Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Pagaler Jhuli Ed. 1st

Krishna,madbrammharshi · 2010/02/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ওঁ গুরবে নমঃ
পাগলের ঝুলি
ধৰ্ম্ম-রাজ্যের খাঁটি কথা ।
ম ব্রহ্মণি কৃষ্ণ
সাং
কুল
সর্বসত্ব সংরক্ষিত
১৩৪০ বঙ্গা।
মূল্য ছ অ} মাত্র।

প্রকাশক--
ব্রহ্মচারী ওঙ্কারনাথ।
আৰ্য-ঋষিকুল-শ্রীসাধু-আশ্রম।
প্রাচীন মায়াপুর, পােঃ নবদ্বীপ,
জেলা নদীয়া ।
শ্ৰীমন্ ব্ৰহ্মর্ষি কৃষ্ণ কৃত অন্যান্য পুস্তক
১। চক্ষুদান বা সনাতন ধম্মের গূঢ় রহস্য।--( পশ্ন সম্বন্ধে বহু
সন্দেহের নিরসন, বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়, ধৰ্ম্মের চরম লক্ষ্য, উপাস,
চরম ফল ইত্যাদি বিষয় যুক্তি ও শাস্ত্রীয় প্রমাণ সহ ইহাতে সন্নিবেশিত
হইয়াছে । )
মূল্য-কাগজে বাঁধাই ২, ও কাপড়ে বাধাই ২০
২। সাধক-হৃদয়ে গুরু-বাণী। ব্রহ্ম-গায়ত্রী-রহস্য-সম্বলিত )
( ) ।
ব্রহ্মর্ষি শ্ৰীযুক্ত হৃষীকেশ চট্টোপাধ্যায় কৃত
১। মুক্তি-দীপ-মণিমালা- মূল্য আনা
২। পরাশান্তি।
মূল্য • 'আনা
প্রাপ্তিস্থান :-
১। অ্য-ঋষি-কুল-শ্রীসাধু-আশ্রম, প্রাচীন মায়াপুর ।
পােঃ নবদ্বীপ, জেলা নদীয়া।
১। মহেশ লাইব্রেরী ১৯৫২ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
৩। ভাঙ্গার শ্রীযুক্ত বঙ্কবিহারী কুণ্ডু এল, এ, এফ,
লক্ষীনারায়ণ ফার্মেসী। পােঃ ও গ্রাম খানখানাপুর।
জেলা ফরিদপুর (ই, বি, তার)।

No text on this page.

শ্ৰীযুত নগেন্দ্রনাথ সরকার
এ, বি, রেলওয়ে লােকে এণ্ড ক্যারেজ ডিপার্টমেন্টের চিহ্ন ক্লার্ক
ট, চট্টগ্রাম।

উৎসর্গ পত্র চট্টগ্রাম শহরের উপকণ্ঠস্থ পাহাড়তলী “এ, বি, রেলওয়ে লােকে। এও, কারেজ ডিপার্টমেন্টে চিফ ক্লার্ক” শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ সরকার মহেদয়ের কর-কমলে- নগেন দাদা, গুরুদেবের শ্রীচরণে আপনার যে অচলা ভক্তি আছে, তারি দিশা-স্বরূপ অধম আমাকেও আপনি দাদা বলে যথেষ্ট ভক্তি করে থাকেন। তার ভাব-ধারা প্রকাশের জন্য আমার যে ক্ষুদ্র চেষ্টা, তাহা ফলবতী করবার উদ্দেশ্যেই আপনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হ’র এই পুস্তক প্রকাশের ব্যয়ভার বহন করেছেন। “সংসারে পরমারাধ্য সেই সে এক জনা” এই গানটা শ্ৰীশ্রীগুরু মহারাজের বড়ই প্রিয় ছিল। আপনারই অনুপ্রেরণায় তাহা এই পুস্তিকায় স্থান লাভ করে ইহার মুকুট-মণির ৪ান অধিকার করেছে। ভিখারী আমি কি দিয়ে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাব ? এই ক্ষুদ্র পুস্তক আপনারই পবিত্র নামে উৎসর্গ ক’লাম, আব তার চরণে প্রার্থনা করি, আপনার সাধন-পথ সুগম হােক । ইতি - আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী দাদা প্রাচীন মায়াপুর। ( নবদ্বীপ ) ব্ৰহ্মর্ষি কৃষ্ণ

No text on this page.

ভূমিকা। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ তার প্রিয় সখা অর্জুনকে বলেছিলেন, “ভগবানের 'তত্ত্ব সাধারণ মানুষের কাছে রাত্রির মত অন্ধকার অর্থাৎ সেটা তারা বুঝতে পারে না, তাদের নজর সে দিকে মােটেই পড়ে না। যারা ইন্দ্রিয় সংযম ক’তে পেরেছেন তারা ভগবানের তত্ত্বে সর্বদা জেগে থাকেন, সেটা তাদের কাছে দিনের আলােকের মত পরিস্কার। আবার ইন্দ্রিয়ের সুখ যাতে হয়, সেই রূপ রস গন্ধ শব্দ ও স্পর্শ সংসারী জীবের পক্ষে দিনের মত পরিস্কার, তাতেই তারা সর্বদা জেগে থাকে, তাদের যােল আনা নজর ঐ গুলোর উপর। কিন্তু যারা ভগবাকে বাস্তবিকই চান, তাদের কাছে ওগুলাে রাত্রির মত অন্ধকার, ওগুলােতে তাদের নজর পড়ে না। কাজেই যাদের বিষয়-বুদ্ধি পাকা, বিষয়ের সুখ ছাড়া পানি বা জ্ঞানের বিষয় যাদের আর কিছু নাই, তারা, তাদের মত যারা চলে না, ত’দিগকে পাগল ভিন্ন আর কি ভাববে? সংসারী মানুষ দেহকে যথা-সৰ্বষ ভেবে তারই সুখের ভাবনায় ব্যস্ত। সমাজের আচার ব্যবহার, ধর্মের অনুষ্ঠান, স্বাস্থ্যের নীতি, এ সব বিষয় ভাববার অবসর তাদের মোটেই নাই; যদিও কেউ কিছু ভাবে, তবে সেটা তার নিজের স্বার্থের সঙ্গে যতটুকু খাপ খায় ততটুকুই ভাবে, তার বেশী নয়। কাজেই ও সব বিষয়ে দেশাচার লােকাচার কুলাচার যা মামুলি-ভাবে চলে আছে, তারই যতটা খেয়াল ম হয়, তাই তারা মানে, আর কিছুর ধার ধারে না। কিন্তু দেহ ছাড়াও যে আর একটা কিছু আছে, এ জীবনের পরও জীবন আছে, এটা যারা জানে, তারা ত বিচার না করে, শাস্ত্রাদির প্রকৃত উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে, যা খুশি তাই ব’লতে বা ক’তে • পারে না। সুতরাং মামুলি কথা ও মামুলি প্রথার সঙ্গে অনেক যায়গায়ই তাদের কথা ও কাজের মিল দেখা যায় না। সেইজন্য, মামুলির দল সংখ্যায় জাকাল হওয়ায়, ঐ দলের লােককে পাগল বলে উজিয়ে দিতে চায়। উড়িয়ে দিতে চাইলে হবে কি ? যদি প্রকৃত মঙ্গল আনতে হয়, প্রকৃত সুখ পেতে হয়, তবে সত্যকে সুবােধ ছেলের মত মাথা পেতে স্বীকার করতেই হবে, নৈলে পচে গলে য’তে হবে। শ্রীগুরুদেবের পদ-ধূলি মাথায় মেখে, ঐ শ্রেণীর পাগলের কথা ও ভাব কিছু কিছু তাদের ঝুলি থেকে নিয়েছি এবং মানুষের হিতের জ বিতরণ ক’তে চেষ্টা করেছি। আশা করি, উদার পাঠক মহাশয়দের নিকট ইহা অনাদরের বিষয় হবে না। অতি অল্প লেখাপড়া জানা লােকদের মধ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যে ভাষা খুব সােজা করা হয়েছে। [ স্মরণ না হওয়ায় একটী অতি আবশ্যকীয় প্রমাণ যথাস্থানে দিতে পারি নাই। পুস্তক-ছাপা প্রায় শেষ হবার পর উহা মনে হওয়ায় এই ভূমিকার মধ্যে এই স্থানে উহা দিলাম। পাঠক পাঠিকাগণ, দয়া করে এটা যথাস্থানে যােগ করে পাঠ ক’রূবেন। ৬৫ পৃষ্ঠা ১৪ পংক্তিতে আছে, “খুব সম্ভব, এই কথার ফলে হয়েছে কি, না তুমি যে আচারের কথা বললে সেই আচার!” শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের অন্তলীলায় ষষ্ঠ পরিচ্ছেদেও ঐ সিদ্ধান্তই আছে। একান্ত ভক্ত রঘুনাথ দাস বিষয় ছেড়ে নীলাচলে এসে শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর শ্রীচরণে আশ্রয় নিয়েছেন। রঘুনাথের পিতা গােবর্ধন দাস খুব অবস্থাপন্ন লােক ছিলেন। একমাত্র পুত্র রঘুনাথ নীলাচলে ভিক্ষা করে খায়, কোনদিন বা অন্নাভাবে উপবাস করে; এ কথা শুনে গােবর্ধন দাস মনে বড় দুঃখ পান ও চারশ’ টাকা, দুইজন চাকর এবং একজন পাচক ব্রাহ্মণ শিবানন্দ সেনের সঙ্গে রঘুনাথের নিকট পাঠিয়ে দেন। রঘুনাথ সে টাকা গ্রহণ না করায়,

v০
যারা টাকা এনেছিল তাদের মধ্যে দুইজন টাকা সহ সেইখানেই থেকে
গেল, ফিরে গেল না। রঘুনাথ অগত্যা ঐ টাকা থেকে কিছু কিছু এই
ভাবে খরচ করতে লাগলেন প্রতি মাসে দুই দিন অতি যত্নের সহিত
মহাপ্রভুকে নিমন্ত্রণ করেন। দুই বৎসর এরূপ করার পর তিনি মহা-
প্রভুকে নিমন্ত্রণ করা ছেড়ে দিলেন। দুইমাস নিমন্ত্রণ না পাওয়ায়
মহাপ্রভু একদিন স্বরূপকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। স্বরূপ গোস্বামী
সে কথার উত্তরে বলেন, “বিষয়ীর দ্রব্য নিয়ে মহাপ্রভুকে নিমন্ত্রণ করি,
এতে তার মন প্রসন্ন হয় না, বােধহয় এইরূপ বিচার করেই সে আর
আপনাকে নিমন্ত্রণ করে না।” এ কথা শুনে মহাপ্রভু একটু হাস্য করে
বলেন -
“বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন।
মলিন মন হৈলে নহে কৃষ্ণের স্মরণ ।
ইহার সঙ্কোচে আমি এতদিন নিল।
ভাল হৈল জানিয়া সে আপনি ছাড়িল । ]
লোকের হিত হােক্, ইাই ভগবানের চরণে প্রার্থনা। ইতি
অৰ্য-ঋষি-কুল-গ্রীসাধু-আশ্রম
প্রাচীন মায়াপুর, (নবদ্বীপ )
১৩৪০ | ১৫ই কাত্তিক।
রাসপূর্ণিমা।
ব্ৰহ্মর্ষি
কৃষ্ণ।

পৃষ্ঠা ১-১৪ •••১৪- ২৫ সূচী পত্র! প্রথম রাত্রি!—এক পরমেশ্বরই সকলের প্রকৃত উপাস্য দ্বিতীয় রাত্রি সাধনার নানা আচারের কথা তৃতীয় রাত্রি।—অধিকারের কথা চতুর্থ রাত্রি।-অশৌচের কথা পঞ্চম রাত্রি।জাতি-ভেদের কথা বষ্ট রাত্রি।-গুরুর কথা সপ্তম রাত্রি।—উপসংহার... ০ ০ ০ •••৩৭ ৪৯ . * * ০ ০ ০ শুড়িপত্র। ৬ পৃষ্ঠা ৪র্থ পংক্তি অশুদ্ধ বা ক ৯ম * না বেশে বেসে। . ১১ ২৪শ শেষ পংক্তি তাঁর। কিছু। দেহাভিমানী। প্রতিপত্তি । কিছ দেহভিমানী প্রতিপত্তি . ১৪ ৬ষ্ঠ ২৪ ৪র্থ ১৬। কাপড়। • কাপড় * কাছে ১৮ ১৮শ : আছে। ঔীলােক ও। 23 শেষ পংক্তি স্ত্রীলােকও * নবক নরক। ১ ১৯শ ৪৮ তখন। ৫ ১ম তখই হয়েছ * ‘অন্ন খাইলে হয়েছে। ‘অন্ন খাইলে। ১৬শ ৯ ৩৮

পাগলের ঝুলি
বা
ধর্ম-রাজ্যের খাঁটি কথা।
প্রথম রাত্রি।
এক পরমেশ্বরই সকলের
প্রকৃত
উপাস্য।
-:)*(:--
অহং হি সর্বজ্ঞানাং ভােক্তা চ প্রভুরেব চ।
ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাশ্যবন্তি তে ।
শ্রীমদ্ভগবদগীতা।৯২৪।
অন্য দেবতার আরাধনারূপ যজ্ঞসকলেরও স্বামী এবং ফলদাতা
আমিই, ইহা ভেদদশী সাধকেরা যথার্থরূপে জানে না বলিয়াই তাহাদিগকে
পুনঃ পুনঃ এ সংসারে যাতায়াত করিতে হয়। ( যাহারা সকল দেবতার
মধ্যে অন্তর্যামিরূপে একমাত্র আমাকেই দেখে তাহাদিগকে আর সেরূপ
করিতে হয় না, তাহারা আমাকেই প্রাপ্ত হয়।)
হরিপুর গ্রামে বহুদিন যাবৎ একটা পাগল আছে। সে কারো
সঙ্গে কোন কথা বলে না, আপন মনে আপনি ঘুরে বেড়ায় ; ক্ষুধা হলে
কারাে বাড়ী গিয়ে পেটে হাত বুলিয়ে ইসারা করে। ওখানকার লােকেরা
তার ইসারা, অনেক দিন ধরে দেখতে দেখতে, এখন বেশ বুঝতে
পারে। তাই ওরকম ইশারা করলে, গৃহস্থ ঘরে যা থাকে কিছু খেতে
দেয়, সেও খেয়ে আপন খুসি মত একদিকে চলে যায়। তার রাত্রে

• পাগলের ঝুলি। ঘুমাবারও ষায়গার ঠিক নাই কোন দিন গাছতলায়, কোন দিন মাঠের মধ্যে, কোন দিন বা কারাে বাহিরের ঘরের বারান্দায় মাটিতে বেশ শুয়ে আছে, দেখা যায়। মুখখানা বেশ শান্ত, গভীর। কি নাম, কোন্ জাতি, কোথায় বাড়ী কেউ জানে না। ঐ গ্রামে কেশবদাস নামে এক বুড়াে বৈরাগীর বাস। লােকটা বেশ সরল, তার কথাগুলাে ভারী মিষ্ট । সে কোনদিন কারাে অনিষ্ট করেছে কি কারাে মনে ব্যথা দিয়েছে, এ কথা কেউ বলতে পাৰে ; বরং গরীব হ'লেও, তার যতটুকু ক্ষমতা, সে ততটুকুন উপকারই লােকের করে থাকে। কারাে মনে কোন শােক তাপ হ'লে, যদি সে জানতে পারে, তবে তার কাছে গিয়ে, যতটা তার বুদ্ধিতে যােগায় সেই ভাবে তাকে প্রবােধ দিবে; ক্ষুধায় ভারী কাতর হয়েছে এমন কাউকে দেখতে পেলে, নিজের ঘরে যদি কিছু থাকে, তাকে আদর করে খাওয়াবে, না থাকলে একজনের বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে তার খাবার ব্যবস্থা করে দেবে। কারাে অসুখ হয়েছে শুনতে পেলে সে তখনি তাকে দেখতে যাবে, দরকার হলে তার সেবাও কবে। সেই গ্রামে বা গ্রামের আশে পাশে অনেক যায়গার লােকই তাকে শ্রদ্ধা ভক্তি করে। কেউ যদি নিজের অবসর সময় তাকে পায়, তবে ধর্ম বিষয়ে নানা কথা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, সেও তার যতটা জানা আছে উত্তর করে; আর যদি জানা না থাকে কি বুঝে উঠতে না পারে, তবে বলে, “বাবা, এর জবাব আমি দিতে পারূৰৰ না, এ ঘটে গুরু কিছু বােটাচ্ছেন না।” এই কেশব বাবাজির আখড়ায় ঐ পাগল মাঝে মাঝে যায়, খায় এবং কোন কোন দিন তার শােবার ঘরের বারান্দায় ঘুমায়। এই দেখে লােকের ধারণা যে, পাগল কেশবকে ভালবাসে। কেশবেরও সেই ভাবের ধারণা জমে ঘনিয়ে উঠতে লাগল। কেশব পাগলকে নিজের আখড়াতে পেলেই খুব আদর য ক’বার চেষ্টা করে, কিন্তু পাগল ত কথা কৰে না, লে প্রকৃত উপান্ত। ; এক পরমেশ্বরইকনে প্রকৃত উপায়। আর কোন কিছুর ধার ধারে না, কাজেই কেশব কিছুতেই তাকে বাগা’বার সুবিধা করূতে পারছে না। পারছে না। সে কোন দিন হয় ত ভাল যায়গায় আসন দিয়ে, থালায় ক'রে খাবার দিল, পাগল থালাখানা আঙ্গিনায় নামিয়ে নিয়ে, হয়ত খাবার জিনিষগুলাে মাটিতে ঢেলে, খেয়ে চ'লে গেল। কেশবও ছাড়বার লােক নয়। ওকে আর পাগল বলে তার মনে হয় না, মহাপুরুষ বলে ক্রমেই বিশ্বাস হচ্ছে ; সে কথা কাউকে বলে না বটে, কিন্তু পাগলের কাছে ক্রমেই সে ভক্তিতে গলে নত হয়ে প'ড়ছে। কিছুদিন এমনি ভাবে যায়। একদিন কেশবদাস বাবাজি রাত্রে ঘরে ঘুমিয়ে আছে। রাত্রি তখন দুটা আড়াইটা হবে। গায়ের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। পাগল হঠাৎ এসে ডাকছে, “কেশব, ওঠ, ওঠ, আমি আসছি। আয়, আমার কাছে আয়।” কেশব বাবাজি আওয়াজ শুনে চমকে উঠল। তার শরীরের ভিতর দিয়ে যেন একটা তাড়িতের খেলা হয়ে গেল, গা কাটা দিয়ে উঠল। কিছুই বুঝতে না পেরে সে বিছানায় ব'সে ভাবছে, এমন সময় বারান্দায় আবার শুল, “কেশবরে, দরজা খােল্, আয়, আমার কাছে আয়।” বাবাজি এবার বল, “এত রাত্রে আপনি কে? উত্তর হল, “আমি তাের সেই পাগল।” আননে টলমল হয়ে, টলতে টলতে বাহিরে এসে, বাবাজি পাগলের পা দুখানি জড়িয়ে ধরে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে লাগল ; কিছুই বলতে পারূছে না। কতকালের সাধনার পর যেন আজ পরম রতন পেয়ে, তার হৃদয়ে আনন্দের ভরা বা ঢেউ খেলে চলেছে। পাগল কেশবের হাত ধরে তুলে বলল, “বাপ, স্থির হ’, শান্ত হ'। আমি ত এসেছি, কি চাস, বল্।” কেশব কতক্ষণ চুপ করে থেকে কান্নার সুরে বল্ল, “কি ব’, ৰাপ? তােমার মত দেবতাকে হাতে পেয়ে কি যে চাইতে হয়, তা আমি জানি না।”

৪
পাগলের ঝি
তাের যা
পাগল।
মেহভরে) তােরুবি
“ভাবনা নাই, বাপ। তুই
'ত আমাতে আত্মসমর্পণ করেছিস, আ তাের হয়েছি।
জানবার দরকার হয়, জিজ্ঞাসা করি' তাের যতটা নেবার ক্ষমতা
আছে, তাই বুঝে আমি তােকে উত্তর দিব। মাঝে মাঝে এমনি গভীর
রাত্রে আমি আ, তােতে আমাতে কথা হবে। সাবধান, আমি যে
তােকে উপদেশ দিচ্ছি, এ কথা কাউকে জানা’ না—আমি যতদিন এ
দেশে থাকি
কেশব।-আমি মুখ মানুষ। একটু একটু লেখাপড়া যা জানি,
সেটা লেখাপড়ার সামিল নয়। শাস্ত্র টাও বড় কিছু দেখি নাই। যাও
বা দেখেছি, তারও সব যায়গা বুঝি না। সংস্কৃত ত মােটেই জানি না।
কাজেই আমি যা যা ধারণা করতে পারি, তাই সােজা কথায় দয়া করে
ব’বেন। আমি আর কি জাতে চাইব? ধর্মতত্ত্ব একটু ভাল ক'রে
জানিয়ে আমার প্রাণের পিপাসা মিটান, এই প্রার্থনা। এ পােড়া জীবনে
ত কিছুই হলাে না।
পাগল।তাই হবে। এখন কি জিজ্ঞাসা কবি, ক।
কেশব।—আপনার দয়ায় সকলেই আমাকে একটু মেহ করে ।
সেই জন্য তারা অনেক সময় ধৰ্ম্ম কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করে থাকে।
আপনার চরণ-কৃপায় আমি যেটুকু জানি বা যা বুঝি, তাই তা’দিগকে
বলে থাকি, তারাও তাতে সন্তুষ্ট হয়ে থাকে। তবে সব চাইতে মুস্কিল
দুই একজন হাল ফেশানের বাবুকে নিয়ে। বুড়াের মধ্যেও দুই একজন
আছে, তারা সময় সময় এমন সব কথা জিজ্ঞাসা করে, যার জবাব দেওয়া
আমার কর্ম নয়। সে সব কথা শুনে, সময় সময় আমার নিজেরই সন্দেহ
এসে যায়। যাই হােক, ভগবানের কৃপায় যখন আপনাকে পেয়েছি,
তখন সেই সব ধাঁধা মিটিয়ে নেবারি চেষ্টা করব।
পাগল।-আরে বাপু, মত বক্তৃতা করিস্ কেন? যা ব’

এক পরমেশই সকলের প্রকৃত উপাস্য। হয়, সােজাসুজি বলে ফেনা । কেশব।-আজ্ঞে হাঁ, তাই বলি। হিন্দুর তেত্রিশ কোটি দেবতা। হিন্দুরা সকল দেবতারই পূজা করে। তা হলে তাদের ঈশ্বর এক নয়, অনেক, এই সন্দেহ অনেকে করে। আবার একথাও তাদের শাস্ত্রে শুনা যায়, ভগবান্ এক, দুইজন ভগবান্ নাই। এখন এই দুই রকম কথার মিল কি করে করা যায় ? আমি ত বলি, যে কালী সেই কৃষ্ণ, সেই শিব, সেই সূৰ্য্য, কাজেই এক ভগবান্। তা ত অনেকে মান্‌তে চায় । তারা বলে, দেখছি অনেক, তবুও এক বল কি করে? আর, এক দেবতার সঙ্গে আর এক দেবতার চেহারার মিল নাই, নামেও মিল নাই ; কেউ পুরুষ, কেউ স্ত্রী। এসব আপত্তির যে জবাব দেই, সে ক্ষমতা আমার নাই। তবে আমি সবই সেই এক ভগবান্ বলে বিশ্বাস করি ও ভক্তি করি । পাগল।—বেশ কথা বলেছ। অনেককাল হ'ল দেশে এই নিয়ে নানা দলের মধ্যে বিবাদ চলছে, অনেকেই নিজের নিজের মতটাকে বড় বলে, আর অন্যের উপাস্য দেবতাকে উড়িয়ে দিতে চায় এবং ঘৃণা করে। যারা এসব নিয়ে ঝগড়া করে, তাদের শাস্ত্র ভাল করে দেখার প্রবৃত্তি বা ক্ষমতা নাই; আর সাচ্চা সাধুর কাছে বা ধার্মিক লােকের কাছেও তারা এসব কথা শুনতে বা জাতে যায় না। কপট ললাকের বাহিরের চটক দেখে উপদেশ নিতে যায়, ফলও তেমনি হয়। ভগবান্ সব জায়গায় আছেন, যারা এ কথা মুখে বলে, তারা যদি এ কথা বিশ্বাস করে, কি অন্ততঃ শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নেয়, তবে ঐ বিষয় বুঝা'তে বেশী কষ্ট হয় না। ঐ ভাবটাকে না ধরলে এর মীমাংসা হওয়া বড় কঠিন। যারা ভগবানকে নিজ মনের মত গড়ে একটা যায়গায় আবদ্ধ করে রাখতে চায়, অন্য কথায় কাণ দিতে চায় না, তাদিগকে একথা বুঝাতে যাওয়া বৃথা। এখন তুমি নিজে ভাল করে ' পাগলের বুলি। বুঝবার চেষ্ট কর দেখি। সবই এক' এ কথা মুখে বলে, মনে মনে একটা বিশ্বাস রাখলেই হয়ে গেল না। কথাটা যদি যুক্তির উপরে দাড় করান যায়, তা হলে আর কোন দিন সন্দেহ আসতে পারে না। যতদূর সম্ভব তাই করা উচিত। যে কথার পেছনে বিশেষ কোন যুক্তি নাই, সে কথার বিরুদ্ধে জোর করে কেউ কিছু বললে বা যুক্তি দেখালে, আগের বিশ্বাস ট’লে যেতে বেশীক্ষণ লাগে না। আচ্ছা, ভগবান্ কোথায় আছেন বলে তুমি মনে কর? কেশব।-আজ্ঞে, তিনি কোথায় নাই ? তিনি ত সব যায়গায়ই আছেন। তিনি ত সকলের আত্মা-রূপে আছেন, শুনি। তিনি যদি সব যায়গায় না থাকেন, তবে তা কেউ বাঁচতেই পারে না। এই ত সে দিন গােসাঞি ও বাড়ীতে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ ক’ছিলেন। সেখান থেকে এ কথা বেশক'রে শুনে রেখেছি। ব্রহ্মা যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সখা সকল ও গাই বাছুরগুলাে সব হরণ করে নিয়ে, গিরি গােবর্ধনের গুহার ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিলেন, সেই সময়ে ভগবান্ নিজেই রাখাল গৰু বাছুর সব হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ এই সব নিয়ে গােষ্ঠ লীলা ক’তেন। এক বৎসর এমনি গেলে, ব্রহ্মার ভুল ভাঙ্গল। এই এক বৎসর গােপিনী মায়েরা আপন আপন ছেলেকে আগের চেয়ে বেশী ভাল বাতেন, আর গাইগুলাে তাদের বাছুরগুলােকে আগের চেয়ে বেশী ভাল বেসেছিল। তাই, মহারাজ পরীক্ষিৎ এর কারণ জিজ্ঞাসা ক'লে, শুকদেব গােস্বামী স্পষ্টই বললেন, “দেখ, মানুষ যতই বলুক না কেন যে, ছেলেকে বা স্ত্রীকে বা অপর কাউকে সে খুব বেশী ভাল বাসে, কিন্তু তথাপি এটা ঠিক জাবে যে, নিজের প্রাণের চেয়ে কেউ কাউকে বেশ ভাল বাসে । দেখ, মানুষের যখন ভারী ব্যায়াম হয়, তখন সে টাকা পয়সা স্ত্রী পুত্র কারুর জন্যই তেমন ভাবে না, যেমনটা নাকি নিজের ভাল হবার জন্য ভাবে। আবার যখন ব্যারামে শরীর জীর্ণ শীর্ণ হয়ে যায়, হয় ত এক পরমেরই সকলের প্রকৃত উপায়। ৭ কোন কোন অঙ্গ অবশ বা নষ্ট হয়ে যায়, তখনও সে ভাবে, যাক্, ওগুলাে গিয়েও আমার প্রাণটা থাক। এ সময় তাদের দেহের চেয়েও প্রাণটার উপরই বেশী মমতা দেখা যায়। আর, এই যে লােকে অন্যকে ভালবাসে, তাও নিজের প্রাণের তৃপ্তির জন্যই। কাজেই, একথা খাটি সত্য যে, প্রাণ বা আত্মাই প্রকৃত ভালবাসার জিনিস। আর, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণই সকলের প্রাণের প্রাণ, আত্মা। তবে তিনি জগতের হিতের নিমিত্তই নিজ মায়াতে দেহধারীর মত দেখাচ্ছিলেন, সেই কৃষ্ণই যখন রাখাল ও বাছুর হয়েছিলেন, তখন তাদের মায়েরা তাদেরে বেশী ভাল বেশে পারে নাই। এ সব কথা শুলে কে না বিশ্বাস করবে যে, ভগবান্ সব যায়গায়ই আছেন, সকলের মধ্যেই আত্মারূপে আছেন? পাগল।বেশ,, তুমি নিজেই যে প্রমাণ উপস্থিত ক'লে, তাতে ব্যাপারখানা অনেক সােজা হয়ে গেল। তুমি সম্ভবতঃ শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের অন্ত্যলীলায় পড়েছ :- উত্তম হইয়া বৈষ্ণব হবে নিরভিমান। জীবে সম্মান দিবে জানি কৃষ্ণ-অধিষ্ঠান। কেশৰ।আজে হাঁ, এখন মনে পড়ছে, ভুলে গিয়েছিলাম। পাগল।-এখন গােটাকত দৃষ্টান্ত দিয়ে বিষয়টাকে আরাে খােলাসা করি। শশাবার সময় তােমরা বালিশ ব্যবহার কর। বালিশের উপরের খােল নানা রঙ্গের হয়, বালিশের চেহারাও হােট বড় গােল চেপ্টা নানা রকমের হয়, কিন্তু ঐ খােল ছিড়ে ফেলে, ভিতর থেকে কি বেনােম? কেবল তুলা, সাদা তুলা। শাস্ত্রে গাইয়ের দুধের দৃষ্টান্তও আছে। গাই যে কোন চেহারার বা যে কোন রঙ্গেরই হােক, তার দুধ সাই হবে। তেমনি আমাদের শরীরটা যেন খােল,আনুষ খােলস, পণ্ড খােলস, পক্ষী খােলস ইত্যাদি যদি ছেড়া যায় অর্থাৎ ভিতরের দিকে যদি লক্ষ্য করা যায়, তবে ভিতরে কেবল সেই এক আত্মাই পাওয়া E== { ভগবান্ নিজ পাগলের বুলি। যাবে। খােলসের মধ্যে যে জিনিসটী আছে, সেটা সব যায়গায়ই এক, তবু বাহিরের অমিল দেখে আমরা মারামারি করি। একটু ভাল করে বুঝে দেখলে, যাদের মধ্যে কোন মিল নাই ৰ'লে আগে বুঝেছি, তাদের মধ্যে বেশ মিল দেখা যায়। মানুষ পশু পাখী স্ত্রী পুরুষের সম্বন্ধে যে ক'। বলা গেল, ঐটা এখন হিন্দুর তেত্রিশ কোটি দেবতার উপরে খাটাও দেখি। ঐটা খাটাতে পারুলেই সকল গােল চুকে যায়। মুখে গীতায় অর্জুনকে ঐ কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, সকল দেবদেবীই আমার শরীর, আমি তাদের মধ্যে আত্মারূপে আছি। যার তা’ না বুঝে ঐ সকলকে পৃথক পৃথক মনে করে, তারা আমাকে পায় না, কাজেই পরম শান্তি পেতে পারে না। কেশব।এ ত এখন বেশ বুঝলাম ব'লে মনে হচ্ছে, কিন্তু তবু যেন পুরাপুরি বুঝা হ’ল না বলে মনে হয়। নিজে একবার অনুভব করতে পারূলে যেন বেশ পরিষ্কার হ’ত, খুব আনন্দ হত। পাগল।—ঠিক বলেছি। দেখ, কেশব, মুখে যতই বলি না কেন, নিজকে যতক্ষণ না চিনতে পাবি, নিজের ভিতর কি একটা আছে যার বলে চলতে ফিরতে, ব’তে কইতে, ভাবতে চিন্তিতে পাছি, . তা যতদিন না দেখবি, ততদিন মনের ধাধ। ঠিক ঠিক ঘুচবে না,, ভগবাকেও চিবি না এবং প্রকৃত শান্তিও পাবি না। কেশব।-তবে কি ক’ব, বাবা ? কি করলে সেটা হয় ? পাগল।-ততার ভিতর যে পরম গুরু রয়েছেন, তিনি যখন তাের সুবুদ্ধি যুটিয়ে দিয়েছেন, তখন ত আর কোন ভাবনা দেখি না।.. তুই একবার ঠিক হয়ে, সােজা হ'য়ে, আমার চোখে চোখে চেয়ে বস দেখি। মনটা খালি করে ফেল্, কোন কিছু ভাববি না, কেবল আমার চোখে চোখে চেয়ে খাবি, পলক ফেবি না। যতক্ষণ কিছু না বলি, ততক্ষণ এমনি ক'রে চেয়ে থাকবি, নড়বি চড়বি না।

