে বসল। ভানীর গায়ের ওপর থেকে ভারী একটা জিনিষ প্রবল আতনাদ করে পড়ে গেল মাটিতে, তারপর বিদ্যুৎগতিতে উঠে ঝাঁপি খুলে বেরিয়ে গেল বাইরে। আলাে জ্বেলে ভানী দেখলে ঘরটা রক্তে ভাসছে। পরদিন সকালে ব্যাপারটা তার ভালাে করে মনেই পড়ল না। আর বৈজু কামার মাথায় একটা রক্তাক্ত ন্যাকড় জড়িয়ে তিন দিন পড়ে রইল বিছানায়। অন্ধকারে ঘর থেকে বেরােতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়েই তার এই দুর্দশা। দৈব দুর্বিপাকে এমন কত বিড়ম্বনা মানুষকে ভােগ করতে হয় যে। তারপর থেকে ভানী মােটামুটি শান্তিতেই দিন কাটিয়ে আসছে। আকার-ইঙ্গিত দু'চারজন মাঝে মাঝে করে বটে, কিন্তু বেশি কাছে এগিয়ে আসবার সৎসাহস আর নেই কারাে। সে সব ইঙ্গিত ভানী ভালো করে বুঝতেও পারে না। পুরুষের মতাে স্বাস্থ্য, পুরুষের মত জীবন-যাত্রা মনের দিক থেকেও তাকে অনেকখানি স্বতন্ত্র করে দিয়েছে। যে সমস্ত ইঙ্গিত ও কথাবার্তায় অন্য মেয়েরা লজ্জায় মুখ তুলতে পারত না, তাদের সমস্ত শিরা স্নায়ুগুলাে চমকে উঠত, সেগুলাে ভানীর কাছে নিছক ঠাট্টা আর অর্থহীন মুখভংগি বলেই মনে হয় শুধু। কিন্তু কেশােলালকে সে ভুলতে পারেনি। ভালাে করে মনে কি পড়ে ? সবটা পড়ে না—সাত আট বছরের ব্যবধান একটা সূক্ষ্ম পরদার মতাে তার ওপরে নেমেছে, তার অন্তরালে সে সব দিনগুলাে দেখা যায় ছায়ার মতাে, কতক দেখা যায়, কতক দেখা সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ যায় না। তা ছাড়া ভানীর বয়স তখন বেশি নয়, আর বয়সের অনুপাতে বুদ্ধিও ছিল অপরিণত। তরল অগঠিত চিন্তার ওপরে সে দিনের স্মৃতি কোনাে রেখাপাত করেনি, দাগ কাটতে না কাটতেই মিলিয়ে গেছে। কেশােল লাথি মেরেছে তাকে, নির্যাতন করেছে নানারকম, কঠিন হাতে টেনে টেনে মাথার চুল অর্ধেকের বেশি উপড়ে ফেলেছে, আর আর ভালােবেসেছে নির্মমভাবে, নিষ্ঠুরভাবে—রূপাপুরের কামারের। যেমন ভাবে ভালােবেসে থাকে। তারই এক একটা দিন হঠাৎ অতিরিক্ত উজ্জ্বল হয়ে দৃষ্টির সামনে ঝল মল করে ওঠে যেন। যেন পাতলা পদটি। জায়গায় জায়গায় ছিড়ে গিয়ে সূর্যের আলাে গিয়ে প্রসারিত হয় তাদের ওপরে। দাওয়ায় বসে আপন খেয়ালে কোকিল ডাকতে ডাকতে ভানী হারিয়ে ফেলে নিজেকে। ভানীকে বেদম প্রহার দিয়ে বেরিয়ে গেছে কেশােলাল, ফিরেছে অনেক রাতে। গায়ের ব্যথায় চোখের জল ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছে ভানী, আচমকা জেগে উঠেছে কেশােলালের নিস্পেষিত সােহাগের উদগ্র উচ্ছাসের মাঝখানে । রুদ্ধশ্বাসে কেশােলাল বলছে, খুব রাগ হয়েছে, না ? আচ্ছা, এবার হাট থেকে তাের জন্যে ডুরে শাড়ী কিনে আনব আর সােনাদীঘির মেলা থেকে কিনে দেব নানারঙের কাচের চুড়ি। কোথায় সেই কেশােলাল। বুদ্বদের মতো মিলিয়ে গেছে একদিন। অত বড় মানুষটা, অমন শক্তিমান, হাতুড়ির মুখে যার আগুন ছুটত আর চারদিকের সমস্ত মানুষ-জানােয়ার তটস্থ থাকত যার ভয়ে, একদিন একটা দমকা হাওয়ার মতােই বিলীন হয়ে গেল সে। সমস্ত রূপাপুর, শুধু রূপপুর কেন, আশেপাশের সব অঞ্চলগুলাে যে জুড়ে থাকত-আজ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ কোনােখানে তার একটুকু পাত্তা পাওয়া যায় না। এও কি সম্ভব! ভানীর ভারী বিস্ময় বােধ হয় । সামনে দিয়ে মানুষের শােভাযাত্রা। গাড়ীর মিছিল। চলেছে, কত অসংখ্য লােক। দূর বিদেশ থেকে সব আসছে—দেখলেই বােঝা যায়। মানুষগুলাের হাঁটু অবধি ধূলাে, জামা কাপড় লাল আর ময়লা হয়ে গেছে। চোখে মুখে গভীর ক্লান্তি। মাথার ওপর জলছে জৈষ্ঠের সূর্য, এখনাে বৃষ্টি নামেনি, ফাটা মাঠগুলাের ফাটল দিয়ে আগুন উঠছে, পথের পাশে মরা বিলগুলাে শুধুই কাদা। লােকগুলাে তৃষ্ণাত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে সেই শুকনাে বিলগুলাের দিকে, রূপাপুরের দীর্ঘ তাল গাছগুলাের কৃপণ ছায়া তাদের মনে ক্ষণিক বিশ্রাম নেবার প্রলােভন জাগিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু দাড়াবার সময় নেই তাদের। গােরুর গাড়ীর চাকায় ধুলাে জমে সেগুলাে আকারে যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে, চাকার ভেতর থেকে ক্যাচক্যাচ শব্দে উঠছে একটা কাতর আতনাদ। গােৰুগুলো পা ভেঙে ভেঙে এগিয়ে চলেছে মন্থর গতিতে যেন অন্তিম যাত্রায় ; মহিষের গালের দু'পাশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সাদা ফেনা। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভানীর কত কী মনে হয়। মনে হয় যেন পৃথিবীতে আর কোন লােক বাকী নেই, সবাই দল বেঁধে আজ সােনা- দীঘির মেলার দিকেই এগিয়ে চলেছে। এত লােকও কি আছে সংসারে । সঙ্গে সঙ্গে মনের সামনে ভেসে ওঠে আর একজনের কথা—সে। কোেেলাল। কোেেলাল। সে কোথায় আজকে? সেও কি এমনি দুপুরের রােদে আজ পথ চলেছে ছন্নছাড়া, লক্ষ্মীছাড়ার মত ? প্রখর রােদের আলায় পুড়ে যাচ্ছে মাথার ওপরটা, তৃষ্ণায় শুকিয়ে এসেছে কণ্ঠ, কিন্তু কোনােখানে এতটুকু ছায়া নেই, জল নেই একটি বিন্দুও। তবু সে
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ
চলেছে, চলেছে—তার চলার শেষ নেই। দু দুটো খুন করেছে সে,
পুলিশ তাকে একবিন্দু বিশ্রাম দেবে না, এ কথা ভানীও জানে।
যে লােকগুলাে চলেছে, তাদের দিকে ভানী আকস্মিক তীক্ষ্ণ
প্রসাৱিত করে দেয়।
কে জানে, এদের মধ্যেও হয়তাে কেশোনাল
থাকতে পারে, হয়তাে এদের সঙ্গে পা মিলিয়ে সেও চলেছে মেলায়।
কিন্তু ভানী কি তাকে চিনতে পারবে? ওই যে লােকটা অতি কষ্টে
কুঁজো হয়ে পথ চলছে, ওই কি? কিন্তু কেশােলালের তাে অত বুড়াে
হবার কথা নয়। কিংবা ওই কে একজন এক মুখ দাড়ি নিয়ে সতর্ক
চোখে চারিদিক তাকাতে তাকাতে চলেছে, ওই যে কেশােলাল হতে
পারে না, এমন কথা কে বলবে। সাত আট বছর আগেকার কথা,
ভানীর তাকে ভালাে করে মনে পড়ার কথা নয়।
কামিনী এল পিছন থেকে ।
-এত করে কী ভাবছিস ভানী।
চিন্তার সুর কেটে গেল। ভানী জবাব দিলে না, তাকিয়ে রইল
বড় বড় নিবোধ চোখ মেলে।
—এমন করে বসে আছিস যে? ক্ষিদে পেয়েছে ? চল এক ধামি
মুড়ি দেব তােকে। আমার এক কাঠা ধান কিন্তু ভেনে দিতে হবে।
-নাঃ। ভানীর দীর্ঘনিশ্বাস পড়লাে একটা।
কামিনীর বিস্ময় বােধ হল। -ভাবছি কী, সােয়ামীর কথা
নাকি ?
ভানী এবারেও জবাব দিলে না, তেমনি করেই তাকিয়ে রইল, কিন্তু
এবারে তার নিবেধ চোখে কী যেন একটা কথা স্পষ্ট হয়ে উঠল
কামিনীর কাছে।
সহানুভূতি এল কামিনীর। সত্যিই ভানীর বড় দুর্ভাগ্য।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ
নিজের সঙ্গে তুলনা করলে সে দুর্ভাগ্যের রূপ আর রেখাটা যেন বড় বেশি
প্রকট হয়ে ওঠে। রামনাথ তাকে পাগলের মতাে ভালােবাসে,
অস্বাভাবিক সােহগের উচ্ছ্বাসে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর একা ঘরে
রাত কাটায় ভানী; নিজের কোনাে জীবন নেই—সকলের সঙ্গে নিজেকে
ছড়িয়ে দিয়ে নিজেকেই সে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে রেখেছে।
কয়েক মুহূত কামিনী চুপ করে রইল ।
—কাল তাে সব মেলায় যাচ্ছি। যাবি তাে তুই ?
অনাসক্ত কণ্ঠে ভানী বললে, গিয়ে কী হবে ?
—খালি খালি পড়ে থাকবি কেন ? কত জিনিষ আসবে মেলায়,
কত দেখবার জিনিষ। নাচ গান আরাে কত কী।
ভানীর মনে পড়ে গেল সােনাদীঘির মেলা থেকে কোেল তার
জন্যে বেলােয়াড়ী কাচের রং-চঙে চুড়ি কিনে আনত ; একবার সুন্দর
শিশিতে করে ভালাে তেল নিয়ে এসেছিল, মাথায় মাখলে তার মিষ্টি
গন্ধটা দুদিন পর্যন্ত ভানীকে আচ্ছন্ন করে রাখত। কিন্তু ভানী তাে
তেল মাখতে জানত না, জটাবাঁধা চুলের ফাক দিয়ে ফোটায় ফোঁটায়
তেল গড়িয়ে পড়ত তার গায়ে। কেশােল আদর করে বলত, তুই
একটা জংলী, এ সব বাবুগিরি করা তাের কাজ নয়।
পদার আবরণটা ছিড়ে আরেক ঝলক আলাে এসে পড়ল।
ভানী হঠাৎ যেন জেগে উঠল, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাে কামিনীর
মুখে।
-আচ্ছা দিদি-
-কী বলবি ?
-মেলায় তাে অনেক লােক আসে, তাই না?
-আসে বই কি।
=
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ —তা হলে, তা হলে, সেও তাে আসতে পারে এতক্ষণে কামিনী সব বুঝতে পারল। ভানীকে বাইরে থেকে যা দেখায় সে তা নয়। তার মনের প্রচ্ছন্ন প্রান্তে প্রান্তে এখনাে কেশােলাল আসন জুড়ে রয়েছে, তাকে সে ভুলতে পারে নি। আবার সহানুভূতির একটা প্লাবন এসে তার মনটাকে ভাসিয়ে দিয়ে গেল। এখনাে প্রতীক্ষা করে আছে, কেশােলাল আসবে, ওকে নিয়ে আবার ঘর বাধবে। কিন্তু কিন্তু সে কথা বলে কী হবে। কামিনী আস্তে আস্তে বললে, আশ্চর্য ততা কিছু নয়, কত লােক আসে, কেশােলালও আসতে পারে হয়তাে। ভানী সতৃষ্ণ নয়নে সামনের জনতার দিকে তাকিয়ে রইল খানিক- ক্ষণ। তারপরে বললে, চলাে দিদি, তােমার ধান ভেনে দিই। এইবার কামিনীই বললে, নাঃ, সে থাক এখন। কালাে একখানা মেঘের মতো মুখ নিয়ে বিশ্বনাথ ফিরলেন। কাছারীতে খবর নিয়ে শুনলেন ব্যোমকেশ এখনাে আসেনি। জমাদার বললে, ম্যানেজার বাবুকে ডেকে আনব হুজুর? –থাক, দরকার নেই। দেউড়ি পেরিয়ে, রাঘবেন্দ্র রায়বমার ভাঙা রংমহল ছাড়িয়ে অন্তঃপুরের দিকে পা বাড়ালেন বিশ্বনাথ। অন্তঃপুরের এই একটা জীবন—যা বিশ্বনাথের প্রায়ই মনে পড়ে না এবং বিশ্বনাথকে দেখেও মনে পড়ে না কাররা। বরেন্দ্রভূমির রুক্ষ রিক্ত মাঠের ওপর দিয়ে হাওয়ার মত যার ঘােড়া উড়ে যায়, আর রেসের ঘােড়ার দ্রুত পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে উড়তে থাকে যার মন, অন্তঃপুরের একটা নিভৃত পরিবেশে আর প্রগাঢ় একটা বিভ্রান্তির মধ্যে তাকে যেন ভাবা চলে না। কাল থেকে মহাকাল পেরিয়ে मा ७ बछी চলে ক্লান্তিহীন পৃথিবী—চলে জীবন। ঘুমিয়ে পড়বার সময় নেই তার। কিন্ত বিশ্বনাথের জীবন কি পৃথিবীর মত নিয়ন্ত্রিত—অথবা শৃঙ্খলিত তার কক্ষপথের সীমানায়? সে জীবন উস্কার মতাে, লক্ষ্যভ্রষ্ট একটা আগ্নেয় তীরের মতাে-মৃত্যুর অতলতায় যার নিবাণ । তবু রঙ্গমঞ্চের নেপথ্যে আছে অন্তঃপুর। আর সেখানে আছেন অর্পণ। আফ্রিকার কালাে সিংহের মতাে উদগ্রযৌবনা ওঁরাওঁ মেয়েদের বাহু- বন্ধনে জড়িয়ে রাত্রির নেশা ঘনীভূত হয়ে ওঠে। দেহ-যমুনায় বাঁধভাঙা বন্যা। কিন্তু এমনও সময় আসে, যখন বন্যার জল থিতিয়ে মরে যায়, পলিপ্ত দেহমন মাঝে মাঝে কী একটা দাবী করে অসহায় শ্রান্তিতে । তখন অপনাকে মনে পড়ে যায়। অর্পণা কিন্তু অভিযােগ করেন না, অনুযােগ করেন না কখনাে। কলকাতায় এবং কলেজে নাগরিক জীবন কাটিয়ে ঘটনাচক্রে তিনি রায় বমাদের কুলবধূ হয়েছেন। নিঃসঙ্গ অন্তঃপুরে তার একাকী.দিন কাটে। বিয়ের পরেই টের পেয়েছিলেন অর্পণা—এ তার কঙ্কাল-বাসর। এখানে প্রাণ নেই, এখানে ছন্দ নেই—এখানকার জীর্ণরিক্ত প্রাসাদে প্রাসাদে শুধু মৃত অতীতের প্রেতচ্ছায়া। আর স্বামী ! অর্পণা হিন্দুর মেয়ে, স্বামীর সমালােচনার তার অধিকার তার নেই। বিশ্বনাথ যখন অন্তঃপুরে ঢুকলেন, তখন অৰ্পণ কী একখানা বই পড়ছিলেন। বিশ্বনাথ ঘরটার দিকে ভালাে করে তাকালেন। আশ্চর্য এই ক মাসের মধ্যেই রাশি রাশি বই কিনেছে অর্পণ।। টেবিলে, শেলফে, বিছানার ওপর অসংখ্য বই ছড়ানাে। এত কী পড়ে অর্পণ, এত পড়তে কেমন করে ভালাে লাগে! বিশ্বনাথ এগিয়ে এলেন—আস্তে ? সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ একখানা হাত রাখলেন অর্পণার কঁাধের ওপর। চমকে মুখ তুলে তাকালেন অর্পণা, লুটিয়ে পড়া আঁচলটাকে বুকে তুলে নিলেন, তারপর বললেন, কে, কুমার-বাহাদুর ? এতদিন পরে কি দাসীকে মনে পড়ল ? বিশ্বনাথ কথাটাকে মনে করলেন চমৎকার রসিকতা। আকর্ণ বিস্তীর্ণ খানিকটা হাসিতে তার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গেই অর্পণা অনুভব করলেন, শরীরে ও মনে আসুরিক শক্তি থাকলেও বিশ্বনাথ কী অস্বাভাবিক সুল—কী অশােভন পরিমাণে অমার্জিত। হাসলে উচু উচু দাত গুলাে উদঘটিত হয়ে যায়, গলা পর্যন্ত দেখা যায় মােটা জিভটাকে—চোখ দুটোকে কী পরিমাণে ঘােলা আর দীপ্তিহীন মনে হয় ! বিশ্বনাথ প্রসন্নমুখে বললেন, কী বললে? দাসীকে? তুমি তাে বেশ কথা শিখেছ অর্পণা-হে-হে-হেঃ । অর্পণা বললেন, হঠাৎ এই অনুগ্রহ কেন ? কোনাে আদেশ আছে ? বিশ্বনাথ আবার হেসে উঠলেন, হেঃ হেঃ হেঃ। তারপর কৌচের ওপর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন অর্পণার পাশেই। অর্পণ রােমাঞ্চিত উঠলেন না, সরেও গেলেন না। জীবন সম্পর্কে তার একটা নির্বেদ এসেছে। লােলুপভাবে অর্পণার সুগােল সুন্দর শুভ্র একখানি হাত নিজের হাতে টেনে আনলেন বিশ্বনাথ। বললেন, তুমি অমন ছাপার হরফে কথা কোয়াে না অৰ্পণা, ভালো বুঝতে পারি না। আমরা চাষাভূষাে মানুষ —লেখাপড়া জানিনে। এটা বিশ্বনাথের বিনয়—বৈষ্ণবী ধরণের বিনয়। রাজকুমার কলেজে এক সময়ে তিনি বছর পাঁচেক পড়াশােনা করেছিলেন, কিন্তু পাশ করতে পারেন নি। পাশ করবার জন্যে অবশ্য মনের দিক থেকে তার কোনাে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ জোরালো তাগিদ ছিল না। তাই বলে বিশ্বনাথ সত্যিই নিজের সম্বন্ধে এমন দৈন্য পােষণ করেন না। দেবীকোট রাজবংশ নিজেদের ছােট বলে মনে করতে জানে না। এটাকে স্ত্রীর সঙ্গে রসিকতা বলেই মেনে নেওয়া উচিত। -কী পড়ছিলে? —বই একখানা। -বই তাে বটে কিন্তু কী বই ? উপন্যাস না কি ? গভীর বিস্ময়ে বিশ্বনাথ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন।—উপন্যাস নয় ? তবে কি ধর্মের বই পড়ছিলে। গীতা? ভাগবত ? কংসবধ ? -না, তাও নয়। -তাও নয়? তবে কী বই ?--বিশ্বনাথের বিস্ময় ঘনীভূত হল। উপন্যাস নয়, ধর্মের বই নয়, তবে আর কী পড়বার থাকতে পারে দুনিয়ায়? বিশ্বনাথ নিজে অবশ্য কিছুই পড়েন না, কিন্তু তাই বলে কোন খবরও তিনি রাখেন না না কি? উপন্যাস আর ধর্মের বই বাদ দিলে মাত্র দুটো জিনিস রইল সংসারে—খবরের কাগজ আর হােমিওপ্যাথি । -দেখি দেখি বইখানা—হাত বাড়িয়ে বিশ্বনাথ অপর্ণার কোলের ওপর থেকে বইখানা নিয়ে এলেন। ওঃ বাবা, এ যে ইংরেজি। অপর্ণা কলেজে পড়েছে বটে, তাই বলে ইংরেজি বই পড়েও সে রস পায় ! বিশ্বনাথ একবার সশ্রদ্ধ আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন, তারপর বইয়ের লাল রঙের মলাটটির দিকে মনােনিবেশ করলেন। —এ যে মস্ত দাড়িওয়ালা মাথা একটা। কার ছবি ? রবি ঠাকুরের কি?
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ অপর্ণার চাপা ঠোটের কোণ দুটো সামান্য একটু বিচ্ছুরিত হল মাত্র। মৃদুকণ্ঠে অপর্ণা জবাব দিলেন—না, রবি ঠাকুরের নয়। তবে, তবে কার ?-বিশ্বনাথ এবার বানান করে বইয়ের নামটা পড়বার চেষ্টা করতে লাগলেন : প্রিন্, প্রিন্, প্রিন্ কাইপনেস অফমার -মার—এক্স-আই—এস অপর্ণা রক্ষা করলেন স্বামীকে। বললেন, থাক, এই বেলা দুটোর সময় আর তােমাকে এ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হতে হবে না। এখন দয়া করে স্নান করতে যাও। কথা নেই, বাত নেই, বিশ্বনাথের চোখ হঠাৎ দপ দপ করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে যেন মনে পড়ে গেল সােনাদীঘির মেলার কথা, মনে পড়ল লালা হরিশরণের কথা, মনে পড়ল চারদিক থেকে আসন্নপ্রায় দুর্দিন আর দুর্গতির কথা। চরম অসম্মানের মধ্যে সব হারিয়ে যেতে চলেছে, তলিয়ে যেতে চলেছে দেবীকোট রাজবংশের এই ঐশ্বর্য এই প্রতাপ । সমস্ত অপমানের মধ্যে অপর্ণাও আজ সুর মিলিয়েছে, বিশ্বনাথ মূখ, ইংরেজি পড়বার যােগ্যতা তার নেই, এ সত্য কি তার স্ত্রীও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আশ্চর্য, বিশ্বনাথ কি ভুলে গিয়েছিলেন যে তার মাথার ওপর ধারালাে একখানা খঙ্গ যে-কোনাে সময়ে নেমে পড়বার জন্যে উদ্যত হয়ে আছে? তিনি কি ভুলে গিয়েছিলেন তার যথাসর্বস্ব নিঃশেষে আত্ম- সাৎ করবার জন্যে সাপের মতাে প্যাচে কষছেন লালার্জী ? আর মাত্র দুঘণ্টা আগেই তিনি রূপপুরের কামারদের উদ্বুদ্ধ করে এসেছেন— ভাঙতে হবে সােনাদীঘির মেলা, লাঠির মুখে ভেঙ্গে ছত্রাকার করে দিতে হবে এবার। দেখা যাবে, ওই মেলা থেকে কত টাকা কুড়িয়ে নিতে পারে লালা হরিশরণ ?
৭২ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ অন্তঃপুরে আসা মাত্র অপর্ণাকে দেখে তিনি কি সব ভুলে গিয়ে ছিলেন? তাঁর মন কি আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্যে ? তাই অপর্ণার কাছ থেকে এই অবজ্ঞা-এই পুরস্কার! বিশ্বনাথের ভাবান্তর লক্ষ্য করলেন অপর্ণা। সবিস্ময়ে বললেন, এখন আবার কোথায় চললে ? খাবে না, আন করবে না ? বিশ্বনাথ জবাব দিলেন না। অপর্ণা নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন, শুনতে পেলেন সিড়ি দিয়ে উদ্ধত পদধ্বনি নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। কাছারীর দিকে পা বাড়াতেই মতিয়া সামনে এসে দাড়াল। -একটা লােক দেখা করতে চায় হজুর। -আস্কাপের দলের লােক—কী একটা জরুরি কথা বলবে। -জরুরি কথা ?—বিশ্বনাথ জ কুঞ্চিত করে বললেন, ডেকে নিয়ে এসাে। জরুরি কথা, জরুরি কথা। বিশ্বনাথের মনের মধ্যে ঘুরে ফিরে যেন শব্দ দুটো অনুরণন জাগাতে লাগলাে। তার জীবনের নিভৃতি নেই, নিঃসঙ্গতা নেই, অন্তঃপুরের জীবনে তার সান্ত্বনা নেই—সেখানে অপর্ণাও তঁাকে ব্যঙ্গ করে। জীবনের স্রোত কোথাও তাে থেমে দাড়িয়ে বিশ্রাম করতে পারেনা, তাকে চলতে হয় অবিয়াম -সংঘাতে সংকুল, তরঙ্গে ফেনিল। -আচ্ছা থাক আমিই যাচ্ছি। কিন্তু অন্দরের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে কয়েক পা আসতে না আসতেই নিজের মধ্যে হারিয়ে গেলেন বিশ্বনাথ। ভুলে গেলেন আজ সারাদিন তাঁর খাওয়া হয়নি, ঘােড়ার পিঠে তীব্ৰ চাবুক বসিয়ে ঘূর্ণির মতাে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। কিসের একটা অত্যন্ত তীব্দ বেদনাবােধ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী যেন অন্য সমস্ত অনুভূতিগুলােকে তাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। লালাঙ্গীর সেই সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যঙ্গবিদ্ধ হাসি, বিনয়-বিগলিত কথার ভঙ্গিতে উদ্যত অবজ্ঞা, চারিদিক থেকে ঘনিয়ে আসা সংকটের করাল ছায়ামূর্তি কোনটাই তাকে এত শীর্ণ আর সংকুচিত করে দেয়নি। রূপাপুরের কামারের হাতিয়ার ধরেছে—এই সােনাদীঘির মেলায় লালাজীর সঙ্গে সত্যিকারের একটা শক্তিপরীক্ষা হয়ে যাবে। তার জন্যে দেবীকোট রাজবংশ চিরদিন প্রস্তুত হয়েই আছে। কিন্তু অপর্ণা ? একথা সত্যি, তার বিরুদ্ধে অপর্ণার অভিযােগ অনেক আছে। তার নিজের জীবন এত বহিমুখী যে, ব্যক্তিগত প্রয়ােজনে অপর্ণার অভাব কখনাে তাকে পীড়া দেয় না। 'ওঁরাওঁ মেয়েদেব বলিষ্ঠ গঠিত দেহে যে প্রখর যৌবনের আগুন জ্বলে—সে দীপ্তি অপর্ণার কোথায় ? সত্যি কথা, অপর্ণাকে তার মনে থাকে না। কিন্তু তাই বলে কোন অধিকারে অপর্ণা তাঁকে ব্যঙ্গ করতে পারে, ব্যঙ্গ করতে পারে তার নিরক্ষতাকে ? আর সত্যিই তাে তিনি মূখ নন। মােটা মােটা ইংরেজি বই পড়ে অপর্ণা হয়তাে বুঝতে পারে, তিনি পারেন না। কিন্তু তাতে কী আসে যায় ! তাঁর অমিত পৌরুষ—তার শক্তি- কিন্তু দাড়াও! বিশ্বনাথের মনের মধ্যে কে যেন প্রচণ্ডভাবে একটা ধমক দিয়ে তাঁর চিন্তাকে স্তব্ধ করে দিল। পৌরুষ আর শক্তি। যার জমীদারীর একখানার পর একখানা মহল দেনার দায়ে বিকিয়ে যায়, লাটের খাজনা দেবার জন্য ঘােড়ার সহিস রামসুন্দর লালার বংশধরের কাছে গিয়ে যাকে নতজানু হয়ে দাড়াতে হয়, তার শক্তি আব পৌরুষ । তার দাম কী। তার মূল্য কতটুকু। তা হলে—তাহলে-অপর্ণার এই ব্যঙ্গের পেছনে তার কি কোনাে ইঙ্গিত আছে ? কোনাে কটাক্ষ কি আছে এই দুর্বলতাকে লক্ষ্য করে ?
