Makardah Saraswat Library, Howrah

Rani Bou Ed.1st

Ghosh, Pravaschandra · 2009/07/10

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রাণীবৈ সাহিত্য-সীন

প্রকাশক–শ্রীহরিশ চন্দ্র মজুমদার
২১৮, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ ২০০০
আশ্বিন-১৩৩৪
প্রিন্টার-আশুতােষ মজুমদার
বি, পি, এস প্রেস
২২৫ বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা।
কক

প্রাতি-উপহার)
সন
(সা)-

উনসর্গ।
স্বর্গীয়
পিতৃদেবের
চরণ
ধূলির
তলে--

No text on this page.

রাণী-বী অকৃ৷ রাণী সাজিয়া চিত্ৰাপিতের মত দাড়াইল... পৃষ্ঠা-৩৭।

রাণী-বৌ
“সনৎ।”
“দাদা।”
“আজ কি বার রে?”
“শনিবার।”
“উঃ মাগো! আর কেন মা,আর যে পারি না মা।”
সতাত ছােট ভাই সনৎ কুমারের নয়ন হইতে কয়েক ফোটা
অশ্রু গড়াইয়া পড়িল। বারের নাম শুনিয়া কেন যে তাহার দাদা
অমন করুণ আক্ষেপবাণী উচ্চারণ করিলেন, তাহা বুঝিতে তাহার
ক্ষণকালও বিলম্ব হইল না।
“তাহলে শরতের সঙ্গে আজ আর দেখা হ’ল না, কি বল
সনৎ ?” বলিয়া তিনি একটা ছােট নিশ্বাস ফেলিলেন।
সনৎ কোন উত্তর দিল না। মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া রহিল।
বড়-বৌ কিসমিসের কাটিগুলি ছাড়াইতে ছাড়াইতে ধীরে ধীরে

রাণী-বৌ
ক
বলিল, “ঠাকুরপো আসবে’খন—অত ভাবনা করছো কেন ? :এখন
একটু ঘুমােও না।”
“ঘুমবার আগেই তাকে একবার দেখতে চাই বড় ; ঘুমলে ত
আর তার সঙ্গে দেখা হবে না। তখন ‘দাদা দাদী' বলে হাজার
চীৎকার করলে ও আর সাড়া পাবে না—সে।” পরে দম টানিয়া বলিলেন,
“আমার যে তাকে অনেক বলার ছিল বড়।”
কিছুক্ষণ সব নিস্তব্ধ হইয়া রহিল।
“সনৎ, যা ত, তোর বৌদিকে একবার ডেকে অতিত, অনেক
দিন রাণী মাকে দেখিনি। আজ একবার তাকে সামনাসামনি দেখবাে।
যা সনং-যনা। ভয় নেই, শরৎ কিছু মনে করবে না—ববে না।
বলবি, দাদা মরবার আগে তোমাদের একবার দেখতে চেয়েছিল। যা
ভাই লক্ষ্মীটি আমার।”
সনৎ কোন কথা না বলিয়া উঠিয়া গেল।
বড়বৌ লুকাইয়া চোখের জল মুছিলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বড়কর্তা অবির বলিতে লাগিলেন,
-“বড়, তোমার মনে আছে-ওকে আমি কেমন করে বড় করেছি?
আচ্ছা বড়, কেমন করে ও আলাদা হ’ল বলত ? ভাই হয়ে
ভায়ের প্রাণে কেমন করে এমন ব্যথা দেয় বল ত?”
বড়বৌ অস্তে আস্তে অথচ দৃঢ়স্বরে কহিল,-“আচ্ছা আজ অত
বচো কেন বল ত?”
২

রাণী-বে
“বড়, আর কোন দিন ববব না বলেই বোধ হয় আজ এত
বকৃতি।”
“তুমি • যেন কি রকম হ'য়েছ ; অজ তিনদিন ধরে ঐ এককথাই
তােমার হয়েছে।”
“কি করবো বড়, মন ক’দিন থেকে ঐ একপলাই গাইছে সে।”
বলিয়া আপন মনেই তিনি একটু হাসিলেন।
তারপর বহুক্ষণ কাটিয়া গেল, আর তেমন কোন কথা হইল
তিনি অাচ্ছন্নের মত নীরবে পড়িয়া রহিলেন। আকাশ পাতাল কত
কি যে ভাবিতে লাগিলেন, তাহ৷ তিনিই জানেন।
“বড়, সনৎ এসেছে রে?”
“এসেছে।”
বৌমা আসিয়াছে কিনা তাহ। তিনি আর জিজ্ঞাসা করিতে সাহস
করিলেন না। কারণ, যদি কেহ ইহার উত্তরে “না” বলিয়া বসে,
তাহা হইলে, তাঁহার প্রাণ বোধ হয় নিমেষেই শূন্তে মিলাইয়া
যাইবে।
সুতরাং তিনি কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করিয়া কেবল ব্যথিত নয়নে
একবার স্ত্রীর দিকে চাহিলেন। বড়বৌ এ চাহনির অর্থ বুঝিল।
বলিল,-“তােমার রাণী-বৌমাও এসেছে।—নিয়ে আসি ?”
তিনি আহলাদে বলিয়া উঠিলেন, “এসেছে ? দেখলে বড়, আসবে

রাণী-বৌ
, আমি যে তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। নিয়ে এসে
আমার রাণী-বৌমাকে এখানে।” আনন্দে তাহার ম্লান মুখ উজ্জ্বল
হইয়া উঠিল।
বড়বৌ কোন কথা না বলিয়া চলিয়া গেল। কেবল সে-ই জানিত
যে কত চেষ্টা করিয়া তবে সে এখানে আসিয়াছে।
নিরাভরণা রাণী-বোমাকে দেখিয়া বড়কৰ্ত্তা বিকট হাসি হাসিয়া
বলিলেন, “বড়, দেখ দেখ, চেয়ে দেখ, আমার সােনার প্রতিমাকে,
রাণীমাকে কেমন করে সাজিয়েছে।”
তারপর বড়কর্তা একটু আবেগের সহিত বলিলেন,-“বড়, আমি
থাকলে তুমি বিধবা সাজবে, কিন্তু আজ বাঙ্গালীর ঘরে স্বামী
বর্তমানে কেমন বিধবা সেজেছে দেখ একবার ! যাকে সোনা দিয়ে
মুড়ে আমি সকলকে দেখিয়ে বারবার বলেছি-ওগো দেখ, আমাদের
রাণী-বৌ দেখ তােমরা।আর আজ!-সন, তােরা আজ-কাল-কার
ছেলে, এমন করে আর ঘরের লক্ষ্মীকে সাজাসনি, বাঙ্গালীর সব গেছে,
কেবল এই ঘরের লক্ষ্মীই তাে......
তিনি আর বলিতে পারিলেন না। উত্তেজনায়, কামায়, অভি-
মানে, দুঃখে-কষ্টে তাহার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া আসিল। তিনি যেন
হাঁপাইয়া উঠিলেন।
সনৎ তাড়াতাড়ি বাতাস করিতে লাগিল। বড়বৌ মুখে একটু
জল দিল। মিনিট পাঁচেক পরে তিনি একটু সুস্থ হইলেন। সনৎ

রাণী-বো
কাণের কাছে মুখ
লইয়া বলিল,-“বেশীক্ষণ আজ
ব’লন। দাদা-তােমার আবার কষ্ট হবে।”
“আমার কিছু কষ্ট হবে না রে, কিছু কষ্ট হবে না। যে কষ্ট
সহ্য করে এসেছি এ জীবনে, তাতেও যদি-না আজও কষ্ট সহ্য
হয়ে থাকে ত, সে প্রাণ যাক।” বলিয়া রাগে তিনি চুপ
করিলেন।
বহুক্ষণ অলঙ্কারশূন্য ধুতিপরিহিতা বৌমার কমনীয় দেহখানির
দিকে ফিরিয়া রহিলেন। কত কি যেন ভাবিতে লাগিলেন। তারপর
একটা অস্ফুট বেদনার ধ্বনি উচ্চারণ করিয়া বলিলেন,-“শরৎ
গহনা খুইয়েছে,-বেশ। ও-শাখাট। আর কেন রাণীমা? না-না,
ওটার যে দাম নেই। সনং ! ঐ এক ঘােড়ার খুরের চাপে ও ভেঙ্গে
যাবে একদিন। ধুতি পরেছ কেন মা? না-না আর বলতে হবে
, বুঝেছি সাড়ীর দাম যে বেশী । মা, হবিষ্টি করত,একবেলা
খাও! আলু ভাতে আর ভাত! দেখ বড়, শেখ, শেখ, তােমাদের
পূর্বপুরুষের মা লক্ষ্মীরা এত কঠোর সাধনা করতো ? বিধবা হবার
আগে থেকেই বিধবার নিয়ম পালন!” বলিয়া নিজের মনেই তিনি
একটু হাসিলেন, একটু নিশ্বাস ফেলিলেন। আবার বলিতে
লাগিলেন,—“জুয়াড়ীর সহধৰ্ম্মিণীর কি সুন্দর সহধৰ্ম্ম পালন!”
পাগলের মত কি যে বকিলেন, কেহ ঠিক করিতে পারিল
না।

রাণী-বৌ
“তারপর তাহার কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়া গেল। তিনি
সজলকষ্ঠে বলিতে লাগিলেন, “রাণীবৌমা, তােমায় আর কি আশীর্বাদ
করবাে মা ! ‘চিরসুখী হও', এ বলে ফল নেই আর! ‘জন্ম
এয়ােস্ত্রী হও তাতে তােমার লাভ !তবে একটা কথা বলি, যে
সভ্যতা আজ আমাদের ভয়ে ভয়ে বৌয়ে বৌয়ে এমন করে
বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছে, আনার বাঙ্গালার সংসারকে ছারখারে
দিতে বসেছে, তাকে যেমন করে পারে। দূর করে পায়ে ঠেলে দাও।
ভয়ে ভয়ে বেয়ে বৌয়ে আবার এক হ’য়াে । সনৎ! শরৎ এলে
অজি তাকে বলতাম—‘রেস ছেড়ে দে ভাই, অ'র ভয়ে ভয়ে বিষয়
নিয়ে গােল করিস নি ; কিন্তু, বোধ হয় ঈশ্বরের তা ইচ্ছা নয়—তা
হলে আজই শনিবার পড়বে কেন ? শনির ফের ভাই, শনির
ফের।”
উত্তেজিতভাবে এত গুলি কথা বলিয়া কর্তা আনিলেন, হাপাইতে
লাগিলেন।
বোমা চক্ষু মুছিতে লাগিল। সনৎ প্রাণপণে নিজের অর্শ রােধ
করিতে লাগিল। কৰা উদাসভাবে কড়িকাঠের দিকে তাকাইয়া
রহিলেন।
যেন তিনি কোন একটি অদৃশ্য দেবতার পায়ে হার
অব্যক্ত বেদনা জানাইতে লাগিলেন।
৬

দুই শবকে এতক্ষণ রাখা উচিত নয় বিবেচনা করিয়া, পাড়ার লোক শরতের অপেক্ষা না করিয়া বড় কর্তাকে শ্মশানে লইয়া গেল। শরৎ রেস হইতে ফিরিয়া আসিয়া ঝিয়ের নিকট হইতে সব শুনি। সে ভায়ের সঙ্গে জোর করিয়া পৃথক হইয়াছিল । অতএব তাহার মৃত্যুতে সে না যাইলেও অপর লােকের তেমন কিছু বলিবার ছিল ন', তবুও এ সংবাদে তাহার ছোট মন আরাে ছােট হইয়া গেল। ওবাড়ী যাইয়া আর কোন সংবাদ পর্যন্ত লইতে সাহস করিল ন কোথা হইতে একটা বিষম লচ্ছ। তাহাকে তাহার অন্ধকার ঘরের কোণে টানিয়া ধরিয়া রাখিল। সে কাপড় চোপড় পরিয়া সে রেস থেতিতে গিয়াছিল, সেই কাপড়-চোপড়েই সে শুইয়া পড়িল । হাত ধুইল না, মুখ ধুইল না, বালিসে মুখ গুজিয়া পড়িয়া রহিল। গভীর রাত্রে স্ত্রী ওবাড়ী হইতে আসিল। শরৎ তাহা বুঝিতে পারিল। স্ত্রী নিজের শয্যার পার্শ্বে আসিয়া দাড়াইল, আলো জ্বালিল, তাহাও তাহার বুঝিতে বেশী বাকী রহিল না ; তথাপি, সে নিদ্রার ৭

রাণী-বৌ
বসিল।
ভাণ করিয়া পড়িয়া রহিল। কারণ, এ ছাড়া জগতে স্ত্রীর সম্মুখে মুখ
দেখাইবার যেন আর তাহার দ্বিতীয় কোন পন্থাই ছিল না।
স্ত্রী অরুণা শয্যার এক অংশে বসিয়া কঁদিতে লাগিল। ঘণ্টা খানেক
এমনভাবেই কাটিল। ভোর হইয়া আসিল। পূৰ্ব্বদিকের জানালা
দিয়া ভােবের আলাে নিঃশব্দে প্রবেশ করিল। সঙ্গে সঙ্গে ওবাড়ীর
কৰ্ত্তার শবদেহের সৎকার করিয়া ফিরিয়া-আসার হরিধ্বনি তাহাদের
দু’জনারই কর্ণে আসিয়া আঘাত করিল। অরুণ-“বাবা গাে”
বলিয়া করুণস্বরে নিস্তব্ধ ঘরে চীৎকার করিয়া উঠিল।
শরৎ আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। শয্যার উপর উঠিয়া
তাহার বিনিদ্র শোকাতুর নয়ন দু’টা মুছিতে মুছিতে
বলিল, “অৰু কখন ফিরে এলে ?” কি কথা বলিবে কিছুই যেন
ঠিক করিতে না পারিয়াই শরৎ ইহা বলিয়া উঠিল।
অরুণা কোন কথা কহিল না, কঁদিতে লাগিল। শরতেরও চক্ষু
দু’টা আবার ছল ছল করিয়া আসিল। ভাই তাহার যে কি ছিল,
তাহা সে জানিত। কিন্তু......
তাহার বয়স যখন খুবই কঁচা, যখন সে সবেমাত্র চার-কি-পাঁচ
বৎসরের হইবে, তখন তাহার পিতা মারা যান; তখন হইতেই তাহার
জ্যেষ্ঠভ্রাতা তাহাকে এবং তাহার কনিষ্ঠভ্রাতাকে কোলে-পিঠে করিয়া
মানুষ করিয়াছেন। আর অঙ্গ ?...ইত্যাদি ইত্যাদি।
“অৰু, দাদার শেষ সময় কে কে কাছে ছিল ?” স্ত্রী উত্তর দিল না

রাণী-বো ; দেখিয়া শরৎ গভীর দুঃখে বলিল,-“ছিঃ অরু অভিমান করেছ- বলনা।-তুমি জাননা অরু আমি ভাইকে কত ভালবাসি ! আমি, আমি • আলাদা হয়েছি—আমি কটু কথা বলেছি ; আমি ভায়ের অসুখের সংবাদ শুনেও রেস খেতে গেছি ; আমি সব করেছি; কিন্তু, কিন্তু তুমি বিশ্বাস কর অরু, তবুও আমি আমার ভাইকে ভালবাসতুম, আজও ভালবাসি। কি করবাে এই রেসের নেশাই আমার ভাই থেকে আমায় অনেক দূরে নিয়ে গেছে...” বলিতে বলিতে সত্যই সে তাহার চক্ষু মুছিতে লাগিল। স্বামীকে এত কাতর হইতে অরুণা কোন দিনই দেখে নাই। অরুণ। স্বামীর এ কাতরতায় সত্যই বিচলিত হইয়া পড়িল এবং সজল অথচ সংযতকণ্ঠে বলিল,-“তুমি থাকলে ভাল হতাে। যাবার সময় ছোট, ঠাকুরপােকে কত কথা তিনি বলেন । আমি দরজার পাশে নীরব হয়ে শুনছিলাম!” শরৎ একটু আগ্রহের সহিত কহিল—“কি বললেন তাকে ?” অরু বলিল—“আগে জানি না কত কি বলেছেন, কিন্তু আমি যখন গেলুম তখন বলছিলেন-তােমার নাম করে—সে যদি আজ থাক্তাে ত তােদের দু’হাত এককরে আমি আমার এই যাবার সময় বলে যেতুম—ওরে তােরা দুজনে দুজনকে এমন ভুল বুঝিনি,তাকে তােরা অমন করে শােনানি, ভাল করে বােঝ। সংসারে সত্য পালন করতে গিয়ে অত কঠোর হ'লে রণী-বে চলে না। তাহলে ক্ষমা ধৰ্ম্ম থাকতে না সনং : সে একটা বিষয় ভুল করেছে, তুইও একটা বিষয় হয়ত ভুল করবি, তা বলে কি কারুক ফেলে দেওয়া চলে ?—আমার শেষ কথা মনে রাখিস আর দাদার যাবার সময়ের অনুরোধ বলে পালন কপিস—সে যত দোষই ক’বে থাক, তা’র বিপদের সময় কখন কঠোর হসনি, ভাইকে ঠেলিস্ নি।--অর নিজের বিপদেও সাহায্য নিতে লক্ষ করিনি—বুঝলি ? সে যে নিজের ভাই তা যেন বরাবর মনে থাকে।'--ভাসুরের কথা গুলি পুনরায় তাহারই ভাষায় আবৃত্তি করিতে করিতে হার ক্রন্দন তাহার কে বুকের ভিতর জ্বালা দিয়া উঠিল। *রং টিয়া টিয়া সকল কথাই জিজ্ঞাসা করিয়া লইল। বহুদিন পরে জ্যেষ্ঠতার জন্য, বড় বৌদিদির জন্য, ভ্রাতৃপুত্রের জন্য, তাহার প্রাণ কঁদিতে লাগিল। সে বসিয়া দিল। আকাশ-পাতাল কত কি ভবিল। রেস পেলার উপর বিরক্তি আসিল। মনে মনে মনকে ধিক্কার দিতে লাগল। আর রেসে যাইবে না। আর সে আপের ( Make up) চেষ্টা করিবে না। যাহা গিয়াছে, গিয়াছে। মনে মনে সত্যই সে সেদিন দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই করিয়া বসিল। অজি সে প্রতিজ্ঞা করিয়া মনে যেন একটু শান্তি পাইল । পরদিন সকালবেলা শরৎ ওবাড়ীতে গেল। সে জানিত, এমন সময় সনং নিশ্চয়ই ছেলে পড়াতে গেছে। সে নীচের তলায় কাহাকে দেখিতে পাইল না। সব নিস্তব্ধ, খা খা করিতেছে। বুক-ভরা

রাণী-বো
বেদনা লইয়া ধীরে ধীরে উপরে উঠিল ।
সম্মুখে বড় হল ঘর-বড়
বৌ
চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। জিতু তখনও পার্শ্বে অনেক
ঘুমাইতেছিল। বড়বো তাহাকে দেখিয়া মাথার কাপড়টা একটু ঠিক
করিয়া লইল, একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “এস, ব’স ঠাকুরপো
শরৎ লজ্জায় যেন এতটুকু হইয়া গেল। চৌকাঠের পাশেই সে
বসিয়া পড়িল এবং কি যে বলিবে তাহা ভাবিয়াই পাইল ।
অনেকক্ষণ নীরবেই কাটিল। কিছুক্ষণ বসিয়া থাকার পর ২
একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিল। শরং লজ্জায় এবং নিজে এত ,
কথা না বলায় মনে মনে ভাবী একটা অসোয়াস্তি বোধ :
লাগিল। শেষে বলিল, “নং বুঝি পড়াতে গেছে ?”
আজ পাঁচ বৎসর পরে ভয়ের ঘরে আসিয়া শরৎ এই কুখ। উক্ত
করিল! এমনটি কেন হই! কে করিলকহোর অভিশপ্ত কক্ষ
আজ তাহারা পৃথক্‌! এমন সােনার সংসার, এমন মায়ের মত ;
বৌদিদি-সেখানে তাহার সাথে কথা কহিব-বলিবর—দুঃখ ও
বার তাহার প্রাণ নাই, মাথা তুলিবার এতটুকু ক্ষমতা নেই।
করিয়া নিজের বাড়ীকে পর করিল কোন্ সভ্যতা? কোন্ কি ?
তাহার বড় বৌদিদি ঝর ঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। শান্তক?
বলিল—“না ঠাকুরপাে, সে পাশের ঘরে শুয়ে আছে । কাল থেকে
এক রকম মুখে জল দেয়নি। তােমরা ব্যাটা ছেলে তোমারই

রাণী-বাে যদি এই অধীর হয়ে পড়বে,-তবে অরি কাল মুখ চেয়ে থাকি বল ?” শরৎ একটা কথা বলিল না-অপরাধীর মত নীরবে বসিয়া রহিল। তাহার বুকের ভিতর জ্বালা দিয়া উঠিল। তাহার বড়বৌদিদি আবার বলিল,-“যাও না ঠাকুরপাে, তুমি এক- বার ওঘরে-একবার বুজিয়ে গুছিয়ে বলগে না। এমন দুঃখ করলে কি আর তিনি ফিরবেন। ও যখন শ্মশান থেকে ফিরে এলো, ভেবেছিলুম-র মুখ চেয়ে আমি বেশ বুক বেঁধে থাকবে ; কিন্তু।”—আবার বড়বৌ ঝর ঝর করিয়া কঁদিয়া ফেলিল। শরং দুঃখ করিতে পারে। সে দুঃখ সহিতে পারে। জগতের মধ্যে অনেক কঠিন কাজ সে করিতে পারে। কিন্তু, ওঘরে আজ সে বাইবে! কেমন করিয়া যাইবে ! কোন্ মুখ লইয়া যাইবে ! কিন্তু, না যাইয়া ত আর উপায় নাই। নিজের সকল লজ্জা, দ্বিধা মনে চাপিয়া সে ওঘরে গেল। দেখিল, সনং উপুড় হইয়া পড়িয়া অছে। হাতের উপর তাহার মাথা—বােধ হয় সে কঁদিতেছে। শরৎ ডাকিল—“সনৎ।” সনৎ তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া লইয়া বলিল—“কে মেজদা ?” শরৎ কাছে আসিয়া বসিল। দু'ভায়ে—পাঁচ বৎসর পরে—অনেক সুখ-দুঃখের কথা কহিল। দু’গায়ে দিল। দু’ভায়ে অনুতাপ করিল। দু’ভায়ে দুঃখের আবর্তে পড়িয়া এক হইবার সংকল্প করিল। ১২

রাণী-বো
সনৎ বলিল—“মেজবৌদিকে কালথেকে এখানে পাঠিয়ে দিও, মা ও
কাল আসবেন জানিয়েছেন, আমি হাবড়া ষ্টেশনে কাল যাব, তুমি
এখানের সব গুছিয়ে রাখবে।”
শরৎ আজ কোন কথায়ই ‘না’ করিতে পারিল না। দুঃখের টানে,
রক্তের টানে, তাহাকে আজ এক বহুদিনের চিরপরিচিত ঘাটের ধারে
আনিয়া ফেলিল। এতদিন সে যেন ভাসিয়া বেড়াইতেছিল। অাজ
যেন সে কূল পাইল-আশ্রয় পাইল। এমনিই তাহার মনে হইতে
লাগিল।
নিজের বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া স্ত্রীকে বলিল “অরু, আজ তােমাকে
ওবাড়ী যেতে হবে।”
এই কয়েকটি কথায়—অরুণা এত দুঃখের
মাঝেও এক অপূর্ব সুখের পরশ অনুভব করিল।
“কিন্তু রান্না-বান্না—যে এখনও......!”
“থাক, তােমার রান্না, ওবাড়ীর সবাই শুকিয়ে থাকলো, আর আমি
খেয়ে আফিস যাব, না অরু, তা হয় না। আজ আর আমি আফিস
যাব না; তােমার ওবাড়ীতে—আজ হ'তে বরাবরে থাকবার
বন্দোবস্ত করে তবে আমি জলস্পর্শ করবাে--"
“আর তুমি যাবে না?” বলিয়া অরুণা শঙ্কিত মুখে তাহার মুখের
দিকে একবার চাহিল।
“আমি যাব বৈ কি অরু, আমি না গেলে তুমি একলা যাবে
কেন ?”