এক পরমেশ্বরই সকলের প্রকৃত উপাস্য। কেশব তাই করল। এ ভাবে কখন থাকা অভ্যাস নাই, তাই তার একটু কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তথাপি সে সেই ভাবে অনেকক্ষণ থাল! শেষে তার বাহ্য জ্ঞান যেন কিছু কমে আতে লাগল। তখন পাগল বলল “এখন একবার তাের ভিতরে ভাল করে খেয়াল কর, তাের শ্বাস প্রশ্বাসের গতির প্রতি লক্ষ্য কর দেখি। কেশব লক্ষ্য করূতে লাগল । কতক্ষণ পর পাগল ব’, ‘দেখলি কি ? কেশব।আজ্ঞে হাঁ, দেলাম । পাগল।—কিছু অনুভব করতে পারলি কি ? কেশব যা যা অনুভব করেছিল, সবই তাকে ব’ল। পাগল তখন কেশবের নিকটে এগিয়ে অতি অনুচ্চস্বরে কতকগুলি সঙ্কেত তাকে বলে দিল ও জিনিসটা, কিছু কিছু প্রমাণ দিয়ে এবং যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিল। অবশেষে পাগল তাকে ব’ল, “আচ্ছা, ঐ ভাবে কিছুক্ষণ কাজ কর যতক্ষণ আমি তােকে না ডাকি।” কেশব পাগলের কথামত কাজ করতে করতে ক্রমে বাহ্য-জ্ঞান- শূন্য হয়ে পড়ল। তার মুখখানি খুব শান্ত ও আনন্দময় দেখা যেতে লাগল। কতক্ষণ পর পাগল ডাল, “কেশব ! কেশব!” কেশব নীরব, কারণ তার বাহিরের জ্ঞান কিছুই নাই, সে যেন সুখে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাগল কেশবের মাথায় ও পিঠে আস্তে আস্তে হাত বুলা'তে বুলাতে ডাল, “কেশব ! কেশব!” এইবার কেশব আস্তে আস্তে চোখ মে’ । পাগল।-কি হয়েছিল রে ? কেশব।-( ধীরে ধীরে ) আজ্ঞে, তা জানি না। জগতের সব ভুলে গিয়েছিলাম, এই দেহটা ছিল কি না, তাও জানি না। কি এক অজানা অবস্থায় ডুবে গিয়েছিলাম। বড় আনন্দ! বড় আনন্দ । এমন আনন্দ ত জীবনে কখনাে পাই নাই।

১০ পাগলের ঝুলি। পাগল।-বেশ! তাের পূর্ব পূৰ্ব্ব জন্মে অনেক তপস্যা কর। ছিল, তাই এই উচ্চ অবস্থা এত সহজে অনুভব করতে পারলি। এখন বুঝলি তুই কে? কেশব।আজ্ঞে, এই ত এখানে বসে আছি। পাগল।—আরে মুখ, এতক্ষণও বুঝলি না। আচ্ছা, বলা দেখি, শরীরের জ্ঞান চলে যাওয়া পর্যন্ত যে জিনিসটা খেয়াল ক’ছিলি, মরা মানুষের কি সেটা থাকে ? কেশব।-আজ্ঞে, না। এখন বেশ বুঝেছি। অনেক লােককে মরতে দেখেছি। তাদের মরার পর দেখেছি, দেহের সবই থাকে, কেবল ঐ জিনিসটাই থাকে না। হাত পা চোখ মুখ সহ সমস্ত দেহটাই থাকে, তথাপি আত্মীয় স্বজনেরা কাঁদে, হায়রে অমুক কোথায় গেল ! আর তার দেখা পাব না। পাগল।হাঁ, এখন বুঝলি ঐটাই হচ্ছে আসল মানুষ। এর মধ্যে আরও অনেক কথা ব’র আছে, তবে তা এখন তােকে বলব , যদি পরে দরকার বুঝি, সময় মত বলা বাবে। এখন বুঝতে পালি, মেয়ে মানুষ পুরুষ মানুষ পশু পক্ষী কীট পতঙ্গের মধ্যে আসল জিনিস কোষ্টা ? কেশব।-আজ্ঞে, এখন বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ঐ একটা জিনিসই সবার মধ্যে আছে, দেহগুলাে খােলস মাত্র। দেব দেবীর পূজার সম্বন্ধে একজন সাধক আমাকে অনেকগুলি কথা বলেছিলেন, তখন সে সব বুঝতে পারি নাই। এখন বেশ বুঝতে পারছি যে, দেব-দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে পূজকের নিজের ভিতরের ঐ জিনিসটীই সামনে দেব-দেবীর যে মূৰ্ত্তি থাকে তার ভিতরে আরােপ করা। পূজা তারই হয়, দেব-দেবীর মূৰ্ত্তি যা দেখি, তা সেই জিনিসটারই আধার মাত্র। আবার যে যার উপাসক, সে তাকে স্তব করবার সময় বলে,-“তুমিই জগতের একমাত্র এক পরমেশ্বরই সকলের প্রকৃত উপাস্য। উপাস্য, একমাত্র তুমিই আদিতে ছিলে, তােমার আদি কেউ নেই, সব লয় হয়ে গেলে একমাত্র তুমিই থাকবে, আর এখনও সকল জীবে আত্মা- রূপে তুমিই আছ। এতে বেশ প্রমাণ হয় যে, লােকে যে নামেই ডাকুক কেন, আর যতরূপেই দেখুক না কেন, সকলেরই উপাস্য সেই এক জনই। পাগল।হ, তাই বটে। বেশ বলেছ। বড় বড় সাধক- দের মুখে একটা গান শােনা যায়। সেই গানটা তােমাকে বলি, তার মধ্যে তুমি সংক্ষেপে খাঁটি কথাগুলাে পাবে :- সংসারে পরমারাধ্য সেই সে একজনা। সে যে চিন্ময় সচ্চিদানন্দ, তারে কেউ চিনে কেউ চিনে না। সে যে নিরাকার বহুরূপী, দৃশ্য নয় সে সর্বব্যাপী, কার বা আলাপী ; ভেবে পাই না যে কূল, সূক্ষ্ম কি স্থল, আদি মূল তার মিলে না। চরণ নাই চলিতে দক্ষ, নয়ন নাই সে করে লক্ষ্য, স্থলাদি সূক্ষ্ম, বদন নাই সে বলে বাক্য, অলক্ষ্য তার নিশানা। তারে বৈষ্ণবে কয় বিষ্ণু হরি, শৈবে কয় শিব জটাধারী, শাক্তে শঙ্করী, সে যে পুরুষ কি নারী, চিন্‌তে নারি, কোন যুক্তি শাস্ত্রে মিলে না। তার ধাম জানি না নামটী গুরু, ভক্ত-বাঞ্ছাকল্পতরু, অতি সুচারু, সেই গুরু ছেড়ে যে অন্যে ভজে, তার এ কুল ও কুল মিলে না। তিনি নিরাকার, কিন্তু সাধকের হিতের জন্য অথবা ভক্তকে কৃতার্থ ক’বার নিমিত্ত তিনিই সাকার হন; যেভক্ত যে নামেতাকে ডেকে আনন্দ পায় তিনি সেই নামেই সাড়া দেন ; যে ভক্তের হৃদয়ের ছাঁচ যেমন তার হৃদয়ে সেই ছাঁচেই তিনি ফুটে উঠেন; তার স্বরূপ কোন ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—তার ধারণা করূতে গিয়ে মনও আপনি ডুবে যায় ; তিনি সাক্ষী মাত্র, নিজে কিছু করেন না, কিন্তু অনন্ত বিশ্বে যা কিছু ;

১২ পাগলের ঝুলি। হচ্ছে, তাকে ছেড়ে তার কিছুই হবার উপায় নাই, কাজেই তিনি সর্বময় কর্তা; এই সব বিরুদ্ধ ভাব একমাত্র তাতেই সমন্বয় লাভ করেছে, তার পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয় ; একমাত্র তিনিই সকলের চরম উপাস্য। আর তােমাদের সম্প্রদায়ে যে একটা কথা আছে, “গুরু ছেড়ে গােবিন্দ ভজে, সে পাপী নরকে মজে, তার ব্যাখ্যা এই গানের শেষ অন্তরার মধ্যে কেশব।-আঃ কি আনন্দ! আমার যদি হাজারখানা মুখ থাত তা হলেও আমি আপনার দয়ার কথা বলে শেষ করতে পারতেন না। আপনার এই সব কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছে আমি যেন কোন্ দেবপুরীতে আছি, কাণে অমৃত-ধারা প্রবেশ করছে, হৃদয়-প্রাণ সুশীতল হয়ে যাচ্ছে ! আপনার মুখে শুনে আজ আমার মনে পড়ছে, অনেক দিন আগে গােপীনাথজির নাট-মন্দিরে একজন সাধু, ভাবে মেতে, এই গান গেয়েছিলেন, তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল । কেউ তাকে বড় গ্রাহ্য করল না। একবেলা তিনি ছিলেন, দুটো প্রসাদ পেয়েই অন্যত্র চলে গেলেন। আমিও ওসব কিছু বুঝতাম না, কেবল বিশ্বাস করতাম, যে কৃষ্ণ সেই কালী সেই শিব সেই দুর্গা, সবই এক। আজ আপনি নিজগুণে কৃপা করে আমাকে যা বুঝিয়েছেন, আমার হৃদয়-মন্দিরে যে জ্ঞানের বাতি জ্বেলে দিয়েছেন, তার শীতল ও উজ্জ্বল আলােকে সব যেন পরিষ্কার দেখছি। মরি, মরি ! কি আনন্দ! এই ব’তে ব’তে কৃতজ্ঞতায় গ'লে, কেশব গুরুদেবের চরণ-ধূলি নিয়ে একটু খেল, আর বাকীটুকু বুকে ও কপালে মাখতে লাগল। পাগল।বেশ, বাবা। বড়ই সুখী হ’লাম । আত্মা-গুরু কৃপা করে তােমার হৃদয়ের গাঁটগুলাে ভেঙ্গে দিয়েছেন। তােমার বড়ই সৌভাগ্য। আচ্ছা, আর কিছু জিজ্ঞাসা ক’রুতে চাও, বাবা? কেশব।-বাবা, আর ত কিছুই আমার দরকার দেখি না এক পরমেশ্বরই সকলের প্রকৃত উপাস্য। ? আপনি অধম-তারণ, তাই অন্য লােকের জন্য আর একটা কথা আজ জিজ্ঞাসা করতে হচ্ছে। হিন্দুদের মধ্যে যারা দেব-দেবীর মূর্তি গড়ে, তার মধ্যে দেবতার পূজা আরাধনা করে, তা’দিগকে অনেকেই পৌত্তলিক বলে নিন্দা করে। এটা কি ঠিক পাগল।-এ সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন তােলা যায় ও খণ্ডন করা যায়। সে সব না করে, সােজা ভাবে তােমাকে কথাটা ধরিয়ে দিবার চেষ্ট। করছি। তুমি ত দেখেছ প্রতিমার গড়ন প্রভৃতি শেষ হলে অর্থাৎ রং ফিরান আদি হয়ে গেলে, অমনি লােকে সেই প্রতিমার পূজা করে না , প্রাণ প্রতিষ্ঠা না হলে পূজা হয় না। আর মন্ত্র পাঠ করে বিধানমত বিসর্জন-ক্রিয়া শেষ করলে, ঐ প্রতিমা তার পর যতনিই সেখানে থাকুক না কেন, কেহই আর তার পূজা আরতি করে না বা সেখানে ভােগও দেয় না। তবে অবশ্য চিরদিনের জন্য যে প্রতিমার দেবতার আবাহন বা প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং যার বিসর্জন-ক্রিয়া হয় নাই, সে প্রতিমা অবলম্বন করে চিরকালই প্রতিদিন পূজা আদি হয়ে থাকে । এখন দেখ, পূজা কোষ্টার হয়, মূৰ্ত্তিটার, না আর কিছুর ? কেশব।--আজ্ঞে, আমি ত এটা বেশ বুঝছি, কেননা এ বিষয়টা অনেক দিন থেকে লক্ষ্য করে আসছি। তার পরে আপনার কৃপা হবার পর আমার আর একটুও সন্দেহ নাই। তবুও, লােকে হিন্দুদিগকে প্রতিম-পূজক বা পৌত্তলিক বলে কটাক্ষ করতে ছাড়ে না, অনেকে নিন্দা এবং ঘৃণাও করে থাকে, সেই জন্যই বলছি। পাগল।—যারা দেখবে না, শুবে না, ভাববে না ; দেখে শুনেও বুঝতে পারবে না বা বুঝতে চেষ্টা করবে না; অথবা বুঝতে পেরেও কোন স্বার্থসিদ্ধির জন্য জিনিসটা মিথ্যা ভাবে প্রকাশ করবে, তাদের কথার মূল্য কি আছে ? তাই ব’ছি, এ ব্যাপারটা যা তােমাকে

পাগলের ঝুলি।
বল্লাম, সেটা এত সহজ যে, সাধারণ মােটা বুদ্ধির লােকও একটু চিন্তা
কলেই বেশ বুঝতে পারে। এ অবস্থায়, যারা নিন্দা করে বেড়ায়
তাদের বুদ্ধির সুখ্যাতি কে কবে ? তবে সত্যের খাতিরে এ কথাটাও
বলা এখানে খুব দরকার যে, যে সব লােক পূজা বা আরাধনা করতে
গিয়ে ঐ প্রতিমাই যথা-সর্বস্ব ভাবে, তার বেশী কিছু বুঝে না, তারা
সত্যই পৌত্তলিক, কেননা এই অর্থেই গােড়ায় ও শব্দটা ব্যবহার
হয়েছিল।
কেশব-আজ্ঞে হাঁ। ব্যাপারটা তাই বটে।
“রাত্রি শেষ হয়ে আসছে। আজকার মত চ’ল্লাম”-
বলে মহাপুরুষ তাড়াতাড়ি বাহির হয়ে গেলেন। কেশব সেইখানেই
বসে ঐ সব কথা এক মনে ভাবছে। প্রভাত হয়েছে, পাখী ডাকছে।
কেশব হঠাৎ আঙ্গিনার দিকে তাকিয়ে ব’ল, “রাত্রি প্রভাত হয়েছে।
এখন যাই, হাত মুখ ধুয়ে এসে সাধনায় বসি।”
-এই
দ্বিতীয় রাত্রি।
সাধনার নানা আচারের কথা।
ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনা সা স্বভাবজা ।
সাব্দিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু ॥
শ্রীমদ্ভগবদগীতা।১৭২।
ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিতেছেন—দেহভিমানী ব্যক্তিদিগের
মধ্যে কেহ সত্ত্বগুণী, কেহ রজোগুণী কেহ বা তমােগুণী হয়, সুতরাং

সাধনার নানা অাচারের কথা। তাহাদের শ্রদ্ধাও, যথাক্রমে, স্বভাবতই তিন প্রকার হয় অর্থাৎ সাত্ত্বিকী রাজসী বা তামসী হয়। প্রায় একমাস কেটে গিয়েছে, এর মধ্যে পাগল আর কেশবের আখড়ায় আসে নাই। মাঝখানে এক দিন সকাল বেলা, সাধনা শেষ করে ঘর থেকে বাহির হবাব সময়, কেশব দেখতে পেল, পাগল তাড়াতাড়ি তার আখড়ার সীমানার ভিতর থেকে বেরিয়ে গেল। কেশব তৎক্ষণাৎ সীমানার বাহিরে এসে এদিক ওদিকে চেয়ে কিছু দেখতে পেল , কাজেই সে মনে করল, “এ বুঝি আমার সৌভাগ্য, গুরুদেব বুঝি অধম সন্তানকে সূক্ষ্মভাবে দেখা দিয়ে অন্তর্ধান হলেন”। এই ঘটনার কয়েক দিন পর একদিন গভীর রাত্রে পাগল এসে কেশবকে ডাকূল। শব্দ কেশবের কাণে পৌছিবা মাত্র, কেশব আস্তে ব্যস্তে দরজা খুলে বাহির হ’ল এবং তাকে দণ্ডবৎ প্রণাম করে ব’সূতে আসন দিল। পাগল ক্রমান্বয়ে কতকগুলি প্রশ্ন করে দেখতে লাগল সে দিনকার বিষয় কেশবের বেশ একটু বােঝা হয়েছে কি না। কেশবের উত্তর সকল সন্তোষজনক হওয়াতে, পাগল বল্ল-“বল্ এখন তাের আর কি জিজ্ঞাসা করার আছে।” কেশব!-বাবা, কি বলব, আমার ত আর কিছু জিজ্ঞাসা ক’তে ইচ্ছা হয় না। আমাকে যেন আমি হারিয়ে ফেলছি। আমার ইচ্ছা হয় সর্বদা এই ভাবে ডুবে থাকি। যদি অন্য কিছু ভাবতে হয় ত আপনার কথা ভাবি। যদি কিছু কাউকে বলতে হয়, তবে এই অমৃতের খবর যতটুকু আমি পেয়েছি, তাই বলি। কিন্তু সে কথা কেউ জিজ্ঞাসাও করে না, আবার নিজে যদি গায়ে পড়ে ব’তে যাই, তাও শুনতে চায় । দুই এক কথা হতে না হতেই তাদের কথা তুলে বসে, আর প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে।

