Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Charturbbarna Bibhag Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
চতুৰ্ব্বর্ণ বিভাগ।
জাতিভেদ, শূদ্রের পূজা ও বেদাধিকার, জল চল ও
খাদ্যাখাদ্য বিচার, প্রেমাবতার শ্রীগৌরাঙ্গ,
বঙ্গীয় হিন্দু সমাজ,
দেবী পূজায়
জীবলি প্রভৃতি
প্রণেতা ও প্রকাশক
স্ত্রীদিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য প্রণীত
ক
(প্রথম সংস্করণ)
সিরাজগঞ্জ দরিদ্রবান্ধব ঔষধালয় হইতে
শ্ৰষতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচাৰ্য্য
সত্যেন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচাৰ্য্য
কর্তৃক প্রকাশিত।
সৰ্বস্বত্ব সুরক্ষিত।]
{ মুল্য ॥ আট আনা
কলিকাত
রাধাপ্রসাদ সেন ( সুকীয়া ষ্ট্রীট ) মণিকা প্রেসে
হরিচরণ দে দ্বারা মুদ্রিত।
এম
এস
উৎসর্গ।
* * *সতে
ওefits
শ্রীশ্রীবংশীবদন কালার্চা
সেবা-নিরত নিত্যধাম গত
পরমারাধ্য ও পরম পূজনীয় পণ্ডিতবর
ঐশ্ৰশ্ৰীযুক্ত যাদবচন্দ্ৰ শিয়াের
পিতৃদেবের চরণ উদ্দেশে
পিতৃবিরহ সন্তপ্ত, সেবাধিকার বঞ্চিত
অকৃতি অধম সন্তানের ভক্তির
দীন পুস্পাঞ্জলি স্বরূপ
“চতুৰ্বণ বিভাগ
অর্পিত হইল।
শােকার্ত পুত্র-দিগিন্দ্র।
###k
No text on this page.
t নিবেদন। পিতৃ পরিচয় বঞ্চিত, হেয় জাত্যুৎপন্ন বলিয়া ঘৃণিত, সমাজ লাঞ্ছিত-অবজ্ঞাত ঋষি বংশধরগণের নূতন পরিচয়, মব আশা-বাণী লইয়া “চতুৰ্বণ বিভাগ” প্রকাশিত হইল। অত্যা- চারী, আভিজাত্যগৰ্বস্ফীত, উচ্চ কুল-গৌরব-গৰ্বান্বিত, পরম পণ্ডিত, সবজান্তাগণ যে ইহা পাঠ করিবেন, সে আশা অল্পই আলােচনা ও আন্দোলন করা ত দূরের কথা। তবে যাহাদেব জন্য ইহা প্রকাশিত করিলাম—তাহারা পাঠ করিলেই আমার শ্রম সার্থক ও পরিতৃপ্তি। জাতিভেদ বা চতুৰ্বর্ণ বিভাগ যে গুণকৰ্ম্মানুযায়ী,-মানুষেরই সৃষ্টি, -সমদৃষ্টি ভগবান যে কাহাকেও বড় বা কাহাকেও ছােট করেন নাই, মানুষ আপন আপন গুণ- কৰ্ম্মানুসারে~-ব্রাহ্মণ শূদ্র হইয়াছে মাত্র—এই ধারণা লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি লােকের হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত করিয়া দিবার জন্যই ইহার প্রণয়ন ও প্রচার। মানুষ মাত্রেই যে ভাবানের অংশ, সন্তান—তাহা চক্ষুতে অঙ্গুলি দ্বারা দেখানই এই গ্রন্থে প্রধান উদ্দেশ্য। এই নব যুগের প্রধান কাৰ্য্যই হইতেছে যে, নিম্ন শ্রেণী যাহারা তাহারা বুঝুক যে তাহারা মানুষ, তাহাব। উচ্চ জাতীয় লােক অপেক্ষা তিল মাত্র নূন নহে। তাহাদের প্রাণ নব আশা লইয়া জাগরিত হউক, তাহারা চতুৰ্বর্ণ বিভাগ সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান লাভ করুক। তাহারা বুঝুক যে, তাহারা ও উচ্চ জাতি—এ উভয়ের মধ্যে এমন কোনও অল্য প্রাচীর ভগবান্ নিৰ্মাণ করিয়া দেন নাই। বর্তমানে যে ব্যবধান দেখা যাইতেছে তাহা কৃত্রিম, তাহা স্বার্থ প্রণােদিত। তাহা কুটিল ব্যক্তিগণের কৌশল জাল মাত্র। জ্ঞানসূর্যের আলােকে তাহঃ তষ্ঠিতে পারিবে না। এ নব যুগের অভূপান অর্থে নিম্ন শ্রেণীর সম্মুখেই ন ( 19 ) গরণ বা মনুষ্যত্ব লাভ। সুতরাং আশা করা যায় এই পুস্তকখানি অন্ধকারে আলােক বর্তিকার কাৰ্য্য করিতে পারিবে। চতুৰ্বর্ণের উৎপত্তি ও বিস্তৃতি সম্বন্ধে শাস্ত্রে যাহা লিখিত হইয়াছে—তাহা ও তাহার উদ্দেশ্য ভুলিয়া—লােকের মনে যে ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার ও নিজেদের প্রতি হীন ধারণা, হীন বুদ্ধি জন্মিয়াছে, তাহা দূর করিয়া মানুষকে যথার্থ মানুষ বলিয়া পরিচয় দিতে সাহসী করা হইয়াছে। অবজ্ঞাত জনসাধারণের পক্ষে শাস্ত্ৰসিন্ধু 'আলােড়ন করিয়া রত্ন উদ্ধার সম্ভব নয়,-এ গ্রন্থ পাঠে অনায়াসে তাহারা শাস্ত্রের মৰ্ম্ম উপলব্ধি করিয়া সিংহবলে বলীয়ান হউক—ইহাই আমার অভিলাষ। বিরাট কর্মক্ষেত্র যে সকলের তাহাতে যে সকলেরই তুল্যরূপে অধিকার,-ব্রাহ্মণ শূদ্রের কোন পার্থক্য নাই, কোন জাতিবিশেষের জন্য কোন গণ্ডী বা কোন রেখাঙ্কিত প্রাচীর নাই—সকলের জন্যই সৰ্ব্ব কৰ্ম্মের দ্বার উন্মুক্ত এই ধারণা দৃঢ়রূপে হৃদয়ে অঙ্কিত করিয়া দিবার জন্যই আমার ক্ষুদ্র চেষ্টা। ফলশ্রীহরির হস্তে। কাগজের মূল্য প্রায় তিনগুণ বাড়িয়াছে। কিন্তু যাহাদের জন্য এই পুস্তক লিখিত হইয়াছে তাহারা প্রায় সকলেই দরিদ্র কাজেই মূল্য যতদূর সাধ্য সুলভ করা হইল। আমার পুস্তকাবলীর পাঠক মাত্রের সঙ্গেই আমি পরিচিত হইতে ইচ্ছা করি। এজন্য তাঁহারা পত্র ব্যবহার করিলে সুধী হইব। কিমধিক মিতি- পােঃ সিরাজগঞ্জ ; কাওয়াকোলা : এ বংশী- ঐদিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য্য। যান চালাদের অঙ্গন। ভাষাঢ়-১৩৪ ভুর্ণ বিভ অবতরণিকা। ভারতীয় চতুর্বর্ণের কি শশাচনীয় অধঃপতন, কি ভয়ঙ্কর দুরবস্থা। পরস্পরের মধ্য হইতে প্রেম, প্রীতি, স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রণয়, ভালবাসা যেন চিরকালের জন্য বিদায় গ্রহণ করিয়াছে। যে ভূমিতে বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছিল, যে দেশে শঙ্কর-রামানুজ অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, যে দেশে মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গ দেব প্রেমের বন্যা প্রবাহিত করিয়াছিলেন, নানক, কবির, তুলসীদাস, ভাস্করানন্দ, বিশুদ্ধানন্দ, ত্ৰৈলিঙ্গ স্বামী জন্মগ্রহণ করিয়া পবিত্র পদরজে যে দেশের ধূলিকণা পর্যন্ত পবিত্র করিয়া গিয়াছেন, রামকৃষ্ণ, রামমােহন, কেশবচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ, দয়ানন্দ, বিবেকানন্দ, বিজয়কৃষ্ণ প্রভৃতি যুগাচাৰ্য্যগণ যে ভূমিতে সত্য, প্রেম, ভক্তি এবং সর্বজীবে ভালবাসা প্রভৃতি প্রচার করিয়া গিয়াছেন, সেই দেশে -সেই পুণ্যভূমি ভারতবর্ষে আজ জাতিভেদের কি ভয়া- বহ রাজত্ব! মানুষে মানুষে প্রেম নাই, ভাইয়ে ভাইয়ে প্রীতি নাই, সম্ভাব নাই, পিতাপুত্রে অনুরাগ নাই, প্রতিবাসীগণের প্রতি ভাল- বাসা নাই। প্রেম ভালবাসা যেন একটা উপকথার মধ্যে দাঁড়াইয়াছে। সকলেই নিজেদের সঙ্কীর্ণ গর্তের মধ্যে বাস ও দিবারাত্র অন্যের নিন্দ, অন্যের দোষ ঘােষণা করিয়া আনন্দ অনুভব করিতেছে। এই রূপ যে সমাজের অবস্থা, তার আর অধােগতি হইবে না কেন?
২ চতুর্বর্ন বিভাগ। জগতের সকল জাতি জীবন-সংগ্রামে শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হইতেছে, সকলেই শিক্ষা-দীক্ষায় প্রাণপণে লাগিয়াছে—আর আমাদের হতভাগ্য সমাজ, কে শূদ্র, কে বৈশ্য, কে ব্রাহ্মণ, কে চণ্ডাল, কে উচ্চ, কে নীচ, কে অধম, কে উত্তম, কার জল পবিত্র, কার জল অস্পৃশ্য—এই জঘন্য বিচার লইয়া আন্দোলনে উন্মত্ত হইয়াছে ; আর দিনে দিনে অবনতির কাল-গর্ভে ধীরে ধীরে ডুবিয়া যাইতেছে। নিম্নশ্রেণীর হিন্দু ভ্রাতৃগণের উপর উচ্চশ্রেণীর কি ঘৃণা, কি বিদ্বেষ, কি হিংসা! ঘৃণায় ঘৃণায় নিম্নশ্রেণীর হতভাগ্য হিন্দু সন্তান, তাহারা যে মানুষ, একথা প্রায় তাহারা ভুলিয়া গিয়াছে। তাহারা জানে, জলতােলা, কাঠ কাটা, ভার বহন করা, আদেশ পালন করাই তাহাদের জীবনের একমাত্র কাজ, তাহাদের আর অন্য কিছু করিবার নাই, অন্য কিছু ভাবিবার নাই। দেশ সমাজের উন্নতি ইহা একটা কথার কথা, উহা উচ্চশ্রেণীদের জন্য। তাহারাও যে মাতৃভূমির চির আদরের সন্তান, তাহারাও যে এই বিরাট হিন্দু সমাজের অন্তভূত, তাহারাও যে সমাজ-অঙ্গের এক একটা অংশ, অঙ্গ, ইহা তাহারা জানে না, বােঝে না, বুঝিবার উপায় নাই। শত শত শতাব্দীর নিরাশার মধ্যে, শত শত শতাব্দীর ঘৃণা-অবজ্ঞার মধ্যে, শত শত শতাব্দীর নির্যাতন-নিস্পীড়নের মধ্যে তাহাদের জন্ম। উৎসাহের সুমন্দ মারুত-হিল্লোল তাহাদের কর্মক্লান্ত ঘর্মাক্ত কলেবর কখনও স্পর্শ করে নাই। দুঃখ-দুর্দিনে, অত্যাচার-অবি- চারের সময়, তাহাৱা মেহব্যঞ্জক একটী ‘আহা’ শব্দ পায় নাই, তাহাদের হইয়া কেহ অত্যাচারীর বিরুদ্ধে একটা কথা বলে নাই। ইহার পরিণামত হাতে হাতেই দেখিতে পাইতেছ। মুষ্টিমেয় সংস্কা- রক দেশ দেশ বলিয়া, ভারত ভারত বলিয়া উচ্চকণ্ঠে আর্তনাদ চতুর্বর্ণ বিভাগ। করিতেছেন, কিন্তু সমাজ, দেশ যেমন নিশ্চল-নিথর, তেমনই নিশ্চল-নিথরই থাকিয়া যাইতেছে। মা’র কোটী কোটী সন্তান অনাহারে, অর্ধাহারে, পীড়নে, লাঞ্ছনায় দিনাতিপাত করিতেছে। তােমরা, সমাজপতিগণ, অভিজাতবৰ্গ নিজের দুই পা দিয়া তাহা- দিগকে দিবারাত্র দলন করিতেছ, মা কি তােমাদের কথা শুনিতে পারেন ? সমাজপতির সমাজ-শাসনরূপ যমদণ্ডের তীব্র প্রহারে তাহাদের দেহ-প্রাণ ক্ষত-বিক্ষত, জর্জরিত। তােমরা নিজেরা নিজেদের ভাইয়ের রক্ত পান করিতেছ। কিন্তু ভগবানকে ধন্যবাদ, তােমাদের অত্যাচারের যুগ অবসান-প্রায়। ইংরেজ রাজত্বে, অবাধ বিদ্যাপ্রচারে তােমাদের জারিজুরি আর টিকিতেছে না। সমাজপতিগণ ! একটীবার নিজেদের দিকে দৃষ্টিপাত কর, একটাবার দেশের কথা, সমাজের কথা স্মরণ কর। কি ছিলে আর কি হইয়াছ! হিন্দুসমাজ মরণােম্মুখ, আর হিংসা-বিদ্বেষের বহ্নিশিখা আলাইও না, আর জ্বলন্ত অগ্নিমুখে ঘৃতাহুতি দিও না। হিন্দু- সমাজের দুর্দশার কথা একবার চিন্তা কর। তােমারই কত শত শত ভাই, কত সহস্র সহস্র ভাই, কত লক্ষ লক্ষ কোটা কোটী ভাই তােমারই প্রদত্ত শাসনরূপ অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া তােমার হিন্দু সমাজ ত্যাগ করিয়া অপর সমাজের অঙ্গ পরিপুষ্ট, মাংসল ও বলিষ্ঠ করিয়াছে এবং করিতেছে। পার যদি তবে যােগ দাও-আর বিয়ােগ দিও না—আয় অপেক্ষা ব্যয় বাড়াইয়া নিঃস্ব হইও না। সমাজের যাহারা নিম্নস্তরে অজ্ঞতার ঘূর্ণাবর্তে পড়িয়া হাবুডুবু করিয়া মরিতেছে, কালবিলম্ব না করিয়া তাহাদিগকে উত্তোলন কর। ব্রাহ্মণ প্রকৃত ব্রাহ্মণের কাজ কর, সমাজপতি প্রকৃত সমাজপতির কর্তব্য সম্পাদন কর। ত্যাগে বীরত্ব নাই,, গ্রহণেই বীরত্ব। অধিকার দাও- ১ চতুর্ণ বিভাগ। আধকার দাও, যত শীঘ্ন পার অধিকার দাও, উহাদের কাতর ক্রন্দনে কর্ণপাত কর, ভগবান তােমার ক্রন্দন অবশ্যই শুনিবেন। অধিকার দিতে প্রস্তুত নও, অধিকার চাহিতে যাও কোন্ মুখে ? অধিকার দিবে না,অধিকার পাইবে? হায় নির্বোধগণ ! তােমাদের আকাঙ্ক্ষাকে ধন্যবাদ! দুই দিন অগ্র পশ্চাৎ, ভগবান নিম্নশ্রেণীকে তুলিবেনই তুলিবেন, তাহার প্রমাণ কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ সকলেই পাই- গাছ। শ্রীভগবান তুলিবার জন্য, উঠাইবার জন্য যাহাদিগের হাত ধরিয়াছেন, তুমি নির্বোধ তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইয়া বাধা দিতে বৃথাই অগ্রসর হইয়াছ। কালের গতি অপ্রতিহত। কেহই এ বেগ-রােধে সমর্থ নহে। বৃথা উদ্যম পরিত্যাগ কর, বরং আশী- বাদ ও শান্তি উচ্চারণ পূর্বক নিম্নশ্রেণীকে তুলিবার জন্য দুই বাহু প্রসারিত কর-স্বর্গে দুন্দুভি বাজিয়া উঠুক-মর্তে সত্যযুগ আবি- ভূত হউক। হিন্দু সমাজের চারিদিকেই অভাব, চতুর্দিকেই আবর্জনা। যে দিকেই দৃষ্টিপাত করি, সেই দিকেই অন্ধকার, সেই দিকই কুসংস্কারের দুর্লভঘ্য প্রাচীরে পরিবেষ্টিত। সমাজহিতৈষী মনীষীবৃন্দ ভাবিয়া আকুল, কিন্তু সমাজপতি গুরু-পুরােহিতকুলের এদিকে বিন্দুমাত্র দৃষ্টি নাই, হিন্দুসমাজের সম্বন্ধে তাহাদিগের যে কিছু কর্তব্য আছে, ইহা তাহারা ভ্রমেও মনােমধ্যে চিন্তা করিবার অবসর পান না। যে সমাজের অনুজলে ইহারা পরিপুষ্ট, তাহার ভাবনা ভাবিয়া শরীর ও মস্তিষ্ক নষ্ট করিতে ইহাদের আদৌ প্রবৃত্তি নাই। পৃথিবীর অন্যান্য সুসভ্য জাতিগণের সহিত তুলনা করিলে আমর বুঝিতে পারি, আমরা কোথায় আছি। জগতের যাবতীয় স্য, স্বাধীন জাতি এ জাতিকে যে কিরূপ অপদার্থ, হীন চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ও অধম মনে করে, তাহা সংবাদপত্রের পাঠকমাত্রেই অম্লাধিক বিদিত আছেন। ২৪টি ভিন্ন প্রায় সমুদয় পাশ্চাত্য জাতি এবং এমন কি জাপানীগণ পৰ্য্যন্ত হিন্দু জাতিকে অতি অবজ্ঞার সহিত অব- লােকন করিয়া থাকে। আর আমরা ক্ষুদ্র কূপমণ্ডুকের মত নিজে দের পাদোদক নিজেরা মহানন্দে পান করিতেছি এবং পূর্বপুরুষ ঋষিগণের গৌরব কীৰ্ত্তন করিয়া আত্মশ্লাঘা অনুভব করিতেছি। ঐ সঙ্গে মাঝে মাঝে পাশ্চাত্যজাতিগণকে জড়বাদী, জড়সৰ্বস্ব, অনাৰ্য, স্লেচ্ছ প্রভৃতি মুখরোচক গালি দ্বারা অভিনন্দিত করিয়া আনন্দে অধীর হইতেছি। হায়! হিন্দু মাজ! তোমার কি অধঃপতন, কি অপােগতিই না হইয়াছে ! তোমরা যে কোন মুখে তােমাদের পিতৃপুরুষ আৰ্যদের নাম উল্লেখ কর, ভাবিয়া পাই না, পিতৃপুরুষ- দের তােমরা রাখিয়া কি ? প্রাচীন আৰ্যগণের তোমরা কোন্ গুণের অধিকারী হইয়াছ,কোন্ চিহ্ন, কোন্ নিশানাটা বজায় রাখি- আছ ? গুণের অধিকারী না হইয়া অনর্থক গুণকীর্তন করিয়া লাভ ফি? কোন্ কালে ঘি ভাত খাইয়াছ, এখন আর সে হাত চাটিয়া ফল কি? শিক্ষায় সাধনায়, জ্ঞানে বিদ্যায়, সংযম তপস্যায়, বিনয় সৌজন্যে, পালনে রক্ষণে, কোন্ গুণ লইয়া আৰ্যত্বের দাবী করি- তেছ ? তােমরা পূৰ্বপুরুষদের রাখিয়াছ কি? ঘোর অনাৰ্যগুণে তামসিকতায় ডুবিয়া গিয়াছ। সামান্য দুই চারিটী টাকার লােভে, সামান্য সামান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের মায়ায় ভাইএর বুকে ভাই হইয়া তীক্ষ্ণ শা-িত ছুরিকা বিদ্ধ করিয়া দিতে বিন্দুমাত্র কাতর ও কুষ্ঠিত হইতেছ না। স্ত্রীর প্ররােচনায় মর্তের দেৰী মাতা-ভগিনীকে গৃহ হইতে দূর দুর করিয়া তাড়াইয়া দিতেছ। শত সহস্র লেলিহান জিহ্বা বিস্তার করিয়া তাইওর শােণিত মহানন্দে পান করিতেছ, ' সত্য, চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। রাক্ষসী-তৃষ্ণা নিবৃত্তি করিতেছ । জমিদার হইয়া খাজনার দায়ে পুত্র-তুল্য, দীনহীন, বিশুদ্ধমুখ প্রজাগণের ভিটামাটি উৎসন্ন করিয়া তােনার সাধের জমিদারী হইতে খেদাইয়া -তাড়াইয়া দিতেছ। ব্রাহ্মণ পণ্ডিত গুরুপুরােহিত জমিদার মহাজনরূপে জনসাধারণের প্রকৃতিপুঞ্জের ধনরত্ন প্রতিপালন ও ভরণ পােষণের আহরণ করিয়া নিজেরা ঐশ্বর্যশালী হইতেছ। তােমরা আবার আৰ্য- বংশধর বলিয়া পরিচয় দাও, অভিমান কর। স্বার্থসিদ্ধিব লক্ লক্ বহ্নি তােমাদের হৃদয়কোটর আচ্ছন্ন করিয়া দিবানিশি দাউ দাউ করিয়া জ্বলিতেছে, তােমাদের বিমল আত্মা স্বাথ- পরতার কালিমারেখা-সম্পাতে দিন দিন কি মলিন ভাবই না ধারণ করিতেছে। ধৰ্ম্ম, ন্যায়, দয়া, পরােপকার, প্রেম, সাৰ্বজনীন প্রীতি-ভালবাসা, ভ্রাতৃভাব প্রভৃতি মানবোচিত গুণাবলী তােমাদের হৃদয় হইতে ঘৃণায় দুঃখে ম্রিয়মাণ হইয়া পলায়ন করিয়াছে। সমাজ এখন দৈত্যদানার আধিপত্যে---- পিশাচের তাণ্ডব নৃত্যে অধ্যুষিত। কেবল স্বার্থপরতা, কেবল হিংসাবিদ্বেষ, কেবল ঘৃণা-অবজ্ঞার ভয়াবহ-রাজত্ব! মানুষ নাই, এই চারি জন বাদে আর মানুষ নাই। দেশের নেতা, সমাজের অধিনায়ক, জনসাধারণের সংগৃহীত অর্থ অবলীলা- ক্ৰমে কুকার্যে ব্যয় করিয়া দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা বােধ করেন কত বারোয়ারীর ঘটনা জানি, যেখানে দুৰ্বল নিরীহ দীন দরিদ্রের ঘটি বাটী বন্ধক রাখিয়া কালীপূজার চাদা তুলিয়া দলপতিগণ অনায়াসে অকুণ্ঠিতচিত্তে থেষ্টা, বাইনাচ প্রভৃতি জঘন্য আমােদে শত শত টাকা ব্যয় করিয়া দিতেছেন। মদের জন্য কত অর্থ ঢালিতেছেন! অথচ এ টাকা নিজেদের নয়, দরিদ্রের চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। কষ্টোপার্জিত হৃদয়-রক্ত, পূজার নামে সংগৃহীত। কত বড় বড় নেতা ইনসিওর কোম্পানীর নামে দরিদ্রের বুকের রক্ত স্বরূপ টাকা কড়ি আত্মসাৎ করিতেছেন। নেতৃগণের এই রূপ ব্যবহার একটী নয়, দুইটী নয়, ভূরি ভুরি। তাঁহাদের হৃদয়- হীনতার কথা, পশুত্বের কথা লিখিতে গেলে, লেখনী কলঙ্কিত হয়, ক্ষোভে দুঃখে হৃদয় অবসন্ন হইয়া পড়ে। নেতারা মনে করেন, তাহাদের প্রতারণা বােধ হয় কেই টের পায় না। নির্বোধগণ জানে না, যে “পাপ আর পারা কখন হজম হইবার নহে।” এক- দিন না একদিন ফুটিয়া বাহির হইলেই হইবে, অদ্য বা শতাব্দান্তে বা। প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, শঠ, জালিয়াতি সমাজ-শরীর আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। বৎসর বৎসর শত শত সহস্র সহস্র ভারতীয় যুবক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি লাভ করেন—উপাধিমণ্ডিত হন, তাহা দেখিয়া আমাদের কত আনন্দ! কত আলাদ। মনে হয় ইহা- দিগকে অবলম্বন করিয়া এইবার বুঝি সমাজ জাগিয়া উঠিবে। কিন্তু তার পর যেই দুই দশ দিন উত্তীর্ণ হইয়া গেল—তখন দেখিতে পাই, ও বাবা, বনে যে আসে সেই বনমানুষ হয়। তাহারা শিক্ষিত, কাজেই তাহাদের প্রতারণার কৌশল আরও অদ্ভুত, আরও সাংঘা - তিক, আরও ভীষণ। তখন মনে হয়, “কা’কে নিন্দি, কা’কে বন্দি, দুইই পাল্লা ভারী।” এই ত আমাদের চতুৰ্ব্বর্ণসমন্বিত হিন্দুসমাজ । কেবল মুখে মুখে ভেরী নিনাদ করিয়া সহস্র জয়ঢাক বাজাইয়া লাভ কি ? উহাতে যে কেবলই মিথ্যার প্রশ্রয় দেওয়া হয়, প্রতারণা প্রকাশ পায়। ওদিকে ভারত-জননীর কোটী কোটী স্নেহের সন্তান, মূর্খতার অতল সাগরে নিমজ্জিত ; দেশ, সমাজ, উন্নতি কাহাকে বলে, তাহা তাহারা জানে না খবরের কাগজ ‘বঙ্গবাসী’র কথা, ৮ চতুর্বর্ণ বিভাগ। আন্দোলন আলােচনার কথা বাবুদের মুখে মাঝে মাঝে শোনে মাত্র। তাহাদের বাহিরে অভাব অভিযােগ অত্যাচার নির্যাতনের যেমন হাহাকার, ভিতরেও তেমনি অবিদ্যার ও অজ্ঞতার হাহাকার। ভারতের কোটী কোটী সন্তান মনুষ্যাকারে পশুর ন্যায় জীবন যাপন করিতেছে, তাহাদিগকে তুলিবার জন্য, উঠাইবার জন্য কয়জন মন- স্বীর প্রাণ কাঁদিয়া উঠিয়াছে ? যাহাদের দেবহৃদয় কাঁদিয়াছে, সমা জের নিকট উৎসাহ পাওয়া ত দূরের কথা, তারা সমাজপতিগণ কর্তৃক উন্মত্ত, ধৰ্ম্মধ্বংসী ধনিয়া অভিহিত, উপহসিত এবং এমন কি নির্যাতিত। মানুষ হয়া মানুষের প্রতি প্রেম নাই, ভাই হইয়া ভাইএর প্রতি ভালবাসা নাই, সহানুভূতি নাই। তুলিবার জন্য, উঠাইবার জন্য ত চেষ্টা নাই, পরন্তু দাইয়া রাখিবার জন্য কত চেষ্টা, কত আগ্রহ, কত সাধ্যসাধনা, কত সভাসমিতি স্থাপন এবং সর্বোপরি শাস্ত্রের নামে কত কৌশল-জাল বিস্তার। ভগবান কবে এ পতিত জাতির পঙ্কিল হৃদয় প্রেম-পবিত্রতার পূত গঙ্গানীৰে বিধৌত করিয়া দিবেন, কবে তাহাদিগের মন হইতে হিংসা-বিদ্বেষের বহ্নিশিখা নিৰ্বাপিত হইবে! পাপ-প্রলোভন, বিলাস-ল লসায় দেশের যুবকগণ প্রমত্ত। সুরা স্রেতি দেশে তরতর বেগে চলি- যাছে, গুরু পুরােহিত পৰ্যন্ত এ বিষে জর্জরিত। কোটী কোটী টাকা অনর্থক জলের মত ব্যয় হইয়া যাইতেছে - অপর পক্ষে অনা- হারে অর্ধাহারে, কুখাদ্যে অখাদ্যে কোটী কোটী অধিবাসী প্রতি বৎসর বিবিধ পীড়ায় আক্রান্ত হইয়া শমন-ভবনে যাত্রা করিতেছে। তামাক, গাঁজা, আফিং, চরস, চণ্ডু, সিদ্ধি, চুরুট, সিগারেট অনবরত চলিতেছে, ইহার জন্য কত কোটী কোটী টাকা প্রতি বৎসর অপ- ব্যয়িত হইতেছে। নাচে, গানে, বাই, খেমটায়, আমােদে, প্রমােদে, চতুর্ণ বিভাগ। বিলাসে, ব্যসনে কোটী কোটী টাকা ব্যয় হইয়া যাইতেছে। কিন্তু তুমি যদি একটী টাকা একটা পাঠাৰ্থী ছাত্রের পুস্তকের সাহায্য- বাবদ যাজ্ঞা কর, দেখিবে কত বড় লােক, কত ধনাঢ্য জমিদার, কত বিশ্ব বিদ্যালয়ের অত্যুজ্জলরঙ্গ তােমাকে কটু কথায় প্রত্যাখ্যান করিয়া দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হইবে না। “ছােট লােকের ছেলেরা বিদ্যাশিক্ষা করে, জ্ঞানােপার্জন করে, ইহা যে তাহাদের অসহ! মুখে প্রায় সকলেরই এক বুলি-“ছােট লােকের ছেলের আবার লেখা পড়া ? আমাদের কাজকৰ্ম্ম করিবে কে ? সদাশয় ইংরেজ জাতি যদি এ দেশের রাজা না হইতেন,-এইরূপ- ভাবে আচণ্ডালের মধ্যে শিক্ষার পথ মুক্ত করিয়া না দিতেন—তবে উচ্চবর্ণের অভিজাতবর্গের অত্যাচারে, পীড়নে নিম্নশ্রেণীর “ছােট লােকদের” যে কি দশা ঘটিত, তাহা চিন্তা করিলে শরীর শিহরিয়া উঠে ! যে দেশের ব্রাহ্মণ অনাচরণীয় শূদ্ৰস্পর্শে স্নান করিয়া শুদ্ধ হন, (ইহা কল্পিত কথা নহে, ইহা আমার প্রত্যক্ষ-দৃষ্ট ঘটনা), যে দেশের ব্রাহ্মণ নিম্নশ্রেণীর শূদ্র সাধারণকে কুকুর শৃগাল অপেক্ষাও হেয়জ্ঞান করেন, যে দেশের সমাজপতি পণ্ডিত উহা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দ্বারা সমর্থন করেন, যে দেশের ব্রাহ্মণ শূদ্রগণকে সর্বপ্রকার অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া, আপনাদিগকে অতি বুদ্ধিমান মনে করিয়া থাকেন, হায়! সে দেশের উত্থান-আশা, আকাশ-কুসুমের ন্যায় কি বিড়ম্বনাজনক -কতই মূল্যবিহীন—কি হতাশময় ! যে দেশের অভিজাতবর্গ আভিজাত্য গর্বে স্ফীত হইয়া-মানুষকে মানুষের মধ্যে গণ্য করিতেছে না, শূদ্র শ্রাতা- সাধারণকে আপনার বলিয়া জ্ঞান করিতে পারিতেছে না, প্রতিদিন নানা অছিলায়—নানাপ্রকার প্রবঞ্চক কারণ দর্শাইয়া-তাহ- ১০ চতুর্বর্ণ বিভাগ। দিগকে দুই পা দিয়া দলন করিতেছে, ছলে বলে কৌশলে যেন তেন প্রকারেন তাহার আত্মশক্তি ব্ৰহ্মতেজ অপহরণ করিতেছে, তাহাদের হৃদয়-রুধির মনের আনন্দে পান করিতেছে—সে দেশের, সে সমাজের উন্নতি কি নিতান্তই সুদূরপরাহত, বিড়ম্বনা জনক নহে ? যতদিন না বঙ্গের সন্তান আপন হৃদয় প্রেমানলে দ্রবীভূত করিয়া সমাজের প্রত্যেক নর-নারী, বালক-বালিকা, যুবা-বৃদ্ধ, জাতিবর্ণ নিৰ্বিশেষে এবং এমন কি আচণ্ডালের জন্য ঢালিয়া না দিবে, ততদিন সমাজের কল্যাণ—দেশের কল্যাণ নাই। যেদিন পরস্পরে পরস্পরের হস্ত ধারণ করিবে, যেদিন ব্রাহ্মণ জাত্যা- ভিমান বিসর্জন দিয়া-চণ্ডালকে আলিঙ্গন দিতে ছুটিয়া যাইবে, যেদিন একের দুঃখে সকলের প্রাণে ঝঙ্কার দিয়া উঠিবে, যেদিন এক জনের অপমানে, এক জনের লাঞ্ছনায় সকলে সমভাবে অপমানিত লাঞ্ছিত মনে করিবে, সেই দিন দেশের উন্নতি, সমাজের উন্নতি। দেশের এই সকল অবজ্ঞাত নিম্নশ্রেণীর লােকদিগের উন্নতি ভিন্ন দেশের উন্নতি, সমাজের উন্নতি অসম্ভব। যাহারা সমাজের সর্বে সৰ্বা, সেই নিম্নশ্রেণীর কথা কয়জন ভাবিয়া থাকেন? যাহাদিগের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে ধনবানের পেটের অন্ন, বিলাসের সামগ্রী, উন্নত মেঘস্পর্শী মৰ্ম্মর প্রাসাদ, পরিধেয় বসনভূষণ, নানাবিধ অভিরণ, যাহাদিগের বিন্দু বিন্দু হৃদয় রুধির দ্বারা বড় লােকের বিশাল অট্টালিকার এক একখানি ইটপাথর গাথা হইয়াছে, তাহাদের সংবাদ কয়জন রাখেন, কয়জন এ বিষয়ে চিন্তা করিয়া থাকেন? আমাদের মনুষ্যত্ব কি ভয়াবহ! আমরা আবার উন্নত বলিয়া বুক ফুলাইয়া গৰ্ব্ব করিয়া থাকি। আমাদের এ প্রকার চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। উন্নতি-ভারত মহাসাগরের জলে ডুবিয়া যাউক-চাই না আমরা এমন পাশবিক উন্নতি। যে শিক্ষায় প্রকৃত মনুষ্যত্ব জন্মে না, যে শিক্ষায় দেশবাসীর প্রতি, সমাজের প্রতি প্রীতি-অনুরাগ সঞ্চার হয় না, যে শিক্ষায় মানুষের প্রতি, ভাইয়ের প্রতি ভালবাসা জন্মে , সকলকে আপনার জন বলিয়া মনে হয় না, সে শিক্ষায় কি প্রয়ােজন ? আমেরিকার কথা শুনিয়াছি; সে দেশের নিম্নশ্রেণীকে তুলিবার জন্য তথাকার বড়লােকদের কি আগ্রহ! কি যত্ন ! নিম্ন- শ্রেণীর শিক্ষার জন্য ধনবানগণ মুক্তহস্তে কোটী কোটী টাকা দান করিতেছেন, কত বিদ্যালয়, কত নৈশ শিক্ষালয়, কত শিল্প-বিজ্ঞা- নাগার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে ও দিন দিন হইতেছে । মূলমন্ত্র কেবল ‘শিক্ষা দাও; আর আমরা, আমাদের নিম্ন শ্রেণীকে আমরা নিজেরা ত তুলিবই না, বরং তাহারা সাধ্যসাধনা চেষ্টা যত্ন করিয়া একটু মাথা তুলিবার, একটু উন্নত হইবার চেষ্টা করিলে, আমরা অমনি শাস্ত্রের বচনরূপ যমদণ্ড প্রহারে তাহাদিগকে দােইয়া দিতেছি। আমরা কি আবার মানুষ ? আমরা কি আৰ্য- সন্তান? আমরা ঘাের অনাৰ্য্য হইয়া দাড়াইয়াছি, আমাদের স্নেহ- কোমল, মায়া-মমতা, প্রেম-ভালবাসা, কথার কথা মাত্র। বঙ্গীয় সমাজপতিগণ ! করযােড়ে বলি, তােমাদের পায় ধরিয়া বলি, আর কঠিন থাকিও না—অার অত্যাচার করিও না, আর নিম্নশ্রেণীকে এমন করিয়া পশুর মত দাবাইয়া রাখিও না। অধিকার দাও অধিকার দাও, যত সত্বর পার অধিকার দাও। আবার হিন্দু সমাজ-গগনে—উন্নতির সুখ-সূৰ্য্য সমুদিত হউক-যুগ যুগান্তরের নিশা-শুষ্ক নিম্নশ্রেণীর বদনমণ্ডল শারদোৎফুল্ল ফুটন্ত মল্লিকার মত হাসিয়া উঠুক—আবার, তাহাদের গাঢ় তমসাচ্ছন্ন হৃদয়- চতুৰ্বণ বিভাগ। আকাশে আনন্দের পূর্ণ শশধর ফুটিয়া উইক -সৰ্ব্বত্র শান্তির মঙ্গল-শঙ্খ নিনাদিত হউক -দিকে দিকে কল্যাণ-ঘণ্টা বাজিয়া উঠুক। ব্রাহ্মণগণ! নিজেরা প্রকৃত ব্রাহ্মণ হও, প্রত্যেককে ব্রাহ্মণ করিবার জন্য সাহায্য কর। নিম্নশ্রেণীর উপর সদাশয় গভর্ণ- মেন্টের কৃপাদৃষ্টি পড়িয়াছে তাহারা গ্রামে গ্রামে অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করিবার আয়ােজন করিতেছেন -তােমরা তাহ- দের যথাসাধ্য সাহায্য কর। নিম্নশ্রেণীকে তুলিবার জন্য ভগবান আসিয়াছেন, তঁাহার কৃপা-কিরণরাশি উহাদের উপর পড়িয়াছে, তিনি উহাদের হাত ধরিয়াছেন, তােমরা জয় ও শান্তি উচ্চারণ পূৰ্ব্বক উহাদিগকে বরণ করিয়া লও-বঙ্গীয় হিন্দুসমাজ সুশীতল । সূচনা। ভুবন-বরেণ্য হিন্দুজাতির কি শোচনীয় অধঃপতন! সে পরস্পর প্রতি-মমতা, সে একাত্মত্বভাব, সে প্রণয় ভালবাসা আজি অন্তর্হিত! হিন্দুর সে জাতীয় ভাব দূরে প্রস্থিত। সমাজ হইতে বিদ্য, জ্ঞান, বিবেক, বৈরাগ্য, ভক্তি, প্রেম, কলির কাল প্রভাবে অনন্ত স্রোতে ভাসিয়া গিয়াছে। সত্যযুগের এক বর্ণ আজি শত সহস্র ভাগে বিভক্ত হইয়া ভাই ভাইএর রক্তপানে উন্মত্ত, জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠের সহিত সর্বপ্রকার ভ্রাতৃত্ব তুলিয়া লইয়া তাহাকে হীন, অপবিত্র, ইতরবােধে পদদলিত করিতে সচেষ্ট। আজ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ভুলিয়া গিয়াছেন, কৃষি বাণিজ্যনিরত বৈশ্য ও সেবাপরায়ণ পুত্রগণ অশকেহই নহে—তাহাদেরই ভাই, তাঁহাদেরই জ্ঞাতি বান্ধব। কালের এমনই প্রভাব ও হিসা বিদ্বেষের এমনই মহিমা চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। যে, সেই জ্ঞাতি বান্ধবগণ, আত্মীয় স্বজনগণ আজ পংক্তি নিৰ্বাসিত, জলস্পর্শেও অনধিকারী! আত্মম্ভরিতা ও আত্মগৌরব-ঘােষণার পুতিগন্ধে সমাজ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। আৰ্য সন্তানগণ শাস্ত্র ভুলিয়া, ভগবদ্বাণী বিস্মরণ হইয়া আজ হীন দেশাচার, লােকাচার এবং স্ত্রী-আচারের অনুগত ও পক্ষপাতী হইয়া পড়িয়াছেন। কুসংস্কার ও দেশাচার তাহাদিগকে একেবারে অন্ধ ও বধির করিয়া ফেলিয়াছে। শাস্ত্র যুক্তি প্রমাণ কিছুই তাহারা মানিতে প্রস্তুত নহেন। অথচ শান্ত্র শস্ত্রি করিয়া চীৎকার করিতেও কেহ ক্ষান্ত হইতেছেন না। লােক-পিতামহ ব্ৰহ্মাই যে সকল নরনারী, সকল জাতি সম্প্র- দায়ের আদি জনক, এই মােটা কথাও আমরা ভুলিয়া গিয়াছি। ভগবান্ সৰ্বপ্ৰথমেই কিছু নানা জাতির সৃষ্টি করেন নাই। সৃষ্টি করিতে তিনি একজাতি এক রকম নরনারীই সৃষ্টি করিয়া- ছিলেন। সৃষ্টির আদিতে পূর্বজন্মের কৃতকর্ম বা প্রাক্তন কৰ্ম্ম অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ গুণকৰ্ম্মানুষ্ঠান নিরত মানবের সৃষ্টি হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না—কাজেই ভগবান সকল নরনারীকে একই রূপ গুণকৰ্ম্মে মণ্ডিতরূপ সৌন্দৰ্যদানে সুশােভিত—একই জাতীয় করিয়া সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সৃষ্টি বিষয়ে বিন্দুমাত্র ইতর বিশেষ-- উচ্চ নীচ বা বড় ছােট করেন নাই। পরে সেই সকল সৃষ্ট মানব- গণই ক্রমশঃ গুণকৰ্ম্ম অনুযায়ী পৃথক পৃথক সম্প্রদায়ে (জাতিতে নহে) পরিণত ও পরিচিত হন। এ সম্বন্ধে শাস্ত্রেও যথেষ্ট প্রমাণ আছে। অতি পুরাকালে ভূমণ্ডলে একমাত্র জাতি ছিল। সেই একাতি হইতে গুণকৰ্ম্ম অনুসারে এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশে বাস ও অবস্থান জন্য বিভিন্ন জাতির সৃষ্টি হইয়াছে।