৭৪ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ অপর্ণা কি সত্যই ভেবেছে, যেদিন সব দিক থেকে মৃত্যু আর পরাজয় নেমে আসবে বিশ্বনাথের জীবনে, সেদিন সে আবার বিজয়িনীর মতাে ফিরে যাবে তার মাষ্টারীর জীবনে ? এতবড় অপমান সইবার আগে বিশ্বনাথ একবার থেমে দাড়ালেন। মতিয়া পেছনে ছায়ামূর্তির মতাে অনুসরণ করে আসছিল, বিশ্বনাথ তাকে লক্ষ্য করেননি। তিনি থেমে পাড়াতেই সসংকোচে নিবেদন জানাল-হুজুর, রাণীজী বললেন- রাণীজী ! দুই চোখে আগুন বর্ষণ করে বিশ্বনাথ মতিয়ার দিকে তাকালেন। ঝড়ের নিশ্চিত পূর্বাভাস। বিশ্বনাথের পায়ের চটীজোড়ার ওপরে সতর্ক দৃষ্টি রেখে মতিয়া জানাল-রাণীজী বললেন, চান করে -না, যা তুই সামনে থেকে। হন হন করে এগিয়ে গেলেন বিশ্বনাথ ! মতিয়ার ভারী বিস্ময় বােধ হল—হুজুরের আজকে এত সংযম কেন। ওই চোখের দৃষ্টি তাে তার চেনা। কারণে অকারণে ওরা যখন ধক ধক করে উঠেছে, তখনই দু’চার ঘ জুতাে ধপাধপ তার পিঠে এসে পড়েছে। রাগের ওপরে অনেকে জিনিসপত্র যেমন আছড়ে ভেঙে ফেলে, বিশ্বনাথের কোপটাও সেই রকম মতিয়ার পৃষ্ঠের ওপরেই প্রশমিত হয়ে থাকে। আজ যেন তার ব্যতিক্রম ঘটল। বিশ্বনাথ রংমহলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু মনে পড়ে গেল, আর একটা লােক তার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে এসে বসে আছে। আর একটা লােক। একটা গভীর বিরক্তিতে জা দুটো কুঞ্চিত হয়ে উঠল—একটি মুহূত এরা কি তাকে ভাবতে দেবে না, আত্মগােপন করতে দেবে না নিজের নিভৃত অবকাশের মধ্যে ? কে এসেছে এবং কেনই বা এসেছে সবই অনুমান করা অসম্ভব তার পক্ষে। যেচে কেউ খাজনা দিতে আসেনি, অপ্রত্যাশিত সুসংবাদও বয়ে আনেনি কেউ। হয়ত সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ফরিয়াদ, হয়তাে হাতে-পায়ে ধরে কোন একটা কিছু মাপ করিয়ে নিতে চায়-নয় তাে কোন দুঃসংবাদ। কোন মহাজনের তাগিদার হওয়াও বিচিত্র নয়। একবার মনে হল লােকটাকে পত্রপাঠ বিদায় দেবার কথা। কিন্তু না-ও পাপ একেবারে মিটিয়ে দেওয়াই ভালাে। যে এসেছিল, কাছারীবাড়ীর দাওয়ার নীচে ছায়ায় বসে একটা তৃষ্ণাত কুকুরের মতাে সে তখন জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে। অনেকটা পথ তাকে হেঁটে আসতে হয়েছে। তার শরীর দুর্বল—রাত থেকে যে জ্বরটা ধরেছে এখনাে ছাড়েনি। অসহ রৌদ্র আর দমকা হাওয়ায় উড়ে আসা রাশি রাশি ধূলােতে প্রত্যেকটা পদক্ষেপ তার গুণে গুণে আসতে হয়েছে । যতবার কাশি এসেছে, ধূলাের সঙ্গে মিশে চাপ চাপ রক্ত বেরিয়েছে, মুখ মুছতে গিয়ে ময়লা চাদরের প্রান্তটা তার রক্তে রাঙা আর আঠালাে হয়ে গেছে। লোকটা আর কেউ নয়—কালীবিলাস কুণ্ডু। দাওয়ার নীচে মূৰ্ছিতের মতাে বসে আছে কালীবিলাস। ক্লান্ত নিশ্বাসে বুকটা থর থর করে কাপছে, জিভটা আপনা থেকেই বাইরে ঝুলে নেমেছে। দেউড়ির দাবােয়ানটা অনেকক্ষণ থেকে দূরে দাড়িয়ে লক্ষ্য করছে তাকে ; কী একটা প্রশ্ন জাগছে তার মনে, কিন্তু কাছে এসে কিছু বলতে পারছে না। চোখ দুটো যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আসছে কালীবিলাসের, প্রাণপণে মেলে রাখবার চেষ্টা করছে, আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আপনা থেকেই। শুধু একবার স্বপ্নের মতাে কাছারীবাড়ি, ফাটলধরা দেউড়ি, দেউড়ির দরজায় পা-ভাঙ্গা একটা সিংহ, অস্পষ্ট আকার নিয়ে দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে। যুগ-যুগান্তের সঞ্চিত তন্দ্রা যেন ভিড় করে ভেঙে পড়েছে কালীবিলাসের সর্বাঙ্গে—তাকে তলিয়ে নিতে চায়, তাকে যেন আর জাগাবে না। আচমকা মনে হল, সামনে অনেকগুলাে ঝাড়- লণ্ঠন,—অনেক আলাের কোলাহল। যাত্রার আসর বসেছে নাকি!
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ‘া, যাত্রাই তো! বিস্মিত কালীবিলাস দেথতে পেল, বহুদিন পরে আবার অধিকারী মশাই নেমেছেন গান গাইতে। পরনে গেরুয়া পােক, মাথায় গেরুয়া পাগড়ি; তার তেজস্বী ভারী মুখখানা ঝাড় লণ্ঠনের আলােতে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। বেহালার ছড়ে তীক্ষ্ণ আতনাদ বাজছে, আর তারই সঙ্গে সঙ্গে বাজছে তার কণ্ঠ : “দিন এসেছে ডাক এসেছে আজকে মায়ের শেষ বলি, কে দিবি আয় মায়ের পায়ে রক্তজবার অঞ্জলি” আশ্চর্য ! কী অদ্ভুত গলা খেলছে অধিকারী মশাইয়ের! যতদিন কালীবিলাস তার দলে ছিল ততদিন তাকে এমন প্রাণ দিয়ে গান গাইতে সে তত শােনে নি। কি আশ্চর্য সুর, কী আশ্চর্য গলার কাজ। এমন করে বেহালা বাজাচ্ছে কে? কালীবিলাস লােকটার দিকে তাকালাে, তার মুখ দেখা গেল না, কিন্তু অপূর্ব বেহালা বাজিয়ে চলেছে সে—যেমন গান, তেমনি তার বেহালার ঝংকার। “কে দিবি আয় মায়ের পায়ে রক্তজবার অঞ্জলি”-কথা আর সুরের অপরূপ সমম্বয় হয়েছে। অধিকারী মশাইয়ের মুখখানা জ্বলছে, একটা আশ্চর্য জ্যোতি তাঁর সবঙ্গ থেকে যেন ছড়িয়ে পড়ছে। কালীবিলাসের ভালাে লাগতে লাগল—অদ্ভুতভাবে ভালাে লাগতে লাগল। আকস্মিক একটা আনন্দের জোয়ার যেন বুকের ভেতর থেকে ঠেলে উঠছে। কিন্তু আনন্দ তরঙ্গের দোলায় বুকের ভেতর এত জালা করে কেন, এমন ভাবে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে কেন? অধিকারী মশাই কি এবার তার দিকে তাকালেন। গানের সুরটা কী থেমে গেল ? বেহালার সুরটাও কি আর শােনা যায় না ?
সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী —কে তুমি, কী চাও? কে জিজ্ঞাসা করছে ? অধিকারী মশাই কি তাকে চিনতে পারছেন না? পাঁচ বছরেই তিনি কি তাকে ভুলে গেলেন? যাত্রার আসরটা আর দেখা যায় না কেন? মূহূতে সব যেন গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে গেছে । সে কি স্বপ্ন দেখছিল? সে কোথায় ? বুকের মধ্যে সেই তীব্র জ্বালাটা বড় বেশি স্পষ্ট, নিঃশ্বাস নিতে বড় বেশি কষ্ট হয়। —উত্তর দিচ্ছ না কেন? কী হয়েছে ? কী হয়েছে? কী হবে আবার? কালীবিলাসের ঘুম পেয়েছে, বড় বেশি ঘুম পেয়েছে। আর সে চোখ মেলে তাকাতে পারছে না, তাকাতে চায় না। এই ঘুমটা তার অত্যন্ত ভালাে লাগছে। ডাকে•••ব্ৰজহরি ? ভূষণা ? না, সে ওদের দলে আর যাবে না । বেজাটা ছােট লােক, অধিকারী মশাইকে নিন্দে করে, কু-কথা বলে। তার চাইতে এখানে ঘুমােনােই ভালল-ঘুমটি বেশ জমে এসেছে। আর সে সাড়া দেবে না, চোখ মেলে তাকাবে না। -না-না। বিশ্বনাথ শশব্যস্ত হয়ে বললেন, লােকটা কে? অমন করছে কেন? ব্যোমকেশ কালীবিলাসকে চিনতেন। বললেন, এ তাে ব্ৰজ পালের দলের লােক, কালী কুণ্ডু। কী বলতে এসেছে কে জানে। এতদূর হেঁটে এসে বােধ হয় হয়রাণ হয়ে পড়েছে—তাই—কিন্তু, একি! মরে গেল নাকি লােকটা ? -মরে গেল !—বিশ্বনাথ বললেন, সে কি কখা! মরে যাবে কেন? মতয়া ঝুকে পড়ে একবারটি পর্যবেক্ষণ করলে কালীবিলাসকে। তারপর পেছনে সরে গেল। বললে, হা. হুজুর একদম মরে গেছে। মুখের ভেতল এক চাপ রক্ত জমে রয়েছে। বিস্ময়-ব্যাকুল চোখে কালীবিলাসের চিরনিদ্রিত মুখের দিকে তাকিয়ে ৭৮ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ রইলেন বিশ্বনাথ। মরে গেল, এত সহজেই শেষ হয়ে গেল সমস্ত ! এই কি মানুষের জীবনের মূল্য ! ব্ৰজহরির আকাপের দল ততক্ষণে খেয়া পাড়ি দিয়ে মামুদপুরের টাল ছাড়িয়ে বহুদূরে এগিয়ে গেছে। কুমার বিশ্বনাথ চলে যাওয়ার পর লালা হরিশরণ এসে বসলেন বাইরের গদীতে। বেলা অনেক হয়েছে, এ সময়টা হরিশরণ ওপরের মহলে গিয়েই বিশ্রাম করেন। কিন্তু আজ আর তিনি ওপরে গেলেন না। রামদেইয়া গড়গড়া সাজিয়ে নিয়ে এল। মােটা গিদ। বালিশটা হেলান দিয়ে নিজের ভেতরেই ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন হরিশরণ । কাজ-কাজ-কাজ। পনেরাে বছর বয়সে তিনি ব্যবসায়ে ঢুকেছিলেন, আজ তার বয়স সাতা। বেয়াল্লিশটা বছর কোথা দিয়ে কেটে গেছে নিজেই টের পাননি তিনি। খ্যাতির দিকে লােভ ছিল না, প্রতিপত্তির দিকে লক্ষ্য ছিল না। টাকা চাই, ব্যবসাকে বড় করা চাই। বিষ্ণুশরণ লালা রেখে গিয়েছিলেন, তাতে দিন চলে যেত—হয় তত ভালােই চলে যেত। কিন্তু হরিশরণ বাঙালি জমীদারের ছেলে নন, বাপ-ঠাকুদার সম্পত্তিকে দুহাতে উড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত নবাবী করবার মনােবৃত্তি তার নয়। তা যদি হত-তা হলে শূন্যদম্ভের বােঝা নিয়ে আজ তাঁকে কুমার বিশ্বনাথের মতাে মহাজনের সামনে গিয়ে দাড়াতে হত ঋণের প্রত্যাশায়। কুমার বিশ্বনাথ !—লালাজী করুণার হাসি হাসলেন। কী মূল্য অহমিকার, কতটুকুই বা দাম অর্থহীন আত্মমর্যাদার! বিদ্রোহী প্রজার ঘরে আগুন লাগানাে? তার বাড়ীর মেয়েদের টেনে এনে কাছারীর সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ পেয়াদার হাতে সমর্পণ করা? কী লাভ হয় তাতে ? মামলা হয়, মােকদ্দমা হয়, নিজের জেদের খেসারত দিতে হয় অনাবশ্যক অপব্যয় করে। শুধু কী তাই? একজন বিদ্রোহী প্রজাকে সায়েস্তা করতে গিয়ে দশজন বিদ্রোহী হয় ; স্ফুলিঙ্গকে ইন্ধন জ্বালিয়ে ভােলা হয় সর্বগ্রাসী বিশাল অগ্নিকুণ্ড, সেই আগুন একদিন এসে নিজেকেই গ্রাস করে বসে। লালা হরিশরণ ইতিহাস পড়েননি—কিন্তু লােকচরিত্র তিনি জানেন। ক্ষমতার অন্ধ অহঙ্কারে অস্ত্রাঘাত করতে করতে সেই অস্ত্র একদিন প্রতি- হত হয়ে আসে—লাগে নিজের গলাতেই। অত্যাচারের রূপটা স্পষ্ট হয় যত বেশি–বিদ্রোহের রক্তবীজ ততই বেশি পরিমাণে বংশবিস্তার করে। এ কথা আজ কুমার বিশ্বনাথকে দিয়েই তিনি স্পষ্ট করে দেখতে পান। বিশ্বনাথের প্রজারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালায়, তারা খাজনা দিতে চায় না, তারা কৃষক ইউনিয়ন গড়ে তােলে, মামলা-মােকদ্দমা করে তার যথাসর্বস্ব আজকে যেতে বসেছে। আর তার এলাকাতে যারা কৃষক ইউনিয়নের পাণ্ডা, তাদের খাজনা তিনি মাপ করেছেন—বিনা সেলামীতে জমি বিলি করে দিয়েছেন। গ্রামে টিউবওয়েল বসিয়েছেল, স্কুল খুলে দিয়েছেন। ফল কী দাড়িয়েছে ? হরিশরণ আবার হাসলেন আজ তিনি একজন আদর্শ জমিদার, গরীবের মা-বাপ তিনি ; গরীবেরা তার জমীদারীকে বলে রামরাজ্য। আর অহমিকা ? পাঁচ বছর আগেকার একটা ঘটনা মনে পড়ল। সেটা আজো যেমন উপভােগ্য তেমনি উপাদেয় বােধ হয় । একটা ইকাম-ট্যাক্স অফিসার, কত টাকা মাইনে পায় সে ? তিন শশা, চার শশা, পাঁচ শশা, ছয় শাে? ঠিক জানেন না তিনি। মনে আছে ইনকাম-ট্যাক্সের দরবার করতে তাকে নিজেই যেতে হয়েছিল তার কাছে। চলনে বলনে পুরাে সাহেবী ধাঁচ লােকটার, চিবিয়ে চিবিয়ে বিলিতী সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ কায়দায় কথা বলে আর পাইপ খায়। লালাজীকে সামনের চেয়ারে বসতে বলা তত দূরের কথা, চোখের কোণে ভাল করে তাকিয়ে অবধি অবধি দেখেনি। তারপর খাতাপত্র নিয়ে তার সে কি গর্জন আর হুঙ্কার ! যেন গভর্ণমেন্টের টাকা আত্মসাৎ করবার জন্যে দুনিয়াশুদ্ধ লােক মুখিয়ে বসে আছে, আর যেমন করে হােক এই সমস্ত দুর্জনদের সায়েস্তা সে করবেই—এই তার ব্রত। প্রচুর গালাগালি এবং তর্জন হজম করেও লালাজী একটি কথা বলেন নি, তার মুখের একটি রেখারও স্থানচ্যুতি ঘটেনি। অথচ ইচ্ছে করলে তিনি অনায়াসেই বলতে পারতেন যে, পাঁচশাে টাকা মাইনের একটা ইকামট্যক্স-আফিসারকে চাকর রেখে তিনি জুতাে বুরুশ করাতে পারেন। কিন্তু সেটা তিনি বলেন নি। বরং যুক্তকবে সবিনয়ে নিবেদন করেছেন, মহামহিমান্বিত হুজুর কৃপা না করলে তাকে সগােষ্ঠী উপােস করতে হবে, ভাসতে হবে অকুল পাথারে। অতএব সময়বিশেষে আরসােলাও পাখী হয়, সুতরাং তিনি যত শান্তিবারি সেচন করছেন, মহামহিমান্বিত হুজুর দড়ির গিঠের মত ভিজে ভিজে তত বেশি শক্ত আর জটিল হয়ে উঠেছেন। রাশি রাশি অপমান হজম করে কঠিন আর কালাে মুখে বেরিয়ে এসেছেন লালাজী। শুধু ইকামট্যাক্স অফিসের কম্পাউণ্ড পার হওয়ার পরে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে- ‘লাট বন গিয়া শালা শূয়াকা বাচ্ছা। তার দু’বছর পরে ছােটলাট যখন সত্যিই জেলা সফরে আসেন, তখন লাটসাহেবের খানাতে লালাজীরও নিমন্ত্রণ হয়েছিল। মাথায় জরীর পাগড়ি আর দিল্লীর বহুমূল্য আচকান পড়ে যখন লালাজী টি-পার্টির তাবুর সামনে নামলেন তাঁর ঝকঝকে বড় কাইসার থেকে, তখন সর্ব- প্রথমেই চোখে পড়েছিল সুট পরে দূরে দাঁড়িয়ে সেই ইকামট্যাক্স- সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ৮১ অফিসার। তার মুখে সে পাইপ নেই, সে সিংহগর্জনও নয়। মান, বিষন্ন এবং ভীত তার চোখের দৃষ্টি, সেই সঙ্গে একটা অক্ষম লােলুপতা- বেশ বােঝা যায়, এখানে ঢােকবার যােগ্যতা সে অর্জন করেনি। তাবুর সামনে রেশমী পর্দার ফাক দিয়ে ভেতরে দেখা যাচ্ছে সুসজ্জিত চেয়ার আর টেবিলের সারি, রাশি রাশি ফল, ফুল, আর বিলাতি সুখাদ্যের সমারোেহ। তীর্থের কাকের মতাে দুরে দাড়িয়ে সেদিকে ক্ষুধাত দৃষ্টি ফেলছে—ঘ্রাণেই যতটুকু হয়। তার আসে-পাশে আরে দু'চারজন তার সগােত্ৰীয়, দেখেই সান্ত্বনা। লালাজী নেমে কাজ বার করলেন, তকমাআঁট। চাপরাশী সেলাম করে পথ দেখিয়ে দিলে । ভেতরে ঢুকবার আগে লালাজী একবার পিছন ফিরে তাকালেন হুজুরের দিকে। হুজুর তাকে চিনেছেন, কোনাে সন্দেহ নেই। পলকে তার মুখের চেহারা বদলে গেল, পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালটা মুছল একবার, তারপর বড় বড় পা ফেলে অদৃশ্য হয়ে গেল। লালাজী সেদিনের অপমানের প্রতিশােধ নিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ-কাজ-আর কাজ। কোনাে অপমান, কোনাে দাম্ভিকতা কাজের পথ থেকে তাকে ফেরাতে পারেনি। টাকা চাই, যেমন করে হােক বড় হতে হবে। এই বােধটা যদি মনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে না থাকত তা হলে ইনকাম ট্যাক্স অফিসারকে ওভাবে তােসামােদ না করে পাঁচ- হাজার টাকা বার্ষিক খরচ বাঁচাতে পারতেন না তিনি। বাইরে বেড়ে চলেছে বেলা। আর অনেকক্ষণ আগেই বিদায় নিয়ে গেছে প্ৰসাদাকাজীর দল। গড়গড়ার নল থেকে এখন আর ধোঁয়া ওঠে , অন্যমনস্কভাবে সেটাকে পাশে সরিয়ে রাখলেন লালাজী। সত্যি, অনেক করলেন তিনি জীবনে। আর অনেক না করলেই কি পাওয়া ২ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ধু তাে যায় অনেক ? সেদিন ইকামট্যাক্স-অফিসারকে খােমােদ করতে হয়ে- ছিল বলেই পরে বাংলার গভর্ণর এসে দ্বারােদঘাটন করেছিলেন তার প্রাসাদের। কিন্তু আর নয়—এবার বিশ্রাম করা প্রয়ােজন। ঐশ্বর্য অর্জনের জন্যেই নয়, তাকে তত ভােগ করতেও হবে। বয়স অবশ্য কিছু বেশি হয়ে গেছে, তা ছাড়া বিশ্বনাথের মতাে অমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আনন্দ সম্ভোগের স্পৃহাও তার নেই, চরিত্রে নিষ্ঠার মূল্যও তিনি জানেন। কিন্তু তিনি এবারে বিশ্রাম কররেন আর ভােগ করবেন তার যা প্রাপ্য, তার রাজমর্যাদা। কুমারদহ ফকির ওপর দিয়ে ব্যবসা চালিয়েছে অনেককাল, গায়ের জোরে আদায় করেছে সেলামী। কিন্তু আর সে সুযােগ তাদের দেওয়া চলবে না। সােনাদীঘির মেলা তার প্রথম পর্যায় মাত্র। রাম- সুন্দর লালা যে একদিন কুমারদহের রাজবাড়ীতে ঘােড়ার সহিসের কাজ করতেন, এই সত্যকে মুছে ফেলতে হবে, এই কলঙ্ককে আর সকলের সামনে বুক ফুলিয়ে আত্মপ্রকাশের অধিকার দেওয়া চলবে না। রামদেইয়া ? -জী! রামদেইয়া সামনে এসে দাঁড়াল। কোমরের ঘুনসী থেকে এক গােছ চাবি বের করে লােহার সিন্দুকটা খুলে ফেললেন লালাজী, তারপর বার করে আনলেন এক তাড়া নােট আর কতকগুলাে কাগজ ; বললেন, একটু বেরুতে হবে, কুমারদহ যাব। রামদেইয়া কোন প্রশ্ন করল না, কৌতূহলও জানাল না সে; এইটুকুই জানে যে, হরিশরণ ব্যবসায়ী মানুষ, ব্যবসায়ের প্রয়ােজনে তিনি কিছুমাত্র আলস্য বা আরামের দিকে হৃক্ষেপ করেন না। শুধু জিজ্ঞাসুভাবে যেন নিজের সম্পর্কে কী কতব্য সেটা জানবার জন্যেই বললে—জী ? ;
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী
৮৩
—বড় ঘােড়াটা ঠিক আছে ?
—জী হা।
-কেমন চলবে? জোর কদম ?—লালাজীর চোখ উদ্দীপ্ত হয়ে
উঠল : কুমার সাহেবের ঘােড়াটার চাইতে আরাে জোরে ছুটতে
পারবে তাে ?
-কমার সাহেবের ঘােড়া? হৃ কুঞ্চন করে চিন্তা করতে লাগল
রাইদেইয়া : না হুজুর, অত ছুটতে পারবে না। এটা খেলােয়াড় ঘােড়া,
বহুৎ তাকং।
-তা হলে কুমার বাহাদুরের এখনাে কিছু কিছু আছে যা আমার
নেই ! হরিশরণ হঠাৎ সকৌতুকে হেসে উঠলেন, হাঁ হাঁ আছে বৈকি ।
ওই দারুর বােতল। আমার সাধ্য নেই—ওখানে তার সঙ্গে পাল্লা দিতে
পারি। সাহেব-মেমদের বহুৎ দাৰু খাইয়েছি, কিন্তু মহাবীরজীর দয়ায়
ও হারামী চিজ খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি কোনদিন।
রামদেইয়। এতক্ষণ পরে যেন একটা ভালাে কথা বলবার সুযােগ
পেল।
–ও বড় শয়তান চিজ হুজুর । মাথায় পা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়।
-হু', সে তত কুমার বাহাদুরকে দেখেই বুঝতে পারছি। কিন্তু
কিন্তু লালাজী নিজের মধ্যেই আবার তলিয়ে গেলেন : ঘােড়াটা অত
জোর চলতে পারবে না সত্যিই ?
