Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Keshab Chandra Sener Sankhipta Jeebani

Mitra ,jagadbandhu · 2010/01/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ত্মা,
কেশব চন্দ্র সেনের সংক্ষিপ্ত জীবন্নী
শ্রীজগদ্বন্ধু মৈ:
কলিকাতা।
১৩নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট ব্রাহ্মমিস প্রেসে
কার্তিকচন্দ্র দত্ত দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
১২৯৩।
মূল্য। চারি আনা

No text on this page.

ভূমিকা। ভারতভূমি রত্ন প্রসূ। ইনি অসংখ্য রত্ন গর্ভে ধারণ করি- য়াছেন। কহিনুর, কৌস্তুভ প্রভৃতি মহামূল্য রত্ন সকল একদিকে যেমন ইহার গর্ভে উৎপন্ন হইয়া, জুন সমাজে ইহাকে ঐশ্বৰ্য্যশালিনী রূপে পরিচিত করিয়াছে, অন্যদিকে আবার সেইরূপ, বাল্মীকি, ব্যাস, কালীদাস, ভবভূতি প্রভৃতি কবিগণ কপিল, গৌতম, কণা প্রভৃতি। দার্শনিকগণ মনু, অত্রি, বিষ্ণু, হারীত প্রভৃতি ব্যবস্থা শাস্ত্র প্রণেতৃগণ, আৰ্য্যভট্ট বরাহ মিহির প্রভৃতি জ্যোতির্বিদগণ, নারদ, শুকদেব, বুদ্ধদেব, প্রভৃতি ধৰ্ম্ম- প্রাণ সাধুমহাত্মাগণ, ইহার উদরে জন্ম গ্রহণ করিয়া ইহঁাকে সভ্য জগতের শীর্ষস্থানীয় করিয়া তুলিয়াছে। সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী, শৈব্যা প্রভৃতির ন্যায় আদর্শ রমণী জগতে অতি অল্পই পাওয়া যায়। মহাবীৰ্য্যবান সুধন্বী লক্ষ্মণ, অতুল পরাক্রমশালী মহাবীর ভীষ্ম, প্রবল প্রতাপ মহাবল কর্ণ, অরাতি নিসূদন পরন্তপ পার্থ প্রভৃতি বীরগণের তুল্য বীর জগতের ইতিহাসে কয়জন দৃষ্টি গােচর হয়? এত গেল ভারতের সৌভাগ্যময় সময়ের qo { কথা। ভারত যখন স্বাধীন, ভারত যখন জ্ঞানে ধর্মে সভ্যতায় বাহুবলে জগতে অতুলনীয়, এ ত গেল সেই শুভ দিনের কথা। সে সময়ে—সেই গৌরবময় সময়ে সকলই সম্ভবে। ইহার পরবর্তী সময়ে অবরােহণ কর, যে সময়ে ভারতের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হইয়াছে, জ্ঞান গরিমা অন্তহৃত হইয়াছে ও সৌভাগ্য-শশী ঘাের দুর্ভাগ্য রাহুর কবলগত হইয়াছে, সেই সময়ের প্রতি, সেই অধঃপতনের সময়ের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ কর, দেখিবে রত্ন প্রসূতি তখনও রত্ন প্রসব করিতেছেন। তখনও তাহার খনিতে এমন সকল অত্যুজ্জ্বল অমূল্য রত্ন সকল উৎপন্ন হই- তেছে, যাহা অবলােকন করিয়া জ্ঞান বিজ্ঞানে সমুন্নত, সভ্যতা রশ্মিতে উদ্ভাসিত, স্বাধীনতালােকে আলােকিত সুসভ্য দেশ সকলও, বিস্মিত, স্তম্ভিত ও মােহিত হইয়া যাইতেছে। প্রাতঃস্মরণীয় বীর শ্রেষ্ঠ রাণা প্রতাপ সিংহের ন্যায় স্বদেশ প্রেমিক জগতে সুলভ নহে। পদ্মিনীর ন্যায় সতী রমণীও জগতে অতি অল্পই জন্ম গ্রহণ করিয়াছে। নানক, কবির, চৈতন্য, রামমােহন রায় প্রভৃতি ধৰ্মাত্মা সাধুগণের ন্যায় ক্ষণজন্মা পুরুষ ও পৃথিবীতে অধিক মিলে না, ইহারা এক একটী মহারত্ন, ভারত মাতার অমূল্য অঙ্ক ভূষণ। মহাত্মা কেশবচন্দ্র ও তাহার অন্যতম। এই সবল রত্নের মধ্যে একটী উজ্জল মহামূল্য রত্ন।

;
কেশব বাবু জগৎকে—বিশেষতঃ স্বজাতিকে যে শিক্ষা
দিয়া গিয়াছেন, তাহা অমূল্য। পৃথিবী তাহার নিকট যে
শিক্ষা লাভ করিয়াছে, জগতে তিনি যে সকল মহাসত্য
প্রচার ও জীবনে পরিণত করিয়া গিয়াছেন, সংক্ষেপে
তাহার কিঞ্চিৎ আলােচনায় প্রবৃত্ত হওয়া গেল।
কোন ধৰ্ম্ম-পুস্তক অভ্রান্ত আপ্ত বাক্য নহে, ভ্ৰম
প্রমাদ শালী মনুষ্য বিরচিত ; সুতরাং সত্য অসত্য সংমি-
শ্রিত। ধর্মের মূল ভিত্তি কোন শাস্ত্র নামধারী পুস্তক
বিশেষ নহে, কিন্তু আত্ম প্রত্যয় সিদ্ধ সহজজ্ঞান ; মহাত্মা
কেশব চন্দ্রের এই একটী মহাশিক্ষা। হিন্দু, মুসলমান
য়িহুদি, খৃষ্টান প্রভৃতি ধৰ্ম্ম কোন না কোন গ্রন্থপ ভিত্তির
উপর প্রতিষ্ঠিত। বেদ, হিন্দু ধর্মের, বাইবেল যিহুদি ও
খৃষ্টান ধর্মের এবং কোরাণ মুসমান ধর্মের ভিত্তি। এই
সকল ধর্মাবলম্বীগণ তাঁহাদিগের স্ব স্ব ধর্মের ভিত্তি স্বরূপ
বৰ্ম্ম গ্রন্থ সকলে যাহা ধৰ্ম্ম বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে
তাহাকেই ধর্ম ও তৎভিন্ন আর সকলকে অধৰ্ম্ম মনে
করেন। এই সকল ধর্ম শাস্ত্রে যাহা ধৰ্ম্ম বলিয়া নির্দিষ্ট
হইয়াছে, তাহা মানিয়া চলিলেই ধাৰ্মিক, তদন্যথায়
অধাৰ্ম্মিক। মহাত্মা কপিল এই ধৰ্ম্ম মতের বলে ঈশ্বর
মানিয়াও• কেবল হিন্দুধর্মের ভিত্তি বেদকে অভ্রান্ত
আপ্ত বাক্য বলিয়া স্বীকার করাতে আস্তিক।

| আর মহামুণী পরম যােগী শাক্য সিংহ ঈশ্বর মানিয়াও কেবল বেদকে অমান্য করাতেই নাস্তিক নামে অভিহিত। এই সকল ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র আবার অভ্রান্ত ঈশ্বর বাণী। হিন্দুর বেদ মানবের বাগযন্ত্র হইতে বহির্গত হয় নাই। ইহা অপৌরুষের আপ্তবাক্য, ভগবানের উক্তি। এইরূপ মুসল- মানের কোরাণ, খৃষ্টানের বাইবেল প্রভৃতি ধৰ্ম্ম-গ্রন্থ সকল ভগবদুক্ত অপৌরুষের আপ্তবাক্য রূপে পরিগৃহীত। এই সকল ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র যদি অপৌরুষের আপ্তবাক্য হয়, ভগ- বানের উক্তি হয়, তাহা হইলে ইহাদের মধ্যে এত মত পার্থক্য কেন? এত বিরােধ কেন ? বেদ, বাইবেল, কোরাণ প্রভৃতিতে এত প্রভেদ কেন? ঈশ্বরত এক। সকল ধৰ্ম্ম-শাস্ত্রই ত, জগতের সৃষ্টি স্থিতি পালন কৰ্ত্তা, মানবের ধৰ্ম্ম জীবনের নেতা ও উপদেষ্টা এক বলিয়া মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে। তবে তাহার প্রণীত ধৰ্ম্ম-শাস্ত্রে এত মত পার্থক্য কেন, এত বিভিন্নতা কেন, পরস্পর এত বিরােধ ভাব কেন? তিনি কি দেশ ভেদে, কাল ভেদে, জাতি ভেদে বিভিন্ন প্রকার ধর্ম নির্ধারণ করিয়াছেন, তিনি কি হিন্দুর পক্ষে যাহা ধৰ্ম্ম, মুসলমানের পক্ষে তাহা ধৰ্ম্ম নহে বরং অধৰ্ম্ম, খৃষ্টানের পক্ষে যাহা, ধৰ্ম্ম অন্য ধর্ম সম্প্রদায়ের পক্ষে ধৰ্ম্ম নহে, প্রত্যুত পাপ কাৰ্য,এই প্রকার ব্যবস্থা করিয়াছেন। কদাচ নহে। প্রভু পরমেশ্বর যেমন 1/ ও অদ্বিতীয়, তাহার ধৰ্ম্মও সেইরূপ এক ও অদ্বিতীয়। জাতি কাল ও দেশ ভেদে তাহার কোন প্রকার প্রভেদ হয় না, ইতর বিশেষ হইতে পারে না। আর এক কথা, ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র সমূহে অনেক ভ্ৰম প্রমাদ, অনেক অসত্য দেখিতে পাওয়া যায়। পূর্ণ সৰ্বজ্ঞ অনন্ত জ্ঞানবান পুরুষ প্রণীত শাস্ত্রে ভ্ৰম, কুসংস্কার, অসত্য প্রভৃতি স্থানলাভ একান্ত অসম্ভব। বাস্তবিক সেই অনন্ত জ্ঞানের আকর, সর্বজ্ঞ পূর্ণপুরুষ এই সকল শাস্ত্রের প্রণেতা নহেন। এই সকল ভ্রম প্রমাদ পূর্ণ, অসত্য সং- মিশ্রিত, পরস্পর বিভিন্ন মত বিশিষ্ট ধর্ম-গ্রন্থ সমূহ, তাহা হইতে সমুৎপন্ন হয় নাই। ভ্ৰম প্রমাদ যুক্ত অপূর্ণ মানব ইহার প্রণেতা। সুতরাং ইহা এত ভ্ৰম প্ৰমাদপূর্ণ। এত পরস্পর বিভিন্ন প্রকারের মত সমূহে পরিপূর্ণ। আর এক কথা,কেহ কেহ হয়তঃ, হয়তঃ কেন নিশ্চয়ই বলিবেন যে সমস্ত ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র ঈশ্বরের প্রণীত নহে, কেবল একখানি ধৰ্ম্ম-শাস্তু তাহার প্রণীত। মানব জাতির ধৰ্ম্ম- শিক্ষার জন্য কেবল একখানি ধৰ্ম্ম-গ্রন্থ তিনি প্রণয়ন করি- য়াছেন। অন্যান্য সকল গুলি মনুষ্য প্রণীত। ধৰ্ম্ম-গ্রন্থ সকলের কোনখানি তাহার প্রণীত ও কোন খানি মনুষ্য বিরচিত ? কোন খানি যে ঈশ্বর প্রণীত ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র, কেমন করিয়া তাহা নির্ধারিত হইবে? ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র সকলের মধ্যে যে কোন খানি অভ্রান্ত অপৌরুষেয় আপ্তবাক্য, বেদ, বাইবেল,কোরাণ, জেন্দাবেস্তা প্রভৃতির কোন স্থানী যে ভগবদুক্তি তাহা নির্ধারণ করিবার কোন উপায় আছে কি ? বাস্তবিক সম্প্রদায় বিশেষ প্রবর্তিত কোন ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র ভগবদুক্তি বলিয়া ধরিয়া লইলেও তাহা নির্ধারণ করিবার কোন উপায় নাই। ভগবান কাহাকেও কিছু বলিয়া দেন নাই। আর এক কথা, ঈশ্বর মানব মাত্রেরই সৃষ্টি কর্তা। হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান সকলই তাহার সৃষ্ট। কিন্তু যদি তিনি বেদকেই শুধু ধৰ্ম্ম নির্ণায়ক গ্রন্থ রূপে নির্ধারণ করিয়া থাকেন, তাহা হইলে, মুসলমান, খৃষ্টান প্রভৃতি ধর্মাবলম্বীগণের দশা কি হইবে ? তাহারা কি পরম মঙ্গলকর ধর্ম ধনে বঞ্চিত থাকিবে ? আর যদি বাইবেল, কি কোরাণ কি জেন্দাবেস্তার অন্যতম ঈশ্বর প্রণীত হয়, তাহা হইলে সেই শাস্ত্রানুসরণকারী ভিন্ন অন্যান্য সম্প্র- দায়ের লােক সমূহ কি চিরকাল ধৰ্ম ধনে বঞ্চিত থাকিয়া পশুজীবন অতিবাহিত করিবে ? ধৰ্ম্মের সাহায্যে মুক্তি রত্ন লাভ করিতে পারিবে না ? পরম ন্যায়বান ও অনন্ত করুণাময় বিধাতার রাজ্যে ঈদৃশ অবিচার হওয়া একে- বারে অসম্ভব। যিনি এ কথা বলেন,তিনি ঘাের নাস্তিক। অধুনা ব্রাহ্মধৰ্ম্ম যে সহজ জ্ঞানরূপ সুদৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়া নিরাপদে দণ্ডায়মান রহিয়াছে, এক সময়ে তাহা ছিলনা। তখন বেদ ইহার ভিত্তিভূমি ছিল। যদিও উদারভাবে সৰ্ব্ব জাতীয়, সৰ্ব্ব দেশীয়, সকল সম্প্র- দায়ের ধর্মশাস্ত্র হইতে সত্য সকল গ্রহণ করিয়া ইহার অঙ্গ পুষ্টি করা হইয়াছিল, তথাপি বেদই ইহার মূল ভিত্তি ছিল। ইহার পর কিছুদিন যুক্তি ব্রাহ্মধর্মের মূল ভিত্তির স্থান অধিকার করে। কেশব বাবু, ব্রাহ্মসমাজে প্রবেশ করিবার পর যুক্তি ব্রাহ্মধর্মের ভিত্তি ভূমির স্থান হইতে বিচ্যুত হয়। সহজজ্ঞান সেইস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের দ্বারা এই কার্য সম্পাদিত হয়, কিন্তু কেশব বাবু তাহার প্রধান সহকারী ছিলেন। মহর্ষি কেশব বাবু হইতে এ বিষয়ে প্রচুর সাহায্য লাভ করিয়াছিলেন। পূজ্যপাদ মহাত্মা রাজা রামমােহন রায় এক নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা প্রচার করেন বটে, পৌত্তলিকতা পূর্ণ ভারত ক্ষেত্রে, বহু দেব দেবীর রাজ্যে এক নিরাকার ব্রহ্মের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করেন বটে,বহু দেবব্যপাসনার পরিবর্তে অদ্বিতীয় ঈশ্বরের পূজা প্রচার করেন বটে, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তাহা কার্যে পরিণত হয় নাই। যাহারা তাহার ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়াছিলেন, তাহারা কেবল সপ্তাহান্তে সমাজে গিয়া নিরাকার ঈশ্বরকে উপা- সনা করিতেন মাত্র। কিন্তু তাহাদিগের পরিবারের মধ্যে, অনুষ্ঠানে, ইহা স্থান লাভ করিতে পারে নাই।

পৌত্তলিকতার যাবতীয় অনুষ্ঠানই তাহার গৃহে সম্পাদন
করিতেন, কেবল সপ্তাহান্তে ব্ৰহ্ম মন্দিরে গিয়া একবার
নিরাকার ব্রহ্মকে অর্চনা করিয়া আসিতেন।
বাবুই একেশ্বর বাদ ব্রাহ্মধৰ্ম্মকে ব্রাহ্মগণের পরিবার মধ্যে,
সকল প্রকার অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন। ষষ্ঠী,
মাকাল, সুবচনী প্রভৃতি গৃহ দেবতার স্থানে নিরাকার
ঈশ্বররের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। অধুনাতন যে মতে
ও অনুষ্ঠানে অনেক একেশ্বর বাদী ব্রাহ্ম পরিবার দেখিতে
পাওয়া যায়, কেশব বাবুই তাহার প্রতিষ্ঠাতা।
অতি প্রাচীন কাল হইতে ভারতবর্ষে ঈশ্বর সম্বন্ধে
এই প্রকার মত প্রচলিত হইয়া আসিতেছে যে ঈশ্বর
নিষ্ক্রিয়, নির্লিপ্ত, নিঃসঙ্গ ও উদাসীন। সৃষ্টির সঙ্গে তাহার
প্রত্যক্ষ ভাবে কোন সম্পর্ক নাই। তিনি ইহা সৃষ্টি
করিয়া নিয়মিত রূপে পরিচালিত হইবার জন্য কতকগুলি
নিয়ম করিয়া দিয়াছেন। সেই সকল নিয়ম দ্বারা ইহার
যাবতীয় কার্য নিয়ন্ত্রিত হইতেছে, সুশৃঙ্খল ভাবে চলি
তেছে। কিন্তু তিনি ইহার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন
নিষ্ক্রিয়। এই মত নিতান্ত ভ্রমাত্মক। ঈশ্বর নিষ্ক্রিয় বা
উদাসীন নহেন। সৃষ্টির সঙ্গে সাক্ষাৎ ভাবে তাহার কোন
সংস্রব নাই, বাস্তবিক তাহা ঠিক নহে। এই অনন্ত বিশ্ব
যেমন সেই অনন্ত পুরুষ হইতে সমুৎপন্ন হইয়াছে,সেই রূপ
;
।

ইহা প্রত্যক্ষভাবে তাহারই দ্বারা পরিচালিত ও পরিক্ষিত
হইতেছে। ঈশ্বর যেমন ইহাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করিয়াছেন,
সেইরূপ তিনি স্বয়ং ইহার মধ্যে বর্তমান থাকিয়া, শক্তি-
রূপে, প্রাণরূপে, অবলম্বনরূপে বিদ্যমান থাকিয়া ইহার
প্রত্যেক কার্য স্বহস্তে নিৰ্বাহ করিতেছেন। এবং দিন দিন
ইহাকে উন্নত হইতে উন্নততর অবস্থার দিকে স্বয়ং লইয়া
যাইতেছেন। ব্রাহ্মসমাজ বিশেষতঃ কেশব বাবুই এই মতের
প্রতিষ্ঠাতা ও পূর্বোক্ত ক্রমাত্মক মতের নিবারণ কারী।
ভক্তি সম্বন্ধে ভারতবর্ষে বিশেষতঃ বঙ্গদেশে এই
প্রকার মত প্রচলিত আছে যে নিরাকার পদার্থকে ভক্তি
করা যায় না। শুধু বিশ্বাসের উপর নির্ভর করিয়া ভক্তি
সন্তুষ্ট হইতে পারে না, চরিতার্থতা লাভ করিতে পারে
। প্রত্যক্ষ দর্শনেন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য পদার্থ ভিন্ন তাহার
সন্তুষ্টি ও চরিতার্থতা লাভ হয় না। জ্ঞানযােগে বিশ্বাস
বলে নিরাকার পরব্রহ্মের উপাসনা হইতে পারে, কিন্তু
ভক্তি যােগে ঈশ্বরকে উপাসনা করিতে হইলেই তাহাকে
সাকার বলিয়া মানিতে হইবে। নতুবা ভক্তি কদাচ
চরিতার্থ হইতে পারিবে না। এ কথা অতি ভ্ৰমা-
ঈশ্বর যে সাকার নহেন, এ কথা সৰ্ব্ব বাদী সম্মত।
বাস্তবিক ঈশ্বরকে সাকার রূপে ধরিয়া লইলে তাঁহার
আর ঈশ্বরত্ব থাকে না। যে অনন্তত্ব, সর্বশক্তিমত্তা

সৰ্বজ্ঞতা প্রভৃতি গুণের জন্য তিনি ঈশ্বর, যদি তিনি নিরাকার না হইয়া সাকার হন, তাহা হইলে এই সকল গুণ তাহাতে কিছুতেই থাকিতে পারে না। সাকার হই- লেই তিনি পরিমিত, পরিমিত হইলেই তাহার গুণরাশিও পরিমিত। তাহা হইলে তিনি অনন্ত নহেন, সর্বশক্তিমান হইতে পারেন না ও সর্বজ্ঞ হওয়া অসম্ভব। তাহা হইলে সৃষ্ট জীবে আর হাতে প্রভেদ থাকিল কোথায় ? তবে যদি তিনি বাস্তবিক সাকার না হইলেন, তবে সাকার কল্পনা করিয়া লাভ কি ? কল্পিত পদার্থকে কি কেহ কখন বাস্তবিক ভক্তি করিতে পারে। একটী মৃত্তিকা নির্মিত ব্যাভ্রকে যদি জীবন্ত প্রকৃত ব্যাঘ্ৰ কল্পনা করা যায়, তাহা হইলে সেই কল্পিত ব্যাঘ্র হইতে কি বাস্তবিক জীবন্ত ব্যাঘ্র হইতে লােক যত ভয় পায়, তত ভয় পাইয়া থাকে ? কদাচ নহে। সেই প্রকার নিরাকার ঈশ্বরকে সাকার বলিয়া কল্পনা করিলেও বাস্তবিক ভক্তির উদয় হয় না। হইতে পারে না। কেননা সে জানিতেছে যে আমার দেবতা কাল্পনিক ভিন্ন আর কিছুই নহে। এই প্রকার কল্পনা দ্বারা উপকার ত কখনই হয়না, বরং মহান ঈশ্বরকে ক্ষুদ্র রূপে কল্পনা করাতে অনন্ত সর্বশক্তিমান পুরুষকে পরিমিত মনে করাতে নিজের মহান্ ক্ষতি হয়। ঈশ্বরের নিকট অপরাধী হইতে হয়। আর এক কথা,বাস্তবিক