,
।
১৪
চতুর্বর্ণ বিভাগ।
শ্রীমদ্ভাগবতে উক্ত হইয়াছে—
এক এব পুরাববদঃ প্রণবঃ সৰ্ববাত্ময়।
দেবনারায়ণােনান্য একোহগ্নিবর্ণ এব চ ।
ভা, পু, ৯-১৪-৪৮
“পূৰ্বে এক বেদ, সৰ্ববাত্ময় এক প্রণব, এক নারায়ণ দেবতা,
এক অগ্নি ও (হংস নামক একমাত্র বর্ণ (জাতি) ছিল।”
পদ্মপুরাণ স্বর্গখও ২৫ অধ্যায়ে আছে-
ন বিশেযােহস্তি বর্ণানাং সৰ্ব্বং ব্রহ্মময় জগৎ।
ব্ৰহ্মণা পূৰ্ব্বসৃষ্টং হি কৰ্ম্মণা বর্ণং গতম্।
পঞ্চম বেদ মহাভারত শান্তিপর্বের ১৮৮ অধ্যায়ে আছে-
ন বিশেষােহস্তি বর্ণানাং সর্বং ব্রহ্মমিদং জগৎ।
ব্ৰহ্মণা পূৰ্বসৃষ্টং হি কৰ্ম্মভিবতঃ গত ।
বস্তুতঃ ইহলােকে বর্ণের ইতর বিশেষ নাই। সমুদয় জগতই
ব্রহ্মময়, (অথবা সমস্ত জগতে এক ব্রাহ্মণ মাত্র, ব্রহ্মাকর্তৃক সৃষ্ট
হইয়াছিলেন) মানবগণ ব্রহ্মা হইতে সৃষ্ট হইয়া ক্রমে ক্রমে কাৰ্য্য
দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণে পরিগণিত হইয়াছে।
বৃহদারণ্যক উপনিষৎ বলেন :-
ব্ৰহ্ম বা ইদমগ্রে আসীৎ একমেব, তদেকং সৎ নব্যভবৎ।
তচ্ছে মােৰূপং অত্যজত ক্ষত্রং।
“অগ্রে একমাত্র ব্রাহ্মণ জাতিই ছিল। ঐ জাতি একাকী বৃদ্ধি
প্রাপ্ত হইল , সুতরাং সেই শ্রেষ্ঠবর্ণ (ব্রাহ্মণ) কে সৃষ্টি
করিলেন।” :
চতুর্বর্ণ বিভাগ। মহাভারতে পুনশ্চ- বাক্য সংযমকালে হি তত বরদস্য দেব দেব ব্রাহ্মণাঃ। প্রথমং প্রাদুভুত ব্রাহ্মণেভ্যশ্চ শেষ বর্ণাঃ প্রানুভূতাঃ ॥ ২১ (শান্তিপর্ব-৩৪২ অধ্যায়) “সৰ্বকর্তা লােকের হিতকারী বরপ্রদ ব্রাহ্মণগণ, নারায়ণের বাক্য সংযমকালে, মুখ হইতে প্রাদুভূত হইয়াছেন। ব্রাহ্মণ হইতে অন্যান্য সমুদয় বর্ণ উৎপন্ন হইয়াছে।” সসৰ্জ ব্রাহ্মণানগ্রে ষ্ট্যাদৌ চ চতুর্মুখ। সৰ্ববর্ণাঃ পৃথক পশ্চাৎ তেষাং বংশে জজ্ঞিরে। (উৎকল খণ্ড, ৩৮ অধ্যায়, ৪৪ শ্লোক ) “ব্রহ্মা, সৃষ্টির প্রারম্ভে অগ্রে ব্রাহ্মণগণকেই সৃজন করিয়া- ছিলেন। তৎপরে পৃথক পৃথক সমস্ত বর্ণ তঁাহাদিগেরই বংশে উৎপন্ন হইয়াছে।” তস্মাৎ বর্ণাঞ্চজবাে জ্ঞাতিবর্ণাঃ সংজ্যতে তস্য বিকার এব। এবং সাম যজুরেক মৃগেকা বিপ্ৰশ্চৈকো নিয়ে তেষু সৃষ্ট । (মহাভারত, শান্তিপর্ব, ৬০ অধ্যায়, ৪৭ শ্লোক) যখন ক্ষত্রিয় প্রভৃতি বৰ্ণত্রয় ব্রাহ্মণ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে, তখন ঐ তিন বর্ণ, ব্রাহ্মণের জ্ঞাতিস্বরূপ। তত্ত্ব নির্ণয় করিতে হইলে ঋক্, যজু ও সামবেদের প্রচার নিমিত্ত, প্রথমে ব্রাহ্মণেরই সৃষ্টি হইয়াছে। একবর্ণমিদং পূৰ্ব্বং বিশ্বমাসীৎ যুধিষ্ঠির। কৰ্ম্মক্রিয়া বিশেষেণ চাতুর্বর্ণং প্রতিষ্ঠিত। “হে যুধিষ্ঠির! পূৰ্ব্বে এই জগতে কোন বর্ণ বা জাতিভেদ ছিল
চতুর্বর্ণ বিভাগ।
। সকলে এক জাতীয় ছিল। পরে কর্ম ও গুণের বিশেষত্ব
নিবন্ধন একই মানব ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র, এই বর্ণ চতুষ্টয়ে
বিভক্ত হয়েন।”
আদৌ
কৃতযুগে
বর্ণো নূণাং হংস ইতি ঘৃতঃ।
কৃতকৃত্যাঃ প্রজা জাত্যা তস্মাৎ কৃত যুগং বিদুঃ ।
“পূৰ্ব্বে সত্যযুগে কোন বর্ণ বা জাতিভেদ ছিল না, সকল মানবই
‘হংস’ বলিয়া প্রখ্যাত ছিলেন। মানুষ জন্ম দ্বারাই যেন কৃতকৃত্য
হইত, তাই উক্ত যুগের নাম কৃতযুগ ছিল।”
এই জন্যই বােধ হয় শ্রেষ্ঠ মানবগণের পদবী হইয়াছিল
পরমহংস।
বায়ুপুরাণ বলিতেছেন -
নিৰ্বিশেষাঃ কৃতে সৰ্বারূপায়ুঃ শীল চেষ্টিতৈঃ।
অবুদ্ধি পূৰ্বকং বৃত্তি প্রজানাং জায়তে স্বয়ম্ ।
অপ্রবৃত্তিঃ কৃতযুগে কৰ্ম্মােঃ শুত পাপয়াের।
বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা ন তদাস ন সঙ্করঃ ।
অনিচ্ছাদ্বেষযুক্তান্ত বয়স্তি পরস্পরং।
তুল্যরূপায়ুষঃ সৰ্বা অধমােত্তম বর্জিতাঃ ।
বর্ণানাং প্রবিভাগশ্চ ত্রেতায়াং সংপ্রবর্তিতঃ। (৮ অঃ )
“সত্যযুগে লােকের রূপ, গুণ, পরমায়ু ও চেষ্টা এক ছিল।
কেহই বুদ্ধি খাটাইয়া কিছু করিতে পারিতেন না। সকলেই
যদৃচ্ছালব্ধ ফল মূল ও আম মাংসাদি খাইয়া জীবন ধারণ করিতেন ।
পাপ ও পুণ্যকাৰ্য কাহাকে বলে তাহা তাহারা জানিতেন না।
তথন বর্ণ বা জাতি বা বর্ণসঙ্কর কথাও অজ্ঞাত ছিল। কেহ ইচ্ছা
করিয়া বা মতলব আঁটিয়া কোন কাৰ্য্য করিতেন না। পরস্পরের
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। '১৭ মধ্যে হিংসা দ্বেষও ছিল না। সকলেরই রূপ ও আয়ু সমান ছিল। এ ছােট, এ বড়, এরূপ কোন ভেদাভেদ ছিল না। পরে ত্রেতা- যুগে (পরবর্তী সময়ে ) গুণ ও কর্মের বিভেদবশতঃ চাতুর্বর্ণ প্রতি স্থাপিত হয়।” তাহাতেই একই মানব ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র এই বর্ণ চতুষ্টয়ে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় যখন মানবগণ সংখ্যায় অতি অল্প, যখন জীবিকার জন্য চিন্তা ছিল না, সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা মেদিনী প্রচুর আহার- সামগ্রী যােগাইতেন, হিংসা দ্বেষ লােভ যখন মানবকে স্পর্শ করিতে পারে নাই, যখন সত্যভাষী সরল মানব কেবল স্বভাবজাত ফল মূলাহারে পরিতৃপ্ত হইত, মানবের সেই সুখ-শান্তির যুগে সমাজ বন্ধনের কোনও প্রয়োজন হয় নাই। সুতরাং তাদের মধ্যে উচ্চ নীচ ক্রমে শ্রেণী বা বর্ণবিভাগেরও আবশ্যকতা ছিল না। যখন পূজ্যপাদ আৰ্য্যগণ হিমালয়ের তুষার শিখর পরিত্যাগ করিয়া ভারতের সমতলভূমিতে অবতরণ করিতে আরম্ভ করিলেন, তাহাদের (ব্রাহ্মণ বা দ্বিজ কথিত একজাতীয় আর্য্যগণের ) মধ্যে যাহারা রাজসােক্তি হইয়া রাজ্য বিস্তার, বলবীৰ্য্য সঞ্চার সাত্ত্বিক বেদস্তোতাগণের রক্ষা বিধানে অগ্রসর হইলেন, তাহারাই শেষে “ক্ষত্রিয়” উপাধি লাভ করিলেন। ওজঃ বা বীৰ্য্যই রজোগুণে পরিচায়ক। তাই পুরাণে ক্ষত্রিয়ের রক্তবর্ণতা নির্দিষ্ট হইয়াছে। বাহুর কাৰ্য্যই ক্ষত্রিয়ের মুখ্য কাৰ্য, তাই ক্ষত্রিয় বা রাজন্য বিরাট পুরুষের বাহু বা বাহুজ বলিয়া কল্পিত হইয়াছেন।” যথা— কামভােগ প্রিয়াস্তীক্ষা ক্রোধনাঃ প্রিয় সাহসাঃ। ত্যক্ত স্বধৰ্মারক্তাঙ্গাস্তে দ্বিজাঃ ক্ষত্ৰতাং গতাঃ । মহাভারত, শান্তিপর্ব, ১৮ ফুধ্যায়) ৪
চতুর্বর্ণ বিভাগ।
“যে সমুদয় দ্বিজ বা ব্রাহ্মণ রজোগুণ প্রভাবে কামভােগ
প্রিয়, ক্রোধ-পয়ত, সাহসী ও বিকারী হইয়া স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া
ছিলেন, তাঁহারাই রক্তবর্ণ ক্ষত্রিয় হইয়াছিলেন।”
অাহতাশ্চ ধন সংগ্রামে সর্বসম্মুখে।
আরম্ভে নিৰ্জিতা যেন স বিপ্ৰঃ ক্ষত্র উচ্যতে। ৩৬৮
(অত্রিসংহিতা )
“যিনি সমরস্থলে সৰ্ব্বসমক্ষে আরম্ভ সময়েই ধন্বীদিগকে অস্ত্ৰদ্বারা
আহত ও পরাজিত করেন, সেই ব্রাহ্মণের ক্ষত্ৰ সংজ্ঞা।”
শৌৰ্য্যং বীৰ্য্যং ধৃতিস্তেজত্যাগশাত্ম জয়ঃ ক্ষমা।
ব্ৰহ্মণ্যতা প্রসাদণ্ট সত্যঞ্চ ক্ষত্র লক্ষণং ।
{ শ্রীমদ্ভাগবত )
ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি হইতেছে :-
শৌৰ্য্যং তেজোধূতিদক্ষ্যিং যুদ্ধেচাপ্যপলায়ন।
দামীশ্বর ভাবশ্য ক্ষাত্ৰং কৰ্ম্ম স্বভাবজম্।
প্রজানাং রক্ষণং দানমিজ্যাধ্যয়ন মেবচ।
বিষয়ে প্রসক্তি চ ক্ষত্রিয় সমাসতঃ।
(মনুসংহিতা)
(স্বয়ম্ভু ভগবান) ক্ষত্রিয়দিগের পক্ষে প্রজাপালন, দান, অধ্যয়ন,
যজ্ঞ, মালাচন্দন, স্ত্রীসম্ভোগ, এই কয়েকটী নির্ধারিত করিলেন।
ক্ষত্রজং সেবতে কৰ্ম্ম বেদাধ্যয়ন সঙ্গতঃ।
দানাদান রতির্যন্ত স চ ক্ষত্রিয় উচ্যতে।
(মহাভারত, শান্তিপর্ব )
“যিনি প্রজারারূপ কাৰ্য করেন,বেদাধ্যয়ন করেন, ধনদান ও
কর গ্রহণ করেন, তাঁহাকে ক্ষত্রিয় বলা যায়।”
চতুর্বর্ণ বিভাগ। তার পর বৈশ্য। “ঐতরেয় ব্রাহ্মণ পাঠে স্পষ্ট বােধ হইবে, যাহারা কৃষি, গােরক্ষা, সুজল ধন ও ধান্যের উপায় সর্বদা চিন্তা করিত, তাহারাই বৈশ্য বলিয়া পরিগণিত হইল।” ফলতঃ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও শূদ্রগণের সুখ শান্তির জন্য যাহারা কৃষিদ্বারা শস্যাদি উৎপন্ন করিতেন, পশ্যাদি পালন করিতেন, ধন দ্বারা রাজার অভাব- পূরণে চেষ্টা করিতেন, তাহারা বা তাঁহাদের সন্তান সন্ততিগণই বৈশ্য নামে অভিহিত হইয়াছিলেন। শ ব্ৰহ্মাণ্ডপুরাণের পূর্বভাগে ৮ম অধ্যায়ে বৈষ্ণবর্ণের স্বরূপ এইরূপ লিখিত হইয়াছে ;- “যাহারা ক্ষত্রিয়গণের আশ্রয়ে নির্ভরশীল হইয়া কেবলমাত্র সৰ্ব্বভূতেই ব্ৰহ্ম বিদ্যমান, এইরূপ চিন্তায় দিনপাত করিতেন, তাহারা ব্রাহ্মণ ; তাঁহাদের মধ্যে যাহারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, বৈশস কর্মে নিযুক্ত, কৃষকরূপে যাহারা অনিষ্ট উৎপাদন (?) করিত এবং ভূমি সম্বন্ধে যাহারা কাৰ্য্যকারী হইয়াছিল, তাহারাই বৃত্তি সাধক কৃষক বৈশ্য। বৈশ্যে রজঃ ও তমােগুণের একত্র সংযােগ অর্থাৎ ক্ষত্রিয় ও শূদ্র উভয়ের ভাব বিদ্যমান। বৈশ্যের প্রধান অবলম্বন কৃষি। শস্য পরিপক্ক হইলেই তাহাদের শ্রীবৃদ্ধি ও কামনা পূর্ণ হয়। এইজন্য পরিপক শস্যের রূপ পীতবর্ণই হিন্দুশাস্ত্রে বৈবে লক্ষণ বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে। ব্ৰহ্মাণ্ডপুরাণে দেখা যায়—গুণকৰ্ম্মানুসারে ব্রাহ্মণের মধ্য হইতেই বৈশ্যজাতি উৎপন্ন হয়। বৈশ্যের জীবিকার হেতু কৃষি আদি, উরুই তাহাদের প্রধান অবলম্বন, সেই জন্যই বৈশ্য বিরাট- পুরুষের উরুদেশজাত এইরূপ কল্পিত হইয়াছিল।”
২০
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
যথাঃ-
গােতভ্যাবৃত্তিং সমাস্থায় পীতাঃ কৃষ্ণপজীবিন।
স্বধৰ্ম্মান্নতিষ্ঠন্তি তে দ্বিজাঃ বৈশ্যতাং গতাঃ ।
(মহাভারত, শান্তিপৰ্ব্ব, ১৮৮ অধ্যায়)
“ব্রাহ্মণ সাধারণ নামধারী যে আর্যগণ গােপালনবৃত্তি অবলম্বন
করিয়াছিলেন, কৃষিজীবী হইয়া স্বধর্ম পরিত্যাগ করিয়াছিলেন,
তাহারাই পীতবর্ণ বৈশ্য হইয়াছিলেন।”
কৃষিকৰ্ম্মরতে যশ্চ গঞ্চ প্রতিপালকঃ ।
বাণিজ্য ব্যবসায় স বিপ্রাে বৈশ্য উচ্যতে ॥ ৩৬৯
( অত্রিসংহিতা)
“যে বিপ্র কৃষিকাৰ্য-রত, গাে-প্রতিপালক, বাণিজ্য ও ব্যবসা
তৎপর, তিনি বৈশ্য বলিয়া উক্ত হন।
বৈশ্যের লক্ষণ হইতেছে :---
দেবগুৰ্বচ্যুতে ভক্তিত্ৰিবৰ্গ পরিপোষণং।
আস্তিক্য মুদ্যমােনিত্যং নৈপুণ্যং বৈশ্যলক্ষণ।
(শ্রীমদ্ভাগবত )
বৃত্তিঃ--
কৃষি গােরক্ষা বাণিজ্যং বৈশ্যকৰ্ম্ম স্বভাবজম্।
( শ্রীমদ্ভগবদগীতা
“কৃষিজীবী, গােপালক ও বাণিজ্য ব্যবসায়ী আৰ্য্য সম্প্রদায়
বৈশ্য বলিয়া উক্ত হইয়াছে।”
পনাং রক্ষণং দানমিজ্যাধ্যয়ন মেব চ।
বণিকপখং কুসীদঞ্চ বৈশুস্য কৃষিমেব চ। ৯০
(মনুসংহিতা, প্রথম অধ্যায় )
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। “বৈশ্যগণের পক্ষে পশুপালন, দান, যজ্ঞ, অধ্যয়ন, বাণিজ্য, কৃষিকৰ্ম্ম, কুসীদগ্রহণ—এই কয়েকটি কার্য নিরূপিত।” বিত্যান্ত পশুভ্যশ্চ কৃষ্যাদান রতিঃ শুচিঃ। বেদাধ্যয়ন সম্পন্নঃ স বৈশ্য ইতি সঙ্গিতঃ || ২৬ (শান্তিপৰ্ব্ব, মহাভারত) “বেদ অধ্যয়ন, পশুরক্ষা, কৃষি ধনােপাৰ্জন, শৌচাচার সম্পন্ন হওয়া বৈশ্যের লক্ষণ।” বৈশ্যের করণীয় আরও কতিপয় বিধি উদ্ধত হইতেছে --- ব্রাহ্মণস্য তপােজ্ঞানং তপঃ ক্ষত্ৰত্য রক্ষণং। বৈশ্য তু পােবাৰ্তা তপঃ শূদ্র সেবনং। ২৩৬ ' (মনু, ১১ অধ্যায়) “ব্রাহ্মণের তপস্যা জ্ঞান, ক্ষত্রিয়ের তপস্যা প্রজাপালন, বৈশ্যের তপস্যা কৃষি-বাণিজ্য এবং শূদ্রের তপস্যা পরিচর্যা।” বৈস্তু কৃত-সংস্কারঃ কৃত্বদার পরিগ্রহং। বার্তায়াং নিত্যযুক্ত স্যাৎ পশূনাঞ্চৈব রক্ষণে। ৩২৬ (ঐ, ৯ অধ্যায়) “বৈশ্যগণ উপনীত হইয়া দ্বার পরিগ্রহ করতঃ কৃষিকাৰ্য্য সম্পাদ- নার্থে পশুপালনে নিযুক্ত থাকিবেন।” ন চ বৈশস্য কামঃ স্যান্ন রক্ষেয়ং পশূনিতি। বৈশ্যে চেচ্ছতি নানে রক্ষিতব্যাঃ কথঞ্চন। ৩২৮ (ঐ, ৯ অধ্যায়) “বৈশ্যেরা কখনও পশুপালন হেয় কৰ্ম্ম বিবেচনা করিবে না, যেহেতু সমর্থবান্ বৈশ্য থাকিতে পশুপালনে অন্যের অধিকার নাই।”
চতুর্থ বিভাগ।
লবণাদির মূল্য
মণিমুক্তা প্রবালানাং লােহাং তাবস্য চ।
গন্ধনাঞ্চ রানাঞ্চ দিদ্যদর্ঘ বলাবলং। ৩২৯
(মনু, ৯ অধ্যায় )
“বৈশ্য, মণি, মুক্তা, প্রবাল, লৌহ, বস্ত্র, গন্ধদ্রব্য,
নির্ণয় করিয়া দিবে।”
বীজানামুপ্তিবিচ্চস্যাৎ ক্ষেত্রদোষ গুণস্য চ।
মানযোগঞ্চ জানীয়াত্ত লা যােগাংশ্চ সৰ্ব্বশঃ ৩৩০
(ঐ, ৯ অধ্যায়)
“উহাৱা বীজ ও ক্ষেত্রে দোষগুণজ্ঞ এবং পরিমাপক হইবে,
তুলামান পরিমাণ ইত্যাদিতেও অভিজ্ঞ হইবে।”
সারাসার ভাণ্ডানাং দেশানাঞ্চ গুণাগুণান্।
লাভালাভঞ্চ পণ্যানাং পশূনাং পরিবর্ধনং ৩৩১
(ঐ, ৯ অধ্যায় )
“বস্তুর গুণাগুণ, দেশের গুণাগুণ, পণ্য দ্রব্যের লাভালাভ এবং
কি প্রকারে পশুপালন করিলে পশু বৃদ্ধি হয়, এ সমস্ত বিষয়েও
অভিজ্ঞ হইবে।”
ভৃত্যানাঞ্চ ভূতিং বিদ্যাভাষাশ্চ বিবিধা নৃণাং।
দ্রব্যাণাং স্থান যােগাং ক্রয় বিক্রয় মেবচ | ৩৩২
(ঐ, ৯ অধ্যায়)
“দেশকাল বিবেচনায় ভৃত্যদিগের বেতন নির্ণয়, বহুভাষাজ্ঞ
এবং কোন্ স্থানে কোন্ দ্ৰব্য রাখিতে হয় এবং কোথায় ক্রয় বিক্রয়
করিলে অধিক লাভ হইবে, এ সকল বিদ্যাতে পারগ হইবে।”
ধৰ্ম্মেণ চ দ্রব্য বৃদ্ধাবাতিষ্ঠে যত্ন মুত্তমং।
দচ্চি সৰ্ব্বভূতানামঃমেবাতি যত্নতঃ ॥ ৩৩৩
(ঐ, ৯ অধ্যায় )
চতুর্ণ বিভাগ। “যথাধর্ম মতে বৃদ্ধি লইয়া ধন ন্যস্ত এবং সম্যক্ যত্নের সহিত সকল প্রাণীকে স্বর্ণাদি দান হইতে উৎকৃষ্ট যে অন্নদান তাহা করিবে।” আঁপিচ শাস্ত্ৰভৃত্বং ক্ষত্র বণিক পশু কৃষিবিশঃ। আজীবনার্থং ধৰ্ম্মন্তু দামধ্যয়ং যজিঃ ॥ ৭৯ (মনু, ১০ অধ্যায় ) “ক্ষত্রিয়ের বৃত্ত্যর্থে শাস্ত্র, অস্ত্র এবং প্রজাপালন, বৈশ্যের জীবি- কার্থে বাণিজ্য, পশুপালন এবং কৃষিকাৰ্য্য আর ধৰ্ম্মার্থে অধ্যয়ন, যাগ এবং দান, এই তিনটি জানিবে।” বেদাভ্যাসসা ব্রাহ্মণস্য ক্ষত্রিয়স্য চ রক্ষণং। বার্তা কৰ্ম্মৈব বৈশ্বাস্য বিশিষ্টানি স্বকৰ্ম্ম ॥৮০ (ঐ, ১০ অধ্যায়) “ব্রাহ্মণের প্রশস্ত কাৰ্য বেদাভ্যাস,ক্ষত্রিয়ের প্রজারা, বৈশ্যের বাণিজ্যাদি কাৰ্য জানিবে।” এক্ষণে ব্রাহ্মণের কথা- সন্ধ্যাং স্নানং জপং হােমং দেব নিত্যপূজন। অতিথিং বৈশ্ব দেব দেব ব্রাহ্মণ উচ্যতে ॥ ৩৬৫ শাকে পত্রে ফলে মূলে বনবাসে সদা রতঃ। নিরতােহরহঃ শ্রাদ্ধে স বিপ্রাে মুনিরুচ্যতে। ৩৬৬ বেদান্তং পঠতে নিত্যং সর্বসঙ্গং পরিত্যজেৎ। সাখযােগবিচারস্থঃ স বিপ্রাে দ্বিজ উচ্যতে। ৩৬৭ (অত্রিসংহিতা) “যিনি প্রতিদিন সন্ধ্যা, জপ, হােম, দেবপূজা, অতিথিসেবা এবং বৈশ্বদেব করেন, তাহাকে “দেব” ব্রাহ্মণ কহে (এই সকল ধর্ম-
২৪
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
কর্তা ব্রাহ্মণ, দেব-সংজ্ঞক)। শাক পত্ৰ ফলমূলভােজী বনবাসী এবং
নিত্য-শ্রদ্ধরত ব্রাহ্মণ “মুনি” বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইলেন। যিনি
প্রত্যহ বেদান্তপাঠী, সৰ্বসঙ্গ ত্যাগী, সাংখ্য এবং যােগের তাৎপর্য
জ্ঞানে তৎপর, সেই ব্রাহ্মণ “দ্বিজ” নামে অভিহিত হইলেন।”
ব্রাহ্মণের লক্ষণ
শমােদমস্তপঃ শৌচং সন্তোষঃ ক্ষান্তিরার্জবং।
জ্ঞানং দয়াতাত্মত্বং সত্যঞ্চ ব্ৰহ্মলক্ষণং।
(শ্রীমদ্ভাগবত )
শমােদমস্তপঃ শােচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞান মাস্তিক্যং ব্রহ্মকৰ্ম্ম স্বভাবজম্ ।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা )
অধ্যাপনমধ্যমনং যজনং যাজনং তথা।
দানং প্রতিগ্ৰহঞ্চৈব ব্রাহ্মণানামকল্পয়ৎ ॥ ৮৮
(১ম অ, মনুসংহিতা)
জাতকৰ্ম্মাদিতির্যন্তু সংস্কারৈঃ সংস্কৃতঃ শুচিঃ।
বেদাধ্যয়ন সম্পন্নঃ ষট্কৰ্ম্মস্ববস্থিতঃ || ২২
শৌচাচারহিতঃ সম্যগ বিবসাশী গুপ্রিয়।
নিত্যব্রতাে সত্যপরঃ স বৈ ব্রাহ্মণ উচ্যতে। ২৩
সত্যং দানমখাদ্রোহ মনৃশংস্যংপা ঘৃণা।
তপশ্চ দৃশ্যতে যত্র স ব্রাহ্মণ ইতি মৃতঃ ॥ ২৪
(শান্তিপর্ব, মহাভারত, ভৃগু-ভরদ্বাজ সংবাদ)
“জাতকৰ্ম প্রভৃতি সংস্কার দ্বারা যে ব্যক্তি সংস্কৃত ও শুচি,
বেদাধ্যয়ন সম্পন্ন, য কর্মশালী (সন্ধ্যা বন্দনা জপ হােম দেবপূজা
অতিথি-সৎকার এই ছয়টী অথবা যজন-যাজন অধ্যয়ন অধ্যাপন
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
সংপাত্রে দান ও সৎপ্রতিগ্ৰহ এই ছয়টী ষটকৰ্ম্ম ) যে শৌচাচার,
দেবপ্রসাদ ভােজী, গুরুপ্রিয়, নিত্যব্রতপরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ, সে
ব্রাহ্মণ। সত্য, দান, অদ্রোহ, অনৃশংসতা, লজ্জা (কুকাৰ্য্য করিতে
লজ্জা ) ঘৃণা ( নিন্দনীয় কৰ্ম্মে ঘৃণা) ও তপস্যা যাহাতে দেখিবে,
তাহাকেই ব্রাহ্মণ জানিবে।”
সৰ্বশেষে শূদ্রের কথা-
ইহারা সকলে স্বভাবতঃই ধীসম্পদে দরিদ্র, শক্তিসামর্থ্যহীম,
বুদ্ধে অপারগ ও অনভিজ্ঞ, অর্থ উপার্জনে, ব্যবসা বাণিজ্যে অক্ষম।
ইহারা আর কি করিবে, উল্লিখিত ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য নামধারী
দ্বিজাতি বলিয়া অভিহিত আৰ্যগণের পরিচর্যা ও সেবাকাৰ্য্যে
নিযুক্ত হইল। ইহাদের লক্ষণ এইরূপ লেখা হইয়াছে -
হিংসান্বত প্রিয়ালুব্ধ সৰ্বকর্মোপজীবিনঃ।
কৃষ্ণাঃ শৌচ পরিভ্রষ্টাস্তে দ্বিজাঃ শূদ্রতাং পতাঃ ।
(মহাভারত, শান্তিপৰ্ব্ব, ভূগু ভরদ্বাজ সংবাদ)
লাক্ষালবণসম্মি কুসুম্ভ ক্ষীর সর্পিৰ্ষা।
বিক্রেতা মধুমাংসানাং স বিপ্রঃ শূদ্র উচ্চতে॥ ৩৭০
(অত্রিসংহিতা)
ব্রাহ্মণ নামে সাধারণতঃ অভিহিত আৰ্যদিগের মধ্যে যাহারা
তমােণ প্রভাবে হিংসাপরতন্ত্র, লুব্ধ, সর্বকৰ্মাপজীবী, কৃষ্ণবর্ণ,
মিথ্যাবাদী ও শৌচষ্ট হইয়া উঠিয়াছিলেন, তাঁহারাই শূদ্রত্ব প্রাপ্ত
হইয়াছেন।
যে লাক্ষা, লবণ, কুসুম্ভ, দুগ্ধ, ঘৃত, মধু বা মাংস বিক্রয় করে,
সেই ব্রাহ্মণ কথিত আৰ্য শূদ্র বলিয়া নির্দিষ্ট।
২৬
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
সৰ্বভক্ষ্য রতিনিত্যং সর্বকৰ্ম্ম করােহশুচিঃ।
ত্যক্তবেদনাচারঃ স বৈ শূদ্র ইতি ঘৃতঃ।
অর্থাৎ যিনি অপবিত্র, যাহার খাদ্যাখাদ্যের বিচার নাই, জীবিকা
নির্বাহের ব্যবসায়েরও বিচার নাই, বেদ পরিত্যাগ করিয়াছেন,
এবং আচারভ্রষ্ট হইয়াছেন, তাহাকে শূদ্র বলা যায় ।
পরিচৰ্য্যাত্মকং কৰ্ম্ম শূদ্ৰাপি স্বভাবজম্।
(ভগবদগীতা )
শূদ্র তমঃগুণ প্রধান, অলস, নিরুৎসাহ এবং অজ্ঞান, সুতরাং
দাসত্বই তাহার স্বাভাবিক কৰ্ম্ম বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছিল। দ্বিজাতির
পদসেবাই শূদ্রের মূখ্য ধৰ্ম্ম, তাই শূদ্র বিরাট পুরুষের পাদজ বলিয়া
কল্পিত হইয়াছে।
এই প্রকারে গুণকৰ্ম্ম আচরণ চরিত্র ব্যবসায় অনুসারে একই
আৰ্যজাতি ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি শ্রেণীতে,
পরে চারি জাতিতে বিভক্ত হইয়া পড়িল। ছিল এক জাতি, হইল
চারি জাতি।
ইত্যেতৈ কৰ্ম্মভিব্যস্তা দ্বিজাঃ বর্ণান্তরং গতাঃ।
ধৰ্ম্মযজ্ঞে ক্রিয়া তেষাং নিত্যং ন প্রতিষিধ্যতে। ১৪
ইত্যেতে চতুরাে বর্ণা যেং ব্রাহ্মী সরস্বতী।
বিহিত ব্ৰহ্মণা পূৰ্ব্বং লােভত্ব জ্ঞানতাং গতাঃ ॥ ১৫
(মহা, শা, প, ১৮৮ অধ্যায়)
“ব্রাহ্মণগণ এই প্রকার কাৰ্য্য দ্বারাই পৃথক পৃথক বর্ণ লাভ
করিয়াছেন; অতএব সকল বর্ণেরই নিত্যধৰ্ম্ম ও নিত্যযজ্ঞে অধিকার
আছে। পূর্বে ব্রহ্মা, যাহাদিগকে সৃষ্টিপূৰ্ব্বক বেদময় বাক্যে
চতুর্বর্ণ বিভাগ। ২৭ অধিকার দিয়াছিলেন, তাঁহারাই লােভ হেতু শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন।” এ সম্বন্ধে স্বর্গীয় নীলকণ্ঠ মজুমদার এম, এ, পি, আর, এস্, কটক র্যাভেন্স কলেজের অধ্যক্ষ মহাশয় এইরূপ লিখিয়াছেন :- “কৃষ্ণ বলিতেছেন -‘আমি কোন এক নির্দিষ্ট সময়ে হিন্দুদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তিত করি নাই। অর্থাৎ এমন কোন সময় হয় নাই, যখন আমি সমস্ত হিন্দুদিগকে একত্রিত করিয়া কতক- গুলিকে ব্রাহ্মণ, কতকগুলিকে ক্ষত্রিয় প্রভৃতি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছিলাম। তবে আমি হিন্দুসমাজে যে শক্তি নিহিত করিয়া- ছিলাম, সেই শক্তি প্রভাবেই, কালসহকারে সমাজ মধ্যে চারিটি বর্ণের সৃষ্টি হইয়াছিল। * * * কালসহকারে হিন্দুসমাজের কলেবর ও আয়তন বর্ধিত হইলে হিন্দুগণ স্বাভাবিক নিয়ম বলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা অবলম্বন করিয়া জীবিকা-নিৰ্বাহ করিতে লাগিলেন। কিন্তু ঐ সমস্ত ব্যবসার মধ্যে যে গুলি অর্থকর, অনেকেই সেই পথে যাইতে লাগিলেন। এইরূপে সমাজস্থ ব্যক্তিগণ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা অবলম্বন করিতে লাগিলেন। অর্থাৎ যতদিন কৃষিকাৰ্যে আৰ্যগণের সুবিধা থাকে, ততদিন সকলেই কৃষক হয়, আবার অধিক লােকে কৃষক হইলে উহাতে লাভ অধিক থাকে না। তখন আবার কৃষকদের মধ্যে কতকগুলি লােক বাণিজ্য ব্যবসা অবলম্বন করে। এইরূপে যুদ্ধে সময় কৃষকদের বিনাশ হইয়া গেলে কে কৃষিকাৰ্য্য করিবে তাহার নির্ণয় হয় না। ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা শ্ৰেণীবদ্ধ না থাকাতে এইরূপ নানাবিধ অসুবিধা ঘটে। * * * হিন্দুসমাজেও বােধ হয়, অনেকবার এইরূপ এক শ্রেণীর উন্নতি ও অপর শ্রেণীর অবনতি ; ২৮ চতুর্বর্ণ বিভাগ। হইয়াছিল। বহুবার এরূপে বহু প্রকার অসুবিধা ভােগ করিয়া হিন্দুসমাজ দেখিল যে, শ্রেণী বা জাতির স্পষ্ট নির্দেশ ও সীমা না থাকিলে, সকল শ্রেণীরই অবনতি ও অসুবিধা হয়। এজন্য সকলের সম্মতিক্রমে সর্বপ্রকার শ্রেণীর মধ্যে সুবিধা ও অসুবিধা অংশ সমানরূপে বণ্টন করিয়া দিয়া সমাজ মধ্যে চাতুব্বর্ণের প্রচাৰ করা হইয়াছিল। প্রথমে ব্রাহ্মণ। ইহার সুবিধা কি কি? শারীরিক পরি- শ্রমের অভাব, সকলের নিকট পূজা ও সম্মাননা গ্রহণ ; শাস্ত্র পাঠে অধিকার। ইহার অসুবিধা কি কি? অহরহঃ মানসিক পরিশ্রম, দারিদ্র্য, সাংসারিক ও শারীরিক সকল প্রকার সুখে বিতৃষ্ণা ; একবেলা ভােজন, পঞ্চাশের পর অরণ্যবাস। তাহার পর ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়ের সুবিধা কি কি ? রাজ্যভােগ, ঐশ্বৰ্য্য, বিলাস, শাস্ত্রে অধিকার। ক্ষত্রিয়ের অসুবিধা কি কি ? সৰ্ব্বদা প্রাণহানির আশঙ্কা, রাজকার্যের জন্য সর্বদা মস্তিষ্ক পরি চালনা ও চিন্তা, পঞ্চাশের পর অরণ্যবাস। তাহার পর বৈশ্য। বৈশ্যের সুবিধা কি কি ? ঐশ্বৰ্য্য, বিলাস, শাস্ত্রে অধিকার। ইহার অসুবিধা কি কি ? পরিবারস্থ ব্যক্তি, হইতে সৰ্ব্বদা দূরে অবস্থান, পঞ্চাশের পর অরণ্যবাস। শেষ শূদ্র। শূদ্রের সুবিধা কি কি? নির্ভাবনা, গ্রাসাচ্ছাদন সম্বন্ধে ভাবনারাহিত্য ; চিরকাল গৃহস্থাশ্রমের অধিকার, মানসিক স্বচ্ছন্দ। ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের জীবনে নানাবিধ দুর্ঘটনা সম্ভবপর। ক্ষত্রিয় যুদ্ধে পরাজিত হইতে পারেন, বৈশ্য বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারেন; কিন্তু শূদ্রের জীবনে এরূপ দুর্বিপাক একেবারেই অসম্ভব। শূদ্র চিরকাল পরিবারবর্গের মধ্যে অবস্থান করিতে চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ২৯ পারেন। শূদ্রের অসুবিধা কি কি? দারিদ্র্য, অন্যের সেবা, শারীরিক পরিশ্রম। * * * “কৃষ্ণ বলিতেছেন-‘মনুষ্যেরা স্বভাবতঃ ত্রিগুণাত্মক। সেই তিনটী গুণের নাম সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ। দয়া, মমতা, পরােপকার প্রভৃতি কাৰ্য্য, সত্ত্বগুণের ফল। পরদ্রোহ, পরােপকার প্রভৃতি দ্বারা উদ্দেশ্য সাধন, রজোগুণের ফল। হিংসা, লােভ, ক্রোধ প্রভৃতি কাৰ্য তমােগুণের ফল। সত্ত্বগুণে লােক সকল পরােপকারের জন্য সর্বদা স্বার্থ বিসর্জন করেন। রজোগুণে লােকসকল সদুপায় বা অসদুপায় দ্বারা আত্মােন্নতির প্রয়াস পান। তমােগুণে লোকসকল অসদুপায় দ্বারা আত্মােন্নতির প্রয়াস পাইয়া থাকেন। সত্ত্বগুণের কাৰ্যমালা পুণ্যময়। রজোগুণের কামাল। কখনও বা পুণ্যময় কখনও বা পাপদারা কলঙ্কিত। তমােগুণের কাৰ্যমালা পাপারা কলঙ্কিত। এই তিন গুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ ও তমােণ একত্র অবস্থান করিতে পারে না। আলােক ও অন্ধকার, পপি ও পুণ্য, পরােপকার ও পরাপকার একত্ৰ থাকিতে পারে না। পূর্বোক্ত তিনটি স্বাভাবিক গুণ সম্বন্ধে মনুষ্যদিসের প্রধানত নিম্নলিখিত কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যাইতে পারে। প্রথমতঃ,—যাহাদের মধ্যে সত্ত্বগুণ প্রধান, ইহাদের রজঃ ও তমঃগুণ থাকিতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ, যাহাদের মধ্যে বজঃগুণ প্রধান। ইহাদের মধ্যে আবার দুইটি শ্রেণী থাকিতে পারে, যাহাদের মনে রজোগুণ অধিক পরিমাণে ও সত্ত্বগুণ অল্প পরিমাণে কাৰ্য্য করে এবং যাহাদের মনে রজোগুণ অধিক পরিমাণে ও তমােণ অল্প পরিমাণে কাৰ্য্য করে। এতদ্ভিন্ন অন্য কতকগুলি লােক আছেন, যাঁহাদের মনে তমােণ প্রধান। ইহাদের মনে চতুর্ণ বিভাগ। সত্ত্বগুণ ও রজোগুণ থাকিতে পারে না। এইরূপে মনুষ্যদিগকে ( শুধু হিন্দুজাতিকে নয়) চারিটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত কৰা যাইতে পারে। যথা সত্বপ্রধান, স-রজাময়, রজস্তমমময় ও তমঃ প্রধান। এই চারি প্রকারের লােকে স্বভাবতঃ চারি প্রকারের কাৰ্য্য বা ব্যবসা অবলম্বন করিবে। সত্ত্বপ্রধান ব্যক্তিগণ স্বভাবতঃ শম, দম, উপরতি, তিতিক্ষা, সমাধান, শ্রদ্ধা প্রভৃতি গুণে বিমণ্ডিত হইয়া যজন, যাজন, অধ্যাপন, দান, গ্রহণ প্রভৃতি কাৰ্য্যে আপনা দিগকে ব্যাপৃত করিবে। যাহারা সত্ত্বরজঃ প্রধান তাহারা শৌর্য- বীৰ্যাদি গুণে বিভূষিত হইয়া প্রজারক্ষা, যজন, দান, অধ্যয়ন প্রভৃতি কাৰ্যে আপনাদিগকে নিযুক্ত রাখিবে। যাহারা রজস্তমঃ প্রধান, তাহারা বুদ্ধি, বিবেচনা, অধ্যবসায়, তীক্ষ্ণদৃষ্টি গুণে বিমণ্ডিত হইয়া কৃষি বাণিজ্যাদি কাৰ্য্য অবলম্বন করিবে। আর যাহারা তমােণ প্রধান, তাহারা ক্রোধ, হিংসা, লােভ প্রভৃতি স্বভাবের হীনতা বশতঃ অন্য সকল ব্যবসায় অবলম্বনে অসমর্থ হইয়া অন্যের প্রভুত্বে থাকিবে। এইরূপে মনুষ্যগণ ভিন্ন ভিন্ন গুণ দ্বারা প্রণােদিত হইয়া ভিন্ন ভিন্ন কৰ্ম্ম অবলম্বন করিবে। এবং ভিন্ন ভিন্ন কর্মে নিযুক্ত থাকিয়া ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের মধ্যে অন্তর্নিবিষ্ট হইবে। যাহারা সত্ত্বগুণ প্রধান, তাহারা ব্রাহ্মণ বলিয়া খ্যাত হইবেন; যাহাবা সত্ত্বরজোগুণ প্রধান তাঁহারা ক্ষত্রিয়, যাহার রজস্তমােণ প্রধান তাহারা বৈশ্য, এবং যাহারা তমঃ প্রধান তাহার শূদ্র হইবেন।” (গীরহস্য।) ভাবতীয় কাৰ্য্যগণের চতুৰ্বর্ণে বিভক্ত হওয়া সম্বন্ধে অশেষ শ্রদ্ধাস্পদ আচাৰ্য-প্রবর শ্রীযুক্ত শিবনাথ শাস্ত্রী এম, এ, মহােদয় এইরূপ লিখিয়াছেন : ;