রাণী-বো অরুণা অবাক্ হইয়া গেল। একি সত্য ! সে বহুদিন পূর্বের মত আজ নিজেকে সত্যই রাণী-বৌ বলিয়া অনুভব করিল। সংসারে পাঁচ- নকে লইয়া সে রাণীর মত থাকিবে এই ত তাহর বসল! কোন কথা কহিল না। “অবাক হবারই কথা অরু, ভায়ের কাছে ভাই যাবে, হিন্দুর সংসারে তাইতে অবাক্ হতে হচ্ছে। অরু, আজ কি হয়ে গেছি বল দেখি।” অরুণা অনেকদিনই তাহা দেখিয়াছিল । কেবল সে-ই দেখিতে পায় নাই। তাহারই দেখিবর অবসর হয় নাই। আজ দুঃখের কুঁড়ে ঘরে কেমন করিয়া বেদনার ফাইল নিয়া সুখের দ্যোৎস্না সবার অলক্ষ্যে আঁচল বিছাইয়া দিল। বিধাতার এক অদৃশ্য পরশে কেমন করিয়া এক হিন্দুর পরিবারকে এক খো:ট বাধিয়া দিল। বাঙ্গালীর দীনা বরের লক্ষ্মী আবার কিছুদিন বড় ভাজের স্নেহের রা-বৗ হইয়া ১৪

তিন
“ওহে জিতু আজ ব্যাপারটা কি বল দেখি?”
“কেন, হয়েছে কি ?”
“শরং যে বলে অজি যাবে না রেসে; তা হলে আজ সেখানে
খবর বলবে কে ?”
“তুই আচ্ছা ছেলে ত, তাকে বুঝ আজ আবার জিজ্ঞেস
করতে গেছলি।”
“কেন, কি হয়েছে তা!”
“তার বড়দা মারা গেছে তা বুঝি জানি না-শুনি নি ?”
“সে ত জানি, তাতে রেস যাওয়া বাধবে কেন? বাবা-কাচা
গলায় দিয়ে তার উপর আবার এ্যাণ্ডে ঢোকবার হতে প্যান্টকোট
পর্কে দেখেছি, তা আবার দাদা!”
“সবাই ত আর সমান নয় ?”
“বরাবর ভাইয়ে ভাইয়ে ঠাই ঠাই, আজ মারা যাবার পর আবার
কি ভ্রাতৃপ্রেম উংলে উঠলাে নাকি?”
A

রাণী-বৌ বিধু ওপাশের টেবিলে কাজ করিতে করিতে এসব শুনিতেছিল। সে হাসিয়া বলিল,-“শুধু উৎলােয়নি রে হীরে, শুধু উৎলােয়নি, শুছি—একদম উনুনময় হয়েছে।” হীরালাল এ রহস্য উপলব্ধি করিতে না পারিয়া বলিল,-“তার মানে ?” বিধু হাসিয়া উত্তর করিল-“তার মানে, দাদা মারা যাবার পর শরৎ নিজের স্ত্রীকে অবধি তার বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়েছে। আর সেই থেকে তারা একান্নবর্তি হয়েছে। সে-ই ছােট ভাইয়ের সঙ্গে একসঙ্গে আছে, খায় দায়ও এক সঙ্গে।” “বল কি বিধু, অমন বিষয় ভাগ হয়ে গেল ;-এই সেদিন নিজের মাকে পৰ্য্যন্ত দেশে পাঠিয়ে দিলে-” “শুনেছি ভাগের মা গঙ্গা পায় না—এ ত তবু দেশ পেয়েছে বাবা।” “আর আজ সে-ই এক সঙ্গে খায়? কালে কালে কত দেখবাে ?” বিধু হাসিয়া উত্তর করিল—“বাবা, too much familiasity breeds comtempt—বেশী ঘনিষ্ঠতায় ডিম পাড়ে ; দুদিন সবুর কর -অজ সবাই একসঙ্গে খায় শুনে আশ্চর্য্য হ’চ্ছ ; আবার শরৎ দু’এক বছর রেস খেলুক, তখন শুনবে সবাই একসঙ্গে উপোস করে ! বাবা, রেস ঠাকুর আর যে সে ঠাকুর নয়,-এ ঠাকুর কঁাচাও খায়, পাকাও খায়।-এ শনিবারের দেবতা বাবা, শনি ঠাকুরের চেয়েও রাণী-বৌ যাহারা আজ রেসের মাঠে যাইবে তাহাদের শেষের এ কৎ। কয়টা ভাল লাগিল না। তথাপি তাহারা সকলেই শুক হাসি হাসি । কারণ, রেসে যাইবার পূর্বে ঠাকুর-দেবতার নামে হাসি-ঠাট্টা করিলে তাহারা মনে মনে শঙ্কিত হইয়া পড়ে ; ভয়,বেশী হার হইবে । সেইজন্য রেসের দিন আফিসে আসিবার সময় তারা ঠাকুর-দেবতাকে খুব ভক্তির সহিত প্রণাম করিয়া তবে বাড়ীর বাহির হয়। কেইবা দেবতার নিকট হইতে বর প্রার্থনাও করে। কেহবা কত কি মানতও করিয়া বসে। কেহবা গত-রেসের হারের উল্লেখ করিয়া দেবতাকে দুঃখ জানায়। এমন আর কত কি! এসব দেখিয়া শুনিয়া দেবতা মনে মনে হাসেন এবং তাহাদের অধঃপতনের জন্য কাঁদেনও হয়ত। মানুষ যখন ছােট হয়, নীচ হয়, তখন সে তাহারই উপাস্য দেবতাকে হার আসন হইতে ধীরে ধীরে নিজের অজ্ঞাতে নামাইয়া আনে। তাহা হইলে এমন ত প্রায়ই, সর্বত্রই, দেখা যায় যে, যখন মানুষ ঘােতর পাপ,কাৰ্য্যও করিতে যাইতেছে, তখনও সেই কাৰ্য্যেই সে তাহার দেবতারই সাহায্য চাহিতেছে এবং সেই পাপকাৰ্য্যে সাময়িক সফলতা লাভ করিলে, দেবতার ঘােড়শোপচারে পূজা দিতেছে। আবার তারই ব্যবস্থা দিতেছে তাহাদের কুলপুরােহিত--ব্রাহ্মণ ! কথাটা চাপা দিবার জন্য জিতু তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল— “থাক ওসব কথা, এখন পরের কথায় সময় কাটান আর চলে না। দেখ না হীরে, সাহেব মশায় বেরুলেন কি না। আমি ততক্ষণ २ ১৭ রাণী-বৌ Balance sheetটা ঠিক করে নি,এটার যে আবার তাড়া!-বড়- বাবুর আর কি, তাকে ত আর রেসে যেতে হয় না। তা শনিবারের মর্ম বুঝবেন কি।” বিধু বলিল,-“বুড়াে দ্বিতীয় পক্ষ নিয়েই ব্যস্ত, আবার রেস্!” হীরালাল সাহেবের কাছে গেল না। সে তাহার চাপরাসীর কাছে গেল। জিতেন নিজের ব্যালেন্স, সীটে মন দিল। বিধু শরতের কথা ভাবিতে লাগিল। শরৎ ক্যাস ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। সে তখনও কাজ করিতে ছিল। একজন সহকর্মী তাহার নিকট আসিয়া বলিল,-“কি শরৎ, এখনও আজ কাজ করছে যে বড়? ঘড়ীর কাটা যে তােমার Notmuchএর চেয়েও দৌড়চ্ছে হে ?” শরৎ তাহার মুখের দিকে একবার চাহিল এবং সরলভাবে এক- বার হাসিবার চেষ্টা করিল। কোন উত্তর করিল না। একমনে কাজ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। জিতেন, হীরালাল, বিধু প্রভৃতি কয়েকজন কেরাণী শরতের সীটের একটু দূরে থাকিয়া নিজেরা নিজেদের মুখ চাওয়া-চাহি করিতে লাগিল। ভাবটা এই যে, কে তাহার নিকটে গিয়া আজিকার রেসের টিপের কথা বলিবে! একটা চক্ষুলজ্জা আছে ত! ভ্রাতার মৃত্যুশােককে উপ- লক্ষ্য করিয়া যে ব্যক্তি অত জুয়াড়ী বা রেসাড়ী হইয়াও আজ এমন রেসের দিনে রেসকোর্সে যাইতেছে না; তাহাকে কেমন করিয়া টিপের so রণী-বে। সংবাদ জিজ্ঞাসা করা যায় । কিন্তু রেসের কাছে চক্ষুলজ্জা, সব লজ্জাই হার মানিয়া যায় ! জুয়ার নেশার কাছে সবই টলিয়া যায় তাই দর- জার কাছে যা কিছু গুতােণ্ড তি, যা কিছু ‘তুই যা-না-ভাই’ ‘আমি পারবে না......ইত্যাদি, সবই ভাঙ্গিয়া ধ্বসিয়া গেল। এধারে দেরী হইয়া যাইতেছে-একতরফা, ছোট সাহেব দেরী করিয়া দিয়াছে, আবার একবার এখানে দেরী ! তাহাদের অনেকেরই আর সহ্য হইতে ছিল না। কাজেই, যা কিছু চক্ষুলজ্জা, তা কাটাইয়া হীরালাল একাই সদর্পে শরতের টেবিলের নিকট গিয়া ধীরে ধীরে নম্বরে বলিল,- “আপনি কি আজ যাবেন না সেখানে,-বেড়ার ধারে কি আমরা দাড়িয়ে থাকবাে ?” শরৎ ব্যথিত স্বরে কহিল-“না, আমি আজ যাব না—আপনারা যান।” বলিয়া সে কাজে মন দিল। হীরালাল একটু ইতস্ততঃ করিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল,-“কোন শরং পূর্ববৎ ব্যথিত স্বরে কহিল,-“কেমন করে খবর নেব বলুন ; বাড়ীতে যে বিপদ......” হীরালাল চক্ষুলজ্জ। কাটাইয়া আসিলেও তাহার যে চক্ষুলজ্জা মােটেই ছিল না—এমন বলা খুব সত্য কথা নয়। তাই, সে কথা শেষ করিতে না দিয়াই কথার মাঝে বলিয়া বসিল,—“হাঁ, হাঁ, সে ত ঠিকই সে ত ঠিকই—না এই জিতুই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে আমিও ১৯

রাণী-বৌ
বলছিলুম।—আচ্ছা—”বলিয়া হঠাৎ নমস্কার করিয়া সে চলিয়া গেল।
অথচ, সে শরতকে কোন দিনই নমস্কার করে না।
শরৎ তাহার এই অভূতপূর্ব ব্যবহারে সামান্য অংশ্চৰ্য্য হইল ;
কিন্তু এধারে বেশীক্ষণ সে মন দিতে পারিল না। আজ তাহার মন
অন্যধারের সংবাদের জন্য যেন ঝুকিয়া পড়িতেছে। অথচ, সেই মনকে
সে টানিয়া লইয়া কাজ করিতেছে। আজ যাইবেই না সে রেসে ।
—ইহা ঠিক করিয়া ফেলিয়াছে এবং প্রতিজ্ঞাও করিয়াছে যে, এই
জুয়ার বদ নেশা সে ছাড়িবেই। তথাপি, তাহাকে কে যেন প্রতি-
বাৱেই মনে মনে বলাইতেছে যে,আজ সে বেস যাইবেই না—আজ
সে রেস যাইবেই না।-ওঃ, ভারি রেস!—এই কথাটা-ই দুশ’বার
সে কাজের মধ্যে ভাবিতেছে।
জিতেন, হীরালাল প্রভৃতি এদের সঙ্গে শরতের কেবল এই রেসের
সংবাদ দেনা-পাওনার জন্য যা একটু ঘনিষ্ঠতা রহিয়াছে, তাহা নহে ;
তাই চক্ষুলজ্জাও আছে। কিন্তু যাহারা মাঝে মাঝে কেবল টিপ লা এবং
এমনি মুখের আলাপ, তাহারা ত আর এত লজ্জাও পাইবে না ;
শরতের এই বিপদের কথা এত গ্রাহ্যও করিবে না। এখন
তাহাদের আসিবার সময় হইয়াছে।
হীরালালের দল চলিয়া গেল। আজ তাহাদের রেস্ খেলার
উৎসাহ তেমন জোর রহিল না। কারণ, শরৎ নিজে হমু হারিলেও
সে নাকি টিপ দেয় খুব ভাল ; এ সুখ্যাতি তাহার ছিল। এমন
২০

রাণী-বো
কি—অন্য সাহেবেরাও নাকি তাহার নিকট হইতে টিপ লইতে
আসিত। সে খুৰ খবর রাখে। এমন লােকের নিকট হইতে টিপ
পাইল না। . তাহাদের মন-ত ক্ষুন্ন হইবারই কথা। যদিও তাহারই
টিপে তাহারই মত, তাহাদের মধ্যে অনেকেই সর্বস্বান্ত হইয়াছে এবং
হইতে চলিয়াছে, কিন্তু তাহাতে কি!
যা হােক, এরা ত চলিয়া গেল। এবার ওদের পালা-
তাদের মধ্যে একজন বাবু আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল,-“শরৎ বাবু,
এখনও যাননি,যাক্, আমিত হাঁপাতে হাঁপাতে আচি,কেলোত
বলে ছিল—“তার আর দেখা পেয়েছ,'—আমি বল্লুম, তিনি না থাকলেও
তার Assistantকে কি বলে যাননি—নিশ্চয়ই•••••.”
শরৎ ব্যথিত অথচ বিরক্তির স্বরে কহিল,-“এ সপ্তাহটা আমি
কোন খবর নিতে পারিনি—বাড়ীতে যে বিপদ-আপদ গেল।”
“আরে মশায়—সংসারে অমন বিপদ-আপদ থাকে সকলেরই
বলে কি খবর নিতে দোষ।”
বাবুটি শরতের কথা গ্রাহের মধ্যে না আনিয়া এই কথাগুলি
সে জানিত-শরতের দাদা মারা গেছেন। সে জানিত,
দাদার সঙ্গে তাহার বনি-বনা কোন দিনই ছিল না। তজ্জন্য সে
পৃথক হইয়া বাস করিতেছিল। আর তাহারই দুঃখে দুঃখিত হইয়া
সে শরৎ আজ রেসের সংবাদ রাখিবে না বা রেসে যাইবে না।
এরূপ অসম্ভব চিন্তা করা তাহাদের কুষ্ঠীতে লিখে নাই।
বলিল।
২১

রাণী-বৌ “সত্যি, আমি কোন খবরই রাখিনি,আর আজ আমি যাব ও না।” “তা কি হয় ! আপনি বলুন না—আপনার মুখের কথায়ই যথেষ্ট।” বাবুটি সত্যই শরৎ যে রেসে যাইবে না—এ কথা বিশ্বাস করিতে পারিতে ছিল না। শরৎ দৃঢ় স্বরে ইহাই প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করিল যে, সে আজ বাইবেই না। তথাপি বাবুটি শরৎকে রেহাই দিল না। বলিল,-“কিন্তু Dalkesterএর খবরটা আপনিই বহুদিন আগে বলে এসেছিলেন যে এ রেসে ঠেসে ধরবেনই---তা’তে এমন কি নিজেকেও যদি বাধা দিতে হয় তাও স্বীকার-মনে আছে আপনার?” শরতের মনটা ঘঁাৎ করিয়া উঠিল। মনটা দুলিতে লাগিল। বাবুটি পুনরায় বলিল,-“লিন্টন সাহেব কি বলেছিলেন-Dalgester win-any amcunt-কেমন ? আর আপনিই বলছেন, আজ যাবেন না, আশ্চর্য !—আমি বাড়ী থেকে বেরুবার সময় সিদ্ধেশ্বরী- তলায় জোড়া পাঠা মেনে এলুম-আর আপনিই পথে বসালেন শেষে।” তাই ত? লিটন সাহেব ! শরতের মনের মধ্যে ঝড় তুলিয়া দিল। সে তাড়াতাড়ি বলিল,-“না—নাআমি যাব না, আমায় আর বিরক্ত করবেন না। বড় কাজ আছে ! আমায় মাপ করুন।” ২২ রাণী-বৌ এমন ব্যবহারে সত্যই বাবুটি সুখী হইল না। বাবুটি আরাে কিছু ক্ষণ শৰংকে বিরক্ত করিয়া, নিজেও বিরক্ত হইয়া, ক্ষুন্ন এবং রাগান্বিত হইয়া চলিয়া গেল। এইরূপ পরে আরো দুই চারজন অ-সিয়া তাহাকে বিরক্ত করিয়া চলিয়া গেল। শরৎ কাজে আর মন দিতে পারিল না। যে শনিবারটা আজ সে সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়া থাকিবে বলিয়া কাজে মন দিয়াছিল, সেই বারটাই অজি তাহাকে সকলে মনে করাইয়া দিতে লাগিল। তৎক্ষণাৎ কাজ ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িল। ট্যামে করিয়া বাড়ী ফিরিল । পাচ ছয় বৎসরের মধ্যে এই সর্ব প্রথম রেসের শনিবারে সে তাড়া- তাড়ি বাড়ী ফিরিল। অরুণা আসিয়া তাহাকে মুখ-হাত-পা ধুই বার জল দিল এবং তাহাকে এমন সময় দেখিয়া পরম তৃপ্তিবােধ করিল। স্বামীর মুখের পানে চাহিয়া বলিল,-“আজ আফিসে বড় বুঝি খাটুনি হয়েছে—মুখটা অত শুকনাে-শুকনাে ?” শরৎ জলযোগ করিতে করিতে বলিল,-“ই। নিতু কোথা গেল ?” “সে ঘুমুচ্ছে,—ওগাে তাকে ডাকা পরে হবে, তুমি একটু শােও, একটু জিরােও। আমি ততক্ষণ মাথায় বাতাস করি।”—বলিয়া জোর করিয়া অরুণ শরতকে বিছানায় শয়ন করাইল এবং নিজে মাথার কাছে বসিয়া পাখার বাতাস করিতে লাগিল। শরৎ চোক বুজিয়া পড়িয়া থাকিয়া ঘুরিয়া-ফিরিয়া রেসের কথাই ভাবিতে লাগিল। বাবুটির কথাও তাহার প্রাণে ঘুরিয়া-ফিরিয়া জাল ২৩

রাণী-বৌ
•
বুনিতে লাগিল। আজ বাজিটা ধরিতে পারিলে নিশ্চয়ই কাল কিছু
সে করিতে পারিত। কিন্তু কেমন করিয়া সে যাইত! কেমন করিয়া
সে তাহা হইলে সন্ধ্যার সময় তাহার ছােট ভাইকে, বড় বৌদিদিকে,
নিজের স্ত্রীকে মুখ দেখাইতা-মা সবে দেশ হইতে আসিয়াছেন
তিনিই বা কি মনে করিতেন। -না—সে যায় নাই—ভালই
করিয়াছে।
শরৎ শয্যায় শুইয়া যেমন রেসে না-যাওয়ার দরুণ ভিতরে ভিতরে
অস্থির হইয়া পড়িল, তেমন বাড়ীতে সকলে তাহার এই ব্যবহারে
সুখী হইয়াছে ভাবিয়াও কিছু তৃপ্তি অনুভব করিল। সকলই তাহার
ভাল হইত যদি-না আজ Governor কাপটা থাকিত এবং Dalkester
যদি-না তাহাতে আজ দৌড়াইত। প্রধান এই দুঃখুটি তাহার
প্রাণে আঘাত করিল যে, ঐ সংবাদ সে লিটন সাহেবের নিজের
মুখ হইতে বহুদিন পূর্বে কেন পাইল।
কিছুক্ষণ শরৎ শয়িত থাকিয়া স্ত্রীকে হঠাৎ বলিয়া উঠিল—“তরু,
নিতুকে ডেকে দাও, আর যদি সে ঘুমােয়ত উঠিয়ে দাও।”
অরুণা জিজ্ঞাসা করিল, “কেন?”
“বল তাকে যে, কাকাবাবু আজ বায়স্কোপে যাবে তােমায় নিয়ে
শীগগির করে এস।”
স্ত্রীর মনে এ কথাটা পরম তৃপ্তির পরশ দিল।
বৈকালে কিছু
পূৰ্বেই সে নিতুকে লইয়া বায়স্কোপে বেড়াইতে গেল। এমন সাতে-
২৪

রাণী-বো পাচে সে সে-শনিবারটা কাটাইয়া দিল। রেসের নেশাকে প্রাণপণ চেষ্টায় ঠেলিয়া রাখিল। নিতুকে লইয়া শরৎ যে বেড়াইতে বাহির হইয়াছে ইহা শুনিয়া সকলেই যেমন আশ্চৰ্য্য বোধ করিল, তেমন সুখীও হইল। শনিবার কাটিল । রবিবার আসিল। ভাের হইয়া গিয়াছে। তখনও শরৎ উঠে নাই। আজ আফিসের ভাতের তাগিদ নাই। তাই সে নিশ্চিন্তে ভােরের দিকটায় রেসের স্বপ্ন দেখিতেছে। যেন গভর্ণর কাপটা ডেলকেটার মারিতেছে । সে নিজের সিটে আপনা আপনিই উত্তেজিত হইয়া দাঁড়াইয়া উঠিয়াছে এবং আবেগভরে চীৎ- কার করিয়া উঠিতেছে। সে ঘােড়াটা সত্যই যেন বাজী জিতিল। লিটন্ সাহেব ধমকাইতেছেন—কেন সে উইনে এত কম টাকা ধরিয়াছে। বাস্তবিকই, এত কম ধরার দরুণ তাহার প্রাণে এত বাজী জিতিয়াও কিছু ভাল লাগিতেছে না। এমন সময় নিতু আসিয়া ডাকুিল,—“কাকাবাবু ! কাকাবাবু ! পড়াটা বলে দেবে এস না। অনেকক্ষণ যে সকাল হয়ে গেছে।” কাকাবাবু শয্যায় উঠিয়া বসিল এবং স্বপ্নের কথা ভাবিতে ভাবিতে বলিল—“তুমি যাও নিতু, পড়তে বস, আমি যাচ্ছি।” নিতু বাহিরের ঘরে বসিয়া পড়িতে লাগিল। কাকাবাবু পড়া বলিয়া দিতে লাগিল এবং খবরের কাগজ পড়িতে লাগিল। পড়ার জন্য পড়িতে লাগিল, তাহার পড়ায় যত মন বসিল, যে ২৫ রাণী-বাে রেসের জন্য পড়িতেছিল, তাহার মন সে-পাঠে খুবই বসিয়া গেল । “অই যে সত্যই Dalkester win করেছে।”—সে পড়িতে পড়িতেই আপন মনে এ কথা বলিয়া ফেলিল এবং দুঃখে ক্ষোভে আক্ষেপে তাহার মনটা নিমেষে ভারী হইয়া উঠিল। তাহার মনটা বলিল—কেন সে গেল না।” এই আক্ষেপের বেদনায় বুকের ভিতরটা টান ধরিল। নিতু দুইবার তিনবার জিজ্ঞাসা করিল—“কাকাবাবু-অ-কাকাবাবু Lame মানে কি ? বল না-বল না।” হ: শরৎ বলিয়া উঠিল—-“Lame মানে--Lame মানে- থোড়া।”—বলিয়া আবার সে খবরের কাগজে চোখ রাখিয়া ভাবিতে লাগিল। অজি তাহার কিছু না হয় পাঁচশ টাকা আণিত! তাহার এই টানাটানির দিনে-এ টাকার কথা সত্যই তাহার প্রাণে আঘাত করিল। খাইবার সময় স্ত্রীকে বলিল—“জান অরু, কাল ভারী একটা লােকসান করে ফেলেছি।—অন্তত পাঁচ পাঁচশ টাকা।” অরুণা নিমেষে বুঝিয়া লইল তাহার স্বামীর লােনটার কথা ! মনে মনে সে কষ্ট পাইল । পাঁচশ টাকার জন্য নয় ! কষ্ট এই যে, তাহার স্বামী রেসের কথা ভুলিতে পারেন নাই বলিয়া এবং সেই কথায়-ই কাজে-কর্মে অহর্নিশি ভাবিতেছেন বলিয়া। অরণার কাছে এ সব আক্ষেপের কথা আজ নােতুন নয়। সে বহুবার বহু- দিন এমন শুনিয়াছে, তবুও সহজভাবে আজও জিজ্ঞাসা করিল—“কি করে লােকসান করলে ?” ২৬

রাণী-বো
বরং
“কাল রেসে গেলুম না—আর অমি বরাৎ গেল !-অরু,
যখন মন্দ হয় তখন এমন করেই যায়।”
স্ত্রী কোন কথা কহিল না। চুপ করিয়া পাতে বাতাস কবিত
লাগিল। শরৎ বলিয়া যাইতে লাগিল—“জান অরু, আমার যেন সে
রকম হয়েছে। একজন সমস্ত দিন ভিক্ষার জন্যে ঘুরে ঘুরে হয়রাণ
হ’ল, কিছু পেলে না। তাই দেখে, স্বর্গ থেকে মা দুর্গা বিকে
বলেন কিছু তাকে দিতে। শিব বললেন--ওর বরাতে নেই,
পাবে কোত্থেকে ? বলে তিনি তাদের চলা-পথের ধারে একটা গুলি-
ভরা টাকা রেখে দিলেন। কিন্তু, এদিকে ভিখারীর ইচ্ছা হ'ল কাণ।
সাতে—এতক্ষণ ভিক্ষা পেলে না বলে। তাই সে করলে। চোখ বুজে
‘একটা পয়সা দাও—একটা পয়সা দাও' বলতে বলতে সে-পথ সে পার
হয়ে গেল। পায়ের তলায় তার টাকার থলি পড়ে রইল ।
আমার তাই হলো। বরাৎ-বরাৎসব!”
স্ত্রী কোন কথা বলিল না। কেবল ভাবিতে লাগিল যে তাহার
স্বামী আবার রেসে যাইবেই। কিন্তু তাহার বলিবারই বা কি
আছে ? সে বাঙ্গালীর ঘরে কাঙ্গালী বধূ! স্বামীর ভালবাসা ভিক্ষ।
করিতেই সে আজীবন শিখিয়াছে ! স্বামীর কাজে ভাল-মন্দ বিচার
করিতে সে শিখে নাই। স্বামীর জন্য সে সব করিতে পারে। ইহার
জন্য সে দুঃখ পাইলেও, দুঃখ সহ্য করতে শিখিয়াছে।
२१

