Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Dharmmasar-sangraha Ed. 4th

Mukhapadhyay,jaminikumar · 2010/02/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ধর্মসার-সংঘ।
সিদ্ধ মহাপুরুষ (বাদীর) শ্ৰীশ্ৰীলােকনাথ ব্রহ্মচারিবাবার
জীবনী সহ তদীয় উপদেশাবলী।
শ্ৰীযামিনীকুমার মুখােপাধ্যায় কর্তৃক
সঙ্কলিত।
চতুর্থ সংস্করণ।
প্রকাশক
শ্রীহরিদাস রায়।
ম্যানেজার-শক্তি লাইব্রেরী, ঢাকা।
১৩২১।
মু-আট আনা

ঢাকা, শক্তিপ্রেস হইতে ঐবিপিনচন্দ্র বর্মণ কর্তৃক মুদ্রিত।

গ্রন্থকারের নিবেদন। “একাগ্রচিত্তে শান্তে চ শ্রদ্ধাভক্তিসমন্বিতে প্রদাতব্যমিদং তত্ত্ব।” “অভক্তে বঞ্চকে ধূৰ্তে পাষণ্ডে নাস্তিকে নরে। মনসাপি ন বক্তব্য।” ইতি গুরুগীতা। “ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কৰ্ম্মসঙ্গিনা। যােজয়েৎ সৰ্ব্বকৰ্ম্মাণি বিদ্বান্ যুক্তঃ সমাচরেৎ। অজ্ঞস্যাৰ্দ্ধপ্রবুদ্ধস্য সৰ্ব্বং ব্রহ্মেতি যাে বদেৎ। মহানিরজালেবু স তেন বিনিযােজিতঃ ॥”ইতি গীতা আমাদের বংশ পূজ্যপাদ সৰ্ব্ববিদ্যাবংশের শিষ্য। আমি সৰ্ববিদ্যা- সশসত পরমারাধ্যদেব ৩ অম্বিকাচরণ ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের নিকট হইতে তান্ত্রিকী দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছি। আমি সিদ্ধ মহাপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জনৈক শিষ্য পূজ্যপাদ কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় ও পূজ্যপাদ মহাত্মা বিজয়রুষঃ গােস্বামী মহাশয়ের উপদেশমতে এবং পরমারাধ্যা মাতৃদেবী ও অগ্রজ শ্ৰীযুক্ত কামিনীকুমার মুখখাপাধ্যায় মহাশয়ের আজ্ঞানুসারে পূর্বোক্ত কৌলিক গুরুদেব হইতে তান্ত্রিক মন্ত্র গ্রহণ করিয়া এবং প্রথমােক্ত মহাপুরুষদ্বয়ের উপদেশ যথাশক্তি প্রতিপালন করিতেছিলাম। এই সময়ে মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী ঢাকার সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের উপাচার্যের কার্য করিতেন। তিনি ঢাকা হইতে কয়েকবাৰ বারদীর ব্রহ্মচারিবাবার নিকট যাতায়াত করিয়াছেন এবং এই মহা- পুরুষের সঙ্গলাভে নিজকে কৃতার্থ মনে করিয়াছেন। পূজ্যপাদ বিজয়কৃষ্ণ গগাস্বামী সর্বদাই সকলের নিকট বলিতেন যে বারনীর ব্রহ্মচারীর ন্যায় ঐশ্বৰ্য্যবান্ মহাপুরুষ তিনি অল্পই দেখিয়াছেন এবং নিম্নভূমিতে এরূপ মহাপুরুষ কদাচিৎ আসিয়া থাকেন। তাহার মুখে বারদীর ব্রহ্মচারিবাবার বৃত্তান্ত অবগত হইয়া তাহাকে দেখিবার নিমিত্ত বলবতী স্পৃহা জন্মে। ভগবং- কৃপায় সেই বাসনা অচিরেই পরিপূর্ণ হওয়াতে আমিও চরিতার্থ হইয়াছি। প্রথমবার তাঁহার নিকট হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়াই স্নেহময়ী মাতা ঠাকুরাণীকে বলিয়াছিলাম –“মা! বারদীর ব্রহ্মচারীর মত আপনিও আমাকে ভালবাসিতে পারেন না।” “ব্রহ্মচারী কেমন ?” কেহ জিজ্ঞাসা করিলে প্রত্যুত্তরে বলিতাম—‘মূর্তিমতী গতা’, ‘জীবন্ত গীতা দেখিয়া আসিয়াছি। আমার প্রত্যেক উপদেশকের উপদেশই নিতান্ত পবিত্র ও কল্যাণকর। বিশেষতঃ পরমগুরু বারদীর ব্রহ্মচারিপাবার উপদেশপরম্পরা এতই উপাদেয়, মূল্যবান্, ও পবিত্র বলিয়া বোধ হইতেছে, যে ঈদৃশ সুদুলভ রত্নরাজি অথবা ভবরােগের মহৌষধসমূহ লােকচক্ষুর অগােচর রাখিয়া জগৎকে বঞ্চনা করিতে কিছুতেই প্রবৃত্তি হইতেছে না। তাই উহাদিগকে ‘ধর্মসার-সংগ্রহ' নামক ক্ষুদ্র গ্রন্থাকারে নিবদ্ধ করিয়া লােকসমাজে উপন্যস্ত করিতে বাধ্য হইলাম। শুভ্র ও বিশুদ্ধ আকাশের জল যেমন আধারভেদে বিভিন্ন গুণাক্রান্ত হয়, এই পবিত্র উপদেশগুলিও সেইরূপ মাদৃশ পাত্রে ন্যস্ত হওয়াতে অন্তত কিয়ৎপরিমাণেও আমার গুণবিশিষ্ট হইয়াছে সন্দেহ নাই। এই গ্রন্থে যাহা যাহা অপবিত্র বলিয়া বিবেচিত হইবে, তাহাই আমার ; এবং যাহা যাহা পবিত্র ও মঙ্গলময় বলিয়া প্রতিভাত হইবে, তাহাই গুরুর বলিয়া মনে করিতে হইবে। আশা করি, সহৃদয় পাঠকগণ অপবিত্র অনুপাদেয় অংশ হংসের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া পবিত্র উপাদেয়াংশ গ্রহণপূর্বক স্বয়ং পবিত্র ও উপকৃত হইতে যত্ন করিবেন। ইহাতে অপবিত্র অসার কিছু আছে বলিয়া আমি বুঝিতে পারিতেছি না ; অতএব আমি সজ্জন মাত্রেরই ক্ষমার যােগ্য। উপসংহারে সহৃদয় পাঠকবর্গের সমীপে আমার ইহাও অবশ্য নিবেদনীয় বলিয়া বােধ হইতেছে, যে ঈদৃশ পুস্তক সৰ্বসাধারণে প্রচারযােগ্য কিনা এসম্বন্ধে এবং মতভেদ চলিতেছিল। এই জন্যই এই গ্রন্থ অদ্যাপি মুদ্রিত ও প্রচারিত হয় নাই। কিন্তু প্রকাশ না করিলেও এই অমূল্য রত্নগুলি রক্ষা করা সুদুষ্কর, এই ভাবিয়া ইদানীং মুদ্রিত করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। এই গ্রন্থ আমার ন্যায় অজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষেই উপকারক। এতদ্বারা অন্য কাহারও কিঞ্চিৎ উপকার হইলে নিজকে কৃতার্থ মনে করিব। ইহাদ্বার। শিষ্যের কর্তব্যও কিয়ৎপরিমাণে সংসাধিত হইবে বলিয়া বিশ্বাস করি। “আসনং বসনঞ্চৈব ভুষণং বাহনং তথা। গুরবে চ নিবেদয়েং।” অলমিতি বিস্তরেণ। এই শ্লোকের অর্থ বাবা কিরূপ বুঝাইয়াছেন তাহা এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করা হইবে। শ্ৰীযামিনীকুমার শর্মা মুখােপাধ্যায়।

বিজ্ঞাপন। দ্বিতীয় সংস্করণের প্রয়ােজনীয়তা। ধর্মসার সংগ্রহের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হইলে পর সহৃদয় ভক্ত পাঠকবর্গের মধ্যে অনেকেই ইহা পাঠ করিয়া নিরতিশয় প্রতি লাভ করিয়াছিলেন। কেহ কেহ পত্রছাৱাও হৃদয়ের আনন্দ প্রকাশ করিতে কুষ্ঠিত হন নাই। যাহারা উৎকট আগ্রহসত্ত্বেও পুস্তকের অসদ্ভাবে প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ লাভে বঞ্চিত রহিয়াছেন, তাহারা ইহার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করিবার জন্য আমাকে পুনঃ পুনঃ অনুরােধ করিয়াছেন। বিশেষতঃ যাহারা ব্রহ্মচারিবাবার কৃতী শিষ্য বলিয়া পবিগণিত, যাদের সেই মহাপুরুষের প্রতি নিরতিশয় ভক্তি ও অনুরাগ আছে, তাহাদের সেই সদাকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা আমার কর্তব্য কাৰ্য্য বলিয়াই মনে করিতেছি। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের উপাদেয় ও পুনদান সম্বন্ধে ঈদৃশ স্বাভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন যে, এখানে তারা উল্লেখ না কবিয়া নীরব থাকা সঙ্গত মনে করিলাম না। ইহাদের মধ্যে ব্রহ্মচারিবাবার অন্যতম প্রধান ও প্রিয় শিষ্য তদীয় চরিতাখ্যায়ক ঐক্ত ব্রহ্মানন্দ ভারতী মহাশয় এই ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া পদারা যে মন্তব্য লিথিয়া পাঠাইয়াছেন, তাহা অবিকল নিম্নে প্রকটিত হইল। প্রিয় যামিনী বাবু, তােমার প্রণীত ‘ধর্মসার-সংগ্রহ' নামক পুস্তকখানা আমি সাদরে গ্রহণ করিয়াছি। তুমি, আমি, ও অন্যান্য বন্ধুগণ সকলেই গুরুদেব বারদীর ‘ব্রহ্মচারিবাবার চরণপ্রান্তে যাইতাম। গত উনবিংশ বৎসর মধ্যে কেহই উক্ত মহাপুরুষের উপদেশ বা যথার্থ ইতিবৃত্ত সাধারণের গােচর করিতে অগ্রসর হন নাই। তুমি তদীয় অমূল্য উপদেশ গুলি সংগ্রহ করিয়া পুস্তকাকারে মুদ্রিত কৰাতে প্রকৃত জিজ্ঞাসু সজ্জনগণের কৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছ। উহা সাধারণের আদরের বিষয় হওয়াতে কতিপয় ব্যক্তির অনুরােধে তুমি উহার নূতন সংস্করণ করিতে চাও। দ্বিতীয় সংস্করণে ঐ পুস্তকের শেষভাগে গুরুদেবের জীবনবৃত্তান্ত সংযােগ করিবার অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিয়াছ। এদিকে আমার লিখিত “সিদ্ধজীবনী” নাম্নী পুস্তিকাও মুদ্রিত হইয়াছে। তুমি আবশ্যক বােধ করিলে উহা হইতে বারদীর ব্রহ্মচারিবাবার বৃত্তান্ত, যতদূর ইচ্ছ, উদ্ধত করিতে পার। এই মহাপুরুষের বিবরণ প্রচারিত হইলে আমি বিশেষ আহলাদিত হই। সম্প্রতি ঢাকাপ্রকাশ পত্রে আমি যে মৃত্যু ও মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা’ নামক প্রবন্ধ প্রকাশ করিতেছি, তাহারও সমগ্র কি কোন কোন অংশ, তুমি ইহাতে সংযােগ করিয়া দিলে লােকের আরও মঙ্গল হওয়ার ও প্রকৃত তথ্য জানিবার সুবিধা হইবে মনে করি। এজন্য আমি আহলাদ সহকারে অনুমােদন পূর্বক তােমাকে এই পত্র লিখিলাম। ইতি ১৩১৫ সন, ১৯শে পৌষ । শ্ৰব্ৰহ্মানন্দ ভারতী। ২১৪ বাঙ্গালাবাজার, ঢাকা। অপিচ এই গ্রন্থখানার (ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহের) সমালােচনায় ব্রহ্মচারিবাবার পরমভক্ত অন্যতম শিষ্য, রােয়াইল হাইস্কুলের ভূতপূৰ্ব্ব হেড মাষ্টার শ্ৰীযুক্ত বাবু মথুরামমাহন চক্রবর্তী, বি, এ, মহাশয় এই ক্ষুদ্র পুস্তক সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন তাহাও নিম্নে অবিকল উদ্ধত হইল। “ব্রহ্মচারিবাবা তাহার প্রিয় শিষ্য শ্রীযুক্ত যামিনীকুমার মুখখাপাধ্যায় মহাশয়কে প্রসঙ্গত প্রশ্নোত্তর ক্রমে সময়ে সময়ে যে কতকগুলি উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন, এই পুস্তকে সেই অমূল্য ও সারগর্ভ উপদেশগুলিই সন্নিবেশিত হইয়াছে। অল্প কয়েকটী কথায় বাস্তবিকই ধর্মের সার সংগ্রহ . করা হইয়াছে। তাই বলি গ্ৰন্থখানা সার্থকনামা হইয়াছে। বাস্তবিকই সুগন্ধি গােলাপনিৰ্যাস ও গােলাপ জলে যে প্রভেদ, এই সদুপদেশগুলি ও অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থে ঠিক সেই প্রভেদ। কয়েক ফোঁটা দ্বারাই এক বােতল প্রস্তুত হইতে পারে। ধর্মসম্বন্ধে এমন কোন প্রশ্ন হইতে পারে না, যাহার সুমীমাংসা এই কয়েকটা উপদেশ দ্বারা সুসম্পন্ন হয় না। ইহাকেই বলে বাক্‌সিদ্ধ মহাপুরুষ।” এইরূপ আরও কতিপয় ভক্ত শিষ্যের প্রবর্তনীয় ধর্মসার-সংগ্রহ দ্বিতীয়বার মুদ্রিত করিতে প্রবৃত্ত হইলাম এবং তাহাদের কাহারও কাহারও অনুরােধে ব্ৰহ্মচারিবাবার লৌকিক ও অলৌকিক জীবনবৃত্তান্ত, যতদূর জানিতে পারিয়াছি সংগ্রহ করিয়া, গ্রন্থের শেষ ভাগে সংযােজিত করিতে প্রয়াস পাইলাম। এস্থলে কৃতজ্ঞতার সহিত ইহাও প্রকাশ করা আবশ্যক বােধ করিতেছি যে, সিদ্ধজীবনীকার শ্রীযুক্ত ব্রহ্মানন্দ ভারতী মহাশয় তদীয় গ্রন্থ হইতে তাহার সংগৃহীত ব্রহ্মচারিবাবার জীবনবৃত্তান্তের অধিকাংশ উদ্ধত করিতে অনুমতি প্রদান করিয়া আমার প্রতি যে অনুগ্রহ ও দয়া প্রকাশ করিয়াছেন, বাবা তাহার স্বাভাবিক ঔদার্যের যথেষ্ট পরিচয় প্রদান করিয়াছেন এবং আমাকেও চিরকৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ রাখিয়াছেন। এস্থলে আমার গুরুভাই এবং বাবার একজন প্রিয়তম শিষ্য উল্লিখিত ব্ৰহ্মানন্দ ভারতী মহাশয়ের সম্বন্ধে দুচার কথা না লিখিয়া চলিয়া যাওয়া একান্ত অসঙ্গত ও অকৃতজ্ঞতার নিদর্শন বলিয়া, সংক্ষেপে তাহার একটু পরিচয় দিতে বাধ্য হইলাম। বাবার এই প্রিয়তম শিষের নিবাস বিক্রমপুর পশ্চিমপাড়া গ্রাম। ইনি কুলীনবংশীয়। ইহার লৌকিক নাম তারাকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়। ব্ৰহ্মচারিবাবা দেহধারী থাকা অবস্থায় ইনি সৰ্ব্বদাই তঁাহার চবণ দর্শনার্গে বারদী যাইতেন। বাবা ইহাকে সবিশেষ অনুগ্রহ ও স্নেহ করিতেন। আধ্যাত্মিক উন্নতি দেখিয়া বাবা আপনা হইতেই ইচ্ছা করিয়া ইহাকে ‘ব্রহ্মানন্দ ভারতী’ এই উপাধি প্রদান করেন। আমরা বাবার নিজ মুখেই শুনিয়াছি, তাহার গুরু সর্বশাস্ত্রবিৎ পণ্ডিত ভগবান্ গাঙ্গুলী পুনরায় ব্রহ্মানন্দ ভারতী রূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। আমরা এই গ্রন্থে পণ্ডিতবর ভগবান্ গাঙ্গুলীর কথা অনেক স্থানেই উল্লেখ করিয়াছি। ব্রহ্মচারিবাবা যখন হিমালয়ে যাইয়া পরম সিদ্ধি লাভ করিলেন, তখন গুরু ভগবান্ গাঙ্গুলীর সিদ্ধি লাভ হইল না বলিয়া, তাহার জন্য গভীর শােক প্রকাশ করিয়াছিলেন। সেই সময়ে গুরু ভগবান্ গাঙ্গুলী ব্ৰহ্মচারিবাবাকে বলিয়াছিলেন--“আমি এজন্মে সিদ্ধিলাভে কৃতার্থ হইতে পারিলাম না। দেহ ত্যাগ করিয়া পুনরায় জন্মগ্রহণ করিতে চলিয়াছি। পর জন্মে তুমি আমাকে কৰ্ম্মমার্গে চালাইয়া মুক্তির পথে অগ্রসর হইতে সাহায্য করি। আমি চিরদিনই জ্ঞানপথাবলম্বী। কর্মদ্বারা যে মুক্তি (ব্রহ্ম) লাভ হইতে পারে, ইহা আমার এতদিন বিশ্বাস ছিল না। তােমাকে দেখিয়া এখন বিশ্বাস হইল। পর জন্মে তুমি গুরু হইয়া আমাকে শিষ্যরূপে শাসন করিবে।” এই সম্বন্ধে গুরু শিষ্যের মধ্যে যে সকল কথােপকথন হইয়াছিল, তাহা সিদ্ধজীবনীতে বর্ণিত আছে। স্থানাভাবে এস্থানে তাহা বিস্তার করিয়া লিখিতে বিরত রহিলাম। বাস্তবিক ‘ব্রহ্মানন্দ’ গুরুদত্ত নামের সম্পূর্ণ যােগ্যতা লাভ করিয়াছেন। ইহার বাহ ও আভ্যন্তর উভয়বিধ লক্ষণ দৃষ্টেই আমাদের দৃঢ় প্রতীতি হইতেছে যে, আজ হউক, কি দুদিন পরে হউক, ইনি ব্ৰহ্মদর্শনে চরিতার্থ হইবেন। ইনি ইদানীং ৩ কাশীধামে বাস করিতেছেন। শিশুকাল হইতেই ইহার ব্রাহ্মণতের দিকে অনিবাৰ্য গতি প্রত্যক্ষ করিয়া আসিতেছি। ইনি যৌবনে ঢাকার নিকটবর্তী নারায়ণগঞ্জ মহকুমায় মুনসেফ, কোর্টের উকীল ছিলেন। ব্যবসায়ে বেশ খ্যাতি প্রতিপত্তিও বৃদ্ধি পাইতেছিল। কিন্তু হঠাৎ পূৰ্ব্বসংস্কারের বলবতী প্রেরণার বশীভূত হইয়া, সেই অর্থকরী জীবিকা পুরীষরাশির ন্যায় ত্যাগ করিয়া উদাসীনের অবস্থা লাভ করিয়াছেন। ঢাকার অন্যতম ডিপুটী মাজিষ্ট্রেট শ্ৰীযুক্ত বাবু বরদাকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় ইহার অনুজ ভ্রাতা। বর্তমান সময়ে অনেক উন্নতিশীল প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ইহার শিষ্যশ্রেণীভুক্ত, তন্মধ্যে আমেরিকাবাসী আচাৰ্য্য প্রেমানন্দ ভারতী (বাবা ভারতী) অন্যতম। শুনিতেছি বাবা ভারতী আমেরিকায় অনেক ইংরাজ শিষ্য করিয়াছেন। ব্রহ্মানন্দ ভারতীতে যে ব্রহ্মচারিবাবার শক্তি বহুল পরিমাণে সংক্রামিত হইয়াছে তাহার কোনও সংশয় নাই। ব্রহ্মচারিবাবা জাতিস্মর ছিলেন, তাই তিনি গুরু ভগবান গাঙ্গুলীকে তারাকান্ত জন্মেও দেখিয়াই চিনিতে পারিয়াছিলেন। আমরা এই জন্মেও ব্রহ্মানন্দের শাস্ত্র বিষয়ে ঐকান্তিক প্রবৃত্তি এবং জ্ঞানলি প্রত্যক্ষ করিয়া বুঝিতে পারিতেছি যে ইনি, খুব সম্ভব, সেই ভগবান্ গাঙ্গুলীই হইবেন। ভগবানের সংসার ত্যাগ করিয়া যাওয়ার প্রবৃত্তিও পূর্ব হইতেই ছিল, অন্যথা তিনি প্রস্তাবমাত্রই ব্রহ্মচারী ও বেণীমাধবকে লইয়া তৎক্ষণাৎ গৃহ ছাড়িয়া যাইতে প্রস্তুত হইতেন না। ব্ৰহ্মানন্দ ও বাল্যকাল হইতেই এই সংসারবৈরাগ্যের ভাব পােষণ করিয়া আসিতেছিলেন, তাই ব্রহ্মচারীর সহিত কিয়ৎকাল আলাপের পরই তাহার সংসারত্যাগের ইচ্ছা বলবতী হইয়া পড়ে। তখনই ওকালতী ত্যাগ করিয়া উদাসীনের ন্যায় ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া বেড়াইতে থাকেন। পূৰ্ব্বজন্মার্জিত সংস্কার ভিন্ন হঠাৎ এরূপ মতি গতি লােকের হয় না। তাই মনে হয়, ব্ৰহ্মানন্দ নিশ্চিত ব্রহ্মচারিবাবার গুরু সেই ভগবান্ গাঙ্গুলীই হইবেন। অবশেষে আমি কৃতজ্ঞ হৃদয়ে ইহাও জানাইতেছি, যে ঢাকা কিশােরীলাল জুবিলী স্কুলের হেড পণ্ডিত শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত আমীন বেদান্তবাগীশ মহােদয় “ধৰ্ম্মসার-সংহের” রচনা ও শ্রমসংশােধনের সাহায্য করিতে অকাতরে যেরূপ পরিশ্রম স্বীকার করিয়াছেন, তাহা তাঁহার স্বাভাবিক উদারতার ও নিঃস্বার্থ পবােপকারিতার অন্যতম দৃষ্টান্ত। আমি অকপটভাবে স্বীকার করিতে বাধ্য, যে তাহার ন্যায় পণ্ডিতের সাহায্য না পাইলে আমাকর্তৃক এই পুস্তকের যথাযথ প্রণয়ন কখনও সম্ভবপর হইত না। পণ্ডিত মহাশয়ের এই মহানুভবতার জন্য আমি তাহার নিকট বিশেষরূপে ঋণী। অথবা তাহাই বা বলি কেন ? ব্রহ্মচারিবাবার প্রতি তাঁহার যেরূপ অকৃত্রিম ভক্তি ও সরল বিশ্বাস দেখিতে পাই, তাহাতে আমার মনে হয়, বাবাই বা তাহাকে এই কাৰ্যে ব্ৰতী করিয়া থাকিবেন। তৃতীয় সংস্করণ। দ্বিতীয় সংস্করণের বহিগুলি অতি অল্প সময়েই নিঃশেষিত হওয়াতে তৃতীয় সংস্করণ করিতে বাধ্য হইলাম। দেখিতেছি বাবার অমৃতােপম উপদেশাবলা ধৰ্ম্মজিজ্ঞাসু সকলেরই আদরণীয় হইতেছে। মহাপুরুষের ইচ্ছাশক্তি দ্বারাই এইরূপ হইতেছে ও হইবে, ইহাই আমার বিশ্বাস। চতুর্থ সংস্করণ। স্কুল সমূহের কর্তৃপক্ষ মহামান্য ডিরেক্টার বাহাদুর কর্তৃক “ধর্মসার- সংগ্রহ থানা ঢাকা, প্রেসেডেন্সী ও বর্ধমান্ বিভাগের বিদ্যালয়সমূহের জন্য প্রাইজ ও ব্রেরীর পুস্তকরূপে অনুমােদিত হইয়াছে। স্কুলে ছাত্রগণেব ধৰ্ম্মশিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা আছে। আশাকরি প্রত্যেক স্কুলের লাইব্রেরীতে এই ধর্মগ্রন্থখানা শিক্ষক মহােদয়গণ রাখিয়া নিজে ইহা অধ্যয়ন করিবেন এবং ছাত্রগণকেও পড়িতে উপদেশ দিবেন। বিনীত- যামিনীকুমার দেবশর্মা মুখখাপাধ্যায়, ঢাকা। =

No text on this page.

শ্রীশ্রীলােকনাথে জয়তি
পৰ্ম্মসা-সংগ্রহ।
শ্রীশ্রীলােকনাথ-স্তোত্রম।
আজন্ম ব্রহ্মচারী ব্রতনিশিতপু বীৰ্য্যমজ্জাস্থিসার,
ব্রাহ্মং তেজঃ সমিদ্ধং শ্রিতমিব বিমলং কায়মুদ্ধতকামঃ।
নির্লিপ্তাহপি ত্রিলােক্যা হিতমতিকৃপয়া চিল্লিপ্ত এব,
ব্ৰহ্মানন্দস্বরূপঃ পরমগুরুরসৌ মুভয়েহস্ত প্রজানাম্ ।
জন্মাবধি ব্রহ্মচারী ব্রতশিতকায়।
অস্থি-মজ্জা-বীৰ্য-মাত্ৰ-শেষ দেহ যায় ।
প্রজ্বলিত ব্ৰহ্মতেজঃ, পবিত্ৰমূরতি
ধরি যেন উপনীত, জগতের গতি।
নিলিপ্ত তথাপি, ভাবি ত্রিলােকের হিত,
কৃপা করি লিপ্তবৎ যাঁর আচরিত ।
ব্ৰহ্মানন্দময় যিনি দেশিকের গুরু।
জগতের মুক্তিহেতু বাঞ্ছাকল্পতরু।
শ্ৰীযুক্ত পণ্ডিত রজনীকান্ত আমীন
বেদান্তবাগীশ বিরচিত।

২
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
১। ১১।
নিঃসঙ্গে বিশ্বসঙ্গী সকলজনিমতশ্চাত্মদৃষ্ট্যানুপ,
প্রেমাক্ষিভ্যাং স্থিরাভ্যাং চিরমিহ যুগপৎ সৰ্বসাম্মুখ্যমিষ্য
নিদ্বন্দ্বঃ শুদ্ধিবুদ্ধ্যোনরুপমনিলয়শ্চাত্মসংস্থে বিভূত্যা
গীতার্থে দেহবদ্ধো জয়তি সকলয়া লােকনাথঃ সনাথঃ।
অনাসক্ত বটে, কিন্তু আসক্ত আবার
বটে বিশ্বে-যেহেতু জনম আছে যার
তারি প্রতি আত্মবােধে দৃষ্টিপাত করে ;
স্থিরপ্রেমে তথা স্থিরনয়নে সঞ্চরে
সতত এদেশে, সবাকার সম্মুখীন
একই সময়ে হয়ে ; বটে দ্বন্দ্বহীন,
আত্মসংস্থ ; শুদ্ধি আর বুদ্ধি দোহাকার
অতুল আস্পদ ; দেহাশিত গীতাসার ;
সকল বিভূতিযুত-সে হয় আমার
লােকনাথ, হ’ক তার জয় জয় কার।
;
ব্ৰহ্মচারিবাবার জনৈক ভক্তকর্তৃক বিরচিত।

ধর্মসার-সংগ্রহ।
•••••
na,hAn। "•••••• • •।
২। তিনি
অবতরণিকা।
প্রবন্ধ মুখে ঐ যে উজ্জ্বল দিব্য শ্ৰীমুর্তিটী দেখিতেছি,
উহা কাহার মূৰ্ত্তি ? তিনি কে ?
মুর্তিমতী গীতা; জীবন্ত গীতা।
তিনি এক সময়ে উপদেশস্থলে বলিয়াছিলেন “গুরু অনন্ত
সাগরের ন্যায় অনন্ত রত্নের আধার। সাগর কাহাকেও নিমন্ত্রণ
করিয়া আনেন না, যে ডুবারু যত পারে তাহা হইতে রত্নরাশি
কুড়াইয়া লয়; সাগর কাহাকেও নিষেধ করেন না।” যতই
প্রবেশ করি, ততই ঐ অসীম সাগরে অনন্ত রত্নরাশি দেখিতে
পাই। তাই বলি-
৩। তিনি গুরু। তিনি জ্ঞানস্বরূপ। জ্ঞানদান
করিয়া বহুলােকের অজ্ঞানতা নাশ করিয়াছেন। অজ্ঞান
ধ্বংসক ব্রমগুরুরেব ন সংশয়ঃ।” জ্ঞান
কি ? অজ্ঞান কি ? বিদ্যা কি ? অবিদ্যা কি ? জীবে ব্রহ্মে প্রভেদ
কি ? ইত্যাদি বিষয় বুঝাইয়া দেওয়াতে তাঁহার কৃপায় অনেকেই
ব্ৰহ্মানন্দলাভের পথ পাইয়াছেন।
৪। তিনি প্রেমস্বরূপ—প্রেম দান করিয়া তিনি
বহুলােকের মন, অর্থাৎ পাপ ও পুণ্য, হরণ করিয়াছেন। তাই
তাহার নাম হরি। যত লােকই ব্রহ্মচারিবাবার নিকট
গিয়াছেন, সকলেই তাঁহার প্রেমে মুগ্ধ হইয়াছেন এবং প্রত্যেকেই
বলিয়াছেন, কেহ কেহ এখনও বলেন “ব্রহ্মচারিবাবা সর্বাপেক্ষা
?

৪
ধর্মসার-সংগ্রহ
আমাকেই অধিক ভাল বাসিতেন।” তঁাহার উজ্জ্বল অনিমেষ নেত্র
দুইটীর দিকে যাঁহারা যেখানে থাকিয়া যুগপৎ দৃষ্টিপাত করিয়াছেন
তাহাদের প্রত্যেকেই মনে করিয়াছেন ব্রহ্মচারিবাবা আমাকেই
সস্নেহনয়নে দর্শন করিতেছেন।
(ক) তিনি ভবরোগেৱ বৈদ্য। তাঁহার
নিকট যাইয়া বহুলােক ভবােেগ হইতে আরােগ্য লাভ করিয়া
নিত্যানন্দ ভােগ করিয়াছেন এবং কেহ কেহ এখনও করিতেছেন।
অনেকেই বিরতা লাভ করিয়াছেন এবং বহুলােক তাহা লাভ
করিবার পথ পাইয়াছেন।
৫। (খ) তিনি শারীরভােগেরও বৈদ্য।
প্রচলিত কথায় বলে “উদরী, বাদুড়ি, যক্ষা—এই তিন রােগের
নাই রক্ষা।” ব্ৰহ্মচারিবাবার ইচ্ছামাত্র ঈদৃশরােগাক্রান্ত
বহুরাগী আরােগ্য লাভ করিয়াছে। এইরূপ আরও কতপ্রকার
উৎকটরােগাক্রান্ত রােগী যে, তাহার নিকট যাইয়া রােগমুক্ত
হইয়াছে, তাহা গণনা করিয়া শেষ করা যায় না।
৬। তিনি কল্পবৃক্ষ। তাহার নিকট যাইয়া কখনই
কেহ বিফল মনােরথ হয় নাই। যিনি যাহা চাহিয়াছেন, তিনি
তাহাই পাইয়াছেন। জ্ঞানপ্রার্থী জ্ঞান পাইয়াছেন, প্রেমপ্রার্থী
প্রেম পাইয়াছেন, বন্ধ্যা স্ত্রী পুত্র পাইয়াছেন, অন্ধব্যক্তি চক্ষু
পাইয়াছেন, নিধন ধন পাইয়াছেন, ব্যাধিগ্রস্ত স্বাস্থ্যলাভ
করিয়াছেন এবং মানসরােগী শান্তি ও বিজরত লাভ
করিয়াছেন। যাঁহার যে কোন বিষয়ে যে প্রকার সন্দেহ

ধর্মসার-সংগ্রহ
থাকুক না কেন, তাহার নিকট যাইয়া সকলেই সেই সন্দেহ
ভঞ্জন করিয়াছেন।
৭। (ক) তিনি পণ্ডিত। আত্মবৎ সব
ভুতেষু যঃ পশ্যতি স পণ্ডিতঃ।” তিনি জীব
মাত্রেরই ক্ষুধা তৃষ্ণায় আহুতি দিয়া ক্ষুৎপিপাসার নিবৃত্তি
করিয়াছেন।
৭। (খ) তিনি সর্বশাস্ত্রবিৎ পণ্ডিত। মৃত
পার্বতীচরণ রায় তাহার সময়ে ইউরােপীয় বিজ্ঞানে একজন
বড় পণ্ডিত বলিয়া গণ্য ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী হইয়া
বহুকাল সুখ্যাতির সহিত ডেপুটী মাজিষ্ট্রেটের কার্য করেন;
অবশেষে বিলাতে যাইয়া একটা ইংরেজ মহিলারও পাণিগ্রহণ
করেন। তৎপরে পুনরায় ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসিয়া একদা
বারদীর ব্রহ্মচারিবাবাকে দেখিতে যান এবং কথাপ্রসঙ্গে
তাহাকে বােটার্নীর (উদ্ভিজ্জ-তত্বের) একটী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা
করেন। ব্রহ্মচারিবাবা সেই প্রশ্নের এমন সন্তোষজনক উত্তর
দিয়াছিলেন যে তাহা শুনিয়া পাৰ্বতীবাবু আহলাদের সহিত
বলিয়াছিলেন, “আপনার ন্যায় পণ্ডিত ভারতবর্ষে আছে পূর্বে
জানিলে, আমি বিলাতে যাইতাম না।” অতঃপর পার্বতীবাবু
* “Froin Hinduism to Hinduism” নামক একখানা পুস্তক
লিখিয়া পুনরায় হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন। বঙ্গদেশের তৎকালিক
প্রধান নৈয়ায়িক স্বর্গীয় প্রসন্নকুমার তর্করত্ন মহাশয় ব্রহ্মচারিবাবার
ব্ৰহ্মবিদ্যার পরিচয় পাইয়া তাহার শিষত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন।
••

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ••• ১A,,,,। ৩। ৮। তিনি সর্বজ্ঞ ও ত্রিকালদর্শী। তাহার নিকট যে সকল লােক যাইত, তিনি তাহাদের প্রত্যেকেরই মনের অভিপ্রায় ও প্রশ্ন জানিতে পারিতেন। যে কেহ যে কোন শাস্ত্রের কি বিষয়ের যে কোন প্রশ্ন করিয়াছেন, প্রত্যেকেই তাহা হইতে তাহার সন্তোষজনক উত্তর পাইয়াছেন। পঁচিশ কি পঞ্চাশের বন্ধের ঘরে বাঁশ, বেত, খুটা ইত্যাদি কি পরিমাণ লাগিবে, তিনি তাহাও ঠিক বলিয়া দিতে পারিতেন। পাঁচজন কি পাঁচশত লােককে খাওয়াইতে হইলে, কিংবা উপনয়ন, বিবাহ, কি শ্রদ্ধে, কোন্ জিনিষ কি পরিমাণে লাগিবে, তাহা ঠিক উপদেশ করিতেন। বিদ্যার্থী ও মােকদ্দমাকারিদিগকে তিনি যখন যে পরামর্শ দিয়াছেন, তাহারা তদনুরূপই ফল পাইয়াছে। বনের ব্যাঘ্ৰ, সৰ্প প্রভৃতি হিংস্ৰজন্তুগণ এবং আকাশের মেঘও এই মহাপুরুষের আদেশ শিরােধার্য্য করিয়া চলিয়াছে। ব্রহ্মচারিবাবাকে বহুলােকেই একসময়ে বহুস্থানে ও ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে দেখিতে পাইয়াছেন। এই বিষয় ভঁহার নিকট যাঁহারা যাহার যাতায়াত করিয়াছেন, তাহারা অনেকেই প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। এবিষয়ে এস্থলে অনাবশ্যক ও বাহুল্য বোধে আর অধিক লেখা সঙ্গত মনে করিলাম না। তাঁহাকে জানিবার, কি তঁাহার পরিচয় দিবার শক্তি বা অধিকার আমার নাই। তবে “জহরী জহর চিনে”; পূজ্যপাদ মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী বলিয়াছেন—“হঁহার প্রতি রােমকূপে দেবতা; আমি ইহাকে ত্রিসন্ধ্যায় ত্রিবিধমূর্তি ধারণ করিতে দেখিয়াছি।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ৭ । তাই বর্ণাশ্রমধর্মাবলম্বী সাধারণ ব্রাহ্মণের ন্যায় ইহার ত্রিসন্ধ্যায় মন্ত্রপাঠ করিবার প্রয়োজন হয় না।” অতএবই বলিতে পারি- তাহার নাম ব্রাহ্মণ। শ্ৰীযুক্ত ব্ৰহ্মানন্দ ভারতী প্রণীত সিদ্ধজীবনীনামক গ্রন্থের সমালােচনা-প্রসঙ্গে, ব্রহ্মচারিবাবার পরমভক্ত অন্যতম শিষ্য শ্ৰীযুক্ত মথুরামােহন চক্রবর্তী বি, এ, মহাশয় তাহার সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন, তাহার কিয়দংশ নিম্নে উদ্ধত করা হইল। “বিশ্বগুরু শ্ৰীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারিবাৰ সিদ্ধ মহাপুরুষদিগের মধ্যে শ্রেষ্ঠস্থান অধিকার করিয়াছিলেন। লােকশিক্ষার জন্য এবং ব্রহ্মজ্ঞ ব্রাহ্মণের পদগৌরব ও প্রভাব যে অবতার হইতেওঁ অধিক তাহা বিষদরূপে দেখাইয়া দিবার নিমিত্ত, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ যে ব্রাহ্মণের পদচিহ্ন বক্ষে ধারণ করিয়াছিলেন, বারদীর মহাপুরুষ সেই ব্রহ্মজ্ঞ ব্রাহ্মণ ছিলেন। ব্রহ্মচারিবাৰা বলিয়া গিয়াছেন –‘আমি হিমালয় পর্বত হইতে নামিয়া নিম্নভূমিতে আসিয়া একটা ফুলের বাগান প্রস্তুত করিয়া গেলাম। সময়ে এই বাগানে এক একটী ফুল ফুটিবে, আর ফুলের গন্ধে জগৎ অামােদিত হইবে। তিনি মধ্যে মধ্যে শিষদিগকে ইহাও বলিতেন—একশত বৎসর পাহাড় পর্বত বেড়াইয়া বড় একটা ধন কামাই করিয়া বসিয়াছি ; তােরা ব'সে খাবি। তাই মনে হইতেছে সেই বাগানের এক একটি ফুল ফুটিতে আরম্ভ করিয়াছে, এবং তাহার সৌরভ আস্তে আস্তে ছড়াইয়া পড়িতেছে।”

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
বিশ্বশুরু খ্রীশ্রীলােকনাথ ব্রহ্মচারিবাবার
উপদেশ ।
ব্ৰহ্মচারিবাবা। যাহা ইচ্ছা হয় তাহাই কর, দেখিও যেন
তাপ না লাগে।
প্রঃ। তাপ শব্দের অর্থ কি ?
উঃ। সুখে অথবা দুঃখে, জয়ে অথবা পরাজয়ে, মনের যে
অবস্থা হয়, তাহার নাম “তাপ” ।
?
প্রঃ। আমি যাহা ইচ্ছা করি তাহাই করিব, এই কথা সত্য
হইলে চুরি ও পরদার প্রভৃতি উৎকট পাপকাৰ্যও আমি
করিতে পারি
উঃ। তুমি তাহা করিতে পায় না। করিতে চেষ্টা করিয়া
দেখিও, তুমি তাহা পারিবে না। জীব যতই শ্রেষ্ঠতা লাভ করে,
ততই সমাজে যাহাকে নিকৃষ্ট কাৰ্য বলে, সেই সকল কাৰ্য সে
করিতে পারে না ; করিলে তাপ লাগে। কারণ যাহার যে কৰ্ম্ম
শেষ হইয়া গিয়াছে সে আর তাহা করিতে পারে না। তুমি
এখন আর হাটুতে ভর দিয়া চলিতে পার না।
প্রঃ। পাপ কাহাকে বলে ?
উঃ। যাহাতে তাপ লাগে। সেই তাপ তােমার নিজেরও
হইতে পারে অথবা তােমার সমাজেরও হইতে পারে। যে কাৰ্য্য

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
দ্বারা তুমি নিজে তাপগ্রস্ত হও, অথবা তোমার সমাজকে
তাপগ্রস্ত কর, তাহাই পাপ কার্য্য।
প্রঃ। পাপকাৰ্য করা কি কৰ্তব্য ?
উঃ। কর্তব্য কি অকৰ্ত্তব্য, তাহা ব্যক্তিগত কথা। যাহা
তােমার অকৰ্তব্য তাহা অন্যের কর্তব্য এবং যাহা অন্যের অকৰ্তব্য
তাহ তােমার কর্তব্য।
আমার মাথাবেদনায় আমি তাপগ্রস্ত হইলাম ;
মাথাব্যথাও কি পাপ হইল ?
উঃ। ।
প্রঃ। ইহাতে পাপ কোথায় আছে, বুঝিলাম না।
উঃ। মাথা কি ? কাহার মাথা ? বেদনা কি ? কে বেদনা
বোধ করে ? ইত্যাদি বিষয় আলােচনা করিলে দেখিবে,
অবিদ্যাতেই (মনে) বেদনার উৎপত্তি, স্থিতি, ও লয়। তবেই
বুঝিতে পারিবে, যেখানে অবিদ্যা সেই খানেই পাপ এবং সেই
খানেই তাপ। বিদ্যা অর্থাৎ জ্ঞানে পাপ তাপ থাকে না।
(যখন দেখিলাম ধন ও জনের সৃষ্টি, স্থিতি, লয় এই তিন
অবস্থাই তাপজনক, তখন যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম)
প্রঃ। তাপশূন্য ত, বাবা, কোন কাৰ্যই দেখি না ?
উঃ। ঠিক কথা, ইহা জানিয়া যে কাৰ্য্য করে সেই মুক্ত।
কিঞ্চিৎ পরিমাণ তাপ বিনা কোন কাৰ্য্যই হয় না। কিঞ্চিৎ
পরিমাণ তাপ ছাড়া ঈশ্বরও সৃষ্টি করেন না।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। প্রঃ। ঈশ্বরও কিঞ্চিৎ তাপ ব্যতিরেকে সৃষ্টি করেন না, একথা বুঝিলাম না। উঃ। অজ্ঞানতাই তাপের মূল কারণ। ঈশ্বরও অবিদ্যার সাহায্য ব্যতিরেকে সৃষ্টি করেন না। অতএব কিঞ্চিৎ পরিমাণ তাপ সকল কাৰ্য্যেই আছে। গুরু কে ? উঃ। ঠেকা। যে, যে স্থানে ঠেকে, সে সেই স্থানেই শিক্ষা পায়। যাহার আদেশ তুমি অনুসরণ কর তিনিই তােমার প্রঃ। গুরুকে সর্বদা স্মরণ করিবে’ ইহার অর্থ কি ? গুরুর আদেশ সর্বদা স্মরণ করিবে। গুরুর আদেশই উঃ। প্রঃ। গুরুর আদেশ যদি গুরু হয়, তবে তাহার দেহকে আমি অনাদর করিতে পারি ? উ:। না। গঙ্গাজলের পাত্রকেও লােকে আদর করে। প্রঃ। গুরুর চরণ ধরিবে ইহার অর্থ কি ? গুরুর আচরণ ধরিবে, অর্থাৎ গুরু যে আচরণ করিয়া শিবত্ব লাভ করিয়াছেন, তদনুরূপ আচরণ করিবে- “মহাজনের যেই পথ, তাতে হবে অনুগত পূৰ্ব্বাপর করিয়া বিচার।” প্রঃ। গুরুকে “আসন দিবে”—ইত্যাদি গুরুগীতার বাক্য- গুলির অর্থ কি?