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। * * * এখন একবার কল্পনাতে তৎকালীন আৰ্য সমাজের অবস্থা চিত্রিত করিবার চেষ্টা করুন। একদিকে দেখুন, একদল দীর্ঘাকৃতি, গৌরবর্ণ, উন্নত নাসিকা বিশিষ্ট বিদেশী লােক আসিয়া পঞ্চনদের উপকুলে উপনিবেশ স্থাপন পূৰ্ব্বক বাহুবলে পরাজিত দেশকে স্বদেশ করিয়া আপনাদের গ্রাম জনপদ প্রভৃতি নিৰ্ম্মাণ করিতেছেন, কৃষি বাণিজ্যের আয়োজন করিতেছেন, অরণ্য সকল নিঃশেষ করিয়া মনােহর কৃষিক্ষেত্র সকল বিস্তার করি- তেছেন, উপনিবেশের প্রান্তবর্তী অরণ্যভূমি সকলে মৃগয়া শৰ্যটন করিতেছেন এবং আপনাদের যজ্ঞাগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া তাহাতে মেকাৰ্য্য সম্পন্ন করিতেছেন, আর একদিকে দেখুন, পরাজিত আদিম অধিবাসিগণ পৰ্বদিতে আশ্রয় লইয়া নিরন্তর তাহাদের উপর উপদ্রব করিতেছে। আৰ্যেরা যাহাতে বিরক্ত হইতেন, এই সকল অসভ্য দস্যগণ তাই করিতেছে। আৰ্য্যের ইহাদিগকে আমমাংসভােজী বলিয়া ঘৃণা করেন, সুতরাং ইহার দুষ্টামি করিয়া তাহাদের যজ্ঞভূমিতে আমমাংস প্রভৃতি বর্ষণ করি- তেছে ; হঠাৎ বনভ্যন্তর হইতে নির্গত হইয়া তাহাদের রমণীদিগকে পথে পাইলে ধরিয়া লইয়া যাইতেছে। আপনারা প্রাচীন যে সকল পৌরাণিক কথাতে ঋষিদিগের উপর রাক্ষসদিগের উপদ্রবের বিবরণ শুনিতে পান, তাহাতে এই সকল উপদ্রবেরই প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যাহা হউক, যখন প্রতিনিয়ত দগণের উপদ্রব চলিতে লাগিল, এবং তাহাদের ভয়ে সুখ শান্তিতে শ্রমের অন্ন ভােগ করা আৰ্যদিগের পক্ষে দুষ্কর হইয়া পড়িল, তথন আৰ্য- গণের আত্মরক্ষার বিশেষ উপায় অবলম্বন করা আবশ্যক হইল। তঁাহারা লােক বাছিয়া আপনাদের গ্রাম ও জনপদ সকলের প্রান্ত- চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ভাগে স্থাপন করিলেন। ইহারা সশস্ত্র হইয়া দলে দলে স্বীয় অধিকার মধ্যে বাস করিতে লাগিলেন। ইহারাই ক্রমে ক্ষত্র বলিয়া পরিগণিত হইলেন। ক্ষত্র শব্দের অর্থ, যাহারা ক্ষয় হইতে রক্ষা করে। এই অর্থের সহিত বর্ণিত ঘটনার চমৎকার সৌসাদৃশ্য লক্ষিত হইতেছে। এই ক্ষত্রগণ অদিতে অবিভক্ত আৰ্যসমাজের অঙ্গীভূত ছিলেন ; তখন ব্রাহ্মণ ক্ষত্র প্রভৃতি প্রভেদ ছিল না। কৰ্ম্মভেদ বশতঃ এই সকল প্রভেদ উৎপন্ন হইল। পূৰ্বে একমাত্র জাতি ছিল, তাহা হইতে ক্ষত্র প্রভৃতি উৎপন্ন হইল।” বেদান্ত বলিয়াছেন— “ব্ৰহ্ম বা ইদমগ্রে অসিৎ একমেব, তদেকং সৎ নব্যভবৎ । তচ্ছে যােরূপং অত্যজত ক্ষত্ৰং”। অগ্রে একমাত্র ব্রাহ্মণ জাতিই ছিল। ঐ জাতি একাকী বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল না–সুতরাং সেই শ্রেষ্ঠ ( ব্রাহ্মণ ) ক্ষত্রকে সৃষ্টি করিলেন। এখন প্রশ্ন হইতে পারে, অবশিষ্ট আৰ্য্যগণ কি করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের মধ্যে কিয়দংশ লােক একটা গুরুতর কার্যে নিযুক্ত হইতে লাগিল। সে কাৰ্য্যটা কি ? আপনারা স্মরণ রাখিবেন যে, যে সময় বেদের প্রাচীন মন্ত্র সকল রচিত হইয়াছিল, সে সময় ঐ সকল মন্ত্র কণ্ঠ রাখিতে হইত। আৰ্যেরা যখন ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন, তাহার পূৰ্বাবধিই তাঁহাদের মধ্যে সােমযজ্ঞ ও অগ্নির উপাসনা প্রভৃতি প্রচলিত ছিল। * * * অতি প্রাচীন কাল হইতে অগ্নির উপাস- নাদি ও তদর্থ রচিত মন্ত্র সকল দৃষ্টিগােচর হয়। আৰ্যেরা যখন অত্যুন্নত গিরিমণ্ডিত বহুনদ-পরিধৌত ও শস্যশালী-শ্যামল ক্ষেত্রপূর্ণ ভারতবর্ষে প্রবেশ করিলেন, তখন এখানকার প্রকৃতির গম্ভীর ও মনােহর ভাব সকল সন্দর্শন করিয়া তাহাদের চিত্তে কবিত্ব-শক্তির * * * চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। সমধিক আবির্ভাব হইতে লাগিল। যখন তাহারা ঊষাকালে নবােদিত সূর্যের তরল কিরণচ্ছটা দ্বারা অনুরঞ্জিত নীলাকাশ দেখিতে লাগিলেন, যখন নিদাঘের প্রখর তাপের পর প্রাবৃট কালের নব মেঘমালার ঘন নীলিমা প্রত্যক্ষ করিলেন, যখন গিরি- পৃষ্ঠ হইতে অবতীর্ণ বন্যা সমূহের কল্লোলিত জলরাশী নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন, তখন তাহাদের হৃদয়-সাগরে অপূৰ্ব ভাব-তরঙ্গ সকল উখিত হইতে লাগিল এবং মন্ত্রের পর মন্ত্রসকল রচিত হইতে লাগিল। * * * যাহা হউক আৰ্যগণ পুণ্যারণ্য ভারত-ক্ষেত্রে যখন তাঁহাদের ধর্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন, তখন তাহাদের মন্ত্র সকলের সংখ্যা দিন দিন বৰ্দ্ধিত হইতে লাগিল। এই সময় বর্ণ- মালার সৃষ্টি হয় নাই। সুতরাং এক শ্রেণীর লোেককে যত্ন সহকারে এই সকল মন্ত্র অভ্যাস করিয়া রাখিতে হইত। ইহারা বাল্যকাল হইতে ঐ সকল মন্ত্র কণ্ঠস্থ করিতেন। যজ্ঞস্থলে ঐ সকল মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া হােমকার্যের সহায়তা করিতেন। বর্তমান সময়ে আপনার পল্লীগ্রামে অনেক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সন্তান দেখিয়া থাকিবেন, ইহারা বর্ণজ্ঞানবিহীন, সংস্কৃত ভাষা বিন্দুবিসর্গ জানেন না—অথচ ইহারা দশকৰ্ম্মান্বিত, অর্থাৎ গৃহস্থের গৃহে যে সকল নিত্য-নৈমিত্তিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান হয় তাহার সমুদয় প্রকরণ ইহার কণ্ঠস্থ করিয়া রাখিয়াছেন। জিজ্ঞাসা করুন পিতৃশ্রাদ্ধ কিরূপে করিতে হয় ? অমনি ইহারা শ্রাদ্ধের মন্ত্র সকল অনর্গল বলিয়া যাইবেন; ‘মধুবাতা ঋতায়তে’ প্রভৃতি মন্ত্র সকল পাঠ করিতে আরম্ভ করিবেন। শুদ্ধ হউক অশুদ্ধ হউক, যেরূপ শিখিয়াছেন, অবিকল আবৃত্তি করিতে পারিবেন। বর্তমান হিন্দু-সমাজের ধর্মানুষ্ঠানের সাহায্যের জন্য যেমন এক শ্রেণীর দশ-কৰ্মান্বিত লােক দৃষ্ট হয়, চতুর্বর্ণ বিভাগ। প্রাচীন আর্যসমাজেও বেদ-মন্ত্র সকলের রক্ষা ও শিক্ষার নিমিত্ত এক শ্রেণীর লােক নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ইহারাই উত্তর কালে ব্রাহ্মণ বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিলেন। ব্রাহ্মণ শব্দের ব্যুৎপত্তিলব্ধ অর্থ —যিনি ব্রহ্মকে জানেন বা ধারণ করেন ; অথবা বেদমন্ত্র যাহারা ধারণ করেন,তাহারাই ব্রাহ্মণ। এইরূপে যখন প্রাচীন আৰ্য-সমাজের একাঙ্গ সশস্ত্র হইয়া সমাজরক্ষা ব্ৰতে ব্রতী হইলেন এবং অপরাঙ্গ বেদমন্ত্র সকল শিক্ষা ও শিক্ষাকার্যে নিযুক্ত হইলেন, তখন সমাজের অপর সকল লােক—ইহাদের সংখ্যা সর্বাপেক্ষা বেশী ছিল—কৃষি, বাণিজ্য প্রভৃতিতে নিযুক্ত হইয়া অর্থোৎপাদনে রত হইলেন। বেদে ইহার। “বিশ” শব্দে উক্ত হইয়াছেন। বর্তমান বাঙ্গলা ভাষাতে “সাধারণ এই শব্দ ব্যবহার করিলে যেরূপ অর্থ বােধ হয়, বেদমন্ত্র সকলে “বিশ” শব্দে সেই প্রকার অর্থ। বিশ অর্থ প্রজাব। এই কারণে “বিশম্পতিঃ” শব্দের অর্থ রাজা, যিনি প্রজাদিগের প্রভু। দেখুন তবে কেমন অপরিহার্য কারণে আদিম আৰ্য-সমাজ মধ্যে চার প্রকার জাতির সূত্রপাত হয়। প্রথম যখন ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী ভিন্ন ভিন্ন কার্যের ভার গ্রহণ করিলেন, তখন জাতিভেদের বর্তমান চিহ্নসকল কিছুই বিদ্যমান ছিল না। অর্থাৎ বর্তমান সময়ে জাতিভেদের যে তিনটি প্রধান ব্যাপার দৃষ্ট হয়, যথা-(১ম) নিম্ন জাতীয়দিগের অন্ন পান গ্রহণ নিষেধ, (২য়) ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধ নিষেধ, (৩য়) জাতির প্রভেদ অনুসারে ব্যব- সায়ের ভিন্নতা; আদিম আৰ্য-সমাজে এই সকল চিহ্নের কোনটিই লক্ষিত হয় না। এগুলি প্রবল দলাদলি ও বৈর ভাবের ফলস্বরূপ, সুতরাং এগুলি সামাজিক নিয়মরূপে পরিগণিত হইতে অনেক চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ৩৫ শতাব্দী লাগিয়া ছিল। বরং শাস্ত্রে এমন ভূরি ভূরি নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায় যে, বর্তমান সময়ে জাতি যেমন জন্মগত, গুণ-কৰ্ম্মগত নয়, পূর্বে তাহা ছিল না। উৎকৃষ্ট বর্ণেব হীন বর্ণত্ব প্রাপ্তি এবং হীন বর্ণের উত্তম বৰ্ণত্ব প্রাপ্তি দেখিতে পাওয়া যায়। (১) “এখন একটি কথা আপনার স্মরণ রাখিবেন। বর্তমান সময়ে সভ্যসমাজে সাধারণ শিক্ষার যেমন রীতি দৃষ্ট হয়, আদিম আৰ্যসমাজে তাহা কখনই ছিল না। অর্থাৎ এখন যেমন একটি বিদ্যালয়ে তুমি আমি দশ জন আপনাপন অবস্থা ও শক্তি অনুসারে আমাদের সন্তানদিগকে প্রেরণ করিতে পারি, দশ দিক হইতে শত শত বালক বালিকা আসিয়া প্রতিদিন শিক্ষা করিতে পারে, প্রাচীন ভারত সমাজে এরূপ বিদ্যালয় ছিল না। তখন বিদ্যার্থ- দিগকে গুরুকুলে বাস করিতে হইত। গুরুদিগের প্রতিও কঠোর শসিন ছিল, তাহারা ভূতি বা বেতন গ্রহণ করিতে পারিতেন না, পরন্তু শিষ্যগণকে অন্ন দিয়া পুষিতে হইত। শিষ্যগণ গুরুগৃহে বাস ও গুরুগৃহের পরিচর্যায় নিযুক্ত হইয়া দিনাতিপাত করিতেন। বিশেষ তখন বর্তমান সময়ের মত গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় ছিল না মুদ্রাযন্ত্র না থাকাতে অতি কষ্টে অনেক পরিশ্রম সহকারে বিদ্যার্থ- দিগকে বিদ্যাভ্যাস করিতে হইত ; সুতরাং ব্যুৎপন্ন গুরুর সংখ্যা অধিক হইত না। যে সকল ব্যুৎপন্ন ব্যক্তি শাস্ত্রবিশারদ বলিয়া প্রতিষ্ঠাবান্ হইতেন, বহুদুর হইতে শিষ্যগণ আকৃষ্ট হইয়া সেখানে আসিয়া বাস করিত। এইরূপ অবস্থায় যাহার যে বিদ্যা ছিল, তাঁহার নিজ বংশীয় বালকদিগকে শৈশব অবস্থা হইতেই শিক্ষা (১) ইহার প্রমাণ, উদাহরণ ও বিস্তৃত বিবরণ মল্লিখিত জাতিভেদ এহের তৃতীয় অধ্যায় স্রষ্টব্য। ;
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। দেওয়াই স্বাভাবিক। মানুষ যে বিষয়ে প্রতিষ্ঠা বা গৌরব লাভ করে, তাহা নিজ বংশে রক্ষা করিবার ইচ্ছা স্বতঃই উদিত হয় । এই সকল কারণেই দেখিতে পাই, এদেশে সকল প্রকার বিদ্যাই কৌলিক হইয়া যায়। এখানে নৈয়ায়িকের ছেলে নৈয়ায়িক, আর্তের ছেলে স্মার্ত, দেওয়ানের ছেলে দেওয়ান, বৈদ্যের ছেলে বৈদ্য। যিনি যখন যে বিষয়ে কৃতিত্ব লাভ করিয়াছেন, তিনিই তাহা নিজ বংশধরদিগকে শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন। “আপনারা এই বিষয়টি স্মরণ রাখিলেই, কিরূপে বর্তমান জাতিভেদ প্রথার সৃষ্টি হইল, তাহা বুঝিতে পারিবেন। যাহারা সশস্ত্র হইয়া দেশ রক্ষা করিতে নিযুক্ত হইলেন, তাঁহারা যুদ্ধ বিদ্যাতে যে নিপুণতা লাভ করিলেন, তাহা তাহাদের বংশপরম্পরাতে থাকিল। যাহারা বেদমন্ত্র সকল রক্ষা ও শিক্ষা করিতে লাগিলেন, সেই কাৰ্য্য তাঁহাদের কৌলিক কাৰ্য্য হইল। যাহারা কৃষি ও বাণিজ্যাদিতে প্রবৃত্ত হইলেন, তাহারা আপন আপন সন্তানদিগকে উক্ত বিষয়ে শিক্ষা দিতে লাগিলেন। এখন কি আপনাদিগকে দেখাইয়া দেওয়া আবশ্যক যে, যে বিদ্যা এ প্রকার কৌলিক হয়, লােকে সর্বদাই যত্নপূর্বক তাহাকে রক্ষা করিয়া থাকে ও তদুপরি অপরকে সহজে অধিকার স্থাপন করিতে দেয় না ? (১) (১) বৈশ্য জাতীয় তিলি, সুবর্ণবণিক, সাহা, গন্ধবণিক প্রভৃতিগণ যেমন করিয়া ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও শুদ্রকে বঞ্চিত করত: আপনাদের বিপুল ঐশ্বৰ্য্য, অতুল ধনরাশি, বৃদ্ধির টাকা নিজেরা ও পুত্র প্রপৌত্রাদি লইয়া খ স্বামীত্ব আরােপ করিয়া ভােগ করিয়া থাকেন, প্রাচীন ব্রাহ্মণগণও তদ্রুপ আপনাদের এক কষ্টার্জিত সম্পত্তি বেদবিদ্যা ও ধর্মশাস্ত্র পূজার্চনার অধিকার সকলকে বণ্টন করিয়া না দিয়া বংশপরম্পরা ভাবে আপনারাই ভোগ চতুর্থ বিভাগ। আপনারা সমাজমধ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রকার প্রমাণ প্রাপ্ত হইতেছেন, সুতরাং এই কথার প্রমাণ দিবার জন্য আর ব্যগ্র হইবার প্রয়ােজন নাই। যখন বেদ-মরক্ষকগণ আপনাদের কর্মের জন্য গৌরব ও স্পর্ধা করিতে লাগিলেন এবং দেশরক্ষক ক্ষত্রগণ স্বীয় কার্যের গৌরব ঘােষণা করিতে লাগিলেন, তখন অল্পে অল্পে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিদ্বেষ ভাবের সৃষ্টি হইল এবং ক্রমে ক্রমে বর্তমান কঠিন নিয়ম সকল দেখা দিল।” বেদে বিরাট পুরুষের মুখ বাহু হইতে ব্রাহ্মণাদি চতুৰ্বর্ণের উৎপত্তি বিবরণ। “জগতের সমুদয় গ্রন্থের মধ্যে আদিগ্রন্থ বেদ---ঋগ্বেদ তন্মধ্যে আদিতম। এই ঋগ্বেদ সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলা আবশ্যক। এই ঋগ্বেদ কতকগুলি মন্ত্রের সমষ্টি। এই সকল মন্ত্রের অধিকাংশ এমন সময়ে রচিত হইয়াছিল, যখন বর্ণমালার সৃষ্টি হয় না, এবং লিখিবার প্রথা প্রবর্তিত হয় নাই। তখন ঐ সকল মন্ত্র মুখে করিয়া আসিতেছেন। এইরূপ কায়ণেই শূদ্রকে বেদ বেদান্ত প্রণব গায়ত্রী পূজার্চনা হইতে বঞ্চনা করা হইয়াছে। ধনবান্ বৈশ্য, শূদ্র ও সাম্রাজ্যশালী ক্ষত্রিয় যেমন করিয়া ব্রাহ্মণকে স্বীয় স্বীয় অধিকার ও ধন সম্পত্তি হইতে ঘাের স্বার্থপরের মত বঞ্চিত করিয়াছেন, ব্রাহ্মণগণও ঠিক তদ্রুপই তাহাদিগকে আপনাদের একমাত্র সম্পদ বেদ-বিদ্যা হইতে বঞ্চিত করিয়াছেন। প্রতিশোধ পরায়ণ মানুষের পক্ষে ইহা অস্বাভাবিক নহে। অপরকে আপনাদিগের অধিকার দিতে যাহারা নারাজ, তাঁহারা অধিকার লাভের কিছুমাত্র যােগ্য নহে। নিজেদের সুচপ্রমাণ অধিকার দিতেও যাহারা সম্মত নহে, তাহারা আবার ব্রাহ্মণগণকে অধিকার না দেওয়ার জন্য দায়ী করিয়া বক্তৃতা করি- তেছেন। কি প্রহেলিকা।
৮ চতুর্বর্ণ বিভাগ। মুখে রচিত হইয়া মুখে মুখে শেখা হইত, এবং মুখে মুখে বিচরণ করিত। লােকে ইহার মুখে, উহার মুখে, তাহার মুখে মন্ত্রগুলি সৰ্ব্বদা শ্রবণ করিত, এবং যত্নপূৰ্ব্বক স্মরণ করিয়া রাখিত। এইজন্য বেদের নাম, শাস্ত্রের নাম শ্রুতি স্মৃতি হইয়াছিল। তৎপরে বর্ণমালার সৃষ্টির পরে, সময়ে সময়ে এক একজন পণ্ডিত উদ্যোগী হইয়া স্মৃতি হইতে ও লােকমুখ হইতে সংগ্রহ পূর্বক বর্ণিত বিষয় অনুসারে তাহাদিগকে মণ্ডল, অধ্যায়,ক্ত প্রভৃতিতে বিভাগ করিয়া গ্রন্থাকারে নিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। এই সকল পণ্ডিত বেদব্যাস নামে উক্ত হইয়াছেন। এই ঋগ্বেদের কোন একটি সূক্ত পাঠ করিতে গেলেই দেখিতে পাই, সৰ্ব্বাগ্ৰেই অমুক ঋষি, অমুক ছন্দ, অমুক ( মন্ত্রের লক্ষ্যীভূত আরাধ্য দেবতা প্রভৃতি নির্দেশ করা হইয়াছে। ইহার তাৎপৰ্য এই, সংগ্রহকর্তা সংগ্রহ করিবার সময় যে ঋষিকে যে মন্ত্রের রচয়িতা বলিয়া শুনিয়াছেন, সেই মন্ত্রের অগ্রে সেই নাম নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন। ঋগ্বেদের সূক্ত সংখ্যা মােট ১০২৮ এবং ঋক্ সংখ্যা ১০৪২২ (মতান্তরে ১০৪০২)। যে সূক্তের মধ্যে জাতিভেদের উৎপত্তির কিঞ্চিৎ বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহার নাম পুরুষসূক্ত। এই সুক্তটীতে এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে যে, দেবগণ এক আশ্চৰ্য্য প্রকৃতি-সম্পন্ন পুরুষকে যজ্ঞে বলি দিয়াছিলেন। তস্মাৎ যজ্ঞাৎ সৰ্বহুতঃ ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে। ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাৎ যজুম্মাদজায়ত! তদখা অজায়ন্ত যে কে চোয়া- দতঃ। গাবােহজজ্ঞিরে তম্মাজ্জাতা অজাবয়। অর্থ—“হত যজ্ঞ হইতে ঋক সকল ও সাম সকল জন্মগ্রহণ ল । তাহা হইতে ছন্দ অর্থাৎ বেদ সকল ও যজুর্বেদ উৎপন্ন
চতুর্বর্ণ বিভাগ।
হইল। তাহা হইতে অশ্ব সকল ও দুই পাটী দন্তবিশিষ্ট অপর
সকল প্রাণী এবং গাে, মেষ, অজা প্রভৃতি উৎপন্ন হইল।(১)
তং যজ্ঞং বহিষি পৌক্ষন পুরুষং জাতমগ্রতঃ
তেন দেবা অজন্ত সাধ্যা শ্চ ঋষয়শ্চ যে।
যং পুরুষং বদধু
কতিধা
ব্যকল্পয়ন্
মুখং কিমস্ত কৌ বাহু কা উরূপানা উচ্যেতে।
অর্থাৎ যিনি সকলের অগ্রে জন্মিয়াছিলেন, সেই পুরুষকে
নীয় পশুরূপে সেই বহ্নিতে পূজা দেওয়া হইল। দেবতারা,
সাধ্যবর্গ এবং ঋষিগণ উহা দ্বারা যজ্ঞ করিলেন।
সেই যীয় পুরুষকে খণ্ড খণ্ড করিয়া কতিপয় খণ্ডে বিভক্ত
কব। হইয়াছিল। উহার মুখ কি হইল, দুই হস্ত, দুই উরু, দুই
চরণ কি হইল।
উত্তর স্বরূপ বলা হইতেছে :-
“ব্রাহ্মণহস্য মুখমাসীৎ বাহু রাজন্যঃ কৃতঃ।
উরু তদস্য যদ্বৈত্য প্যাং শূদ্রোহজাত ।
(ঋগ্বেদ ১২১০১৯)
১ম মণ্ডল, ৯০ সূক্তের ১২শ ঋক।
ইহার মুখ ব্রাহ্মণ হইল, দুই বাহু রাজন্য হইল, যাহা উরু ছিল,
তাহা বৈশ্য হইল, দুই চরণ হইতে শূদ্র হইল। ইহাই ব্রাহ্মণ্য
ধৰ্ম্মের বা জাতিভেদের মূল ভিত্তি। এই কথার উপরই দেশশুদ্ধ
লােক দোহাই দিতেছেন। এক্ষণে এই সূক্তের একটু আলােচনা
করা যাউক। এই সূক্তের ছায়াই পরবর্তী সংহিতা ও পুরাণাদিতে
প্রতিফলিত হইয়াছে, এবং ক্রমে তাহা হইতেই “ব্রহ্মার মুখ বাহু
(১) পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত শিবনাথ শাস্ত্রী এম, এ, প্রদত্ত বক্ত তা জাতিভেদ।
৪০ চতুর্ণ বিভাগ। উরু পাদ হইতে ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণের উৎপত্তির ভ্রান্ত ধারণা, অলীক কল্পনা লােকের মনে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। যদি আমরা নানাবিধ যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করিতে পারি যে, এই সূক্ত ঋগ্বেদের নহে, পরবর্তী সময়ে রচিত এবং ঋগ্বেদে প্রক্ষিপ্ত, তাহা হইলে তাহাকে (এই প্রক্ষিপ্ত শ্লোককে অবলম্বন করিয়া পরবর্তীকালে যে সমস্ত পুরাণ ও সংহিতাদিতে উদ্ধত ৰা রচিত হইয়াছে, সে গুলিও ভিত্তিহীন ও অসার বলিয়া গৃহীত হইবে। প্রথমতঃ—দেখা যাউক,ষজ্ঞ করিলেন কাহারা ? লেখা আছে- ঋষিগণ যজ্ঞ করিলেন। এই ঋষিগণ আসিলেন কোথা হইতে ? ব্রাহ্মণ ঋষি ত তখন জন্মগ্রহণই করেন নাই—পরে মুখ হইতে জন্মগ্রহণ করিলেন মাত্র। দ্বিতীয়তঃ—“বিশ্বনিয়ন্তা ভগবানকেই বলিদান করার অনুভবটী ঐ স্থান ভিন্ন ঋগ্বেদের অন্যত্র কোথাও নাই। ইহা অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ের অনুভব। মুয়ার সাহেব লিখিয়াছেন—“বলি- প্রথা অতিশয় বিস্তৃতি লাভ করিলেই বৰ্তমান কল্পনা সম্ভব হয়, নতুবা নহে। এই বলি-প্রথার আনুসঙ্গিক ক্রিয়াকলাপ সম্বন্ধে যাহার সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা শ্রদ্ধা ভক্তি বিশ্বাস আছে, যিনি এই প্রথার পবিত্রতা এবং সফলতা বিশ্বাস করিয়া থাকেন, শুধু সেইরূপ পুরােহিত কবিই কল্পনা করিতে পারেন যে, পরমপুরুষ পরমেশ্বরকেও বলি দেওয়া যাইতে পারে। অন্যের পক্ষে এরূপ কল্পনা ধৰ্ম্ম-বিগর্হিত।” (১) তৃতীয়তঃ—ঋগ্বেদ ক্ষুদ্র একখানি গ্রন্থ নহে,খুব বড়ু গ্রন্থ। ইহাতে তৎকালিক সমাজের সকল কথাই বিশেষ ভাবে লিখিত রহিয়াছে। (১) অনুবাদ Meir's Sanskrit Texts-vol. v. * ৪১, চতুর্বর্ণ বিভাগ। আৰ্যদিগের আচার, নীতি, ব্যবহার, বিশ্বাস প্রভৃতির ভূরি ভূরি বর্ণনা আছে। প্রাচীন আৰ্যগণের গার্হস্থ্য নীতি, স্ত্রীলােকদিগের অবস্থা, বিবাহ পদ্ধতি, যজ্ঞাদি ধর্মাচার, জ্যোতিষ, আৰ্যদিগের শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, অনাৰ্য দস্যদিগের সহিত যুদ্ধবিগ্রহ, ক্ষেত্রে লাঙ্গল দেওয়ার কথা, সােমর প্রস্তুতের উপায় প্রভৃতি যাবতীয় বিষয়ই বিশেষরূপে বর্ণিত রহিয়াছে। কিন্তু এই জাতিভেদের কথাই তেমন ভাবে লিখিত হয় নাই—ইহাও কি সম্ভব ? একটি ঋকে মাত্র অতি সামান্য কয়েকটি কথায় উহার উল্লেখ দৃষ্ট হয় মাত্র। চতুর্থতঃ-“পরবর্তী সংস্কৃত ভাষায় যে বর্ণ শব্দ জন্মগত জাতি অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহা ঋগ্বেদে আৰ্য্য ও অনাৰ্য্যের (গৌর ও কৃষ্ণের) বিভিন্ন শারীরিক বর্ণ (রং) অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।” (১) পঞ্চমতঃ—“ঋগ্বেদের রচনাকালের অনেক পরে এই অংশ রচিত হইয়া ঋগ্বেদের ভিতর প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে, ঋগ্বেদের অন্য কোন অংশে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, এই চারিজাতির উল্লেখ নাই। ব্যাকরণবিদ পণ্ডিতগণ প্রমাণ করিয়াছেন যে, এই ঋকের ভাষাও আধুনিক সংস্কৃত। উক্ত সূক্তটীর ভাষা দেখিলেই মনে হয় উহা আধুনিক সংস্কৃত। ঋগ্বেদের অন্যান্য মন্ত্রগুলির ভাষা আধুনিক সংস্কৃতের মত নহে। তাহা অতিশয় কঠোর এবং তাহার ব্যাকরণও স্বতন্ত্র ; শুধু ব্যাকরণ স্বতন্ত্র নহে, ছন্দ ও আবার অন্য রূপ”।(২) ভাষা ও শব্দদ্বারা বিভিন্ন জাতির পরস্পর সম্বন্ধ নিৰ্ধারিত হইয়া থাকে। এই ভাষার সাহায্যেই ইউরােপীয় সভ্য জাতিগণের সহিত সুপ্রাচীন আর্যজাতির সম্বন্ধ অনুমিত হইতেছে। (১) ও রমেশচন্দ্র দত্ত সম্পাদিত ঋগ্বেদ-সংহিতা। (২) পরমেশ্চন্দ্র দত্ত সম্পাদিতখগ্বেদ-সংহিতা ৪২ চতুৰ্ব্বর্ণ বিভাগ। শ্রবণ করুন-ঋগ্বেদের প্রথম সূক্তের সর্বপ্রথম খ- অগ্নিমীলে পুরােহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজং। হােতারং রত্নতমম্। আধুনিক সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের পক্ষে টীকাকারের সাহায্য ব্যতীত এই মন্ত্রের অর্থ গ্রহণ করা অতিশয় দুরূহ। এইরূপ সমুদয় বৈদিক মন্ত্রের অর্থ গ্রহণই দূরূপ। কি সন্ধ্যামন্ত্র, কি গায়ত্ৰীমন্ত্র, কি যজ্ঞাদির মন্ত্র, সব মন্ত্রেরই অর্থ গ্রহণ কঠিন এবং তাহার ভাষা, ছন্দ প্রভৃতিও পৃথক। “ব্রাহ্মণােৎস্য” শ্লোকের সহিত উহাদের তুলনা একে- রারেই চলে না। ষষ্ঠতঃ-ধরিয়া লইলাম ব্রাহ্মণাদি জাতি চতুষ্টয় ব্রহ্মার বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রভবই বটে, কিন্তু তাহাতে একের সন্তান জাতি চতুষ্টয়ে পার্থক্য ঘটিবে কেন? ভবিষ্য পুরাণ বলিতেছেন ? বঞ্চনং দুর্বচাপি ক্রিয়তে সৰ্বমানবৈঃ শূদ্র ব্রাহ্মণয়াে স্তস্মাৎ নাস্তি ভেদঃ কথঞ্চন। শুদ্র ব্রাহ্মণয়াের্ভেদো মৃগ্যমানােপি যত্নতঃ। নেক্ষ্যতে সর্বধর্মেষু সংহতৈ ব্ৰিদশৈপি। - ন ব্রাহ্মণাশ্চ মরীচি শুক্লা, ন ক্ষত্রিয়াঃ কিংশুক পুষ্পবর্ণাঃ। ন চাপি বৈশ্যা হরিতাল তুল্যাঃ, শূদ্রা ন চাঙ্গার সমান বর্ণাঃ। পাদপ্রচারৈস্তমুবর্ণকেশৈঃ, সুখেন দুঃখেন চ শােণিতেন। ত্বক মাংসমেদোস্থি রসৈঃ সমানা, চতুপ্রভেদাহি কথং ভবন্তি। বর্ণমালাকৃতি গর্ভস বাগবুদ্ধি কৰ্ম্মেন্দ্রিয় জীবিতেষু। ৰাত্ৰিৰ্গাময় ভেষজে ন বিদ্যতে জাতিতে বিশেষঃ ৪ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ১৩ স এক এবাৰ পতিঃ প্রজানাং কথং পুনর্জাতি কৃতঃ প্রভেদঃ। প্রমাণ দৃষ্টান্ত নয় প্ৰবালৈঃ, পরীক্ষমাণাে বিঘটত্ব মেতি। চত্বর এক পিতুঃ সুতাশ্চ তেষাং সুতানাং খলুজাতিরেকা। এবং প্রজানাং হি পিতৈক এবপিত্রেকভাবাৎ ন চ জাতিভেদঃ ॥ ফুলাথােম্বর বৃক্ষজাতেথা মধ্যান্ত ভবানি যানি। বর্ণাকৃতি স্পর্শরসৈঃ সমানি, তথৈকতা জাতেরিতি প্রচিন্ত্যং । ব্রাহ্মপর্ব-ভবিষ্যপুরাণ। পদ্যানুবাদ- “অসাধু চরিত কৰ্ম্ম করে সর্বজনে। কোন ভেদ নাই তাই শূদ্র ও ব্রাহ্মণে। শূদ্র ব্রাহ্মণের ভেদ অন্বেষি যতনে। দেখিতে না পান সৰ্বধৰ্ম্মে সুরগণে। মরীচি সমান শুক্ল নহে দ্বিজগণ। ক্ষত্রিয় নহেন সবে কিংশুক বরণ হরিতাল তুল্য বর্ণ নহে বৈশ্যগণ। অঙ্গারের সম নয় শূদ্রের বরণ। গতিবিধি আদি আর তনুবর্ণ কেশে। সুখে দুঃখে শােণিত প্রবাহে আর রসে । মেদ অস্থিত্ব মাংসে সবাই অভিন্ন। কিসে তবে ভেদযুক্ত হয় চারি বর্ণ। দেহ পরিমাণ, গর্ভবাস ও বরণ। বাক্য বুদ্ধি আর কৰ্ম্মেন্দ্রিয় ও জীবন। বল আর তিন মার্গ ভেষজ আময়। জাতিগত ভেহে কতু বিভিন্ন না হয়।
৪৪ চতুর্ণ বিভাগ। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এ তিন ভুবনে। জাতিগত ভেদ তবে হয় কি কারণে ? প্রমাণ দৃষ্টান্ত নীতি প্রবাদের বলে । নাহি থাকে ভেদবাদ পরীক্ষা করিলে ॥ এক জনকের হয় চারিটী নন্দন। সমজাতি তাহাদের সেই নিবন্ধন। সকল প্রজার পিতা একমাত্র তাই। একই জনক ৰলি জাতিভেদ নাই। উদর * ফল যথা অনুরূপ সব। কিবা অগ্ৰ কিবা মধ্য কিবা মূলােব। বর্ণাকৃতি স্পর্শরসে নাহিক অন্তর। তেমনি এক সৰ্ব্ব জাতির ভিতর ।” “অতি সুন্দর কথা, পিতা এক, পুত্র চারিটী,ইহারা কি প্রকারে এক না হইয়া ভিন্ন জাতি হইতে পারে ? ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়াদিতে কি বর্ণ ও দেহাদিগত কোন পার্থক্য আছে ? পিতা এক, সুতরাং মানুষের জাতিও এক ভিন্ন দুই হইতে পারে না। তথাস্তু ধরিয়া লইলাম কেহ যেন মুখ প্ৰভব, কেহ বা যেন পদ প্রভব। কিন্তু ডুমুর গাছের গােড়ায় আগায় ডালে ও গুড়িতে যে ফল হয়, তাহার কি কোনটী আম কোনটী জাম ও কোনটা কাটাল বলিয়া কথিত হইয়া থাকে ? উহাদের নাম কি এক ডুমুরই নহে? রস ও স্বাদাদি একরূপ দেখা যায় না? তবে ভিন্নাঙ্গ প্রভব হইলেও জাতি পৃথক্ হইবে কেন ? ফলতঃ, ইহা কেবল মূখগণকে ভুলাই- যজ্ঞডুমুর, যদুর।
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
বার জম্ভ বলা হইয়াছে। ঈশ্বরের নিকট ব্রাহ্মণ ও শুদ্র বলিয়া
কোন ভেদ নাই ও থাকিতে পারে না।
“ব্রাহ্মণােহ মুখমাসীৎ” এই ঋক ও শ্লোক লইয়া বঙ্গদেশে
বহু আলােচনা হইয়াছে। বহুবিধ বিভিন্ন পণ্ডিত ইহার বহুবিধ
বিভিন্ন ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তৎসম্বন্ধে নিয়ে কিঞ্চিৎ উদ্ধত করা
যাইতেছে-
হিন্দুধর্মের মুখপত্রিকা সুবিখ্যাত “হিন্দুপত্রিকায় উক্ত ঋক
সম্বন্ধে এইরূপ ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, যথা :-
পদ পাঠঃ। ব্রাহ্মণঃ । অশ্য। মুখ।
আসীৎ। বাহু।
রাজন্যঃ। কৃতঃ। উরু। তৎ। অশ্রু।
অশ্য। যৎ। বৈঃ। পদ্ভ্যাং
শূদ্রঃ। অজাঙ্কত।
(১) ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণ অর্থাৎ শমদমাদি গুণসম্পন্ন সাত্ত্বিক ব্যক্তি।
(২) অস্য – বিরাট পুরুষের।
(৩) মুখং-মুখ।
(৪) আসীৎ-হইয়াছিল অর্থাৎ বর্ণনা করা হইয়াছিল।
(৫) বাহ-বাহুদ্বয়।
(৬) রাজন্যঃ- যুদ্ধাদি কার্যে নিযুক্ত রজঃগুণ প্রধান মানব।
(৭) কৃতঃ-অর্থাৎ কল্পনা করা হইয়াছিল।
(৮) উরু উরুদ্বয়।
(৯) তৎ—তাহা, সেই।
(১০) অ-ইহার অর্থাৎ বিরাট পুরুষের।
(১১) যৎ—যাহার।
(১২) বৈশ্য-কৃষি বাণিজ্যাদি দ্বারা অর্থোপার্জনে নিযুক্ত, তমঃ
রজোগুণ প্রধান ব্যক্তি
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
(১৩) পঙ্ক্যাংপদদ্বয় হইতে।
(১৪) শূদ্রঃ-বেদ পরিত্যাগী তমােণ প্রধান ব্যক্তি।
(১৫) অজাত উৎপন্ন হইয়াছিল।
অন্বয়ঃ। ব্রাহ্মণঃ অন্য পুরুষস্ত মুখমাসীৎ।
রাজন্যঃ অস্ত পুরুষ বাহুকৃতঃ কল্পিতঃ।
ষদ্বৈঃ তদস্য পুরুষ উৰু কল্পিতঃ।
সূত্র প্যাং অজাত।
শূদ্রপদরূপেণ কল্পিত ইত্যর্থ।
বঙ্গানুবাদ। ব্রাহ্মণকে এই পুরুষের মুখরূপে কল্পনা করা
হইয়াছিল। ক্ষত্রিয়কে বাহুস্বরূপ কল্পনা করা হইয়াছিল। বৈশ্যকে
উরুরূপ কল্পনা করা হইয়াছিল। শূদ্রকে পদরূপে কল্পনা করা
হইয়াছিল।
১১শ ঋকে জিজ্ঞাসা করা হইতেছে
যৎ পুরুষং ব্যদধুঃ কতিপা ব্যকল্পয়ন্ ।
মুখং কিম কৌ বাহু কা উরু পাদা উচ্যেতে ।
১২শ ঋকে উহার উত্তরে বলা হইতেছে-