চার সোমবার দিন শরং আফিস গেল। প্রত্যেক সপ্তাহের রেসের সংবাদ নিয়ে আফিসে যেমন নরক শুঙ্গার হয়,-আজও তেমন গত শনিবারের বেসের ব্যাপার লইয়া ঘোট চলিল। কে কোন ঘােড়াটা ধরিবার ঠিক করিয়াছিল, কে কোন ঘােড়টা ধরিয়া বাজী জিতিয়াছে, কেবা হারিয়াছে, কেহ বলিল, ভাগের লােক পায় না ? বলিয়া ধরিতে পারে নাই। কেহ বলিল যে, সে ঠিক ধরিত; কিন্তু, টিকিট কিনিবার সময় তাহারই পশ্চাতের এক ব্যক্তি সেই সময় হাঁচিয়া মরিল ! তাহা না হইলে সেদিনও সে কিছু দাও পিটিত ওসপ্তাহের হারটা ‘মে অপ’ করিত। কেহ জানাইল, সে অমুককে কিনিতে দিয়াছিল, সে নাকি চার নম্বরের বদলে পাঁচ নম্বরের টিকিট ভুল করিয়া কিনিয়াছিল। কেহ কহিল, সে পাইয়াছে বটে, কিন্তু টিকিটটা পাঁচজনে কেন, এই যা তার আক্ষেপ। যে খুব সৌভাগ্য- বান, সে বলিল যে, আগের রেসের |ayment নিতেই তা’র দেরী হ’ল ত সে করিবে কি ?...ইত্যাদি ইত্যাদি তাহাদের আক্ষেপের, ২৮

রাণী-বো
ও অনুতাপের অনুযোগের কত ছবি তাহারা তাহাদের কথায় কথায়
আঁকিবা তুলিল তাহার ঠিক ঠিকানা রহিল না।
এই প্রকারের নানান কথা আফিসের সকল ডিপার্টমেন্টে চলিতে
লাগিল।
শরতের বিভাগেও হইতেছিল।
সকল কথার
কিছু কিছু তাহারও যে কাণে যাইতেছেল না—তাহা নহে।
শুনিয়াও শুনিতেছে না; আপন মনে কাজ করিয়া যাইতেছে।
অন্যদিন হইলে সে নিজেই তাহাদের সঙ্গে কথা
আরাে মাতাইয়া তুলিত। তাহার বিভাগের লোকরাও তাহাকে গত
পরশু শনিবারের রেসের কথা জিজ্ঞাসা করিয়া তৃপ্তি লাভ করিতে
পারিতেছে না। কারণ, একদিনের ব্যবহারে তাহাদের সত্যই মনে
ধারণা জন্মিয়াছে যে শরৎবাবুকে এ সকল রেসের ব্যাপার জিজ্ঞাসা
করা ঠিক নয়। তাই নিজেরা কথা কহিতেছে, তাহাকে ডাকে নাই,
কোন কিছু জিজ্ঞাসাও করে নাই।
আফিসের কাজকৰ্ম্ম গল্প-গুজাব সমান ভাবেই চলিতেছে, এমন
সময় কোথা হইতে নিশীথ আসিয়া শরতের টেবিলের সামনে বলিল,
-“কি শরৎ কখন খাওয়াচ্ছ হে ?”
শরৎ আশ্চর্য হইয়া তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল।
নিশীথ পুনরায় বলিল,-“ভয় নেই, তােমার অশৌচ জানি,
কেবল খাবার খাব, মিষ্টি খাব, হােটেলের মাছমাংস একদম
খাব না।”
২৯

রাণী-বো “শরৎ তথাপি বুঝিতে পারিল না। কেবল সে আশ্চর্য হইয়া বলিল,-“কিসের খাওয়া ? আমি ......” নিশীথ একগাল হাসিয়া কহিল,-“অম্নি ভুলে যাওয়া হচ্ছে ? বাবা, বলা হয়েছিল Dalkester win করলে খাওয়াব ! এইত পরশু Governor cup win করুলে,আর ভুলে গেলে চলবে কেন বল ? তারপর কতটাকা হ’ল তােমার—শ’ছয়েক হবে?” শরৎ ম্লানমুখে কহিল,-“না নিশীথ, আমি যায়নি সেদিন।” সে বিশ্বাসই করিল না। বরঞ্চ, জোর করিয়া কহিল,-“ওসব বাজে কথা শুনছি না,-একজনকে খাওয়াবার ভয়ে এত বড় মিথ্যা কথা !” শরং পূর্বের মতই বলিল,-“মিথ্যা নয় নিশীথ, সব সত্যি, আমি সত্যিই সেদিন যাইনি, আর বােধ হয় যাবওনা কোন দিন।” নিশীথ এ বৈরাগ্যের কারণ ঠিক বুঝিতে পারিল না। কারণ ভায়ের মৃত্যুতে যে সে এমন জুয়ার নেশা ত্যাগ করিতে পারে ই তাহার কাছে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। এরূপ অবিশ্বাস করিতে সে -ই আফিসেই বসিয়া শিখিয়াছে। ভাই-বােন-জ্যেঠা-খুড়াে-বাপ-মা- স্ত্রী মারা গিয়াছে বা মরিতে বসিয়াছে, তথাপি জুয়ার নেশায় দয়া- মায়া-মেহ-ভালবাসা কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে, তাহাদেরই মাঠে দৌড় করাইয়াছে। তাই সে বৈরাগ্যের কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া মনে মনে হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল। তারপর জিতু বিধুকে কহিল,-“শুনছ হে, আমাদের শরৎ রেস রাণী-বৌ ছেড়ে দিলে। আর আমরাই শালা পচে মরবােলােকে জুয়াড়ী বলবে।” বিধু সিগারেট ধরাইয়া বলিল,-“আক্ষেপ কেন ? ও যে যাই বলুক, আর যাই বৈরাগ্যই দেখাক ও বাবা মদ-মেয়েমানুষ- জুয়া এ তিন নেশায়ই সমান, এ ছাড়া দায় হয়ে উঠে-একবার পেয়ে বসলে পান্নালাল গম্ভীর ভাবে বলিল-“তার উপুর এ হচ্ছে ঘােড়া রােগ।” বিধু কথাটা কাড়িয়া লইয়া বলিল,-“ঘােড়ার রােগ হ'লে,- ভেটেন্যারী সারজ দেখালে সারতেও পারে। কিন্তু এঘােড়ারােগ রোজায়-ডাক্তারে-হাকিমে-বদ্দিতে কিছুতেই সারাতে পারবে না,-এক নিঃসম্বল হওয়া ছাড়া।” পান্নালাল কহিল--“ঘোড়ার খুর নাকি ইংরাজদের ভারি পায়া ; তারা ঘােড়ার খুর নিয়ে ঘরে সাজিয়ে রাখে। তারা রাজার জাত তাদের সবই সাজে। ও ঘোড়ার খুর বাবা বাঙ্গালীর ধাতে সওয়া, দায়! ও বাবা ঘোড়া ঠাকুরের পায়ের খুরের তলায় আমাদের কত মা লক্ষ্মীর বরাৎ গহনা,-টাকা-কড়ি, মান-ইজ্জৎ যে গুড়িয়ে গেছে তার ঠিক নেই। তাই জন্যেই বােধ হয় লােকে বলে তােমার খুরে খুরে প্রণাম।” বিধু নিজের বাহাদুরী বাচাইবার জন্য বলিল—“ও আর এমন নূতন কি বলা হ’লও কথা ত সকলেই জানে।”

রাণী-বৌ
পান্নালাল একটু ঠেস্ দিয়া বলিল, “নতুন আর কে ক’টা বলে,
আর কে কটা বলতে পারে। সবই ত পুরাতন,কেবল নতুন
করে বলতে পারলেই নতুন হলাে।”
“এখন ওসব কথা কাটাকাটি রেখে দাও, এখন শরৎ যদি সত্যি
আর না যায় বেসে, তখন টিপের কি করছে বল ?”
“ও বাবা, ঘােড়া হলে চাবুকে আসে যায় না ; অাগে টাকার
জোগাড় কর তারপর সব হবে। সামনে মাস কাবার মনে আছে
যাদু?”
“ওষে শনিবার Dalkesterটা মেরেছে কি না--তাই গােটা
চাল্লিশেক টাকা হাতে মজুত আছে—তাই ধরাকে মধুপর্কের বাটি
দেখচে আর কি ?”
“ভয় নেই, শরতের বৈরাগ্য বেশীদিন থাকবে না তা বলে
দিলুম।-হদ্দ, এই অশৌচটা পর্যন্ত।-তাও টাকে কি না সন্দেহ।”
বিধু বলিল,-“দেখ চক্ষুলজ্জা ত একটা আছে !
তাই দুদিন
অমন মায়া কান্না কঁাছেন; তারপর আবার যেমন, তেমন হবে।
ভেতরে ভেতরে প্রাণটা ঘোড়ার মতই দৌড়াদৌড়ি করছে, বুঝলি ?
ও আমার ঢের জানা আছে।”
কথায় কথায় তাহাদের বাজী রাখারাগি পৰ্য্যন্ত হইল। একজন
বলিল—শর ১০ তারিখের মধ্যে রেসে যাইবে। অপরজন বলিল,
-না, ও আর যাইবে না।

রাণী-বো অতএব সকলেই কিন্তু বলিল, শরং বেসে যাইবে। তাহার এই বৈরাগ্য ধোপে টিকিবে না। শরং নিজের কাজ করিতে করিতে এইসকল আলােচনার মােট- মুটি কথাগুলি শুনিতে পাইল। কিন্তু কাহাকে কিছু বলিল আর বলিবারই বা কি ছিল ! কারণ, সে নিজে রেসে যাওয়াব বিপক্ষে যতই প্রতিজ্ঞা করাইয়া মনকে বসে আনিতে চেষ্টা করুক, কেন; তবুও তাহার মন যে দুৰ্ব্বল, সে-বিষয় সে খুব রকমেই জানিত। মন যতই দুর্বল হাে’ক, তথাপি শরৎ তা না-না-না করিয়া হপা চারেক কাটাইয়া দিল, রেসে গেল না! এজন্য অনেকে বাজি হারিল । অনেকে আশ্চর্য্য হইয়া গেল। অনেকে বিশ্বাস করিল । কেহ বলিতে লাগিল—সে নিশ্চয়ই কারুর-না-কারুর হাত দিয়ে টাকা পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু কেহই জানাইল না যে, কাহার হাত দিয়া পাঠাইয়া দেয়। ছােট ভাই সনং দাদার এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে যেমন আশ্চর্য হইল, তেমন সুখীও হইল। সকলের চাহিতে বেশী সুখী হইল—অরুণা। সে লুকাইয়া লুকাইয়া সিদ্ধেশ্বরীর তলায় পূজা পাঠাইতে লাগিল এবং কত-কি মানৎ করিয়াও বসিল। এরূপে শরতের আরো কিছু দিন কাটিল ।

পাঁচ শ্রাদ্ধ-শান্তি শেষ হইয়া গেল। মা স্বামীর ভিটা ছাড়িয়া আর থাকিতে পারিলেন না—দেশে চলিয়া গেলেন। সনৎ কলেজ ছাড়িয়া দিয়া একটা সামান্য-কাজের চাকুরীতে ঢুকিয়া পড়িল। বড়বৌ ছােট- ঠাকুরপােটিকে এমন কাজ করিতে মানা করিল। কারণ, বড় ভায়ের লাইফ ইন্‌সিওরের এবং অফিসের প্রভিডেও-ফাণ্ডের টাকা যা কিছু পাওয়া যাইবে তাহাতে তাহাদের কিছু দিন বেশ চলিয়া যাইবে, বড়বৌ সনৎকে সে-আশা দিল। কিন্তু সনৎ স্পষ্ট বলিয়া বসিল, “দেখ বৌদি’, পড়ে তেমন কি হাতী-ঘোড়া হ’ব। তােমার ছােট-ঠাকুরপাে কোনদিন জজও হবে না,-ব্যাবেষ্টারও হবে না; যা কেরাণী তাই তবু, এই বেলা দাদার সাহেবকে ধরে চাক্রী হয়ে গেল সেই ভাল না ?—না হলে বাঙ্গালীর ভাগ্যে চাী জোটা ত আর কম সাধনার কথা নয় ?” এ কথার সত্যতা বাঙ্গালীর ছেলে-মেয়েকে বুঝাইতে হয় না। তাহা না হইলে, বাঙ্গালীর ছেলে একটা চাকরী পাইলে ঘরে-বাহিরে ; হবে। ৩৪

রাণী-বৌ
যেন আনন্দের সীমা থাকে না। ঠাকুরকে পূজা দেওয়া হয় ; বন্ধুদের
খাওয়ান হয়।, সাহেবদের ভেট পাঠান হয়। পরাধীন বাঙ্গালীর
পরাধীনতায় এত আনন্দ হইবে না ত হইবে কিসে?
তাই, বড়বৌ মানা করিলেও মনে মনে খুব বেশী দুঃখিত হইল
। তবুও বলিল, “টাকা ত ক মাস বাদে পাওয়া যাবে তবে
এই পাশটা দিয়ে নাও না ঠাকুরপাে ।”
অকণাও একথার সমর্থন করিল। কিন্তু সনং গভীর দুঃখে
বলিল, “দাদা নিজের জীবন পাত করে যে টাকা জমিয়ে দিয়ে
গেলেন, সে টাকা আমি পড়াতে খরচ করবাে ?—আর নিতু কি
করবে বড় হ'লে ।না বৌদি, আমি মরে গেলেও ওটাকার এক
পয়সাও আমার জন্যে খরচ করবাে না।”
বড়-বৌ অঞ্চল দিয়া নিজের নয়ন মুছিল । অরুণা মলিন মুখে
বসিয়া রহিল। কারণ তাহাদের দু'জনারই ইহার উত্তরে কিছুই তেমন
বলিবার ছিল না। সনং পুনরায় বলিতে লাগিল-“জান বৌদি’, একটা
ছেলেকে মানুষ করতে তােমার ঐ অত ক’টা টীকা দুদিনে জল
হয়ে যাবে ?”
বড়বৌ হাসিয়া বলিল, “কেন ঠাকুরপাে, তােমরা দু’ভায়েতে
মানুষ হলে, তাতেই বা এমন কি টাকা লেগেছিল—বল ত ?—তার
একার চাকুরীতেই ত তখন সংসার চলে যেত?”
সনৎ হাসিয়া বলিল, “দুএকটা পাশ করলেই লােকে বাঙ্গালীর

রাণী-বো ছেলেকে বলে মানুষ হয়েছে। কিন্তু বৌদি, তাকে শেষে সেই পরের দস্তিত্ব বৃত্তি করতে হয়, গাধার খাটুনিই খাটতে হয়।—বাঙ্গালীর মানুষ হওয়া ত এমনই মানুষ হওয়া !” এ সব কথা যখন হইতেছিল, এমন সময় শরং তয় আসিয়া উপ- স্থিত হইল। বলিল-“হারে সনৎ, তুই নাকি ঢী ঝুটিয়েছি। পড়াটা অমনি টপ করে ছেড়ে দিলি,--আমাকেও একবার জানান ।—সকলেই বলচে পড়াটা ছাড়া তার উচিত হয় নি।” “দাদা ওকথা সকলে তােমায় ও বলচে, আমারও বলচে ; কিন্তু অসময়ে তাঁরা কি কেউ উচিত দেখবে? কার কখন কি হয় কে জানে? বলবার সময় ঢের লোক টের কথা বলবে, কিন্তু কাজের সময় কাউকে পাওয়া যাবে না।অামাদের সংসার ত আর স্বচ্ছল নয় তেমন।” একথার তেমন উত্তর নাই। তথাপি শরং বলিল,-“তবুও এ একটা বছর ত যেমন-তেমন করে চলে যেত।” অরুণা স্বামীর এসব কথাতে বেশ প্রীতি অনুভব করিতেছিল। দু’ভায়ে বরাবরই খুব বেশী সংভাব ছিল না। কারণ, এই রেস খেলা নিয়ে সব সময়ই তাহাদের খিটিমিটি চলিত। এমন কি, শরৎ সনৎ দুই সহােদর হইলেও সনং শরতের জুয়া খেলার আলায় অস্থির হইয়া তাহার দেবতুল্য সতত বড়ভায়ের সঙ্গেই থাকিত। নিজের ভায়ের সঙ্গ সে ত্যাগ করিয়াছিল । কিন্তু আজ ভায়ের

রাণী-বো
মৃত্যুর সূত্র ধরিয়া তাহারা এক হইয়াছে বটে, কিন্তু তাহারা ত মনে
প্রাণে তাজও এক হইয়া যাইতে পারে নাই।
অতএব সনং সিদ্ধেশ্বরীর পূজা দিয়া, কালীতলার সিন্দুরের ফোট
কাটিয়া, বিল্বপত্র লইয়া কৰ্ম্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিল। এই কৰ্ম্ম পাওয়ার
জন্য বিধাতা হাসিলেন, কি কাদিলেন তাহা তিনিই জানে।
সে দিন রাত্রে অরুণা রাণী সাজিয়া চিত্ৰাপিতের মত দাড়াই।
শবং বলিল—“এসব কি করেছ বল দেখি ! এতদিন পরে তুরি
আবার নতুন বৌ হ'লে দেখচি।-তোড়াটা পরতে আর বাকি রাখতে
অরুণা ম্লান-হাসি হাসিয়া উত্তর দিল-বৌরেরা কি আবার স্বামীর
কাছে পুরোতন হয় নাকি! কৈ তুমি ত আমার কাছে আজও
পুরোতন হওনি?
শরৎ বলিল—“সে কথা থাক, এমন বেশে হঠাং সাজা হ’
কেন বলত আমায় ?” এই বলিয়া শরৎ আবেগভরে স্ত্রীকে চুম্বন
করিল। অরুণা স্বামীর এমন সোহাগ বহুদিন পায় নাই ; তাই
গলিয়া গেল, সহজে কোন উত্তর দিতে পারিল না।
শরং পুনরায় সে কথা জিজ্ঞাসা করিল। অরুণা আস্তে আসে
উত্তর দিল,-“বড়দি’ সাজিয়ে দিলে।”
কিন্তু স্বামীর এ কথার উত্তর দিতে অরুণা ইতস্ততঃ করিতে

রাণী-বো
}
লাগিল। কারণ, কি সে বলিবে । এ বলার ভিতর স্বামীর আজ
আনন্দ হইবে কি না, তা সে বুঝে না; কিন্তু ইহার ভিতর যে
স্বামীর একটা প্রচ্ছন্ন ব্যথা লুকান আছে, তা সে বুঝিত।
শরৎ তাহাকে আরাে কাছে টানিয়া আনিয়া বলিল— “কি, লজ্জা
হচ্ছে বলতে?—সত্যিই আজ তােমাকে ভারী অন্য রকম দেখাচ্ছে।
বড়দা যে তােমাকে রাণী-বৌ কেন বলতেন, তা অজ বুঝতে পারছি।
সেই প্রথম যখন তুমি রাতিরে এমনি গহনা পরে লজ্জায় আস্তে আস্তে
ঘরে ঢুকতে--আর আমি.........”
অরুণা হাসিয়া ফেলিল। বলিল, “থাম, তুমি থাম।
আদর হচ্ছে, আবার যখন রেসে হেরে আসবে তখন এই আমিই
তােমার চোখে বিষ হয়ে উঠবে, কেমন ? তখন লাথি-ঝাটা আর
গাল—এইত !”
শরৎ ভিতরে ভিতরে চমকিয়া উঠিল। এ কথাটা তার ত মনে
ছিল না। স্ত্রীকে নববধূর সাজে দেখিয়া সত্যই সে জুয়ার • কথা
ভুলিয়া গিয়াছিল। শরৎ ম্লান হইয়া গিয়া বলিল, “তা বটে, তা
বটে, তখন যেন আমি অন্য মানুষ হয়ে যাই, না? সত্যিই তােমাকে
বড় কষ্ট দি।
স্বামীর প্রফুল্ল মুখশশী সহসা মেঘে ডাকা পড়িয়া যাইতে দেখিয়া
অরুণা বলিল,-“না-না, আমি এমি ঠাট্টা করছিলাম। দিদি বলে,
‘আমার ত আর গহনাগুলাে পরা হবে না, তা তুই পর। আমি

রাণী-বৌ কিছুতেই পরবাে না। দিদি কঁদিতে লাগল। কিছুতেই না পরিয়ে ছাড়লে না। আমার হাত ধরে দিব্বি দিয়ে পরিয়ে দিলে।আমি কি করঝে বল।” বলিয়া অপরাধীর মত চুপ করিয়া খাটের ধারে সে দাড়াইয়া রহিল। শরৎ একটু রাগিয়া শ্লেষের স্বরে বলিল—“না—না, আদং কত হচ্ছে মেয়েদের গহনা পরবার সখ ?” অরুণা কঁদিয়া ফেলিল। কারণ, তাহার পিতা বড় লােক- বিবাহের সময় তাহাকে তাঁহারা গহনায় মুড়িয়া দিয়াছিলেন। তাহার স্বামী, আজ পর্যন্ত তাহাকে গহনা দেওয়া দূরে থাক, সেই গহনাই একটি একটি করিয়া ঘােড়ার খুরের ঘােড়ার খুরের তলায় গুড়া হইতে দিয়াছে। তাহাতে সে কিছুই প্রতিবাদ করে নাই ; যেদিন শরৎ চাহিয়াছে সেদিনই সে অঙ্গ হইতে খুলিয়া দিয়াছে ! তাহার জীবনের যত কিছু সখ, সে সেই সুখের তলায় নির্বিবাদে বিসর্জন দিয়াছে। আর আজ কিনা তাহাকেই তাহার স্বামী এতবড় দোষী সাব্যস্ত করিল। ইহাতে তাহার দুঃখ আসে না কি ? ইহাতে কি তাহার প্রাশ ফাটিয়া যায় ! ইহাতে কি গহনার উপর তাহার ধিক্কার আসে না! সে দ্বিতীয় কথা না বলিয়া ঘরের বাহির হইয়া গেল। সম্মুখের বারাণ্ডায় দাড়াইয়া নীরবে অনেকক্ষণ কাদিল। অতীত বর্তমানের অনেক সুখ-দুঃখের সুখ-দুঃখের কথা মনে পড়িল। পড়িল। তারপর বড়দিদি ঘরের দরজায় গিয়া আঘাত করিল। বড়বৌ ঘুমায় নাই, রামায়ণ পড়িতেছিল, ৩৯

রাণী-বৌ
বাহিরে আসিয়া দেখিল—অরুণা। অরুণাকে তাহার বানী যখন ঘরে
আনিয়াছিলেন তখন সে ছোট। তাই বড়বো তাকে নিজের ছােট
বোনের মতই তাহাকে ভালবাসিত এবং নাম ধরিয়া ডাকিত।
বড়বৌ বলিল—“কঁদছিস্ কেন! আবার কি হল ?”
অরুণা কোন কথার জবাব না দিয়া গহনা খুলিতে লাগিল। তাহার
নয়ন দিয়া অবিরল ধারায় অশ্রু পড়িতে লাগিল। বড়বো ব্যস্ত হইয়া
বলিল,-“কি হয়েছে বল্ না আমায়, ঠাকুরপাে বুঝি ৭িছু বলেছে!”
অরুণ। ঘাড় নাড়িয়া বলিল,—“না।”
বড়বৌ শরতের কাছে যাইতে উদ্যত হইলে অরু। পথ রোধ
করিয়া দাঁড়াইয়া গহনা খুলিতে লাগিল। বড়বৌ বলিল,-“গহনা
খুলছিস কেন বল না ; কোন কথা কস্ না কেন?”
বড়বৌ জোর করিয়া শরতের কক্ষে গেল। শরতের কক্ষে
তখনও আলাে জ্বলিতেছিল। সেও জাগিয়া কত কি ভাবিতেছিল।
বড়বৌ কক্ষে প্রবেশ করিয়াই বলিল,-“ঠাকুরপাে, বো’কে কি বলেছ
গহনার জন্যে! সে ছেলেমানুষ তার কি দোষ।
আমি তাকে
দিয়েছি, তাই সে পরেছে। সে ত চেয়ে পরেনি, সে-ত কিছু
তেই পারবে না—আমিই জোর করে পরিয়ে দিয়েছি।”
এই সামান্য কথায়
এতটা
অৰুণার লাগিবে তাহা সে ধারণা
করিতে পারে নাই; তাই শরৎ অপ্রস্তুত হইয়া বলিল,-“কই বৌদি
আমি ত তেমন
কিছুই বলিনি?”
৪০