রামদেইয়া নিরাশভাবে মাথা নাড়ল।
-নাঃ। এবার একটা কাম করুন না হুজুর । কলকাতা থেকে বড়
একটা ওয়েলার কিনে আনুন, আমি তালিম দিয়ে তাকে ওই ঘােড়ার
চাইতে আচ্ছা করে দেব ।
-আচ্ছা সে দেখা যাবে পরে। কিন্তু কিন্তু লালাজীর চোখ
৮৪ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী আবার প্রদীপ্ত হয়ে উঠল : ঠিক হয়।। তুই হাওয়া গাড়ীটাকেই বার করতে বলে দে। হাওয়া গাড়ী ? এবারে রামদেইয়াও যেন বিস্মিত হয়ে উঠল । হাওয়া গাড়ী নিয়ে যাবেন কুমারদয় ? রাস্তা যে ভারী খারাপ হুজুর, গাড়ী একদম বরবাদ হয়ে যাবে। বরবাদ হয়ে গেলে আবার দোসরা গাড়ী কেনা যাবে। তুই গাড়ী বার করতে বল, আমি জামা-কাপড় পরে আসছি। আর সার- লালাজী হঠাৎ হাসলেন : একটা হাতিয়ারও সঙ্গে নিই, কী জানি, রাজারাজড়ার ব্যাপার! হাতিয়ার ? পিস্তল ? —হু। রাইদেইয়ার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল কপালে : হাতিয়ার কী হবে হুজুর ? কাজে লাগতে পারে হয় তাে। -মারামারি ? হাঙ্গামা? জমি নিয়ে কোন গােলমাল হয়েছে নাকি ? উত্তেজিত ও সন্ত্রস্ত রামদেইয়া যেন প্রশ্নের পর প্রশ্নবাণ বর্ষণ করতে লাগল : তা হলে হুজুরের যাওয়ার দরকার কী? বরকন্দাজ যাক, লাঠি যাক, থানায় একটা খবর দেই। আমরা হরিশরণ প্রচণ্ড একটা ধমক লাগালেন এইবার। -না, না, ওসব কিছু করতে হবে না। আমি যা বলি তাই শুনে যা খালি। হাওয়া গাড়ী বার করতে বল। আর আমি একাই যাব, সঙ্গে যেতে হবে না কাউকে। নােট আর কাগজপত্রগুলাে মুঠো করে নিয়ে হরিশরণ অন্দরের দিকে অগ্রসর হবেন।
মােটর লালাজীর আছে বটে, আশে পাশেও চলে, কিন্তু কুমারদহের রাস্তা এত দুর্গম যে সে পথে মােটর চালানাে প্রায় অসম্ভব। গাের গাড়ির কল্যাণে রাস্তার সর্বাঙ্গে রাশি রাশি গত ; প্রতি পদে তার ভেতর আটকে যেতে পারে মােটরের চাকা। মাঝে মাঝে সে গত এত গভীর যে তাতে বছরের প্রায় ছমাস কাদা জমে থাকে। এটেল মাটির সে কাদা আঠার মতােই শক্ত-গােরুর গাড়ীর চাকা আঁকড়ে ধরে, বলদের পা একবার তাতে পড়লে টেনে তােলা যায় না। তা ছাড়া রাস্তার দুপাশে নয়ানজুলি, পথ তৈয়ারী করবার সময় লােকাল বাের্ড ওখান থেকে কেটে কেটে মাটি তুলেছিল। খানিকটা ঘােলা আর অপরিচ্ছন্ন জল জমে রয়েছে, নয়ানজুলিতে উঠছে কাদার একটা দুর্গন্ধ । মােটরের চাকা একটুখানি বেসামাল হয়ে গেলে সােজা ডিগবাজী দিয়ে ওই জলের মধ্যেই আশ্রয় নিতে হবে । অসমতল বন্ধুর পথে ক্রমাগত ঝাঁকুনি খেতে খেতে লালাজীর মােটর এগিয়ে চলল। পাঁচ মাইল পথ যেন পঁচিশ মাইলের চাইতেও দুর্গম হয়ে উঠেছে। মােটরের শব্দে দুপাশের মাঠের গােরুর দল চকিত হয়ে উঠল ; কেউ কেউ বা উর্ধ শ্বাসেই ছুটতে শুরু করে দিলে। বাইরে থেকে রাশি রাশি ধূলাে এসে পড়তে লাগল লালাজীর মুখে। তারপর আরাে খানিকটা এগিয়ে আমবাগানের মধ্য দিয়ে একটা বাঁক নিয়ে গাড়ি ঢুকল কুমারদয়। দুপাশে ভাঙা বাড়ী ঝুকে পডেছে, জংলা আমের বনের মধ্যে মজা দীঘির বুকের উপর অন্ধকার ছায়া নেমেছে। মােটরের আবির্ভাবে এই দুপুরেই কোথা থেকে দুটো প্যাচা উড়ে গেল। কচুরী পানার স্তরের ওপরে বসে যে আলাদ গাের নিজের একরাশ নীল ডিমের পাহারা দিচ্ছিল—চট করে জলের তলায় লুকিয়ে গেল সে। চোখে পড়ল রায় সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী বমাদের ভাঙা দেউড়ি, রাঘবেন্দ্র রায় বর্মার আমলে যাকে বলত সিংহদ্বার। সিংহদ্বারে পাথরের সিংহ এখনাে বীরবিক্রমে পঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু তাদের রঙ মলিন আর বিবর্ণ, একটা দাড়িয়ে আছে তিন পায়ে, তার লেজটাও খসে পড়েছে। আর একটার মাথাই নেই, শুধু গলায় ফোলানাে কেশরগুচ্ছের ওপর কোলাহল করছে দু তিনটি চড়াই পাখী। দেউড়ির সামনে মােটরটা থামাতেই চড়াই পাখীরা উধশ্বাসে পালিয়ে গেল । অন্তঃপুরের দোতলাতে জানালার শিক ধরে দাড়িয়ে ছিলেন অপর্ণা । তঁার দৃষ্টি আকাশের দিকে প্রসারিত—যেখানে নীলের বিস্তৃত পটভূমিতে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, উড়ছে শঙ্খচিল। মনটা মুক্তি চায়, উড়তে চায় ওই শঙ্খচিলের মতাে। কিন্তু সে মুক্তি নিতে হলে বিলাতী বইয়ের ‘নােরার মতাে বেড়িয়ে পড়তে হয়, আইরীণের মতাে উদ্বুদ্ধ হযে উঠতে হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের অনুপ্রেরণায়। কিন্তু অত সুলভ ৰােমান্স অপর্ণার নেই। কী চমংকার কলেজ-জীবন কেটেছে কলকাতায়। শীতের দীর্ঘ নিদ্রার পর থেকে পাহাড়ের গুহ' থেকে যেমন করে বিেরয়ে আসে ক্ষুধাত আর বিশালকায় অজগর—তেমন প্রকাণ্ড এক ভুখা মিছিল প্রসারিত হয়ে গেছে হারিসন বােড় আর কলেজ দ্বীটের মােড থেকে ওয়েলিংটন স্ত্রীট পর্যন্ত। ইউনিভার্সিটির গেট দিয়ে জয়ধ্বনি জয়ধ্বনি তুলে বেরিয়ে এল প্রকাণ্ড একটা ছাত্ৰতরঙ্গ, মিশল সেই বিরাট মিছিলের সঙ্গে। সকলের পুরােভাগে রক্ত-পতাকা বয়ে অপর্ণা। একটা লালমুখ সার্জেন্ট মােটর সাইকেল থেকে নেমে উঠে দাড়াল ফুটপাথে, অত্যন্ত সন্দিগ্ধ আর শঙ্কিত চোখে লক্ষ্য করতে লাগল এই বিরাট জনযাত্রাকে। তারপর ওয়েলেসলিতে জনসভা। নতুন মুক্তি, নতুন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা দিয়েছে মানবতার উদয় দিগন্তে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ৮৭ আশ্চর্য—সেই অপর্ণা আজ কুমার বিশ্বনাথের স্ত্রী। কুমার বিশ্বনাথ -সামন্ততন্ত্রের আত্মঘাতী ধ্বংসস্তুপ। তার সঙ্গে অপর্ণাকে আজ মানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু শুধু মানিয়ে নেওয়ার কাজই অপর্ণার নয়। জয় করতে হবে বিশ্বনাথকে, তাকে নামিয়ে আনতে হবে তার ব্রতের মধ্যে। অপর্ণা সেই দিনের প্রতীক্ষায় আছেন। সম্রাটের ঔদ্ধত্য, রাজশক্তির একটা দৃঢ় কঠোর মর্যাদাবােধ বহন করে বিশ্বনাথকে তাকে এখনাে উপেক্ষা করে চলেছেন, অস্বীকার করে চলেছেন। এই পরিবারে অন্তঃপুরিকাদের যে প্রাণহীন বিলাসমূল্য পুরুষানুক্রমিক ধরে নির্ধারিত হয়ে এসেছে, সেই মূল্যই পেয়েছেন অপর্ণা। কিন্তু সম্রাটের সাম্রাজ্যে আজ ভাঙন ধরেছে। তাকেও নেমে আসতে হবে, কিন্তু কোথায় ? সম্রাট আর সবহারার মধ্যে কোনাে মাঝামাঝি স্তরভেদ নেই—তার শক্তি দুবার আর প্রচণ্ড—শুধু সে শক্তিপ্রকাশের প্রকারভেদ মাত্র। কিন্তু সম্রাটের পরিবর্তনও একদিন আসবে—অপর্ণা আছেন তারই প্রতীক্ষাতে । মােটরের শব্দে অপর্ণার চমক ভাঙল । কে এল ? পুলিশের লােক নয় তো? বিশ্বনাথ সম্বন্ধে কিছুই অসম্ভব বা অপ্রত্যাশিত নয়। বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠল। অপর্ণা ডাকলেন, মতিয়া ? মতিয়া সামনে এসে দাড়াল। -মােটরে কে এল দেখে আয় তাে। মােটর? মতিয়ার মনও শঙ্কিত আর কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। দ্রুতগতিতে নেমে গেল সে। আর ওদিকে লালজী দেউড়ি পার হয়ে ঢুকলেন সােজা কাছারী বাড়ির মহলে। কালীবিলাসের মৃতদেহের সামনে বিশ্বনাথ যেখানে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছেন, হরিশরণ সেখানেই দর্শন দিলেন এসে। চমকে ফিরে তাকালেন বিশ্বনাথ ।
৮৮ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী রাম রাম। ? —রাম রাম। বিশ্বনাথ সবিস্ময়ে বললেন, এ কি লালাজী ? —হ, হুজুরের টাকাটা দেবার জন্যে —এই সময়ে এত কষ্ট করে । কথাটা বলতে গিয়ে সৌজন্যের চাইতে সন্দেহই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল বিশ্বনাথের গলায়। এর পেছনে হরিশরণের কোনাে রকম একটা চাল নেই তাে? অথবা সােনাদীঘির মেলাটা যত তাড়াতাড়ি বাগিয়ে নেওয়া যায়, সেই আশাতেই বিশ্বনাথের দৃষ্টির প্রশ্নটা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েই যেন কথা বললেন লালাজী। অত্যন্ত নিরীহ কণ্ঠে বললেন, হযখন জরুরি দরকার। আমরা তাে গােলাম—মনিবের সুবিধে সব সময়েই নজর রাখতে হয়। কিন্তু একি ব্যাপার? এ লােকটা কে পড়ে আছে এখানে? অসীম বিরক্তিতে জ কুঞ্চিত করে বিশ্বনাথ বললেন, কে জানে, ঠিক বুঝতে পারছি না। কী একটা খবর দিতে এসেছিল আলকাপের দল থেকে আলকাপের দল! লালাজীর ভাবান্তর ঘটল, বিচক্ষণ আর তী চোখ গিয়ে পড়ল কালীবিলাসের মৃত্যুপার আর রক্তকলঙ্কিত মুখের ওপর। লােকটাকে চিনেছেন তিনি। সমস্ত মনটা চমকে উঠল, মনে হল- বিশ্বনাথ বললেন, থাক ওপরে চলুন। লালাজীর কণ্ঠস্বরে কিছু টের পাওয়া গেল না। তেমনিই শান্ত কোমল গলাতেই তিনি বললেন, হ্যা চলুন। —– আট পর পর বেনােল তিনখানা গাড়ী। একখানা রামনাথের, একখানা সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ৮৯ বৈজুর, আর একখানা সূষের। গাড়ীতে যাবে জিনিষপত্র, লােহা-লক্কড়, যন্ত্রপাতি আর মেয়েরা । রূপপুরের কামারেরা যখন দল বেঁধে কোথাও বেরিয়ে পড়ে, তখন সহধর্মিণী মেয়েরাও চলে তাদের সঙ্গে সঙ্গে। অনেকটা প্রাচীনকালের রণ-- যাত্রার মতাে। দাঙ্গা হাঙ্গামার দরকার হলে ওদের মেয়েরাও সঙ্গে হাতিয়ার ধরে। তা ছাড়া শত্রুর অভাব নেই। দু একজন অথব বুড়াে অথবা বুড়ি ছাড়া যুবতী মেয়েদের অনেকটা অরক্ষিতভাবে গ্রামে ফেলে যাওয়া ওরা নিরাপদ মনে করেনা। গাড়ী সাজানাে সুরু হল। হাতুড়ী, হাপর, ছেনী, লােহার টুকিটাকি। বড় বড় পাকা বাঁশের লাঠিগুলাে মরদদের হাতে, ওরা পেছনে হেটে যাবে। মেয়েরা আজকের দিনে বিশেষ ভাবে প্রসাধন করেছে, রঙীন শাড়ী পরেছে, গায়ে রূপাের গয়না। কটাক্ষগুলি চঞ্চল আর উৎসুক হয়ে উঠেছে। নানা গােলমালে গত দু বছর মেলায় যায়নি, তাই এবারে উৎসাহ আর উদ্যমটা কিছু বেশী । কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁকে বসল রামনাথ । —না রে, তােরা চলে যাে। আমার শরীরটা আমার শরীরটা ভালাে নেই, আমি আর যেতে পারব না। সমস্ত কামারপাড়া বিস্ময়ে হতবাক্ । -সে কি কথা তাউই। -না আমি যাব না। সূরয হাে হাে করে হেসে উঠল।--ভয় করছে ? মেলায় তােমার নতুন বউ হারিয়ে যাবে নাকি? কিন্তু এ কথাতেও রামনাথ প্রদীপ্ত হয়ে উঠল না, দপদপ করে ওর চোখে জ্বলে উঠলনা সেই স্বভাবসিদ্ধ প্রখর দৃষ্টি। ম্লান আর বিমর্ষ মুখে রামনাথ শূন্য দিগন্তের দিকে নিরুত্তরে তাকিয়ে রইল। কাদমাক্ত বিলের সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী জলে তাল গাছের ছায়া কঁপছে। শঙ্খচিল উদ্গ্রীব হয়ে বলে আছে সেই তাল গাছের ওপর—তার সমস্ত ধ্যান, জ্ঞান, তপস্যা ওই বিলের দিকে নিবদ্ধ। কখন একটা দুর্ভাগ্য গজাল মাছ নিশ্বাস নেবার জন্যে চকিত মূহুতে জলের ওপর ভেসে উঠবে আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা ছো দিয়ে- সূর্য বললে, ভয় নেই, আমরা পাহারা দেব বউকে। অন্য সময় হলে রামনাথ বলত, হু, পাহারা পাহারা দেওয়া মানে নিজেরা ভালাে করে গ্রাস করবার মতলব ।আর সঙ্গে সঙ্গে এক হাত পরিমাণে একটা জিভ কাটত সূর্য। নীচু হয়ে রামনাথের পায়ের ধূলাে নিয়ে বলত : ছি ছি তাউই, আমাদের কি নরকের ভয় নেই ! কিন্তু আজ সব কিছুই অস্বাভাবিক আর স্বতন্ত্র। রামনাথের মনের সুর কেটে গেছে। কোথা থেকে দেখা দিয়েছে সংশয়, দোলা লেগেছে নিজের যা কিছু বিশ্বাসের ভিত্তিতে। ঘর-ঘরঘর। ঘরের এত মায়া এ কথা কি রামনাথ আগে জানত কোনো দিন ? সবুজ ফসলে সােণালি সম্ভাবনা আজ ওর চোখে মুখে স্বপ্নের মায়া পরশ বুলিয়ে দিয়েছে। এখন বিলের জলে চাদ নিজেকে হারিয়ে ফেলে, এখন মহুয়া বন থেকে পাপিয়ার ডাক শােনা যায় । রক্তের জোর মরে গেছে; তাই কামনা নিয়েছে প্রেমের রূপ। এতদিনের সেই ধূ-ধূ করা পথ, আশ্রয়হীন শূন্য দিগন্ত—সে সব এখন গত জীবনের দুঃখের স্মৃতি। সােনাদীঘির মেলাকে আশ্রয় করে আবার সেই অনিশ্চয়তা আর সংঘাতের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়া-নাঃ, রামনাথকে দিয়ে তা আর হবার নয়। বৈজু কামার সামনে এসে দাঁড়াল। রূপাপুরের কামারই বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য জাতের লােক। ক্ষীণজীবী মানুষ, পেশীতে জোর সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ - নেই, সুরয বা দূর বিস্তৃত কোশােলালের মতাে উগ্র বন্যতায় তার চোখ পিঙ্গল হয়ে ওঠেনা। কিন্তু তবু বৈজুকে মান্য কার সকলে, ভয়ও করে অনেকে। লােকটা কুটিল আর কূট বুদ্ধি। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে কলকাতাতে। গাঁজা, চণ্ডু, চরস, মদ, ভাং কিংবা কোকেন সমস্ত নেশায় সে বিশারদ। সারা গায়ে এক সময় বিষাক্ত ক্ষতচিহ্ন ফুটে উঠেছিল—এখন তাদের শুকনাে কালাে কালাে দাগগুলাে ইন্দ্রের সহ-লােচনের মতাে তাকিয়ে আছে । তারপর থেকেই শহর ছেড়েছে বৈজু—সহরে শুধু অমৃতের পাত্রই যে পরিপূর্ণ নয়, সেখানে বিষও আছে -এই সত্যটা ভালাে করে অনুভব করেছে সে, গ্রামে ফিরে মন দিয়েছে বিষয়-কমে। বৈজুর হাত পরিষ্কার, এমন চমৎকার কাজ রূপাপুরে কেউ করতে পারে না। শুধু তাই নয় । লােকে বলে সিসা আর রাঙের কাজেও তার জুড়ি নেই। নবীপুরের কোন্ মহাজনের সঙ্গে তার বন্দোবস্ত আছে কে জানে, তার তৈরী টাকা সিকি, আধুলি নাকি সরকারী জিনিষের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চলতে পারে। পুলিশ দু একবার ও সব জিনিষের সন্ধানে এ তল্লাটে হানা দিয়েছে, বৈজুকে ডেকেও নিয়ে গেছে থানায়, কিন্তু কিছু বার করতে পরেনি। বৈজু বললে তুমি যাবেনা মানে? কুমার বাহাদুরকে জবান দিয়েছি আমরা । রামনাথ তবু নিরুত্তর হয়ে রইল । —রূপাপুরের কামারেরা জবান ভাঙ্গে না কোনােদিন। তুমি না গেলে রহিমগঞ্জের শেখদের সঙ্গে লাঠি ধরবে কে ? এরা তাে একটা চোট খেলে চিৎ হয়ে পড়বে । -কেন, সূরয ? বৈজু হাসল।—হাঁক-ডাক করেলেই মরদ হয় না, মুরােদ চাই । ।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ সূষের হাতের গুলি শক্ত হয়ে উঠল মুহূর্তের মধ্যে। মুরাদটা একবার পরখ করব নাকি তাের সঙ্গে? বৈজু একবিন্দু বিচলিত হল না, সাপের মত কুটিল আর অতি শীতল চোখ পলকের জন্যে পড়ল সূর্যের মুখে। -তা ক্ষতি নেই। অতান্ত সুস্পষ্ট সংকেত। রূপপুরের কামারদের বেশি আয়ােজন দরকার হয় না। শক্তির অভাব যেখানে, গলার তােড়-জোরটা সেখানেই বেশি। দুজনে মুখখামুখি দাঁড়াল। কিন্তু সংশয়টা দেখা দিল সুরযের মুখেই। বৈজুর গায়ে ওর মতাে শক্তি নেই এ-কথা সত্যি, কিন্তু কাপড়ের ভেতর থেকে একখানা ছােরা বের করতে তার সময় লাগে না। দুজনের মাঝখানে রামনাথ এসে পড়ল। —নিজেরাই মারামারি করে মরবি নাকি এখন ! গায়ের জোর কার কত সে পরখ পরে হবে। কিন্তু আমি যাব না। কুমার বাহাদুরের কাজ নিয়েছিস, তােরাই করবি। সূর্য বাঘের মতাে ফুলছিল। বৈজুর ওপর একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি ফেলল সে। আচ্ছা দেখা যাবে। অপমান সহ্য করবার পাত্র সে নয়। বৈজু কিন্তু হাসল। সাপের মত তীক্ষ আর শীতল দৃষ্টি। সূর্য রুদ্ধশ্বাসে বললে, আর ভাগের বেলায় ? এবার রামনাথও হাসল। বললে, সে ভাবনা ভাবতে হবে না। তার সবই তােদের। কথা চলছিল রামনাথের দাওয়ায় বসে । ঠিক এই সময় ঘরের ভেতর থেকে ইনতুন করে শিকল নড়ে উঠল। সমস্ত আবহাওয়াটা যেন বদলে গেল মুহূর্তের মধ্যে—যেন একটা গুমােট অতৃপ্তির ভেতরে খানিকটা মুক্তির ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেল।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী । বৈজু বললে, যাও তাউই, তােমার ডাক পড়েছে। শুধু আমাদের বললেই তাে হবে না-নতুন বউয়ের মত নিয়ে এসাে আগে। রামনাথ বললে—থাম হতভাগা । ঘরের ভেতরে শিকলটা নড়তে লাগল অধৈর্যভাবে। জরুরি তাগিদ। রামনাথ উঠে পড়ল। তারপর বেরিয়ে এল একটু পরেই। -আচ্ছা যাব, তােদের সঙ্গেই যাব। যা থাকে কপালে। তিরিশটা করাতের মতাে প্রখর শব্দ করে তিরিশজন কামার একসঙ্গে অট্টহাসি করে উঠল। সে হাসির শব্দে বিলের জলে লাগল চমক, তাল- গাছের মাথার ওপর থেকে তীক্ষ কণ্ঠে চীৎকার করে মৎস্যলােভী শঙ্খচিলটা উড়ে চলে গেল রৌদ্র ঝকিত নীল-দিগন্তে। পর পর বেরােল তিনখানা গাড়ী। বৈজুর গাড়ীতে উঠেছে ভানী, কামারপাড়ার আরাে তিন চারটি মেয়ে। অপাকুটিল কটাক্ষে ভানীর দিকে একবার তাকালাে বৈজু, তারপর মহিষ দুটোর লেজে শক্ত করে মােচড় লাগালে। লােহা-বাঁধানাে ভারী চাকায় বিদীর্ণ পথটাকে আরাে চুর্ণ-বিচূর্ণ করে গাড়ীটা ছুটে চলল ঘড় ঘড়, করে—পেছনে লাঠি হাতে যে-সব পুরুষেরা আসছিল, ধূলাের কুয়াশায় মুহূর্তে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল তারা। কুমার বিশ্বনাথের বৈঠকখানায় বেশিক্ষণ বসলেননা হরিশরণ । তিনি কাজের লােক, বিশ্বনাথ কাগজপত্র সই করে দিতে অবহেলাভরে ভাঁজ করে তিনি সেখানাকে পকেটে পুরলেন, একবার পড়েও দেখলেন পর্যন্ত। এ-সব সামান্য ব্যাপারে খুব বেশি পরিমাণে মনােযােগ দেওয়া তার স্বভাববিরুদ্ধ। আর ক'টাই বা টাকা। বড় জোর পাঁচ সম্রাট ও শ্ৰেতী হাজার, একটা টী-পার্টিতেই পাঁচ হাজার টাকা বেরিয়ে যায় লালা হরিশরণের। ইচ্ছা করলে কিন্তু হরিশরণের উদ্দেশ্য পাঁচ হাজার নয়। এই কুমারদহকে ধ্বংস করতে হবে—দেবীকোট রাজবংশকে লুটিয়ে দিতে হবে ধূলাের নীচে। ইতিহাসের পাতা থেকে, জনশ্রুতি থেকে, কুমারদহের আকারহীন, অর্থ- হীন শূন্যদম্ভ থেকে এই কথাটাকেই নিঃশেষ করে মুছে দিতে হবে যে রাঘবেন্দ্র রায় বর্মার ঘােড়ার সহিস ছিল রামসুন্দর লালা। আর কুমারদহ! কী আছে কুমারদহের ? বহুদিন পরে আজ চোখ মেলে লালাজী কুমারদহের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন। ভাঙা বাড়ী, মজা দীঘি, অপব্যয়, ব্যভিচার আর জীর্ণতার প্রেতমূর্তি। একে শেষ করে দিতে হবে। কুমারদহের তলা দিয়েই বয়ে গেছে নীলস্রোতা কাঞ্চন আর ঠিক দশ মাইল দূরে রেলের ইষ্টিশন। রাঘবেন্দ্র বায় মার সাত- মহল বাড়ী যেখানে অজগর-জঙ্গলে দুর্গম হয়ে আছে, ওখানে বসতে পারে মস্ত বড় গঞ্জ-নবীপুরের মতাে সমৃদ্ধ বিরাট বন্দর। তা ছাড়া কিছুদিন থেকে আরাে নানা রকমের প্ল্যান ঘুরছে লালাজীর মাথায়। কয়েকটা চাউলের কল এখানে বসালে কেমন হয় ? খুব মন্দ হবে না বােধ হয় ! আর পাঁচ সাত বছরের মধ্যে একটা মােটর চলবার মতাে পাকা রাস্তা ষ্টেশন পর্যন্ত টেনে নেওয়াও খুব শক্ত হবে না। মৃত বিষাক্ত কুমারদহ নতুন করে গড়ে উঠবে প্রাণের ঐশ্বর্য নিয়ে, যান্ত্রিকতার নতুন স্বাস্থ্যে। তখন এর নাম কী হবে? নাম হবে হরিশরণপুর । বিশ্বনাথের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঠিক এই জিনিসগুলােই লালাজীর মনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আর একটা চিন্তাও তারি সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষমুখ কাটার মতাে খচ খচ করে বিধছিল। কালী- বিলাস কুণ্ডুর মৃত্যুটা অত্যন্ত সন্দেহজনক। কী কথা বলতে এসেছিল, সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী কুমার বিশ্বনাথের সঙ্গে কী দরকার ছিল তার। আলকাপ দলের ব্যাপার কী? আজ তাে তাদের নবীপুরে পৌছবার কথা ছিল—কিন্তু ? নাঃ, যাওয়ার পথে শােভাগঞ্জের হাট ঘুরে ব্ৰজহরি পালের খবরটা একবার নিয়ে যেতেই হবে। বিশ্বনাথ বললেন, তা হলে একটু চায়ের ব্যবস্থা করি। লালাজী হাতজোড় করলেন। মাপ করবেন, অসময়ে চা আমার চলেনা। আচ্ছা আমি তা হলে আসি–রাম রাম। লালাজী বের হয়ে গেলেন। বেরােবার পথে দরজার গায়ে কী একটা খটাস করে আটকে গেল এক মুহূর্তের জন্যেলালাজীর পকেটের সেই পিস্তলটা। থমকে থেমে দাড়ালেন তিনি, পকেটে হাত পুরে অস্ত্রটাকে টিপে ধরলেন, তারপর দ্রুত গতিতে নেমে গেলেন সিড়ি দিয়ে। এটা কি কোনাে কিছুর একটা আসন্ন সঙ্কেত ! অস্ত্রটা কি সুনিশ্চিতভাবে জানিয়ে দিল—শুধু পকেটের মধ্যে নিশ্চিন্ত হয়ে বিশ্রাম করাই তার কাজ নয়, একটা রক্তাক্ত কতব্যের প্রেরণাতে সে উন্মুখ হয়ে আছে ? আর এদিকে জ্বলন্ত চোখে টেবিলের ওপরে রাখা নােটগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন বিশ্বনাথ। ওগুলাে যেন নােট নয়—একরাশ তীক্ষ্ণধার অস্ত্রের মতাে তার হাতের সামনে ছড়িয়ে রয়েছে। কেন কে জানে, নােটগুলাে স্পর্শ করতে বিশ্বনাথের কেমন একটা ভয় আর সংশয় বােধ হতে লাগল। মনে হল : ওদের প্রত্যেকটি যেন ছুরির ফলার মত তার বুককে বিক্ষত আর রক্তাক্ত করে দেবে। শিউরে নােটগুলাের ওপর থেকে তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। ওগুলাে ব্যোমকেশের হাতে তুলে দিতে হবে—টাকার জন্যে ব্যোমকেশ হতে কুকুরের মতাে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কালই সদরে খাজনা পাঠাতে ৯৬ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ হবে, নইলে সব মহালগুলাে একসঙ্গে লাটে চড়ে যাবে। আর নীলামে কিনে নেবার জন্যে লালা হরিশরণই এগিয়ে আসবেন সর্বাগ্রে। সদর ? একবার সদরের ওই কাগজপত্রের স্তুপে যদি আগুন ধরিয়ে দেওয়া যেত উড়িয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেওয়া যেত সমস্ত ! কী দিন গেছে রাঘবেন্দ্র রায় বমার আমলে। দেবীকোট রাজবংশ—রাজ। তারা। ইজারাদার দেবী সিংহ দু হাতে বাংলা দেশকে লুটে নিয়েছে বটে, কিন্তু সেদিনের জমিদারের ক্ষমতাও ছিল তেমনি সীমানাহীন, তেমনি অব্যাহত। হাঁসমারীর খাড়িতে ঠাণ্ডা কাদার তলায় সন্ধান করলে বহু বিদ্রোহী প্রজার শ্যাওলা-পড়া কঙ্কাল আজও তুলে আনা যায়। বেলা তিনটার কাছাকাছি। অত, অভুক্ত বিশ্বনাথ, অস্বাভাবিক উত্তেজনায় শিরাগুলাের মধ্যে প্রখর বিদ্যুতের দীপ্তি বয়ে যাচ্ছে। একটু স্নান করে বিশ্রাম নিতে পারলে শরীরের আগুনটা বােধ হয় অনেকখানি জুড়িয়ে যেত। কিন্তু বিশ্রাম! বিশ্রামের কথা ভাবতেই মনে পড়ল অন্তঃপুরের কথা মনে পড়ল অপর্ণাকে। আশ্চর্য, অপর্ণার অবজ্ঞাটা অনুভব করেই কি বিশ্বনাথ আজ তার সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠলেন। টেবিলের উপর রাখা নােটগুলো তখনাে আগুনের হলকার মতাে জলছে। আর একবার সেদিকে তাকিয়ে বিশ্বনাথ এক কোণের কাচের আলমারী খুললেন। মদের বােতল, গ্লাস, কর্ক, স্কু। এমন সময় আবার মতিয়ার আবির্ভাব। হুজুর ? আরক্ত প্রচণ্ড দৃষ্টিতে বিশ্বনাথ যেন মতিয়াকে দগ্ধ করবার উপক্রম করলেন কী চাই?