॥/০
ঈশ্বরকে নিরাকার ভাবে ভিন্ন সাকার ভাবে কদাচ উপা-
সনা করা যাইতে পারে না। যাহারা বলেন আমরা
সাকার বাদী, তাহারাও বাস্তবিক সাকার বাদী নহেন,
কিন্তু নিরাকার বাদী। একটী দৃষ্টান্ত লওয়া যাউক।
যাহাদের বাটীতে দুর্গোৎসব কি, অন্য কোন পূজা হইয়া
থাকে, তাহারা সকলেই জানেন যে, বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা
হইয়া থাকে, আবাহন হইয়া থাকে, বিসর্জন হইয়া
থাকে। প্রাণ প্রতিষ্ঠার পূৰ্ব্বে, আবাহনের পুৰ্ব্বে, প্রতিমা
পঞ্জরকে কেহ দেবতা বলিয়া মনে করে না। তখন
সেই প্রতিমা পঞ্জর অস্পৃশ্য জাতিদিগের দ্বারা সৃষ্ট হইয়া
থাকে। তাহাতে কিছু দোষ হয় না। কিন্তু প্রাণ
প্রতিষ্ঠা হইলে, প্রতিমা পঞ্জরে দেবতার অধিষ্ঠান হইলে
আর তাহা অস্পৃশ্য জাতিদিগের দ্বারা কদাচ পৃষ্ট হইতে
পারে না। বিসর্জনের পরও এই ব্যবস্থা দৃষ্ট হইয়া থাকে।
ইহা দ্বারা কি জানা যায় ? ইহাদ্বারা কি এই জানা যায়
যে প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান চক্ষুরিন্দ্রিয়ের গােচরীভূত যে
প্রতিমা পঞ্জর তাহা আর কিছুই নহে, কেবল তৃণ মৃত্তিকা-
দির স্থূপ মাত্র। কিন্তু উহার অভ্যন্তরে যে দেবতার আবি-
ভাব হয়, তাহাই বস্তবিক উপাস্য।
উপাসকেরা প্রকৃত
প্রস্তাবে সেই দেবতারই উপাসনা করিয়া থাকেন। কিন্তু
সেই দেবতা কি লােক লােচনের গােচরীভূত ? কেহ কখন

কি আবাহনের কি বিসর্জনের সময় চৰ্ম্ম চক্ষু দ্বারা
দেবতাকে দেখিতে সক্ষম হইয়াছেন, কদাচ নহে।
দেবতাকে দর্শন করিতে পারিতেছেন না, অথচ ভক্তি
করিতেছেন ; শুধু বিশ্বাসকে অবলম্বন করিয়া ভক্তি
চরিতার্থ হইতেছে। তাহারা মুখে বলিতেছেন যে
নিরাকার ঈশ্বরকে ভক্তি করা যায় না, কিন্তু তাহাদের
কাৰ্য্য দ্বারা তাহাদিগের কথার ভ্রমাত্মকতা প্রতিপাদিত
হইতেছে। তাহাদের কাৰ্য্য দ্বারা ইহাই জানা যাইতেছে,
সাকারভাবে ঈশ্বর উপাসনা অসম্ভব। যাহা হউক এই
‘প্রকার বিশ্বাস বহুকাল মানব মন ধিকার করিয়াছিল।
অনেক দিন হইতে এই মত প্রচলিত হইয়া আসিতেছিল।
কেশব বাবুই এই মতের ভ্রমাত্মকতা প্রতিপাদন করেন।
অনন্ত, অসীম, সর্বশক্তিমান অনন্ত বিশ্বের সৃষ্টি স্থিতি
পালন কৰ্ত্তা মহান নিরাকার ইশ্বরকে যে ভক্তি করা যায়
তিনিই তাহা দেখাইয়া গিয়াছেন।
কেশব চন্দ্রই জাতি ভেদের প্রকৃত উচ্ছেদ কারী।
মহাত্মা রাজা রাম মােহন রায় যদিও জাতি নিৰ্বিশেষ,
সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল দেশের সকল জাতীয় সকল
শ্রেণীর লােক একত্র ব্রহ্মোপাসনা করিতে পারিবে, এই
জন্য ব্ৰহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাতেও
জাতি ভেদ প্রথা ব্রাহ্মসমাজ হইতে উঠিয়া যায় নাই।

তাহার সময়ে ও তাহার পরে অনেক দিন পর্যন্ত
বাক্যে না হউক কিন্তু কাৰ্য্যে এক প্রকার জাতিভেদ
বর্তমান ছিল। উচ্চ বর্ণ কদাচ নীম্ন বর্ণের সহিত আদান
প্রদান করিতেন না। প্রকাশ্য ভাবে একত্র ভােজন
করিতেন না। কেশব বাবু এই দূষিত বৈষম্য মূলক
অপবিত্র প্রথাকে ব্রাহ্ম সমাজ হইতে সমুলে বিনষ্ট
করেন। তিনি কাৰ্যে সকল বর্ণ, সকল জাতি সকল
সম্প্রদায় এক করিয়া ফেলেন। বিভিন্ন জাতি বর্ণ ও
সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মদিগকে কেবল পান ভােজন সম্বন্ধে সমান
করিলেন না, পান ভােজনেই কেবল জাতিভেদ ।
বিনষ্ট হইল না। তিনি বিভিন্নজাতি, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের
ব্রাহ্মগণের মধ্যে আদান প্রদান করিতে আরম্ভ করিলেন।
আজ কাল যে ব্রাহ্ম সমাজে অসবর্ণ বিবাহ, বিভিন্ন প্রদেশ
বাসী ব্রাহ্মের সহিত বিভিন্ন প্রদেশবাসিনী ব্রাহ্ম মহিলার
বিবাহ হইতেছে কেশব বাবুই ইহার প্রবর্তয়িতা।
হিন্দু ধৰ্ম্ম ও হিন্দু শাস্ত্র আবহমান কাল নারীজাতির
প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়া আসিতেছে। জ্ঞানে ধর্মে
প্রায় চিরদিন বঞ্চিত থাকিয়া মুখতা ও কুসংস্কারের ঘাের
তমিাময়ী রজনীর মধ্যে তাহারা ডুবিয়া রহি
য়াছে। যদিও প্রাচীন কালের
প্রাচীন কালের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিলে মৈত্রেয়ী, খনা, লীলাবতী, হটী বিদ্যালঙ্কার

• প্রভৃতি দুই চারি জন বিদূষী রমণী দেখিতে পাওয়া যায়, প্রশান্ত মহাসাগরের ন্যায় সুবিস্তৃত হিন্দুসমাজ মধ্যে তাহা ধর্তব্যের মধ্যেই নহে। দিগন্ত প্রসারিত হিন্দু সমাজ সমু- দ্রের মধ্যে তাহা অতি সামান্য নগণ্য বুদবুদ মাত্র। সমা- জের অধিকাংশ রমণী ( সমস্ত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না) অজ্ঞান কুসংস্কারে সমাচ্ছন্ন। যাহা মানবের শ্রেষ্ঠ অধিকার, যে অধিকার লাভ করাতে মানুষ মানুষ হইয়াছে, যে জ্ঞান ও ধৰ্ম্ম মানবকে পশুত্ব হইতে দেবত্বে লইয়া যায় যে স্বাধীনতা, মানব মনের উন্নতির, বিকাশ লাভের সুপ্রশস্ত উপায়, নিষ্ঠুর স্বার্থপর পুরুষগণ তাহা হইতে, আত্মার উন্নতির উপায়, মানব মনের বিকাশ প্রাপ্তির অ- দ্বিতীয় হেতু,জ্ঞান ধর্ম ও স্বাধীনতা হইতে চিরকাল তাহা- দিগকে বঞ্চিত রাখিয়া আসিতেছে। স্ত্রীজাতির বেদে অধি কার নাই, বিগ্রহ মূর্তি স্পর্শ করিবার অধিকার নাই, প্রণব (ঙ) উচ্চারণ করিবার ক্ষমতা নাই। এত গেল ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে, জ্ঞান সম্বন্ধেও এই কথা। এখনও অনেক স্থানে মেয়েরা কি লেখা পড়া শিখিয়া চাকরী করিয়া টাকা আনিবে” এইরূপ কথা শুনিতে পাওয়া যায়। আমাদের দেশের স্ত্রী পুরুষ অধিকাংশের এই ধারণা ছিল ও এক্ষণে আছে যে বিদ্যাশিক্ষা করিলে স্ত্রীলােক বিধবা হয়। স্বাধীনতার কথা আর অধিক বলিবার প্রয়ােজন নাই। সােজা কথায় .

• এই বলিলেই যথেষ্ট যে তাহারা কারার বন্দিনী। বন্দী দিগের স্বাধীনতা আছে ত তাহাদিগের নাই।. এতদ্ভিন্ন তাহারা সমাজে অতি অনাদৃত, নিপীড়িত। নানা প্রকারে সমাজ তাহাদিগকে নিপীড়ন করিতেছে। কেবল কি জ্ঞান ধৰ্ম্ম ও স্বাধীনতায় বঞ্চিত করিয়াই সমাজ ক্ষান্ত হইয়াছে। নানা প্রকারে, বিবিধ বিধানে তাহাদিগকে বিড়ম্বিত করিতেছে। বাল্যবিধবা ইহার একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অশীতিপর বৃদ্ধের পত্নিবিয়ােগ হইলে দারান্তর গ্রহণের অধিকার আছে। এক স্ত্রী বৰ্ত- মানে ইচ্ছা হইলেই অন্য স্ত্রী বা স্ত্রীগণ গ্রহণ করিবার অধিকার আছে, আর ৭ম কি ৮ম বর্ষীয়া বালিকা যে বাল্য ক্রীড়া ভিন্ন আর কিছুই জানে না; বিবাহ, স্বামী, পতি প্রেম যাহার নিকট অর্থশূন্য নিরর্থক বাক্য ভিন্ন আর কিছুই নহে, সে যদি একবার বিধবা হইল, দুর্ভাগ্য বশতঃ স্বামীধনে বঞ্চিত হইল, তাহা হইলে সংসারের যাবতীয় সুখের নিকট তাহাকে চির বিদায় গ্রহণ করিতে হইল। দাম্পত্য সুখের কথা দূরে থাকুক, সামান্য আহারাদির সুখ ও তাহার পক্ষে নিষিদ্ধ। একাদশীর দিন পিপাসায় শুষ্ক কণ্ঠ হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিলেও একবিন্দু জল পান তাহাঁর পক্ষে প্রাণী-হত্যার উৎকট মহাপাতক। এইরূপ অসংখ্য প্রকারে অবিশ্রান্ত সমাজ নারীজাতিকে

নিপীড়ন করিতেছে। সকল প্রকার অধিকার হইতে বঞ্চিত
করিয়াছে। ব্রাহ্ম সমাজ বিশেষতঃ মহাত্মা কেশবচন্দ্র সেন
সমাজের এই অত্যাচারের হস্ত হইতে নারীজাতিকে উদ্ধার
করেন। নারীজাতি যে সমাজের এক অঙ্গ, পুরুষের
সমকক্ষ, ঈশ্বরের কন্যা, আমাদের ভগিণী, অনাদরের নহে
কিন্তু আদরের, অশ্রদ্ধার নহে কিন্তু শ্রদ্ধার পাত্রী, জ্ঞান
ধৰ্ম্মে তুল্যাধিকারিণী কেশব বাবুই তাহা বিশেষভাবে
প্রচার করেন।
যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ধৰ্ম্মরাজ্যে প্রবেশের একটা
প্রশস্ত উপায়, কেশব বাবুই তাহার শিক্ষাদাতা।
প্রার্থনাই ধৰ্ম্মজীবন লাভের অদ্বিতীয় উপায়,ধৰ্ম্মরাজ্যে
প্রবেশাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিগণের প্রার্থনাই একমাত্র সম্বল,
কেশব বাবুর দ্বারা এই সত্য বিশেষভাবে (ক্রাইষ্টের
পরে) প্রচারিত হইয়াছে। তিনি স্বয়ং প্রার্থনার
অভ্যন্তর দিয়াই, প্রার্থনাকে সার সম্বলরূপে গ্রহণ
করিয়াই ধৰ্ম্মজগতে অগ্রসর হইয়াছিলেন। জগৎকে ও
তাহাই শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন। তিনি খৃষ্টধর্মের স্রোত বন্ধ
করিয়াছেন। শিক্ষিত লােকে আর এখন খৃষ্টান হয় না।
আজ কাল যে মানব বিবেকের প্রধান্য বলিয়া
একটা শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়; কেশব বাবুই ইহার
প্রচার কর্তা। তিনি মানব বিবেকের প্রাধান্য সংস্থাপিত

১/০ করেন। বিবেকে সর্বোপরি আসন প্রদান করেন ধৰ্ম্মজগতে বিবেকই সৰ্ব্বেসর্বা এই মহান শিক্ষা কেশব বাবুর দ্বারা প্রচারিত হয়। কেশব বাবু জ্ঞান, ভক্তি, যােগ ও কর্মের সমন্বয় করেন। জ্ঞানযােগও ভক্তিযােগ দ্বারা ঈশ্বরকে উপাসনা করিতে হইবে এবং উৎসাহী হইয়া তাঁহার প্রিয় কার্য্য সাধন করিতে হইবে, ইহা কেশব বাবুর শিক্ষা। এতদ্ভিন্ন তিনি অশেষ দেশ হিতকর কাৰ্য্যে, সামাজিক , কল্যানকর অনুষ্ঠানে সৰ্ব্বদা ব্যাপৃত হইয়া,ও অনেক মঙ্গল- কর বিষয়ে উপদেশাদি দ্বারা অনেক শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন। তাহার সমস্ত গুলীর উল্লেখ করিতে গেলে গ্রন্থকলেবর অত্যন্ত বর্ধিত হইয়া উঠে। সুতরাং তাহা আর উল্লেখ করা গেল না। প্রধান কয়েকটীই উল্লিখিত হইল। ইহা দ্বারাই পাঠকগণ দেখিতে পাইবেন কেশব বাবু স্বদেশ বাসীকে, জগৎকে কি মহান শিক্ষা প্রদান করিয়া গিয়াছেন। কাৰ্য দ্বারা উপদেশ দ্বারা যে সকল সত্য প্রচার করিয়া গিয়া- ছেন, মানবজাতিকে যে শিক্ষা প্রদান করিয়া গিয়াছেন, তাহা অমুল্য। এতদ্বতীত কেশব বাবু তাহার জীবনের শেষ ভাগে, কোচবিহার বিবাহের পরে, ব্রাহ্মধৰ্ম্ম বিবােধী অনেক মত প্রচার করেন ও ব্রাহ্মধৰ্ম্ম বিরােধী অনেক অনুষ্ঠান

করেন, আমরা আর তাহার অবতারণা এস্থলে করিলাম
। পাঠক পাঠিকাগণ এই পুস্তক পাঠ করিলেই সমস্ত
অবগত হইতে পারিবেন। এই স্থানেই আমরা আমাদিগের
বক্তব্য শেষ করিলাম।

কেশব চন্দ্র সেনের সংক্ষিপ্ত প্রথম কলিকাতা মহানগরীস্থ কলুটোলার সুপ্রসিদ্ধ সেন পরিবারে ১৮৩৮ খ্রীঃঅব্দের ১৯ শে নবেম্বর মহাত্মা কেশব চন্দ্র সেন জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম প্যারী। মােহন সেন। কেশব চন্দ্র যে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন, তাহা একটা বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী বিশুদ্ধ হিন্দু পরিবার। হিন্দুধর্মের যাবতীয় ক্রিয়া কলাপ এই পরিবারে অতি সাত্ত্বিক ভাবে সম্পাদিত হইত। আর কেশব বাবুর জননীও একজন অতি নিষ্ঠাবতী রমণী। এই উভয় দ্বারা তাহার জীবন সংগঠনের বিলক্ষণ সাহায্য হইয়াছিল। কেশব বাবু ভবিষ্যতে যে একজন মহৎ লােক হই- বেন, এই সময়েই তাহার অনেক লক্ষণ অতি পরিস্ফুট রূপে পরিলক্ষিত হইয়াছিল। তাঁহার পিতামহ সুবি- খ্যাত রামকমল সেন মহাশয় সুস্পষ্টরূপে বুঝিতে ( ২ ) পারিয়াছিলেন যে কালে কেশব একজন অতি মহৎ লােক হইবেন।. দুই কি আড়াই বৎসর বয়সে একদিন কেশব বাবু মাতৃ ক্রোড়ে ক্রীড়া করিতেছিলেন, সেই সময়ে তাঁহাকে দেখিয়া রামকমল সেন মহাশয় বলিয়াছিলেন যে “এই বালক আমার গদিতে বসিবার সম্পূর্ণ উপযুক্ত হইবে।” তাহার ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ হইয়াছে। যে স্বাধীন কর্তৃত্বভাব তাহার জীবনের একটী প্রধান অলঙ্কার স্বরূপ হইয়া এক সময়ে ব্রাহ্মধৰ্ম্মকে নববলে বলীয়ান ও নবজীবনে উজ্জীবিত করিয়া তুলিয়াছিল, এবং তৎপরে আবার ব্রাহ্মধরে ও ব্রাহ্মসমাজের সর্বনাশের অমােঘ অস্ত্রস্বরূপ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, তাহাও এই সময়ে তাহার জীবনে বিশেষরূপে দৃষ্ট হইত। তিনি যে সকল সমবয়স্ক বালকগণের সহিত বাল্যক্ৰীড়া করিতেন, নেতা হইয়া তাহাদিগের সকলকে পরিচালিত করিতেন। সমবয়স্ক বালকগণ সহজেই তাহার অনুগামী হই। যে অসাধারণ প্রতিভাবলে তিনি সমগ্র পৃথিবীকে স্তম্ভিত করিয়া গিয়াছেন, এই সময়ে, জীবনের এই মধুময় প্রভাতকালে তাহারও কিছু কিছু আভাস পাওয়া গিয়াছিল। তিনি টাউনহল প্রভৃতি স্থানে যে সকল তামাসা বা ভােজবাজী দেখিয়া আসিতেন, বাড়ীতে সম- বয়স্ক সঙ্গীগণের সহিত সেই সকল তামাসা ও ভােজ- ( ৩ ) বাজী দেখাইয়া, লোকদিগকে বিস্ময়াপন্ন করিতেন। বাস্তবিক তিনি অন্যের সদ্গুণরাশি অতি সহজেই আয়ত্ত করিতে পারিতেন। এসম্বন্ধে ভক্তিভাজন মহর্ষি দেবেন্দ্র- নাথ ঠাকুর মহাশয় বলিয়াছেন যে “আমাদের মনে কোন ভাবের উদয় হইলে, আমরা তাহা সম্যরূপে প্রকাশ করিতে পারি না; যদিওবা প্রকাশ করিতে সমর্থ হই, কিন্তু কার্যে পরিণত করিয়া উঠিতে পারি না ; যদিও কাৰ্যে পরিণত করিতে পারি, কিন্তু অন্যের দ্বারা করাইয়া লইতে পারি না। কিন্তু কেশবের এ সমস্ত গুণই ছিল।” কেশৰু বাবু স্বয়ংও বলিয়াছেন, আমার মনে ব্লটিং কাগজের ন্যায় এমন একটা বস্তু বিদ্যমান আছে, যদ্বারা আমি অন্যের সদ্গুণরাশি সহজেই শশাষণ করিয়া লইতে পারি। ক্রমে কেশব বাবু শৈশব অতিবাহিত করিয়া কৈশােরে পদার্পণ করিলেন। বর্তমান এলবার্ট হল নামক অট্টালিকা যেস্থান অধিকার করিয়া রহিয়াছে, পূৰ্ব্বে তথায় একটা সামান্য পাঠশালা ছিল, এই স্থানেই কেশব বাবুর বিদ্যারম্ভ হয়। পরে তিনি হিন্দু কলেজে প্রবিষ্ট হইয়া ইংরেজী অধ্যয়ন করিতে প্রবৃত্ত হন। এই স্থানে তিনি ছেকেণ্ড সিনিয়ার ক্লাস পর্যন্ত অধ্যয়ন করিয়া হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজে প্রবেশ করেন। এই বিদ্যা- ( ৪ ) লয়টী দেশীয়দিগের দ্বারা সংস্থাপিত হইয়া কিছুকাল জীবিত থাকিয়া উঠিয়া যায়। পরে কেশক বাবু প্রেসি- ডেন্সি কলেজে প্রবিষ্ট হইয়া কয়েক বৎসর অধ্যয়ন করেন। গণিত শাস্ত্রে বিশেষ বুৎপত্তি না থাকাতে তিনি শিক্ষাকাৰ্যে বিশেষ গৌরব লাভ করিতে পারেন নাই। পরে তিনি ইতিহাস, ন্যায় ও বিজ্ঞান শাস্ত্রের অনুশীলনে প্রবৃত্ত হন। সেক্সপিয়ার মিল্টন ও ইয়ংএর কবিতা সমূহ তাহার অতি আদরের সামগ্রী ছিল। বেকনের সন্দৰ্ভগুলিও যত্ন করিয়া অধ্যয়ন করিতেন। এই সময়ে তিনি অধ্যয়নে বিশেষ মনােযােগ দিয়া- ছিলেন। নয় কি দশ বৎসর বয়সের সময় তিনি তিলক কাটিয়া সর্বাঙ্গে চন্দনের ছাপ দিয়া গরদের ঘােড় পরিয়া মৃদঙ্গের সঙ্গে সংকীৰ্ত্তন করিতেন। এই সময়ে তিনি কিছু আত্মাভিমানী ছিলেন। সমবয়স্ক সহচর- গণ এজন্য তাহাকে কিছু ভয় করিত; বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান বলিয়া মনে করিত। ক্রমে যৌবন আসিয়া কৈশােরকে অধিকারভ্রষ্ট করিয়া তাহার স্থান অধিকার করিল। কেশব বাৰু যৌবনে পদার্পণ করিলেন। যৌবনের । অপূৰ্ব শ্রী তাহাকে অধিকতর মনােহর করিয়া তুলিল। সঙ্গতিপন্ন পরি- বারের ছেলেরা যৌবনের প্রারম্ভে যেরূপ কুৎসিত ;

( ৫ ) আমােদ ও দুর্নীতি পরায়ণ হইয়া উঠে, তিনি সেরূপ হন নাই। পাপও দুর্নীতির উপর তাহার বিজাতীয় স্মৃণা এবং ধর্ম ও নীতির প্রতি আন্তরিক অনুরাগ ছিল। এই সময় হইতেই তিনি অত্যন্ত মিতাচারী ছিলেন। তাঁহার শরীর অত্যন্ত ক্ষীণ ও প্রভাহীন ছিল। ইহাও কলেজ পরিত্যাগের অন্যতর কারণ। ১৮৫৭ খ্রীঃঅব্দে কেশব বাবু তাহার পৈতৃক পূর্ব বাসস্থান গৌরী গ্রামে সুপ্রসিদ্ধ কবি সেক্সপিয়ার প্রণীত “হামলেট” (Hamlet) নামক জগদ্বিখ্যাত নাটক অভিনয় করেন। প্রসিদ্ধ বক্তা ও ধৰ্ম্মবীর শ্রীযুক্ত বার প্রতাপচন্দ্র মজুমদার মহাশয় এ বিষয়ে তাহার প্রধান সহ- কারী ও সহযােগী ছিলেন। এই গৌরী গ্রামে হিনি একবার বাজীকর সাহেব সাজিয়া এমন আশ্চৰ্য্য বাজী দেখাইয়াছিলেন ও ইংরেজী ভাষায় কথা বার্তা কহিয়া- ছিলেন যে ইউরােপীয়গণও মুগ্ধ হইয়াছিলেন, এবং তাহাকে ইউরােগীয় বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। যে প্রার্থনা তাহার জীবনের নেতা হইয়া তাহাকে ধৰ্ম্ম জগতের অতি উচ্চতর স্থানে লইয়া গিয়াছিল, যে প্রার্থনা দ্বারা তিনি উন্নত ধৰ্ম্মজীবন লাভ করিয়াছিলেন, জীবনের এই সময়েই তাহার আভাস পাওয়া গিয়াছিল। এই সময় হইতেই তাঁহাকে প্রার্থনাশীল দেখিতে পাওয়া