রণী-বৌ
বড়বৌ ' এ কথায় কাণ দিল না—বলিয়া যাইতে লাগিল,-
তিনি যাবার আগে অরুকে দেখে বড় দুঃখু করেছিলেন । আমায়
বলেছিলেন, “আমার মরণের পর তোমার ত আর গহনার দরকার
হবে না; তা তােমার গহনাগুলাে সব মেজবৌমাকে পরিয়ে আবার
তাকে আমার সাধের রাণী-বৌ সাজিও। তুমি নিজে মেয়েমানুষ
তুমিই রাণী-বৌয়ের কষ্ট ভাল করে বুঝবে, ও বুঝতে পারবে না কোন
দিন। তাই আমি ওসব পরিয়ে দিয়েছি। আমার এখন আর গহনায়
কি হবে ঠাকুরপো ?”
শরৎ দুঃখের সহিত কহিল,—“কি হবে বৌদি! তােমার নিতুর
বৌ হবে, সনতের বে আছে।”
“দেখ ঠাকুরপো, তুমি যেমন আমাদের পর ভাব আমি তেমন
ভাবি না, নিতু সনৎ তুমি অরু কেউ-ই আমার পর নও।
একটা বৌ, লক্ষ্মী-বৌ, এয়ােস্ত্রী, সে অমন বেশে থাকবে। তাহলে
বাড়ীর, কি লক্ষ্মী-শ্রী ফেরে? তুমি কি যে বল ! অরু আমার জন্মজন্ম
এয়োস্ত্রী হয়ে থাক।
জন্মজন্ম সোনাদানা পরুক ? ও আমার রাণী-বো
হয়ে রাজরাণীর মত সংসারে থাকে ! ঠাকুরপাে, তােমরা ব্যাটাছেলে
তােমরা জুয়াখেলে, রেস খেলে উড়িয়ে পুড়িয়ে দিতে পার—তােমাদের
বুকে বাজে না—ঘরের লক্ষ্মীদের এ বেশ দেখে।”
শরৎ কোন কথাই বলিল না। আর বলিবারই বা তার কি
ছিল। বড়বৌ যাবার সময় বলিল,---“আমার সকল গহনা আজ
ঘরের
৪১

রাণী-বো থেকে অরুকে দিলুম, দেখি ও কেমন খুলে রাখে—আমার কথা ঠেলে ! সনৎ নিতুর ভাবনা পরে ভাববাে।” বলিতে বলিতে তাহার চোখ ছল ছল করিয়া আসিল। বড়বো তথাপি বলিতে লাগিল- “তােমার দাদা, তােমার নাম করে বলেছিল-আমার লক্ষ্মী বৌমাকে আমার রাণী-বৌমাকে ও কি করেছে দেখ বড়। আমার সময় নেই, না হ'লে তাকে আমার সব খুইয়ে লক্ষ্মী সাজাতাম, রাণী সাজাতাম। তাঁর কথা রাখবার জন্যই আমি দিয়েছি, আমার যতটুকু ক্ষমতা ছিল আমি করেছি—তাতে তুমি যদি বাদ সাদ তাহলে আমার মরবার ও স্থান থাকবে না—আমি মাথা খুড়ে মরবাে বলছি।” শরৎ কোন কথায়ই বলিল না কেবল নীরবে মৃত জ্যেষ্ঠভ্রাতার কথাই ভাবিতে লাগিল। অরুণা এতক্ষণ তাহার কক্ষের দ্বারের পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। ঢুকিতে সাহস করে নাই। বাহিরে দাড়াইয়া ভাসুরের কথা শুনিয়া কঁাদিতে ছিল। এমনই ছিল শরতের বড় ভাই! এমনই ভালবাসিত সে! এমন ভায়ের সঙ্গেই সে পৃথক হইয়াছিল । কেমন করিয়া কোন গ্রহের ফেরে! সে কঁাদিল না । এক ফোটা অশ্রু তাহার নয়ন হইতে পড়িল না। এ স্বপ্নরাজ্যে সে অনেকদিন বাস করিতে পায় নাই। তাই বসিয়া বসিয়া সেই ভ্রাতৃপ্রেমের অদৃশ্য করস্পর্শে সে যেন তন্মর হইয়া রহিল। জুয়ার নেশা এ রাজ্য হইতে তাহাকে কোথায় কোন রাজ্যে লইয়া গিয়াছিল এতদিন—তাই সে ভবিল । ৪২ অখিলবাবুদের বাড়ীতে একরকম রােজই তাসের অডিডা বনে। তাহারা ধনী লােক। তাই, এখানে পাঁচরকম লােকের যাতায়াতও আছে। অখিলবাবু সৰ্ব্ব বিষয়ে পারদর্শী। তাহার মদের নেশা করবার অভ্যাস আছে। মেয়েমানুষও আছে। রেস খেলার ঝােক ও তাহার কম নহে। এদিকে তিনি বড় এটণীও বটে। অতএব, নেশা জুয়া প্রভৃতি লইয়া কেহ যদি তাহাকে বলে যে, তিনি সৰ্ব্বগুণকর,তাহা হইলে তাহাকে কেহ বােধ হয়, দোষ দিতে পারে না। কি একটা উপলক্ষে অখিলবাবুর বাড়ীতে আজ শরতের নিমন্ত্রণ। শরং সন্ধ্যার পরে তাহার বাড়ীতে গেল। উপস্থিত সকলেই সমাদর করিয়া তাহাকে বসাইল। তারপর তাহার সহিত সংসারের পাঁচ রকমের কথা হইতে লাগিল। এমন সময় কান্ত আসিয়াই বলিয়া উঠিল—“আরে প্রাইমিনিষ্টার যে ! হালাে, কেমন আছ ? আরে তােমার জন্যে আমাদের পারলামেন্টের সভা তেমন জোর জমায়েত আর হয় না। এবার দেখছি অন্যজনকে তােমার পােষ্টে ভর্তি করতে হবে।” ৪৩

রাণী-বৌ
কিনা ?
শরৎ ম্লান হাসি হাসিয়া কহিল,-“তাই কর কান্ত।" ।
অখিলবাবুর বৈঠকখানায় পাঁচ সাতজন মিলিয়া রােজই প্লেসের সময়
টিপের পরামর্শের যেন একটা সভা বসে। কান্ত, তাইজন্য তাহার নাম
করণ করিয়াছিল পারলিয়ামেন্টের সভ এবং অখিলবাবুকে সে ডাকিত
রাজা, আর শরতকে প্রাইমিনিষ্টার।
কান্ত কিন্তু, একথাতে তেমন আমোদ পাইল না। তাই একটু
বিরক্ত হইয়া বলিল,-“ওসব বাজে খবর ছেড়ে দাও। এখন আসল
খবর বল দেখি-এই আসছে রেসে কোন Stableএর খবর অাছে
হ্যারি ত বলছিল...” বলিয়া তাহার কাণে কাণে সে একটি
ঘোড়ার নাম করিল। ভয়, যেন পাছে অন্য কেহ শুনিয়া তাহার বরাৎ
কাড়িয়া লয়।
এ সংবাদে শরৎ তেমন কোন আগ্রহ প্রকাশ করিল
না। অপর সকলে রান্ এও ফাস থেলিতেছিল, এদিকে তাহাদের
তেমন মন দিবার অবকাশ ছিল না। একটা দান শেষ হইলে রাজা
বলিলেন,—“কিহে শরং খেলবে নাকি, এস না।”
শরৎ এতক্ষণ খেলা দেখিতেছিল। মনটা খেলার জন্যেও বিশেষ
নারাজ ছিল না। তবে কেমন একটা লজ্জা আসিতেছিল।
হয়, অনেক দিন না খেলারই দরুণ হইবে। অপর একজনও
খেলিবার জন্য অনুরোধ করিল। বলিল—“কিরে তুই যে একে-
বারে সতী হ'লি দেখ চি ! আর কখন বেবি না নাকি,দেখবাে
দেখবাে।”
৪ ৪

রাণী-বো শরং জ্জিায় কুণ্ঠিত হইয়া পড়িল। তেমন কিছু বলল ন'। কেবল বলি,-না-না-কিছু ত সঙ্গে নিয়ে আসিনি তাই ?” রাজা বলিলেন,-আরে ওর জন্যে ভাবনা কেন?” কাজেই শরৎকে খেলিতে বসিতে হইল। বহুদিন পরে গেল- তেছে, সুতরাং সে সাধারণতঃই একটু সতর্ক হইয়াই খেলতে লাগিল। যাহারা তাহাকে পূর্বের মত খেলিতেছে ভাবিল, তাহারাই হারিল। খেলিতে খেলিতে খেলা জমিয়া উঠিল। রাতও বাড়িয়া চলিল। শরতের জিতও বাড়িয়া চলিল। কাজেই, ইচ্ছা থাকিলেও সে তাড়াতাড়ি উঠিতে পারিল না। অনেক রাত হইলে অনেক কষ্টে সে উঠিয়া, আহারাদি সারিয়া অনেক টাকা জিত লইয়া বাড়ী ফিরিল। ফিবি- বার সময় সকলের নিকট হইতেই আবার কাল আসিবার খুব অনু- রোধ আসিল। জতিয়াছে, সুতরাং সে অনুরোধ এড়াইতে পারিল না ; অতএব কাল আসিবার প্রতিশ্রুতি তাহাকে দিয়া যাইতে হইল। আজ জিতিয়াও তাহার মন খুঁত খুত করিতে লাগিল। সে মনে প্রসন্নতা আনিতে পারিল না। অরুণা জাগিয়া বসিয়াছিল। স্বামী আসিলে সে দ্বার খুলিয়া দিল। এবং ঘড়ির দিকে তাকাইয়া হাসিয়া বলিল-“এত রাত হল যে ?” শরং এ কথার উত্তর দিল না বা দিতে পারিল না। জামাটি খুলিয়া সে আল্লায় রাখিল। রাখিবার সময় টাকার শব্দ হইল। অরুণার মুখের হাসি মুখে মিলাইয়া গেল। বলিল-“এতক্ষণ তাস থেছিলে বুঝি?” ৪৫

রাণী-বো
শরৎ টাকাগুলি বাক্সের মধ্যে রাখিল। নীরবে কাপড়-Fামা ছাড়িয়া
হাত মুখ ধুইয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল। অরুণা দাড়াইয়া রহিল।
কিছুক্ষণ কাটিলে শরৎ বলিল,-“হাঁ, তাস খেলতে দেরী হয়ে গেল!”
অরুণার মন নরম হইল। বলিল,-“আবার খেলা আরম্ভ হলত ?”
“না, কাল খালি একবার যাব।”
কাল যাইবার প্রস্তাবে অরুণার অত্যন্ত রাগ হইল। অার কোন
কথা না বলিয়া সে পাশ ফিরিয়া শুইয়া পড়িল । কেবল মনে মনে
বলিল,-“ঐ কাল কাল করেই কালে খাবে।”
সে সতীসাধ্বী হইয়াও এ ভাবনা ভাবিয়া ফেলিল।
কাল আসিল। শরৎ অখিলবাবুর বাড়ী গেল। ঘণ্টা কয়েক
ফ্যাস খেলিল। রাত্রি একটার সময় বাড়ী ফিরিল। এমন দু’চার
দিন কাটিল। শনিবার আসিল। আজ বাবুদের রেসের টিপের আলাে-
চনা হইতে লাগিল। শরৎ তাহার মতামত-সাজো দিল।
সকলে তাহাকে যাইতে অনুরোধ করিল, কিন্তু সে গেল না।
শরৎ সারা সকালটা যাইবে কিনা ভাবিল। দুইচারদিন রান্ এও
ফুসে জিতিয়াছে, অফিসের মাহিনাটাও বাড়িয়াছে, অতএব সে
ভাবিল--তাহার বরাতটাও এখন ভাল আছে। তাই যাইবার জন্য
তাহার মন টলিল । অফিসে নাইবার সময়, অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে
গােটা কয়েক টাকা বেশী করিয়াই নিল। টাকা লইবার সময় অরুণ
জিজ্ঞাসা করিল,-“অত টাকা কি হবে ?”
০

রাণী-বো
শরৎ তাড়াতাড়ি বলিল,-“একজন অফিসে ধার চেয়েছে।”
অরুণা হাসিয়া বলিল,-“তবু ভাল আমি মনে করে ছিলাম
বুঝি তুমি অজি রেস খেলতে যাবে। যে রকম ক’দিন জুয়াে খেচো।”
শরৎ ভিতরে ভিতরে কিন্তু-মিন্তু হইয়া পড়িল। ভাবিল—একবার
সে টাকাগুলাে রাগ করিয়া রাখিয়া যায়। কিন্তু সে রাখিতে পারিল
। কে যেন রাখিতে দিল না।
অরুণা জামা পরাইতে পরাইতে বলিল,-“তােমার ধারই শােধে
কে, তুমি আবার ধার দিতে যাচ্ছি। আচ্ছা নীরুর মার ধারটা
দিয়ে দাও না, ও বিধবা মানুষ।”
শরৎ বলিল,-“দেব, দেব, এইবার দেব।” বলিয়া সে আফিসে গেল।
আফিসে দু'চার জন টিপ জানিতে আসিল। তবে পূর্বের মত
অত লােক আসিল না । যদিও শরৎ কিছু খবর লয় নাই, তথাপি
তাহাদের সাজেসানের উপর তাহার একটু সাজোন দিল। যাহারা
টিপ লইতে আসিয়াছিল শরতের আজিকার ব্যবহারে তাহারা সন্তুষ্ট
হইল। এতদিন তাহারা তাহাকে অভদ্র ভারিয়াছিল ।
প্রায় একটার সময় অখিলবাবুর মােটার আসিয়া শরতের
অফিসে দাড়াইল। অখিলবাবু নিজে শরতের সিটের কাছে আসিয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন যে, আজ সে যাইবে কিনা। শরতের ইচ্ছা থাকি-
লেও সে যাইতে পারিল না। কারণ, তাহার স্ত্রীর কথাগুলি মনে পড়িল
এবং তাহাকে যাইতে বাধা দিল। সঙ্গে সে টাকা আনিয়াছিল বটে,
৪৭

রাণী-বে
কিন্তু যাইতে পারিল না। অখিলবাবু আরো ৫' একরার ধরাধরি
সে কিছুতেই যাইতে রাজী হইল না। অবশেষে,
অখিলবাবুর হাতে গােটাকতক টাকা দিয়া বলিল—“IBidesia winএ
ধরবেন।” সুতরাং রাজাকে মন্ত্রীর পরামর্শে ফিরিতে হইল।
শরৎ ছুটি হইলে বাড়ী ফিরিল। অরুণ! একগাল হাসি হাসিয়া
বলিল,-“ভাগ্যে তুমি এলে নইলে ত আমার দেখান ভার
দিদি ঠাকুরপাে সবাই বলছিল যে তু: রেসে গেছ।
আজ এত দেরী হল কেন গা।”
শরৎ মুখভার করিয়া জামা ছাড়িল, কাপড় ছাড়িল ।
অরুণা শঙ্কিতমুখে জিজ্ঞাসা করিল—“তোমার কি হয়েছে গা,
আজ কথা ক’চ্ছ না বে বড়?”
“কি কথা ক’ব। কেবল রেসের কথা, কেবল জুয়ার কথা ;-
ঘরে-বাহিরে আমি অস্থির হয়ে পড়লাম।”
অরুণা নারীসুলভ কোমল কণ্ঠে বলিল—“কি করবো, ওরা যে
সমস্তক্ষণ তােমায় জুয়াড়ী......আরাে কত কি বলে—আমার কি ও
সব কথা শুনতে ভাল লাগে ? তাই ত রাগ করে তোমায় বলি।”
শরৎ তথাপি রাগিয়া বলিল,-“ভাল লাগে না ত চুপ করে
থেক আমার কাছে খালি গজর গজর কর না।” তারপর আপন
মনে বলিল—“আমি রেসে নাইকার কি ?—সবাই বলবার কে ?”
অরুণা কোন কথা বলিল না। এ যেন তাহার অালা হয়েছে।
৪৮

রাণী-বৌ
স্বামীর কাছে সে বকুনি খাইবে। আবার আর পচি জনের নিকট
হইতে সে কথা শুনিবে । অথচ, তাহার দোষ কিছুই নাই।
কিন্তু, এ সব সহ্য করা ছাড়া বাঙ্গালী-বধূর উপায়ান্তরই বা কি !
কাজেই, চোখের জল চোখে মুছিতে হয়।
সন্ধ্যা না হইতেই শরতকে অখিলবাবুর বাড়ীতে ছুটিতে হইল—
রেসের সংবাদ জানিবার জন্য ।
অখিলবাবুর সহিত সাক্ষাৎ হইলে তিনি বলিলেন,-“ওহে রং,
তােমার লাটা খারাপ, Bidesia ধরতে পারলুম না। সময় পেলুম
।
আর—তুমি গেলে না Dobie চাপ লে—নিজে না গেলে কি
হয় ?—ধরবাে কিনা-তাই-ই ভাবতে লাগলুম।”
শরৎ প্রথম সংবাদ শুনিয়াই দমিয়া গেল । কোন কথা বলিল
আর বাকি কথাগুলি কেবল শুনিয়া গেল। তাহার
কথা শেষ হইলে সে কেবল জিজ্ঞাসা করিল—“Bidesia-কত
দিয়েছিলাে।”
“তা খুব দিয়েছিলাে” বলিয়া টাকাটা তিনি ইসারায় দেখাইলেন।
শরতের মুখ আরো চূণ হইয়া গেল। অখিলবাবু বলিলেন,-
“তখন বললুন—চল চল—তা নয় !
নয়। তাহলে আমারও
কিছু হতাে।”
এতগুলি কথাবার্তার ভিতর শরৎ কেবল ইহাই ঠিক করিল যে
তাহার যাওয়াই উচিত ছিল। এবং যদি সে কখন আর খেলে ত
।
৩১
৪৯

রাণী-বৌ
নিজে গিয়া খেলিবে, পরের হাতে আর কখন সে টাকা দিবে
......ইত্যাদি।
সে দিন আর তাহার ফ্যাস খেলা হইল না।
বুধবার সকালে উঠিয়া সে একটি সাহেবের বাড়ী গেল—আচে
শনিবারের খবর জানিতে। তারপর ফারপের একটি লােকের সহিত
তাহার আলাপ ছিল—তাহার কাছে গেল। দু’একটি ওনার
ট্রেনারের কাছেও এই কদিন সে দেখা করিল। অনেক করিয়া
শনিবারের টিপের জোগাড় হইল।
শনিবার আসিল। অখিলবাবু তেমনি মােটর লইয়া আসিলেন
এবং অনুরােধও করিলেন। শরৎ আফিসের কাজ রাখিয়া রেস
খেলিতে চলিল। ছােট সাহেব হইতে কেরাণীকুল জানিল আজ
অখিলবাবুর খুবই অনুরােধে পড়িয়া শরৎ রেস খেলিতে গেল—না
হইলে সে নিশ্চয়ই যাইত না।
পান্নালাল, বিধু, জিতু সকলই মুখ টিপিয়া হাসিল,—তাহা-
দের মধ্যে একজন বলিল,-“দেখলি বলেছিলুম কিনা—আমার কথা
মিললল কিনা।”
আর একজন বলিল—“ভারী ত কথা—তা আবার মিললাে কিনা।”
এমনি করিয়া শরৎ আবার জুয়াড়ীর খাতায় নিজের হাজরী
সই করিল।
তারপর কত দিন কাটিয়া গিয়াছে। শরতের রেসও চলিতেছে,

রাণী-বো
তাসও চলিতেছে। যেন তাহার রেস খেলার নব-যৌবন আবার
ফিরিয়া আসিয়াছে। বাড়ীতে ছােট ভায়ে বড়-বৌদিতে কত কথা
এ বিষয় হইয়া গিয়াছে। এমন কি দু’একটা সংসারের খরচপাতি
লইয়াও খিটিমিটি, আভাস-ইঙ্গিত হইয়া গিয়াছে। তথাপি শরৎ
টলে নাই। তবুও তাহার জুয়ার নেশা পুরা দমে চলিয়াছে।

সাত প্রায় তিনটা রাজিয়া গিয়াছে। অমল আপনার বাহিরের কক্ষে বসিয়া সদ্যপ্রাপ্ত একখানি মাসিক পত্র পাঠ করিতেছিল, এমন সময় শরতের না আসিয়া সেই কক্ষে প্রবেশ করিয়াই পুনরায় ফিরিয়া যাইতেছিলেন। কিন্তু যাইবার সময় তঁাহার দেহের পরশে দরজার কড়াটার শব্দ হইয়া গেল। অমল। ফিরিয়া তাকাইল এবং বলিল,-“কি জ্যেঠিমা ফিরে যাচ্ছেন যে ?” জ্যেঠিমা একটু হাসিয়া বলিলেন,—“ন—তুমি পড়ছিলে তাই, একটু না হয় পরেই আস্তাম—এই একখানা চিঠি পড়াবার জন্যে এসেছিলুম।-না-না এখন পাক না—তুমি এখন পড়।” অমল হাসিয়া হাত বাড়াইল । বলিল,-“দিন দিন আমার পড়ার একটুও ক্ষতি হবে না, ভয় নেই।আশ্চৰ্য্য, আমার পড়ার একটু ক্ষতি হবে বলে আপনি চিঠিটা পড়াবেন না,আপনি আচ্ছা মাত ! ছেলেরা বিদেশে থাকে, তা বলে আপনার একটুও আগ্রহ নেই- তাদের সংবাদ জানবার ?”

রাণী-বো অমল মা ম্লান হাসি হাসিয়া পত্রখানি অমলের হাতে দিল। খামখানি, ছিড়িতে ছিড়িতে বলিল,-“এতে যদি সনতের বের কথা না থাকে ত আর পড়বেই না,—কি বলেন জ্যেঠিমা ?” তিনি কোন উত্তর দিলেন না, পড়া শুনিবার জন্য উংগ্রীব হইয়া রহিলেন। পত্রখানি বড়-বৌ লিখিয়াছে । অমল পত্রখানি একবার মনে মনে পড়িয়া লইল। তারপর বলিল,-“নিতুর মা লিখছেন- সংসারে আর সুখ নেই !—এখন হাড়ের জ্বালা তাহার ভয়ানক হয়েছে।” “না—না—অমল কি লিখেছে বল—আর-পত্রে ত জান না—বড়- বৌ-মা কি সব লিখেছিল—তুমি ত হেথা ছিলে না—কি সব রেস-ফেস্ লিখেছিল। ওদের হরিচরণ কত কি সব বল্লে—আমি ত সেই অবধি ভেবে সারা হয়ে আছি। আমি চারকাল পাড়াগেঁয়ে মানুষও সব খেলা কিছু বুঝিও না, সুজিও না। তাতে বড়-বৌমা আবার লিখে- ছিলেন আপনি একটা বিহিত করুণ !-দেখ দিখি দাদা,-এখন ভালাে করে বুঝিয়ে বল দেখি আর সব কি লিখেছে।” কথা বলিতে বলিতে তিনি প্রায় কঁদিয়া ফেলিয়াছিলেন,—ভয়ও তঁাহার যথেষ্ট হইয়াছিল। অমল তঁহার অবস্থা বুঝিয়া আর কোনরূপ ঠাট্টা না করিয়া ভাল ভাবেই বলিতে লাগিল,—“সেই কথাই এ চিঠিতেও লিখেছে। লিখেছে যে মেজদা (শরৎ ) আবার রেস খেলা শুরু করেছেন এবং খুব বেশী ভাবেই তিনি খেলছেন।-সংসারে টানা-

রাণী-বো
টানি আরম্ভ হইয়াছে। কি করে যে তিনি সংসার চালাছেন তা
তিনিই জানেন।
এই খেলা নিয়ে দু’ভয়ে মাঝে মাঝে সংসারে বেশ
অশান্তির সৃষ্টি হয়। তিনি আর সংসার চালাইতে চাহেন না। আপনার
কাছে চলে আসতে চান।”
মাঝে মাঝে চিঠি পড়িয়া, মাঝে মাঝে নিজের মুখে বলিয়া অমল
তাহার জ্যেঠিমাকে পত্রের সার মর্মটুকু বুঝাইয়া দিল।
জ্যেঠিমা নীরবে সব শুনিলেন এবং সর্ব শেষে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস
অ-দীর্ঘ করিয়া ছাড়িলেন।
অমলের মা বহুক্ষণ পূৰ্বেই সেই ঘরে আসিয়াছিলেন। কিন্তু তাহা
কেহ জানিত না। অমল পড়ায়, এবং তাহার জ্যেঠিমা নিজের ভাবনায়
ব্যস্ত ছিলেন, তাহারা লক্ষ্য করিবার অবকাশ পায় নাই। অমলের
কথা শেষ হইলে অমলের মা বলিলেন, “তুমি দিদি, বড়-বৌমাকে এখানে
নিয়ে এস।”
“নিয়ে এলেই কি বৌ-মা আসবে, তাহলে ভাবনা কি ?—সনতের
জন্যে কি তার এ দেশে আবার যে আছে ?—আর সেখানের সব
দেখবে শুনবে কে?”
“তা বলে তােমার বৌ......”
“মা তুমি থাম—এ এখানে-ওখানে থাকা-থাকির কথা নয়—যা
হচ্ছে তা তারাই জানে।”
অমলের মা চুপ করিয়া গেলেন। শরতের মা আরো শঙ্কিত হইয়া
৫৪