ব্রাহ্মণােহস্য.•••••••••••ইত্যাদি।
ইহা বলা হইতেছে না যে,-মুখ ব্রাহ্মণ হইয়াছিল, কিন্তু বলা
হইতেছে যে ব্রাহ্মণ মুখ হইয়াছিল। ব্রাহ্মণ এবং মুখের অস্তিত্ব
কাল ধরিয়া লইলে, ব্রাহ্মণের অস্তিত্ব কাল পূর্বেই আইসে।
যেমন—যদি বলা যায় স্বর্ণ অলঙ্কার হইয়াছিল, তাহা হইলে যেমন
স্বর্ণের অস্তিত্ব পূৰ্বে এবং অলঙ্কারের অস্তিত্ব পরে সূচিত হয়,
তদ্রপ ব্রাহ্মণ মুখ হইয়াছিল বলিলে ব্রাহ্মণের অস্তিত্ব পূর্বে এবং
“মুখে স্তিত্ব পরে সূচিত হয়। সুতরাং ইহা দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়-
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ৪৭ মান হইতেছে যে—“ব্রাহ্মণােস্ত মুখমাসীৎ” শব্দের অর্থ ইহা নয় যে-“ব্রাহ্মণ মুখ হইতে উৎপন্ন হইয়াছেন”। কিন্তু ইহার প্রকৃত অর্থ এই যে, ব্রাহ্মণকে মুখস্বরূপ কল্পনা করা হইয়াছে। বাই দ্বিবচন এবং কৃত একবচন; সুতরাং কৃতের সহিত বাহুর যােজনা হইতে পারে না, রাজন্যের সহিত উহার অন্বয় হইবে। অর্থাৎ রাজন্যকে বাহুদ্বয় করা হইয়াছিল। তৎপরে “উরু তদন্ত যদ্বৈঃ” ইহার অর্থ এই যে, বৈশ্যকে উরুদ্বয় করা হইয়াছিল। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, পুরুষের মুখ, বাহু ও উরু কল্পিত হইয়াছিল। কিন্তু যদিও শূদ্র সম্বন্ধে “পদ্ভ্যাং শূদ্র অজামত” এই- রূপ উল্লেখ আছে, তত্রাচ পূর্ববর্তী তিনটীর ন্যায় ইহাকে কল্পনা মাত্র বলিয়াই গ্রহণ করিতে হইবে। এ সম্বন্ধে ভারতের অদ্বিতীয় বৈদিক পণ্ডিত পূজ্যপাদ সত্যব্রত সামশ্রমী মহাশয় লিখিয়াছেনঃ- “পূর্ব মন্ত্রে কোন্ বস্তুই বা পাদদ্বয়রূপে কথিত হইয়া থাকে, এই প্রশ্ন থাকায় এবং এই মন্ত্রে আদিম ভাগত্ৰয়ে ব্রাহ্মণাদি জাতি- এয়ই মুখাদিরূপে কল্পনীয় ক্ষুটোক্তি থাকায়, এই শেষ ভাগে অর্থাৎ পাদদ্বয় হইতে শূদ্রের উৎপত্তি এই অংশটুকুরও ঐ অনুসারে ব্যাখ্যা কর্তব্য। সুতরাং শূদ্র জাতিই তাহার পাদদ্বয়রূপে কল্পিত হয় ইহাই প্রকৃত অর্থ বুঝিতে হইবে। এস্থলে আরও বিবেচনীয় যে,-প্রশ্নমন্ত্রে প্রথমই মােটামুটি প্রশ্ন আছে,—যাহাকে পুরুষ বলিয়া বিধান হইল,—তিনি কি প্রকার কল্পিত হয়েন, অর্থাৎ তিনিও বাস্তবিক শরীরী নহেন, তবে কবিগণ শরীরী. বলিয়া কল্পনা করেন মাত্র, সুতরাং কোন্ বস্তু দ্বারা কোন্ অঙ্গ কল্পিত হয়, ইহাই জিজ্ঞাস্য, ও এই প্রশ্নের উত্তরে অমুক বস্তু অমৃতমন ৪ চতুর্ণ বিভাগ। কল্পনীয় ইহাই সুসঙ্গত উত্তর। অতএব ঈদৃশ স্থলে এইরূপ অর্থ করাই কর্তব্য। ইহার সুসঙ্গত অর্থ--মানব সমাজকে একটি পুরুষ কল্পনা করতঃ ব্রাহ্মণকে এই পুরুষের মুখ, ক্ষত্রিয়কে বাহু, বৈশ্যকে উরু, শূদ্রকে পদরূপে কল্পনা করা হইয়াছে। এবং এই রূপ কল্পনা করার উদ্দেশ্য এই যে-প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণগণ বিশেষ জ্ঞানবান্ ছিলেন, এবং মুখ দ্বারা বেদপাঠ ও মন্ত্রাদি উচ্চারণ করিতেন, এ নিমিত্ত তাহাদিগকে সমাজে উচ্চস্থান দেওয়া হইয়াছে এবং বিরাট পুরুষের উত্তনাঙ্গ মুখস্বরূপ কল্পনা করা হইয়াছে। বাহুদ্বারা যুদ্ধাদি সৰ্ব্ববিধ কার্য সম্পন্ন করা হয়-একারণ রাজ্য- রক্ষক ক্ষত্রিয়গণকে বিরাট পুরুষের বাহুরূপে কল্পনা করা হইয়াছে। ঊরু যেমন শরীরের স্তম্ভ স্বরূপ—কৃষি বাণিজ্য ব্যবসায়ী বৈশ্যগণও তেমনি সমাজের স্তম্ভ স্বরূপ—প্রধান অবলম্বন-উই তাহাদের সর্বপ্রধান অবলম্বন, একারণ তাহাদিগকে বিরাট পুরুষের উরু- রূপে কল্পনা করা হইয়াছে। পদ যেমন শরীরের নিম্ন অঙ্গ, হীন কৰ্ম্ম শূদ্রগণকে তেমনি বিরাটের পদরূপে নিম্নশ্রেণী বলিয়া কল্পনা করা হইয়াছে। এবিষয়ে শ্রীমৎ নিৰ্মলানন্দ ভারতী মহােদয় বলেন —*** “পুরুষসূক্ত রূপকে পরিপূর্ণ। “ব্রাহ্মণােস্ট” ইত্যাদি মন্ত্রটা নিরপেক্ষভাবে আলােচনা করিলে বুঝা যায়, উহা বিরাট পুরুষের বর্ণনাও নহে, প্রজাপতির বর্ণনাও নহে, রাষ্ট্র পুরুষের বর্ণনা মাত্র। সমাজের বর্ণনাই ঐ ঋকের অর্থ। ব্রাহ্মণ তখনকার সমাজে মুখ, ক্ষত্রিয় বাহ, বৈশ্য উরু এবং শূদ্র পদ। জ্ঞান প্রকাশ ব্রাহ্মণে, সুতরাং তাবে সমাজ নীরব, বল ক্ষত্রিয়ে তাহা না হইলে সমাজের কাৰ্য্য করিবার শক্তি লােপ পায়। কৃষি বৈশ্য বল, তাহা না থাকিলে সমাজ ভগ্ন উরু, গড়াইতে ৪৯ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। পারে না। পরিচা শূদ্ৰ কাৰ্য্য, তাহা না থাকিলে, সমাজের হস্ত পদ মস্তিষ্ক সবই অপরিস্কৃত রুগ্ন ভগ্ন হইয়া যাইবার সম্ভাবনা। যাহার দ্বারা কাজ পাইতে হইবে, তাহার সেবা শুশ্রুষা চাই। এই ত গেল ঋকের প্রকৃত অর্থ। এখন টাকাকাব, ভাষ্যকার যাহাই কেন বলুন না, এ ঋক্ আধুনিক। সকলেই ব্যাখ্যা করিতে গোজামিল দিয়াছেন। বেদের বর্ণিত বিবাট পুরুষ জিনিষটা কি, এ বিষয় যাহার কিছুমাত্র জ্ঞানও আছে, তিনি অবশ্যই বলিবেন, ৰাহ্মণ জাতি বিরাট পুরুষের মুখ হইতে পারে । কেবল ব্রাহ্মণাদি চারি জাতি মানবের দ্বারা যদি বিরাট মূৰ্তি কল্পিত হয়, তবে স্থাবর, জঙ্গম, গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র, সূৰ্য্য, নদ, নদী, পাহাড়, পৰ্বত কাহার বাটী যাইবে ? অতএব ব্রাহ্মণ মুখরূপে কল্পিত হইয়াছিলেন, এরূপ অর্থও দর্শনশাস্ত্র বিরুদ্ধ। বিরাট পুরুষের বর্ণনা বহু পুরাণে আছে, বেদান্তাদি দর্শনেও সমর্থিত হইয়াছে, কিন্তু তাহা ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণ বিশিষ্ট ভারতীয় সমাজ হইতে বড় বিভিন্ন। ঐ মন্ত্র পুরুষ সুক্তের অন্তর্গত নর, উহা কোনও মতে জাতিভেদের প্রমাণরূপে পুরুষক্তে প্রক্ষিপ্ত। বিরাটের সহিত উহার সম্বন্ধ বলিতে গেলে, বিরাট বহুপি হয়। দাঁড়াইবে। ঐ মন্ত্রের অর্থ যদি টীকাকারদিগের মানুষ না , তাহা হইলেও উহা অর্থাৎ মুখ দিয়া, হাত দিয়া অপূৰ্ব জা২৪ প্রক্রিয়া প্রচার করা বেদের অনধিকার চর্চা ব্যতীত আর কিছুই জীব-শরীর-নিৰ্মাণ প্রণালী ও জগতের পূর্ণতা অবস্থা বিষয়ে ভারতীয় আর্যজাতির জ্ঞান এত তিরস্কৃত এস সি করিতে কষ্ট হয়।” বিবাটের মুখ বাহু হইতে ব্রাহ্মণাদি চারি জানি কি নহে।
৫০ চতুর্বর্ণ বিভাগ। সম্বন্ধে বিখ্যাত সমাজতত্ত্ব লেখক বহুবিধ গ্রন্থপ্রণেতা পণ্ডিত পূর্ণচন্দ্র বসু মহাশয় এইরূপ লিখিয়াছেন—“যাহা বিরাটের মুখ তাহাই ব্রাহ্মণ, যাহা বাহু তাহাই ক্ষত্রিয়, যাহা উরু বা মধ্যভাগ তাহাই বৈশ্য, যাহা পাদ তাহাই শূদ্র। এস্থলে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র বলিতে এক একজন ব্যক্তি মাত্র নহে, সকলই সমষ্টি অর্থে বুঝিতে হইবে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ত্ব, বৈশ্যত্ব এবং শূদ্রত্ব- যুক্ত লােক সমষ্টিই ব্রহ্মার কায়া। যাহা ব্রহ্মার কায়া, তাহা শুধু আৰ্য জাতিতে নহে, শুধু অনাৰ্য জাতিতে নহে, সমস্ত লোক মণ্ডলীতে যাহা আছে, তাহাই ব্রহ্মার কায়া। ব্রহ্মা শুদ্ধ জাতি বিশেষে আবদ্ধ নহেন ; সৰ্বজাতিতে তিনি বিদ্যমান। বিরাট ব্ৰহ্ম কোন নির্দিষ্ট জাতিবিশেষে আবদ্ধ বা সীমাবদ্ধ বলিলে বড়ই ভ্ৰম করা হইবে। কেন না বিরাট অনন্ত -বিশ্ব- ব্যাপ্ত। সমগ্র বিশ্ব জীবজগৎ বিরাটের মধ্যে নিহিত। বিরাট ব্ৰহ্ম ছাড়া পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকার করিলে তাহার সর্বব্যাপিত্বে ও অনন্তত্বে, আঘাত লাগে। এইজন্য বিখ্যাত লেখক শ্রীযুক্ত যােগেন্দ্রকুমার ঘােষ এম, এ, মহাশয় বলেন-“আমাদের বেদে আছে যে, বিরাট পুরুষ ব্ৰহ্মার মুখ বাহু উরু ও পদ হইতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের উৎপত্তি হইয়াছিল। এই ব্রাহ্মণাদি চতুৰ্ব্বর্ণ যখন ভারতবর্ষের বাহিরে নাই এবং বিরাট পুরুষের মুখ হইতে পাদ পর্যন্ত যখন ভারতবর্ষেই শেষ হইল, তখন আর পৃথিবীর অপরাপর জাতির জন্য অন্য কোন অঙ্গ বাকী রহিল না। এ যুক্তি নিতান্ত অসার, নিতান্ত ভ্রমাত্মক।” পূৰ্বে উক্ত হইয়াছে, প্রাচীন আর্যগণ একবর্ণ ও একজাতীয় ছিলেন। একবর্ণ আসীৎ পুরা”। “আদিম কালে (পরিচৰ্য্যা ) চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। কৃষি, যাজন ও যুদ্ধাদি জীবিকা-ভেদজনক বর্ণবিচার বা বংশানুক্রমে পুরােহিত বা রাজার প্রথা তখন ছিল না। শ্যামল শস্যভর। প্রভূত ক্ষেত্রের অধিস্বামী যেমন স্বহস্তে ক্ষেত্ৰকৰ্ষণ করিতেন, আবার তেমনি বাহুবলে স্বগ্রাম, আত্মজীবন ও অর্থ প্রভৃতি রক্ষা করিতেন।” (আদিম অধিবাসী অনাৰ্যগণের সহিত তখন তাহাদিগের বহুবর্ষব্যাপী সংগ্রাম চলিতেছিল) যুদ্ধান্তে গৃহে ফিরিয়া তাহারাই আবার সুন্দর ভাষায় মন্ত্র রচনা করিয়া ইন্দ্রাদি দেবগণের উপাসনা করিতেন। তখন দেবমূৰ্ত্তিও ছিল না, দেবগৃহও ছিল না, পূজা-বিধির নানাবিধ আড়ম্বরও ছিল না। (তাহারা অগ্নি, চন্দ্র ও সূর্যদেবের উপাসনা করিতেন। ইহারা তিন জনেই অন্ধকারের পরিত্রাতা। রাত্রির অন্ধকারে রাক্ষস, দৈত্য ও দানব নামধেয় অনাৰ্য্যগণ অলক্ষিতে আসিয়া আৰ্য্যগণের ধন সম্পত্তি ও সুন্দরী কন্যাগণ লইয়া পলায়ন করিত। এসব বিপদ রাত্রির অন্ধকারেই সংঘটিত হইত। রাত্রিতে যজ্ঞের প্রজ্বলিত অগ্নি, চন্দ্রের জ্যোৎস্না এই অন্ধকার রূপ বিপদনাশের প্রধান সহায়। প্রভাতকালে সূর্য উদয় হইলে ত আর কোন বিপদ থাকিতেই পারিত না। অনাৰ্য দস্যগণ দিবার আলােকে ধরা পড়িবার আশঙ্কায় পলায়ন করিত। তাই অগ্নি, চন্দ্র ও সবিতা দেবতার এত আরাধনা স্তবস্তুতি)। তখন ক্লান্তি অপনােদনকারী কোন দাসদাসী শ্রেণী ছিল না, হস্তপদ প্রক্ষালনের জল দিবার, বসিবার আসন নির্মাণ করিবার, তালবৃন্তে ব্যজন করিয়া ক্লান্তি অপনােদন করিবার, খাদ্যদ্রব্য ও রন্ধনের উপাদানাদি সংগ্রহ করিবার নির্দিষ্ট লােক বা শ্রেণী ছিল না। অথবা বহুদিনব্যাপী যুদ্ধের খরচ পত্ৰ নিৰ্বাহ করিবার, বিজিত ভূমিখণ্ড চাষ বাদ চতুর্বর্ণ বিভাগ। কবিয়া প্রাণ ধারণােপযােগী শষ্যাদি উৎপাদন করিবার, যুদ্ধের ও দৈনন্দিন জীবনের অস্ত্র-শস্ত্র আসবাব আদি নিৰ্মাণ করিবার এবং অধিকৃত জনপদ শাসন করিবার তখন কোন নির্দিষ্ট লােক বা শ্রেণী ছিল না। সকলেই সকল কাজ করিতেন। কিন্তু ইহা অত্যন্ত অসুবিধাজনক বােধ করায় সর্বসম্মতি ক্রমে আপনারাই আপন আপন গুণকৰ্ম্ম শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চারি শ্রেণীতে বিভক্ত হইলেন। এক এক শ্রেণী এক এক কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। আৰ্যগণের মধ্যে যাহারা ধীশক্তিসম্পন্ন মেধাবী মন্ত্রণাকুশ তীক্ষবুদ্ধি সম্পন্ন অথচ শারীরিক শক্তিতে দুৰ্বল ও যুদ্ধকাৰ্য, কৃষি- ব্যবসা বাণিজ্যে অপটু ছিলেন, তাহারা এক শ্রেণীতে বিভক্ত হইলেন, এই শ্রেণীর নাম হইল ব্রাহ্মণ। ইহারা যজন-যাজন, অধ্যয়ন অধ্যাপনাদি কর্মে ব্যাপৃত ও অন্য তিন বর্ণের পরামর্শদাতা ইলেন। যাগ যজ্ঞ পূজা অর্চনা বেদমন্ত্র রচনা ও পারলৌকিক সমুদয় কৰ্ম্ম নিৰ্বাহের ভার ইহাদের উপর পড়িল। পৌরহিত্যে ইহারাই ব্রতী হইলেন। অবশিষ্ট আৰ্য্যগণের মধ্যে যাহারা যুদ্ধবিদ্যা বিশারদ, মহাবলশালী, কষ্টসহিষ্ণু, অনলস, মহাবীৰ্য্যসম্পন্ন, কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যাদি কাৰ্য্যে অপটু, তাহারা পৃথক এক শ্রেণীতে বিভক্ত হইলেন। অনাৰ্যদিগের সহিত সংগ্রাম করা, অধিকৃত জনপদ শাসন করা, অপর তিন শ্রেণীকে রক্ষা করা ইহাদের কার্য হইল। ইহারা “ক্ষত্রিয়” নামে অভিহিত হইলেন। তারপর তদবশিষ্ট আৰ্যাদিগের মধ্যে যাহারা তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন বা প্রচুর বলশালী নহেন, যুদ্ধকার্যে ভীত অথচ পশুপালন,কৃষিকাৰ্য্য ও ব্যবসা বুদ্ধিতে সুনিপুণ, বাণিজ্য বিদ্যদক্ষ, তাঁহারা এক শ্রেণীতে বিভক্ত চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। লেন। ইহাদের নাম হইল বৈশ্য। কৃষিকাৰ্য্য দ্বারা শস্য উৎ- পাদন, গোপালন, ধনসম্পদ যুদ্ধোপকরণ, অন্নদানাদি দ্বারা তিন শ্রেণীকে ভরণপােষণ করা ইহাদের কাৰ্য্য বলিয়া নির্দিষ্ট হইল। সর্ব অবশিষ্ট যাহারা বহিলেন তাঁহারা স্বভাবতঃই ধীসম্পদে দরিদ্র শক্তি সামর্থ্যহীন, যুদ্ধে অসমর্থ ও অনভিজ্ঞ, কৃষি ব্যবসা বাণিজ্য কাৰ্যে অপটু, সামান্য সামান্য শিল্পকৰ্ম্মে পটু, তাহারা আর কি করিবেন ? উপরি লিখিত তিন শ্রেণীর পরিচর্যা ও সেবাকাৰ্য্যে নিযুক্ত হইলেন। ইহারাই শূদ্র বলিয়া কথিত হইলেন। এইরূপ ভাবে সৰ্বশ্রেণীর সুখ সুবিধা, শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ করিয়া আৰ্যাণ অতি অল্পকাল মধ্যেই এক অমিত পরাক্রমশালী জাতিরূপে পরিগণিত হইলেন। ব্রাহ্মণ সর্ববিষয়ে উক্ত তিন শ্রেণীর পরামর্শদাতা হইলেন। তাঁহাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ ও মঙ্গল উদ্দেশ্যে ঈশ্বর আরাধনা, নানা প্রকার যাগ যজ্ঞ, ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করিতে লাগিলেন, যুদ্ধ বিষয়ে ক্ষত্রিয়গণকে সদুপদেশ দিতে লাগিলেন। ক্ষত্রিয়গণ আবার অপর পক্ষে নিশ্চিন্ত মনে অনাৰ্যগণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া তাহাদিগকে পরাজিত করতঃ দিন দিন নব নব রাজ্য জনপদ জয় করিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও শূদ্র শ্রেণীভুক্ত স্বজাতীয় আৰ্য্যগণকে সর্বপ্রকার বহিঃশত্রু হইতে রক্তদান ও জীবনদান করিয়া রক্ষা ও সাম্রাজ্যবৃদ্ধি করিতে লাগিলেন। বৈশ্য শ্রেণী ও অন্নদান, ধনৈশ্বৰ্য্য, যুদ্ধোপকরণ, কৃষি ও বাণিজ্যলব্ধ দ্রব্যাদি দ্বারা তিন শ্রেণীকে প্রতিপালন করিতে ও ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় শূদ্ৰশ্রেণীর যাবতীয় অভাব অভিযােগ পরিপূর্ণ করিতে লাগিলেন। ইহার তিন শ্রেণী দ্বিজ বলিয়া পরিচিত হইলেন। উপনয়ন, বেদাধ্যয়ন, ৫৪ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। দান, যজ্ঞ প্রভৃতিতে ইহারা অধিকারী হইলেন। অবশিষ্ট পরবর্তী শূদ্ৰশ্রেণী ভুক্ত আৰ্যগণ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই তিন বর্ণের সেবা কার্যে নিযুক্ত হইলে তাহাদিগের রক্ষার ভার, আহারাদি সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের ভার, প্রতিপালন ও ভরণপােষণের ভার উল্লিখিত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যশ্রেণী গ্রহণ করিলেন। ইহারা কোনও শ্রেণী কোনও শ্রেণীকে ঘৃণা বা বিদ্বেষের চক্ষে নিরীক্ষণ করিতেন না। কেন না ইহারা সকলেই জনিতেন, বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভিন্ন কার্যে ব্ৰতী হইলেও আমরা সকলে এক জাতি, এক ভাই। বিশেষতঃ ইহারা নিজেরাই এমন ভাবে বিভক্ত হইয়াছিলেন যে, ইহাদের কোনও শ্রেণীর সাহায্য ব্যতীত কোনও শ্রেণীর চলিবার উপায় ছিল না। ইহাদের প্রত্যেক শ্রেণী অপর তিন শ্রেণীর দ্বারা তুল্যরূপে উপকৃত হইতেন, এবং তজ্জন্য পরস্পর পরস্পরের নিকট কৃতজ্ঞ থাকিতেন। বর্তমান কালের ন্যায় জাতিভেদ তৎকালে ছিল ও কেহ তাহা কল্পনাও করিতে পারিতেন না। তখন শ্রেণী- ভেদ ছিল মাত্র, জাতিভেদ ছিল না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্ররূপে চারিটী শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়াছিলেন, জাতিতে নহে। পরন্তু আচরণ গুণ ও কৰ্ম্ম অনুযায়ী এক এক শ্রেণীর লােক যােগ্যতা অনুসারে অপর তিন শ্রেণীর যে কোন শ্রেণীতে প্রবেশ করিয়া তত্ত শ্রেণীভুক্ত হইয়া যাইতে পারিতেন। ব্রাহ্মণের পুত্র ক্ষত্রিয় বৈশ্য বা শূদ্ৰকৰ্ম্মা হইলে ক্ষত্রিয় বৈশ্য বা শূদ্র শ্রেণীভুক্ত হইয়া যাইতেন। এইরূপে ক্ষত্রিয় সন্তান, ব্রাহ্মণ বৈশ্য বা শূদ্র ; বৈশ্য সন্তান, ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বা শূদ্র এবং শূদ্র সন্তান, বৈশ্য ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মণ শ্রেণীভুক্ত হইয়া যাইতেন। এতদনুমােদক কতিপয় শাস্ত্রীয় উক্তি ও উদাহরণ দেখিলেই উদ্ধত বাক্যের সত্যতা উপলব্ধি হইবে।
চতুর্বর্ণ বিভাগ।
শাস্ত্রীয় উক্তি - যথা :-
যস্য যল্লক্ষণং প্রােক্তং পুংসােবর্ণাভিব্যঞ্জকং।
যদন্যত্ৰাপি দৃশ্যেত তত্তেনৈব বিনিৰ্দিশেৎ ॥ ৩৫
(শ্রীমদ্ভাগবত, ৭ম স্কন্ধ, ১১শ অঃ)
“যে বর্ণের যে লক্ষণ বলা গেল, তাহা অন্যত্র দৃষ্ট হইলেও
তাহাকে তার নির্দেশ করা যাইবে।”
শূদ্রো ব্রাহ্মণতামেতি ব্রাহ্মণশ্চেতি শূদ্রতা।
ক্ষত্রিয়াজ্জাতমেবন্তু বিদ্যাদৈস্যাৎ তথৈব চ ॥ ৬৫
(মনুসংহিতা, দশম অধ্যায়)
“এই ক্ৰমে যেরূপে শূদ্র ব্রাহ্মণ হয়, তদ্রুপ ব্রাহ্মণেরও শূদ্রত্ব
প্রাপ্তি হয়,-ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য সম্বন্ধেও ঐরূপ জানিবে।”
বৃহদ্ধর্ম পুরাণ বলিতেছেন ?
শৌদ্ৰান্ ধর্মান্ অশেষেণ কুন্ শূদ্রো যথাবিধি।
বৈশ্যত্ব মেতি বৈশ্যশ্চ ক্ষত্রিয়ত্বং স্বকৰ্ম্ম-কৃৎ ॥ ১৫
বিপ্রত্বং ক্ষত্রিয়ঃ সম্যক্ নিজধৰ্ম্মপরাে যদি।
বিপ্র মুক্তিলাভেন পূজ্যতে যৎক্রিয়া পরঃ ॥ ১৬
( প্রথম অধ্যায়, উত্তর খণ্ড)
“শূদ্র যদি যথাবিধি নিজবর্ণের ধর্মাচরণ করেন, তবে তিনি
বৈস্তত্ব প্রাপ্ত হয়েন। আর বৈশ্য ও ক্ষত্রিয়ও যদি স্ব স্ব ধর্ম
পালন করেন, তবে তাহারাও যথাক্রমে ক্ষত্রিয়ত্ব ও ব্রাহ্মণ্যলাভে
অধিকারী হইয়া থাকেন। আর ব্রাহ্মণ সৎ-ক্রিয়ান্বিত হইলে
তিনি মুক্তিলাভের অধিকারী হইবেন।”
ধৰ্মচৰ্য্যয়া জঘন্যাবর্ণঃ পূৰ্বংপূৰ্ব্বং বর্ণপদ্যতে জাতিপরিবৃত্তৌ।
অধৰ্ম্মচৰ্য্যয়া পূৰ্বোবর্ণো জঘন্যং বর্ণমাপদ্যতে জাতিপরিবৃত্তৌ ।
.( ভট্টমােক্ষমূলধত-ধৰ্ম্মসূত্র বচন)
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
“ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য অধৰ্ম্মাচরণ দ্বারা পর পর বা একেবারে
অধম জাতিত্ব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। সেইরূপ শূদ্র, বৈশ্য ও ক্ষত্রিয়
ক্রিয়াবান্ হইলে পর পর বা একেবারে উচজাতিত্ব প্রাপ্ত হইয়া
থাকে।”
বস্তু শূদ্রো দমে সত্যে ধৰ্ম্মে চ সততােখিতঃ ।
তং ব্রাহ্মণমহং মধ্যে বৃত্তেন হি ভবেজিঃ |
(মহাভারত, বনপর্ব, ১২৫ অধ্যায়)
“যে শূদ্র, দম (বাহেন্দ্রিয় নিগ্রহ ) সত্য ও ধৰ্ম্মে সতত অনুরক্ত,
তাহাকেই আমি ব্রাহ্মণ বলিয়া বিবেচনা করি, কারণ ব্যবহারেই
দ্বিজ হয়।”
সত্যং দমস্তপােদানমহিংসা ধৰ্ম্ম নিত্যতা।
সাধকানি সদা পুংসাং ন জাতি নকুলং নৃপ । ২৫
শূদ্রেচৈতদ্ভবেল্লক্ষ্যং দ্বিজে উচ্চ ন বিদ্যুতে।
ন বৈ শূদ্রোভবেচ্ছদ্রো ব্রাহ্মণণা ব্রাহ্মণপা ন চ ॥ ৮
(মহা, বন, প, ১৮১ অধ্যায় ; এবং ঐ মহাভারত;
শান্তিপৰ্ব্ব, ১৮৯ অধ্যায় )
“সত্য, দম, তপ, দান, অহিংসা ও ধৰ্ম্ম নিত্যতাই পুরুষার্থ
সাধক। জাতি ও কুল কোন কাৰ্যকারক নহে। যদি কোনও
ব্যক্তি ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া শূদ্রবৎ আচরণ করে, তাহাকে
শুদ্র এবং যদি কোন ব্যক্তি শূদ্রকুলে জন্ম লইয়া আচারনিষ্ঠ হয়,
তবে তাহাকে ব্রাহ্মণ বলা যায়।”
কৰ্মভিঃ শুচিভিদেবি শুদ্ধাত্মা বিজিতেন্দ্রিয়ঃ
শূদ্রেৎপি দ্বিজবৎ সেব্য ইতি ব্ৰহ্মানুশাসনম্। ৪৮
চতুর্বর্ণ বিভাগ।
স্বভাব কৰ্ম্ম চ শুভং যত্র শূদ্রেহপি তিষ্ঠতি ।
বিশিষ্ট স দ্বিজাতেবৈবিজ্ঞেয় ইতি মে মতিঃ ॥ ৪৯
ন যােনির্নাপি সংস্কারাে ন সুতং ন চ সন্ততিঃ।
কারণানি দ্বিজত্ব বৃত্তমেব তু কারণম্ ॥ ৫০
সৰ্বোহয়ং ব্রাহ্মণণা লােকে বৃত্তেন চ বিধীয়তে।
বৃত্তেস্থিতস্তু শূদ্রোহপি ব্রাহ্মণত্বং নিষচ্ছতি ॥ ৫১
(মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, ১৪ অধ্যায়)
“ব্রহ্মা বলিয়াছেন যে, শূদ্রও যদি পবিত্র কাৰ্যানুষ্ঠান দ্বারা
বিশুদ্ধাত্মা ও জিতেন্দ্রিয় হয়, তবে তাহাকে ব্রাহ্মণের ন্যায় সমাদর
করা কর্তব্য। ফলতঃ, আমার (শিবের) মতে শূদ্র সচ্চরিত্র ও
সৎকর্মান্বিত হইলে, ব্রাহ্মণ অপেক্ষা প্রশংসনীয় হয়। কেবল জন্ম,
সংস্কার, শাস্ত্রভান ও কুল ব্রাহ্মণত্বের কারণ নহে। সদাচার দ্বারা,
সকলেই ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিতে পারে। সদাচারী শুদ্রও ব্রাহ্মণত্ব
লাভ করিতে পারে।”
শপচোহপি কুলজ্ঞানী ব্রাহ্মণাতিরিচ্যতে।
কুলাচার বিহীনস্তু ব্রাহ্মণ পচাধমঃ ॥ ৪২
(মহানিৰ্বাণ তন্ত্র, ৪ উঃ )
“আচারনিষ্ঠ চণ্ডাল, ব্রাহ্মণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং আচারবিহীন
ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল অপেক্ষা নিকৃষ্ট।”
চণ্ডালােহপি ভবেদবিপ্রাে হরিভক্তিপরায়ণ।
হরিভক্তি-বিহীনস্তু দ্বিজোহপি শপচাধমঃ ।
“হরিভক্তিপরায়ণ চণ্ডাল ব্রাহ্মণ, আর হরিভক্তিবিহীন ব্রাহ্মণ
চণ্ডালাম।”
চতুর্ণ বিভাগ।
২
ধৰ্ম্মপ্রাণ যুধিষ্ঠির নাগরূপী অভিশাপগ্রস্ত মহারাজ নহুষের
“ব্রাহ্মণ কাহাকে বলে ?” এই প্রশ্নের উত্তরস্বরূপ বলিয়াছিলেনঃ-
নবৈ শূদ্রো ভবেচ্ছদ্রো ব্রাহ্মণণা ব্রাহ্মণণা ন চ ।
যত্ৰৈতৎ লক্ষ্যতে সর্প! বৃত্ত স ব্রাহ্মণােস্মৃতঃ।
যত্রৈতন্ন ভবেৎ সর্প! তং শূদ্ৰমিতি নিৰ্দিশেৎ।
“শূদ্র হইয়াও শূদ্র হয় না, ব্রাহ্মণ হইয়াও ব্রাহ্মণ হয় না, অর্থাৎ
শূদ্রবংশে বা ব্রাহ্মণবংশে জন্ম, শূদ্রত্ব বা ব্রাহ্মণত্বের কারণ নহে।
‘বৃত্ত অর্থাৎ সদাচার যাহাতে লক্ষ্য করিবে, তাহাকেই ব্রাহ্মণ
জানিও।”
তপাে বীজ প্রভাবৈস্তু তে গচ্ছন্তি যুগে যুগে।
উৎকৰ্ষাপকর্ষঞ্চ মনুষ্যেষিহ জন্মতঃ ॥ ৪২
(মনুসংহিতা, ১ম অধ্যায় )
উক্ত ষড়বিধ জাতি (ব্রাহ্মণাদি দ্বিজয়ের স্বজাতি পত্নীসস্তৃত
সন্তানত্রয় এবং অনুলােমক্রমে ব্রাহ্মণ ঔরসজাত তনয়দ্বয় ও ক্ষত্রিয়
ঔরসজাত বৈশ্যের সন্তান, এই ষড়বিধ সন্তান দ্বিজধর্মাবলম্বী এবং
ইহারা উপনয়নাদি দ্বিজসংস্কার যােগ্য )।
“যুগে যুগে তপস্যা-প্রভাবে ও বীজোৎকর্ষে মনুষ্য মধ্যে যেমন
জাত্যুৎকর্ষ লাভ করিয়া থাকে ; তদ্রুপ তদ্বৈপরীত্যে তাহাদের
জাত্যপকর্যও ঘটিয়া থাকে।”
প্রচ্ছন্না বা প্রকাশ বা বেদিতব্যাঃ স্বকৰ্ম্মভিঃ । ৪০
(মনুসংহিতা, ১০ম অধ্যায়)
“প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশমান জাতি স্ব স্ব কৰ্ম্ম দ্বারা জ্ঞেয়।”
শৈব পুরাণ বলিতেছেন
এতৈশ্চ কৰ্ম্মভির্দেবি ব্রাহ্মণে যাত্যধােগতিং।
শূদ্রশ্য বিপ্রমেতি ব্রাহ্মণশ্চৈব শূদ্ৰতাম্।
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। “হে দেবি! এই সকল মিথ্যা, চৌর্য, ক্রোধ ও হিংসাদি দোষ হইলে ব্রাহ্মণ অধােগতি প্রাপ্ত হইয়া শূদ্র হইয়া যাইবেন, আর যদি শূদ্র সদ্গুণান্বিত ও সাধুশীল হন, তবে তিনিও ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইতে পারিবেন।” প্রাচীন আৰ্যজাতিকে একটি বিদ্যালয়ের সহিত কতকটা তুলনা করা যাইতে পারে। একটি বিদ্যালয়ে কতকগুলি শ্রেণী থাকে, এক এক শ্রেণীতে বালকগণ এক বৎসর পড়িয়া পরীক্ষা দিয়া পাশ করিশ উপরের শ্রেণীতে প্রমােশন পাইয়া থাকে। আর যে সম্বৎসর পড়িয়াও পরীক্ষায় পাশ করিতে না পারে,সে আর উপরের শ্রেণীতে প্রমোশন পায় না, সে সেই শ্ৰেণতেই থাকিয়া যায়। আবার পর বৎসর পরীক্ষা দেয়, পাশ হইলে উপরের শ্রেণীতে উঠে, নতুবা আবার সেই শ্রেণীতেই থাকিয়া যায়। পাশ করিয়া উপরে উঠিবার যােগ্যতা দেখাইতে পারিলেই শিক্ষকগণ তাহাকে উপরের শ্রেণীতে প্রমােশন দিয়া থাকেন। শুধু তাহাই নহে, যে ছাত্র পরীক্ষায় খুব কৃতিত্ব দেখায়—অসাধারণরূপে নম্বর রাখিতে পারে, -সে একেবারে উপরের এক শ্রেণী অতিক্রম করিয়া তাহার উপর শ্রেণীতে ডবল প্রমােশন পাইয়া থাকে। অন্য পক্ষে যে ছাত্র তদীয় শ্রেণীর পড়া যথাযােগ্য ভাবে চালাইতে পারে না, কখন কখন তাহাকে শিক্ষকগণ তন্নি শ্রেণীতে নামাইয়াও দিয়া থাকেন। এখন মনে করুন, হিন্দুসমাজ যেন একটি বিদ্যালয়। উহার চারিটী শ্রেণী। শূদ্র, বৈশ্য, ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ সন্তানগণ যথাক্রমে ঐ চারি শ্রেণীর ছাত্র। শূদ্র সন্তানগণ যদি গুণ ও কর্মদ্বার বৈশ্যত্ব, ক্ষত্রিয়ত্ব বা ব্রাহ্মণত্ব লাভের যােগ্যতা অর্থাৎ বৈশ্য, ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মণ- চতুর্বর্ণ বিভাগ। শ্রেণীতে উঠিবার যােগ্যতা প্রদর্শন করিতে পারে, তবে তাহাদিগকে সেই সেই উচ্চ শ্রেণীতে প্রমােশন দেওয়া হইত। বৈশ্য ও ক্ষত্রিয় সন্তান সম্বন্ধেও ঐ একই কথা। অন্য পক্ষে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য সন্তানগণ যদ্যপি তাহাদের নিজেদের শ্রেণীর পাঠ চালাইতে অক্ষম হয়, আপন আপন শ্রেণীর যােগ্য কৰ্ম্ম চালাইতে অসমর্থ হয়, তবে তাহাদিগকে কৰ্ম্ম অনুসারে পর পর শ্রেণীতে বা কৰ্ম্ম ও যােগ্যতা অনুসারে একেবারে সর্বনিম্ন শ্রেণীতে (শূদ্ৰত্বে) নামাইয়া দেওয়া হইত। তাহাতে দয়া-মমতা প্রদর্শন করা হইত না। ফল- কথা, যােগ্যতা অনুসারেই উচ্চ উচ্চ শ্রেণীতে প্রমোশন পাইত, এবং যােগ্যতার অভাবেই পর পর শ্রেণীতে নামাইয়া দেওয়া হইত। এ সম্বন্ধে বৰ্তমান সময়ের মত জাতি কুল বা বংশাদির বিচার করা হইত না। ইহাই ছিল সুপ্রাচীন আৰ্যদিগের, বৈদিক যুগের রীতি। পরবর্তী পৌরাণিক যুগে এ রীতি-নীতির পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে, এবং “সাত নকলে আসল খাস্তা” হইয়া বর্তমান আকারে পরিণত হইয়াছে। এখন ব্রাহ্মণগণ হাজার অযােগ্য হইলেও ব্রাহ্মণই, আর শূদ্র হাজার গুণে যােগ্য হইলেও সে শূদ্রই। ব্রাহ্মণত্ব, শূদ্রত্ব এখন জন্মগত হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এ সম্বন্ধে আমরা কতিপয় প্রমাণ উদ্ধত করিতেছি- পুরূরবসাে জ্যেষ্ঠ পুত্রো যন্তায়ুর্ণামা, স বাহােদুহিতরমুপ যেমে। তস্যাৎ স পঞ্চপুত্ৰান্ জনয়ামাস। নহুষ-বৃদ্ধ রম্ভ-রজি সংজ্ঞাঃ, তথৈবানেনাঃ পঞ্চম পুত্রোহৎ। ক্ষত্রবৃদ্ধাৎ সুহােত্রঃ পুত্রোভূৎ।
চতু
কালেশ গৃৎসা পুজায়ােহভব।
গৃৎসমস্ত শৌনকাতুর্কণ প্রবর্তয়িতাৎ
(বিষ্ণুপুরাণ অংশ, ৮ অঃ)(১)
রাজা পুরূরবার জ্যৈষ্ঠপুত্র আয়ু। তিনি বাহুর কন্যা বিবাহ
করিলে তাহার গর্ভে (আয়ুর) নহুষ, বৃদ্ধ, রম্ভ, রজি ও অনেনা
এই পাঁচ পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। উক্ত দ্বিতীয় পুত্র ক্ষত্রবৃন্ধের
পুত্র সুহােত্র, সুহােত্রের কাশ, লেশ ও গৃৎসমদ এই তিন পুত্র
জন্মগ্রহণ করেন। গৃৎসমদের পুত্রের নাম শোনক। এই শৌনক
ঋষিই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি বর্ণের প্রবর্তক।
অর্থাৎ তাহার চারি পুত্র চারি বর্ণে স্থান পাইয়াছিলেন।(২)
তথালক সন্নতির্ণামাজোঙবেৎ।
ততঃ সুনীখঃ ত ফুকেতু, ততধৰ্ম্মকেতু,
ততঃ সত্যকেতু। তস্যাৎ বিভু, তনয়ঃ বিভু,
তত সুকুমায়, তাপি খৃষ্টকেতু, তত
বৈনহােত, তত ভাগ, আর্গ ভার্গভূমি,
অতশ্চাতুৰ্ব্বর্ণ প্রবৃত্তি, ইত্যেতে কাপা
ভূপতয়ঃ কথিতা। (৩)
(বিষ্ণুপুরাণ, ৪ অংশ, ৮ অ, ৮)
সেই অলর্কের সন্নতি নামক পুত্র হয়। তৎপুত্র সুনীত,
তৎপুত্র সুকেতু, তৎপুত্র ধর্মকেতু, তৎপুত্র সত্যকেতু, তৎপুত্র
বিভু, তৎপুত্র সুবি, তৎপুৱ সুকুমার, তৎপুত্র ধৃষ্টকেতু, তৎপুত্র
(১) বায়ুপুরাণ ৩• অধ্যায়, উত্তরখও।
(২) এই বিষয়ণ হরিবংশ ২৯ অধ্যায়ে বর্ণিত হিয়াছে।
বিত হইয়াছে।
.