যাইত। এই সময়কার প্রার্থনায় তিনি বিভু শব্দ অধিক
পরিমাণে ব্যবহার করিতেন। খ্রীষ্টানদিগেন্যায় ইংরেজী
ভায়ায় “o Lord” বলিয়া প্রার্থনা করিতেন, তাহাতে
তাহার সঙ্গীগণ তাঁহাকে খ্রীষ্টান বলিয়া সন্দেহ করিত।
কেশব বাবুর প্রথম লােক হিতকর কাৰ্য কলুটোলার
নৈশ বিদ্যালয় সংস্থাপন। ১৮৫৫ খ্রঃঅব্দে এই বিদ্যা-
লয় স্থাপিত হয়। তিনি এখানে সমবয়স্ক বন্ধুগণের
সহিত দরিদ্র বালক ও শ্রমজীবী লােকদিগকে ধর্ম ও
নীতি বিষয়ে উপদেশ দিতেন।
১৮৫৬ খ্রী:অব্দের ২৭শে এপ্রিল, বালী গ্রামের কোন
সম্রান্ত বৈদ্য কুলােবা সুলক্ষণসম্পন্ন গােলাপসুন্দরী
নান্ধী একটী বালিকার সহিত কেশব বাবুর উদ্বাহ ক্রিয়া
সম্পন্ন হয়। এই বিবাহে তাহার অভিভাবকগণ যথেষ্ট
সমারােহ করিয়াছিলেন। বিবাহের পর কেশব বাবু
বিশেষভাবে নির্জন ব্ৰত অবলম্বন করিয়াছিলেন। তিনি
সর্বদা একাকী থাকিতেন। জন কোলাহল হইতে
আপনাকে সর্বদা দুরে রাখিতেন। বন্ধু বান্ধবগণের সহিত
ভাল করিয়া আলাপ করিতেন না। পত্নীর সহিত ভাল
করিয়া সাক্ষাৎ করিতেন না। এজন্য সময়ে সময়ে
তাঁহার স্কন্ধে অহঙ্কারী অপবাদ নিক্ষিপ্ত হইত। বাস্তবিক
তাঁহার শিষ্টাচার ও লৌকিকত বড় অধিক ছিল না, এজন্য

অনেক সময়ে অপরিচিত লােকের সহিত তাহার ব্যবহার
বড় প্রীতিকর হইয়া উঠিত না।
এই সময়ে, যৌবনের এই প্রারম্ভ অবস্থাতে, তিনি
ধর্ম গ্রন্থ পাঠ ও ধৰ্ম্ম চিন্তাতে বিশেষরূপে নিযুক্ত হইয়া-
ছিলেন। ব্রাহ্মৰ্ম্মের বর্তমান উন্নতাবস্থা ইহারই ফল।
এইরূপে ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও চিন্তা করিতে করিতে তিনি
ধৰ্ম্মরাজ্যে প্রবেশ করিলেন। যৌবনের প্রারম্ভে তিনি
যে প্রার্থনা অবলম্বন করিয়াছিলেন, সেই প্রার্থনাই তাহার
জীবনের প্রধান সম্বল হইয়া উঠিল। তিনি প্রার্থনার
অভ্যন্তর দিয়া দিন দিন ধৰ্ম্মজগতে অগ্রসর হইতে
লাগিলেন।
এই সময়ে তিনি পাদরী বান্ সাহেবের নিকট
বাইবেল পাঠ করিতে আরম্ভ করেন। বৈষ্ণব পরিবারের
মধ্যে অবস্থান করিয়া খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র পাঠ করা পরিবার
বর্গের বিশেষ ভয়ের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল; পাছে তিনি
খৃষ্টান হইয়া যান। আর সে সময়ে খৃষ্ট ধর্মের দিকে।
লােকের অপেক্ষাকৃত কিছু অধিক পরিমাণে আসক্তি ছিল।
• কেশব বাবু এইরূপে ইউরােপীয় ধৰ্ম্ম শাস্ত্রের নিকট উৎকৃষ্ট
ধর্মমত ও পরমার্থজ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। বিদেশীয় মত
ও জ্ঞানের সহিত দেশীয় জ্ঞান ও মতের সংমিলন হইয়া
পূর্ণতা লাভ করিল। তিনি যাহা কিছু শিক্ষা করিয়া-

( ৮ )
ছিলেন, তাহার অধিকাংশই বিদেশের নিকট, কিন্তু
তাহাতে তিনি দেশীয় ভাব পরিত্যাগ করেন নাই।
আহার, পরিচ্ছদ প্রভৃতি সকল বিষয়েই তিনি দেশীয় ভাব
রক্ষা করিয়া গিয়াছেন। যে ইংলণ্ডকে পাদ দ্বারা স্পর্শ
করিয়াই আমাদিগের শিক্ষাভিমানী যুবকগণ সাহেব
সাজিয়া বসেন, ইণ্ডিয়ার আব হাওয়াকে দুষিত ও বিষাক্ত
মনে করেন, ভারতবর্ষ হইতে ইংলণ্ডে যাওয়াকে হােমে
( Home) যাওয়া বলেন, কেশব বাবুর এই ব্যবহার
তাহাদিগের বিশেষ শিক্ষনীয় ও অনুকরণ যােগ্য।
কেশব বাবুও ইংলণ্ডে গমন করিয়াছিলেন।
কেশব বাবু প্রার্থনাকে সঙ্গে করিয়া বিশ্বাসের ভূমি
অবলম্বন করিয়া দিন দিন ধৰ্ম্ম পথে অগ্রসর হইতে লাগি-
লেন। বাইবেল প্রভৃতি পাশ্চাত্য ধর্ম শাস্ত্র পাঠ করিয়া
তিনি ঈশ্বরকে নিরাকার বলিয়া জানিতে পারিলেন।
দারু, অন্তর, ধাতু বা মৃন্ময় মূর্তিতে ঈশ্বরজ্ঞান এবং
ঈশ্বরের সাকারত্ব ঐ সকল পুস্তক পাওঁ দ্বারাই তিনি
ভ্রমাত্মক বলিয়া বুঝিতে পারেন। এই সময়ে কেশব
বাবু স্বহস্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাগজে “হে পথিকগণ এ পৃথি-
বীতে শান্তি নাই, তােমরা কি চিন্তা করিতেছ, মৃত্যুকে
স্মরণ কর।” ইত্যাদি লিখিয়া পথ পার্শ্ব প্রাচীরের
গায়ে লাগাইয়া দিতেন। লােকে মনে করিত, হয়তঃ

(৯) কলেজের জৈ কোন পাদরী এইরূপ করে। তাহার বয়স্যগণ এজন্য অনেক সময়ে তাঁহাকে উপহাস করিত, কিন্তু তিনি কিছুতেই বিচলিত হইতেন না। ইহার পুর “গুড, উই ফ্রেটারনিটী” ও “ব্রিটীশ, ইণ্ডি- য়ান্ সােসাইটী” নামক দুইটী সভা সংস্থাপিত হয়। প্রথম সভার উদ্দেশ্য ধৰ্ম্মালােচনা। ইহা কেশব বাবুর কলু- টোলার বাটীতে হইত। এই সভাতেই কেশব বাবু প্রার্থনা ও বক্তৃতা করিতে শিক্ষা করেন। দ্বিতীয় সভা হিন্দু কলেজ থিয়েটার গৃহে হইত। সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চাই এই সভার উদ্দেশ্য ছিল। অধ্যাপক ইহার সভাপতি ছিলেন। মহাত্মা উড়াে এবং পাদরী রেভারেণ্ড ডল, ইহার উৎসাহ দাতা ছিলেন। বিশ্ব বিমােহিনী বক্তৃতাশক্তি তিনি প্রথমে এই স্থানেই লাভ করেন। অনন্তর “রাজ নারায়ণ বসুর বক্তৃতা” নামক এক খানি পুস্তক দৈবাৎ তাহার হস্তগত হয়। পাঠ করিয়া তিনি দেখিলেন যে তাঁহার ধর্ম মত ও এই পুস্তকোল্লিখিত ধর্মমত এক প্রকার। এই পুস্তক খানি ব্রাহ্ম সমাজ হইতে বাহির হইয়াছিল। ব্রাহ্ম সমাজের ধর্ম- মতের সহিত তাহার স্বীয় ধর্ম মতের ঐক্য হওয়াতে তাঁহার মন ব্রাহ্ম সমাজের দিকে আকৃষ্ট হইল। তিনি ব্রাহ্ম সমাজে প্রবিষ্ট হইলেন। এই পুস্তক দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ১৮৫৭ খৃঃঅব্দের শেষ ভাগে কেশব বাবু ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইহার পূর্ব হইতেই তিনি ব্রাহ্ম সমাজে যাতায়াত করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। এই যাতায়াত উপলক্ষে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সহিত তাহার পরিচয় হয়। এই সময়ে তাহার অভিভাবকগণ তাহাকে মন্ত্র গ্রহণ করিবার জন্য অত্যন্ত পীড়াপীড়ি করিতে আরম্ভ করেন। কিন্তু তিনি মন্ত্র গ্রহণ করেন নাই। অদ্বিতীয় সর্বশক্তি- ন অনন্ত ভূমা মহান অসীম নিরাকার ঈশ্বর যাহার উপাস্য, তিনি কি প্রকারে পরিমিত সসীম ক্ষুদ্র পৌত্ত- লিকতার নিকট আত্ম সমর্পণ করিবেন ? প্রশান্ত মহাসাগ- রের সুদুর প্রসারিত অতলস্পর্শ গভীর জলে যাহার বাস, সে কি কখন ক্ষুদ্র কূপে বাসস্থান মনােনীত করিতে পারে? অনন্ত প্রসারিত গগন-বিহারী বিঙ্গম কি স্বেচ্ছাপূৰ্ব্বক ক্ষুদ্র পিঞ্জরে আবদ্ধ হতে ইচ্ছা করে ? বাড়ীতে মন্ত্র গ্রহণের সমস্ত আয়োজন হইল,গুরু উপস্থিত হইলেন, কিন্তু মন্ত্র গ্রহণ করিবে কে? কেশব বাৰু সে দিবস বাড়ীতে আসিলেন না। দেবেন্দ্র বাবুর বাড়ীতে থাকিলেন। মন্ত্র গ্রহণ উদ্যোগে তাহার মাতাই বিশেষ উদ্যোগী ছিলেন। কেননা তাহার ভয়, কেশব

( ১১ )
প্রচলিত উপধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধাবান হইলে পাছে নিপী-
ড়িত 'ও বাটী হইতে বহিষ্কৃত হন। তাহাতে আবার
তিনি পিতৃহীন। কেশব বাবু অল্প বয়সেই পিতৃহীন
হইয়াছিলেন। সমস্ত দিন দেবেন্দ্র বাবুর বাড়ীতে অতি-
বাহিত করিয়া রজনী দশ ঘটিকার সময় তিনি বাড়ীতে
প্রত্যাগমন করিলেন। বাড়ীতে আসিয়া মাতাকে ব্রাক্ষ
সমাজের কয়েকখানি পুস্তক দিলেন। তাঁহার মাতা সেই
গুলী গুরুকে দেখাইয়া বলিলেন, “দেখুন আমার কেশব
এই ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়াছে। গুরু পুস্তক পাঠ করিয়া
বলিলেন “ধৰ্ম্ম ত উজ, প্রতি পালন করিতে পারি।
হয়। মা তুমি ভীত হইও না, কেশব যে পথ ধরিয়াছে,
তাহাতে তাহার মঙ্গল হইবে।” এই হইতে মাতা তাহার
ধৰ্ম্ম পথের সহায় হইলেন। তিনি যে কাৰ্যই করিতেন,
তাহাতেই মাতার নিকট যথেষ্ট সহানুভূতি পাইতেন।
ইহাতে অন্যান্য লােকে বলিত, মাতাই কেশবকে মন্দ
করিল। বলা বাহুল্য যে কেশব বাবু মন্ত্র গ্রহণ না করাতে
তাহার স্বজনবর্গের নিকট তিনি অতি অপ্রিয় হইয়া
উঠিয়াছিলেন। এই সময় হইতে তাঁহাকে অত্যন্ত পরীক্ষার
মধ্যে পতিত হইতে হইয়াছিল। কিন্তু এক দিকে যেমন
আত্মীয় স্বজনগণের নির্যাতন, অন্যদিকে আবার সেইরূপ
মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের অপরিমেয় মেহ ও সাহায্য। সুতরাং

( ১২ ) পরীক্ষাতে পতিত হইয়াও তাহাকে বিশেষ কষ্ট পাইতে হয় নাই। তাহার পরীক্ষা ও নির্যাতনের কথা শুনিয়া দেবেন্দ্র বাবু তাহাকে সান্ত্বনা প্রদান করিবার জন্য স্বীয় দ্বিতীয় পুত্র শ্রীযুক্ত বাবু সত্যেন্দ্র নাথ ঠাকুর,মহাশয়কে তাহার কলুটোলার বাড়ীতে প্রেরণ করেন। এই সময়ে কেশব বাবু বিধবাবিবাহ নাটক অভিনয় করেন। অভিনয় কাৰ্য্য অতি সুন্দর হইয়াছিল। মৃত গােপাল মল্লিকের বাড়ীতে এই নাটক অভিনীত হইয়াছিল। ১৮৫৯ খ্ৰীঃঅব্দের ২৪শে এপ্রিল এই গােপাল মল্লি- বের বাড়ীতে অল্পবয়স্ক যুবকদিগের ধর্মশিক্ষার জন্য মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের সাহায্যে ও উৎসাহে তিনি এক ব্ৰহ্মবিদ্যালয় স্থাপন করেন। এখানে দেবেন্দ্র বাবু বাঙ্গালাতে ও কেশব বাবু ইংরেজীতে ধৰ্ম্মবিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। কেশব বাবুর ব্রহ্মবিদ্যালয়ে প্রদত্ত বক্তৃতা সকল পুস্তকাকারে মুদ্রিত হইয়া অনেক ধর্মপীপাসু যুবককে ব্রাহ্মসমাজে আনয়ন করিয়াছে। কেশবাবুর সঙ্গে ব্রাহ্ম- সমাজের যােগ হইলে স্কুল ও কলেজের ছাত্রদিগের মধ্যে ধর্ম সম্বন্ধে অত্যন্ত আন্দোলন আরম্ভ হয়। খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের স্রোত মন্দীভূত হইয়া আইসে, এবং যাহারা হিন্দু ও খৃষ্টধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করিতে না পারিয়া নাস্তিকতার হন্তে আত্ম সমর্পণ করিয়াছিলেন, তাঁহারাও ( ১ ) কেশব বাবুর অনুবর্তী হইয়া নাস্তিকতা হইতে আত্ম রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ব্রহ্মবিদ্যালয় কিছু দিন মল্লিক বাড়ীতে থাকিয়া কলুটোলার কোন বাড়ীতে উঠিয়া আইসে। পরে আদি ব্রাহ্মসমাজের দ্বিতল গৃহে হইতে আরম্ভ হয়। ব্রাহ্মগণ অনন্তর ব্রাহ্মধর্মের মূলান্বেষণে প্রবৃত্ত হই- লেন। অনুসন্ধান করিয়া তাহারা দেখিতে পাইলেন যে ব্রাহ্মধর্মের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। ব্রাহ্মধর্ম যে ভিত্তি অবলম্বন করিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছে, তাহা নিরা পদ নহে। ইহাকে এমন একটা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করিতে তাহারা কৃতসংকল্প হইলেন, যাহাতে কদাচ ইহার পতন হইবার সম্ভাবনা থাকিবে না। সেই ভিত্তি সহজ জ্ঞান। জাতি নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের লােক একস্থানে সমবেত্ত হইয়া নিরাকার অদ্বিতীয় ঈশ্বর উপাসনা করিতে পারিবে, এই উদার মহান সত্যটী মহাত্মা রাজা রামমােহন রায় প্রচার করেন। এবং সেই জন্য একটী উপাসনা মন্দির নির্মাণ করেন। এক্ষণে যেমন মত ও অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মধর্মের অপপৗত্তলিকতা রক্ষা করিয়া অনেকগুলি ব্রাহ্ম পরিবার সংস্থাপিত হইয়াছে, সে সময়ে ইহার কিছুই ছিল না। কতকগুলি অনিশ্চিত

( ১৪ )
ও অনির্দিষ্ট লােক প্রতি বুধবারে একত্র হইতেন মাত্র।
তখন উপাসনার প্রকৃষ্ট পদ্ধতি ছিল না। ব্রাহ্মধর্মের
বিধান অনুসারে কোন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হইত না। যিনি
যে সম্প্রদায়ের লােক তিনি সেই সম্প্রদায়ের অবলম্বিত
পদ্ধতি অনুসারে যাবতীয় অনুষ্ঠান নির্বাহ করিতেন।
একটী হাটে যেমন নানা স্থান হইতে নানা জাতীয় লােক
কিছুক্ষণের জন্য সমবেত হয়, রাজা রামমােহন রায়ের
সময়ে এবং তাহার পরেও অনেক দিন পর্যন্ত ব্রাহ্ম
সমাজের তদনুরূপ অবস্থা ছিল। রাম মােহন রায় ব্রাহ্ম
পুকে বেদরূপ মূল ভিত্তির উপর সংস্থাপিত করেন।
বেদান্ত শাস্ত্রে
শাস্ত্রে যে নিরাকার ব্রহ্মোপাসনা আছে,
তাহার ব্রাহ্ম ধর্ম তদনুরূপ ছিল। ধৰ্ম্মবীর পূজ্যপাদ
লুথার যেমন বাইবেলকেই ভিত্তিরূপে গ্রহণ করিয়া
খৃষ্টধর্মের সংস্কারে প্রবৃত্ত হন, পরম শ্রদ্ধেয় রাজা রাম
মোহন রায় সেইরূপ বেদকে ভিত্তিরূপে গ্রহণকরিয়া
হিন্দুধৰ্ম্ম সংস্কার করতঃ উদার সাৰ্বভৌমিক নিরাকার
ব্রহ্মোপাসনা প্রতিষ্ঠিত করেন। যদিও বেদকে তিনি
মূল ভিত্তিরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন, তথাপি তাহার
উদার মন অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রের প্রতি অনাদর প্রদর্শন করে
নাই। হার প্রচারিত ধৰ্ম্মমতের পােষক, যে কোন
সত্য তিনি যে কোন ধর্মশাস্ত্রে প্রাপ্ত হইতেন, সমা-

( ১৫ )
দরে তাহা গ্রহণ করিতেন। তাঁহার উদার বিশ্বজনীন
হৃদয় কেবল দেশীয় ধর্মশাস্ত্রেই আবদ্ধ থাকে নাই। এই
তাঁহার মহত্ত্ব, এই তাহার উদার। যদিও তাঁহার মত
অত্যন্ত উদার ছিল,তথাপি তিনিসৰ্ব্বদা জাতীয় ভাব রক্ষা ও
স্বজাতীয় ধৰ্ম্মশাস্ত্রের প্রতি অধিকতর অনুরাগ প্রদর্শন
করিতেন। এই জন্যই তাহার সময়ে ব্রাহ্মসমাজে
হিন্দুধৰ্ম্ম শাস্ত্রের প্রতি অধিক সমাদর প্রদর্শিত হইত।
আর তিনি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট তাহাদিগের স্বকীয়
ধৰ্ম্মশাস্ত্রের দ্বারা ধর্মপ্রচার করিতেন। ইহাতে অধিক
তর ফল লাভ হয়, তাহার এইরূপ বিশ্বাস ছিল।
বিশ্বাসটী যে ভ্রমাত্মক নহে, তাহা চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রেই
স্বীকার করিবেন।
পূজ্যপাদ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মসমাজে প্রবিষ্ট
হইবার পর ইহার অনেক উন্নতি হয়। তিনি চারি জন
পণ্ডিতকে বেদাধ্যয়ন করিবার জন্য কাশীতে প্রেরণ
করেন। প্রেরিত পুণ্ডিত চতুষ্টয় বেদ অধ্যয়ন করিয়া প্রত্যা-
গত হইলে হাদিগের সাহায্যে দেবেন্দ্র বাবু বেদ
আলােচনায় প্রবৃত্ত হন। বেদ আলােচনা করিয়া তিনি
দেখিতে পাইলেন যে বেদে অনেক ভ্ৰম প্রমাদ বৰ্ত্তমান
রহিয়াছে। ইহার অনেক স্থান অদ্বৈত বাদে পরিপূর্ণ।
ভূখন আর তিনি বেদকে ব্রাহ্মধর্মের মূল ভিত্তি বলিয়া

( ১৬ ) গ্রহণ করিতে পারিলেন না। ইহার পর কিছুদিন ব্রাহ্ম- ধর্মকে যুক্তি ও জ্ঞানরূপ ভিত্তির উপর সংস্থাপিত করা হয়। অনন্তর সহজ জ্ঞানই যে ব্রাহ্মধর্মের প্রকৃত ভিত্তি ভূমি,যুক্তি ও জ্ঞান বাস্তবিক মূল ভিত্তি নহে। ইহা দেবেন্দ্র বাবু সুস্পষ্টরূপে বুঝিতে পারিলেন। এ সম্বন্ধে পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়ের নিকট তিনি অনেক সাহায্য পাইয়াছিলেন। এতদ্ভিন্ন দেবেন্দ্র বাবু ব্ৰহ্মোপাসনার পদ্ধতি সংকলন করেন। অনির্দিষ্ট উপাসকগণকে এক প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করাইয়া একুঢ়ী উপাসকমণ্ডলী দলবদ্ধ করেন। এই সময়ে যাঁহারা ব্রহ্ম হইতেন, তাহাদিগকে প্রতিজ্ঞা করিতে হইত যে “প্রতি দিন নিরাকার অদ্বিতীয় সর্বশক্তিমান মঙ্গলদাত। সৰ্বব্যাপী ঈশ্বরকে উপাসনা করিব। সৃষ্ট কোন বস্তুকে ঈশ্বর জ্ঞানে উপাসনা করিব না। রােগ বা বিপদগ্রস্ত হইলে প্রতিদিন উপাসনায় ক্ষান্ত হইব না। সৎকর্মের অনুষ্ঠানে যত্নবান থাকিব। মােহবশতঃ কোন পাপ । * কেশব বাবুর জীবনচরিত লেখক মাননীয় চিরঞ্জীব শৰ্মা বলেন যেকেশব বাবুই ব্রাহ্মধর্মকে সহজজ্ঞানরূপ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত” নামক গ্রন্থে দেবেন্দ্র রাবুর দ্বারা এই কাৰ্য্য সম্পাদিত হয় লিখিত আছে।