। পাগলের ঝুলি। পাগল।-আরে, তা ত ক’রূবেই। যে যে রাজ্যে আছে সে সেই রাজ্যের কথাই বলবে, সেই রাজ্যের খবরই জিজ্ঞাসা করবে । সংস্কারাবদ্ধ জীব যদি সরল প্রাণে সত্যের খোঁজ করতে থাকে, তবে এক দিন তার আত্মতত্ত্ব জানার ইচ্ছা হবে, তার আগে নয়। কাজেই যে যা জিজ্ঞাসা করে তার উত্তর দিয়ে, কিছু রহস্য বুঝাতে চেষ্টা করতে হয়। এমনি কলে তাদের কিছু কিছু ভ্রম দূর হতে থাকবে। তা ছাড়া আর কি উপায় আছে, বাবা ? সংসারে পৌণে যােণ আনা লােকই মায়ার জালের মধ্যে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেশব।—সংসারের ছায়াবাজির খেলার কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে ত আমার প্রাণে আর চায় না। তবে লােকে ধর্মের সম্বন্ধে যে সব প্রশ্ন করে বিরক্ত করে, তাই কিছু কিছু জিজ্ঞাসা করি। পাগল।--অজ্ঞানের জন্যই দুনিয়ার লােক শােক তাপ নানা রকম ভােগ করছে। তাদের অজ্ঞান দূর করার চেষ্টা করলে ভগবানের একটা বড় রকমের সেবা করা হয়। কাজেই তাদের সে বিষয়ে ধাধা আছে, তাই জিজ্ঞাসা ক। এ সব জানলে তাের হৃদয়ে জানা ভাবে যদি কোন সন্দেহ থেকে থাকে, তাও চলে যাবে। তােরও লাভ আছে। কেশব।-ভগবান্ যখন এক, আর সকল লােকই সেই ভগবান- কেই পেতে চায়, তখন সকলে এক ভাবে অর্থাৎ একই নিয়মে সাধন ভজন করে না কেন? নানা রকম আচার, নানা রকম প্রথা দেখা যায়। কেউ বলে, নিরামিষ খাবে, স্ত্রীলােকের সঙ্গ করবে না, ঠাকুরদের নিরামিষ ভােগ দিবে ইত্যাদি। আবার কেউ বলে, কলিযুগে তন্ত্রমতে সাধন ছাড়া সিদ্ধি হবে না, আর তন্ত্রমতে, সাধন করতে হলে, মৎস্য মাংস মদ্য মুদ্রা ও মৈথুন, এই পঞ্চ মকারের ব্যবহার করা চাই। আবার কেউ বলে, পূজার জন্য ফুল তুলসী বেলপাতা চন্দন নৈবেদ্য, এ সব দিয়া এতে একটা একটা করে জবাব দেই,, শুতে থাক। সাধলায় মালা যাচার কথা। প্রয়ােজন কি ? ভগবান কি এই সব নেন ? তিনি হচ্ছেন সূক্ষ্ম জ্ঞান- ময় আনন্দময়, তাকে ধ্যান করুলেই হল, ভক্তি কলেই হল। কেউ বলে, একটা মূর্তি না হলে তাকে ভজন করি কেমন করে? মুর্তি না নিলে ভজন হয় না। আবার কেউ বলে, ঈশ্বরের কি কোন মুৰ্ত্তি আছে? তিনি সর্বব্যাপী, কাজেই তার মূর্তি কল্পনা করা পাপ। এ সৰ কথার মীমাংসা কি পাগল।হ, এক নিশ্বাসে প্রশ্ন কম কর নাই। আচ্ছা, ? সাধারণত এই দেখতে পাওয়া যায় যে, স্ত্রী-পুত্র বাপ-মা আত্মীয়- স্বজন নিয়ে বেশ ঘরকন্না ক’ছে, খাবার প’রবার কোন কষ্ট নাই, এ ধরণের লােকের অনেকেই ‘ঈশ্বর ঈশ্বর’ করে মাথা ঘামাবার বড় ধার ধারে না; যদিও কিছু করে তাও হয় ত বাপ পিতামহ ক’ত র’লে, না হয় দেশের বা গ্রামের পাঁচজনে.করে বলে, লােক দেখান ভাবে করে, প্রাণের টানে নয়। ব্যারাম পীড়া হ'লে যখন ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়ে কোন ফল পাওয়া যায় না, জীবনের আশা আর থাকে না, হয় ত এমনি সময় ঈশ্বরকে ডাকে, ‘প্রভু, রক্ষা কর। আর ত গতি নাই। তুমিই অগতির একমাত্র গতি। হয়ত কেউ কিছু ঘুসেরও ব্যবস্থা করে, ‘প্রভু ছেলে যদি ভাল হয়, যদি বেঁচে থাকে, ছেলে ওজন করে হরির লুট দিব। অথবা বলে, “মা কালী, আমার খােকারে ভাল কর; বাঁচিয়ে রাখ, খােকার বিয়ের সময় যােড় পাঁঠা বলি দিয়ে ভােমার পূজা ক’ব। হয় ত কোন মামলায় ঠেকেছে, জেল হবে, মানস.কল, বিপদ কেটে গেলে ঐ রকম একটা পূজা দিবে। এই সব অবস্থায় ঈশ্বর বা ঈশ্বরীকে যে ভাকে সে প্রাণের টানেই ডাকে, কিন্তু এটা তাকে পাবার জন্য নয়, তাঁকে খুসি করে, সংসারের বেড়ী কাটবার জন্য নয়, কেবল উপস্থিত বিপদটা কাটিয়ে সংসারের মুখটা ছােগ করার জন্য। বিপদটা কেটে গেলে আর পাগলের বুলি। ঈশ্বর বা ঈশ্বরীর কথা মনে থাকে না; বাস! নাক মুখ গুজে আবার সংসারের সুখে মেতে গেল ! তবে অবশ্য খুঁসটার কথা ভুলে না, সময় মত, সুযােগ বুঝে দিয়ে ফেলে। এ রকম হরির লুট বা পূজা ত ভগবানের আরাধনা নয়, এ কেবল কোন রাজ-কর্মচারীকে ঘুস দেওয়ার মত একটা কাজ। আর বাপ পিতামহ করেছে বা দেশের পাঁচজনে করে বলে যে পূজা আদি করা, সেটাও কোনমতে বেগার শােধ দেওয়া, ওর সঙ্গে ভজন সাধনের সম্পর্ক নাই বললেই হয়। কেশব।-বাবা, এই রকমই যে পৌণে যােল আনা যায়গায় দেখি । পাগল।তাইত ব’লছি, প্রায়ই এই প্রকার। তাই দেশে এত ঢাক-ঢােল খােল-করতাল বাজছে তবু কারো কিছু হচ্ছে না। এখন শুন। আরও দুই রকমের লােক আছে। এক রকমের লােক ধর্মের সাজ পােষাক নিয়ে লােক ঠকাবার ফাঁদ পাতে। যেমন, একজন দোকানদারি করে। লােকে তার কথা বিশ্বাস করবে বলে ফোটা তিলক কাটে, মুখে খুব হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ বলে, আর সুযােগ পেলেই কম জিনিস দিয়া বেশী দাম নেয়, না হয় কম দামের জিনিস দিয়া বেশী দাম নেয়—আর মুখে কত সাধুগিরি ফলায়, ধৰ্ম্ম-কথা কয়, যেন গ্রাহকে ঠকানের কথাটা মােটেই বুঝতে না পারে। একজনের হয় ত রােজগার করার ক্ষমতা নেই। সে সাধুর পােষাক প’রুল আর ধর্মের বুলি আও- ড়াতে লাগল। লােকে তাকে সাধু ব’লে বেশ, খাওয়ায়, পয়সা কড়িও দেয়, সে কিন্তু সুযােগ পেলে গৃহস্থের ঘরে চুরি করূতেও ছাড়ে না! বেশ দু পয়সা হয়। ' এমনি করে দূর দেশ থেকে পয়সা এনে মাগ, ছেলের ভরণ পােষণ করে। আবার হয় তকোন লুচ্চা সাধু সেজেছে। কোন গৃহস্থ তাকে বিশ্বাস ভক্তি করে বাড়ীতে যায়গা দিয়েছে, খেতে দেতে দিচ্ছে, সে কিন্তু গৃহস্থের বৌটাকে নিয়ে একদিন পলাতক।. এই সব ভও লােকের অত্যাচারে এখন অনেকে প্রকৃত বৈষ্ণব বা, সন্ন্যাসীকেও শাপলার মাত্র সাগরের কথা। বিশ্বাস করতে চায় না ও পারে না।” আর এক রকমের, 'লােক আছে, তারা কেবল সস্তা খােজে। চরিত্র সংশােধন করা, সৎপথে চলা, সাধন ভজন করা, এ সব কিছু ক’তে রাজি নয়। যারা এ সব করতে বলে তাদের কাছে তারা ঘেসেও না। যদি কেউ ব’ল; যা ইচ্ছা তাই কর, তাতে কি? হরি আমার পরম দয়াল, দিনান্তে একবার হরি বল্লেই বিষ্ণুলােকে স্থান পাবে”; অথবা যদি কেউ বলে, “মা কালী কি দুর্গা বড় দয়াময়ী; যা ইচ্ছা কর, কিন্তু দিনান্তে একবার মা বলে ডালেই কৈলাশে স্থান পাবে”; তা হলেই তারা তাকে ভারী দয়াল গুরু বলে মেনে নেয়, তা’রই শরণ লয়। আর যদি এরই সঙ্গে উপকরণ-রূপে একটু মদ্যপান, গঞ্জিকা সেবন, পর-নারী-গমনের ব্যবস্থা থাকে, তবে ত সােণায় সােহাগা। এ ধর্ম সকল ধর্মের সেরা বলে তারা বগল বাজায়। তবে এ লােকগুলাে ঠকদের চেয়ে অনেক ভাল। ঠকগুলাে কেবল পরের সর্বনাশ করে এবং নিজের পায়ের নীচে ত খাল কাটেই; আর এরা কেবল নিজেদেরই ফাকি দেয়, পরের সর্বনাশ করার উদ্দেশ্য এদের তত নাই। কেশবঠিকই বলছেন, বাবা। এমনি দুনিয়ার খেলা। পাগল।-যারা ধর্মশান্ত্রের আদেশ মানে, ধৰ্ম্মরাজ্যে উন্নতি করার জন্য যারা সাধন ভজন করে, তাদের মধ্যে যে নানামত ও নানা পথ দেখ, সেই কথা এখন ব’ব। কিন্তু সে কথা বলার পূর্বেই তােমাকে আর একটা কথা বলে নেই। এই সব লােক অল্প বিস্তর এটা বুঝেছে যে, সংসারের সুখ চিরদিন থাকে না। দুদিনেই সে সুখ শেষ হয়ে যায়, দুঃখ আবার আসে। সংসারে আসলেই এই সুখ দুঃখের মধ্যে পড়তে হয় । জন্ম মৃত্যু ব্যাধি শােক কলহ ইত্যাদি লেগেই আছে। শ্রীভগবানের পাদ-পয়ে স্থান লাভ না করা পর্যন্ত আর এ সব পাগলের বুলি। যাবার নয়। তাই তারা নিজ নিজ সাধ্য অনুসারে ভােগের বাসনা ত্যাগ ক’ছে এবং ইষ্ট দেবের আরাধনায় যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। দরকার বড় বালাই, রে বাবা। যার যেমনটা দরকার সে ত তেমনটাই খুজবে। যাদের মােটা নজর, বুদ্ধিও মােটা, ঠেকে ঠেকে নানা যাতনা পেয়েও যাদের বিশেষ করে ভাবার প্রবৃত্তি আসে না, তারা দুদিনের সংসারে দুদিনের জন্য হাসিখুসি খাওয়া-দাওয়া লঝ ছাড়া আর কিছু বােঝেও মা, চায়ও না, কাজেই তাই খুঁজে বেড়ায়। আর নিজের চেষ্টায় সেটা না.পেলে, তখন ভগবান্ বা ভগবতীর কাছে তাই চায়। এর বেশী যে কিছু আছে, সে কথা তাদের মাথায় আদৌ ঢােকেই না, তাই সে পথে যাবার চেষ্টাও তাদের নাই। ভগবান্ বা ভগবতীকে পাওয়া যাদের একান্ত দরকার বােধ হয়, তা সংসারের আলা-যন্ত্রণা বা শােক-তাপ পেয়েই হােক, আর যে জন্যই হােক; তারাই প্রকৃত সাধক। সব মানুষের রুচি এক রকমের নয়, সকল মানুষের জ্ঞানের পরিমাণও সমান নয়। দেখ, সংসার চালাবার জন্য সকলেরই টাকা উপায় করতে হয়, কিন্তু সকলেই কি এক রকম ব্যস করে? কেউ দোকানদারি করে, কেউ ডাক্তার হয়, কেউ কবিরাজ হয়, কেউ উকিল হয়, কেউ গবর্ণমেন্টের চাকুরি করে, কেউ জমিদার বা মহাজনের চাকুরি করে, কেউ চাষ করে, কেউ লােহার কামার হয়, কেউ সােনার কামার হয়—এ ত দেখতেই পাচ্ছ। তার মধ্যে আবার দেখ একই ব্যবসা যারা করে, তাদের সকলের বুদ্ধির পরিমাণও এক নয় এবং কাজ করার সুধািও সকলের সমান, যােটে না, সুতরাং টাকা উপায়ও সকলের সমান হয় না। আবার দেখ ঐ সকলের মধ্যে ভাল মন্দ দুই রকমেরই মানুষ আছে। কেউ বা ব্যায়-মতে সত্য পথে থেকে কাজ করে, কেউ বা নানা ছল চাতুরি করে লােক ঠকায়। এই ঠকদের কথা বাদ দাও। তাদের কথা এই অল্প আগেই বলেছি। এখন *। সালর নানা আচারের কথা। এই সংসারী জীবনের ভাবটা ধৰ্ম্ম-জীবনে খাটাও সাধকদের মধ্যে সত্ব রজঃ ও তমঃ এই তিন প্রকার গুণের লােকই আছে। সত্ত্বগুণ যাদের বেশী তারা ইন্দ্রিয়-সেবায় মােটেই যায় না, যশ- মান ধন-জন এ সকলের দিকেও তাদের খেয়াল নাই, তারা কেবল শান্ত- মনে পৰিত্ৰ-ভাবে ভগবানের আরাধনায় লেগে থাকে। রজোগুণ যাদের বেশী তারা হৈ চৈ ভালবাসে, মান-যশ-প্রতিপত্তি ধন-জন এই সব খুব চায়। তাদের সাধনায় একটা ধুমধাম জাক-জমক থাকবেই, দম্ভ অহঙ্কারও থাকে। আর তমােগুণ যাদের বেশী তাদের আচার বিচার কিছু নাই, উৎসাহ উদ্যম খুবই কম, প্রাণটা হিংসা দ্বেষে ভরা ;তারা অপবিত্র জিনিস দিয়ে অপবিত্র ভাবে পূজা আদি করে। আবার ঐ এক একটা গুণের কম বেশী অনুসারে ঐ সকল ভাবের ও কাজেরও কম বেশী হয়ে থাকে। এই যা সব ব’লাম, এগুলাে বেশ বুঝতে পারছ ত? কে।আজ্ঞে, হাঁ। পাগল।—সকলেই যদিও একই ভগবাকে পেতে চায় তথাপি ঐ সব কারণে একই ভাবে বা একই নিয়মে সাধন ভজন করে না বা কতে পারে না। লােকের প্রকৃতি প্রবৃত্তি ও ক্ষমতা নানা ভাবের বলেই, সাধনায়ও নানাবিধ আচার ও নানাবিধ প্রথা দেখা যায়। যারা সান্তিক প্রকৃতির লােক, ভগবানের দিকে যারা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে, তাদের মন বিষয় ভােগের পিপাসা থাকতেই পারে না। তাই তারা নিরামিষ আহার করে, কেউ কেউ বা এক বেলা হবিষ্যান্ন করে, শ্রীলােক হতে দূরে থাকে, ঠাকুর দেবতার ভােগ দিতে হলে ভাল ভাল সাত্ত্বিক ধান্ত দিয়ে নৈবেদ্য করে দেয়। যারা অত্যন্ত রাজসিক প্রকৃতির.লােক, মন্ত মাংসাদিতে যাদের প্রবৃত্তি আছে, তাদেরই ঐ সব জিনিস দিয়ে পূজা ক’তে সাধ হয়। শুধু পূজা করা নয়, তারা পূজা-কালে বা পূজা-অন্তে ২২ পাগলের খুলি। মহা আনন্দে ঐ সব জিনিস ব্যবহার করে সাধনারই অঙ্গ মনে করিয়া । এটাকে প্রবৃত্তি-মার্গের সাধনা বলে। এ ভাবে শাস্ত্রের আদেশ মেনে, যথারীতি পূজা ধ্যান জপ আদি ক’রুতে করতে কালে চিত্ত কিঞ্চিৎ শুদ্ধ হইলে সাধনার দিকেই মন বেশী যায়, ওগুলির দিকে দৃষ্টি কম হয়ে যায়, শেষে ওগুলির ব্যবহারে তাদের প্রবৃত্তি আর থাকে না। তখন তারা শুধু ধ্যান জপ এই সব নিয়েই থাকে। প্রবৃত্তি সংযত ভাবে থাকতে থাকতে নিবৃত্তিই এসে যায়। আগে যাদের কথা বলা হয়েছে তারা নিবৃত্তি-মার্গের সাধক। তাদের প্রথম প্রথম বাহিরে পূজার উপকরণ আদিতে (যদিও সার্বিক ভাবের হােক) নজর থাকলেও, শীঘ্রই ও সকলের দিক হতে দৃষ্টি স’রে আসে। তারাও শেষে কেবল ইষ্ট দেবতার ধ্যান জপেই মজে যায়। এমনি করে সাধক বাহিরের দিক থেকে ক্রমে ভিতরে ডুবে যায়। বাহিরের কাজগুলাে হচ্ছে শুধু সাধকের চিত্ত শুদ্ধির জন্য। চিত্ত যতই নিৰ্ম্মল হবে, মন ততই অন্তর রাজ্যে ডুবে যাবে, ক্রমে সূক্ষ্ম তকে গিয়ে পৌছিবে। সাধকের মনটাকে সরল নিৰ্ম্মল এবং সদা ভগবানের ভাবে ভাবিত করার উদ্দেশ্যেই, সাধকের অবস্থা বিবে- চনায়, শাস্ত্রে নানা বেশ-ভূষা, আচার-ব্যবহার, বিধি-নিষেধ-এ সকলের কথা বলা হয়েছে। যে ভাল হ'তে ইচ্ছা করে না ও চেষ্টা করে না, ভগবান্ শুধু তার বেশ পােষাক ইত্যাদিতে ভুলেন না। কেশব।—তা হ'লে, আগেই যদি কেউ ঐ সব বাহিরের কাজ করে, শুধু ধ্যান নিয়েই থাকে, তবে কি ভাল হয় না? পাগল।—পালে ত ভালই। মানুষ তা পারে কৈ? বাহিরের নানা ভােগের বিষয়ে যতক্ষণ টান থাকে, ততক্ষণ ত মন স্থির করে ধ্যানই ক’তে পাবে না। ঐ সব বাহ পূজাদির দ্বারা ভগবানের দিকে মন’রাখতে রাখতে যখন ভােগের বাসনা খুব কমে যায়, তখন ধ্যান করার ক্ষমতা জন্মে। নচেৎ ধ্যান করূতে বসলেও বিষয়-সম্পত্তি, যশ- সাধনার নানা আচারের কথা। মানের, ভােগ-বাসনার কথাই মনে এসে হাজির হয়, কাজেই চুপ করে বসে থাকাই সার হয়, আসল কাজের কিছু হয় না। তাই সাধারণ লােকের পক্ষে বাহিরের পূজা কীর্তন প্রভৃতির খুব দরকার আছে। তবে যদি কোন লােকের পূর্ব পূৰ্ব্ব জন্মের সাধনার বলে মনের অবস্থা এমনি হয় যে, সহজে মন স্থির হয়, ধ্যানাদির সময় বাহিরের বিষয় আর মনে আসে না, তার পক্ষে বাহিরের ওগুলাে করার আবশ্যক হয় না। ভগবান্ ঐ ফুল তুলসী শঙ্খ ঘণ্টা নৈবেদ্য ইত্যাদি না চাইলেও, প্রথম অবস্থায় মনকে বিষয়-ভােগের দিক থেকে টেনে আবার নিমিত্ত সাধকেরই প্রয়ােজন হয়ে থাকে। কেশব।এ কথাগুলাে বেশ বুঝলাম। আচ্ছা, সাধনা করতে মুক্তির দরকার হয় কি না, মুক্তি-পূজা পাপ কি না, সেইটা শুতে বাসনা। পাগল।—নিজের স্বরূপ বােধ যত দিন না হয়, নিজকে এই দেহ ব’লে যত দিন বােধ হয়, তত দিন মূর্তির সাহায্য না নিয়ে সাধনা করা যায় না। তবে ঐ ভাবে সাধনা ক’রুতে করতে, স্তব স্তুতি পাঠ ক’তে ক’রুতে, দেহ-তত্ত্ব ও আত্ম-তত্ত্বের আলােচনা ক’তে করতে, যখন এ ধারণা বেশ বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, আমি দেহ নই, আমি আত্মা, তখন স্বভাবতঃই মন স্থির হয়ে আসে। তখন রূপের দিকে আর ঝোঁক থাকে না, তখন বিশ্বময় ভগবানের শক্তির খেলার দিকেই চোখ পড়ে ; তার গুণের, জ্ঞানের ও দয়ার মহিমা দেখে মানুষ মােহিত হয়ে যায় । ক্রমে এমন অবস্থাও আসে যে, তাঁর মহিমার কথা মনে হতেই মানুষ অন্তমুখীন হয়ে পড়ে, সমাধিস্থ হয়ে যায়, সকল উপাধির পারে চলে সে এমন এক আনন্দ-সাগরে ডুবে যায়, যার কথা, কোন দিন কেউ ভাষায় প্রকাশ করতে পারে নাই। এখানে রূপের কোন কথা নাই। এ বড় শক্ত কথা। এ অনেক জন্মের সাধনায় হয়। এ অবস্থায় সাধক জেগে থাকলেও যা কিছু দেখে সব ভগবান্ বলেই বােধ করে। যায়।

২৪ পাগলের ঝুলি। “স্থাবর জঙ্গম দেখে না দেখে তার মূর্তি। যাহা যাহা নেত্র পড়ে হয় ইষ্ট ফুর্তি ॥” শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের এ কথা কি তােমার মনে পড়ে? কেশব।-আজ্ঞ, হাঁ। এত দিন ও কথাগুলাে বুঝি নাই। পাগল।কিন্তু এ কথা মনে রেখাে যে, বাহ পূজা ও বিচারাদির সঙ্গে সঙ্গে ধ্যানও কিছু কিছু অভ্যাস করা দরকার। তা না করলে শুধু বিচারের দ্বারা ‘আমি দেহ নই, আমি আত্মা এ জ্ঞান পাকা হতে পারে না। দেহ যে আত্মা নয়, এটা ধ্যানের দ্বারা ক্রমে অনুভবের মধ্যে আসে। এখন কথা হচ্ছে, মূৰ্ত্তি অবলম্বন করে সাধনা কবা পাপ কি না। এটা পাপ হতে পারে না। মূর্তির পূজা সাধক করে না, সে ত তুমি জানই। তবে মনটাকে এক যায়গায় গােছাবার জন্য, নিজের প্রাণে খুব ভাল লাগে এমনি একটা দেব-মূর্তি বা দেবী-মূৰ্ত্তি সে সামনে রাখে বা তার ধ্যান করে, সে ত সেই ভগবাকে লক্ষ্য করেই করে। এতে তার মন ভগবানের দিকে ক্রমেই বেশী ছুটতে থাকে। তার কথা কইতে, তার তত্ব শুতে তার খুব ভাল লাগে, আর কিছু ভাল লাগে না। ক্রমেই ভগবানের কাছে এগুতে থাকে। এতে পাপের কি আছে? আর শান্ত্রে লিখিত এই মূর্তিগুলােও এমন ভাবের যে, এর ভিতরের খবর নিতে পারলে দেখা যায়, এগুলাে ভগবানের নানাবিধ শক্তি ক্রিয়া গুণ ও দয়ার কথাই মনে উদয় করে দেয় । এগুলাে গাজায় দম দিয়ে কল্পনা করা হয় নাই। তবে যে লােকের পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধন-বলে প্রথম থেকেই সূক্ষ্ম তত্বের স্ফুরণ হতে থাকে, তার বিশেষ কোন মূর্তি অবলম্বন করে সাধনা করার দরকার হয় না। #লেখকের দুক্ষন ৰা সনাতন ধর্মের গুঢ় রহস্য’ নামক গ্রন্থে, প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে, এ বিষয়ের বিস্তারিত আলােচনা আছে। তাই সে সাধনার নানা আচারের কথা। তুমি জিজ্ঞাসা কর নাই বলে একটা কথা বলা হয় নাই। কথাটা বড়ই দরকারী বলে তােমাকে জানাই, বাবা । জীব-সেবার কথাটা বােধ হয় তােমার মনে উঠে নাই। ভগবান্ যখন সকলের মধ্যেই আত্ম- রূপে আছেন, তখন মানুষ পশু পাখী ইত্যাদির সেবাও ভগবানেরই সেবা জানিও। বিশেষতঃ, এদের মধ্যে যার খাদ্যাদির অভাব হয়েছে, যে ব্যক্তি ব্যাধি-যন্ত্রণায় ভুগছে অথচ দেখবার কেউ নাই, যার থাবার কোন যায়গা নাই, এইরূপ নানা দুঃখে যারা ভুগছে সেই সব লােকের দুঃখ দূর করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করা ভগবানের অতি প্রিয় কাৰ্য্য জাবে। জীবগণের প্রতি হিংসা বা ঘৃণা না করা এবং তা’দিগকে ভাল- বাসা ভক্তির একটা প্রধান অঙ্গ। শ্রীমদ্ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধে, উনত্রিশ অধ্যায়ে, যেখানে ভক্তি-যােগের কথা বিস্তারিত বলা আছে, সেখানে এ কথা স্পষ্টই বলা হয়েছে। সেখানে এ কথাও আছে, জীবের হৃদয়ে ভগবান্ আছেন; যে ব্যক্তি জীবকে ঘৃণা করে ও কষ্ট দেয় সে ভগবাকেই . কষ্ট দেয় ; কাজেই সে ব্যক্তি প্রতিমায় যদি ভগবানের পূজা করে, সেটা ভস্মে ঘৃত আহুতি দেওয়ার মত বৃথা হবে। ঐ অধ্যায়ের বাংলা অনুবাদটা মনোেযােগ দিয়ে পড়ি। কেশ।-বাব', এ সব বিষয়ে আমারও মনে যা যা সন্দেহ ছিল, তা চিরকালের মত ঘুচে গেল। আমি ভুলে গেলেও আপনি দয়া করে জীব-সেবার মহিমা শুনালেন। বাবা, কি দিয়ে যে আপনার চরণ-যুগল পূজা ক’ব তা আর ভেবে পাই না। ভাবে বিভাের হয়ে কেশব গুরুর চরণ দুখানি নিজের বুকের ভিতর জড়িয়ে ধ’ল। কিঞ্চিৎ অপেক্ষা করে পাগল ব’, “এরে ! রাত্রি বেশী নেই, আমি চ’ল্লাম।” এই বলে কেশবের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে, পাগল আস্তে আস্তে পা দুখানি টেনে নিল এবং তাড়াতাড়ি বাহির হয়ে কোন্ দিকে চলে গেল, তার দেখা গেল না।

তৃতীয় রাত্রি। অধিকারের কথা। মাং হি পার্থ ব্যপাশ্ৰিত্য যেইপি স্যঃ পাপযােনয়। ব্রিয়াে বৈশ্যাস্তথা শূদ্রান্তেহপি যান্তি পরাং গতিম্ । শ্রীমদ্ভগবদগীতান৩২ ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিতেছেন, “আমাকে বিশেষরূপে আশ্ৰয় করিলে, স্ত্রীলােক বৈশ্য শূদ্র, এমন কি যাহারা অতি হীন কুলে জন্মিয়াছে তাহারাও নিশ্চয়ই পরম গতি পায়।” যেই ভজে সেই বড় অভক্ত হীন ছার। কৃষ্ণ-ভজনেতে নাহি জাতি কুলাদি বিচার। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত। “ষথেমাং বাচং কল্যাণীমাবদানি জনেভ্যো ব্রহ্মরাজদ্যাভ্যাং শূদ্রায় চাৰ্য্যায় স্বায় চারণায়” যজুৰ্বেদ। ২৬ অধ্যায়। যজুর্বেদের ২৬ অধ্যায় দ্বিতীয় মন্ত্রে দেখা যায়, পরমেশ্বর বলিতে- ছেন, “আমি যে প্রকার সকল মনুষ্যের কল্যাণকর অর্থাৎ ঐহিক ও পারত্রিক বিষয়ে সুখকর চারি বেদের পবিত্র বাণী দ্বারা তােমাদিগকে উপদেশ করিতেছি, সেইরূপ হে মনুষ্যগণ, তােমরাও মনুষ্যমাত্রকেই এই বেদুরূপ বাণীর উপদেশ করিবে। এই কল্যাণীয় উপদেশ তােমরা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, আৰ্য (অর্থাৎ বৈশ্য ), শূদ্র, ভৃত্য এবং অরণ অর্থাৎ অতি ক্ষুদ্র ৰা অস্পৃশ্য প্রভৃতিকে প্রদান করিবে মানুষের মনের আঁধার যতই ঘুচতে থাকে ততই তার প্রাণে একা।

অধিকারের কথা। २१ বল বাড়তে থাকে, সেই সঙ্গে সঙ্গে একটা আনন্দও দেখা দেয়। প্রকৃত জ্ঞানের অভাবেই লােকে, নানা কুসংস্কারের দাস হয়ে, দুঃখ যন্ত্রণা ভােগ করে। কেশবের মনটা ভাল, স্বভাবও পবিত্র, কাজেই তার শান্তি আবারই কথা, তবে যাতে ঠিক ঠিক শান্তি আসে সেই জ্ঞানেরই কিছু অভাব ছিল। তার ধর্ম ভাবের দরুণই, ভগবানের দয়ায়, একজন ভাল সাধুর উপদেশ পাবার সুযােগ সে পেয়েছে। তাই, দিনের দিন ধৰ্ম্মের ও আচারের রহস্য যতই জানতে পারূছে ততই তার আনন্দ বেড়ে যাচ্ছে। ভাদ্র মাস। অমাবস্যা তিথি। রাত্রি চার ছয় দণ্ড হয়েছে। বেশ বৃষ্টি পড়ছে। কেশব নিয়ম মত সন্ধ্যা বন্দনা করে, ভজন-সুখে মাতােয়ারা হয়ে বসে আছে, আর গুরুদেবের অপার দয়ার কথা মনে হওয়ায় তার দুই চোখে জলধারা বইছে। এমনি সময় পাগল এসে হাজির। বৃষ্টির জলে সমস্ত শরীর ভিজে গিয়েছে পরণের ময়লা ও ছােট কাপড়খানা হ’তে জল পড়ছে। কেশব গুরুদেবকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে, একখানা শুন ন্যাড়া এনে তার গা মুছে দিতে চাইতেই পাগল হাতের ইসারা করে নিষেধ ক’ল। কেশব পাগলকে ভিজা কাপড় ছেড়ে গুন কাপড় পরার জন্য যােড়হাত করে অনেক ব’ল। পাগল সে কথায় কাণ না দিয়ে ব’ ‘, দেখ, ঘরে কি আছে। কিছু খেতে দে। কলার পাতা থাকে ত তাতে করেই দে। কেশব তাড়া- তাড়ি খই মুড়ি গুড় কলা শশা এই সব এনে দিল। পাগল নিজের খুসি , মত কিছু খেয়ে এসে ব’ল। কেশব অতি ভক্তির সহিত গুরুদেবের প্রসাদ গ্রহণ করেই তার কাছে এসে বল্ল। পাগল।-কেমন লাগছে রে ? কেশব।-আজ্ঞে, বাবা, বড়ই আনন্দ পাচ্ছি। পাগল।আর কি কিছু তাের জিজ্ঞাসা ক’বার আছে ? কেশব -এই কত দিনের মধ্যে আবার নানা কথা যুটে ২৮ পাগলের ঝুল। গিয়েছে। আপনার কাছে এ পর্যন্ত যে সব সিদ্ধান্ত শিখেছি, সেগুলাে শুনে বহু লােকেই খুব কাজের কথা ও খাঁটি কথা বলে মেনে নিচ্ছে। তবে কতকগুলাে গোড়া লােক আছে তারাই ঝগড়া করতে আসে। কিন্তু আপনার কি কৃপা, সে সব ঝগড়ায় আর আমার জবাব দিবার দরকার হয় না। যারা আপনার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে, তাদেরই কেউ কেউ নানা যুক্তি ও শাস্ত্রের প্রমাণ দিয়ে ওদেরে হটিয়ে দেয়। এখন যে কয়টা নূতন কথা যুটে গিয়েছে, তাই আপনাকে বলি । পাগন।- কি ? বল্ না । কেশৰ।–স্ত্রী-শূদ্রের বেদে অধিকার নাই, দেব-দেবীর মূর্তি পূজায় ও ভােগ দেওয়ায় অধিকার নাই, প্রণব উচ্চারণে অধিকার নাই, কেবল ব্রাহ্মণেরই অধিকার আছে। ভগবান্ কি তা হলে ইচ্ছা করেন যে, স্ত্রী-শূদ্রের প্রাণ ভরে বা ইচ্ছামত তার ভজন করে ? পাগল।-কেন্ রে বেটা, তাের এ ধারণা হ’ল কোথা থেকে যে, ভগবান্ কাউকে খাতির করেন আর কাউকে ঘৃণা করেন ? কেশন।-ভগবান্ এমন অবিচার করেন এ কথা আমি মনে করি না, তবে দুনিয়ায় যে এই রকমই দেখি। পাগল।আসল কথা বেশ করে মন দিয়ে শােন, তা হলেই সব বুঝতে পারবে। অধিকার কার কাছে আর কার নাই? যে যা নিজ অধীনে আনতে পারে, নিজের ব্যবহারের মধ্যে আতে পারে, তাতেই তার অধিকার আছে ব’তে হবে । তুমি মুখে স্বীকার কর আর নাই কর, সে ত তার ব্যবহার করবেই, কেন না সেটা তার নিজের হাতের মধ্যে। যে তা ক’তে পারে নাই, সে মুখে হাজার ব’লুক না কেন ‘আমার এতে অধিকার আছে কিন্তু সে তার ব্যবহার করতে পারবে না, আর ব্যবহার করার ভান করলেও সেটা কেবল ছেলে খেলাই হবে।