ধর্মসার-সংগ্রহ।
গুরুকে “আসন দিবে” অর্থাৎ গুরুর আদেশ হৃদয়ে
ধারণ করিবে। “বসন দিবে” অর্থাৎ আচ্ছাদন দিবে-অভক্ত
নাস্তিক প্রভৃতির নিকট তাঁহার আদেশ প্রকাশ করিবে না।
“বাহন দিবে” অর্থাৎ ভক্ত ও আস্তিক প্রভৃতির সহিত গুরুর
উপদেশ সম্বন্ধে আলোচনা করিবে। “ভুষণ দিবে” অর্থাৎ
তাহার কৃতী শিষ্য হইবার জন্য যত্ন করিবে—কৃতী শিষ্যই গুরুর
ভূষণ। “শয়ন দিবে” অর্থাৎ গুরুর আদেশ হৃদয়ে রাখিবে এবং
ক্রমে উহা নিজের প্রকৃতিগত করিয়া লইবে।
প্রঃ। “গুরুবৎ গুরুপুষুে” ইত্যাদির অর্থ কি ?
উঃ। গুরুর ন্যায় যােগ্য যে গুরুর পুত্র পৌত্রাদি তাহা
দিগকেও গুরুর ন্যায় ভক্তি করিবে।
গুরুর পুত্র কে ?
উঃ। তাঁহার ঔরস পুত্র বা গুরুর উপদেশে যাহার জ্ঞান
জন্মিয়াছে।
প্রঃ। গুরুপুত্র মুখ হইলেও যদি আমি তাঁহাকে ভক্তি
করিতে পারি, তাহাতে দোষ কি ?
উঃ। যদি’ শব্দ সংশয়াত্মক। তুমি পার কিনা তাহা দেখ ;
পারিলে লােক দেখান কাৰ্য্য করিলে তাহাতে লাভ না হইয়া
ক্ষতি হইবে।
গুরু শিষের কি করেন ?
উঃ। “অজ্ঞান-তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন-শলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ ॥”
প্রঃ।

১২
ধর্মসার-সংগ্রহ।
;
অর্থাৎ তিনি জ্ঞানরূপ অঞ্জনশলাকাদ্বারা অজ্ঞান মানবের
চক্ষু উন্মীলিত করেন।
আমি কে? আমার কর্ম কি ? আমি কোথা হইতে
আসিয়াছি ; কোথায় যাইব? গুরু কে ? গুরুর সহিত আমার
সম্বন্ধ কি ? জগতের সৃষ্টিকর্তা কে ? সৃষ্টিকৌশল কি? এই
সকল বিষয় গুরু শিষ্যকে বুঝাইয়া দিয়া সাধন পথে তাহাকে
সাহায্য করেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য-ব্রহ্মচারিবাবা প্রত্যক্ষবাদী ছিলেন
তিনি বলিতেন তুমি যাহা অনুভব করিতে পার নাই, তাহা
কাহাকেও বলিও না। তিনি গুরুর কাৰ্য্য কি ইহা প্রত্যক্ষভাবে
আমাকে বুঝাইয়া দিবার নিমিত্ত একদিন তাহার আহারান্তে
আমাকে ডাকিয়া নিয়া আমার সঙ্গে একপাত্রে আবার ভোজন
করিতে আরম্ভ করিলেন ; আমাকেও আহার করাইতেছেন,
নিজেও আহার করিতেছেন। তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
“যামিনি! কি কাৰ্য্য হইতেছে ?” আমি বলিলাম-“আপনি আমার
মুখে অন্ন তুলিয়া দিতেছেন, আর আমি চিবাইয়া গলাধঃ
করিতেছি।” তাহা শুনিয়া তিনি বলিলেন—“গুরু শিষ্যের এই
পর্যন্তই করেন—মুখে উঠাইয়া দেন এই পর্যন্তই ; শিষ্য নিজে
চিবাইয়া উদরস্থ করিবে।”
প্রঃ। বেদ, বেদান্ত, তন্ত্র, পুরাণ, গুরুগীতা, ভগবদ্গীতা,
চণ্ডী প্রভৃতি উৎকৃষ্ট শাস্ত্র পাকা সত্বে আবার শুরুর প্রয়ােজন
কি ?

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ম } ক উ। শাস্ত্র জ্ঞানশিক্ষা দিতে পারে কিন্তু শাস্ত্র পাঠে বিজ্ঞান লাভ হয় না; অর্থাৎ যাঁহার প্রত্যক্ষ অনুভূতি হইয়াছে তিনি ভিন্ন শাস্ত্রের অর্থ ও তাহার প্রকৃত মৰ্ম্ম, অন্যে বুঝিতে পারেনা। তুমি যেসকল শাস্ত্রের নামােল্লেখ করিলে, মনােযােগ- পূৰ্ব্বক অধ্যয়ন করিলে দেখিতে পাইবে, প্রত্যেক শাস্ত্রই সম্যক উপদেশ দিয়াও বলিয়াছেন—তুমি গুরুর নিকট যাইয়া উপদেশ গ্রহণ কর। যথা- “তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং আনিনস্তত্ত্বদনিঃ ॥” (শ্রীমদ্ভগবদ্গীত) অর্থাৎ গুরুর পাদ বন্দনা করিয়া তাহার আরাধনা করিয়া, এবং তাহাকে পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করিয়া, সেই তত্ত্ব (ব্ৰক্ষ্ম ) জ্ঞাত হইবে, তত্ত্বদশী জ্ঞানিগণ তােমাকে সেই জ্ঞান উপদেশ করিবেন। অপিচ “ন গুরােরাধকং ন গুয়ােরধিকং ন গুরােনধিক। (গুরুগীতা ) অর্থাৎ গুরু অপেক্ষা অধিক (শ্রেষ্ঠ) নাই। গুরু অপেক্ষা অধিক নাই ! গুরু অপেক্ষা অধিক নাই ! গুরুগীত অতিশয় দৃঢ়তার সহিত এই বাক্য তিনবার উচ্চারণ করিয়াছেন। অথচ্চ- “যজ্ঞ-দান-তপােব্ৰত-জপ-তীর্থানুসেবন। গুরুতত্ত্বমবিজ্ঞায় নিষ্ফলং নাত্ৰ সংশয়ঃ ।”

১৪
ধর্মসার-সংগ্রহ
অর্থাৎ গুরুতত্ত্ব (গুরু কি পদার্থ) তাহা না জানিয়া যজ্ঞ, দান,
তপঃ, ব্ৰত, জপ ও তীর্থবাসের অনুশীলন করিলে, সে সমস্তই
বিফল হয়, সন্দেহ নাই।
শাস্ত্র মােক্ষলাভের প্রধান উপায়। গুরুর সাহায্যে সেই
শাস্ত্রানুসারে চলিতে অভ্যাস করিতে হয়।
প্রঃ। গুরুগীতাতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের গুরুর ধ্যান
লিখিবার কারণ কি?
উঃ। গুরু অনন্ত ; তাহার মহিমা এবং মূৰ্ত্তিও অনন্ত।
তন্মধ্যে গুরুগীতাতে ভঁহার কিঞ্চিত্মাত্র প্রভাব ও কয়েকটী মাত্র
মুর্তির উল্লেখ আছে। অধিকারভেদে যে যে ভাবে গুরুকে
ধরিতে ও বুঝিতে পারিবে, সে সেইভাবেই ক্রমে উন্নতি লাভ
করিতে পারিবে।
প্রঃ। আমার বন্ধনের ও মুক্তির কারণ কি?
। একই কারণ, যিনি তােমাকে বদ্ধ করেন, তিনিই
আবার তােমাকে মুক্ত করেন। তিনি—দেবী ভগবতী মায়া।
“তয়া বিস্জ্যতে বিশ্বং জগদেচ্চরাচরম্।
সৈষা প্রসন্ন বরদা নৃণাং ভবতি মুক্তয়ে ।
সা বিদ্যা পরমা মুক্তেহেতুভূতা সনাতনী।
সাংসারবন্ধহেতুশ্চ সৈব সৰ্বেশ্বরেশ্বরী।” (চণ্ডী)
অর্থাৎ সেই ভগবতী মায়াদেবীই স্থাবর জঙ্গম সমস্ত জগৎ সৃষ্টি
করিয়াছেন, আরাধনা করিয়া সেই দেবীকে প্রসন্ন করিতে
উঃ।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
পারিলেই তিনি বরদাত্রী হইয়া অর্থাৎ অনুগ্রহ করিয়া . জীবকে
মুক্ত করেন। তিনিই জীবের মুক্তির হেতু নিত্যা ও পরমা
বিদ্যা। সংসারবন্ধনেরও তিনিই কারণ এবং তিনিই সমস্ত
ঈশ্বরেরও ঈশ্বরী। তুমি ইহার সঙ্গে এই মহাবাক্যটাও স্মরণ
রাখিবে। যথা :-
“পৃথিব্যাং যানি ভূতানি জিপেস্থ-নিমিত্তকম্।
জিহােপস্থ-পরিত্যাগে পৃথিব্যাং কিং প্রয়ােজনম্ ॥”
( ভগবান্ শঙ্করাচাৰ্য)।
অর্থাৎ জিহ্বা ও উপস্থ, এই দুয়ের কৰ্ম্মই তােমার কৰ্ম্ম। এই
দুই কৰ্ম্মদেবতাকর্তৃকই তুমি বদ্ধ। জিহবা ও উপস্থের কাৰ্যত্যাগ
হইলে তুমিও মুক্ত হও।
*নৈকাদিত্যে বিভােজন” এই বাক্যের
অর্থ তিনি এইরূপ করিতেন—একবার ক্ষুধাতে দুইবার ভােজন
করিওন, অর্থাৎ ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য যে পরিমাণ ভােজন করা
আবশ্যক, ততটা মাত্র আহার করিও, অতিরিক্ত আহার করিওনা ।
ক্ষুধা না হইলে অথবা ক্ষুধার নিবৃত্তি হইলে, লােভে অথবা
কাহারও অনুরােধে আহার করিওনা। ক্ষুধা লাগিলেই আহার
করিবে, ক্ষুধা হইলে অভুক্ত থাকিবেনা। ক্ষুধার পূজা করিও,
জিহ্বার অর্থাৎ লােভের পূজা করিওনা।
“যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা।” (চণ্ডী)
অর্থৎ সেই দেবী ভগবতী সপ্রাণীতেই ক্ষুধারূপে অবস্থান
করিতেছেন।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ
অপিচ—“তুমি আহার কর, মনে কর,
আহুতি দেই শ্যামা মাকে।” (রামপ্রসাদ)
প্রঃ। জিহ্বা ও উপস্থের কৰ্ম্ম নিবৃত্তির উপায় কি ?
এ সম্বন্ধে একজন শাস্ত্রকার বলিয়াছেন—
“ন জাতু কামঃ কামানামুপভােগেন শামতি।
হবিষ কৃষ্ণ বত্মেব ভুয় এবাভিবর্ধতে।”
অর্থাৎ ভােগ্যবস্তুর উপভােগদ্বারা কামনার (বাসনার) নিবৃত্তি
হয় না। অগ্নি যেমন ঘৃতাহুতি পাইলে আরও প্রজ্বলিত হইয়া
উঠে, বাসনাও তেমন উপভােগদ্বারা ক্রমেই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।
পক্ষান্তরে অপর একজন পণ্ডিত বলিয়াছেন—
মাহভুক্ত ক্ষীতে কর্ম”
;
অর্থাৎ বিনা ভােগে কর্মের ক্ষয় হয় না। এই দুই শাস্ত্রোক্ত
বাক্যের সামঞ্জস্য কোথায় ?
উঃ। প্রথম শাস্ত্রবচনে বলা হইয়াছে—“উপভোগেন”
উপভােগদ্বারা; কিন্তু দ্বিতীয় শাস্ত্রবাক্যে উক্ত হইয়াছে “অভুক্ত”
অর্থাৎ ভােগবিনা ; তবেই বুঝিতে হইবে – উপভােগর কর্ম
( বাসনা) বৃদ্ধি পায়, জয় পায় না। কিন্তু ভােগদ্বারা ক্রমে
কৰ্ম্মের ক্ষয় হয়। কর্মের ক্ষয় না হইলে জবি মুক্ত হয় না।
প্রঃ। ভোগে ও উপভােগে প্রভেদ কি ?
উঃ। পতি ও উপপতি এই দুইয়ে যে প্রতে, পত্নী ও
;

ধর্মসার-সংগ্রহ।
১৭
উপপত্নী এই দুইয়ে যে প্রভেদ ; ভােগে ও উপভােগেও ঠিক
সেইরূপ প্রভেদ। বিচারপূর্বক ভােগকে—“ভােগ”, এবং
অবিচারে ভােগকে—“উপভােগ” কহে। জিহবা ও উপস্থের
ভােগের জিনিষ লইয়া নাড়াচাড়া করা এবং প্রকৃতরূপে সম্যক
ভােগ না করাও “উপভােগ”। যথা-সুখাদ্য জিনিষ খাওয়ার
ইচ্ছায় নাড়াচাড়া করিলে, কিন্তু খাইলে না, ইহারও নাম
উপভােগ”। এই প্রকার উপভােগে, অথবা লােভের দাস হইয়া
প্রকৃতির আকাঙ্ক্ষার অতিরিক্ত পরিমাণে ভােগ করিলে, বহুমূত্র,
প্রমেহ, অজীর্ণ, জ্বর ইত্যাদি নানাবিধ রোগ হয়। অতএব
মুমুক্ষু আহার ও বিহার বিশেষ বিচারপূর্বক করিবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :--প্রকৃতি দ্বিবিধা-বিদ্যা ও অবিদ্যা।
বিদ্যার পূজায় জীব মুক্ত হয়, অবিদ্যার পূজায় বদ্ধ হয়। অনেক
সময়ে বিদ্যা ও অবিদ্যার সন্ধিস্থল ( Line of demarcation)
অর্থাৎ কোথায় যাইয়া উভয়ের অধিকার বা সামা মিলিয়াছে,
নির্দেশ করা দুষ্কর। যেমন উদ্ভিজ্ঞতত্ত্ব (Botany) ও
জীবতত্ত্ব (Zoology) এই উভয়ের অধিকার কোথায় মিলিয়াছে
নিশ্চয়রূপে দেখাইয়া দেওয়া কঠিন।
এইরূপ সন্ধিস্থলে সংশয় জন্মিলে ভক্তিপূর্বক জিজ্ঞাসু হইলে
“অন্তর্যামিরূপে গুরু দিবেন জানাইয়া।”
অপিচ-“বিষয়া বিনিবৰ্ত্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ।
রসবর্জং রসােহপ্যশ্য পরং দৃষ্ট। নিবৰ্ত্ততে।”
( শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা)

১৮
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ
অর্থাৎ অনাহার, ফলাহার ইত্যাদিদ্বারা ক্লিষ্টেন্দ্রিয় দেহীর
বানার রসবােধহেতু ভােগেচ্ছা রহিয়া যায়। বাসনার
মূলােৎপাটন করিতে এবং তাহাকে নিঃশেষ করিতে হইলে, এই
সকল কাৰ্য্য করিতে করিতে আস্তিক্যবুদ্ধিদ্বারা বহির্মুখ দেহা ক্রমে
অন্তর্মুখ হইয়া ব্ৰহ্ম, আত্মা অথবা ভগবানের দিকে চাহিয়া সর্বদা
তার সাক্ষাৎকার লাভ করিলে, ভােগবাসনার নিবৃত্তি হয়।
“ভেকে বৈরাগ্য নাই বিনা উপদেশে।
সাধিলে সিদ্ধি নাই বিনা কৃপালেশে।”
প্রঃ। আমি বদ্ধ অথবা মুক্ত, কিসে বুঝিব ?
উঃ। তাপই তাহার পরীক্ষাস্থল। যখন তােমার কিছুতেই
তাপ লাগিবেনা, সুখে বা দুঃখে, মানে বা অপমানে, শীতে বা
গ্রীষ্মে, একই অবস্থায় থাকিবে, তখনই বুঝিবে তুমি “মুক্ত”
হইয়াছ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য :-ব্ৰহ্মচারিবাবার কখনও ঘৰ্ম্ম, হাঁচি,
হাই অথবা দীর্ঘনিশ্বাস দেখি নাই।
প্রঃ। তাপ লাগিবার কারণ কি ?
উঃ। বাসনাই তাপের কারণ। যাহার বাসনা নাই তাহার
তাপও নাই।
প্রঃ। যখন তাপভিন্ন কোন কাৰ্য্যই নাই এবং বাসনাই
যখন তাপের মূল, তখন তাপের মূল কারণ “সমস্ত কাৰ্য্য ও স্ত্রী
পুত্র কন্যা ইত্যাদি” পরিত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস গ্রহণ করতঃ
গাছতলায় কি পাহাড়ে যাইয়া থাকাই ভাল।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
উঃ। তাহা ভাল হইলেও তুমি তাহা পার কই ? সাময়িক
ভ্রমবশতঃ মনে করিতে পাৰ তােমার বৈরাগ্য জন্মিয়াছে; কিন্তু
ভিতরে যে তােমার বাসনা আছে, অন্ধতাপ্রযুক্ত তুমি তাহা
দেখিতে পাও না। বাসনা থাকিতে গাছতলায় গেলেও তােমার
সন্ন্যাস হইবে না। এইমাত্র লাভ হইবে যে শাস্ত্রানুমােদিত
পরিণীতা স্ত্রী পরিত্যাগ করিয়া একটী সেবাদাসী গ্রহণ করিবে
প্রঃ। সন্ন্যাস ভাল অবস্থা কি না ?
।
উঃ। ভাল অবস্থা।
প্রঃ। তবে প্রকারান্তরে গাছতলায় কি পাহাড়ে যাইতে
নিষেধ করিলেন কেন?
উঃ। সন্ন্যাস—মনের অবস্থা, তাহা যাহার হয় নাই, তাহার
গাছতলায় কি পাহাড়ে গেলেও হইবে না। যাহার হইয়াছে
তাহার গাছতলায় কি সংসারে থাকিলেও হইয়াছে। অতএব
যাহার হইয়াছে, তাহার স্থান পরিবর্তনের প্রয়ােজনাভাব।
এয়ােজন থাকিলে সন্ন্যাস হয় না, কারণ তাহার অভাববােধ
রহিয়াছে।
সন্ন্যাস কাহাকে বলে ?
উঃ। “কাৰ্য্য পরিত্যাগ” এবং “কাৰ্য্য করা” এই উভয়কে
যে একই অবস্থা মনে করে, সেই সন্ন্যাসী। অলসতাপ্রযুক্ত
কর্মপরিত্যাগকে সন্ন্যাস” বলে না।
প্রঃ। পূর্বে বলিলেন, “পরিবর্তনের প্রয়োজনাব
কিন্তু পরিবর্তনে আপত্তিরই বা কারণ কি ?
প্রঃ।

ধর্মসার-সংগ্রহ
।
উঃ। বিশেষ কোনও আপত্তির কারণ নাই। তবে যিনি
ভয়ে অথবা কোনপ্রকার লােভে পরিবর্তনের চেষ্টা বা ইচ্ছা
করেন, তিনি নিকৃষ্ট লােক, সন্ন্যাসী হওয়া ত দুরের কথা।
প্রঃ। ভয়ে অথবা লােভে পরিবর্তনের ইচ্ছা কি অবস্থায় হয় ?
উঃ। এই সংসার ত্রিবিধ তাপে পূর্ণ। যথা-(১) বাক্যবাণ,
(২) বিত্তবিচ্ছেদবাণ ও (৩) বন্ধুবিচ্ছেদবাণ। যিনি এই তিনটী বাণ
( ত্রিবিধ তাপ) সহ্য করিতে পারেন, তিনি মৃত্যুকে জয় করিতে
পারেন। অনেকে এই ত্রিবিধ তাপের ভয়ে অথবা মানসম্রমাদির
লােতে পরিবর্তনের ইচ্ছা করেন। এই দ্বিবিধ লােকেই
মােহে অন্ধ। অতএব তাহাদের কাহারও সন্ন্যাস হয় নাই।
এ। বিত্যাগ করিয়া গেলে আর বিনাশের আশঙ্কা
রহিল না। বন্ধুত্যাগ করিয়া গেলে আর বন্ধুবিয়ােগের ভয়
থাকে না। বনে চলিয়া গেলে আর বাক্যবাণেরও আশঙ্কা
রহিল না।
তবে তাহাতে লাভ ভিন্ন ক্ষতি কি?
বনে যে পশু পক্ষী আছে তাহাতে আর তােমাতে
প্রভেদ কি ?
তবে কি আপনি ঐ সকল তাপের ভিতরে থাকাই
কর্তব্য মনে করেন ?
উঃ। হাঁ, মনে করি। কৰ্ম্মত্যাগ অপেক্ষা কর্ম করাই শ্রেয়।
প্রঃ। ঐ সকল তাপের কি কোন উপকারিতা আছে ?
উঃ। প্রচুর উপকারিতা। প্রহ্লাদ ও সীতাকে দেখ।
প্রঃ। প্রহলাদ ও সীতার কথা কি বলিলেন বুঝিলাম না।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
উঃ।
; তাহার
কেন? অবতর কি উদ্দেশ্যে হয়, তাহাত বুঝ ?
ভগবান্ ধৰ্ম্মরক্ষা করার জন্য যুগে যুগে অবতীর্ণ হন এবং নিজে
সেই ধৰ্ম্ম আচরণ করিয়া জীবকে শিক্ষা দেন।
প্রঃ। প্রলাদের এবং সীতার সম্বন্ধেত দেখিলাম তাহারা
ভগবানকে পাইতে যাইয়া কত উৎকট বিপদেই না পতিত হইলেন।
উঃ। ঘঁ, সত্য। কিন্তু তাহাৱা ত কখনও নষ্ট হয় নাই।
প্রঃ। তবে প্রহলাদসম্বন্ধে, কি সীতা সম্বন্ধে, আপনার
কথিত বাক্যদ্বারা কি উপদেশ পাইলাম ?
অত উৎকট তাপও যখন প্রহ্লাদকে অণুমাত্রও স্পর্শ
করিতে পারিল না, তখনই হরি তাহাকে কোলে নিলেন
পূৰ্বে নেন নাই। অগ্নিপরীক্ষার যখন সীতার অণুমাত্রও তাপ
লাগে নাই, তখনই হরি সীতাকে গ্রহণ করিলেন; তাহার পূর্বে
গ্রহণ করেন নাই। তােমাদেরও যখন এইপ্রকার অবস্থা হইবে
যে অবস্থায় কোনও তাপ তোমাদিগকে স্পর্শ করিতে পারিবে না,
তখনই হরি তােমাদিগকে কোলে নিবেন, তাহার পূর্বে
নিবেন না।
অতএব তােমরা সংসার ছাড়িয়া যদি পশুর মত
বনে যাইয়া থাকিতে ইচ্ছা কর, তবে সীতার ন্যায় তােমাদের
পরীক্ষাও হইল না, হরিকে পাওয়াও ঘটিল না। অতএব সমাঙ্গে
থাকিয়াই সাধন করিতে হইবে।
প্রঃ। তবে কি আপনি বলিতে চাহেন যে বদ্ধাবস্থাই শ্রেষ্ঠ
অবস্থা ।
বন্ধাবস্থাকে আমি শ্রেষ্ঠ অবস্থা বলি নাই এবং

ধর্মসার-সংগ্রহ বদ্ধাবস্থা শ্রেষ্ঠ অবস্থাও নয়। তবে বদ্ধাবস্থা মুক্তাবস্থার সোপান। তােমার হাতে যদি বাঁধ না থাকে, তবে তার আমি কি খুলিয়া দিব? যদি তুমি মুক্ত হইতে ইচ্ছা কর, তবে তােমর পূর্বে বদ্ধ হইতে হইবে। বদ্ধ না হইলে মুক্ত হওয়ার কোনও অর্থ থাকে না। বিশেষ দ্রষ্টব্য :-এইজন্যই মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত লােকস্থিতির অনুরােধে, আচার, জাতিভেদ, ও বর্ণভেদ প্রভৃতি শাস্ত্রোক্ত বিধানগুলি মানিয়া চলা একান্ত কর্তব্য। মুক্তাবস্থায় এই গুলি আপনা হইতেই চলিয়া যায়। তখন আর সংস্কারের কোন নাম গন্ধও থাকে না। প্রঃ। জীবের কি কি অবস্থা হয় ? উঃ। ত্রিবিধ অবস্থা ; (১) মুক্তাবস্থা (২) বদ্ধাবস্থা ও (৩) মুক্তাবস্থা। জীবের প্রথম অবস্থায় পিতা, মাতা, ভ্রাতা, বন্ধু ইত্যাদি বন্ধন, কি সমাজ বন্ধন থাকেনা। যথা--পশুজীবন ও পাৰ্বতীয় মনুষদের জীবন। দ্বিতীয় অবস্থায় পিতা, মাতা, স্ত্রী পুত্রাদির বন্ধন ও সমাজবন্ধন থাকে। যথা—তােমার 'ও হরিচরণ প্রভৃতির *। তৃতীয় অবস্থা আবার মুক্তাবস্থা অর্থাৎ যে অবস্থায় কোন বন্ধনই থাকেনা। যথা—আমার ও ত্রৈলঙ্গস্বামী ইত্যাদির। * হরিচরণ চক্রবর্তী ঢাকা জজকোটের উকীল এবং ব্রহ্মচারিবাবার পরমৎক্ত ছিলেন। তিনি ব্রহ্মচাঝিবাবার মুক্তি বক্ষে ধারণ করিয়া, তাহার রূপধ্যান ও নামজপ করিতে করিতে সজ্ঞানে দেহ ত্যাগ করিয়াছেন। শুনিয়াছি মৃত্যুর সময়ে তিনি স্ত্রী, পুত্র, ও কাদিগকে তাঁহার সম্মুখে আসিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। ।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
প্রঃ। প্রথম ও তৃতীয় অবস্থায় প্রভেদ কি ?
উঃ। প্রথম অবস্থা-জ্ঞানের অভাব, মােহ ও অন্ধতায়
পরিপূর্ণ। সে অবস্থায় জীব ‘আমি কে ? কেন আসিয়াছি ?
আমার কাৰ্য্য কি ? ইত্যাদি কিছুই জানে না। তৃতীয় অবস্থা
বিজ্ঞানের অবস্থা।
প্রঃ। দ্বিতীয় অবস্থার সহিত অন্য দুই অবস্থার প্রভেদ কি ?
উঃ। দ্বিতীয় অবস্থা—মধ্যম অবস্থা। প্রথম অবস্থার ন্যায়
অজ্ঞানের অবস্থাও নয়, তৃতীয় অবস্থার ন্যায় বিজ্ঞানের অবস্থাও
নয়। যে কথঞ্চিৎ জ্ঞান আছে, সেই জ্ঞানদ্বারাই বিচারপূর্বক
কৰ্ম্ম করিতে করিতে তৃতীয় অবস্থা প্রাপ্ত হয়।
প্রঃ। আমাকে দ্বিতীয় অবস্থার এবং আপনাকে তৃতীয়
অবস্থার লােক বলিলেন ; আপনার ও আমার কাৰ্যে প্রভেদ কি ?
উঃ। এই প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞাসা কর কেন? আমার
এখানে আসিয়া যদি আমার কাৰ্য্য না দেখ এবং তাহার সহিত
তােমার নিজের কাৰ্য্যের তুলনা না কর, তবে এখানে আসা
নিষ্প্রয়ােজন। আমার এখানেও কয়েকটা লােক আহার করে,
তােমার বাসায়ও কয়েকটী লােক আহার করে। আমার এখানে
যাহারা আহার করে, তাহাদের খাইবার জিনিষ কোথা হইতে
আসিবে, তাহারা কি খাইবে, তৎসম্বন্ধে আমার কোন চেষ্টা কি
ভাবনা নাই; তোমার চেষ্টা ও ভাবনা আছে। বিশেষ, তুমি
এই মনে কর, যে তুমিই তাহাদিগকে খাইতে দাও।
প্রঃ। আপনার চেষ্টা অথবা ভাবনা নাই কেন ? এবং

২৪ ধর্মসার-সংগ্রহ। •••• আমারই বা চেষ্টা অথবা ভাবনা থাকে কেন? উঃ। আমি জ্ঞানী, তুমি অজ্ঞান। আমি জানি আমি কাহাকেও খাইতে দেই না। যাহার এখানে আহাৰ্য আছে সে আহার করে, যাহার নাই সে আহার করে না ; তাহাতে আমার কোনও তাপ নাই। তােমার মনে এই ভয় আছে যে তুমি খাইতে দিতে না পারিলে সমাজের লোেক তােমাকে নিন্দা করিবে। আমার সে ভয় নাই। প্রঃ। ধর্ম কাহাকে বলে ? শাস্ত্রের মতে কিন্তু শাস্ত্র- বিহিত কাৰ্য্যই “ধর্ম” এবং শাস্ত্রনিষিদ্ধ কৰ্ম্মই “অধর্ম” বলিয়া উক্ত হইয়াছে। উঃ। সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই তিনগুণের যে কাজ তাহাই ধর্ম। অতএব যাহার যে গুণ তাহা অতিক্রম করিয়া ভ্রমবশতঃ যে যে কোন কাৰ্য্য করে তাহাই তাহার পক্ষে অধৰ্ম্ম। ভগবান্ রজোগুণান্বিত ক্ষত্ৰকুলজ অর্জুনকে যুদ্ধে নিযুক্ত করিলেন। “অহিংসা পাগমাধৰ্মঃ”, অহিংসা শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম (ব্রাহ্মণের ধর্ম) হইলেও তাহা তাঁহাকে করিতে দিলেন না। প্রঃ। আপনার মতে ও শাস্ত্রমতে কি কোনও প্রভেদ আছে? উঃ। কিছুমাত্র প্রভেদ নাই । প্রভেদ নাই। তবে শাস্ত্র মুক্তপুরুষের লেখা, বদ্ধজীব তাহা বুঝিতে অক্ষম, তাই তােমাকে বিশদরূপে বুঝাইয়া দিবার জন্যই প্রকারান্তরে উল্লেখ করিলাম। আমি “ধৰ্ম্ম” শব্দের যে ব্যাখ্যা করিলাম, ইহা মনে রাখিয়া শাস্ত্র পড়, দেখিবে আমার ব্যাখ্যার সহিত শাস্ত্রের কিছুমাত্র অনৈক্য নাই।

ধৰ্ম্মসারসংগ্রহ।
বথা—বীরাচার সাধক ছাগাদি বলি দিয়া কালীপূজা করে।
পক্ষান্তরে, পশ্বাচারী সাধক ছাগাদি বলি না দিয়া কেবল
নৈবেদ্যাদি দিয়াই সেই কালীরই পূজা করে। সাধকের গুণভেদে
আচারভেদ মাত্র।
তবে কি আপনার কথাতে আমি ইহাই বুঝিব ৰে
আমার যে গুণ আমি সেই প্রকার সাধনই করি ?
উঃ। তুমি জান কি না জান, তােমার যে গুণ সেই প্রকার
কাৰ্য্যই তুমি করিতেছ এবং তােমার কাৰ্য্যই তােমার সাধন।
তবে অর্জুনের যেমন মােহবশতঃ ‘যুদ্ধ করিব না” প্রতিজ্ঞা করা
সত্ত্বেও ভগবান্ তাহাকে যুদ্ধে নিযুক্ত করিয়াছিলেন, তুমিও
তদ্রুপ মােহবশতঃ বনে যাইয়া সন্ন্যাসী হইবে বলিয়া সংকল্প
করিয়াছিলে, তােমার সেই মােহ ও অজ্ঞানতা দেখাইয়া দিয়া
অামি তােমাকে সংসারে নিযুক্ত করিয়াছি। তোমাকে সংসারে
থাকিয়াই সন্ন্যাসী হইতে হইবে।
প্রঃ। আমার কি গুণ, আমার কি কৰ্ম্ম, আমি তাহা
উপায়ে নির্ধারণ করিব ?
উঃ। গভীর রাত্রিতে নির্জন স্থানে পূর্ণভাবে নিশ্চিন্ত হইতে
চেষ্টা করিয়া দেখিও, তােমার মন কোন্ দিকে যায়; তােমার মন
পুনঃ পুনঃ নিবারণ করা সত্ত্বেও যেদিকে যাইতেছে তাহাই তোমার
কর্ম; এবং সেই সময় ইহাও চিন্তা করিয়া দেখিও যে তুমি
সন্তদিন যে সকল কাৰ্য্য করিয়াছ তাহা সধান, কি
;
;

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
।
।।।।।
উঃ।
?
রজঃপ্রধান, কি তমঃপ্রধান। তােমার অধিকাংশ কাৰ্য্য যে
গুণের, তুমি সেই গুণবিশিষ্ট বট।
প্রঃ। সত্ত্বগুণের লক্ষণ কি ?
প্রকৃত ব্রাহ্মণের লক্ষণই সত্ত্ব গুণের লক্ষণ ; অর্থাৎ
শম, দম, তপঃ, শৌচ ইত্যাদি।
প্রঃ। রজোগুণের লক্ষণ কি ?
উঃ। দান, ঐশ্বৰ্য্য, বীরত্ব ইত্যাদি।
প্রঃ। তমােগুণের লক্ষণ কি
উঃ। হিংসা, নিদ্রা, তন্দ্রা, আলস্য, দীর্ঘসূত্রিতা ইত্যাদি।
প্রঃ। এই সমস্ত গুণ ও কাৰ্য্য প্রত্যহ চিন্তা করিলে আমার
কি লাভ হইবে ?
উঃ। সূর্যোদয়ে যেমন অন্ধকার থাকে না; গৃহস্থ জাগিলে
যেমন চোর পলায়ন করে ; সেই প্রকার পুনঃ পুনঃ আলােচনা
করিলে তােমার নিকৃষ্ট বৃত্তির কাৰ্য্যসমূহ দিন দিন পলায়ন
করিবে, তােমার দেহ একটী দেবমন্দির হইবে, ব্ৰহ্মশক্তি
তােমার হৃদয়কে অধিকার করিবে এবং তুমি ক্রমে ব্রাহ্মণত্ব
লাভ করিতে পারিবে।
প্রঃ। পূর্ণভাবে নিশ্চিন্ত হইতে চেষ্টা করিবার উদ্দেশ্য কি ?
উঃ। যে দিন পূর্ণভাবে নিশ্চিন্ত হইতে পারিবে, সেই দিন
ইহার উত্তর পাইবে ; আমার বলিয়া দেওয়া নিষ্প্রয়োজন ।
গুরু শিষ্যকে অসার ক্ষোদিতে বলেন, সারের কথা অগ্নে
;

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
২৭
।
বলিয়া দেন না; বলিয়া দিলে তাহা কল্পনাতে পরিণত হয় প্রকৃত
তত্ব অনুভূত হয় না।
প্রঃ। অসার কি ? সার কি ? অসার ক্ষোদিতে বলিবার
কারণ কি?
অসার ক্ষণকালস্থায়ী, সার চিরকালস্থায়ী। তােমার
দেহ ও মন অসার, তােমার আত্মা সার। তােমার দেহ ও
মন মায়াতে গঠিত, অতএব মায়ার অধীন। তােমার আত্মা
মায়ার অতীত। অসার ক্ষোদিতে বলিবার কারণ এই যে,
তােমার এমন কোন শক্তি নাই, এমন কোন উপকরণ নাই,
যদ্বারা তুমি হরিকে পাইতে পার, কি হরির সাধন করিতে পারি।
মায়ামুগ্ধাবস্থায় মায়ামুক্ত ভগবানের কোনও প্রকার অনুভূতি
হয় না। যতপ্রকার সাধন প্রণালী দেখ, সাধক জানে কি না
জানে, সকলেরই লক্ষ্য-দেহ ও মনের সাধন; দেহ ও মনকে
পবিত্র করা, দেহ ও মনকে শুদ্ধ করা। সকলপ্রকার সাধনেরই
মূলভিত্তি এক।
দেহ ও মনকে পবিত্র করিবার কি কোন বিশেষ
উপায় আছে?
উঃ। আছে ; সাত্ত্বিক আহারে দেহ পবিত্র হয় এবং
বাসনাত্যাগেতে মন পবিত্র হয়। যখন তােমার দেহ ও মন
পবিত্র হইবে, তখন বুঝিবে, হরি কেমন, তখন জানিবে হরি
তােমার কে।
প্রঃ। শক্তি আমার হৃদয়কে অধিকার করিবে ইহা
অর্থ কি ?

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
কেন? মহাষ্টমীর দিন যে কালীপূজা হয়, সেই
কালীমূর্তি কি কোন দিন দেখ নাই ?
প্রঃ। দেখিয়াছি, তাহাতে কি বুঝিলাম ?
উঃ। সেই কালীই ব্রহ্মশক্তি; তিনি শবে হৃদয়
অধিকার করিয়া রহিয়াছেন।
প্রঃ। শব কে ?
উঃ। তুমি যাহাকে শিব বলিয়া জান।
প্রঃ। শব ত মৃতদেহকে বলে।
উঃ। তাই শিবকে “শব” বলে।
প্রঃ। শিব-মৃত্যুঞ্জয়, তাহাকে “শব” বলে কেন ?
বুঝিলাম না।
যে কারণে শিব মৃত্যুঞ্জয়, সেই কারণেই শিব—শব।
প্রঃ। সেই কারণ কি ?
উঃ। বাসনা ত্যাগ। বাসনাত্যাগ হইলেই জীব
অমরত্ব প্রাপ্ত হয়, তাহার তার মৃত্যু থাকেনা। ঘটের নাশই
মৃত্যু; যাহার দেহে আত্মবুদ্ধি নাই, তাহার আবার মৃত্যু হইবে
কি প্রকারে ? অভিমান না থাকাতে কোন কাৰ্য্যই তাহার
নিজের কর্তৃত্বে হইয়াছে বলিয়া তিনি বােধ করেন না। এই
অবস্থায় তিনি সংসারের সকল কাৰ্য্যই করিতে থাকেন, অথচ
কিছুই করেন না। ভােগবাসনার অন্সরে জীব মৃতবৎ সংসারে
বিচক্ষণ করে। জীব যখনই বাসনাশূন্য হয়, তখনই তাহার
জীব শেষ হইয়া যায় এবং তিনি শিবত্ব লাভ করেন অর্থাৎ
;

ধর্মসার-সংগ্রহ।
তাহার জীৰৰ ব্ৰহ্মসত্তায় বিলীন হইয়া যায়। সেই অবস্থার
ইচ্ছাময়ী ব্ৰহ্মশক্তি (কালী) তদীয় শবদেহ অধিকার করিয়া
বসেন, এবং সেই শৰশরীর আশ্রয় করিয়া সৃষ্টি, স্থিতি, লয়
করিয়া থাকেন। এইরূপে ষড়ৈশ্বর্যশালী ভগবানের শক্তি ও
গুণসম্পন্ন হইয়া শব,শিব নামে কথিত হয়েন।
প্রঃ। তবে কি আমার বাসনাত্যাগ হইলে আমার হৃদয়ে
কালীমূর্তির ন্যায় চতুর্ভূজা লােলজিহ্বা এক মূর্তি দণ্ডায়মান
থাকিবে ?
উঃ। “সাধকানাং হিতার্থায় ব্রহ্মণাে রূপকল্পন।”
উঃ।
ইহা ত জান?
প্রঃ। হা জানি, তাহাতে কি হইল ?
তােমার হিতের জন্য, তােমাকে বুঝাইয়া দিবার জন্য
ঐ মূর্তি। তােমার বাসনাত্যাগ হইলে যে ব্ৰহ্মশক্তি তােমার
হৃদয়কে যুগে যুগে অধিকার করিবেন তিনিই কালী এবং
তিনিই জ্ঞানস্বরূপা।
( ১ )
কে জানে গাে কালী কেমন ?
ষড় দর্শনে না পায় দরশন।
কালী পদ্মৰনে, হংস সনে, হংসীরূপে করে রমণ,
তারে মূলাধারে সহস্ৰারে সদা যােগী করে মনন।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রই
আত্মাৱামের আত্মা কালী, প্রমাণ প্রণবেরই মতন,
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন, ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।
মায়ের উদর ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড, প্রকাণ্ড তা জান কেমন,
মহাকাল জেনেছেন কালীর মৰ্ম্ম, অন্যে কি আর
জানে তেমন ?
প্রসাদ ভাসে, লােকে হাসে, সন্তরণে সিন্ধুগমন,
আমার প্রাণ বুঝেছে, মন বুঝেনা, ধরবে শশী হয়ে
বামন।
( ২ )
জানি গাে জানি গাে তারা, তুমি যেন ভােজের বাজি,
যে তােমায় যেভাবে ডাকে, তাতেই তুমি হওমা রাজি।
মগে বলে ফরাতারা, গড়, বলে ফিরিঙ্গি যারা;
আল্লা বলে ডাকে তােমায়, মােগল পাঠান ছৈয়দ কাজি।
গাণপত্য বলে গণেশ, যক্ষ বলে তুমি ধনেশ,
শিল্পী বলে বিশ্বকৰ্ম্মা, বদর বলে নায়ের মাঝি।
শাক্তে বলে তুমি শক্তি, শিব তুমি শৈবের উক্তি ;
সৌর বলে সূৰ্য্য তুমি, বৈরাগী কয় রাধিকাজী।
শ্রীরামদুলালে বলে, বাজি নয় এ যেন ফলে,
একব্রহ্ম, দ্বিধা ভেবে মন আমার হয়েছে পাজি,
প্রঃ। সাধক কোন্ কোন্ শ্রেণীতে বিভক্ত?

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
উঃ। সকল প্রকার সাধকই কৰ্ম্মী, তবে শাস্ত্রকারের
সাধকদিগকে প্রধানতঃ চারিশ্রণীতে বিভক্ত করেন।
(১) জ্ঞানী, (২) যােগী, (৩) ভক্ত, (৪) কৰ্ম্মী। যাহারা
জ্ঞানী তাহারা বলেন—ব্ৰহ্ম অর্থাৎ জ্ঞান স্বরূপ। যাঁহারা ভক্ত,
তাহারা বলেন-ভগবান্ অর্থাৎ ষড়ৈশ্বর্যশালী চতুর্ভুজ, দ্বিভুজ
ইত্যাদি মুর্তি। যাঁহারা কর্মী, তাঁহারা বলেন—কৰ্ম্মই ব্ৰহ্ম ।
যােগীরা বলেন- আত্মাই ব্ৰহ্ম।
প্রঃ। এই চারিশ্রণীর সাধনপ্রণালীর কি কোনও প্রভেদ
আছে ?
উঃ। আছে। জ্ঞানীর সাধন-সৎসঙ্গ, দান, বিচার
( নিত্যানিত্যবিবেক) ও সন্তোষ। যােগীর সাধন—জীবাত্মাকে
পরমাত্মার সহিত যােগকরা অথবা কুণ্ডলিনী শক্তিকে
পরম শিবেতে লীনকরা, অথবা রাধাকৃষ্ণের মিলন করা।
ভক্তের সাধন-ভগবানের আত্মবৎ সেবা এবং পূজা করা।
কর্মীর সাধন—দান, যজ্ঞ, ও অনাসক্তভাবে সাংসারিক কাজকর্ম
করা। তােমাকে এই চতুর্বিধ সাধন প্রণালী বলিলাম বটে,
কিন্তু সকল প্রকার সাধকই বিচারপূর্বক কৰ্ম্ম করিতে করিতে
বাসনাশূন্য হইয়া মুক্ত হয়।
প্রঃ। সৎসঙ্গের ফল কি ?
উঃ। “গঙ্গা পাপং শশী তাপং দৈন্যং কল্পদ্রুমাে হরে।
পাপং পং তথা দৈন্যং সদ্যঃ সাধুসমাগমঃ ॥”
“তাৰ্থীকুৰ্বন্তি তীর্থানি দর্শনাদেব সাধবঃ।”
সাধুসঙ্গের অনন্ত মহিমা এবং অনন্তগুণ।

ধর্মসার-সংগ্রহ।
ঐ দানের উপকারিতা কি ?
দানে উদারতা ও বৈরাগ্য আনিয়া দেয়।
প্রঃ। বিচারে লাভ কি ?
উঃ। অাত্মনাত্মবোধ হয়। আত্মনাত্মবিবেক জন্মিলে
বিশুদ্ধ বৈরাগ্যের উৎপত্তি হয় এবং জীব শিব হইয়া যায়।
প্রঃ সন্তোষ কি প্রকারে সাধন করিতে হয় ?
উঃ। সাংসারিক বিভিন্ন অবস্থার মধ্যেও সর্বদা মনের
সন্তোষরক্ষা করার চেষ্টাকরা ।
প্রঃ। ভগবান্ ধৰ্ম্মরক্ষার জন্য যুগে যুগে অবতীর্ণ হন, এই
স্থানে “যুগ” শব্দের অর্থ কি ?
উ। কোন এক কার্য্যের আরম্ভ হইতে শেষপর্যন্ত যে
সময় তাহারই নাম “একযুগ”। অতএব যুগে যুগে অর্থাৎ সত্য,
ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে; অথবা বাল্য, যৌবন, প্রৌঢ় ও বার্ধক্যে
বুঝিতে হইবে। ইহার আরও এক অর্থ একই জীবের দুই তিন
বারের জন্ম নিয়াও হইতে পারে। তুমি যুগে যুগে শব্দের
অর্থ সময়ে সময়ে’ বলিয়া বুঝ। তাহা হইলেই তুমি সকলই
বুঝিতে পারিবে ।
প্রঃ। আপনার এই বিবিধ প্রকারের অর্থ আমি বুঝিলাম
ভগবান ধৰ্ম্মরক্ষার জন্য কালী, কৃষ্ণ ইত্যাদিরূপে, সত্য,
ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, বরং বুঝিলাম।
কিন্তু বাল্য, যৌবন, প্রৌঢ় এবং বার্ধক্য ইহার প্রত্যেক সময়ে
একজনের একজীবনে ভগবান্ তিন চারিবার কি প্রকারে অবতীর্ণ

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
উঃ।
হন, বুঝিলাম না; এবং একই জীবের দুই তিন জন্ম নিয়াও
কিপ্রকারে ভগবান্ একবার অবতীর্ণ হন, তাহাও বুঝিলাম না।
অবতারের অন্যতম উদ্দেশ্য অসুর নিপাত করা।
তােমার হৃদয়ে জ্ঞানরূপ ভগবান্ যুগে যুগে অবতীর্ণ হইয়া তােমার
অধৰ্ম্মরূপ অসুরকে যুগে যুগে বিনষ্ট করেন; অতএব অধৰ্ম্মরূপ
অসুর তােমার জ্ঞানের অবতরণে বিনষ্ট হইয়া যায়। এই
প্রকারে একজনের জীবনে ভগবান্ পাঁচ সাত বারও অবতীর্ণ
হইতে পারেন। যেমন এক ব্যক্তি মদ খাওয়া ও চুরি করা এই
দুইটা পাপকার্যে লিপ্ত আছে। কতদিন মদ খাওয়ার পর মদ
খাওয়া যে মুহূর্তে তাহার পাপ বলিয়া বােধ হইল, সেই মুহূর্তেই
পরিত্যাগ করিল এবং চৌর্যবৃত্তিকেও যখন পাপ বলিয়া বােধ
হইল, তখনই সে চৌর্যবৃত্তি পরিত্যাগ করিল। এই প্রকারে
একজনের হৃদয়ে ভগবান্ বহুবার অবতীর্ণ হন। পক্ষান্তরে
এক জীবের বহুবারের জন্ম নিয়াও ভগবান্ অবতীর্ণ হইতে
পারেন।
}
একবার যাহার হৃদয়ে ভগবান্ অবতীর্ণ হইলেন, সে
তৎক্ষণাৎ মুক্ত হইয়া যায়না কেন ?
উঃ। ভােগ ভিন্ন প্রারব্ধকৰ্ম্ম ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। বিশেষত
একবারেই জীবকে মুক্তি করিয়া দিলে ভগবানের সৃষ্টিকৌশলও
থাকে না।
প্রঃ। ভগবান্ সর্বব্যাপী; অতএব আমার হৃদয়ে তিনি
সর্বদাই আছেন, আবার “অতীর্ণ হইলেন” ইহার অর্থ কি?