সম্রাট ও তী ১৭ বিশ্বনাথের চটির ঘা খেয়ে পিঠ শক্ত হয়ে গেছে মতিয়ার। সে ভয় পেল না। একবার দ্বিধা করে বললে, রাণীজী ডাকছেন। সম্পূর্ণ অনিশ্চিতভাবে বিশ্বনাথ কয়েক মূহুত স্থির হয়ে রইলেন। পায়ের চটিটাই খুলবেন, না শিসের ভারী কাগজচাপাটা ছুঁড়ে মারবেন মতিয়ার মাথায় ? কিন্তু বিশ্বনাথ কিছুই করলেন না। কী ভাবলেন কে জানে, তারপর ওই অভিশপ্ত নােটগুলােকেই মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে ধরে বললেন, চল হারাজাদা, কোন জাহান্নামে যেতে হবে। মতিয়া একগাল হাসিল। “আজ্ঞে না, জাহান্নামে নয়, রাণীজী ডেকে পাঠিয়েছেন। চলতে চলতে বিশ্বনাথ থেমে দাড়ালেন। পেছন ফিরে বললেন, শি ইয়াকী দিবি তােত একদম খুন করে ফেলব রাস্কেল কোথাকার। অনেক দিন পরে বিশ্বনাথকে সামনে বসিয়ে খাওয়ালেন অপর্ণা। আজ কোথা থেকে কী যেন হয়ে গেছে, নিজের মধ্যে একটা বিস্ময়কর পরিবর্তনের ইঙ্গিত লক্ষ্য করছেন বিশ্বনাথ । মনের মধ্যে কোথায় একটা নিভৃত দুর্বলতার বীজ পড়েছিল—এতদিন পরে সেটা যেন ফুলে ফলে রূপায়িত হয়ে উঠবার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। বাইরে ভাঙন ধরেছে—অজগর সাপের মতাে লালা হরিশরণের ঋণের বন্ধন চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরেছে তাঁকে। অবশিষ্ট ছিল সােনাদিঘীর মেলা কুমারদহ রাজবংশের শেষ একচ্ছত্র আধিপত্য, কিন্তু তাও আজ হরিশরণের হাতে তুলে দিতে হল। কোথাও কিছু আর বাকী থাকবে । তাই কি বিশ্বনাথের মন আজ আকস্মিক ভাবে ঘরের দিকে ফিরে গিয়েছে ? তাই কি আজ মনে হচ্ছে অপর্ণার কাছে এমন একটা কিছু ৭ সম্রাট ও এত আছে যেখানে তার শেষ আশ্রয় ? রাত্রির অন্ধকারে ওঁরাও মেয়েদের মাংসস্তুপে কামনার আগুন লেলিহ হয়ে ওঠে-মদে আর মত্ততার মধ্যে রাঘবেন্দ্র রায় বর্মার জড়তা-জীর্ণ ;ং-মহালে যেন দূবিশ্বত লক্ষ্ণৌয়ের সেই সরযু বাইজীর নূপুরের নিক্কণ শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু সেই রাত যখন শেষ হয়, তখন? তখন? গ্লানি আর অবসাদ। মদ নয়, এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল। আজ কি সমস্ত জীবনের ওপর থেকে সেই রাত প্রভাত হয়ে গেল? সে কি কোনােদিন ফিরে আসবে না? একপাত্র শীতল জলের মতাে অপর্ণা কি সমস্ত জলা জুড়িয়ে দেবে? কিন্তু অপর্ণা ! অপর্ণা ইংরেজী জানে, অপর্ণা নিজের বিদ্যার গবে বিশ্বনাথকে ব্যঙ্গ করে। অপর্ণার ব্যবহারে কিন্তু তার কিছুমাত্র আভাস পাওয়া গেল না। বেলা পড়ে এসেছে ; দিনান্তের আলােয় ধূসর হয়ে আসছে দিগদিগন্ত। দেউড়ির ভাঙা সিংহদুটো বিকেলের মান আলােয় যেন ক্লান্ত বিষন্নতার প্রতিচ্ছবি। কাছারীবাড়ির কবুতরগুলাে দূরের মাঠ থেকে ধান খাওয়া শেষ করে ফিরে আসছে। নীড় আর শাবকের জন্যে ব্যাকুল উৎকণ্ঠা। অসীম শ্রান্তিতে বিশ্বনাথ একখানা চেয়ারে নিজেকে এলিয়ে দিয়েছিলেন। পাশে এনে দাঁড়ালেন অপর্ণা। মেহসিক্ত স্বরে বললেন, সারাদিন এমন পাগলের মতাে ছুটোছুটি করে বেড়াও কেন? নীড়মুখী কবুতরগুলাের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই নিরৎসুক গলায় বিশ্বনাথ বললেন, কী করব? করবার অনেক কিছু আছে, তুমি পথ খুঁজে পাচ্ছ না। —পথ খুঁজে পাচ্ছি না?—দেবীকোট রাজবংশের সামন্ত-রক্ত একবার চলকে উঠেই আবার নিরুপ হয়ে গেল। আল আরঅবসাদের মতাে পার স্যা। স্যার এত করুণ কোমল রূপ যেন আর কখনাে বিশ্বনাথের সম্রাট ওঠেী চোখে পড়ে নি। আর সেই সন্ধ্যা মােহ ছড়িয়েছে করুণ প্রশান্তি ছড়িয়েছে বিশ্বনাথের মনে। -না।-অপর্ণা তেমনি স্নেহ-মধুর গলাতে বললেন, পথ খুঁজে পাচ্ছ না তুমি। একটা কথা এখনাে বুঝতে পারে নি। তিনশাে বছর আগে পৃথিবী যা ছিল আজ আর তা নেই। বিশ্বনাথ নিবোধ আর হতাশ চোখ মেলে অপর্ণার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথাগুলাের অর্থ তিনি এখনাে ধরে উঠতে পারছেন না। শুধু অনাসক্তভাবে তিনি অপর্ণার বক্তব্যের গতিটা লক্ষ্য করতে লাগলেন। অপর্ণা লঘুভাবে আঙুলগুলাে বুলােতে লাগলেন বিশ্বনাথের রুক্ষ অবিন্যস্ত চুলের মধ্যে। -আজ নতুন দিন। রাজার অধিকার আজ টলে গেছে, এটা লালা হরিশরণের যুগ। এ যুগে হরিশরণদের জোর বেশি, তারা জিতবেই। তুমি আমাকে কিছু বলতে চাওনা, কিন্তু ব্যোমকেশ সব জানিয়ে গেছে আমাকে। সােনাদীঘির মেলা চলে গেল, এর পর তুমি দাড়াবে কোনখানে? —সােনাদীঘির মেলা চলে গেল।-ডেক চেয়ারের ওপর বিশ্বনাথ সােজা হয়ে উঠে বসলেন, কখননই না। তুমি দেখাে অপর্ণা, ও মেলা কিছুতেই ওর ভােগে লাগবে না—কখননই না। আমিও এবার দেখে নেব কার জোর কতখানি। অপর্ণা সমেহ হাসলেন। শীতল একখানা স্নিগ্ধ হাত রাখলেন বিশ্বনাথের কপালে। আশ্চর্য, অপর্ণার হাতের স্পর্শ এত মধুর ! মনের সমস্ত উত্তেজনা যেন ঝিমিয়ে মরে যায়—যেন ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করবে? লাঠালাঠি করবে, মেলা ভেঙে দেবে? কী লাভ সম্রাট ও তো হবে তাতে? ফৌজদারী। কে জিতবে তাতে? তােমার কত টাকার জোর আছে যে লড়াই করবে তুমি ওই বেনের বাচ্ছার সঙ্গে? বরং তােমার যা আছে তাও শেষ হয়ে যাবে, জিত হবে কার ? বিশ্বনাথ চুপ করে রইলেন। এসব কথা কি কখনাে ভাবেন নি তিনি? নিশ্চয় ভেবেছেন, অনেকবার ভেবেছেন। মনের দিক থেকে যতটা নির্বোধই তিনি হােন না কেন, এসব অতি সাধারণ সত্যকে বােঝবার মত বুদ্ধি তার নিশ্চয় আছে। কিন্তু বােঝাটাই তাে আর সব নয়। মদের পাত্রে যে মৃত্যুর বিষ ফেনিয়ে ওঠে—উচ্ছল উন্মত্ত রাত্রিগুলাে যে নিয়তির মতাে একটা নিষ্ঠুর আর অনিবার্য পরিণতির ইঙ্গিত—এ তথ্যকে তিনি চেতনা দিয়ে, শিরায়ু দিয়েই অনুভব করেছেন। কিন্তু দেবীকোট রাজবংশের রক্ত। সে রক্ত একাধারে আশীবাদ আর অভিশাপ। তীব্র বহ্নিজালার মতাে তা নিজেকে রাজ মহিমায় জাগ্রং করে রাখে, আর তীব্র বহ্নিজালার মতােই ইন্ধনের দাবীতে সে নিজেকেই দাহন করতে থাকে। সমস্ত বুঝেও রক্তের মধ্যে সেই বংশক্রমের শৃঙ্খল-বন্ধন বিশ্বনাথ অনুভব করতে থাকেন। অপ্রতিহত প্রতাপের রাজত্ব করে—নিজের ইচ্ছার উপরে কোথাও রাশ টেনে দিয়াে , ভেঙে চুরে সব শেষ করে দাও। রাজা ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি বিধাতার দূত। তাকে বাধা দিতে পারে কে, কে তাকে রুখতে - পারে ? তাই বিশ্বনাথ বাধা দিলেন না, অপর্ণার কথার প্রত্যুত্তর দিলেন না। এর মধ্যে সত্য আছে। যা আর কারাে কাছে শুনতে ভালাে লাগত নাঘা লাগত নিজের আত্মমর্যাদায়, অপর্ণার মেহস্নিগ্ধ পরিচর্যার সঙ্গে তা যেন একটা নতুন আবেদন নিয়ে মনের কাছে এসে দেখা দিল। দেউড়ির সীমা ছাড়িয়ে চোখের দৃষ্টি চলে যাচ্ছে দূর দিগন্তে। সিংহাবাদের হিজলবন যেন গাঢ় কালির রেখায় চক্ৰবালে আঁকা রয়েছে। ওই জঙ্গলে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ একদিন বাঘ থাকত, থাকত শঙ্খচুড়-নীল গাইকে পাক দিয়ে জড়িয়ে ধরত অতিকায় ময়াল সাপ। আজ ওখানে রাখালেরা গােৰু চরায়- বাঁশি বাজায়। কুমীরমারারা কাঞ্চন নদীর নীল জল থেকে কুমীরের বংশ উচ্ছন্ন করেছে-গােৰু চরানাে শেষ করে রাখালেরা ওই নদী সাঁতার দিয়ে ওপারের গ্রামে চলে যায়। তিনশাে বছর। তিনশাে বছর কেন, পঞ্চাশ বছর আগে যা ছিল, তাও কি আজ আছে ? রামসুন্দর লালা একদিন কুমারদহ রাজবাড়িতে ঘােড়াকে চাল শেখাত, এ কথা আজ কি কারাে মনে পড়বে কখনাে? হঠাৎ নিজের অত্যন্ত সজাগ মর্যাদাবােধ, দেবীকোটের রক্তের অনমনীয় ঔদ্ধত্য যেন কী একটা মন্ত্রবলে শান্ত হয়ে গেল। অত্যন্ত নতুন–অপ্রত্যাশিত গলায়, আশ্রয়ার্থীর মতাে অসহায় স্বরে বিশ্বনাথ অপর্ণাকে বললেন, তুমি কী করতে বলাে? অপর্ণা জয়ের পূর্বাভাস অনুভব করলেন—অনেক দিন পরে নিজের মধ্যে ফিরে এলেন তিনি। কুমারদহের অসূর্যম্পশ্যা কুলবধু নয়—পার্টি আফিসের অপর্ণা, ভুখ-মিছিলের অপর্ণা। -তুমি জমিদার, জমির সঙ্গে তােমার সম্পর্ক। আর সেই জমির মালিক যারা—জমি যারা চাষ করে, তারাই তাে তােমার আপনার লােক। তাদের জোরেই তােমার জয় হবে। তুমি একা কেন ? -একা কেন?—বিশ্বনাথ যেন চমকে গেলেন। সত্যিই তাে—আজ কেন তার এই নিঃসহায় একাকিত্ব। তার অসংখ্য প্রজা যদি আজ এসে দাড়ায় তা হলে তার মতাে শক্তি কার আছে। কোনাে হরিশরণের সাধ্য নেই তাকে জয় করতে পারে। অপর্ণা বললেন, তিনশাে বছর ধরে ওদের অস্বীকার করে এসেছ তােমরা। ওদের কাছ থেকে শুধুই নিয়েছ, এতটুকুও ফিরিয়ে দাও নি। আজ একটুখানি ওদের কাছে নেমে এস–একবার ওদের স্বীকার করে সম্রাট ও নাও, দেখবে আর কোনাে ভাবনা নেই। মনে রেখাে ওদের আপনার জন যদি কেউ থাকে, তা হলে সে জমিদার-জমিদারের সঙ্গেই ওদের হাত মিলবে সকলের আগে। আর মহাজন। সে যে ওদের কতখানি শত্রুতা বােঝবার দিনও ওদের আসছে। বিশ্বনাথ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অপর্ণার মুখের দিকে। কিছু একটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু ঠিক ধরতে পারছেন না। বাইরে রক্ত- সন্ধ্যা। ক্রমে কালাে হয়ে আসছে। আর আধাে অন্ধকারে অপর্ণার মুখখানা সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছে না—কিন্তু কী একটা সম্ভাবনা আর আশার সংকেতে সে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে—বিশ্বনাথের অনুভূতির মধ্যে সেটা সঞ্চারিত হয়ে গেল। -আচ্ছা ভেবে দেখব। ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলে বিশ্বনাথ উঠে দাড়ালেন। উঠবার ইচ্ছা ছিল না, এই সন্ধ্যা আর অপর্ণাকে কেমন ভালাে লাগছিল, কেমন যেন আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল চেতনাকে। কিন্তু উঠতেই হবে—অনেক কাজ। এ সব কথা পরে ভাবলেও চলবে, তার আগে ব্যোমকেশের সঙ্গে লালাজীর টাকাগুলাে পৌছে দিতে হবে। রাত্রেই সদরে লােক না পাঠালে লাটের নীলাম ৰােধ করা যাবে না। মন্থর বিষ পায়ে সিড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন বিশ্বনাথ, আগে আগে লণ্ঠন ধরে চলল মতিয়া। আর বারান্দার রেলিং ধরে ঝুকে দাড়িয়ে অপর্ণা নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তার দিকে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বধানাে উঠানের ওপর দিয়ে ভারাতুর পায়ে বিশ্বনাথ এগিয়ে চললেন। অপর্ণার কথাগুলাে মনের মধ্যে থেকে থেকে গুঞ্জন তুলছে—এতদিন পরে কোথায় যেন জাগিয়ে তুলছে একটা মৃদু অথচ তীব্র আলােড়ন। । ওদের দাবীকে স্বীকার করে নিতে হবে, ওদের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। কিন্তু কেমন করে? কেমন করে মিলন সম্ভব, কী ভাবে চলবে ওদের সঙ্গে হাত মেলানাে, ওদের দাৰীকে স্বীকার করে নেওয়া। দেবীকোট রাজবংশ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ কানাে দাবীকে স্বীকার করে না কোনাে দিন, শুধু নিজের দাবীকেই প্রতিষ্ঠা করে যায়। তিনশাে বছর ধরে আগুন আর রক্ত দিয়ে যে ইতিহাস লেখা হয়েছে, আজ কি তার একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল ? কাছারী-বাড়ির সামনে আসতেই শােনা গেল ব্যোমকেশের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। তীব্র গলায় সে বলছে, না, এ অপমান, চূড়ান্ত অপমান। কখনােই এ সহ্য করা যায় না। আমরা মরিনি এখনাে। কাছারীতে ঢুকে বিশ্বনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে ? বিশ্বনাথকে দেখে ব্যোমকেশ তেমনি উত্তেজিত ভাবে উঠে দাড়াল। বললেন, এই যে হুজুর—নিজেই এসেছেন। শুনুন—এই মাণিক ঘােষের কাছেই ব্যাপারটা শুনুন। মাণিক ঘােষ আকর্ণ-বিস্তৃত হাসি হেসে সাষ্টাঙ্গে বিশ্বনাথকে প্রণাম করল। বিশ্বনাথের প্রজা--শােভাগঞ্জের হাটে দই ক্ষীর বিক্রি করে। মােটাসােটা মাঝারি বয়সের মানুষ। অত্যন্ত সাদাসিধে লােক—জমিদারের অতিশয় অনুগত। কুমারদহ রাজবংশের প্রতি তার বংশানুক্রমিক শ্রদ্ধা -চার পুরুষ এখানে তারা নিয়মিত ভাবে দই ক্ষীরের নজর আর যােগান দিয়ে আসছে। ব্যাপার কী মাণিক ? মাণিক সংকুচিত হয়ে গেল।—আজ্ঞে এই আকাপের দল । -আকাপের দল?—বিশ্বনাথ জ কুঞ্চিত করলেন। কী একটা কথা মনে পড়ে গেল চকিতের মধ্যে।—ঠিক, ঠিক । আজ তাে ওদের সােনদীঘির মেলায় গান গাইবার কথা ছিল। আসেনি কি ? আজ্ঞে আসবে কি ?-ব্যোমকেশ সশব্দে ফেটে পড়ল । আসবে তারা? নবীপুরের কাচা পয়সালালা হরিশরণ ওখানকার লাট সাহেব । এক এক রাত পচিশ টাকা করে পাবে, দশ টাকা দরে কেন তারা গান গাইতে আসবে সােনাদীঘির মেলায় ?
১৪ नाबी বিশ্বনাথ বিরক্ত হয়ে বললেন, ব্যোমকেশ তুমি থামাে। তুমি থামাে। যা বলবার তা মাণিক ঘােষকেই বলতে দাও। কী করেছে আস্কাপের দল? মাণিক ঘােষ বিব্রত বােধ করল। শােভাগঞ্জের হাটে সমস্ত ব্যাপার- টার নীরব দর্শক ছিল সে, ব্যোমকেশের কাছে তারই খানিকটা সরল বর্ণনা দিয়েছিল। কিন্তু এর পেছনে এতখানি গােলমাল আছে, তা সে কল্পনাতে আনতে পারেনি। পারলে কখনই বলত না। সে ছাপােষ মানুষ, সকলের মন জুগিয়ে তাকে চলতে হয়। লালাজীর প্রতাপ তারও অবিদিত নয়। কুমার বিশ্বনাথের প্রতি তার আনুগত্য আছে, লালা- জীকেও সে ভেট দিয়ে নিজেকে কৃতকৃতার্থ বােধ করে। ঐহিক এবং পারত্রিক জগতে তেত্রিশ কোটি, তারও অনেক বেশি যত দেবতা আছে, সকলকেই তুষ্ট করবার জন্যেই সে প্রস্তুত। বার কয়েক দ্বিধা করে টাক চুলকে মাণিক ঘােষ ব্যাপারটা বিবৃত ফেলল। ব্যোমকেশ কথার মধ্যেই বার বার লম্ফ ঝম্প করতে লাগল, বলতে লাগল, এ অপমান সহ্য করে গেলে কুমারদহের আর মাথা তুলে দাড়াবার উপায় থাকবে না। আর বিশ্বনাথের সর্বাঙ্গে হিংস্রতার দীপ্তি এমন ভাবে শিখায়িত হয়ে উঠল যে, তার মুখ দিয়ে একটি কথা বেরােল না। এতক্ষণ ধরে অপর্ণার কথাগুলাে মনের মধ্যে নেশার মতাে যে প্রভাব বিস্তার করেছিল—মুহূতের আগ্নেয় কশাঘাতে—তা মিলিয়ে গেল। প্রজাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিয়ে যদি লালাজীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে তার সুযােগ ঢের পাওয়া যাবে কিন্তু তার আগে–বিশ্বনাথ চুপ করে দাড়িয়ে রইলেন। দূরে ঢােলের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে—বহু কষ্ঠের মিলিত চীৎকার ভেসে আসছে। কিন্তু একটু কান পেতে শুনলেই বােঝা যাবে—এটা চীৎকার নয়, গান। কাল থেকে সােনাদীঘির মেলা, মেলার যাত্রীরা রাত্রে উৎসবের আয়ােজন করেছে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ মাণিক ঘােষ বললে, রূপাপুরের কামারের। খুব গান জমিয়ে বসেছে। ভারে ভারে তাড়ি চলছে আর তার সঙ্গেই রূপপুরের কামারেরা! ঠিক। মুহূতে বিশ্বনাথের মনের মধ্যে সব কিছুর সমাধান হয়ে গেল। দাতে দাত চেপে বিশ্বনাথ বললেন, লাঠি ধরবে ওই রূপাপুরের কামারেরা। ভেঙে দেবে--উড়িয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেবে। । দেখব বেনের বাচ্চা এবার সােনাদীঘির মেলা থেকে কত টাকা লুটে নিতে পারে। মাণিক ঘােষ কথাটা শুনে শিউরে উঠল। মেলায় সেও দোকান নিয়ে এসেছে। মেলা যদি লুট হয়ে যায়, তাহলে তারও বিপদ কম নয়। তা ছাড়া মাণিক ঘােষের টাকায় নাকি শ্যাওলা পড়ে—এমন একটা জন- শ্রুতি সর্বসাধারণে চলিত আছে। অতএব বুদ্ধিমানের মতাে কালই দোকান-পাট তুলে নেওয়া ভালাে। তা ছাড়া বিশ্বনাথের মতলবটাও লালাজীকে জানিয়ে দেওয়া দরকার। মাণিক ঘােষ সাদাসিধে নিরীহ মানুষ, কারও সাতেও নেই পাচেও নেই। সুতরাং দুজনকে খুসি করাই তার উচিত । বিশ্বনাথ বললেন, ব্যোমকেশ, আমার সঙ্গে এস। -কোথায়? —চল, রূপাপুরের কামারদের খবরটা একবাব নিয়ে আসা যাক। কুমারদহ রাজবাড়ী থেকে সােনাদীঘি মাত্র ছটাকখানেক পথ। একটা বড় আম বাগান, তার পরে ছােট একখানি তৃণ-বিরল কংকর- মণ্ডিত মাঠ পেরােলেই দীঘির উচু পাড়টা চোখে পড়ে । আগে ওই পাড়টা ছিল পাহাড়ের মতাে উত্তঙ্গ, কিন্তু বছর বছর ওখানে মেলা বসাতে পাড়টা ধ্বসে ঢালু আর জায়গায় জায়গায় প্রায় সমতল হয়ে গেছে। দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সােনা-ফকিরের ভাঙা দরগা। ওপরে मबाट গম্বুজ নেই-প্রায় বারাে আনা অংশেরই ছাদ ভেঙে পড়েছে। চারদিকে রাশি রাশি ইট আর পাথর ছড়ানাে। দরগায় ঢুকবার প্রধান দরজার দু-পাশে সম-চতুষ্কোণ কতকগুলাে কষ্টিপাথর সাজানাে--লাল লাল ছােট ইটের সঙ্গে বেমানান। দেখলেই বােঝা যায় স্থানান্তর থেকে সংগ্রহ করে ওদের ওখানে সগৌরবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু সগৌরবে নয়, বিজয়-গৌরবে। গৌড়-বঙ্গজয়ী মুসলমানের আক্রমণে বিধস্ত দেবমন্দির থেকে সংগৃহীত শিলাখণ্ড -। তাদের বুকে ক্ষয়ে-আসা পদ্মের চিহ্ন এখনো দেখা যায়, দেব-মূর্তির অস্পষ্ট রেখাঙ্কণ এখনাে চোখে পড়ে। ঠিক সদর দরজার পেছনেই পাশাপাশি দুটি শ্বেতপাথরের সমাধি। একটির ওপরে নানা রঙের কাচের টুকরাে দিয়ে মিনে করা, সেটি সােনা ফকিরের, পাশেরটি কার, ইতিহাস সে কথা বলতে পারেনা। আর একপাশে কালাে পাথরের একটি দীপাধার, ওখানে ফকিরের নামে বাবােমাস ‘চিরাগ জলে। তেল পড়ে তার অর্ধেকটাতে-একটা পুরু কালাে আস্তরণ জমে উঠেছে। দরগাকে কেন্দ্র করে কোথাও উচু পাড়ের উপর, কোথাও বা নীচের ইট-পাথর ছড়ানাে সমতল মাটিতে অর্ধচন্দ্রাকারে মেলার ছাউনিগুলাে মাথা তুলেছে। আর তারই একটা ছাউনিতে এসে আশ্রয় নিয়েছে রূপাপুকুরের কামারে। এরই মধ্যে হাপর বসিয়েছে, আগুন জ্বালিয়েছে -সােনা দীঘির উত্তর পাড়ে মেলায় যে সমস্ত গাড়ি এসে আস্তানা গেড়েছে, এর মধ্যেই তাদের চাকাতে লােহার পাত পরিয়ে দিতে সুরু করেছে ওরা। ওদের দেখে এখন কে বুঝতে পারে যে, মেলা ভেঙে দেওয়াই ওদের একমাত্র উদ্দেশ্য এবং তার জন্যে ওরা কুমার বিশ্বনাথের কাছ থেকে একশাে টাকা আগাম বায়না নিয়েছে। কিন্তু-দুদিন পরে যা হবার তা হবে, আপাতত ওরা মনের আনন্দে গান জুড়ে দিয়েছে। তিন চারটে বড় বড় মশাল জেলে পুতে দিয়েছে মাটিতে, চারদিকে গােল হয়ে ঘিরে বসেছে মেলার কৌতুহলী দর্শকের मयाबी দল। সূর্য ঢােল বাজাচ্ছে, রামনাথ একটা করতাল পিটছে ঝম ঝম করে। একজন প্রাণপণে বেসুরা একটা বাঁশি বাজাচ্ছে, আর এক জন দু’হাতে কতকগুলাে ঘুঙুর নিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে তাল দেবার চেষ্টা করছে। আর মাঝখানে বসে সমস্বরে গান জুড়েছে ভানী, কামিনী, কামার পাড়ার আরও তিন চারটি যুবতী আর প্রৌঢ়া। তাড়ির পাত্র চুমুকে চুমুকে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, গানের মধ্যে আসছে মত্ততার আমেজ। দশকেরা কখনেও কখনাে এক একটা অশ্লীল উক্তি করছে, কখনাে বা বলে উঠছে, বাঃ- বাবাহবা ! তারই মধ্যে সবটার সুর কেটে দিয়ে একবার চকিত কলরব জেগে উঠল। -জমিদার । রসভঙ্গে বিরক্ত এবং সন্ত্রস্ত হয়ে জনতা উঠে দাড়াল। গান বন্ধ করে মেয়েরা জড়ােসড়ো হয়ে সরে বসল এক পাশে। ঢোল, করতাল বাঁশী আর ঘুঙুরের বাজনা মুহূর্তে থেমে গেল। বিশ্বনাথ ডাকলেন, ওস্তাদ। সামনে এসে আভূমি অভিবাদন জানাল রামনাথ ' পিছনে এসে দাড়ালাে সূরয, এল বৈজু। —সব ঠিক আছে ? রামনাথ মাথা নীচু করে রইল। সুরযের পেশীতে লাগল হিংস্রতার মত্ত-আন্দোলন। বৈজুর দুটো চোখ সাপের মতাে কুটিল আর বিষাক্ত হয়ে উঠল—মশালের রাঙা আগুন প্রতিফলিত হতে লাগল সেই চোখে। জবাব দিলে বৈজু। শান্ত গলায় বললে হাঁ হুজুর, সব ঠিক আছে । আপনার চাকর আমরা। -বেশ, মনে থাকে যেন।ঠোটের উপর বিশ্বনাথের দাত চেপে ১০ সম্রাট ও তো পড়ল । কোন ভাবনা নেই তােদর। শেষ পর্যন্ত যা হবে তার দায় আমার- রামনাথের মুখে ক্লান্তি আর অবসাদের ছায়া। কিন্তু সুষের সমস্ত চেতনায় রূপাপুরের বিদ্রোহী পূর্ব পুরুষেরা সাড়া দিয়ে উঠেছে। অতীতের সম্রাট আর অতীতের সৈনিক। বিশ্বনাথ বললেন, থামলে কেন, গান চলুক তােমাদের এক জন কোথা থেকে এর মধ্যেই একটা লােহার চেয়ার জোগাড় করে এনেছে। বিশ্বনাথ চেয়ারে ভালাে করে চেপে বসলেন। আর সঙ্গেসঙ্গেই চোখ পড়ে গেল ভানীর ওপর। এমন সুগঠিত, এমন পূর্ণায়ত। রাঘবেন্দ্র রায় বর্মার লালসা আর লােভ উত্তর-পুরুষের সমস্ত শিরায়ুগুলােকে মাতাল করে দিল। কোথায় রইল অপর্ণা কোথায় রইল আসন্ন সন্ধ্যার সেই আবিষ্ট আচ্ছন্নতা। কী হবে ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে--কী হবে লালা হরিশরণের কথা ভেবে। আপাতত এই মুহূতটাই সত্য—তার চেয়ে অনেক বেশি সত্য ভানীর এই উচ্ছলিত-যৌবনশ্রী। বিশ্বনাথ ব্যোমকেশকে ইঙ্গিত করলেন দু বােতল মদ জোগাড় করে আনবার জন্যে, আর দু চোখের তীব্র নিলজ্জ দৃষ্টি নিয়ে যেন গিলতে লাগলেন ভানীকে। ওপাশ থেকে বৈজুর সাপের মত তীক্ষ্ণ চোখ বার বার এসে বিশ্বনাথের মুখের ওপর পড়তে লাগল—আর কেউনা হােক, সে বিশ্বনাথকে বুঝতে পেরেছে। বৈজু মৃদু হাসল । ভানী একদিন ঘটির ঘায়ে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। সে কথা বৈজু ভােলেনি—প্রতীক্ষা করে আছে। আজ তার প্রতিশােধের দিন ফিরে এসেছে হয়তাে। রাত বাড়তে লাগল। মদের পাত্র শূন্য হয়ে চল, এল তাড়ির ভাড়। ওদিকে নিজের ঘরে বসে কী একখানা বই পড়তে পড়তে বার বার উৎকর্ণ হয়ে উঠতে লাগলেন অপর্ণা। জানলার ফাকে বাইরে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী শুধু কালাে অন্ধকার আকাশে জ্বলন্ত সপ্তর্ষি। রাত্রির স্তব্ধতার সঙ্গে সঙ্গে সােনাদীঘির দিক থেকে ঢলের শব্দ আর উত্তাল আর উন্মও হয়ে উঠেছে। বৈজু লোকটা চালাক। শেয়ালের মতাে ধূত-শকুনের মতাে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ওদিকে গানের পর্বটা ক্রমেই উদ্দাম আর উতরােল হয়ে উঠছে—ড়ির নেশায় সূর্য ঢেলে চাটি দিচ্ছে বেতালে। মশালের আলােগুলাে ম্লান শিখা হয়ে আসছে ক্রমশ। আর বিশ্বনাথের নেশায় বিহ্বল চোখ দুটো তারই প্রতিফলনে পিঙ্গল আর স্বচ্ছ হয়ে উঠছে আয়নার মতাে চকে, উজ্জ্বল, তার ওপর ছায়া ফেলছে স্খলিত-বাসা ভানীর দেহ কান্তি। বৈজু-ভাবছে : তার কি প্রতি শশাধ নেবার সময় এল? একদিন অসতর্ক অবসরে—ঝাপ কেটে সে ভানীর ঘরে ঢুকেছিল আর কুড়ুল ধরা—যাতা ভাঙ্গা কঠিন হাত থেকে প্রচণ্ড একটা ঘটির আঘাত খেয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল তাকে ; যেমন করে একটা আহত কুকুর আতনাদ করে পালিয়ে আসে। কিন্তু সে অপমান সে ভুলতে পারেনি। যেমন করে হােক—এর শােধ নিতে হবে। নিজে না থােক আর কোনাে সুযােগে। আজ বিশ্বনাথের নেশায় বিহ্বল লােলুপতায় সে সুযােগ যেন তার কাছে এসে দেখা দিয়েছে। বৈজু উঠে নীরবে এসে বসল বিশ্বনাথের পায়ের তলায়। রাত বেড়ে চলেছে। সমস্ত কৌতুহলী মানুষ গান শােনবার জন্য এসে ভিড় জমিয়েছিল একে একে সরে গেল তারা। সােনা ফকিরের দরগায় প্রদীপ নিবে গেল—সােনাদীঘির কমি দামের মধ্যে মানুষের কোলাহলে ভয় পেয়ে যে পানকৌড়ি দুটো এতক্ষণ মাথা ডুবিয়ে ছিল এতক্ষণ পরে নিশ্চিন্তে উঠে এল তারা—থেমে থেমে ১১০ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ জলের মধ্যে বাজতে লাগল তাদের পাখার ব্যপট। কাপড় পষ্টি, লােহাপট, মিঠাই পষ্ট—নিস্তব্ধ হয়ে গেল ঘুমের জড়তায়। এমন কি ‘খােপরা পট্টির’ অভিসারপবও আস্তে-আস্তে জন বিরল হয়ে এল ; শুধু আমবাগানের মধ্যে এখনাে খানিকটা আগুন জ্বলছে—ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে তিন চারটে মানুষের মাথা। গােরুর গাড়ির গাভােয়ানদের কেউ কেউ ভাত রাঁধছে ওখানে। এবার সত্যিই সাড়ম্বরে মেলা বসবে-রাত্রির অন্ধকারেও সেটা অনুভব করা চলে। শুধু টিকি- ধারীর জুয়াের আড্ডাটা এখনও বসেনি। আশা করা যায়, কাল নাগাদ এসে পড়বে তারা। তা হলেই অনুষ্ঠানের কোন ত্রুটি থাকবে না কোথাও। বিশ্বনাথের প্রসাদ পেয়ে ব্যোমকেশের নেশাটা তত জমে ওঠেনি। কাপ্তান লােক সে-পাকা এক বােতল ‘সাদা ঘােড়া’ টালেও তার পা টলে না—আর সেই যােগ্যতাতেই সে বিশ্বনাথের ম্যানেজার। সে বুঝতে পারল রাত বাড়ছে। এবারে বিশ্বনাথকে টেনে তােলা দরকার। -হজু, উনি। ঢের রাত হয়ে গেল। ভানীর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে না নিয়েই বিশ্বনাথ বললেন, ধ্যাৎ, দিনের পর দিন তুমি বেরসিক হয়ে উঠছ ব্যোমকেশ। রাত বাড়ক, কিন্তুটা কী, বুঝতে না পেরে ব্যোমকেশ মাথা চুলকাতে লাগল। কিন্তু বৈজু বুঝেছিল। কয়েক মুহূত একটা অনিশ্চয়তায় মনটা আন্দোলিত হতে লাগল তার—তারপর সে সােজা উঠে দাড়াল বিশ্বনাথের পাশে। কানের কাছে মুখ এনে চাপা অস্পষ্ট গলায় বললে, ঐ মেয়েটাকে চাই হুজুর, ঐ লাল শাড়ীপরা মেয়েটা? বিশ্বনাথের চোখে ঝড়াং করে বিদ্যুৎ জলে গেল।