অধিকারের কথা। ২৯ প্রথম ধর বেদের কথা। বেদ অর্থ জ্ঞান। যে জ্ঞান দ্বারা ভগবানকে পাওয়া যায়, তাই প্রকৃত বেদ এবং তা নিত্য। তবে লােকে সাধারণতঃ ঋক্‌ যজুঃ সাম ও অথৰ্ব্ব নামে চারিখানি অতি প্রাচীন মহা গ্রন্থকেই বেদ বলে। এই চারিখানা মহাগ্রন্থেরও আবার দুই দুই ভাগ আছে—কৰ্ম্ম-কাণ্ড ও জ্ঞান-কাণ্ড। সংহিতা কৰ্ম্মকাণ্ড আর উপনিষদ জ্ঞানকাণ্ড! কালে কালে বেদের কর্মকাণ্ড উঠে গিয়ে পুরাণের ও তন্ত্রের কৰ্ম্মকাণ্ড চলিত হয়েছে। কাজেই সংহিতার আলােচনা আজ কাল অতি কম লােকেই করে থাকে। উপনিষদে নিত্য-জ্ঞানের কথা আছে এবং তার ভাষাও অনেকটা আজ-কালকার ভাষার মত। তাই সেগুলাে এখনও অনেকেই চৰ্চ্চা করে। বেদ-সংহিতা অতি পুরাতন জিনিস। তার ভাষা ছন্দ ব্যাকরণ অভিধান সব অতি পুরাতন কালের। সে সব তা এখন চলিত নাই। ঐ সব তা না শিখলে বেদ-সংহিতা শুধু পড়লেও কিছু বুঝা যায় না। আগে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য বংশের ছেলেরা উপনয়ন হলে গুরুগৃহে পড়তে যেত। সেখানে দীর্ঘ দিন গুরু-সেবা ক’ত আর ঐ সব শিখত ; সঙ্গে সঙ্গে সাধন ভজন ক’ত বলে ঐ সব জিনিস বুঝতে পারত। এখন সে সব প্রথা উঠে গিয়েছে। যারা মুখে বলে আমাদের বেদে অধিকার আছে তাদের পৌণে ষােল আনাই বােধ হয় কোন দিন চোখেও দেখে নাই বেদ-সংহিতা কেমনধারা জিনিস, তা পড়া বা বুঝা ত অনেক দূরের কথা। ভগবান্ বেদব্যাস লােকের ঐ দশা দেখে, বেদের জিনিসগুলাে সােজা করে গল্পের সাহায্যে শিখাবার জন্য, আজকালকার ভাষায় মহাভারত এবং শ্রীমদ্ভাগবত লিখেছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে স্পষ্টই আছে যে, ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যকুলে যারা বেদ পড়তে ও বুঝতে পারে না তাদের এবং স্ত্রীলােক ও শূদ্রদের জন্যই তিনি ঐ দুই গ্রন্থ রচনা করে- ছিলেন। কাজেই বুঝে দেখ, বেদ-সংহিতায় এখন অধিকার খুব কম ।

পাগলের ঝুলি। লােকেরই আছে, কিন্তু বেদে বা ভগবদ্ জ্ঞানে (নিত্য জ্ঞানে) সকলেরই অধিকার দিবার জন্য ঋষিরা অনেক চেষ্টা করে গিয়েছেন। এখন কথা হচ্ছে পূর্বকালে স্ত্রীলোেক ও শূদ্রের এতে অধিকার ছিল কি না। তার উত্তর এই যে, পূর্বে লােকে এখনকার মত কেবল দেশাচার বা লােকাচার মতই কাজ ক’ত না। তার। বিশেষ বিচার করে কাজ ক’ত। যার মতিগতি ভাল দেখত, তারেই তারা তুলে নিয়ে শিক্ষা দীক্ষা দিয়ে মানুষ করে তুত। দাসী জাবালীর পুত্র জাবাল, গুরুকুলে বাস করে শিক্ষালাভ করার ইচ্ছা হওয়ায়, গৌতম মুনির আশ্রমে যায়। মুনি তার বাপের নাম জিজ্ঞাসা করেন। জাবাল তা ব’তে পারে না। মায়ের কাছে শুনে গিয়ে পর দিন সে মুনিকে বলেছিল, ‘মা বলেছেন, অতি গরিব বলে যৌবনে অনেক যায়গায় তাকে দাসীর কাজ করতে হয়েছিল, সেই সময় আমার জন্ম হয়েছে, কাজেই আমার পিতা যে কে, তা তিনি বলতে পারেন না। তখন মুনি ব’ললেন, ‘সত্য কথা কহা ব্রাহ্মণের লক্ষণ। তুমি সত্য বলেছ, সুতরাং তুমি ব্রাহ্মণ ! আজ থেকে তােমার নাম সত্যকাম। এস, তােমাকে উপনয়ন দিয়ে আমি বেদপাঠ করাব। কাজেও তাই হয়েছিল। শাস্ত্রে আরও দেখা যায় যে, নারদ ব্যাস বশিষ্ট প্রভৃতি যারা আমাদের মাথার মুকুট, যারা না জন্মিলে হয় ত হিন্দুর নাম জগতে শ্রদ্ধা পাবার কোনই সুযােগ পেত না, সেই সব ঋষিরা অতি হীন স্থানে জন্মেছিলেন। তাদের অধিকার দিতে ত কেউ কৃপণতা করে নাই। তবে যাদের কিছু শিখবার মত বুদ্ধি শুদ্ধি কিছুই ছিল না, তারাই শুদ্র হয়ে থাকত। তারা সুযােগ পেলেও শিখতে পারুত না, কাজেই তাদের অধিকার থাকবে কেমন T তার পরে স্ত্রীলােকের কথা। স্ত্রীলােকদের মধ্যেও যারা শিখবার ইচ্ছা ও ক্ষমতা রাখত, তাদের ত কেউ বেঁধে রাখে নাই। মৈত্রেয়ী 'অবিচারের কথা। ; গার্গী বাচাবী সুলভ প্রভৃতি মেয়েদের নাম শুনা যায়। তারা ব্ৰহ্ম-বিদ্যা লাভ করেছিলেন। চণ্ডীপাঠের প্রথমে দেবী-সূক্ত অবশ্য পড়তে হয়। ইহা বেদেরই একটা সূক্ত বা শ্লোকমালা এবং ইহা একজন স্ত্রীলােকের রচনা। এঁর নাম ছিল বাক্ আর পিতার নাম ছিল অতৃণ ঋষি। কাজেই দেখ, তাদের অধিকার নাই বলে কেউ ফেলে রাখতে পারে নাই। সময়ে সব জিনিসেরই অবনতি এসে পড়ে। এ বিষয়েও তাই হয়েছে। পরবর্তী কালে মানুষ যখন বেশী স্বার্থপর হয়ে পড়ল, তখন যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল, তারা অপর সকলকে নানা কৌশলে নীচুতে রেখে নিজেরা আধিপত্য ও সম্মানটা একচেটে করে নিয়েছিল। আর যারা নীচে পড়ে রইল, তারা বংশানুক্রমে আপনাদিগকে হীন ভাবতে ভাবতে হীনই হয়ে গেল ; আর উঠবার চেষ্টাও ক’ল না, উঠলও না। তাই হিংসা ঘৃণা ও বিবাদ সমস্ত সমাজের মধ্যে লেগেই আছে, সকলকে দুর্বল করে ফেলছে, সুখ শান্তি মােটই নাই। এখন শােন প্রণবের কথা। বেদের সার ব্ৰহ্ম-গায়ত্রী, আর ব্রহ্ম গায়ত্রীর সার প্রণব। প্রণব হচ্ছে বীজ, তার অর্থ পাবে ব্ৰহ্ম-গায়ত্ৰীতে আর বিস্তারিত অর্থ পাবে বেদসকলে। অর্থ বুঝে প্রণবের সাধনা ক’রুতে হয়, তবে প্রণবে অধিকার জন্মে । প্রণবই হচ্ছে ভগবানের স্বাভাবিক নাম এবং তার সকল নামের শ্রেষ্ঠ নাম। তার সাধনা না ক’রুতে পারাই দুর্ভাগ্য, কিন্তু তার সাধনা ক’বার মত ক্ষমতা যদি কারাে থাকে, তবে সে তা করলে তার পাপ হবে, এটা নিতান্তই গায়ের জোরের কথা। প্রণব বা ওঙ্কারের অর্থ অতি গভীর। সে কথা ভাল করে বুঝবার শক্তি এখন তােমার হয় নাই। কাজেই এখন তা থাক্। তােমাদের ধর্মগ্রন্থ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে আছে— প্রণব যে মহাবাক্য ঈশ্বরের মূর্তি। প্রণব হইতে সৰ্ব্ব বেদ জগতে উৎপত্তি।

পাগলের ঝুলি। কেশব।আজ্ঞে, হাঁ। শ্ৰীমন্মহাপ্রভু গৌরাঙ্গসুন্দর বাসুদেব সার্বভৌমকে এ কথা বলেছিলেন। পাগল।-এখন প্রণব বা ওঙ্কার-রূপী ঈশ্বর সকলের মধ্যেই প্রাণ-সূত্ৰ-আকারে আছেন। সেই সূত্রে ( ভগবানে) যাতে সর্বদা মন থাকে, তারই জন্য বাহিরে পৈতা ধারণ করা হয়। এই হচ্ছে উপনয়নের সাধনা-গত প্রকৃত ভাব। এই ভাব নিয়ে যারা না চলে তাদের কিছু সূতা ধারণ করাই সার হয়। আর সেই প্রাণ-সূত্রকে ধরে যারা কাজ করতে পারে, ওটীকে যারা ধরে থাকে, তাদের বাহিরে পৈতা ধারণ করা বা করায় কিছু আসে যায় না। সদ্গুরু লাভ করে যারা এই প্রণবের সাধনা করে, তারাই এর উচ্চারণে প্রকৃত অধিকারী। নচেৎ ও শব্দটা সাধারণতঃ যে ভাবে উচ্চারণ করা হয়, অতি হীন শূদ্র যাকে বলা হয়, তার পক্ষে সে ভাবে উচ্চারণ করা কি অসাধ্য বলে মনে কর ? কেশব-আজ্ঞে, না। সে এত কথা ব’তে পারে, আর ও কথাটা বলতেই পারে না, এ কেমন করে হয় ? পাগল।তা হলে ওটা শুধু মুখে বললেই হয়ে গেল না। উহার সাধনা যারা করেছে তারাই ওর মৰ্ম্ম জাতে পারে, তাদের উচ্চারণই সার্থক অর্থাৎ ফল দেয়। তাদেরই প্রকৃত পক্ষে অধিকার আছে ব’তে হবে। এখন বুঝলে ? কেশব।-আজ্ঞে, হাঁ। আমাদের পক্ষে কি ? পাগল।এতদিনে বুঝি এই বিদ্যা হ’ল, রে বেটা গাধা? সাধনা দিবার সময় তাের ক্রিয়ার সঙ্গে এটা মিলিয়ে দেই নাই ? কেশব-আজ্ঞে, হাঁ। বুঝলাম এই সাধনাই প্রণবের সাধনা, আর এই সাধনা হতেই ও বিষয়ে অধিকার জন্মে। শুধু কোন জাতি বিশেষে জন্মিলেই অধিকার থাকে বা থাকে না, এ কথা ঠিক নহে। বাবা, এখন ঐ বিষয়টা শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে অর্থাৎ স্ত্রীলােকও ৬ অধিকারের কথা। শূদ্রের পক্ষে দেব-দেবীর মূর্তি পূজা ও ভোগ দেওয়ার অধিকার আছে কি না। পাগল—স্ত্রীলােক এবং শূদ্রদিগকে দেব-দেবীর আরাধনার জন্য গুরু মন্ত্র দিয়ে থাকেন, সেই মন্ত্র জপ করতে বলেন, সেই দেব বা দেবীর রূপ ধ্যান ক’তে বলে থাকেন এবং দর্শন লাভ ক’রুতে বলে থাকেন। এ জান ত ? কেশব—আজ্ঞে, হাঁ। এমন কি অনেক স্থানে, বাহিরে কোন মূৰ্ত্তি সানে না রেখে, ফুল তুলসী বা ফুল বেলপাতা দিয়ে পূজাও শিখান হয় দেখি। সেখানে ত দেবতার মূর্তি ধ্যান করে, তারই পূজা করতে হয়। এই যে ষষ্ঠী সুবচনী লক্ষ্মী সরস্বতী মনসা প্রভৃতির পূজা, বার মাস যা পুরােহিত ঠাকুররা যজমানের বাড়ী করে থাকেন, তার অনেক স্থলেই মূৰ্ত্তির কোন ব্যবহার নাই। সেগুলাে এই রকমেরই পূজা। পাগল—তা হলে এই কথাই প্রমাণ হচ্ছে যে, কোন দেবতার পূজা, তৈয়ারি মূর্তি সামনে রেখেও করা হয়, না রেখেও করা হয়। এখন, যে সব স্ত্রীলােক বা শূদ্রকে গুরু-ঠাকুররা পূজা শিখান, তারা যদি ইষ্ট মূৰ্ত্তি সামনে রেখে পূজা করে, তাতে কি দোষ হতে পারে ? তবে ঐ মূর্তিতে প্রাণ-প্রতিষ্ঠাদি যে সকল ব্যাপার আছে, সেইগুলাে তাদের জানা দরকার। তা যদি তারা শিখে নেয়, তবে আর তাদের মূর্তিপূজায় কোনই বাধা দেখা যাচ্ছে না। দেবতা ত আর ঐ স্থূল মূর্তি নয়। বিনা মূর্তিতে যার পূজা হয়, মূর্তির ভিতরে তাকেই স্থাপন করে পূজা করা হয়। এ অবস্থায়, মুৰ্ত্তি অবলম্বন করে পূজা করায় ও ভােগ রাগ দেওয়ায় শূদ্রের বা স্ত্রীলােকের কোন দোষ হতে পারে না। মােটর উপর, সব ব্যাপার জানা চাই, শেখা চাই, প্রাণের গাছ ভক্তি ঢেলে দিয়ে পূজা করা ও ভােগ রাগ দেওয়া চাই। তা হলে দেবতা সন্তুষ্ট বই অসন্তুষ্ট হতে পারেন না। আর যদি ভক্তি শ্রদ্ধা না পাগলের ঝুলি। থাকে, পূজাদির ক্রম ও মৰ্ম্ম জানা না থাকে, পবিত্র ভাবে যদি করা হয়, তবে জাতিতে ব্রাহ্মণ হলেও এবং পুরুষ লােক হলেও তার পূজা সিদ্ধ হয় না, দেবতা তুষ্ট হন না। এ কিছু জেদাজেদির কথা নয়, জোর বলের কথাও নয়। নিয়ম ক্ষত এবং ভালবাসার সঙ্গে কাজ না ক’লে মানুষই সন্তুষ্ট হয় না, তখন দেবতার কোন্ কথা? কাজেই যার এ সব আছে তারই অধিকার আছে-শ্রীলােক বা পুরুষ, জন্মগত জাতিতে ব্রাহ্মণ বা শূদ্র বলে কোন কথা হতে পারে না। তবে সাধারণতঃ স্ত্রীলােক ও শূদ্রের শিক্ষা দীক্ষার ব্যবস্থা তেমন না থাকায়, ঐ সব গুণ তাদের লাভ করা ঘটে না বলেই অধিকার নাই, এ কথা বলা হয়। তােমাদের হরি-ভক্তি-বিলাসের টীকায় ও ভক্তমাল গ্রন্থে ভক্তিমান্ শূদ্রদিগকে শালগ্রাম অর্থাৎ নারায়ণ-শিলার পূজারও অধিকার দেওয়া হয়েছে। কেশব-আজ্ঞে হাঁ, এ কথা শুনেছি। তবে ওগুলাে দেখা বা পড়া আমার ভাগ্যে ঘটে নাই। বাবা, আর একটা কথা মনে উঠল। জিজ্ঞাসা ক’তে সাহস হচ্ছে না। আপনি অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছেন, নিশ্চয়ই আপনার কষ্ট হচ্ছে। আজ আর কিছু জিজ্ঞাসা ক’ব না, অন্য দিন শুন্য। পাগল না, বেটা, কি বলবি। আমার কোন কষ্ট নাই। কেশব—আচ্ছ, লােকে বলে, ব্রাহ্মণের কাছে ভিন্ন অন্য কারো কাছে ধৰ্ম্ম উপদেশ শুনতে নাই। বিশেষতঃ জাতিতে ব্রাহ্মণ হয়ে অব্রাহ্মণের কাছে ধৰ্ম্ম-উপদেশ নিলে, সেই ব্রাহ্মণের ব্ৰহ্ম-তেজ নষ্ট হয়। এ কথাটা আমি ভাল বুঝতে পারি না। আমার ত মনে হয়, যে ব্যক্তি প্রকৃত ধার্মিক, ধৰ্ম্ম-তত্ব যে জানে তার কাছেই ধৰ্ম্ম-উপদেশ নিতে হয়। তাতে কারো হানি হয় না বরং উপকারই হয়। এতে জাতি-ভেদ দেখবার ।

অধিকারের কথা। { দরকার নাই। আমার এ ধারণাটা ঠিক কি না, এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। পাগল।-দেখ, এই সামাজিক জাতি যা এখন চলছে, তার সঙ্গে ধৰ্ম্ম-জগতের জাতি বা প্রকৃত জাতির রাত্রি দিন তফাৎ। ভগবান জাতি ভাগ করেছিলেন গুণ ও কর্ম অনুসারে, আর এখন যে সামাজিক জাতি দেখতে পাচ্ছি তার সঙ্গে গুণ-কর্মের সম্পর্ক খুবই কম আছে। এখন সমাজে হয়েছে জন্মগত জাতি, গুণ-কৰ্ম্ম থাক আর না থাক্। এ জাতি-বিভাগ নিয়ে ধৰ্ম্মে অধিকার বা অনধিকারের কোন কথাই হতে পারে না। গুণ-কৰ্ম্ম অনুসারে যে গতি, তাই নিয়ে ধৰ্ম্ম-বিষয়ে অধিকার বা অনধিকারের কথা বলা হয়েছে। একটা মােটা কথা শােন্। যে ডাক্তারি বা কবিরাজি বিদ্যা ভাল জানে, চিকিৎসা ভাল জানে, যে-ই রােগ চিনতে পারে, তার দ্বারা চিকিৎসা করালে ব্যারাম ভাল হতে পারে। সে যদি সমাজের অতি হীন কুলেও জন্মে থাকে, তবু সে ব্যারাম সারাতে পাবে। আর যদি কেউ সমাজের খুব উচু কুলেও জন্মে থাকে, অথচ ঐ বিদ্যা যদি তার না থাকে অথবা সে বিষয়ে অতি সামান্য জ্ঞান থাকে, তবে তার দ্বারা কি উৎকট ব্যাধির চিকিৎসা হতে পারে, না ব্যারাম সারান যেতে পারে ? ভগবানের ভজন দ্বারা মনের ব্যারাম দূর করে শান্তি লাভ ক’রুতে হয়, তার পরে না সেই পরম আনন্দ। সুতরাং ভগবানকে যে জানে, তঁার ভজন যে করেছে, তাকে যে পেয়েছে, সে-ই ত র ভজন শিখাতে পারে, তার কাছে নিয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে সামাজিক জাতি-কুলের প্রশ্ন কি আছে? চৈতন্য দেব বলেছেন- কিবা শূদ্ৰ কিবা বিপ্র সন্ন্যাসী কেনে নয়। যেই কৃষ্ণ-তত্ববো সেই শুরু হয় । চৈয় দেব নিজে রায় রামানন্দের কাছে উপদেশ নেছিলেন পাগলের ঝুলি। এবং প্রদ্যুম মিশ্রকে উপদেশ শুবার নিমিত্ত তার কাছে পাঠিয়েছিলেন। ( রায় রামানন্দ জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন না।) ভগবানের জাতি কুল কিছু নাই, তিনি সকলের মধ্যেই আছেন। তাকে পেতে হলে তারই মত হতে হবে, জাতি কুল বিদ্যা ধন প্রভৃতির অভিমান ছাড়তে হবে। ধৰ্ম্ম-জগতের যত বড় লােক সবারই এই দশা ধৰ্ম্ম-জগতে ব্রাহ্মণ শব্দের অর্থ-যে ব্ৰহ্মকে জেনেছে, যে ব্ৰহ্মকে পেয়েছে ; কাজেই যার ভেদ-জ্ঞান ও সঙ্কীর্ণতা দূর হয়েছে, ভগবানের খবর জানে ও দিতে পারে। এই জন্যই বলা হয় “ব্রাহ্মণের কাছে ধৰ্ম্ম শিক্ষা করতে হয়, অন্যের কাছে নয়’ অব্রাহ্মণ অর্থাৎ যার তত্ত্ব-জ্ঞান নাই, তার কাছে শিখলে, ভুল পথে চ'লে আরাে অধঃ- পতন হয়। এটা সামাজিক জাতি ব্রাহ্মণকে লক্ষ্য করে বলা হয় নাই। এ সম্বন্ধে তাের যে ধারণা আছে সেটা ভুল নয়। যারা জাতি কুল বিদ্যা ধন ইত্যাদির অভিমানে বদ্ধ, তারা ভগবাকে কখনও জানতে পারে না। তবে কথা হচ্ছে কি জানিস, যে যেমন লােক সে তেমনি লােককেই ভালবাসে আর তার সঙ্গেই উঠা বসা করে । সুতরাং সামাজিক জাতির অভিমানে একান্ত বদ্ধ এক ব্যক্তি সামাজিক জাতির অভিমানে একান্ত বদ্ধ আর এক ব্যক্তিকে যে বরণ ক’রূবে, তা ত স্বাভাবিক। কারণ মুক্ত ব্যক্তির নিকট যেতে তার প্রবৃত্তিও আসে না এবং তার সামর্থ্যও নাই। কথা শেষ করে পাগল ব’, “এখন যাই”। কেশবের প্রাণে একটা আঘাত লাগল—সুখের স্বপন ভেঙ্গে গেল। কেশব কাতর- প্রাণে গুরুদেবের চরণে প্রণাম করে তার দিকে চেয়ে রইল। পাগল, আশৰ্ব্বাদ করে, আপন মনে চলে গেল যেন তার প্রাণে কিছুই স্পর্শ করে নাই। .

চতুর্থ রাত্রি। অশৌচের কথা। —- “এবং গুণবিশেষেণ সূতকং সমুদাহৃতম্।” দক্ষসংহিতা! ষষ্ঠ অধ্যায় । ( দক্ষ সংহিতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে, কি কি অবস্থায় কত দিন অশোচ হয়, তাহা বিস্তারিত বলার পর উপসংহারে বলা হইয়াছে) এইরূপে গুণের নূনাধিক্য অনুসারে অশৌচের ব্যবস্থা নির্দিষ্ট হইল। কয়েক মাস যায়, পাগলের সঙ্গে আর কেশবের দেখা হয় না । কেশব বাবাজি গুরুদেবের উপদেশ মত সাধন ভজন করে ; ভগবানের সেবা, লােক-সেবা এবং জীব-সেবা নিয়ে আছে। পরম আনন্দে দিন কেটে যাচ্ছে। কিন্তু গুরুদেবকে দেখবার জন্য তার প্রাণ বড়ই ব্যাকুল- যার কৃপায় সে আজ অমৃত পান করছে, তঁাকে না দেখতে পেয়ে তার হৃদয় সময় সময় বড়ই অস্থির হয়ে ওঠে। অগ্রহায়ণ মাস। অল্প অল্প শীত পড়েছে। এক অন্ধকার রাত্রিতে কেশব, ঘরের দরজা বন্ধ করে, বারান্দায় শুয়ে শুয়ে কেবল গুরুদেবের কথাই ভাবছে, চোখে ঘুম নাই। হঠাৎ আঙ্গিনায় কার পায়ের শব্দ , পাওয়া গেল। কেশব উঠে ব’ । পাগল সাম্‌নে এসেই সঙ্গে যাবার জন্য তাকে ইসারাক’রুল। সেও ছায়ার ন্যায় তৎক্ষণাৎ গুরুদেবের পেছনে পেছনে চল। কারাে মুখে কথা নাই। কতক্ষণ পরে দুজনেই, গ্রামের দুর প্রান্তে নদীর ধারে শ্মশানে এসে উপস্থিত। ভয়ানক, স্থান। কেশবের শরীরটা একবার কাঁটা দিয়ে উঠল। কিন্তু সে তখনি মনকে একটা ধমক দিল, “হতভাগা! যার জন্য আমার প্রাণ অস্থির, সেই প্রাণের

পাগলের ঝুলি।
দেবতা আজ আমার সামনে, আর শ্মশান বলে ভয় ! ৩ার চরণ দেখতে
পেলে আমি মরণকেও ডরাই না, সে মরণ আমার বড় আরামের, বড়
আনন্দের, বড় সাধের। আম, তাের কোন কথা আমি এখন শুনতে
রাজি নই।”
নীরবে পাগল ব’, নীরবে কেশবও ব’ল। কতক্ষণ পরে
পাগল জিজ্ঞাসা করল, “কেমন চলছে রে ?”
কেশব।--বাবা, বড় আনন্দে আছি। আপনার অসীম দয়ার
কথা যখনি আমার মনে হয়, তখনি আমার দুই চোখ জলে ভরে
আসে। বাবা, আপনি যে এক এক বার দেখা দিয়ে কোথায় চলে যান,
আর আপনাকে পাই না। হয় ত একদিন শুনলাম আপনি অমুক
ষায়গায় আছেন, তখনি ছুটে সেখানে যাই। কিন্তু আমার কি পােড়।
কপাল, আপনার চরণ-দর্শন সেখানে পাই না, আর খুঁজেও কোন সন্ধান
পাই না। অভাগা ছেলের কথা আপনি একেবারে ভুলে যান, এইটাই
আমার দুঃখ।
পাগল।-(একটু ক্রোধ দেখিয়ে) হাঁ, এই বুঝি তাের এত
দিনে জ্ঞান হয়েছে ? আমি কি তােকে ছাড়া ? তাের মধ্যে আমি
নাই? এই দেহটাকে বুঝি আমি বলে ঠাউরে বসে আছিস্?
কেশব।—না বাবা। আপনি আমার ভিতরে আছেন, তা
জানি, তথাপি ঐ দেহ নিয়ে আপনি যখন আসেন তখন প্রাণটা বড়ই
আশ্বস্ত হয়। ঐটার সঙ্গে আপনাকে দেখতে বড় সাধ হয়।
পাগল।-আচ্ছা, আচ্ছা, এখন রেখে দে ওসব কথা। কি
জানতে চাস তাই এখন বল্।
কেশব।—কিছু জানতে ত আর প্রাণ চায় না, যা দিয়েছেন
তাই নিয়েই থাকতে ইচ্ছা হয় । লােক-সেবা এবং জীব-সেবাই ভগবানের
সেবা এবং আপনারও সেবা-আপনি এই যা শিখিয়েছেন, আমিও তাই
।

অশৌচের কথা।
মনে করি। সেই সেবা-ধৰ্ম্ম নিয়ে আছি বলে, লােকের সন্দেহ দূর
করার জন্য অনেক কথা আপনার কাছে আমার শোনার দরকার হয়,
নচেৎ ও সবে আমার কোন প্রয়ােজন নাই।
পাগল।-ভাল, কি জিজ্ঞাসা করবি, তাই কর।
কেশন।—অশৌচ হলে ধর্ম-কৰ্ম্ম কিছু করতে নাই, এ কথার
তাৎপৰ্য কি ? অশৌচ অবস্থায় বা অপবিত্র স্থানে ভগবানের নাম করা,
কি তাকে স্মরণ করায় পাপ হয় কি? অনেকে বলে যে, ওরূপ করলে
পাপ হয়, ও করতে নাই। আচ্ছা তা হলে, যদি কেহ অশৌচের মধ্যে
মারা যায়, আর অশৌচ বলে মরণের আগে ভগবানের নাম ক’বার
শক্তি থাকতেও যদি না করে, তবে তার সদগতি হ’ল না ত।
পাগল।অশৌচ কি, ভগবানের নাম করা বা ভগবান্‌কে স্মরণ
করা, কোন দেব-দেবীর ভজনাই বা কেমন করে করতে হয়, কোন্
উদ্দেশ্য নিয়েই বা তা করা হয়—এই সব যদি একটু তলিয়ে দেখ, তা
হলে ওরকম সন্দেহ আবার কোন কারণই থাকে না।
কেশব—আমি ত ও সন্দেহ থাকলেও তার কোন ধার ধারি
না। আপনার আদেশ, আপনার দেওয়া সাধনা, তাই আমার যথা-
সৰ্বস্ব ; কাল-অকাল সুস্থান-কুস্থান শৌচ-অশৌচ আমার মনেই আসে
না। তবে যাতে সকলকে ঐ ব্যাপারগুলাে ভাল করে বুঝতে পারি,
তেমনি করে এ অধমকে দয়া করে বলুন।
পাগল।-অশৌচ মানে অশুচির ভাব, অপবিত্রতা। অশৌচ
আবার দুই রকমের, বাহ এবং আন্তর অর্থাৎ বাহিরের আর ভিতরের।
শরীরে লাগলে অথবা মল-মূত্রাদি অপবিত্র জিনিসে পূর্ণ
স্থানের ভিতর দিয়া গেলে বাহিরের অশৌচ হয়। ইহা জলে স্নান
প্রভৃতির দ্বারা দূর ক’তে হয়। কুবৃত্তি কুচিন্তা, ইন্দ্রিয়-মুখ ভােগের
লালসা, শােক, দুঃখ ইত্যাদি, যা মনকে অস্থির করে, সেইগুলাে যখন
;