৩৪
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
।।।।।।
উঃ। তুমি যখন তঁাহকে তােমার হৃদয়ে দেখ এবং আছেন
বলিয়া উপলব্ধি কর, তখনই তিনি “অবতীর্ণ হইলেন” বলিয়া
লোকে বলে।
( রাম প্রসাদের গান )
“মা আমার অন্তরে আছ।
তােমায় কে বলে অন্তরে ? শ্যামা ।
তুমি পাষাণময়ী বিষম মায়া কত কাচ কাচাই কাচ।
উপাসনাভেদে তুমি প্রধান মূৰ্ত্তি ধর পাঁচ,
যে জন পাঁচেরে এক করে ভাবে, তার হাতে মা কোথায়
বাঁচ।
বারে বারে যাতায়াত, পুত্ৰদারাসমম্বিত,
যে জন কাঞ্চনের মূল্য জানে, সে কি ভােলে পেয়ে কাচ
প্রসাদ বলে মম হৃদে অমল কমল উঁচি,
সেই ছাঁচে নির্মিত হয়ে, মননাময়ী হয়ে নাচ ।”
প্রঃ। প্রারব্ধ কৰ্ম্ম কাহাকে বলে ?
উঃ। শাস্ত্রকারের বাণের সহিত প্রারব্ধ কৰ্ম্মের তুলনা
করিয়াছেন। বাণ যেমন ধনু হইতে ছাড়িয়া দিলে কর্তার আর
তাহার উপর কোনও কর্তৃত্ব থাকেনা, বাণ আপন গতিতে যেখানে
ইচ্ছা যাইয়া পতিত হয়, জীবের প্রারব্ধ কৰ্ম্মও তদ্রুপ।

ধর্মসার-সংগ্রহ। •••• a gaan d, প্রঃ। ইহাতেও বুঝিলাম না। উঃ। ছােটবেলা পড়িয়াছ- “ললাটে লিখিতং য, ষষ্ঠীজাগরবাসরে। ন হরিঃ শঙ্করাে ব্রহ্মা চান্যথা কওঁ মহতি ॥” এই শ্লোকের অর্থ যদি পরিষ্কাররূপে বুঝিতে পার, তবেই “প্রারব্ধ” উত্তমরূপে বুঝিতে পারিবে। “যষ্ঠী” শব্দের অর্থ ছয়ের সমষ্টি। বিচ্ছিন্ন ভাবে নহে, একীকৃত অবস্থায়। জাগরবাসরে—জাগ্রত অবস্থায় অর্থাৎ পূর্ণ জ্ঞানের অবস্থায় (সৃষ্টির পূর্বের অবস্থায় )। এখন এই শ্লোকের অর্থ হইল— সৃষ্টির পূর্বের অবস্থায় যখন সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্ম পূর্ণজ্ঞানরূপে একমাত্র থাকিয়া একোহহং বহু স্যাম” “আমি এক আছি, বহু হইব” বলিয়া সঙ্কল্প করিয়া সৃষ্টি করিলেন, তখন যাহার ললাটে যাহা লিখিত হইয়াছে অর্থাৎ যাহার সম্বন্ধে যে কৰ্ম্ম নির্দিষ্ট হইয়াছে, হরি, হর বা ব্রহ্মাও তাহার অন্যথা করিতে পারেন না। কারণ হরি, হর ও ব্রহ্মাও সেই সঙ্কল্পের অধীন। এই সঙ্কল্পই—প্রারব্ধ। অতএব ভগবান্ একজনের জীবনে জ্ঞাতস্বরূপে বহুবার অবতীর্ণ হইলেও, সেই সঙ্কল্পের অধীন থাকায় জীব মুক্ত হয় না। পক্ষান্তরে একবারেও মুক্ত হইতে পারে। প্রঃ। মালসীগান, হরিসংকীৰ্ত্তন, জপ ও ধ্যানে আনন্দ পাই কেন ?

ধর্মসার-সংগ্রহ। উঃ। তখন তোমার জিহ্বা কি উপস্থের কাৰ্য্য বা চিন্তা থাকে না। অতঃপর তিনি ইহাও বলিয়াছেন- । “যদি যোগী ত্রিকালজ্ঞঃ সমুদ্রলঙ্ঘনে ক্ষমঃ। তথাপি লৌকিকাচারং মনসাপি ন লঘয়েৎ ॥” ব্রহ্মচারিবাৰা সমাজের প্রচলিত প্রথার সম্পূর্ণ অনুমােদন করিতেন। তিনি বলিতেন—অধিকারিভেদে ক্ষেত্ৰব্ৰত হইতে অশ্বমেধ যজ্ঞ পৰ্যন্ত এবং সন্ধ্যাপূজা, ধ্যান, ধারণা প্রভৃতি জীবের অবশ্য কর্তব্য। তিনি নিজে কোন কোন ব্যক্তিকে মন্ত্র দিয়াছেন, কোনও গরীব ব্রাহ্মণ পুত্রের যজ্ঞােপবীত দেওয়াইয়া দিয়াছেন, কোন কোন ব্যক্তিকে ফুল দুর্বাঘারা পূজা করাইয়াছেন। শিবপূজা, দুর্গাপূজা, কালীপূজা, ও হরিপূজা ইত্যাদি এবং পিতৃশ্রাদ্ধ, মাতৃশ্রাদ্ধ ইত্যাদি কৰ্ম্ম তিনি সম্পূর্ণ অনুমােদন করিতেন এবং বলিতেন ইহার প্রত্যেক কাৰ্যেই বিশেষ উপকার আছে। ব্ৰহ্মচারিবাবা প্রসঙ্গত এই তিনটা উপদেশও দিয়াছিলেন— রজ করিবে, তাহম্মক হইবে না। ক্রোধ করিবে, অন্ধ হইবে না। পাত কাটিয়া ভাত খাইবে, বাসন করিবে না।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
* * ৫৭" 45 44//।।। charAAAAAAAAAAAAAAAA%
উপসংহার ।
আমার সহিত কথাপ্রসঙ্গে পরম কারুণিক ব্রহ্মচারিবাবা স্বয়ং
অথবা আমার প্রশ্নের উত্তরে ধর্মাধর্ম ও তত্ত্বজ্ঞান সম্বন্ধে যে
কয়েকটা মহামূল্য উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন, ধর্ম ও তত্ত্ব
জিজ্ঞাসু সাধকদিগের সাধনপথে উহা কঞ্চিৎ সাহায্যকারী
হইতে পাৱিবে এই বিশ্বাসে আমি সেই সকল উপদেশ, যতদূর
স্মরণ হইতেছে, যথাযথ এস্থানে উপন্যস্ত করিলাম। অতঃপর
আমাদের সতীর্থদিগের মধ্যে পরস্পর আলাপপরম্পরায় যে
কয়েকটী সলঙ্গা ব্যবহার্য শাস্ত্রীয় পারিভাষিক শব্দের অর্থ লইয়া
সময়ে সময়ে সংশয়, বিতর্ক, ও মতভেদ উপস্থিত হইত এবং
যে সম্বন্ধে সংশয় ও মতভেদ অপরের মধ্যেও সর্বদা সংঘটিত
হওয়ার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা, সেই সকল শব্দের নিঃসন্দেহ ও
প্রকৃত অর্থ শাস্ত্রানুসন্ধানপূর্বক যতদূর উপলব্ধি করিতে পারিয়াছি,
তাহও এস্থলে নিম্নে প্রকটিত হইল।
যােগ, চিত্ত, ও হৃদয় শব্দের প্রকৃত শাস্ত্রীয় অর্থ এবং
শেযােক্তশব্দদ্বয়ের মধ্যে অর্থভেদ লইয়া প্রায়ই সাধকসমাজে
বিতর্ক ও আলােচনা হইয়া থাকে। অনুসন্ধান করিয়া, এসম্বন্ধে
যােগবাশিষ্ঠ রামায়ণে ভগবান বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে যে
উপদেশ করিয়াছেন, সমধিক প্রামাণিক বেধে সেই অর্থই
এস্থলে উল্লিখিত হইল।
চিত্ত-অন্তরে প্রাণের অর্থাৎ প্রাণাদি বায়ুর স্পন্দন
৪.

ধর্মসার-সংগ্রহ।
NvN
Wa
\\AAAAve
হইয়া সংসার ভাবােম্মুখী যে চিতি শক্তির উৎপত্তি হয়, তাহাকেই
চিত্ত বলে।
হৃদয়-হৃদয় দুই প্রকারে বিভক্ত। তন্মধ্যে একটী ‘হেয়’
ও অপর একটী ‘উপাদেয়। দেহাত্মবাদীদের মতে বক্ষঃ ও
পৃষ্ঠদেশের মধ্যস্থলে হৃদয় নামে যে স্থান আছে, তাহাকেই ‘হেয়’
বলে। জ্ঞানমাত্র যে হৃদয় তাহাকেই জ্ঞানিগণ উপাদেয়
সংজ্ঞা প্রদান করেন। এই উপাদেয় হৃদয়ই অন্তরে ও বাহিরে
সর্বদা বিদ্যমান ; অথচ আবার কোথাও অবস্থিত নহে। উহাই
‘প্রধান' হৃদয়। উহাতেই এই নিখিল বিশ্ব অবস্থান করিতেছে।
উহ সমস্ত পদার্থের দর্পণস্বরূপ, সকল সম্পদের কোষ্ঠাগার এবং
সমস্ত জীবের চিন্ময় জ্ঞানস্বরূপ বলিয়া কথিত হয়। উহা
দেহীর দেহের কোনও অবয়ব বা কোনও অবয়বের অংশ নহে।
মোগ—চিত্ত ও তদীয় স্পন্দন, এই উতয়ই নিত্য এবং
অভিন্ন ও অবিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। ইহাদের একতরের ধ্বংস
হইলে, অপরের অর্থাৎ গুণী ও গুণ উভয়েরই বিনাশ হইয়া
থাকে।
যােগ ও জ্ঞান এই দুইটী ক্রমান্বয়ে চিনাশের প্রধান
উপায়। চিত্তের ব্যাপার নিরোধকে ‘যােগ’ এবং বস্তুর
অর্থাৎ তত্ত্বের সম্যক দর্শনকে ‘জ্ঞান’ বলে। শাস্ত্রে বস্তু’ শব্দে
আত্মাকে বুঝায়। তদ্ভিন্ন পদার্থকে অবস্তু কহে ।
প্রাণ সম্যক্ রুদ্ধ হইলেই মনের ( চিত্তের) ও নিরােধ

ধর্মসার-সংগ্রহ। ঘটে। যে যে উপায়ে প্রাণকে নিরুদ্ধ করা যাইতে পারে, তাহা নিম্নে প্রদর্শিত হইতেছে। শাস্ত্রালােচনা, সজ্জনসংসর্গ, ও বৈরাগ্যের অনুশীলনদ্বারা ক্রমে সংসারবৃত্তান্তে অনাস্থা জন্মিলে, একাগ্রতালক্ষণ অভীষ্ট- বস্তু-ধ্যানের আশ্রয় গ্রহণ করতঃ দীর্ঘকাল ব্ৰহ্মতত্ত্বের অনুশীলন করিতে থাকিলেই প্রাণের স্পন্দন রহিত হইয়া যায়। ঐকান্তিক ধ্যানযােগ অভ্যাস করিলেও প্রাণের স্পন্দন বিনষ্ট হয়। পূরক, কুম্ভক, ও রেচকাদি নিরন্তর অভ্যাস করিলেও প্রাণের স্পন্দন নিরুদ্ধ হইয়া যায়। অ উ ম দ্বারা যে প্রণব অর্থাৎ ওঁঙ্কাৱে উৎপত্তি হয়, তাহার সুদীর্ঘ উচ্চারণের অবসানে ঐ শব্দের স্বরূপের উপলব্ধি হইয়া থাকে। এবং সেই কালেই বাহবিষয়ক জ্ঞানের উপরতি হয়। ইহাতেও প্রাণের নিরােধ হইয়া থাকে। বারংবার রেচকের অনুশীলন করিলেও প্রাণ দীর্ঘতা প্রাপ্ত হইয়া বাহাকাশে উপনীত হয়, তখন আর সে নাসাবিবরকে স্পর্শ করে না। ইহাতেও প্রাণ নিরুদ্ধ হইয়া থাকে। কেবল পূরকের পুনঃ পুনঃ অভ্যাস দ্বারাও প্রাণের নিরোধ ঘটিয়া থাকে। সেইরূপ কেবল কুম্ভকের বারংবার অভ্যাসেও প্রাণের নিরােধ হইয়া থাকে। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা, ও সমাধি, এই অষ্টা যােগের মধ্যে, শেষােক্ত চারিটীর অনুশীলন করিলেও যােগে সিদ্ধি লাভ করা যায়।

৪৩
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
১ । ।। ।। WA
*।।।।।
।।।।।।।
যােগে সিদ্ধিলাভ করিলে, সাধকের নিম্নলিখিত অবস্থা ঘটে।
চক্ষুঃ স্থিরং যস্য বিনাবলােকন,
প্রাণঃ স্থিরাে বস্ত বিনা নিরােধন,
মনঃ স্থিরং যস্য বিনাবলম্বন।
“তখন যােগীর, অবলোকন ব্যতিরেকেও, চক্ষুঃ স্থির হয় ;
বায়ুরােধের যত্ন ব্যতিরেকেও প্রাণবায়ু স্থিরত্ব লাভ করে; এবং
আশ্রয় বিনাও চিত্ত নিশ্চল অবস্থা প্রাপ্ত হয়।”
যােগীর এইরূপ অবস্থার কথা যাহা শুনিয়াছি, আমি যতদূর
দেখিতে ও বুঝিতে পারিয়াছি, তাহাতে ব্রহ্মচারিবাবার ঠিক এইরূপ
অবস্থা হইয়াছিল বলিয়া সাহস করিয়া বলিতে পারি। এখানে
আমরা আমাদের সাধক ভ্রাতাদের হিতের জন্য আর দুই একটা
কথা না বলিয়া প্রবন্ধ শেষ করিতে চাহিনা।
যােগে সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন এইরূপ মহাপুরুষের সাহায্য ও
উপদেশ না পাইয়া যােগাভ্যাস করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ আছে।
বৈরাগ্যকে মূলভিত্তি না করিয়া যাহারা যােগবলে বলবান্
হইতে যান, তাহাদিগকর্তৃক সংসারে অনিষ্ট সংসাধিত হইবার
সম্ভাবনা যত অধিক, ইষ্টসিদ্ধির সম্ভাবনা তত নহে। কারণ,
তাহারা কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ, মাৎসর্য প্রভৃতির এবং
রজঃ ও তমােগুণের অধীন থাকা বশতঃ আসক্তি ত্যাগে সমর্থ
হন না।

ধৰ্ম্মসার-সং গ্রহ।
৪১
১১******•. /
•••••••
^^\
বিশ্বগুরু শ্রী শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারিবাবার
জীবন বৃত্তান্ত ।
ধর্মসার-সংগ্ৰহ’ নামক এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে যে সকল মহামূল্য
উপদেশপরম্পরা প্রকাশিত হইল, আমার মতে কি ধৰ্ম্ম, কি
তত্ত্বজ্ঞান সম্বন্ধে, এরূপ সারবান্ উপদেশ অতি তাল্পই শুনিতে
পাওয়া যায়। বহুকাল হইতেই আমার মধ্যে এমন একটা
রোগ ঢুকিয়াছিল, যে অমুক স্থানে অমুক সন্ন্যাসী কি মহাপুরুষ
আসিয়াছেন, অমুক গ্রামে অমুক ফকীর বা দরবেশ বাস
করিতেছেন, অমুক নগরে অমুক শাস্ত্রজ্ঞ ও সাধক পুরুষ আসিয়া
ধৰ্ম্মোপদেশ প্রদানে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, শুনিলেই অমনি ব্যগ্র
হইয়া তাহার চরণদর্শনে বহির্গত হইতাম। দূরবর্তী স্থান
হইলেও গমনক্লেশ ও অন্য সর্ববিধ অসুবিধা উপেক্ষা করিয়া,
তথায় চলিয়া যাইতাম। এই রােগের বশীভূত হইয়া আমি
এযাবৎ বহুল মহাজন ও গুরুব্যক্তির চরণ সেবা করিয়াছি।
কিন্তু অবশেষে জন্মান্তরীণ বহু পুণ্যফলে বাবা লােকনাথ ব্রহ্মচারীর
চরণে শরণ লাভ করিয়া তাহার অনুগ্রহে ও ভঁহার অমূল্য
উপদেশপরম্পরা শ্রবণে, হৃদয়ে যে অসামান্য আলোেক ও
অনির্বচনীয় শান্তি লাভ করিয়াছি, সেরূপ আর কুত্রাপি যাইয়া
লাভ করিব বলিয়া আশাও করিনা এবং অন্যত্র যাইয়া আর
উপদেশগ্রহণের স্পৃহাও রাখি না। তাঁহার প্রদত্ত উপদেশগুলি

৪২ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। AAAAA কীদৃশ সারবান্ ও মূল্যবান, তাহা বােধ হয় ধর্ম ও তত্ত্বজিজ্ঞাসু সাধকসমাজে বুঝাইয়া দিবার প্রয়ােজন হইবে না। বুদ্ধিমান্ ও সূক্ষদর্শী সাধকগণ পাঠ করিয়া আপনা হইতেই তাহা সম্যক উপলব্ধি করিতে পারিবেন। এসম্বন্ধে ব্রহ্মচারিবাবার পরমভক্ত অন্যতম শিষ্য শ্ৰীযুক্ত মথুরামােহন চক্রবর্তী বি, এ মহাশয়, এই গ্রন্থের সমালােচনায় নিজের যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা গ্রন্থের প্রারম্ভে ‘দ্বিতীয় সংস্করণের প্রয়ােজন নামক ভূমিকাতেই দেখিতে পাইবেন। এস্থলে আর পৃথভাবে পুনর্বার উল্লেখ করিতে বাসনা রাখিনা। এই মহাত্মা কিরূপ অদ্ভুত ও অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন ছিলেন, তাহার কিঞ্চিৎ আভাস এই গ্রন্থের অবতরণিকায় পূর্বেই প্রদত্ত হইয়াছে। যাহারা তাহার এই উপদেশপরম্পরা পাঠ করিবেন, তাহাদের মধ্যে হয়ত অনেকেই তাঁহার লৌকিক ও অলৌকিক জীবনী-সম্বন্ধে অনেক কথা অবগত হইবার নিমিত্ত অভিলাষী হইবেন, এই সম্ভাবনা করিয়া, ইদানীং তাদৃশ পাঠকগণের সেই আকাঙক্ষা নিবৃত্তির জন্য, তদীয় জীবনবৃত্তান্তের যতদূর গবেষণাদ্বারা জানিতে পারিয়াছি, এস্থলে তাহার কিয়দংশ উপন্যস্ত করিতে বাধ্য হইলাম। তন্মধ্যে প্রথমে তাহার অলৌকিক জীবন সম্বন্ধেই কিছু বলিব।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
৪৩
ব্ৰহ্মচারিবাবার অলৌকিক
জীবন-কাহিনী
ন্যূনাধিক ৪৭ বৎসর অতীত হইল অর্থাৎ বাঙ্গালা ১২৭০
সনের কিঞ্চিৎ পূর্ব বা পরবর্তী সময়ে চিরহিমানী-পরিবৃত
হিমালয়শিখর হইতে অবতীর্ণ হইয়া দুইটী মহাপুরুষ বাঙ্গালার
পূর্ব প্রান্তস্থিত পর্বতমালার কোনও উপত্যকায় আসিয়া পদার্পণ
করেন। দীর্ঘকাল তুষারমণ্ডিত পার্বত্যভূমিতে নিবাসনিবন্ধন
তঁাহাদের সর্বাঙ্গে এমন এক স্থূল ও শুভ্রবর্ণ উপচৰ্ম্মের আবরণ
পড়িয়াছিল, যে হঠাৎ দেখিলে তাহাদিগকে পর্বতবাসী শ্বেতবর্ণ
এক অভিনব বা অদ্ভুত জীব বলিয়াই বােধ হইত। এই
চৰ্মাবরণের প্রভাবেই হার হিমালয়ের অসহ শীত সহ
করিয়াও তথায় বহুকাল বাস করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
নিম্নভূমিতে উপস্থিত হইলে, সকলেই, তাহাদের সেই শুভ্রবর্ণ
চৰ্ম্মচ্ছদ, ভূতলস্পর্শী সুদীর্ঘ জটাকলাপ এবং উলঙ্গ দেহ দর্শন
করিয়া ভীত ও বিস্মিত হইয়াছিল। পৰ্বতবাসী অসভ্য লােকেরা
প্রথমে তাহাদিগকে মানুষ না ভাবিয়া, একপ্রকার অদৃষ্টপূর্ব
অভিনব জীব-যুগল বলিয়াই মনে করিয়াছিল। ইহাদের মধ্যে
একজনের নিম্নভূমিতে আসিয়া বাস করিবারই সঙ্কল্প ছিল।
এজন্য উভয়ে চন্দ্রনাথ পর্বত পর্যন্ত একসঙ্গে আসিয়া, একজন
তথা হইতে পূর্ববঙ্গের নিম্নভূমিতে নামিয়া বাস করিতে

৪৪ ধর্মসার-সংগ্রহ। লাগিলেন। অপর মহাপুরুষ কামাখ্যাভিমুখে চলিয়া গেলেন। যিনি বঙ্গের পূর্ব সীমান্থ নিম্নভূমিতে নামিয়া বাস করিতেছিলেন, তিনি কয়েকদিন তথায়, অনাবৃত স্থানে ( মাঠের মধ্যে ), শীতাতপ ও বাতবৃষ্টি হইতে রক্ষিত হইবার নিমিত্ত গৃহাদি কোনরূপ আবরণ আশ্রয় না করিয়াই, এক বৃক্ষমূলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। কৃষকেরা ক্ষেত্র হইতে প্রত্যাগমন করিবার সময়ে অযাচিত ভাবে দয়া করিয়া দুই চারিটী ক্ষীরা, সসা প্রভৃতি যাহা সম্মুখে রাখিয়া যাইত, তাহা ভক্ষণ করিয়াই তিনি ক্ষুধা নিবৃত্তি করিতেন। সেই স্থানে কিছুকাল অবস্থানের পর এক কর্মকার তাহাকে দেখিতে পাইয়া স্বীয় নৌকাযানে উঠাইয়া স্বকীয় গ্রামে আনয়ন করে। কিছুকাল পরে সেই কৰ্ম্মকার তাহাকে ঢাকার অন্তর্গত নরসিংহদী থানার অদূরবর্তী গজারিয়া নামক এক গ্রামে ইয়া যায়। মহাপুরুষ গজারিয়াতে কিছুকাল ক্ষেপণ করিয়া যদৃচ্ছা- ক্রমে ভ্রমণ করিতে করিতে তথা হইতে সােণাগ পরগনার অন্তর্গত বারদী নামক গ্রামে আসিয়া উপস্থিত হন। এই গ্রাম নয়াবাদের প্রসিদ্ধ নাগ জমিদারদিগের বাসস্থান। এই গ্রামে আসিয়া অবস্থান করিবার পরেও কিছুকাল গ্রামবাসীরা তাঁহার বড় একটা খোঁজ খবর করে নাই। ইতিমধ্যে গ্রামের অশিক্ষিত বালক ও যুবকবৃন্দ এই উলঙ্গ পুরুষকে বিকৃত ‘বেশে ইতস্ততঃ বেড়াইতে দেখিয়া কৌতুকচ্ছলে তাহার গাত্রে ধুলি ও লােষ্ট্র ক্ষেপণ করিতে আরম্ভ করে। মহাপুরুষ'সেই দুবৃত্তদের ব্যবহারে ধর্মসার-সংগ্রহ। ৪৫ বিরক্ত ও অনন্যোপায় হইয়া কৌতুকচ্ছলে অঞ্জলিগৃহীত মূত্র নিক্ষেপ পূর্বক তাহাদিগকে তাড়াইতে লাগিলেন। তদৃষ্টে গ্রামের কোনও ভদ্রলােক গৱস্রাব ইত্যাদি বলিয়া তাহাকে গালিও দিয়াছিলেন। গ্রামের ভদ্র ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাহাকে উন্মত্ত ও নীচ শ্রেণীর লােক বলিয়াই এপৰ্যন্ত ঘৃণা ও অনাদর করিতেছিলেন। একদিন কয়েকজন ব্রাহ্মণ একস্থানে বসিয়া যজ্ঞােপবীত গ্রন্থি দিতে- ছিলেন। দৈবাৎ মহাপুরুষ বেড়াইতে বেড়াইতে সেই স্থানে আসিয়া উপনীত হইলেন। ব্রাহ্মণেরা তাহাকে অস্পৃশ্য হীন জাতি বলিয়া জানিতেন, তাই আগমন মাত্র—“দূর হ, আমাদিগকে ছু ইস্ না, তুই কি না কি জাত কে জানে ?” বলিয়া কটুক্তি করেন। তখন মহাপুরুষ ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন—“তােমরা কোন্ গােত্র।” তখন ব্রাহ্মণেরা একটু স্তম্ভিত হইয়া কহিলেন— “আমরা কাশ্যপগােত্র।” মহাপুরুষ কহিলেন—“তােমাদের তিন প্রবর–কাশ্যপ, অপ্সর, ও নৈব।” হীন অন্ত্যজ জাতির মুখে প্রবরের উক্তি শুনিয়া ব্রাহ্মণেরা কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হইলেন, এবং এই ব্যক্তি যে কোন ছদ্মবেশী মহাপুরুষ হইবেন এইরূপ সংশয় করিলেন। মহাপুরুষ পুনর্বার কহিলেন “পৈতা গ্রন্থি দিতেছিলে, দাও না কেন ?” তাহারা উত্তর করিলেন- '“পৈতাটাতে পেঁচ লাগিয়া গিয়াছে।” মহাপুরুষ কহিলেন- “পৈতায় পেঁচ লাগিলে কি করিয়া খুলিতে হয় ?" তাহারা কহিলেন-“গায়ত্রী জপ করিয়া খুলিতে হয়।” মহাপুরুষ কহিলেন—“তবে তাহা করিতেছ না কেন ?” তখন তাহারা

৪৬
ধর্মসার-সংগ্রহ
একটু ইতস্ততঃ করিয়া কহিলেন—“অনুগ্ৰহ করিয়া আপনি
খুলিয়া দিন্ না কেন?” তখন মহাপুরুষ পৈতার উপর গায়ত্রী
জপ করিয়া একটী করতালী দেওয়ামাত্র পেঁচ খুলিয়া গেল।
এই ঘটনার পরক্ষণ হইতেই বারদীর বহু লােক এই
মহাপুরুষকে অদ্ভুত ক্ষমতাশালী মনে করিয়া তাহার দিকে আকৃষ্ট
হইতে লাগিল। গ্রামের কতিপয় প্রধান নাগজমিদারও তাহার
এমন ভক্ত ও অনুগত হইয়া পড়িলেন যে তাহার অনুমতি
ব্যতিরেকে তাহারা কখনও কোন সামান্য কাৰ্যও সম্পাদন
করিতেন না।
এমন কি জমিদারী সম্বন্ধীয় কাজকৰ্ম্ম-প্রজা-
শাসন, মামলা মেকিদ্দমা প্রভৃতিও ভাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া
করিতে লাগিলেন এবং সুফল পাইতে লাগিলেন। গ্রামের এক
দেশে তাহার জন্য একখানি বাসস্থান নির্দিষ্ট হইল এবং সে
স্থানে তাহার বাসের জন্য কয়েকখানা ক্ষুদ্র কুটীরও নির্মিত
হইল। ইতিপূর্বে কয়েকদিন তিনি একখানি পরিত্যক্ত ভগ্ন
শিবিকার অভ্যন্তরেই বাস করিয়াছিলেন।
বারদীতে আসিয়া এই মহাপুরুষ জীবনের অবশিষ্টাংশ
অতিবাহিত করেন।
১২৯৭ সনের ১৯শে জ্যৈষ্ঠ তাহার
তমুত্যাগ হয়। বারদীতে তিনি প্রায় ২৭২৮ বৎসর বাস করেন।
বারদীতে দীর্ঘকাল বাস করা নিবন্ধন এদেশে তিনি বারদীর
ব্রহ্মচারী” নামেই সর্বত্র সুপরিচিত। (১) ইহার নাম -
(১) ইনি প্রাচীন বৈদিক প্রথানুসারে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্যা অবলম্বন করিয়া ব্রহ্মচারী
নামেই আপনার পরিচয় দিতেন। বর্তমান সময়ের পাচার্যের সম্প্রদা-তুক
ব্রহ্মচারীদের গায় হার নামে ‘আনন্দ’ পদ সংলগ্ন ছিল না।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ৪৭ ঐশ্রীলােকনাথ ব্রহ্মচারী। এখানে আসিয়াও কয়েক বৎসর পৰ্যন্ত গ্রামবাসী ও নিকটবত্তিজনপদবাসী কতকগুলি অশিক্ষিত ও নীচশ্রেণীর লােক ব্যতীত, অতি অল্পসংখ্যক লােকই তাহাকে তাদৃশ অসামান্য শক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষ বলিয়া জানিতে পারিয়া- ছিল; এবং অতি অল্পসংখ্যক ভদ্র ও শিক্ষিত লোেকই তাহার নিকট যাতায়াত করিত। অশিক্ষিত নীচশ্রেণীর লােকেরা তাহাকে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি ও পূজা করিত। তাহারা তঁাহার। আদেশ ব্যতীত কোন কাৰ্য্যই করিত না। তাহাদের মধ্যে যে সকল বিবাদ বিসংবাদ সংঘটিত হইত, তাহার বিচার নিষ্পত্তি তাহার নিকটেই হইত। জমীদারের দরবারে বা গবর্ণমেন্টের বিচারালয়ে যাইবার প্রয়ােজন হইত না। তিনিও তাহাদিগকে অপত্যনির্বিশেষে স্নেহ করিতেন। নিম্নশ্রেণীর নিরীহ গ্রামবাসীরা গাছে ফল না হইলে, গাভীতে দুধ না দিলে, পুত্র না জন্মিলে বা জন্মিয়া পুনঃপুনঃ বিনষ্ট হইলে, ক্ষেত্রে শস্য না জন্মিলে, পুত্র কন্যার বিবাহের সম্বন্ধ না জুটিলে, শরীর অসুস্থ হইলে, বা কারবারে লাভ না পাইলে, সেই সেই অনিষ্টের প্রতীকারের জন্য তাঁহার নিকট প্রার্থনা জানাইয়া যথাশক্তি তাহার নামে মানস করিত এবং অচিরেই স্ব-ইষ্টলাভে কৃতার্থ হইয়া তাহার চরণে উপহার প্রদান করিত। মােকদ্দমাকারীরা মােকদ্দমায় জয় লাভের প্রত্যাশায় তাহার আশ্রমে পূজা মানস করিত এবং ইচ্ছানুরূপ ফললাভ করিয়া তথায় পূজা প্রদান করিত। যদিও তিনি অনেক ।

৪৮ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ সময়েই ধনী ও জমিদারদিগের সদম্ভে প্রদত্ত মূল্যবান্ উপহারেও উপেক্ষা প্রদর্শন করিতেন, তথাপি ভক্তের প্রদত্ত বলিয়া তাহাদের সামান্য উপহারও কদাচ অগ্রাহ করিতেন না, বরং সমধিক আদরপূৰ্ব্বকই প্রতিগ্ৰহ করিতেন। তিনি প্রসন্ন হইয়া যখন যাহাকে যে বর প্রদান করিয়াছেন, সে তাহাই লাভ করিয়া শত মুখে তঁাহার অমানুষ মহিমার প্রশংসা কীৰ্ত্তন করিয়াছে। কিন্তু তিনি এইরূপ মহামহিমান্বিত হইলেও, বহুদিন পর্যন্ত দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় তাহার অনুসন্ধান করিয়া, তদীয় প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হইতে ইচ্ছুক বা চেষ্টিত হন নাই । মহানুভব পুজ্যপাদ ৩ বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী মহােদয় পাঠক, বর্গের অনেকের নিকটেই পরিচিত, সন্দেহ নাই। এই মহাত্মা নবদ্বীপের বিখ্যাত বৈষ্ণবাচাৰ্য ৩ অদ্বৈত প্রভুপাদের বংশধর। যৌবনের প্রারম্ভে ইনি ধৰ্ম্মজিজ্ঞাসু হইয়া পৈতৃক বৈষ্ণব ধর্ম পরিত্যাগপূর্বক ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন এবং কিছুকাল পরেই আচার্য পদৰা লাভ করিয়া ব্রাহ্মধর্মের প্রচার দ্বারা সর্বত্র খ্যাতি লাভ করেন। দৈবের গতি অচিন্তনীয়; গোস্বামী মহােদয় ব্রাহ্মধৰ্ম্মের পরম সেবক হইয়াও, কোনও অবিদিত কারণে হঠাৎ ব্রাহ্মধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া পুনর্বার হিন্দুধর্ম গ্রহণপূর্বক যােগাভ্যাসে প্রবৃত্ত হন। সাধুসঙ্গের অভিলাষী হইয়া ইনি কিছুকাল সাধু মহাপুরুষদিগের অনুসন্ধানে নানাস্থান পরিভ্রমণ করেন এবং অনেক সাধু মহাজনের চরণ দর্শন করিয়া, একদা বরদীর ব্রহ্মচারীর নিকট উপস্থিত হন। গােস্বামী মহাশয় এই ;

ধর্মসার-সংগ্রহ। ৪৯ ••• • • • • • । " । সময়ে গুরুকৃপালাভে ও সাধনা দ্বারা ধৰ্ম্মতত্ত্বে প্রগাঢ় অভিনিবেশ লাভ করিয়াছিলেন। বারদীর ব্রহ্মচারিবাবাকে দেখিয়া, তাহার সহিত আলাপ করিয়া এবং তাহার কাৰ্যকলাপ ও আচার ব্যবহার পর্যালােচনা করিয়া, এমন বিস্মিত হইয়াছিলেন এবং তথা হইতে ঢাকা আসিয়া এরূপভাবে ব্রহ্মচারিবাবার জ্ঞান ও প্রভাব কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন, যে তাহা শুনিয়া ঢাকার অনেক শিক্ষিত ও পদস্থ লােকই তাহার দর্শনার্থী হইয়া বারদী গমন করিতে লাগিলেন। কেহ কেহ বা তাহার তাদৃশ জ্ঞান ও প্রভাব দেখিয়া তাহাকে গুরুত্বে বরণ করিলেন। অতঃপর অচিরেই তঁাহার খ্যাতি তড়িবেগে সর্বত্র বিস্তৃত হইয়া পড়িল। তাঁহার অগাধ জ্ঞান ও অসীম শক্তির পরিচয় পাইয়া দিগদিগন্ত হইতে ধৰ্ম্মজিজ্ঞাসু ও জ্ঞানপিপাসু সাধকসমূহ আসিয়া তাঁহার চরণ দর্শনে কৃতার্থ হইতে লাগিলেন। পূবেই কথিত হইয়াছে—“জহরী ব্যতীত জহর চিনে না।” তাই তাহার শিষনামের সম্পূর্ণ অযােগ্য আমার ন্যায় জ্ঞানহীন ও মােহান্ধ মানব সেই অগাধ জ্ঞানসমুদ্রের ইয়ত্তা করিতে অথবা তাহার লােকোত্তর মহিমার তত্তোঘাউনে নিতান্তই অনধিকারী। তবে, বহুকাল তাহার সহিত একত্র বাস ও আলাপ করিয়া এবং তাহার কার্যকলাপ পৰ্যালােচনা করিয়া, যতদূর বুঝিতে পারিয়াছি এবং জ্ঞানপথে সমধিক অগ্রসর অন্যান্য সাধক মহাত্মার নিকট শুনিয়া যতদূর অনুমান করিতে পারিয়াছি, তাহাতে সাহসপূৰ্ব্বক এই পর্যন্ত বলিতে পারি, যে ব্রহ্মচারিবাৰা একজন অত্যুন্নত ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ কৰ্ম্মযােগী মুক্ত পুরুষ ছিলেন। কৰ্ম্মযােগ দ্বারা যে তাহার ব্ৰহ্মলাভ হইয়াছিল তৎসম্বন্ধে আর অণুমাত্রও সংশয় নাই। পূজ্যপাদ বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামিমহাশয় কর্তৃকই ব্রহ্মচারিবাবার ব্রহ্মজ্ঞান ও লােকাতীত ঐশ্বর্যের কথা সর্বপ্রথমে শিক্ষিত সমাজে প্রচারিত হয়। ঢাকা বিভাগের অনেক শিক্ষি লােকই গােস্বামিমহাশয়কে নিরতিশয় ভক্তি ও বিশ্বাস করিতেন। তাঁহার নিকট ব্রহ্মচারিবাবার তাদৃশ শক্তি ও ঐশ্বর্য্যের পরিচয় পাইয়া তাঁহার ব্যগ্র হইয়া বারদী যাতায়াত করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তিই ঐহিক ধনসম্পৎ, আবােগ্য, ভাগ্যোন্নতি, মােকদ্দমায় জয়লাভ ইত্যাদি আকাঙক্ষা করিয়া তাহার নিকট যাইতেন। ধৰ্ম্মতত্ত্বজিজ্ঞাসু হইয়া অতি অল্প লােকই তাঁহার উপাসনা করিয়াছেন। এই মহাপুরুষের আসন, শয়ন, ভোজন, আচার, ব্যবহার, কাৰ্যকলাপ, কথোপকথন এবং শরীরের নিত্য নৈমিত্তিক অবস্থা যাঁহারা প্রণিধানপূর্বক পৰ্যবেক্ষণ করিয়াছেন, তাঁহারা পরােপদেশ ব্যতিরেকেও তাঁহাকে ব্ৰহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ বলিয়া বুঝিতে পারিয়াছেন। ধ্যাননিমগ্নাবস্থায় তাঁহার সুতীক্ষ্ণ চক্ষুদ্বয়ের প্রতি যাহারা দৃষ্টিপাত করিয়াছেন, তাহারা সকলেই তাঁহাকে এক অলৌকিক অদ্ভুত পুরুষ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। এসম্বন্ধে ব্ৰহ্মচারিবাবার অন্যতম প্রধান ও প্রিয়তম শিষ্য শ্ৰীযুক্ত ব্ৰহ্মানন্দ ভারতী মহােদয় স্বপ্রণীত ‘সিদ্ধজীবনী” নামক তদীয় চরিতাখ্যানে যাহা লিখিয়াছেন তাহা অবিকল নিম্নে উদ্ধত হইল।

ধর্মসার-সংগ্রহ। “পরদিন আমাদের (গুরু ব্রহ্মচারী ও আমার) মধ্যে সেই বিষয়েই তর্ক বিতর্ক চলিতে লাগিল। আমার কিছু দর্শনশাস্ত্র পড়া ছিল, জেরা করিয়া সাক্ষিকে আটকাইবার অভ্যাসও হইয়া গিয়াছিল। আমি সেই সকল অস্ত্র শস্ত্র প্রয়ােগে ব্রহ্মচারীকে অবরুদ্ধ করিলাম ; এবং (আরও) নূতন প্রশ্ন করিয়া তাহাকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলাম। প্রশ্নটী ( একটা প্রশ্ন) দুই তিন বার করিলাম, কিন্তু কোন উত্তর পাইলাম না। তখন ব্রহ্মচারীর মুখের দিকে তাকাইলাম, দেখিলাম চক্ষু স্থির ; যেন তিনি আর তথায় নাই। সেই বিশাল নয়নযুগলের তারকাদ্বয় উভয় দিক হইতে আসিয়া নাসিকার নিকটবর্তী হইয়াছে, ব্রহ্মচারী যেন চক্ষুঃকনীনিকার ছিদ্রপথ দিয়া কোন গভীর অজ্ঞাত দেশে ডুবিয়া গিয়াছেন। আমার চক্ষুঃ তখন সেই দিকেই আকৃষ্ট হইল এবং কোন এক স্থির, ধীর, গম্ভীরভাব আসিয়া আমার হৃদয়ে আবির্ভূত হইল। আমি আর কখন কাহারও সেরূপ ভাব দেখি নাই। মানুষ যে এমন হইতে পারে, এমন ধারণাও ইতিপূর্বে আমার হয় নাই।” ১। এই মহাপুরুষ জাতিস্মর ছিলেন-তৎসম্বন্ধে সিদ্ধ জীবনীকার স্বগ্রন্থে এইরূপ লিখিয়াছেন— “তিনি এজন্মের অব্যবহিত পূর্ব জন্মে যাহা যাহা করিয়া- ছিলেন, তৎসমুদায় স্মরণ করিতে সমর্থ ছিলেন। এমন কি গত জন্মের মৃত্যু হইতে এজন্মের ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রাক্কাল পর্যন্ত যে ভাবে ছিলেন, তাহাও তাঁহার স্মরণ ছিল। কিন্তু প্রসবের পর

ধর্মসার-সংগ্রহ।
• • A+ ।
। । । ।
। A T
দেহে,
হইতে কয়েক বৎসর পর্যন্ত শৈশবকালের কথা তাহার কিছুমাত্র
স্মরণ হয় নাই।”
ইনি বর্তমান লােকনাথদেহ ধারণ করিবার পূর্বে যে
সীতানাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নামক দেহে বিদ্যমান ছিলেন, সেই
কাহিনীও ভারতী মহাশয়ের নিকট বর্ণন করিয়াছিলেন। সীতানাথ
বর্ধমান জিলান্তবর্তী দামোদর নদের তটস্থিত ‘বেড়' নামক
গ্রাম তাহার জন্মভূমি ছিল। তিনি যখন একমাসব্যাপী কঠোর
উপবাসব্রত দ্বিতীয়বার অভ্যাস করিতে প্রবৃত্ত ছিলেন, তখন
একদিন হঠাৎ স্বকীয় পূর্বজন্মের কথাগুলি স্বপ্নের ন্যায় তাহার
স্মৃতিগােচর হইল। দেখিতে পাইলেন যেন, তিনি সীতানাথ
বন্দ্যোপাধ্যায় রূপে দামোদর নদের তটস্থিত বেড় গ্রামে এক
বন্দ্যোপাধ্যায়পরিবারের মধ্যে বিচরণ করিতেছেন। একথা
তাঁহার গুরুদেবকে জানাইলেন; তিনি তাঁহার স্বপ্নদৃষ্ট সমস্ত
ঘটনা আছোপান্ত লিখিয়া রাখিলেন। ইহার বহুকাল পরে
তাঁহারা (১) পুনরায় দেশভ্রমণে বহির্গত হইলে, হাটিতে
হাটিতে এক অপরিচিত স্থানে উপস্থিত হইয়া একটী নদী
দেখাইয়া তাহার গুরুদেব তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“এই
নদী, এইস্থান, আর কখনও দেখিয়াছি কি?” তখন তিনি
পূৰ্ব্বদৃষ্ট স্বপ্ন স্মরণ করিয়া তাহাকে কহিলেন—“আমি যে
আপনাকে দামােদর নদের কথা বলিয়াছিলাম, এই সেই দামােদর
(১) তিনি, তাহার গুরু ভগবান্ গাঙ্গুলী, ও বেণীমাধব। (ব্রহ্মচারীর লৌকিক
জীবনী অষ্টব্য)।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। A6%AA-ye • ANAN নদ বলিয়া বোধ হইতেছে।” অতঃপর বেড়গ্রামও চিনিতে পারিয়া তথায় প্রবেশ করিলেন। তৎকালে বেড়গ্রামে যে সকল বৃদ্ধলােক জীবিত ছিলেন, তাহারা সীতানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা আলােচনা করিতে আরম্ভ করিলে পর তঁাহার পূর্বজন্মের অনেক কথাই স্মৃতি-পথারূঢ় হইয়াছিল। তিনি ভারতী মহাশয়ের নিকট ইহাও বলিয়াছেন— “সীতানাথজন্মে মৃত্যু পর্যন্ত আমি যাহা যাহা করিয়াছি, তাহার সমস্তই এখন আমার স্মৃতিপথে উপস্থিত হইয়াছে। আমি পূর্বজন্মে ভ্রাতাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলাম। সে জন্মেও বিবাহ করি নাই, ৪৫০ বৎসর বয়সের সময় সে দেহ ছাড়িয়া আসিয়াছি। আমার ভ্রাতৃবধুগণ সর্বদা আমাকে বিবাহের জন্য অনুরােধ করিতেন। গত জীবনে আমার এই একটা বিশেষ প্রকৃতি ছিল, যে আমি কাহারও সহিত মিশিতামনা, একাকী ঘরে বসিয়া থাকিতে ভাল বাসিতাম। অনেক সময়ে গ্রামের সমবয়স্ক বন্ধুরা আসিয়া আমাকে লইয়া যাইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিত, কতরূপ ঠাট্টা বিদ্রুপও করিত, কিন্তু আমি কিছুতেই তাহাদের সঙ্গে যাইতে সম্মত হইতাম না।” ২। ব্রহ্মচারিবাবার এই অদ্ভুত শক্তিও ছিল যে দেহে থাকিয়াই ইচ্ছানুসারে দেহ-সম্বন্ধ ত্যাগ করিয়া অবস্থান করিতে পারিতেন এবং ইচ্ছা হইলে দেহ ছাড়িয়া অন্যত্রও চলিয়া যাইতেন। আবশ্যক কার্য সম্পাদন করিয়া পুনরায় পূৰ্ব দেহে প্রবেশ করিতেন। সিদ্ধজীবনীকার ভারতী লিখিয়াছেন- তিনি যখন দেই ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেন, তখনও তিনি ৫৪ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। আসনে উপবিষ্টই থাকিতেন, দেহটা দেয়ালাদিতে ঠেশ দিয়া নিদ্রিতের ন্যায় পড়িয়া থাকিত। পার্শ্বস্থ পরিচারকেরা বলিত ‘গোঁসাই মরিয়াছেন, কিছু পরেই বাঁচিয়া উঠিবেন।” “এইরূপে দেহ হইতে বাহির হইয়া যাওয়ার বিষয় প্রসঙ্গত: তিনি কথার ভাবে স্বয়ংই স্বীকার করিয়াছেন। বাহির হইয়া যাইয়া কি করিতেন, তৎসম্বন্ধে এইরূপ জানা গিয়াছে-- (ক) “তাহার নিকট যে সকল লােক সাধু বা সিদ্ধ বলিয়া প্রকাশ পাইতেন (যেমন রামকৃষ্ণ পরমহংস প্রভৃতি), ব্রহ্মচারী দেহ হইতে বহির্গত হইয়া তাহাদের ভাব জানিয়া আসিতেন।” (খ) “বৰ্তমান সময়ের প্রায় বিশ বৎসর পূর্বে, পণ্ডিত বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামি মহাশয় উত্তরাঞ্চলে গিয়া কোন সঙ্কট রােগে মরণাপন্ন হন। ঢাকাতে এই বিষয়ে টেলিগ্রাম আসিলে গােস্বামী মহাশয়ের প্রিয় শিষ্য ও আমার সহধ্যায়ী ও শ্যামাচরণ বক্সী বারদীতে গিয়া ব্রহ্মচারীর চরণে পড়িয়া স্বীয় গুরুর প্রাণভিক্ষা চাহিয়াছিলেন। ব্রহ্মচারী পূর্বে না আসিবার দোষ দেখাইয়া আপত্তি করিলেন। শ্যামাচরণ কাকুতি মিনতি করিয়া বলিলেন- ‘আমার আয়ুদ্বারা তাহাকে বাঁচাইয়া দিন। শ্যামাচরণের গুরু- ভক্তিতে ব্রহ্মচারী তুষ্ট ও সদয় হইয়া বলিলেন--তুমি ঢাকাতে ফিরিয়া যাও, আমি বিজয়কৃষ্ণের নিকটে যাইব। আগামী পরশ- দিন তােমরা সংবাদ পাইবে। ইহার পরেও ব্রহ্মচারীর দেহ বারদীতে বিদ্যমান ছিল, কিন্তু, অনেক সময়েই বিজয়কৃষ্ণ গোস্বা- মৗর শু=দকারিগণ বারদীর ব্রহ্মচারীকে তঁাহার শিয়রে উপবিষ্ট