চতুর্ণ বিভাগ।
বৈনহােত, তৎপুত্ৰ ভাৰ্গ, তৎপুত্ৰ ভাৰ্গভূমি। এই ভার্গভূমি হইতে
চাতুৰ্বর্ণ প্রবর্তিত হয়। এই কাশ্যপ ভুপালগণের বিষয় তােমাকে
কহিলাম। (১)
ব্ৰহ্মণশ্চ দক্ষিণাঙ্গুষ্ঠজন্ম দক্ষ প্রজাপতি
দক্ষাপ্যদিতিরদিতেৰ্বিবস্বান্ বিবস্বততা
মনুৰ্ম্মনােরিক্ষাকুনৃগধৃষ্টশৰ্যাতি নবিষ্যন্ত
প্রাংশু নাভাগ ননদিষ্ট করুষ পৃষাখ্যাঃ
পুত্ৰা বভূবু।
পৃষধস্তু গুরুগােবৎ শূদ্রত্বমগমৎ। (২)
করুষাৎ কাৰুষা মহাবলা ক্ষত্রিয়া বহুবু।
নাগােনেদিষ্ট পুত্ৰস্তু বৈশ্যতামগমৎ।
(বিষ্ণুপুরাণ, ৪ অংশ, ১ অ, ৫১৩১৪১৫)
ব্ৰহ্মার দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ হইতে দক্ষ প্রজাপতি জন্মগ্রহণ করেন।
দক্ষের অদিতি নাম্নী কন্যা, অদিতির পুত্র সূৰ্য্য, সূর্যের পুত্র মনু,
মনুর যে কয়জন পুত্র হয় তাহাদিগের নাম ইক্ষাকু, নৃগ,ধৃষ্ট, শৰ্য্যাতি,
নরিষ্যন্ত, প্রাংশু, নাভাগা, নেদিষ্ট করুষ ও পৃষ। * * * *
পৃষ গুরুর গাে বধ করিয়াছিলেন বলিয়া শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হন।
করুষ হইতে কারুষ নামে মহাবল ক্ষত্রিয়গণ উৎপন্ন হন। নেদিষ্ট
পুত্র নাভাগ বৈশ্যত্ব প্রাপ্ত হন। (৩)
(১) এই বিবরণ হরিবংশ ২৯ অধ্যায়ে বর্ণিত হইয়াছে।
(২) পৃষদ্রোহিংসন্নিাতু ওয়াের্গাং জনমেজয়।
শাপাং শূদ্রমপন্ন। (হরিবংশ ৯ম অধ্যায়।)
(৩) নাভাগারিষ্ট পুত্ৰেী থৌ বৈখে ব্রাহ্মণতাং গতৌ-হরিবংশ।
নাগৰিঠের দুই পুত্র বৈশ্য হইয়াও ব্রাক্ষ্মণত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
মাগৰত ; ৯ম স্কন্তু, ২য় অধ্যায়।
চতুর্ণ বিভাগ।
মনুসংহিতায় উক্ত হইয়াছে।
পৃথুক্ত বিনয়াদ্ৰাজ্যং প্রাপ্তবান্ মনুরেব চ।
কুবের ধনৈশ্বৰ্য্যং ব্রাহ্মণ্যঞ্চৈব গাধিজঃ ৪২
সপ্তম অধ্যায়।
[ গাধিপুত্রো বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয়ঃ সন্ তেনৈব দেহেন ব্রাহ্মণ্যং
প্রাপ্তবান্। কুল ভট্টকৃত টীকা। ]
বিনয় বলে মহারাজ পৃথু এবং মনু সাম্রাজ্য লাভ করেন;
কুবের ধনেশ্বর এবং গাধি রাজার পুত্র বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় তনয়
হইয়াও দ্বিজত্ব লাভ করিয়াছেন।
বায়ুপুরাণও বলিতেছেন :-
কিং লক্ষণেন ধৰ্ম্মেণ তপসেহ ক্ৰতেন ।
ব্রাহ্মণ্যং সমনু প্রাপ্তং বিশ্বামিত্রাদিভি নৃপৈঃ ॥ ১০৮
কেন যেনাভিধানেন ব্রাহ্মণং ক্ষত্রিয়া গতাঃ।
বিশেষং জ্ঞাতুমিচ্ছামি তপসা দানতােহথবা ॥ ১১০
শামন্তে হি তপঃ সিদ্ধাঃ ক্ষাপ্রােপেল দ্বিজাতয়ঃ ।
ব্রাহ্মণ্যং সমগ্রপ্তাঃ কেবলং গুণ সম্পদা । ১১১
বিশ্বামিত্র নরপতি মান্ধাতা সঙ্কুতিঃ কপি।
কপেস্ট পুত্রঃ কুৎস সত্যাহবান্ ঋভুঃ ॥ ১১২
আষ্টিষেণােজমীঢ় ভগােছচে তথৈবচ।
কক্ষীবান্ বৈ শিজয় তথা চে মহারথাঃ ১১৩
রথীতর বিষ্ণুবৃদ্ধাদয়াে নৃপাঃ।
কালোপেতাঃ মৃতাহেতে তপসা ঋষিং গতঃ ॥ ১১৪
২৯ অ-উত্তরখণ্ড।
চতুর্ণ বিভাগ। বিশ্বামিত্র প্রভৃতি রাজগণ কোন্ কোন্ গুণে ব্রাহ্মণ্য লাভ করিয়াছিলেন, কোন্ লক্ষণ, কোন্ ধর্ম কি তপস্যা কি শ্ৰেত জ্ঞান ভঁহাদিগের এই ব্রাহ্মণ্য লাভের নিদান? আমি তা জানিতে ইচ্ছা করি। এই ক্ষত্ৰিষগণ কি কেবল তপােবলে ব্রাহ্মণ্য লাভ করিয়াছিলেন, না একমাত্র দানই তাহাদিগের ব্রাহ্মণ্য লাভের নিদান ? আমি শুনিষ্কাছি কেবল একমাত্র গুণ সম্পন্বলেই বহু কালোতে দ্বিজাতি ব্রাহ্মণ্য লাভে সমর্থ হইয়াছিলেন। বিশ্বামিত্র, মান্ধাতা, সঙ্কুতি, কপি, কপিন কুৎস সত্য অনুহৰা, ঋতু, আষ্টিষেণ, অজমী, ভগ ও অন্যান্থ রাজগণ এবং কক্ষীবান্, শিজয়, রথীতর, চন্দ, বিষ্ণুবৃদ্ধ এবং অন্যান্য আরও মহারথ ও নৃপতিগণও নাকি কেবল তপস্যা প্রভাবেই ব্ৰহ্মর্ষিত্ব লাভ করিয়াছিলেন। ভবিষ্যপুরাণেও কথিত হইয়াছে - বিশ্বামিত্র রাজেন্দ্র! ব্রাহ্মণত্ব জিগীষয়া। তপক্ষার বিপুল সম্ভাশয় দিবৌকসাং | ৫১ ততো দেৰৰ দৌ ব্ৰহ্ম বিশ্বামিত্রায় ধীমতে। ইহৈব তেন দেহেন ব্রাহ্মণত্বং সুদুর্লভম্ ॥ ৫২ তিথীনাং প্রবরাহে তিথীনা প্রবন্ধ তিথি। ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্রৌ বা ব্রাহ্মণত্ব মবাগ যুঃ ৫৩ হে রাজেন্দ্র। ব্রাহ্মণ লাভের জন্য রাজা বিশ্বামিত্র ঘােয় তপস্থা করেন। তাহাতেই ব্ৰহ্মা তাঁহাকে ব্রাহ্মণ্য প্রদান করিয়াছিলেন। সেই একটা মাহেন্দ্র ঋণ বিশেষ ছিল, তাই একটা মহাপুণ্য তিথি বিশেষ ছিল, যে সময়ে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রগণ গুন মাহাত্মে ব্রাহ্মণ্য লাভ করিতেন। বিশ্বামিত্রের ন্যায় আঞ্জিষেণ, সিন্ধুদ্বীপ ও দেবাপি ইহারাও ক্ষত্রিয় হইয়া ব্রাহ্মণ পদ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
চতুর্বর্ণ বিভাগ। তত্রাষ্টিষেণঃ কৌরব্য ব্রাহ্মণ্যং সংশিত ব্ৰতঃ। তপসা মহত রাজন্ প্রাপ্তবাধিসত্তমঃ । সিন্ধুদ্বীপ রাজর্ষিদেবাপিশ্চ মহাতপাঃ। ব্রাহ্মণ্যং লক্কবান্ যত্র বিশ্বামিত্র স্তথা মুনি । মহাতপস্বী ভগবানুগ্রতেজা মহাতপাঃ । মহাভারত, শল্যপৰ্ব্ব, ৪০ অধ্যায় ; ৩৬-৩৮ শ্লোক। জাতত ব্যাস্তু কৈবৰ্তাঃ শ্বপাক্যাশ্চ পরাশরঃ। ক্যাঃ শুকঃ কণদশ তথােলুক্যাঃ সুতােহভবৎ। ২২ মৃগীজোহথষশৃঙ্গোপি বশিষ্ঠো গণিকাত্মজঃ। মন্দপালাে মুনিশ্রেষ্ঠো নাবিক। পত্য মুচ্যতে। ২৩ মাগুবব্যামুনিরাজস্তু মণ্ডুকী গর্ভ সম্ভব। বহবােহন্যেপি বিপ্রত্বং প্রাপ্তা যে পূৰ্ব্ববৎ দ্বিজা। ২৪ (৪২ অ, ব্রাহ্মপৰ্ব্ব, ভবিষ্যপুরাণ) ভারতবিখ্যাত কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস কৈবর্ত কন্যার গর্ভসস্তৃত। তদীয় পিতা কলিযুগধর্ম প্রবর্তক পরাশর পাককন্যার গর্ভসঞ্ছত। চণ্ডালের ঔরষে শপাকের জন্ম, ইহারা কুকুর মাংসভােজী চণ্ডাল বা তদপেক্ষা হীনকৰ্ম্মা। বেদব্যাসপুত্র পরম ভাগবত শুকদেব গােস্বামী শুকীর গর্ভসস্তৃত। বৈশেষিক দর্শনশাস্ত্র-প্রণেতা মহর্ষি কণাদ উলুকীর গর্ভসস্তৃত । ইনি অনাৰ্য জাতির কন্যা। মাতার নামানুসারে কণাদ দর্শ- নের অন্ত নাম ঔলুকদর্শন। শুকী ম্লেচ্ছজাতীয় রমণী। মহাতপা ঋষ্যশৃঙ্গ মানবী নয় পশু হরিণীর গর্ভসস্তৃত। সূৰ্য্যবংশের কুলগুরু মহর্ষি বশিষ্ঠ স্বর্গ-বেশ্যা উৰ্বশী গর্ভসস্তৃত। মুনিশ্রেষ্ঠ মন্দপাল নাবিক কড়া গর্ভসস্তৃত।
ক চতুর্থ বিভাগ। মহামুনি মাগুব্য মকী নাম্নী অতি হীন বংশ সহ নারীর গর্ভে জন্মিয়াছিলেন। ইহারা এবং ইহাদের ন্যায় আরও বহু হীনমাতৃক দ্বিজ কৰ্ম্ম ও তপস্যা প্রভাবে ব্রাহ্মণ্য লাভ করিয়াছিলেন। দাসী গর্ভ সমুৎপন্না নারদ মহামুনি দাসী গর্ভ সস্তৃত “না” মহামুনি। শূদ্রীগর্ভ সমুৎপন্নঃ কুশিক মহামুনি । শূদ্রাণী গর্ভসস্তৃত “কুশিক” মহামুনি। নাভাগাদিষ্ট পুতৌ দৌ বৈী ব্রাহ্মণতাং গতো। ( ৯-১১অঃ, হরিবংশ।) বৈশ্য নাভাগাদিষ্টের দুই পুত্র কর্ম ও সাধনা বলে ব্রাহ্মণ্য লাভ করিয়াছিলেন। দাসীপুত্রের ব্রাহ্মণ্যলাভ- কক্ষীবচ্চক্ষুষৌ তাং দ্রযােন্যা সৃষিশী। জনয়ামাস ধৰ্মাত্মা পুত্রা বেতৌমহৌজসৌ॥ ৭০ তত কালেন মহতা তপসা বিতঃ স বৈ। বিধুয় মনসাে দোষান্ ব্রাহ্মণ্যং প্রাপ্তবান প্রভু। ব্রাহ্মণ্যং প্রাপ্য কুক্ষীবান্ সহস্র মজৎসুতান্। ৩৭ অঃ উত্তরখণ্ড; বায়ুপুরাণ, মহারাজ বলি (দৈত্য বলি নহে) অপুত্রক ছিলেন, তিনি সন্তানােৎপাদনের জন্য মহর্ষি দীর্ঘতমাকে নিয়ােজিত করেন। ঋষি অন্ধ ছিলেন, তজ্জন্য মহিষী সুদেষ্ণা দাসী উশিজকে পাঠাইয়া দেন, তর্ভে কক্ষীবা ও চক্ষুঃ দুই ভ্রাতা জন্মগ্রহণ করেন। পরে সুদেষ্ণার গর্ভে বলি রাজার অঙ্গ, বন্ধু, কলিঙ্গ, সুহ্ম ও পুণ্ড এই চতুর্বণ বিভাগ, পাঁচ পুত্র হয়। এবং ইহারা রাজমহিষীর গর্ভ প্রতৰ বলিয়া রাজ্যলাভ করেন, সেই সকল রাজ্যই সম্প্রতি অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুহ্ম (রাঢ়) ও পুণ্ড (বরেন্দ্র) নামে প্রসিদ্ধ। কক্ষীবান্ দাসীর সন্তান বলিয়া মনে মনে বড় ভিন্ন ছিলেন। পরে ব্রাহ্মণ্য ও ঋষিত্ব লাভ করিয়া আত্মাতে প্রসাদ অনুভব করেন। হার সহস্র সহস্র বংশধরগণও ব্রাহ্মণ হইয়া ছিলেন। এই কক্ষীবান সামান্য ব্যক্তি নহেন ; ইনি বেদের বহু মন্ত্রের প্রণেতা, ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলে ১১৬-১২১ সূক্ত পর্যন্ত তাঁহার রচিত বলিয়া প্রসিদ্ধ। তাঁহার কন্যা ঘােষা ও বহু বেদ মন্ত্রের রচয়িত্রী, ইহার মাতা বলি রাজমহিষী সুদেষ্ণার দাসী। তাহারা দুই ভাই গুণ ও কৰ্ম্ম প্রভাবে ব্রাহ্মণ্য লাভ করেন। দুই ভাই দুই জাতি কুরুবংশীয় ঋঠিসেনের পুত্র দেবাপি ও শান্তনু দুই ভাই। ঘােট ভাই শান্তনু রাজা হইলেন, দেবাপি ব্রাহ্মণের স্থায় তপস্যার্থে নিযুক্ত রহিলেন। শান্তনুর রাজ্যকালে বার বৎসর দেবত বারি বর্ষণ করিলেন না, সুতরাং রাজ্যে অরাজক উপস্থিত হইল ; শান্তিশূন্য হইয়া শান্তনু ব্রাহ্মণগণকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিলেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে রাজা না করিয়া তুমি নিজে অভিষিক্ত হইয়াছ, এজন্য দেবতা বারিবর্ষণ করিতেছেন না। তখন শান্তনু দেবাপির নিকট যাইয়া তাহাকে সিংহাসন গ্রহণের জন্য প্রার্থনা করিলেন, কিন্তু দেবাপি রাজ্য গ্রহণ না করিয়া ছােট ভাইএর জন্য যজ্ঞ করিতে লাগিলেন এবং নিজে ছােট ভাইএর পুরােহিত নিযুক্ত হইলেন। এইখানে আমরা এক পরিবারে দুই জাতি দেখিতে পাইতেছি; এক ভাই ব্রাহ্মণ, আর এক ভাই ক্ষত্রিয়।
চতুর্বর্ণ বিভাগ। দাসী পুত্র বেদরচয়িতা ঋষি কবষ-ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (২১৯) ও কৌষিকী ব্রাহ্মণে ইহার প্রসঙ্গ আছে। লিখিত আছে যে একবার সরস্বতীতীরে যজ্ঞস্থলে তিনি উপস্থিত ছিলেন, ঋষিগণ তাঁহাকে দাসীপুত্র বলিয়া অবজ্ঞা প্রকাশপূৰ্ব্বক বলেন- “দাস্যাবৈত্বং পুত্রোহসি ন বয়ং ত্বয়া সহ ভক্ষয়িষ্যামঃ।” কৌষিতকী ব্রাহ্মণ। ১১ অর্থাৎ তুমি দাসীপুত্র, আমরা তােমার সহিত ভােজন করিব । এই কবৰ ঋষি ঋগ্বেদ-সংহিতার দশম মণ্ডলের ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ও ৩৪, সুক্তের মন্ত্রগুলি রচনা করেন। তদীয় পুত্র তুর পরীক্ষিৎ-তনয় মহারাজ জনমেজয়ের রাজ্যাভিষেক ক্রিয়া সম্পাদন করিয়া দেন। শূদ্ররাজা ও বেদঅধ্যয়ন ছান্দোগ্যোপনিষদে চতুর্থ প্রপাঠকের অন্তর্গত জানশ্রুতি আখ্যায়িকায় লিখিত আছে-রৈকঋষি জানশ্রুতি রাজাকে শূদ্র জানিয়া ও বার বার তাহাকে শূদ্ৰশব্দে সম্বােধন করিয়া পশ্চাৎ বেদবাক্য দ্বারা সংবর্গবিদ্যা শিক্ষা দেন। “স তস্মৈ হবাচ-বায়ুবাব সংবর্গ।” ইত্যাদি তিনি (অর্থাৎ রৈ) তাহাকে (অর্থাৎ শূদ্রকুলােব রাজা জানশ্রুতিকে) বলিলেন-বায়ুই সংবর্গ। ক্ষত্রিশ্নের পুত্র ব্রাহ্মণ ও মুনি- শ্রীমদ্ভাগবতে উক্ত হইয়াছে ক্ষত্রিয় বংশােদ্ভব ভগবানের অন্যতম চতুর্থ বিভাগ। ৬৯ অবতার ঋষভের ১০০ শত সন্তান। সেই শতপুত্রের মধ্যে ভরত শ্রেষ্ঠ। তিনি মহাযােগী ছিলেন, এবং তাহারই নামানুসারে এই বৰ “ভারতবর্ষ”নামে অভিহিত। কবি, হবি, অন্তরীক্ষ, প্রবুদ্ধ, পিপ্পলায়ন, আবিহোত্র, বিড়, চমস এবং করােজন নামক পুত্রগণ -ভাগবতধৰ্ম প্রদর্শক ও মহাভাগবত হন এবং ঐ সকলের কনিষ্ঠ একাশীতি (৮১ জন) পুত্রেরা পিত্ৰাজ্ঞাপালক বিনয়ান্বিত, বেদজ্ঞ, যজ্ঞবান্ ও বিশুদ্ধ কর্মশীল। তাহারা সকলেই ব্রাহ্মণ হইলেন। (পঞ্চম স্কন্ধ ৪র্থ অধ্যায় ; অনুবাদ) এক পরিবারে বহুজাতি- ঋগ্বেদে সরল ভাবে একজন ঋষি বলিতেছেন,-“দেখ আমি স্তোত্রকার (ব্রাহ্মণ) আমার পিতা, চিকিৎসক (বৈদ্য ), আমার মাতা প্রস্তরের উপর যব ভর্জনকারিণী। আমরা সকলে ভিন্ন ভিন্ন কৰ্ম্ম করিতেছি। যেরূপ গাতিগণ গােষ্ঠমধ্যে তৃণ কামনায় ভিন্ন দিকে বিচরণ করে, তদ্রুপ আমরাও ধন কামনায় নানাভাবে তােমার পরিচর্যা করিতেছি।” স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় ইহার টীকায় বলেন-“হারা বৈদিক সময়ে জাতিভেদ প্রথা ছিল বলিয়া মনে করেন, তাঁহারাই বলুন, যে পরিবারের পুত্র মন্ত্র প্রণেতা ঋষি, পিতা বৈদ্য এবং মা ময়দাওয়ালী তাঁহারা কোন জাতিভুক্ত?” ধীবরগণের ব্রাহ্মণত্ব লাভ পূৰ্বে কেরল রাজ্যে ব্রাহ্মণ ছিল না। ভৃগুবংশাবতংশ ক্ষত্রিয়- কুলারি পরশুরামের সাহায্যে কেরল দেশীয় ধীবরগণ ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়াছিল।
. চতুর্থ বিভাগ। অব্রাহ্মণ্যে দাদেশে কৈবর্ত্তান্ প্রেক্ষ্য ভার্গব । যজ্ঞসূত্রমকল্প। স্থাপয়িত্ব স্বকীয়েসঃ ক্ষেত্রে বিন্ প্রকল্পিতা যামদগ্ন্য দোবাচ সুপ্রীতে নাস্তবায়না। (স্কন্দপুরাণ।) শূদ্রার ব্রাহ্মণী হওয়া- বশিষ্ঠ পত্নী অক্ষমালা শূদ্রা হইয়াও পরে ব্রাহ্মণী হইয়াছিলেন। “অক্ষমালা বশিষ্ঠেন সংযুক্তাধম যোনিজা। শারঙ্গী মনপালেন জগামাহনীয়তা। ২৩ এতশ্চাত্যাশ্চ লােকেহস্মিন্নপষ্ট প্রতয়ঃ। উৎকর্ষং যােষিতঃ প্রাপ্তাঃ ভৈর্তুগুণৈঃ শুভৈঃ | ২৪ (মনুসংহিতা ; নবম অধ্যায়)। “নিকৃষ্ট (শূদ্র) কুলসন্ধুতা অক্ষমালা এবং পক্ষিণী শারঙ্গী ক্রমান্বয়ে ঋষি বশিষ্ঠ ও মন্দপালের সহিত উদ্বাহসূত্রে মিলিত হইয়া পরম পূজনীয়া হইয়াছিলেন। উক্ত রমণীদ্বয় এবং সত্যবতী প্রভৃতি আরও কতকগুলি রমণী অপকৃষ্ট বংশী বা যােনিজা হইলেও ভর্তুগুণে সবিশেষ উৎকৰ লাভ করিয়াছিলেন।” আজিও যে গায়ত্রীদ্বারা ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ রক্ষিত হইতেছে, সেই বেদমাত গায়ত্রীর রচয়িতা বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণের সন্তান নহেন। চন্দ্রবংশােব ক্ষত্রিয় গাধিরাজার পুত্র। ইনি তপস্যা বলে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন। ক্ষত্রিয়বংশে ব্রাহ্মণ- মৌগল্য ও কাদায়ণ গােত্র সমস্ত ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বংশজাত।
৮
-
চতুর্বণ বিভাগ।
শ্রীমদ্ভাগবতে দেখিতে পাওয়া যায় যে, মুদগল হইতে ব্রাহ্মণ জাতির
মৌদগল্যগােত্র সৃষ্টি হইয়াছে।
(শ্রীমদ্ভাগবত ৯|২১)
মুদগলা মৌদগল্যাঃ ক্ষত্রো পেতা দ্বিজাতয়াে বভূবু।
(বিষ্ণুপুরাণ)
মুদগল তু দায়াদো মৌদগল্যঃ সুমহাযশাঃ।
এতে সৰ্ব্বে মহাত্মানাে ক্ষত্রো পেতা দ্বিজাতয়ঃ ॥
ক্ষত্রিয় পুত্র ব্রাহ্মণ
ভৰ্ম্মাখের পুত্র মুগল, মুদগলের পুত্র রাজা দিবােদাস, দিবো-
দাসের পুত্র মিত্ৰযু ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। (হরিবংশ )
চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় রাজা পুরুরবার বংশে রম্ভ নামক নৃপের রস
নামক পুত্র, তাহার বংশে গভীর জন্মিয়াছিলেন, সেই গভীরের
বংশে ব্রাহ্মণ জন্মিয়াছিল। (ভাগবত )
গর্গ হইতে শিনি উৎপন্ন হন। শিনির পুত্র গাৰ্গ। গার্গ
ক্ষত্রিয় হইতে উৎপন্ন হইলেও ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। (শ্রীমদ্ভাগবত
৯ম স্কন্ধ, ১২শ অধ্যায়।)
গর্গাৎ শিনি তততঃ গার্গাঃ শৈনেয়াঃ
ক্ষত্রো পেতা দ্বিজাতয়াে বভূবঃ। (বিষ্ণুপুরাণ)
ক্ষত্রিয় মহাবীৰ্য্য হইতে দুরিত ক্ষয় উৎপন্ন হন। দুরিত ক্ষয়ের
তিনটী পুত্র এয়্যারুণি, কবি ও পুফরারুণি, তিনজনই ব্রাহ্মণত্বলাভ
করিয়াছিলেন।
দুরিত ক্ষয়ে মহাবীৰ্যাৎ তস্য ত্রয়্যাণিঃ কবি।
পুরারুণিরিত্যত্র যে ব্রাহ্মণ গতিং গতাঃ । (শ্রীমদ্ভাগবত)
१२
চতুর্বর্ণ বিভাগ।
ক্ষত্রিয় রাজা যযাতি বংশীয় ঋতেয়ুর সন্তান রঙ্গিনার, তাঁহার
পুত্র তং, অপ্রতিরথ ও ধ্রুব। অপ্রতিরথের বংশে কম্ব জন্মগ্রহণ
করেন। কপ্নের পুত্র মেধাতিথি হইতে কাথায়ন (গােত্ৰজ) ব্রাহ্মণ
গণের উৎপত্তি হইয়াছে।
ঋতেয়ােঃ রঙ্গিনারঃ পুলল্লাহভুৎ। তং
অপ্রতিরথং বঞ্চ রঙ্গিনারঃ পুত্ৰান্ অবাপ।
অপ্রতিরথাৎ কং: তস্যাপি মেধাতিথিঃ ।
যতঃ কগয়না দ্বিজা বভূবু। (বিষ্ণুপুরাণ)
ঋতেয়ুর পুত্র রঙ্গিনার। রঙ্গিনারের সুমতি, ধ্রুব ও অপ্রতিরথ,
-এই তিন পুত্র। অপ্রতিরথের পুত্র কম্ব, কথের পুত্র মেধা-
তিথি। এই মেধাতিথি হইতে প্রশ্ন প্রভৃতি দ্বিজগণ উৎপন্ন হন।
(শ্রীমদ্ভাগবত-৯ম স্কন্ধ)
রামায়ণে যে অন্ধ মুনির কথা আছে, যাঁহার পুত্র সিন্ধুমুনি,
ইহারা কেহই ব্রাহ্মণ বংশে জন্মেন নাই। তপস্য প্রভাবে মুনি
বা ব্রাক্ষণ হন।
শূদ্রায়ামম্মি বৈনে শৃণু জান পদাধিপ
( রামায়ণ )
শূদ্রার গর্ভে বৈশ্য কুলােব অন্ধ মুনির ঔরসে সিন্ধু মুনির
চতুৰ্বণ বিভাগ। উপসংহার। চতুৰ্বর্ণের উৎপত্তি ও বিভক্ত হওয়ার বিস্তৃত বিবরণ প্রদত্ত হইল। শাস্ত্র, যুক্তি, বিচার ও দৃষ্টান্ত সমস্তই পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে প্রদর্শিত হইল। স্বায়ম্ভুব মনু ও শতরূপা এবং মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলহ, পুলস্তু, ক্রতু, প্রচে, ভৃগু, বশিষ্ঠ, নারদ প্রভৃতি ঋষি ও প্রজাপতি হইতেই যাবতীয় মানবজাতি ও প্রজার উদ্ভব হইয়াছে। ব্ৰহ্ম বা বিরাট পুরুষের মুখ, হু, উরু ও পাদ হইতে ব্রাহ্মণাদির উৎপত্তি হয় নাই। উহা রূপক কল্পনা মাত্র। ব্রাহ্মণ- পণকে যেমন আপন আপন আভিজাত্যভিমান বিসর্জন দিয়া সকলকে ক্রোড়ে ধারণ করিতে বলিয়াছি,-শ্ৰাহ্মণের বৈদ্য, কায়স্থ, কৰ্ম্মকার, কুম্ভকার, সুবর্ণবণিক, সূত্রধর, সাহা, নমঃশূদ্র- গণকেও সেই কথাই বলি। ব্রাহ্মণগণের ব্যবহারে হৃদয়ে যেরূপ বেদনা অনুভব করি, সামাজিক অধিকারপ্রার্থী ব্রাহ্মণের জাতি- গণের ব্যবহারেও দুঃখ, ঘৃণা ও হাস্য সংবরণ করিতে পারি না। জাতিভেদের বিরুদ্ধবাদী ও নিন্দুকগণ একবাক্যে উহায় দোষ ঘােষণা এবং ব্রাহ্মণগণের দ্বাণা বিদ্বেষের কথা উচ্চ কণ্ঠে ঘােষণা করিয়া থাকে। কিন্তু জাতির অভিমান ব্রাহ্মণগণের অপেক্ষা কারও যে কম আছে, ইহা ত দেখিতে পাই না। আমি কোন বিজ্ঞাপনে কায়স্থ বৈদ্য কর্মকার ইত্যাদি বলিয়া অনেকগুলি জাতির উল্লেখ করিয়াছিলাম। তাহা দেখিয়া কতিপয় বৈশ্যত্ব ধীকারী বৈদ্য মহাশয় আমার উপর খগহস্ত হইয়াছিলেন। জাতিভেদ প্রয়ে ১০১ পৃষ্ঠায় কায়স্থ, নাপিত, গোপ, কুম্ভকার, বণিক, মালাকার, চণ্ডাল, কৈবর্ত, খপ ও কোল জাতিকে সমসূত্রে, গণিত, বাস সংহিতার (১০১৯১২) ৩টী শ্লোক উদ্ধত হইয়াছে। উহা দেখি- ৭৪ চতুর্ব বিভাগ। ঝাই কতিপয় কায়স্থনন্দন জাত্যভিমানে ফুলিয়া উঠিয়া আমার সঙ্গে বিবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। সাহাদের দুইটা দৃষ্টান্ত দিতেছি। একদিন আমার বাসায় একটি নমঃশূদ্র যুবক ( আমারই অবৈতনিক নৈশ-বিদ্যালয়ের ছাত্র ) নিম্নতর আসনে, টুলে বসিয়া কথাবার্তা বলিতেছিল, একটু পরে সেই স্থানে একজন সাহা যুবক ( ১০২০ টাকার মাটীর মালীক) আসিয়া আমারই বিছানায় বসিয়া নমঃশূদ্রকে টুলে বসিতে দেখিয়াই ধৈৰ্য্যহারা হইয়া উঠিলেন। আমাকে দূরে ডাকিয়া লইয়া-আমি নমঃশূদ্রকে ছালা বা চাটাই বসিতে দিয়া কেন কাষ্ঠাসন টুলে বসিতে দিয়া তাহাদিগকে প্রশ্রয় দিয়া অন্যায় কৰ্ম্ম করিতেছি-বলিয়া অনুযােগ ও ক্রোধ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। শুনিয়া আমি তাঁহাকে যে উত্তর দিয়া ছিলাম তাহ বিস্তৃত। বলিয়াছিলাম—“এইটুকু মন ও হৃদয় লইয়া তােমর বৈশ্য হইতে অভিলাষ কর ? বড় হইতে সাধ? ব্রাহ্মণের ও উচ্চজাতির লক্ষ বৎসরের পয়জারের আঘাতেও কি শিক্ষার উদয় হয় নাই ? এত জুতাতেও কি জ্ঞানােদয় হয় নাই ? বুঝিতেছি হাজার বৎসরের পয়জার যে আরও অবলীলাক্রমে চলিবে তাহাতে সন্দেহ নাই। বিশ্বের প্রতিপালক সরল, ধাৰ্ম্মিক, ভগবদ্-অনুরাগী কৃষক নমঃ শূদ্রের প্রতি তােমাদের এত ঘৃণা ; এত অবজ্ঞা ; এত বিদ্বেষ ? তুমি আমার আসনে বসিতে একটুকুও দ্বিধা ও সঙ্কোচ বােধ করিলে —আর নমঃশুদ্রটী নীচে ভিন্ন আসনে বসিয়াছে—টুলে বসিয়াছে বলিয়া তােমার হিংসানলে অন্তর ও গাত্রদাহ উপস্থিত হইতেছে। ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ, কামার, কুমার প্রভৃতি উচ্চ জাতিকে টানিয় জামিয়া সাম্যবাদের দোহাই দিয়া সমান হইতে মাধ কর-কিন্তু ছােটকে টানিয়া লইয় সমান হইতে রাজি নও। তাহাতে ব্যাজার, চতুর্ণ বিভাগ। অনিচ্ছুক ? প্রেম দান করিলে প্রেম পাইবে, ঘৃণার বিনিময়ে ঘৃণা পাইবে।” ইত্যাদি। ২য় ঘটনা এইরূপ-জনৈক সাহার সহিত দেখা করিতে তাঁহাদের বাটীতে যাই। তিনি সেই গ্রামের দেড় ছটাক জমিদারীর মালিক। আমার সঙ্গে দুইটা স্কুলের গৌরব, রক্ত সদৃশ সুত্রধর ছাত্ৰও গিয়াছিল। আমার দুই পাশে ছাত্র দুইটা হাত ধরাধরি করিয়া গিয়াছে। আমাকে তিনি তার ফয়াসে সম আসনে বসিতে বলিয়া ছাত্র দুইটিকে নিয়ে জল-চৌকিতে কিম্বা মাটিতে কম্বল আসনে বসিতে আদেশ ও ইঙ্গিত করিলেন। ছাত্রদ্বয়ের একটী তাহার পুত্রয়ের সহপাঠী, অন্যটী উচ্চপাঠী। দুইটাই শ্রেণীর প্রথম ছাত্র। তাহার আদেশে আমি এবং ছাত্র দুইটী বড়ই সঙ্কুচিত হইলাম। তিনি জমিদার কি না, কাজেই প্রজাকে কেমন করিয়া সৰ আসনে নিজের বিছানায়-কাসে বাইবেন ? তাহাতে যে গৌরব ও সম্মান নষ্ট হয়। আমাকে লইয়া তিনি সমান হইলেন কিন্তু ছাত্র দুইটাকে লইয়া তিনি সমান হইতে অনভিলাষী। ছাত্র দুইটা আর বসিল নাসঁছাইয়াই আহিল। মনঃক্ষু হওয়ায় আমরা তাড়াতাড়ি রওনা হইলাম। পথে আমি এই প্রসঙ্গে নানা কথা বলিতে লাগিলাম। শুনিয়া জনৈক গ্রামবাসী উত্তর করিল-প্রভু, মুড়িদের কথা হাড়িয়া দিন, ঘােটলােকরা দেড় পয়সার মাটি কিনিয়া, কি জমিত্রের রক্ত চুসিয়াসুদ কসিয়া সম্প্রতি ভদ্রলােক হইয়াছে, বড়লােক হইয়াছে। তাহার মন্তব্য শুনিয়া বুঝিলাম-কেন লােকে আন্দোলনকারিগণকে বিদ্রুপ করে-ঠাট্টা করে, সামাজিক আন্দো- শনে সহানুভূতি প্রকাশ করে না। হে সামাজিক আন্দোলনকারী ও সামাজিক উচছ অধিকার দাবীকারিগণ! তােমরা যে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, ৭৬ চতুর্বর্ণ বিভাগ। কায়স্থ প্রভৃতি তথাকথিত উচ্চ জাতিগণকে তােমাদিগকে ঋণ করার জন্য, জল অনাচণীয় করার জন্য দোষী করিতেছ, উচ্চ কঠে, জাতিভেদের দোষ ঘোষণা করিতেছ—জিজ্ঞাসা করি তােমরা কি তোমাদের নীচ জাতিগণকে অামাদের মতনই ঘৃণা ও অবজ্ঞা করনা ? তােমরা কি মুচি, ডোম, চণ্ডাল, দুলি, মালি, বাগদি, হাড়িকে আপনাদের ন্যায় সমান জ্ঞান কর, একই পিতার সন্তান বলিয়া ভ্ৰাতৃভাব পােষণ করিয়া থাক ? তােমরা কি তাহাদিগকে জল অচল অনারশীয় করিয়া রাখ নাই ? তােমাদের কুয়া ছুইলে, ঘরে গেলে তােমাদের কুয়া, ঘর ও ঘরের দ্রব্যাদি কি নষ্ট হয় না ? তাহাদিগকে জুলাচরণীয় করিয়া লইতে পার কি? তা যদি পার, তবে উচ্চ জাতিকে জলাচরণীয় করিয়া লইতে বল কোন্ আইনে, কোন সাহসে? অধিকার দিতে রাজী নও-অধিকার পাইতে সাধ কর! অধিকার না দিলে কিছুতেই অধিকার মিলিবে । ব্রাহ্মণদের অপেক্ষাও শতগুণে নীচ জাতিদের প্রতি ঘৃণা তােমাদের অধিক। নমঃশূদ্রগণ বলিতেছে—“নীচ, ঘৃণিত চঞ্জল আমরা নহি।” কেন সই, চণ্ডালের-নীচ, ঘৃণিত এই বিশেষণ দিতেছ ? শুধু—এইরূপ লিখিলে কি হইত না বা হয় না, যে-- ‘আমরা চণ্ডাল নহি।” তােমরা অন্যকে—শ্রীহরির অন্য সন্তান- গণকে নীচ বল--ঘৃণিত বল--কিন্তু অন্য যদি তােমাদের নীচ ঘূঙ্গিত বলে—তবে অমনি সাবাদের দোহাই দাও। সমাজ কি এ সব দেখে না, বোঝে না ? বান কি এসব, দেখিতেছেন না ? নিজে মহৎ হও। অঙ্কুকে বুকে টানিয়া তােল ব্রাহ্মণগণের কা কথা, স্বয়ং ভগবান্ আপনার বক্ষে তােমাদের টানিয়া তুলিয়া বড় করিবেন। অন্যকে নীচে রাখিয়া বড় হইতে যাইও না-কখন ৰছু হইতে পারিবে না।