৪০ পাগলের ঝুলি। মনের মধ্যে খেলা ক’তে থাকে, তখনই ভিতরে অশৌচ হয়েছে জাবে। সত্য পথে চলা, ইন্দ্রিয় দমন করা, জগতের অনিত্যতা চিন্তা করা, আত্মার স্বরূপ আলােচনা করা ইত্যাদি দ্বারা সেই অশৌচ দূর হয়। ভিতরে যতক্ষণ বিশুদ্ধ ভাব না আসে, শান্তি না আসে, ততক্ষণ ভিতরের • অশৌচ যায় না। তুমি যে অশৌচের কথা বলেছ, সেটা মৃতাশৌচ আর সন্তান হলে যে অশৌচ হয়, তার উপর লক্ষ্য করেই বলেছ। এ দুটাই ভিতরের অশৌচ। এই দুই অবস্থায় লোকে সব জাতীয় দেব-কাৰ্য্য, অনেকে এমন কি নিজের নিত্য-কৃত্য সন্ধ্যা-বন্দনাদি পৰ্যন্ত, বাদ দিয়ে থাকে। ভিতরের অশৌচ অবস্থা কি, তা তােমাকে একটু আগেই বলেছি। ভগবানের নাম করতে হলে, ভগবানকে স্মরণ করতে হলে, মন প্রাণ এক করে করতে হয়। মন আর সব কথা অর্থাৎ সংসারের ‘মাবতীয় ভোগ-বিলাস বা সুখ-দুঃখের কথা ভুলে কেবল ভগবানকেই ভাববে, তঁারই নাম উচ্চারণ করবে। এখন, মন যদি শােকে একবারে গলে যায়, মৃত ব্যক্তির ভালবাসার কথা জেগে উঠায় মন যদি কেবল কেঁপে কেঁপে ওঠে, তা হলে ভগবানের চিন্তা যে আসেই না, যদিও বা জোর করে কখন একটু আধটু আনা যায় তা উপর উপরে কেবল। এই জন্যই কোন জ্ঞাতি অর্থাৎ নিকট আত্মীয় মারা গেলে যে অশৌচ হয়, সেই সময়ে কোন দেব-কাৰ্যাদি করা হয় না। এই না করার যে ব্যবস্থা সেটা করা হয়েছে শুধু অজ্ঞানী সাধারণ লােকের জন্য, তত্ত্বজ্ঞানী বা প্রেমিক সাধকের জন্য এ বিধি নয়। ওরূপ ব্যক্তির মন সর্বদাই অতি পবিত্র, বিশেষতঃ পিতা পুত্র স্ত্রী আত্মীয় প্রভৃতির মৃত্যুতে তার মনে কোন দুঃখ বা দুর্বলতা আসে না। গৃহস্থ হলে তিনি তার সামাজিক নিয়ম অনুসারে অশৌচ পালন করেন বটে, কিন্তু ঐ অশৌচ তঁার সাধনা ৪১ অশৌচের কথা! বন্ধ করতে পারে না এবং তিনি তা বন্ধও করেন না। এ বিষয়ে কেউ কেউ বলেন, নিত্য সাধনা যে সন্ধ্যা-বন্দনা, তা বাদ দিতে নাই। সে কথাটা ঠিক। নিত্য-কৰ্ম্ম চিত্তশুদ্ধির নিমিত্তই ক’তে হয়, এর মধ্যে অন্য কোন কামনা নাই। কাজেই শশাকের দরুণ যদি ঠিক ঠিক নাও হয়, তাতে তেমন দোষ নাই, যেটুকু হয় সেইটুকুই লাভ। তবে যে শােকে একবারে গলে গিয়েছে, সে ত ক’রুতেই পারে না, তার আর কি করা যায় ? সকাম উপাসনা অর্থাৎ এ জগতে বা পর-লােকে কোন সুখ-ভােগ পাবার লালসায় যে পূজা প্রভৃতি, সেটা ও সময় করতেই নাই। কারণ একে ত ও জিনিসটাই ভাল নয়, তারপর আবার উহা করতে গিয়ে মনের গােলে নানা ত্রুটী করে ফেলে আশা পূর্ণ ত হয়ই না, আরও নানা বিপদ ঘ’বার সম্ভাবনা। এখন কথা হচ্ছে এই যে, নানা বাসনার ফলে মানুষ যে সুখ- দুঃখের সংসারে জড়িয়ে পড়েছে, তা হতে উদ্ধার পেতে হলে, সর্বদা কায়-মন-প্রাণে ভগবানের আরাধনা করাই তার উচিত। এই ক’তে পালে, ক্রমে মন নিৰ্ম্মল হয় এবং মৃত্যু-সময়ে ভগবানে মন প্রাণ সমর্পণ করার সম্ভাবনা থাকে। মৃত্যুকালে যদি একমনে ভগবাকে স্মরণ করা যায়, তবেই জন্ম-মৃত্যুর হাত হতে নিস্তার পাওয়া যায় ও চির-শান্তি লাভ হয়। সুতরাং শৌচ-অশৌচ সুস্থান-কুস্থান কিছু বিচার না করে, যাতে তার কথা মনে থাকে, সেই উপায়ই সর্বদা অবলম্বন করা উচিত এ বিষয়ের চেষ্টা তার কখনও ছাড়া. উচিত নয়। নিজের প্রকৃত হিত যে চায় তাকে এ ক’তেই হবে ; তবে সমাজ-ভুক্ত থাকলে, ধর্মের বাহিরের যে অনুষ্ঠানগুলাে আছে, তা অশোচ-সময়ে সমাজের খাতিরে বাদ দিতে পারে। আর যিনি প্রেমিক, যিনি তত্ত্বজ্ঞানী, তিনি ত ইহা ছেড়ে থাকতেই পাবেন না, সুতরাং জোর করে কোন লােকাচার বা দেশা, চারের বাধ্য হওয়া তার উচিত নয় ।

৪২ পাগলের ঝুলি। কেশব।-বাবা, এ ত মৃতশৌচের কথা হল । আচ্ছা, সন্তানাদি হলে ত আনন্দই হয়, তাতে অশৌচ কেন হয়? দেব-কাৰ্যাদি তাতে বন্ধ থাকে কেন ? পাগল-বুঝলি না? আনন্দেও যে মনে চঞ্চলতা আসে। চঞ্চল মনে কি সাধনা হয় রে ? যে অবস্থায় ঈশ্বর-স্মরণ হয় না সেইটাই কি অশৌচ-সময় নয় ? আচমনের মন্ত্র জানিস্ ত ? কেশব—আজ্ঞে, হাঁ। বিষ্ণুকে স্মরণ করলেই ভিতর বাহির শুদ্ধ হয়ে যায়। পাগল—ছেলে মেয়ে জন্মিলে অজ্ঞানী সংসারী মানুষ আহলাদে আটখানা হয়ে ভগবাকে একেবারে ভুলে যায়, ঐ আদেই যেতে থাকে, ভগবানকে মনে ক’রূতে পারে না, তাতে মন বসাতে পারে না, তাই তখন তার অশোচ! তাকে ঠিক ঠিক মনে ধারণা ক’রূতে পারলে-- অশৌচ—অপবিত্রতা কোথায় থাকে ? এই জন্যই যে ভগবাকে ও সময় ভুলে যায় তার অশৌচ হয়, তার দেব-কাৰ্য্য নিষেধ। এখানেও তত্ত্বজ্ঞানী বা প্রেমিক ভক্তের জন্য ও আইন নয়। কেশব '-এ পর্যন্ত বেশ বুঝলাম, বাবা। কিন্তু ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্রের অশৌচ অন্ত হতে কম বেশী সময় দেওয়া হয়েছে কেন? আর ঐ নির্দিষ্ট দিনের পর কি তাদের অশৌচ সত্য সত্যই যায় ? পাগল।ভিতরের অশৌচের কথা আগেই বলেছি। গুণ অনুসারে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্রের অশৌচ-সময়ের কম বেশী করা হয়েছে। এখন ভগবান্ চারি বর্ণ কেমন করে ভাগ করেছিলেন, তা শােন্। তিন প্রকার গুণ আছে—সত্ব, রজঃ ও তমঃ। (১) সত্বগুণ নিৰ্ম্মল, অতএব প্রকাশক। এই গুণ-যুক্ত মানুষ আপনাকে সুখী এবং জ্ঞানী বলে অভিমান করে। যে সময় এই গুণ বাড়ে সেই সময় সকল ইঙ্গিয়ে অশৌচের কথা। জ্ঞান-রূপ প্রকাশের অনুভব হয় এবং মানুষ বেশ শান্ত ও স্থির থাকে। তখন ভগবানের ভজন করা, সকলের প্রতি দয়া করা, পরের উপকার করা, খারাপ ইন্দ্রিয়-সুখে মত্ত না হওয়া, এই সব ভাল কাজ লােকৈ করে ; তাদের বিষয়ে আসক্তি থাকে না। এই গুণের ফলে মানুষের উর্ধ লােকে গতি হয় । এই গুণে থাকা সময়ে যদি কেউ মরে, তবে সগুণ পরমেশ্বরের উপাসকেরা যে সুখময় লােকে গমন করে, সে সেই লােকে যায় ও আনন্দ ভােগ করে। (২) রজোগুণ তৃষ্ণা বা আসক্তি হতে হয়। এই গুণের জারা মানুষ চঞ্চল হয়ে আসক্তির বশে নানা কর্ম করে ও বদ্ধ হয়। এ গুণ যখন প্রবল হয়, তখন মানুষ ধন সম্পত্তি ইত্যাদি যা আছে তা আরাে বাড়াতে ইচ্ছা করে, ভাল ঘর বাড়ীসম্পত্তি প্রভৃতি করার নিমিত্ত খুব চেষ্টা করে, এই করেছি, এই ক’র’ ইত্যাদি নানা জল্পনা কল্পনা করূতে থাকে। ইহাতে থাকা সময়ে মানুষ মরুলে আবার মানুষ হয়ে জন্মে। এ গুণের ফল দুঃখজনক। (৩) তমােগুণ অজ্ঞান হতে জন্মে। এই গুণে জীবের মােহ জন্মায় এবং ইহার ফলে জীৰ ভ্ৰম আলস্য নিদ্রাদি দ্বারা বদ্ধ হয়। এ গুণ বাড়লে মানুষের বিবেক নষ্ট হয়, কি কৰ্তব্য কি অকৰ্তব্য তার বিচার থাকে না। ইহাতে থাকা সময়ে মরলে পশু পক্ষী বৃক্ষ লতা ইত্যাদি হয়ে জন্মিতে হয় । এই তিন গুণ সকলের মধ্যেই আছে ; কেবল সত্ত্ব, কেবল রজঃ বা কেবল তমােগুণ কারাে মধ্যে আছে, এমন হতে পারে না। তবে যখন সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি হয় তখন রজঃ ও তমােণ খুব দুর্বল হয়ে থাকে, রঙ্গোগুণ বাড়লে সত্ব ও তমােগুণ কম হয়ে থাকে আর তমােগুণ বৃদ্ধি পেলে সত্ব ও রজোগুণ দুর্বল হয়ে যায় । ভগবান্ এই তিন গুণ ও তার প্রধান মিশ্রণ দেখে মানুষের চারিটা শ্ৰেণী ভাগ করেছিলেন :- (১) যাঁদের সত্ত্বগুণ প্রবল (রঃ ও তমােণ খুব কম ), তঁাদিগকে ভগবান্ এক শ্রেণীতে ফেলেছিলেন, ৪৪ পাগলের ঝুলি। তারাই হয়েছিলেন ব্রাহ্মণ। যজ্ঞাদি ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম নিজেরা করা ও অন্যকে কুরান, বেদাদি নিজে পাঠ করা ও অন্যকে পাঠ করান, নিজে দান গ্রহণ করা ও অন্যকে দান করা, এই ছয়টী কৰ্ম্ম নিজের স্বভাব অনু- সারেই এরা করতে ভাল বাতেন ও ক’রুতেন । ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম ও বেদ-পাঠ ইত্যাদি এবং সমাজের ও দেশের কিসে ভাল হয় সেই চিন্তা নিয়েই সর্বদা থাকতে ভাল বাতেন বলে এঁরা অন্য লােক- দিগকে যজ্ঞাদি ধৰ্ম্ম কাৰ্য্য করাতেন এবং বেদ-পাঠাদি করাতেন ( বিদ্যা শিক্ষা দিতেন )। এই সকল কাজ করে তারা দক্ষিণা বা প্রণামী রূপে অর্থাদি পেতেন। ধনী লােকে ধৰ্ম্ম কাৰ্য্য বা কোন সামাজিক ব্যাপার ক’রুলে, যারা সেই সব কাজে ব্রতী থাকতেন তাদের ছাড়াও অনেক ব্রাহ্মণকে নিমন্ত্রণ করে টাকা পয়সা জিনিস পত্র দান করতেন। এইরূপে তাদের আর জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য উপায়ে টাকা রােজকার করতে হত না। এরা যে শুধু দান নিতেনই তা নয়, পরের দুঃখ দূর করার নিমিত্ত দান ক’তেনও। ইন্দ্রিয়গণকে এবং অন্তঃকরণকে দমনে রাখা, তপস্যা, ভিতরে ও বাহিরে পবিত্রতা, ক্ষমা, সরলতা, শাস্ত্র-জ্ঞান এবং সেই জ্ঞান অনুসারে অনুভব, পরকালে বিশ্বাস- এইগুলো তাদের স্বভাবতঃই প্রবল ছিল। মােট কথা, ব্রাহ্মণের জীবন ভােগ-সুখ আদৌ চাইত না, ভগবান্‌কে লাভ করার জন্য অথবা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে ধৰ্ম্মের সুপবিত্র পথে চলা আর দেশের ও সমাজের হিত করা, এই ছিল তাদের জীবনের ব্রত। তাই তাঁরা স্ব-ইচ্ছায় দরিদ্র হলেও লােকে তাদের এত আদর ও সম্মান ক’ত। (২) যাদের সত্ত্বগুণের সঙ্গে রজোগুণ অনেকটা বেশ ছিল (তমাে- গুণ খুব কম ছিল), তারাই পড়েছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণীতে এবং তারাই হয়েছিলেন ক্ষত্রিয়। যজ্ঞাদি ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম নিজে করা, বেদাদি নিজে পড়। ( বিদ্যা শিক্ষা করা), যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রাজ্যশাসন করা এবং দান, এইগুলাে অশৌচের কথা। ৪৫ তার ভালবাসতেন ও ক’তেন। তাদের শারীরিক বল ও রজোগুণের চঞ্চলতা বেশী ছিল বলে তারা শুধু ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম ও বিদ্যা-চৰ্চ্চা নিয়ে থাকতে পরুতেন না। অন্য দেশের শত্রুদের হাত হতে নিজের দেশ রক্ষা করা, দেশে দুষ্ট লােকদের শাসন করে ভাল লােকদের রক্ষা করা, রাজ্যশাসন করা ও প্রজাদের নিকট থেকে কর আদায় করা এ সবও তারা করতেন। আয়ের কতকটা তারা প্রজার হিতের জন্য ব্যয় করতেন আর কতকটা দ্বারা নিজের সংসারের খরচ চালাতেন। তারা রাজত্ব করতেন বলায় এ কথা মনে করাে না যে, ক্ষত্রিয় মাত্রেই রাজা হতেন; কেহ কেহ রাজা হতেন, অনেকে সেনা সেনাপতি ইত্যাদি হতেন, অনেকে বিচার- পতি কেরাণী হিসাবরক্ষক প্রভৃতি হতেন। প্রজাদের যাতে সুখ-সুবিধা হয় তারা যে শুধু এমন কাজেই দান ক’তেন, তা নয়, নিঃস্বার্থ ব্রাহ্মণ- দিগকেও দান করতেন, নিজেরা ( অভাব না থাকায়) কারো দান নিতেন না। রজোগুণ যথেষ্ট থাকায় (সত্ত্বগুণও অনেক পরিমাণে তার সঙ্গে মিশাল থাকায়) পরাক্রম, গৰ্ব্ব, ধৈৰ্য্য, কাৰ্য্যে নিপুণতা, যুদ্ধে বিমুখ না হওয়া, দান, শাসনের ক্ষমতা—এইগুলাে ছিল তাদের স্বভাব । (৩) যাদের রজোগুণ ও তমােগুণ বেশী ছিল (সত্ত্বগুণ কম ছিল। তারাই পড়েছিলেন তৃতীয় শ্রেণীতে এবং তারাই হয়েছিলেন বৈশ্য । রজঃ ও তমােগুণের প্রবলতা-বশতঃ তারা আত্ম-তত্ত্বের দিকে তেমন ঝোক দিতে পারতেন না। তাদের বুদ্ধি কিছু স্থূল ও চঞ্চল ছিল বলেই স্থূল জগতের বিষয়েই তাদের বেশী মনােযােগ ছিল। তাই তারা ধৰ্ম্ম- কাৰ্য্যে ও বিদ্যায় অল্প মনােযােগ দিতেন; কৃষি, বাণিজ্য, গাে-পালন, সুদে টাকা ধার দেওয়া ইত্যাদি নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকতেন। এই ছিল তাদের স্বাভাবিক কৰ্ম্ম। চিন্তা করে দেখ এঁদের কর্মগুলােই সাক্ষাৎ সম্বন্ধে সমাজের ভরণ-পােষণ ক’ত । (৪) যাদের তমাে গুণ ছিল বেশী (সত্ব ও রজোগুণের ভাগ খুব পাগলের ঝুলি। কম), সুতরাং ধৰ্ম্ম-বিষয়ের জ্ঞান এবং কৰ্ম্ম-বিষয়েও আবশ্যকীয় জ্ঞানের অভাব ছিল, তারাই পড়েছিলেন চতুর্থ শ্রেণীতে এবং তারাই হয়েছিলেন শূদ্র। তমােগুণের কাৰ্য্য, অজ্ঞানতা। অজ্ঞানী নিজের বুদ্ধিতে কোন হিতকর কাজ করতে পারে না। তাই অপর তিন বর্ণ যেমন নিজ নিজ স্বভাব অনুসারে সমগ্র-সমাজরূপ বিরাট-পুরুষের সেবার নিমিত্ত নানা কাজ করতেন, এরা তা ক’তে পাতেন না। সেই জন্য অন্য তিন বর্ণের লােকে অল্প বুদ্ধির সামান্য সামান্য কাজ ক’তে এদিগকে বলতেন, কারণ তাতে তাদের বড় বড় কাজগুলাে করার অনেক সময় পেতেন এবং কাজেরও সুবিধা হত। কাজেই দেখ, প্রকৃত পক্ষে শূদ্রের সমাজ- সেবারই সাহায্য করতেন। সুতরাং তারাও সমস্ত সমাজেরই সেবক, ব্যক্তি বিশেষের বা সমাজ বিশেষের সেবক ছিলেন না। যা হােক অন্য তিন বর্ণের অধীনে থেকে তাদের আদেশ মত কাজ ক’তেন বলে বল। হয়, শ্রেষ্ঠ তিন বর্ণের পরিচৰ্যা বা সেবাই শূদ্রের স্বাভাবিক কৰ্ম্ম। বস্তুতঃ অপর তিন বর্ণও নিজ নিজ স্বভাব ও বুদ্ধি অনুসারে যে সব কৰ্ম্ম কতেন তাও সমাজেরই সেবা। আমি যে তােমাকে উপদেশ দিচ্ছি এটা কি তােমাকে সেবা করা হচ্ছে না? কারাে সুখ-শান্তি বিধান করাই তার সেবা। অপর তিন বর্ণ যে শূদ্রদের প্রতিপালন ক’তেন, সেটা কি শূদ্রদের সেবা নয় ? পিতামাতা যে সন্তানকে লালন পালন করেন, সেটা কি সন্তানের সেবা নয় ? এই সরল সত্য ভুলে যাওয়ায় যত গণ্ডগােলের সৃষ্টি হয়েছে। চারি বর্ণই বিরাট সমাজ-রূপ দেহের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ। সকলেই নিজ নিজ গুণ ও শক্তি অনুসারে সেই বিরাটরূপী ভগবানেরই সেবা করছে ও কবে । এর মধ্যে কোন অঙ্গেরই অধিকার নাই যে, অন্য অঙ্গকে ঘৃণা ক’রূবে ও তার উপর অত্যাচার করবে। মানুষের দেহের মধ্যে মাথা পায়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাই বলে মাথা যদি পা’কে ঘৃণা করে, তার যত্ন না করে অর্থাৎ অশৌচের কথা। ৪৭ তার কোন কষ্ট বা কোন ব্যাধি হলে তার শান্তির জন্য বুদ্ধি না খাটায়, আর তাকে নানা রকমে যন্ত্রণা দিয়ে অচল করে হােলে, তবে তাতে দেহেরও ক্ষতি এবং মাথারও ক্ষতি, এ কথার ভুল কি আছে ? যার পা নাই সে জানে যে, অন্যান্য অঙ্গ সুস্থ থাকতেও তার কতখানি অসুবিধা ও কষ্ট। সমাজ সম্বন্ধেও আমাদের এ কথাটা তলিয়ে বুঝা উচিত। এখন অশৌচের কালের পরিমাণ সম্বন্ধে ব’ছি, শােন। দক্ষ- সংহিতায় অশৌচের ব্যবস্থা এই প্রকার দেওয়া আছে : (১) যে ব্যক্তি সঙ্কল্প, রহস্য ও শিক্ষা-কল্প-আদি ছয়টী অঙ্গের সহিত বেদ পাঠ করে তার অর্থ বুঝেছেন আর সেই অনুসারে কাজ করেন, সে ব্যক্তির সদ্য অশৌচ অর্থাৎ স্নান ও আচমন করলেই তার অশৌচ যায়। (২) যে বিঞ্জ ( অর্থাৎ যার উপনয়ন হয়েছে ও যিনি বেদ পাঠ করেছেন) বেদ ভাল জানেন এবং প্রত্যহ হােম করেন, তার অশৌচ একদিন। (৩) যিনি তাহা অপেক্ষা বেদ কম জানেন এবং হােম তাহা অপেক্ষা কম করেন, তার তিন দিন অশৌচ হয়। (৪) ঐ দুই বিষয়ে যিনি আরও কম, তার অচ চারি দিন। (৫) ঐ দুই বিষয়ে যিনি তার চেয়েও অধম, তার গুচ ছয় দিন। (৬) যে ব্যক্তি জাতি-ব্রাহ্মণ অর্থাৎ ব্রাহ্মণের কুলে জন্মেছে মাত্র কিন্তু যথানিয়মে ব্রাহ্মণের কর্তব্য কৰ্ম্ম করে না, তার অগুচ দশ দিন। (৭) জাতি-ক্ষত্রিয়ের অর্থাৎ যে ক্ষত্রিয় কুলে জন্মেছে মাত্র কিন্তু ক্ষত্রিয়ের যা কৰ্তব্য কৰ্ম্ম তা করে না, তার অফ বার দিন। (৮) জাতি-বৈশ্যের অর্থাৎ বৈশ্য কুলে জন্মেছে মাত্র কিন্তু বৈশ্যের কর্তব্য কৰ্ম্ম যে করে না, তার অশুচ পর দিন। (৯) শূদ্রের একমাসে শুদ্ধ হয়। আর (১০) যে ব্যক্তি চিররােগী, যে কৃণণ, যে মূখ, যে স্ত্রীর বাধ্য, যে সৰ্ব্বদাই পরাধীন, যে চিরদিনই ঋণে বন্ধ, যে আত্মার বন্ধন মােচনের জন্য কোন ক্রিয়া করে না, যে মদ্যপান মৃগয়া ইত্যাদি কাজে আসক্ত, যে বেদ পড়ে না—এই সকল লােকের প্রত্যেকেরই অশৌচ মরণ পৰ্যন্ত থাকে * ৪৮ পাগলের ঝুলি। অর্থাৎ এরা এক দিনের জন্যও শুচি নয়, চিরদিনই অশুচি। গুণের কম বেশী অনুসারে এই মত অশৌচের ব্যবস্থা হয়েছে। উপরের কথাগুলাে বিবেচনা করে দেখলেই বেশ বুঝতে পারবে, শাস্ত্রে গুণ অনুসারে যে অশৌচের ব্যবস্থা দিয়েছে, তা এখন চলিত নাই। এখন সমাজে দশ দিন, বার দিন, পনর দিন আর এক মাসের অশৌচ বাঁধা বাধি ভাবে চলছে। বাকী ছয় রকম অশৌচের কোন খবরই নাই। যদিও কোন কোন অবস্থায় সদ্য শৌচ বা ত্রিরাত্রি অশৌচের ব্যবস্থা দেখা যায়, সেটাও মামুলি ধরণের, যার অশৌচ হ’ল তার গুণের উপর নির্ভর করে নয়। কিন্তু সত্য কথা ব’তে গেলে বলতে হয়, ঐ যে শেষ নম্বরে যেটা বলা হয়েছে, ঐটাই এখন বােধ হয় সাড়ে পনর আনা লোকের পক্ষে খাটে, অর্থাৎ চির জীবন অশৌচ। বেদ বেদান্ত সব উড়ে গিয়েছে। যদিও দুই চারিজন ওর আলােচনা করে দেখা যায়, তা হলেও সেটা কেবল মুখে মুখে, কাজে কিছুই পরিচয় পাওয়া যায় না ; সুতরাং গুণ অনুসারে অশৌচের ব্যবস্থা আর খাটবে কেমন করে? লােকে কেবল খুজছে দুনিয়ার সুখ কিসে পাবে, তার জন্য নরকে যেতে হয় তাতেও প্রস্তুত। কাজেই তাদের আর গুণের দিকে তাকাবার অবসর কোথা ? তবে সমাজে দুটা চাটা নিয়ম না মানলে চলে না, তাই মামুলি নিয়ম গােটা কত বেগার শােধ দিবার মত লোকে মেনে থাকে। আর যাদের বাস্তবিকই বােধ-শক্তি নাই, তারা হয় ত নবক ভােগ করতে হবে, এই ভয়ে মানে। অতএব, দেখ নিয়মিত দিনেই অশুচ সত্য সত্য যায় না। যে পর্যন্ত মানুষ শােক ভুলে আত্মস্থ হতে না পারে, ততদিন প্রকৃত পক্ষে সে অশুচি থাকে। রাজসূয় যজ্ঞের অনেক দিন পর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, কুরুক্ষেত্রে যে সব আত্মীয় স্বজন মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের কথা মনে করে, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিলেন যে, এত যাগ যজ্ঞ করেও তার অশৌচের কথা। শোক দূর হচ্ছে না। তা শুনে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, “মহারাজ, আপনার তশৌচ ত যায় নাই। এতদিনেও যখন শােক ভুলতে পারলেন না, তখন র শুচি হলেন কেমন করে? মনের শুচি ভাব অর্থাৎ প্রশান্ত বস্থা না এলে তাশৌচ যায় না। কাজেই যার তত্ত্বজ্ঞান যত বেশী, সুতরাং যার মনের প্রশান্ত ভাব যত শীঘ্র আসে, তার অশৌচ তত কম দিনা থাকে। কিন্তু প্রকৃত ভাবে বুঝে চ’বার মত লােক কয়জন আছে ? তাই মুনি ঋষিরা সূক্ষ্ম বিচার করে যে ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন, তারই কতকটা নিয়ে সমাজে ব্যবহারিক ভাবে একটা অশৌচ হওয়া এবং অশৌচ দূর হওয়ার প্রথা পালন করা হয় মাত্র। বাস্তবিক পৰ্ম্মঅনুষ্ঠানের পক্ষে ঐ সূক্ষ্ম বিচারের ব্যবস্থাই ধরা উচিত অর্থাৎ ব্যবহারিক ভাবে শোচ গেলেও যদি মনে শোক বা আনন্দের চঞ্চলতা থাকে, তবে সে সময়ের গনুষ্ঠান ঠিক মত হয় না ; আবার ব্যবহারিক ভাবে শৌচ না গেলেও প্রকৃত জ্ঞানের প্রভাবে যদি প্রাণে শান্তি এসে থাকে, তবে সে ১ময় অনুষ্ঠান করলে ঠিক মতই হয়ে থাকে, জানবে । “এখন আসি” বলে পাগল ছুটে চলে গেল । কেশব শুরু প্রণাম করারও সুযোগ পেল না।