( ১৭ )
করিলে অকৃত্রিম অনুতাপ করিব। ব্রাহ্মসমাজের উন্নতি
কল্পে বর্ষে বর্ষে কিছু কিছু দান করিব। দেবেন্দ্র বাবু
কতকগুলি লােককে প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করাইয়া
ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করাইলেন বটে, কিন্তু তাহাতে প্রকৃত
অপৌত্তলিক ব্রাহ্ম পরিবার সংগঠিত হইল না। উপা-
সকগণ যদিও প্রতিজ্ঞা করিয়া ব্রাহ্ম হইতেন, কিন্তু
তাহা কার্যে পরিণত হইত না। প্রতিজ্ঞা করিতেন বটে,
কিন্তু তদনুসারে কাৰ্য্য করিতেন না। অপৌত্তলিক ব্রাহ্ম
পদ্ধতি অনুসারে তাহারা কোন অনুষ্ঠানই করিতেন না।
পৌত্তলিকতা দোষ পরিশূন্য পবিত্র ব্রাহ্ম পদ্ধতি অনুসারে
সাংসারিক অনুষ্ঠান মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় দ্বারা
সৰ্ব্ব প্রথমে অনুষ্ঠিত হয় বটে, কিন্তু কেশব বাবুই তাহা
ব্রাহ্মসমাজে দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই হইতেই
ব্রাহ্মসমাজের স্থায়িত্বের সূত্রপাত হইল। বর্তমান সময়ে
যে অনেকগুলি ব্রাহ্ম পরিবার প্রতিষ্ঠিত হইয়া ব্রাহ্মধর্মকে
বদ্ধমূল করিয়াছে, কেশব বাবুই তাহার মূল পত্তন
করেন। দেবেন্দ্র বাবু ও কেশব বাবুর প্রযত্নে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম
পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হইয়া, এইরূপ নূতন আকার
ধারণ করিল। মহাত্মা রাজা রামমােহন রায়ের প্রচারিত
ধৰ্ম্মের সহিত এই ধর্মের যে অনেক প্রভেদ, তাহ
সহজেই অনুমিত হইবে। কেশব চন্দ্র সেন আর

একটী মহান্ সত্য প্রচার করেন, সেই সত্যটী বিবেকের
প্রাধান্য।
এই সময়ে ব্রাহ্মসমাজে নস্য গ্রহণ, আমিষ ভােজন
পরিত্যাগ, মােটা চাদর, চটি জুতা, চসমা ব্যবহারের
কিছু ধূম পড়িয়া যায়। কেশব বাবুকে সংসারী করিবার
জন্য তাহার আত্মীয়গণ এই সময়ে বিশেষ যত্নবান হন।
এই যত্নের ফল তঁাহার বেঙ্গল ব্যাঙ্কে চাকরী গ্রহণ। ১৮৫৯
yঃ অব্দের ১লা নবেম্বর তিনি ত্রিশ টাকা বেতনে উক্ত
ব্যাঙ্কে নিযুক্ত হন। তঁাহার হস্তাক্ষর অতি সুন্দর ছিল।
উৎকৃষ্ট হস্তাক্ষরের জন্য ডিপুটী সেক্রেটারী কুক্ সাহেব
তাহার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। ত্রিশ হইতে তাহার
বেতন পঞ্চাশ করিয়া দেন। এই স্থানে অবস্থানকালীন
কাৰ্য্যালয়ে বসিয়াই ‘হে বঙ্গীয় যুবক ইহা তােমারই
জন্য।” নামক পুস্তক রচনা করেন। সেই পুস্তক
দেখিয়া সেক্রেটারী ডিন্ সাহেব তাহার সহিত অনেক
কথাবার্তা বলেন। বেঙ্গল ব্যাঙ্কের নিয়ম আছে যে,
কাৰ্য্যালয়ের কোন গােপনীয় কথা প্রকাশ করিব না,
এই মৰ্ম্মে কর্মচারীগণকে প্রতিজ্ঞা করিতে হয়। বিবেক
সায় না দেওয়াতে কেশব বাবু এই প্রতিজ্ঞা করেন
নাই। কিন্তু উৰ্দ্ধতন কর্মচারীগণ ইহাতে তাহার
প্রতি সন্তুষ্ট বই অসন্তুষ্ট হন নাই। তিনি এই কাৰ্য্যে

( ১৯ ) অধিককাল থাকিতে পারেন নাই। বিশ্বপতি ঈশ্বর যাহার একমাত্র প্রভু, তিনি কি সামান্য মানুষকে প্রভু বলিয়া মানিতে পারেন? ১৮৬১ খৃঃঅব্দের ১লা জুলাই তিনি কর্ম পরিত্যাগ করেন। যে সময়ে তিনি কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিতে মনস্থ করেন, তখন ডিক্স সাহেব তঁাহাকে বলিয়াছিলেন যে “তুমি কর্ম পরিত্যাগ করিও , আমি শীঘ্রই তােমার একশত টাকা বেতন করিয়া দিব। তাহাতে তিনি উত্তর করিলেন যে পাঁচ শত টাকা বেতন দিলেও আর চাকরী করি না। ১৮৬২ খৃঃঅব্দের ১৬ই এপ্রিল তিনি কলিকাতা ব্রাহ্ম সমাজের (বর্তমান আদি ব্রাহ্মসমাজ) আচাৰ্য পদে অভিষিক্ত হন। এই সময়ে মহর্ষি তঁাহাকে ব্ৰহ্মানন্দ উপাধি প্রদান করেন। যেদিন তাহাকে ব্রাহ্মসমাজের আচাৰ্য পদে বরণ করা হয়, সেই দিন প্রাতঃকালে কেশব বাবু সপরিবারে দেবেন্দ্র বাবুর বাড়ীতে যাইতে উদ্যোগী হন। ইহাতে আত্মীয়বর্গ তাহার প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া উঠেন। যাহাতে তাহার সংকল্প কাৰ্যে পরিণত হইতে না পারে, তাহারা তাহার জন্য বদ্ধপরিকর হই- লেন। কেশব বাবু পূৰ্ব্ব রাত্রিতে পত্নীর সহিত দেবেন্দ্র বাবুর বাড়ী যাওয়ার বিষয় স্থির করিয়া মাতাকে সেই কথা বলেন। মাতাও তাহাতে অনুমতি প্রদান করেন।

( ২০ )
সকাল বেলা তিনি সস্ত্রীক গমনের জন্য প্রস্তুত হইলেন,
এদিকে গৃহস্বামীর আদেশে বাড়ীর বহিদ্বার অবরুদ্ধ
হইল। চারিদিকে আত্মীয়গণ মধ্যস্থলে কেশব চন্দ্র
দণ্ডায়মান হইয়া পত্নীকে বলিলেন, “হয় আমার সঙ্গে
অগ্রসর হও,নতুবা গুরুজনের পশ্চাদ্বী হও। এই সময়।”
এই বলিয়া তিনি বহিদ্বার উদঘাটন করিয়া বহির্গত
হইলেন। পত্নীও তাহার অনুগামিনী হইলেন। আত্মীয়গণ
মন্ত্র মুগ্ধের ন্যায় দণ্ডায়মান রহিলেন। এই অপরাধে
কেশব বাবুকে কয়েক মাস বাড়ীতে প্রবেশ করিতে
দেওয়া হয় নাই। তিনি কিছুকাল দেবেন্দ্র বাবুর বাড়ীতে
অবস্থান করিয়া, পরে কলুটোলায় একটা ক্ষুদ্র বাড়ীতে
সস্ত্রীক বাস করেন। এই স্থানে তিনি দুশ্চিকিৎস্য
ক্ষত রােগে সাংঘাতিকরূপে আক্রান্ত হন। পাঁচবার
অস্ত্র প্রয়ােগের পর বহু কষ্টে রােগের হস্ত হইতে মুক্তি
• লাভ করেন। এই সময়ে তাহার প্রথম পুত করুণা
চন্দ্র সেন জন্ম গ্রহণ করেন। অনন্তর কেশববাবু স্বজনগণ।
কর্তৃক পরিগৃহীত হন।
হিন্দুধৰ্ম্মের দুর্গস্বরূপ তাহার বাস ভবনে প্রবিষ্ট হইয়া
তিনি ব্রাহ্ম পদ্ধতি অনুসারে পুত্রের জাতকৰ্ম্ম সম্পন্ন
করেন। এই কাৰ্যে আত্মীয়গণ তাহাকে বাধা দিতে
পারেন নাই। এই অনুষ্ঠানে মহর্ষি অতি উৎসাহে

( ২১) কর । । সহিত যােগ দান করিয়াছিলেন। এই দিন বাড়ী, কর্তা বাড়ী পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমন করিয়াছিলেন। ইহার পর কেশব বাবু দেবেন্দ্র বাবুর সহিত সিংহল গমন করেন। ইহাতে তাহার জাতিত্বের যাহা কিছু অবশিষ্ট ছিল, তাহা শেষ হইল। সিংহল হইতে ফিরিয়া আসিয়া কেশব বাবু খ্ৰীষ্টান- দিগের সহিত বিচারে প্রবৃত্ত হন। আজ কাল খৃষ্টধর্ম ভারতে যেরূপ হীনপ্রভ ও ক্ষীণবীৰ্য্য, সে সময়ে এরূপ ছিল না। খৃষ্টধর্ম সে সময়ে ভারতে অত্যন্ত প্রবল ছিল। শিক্ষিত যুবকগণের মন তখন খৃষ্টধর্মের দিতে, অধিক আকৃষ্ট হইত। অনেক কৃতবিদ্য লােক এই ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। কেশব বাবু এপর্যন্ত যে সকল বক্তৃতা ও উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন, তাহা দ্বারা খ্রীষ্টধর্মের মধ্যবর্তিত্ব, অনন্ত নরক,বাহিক প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি মাত্মক মত সমূহ খণ্ডিত হইয়া যায়। ইহাতে খ্রষ্টীয় মিসনরিগণ কেশব বাবুর উপর অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠেন। ব্রাহ্মধর্মের কোন ভিত্তি নাই বলিয়া উপহাস করিতে আরম্ভ করেন। এই সময়ে কেশব বাৰু ৰায়ু পরিবর্তনের জন্য কিছুকাল কৃষ্ণনগরে শ্রীযুক্ত বাৰু মনােমােহন ঘােষ মহাশয়ের বাড়ীতে অবস্থান করেন। এই স্থানে পাদরী ডাইসনের সহিত তাঁহার প্রথম ধৰ্ম্ম- ।

(, ২২ ) যুদ্ধ আরম্ভ হয়। বক্তৃতা দ্বারা এই সংগ্রাম হইয়াছিল। কিছুকাল সংগ্রাম করিয়া সাহেব পৃষ্ঠভঙ্গ দেন। ডাই- সন সাহেবকে পাস্ত করাতে কেশব বাবু নবদ্বীপের অধ্যাপক মহাশয়গণের নিকট অত্যন্ত ধন্যবাদ পাইয়া- ছিলেন। অনন্তর রেভারেণ্ড লালবিহারী দে মহাশয়ের সহিত তাহার বিচার হয়। ইহাতেও কেশব বাবু জয়ী হন। ইহার পর আর কোন খৃষ্টশিষ্য কেশব বাবুর সহিত বিচার করিতে অগ্রসর হন নাই। ইহার কিছুদিন পর কেশব বাবু আদি ব্রাহ্মসমাজের দ্বিতল গৃহে “ব্রাহ্মসমাজ সমর্থন” নামক একটা বক্তৃতা করেন। এই বক্তৃতা শুনিয়া মহাত্মা ডফ স্বীকার করেন যে ব্রাহ্মসমাজ একটী মহতী শক্তি। ইহার কিছুকাল পরে কেশব বাবুর যত্নে সঙ্গত সভা সংস্থাপিত হয়। তাহার কলুটোলার বাস ভবনে এই সভার অধিবেশন হইত। ধর্মচর্চা চরিত্র সংশােধন ও সমাজ সংস্কার বিষয়ে নানা কথার আলােচনা এখানে হইত। ধর্ম- সাধন নামক পুস্তকে সঙ্গত সভার আলােচিত বিষয়ের সার মর্ম লিপিবদ্ধ আছে। এই সভা স্থাপনের পর কেব বাবু “ব্রাহ্মধর্মের অনুষ্ঠান” নামক পুস্তক প্রচার করেন। এই পুস্তক প্রচারিত হইলে দেবে বাৰু উপবীত পরি- - ত্যাগ করেন ও ব্রাহ্মমতে স্বীয় কন্যার বিবাহ দেন।

( ২৩ ) এই সময়ে কেশব বাবু ব্রাহ্মসমাজে এক প্রকার সর্বেসর্বা ছিলেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ তাঁহার হস্তে ব্রাহ্মসমাজের বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক যাবতীয় ভার ন্যস্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু কেশব বাবু ও তাহার সম- বয়স্ক যুবক ব্রাহ্মগণ আর অধিক দিন এই সমাজের সহিত যােগ রাখিতে পারিলেন না। তাহারা এমন কতকগুলি কর্মে হস্তক্ষেপ করিলেন, যাহাতে ব্রাহ্মদিগকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া ফেলিল। ব্রাহ্মসমাজের যে সকল পুরাতন প্রাচীন সভ্য ছিলেন, তাঁহারা অত্যন্ত রক্ষণশীলতার পক্ষপাতী; কেশব বাবু ও তাহার সময় যুবক ব্রহ্মগণ অত্যন্ত বিপ্লবশীল। তৎকাল প্রচলিত সামাজিক রীতি নীতি রক্ষা করা প্রাচীন ব্রাহ্মগণের আন্তরিক ইচ্ছা, সেই সকল দূষিত রীতি নীতি দূর করিয়া তাহার স্থানে সংস্কৃত রীতি পদ্ধতি প্রচলিত করা কেশব ও যুবক ব্রাহ্মগণের হৃদয়ের বাসনা। এই বিষয় লইয়া সময়ে সময়ে দুই দলে সংঘর্ষণ উপস্থিত হইত। কিন্তু তাহা তত প্রবল হয় নাই। নব্যদল যখন অত্যন্ত বাড়াবাড়ি আরম্ভ করিলেন,তখন দুই দলের একত্র অবস্থান করা অসম্ভব হইয়া উঠিল। পূৰ্ব্ব হইতেই মহর্ষির মত অনেক পরিমাণে রক্ষণশীলতার পক্ষপাতী ছিল ; কেবল কেশব বাবুর জন্য অনুষ্ঠান সম্বন্ধে কিছু কিছু ( ২৪ ) - অগ্রসর হইতেছিলেন। কিন্তু নব্যদল যখন দ্রুতপাদ বিক্ষেপে অগ্রসর হইতে লাগিলেন, তখন আর তিনি তাঁহাদিগের অনুসরণ করিতে পারিলেন না। ১৮৬২ খ্ৰীঃঅব্দের ২রা আগষ্ট তারিখে নব্যদলের উদ্যোগে একটী অসবর্ণ বিধবা বিবাহ হয়। পাত্র শ্রীযুক্ত | বাবু পাৰ্বতীচরণ গুপ্ত,জাতিতে বৈদ্য। ইনি একটী বিধবা বৈষ্ণব কন্যাকে বিবাহ করেন। এইটাই ব্রাহ্মসমাজে প্রথম সঙ্করবিবাহ। ইহার পূর্বেও দুইটী সমাজচ্যুত অজ্ঞাত কুলশীল যুবক যুবতী ব্রাহ্মধর্মের বিধান মতে বিত সূত্রে আবদ্ধ হন। এই দুই ঘটনায় বিরােধের আগুন জ্বলিয়া উঠিল। দেবেন্দ্র বাবু পূর্ব হইতেই রক্ষণশীলতার দিকে পশ্চাৎ- পদ হইতেছিলেন। তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায় এই অসবর্ণ বিধবা বিবাহের সংবাদ প্রকাশিত হইলে, দেবেন্দ্র বাবু অত্যন্ত বিরক্ত ও ভীত হইলেন। আর তিনি ব্যদলকে সমর্থন করিতে পারিলেন না। প্রাচীন ব্রাহ্মগণও সেই সময়ে, ইহারা জাতিকুল সব নষ্ট করিল, মনে করিয়া দেবেন্দ্র বাবুকে উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। তাহারা বলিতে লাগিলেন যে কেশৰ বাৰু তরলমতি যুবক, তাহার উপর সমাজের ভার থাকিলে সমাজের সমূহ অমঙ্গল হইবে। দেবেন্দ্র বাবুও মনে মনে এই আশঙ্কা করিতে- ( ২৫) ছিলেন। এই সময়ে উপবীতধারী আচাৰ্য বেদীতে উপ- বেশন করিতে পারিবে না কেন, এই আন্দোলন উপস্থিত হইল। উপবীতধারী ব্রাহ্মণদিগকে দেবেন্দ্র বাবু বেদীতে উপবেশন করিতে অনুমতি প্রদান করিলেন। সুতরাং নব্য- দলকে ব্রাহ্মসমাজের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতে ১৮৬৫ খ্রঃঅব্দে নব্য ব্রাহ্মদল আদি ব্রাহ্মসমাজ পরিত্যাগ করেন। হইল। তৃতীয় পরিচ্ছেদ। কেশব বাবু আদি ব্রাহ্মসমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন হইলেন বটে, কিন্তু তাহার মস্তক রাখিবার স্থান রহিল না। তাহাতে কি তিনি ভীত? না । ভীত হইবেন কেন? সর্বশক্তিমান মহান্ ঐশী শক্তি তাহার অভ্যন্তরে বর্তমান থাকিয়া যখন তাহাকে অভয়বাণী দ্বারা আশ্বাস প্রদান করিতেছে, তখন সংসারের সামান্য পরীক্ষাতে তাঁহাৰু কি করিতে পারে? জগতে যত সাধু মহাজন জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন, সকলেরই সাংসারিক অবস্থা অতি হীন ছিল। কিন্তু তাহারা একু ঐশী শক্তি প্রভাবে সংসারে যে সকল অলৌ- কিক কাৰ্য্য সম্পাদন করিয়া গিয়াছেন, তাহা ভাবিলে

( ২৬ )
বিস্ময়াপল্প হইতে হয়। মহর্ষি ঈশা দরিদ্র সূত্রধরের-তনয় ;
সাংসারিক অবস্থা অতি হীন; জগতে মস্তক রাখিবার
স্থান নাই; কল্য কি আহার করিবেন, তাহার সংস্থান
নাই; কিন্তু এমন এক শক্তি তাহার অভ্যন্তরে বিদ্যমান
ছিল, যে শক্তি প্রভাবে তিনি প্রবলপ্রতাপ সম্রাটগণ
অপেক্ষাও অতি মহৎ কাৰ্য সকল সম্পন্ন করিয়া গিয়াছেন।
ঘাের দরিদ্রতার মধ্যে অবস্থান করিয়াও কেবল ধৰ্ম্মের
বলে মহান্ ঐশ্বরিক শক্তিতে ভগবান, বুদ্ধ যে অমানুষিক
কাৰ্য্য সম্পন্ন করিয়া গিয়াছেন, তাহা জগতের ইতিহাসে
অত্যুজ্জ্বল স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হইয়া রহিয়াছে। “সাধু
যাহার ইচ্ছা ঈশ্বর তাহার সহায়।” এই বাক্যটী একটা
অভ্রান্ত মহাসত্য। কেশব বাবুও সর্বশক্তিমান ঐশী শক্তি
প্রভাবে, মহিমাময় ধর্মের বলে এবং উল্লিখিত মহাসত্যের
সাহায্যে জগতে অতি মহান কাৰ্য সকল সম্পন্ন করিয়া
গিয়াছেন। আর্থিক অনাটন সত্ত্বেও তিনি অনেক দু ব্যয়-
সাধ্য কার্য সম্পন্ন করিতে সক্ষম হইয়াছেন। অর্থের
অনাটন তাহাকে কোন কাৰ্য্যে বাধা দিতে পারে নাই।
আদি ব্রাহ্ম সমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া কেশব বাৰু
সেয়ালদহ রেলওয়ে ষ্টেশনে “ব্রাহ্ম সমাজ স্বাধীনতা
ও উন্নতির জন্য সংগ্রাম।” বিষয়ে একটী বক্তৃতা প্রদান
করেন। এই বক্তৃতায় বহু লােকের সমাগম হইয়াছিল।

( ২৭ ) সিন্দুরিয়া পটীর মৃত.গােপাল মল্লিকের ভবনেও তিনি দুইটী বক্তৃতা করিয়াছিলেন। অনন্তর ১৭৮৬ শকের ৬ই ফান তাড়িত ব্ৰাহ্মদলকে লইয়া তিনি একটা সাধারণ সভা সংগঠিত করিলেন। তৎসঙ্গে একটা প্রচার বিভাগও সংস্থাপিত হইল। ব্রাহ্মসমাজের যাবতীয় কাৰ্য্য এই সাধারণ সভার মতে সম্পন্ন হইত। এইরূপে ব্রাহ্মসমাজে সাধারণতন্ত্র সংস্থাপিত হইল। স্থাপিত হইল বটে, কিন্তু অধিক দিন স্থায়ী হইতে পারি না। প্রতিষ্ঠাতাই ইহার মস্তকে কুঠারাঘাত করিলেন। তিনি যদি ব্রাহ্মসমাজে স্বীয়, মত প্রবল না রাখিয়া সাধারণ মতের আদর ও সম্মান করিতেন, তাহা হইলে ব্রাহ্ম- সমাজে যে সকল আন্দোলন উপস্থিত হইয়া ইহাকে সমূহ ক্ষতিগ্রস্ত করিয়াছে ও লোকচক্ষে অশ্রদ্ধেয় করিয়া তুলিয়াছে, তাহা হইত না। আর তাহার জীবনী লেখককও তাহার জীবনের কালিমাময় অংশ লােক চক্ষুর নিকট উদঘাটিত করিয়া সন্তপ্ত হইতে হইত না। সভা সংগঠনের পর ১৮৬৬ খৃঃঅব্দের ১১ই নবেম্বর ভারত- র্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ সংস্থাপিত হয়। এই সময় হইতে তিনি প্রকাশ্যভাবে প্রচার কার্যে ব্রতী হন। কলিকাতা,ভবানী: পুর, চুচুড়া, শ্রীরামপুর প্রভৃতি স্থান তাঁহার প্রথম প্রচার ' ক্ষেত্র হয়। তিনি বক্তৃতা দ্বারা প্রচার করিতেন। তাঁহার ( ২৮ ) বক্তৃতার মােহিনী শক্তিতে লােকে মুগ্ধ হইয়া যাইত। বিদ্যা- লয়ের ছাত্রগণই তাহার বক্তৃতায় অধিক অষ্কৃষ্ট হইত। এইরূপে তিনি তিন চারি বৎসর বঙ্গের নানা স্থানে প্রচার করিয়া ১৮৬৪ খৃঃঅব্দের ৯ই ফেব্রুয়ারি বােম্বে ও মাজ অঞ্চলে প্রচারার্থ গমন করেন এবং ব্রাহ্ম- ধৰ্ম্মের অশেষ কল্যাণপ্রদ উদার সার্বভৌমিক সত্য সমূহ প্রচার করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগত হয়েন। তাহার অসাধারণ বাগ্মিতায় ঐ সকল প্রদেশের লােক মুগ্ধ হইয়াছিল। ইহার পূর্বে উক্ত অঞ্চলের লোক ব্রাহ্মধৰ্ম্ম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। কেশব বাবুই সর্বপ্রথম তথায় ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করেন। সেই প্রচারের যে কি ফল দর্শিয়াছে, তাহা সাধারণের অবিদিত নাই। এই প্রচার যাত্রা তাঁহার আদি ব্রাহ্মসমাজে অবস্থানকালীন ঘটিয়াছিল। ১৮৬৬ খৃঃ অব্দের ৬ই মে কেশব বাবু মেডিকেল কলেজ থিয়েটারে “যীশুখৃষ্ট, ইউরােপ এবং এদিয়া।” বিষয়ে একটী বক্তৃতা করেন। এই বক্তৃতা শুনিয়া অনেকে সন্দেহ করিয়াছিল যে তাহার খ্রীষ্টান হইবার আর অধিক বিলম্ব নাই। পাদরী মহাশয়েরা আহলাদে আটখানা হইলেন। মনে করিলেন, “কেশব সেন ত খ্ৰীষ্টান হইল।” এই বক্তৃতায় সভ্যসমাজে তাহার অত্যন্ত খ্যাতি বৃদ্ধি হইল। তদানীন্তন গবর্নর জেনারেল