রাণী-বো
উঠিলেন এবং ভয়ে ভয়ে বলিলেন,-“তবে কি করি অমল, তােরা ত
লেখাপড়া জানিস, একটা বুদ্ধি করে আমায় উপায় দেখে দে—আমি
আর ভাবতে পারি না। যতদিন আমার অজু ছিল, ততদিন আমার
আর এ ঝক্কি পােহাতে হয় নি।”
অমল এ কথার উত্তর করিল,-“জ্যেঠিমা, এর উপায় আমি কি
করবো,আমার চেয়েও যারা ঢের বেশী লেখা-পড়া জানেন তারাই
এই রেস খেলা সৃষ্টি করেছেন,আবার যারা খেলেন তারাও খুব
কম লেখা-পড়া জানা লোক নন্-তারাই আবার রাজার কাছে
দরবার করে, আইনে পাশ করে নিয়েছেন যে,-এটা জুয়া নয়। তারাই
যে সব উপায় কে নিরুপায় করে রেখেছেন। আমাদের মত চুনাে-
পুটির এতে কি কোন হাত আছে জ্যেঠিমা ?”
এতগুলি কথার কোনরূপ অর্থই উপস্থিত নারী দুটির হৃদয়ে ছাপ
ফেলিতে পারিল না।—তাহাদের বােধগম্য হইল না—হইবার কথাও
নয়—তাহারা কেবল এইটুকুই বুঝিলেন—এ খেলার বােধ হয়
কোন প্রতীকারই নেই।
তারপর অনেক কথা হইল। অমল তাহার জ্যেঠিমাকে কাল দুপুর
বেলা আসিতে বলিয়া দিল। তাহাকে আশা দিল যে কাল
একখানি পত্র সে শরতের নামে কড়া করিয়া লিখিয়া পাঠাইয়া
শরতের মা উঠিয়া গেলেন।
অমল আহাৱাদি করিয়া ভাবিতে লাগিল। সে সহরে থাকি।
দিবে।

রাণী-বে রেস-খেলা দেখিয়াছে এবং বাজী হাবিবার দুর্দশার কথাও শুনিয়াছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত সে বুঝিতে পারে নাই যে, কেন মানুষ এই বাজীর লােভে পড়িয়া সর্বস্বান্ত হইতে বসে! কেনই বা সে খেলার নেশায় অভিভূত হইয়া যায়। আর নেশা বলিবারই বা ইহাতে কি আছে ? জুয়া হারার উত্তেজনা, উন্মাদনা যে কত তাহা জুয়া খেলা খেলিয়া খেলােয়াড়ের সাধ্যাতীত হারিয়া না দেখিলে বুঝিবার ক্ষমতা থাকে । তবে সে বিদ্বান বুদ্ধিমান—তাই এট। সে উপলব্ধি করিতে পারে যে, একটা মানুষ যে কোন প্রকারেই হউক, যদি সে তাহার সৰ্ব্ব- নাশের পথ খুলিয়া বসে, তবে তাহার সাথে তাহার পরিবারস্থ আবাে কতকগুলি নিরীহ অবলা সরলা কেমন করিয়া নীরবে ধীরে ধীরে সেই সর্বনাশা পথের ধূলায় বেদনা-রথের চাকার নিপীড়নে নিজেকে মথিত করিয়া ফেলে। খুব কম লোকই তার খোঁজ রাখে। সে ভাবিস যে রেস খেলার সেইটাই বােধ হয় সব চেয়ে বড় শাস্তি। এমনি আরো কত কি? পরদিন অমল শরৎকে চিঠি লিখিতে বসিল। জ্যেঠিমা টেবিলের একটু দূরে বসিয়া রহিলেন। অমল লিখিল। যাহা নিখিল তাহা সংক্ষেপে এইরূপ :- শরৎ, তোমাকে আমি কত কষ্টে যে মানুষ করিয়াছি তাহা তুমি আজ এত বড় হইয়া বুঝিবে কিনা বলিতে পারি না। তুমি যখন খুবই ছােট, তখন হইতে তােমার বড় ভাই তােমাদের দুজনকে তাহার নিজের রােজগারের যা-কিছু টাকা দিয়া লেখাপড়া শিখা- ।

রণী-বৌ ইয়াছে। সে যে কত কষ্টে মানুষ করিয়াছে, তখনকার সংসার চালাইয়াছে, তা আমিই জানি। তুমি সে কষ্ট বুঝ নাই, বুঝিবার মত জ্ঞানও তােমার তখন ছিল না। আজ তুমি কোথা তাহাদের লালন-পালন করিবে, তাহাদের দেখা-শুনা করিবে ; তাহা না হইয়া তুমি তাহাদের যথাসর্বস্ব নষ্ট করিতেছ, কষ্ট দিতেছ ! তােমার বড় ভাইকে আমি পেটে ধরিনি, তবুও সে-ই আমায় মায়ের যত্ন সিংহাসনে বসাইয়া গিয়াছে ; কিন্তু তাহার সেই স্নেহের ভালবাসার পরিবর্তে তুমি বড়-বৌমাকে কষ্ট দিতেছ ? সতাত ভাইয়েরই মত ব্যবহার করিতেছ ! ছিঃছিঃ ! আমার রাণী-বৌ অরুণা, সে আজও তেমন বড় নয় ! সে দুধের বৌ, তার যে দুর্দশা তুমি করিয়াছ, তাহাতে তােমায় আমার ছেলে বলিতে ঘৃণ্য বােধ হয়, কষ্ট বাধ হয় ! দু-বৌমাকে অত কষ্ট দিওনা। মেয়েদের কষ্ট—নীরবে সম্পূর্ণ অজানিতভাবে এক নীরব দেবতার কাছে গিয়ে জমা হয়। তারা কারুর নামে নালিশ করে না। তাই, তাদের বেদনায় মাঝে মাঝে ঠার অসিন টলে। এতে তােমার ভাল হইবে না। সেবার আসিবার সময় আমি সব জানিয়া আসিয়াছি। আমার রাণী-বৌমাকে তুমি ভিখারী করিয়াছ ! এবার কি পথে বার করিয়া ভিখারপাত্র হাতে দিবে মনে করিয়াছ! তাহা হইলে তােমার পিতার বংশের নাম অক্ষয় হইয়া থাকিবে !কেমন ? আসিবার সময় আমার পা ছুইয়া দিব্য করিলে যে, আর ৫৭ রাণী-বে ও সর্বনাশা পাপ জুয়া খেলিবে না! সে কি মায়ের সঙ্গে ছলনা করিবার জন্য ! যাক,—যা হইয়াছে এখন তুমি ও পপি খেলা পরিত্যাগ করিয়া আমার হতভাগিনী বৌমা রাণী-মাকে নিয়ে চলে এস-এখানে। আমার শ্বশুরের, স্বামীর ভিটায় আজও যা দেবতার আশীৰ্ব্বাদী আছে, তাহাতে তােমাদের দুজনার সচ্ছলে চলিয়া যাইবে । সেখানে চাকরীর প্রয়ােজন নাই! তােমরা দু’জন চলিয়া আসিলে, বড়বোমা, নিতু, সনৎ এরা সকলে সুখে থাকিবে ! তাহাদের কষ্ট দিবার তােমার অধিকার নাই। দেশে দুদিন থাকার কষ্ট হইবে, কিন্তু সে-কষ্ট তােমার ঐ জুয়ার জ্বালার চেয়েও কম কষ্ট! এই পাড়াগাঁয়েরই মাটিতে তােমার পূৰ্বপূরুষেরা মানুষ হইয়াছেন। এই মাটিতে আজও তােমাদের সহর বাসীদের অন্ন প্রস্তুত হয়। আজ যদি না এখানে ফিরিয়া এস ত একদিন এই আমার কথা না-শেনিবার দরুণ, এই ফিথে না-আসার দরুণ--তােমার দুঃখের কষ্টের সীমা থাকিবে না। মায়ের চোখের জল আর ফেলিও না!...ইত্যাদি ইত্যাদি এমনি আরাে কত কি অমল নিজের মনে লিখিয়া গেল। আরাে কত কি তীব্র ভৎসনা করিল। শেষে তাহাদের সকলকে আশীর্বাদ করিয়া ইতি, তােমার মা বলিয়া পত্রখানি শেষ করিয়া অমল ডাকে সেখানি ফেলিয়া দিল । মায়ের কোমল প্রাণ, মা ভাবিলেন এমন ভাবের খেলায় নিশ্চয়ই তাহারা এখানে ফিরিয়া আসিবে। শরৎ খেলা ছাড়িয়া দিবে! মা

রাণী-বো
মার প্রাণ দিয়া বুঝিল। কিন্তু সন্তানের প্রাণ যে কত কঠিন হইয়া
গিয়াছে, কত 'আঘাতে যে তাহার সে-চেতনা হইবে সে শিক্ষা
মায়ের ছিল না।
সেই পত্র শরতের কাছে আসিতে বিলম্ব হইল না। শরৎ তখন
সবে জলযোগ করিয়া উঠিয়া বড়-বৌদির সহিত সংসারের খরচের জন্য
কি একটা গােলমাল লইয়া ব্যস্ত ছিল। সনং সংসারের খিটিমিটির
ভিতরে থাকে না, বড়-বৌই তাহাকে থাকিতে দেয় নাই।
তাহার ভয়—কোন দিন হয়ত দুইভাইয়ে কিছু কাণ্ড বাধাইয়া দিবে ।
সে দিন কি কথার পর বড়-বৌ বলিল,-“তুমি যেন দিন
দিন কি হয়েছ ঠাকুরপাে-বড় টাকা কড়ি নিয়ে গােলমাল কর।
সনৎ তাই রাগ করে। বড় ভাই কিছু বলতে পারে না আমিও
কিছু বলতে দিই না। এরকম করলে ক’দিন চলবে? এমাসে
আটান্ন টাকা কোথা গেল তার হিসেব নেই ! একি আবার একটা
কথা, হ’ল ! না এমন করলে আর চলবে না।” বলিয়া বড়-বৌ রাগ
করিয়া চলিয়া গেল।
শরৎ চিঠিখানি না-খুলিয়া সব কথা শুনিয়া গেল একটি কথার ও
প্রতিবাদ করিল না। সাধারণতঃ, সে প্রতিবাদও বেশী করে না।
কারণ এমন কথা সে বহুবার শুনিয়াছে ! এসব তাহার সহ্য হইয়া
পাওনাদার, সে ত আর তাহার আপনার লােক নয়,
ইহার অপেক্ষা আরো কত শত কড়া এবং কটু কথা শুনাইয়া
০
গিয়াছে।

রাণী-বৌ
দেয়, তথাপি সে তেমন প্রতিবাদ করে না। এ স্বভাব তাহার
দোষের কি গুণের, তা ঈশ্বরই জানেন। তবে, ইহাতে বিপক্ষের
কিছুই সুবিধা হয় না, বরঞ্চ অসুবিধাই যথেষ্ট থাকে, তা বিপক্ষ দল
বুঝিতে পারে।
শরৎ চিঠি খুলিল। আপন মনে চিঠি পাঠ করিল। তারপরে
ধীরে ধীরে স্ত্রীর হাতে দিয়া বলিল,-“চিঠিটী পড়ে দেখ, মা
লিখেছেন।”
স্ত্রী স্বামীকে বলিল,-“আমি কি পড়বাে, তুমি পড়ে শুনাও না।”
শরৎ দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করিয়া চিঠিখানি পড়িল। অরুণার
নয়ন হইতে কয়েক ফোটা অশ্রু পড়িল। সে নীরবে তাহা মুছিয়া
লইল। সে ভাবিতে লাগিল—এমন দিদি পাইয়াছে, এমন দেবর,
এমন শ্বাশুড়ী, এমন ভাসুর পাইয়াও তাহার বরাতে সুখ মিলিল না।
সে একটা গভীর নিশ্বাস ছাড়িল মাত্র।
শরৎও এতক্ষণ কি সব ভাবিতেছিল। বলিল,-“দেখলে ত অরু,
তোমার বড়দি মাকে পৰ্যন্ত লাগায় কিনা? সেদিন আমি বললুম,
তােমার তাতে বিশ্বাস হলো না। এযে স্বামীর কথা—এতে বিশ্বাস
হবে কেন? একি আর বড়-বৌদির কথা,—না সনতের কথা যে
বেদবাক্য বলে মনে হবে ?”
রাণী-বৌ একথা শুনিল না ; নিজের অদৃষ্টের কথাই ভাবিতে
শরৎ পুনরায় শ্লেষের স্বরে বলিল,-“আমার আগেকার
লাগিল।

রাণী-বৌ
কথাগুলাে বুঝি তেমন ভাল লাগলাে না, আর বড়বৌদি যে কথাগুলো
আমায় বলে গেল--তা বেশ তােমার ভাল লাগলাে নয়?”
রাণী-বৌ কঁদিয়া ফেলিল। বলিল,-“আমার কারুর কথা আর
ভাল লাগে না; মনে করি আমার মরণ হলেই ভাল।”
বাঙ্গালী পরাধীন, তাই তাদেরও যারা অধীন তাদের কষ্ট দিতে
সে ভালবাসে। তাই, আফিসের বড় বাবু বড় সাহেবের কাছে
খোচা খাইলে—সে তাহার অধীনস্থ কর্মচারীদের অধিকতর খোঁচা
দেয় ; আবার সেই অধীনস্থ কর্মচারীরা --বাড়ীতে আসিয়া সৰ্ব্ববিষয়ে
পরাধীন অবল স্ত্রীর উপর তম্বি চালায়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটিল।
শরৎ খোচা খাইল ওদিক হইতে। তাই তাহার খোঁচা অধিকতর তী
তীব্র হইয়া ফিরিয়া আসিয়া বিধিল এদিকে, স্ত্রীর বুকে।
শরৎ রাগ করিয়া বলিল,-“মরণ ত নিজের হাতেই আছে! কত
বৌ-ঝি অমন প্রায়ই ত মরচে !”—বলিয়া আর অপেক্ষা করিল না
সে বাহির হইয়া গেল।
কিন্তু সন্ধ্যার পূর্বেই সে ফিরিয়া আসিল। আজ প্রাণ ধুলিয়া
সে বেড়াইতে পারিল না। এতবড় খোচার ভয় তাহার প্রাণে খচ, খচ,
করিয়া বিধিল। সে ফিরিয়া আসিয়া দেখিল অরুণা সেখানেই তখনও
উপুড় হইয়া কঁদিতেছে। এদৃশ্য দেখিয়া শরতের মনে কি ভাব উদয়
হইল কে জানে! সে অরুণাকে অনেক কষ্টে উঠাইল, অনেক আদর
অনেক যত্ন করিল। অনেক চুম্বন করিল। নিজের কাপড়
A
করিল।

রাণী-বো
দিয়া স্ত্রীর নয়ন মুছাইয়া দিল। শেষে সে বলিল,-“আমার কথায়
রাগ করলে অরু?”
অরুণা কথার উত্তর দিল না । নিজের অঞ্চলের প্রান্তভাগ লইয়া
নাড়াচাড়া করিতে লাগিল আর কাদিতে লাগিল।
শরৎ ব্যথিত স্বরে বলিল,-“অৰু, আমার মনেও কি তােমার
চেয়ে কম জ্বালা। আমি কি কম কষ্টে ভুগ চি ! আমারও কি
মনে মাঝে মাঝে হয় না—যে আমি মলে তােমরা সবাই সুখে থাক,
নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে বাস কর । আমার জন্যে মা, তুমি......”
হিন্দুর-বৌ এতটা সহ্য করিতে পারিল না। স্বামী মরিতে চান
সাধ্বীর প্রাণে বস্ত্রের মত তা বাজিল ! তাহার সব দুঃখ কষ্ট নিমেষে
অন্তর্ধান হইয়া গেল। অরুণা মুখ তুলিয়া বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল,
—“তুমি মরতে যাবে কেন—আমিই মরবাে, আমায় নিয়ে তােমারই
ত যত জলা!”
শরৎ বুঝিল এ কথা সেই পূৰ্ব কথারই উত্তর।
তাই, আর
কোন কথা না বাড়াইয়া শরৎ খাইতে গেল। সে আহার করিয়া
আসিয়া স্ত্রীকে জোর করিয়া খাইতে পাঠাইয়া দিল। স্ত্রী খাইয়া
আসিয়া পাশে ৩ইল।
অনেকক্ষণ পরে দু’একটা কথার পর অরুণা আস্তে আস্তে বলিল,
“চল আমরা মার কাছে ফিরে যাই, সেখানে গিয়ে বেশ থাকবাে’খন।
সেখানে জমিজমাওলােও ত একজন দেখবার লােক চাই। মা ত

রাণী-বো
;
'এমন কতবার বলছেন সে-কথা। আর এখানে সংসারের
কথা কাটাকাটি আমার আর ভাল লাগে না ; আমি আর পারি না।
সে বেশ থাক্‌বাে’খন?”
শরৎ হাসিয়া বলিল, “বড় বেশ থাকা নয়। সেখানের জ্বালা
এখানের জ্বালার চাইতে কম নয়—সেখানে রে নেই বটে, কিন্তু
ম্যালেরিয়া আছে, দুর্ভিক্ষ আছে।”
অরুণা অম্লান বদনে উত্তর দিল-“সেও আমার ঢের ভাল।
সে আর মাঝে মাঝে ছাড়ে, মাঝে মাঝে জ্বর ছাড়ার মুখে ভাতও
বেশ লাগবে, কিন্তু তােমার দেওয়া এমন ভাত আমার চিরজীবন ও
আর ভাল লাগবে না।
শরৎ ভিতরে ভিতরে রাগ করিল; কিন্তু কিছু রাগের কথা
বলিল না; বলিল, “কিন্তু সারা জীবন রোগে ভুগতে হবে।”
অরুণা মুক্ত কণ্ঠে বলিল, “সে ও ভাল, সে ভােগ আমার দুর্ভোগ
হবে না, সে ভােগে আর পাঁচজনে আহা-উহু করবে, তােমায়
সারাদিন দেখতে পাবে, সে ভুগে মরা আমার সার্থক হবে।
এমন ভেতরে ভেতরে জ্বলে-পুড়ে আর মরতে পারি না। এ গে
যে কি আমিই জানি।”
শরৎ ক্ষণকাল কোন কথা বলিল না, চুপ করিয়া রহিল।
রাণী-বৌ পুনরায় বলিতে লাগিল, “অামার মত কত মেয়ে-মানুষ
জানি কষ্ট পাচ্ছে ঠাকুরের কাছে এত মানত করি তবু তাঁকে

রাণী-বো
ব্যথা দিতে পারি না। এক এক সময় মনে হয় আত্মহত্যা করি।
তােমার নিলেও আর সহ্য করতে পারি না-কারুকে কোন কথা
জানাতেও পারি না!”
শরৎ মনে মনে কি ভাবিয়া বলিল, “দেখ তুমি এক কাজ কর
তুমি দিনকতক মার কাছে গিয়ে থাকগে। বাপের বাড়ী ত আর
যেতে চাও না। তুমি দিনকতক সুখে থাকলে, আমি যাহােক
করে কাটিয়ে দেব’ণ !”
রাণী-বৌ কঁদিয়া ফেলিল। অশ্রু জড়িত কণ্ঠে বলিল, “তা যদি
পারতাম তোমায় ছেড়ে থাকতে, তাহলে ত আ তুমি যে যে পথ
দেখিয়ে দিয়েছ সে পথেই চলে যেতাম-বাপ-মায়ের কাছে গিয়ে
কোলে চড়ে বস্তমি। তা যে পারি না”
অরুণা দিতে থাকিল। শরৎ আর কোন কথা সে রাত্রে
তুলিল না। মা যে অমন করিয়া চিঠি লিখিলেন ; স্ত্রী যে
যাইবার জন্য অত ব্যথা জানাইল ; বড়-বৌ যে সংসারের জন্য অত
করে শোনাইল ; তথাপি তাহার মন তেমনভাবে কেহ-ই টলাইতে
পারিল না। যেটুকু টলিল, তাহা দু'একদিনের জন্য। তাহার শক্তি
শুক্রবার পর্যন্ত রহিল না।
প্রতি সপ্তাহের মত সে রেসে গেল। হারিয়া বাড়ী ফিরিয়া
আসিল পরিবারবর্গের উপর বিরক্ত হইল। সনতকে দেখিয়া লজ্জা
পাইল। বড়-বেদিদিকে দেখিয়া বিরক্ত হইল। স্ত্রীকে দেখিয়া মুখ
দেশে
;
৬৪

রাণী-বৌ
ফিরাইল। নিজের হার ভাবিয়া নিজের উপর ধিক্কার আসিল।
তথাপি তাহার রেসে যাওয়া চলিল। দেনার অঙ্কও বাড়িয়া চলিল ।
পাওনাদারের সংখ্যাও বাড়িয়া চলিল । অভাব অনাটনের ফাঁকি ও
বাড়িয়া চলিল।—যন্ত্রণা দিবার যা-কিছু সবই বাড়িয়া চলিল।
কেবল কমিতে থাকিল মান, সন্ত্রম, আর যা-কিছু সদগুণ।

আট
রেসে হারিয়া হারিয়া, অনেক কিছু খুয়াইয়া সে নিঃস্ব হইয়া
পড়িল। সেদিন শনিবার—হাতে একটিও টাকা নাই, অথচ রেসে
যাইতে হইবে। ঘরে-বাহিরে কেহ তাহাকে আর ধার দেয় না
অতএব লজ্জার মাথা খাইয়া স্ত্রীর গায়ে বড়-বেয়ের যা গহনা ছিঃ
তাহ। সে চাহিল। স্ত্রী রাগ করিয়া বলিল, “না-না—সে তুমি যাই
বল আর যাই কর এ আমি কিছুতেই দেব না।”
“লক্ষ্মীটি দাও অরু, আমি ঠিক বলছি, রবিবারে ফিরিয়ে এনে দেব
দেব।”
“তােমার কথা রেখে দাও-আর সব গহনাই ত ফিরিয়ে এনে
দিলে, খালি এইটেই বাকি আছে।”
শরং একটু রাগিয়া বলিল,-“অরু, আজ-কাল ভারী তুমি মুখে
উপর জবাব দাও।ও ভারী এক জোড়া তাগা খুলে দেবে ত তা
এত কথা। আমি—স্বামী না! এই বুঝি স্ত্রীর কাজ ! স্ত্রী আমা
গহনা পরে থাক—আর স্বামী দেনার জন্যে জেল খেটে মরুগ কেমন ?”