-তুমি কে? বৈ বিনয়ে গলে গেল।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ১১১ -আমাকে চিনলেন না হজুর ? আমি বৈজু কামার-রূপাপুরের কামার। -বেশ। জড়িত অসংযত পায়ে বিশ্বনাথ হঠাৎ উঠে দাড়ালেন। এক হাতের ভর রাখলেন বৈজুর কঁাধে আর এক হাতে আঁকড়ে ধরলেন ব্যোমকেশের গলাটা—এস আমার সঙ্গে। এদিকে শেষ মশালটাও দপ করে অন্ধকারের মধ্যে অকস্মাৎ নিবে গেল। আর চড়াৎ করে একটা বিকট শব্দ হয়ে ছিড়ে গেল রযেৰ ঢােলের চামড়াটা। সােনাদীঘির জলে একটা পানকৌড়ী অস্বাভাবিক প্রেতিনীর গলায় কোকিয়ে উঠল। কী দেখে যেন ভয় পেয়েছে। দেউড়ির বিকলাঙ্গ সিংহ দুটো তাহার আলােয় একটু একটু আভাস দিচ্ছে। রাঘবেন্দ্র রায় বর্মার রংমহলের পথে ঘন-অন্ধকার। ওদের তিন জনের পায়ের তলায় শুকনাে পাতা মড় মড় করতে লাগল। কোথা থেকে একটা পাতিহাঁস চুরি করে ভারমন্থর একটা শেয়াল ওদের সামনে দিয়েই পালিয়ে গেল ভয়াত পদক্ষেপে। আর টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলােয় দোতলার ঘরে অপর্ণা প্রহর জাগতে লাগলেন—আজ তার মন বলছে, বিশ্বনাথ আসবেন, আশ্রয় চাইবেন তার কাছেই। তার সমস্ত মন সমস্ত স্নায়ু তারই জন্যে উদগ্র হয়ে আছে। কিন্তু একটা খবর ওরা কেউ জানত না। সেটা শুধু ছায়া ফেলেছিল ভানীর চেতনায়। মানুষের অজ্ঞান মনে যেমন করে তার সহজাত- সংস্কার একটা নিশ্চিত ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিয়ে যায়। সােনাদীঘির মেলায় কেশােলাল এসেছে। সেই কোেেলাল। চৌকিদার আলী মহম্মদ যার বল্লমে এফেঁড় ওফোড় হয়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল—আর ওঠে নি। খানিকটা কাঁচা মাংস যে একদিন চিবিয়ে খেয়েছিল-তাজা রক্তের আস্বাদ পাবার জন্যে ; যার ভালােবাসার সম্রাট ও তো ; পাশব আর কঠিন আলিঙ্গনে ভানীর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত; আর পুলিসের হুলিয়া যার সন্ধান পাওয়ার জন্যে সমস্ত দেশটা এই সাত বছর ধরে চষে বেড়াচ্ছে। সেই কেশােলালরামনাথের শিষ, রামনাথের গর্ব। সেও এসেছে সােনাদীঘির মেলাতে। কিন্তু কেউ তাকে চিনতে পারেনি। তার চোখে গগলস, মুখে দাড়ি, পরণে লুঙ্গি। ঘাড়ের ছাঁট চৌদ্দ আনা আর দু- আনা। বেশে-বাসে তার সম্পূর্ণ-রূপান্তর ঘটেছে। শুধু কি বেশে- বাসেই ? মনের দিক থেকেও তার পুনর্জন্ম হয়েছে। খােপরা-পট্টি' বা মেলার গণিকা-পল্লীর অন্যতমা-নায়িকা নিশিবালার সে রক্ষিত। নিশি বালা তাকে ভালােবাসে। ভালােবাসে। বহুপরিচর্যার মধ্যেও প্রেমের জগতে কোেলাল একক—একচ্ছত্র। নিশিবালা তার সবরকম খরচ যােগায়, -বেশভূষা থেকে আরম্ভ করে মদ-বিড়ির পর্যন্ত। কেশােলালও অকৃতজ্ঞ নয়, সে তার প্রেমিকার জন্যে দালালী করে, খদ্দের জুটিয়ে আনে। নিশিবালার উন্নতি হচ্ছে—আর দু-এক বছরের মধ্যেই সে কলকাতায় যাবে। তার অনুগ্রাহকেরা বলেছে অনায়াসেই নাকি সিনেমা আর থিয়েটারওয়ালারা লুফে নিয়ে যাবে তাকে। এর জন্যে কেশােলালের কৃতিত্ব প্রচুর এবং সে কথা নিশিবাল। মুক্তকণ্ঠেই স্বীকার করে থাকে। কৃতার্থতার হাসি হেসে কেশােলাল বলে, আমি আর কে, তাের গুণেই সব । অনেক রাতে কেশােলাল এল নিশিবালার ঘরে। নিশিবালা তখন বিছানাটার ওপর অবসন্নভাবে শরীরটাকে এলিয়ে দিয়েছে। সান্ধ্য-মণ্ডন আর অভিসার সজ্জা এখন আর নেই। রঙীন শাড়ীটাকে ছেড়ে ফেলেছে, পরনে আটপৌরে সাদা শাড়ী। স্নান কয়ে এসেছে, ঝুলিয়ে দিয়েছে ভিজে চুলের গুচ্ছ। অধনিমীলিত চোখে ওপরের দিকে তাকিয়ে বিড়ি টানছে।
Old Bore করল। এই বেদেয় করলুম সব! সম্রাট ও শ্ৰেী ১১৩ কেশােলাল নিশি মাত্রার পা পাণে একটার পরে একটা, আছেই আসতবু তাে মেলা ভালাে করে বসবে কাল থেকে। এলে আর নড়তে চায় না, একেবারে বেদম হয়ে গেছি। —কী খবর? নিশিবালা -কু aun) -আর রােজগার ? ? নিশিবাল তেমনি উদাস ভাবেই বিড়ির ধোঁয়া ছড়াতে লাগল। -এক রকম। এই গাওয়ার লােকগুলােকে নিয়েই মুস্কিল, চার আনা, ছ-আনার বেশি ফেলতে চায় না। কাল থেকে দরজায় দাড়িয়ে তো, একটা টাকার কমে কাউকে ঢুকতে দিয়াে না। -আচ্ছা—কেশােল অন্যমনস্ক হয়ে রইল খানিকক্ষণ। আস্তে আস্তে বললে, একটা কথা আছে তােমার সঙ্গে। -কী ? নিশিবাল জ কুঞ্চিত করলে, টাকা চাই নাকি -না ভয় নেই, টাকা চাইনে। তুমি লােক চাইছিলে না? -লােক? আছে নাকি খোজে ? -হ, আমার বউটা। দেখলুম মেলায় এসেছে, ছাউনি গেড়েছে বলল তাে জোগাড় করে আনি। তীক্ষ্ণ শব্দ করে নিশিবাল হেসে উঠল। হাসিটা বীভৎস আর নির্মম মুখের কালিমা চিহ্নের উপর কতগুলো কঠিন ব্যঙ্গের রেখা উঠল রূপায়িত হয়ে। মােহিনীর হাসি নয়, গজভুক্ত কপিখের মধ্যে শূন্য পকেট পুরােনাে প্রেমিককে অধচন্দ্র দেবার সময়ে এমনি করেই হেসে থাকে নিশিবালা। -খুব বাহাদুর সােয়ামী যাহােক। নিজের বৌকে তুলে দিতে চাচ্ছ পেশাকরের হাতে।
১১৪ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ কিন্তু কেশােলাল লজ্জা পেল না। জীবনে সে কখনাে ভয় পায়নি, লজ্জাও পায় না। পাশব-ববরতা তার রূপান্তরিত হয়েছে পাশব নিলজ্জতায়। পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। -বউ বলেই তাে। লােকের বাড়ী খেটে খায়, এখন বাজবাণী হয়ে কাটাবে। -আহা হা, বউয়ের ওপর কী দরদ। মরে স্বর্গে যাবে তুমি। -এই তাে আমার স্বর্ণকেশােলাল নাটকীয় ধরণে এগিয়ে এল নিশিবালার দিকে। সাত বছরে কেশােলাল গ্রাম্য নিরক্ষরতাকে ছাডিয়ে এসেছে অনেক পেছনে। অনেক সিনেমা-থিয়েটার দেখেছে, সম্পর্কে এসেছে অগণিত পণ্য নারীর। কেশােলালের জীবন দর্শন আজ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। নিশিবালা একট। ঝাপটা মেরে দূরে সরে গেল। -থাক্ থাকু, অত কাব্যি করতে হবে না। তােমার বউকে নিয়ে যা খুসি করাে, আমাকে জালিয়াে না এখন। সােনাদীঘিব মেলার ওপর দিয়ে রাত গভীর হয়ে এল। আম বাগানের আলাে নিবে গেছে, শুধু এখানে ওখানে মিট মিট করছে দু- একট। লণ্ঠন। আকাশ ভরা তারার আলাের নিচে মেলার বিস্তীর্ণ জনারণ্য নীরব হয়ে আছে রণক্লান্ত সৈনিকদের শিবিরের মতাে। সােনা দীঘির কালাে জলে একটা অতিকায় মাছ লেজের ঝাপটা দিলে, ছল ছলাৎ করে প্রচণ্ড একটা শব্দ। যেন কী একটা আকস্মিক ভয়ে কালো রাতটায় হৃৎপিণ্ডের মধ্যে এক ঝলক রক্ত চলকে উঠল। এখানে সেখানে কতগুলাে পিঙ্গল বন্য চোখ জ্বলে উঠছে, আচমকা দেখলে মনের মধ্যে সংশয়ের খটকা লাগে। কিন্তু ওরা বন্য জন্তু নয়, অন্ধকারের মধ্যে গা মিলিয়ে দিয়ে দাড়িয়ে আছে নিতান্ত অসহায় এবং অহিংস একপাল সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ গােৰু মহিষ। ওদের দৃষ্টিতে হিংস্রতা নেই, আছে পথ চলার ক্লান্তি আর কৌতূহল। ছাউনির মধ্যে এক পাশে ভানী ঘুমন্ত। অন্ধকারে নিঃশব্দে কে একজন নির্ভুল ভাবে তার পাশে গিয়ে দাড়ালাে। বৈজু ? না বৈজু ভানী, ভানী, ভানী- গলার স্বরে গভীর ঘুমের মধ্যেও ভানীর চেতনা সাড়া দিয়ে উঠল। সাত বছরেও ভানী সে স্বর তুলতে পারেনি। সবটা কি মনে পড়ে ? পড়ে না। তবু ভােলবার নয়। বিস্মৃতির জাল ছিড়ে সােনার আলাে এসে চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, সমস্ত জানা-অজানা একাকার হয়ে গিয়ে বুকের মধ্যে ঢেউ ওঠে। হারানাে মানুষ কি কখনাে ফিরে আসে না ? আসে বই কি। ? নেই। -আন্তে, আমি। আমাকে চিনতে পারছিস না? অন্ধকারেও ভানী চিনতে পারল। আজ আর সে দিন তার কখন যে কার মন কোনখান দিয়ে জেগে ওঠে কেউ সে কথা বলতে পারে না। এতদিন সে ছিল শিশুর মতে, খানিকটা নিবোধ আর প্রায় সবটাই অপরিণত। দেহ পূর্ণ হয়ে উঠেছিল, কিন্তু চেতনার কোথাও সে পূর্ণতার ঢেউ উচ্ছলিত হয়ে দুলে ওঠেনি। জীবনের অনেকগুলাে বসন্ত শরতের মেঘ হয়ে ঔদাসীন্যের নীল দিগন্তের ওপর দিয়ে ভেসে চলে গেছে ; বাইরের বসন্ত তাকে কোকিলের ডাকে আন- মনা করে দেয়নি, তালের ঘাটপাতা পানা-পুকুরের পাশে বসে সে সকৌতুকে কোকিলের সঙ্গে কলহ করেছে। প্রথম কৈশােরে কেশাে- লালের দুঃসহ প্রেম তাকে কতটুকু আনন্দ দিয়েছিল মনে নেই, তার সম্রাট ও তী চাইতে ঢের বেশি দিয়েছে ব্যথা, দিয়েছে ভয়। কিন্তু এত দিন পরে জেগে উঠেছে ভানী। কামিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভাঙা ভাঙা আভাস ইঙ্গিতে অনেক কিছু অর্থ বুঝতে পেরেছে। আজ তার আবার সেই মানুষটাকে একান্ত করে বুকের মধ্যে পেতে ইচ্ছে করে, সেই বলিষ্ঠ ঘর্মাক্ত বাহুর লােহার মতাে কঠিন বন্ধনের মধ্যে এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে নিজেকে। হয়তাে মরে যেতে পারলেও খুশি হয় ভানী। -তুমি ? ভানী খলিত পায়ে উঠে দাড়াল, নেশাটা তার এখনাে কাটেনি। এ যেন অপ্রত্যাশিত বা অসম্ভব কিছু নয়। সােনাদীঘির মেলায় আসবার সময়েই তার অচেতন মনে কোথায় একটা সুনিশ্চিত আশ্বাস আর বিশ্বাসের ছায়াপাত হয়েছিল । কেন যেন মনে হয়েছিল, কেশােলালের সঙ্গে তার দেখা হবেই, মেলায় এত লােক এসেছে, নানা দিক থেকে নানা জাতের এত অসংখ্য লােক, পৃথিবীর কোথাও যেন কেউ বাকী নেই। এদের মধ্যে কেশােলাল কি থাকবেনা ? নিশ্চয় থাকবে, তাকে এসে দেখা সে দেবেই। ভানী যেন একান্তভাবে দেহে মনে তার জন্যেই প্রতীক্ষা করছিল। ভানী এবারে ঝাপিয়ে পড়ল কেশােলালের ওপর, দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলে তাকে। কিন্তু এবারে বিব্রত হাওয়ার পালা কেশােলালের, উগ্র আলিঙ্গনে যেন তারই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। দিন বদলেছে, মানুষ বদলেছে। সে কেশােলাল নেই, সে ভানীও না। ভানী যতটা এগিয়েছে, কেশােলাল পেছিয়েছে তার চাইতে ঢের বেশি। যাতা ঘুরিয়ে আর কুড়ল চালিয়ে ভানীর হাত আজ লােহার মতাে শক্ত হয়ে গেছে, আর ফেরারী নরহত্যা কেশােলাল মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রেখে সম্রাট ও তো ! •• কুলির মাথায় মাল পত্র চাপিয়ে ষ্টেশনে যায় আজকাল। মাঝে মাঝে হাঁপানীর মতাে কী একটা অনুভব করে বুকের মধ্যে। সুতরাং বলা বাহুল্য, বহুদিনের আদর্শনের পরে বাহিতা স্ত্রীকে বুকে নিয়ে আনন্দে কেশােলালের সবঙ্গ রােমাঞ্চিত হয়ে উঠল না। ভানীর অমার্জিত গায়ের দুর্গন্ধ তার অত্যন্ত অপ্রীতিকর ঠেকল। আন্তে আস্তে তাকে বুক থেকে সরিয়ে দিয়ে কোেেলাল বললে, আমি। চাপা কান্নায় ভানী আবার তার গায়ের ওপর ভেঙে পড়ল। এত- দিনে তুমি এলে ! আমি কথাটা কেশােল শেষ করতে দিলেনা, শশব্যন্তে ওর মুখের ওপর চাপা দিয়ে দিলে হাতটা। —চুপ-আন্তে, আন্তে। তােকে নিয়ে যেতে এলাম, এখন থেকে আমার কাছে থাকবি তুই। কিন্তু গােলমাল করিস নে ; জানিস তাে আমার পিছনে পুলিসের হুলিয়া ঘুরছে। কেউ টের পেলে সােজা ধরে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে। -না, না, গােলমাল করব না। ভানী আবার প্রাণপণে কেশে- লালকে আঁকড়ে ধরলে। কী দুর্গন্ধ মেয়েটার গায়ে, স্নান করেনা, পাত মাজেনা নিশ্চয়। মাথার চুলগুলাে থেকে একরাশ ধূলাে কেশােলালের চোখের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে, কিচকিচ করছে চোখ দুটো। আর নিশিবাল। দুজনের মধ্যে কত তফাৎ, কত বৈষম্য। ভানীকে মানুষ করতে নিশিবালার সময় লাগবে। কিন্তু যতই করুক খ্রীর প্রেমে পড়বার মতাে রুচি বিকার তার ঘটবে না কোন দিন, সে বৃহত্তর জীবনের আবাদ পেয়েছে। বিরক্তি চেপে কেশােলাল বললে, চল আমার সঙ্গে। -এখুনি ?
1 मयाबी - এখুনি। কোথায় যেতে হবে । অন্ধকারের মধ্যে কেশােলাল মুখভঙ্গি করলে, কথায় অবশ্য তার আভাস পাওয়া গেল না। জোর করে গলায় খানিকটা মধু ঢেলে দিয়ে বললে, আমি তাে তাের সােয়ামী, যেখানে নিয়ে যাই। পরম নির্ভরে ভানী বললে, চলাে। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল ওরা। রাত প্রায় দুটো। সােনা-- দীঘির জলে সপ্তর্ষির রেখাটা বেপথুমান জিজ্ঞাসা-চিহ্নের মত ঝলমল করছে। রূপাপুরের কামারদের নাক ডাকছে। ঝােপের মধ্যে বসে েশেয়ালটা এখনাে অপহৃত হলের একটা পাখা চিবুচ্ছিল, পরিতৃপ্তির আনন্দে সে হঠাৎ তারস্বরে জয়ধ্বনি করে উঠল। কেশােলালের হাত ধৰে ভানী হেঁটে চলল, সােনা ফকিরের ভাঙা দরগায় ছড়ানাে ইট পাথর তার পায়ে খচ খচ করে বিঁধতে লাগল বারে বারে। রাত বাড়তেই লাগল। মেলার গােরু-মহিষেরা জাবরের পােয়াল শেষ করে বসে পড়ল পা ভেঙে, পরিপূর্ণ বিশ্রান্তিতে তাদের চোখ এল ঝিমিয়ে-অন্ধকারে হিংস্র পিঙ্গল আলাে আর এখানে ওখানে ঝিলমিল করে উঠছে না। সােনাবীঘির জলে জেগে উঠল ঝপঝপ ঝপাং করে খানিকটা শব্দ, প্রেম কৌতুকে ডাহকী ডাহুকে তাড়া করেছে। -এই তাে ? —হ, এই। নিঃশব্দ চরণে তিনটি ছায়ামূর্তি, এসে দাড়িয়েছে কামারদের ছাউনির সামনে। পেছনের তারা-খচিত আকাশের শেভ পটভূমিতে মূর্তিগুলাে যেন আঁকা, তাদের কাউকে চেনা যায় না। একজন বললে, দেশলাই সম্রাট ও না, না। নিশব্দ কর, যেন শােনা যায় না, অনুভব করা যায়। কিছু দরকার নেই, আমি ঠিক চিনে নেৰােৰ। ই-ঠিক, ওই ওকেই। নিদ্রিত একটি নারীর মুখের ওপর শক্ত করে কাপড় চাপা পড়ে গেল মুহূর্তে। অন্ধকার। কী ঘটছে চোখ মেলে দেখবার অথবা সমস্ত চেতনাটা ভালাে করে জেগে ওঠবার আগেই তিনচারজন বাহক তাকে তুলে নিয়ে দ্রুতবেগে তিরােহিত হল আমবাগানের মধ্যে। রূপাপুরের সৈনিকদের ঘুমন্ত শিবির থেকে তাদের রাজলক্ষ্মী অপহৃত হয়ে গেল । জন্মবিদ্রোহী দুঃসাহসী লৌহপেশল মানুষগুলি তার আভাসও পেল না। শুধু ঘুমের মধ্যে রামনাথ কামিনীর স্বপ্ন দেখতে লাগল। জড়িত ধরে একবার যেন বললে, কই, কাছে আয় । আমবাগানেরামধ্য দিয়ে সরু চলার পথ। এই পথ দিয়ে এমন অনেক গেছে অনেক বার, দু’বছর পাঁচ বছর ধরে নয়, তিনশো বছর ধরে। বহু চোখের জলে এই পথ ভিজে গেছে, বহু অভিশাপে এই পথের লতাগুল্মগুলাে পর্যন্ত জর্জরিত হয়ে আছে। কেয়া কাটার বনে ঘুমন্ত গােখরাে সাপ ঘুমের মধ্যে চমকে উঠে ঠাস করে একটা ছােবল লাগাল মাটিতে—পােড়াে বাড়ীর কোন্ প্রান্তে একটা তক্ষক বিকট শব্দ করে আঁতকে উঠল। এই পথের শেষ প্রান্তেই রাঘবেন্দ্র রায়ৰমার রংমহল। আর চমকে জেগে উঠলেন অপর্ণা, টেবিলের ওপর মাথা রেখে কখন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন টেরই পাননি। সামনে ঘড়ির কাঁটা চলে গেছে আড়াইটের ঘরে। আজ আর বিশ্বনাথ আসবেন না। অপর্ণা উঠে জানালা বন্ধ করে দিলেন, তার পর একটা ক্লান্ত নিখাদ ফেলে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ নিবিয়ে দিলেন আলােটা। মূছার মতাে অন্ধকার এসে সমস্ত ঘরটাকে প্লাবিত করে দিলে—ঠিক সেই রকম অন্ধকার, যার প্রত্যালয় সূচনায় কুমারদহের সমস্ত ভবিষ্যৎ আজ সমাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। এগারাে মাণিক ঘােষ অত্যন্ত সমস্যায় পড়ে গেল। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হােক, কারাে তাতে আপত্তি করার কারণ নেই বরং দূর থেকে বাহবা দেওয়া চলে, যেমন ষাঁড়ের লড়াই দেখে খুশি হয়ে আনন্দে করতালি দেয় মানুষ। মামলা মােকদ্দমা, মহকুমা কাছারী, সদর, হাইকোর্ট-জল্পনা কল্পনায় লােকের সময়টা কাটে ভালাে। কিন্তু বিপদটা যখন ধারালাে একখানা খাড়ার মতাে উলুখাগড়ার কাঁধেই নেমে আসতে চায় তখন সেটাকে আর তেমন উপভােগ্য বলে বােধ হয় না। রাজবাড়ীতে আগুন লেগে যখন তার অভ্রভেদী ঐশ্বর্য পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তখন আহা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা যায় বটে, কিন্তু মজা দেখবার আনন্দটা পরিমাণে অনেক বেশি হয়ে ওঠে। কিন্তু সে আগুন যখন গরীবের চালা ঘরেও ছড়াতে শুরু করে, তখন? তখন যে কী হয় সেটা মমে মর্মে অনুভব করছে মাণিক ঘােষ। না বিষহরী, রক্ষে কর মা। শােভাগঞ্জের থানে জোড়া পাটা দিয়ে তােমার পূজা দেবাে। রূপাপুরের কামারদের তত বিশ্বাস নেই। মেলা লুঠ করবে, দই ক্ষীরের ভাঁড় শেষ করবে—তা না হয় একরকম সয়ে যাবে। কিন্তু মাণিক ঘােযের অনেক টাকা—তার যক্ষের ধন বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন—সাতখানা গাঁয়ে এ খবরটা অজানা নেই কারাে। সেই সম্রাট ও শ্ৰেী ১২১* টাকার জন্যে রূপাপুরের কামারেরা এসে তার পেটটা ফাসিয়ে দেবে এটা কাজের কথা নয়। অতএব আর বিলম্ব নয়। দেবী বিষহরীকে মানত করা হয়েছে । বটে, কিন্তু এই নিদারুণ কলিযুগে দেবতারা সব যােগনিদ্রায় আছেন, তাঁদের ওপর পুরােপুরি বিশ্বাস রাখা চলে না। আলকাপওলা ব্ৰজহরি পাল বুদ্ধিমানের কাজ করেছে, পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে। সেই পথটা অবলম্বন করাই শ্রেয় এক্ষেত্রে। কিন্তু তার আগে- মাথায় হাত দিয়ে মাণিক ঘােষ জরাব হয়ে বসে রইল খানিকক্ষণ। তার পরেই উত্তিতঃ জাগ্রত। খুড়তুতাে ভাই থােকা ঘােষকে ডাক দিয়ে বললে, তুই বােস দোকানে, আমি আসছি। খােকা ঘােষ ঘিয়ের সঙ্গে বাদাম তেল মিশিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে ব্যাপৃত ছিল। চোখ না তুলেই বললে, এই সন্ধ্যে বেলায় কোথায় চললে? তাগাদায় নাকি ? -না তাগাদায় নয়। অন্য কাজ আছে, নবীপুরে যাচ্ছি। একটু রাত হতে পারে। তুই হুশিয়ার থাকিস। থােকা ঘােষ বিস্মিত হয়ে বললে, হুসিয়ার কেন ? -না, এমনি বললাম। -মাণিক বেরিয়ে এল। সন্ধ্যা আসছে কালাে হয়ে। রূপপুরের কামারদের ওখানে গানের কোলাহল। মেলার যাত্রীদের বহু-মিশ্রিত কথায় কলরবে আকাশ মুখর হয়ে উঠেছে। বৈষ্ণবদের আস্তানায় ঝম ঝম টুম টাম করে বাজছে খােল আর করতাল। খােপরাপটিতে ভিড় জমেছে, আরাে বেশি করে জমেছে নিশিবালার দরজায়। বাতাসে ভাতের গন্ধ, গােবরের গন্ধ, ধূলাের গন্ধ, সােনাদীঘি থেকে শ্যাওলা আর পাকের গন্ধ-অনেক দিন পরে জলে ২২ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ আলােড়ন পড়েছে। আর সকলের মাথার উপর মেলার দক্ষিণ কোণে দীঘির উচু পাড়ের ওপর একটা নাগরদোলা স্তব্ধ হয়ে আছে-কাল থেকে ওটা চক্রাকারে পরিভ্রমণ করবে। বাঘের তাড়া খেলে মানুষ যেমন করে উধশ্বাসে ছােটে, ঠিক তেমনি ভাবেই ধাবমান হল মাণিক ঘােষ। কুমারদহ থেকে নবীপুর পুরাে তিন মাইল পথ। রাস্তা খুব অনুকূল নয়। অসমতল পথ, আমবাগানের ঘন ছায়ায় রাশি রাশি ইটের টুকরায় প্রতি পদে পদে হোঁচট খেতে হয়। তাছাড়া দুপাশে মজা দীঘি, সাপের রাজত্ব। তেড়ে আসা বিচিত্র নয়। কিন্তু মাণিক ঘােষের সে দিকে লক্ষ্য নেই, যত তাড়াতাড়ি পারা যায় লালাজীকে খবরটা পৌছে দেওয়া দরকার। লালাজী কুমার বিশ্ব- নাথের মতাে শূন্যদন্তের পূর্ণপাত্র নন—কিছু বিনিময় তার কাছ থেকে মিলবে। তিনি ব্যবসায়ী মানুষ, কাজ বােঝেন ভালাে। তিন মাইল পথ চলার অবিরাম গতিতে হাওয়া হয়ে গেল। যাওয়ার পথে শােভাগঞ্জের হাটে বিষহরীর থানে আর একটা প্রণাম ঠুকে গেল ' মাণিক ঘােষ। মা বিষহরী, এ যাত্রা রক্ষা করে মা। জোড়া পাঠা দিয়ে পূজো দেবাে। লালা হরিশণের গদী বাড়ী। চওড়া সিড়ি উঠে গেছে ধাপে ধাপে, প্রতিহারী মহাবীরজীর মূর্তির দুটো পিতলের চোখ জ্বলছে জ্বল জ্বল করে। প্রকাও লােহার নিক্তিতে ধান মাপা হচ্ছে এখনাে। পন্দ্র প—যােডাে। একটা লণ্ঠন জ্বলছে, তার আলােতে দেওয়ালের গায়ে লেখা “লাভ শুভ” যেন রক্তের অক্ষর বলে মনে হচ্ছে। সিড়ির নীচে বসে লালাজীর খাস বরকন্দাজ শিউ পাড়ে খৈনী ভলছে। অন্ধকারের মধ্যে সংশয়গ্ৰন্ত পায়ে মাণিক মােষ থেমে আঁড়ালাে
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ
একবার। নাকে ভালাে করে টেনে নিলে বেনেতী মশলার গন্ধটা। কী ।
করা যায়।
কৌন্?