( ২৯ }
সার জন লরেন্স বাহাদুর সংবাদ পত্রে এই বক্তৃতা পাঠ
করিয়া সিমকা হইতে তদীয় সহকারী গর্ডন সাহেব
ধারা সংবাদ প্রেরণ করেন যে, পৰ্বত হইতে কলি-
কাতা ফিরিয়া গিয়া তিনি তাহার সহিত সাক্ষাৎ
করিবেন। তিনি এই সময় হইতে কেশব বাবুকে মেহ
করিতে আরম্ভ করেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তাহার এই
মেহ অবিচলিত ছিল। কেশব বাবু মহাত্মা লর্ড লরেন্স
বাহাদুর দ্বারা তদানীন্তন যাবতীয় প্রধান রাজ কর্মচারী
গণের সহিত পরিচিত হন। ইহার কিছুদিন পরে মিস্
মেরী কার্পেন্টর এদেশে আগমন করেন। তিনি গবর্ণমেন্ট
ভবনে অবস্থিতি করিয়াছিলেন এবং ফেববাবুকে
নিমন্ত্রণ করিয়া লাট ভবনে লইয়া গিয়াছিলেন। এই
উপলক্ষে গবর্ণর বাহাদুরের সঙ্গে তাহার অনেক কথা
বার্তা হয়, এবং তাহাদিগের উভয়ের বন্ধু অধিকতরঘনিষ্ঠ
হইয়া উঠে।
অাত্মীয়গণের অনুরােধে এই সময়ে
তাহাকে কিছুদিন ট্যাক্শালের দেওয়ানী কাৰ্য্য করিতে
হইয়াছিল। অনন্তর ২৮শে ডিসেম্বর তিনি মহাপুরুষ
(Great men) বিষয়ে এক বক্তৃতা করেন। ভবিষ্যতে যে
তিনি একজন মহাপুরুষ হইয়া দাঁড়াইবেন, এই বক্তৃতা
তাহার পূর্বাভাস। এই বক্তৃতা শুনিয়া শ্ৰদ্ধাস্পদ যুক্ত
বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী মহাশয়ের মন সন্দিগ্ধ হইয়াছিল ।

( ৩০ )
তাহার সন্দেহ যে নিরর্থক হয় নাই, তাহা এক্ষণে স্পষ্ট
বুঝিতে পারা যাইতেছে। সাধারণ ব্রাহ্মগণও এই বক্তৃতায়
ভীত হইয়াছিলেন। ভীত হইবার কারণও ছিল এবং
তাহা কাৰ্যেও পরিণত হইয়াছে। ইহার পর হইতেই
অনেক ব্রাহ্ম কেশব বাবুর প্রতি সন্দিহান হইয়া
উঠেন। এই বৎসরের শেষ ভাগে তিনি ঢাকা,ফরিদপুর,
ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রচারার্থ গমন করেন। তাহার গমনে
ঐ সকল অঞ্চলে অত্যন্ত আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল।
এই স্থানে তঁাহাকে ভৃত্য ও পাচক অভাবে অত্যন্ত কষ্ট
পাইতে হয়। বৈষ্ণবদিগের আঁখড়াতে কদৰ্য্য অন্ন ভােজন
করিমকে প্রাণ ধারণ করিতে হইয়াছিল। পণ্ডিত
বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী ও মৃত সাধু শ্রদ্ধেয় অঘােরনাথ গুপ্ত
মহাশয়দ্বয় তাহার সঙ্গে ছিলেন। “প্রকৃত বিশ্বাস
(True faith) নামক পুস্তক এই সময়ে লিখিত হয়।
পর বৎসর তিনি হিন্দুস্থান ও পঞ্জাব অঞ্চলে প্রচা-
রাৰ্থ গমন করেন। তথাকার লোকেরাও তাহার
বক্তৃতা শুনিয়া মুগ্ধ , হইয়াছিল। পঞ্জাবের তদানীন্তন
গবর্ণর ম্যাকলিয়ড সাহেব তাহাকে অত্যন্ত সমাদর
করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহাকে একদিন নিজ ভবনে
আহারের নিমন্ত্রণ করেন। এ অঞ্চলেও তাহার প্রচা-
রের প্রচুর ফল দর্শিয়াছে।

( ৩১
মানুষ কেবল কতকগুলি 'কাৰ্য লইয়া চিরদিন
থাকিতে পারে না। উপাসনা যদি হৃদয়ের সম্বল না হয়,
তাহা হইলে কেবল শুধু কতকগুলি সৎকাৰ্য লইয়া
লােকে বাস্তবিক সুখী হইতে পারে না। আত্মার
পিপাসা নিবারিত হইতে পারে না। কেবল কার্যকে
জীবনের সম্বল করিলে সময়ে মনে নিরাশার উদয় হয়।
আত্মায় শুষ্কতা আইসে আত্মপ্রসাদজনিত বিশুদ্ধ
সুখ ও প্রশান্ত ভাব যাহা অহরহঃ আত্মাকে সুখী করে,
তাহার অভাব হয়। সাধারণ ব্রাহ্মগণেরও এই প্রকার
অবস্থা হইয়াছিল। তাহারা এতকাল উপাসনা অপেক্ষা
কাৰ্য্যকেই অধিক পরিমাণে অবলম্বন করিয়াছিলেন।
ব্ৰহ্মোপাসনার প্রধান অঙ্গ প্রীতিকে কতক পরিমাণে
অনাদর করিয়া দ্বিতীয় অঙ্গ প্রিয়কাৰ্য্য; সাধনকেই
আত্মার সম্বলরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহাতে তাহা-
দের হৃদয় পরিতৃপ্ত হইতে পারিল না। তাহারা দেখিতে
পাইলেন যে দিন দিন তঁাহাদিগের হৃদয় শুষ্ক হইয়া
যাইতেছে। আত্মা আর সেরূপ সজীব থাকিতেছে
। প্রাণ স্ফৰ্ত্তি হীন হইয়া মৃতপ্রায় হইয়া পড়িতেছে।
সজীবতা উত্তরােত্তর ধ্বংস প্রাপ্ত হইতেছে। তখন
তঁাহার অত্যন্ত ভীত হইলেন। যাহাতে ইহার প্রতি-
বিধান হয়, তাহার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। উপাসনায়

( ৩ )
অমনােযােগই ইহার প্রকৃত কারণ জানিয়া তাহারা উপা
লনাকে জীবনের প্রধান সম্বলরূপে অবলম্বন করিলেন।
১৭৮৯ শকের ভাদ্র মাসে কেশব বাবু স্বীয় কলুটোলার
বাড়ীতে দৈনিক উপাসনা আরম্ভ করিয়া ব্রাহ্মদিগকে
নিরাশাও শুফতার হস্ত হইতে উদ্ধার করিবার সূত্রপাত
করেন। এই সময়ে ব্রাহ্মসমাজে মৃদঙ্গ ব্যবহৃত হইতে
আরম্ভ হয়। প্রথমে অনেকে ইহাতে নানা আশঙ্কা
করিয়াছিলেন। কিন্তু শেষে সে আশঙ্কা অমূলক বলিয়া
প্রতীত হইয়াছে। ইহার কিছু দিন পরে কেশব বাবু
একবার শান্তিপুরে গমন করিয়াছিলেন। তথায় তিনি
বাঙ্গালী*ভাষায় ভক্তি বিষয়ে বক্তৃতা করেন। এই
সময় হইতেই ভক্তির দিকে ব্রাহ্মদিগের মন আকৃষ্ট হয়।
এই সময় হইতেই ব্ৰাহ্মগণ স্পষ্টরূপে বুঝিতে পারেন
যে জ্ঞানের সহিত ভক্তির মিলন না হইলে আত্মার
বাস্তবিক তৃপ্তি লাভ হইতে পারে না। প্রকৃত প্রস্তাবে
হৃদয়ের দেবতাকে অকৃত্রিম প্রীতির অঞ্জলী প্রদান করিতে
পারিলে চরিতার্থতা লাভ করিতে পারা যায় না।
প্রকৃত ঈশ্বরপ্রেমিক হইতে হইলে জ্ঞানের সহিত ভক্তিকে
উদ্বাহ শৃঙ্খলে আবদ্ধ করিতে হইবে। ভক্তি বিহীন
জ্ঞানে কাৰ্যসিদ্ধি হইবে না; প্রাণারাম পরম প্রভুকে লাভ
করিয়া কৃতার্থ হইতে পারা যাইবে না। যখন তাহারা এই
।

মহান সত্যটা সুন্দররূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলেন, তখন তাহারা, ভক্তি লাভাকাঙ্ক্ষায় লালায়িত ও ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। ভক্ত জীবন লাভ করিবার জন্ঠ, হৃদয়ে ভক্তির প্রাণদায়িনী স্রোতস্বতী, প্রবাহিত করিবার জন্য, দৃঢ় যত্নপর হইলেন। বলা বাহুল্য যে তাহাদিগের চেষ্টা সফল হইয়াছিল। এই বৎসর কেশব বাবু সাধারণ ব্রাহ্মগণের সহিত মিলিত হইয়া মাঘােৎসব করেন। এই উৎসব উপলক্ষে রাজপথে নগর সংকীৰ্ত্তন বাহির হয়। ব্রাহ্মসমাজে সঙ্কী- ব্রনের দল এই প্রথম রাজপথে বহির্গত হয়। পরে সন্ধ্যাকালে মৃত গোপাল মল্লিকের ভবনে “নবনপ্রদ বিশ্বাস” বিষয়ে একটী বক্তৃতা করেন। সস্ত্রীক মহাত্মা লর্ড লরেন্স, টেম্পল, মিওর, পাদরী ম্যাকুলাউড প্রভৃতি অনেক উচ্চ পদস্থ সন্ত্রান্ত ইংরেজ বক্তৃতা স্থলে উপস্থিত ছিলেন। বক্তৃতা শুনিয়া তাহারা সকলেই আহলাদিত হইয়াছিলেন। উৎসবের পর কেশব বাবু কিছু দিন মুঙ্গেরে অব- স্থিতি করেন। অনন্তর তথা হইতে তিনি দ্বিতীয়বার বােম্বে অঞ্চলে গমন করেন। এবার তাহাকে অর্থের জন্য অত্যন্ত কষ্ট ভােগ করিতে হইয়াছিল। বােষে অঞ্চলে প্রচার করিয়া তিনি পুনরায় মুঙ্গেরে প্রত্যাগত হন এবং গ

( ৩৪ )
তথায় কয়েক মাস সপরিবারে বাস করেন। এই স্থানে
অবস্থানকালীন সাধন ভজনের অত্যন্ত ধূম হইয়াছিল।
মুঙ্গের যেন ভক্তি-স্রোতে ভাসিয়া গিয়াছিল , পবিত্র ব্রহ্ম
নামের ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হইয়াছিল। এই স্থান হইতে
কেশব বাবু বিবাহ বিধি বিধিবদ্ধ করিবার জন্য সিমলা
গমন করেন। কেশব বাবুর মুঙ্গেরে অবস্থান কালীন
কয়েকটী ব্রাহ্ম ভক্তির আতিশয্য নিবন্ধন তাহার পদ
ধারণ, তাঁহার প্রতি আপত্তি জনক ভাষা প্রয়ােগ ইত্যাদি
দ্বারা তাঁহাকে অন্যায় ও আপত্তিকর সম্মান প্রদর্শন
করিয়াছিলেন। এলাহাবাদ উৎসব ক্ষেত্রে শ্রীযুক্ত বাবু
প্রতাল মজুমদার মহাশয়ও তাহাকে আপত্তিকর
ভাষাতে অন্যায় প্রশংসা করিয়াছিলেন। এই সকল
ঘটনাতে শ্রীযুক্ত বাবু বিজয় কৃষ্ণ গােস্বামী ও শ্ৰীযুক্ত বাবু
যদুনাথ চক্রবর্ত্তী মহাশয়, অত্যন্ত বিরক্ত ও ভীত হন।
উভয়ে মিলিত হইয়া সংবাদ পত্রে এই সকল অন্যায়
কার্যের প্রতিবাদ করেন। এই সকল ঘটনায় কেশব
বাবুও যে সম্পূর্ণ নির্দোষী ছিলেন তাই বােধ হয় না।
তিনি এই সকল অনুচিত কাৰ্যে কখনও কোন প্রকার
বাধা দেন নাই। এই জন্যই তাহাকে আমরা নির্দোষী
বলিতে সক্ষম হইলাম না। এসম্বন্ধে তাহার নীরবতা
বরং তাহার নির্দোষিতার বিপরীত পক্ষই সমর্থন করে।

এই গােলযােগে অনেক গুণী ব্রাহ্ম ব্রাহ্মসমাজ পরিত্যাগ
করেন। সংবাদ পত্রে এই ঘটনা প্রকাশিত হইলে কেশ
বাবু অনেক দুঃখ প্রকাশ করিয়াছিলেন এবং ইহাতে
তাহার কোন দোষ নাই বলিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার কথা
লােকে বিশ্বাস করে নাই।
১৮৬৯ খৃঃঅব্দের ২২শে আগষ্ট ভারতবর্ষীয় ব্রহ্ম
মন্দিরের দ্বার উন্মুক্ত হয়। এই বৎসর শ্রীযুক্ত বাবু
আনন্দমােহন বসু, শ্ৰীযুক্ত বাবু কৃষ্ণবিহারী সেন, শ্রীযুক্ত
বাবু শিবনাথ শাস্ত্ৰী শ্ৰীযুক্ত বাবু রজনীনাথ রায় প্রভৃতি
অনেকগুলি কত বিদ্য লােক ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হন।
১৮৭০ খৃঃঅব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে কেশব ইংলণ্ডে
গমন করেন। পূর্ব হইতেই তিনি ইংলণ্ডের নিকট
পরিচিত হইয়াছিলেন। ইংলণ্ডবাসী অনেকগুলী লােক
তাহাকে তথায় যাইবার জন্য পূর্ব হইতেই আহ্বান
করিতেছিলেন। যথা সময়ে কেশব বাবু লণ্ডন নগরে
উপনীত হইলেন। লণ্ডনে উপস্থিত হইবার কয়েক দিন
পরে তিনি সার জন বাউয়ারিং, ডাক্তর মার্টিনাে ও
ইউনিটেরিয়ান সম্প্রদায় কর্তৃক নিমন্ত্রিত হন। শেষােক্ত
সম্প্রদায়ের যত্নে তাহার অভ্যর্থনার জন্য এক সভা আহুত
হইয়াছিল। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ ভিন্ন
সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণই উপস্থিত হইয়াছিলেন।

( ৩৬ ) পুরােহিত ডি ষ্ট্যালি ও অনেক বিদ্বান এবং সন্ত্রান্ত লােক সভায় উপস্থিত হইয়া বক্ততা দ্বারা তাহাকে সাদরে গ্রহণ করিয়াছিলেন। কেশব বাবুও প্রতি বক্তৃতা দ্বারা তাহা- দিগের প্রতি তাঁহার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানাইয়াছিলেন। এই দিনকার বক্তৃতাতেই তাহার খ্যাতি বাহির হইয়া পড়ে। গ্রাফিক্ পত্রিকায় তাঁহার জীবনী ও প্রতিমূর্তি প্রকাশিত হয়। কেবল এক মাসের ব্যয়ােপযােগী অর্থ তাহার সঙ্গে ছিল। ইহার পর তাহার যে ব্যয় হইয়াছিল, উক্ত ইউনিটেরিয়ান সম্প্রদায় তাহা বহন করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত তাহারা তাহার পরিবারকে পাঁচ সহস্র মুদ্রা প্রদান করিয়াছিলেন। উক্ত ইউনিটেরিয়ান সম্প্রদায়ের সম্পাদক রেভারেণ্ড স্পিয়াস সাহেব তাহাকে নিজবাটীতে লইয়া যান। ইংলণ্ডে এই নিয়ম আছে যে কোন আগ- স্তৃক কোন উপাসনালয়ে উপাসনা করিলে তাহাকে একটী কিম্বা ততােধিক স্বর্ণ মুদ্রা প্রদান করা হইয়া থাকে। কেশব বাবু তাহা গ্রহণ করেন নাই। ডাক্তর মার্টিনাের ভজনালয়ে “ঈশ্বর প্রাণের প্রাণ বিষয়ে উপদেশ প্রদান করেন। এই দিন অনেক বিদ্বান ও সন্ত্রান্ত রাজপুরুষ এবং রমণীরত্ব মিস্ক উপস্থিত ছিলেন। পরে কওয়ের গির্জায় “অপব্যয়ী পুত্র। হ্যানী চার্চে “প্রার্থনা ইসলিংটনে “ঈশ্বর প্রেম অনন্তর তিনি .

( ৩৭ ) এবং একজেটার হলে “সাধারণ শিক্ষা সম্বন্ধে উপদেশ দেন। শেষােক্ত স্থানে তাহার বক্তৃতায় মুগ্ধ হইয়া জনৈক পাদরী বলিয়াছিলেন যে, “বাস্তবিক সেন মহাশয় আমা- দের উচিত যে, আপনার পদতলে বসিয়া কিছু শিক্ষা করি।” ইহার পর মদ্যপান ও যুদ্ধনিবারিণী সভা, দাতব্য সভা, শ্রমজীবী ও অন্ধ বধিরদিগের আশ্রম প্রভৃতি স্থানে তিনি অনেক উপদেশ প্রদান করেন। সেন্ট জেম্স হলে প্রায় পঞ্চ সহস্র শ্রোতার সম্মুখে বৃটীশ রাজের সুরা ব্যবসায়ের প্রতি তীব্র আক্রমণ করিয়া তিনি এক ওজস্বিনী বক্তৃতা প্রদান করেন। স্পার্জ টেবার্ণকেলে “ভারতের প্রতি ইংলণ্ডের ক্য” বিষয়ে এক বক্তৃতা করে। এই বক্তৃতায় তিনি ভারতীয় নীচ শ্রেণী ইংরেজদিগের অত্যা- চার স্পষ্টরূপে প্রকাশ করেন। ভারতবাসী শ্বেত নবাবগণ তাহাতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন। এই সভায় মহাত্মা লরেন্স সভাপতির আসন পরিগ্রহ করিয়াছিলেন। উদার চিত্ত নিরপেক্ষ ব্যক্তিগণ কেশব বাবুর পক্ষ সমর্থন করিয়া- ছিলেন। অনন্তর তিনি “খৃষ্ট ও খৃষ্টধর্ম” সম্বন্ধে এক বক্তৃতা করেন। খৃষ্টধর্মের অনেক গূঢ় তত্ত্ব এই বক্ত তায় প্রকাশিত হয়। এই বক্তৃতা শুনিয়া পাদরী মহাশ- য়েরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। এই বক্তৃতা শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া সুইডেনবর্গ সভা তাহাকে একথানী অভিন- ( ৩৮ ) দন পত্র ও অনেকগুলী প্রেততত্ব বিষয়ক সুন্দর দৃশ্য গ্রন্থ প্রদান করিয়াছিলেন। ১১ই জুন কেশব বাবু লণ্ডন পরিত্যাগ করিয়া ব্ৰিষ্টলে গমন করেন। মিস্ কবের ভবনে তিনি অবস্থিতি করিয়াছিলেন। এই স্থানে মহাত্মা রাজা রামমােহন রায় মহাশয়ের সমাধি মন্দির দর্শন করিতে গমন করিয়া সমাধি স্থানে জানু পাতিয়া রাজার পরলােকগত আত্মার মঙ্গল উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করিয়া আপনার নাম লিখিয়া আইসেন। অনন্তর মহাকবি সেক্সপিয়ারের জন্ম স্থান ৪ার্টফোর্ড, পরে লিচেষ্টার, বর্মিংহাম ও নটিংহাম গমন করেন।শেষােক্ত স্থানে ৪০ জন মাদীর স্বাক্ষরিত এক পত্র তাহার হস্তগত হয়। পত্রের মর্ম-খৃষ্টান না হইলে পরিত্রাণ নাই। তুমি খৃষ্টান হইবে কি না? “আপনাদিগের মতানুসারে আমি খ্ৰীষ্টান হইব না। তবে যীশুর প্রেম, ভক্তি ও আত্মত্যাগ আমার প্রার্থ- নীয়।” পত্রের তিনি এইরূপ উত্তর দিয়াছিলেন। এই স্থান হইতে তিনি মাচেষ্টারে গমন করেন। এই সময়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম নিবন্ধন তিনি পীড়িত হইয়া পড়েন। পীড়িতাবস্থায় তিনি রেভারেও হার্ডফোর্ড ব্রুকের গৃহে অবস্থিতি করেন। ক্ৰকের পত্নী জননীর ন্যায় যত্ন করিয়াছিলেন। পীড়িত অবস্থাতেই তিনি লিভারপুল গিয়া ( ৩৯ ) ৫ বক্তৃতা করেন। অনন্তর পীড়া অত্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়াতে দুই সপ্তাহের জন্য কাৰ্য্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হইয়াছিলেন। লিভারপুলে তিনি উবারণ সাহেবের বাটীতে অবস্থিতি করিয়াছিলেন। কেশব বাবুর আমেরিকা গমনের অভি- লাষ ছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ ও চিকিৎসক গণের নিষেধে তিনি তথায় গমন করিতে পারেন নাই। স্বাস্থ্য লাভ করিয়া তিনি লণ্ডনে প্রত্যাগমন করিলেন। থাকার প্রধান প্রধান সভাতে তাহার বক্তৃতা হইল। অতঃপর তিনি রাজনী পরিত্যাগ করিয়া এডিনবরা, গ্লাসগাে, লিড প্রভৃতি স্থান পরিভ্রমণ করেন। অক্স- ফোর্ড নগরে পণ্ডিতবৃত্ন মােঙ্গ মূলারের সহিত শ্রক্ষাৎ হয়। পণ্ডিতবর তাহাকে নিমন্ত্রণ করিয়া নিজ ভবনে লইয়া গিয়াছিলেন। পরে ধার্শ্বিকবর ডাক্তার পিউজী, জন য়ার্ট মিল, নিউম্যান, কাউয়েল প্রভৃতি প্রধান প্রধান পণ্ডিতগণের সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়। অস্বরণ নামক রাজপ্রাসাদে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সাক্ষাৎকার লাভ করেন। রাজকন্যা লুই মাতার সমভিব্যাহারিণী ছিলেন। মহারাণী কেশব বাবুকে নিজের একখানি প্রতিমূর্তি ও তাঁহার স্বামীর দুইখানি জীবনী উপহার প্রদান করেন। এই সময়ে রাজকুমার লিওপােন্ড কেশব বাবুর হস্তাক্ষর চাহিয়া লন। মহারাণী স্বামীর যে জীবনী দুইখানি ( ৪০ ) কেশব বাবুকে উপহার দিয়াছিলেন, তাহাতে তাহার হস্তাক্ষর সংযুক্ত ছিল। কেশব বাবুও মহারাণীকে পত্নীর প্রতিমূর্তি উপহার দিয়াছিলেন। অনন্তর কেশব বাবু স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন। ইংলণ্ড পরিত্যাগ করিবার পূৰ্ব্বে, তাঁহাকে বিদায় দিবার জন্য ১২ই সেপ্টেম্বর হানাে- বর স্কোয়ার রুমে এক সভা হয়। এই সভায় রেভারেণ্ড ম্পিয়ার্স বক্তা ছিলেন। ১৮ই সেপ্টেম্বর তিনি জাহাজে আরােহণ করেন। অনেক বন্ধু তাহার সঙ্গে আগমন করিয়াছিলেন। স্থানীয় লােকের অনুরােধে এই স্থানে তাহাকে কিছু বলিতে হইয়াছিল। ইংলণ্ডে অবস্থান- কালী মহারাণী ভিক্টোরিয়া, গ্লাভষ্টোন, ডিন ষ্ট্যালী এবং আরও অনেক সম্ভ্রান্ত লােক কর্তৃক তিনি আহারের জন্য নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। ১৮৭০ খ্রীঃঅব্দের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ইংলণ্ডে গমন করিয়া ছয় মাস কাল তথায় অবস্থান পূর্বক ঈশ্বরের নাম ঘােষণ। করিয়া এবং স্বীয় মােহিনী বক্তৃতা শক্তিতে দেশবাসী- দিগকে মুগ্ধ করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগত হন। কেশব বাবুর ইংলও গমনে তথাকার অনেক প্রধান লােকের মন ভারতের দিকে আকৃষ্ট হয়। তিনি সেখানে অতি উচ্চ সম্মান লাভ করিয়াছিলেন। 'ইংলণ্ডবাসীগণ তাহাকে অনেক অর্থ, গ্রন্থ, অলঙ্কার ও শিল্প দ্রব্য উপ-