পঞ্চম রাত্রি। জাতি-ভেদের কথা। চাতুর্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণ-কৰ্ম্ম-বিভাগ। তষ্ঠ কর্তারমপি মাং বিদ্ধকৰ্তাৱমব্যয়ম্ । শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৪১৩ গুণ এবং কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি চারি বর্ণের সৃষ্টি করিয়াছি। এইগুলি সৃষ্টি করিলেও আমাকে অকর্তা বলিয়াই জানিবে, কারণ আমি অব্যয়। অর্থাৎ যাহার যেমন গুণ ও কর্ম তাহাকে সেইরূপ শ্রেণীর মধ্যেই ফেলিয়াছি, ইহাতে আমার কোন লাভালাভ বিচার, পক্ষপাতিত্ব, ইচ্ছা বা আসক্তি নাই। । কেশৰ বাবাজি তিন চার মাসের মধ্যে আর গুরুদেবের সাক্ষাৎ না পেয়ে মাঝে মাঝে প্রাণে বড়ই যাতনা অনুভব করে। মনকে সে কত এবােধ দেয়, ‘গুরুদেব ত বলেছেন, তিনি আমার মধ্যেই আছে, আমার আশে পাশেও রয়েছেন, আমার আত্মারূপেই তিনি বিরাজ করছেন, কিন্তু তবু তার রূপখানি দেখবার জন্য প্রাণ আকুলি বিকুলি করে কেন ? মন, শান্ত হও। তাঁর কথা বুঝ, তঁার প্রত্যেক কথা বেবাক্য। বিশ্বাস কর, শান্ত হও। মন তা মানে না। তাবিক হিসাবে কথাটা ঠিক হলেও, যে দেহ অবলম্বন করে আত্মা নিজ স্বরূপ ও নিজ লীলা-রহস্য-রূপ জগৎ-রহস্য বুঝাচ্ছেন, সে দেহটাই বা কম প্রিয় হবে কেন ? যতক্ষণ জগতে ‘আমি তুমি ব্যবহার আছে ততক্ষণ ওটা হি-ছেদের কথা। হওয়া স্বাভাবিক এবং গুরুর জন্য প্রাণের এই ব্যাকুলতায় শিষ্যের মঙ্গলই হয়ে থাকে। ফান মাস। এক দিন, রাত্রি প্রায় বারটার সময়, কেশব বাবাজি একটা রােগীর শুশ্রুষা করে নিকটবর্তী গ্রাম হতে আখড়ায় ফিরে আছে, তখন হঠাৎ মাঠের মধ্যে দূর হতে একটা লােক আছে বলে তার অনুমান হ'ল। মুর্তিটা কিছু দূর অগ্রসর হলে জ্যোৎস্নার লােকে কেশবদাস দেখল এটা তারই হৃদয়ে শান্তি-জল ঢালে এরূপ মেষ—এ তারই গুরুদেব। কেশবের পা আর চল না ক্ষণকাল পটে আঁকা পুতুলের মত থেকেই যেন অজ্ঞাতসারে কেশব এগুয়ে চল। অর্ধ পথে চাষ করা জমির ভিতরে যেমন সা সানি হওয়া অমনি সে ভক্তিভরে গুরুর চরণে লুটিয়ে পড়ল। গুরুদেবের পদ্ম-হন্ত কেশবের মস্তক হতে পৃষ্ঠের মেরুদণ্ডের উপর দিয়ে পরিচালিত হওয়ায়, তার দেহের প্রতি লােম-কুপে এক অজানা অমৃতধারা ছড়িয়ে গেল। পাগল কেশবের হাত ধরে তুলে বলল, “আয়, রাস্তা ছেড়ে দূরে ঐ মাঠের ভিতর বসে কথাবার্তা বলা যাক।” পাগল চলেছে, কেশৰ পিছনে পিছনে যাচ্ছে। মাঠের মাঝখানে গিয়ে দু’জনেই ব’ল। চারদিকে যতদুর দেখা যায়, দরে গাছপালা-ঢাকা গ্রামগুলাে নীল আকাশের তলে গােল হয়ে দাড়িয়ে আছে। চারদিকে কেবল মাঠ, জনপ্রাণীর সমাগম নাই—জ্যোৎস্না যেন রূপার তরল ধারার মত সব ছেয়ে রয়েছে। পাগল।—দিন কেমন যাচ্ছে। আর কিছু জানতে চা’? কেশব।আতে, বাবা, খুবই আনন্দে আছি। মাঝে মাঝে দুঃখ আসে, সে আর কিছুই দুঃখ নয়, আপনাকে যে দেখতে পাইনা এই দুঃখ। পাগল মাকে ভালবাসা যায় তার জন্য এটা এমনই করে।

পাগলের ঝুলি। তা আমি ত তােকে ছাড়া নই, আমি ত তাের মধ্যেই আছি, তবে তার দুঃখ কি রে ? আচ্ছা, কিছু জানতে চাস্ত জিজ্ঞাসা ক। কেশব।-বাবা, সে দিন অশৌচের কথা বলতে গিয়ে জাতি- ভেদের প্রকৃত মুল কি তা বলেছিলেন। কিন্তু হিন্দুসমাজে জাতির ৩ অন্ত দেখি না, আর ছুয়ােনা, খেয়ােনা’ এটার বাড়াবাড়িও খুব দেখি। তারপর প্রায়ই দেখি কোন কাজের জন্য একজনের জাতি গেল, তখন সে সমাজের পাঁচ জনকে ধ’রূল, কিছু জরিমানা দিল, হয় ত সমাজে একটা ভােজ দিল, তারপরই জাতিতে আবার উঠতে পাল। জাতির গিয়েছিল কি, আবার জাতিতে উঠলেই বা তার এলো কি, সেটা কিছুই বুঝা যায় না। বর্ণ-সঙ্করটা কি? সমাজে এত বৰ্ণ-সঙ্করের ঘটা কোথ। থেকে এল ? পাগল।সে দিন যা বলেছি তা যদি ভাল করে বুঝে থাক, তবে খাঁটি জিনিসটা তােমাকে বুঝান বেশ শক্ত হবে না। কামাজে সচরাচর যা দেখে থাক, বিচার করলে ওর অনেক গুলোই টিকতে পারে , দেখতে পাবে। মানুষ বিচার করে কাজ ক’তে চায় না, যেমন পাঁচ জনকে কবুতে দেখে তেমনি করে যায়। কোন বিশিষ্ট কারণে হয় ত দরকার বােধে কোন লােক একটা কাজ ক’বু, তা দেখে সাধা- রণ লােকে ওর ভিতরকার কারণ সূক্ষ্মভাবে বিচার না করে, বাহিরে যেটা কারণ বলে বােধ হ’লসেইটাকেই প্রকৃত কারণ মনে করে এবং মােটামুটি সেই প্রকারের অবস্থা উপস্থিত হলেই ঐরূপ কাজ করে। দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। একজন ভদ্রলােক একটা বিশাল মাঠের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রচণ্ড রৌদ্র। বাতাসও প্রবল-বেগে ব’চ্ছে। ভদ্রলোকটা ছাতা মুড়ি দিয়ে যাচ্ছিলেন। বাতাসের বেগে আর ছাতা রাখা যায় না দেখে, তিনি কতকদূর গিয়ে ছাতাটা বন্ধ করে ফেলেন। পাশেই কতকগুলো রাখাল গরু চরাচ্ছিল। তারা দেখল ভদ্রলােকটা জাতি-ভেদের কথা। সেই ভয়ঙ্কর রৌদ্রের মধ্যেও ছাতা বন্ধ করে, বলে গিয়ে, চাদরটা মাপার উপর দিয়ে দীর্ঘ মাঠটা পার হয়ে গেলেন। তখন তারা বলাবলি করতে লাগল, ‘আচ্ছা, ভাই, এ শােকট। এখানে ছাতা বন্ধ করে গেল কেন? বােধ হয় এখানে ভূতের ভয় আছে। ছাতা মাথায় দিয়ে গেলে বোধ হয় ভূতে অত্যাচার করে। ঐ মাঠে ছাতা মাথায় দিয়ে গেলে ভূতে অত্যাচার করে, এইটাই তাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। এর পর কোন দিন কোন লােককে ছাতা মাথায় দিয়ে সেই মাঠের মধ্যে যেতে খেলে, তারা তাকে ব’, ‘মহাশয়, তপার ত হ ক য় ! এ মাঠে ভয়ানক ভূতের ভয় ; কেউ ছাতা মাথায় দিয়ে গেলে তাকে মেরে ফেলে। কাজেই ছাতা মাথায় দিয়ে কেউ তার সেই মাঠের মধ্যে যাতায়াত করত না, তা রৌদ্রের মধ্যেই হােক তার বৃষ্টির মধ্যেই হোক । এইরূপে সেই মাঠে ছাত-ব্যবহার বন্ধ হয়েছি।' কেউ এর প্রকৃত কারণের খোজ পেল না। ভূতের ভয় ছাত-বন্ধের কারণ হয়ে রইল । সে দিন ত শুনেছ, প্রথমে একটা শ্রেণী-বিড় গুণ ও কৰ্ম্ম অনুসারেই হয়েছিল। প্রথমে হয় চারটা ৬। হয়ে গেল, তখন কাজের সুবিধার নিমিত্ত, ঐ এক এক দলের মধ্যে আরও ছোটখাট ভাগ হতে লাগল। যেস, ব্রাহ্মণদের মধ্যে কেউ হলেন অধ্যাপক, ছেলেপেলেদের লেখাপড়া শিখান' তার কাজ হ’ল ; কেউ বা পুরােহিত হলেন, লোকের বাড়ী জাত-কৰ্ম্ম চূড়াকরণ বিবাহ ইত্যাদি কাজ এবং যাগ যজ্ঞ পূজা প্রভৃতি করা হ’ল তার কাজ ; কেউ গুরু হলেন, মুক্তি লাভের জন্য লােককে সাধনা শিক্ষা দেওয়া হ’ল তার কাজ। এই ভাবে ক্ষত্রিয়দের মধ্যে একদল শাসন-কাৰ্য্য সম্পর্কে লেখা পড়া ইত্যাদি নিয়ে থাকলেন, আর একদল দেশ রক্ষার জন্য যুদ্ধ-ব্যবসায় নিয়ে থাকলেন ; বৈশ্যদের মধ্যে কেউ হ’ল তিলি ( জিনিস খরিদ বিক্রয় ব্যবসা নিয়ে), কেউ হ’ল কর্মকার, কেউ কুম্ভকার, কেউ মালাকার একবার যখন ভাগ ;

৫৪ পাগলের ঝুলি। ইত্যাদি। দিন দিন ক্রমে আরও ভাগ হতে লাগল, যেমন নাকি গাছ একটা জন্মিলে ক্রমান্বয়েই তার ডালপালা সংখ্যায় বাড়তে থাকে। এখন, এক এক কাজের মধ্যে কতকগুলাে করে লােক থাকায় এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে একই প্রকারের চলন্ ফের ও প্রবৃত্তি থাকায়, তারা ক্রমে অন্যান্য দল থেকে পৃথক হয়ে পড়তে লাগল। বিবাহ-ব্যাপার নিজ দলের মধ্যে ভিন্ন অন্য দলের সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল। এই প্রকারে হিন্দু-সমাজে কালক্রমে বহু জাতির উৎপত্তি হয়ে গিয়েছে। বহু জাতি হলেও মূলে কিন্তু চারবর্ণ বা আসল জাতি জাবে। ‘চুয়ােনা, খেয়োনা এই যা দেখছ, এটাও অতি মাত্রায় বাড়া- বাড়ির ফলে হয়েছে। চুয়ােনা, খেয়ােনা’ এটাও হবার একটা বিশিষ্ট কারণ ছিল, কিন্তু সেটা এখন লােকে ভুলে গিয়েছে। যে উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছিল, সে উদ্দেশ্য এবং সেই উদ্দেশ্য অনুসারে কাজ করার কথা ভুলে গিয়ে লােকে কেবল সেই অচারটা আঁকড়ে ধরে আছে আর সেই চারের ভিত্তি হয়েছে ঘৃণা ও হিংসা। প্রথমে হেয়ার কথা দেখা যাক্। যে, যে গুণের লােক, তার ভিতর থেকে সেই গুণের শক্তিই বাহির হয়। কাজেই, যে অল্প সত্ব- গুণের লােক, সে যদি বেশী রজোগুণের লােককে স্পর্শ করে, তবে তার ভিতরে রজোগুণ এসে পড়বে, তার সত্ত্বগুণ আরাে কমে যাবে। আবার যে অল্প রজোগুণের লােক, সে যদি বেশী সত্ত্বগুণের লােককে স্পর্শ করে, তবে তার ভিতরে সত্বগুণ এসে পড়বে, তার রজোগুণ আরাে কমে সাবে। মানুষকে সত্ত্বগুণী ৩’তে হবে যদি সে ভগবানের দিকে অগ্রসর হতে চায়। তারপর যদি সে গুণাতীত হতে পারে তবে ভগবানের সঙ্গে তার মিলন হবে। এই ভাবটীর উপর লক্ষ্য করে কা’কে ছুঁতে দেওয়া উচিত, আর কাকে চুতে দেওয়া উচিত নয়, সেটা বিচার করবে। এখন তা নাই; কেবল কে উচু কুলে জন্মেছে আর কে নীচ ?

তি-ভেদের কথা। কুলে জন্মেছে, সেই নিয়ে, গুণ নাশ বা বৃদ্ধির বিচার নয়, মান অপমানের এবং পবিত্র বা অপবিত্র হওয়ার বিচার হয়। সাধন নাই, ভজন নাই, ভগবানের কোন ধার ধারে না, কেবল অমুক ছােট জাতির লােক ছুঁয়েছে, তার চৌদ্দ পুরুষের বাপান্ত ক’তে হবে, আর জলে ভাল করে ডুবিয়ে এসে তবে শান্তি ! তাতেও শান্তি নাই, এই ছোয়া-রূপ অপরাধের জন্য বিশেষ শাস্তি দিতে পারুলে তবে শান্তি ! আরে বাপু, যদি সত্য সত্যই সরল-প্রাণে সাধনা ক’তে থাক, তবে সাধন অবস্থায় গুণের দিকে দৃষ্টি রেখে ছোঁয়ার কথা বিচার করূবে, শুধু গতির দিকে তাকিয়ে নয়। তার পর যখন সিদ্ধিলাভ করবে, যখন গুণাতীত হবে, তখই সর্বত্রই ভগবাকে দেখতে পাবে। তখন ছোয়া ছুঁইয়ের কোন বিচার দরকার হবে না—বিচার ক’তেও পাবে না, কারণ তখন সবই যে ভগবান্ ব’লে দেখবে (যাহা বাহা নেত্র পড়ে তাহা কৃষ্ণ ঘুরে’ )। কেশব।—কি সর্বনাশ ! শাস্ত্রের উদ্দেশ্য কোথায় ডুবে গিয়েছে ? আচ্ছা, বাবা, আজ কাল অস্পৃশ্যতা উঠিয়ে দিবার জন্য একটা ভারী আন্দোলন চ’ছে। এটা কি ভাল না মন্দ? পাগল।-দেখ, বাবা, এক কথায় এর উত্তর দেওয়া যায় না। অবস্থাটা খুলে বললে এটা ভাল কি মন্দ তা তুমি নিজেই বুঝতে পাবে। সমগ্র সমাজের হিতের জন্য যারা অতি নিন্দিত কাজ করছে (যেমন— মেথর, চামার মুদ্দাফরাস ইত্যাদি ), তাদিগকে অতি হীন অবস্থায় ফেলে রেখে, চিরকাল দুঃখের সাগরে ডুবিয়ে রাখাও একটা মহাপাপ। যদি কখনাে এমন ঘটনা হয় যে, ওরা ঐ সব কাজ না করে হাত পা গুটিয়ে বসে, তখন সমাজে যারা বড় ও মাঝারি আছেন, তাঁদের নিজেদেরই কি ঐ সব কাজ ক’তে হবে না? মেথরের কথা ধর। সইর বাজারে বহু দূর পর্যন্ত ঘন বসতি থাকায়, মল দূরে ফেলে আস্থার জন্য মেথরের দরকার হয় ; কিন্তু পাড়াগাঁয়ে ফাকা মাঠ আদি যথেষ্ট আছে বলে ;

. পাগলের ঝুলি। সেখানে মেথরের দরকার হয় না। তা হলেও কেউ যদি ব্যারামে চ’তে অক্ষম হয়, তবে তার মাল আত্মীয় স্বজনেই বহন করে ফেলে। তাতে কি তার ঘৃণার পাত্র হয় ? ছোট ছেলেমেয়েদের মল বাপ না বোনেরাই অনবরত ফেছেন, তাতে কি তারা মেথর হয়ে যাচ্ছে? হলের ( ধীবরের জল খেতে নাই। তার অপরাধ,সে মাছ মারে অর্থাৎ জীব হিংসা করে। মাছ সদি কেউ না খায়, তবে জেলে মাছ মারবে কেন? সে মাছ খায় সে শুদ্ধ, মে মাছ মরে সে অশুদ্ধ! ৯ কিন্তু বলেন, সে মাছ পায় তারও মাছ মারার পাপই হয় * ৰাৱা মরা পথে নিয়ে যায়, পােড়ায়, তাদের জাতি যায় না, আর যারা শ্মশানে কাঠ যোগাবে তারাই তাশ! মুচীর অপরাধ,তারা চামড়ার কাজ করে। তোমরা জুতা পায় দিও না, খেল-ঢোলক লক-দুগি-তবলা-ঢাক বাজিও না, চামড়ার কাজের দরকার হবে না, মুচীও থাকবে না। ঠাকুর-ঘরে খােল ও ঢাক রাখতে পার, কিন্তু তা সাবা তৈয়ার করেছে, তারা ঠাকুর ঘরে যেতে পাবে না। মুভি,—ঐ সব লোক অপরিষ্কার থাকে, ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম করে না, সেই জন্য অধিকারী। কথাটা খুবই সত্য; যাদের আচার- ব্যবহার কপ-বা এবং মনের ভাব সকলই মন্দ তারা অনধিকারী। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, তাদের কি ভাল হবার কোন সুবিধা দেওয়া হয়েছে ? পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ত দূরের কথা, যে পরিমাণ অর্থ হ'লে পেট ভরে দুবেলা খাবার ব্যবস্থা করূতে পারে, তাও কি তা দিগকে দেওয়া হয়? ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম তারা করলে কি ? তাদিগকে সে সব ত শিগনি হয়ই না, উপরন্তু তারা যদি কোন রকমে শিখতে চেষ্টা করে, তবে স্মৃতি-শান্ত্রের দোহাই দিয়ে হাদিগকে বাধা দেওয়া হবে; যদি কোন ব্যক্তি তাদের দুঃখে কাতর হয়ে হাদিগকে এ সব শিখাবে, তবে সে সমাজে যায়গা পাবে না, সে পৃতি হবে। সুতরাং অনধিকারী হওয়াটা মনু সংহিতা ৫১ ৭ .

জাতি-ভেদের কথা। যদি বল, কি তাদের অপরাধে হয়েছে, না সমাজের উচু জাতি ও ধনী লােকদের অত্যাচারের ফলে হয়েছে ? যে সব স্মৃতিশাস্ত্রে লিল, সকল প্রাণীতে ভগবান্ দর্শন করাই মুক্তি লাভের, ভগবানকে পাওয়ার একমাত্র উপায়, তাতেই লিখল, ঐ মানুষ গুলাের উপর এরূপ অবিচার কর, এমন সৰ কৌশল কর যাতে তারা কোন দিনই আর উঠতে না পারে । বেশ ধৰ্ম ! সমাজের সুবিধার জন্যই এ সব ক’রূতে হয়, তবে পালা করে নেও না কেন, বাবা? কতককাল ওরা এই রকম করবে, আবার কতকাল ওদিগকে তােমাদের সুখ-সুবিধা দিয়ে তােমরা তাদের কাজগুলাে করূবে, এই নিয়ম কর না ? যদি বল, অন্তের পূর্ব জন্মের কৰ্ম্ম-ফলে শাস্তি ভােগ করার নিমিত্তই ঐ সব নীচ কুলে জন্মেছে, ওদের দুঃখ দূর করার চেষ্টা করাটা ভগবানের বিচারের বিরুদ্ধে কাজ করা, এতে পাপ হয়। তা হলে এই প্রকারের একটা যুক্তি দিয়ে কয়েকটা কথা তােমাদের বিরুদ্ধে বলি, দেখ ত তােমাদের প্রাণে কেমন লাগে। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণের লােকের মধ্যে ত ব্যাধি পীড়ায় বহু লােক ভােগে। ব্যাধিতে কষ্ট পাওয়া, এটাও ত বিনা পাপে হয় না। সুতরাং রােগ-যন্ত্রণার সময় ঐ সব লােকের সেবা শুশ্রুষা করা উচিত নয়, যদি কেহ করে তবে তার পাপ হয়, এ কথা বলা যেতে পারে। আবার ঐ সকল রােগীর মধ্যে অনেকে গরিব বলে টাকা খরচ করে চিকিৎসা করাতে পারে না, সরকারী ডাক্তার-খানায় গিয়া বিনা পয়সায় চিকিৎসা করায় । এটাও ক’রুতে দেওয়া উচিত নয়, কেন না ঐ যুক্তি অনুসারে এটাও ভগবানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করা হয়। এই প্রকার, কোন ব্রাহ্মণ নিতান্ত গরিব বলে ছেলের উপনয়ন দিতে পারূছেন না, তাকে ঐ কাজের জন্য টাকা পয়সা দেওয়া উচিত নয় বলা লাগে, কেন না পাপের ফলেই তিনি গরিব ৫৮ পাগলের ঝুলি। হয়েছেন। বিদ্যালয়ে ঐ তিন বর্ণের নিতান্ত গরিব ছেলেদের বিনা বেতনে পড়তে দেওয়া বা তাদিগকে কারাে বাড়ীতে রেখে খরচ না নিয়ে খেতে দেওয়া কিংবা বই কাগজ আদি দিয়ে সাহায্য করা উচিত নয়, কেন না পাপের ফলেই তারা গরিব হয়েছে। এই রকমের অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু, বাবা, তােমাদের যত রকমের অন্যায় যুক্তি, তা খাটবে কেবলি পরের বেলায়, যারা নাকি নিতান্ত নিরুপায় হয়ে পড়ে আছে। কেবল ফাঁকিবাজি, মুখে যুক্তি ও ধর্মের দোহাই দেওয়া আর ভিতরে নিজের সুখ ও সম্মানের চিন্তা। এতে কি চলে, বাবা ? এর ফলেই ত সমাজ এত দুর্বল, ভগবানের অসন্তুষ্টিতে এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা ভােগ ! এর জন্যই ত ‘ভগবান্, ভগবান্ করে এত চেঁচিয়ে, এত লাফালাফি করে, এত আঁক-জমকে পূজা আদি করেও কিছু হচ্ছে (১)। বহু কাল ধরে ভারতে এই পাপের বাড়াবাড়ি চলছে। বৈদিক যুগে কিন্তু এ সব ছিল না; ত্রেতা যুগে শ্রীশ্রীরামচন্দ্রের সময়ে এর সূচনা দেখা যায়। এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছেলে অকালে মারা যায় ; তিনি এসে সে বিষয়ে প্রতিকার ক’বার নিমিত্ত রামচন্দ্রকে বলেন, প্রতি- কার না করলে তাকে অভিসম্পাত দিবেন বলে ভয় দেখালেন। বশিষ্ট দেব ধ্যানে জানতে পারুলেন, এক শূদ্র ভাবাকে পাবার জন্য তপস্যা ক’ছে, সেই হেতু এই ঘটনা হয়েছে !! কাজেই, অগত্যা রামচন্দ্র সেই শূদ্রের মাথা কেটে, তবে রাজ্যের সে পাপ নিবারণ করলেন ! এম- ভগবদগীতা দ্বাপর যুগে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের মুখের উক্তি হলেও, এতে সব উপনিষদের সার কথা বলা হয়েছে (২)। তাতে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “আমি কারও শত্রু বা মিত্র নহি, যে আমাকে ভজে সেই আমার অতি প্রিয় হয়” (৩) “তা সে বৈশ্য শূদ্র বা স্ত্রীলােক বা অতি নীচ জাতি যাই কেন হােক না” (৪)। আর শ্রীশ্রীরামচন্দ্রকে যে গ্রন্থে পূর্ণ ব্ৰহ্ম ভগবান্ জাতি-ভেনের কথা। বলা হয়েছে, সেই গ্রন্থেই তার এই অপূৰ্ব বিচারের কথা লেখা হয়েছ। যাদের একটুও বিবেচনা-শক্তি আছে, তারা বেশ বুঝতে পারবে, এ প্রকারের গল্প কি জন্য লেখা হয়েছে এবং কারা লিখেছে। বর্তমান কালে কেউ আর নির্যাতন নীরবে সইতে চায় না। এখন ও সব করলে চলবে না। হৃদয়কে উদার করতে হবে। যাদের উপর এতদিন, যে কারণেই হােক, এত অত্যাচার করে ভগবানের নিকট মহা অপরাধী হতে হয়েছে, তারা যাতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পারে, শিক্ষা দীক্ষা পায়, ভগবানের সাধন-ভজন ক’রূতে পারে, তার ব্যবস্থা করে তা’দিগকে তুলে নিতেই হবে। তবে এতকালের পাপের কিছু প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে। যদি এর উন্নতি করার সুবিধা পায়, তবে ত এদের মধ্যে কে সত্ত্বগুণী, কে রজোগুণী এবং কে তমােগুণী তা জানা যাবে। নচেৎ, এরা সব তমােগুণী বলে চীৎকার করে, এদিগকে চেপে ধরে নীচে হীন অবস্থার মধ্যে ফেলে রাখলে, সেটা কি সুবিচার হবে, ধৰ্ম্ম-সঙ্গত কাজ হবে ? যারা এই মহা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চেষ্টা না করে কেবল এর বিরুদ্ধে চেঁচাচ্ছে, দুটা চারটা অনুষ্টুপ ছন্দের শ্লোক দেখিয়ে ন্যায়ের ফাকি ঝাড়ছে, তারা মানুষ-নামের ষােগ্য নয়। অবশেষে আর একটা কথা বলাও বিশেষ দরকার মনে করি। যাদিগকে এতদিন অস্পৃশ্য করে রাখা হয়েছে, তা’দিগকে যেমন তুলে নিতে হবে যে, তাদের গুণ এবং কর্ম ক্ৰমশঃ উন্নত ও পবিত্র হওয়া চাই, সমস্ত সুখ ও শান্তির নিদান যে জ্ঞান ও ভক্তি তা ক্রমশঃ তাদের হৃদয়ে বিকশিত হওয়া চাই, সদাচার ক্রমশঃ অভ্যাস করা চাই, যাতে সত্যই তারা উন্নত সমাজের অখণ্ড অঙ্গ-রূপে পরিণত হতে পারে। নচেৎ তাদিগকে শৃশ্য করে নেওয়া গেল, কিন্তু কুৎসিৎ আচার আদি ও পাপ- (১) এরূপ ধর্মে কোন মতেই ফল হতে পারে না। শ্রীমদ্ভাগবত ।৩২৯২১-২২। (২) গী-মাহাত্ম্য। (৩) মগবদগীতা -২৯ () শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৩২ পাগলের ঝুলি। প্রবৃত্তি তাদের মধ্যে সমানভাবেই চিরদিন থেকে গেল, এ যদি হয় তা হলে সমগ্র সমাজ আরও কলুষিত হয়ে ধ্বংসের মুখে যাবে। সমগ্র সমাজের প্রত্যেকেরই চেষ্টা ক’তে হবে পূর্ণত্বের দিকে, ভগবানের দিকে অগ্রসর হতে, ইহাই সনাতন ধর্মের প্রধান নীতি। কেশব।-ওঃ! কি ভয়ঙ্কর অবস্থা। আচ্ছা, অপরের হাতে খাওয়া বা না খাওয়া সম্বন্ধে যে ভাবে আমরা এখন চলি, সেটা ঠিক কি , তাই দয়া করে বলুন। পাগল।—ঘঁ, সেটা শােন। খাদ্যের তিন প্রকার দোষ আছে ; (১) জাতি-দোষ (২) স্থান-দোষ (৩) স্পর্শ-দোষ। যে সব জিনিস রজোগুণ বা তমােণ বৃদ্ধি করে (যেমন, মাছ মাংস পেঁয়াজ রসুন ইত্যাদি) সেগুলাে জাতি-দোষযুক্ত খাদ্য। দুর্গন্ধ-পূর্ণ স্থানে বা যে সব স্থানে কীটাদি বহু পরিমাণে আছে, সে স্থানে যে খাদ্য থাকে, তা যদি খুব ভাল করে ঢাকা না থাকে, তবে তা স্থান-দোষযুক্ত খাদ্য। যদি কোন খাদ্য দ্রব্যের ( ভাত ডাল তরকারি, কাটা ফল ইত্যাদির) ভিতরে কোন ব্যক্তি হাত বা আঙ্গুল দ্বারা নাড়ে এবং সেই ব্যক্তি বিশেষ রজো- গুণী বা তমােণ যদি হয়, তবে সে খাদ্য স্পর্শ-দোষে দুষিত হয়। (তমােগুণী লোেক অবশ্য রজোগুণী কর্তৃক ঐ প্রকারে ছোঁয়া খাদ্য খেতে পারে ; বেশ তমােঝ লােক অল্প তমােগুণী লােকের দ্বারা ঐ প্রকারে ছোয়া খাদ্য খেতে পারে এবং সকল লােকেই সত্ত্বগুণী লােকের দ্বারা ঐ প্রকারে ছোয়া খাদ্য খেতে পারে।] ঐ সব দোষ বিচার করে, কোন জিনিস খাওয়া উচিত নয়, তা ঠিক করা দরকার। আজকাল প্রথম দুই নম্বরের প্রতি দৃষ্টি খুবই কম ; আর তিন নম্বরেরটী হয়েছে এই, যদি অমুক জাতির লােক বারান্দায় উঠল কি ঘরে গেল, তবেই সেখানকার খাদ্য নষ্ট হয়ে গেল –এতটা বাড়াবাড়ি। ফলে এই হয়েছে, কেবল জাতি-বিশেষের প্রতি ঘৃণা আর সেই হেতু ঐ অপমানিত জাতির হিংসা- জাতিভেদের কথা। বৃদ্ধি। কেশব।-কেহ কেহ এই সকলের জন্য ব্রাহ্মণ জাতিকে দোষী বলেন। পাগল।-গােড়ায় যেই দোষ করুক এখন সব জাতিই দোষী। নিজের সুবিধা ও সম্মানটুকু কেউ ছাড়তে চায় না। জাতি যাওয়া এবং আবার জাতিতে উঠা, এটাও এখন যা দেখছ সে একটা ছেলেখেলা। কোন লােকের প্রতি তার সমাজের কোন প্রবল লােক বা সমাজের পাঁচজন সাধারণ লােক কোন কারণে অসন্তুষ্ট হল, তখন সমাজ শুদ্ধ লােক আর তাকে নিয়ে উঠা বসা করবে না বা আহারাদি করবে না, ব’বে ‘ওর জাতি গিয়েছে। আবার তাদেরে যদি সে সন্তুষ্ট করতে পারুল ত সকলে তাকে নিয়ে আহারাদি করতে লাগল, তখন তার জাতি উঠল। এখানে গুণ ও কর্মের কোনই বিচার নাই । পাঁচজনের খেয়াল মত চল, তােমার গুণ ও কৰ্ম্ম যতই খারাপ হয়ে যাক না কেন, তােমার জাতি যাবে না। আর, পাঁচজনের সঙ্গে যদি মিশে চলতে না পার, তবে তােমার গুণ ও কৰ্ম্ম তাদের সকলের চেয়ে ভাল হ'লেও তােমার জাতি ষাবে—তােমাকে তাদের চেয়ে হীন বলে সমাজ থেকে দূর করে দিবে। যদি বড় লোক হয়, যে অনিষ্ট করতে পারে, সে যা ইচ্ছা করুক, কেউ তাকে ভয়ে কিছু বলবে না, তার জাতিও যাবে না। বাস্তবিক যাতে জাতি যায় ও জাতি উঠে, সেটা কেউ তলিয়ে দেখে না। তুমি যে সমাজে আছ, সেই সমাজের যে গুণ ও কৰ্ম্ম, তা যদি তােমার না থাকে, তার থেকে যদি খারাপ হয়, তবে তােমার জাতি নাই জাবে। তারা তােমাকে নিয়ে উঠা বসা বা খাওয়া দাওয়া ক’রূলে কি হবে ? সত্যই তােমার জাতি গিয়েছে, আবার যখন ঐ সমাজের গুণ ও কৰ্ম্ম তােমার হবে, তখন তুমি ঐ জাতিতে উঠবে। আর যদি তােমার , ?