ধর্মসার-সংগ্রহ।
যমফাতনায়
দেখিয়াছেন। তাহার একজন শিষ্য আমার নিকট বলিয়াছেন
সেই রােগে গােস্বামী মহাশয়ের এমন অবস্থা ঘটিয়াছিল যে,
ডাক্তারেরা মৃতজ্ঞানে বাহির করিতে বলিয়াছিলেন, বাহির করার
পর রােগী পুনর্জীবিত হইয়াছেন। এরূপােব একবার নহে,
দুই তিনবার ঘটিয়াছিল। ইহার অভ্যন্তরিক ব্যাপার এই যে,
গগাস্বামী মহাশয়ের তমুত্যাগ হওয়ার পরক্ষণেই বারদীর
ব্রহ্মচারী তঁাহাকে পুনরায় পূর্বদেহে প্রবেশ করাইয়াছিলেন।
সেই রুগ্ন দেহে প্রবেশ করিয়া পুনরায় যাতনা ভােগ করা
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর অভিপ্রেত না থাকিলেও, ব্রহ্মচারীর বলে
তিনি দেহে পুনঃ প্রবেশ করিতে বাধ্য হইয়াছেন।
অধীর হইয়া পুনর্বার দেহত্যাগ ঘটিয়াছে, ব্রহ্মচারী তাহাতেও
ক্ষান্ত হন নাই। তিনি পুনরপি গােস্বামীকে দেহের মধ্যে প্রবেশ
করাইয়া দিয়াছিলেন। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয় অল্প দিন
হইল পরলোকগত হইয়াছেন। পাঠকগণের মধ্যে হয়ত কেহ
কেহ একথা তাহার নিজ মুখেও শুনিয়া থাকিবেন।”
(গ) “কখন বা দূরস্থ বিপন্ন শিষদিগের রক্ষাৰ্থ বাহির
হইতেন। ঢাকা জজ আদালতের উকীল বাবু বিহারিলাল
মুখখাপাধ্যায় মহাশয় ব্রহ্মচারীর আশ্রয় লইয়াছিলেন। কোনময়ে
তিনি সপে সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম হইতে আসিতে ছিলেন।
পথিমধ্যে বটিকা উপস্থিত হইয়া
হইয়া সুলুপখানি আন্দোলিত
করতঃ পর্যন্ত করিবার উপক্রম করে।
মৃত্যুকাল উপস্থিত জানিয়া ব্ৰহ্মচারীকে হৃদয়ের সহিত
বিহারি বাবু

ধর্মসার-সংগ্রহ। ডাকিয়াছিলেন। তখন হঠাৎ জাহাজখানা স্থির হইল, আরােহীর আসন্ন মৃত্যু হইতে রক্ষা পাইল। অনেকেই নাকি সেই সময়ে জাহাজের উপরে একখান অভয় হস্ত দর্শন করিয়াছিলেন।” “কয়েক মাস পরে যখন বিহারি বাবু আসাম হইতে প্রত্যাগত হইয়া বারদীতে উপস্থিত হন, তখন আমি ব্রহ্মচারী মহাশয়ের নিকট উপস্থিত ছিলাম। ব্রহ্মচারী বিহারিবাবুকে দেখিয়াই বলিলেন—“কিহে বিহারি ! তুমি কি ইহার মধ্যে আমাকে স্মরণ করিয়াছিলে ? বিহারিবাবুর তখন সুলুপের কথা স্মরণ হয় নাই, তিনি বলিলেন—“বাড়ীতে আসিয়া আপনার পাদপদ্ম দর্শন করার ইচ্ছা হইয়াছিল বই কি ? ব্রহ্মচারী বলিলেন- ‘তা নয় হে! জলপথে নৌকা বা জাহাজে থাকিয়া কখনও মনে করিয়াছ কি ? তখন পূর্বকথা স্মরণ করিয়া তিনি ব্রহ্মচারীর চরণে নিপতিত হইলেন এবং জাহাজে যে বিপদ ঘটিয়াছিল তাহার যথাযথ বিবরণ গদগদরে প্রকাশ করিয়া বলিতে লাগিলেন। ৩। ব্রহ্মচারিবার অপর এক শক্তি এই ছিল, যে তিনি কাহারও রােগ নিজ শরীরে সংক্রামিত করিয়া তাহাকে রােগমুক্ত করিয়া দিতেন। দুই তিন দিন ভােগের পরই রোগ তাঁহার দেহ ছাড়িয়া যাইত। ভারতী লিখিয়াছেন— “আমি তাহার এই ক্ষমতা দেখিয়া তাদৃশ রোগ গ্রহণ করার সঙ্কেত শিক্ষা করিতে চাহিয়াছিলাম, তদুত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন- ‘হােমার কঁচা শরীর একাৰ্য্যের উপযােগী নহে; এরূপ করিতে গেলে তােমার পিণ্ডােতের আশঙ্কা আছে।”

ধর্মসার-সংগ্রহ। ৪। ব্রহ্মচারী ইচ্ছা করিলেই অন্যের মনােভাব বুঝিতে পারিতেন। ভারতী লিখিয়াছেন— “তিনি (কখন কখন) এমনও প্রকাশ করিয়াছেন—তুমি অমুক সময়ে অমুক বিষয় চিন্তা করিয়াছ, তাহা অতি উত্তম। আমি (তাহাকে একবার) জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, তুমি আমাদের অন্তরের কথা কিরূপে টের পাও ? ব্রহ্মচারী বলিলেন –“আমি যখন দেহ হইতে আলগ হই, তখনই এসকল জানিতে পারি।” “আমরা কোন গুরুতর বিষয়ে প্রশ্ন করিলে ব্রহ্মচারী যখন চিত্ত একাগ্র করিয়া তাদৃশ অবস্থা আনয়ন করিতে যাইতেন, তখন আমরা বাহ লক্ষণদ্বারা কিছুই টের পাইতাম না, পূর্বের , মত আলাপ করিতে থাকিতাম। আমাদের তাদৃশ আলাপ তাঁহার একাগ্রতা বা সমাধির পক্ষে বাধক হইত। তাতেই বলিতেন – “আমাকে যদি কথা কহিয়া নীচের দিকে রাখ, তবে যে আমি তােমাদের মতই থাকিয়া যাইব।” “একদা একজনের মনে সংশয় হইয়াছিল যে-গুরুদত্ত মন্ত্রে অশুদ্ধি রহিয়াছে। তিনি ব্রহ্মচারীর নিকট হইতে তাহার মীমাংস (যাথার্থ্য) জানিয়া লইবেন সঙ্কল্প করিয়া তাহার নিকট গমন করিলেন। আগন্তুক তথায় যাইয়া কিছু না বলিয়া দণ্ডায়মান আছেন, এমন সময় ব্রহ্মচারী আপনা হইতেই বলিতে লাগিলেন- ‘গুরুদত্ত মন্ত্রের শুদ্ধাশুদ্ধ বিচার করা শিষ্যের কৰ্ম্ম নহে। যাহা বলিয়াছেন, কোন দ্বিধা না করিয়া তাহা জপ করিয়া যাওয়াই শিষ্যের কর্তব্য।”

৫৮ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। “অন্যের মনােগত কথা বলার শক্তি অনেকেরই (সাধু মহাজনেরই) থাকিতে পারে, কিন্তু ) ব্রহ্মচারী যেমন প্রত্যক্ষবৎ দর্শন করিয়া বলিয়া দিতেন, অন্যেরা তেমন ভাবে বলিতে পারেন না। ব্রহ্মচারী লােকের মনােগত ভাব যেমন প্রত্যক্ষবং জানিতে পারিতেন, দূরস্থ বা ভাবী ঘটনা সকলও সেইরূপ সাক্ষাৎ দর্শন করিতে সমর্থ ছিলেন। ভারতী মহাশয় লিখিয়াছেন- এক সময়ে কলিকাতানিবাসী কোনও বড় ঘরের এক ব্যক্তি তাঁহার নিকট উপস্থিত হন। আমি তাহাদের যথেষ্ট সম্মান ও সম্পত্তির পরিচয় দিয়া ব্রহ্মচারীর সহিত আলাপ করাইতে যত্ন করিলাম। ব্রহ্মচারী একটু চিন্তা করিয়া সেই আগন্তুক ভদ্রলােককে বলিলেন--তােমরা এখন ভাড়াটিয়া বাড়ীতে থাকিতেছ ? বারদীতে বসিয়া ব্রহ্মচারী কলিকাতার কোন বড় ঘরের ব্যক্তি যে পৈতৃক ভদ্রাসন ত্যাগ করিয়া ভাড়াটিয়া বাড়ীতে থাকিতে বাধ্য হইয়াছেন, এতদূর পর্যন্ত অবগত হইলেন, (আমিও কিন্তু তাহাদের ভাড়া বাড়ীতে থাকার কথা জানিতাম না) দেখিয়া সেই ভদ্রলােক পরম বিস্মিত হইয়া বলিলেন— মহাশয় ! অনেক পাকচক্রে পড়িয়া নিজ হিস্যার বাড়ী ছাড়িয়া এখন ভাড়াটিয়া বাড়ীতেই আছি।” ৬। ব্রহ্মচারীর আর এক শক্তি ছিল—তিনি দূর হইতে অন্যকে আকর্ষণ করিতে সমর্থ ছিলেন। ভারতী লিখিয়াছেন- “তিনি যখন আমাদের (শিষ্যদের) মধ্যে কাহাকেও দূর

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
৫৯
হইতে নিকটে আনয়ন করিতে চাহিতেন, তখন আমাদের অন্তঃ-
করণ এমন ব্যাকুল হইয়া উঠিত যে কিছুতেই বারদীতে না গিয়া
থাকিতে পারিতাম না। (একবার) তথায় যাইয়া এরূপ হওয়ার
কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন—“আমি তােমায় ডাকিয়াছিলাম।”
ইচ্ছা বা প্রয়ােজনানুসারে দূর হইতে কোন ব্যক্তিকে
আকর্ষণ করিবার শক্তি হার এমন বলবতী ছিল, যে শুনিলে
অদ্ভুত বলিয়া প্রতীতি জন্মে। এবিষয়ে ভারতী মহাশয় তাহার
স্বচক্ষে দৃষ্ট এক ঘটনার কথা এইরূপ উল্লেখ করিয়াছেন—
“তিনি যখন বহুসংখ্যক রােগীর দ্বারা ব্যতিব্যস্ত হইয়া
পড়িলেন, তখন বলিলেন-“এরূপ হইলে আমি দেহ ছাড়িয়া
দিতে বাধ্য হইব। তিনি যে যােগবলে নিদ্রাকে অতিক্রমপূর্বক
মৃত্যুর
সম্ভাবিত কাল অতীত করিয়া এতদিন জীবিত ছিলেন
এবং ইচ্ছা করিলেই মােহকে আশ্রয় করিয়া মৃত্যু ঘটাইতে
পারেন, এই কথায় লােকে তেমন আস্থা করিত না। তাঁহার
অনিচ্ছাসত্ত্বেও বহুসংখ্যক রােগী আশ্রম পূর্ণ করিতেছিল। তখন
তিনি মেজিষ্ট্রেটের সাহায্যে লােকদিগকে নিবারণ করিতে সঙ্কল্প
করিলেন এবং আমার প্রতি আদেশ করিলেন—‘মেজিষ্ট্রেটের
নিকট যাইয়া দরখাস্ত কর, যে আমার গুরুর আশ্রমে যাহাদিগকে
আসিতে বা থাকিতে নিষেধ করা হয়, তাহারা সেই কথা না
মানাতে গুরুর পিণ্ডপাত হওয়ার সম্ভাবনা হইয়াছে। অতএব
(তাহারা) যাহাতে ভবিষ্যতে আর না আসে এমন ভাবের এক
নিষেধাজ্ঞা সরকার হইতে জারি হউক।

সার-সংগ্রহ। “আমি তাহার আদেশমত নারায়ণগঞ্জ মহকুমাতে যাইয়া মেজিষ্ট্রেটের নিকট ঐ বিষয়ে ফরিয়াদী হইতে প্রস্তুত হইলাম । লােকনাথ আমাকে বারণ করিয়া বলিলেন -'এখন যাইও না, দুই তিন দিন মধ্যে মেজিষ্ট্রেট সাহেবই এখানে আসিবেন ; তখন দরখাস্ত করিও। গুরুদেব নিজ ঐশী শক্তির পরিচালন দ্বারা জয়েন্ট-মেজিষ্ট্রেটকে বারদীতে আকর্ষণ করিয়াছিলেন, এভাব তখন আমার মনে আসিল না। আমি মনে করিলাম হয়ত লোক- মুখে শুনিয়া মেজিষ্ট্রেট আসিবেন বলিতেছেন। আমরা কিন্তু অন্য কাহারও নিকট মেজিষ্ট্রেটের বারদী আসিবার কথা শুনি নাই। এসকল কথার পূর্বে ততটা প্রচারও হয় না। দেখিতে দেখিতে সেই দুই তিন দিনের মধ্যে ২০০৩০০ হাত দূরে সাহেবের তাম্বু গাড় হইল। আমি যথাসময়ে মােক্তারদের সাহায্যে দরখাস্ত দাখিল করিলাম। আমার সেই দরখাস্ত অনুসারে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করিয়াই সাহেব তাম্বু উঠাইয়া প্রস্থান করিলেন। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সে যাত্রায় মেজিষ্ট্রেট বারদীতে আসিয়া এই হুকুম দেওয়া ভিন্ন আর কোন কাৰ্য্যই করেন নাই। ইহাতে স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে যে, শুদ্ধ এই কাৰ্য্যের নিমিত্তই তিনি বারদী আসিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।” “আমরা দেখিয়াছি দূরবর্তী থাকার কালে, গুরুদেব যদি কখনও আমাদিগকে নিকটে আনিতে ইচ্ছা করিতেন, তখন আমাদের মধ্যে এমন একরূপ প্রেরণ উপস্থিত হইত, যে তাহার প্রভাবে আমরা কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিতাম না; বারদী ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। আসার জন্য উতলা হইয়া পড়িতাম। নিকটে আসিয়া গুরুদেবকে এরূপ হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন-“আমি তােমা- দিগকে ডাকিয়াছিলাম। তাহাতেই বলি--জয়েন্ট মেজিষ্ট্রেট সেই ভাবেই আকৃষ্ট হইয়া আসিয়াছিলেন এবং শুদ্ধ আমার দরখাস্তের হুকুম দিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন।” ৭। জগতের প্রাকৃতিক ঘটনার উপরেও তাহার ঐশী শক্তি অব্যাহত রূপে প্রভুত্ব বিস্তার করিত। এই বিষয়ে সিদ্ধ জীবনীর প্রণেতা ভারতী মহাশয় এক আশ্চর্য ঘটনা উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন-- (ক) “এক সময়ে কয়েকজন শিক্ষিত ভদ্রলােক ব্ৰহ্ম- চারীর আশ্রমে আসিয়া পদব্রজে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করিতে উদ্যত হইলেন। সূর্যের উত্তাপ অতিশয় প্রচণ্ড দেখিয়া তাহারা নানারূপ ইতঃস্তত করাতে, ব্রহ্মচারী তাহাদিগকে ডাকাইয়া আনিয়া বলিলেন-“চলিয়া যাও, সূর্যের উত্তাপ ভুগিতে হইবে । তাহারা কিয়দ্দর চলিয়া দেখিলেন একখানি বৃহৎ মেঘ আসিয়া সূৰ্য্যকে আচ্ছাদন করিল। এই ব্যাপারকে ব্রহ্মচারীর আদেশের ফল মনে করিয়া, তথা হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া তাহারা পুনরায় আশ্রমে আসিয়া বলিলেন—প্রভভ ! আপনার আদেশ মতে মেঘ সূর্যকে আচ্ছাদিত করিয়া আমাদিগকে ছায়াদান করিয়াছে। কিন্তু আমাদের সন্দিগ্ধচিত্ত ইহাতেও তুষ্ট হয় নাই। আমরা জানিতে চাই আমরা কোন স্থানে পৌছিলে মেঘ অপমৃত হইয়া সূৰ্য্যকে মুক্ত করিবে। ব্রহ্মচারী কহিলেন-‘লােমর

৬২
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ
ঢাকা সহরের প্রান্তবর্তী দয়াগঞ্জে উপনীত হইলে পুনরায় রৌদ্র
উঠিবে। বারদী হইতে দয়াগঞ্জ ৮১০ ক্রোশ ব্যবহিত। তাহারা
এই পথ অতিক্রম করিয়া দয়াগঞ্জে উপস্থিত হওয়া মাত্র পুনরায়
খরতর সূৰ্য্যকিরণ প্রকাশ পাইল। তদ্দর্শনে বাবুরা চমৎকৃত
হইয়া বাসস্থানে না যাইয়া তৎক্ষণাৎ আবার বারদীতে ফিরিয়া
মাইয়া মহাপুরুষের চরণে পতিত হইলেন।”
এ বিষয়ে ভারতী মহাশয় এইরূপ আরও দুই তিনটী ঘটনার
কথা উল্লেখ করিয়াছেন
(খ) “একব্যক্তি জাল করার অপরাধে কোন মহকুমার
মেজিষ্ট্রেটের নিকট অভিযুক্ত হন। তিনি অপরাধ অস্বীকার
করেন। এদিকে বরদীতে আসিয়া ব্রহ্মচারীর আশ্রয় গ্রহণ
করিয়া আপনার নির্দোষিত প্রকাশ করেন। মহাপুরুষ অভয়
দিয়া বলিলেন-“তুমি মুক্তিলাভ করিবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি
হৃষ্টচিত্তে প্রত্যাবর্তন করিতে উদ্যত হইলেন।
ব্রহ্মচারীর একজন সেক অভিযুক্তকে দোষী বলিয়া অবগত
ছিলেন। তিনি দেখিলেন, এই লােকটা সাধুকে ফাঁকী দিয়া
অভয়বাণী লইয়া যাইতেছে। এই ব্যবহার তাহার নিকট
অসহনীয় বােধ হইলে, তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ডাকিয়া আনিয়া
বলিলেন –“মহাশয় ! আপনি সাধুর সহিত যেরূপ ব্যবহার
করিলেন, সেইরূপই ফল পাইতে পারেন, অধিক প্রত্যাশা
করিতে পারেন না। আপনি যদি স্বয়ং দোষী হইয়া সাধুর
নিকট আপনাকে নির্দোষ প্রতিপাদন করিয়া অভয়বাণী আদায়
তুচ্ছ বণে

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ; করেন, তাহা হইলে সাধুর প্রদত্ত অভয়বাণীও উলটিয়া সভয়- বাণীতে পরিণত হইতে পারে না কি? আপনি যদি সাধুর নিকট মিথ্যা কথা কহিয়া অভয়বাণী গ্রহণ করেন, তবে সাধুর কথিত কথাও আপনার মিথ্যা আচরণে মিথ্যা হইতে পারে। “অভিযুক্ত পুরুষ এই কথায় চমকিয়া উঠিলেন। ভাবিলেন— ‘সাধারণ লােকের নিকট প্রতারণা করিয়া পার পাওয়া যাইতে পারে; কিন্তু সাধুকে ঠকাইয়া গেলে স্বয়ংই ঠকিতে হয়। তিনি দ্রুতপদে চলিয়া গিয়া পুনরায় ব্রহ্মচারীর চরণে পড়িলেন। বলিলেন—“আমি অপরাধি ত আছিই, আপনার নিকট মিথ্যা কথা কহিয়া সে অপরাধের মাত্রা শতগুণে বৃদ্ধি করিয়াছি। এক্ষণে অনুতপ্ত হৃদয়ে আপনার শরণাপন্ন হইলাম ; আমায় রক্ষা করুন। ব্রহ্মচারী বলিলেন—“যদি যথার্থ আমার শরণাপন্ন হইয়া থাক, তবে আমি যাহা বলি সেরূপ করিতে পার কি ? অপরাধী বলিল,—অবশ্য পারিব।' ব্রহ্মচারী পুনরায় বলিলেন- ‘যাও বিচারকের নিকট যাইয়া স্বমুখে দোষ স্বীকারপূর্বক প্রায়শ্চিত্ত কর, আমি যে বলিয়াছি মুক্তিলাভ করিবে সে কথার অন্যথা হইবে না। অভিযুক্ত ব্যক্তি তাহাই করিলেন—বিচারের দিন জয়েন্ট মেজিষ্ট্রেটের নিকট উপস্থিত হইয়া অপরাধ স্বীকার করিয়া ফেলিলেন। মেজিষ্ট্রেট ভাবিলেন—‘লােকটা ভয় বা প্রলােভন প্রযুক্ত এখন অপরাধ স্বীকার করিতেছে, নথীস্থিত প্রমাণের সহিত কিন্তু ঐক্য হইতেছে না। এজন্য অভিযুক্তের মোক্তারদের প্রতি কিছু ইঙ্গিত করিলেন । মোক্তারেরা

৬৪
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
vi+A+ • •••••••••••
Rf. • • • • • • • • Vv ।। ৭
আসামীকে অপরাধ অস্বীকার করার জন্য উপদেশ ও অনুরােধ
করিতে লাগিলেন। আসামী তাহাতে কর্ণপাত না করিয়া
বলিলেন,-“আমি দোষী, শেষ পর্যন্ত আমার দোষ আমার
সমুখে ব্যক্ত করিব। মেজিষ্ট্রেট আর কি করেন, অগত্যা
অভিযুক্তকে দায়রায় সােপর্দ করিতে বাধ্য হইলেন। আসামী
সেসনে গিয়াও সেই কথা বলিতে লাগিলেন-আমি দোষী।”
“জুরিগণও মেজিষ্ট্রেটের ন্যায়—আসামী নির্দোষ, কেবল ভয়
বা প্রলােভনের বশবর্তী হইয়া অপরাধ স্বীকার করিতেছে,—স্থির
করিলেন। সেসন জজ জুরীর সহিত একমত হইতে না পারিয়া
মােকদ্দমা হাইকোর্টে পাঠাইলেন। হাইকোর্টের বিচারে অভিযুক্ত
ব্যক্তি মুক্তিলাভ করিয়া বারদীতে আসিয়া ব্ৰহ্মচারীর পদপ্রান্তে
নিপতিত হইয়া যখন আপনাকে বিকাইতেছেন, তখন আমি
বারদীতে উপস্থিত হইয়া ঐসকল ব্যাপার অবগত হইলাম।”
(গ) “বারদীতে একব্যক্তির পাদদেশে সর্পে দংশন করে।
বিষ প্রবল হইয়া সকল অঙ্গ ছাইয়া উঠিতে থাকে।
ওঝা বৈদ্য
আসিয়া বিষ নামাইবার যত্ন করিল। এদিকে, আরােগ্য হইলে,
নির্দিষ্ট সময়ে ব্রহ্মচারীকে কিছু পূজা দেওয়ার মানস করা হইল,
ক্রমে বিষ নামিয়া আসিল, রােগী আরােগ্য লাভ করিল।
রােগীর আত্মীয়েরা মনে করিল, চিকিৎসার গুণে বিষ নামিয়াছে,
ব্রহ্মচারীর কৃপায় নহে; অতএব পূজা দেওয়ার আবশ্যকতা নাই।
এই ভাবে ব্রহ্মচারীর নিকট মানসিক পূজা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়
অতিক্রান্ত হইয়া গেল। সকলেই নিশ্চিন্ত আছে। এক বৎসর
তখন
;

ধর্মসার-সংগ্রহ। Wad Av কাল পরে, সেই সর্পদষ্ট ব্যক্তি প্রয়ােজন উপলক্ষে কিছু দূরস্থানে গিয়াছিল, ফিরিয়া বাড়ী আসার সময়ে অকস্মাৎ সেই শুষ্ক ক্ষত স্থানে বেদনা উপস্থিত হইল এবং বিষ পূর্ববৎ পরাক্রম সহকারে রােগীর সর্বাঙ্গ ছাইয়া ফেলিল, রােগী (বিষের জ্বালায় ছটফট করিয়া (ভূতলে) পড়িয়া গেল। বাড়ীতে সংবাদ আসিলে আত্মীয়স্বজনগণ তৎক্ষণাৎ তাহাকে গৃহে আনয়ন করিল। হঠাৎ এই বিপদ্দর্শনে সকলেই অধীর হইল। তখন ব্রহ্মচারীর আশ্রমে আসিয়া নালিশ করিল এবং তাহার পরে বিশিষ্টভাবে পূজা দিয়া নিষ্কৃতি লাভ করিল।” ( এই ঘটনা বাবার নিত্য সেবক শ্ৰীযুক্ত জানকীনাথ ব্রহ্মচারী বলিয়াছেন)। ৮। ব্রহ্মচারিবাবার প্রভাব দেবতার শক্তিকেও অতিক্রম করিয়া কাৰ্য্য করিত। এসম্বন্ধেও ভারতী মহাশয় একটা অদ্ভুত ঘটনার উল্লেখ করিয়া এইরূপ লিখিয়াছেন :- “লােকনাথ একদা আশ্রমের পার্শ্বে, ঘরের বাহিরে উপবিষ্ট আছেন, এমন কালে দেখিলেন, একটী রক্ত-বস্ত্র-পরিধান স্ত্রী তাহার পার্শ্বে দণ্ডায়মানা। মেয়ে লােকটী শীতলামুখী অর্থাৎ তাহার মুখে বসন্তের দাগ আছে। স্ত্রীলোেকটী শীতলাদেবী বলিয়া বােধ হইতেছিল। দেবী বলিলেন-“আমি এখান দিয়া যাইব। লােকনাথ কহিলেন-‘না, এখান দিয়া যাইতে পারিবে না। কিছুকাল উভয়েই নিস্তব্ধ, পরক্ষণে দেবী লােকনাথের সম্মুখদিকে এক পা বাড়াইলেন। লােকনাথ গভীর স্বরে বলিয়া উঠিলেন— ‘আমি যে এখানে আছি, আমি কি কিছুই নই ? দেবী তৎক্ষণাৎ ধর্মসার-সংগ্রহ। পা উঠাইয়া পূর্বব স্থানে দাঁড়াইলেন, এবং বলিতে লাগিলেন- ‘আমি কি যাইবার পথ পাইবনা—এখানে কি আবদ্ধ থাকিব ? লোকনাথ উত্তর করিলেন—না, বদ্ধ থাকিতে হইবে না; এই যে নিকটে ছাওয়াল বাঘিনী নদী (খাল), ইহার পার্শ্বস্থ ঢালু ভূমি দিয়া চলিয়া যাও, উচ্চতর সমভূমিতে উঠিও না। এই ঘটনার কয়েক দিন পরে আশ্রমের অনতিদূরে এক ভূইমালীর বাড়ীতে বসন্ত হইয়া দুইটা লােক মারা যায়। তখন গৃহস্বামী লােকনাথের নিকটে নালিশবন্দী হইলে, তিনি জিজ্ঞাসা করিয়া বুঝিলেন, তাহার বাড়ীটী ঐ নদীর তীরে ঢালু ভূমির উপরে স্থাপিত। অতএব আদেশ করিলেন—“বাড়ী ছাড়িয়া পলায়ন পূর্বক জীবন রক্ষা কর। সে তাহাই করিল। (২) ৯। তিৰ্য্যগ জাতির (পশুপক্ষ্যাদির) হৃদয় ও মনের উপরেও তাঁহার প্রভাব অক্ষুন্ন ছিল। তিনি ইচ্ছানুসারে তাহাদিগকে আকর্ষণ, চালন, ও কাৰ্য্যে নিয়ােগ করিতে পারিতেন; এবং, এসম্বন্ধেও দুই একটা সুন্দর ঘটনা সিদ্ধজীবনীতে লিপিবদ্ধ হইয়াছে, তাহা নিম্নে উদ্ধত হইল। (ক) “বারদার আশ্রমে ভজলেরাম নামক এক বৃদ্ধা সেবিকা (২) এই ঘটনাটী নব্য শিক্ষিতদগের কর্ণে স্থান পাইবে বলিয়া বোধ হয় না। ব্রহ্মচারিবাব স্বয়ং “অসম্ভবং ন বক্তব্য এই শাস্ত্ৰবাক্য অনুসরণ করিয়া শিষ্যদিগকে অসম্ভব ঘটনা প্রকাশ করিতে বারণ করিতেন। তথাপি ঘটনাটী প্রকৃত সত্য বলিয়াই অামরা এস্থানে উল্লেখ না করিয়া পারিলাম না।

ধর্মসার-সংগ্রহ।
৬৭
ৰাস করিত। সে একদা ব্রহ্মচারীর নিকট আবদারের ভাবে
বলিল,-“আমি কখনও বাঘ দেখি নাই, আমাকে একটা বাঘ
আনিয়া দেখাইয়া দিন। ইহার কয়েক দিন পরে রাত্রিশেষে
একটা চিতাবাঘ ব্রহ্মচারীর আশ্রমে উপনীত হইল। তখন
গুরুদেব ভজলেরামকে, ডাকিয়া জাগাইয়া, বাঘ দেখিতে বলিলেন।
তজলেরাম উঠিয়া বাঘ দেখিতে লাগিল। আশ্রমের অভ্যাগত
লােক-প্রভৃতি অন্য যাহারা শুইয়াছিল, তাহারাও বেড়ার ফাঁক
দিয়া দেখিতে প্রবৃত্ত হইল। এত লোকের সাড়া পাইয়া ব্যাটী
পলায়নপর হওয়াতে ভজলেরাম কহিল—‘গোঁসাই ! বাঘকে
আর কিছুক্ষণ রাখুন, ভাল করিয়া দেখিয়া লই। দেখিতে দেখিতে
বাঘ নিকটবর্তী বৃক্ষলতার মধ্যে প্রবেশ করিল......।”
(খ) মনুষ্যেরা যেমন উৎকট ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া ব্রহ্মচারীর
শরণ লইত, অনেক রুগ্ন কুকুর কুকুরীও সেইরূপ তাহার আশ্রমে
আসিয়া আরােগ্য লাভ করতঃ ইচ্ছামত চলিয়া যাইত। আমরা
দেখিয়াছি একটা রােগাক্রান্তা কুকুরী সেই অভিপ্রায়ে ব্রহ্মচারীর
আশ্রমে থাকিয়া ক্রমে রােগমুক্ত হইয়াছিল। যে সময়ে কুকুরী
রােগমুক্ত হইয়াছিল, সেই সময় কুকুরীদিগের গর্তধারণের কাল
( ভাদ্র আশ্বিন মাস)। একটা কুকুর ঐ কুকুরীর লােভে
তাহার সঙ্গে আশ্রমে আসিয়া অবস্থান করিতেছিল।
কুকুরের সঙ্গে গুরুদেবের যে আলাপ হইয়াছিল, গুরুদেব
আমাদিগকে তাহা বুঝাইয়া দিয়াছিলেন।”
গুরুদেব আমাদিগকে বলিয়াছিলেন-‘অঙ্গ এই কুকুরটা
একদা ঐ

ধর্মসার-সংগ্রহ। কুকুরীটাকে বারংবার বিরক্ত করিতেছিল। তাহাতে আমি কুকুরকে বলিলাম—তুমি আর কুকুরীকে বিরক্ত করিওনা। এখন উহার ব্যারামের (কামােদ্দীপনার ) নিবৃত্তি হইয়াছে। কুকুর তাহা শ্রবণ করিয়া আস্তে আস্তে দুই চারিবার কেউ মেড শব্দ করিয়া আপনার বিরক্তি প্রকাশ করিল। অবশেষে কিঞ্চিৎ মূত্র ত্যাগ করিয়া আমাকে এই বলিয়া গালি দিয়া গেল যে কুকুরীর উদ্দীপনা নিবৃত্তি হওয়াতে আমার কি হইয়াছে ? আমার তাে বেগনিবৃত্তি হয় নাই ? তথাপি তুমি যখন আমাকে নিবারণ করিতেছ, তখন তােমার কথায় প্রস্রাব করিতেছি এবং তােমার আশ্রমেও প্রস্রাব করিয়া যাইতেছি।” “আমরা বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিয়াছি সেই দিন অবধি উক্ত কুকুর আর আশ্রমে উপস্থিত হয় নাই। ঐ কুকুর পীড়িত হইয়া আশ্রমে আসে নাই, কেবল কুকুরীর লােভেই তথায় অবস্থান করিত। এখন ব্রহ্মচারকির্তৃক নিবারিত হইয়া আশ্রম ত্যাগ করিয়া প্রস্থান করিল। অন্যলােক শত যাতনা দিলেও কুকুর চলিয়া যাইত কিনা সন্দেহ।” (গ) অরণ্যবাস সময়ে তিনি ব্যাঘ্রীর সহিত যেরূপ আলাপ ব্যবহার করিয়াছিলেন তাহাও ভারতী মহাশয় এইরূপে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। “লােকনাথ ও (তাহার সহচর) বেণীমাধব ব্রহ্মচারী বাঙ্গালার পূর্বদিক্‌স্থিত পাহাড় হইতে অবতরণ করিয়া চন্দ্রনাথ পর্বতের জনহীন জঙ্গলে আতিথ্য গ্রহণ করত এক বৃক্ষমূলে ধৰ্ম্মসায়সংগ্রহ। •- আশ্রয় লইয়াছিলেন। তাঁহাদের আগমনের ক্ষণকাল পরে ব্ৰহ্মচারিদ্বয়ের কয়েক হস্ত ব্যবধানে থাকিয়া এক ব্যাঘ্ৰী ভীষণ রবে কানন ও পর্বত নিনাদিত করিয়া তুলিল। সে চিতা ব্যাঘ্ৰী নহে, বঙ্গদেশের বিখ্যাত হিংস্রপ্রধান বৃহজাতীয় বাঘিনী ; ঘাের রবে অনেকক্ষণ পর্যন্ত চীৎকার করিতে থাকায় গুরুদেবের চিত্ত সেই দিকে আকৃষ্ট হইল। তিনি ধ্যানে দেখিলেন--ব্যাঘ্ৰী নবপ্রসূতা ; কয়েকটী সদ্যোজাত শিশুসন্তান সম্মুখে রাখিয়া গর্জন করিতেছে। ব্যাঘ্রীর মনোগতভাৰ কি জানিবার জন্য ধ্যান-নিমগ্ন হইয়া, অবগত হইলেন--অভ্যাগত ব্যক্তিদ্বয় পাছে তাহাকে আক্রমণ করিয়া সন্তানগুলি অপহরণ করিয়া লয়, এই ভয়ে ভীত হইয়া আর্তনাদ করিতেছে। তখন তিনি বাঘিনীকে বলিতে লাগিলেন—তােমার কোন ভয় নাই। তুমি শিশুসন্তান লইয়া সুখে নিদ্রা যাও; আমরা ব্রহ্মচারী, আমাদের হইতে তােমার কোন আশঙ্কা নাই, আর চীৎকার করিও না, এখন ক্ষান্ত হও ইহার পরে বাঘিনীর ঐরূপ চীৎকার অল্পে অল্পে শান্ত হইয়া কাননের নিস্তব্ধতা সম্পাদন করিল। এইভাবে মনুষ্য ও ব্যাঘ্র স্বস্বস্থানে সেই দিন অতিবাহিত করিল। পর দিন বাঘিনী পুনরায় চীৎকার আরম্ভ করিল; ব্রহ্মচারী কারণ জানিবার জন্য আবার গাঢ় চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন এবং জানিতে পারিলেন, বাঘিনী সবে এইবার মাত্র প্রসূতি হইয়াছে, পূৰ্বে আর প্রসব করে নাই। তাহাতেই সন্তানগুলিকে কিরূপে রক্ষা করিতে হইবে বুঝিতে পারিতেছে না। এদিকে ক্ষুধায় কাতর হইয়া 5 ৭০ ধৰ্ম্মসারসংগ্রহ সন্তানগুলিকে কোথায় রাখিয়া আহার সংগ্রহ করিবে, এই সমস্যায় পড়িয়া চীৎকার করিতেছে। তখন ব্রহ্মচারী উঠিয়া বাঘিনীকে বলিতে লাগিলেন—'তুমি সন্তানগুলি এখানে রাখিয়া শীকার করিতে যাও, ছেলেদের জন্য কোন আশঙ্কা করিও না। আমি উহাদিগকে রক্ষা করিব। এই সকল কথা যেমন মনে মুখে বলিতে লাগিলেন, তেমনি আবার হাত দিয়া ইসারা করিয়া নিজ মনের ভাব তাহার অন্তরে প্রেরণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ব্রহ্মচারী বারংবার ঐরূপ করিলে পর ব্যাঘ্ৰী তাহা মানিয়া একাকিনী শীকারে বহির্গত হইল। ব্রহ্মচারীরা আপন আপন ব্যাপারে নিবিষ্ট হইলেন। ঐ পাহাড়ে তাহারা ফলমূল মাত্র ভক্ষণ করিতেন। অনেকক্ষণ পরে বাঘিনী দুই তিন বার আওয়াজ করিয়া ক্ষান্ত হইল। ব্রহ্মচারী বুঝিলেন বাঘিনী বলিতেছে-- ‘আমি আসিয়া চার্জ গ্রহণ করিলাম, তুমি অবসর গ্রহণ কর। ইহার পরে পুনরায় আহারান্বেষণের সময় হইলে, যখন যখন ব্যাস্ত্রী সন্তানদিগকে আবাসে রাখিয়া বহির্গমন করিত, তখন ব্রহ্মচারীকে জানাইয়া যাইত-‘আমি শীকারে চলিলাম, তুমি শিশুদিগকে রক্ষা করিও। এই ভাবে ব্ৰহ্মচারিদ্বয় তিন চারি দিন তথায় কাটাইয়া, সে স্থান পরিত্যাগ করিয়া চলিলেন। তঁাহারা প্রায় এক মাইল পথ অতিক্রম করিলে পর ব্যাশ্রীর প্রচণ্ড রব শুনিতে পাইলেন ; যত পথ অতিক্রম করেন, ততই তাহার চীৎকার শুনেন। তখন লােকনাথ বেণীমাধবকে বলিলেন, ‘বেণী। আজ যাওয়া হইল না, বাঘিনীর বড় কষ্ট হইয়াছে ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। * AE আর কিছুকাল এখানে থাকা যাউক। বেণী তাহাতে দ্বিরুক্তি করিলেন না। উভয়ে যাইয়া পূর্বস্থানে উপনীত হইলেন এবং বাঘিনীকে বলিলেন—“যত দিন তােমার ছেলেরা তােমার সঙ্গে যাইতে না পারিবে, ততদিনের জন্য আমরা এখানে রহিয়া গেলাম। তুমি আর দুঃখ করিও না; এখন ক্ষান্ত হও। বাঘিনী চুপ করিল। তদবধি ব্যাঘ্ৰী শীকারে যাইবার সময়ে ব্রহ্মচারীকে পূর্বের মত বলিয়া যাইত এবং ফিরিয়া আসিয়া গর্জন করিয়া আপনার প্রত্যাগমন বার্তা জানাইত। এইরূপ একমাস গত হইলে ব্রহ্মচারী দেখিলেন, বাচ্চাগুলি বাঘিনীর সঙ্গে সঙ্গে যাইতেছে, কিন্তু কিছু দূর যাইয়া ফিরিয়া আসিল। অহার পর, একদিন বাঘিনী যখন শীকারে চলিল, শাবকগুলিও ' সঙ্গে সঙ্গে গেল। সে দিন আর পথ হইতে ফিরিয়া আসিল না। ব্রহ্মচারী তখন আপনার অঙ্গীকার প্রতিপালিত হইয়াছে ভাবিয়া সেস্থনি হইতে প্রস্থান করিলেন।” (ঘ) “তাহার নিকট রাশি রাশি পিপীলিকা উপস্থিত হইত, তিনি কখন পরিচারকদিগকে ডাকিয়া বলিতেন, ইহাদিগকে কিছু খাইতে দাও। কখনও বা মুখ পাতিয়া অস্ফুট- স্বরে পিপীলিকাদিগকে কি বলিতেন, আর তাহারা প্রস্থান করিত।” (ঙ) “এক সময়ে তাহার কৃষিকাৰ্য্য করিতে সখ হইয়াছিল। ভূম্যধিকারীরা তাঁহার আশ্রিত, অবিলম্বে তাহা সম্পাদিত হইল। ক্ষেত্রে চাষ ও ধান্ত বপন যথা সময়ে সম্পন্ন হইল। চারাসকল ৭২ ধর্মসার-সংগ্রহ। পরিণত হইয়া যখন ধান্য প্রসব করিল, তখন পােষিত শূকর সকল ছুটিয়া গিয়া তাহা পয়মাল করিতে লাগিল। তাহার আশ্ৰমস্থ রক্ষিগণ যষ্টি সংগ্রহ পূর্বক, শূকরদিগকে প্রহার করিবার জন্য প্রস্তুত থাকিত। ক্ষেত্রে শূকরপ্রবেশের শব্দ পাইয়া, যষ্টি হস্তে করিয়া গিয়া দেখিত, তাহাদের আগমনের পূর্বেই বরাহগণ প্রস্থান করিয়াছে। এক দিনও তাহাদিগকে ক্ষেত্রে দেখিতে পাইত না ; শূকরেরা যেন দূতমুখে রক্ষীদের আগমনের সংবাদ শুনিয়া পলায়ন করিত। আশ্রমবাসীরা ইহার কারণ স্থির করিতে না পারিয়া বিস্মিত হইত এবং আপনারা বলাবলি করিত। ব্রহ্মচারীর একজন পার্শ্বচর ভক্ত এই রহস্য ভেদ করিয়াছিলেন যে ব্রহ্মচারী স্বয়ং আশ্রমে বসিয়া বরাহদিগকে পলায়ন করিতে বলিয়া দেন। তিনি স্বকর্ণে শুনিয়াছিলেন রক্ষীরা যখন লাঠি লইয়া তাড়া করার জন্য আশ্রম হইতে বহির্গত হইত, তখন ব্রহ্মচারী শূকরদিগকে সম্বােধন করিয়া চুপি চুপি বলিতেন-‘তােমরা শীঘ্র প্রস্থান কর; তােমাদিগকে মারিতে আসিতেছে।” (৯) ব্রহ্মচারীর দৃষ্টিশক্তিও অদ্ভুত ছিল। এই ১৫০ কি ১৫৫ বৎসর বয়সেও তাহার চক্ষুর তেজঃ এবং দৃষ্টিশক্তির তীব্রতার অণুমাত্র হ্রাস হয় নাই। তাঁহার চক্ষুদ্বয় এক প্রকার দূরবীক্ষণ বা অণুবীক্ষণ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তাঁহার শৰীরের গঠন সাধারণ মনুষের মত হইলেও চক্ষুদ্বয় এক অভিনব আকারে গঠিত হইয়াছিল। অথবা যােগের প্রক্রিয়াবিশেষ দ্বারাই,

ধর্মসার-সংগ্রহ।
৭৩
viruf
says • ?
অলৌকিক আকার ধারণ করিয়াছিল। যাহারা জীবিতাবস্থায়
তাঁহার চক্ষুর দিকে দৃষ্টিপাত করিয়াছেন, অথবা যাহারা তাহার
ফটো অভিনিবেশ সহকারে লক্ষ্য করিয়াছেন, তাহারা সকলেই
এবিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করিবেন। তঁাহার নেত্র অতীব বিশাল ও
তেজস্বী ছিল। ভারতী লিখিয়াছেন—“আমরা স্থির দৃষ্টিতে
চাহিলে আমাদের উভয়নেত্রের তারকাযুগল চক্ষুর মধ্যস্থলে
অবস্থান করে, কিন্তু লােকনাথ চক্ষুঃ স্থির করিলে তাঁহার
উভয় নেত্রের তারকা আসিয়া নাসিকার পার্শ্বে সংলগ্ন হইত।”
শ্ৰীযুক্ত জানকিনাথ চক্রবর্তী বলিয়াছেন—“তাহার চক্ষুর তেজ
সাধারণ লােকে সহ করিতে পারিত না। ১৬১৭ বৎসরের ছেলেরা
ব্ৰহ্মচারীর চক্ষুর দিকে চাহিয়া আড়ষ্ট হইয়া যাইত।
তঁাহার চক্ষুর নিকট দূরবীক্ষণ যন্ত্রও লজ্জা পাইত। একদা
ব্রহ্মচারীকে কোনও ফৌজদারী মােকদ্দমায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য
নারায়ণগঞ্জের মেজিষ্ট্রেটের কাছারীতে নেওয়া হইয়াছিল।
মেজিষ্ট্রেট জিজ্ঞাসা করিলেন—“বয়স কত ?? ব্রহ্মচারী (বলিলেন)
১৫০ কি ১৫৫। মােক্তারেরা বলিলেন—এ আদালত এখানে
এরূপ অসম্ভব কথা বলা চলে না। ব্রহ্মচারী (বলিলেন)
আচ্ছা, যাহা সম্ভব হয় লিখিয়া লও। তখন ৭৭৫ বৎসর
লিখিয়া অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর লওয়া হইল। ইহার পরে বিপক্ষের
মােক্তারের জেরা করার সময় আসিল। বিপক্ষের মােক্তার
দেখিলেন—এই সাক্ষীর স্বয়ং ঘটনা প্রত্যক্ষ করার প্রসঙ্গ
উড়াইয়া দিতে হইবে। সাক্ষী আপনাকে অতি বৃদ্ধ বলিয়