চতুর্বর্ণ বিভাগ। ৭৭ শূদ্ৰাচারা, মাসাশৌচ পালনকারী, যজ্ঞসূত্রহীন কায়স্থ যেই মাত্র বলিলেন—আমরা হীনশূদ্র নহি,-কামার কুমার বারােই বণিক আমাদের পদসেবক দাস, আমরা ক্ষত্রিয় রাজা—অমনি কায়স্থেতর সমুদয় জাতি ব্রাহ্মণগণকে লইয়া দল বাঁধিয়া নব ক্ষত্রিয়কে জব্দ করিতে লাগিয়া গেল। কায়স্থগণ ক্ষত্রিয় হইতে অভিলাষী, কিন্তু ঝালমালগণ বা রাজবংশীগণ যে ক্ষত্রিয় হয়, ইহা তাহাদের অসহচক্ষুশূল। বাবােইদিগের দুই দল। যশােহরের শ্রীযুক্ত যদুনাথ মজুমদারের দল ও ঢাকার শ্রীযুক্ত গােবিন্দ ভাওয়ালের দল। যদু বাবুরা বৈশ্যত্ব প্রার্থী, গােবিন্দ বাবু ক্ষত্রিয়ত্ব প্রার্থী। ভাওয়ালের দল বলেন, বৈশ্য হইয়া লাভ কি? সাহা, সুবর্ণবণিক, কৈবর্ত, পাটনী প্রভৃতি ছিল আমাদের ছােট ও নীচ। বৈশ্য হইয়া ত উহাদের সমান হইব? ছিলাম উচুতে, বৈশ্য হইয়া হইব সমান! কি বিদ্বেষ ! নীচ জাতির প্রতি কি হিংসা, কি ঘৃণা ! শূদ্রত্ব হইতে বৈশ্যত্বে প্রমােশন পাইলে যে কতটা অধিকার পাওয়া হয়—সেদিকে লক্ষ্য নাই। বৈশ্য হইলে যজ্ঞসূত্র ধারণ করা যায়, দ্বিজ হওয়া যায়, বেদে ও পুজায় অধিকার হয়, ব্রাহ্মণগণকে কন্যা- দানে ও অনুদানে অধিকার জন্মে, অশৌচ কমিয়া ১৫ দিন হয়, জন্য আনন্দ বা উৎসাহ নাই—কিন্তু সাহা, সুবর্ণবণিক, সুত্রধর, মাহিষ্য যে সমান হইবে ইহাই আশঙ্কা। এইরূপ মন ও হৃদয় লইয়া কি কেহ কখন বড় ও উচ্চ হইতে পারে ? ব্রাহ্মণাদি উচ্চ জাতির দোষ উদঘাটনে ও দোষ পরিদর্শনে তােমরা যেমন মজবুত -তাহাদের গুণ ও মহিমা অনুশীলনে সেইরূপ মনােযােগী হইলে তােমরা অনেকখানি বড় ও উন্নত হইতে পারিতে। ব্রাহ্মণদের ধ্যায় তােমাদেরও বলি-"Oiyour own mechine” নিজেদের ৭৮ চতুর্ণ বিভাগ। চকায় তৈল দাও। সম্মান না দিলে সম্মান মিলিবে না, প্রেম দিলে প্রেম পাইবে না, ভাল না বাসিলে কেহ ভাল বাসিবে না। হিংসার অনল ভারত-বক্ষ দগ্ধ করিয়াছে। প্রেম-মন্দাকিনীর পূত ধারায় উহাকে নির্বাপিত কর। ব্রাহ্মণ কায়স্থগণকে যেমন সমান করিতে ও সমান বলিতে চাও, তেমনি মুচি ডােম চণ্ডাল পারিয়াকে সমান কর ও সমান বলিতে প্রস্তুত হও। অধিকার দিলে কিছুতেই অধিকার পাইবে না। ভগবানের দীন হীন কাঙ্গাল সন্তান মুচি ম্যাথরকে ঘৃণা করিবে ও পদতলে দলিত করিবে, আর ব্রাহ্মণাদি উচ্চ জাতি কেন সম্মান করে না ও ঘৃণা করে বলিয়া বক্তৃতা করিয়া আসর মাতাইয়া ফলের আশা করিবে ? এরূপ আশা ত্যাগ কর। অত্যাচার করিলে অত্যাচারিত হইবে। সম্মান করিলে সম্মান পাইবে। যাত্রা ও থিয়েটার শুনিতে বসিয়া কত সমাজ-লাঞ্ছিত নীচ (?) জাতিদের লম্ব-শাট-পটাবৃত ভদ্রলােক সাজা স্কুল কলেজের ছাত্রদের ও ধনীদের ছেলেদের মুখে বলিতে শুনিয়াছি “আমাদের,ভদ্রলােকদের পৃথক বসিবার স্থান দেওয়া উচিত। আমরা কি এই সব ছােট লােক ও ইতর লােকদের সঙ্গে এক আসনে এক সঙ্গে বসিতে পারি ?" যাহাদের চতুর্দশ কি ছাপ্পান্ন পুরুষ ব্রাহ্মণাদি উচ্চ জাতির পাদুকা বহন করিতে করিতে মাথার চুল উঠিয়া গিয়াছে, তাহাদের সন্তান সন্ততি পার্শ্ববর্তী প্রতিবাসী ভাইদের বলে কি না ঘােটলােক, ইতরলােক! হাসিও পায়-দুঃখও হয়। লেখাপড়া শিখিয়া—ধনী হইয়া এইরূপ উন্নতি হইয়াছে। সকলকেই বলি, যার যার জাত্যভিমান পরিত্যাগ কর। তােমরা তোমাদের ধূলি ধূসরিত জাত্যভিমান এক রতি নষ্ট করিতে প্রস্তুত নও, আর ব্রাহ্মণাদি উচ্চ জাতিগণ উত্তঙ্গ শৈলশৃঙ্গ সদৃশ চতুর্বর্ণ বিভাগ। উচ্চ মান বিসর্জন দিয়া তােমাদের সমান হইবেন, এরূপ আশা করাও কি পাগলামী নয় ? কে বড়, কে ছােট? ভগবানই সকলের পিতা। সকলের জন্মই একস্থান হইতে। পিতৃবংশ সকলের একই। যে বংশে ব্রাহ্মণ জন্ম গ্রহণ করিয়াছে, ক্ষত্রিয় বৈশ্য বা বৈদ্য কায়স্থ, কামার কুমার, সাহা সুবৰ্ণবণিকেরও সেই বংশেই উদ্ভব--এইটুকু মনে করিয়াই ব্রাহ্মণ কায়স্থকে টানিয়া সমান করিতে যাইও না-মনে রাখিও মুচি ম্যাথর, পারিয়া চণ্ডালও তােমারই ভাই---যমজ সহােদর। একই ঋষি বংশেই ইহাদেরও জন্ম। জন্মে ইতর বিশেষ নাই। ইহাদের ভাই বলিয়া বুকে টানিয়া লইতে, আপনার সম আসনে বসাইতে পার কি ? যদি না পার, জাতীয় উন্নতি, আন্দোলন, আলােচনা, বৈশ্য ক্ষত্রিয় হইবার কথা মুখে আনিও না ; পাপমুখে “জাতীয় উন্নতি” এই শব্দ উচ্চারণ করিয়া “জাতীয় উন্নতি”কে অপবিত্র, মলিন ও কলুষ কালিমা লিপ্ত করিও না। জাতীয় উন্ন- তির পবিত্র মন্দিরে তােমাদের প্রবেশাধিকার নাই,বুঝিব সরল অকপট, বিশ্বসেবক বিশ্বপ্রতিপালক—মুচি ম্যাথর অপেক্ষাও তােমরা নীচ, হেয়, ঘৃণিত, অপদার্থ। শুধু তাহাই নহে—বিষ্ঠার ক্রিমি কীট অপেক্ষাও তােমরা হীন, অপবিত্র। স্বজাতিপ্রেমের পবিত্র ধারায় বহু বহু যুগ সঞ্চিত ও সঞ্চারিত ঘৃণা বিদ্বেষ ও হিংসা কুটিলতার কলুষরাশি ধৌত করিয়া ফেল। পবিত্র অপাপবিদ্ধ ভগবানের তােমরা পবিত্র সন্তান। দেবতার সন্তানে কেন পিশা- চের ঘৃণিত অপবিত্র ভাব সকল আচ্ছন্ন করিয়া রাখিবে? মুছিয়া ফেল সমুদয় হিংসা বিদ্বেষ ; মুছিয়া ফেল সমুদয় হীনতা দীনতা ; মুছিয়া ফেল সমুদয় পাপ তাপ। জাতীয় উন্নতির পবিত্র শ্বেত ;
৮০ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। চন্দনে দেহ মন প্রাণ সংলিপ্ত করিয়া উচ্চ নীচ, ধনী দরিদ্র, উত্তম অধম হাত ধরাধরি করিয়া-গলাগলি ধরিয়া জাতীয় কল্যাণ সাধন ব্ৰতে দীক্ষিত হইয়া অগ্রসর হও। দেবর ছেলে,—আবার দেবতার ছেলে হও। প্রেমময়ের সন্তান কি প্রেমহীন হইয়া থাকিতে পার ? একই ধরিত্রী মাতার বক্ষে লালিত পালিত হইয়া পরিবর্ধিত হইয়াছ। এখানে উচ্চ নীচ, উত্তম অধমের পুতিগন্ধময় বৈষম্য বিষের উদগীরণ করিবার চেষ্টা করিও না।
পরিশিষ্ট বা পৌরাণিক সৃষ্টি বিবরণী। হিরণ্যগর্ভ ভগবান্ বা বিরাট পুরুষ হইতে ব্রহ্মার উৎপত্তি। কোন কোন শাস্ত্রকার বলেন এই বিরাট ক হিরণ্যগর্ভের মুখ ব্রাহ্মণ, বাহু হইতে ক্ষত্রিয়, উরু হইতে বৈশ্য ও পদ হইতে শূদ্র এই চতুৰ্বর্ণের উৎপত্তি হইয়াছে। ইহা যে সত্য নয়, সম্পূর্ণ প্রম সঙ্কুল, মানচিত্রে আমরা তাহাই দেখাইয়াছি। ব্রহ্মা উদ্ভব হইয়া সর্ব প্রথম মানস-সৃষ্টিতে সনক, সনাতন, সুনন্দ, সনৎকুমারকে সৃষ্টি করেন। তাহারা যৌন সম্বন্ধে সৃষ্টিকাৰ্য্যে সহায়তা না করার দরুন, তিনি ক্রমশঃ আরও দশ প্রজাপতি সৃষ্টি করেন। তাহাদের নাম—মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলহ, পুলস্ত, কতু, প্রচেতা, ভৃগু, বশিষ্ঠ, নারদ। ইহারাও পাছে সনকাদি ঋষি চতুষ্টয়ের ন্যায় কৌমার্য ব্রত অবলম্বন করিয়া ভগবৎ আরাধনায় মগ্ন হইয়া জগৎ সৃষ্টি কাৰ্যে পরাজুখ হন, এই আশঙ্কায় ব্রহ্মা স্বয়ং স্ত্রী পুরুষ দুই অংশে বিভক্ত হইলেন। পুরুষ অংশের নাম হইল স্বায়ম্ভুব মনু, নারী অংশের নাম হইল শতরূপা। ইহঁাদের উভয়ের সংযােগে—যৌন সম্বন্ধে প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ নামে দুই পুত্র ও আকুতি, দেবহুতি ও প্রসূতি নাম্নী তিন কন্যা উৎপন্ন হইল। আকুতিকে প্রজাপতি রুচির সঙ্গে, দেবহুতিকে ব্ৰহ্মার ছায়া হইতে উৎপন্ন কর্দম ঋষির সঙ্গে এবং প্রসূতিকে ব্রহ্মার দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ হইতে উদ্ভূত দক্ষ প্রজা- পতির সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হইল। দেবহূতি ও কর্দম ঋষির ২ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। সংযােগে ভগবান্ কপিল এবং কলা, অনুসূয়া, শ্রদ্ধা, হবিভূ, গতি, ক্রিয়া, খ্যাতি, অরুন্ধতী, শান্তি নায়ী নয় কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। কলা মরীচিকে, অনুসূয়া অত্রিকে,শ্রদ্ধা অঙ্গিরাকে, হবিভূ পুলস্তকে, গতি পুলহকে, ক্রিয়া ক্রতুকে, খ্যাতি ভৃগুকে, অরুন্ধতী বশিষ্ঠকে, শান্তি ব্রহ্মা হইতে উদ্ভূত অন্যতম প্রজাপতি অথৰ্ব্বাকে অর্পিত হয়, প্রজাপতি দক্ষের ঔরসে প্রসূতির গর্ভে ষোলটী কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে মূর্তি প্রমুখ তেরটী ধৰ্ম্মকে, একটী অগ্নিকে, একটী যাবতীয় পিতৃগণকে--এবং সতী নাম্নী কন্যা মহাদেবকে প্রদত্ত মরীচি বংশ।-ব্ৰহ্মার মন হইতে উৎপন্ন মরীচির পুত্র কশ্যপ। কশ্যপ ঋষি প্ৰচেতস দক্ষের ২৭টী কন্যাকে বিবাহ করেন। তন্মধ্যে অদিতি হইতে ইন্দ্র বায়ু সূৰ্য্য প্রভৃতি আদিত্য বা দেবতাগণ, দিতি হইতে হিরণ্যকশিপু হিরণ্যাক্ষ প্রভৃতি দৈত্যগণ, দনু হইতে দানবগণ, তিমি হইতে জল জন্তুগণ, সরমা হইতে শ্বাপদ কুল, সুরভি হইতে মহিষ গাে, আম্রা হইতে বিহঙ্গগণ, মুনি বা প্ৰাথা হইতে কেশিনী, রম্ভা, তিলােত্তমা প্রমুখ অপ্সরাগণ, কাষ্ঠা হইতে অন্যান্য পশু,অরিষ্টা হইতে গন্ধর্বগণ, সুরসা হইতে রাক্ষসগণ, ইলা হইতে উদ্ভিদ এবং ক্রোধ বসা হইতে সর্পজাতি উৎপন্ন হয়। মানবীর গর্ভে পশু পক্ষি বৃক্ষাদি উৎপত্তির তাৎপৰ্য্য এই যে, যে যে শক্তি দ্বারা সৃষ্টকৰ্ত্তা ভগবান্ এই সব সৃষ্টি করিয়াছেন উহারই উক্ত প্রকার নাম রাখা হইয়াছে মাত্র। অর্থাৎ ভগবান যে শক্তি দ্বারা প্রাণী সৃষ্টি করিছিলেন উহারই নাম সুরভি, যে শক্তি দ্বারা পক্ষি সৃষ্টি করিয়াছেন উহারই নাম ভায়া ইত্যাদি।
চতুর্বর্ণ বিভাগ। পাঠকগণ দেখিবেন, দেবতা, দৈত্য, দানব বা রাক্ষসগণের উৎপত্তির মূলে ইতর বিশেষ হয় নাই। একই প্রাচেস ক্ষের কন্যার গর্ভেই এবং একই কশ্যপ ঋষির ঔরসে দেবতা, দৈত্য, দানব, রাক্ষস প্রভৃতি সন্তানগণ জন্মিয়াছে। ইহারা পরস্পর সম্পর্কে বৈমাত্রেয় ভাই অথবা মাসতুত ভাই। সকলেরই পিতা ঋষি কশ্যপ এবং সকলেরই মাত্র এক প্রাচেতস দক্ষের কন্যা। সমুদ্র মন্থন ও দেবাসুর সংগ্রামের ফলেই, দেবতা ও দৈত্য দানবে চিরবিবােধ, চিরশত্রুতা ও চির বৈর ভাবের সঞ্চার চলিয়া আসিয়াছে। দেবতারা সকলে মিলিয়া বৈমাত্রেয় ভাই দৈত্য দানব- গণকে যখন সুধায় বঞ্চিত করিল অমনি ভ্রাতৃত্বের পূতমন্দাকিনী ধারা নরকের পুতিগন্ধময় জলে পরিণত হইল। দেবতাদের প্রতি দৈত্য দানব ভাইদের প্রতিহিংসানল, বিদ্বেষ বহি, শক্রতা সাধনের ভীষণ অগ্নি দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। তাহার ফলে দেবতা- দের কৃপাভিখারী ঋষিনামধেয় শাস্ত্রপ্রণেতৃগণ লেখনীর সাহায্যে দেব দৈত্যের মধ্যে এক দুর্ভেদ্য পাষাণ প্রাচীর নির্মাণ করিয়া দেব দৈত্যের চির বিদ্বেষের পথ প্রশস্ত করিয়া দিলেন। দিতি-কশ্যপের ঔরসে হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ নামে দুইটী যমজ পুত্র প্রসব করিলেন। হিরণ্যাক্ষ বরাহ অবতার ভগবানের হন্তে নিধন প্রাপ্ত হয়। হিরণ্যকশিপুর স্ত্রী পরমা সাধ্বী ও পূত- চরিত্রা কয়াধু হলাদ,অমুলাদ ও প্রহলাদ নামে কয়েকটী পুত্র প্রসব করেন। পরম হরিভক্ত ও বৈষ্ণচূড়ামণি প্রহলাদ ভক্তি বলে দৈত্যকুল পবিত্র করেন। প্রহলাদের পুত্র বিবােচন ; বিয়ােচনের পুত্র বলি; বলির পুত্র বাণ; বাণ কন্যা উষার সহিত শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র প্রদ্যুম্নের পুত্র অনিরুদ্ধের পরিণয় হয়। দৈত্যকুলের কন্যার ; চতুর্ণ বিভাগ। সঙ্গে চন্দ্রবংশীয় বাসুদেবের পৌত্রের বিবাহ সংঘটিত হইল। ইন্দ্র, বায়ু, সূৰ্য্য প্রভৃতি অদিতির পুত্র। মরীচির পুত্র কশ্যপ এবং কশ্যপের পুত্র সূৰ্য্য। এই সূৰ্য্য হইতে এই বংশের উৎপত্তি বলিয়া ইহার নাম সূর্যবংশ। সূৰ্য্যবংশ।–সূৰ্য্যপুত্র বৈবস্বত মনু, ইনি সপ্তম মনু। মনুর পুত্র--ইক্ষাকু, পৃষ, নৃগ, শৰ্যাদি, নবিষ্যন্ত, করুষ, নেদিষ্ট, ধৃষ্ট, নভগ, প্রাংশু এবং কন্যা ইল। দ্বিতীয় ভাগে সকলেই পড়িয়াছেন “সূৰ্য্য বংশের প্রথম রাজা ইক্ষাকু।” ইক্ষাকুর, ৩ পুত্র ; বিকুক্ষি, দণ্ডক, নিমি। বিকুক্ষির পুত্র পুরঞ্জয় (ককুস্থ বা ইন্দ্রবাহু নামা- স্তর) তৎপুত্র অনেনা, তৎপুত্র পৃথু, তৎপুত্র বিশ্বগন্ধি, তৎপুত্র চন্দ্র, তৎপুত্র যুবনাশ্ব, তৎপুত্র শ্রাবস্ত। ইনি শ্রাবন্তী পুরী নির্মাণ করেন। শ্রাবস্তের পুত্র বৃহদ, তৎপুত্র কুবলয়াশ বা ধুন্ধুমার। ধুন্ধুমার ৩ পুত্র ; দৃঢ়াশ্ব, কপিলা, ভদ্রা। দৃঢ়াশ্বের পুত্র হশ্ব, তৎপুত্র নিকুম্ভ, তৎপুত্র বহুলাশ্ব, তৎপুত্র কৃশাশ্ব, তৎপুত্র সেনজিৎ, তৎপুত্র যুবনাশ্ব । যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতা। মান্ধাতার ৩ পুত্র। পুরুকুৎস, অম্বরীষ, যােগী মুচুকুন্দ। অশ্ব- রীষের পুত্র মুবনাশ্বতৎপুত্র হারীত। পুরু কুংসের পুত্র সদ্দ, তৎপুত্র অরণ্য, তৎপুত্র হৰ্য্যশ্ব, তৎপুত্র প্রারুণ, তৎপুত্ৰ ত্ৰিবন্ধন। ত্রিবন্ধনের পুত্র বিখ্যাতনামা ত্রিশঙ্কু-নামান্তর সত্যব্রত। ইনি চণ্ডালত্ব প্রাপ্ত হন ও রাজর্ষি বিশ্বামিত্র কর্তৃক স্বর্গে গমন করেন। তৎপুত্র বিখ্যাত রাজা হরিশ্চন্দ্র। হরিশ্চন্দ্রের পুত্র রােহিত। রােহিতের পুত্র চম্পাপুরী নির্মাতা চম্প। তৎপুত্র সুদেব, তৎপুত্র বিজয়, তৎপুল ভরুক, তৎপুত্র বৃক, তৎপুল বাহুক, বাহুকের পুত্র সুবিখ্যাত সগর। সগরের পুত্র অসমঞ্জস্। তৎপুত্র অংশু- চতুর্বর্ণ বিভাগ। ৮৫ খটঙ্গি মান, তৎপুত্র দিলীপ, তৎপুত্ৰ মৰ্তে গঙ্গা বা ভাগীরথী আনয়ন- কারী ধন্যজন্ম ভগীরথ। ভগীরথের পুত্র শ্রুত, তৎপুত্র নাত, তৎপুত্র সিন্ধুদ্বীপ, তৎপুত্র অযুতায়, তৎপুত্র বিখ্যাত ঋতুপর্ণ রাজা, তৎপুত্ৰ সৰ্ব্বকাম, তৎপুত্র সুদাস, তৎপুত্র সৌদাস। ইহার মহিষীর নাম মদয়ন্তি। মদয়ন্তির ক্ষেত্রে বা গর্ভে মহর্ষি বশিষ্ঠ দ্বারা সন্তান উৎপন্ন করান হয়। প্রাচীন কালে এইরূপ রীতি প্রচলিত ছিল। এইরূপে অশ্মক জন্মে। অশ্মকের পুত্র বালিক, তৎপুত্র দশরথ, তৎপুত্র ঐড়বিড়ি, তৎপুত্র বিশ্বসহ, তৎপুত্র বিখ্যাত রাজা। তৎপুত্র দীর্ঘ বাহুক। বাহুকের পুত্র বিখ্যাত রাজা দিলীপ। দিলীপের পুল্ল রঘু, রনুর পুত্র অজ, অজের পুত্র দশ- রথ। দশরথের তিন মহিষী। কৌশল্যার গর্ভে শ্রীরামচন্দ্র, কৈকেয়ীর গর্ভে ভরত, সুমিত্রার গর্ভে লক্ষ্মণ ও শক্র। মিথিলা বাজ জনকনন্দিনী সীতার গর্ভে শ্রী রামচন্দ্রের কুশ ও লব নামে তুইটী পুত্র জন্ম গ্রহণ করেন। কুশের পুত্র অতিথি। রাজপুতনার রাজপুতগণ কুশের বংশধর। অতিথির পুত্র নিষধ, তৎপুত্র নভ, তৎপুত্র পুণ্ডরীক, তৎপুত্র মেধা, তৎপুত্র দেবানীক, তৎপুত্র হীন, তৎপুত্র পারি, তৎপুত্র বহুস্থল, তৎপুত্র বর্জনাভ, তৎপুত্র সগন, তৎপুত্র বিস্তৃতি, তৎপুত্র হিরণ্যনাভ, তৎপুত্র পুষ্প, তৎপুত্র ধ্রুবসন্ধি, তৎপুত্র সুদর্শন, তৎপুত্র অগ্নিবর্ণ, তৎপুত্র শ, তৎপুত্র মরু, তৎপুত্র প্রসুশ্রুত, তৎপুত্র সন্ধি, তৎপুত্র অমর্ষণ, তৎপুত্র মহ, তৎপুত্র বিশ্ববাহু, তৎপুত্র প্রসেনজিৎ, তৎপুত্র বৃহদ্বল, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে সুভদ্রানন্দন অভিমন্যু হস্তে নিধন প্রাপ্ত হন। তৎপুত্র বৃহদ্রন, তৎপুত্র বৎসবৃদ্ধ, তৎপুত্র প্রতিবব্যাম, তৎপুত্র ভানু, তৎপুত্র দিবাকর, তৎপুত্র সহদেব, তৎপুত্র বৃহদ, তৎপুত্র ইনি চতুর্ণ বিভাগ। ভানুমান, তৎপুত্র প্রতীকাশ্ব, তৎপুত্র সুপ্রতীক, তৎপুত্র মরুদেব, তৎপু সুনক্ষত্র, তৎপুত্র পুষ্পর, তৎপুত্র অন্তরীক্ষ, তৎপুত্র সুতপা, তৎপুত্র অমিত্ৰজিৎ, তৎপুত্র বৃহদ্রাজ, তৎপুত্র বহি, তৎপুত্র কৃতঞ্জয়, তৎপুত্র রণঞ্জয়, তৎপুত্র সঞ্জয়। সঞ্জয়ের পুত্র বিখ্যাত শাক্য। শাকের পুত্র শুদ্ধোদ। শুদ্ধোদের পুত্র লাঙ্গল, তৎপুত্র প্রসেন জিৎ, তৎপুত্র ক্ষুদ্রক। ক্ষুদ্রকের পুত্র সুমিত্র। ইক্ষাকু বংশ এইখানেই শেষ। ইক্ষাকুর তৃতীয় পুত্র নিমি। ১। নিমি ২। জনক (বৈদেহ) ৩। উদাবস্তু ৪। নবিদ্ধন ৫। সুকেতু ৬। দেবরাত ৭। বৃহদ্রথ ৮। মহাবীৰ্য্য ৯। সুধতি ১০। হৰ্যশ্ব ১১। ১২। প্রতীপ ১৩। কৃতরথ ১৪। দেবমীঢ় ১৫। বিশ্রুতি ১৬। মহাধতি ১৭। কৃতিৱাত ১৮। মহারােমা ১৯। স্বর্ণবােম ২০। হ্ররােমা ২১। শীরধ্বজ ২২। কুশধ্বজ ও কন্যাসীতা ২৩। ধর্মধ্বজ ২৪। কৃতধাজ ও মিতধ্বজ ২৫। কেশিধ্বজ ২৬। ভানুমান পাণ্ডিক্য ২৭। শতম ২৮। শুচি ২৯। সনদ্বাজ ৩০। উজ্জকে চতুর্ণ বিভাগ। ৩১। পুরুজিৎ ৩২। অরিষ্টনেমি ৩৩। শ্ৰতায়ু ৩৪। সুপার্শ্ব ৩৫। চিত্ররথ ৩৬। ক্ষেমাধি ৩৭। সমরথ ৮। সত্যরথ ৩৯। উপগুরু ৪০। উপগুপ্ত ৪১। স্বনন্ত ৪২। যজুৰ্বান্ ৪৩। সুভাষণ ৪৪। ত ৪৫। ৪৬। বিজয় ৪৭। ৪৮। ৪৯। বীতহব্য ৫০। ধৃতি ৫১। বহুলা ৫২। কৃতি (শেষ ) ইক্ষাকুর অন্যতম ভাই পৃষধ শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হন। ইক্ষাকুর অন্য ভাই নৃগ। ১। নৃগ ২। সুমতি ৩। ভূতজ্যোতি (ব্রাহ্মণ হন) ৪। বসু ৫। প্রতীক ওঘবান্ ও ওঘবতী কন্যা ইক্ষাকুর অন্য ভাই শৰ্য্যাতি। ১। শৰ্যাতি ২। পুত্ৰ আনৰ্ত ও ভূষিসেন এবং কন্যা সুকন্যা। ৩। আনৰ্তের পুত্র রেবত, ইনি কুশস্থলী নগরী প্রতিষ্ঠাতা। ৪। রেবতের পুত্র ৫। ককুষ্মী ও কন্যা তী বলদেবের সহিত বিবাহ হয় । ২। আনৰ্তের ভগিনী সুকন্যার সহিত ভৃগুপুত্র চ্যবনের বিবাহ হয়।
চতুর্ণ বিভাগ। ইক্ষাকুর আর এক ভ্রাতা নবিষ্যন্ত। ১। নরিষ্যক্ত ২। চিত্রসেন ৪। মীঢ়াণ ৫। পূর্ণ ৬। ইন্দ্রসেন ৭। বীতিহোত্র ৮। সত্যবা ৯। উরুবা ১০। দেবদত্ত ১১। অগ্নিবেশ (ব্রাহ্মণ হন) অগ্নিবেশ হইতে অগ্নিবেশ্যায়ণ ব্রাহ্মণ বংশ উৎপন্ন হয়। ইক্ষাকুর অন্য ভ্রাতা করুষ। করুষ হইতে ২। কারুম নামক ক্ষত্রিয় বংশ উৎপন্ন হয়। ইক্ষাকুর অন্য ভ্রাতা নেদিষ্ট। ১। নেদিষ্ট ২। নাভাগ (বৈশ্যত্ব প্রাপ্ত হন । ভলন্দন ৪। বৎস প্রীতি । প্রাংশু ৬। প্রমিতি খনিত্ৰ ৯। বিবিংশতি ১১। খননেত্র ১২. কবন্ধ ১৩। অবিক্ষিৎ ১৪। মরুত্ত ( বিখ্যাত যজ্ঞকারী ) ১৬। রাজবৰ্ধন ১৭। স্বধতি নৰ ৭। ৮। চাক্ষুষ ২০। ধুন্ধুমান চতুর্বর্ণ বিভাগ। ৮৯ ২১। বেগবান্ ২২। বুধ ২৩। তৃণবিন্দু ২৪। বিশাল,ধূমকেতু ও শূন্য- বন্ধু এই তিন ভাই ও ইলবিলা ভগিনী বিশ্রব ঋষির সহিত বিবাহের ফলে কুবের জন্মে। ২৪। বিশাল, বৈশালী নগরী স্থাপয়িতা। ২৫। হেমচন্দ্র ২৬। ধূম্রাক্ষ ২৭। সংযম ২৮। কৃশাশ্ব, দেবল ২৯। সােমদত্ত ৩০। সুমতি ৩১। জনমেজয় (শেষ) ইক্ষাকুর অন্য ভ্রাতা প্রাংশু অপুত্রক। ইক্ষাকুর শেষ ভ্রাতা নভগ। ১। নভগ ২। নাভাগা ৩। অম্বরীষ। এই অম্বরীযের নিকট দুর্বাসার নিগ্রহ হয়। ৪। বিরূপ, শম্ভু, কেতুমান ৫। বিরূপ পুত্র পৃষদখ, তৎপুত্র ৬। রর্থীতর। ইহার ভাৰ্য্যাতে অঙ্গিরা ঋষির সন্তান উৎপন্ন করেন। হারাই আঙ্গিরস গােত্ৰীয় ব্রাহ্মণ। সূৰ্য্যবংশ শেষ। কশ্যপের অন্যতমা পত্নীর গর্ভে বৎসর ও অসিত নামে দুইটা পুত্র জন্মে। বৎসর পুত্র নৈব। অসিত পুত্র দেবল শাণ্ডিল্য। মরীচি বংশ শেষ। এই বংশেই অপসার, কাত্যায়ন ও কাশ্যপ গােত্ৰীয় ব্রাহ্মণগণ উৎপন্ন হন।
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ।
অঙ্গিরা। ব্রহ্মার মুখ হইতে অঙ্গিরার উৎপত্তি হয়।
শ্রদ্ধার গর্ভে অঙ্গিরার সম্বৰ্ত, বৃহস্পতি, বামদেব, উতথ্য এই চারি
তনয় জন্মগ্রহণ করেন। বৃহস্পতির পুত্র ভরদ্বাজ ও বাম্পত্য।
ভরদ্বাজের পুত্র দ্রোণাচাৰ্য। কৃপীর গর্ভে দ্রোণাচার্যের অশ্বত্থামা
নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। এই বংশেই শমীক জন্মগ্রহণ
করেন। এই শমীক ঋষির গলদেশে মহারাজ পরীক্ষিৎ মৃত সর্প
প্রদান করেন। শমীকের পুত্র শৃঙ্গী। অঙ্গিরা হইতে আঙ্গিরস
গােত্রীয় ব্রাহ্মণ বংশ জন্মগ্রহণ করে।
পুলহ। গতির গর্ভে পুলহের কর্মশ্রেষ্ঠ, বরীয়স ও সহিষ্ণু
নামে তিন পুত্র হয়।
পুলস্ত্য। ব্রহ্মার কর্ণ হইতে পুলস্ত্যের উদ্ভব। পুলস্থ্যের
হবির্ভর গর্ভে অগস্ত ও বিবস্ নামে দুইটী পুত্র হয়। বিস্রবসের
দুই পত্নী ; ইলবিল ও কেশিনী। ইলবিলার গর্ভে কুবের ও
কেশিনী বা নিকষার গর্ভে রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ জন্মগ্রহণ
করে। বিষবস ঋষি বা ব্রাহ্মণ-—তাহারই পুত্র রাবণ, কুম্ভকর্ণ,
বিভীষণ। জন্মের জন্য রাক্ষস নয় কিন্তু কর্মের জন্যই তাহাদের
নাম রাক্ষস হইয়াছে।
তু।
ক্রিয়ার গর্ভে তুর বালখিল্য প্রমুখ ৬০ হাজার
পুত্র জন্মগ্রহণ করেন।
প্রচেতা। প্রচেতার সন্তানাদির কথা উল্লেখ নাই।
বশিষ্ঠ। ব্রহ্মার প্রাণ হইতে উদ্ভব হন। অরুন্ধতীর গর্ভে
বশিষ্ঠের শক্তি নামক পুত্র জন্মে। অন্ততমা পত্নী উর্জার গর্ভে
চিকেতু, সুয়ােচি, বিরজা, মিত্র, উদ্বন, বহুভূদ্যান, দ্যুমান নামক
;
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। সপ্তর্ষি উদ্ভব হন। শক্তি পুত্র পরাশর, পরাশব কৈবৰ্ত্তজাতীয় দাস রাজকন্যা মৎসগন্ধা বা সত্যবতীর গর্ভে বেদব্যাসকে জন্মদান করেন। ব্যাসের পুত্র শুকদেব গােস্বামী। ভৃগু। ব্রহ্মার হৃদয় (বা মতান্তর ত্বক) হইতে উদ্ভূত। খ্যাতির গর্ভে ভৃগুর ধাতা ও বিধাতা নামে দুই পুত্র হয়। অন্য পত্নী পৌলমীর গর্ভে কবি, চ্যবন ও আধুবান্ জন্মগ্রহণ করেন। ধাতা আয়তির গর্ভে মৃকণ্ডকে জন্মদান করেন। মৃকণ্ডের পুত্র মার্কণ্ডেয়। নিয়তির গর্ভে বিধাতার প্রাণ নামক পুত্র জন্মে। প্রাণের পুত্র বেশির। কবির পুত্ৰ উশনা বা শুক্রাচাৰ্য। শুক্রাচার্যের পুত্র যও ও অমর্ক। চ্যবনের পুত্র ঔৰ্ব্ব ও প্রতি। ঔৰ্বের পুত্র ঋচি। ঋচিক ঋষি চন্দ্রবংশীয় গাধিরাজাব জ্যেষ্ঠা কন্যা সত্যবতীকে বিবাহ করেন। সত্যবতীর গর্ভে ঋচিকের জমদগ্নি নামে পুত্র হয়। পিতৃসম্পর্কে জমদগ্নি ব্রাহ্মণই হন। জমদগ্নি আবার প্রসেনজিৎ রাজকন্যা রেণুকাকে বিবাহ করেন। রেণুকার গর্ভে জমদগ্নির পরশুরাম নামক অমিত পরাক্রমশালী এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। ইনি মাতৃহত্যা করেন ও পিতৃবৈরী সাধন নিমিত্ত বহুবার ক্ষত্রিয়- কুল নির্মুল করিতে যত্ন করেন। ইনি ভীষ্মের যুদ্ধবিদ্যার গুরু ছিলেন। প্রগতির পুত্র রুরু। রুরুর পুত্র শুনক। এই বংশেই নৈমিষারণ্য তপঃ ক্ষেত্রের বিখ্যাত ঋষি শৌনক জন্মগ্রহণ করেন। নারদ। ব্রহ্মার ক্রোড় হইতে নারদের উদ্ভব। ইনি সৰ্ব্বত্যাগী কুমার, ভগবৎপ্রেম মদিরা পানে বিভাের। দিন রজনী হরিগুণ গানে মত্ত, বিশ্বপ্রেমিক। দক্ষ প্রজাপতি। ব্রহ্মার দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ হইতে জন্ম।