শিউ পাড়ে হেঁকে বললে,-কে
ভীত গলায় মাণিক বললে, আমি শােভাগঞ্জের লােক।
গলার স্বরে শিউ পাড়ে চিন্তে পারল।-আরে কে ও, ঘােষ মুশা?'
কী মনে করে ?
আর একবার নাকে বেনেতী মশলার গন্ধ টেনে বুকে সাহস বেঁধে
নিলে মাণিক।-একবার দেখা করব লালাজীর সঙ্গে।
—কেয়া কাম ?
-সােনাদীঘির মেলা।
—সােনাদীঘির মেলা ? চোখের দৃষ্টিকে তীক্ষ আর সন্দিগ্ধ করে ।
তুলল শিউ পড়ে। মেলা তাে এবার হামাদের আছে ঘােষ মুশা।
কোন গােলমাল আছে নাকি?
—ত, গােলমাল আছে বই কি। তাই তাে লালাজীর কাছে ।
ব্যাপারটা বলতে ছুটে এলাম। দেখা পাওয়া যাবে না এখন ?
জরুর।—শিউপড়ে উঠে চলে গেল ।
সব শুনে লালাজী হাসলেন একটু। মনের ভিতর যে আগুন জ্বলে ।
উঠেছিল বাইরে তার কণামাত্রও প্রকাশ পেল না। বিশ্বনাথের সঙ্গে
তার এইটুকুই তফাৎ। এমন যে হতে পারে লালাজী তা জানতেন।
বিশ্বনাথের মতাে লােক—মদের বােতল আর রেসের ঘােড়ার সঙ্গে যার ।
জীবনের সুর বাঁধা—দেবীকোট রাজবংশের অর্থহীন অহমিকাই যার :
সঞ্চয় তার কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না। কিন্তু এর
জন্যে লালাজী তৈরী। বিশ্বনাথের নিজের অন্তই তার মৃত্যুবাণ হয়ে .
উঠবে। লাগুক ফৌজদারী, ভাঙ্গুক মেলা। অজগরের শেষ পাক।
২৪ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ রাঘবেন্দ্র রায় বর্মার রংমহলের শেষ আলােটিও নিভে যাবে, অন্তহীন অন্ধকারে তলিয়ে যাবে সমস্ত । লালাজী শান্তস্বরে বললেন, না না কিছু হবে না ওসব । কুমার বাহাদুর ত আর পাগল নন। নাক ভরে বেনেতী মশলার গন্ধ টানতে লাগল মাণিক যােব। —আপনি কিছু বুঝতে পারছেননা মহাজন। কুমার বাহাদুরের ‘হাল চালই ওই রকম। যে অবস্থা হয়েছে কিছু অসম্ভব নয় তার পক্ষে। এখনি আপনি পুলিশে খবর দিয়ে পুলিস ! লালাজী অবজ্ঞাভরে হাসলেন : পুলিসের দরকার হবে না, ওটা দুবলা লােকের ভরসা। মনে রাখবেন আমাকে। —নিশ্চয়, মনে থাকবে বই কি। আভূমি অভিবাদন করে মাণিক বিদায় নিয়ে গেল । রামদেইয়াকে তামাক আনতে বলে ফরসীটা টেনে নিলেন লালাজী। বড় হতে হবে-কুমারদহের নাম লােপ করে দিয়ে তাকে করতে হবে হরিশরণপুর। কিন্তু ভারী হাঙ্গামা, বড় হট্টগােল ! এর চাইতে ব্যবসায়ী জীবনই ভালাে, নিশ্চিন্তে দিন চলে, টাকা আসে, পয়সা আসে, প্রাচুর্যের বন্যায় নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে চরিতার্থ বােধ হয়। নদীর ধারে ধারে দশ বাবােটা প্রকাণ্ড গােলায় ধান জড়াে হয়। ধানতাে নয় যেন মুঠি মুঠি সােনা। নিজের মধ্যে পরিতৃপ্ত হয়ে থাকলেই বােধ হয় সব চাইতে ভালাে হত সেটা। কিন্তু না। নিজের দুর্বলতাকে বক্ররে একটা ধমক লাগালেন লালাজী, এ চলবে না কোনােমতেই। খেলা যখন শুরু হয়েছে, তখন শেষ পর্যন্ত এর শেষ দেখতে হবে। হার জিত ? সে ভাবনা লালাজীর নেই। ব্যবসার চালে এতদিন যদি ভুল না হয়ে থাকে তবে এবারেও
সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী
১২
তা হবে না। বিশ্বনাথের মতাে রাজত্ব করবার বাসনা তার নেই কিন্তু
রামসুন্দর লালার কলঙ্কিত কাহিনীকে নিঃশেষে মুছে ফেলতে হবে
ইতিহাসের পাতা থেকে।
রামদেইয়া তামাক নিয়ে এল। একবার সপ্রশ্নভাবে লালাজী তার
মুখের দিকে তাকালেন।
রামদেইয়া ?
-জী।
এবার শােনাদীঘির মেলায় আমি যাব, নিজে কাছারী করব
সেখানে।
—আপনি, হুজুর? সােনাদীঘির মেলায় ?—রামদেইয়ার বিস্ময়
যেন বাধা মানল না।
হাঁ, আমিই। লালাজী আবার অত্যন্ত প্রশান্ত মুখে হাসলেন ।
রাজারাজড়ার ব্যাপার তাে, বিশ্বাস নেই কিছু। কাছাকাছি থাকাই
ভালাে।
রামদেইয়া আর প্রশ্ন করল না। শুধু কী করতে হবে তাই জানবার
প্রতীক্ষাতেই সামনে চুপ করে বসে রইল আর একটু একটু হাওয়া
দিতে লাগল ফরসীর কলকেটাতে।
মুখ থেকে একরাশ ধোঁয়া হাওয়ায় বিকীর্ণ করে দিয়ে লালাজী
বললেন, হাঁ কাল ফজিরমেই তাম্বু চড়াও ওখানে। কুমার বাহাদুরের
সঙ্গে একটু ভালাে করে জাহচান করা যাক।
রামদেইয়া কাজের লােক। ভােরের আগেই সােনাদীঘির পাড়ে
লালাজীর তঁাবু বসে গেল। ঝালর দেওয়া লাল মখমলের পদ-মাথার
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ | ওপর লাল রঙের একটি পতাকা। সৈনিকদের মাঝখানে রাজার উদ্ধত শিবিরের মত। দো-তলার জানলায় দাড়িয়ে সকালের প্রথম বােদে সেই পতাকাটিকে দেখতে লাগলেন অপর্ণা। তার বিনিদ্র চোখ হঠাৎ আলা করে উঠল। কাল সারারাত তার শূন্য প্রতীক্ষাতেই কেটেছে, বিশ্বনাথ আসেননি। বেলা একটু বেড়ে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গেই রূপপুরের কামারদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। সেই চাঞ্চল্য ক্রমে প্রবল হয়ে উঠল, তারপর গজন করে উঠল ঝড়ের স্মৃতি নিয়ে। কামিনী আর ভানীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে উঠেই সদাসন্ত্রস্ত রামনাথ সন্ধান করেছিল কামিনীর ' কিন্তু কামিনীকে পাওয়া যায়নি । তখন মনে হয়েছিল সে বাইরে কোথাও গেছে, ফিরে আসবে একটু পরেই। ভানীর কথা কেউ ভাবেনি, তার সম্বন্ধে কারাে বিশেষ উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা ছিল না। কিন্তু বেলা যতই বাড়তে লাগল, ততই রামনাথের সন্দিগ্ধ মন আরাে বেশি সন্দিগ্ধ হয়ে উঠতে লাগল । তার পরেই আস্তে আস্তে ব্যাপারটা একট। সুস্পষ্ট রূপ নিতে লাগল সকলের কাছে। কোন মনের মানুষের সঙ্গে সরে পড়েছে কামিনী। রামনাথ যত বড় জোয়ানই হােক—সে বুড়ো, রূপবতী আর তরুণী কামিনী তাকে পছন্দ করে নিতে পারেনি। যেটুকু ভালােবেসেছে তা রামনাথের ভয়ে, তার পাশবশক্তির বশীভূত হয়ে। কিন্তু মানুষের মন শুধু ভয়কেই মেনে চলে না তার নিজের স্বাধীন ধর্ম আছে, সেখানে সে স্বচ্ছ—সে গতিশীল। তাড়ির নেশা ভেঙ্গে সদ্যজেগেওঠা পাথরের মত জোয়ানগুলাে বসে রইল হতবাক হয়ে। কামিনীর ব্যবহারে তারা বিস্মিত হয়নি, তারা ভয় পেয়েছে রামনাথের জন্যে। রামনাথের সমস্ত শক্তি, সমস্ত প্রেরণার সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ১২৭ কেন্দ্র যে আজ কোথায় এ কথা বুঝতে বাকী নেই কারােই। যাযাবর মন যখন ঘর বেঁধেছে তখন নিজের সব কিছু দিয়েই বেঁধেছে। নতুন ফসল, নতুন আশা, নতুন জীবন। অদূরাগত সন্তানের মুখ চেয়ে কী আশায় যে রামনাথ দিন গুণছিল একথা তত অজানা নেই কারাে কাছেই। বৈজু একপাশে বসে বিড়ি টানছে চিন্তাকুল মুখে। ভুল হয়ে গেছে, যা ভেবেছিল ফল হয়েছে তার উলটো। রামনাথের ওপরে তার বিদ্বেষ নেই কোনােকামিনীর সম্বন্ধে কোনাে শত্রুতাই সে পােষণ করে না। কিন্তু রাত্রির অন্ধকার তাকে ঠকিয়েছে। ভুলটা সে টের পেয়েছিল একটু পরেই, কিন্তু তখন আর কোনাে উপায় ছিল না। বাঘের মুখ থেকে তার বাচ্চাকে বরং কেড়ে আনবার কল্পনা করা চলে কিন্তু কুমার বিশ্বনাথের উদগ্রউন্মত্ততার হাত থেকে কামিনীকে উদ্ধার করবার এত- টুকু সম্ভাবনা ছিলনা কোথাও। সে চেষ্টা করলে ভাের হওয়ার আগেই হাঁসমারীর খড়ির ঠাণ্ডা কাদার মধ্যে আরাে সংখ্যাতীত, তিনশাে বছর থেকে সঞ্চিত কঙ্কালের স্তুপের মধ্যে তাকেও ঘুমিয়ে থাকতে হত। মদের নেশায় কুমার বিশ্বনাথ তখন নতুন মানুষ-হিংস্রতায় আর লােলুপতায় বন্য পশুও তার কাছে হার মানে। অনুতাপ বােধ হচ্ছে বৈজুর—অত্যন্ত তীব্র প্রবল একটা অনুতাপ। কিন্তু কিছু বলা চলবে না—রূপাপুরের কামারেরা তাহলে মুহুতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছাতু করে দেবে। আর সব চাইতে আশ্চর্য লাগছে ভানীর ব্যাপারটা। ভানী গেল কোথায়? কোন মন্ত্রবলে উড়ে গেল সে? কোথাও আর কোন চিহ্ন নেই, কুমার বিশ্বনাথের রংমহলেও যে সে অভিসার করেনি, এ সম্বন্ধে একটুকু সন্দেহও নেই বৈজুর মনে। তাহলে ভানী গেল কোথায়, কে নিয়ে গেল তাকে? সংশয়ে আর বিস্ময়ে বৈজুর মাথাটা ঝিঝিম্ করতে লাগল।
১২৮
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ
সুর কেমন যেন সংকুচিত হয়ে গেছে। রামনাথের দিকে বার,
বার সে তাকাচ্ছে সংশয়াকুল দৃষ্টিতে।
হাঁটুর ওপর মাথা রেখে মােটামােটা দুখানা কালাে হাতে
হাঁটু
আঁকড়ে ধরে সে চুপ করে বসে আছে। কোনাে কথা বলছে না, বিক্ষোভ
প্রকাশ করছে না এতটুকুও। তার উত্তেজিত হয়ে ওঠবার ক্ষমতাটাও,
যেন কামিনী কেড়ে নিয়ে গেছে। ব্যাপারটা সুরযের ভাল লাগল না।
সূরয কাছে এসে ডাকল, সদর ?
রামনাথ জবাব দিলে না।
সূর্য আর একবার তাকে স্পর্শ করলে, সদর শুনছ ?
রামনাথ এবার মুখ তুলল। রক্তের মতাে রাঙা দুটো চোখ, অশ্রুতে
ঝাপসা। মুখের চামড়াগুলাে যেন শিথিল আর কুঞ্চিত হয়ে ঝুলে
পড়েছে। সমস্ত চেহারায় বাধক্যের ছায়া নেমেছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে
সাদার এত বুড়াে হয়ে গেল।
এখন আমরা কী করব সদার।
প্রায় নিঃশব্দ গলায় জবাব দিলে রামনাথ। যেন কথাটা সে সূর্যকে
বললে না, বললে নিজেকেই।
-কিছুই না।
-কিছুই না? খুজে তাে দেখতে পারি ।
কোথায় খুঁজবি ? একটা অপরিসীম নিরাসক্তি আর গ্লানি এসে
যেন আশ্রয় করেছে রামনাথকে : কী হবে খুঁজে? যে চলে যায় তাকে
যেতে দেওয়াইতে ভালাে ।
—তুমি, তুমি এ কথা বলছ তাউই ? রূপাপুরের কামার হয়ে তুমি
চুপ করে থাকবে ! তুমি সদর, তােমার অপমানে আমাদের সকলের
অপমান।
ইচ্ছে করেই কথাটা বলেছে সূর্য।
রামনাথকে সে আঘাত করতে
ভ্রাট ও র ১২৯ চায়, খোঁচা দিয়ে উদ্বোধিত করে তুলতে চায় তার পৌরুষকে।' এমন মড়ার মত নিঝুম মেরে পড়ে না থেকে সে মাথা চাড়া দিয়ে উঠুক, গজন করে উঠুক—একটা হৈ চৈ কাণ্ড বাধিয়ে তুলুক। সেটা সইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই নিরুত্তেজ স্তব্ধতা—সকলের মাঝখানে বসে সদরের এই অসহায় একাকিত্ব, এটাকে যেন শুভ সংকেত মনে হয়না। কী একটা অমঙ্গল আশঙ্কা ভারাতুর করে দেয় চেতনাকে, সূরষের মনে পড়ে তার খুড়ে মটর কামারকে। এমনি চুপ করে বসে থাকত, এমনি অর্থহীন চোখ মেলে তাকাত। তারপর একদিন সকলবেলায় দেখা গেল মটর ঘরের মধ্যে মরে পড়ে রয়েছে। বিস্ফারিত চোখ দুটোয় উড়ছে মাছি, ঠোটের পাশে গড়িয়ে-পড়া শুনাে লালার ওপরে পিপড়ের ভিড় জমেছে। সুরযের মনটা ভয়ে চম চম করে উঠল । কথা কও সদর কথা কও। -কী বলব? রামনাথ আবার নিজের মধ্যে তলিয়ে গেল। —আমরা খুঁজে দেখব। এই মেলার কোনাে ঘরে যদি লুকিয়ে থাকে। যে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে তাকে পেলে টুকরাে টুকরাে করে ছিড়ে ফেলৰ আমরা। -না। -মাথা না তুলেই রামনাথ বললে, না। আমারই ভুল হয়েছিল। আমার ঘরে ওর মন বসবে কেন? ওর বয়েস কাচা, ওর সাধ আহলাদ আছে। যেখানে গেছে যাক। আমার দিনতাে ফুরিয়ে এল। আশ্চর্য রামনাথের কথার সুর। রূপপুরের রক্ত ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক দিন। আগের বউকে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে রামনাথই গলা টিপে মেরেছিল, তার হাতের সাঁড়াশীর মতাে কঠিন নিষ্পেষণেই বার কয়েক তার হাত বেয়েই কয়েক ফোটা গরম রক্ত গড়িয়ে পড়েছিল।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ আজো রামনাথের হাতে সেই নরম শিরাগুলাের অন্তিম অনুভূতি লেগে আছে, সেই রক্তের স্পর্শ এখনাে তাকে বােমাঞ্চিত করে তােলে। রামনাথের সেই শেষ খুন। তারপর থেকে অনুতাপ জেগেছে, বার্ধক্য নেমে আসবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মনকে ভারাতুর করে দিয়েছে অতীত দুস্কৃতির সেই প্রতিক্রিয়া। তাই বড় আশা করেই রামনাথ ঘর বাঁধতে চেয়েছিল—সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু অত সহজেই তার প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয়নি-কমিনী চলে গিয়ে যেন সেই প্রায়শ্চিত্ত সম্পূর্ণ করে দিলে। যার গলা টিপে খুন করেছিল, এত সহজেই সে কি তার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে! চোখ তুলে রামনাথ গভীর গলায় বললে, এই ভালাে এই ভালাে। সূর্য সবিস্ময়ে বললে, কী ভালাে ? কছু নি- রামনাথ আবার হাতের মধ্যে মুখ লুকালাে। সুষ ধীরে ধীরে বললে, তা হলে যাব একবার জমিদারের কাছে, দরবার করব? -না-না-বিকৃত গলায় অস্বাভাবিক ভাবে চীৎকার করে উঠল রামনাথ : কিছু করতে হবে না। সুরষ তিন পা পিছিয়ে সরে আঁড়াল। রূপপুরের কামারদের হাপরগুলাে চলতে শুরু করেছে। লােহার পাতের ওপর ঠন ঠন করে পড়ছে হাতুড়ির ঘা—আগুনের ফুলকি ছিটকে উড়ে যাচ্ছে। মেলার নতুন লােক আসবার বিরাম নেই। আজ ৩রা ভা, দলে দলে লােক ঘড়া-কলসী নিয়ে নামছে দীঘিতে, জল ভরে নিচ্ছে। এ অল আর জল নেই, সােনা ফকিরের মন্ত্রপূত দুধ হয়ে গেছে এখন। এই জল খেলে রােগব্যাধি ভালাে হয়ে যাবে, মৃতবৎসার সন্তান দীর্ঘায়ু হবে, অপুত্রক পুত্র লাভ করবে, আরাে কত কী যে ঘটবে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ১১ লােকেও তা ভালাে করে জানে না। মানুষের হট্টগােলে পানকৌড়ী দম্পতি পানা আর শ্যাওলার আশ্রয়ে নিঃসাড় হয়ে বসে আছে। সকলের মাথার ওপর নাগরদোলাটা এর মধ্যেই বোঁ বোঁ করে ঘুরতে সুরু করে দিয়েছে। ওদিকে কাপড়পট্টিতে নবীপুরের মহাজনেরা দোকান সাজাতে সাজাতে সমস্বরে আহ্বান করেছে সিদ্ধিদাতাকে। ময়রাদের উনুনে আঁচ গন্ গুন্ করে উঠেছে, কড়াইতে চিড়বিড় করছে কটু- গন্ধী-ভেজাল-তেল—তার মধ্যে ছাত্ া করে পড়ছে জিলিপি। ও দিকে একটা দোকানের সামে কতকগুলাে রঙীন বেলুন উড়ছে, ভেপু বাজছে। সােনা দীঘির মেলা রাত্রির সুখ নিদ্রার পরে মুখর আর সতেজ হয়ে উঠেছে। আর এদিকে অত্যন্ত শব্দ করছে কামারদের হাপরগুলাে। যেমন রামনাথের ব্যাথাবিদ্ধ হৃদপিণ্ড থেকে এক একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে, শব্দটা সেই জাতীয়। একবার রামনাথের দিকে অনুতপ্ত দৃষ্টি ক্ষেপণ করে বৈজু সেখান থেকে উঠে গেল। বৈজু উঠে গেল, কিন্তু মনের দিক থেকে স্বস্তি বােধ করতে পারল । কিছু একটা করা দরকার, অন্তত কতব্যের তাগিদেই দরকার। আর যাই হােক রামনাথকে শ্রদ্ধা করে সে, তার এত বড় ক্ষতি সে কিছুতেই করতে রাজী নয়। লাল হরিশরণের দেওয়া সেই নােটগুলাের একটা বিশ্বনাথের হাত দিয়ে তার হাতে এসে পৌছেছে—সেটা যেন বৈজুকে থেকে থেকে তীব্র আঘাত করছিল। মেলার মাথার ওপর ধো বোঁ করে ঘুরছে নাগরদোলা। লালা হরিশরণের তঁাবু বসেছে রাতারাতি—যেন জয়ােত একটা শিবির। পরাভূত কুমারদহকে যেন ব্যঙ্গ করছে। খােপরাপটির সামনে ভিড় জমেনি এখননা, এই দিবা দ্বিপ্রহরে ওখানে পাশব-ক্ষুধা চরিতার্থ করবার ১৩২ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ জ্বলে ঢুকতে কিছু সংকোচবােধ করছে মানুষ। গােধূলির প্রতীক্ষাতে আছে তারা। আড়-নয়নে সে দিকে একবার তাকালাে বৈজু। সামনে তাড়ির দোকান। ভাদ্রের বােদ আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে এর মধ্যেই। গলাটা শুকিয়ে কাঠের মত লাগছে, ঝিমঝিম করছে মাথাটা। কাল সারারাত ঘুম হয়নি এতটুকুও, বৈজু এগিয়ে গেল সেদিকে। ভাড় তিনেক তাড়ি উদরস্থ করে সেখান থেকে উঠে পড়ল সে। শরীরটা বেশ চাঙ্গা বােধ হচ্ছে—চনচন করছে রক্ত। কিছু একটা করা দরকার। টিকিধারীর দল এখনাে এসে পৌছায় নি। বিকেল নাগাদ বসবে জুয়ার আড়া। খােপপট্টির দিকেও এখন যাওয়া চলবে না। উদ্দেশ্যহীন ভাবে মেলার চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল বৈজু। একবার নাগরদোলায় চড়ে দেখলে কেমন হয় ? আকাশে ওড়ার সখটা মিটিয়ে নেওয়া যায় তা হলে। বৈষ্ণবীদের আডডায় গান চলেছে। এও এক রকমের ব্যবসা। খােপরাপটির নামান্তর। তিনজন মােহান্ত তেত্রিশ জন বৈষ্ণবী দিয়ে, কী করে? হাফপ্যান্টপরা জুট অফিসের রসিক কেরাণীটি এক ঠোঙ্গা তেলে ভাজা জিলিপি নিয়ে কঁাচা বয়সের একজন বৈষ্ণবীকে সাধাসাধি করছে। উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই সাধু। বৈজু একবার থেমে দাড়ালাে। ওখানে একটু চেষ্টা করে দেখলে কেমন হয় ? কুমার বিশ্বনাথের দেওয়া নােটটার অর্ধেক মাত্র খরচ হয়েছে -বাকীটা এখনাে সৎকাজে ব্যয় করতে পারে সে। কামিনীকে বিক্রী করা টাকা অন্য কোননা কামিনীর সেবাতেই নয় লাগুক। এ কামার ভাই। ঘাড়ের ওপরে সমেহ করস্পর্শ : এখানে হা করে দাড়িয়ে যে? বৈজু চমকে পিছন ফিরল। রামদেইয়া। লালাজীর খাবার।
সম্রাট ও কে ১৩৩ বৈজুর সঙ্গে একটু সম্পর্ক আছে। লালাজীর অগােচরে শােভাগঞ্জের হাটখােলায় দুজনে এক সঙ্গে কিছু কিছু গঞ্জিকা সেবন করে থাকে। রাম রাম পাঁড়েজী। তুমি এখানে? -হা হুজুরের সঙ্গে এলাম। তারপর, তারপর, খবর কী?—রামদেইয়া গলার স্বর নামিয়ে নিয়ে এল : এবার তােত সােনা দীঘির মেলা আমাদের। তােমরা নাকি দল বেঁধে এসেছ, দাঙ্গা করে মেলা ভেঙ্গে দেবার মতলবে ? বৈজু চুপ করে রইল । রামদেইয়া বললে, ছি দোস্ত ছি! তুমি যে এমন নেমকহারামী করবে তা কখনাে ভাবিনি। এত তামাক খাওয়ালাম গাঁটের কড়ি খসিয়ে, এই তার ফল? বৈজু ভাবছিল অন্য কথা। মাথার মধ্যে তাড়ির নেশা বিদ্যুতের মতাে কাজ করে যাচ্ছে। রামনাথের মুখখানা মনে পড়ে যাচ্ছে, কী অসহায়, কী সকরুণ ! নেশার ঝোঁকে হঠাৎ বৈজুর সব বেসামাল হয়ে গেল। ভারী বিশ্রী লাগছে তার বুকের ভেতর থেকে কেমন একটা কান্না ঠেলে ঠেলে উঠছে। বৈজু হঠাৎ ভেঙে পড়লাে : মাপ করাে ভাই, মাপ করাে। ভারী হারামীর কাজ করেছি আমি, ভারী হারামীর কাজ—ঝর ঝর করে তার চোখ দিয়ে এক পশলা জল নেমে এল। রামদেইয়া সবিস্ময়ে বললে, একি দোস্ত, একি ? সকালেই বুঝি এক চোট জবর টেনে এসেছে? এই ভােরে এত নেশা করে মানুষ? বৈজু ফোপাতে লাগল না পাঁড়েজী না, না। ভারী অন্যায় করেছি আমি, ভারী তুল হয়েছে। এমন করে সারের সর্বনাশ তাে আমি করতে চাইনি। ভারী তাজ্জব কী বাৎভানী রাতারাতি কামিনী হয়ে ১৩ঃ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ সদার গেল, আর তাকে আমি পৌছে দিলাম কুমার বাহাদুরের রং মহলে। এ-খবর পেলে আমাকে তো আর আন্তো রাখবে পাপীর মর্মস্পর্শী স্বীকারােক্তি রামদেইয়াকে যেন অভিভূত করে দিল ঘন হয়ে বৈজুর কাছে এসে দাড়ালো, সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে সে মূল্যবান রহস্যের সন্ধান পেয়েছে। বৌ পালিয়েছে, এ খবরটাই গােটা মেলাতে • জানাজানি হয়ে গেছে তখন । —এসাে দোস্ত তুমি আমার সঙ্গে, দুটো কাজের কথা আছে। বৈজুকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রামদেইয়া লালাজীর তাবুর দিকে নিয়ে চলে গেল। বারাে ভােরের আলাে ভালাে করে ফোটেনি তখনাে । হিজলবনের ভেতর দিয়ে রাস্তাটায় ঘন অন্ধকার জড়িয়ে রয়েছে, দুপাশে কুঁজি কাটা। আর ইকড় ঘাসে গঙ্গা ফড়িং ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। সমস্ত বনটা নিঃশব্দ আর নিঃসাড়। সারাত হাল্কা বাতাসে ফিসফাস্ করে কথা বলেছে পাতারা, ঘাসের বনের মধ্যে চলা-ফেরা করেছে সাপের দল, বকের বাচ্ছারা কান্নাকাটি করেছে তীক্ষ কণ্ঠে অসহায় মানব শিশুর মতাে। ভােরের ছোয়া লাগতেই রাত্রির জীবন নিস্পন্দ হয়ে গেছে। একটি দুটি করে বক পাখা মেলে উড়ছে অলক্ষ্য বিলের সন্ধানে। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর বনপথটা একটু একটু করে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভানী থেমে দাড়াল —আমার ভয় করছে। কেশােলাল বিরক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু এখনাে সময় হয়নি। সােনা দীঘির মেলা পেরিয়ে ওরা খুব বেশি দূরে আসেনি—দুখানা মাঠের ওপারেই কুমারদহ মাথা তুলে রয়েছে। দিনের আলাে ফুটলেই সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ রাঘবেন্দ্র রায়বমীর রং মহলের ভাঙা চুড়ােটা এখান থেকেই চোখে পড়ত। কেশােলালের এই পথটা তাড়াতাড়িই পেরিয়ে যাবার ইচ্ছে ছিল, একটু জোরে হাঁটতে পারলে বেলা দশটার ট্রেনটাও ধরা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু ভানী হাঁটতে চায় না, কথা বলতে চায়। সাত বছর ধরে অনেক কথা জমে উঠেছে—তার মনে অনেকগুলাে অনুযােগ, অনেক বেদনা। ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেগুলাে শুনে যাচ্ছে কেপােলাল, জবাব দিচ্ছে যথাসাধ্য সংক্ষেপে। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছে নিশি বালাকে। নিশিবালার প্রেম কত মুখর, কত চটুল, কত লীলা চপল। আর আর ভানী! গায়ে বিশ্র দুর্গন্ধ, অমার্জিত চাল চলন, কতদিন যে পঁাত মাজে না। •••মুখ থেকে একটা পচা দুর্গন্ধের তরঙ্গ এসে কেশােলালের ক্ষণিক প্রেমচেষ্টাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছে। তেমনি বিরক্তি গােপন করে কেশােলাল বললে, ভয় করছে কেন? -আমি সঙ্গে আছি, তাের ভয় কিসের? তাছাড়া—গলাটা আর একবার সাফ করে নিলে কেশােলালরাতারাতি এ তল্লাট পার হয়ে যেতে হবে। আমার অবস্থা তাে জানিস, দাবােগা যদি ধরতে পারে তত সহরে নিয়ে ঠিক ফাসে লটুকে দেবে। সেই চৌকীদার ব্যাটাকে ফুড়ে দিয়েছিলাম মনে নেই তাের? তাই গরুর গাড়ীর লিক না নিয়ে জঙ্গলের পথ ধরেছি। -এতদিন পরেও তােমাকে চিনতে পারবে ওরা? -কেন পারবে না? এবারে কেশােলাল ধমক দিয়ে উঠল । তুই চিনলি কেমন করে? পুলিসের চোখ সয়তানের চোখ, সব চিনতে পারে ওরা, সব টের পায়। তুই যদি তাড়াতাড়ি হাঁটতে না পারিস তাহলে চৌকীদার এসে কপ, করে ঠিক ধরে নেবে দেখিস । আমাকেও তােকেও।