( ৪১ )
হার প্রদান করিয়াছিলেন। ইংলণ্ডবাসীগণ যদি তাহাকে
অর্থ সাহায্য না করিতেন, তাহা হইলে তাহার দেশে
অবস্থান করিয়া ঈশ্বরের নাম ঘােষণা করা ও স্বদেশে
প্রত্যাগমন করা অত্যন্ত কষ্টকর হইত। তিনি যখন
ইংলণ্ডে গমন করেন, তখন অর্থ সংগ্রহের জন্য কলি-
কাতা টাউনহলে এক সভা আহ্বান করিয়া-“ভারতের
সহিত ইংলণ্ডের সম্বন্ধ” শীর্ষক এক বক্তৃতা প্রদান করিয়া
ইংলণ্ড গমনােপযােগী ব্যয়ের জন্য অর্থ সাহায্য প্রার্থনা
করেন। তাহাতে শত টাকার অধিক সংগৃহীত হয়
নাই। ইংলণ্ড গমনের ব্যয়ের জন্য ইহা অতি সামান্য।
১৬ই অক্টোবর তিনি বােম্বে ও ২০শে অক্টোবর ওড়া
ষ্টেশনে উপনীত হন। তাহার জন্য গঙ্গায় স্বতন্ত্র ষ্টিমার
নিযুক্ত রাখা হইয়াছিল। বাষ্পীয় শকট হইতে নামিয়া
বন্ধু বান্ধবগণের প্রিয় সম্ভাষণ ও সস্নেহ আলিঙ্গন দ্বারা
সাদরে গৃহীত হইয়া দীর্ঘকালের পর পরিবারবর্গের
সহিত মিলিত হইলেন। কিছুদিন ইংলণ্ড সম্বন্ধীয় আলা-
পাদি চলিতে লাগিল। কেশব বাবুর ইংলণ্ড পরিত্যা-
গের পর তথায় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। পূর্বে
তথায় ব্রাহ্মসমাজ ছিল না।
ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাগমন করিয়া কেশব বাবু দেশস্থ
প্রধান প্রধান লােকদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আরম্ভ

( ৪২ ) করেন। তাহাতে প্রধান প্রধান লােকদিগের ব্রাহ্ম- সমাজের প্রতি যে বিদ্বেষ ভাব ছিল, তাহা অনেক পরিমাণে অপনীত হয়। ১৮৭০ খৃঃঅব্দের ২রা নবেম্বর কেশব বাবুর প্রযত্নে ভারত সংস্কারক সল স্থাপিত হয়। এই সভা পাঁচ ভাগে বিভক্ত। সুলত সাহিত্য বিভাগ, দাতব্য বিভাগ, শ্রমজীবীদিগের শিক্ষা বিভাগ, স্ত্রী বিদ্যালয় বিভাগ ও সুরাপান নিবারিণী বিভাগ। সুলভ সমাচার নামক এক পয়সা মূল্যের একখানি স মদ পত্র এই সভা হইতে প্রচারিত হয়। সুলভ সমাচার দেশের প্রভূত কল্যাণ সাধন করিয়াছে। স্ত্রী বিদ্যালয়ে বয়স্থা মহিলাগণ শিক্ষা প্রাপ্ত হইতেন। সুরাপান নিবারিণী বিভাগ হইতে মদ না গরল নামক একখানি পত্রিকা বিনা মূল্যে বিতরিত হইত। ১৮৭১ খ্ৰীঃঅব্দের ১লা জানুয়ারি “ইণ্ডিয়ান মিরার’ সংবাদ পত্র দৈনিক হয়। এই সময়ে দেবে বাবুর সহিত কেশব বাবুর ও সাধারণ ব্রাহ্মণের মিলন হইবার প্রস্তাব হয়; কিন্তু তাহা কাৰ্য্যে পরিণত হয় নাই। ইহার পর ভারত আশ্রম সংস্থাপিত হয়। নানা কারণে, বিশেষতঃ কর্মচারী গণের অন্যায় আচরণে চারি পাঁচ বৎসর ভিন্ন ইহা জীবিত থাকিতে পারে নাই। এই আশ্রম লইয়া অত্যন্ত আন্দোলন' হইয়াছিল। ;

( ৪৩ ) বিচারালয়ে অভিযােগ পৰ্য্যন্ত হইয়াছিল। এই সময়ে সাধারণ ব্রাহ্মগণ কেশব বাবুর অযথাকর্তৃত্বে অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠেন। যাহাতে সাধারণ তন্ত্র মতে সমস্ত কার্য সম্পাদিত হয়, তাহার জন্য তাঁহারা বিশেষ চেষ্টা করেন। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হইতে পারে নাই। কতকগুলি স্বাধীন-চিন্তাশক্তি-বিহীন লােক কেশব বাবুর পক্ষ সমর্থন করতে তাহাদের ধৰ্ম্ম সঙ্গত ন্যায়ানু- মােদিত চেষ্টা কার্যে পরিণত হইতে পারে নাই। কোচবিহার বিবাহের পর কেশব বাবু যে প্রত্যাদিষ্ট প্রেরিত মহাপুরুষ হইয়া বসিয়াছিলেন, এই স্থান হইতে তাহার সূত্রপাত হয়। এই সময়ে মহিলাসিকে যবনিকার বাহিরে উপবেশন করা লইয়া অত্যন্ত গােল- যােগ হয়। এই গােলযােগে কেশব বাবুকে পরাস্ত হইতে হইয়াছিল। কেশব বাবু মহিলাদিগের যবনিকার বাহিরে উপবেশন করার বিপক্ষে ছিলেন। কেশব বাৰু ব্রাহ্মসমাজে সাধারণ তন্ত্র স্থাপন করিয়া- ছিলেন বটে, কিন্তু সমস্ত কর্তৃত্ব নিজ হস্তে রাখিয়াছিলেন। সাধারণ সভার অবস্থা বড় ভাল ছিল না। মাজিষ্ট্রেটের সভাপতিত্বে জেলার এডুকেশন কমিটী ইত্যাদির অবস্থা যেরূপ হইয়া থাকে, এই সভার অবস্থাও অনেক অংশে তদনুরূপ ছিল। প্রকৃত প্রস্তাবে সভার স্বাধীনতা ।

( ৪৪ )
অতি অল্পই ছিল। ইহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কুচবিহার
বিবাহের পর সমাজের আচাৰ্য্য ও সম্পাদক পরিবর্তনের
প্রস্তাব। এই হইতেই অধিকাংশ ব্রাহ্ম কেশব বাবুর
অযথা প্রভুত্বে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া উঠেন ও ভবিষ্যতে
যে দুইটা স্বতন্ত্র দলের সৃষ্টি হইবে, তাহার সূত্রপাত আরম্ভ
হয়। বাস্তবিক কেশব বাবুর অযথা প্রভুত্বের অত্যন্ত বাড়া-
বাড়ি হইয়া উঠিয়াছিল।
এই সময়ে বিবাহ বিধি বিধিবদ্ধ হয়। ইহা লইয়া আদি
ব্রাহ্ম সমাজের সহিত প্রায় চারি খৎসর কাল বিবাদ হয়।
১৭৯৪ শকের শেষ ভাগে কেশব বাবু কতকগুলি ব্ৰত
গ্রহ করেন। সেই ব্ৰতগুলী পাক ভােজন, মধ্যাহ্ন ও
সায়ংকালে কুটীরে বাস ইত্যাদি। এ গুলি দ্বারা যে ধৰ্ম্ম
সম্বন্ধে কি উপকার হয়, তাহা আমরা আমাদিগের ক্ষুদ্র
বুদ্ধিতে হৃদয়ঙ্গম করিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। মাতা পত্নি বা
অন্য কোন আত্মীয়ের প্রস্তুত অন্ন ব্যঞ্জন আহার করিলে
ধর্ম হয় না, স্বহস্তে রন্ধন করিয়া ভােঙ্গন করিলে অধিক
পরিমাণে ধৰ্ম্ম উপার্জিত হয়, ইহার কোন অর্থ নাই। এই
ব্যাপারকে আমাদের নিকট ধর্মের ভেক বলিয়া বােধ
হয়। তাঁহার স্বপাক ভােজন ব্রত অবলম্বনের ফল ১৭৯৫
শকে ফলিল। তিনি পীড়িত হইয়া পড়িলেন। তখন
ব্ৰত ভঙ্গ করিতে বাধ্য হইলেন।

( ৪৫ ) ১৭৯৮ শকের ৫ই বৈশাখ কেশব বাবুর বিশেষ যত্নে “এলবার্ট হাল” নামক অট্টালিকা প্রতিষ্ঠিত হয়। অনন্তর তিনি ৮ই জ্যৈষ্ঠ মােড়পুকুর গ্রামে “সাধন কানন” উদ্যান স্থাপন করেন। এখানে ব্রাহ্মগণ সাধন ভজন করিতেন। এই বৎসর ফাল্গুন মাসে গবর্নর জেনারেল লর্ড লিটন বাহা- দুরের অনুরােধে তিনি টাউন হলে “ধর্মে বিজ্ঞান ও উন্মত্ততা।” বিষয়ে এক বক্তৃতা করেন। ১৭৯৯ শকের আশ্বিন মাসে সাধারণ ব্রাহ্মমণ্ডলীর উত্তেজনায় কেশব বাবু প্রতিনিধি সভা স্থাপন করেন। এই সাধারণ ব্রাহ্ম- দিগকে চিরঞ্জীব শৰ্ম্মা হন্তোত্তলন বাদী বলিয়া উপহাসের চক্ষে একটু কুটীল কটাক্ষ করিয়াছেন। এই বৎসর মাত্রা অঞ্চলে অত্যন্ত দুর্ভিক্ষ হয়। জন্য কেশব বাবু যত্ন কবিয়া ভারতবর্ষীয় ব্ৰহ্ম মন্দিরে এক সভা করেন। সেই সভায় অনেক টাকা সংগৃহীত হইয়াছিল এবং উপযুক্ত কার্যে ব্যয়িত হইয়াছিল। এই বৎসরের ২৮শে কার্তিক কেশব বাবু তাঁহার কলুটোলার বাস ভবন পরিত্যাগ করিয়া কমল কুটীরে আসিয়া বাস করেন। এই বাড়ী ক্রয় করা লইয়া অত্যন্ত গােযােগ হইয়ছিল। উড়িষ্যা দেশ জাত কোন বঙ্গীয় যুবক আপনার সমস্ত সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া প্রায় বিংশতি সহস্র মুদ্রা কেশব বাবুর হন্তে অৰ্পণ করিয়া বলেন যে, আপনি এই টাকা

( ৪৬ )
কোন সৎকার্যে ব্যয় করুন। কেশব বাবু কমল-কুটীর
ক্রয় করিয়ার সময় এই টাকা ব্যয় করেন। সেই যুবক
এই কথা জানিতে পারিয়া হঠাৎ কেশব বাবুর নিকট
টাকা চাহেন। কেশব বাবু তৎক্ষণাৎ টাকা প্রদান
করিতে অক্ষম হওয়াতে সেই যুবক অভিযোগ করিবার
জন্য হাইকোর্টে গমন করেন। কিন্তু অভিযােগ হয় নাই।
কেশব বাবু টাকা পরিশােধ করিয়া দিয়াছিলেন।
ইহার পর যে ভয়ংকর বাত্যা ব্রাহ্ম সমাজে প্রবিষ্ট
হইয়া ইহাকে ভয়ানক আন্দোলিত ভ্ৰষ্ঠ ও ক্ষতিগ্রস্থ
করিয়াছে, পর পরিচ্ছেদে আমরা সেই বিষয়ের অবতারণা
করিতে চলিলাম। সেই ভয়ংকর বাত্যা কোচবিহার
বিবাহ।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
পূৰ্ব্ব পরিচ্ছেদেই আমরা বলিয়াছি যে আমরা এই
পরিচ্ছেদে এমন একটা বিষয়ের অবতারণা করিতে
যাইতেছি যাহা দ্বারা ব্রাহ্ম সমাজ সমূহ ক্ষতিগ্রস্ত
হইয়াছে। ব্রাহ্ম ধর্মের ও যার পর নাই অনিষ্ট হইয়াছে।
যদি কতকগুলি স্বাধীনচেতা ধর্ম-বীর এই সময়ে ব্রাহ্মধর্মকে
অসত্যের হস্ত হইতে উদ্ধার না করিতেন, তাহা হইলে

( ৪৭ )
প্রাণপ্রতিম ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম ও প্রিয়তম ব্রাহ্ম সমাজের যে কি
ঘাের দুর্দশা হইত, তাহা ভাবিলেও শরীর কণ্টকিত হয় ;
হৃদয়ের শশাণিত শুষ্ক হইয়া যায়। কোচবিহার বিবা-
হের পর হইতে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ আর ব্রাহ্মসমাজ
নাই, এবং তাহার উপাসকগণও আর ব্রাহ্মপদ বাচ্য
নহেন। কোচবিহার বিবাহের পর হইতে ভারতবর্ষীয়
ব্রাহ্মসমাজের নিকট ব্রাহ্মধর্ম বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন।
নববিধান নামে এক নুতন ধৰ্ম্ম তাহার স্থান অধিকার
করিয়াছে। এই নববিধান ধৰ্ম্মের সহিত ব্রাহ্ম ধর্মের
অনেক প্রভেদ। যে সকল সত্য ব্রাহ্মধর্মের প্রাণ, তাহার
সহিত কতকগুলি ভ্রমাত্মক মত ও ক্রিয়া মিশ্রিত হইয়া
ইহার জন্ম হইয়াছে। সেই সকল ক্রিয়া হােম, নিশান ও
ধর্মগ্রন্থ আরতি করা, জর্ডনের জল দ্বারা খৃষ্ট যেরূপ
অভিষিক্ত হইয়াছিলেন, তদনুরূপ কমল সােবরের জল
দ্বারা অভিষিক্ত হওয়া ইত্যাদি। ইহা ভিন্ন কতকগুলি
ভেক যাহা সাম্প্রদায়িকতার সহচর, যেমন গৈরিক বস্ত্র
পরিধান, করঙ্গ গ্রহণ করিয়া ভিক্ষা করা ইত্যাদি এই
ধৰ্ম্মে স্থান লাভ করিয়াছে। মধ্যবর্তী বাদ, বিশেষ বিধান
প্রভৃতি ভ্রমাত্মক মত সকলও এই নব ধর্মের অঙ্গ পুষ্টি
করিয়াছে। যদিও এই ধর্মাবলম্বীগণ মুখে বলিয়া থাকেন
যে, আমরা • মধ্যবর্তী স্বীকার করি না, কিন্তু কাৰ্যতঃ

( ৪৮ ) তাহা ঠিক নহে। বাস্তবিক তাহারা মধ্যবর্তী স্বীকার করিয়া থাকেন। তাহাদিগের সেই মধ্যবর্তী মৃত মহাত্মা কেশব চন্দ্র সেন। ঈশ্বর যুগে যুগে পৃথিবীতে বিশেষ শক্তি সম্পন্ন মহাপুরুষ প্রেরণ করেন, ইহাও নববিধানের একটী মত। এই মতটী বিশেষ বিধান নামে অভিহিত। কোচ- বিহার বিবাহের পর কেশব বাবু স্বয়ংই বলিয়াছিলেন যে “বর্তমান সময়ে আমার ভিতর দিয়া ভিন্ন কোন সত্য প্রত্যক্ষ ভাবে কাহারও নিকট প্রকাশিত হইবে না।” আর মধ্যবর্তীর অবশিষ্ট কি থাকিল? বাস্তবিক নববিধান ধর্ম যে প্রকার ও তদবলম্বীগণ যে সকল মতে বিশ্বাস করেন, তাহাতে তাহাদিগকে ব্রাহ্ম নামে অভিহিত করা যায় না, এবং তাহাদিগের সমাজকে ব্রাহ্ম সমাজ বলিয়া স্বীকার করা যায় না। যদি হাদিগকে ব্রাহ্ম বলিয়া স্বীকার করা যায় ও তাহাদিগের সমাজকে ব্রাহ্ম সমাজ নামে অভিহিত করা যায়, তাহা হইলে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজকে ব্রাহ্ম সমাজ ও তদন্তৰ্গত ব্রাহ্মদিগকে অন্য আখ্যা প্রদান করিতে হয়। নববিধান ধর্মকে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম বলিয়া স্বীকার করিলে ব্রাহ্মধর্মকে হত্যা করা হয়। কথার প্রসঙ্গে আমরা অনেক দূর আসিয়া পড়িয়াছি। এক্ষণে মূল বিষয়ের অবতারণায় প্রবৃত্ত হওয়া যাউক। কেশব বাবুর যত্নে ইতিপূর্বে যে বিবাহ বিধি বিধিবদ্ধ, ( ৪৯ ) হইয়াছিল। তাহাতে নির্ধারিত হয় যে কন্যার বয়স নূন- কল্পে চতুর্দশ বৎসর ও পাত্রের বয়স নূনকল্পে অষ্টাদশ বৎসর হইলে পরিণয় হইতে পারিবে না। ব্রাহ্ম মাত্রেরই এই বিধি প্রতিপালন করা উচিত, যে বিবাহে এই বিধির ব্যভিচার হইবে, তাহা ব্রাহ্ম বিবাহ নহে এবং ব্রাহ্মদিগের তদনুরূপ কোন বিবাহে যোগ প্রদান করা আর ব্রাহ্ম বিবাহ পৌত্তলিকতা দোষ স্পর্শশূন্য হইবে, কোনরূপ পৌত্তলিক অনুষ্ঠান তাহাতে স্থান লাভ করিতে পারিবে না, ইহাও তিনি প্রাণের সহিত অনুমােদন করিতেন; এবং পৌত্তলিক অনুষ্ঠান যুক্ত বিবাহকে তিনি কদাচ ব্রাহ্ম বিবাহ নামে অভিহিত করি- তেন না। * কিন্তু কোচবিহারের রাজার সহিত তাহার কন্যার বিবাহ দেওয়াতে এ উভয় বিধিই সম্পূর্ণরূপে ভঙ্গ উচিত নহে, * অযুক্ত বাবু অন্নদাচরণ খাস্তগির মহাশয়ের জ্যেষ্ঠা কন্যার সহিত সিভিলিয়ান শ্ৰীযুক্ত বাবু বিহারীলাল গুপ্ত মহাশয়ের বিবাহ হয়। এই বিবাহে পৌত্তলিক সংস্রব ছিল। সেই জন্য কেশব বাবু উক্ত বিবাহ লইয়া অত্যন্ত আন্দোলন উপস্থিত করেন। যে জন্য তিনি অন্নদা বালুর কন্যার বিবাহের প্রতিবাদ করিলেন, বিবাহ লইয়া আন্দোলন করিলেন, ব্রাহ্ম বিবাহ নহে কিন্তু পৌত্তলিক দোষ দুষ্ট বিবাহ বলিয়া গােলযোগ ক রিলেন, আপনি সেই প্রকার অথবা তাহা অপেক্ষা অধিক পোঃ- লিক সংস্রব যুক্ত ও বাল্য বিবাহে লিপ্ত হইয়া অম্লান বদন, ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া ঘোষণা করিলেন। নিজের দোষ ঈশ্বরের স্কন্ধে নিক্ষেপ করিতে কুণ্ঠিত হইলেন না।