চতুর্বর্ণ বিভাগ । স্বায়ম্ভুব মনু কন্যা প্রসূতির গর্ভে ১৬টী কন্যা জন্মদান করেন। তন্মধ্যে মূৰ্ত্তিপ্রমুখ ১৩টী কন্যা ধৰ্ম্মকে, ১টী অগ্নিকে, ১টী যাবতীয় পিতৃগণকে, ১টী মহাদেবকে অর্পণ করেন। ধৰ্ম্ম। ব্রহ্মার দক্ষিণ স্তন হইতে ধৰ্ম্মের উদ্ভব। দক্ষ প্রজাপতির ১৩টী কন্যাকে বিবাহ করেন। ইহার দুই পুত্র নর ও নারায়ণ ঋষি। ইহারাই কলেবর ত্যাগ করিয়া শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন রূপে আবির্ভূত হন। অধৰ্ব্ব। ব্রহ্মা হইতে জাত। পত্নী চিত্তির গর্ভে মহাত্মা দধীচি মুনি জন্মগ্রহণ করেন। অত্রি। প্রজাপতি অত্রি পদ্মযােনি ব্রহ্মার চক্ষু হইতে উদ্ভূত। কর্দম ও দেবহুতি নন্দিনী অনুসূয়া ইহার সহধর্মিণী । অনুসূয়ার গর্ভে অত্রির তিন পুত্র জন্মগ্রহণ করে। ব্রহ্মার অংশে চন্দ্র (বা সােম, রুদ্রের অংশে মহর্ষি দুর্বাসা, বিষ্ণুর অংশে যােগবিদ দত্ত। এই অত্রির পুত্র চন্দ্র হইতেই চন্দ্রবংশের উৎপত্তি। প্রথম প্রজাপতি মরীচির পৌত্র, কশ্যপের পুত্র সূৰ্য্য হইতে যেমন সূৰ্য্যবংশের উৎপত্তি, তদ্রুপ মহর্ষি অতির পুত্র চন্দ্র হইতেই চন্দ্র- বংশের উৎপত্তি। এই সূৰ্য্য ও চন্দ্রবংশ হইতেই যাবতীয় সূৰ্য্যবংশীয় ও চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় নরপতি এবং তাহাদেরই শাখাপ্রশাখা স্বরূপ কুরুবংশ, পুরুবংশ, বৃষ্ণিবংশ, যদুবংশ, ভােজবংশ, হৈহয় বংশীয় ক্ষত্রিয় নরপতিগণ, বহু ঋষি ও ব্রাহ্মণবংশ, বৈশ্যবংশ ও শূদ্রবংশের উৎপত্তি হইয়াছে। বিরাট ব্ৰহ্ম বা হিরন্ময় পুরুষের মুখ হইতে ব্রাহ্মণ, বাহু হইতে ক্ষত্রিয়, উরু হইতে বৈশ্য এবং পাদ হইতে শূদ্রগণের উদ্ভব হইয়াছে বলিয়া যে কোন কোন শাস্ত্রে দেখিতে চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। পাওয়া যায়, ইহার প্রমাণ আমরা পাইলাম না। প্রমাণ পাইতেছি মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলহ,পুলস্ত্য, ক্রতু, প্রচেতা, ভৃগু, বশিষ্ঠ, নারদ, দক্ষ, ধৰ্ম্ম, অথৰ্ব্ব প্রভৃতি প্রজাপতি ও ঋষিগণ হইতেই যাবতীয় ঋষিবংশ, ব্রাহ্মণবংশ, সূৰ্য্য ও চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় নরপতিগণ, নানা শ্রেণীর বৈশ্য ও শূদ্রগণ উৎপন্ন হইয়াছে। অবশিষ্টগণস্বায়ম্ভুব মনু ও শতরূপা দ্বারা উৎপন্ন প্রিয়ব্রত ও উত্তনিপাদ রাজা এবং আকুতি, দেবহুতি ও প্রসূতি এই তিন কন্য। হইতে উৎপন্ন হইয়াছেন। বিরাট ব্রহ্মের মুখ, বাহু, উরু, পাদ হইতে যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চতুৰ্বর্ণের উৎপত্তির কথা কোন কোন শাস্ত্রে দেখিতে পাওয়া যায়—উহা যুক্তিহীন ও প্রমাণ বিহীন বলিয়া শ্ৰীমদ্ভাগবতকার বেদব্যাস প্রমুখ পৌরাণিকগণ ও শাস্ত্রকারগণ প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন এবং শ্রীমদ্ভাগবতে এইরূপ ভাবে পৌরাণিক সৃষ্টি-বিবরণ লিপিবদ্ধ ও বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। এই পুস্তকের প্রথম অংশে ১৪ পৃষ্ঠায় যে লিপিত হইয়াছে ‘ব্ৰহ্ম বা ইদমগ্রে আসীৎ এক এব’, ‘ন বিশেষােহস্তি বর্ণানাং সর্লং ব্রহ্মমিদং জগৎ’, ‘একবর্ণমিদং পূর্ণ বিশ্বাসীৎ মুধিষ্ঠির’ এখানে আমরা সে কথার বর্ণে বর্ণে সত্য ও প্রমাণ দর্শন করিলাম। মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা ও স্বায়ম্ভুব মনু প্রভৃতি প্রধান প্রধান প্রজাপতি ও ঋষি হইতেই চতুৰ্বর্ণের উৎপত্তি। ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র বর্ণের উৎপত্তির পূর্বে ব্রাহ্মণ বা ঋষিজাতীয় একবৰ্ণ প্ৰজা- পতিগণই ছিলেন। সেই এক ব্রাহ্মণ বর্ণীয় মরীচি, অত্রি প্রভৃতি প্রজাপতির পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র, বৃদ্ধ প্রপৌত্রগণই ক্রমে ক্রমে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র হইয়া গিয়াছিল। পাঠকগণ বলিতে পারেন, লেখক ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় বংশাবলীর ১৪ চতুৰ্কৰণ বিভাগ। ন্যায় বৈশ্য ও শূদ্রবংশাবলী কেন বিস্তৃতভাবে লিখিলেন না। ইহার উত্তর সহজ। ঋষিনামধেয় ব্রাহ্মণ শাস্ত্রপ্রণেতৃগণ তাহাদের নিজেদের ও যাগ যজ্ঞনিরত প্রতিপালক ক্ষত্রিয় সম্রাটগণের বংশাবলীর কথাই বিস্তৃতভাবে লিখিয়াছেন। মুর্থ, বিদ্যাজ্ঞান- বৰ্জিত হতভাগ্য বৈশ্য শূদ্রদের বংশাবলী লেখেন নাই ; জানিবারও কোন আবশ্যকতা উপলব্ধি হয় নাই, উপায়ও ছিল না। জন- সাধারণই ছিল বৈশ্য, শূদ্র। কোটি কোটি বৈশ্য শূদ্রের বংশতালিকা পূর্ণ ইতিহাস বা পুরাণ রচনা করিবার কোনই দরকার হয় নাই। ইহাতে প্রাচীন আর্য ঋষিগণের দোষ দেওয়া যাইতে পারে না। ইতিহাস পাঠক মাত্রই জানেন—সব দেশেই রাজবংশের ধারা- বাহিক ইতিহাস ও সঙ্গে সঙ্গে রাজবংশীয় নরপতিগণের ধারাবাহিক জীবন চরিত ইতিহাস-প্রণেতৃগণ কর্তৃক লিখিত হইয়াছে। কোন দেশেই সাধারণ প্রজাবৃন্দের অর্থাৎ শিল্পি, শ্রমজীবী, বণিক, কৃষক ও দাসগণের ইতিবৃত্ত প্রণীত হয় নাই বা প্রণয়নের প্রয়ােজনীয়তা উপলব্ধি হয় নাই। স্কুল কলেজের ছাত্রগণ গ্রীস, রােম, ইংলণ্ড, ফ্রান্স, ভারতবর্ষের হিন্দু রাজগণের, মুসলমান ধর্মাবলম্বী পাঠান ও মােগল বাদসাগণের বংশতালিকা সহ ধারাবাহিক ইতিবৃত্ত বা ইতিহাস পাঠ করেন। ইতিহাস লেখকগণও শুধু রাজকাহিনীই লিপিবদ্ধ করিয়াছেন—-শিক্ষক ও অধ্যাপকগণও আপন আপন বিদ্যালয়ে ও কলেজে তাহাই ছাত্রগণকে শিক্ষা দিয়া থাকেন বা অধ্যাপনা করাইয়া থাকেন। প্রাচীন কালেও এইরূপই হইয়া- ছিল। তবে বর্তমান যুগেও যেমন মাঝে মাঝে অসাধারণ ক্ষমতা- শালী প্রতিভাবান্ যুগপ্রবর্তনকারী সাধারণ প্রজার সন্তানগণের ইতিবৃত্ত, বংশপরিচয়, জীবন-কাহিনী ইতিহাস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ চতুর্বর্ণ বিভাগ। হইয়াছে, প্রাচীন কালেও সেইরূপ হইয়াছিল। প্রজা সাধারণের সন্তান হইয়াও যেমন জর্মন কৃষক পুত্র—রসায়ন শাস্ত্রবি ভকলিন, ইংরেজ কৃষক সন্তান সার আইজাক নিউটন, চর্মকার জাতীয় প্রসিদ্ধ ইংরেজ সৈন্যাধ্যক্ষ সার ক্লাউডেসলিসভেল, ইংলণ্ডের ক্ষৌরকার নন্দন বিখ্যাত চিফ, জষ্টিস্ লর্ড টেণ্টার্ডেন, মাংস- বিক্রেতা কসাই—রবিনস ক্রুশাে প্রণেতা ডিফো, ফরাসী দেশীয় কুম্ভকার নন্দন বিখ্যাত রসায়ন শাস্ত্রজ্ঞ বার্ণাড, প্যালিসি, স্কট- লণ্ডের কৃষক সন্তান বিখ্যাত কবি রবার্ট বারন্স, ইংরেজ ক্ষৌর- কারের পুত্র প্রসিদ্ধ চিত্রকর জোসেফ টার্ণার, ইংরেজ কৃষক সন্তান—প্রসিদ্ধ ধৰ্ম্মপ্রচারক আনড় ফুলার, চর্মকার পুত্র ফ্রান্স দেশীয় বিখ্যাত কবি জী বাপ টিষ্ট রুসসা, কর্সিকা দ্বীপবাসী সাধারণ লোকের সন্তান নেপােলিয়ন বােনাপাটি, গ্রীসদেশের অদ্বিতীয় পণ্ডিত ধাত্রীনন্দন সক্রেটীস্ এবং সেদিনকার আমেরিকার যুক্তরাজ্যের কাফ্রি বা কৃষ্ণাঙ্গ দাসবংশীয় বুকার ওয়াশিংটনের ইতিবৃত্ত, কাহিনী, জীবন বৃত্তান্ত ও বংশ পরিচয় ঐতিহাসিকগণ বা ইতিহাস লেখকগণ আপনাপন ইতিহাস গ্রন্থে বা জীবন চরিত গ্রন্থে বিস্তৃত ও বিশেষভাবে বর্ণনা ও লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, প্রাচীন কালেও সাধারণ লােকের অসাধারণ সন্তানগণের জন্মবৃত্তান্ত, বংশ পরিচয়, ইতিবৃত্ত, জীবনী, বেদ বেদান্ত পুরাণ, ইতিহাস, রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবত, হরিবংশ, জৈমিনী ভারত প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত ও লিপিবদ্ধ হইয়াছে। তাইতে শাস্ত্রে দৈত্য- কুলের হিরণ্যকশিপু, হিরণ্যাক্ষ, প্রহলাদ, বলি, বান, দানবকুলের ময়, রাক্ষসকুলের রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, ইন্দ্রজিৎ, তরণীসেন, মন্দোদরী, প্রমীলা, সরমা, বানরাদি পশুকুলের বালী, সুগ্রীব, চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। হনুমান, অঙ্গদ, নল, নীল, জাম্বুবান, সুসেন বৈদ্য, চণ্ডালকুলের গুহক, চৰ্ম্মকারকুলের রুহিদাস, বহুপ্রভুর সেবিকা দাসী জবাণীর পুত্রবেদরচয়িতা সত্যকাম, ঋগ্বেদের কতকগুলি সূক্ত ও মন্ত্রপ্রণেতা দাসী-পুত্র কবস, তৎপুত্র তুর, দাসী উশিজের পুত্র বেদমন্ত্র প্রণেতা কুক্ষীবান্ ও চক্ষু, কৈবর্ত রাজকন্যা সত্যবতী, শূদ্রজান শ্রুতি রাজা, দাসী পুত্র বিদুর, ধৰ্ম্মব্যাধ ; ম্লেচ্ছ রমণী শুকীর গর্ভজাত শুকদেব, বৈশ্যবর্ণান্তৰ্গত গােপ বা গােয়ল। জাতীয় নন্দগােপ, উপানন্দ, শ্রীদাম, সুদাম, দাম, বহুদাম, ব্রজের গােপ কন্যাগণ, বৈশ্য পুত্র অন্ধক্ষুনি, ও তৎপুত্র শূদ্ৰাগৰ্ভজাত সিন্ধুনুনি, সুতপুত্র কর্ণের কথা কিন্তু আধুনিক যুগের মুসলমান সন্তান ভক্ত হরিদাস, জোলার পালিত পুত্র কবির, কৃষক সন্তান তুকারাম, ডােমজাতীয় হিন্দি ভক্তমাল প্রণেতা নাভাজি, কুম্ভকার নন্দন ভক্ত কেবল কুবা, কসাই পুত্র সজনের কথা আমরা ইতিহাস গ্রন্থে, ভক্তি গ্রন্থে বা শাস্ত্র গ্রন্থে দেখিতে পাইতেছি। প্রজা সাধারণ বৈশ্য শূদ্রগণের সকলের বংশতালিকা, ইতিবৃত্ত বা বিশেষ বিস্তৃত বিবরণ লিখিত হয় নাই। তবে তাহাদের মধ্যে যাহাৱা কৰ্ম্ম ও ধৰ্ম্ম বলে, সাধনা ও পুণ্য বলে, জ্ঞান ও ভক্তি বলে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়া গিয়াছেন, শাস্ত্রকারগণ তাহাদের জীবন চরিত, ইতিবৃত্ত বা বংশ পরিচয় বিস্তৃত ও বিশদভাবে বর্ণনা করিয়া রাখিয়াছেন ও লিপিবদ্ধ করিয়া- ছেন। ইক্ষাকুর অন্যতম ভ্রাতা পৃষধ, গুরুর ব্যাঘ্র কর্তৃক গােহত্যা নিবারণে অশক্ত হইয়া প্রকারান্তরে গােবধের অপরাধে অপরাধী হইয়া শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। নীচ শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হওয়ার দরুণ শাস্ত্রকার আর তাহার বংশতালিকা লিপিবদ্ধ করেন নাই। ইক্ষাকু রাজারা দশ ভাই ও এক ভগিনী ইলা ছিলেন। দশম ভ্রান্থা চতুর্বর্ণ বিভাগ। প্রাংশু অপুত্রক-কাজেই তাঁহার বংশ-তালিকা অনুল্লেখিত হইয়াছে। শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হতভাগ্য পৃষ ব্যতীত অন্য সকল ভাইদেরই বংশ-তালিকা বর্ণিত হইয়াছে। নেদিষ্ট তাহার (ইক্ষাকুর ) ৭ম ভাই। নেদিষ্ট পুত্র নাভাগও কি এক অনির্দিষ্ট কারণে ও অপরাধে বৈশ্যত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু হইলে কি হইবে, সেই বংশে পুনরায় ধারাবাহিক পরাক্রমশালী ক্ষত্রিয় রাজার উদ্ভব হওয়ায়-- শাস্ত্রকার বংশ-তালিকা বিশদভাবে প্রদান করিয়াছেন। প্রজাপতি অত্রি বা তৎপুত্র চন্দ্রের বংশে অঘােতন ঊনবিংশ পুরুষ হইতেছে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ প্রভৃতি। অঙ্গ হইতে অথােতন চতুর্দশ পুরুষ অধিরথ। ইনি বৈশ্য জাতীয় সুত বা সারথি ছিলেন। ইনিই পঞ্চ পাণ্ডবদের সহোদর ভ্রাতা দাতাকর্ণের পালক পিতা। সুত অধিরথ কর্তৃক প্রতিপালিত হওয়ায় লােকে ইহঁাকে সুতপুত্র বলিয়া সম্বােধন করিতেন এবং জানিতেন। সুতপুত্র বলিয়া পরিচিত থাকার দরুণ দ্রুপদ নন্দিনী দ্রৌপদী স্বয়ম্বর সভায় কণাকে লক্ষ্য বিদ্ধ করিতে অগ্রসর হইতে দেখিয়া সভাস্থলেই সগর্বে বলিয়া উঠিয়াছিলেন “লক্ষ্য বিদ্ধ করিলেও আমি সুপুত্রের গলদেশে বরমাল্য অর্পণ করিব না।” শাস্ত্রকার সুত অধিরথের আর বংশ-তালিকা প্রদান করেন নাই। এইরূপ পূর্বোক্ত অঙ্গ হইতে অপােতন দ্বাদশ পুরুষ দেবমীঢ়। দেবমীঢ় দুই বিবাহ করেন। একটা ক্ষত্রিয় কন্যা, একটি বৈশ্য কন্যা। পূৰ্বে এরূপ নিয়ম ছিল। ক্ষয়ি কন্যার গর্ভে শূর বা শূবসেন ও বৈশ্য কন্যার গর্ভে পর্জন্ত জন্মগ্রহণ করেন । “অনুলােমা মাতৃবর্ণা” এই, বিষ্ণু স্মৃতি অনুসাৰে পর্ডেন্য মার চতুর্বর্ণ বিভাগ। অনুসারে বৈশ্য হন। শূর ক্ষত্রিয়ই হন। এই পর্জনের পুত্রই বৃন্দাবনের সুবিখ্যাত বৈশ্য নন্দ গােপ। আর ক্ষত্রিয় শরেব পুত্র বসুদেব হইলেন ক্ষত্রিয়। উভয়ের পিতামহ বা ঠাকুরদাদা কিন্তু একজন, সেই দেবমীঢ় রাজা। আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই দেবমীঢ়ের উর্দ্ধতন দ্বাদশ পুরুষ হইতেছে অঙ্গ। তার সঙ্গে + যােগ উনবিংশ বা বিংশ ==৩২শ উৰ্দ্ধতন পুরুষ প্রজাপতি বা ব্রাহ্মণ অত্রিঋষি। এখানে আমরা দেখিতে পাইলাম, অত্রি- ঋষির বংশেই যথাক্রমে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যবংশ উৎপন্ন হইয়াছে। ৰাহ্মণ হইতেই গুণ ও কৰ্ম্ম অনুসারে, যৌন সম্পর্কে ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্রগণের উৎপত্তি হইয়াছে। এক বংশই ক্রমশঃ নানা জাতিতে বিভক্ত বা পরিণত হইয়াছে। পুস্তকে উদ্ধৃত প্রথম অংশের শাস্ত্রীয় প্রমাণ সকল পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে, অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়া গেল। অত্রির পুত্র চন্দ্র। চন্দ্রের পুত্র বুধ। সূর্যের পৌত্র, বৈবস্বত মনুর পুত্রী ইক্ষাকুর ভগিনী ইলার সহিত বুধের বিবাহ হয়। ইলার গর্ভে পুরুরবার জন্ম। পুরুরবার স্বর্গ বিদ্যাধরী অপ্সরা উৰ্বশীর গর্ভে আয়ু , তায়ু, সত্যায়ু, রয়, বিজয়, জয় নামক ৬টী পুত্র জন্মে। জয়ের পুত্র অমিত। বিজয়ের পুত্র ভীম, ভীমের পুত্র কাঞ্চন, কাঞ্চনের পুত্র হােত্ৰক। ক্ষত্রিয় হােত্ৰকের পুত্র জহ্নমুনি। ইনি গঙ্গাকে পান করিয়া পুনরায় নিজ জানুদেশ হইতে বহির্গত করিয়াছিলেন জন্য ভাগীরথী গঙ্গার, অপর নাম জাহ্নবী। জহ্নমুনির পুত্র সিন্ধুদ্বীপ ঋষি। সিন্ধুদ্বীপ ঋষির পুত্র ঋষি না হইয়া হইলেন ক্ষত্রিয় বলাকা। বলাকাশ্বের পুত্ৰ বল্লভ বল্লভের পুত্র মহারাজ কুশিক। কুশিকের পুত্র গাধি। গাধির জ্যেষ্ঠা কন্যা সত্যবতী ও কনিষ্ঠ পুত্র বিশ্বামিত্র। অত্রি।
চতুর্ণ বিভাগ। সত্যবতীর সহিত ভৃগুর প্রপৌত্র ঋচিকের সহিত বিবাহ হয়। পুত্র জমদগ্নি পিতৃবর্ণানুসারে ব্রাহ্মণই হন। জমদগ্নি প্রসেনজিৎ রাজকন্যা রেণুকাকে বিবাহ করেন। পুত্র পরশুরাম পিতৃবর্ণানু- সারে ব্রাহ্মণ হয়। এস্থলে পূৰ্ব্ববর্ণিত “অনুলােমা মাতৃবর্ণাঃ” বিধি অনুসারে দেবমীঢ়ের বৈশ্যকন্যা গর্ভজাত পজ্জতের ন্যায় মাতৃ- বর্ণ প্রাপ্তি না ঘটিয়া পিতৃবণত্ব প্রাপ্তি ঘটিল। দুই স্থানে দুই রূপ ঘটিল, দুই জাতি হইল। ব্রাহ্মণের কাছে স্মৃতি বা সংহিতার বিধি উলটাইয়া গেল। ক্ষত্রিয় ঔরসােৎপন্ন পর্জন্য ক্ষত্রিয় না হইয়া মাতৃবর্ণানুসারে বৈশ্য হইলেন কিন্তু ব্রাহ্মণ ঋচিকের ঔরসােৎপন্ন জমদগ্নি এবং জমদগ্নির ঔরসােৎপন্ন পরশুরাম মাতৃবর্ণানুসারে পর্জন্তের ন্যায় ক্ষত্রিয় হইলেন না, ব্রাহ্মণই হইলেন। পৰ্জ্জতের বেলায় ক্ষেত্রের প্রাধান্য স্বীকৃত হইয়াছে কিন্তু জমদগ্নি ও পরশু- রামের বেলায় ক্ষেত্রের প্রাধান্য লােপ হইয়া বীজের প্রাধান্য স্বীকৃত ও সমর্থিত হইল। (১) অধিক টীকা অনাবশ্যক। বিশ্বামিত্র রাজা মৃগয়া ব্যপদেশে বনে গমন করেন। সেখানে মহর্ষি বশিষ্ঠের অলৌকিক তপােবলের শক্তি দর্শন করিয়া বিমুগ্ধ হন, এবং রাজৈশ্বৰ্য্য চরণে দলিত করিয়া তপস্যায় নিরত হন। তাহার ফলে তিনি রাজর্ষি বিশ্বামিত্র হইয়া বহু বেদমন্ত্র রচনা করেন। ক্ষত্রিয় রাজপুত্র তপস্যা বলে ব্রাহ্মণত্ব ও ঋষিত্ব লাভ করেন। জন্ম দ্বারা নহে পরন্তু কৰ্ম্ম দ্বারাই ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হন। বিশ্বামিত্রের—মধুচ্ছ, যাজ্ঞবল্ক, মুদগল, সৈন্ধবায়ন, গাল, মুষল, সালঙ্কায়ন, আলায়ন, গার্গ, জাবালি, সুশ্রুত, কপিল, (১) বিস্তৃত বিবরণ মল্লিখিত “জাতিভেদ” গ্রন্থে শঙ্করবর্ণ অধ্যায়ে দ্রষ্টব্য।
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। মাগমর্ষি, নাচিক প্রভৃতি ৬৫ জন পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। ইহাৰ সকলেই ব্রাহ্মণ। রয়ের পুত্র এক। সত্যায়ুর পুত্র তঞ্জয়। তায়ুর পুত্র বহুমান। আয়ু। আয়ুর পঞ্চ পুত্র। রজি, নহব, বিতথ বা ক্ষত্র- বৃদ্ধ, রাভ, অনেনা। অনেনার পুত্র শুদ্ধ। শুদ্ধের পুত্র শুচি। শুচির পুত্র চিত্রকু। চিত্রকুর পুত্র শান্ত রাজা। রাতের পুত্র রভস। রভসের পুত্র গম্ভীর। তৎপুত্র অক্রিয়। অক্রিয়ের পুত্র ব্রহ্মবিৎ। রজি অপুত্রক। ক্ষত্রবৃদ্ধ বা বিতথ। ক্ষত্রবৃদ্ধের পুত্র সুহােত্ব, সুহােত্র, গয়, গর্গ, কপিল। সুহােত্রের তিন পুত্র, যথা :—কাশক বা কাশ্য, কুশ, গৃৎসমদ। গৃৎসমদের পুত্র শুনক । শুনকের পুত্র শৌনক হইতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই সরি বর্ণের সন্তান উদ্ভুত হইয়াছিল। অর্থাৎ শৌনক আপন পুত্রগণকে স্ব স্ব কৰ্ম্মভেদে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রবর্ণে বিভক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার সন্তানগণ গুণ কৰ্ম্মানুসারে কতক ব্রাহ্মণ, কতক ক্ষত্রিয়, কতক বৈশ্য ও কতক শুদ্র হইয়াছিলেন। এতৎ সম্বন্ধে বায়ুপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ, শ্রীমদ্ভাগবতে বিস্তৃত ভাবে আলােচনা করা হইয়াছে। তত্ত্বজিজ্ঞাসু পাঠক সেই সব গ্রন্থ পাঠ করিতে পারেন। সুহােত্র পুত্র কুশ। কুশের পুত্র প্রতি। প্রতির পুত্র চতুর্বর্ণ বিভাগ। সঞ্জয়ের পুত্র জয়, জয়ের পুত্র হর্ষবল। হর্ষবলের পুত্র সহদেব । সহদেবের পুত্র হীন। হীনের পুত্র জয়সেন। জয়সেনের পুত্র সঙ্কুতি। সঙ্কতির পুত্র জয়। কাশ্যের পুত্র কাশি। কাশির পুত্র রাষ্ট্র। ক্ষত্রিয় বাজা রাষ্ট্রের পুত্র দীর্ঘতমা ঋষি। ক্ষত্রিয়ের পুত্র গুণ কমাহাত্ম্যে ও তপস্যা বলে ব্রাহ্মণ হইলেন। জন্ম দ্বারা নহে। দীর্ঘতমার পুত্র আয়ুৰ্বেদ প্রবর্তক পন্বন্তরি। ধন্বন্তরির পুত্র কেতুমান। তৎপুত্র ভীমরথ। ভীমরথের পুল দিবােদাস। তৎপুত্র দ্যুমা। মনের পুত্র অলর্ক। তৎপুত্র সন্ততি। তৎপুত্র সুনাথ। তৎপুত্র নিকেতন। তৎপুত্ৰ ধৰ্ম্মকেতু। তৎপুত্র সত্যকেতু, সত্যকেতুর পুত্র দুষ্টকেতু। পৃষ্টকেতুর পুত্র সুকুমার। তৎপুত্ৰ বীতিহােত্র । বীতিহােরের পুত্র ভর্গ ব্রাহ্মণ। ভর্গ হইতে ভাৰ্থভূমি নামক ব্রাহ্মণ বংশ উৎপন্ন হয়। বিতথ বা ক্ষত্রবৃদ্ধের অন্য চাবি পুল সুহেব, গয়, গর্গ ও মহাশ্ম কপিলের বংশ পরিচয় অপ্রকাশ। পূৰ্বে উক্ত হইয়াছে, অত্রি পুত্র চন্দ্র। চন্দ্রের পুঙ্গ বুধ। বুধের পুত্র পুরুরবা। পুরুরবার পুত্র আয়ু। অরুর পুত্র নহুষ। নহুষ চন্দ্রবংশের সুবিখ্যাত রাজা। ইনি স্বীয় ক্ষমতা বলে ইন্দ্রত্ব লাভ করেন। ইহারই প্রেতাত্মার উদ্ধার কামনায়, ইহার পুত্র ফাতি হরিভক্ত কুশধ্বজ নামক ব্রাহ্মণ শিশু দারা নরমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করেন। এই নহুষ হইতে চন্দ্রবংশার পরবর্তী সমুদয় ক্ষত্রিয় বংশ ও নরপওিগণ উদ্ভূত হন। নহুষের ৬ পুত্র। যাতি, যতি, শৰ্যাতি, আয়তি, নিম্নতি ও কৃতি। যযাতি ব্যতীত অন্য ৫পুত্রের বংশ বিবরণ অপ্রকাশ।
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। যযাতি। যতি ব্রাহ্মণ শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর পাণিগ্রহণ করেন। এ বিবাহ প্রতিলােম ক্রমে হয়। কেন না স্ত্রী উচ্চবংশীয়, স্বামী নিম্ন ক্ষত্রিয় বংশীয়। উৎপন্ন পুত্র শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে ধরিতে গেলে নীচজাতীয় হইবার কথা। তাহা না হইয়া ক্ষত্রিয় পুত্র ক্ষত্রিয়ই হইয়াছিল। দেবযানীর সঙ্গে দাসীরূপে দৈত্য- পতি বৃষ পর্বের কন্যা শর্মিষ্ঠাও বাতির রাজঅন্তঃপুরে প্রবিষ্ট হয়। ফলে শর্মিষ্ঠার সহিত রাজার গন্ধর্ব বিবাহমতে পরিণয় ক্রিয়া গােপনে সম্পন্ন হয়। এবং তাহার ফলে শর্মিষ্ঠার গর্ভে রাজা যযাতির ক্রমে দ্র্য, অনু ও পুরু নামক তিনটি পরম রূপ-গুণবান্ পুত্র জন্মগ্রহণ করে। এবং দেবযানীর গর্ভেও যযাতির য ও তুৰ্বসু নামক ইন্দ্র ও উপেন্দ্র সদৃশ দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করে। দ্র্যর বংশাবলী, যথা ঃ-দ্রর পুত্র বড়। বর পুত্র সেতু। সেতুর পুত্র আরব্ধ। আরব্ধের পুত্র গান্ধার। গান্ধার পুত্ৰ ধৰ্ম্ম। ধৰ্ম্মের পুত্র ধৃত। ধৃতের পুত্ৰ দুৰ্ম্মম। দুৰ্ম্মমের পুত্র প্রচেতা। শেষ। অণুর বংশাবলী, যথা :—অণুর তিন পুত্র সতানর, চক্ষু ও পরেঙ্কু। চক্ষু ও পরেঙ্গু অপুত্রক। সভানরের পুত্র কালনর। কালনর পুত্র সৃঞ্জয়। সৃঞ্জয় পুত্র জনমেজয়। জনমেজয়ের পুত্র মহাশাল। মহাশালের পুত্র মহামনা। মহামনার দুই পুত্র উশীনর ও তিতিক্ষু। উশীনরের পুত্র মহাত্মা শিবি, বর, কৃমি, দক্ষ। শিবি ভিন্ন অপর তিন পুত্র অপুত্রক। শিবির পুত্র মদ্র, সুবীর, বৃষাদর্ভ ও কেকয়। শেষ। উশনর “ভ্রাতা তিতিক্ষুর বংশাবলী, যথা :- তিতিক্ষুর পুত্র কৰদ্ৰথ। তৎপুত্র হােম। হােম পুত্র সুতপা। সুতপার সন্তান চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। বলি। বলির সন্তান না হওয়ায় তদীয় মহিষীর ক্ষেত্রে বা গর্ভে দীর্ঘতমা ঋষি দ্বারা অঙ্গ, বঙ্গ, সুহ্ম, কলিঙ্গ, পুণ্ড ও ওড় এই ৬ পুত্র উৎপন্ন করিয়া বংশ ও রাজ্য রক্ষা করা হইল। পূৰ্বে এরূপ নিয়ম ছিল। ইহা দোষের মধ্যে গণনীয় ছিল না। অঙ্গ ব্যতীত ‘অন্য পঞ্চ ভ্রাতার বংশ অনুল্লেখ। অঙ্গের বংশাবলী, যথা ঃ-অঙ্গের পুত্র খলপান, তৎপুত্র দিবিরথ। দিবিরথ পুত্ৰ ধৰ্ম্মরথ। তৎপুত্র চিত্ররথ। চিত্ররথের ৩ পুত্র—চতুরঙ্গ, বিদূরথ ও পৃথু এবং কন্যা শান্তা। শান্তাকে মহারাজ চিত্ররথ শ্রীরামচন্দ্রের জনক সূৰ্য্যবংশীয় মহারাজ দশরথকে দান করেন। দশরথ এই পালিত কন্যা শান্তাকে হরিণতনয় ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সঙ্গে বিবাহ দেন। অসবর্ণ বিবাহ তৎকালে সমাজে প্রচলিত ছিল। চিত্ররথ পুত্র চতুরঙ্গ হইতে সুত বা সারর্থী বা সূত্রধর জাতীয় কর্ণের পালক পিতার উদ্ভব। আমরা নিম্নে তাহা প্রদর্শন করাই। চতুরঙ্গের পুত্র পৃথুলাক্ষ। পৃথুলাক্ষের পুত্র বৃহদ্রথ, বৃহৎ কৰ্ম্মা, বৃহৎভা। ২য় ও ৩য় ভ্রাত অপুত্রক। বৃহদ্রথের পুত্র বৃহন্মনা। তৎপুত্র জয়দ্রথ। তৎপুত্র বিজয়। বিজয়ের পুত্র ধৃতি। ধৃতির পুত্র ধৃতব্রত। তৎপুত্র সৎকৰ্ম্মা। সৎকর্মার পুত্র কর্ণের পালক পিতা সুত-অধিরথ । অধিরথের কুন্তী-গর্ভজাত- প্রাপ্ত ও পালিত পুত্ৰ কৰ্ণ। ক্ষত্রিয় নন্দন হইয়াও সুত অধিরথ কর্তৃক প্রতিপালিত হওয়ায় লােকে কর্ণকে সুতপুত্র বলিয়াই জানিত, সম্ভাষণ ও সম্বােধনাদি করিত। কর্ণের পুত্রবৃষসেন ও বৃষকেতু। শেষ। চিত্ররথের পুত্র ও চতুরঙ্গের ভ্রাতা বিদুরথ । বিদুরথ পুত্র শুর। শূরের পুত ১০৪ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ভজমান। ভজমানের পুত্র শিনি। শিনির পুত্র ভােজ। এই ভােজ হইতেই ভােজ বংশের উৎপত্তি। ভােজের পুত্র হৃদিক । হৃদিকের তিন পুত্র দেবমীঢ়, শতধনু, কৃতকৰ্ম্মা। ২য় ও ৩য় ভ্রাত অপুত্রক। ক্ষত্রিয় রাজা দেবমীঢ় হইতে বৃন্দাবনের নন্দগােপ বংশের উদ্ভব। দেবমীঢ় দুই বিবাহ করেন। একটি ক্ষত্রিয় কন্য একটি বৈশ্য কন্যা। ক্ষত্রিয় কন্যার গর্ভে শূর বা শূরসেন জন্মে ও বৈশ্য কন্যার গর্ভে পজ্জন্য জন্মগ্রহণ কবেন। পর্জন্য মাতৃ- বর্ণানুসারে বা মাতৃজাতি অনুসারে বৈশ্যকন্যা গর্ভজাত সন্তান ক্ষেত্ৰপ্ৰভাবে বৈশ্যই হন। এই বৈশ্য পর্জনের পুত্র শ্রীবৃন্দাবনের সফলজন্মা নন্দলােপ। এই বৈশ্য নন্দগােপেরই বংশধর বঙ্গদেশীয় গােপগণ। বৃন্দাবনের বা বঙ্গদেশে বৈশ্য গােপগণ বিরাট পুরুষের উরুদেশ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে বলিয়া প্রমাণিত হইল না। ঋষি অত্রির বংশেই ইহাদের উৎপত্তি। নন্দগােপ পুত্র গােলকবিহারী এ বংশ এইখানেই সমাধা করা হইয়াছে। কারণ পূৰ্ব্বে বলিয়াছি। প্রজা সাধারণ বৈশ্য শূদ্রের বংশাবলী শাস্ত্রকার গণ বিশেষ ভাবে লিখিয়া যান নাই। শূরের পুত্র বসুদেব। যেমন শূরসেন ও পর্ফন্যের পিতা একই ব্যক্তি দেবমীঢ় কিন্তু পুত্রদ্বয়—দুই জাতীয় ; কেহ ক্ষত্রিয় কেহ বৈশ্য। তেমনি বসুদেব ও নন্দ মহারাজার পিতামহ একই ব্যক্তি—সেই দেবমীঢ় কিন্তু দুই পৌত্র দুই জাতি। বসুদেব ক্ষত্রিয় ও নন্দ বৈশ্য। শুরের বসুদেব প্রমুখ ১০ পুত্র, যথা :--বসুদেব, দেবভাগ, দেবশ্র, আনক, সৃঞ্জয়,শ্যামক, কঙ্ক, শমীক, বৎসক, বৃক। বসুদেবের সঙ্গে কংসের খুল্লতাত, উগ্রসেন ভ্ৰাণ দেবকএর পৌরবী, রােহিণী, ভদ্রা, মদিরা, নােচনা, ইলা, দেবকী নাম্নী সাত কন্যার বিবাহ হয়। শ্রীকৃষ্ণ মাতা শ্ৰীকৃষ্ণ।