রাণী-বো অরুণা তাহার কথা শুনিতে শুনিতে কঁদিয়া ফেলিল। কঁদিতে দিতে বলিল,-“অমন কথা বল না আমায়,—বাবা যা-কিছু গহনা দিয়েছিলেন, সব একে একে তোমার ঐ রেসের পায়ে ঢেলে দিয়েছি, একদিনও না বলিনি।-তবু তুমি আমায় এমন কথা বল্লে !” বলিয়া পুনরায় সে কঁদিতে লাগিল। শরৎ একটু নরম হইয়া বলিল—“দাও নি কি আমি বলছি, তবে আজ এমন কচ্ছ কেন? অমন অবাধ্য হ'চ্ছ কেন?” অরুণা অশ্রু-বিজড়িত স্বরে বলিল,-“এ গহনায় আমার হাত দেবার যো নেই ;-বড়-দি আমায় কত দুঃখে এ গহনা পরিয়েছে জান ?—এ গহনা নিতে তােমার একটু লজ্জাও করবে না।” শরং অম্লান বদনে বলিল,-“লজ্জা কি বল ?—রবিবারে ফেরত পাবে। আমি কি এতই আহামুক–যে বড়-বৌদির গহনা খােব ? একটা ‘সিওর টিপ’ পেয়েছি, তাই কিছু কমিয়ে নিতে চাই, এই সন্যে—ব্যস।” “তােমার ছিওর টিপের কথা রেখে দাও। আমি দেব না।” রেস সংক্রান্ত ছােট-খাট ইংরাজী কথা পর্যন্ত অরুণার মুখস্থ হইয়া গিয়াছিল। সে make up, tip, Jokey প্রভৃতির ছােট-খাট অনেক কথারই সে ইঙ্গিত বুঝিতে পারিত। এমন রেস শরৎ খেলিত। শরৎ তাহাকে অনেক বুঝাইল। অনেক অনুনয় বিনয় করিল। এমন- কি হাতে পায়ে পরিবার অতিতয় করিল। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য ৬৭

রাণী-বৌ
= =
বুঝাইল। স্ত্রীলােকের দোষগুণ সম্বন্ধে আরো অনেক কথা সে বলিল।
শেষে শরৎ রবিবারে তাহা ফিরাইয়া দিবে বলিয়া ভয়ানক একটা দিব্য
গালিয়া বসিল। অরুণা আর না বলিতে পারিল না। বলিল,-
“আচ্ছা কাল নিও!-আজ ত আর রেস্ নয়, বৃহস্পতিবার।”
“আজ নিতে চাইছি তার একটু কারণ আছে। তোমার হাত
খালি দেখে বৌদি জিজ্ঞাসা করলে তুমি বলবে ও আফিসের কার
গহনা হবে, তাই সে একবার দেখতে নিয়েছে।কংবা বলবে-আর
সােমবারে বাপের বাড়ী যাব, তাই পল্লিস্ করতে গেছে। পরশু
নিলে সবাই ভাববে রেস খেতে নিয়েছে।”
এ কথা শুনিয়া তাহার সহধর্মিণী মর্মাহত হইল বলিল,-“কিন্তু
আজ লক্ষ্মীবার যে।”
“রেখে দাও তােমার লক্ষ্মীবার ! লক্ষ্মী ত অামায় ঢেলে দিয়েছেন
আর কি !” বলিয়াই আবার কি মনে করিয়া বলিল—“আচ্ছা আজ খুলে
রেখে দাও বাক্সে—কাল ভােবই নেব। কেমন সেই ভাল।”
অরুণা আর কোন উত্তর দিল না ।
শনিবারে বৈকালে সনৎ জলখাবার খাইতে বসিয়াছে। বড়-বৌ
তাহারই কাছে বসিয়া সংসার-সম্বন্ধে এবং তাহার বিবাহ সম্বন্ধে কথা-
বাৰ্তা কহিতেছে। অনেক কথার পর সনং বলিল,-“বড়-বৌদি
তুমি যাই বল, আমি আর সহ্য করতে পারি না। লােকে পথে
ঘাটে আমায় যে এমন অপমান করবে, তা আমি সহ্য করতে

রণী-বে।
পরিবাে না। চেনা-অচেনা, ছোট-বড়, বাবু-চাকর সবার কাছেই
ধার ! একটুও ঘেন্না হয় না, আমি ভাবি তাই।”
“কি করবো বলে ঠাকুরপাে, হাতের পাঁচটা আঙ্গুল সমান হয়
না—তােমার দাদা তাই বলতেন।”
“তা বলে সংসারটাকে উচ্ছন্নে দেবে আর আমরা তাই দেখবো,
সহ্য করবাে-এ কি রকম কথা।”
বড়-বৌ হাসিল, হাক দিয়া বলিল,-“ওরে অরু, আর দু’খানা
কটি নিয়ে আয়—ঠাকুরপাের জন্যে।”
ইহারা যখন কথা কহিত। তখন অরুণা নিকটে থাকিত না।
তাহার ভারি লজ্জা করিত। সদাই সে ভাবিত তাহার স্বামীর
কীর্তির কথাই বুঝি কীৰ্ত্তন হইতেছে।
সে স্বামীর নিন্দা সহ্য করিতে পারিত না। বড়দির ডাকে খান
দুই রুটি লইয়া আসিল এবং সনতের পাতে দিল।
বড়-বৌ অরুর হাতের দিকে লক্ষ্য করিয়া বলিল,-“অৰু তাগা
দু’গাছা খুলে রেখেছ কেন? আমি কি তােমায় খুলে রাখবার জন্যে
দিয়েছি। যাও, এখুনি পরগে—এয়ােস্ত্রী মানুষ”
সনৎ অহার করিতে করিতে মুখ তুলিয়া বৌদির হাত দুখানি
দেখিল। কোন কথা তখন বলিল না।
স্বামী যেমন শিখাইয়া দিয়াছিল সে তেমনি বলিল। বড় জয়ের
কাছে এই সে প্রথম মিথ্যা কথা বলিল। বলিতে বলিতে তাহার

রাণী-বৌ
কথায় কান্না ঠেলিয়া আসিতে লাগিল। সে আর দাড়াইল না,
চলিয়া গেল, এবং যাইবার সময় শুনিতে পাইল—তাহার ছােট
ঠাকুরপাে তাহার বড় জাকে বলিতেছে—“পাল্লিস করতে গেছে। সে
কম পালিস নয়, ঘোড়ার খুরের পাল্লিস—সবটাই খয়ে যায়, কিছু
আর আদায় থাকে না। বৌদি, তােমার গহনা খুলে নাও আর
দুদিন পরে সবই পাল্লিস হতে যাবে বলে দিচ্ছি। ছ্যা-ছ্যা-বৌদি
পৰ্য্যন্ত স্বামীর সঙ্গে সামনে মিথ্যে বলতে শিখেছেন : জগতে কাকে
আর বিশ্বাস করি।”
বড়-বৌ চুপ করিয়া রহিল। সনৎ পুনরায় বলিল,-“না বৌদি
আমি আর পারবাে না, কোন্ দিন কি আবার হাতাহাতি করে
বসবাে। তুমি না হও, আমি নিজেই আলাদা হই।
আমি নিতুর
টাকাকড়ি এমন ভাবে ওড়াতে দিতে পারবে না তা বলে দিচ্ছি।”
সনৎ বলিয়া ফুলিতেছিল। তথাপি বড়-বৌ কোন কথাই বলিল
। কেবল একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিল। ইহাতে সনং আরো
চটিয়া গেল। বলিয়া উঠিল,-“তােমরা মেয়েরা খালি কঁদতেই
শিখেছ—আর অদৃষ্ট শিখেছ। একটু তেজ নেই !
তেজ নেই। ওনার কাছে
গহনা চাহিলে উনি খুলে দিলেন, কার গহনা দিচ্ছি—সেদিকে
হস নেই। বড় দিদি কেন পরতে দিয়েছে, সে দিকে খেয়াল
নেই!—আর্কেল নেই।—গলায় দড়ি
বড়-বৌ ধমক দিয়া বলিল,-“তুমি থাম ঠাকুরপাে, কাকে কি
৭০

রাণ-বো
বচো, রাগলে তােমার জ্ঞান থাকে না। আমার জিনিষ গেছে, আমি
বুঝবে ! ওর কি দোষ, সে আসুক তার সঙ্গে বােঝা-পড়া করবে।”
সনৎ মহা অপ্রস্তুতে পড়িয়া গেল—আর কোন কথা কহিল না।
অরুণা নিজের কক্ষে আসিয়া তাহার দেবরের সকল কথা ভাবিতে
লাগিল। সে মেঝেয় শুইয়া খুব খানিকটা কাদিল ।
কেহ দেখিল
'না—কেহ জানি না। বাঙ্গালী বধূরা এমনি করিয়াই কঁাদে।
এমনি করিয়াই দুঃখ সয় !
অরুণা আলাে আলিল। সন্ধ্যা দিল।
বাহিরের লােক কিছুই জানি না।
শরৎ রেস খেলিয়া আসিল। বাজী হারিয়া আসিল। নানা
সে বর্জী জিতিয়াছিল, কিন্তু শেষের সব বাজীতে সে হারিয়া
বসিল ! বড়-বৌদির গহনাগুলি খােওয়াইল। মুখ শুষ্ক করিয়া বুকে
বেদনা লইয়া সে মাঠের ঠাণ্ডা হাওয়ায় কিছুক্ষণ বসিয়া বাড়ীতে
আসিল। কিন্তু প্রাণ ঠাণ্ডা হইল না।
বাড়ীতে আসিয়া দেখিল তাহার স্ত্রী শুইয়া কাঁদিতেছে। অরুণা
তাহার স্বামীর আসার সাড়া-শব্দ পায় নাই,-এমনি বিভাের হইয়া
কাদিতে ছিল। শনিবার দিন রেস খেলিয়া আসিলে শরৎ যতটা
পারিত নীরবে বাড়ীতে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিত। আজও করিল,
তাই সে প্রথমে জানিতে পারিল না। এমন সময় স্ত্রীকে কাদিতে
দেখিয়া তাহার মাথায় আগুণ জ্বলিয়া উঠিল।
অরুণা স্বামীর আগমন জানিতে পারিয়াই তাড়াতাড়ি উঠিয়া
৭১

রাণী-বৌ
পড়িল। স্বামী কঠোর স্বরে জিজ্ঞাসা করিল—“কতক্ষণ কাদা হচ্ছিল।
আর কেনই বা কাদা হচ্ছিল শুনি ?”
অরুণা কোন কথার উত্তর না দিয়া বলিল,-“ও কিছু নয় এখন
হাত-পা মুখ ধােও।”
সে ধমক দিয়া বলিল,-“চুলােয় যাক আমার হাত-মুখ
ধােওয়া! তুমিই ত কেঁদে কেঁদে আমার অমঙ্গলকে ডেকে আন—তাই ত
রেসে জিততে পারি না।”
তথাপি অরুণা কোন কথা বলিল না। কাৰণ সে জানিত,
রেস হইতে আসিলে তাহার স্বামীর মেজাজের ঠিক থাকে না।
একটু-কিছুতেই সে অনেককিছু করিয়া বসে।
বিশেষতঃ হারের
দিনের ত কথায়ই নেই! অতএব কোন কথা না বলিয়া সে কাজ
করিয়া গেল। শরৎ রাগে গর গর করিতে থাকিল। ইচ্ছা, একচড়ে
ঠিক করিয়া দিয়া কি হইয়াছে জানিয়া লয়। কিন্তু স্ত্রীর গায়ে হাত
তুলিতে সে পারিল না।
শরৎ রাগ চাপিয়া পূনরায় জিজ্ঞাসা করিল—“কি হয়েছে আগে,
তােমায় বলতেই হবে।”
অরুণা অম্লানবদনে বলিল,-“কি হয়েছে আবার—বাপের বাড়ীর
কথা মনে পড়লো তাই কাদছিলুম। একটু কঁদবাে তারও এত
জবাব দিতে হবে ?” বলিয়া সে একটু হাসিবার চেষ্টা করিল।
শরৎ আহারাদি সারিয়া বসিয়া আছে এমন সময় বড়-বৌ
৭২

রাণী-বৌ
বােধ করিতে
তবুও স্থির
আসিল।
ভিতরে ভিতরে অস্কোয়ান্তি
লাগিল।
প্রথমে বড়-বৌ প্রশ্ন করিল,-“কবে অরু বাপের বাড়ী যাবে?”
শরৎ একটু চিন্তিত হইয়া পড়িল। পরে বলিল,-“আচে সপ্তাহে
মনে করছি। আর অনেক দিনই মনে করচি যাওয়া উচিত।”
“তা হলে আমার অন্য গহনাগুলােও পাব্লিস করতে দিলে না কেন?”
শরতের প্রাণটা ধড়াস করিয়া উঠিল।
হইয়া
উত্তর দিল,-“তা দেব’খন। আচ্ছা বৌদি, তাগা গোড়াটা কত
দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল মনে আছে?”
বড়-বৌ হাসিয়া উত্তর করিল-“তা কি মনে আছে ঠাকুরপাে ।
তবু মনে পড়ে যেন মজুরী সমেত পাঁচ-শ কত টাকা পড়েছিল।”
ওঃ, ঐ জিনিস ১৭৫ টাকায় চলিয়া যাইবে, এই ক'দিনের মধ্যে
টাকা দিতে না পারিলে ! আর কার কাছেই বা টাকা ধার সে
চাহিবে ! সবার কাছেই ত সে দেনা করিয়াছে। কে আর তাহাকে
ধার দিবে! কে আর তাহাকে বিশ্বাস করিবে! মন বলিল,-কেউ
—কেউ না! বিশ্বাসের কাজ কি সে করেছে!
“কেন ঠাকুরপো দামের কথা জিজ্ঞাসা করলে ?”
শরৎ যেন অবজ্ঞার সহিতই উত্তর দিল,-“না--এমনি ?"
কিন্তু প্রবীনা বড়-বৌ এ উত্তরটা ফেলিয়া দিতে পারিল না।
সন্দেহ হইল। তবে কি সনতেরই কথা ঠিক। বড়-বৌ হঠাৎ বলিয়া
মনে

রাণী-বে
ফেলিল,-“আমার গহনা রেস খেলার জন্যে বাধা দাওনি ত, দেখ
ঠাকুরপাে। আমি বড় সাধে অরুকে লক্ষ্মী-বৌ রাণী-বৌ সাজিয়েছি।”
বলিতে বলিতে তাহার গলার কণ্ঠস্বর নরম হইয়া আসিল।
শরৎ হঠাৎ এই প্রশ্নে অস্থির হইয়া পড়িল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ
নিজেকে সামলাইয়া লইয়া সে একটু হাসিয়া বলিল,-“বৌদি কি যে
বলে তার ঠিক নেই। আমার কি একটুও জ্ঞান নেই, না ধৰ্ম
নেই। তোমার যদি সন্দেহ হয় বৌদি, তাহলে ওর গা থেকে তুমি
আর সব গহনা খুলে নাও ! কি হবে ওর গহনা পরে, ও এমনিই ত
শুধু গায়ে শুধু হাতে ছিল এতদিন। ওর তাতে দুঃখু নেই,
আমারও তাতে অপমান নেই। রেস খেলি বলে এত অবিশ্বাস কর
আমায় বৌদি ?”
আর মিথ্যা কথা বলিতে শরতের বাবে না। সে ইহাতে এত
অভ্যস্ত' হইয়া গিয়াছে যে, শত অভিনয় করিয়া অম্লান বদনে মিথ্যা
বলে। কোথায় একটুও আটকায় না। পাওনাদারের হাত হইতে
এড়াইয়া চলিবার জন্য
তাহাকে এ মিথ্যার
মিথ্যার ছলনার অভিনয়
শিখিতে হইয়াছে।
বড়-বৌ যত প্ৰবীনাই হোক, এতটা ছলনা বা মিথ্যা বুঝিবার মত
ক্ষমতা তাহার ছিল না। তাই, তাহার ভুল শুধরাইয়া লইতে বড়
বৌ যেন ব্যস্ত হইয়া পড়িল। বলিল,-“না ঠাকুরপো, আমি কি
আর সত্যই বলছিলাম, তবে কিনা সনৎ-এক ছেড়ে দাও ঠাকুরপাে।
৭৪

রাণী-বো
আমি বলছিলাম কি শুক্রবারে দিনটা ভাল আছে সেদিন পাঠালে
হয় না।”
সনতের নাম শুনিয়া শরৎ মনে মনে আগুণ হইয়া উঠিয়াছিল।
কিন্তু, সে রাগ চাপিরা অনায়াসে বলিল,-“আচ্ছা তাই হবে।”
ঐ কথা বলার জন্য বড়-বৌয়ের প্রাণে ভারী লজ্জা হইয়াছিল ।
তাই এ ঘরে আসিয়া বড়-বৌ সনৎকে বলিল,-“তােমার সব ততই
সন্দেহ, অরু শুক্রবার বাপের বাড়ী যাবে তাই, গহনাগুলো পাস
করতে দিয়েছে আর তুমি কিন—আমি বলে ভারী অপ্রস্তুতে পড়ে
গেলুম।”
সনং হাসিতে হাসিতে বলিল,-“আর সবগুলো পাল্লিস করত
বলে দিলে না কেন?”
“বলে দিয়েছিই ত।” বলিয়া বড়-বৌ রাগ করিয়া চলিয়া রে :
৭৫

আজ বুধবার। শুক্রবার আসিতে আরও দুদিন বাকি। অরুণা
বাপের বাড়ী যাইবে। অযাচিতভাবে বাপের বাড়ী যাইতে তাহার
ইচ্ছা নাই। কিন্তু স্বামীর জন্য যাইতে হইবে। উপায় নাই। তাহার
পিতার মৃত্যুর পর সে একরকম বাপের বাড়ী যায় নাই বলিলেই হয়।
এক ভাই সেও অরুণাকে ভালবাসে না—অরুণা তাহা জানে।
শুক্রবার দিন বাড়ীর দোরে গাড়ী আসিয়া দাড়াইল ।
বড়-বৌ
শরৎকে বলিল,-“ঠাকুরপাে গহনাটা কেমন পাল্লিস হ’ল তা দেখতে
পেলুম না? যাক্, কিন্তু সেরার ওখান থেকে গাড়ী থামিয়ে যেন
হাতে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বাপের বাড়ী যাবে যেন শুধু হাতে
যায়। টাকা দুয়েকের সন্দেশ ও কিনে নিয়ে।”
শরং হাসিতে হাসিতে বলিল,-“সব ঠিক করে তবে যাব সেজন্যে
ভাবতে হবে না। আমি দেখে এসেছি সেরা পাল্লিস করুচে।”
বড়-বৌ আসিয়া বলিল—“সেরাদের দশাই ঐ !”
অরুণা সব শুনিতে ছিল আর ভিতরে ভিতরে লজ্জায় ঘৃণায়—
৭৬

রাণী-বে কুষ্টিত হইয়া পড়িতেছিল। সনং অফিস চলিয়া গিয়াছিল বাড়ীতে ছিল না। শরৎ আফিসের কয়েক ঘণ্টা ছুটি লইয়াছিল। নিতুকে চুমা খাইয়া অরুণা কঁদিতে কাদিতে গাড়ীতে উঠিল। বাপর বাড়ীতে যাইতে কেন যে অরুণা কঁাদিল অপরে কেহ না বুঝিলে ও শরৎ বুঝিল। বড়-বৌ ভাবিল, অরুণা তাহার भिमांद्र কঁদিতেছে। বড়-বৌয়ের নিতুর নয়নও ছল ছল করিয়া আসিল। বড়-বৌ যাবার সময় চিবুক ধরিয়া অৰুণাকে চুম্বন করিল এবং শরতকে পুনরায় গহনার কথা স্মরণ করাইয়াদিল । আর একট! বহু দিন পূৰ্বের বিদায়ের ছবি তাহার মনে পড়িল । কিছুদূর গাড়ী যাইতেই শরৎ অন্য মূৰ্ত্তি ধরিল। স্ত্রীকে বলিল, “অরু দেখ, বৌদির গহনাগুলাে খুলে রেখে যাও আমার কাছে !- যদিও তােমার ভয় হবে পাছে আমি রেস খেলে উড়িয়ে দি, তবুও রেখে যাও। কারণ তােমায় শুধু হাতে, শুধু গলায় দখলে তােমার মায়ের চাইকি দয়াও হতে পারে ; দু’খানা গহনা ও দিতে পারেন। কেমন সেই ভাল কথা না ?” অরুণা কোন উত্তর দিল না। নিজের এবং স্বামীর ছলের জন্য তাহার মন ভাল ছিল না। শরৎ এই বক্তব্য নানান ছাদে ব্যক্ত করিল। সেমিনতি করিল ; রাগ করিল ; ধৰ্ম্ম দেখাইল। অরুণ একটিও কথা না বলিয়া শেষে সকল গহনাই তাহার স্বামীর হাতে একে একে খুলিয়া দিল। এ কাৰ্য সে বহুবারই করিয়াছে—আজও --- । ৭৭

রাণী-বৌ
করিল । কেবল সে মনে মনে বলিল, এই যদি তাহার মনে ছিল
'ত, তাহার এত ছলনা করিবাব কি প্রয়ােজন ছিল।
আজ প্রথমই বােধ হয় সে স্বামীকে সত্যই ঘৃণা করিল। শরৎ
সেগুলি ভাল করিয়া বাঁধিয়া লইল। বলিল,-“রাগ করলে অরু?”
বলিয়া তাহার একটা হাত চাপিয়া ধরিল। অরুণা কঁদিয়া ফেলিল,
নীরবে অঞ্চল দিয়া চোখ মুছিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল,-
“না, রাগ করে আর কি করবাে বল ?”
বাঙ্গালী হিন্দুর ঘরে সে জন্মিয়াছে স্বামীকে দেবতা বলিয়া সে
ভাবিয়াছে—ভাল ও বাসিয়াছে। তাহার আর রাগ করিবার বলিবার
কী-না আছে ?
শরং স্ত্রীকে দুগাছি শাখা আর লােহা পরাইয়া বাপের বাড়ী
নমাইয়া দিয়া আসিল। সেখানে তাহার কি লাঞ্ছনা, কি গঞ্জনা
ভােগ ' করিতে হইল তাহা সে ভাবিল ও না। আফিসে আসিয়া
শনিবার রেসের কথা লইয়া মাতিল। বাড়ীর যা কিছু ব্যাপার
বই ভুলিয়া গেল। আফিস হইতে বাড়ী ফিরিলে, বড়-বৌ
গহনা ও সন্দেশের কথা হইতে সৰ কথা টিয় খুটিয়া জিজ্ঞাসা করিল।
শরৎ মিথ্যা উত্তর দিয়া যাইতে লাগিল। সন্ধ্যার পর সে অখিলবাবুর
বাড়ীতে আসিয়া হাজির হইল। তখন
তখন তথায় মদ চলিতেছে।
একজন সাহেব আসিয়াছিলেন—তিনি ট্রেনার। তিনি একটা টিপ
দিয়া গিয়াছেন। তাহারই আনন্দ উৎসব চলিতেছে।
৭৮

রাণী-বৌ
সকল কথা শুনিল। শরৎ সামান্য সামান্য মদ খায়।
চুমুক সেও টানিল। আজ স্ত্রী বাড়াতে নাই, রাত্রে কেহ জানিতেও
পারিবে না। এ অভ্যাস কী প্রভৃতি দুএকটা সাহেবদের সহিত
মিশিয়া তাহার হইয়াছিল।
সাহেবদের মদের মুখে টিপের কথা বেরোয় তাল। এ ট্রেনার
যাহা বলিয়া গিয়াছে তাহা ‘অপসেটের খবর। টিপটা শরতের
মনেও বেশ লাগিযাছে। শরৎ ও কাল অরো টিপ জোগাড় করিতে
পারিবে এমন ভরসাও সে দিল । অতএব ঠিক হইল কাল তাহারা
এক সঙ্গে গ্রাওে যাইবে। শরতের মনে দৃঢ় ধারণা
জন্মিল কাল
সে জিতিবেই জিতিবে।
অতএব গহনাগুলি সেরার দোকানে আসিয়া আশ্রয় লইল
এবং তাহার পরিবর্তে শরং টাকা লইয়া চলিল।
যাইয়া সেই ঠিক-করা বাজীতে সে অনেক টাকা ধরিল। রেস আরম্ভ
হইল। দড়ীর কাছে ঘোড়াগুলি আসিয়া দাড়াইল এবং দৌড়িব'র
জন্য অস্থির হইয়া উঠিল
শরতের পাশে একজন সাহেব বলিয়া উঠিল—“Ridiculous will
win-how sweats-"
শরৎ সাহেবের মুখের পানে একবার। আশ্বান্বিত চোখে
চাহিল ; এমন সময় ঘােড়া দৌড়াইল । এবং দেখিতে দেখিতে
সে ঘোড়া প্লেসের মধ্যে ও আসিতে পারিল না ।
ক্ষণকালের
৭৯

রাণী-বৌ
জন্য শরতের সব রক্ত গরম হইয়া গেল। কি করিবে কিছুই ঠিক
করিতে পারিল না। তাহার কাদিতে ইচ্ছা হইল ; তবু সে হাসিল।
নিজেকে ধিক্কার দিল। মুখ মলিন করিয়া বাড়ী ফিরি ।
এমনি করিয়া আরো এক সপ্তাহ গেল। শরৎ তবুও হারিল বৈ
জিতিল না। সে ভাবিল তাহার অদৃষ্ট খারাপ ; হারেরই তাহার পালা
পড়িয়াছে। কিন্তু রেস সম্বন্ধে একথা বলা ঠিক নয়। কারণ, শতকর
বােধ হয় নিরানব্বই জনের অদৃষ্টই এইরূপ, তাহা শরৎ জানিয়াও
সেদিন জানিল না। বিশেষতঃ বাঙ্গালীর পরাধীন ঘসা অদৃষ্টের কথা
ত দূরে থাক !
এমন করিয়া হাবিয়া হারিয়া তাহার হাতটান আসিল। কেহ
আর এখন তেমন তাহাকে ধার দিতে চায় না। অথচ, তাহাকে
সংসার চালাইতে হইবে, জুয়ার নেশার খরচ চালাইতে হইবে।
অতএব তাহাকে টানাটানি করিতে হইল। বাহিরে টানাটানি কি
করিবে সে ! তাই বাড়ীর ভিতর টানাটানি চলিল। সনৎ এই টানাটানির
কথা লইয়া খিচিমিচি করে,-শরৎ সে কথায় কাণ দেয় না। সনৎ
ট্যাট্যাক্‌ করিয়া শােনায় ,—সে নীরবে থাকে। সে কাহারও কথার
উপর কথা বলিতে পারে না। কাহারও দিকে মুখ তুলিয়া চাহিতে
সাহস করে না। সে সকলের কাছে নীচ হইয়া গিয়াছে। এমনি
করিয়া সে ভিতরে-বাহিরে নিজেকে দেওলিয়া করিয়া দিয়াছে।
সেদিন শরৎ
ও সনৎ খাইতে বসিয়াছে-বড়-বৌ অরুণাকে

রাণী-বো
আনিবার কথা বলিল। শরৎ অন্য কথা পড়িতে চেষ্টা করি ।
কিন্তু কোন ফল হইল না।
কথায় কথায় অনেক কথা হইল। সনং মেজভাইয়ের অনেক
মিথ্যা কথা সহ্য করিতেছিল। কিন্তু আর পারিল না, বলিয়া উঠিল,
“বৌদিকে কি আনবার যাে আছে—তাহলে যে সব
• শের দোকান থেকে ফিরিয়ে আতে হবে। অত টাকা তুশি
দেবে বৌদি ?”
প্রথমটা শরং আর বড়-বৌ দুজনেই স্তম্ভিত হইয়া গেল। বড়-বে
ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিল না, সনৎ কি বলিতেছে। কিন্তু রং
তাহা বুঝিল। সে কিছু বলিতে পারিল না। কেবল ভাতগুলি নিমেষে
তাহার বিষ হইয়া উঠিল।
বড়-বৌ রাগ করিয়া বলিল, “ছােট-ঠাকুর-পাে, তুমি কি বলতে
চাও ? যে-”
সনৎ সহজভাবে বলিল,-“আমি তেমন কিছু বলতে চাই না
বৌদি; আমি বলতে চাই, তােমার গহনা গুলো মেজদা বাধা দিয়েছে,
সেগুলাে না তুলে ত আর তোমার সামনে বৌদি’কে আনতে পারবে
মেজদা—এই বচি ?”
শরৎ রাগিয়া উঠিয়া বলিল,-“দেখ, সনং, যা-তা কথা বলিনি
বলছি ; অনেকদিন অনেক কথা বলেছিস্ কিছু বলিনি। অমন মিথ্যা
কথা বলিস যদি ত তাের মুখে আমি লাথি মারবাে।”
৬