। “৭৪ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। প্রতিপন্ন করিতে চাহেন, দেখিয়া সেইদিকে ঝোঁক দিয়া প্রশ্ন করিলেন—“আপনিত বলিয়াছেন, দেড়শত বৎসরের বৃদ্ধ, তাহা হইলে দৃষ্টিশক্তি খুব কমিয়া গিয়াছে, অতদূর পর্যন্ত আপনার দৃষ্টি অবশ্যই চলে না। ঘটনাটী অতদূর হইতে অবশ্যই দেখিতে পান নাই। ব্রহ্মচারী পরিষ্কার উত্তর দেওয়ার জন্য বিপক্ষের মােক্তারকে নিকটে আনয়ন পূর্বক দূরে একটী বৃক্ষ দেখাইয়া বলিলেন—'ঐ বৃক্ষটীতে কোন প্রাণী আরােহণ করিতেছে এমন দেখা যায় কি ? মােক্তার বলিলেন—‘না’ । ব্রহ্মচারী (বলিলেন) ‘তােমরা যুবক, কিছুই দেখিতে পাইতেছ না? আমি এখান হইতে দেখিতে পাইতেছি একদল লাল পিপড়া শ্রেণীবদ্ধ হইয়া ভূতল হইতে বৃক্ষের ঊর্ধদিকে আরােহণ করিতেছে। কাছারী শুদ্ধ লােক একথা শুনিয়া বিস্ময়ােফুল্ল চিত্তে সেই বৃক্ষের প্রতি নিরীক্ষণ করিতে লাগিল; অনেকে বৃক্ষের তলায় গিয়া লাল পিপড়ার শ্রেণীকে উর্ধে উঠিতে দেখিয়া আসিল।” তাহার চক্ষু, মুর্তি ও বাক্যের এমনই এক স্বাভাবিক প্রভাব ও তেজঃ ছিল, যে দেখিয়া ও শুনিয়া অধাৰ্মিক, পাষণ্ড, ও নাস্তিকের হৃদয়ও ভীত, কম্পিত, ও বিমুঢ় হইয়া পড়িত। ভারতী লিখিয়াছেন - “বারদীর কোন জমিদার লােকনাথের কৃপায় জমিদারদিগের মধ্যে খ্যাতনামা হইয়াছিলেন। তাঁহার মরণান্তর ঠাহর পুত্রের জমিদার হইলেন। জ্যেষ্ঠপুত্র গোঁয়ার গােবিন্দ ; স্থির করিলেন ব্রহ্মচারী কোন মন্ত্র বা ঔষধের বলে এত অঘটন ঘটাইয়া সকলের • • ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ৭৫ এক জন পূজা পাইতেছে। তাহা হইতে সেই সকল মন্ত্র বা দ্রব্য কাড়িয়া নিলেই ত আমি তেমন হইতে পারি। এই ভাবিয়া গোপনে লাঠিয়াল সংগ্রহ করিলেন। কারণ, তাহার সরিকেরা টের পাইলে, বাধা দিয়া দাঙ্গা বাঁধাইতে পারে। একদা গভীর রাত্রিতে লাঠিয়াল সহ ব্রহ্মচারীর আশ্ৰম আক্রমণ করিলেন । হিন্দুস্থানী সাধু আশ্রমে ছিলেন, তিনি যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইলেন অনেক অস্ত্রধারী সদরের সহিত একক কতক্ষণ যুঝিবেন ? তিনি জখমি হইয়া পড়িয়া গেলেন। তখন জমিদারনন্দন ব্রহ্মচারীর গৃহে প্রবেশ করিয়া তাহাকে আসন হইতে দুই হাতে তুলিয়া বলিলেন—'তাের ক্ষমতাপ্রকাশের যাহা যাহা আছে শীঘ্র আমাকে দে। নতুবা এখনি আছাড় দিয়া ফেলিব। সেই দুরাত্মাকর্তৃক সজোরে গৃহীত হইয়া লােকনাথ বলিলেন- দেখরে অমুক! এখনও আমার ক্রোধের উদয় হয় নাই। আমার ক্রোধ আসিলে কিন্তু আর কিছুতেই রক্ষা নাই। কথা গুলি যাইয়া জমিদার যুবকের অন্তস্তল এতই স্পর্শ করিল যে সে দ্বিরুক্তি না করিয়া তৎক্ষণাৎ আশ্রম হইতে প্রস্থান করিল। অন্যান্য হিস্যাতে এই সংবাদ গেলে, পরদিন আহত সাধুকে লইয়া প্রবল মামলা মােকদ্দমা চলিতে আরম্ভ করিল।” (১০) লােকনাথ ইচ্ছা করিলেই রােগীকে দর্শন মাত্র নারোগ করিয়া দিতে পারিতেন। এই জন্য দিগদিগন্ত হইতে ছোট বড়, শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনী নিধন, কত ব্যক্তি যে তাহার আশ্রমে আসিয়া পড়িয়া থাকিত তাহার ইয়ত্তা নাই। তিনি ৭৬ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। যাহাকে অনুগ্ৰহ করিতেন সে ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ তাহার প্রসাদ পাইয়া রােগমুক্ত হইয়া চলিয়া যাইত। যে বারদীতে ইতিপূর্বে বর্ষে বর্ষে ওলাউঠা, জ্বর, বসন্ত প্রভৃতি সাময়িক উৎকট রােগে শত শত লােক অকস্মাৎ কালকবলে পতিত হইত, তাহার আগমনে সেই গ্রামে আর ঐ সকল রােগের উৎপাত এককালেই দৃষ্ট হয় নাই। সিদ্ধ জীবনীর প্রণেতা ভারতী মহাশয় লিখিয়াছেন- “আমার জিজ্ঞাসা মতে লােকনাথ বলিয়াছেন—“আমার ইচ্ছা হইয়াছিল যে আমি মড়া বাঁচাইয়া দিতে পারি কিনা দেখি। তদবধি হার নিকট মৃতকল্প রােগী সকল আসিতে থাকে এবং আরােগ্য লাভ করিয়া চলিয়া যায়। এই সকল ঘটনা প্রকাশ পাওয়াতে চতুর্দিক হইতে রােগী সকল আসিয়া তাহার আশ্ৰমটীকে বড় রকমের একটি হাস্পাতাল করিয়া তুলিল। তখন (তিনি) দেখিলেন—এসকল তাহার সংসার হইয়া পড়িতেছে। তিনি আর ত পরােপকারব্রতের কর্তব্য জ্ঞানে বদ্ধ ছিলেন না; এজন্য রােগী আসিতে নিষেধ করিতে লাগিলেন। রােগীরা সে কথা শুনিবে কেন ? তিনি যতই নিষেধ করেন, ততই রােগীদিগের আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। নূতন রােগী আসিলে বলিতে লাগিলেন—‘তােমার পড়াির কথা শুনিলাম, আমার কিন্তু বৈদ্যশাস্ত্র পড়া নাই; তােমরা ডাক্তার কবিরাজের নিকট যাও আমি ভবয়ােগের বৈদ্য, সেই বােগ আরামের জন্য কেহ আইসে কেন ? তাহারা কিন্তু কাকুতি মিনতি করিয়া পড়িয়া থাকিত। লােকনাথ মিষ্ট বাক্যে কত বুঝাইতেন। তাহারা ভাবিত * ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ৭৭ এরূপ.বলা সাধুদের রীতি। তিনি বিনয় সহকারে বলিতেন- ‘আমি অনায়াসে যদি তােমাদিগকে ভাল করিয়া দিতে পারি, তবে পাপিষ্ঠের মত এত নিষেধ করিব কেন ? রােগীরা ও তাহাদের আত্মীয়েরা এসকল কথা কথার মধ্যেই ধরিত না। ( একদা) একজন বলিয়াছিল - ‘আপনি বাসিদ্ধ, বাক্য পাইলেই রােগ যায়। লােকনাথ বিরক্তি সহকারে বলিলেন- “আমি মুখের কথা বলিলেই রােগ যাইবে? আচ্ছা আমি একটা বাক্য ব্যয় করিলেই যদি তােমরা তুষ্ট হইয়া যাও, তবে তাহাতে আমি নারাজ হইব কেন? এইত বলিতেছি—উহার রােগ দুর হউক, রােগ দূর হউক, রােগ দূর হউক। এখন তুষ্ট হইলে ত ? তবে আমাকে ছাড়িয়া দাও। আমি এই সকল ব্যবহার দেখিয়া কিছুই স্থির করিতে পারি নাই। পূর্বে শুনিয়াছিলাম-তিনি রােগীর রােগ নিজে লইয়া অল্পকাল ভােগ করিতেন, তাহাতেই রােগ যাইত। কিন্তু দেখিতাম, তিনি কাহারও রােগ লইয়া ভুগিলেন না, অথচ রােগীরা রােগমুক্ত হইল। তখন আমি কিছুই মৰ্ম্মোদ্ধার করিতে না পারিয়া, রােগীদের পক্ষ হইয়া বলিলাম—রােগীরা এখানে আসিয়াছে, তুমি তাহাদিগকে তাড়া- ইয়া দিবার কে? তােমার মনে তুমি থাক, রােগীদের মনে রােগীরা থাকুক, তোমার এত আপত্তি কেন? লােকনাথ বলিলেন- “উহারা যে আমাকে লক্ষ্য করিয়া আমার শরণাপন্ন হয়, তাহাতে আমি সুস্থির থাকিতে পারি না ; উহাদের দুঃখ দেখিয়া অন্তঃকরণ আর্দ্র হইয়া যায়; অতএব উহাদের দুঃখে

৭৮
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
{:
আমারও দুঃখ বােধ হয়। আমি বলিলাম-“তুমি রােগীর
রােগ নিজে লও না দেখি, অথচ রােগীরা আরােগ্য লাভ করে
কিরূপে?”
উত্তর।-রােগীর উপর আমার দয়া আসিলেই আমার শক্তি
দ্বারা রােগ দূর হইয়া যায়।
প্রশ্ন।-তােমার দয়া হয় কি করিলে ?
উঃ-আমাকে তুষ্ট করিলে।
প্রঃ।-তুমি তুষ্ট হও কিসে?
উঃ।—তাহা আমি জানিনা ও বলিতে পারি না।
রুগ্ন অবস্থায় তাহার নিকট যাহারা যাইতেন তাহারা প্রায়ই
মৃতকল্প ও ডাক্তার কবিরাজের পরিত্যক্ত রােগী। রােগীরা
যখন বহু চেষ্টা করিয়া, বহু অর্থ ব্যয় করিয়া, দীর্ঘকাল চিকিৎসা
করাইয়া আরােগ্যলাভে নিরাশ হইয়াছে, তখনই তাঁহার শরণাপন্ন
হইয়াছে। আমরা এইরূপ কয়েকটী রোগীর বিবরণ যাহা বিশ্বস্ত
সূর্বে অবগত হইতে পারিয়াছি এস্থলে তাহা দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিয়ে
প্রকাশ করিলাম ।
১। কলিকাতাস্থ হাটখােলার প্রসিদ্ধ মহাজন বাবু
সীতানাথ দাস বাতব্যাধিগ্রস্থ হইয়া বহু অর্থ ব্যয় করিয়াও যখন
ভাক্তার কবিরাজের চিকিৎসায় আরােগ্য লাভ করিতে পারিলেন
না, তখন জীবনের আশায় জলাঞ্জলি দিয়া বারদী আসিয়া ভক্তি
সহকারে ব্রহ্মচারিবাবার পদে আশ্রয় লইলেন এবং কিছুকাল
তাঁহার আশ্রমে থাকিয়া তদীয়কৃপালাতে কৃতার্থ হইয়া কেবল

ধর্মসার-সংগ্রহ। তাঁহার প্রসাদ ভক্ষণ করতঃ অচিরে উৎকট রােগ হইতে সম্পূর্ণ রূপে আরােগ্য লাভ করিয়া চলিয়া যান। ২। ঢাকা নগরের দক্ষিণ-পার্শ্ববর্তী পানিয়াগ্রামনিবাসী বাবু রাধিকা মােহন রায় মহাশয় বাতব্যাধি রােগে আক্রান্ত হইয়া দীর্ঘকাল অচল অবস্থায় কাল যাপন করেন। কবিরাজী ও ডাক্তারী প্রভৃতি নানাবিধ চিকিৎসা করাইয়াও যখন কোন ফল পাইলেন না, তখন বারদী যাইয়া ব্ৰহ্মচারিবাবার আশ্রমে পড়িয়া থাকেন। এবং অত্যল্পকাল মধ্যেই তঁাহার কৃপালাভ করিয়া প্রসাদ পাইবার আদেশ প্রাপ্ত হন। প্রসাদভক্ষণের পর হইতেই কয়েক দিনের মধ্যে নিঃশেষে রোগমুক্ত হইয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। এই ঘটনা তাহার ঢাকাবাসী বন্ধুগণ সকলেই অবগত আছেন। রাধিকাবাবু বাবার কৃপায় য়ােগ শান্তি লাভ করিয়া- ছিলেন, অবশেষে আদেশ লঙ্ঘনে পুনরায় রােগ ভােগ করিয়া, পরলােক গমন করিয়াছেন । ৩। বারদীর অন্যতম জমীদার বাবু কাশীকান্ত নাগ মহাশয় ঢাকাস্থ ছােট বড় অনেকের নিকটেই সুপরিচিত। তিনি ঢাকাতে মুনসে কোর্টে ওকালতী করিতেন। এক সময়ে কঠিন উদরাময় রােগে তাহার জীবন সংশয়িত হইয়া পড়ে। কোনরূপ চিকিৎসায় কোন ফল হয় না। শরীর জীর্ণ শীর্ণ ও কঙ্কালবিশিষ্ট হইয়া যায়। দাড়াইবার বা বসিবারও শক্তি ছিল না। মল- ধারণের শক্তি এককালেই লুপ্ত হইয়াছিল। এই অবস্থায় কাশীবাবু সস্ত্রীক বারদীর বাবার আশ্রমে যাইয়া তাহার পদতলে

ধর্মসার-সংগ্রহ
ইত হইয়া পড়িলেন। তাঁহার সহধর্মিণী স্বামীর জীবনের
জন্য বাবার চরণে পড়িয়া অতি কাতর ভাবে ক্রন্দন করিতে
লাগিলেন। তখন বাবার হৃদয়ে কৃপার উদ্রেক হইল। সেই
সময়ে বাবার পার্শ্বেই কোন ভক্তের প্রদত্ত একটী বৃহৎ আনারস
বিদ্যমান ছিল। বাবা রােগীর দিকে সকরুণ দৃষ্টিপাত পূর্বক
তাহাকে ইঙ্গিত করিয়া বলিলেন-“আনারস খাইতে ইচ্ছা হয় ?
রােগী কিছু না বলিয়া সতৃষ্ণ নয়নে আনারসের দিকে তাকাইয়া
রহিলেন।
তখন বাবা পরিচারকদিগকে ডাকিয়া কহিলেন—
“এই আনারসটা কাটিয়া এই নাগ বাবুকে খাইতে দাও”।
আদেশমতে রােগীকে অানারস খাইতে দেওয়া হইল । রোগী
বহুদিনের উপবাসীর ন্যায় সেই বৃহৎ আনারসটী সম্পূর্ণ উদরস্থ
করিলেন। তাহার কিঞ্চিন্মাত্রও উদর হইতে নিঃসৃত হইল না।
সেই হইতেই রােগীর সুদীর্ঘ কালের জীবনসংশয় উদরাময়
( গ্রহণী ) চিরদিনের জন্য চলিয়া গেল। (এই ঘটনা ঢাকাস্থ
কিশােরীলাল জুবিলী স্কুলের হেড় পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত রজনীকান্ত
আমীন বেদান্ত বাগীশ মহাশয়, কাশীবাবু ও তাহার সহধর্মিণী
উভয়ের মুখে শুনিয়া আমাদিগকে জানাইয়াছেন)।
প্রদানের ভার কবিরাজকে দিয়া, পথ্য বা সুপথ্য দিবার
অধিকার নিজ হস্তে রাখিয়াছিলেন।
আমার সুপরিচিত ও বিশ্বস্ত বন্ধু, ষােলঘর নিবাসী
শ্ৰীযুক্ত দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বলিয়াছেন-“আমার
ব্লাক রাধাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় উদরী রােগে আক্রান্ত হইয়া মুমু
বাবা ঔষধ
৪।

ধর্মসার-সংগ্রহ। ৮১ হইয়া পড়েন। প্রায় ২২/২৩ বৎসর অতীত হইল আমরা তাঁহাকে লইয়া বারদী গমন করি। রাধাচরণের পত্নীরও মৃতবৎসাদোষ ছিল, তিনিও এই সঙ্গে বারদী গমন করিয়াছিলেন। ব্রহ্মচারীর আশ্রমের প্রাঙ্গণের দক্ষিণপার্শ্বে একটি বিশ্ববৃক্ষ ছিল। সেই বৃক্ষের নীচেই আমাদের বাসস্থান নির্দিষ্ট হইল। রাধাচরণ কয়েক দিন তথায় থাকিয়া ব্রহ্মচারিবাবার অলৌকিক শক্তিপ্রভাবে বিনা ঔষধেই সেই অসাধ্য রােগের করাল কবল হইতে সে যাত্রা পরিত্রাণ পাইল। রাধাচরণের সহধর্মিণীও আশ্রম হইতে প্রত্যাগত হইবার পরেই ক্রমে তিনটা সন্তান প্রসব করিয়াছেন। তাহারা সকলেই তাহার কৃপায় এযাবৎ জীবিত আছে। মৃতবৎসার ষে আর তাহাকে এযাবৎ স্পর্শ করিতে পারে নাই।” বারদীর ব্রহ্মচারীর কথামাত্র রােগীর রোগ দেহ ছাড়িয়া পলায়ন করিত। আমরা এই সম্বন্ধে শত শত ঘটনার উল্লেখ করিতে পারি। তবে যেগুলি বিশ্বাসযােগ্য, তবে যেগুলি বিশ্বাসযােগ্য, সত্যনিষ্ঠ লােকের মুখে শুনিয়া জানিতে পারিয়াছি, পাঠকদিগের প্রত্যয়ের জন্য তাহারাই কয়েকটী ঘটনা এই স্থানে উল্লেখ করিতেছি। নিম্নলিখিত ঘটনা কয়টী ঢাকার পেসেপ্রাপ্ত ডিপুটীমাজিষ্ট্রেট শ্ৰীযুক্ত রায় চন্দ্রকুমার দত্ত বাহাদুর মহাশয় নিজে প্রত্যক্ষ করিয়া স্বহস্তে লিখিয়াছেন :- “আমি আমার রুগ্ন। স্ত্রীকে লইয়া ব্রহ্মচারিবাবার নিকট যাই। তখন রােগিণীর বাগ্‌রােধ হইয়াছে, আহার নাই, নিদ্রা নাই, এরূপ অবস্থা যে আহার মুখে দিলে থুথু করিয়া দুরে ২ ধর্মসার-সংগ্রহ। ফেলিয়া দেয়। ডাক্তারী, কবিরাজী প্রভৃতি অনেক চিকিৎসার পর শান্তি স্বস্ত্যয়ন, যাগ যজ্ঞ প্রভৃতিও অনেক করাইয়াছিলাম, কিছুতেই কোন ফল না হওয়ার পর বাবার নিকট যাইয়া তাহার চরণে স্ত্রীকে সমর্পণ করিলাম। দিনের বেলায়ই বারদী যাইয়া উপস্থিত হইলাম এবং দিন থাকিতেই অনেক কথার পর * বাবা শ্ৰীযুক্ত চন্দ্রকুমার বাবু যখন তাহার স্ত্রীকে নিয়া বাবার নিকট উপস্থিত হন তখন বাবার অন্যতম প্রিয় শিষ্য শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত ব্রহ্মচারী মহাশয় বারার চরণপ্রান্তে উপবিষ্ট ছিলেন। এখানে লিখা হইয়াছে “অনেক কথার পরে” কিন্তু কি কি কথা বলা হইয়াছিল বলা হয় নাই। চন্দ্রকুমার বাবুর সঙ্গে বাবার এই সময় বড়ই একটী ভাল কথা হইয়াছিল। তাহা আমরা উক্ত রজনীকান্ত ব্রহ্মচারী মহাশয়ের নিকট শুনিয়াছি। ঐ কথাটী উল্লেখ করিবার প্রলােভন এড়াইতে পারিলাম না। চন্দ্রকুমার বাবুর ব্যগ্রতা ও আগ্রহ দেখিয়া বাবা বলিলেন, “আমি ব্রাহ্মণ হইয়াছি কি না তাহা পরীক্ষা করিবার জয় বাক্যদ্বার চৌরানব্বইটা উৎকট ব্যাধিগ্রস্থ ব্যক্তিকে আরােগ্য করিয়াছি ; এইক্ষণ আর আমার সেই স্পৃহা নাই। যদি কেহ ইচ্ছা করাইয়া নিতে পারে তবে এখনও আরােগ। হয়। ইহার পরে চন্দ্রকুমার বাবু জিজ্ঞাসা কর্নিলেন, “ইচ্ছা করাইয়া নেয় কিপ্রকারে ?” ইহার উত্তরে বাবা বলিয়াছিলেন “যে ক্ষুং নিবারণের জন্য যেরূপ দেহের প্রয়ােজন বোধ, বিষ্ঠা মূত্র ত্যাগের জন্য যেমন দেহের প্রয়ােজন বোধ, ঠিক সেইরূপ প্রয়ােজন বোধ যায় আমার জন্য থাকে, সে এখনও আমার ইচ্ছা করাইয়া নিতে পারে।” বাবার এই শিষ্য মুক্ত রজনীকান্ত ব্রহ্মচারী, মহাশয় পূর্বে ঢাকা ১ম সবজজকোর্টের শেরেস্তাদার ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা, ফরিদাবাদে “যোগাশ্রম” প্রতিষ্ঠা করিয়া বাবার উপদেশানুসারেই যােগজীবন যাপন করিতেছেন। তাহার সঙ্গে বাবার যে সকল কথাবার্ত্তা হইয়াছে তাহা তিনি অবিকল সেই ভাষায় ও ভঙ্গীতে ঠিক ঠিক ভাবে আবৃত্তি করিতে পারেন। সেই সকল কথা বার্তা শ্রীযুক্ত রজনী ব্রহ্মচারী মহাশয়ের একজন কৃতবিদ্য শিষ্য বৃহৎ পুস্তকাকারে প্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। পাঠকগণের ঔৎসুক্য সেই পুস্তক পাঠ করিয়া বা তাহার সঙ্গে ঢাকা ফরিদাবাদ যােগাশ্রমে দেখা করিয়া নিবৃত্তি হইতে পারে।”

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। j4 বলিলেন—“রাখিয়া যাও। সে যাত্রায় ভাল নৌকা সঙ্গে না থাকায় অনুমতি লইয়া বাড়ী চলিয়া আসিলাম এবং ভাল নৌকা ভাড়া করিয়া লােকজন সঙ্গে দিয়া ৫৭ দিনের মধ্যেই বারদী পাঠাইলাম। সঙ্গে খাওয়ার জিনিস পত্র সকলই দিয়া দিলাম। কিন্তু আমার স্ত্রীর প্রতি বাবার আশ্রমেই প্রসাদ পাওয়ার আদেশ হইল। এই সময়ে স্ত্রী কিছুই খাইতেন না। সেই অবস্থায় তিন মাস তথায় বাস করিলেন। ইতিমধ্যে আমি দুই তিন বার তথায় গেলাম। পূজার ছুটীতেও তথায় গিয়াছিলাম। তখন পুত্র প্রভৃতিকে সঙ্গে লইয়া যাই। এই সময় আমার ছােট পুত্রের বয়স ৪ বৎসর। মধ্যম পুত্রের আমাশয়ের ব্যারাম ছিল। এই যাত্রায় গিয়া দেখিতে পাইলাম স্ত্রী বড় স্বরে কথা বলিতেছেন। নৌকার মধ্যে ও বাহিরে এবং নদীতীরে প্রায় দুইশত লােক একত্র হইল এবং বােবায় কথা কহিতেছে দেখিয়া সকলেই যার পর নাই বিস্মিত হইল। রাত্রিতেই মােসই আশ্রমে চলিয়া গেলাম। গােসাঁই ঘরের অভ্যন্তরে ছিলেন; ডাকিয়া অবস্থা জানাইয়া, এখন কি করা কর্তব্য এই বিষয়ে অনুমতি চাহিলাম। ঘরের ভিতরে থাকিয়াই বলিলেন-“নিয়া যাইতে চাই’? উত্তরে বলিলাম—তােমার উপরে নির্ভর, তুমি যা বল তাই করিব। (বলা বাহুল্য তিনি আমাকে তুই বলিয়া এবং আমি তাহাকে ‘তুমি’ বলিয়া বলিতাম। তখন তিনি বলিলেন- একথাও কথা নয়, কাল হয়ত এত কথা থাকিবে না। কয়েক দিন রাখিয়া যা। তদনুসারে আমি তাহাকে তথায় আরও

৪
ধর্মসার-সংগ্রহ।
AAAAAAA••*
রাখিয়া চলিয়া আসিলাম। ইহার পর তিনি একমাস বাবার
আশ্রমে ছিলেন, একমাস অতীত হইলে তাহার আদেশানুসারে
বাড়ী লইয়া আসি। তখন তিনি অল্প অল্প কথা বলিতে পারিতেন।
বাবা বলিয়া দিয়াছিলেন ক্রমেই কথা স্বাভাবিক হইবে। তাহার
আদেশ মতে পরে কথা স্বাভাবিক হইয়াছিল এবং ২০ বৎসর
পর্যন্ত এই ব্যায়ামের কোন চিহ্নও ছিলনা। কিন্তু ইদানীং হঠাৎ
আবার সেই ব্যারাম উপস্থিত হইয়াছে। গােসই বর্তমান
নাই, তথাপি তাহার নামেই আছেন, কোন রকম চিকিৎসা
করাইতেছি না।
যে পুত্রের অমাশয় ব্যায়াম লইয়া যাই, তাহাকে আদেশ
করিয়াছিলেন--“তাের ঐ রােগা ছেলে আমার এখানে প্রসাদ
পাইবে, তােদের কোন জিনিষ ইহাকে খাওয়াই না। দুই দিন
প্রসাদ খাইয়াই আমাশয় সারিয়া গেল, আর কোন ঔষধের
প্রয়ােজন হইল না।
উহাকে যখন ব্রহ্মচারীর নিকট রাখিয়াছিলাম তখন আবার
আমার ৪ বৎসর বয়স্ক পুত্রটীর হঠাৎ ভয়ানক জ্বর হইল।
প্রথম দিন বাবাকে কিছুই বলি নাই। কাহারও নিকট হয়ত
উহার জ্বরের কথা শুনিয়া থাকিবেন, তাই পরদিন প্রাতে আমাকে
গালি দিয়া বলিলেন-তাের ছােট ছেলের জ্বর হইয়াছে, আমার
নিকট বলিস্ নাই কেন? আমি উত্তর করিলাম-“তুমি রােগী
দেখিলেই চট, তাড়াইয়া দেও, যাহার আরাম হওয়ার সম্ভাবনা
নাই, তাহাকে (আমার স্ত্রীকে) তােমার চরণে ফেলিয়া রাখিয়াছি ;

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। পাছে ছেলের কথা বলিলে রাগ কর। জ্বর তাে চিকিৎসা করিলেই সারিতে পারে। তিনি গালি দিয়া বলিলেন—“উহাকে আমার নিকট আন্। আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“ওকে খাওয়াই কি ? আমি বলিলাম– ‘সাগু। পরে উহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিলেন এবং কহিলেন—‘সাগু খাওয়াইস্ না ; এ ওর মায়ের সঙ্গে এখানেই খাইবে, সে ওকে খাওয়াইয়া দিবে। আমার হার প্রতি অচলা ভক্তি ছিল, তাই বিশ্বাস করিলাম- ভাত খাইলে কোন অনিষ্ট হইবে না। দেখিলাম মটরের দা’ল চাতা কি জলপাই দিয়া পাক করিয়াছে, তা দিয়া আতপ চাউলের ভাত খাওয়াইল (আতপ চাউল ভিন্ন অন্য চাউল তথায় পাক হইত )। গােসাঁই তখন সাক্ষাতেই ছিলেন, বলিলেন— বিকালে এই পথ্য খাইবে, ইহাকে সাগু খাওয়াবি না, যাহা হয় আমার এখানেই খাওয়াইবি। সেইদিন বিকালে জ্বর বাড়িল, বাবাকে বলিলাম—জুর ৰাড়িয়াছে। তদুত্তরে তিনি বলিলেন-“কাল আর জ্বর থাকিবে , ভয় পাই না। বিকালেও আমার এইখানেই খাইবে, তাের নৌকার কিছুই খাওয়াইবি না। বিকালেও সেখানে খাইল, পর দিবস সকালে দেখিলাম জ্বর নাই। জিজ্ঞাসা করাতে বাবাকে বলিলাম-জ্বর নাই। পরদিনও সেখানে খাইল। বাবা বলিলেন—“ইহাকে কুইনাইন্ টুইনাইন্ খাওয়াইস না, ভাতই খাইবে। বাস্তবিক ইহাতেই ছেলেটী রােগ মুক্ত হইল। শ্ৰচন্দ্রকুমার দত্ত।

ধর্মসার-সংগ্রহ ঢাকা জিলায় মানিকগঞ্জ মহকুমার অধিবাসী একজন ডেপুটী মেজিষ্ট্রেটও এক সময়ে অসাধ্য মহারােগগ্রস্ত হইয়া অশেষ চিকিৎসা করিয়াও আরােগ্য বিষয়ে বিফলমনােরথ এবং জীবনাশায় নিরাশ হইয়া অবশেষে বারদী যাইয়া ব্ৰহ্মচারিবাবার পদযুগল আশ্রয় করেন এবং তাহার কৃপায় ও অলৌকিক প্রভাব বলে অবিলম্বে রোগমুক্ত হইয়া বন্ধুবর্গের নিকট তাহার যশঃ কীৰ্ত্তনকরিয়া সেই অপরিশোধ্য উপকার ও ঋণ কথঞ্চিৎ পরিশােধ করিয়াছিলেন। ( ঢাকার প্রসিদ্ধ গায়ক শ্ৰীযুত চন্দ্রনাথ রায় মহাশয় এই বৃত্তান্তটী আমাদের নিকট প্রকাশ করিয়া আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন। চন্দ্রনাথ বাবু বলিয়াছেন—“একদা আমি ঢাকা নগরে বুড়ীগঙ্গার তীরে বেড়াইতে গিয়াছিলাম, দেখিলাম ডেপুটী বাবু সর্বাঙ্গে মৃত্তিকা মাখাইয়া নদীর ঘাটে বসিয়া আছেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,-“কিগো ডেপুটী বাবু! আপনার এ দশা কেন ?” তদুত্তরে তিনি বলিলেন-“আমি দারুণ মহাব্যাধি রােগে আক্রান্ত হইয়া বরদীর মহাত্মা লােকনাথ ব্রহ্মচারীর নিকট গিয়াছিলাম। মহাপুরুষের কৃপায় সেই উৎকট ব্যাধি হইতে এখন সম্পূর্ণ আরােগ্য লাভ করিয়াছি। মহাপুরুষ বলিয়াছিলেন—কয়েক দিন গায়ে মাটি মাখিয়া বসিয়া থাকিও, তাহা হইলে পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা থাকিবে না। তাই মহাত্মার মহীয়সী শক্তির কথা সর্বসাধারণে প্রচারিত হইতে পারে এইজ মাটি মাখিয়া প্রকাশ্য স্থানে বসিয়া থাকি। অবিশ্বাসী শ্রদ্ধাবিহীন ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ৮৭ বহিমুখ লােকেরা জানুক যে এখনও ভারতে ঈদৃশ অলৌকিক শক্তিশালী মহাপুরুষগণ বিদ্যমান আছেন, তাঁহারা শ্রদ্ধাবানের নেত্রেই প্রকট হইয়া থাকেন। ব্রহ্মচারীর আশ্চর্য্য মহিমা ও ঐশী শক্তির পরিচায়ক এইরূপ যে কত শত ঘটনার কথা শুনিতে পাওয়া যায়, তাহার সংখ্যা করা যায় না। ঢাকা জজ আদালতের ভূতপূর্ব গবর্ণমেন্ট উকীল এবং ঢাকা কলেজের আইনশিক্ষার ভূতপূর্ব অধ্যাপক রায় ঈশ্বরচন্দ্র ঘােষ বি, এল, বাহাদুর ব্রহ্মচারিবাবার সম্বন্ধে ‘মহাত্মা বারদীর ব্রহ্মচারী”-শীর্ষক যে একখানি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ লিখিয়া আমাদের নিকট উপহার পাঠাইয়াছেন, তাহা অতঃপর লিখিত হইল। মহাত্মা বারদীর ব্রহ্মচারী। বর্তমান সময়ের শিক্ষা ও সংস্কারের বশবর্তী হইয়া আজকাল অধিকাংশ শিক্ষিত লােকই প্রাচীন আর্য ঋষিগণের ত্রিকালদর্শিতা ও অন্তৰ্য্যামিত্বে অবিশ্বাস করিয়া থাকেন অথবা বিশ্বাস করিতে চাহেন না। উপরি লিখিত মহাত্মার অলৌকিক শক্তি ও অদ্ভুত কাৰ্যকলাপ স্বয়ং প্রত্যক্ষ করিয়া আমার যে দৃঢ় প্রতীতি জন্মিয়াছে, তাহাতে এই সম্বন্ধে আধুনিক শিক্ষিত লােকদিগের তাদৃশ অবিশ্বাস ও সংস্কার যে নিতান্তই অমূলক ও ভ্রমাত্মক তদ্বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। এস্থলে আমরা আমাদের এই প্রতীতির প্রতিপােষক কয়েকটী ঘটনার কথা নিম্নে লিপিবদ্ধ করিতে বাধ্য হইলাম।

ধর্মসার-সংগ্রহ অন্যূন ৩৩ বৎসর অতীত হইল, একদা পৌষ মাসের কৃষ্ণা ত্রয়ােদশী কি চতুর্দশী দিন, আমি ও আমার বন্ধু ও আত্মীয় মৃত বাবু মহেন্দ্রকুমার ঘােষ মহাশয় (১) বারদীর উক্ত মহাপুরুষের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ করিতে যাই। মহাত্মা হয়ত পরীক্ষা করিবার অভিপ্রায়েই হউক, কি অন্য যে কারণেই হউক, আমাদিগের সহিত আলাপে প্রথমে অতি কঠোর ব্যবহার করিতে আরম্ভ করেন। কিন্তু কিয়ৎকাল পরেই আবার নিরতিশয় দয়া ও সদ্ব্যবহার দেখাইতে লাগিলেন। আমরা সমুদয়ে প্রায় ৯১০ জন লােক ছিলাম, সকলকেই যত্নপূৰ্ব্বক নিজ আশ্রমে আহার করাইলেন। আহারের সময় আমাকে বৃহৎ একবাটী দুগ্ধ ও ঈষৎ অপক্ক কয়েকটী সুরভী’ (সভরি) কলা খাইতে দেওয়াইলেন। আমার তখন উদরাময় রোগ ছিল। কিন্তু মহাপুরুষ সাক্ষাৎ উপস্থিত থাকাতে, আমি ঐ সকল খাদ্যদ্রব্য উপেক্ষা না করিয়া সমস্তই ভােজন করিলাম। মনে করিলাম- যখন মহাপুরুষের নিকট আসিয়াছি, তখন কোনও অসুখ না হইবারই সম্ভাবনা। আহারের পরে, আশ্রমস্থিত একটী বিশ্ব বৃক্ষের নিয়ে একজন বাতব্যাধিগ্রস্ত রােগী, তাহার সঙ্গের লােকজন সহ, যে শয্যাতে উপবিষ্ট ছিল, তাহারই একপ্রান্তে বসিয়া পান খাইলাম। সেই সময়ে আমার মনে এই কথার উদয় হইল—আমরা যখন এতগুলি লােক ব্রহ্মচারীর আশ্রমে = (১) ইনি ভূকৈলাসের রাজাদিগের জমিদারী বিভাগে সুপারিন্টেণ্ডেটের কাধে। নিযুক্ত ছিলেন ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। •••••••••• আহার করিলাম, তখন ইহাকে কিছু দেওয়া নিতান্তই সঙ্গত। সামাজিক নিয়মানুসারেও কোন ব্রাহ্মণের বাড়ীতে খাইতে হইলে আমার শ্রেণীর লােক প্রণামৗ স্বরূপ কিছু দিয়া থাকে। এইরূপ আলোচনা করিয়া পকেট হইতে ৪৫ টাকা প্রণামী উক্ত মহাত্মাকে দেওয়ার জন্য সঙ্কল্প করিলাম এবং সেই অভিপ্রায়ে তথা হইতে উঠিয়া পুনরায় উক্ত মহাত্মার নিকটে গিয়া বসিলাম। মহাপুরুষ তখন ঐ বিল্ববৃক্ষের সম্মুখস্থিত অঙ্গনের অপর প্রান্তে একখানি ছােট ফুকের ঘরের অভ্যন্তরে বসিয়াছিলেন। আমি যাওয়া মাত্রই অন্তর্যামী মহাপুরুষ তামার মনের উক্ত সঙ্কল্প জানিতে পাইয়া, আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন-“উকীল বাবু। তােমরা অনুগ্রহ করিয়া এখানে আসিয়া যে খাওয়া দাওয়া ও আমােদ প্রমােদ কর, সেই সকলই তােমাদের জিনিষ দ্বারাই হইয়া থাকে, ইহার কিছুই আমার নহে। এমন কৰ্ম্ম করিও না, এমন ভাব দেখাইও না, যাহাতে কেনা বেচা হয় ! এতদ্বারা স্পষ্টই বুঝিতে পারিলাম, বিশ্ববৃক্ষের নীচে বসিয়া আমি মনে মনে যে সঙ্কল্প করিয়াছি অন্তর্যামী মহাপুরুষ নিশ্চিত তাহা জানিতে পারিয়াছেন, এবং তাহাই করিতে আমাকে নিষেধ করিতেছেন। অতঃপর সেই দিন মহাত্মার সহিত আলাপ করিতে করিতে প্রায় চারি দণ্ড রাত্রি হইল। পৌষ মাস, কৃষ্ণপক্ষীয় চতুর্দশীর রাত্রি, চতুর্দিক ঘােতর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আমাদের সহিত দুইটী লণ্ঠন ছিল। আমরা চলিয়া আসিবার অনুমতি চাহিলাম। মহাপুরুষ শুনিয়া বলিলেন—মেঘনা নদীর ঘাটে তােমাদের

ধর্মসার-সংগ্রহ।
;
নৌকা, এখান হইতে যদিও ১৫ পনর মিনিটের বেশী ব্যবধান
নহে, তথাপি সঙ্গে একজন লােক দি; হয়ত তােমরা পথ ভুলিয়া
যাইতে পার। আমরা বলিলাম-আমরা ৯১০ জন লােক,
সঙ্গে দুইটা লণ্ঠন আছে, বারদী ছাড়িয়া গেলেই সম্মুখে ঘােট
একখানা মাঠ, তার পরেই নদীর ঘাট; লােক সঙ্গে দেওয়ার
কোনও প্রয়ােজন দেখিনা; আমাদের জন্য আপনার (মহাত্মার)
কোনও চিন্তা করিতে হইবে না। আমাদের পুনঃ পুনঃ নিষেধ
সত্ত্বেও তিনি নানা কথার অবকাশে, তিনবার আমাদের সঙ্গে
লােক দেওয়ার কথা উল্লেখ করিলেন। কিন্তু আমরা কোন
মতেই তাহা স্বীকার করিলাম না। ইহার পর আমরা তাহাকে
অভিবাদন পূর্বক আশ্রম হইতে বাহির হইয়া বারদী গ্রাম অতি-
ক্ৰম পূর্বক সন্নিহিত অনাবৃত ভূমিতে ( মাঠে) যাইয়া উপস্থিত
হইলাম। মাঠে নামিয়া বােধ হয় ৫৬ হাত মাত্র অগ্রসর
হইয়াছি, অমনি আমাদের সকলেরই যুগপৎ এমন দিগ্ভ্রম
জন্মিল যে কোথায় যাইব দক্ষিণ দিকে, তাহা না করিয়া, ক্রমে
পূৰ্বোত্তরমুখ হইয়া চলিতে থাকিলাম। অনেকক্ষণ পর্যন্ত ক্ষুদ্র
বৃহৎ লােষ্ট্র সমূহে নিরন্তর সমাকীর্ণ কৃষ্টভূমি ( চষাক্ষেত) সকল
পার হইয়া একস্থানে একটা আলাে দেখিতে পাইলাম। একবার
মনে হইল আলােটা কোনও নৌকার হইবে। পরক্ষণেই আবার
সারি সারি কতকগুলি আলাে দেখিয়া বােধ হইল, সেগুলি
কোনও মিঠাই দোকানের আলো হইবে । তখন আমরা আর
অধিকদূর অগ্রসর হইতে ক্ষান্ত থাকিয়া সঙ্গের ২৩টী লােককে

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
WA
AA
একটা লণ্ঠন সহকারে উহাদের নিকটে যাইয়া ঐ সকল আলো
কিসের দেখিতে বলিলাম। তাহারা কিছুদূর অগ্রসর হইয়াই
চীৎকার করিয়া বলিল—তাহারা সম্মুখে কিছুই দেখিতে পাইতেছে
। তথাপি প্রায় এক ঘণ্টার অধিককাল সেইদিকেই হাঁটিয়া
সম্মুখে অন্ধকারের মধ্যে জঙ্গলের মত কিছু অনুভব করিতে
লাগিলাম। অতঃপর মানুষের কথা বার্তার ন্যায় একটা শব্দ
শুনিয়া গ্রামবােধে শব্দানুসারে তত্ৰত্য লােকদিগকে ডাকা
ডাকি করিয়া পথের কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম। তাহাদের
মধ্যে দুই এক জন লােক আলাে সহকারে বহির্গত হইয়া
জিজ্ঞাসা করিলতোমরা কোথায় যাইবে ? আমরা উত্তর
করিলাম—‘বরদীর ব্রহ্মচারীর আশ্ৰম হইতে আসিয়াছি, মেঘনার
ঘাটে যাইব। আমাদের উত্তর শুনিয়া তাহারা কহিল--কোথায়
বা বারদী ! আর কোথায় বা মেঘনার ঘাট ! আর কোথায় বা
আপনারা আসিয়াছেন । আপনারা বারদীর বহুদূরে ( প্রায় এক
ঘণ্টা দূরে ) উত্তর পূর্বদিকে এক গ্রামের নিকটে আসিয়াছেন।
ইহার নিকটেই বাঘাই জঙ্গল। অতঃপর তাহারা আমাদিগকে
তাহাদের বাটিতে লইয়া যাইয়া বিশ্রাম করাইল এবং একজন
লােক দিয়া আমাদিগকে মেঘনার ঘাটে নৌকাতে পহুছাইয়া
দিল। আমরা সেই রাত্রিতে নৌকায়ই শয়ন করিয়া রহিলাম ।
পর দিন প্রত্যুষে নৌকা হইতে উঠিয়া প্রাতঃকৃত্য সম্পাদনপূর্বক
সূর্যোদয়ের পূর্বেই ব্রহ্মচারীর আশ্রমে যাইয়া উপনীত হইলাম।
আশ্রমে যাইয়া দেখি—মহাপুরুষ এই মাত্র তাহার ঘরের