( ৫০ ) হইয়াছিল। কিন্তু তথাপি তিনি আদেশের দোহাই দিয়া, ঈশ্বরকে অসত্য সমর্থনকারী রূপে প্রতিপন্ন করিয়া বিবাহ সমর্থন করিয়া গিয়াছেন। যখনই কোচবিহারের রাজার সহিত তাহার কন্যার সম্বন্ধ আসিল, তখনই তিনি ইহাকে ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া মনে করিলেন। কাহাকে কোন কথা না বলিয়া, জিজ্ঞাসা না করিয়া সম্বন্ধ স্থির করিয়া ফেলিলেন। এই সময়ে শ্রীযুক্ত বাবু শিবচন্দ্র দেব প্রমুখ ২৩ জন ব্রাহ্ম কেশব বাবুকে এই বিবাহ সম্বন্ধে এক পত্র লেখেন। কেশব বাবু সেই পত্র পাঠ করা পাপ মনে করিয়া তাহা পাঠে বিরত হন। আরও অনেক প্রতিবাদ পত্র তাহার নিকট প্রেরিত হইয়াছিল, কিন্তু তিনি কাহারও কথা শ্রবণ করেন নাই। আদেশের দোহাই দিয়া সকলের কথা উপেক্ষা করিয়া বিবাহে প্রবৃত্ত হন। সম্বন্ধ স্থির হইবার পূর্বে কেশব বাবু বর পক্ষের নিকট এই কয়েকটা প্রস্তাব করেন। প্রথম, রাজা ব্রাহ্ম কিম্বা একেরবাদী বলিয়া লিখিয়া দিবেন। দ্বিতীয়, ব্রাহ্ম সমাজের পদ্ধতি অর্থাৎ অপপৗত্তলিক হিন্দু বিবাহ পদ্ধতি অনুসারে বিবাহ হইবে। তৃতীয় পাত্র পাত্রী উপযুক্ত বয়সে বিবাহিত হই- বেন ; এক্ষণে কেবল বাগান মাত্র হইবে। চতুর্থ, বিবাহ পদ্ধতিতে ব্রাহ্ম ধর্মের নিয়ম প্রতিপালিত হইবে। বাগান কথাটী ব্যবহৃত হইল কেন? কেসব বাবু তা

( ৫১ )
কন্যাকে বাগান করিবার সম্বন্ধ স্থির করেন নাই।
বিবাহ দিবার সম্বন্ধই স্থির করিয়াছিলেন। তবে এ চতু-
রতা কেন ? তাহার অনুগামীগণ ইহাকে বাগদান
বলিয়া আপনাদিগের বিবেককে প্রবােধ দিতে পারেন,
কিন্তু অন্যের পক্ষে তাহা
সম্পূর্ণ অসম্ভব। এইরূপে
বিবাহ সম্বন্ধ স্থিরীকৃত হইলে পাত্র পাত্রী পরস্পরের
দেখা সাক্ষাৎ হইল। কেশব বাবু তাহাদিগকে লইয়া
প্রার্থনা করিলেন। অনন্তর নিম্নলিখিত প্রস্তাব কয়েকটা
লইয়া রাজপক্ষীয় লােক কোচবিহার গমন করিল।
প্রথম বিহারের পূর্বে বা পরে পাত্র পাত্রীর সহিত
কোন পৌত্তলিক সংস্রব থাকিতে পারিবে না। দ্বিতীয়
বিবাহ মণ্ডপে মূৰ্ত্তি, ঘট বা অগ্নি রক্ষিত হইবে না।
তৃতীয় কোন মন্ত্র পরিত্যক্ত বা পরিবর্তিত হইবে না।
অনন্তর কেশব বাবু তারযােগে কোচবিহার সংবাদ
দিলেন যে “ধৰ্ম্ম-বিষয়ে বিন্দুমাত্র ও এদিক ওদিক হইবে
।” উত্তর আসিল যে, কোন আশঙ্কা নাই।”
তাহার পর কেশব বাবু যখন কোচবিহার গমনে উদ্যত
হইলেন, তখন সংবাদ আসিল “বিবাহ পদ্ধতি দেখা
হয় নাই এবং উহা মুদ্রিত হইবে না। কয়েক দিন
পরে আবার সংবাদ আসিল যে ব্রাহ্ম পদ্ধতি মন্ত্রের মধ্যে
•নিবিষ্ট আছে, সুতরাং উহা ব্যবহৃত হইতে পারে না।
=

( ৫২ )
তখন কেশব বাবুর গমনােপযােগী স্পেশেয়াল ট্রেণ
প্রস্তুত হইয়াছে। কেশব বাবু বলিলেন স্পেশেয়াল
ট্রেণ বন্ধ থাকুক। বর-পক্ষীয়েরা বলিলেন, তাহা হইতে
পারে না। তখন কেশব বাবু সপরিবারে কোচবিহার
যাত্রা করিলেন। এই স্থানে আমরা বলিতে বাধ্য
হইলাম যে এই বিবাহ আদেশ মুলক নহে। ধৰ্ম্ম-বুদ্ধির
উত্তেজনায় যদি কেশব বাবু এই বিবাহ ব্যাপারে প্রবৃত্ত
হইতেন, তাহা হইলে তিনি যখন দেখিলেন বিবাহে
তাহার প্রাণসম ব্রাহ্মধর্মের পবিত্র নিয়ম প্রতিপালিত
হইবে না, তখন তিনি কদাচ সপরিবারে কোচবিহারে
কন্যা বিবাহ দিতে যাইতে পারিতেন না। স্পেশেয়াল
ট্রেণ ত সামান্য কথা, প্রাণ গেলেও তিনি কদাচ ধৰ্ম্ম
বিগর্হিত কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইতে পারিতেন না।
কেশব বাবু সপরিবারে কোচবিহারে উপস্থিত হইলে
বর-পক্ষীয়েরা প্রস্তাব করিলেন যে কেশব বাবু বিবাহ
মণ্ডপে উপস্থিত থাকিতে পারিবেন না। কেননা ইংলণ্ড
গমনে তিনি জাতিভ্রষ্ট হইয়াছেন। উপবীতধারী ব্রাহ্মণ
ভিন্ন অন্য কেহ মন্ত্র পড়িতে পারিবে না। ব্রহ্মো-
পাসনা হইবে না। পাত্র পাত্রী অঙ্গীকার করিবে না ।
হােম হইবে। কেশব বাবু এ প্রস্তাবে সম্মত হইলেন
। কিন্তু অসম্মত হইয়া আর কি করিবেন। অধি-
=
!

বাসের জন্য বর-পক্ষীয়েরা কন্যাকে রাজবাটীতে লইয়া
গেল ও যথারীতি অধিবাস হইয়া গেল।
পরে বিবাহ দিবসে হােম হইবে কি না, এই বিষয়ে
বাদানুবাদ হয়। বাদানুবাদের পর স্থির হয় যে কন্যা-
পক্ষীয় কেহ পৌত্তলিকতায় যোগ দিবেন না। অনন্তর
বিবাহ ক্রিয়া সম্পাদিত হইল। বিবাহে বর-পক্ষীয়-
দিগের নিয়মাদিই কার্যে পরিণত হইল। বিবাহ স্থানে
হরগৌরী আনয়ন করা হইয়াছিল ও হােম করা হইয়া-
ছিল। বিবাহের পর পাত্র পাত্রীকে অঙ্গীকার পাঠ ও
প্রার্থনা করান হইয়াছিল। কিন্তু বলা বাহুল্য যে
এ বিবাহে তাহার মূল্য ও কার্যকারীতা কিছুই নহে।
এইরূপে কেশব বাবু কন্যার বিবাহ দিয়া দুহিতাকে
রাজরাণী করিয়া এবং ব্রাহ্মধৰ্ম্ম ও ব্রাহ্মসমাজের মস্তকে
কুঠরাঘাত করিয়া কলিকাতায় প্রত্যাগত হইলেন।
এই সময়ে সাধারণ ব্রাহ্ম মণ্ডলী তিনি পৌত্তলিকমতে
অপ্রাপ্ত বয়স্কা কন্যার বিবাহ দিয়াছেন, এই জন্য
তাহাকে বেদীচ্যুত করিতে কৃতসংকল্প হইলেন। কিন্তু
অনেকগুলি স্বাধীন চিন্তাশক্তি বিহীন লােক তাহার
পক্ষ সমর্থন করতে ও উপাসনা মন্দির উপযুক্ত ট্রষ্টীর ,
হস্তে ন্যস্ত না করিয়া আপনার নামে রাখাতে সাধারণ
'ব্রাহ্ম মণ্ডলী তাহাদিগের সংকল্প কাৰ্যে পরিণত করিতে

( ৫৪ ) পারিলেন না। কেশব বাবু অনায়াসে মন্দির হস্ত- গত করিয়া তাহাতে আপন আধিপত্য বিস্তার করি- লেন। তখন সাধারণ ব্রাহ্মগণকে ভারতবর্ষীয় ব্ৰহ্ম- মন্দিরের নিকট বিদায় গ্রহণ করিতে হইল, সাধা- রণের অর্থ দ্বারা নির্মিত মন্দির স্বীয় নামে রাখা, উপযুক্ত ট্ৰষ্ঠীর হস্তে অৰ্পণ না করা, কেশব বাবুর আর একটা অন্যায় কাৰ্য। ইহার মধ্যে যে তাহার কোন অভিপ্রায় ছিল না, আমাদের তাহা বিশ্বাস হয় না। শ্ৰীযুক্ত বাবু প্রতাপচন্দ্র মজুমদার মহাশয়কে এক্ষণে এই মন্দিরের ট্রষ্টী নিয়োেগ করা লইয়া যে কি কষ্ট পাইতে হইতেছে, তাহা সাধারণের অবিদিত নাই। অনন্তর সাধারণ ব্রাহ্মগণ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজের কৰ্ম্ম- চারী পরিবর্তন ইত্যাদির জন্য সম্পাদককে সভা আহ্বান করিতে অনুরােধ করেন। কিন্তু সম্পাদক সে অনুরােধ রক্ষা করেন নাই। সভা আহুত হয় নাই। পরে ট্ৰী নিয়ােগ করিবার জন্যও সম্পাদককে সভা আহ্বান করিতে বলা হইয়াছিল, সে অনুরােধও তিনি প্রতিপালন করেন নাই। কোচবিহার বিবাহকে আদেশ মূলক বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে গিয়া ও আদেশের স্কন্ধে সমস্ত দোষ চাপাইয়া কেশব বাবুকে নির্দোষী করিতে যাইয়া, তাহার জীবনী ( ৫৫ ) লেখক মহাত্মা চিরঞ্জীব শৰ্ম্মা অনেক নূতন ও রহস্য- জনক কথা বলিয়াছেন। তাহার এক কথা “তেজিয়সাং ন দোষায়।” এই বিবাহে তাহাই হইয়াছে। অর্থাৎ কেশব বাবু প্রত্যাদিষ্ট মহাপুরুষ বা অবতার, সুতরাং তিনি তেজিয়ান। তাহার পক্ষে এ কাৰ্য্য অকৰ্ত্তব্য বা নিন্দনীয় নহে। বৈষ্ণবেরাও কিন্তু এই তেজিয়সাং ন দোষায়” বচনের দোহাই দিয়া তাহাদিগের উপাস্য দেবতা শ্রীকৃষ্ণের ব্যভিচার সমর্থন করিয়া থাকেন। তাহার আর এক কথা এই যে পৃথিবীর প্রচলিত নীতি শাস্ত্র অনেক সময় তাঁহার (কেশব বাবুর) পরিচালক ছিল না। পৃথিবীর নীতি শাস্ত্র কি ঈশ্বরাদেশের বিরােধী ? যে নীতি শাস্ত্র পৃথিবীতে প্রচলিত হইয়া জন সমাজকে নিয়ন্ত্রিত করিতেছে, তাহা কি ঈশ্বরের নীতি শাস্ত্র নহে? শয়তান কি ইহার প্রচার কর্তা ? যদি ইহা ঈশ্বর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকে, শয়তান যদি ইহার প্রতিষ্ঠাতা না হয়, তাহা হইলে ঈশ্বরের আদেশের সহিত ইহার কোন প্রকার অমিল বা বিরােধ হইবার সম্ভাবনা নাই। কেশব বাবু আদেশ অনুসারে চলিতেন, সুতরাং পৃথিবীর নীতি শাস্ত্র অনেক সময় তাঁহার পরি- চালক হইতে পারিত না, ইহা দ্বারা এই প্রতীত হয় যে ঈশ্বরের আদেশে ও নীতিতে সামঞ্জস্য নাই। কিন্তু ( ৫৬ ) আমরা এ কথা মানিতে পারি না। যেখানে স্বার্থ- পরতা আদেশের আবরণে আবৃত হইয়া উপস্থিত হয়, সেইখানেই নীতি ও ঈশ্বরাদেশে অনৈক্য ও অসাম- ঞ্জস্য হইয়া উঠে। তিনি আরও বলিয়াছেন যে এ বিবাহ যে সম্পূর্ণরূপে ব্রাহ্মসমাজের প্রণালী অনুসারে হইবে না, তাহা তিনি জানিতেন। তিনি ব্রাহ্ম হইয়া জানিয়া শুনিয়া ব্রাহ্মসমাজের প্রণালী পদদলিত করিয়া কেমন করিয়া এই বিবাহে প্রবৃত্ত হইলেন? তিনি এই ক্লপ অনেক প্রকার অযৌক্তিক ও প্রলাপ বাক্য এবং রহস্যজনক যুক্তি প্রয়ােগ করিয়াছেন। বিস্তৃতি ভয়ে আমরা তাহার সমস্ত কথা তুলিলাম না, যাহার ইচ্ছা হয়, তিনি মূল পুস্তক পাঠ করিয়া অবগত হইবেন। এইরূপে যখন সাধারণ ব্রাহ্মগণ কর্মচারী পরিবর্তন, টুঙ্গী নিয়ােগ প্রভৃতি বিষয়ে অকৃতকার্য হইলেন, কেশব বাবু অন্যায় রূপে মন্দির ও বেদী হস্তগত করিলেন ও বলপূর্বক স্বীয় পদে প্রতিষ্ঠিত থাকিলেন, তখন তাহারা স্বতন্ত্র সমাজ প্রতিষ্ঠিত করিতে বাধ্য হইলেন। এই রূপে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ জন্ম গ্রহণ করিলেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় “সাধারণ” নামটী নির্বাচন করিয়া দেন। কেশব বাবু এই সমাজের স্থায়ীত্ব সম্বন্ধে বরাবর সন্দিহান ছিলেন। তাঁহার বিশ্বাস ছিল যে এই

( ৫৭ )
সমাজে প্রেম, ভক্তি, বিশ্বাস প্রভৃতির সম্পূর্ণ অভাব।
সুতরাং ইহার স্থায়ীত্ব সম্বন্ধে নিশ্চয়তা কোথায় ? তিনি
এই সমাজের ব্রাহ্মদিগকে বৌদ্ধ-ব্রাহ্ম বলিতেন। সাধারণ
ব্রাহ্ম মণ্ডলী ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ পরিত্যাগ করিয়া
গেলে, কেশব বাবুর মনে অত্যন্ত আঘাত লাগিল। সেই
নিদারুণ মনােবেদনায় তিনি অত্যন্ত পীড়িত হইয়া
পড়িলেন। এই মর্মান্তিক আঘাৎ কিছুতেই তিনি সংবরণ
করিতে সক্ষম হন নাই। এই যে তাহার শরীরে
রােগ প্রবেশ করিল, তাহা আর সম্পূর্ণরূপ আরােগ্য হইল
না। সেই রােগই তাহার অকাল মৃত্যুর কারণ হইয়াছিল।
এই রােগের প্রথম আক্রমণে তাহাকে শয্যাশায়ী হইতে
হইয়াছিল।
কেশব বাবু রােগের হস্ত হইতে আপাতমুক্ত হইয়া
কতকগুলি কার্যের সুত্রপাত করেন। ১৮০০ শকে শারদীয়
পূর্ণিমার দিবস নৌকা ও বাষ্পীয়পােতে শারদীয় উৎসব
সম্পন্ন করেন। গঙ্গা বক্ষে সংকীৰ্ত্তন ও গঙ্গাকে অর্চনা
করা হইয়াছিল। দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংস
মহাশয় এই উৎসবে যােগ দিয়াছিলেন। কেশব বাবুর
সহিত তাহার অত্যন্ত সৌহৃদ্য ছিল। কেশব বাবুর অনু-
চরগণ এই গঙ্গা পূজাকে কবিত্ব বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
ইহাকে যদি কবিত্ব বলিয়া দোষ শূন্য বলিতে হয়, তাহা

( ৫৮ ) হইলে হিন্দুদিগের দুর্গোৎসবাদি সমস্ত অনুষ্ঠান যাহা পৌত্ত- লিক অনুষ্ঠান নামে অভিহিত হয়, সেই সমস্তগুলিকেও কবিত্বের চক্ষে দৃষ্টি করিলে দোষশূন্য হইয়া দাঁড়ায়। সুতরাং তাঁহাদের মতে ব্রাহ্মদিগের এই সকল কার্যের অনুষ্ঠান করা বােধ হয় দোষাবহ নহে। অনন্তর কেশব বাবু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কতকগুলি চটি পুস্তক প্রণয়ণ করিয়া রেল- ওয়ে ষ্টেশনে বিতরণ করেন। সাম্বৎসরিক উৎসব সময়ে তিনি ‘‘আমি কি প্রত্যাদিষ্ট প্রেরিত মহাপুরুষ।” সম্বন্ধে টাউন হলে এক বক্তৃতা করেন। এই বক্তৃতায় তিনি যে একজন অসাধারণ লােক তাহা, তিনি স্বয়ংই প্রকাশ করেন।তিনি তাহার নিজের অসাধারণত্ব স প্রমাণ করি- বার জন্য চতুর্দশ বৎসর বয়সের সময় আমিষ পরিত্যাগের কথা প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ করিয়াছিলেন। অতঃপর কেশব বাবুর যত্নে প্রচারকদিগের বাসের জন্য মঙ্গল বাড়ী নামে কতকগুলি বাড়ী প্রস্তুত হয়। প্রত্যেক প্রচারকের এক একখানি বাড়ী হয়। এতদিন তাঁহাদের থাকিবার কোন নির্দিষ্ট স্থান ছিল না। এত দিনে সে অভাব পূর্ণ হইল। এই বৎসর কেশব বাবু টাউন হলে “খৃষ্ট কে?” সম্বন্ধে একটী বক্তৃতা করেন। নারী জাতিকে জ্ঞান ধৰ্ম্ম ও গৃহকাৰ্যে সুশিক্ষিতা করিবার জন্য আৰ্য নারীসমাজ ( ৫৯ ) সংস্থাপিত করেন। ১৮০১ শকের ভাদ্র মাসে তিনি কয়েকজন প্রচারককে বিশেষ বিশেষ কাৰ্যভার অর্পণ করেন। শ্রীযুক্ত বাবু প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার মহাশয়কে খৃষ্টীয় শাস্ত্র, শ্ৰীযুক্ত বাবু গৌর গােবিন্দ রায় মহাশয়কে হিন্দু- শাস্ত্র,শ্রীযুক্ত বাবু গিরিশ্চন্দ্র সেন মহাশয়কে মুসলমান শাস্ত্র শ্ৰীযুক্ত বাবু অঘােরনাথ গুপ্ত মহাশয়কে বৌদ্ধ শাস্ত্র অনু- শীলনের ভার এবং শ্ৰীযুক্ত বাবু ত্রৈলােক্য নাথ সান্যাল মহাশয়কে সঙ্গীতের ভার দেওয়া হয়। কার্তিক মাসে কেশব বাবু স্বদলে প্রচার যাত্রায় বহির্গত হন। এই সময় হইতে তাঁহার হিন্দু আচার ব্যবহারের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিপতিত হয়। এজন্য অনেকে তাহাকে হিন্দু বলিত তাহার ধর্মকে দরবেশের কথা, ঘাসিদাসের চানাচুর বলিত। ইহা শুনিয়া তিনি হাসিতেন। এই সময় হইতে তাহাদের মধ্যে গৈরিক বস্ত্রের অধিক পরিমাণে প্রচলন আরম্ভ হয়। এক তন্ত্রী ও এই সময় হইতেই প্রবেশ করে। ১৮০১ শকের ১২ই মাঘ মহাত্মা কেশব চন্দ্র সেন নব বিধান ধর্ম প্রচার করেন, নববিধান ধৰ্ম্ম কি, তাহা আমরা ইতিপূর্বে এক প্রকার বিবৃত করিয়াছি। সুতরাং এস্থলে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়ােজন। কেশব বাবুর জীবনী লেখক শ্রদ্ধাস্পদ চিরঞ্জীব শৰ্মা বলেন যে ব্রাহ্মধৰ্ম্মই নব- বিধান ধৰ্ম্ম। ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম যে নব-বিধান ধর্ম নহে, উহার ( ৬০ ) সহিত ব্রাহ্মধৰ্ম্মের যে অনেক প্রভেদ, তাহাও আমরা ইতি- পূৰ্বে এক প্রকার বলিয়াছি। ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম উদা'র বিশ্ব জনীন সত্য ধৰ্ম্ম নব-বিধান তাহা নহে। কিন্তু চিরঞ্জীব শৰ্মা একথা স্বীকার না করিয়া বলিয়াছেন যে ব্রাহ্মধৰ্ম্মই নব- বিধান। ব্রাহ্মধৰ্ম্ম শব্দটী ঐশী শক্তির প্রতিশব্দ নহে বলিয়া কেশব বাবু নববিধান নামে অভিহিত করেন। আমরা কিন্তু তাহা বলি না। আমরা বলি কোচবিহার বিবাহ সমর্থন করিবার জন্য তিনি তাহার এই মনগড়া নব-বিধানের সৃষ্টি করেন। বাস্তবিক নব-বিধান ধৰ্ম্ম যদি ব্রাহ্মধৰ্ম্ম হয়, তাহা হইলে হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, প্রভৃতি জন সমাজের প্রচলিত ধৰ্ম্ম সমূহও ব্রাহ্মধৰ্ম্ম। কিন্তু কোন ব্রাহ্ম একথা স্বীকার করিতে পারেন কি ? নববিধানের প্রথম বর্ষে কেশব বাবু নিশান পূজা হােম, জল সংস্কার, খৃষ্টের রক্ত মাংস ভােজন, মস্তক মুণ্ডন, ভিক্ষা ব্ৰত অবলম্বন, বন্ধুগণের চরণামৃত পান ইত্যাদি অনুষ্ঠান সম্পাদন করেন। আমরা পূর্বেই বলি- য়াছি, এ সকল ভেক বা ধর্মান্ধতা ভিন্ন আর কিছুই নহে। এই সকল অনুষ্ঠান ধর্মোপার্জনের কোনই সাহায্য কবে না বরং সমাজকে সাম্প্রদায়িকতা ও কুসংস্কারের হস্তে নিক্ষেপ করে। শ্ৰীযুক্ত বাবু প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার মহা- শয় ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের মাঘ মাসে টাউন হলে “ব্রাহ্ম সমাজের ( ৬১ ) ভবিষ্যৎ” বিষয়ে এক বক্তৃতা করেন। তাহাতে তিনি বলিয়াছেন যে এই সকল কাৰ্য্য দ্বারা সমাজের অনিষ্ট ভিন্ন ইষ্ট সাধিত হয় নাই। এই সময় হইতেই কেশব বাবু তাহার সমাজে শংখ, ঘণ্টা, কাঁসর, ধুপ, ধুনা, পুষ্প ইত্যাদি ব্যবহার করিতে আরম্ভ করেন। আরতি প্রথাও এই সময়েই তাহার সমাজে প্রবর্তিত হয়। বিধান ঘােষনার কয়েক মাস পরে কেশব বাবু সপ- রিবারে নাইনিতল পৰ্বতে গমন করেন। এখানে তিনি সস্ত্রীক ভজন সাধন করিতেন। এই সময়ে তিনি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করিয়া পত্নীকে পার্শ্বে উপবেশন করাইয়া এক- তন্ত্রী লইয়া সাধন করিতেন। কেশব বাবুর পত্নী এই সময়ে যােগ সাধনের জন্য কেশভার মােচন করেন। নাইনিতল হইতে প্রত্যাগত হইয়া কেশব বাবু কয়েক খানি ক্ষুদ্র ইংরাজী পুস্তক প্রণয়ন করেন। এই সময় হইতে তিনি প্রার্থনায় গ্রাম্য ভায়া প্রয়ােগ করিতে আরম্ভ করেন। ১৮০২ শকের ১৬ই মাঘ কেশব বাবু প্রচারক সভাকে “প্রেরিত দিগের দরবার” নামে অভিহিত করেন। পূর্বে এই সভার এই নিয়ম ছিল যে, ইহার প্রত্যেক প্রস্তাব সর্ব সম্মতিক্রমে স্থিরীকৃত হইবে। যদি কোন সভ্য বিরােধী হন, তাহা হইলে প্রস্তাব স্থগিত থাকিতে পারিবে। কোন ( ৬২ ) কোন সভ্য বলিয়াছিলেন যে তথায় সভাপতির মত সর্বোপরি প্রবল হইবে। এক্ষণে নিয়ম হইল যে সৰ্ব্ব- তােভাবে চেষ্টা করিয়া যতক্ষণ পর্যন্ত সকল সভ্য একমত না হইবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন প্রস্তাব বিধিবদ্ধ হইতে এই বৎসর উৎসবের সময় বেদ, বাইবেল, কোরাণ ও ললিতবিস্তার একস্থানে স্থাপিত করিয়া তাহার উপর নব-বিধানের নিশান উড়াইয়া দলস্থ লােক দিগকে উহা স্পর্শ করিতে বলেন। অনেকে তদনুসারে স্পর্শ করিয়াছিলেন। যাহারা স্পর্শ করিলেন, তাহারা বিধান ভুক্ত হইলেন। দরবার স্থাপিত হইল বটে কিন্তু তাহার মতানুসারে কেশব বাবু কোন কাৰ্য্যই করিতেন না। তিনি অাদেশের দোহাই দিয়া নিজের ইচ্ছানুসারে যাবতীয় কার্য সম্পাদন করিতেন। অতঃপর কেশব বাবু শ্ৰীযুক্ত বাবু প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার, শ্রীযুক্ত বাবু গৌর গােবিন্দ রায়, শ্রীযুক্ত বাবু অঘাের নাথ গুপ্ত, শ্ৰীযুক্ত বাবু লৈােক্য নাথ সান্যালকে রৌপ্য পদক প্রদান করেন। এই পাঁচজন প্রচারক ও শ্ৰীযুক্ত বাবু দীননাথ মজুমদার শ্রীযুক্ত বাবু উমানাথ গুপ্ত, শ্ৰীযুক্ত বাবু প্যারিমােহন চৌধুরী, বাবু গিরিশ্চন্দ্র সেনকে প্রেরিত উপাধি দান করেন। শ্ৰীযুক্ত বাবু কান্তিচন্দ্র মিত্র মহাশয়কে প্রচারক পরিবারের প্রতিপালক এবং শ্রীযুক্ত বাবু মহেন্দ্রনাথ বসু, শ্ৰীযুক্ত শ্ৰীযুক্ত