রাণী-বৌ সনং কিন্তু রাগিল না। শান্তকণ্ঠে পূৰ্ববং বলিল,-“শেরা যে কতদিন হাঁটাহাঁটি করছে তার ঠিকানা আছে ? সব আমি-” শরৎ রাগিয়া উঠিয়া একটা বিশ্রী গালাগালি করয়া উঠিল। বড়- বৌ কি করিবে সে ঠিক করিতে পারিল না। শরং ন খাইয়া উঠিয়া পড়িল। সনৎ ছােট হইয়াও খুব কড়া-কড়া কয়েকটা কথা বলিয়া বসিল। তাহার রাগ বহুদিন ধরিয়া জমা হইয়াছিল। কেবল বড়- বৌয়ের মুখ চাহিয়া সে কিছু বলে নাই, আলাদা হয় নাই, সব সহ্য করিয়া আসিতে ছিল। সে তাহার দাদার এবং তাহাদের সংসারের টানাটানির কথা জানিত এবং কি জন্য হইত তাহাও জানিত ; কিন্তু তথাপি সে মুখের রা’ টি কাড়িত না। কিন্তু আজ সে নিজেকে সামলাইতে পারিল না। যে বড়বৌদি তাহার জন্য সব করিতেছে, তাহারই সর্বনাশ সে করিতেছে। অবির মিথ্যা প্রবঞ্চনা দিয়া তাহাকেই ভুলাইতেছে। একি সহাের কথা। 'সনং বড়বৌদির সামনে সেই গহনাগুলি আনিয়া ধরিয়া দিল। বলিল,“সেদিন বড়দা’র-লাইফ ইনসিওরেন্সের টাকা থেকে এগুলাে উদ্ধার করি। গােবর্ধন শেৱা, সেও বলে—“বড়বাবুর গহনা আমি কি নিতে পারি ছােটবাবু—এত সস্তায় ? আমার একটা ধৰ্ম্ম আছে ত? কত টাকা আপনাদের খেয়েছি। তার ধর্মজ্ঞান হল। আর তুমি কাকা হয়ে নিতুর সর্বনাশ কচ্চো-মুখ দেখাতে লজ্জা করে ? অমি হলে ত•••• রাণী-বো শরং রাগিয়া বলিল বটে, আর সে তাহাদের মুখ দেখাইবে না ; কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে এতটুকু হইয়া গেল। তাহার ফাকি যে এমনভাবে ধরা পড়িয়া গিয়াছে ! তাহার বি মিথ্যা যে এমন নিৰ্দররূপে উলঙ্গ মুক্তিতে বড়-বৌদি সম্মুখে প্রকাশ হইয়া পড়ি- র!ছে ! তাহার যে আর সত্যসত্যই মুখ দেখাইবার স্থান নাই। সেই রাত্রেই সে চলিয়া গেল। কোথায় গেল কে জানে! বড় বৌদি এই বিপর্যয়ের জন্য সত্যই প্রস্তুত ছিল না। সেই যে বড়-বো নির্জীব হইয়া শুইয়া পড়িয়াছিল আর উঠিল না—আর কিছু বলিবার বা শরৎকে বাধা দিবার যেন তাহার ইচ্ছাই রহিল না ! কেবল তাহার প্রাণে একটা কান্না উঠিল—“ওগাে আমায় টেনে নাও তুমি! আমি যে আর পারি না।” কিন্তু পারি না বলিলে ত আর সংসারে পার পাওয়া যায় না। অতএব পারিতেই হইল। আবার নিতুকে সনংকে লইয়া সংসার চালাইতে হইল। গহনার জন্য যত না হোক অরুণার জন্য তাহার প্রাণ কঁদিয়া কঁদিয়া উঠিতে লাগিল। বাঙ্গালী বধূর যে নীরবে সহ-করা কষ্ট যে, কত কঠিন তা সে মনে বুঝিত, তাই সে তাহার জন্য কাদিল, খুবই কঁদিল। কিন্তু ছোটকে সনৎকে কিছু বলিতে সাহস করিল না। কারণ, তাহার সহিত শরতের যে ব্যাপার হইয়া গিয়াছে তাহাতে যে তাহাদের হাতাহাতি রক্তারক্তি হয় নাই এই রক্ষা—এই গুরুল !

রাণী-বো বসিল। এমনি না খোজ লইয়া দুই মাস কাটিল। এই দুইমাসে সনৎ- দের সংসার সাভারে চলিল। কিন্তু শরতের সংসার অচল হইয়। আসিল। অখিলবাবুর কাছে সে দেনার দায়ে মঙ্গ। বিক্রয় করিয়া মনের জ্বালায়, তাগিদার জ্বালায় চারিদিক হইতে সে অস্থির হইয়া পড়িল। এবং সেই অস্থির মনকে স্থির রাখিবার জন্য একটু করিয়া মদ খাইতে লাগিল। এবং অখিলবাবু। রক্ষিতার গান বাজনা ও নাচ শুনিয়া মাঝে মাঝে সময় কাটাইতে লাগিল। ইহাতে কিছুকালের জন্য হয় ত, তাহার মনের প্রাণের জ্বালা' স্থির হইত। কিন্তু অরুণার জ্বালা দ্বিগুণ বাড়িল। কেন, সে ত পাপ করে নাই ; স্বামীকে দেবতার নত, স্বামীর মত সে-ত ভালবাসিয়াছে। তাহার ধৰ্ম্ম বলিতে যাহা সে শিখিয়াছে বুঝিয়াছে তাহা ত পালন করিয়াছে ! তবে ?—এমন কথা সে ভাবিত।

দশ সেদিন সনং লোহার সিন্দুকে বড়দা’র জীবন বীমার অবশিষ্ট টাকা গুলি এবং গহনাগুলি তুলিয়া রাখিতে গিয়া যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার প্রাণ কাপিয়া উঠিল। সিন্দুকে যা-কিছু দামী জিনিষ এবং হন ছিল, তা প্রায় সব নিঃশেষিত হইয়াছে। কে ইহা লইয়াছে তাহা তাহার বুঝিতে বাকি রহিল না। ক্ষণকাল সিন্দুকের নিকট দাড়াইয়া থাকিয়া রাগে সে ফুলিতে লাগিল। চক্ষে জল আসিয়া পড়িল। টাকা রাখিবে কি । বড়-বৌ, গহনা ক'খানি কোথায় রাখিতে, কি হইবে কি করিতে হইবে বলিতে আসিয়া-তাহার স্নেহের দেবরের এমন অবস্থা দেখিয়া থমকিয়া দাড়াইল। ক্ষণকাল তেমন-কিছুই ঝিতে পারিল না। তারপর পর সব বুঝিল।-যাহার হাতে সংসার ছিল সেই সংসারকে অরণ্য করিয়া দিয়াছে ! সিন্দুকের চাবি তাহার কাছেই থাকিত, কিন্তু তাহার আঁচলের খেটে ত আর পাকিত না। যেখানে থাকিত সবাই জানিত। কখন কে লইতেছে রাখিতেছে তাহার খোঁজ লইবে কে ? আর লইবেই বা কেন? কেহ পর রাণী-বৌ ; লােক ত আর বাড়ীতে বাস করিত না! বড়-বৌয়ের দুঃখ বাজিল কেবল ঠাকুর-পো চুরি করিয়া লইয়াছে, সে চোর হইয়াছে,আর তাহার আদরের স্নেহের অরুণা তাহাকে এসব কথা লুকাইয়াছে- এইজন্য ! কিন্তু সত্যই অরুণা এ ব্যাপার জানিত না। এদিকে কয়েকদিন শরৎ মেসে বন্ধুর চার্জে খাইল এবং তথায় থাকিল। আফস করিল। তারপর ছোট একটা ভাঙ্গা বাড়ী ভাড়া করিয়া অরুণাকে নিয়া বসবাস করিতে লাগিল। সে সব ব্যাপার শুনিল, কঁাদিল। অবশ্য শরৎ সব দোষটা তার ছোট ভায়েরই উপর চাপাইয়া সেদিনের ব্যাপারটা অরুণার কাছে বিবৃত করিয়াছিল ; অরণ। ভাবিল, কেন-মরতে সে বাপের বাড়ী গিয়াছিল। ১লা জানুয়ারী। ইংরাজদের আজ আনন্দের দিন। পরাধীন বাঙ্গালারও উৎসবের সীমা নাই। আজ ছুটী, আফিস, কলেজ ইত্যাদি সব বন্ধ। গড়েমাঠে, ‘ফ্রান্সি ফোরে জুয়ার মেলা বসিয়াছে। ইংরাজ বাঙ্গালী, দুয়েরই যেন আজ নববর্ষ, কোথাও যেন একটুও পার্থক্য নাই। সাহেবরা মদ খাইয়াছে, রমণীর সঙ্গে হাসি আলাপ করি- তেছে। বড়লােক বাঙ্গালী বেশ্যা লইয়া মদখাইয়া ফুর্তি করিবে বলিয়া আজ আঁচিয়া বসিয়া আছে। রেসের অাজ একটা মহা উৎসব। সারা বৎসরের সেথা নাকি আজ লা ট্রাই হইবে। অন্যদিন যেমন শরৎ রেসে যায় অজি তেমনই ঠাকুর-দেবতাকে মনে মনে স্মরণ করিয়া সেও রেসাভিমুখে গমন করিল ! আজ তাহার রাণী-বো প্রাণে যেন সূৰ্ত্তি নাই। সে হারিয়া হারিয়া কার হইয়া পড়িয়াছে অজি হারিলে তাকে মরিতে হইবে। সে ভাবিতে চাহিল না হারিলে তাহার কি হইবে ! মনে প্রাণে আনন্দকে, শান্তিকে আজ সে যেন-তেন প্রকারেণ ফুটাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিল। ট্রামে যাইতে যাইতে হােয়াইট ওয়ে লেড লয়ের ঘড়ীটার দিকে সে চাহিল না, ভিক্টোরির মেমোরিয়ালের চুড়োটার দিকেও সে মুখ ফিরাইল না। কবে নাকি সে ইহা দেখিয়া হারিয়াছিল। গেটের সম্মুখে সে খানিকক্ষণ দাড়াইল। আশা করিল—অনিলের সহিত দেখা করিবে; কারণ এইখানে দাঁড়াইয়া যে-দিন অনিলের সঙ্গে সে দেখা করিয়াছে—সেই দিনই সে জিতিয়াছে। আজ অনেকের সঙ্গে দেখা হইবার পর অনিলের সঙ্গেও দেখা হইল। মনটা একটু চাঙ্গা হইল। প্রথম বাজী হরিল। মনটা ভার হইয়া পড়িল। দ্বিতীয় বাজী জিতিল। মনটা প্রঃ হইয়া উঠিল। প্রথম বাজীর কথা ভুলিয়া গেল। তৃতীয় বাজীতে তেমন হার-জিত কিছুই হইল না। . চতুর্থ- বাজীটা জোরের বাজী। একটা আপসেটের খবর! এই not-much ঘােড়াটার জন্যে প্রাণটা আজ ক’দিন ধরিয়া কেবল not much, not much করিয়াছে। সেই not muchএর রেস এই চতুর্থ বাজীটা। এই বাজীতেই তাহার ভাগ্য পরীক্ষা হইবে । যদি হারে ত আর সে রেস খেলা খেলিবে না। আর যদি জিত হয় ত সকলের দেনা সে শােধ করিবে, গহনা উদ্ধার করিবে এবং আরাে কত কি করিবে বলিয়া সে ৮৭

রাণী-বৌ
ভাবিয়া আসিয়াছে। সে জানিয়ছে, সে জিতিবেই । অতএব আচে
বৎসরটা তার সুখেই কাটিবে।
রেসের দড়ি চাবুকের মতই সড়াৎ করিয়া লাফাইয়া উঠিয়া
পড়িল। তীরের মত, বিদুৎবেগে ঘোড়াগুলি সেই মুহূর্তেই ছুটিতে
আরম্ভ করিল। দেখিতে দেখিতে থাড় এনফ্রোসার সেকেণ্ড
ইনফ্রোসার হইতে একটা ভীষণ মরণের আর্তনাদ নিমিষে উঠিয়া
নিমিষে পড়িয়া গেল। দুএকজনের হাসি হয়ত থামিল না, কিন্তু
অধিকাংশের হাসি-উল্লাস নিভাইয়া গেল। ঘোড়ার তীরের মত
বেগ অনেকের তীরের মতই বুকে বিধিল । একটা মুহূর্তে কি যেন
কি হইয়া গেল। কি হইল, কি হইল না; কি রহিল, কি রহিল
; কিছুই যেন বুঝা গেল না। আর কাহার কাছে সেই মুহূর্ত
অশুভ হইল, কি অশুভ হইল তাহা লইয়া আমাদের প্রয়ােজন
তেমন নাই, কেবল শরৎ বুঝিল পৃথিবী আজ সত্যই ঘুরিতেছে।
সে কেবল টিকিটগুলি হাতে লইয়া ফটকের বাহির হইয়া আসিল ;
শেষের রেসগুলি আর খেলিল না; খেলিবার টাকাও ছিল না।'
জিতু, বিধু ও পান্নালাল ‘রেসেস’ এ চড়িল। তিনজনই
হরিয়াছে। রেসেসে যাহারাই যাইতেছে অনেকেই হারিয়াছে। বিধু
উঠিয়াই বলিল—“জিতু, পান্নালাল কিহে টাকে বাসের ভাড়াটা
আছে ত?”
বাসস্থ অনেকেরই মলিন মুখে হাসি আসিল। পান্নালাল রসিকতাটা
৮৮

রাণী-বৌ
আরো একটু রং ফলাইয়া বলিল, “বাবা এখনও ৩ সিদ্ধির দশা
আমার আসে নি, এখনও আমি সাধনা মার্গে !”
জিতু বলিল-“সে আবার কি রকম?”
“কি রকম?—সেদিন বাসের একজন ছিলেন, এই বিলাতী
সভ্যতা রেস্ আমাদের মাটি করলে। আমি বল্লম, কেন মশাই
এ যুগে ইংরাজ রাজত্বে বাস করতে হবে তাদের অধীনে অথচ
হিন্দুত্বও বজায় রাখতে হবে। তখন এ রেস্ না পেলে চলবে
কেন মশায় ? তিনি বললেন-'আপনার এ বাজে তর্ক। আমি
উত্তর দিলুম, বাজে একদম নয়—আমার reason আছে, না হলে
বলি না। বলে আমি বললুম—আমাদের আগেকার ঋষিদের প্রধান
‘মটো’ ছিল ‘plain living and high thinking' এই না? এ
ইংরাজ-রাজত্ব,-একটু বদলে অমির সাধনা করচি high thinking
and plain living ; বাড়ী থেকে যখন বেরুই ভাবি মােটর করবে বড়-
লােক হ’ব, কত কি করবাে,high thinking—আর বেসে হেরে যখন
যাই, গায়ে পায়ে এক গাদা ধূলো আর এক পয়সা মটর ভাজা চিবুতে
চিবুতে বাড়ীতে গিয়ে পরিবার যখন নিরস্তু উপবাস, তখন plain living
কেমন কি না? আমাদের সাধনা পূর্ণ হয় নি তাই এখনও বাস
চড় চি !”
সকলেই হাসিয়া উঠিল। বাসের কালেক্টারও। বিধু হাসিতে
হাসিতে বলিল, “তুই থাম্, তুই থাম্।”

রাণী-বো পান্নালাল হাসিয়া বলিল, “থাম থাম কি ? সবাই জুয়ারী বেসাড়া বলে—আমাদের প্রাণে রাগ হয় না। 'অ'নাদের সাধনা বুঝে কে ? একজন বলিল,-“আরে মশায় সকলেই কি রেসে হারে ? ভবানী পুরের লোকেরাত মশা- একথা রেসড়া মাত্রেই শুনিয়াছে অবশ্য দেখিয়াছে কম লোকে। বিধু কপার মাঝেই বলিয়া উঠিল—“ঐ পাপেই অৰ্য বৰ্ত্ত গেল !” পান্নালাল বলিল,-“জানি মশায়, তাইজন্যই কি Improve ment Trust তাড়াতাড়ি ও ধালের রাস্তাগুলো তৈয়ার করে দিলে,- সবাইত বড়লোক হবে নাকি ? এমন সময় বাস, থামিল। সকলে নামিয়া পড়িল । এদিকে শরং হারার পর যা কিছু পয়লা ছিল তাহার দ্বারা মন কিনিল, ভরপুর করিয়া খাইল। মাঠেরই একটা নির্জন স্থানে কিছুক্ষণ বসিয়া চৌরঙ্গীর বড় বড় বাড়ীগুলির দিকে লােভী ছেলের মত তাকাইয়া রহিল। নেশা জমিয়া আসিতে লাগিল তারপর গাড়ী ভাড়া করিয়া বাড়ীরদিকে রওনা হইল । অত নেশাতেও সে আগামী কল্য অফিসের ব্যাপার ভাবিতে লাগিল। যে ভাবনার জন্য মদ পান করিল—সে ভাবনা তাহার গেল না। বাড়ীতে গিয়া কিছু খইল না। তেমন কিছু খাইবারও ছিল না। কোন কথা স্ত্রীর সঙ্গে কহিল না। বিছানায় অবশ হইয়া শুইয়া পড়িল। এ মানুষটি

রাণী-বে।
জীবিত কি মৃত তাহা যেন বুঝিবার উপায় ও রহিল না। কিছুক্ষণ
মধ্যে সে ঘুমাইয়া পড়িল।
অরুণা কোন কথা কহিল না। কেবল পাথরের মূর্তির মত
নিশ্চল হইয়া শয্যার পাশে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। রাণিত
বেদনা তাহার অন্তরে অাসিয়া দাপাদাপি করতে লাগিল ।
নিরুপায়ের মত সহ্য করিতে লাগিল। দুঃ- পাইলে সে কঁাদি::
শিখিয়াছিল—তাই মুখ বুজিয়া কঁদিতে লাগল—সেই হকার
মধ্যে। কেহ জানিল না, কিল ন', শুনিল না, তেল ::

এগার ভােরের আলো সবে মাত্র বাহির হইয়াছে। খনও সম্পূর্ণ অন্ধকার যায় নাই। অরণা স্বামীর পাশে আধ-বসা অব-শােয়া অবস্থায় তন্দ্রাভিভূত হইয়া পড়িয়া আছে। এমন সময়ে শরতের ঘুম ভাঙ্গিয়া লে। সঙ্গে সঙ্গে গতকল্যের একটা বেদনা প্রাণে তহার আঘাত করিল। তাহারই অব্যক্ত গুরুভারে তাহার প্রাণ টনটন করিয়া উঠিল। সে আপনা হইতেই বলিয়া উঠিল—“মাগাে—উঃ ।” অরুণা এস্ত জাগিয়া উঠিল। দুজনেই জাগিল, উঠিয়া বসিল ; কিন্তু কোন কথাই হইল না। যথাসময়ে স্নানাহার সারিয়া শরৎ আফিসে গেল। আজ যেন তাহার পা আর চলিতে চাহিতেছে না। যাইবার পূর্ব হইতেই তাহার একটা গােপন শঙ্কা যেন বুকের ভিতরে মাথা চাড়া দিয়া উঠিতেছিল। মলিন মুখে নিজের সিটে গিয়া বসিল। কাহার সহিত কোন কথা বলিল না। কে একজন বলিল,-“কি শরৎবাবু আপনি যে এক- দিনে শুকিয়ে গেছেন—আপনার কি খুব অসুখ-বিসুখ করেছিল নাকি ?” “না এমনি।” বলিয়া নিজের মলিন চাদরটি নিজের সিটে ৯২

রাণী-বো
?
বঁধিয়। সে কাজে মন দিতে চেষ্টা করিল। দু' একজন
দেখিয়া মুখ চাওয়া-চাহি করিতে লাগিল।
সুধীর পাশে এক টেবিলে বসে নিম্নম্বরে তাহকে বলিল,-
“হঠাৎ শনিবার উপেনবাবু, Cash মেলালেন কেন জানিনা।
টাকা Short, আপনার নামে চার্জ......"
“রং কোন রকমে বলিল, সাহেব জানতে পেরেছেন ?”
“তা জানি না; নরেশ বলে বড় সাহেবকে কে লাগিয়েছে,
যা হোক এইবেলা উপেনবাবুর পায়ে হাতে ধরে...•••
শরৎ স্থির অচঞ্চল নেত্রে চেয়ারের হাতল ধরিয়া কেবল কিছুক্ষ
চাহিয়া রহিল। তাহার কণ্ঠ হইতে আর দ্বিতীয় কথা বাহির হইল
। মুহূর্তের মধ্যে তাহার সেই স্থির নেত্রের সামনে জেল, পুলিস,
হাতকড়ি, আফিসের ভিতর-বাহিরের লােকের ঘুণার দৃষ্টি, স্ত্রীর করুণ
নিরুপায় চাহনি প্রভৃতি সকল আশু অশুভ ঘটনা বায়স্কোপের ছবির
মত চলিয়া গেল। এবং সেই স্থানেই সে মূর্হিত হইয়া পড়িল ।
অফিসের অপরাপর বাবুরা সব ব্যস্ত হইয়া পড়িল।
করিয়া জলের ঝাপটা দিয়া কিছুক্ষণ পরে তাহার চেতনা আনিল ।
সকলে যে যাহার সিটে চলিয়া গেল। উপেনবাবুকে শরৎ সব কথা
খুলিয়া বলিল এবং কঁদিয়া ফেলিল। অনেক ধরিয়া করিয়া কেবল
মাত্র দুইদিনের জন্য টাকাটা জোগাড় করিয়া দিবার সময় পাই ।
সাহেব সময় দিবে না, উপেন বাবু এবং ছােট সাহেব অনেক ধরিয়া
॥

রাণী-বৌ
করিয়া সময় দেওয়াইল। ছােট সাহেব শরৎকে ভালবাসিত, তাই
জামিনও হইল।
শৱং অফিস হইতে কোনরকমে খালাস পাইয়া বাড়ী আসিয়া
মুখ লুকাইয়া বাচিল। তাহার মনে হইল পৃথিবীর সকলেই যেন
তাহাকে বিদ্রুপ করিতেছে। তাহার গড়াইবার কোথ’ ও স্থান নাই
কেহ তাহার আত্মীয় নাই ; আপনার বলিবার কেহ নাই। সকলের
কাছেই সে ঋণী ! সকলের কাছেই আজ সে জুয়াড় দুয়াচোর!
শরৎকে দেখিয়া অরুণা আজ ভয় পাইল ; কঁাদিয়া ফেলিল।
দুজনে হাউ হাউ করিয়া ছেলে মানুষের মত অনেকক্ষণ কঁাদিল।
শরৎ একে একে সকল ব্যাপার স্ত্রীকে বলিল,-রপর কঁদিতে
দিতে নিরুপায় শিশুর মত বলিল-“এখন কি করি উপায় অরু?
শেষে ভদ্রলােকের ছেলে হয়ে চুরির দায়ে জেলে যাব ?
এতটা
ভগবান অামার আদষ্ট কি লিখেছেন ?"
অরু কেবল কাদিতে লাগিল আর মনে-প্রাণে দয়াময়ের নাম
রিয়া ডাকিতে লাগিল। শরৎ ও আজ সেই অব্যক্ত অ-দেখা লজ্জা-
নিবারণের নাম স্মরণ লইল। এমন সে কোনদিনই ডাকে নাই।
রোজই ত্রিসন্ধ্যা তাহাকে স্মরণ করিয়াছে, কিন্তু এমনটা ডাকা যেন
তার কোন দিনই হয় নাই।
অনেক ভাবিয়া-চিন্তি, কঁাদিয়া-কাটিয়া শেষে অরুণা বলিল,
“তুমি একখানা গাড়ী ডেকে আন আমি এক্ষুনি বড়দি’র কাছে
৯৪

রাণী-বৌ
যাই, বড়দি’র যদি টাকা থাকে ত আমায় কিছুতেই পায়ে ঠেতে
পারবে না।-ওগাে তুমি একটু চুপ করতকে চেন না—তুমি
অন গাড়ী ডেকে ? আমি যাব।”
“না অরু, ছোট ভায়ের কাছে হাত পাতার চেয়ে জেলে যাওয়া
ভাল!-না না, সে আমি পারবো না।”
অরুণা বড় ভাসুরের কথা স্মরণ করাইয়া দিল। অনেক কান্না-
কাটির পর শেষে যাওয়াই ঠিক হইল।
একখানি গাড়ী আসিয়া সনদের বাড়ীর দ্বারে দাড়াইল। অবশ্য
একা নামিয়া বাড়ীর ভিতর গেল। শরৎ গাড়ীর ভিতর রহিল ।
নীচু হইতে ডাকিল—“দিদি !—দিদি।”
একটা অতি পরিচিত করুণ মধুর কণ্ঠস্বর তীরের মত আসিয়া
এড়-বৌয়ের কাণে বিধিল, প্রাণে বিধিল। তারপর অরুণাকে দেখিতে
পাইয়া উচ্ছ্বসিত স্বরে বলিল,-“কে অরু, অরু! আয় আয়, এতদিন
পরে মনে পড়েছে তোর দিদিকে ? ওদের ভয়ে ভয়ে ঝগড়া হয়েছে
তা আমার উপর রাগ করে থাকতে পারলি এতদিন?”
বড়-বৌ চোখ মুছিল। জিজ্ঞাসা করিল—“আর কে এসেছে-
সঙ্গে-রে ?”
“ও—এসে রেখে দিয়ে গেছে।”
“একবার দাড়ালেও না, দেখলে না যে তার ছােট ভাই
যায়-যায়—এখনও রাগ ?”
০