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। । r\n•••••••••••••• ? দ্বার খুলিয়াছেন। দ্বার খুলিয়াই আমাদিগের দিকে তাকাইয়া হাসিয়া বলিলেন—‘কেমন উকিল বাবু! তােমরা না বলিয়া- ছিলে, তােমাদের জন্য আমার কোন চিন্তা করিতে হইবে না ? গত রাত্রিতে আমি তােমাদিগকে তিনবার বলিলাম—সঙ্গে লােক দি, তিন বারই তােমরা আমার কথা উপেক্ষা করিলে। গত রাত্রিতে কোথায় গিয়েছিলে ? মিঠাইয়ের দোকানের আলাের মত আললাগুলি কেমন দেখিয়াছিলে ? বাঘাই জঙ্গলে যাইয়া পড়িয়াছিলে নয় ? আমিও তােমাদের সঙ্গে সঙ্গেই ছিলাম, কোন বিপদ ঘটিত না ইত্যাদি ইত্যাদি। ইহাতে স্পষ্টই বোধ হইল মহাত্মা যেন ঠিক আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই গিয়াছিলেন এবং সঙ্গে থাকিয়া সমস্ত ঘটনাই প্রত্যক্ষ করিয়া আসিয়াছিলেন। তাহার কথা শুনিয়া আমরা অবাক ও হতবুদ্ধি হইলাম এবং তাহার অমানুষী শক্তির প্রত্যক্ষ পরিচয় পাইয়া হর্ষ ও বিস্ময়ে বিহ্বল হইয়া পড়িলাম। এস্থলে ইহাও বলা আবশ্যক যে, মহাত্মার কৃপায় সেই হইতেই আমি বহুদিনের উদরাময় (বাতাজীর্ণ ) রােগ হইতেও অব্যাহতি পাইলাম । আর একবার আমি ও আমার বন্ধু ঢাকা জজকোর্টের উকিল মৃত হরিচরণ চক্রবর্তী মহাশয় দুইজন এক সঙ্গে ঢাকা হইতে বারদী যাওয়ার সময়ে কয়েকটা ফল খরিদ করিয়া নেই। যাইবার সময়ে পথে আলাপ করিলাম—ব্রহ্মচারীর নিকট ফলমূল যাহাই কেন উপস্থিত করিনা, তাহা পার্শ্ববর্তী ব্যক্তিরাই গ্রহণ করিয়া ভােগ করে। দুঃখের বিষয় এই যে ব্রহ্মচারী স্বয়ং তাহার ধর্মসার-সংগ্রহ। কিছুই গ্রহণ করেন না। এই আক্ষেপ ঢাকাতে এবং নৌকাপথে উভয় স্থানেই করিয়াছিলাম। পরে বারদী যাইয়া ব্রহ্মচারীর আশ্রমে উপস্থিত হইলে, আমাদের আনীত ফলগুলি ব্রহ্মচারীর সম্মুখে রাখিলে পর, তাহা তাহার ঘরের এক পাশ্বে রাখিয়া দেওয়া হইল। কিছুকাল আলাপের পর ব্রহ্মচারী মহাশয় আপনা হইতেই বলিতে লাগিলেন—'আমি যাহা ইচ্ছা করি, আমি যাহা খাইতে চাই, তাহা আমাকে কেহই দেয় না। আমি এই কথার অর্থ বুঝিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম—বাবা ! আপনি কি ইচ্ছা করিয়াছেন ? কি খাইতে চাহেন ? তদুত্তরে তিনি বলিলেন—'এই যে তােমরা ফল আনিয়াছ তাহা অামার স্বয়ং খাইবার সাধ হইয়াছে। তাহা আমাকে কেহই কাটিয়া দিতেছে না। আমরা তখন ঐ ফলগুলি কাটিয়া ব্রহ্মচারী বাবাকে খাইতে দিলাম। তিনি তাহা হস্ত ও জিহাদ্বারা স্পর্শ করিয়া আমাদিগকে প্রসাদ দিলেন। তখন আমরা নিশ্চিতই বুঝিলাম আমাদের মধ্যে ঢাকায় ও নৌকা পথে যে কথােপকথন হইয়াছে, অন্তর্যামী ব্রহ্মচারিবাবা তাহার সমস্তই জানিতে পারিয়াছেন। ব্ৰহ্মচারিবাবা আমাদিগকে পুত্রের ন্যায় ভালবাসিতেন। একদিন তাহার মাকে (১) (এক বৃদ্ধা গোপতনয়া, যাহাকে (১) বারদীতে ‘কমলা’ নামে এক বৃদ্ধা অধীরা গােপতনয়া বাস করিতেন। এই নিঃসহায়া রমণীকে ব্রহ্মচারী মা বলিয়া ডাকিতেন এবং স্বয়ং ভঁহার গ্রাসাচ্ছাদন প্রদান করিতেন। বৃদ্ধ। তঁাহার আশ্রমে থাকিতেন, এবং ব্রহ্মচারীকে ঠিক পুত্রের ন্যায় ভাল- বাসিতেন ও লালন করিতেন। আমরা শুনিয়াছি ব্রহ্মচারীর বর্তমান জন্মের মায়ের নামও ৯৪ বাসার-সংগ্রহ তিনি মা বলিয়া ডাকিতেন) বলিলেন-মা! ইহারা ছেলে মানুষ, ১০ টার সময়ে খাওয়ার অভ্যাস, ইহাদের জন্য সকালে পাক কর। তৎপরে আমাকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন- এই ছেলেটী শাক বড়ই ভালবাসে, ইহার জন্য শাক প্রস্তুত করিবে। আমি কি খাইতে ভালবাসি ব্রহ্মচারিবাবার ইতঃপূর্বে তাহা জানিবার কোনও সম্ভাবনা ছিলনা। অন্তর্যামী মহাপুরুষ আমি যাহা খাইতে ভালবাসি, তাহাই প্রস্তুত করিতে আদেশ করিলেন। পাক সমাপ্ত হইলে আমরা তাহা যথেষ্ট আহার করিলাম। এইরূপ অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষ করা গিয়াছে, যাহাতে এই মহাপুরুষের অন্তর্যামিত্ব প্রকটরূপে প্রকাশ পাইয়াছে। এতদ্ভিন্ন আরও যে যে ঘটনা আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানিতে পাইয়াছি তাহাও নিম্নে লিপিবদ্ধ করিলাম। ব্ৰহ্মচারিবাবা স্থূল দেহে বারদীতে থাকিয়া অনেক সময়ে সূক্ষাদেহে অতীব দূরবর্তী স্থানেও গমন করিতেন। একবার স্বর্গীয় বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী মহাশয় বারবঙ্গে (দ্বারভাঙ্গায় ) যাইয়া জ্বররােগে আক্রান্ত হইয়া, কয়েক দিন ব্যাপিয়া অচেতন ও বাক্শক্তিরহিত হইয়া থাকেন। ঐ অবস্থা হইতে যখন সংলাভ করিলেন, তখন প্রথমেই এই কথা বলিয়া উঠিলেন- কমলা ছিল। ব্রহ্মচারী জাতির ছিলেন-মাতায় গত জন্মের বৃত্তান্ত তাঁহার স্মরণ ছিল। তিনি জানিয়াছিলেন তাঁহার মাতা কমলা’ দেই দেহত্যাগ করিয়া গােপগৃহে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। বাস্তবিকই এই গোপমর আচার ব্যবহার, কার্যকলাপ, মানসিক ইতি ও উদারতা প্রভৃতি আমরা যাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছি, তারা চায়ীর এই উক্তির সাহা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করিয়াছি। এমন পবিত্র ও আস্তিক্যবুদ্ধিসম্পন্ন নারী ব্যতীত ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ‘ বারদীয় ব্রহ্মচারী ও রামকৃষ্ণ পরমহংস আসিয়া তাহাকে নীলােগ । করিলেন। সেই সময়ে বারদীর ব্রহ্মচারী সূক্ষদেহে ঘরবঙ্গে যাইয়া তাঁহাকে দেখিয়া আসেন এবং তাহার গায় হাত বুলাইয়া দিয়াছিলেন, তাহা গােস্বামী মহাশয় স্বচক্ষে দেখিয়া- ছিলেন। এক সময়ে গোস্বামী মহাশয়ের মনে এই সংশয় উপস্থিত হইয়াছিল যে তিনি দ্বারভাঙ্গাতে ব্রহ্মচারীকে যে নিকটে দেখিতে পাইয়াছিলেন, উহা কি বাস্তবিক সত্য, অথবা জ্বরজনিত মস্তিষ্কের বিকৃতিহেতু মিথ্যা দর্শন অথবা স্বপ্নমাত্র। আরােগ্য লাভের পর এই সন্দেহ দূর করিবার জন্য একদা তিনি অন্য কেহই ঈদৃশ মহাত্মার গর্ভধারিণী হইবার যোগা নহেন। ইনি প্রায় শতাধিক বর্ষ জীবিত থাকিয়া কয়েক বৎসর হইল জীবনলীলা সংবরণ করিয়াছেন। জানিনা এরূপ নির্মল সত্বসম্পন্ন হইয়াও কোন অজ্ঞাত দৈবদুবিপাকে গােয়ালার ঘরে আসিয়া দেহ ধারণ করিয়াছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি মা যশোদার যেমন যুগপৎ পুত্রবৎসল্য ও পরম ব্ৰহ্মজ্ঞানে অচলা ভক্তি ছিল, ইহায়ও ব্রহ্মচারীর প্রতি সেইরূপ বাৎসল্য ও ভক্ত ছিল। তিনি ব্রহ্মচারীকেই একমাত্র উপাস্ট দেবতা বলিয়া জানিতেন। শতবর্ষ বসেও প্রতি দিন স্নান করিয়া স্বহস্তে ব্রহ্মচারীর ভােগ পাক করিয়া তাহাকে নিবেদন পূর্বক সেই প্রসাদ গ্রহণ করিতেন। মৃত্যুর পূর্ব দিবসেও যথাসময়ে নিজ হস্তে ভোগ পাক করিয়া ব্রহ্মচারীর উদ্দেশে অর্পণ করতঃ এসাদ গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং পরদিন বেলা ৪ চারি দয়ে সময়ে সজ্ঞানে ঠাকুরের নাম করিতে করিতে দেই ত্যাগ করেন। আমরা শুনিছি বাবা যখন প্রথমে বারদী আসিয়া বাস করেন, তখন এই গােয়ালিনী মা প্রতিদিন তাহার আহারের দুধ যােগাইতেন। একদিন দুধের পাত্র হঠাৎ বিপয্যন্ত হইয়া কতক দুধ পড়িয়া যায়। বৃদ্ধা অঞ্চ দুধের অভাবে কিঞ্চিৎ জল দিয়া দুগ্ধের মান পূর্ণ করিয়া দেন। অন্তর্যামী বাবা জানিতে পারিয়া পরিহাসস্থলে বৃদ্ধাকে দুধে জল দেওয়ার বিষয় জানাইয়া দিলেন, বৃদ্ধা সেই হইতেই তাহাকে সাক্ষাৎ ঈশ্বরজ্ঞানে ভক্তি করিতে থাকেন। বারদীতে এরূপও জনরব আছে—যে একদা গােয়ালিনী মা ব্রহ্মচারীকে জগন্নাথদর্শনের অভিলাষ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ কাহাকেও কিছু না বলিয়া সপরিবারে বারদী গিয়াছিলেন । লােকনাথ বলিলেন তোমাকে ঘরে দেখিতে পাইলাম না । গােস্বামীপ্রভু বলিলেন আমার গুৰু আমাকে দেহ হইতে বাহির করিয়া নিয়াছিলেন। দেয়ার সুপারিন্টেন্টে মৃত পার্বতীচরণ রায় মহাশয়ও একবার হাজারিবাগে কোনও উৎকট রােগে গুরুতররূপে আক্রান্ত হইয়া ব্ৰহ্মচারিবাবাকে তথায় দেখিতে পাইয়াছিলেন এবং কৃপার চিহ্নস্বরূপ শরীরে তদীয় হস্তপরামর্শ অনুভব করিয়াছিলেন। রায় মহাশয়ও এসম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া বারদী আগমন পূর্বক বাবাকে জিজ্ঞাসা করিয়া নিঃসন্দেহ হইয়াছিলেন। এই সকল ঘটনা আমি অতি বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হইয়াছি এবং সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি। জানাইয়া পুরা যাইতে উৎসুক হইয়াছিলেন। তখন ব্রহ্মচারী—আমিই সেই জগন্নাথ এই বলিয়া তাহাকে স্বদেহে জগন্নাথের মূর্তি দেখাইয়া তাহার জগন্নাথ দর্শনে যাওয়ার ঔৎসুক্য শিথিল করিয়া দেন। আর একবার গোয়ালিনী মাতা কালীঘাটের কালীমাকে দেখিতে যাওয়ার মনন করিয়া ব্ৰহ্মচারীর নিকট তথায় যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু সেইদিনই বিকালে ব্রহ্মচারীর গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখেন স্বয়ং ব্রহ্মচারীই শবাসনা লোল- জিহ্বা জলদবর্ণা কালীমূর্তি ধারণ করিয়া গৃহের অভ্যন্তরে দীপ্তি পাইতেছেন। তদবধি তিৰি কালীঘাট যাওয়ার অভিপ্রায়ও পরিত্যাগ করেন। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন লােকনাথই তাহার জ্ঞান, লোকনাথই তাহার ধ্যান এবং লোকনাথই তাহার জীবন ছিল । লােকনাথের নাম করিতেই তাহার বক্ষঃ নেত্রজলে ভাসিয়া যাইত। লোকনাথ ইহার স্বহস্ত পক্ক অন্ন খাইয়া পরম প্রীতিলাভ করিতেন। তাঁহার সর্বজনীন বাৎসল্য দেখিয়া আমরা বিস্মিত হইতাম। তিনি আমাদিগকে পুত্রবৎ স্নেহ করিতেন। তিনি প্রতিদিন আশ্রমে সমাগত ৪০,৫৩ কি ১০• একশত জনের পাক ও পরিবেশন অনায়াসে নিস্তে করিতেন, একটুও বিরক্তি ছিলনা। বাবাই তাহাকে এই শক্তি দিয়াছিলেন।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ৯৭ শ ? একদিন কথাপ্রসঙ্গে ব্রহ্মচারিবাবা আমাকে কয়েকটী উপদেশও করিয়াছিলেন, তাহা নিম্নে প্রকাশিত হইল। আমি যখন ব্রহ্মচারিবাবার সহিত আলাপ করিতেছি, তখন প্রসঙ্গক্রমে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম—“বাবা! আমাদের গুরুকুলে পুরুষ শ্রেণীর মধ্যে এমন কেহ বিদ্যমান নাই, যাহার নিকট হইতে আমি মন্ত্র গ্রহণ করিতে বা তত্ত্বোপদেশ পাইতে পারি। আমি কিছু ধর্মোপদেশ চাই।”—তাহা শুনিয়া ব্রহ্মচারি- বাবা বলিলেন- ব্রহ্মচারিবাবা।‘সাংসারিক লােকের ফেল না হওয়ার কারণ কি? আমি।—যদি আয় ব্যয় বিচার করিয়া চলে। ব্ৰহ্ম।—আয় ব্যয় বিবেচনা করার নাম কি আমি।—কি বলিলেন বুঝিতে পারিলাম না। ব্ৰহ্ম।—জমাখরচ রাখা। তুমি কর্মের জমা খরচ রাখিতে পার ? আমি-কর্মের জমা খরচ কি, বুঝিতে পারিলাম না। ব্ৰহ্ম।--তুমি উকীল হয়েও কেন এত বােকা হইলে ? আমি।--বাবা ! বুঝাইয়া দিন্ । ব্ৰহ্ম।তােমরা সৎ ও অসৎ উভয়বিধ কৰ্ম্মই করিয়া থাক। রাত্রিতে শুইবার সময়ে চিন্তা করিবে অদ্য কতটা সৎ ও কতটী অসৎ কর্ম করা হইল। সৎকৰ্ম্মগুলি—জমা আর অসৎকর্মগুলিই—খরচ। অসৎ কর্মের ভাগ বেশী হইলেই খরচ বেশী হইল। সৎকর্মের ভাগ বেশী হইলে জমার দিকে

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
বেশী হইবে। প্রথম দিন এই প্রকার হিসাব করিয়া শুইয়া
থাকিবে। পরদিন আবার এই প্রকার চিন্তা করিবে, দেখিবে
কোন্ভাগ বেশী হয়। প্রথম দিনে অসৎকর্মের ভাগ বেশী
হইলে, পরদিন যখন কৰ্ম্ম করিতে থাকিবে তখন অসৎকর্ম
যাহাতে বেশী না হয় তৎপ্রতি তােমার দৃষ্টি পাকিৰে। এইরূপ
ছয় মাস কাজ করিতে পারিলে, ক্রমেই অসৎকৰ্ম্ম কমিয়া যাইবে
এবং সৎকর্মের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইবে ।
পাইবে । পরে ছয় মাস অন্তে
দেখিতে পাইবে, বহু কষ্টে, বহু সাধন করিয়া, যােগী সন্ন্যাসী
যাহা লাভ করিতে পারে, তুমি অল্প দিনেই অস্লায়াসে সেই
অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছ। ইহাই তােমার প্রতি আমার একমাত্র
উপদেশ। এই উপদেশ অনুসারে চলিতে থাক। একমাস
অন্তে পুনরায় আমার নিকট আসিবে।
মহাত্মা ব্রহ্মচারীর নিকট আমি এই উপদেশ পাইয়াও
সাধনমন্ত্র লাভের জন্য পত্ৰদ্বারা বারংবার প্রার্থনা জানাই। প্রার্থনা
পত্রগুলিতে বহুল যুক্তিপরম্পরা ও কারণ সমূহ প্রদর্শন করি ।
কিন্তু মহাত্মা ব্রহ্মচারী তাঁহার দেহত্যাগের অল্পদিন পূর্বে এই
তিনটী শব্দমাত্র বলিয়া পাঠাইয়াছিলেন মন্ত্রণা মন্ত্র না। মহাত্মা
ব্রহ্মচারী আমাকে তাঁহার নিকট যাইতে বলিয়াছিলেন; কিন্তু
আমার দুর্ভাগ্যক্রমে আমি তাহার দেহত্যাগের পূর্বে তাঁহার
সহিত যাইয়া সাক্ষাৎ করিতে পারি নাই।
{
ঈশ্বরচন্দ্র ঘােষ।

ধর্মকার-সংগ্রহ। শ্ৰীযুক্ত দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আরও এক ঘটনার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন—“ব্রহ্মচারিবাবার প্রিয়শিষ পোনপ্রাপ্ত সেরেস্তাদার শ্রীযুক্ত মদনমোহন চক্রবর্তী মহাশয় ও আমার ভ্রাতা শ্ৰমান্ রাধাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বারদীতে ব্রহ্মচারীর আশ্রমের প্রাঙ্গণে বিশ্ববৃক্ষের নীচে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন একদিন দিবাভাগে হঠাৎ আকাশমণ্ডল নিবিড় ঘনঘটায় আচ্ছন্ন হইয়া মূষলধারায় বৃষ্টি হইতে লাগিল এবং প্রবলবেগে ঝড় বহিতে আরম্ভ করিল। থাকিবার অন্য স্থান বা অন্য ঘর না থাকাতে প্রবাসীরা মেঘের আয়ােজন দেখিয়া কি উপায় হইবে ভাবিয়া যার পর নাই ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়েন। কিন্তু ব্রহ্মচারীর কি অদ্ভুত প্রভাব ! বিশ্বক্ষের চতুষ্পর্শ্বে মুষলধারায় বর্ষণ হইতে লাগিল; কিন্তু তাহার কৃপায় বিশ্ববৃক্ষের নিশ্বস্থ যাত্রীদিগের গাত্রে একবিন্দু জলও পতিত হইল না।” ব্রহ্মচারীর একজন ভক্ত শিষ, বাবা বিদ্যমান থাকিতে সর্বদাই তঁহার নিকট গমনাগমন করিতেন। তিনি বলিয়াছেন “চাকার প্রসিদ্ধ উকীল মৃত বাবু রমাকান্ত নন্দী মহাশয়ের ভ্রাতুস্পুত্র পুলিশ ইনস্পেক্টার বাবু কালীকান্ত নন্দী একবার আমার সহিত মিলিত হইয়া বারদী গমন করেন। আমরা উভয়ে তখায় উপস্থিত হইয়া বাবার সহিত সাক্ষাৎ ও আলাপ করিলাম। আহারের সময় উপস্থিত হইল । আমরা মহাপুরুষের আশ্রমে বসিয়া পরস্পর নানা কাবার্তা বলিতেছি, এমন সময় হঠাৎ মনে এক খেয়াল হইল, এ অকাল, এ সময়ে পাকা কাটাল পাওয়ার ধর্মসার-সংগ্রহ। কোনও সম্ভাবনা নাই। পরীক্ষা করিয়া দেখিব বাবার কেমন মহিমা, এই অকালে পাকা কাটাল দ্বারা আমাদিগের আতিথ্য করিতে পারেন কি না ? এই আলাপ হইবার ঘণ্টা দুই পরেই আশ্রমের পথের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখি, এক ব্যক্তি এক সুবৃহৎ পরিপক্ক কাটাল মস্তকে করিয়া বাবাকে উপহার দেওয়ার জন্য আশ্রমের অভিমুখে চলিয়া আসিতেছে। আগন্তুক কাঁটালটাকে বাবার গৃহের দাওয়ায় রাখিয়া তাহাকে অভিবাদন পূর্বক তখনই চলিয়া গেল। কিছুকাল পরেই বাবা পরিচারকদিগের কাহাকেও ডাকিয়া কহিলেন, এই কাটালটাকে এখনি ভাঙ্গিয়া ঐ ভদ্রলোক দুটীকে খাইতে দাও। ইহারা যথেষ্ট ভক্ষণ করিয়া যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, আশ্রমের অন্য সকলকে বাঁটিয়া দিও।” বাবার উক্ত শিষটী আরও বলিয়াছেন—“একদা আমরা কয়েকজন বাবার নিকটে বসিয়া রহিয়াছি, এমন সময়ে বাবা হঠাৎ যেন কাহাকেও লক্ষ্য করিয়া অকথ্য গালাগালি করিতে লাগিলেন। আমরা একটু অপ্রতিভ হইয়া পরস্পরের মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলাম। ভাবিলাম আমাদের মধ্যে কে এমন অপরাধ করিল, যে বাবা তাহাকে এমন ভাবে ভৎসনা করিতেছেন। কতক্ষণ পরেই দেখি, একটী অপরিচিত ব্রাহ্মণ আসিয়া বাবার একপাশে দাঁড়াইয়াছে। বলাবাহুল্য ইতিপূর্বে সে কখনও আশ্রমে আসে নাই। বাবা তাহাকে দেখিয়া দ্বিগুণতর ক্রোধ প্রকাশপূর্বক গালি বর্ষণ করিতে লাগিলেন। বাবার এই কাৰ্য্য দেখিয়া আমরা অবশ্য একটু দুঃখিত হইলাম। কিন্তু

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
ব্রাহ্মণ তখনই তাহার ভৎসনা সহ্য করতে না পারিয়া, চলিয়া
গেল। বাবা কহিলেন এই বামুনের একটা বিবাহযোগ্য কন্যা
আছে। ঐ কন্যার পণ বাড়াইয়া বামন ক্রমে ক্রমে ৮০০ শত
টাকায় উঠাইয়াছে। আরও ২১ শত টাকা বাড়িবে কিনা,
জানিবার জন্য আমার নিকট আসিয়াছিল। এইজন্য এই
নরমাংসবিক্রয়ী পাপিষ্ঠকে আমি গালাগালি করিয়া তাড়াইয়া
দিলাম। আমরা ইহার সত্যতা জানিবার নিমিত্ত কৌতূহলী হইয়া
পশ্চাৎ ঐ ব্রাহ্মণের অনুসন্ধান করিয়া জানিলাম, প্রকৃত পক্ষেই
সে কন্যার পণ ৮০০ শত টাকায় চড়াইয়া আরও দু একশত টাকা
চড়িবে কিনা জানিবার জন্য বাবার নিকট আসিয়াছিল।”
বাবার পরমভক্ত অন্যতম শিষ শ্ৰীযুক্ত অন্নদাচরণ চাকলাদার
মহাশয়ও দুই একটী অতি আশ্চর্য ঘটনার কথা বর্ণন করিয়াছেন,
তাহ। নিম্নে প্রকাশিত হইল।
(ক) “একবার আমার মাতার বুকে পিঠে তীব্র বেদনা
জন্মে ; তখন আমি বারদীতে বাবার আশ্রমে অবস্থান করিতে-
ছিলাম। আমার শ্যালক আসিয়া আমাকে খবর দেয়। আমি
বাড়ী যাওয়ার জন্য বাবার নিকট অনুমতি চাহিলাম। বাবা
বলিলেন-“যা, বাড়ী চলিয়া যা, বাড়ী যাইয়াই মাকে বেড়াইতে
দেবি। আমি বাড়ী যাইয়া মাকে সুস্থ দেখিলাম। শুনিলাম
মা ক্ষীর ও খই দিয়া পথ্য করিয়াও রােগমুক্ত হইয়াছেন।
ইহার পর মাকে সুস্থ দেখিয়া ফিরিয়া আসিয়া বাবাকে সংবাদ
বলিলাম। শুনিয়া বাবা বলিলেন-“আমি তােদের বাড়ী

১০২
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ
গিয়াছিলাম, তাের মাকে ক্ষীর ও খই খাওয়াইয়া আসিয়াছি।
তাের মা ভাল হইয়াছে বটে, কিন্তু দুই বৎসরের মধ্যেই অর্থাৎ
আগামী বৈশাখের পরবর্তী বৈশাখে তাহার মৃত্যু হইবে। বলা
বাহুল্য বাবার ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলিল। তৃতীয়
বৎসর বৈশাখ মাসেই মার মৃত্যু ঘটিল।
(খ) “আর একবার দেনার দরুণ ডিক্রীতে আমাদের
‘কালীকিশাের চাকলাদার’ নামক হাওলা নীলামে উঠিল।
নিরুপায় ভাবিয়া দৈববলের প্রত্যাশী হইয়া তৎক্ষণাৎ নিরতিশয়
ক্ষুব্ধ ও ব্যথিতচিত্তে বাবার আশ্রমে চলিয়া আসিলান,
এবং বিপদের কথা বাবাকে নিবেদন করিলাম। আমার মুখে
আদ্যোপান্ত সকল অবস্থা শুনিয়া নীলাম করাইতে আদেশ
করিলেন, বলিলেন তোরই এক ভ্রাতা ডাকিয়া ডাক বাড়াইবে।
নীলামের পর জানিলাম, আমারই গােমস্তা (যাহাকে আমি ভাই
বলিয়া ডাকিতাম) অন্যের নামে একযোগে ১১২৫ টাকায় নীলাম
খরিদ করিয়াছে। তখনই আবার এ সংবাদ বাবাকে জানাইবার
জন্য বারদী যাত্রা করিলাম। ভােরের ট্রেন হারাইলাম। ৯টার
ট্রেনে চড়িয়া নারায়ণগঞ্জ নামিলাম এবং তথা হইতে পদব্রজে
লাঙ্গলবন্ধে যাইয়া উপস্থিত হইলাম। সেখানে সার্ভে স্কুলের
ছাত্রগণ জরীপ অভ্যাস করিতেছিল। তন্মধ্যে কোলাগ্রামনিবাসী
শ্ৰনাথ দাস মহাশয়ের পুত্র আমার বিশেষ পরিচিত। তাহার
অনুরােধে তথায় স্নানাহার সম্পাদনপূর্বক তীরবেগে আবার
বারদী অভিমুখে ধাবিত হইলাম। এই সময়ে বাবার অন্যতম

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
১০৩
শিষ্য এবং আমাদের গুরুভাই, মধ্যপাড়া নিবাসী শ্ৰীযুক্ত
চন্দ্রকিশাের চক্রবর্ত্তী (১) ও অন্যান্য অনেক ভক্ত শিষ্যগণ আশ্রমে
বসিয়া বাবার সহিত নানা বিষয়ে আলাপ করিতেছিলেন।
বাবা তাহাদিগের নিকট বলিলেন, ঢাকা হইতে একটী ঘােড়া
বায়ুবেগে ছুটিয়া আমাদিগের দিকে আসিতেছে। উপস্থিত
আলাপকারীরা একথার মর্ম কিছুই বুঝিতে পারে নাই।
কিয়ৎকাল পরেই আমি অশ্রমে যাইয়া উপস্থিত হইলাম।
অামার মন যারপরনাই চঞ্চল, কতক্ষণে আসিয়া বাবাকে
বিপদের কথা জানাইব এইজন্য অতীব উৎকণ্ঠিত। আনুরােধে
পড়িয়া একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও লাঙ্গলবন্ধে আহার করিয়াছিলাম
বটে, কিন্তু ব্যস্ততা নিবন্ধন আধাপেটও ভােজন করিয়াছিলাম
কিনা সন্দেহ। বাবার আশ্রমে উপস্থিত হইয়াই বলিলাম—“বাবা।
তালুকত নীলাম হইয়া গেল ; আমার ঋণও আদায় হইল না,
এখন উপায় কি বল ? ইহার মধ্যে কোন রহস্য থাকিলে বা এখনও
কোন উপায় থাকিলে, আমার মাথায় পা দাও।” ব্রহ্মচারিবাব।
আমার মাথায় পা দিয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন—খাই
নাই, রে? আগে আহার কর,' এই বলিয়া মাকে ডাকিয়া বলিলেন,
ঘরে খাওয়ার কি আছে দেখ। চাকলাদারকে খাইতে দাও। ঘরে
চিড়া, দুধ ও সুরভি কলা ছিল, তাহাই আহার করিতে দিলেন--
;
(১) এই চন্দ্রকিশাের চক্রবর্তী মহাশয়ই বাবার আশ্রমে যাইয়া আহার, নিদ্রা, বাহ,
প্রস্রাব সমস্তই বন্ধ রাখিয়া নয়দিন নয়রাত্রি একাসনে বসিয়া রহিয়াছিলেন। ইনি বাবার
শক্তিদ্বারাই বহুলােকের নানাবিধ অসাধ্য ব্যাধি আরোগ্য করিয়াছেন।

১০৪ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ স্বয়ং মুখে স্পর্শ করিয়া আমাকে প্রসাদ দিলেন। আমাকে বলিলেন, “কিছুকাল অপেক্ষা কর, আমি দেখি । তাের নিলামী মহালের মহালতের দরখাস্তে ত উকীলের দস্তখত নাই ; বেআইন নীলাম হইয়াছে, রদ হইবে।” ঢাকা আসিয়া দরখাস্ত তালাস করিয়া দেখিলাম—দরখাস্তে বাস্তবিকই উকীলের দস্তখত নাই। অথচ আমার উকীল চন্দ্রকুমার সেন মহাশয় আমার সাক্ষাতে স্বহস্তে পার্সিতে দস্তখত করিয়াছেন, আমিই তাহাকে দিয়া দস্তখত করাইয়াছিলাম। যখন দরখাস্তে উকীলের দস্তখত দেখিতে পাইলাম না, তখন বাবার অচিন্তনীয় মহিমার কথা চিন্তা করিয়া হর্ষ ও বিস্ময়ে অভিভূত হইলাম। পরে নীলাম রদের প্রার্থনা করাতে বেআইন বলিয়া নীলাম রদ হইল। কিন্তু দেন। পরিশােধের কি উপায় হইবে, এই চিন্তায় ব্যাকুল হইয়া পুনরায় বারদী আসিয়া, কি কৰ্তব্য বাবাকে জিজ্ঞাসা করিলাম। বাবা উত্তর করিলেন-“যা, আবার যাইয়া নালাম করা, ঋণশােধ হইয়া যাইবে। পুনরায় মহাল নীলামে উঠাইলাম। বাবার কৃপায় ডাক বাড়িয়া এবার ভাগ্যকুলের জমীদার কুণ্ডবাবুদের গােমস্তা জয়চন্দ্র গুহ ৪৫০০ টাকায় নীলাম খরিদ করিলেন। তাহাতে দেনা শােধ হইয়াও নীলামের উদ্বও ১০০০ হাজার টাকা আমার প্রাপ্য হইল। তখন কৃতজ্ঞ চিত্তে বাবার অপার মহিমা ও নাম ধ্যান করিতে লাগিলাম। তাহার অসীম কৃপার কথা স্মরণ করিতে করিতে দুই নেত্র হইতে অজস্র আনন্দবারি বিগলিত হইয়া বক্ষ ভাসিয়া গেল।”

ধর্মসার-সংগ্রহ। ঢাকা জুবিলী স্কুলের হেড পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত রজনীকান্ত আমীন মহাশয় বলিয়াছেন—“ঢাকার ভূতপূর্বব সরকারী উকীল বিখ্যাত গোকুলকৃষ্ণ সেন মুন্সীর পুত্র হাইকোর্টের উকীল শ্ৰীযুক্ত চন্দ্রমােহন সেন এম, এ, বি, এল মহাশয় একদা অন্য একজন ভদ্রলােক সহ বারদী গিয়াছিলেন। বাবার আশ্রমে উপস্থিত হইলে ব্রহ্মচারী তাহাদিগকে নানাবিধ ভোজ্য দ্রব্যদ্বারা আহার করাইয়াছিলেন। চন্দ্রমোহনবাবু অহার করিতে যাইবার প্রাক্কালে দেখিলেন—অতিথিদিগের ভােজনের নিমিত্ত গােয়াল। যে দধি দিয়াছিল, একটা বিড়াল আসিয়া চক্ চক করিয়া তাহার উপরিস্থিত কিয়দংশ খাইয়া ফেলিল। তিনি তাহা দেখিয়া মনে মনে সঙ্কল্প করিলেন—এ দধি কিছুতেই খাওয়া হইবে না। স কলে আহার করিতে বসিলে, দধি পরিবেশনের সময় আসিল। তখন বাবা পরিবেশনকারীকে ডাকিয়া বলিলেন- দেখ, ঐ বাবুঢ়ীকে দধি দিওনা। চন্দ্রমােহনবাবু, নিজের হৃদূগত সঙ্কল্প অন্তর্যামী ব্রহ্মচারী জানিতে পারিয়াছেন দেখিয়া, লজ্জা ভয়ে জড়সড় ও ভক্তিতে আত্মহারা হইয়া বলিলেন--না, আমি দধি খাইব, খাইতে আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্তু বাবা কিছুতেই তাহাদিগকে ভয়ে এবং লজ্জায় পড়িয়া দধি খাইতে দিলেন না।” (এই ঘটনাটী পণ্ডিত মহাশয় উক্ত চন্দ্রমােহন বাবুর নিজ মুখে শুনিয়াছিলেন।) উক্ত পণ্ডিত মহাশয় আরও বলিয়াছেন-“প্রায় ২২২৩ বৎসর গত হইল একবার আমাদের গ্রামের এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, ১০৬ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। NAAAAAA বহু গণককে স্বীয় কোষ্ঠী দেখাইয়া জানিতে পাইলেন—আগামী ৬২ বর্ষ বয়সে বড় দশা ও ত্রিপাপ রিষ্টিতে তাহার নিশ্চিত মৃত্যু হইবে। তঁাহার ইচ্ছা, যদি নিশ্চিতই মরিতে হয়, তবে কোন তীর্থ স্থানে যাইয়া মরিলেই ভাল। মৃত্যু নিশ্চিত কিনা জানিবার জন্য লােকমুখে শুনিয়া বারদীর ব্রহ্মচারীর নিকট চলিয়া গেলেন। বাবা বৃদ্ধব্রাহ্মণকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-- কেন আসিয়াছি ? ব্রাহ্মণ কহিলেন--“গণকেরা বলিয়াছে আগামী ৬২ বর্ষে আমার মৃত্যু হইবে। কিন্তু গণকের বাক্যে সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারিতেছি না। যদি নিশ্চিতই মৃত্যু হইবে জানি, তবে কোন তীর্থস্থানে যাইয়া মরাই ভাল মনে করিয়া, নিশ্চিত মৃত্যু হইবে কিনা জানিবার জন্য ত্রিকালদর্শী যােগীপুরুষ আপনার নিকট উপস্থিত হইয়াছি। ব্রহ্মচারী হাসিয়া বলিলেন-“তোমাকে কুষ্ঠ রােগে ধরিয়াছে দেখিতেছি। যাও, বাড়ী ফিরিয়া যাও, সম্প্রতি কোথাও যাইতে হইবে না। দশ পনর বৎসর পরে পারিলে একবার আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যাইও। এই ব্রাহ্মণ অদ্যাপি জীবিত আছেন, তঁাহার বয়স এখন ৮২৮৩ বৎসর হইবে। পূর্বেই বলিয়াছি, ব্রহ্মচারিবাবার অদ্ভুত শক্তি ও বিভূতির পরিচায়ক এইরূপ কত ঘটনা বর্তমান রহিয়াছে তাহার সংখ্যা কর। যায় না। গ্রন্থবিস্তার ভয়ে আর অধিক লিখিতে ইচ্ছা নাই । ব্ৰহ্মচারিবাবা অহঙ্কারীর অহঙ্কার চূর্ণ করিতেও ইতস্ততঃ করেন নাই। একবার একটী যােগী আসিয়া তাহার আশ্রমে ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। পঞ্চাগ্নি যাগ আরম্ভ করিয়াছিলেন। বাবা তাহার আড়ম্বর ও আস্ফালন দেখিয়া তঁাহাকে গর্বিত ও স্বীয় ক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যগ্র জানিতে পারিয়া এমনভাবে স্বীয় ঐশ্বৰ্য্য বিস্তার করিলেন, যে যােগী আর পঞ্চাগ্নি যজ্ঞ পূর্ণ করিতে সমর্থ হইলেন না। হঠাৎ এমন নিবিড় বৃষ্টিপাত হইল যে যজ্ঞের অগ্নি তখনই মেঘজলে নির্বাপিত হইয়া গেল। যােগী লজ্জায় অােবদন হইয়া তখনই আশ্রম পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। (বাবার একজন ভক্ত ও শ্রদ্ধাবান্ শিষ্যের নিকট আমরা একথা জানিতে পাইয়াছি।) তঁাহার কাৰ্যকলাপ দেখিয়া আমরা কারণ অনুসন্ধান করিতে যাইয়া বিমূঢ় হইয়া পড়িতাম। কখনও তিনি তাহার কার্যের উদ্দেশ্য ইচ্ছা করিয়া স্বয়ং বুঝাইয়া দিলে বুঝিতাম—আমরা অজ্ঞান, তঁাহর কাৰ্যের অনুসন্ধান করিয়া ভাল মন্দ বিচার করা আমাদের ন্যায় নির্বোধ ও তানভিজ্ঞের কৰ্ত্তব্য নহে। তিনি যে কি উদ্দেশ্যে কি করিতেন, তাহা আমাদের বুদ্ধির অতীত। তিনি অনেক সময়ে অনধিকারী, অজ্ঞান ও কপট তত্ত্ব জিজ্ঞাসুকে লইয়া নির্দোষ কৌতুক ও আমােদ করিতেন। ভারতী মহাশয় লিখিয়াছেন—একদা ঢাকা কলেজের এল, এ ও বি,এ, ক্লাসের কয়েকজন ছাত্র আসিয়া বলিলেন আমরা আপনার নিকট ব্ৰহ্ম জানিতে আসিয়াছি, আমাদিগকে উপদেশ দি। ব্রহ্মচারী কহিতে লাগিলেন— অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্। তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।

১০৮
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ
অর্থাৎ যাহা অখণ্ড মণ্ডলাকার, যারা চরাচর ব্যাপ্ত রহিয়াছে,
এহেন ব্ৰহ্মকে যিনি দেখাইয়া দেন, সেই গুরুকে নমস্কার করি।
তাহারা কহিলেন—অাপনাকেই গুরু করিব। ব্রহ্মচারী
কহিলেন—“আচ্ছা সে হবে—এই শ্লোকটী বুঝিলেত ? তাহারা
কহিলেন—“কিছু কিছু বুঝি—আপনি বুঝাইয়া দিম্।' ব্রহ্মচারী
কহিলেন--তােমাদের পক্ষে ব্ৰহ্ম কি জান ?—টাকা। কারণ
টাকাগুলিও অখণ্ড এবং মণ্ডলাকার, চরাচর জগতে উহারই প্রভুত্ব
চলিতেছে। তােমরা সেই টাকাব্রহ্মের দর্শনের জন্য দীক্ষিত
হইয়াছ। অধ্যাপক নামে গুরু তােমাদিগকে সেই টাকা ব্রহ্ম
লাভ করার পথ দেখাইয়া দেন। অতএব এখন সেই অধ্যাপক
গুরুরই অনুসরণ করিতে থাক। পরে টাকা ব্ৰহ্ম লাভ করিতে
পারিলেও যদি তাহাকে ছাড়িয়া অন্য ব্ৰহ্ম দর্শন করিবার অভিলাষ
উৎপন্ন হয়, তখন আমার নিকট আসিও। তখন যাহা বক্তব্য
হয় বলিব।
তাহার যে কীদৃশী মহীয়সী শক্তি ছিল, তাহা না দেখিলে
প্রত্যয় হয় না। তিনি সর্বশক্তিমান পুরুষ ছিলেন। জগতে
ইচ্ছা করিলে কিছুই তঁাহার অসাধ্য বা শক্তির বহিভুত ছিল না।
এবিষয়ে আরও একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা বলিয়া সম্প্রতি
প্রবন্ধের উপসংহার করিব।
“বারদীতে নাগ জমিদারদের মধ্যে বাবু
মধ্যে বাবু রাজমােহন নাগ
মহাশয় তাগতম। রাজমোহনবাবুর একমাত্র পুত্র মান
উমাপ্রসন্ন নাগ। তাঁহার পত্নী একটী পুত্র সন্তান প্রসব করিয়!