১৩
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ
-তােকেও! ভানী চমকে উঠল। না, না, পুলিসের হাতে আর
লে পড়তে চায় না সে। সাত আটবছর আগেকার সে অভিজ্ঞতা
এখনাে ছায়া হয়ে মিলিয়ে যায়নি তার স্মৃতি থেকে।
সে দুঃস্বপ্ন ভানী
কখনাে ভুলবে না। সেই বেঁটে টাকমাথা দাবােগা, শেয়ালের মতাে
চোখ। সেই দাড়িওয়ালা গাড়ােয়ানটা, কুকুরের মত চোখা আঁতগুলাে।
আর কয়েকটা শেয়াল কুকুর-তাদের ভালাে করে মনে পড়ে না
আজকে। কিন্তু এটা স্পষ্ট মনে পড়ে, তারা সবাই মিলে একসঙ্গে যেন
ওকে ছেড়াছেড়ি করে খাবার চেষ্টা করে ছিল।
সৰ কথা সে খুলে বলেছে কেপােলাৰূকে। নির্বোধ বিশ্বাসে স্বামীর
কাছে অকপটে প্রকাশ করে দিয়েছে তার সমস্ত লাঞ্ছনা আর অপমানের
ইতিহাস। শুনে মুহূর্তের জন্যে কেশােলালের মুখ কালাে হয়ে গেছে,
শুধু মুহূতের জন্যে সমস্ত শরীরের রক্তে যেন সাপের বিষের জালা ধরেছে,
ইচ্ছে হয়েছে-
কিন্তু ঐ মুহূর্ত। তারপরেই আর কিছু নেই। শান্ত হয়ে গেছে,
সে, স্তিমিত হয়ে গেছে। রূপপুরের রক্তকে মেরে ফেলেছে নিশিবালা,
নিশিবালার মতাে আরাে অনেকে। সহর আছে, শৃঙ্খলা আছে,
সভ্যতার মােহ আছে। তারা সবাই মিলে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে
কেশােলালকে—আর কেনােদিন সে-ঘুম ভেঙে সে জেগে উঠবে না।
ভানীর কাহিনী শুনে তার মনে আরাে খানিকটা তিক্ত বিস্বাদ চাড়া
আর যাই হক ঘুণে-খাওয়া বাঁশ নিয়ে ঘর বাঁধা
চলবে না কোন উপায়েই।
ভানী বললে, চল তাহলে, তাড়াতাড়িই চলল।
কেশােলালের আসল কথাটা কিন্তু পুলিসের ভীতি নয়। মুখে
কান্তের দাগ পড়েছে, দাড়ি নেমেছে, গলার স্বর বদলে গেছে পর্যন্ত।
তার নাম আজিমুদ্দিন ব্যাপারী। পুলিশের চোখের সামনে সে
দিয়ে উঠেছে ;
••
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ ১৩৭ নিঃসঙ্কোচে ঘুরে বেড়াচ্ছে তিন বছর ধরে। সুতরাং সে ভয় তার নয়। নিশিবালা তাকে উপদেশ দিয়েছে রাতারাতি ভানীকে সহরে নিয়ে গিয়ে নাম লিখিয়ে দিতে। গ্রাম্য ও নির্বোধ মেয়ে, স্বামীকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে, ব্যাপারটা তার ভাল করে বুঝতেও কিছুদিন সময় নেবে। তারপর কেশােলালেরই আয়ের পথ হয়ে যাবে একটা। ভানী টাটকা নতুন জিনিষ, সহরের খদ্দেরেরা একরকম লুফে নেবে তাকে। একটা বিড়ি ধরিয়ে কেশােলাল বললে, তাের ভালাে শাড়ী চাই, না? ভয়াত দৃষ্টিতে ভানী শুধু তাকাচ্ছে চারদিকে। ভােরের আলােয় অবয়বহীন হয়ে এলােমেলাে জঙ্গল নিস্তব্ধ। মাথার ওপর পাতার নিচ্ছিদ্র আচ্ছাদন, পায়ের নীচে ঝরা পাতা মড় মড় করছে, ইকড় আর বিন্না ঘাসের আগাগুলাে থেকে থেকে পা জড়িয়ে ধরছে, সাপের শীতল স্পর্শ বলে সন্দেহ হয়। থেকে থেকে ঝটপট করে উঠছে বক পালিয়ে যাচ্ছে বাদুড়, একটা ডাল ধরে ঝপ করে ঝুলে পড়ছে। কোথাও গাছের কোটরের মধ্যে পেত্নীর আগ্নেয় চোখের মতাে প্যাচার গােল গােল চোখগুলাে জেগে আছে। কাঞ্চন নদীর জল থেকে সকালের ভিজে হাওয়া এসে গাছগুলােতে দোলা দিচ্ছে—যেন ভূতের নিশ্বাস। ভানীর বুকটা ছমছম করছে। কেশােলালের কথায় ভানী চমকে উঠল । শাড়ী- -হ শাড়ী।–বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে কেশােলাল বললে গয়না। চাই তাের ? কিন্তু ভানীর কোনােটাই ভালাে লাগছে না—ভয় করছে। কী বি এই জলটা। কী অস্বাভাবিক অন্ধকার। গাছের শিকড়ে হঠাৎ একটা হোঁচট লাগল তার পায়ে, ভানী দু’হাতে কেশােলাকে গ্রাণপণে জড়িয়ে ধরলে।
১৩ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ । -ভয় কী, আমি তত আছি।এক মুহূর্তের জন্যে কেশােলাল ভানীকে বাহুর আশ্রয় দিলে। সে বলিষ্ঠ বাহু আর নেই—আলী মহম্মদকে ল্যাজা দিয়ে ফুড়ে যে শেষ করে দিয়েছিল, সে মানুষও আর নেই। শুধু বাহুর মােটা মােটা হাড়গুলােই অবশিষ্ট। আর এক মুহূর্তের জন্যেই কোেেলালের মনে লাগল দুর্বলতার ছোঁয়া। সত্যিই কী এর প্রয়ােজন আছে? ভানীকে এমন ভাবে বিলিয়ে না দিলে কি ক্ষতি হবে তার? নিশিবালার আলিঙ্গন মনে পড়ল। কিন্তু তার মধ্যে এমন বিশ্বাসের আন্তরিকতা নেই, এমন নিশ্চিন্ত নির্ভরতার স্পর্শ নেই কোনােখানে। আত্মবিস্মৃতির মত কেশােলাল বললে আমি আছি, কোনো ভয় নেই তাের। সন্তর্পণে ভানীর হাত ধরে সে এগােতে লাগল। একটু একটু করে আলাে ফুটছে—হিজল বনের ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারের ওপর নামছে সূর্যের রঙ। সেই রঙের স্পর্শ কি লাগল কেশােলালের মনে? কিন্তু এ কতক্ষণ ! এই জঙ্গলের পথ শেষ হবে—দুর বিস্তৃত মাঠের সীমা শেষ হয়ে গিয়ে দেখা দেবে রেল ষ্টেশন, রেলগাড়ি, তারপরে শহর। ততক্ষণ কি আত্ম-বিশ্বতির এই ক্ষণিকতা কেশােলালকে আচ্ছন্ন করে রাখবে ? কী জানি। ভানী পথ চলেছে তার স্বামীর সঙ্গে, চলেছে নিশ্চিন্ত নির্ভরে। হিজল বনের অরণ্য পার হয়ে দেখা দেবে পৃথিবীর অরণ্য। সে অরণ্য এমন অহিংস নয় ; সেখানে এখনাে শঙ্খচূড়েরা ফণা মেলে আছে, সেখানে এখনাে বাঘের চোখ জ্বল জ্বল করছে, সেখানে এখনাে নদীর জলে কুমীরের ছায়া ভাসছে নীল মেঘের মতাে। সে অরণ্যে কে কার পথ চেনে। সেই দুর্গম জটিলতার মধ্যেই ভানীকে আজ আমি হারিয়ে ফেলেছি-তার সন্ধান আমি আর বলতে পারব না। নিশীথ-নগরীর সম্রাট ও তো অন্ধকার নেপথ্যে যদি কোনােদিন তাকে দেখতে পাই তাহলে সেই দিন লিখব তার কথা। লালাজীর তাবু থেকে আগুনের মতাে মুখ নিয়ে ফিরল সূরষ । লালাজী ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কামিনীর সন্ধান ঠিক কোথায় গেলে পাওয়া যাবে, সে খবরটা তিনি রূপাপুরের কামারদের ভালাে করে বলে দিয়েছেন। যার টাকা খেয়ে ওরা মেলা ভেঙে দেবার মতলব করেছে সে যে কী জাতের লােক এখন ওরা ভাল করেই দেখুক। ছাড়া লালাজী মৃদু হেসে বলেছেন: কুমার বিশ্বনাথের মতাে অমন দশটা রাজাকে পুষবার ক্ষমতা আজ তিনি রাখেন। ওরা যদি জোয়ানকি দেখিয়েই পয়সা রােজগার করতে চায় তাহলে তিনিও সে সুযােগ দিতে রাজি আছেন। তারও জমি জমা আছে এবং দিয়াড়িয়াদের হাত থেকে পাকা ফসলের ক্ষেত রক্ষা করবার তারও লােক-লস্করের দরকার হয়ে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শােনবার ধৈর্য সুরযের থাকেনি। পাগলের মতাে ছুটে এসেছে সে। এখনি এর শােধ নিতে হবে। জমিদারকে তারা মানা করে তারা তাই বলে তাদের মর্যাদাকে এতটুকু হানি করতে রাজি নয়। রূপপুরের কামারেরা অসম্মান সহ্য করে না কোনােদিন। সুরষ চীৎকার করে ডাকল, সর্দার ? রামনাথের সাড়া নেই। সর্দার কোথায়, তাউই গেল কোথায় ? -এই তাে ঝিম মেরে বসে ছিল এতক্ষণ। কোথায় উঠে গেল? রূপাপুরের বিস্মিত কামারেরা জবাব দিলে । —বৌয়ের খোঁজ পেয়েছি। সর্দারকে দরকার, বড্ড জরুরী দরকার, খোজ তাকে।
"১০০ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ সােনাদীঘির মেলা—চারদিকের সমস্ত সম্ভব অসম্ভব জায়গায় রামনাথের খােজ চলতে লাগল। আতকণ্ঠের চীৎকার ছড়িয়ে পড়তে লাগল : সর্দার, সর্দার, তাউই। কিন্তু সর্দারের তখন সাড়া দেবার উপায় ছিল না। রামনাথকে খুজে পাওয়া গেল না কোনখানে। আর কামারপাড়ার হট্টগােলের সুচনা দেখেই সেখান থেকে সরে পড়ল বৈজু। তার অনেক কাজ। কাউকেই সে বঞ্চিত করবে না- বিশ্বনাথকে নয়, লালাজীকেও না। কাজের মানুষ সে-টাকাটা ভালাে করে বােঝে। হাতে মােটা একটা ছােট লাঠি নিয়ে সে নিঃশবে এগুতে লাগল আমবাগানের মধ্য দিয়ে। দিন দুপুর । এমম কাজের সময় এ নয় । বৈজুর গা শির শির করতে লাগল। হয় মাথা রেখে আসতে হবে, নয় পাঁচশাে টাকা। কিন্তু লালজীর মতলবটা ঠিক সে বুঝতে পারছে না। কুমার বিশ্বনাথ হ'লে একটা কথা ছিল, তার একটা যুক্তিসঙ্গত কারণও খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু একটা অবেলা জীবের ওপর লালাজীর এই আক্রোশ থাক-অত ভেবে তার কী হবে। পাঁচশাে টাকা—বৈজু কিছু আর কল্পনাই করতে পারছে না এখন। এত টাকা কী ভাবে কোন কাজে যে লাগবে, সে তা নিজেই জানে না। তবে একটা জিনিষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার কাছে। রূপপুরের কামারদের কাছে কামিনীর ব্যাপারটা আর চাপা থাকবে না বেশিক্ষণ। যে মুহূতে কামারেরা চড়াও হয়ে রংমহল আক্রমণ করে বসবে ঠিক সেই মুহূর্তেই আক্রোশের বশে বিশ্বনাথ তার নাম প্রকাশ করে দেবেন। তারপর? তারপরে যদি সে কামারদের হাতে পড়ে, তাহলে শকুনে যেমন করে মড়া ছিড়ে ছিড়ে খায়, তেমনি ভাবেই ওকে টুকরাে টুকরাে করে ফেলবে তারা। অতএব সমস্ত ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে ওঠবার আগেই দ্বিতীয় কাজটা শেষ করে ওকে অবিলম্বে টাকা নিয়ে রূপপুরে প্রস্থান করতে হবে, তারপর সেখান সম্রাট ও তো থেকে সােজা কলকাতায় জনারণ্য। তার ওপর লালাজীরও এই আদেশ। সমস্ত জিনিষটাই একটা সুসজ্জিত পরিকল্পনা। মাথা আছে। লালাজীর। আয়ােজনের কোনখানে এতটুকু ফাকি ধরবার কিছু নেই। পাঁচশাে টাকার জন্যে আজ সে দেশ ছাড়ছে। তা সে ছাড়ুক, দেশের ওপর এমন কিছু অমানুষিক আকর্ষণ বা প্রতি তার নেই। সে নিজের কদর বােকে। তার হাতের কাজ টাকশালাকেও লজ্জা দেয়। তা ছাড়া দীর্ঘ দিন উচ্ছঙ্খল বন্যজীবনও, সে যাপন করে এসেছে কলকাতায় মহানগরীর অমৃত আর হলাহল মন্থন করেছে এক সঙ্গেই। আজো সর্বাঙ্গে কতকগুলাে শুকনাে ক্ষত চিহ্ন সে সব দিনের স্মৃতি বহন করে। কিন্তু এবারে সাবধান হয়ে গেছে বৈজু, মাত্রাহীন আনন্দের স্রোতে নিজেকে আর অমন করে ভাসিয়ে দেবে না সে। আর—আর ভানী ? ভানী গেল কোথায় ? মনের দিক থেকে বৈজু কিছুতেই এ সমস্যার একটা সুনিশ্চিত মীমাংসায় আসতে পারছে না। তাকেও খুঁজে দেখতে হবে—কলকাতায় হােক, যেখানে হােক। ভারী ফাকি দিয়েছে ভানী, সে দিনের প্রতিশােধ বৈজু নিতে পারল না। কিন্তু কোথায় পালাবে! যেখানে যাক্, খুঁজে বের করবেই, তবে আপাতত আবার বাগানের মধ্য দিয়ে চোরের মত বৈজু এগােতে লাগল । এই পথটা রাঘবেন্দ্র রায় বর্মার রংমহলের পাশ দিয়ে সােজা চলে গেছে কুমার বিশ্বনাথের আস্তাবল পর্যন্ত। সম্প্রতি সেই দিকেই বৈজুর গতি। হাতের মধ্যে ফাপা লাঠিটার ভেতর শাণিত অস্ত্রটা রাক্ষসের জিভের মতাে লক লক করছে, থেকে থেকে খট খট করে জানান দিচ্ছে নিজের। ওটা লাঠি নয় গুপ্তি। দুহাত লম্বা একটা দীর্ঘ খৰধার ফলা, হাতের ওপর ছোয়াবার আগেই খচ করে কেটে যায় চামড়া। তারই মাথাটা ১৪২ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে এগােচ্ছে বৈজু। ভয়ে শির শির করছে শরীর। কিন্তু কোনখানে জন-মানুষ নেই। দু'পাশে ফণীমনসা আর কেয়াঝােপ, বাতাসে কেয়ার উগ্রগন্ধ ভাসছে। শুকনাে আমের ডাল ঝরে পড়ছে নিজন পথের উপর। রংমহলের এই অভিসার পথ চিরদিনই এমনি অভিশপ্ত। তা ছাড়া সােনাদীঘির মেলায় তুমুল কলরােল। নাগরদোলা ঘুরছে, হয়তাে জমে উঠেছে টিকিধারীর জুয়ার আড্ডাটা। কুমার বিশ্বনাথের লােক-লস্করেরা এখন ওখানেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে আছে। একটা ভাট ফুলের বােপকে চক্কর দিয়ে জন্তুর মত বৈজু রংমহলের পেছনে চলে এল। নিজের পায়ের নীচে ঝরাপাতার শব্দে চমকে উঠল একবার। ব্ৰন্ত চোখে তাকাল চারদিকে। শুধু মাথার ওপর 'একটা নিমগাছে অসংখ্য থলির মতাে ঝুলে রয়েছে হাজার খানেক বাদুড়। আর তালা দেওয়া লােহার দরজার ওপারে আস্তাবলের ভেতর বিশ্বনাথের কালাে ঘােড়াট। পা ঠুকছে। নিমগাছের আড়াল থেকে বৈজু উকি মেরে সহিসের ছােট ঘরটার দিকে তাকালাে। সেটাও তালাবন্ধ, সহিস সপরিবারে গেছে মেলার ওখানে। বৈজু জানে না, কিন্তু লালা হরিশরণ জানেন, এককালে ওই ঘরটাতেই দিন কাটিয়েছে । রামসুন্দর লালা। নিমগাছের আড়ালে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইল বৈজু। না কোথাও কেউ নেই। হাতের ফাপা লাঠিটা পরে সে শিক দেওয়া দরজাটার পাশে এসে দাড়ালাে। চমৎকার কালাে ঘােড়াটা। ঘাড়ের ওপর সিংহের মতাে সমুদ্যত কেশরগুচ্ছ। উল মসৃণ গা থেকে চিক্ চিক্ করে যেন তেল গড়িয়ে পড়ছে। কদমে চলে, “নে চলে, কুমার বিশ্বনাথকে পিঠে বয়ে হাওয়ার সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ '১০৩ মতাে পথ কেটে বেরিয়ে যায়। মহিমা আর শক্তির প্রতীক। কয়েক মুহূত বৈজু স্থির অপলক চোখে ঘােড়াটার দিকে তাকিয়ে রইল। ভারী মায়া লাগছে—ভারী বেদনা বােধ হচ্ছে। কী অপরাধ এই নিরীহ নিবোধ জীবটার! কারাে কোনাে ক্ষতি করে না—সমস্ত জেলায় এমন সেরা ঘােড়া আর নেই। এর চলন দেশে বৈজু নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেছে কতবার। নিজের অজ্ঞাতেই সে পিছিয়ে এল। কিন্তু না—বৈজু চমকে গেল মুহূর্তে। এ দুর্বলতার প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না কোনাে মতেই। রূপপুরের কামারেরা এখনই জানতে পারবে কামিনীকে বিশ্বনাথের হাতে তুলে দেওয়ায় মূলে কে আছে। তারপর দ্বিধা কেটে গেল। নিজের প্রাণকে বলি দেওয়ার চাইতে একটা পশুর প্রাণ নেওয়া অনেক সহজ। তা ছাড়া পাঁচশাে টাকা। বৈজু আবার এগিয়ে এল। নিশ্চিন্তে ছােলা খাচ্ছে ঘােড়াটা, দাড়িয়ে আছে একেবারে দরজার কাছে ঘেসেই। বৈজুকে দেখে একবার শান্ত জিজ্ঞাসায় তার দিকে কালাে কালাে চোখ দুটো মেলে তাকালে, তারপর আবার মন দিলে আহারে। ফস্ করে কঁপা লাঠির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল রাক্ষসের জিভটা। বৈজুর হাতটা শিকের ফাক দিয়ে সজোরে চলে গেল ভেতরে, পরক্ষণেই আকাশ ফাটানাে একটা অতিনাদ করে ঘােড়াটা প্রচণ্ড একটা লাফ দিলে—যেন লােহার দরজাটা ভেঙ্গে বৈজুর ঘাড়ের ওপরে এসে পড়বে। হাতে একটা প্রবল ঝাঁকুনি লাগলাে। ঘােড়ার বিদীর্ণ হৃৎপিণ্ডের ভেতর থেকে রক্তাক্ত গুপ্তিটা ছিটকে বাইরে চলে এলাে—ফিনকি দিয়ে ছড়িয়ে পড়লাে একরাশ সতেজ রক্ত। তারপরেই আর একবার আতনাদ করে কালাে ঘােড়াটা চারপা বিস্তার করে দিয়ে পড়ে গেল মাটিতে। মুখের দুপাশ দিয়ে সাদা ফেনার সঙ্গে সঙ্গে আধ চর্বিত একরাশ ছােলা গড়িয়ে ১৪ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ পড়লাে, চোখে চিক চিক করতে লাগলাে জল-ফোয়ারার মতাে উচ্ছসিত ধারায় রক্ত ছুটে ঘটাকে ভাসিয়ে দিতে লাগলাে। পিছনেই কাঞ্চন নদীর জল ভাদ্রের ভরা বানে খরস্রোতে বয়ে যাচ্ছে। রক্তাক্ত গুপ্তিটা জলের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বৈজু দ্রুত পদক্ষেপে সেখান থেকে ছুটে পালালাে। তার সময় নেই, একবিন্দু সময় নেই। এখনই লালাজীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাকে কুমারদহ ছাড়তে হবে, রূপপুর ছাড়তে হবে। পাঁচশাে টাকা। পারিশ্রমিকটা মন্দ নয়- জীবনকে আবার সে নতুন করে আৰম্ভ করতে পারবে, নতুন পারি- পাখিকের মধ্যে, নতুনতর কর্মক্ষেত্রে। রংমহলে একটা তাকিয়া আঁকড়ে পড়েছিলেন বিশ্বনাথ। দু' তিনটে শূন্য মদের বােতল আশে পাশে গড়াগড়ি দিচ্ছে তখনাে । ব্যোমকেশ উঠে গেছে ভাের বেলাতেই। সমস্ত রাত্ৰিৰ বীভৎস ঝড়ের পরে পাশে লুটিয়ে পড়ে আছে কামিনী-তার মুখে কাপড়টা তখনাে শক্ত করে বাঁধা। তার সমস্ত চেতনা অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্নের মধ্যে মুছিত। আর স্বপ্ন দেখছেন বিশ্বনাথ । কিসের স্বপ্ন ? এই ভাঙ্গা রংমহলে- দেওয়ালের গায়ে যেখানে বহু বিচিত্র ছবিগুলাে অর্থহীন নীল শ্যাওলার এলােমেলাে দাগে প্রায় মুছে গিয়েছে ; ছাদ থেকে চুইয়ে যেখানে অজস্র ধারায় নেমেছে বর্ষার জল, ফাটলের ভেতর দিয়ে বটের শিকড় যেখানে প্রত্যাসন্ন মৃত্যুর জটিল জাল বিস্তারের মতাে আত্মপ্রকাশ করছে আর ছিন্নবিছিন্ন কাশ্মীরী কারপেট পুঞ্জীভূত একরাশ ধুলাের মতাে জড়াে হয়ে রয়েছে সেখানে কী স্বপ্ন দেখছিলেন কুমার বিশ্বনাথ ? একদিন নয়—দুদিন নয়—দেড়শাে বছর। জরির আচকান পরা রাঘবেন্দ্র রায় বর্মা। উন্নত দীর্ঘ দেহটা একটা আগুনের শিখার মতাে অলছে। রূপাের পান পাত্রে টলমল করছে ফেনিল ।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ১৪৫ ঝাড় লণ্ঠনের আলােয় লালসার সুতীব্র দীপ্তি। সরযূ বাইজীর উচ্ছঙ্খল নৃত্য চলেছে অসংযত পদক্ষেপে-গায়ের স্বচ্ছ বস্ত্রাবরণ সরে গিয়ে দেহবল্লরী বিদ্যুৎ প্রভার মতাে পূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর বাঘের মতাে মানুষগুলাের শিরায় শিরায় উদ্দাম কামনার রক্তধারা আরণ্য-ছন্দে নেচে উঠছে। ঝন্ঝন্ঝন্। নেশার ঝোকে কে একটা সুরাপাত্র ছুঁড়ে মেরেছে ঝাড়-লণ্ঠনের দিকে। ঝন্ঝন্ঝ। অসংখ্য ভাঙ্গা কঁাচচার দিকে বৃষ্টির মতাে ছড়িয়ে পড়লাে। তারপরে অন্ধকার। অন্ধকারের একটা অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গের মধ্য দিয়ে দেড়শাে বছর নিঃশব্দে পার হয়ে গেল। তারপর ঝনঝন-ঋন- কুমার বিশ্বনাথ চমকে জেগে উঠলেন। ভাঙা রংমহলের বন্ধ দরজায় ক্রমাগত করাঘাত পড়ছে। জানালার ফাক দিয়ে সূর্যের প্রচুর আলাে এসে সমস্ত মুখ চোখকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে যেন। এক মুহূর্তে মনে পড়ে গেল রাত্রিটাকে। চোখে পড়ল দেওয়াল ঘেসে একটা নিঃসাড় আর নিস্তব্ধ মাংসস্তুপ। নিঃশ্বাসে কঁপছে—এখনাে মরেনি । বিদ্যুৎবেগে বিশ্বনাথ উঠে বসলেন। তীব্রস্বরে বললেন, কে ? দরজায় খিল দেওয়া ছিল না। পরক্ষণেই সবেগে খুলে গেল সেটা। সামনে এসে দাড়িয়েছে মতিয়া—অমানুষিক ভয়ে তার চোখ দুটো বিস্ফারিত । তার হাত পা থর থর করে কাপছে, আর তার পেছনে ? নিজের চোখকে বিশ্বনাথ বিশ্বাস করতে পারলেন না। অপর্ণা? —হ আমি।—অপর্ণার চোখে আগুন। সেই শান্ত পাঠরতা মেয়েটি—বিশ্বনাথ যাকে দুর্বোধ্য বলে জেনে এসেছেন চিরদিন, নিজের ১৪৬ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ পৌরুষের গর্বে যাকে কোনােদিন স্বীকার করতে চাননি তিনি। সেই অপর্ণার চোখে এ কিসের দৃষ্টি ? -কী চাও তুমি? আড়চোখে একবার কামিনীর দিকে তাকিয়েই বিশ্বনাথ প্রমিত হয়ে উঠলেন : এখানে কে আসতে বলেছে তােমায় ? -কে বলেছে ? কঠিন দৃষ্টিতে বিশ্বনাথের সমস্ত পৌরুষকেই যেন অবজ্ঞা করে গেলেন অপর্ণা । বললেন, শুনতে পাচ্ছ ? কী করেছ তুমি ? বিশ্বনাথ কান পাতলেন। হাঁ, শুনতে পাচ্ছেন তিনি। অনেক- গুলাে কণ্ঠে উদ্দাম কোলাহল । সােনাদীঘির মেলা থেকে কলরব ? না। তার সিংহ দবজার কাছে দাডিয়ে অনেক মানুষ প্রাণপণে চীৎকার করছে। প্রাপ্য শিকারের জন্যে যেন সমস্বরে দাবী জানাচ্ছে একদল হিংস্র বন্য জন্তু। বিশ্বনাথ শুধু নিবোধ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ঘাের এখনাে ভালাে করে কাটেনি,স্নাযুগুলাে এখনাে শিথিল আর শৃঙ্খলাহীন-কোনাে কিছুকেই স্পষ্ট করে বুঝতে পারছেন না—গ্রহণ করতেও পারছেন না। অপর্ণা বললেন, ওরা কারা জানাে ? রূপপুবের কামারেরা ! যাদের তুমি মেলা ভাঙবার কাজে লাগিয়েছিলে তারাই আজ তােমার মাথা ভাঙবার জন্যে এগিয়ে এসেছে। গভীর বিস্ময়ে বিশ্বনাথ বললেন, কেন ? -ওদের সদরের বউকে তুমি কেড়ে নিয়ে এসেছ। তােমার লােভের গ্রাসে তাকে গিলে খেয়েছ তুমি। যে অস্ত্রে তুমি বেনের বাচ্ছাকে শেষ করবার মতলব করেছিলে, সে অস্ত্র আজ তােমার দিকেই ছুটে এসেছে। ওরা কী করতে এসেছে জাননা? যন্ত্র-চালিতের মতাে বিশ্বনাথ বললেন কী করতে ? -তােমার ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দিতে, আমাকে চূড়ান্ত অপমান করতে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী
১৪৭
কয়েক মুহূত সব কিছু নিস্তব্ধ। নিজের মূঢ়তার অপমানে আজ
কুমার বিশ্বনাথের মাথা নত হয়ে গেল। দেবীকোট রাজবংশের রক্তে
এই প্রথম এল অনুতাপের স্পর্শপাত। দূরে প্রবল কোলাহল। মানুষের
বিক্ষোভ ঝড়ের মতাে ভেঙে পড়বার জন্য এগিয়ে আসছে।
অর্পণা পাংশুমুখে বললেন, শুনছ আর সময় নেই।
স্থির হয়ে দাড়ালেন বিশ্বনাথ। চকিতে নিজের কতব্য স্থির করে
নিলেন।
-মতিয়া!
-হুজুর!
-আমার ঘােড়।।
অর্পণা বললেন ঘােড়া দিয়ে কী হবে?