রাণী-বৌ
অরু শঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিল-“ঠাকুর-পোর কি হয়েছে ?”
“চল না রে—অরু—?” বলিয়া বড়-বৌ কঁদিয়া ফেলি।
দুজনে উপরে গেল। অরুণা দেখিতে পাইল কে একজন
রােগীর মাথায় বরফ ধরিয়া বসিয়া আছে। রোগী আচ্ছন্নের মত
পড়িয়া আছে। এমন সময় নিতু আসিয়া সংবাদ দিল যে সে গাড়ীতে
তাহার কাকাবাবুকে দেখিতে পাইয়াছে। গাড়ীটা বাড়ীর দরজারই
কিছু দূরে আছে। নিতুর এই কণ্ঠস্বরে সনং সজাগ হইয়া উঠিল।
চোখ না মেলিয়া বলিল, নিতু কে আছে রেবল ?”
“মেজ-কাকাবাবু!”
“নিয়ে আয় না তাকে হাতে পায়ে ধরে—ওরে অ-নিতু। তুই
যা চাইবি তাই দেব তোকে।”
“মেজ কাকীমা এসেছে কাকাবাবু—চেয়ে দেখ না তুমি।”
সৎ নিষ্প্রভ নয়ন দু’টি দিয়া দেখিল। চিনিতে পারিয়া বলিল,
“মেজ-বৌদি, মেজদাকে একবার ডেকে অনিবল যে আর সনং
তার অবাধ্য হবে না। সে বড়-দা’র কথা রাখবে।”
“তুমি অত ব্যস্ত হয়ো না ঠাকুর-পো, তিনি
আসছেন—তিনি
আসবেন। তোমাদের কাছে আমি ভিক্ষা নিতে এসেছি।” বলিয়া
সে একটু থামল এবং একটু ইতস্ততঃ করিল। তারপর কাদিতে দিতে
বলিতে লাগিল—“তােমার দাদা অফিসের টাকা নিয়ে বেস খেলে-
ছিলাে—আজ তার জেল হবে। তুমি বঁাচাও ঠাকুর-পো, তুমি

রাণী-বে। বাঁচাও ঠাকুর-পো; তােমরা বৈ যে আমার আপনার বলবার আর কেউ নেই।” বলিতে বলিতে তাহার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া আসিল। কয়েক ফোটা অশ্রু সনতের নয়ন হইতে গড়াইয়া পড়িল। ধীরে ধীরে বলিল,-“নিয়ে এস মেজদাকে এখানে। আমি যাবার সময় মাপ চেয়ে যাই, আর নিতুকে, বৌদিকে তার হাতে দিয়ে যাই। শেষ কথা রেখে যাই—আন—আননা।” অনেক দিন পরে আবার দুই ভাইয়ে দেখা হইল। এমন অবস্থা তখন দুজনকার যে, কেহ আর পূৰ্ব্ব ক্রোধের বা সেই কদৰ্য ঘটনার কথা মনে আনিতে পারিল না। দুঃখের পরশ সে কথা ভুলাইয়া দিল । শরৎকে বা অরুণাকে অনুরােধ করিতে হইল না—টাকার জন্য । ভাই থাকিতে ভাই জেলে যাইবে। একথা কি সহ্য হয় । বড় ভাই জীবিত থাকিলে কি সহ্য করিতেন? কখনই না-কখনই না, একথা বড়-বৌ আর সনতের বুকে যুগপৎ জাগিয়া উঠিল । যে, গহনার জন্য, যে টাকার জন্য ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ হইয়াছিল, আজ সেই সব গহনা-টাকা-কড়ি সব শরতের হাতে সনং তুলিয়া দিল। বড় ভাইয়ের জীবন বীমার টাকায় সে-যাত্ৰা শরৎ জেলের হাত হইতে বাচিয়া গেল ; কিন্তু বাঙ্গালীর একমাত্র আশার ধন, ভাল- বাসার ধন, চাকুরীটি সে হারাইল।

বার
এ নতুন
য়াত্রি হইলে সে বড় ভাইয়ের বাড়ীতে গেল। কাহাকে
কিছু বলিল না। কেবল সে যে মুক্তি পাইছে এই কথাই
সকলে
জ্যনিল । পরদিন সে আফিস্ গোল না ; বলিল সনতের
অসুখের জন্য সে ছুটি লইয়াছে। সকলেই মনে মনে তৃপ্ত হইল।
সনতের পাশে বসিয়া তাহার সেবা করিতে লাগিল। ঔষধ, পথ্য,
ডাক্তার-ডাকা প্রতি সকল কাজই সে করিতে লাল।
কাজে, তাহার দু একদিন বেশ কাটিয়া গেল।
একদিন সনং বলিল,-“দাদা ডাক্তারে যাই বলুক, আমি বুঝতে
পার,ি আমি আর বেদিন নয় । তোমাকে আমি অনেক কষ্ট
দিয়েছি, অনেক তোমার প্রতি দুর্ব্যবহার করেছি—সে সব ভুলে গিয়ে
এখানে থাক। এবার থেকে নিতুর সমস্ত ভার তােমার উপর পড়বে
তা যেন ভাল করে নিয়ে ! স্বর্গে বড়দাকে আর যেন কষ্ট দিও
ন?” বলিয়া .খ ছয় পুনরায় সে বলিতে লাগিল—“অার বেল্ট।
েদও, যা ছে—গেছে, তা আর ফিরবে না! তাতে দুঃখ

রাণী-বৌ
করে লাভ নেই। ইংরাজদের ভাল নিলে হয়ত কোন দিন ভাল
হতে পরা যেতে পারে; কিন্তু এমন সর্বনাশা সভ্যতার হাত হ'তে
নিজেকে বাচাও আর আমাদের মত ছোট ছোট স্তদের প্রাণও
5াও তোমার পায়ে ধরচি।” বলিতে বলিতে নে দিয়া ফেলিল।
শরং মাখা হেট করিয়া মনে মনে কি ভাবিতে লাগিল কে
জানে! একটি কথার উত্তরও দিল না। ভাইয়ে ভাইয়ে দুঃখ-কষ্টের কথা
কহিয়া এমনি আরো দিন কতক কাটিল । কিন্তু মতের অসুখ
কমিতে চাহিল না।
এ কয়দিন সে এ বাড়ীর বাহির নাড়ায় নাই। আজ সং
একটু ভাল আছে। শরৎ নীচের বৈঠকখানায় বসিয়া কি এক খান।
পুরাতন মাসিক পত্রিকা পড়িতেছে। এমন সময়
এমন সময় অখিলবাবু স্বয়ং
নোটার করিয়া আসিয়া হাজির হইলেন। জানালার সম্মুখে কাখানি
দাড়াইল। শরতের সঙ্গে দেখা হইয়া গেল। সে অত্যন্ত সঙ্কুচিত
হইয়া পড়িল। তারপর তাহাদের কথা হইল এই যে, তাহ'র স্ত্রী শিব
প্রতি। করিয়াছে, সেইজন্য তাহার বিশেষ অনুরোধ মে অরুণাকে
লইয়া যাইতে হইবে। আজ নইলে পরশু সকল স হবেই আসিবে,
শরৎ তাহার ভাইয়ের অসুখের কথা জানাইল। ওরও ছুিতেই তাহার
বন্ধু বনী পাওনাদার শুনলেন না। বাড়ী গয়; এদিকে রং
অরুণা কিছুতেই রাজী হইল না। বাড়ীতে এমন অসুখ
কেন মুখে ঘরের বৌ অমোদ করিতে যাইবে। কিন্তু এদিকে

রাণী-বো
অখিলকেও চটাইতে শরতের সাহস হইতেছে না। সাত-পাঁচ ভাবিয়া
শরৎ অরুণাকে পাইতে বাধ্য করাইল। সঙ্গে কেহ যাইবার লোক নাই ;
যাইলে বাড়ীর কাজ এখন চলিবে কিরূপে? অতএব বন্ধুর সঙ্গে
যাইবে তাহাতে এমন দোমই বা কি! এমন ত কতবার গিয়াছে
ইত্যাদি কথা ভাবিয়া শরং একা যাইবার সম্মতি দিল।
অরুণা বাহির হইয়াছে তাহার অর্ধঘণ্টা পরে শরতের ডাক
পড়িল উপরে। উপরে গিয়া শরৎ দেখিল সনং হাপাইতেছে। শরৎ
ডাক্তার ডাকিবার জন্য যাইতেছে দেখিয়া সনং ইসারায় মানা করিল।
কথা কহিতে পারিল না। কিছুক্ষণ পরে অতি কষ্টে বলিল,-“মেজদ।
এদের নিয়ে না পার ত—দেশে—ফিরে--সে ও! মা—আমাদের যেতে
অনেক বার চিঠি লিখেছেন-আমার হ’ল—না—তুমি—যেও।”
শরৎ কথা কহিতে মানা করিল; কিন্তু কোন ফল ফলিল না।
সনং দম লইয়া পুনরায় বলিল,-“মনে রেখ মেজদা,
অনি—
বড়দার কাছে গিয়ে-দেন না—শুনি—লােকে—তােমায়—বলে—
জুয়াড়ী,—আর মায়ের কোলে যেও, দেশে—ফিরে যেও—এ সহুরে
সভ্যতা-”
স্বর আর ফুটিল না। কত কি বলিবার চেষ্টা করিল বলিতে
পারিল না। বাড়ীতে হাহাকার উঠিল। বাড়ীর সকলের আকুল
ক্রন্দন সনতের কণ্ঠের স্বর ফিরাইতে পারিল না, তাহাকেও ফিরাইতে
পারিল না। অরুণা তখন কি করিতেছে কে জানে! তাহাকে
১০০

রাণী-বৌ ডাকিবার জন্য কাহাকেও পাঠান হইল না। অরুণা তাহাকে শেষ দেখা দেখিতে পাইল না। রাত্রি কত কে জানে! হয়ত বেশী নয় ; তথাপি এ বাড়ীর সব নিস্তব্ধ। বাহিরের ঘরে শরৎ কঁদিতেছে কি গুম হইয়া বসিয়া আছে—কে জানে! শ্মশানে কোন লোকের পাল্লায় পড়িয়া সে মদ খাইয়া বাহিরের ঘরে একাকী বসিয়া আছে। বাড়ীর ভিতর সকলেই একা একা কাদিতেছে। এমন সময় একখানা মােটর গাড়ী আন্নিা পামিল। অরুণা গাড়ী হইতে নাবিল । সে জানিত না তাহার দেবরের মৃত্যু হইয়াছে। সম্মুখে তাহার স্বামীকে দেখিয়া সে কঁদিয়া ফেলিল। সে পায়ে লুটাইয়া পড়িল । শরৎ অবাক হইয়া গেল। কিন্তু মদের মুখেও সে বুঝিতে পারিল এ কান্না তাহার ভ্রাতার মৃত্যু জনিত কান্না নয়। স্ত্রীর একান্না স্বামী বুঝিল। তারপর জড়িতস্বরে সে কি বলিল, কি না বলিল, কিছুই তেমন বুঝা গেল না। যে ঝি দিতে আসিয়াছিল সে হতভম্ব হইয়া গিয়াছিল। ট্যাক্সিওয়ালা বাহিরে”ডাক দিতে ছিল। স্ত্রীর এই ক্রন্দন এবং অধা-বলায় আধা-না-বলায় স্বামী কি বুঝিল কে জানে! সে স্ত্রীকে ঠেলিয়া দিয়া সেই ট্যাক্সিতে করিয়া সে অখিলবাবুর বাড়ীতে গেল। বৈঠকখানায় অখিলবাবু নাই, বন্ধুরা আমােদ আলাদ করিতেছে। বাড়ীর ভিতর হইতে চাকর আসিয়া সংবাদ দিল বাবু কোথায় বাহির হইয়া গিয়াছেন। শরতের ১০১

রাণী-বো
মূর্তি দেখিয়া সকলে ভয়ে স্তম্ভিত হইয়া গেল। শরং সকল বন্ধুদের
সামনে চীৎকার করিয়া বলিল,-“গরীব ঋণী বলে কি আমি ভদ
নই,আমার মান ইজ্জং নেই,আজ অখিল যদি আমার সামনে
পড়তো ত জুতিয়ে লাগিয়ে তার মুখ ভেঙ্গে দিতাম ছােট লোক
ছোট লোক—মেয়ে মানুষের
আপনার বন্ধুবান্ধবরা মুখ টিপিয়া ধরিল। কেহ কেহ বলিল-“কি
কর শরৎ, পাঁচজন এসেছে” শরং তাহাদের হাত ছাইয়া লইয়া
বলিল-“পাচ’শ বার বলবে সে ছােট লােকটার এত অস্পর্ধা
জুতিয়ে---
পাঁচজনে ধরিয়া তাহাকে ট্যাক্সিতে উঠাইয়া দিল । শরং রাতে।
ফুলিতে দলিত গালাগালি করিতে করিতে চলিয়া গেল। পাঁচজন
বুঝিল, শরৎ মাতাল হইয়া এরূপ করিতেছে।

* * APASWA Ex'. 1, / M এ ঘটনার অল্পদিন পরেই অখিলবাবুর মােনাহেবদল এবং "- ওয়ালার লােক পুলিসের এবং কোটের সাহায্যে শরতের বাস তালা ভাঙ্গিয়াও যখন তেমন কিছুই পাইল না, কেবল একখান ৭ পাইল, তখন সেই পত্ৰখানা লইয়াই বন্ধুমহলে খুব আলোচনা হতে লাগিল। পত্রে লেখা ছিল- যিনি এই পত্রখানি পড়িবেন তিনিই আমার গুরুজন, নমস্য। অতএব প্রণাম হই। বড় ব্যথায় এই চিঠিপানি লিখিতেছি। যার হাতে ইহা পড়ি: তিনি যেন ছিড়িয়া না ফেলেন। ইহার প্রত্যেক কথা সত্য। স্বচক্ষে যাহা দেখিয়াছি, উপলব্ধি করিয়াছি তাহাই লিখিতেছি। তাই ছিড়িয়া ফেলিতে নিবারণ করিতেছি। এ চিঠি পড়িবেন, পড়িয়- বাঙ্গালীকে জানাইবেন আমার ভাই-দাদা-বােন সকলকে জানাইবেন , কেমন করিয়া তাহাদেরই এক ভাই এই রেসের জুয়ায় পড়িয়া সর্বস্বান্ত হইয়াছে। শুধু বিত্তহীন নয়, সৰ্ব্বস্বান্ত হইয়াছে, মান সন্ত্রম সব, মনুষ্যত্বের যত কিছু গৌরবের জিনিষ সব সে খোওয়াইয়ছে। প্রাচ্য সভ্যতার এই যে কি নিদারুণ খেলা । এ খেলায় মা মরে না। কেবল চিতার আগুনে পুড়িতে থাকে। ৫। বিধবা হ রাণী-বৌ । , কিন্তু বিধবার সমস্ত জ্বালা তাহাকে সহ্য করিতে হয়। পুত্র পিতৃহীন হয় না, কিন্তু পিতা পুত্রের ভরণপোষণ যাৈগাইতে পারে এ নেশায় মানুষ টলে না, মাতাল হয় না—কেবল পাগল হয় ! সে যে কি-করে, কি না-করে তা তার বোধ থাকে না। দেদার, জুয়াচোর, মিথ্যাবাদী, শঠ সবই হইতে পারে, হয়ও। মানুষকে অ-মানুষ করিবার এ কি সুন্দর অস্ত্র। এ নেশায় মত্ত হইয়া ভাইয়ের সঙ্গে পৃথক্‌ হইয়াছি, বৌদির গহনা চুরি করিয়াছি, আফিসের কাস্ ভঙ্গিয়াছি, স্ত্রীর গায়ে হাত তুলিয়াছি, পাওনাদার আমার স্ত্রীর গায়ে হাত দিয়াছে তাও সহ করিয়াছি। বড়ভাই ছােটভাই মরবার সময় এ খেলা খেলিতে মানা করিয়াছে, তা শুনি নাই। বড় ভাইয়ের পুত্রকে, স্ত্রীকে পথের ভিখারি, করিয়াছি! আমার আছে কি! কান্তবাবু সাতলাখ টাকার অধিকারী ছিলেন অনেকেই জানেন। তিনিও আজ এর তার দোরে একটা অাম, একটা আধ-পোড়া সিগারেট, একটু ভাল জিনিষ খাইবার জন্য লালায়িত ! পরিধানে তার বস্ত্র নাই। মাথা গুজিবার তার স্থান অথচ, তাহারই পয়সায় কতজন না কত ফুর্তি করিয়াছে। কতজন কত রকমে তাহাকে ঠকাইয়া লইয়াছে। এসব দেখিয়াছি, এসব ভুগিয়াছি, তবুও লজ্জা আসে নাই—তবুও সহজে ধিক্কার হয় নাই। আজ, সকল রকমে নিঃস্ব হইয়াছি তাই ধিক্কার আসিয়াছে। একদিন ট্রামের পয়সার জন্য ভিক্ষাও করিয়াছি। নাই। ১০৪ রাণী-বে। সকলের অপেক্ষা দুঃখের-ভয়ের-ক্ষোভের বিষয় এই যে, ই আমি দেখিয়াছি, অনুভব করিয়াছি, এই ব্যাধি—এই নেশ—এই না জুয়া ধীরে ধীরে বাঙ্গালার ধনী, দরিদ্র, ভদ্র, অভদ্র, সকলকেই এ করিতেছে, আর গ্রাস করিবার জন্য অগ্রসর হইতেছে। এ নেশার দয়া নেই, মায়া নেই, ধর্ম নেই। ধৰ্ম্ম নেই ! জয়ার নেশায় মহাভারতের কুরুক্ষেত্র ! ভাইয়ে ভাইয়ে পৃথক । সহিস, কোচম্যান, ড্রাইভার, কেরাণী, বেশ্যা ও কারিকর সকলেই এ খেলা খেলিতে সুরু করিয়াছে। অধঃপাতের পথে যাইতেছে। কত সংসার নীরবে জুয়ার কবলে পড়িয়া নরকে তলাইয়া যাইতেছে। কত আর বলিব, ভাষার জোরে এ বুঝান যায় না। কালির কলমে কত আব লেখা যায়। মনে হয় ব্যথার অশ্রুর সমস্তটুকু নির্যাস দিয়া লিখি। আমার বাঙ্গালীর ভাইয়ের প্রাণে আঘাত করি; কিন্তু, সে ক্ষমতা কৈ ৮ তবুও এ পাগলা চিঠি শেষ করবার আগে একটা কথা-ভগবানের কাছে একটা প্রার্থনা করি যে, মঙ্গলময় !-জানি না তুমি কেমন ! তােমার কোন হাতে বর, কোন্ হাতে অভয়! তবুও জিজ্ঞাসা করি— বাঙ্গালী পরাধীন, চিরদুঃখী, দরিদ্র, লাঞ্ছিত—পৃথিবীর কাছে নাকি হেয়, অসভ্য! এদের ধ্বংসের জন্য মহামারী আছে, ম্যালেরিয়ার বিষ আছে— দুঃখ কষ্ট পাবার শতসহস্র অস্ত্র আছে ! তবু কেন তাদের সভ্যতা দেবার আগে সভ্যতার রূপ ধরে এমন অপরূপ সুন্দর নিদারুণ অস্ত্র পাঠিয়ে দিলে পরমেশ্বর-তাদের জীর্ণ বুকে বেঁধবার জন্য? এতে কি মঙ্গল

রাণী-বো
হ'ল মঙ্গলময় ! আজ এ জাতিকে সেটা বুঝিয়ে ও! আর
মঙ্গল যদি না থাকে ত মঙ্গলের পথে একে ফিরিয়ে নিয়ে যাও।
আর কত দুঃখ সব !
অপিনিও এমন কোন প্রার্থনাই যেন আমার দেশবাসী ভাইয়ের
গে করেন। সবাইকে বলবেন ; সবাই গেন করে । তাহা হ'লে
তিনি কি থাকতে পারবেন? তঁার অসন কি উলবে না ! তঁার বুকে
কি ব্যথা বিধূবে না !
আর না, ভোর হ'ল । মদের নেশায় দুঃখের ভ'রে কি লিখলুম
জানি না, কত ভুলও হয়ত থাকবে, হানি না। তবে একটা জানি,
রে এ বিষয়ে আমি নিল—আমি যে কষ্ট পেয়েছি সে ৫৪ যেন অপরে
না পায়, তারই জন্য এ চিঠিতে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছি
এবং আপনাদের সকলকে তাহাই করিতে বলিতেছি, ইতি।
হতভাগ্য ঘৃণ্য
জুয়াড়ী।
পু:-আমার জীবনের কতটুকু কথাই বা বলা হল। যদি বিধাতা
আবার আমায় কোনদিন সময় দেন, 'ত, সেদিন এই
দুয়ার আরাে কত যে কষ্টেব-দুঃখের-হীনতা?-নীচতার অভিজ্ঞতার দুঃসংবাদ
আছে তা জানা'ব, এখন আমার সয় ও নেই, তেমন মনের
অবস্থাও নেই। অতএব ক্ষমা করুন।
পড়া শেষ হইলে কে হাসিল। কেহ পাম বলিয়া উড়াইয়া
রেসের এই
১০৬

রাণী-বে।
দিবার চেষ্টা করিল। কেহ ভাবিল, সত্যই কি বাঙ্গালী ভিতরে-
হিরে এতই নিঃস্ব হীন সে হইয়া পড়িয়াছে ? তাহার দেশভাইকে
এত হীন ভাবিতে কাহারও কাহারও প্রাণে বাজিল। এমনি আরাে কত
চিন্তা আসিল, তর্ক আসিল ! তথাপি, কেন জানিনা সেই, ব্যথার চিঠির
সত্যতা সম্বন্ধে উপস্থিত সকলেই কোথায় যেন এক মত হইয়া গেল।
তাই ঐক্যতানের কল্লোল সকলের প্রাণে গুর গুর করিয়া উঠিল।
সেখানে যখন এসব লইয়া এমনভাবে আলােচনা হইতেছিল,
তখন কোন এক সামান্য গ্রামের অজ্ঞাত কুটীরে অমল এবং শরতের
নিম্নলিখিত আলােচনা চলিতেছিল।
অমল সমবেদনার সহিত বলিল,-“আমি ভাবি কেমন করে এমন
১২ এ তীব্র নেশার ঘোর কাটলো।”
শরৎ ছল ছল নেত্রে, বেদনাভরা কণ্ঠে বলিল,-“এই কেমনটা
যে কেমন তা যে উপলব্ধি করেছে সেই জানে। আমি যে আমার
বনের এ অঙ্কে কেমন করে যে হঠাৎ যবনিকা তেলে দিলাম,
। আমি নিজেই জানি। এ হঠাৎ—তোমাদের কাছে হঠাৎ,
তার কাছে নয়। কতদিন ধরে যে ভেতরে ভেতরে আমার মন
৭)থিয়ে উঠেছিল—এ নেশার বিষাক্ত নিঃশ্বাসে । কত সহ্য করেছি।
শুনেছি ভূমিকম্পও নাকি এম্নি হঠাৎ ; তার কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে ও জানা যায়
না। এমনি অশ্চিৰ্য্য আমার জীবনধারার সম্বন্ধে আলােচনার সময় আমার
ও হয় আমি জানি।” বলিয়া শরৎ নিজের চোখদুটি মুছিল।
১০৭

রাণী-বৌ
অমল কথাটা ঘুরাইয়া লইবার জন্য বলিল,-“আর একদিন সব
বলতে হবে। এখন-”
শরৎ সে সব কথায় কাণ না দিয়া বলিল,-“এই প্রতি শনিবারে
যখন আমি আমার গ্রামের হীরুখুড়ােকে দেখি যে সে একটি ছোট্ট
রুমালে দুটি যা-কিছু বেঁধে হন্তমন্ত হয়ে ষ্টেশন হতে গ্রামের পথে
চলে, তখন আমার দুচোখ জলে ভরে যায়, মনে হয় এমন দিনে
আমি কোথায় ছুটতাম । হীরুখুড়াের বুকে থাকে আনন্দ, আশা-
আর আমার
“শরৎ রাত্রি অনেক হল যে কতক্ষণ আর”
শরং করুণস্বরে বলিল -“যাই মা-ই।” বলিয়া সে মায়ের
ডাকে বাড়ীর ভিতর গেল ।
অমল ভাবিতে লাগিল।
বাড়ীর ভিতরে অরুণা—আমাদের বাণী-বৌ তখন স্বামীর ভবিষ্যৎ
মঙ্গলের জন্য দেবতার চরণে প্রার্থনা করিতেছিল। আকাশে তখন
এক টুকরা শুভ্র মেঘ অনেকটা অশ্ব খুরের মত অৰ্দ্ধচলের সমস্ত 'কলঙ্ক
যেন ঢাকিয়া দিতেছিল।
সমাপ্ত
১০৮

No text on this page.

No text on this page.

Rani Bou Ed.1st

Author
Ghosh, Pravaschandra
Title
Rani Bou Ed.1st
File name
Rani Bou Ed.1st
Text
OCR done
Citation
1927
Published
2009/07/10
Publisher
Harishchandra Mazumdar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
119
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Other Genres.
Keywords
Rani Bou-Story
DLI number
551420
Barcode
4990010021134.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
huF3aUPQ1cZ
Download PDF

Rani Bou Ed.1st