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। কয়েক মাস পরে সূতিকারােগে জীবন ত্যাগ করেন। তিন মাসের বালকটী স্তন্যের অভাবে মুমুর্মু প্রায় হইয়া দাঁড়াইল। এমন কোন দুগ্ধবতী ধাত্রী পাওয়া গেল না যাহার স্তন্য পান করিয়া শিশুটী জীবিত থাকিতে পারে। তখন উমাপ্রসন্ন বাবুর শ্বশুর কুলের লোক আসিয়া বালকটীকে তাহাদের বাড়ীতে লইয়া যায়। সেখানে তাহারা হিন্দু ধাত্রীর অসদ্ভাবে একজন মুসলমান ধাত্রী নিযুক্ত করিয়া শিশুর স্তন্যপানের ব্যবস্থা করিলেন। কিন্তু জানি না কোন্ অনির্বচনীয় কারণে শিশুটীর মুসলমান ধাত্রীর স্তন্য পান সহ্য হইল না। মুসলমান ধাত্রীর স্তন্য পান করিয়া বালকটী আবার মৃত্যুদশায় পতিত হইল। ঘােরতর উদরাময় রােগ আসিয়া তাহার কোমল শরীর আক্রমণ করিল। বালকের মাতুলকুল নিরুপায় হইয়া বালককে পুনরায় তাহার পিত্রালয়ে পাঠাইয়া দিতে বাধ্য হইলেন। তখন বালকের জীবনরক্ষার কি উপায় হইবে, পিতা এই সমস্যায় পড়িয়া ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। উমাপ্রসন্নের এক ভগিনী আছেন, তাহার নাম সিন্ধুবাসিনী; তখন তাহার বয়স ৩০ বৎসর ইনি জন্মবন্ধ্যা। এই বিপদের সময়ে সেই শিশু বৎসল। পিসিমা শিশুর জীবনরক্ষার উপায়ান্তর না দেখিয়া ব্যাকুল হইলেন। তঁাহার পতিকে বাবা শিশুর কথা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন বুকের দুধের অভাবে সে ছেলেটী মারা যায়। বাবা বলিলেন সিন্ধুকে আমার কাছে পাঠাইয়া দেও। সিন্ধু তখন ব্রহ্মচারীর আশ্রমে যাইয়া উপস্থিত হইলেন এবং বালকটীকে মহাপুরুষের চরণে নিক্ষেপ করিয়া কাতর স্বরে ১১০ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। শিশুর জীবন ভিক্ষা প্রার্থনা করিলেন। ব্রহ্মচারী বলিলেন- “তুমি কেন শিশুকে স্তন্য দান করিয়া বাঁচাওনা ?” নাগ কন্যা কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিত হইয়া নবদনে মৃদুস্বরে উত্তর করিলেন-“বাবা একি বলিতেছেন ? আমি যে জন্মবন্ধ্যা; আমার বুকে দুধ, থাকিলে আর চিন্তার বিষয় ছিল কি ?” ব্রহ্মচারী কি চিন্তা করিয়া বলিলেন—“মা। আমার কাছে আসিয়া বস দেখি, আমি তােমার স্তন্য পান করিব।” নাগ কন্যা তাহাই করিলেন। তখন ব্রহ্মচারী সরল স্বভাব শিশুর ন্যায় অসঙ্কুচিত ভাবে মাতৃজ্ঞানে নাগ দুহিতার স্তন্যপানে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি সিন্ধুবাসিনীর স্তনে মুখ সংযােগ করিবামাত্র তাঁহার স্তন্যদ্বয় দুগ্ধভারে স্ফীত হইয়া তাহা হইতে অনর্গল দুগ্ধ ধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। নাগকন্যা ভ্রাতুস্পুত্রকে ক্রোড়ে তুলিয়া তাহার বদনে স্তন্যার্পণপূর্বক ভক্তিভরে ব্রহ্মচারীর চরণে পুনঃ পুনঃ মস্তক অবনত করিয়া আনন্দমন্থরগতিতে নেত্রনীরে নির্নিক্ত হইয়া স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। মুমূর্ষ বালক গৃহে আসিয়া প্রচুর স্তন্য পানে দিন দিন পরিপুষ্ট ও সুস্থকায় হইয়া উঠিল। এই বালক অদ্যাপি জীবিত আছে। ব্রহ্মচারীর কৃপায় জীবন লাভ করিয়াছিল বলিয়া ঐ বালকের নাম ‘ব্ৰহ্মপ্রসন্ন’ রাখা হইয়াছে। সে এট্রেন্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হইয়াছে। তাহার আকৃতি ও শক্তিশালী দেহ দেখিলে বাবাব কৃপার কথা স্বতঃই স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়। সিন্ধুবাসিনীও এখন পর্যন্ত বাঁচিয়া আছেন। তিনি এখনও বন্ধ্যা অবস্থায় সধবা আছেন। তঁাহার বয়স এখন ৫০ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ১১১ বৎসরেরও উপরে। এই ঘটনাটী বারদীবাসী ছােট বড়, শিক্ষিত অশিক্ষিত, অনেকেরই সুবিদিত। (বাবার অন্যতম শিষ্য রোয়াইল হাইস্কুলের ভূতপূৰৰ হেমাষ্টার শ্রীযুক্ত মথুরামােহন চক্রবর্তী বি, এ মহাশয় অল্পদিন হইল গুরুপাটদর্শনে বারদী যাইয়া এই অদ্ভুত ঘটনাটী উমাপ্রসন্ন ও তাহার ভগিনী উভয়ের মুখে শুনিয়া এবং বারদীর বহুলােকের মুখেও ইহার সত্যতা অবগত হইয়া আসিয়া জানাইয়াছেন।) আমরা এই স্থানেই ব্রহ্মচারিবাবার অলৌকিক জীবন কাহিনী শেষ করিলাম। অতঃপর তাঁহার লৌকিক জীবনী সম্বন্ধে দুচারিটা কথা বলিয়াই গ্রন্থ সমাপ্ত করিব। ব্ৰহ্মচারিবাবার লৌকিক জীবন কাহিনী। এদেশে লােকালয়ে অবস্থিত ও সমাজের শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত, ধৰ্ম্ম প্রবর্তক, ধর্মপ্রচারক, ধর্মোপদেষ্টা, রাজা, মহারাজা, কৰ্ম্মবীর, পণ্ডিত, ধনী প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ ব্যক্তিদিগেরই যখন জীবনী লিখিবার রীতি প্রচলিত নাই, তখন জনসমাজের বহিভূত, লােকচক্ষুর অগােচর, সংসারবিরক্ত, অরণ্যবাসী সন্ন্যাসীদিগের জীবনী যে লিপিবদ্ধ হইয়া রক্ষিত হইবে না, সে বিষয়ে আর বক্তব্য কি ? ব্রহ্মচারিবাবার জীবনী সম্বন্ধেও তাহাই ঘটিয়াছে। তিনি জন্মগ্রহণ করিয়া যে কোন্ গ্রাম, নগর বা দেশকে পবিত্র অলঙ্কৃত ও উন্নত করিয়াছেন; কোন্ বংশে উদ্ভূত হইয়া সেই ;

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ; বংশের চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করিয়াছেন; এবং কোন্ পিতা ও মাতার ঔরসে ও গর্বে আবির্ভূত হইয়া পিতার পিতৃনাম সার্থক করিয়াছেন এবং মাতাকে রত্নগর্ভা সংজ্ঞায় বিভূষিত করিয়াছেন, তাহা বিশেষরূপে জানিবার উপায় নাই। তবে প্রসঙ্গক্রমে কোন কোনও শিষের নিকট আত্মজীবনী সম্বন্ধে যে দুই এক কথা প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাই অবলম্বন করিয়া দুচার কথা বলিবার ইচ্ছা করিয়াছি। সিদ্ধজীবনীর প্রণেতা ভারতী মহাশয় লিখিয়াছেন—“১১৩৮ বঙ্গাব্দে (ইংরেজী ১৭৩০ খৃঃ অব্দে) পশ্চিম বঙ্গের কোনও গ্রামে তার জন্ম হয়। তাঁহার পিতার নাম ধাম ইত্যাদি কেহ কেহ তাঁহার মুখে না শুনিয়াছেন এমন নহে, কিন্তু কোনও নিগূঢ় কারণে তিনি সেই সকল সাধারণের কর্ণগােচর করিতে নিবন্ধ সহকারে নিষেধ করিয়া গিয়াছেন। তাই ভারতী মহাশয় তাঁহার পিতার নাম ধাম ও তঁাহার নিজের জন্মস্থান ইত্যাদির বিষয় অবগত হইয়াও তদীয় জীবনচরিতে তাহা লিপিবব্ধ করিতে সাহস করেন নাই। ভারতী মহাশয় ইহাও লিখিয়াছেন— “আমি গুরুদেবের নির্দেশ মতে তঁাহার জন্মস্থানদর্শনে গমন করিয়াছিলাম। কিন্তু তথায় যাইয়া তথাকার বর্ষীয়ান্ অধিবাসী- দিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া তাহার বংশের কোনও নিশ্চিত পরিচয় পাইলাম না । কোনও এক বৃদ্ধ বলিলেন—'এই বংশীয় কোন কোনও ব্যক্তির নাম আমাদের পুরাতন কবলপত্রে দৃষ্ট হয় বটে, কিন্তু এই বংশের কেহ ইদানীং আমাদের গ্রামে নাই। বহুদিন ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। যাবৎ তাহাদের বংশের লােপ হইয়াছে। অথবা তাহাদের বংশীয়েরা অন্যত্র কোথায় যাইয়া বাস করিতেছেন, তাহা আমরা অবগত নহি। আমি তথা হইতে ফিরিয়া আসিয়া গুরুদেবকে গ্রামের অবস্থা জানাইলে, তাহাই তাহার জন্মস্থান বলিয়া স্বীকার করিয়াছিলেন।” লােকনাথের পিতার ইচ্ছা হইয়াছিল পুত্র জন্মিলে একটীকে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী করিয়া দিবেন। সেকালের লােকের এক দৃঢ় সংস্কার ও বিশ্বাস ছিল যে বংশের মধ্যে যদি এক ব্যক্তিও নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী হইয়া গৃহ হইতে বহির্গত হয়েন, তবে তাহার চৌদ্দপুরুষের উদ্ধারসাধন হইয়া যায়। তাঁহার পিতা এই বলবান্ সংস্কারের বশীভূত হইয়া প্রথম হইতেই এই অভিপ্রায় সাধনের চেষ্টায় ছিলেন। প্রথম পুত্রের জন্ম হইলেই তিনি তাহাকে ব্রহ্মচারী করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন ; কিন্তু পত্নী নিবন্ধাতি- শয়ের সহিত প্রতিবন্ধকতা প্রদর্শন করাতে কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। পরে আরও দুই কুমারের জন্ম হইল, কিন্তু ব্রাহ্মণী সেই দুইজনকেও কিছুতেই ব্রহ্মচারী করিতে সম্মত হইলেন না। তৎকালে লােকনাথের জন্মস্থানের নিকটেই ভগবান্ গাঙ্গুলী নামে একজন অদ্বিতীয় পণ্ডিত ও জ্ঞানী লােক বাস করিতেন। তিনি সর্বশাস্ত্রবিশারদ দেশবিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। দেশের সকল শ্রেণীর লােকই তাহাকে ঋষিবৎ পূজা করিত। শ্রাদ্ধাদি কোন সুবৃহৎ কৰ্ম্মোপলক্ষে ভারতবর্ষের নানাদিগদেশবাসি পণ্ডিত সমাজের সমাগম হইলে, সেই পণ্ডিতসভায় একমাত্র ভগবান্ ১১৪ ধর্মসার-সংগ্রহ। গাঙ্গুলীই সর্ববিধ শাস্ত্রীয় মীমাংসার মধ্যস্থ হইতেন। তাঁহার অসাক্ষাতে বা অনুপস্থিতিতে শাস্ত্রীয় কোন পূর্বপক্ষেরই মীমাংসা হইত না। ভগবানের কনিষ্ঠ সহােদর গঙ্গাধর এবং তাহার জ্যেষ্ঠপুত্র উপাধিধারী পণ্ডিত হইয়াছিলেন। ভারতী মহাশয় লিখিয়াছেন—“কলিকাতার পূর্বদিকে বারাসত ও টাকি পৰ্য্যন্ত প্রসারিত রাস্তার নিকটে কচুয়া (কাকড়া) গ্রামে বাঙ্গালা ১০৮৮ শকে ( কি ইহার নিকটবর্তী সময়ে ) রাঢ়ীয়কুলীনবংশে ভগবান গাঙ্গুলীর জন্ম হয়। ভগবান্ সর্বানন্দীমেলের কুলীন, রাঘব গাঙ্গুলীর সন্তান। আমি লােকনাথের প্রমুখাৎ ভগবান্ গাঙ্গুলীর মাহাত্ম শুনিয়া কচুয়াতে গিয়া ভগবানের বংশের অনুসন্ধান করিয়াছিলাম। এখন আর ভগবানের বংশ কচুয়াতে বাস করেন না; তাহারা স্থানান্তরে গিয়াছেন।” ভগবান্ যে কেবল শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন এমন নহে, সাধনমার্গেও তিনি অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছিলেন। লোকনাথের পিতা হার হৃদয়ের অন্তর্হিত উল্লিখিত সঙ্কল্পের কথা এই পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ ভগবান গাঙ্গুলাকে জানাইয়া তৎসম্বন্ধে স্বীয় সহধর্মিণীর প্রতিকূলতার কথাও তঁাহার নিকট প্রকাশ করিলেন এবং এবিষয়ে তাহার উপদেশ চাহিলেন। এদিকে তাঁর পত্নীর চতুর্থ গর্কে গুরুদেব লােকনাথের জন্ম হইল। জানি না কোন অজ্ঞেয় কারণবিশেষের বশবর্তী হইয়া প্রসূতি এবার আপনা হইতেই অগ্রবর্তী হইয়া পতিকে ডাকিয়া বলিলেন, আমি এতদিন আপনার বলবতী আকাঙক্ষার ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। প্রতিবন্ধকতা করিয়া আসিয়াছি ; ইদানীং এই নবজাত বালককে লইয়া আপনি স্বকীয় মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করুন। পত্নীর এই কথা শুনিয়া পতির আনন্দের আর পরিসীমা রহিলনা। তিনি তৎক্ষণাৎ শুভ সংবাদ লইয়া পণ্ডিতপ্রবর ভগবান্ গাঙ্গুলীকে জানাইলেন। ভগবান্ যারপরনাই আহলাদিত হইয়া নবপ্রসূত কুমারের জাত কৰ্ম্মাদির ব্যবস্থা করিলেন। ভগবান্ বুঝিতে পারিলেন এ বালক অবশ্যই সামান্য বালক হইবে না। যিনি তাদৃশ কঠোর দুষ্কর ব্রহ্মচর্য ব্রতের উপযােগী হইবেন, এতদিনে সেই পুরুষই আসিয়া আবিভূত হইয়াছেন। নতুবা প্রসূতি এতদিন পতির একান্ত আগ্রহ ও প্রার্থনা সত্ত্বেও অগ্রজাত পুত্রদিগের মধ্যে একটীকেও ব্রহ্মচারী করিয়া দিতে সম্মত হইয়া, ইদানীং বিনা প্রার্থনায় আপনা হইতেই ইহাকে ব্রহ্মচারী করিয়া দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিবেন কেন ? নিশ্চিতই নবজাত শিশুর হৃদয়ে ভাবি মহত্ত্বের বীজ নিহিত রহিয়াছে। অতএব প্রথম হইতেই ইহার জন্মান্তরীণ উৎকৃষ্ট ও উন্নত সাধু সংস্কারগুলি ক্রমে প্রস্ফুটিত করিয়া দেওয়া উচিত হইবে। ব্ৰহ্মচারী, ভারতী মহাশয়ের নিকট বলিয়াছেন তাহার গুরুজনেরা শৈশবকালেই তাঁহার নিকট জ্ঞানের নিগূঢ় কথা সকল উত্থাপন করিয়া, যাহাতে তাহার মন সেই দিকে আকৃষ্ট হয় তাহার চেষ্টা পাইতেন। দেখিতে দেখিতে লোকনাথের বাল্যকাল চলিয়া গেল, উপনয়নের সময় আসিয়া নিকটবর্তী হইল। সর্বশাস্ত্রবিৎ পণ্ডিত ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ••••••;A1Advtv ।।। ; ভগবান্ গাঙ্গুলী লােকনাথের আচাৰ্য গুরুর পদে বৃত হইলেন। ভগবান্ লােকনাথকে লইয়া, সংসার পরিত্যাগপূর্বক অরণ্যবাসী হইতে সম্মত হইলেন। লোকনাথের মাতাপিতা পণ্ডিত ভগবান গাঙ্গুলীকে নিরতিশয় সম্মান করিতেন ; এই প্রস্তাবে তাহারা উভয়েই যারপরনাই আলাদ প্রকাশ করিলেন। যে দিবস লােকনাথের উপনয়নের দিন বলিয়া নির্ধারিত হইয়াছিল, ঐ দিন উপনয়নের অতি প্রশস্ত দিন ছিল বলিয়া গ্রামে আরও অনেক বাড়ীতেই যজ্ঞােপবীতের আয়ােজন হইয়াছিল। তবে লােকনাথ উপনীত হইয়া সংসার পরিত্যাগ পূর্বক গুরুর সহিত বনবাসী হইতে চলিলেন, এই হেতু তাঁহার উপনয়ন ক্রিয়াটা গ্রামের মধ্যে একটা বিশিষ্ট ব্যাপার বলিয়া গণ্য হইয়াছিল। বিশেষতঃ তাহার সহিত আচাৰ্য গুরু ভগবান্ গাঙ্গুলীও চিরদিনের জন্য জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া উদাসীন হইয়া যাইতেছেন, এই বার্তা অতি সত্বর গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। গ্রামে বেণীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায় নামে লােকনাথের এক বাল্যসহচর ছিল, তাহারও ঐদিনে উপনয়ন হওয়া নিশ্চিত হইয়াছিল। উপনয়নের নির্দিষ্ট দিন উপস্থিত হইলে বেণীমাধবও লােকনাথের ন্যায় গৃহত্যাগ করিয়া যাওয়ার অভিলাষ ব্যক্ত করিলেন। বেণীর অভিভাবকেরা প্রথমে ইহাকে বালসুলভ চাপল্য বলিয়াই উপেক্ষা করিয়াছিলেন, কিন্তু পরিশেষে বালকের নিবন্ধাতিশয় দর্শন করিয়া চঞ্চল হইয়া পড়িলেন। তঁাহারা ব্ৰহ্মচর্যের কঠোরতা ও অরণ্যবাসের দুঃসহ ক্লেশপরম্পরা প্রদর্শন করিয়া নানাপ্রকারে ধর্মসার-সংগ্রহ। ১১৭ তাহাকে প্রবােধ দিতে প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু বালক কিছুতেই তাহার সঙ্কল্প ত্যাগ করিল না। তাহারা যতই বাধা বিপত্তি দর্শাইতে লাগিলেন, ততই বালকের বনগমনের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অবশেষে তাঁহার, পণ্ডিতগণের অভিমত লইয়া, কৰ্তব্যাবধারণে বাধ্য হইলেন। অনেক অনুকূল ও প্রতিকূল তর্ক বিতর্কের পর স্থির হইল, ভগবান্ গাঙ্গুলী বালক- দিগের উভয়েরই অাচাৰ্য্যগুরু হইয়া উপনয়ন ক্রিয়া সম্পাদন করিবেন এবং উভয়কেই সঙ্গে লইয়া বনে গমন করিবেন। নির্ধারিত দিবসে বালকদ্বয়ের উপনয়ন ক্রিয়া সম্পন্ন হইল। উপনয়নের পরেই ভগবান্ ব্ৰহ্মচারিদ্বয়কে সঙ্গে করিয়া জন্মের মত গৃহত্যাগপূর্বক বহির্গত হইলেন। যে সময়ে ভগবান্ ( অনুমান ১১৪৮ সনে) সংসার ছাড়িয়া সন্ন্যাসী হইয়া বাহির হইলেন তখন তাহার বয়স অনুমান ৬০ ষাট বৎসর হইয়াছিল। তাহারা জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া চলিতে চলিতে কালীঘাটে যাইয়া উপস্থিত হন এবং কিছুকাল সেখানে অবস্থান করেন। এই সময়ে কালীঘাট নিবিড় জঙ্গলময় ছিল। তখন ইংরেজেরা এদেশের রাজা হন নাই। তাহারা বর্তমান কলিকাতার নিকটবর্তী সুতানটী- নামক স্থানে সওদাগরী করিতেন। ব্রহ্মচারীরা যখন কালীঘাটে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন অনেকগুলি জটাজুটধারী সন্ন্যাসী ও তথায় বাস করিতেছিলেন। লােকনাথ, ভারতী মহাশয়ের নিকট, বলিয়াছিলেন-“আমি ও বেণী এই অভিনব জীবদিগকে পাইয়া বিলক্ষণ তুষ্ট হইলাম। কয়েক দিন বাস করিয়া কালী- ।

১১৮
ধর্মসার-সংগ্রহ।
/\/\/\•••••১n
।।,,,,।
.
ঘাটকে নিজ বাড়ী ঘরের মত করিয়া তুলিলাম। সাধুরা যখন
চুপ করিয়া স্থিরভাবে উপবিষ্ট থাকিতেন, তখন বালস্বভাবসুলভ
চপলতাবশতঃ আমরা (ভঁহাদের) কাহারও জটায় হস্তাৰ্পণ
করিতাম, কাহারও বা লেংটী স্পর্শ করিতাম। তাহারা কিছুই
বলিতেন না।
আমরা প্রশ্রয় পাইয়া উহাদের জটা ও লেংটা
ধরিয়া টান দিয়া দৌড়িয়া পলায়ন করিতাম । সাধুরা আমাদের
উপদ্রব কয়েক দিন সহ্য করিয়া অবশেষে গুরুদেবকে জানাইলেন।
গুরুদেব উত্তর করিলেন--তামাকে বলেন কেন? আমি ত
গৃহী। ইহারা আপনাদের লােক, আপনারা ইহাদিগকে প্রস্তুত
করিয়া লউন। আমি আপনাদেরই দুইটী লােককে গৃহ হইতে
সঙ্গে করিয়া তানিয়া আপনাদের নিকট উপস্থিত করিয়াছি'।
এই উত্তর শুনিয়া তাহারা আর গুরুদেবকে অনুযােগ দিতে
পারিলেন না এবং আর কিছু করিলেন না। তাহার পর
গুরু আমাদিগকে একান্তে ডাকিয়া বলিলেন—“তােমরা যে
উহাদের জটা খাইয়া ফেল, লেঙটী ধরিয়া টান, বড় হইলে
যখন অন্যেরা তােমাদের জটা ও লেংটা ধরিয়া টানাটানি করিবে
তখন কি করিবে ? আমি বলিলাম-সে কি ? আমরা পৈতার
দিনে চেলির কাপড় পরিয়াছি, আমাদের জটা ও লেংটী হইবে
কেন ? গুরু বলিলেন—‘তোমরা ঐসকল ছাড়িয়া উহাদের
মত হইতে আসিয়াছ, তাহা কি এখনও বুঝিতে পার নাই ?
আমি বলিলাম—‘আমরা যদি উহাদের মত হইতে আসিয়া থাকি,
তবে তঁাহারা ভিক্ষা করিয়া খান, আর আমাদের ঘর হইতে
খরচ আইসে কেন ? গুরু বলিলেন--তাহাও আমাদের ভিক্ষা

ধর্মসার-সংগ্রহ।
১১১
A/Mv1
••••
স্বরূপ। আমরা এখানে আছি এই কথাটা আমাদের পরিত্যক্ত
বাটীতে প্রকাশ থাকা হেতু তথহইতে খরচ আসিয়া থাকে
আমি বলিলাম-“তবে আর আমাদের এখানে থাকা উচিত নহে,
শীঘ্র কোনও দূরতর স্থানে প্রস্থান করা কর্তব্য।
গুরু তাহাই
করিলেন—আমরা কালীঘাট ছাড়িয়া চলিলাম”।
“ব্রহ্মচারী আরও বলিয়াছেন—“নূতন কোনও ব্যাপারে প্রবৃত্ত
হইতে বা কোথাও যাইতে হইলে গুরুদেব আমাকে অগ্রবর্তী
করিয়া চলিতেন। ভারতী মহাশয় বলেন,—“ইহার কারণ এই
যে লােকনাথের ভিতর দিয়া স্বভাবতঃ যেটা প্রস্ফুটিত হইত গুরু
তাহা বিশেষ মূল্যবান্ হওয়ার সম্ভাবনা করিতেন । লােকনাথের
স্বাভাবিক গতি রােধ না করিয়া সেই ভাবের বিকাশ হইতে
দেওয়ার যত্ন করিলেই সিদ্ধির সাহায্য করা হইবে, গুরু ইহাই
মনে করিতেন।”
কালীঘাট ত্যাগ করিয়া ব্রহ্মচারীরা প্রায়শঃ বনে বনেই বাস
করিতে লাগিলেন। এই সময়ে তাহারা নক্তব্ৰতনামক বিশেষ
নিয়মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। সমস্ত দিন অনাহারে থাকিয়া
রাত্রিতে হবিষ্যান্ন ভক্ষণ করাকে ‘নক্তব্রত বলে। ভগবান্
ব্রহ্মচারীদ্বয়কে জঙ্গলে রাখিয়া, দিবার শেষ ভাগে ভিক্ষালব্ধ তিল
ও দুগ্ধদ্বারা একপ্রকার অন্ন প্রস্তুত করিয়া শিষ্যদিগকে খাইতে
দিতেন এবং নিজেও খাইতেন।
লােকনাথ ব্রহ্মচারী বলিয়াছেন-‘আমরা প্রত্যহ সেই তিল
ও দুগ্ধ-মিশ্রিত অন্ন খাইয়া এত বিরক্ত হইয়াছিলাম, যে তাহা

১২০ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ আর খাইতে ভাল লাগিত না। সর্বদা মনে করিতাম-গৃহস্থেরা অন্য খাদ্য সামগ্রী ভিক্ষা দেয় না কেন? ব্রহ্মচর্যের নিমিত্ত যে এতাদৃশ খাদ্যই প্রশস্ত, তাহারা তখন তাহা বুঝিতে পারেন নাই। ব্ৰহ্মচারিবালকদ্বয় তখন গুরুর নিকট সর্বতােভাবে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। গুরুই তাহাদের হর্তা কৰ্ত্তা বিধাতা ছিলেন। অতএব অনিচ্ছাসত্ত্বেও, উদরজালায়, সেইরূপ খাদ্যই উদরসাৎ করিয়া কষ্টেষ্টে ক্ষুন্নিবৃত্তি করিতে বাধ্য হইতেন। সাধু নামধারী গুরুরা শিষদিগকে বিনা বেতনে হদ্দ খেজমত করাইয়া ছাড়েন। আমাদের ব্রহ্মচারিদ্বয়ের কিন্তু গুরুর সহিত তেমন ভাব ছিল না; বরং গুরুই উটা শিষদিগের খেজমত করিতেন। অথচ তাঁহাদের নিকট কোনরূপ প্রত্যাশা ছিল না । শিষ্যদ্বয়ও জন্মান্তরীণসংস্করবশে বাল্যাবস্থায়ই গুরুতে আত্মসমর্পণ করিয়া সর্বপ্রকার স্বাধীনতা হারাইয়াছিলেন। বনে আসিয়া তাহারা যে নক্তব্ৰত অবলম্বন করিয়াছিলেন, সেই ব্রতের উদযাপন ২৩ বৎসরে হয় নাই। তাহারা এই ব্রত ৩০/৪০ বৎসর অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তাঁহারা যখন পূর্ণ যােবন প্রাপ্ত হইলেন; তখন ব্রহ্মচারী গুরুকে বলিয়াছিলেন— “আমরা যুবক শিষ্যদ্বয় জঙ্গলে বসিয়া খাই, আর তুমি, বৃদ্ধ এবং গুরু, লােকালয় পৰ্যটন করিয়া ভিক্ষা করিয়া আমাদের উদর সূরণ কর ; এটা আমাদের নিকট ভাল বােধ হইতেছে না এখন হইতে তামাদিগকেই ভিক্ষা কাৰ্যে নিযুক্ত কর না কেন ?” গুরু বলিলেন--“না, তেমন করিলে তােমাদের একনিষ্ঠত ধর্মসার-সংগ্রহ। থাকিবে না। গৃহস্থদিগের বিবিধ ভাব দেখিয়া তােমাদের চিত্ত- মধ্যে তাদৃশ চিন্তা সকল উদিত হইয়া তােমাদের যােগ নষ্ট করিয়া দিবে।” লােকনাথ ব্রহ্মচারী একদা গুরুদেবকে বলিয়াছিলেন— “যাহারা সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারী হন, তাহাদিগকে বিবিধ শাস্ত্রবেত্তা হইতে দেখা যায়, কিন্তু আপনি আমাদিগকে কোন শাস্ত্রই শিক্ষা দিতেছেন না কেন? এমন কি সংস্কৃত ভাষাটী পৰ্যন্তও আমাদিগকে শিখাইলেন না। আমরা কেমন ব্রহ্মচারী হইব ?” গুরু বলিলেন—“তােমরা শাস্ত্র শিক্ষার কষ্ট স্বীকার করিবে কেন? আমিইত সকল শাস্ত্র শিক্ষা করিয়াছি। তােমাদের জন্য যখন যে শাস্ত্রের ব্যবহার আবশ্যক হইবে, তাহা অামার নিকটই পাইতে পারিবে। তােমরা যখন আমাতে আত্মসমর্পণ করিতেছ, তখন আমার অধীত বিদ্যা বিনা অধ্যয়নে তােমাদের মধ্যে সংক্রামিত হইবে। তােমরা যদি শাস্ত্রাধ্যয়ন কর, তবে আমার আদেশের প্রতি তােমাদের তর্ক উপস্থিত হইবে। এখন যেমন দ্বিরুক্তি না করিয়া আমার আদেশ প্রতিপালন করিতে যত্নবান হও, তখন তেমন পারিবে না; আমার আদেশ শাস্ত্রসঙ্গত হইল কিনা এই কথা লইয়া বাদবিতণ্ডা করিবে। অতএব তােমাদের মন স্থির হওয়ার বাধা ঘটিবে।” কথাপ্রসঙ্গে লােকনাথ ইহাও বলিয়াছেন —উপনয়নের সময়ের চেলির কাপড়টিকে তিনি ৪০ বৎসর বয়স পৰ্যন্ত দড়া পাকাইয়া পরিয়াছিলেন । কঠোর ব্রহ্মচর্য্যাবস্থায়, গুরু শিষ্যদ্বয়কে কঠোর ব্ৰতানুষ্ঠানে ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ^^^^^••• \\\***/ নিযুক্ত করিয়াই নিশ্চিন্ত ছিলেন না। যাহাতে জন্মান্তরীণ উৎকৃষ্ট সংস্কারগুলি তাহাদের অন্তঃকরণে বিকসিত হয়. গুরু সর্বদা সেই উপায় দেখিতেন। পূর্বজন্মার্জিত কোনও অসৎ সংস্কার উদিত হইয়া, সৎ সংস্কার বিকাসের বাধা জনাইলে, গুরু বিবিধ উপায়ে সেই বিরুদ্ধ সংস্কার সমূলে উৎপাটন করিতে যত্নবান হইতেন। এই নিমিত্ত শিষ্যদের মধ্যে কোন্ কোন্ ভাবের উদয় ও বিলয় হইতেছে, গুরু সতর্কতার সহিত সর্বদা তাহা পরীক্ষা করিতেন। যাহারা সন্ন্যাসী হইয়া জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া চলিয়া যান, তাহাদের মধ্যে এমন একটা নিয়ম আছে যে জন্মভূমিত্যাগের দ্বাদশ বৎসর পরে যে কোনও এক সময়ে আসিয়া জন্মভূমি দর্শন করিয়া যাইতে পারেন। এই নিয়মানুসারে আমাদের ব্রহ্মচারিরা ও জন্মভূমিত্যাগের প্রায় ৩০/৩৫ বৎসর পরে একবার জন্মভূমি, দর্শনে আসিয়া অল্পকাল তথায় বাস করিয়া গিয়াছিলেন। ব্রহ্মচারিদ্বয় নক্তব্রত উদযাপন করিয়া তৎপরে ‘একান্তর। আরম্ভ করিয়াছিলেন, অর্থাৎ একদিন সম্পূর্ণ উপবাসী থাকিয়া পরের দিন আহার করিতেন। এই একান্তরা অভ্যস্ত হইয়া গেলে, ত্রিরাত্র উপবাস, পঞ্চাহ উপবাস, নবরাত্র উপবাস প্রভৃতি ক্রমে ক্রমে অভ্যাস করিতে লাগিলেন। এমন কি, অবশেষে একমাস পর্যন্ত উপবাসী থাকিতে অভ্যাস করিয়া- ছিলেন। যাঁহারা একদিন উপবাস করিয়াই, ক্ষুধার জ্বালায়, প্রাণ গেল বলিয়া ভয়ে বিহবল হন, তাহাদের নিকট একমাস উপবাসের অৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। •••••••• *••••••••• কথা নিতান্তই অলীক ও অসম্ভব বলিয়াই বােধ হইবে। ব্রহ্মচারি- বাবা সর্বদাই শিষ্যদিগকে ‘অসম্ভবং ন বক্তব্য এই বলিয়া কাহারও নিকট অসম্ভব কথা বলিতে পুনঃ পুনঃ নিষেধ করিয়াছেন। তথাপি এগুলি তাহার মুখের উক্তি বলিয়া পরম সত্য জ্ঞানে আমরা প্রকাশ করিতে বাধ্য হইলাম। আমরা এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে যতগুলি কথা লিপিবদ্ধ করিলাম, তাহার সকল কথাই যে সকলে বিশ্বাস করিবেন এমন নহে, পক্ষান্তরে অনেক কথাই সাধারণ লােকে বিশ্বাস করিতে চাহিবেন না। তাহা হইলেও আমরা যাহা প্রত্যক্ষ সত্য বলিয়া জানি ও বিশ্বাস করি, তাহা না লিখিলেও একপক্ষে সত্যের অপলাপ-জনিত পাপ পঙ্কে নিতান্তই লিপ্ত হইব। কিন্তু এই দীর্ঘকালব্যাপী উপবাস তাহারা বেশ দিন অভ্যাস করেন নাই। ব্রহ্মচারী বলিয়াছেন--“এই একমাস- ব্যাপী উপবাস আমি দুইবার মাত্র অনুষ্ঠান করিয়াছি। বেণ- মাধব একবার মাত্র এই উপবাস করিয়াছেন, দ্বিতীয় বার আর সম্পূর্ণ একমাস উপবাসী থাকিতে পারেন নাই।” ভারতী লিখিয়াছেন—“ব্রহ্মচারী বলিয়াছেন--“উপবাসের কালে যাহাতে আমাদের কোনরূপ অঙ্গসঞ্চালন করিতে না হয়, সে বিষয়ে গুরু সর্বদা সতর্ক থাকিতেন। এমন কি, মলমূত্র ত্যাগের জন্যও শরীর নাড়াচাড়া করিতে গুরুর নিষেধ ছিল। মলমূত্র ত্যাগ করিলে, গুরু আসিয়া জলশৌচাদি সমাধা করাইয়া দিতেন এবং আমাদিগকে ধরিয়া তুলিয়া পরিস্কারস্থানে বসাইতেন তাহার পর বিষ্ঠা সইয়া স্থান পরিষ্কার করিতেন। আমরা ১২৪ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। . চাহিয়া দেখিয়াছি—এই সকল কথা বলিতে বলিতে ব্রহ্মচারীর চক্ষুর্জলে বক্ষঃ ভাসিয়া যাইত। বারদীর ব্রহ্মচারীর ন্যায় মহাত্মাও যেমন কোথাও দৃষ্ট হয় না, তাহার গুরুভক্তির তুলনাও কোথাও মিলে না। গুরুর কথা স্মরণ করিয়া যে তিনি কিরূপে গলিয়া যাইতেন, তাহা পার্শ্বস্থ সকলে বুঝি টের পাই না। ধন্য গুরুভক্তি! বলি হারি যাই। আমি তঁাহার গুরুভক্তি দেখিয়া গুরুভক্তির গুরুত্ব অনুভব করিয়া, আর তাঁহাকে গুরু বলিতে ভরসা পাই নাই। আমাদের গুরু-সম্বােধন, কথার কথা মাত্র। তাহার গুরুভক্তি তেমন সহজ নহে, উহা ব্রহ্মচারীর হৃদয়ের সহিত জড়িত ছিল। ব্রহ্মচারী বলিয়াছেন—‘ব্ৰহ্মচর্যের প্রথমাবস্থায় যেমন গুরু তাহাদিগকে এক নির্দিষ্ট স্থানে বসাইয়া রাখিতেন, পরে আর সেরূপ না করিয়া তাহার বিপরীত করিতেন। তাহাদিগকে লইয়া যেখানে লােকযাত্রা (মেল) হয়,-যেখানে বহুলােকের জনতা হয়, সেই সেই স্থানে লইয়া যাইয়া তথায় বসাইয়া দিতেন। বহুলোকের মধ্যে মনঃসংযমের ব্যাঘাত হয় বলিয়া তাহার পত্তি দেখাইলে, গুরু বলিতেন—‘নির্জনে চিত্ত স্থির করা যেমন অভ্যাস করিয়াছি, জনতার কলরবের মধ্যেও তেমন করিয়া চিত্ত স্থির করিতে অভ্যাস করিতে হইবে। তৎপরে তাঁহারা, গুরুর অভিপ্রায় বুঝিয়া, সেইরূপ করিতে আর আপত্তি করেন নাই। এইরূপে গুরু তাহাদিগকে মশক-পিপীলিকাদির উপদ্রব ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ১২৫ v সহ করিতে অভ্যাস করাইয়াছিলেন। একদিন একস্থানে লােকনাথ গুরুকে বলিয়াছিলেন- এখানে পিপড়ায় বড় যন্ত্রণা দেয়, স্থানান্তরে গেলে হয় না কি ? তাহার পর চক্ষু মুদ্রিত করিয়া পড়িয়া থাকিয়া দেখিলেন—গুরু তাঁহাদের অগােচরে চিনি ছড়াইয়া পিপীলিকাদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিতেছেন । তখন বুঝিলেন—পিপড়ার কামড় অভ্যাস করাইবার জন্যই এরূপ করা হইতেছে। তদবধি পিপীলিকাসম্বন্ধীয় বিজ্ঞান নিরূপণ করিতে যত্নবান্ হইয়াছিলেন। এইরূপে মশাসম্বন্ধীয় বিজ্ঞানও লাভ করিয়াছিলেন। ব্রহ্মচারীরা যেমন একদিকে উপবাসাদি বাহ ক্রিয়া অভ্যাস করিতেন, তেমন অন্যদিকে আবার আভ্যন্তরক্রিয়া সমাধিরও অভ্যাস করিতেন এবং অন্তর্বিজ্ঞান খুঁজিয়া বেড়াইতেন। এই সময়েই লােকনাথব্রহ্মচারী তপশ্চৰ্য্যার অবশ্যম্ভাবিফলস্বরূপ জাতিস্মরতা লাভ করিয়াছিলেন। সেই কাহিনী ইতিপূর্বে তদীয় অলৌকিক জীবনীতে উল্লিখিত হইয়াছে, আর দ্বিতীয়বার উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করি না। জাতিস্মরতলাভের পর পূর্বজন্ম স্মৃতিপথে উদিত হইলে, যেরূপে তিনি পূর্বজন্মের জন্মভূমি বেড়গ্রামে উপনীত হইয়া পূৰ্বদৃষ্ট পদার্থের ন্যায় তথাকার বাড়ী, ঘর, খাল, বিল, নদী, বৃক্ষ প্রভৃতি চিনিতে পারিয়াছিলেন তাহাও ইতিপূর্বে বর্ণিত হইয়াছে, এখানে আর দ্বিরুক্তির প্রয়ােজন নাই। ইহার পর ব্রহ্মচারী সিদ্ধিলাভের জন্য হিমালয় পর্বতে গমন সৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। A AAAAAA AAAAAAAAAAAA করেন। . বলা বাহুল্য ব্রহ্মচারীর নিত্য সহচর বেণীমাধব এবং গুরু ভগবান্ গাঙ্গুলীও এই সঙ্গে ছিলেন। হিমালয় যাইবার অব্যবহিত প্রাক্কালে তাঁহারা বর্ধমানে অবস্থান করিতেছিলেন। ব্ৰহ্মচারী, ভারতী মহাশয়ের নিকট, বলিয়াছেন—“বর্ধমানে কোনও কালীমূর্তির পূজারি ব্রাহ্মণ দেবশ্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন বলিয়া লােকে জানিত। আমি এই রহস্য অবগত হইবার নিমিত্ত তাহার নিকট ক্রমাগত যাতায়াত করিতে লাগিলাম। কিন্তু তিনি কিছুতেই গুপ্ত রহস্য প্রকাশ করিতে ইচ্ছুক হইলেন না। আমি কিন্তু তাহাকে কিছুতেই ছাড়িলাম না। একটা মানুষকে উপাসনা করিয়া বশীভূত করা আর কত বড় কথা! বড় পীড়াপীড়ি করিয়া ধরাতে অল্পদিনেই তিনি আমার বাসনা পূর্ণ করিলেন। কহিলেন- ‘আমি কোনও দেবতাকে আয়ত্ত করিয়াছি। সেই দেবতা প্রত্যহ আমাকে আট আনা করিয়া প্রদান করেন এবং প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে যে কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দিয়া থাকেন। তখন আমি কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম—আমি হিমালয়ে যাইয়া বাস করিব, তথাকার শীত আমার সহ্য হইবে কিনা? উত্তর হইল- ‘হইবে। এ উত্তরটা আমিও শুনিতে পাইলাম। তখন আমি পূজারিকে বলিলাম—আমি স্বয়ং একটা প্রশ্ন করিতে চাই, দেখিব, মামার কথার উত্তর দেন কিনা ? আমি প্রশ্ন করিলাম—হিমালয়ে মাইয়া আমি সিদ্ধিলাভে সমর্থ হইব কিনা? পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করিয়াও কোনও উত্তর না পাওয়াতে, পূজারিকে প্রশ্ন করিতে তনুরোধ কৰিলাম। হিমি প্রশ্ন করিলে পর উত্তর হইল—

ধর্মসার-সংগ্রহ।
১২৭
We
AAAA
‘সিদ্ধিলাভ হইবে। আমি তখন আশ্বস্ত ও উৎসাহিত হইয়া
হিমালয়ে গমন করিবার জন্য উদ্যত হইলাম। এই পূজারি
মলমূত্র ত্যাগ করিয়া শৌচ করিত না। অপবিত্র অবস্থায়ই মায়ের
অর্চনাদি করিত।
হিমালয়ে যাইয়া অবস্থানের পর যথাকালে লােকনাথ
পরমসিদ্ধি লাভ করিলেন। তঁাহার এই পরমসিদ্ধি কি ?
তাহা আমরা এস্থানে ব্যাখ্যা করিতে ইচ্ছা করি না। তাহার মুখের
কথা শুনিয়া যতদূর বুঝিতে পারিয়াছি তাহাতে মনে হয় তিনি কৰ্ম্ম
করিতে করিতে কর্মসন্ন্যাস অর্থাৎ নষ্কৰ্ম্মসিদ্ধি
লাভ করিয়াছেন। তিনি কর্মযোগদ্বারাই ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া
ব্ৰহ্মজ্ঞ ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন এবং কৰ্ম্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া
মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন। তিনি সর্বদা কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াও
অকৰ্ত্তা এবং দেহধারী হইয়াও দেহসম্বন্ধবর্জিত হইয়া অবস্থান
করিতেন।
ভারতী লিখিয়াছেন—“যে মুহুর্তে ব্রহ্মচারী সিদ্ধিলাভ
করিলেন, সেই মুহূর্তেই গুরুদেবের দিকে চাহিয়া অত্যন্ত রােদন
করিতে লাগিলেন! গুরু কারণজিজ্ঞাসু হইলে কহিলেন ‘আমি ত
পার পাইলাম, তুমি এখনও সংসারসমুদ্রে পড়িয়া হাবুডুবু
খাইতেছ।
তােমার এই অবস্থা দেখিয়া আমি আর ধৈর্য্য ধারণ
করিতে পারিতেছি না। তুমি এত খাটিয়া আমাকে পার করিলে,
আমি মুক্ত হইলাম ; আর তুমি তটান্তৱলাভের আশায় উম্নেত্র
হইয়া অনকালের প্রতিক্ষায় পরতীরে দাঁড়াইয়া রহিলে ।

১৮ ধর্মসার-সংগ্রহ। কিরূপে যে তােমার উদ্ধার হইবে, ভাবিয়া আমি আকুল হইতেছি। গুরু কহিলেন—“আমি চিরদিন জ্ঞানপথের পথিক। কৰ্ম্মদ্বারা যে এরূপ সিদ্ধিলাভ হইতে পারে, এতকাল আমি একথা বিশ্বাস করি নাই। অতএবই সিদ্ধিলাভের জন্য তােমার ন্যায় এতদূর যত্ন করিতে পারি নাই। এখন তােমাকে কৰ্ম্মপথে চালাইয়া, কৰ্ম্মযােগে তােমাকে এই পরম সিদ্ধলাভ করিতে দেখিয়া, এতদিনে আমি শিক্ষালাভ করিলাম। আমি এই দেহ পাত করিয়া পুনরায় জন্মগ্রহণ করিয়া তােমার শিষ্য হইব। তখন তুমি আমাকে এই পথে চালাইও। ব্ৰহ্মচারীর সিদ্ধিলাভের কিছুকাল পরেই ভগবান, ব্রহ্মচারি- দ্বয়কে সঙ্গে করিয়া, কাশীধাম যাত্রা করেন। পথে, হিতলাল মিশ্র নামক এক সিদ্ধপুরুষের সহিত তাহাদের সাক্ষাৎকার হয়। চারিজনেই একসঙ্গে কাশী চলিয়া আইসেন। ভারতী লিখিয়াছেন- এই হিতলাল মিশ্ৰই এক সময়ে কাশীতে ত্রৈলঙ্গ স্বামী নামে পরিচিত ছিলেন। ব্রহ্মচারীর গত দুই জন্মের কথা স্মরণ ছিল, হিতলাল গত তিন জন্মের কথা স্মরণ করিতে পারিতেন। কাশীতে আসিয়া চারিজনেই একত্র বাস করিতে লাগিলেন। এই সময়ে লােকনাথ ও বেণীমাধবের বয়স ৯০ কি ১০০ বৎসর হইয়াছিল, তথাপি ভগবান্ তাহাদিগকে বালক বলিয়াই মনে করিতেন । একদিন ভগবান শিষ্যদ্বয়কে হিতলালের হাতে সমর্পণ করিয়া অপূর্ণ নয়নে কহিলেন—অতঃপর আমার এই বালক দুইটার ভার তােমার উপর অর্পিত হইল, তুমি ইহাদের ভার গ্রহণ কর।