পাগলের ঝুলি। গুণ ও কৰ্ম্ম, তুমি যে জাতির মধ্যে আছ, তাদের গুণ ও কৰ্ম্ম হ’তে ভাল হয়, তবে তুমি তাদের চেয়ে জাতিতে উচু, যদিও তুমি তাদের চেয়ে উচু জাতির সমাজে যায়গা পাবে না এবং তােমাকে তাদের জাতির মধ্যেই থাকতে হবে। এখানে সাধারণ দৃষ্টিতে তুমি উপরের জাতিতে উঠলেও বাস্তবিক তুমি উপরের জাতি হয়ে গেলে। এমন কি, যদি কেউ কোন কারণে নীচ জাতিতে জন্মে থাকে আর তার কোন উচ্চ জাতির গুণ ও কৰ্ম্ম থাকে, তবে সে সেই উচ্চ জাতি বলেই গণ্য হবে ; আর যদি কেউ উচ্চ জাতিতে জন্মেও কোন নীচ জাতির গুণ ও কর্মযুক্ত হয়, তবে সে সেই নীচ জাতির মধ্যেই পড়বে। সমাজে যখন প্রাণ ছিল, বিচার ছিল, তখন এ সব হত। এখন ও সব ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে, লােকেরা মামুলি চান্ খামখেয়ালির ভাবে চালাচ্ছে। এতে সমগ্র জাতি জীবনীশক্তি-হীন হয়ে পড়ছে, আর হিংসা ঘৃণা ও বিবাদের হােটেলখানা বসেছে। এখন বর্ণ-সঙ্করের কথা। এক বর্ণের পুরুষের সঙ্গে অন্য এক বর্ণের স্ত্রীলােকের সংশ্রবে, অবৈধ প্রণয়ে, যে সন্তান জন্মে তাকে বর্ণ সঙ্কর বলে ।* পুরাণে যে ভাবে বর্ণ-সঙ্করের ফর্দ দেওয়া হয়েছে, তা কোন বিচারের ধার ধারে না। বিশেষতঃ যে সময়ে ঐ সব বর্ণ-সঙ্করের উৎপত্তি হয়েছে বলে লেখা হয়েছে, সে সময়ে অসবর্ণবিবাহ অর্থাৎ এক বর্ণের পুরুষের সঙ্গে অন্য বর্ণের স্ত্রীলােকের বিবাহ চলিত ছিল। তখন যদি এত অধিক মাত্রায় অবৈধ প্রণয়ের ছড়াছড়ি দেশে হয়েছিল স্বীকার ক’তে হয়, তবে তখন দেশে ঘাের অরাজকতা হয়েছিল এবং সমাজের শাসন মােটেই ছিল না, বলতে হয়। আর তা যদি হয়, তবে সমাজের সকল স্থানই কলুষিত হয়েছিল, এ কথা বাধ্য হয়ে বলতে হয়। আর একটা প্রশ্ন আসে, ঐ সব বর্ণ-সঙ্কর যখন হয় নাই, তখন সমাজে তাদের কাজ কে ক’ত? ঐ সব কাজ যদি কেউ না ক’ত, জাতি-ভেদের কথা। তবে সমাজ কেমন করে চ’ত? কিন্তু যেরূপ দেখা যায়, তাতে অবৈধ প্রণয়ের কথা আসে না। ওটা সমাজ-পতিদের বাহাদুরি মাত্র। মােটের উপর, অসবর্ণ-বিবাহে জাত সন্তানদের পিতার বা মাতার জাতি হওয়া উচিত ছিল। "এখন সব বুঝতে পারুলে কি ? কেশব।-“হাঁ, বাবা। এত দিনে একটা মস্ত পর্দা আমার চোখের সামনে থেকে সরে গেল। ক্রমে আমার কাছে বােধ হচ্ছে দুনিয়াটা একটা হাওয়া বাজির উপর চলছে, সব যেন ছেলেখেলা। কি ধৰ্ম্ম-রাজ্যে, কি সমাজে, কোথায়ও খাটি ভাবে কিছু হচ্ছে না। আসল জিনিস যে কোথায় ডুবে গিয়েছে, তা খুঁজেও পাওয়া কঠিন। মানুষগুলাে মিথ্যার হাট বাজারে মজ,গু হয়ে ছুটে চলেছে। মিথ্যা ভাবে মেতে কি দম্ভ অহঙ্কার অভিমান নিয়ে পরস্পরে মারামারি কাটাকাটি করছে ! অশান্তি হবে না কেন? ছড়াবে অশান্তির বীজ, ফ’বে কি শাস্তি ? হ ভগবান্ ! এ তােমার কেমন খেলা! বাবা, জগতে কি পূর্ণ শান্তি আনা যাবে না? বাবা, আমার মনে হয়, যদি এ ক্ষুদ্র প্রাণ বলি দিয়েও জগতে প্রকৃত সুখ শান্তি আনতে পাতাম। পাগল।-হাঁ রে বেটা, যা বলেছি তা অতি সত্য। যাদের চোখ ফুটেছে, তাদের কাছে দুনিয়াটা ঐ প্রকারই বােধ হয়। তােরই মত প্রাণের আবেগ নিয়ে, যুগ যুগান্তর ভরে কতজন প্রাণপণে চেষ্টা করেছে, জীবন বলি দিয়েছে, তাতে যতটুকু যায়গায় যতটুকু শান্তি আশা সম্ভব, তাই এসেছে। এ মায়ার রাজ্যে সৰ্ব্বত্র পূর্ণ শান্তি আসতে পারে । অশান্তি যদি একবারে দূর হয়ে যেত, তবে শান্তির কোন আস্বাদই পাওয়া যেত না, শান্তির কোন মূল্যই থাকত না। সমস্ত * মনু ১০২৪া ভারতের অবজ্ঞাত শ্রেণীর অকপট বান্ধব শ্রীযুক্ত দিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য বিদ্যাভূষণ প্রণীত “জাতিভেদ” নামক পুস্তকের সপ্তম অধ্যায় বিশেষরূপে পাঠ করুন।

৬৪ পাগলের ঝুলি। জগৎট। যাতে অশান্তির বিষে একবারে পুড়ে ছারখার হয়ে না যায়, তারই জন্য ভগবান্ সময়ে সময়ে স্থানে স্থানে শান্তি-দূত পাঠাচ্ছেন। কতক কতক লােক যাদের মনটা একটু ঘুরে দাড়িয়েছে, তারা সেই শান্তি- দূতের কাছ থেকে উপায় জেনে নিয়ে, সেই পথে চলে শান্তি-সুধা পান করছে। এই ত ভগবানের খেলা । এতে তাের অস্থির হবার কিছু নাই। তাের যখন সৌভাগ্য লাভ হয়েছে, তুই নিজে শান্তি ভােগ কর, আর যাদের মধ্যে সম্ভব এবং যে পরিমাণে সম্ভব শান্তি-জল ঢেলে য, এই তাের কর্তব্য। কেশব-আমার জন্ম ধন্য ! আমার জীবন ধন্য ! পূর্ব জন্মে কত তপস্যই যেন করেছিলাম, যার ফলে এবার আপনার মত মহা- পুরুষের চরণে আশ্রয় পেয়েছি। আপনার শ্রীমুখের কথা নয়, এ যেন কলসে কলসে অমৃত পান ক’ছি। আপনাকে যখনি পাই কত কথা জিজ্ঞাসা করে আপনাকে জ্বালাতন করি। বাবা, অধম সন্তানের এ অপরাধ, আপনি দয়াল, অাপনি অবশ্য ক্ষমা করবেন। আর একটা কথা জিজ্ঞাসা ক’তে বড়ই ইচ্ছা হচ্ছে। আচ্ছা, আমাদের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে নিয়ম আছে, কোন গৃহস্থের হাতে অন্ন খাবে না, তবে ঠাকুর বাড়ীর প্রসাদ খাওয়া যেতে পারে এবং ব্রাহ্মণবাড়ীর অন্ন খেতে কোন দোষ নাই। আমার কিন্তু অনেক ঠাকুর বাড়ীর ও ব্রাহ্মণবাড়ীর ব্যাপার দেখে সেখানে খেতে ইচ্ছা হয় না, আবার হয় ত ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য জাতির অনেক গৃহস্থের হাতে ভাত খেতে ইচ্ছা হয়। ইচ্ছা হয় বটে কিন্তু খাই না, কেন না সম্প্রদায়ের যে নিয়ম তা না মানলে ভারি বিভ্রাটে পড়তে হয়। যাই হক, এই নিয়মটার মানে কিছু বুঝে উঠতে পারি না। পাগল শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের আদি লীলা, কাদশ পরিচ্ছেদ যদি পড়ছে, তবে এর রহস্য কোন্ দিন বুঝতে পাতে। এ বিষয়ে জাতি-ভেদের কথা। তােমার মনে যে রকম ইচ্ছা হয় বললে, সেটা খারাপ নয়, ঠিক ব্যবস্থা মতই হয়ে থাকে। অদ্বৈত গােস্বামী প্রভুর কমলাকান্ত বিশ্বাস নামে এক শিষ্য ছিল। দৈব-ক্রমে গােস্বামী প্রভু তিন শ' টাকা দেন হয়ে- ছিলেন। কমলাকান্ত তাকে না জানিয়ে উড়িষ্যার রাজা প্রতাপরুদ্রকে ঐ দেনা পরিশােধ করে দিবার জন্য পত্র লেখে। এই পত্ৰ কোনক্রমে শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর হাতে পড়ে যায়। এই উপলক্ষে মহাপ্রভু প্রথম কমলাকান্তকে শাসন করেছিলেন, তারপর তাকে বলেছিলেন, “রাজার নিকট টাকা চেয়ে নিতে নাই, কারণ রাজারা প্রায়ই বিষয়ে অত্যন্ত আসক্ত হয়ে থাকে। বিষয়ে আসক্ত ব্যক্তির নিকট থেকে যদি কিছু নিয়ে ভােগ করা যায়, তবে যে, তা ভোগ করে তার মন মলিন হয়ে যায় অর্থাৎ বিষয়ে আসক্ত হয়ে পড়ে। মন মলিন হলে ভগবানের ভজন করা যায় না, আর ভগবানের ভজন করূতে না পারুলে জীবন ত বিফলেই যায়। সুতরাং এ রকম কাজ আর করে না। এই উপদেশের মধ্যে আছে ‘বিষয়ীর অন্ন খাইলে দুষ্ট হয় মন। খুব সম্ভব, এই কথার ফলে হয়েছে কি, না তুমি যে আচারের কথা বলে সেই আচার ! যা কিছু খাওয়া যায় তারই নাম অন্ন, শুধু ভাত নয়। এখানে ‘অন্ন খাইলে এই শব্দ দুটা কারাে হাতে ভাত খাওয়া অর্থে ব্যবহার হয় নাই। কেন না ওর আগের লাইন হচ্ছে প্রতিগ্রহ না করিয়ে কভু রাজধন’ অর্থাৎ রাজার নিকট থেকে টাকা চেয়ে নেওয়া উচিত নয় বা রাজা নিজে ইচ্ছা করে দিলেও নেওয়া উচিত নয়। সুতরাং যারা ভগবানের ভজন করে , কেবল বিষয়ে মজে আছে, তাদের কোন জিনিষই নিতে নাই, এই কথাই তিনি বলেছেন। এখন বুঝতে পারুলে প্রকৃত অভিপ্রায় কি। প্রায় গৃহস্থই বিষয়ে আসক্ত দেখা যায়। তাই অধিকাংশ গৃহস্থকেই বিষয়ী বলা যায়। গৃহস্থের বা বিষয়ীর টাকা পয়সা নিবে, চাল ডাল নিবে, তার বাড়ীতে রেধে খাবে, তাতে ধৰ্ম্ম নষ্ট হবে না, !

পাগলের ঝুলি। তার হাতে ভাত খেলেই সর্বনাশ! এখন ঠাকুর-বাড়ী ও ব্রাহ্মণবাড়ী খাবার কথা শােন। ঠাকুর- বাড়ীতে কেবল দেবতার পূজা, ভগবানের গুণ-গান, আরাধনা, সাধু সন্তের আগমন ও বাস হয়। সুতরাং সেটা ধর্মেরই মন্দির। সেখানে ঠাকুরের ভােগ দিয়ে সেই প্রসাদ বিতরণ করা হয়। কাজেই সে অন্ন অতি পবিত্র, তা খেলে প্রাণে ভগবানের প্রতি ভক্তির উদয় হয়। ব্রাহ্মণের বাড়ীও সেই প্রকারই। ব্রাহ্মণ ত সরল, পবিত্র, সদাচারী, সচ্চরিত্র, পর-দুঃখে কাতর, পর-হিতৈষী, ভজন-শীল, সর্বত্র সমদর্শী অর্থাৎ সৰ্বত্ৰ ভগবানকেই দেখেন। তার বাড়ীতে দোষের বা পাপের কোন কাজ হয় না, যা কিছু হয় সবই ভগবানের ভক্তিতে ভরা। কাজেই সেখানকার অন্ন অতি পবিত্র । তা খেলে মন পবিত্র হয়, ভগবানে ভক্তি জন্মে ও বাড়ে। এই সব কারণে ঐ দুই স্থানে অন্ন গ্রহণে বাধা নাই। কিন্তু ঐ সব ভাব যেখানে নাই বরং বিপরীত ভাব আছে, সেখানে খেলে মন ত দূষিত হবেই। আবার যে কোন গৃহস্থের বাড়ীতে ঐগুলাে সব আছে সে বাড়ীও ত ঠাকুর-বাড়ী বা ব্রাহ্মণবাড়ীর সমান। সেখানে খেলে মন পবিত্র না হয়ে দুষিত হবার কোন কারণ নাই। বুঝলে এখন ? গুরুদেবের কথা শুনে কেশবের হৃদয় একেবারে গলে গেল। সে আর কোন কথা কইতে পাল না, কেবল গুরুদেবের চরণ-ধূলি নিয়ে নিজের কপালে ও বুকে, মাখতে লাগল। রাত্রি শেষ হয়ে আছে। পাগল আর বেশীক্ষণ সেখানে অপেক্ষা ক’ল না। “আমি এখানে আর বেশী দিন থাকব না। পনর দিনের দিন এখানে আবি। আর যা জানতে চা’, বলে যাব” এই বলতে বলতে পাগল দ্রুতপদে চলে গেল। *

ঘই রাত্রি।
গুরুর কথা।
গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণুঃ গুরু দেবাে মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।
গুরুদেব ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর, এমন কি পর-ব্ৰহ্ম-স্বরূপ। সেই
গুরুদেবকে প্রণাম করি।
চৌদ্দটা দিন কেশব অতি কষ্টে কাটিয়েছে। গুরুদেব আর বেশী
দিন এ দেশে থাকবেন না ! আনন্দের বাজার ভেঙ্গে যাবে’! কেশবের
মনে কেবল এই চিন্তা।
সে আজ মধ্য-রাত্রিতে সেই মাঠে এসে হাজির,
দেখে পাগল সেখানে তার অপেক্ষায় বসে আছে। দণ্ডবৎ ভুমিতে
প’ড়ে প্রণাম করে কেশব তার কাছেই বসল।
পাগল।আজ কি শুনতে চাস?
কেশব।-বাবা, আপনাকে আর দেখতে পাব না ভেবে প্রাণটা
অস্থির হয়েছে। আর কি-ই বা জিজ্ঞাসা করব, কি-ই বা শুনব? আজ
আপনার তত্ত্বই জানতে চাই। আপনাকে নিয়েই জীবন কাটাব।
আচ্ছা, বাবা, অনেকে বলে, মানুষ কখনাে গুরু হতে পারে না,
এক ভগবানই গুরু। ভগবানই পথ দেখিয়ে দিবেন, মানুষকে গুরু
করার প্রয়ােজন নাই। মানুষ-গুরুকে ভগবানের মত পূজা করা দোষ।
মানুষকে ভগবান্ বলে পূজা করা অন্যায়। এ সব কথা কি ঠিক?
পাগল।-হ, ভগবানই একমাত্র গুরু। মানুষ গুরু হয় না,
ভগবানই মানুষের মধ্য দিয়া গুরু হন। ভগবান্ ত সৰ্বব্যাপী চিন্ময় ও

পাগলের ঝুলি। আনন্দময় সত্তা। তাঁর কথা শুনতে পারে এ রকম কাণ কয়জনের আছে ? দেহে বদ্ধ জীব খুব উচু স্তরে না উঠলে তার কথা শুনতে ও বুঝতে পারে না। তাই, দেহে বদ্ধ অজ্ঞান জীবের হিতের জন্য, ভগবান্ তত্ত্বজ্ঞানী ভক্তদের পবিত্র দেহ অবলম্বন করে, জীবের বন্ধন মােচনের এবং পরম আনন্দ প্রাপ্তির উপায় জানান। তত্ত্বজ্ঞানী পরম ভক্তের হৃদয়েই ভগবানের বিশেষ বিকাশ। এই গুরুর সেবা করতে করতে এবং তার উপদেশ মত ভগবানের আরাধনা ক’রুতে করতে সাধকের হৃদয় যখন বেশ পরিস্কার হয়ে আসে, তখন সে নিজের ভিতর থেকেও ভগবানের উপদেশ শুনতে পায়। এই যে নিজের ভিতরের গুরু, একে বলে ‘আত্মা-গুরু’ বা ‘চৈত্য-গুরু। তুমি যাকে গুরু বলে গ্রহণ করেছ, ভগবান্ যে শুধু তার মধ্য দিয়াই তােমার সঙ্গে কথা কবেন, তা নয় ; অন্যান্য প্রকৃত সাধু মহাপুরুষের ভিতর দিয়াও তিনিই কথা কন্। কি না, যিনি তােমার ভার নিয়েছেন, তিনি তােমার উপকারের জন্য তােমার পক্ষে যখন যেমন কথার দরকার তেমনি কথাই বলবেন, তােমাকে তেমনি করে চালাবেন, তিনি সর্বদার তরে তােমার চালক। আর তিনি তােমার অধিকার বুঝে কথা বলবেন, কাজেই তুমি সেটা যেমন বুঝবে ও ক’রূতে পাবে, অন্য সাধু মহাজনের ভাষা ও ভাব হয় ত তুমি সে ভাবে বুঝে উঠতেই পাবে না। তবে তােমার সময়-উপযােগী ও অধিকার-উপযােগী কথা যেগুলাে তাদের কাছে শুনবে, তা অবশ্য বুঝতে পারবে। আবার শুধু মানুষ নয়, শাস্ত্রও গুরু হয়, কারণ শাস্ত্র- পাঠে অনেক উপদেশ পাওয়া যায়। এই সব কারণেই শ্ৰীমন্মহাপ্রভু সনাতন গােস্বামীকে বলেছিলো- মায়া-মুগ্ধ জীবের নাই কৃষ্ণ-স্মৃতি-জ্ঞান। জীবের কৃপায় কৃষ্ণ কৈল বেদ-পুরাণ ।

4, গুরুর কথা।
।
শাস্ত্রগুরু-আত্মা-রূপে আখনা জানান।
। : : কৃষ্ণ 'মাের প্রভু ত্রাতা জীবের হয় জ্ঞান।
এ বিষয়ে কবিরাজ গােস্বামী শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের প্রথমেই
বলেছেন:
যদ্যপি আমার গুরু চৈতন্যের দাস।
তথাপি জানিয়ে আমি তাহার প্রকাশ।
গুরু কৃষ্ণ-রূপ হন শাস্ত্রের প্রমাণে।
গুরু-রূপে কৃষ্ণ কৃপা করেন ভক্তগণে।
শিক্ষা-গুরুক ত জানি কৃষ্ণেৱ স্বরূপ।
অন্তর্যামী ভক্ত-শ্রেষ্ঠ এই দুই রূপ ।
জীবে সাক্ষাৎ নাহি, তাতে গুরু চৈত্য রূপে।
শিক্ষা-গুরু হয় কৃষ্ণ মহান্ত-স্বরূপে।
ঈশ্বর-স্বরূপ ভক্ত তার অধিষ্ঠান।
ভক্তের হৃদয়ে কৃষ্ণের সতত বিশ্রাম।
সাধারণতঃ অজ্ঞান লােকের ধারণা এই যে, দেহটাই মানুষ, তাই
যত গােল। প্রকৃত মানুষ কোনটুকু তা যারা জেনেছে, তাদের এ সব
বিষয় নিয়ে কোন সন্দেহই আসে না।
এখন'বুঝলে?—মানুষ-রূপী গুরুর ভিতর দিয়ে, সাধু মহাজনের
ভিতর দিয়ে, বিশুদ্ধ মনের ভিতর দিয়ে, সৎ শাস্ত্রের ভিতর দিয়ে ঐ
ভগবানের বাণীই আছে। ভগবান্ সাধারণতঃ কোন পবিত্র এবং
উপযুক্ত 'আধারের ভিতর দিয়েই কাজ করেন,—যদিও, কখন কখন
অলৌকিক উপায়েও তার কাজ হয়ে থাকে।
গুরু ধরার দরকার নাই, এ কথা যারা মনে করে, তাদের চিন্তা-
শক্তি বড়ই দুর্বল। সংসারের যে কোন প্রকার বিদ্যা বা কাৰ্য শিক্ষার
জন্য তারা গুরু করে থাকে, তার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম, অর্থ-ব্যয় ও ত্যাগ

পাগলের বুলি। স্বীকার করে থাকে। কিন্তু ভগবানের তত্ত্ব জানার নিমিত্ত, ভগবানকে পাবার উপায় শিখবার ও তার গুরু করতে পরিশ্রম করতে, অর্থ- ব্যয় করতে বা ত্যাগ স্বীকার করতে একেবারেই নারাজ। এটা কতকটা তাদের অভিমান এবং পার্থিব সুখ ও অর্থাদিতে অত্যন্ত আসক্তির নিমিই হয়ে থাকে। যদি কোন দরিদ্র লােকের জল-পিপাসা হয়ে থাকে, আর সে যদি মনে করে, ‘নদীর জল অথবা অন্যের কাটা কৃপ বা পুকুরের জল আমি পান ক’ব না, নিজে ধূপ বা পুকুর কেটে তারই জল পান ক’ব, তা হলে তার দশা কেমন হয় ভেবে দেখ। যে সব লোেক ভাবে যে, শাস্ত্রের সাহায্য না নিয়ে এবং কোন তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তির নিকট দীনতা স্বীকার করে শিষ্য না হয়ে, নিজের চেষ্টায় এবং মাত্র নিজের অপরিপক্ক বুদ্ধির সাহায্যে ভগবানকে জেনে ফেলবে ও ধরূবে, তাদের দশাও তেমনি হয়। ‘শাস্ত্র ও মানুষ-গুরুর দরকার নাই, ভগবানই পথ দেখিয়ে দিবেন’ এ কথা বলে, যারা সৎ শাস্ত্র ও উপযুক্ত গুরুর সাহায্য নিতে চায় না, তাদের যদি জিজ্ঞাসা করা যায় ‘ভগবান্ কি ভাবে পথ দেখাবেন, তা হলে তারা হয়ত কোন জবাবই দিতে পাবে না, না হয় উন্মাদের মত যা তা কতকগুলাে বাজে কথা বলবে। আরো একটা কথা বলা দরকার। অনেকে ভাবে, গুরুর নিকট উপদেশ শুনতে হয়, তা উপদেশ যে কোন প্রকারে পেলেই হ’ল, তার জন্য আবার এক জনের কাছে মাথা বিক্রয় করার প্রয়ােজন কি ? তারা জানে না যে, শুধু উপদেশ জালেই সব কাজ করা যায় না। গুরুর শক্তি, জ্ঞান ও স্বভাব শিষ্যের উদ্দীপনা জন্মায় এবং তার ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলে। তা গুরু-সেবা ভিন্ন অন্য উপায়ে লাভ হয় না। এটা যে সিদ্ধি লাভের জন্য একান্ত প্রয়ােজন, তা সাধক মাত্রেই স্বীকার কবে। সুতরাং উপযুক্ত গুরুর আশ্রয় লওয়া অবশ্য কর্তব্য। ।