-কাজ আছে। মতিয়া
-যাচ্ছি হুজুর। ভয়াত পদক্ষেপে মতিয়া গেল ঘােড়র সন্ধানে।
অর্পণার চোখে ঘৃণার চিহ্ন ফুটে উঠল জলন্ত হয়ে : ঘােড় নিয়ে কী
করবে? পালাবে ?
-পালাব! বিস্ফোরকের মতে ফেটে পড়লেন বিশ্বনাথ : কেন
পালাব? দেবীকোট রাজবংশ পালায় না কোনদিন। কতগুলাে কামারের
ক্ষ্যাপামিকে শায়েস্তা করবার ওষুধ আমার জানা আছে।
কী করবে?
-থানায় খবর দেব, পুলিশ নিয়ে আসব।
অপর্ণা সব্যঙ্গে
বললেন, চমৎকার,পপৗরুষ প্রকাশের এটা
একটা সত্যিকারের রূপ বটে।
বিশ্বনাথ গজন করে উঠলেন, অপর্ণা তুমি থামাে। আমার কাজ
আমি জানি, তােমার উপদেশ শােনবার সময় আমার নেই।
অপর্ণা তেমনি ব্যঙ্গের হাসিটাকে মুখের ওপর টেনে রেখেই বললেন,
১৪৮ সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী কিন্তু থানায় যাওয়ার সময়ও আর নেই। ওরা তােমার রংমহলের দিকেই ছুটে আসছে এখন। তাই বটে। দূরের অরণ্যকে ভূশায়িত করে দিয়ে ভৈরব হুঙ্কারে এগিয়ে আসছে ঝড়। ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বেরিয়ে যাওয়ায় পথও আর নেই। পালাতে হলে এখন ওদের ভেতর দিয়েই পথ করে নিতে হবে। ক্ষুব্ধ আক্রোশে ঠোট কামড়ালেন বিশ্বনাথ । অপর্ণা বললেন, কেন তুমি এমন করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনলে? কেন তুমি এ কথা ভুলতে পারেনা যে তিনশাে বছর আগেকার পৃথিবী আজ সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়েছে ? এ যুগ লালা হরিশরণের -কোন অস্ত্র, কোন রাজার ক্ষমতা নেই আজ তাদের হারিয়ে দিতে পারে। পৃথিবীর চারদিকে তারা মাকড়সার মতাে জাল ছড়াচ্ছে, গ্রাস করে নিচ্ছে রাজাকে, গ্রাস করছে প্রজাকে। এদের লােভের মুখে কারাে রক্ষা নেই—রাজারও নয়, প্রজারও নয়। আজ যদি বাঁচতে চাও, তা হলে তিনশাে বছর আগেকার ইতিহাস ভােলাে, নেমে এস তাদেরই দলে যারা অপর্ণা কথাটা শেষ করতে পারলেন না। মতিয়া ছুটে এসেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে অরুদ্ধ কণ্ঠে বললে, সর্বনাশ হয়ে গেছে রাণী মা । —সব নাশ ! -হঁ৷ রাণী মা। কালাে ঘােড়াটাকে কে খুন করেছে। ঘরের মধ্যে ঢেউ খেলে যাচ্ছে রক্তের, তার মধ্যে মরে পড়ে আছে ঘােড়াট।। -খুন করেছে ? একটা আত চীৎকার করে বিশ্বনাথ মেঝের ওপর বসে পড়লেন। যেন শাণিত একটা অস্ত্র এসে বিঁধেছে তারই বুকের কোথায় গেল দেবীকোট রাজবংশের অনমনীয় আগ্নেয়-প্রতাপ, তার শক্তির দম্ভ ? অদূরে যে বিক্ষুব্ধ জনতার কোলাহল মৃত্যুর মতাে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী ১৪৯ এসে ভেঙে পড়বার উপক্রম কবেছে সে দিকেও বিশ্বনাথের লক্ষ্য বইল । -মরে পড়ে আছে ? আমার কালাে ঘােডাটা ? বাইরের প্রচণ্ড কোলাহল রং মহলের দরজায় এসে পৌঁছেছে। বাঘবেন্দ্র বা বমব বিলাসভবন থরথব কবে কেঁপে উঠেছে একেবারে ভিত্তিব শেষ প্রান্ত পর্যন্ত । তিনশো বছবের ব্যাভিচার আর পাপেব আজ কি চরম প্রায়শ্চিত্ত। কিন্তু বিশ্বনাথ দুহাতে মুখ ঢেকে চুপ করে বসে বইলেন, তার চোখ থেকে টপ টপ কবে জল গড়িয়ে পভতে লাগল কুমার বিশ্বনাথেব চোখে জল । মতিযা দেওয়ালে ঠেশান দিয়ে দাডিযে বইল মড়ার মতাে নিঃসাড় হযে আর অপর্ণা আতঙ্ক পাণ্ডুর মুখে এক একবার খানিকটা বক্তোচ্ছাস এসে সবে যেতে লাগল। ব্যোমকেশ ? দেউডিব দাবােয়ানেবা, আব সবাই ? সময় বুঝে তাব। নিবাপদ জায়গাতেই আশ্রয় নিয়েছে। মনিবের জন্য সব কবা চলে, কিন্তু রূপাপুবের বাঘা কামাবদেব হাতে প্রাণ দেওয়া চলে না- হঠাৎ কী যেন মন্ত্রবলে বাইবেব কলরবটা নিঃশব্দ হযে গেল। ঝন ঝন শব্দ করে আবাব খুলে গেল বংমহলেব দরজাটাঘবে ঢুকলেন লালা হবিশবণ। তার পেছনে পেছনে অনুগত বিশ্বস্ত কুকুরের মতাে বামদেই। ঘবেব সকলকে চমকে উঠবাব সুযােগ না দিয়েই লালাজী এক গাল হাসলেন। বললেন, নমস্তে রাজাবাহাদুর, নমস্তে রাণীমা। গােলাম মেলায় এসেছে সকালে। এই বিশ্রী গােলমালের খবরে আব স্থির থাকতে পাবলাম না। হাজার হােলালাজী আবার চরিতার্থ হাসিতে মুখখানাকে একেবারে উদ্ভাসিত করে দিলেন : রাজবাডির খেয়েই আমবা মানুষ তাে। তাই ওদের তিনশাে রূপেয়া বকশিস দিযে চুপ করিয়ে দিলাম। রাজা বাহাদুর মেয়ে মানুষটাকে ফিরিয়ে দিলেই ঝামেলা মিটে যাবে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ তিন জোড়া নিৰ্ণিমেষ চোখ লালাজীর মুখের দিকে তেমনি অর্থহীন ভাবেই তাকিয়ে রইল। লালাজী আবার বলে চললেন, ছােট লােক নিয়ে কারবার, ভারী ঝকমারী, ভারী ঝকমারী। কিছুতে কি বুঝতে চায় ! বললাম, কুমার বাহাদুর দেবতার বংশ। ওঁর ভােগে লাগলে ময়লা হয় না। হুজুরের হয়ে আমি তিনশশ রূপেয়া ধরে দিচ্ছি, জ্ঞাতগুষ্টিকে খাইয়ে মেয়েটাকে জাতে তুলে নে। ঘরের মধ্যে তেমনি স্তব্ধতা বিরাজ করতে বাইরে লাগল।. জনতার গুঞ্জন। -তা কথা শুনল। আর যদি না শুনত—জামার পকেটে হাত পুরো লালাজী বের করলেন রিভলভারটা : এটা লাগাতে হােত হুজুরের সেবাতেই। কিন্তু আমরা ব্যবসাদার মানুষ, টাকাপয়সা দিয়েই গণ্ডগােল মেটাতে ভালােবাসি, খুন-খারাপীটা তেমন পছন্দ হয় না। আমাদের গায়ে তাে রাজা-রাজড়ার লৌ নেই কী বলেন? লালাজী আবার প্রসন্ন অর বিগলিত হাসি হাসলেন। বিশ্বনাথ, আবার মুখ লুকোলেন। মতিয়া পাথরের মতাে স্তব্ধ। অপর্ণার দুচোখ থেকে শুধু আগুন ছড়িয়ে পড়তে লাগল। তেরাে আজ সত্যিকারের পরাভূত মন আর দেহ নিয়ে অপর্ণার ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন বিশ্বনাথ। কোনদিকে সেন এতটুকু আলাে দেখা যাচ্ছে- । • এতদিন পরে যেন নিজের মধ্যে কুমার বিশ্বনাথ অনুভব করেছেন, রাঘবেন্দ্র রায়বমার রক্ত শুধু পুড়িয়েই শেষ করে দিতে পারে; নিজের সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ যুগসঞ্চিত অগ্নিজালায় দাহন করে নিজেকেই টেনে নিতে পারে ধ্বংস আর অপমৃত্যুর মধ্যে। যে অস্ত্র সে শত্রুর জন্যে শাণিত করে রাখে, সে অস্ত্র এসে নির্মম আঘাত করে তারই বুকে। কেন এমন হল! কেন এমন হয় ? এ কি কেবল লালা হরিশরণের জন্যেই ? তা তাে নয়। তার দুর্বলতার রন্ধ, বয়েইতাে-শনি-গ্রহের মতাে হরিশরণের আবির্ভাব ঘটে। রূপপুরের কামরেরা। তাদের সঙ্গে যা সম্পর্ক সেটা যে এই ভাবে রূপান্তর নেবে একথা কি কোনােদিন কল্পনা করতে পেরেছিলেন বিশ্বনাথ ? আজ কি সবচেয়ে বড় দরকার নিজেকে জয় করা? একথা কি সত্যি যে দেবীকোট রাজবংশের রক্তধারার শৃঙ্খলে বিশ্বনাথ বন্দী, আর সেই শৃঙ্খলের অনিবার্য নিষ্ঠর আকর্ষণে তিনি তার অন্যান্য প্রাক-পুরুষের মতাে নেমে যাচ্ছেন আত্মহত্যার অতল গহ্বরে ? নিজেকেই জয় করতে হবে ? কেমন করে? বিশ্বনাথ জানেন না। মাথার কাছে চুপ করে বসে ছিলেন অপণ। বললেন, ঘুমােবে ? -না। -চা খাবে একটু ? -না। করুণ আর শান্ত চোখে অপর্ণা বিশ্বনাথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সত্যি বলতে কী, এতদিন স্বামীকে এতটুকু শ্রদ্ধা করতে পারেন নি তিনি। নির্বোধ বর্বরতার প্রতীক, সামন্ত-তন্ত্রের ঘুণ ধরা কঙ্কাল। পার্টি অফিসের অপর্ণা, ভুখ মিছিলের অপণ। নিজের মধ্যে বিদ্রোহের তাপ অনুভব করেছেন। কতবার ইচ্ছে হয়েছে সব ভেঙেচুরে তিনি বেরিয়ে যান, ঝাঁপিয়ে পড়েন নিজের কাজের মধ্যে, নিজের ব্রতের মধ্যে। কিন্তু তার পরেই মনের এই দুর্বলতাকে শান্ত করেছেন তিনি। এ স্বার্থপরতা— এ ফাঁকি। বিশ্বনাথকে নিজের স্বামীকেই যদি তিনি জাগিয়ে তুলতে সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ না পারেন তা হলে পৃথিবীকে জাগিয়ে তােলবার অধিকার তার কোথায় তিনি ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রলােভী সুলভ ঝােম্যান্টিক নােরা মন, আইরীন তার আদর্শ নয়। তাই তিনি প্রতীক্ষা করেছেন, অসীম ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করেছেন। একদিন মশালের মতাে নিজেকে জ্বালাতে জ্বালাতে নির্বাপিত অবস্থায় বিশ্বনাথকে তারই কাছে ফিরে আসতে হবে আর সেদিনই আস র যােগ। আজ বিশ্বনাথের ক্লান্ত-করুণ মুখখানার দিকে তাকিয়ে অপূর্ব একটা স্নেহের তরঙ্গে অপণার মনটা যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল। ভারী ভালাে লাগল। প্রেম ? না প্রেম নয়। অসহায় শিশুর ওপরে মাতৃত্বের স্নেহছায়া। এতবড় বিরাট পুরুষটা কী অদ্ভুত ভাবে নিরুৎসাহ আর মেরুদণ্ডহীন হয়ে লুটিয়ে পড়েছে। লালাজীর হাসিটা মনের সামনে থেকে থেকে ভেসে উঠছে : আমাদের শরীরে তাে আর রাজা রাজড়ার লৌ নেই, কী বলেন? পাশার দানে লাল হরিশরণ জিতে নিয়েছেন। এর পরে সব সহজ। বিজয়ের অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস। লালাজীর কাছ থেকে লাটের কিস্তি দেবার জন্য টাকা নিয়েছিলেন বিশ্বনাথ। কাল সারাদিন রাত যে উন্মত্ত ঝড় বয়ে গেছে তার মধ্যে যে টাকা সদরে পাঠানাে হয়েছে কিনা, সে সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তার ফল ? কিন্তু কী হবে ওসব ভেবে ? লালাজীই লাটে কিনে নেবেন। অজগরের শেষ পাকে মুমু পশুর নাভিশ্বাস আসবে ঘনিয়ে। তার পর? তারপর আর কিছুই নেই। কিন্তু অপণ অনুভব করলেন, তিনি আছেন, আরাে অনেকে আছে যাদের রাশি রাশি নিঃশব্দ তলােয়ার পৃথিবীর চারদিক থেকে উদ্যত হয়ে উঠেছে--কুমার বিশ্বনাথদের টেনে নামাবার জন্যে, লালা হরিশরণদের অধিকারকে সমূলে উৎপাটন করবার জন্যে। বিশ্বনাথ বললেন, চাদরটা আমার গায়ে টেনে দাও অপর্ণা। শীত করছে। বােধ হয় বর আসবে। ।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী জ্বর আসবে? অপর্ণা বিশ্বনাথের কপালে হাত রাখলেন। আর আসা অসম্ভব নয়। সুয়ে পড়ে স্বামীর কপালে আলগা একটি চুম্বন দিলেন তিনি। বললেন, না কিছু হবে না। ক্লান্ত শিশুর মতাে অসীম অবসাদে চোখ বুজলেন বিশ্বনাথ। বিছানার কাছ থেকে ধীরে ধীরে সরে এলেন অপর্ণা। দাড়ালেন জানালার সামনে। দূরে সােনাদীঘির মেলা নিরুপদ্রব, আনন্দ-মুখরিত। এখানে যা হয়ে গেছে তার তিল মাত্র ছোঁয়া যেন ওখানে গিয়ে পৌছােয়নি, এতটুকু আলােড়িত করে তােলেনি কোনােকিছুকে। মাথার ওপরে নাগরদোলা ঘুরছে। লালাজীর তাবুর ওপরে উড়েছে বিজয়ী মহারাজার স্পর্ধিত পতাকা। বিকালের আলােয় নিশানের টকটকে রংটা চুণীর মত উজ্জ্বল। ওই দিকে তাকিয়ে তার চোখ জ্বালা করতে লাগল, জল এল। এক মুহূত স্থির হয়ে জানালার গরাদে ধরে দাড়িয়ে রইলেন তিনি। যে কথা তিনি বিশ্বনাথকে বলেছিলেন, তাঁর মনের কানেই সেটা যেন ঝঙ্কৃত হয়ে উঠল : তুমি একা কেন? এদের মধ্যে নেমে এসাে, এরা সবাই তত তােমারই দলে। অপর্ণা পিছন ফিরলেন। বিশ্বনাথের চোখ দুটি মুদ্রিত। হয়তাে ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি। গায়ে হাত রেখে অপর্ণা দেখলেন বিশ্বনাথের জ্বর এসেছে, চাদরটা সযত্নে গলার নীচে গুজে দিতে বিশ্বনাথের উত্তপ্ত দীর্ঘ নিশ্বাস তার হাতে লাগল। স্বামীর চোখের কোণ দুটো কি ভিজে গেছে ? নীচের ঠোটটাকে কামড়ে ধরে কয়েক সেকেণ্ড কী ভেবে নিলেন অপর্ণা। তার পরে সােজা নেমে গেলেন একতলায়। লালাজীর ভদ্রতা সীমাহীন। খবর দিতেই তিনি এলেন । বাইরের ঘরে হাতের ওপর মুখ রেখে অপর্ণা চুপ করে বসেছিলেন। ঘরে ঢুকেই যেন চমকে গেলেন লালাজী। অপর্ণার পরনে টকটকে ১৫৪ সম্রাট ও শ্ৰেষ্ঠী লাল গাঢ় রঙের সাড়ী। কাণের বালা দু’টোতে দুখণ্ড লাল পাথর জ্বলছে। অনিন্দ্য সুন্দর দেহের বর্ণে আর মুখশ্রীতে প্রখর একটা দীপ্তি বিচ্ছুরিত। সবটা মিলে যেন অপূর্ব একটা আগ্নেয় সৌন্দর্য। লালজী বললেন, নমস্তে। অপর্ণা প্রতি-নমস্কার করে সহজ সরল দৃষ্টিতে লালজীর দিকে তাকালেন। সে-দৃষ্টিতে সংকোচ নেই, প্রথম পরিচয়ের জড়তা নেই কোথাও। বললেন, দয়া করে বসবেন একটু ? সামান্য গােটা কয়েক কথা ছিল আপনার সঙ্গে। লালাজী বললেন, বিলক্ষণ, বিলক্ষণ। আপনারা মনিব, যা হুকুম করবেন- অপর্ণার গলার স্বর তীক্ষ হয়ে উঠল : বিনয় করবার কোনাে দরকার • আছে কি? আজ যে কে মনিব, আর কার ক্ষমতা কতখানি সে তাে আপনি নিজেই সব চাইতে ভালাে করে জানেন। লালাজী আবার চমকে উঠলেন। অত্যন্ত আশ্চর্য লাগল তঁার। মেয়েদের মুখ থেকে এ ধরণের কথা শােনবার অভ্যাস তঁার নেই। জাতীয় মেয়ের সংশ্রবে তিনি আসেননি কোনাে দিন। নীরবে আসন নিলেন লালাজী। চোখের দৃষ্টি সংকুচিত করে তিনি অপর্ণাকে লক্ষ্য করতে লাগলেন, বলুন। -আপনি একটু উপকার করুন। লালাজী মনে মনে হাসলেন। সম্রাটের পূর্ণ পরাজয়। নিজে আর লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছে না, তাই স্ত্রীকে দিয়ে করুণা ভিক্ষা করছে। আমাকে বাঁচাও, রক্ষা করাে। তা লালাজী বাঁচাতে পারেন, রক্ষা করতেও পারেন। দশ পনেরাে হাজার টাকা কিছুই নয় তার কাছে। আর তা ছাড়া-তা ছাড়া একেবারে অকৃতজ্ঞ হওয়াও তাে কোনাে কাজের কথা নয়। কুমারদহের ঋণ সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে অধম হবে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ শুধু খান রামসুন্দর লালা যে দিন রাঘবেন্দ্র রায়বমার বাড়ীতে ঘােড়ার চাল শেখাবার চাকরী পেয়েছিলেন, সেই দিনই নবীপুরের গােড়া পত্তন। আর রাজা হওয়া ভারী হাঙ্গামার কাজ। অনেক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক যুদ্ধ করতে হয়। তার চাইতে—কুমারদহকে আবার বাঁচবার সুযােগ দিয়ে তাঁর অনুগ্রহধন্য করে রাখলে কেমন হয় ? কয়েক খতের ব্যাপার। পুড়িয়ে ছাই করে দিলেই মিটে যায় সমস্ত। দশ পনেরাে হাজার টাকা? সে ক্ষতি তার কাছে পাঁচটা টাকা হারানাের চাইতে বেশি নয়। দাক্ষিণ্যের প্রসন্নতায় লালাজীর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। লােক খারাপ নন তিনি—দুতিনটে ধমশালা করে দিয়েছেন নানা তীর্থ স্থানে। সেহ মিগ্ধস্বরে বললেন, কী বলবেন, বলুন। কাপড়ের ভেতর থেকে একটা পুটলি বের করলেন অপর্ণা। তারপর লালাজীকে বিস্মিত হওয়ার অবকাশ মাত্র না দিয়েই ঝর ঝর করে এক রাশ জড়ােয়া গহনা ঢেলে দিলেন টেবিলটার ওপরে। খুব বেশি নয়—বিশ্বনাথের অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়ে যৎসামান্য এই অবশিষ্ট। অপর্ণা বললেন, এগুলাের দাম কত হবে বলতে পারেন? লালাজী চমকে উঠলেন : কেন ? -একটু দরকার আছে। বলতে পারেন, কত দাম হবে এদের ? চকিতে একটা সন্দেহে হরিশরণের মনটা পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। অপর্ণা ভেবেছেন কি ? এই এক মুঠো গয়নার সাহায্যেই হরিশরণের সমস্ত ঋণ শােধ করবার আশা তিনি রাখেন নাকি? হাসিও পেল, দুঃখও হল। -কত আর হবে? তিন চারশাে টাকা হতে পারে বড় জোর । লালাজীর অনুমানের ধার দিয়েও গেলেন না অপর্ণা। -তা হলে দয়া করে এগুলাে নিয়ে যান আপনি। আপনার ঋণ শোধ করবার দাবী নেই, সে আপনি নিজেই আদায় করে নিতে জানেন ।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ রূপপুরের কামারদের যে টাকাটা আপনি খেসারত দিয়েছেন, এ সেই টাকা তার বেশি কিছুই নয়। -এর মানে? লালাজী যেন আঘাত খেলেন একটা ? এ টাকাটা তাে আমি চাইনি। মনিবের জন্য সামান্য কিছু করেছি সাধ্যমত, তাই বলে কি আর– -আপনি চাকরের উপযুক্ত কাজ করেছেন, তাতে আর সন্দেহ কী ? আপনি আমাদের ঘােড়ার সহিমের বংশধর, সে হিসাবে এটা আপনার কতব্য নিশ্চয়ই। কিন্তু অপর্ণার কণ্ঠস্বরে বিষ ছড়িয়ে পড়ল। চাকরের দান নিয়ে ধন্য হতে কুমারদহ আজো লজ্জা বােধ করে। সে সদাশয়তা আর করুণার স্নিগ্ধতায় লালাজীর মন পরিপূর্ণ হয়ে ছিল এতক্ষণ, অপর্ণার নিষ্ঠুর আঘাতে সে মােহের জাল মুহূতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চাকরের উপযুক্ত কাজ! ঘােড়ার সহিসের বংশধর। অপমানে লালাজীর সমস্ত মুখ কালির মতাে কালো হয়ে উঠল। নাক কান দিয়ে আগুনের দীপ্তি যেন ছড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি, লাল। হরিশরণ ! সারা বাংলাদেশে নাম—স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। কলকাতার বিবেকানন্দ রােডে তার আকাশ ছোয়া প্রাসাদের দ্বারাে- ঘাটন করেছেন বাংলার গবর্ণ স্বয়ং। স্থির বজ্রগর্ভ দৃষ্টিতে হরিশরণ অপর্ণার দিকে তাকালেন। অবচেতন মন থেকে সুস্পষ্ট সাড়া উঠল । এ তঁার নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বনাথ সরে গেলেন রঙ্গমঞ্চ থেকে, এবার অপর্ণার সঙ্গেই তার বােঝাপড়া করতে হবে। অপূর্ব এই আগ্নেয় সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে হরিশরণের মন আশঙ্কায় ভরে গেল, সংশয়ে পীড়িত হয়ে উঠল। গলার স্বরে তিক্ত বিদ্রুপ মিশিয়ে হরিশরণ বললেন, চাকরের দান এই খানেই শেষ নয়, এ খবর রাণীমা বােধ হয় জানেন না।
ম্রাট ও শ্রেষ্ঠী তেমনি ঘৃণাভরেই অপর্ণা বললেন, না জানি না। কিন্তু ঋণের কথা জানি। সােনাদীঘির মেলা থেকে আরম্ভ করে সব দিক দিয়েই সে টাকা আদায়ের চেষ্টা চলেছে। সেই পাপেই আলকাপ দলের একটা নিরীহ লােক প্রাণ দিয়েছে, আমার স্বামীর কালাে ঘােড়াটাকে খুন করা হয়েছে। মহাজন তার প্যাচের পর প্যাচ বসিয়ে যথাসর্বস্ব গ্রাস করবার চেষ্টা করছে—অসহায় খাতকের কোন উপায় নেই বলে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন লালাজী। লালাজী ঠোঁটের ওপরে দাত চেপে অপর্ণার দিকে তাকালেন। -মনিবের হয়ে বকশিস করবার বা খেসারত দেবার অধিকার চাকরের কোন দিন থাকে না। কাজেই ওই গয়নাগুলাে আপনি নিয়ে যেতে পারেন। আর রাজা চিরদিনই রাজা; বানরকে সােনার মুকুট পরিয়ে সিংহাসনে বসালেই সে রাজা হয় না। -বেশ। সমস্ত সংযমের গণ্ডী হারিয়ে গুলি-খাওয়া বাঘের মতাে হরিশরণ লাফিয়ে উঠলেন। কঠিন থাবার মধ্যে আঁকড়ে ধরলেন গয়নাগুলাে। বললেন, নমস্তে । -নমস্কার। জুতাের শব্দে ঘর কঁপিয়ে লালাজী বেরিয়ে গেলেন। দরজার গায়ে আবার খটাস্ করে শব্দ করলে পকেটের রিভলভারটা—কী একটা কথা যেন বার বার হরিশরণকে মনে করিয়ে দিতে চায়। মুঠিভরা গহনাগুলাে অবহেলা ভরে তিনি পকেটের মধ্যে ফেলে দিলেন, সােনায় লোহায় একসঙ্গে ঝম ঝম করে বাজতে লাগল একটা বিচিত্র শব্দ, মৃত্যু আর রূপ যেন মিশেছে একসঙ্গে। একি অপর্ণারই প্রতীক? বাইরে সিউ পাড়ে দাড়িয়ে ছিল প্রতীক্ষায়। হরিশরণের ওপর চোখ পড়তে সে চমকে গেল। মনিবের এমন মুখ সে কখনাে দেখেনি। যেন ঝড়ের আকাশের মতাে ভেঙে পড়বার জন্যে থম থম করছে।
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ জুতাের তলায় কর।-পাতাগুলােকে মাড়িয়ে লক্ষ্মীহীন রাজবাড়ীর ভাঙা পথ দিয়ে হরিশরণ বেরিয়ে এলেন। দেউড়ির ভাঙা সিংহ দরজায় বিকলাঙ্গ সিংহ দুটোর শ্যাওলা পড়া কেশরগুচ্ছের ওপর কোলাহল করছিল চড়ুই পাখীরা। কী একটা অজানিত ভয়ে তারা কিচ কিচ, করে উড়ে গেল । মেলার দিকে আবার হৈ হৈ রব। নতুন কী একটা ঘটেছে ওখানে। ললাজী কুঞ্চিত করলেন। আর সেই মুহুতেই দেখা গেল ছুটতে ছুটতে আসছে রামদেইয়া। -কী রামদেইয়া, কী খবর ? উধশ্বাসে রামদেইয়া বললে, মেলায় ভারী গণ্ডগােল বেধেছে হুজুর । কিসের গণ্ডগােল ? কুমার বাহাদুরের লােক ঢোল দিয়েছে মেলায়। এবার মেলায় কানাে খাজনা লাগবে না, ভােলা লাগবে না। জমিদারের মেলা, জমিদার তার প্রজাদের এবার বিনা পয়সায় মজা লুঠতে বলে দিয়েছে। লালাজী থমকে দাড়ালেন। মুখের ওপর ঝড়ের মেঘ আরাে ঘনীভূত। এ চাল অপর্ণার। জমিদার এখন আশ্রয় নিয়েছে তার প্রজাদের মধ্যে, সেখান থেকেই এখন সে তার সঙ্গে লড়াই করতে চায়। বেশ ভালাে কথা। লড়াইতে লালজীও পিছােবেন না। ঘােড়ার সহিসের বংশধর তিনি—তিনি চাকর! রামদেইয়া বললে, আমাদের যে লােক ট্যাক্সো আদায় করতে গিয়েছিল, তেলের বাঁক দিয়ে তার মাথা ফাটিয়েছে। লােকে মানে না। তারা বলে, মেলা জমিদারের, তা ছাড়া আর কারাে কথা তারা জানে না, শুনবেও না। কী করা যায় হুজুর ? লালাজী বললেন, হ। মুখের ওপর সংশয়ের রেখাগুলাে গভীরতর হয়ে পড়ছে। কুমার বিশ্বনাথের সঙ্গে লড়াই করা শক্ত নয়, কিন্তু তার
{:
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী
প্রজাদের সঙ্গে, জনতার সঙ্গে? রূপাপুরের কামারদের লেলিয়ে দিয়ে
মেলা ভেঙে দেওয়া যায় কিন্তু তাতে কার ক্ষতি ?
রামদেইয়া আকুল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলে, কী করা যায় মহাজন ?
পকেটের মধ্যে রিভলভার আর গয়নায় ঝনঝন করে বাজছে।
অপর্ণা তার নতুন শত্রু, কঠিন শত্রু। অন্ধকার মুখে লালাজী স্তব্ধ
হয়ে দাড়িয়ে রইলেন।
-পুলিশে খবর দেব?
কুটিল সংশয়ান্বিত মুখে লালাজী বললেন, না।
সােনাদীঘির মেলায় কোলাহলটা আরাে প্রবল হয়ে যেন আকাশ
ফাটিয়ে দিচ্ছে। রামনাথের মৃত দেহটা এতক্ষণ পরে ভেসে উঠেছে
সােনাদীঘির জলে ।
9;
TEXT WRARY
-si.
HOWRAH ,
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.