ধর্মসার-সংগ্রহ। ইহার অল্প কয়েকদিন পরে একদিন ভগবান্ শিদিগকে কহিলেন—‘অদ্য গঙ্গায় যাইয়া স্নান করিয়া কিছুকাল জপ করিব। তোমরা আমার প্রতীক্ষায় থাকিও। এই বলিয়া তিনি গঙ্গায় যাইয়া স্নান করিয়া মণিকর্ণিকার ঘাটে জপে বসিলেন। লােকনাথ তাহার প্রত্যাগমনের বিম্ব দেখিয়া একটু উদ্বিা হইলেন। গঙ্গার ঘাটে যাইয়া তাহাকে জপে নিবিষ্ট দেখিয়া ভাবনা দূর করিলেন। কিছুকাল প্রতীক্ষা করিয়া পরে তাহার শরীর ধরিয়া বলিলেন—“তােমার আবার জপ।” তাঁহার অঙ্গ স্পর্শেই ভগবানের দেহ ভূতলে পড়িয়া গেল। তখন তিনি জানিতে পাইলেন গুরু দেহত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। লোকনাথ তঁাহার নিমিত্ত কোন শােক ও করেন নাই। তৎপরে যথাবিধানে তাহার পাঞ্চভৌতিক দেহের দাহসংস্কার সম্পাদন করিয়া তৎসম্বন্ধে স্বীয় কৰ্ত্তব্য শেষ করিলেন। এই সময়ে ব্রহ্মচারী দেশভ্রমণে বহির্গত হইয়া পশ্চিমে বহুদূর পর্যন্ত গমন করিয়াছিলেন। এই ভ্রমণ সম্বন্ধে কোনও ধারাবাহিক ইতিহাস জানিতে পাওয়া যায় নাই। এবিষয়ে ভারতী মহাশয় স্বপ্রণীত সিদ্ধজীবনী গ্রন্থে এইরূপ লিখিয়াছেন— “বারদীর ব্রহ্মচারীর ভ্রমণবৃত্তান্ত, বিশেষতঃ তাঁহার উত্তর ও পূর্বদিক যাত্রার কথা, নব্য সমাজের পক্ষে বিশ্বাসের অযােগ্য এবং প্রচলিতবিজ্ঞান বিরুদ্ধ। আমরা প্রথমে তাঁহার পশ্চিমদিক যাত্রার বিষয় বর্ণন করিতেছি। এই ব্যাপার ব্রহ্মচারীর গুরুর মৃত্যুর পূর্বে কি পরে সংঘটিত হইয়াছিল, তাহা পরিষ্কাররূপে ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ ; জানা যায় নাই। তবে কিনা, এই ভ্রমণ বৃত্তান্তে তিনি যে সকল কথা প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাতে তাহার গুরুর বিষয় কিছুই ব্যক্ত করেন নাই। (উত্তর ও পূৰ্বদিক্‌ যাত্রার সময়ে যে তাহার গুরু বিদ্যমান ছিলেন না—তাহা স্পষ্ট ব্যক্ত করিয়াছেন)। আমরা অনুমান করি তাহার পশ্চিম যাত্রাতেও গুরু ছিলেন না। ব্রহ্মচারী আমার জিজ্ঞাসামতে বলিয়াছেন—‘আমার পশ্চিম- যাত্রার সীমা সমুদ্র পর্যন্ত। আমি ভাবিলাম তাহা হইলে আরব সাগরের পূর্বপার পর্যন্ত গিয়া থাকিবেন; কিন্তু পরে বুঝিয়া- ছিলাম আমার এই অনুমান ঠিক নহে। যে সকল মুসলমান, মহিইতে প্রত্যাগমন করিয়া, তঁাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিত, তাহাদিগের সহিত মক্কা ও মদিনার অবস্থাদি জিজ্ঞাসাবাদ করিতেন। তাহাতে যে সকল উত্তর প্রত্যুত্তর হইত, তদ্বারা তাঁহার মক্কা ও মদিনার গমন স্পষ্টরূপে বুঝিয়াছি। পরে তিনি প্রসঙ্গক্রমে স্পষ্টতঃ তাহা বর্ণনাও করিয়াছেন। পাঠকগণ এপর্যন্ত শুনিয়া, আমাদের ন্যায়, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব-তট তাহার পশ্চিম যাত্রার শেষ সীমা মনে করিতে পারেন। কিন্তু তাহাও সমীচীন নহে। একদা কতিপয় ইংরেজীশিক্ষিত ব্যক্তি তাহার নিকট উপবেশন করিয়া, আপনাদিগের মধ্যে কথােপকথন করিতেছিলেন যে, অমুক ইংরেজী শব্দটা ফরাসিগণ কর্তৃক এরূপ ভাবে উচ্চারিত হয়। তুচ্ছ বণে ব্রহ্মচারী ফরাসীদের ঐরূপ দুই চারিটী শব্দের উচ্চারণ করিয়া তাহাদের দেশ পর্যন্ত গিয়াছিলেন এরূপ স্বীকার করিলেন। এতদ্বারা তাঁহার পশ্চিমদিক যাত্রার ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। শেষ সীমা আমরা আটলান্টিক মহাসাগরকে স্থির করিতে পারি। তৎসম্বন্ধে আমার সহিত তাঁহার আর বিশেষ কোনও প্রসঙ্গ হয় নাই! মক্কা ও মদিনার যাত্রাসম্বন্ধে তিনি বলিয়াছিলেন যে, ‘আমি হাটিতে হাটিতে মক্কাতে উপস্থিত হইয়াছিলাম। এতদ্দেশীয় হিন্দুদের সংস্কার আছে যে, মুসলমানেরা হিন্দুদিগকে মক্কায় যাইতে দেয় না। কদাপি কেহ গেলে, যবনাম ভক্ষণ করাইয়া তাহাকে জাতিভ্রষ্ট করিয়া লয়। কিন্তু সে কথা সত্য নহে। আমি তথায় উপস্থিত হইলে, মুসলমানেরা আমাকে বিশেষ যত্ন করিয়া আমার আতিথ্যসৎকার করিয়াছিল। তাহারা আমাকে বলিয়াছিল—“আপনি স্বয়ং রসুই করিযা খাইতে ইচ্ছা করেন, সিধা গ্রহণ করুন। নতুবা আদেশ করিলে আমরাও রসুই করিয়া দিতে প্রস্তুত আছি। আমি শেষােক্ত কথায় সম্মত হইলাম। তাহারা, অতি পবিত্র হইয়া, কাপড় দিয়া মুখ বাঁধিয়া, আমার জন্য রন্ধন করিতে লাগিল। মুখ বাঁধার তাৎপর্য এই যে, রন্ধন করিতে করিতে সহসা কথা কহিলে পাক দ্রব্যে থুথু পতিত হইয়া তাহা অপবিত্র করিতে পারে। তথা হইতে মদিনাতে যাই। সেখানে একস্থানে উপবেশন করিয়া থাকিলাম। তথায় সমাগত মুসলমানগণ আমার আহারের জন্য বড় বড় লাড়, রাখিয়া চলিয়া যাইত। এইরূপ প্রত্যহ আমার নিকট প্রচুর লাড্ড সমানীত হইত। আমি সামান্য যৎকিঞ্চিৎ আহার করিলে, ভক্ষাবশেষ তাহার, অদির করিয়া, ভােজন করিত। এখানকার মুসলমানেরাও মক্কাবাসীদের ন্যায় ধর্মসার-সংগ্রহ ; মুখ বাঁধিয়া রসুই করিয়া আমাকে ভােজন করাইয়াছে। ওখানে যাইয়া আমার মক্কেশ্বরদর্শনেচ্ছা বলবতী হইল। শুনিলাম, পশ্চিমদিকে মরুভূমির মধ্য দিয়া দুই তিন মাস গমন করিলে মকেশ্বরে যাওয়া যাইতে পারে। আমি তদুদ্দেশ্যে কিয় দূর গমন করিয়াছিলাম। কিন্তু মক্কেশ্বর পর্যন্ত যাওয়া ঘটে নাই। কয়েক দিনের পথ অতিক্রম করিলে ‘আবদুল গফুর নামক এক মহাপুরুষের সন্ধান পাইলাম । মুসলমানেরা তাহাকে অতিশয় ভক্তি করে। তিনি একস্থানে চুপ করিয়া বসিয়া থাকেন ; কাহারও সহিত কথাবার্তা কহেন না। আমি অনুসন্ধানপূর্বক তাহার দর্শন পাইয়া, নিকটে গিয়া উপবেশন করিলাম ; তিনি আমার প্রতি লক্ষ্য ও করিলেন না। আমি ধীরে ধীরে দুই চারি কথা জিজ্ঞাসা করিতে আরম্ভ করিলাম ; তাহার কোনও সাড়াশব্দ নাই। তথাপি আমি বিরত হইলাম না । মধ্যে মধ্যে জিজ্ঞাসা চলিতে লাগিল। অনেকক্ষণ পর তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি কয় দিনের লােক? আমি ত প্রশ্ন শুনিয়াই অবাক। বুঝিলাম, নিশ্চিতই তিনি আমার বয়স জিজ্ঞাসা করেন নাই। ইহার ভিতর কিছু গাঢ় ভাব আছে। আমি চিন্তামগ্ন হইলাম ; ভাবিলাম কত জন্মের কথা স্মরণ আছে, তাহাই জানিতে চাহিয়াছেন। উত্তর করিলাম--আমি দুইদিনের লোক। আপনি কয়দিনের ? তিনি কহিলেন, “আমি চারিদিনের মনুষ্য অর্থাৎ আমার ঢারি জন্মের কথা স্মরণ আছে। পরে বিস্তর আলাপ হইতে লাগিল ; জানিলাম, দাক্ষিণাত্যে কোনও ক্ষত্রিয় বংশে তাঁহার এই জন্ম হইয়াছে।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
১৩৩
vvv
পাঠক এ পর্যন্ত পড়িয়া মনে করিতে পারেন যে, ঐ মহাপুরুষ
ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া, পশ্চাৎ মহম্মদীয় ধৰ্ম্ম গ্রহণ
করেন, তাহাতে ‘আব্দুল গফুর নাম প্রাপ্ত হইয়াছেন। বাস্তবিক
তাহা নহে। যিনি জন্ম গ্রহণ করিয়া, গত তিন জন্মের বৃত্তান্ত
স্মরণ করিতে পারেন, তিনি কখনও বাহ সমাজবন্ধনে বাধ্য
থাকিতে পারেন না। এই ভাবটী আমার স্বকোপল কল্পিত
নহে। গুরুদেব লােকনাথ ব্রহ্মচারীও সমাজবন্ধন মানিতেন না
স্পষ্ট বলিতেন—“আমরা অসামাজিক লােক। তবে তাঁহার
দেখাদেখি পাছে অন্যেরা সমজি বন্ধন না মানিয়া উচ্ছঙ্খল হইয়া
উঠে, এই জন্য তিনি লোকালয়ে আসিয়া অনেকটা সমাজের
অনুসরণ করিতেন। শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন—
‘যদি হং ন বর্ভেয়ং জাত কৰ্ম্মণ্যতন্দ্রিতঃ।
মম বঙ্গানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সৰ্ব্বশঃ
উৎসীদেষু রিমে লােক ন কুৰ্যাং কৰ্ম্ম চেদহ।
(গীতা)।
“আমি কৰ্ম্মক্ষম হইয়াও যদি শাস্ত্র নির্দিষ্ট কৰ্ম্মকলাপ
তিক্রম করি, তবে সকল মনুষ্যই আমার অনুসরণ করিয়া
কৰ্ম্মকাণ্ড ত্যাগ করিবে; অতএব আমার কৰ্ম্ম না করা হেতু,
সমাজ উচ্ছিন্ন হইয়া যাইবে।
উক্ত মহাপুরুষ সংসারের এই সকল ভাব পূর্ব পূৰ্ব জন্মে
বিদিত হইয়াই জন্মে জন্মে লােক সমাজের বাহিরে অবস্থান

১৩৪ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ।।।।।।।।।।।।।।। করিয়া আসিতে ছিলেন এবং বর্তমান জন্মেও হিন্দুসমাজ ছাড়িয়া , আরব দেশের মরু প্রদেশে লুক্কায়িত রহিয়াছেন এবং তথাকার মুসলমান সমাজোপযোগী ‘আবদুল গফুর’ নামে পরিচিত হইয়াছেন। ব্রহ্মচারীও তঁাহার ‘আবদুল গফুর’ নাম পাইয়াছেন। তিনি গত তিন জন্মে যে যে স্থানে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, ব্রহ্মচারীর নিকট তৎসমুদয় প্রকাশ করিলে, ব্রহ্মচারী তাহার নির্দিষ্ট সেই সকল স্থান দর্শন করিয়া আসিয়াছেন। ‘আবদুল গফুরের সহিত ব্রহ্মচারীর বিশেষ প্রকার আলাপ পরিচয় হইলে পর, তিনি ব্রহ্মচারীর ক্ষমতা দর্শনে বিস্মিত হইয়া বলিয়াছিলেন, ‘তুমি পাকা লােকের (গুরু ভগবান্ গাঙ্গুলীর ) হাতে পড়াতে অত উন্নতি লাভ করিতে পারিয়াছ, আমাদের ভাগ্যে এতাদৃশ গুরু প্রাপ্তি ঘটে নাই। ব্রহ্মচারী একবার কাবুলে যাইয়া সেক মােল্লাসাদির গৃহে অতিথি হইয়া কোরাণ শিক্ষা করিয়াছিলেন। আমি দেখিয়াছি—একদিন লােকনাথ ব্রহ্মচারীর বারদীস্থ আশ্রমে একজন জগন্নাথ দেবের পাণ্ডা উপস্থিত হইয়া তাঁহার মুখে জগন্নাথের প্রসাদ অর্পণ করিতে অগ্রসর হইয়াছিল। পাণ্ডার বিশ্বাস যে, হিন্দুমাত্রেই দেবদেবীর প্রসাদ ভক্ষণের জন্য লালায়িত। কেবল পাণ্ডার কেন, খাঁটি হিন্দুমাত্রেরই তাদৃশ ধারণা বিদ্যমান দেখা যায়। ব্রহ্মচারী পাণ্ডাকে প্রসাদ হস্তে ধাবমান দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন,—“আমি মুসলমান। পাণ্ডা অমনি প্রত্যাবৃত্ত হইল। পরে পাণ্ডাকে দুই চারিখানা পয়সা ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। দিয়া বিদায় করা গেল। তাঁহার মুখে “আমি মুসলমান” এই কথা শুনিয়া সেখানকার সকলেই স্তম্ভিত হইয়াছিল, সেজন্য ব্রহ্মচারী তাদৃশ উক্তির এই ব্যাখ্যা করিলেন। মুছুলুম ইমান মুসলমান। আমার মােল আনা ইমান্ বিদ্যমান আছে, ইমান পাওয়ার জন্য প্রসাদভক্ষণের অনাবশ্যকতা দেখাইয়াছি। ব্রহ্মচারীকে আরবী ভাষায় অভিজ্ঞ দেখিয়া তাহার তাদৃশ জ্ঞান লাভের কারণ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তাহাতে তিনি বলিয়াছেন—‘আমরা গুরু শিষ্য মিলিয়া কাবুলে গিয়া মােল্লাসাদীর বাড়ীতে অবস্থান করিয়া তাহার নিকট রীতিমত কালেমােল্লা ( কোরাণ) পাঠ করিয়াছি। এই কোরাণ শিক্ষা জাতিস্মরতা লাভের পূর্বে বা পরে হইয়াছে তাহা স্থির করা যায় না। সম্ভবতঃ জাতিস্মর হওয়ার পূর্বেই কোরাণ শিক্ষা করিয়া থাকিবেন। ব্রাহ্মণের সন্তান হইয়া কোরাণ শিখিতে হইল কেন ? এই প্রশ্ন করাতে ব্রহ্মচারী বলিলেন,-আমার গুরুদেব সর্বশাস্ত্রবেত্তা ছিলেন। মহম্মদীয় ধৰ্ম্মে, সিদ্ধিলাভের কোনও বিশেষ উপায় বর্ণিত আছে কিনা, এই সন্দেহভঞ্জনের জন্য তিনি নিজেও আমাদের সঙ্গে কোরাণ অভ্যাস করিয়াছিলেন। ফলতঃ জ্ঞানবান্ মনুষের সন্দেহগুলিকে সর্বতোভাবে নিরসন করাই কর্তব্য।” ইহার পর ব্রহ্মচারী, হিতলাল মিশ্র, ও বেণীমাধব তিন জনে মহাপ্রস্থানের সঙ্কল্প করিয়া সুমেরু যাত্রা করেন। ভারী মহাশয় অনেকগুলি বৃত্তান্ত সিদ্ধজীবনী গ্রন্থে উল্লেখ তৎসম্বন্ধে ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। { করিয়াছেন। যাঁহারা সুমেরুযাত্রা সম্বন্ধে সকল কথা বিস্তারিত জানিতে ইচ্ছা করেন, তাহারা সিদ্ধজীবনী গ্রন্থের ‘সুমেরু-যাত্রা নামক বৃত্তান্তটী পাঠ করিয়া দেখিবেন। আমরা এস্থানে সংক্ষেপে মাত্র ২৪টী কথা বলিব। পরম সিদ্ধিলাভে চরিতার্থ ব্রহ্মচারীর দীর্ঘকাল নিম্নভূমিতে বাস করিয়া আর এই নিকৃষ্ট মর্তলােকে অধিবাস ভাল লাগিল না ; তিনি সশরীরে স্বর্গবাসের অভিলাষী হইলেন। তাই তদীয় নিত্য সহচর বেণীমাধবকে লইয়া সুমেরু যাত্রার সঙ্কল্প করিয়া কিছুকাল কেদারতীর্থে বাস করিয়া শরীরকে হিমালয়ের সুদারুণ শীত সহ্য করিবার উপযােগি করিয়া লইলেন। এই কেদার তীর্থে ও শীতের তাদৃশ প্রাদুর্ভাব যে গ্রীষ্ম ঋতু ভিন্ন অন্য সময়ে সেস্থানে বাস করা সাধারণ মানবের অসাধ্য। কিছুদিন পরে হিতলাল মিশ্র ও তঁাহাদের সুমেরুযাত্রার সহায় হইলেন। যাত্রিত্ৰয় তিন বৎসরকাল কেদার তীর্থে অবস্থান করিয়া দেহকে শীতপ্রধান প্রদেশে বরফের উপর দিয়া ঢলিবার উপযুক্ত করিয়া লইলেন। পরে তথা হইতে যুধিষ্ঠিরাদি যে পথে স্বর্গ গমনে প্রয়াসী হইয়াছিলেন, সেই পথ ধরিয়া ক্রমে উত্তরাভিমুখে চলিতে লাগিলেন। তাহারা, সুমেরু উদ্দেশ্যে প্রায় দশবৎসর কাল ক্রমাগত উত্তরদিকে চলিতে চলিতে, অবশেষে এমন একস্থানে নাইয়া উপনীত হইয়াছিলেন, যে স্থানে সূর্যের উদয়াস্ত নাই, যাহা নিরন্তর নিবিড় অন্ধকারে সমাবৃত। যাইবার পথে তঁাহারা মানস- সরােবরের তীরে যাইয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। এই মানসসরােবর আমাদের তিব্বত দেশীয় মানসসরােবর নহে। উহা পৃথিবীর উত্তর ধর্মসার-সংগ্রহ। ১৩৭ • প্রান্তে অবস্থিত। শাস্ত্রে ইহা ‘উত্তরমানস’ নামে উল্লিখিত আছে। তাহারা সেই অন্ধকারময় দেশে চলিতে চলিতে শেষে আর অগ্রসর হইতে পারেন নাই। নিরন্তর বরফরাশির মধ্য দিয়া চলিবারও পথ পাইলেন না। অবশেষে সেই অন্ধকারাবৃত দেশে কিছুকাল অবস্থান করিতেই বাধ্য হইয়াছিলেন। এখানে কিছুকাল থাকিয়া তাঁহাদের দৃষ্টিশক্তির এমন এক আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন ঘটিয়াছিল, যে তখন তাহারা বিড়ালের ন্যায় অন্ধকারেও স্পষ্টরূপে দেখিতে পাইতেন। এই সময়ে ভাহাদের গাত্রে কোনও আবরণ ছিল না তাহারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ ছিলেন। কিন্তু বিধির অনির্বচনীয় বিধান- মতে তাহাদের গাত্রের উপরে শ্বেতবর্ণ এমন এক চৰ্মাবরণ জন্মিয়াছিল, যে সেইহেতু তাহাদিগকে শীতের অসহ্য কষ্ট অনুভব করিতে হয় নাই। তাহারা তখন যে দেশে অবস্থান করিয়াছিলেন সেই দেশের অধিবাসীদের শরীরের প্রমাণ এক কি দেড়হস্তের অধিক নহে। তাহাদের বর্ণ সম্পূর্ণ শুভ্র। তাহারা ইহাদের ভাষা বুঝিতে পারেন নাই। প্রথমে এই আশ্চৰ্য মনুষ্যাকৃতি জীবের তাহাদের সমীপে ঘনাইত না। অবশেষে যখন তাহাদিগকে সম্পূর্ণ হিংসাদি পরিশূন্য বলিয়া বুঝিতে পারিল, তখন আর ভয় করিত । এমন কি, তাহাদের জন্য ফলমূলাদি আহরণ করিয়া আনিয়া কিঞ্চিদ্দরে রাখিয়া চলিয়া যাইত। ব্রহ্মচারী উহাদিগের কয়েকটা শব্দও স্মরণ রাখিয়াছিলেন। ইহারা সর্বদা উলঙ্গ থাকে। ব্রহ্মচারীরা সুমেরুগমনে নিরাশ হইয়া তথা হইতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। প্রত্যাবর্তন করিতেও তাহাদের সেই পরিমাণ কাল ১৩৮ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ অর্থাৎ ১০ বৎসর লাগিয়াছিল। ইদানীং তাহারা পৃথিবীর যে অংশে অবস্থান করিতেছিলেন, হিন্দুশাস্ত্র ও ভারতীয় ভূগােলশাস্ত্র মতে উহার নাম ‘ইলাবৃত বর্ষ।' এই বর্ষ সুমেরু পর্বতের পদতলে অবস্থিত বলিয়া নিরন্তর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তথা হইতে প্রত্যাবৃত্ত হওয়ার পর হিতলালের উদায়চল গমনের ইচ্ছা হইল। লােকনাথও তাহার সঙ্গী হইয়া চলিলেন, অতএব বেণীমাধবও তাঁহাদের অনুগামী হইলেন। কিছুদিন পূর্বমুখে চলিয়া হিতলাল ব্রহ্মচারীকে কহিলেন, “তােমাদের নিম্নভূমিতে কাৰ্য রহিয়াছে, অতএব তােমাদের আর আমার সহিত অধিক দূর অগ্রসর হইবার প্রয়ােজন নাই। তদনুসারে লোকনাথ ও বেণীমাধব হিতলালের সঙ্গ পরিত্যাগ করিয়া বঙ্গের পূর্ব প্রান্তবর্তী পর্বতে ফিরিয়া আসিলেন। সেখান হইতে লােকনাথ বারদী আসিয়া জীবনের অবশিষ্টাংশ অতিবাহিত করেন। বেণীমাধব কামাখ্যাভিমুখে চলিয়া যান। বারদীতে আসিয়া লােকনাথ প্রায় ২৬২৭ বৎসর ছিলেন। এখানে থাকিয়া তিনি যে স্বীয় লৌকিক ঐশ্বর্যের পরিচয় দিয়াছেন, তাহাদের তানেকগুলি তদীয় অলৌকিক জীবনের কাহিনীতে ইতিপূর্বে বিবৃত হইয়াছে। লােকনাথ কীদৃশী মহিয়সী শক্তি ও অনন্ত জ্ঞানের আধার ছিলেন, তাহা আমাদের ন্যায় মায়ামােহান্ধ বদ্ধজীবের বুঝিবার অধিকার নাই। কতকগুলি লােকাতীত আশ্চর্য ঘটনাদ্বারা তাহার অনন্ত মহিমার পরিচয় করিতে যাওয়া নিতান্ত অজ্ঞ ও নির্বোধের কাৰ্য। ব্রহ্মচারী বিভূতি দেখাইয়া লোককে চমৎকৃত করিয়া তাহাদের পূজা পাইবার ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ১৩৯ প্রয়াসী ছিলেন না। অনেক সময় তিনি বলিতেন “বিভূতি আমি প্রস্রাব বলিয়া গণ্য করি।” কেহ কেহ প্রশ্ন করিতে পারেন, যদি ঐশ্বৰ্যপ্রদর্শন না করাই তাহার অভিপ্রেত ছিল, তবে এগুলি দেখাইলেন কেন? তদুত্তরে আমরা বলিতে পারি—বিভূতিসমূহ সিদ্ধমহাপুরুষদিগের স্বভাবসিদ্ধ ধৰ্ম্ম। অগ্নি যেমন অনিচ্ছাসত্ত্বেও দীপ্তি পায় বা দগ্ধ করে ; সূৰ্য্য হইতে যেমন রশ্মিসকল আপনা আপনিই বাহির হয়, জল যেমন স্বভাবতঃই তৃষ্ণা নাশক এবং শীতল, সিদ্ধমহাপুরুষেরাও সেইরূপ স্বভাবতঃই বিবিধ ঐশ্বর্যের আধার এবং তঁাহাদের ব্রহ্মশক্তি আপনা আপনিই বিকাস পায়, কোনও চেষ্টার প্রয়োজন হয় না। শুষ্ক কাষ্ঠ যেমন অগ্নিসংস্পর্শে তৎক্ষণাৎ দগ্ধ হইয়া যায়, মনুষ্যেরাও সেইরূপ কৰ্ম্মক্ষয়ে তাঁহাদের কৃপালাভের যােগ্যতা লাভ করিলে, আপনা হইতেই রােগমুক্ত ও দারিদ্র্যবিরহিত হইতে এবং বাঞ্ছিত বস্তু লাভ করিতে অধিকারী হয়। যিনি অাত্মারাম, ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া যিনি বাহ বস্তুর সহিত সম্পর্ক ত্যাগ করিয়াছিলেন, বাহ্যজগতের সঙ্গে, বাহ বস্তুর সহিত যাহার সম্পর্ক ও তিরােহিত হইয়াছিল, সাংসারিক পাপ পুণ্যের সহিত যাঁহার সম্বন্ধই ছিল না, আত্মপ্রীতি ভিন্ন অন্যবিধ আনন্দের অনুভূতি যাহার হইত না, অহংবুদ্ধি যাহার ত্রিসীমায়ও স্থান পাইত না, তিনি পার্থিব অকিঞ্চিৎকর সম্মান ও যশের জন্য লালায়িত হইয়া ঐশ্বৰ্যপ্রদর্শনে ব্যগ্র হইবেন, ইহা নিতান্তই বিচারবিরুদ্ধ এবং অসম্ভব। ব্রহ্মচারী বহির্জগতের অস্তিত্ব স্বীকার করিতেন না, সুতরাং বহির্জগতের সহিত যে যে বিষয়ের অণুমাত্রও সম্বন্ধ আছে, সেই সেই বিষয়ই তাহার নিকট অলীক বলিয়া ১৪০ ধর্মসার-সংগ্রহ। অনুভূত হইত। অতএব বাহজগতে যশঃ, সুখ্যাতি, অখ্যাতি মন, অপমান, কিছুই তাঁহার হৃদয়ে স্থান পাইত না, অথচ তিনি উপস্থিতমত ফলাভিসন্ধিরহিত হইয়া সকল কাৰ্যই করিয়া যাইতেন। তাহার শুভাশুভ পরিণামের দিকে একটুও লক্ষ্য ছিল না। প্রকৃতি যাহা করাইত তাহাই, আত্মাকে অকর্তা জানিয়া তিনি সম্পাদন করিতেন। প্রকৃতির কাৰ্য্য প্রকৃতি করিয়া যাইত, তিনি সাক্ষী গােপাল হইয়া থাকিতেন। আমাদের ন্যায় প্রাকৃত লোকেরা মনে করিতাম, ব্রহ্মচারী ঐ নিমিত্ত এই কাজ করিলেন, না করিলে দোষ হইত। অমুক কাজটা তিনি ভাল করেন নাই ; ঐটী আমার প্রতি অন্যায় ব্যবহার করিলেন, অমুকের প্রতি অকারণ সেদিন ক্রোধ প্রদর্শন করিয়াছেন; নিজের খ্যাতি বাড়াইবার জন্য এবং লােকের পূজা পাইবার জন্য অমুক অদ্ভুত কাৰ্য্য করিলেন। প্রকৃত পক্ষে কিন্তু তাহার কিছু করিবার ইচ্ছাই ছিল না। এই প্রত্যক্ষ দৃশ্যমান জগৎ বিদ্যমান থাকিয়াও তাঁহার নিকট অবিদ্যমানই ছিল। বাহ্যজগতের বিদ্যমানতা ঘটাইবার জন্য অনেক সময়ে তাহাকে ইচ্ছা করিয়া মায়ার আশ্রয় লইতে হইত । বাঙ্গল। ১২৯৭ সনের ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ব্রহ্মচারীর দেহত্যাগের দিন ধাৰ্য্য হয়। ভারতী মহাশয় লিখিয়াছেন-“বারদীনিবাসী কোনও একব্যক্তি যক্ষারােগে মৃত প্রায় হইয়াছিল। তাহার আত্মীয়েরা ঐ রােগ ব্রহ্মচারীকে গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করে। ব্রহ্মচারী মৃত্যুজনক রোগ বলিয়া তাহা প্রথমে লইতে চাহিলেন না। শেষে বিশেষ সাধ্য সাধনাতে রোগটা তুলিয়া লইলেন৷ রােগী যক্ষারােগ ধর্মসার-সংগ্রহ। ১৪১ হইতে মুক্তিলাভ করিল, কিন্তু বাঁচিল না। ২৪ মাস মধ্যে অন্য রােগে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইল। এদিকে সেই মৃত্যুজনক কফরােগ ব্ৰহ্মচারিবাবার শরীরে তাহার পিণ্ডপতনের দিন পর্যন্ত অবস্থান করিয়াছিল। লােকনাথের দেহত্যাগের ২৪ মাস পূর্বে ঐ কফয়ােগ অতিশয় প্রবল হইয়া জীবন সংশয় ঘটা- ইয়াছিল। সাধারণ লােক ঐ অবস্থায় বাঁচিতে পারে না। তিনি যােগী বলিয়া সেই অবস্থা কাটিয়া উঠিয়াছিলেন। তখন তিনি উঠিয়া আস্তে আস্তে হাটিতেন। শরীর ভারী দুর্বল ছিল। ইহার পর লােকনাথ নিজের ইচ্ছাশক্তির বলে দেহধারণ করিতে লাগিলেন। ১২৯৭ সনের ১৯শে জ্যৈষ্ঠ রবিবার দেহত্যাগের দিন ধার্য্য হইল। প্রাতে উঠিয়া আদেশ করিলেন অদ্য আশ্রমবাসীদের ভােজন ব্যাপার বেলা ৯টার মধ্যে শেষ করিতে হইবে। বেলা ১০টার সময়ে অনুসন্ধান করিয়া জানিলেন—আশ্রমের সকলেরই আহারাদি কার্য সম্পন্ন হইয়াছে। তখন বাহ্য ব্যাপারের ভাবনা ছাড়িয়া দিলেন। দিন বেশ পরিষ্কার ছিল, দিনমণি উজ্জ্বল কিরণজাল বিকিরণ করিতে লাগিলেন। ব্রহ্মচারী, উপযুক্ত সময় বুঝিয়া, স্থির হইয়া আসনে উপবিষ্ট হইলেন। পৃষ্ঠদেশে হেলান দেওয়ার জন্য একখানি কাষ্ঠল বস্ত্রদ্বারা পরিবৃত ছিল। লােকনাথ ধ্যানাবলম্বন পূর্বক দেহ হইতে পৃথক (আল ) রহিলেন। দেহটী কাণ্ডারিবিহীন জীর্ণ তরীর ন্যায় সংসার তরঙ্গে ভাসিতে লাগিল। আসনের ভাব দেখিয়াই সেবকেরা বুঝিলেন, এদেহের পক্ষে ইহাই শেষ আসন। সকলেই উৎকণ্ঠা ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ সহকারে চক্ষুর দিকে চাহিতে লাগিলেন। অন্য মুমুদিগের নেত্র পলকহীন বিস্ফারিত দেখিলে মৃত বলিয়া অনুমান করা হইয়া থাকে। লােকনাথের চক্ষুঃ স্বভাবতঃই পলকশূন্য ছিল। অন্যান্য দিনের ন্যায় আজও তিনি ধ্যানাবলম্বন করিয়া রহিয়াছেন, দেখিলে ইহাই অনুমান হইল। এজন্য পাছে ধ্যানভঙ্গ হয়, এই আশঙ্কায় কেহই গায়ে হাত দিতে সাহস পাইল না। কেহ বলিলেন দেহ ছাড়িয়া গিয়াছেন, কেহ বলিলেন—না। কেহ বা দেহের বিশেষ ব্যত্যয় লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। অবশেষে বেলা সাড়ে এগারটার পরে সকলে পরামর্শ করিয়া দেহ স্পর্শ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। স্পর্শে ১১ টা ৫৫ মিনিটের সময় বুঝিলেন—তিনি ইহার কিছু পূর্বেই চিরদিনের জন্য দেহ ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন। তৎপরে মহাসমারােহের সহিত ঘৃত ও চন্দন-কাষ্ঠ-দ্বারা চিতা প্রজ্জ্বলিত করিয়া সেই দেবদেহের দাহ সংস্কার সমাধা করা হইল। দহি ক্রিয়ার পরে আমরা অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারিয়াছি বারদীর চতুর্দিকে এক প্রহরের মধ্যে হাট বাজার ও গৃহস্থের বাড়ীতে যত ধৃত ও চন্দনকাষ্ঠ ছিল, সকলই ব্ৰহ্মচারিবাবার দাহ কার্যে নিঃশেষে ব্যয়িত হইয়াছিল । অনেকে বলিয়াছেন—যে সময়ে ব্রহ্মচারী বারদীতে দেহত্যাগ করেন, ঠিক সেই সময়ে তঁাহারা তাঁহাকে একখানি লাঠি হাতে করিয়া লাঙ্গলবন্ধের নিকট ব্ৰহ্মপুত্র নদ পার হইয়া যাইতে দেখিয়াছেন। যে সময়ে এবং যে ভাবে ব্রহ্মচারী দেহ ত্যাগ করিয়াছেন, তাহাতে বােধ হয় তিনি যে সূৰ্য্যভেদ করিয়া চলিয়া ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ১৪ . যাওয়ার ইচ্ছা করিয়াছিলেন, দেহত্যাগের সময়ে সেই বিষয়ে কৃতকার্য হইয়াছিলেন এবং তিনি পরমব্রহ্মে মিশিয়া গিয়াছেন। আমরা শুনিয়াছি তিনি কখন কখন কোন কোনও শিষ্যকে বলিয়াছিলেন—আমার দেহত্যাগ যদি উত্তরায়নে দিবাভাগে হয় এবং সেই দিন যদি আকাশ নিৰ্ম্মল থাকে, সূৰ্য্যদেব উজ্জ্বল কিরণ দিতে থাকেন, তবে বুঝিবে আমি সূৰ্যভেদ করিয়া চলিয়া গিয়াছি; আর আমার ইহলােকে পুনরাবৃত্তি ঘটিবে না। “ভারতী মহাশয় লিখিয়াছেন—জীবিতাবস্থায় তানেকে তাঁহাকে গাঢ় চিন্তায় নিমগ্ন থাকিয়া আপনা আপনি বলিতে শুনিয়াছে—“আমি এঘর ছাড়িয়া কোন ঘরে যাইব কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিতেছি না। “আবার আমার দেহ ধারণ করিতে হইবে। এবার গঙ্গাতীরে জন্মগ্রহণ করিব। তােরা আমাকে চিনিতে পারিবি না, তোদিগকে আমি চিনিয়া লইব’ ইহা তিনি কাহাকে কাহাকে বলিয়াছিলেন। ইহাতে অনেকে তাহাকে কোথায় যাইয়া জন্মগ্রহণ করিবেন এই কথা জিজ্ঞাসাও করিয়াছিলেন। তিনি যখন নিশ্চিতই জন্মগ্রহণ করিবেন না তখন সে বিষয়ে কি উত্তর করিবেন ? যদি তিনি দেহত্যাগ করিয়া কোথাও জন্মগ্রহণ করিতেন তবে জাতিস্মর বলিয়া এতদিনে (২২২৩ বৎসরে ) হয়ত আমাদের অন্বেষণ করিয়া আমাদের সহিত আলাপ পরিচয়ও করিতেন। এতদ্বারা নিশ্চিতই বােধ হইতেছে তিনি সূৰ্যভেদ করিয়া পুনরাবৃত্তি রহিত হইয়া ব্ৰহ্মলোেক লাভ করিয়া থাকিবেন।”

১৪
ধর্মসার-সংগ্রহ।
••••••••••
গুরুমাহাত্ম।
১। “গুরুদেবাে গুরুধৰ্ম্মো গুরুনিষ্ঠা পরং তপঃ।
গুরােঃ পরতরে নাস্তি নাস্তি তত্ত্বং গুরােঃ পরম্ ॥”
অর্থাং গুরুই দেবতা, গুরুই ধৰ্ম্ম, গুরুই নিষ্ঠা, এবং গুরুই শ্রেষ্ঠ
তপস্যা স্বরূপ। গুরু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর আর কিছুই নাই। গুরুতত্ত্ব
হইতে শ্রেষ্ঠত্ত্বও আর নাই ।
২। “গুরােঃ কৃপাপ্রসাদেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-দিয়ঃ ।
সৃষ্ট্যাদি সমর্থন্তে কেবলং গুরুসেবয়া ॥”
অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবও, গুরুসেবাদারা গুরুকে প্রসন্ন করিয়া, গুরু-
কপাবলেই সৃষ্টি স্থিতি লয় করিবার শক্তি লাভ করিয়াছেন।
“ব্ৰহ্মানন্দং পরমসুখদং কেবলং জ্ঞানমূর্তি
দ্বন্দ্বীতং গগনসদৃশং তত্ত্বশস্যাদিলক্ষ্য।
একং নিত্যং বিমলমচলং সর্বদা সাক্ষিভূতম্
ভাবাতীতং ত্রিগুণরহিতং সদ্গুরুং তং নমামি।”
যিনি ব্রহ্মানন্দস্বরূপ, পরমসুখদাতা, একমাত্র জ্ঞানস্বরূপ (চৈতন্যস্বরূপ,
শীতােষ্ণাদিরূপ দ্বন্দ্বভাবের অতীত, আকাশসদৃশ সূক্ষ্ম, সৰ্ব্বব্যাগ, বেদোক্ত
তমস্যাদি বাক্যের প্রতিপাদ্য, নিত্য, নিৰ্ম্মল, অচল, সৰ্ব্বদা সাক্ষিস্বরূপ,
নির্লিপ্ত, সর্বপ্রকার পদার্থের অতীত, গুণত্রয় বিরহিত, সংস্বরূপ সেই
গুরুকে আমি নমস্কার করি।
৪। “নিত্যং শুদ্ধং নিরাভাসং নিরাকারং নিরঞ্জনম্ ।
নিত্যবােধং চিদানন্দং গুরুং ব্রহ্ম নমাম্যহম্ ॥”
অর্থাৎ যিনি নিত্য (সৰ্ব্বদা অবিকৃত বা পরিবর্তন রহিত অবস্থায়
অবস্থিত), যিনি শুদ্ধ, আভাস শূন্য, যাহার আকার নাই, নিরঞ্জন,
(নিৰ্ম্মল ), সর্বদা বােধ (জ্ঞান) স্বরূপ, চিদানন্দ (চৈতন্য ও আনন্দ।
স্বরূপ, সেই পরম ব্ৰহ্ম গুরুকে নমস্কার করি।

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ।
১৪৫
“আনন্দমানন্দকরং প্রসন্নং
জ্ঞানস্বরূপং নিজবােধযুক্ত।
যােগীন্দ্ৰমীড্যং ভবােেগ বৈদ্যং
শ্রীমদ্গুরুং নিত্য মহংভজামি ।”
যিনি আনন্দময়, আনন্দদায়ক, প্রসন্ন, আত্মজ্ঞানযুক্ত, যােগন্দ্র, বন্দনীয়,
যিনি ভবরােগের বৈদ্যস্বরূপ, সেই শ্ৰীমদ্ গুরুদেবকে সর্বদা ভজনা করি।
গান।
নমামি তােমায় লােকনাথ
ব্ৰহ্মজ্ঞানােদ্ভাসিত
ব্ৰহ্ম-তেজ প্রদীপিত
পরম ব্রহ্মচারী।
তেজোময়রূপ, জ্ঞানে গবীয়া,
আজীবন আচরি ব্রত মহান,
ব্রহ্মচারিরূপে কেটেছ জীবন,
ওহে যােগী যােগাচারী।
প্তি আৰ্য রীতি নীতি প্রকাশিতে,
আৰ্য ব্রহ্মচর্য কাৰ্য্যে দেখাইতে,
আয্যের আচার জগতে শিখাতে,
( গিয়েছ ) অৰ্য্য ধরম প্রচারি।
মােহাচ্ছন্ন জীবে তরাবার তরে,
যেই ধীজ তুমি গেছ বপন করে,
সেই বীজ তব বৃক্ষের আকারে,
ঘােষিবে মহিমা তােমারি। ৪
কোথাহ’তে প্রভাে! এসেছিলে হেথা?
আবার চলিয়ে গেলে বা কোথা ?
{ বুঝি ) দেশ দেশান্তরে আছ যথা তথা,
জগত ব্যাপ্ত করি। ৫

১৪৬
ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ
আলেখ্য শুধু রহিয়াছে এথা,
(তাই) জাগায় মনে তােমারি বারতা,
গায় যেন সদা তব গুণ গাথা,
কলুষ রসনা আমারি। ৬
অলক্ষ্য আলেখ্যে তব রূপভাতি,
জাগুক অন্তরে জ্বলন্ত মূরতি,
লকবিহীন আখির পাতি,
দিবা নিশি যেন নেহারি।
আদেশিছে যেন ও আখি যুগল,
করমের পথে চলরে মূঢ় চল,
পাইবে পরাণে অমৃত অমল,
হৃদয়েরি তম পরিহরি। ৮
আমার মানস চঞ্চল দুৰ্বল,
ধাবিত সদা কুপথে কেবল,
থাকে যেন ভক্তি মােহে অচল,
( জীবন) সপেছি চরণে তােমারি ।
{ এভা!) দাসানুদাস আমি হে তোমার,
ভুলি যেন না হে ও চরণ আর,
দেখেছি অন্তরে কবিয়া বিচার,
তুমি গুরুর গু আমারি।
ব্রহ্মচারিবাবার অন্যতম প্রিয় শিষ্য পরলোকগত মহাত্মা কৃষ্ণচন্দ্র রায়েব
পত্ৰ শ্ৰীমন্ হরিদাস রায় কর্তৃক বিরচিত। (১)
{১) মহাত্মা কৃষ্ণচন্দ্র ব্রহ্মচারিবাবার বিশেষ প্রিয়শিষ্য ছিলেন। ইনি বারদীর
উত্তরে ব্রাহ্মণদী গ্রামে ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেন। ইহাদের ভাল ভূসম্পত্তি ছিল।
দৈবদুর্বিপাকে অবস্থার বিষয়ে এই রায়পরিবার নি:স্ব হইয়া পড়ে। পরে

ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ। ১৪৭ রাগিনী সিন্ধু খাম্বাজ, তাল-মধ্যমান। কিসে দোষী আমি জগতে ? দোষ নামে কি পদার্থ আছে তাহা জাব কিমতে। ত্রিগুণে আমার আমিত্ব, এ জগৎ গুণনিমিত্ত, ব্ৰহ্মাদিদেব গুণায়ত্ত, দোষ আসিল কোথা হতে ? অখিল ব্ৰহ্মাণ্ড যত সকলি মায়াকল্পিত। সত্ব রজ, তম, মায়া, এই ত্রিগুণ বই দোষ কৈ তাতে? মনকষ্টে দুইজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে পাহাড়ে পাহাড়ে অনেক দিন ঘুরিয়া তিনি তাহাদের সেবা করেন। সন্ন্যাসিন্বয় কৃষ্ণচন্দ্রের সেবায় সন্তুষ্ট হইয়া আদেশ করেন—“তােমাকে আবার সংসাশ্রমে প্রবেশ করিতে হইবে। কারণ আমরা স্পষ্ট দেখিতেছি যে তােমার দুইটা পুত্র সন্তান জন্মিবে। আরও দেখিতেছি মেঘনানদীর পারে কোন একটী যােগসিদ্ধ মহাপুরুষের সঙ্গলাভ হইবে। তিনিই তােমার গুরু। তাঁহার নিকট যাও তবেই তােমার সকল অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে।” তদনুসারে তিনি সংসারে ফিরিয়া আসেন এবং মেঘনা নদীর পারই বারদীর ব্রহ্মচারিবাবার নিকট আসিয়া তাহার কৃপা লাভ করেন। ক্রমে তাহার দুইটী পুত্র জন্মে। পত্নীর বয়স তখন ত্রিশ বৎসরেরও উপরে, সন্তানাদি এপর্যন্ত জন্মিয়াও ছিলনা, জন্মিবার সম্ভাবনাও ছিল না। জ্যেষ্ঠটীর নাম শ্রীমান হরিদাস রায় এবং কনিষ্ঠের নাম শ্রীমান্ জানকীদাস রায়। মহাত্মা কৃষ্ণচন্দ্র দেখিতে অতি সুপুরুষ ছিলেন। বাবা বহুমূল্য বস্ত্রাদিদ্বারা তাঁহারসাজসজ্জার বন্দোবস্ত করিতেন এবং পুত্র নির্বিশেষে তাহার সকল অভাব পূরণ করিয়া প্রতিপালন করিতেন। ব্রহ্মচারিবাবার পিণ্ডপতনের কয়েক বৎসর পরেই মহাত্মা কৃষ্ণচন্দ্রের মধ্যে অনেক যোগবিভূতি প্রকাশ হইতে থাকে। তিনি সর্বদাই বাবার শীমূৰ্ত্তি সেবায় নিযুক্ত থাকিতেন এবং সর্বদা আনন্দে বিভাের থাকিয়া পার্শ্বস্থ সকলকে অনিন্দিত করিতেন। তাহার নিকটে আসিয়া অনেকেরই নানা প্রকার মনাের পূরণ হইত। কত দুরারােগ্য রােগী যে তাহার কৃপায় আরোগ্য লাভ করিয়াছে তাহা গণনা করা যায় না। পরিশেষে ঢাকার কোন একটী আশ্রিত ভক্তের পুত্রের বিষমজ্বর হওয়াতে সে মহাত্মা কৃষ্ণচন্দ্রের শরণাগত হয় এবং সেই রােগীকে দূর করিবার জন্য নির্বাতিশয়ে প্রার্থনা করে। তিনি বলিলেন “এইটী মৃত্যুরােগ, দূর করিবার উপায় নাই। কিন্তু রােগীর আত্মীয় স্বজনের অনুরােধ কোন মতেই এড়াইতে পারিয়া ঐ রােগ দুর করিতে বাধ্য হন। রােগী আরােগ্য লাভ করিল, কিন্তু তিনি ঢাকাস্থ আশ্রমে আসিয়াই বলিলেন যে তাহার শরীরে ঐ বিষমজ্বর সংক্রামিত হইয়াছে এবং সেই অরেই তাঁহার মৃত্যু নিশ্চিত। বাস্তবিকই ৩৪ দিন পরেই তিনি ঐ বিষয়- ১৪৮ ধৰ্ম্মসার-সংগ্রহ hULWWWWWWWWW গুণী আমি মহাগুণে, জলছি সদা মহাগুণে, কেটে দে গুণ নিজগুণে, গুণের গুণ নাশে যাহাতে । দোষ যদি হয় গুণের অভাব, পেতে বাঞ্ছা সেই স্বভাব। দয়া ক'রে দয়াল গুরু দোষী করে দেও সুরথে। মহাত্মা সুরথাথ ব্রহ্মচারিবিরচিত। (১) করে আক্রান্ত হইলেন। রাবস্থায়ও প্রতিদিনই তিনি স্বহস্তে ভােগ পাক করিতেন এবং ব্রহ্মচারিবাবার উদ্দেশ্যে ভােগ নিবেদন করিয়া প্রতিদিনই প্রসাদ পাইতেন। কয়েকদিন পরে তিনি গুরুপাটে বারদীর আশ্রমে যাইয়া নিজ ভদ্রাসনে “দয়ালগু, মালগুরু” বলিতে বলিতে উদেহ রক্ষা করেন এবং পরমপিতা শ্রীগুরুর চরণ প্রান্তে আশ্রয় নেন। (১) মহাত্মা সুরথনাথ ব্রহ্মচারীও ব্রহ্মচারিবাবার অন্যতম একজন প্রিয়তম শিষ্য ছিলেন। ইহার নিবাস ঢাকা জিলার অন্তর্গত সোণারগ পরগণ। অন্তঃপাতী গােবিন্দপুর গ্রাম। ইনি স্যাতিত বৈদ্য ছিলেন। ইহার লৌকিক নাম অখিলচন্দ্র সেন। বাবার এই প্রিয়শষ্যের পূজীবনী বড়ই উচ্ছ,খল ছিল। ইনিও দেখিতে বড়ই সুঙ্গী ছিলেন। প্রকৃতির তাড়নায় ইনি কতকগুলি বড়লােকের সংসর্গে পড়িয়া মদ্যপায়ী ও বেশ্যাসক্ত হইয়া পড়েন। এইরূপে অনেকদিন গত হইলে অনুতপ্ত হৃদয়ে পূৰ্বন্মের সুকৃতি বলে বাবার শরণাগত হন। কয়েক বছর বাবার সঙ্গলাতে ইহার পূর্বাভ্যাস অনেক পরিমাণে সংশোধিত হইয়া আসিতে থাকে। মে তিনি বাবার কৃপার অধিকারী হইলেন। উপযুক্ত সময় দেখিয়া বাবা তখন ইহাকে ব্রহ্মচারীর বেশ, গৈৰ্মীক বস্ত্রাদি প্রদান করেন এবং "সুরথনাথ ব্রহ্মচার' নামে অভিহিত করেন। বাবার কৃপায় ইনি পন হইতেই সাধনমার্গে বহুদূর অগ্রসর হতে থাকেন। ব্রহ্মচারিবাবা ইহার মধ্যেও এমন শক্তি সঞ্চারিত করিয়াছিলেন যে ইনিও বাবার মহীয়সী শক্তি ও অনন্ত বিভূতির বিশেষ পরিচয় প্রদান করিয়া হঠাৎ ১৩৯ সনের ৪ঠা পৌষ বৃহস্পতিবার দেহ ত্যাগ করিয়া শুরধামে বাবার পদ প্রান্তে উপনীত হইয়াছেন। তাহার কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত শিষ্যও বৰ্তমান আছেন। ধনী শিষ্যদের মধ্যে ধানকোড়ার ব্রাহ্মণ জমিদার মুক্ত বাৰু সীনেশচন ব্যয় অত। আশাকরি সুরথনাথের জীবনী শীঘ্রই হার কোনও কৃতীশিষ্য কর্তৃক লিপিত হইবে। সমাপ্তোহয়ং গ্রন্থঃ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dharmmasar-sangraha Ed. 4th

Author
Mukhapadhyay,jaminikumar
Title
Dharmmasar-sangraha Ed. 4th
File name
Dharmmasar-sangraha Ed. 4th
Text
OCR done
Citation
1914
Published
2010/02/6
Publisher
Sri Haridas Ray, Dhaka
Language
Sanskrit
Pages
166
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Mukhapadhyay,Jaminikumar
DLI number
512594
Barcode
4990010019654.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
hsHCflWUSF0
Download PDF

Dharmmasar-sangraha Ed. 4th