গুরুর কথা। ৭১ যারা জানে যে, মানুষ-গুরুর ভিতর দিয়েই ভগবান্ তা'দিগকে পথ দেখিয়ে অমৃত-সাগরে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা গুরুর দেহ অবলম্বন করে সেই ভগবানেরই পূজা করে থাকে। এ তত্ত্ব না এ তত্ত্ব না বুঝাতেই স্থূল বুদ্ধির লােকেরা এটা মহা-অপরাধের কাজ বলে মনে করে। সচ্চিদানন্দ-রূপী ভগবান্‌কে লক্ষ্য করে যেখানেই কোন পূজা বা প্রার্থনা করা যাবে- তা সাকারেই হক আর নিরাকারেই হক-তাই সার্থক হবে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই। কেশব।-বাবা, আমার আর এক কথা মনে হয়, অনেক গুরুরও দোষ আছে। তারা নিজে ভগবানের তত্ত্ব না জেনে এবং সাধন ভজন না করেই, লােক ভুলাবার কতকগুলাে কৌশল শিখে গুরু হয়ে বসে এবং বেশ পসার প্রতিপত্তি করে অর্থ উপায় করে থাকে। তাদের তারা প্রতারিত হয়ে হয়েও অনেক লােকে শ্রদ্ধা ভক্তি হারিয়েছে। পাগল।-হাঁ, তাও অনেক স্থলে হচ্ছে। এই শ্রেণীর পাষণ্ড গুরুরা বােধ হয় একবারও ভাবে না যে, তারা নিজেদের জন্য কি ভয়ঙ্কর নরকের পথ পরিষ্কার কছে। সংসারের জিনিস নিয়ে যারা প্রতারণা ক’ছে তাদেরি কত যাতনা ভােগ ক’তে হবে তার ঠিক নাই। আর এরা ক’ছে কি?—না যে ভগবানের পথে গেলে লােকে বিষয় বাসনা হতে মুক্ত হয়ে পরম শান্তি পায়, সেই ভগবানের নাম করে লােককে বিপথে চালিয়ে তাদের ইহকাল ও পরকালের মাথা খাচ্ছে, আর তাদেরে ফাকি দিয়ে অর্থাদি নিয়ে নিজেরা কলুষিত সংসার-সুখ ভােগ ক’ছে! যে সৰ অজ্ঞান লােক ধর্ম-কর্মের ধার ধারে না, কেৰল সংসার সুখের জ পাপ কর্ম করূছে, তাদের যে ভয়ানক শাস্তি হবে, এদের তার চেয়ে শতগুণে বেশী ভয়ানক শাস্তি ভােগ করতে হবে। ঐ প্রকার লােকের যারা বঞ্চিত হয়েছে বলে যারা ধৰ্ম্ম-পথে যাবার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে, এখন তাদের কথা বলি। যদি কারাে থালা ৭২ পাগলের ঝুলি। চুরি যায়, তবে চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া যেমন তার পক্ষে নির্বোধের কাজ, এদের কাজও তেমনি। সাবধান হয়ে, বিশেষ রূপে পরীক্ষা করে গুরু ধ’তে হয়। যারা কোন লােকের ভেল্কি দেখে তাকে মহাপুরুষ বলে মনে করে এবং তাকে গুরু ক’রূলে তাদের সংসারে অনেক সুখের জিনিস লাভ হবে, পাণ করে এ জীবনে শান্তির হাত এড়ান যাবে, 'এই মনে করে তাকে গুরু করে, তারা ঠক্‌বে না ত ঠক্‌বে কে? যারা ভগবাকে সত্যই চায়, তারা সংসারের সুখে বিরক্ত হয়েছে, এ কথা অতি সত্য। সুতরাং যাকে ভগবানের ভক্ত, শান্ত-চিত্ত, সাধন ভজনে আসক্ত, পবিত্ৰ-চরিত্র, পবিত্র কথায় ও ভগবানের কথায় মত্ত, বিষয়-ভােগে লোভ হীন, লােকের হিতকারী, ভগবানের কথা যুক্তি শাস্ত্র ও নানাপ্রকার উদাহরণের দ্বারা সুন্দররূপে বুঝাতে সমর্থ, এরূপ বলে তারা মনে করে তাকেই গুরু করে। এই সব বিশেষ করে দেখে শুনে গুরু ধ’লে আর ঠক্‌তে হয় না। যে সব ভগবদ্ভক্ত সাধক বা সিদ্ধপুরুষ লােকের হিতের নিমিত্ত শিষ্য করে থাকেন, তাদেরও যাকে তাকে শিষ্য করা উচিত নয়। ধন জন মান লাভের জন্য, অথবা ইচ্ছা পূৰ্ব্বক লােকের সর্বনাশ করেছে, হঠাৎ ঠেকে পড়ে কেবল সেই বিপদ হতে নিস্তার পাবার নিমিত্ত, কিংবা সাধুদের মধ্যে কার সাধনপ্রণালী কি প্রকার তা জানবার রা তাদের গুহ রহস্য কি মাত্র তাই শুনবার জন্য কেউ শিষ্য হতে এসেছে, এটা বুঝতে পারলে তাকে শিষ্য করা উচিত নয়, কারণ সে সাধন ভজনও ক’রূবে না এবং ভগবানকেও চায় না।' কেশব-ই, বাবা, তাই প্রায় দেখা যায়,যে যেমন লােক তার কাছে তেমনি লোকই আসে। আচ্ছা, বাবা, আর একটা কথা আমার জানতে ইচ্ছা হয়। অনেকে বলে; ভক্তি-মার্গে ‘মম ও নিয়মের, দরকার নাই, ও সব যারা যােগী তাদেরই দরকার। আবার এমন কথাও ৭৩ অনেকে বলে, কলিতে মানুষ এত কঠিন কাজ করতে পারে না, কাজেই মােগ-মার্গে একটু ষট্‌চক্র ভেদ বা ধ্যান এবং জ্ঞান-মার্গে একটু বিচার ক'রলেই হয়ে যায়, কলিতে বেশী কিছু দরকার নাই। এ কি ঠিক ? পাগল।-ওরে বেটা, সাধনার চরম লক্ষ্য ত বুঝতে পেরেছিস —বিষয়-ভােগ ও বিষয়-চিন্তা থেকে মনটাকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে নিয়ে এসে পরম-আনন্দ-স্বরূপ ভগবানেই একেবারে ডুবিয়ে দেওয়া, সর্ব অবস্থায় সৰ্ব্ব স্থানে তাকেই দেখা, অনুভব করা। কেমন কি না? এখন যে উপায়ে কারাে মন এমনি ধারা হয়ে যায়, সেই তার সাধনা। একটু নাম ক’রূলেই, একটু ষট্‌চক্র ভেদ কল্পনা ক’রূলেই বা ধ্যান করূলেই অথবা একটু বিচার ক’রুলেই যদি কারো মনের ঐ অবস্থা এসে যায়, তবে সে আর অন্য কিছু করূবে কেন ?—আর সে তা ক’রুতেও পারে না। প্রত্যেক শাস্ত্রেই বলা আছে, এই প্রকার কি ঐ প্রকার সাধনা করলেই হয়ে যায়, আর কিছু করা লাগে না। তারপরই অনেক নিয়ম পালনের কথা ঐ সব শাস্ত্রের মধ্যেই বলা হয়েছে। এরূপ করার কারণ এই যে, সেই সব উপায় অবলম্বন ক’রূলে মন বিষয় হতে দূরে থাকবে, সুতরাং নিৰ্ম্মল হবে এবং ক্রমে ভগবানে লেগে থাকবে। যদি কলিকালের লােক দুর্বল বলে ওগুলাের এখন কোন প্রয়ােজনই না থাকত তবে এখনকার শাস্ত্রে মিছামিছি ওগুলাে লিখারই কি দরকার ছিল? অহিংসা, সত্য, অস্তেয় (চুরি না করা ), ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ ( মাত্র জীবন রক্ষার জন্য যা দরকার তার বেশী গ্রহণ না করা) এই- গুলােকে যােগশাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘যম”, আর শৌচ ( ভিতর ও বাহিরে পবিত্রতা), সন্তোষ ( ন্যায় পথে থেকে যা পাওয়া যায় তাতেই তুষ্ট হওয়া ), তপস্যা (একাদশী ব্রত প্রভৃতি দ্বারা কষ্ট সহিতে অভ্যাস করা), পাধ্যায় ( ভগবানের নামাদি জপ, সৎ শাস্ত্র পাঠ। এবং ঈশ্বর-প্রণিধান (ঈশ্বরের ধ্যান বা তার দিকে মন একাগ্র করে রাখা), এইগুলােকে ৭৪ পাগলের ঝুলি। বলা হয়েছে ‘নিয়ম। ভক্তি শাস্ত্রে ঐ দুই শব্দ ব্যবহার না করলেও ঐ দুই শব্দ দ্বারা যে সকল কাৰ্য্য বুঝায় তা করতে বলা হয়েছে। কাজেই শুধু কীৰ্ত্তন, জপ, পূজা, ধ্যান বা বিচার করেও যাদের মন স্থির হচ্ছে , নিৰ্ম্মল হচ্ছে না, ভগবানের পাদপদ্মে লেগে থাকছে না, তারা যদি ঐ সব নিয়ম পালন না করে, তবে তাদেরই ক্ষতি, তাদের সিদ্ধিলাভ হবে না। ষ ও নিয়ম এই দুটা শব্দ শুনেই যারা শিউরে উঠে তারা ঐ নাম দুটা ব্যবহার না করুক, কিন্তু উহার কাজ গুলো তাদের বিশেষ যত্ন করে অভ্যাস ক’তেই হবে যতদিন তাদের চিত্ত নিৰ্ম্মল না হয় ও ভগবানের সাক্ষাৎকার লাভ না হয়। এ সব যার নাই তাকে সাধক না ব’লে পশুর অধম বলায় কোন দোষ দেখা যায় না। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থে, মধ্যলীলায়, শ্রীমন্ মহাপ্রভু সনাতন গােস্বামীকে বিধি-মার্গের সাধন সম্বন্ধে যে সব কথা বলেছেন, সেগুলাে একটু তলিয়ে দেখলেই সব বুঝতে পারবে। তবে, অতি দুর্বল সাধকদের জন্য একটা ব্যবস্থা হতে পারে। যাদের বাধা বিঘ্ন বড় বেশী অথবা মন্দ অভ্যাস যাদের হাড়ে মাংসে ঢুকে গিয়েছে, তাদের পক্ষে ভগবানের নাম গান করা বা জপ করা অথবা অন্য কোন সাধনা কিছু কিছু করা অর্থাৎ ‘নিয়মের’ দুটা অঙ্গ ‘পাধ্যায় ও ঈশ্বর-প্রণিধান’ কিছু কিছু করা, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে ‘যম ও নিয়মের বাকীগুলাে ক্রমে যথাসাধ্য অভ্যাস করাই কৰ্ত্তব্য। কেননা সেগুলাে তাদের আয়ত্ত হতে হয় ত কয়েক জন্ম বা কত জন্ম কেটে যেতে পারে। ঈশ্বর-প্রণিধানই উদ্দেশ্য, অন্যগুলাে তার সহায়। ‘যম ও নিয়মের অন্যান্য অঙ্গ ভাল অভ্যাস না হলে ‘ঈশ্বর-প্রণিধান’ ঠিক মত হতে পারে না। এই নিমিত্তই অনেক সাধু মহাত্মা দুৰ্বল সাধকদের জন্য কৌশলে এই ব্যবস্থাই করে থাকেন। এতে এ কথা বুঝায় না যে, কলিতে ও সকলের দরকারই নাই।

শুরুর কথা। ৭৫ এই কথা বলতে বলতেই পাল উঠে দাঁড়াল। কেশব বুঝল গুরুদেব এখন চলে যাবেন। সে তার চরণ দুখানিতে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। কেন প্রাণ এমন হ’লকেন কান্না আছে, কেশৰ তা কিছু বুঝতে পারূছে না, কেবল তার হৃদয় আকুলি বিকুলি করূছে, যেন অতি বড় মূল বা কোন পদার্থ হারিয়ে গিয়েছে। পাগল কেশবের মাথা থেকে পিঠের মেরুদণ্ডের উপর দিয়ে হাত বুলাতে লাগলেন। কেশবের শরীরে রােমাঞ্চ হচ্ছে। পাগল ব’তে লাগলেন, “কাদি কেন, বাবা ? কি য়েছে? এই দেহে আর দেখা পাবি না? তাতে কি হ’ল ? তাের যখনি দরকার, ধ্যান ক'লে এই প্রকারের সূক্ষ্ম শরীরের দর্শন পাবি। তাের যখন যা দরকার আমি তাের অন্তরে থেকেই তােকে জানিয়ে দেব। দেহের নাশ আছে, আত্বার নাশ নাই, আত্মা অখণ্ড অব্যয়-এ তত্ত্ব ত তোকে বিশেষ করে জানিয়েছি। তাই সর্বদা ভাববি, তাই দেখবি। যে রত্ন লাভ ক’লি, তাের জীবন ধন্য । এখন বিশ্বময় ভগবানের সেবায় ও আহু-ধ্যানে ডুবে থাক। সময়ে তােরও ঐ নশ্বর দেহের পতন হবে, তার পর তুই আর আমি এক হয়ে যাব,-এখনও একই আছি, প্রারব্ধ কৰ্ম্ম-ফলের জন্য মাঝে মাঝে ভুলে যা’, তাই বিরহ-আলা আসে। ভয় নাই, বাছা। আশীর্বাদ ক’ছি, মুক্ত হও, সর্বময় বিষ্ণু-পাদপদ্মে নির্ভয়ে ও আনন্দে বিচরণ কর।” এই বলে পাগল দ্রুতবেগে কোথায় চলে গেলেন! কেশব পৃথিবী যেন শুন্যময় দেখতে লাগল, তার চক্ষু দিয়ে জল-ধারা পড়ছে, হৃদয়ে যেন পাষাণ চাপা পড়েছে—প্রাণ উদাস! কতক্ষণ এই ভাবে বসে থেকে থেকে, কেশব গুরুদেবের শেষ কথাগুলাে ভাবতে ভাবতে, অবশে নয়- যেন অভ্যাসের বশে, নিজের আখড়ায় ফিরে এল।

উপসংহার। কেশব বাবাজি এখন আর কেশব বাবাজি’ নন্। এখন অনেক লােকেই তঁাকে “বাবাজি মহারাজ” বলে ডাকে। ‘বাবাজি’ কথাটা এদেশে অনেক তথাকথিত শিক্ষিত লােকের কাছে একটা ঘৃণার শব্দ হয়ে পড়েছে, কিন্তু কথাটা বাস্তবিক তা নয়। বাবা-পিতা, জ্ঞান- দাতা। শুধু জ্ঞান-দাতা পিতা নয়, সম্ভ্রম দেখাবার জন্য তার সঙ্গে ‘জি’ শব্দ লাগান হয়েছে। “জি” তার্থ মহাশয়। সুতরাং “বাবাজি” অর্থ ‘তত্ত্বজ্ঞান-দাতা পিতা মহাশয়। হিন্দু ভিখারী দেখলেই অনেকে একটু নাক কুঁচিয়ে বলবে, “ঐ যে বাবাজি যায়, ঐ যে বৈরাগী যায়। বাবাজি শব্দের অর্থ বলা হয়েছে, এখন ‘বৈরাগী’ শব্দ। বৈরাগী হওয়া মুখের কথা নয় । বহু ভাগ্যের ফলে বিবেক ( নিত্যনিত্য বিষয়ে জ্ঞান) জন্মে, এক ভগবানই নিত্য (সত্য) আর সব অনিত্য ( মিথ্যা) এরূপ জ্ঞান জন্মে। বিবেক হলে তবে অনিত্য বস্তু সকলে বিরাগ বা বিরক্তি জন্মে, আর নিত্য বস্তুতে অর্থাৎ ভগবানে অনুরাগ জন্মে। ঐ অবস্থা এলে তবে বৈরাগী হয়। যাকে তাকে বৈরাগী বা বাবাজি বলা যায় না। তারপর ‘মহারাজ কাকে বলা যায় ? যে রাজা অন্য রাজার নিকট কর পান এবং যাহার অধীনে সামন্ত রাজা আছেন তিনিই মহারাজা। কিন্তু, পশ্চিম দেশে ভক্ত লােকেরা সাধু মহন্ত এবং ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকেও সন্ত্র দেখাবার নিমিত্ত ‘মহারাজ’ বলে থাকেন। কাজেই কেশব এখন এক জন সম্মানিত সাধু। মুর্থ লােক বা সংস্কারে আবদ্ধ লােক, লেখাপড়া বা শাস্ত্রাদি জালেও, যা সকলকে বরাবর ক'ৰূতে দেখছে বা নিজে করে আসছে, উপসংহার। তা হাজার বুঝলেও ছাড়তে পারে । যাদের হৃদয়ের বল বেশী এবং বিচার-শক্তি প্রবল, তারা কিন্তু যা ঠিক বলে বােঝে, কারাে কথায় কাণ দিয়ে সেই পথেই চলে। এ বিষয়ে বালক এবং যুবকেরাই বেশী অগ্রসর। বৃদ্ধদের মধ্যে কদাচিৎ কেউ পূৰ্ব সংস্কার ছাড়তে পারে, কারণ তাদের চির জীবনের বদ্ধ সংস্কার তাদের অনেককেই প্রবল ভাবে বাধা দেয়। বালক ও যুবকেরা কিন্তু কেশবের উদার হৃদয় ও সেবা-ধৰ্ম্ম দেখে পূর্বেই তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল, তবে তাদের প্রশ্নের সন্তোষ- জনক উত্তর না পাওয়াতেই তাকে ততটা শ্রদ্ধা দেখাতে পারছিল না। কয়েক মাস যাবৎ কেশবের মুখে নানা বিষয়ে যুক্তি-পূর্ণ যথার্থ ব্যাখ্যা সকল শুনে শুনে তারা চিন্তা ক’ছিল, “কেশব বাবাজি কি কালিদাসের মত সরস্বতীর বর পুত্র হ’ল নাকি? এতদিন ত তাকে এত জোরে কথার উত্তর দিতে দেখি নাই, দু চার কথা বলেই ব’ত ‘আমি এটা ঠিক ব’তে পা না বা আমি সে কথা জানি না।” কেশবের ভিতর যে আগুন ঢুকেছে তা ত কেউই জাত না। যা হক, কেশবের ব্যাখ্যা শুনে এবং কাৰ্য দেখে অনেক বালক ও যুবকেরই প্রাণ গলে গিয়েছিল, দু’ একজন বৃদ্ধও মেতে গিয়েছিল। ক্রমে প্রকৃত রহস্য বুঝবার জন্য ও প্রকৃত আনন্দ আস্বাদন ক’বার নিমিত্ত তাদের অনেকেই কেশবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল এবং কেশবের নির্দেশ মত সাধন ভজন করে আনন্দ সম্ভোগ ক’ত ও জীব সেবায় নিযুক্ত থাকত। বাবাজি মহারাজকে এখন আর সেবা-ধৰ্ম্মের জন্য ছুটাছুটি করতে হয় না। শিষ্য ও ভক্তেরাই সে ভার নিয়েছে, তবে বিশেষ কঠিন কঠিন স্থানে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে তাদের সাহায্য করেন এবং যেখানে হয়ত যাবার মত লোক পাওয়া যায় না, সেখানে তিনি নিজে গিয়ে কাজ করেন। নচেৎ তার অধিকাংশ সময়ই নিজের সাধন ভজনে এবং শিষ্য ও ভক্তদের উপদেশ-কাৰ্য্যে কাটে। তার শিষ্য শিষাণীদের মধ্যে সব ৭৮ পাগলের ঝুলি। বর্ণের লােকই আছে এবং তাদের মধ্যে এমন মাখামাখি যেন সব সহােদর ভাই বা সহােদরা ভগ্নী। কেশব বাবাজি জীবন ভরে যে সুখের কথা স্বপ্নবৎ দেখতেন এখন তা হাতে হাতে ফ’লেছে। তিনি কিন্তু আচারে, লােকের সঙ্গে কথাবার্তায় ও ব্যবহারে আগের মতই আছেন, যেন সরল- প্রাণ বালক। অবস্থার পরিবর্তনে তার কোন অহঙ্কার আসে নাই, তিনি আগের চেয়েও নরম হয়ে গিয়েছেন। মাঝে মাঝে তার দুচোখের জল গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, এটার কারণ লােকে বুঝতে পারে না। কিন্তু, কারণ আর কিছুই না; গুরুদেবের এবং ভগবানের করুণার কথা যখনই মনে হয়, তখনি তার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে যায়, তাই বাহিরে অশ্রু-ধারা রূপে দেখা দেয়। যে কেউ তার কাছে আসুক না কেন, তারই হৃদয় অন্ততঃ সাময়িক শান্তিলাভ করে । এই ভাবে কেশব বাবাজি এ অঞ্চলে এক যুগান্তর এনে ফেলেছেন। ওর গুণের সৌরভ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় দুর দূর স্থানেরও অনেকে এসে তাঁর ভক্ত বা শিষ্য হচ্ছে। দিন এই ভাবে যাচ্ছে। এই শাস্তি-রাজ্যে তার আর কোনই দুঃখ নাই, দুঃখের মধ্যে এই যে, গুরুদেবকে স্থূল-দেহে আর দেখতে পান , আর যে সে ভাবে দেখা পাবেন সে আশাও নাই। গুরুদেবের উপদেশে তার দেহাত্ম-জ্ঞান দূর হয়েছে, কিন্তু হলে কি হয় ? দেবের চরণে অসীম কৃতজ্ঞতা ওঁকে সেই গুরু-মূর্তির কথা ভুলতে দেয় । তত্ব-জ্ঞানের বিকাশ হওয়ায় তিনি সবই গুরুর প্রকাশ বলে দেখছেন, সবই গুরুর লীলা বলে বােধ করছেন, কিন্তু তবু তার সেই মুর্তি—সেই প্রশান্ত এবং স্নেহভরা, বৈরাগ্যের জীবন্ত ছবি মূর্তিখানি তার হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছে, চোখ সেই রূপ-সুধা পান করার জন্য লালায়িত। কখন কখন তার ধ্যানের সময় সেই রূপ-রাশি ভেসে উঠে, তখন তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান।

উপসংহার। ৭১ গুরুদেবের সঙ্গে শেষ দেখা হবার পর দীর্ঘ চার মাস এই ভাবে কেটে গিয়েছে। আজ সকালে বিছানা থেকে উঠা অবধি বাবাজি মহারাজের হৃদয় কি যেন এক অজানা বেদনায় অস্থির হয়ে উঠেছে। সমস্ত দিনের মধ্যে স্নান আহারাদি কিছুই করলেন না, কারাে সঙ্গে কথাও বলেন না। গম্ভীর হয়ে বিছানায় একই ভাবে বসে আছেন। শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই আ, কেউ কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করতেও চেষ্টা ক’ল, কিন্তু সেই গম্ভীর প্রশান্ত মুখের দিকে চেয়ে আর কিছুই বলতে পারুল না। তিনি কি দেখছেন? তিনি যে নিজের আখড়ায় আছেন, তাও তার জ্ঞান নাই। তিনি দেখছেন—তিনি কোথায় কোন্ এক অজানা দেশে, এক গভীর জঙ্গলের ভিতরে, এক মনোহর পুষ্করিণীর ধারে বসে আছেন। চারিদিকে সুন্দর সুগন্ধি ফুলের বাগান। সেখানে যে আলো দেখছেন সেটা সূর্যের কি চন্দ্রের আলাে, তা কিছু বুঝা যায় —সূর্যের আলাের মতই পরিস্কার কিন্তু তাতে তেজ নাই, চন্দ্র-কিরণের মত শীতল। সম্মুখে এক বঁধা ঘাটলায় গুরুদেব প্রসন্ন-মুখে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছেন। বাবাজি অপলক আঁখিতে সেই মূর্তি দর্শন করছেন। কত সময় এই ভাবে কেটে গিয়েছে তা তার জ্ঞান নাই। রাত্রি যখন প্রায় অবসান (এ যে কোন্ সময় তা তিনি কিছু বুঝছিলেন ), তখন তিনি দেখলেন গুরুদেবের মুখমণ্ডল এক অপূৰ্ব আলােকে পূর্ণ হয়ে উঠল, ক্রমে সমস্ত শরীর জ্যোতির্ময় হয়ে গেল, কতক্ষণ পর সে আলাে অদৃশ্য হ’ল—গুরুদেবের দেহ আস্তে আস্তে পঞ্চভূতে মিশে গেল ! ক্রমে সে পুষ্করিণী, সে বাগান, সমস্তই শূন্যে মিশে গেল, বাবাজি মহারাজের বাহ্ জ্ঞান আল! তিনি উন্মাদের ন্যায় চারদিকে চাইলেন এবং উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে উঠলেন, “গুরুদেব! বাপ! কোথায় গেলে !” সেই কান্নার পর পরই কি একটা অস্ফুট মধুর ধ্বনি শােনা গেল। পাশের শিষ্য ও ভক্তেরা কিছুই বুঝতে পারল না, কিন্তু বাবাজি মহারাজ পাগলের ঝুলি। শুনলেন, “কেঁদ না. বাপ, শান্ত হও। আমি তােমার মধ্যেই আছি!” রাত্রি প্রভাত হল। বাবাজি মহারাজ প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপন করলেন, মান সন্ধ্যা বন্দনাদি কবুলেন। শিষ্য সেবকের যত্ন সহকারে তাঁহাকে আহারাদি করাল। আহারান্তে শিষ সেবকদের সাহায্যে তিনি তার শয়ন-গৃহে একটা মাটীর বেদি রচনা করলেন। গত বৎসর ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে গুরুমহারাজ যে রাত্রে তার আখড়ায় এসেছিলেন, সেই দিন তিনি তার চরণ থেকে কিছু কাদা রেখে দিয়ে- ছিলেন। কেন রেখেছিলেন, তাও তিনি জানেন না। বাসনার উদয় হওয়া মাত্রই, যন্ত্র-চালিত পুতুলের মত, তিনি তা রেখেছিলেন। সেটা তিনি বেশ করে শুকিয়ে, একটী কৌটায় যত্নে রেখে, বাক্সে আটকিয়ে রেখেছিলেন। আহারের পর মনে পড়ায়, তিনি আজ সেই কৌটা অতি ভক্তি সহকারে বের ক’লেন, সেই পবিত্র মাটী একটু ভেঙ্গে নিয়ে প্রণাম করে আহার করলেন। তিনি ভাবে মাতোয়ারা হয়ে কখ মধুর ঝঙ্কারে প্রণব-ধ্বনি করছেন, কখনাে বা মধুর কণ্ঠে গাইছেন “হরে মুরারে মধু কৈটভারে, গােপাল গােবিন্দ মুকুন্দ শৌরে”। শিষ্য এবং ভক্তগণও প্রেমভরে তার সুরে সুর মিশিয়েছেন। তরঙ্গ উঠেছে। এই অবস্থায় বাবাজি মহারাজ সেই কৌটাটী, একটা ছােট লােহার বাক্সের ভিতর রেখে, ঐ বেদির ঠিক মধ্যভাগে একটা গর্তে স্থাপন ক’লেন এবং গর্তটী মাটী দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। সকলেই তারপর সেই বেদিমূলে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। বাবাজি মহারাজের বাসগৃহ মন্দিরে পরিণত হল। তিনি জীবনের অবশিষ্ট কালের অধি- কাংশ সময় সেই বেদিমূলে সাধনা করে কাটিয়েছিলেন। বাবাজি মহারাজের অপ্রকট হবার পর থেকে তার শিষ্য প্রশিষ্যগণ সেই আখড়া ও তার প্রতিষ্ঠিত কাৰ্য-প্রণালী চালাতে লাগল। শ্রীকৃষ্ণার্পণমন্তু। -সমান্ত- ভক্তি-গঙ্গায় মধুময়

No text on this page.

পাগলের ঝুলি। শুলেন, “কেঁদ না, বাপ, শান্ত হও। আমি তােমার মধ্যেই আছি।” রাত্রি প্রভাত হল। বাবাজি মহারাজ প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপন ক’লেন, স্নান সন্ধ্যা বন্দনাদি ক’লেন। শিষ্য সেবকের যত্ন সহকারে তাঁহাকে আহারাদি করাল। আহারান্তে শিষ সেবকদের সাহায্যে তিনি তার শয়ন-গৃহে একটী মাটীর বেদি রচনা করলেন। গত বৎসর ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে গুরু-মহারাজ যে রাত্রে তাঁর আখড়ায় এসেছিলেন, সেই দিন তিনি তার চরণ থেকে কিছু কাদা রেখে দিয়ে- ছিলেন। কেন রেখেছিলেন, তাও তিনি জানেন না। বাসনার উদয় হওয়া মাত্রই, যন্ত্র-চালিত পুতুলের মত, তিনি তা রেখেছিলেন। সেটা তিনি বেশ করে শুকিয়ে, একটী কৌটায় যত্নে রেখে, বাক্সে আটুকিয়ে রেখেছিলেন। আহারের পর মনে পড়ায়, তিনি আজ সেই কৌটা অতি ভক্তি সহকারে বের করলেন, সেই পবিত্র মাটী একটু ভেঙ্গে নিয়ে প্রণাম করে আহার করলেন। তিনি ভাবে মাতোয়ারা হয়ে কখন মধুর ঝঙ্কারে প্রণব-ধ্বনি ক’রূছেন, কখনাে বা মধুর কণ্ঠে গাইছেন “হরে মুরারে মধু কৈটভারে, গােপাল গােবিন্দ মুকুন্দ শৌরে”। শিষ্য এবং ভক্তগণও প্রেমভরে তার সুরে সুর মিশিয়েছেন। তরঙ্গ উঠেছে। এই অবস্থায় বাবাজি মহারাজ সেই কৌটাটী, একটা খুব ছােট লােহার বাক্সের ভিতর রেখে, ঐ বেদির ঠিক মধ্যভাগে একটা গর্তে স্থাপন ক’লেন এবং গর্তটী মাটী দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। সকলেই তারপর সেই বেদিমূলে ভক্তিভরে প্রণাম করুলেন। বাবাজি মহারাজের বাস-গৃহ মন্দিরে পরিণত হল। তিনি জীবনের অবশিষ্ট কালের অধি- কাংশ সময় সেই বেদিমূলে সাধনা করে কাটিয়েছিলেন বাবাজি মহারাজের অপ্রকট হবার পর থেকে তাঁর শিষ্য প্রশিষ্যগণ সেই আখড়া ও তার প্রতিষ্ঠিত কার্যপ্রণালী চালাতে লাগল। শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু। সমাপ্ত ভক্তি-গঙ্গায় মধুময়

No text on this page.

Pagaler Jhuli Ed. 1st

Author
Krishna,madbrammharshi
Title
Dharmarajyer Khati Katha
File name
Pagaler Jhuli Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1933
Published
2010/02/5
Publisher
Brammachari Wnkaranath, Nadiya
Language
Sanskrit
Pages
98
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Essays
Keywords
Krishna, Sri Madbrammharshi
DLI number
513014
Barcode
4990010020032.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
hbQO1Uveu9K
Download PDF

Pagaler Jhuli Ed. 1st