( ৬৩ )
বাবু রামচন্দ্র সিংহ ও শ্রীযুক্ত বাবু প্রসন্নকুমার সেন
মহাশয় দিগকে তাহার সহকারী নিযুক্ত করেন। অনন্তর
শ্ৰীযুক্ত বাবু অমৃতলাল বসু মহাশয়কে মান্দ্রাজে শ্ৰীযুক্ত
বাবু অঘাের নাথ গুপ্ত মহাশয়কে পঞ্জাবে, শ্ৰীযুক্ত বাবু
দীননাথ মজুমদার মহাশয়কে বিহারে, শ্ৰীযুক্ত বাবু গৌর
গগাবিন্দ রায় মহাশয়কে উড়িষ্যা ও উত্তর বাঙ্গালায়,
শ্ৰীযুক্ত বাবু প্যারিমােহন রায় ও শ্ৰীযুক্ত বাবু গিরিশ্চন্দ্র
সেন মহাশয়দ্বয়কে পূর্ববঙ্গে এবং শ্রীযুক্ত বাবু ত্রৈলােক্য
নাথ সান্যাল ও শ্রীযুক্ত বাবু উমানাথ গুপ্ত মহাশয়দ্বয়কে
কলিকাতা ও তন্নিকটবর্তী স্থান সমূহে প্রচারার্থে নিযুক্ত
করেন। ইহার কিছুদিন পরে হােম, জলসংস্কার ও মহর্ষি
ঈশার রক্ত মাংস ভােজন ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। কেশব
বাবুর কমল কুটীর ভবনস্থ কমল সরােবর নামক পুষ্করি-
ণীতে তিনি শ্রীযুক্ত বাবু ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল মহাশয়
কর্তৃক অভিষিক্ত হন। অনন্তর পুত্রের প্রতি সংসারের
সমস্ত ভার অর্পণ করিয়া গোঁফ ও মস্তক মুণ্ডন ও গৈরিক
খেলকা পরিধান করিয়া ভিক্ষার ঝুলী গ্রহণ করেন।
এই সময়ে “বিধান ভারত” নামক গ্রন্থ রচিত হয়।
১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে মার্চ “নববিধান” নামক
ইংরেজী সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এতদ্ভিন্ন পরিচারিকা
বালক বন্ধু, থিমিষ্টিক কোয়াটালী রিভিউ পত্র প্রকাশিত

( ৬৪ ) হয়। ব্ৰহ্মবিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া কলেজেও এই সময়ে স্থাপিত হয়। স্ত্রীদিগের বিদ্যাশিক্ষার জন্য ভিক্টোরিয়া কলেজের সৃষ্টি। কেশব বাবু অনেক অন্যায় কথা ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া রবি বাসরীয় মিরার পত্রে প্রকাশ করিয়া- ছিলেন। ১৮০৩ শকের সাম্বৎসরিক উৎসবের পর কেশব বাবু বহু মূত্ররােগে আক্রান্ত হন। পীড়ার প্রথম অক্রমণেই তিনি মৃতপ্রায় হইয়াছিলেন। কিন্তু সে যাত্রায় পীড়া কথ- ঞ্চিৎ উপশম হইল। শরীর কিঞ্চিৎ সুস্থ হইবামাত্র তিনি দারজিলিং গমন করিলেন। তথায় তাহার পীড়া বৃদ্ধি পাইল। তিনি তথা হইতে কলিকাতা প্রত্যাগমন করিলেন। কলিকাতায় ফিরিয়া আসিয়া নব বৃন্দাবন নাটক অভিনয়ে ব্যাপৃত হইলেন। অভিনয় কাৰ্য্য অতি সুন্দর হইয়াছিল। কলিকাতার অনেক সম্ভান্ত লােক তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করিয়া নিজ-নিজ বাটীতে নাটক অভিনয় করাইয়াছিলেন ১৮৮৩ খ্রষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি পৃথিবীস্থ সমস্ত ধর্ম সম্প্রদায়কে সম্বােধন করিয়া এক পত্র লেখেন। তাহাতে নব বিধা- নের বৃত্তান্ত লিখিত হইয়াছিল। নব বিধান প্রচারের পর কেশব বাবু ভারতবর্ষীয় ব্ৰহ্ম-মন্দিরের নাম “টেবাৰ্ণেকেল” রাখেন ও প্রচারক- দিগের নামের পূর্বে “শ্রদ্ধেয় ভাই” শব্দ সংযুক্ত করেন।

১৮০ ৪ শকের সাম্বৎসরিক উৎসব উপলক্ষে তিনি টাউন হলে, “ইয়ােরােপের নিকট এসিয়ার সংবাদ” নামক বক্তৃতা প্রদান করেন। টাউন হলে এই তাহার শেষ বক্তৃতা। সেই সুন্দর মূর্তি আর বহু জন-সমাকীর্ণ টাউন হলের সুপ্রশস্ত কক্ষে উপস্থিত হইয়া মধুর বক্তৃতা দ্বারা শ্রোতৃ বর্গের কর্ণে আর অমৃত বর্ষণ করিতে পারে নাই। শ্রোতাগণ আর তঁাহার মােহিনী বাগ্মীতায় মুগ্ধ হইয়া সােৎসুক করতালী দ্বারা হৃদয়ের আনন্দ প্রকাশ করিবার অবসর পান নাই। এই বৎসর উৎসবের সময় কেশব বাবু স্বর্ণ বলয় হন্তে দিয়া নৃত্য করিয়াছিলেন। উৎসবান্তে তিনি সপরিবারে শমলা শৈলে গমন করেন। পথের কষ্টে অম্বালায় গিয়া পীড়িত হইয়া পড়েন। সিমলায় উপস্থিত হইয়া চিকিৎ- সার প্রভাবে কথঞ্চিৎ সুস্থতা লাভ করেন। সিমলাতে “তার ভিউ” নামক ভবনে তিনি অবস্থান করিতেন। কিছু সুস্থ হইয়া তিনি নব সংহিতা নামক পুস্তক প্রণয়নে নিযুক্ত হন। সকাল হইতে বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত লিখিয়া তাহার পাণ্ডুলিপি (copy) ডাকে পাঠাইয়া পরে উপাসনায় প্রবৃত্ত হইতেন। এইরূপ অতিরিক্ত পরিশ্রমে তাঁহার পীড়া পুনরায় বৃদ্ধি পাইল। এই পীড়িত অবস্থাতে আমেরিকার কোন ব্যক্তির পুস্তক

( ৬৬ )
অনুরােধে “যােগ” নামক একটা প্রবন্ধ লিখিয়া তথায়
প্রেরণ করেন। এই সময়ে উপাসনার পর আর তিনি
বসিয়া থাকিতে পারিতেন না। শরীর এত দুর্বল হইয়া
পড়িত যে তাহাকে শয্যাশায়ী হইতে হইত। অন্য লােকে
কোমর ও পিট টিপিয়া দিলে তবে আহার করিতে পারি-
তেন। এই প্রকার অবস্থা দেখিয়া চিকিৎসকেরা শারী-
রিক পরিশ্রমের জন্য সুতারের কাৰ্য্য করিতে পরামর্শ
দিলেন। কেশব বাবু তদনুসারে আহারান্তে ২৩ ঘণ্টা
সুতারের কার্য করিতেন। কয়েক খানি টেবল ও ছােট
ছােট কয়েকটা আলমায়রা তিনি প্রস্তুত করিয়াছিলেন।
উত্তরােত্তর শরীর দুর্বল হইতে লাগিল দেখিয়া চিকিৎসক
গণ দুগ্ধের সহিত ডিম্ব ভােজনের ব্যবস্থা করিলেন।
বলা বাহুল্য যে কেশব বাবুর দ্বারা এই ব্যবস্থা প্রতি
পালিত হইয়াছিল। যে দুঃসহ বেদনা তাহাকে মৃত্যু
পৰ্যন্ত যন্ত্রণা দিয়াছিল, তাহা এই স্থানেই তাহাকে
আক্রমণ করে। দুইজন বলবান লােক কোমর টিপিয়া
ধরিয়াও বেদনার কিছু করিতে পারি না। ইহার উপর
আবার শুষ্ক কাশীতে যার পর নাই যন্ত্রণা দিত। যখনই
কাশী তাহাকে আক্রমণ করিত, তখনই তিনি উপাসনা
সাগরে নিমগ্ন হইতেন। সে অবস্থায় কাশী তাহাকে
অধিক যন্ত্রণা প্রদান করিতে পারি না।

( ৬৭ )
১৮৮৩ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি
ভগ্ন শরীরে কলিকাতায় প্রত্যাগত হন। পথে দিল্লী ও
কাণপুরে কয়েকদিন থাকিয়া হাকিম দ্বারা চিকিৎসা
করাইয়াছিলেন। কিন্তু কোন উপকার হয় নাই।
কলিকাতা আসিবার পর এলােপেথি মতে চিকিৎসা
চলিতে লাগিল। পথ্য মাংসের যুষ ও ডিম্ব। এ সময়ও
তিনি নিৰ্মা থাকিতে পারেন নাই। নব সংহিতার প্রাফ
সংশােধন বাটী মেরামত ইত্যাদি কাৰ্য্যে, যখনই শরীর
সুস্থ থাকিত তখনই তিনি ব্যাপৃত হইতেন। এই সময়ে
তিনি তাঁহার বাড়িতে দৈনন্দিন উপাসনার জন্য একটা
মন্দির প্রস্তুত করিতে আরম্ভ করেন। কেদারায় বসিয়া
মন্দিরের নির্মাণ কাৰ্য পরিদর্শন করিতেন। অতঃপর
পীড়া অত্যন্ত সাংঘাতিক আকার ধারণ করিল। এই
সময়ে মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর মহাশয় তাহাকে দেখিতে
আসিয়াছিলেন। দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংসও
তাহাকে দেখিবার জন্য আগমন করিয়াছিলেন। তাঁহার
পীড়ার সংবাদ শুনিয়া লর্ড বিশপ তাহাকে একদিন
দেখিতে আইসেন। সে সময়ে তাহার দন্ত মূল হইতে
রক্ত নিঃসৃত হইতেছিল। তিনি পিকদানিতে রক্ত
ফেলিতে ফেলিতে তাহার সহিত আলাপ করেন।
পীড়া দিন দিন ভীষণ হইতে ভীষণহরে পরিণত

( ৬৮, ) হইতে লাগিল। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি কেশব বাবু তাহার বাটীস্থ অসম্পূর্ণ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তাহাকে কেদারায় বসাইয়া ধরাধরি করিয়া নীচে আনা হয়। বেদীর কাৰ্য্য তিনিই সম্পন্ন করেন। তাঁহার বেদীতে এই শেষ উপবেশন। প্রকাশ্য ভারে ধর্মবন্ধুগণের সহিত মিলিত হইয়া এই তাহার শেষ প্রার্থনা। দেবালয় (বাটীস্থ মন্দির প্রতিষ্ঠার তিন চারি দিন পূৰ্ব্ব হইতেই তাঁহার বেদনা অত্যন্ত বৃদ্ধি পাইয়াছিল। বেদনার যন্ত্রনায় তাঁহাকে অত্যন্ত কাতর করিয়াছিল। বেদনার যাতনায় তিনি দিন রাত্রি কেবল “মারে, বাবারে,”বলিয়া চিৎকার করিতেন। একদিন শ্রীযুক্ত অমৃত লাল বসু মহাশয় শয্যার পার্শ্বে বসিয়াছিলেন,কেশব বাবু অমৃত বাবুর গলা ধরিয়া তাহার ক্রোড়ে মাথা লুকাইয়া বলিলেন ভাই অমৃত,বেদনায় হাড় গুড়া হইয়া গেল। অন- স্তর দেবালয়ের মেজেতে কত শ্বেত পাথর লাগিবে? সেই সম্বন্ধে অমৃত বাবুর সহিত আলাপ করিতে লাগিলেন । আর একদিন সঙ্গীত প্রচারকের গলা ধরিয়া বলিলেন, “ভাই, প্রাণের ভাই আমার, তুমি আমাকে অনেক ভাল ভাল গান শুনাইয়াছ। আবার আমি গান শুনিব। স্বর্গে গিয়া আবার গান শুনিব। মা আমাদের জন্য বলােক প্রস্তুত করে রেখেছেন। সেই খানে আমরা সকলে যাব।” ।

৬৯ ) তিনি শয্যা পার্শ্বস্থ জননীর পদধূলি পুনঃ পুনঃ গ্রহণ করিতেন। একদিন জননী তাহাকে বেদনায় অস্থির দেখিয়া বলিলেন, “কেশব আমার পাপেই তােমার এত যন্ত্রণা হইতেছে।” তিনি মাতৃবক্ষে মস্তক রাখিয়া বলি- লেন, “মা তুমি এমন কথা বলিও না। তুমি আমার ধার্মিক মা। তােমার আশীর্বাদেই আমার সব হইয়াছে, এবং তােমার গর্ভে জন্মিয়াছি বলিয়াই, আমি এত ভাল হইতে পারিয়াছি।” এই সময়ে সিন্ধু দেশ বাসী নেভাল রাও তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আইসেন। তিনি তাহাকে বলিলেন, কোন ভাল দ্রব্য দেখিলে আনন্দ বাজারের জন্য পাঠাইয়া দিও। ইহার কয়েকদিন পূর্বে অমৃত বাবুকে বলেন যে মন্দিরের পার্শ্বস্থ জমী বিক্রয় করিয়া মন্দিরের ঋণ পরিশোধ করিও। তিনি নিজেও ইহার জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু পীড়ার আতিশয্য নিবন্ধন কিছু করিয়া উঠিতে পারেন নাই। ক্রমেই তাঁহার অবস্থা মন্দ হইতে লাগিল। চিকিৎসক- গণ হতাশ হইলেন। আত্মীয়গণ তাহার বাঁচিবার অশি। পরিত্যাগ করিলেন। এই সময়ে প্রসিদ্ধ ডাক্তাব মহেন্দ্র- লাল সরকার মহাশয় হােমিওপ্যাথি মতে তাহার চিকিৎসা করিতেছিলেন। ৭ই জানুয়ারি তাঁহার বাক্য রােধ হয়। কেশব বাবু পীড়ার যন্ত্রণায় সর্বদা ছট ফট করিতেন, ( ৭০ ) ৫ কেবল সঙ্গীত করিলে নীরব ও সুস্থির থাকিতেন। অন- স্তর শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিন সমুপস্থিত হইল। সােমবার তাহার বাক্যরােধ হইয়াছিল। মঙ্গলবার পূর্বাহ্ন ৯টা ৫৩ মিনিটের সময় তিনি পরিবারগণকে দুস্তর শােক সাগরে ভাসাইয়া, আত্মীয় বন্ধুগণকে অকূল পাথারে নিক্ষেপ করিয়া অমরধামে গমন করিলেন। স্নেহময়ী জননীর গভীর শােকাচ্ছাসে কমল কুটীর উচ্ছাসিত হইয়া উঠিল। জননীর হৃদয় ভেদী আর্তনাদে-অভাগিনী পত্নীর মৰ্ম্ম বিদারক ক্রন্দন ধ্বনীতে কমল কুটীর পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। শোকের সেই বিষাদময়ী মূর্তি যিনি অবলােকন করিয়াছেন, তাহার অন্তরে তাহা অঙ্কিত থাকিবে। মৃত ভাষার সাধ্য নাই যে শশাকের সেই জীবন্ত প্রতিমূর্তি চিত্রিত করিতে পারে। অনন্তর কেশব বাবুর রােরুদ্যমানা পত্নী তাঁহার পদ বুগলে পুষ্পাঞ্জলি ও গলে পুষ্পমালা প্রদান করিয়া বলি- লেন, “আমি দেবতা স্বামী পাইয়াছিলাম। • হায় ! চিনিতে পারিলাম না।” অনন্তর অপরাহ্ন ৩টার সময় মৃত দেহ শ্মশানে লইয়া যাইবার আয়ােজন হইল। মৃত দেহকে স্নান করাইয়া গরদের কাপড় পরাইয়া পুষ্পমালা ও ললাট চন্দনে চর্চিত করিয়া খট্টার উপর শায়িত করা হইল। খটুও পুস্পদ্বারা সজ্জিত হইয়াছিল। পরে খট্টা দেবালয়ে ( ১ ) রাখিয়া উপাসনা হইল। অনন্তর মৃত দেহকে লইয়া সকলে শ্মশনাভিমুখে যাত্রা করিলেন। হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়ের শত শত লোক তাহার অনুযাত্রী হইয়াছিল। যথা সময়ে মৃত দেই শ্মশান ভুমিতে নীত হইল। চন্দন কাষ্ঠ দ্বারা চিতা:প্রস্তুত হইল। যে সুন্দর কলেবর বিডন উদ্যান, টাউন হল, ব্ৰহ্ম মন্দির প্রভৃতি শােভিত করিয়া লােক লােচনের আনন্দ বর্ধন করিত, মূহুর্তের মধ্যে তাহা ভস্মরাশিতে পরিণত হইয়া গেল। সুবৰ্ণ প্রতিমা বিসর্জন দিয়া সকলে ভগ্ন হৃদয়ে গৃহে প্রত্যাগত হইলেন। পরে ভস্মাবশিষ্ট চিতাভস্ম কমল কুটীরের সম্মুখভাগে প্রােথিত করিয়া তাহার উপর সমাধি স্তম্ভ নির্মিত হইয়াছে। মহাত্মা কেশবচন্দ্র সেনের জীবনী আমরা এই স্থানেই শেষ করিলাম। তিনি ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন। তাহার ন্যায় লােক পৃথিবীতে অল্পই জন্ম গ্রহণ করিয়াছে। তাহার জন্ম গ্ৰণ পতিত বাঙ্গালী জাতির গৌরব বাড়িয়াছে। বঙ্গমায় তাহার ন্যায় সন্তান আর লাভ করিতে পারিবেন কিনা গভীর সন্দেহ। তাহার বিশ্ব বিমােহিনী বাগ্মীতা, অসাধারণ প্রতিভা, ঐকান্তিক ঈশ্বর নিষ্ঠা ও উন্নত ধৰ্ম্ম- জীবন তাহাকে চিরকাল অমর করিয়া রাখিবে। যতদিন ইতিহাস বিদ্যমান থাকিবে, মহৎ লোকের সম্মান

( ৭২ )
থাকিবে, মহাত্মা কেশবচন্দ্র তাবৎ জন সাধারণের হৃদয়ে
অধিষ্ঠিত থাকিবেন। কিন্তু এ হেন মহাত্মাকে যে আমরা
নিরবচ্ছিন্ন প্রশংসা করিতে পারিলাম না, গুণগানের সঙ্গে
সঙ্গে আমাদিগকে যে দোষের উল্লেখ করিতে হইল, তজ্জন্য
মনে দুঃসহ ক্ষোভের উদয় হইতেছে। হৃদয় গভীর
সন্তাপে সন্তপ্ত হইতেছে; কিন্তু নিরুপায়। সংসারের
কিছুই দোষশূন্য নহে। নিরবচ্ছিন্ন নির্দোষ পদার্থ
সংসারে দুর্লভ। নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
সুতরাং কেশবচন্দ্রতেও দোষ থাকা কিছু বিচিত্র নহে।
এই আমাদের প্রবোধ ও সান্ত্বনা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Keshab Chandra Sener Sankhipta Jeebani

Author
Mitra ,jagadbandhu
Title
Keshab Chandra Sener Sankhipta Jeebani
File name
Keshab Chandra Sener Sankhipta Jeebani
Text
OCR done
Citation
1886
Published
2010/01/15
Publisher
Karttikchandra Dutta, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
102
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Mitra ,Jagadbandhu
DLI number
511162
Barcode
4990010018334.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
hdZArsW5RVw
Download PDF

Keshab Chandra Sener Sankhipta Jeebani