চতুৰণ বিভাগ। বসুদেব পত্নী দেবকী কংসের সহােদরা ভগিনী নহেন ; খুল্লতাত ভগিনী। বসুদেবের পৌরবীর গর্ভে সুভদ্রা নাম্নী কন্যা, রােহিণীর গর্ভে বলরাম বা বলদেব, গদ, সারণ ; ভদ্রার গর্ভে কেশি ; মদিরার গর্ভে নন, উপানন্দ ও শূর এবং দেবকীর গর্ভে ক্ষীরােদশায়ী চতুভুজ ভগবান বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। সুভদ্রার সঙ্গে পাণ্ডুনন্দন অর্জুনের বিবাহ হয়। শ্রীকৃষ্ণের পুত্র—প্রদ্যুম্ন, মদন, প্রভৃতি। প্রদ্যুম্নের পুত্র অনিরুদ্ধ। দৈত্য বলির পৌত্রী বান-কন্যা ঊষার সহিত অনিরুদ্ধের বিবাহ হয়। অনিরুদ্ধ ও উষার পুত্র বজনাভ। ইনিই জয়পুরের বা শ্ৰীবৃন্দাবন ধামের বর্তমান গােবিন্দ গােপীনাথ ও মদনমােহন বিগ্রহ স্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন। শ্রীকৃষ্ণ হইতেই ৫৬ কোটি যদুবংশের উৎপত্তি ও লয়। বসুদেবের পঞ্চ ভ্রাতার সঙ্গে কংসের সহােদরা পঞ্চ ভগিনীর বিবাহ হয়। কংস অসুর হইলে তাহার ভগিনীকে কি কখন মনুষ্য রাজা বিবাহ করিতেন না বিবাহ করিতে সাহণী হইতেন ? চ- বংশীয় উগ্রসেন রাজার দুর্দান্ত ও দুশ্চরিত্র পুত্র কংস নানাবিধ অসৎ গুণের জন্যই অসুর এই ঘৃণিত অখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছিল মাত্র। দেবভােগর সঙ্গে কংসের কংসানাম্নী ভগিনী, দেবশ্রবার সঙ্গে কংসবতী, সঞ্জয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রপালী, কঙ্কের সঙ্গে কঙ্কা, শ্যামকের সঙ্গে শূরভূর বিবাহ হয়। দেবভােগর পুত্র চিত্তকেতু, বৃহদ্বল ; দেবশ্রবার সুবীর এবং ইমুমান্ ; কঙ্কের বক, সত্যজিৎ ও পুরুজিৎ ; জঞ্জয়ের বৃষ, দুৰ্ম্মৰ্ষণ প্রভৃতি; শ্যামকের শূরভূ বা শূভূমির গর্ভে হরিকেশ ও হিরণ্যাক্ষ; বৎসকের ঔরসে মিশ্রকেশী অপ্সরার গর্ভে বৃকাদি, ১০৬ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ; বৃকের ঔরসে দুৰ্ব্বাক্ষীর গর্ভে তক্ষ ও পুষ্করমাল প্রভৃতি ; সমীকের ঔরসে সুদামনীর গর্ভে সুমিত্র, অর্জুনপাল প্রভৃতি এবং আনকের ঔরসে কর্ণিকার গর্তে ঋতধামা ও জয় উৎপন্ন হয়। বসুদেবের ৫ পাঁচ ভগিনী, যথা—পৃথ, শ্রুতদেবা, শ্রুতকীত্তি, এতবা ও রাজাধিদেবী। বসুদেব পিতা শূর আপনার সখা কুন্তি- রাজকে অপুত্রক দেখিয়া আপনার তনয়া পৃথাকে দান করিয়াছিলেন। কুন্তিরাজ পালিতা বলিয়া পৃথার নাম কুন্তিই হইয়া গিয়াছিল। এই পৃথা বা কুন্তির সঙ্গে পাণ্ডুর বিবাহ হয়। কুন্তির গর্ভে কর্ণ, যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন জন্মগ্রহণ করেন। শ্রতদেবাকে করূষবংশীয় বৃদ্ধশৰ্ম্মা বিবাহ করেন। তাঁহার গর্ভে দিতিসুত দন্তবক্র, ঋষি শাপগ্রস্ত হইয়া জন্মগ্রহণ করেন। কেকয় বংশীয় ধৃষ্টকেতু শ্রুতকীর্তিকে বিবাহ করেন। তঁাহার সন্তর্পন প্রভৃতি পাচটী পুত্র জন্মিয়াছিল। জয়সেন রাজাধিদেবীর পাণিগ্রহণ করিয়া তাহার গর্ভে বিল ও অনুবিল নামে দুই পুত্র উৎপাদন করেন। চেদিরাজ, দমঘােষ তবার পাণিগ্রহণ করেন। তাহার তনয় শিশুপাল। শেষ। বিদুরথ ও চতুরঙ্গের ভ্রাতা পৃথু অপুত্রক। যযাতির পুত্র পুরুর বংশাবলী, যথা :—পুরুর পুত্র জনমেজয়। তৎপুত্র প্রচিন্তান। তৎপুত্র প্রবীর। প্রবীর পুত্র মন। মনসুর পুত্র চারুপদ। চারুপদর পুত্র সু। তৎপুত্র বহুগব। তৎপুত্র সংযুতি। তৎপুত্র অহংযতি। অহংঘতির পুত্র রৌদ্রা। রৌদ্রা ঘৃতাচী অপ্সরার গর্ভে যথাক্রমে-কক্ষেয়ু, লিলেয়ু, ঋতেয়ু, কৃতেয়ু , জলেয়, সন্নতেয়ু, ধৰ্ম্মেয়ু, সত্যেয়ু, ব্রতেয়ু ও বলেয়ু এই ১০ পুত্র জন্ম দান করেন। ঋতেয়ু ভিন্ন আর সকলেই অপুত্রক।
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ১০৭ খাতেয়ুর বংশাবলী, যথা :-ঋতেয়ুর পুত্র রঙ্গিনাব বা বদুি- নার। রছিনাবের পুত্র সুমতি, ধ্রুব ও অপ্রতিরথ । নিঃসন্তান। ক্ষত্রিয় রাজা অপ্রতিরথের পুত্র-কন্ব ঋষি। কথের পুত্র ঋগ্বেদভাষ্য প্রণয়নকারী ব্রাহ্মণ মেধাতিথি। মেধাতিথি হইতে প্ৰস্কঃ দ্বিজগণ উৎপন্ন হন। সুমতির বংশাবলী, যথা—সুমতির পুত্র রেভি। রেভির পুত্র বিখ্যাত রাজা দুঘন্ত। বিশ্বামিত্র+মেনকার কন্যা ও কমুনির আশ্রম-পালিতা কন্যা শকুন্তলার সঙ্গে ইহার বিবাহ হয়। ইহার পুত্র ভরত। ভরত ভরদ্বাজ বা বিতথ নামক দত্তক পুত্র গ্রহণ করেন। ভরদ্বাজের পুত্র মনু। মনুর পাঁচ পুন্ন--যথা :- বৃহৎক্ষত্ৰ, জয়, মহাবীৰ্য্য, নর, গর্গ। গর্গ পুত্র শিনি। শিনির পুত্র গাৰ্গ ব্রাহ্মণ হন। নরের পুত্র সঙ্কুতি। সঙ্কতির পুত্র বিখ্যাত রন্তিদেব, গুরু। মহাবীর্যের পুত্র দুরিতক্ষয়। তৎপুত্র ত্রয়ারুণি, কবি, পুষ্করারুণি, ইহারা তিন জনই ব্রাহ্মণ হন। জয় অপুত্রক। বৃহৎক্ষত্রের বংশাবলী, যথা :—বৃহৎক্ষত্রের পুত্র হন্তী। ইনিই হস্তিনাপুর নির্মাণ করেন। হস্তীর তিন পুত্র, যথা :—অজমী, দ্বিমীঢ়, পুরুমীঢ়। পুরুমীঢ় নিঃসন্তান। দ্বিমীঢ়ের পুত্র-যবীনর। তৎপুত্র কৃতিমান। তৎপুত্র সত্য- ধৃতি। তৎপুত্র দৃঢ়নেমি। তৎপুত্র সুপার্শ্ব। তৎপুত্র সুমতি। তৎপুত্র সন্নতিমা। তৎপুত্র কৃতি। তৎপুত্ৰ উগ্ৰায়ুধ। তৎপুত্র ক্ষ্যে। তৎপুত্র মুবীর। তৎপুত্র রিপুঞ্জয়। রিপুঞ্জয়ের পুত্র বহুরখ। শেষ।
১০৮ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। • অজমীঢ় বংশাবলী, যথা :—ঋক্ষ, প্রিয় মেধাদি দ্বিজগণ এবং অন্য স্ত্রী নলিনীর গর্ভে নীল নামক সন্তান অজমীঢ়ের উৎপন্ন হন। অজমীঢ় হইতে বৃহদিষু নামক পুত্র জন্মে। তৎপুত্র বৃহদ্ধ। বৃহদ্ধর পুত্র বৃহৎকায়। তৎপুত্র জয়দ্রথ। তৎপুত্র বিষদ। বিষদের পুত্র স্নেজিৎ। স্টেনজিতের পুত্র রুচিরাশ্ব, দৃঢ়হনু, কাশ্য এবং বৎস। রুচিরা ব্যতীত অপর তিন ভাই অপুত্রক। রুচিরাখের পুত্র পার ও নীপ। পারের পুত্র পৃথু সেন ; পারের ভ্রাতা নীপ শুককন্যা কৃত্বীর গর্ভে ব্রহ্মদত্তকে উৎপাদন করেন। এই ব্ৰহ্মদত্ত যােগী। ব্রহ্মদত্ত স্বীয় ভাৰ্য্যা সরস্বতীর গর্ভে বিধক্সেন নামে এক সন্তান উৎপাদন করেন। বিশ্বক্সেন জৈগীযব্যের উপ- দেশে যােগশাস্ত্র প্রণয়ন করিয়াছিলেন। বিশ্বক্সেনের পুত্র উদক্সেন এবং উদক্সেনের পুত্র ভল্লাট। বৃহদিষুবংশ শেষ । (শ্রীমদ্ভাগবত ৯ম স্কন্ধ, ২১শ অধ্যায় দ্রষ্টব্য) অজমীঢ় পুত্র নীলের বংশাবলী :-নীলের পুত্র শান্তি ; শান্তির পুত্র সুশান্তি; সুশান্তির পুত্র পুরুজ ; পুরুজের পুত্র অর্ক অর্কের পুত্র ভৰ্মাশ্ব। ভৰ্ম্মাশ্বের পুত্র, যথা মুদগল, যবনীর, বৃহদ্বিশ্ব, কাম্পিল ও সঞ্জয়। ভৰ্ম্মাশ্ব একদা কহিয়াছিলেন, “আমার পাঁচটী পুত্র পঞ্চ বিষয় রক্ষণে সমর্থ, এই কারণে পরে তাহাদের পঞ্চাল সংজ্ঞা হয়। মুদগল হইতে ব্রাহ্মণ জাতির মৌগল্য গােত্র সভূত হয়। মুদগলের যমজ অপত্য হয়। পুত্রের নাম দিবােদাস ও কন্যার নাম অহল্যা। অহল্যার গৌতম হইতে শতান জন্ম- গ্রহণ করেন। শতানন্দের পুত্র সত্যধৃতি; তিনি ধনুর্বেদে সুপণ্ডিত ছিলেন। তাঁহার পুত্র শরদ্বান্। শরদ্বানের উৰ্বশীর দ্বারা যমজ সন্তান হয় -পুত্রের নাম কৃপ বা কৃপাচার্য্য, আর কন্যার নাম ;
চতুৰ্বন বিভাগ। কৃপী। শান্তনু রাজা এতৎ উভয়কে লালন পালন করেন। কৃপী দ্রোণাচার্যের পত্নী হইয়া অশ্বখমা জননী হইয়াছিলেন। দিবােদাসের বংশাবলী। দিবােদাসের পুত্র মিত্ৰায়ু; মিত্ৰায়ুর পুত্র চ্যবন ; চ্যবনের পুত্র সুদাস; সুদাসের পুত্র সহদেব ; সহ দেবের পুত্র সােমক। সােমকের একশত সন্তান জন্মে, তন্মধ্যে জন্তু জ্যেষ্ঠ এবং পৃষৎ কনিষ্ঠ। ঐ পৃষৎ হইতে দ্রুপদ রাজা জন্ম- গ্রহণ করেন। দ্রুপদ হইতে দ্রৌপদী এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতির জন্ম। ধৃষ্টদ্যুম্নের পুত্র ধৃষ্টকেতু। ইহারা ভৰ্মা বংশীয় পাঞ্চাল। ( ভাগবত, ৯ম স্কন্ধ, ২২শ অধ্যায়)। হস্তী পুত্র অজমীরের ঋক্ষ নামে যে পুত্র হইয়াছিল—সেই ঋক্ষের পুত্র সম্বরণ। এই সম্বরণের ঔরসে সুৰ্য্যতনয়া তপতীর গর্ভে কুরুক্ষেত্ৰপতি কুরু জন্মগ্রহণ করেন। কুরুর চারি পুত্র—পরীক্ষি, সুধনু, জহ ও নিষধ। প্রথম নিঃসন্তান ও চতুর্থ পুত্রের বংশ অনুল্লেখ। সুধনু ও জহ্নর বংশ সুদীর্ঘ ও বহু বিস্তৃত। জহর বংশাবলী যথা --জহর পুত্র সুরথ ; তৎপুত্র বিদূথ ; তৎপুত্র সার্বভৌম ; তৎপুত্র জয়সেন ; তৎপুত্র রাধিক; তৎপুত্র অযুতায়ু; অযুতায়ুর পুত্র অক্রোধন; তৎপুত্র দেবাতিথি। দেবা- তিথির পুত্র খ; ঋক্ষের পুত্র দিলীপ ; দিলীপের পুত্র প্রতীপ। প্রতীপের তিন পুত্রদেবাপি, শান্তনু ও বালীক। তন্মধ্যে দেবাপি জ্যেষ্ঠ, ইনি পিতৃরাজ্য পরিত্যাগ করিয়া সাধনার জন্য অরণ্য গমন করেন। শান্তনু রাজা হন। কোন নাম:2 হার রাজ্যে দ্বাদশ বৎসৱ ;
চতুর্বর্ণ বিভাগ। অনাবৃষ্টি হয়-তৎকারণ ব্রাহ্মণগণ, এই নির্দেশ করেন যে, অগ্রজ সত্বে রাজ্যভােগ করায় এই অনাবৃষ্টির কারণ। দেবাপি অনুজের প্রার্থনায় বন হইতে আসিয়া এক যজ্ঞানুষ্ঠান করেন এবং তিনি তাহার পৌরহিত্য করেন। বারিবর্ষণ হয়। শান্তনুর গঙ্গার গর্ভে দেবব্রত বা ভীষ্ম নামক পুত্র জন্মে এবং দাস কন্যা সত্যবর্তীর গর্ভে চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীৰ্য্য নামে দুই পুত্র জন্মে। জ্যেষ্ঠ চিত্রাঙ্গদ, চিত্রাঙ্গদ নামক জনৈক গন্ধৰ্ব্ব কর্তৃক যুদ্ধে নিহত হন। কনিষ্ঠ বিচিত্রবীৰ্য্য। ইনি কাশিরাজের দুই কন্যা অম্বিকা ও অলিকার পাণিগ্রহণ করেন। বিচিত্রবীৰ্য অত্যন্ত ভাৰ্যাসক্ত হইয়া ইন্দ্রিয় সেবা করায় যক্ষ্মা রােগে কাল কবলিত হন। তাঁহার সন্তান সন্ততি হয় নাই। সত্যবতী নন্দন পরাশর মুনির পুত্র বেদব্যাস মাতৃনিয়ােগে তদীয় ক্ষেত্রে—অম্বিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র এবং অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডু এই দুইটী পুত্ৰ উৎপন্ন করিয়া দেন। অম্বা ও অম্বালিকার দাসীর গর্ভে বেদব্যাসের ঔরসে শূদ্র কিন্তু পরম ধার্মিক ও পরম ভক্ত বিদুরের জন্ম। ধৃতরাষ্ট্র গান্ধার বা কান্দাহার রাজনন্দিনী গান্ধারীর গর্ভে দুৰ্য্যোধন, দুঃশাসন ও বিকর্ণ প্রমুখ শত পুত্র ও দুঃশলা নাম্নী এক কন্যা জন্ম দান করেন। দুর্যোধনের পুত্র লক্ষ্মণ কুরুযুদ্ধে অভিমন্যু হন্তে নিহত হয়। দুর্যোধনের বংশ শেষ। পাণ্ডুর দুই পত্নী। বসুদেব ভগিনী কুন্তিরাজার পালিতা কন্যা পৃথা বা কুন্তি ও মদ্ররাজনন্দিনী মাদ্রী। কুন্তীর তিন পুত্র—যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন। মাদ্রীর দুই পুত্র নকুল ও সহদেব। পঞ্চ পাণ্ডবের সঙ্গে দ্রৌপদীর বিবাহ হয়। দ্রৌপদীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের প্রতিবিন্ধ্য, ভীমের শ্রুতসেন, অর্জুনের শ্রুতকীর্তি, নকুলের শতানিক ও সহদেবের শতবৰ্মা চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ১১১ উৎপন্ন হন। ইহারা পাঁচ জনই অশ্বখমা হস্তে রাত্রিকালে পাণ্ডব শিবিরে নিদ্রিতাবস্থায় নিহত হন। অন্যান্য ভাৰ্য্যার গর্ভে যুধিষ্ঠিরের দেবক (পৌরবীর গর্ভে ); হিড়িম্বার গর্ভে ঘটোৎকচ ও কালীর গর্ভে সৰ্বগত নামক ভীমের অন্য দুই পুত্র জন্মে। পৰ্বতনন্দিনী বিজয়ার গর্ভে সহদেবের সুহােত্র নামে পুত্র জন্মে। নকুলের ঔরসে করেণুমতীর গর্ভে নরমিত্র ; অর্জুনের ঔরসে উলুপীর গর্ভে ইরাবান্, মণিপুর রাজনন্দিনীর গর্ভে ববাহন এবং বসুদেব নন্দিনী সুভদ্রার গর্ভে অভিমন্যু নামক তিন পুত্র জন্মে। অভিমনুর বিরাট রাজকন্যা উত্তরার গর্ভে পরীক্ষিৎ নামক পুত্র জন্মে। ইনি শমীক ঋষির গলদেশে মৃতসর্প দানের নিমিত্ত তৎপুত্র গােগর্ভ সমুদ্ভুত শৃঙ্গী কর্তৃক অভিশপ্ত হইয়া তক্ষক সৰ্প কর্তৃক কাল কবলিত হন। ইনি গঙ্গাতীরে প্রায়ােপবেশন করিয়া পরম ভাগবত শুকদেব গগাস্বামীর মুখে সপ্ত দিবস শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন। পরীক্ষিৎ পুত্র জন্মেজয় এবং শ্রুতসেন, ভীমসেন ও উগ্রসেন। জন্মেজয় ব্যতীত আর তিন জনই অপুত্রক। জন্মেজয় নাগষজ্ঞ বা সর্প ; জন্মেজয় বংশাবলী।জন্মেজয় পুত্র শনিক। তৎপুত্র সহস্রানিক ; তৎপুত্র অশ্বমেধজ; তৎপুত্র অসীম কৃষ্ণ ; তৎপুত্র নেমিচক্র; তৎপুত্ৰ উপ্ত; তৎপুত্র চিত্ররথ ; তৎপুত্র শুচিরথ ; তৎপুত্র বৃষ্টিমান ; তৎপুত্র সুষেণ ; তৎপুত্র মহীপতি ; তৎপুত্র সুনীথ ; তৎপুত্র নৃচক্ষু ; তৎপুত্র সুখীনল ; তৎপুত্র পরিপ্লব ; তৎপুত্র সুনয় ; তৎপুত্র মেধাবী ; তৎপুত্র নৃপঞ্জয় ; তৎপুল দূৰ্ব্ব ; তৎপুত্র তিমি ; তৎপুত্র বৃহদ্রথ ; তৎপুত্র সুদাস ; তৎপুত্র শনিক ; তৎপুত্র দুর্দমন; তৎপুত্র মহীনর ; তৎপুত্র দণ্ডপাণি ; তৎপুত্র ;
চতুর্বর্ণ বিভাগ। নিমি। নিমির পুত্র মেক। কুরুবংশের এক শাখা (কুরুপুত্র এই র বংশ) ও পাণ্ডব বংশ শেষ। কুরুর অন্য পুত্র সুধনুর বংশাবলী, যথা :-সুধ; তৎপুত্র সুহােত্র ; তৎপুত্র চ্যবন; তৎপুত্র কৃতি; তৎপুত্র বস্তু; বস্তুর ৫ পাঁচ পুত্র, যথা :-প্রত্য, চেদিপ, বৃহৎরথ, কুশা, মৎঙ্গ। বৃহৎ- রথ ব্যতীত অন্য চারি ভাই নিঃসন্তান। বৃহৎত্রথের দুই পুত্র। প্রথম বিশ্ববিখ্যাত জরাসন্ধ ও দ্বিতীয় কুশাগ্র। কুশাগ্রবংশ, যথা :-কুশাগ্রের পুত্র ঋষভ ; তৎপুত্র সত্যাহিত ; তৎপুত্র পুষ্পবান্; পুষ্পবানের পুত্র জহু।(শেষ)। জরাসন্ধ বংশাবলী। ইনি কংসের শশুর। ভীম কর্তৃক নিহত হন। জরাসন্ধের পুত্র সহদেব ; সহদেবের পুত্র মার্জারি বা সােমাপি; তৎপুত্র শ্রুতপ্রবা; তৎপুত্র যুতায়ু ; তৎপুত্র নিরমিত্র ; তৎপুত্র নক্ষত্র ; তৎপুত্র বৃহৎসেন; তৎপুত্ৰ কৰ্ম্মজিৎ; তৎপুত্র সুতঞ্জয় ; তৎপুত্র বিপ্র ; তৎপুত্র শুচি; তৎপুত্র গেম ; তৎপুত্র সুব্রত; তৎপুত্র ধর্মসূত্র ; তৎপুত্র সম ; তৎপুত্র দ্যুমৎসেন ; তৎপুত্র সুমতি; তৎপুত্র সুবল ; তৎপুত্র সুনীথ ; তৎপুত্র সত্যজিৎ ; তৎপুত্র বিশ্বজিৎ ; তৎপুত্র রিপুঞ্জয়। রিপুঞ্জয় হইতে প্রদ্যোত ; প্রদ্যোতের পুত্র পালক ; তৎপুত্র বিশাখ ; তৎপুত্র রাজক ; তৎপুত্র নন্দিবর্ধন ; নন্দিবর্ধন হইতে-শিশুনাগ; শিশুনাগ হইতে কাকবর্ণ; কাকবর্ণ হইতে ক্ষেমধৰ্ম্মা ; তৎপুত্ৰ ক্ষেত্ৰজ্ঞ । তৎপুত্র বিক্তিলার বা বিধিসার। বিম্বিসার পুত্র অজাতশত্রু। তাহা হইতে দৰ্ভক ; দৰ্ভক হইতে অজুয়; তাহা হইতে নন্দিবর্ধন ; ** চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। নন্দিবর্ধন হইতে মহানন্দি জন্মগ্রহণ করেন। শিশুনাগ বংশ এইখানেই শেষ। মহানলি হইতে (শূদ্ৰাগৰ্ভজাত) নন্দ বা নামান্তর মহাপদ্ম। নন্দের সুমাল্য প্রভৃতি ৮ পুত্র। চাণক্য কর্তৃক নন্দবংশধ্বংস। নন্দের পিতার দাসী শূদ্ৰামুরার গর্ভে রাজার (নন্দের পিতার ) ঔরসােৎপন্ন চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরােহণ। মুরা এই নাম হইতে উৎপন্ন বংশ বলিয়া এই বংশের নাম মৌৰ্য্যবংশ। চন্দ্রগুপ্ত-গ্রীকরাজ আলেকজাণ্ডারের সেনাপতি সেলুকাশের কন্যা হেলেনার পাণিগ্রহণ করেন। এই বিবাহে ইউরােপ ও এসিয়ার—পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মিলন হয়। চন্দ্রগুপ্তের পুত্র বিন্দুসার ; বিন্দুসারের পুত্র সম্রাট অশােক। যযাতি ও দেবযানীর পুত্র যদু ও তুৰ্ব্বসুর বংশালী। তুৰ্ব্বসুব পুত্র বহ্নি; বহ্নির পুত্র ভর্গ ; ভর্গের পুত্র ভানুমান ; ভানুমানের পুত্র ত্রিভানু ; তৎপুত্র করন্ধন ; করন্ধম পুত্র মরুত্ত। (শেষ)। যদুবংশাবলী।—যদুর চারি পুত্র যথা :—সহস্রজিৎ, নল, রিপু ও ক্রোষ্ট । ২য় ও ৩য় পুত্র অপুত্রক। সহজিৎ বংশ।--সহস্রজিৎ পুত্র শতজিৎ। শতজিতের তিন পুত্র মহাহয়, রেণুহয় ও হৈহয়। মহাহয় ও রেণুহয় অপুত্রক। হৈহয় বংশাবলী—যথা —হৈহয় পুত্ৰ ধৰ্ম্ম ; তৎপুত্র নেত্র ; তৎ পুত্র কুন্তি; তৎপুত্র সােহঞ্জি। তৎপুত্র মমহিদান ; তৎপুল ভদ্রসেন; তৎপুত্ৰ দুৰ্ম্মদ ও ধনক। দুৰ্ম্মদ অপুত্ৰক । ধনকের ৪ পুত্র, যথা-কৃতবীৰ্য্য, কৃতাগ্নি, কৃতবর্মা ও কৃতৌজা। প্রথম পুত্র কৃতবীৰ্য ব্যতীত আর গুলি অপুত্রক। কৃতবীর্যের পুত্র- ;
১১৪ চতুর্বর্ণ বিভাগ। সুবিখ্যাত কাবীৰ্যাৰ্জ্জুন। ইনি ক্ষত্রিয়কুলান্তকারী জমদগ্নিসুত পরশুরামের দারুন-কুঠারে নিহত হন। কার্তবীৰ্যাৰ্জ্জুনের পঞ্চ পুত্র, যথা :-জয়ধ্বজ, শূরসেন, বৃষভ, মধু, উজ্জিত। শূরসেন, বৃষভ, ও উজ্জিত অপুত্রক। জয়ধ্বজের পুত্র সুবিখ্যাত তালজঘ। তালরে বীতিহােত প্রমুখ শতপুত্র। বংশ শেষ। মধুরও বৃষ্ণিপ্রমুখ শত পুত্র। বৃষ্ণি হইতে বৃষ্টি বংশীয় ক্ষত্রিয়গণের উৎপত্তি। যদুর ৪র্থ পুত্র ক্রোষ্ট বংশাবলী। ক্রোধুর পুত্র বৃজিনবান্। তৎপুত্র স্বাহিত তনয় ; তৎপুত্র বিশদণ্ড ; তৎপুত্র চিত্ররথ ; তৎপুত্র শশবিন্দু; শশবিন্দুর—পৃথু- শ্ৰবা, পৃথুকীৰ্ত্তি, পুণ্যযশা নামক তিন পুত্র। ২য় ও ৩য় অপুত্রক। পৃথুশ্রবার পুত্র ধর্ম ; ধৰ্ম পুত্ৰ উশনা ; উশনার পুত্র রুচকঃ। রুচকের পঞ্চ পুত্র, যথা :—পুরুজিৎ, রুক্স, রুক্সে , পৃথু, জ্যামঘ। প্রথম চারি পুত্র অপুত্রক। জ্যামঘ পত্নী শৈব্যার গর্ভে বিদর্ভ নামক জ্যামঘের একমাত্র পুত্র জন্মে। বিদর্ভের তিন পুত্র-কুশ, ক্লথ ও রােমপাদ। কুশ অপুত্রক। রােমপাদের পুত্র বক্র। বর পুত্র কৃতি ; কৃতির পুত্র উশিক। উশিকের পুত্র চেদিরাজ। ক্রথের বংশাবলী, যথা :-“ক্রথের পুত্র কুন্তি; কুস্তির পুত্র বৃষ্টি ; তৎপুত্ৰ নিৰ্বতি; নিৰ্বতির পুত্র দশাহ ; তৎপুত্র ব্যোম ; তৎপুত্র জীমুত ; তৎপুত্র বিকৃতি ; তৎপুত্র ভীমরথ ; তৎপুত্র নবরথ ; তৎপুত্র দশরথ ; তৎপুত্র শকুনি ; তৎপুত্র করন্তি; তৎ পুত্র দেবরাত তৎপুত্র দেবক্ষত্র ; তৎপুত্র মধু; তৎপুত্র কুরুবশ ; তৎপুত্র অনু; তৎপুত্র পুরুহােত্র ; তৎপুত্র আয়ু ; তৎপুত্র সাত্বত।
চতুৰ্বণ বিভাগ।
সাত বংশাবলী। সাত্ত্বতের সাত পুত্র, যথা :--ভজমান,
ভজি, দিব্য, বৃষ্টি, দেবাবৃথ, অন্ধক, মহাভােজ। ভজি, দিব্য,
অপুত্রক।
ভজমানের ছয় পুত্র, যথা :—নিম্নোচি, কিঙ্কণ, দৃষ্টি, শতজিৎ,
সহস্ৰজিৎ ও অজুতাজিৎ। বংশ শেষ ।
দেবাবুথের পুত্র বক্র।
মহাভােজ হইতে ভােজগণের উৎপত্তি।
বৃষ্ণির দুই পুত্র, সুমিত্র ও যুধাজিৎ। সুমিত্র অপুত্রক।
যুধাজিতের দুই পুত্র-শিনি ও অনমিত্র। শিনি অপুত্রক।
অনমিত্রের তিন পুত্র—নিম্ন, শিনি, বৃষ্ণি। নিম্নের দুই পুত্র
প্রসেন, সত্রাজিৎ। শেষ।
শিনির পুত্র সত্যক। তৎপুত্র যুযুধান ; তৎপুত্র জয় ; তৎপুত্র
কুণি ; তৎপুত্র যুগন্ধর। শেষ।
বৃষ্ণিব পুত্র শফল্ক। শফল্ক হইতে গান্ধিনীর গর্ভে অক্রর এবং
আরও দ্বাদশটী বিখ্যাত সন্তান জন্মে। তাহাদের নাম আসল,
সারমেয়, মৃদুরি, মৃদুর, গিরি,
গিরি, ধৰ্ম্মবৃদ্ধ, সুকৰ্ম্মা, ক্ষত্রোপেক্ষ,
অরিমর্দন, শত্রু, গন্ধমাদ এবং প্রতিবাহু। অক্ররের এক ভগিনী
জন্মে—নাম সুচারা। অরের দেববান্ ও উপদেব নামে দুইটা
পুত্র জন্মে। শেষ।
অন্ধকের চারি পুত্র, যথা :-ভজন, শুচি, কম্বল বহিষ
এবং কুকুর। প্রথম তিনজন অপুত্রক।
কুকুরের বংশাবলী। কুকুরের পুত্র বহ্নি; বহ্নির পুত্র
বিলােমা ; বিলােমার পুত্র কপােতনােমা; তৎপুত্র অনু; তৎপুত্র
অন্ধক; তৎপুত্র দুন্দুভি; তৎপুত্র অবিষ্ট ; তৎপুত্র পুনর্ব
চতুর্বর্ণ বিভাগ। পুনৰ্ব্বসুর এক পুত্র আহক ও একমাত্র কন্যা আহুকী। আহুকের দুই পুত্র—দেবক এবং উগ্রসেন। দেবকের চারি পুত্র ও ৭ কন্যা। যথা:-দেববান, উপদেব, সুদেব, দেববন্ধন ও সাত কন্যা যথা :- পৌরৰী, বােহিণী, ভদ্রা, মদিরা, নােচনা, ইলা, দেবকী। এই সাত কন্যাই বসুদেবের সহিত বিবাহ হয়। উগ্রসেনের কংস, কঙ্ক, শঙ্কু, সুনাম, গ্ৰোধ, সুহ্, রাষ্ট্রপাল, ধৃষ্টি, তুষ্টিমান প্রভৃতি ৯ পুত্র এবং কংসা, কংসাবতী, কঙ্কা, শুভূ রাষ্ট্রপালিকা নাম্নী ৫ কন্যা বসুদেব অনুজ দেবভাগাদির সহিত যথাক্রমে বিবাহ হয়। বংশ শেষ। স্বায়ম্ভুব মনুর বংশ বিবরণ। স্বায়ম্ভুব মনু ও শতরূপা নাম্নী দ্বিখণ্ড বিভক্ত ব্ৰহ্মার (যৌন সম্বন্ধে উদ্ভূত ) দুই পুত্র ও তিন কন্যা। পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ রাজা, কন্যা আকুতি, দেবহুতি ও প্রসূতি। প্রজাপতি রুচির সঙ্গে আকুতির, কর্দমঋষির সঙ্গে দেবহুতির ও দক্ষপ্রজাপতির সঙ্গে প্রসূতির বিবাহ হয়। ইহাদের সন্তান সন্ততির বিবরণ পূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে। প্রিয়ব্রতের পুত্র আগ্নী। তৎপুত্র নাভি। নাভির পুত্র ঋষভ। ইন্দ্রদত্ত কন্যা জয়ন্তীর গর্ভে ঋষভদেব আত্ম সদৃশ একশত পুত্র উৎপন্ন করেন। ভরত তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠ। ভরত মহাযােগী ও অসাধারণ গুণশালী। তাহারই নামে এই বর্ষ ভারতবর্ষ” নামে অভিহিত। অবশিষ্ট ৯৯ জন সন্তানের মধ্যে কুশাবর্ত, ইলাব, ব্ৰহ্মাৰ্ত্ত, মলয়, কেতু, ভদ্রসেন, ইন্দ্রম্পৃক, বিদর্ভ এবং কীট এই নয়টি প্রধান। এই নয় জনই ভরতের অনুগত। এই সকল পুত্রের পরবর্তী কবি, হবি, অন্তরীক্ষ,প্রবৃদ্ধ, পিপ্পলায়ন, আবিহোত্র, দ্রবিড়, চমস এবং করভাজন—ইহারা ভাগবত ধর্ম প্রদর্শক ও মহাভাগবত।
চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ১১৭ ইহাদিগকে নবযােগে বলে। ঐ সকলের কনিষ্ঠ ৮১ জন পুত্রই পিত্ৰাজ্ঞা পালক, বিনয়ান্বিত, বেদজ্ঞ, যজ্ঞবান্ ও বিশুদ্ধ কৰ্ম্মশীল। তাহারা সকলেই (গুণ ও কর্মপ্রভাবে ক্ষত্রিয় সন্তান হইয়াও) ব্রাহ্মণ হইলেন। (শ্রীমদ্ভাগবত, ৫ম স্কন্ধ ৪র্থ অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। ভরতবংশাবলী—ভরতের পুত্র সুমতি। সুমতির পুত্র দেবজিৎ। তৎপুত্র দেবদ্যুম ; তৎপুত্র পরমেষ্ঠী ; তৎপুত্র প্রতীহ। প্রতীহের তিন পুত্র, যথা :—প্রতিহর্তা, প্রতিষ্ঠাতা, উদগাতা। ২য় ও ৩য় অপুত্রক। প্রতিহত্তার পুত্র অজ ও ভুমা। অজ নিঃসন্তান। ভূমার দুই পুত্র—উদগীথ ও প্রস্তাব। উদগীথ নিঃসন্তান। প্রস্তাবের পুত্র বিভু। বিভুর পুত্র পৃথুসেন ; পৃথুসেনের পুত্র নক্ত; নক্তের পুত্র গয়। ইনি রাজর্ষি ছিলেন। রাজর্ষি গয়ের তিন পুত্র-চিত্ররথ, সুগতি, অবিবােধন। ২য়, ৩য়, নিঃসন্তান। চিত্ররথ বংশ। চিত্ররথের পুত্র সম্রাট; সম্রাটের পুত্র মরীচি; মরীচির পুত্র বিন্দুমান। বিন্দুমানের পুত্র মধুনামা। মধুনামার পুত্র বীরত। বীরতের দুই পুত্র-মন্থ, ও মন্থ। প্রমহু, নিঃসন্তান। মন্থর পুত্র ভৌবন। ভৌবনের পুত্র ত্বষ্টার পুত্র বিরজ। বিরজের শতজিৎ প্রমুখ শত পুত্র। (প্রিয়- ব্ৰত বা ভরত বংশ শেষ )। (ভাগবত, ৫ম স্কন্ধ, ১৫শ অধ্যায়)। উত্তানপাদ রাজার পুত্র মহাত্মা ধ্রুব। উত্তানপাদের দুই মহিষী—সুনীতি ও সুরুচি। সুনীতির উপদেশে পঞ্চম বর্ষীয় শিশু ধ্রুব মধুবনে পদ্মপলাশলােচন শ্রীহরির আরাধনায় নিযুক্ত হইয়া মনােরথ সিদ্ধ হন। সুরুচির পুত্র উত্তম-বাল্যকালেই অরণ্য মধ্যে এক বলবান্ যক্ষ কর্তৃক নিহত হন। মাতা সুরুচিও পুত্রের অন্বেষণে বহির্গত হইয়া পুত্রের দশাই প্রাপ্ত হন।
১১৮ চতুৰ্বর্ণ বিভাগ। ধ্রুব বংশাবলী।ধ্রুব শিশুমার তনয়া ভ্ৰমিকে বিবাহ করেন। তঁাহার গর্ভে ধ্রুবের কল্প ও বৎসর নামে দুই পুত্র জন্মে। কল্পের অন্য নাম (বােধ হয়) উৎকল। ভূমি ব্যতীত বায়ু পুত্রী ইলাও ধ্রুবের আর এক মহিষী। ইহার গর্ভে এক পুত্র ও এক কন্যা জন্মে। উৎকল ভগবৎ প্রেমে দিব্যোম্মাদ অবস্থায় থাকায়, দ্বিতীয় পুত্র বৎসর রাজা হইলেন। বৎসর সুবীথী নাম্নী রাজমহিষীর গর্ভে পুষ্পণ, তিগ্মকেতু, ইষ, উজ্জ, বসু, ও জয় নামক পুজ উৎপন্ন করেন। পুষ্পর্ণ ভিন্ন আর সকলেই নিঃসন্তান। পুষ্পৰ্ণ প্রভার গর্ভে প্রাতঃ, মধ্যদিন ও সায়ং নামক পুত্র এবং দোষা নাম্নী পত্নীর গর্ভে প্রদোষ, নিশীথ ও ব্যুষ্ট প্রমুখ ৬ পুল উৎপন্ন করেন। উহাদের মধ্যে ব্যুষ্ট ব্যতীত আর সকলেই নিঃসন্তান। ব্যুষ্টের পুত্ৰ সৰ্বতেজা; সৰ্ব্বতেজার পুত্র মনু। মনুর এগারটী পুত্র জন্মে—নাম যথা :—উন্মুক, অগ্নিষ্টোম, অতিরাত্র, প্রদ্যুম, শিবি, পুরু, কৃৎ, ঋত, দ্যুমা, সত্যবান, এক উন্মুক ব্যতীত আর সকলেই নিঃসন্তান। উম্মুকের ৬ ছয় পুত্র, যথা ঃ --অঙ্গ, সুমনা, স্বাতি, ক্রতু, অঙ্গিরা, গয়। অঙ্গ ব্যতীত আর সকলেই নিঃসন্তান। অঙ্গের পুত্র বেন। বেনের পুত্র পৃথু। ইনি শত অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করিয়া ইন্দ্রত্ব প্রাপ্ত হন। পৃথুরাজা রাজমহিষী অর্চির গর্ভে যথাক্রমে বিজিতা, হাশ, ধূমকেশা, বুক ও দ্রবিণ নামে ৫ পাঁচ পুত্র উৎপাদন করেন। বিজিতা শিখণ্ডিনী নাম্নী ভাৰ্য্যার গর্ভে চতুর্বর্ণ বিভাগ। পাবক, পবমান ও শুচি নামক তিন পুত্র জন্ম দান করেন। এবং অন্য ভাৰ্যা নভস্বতীর গর্ভে হবির্ধান নামে এক পুত্র উৎপন্ন করেন। হবির্ধান হবির্ধানী নায়ী পত্নীর গর্ভে ছয়টী পুত্র জন্মদান করেন। তাহাদের নাম-বহিষদ, গয়, শুক্ল, কৃষ্ণ, সত্য ও জিতব্রত। ঐ ছয় পুত্রের মধ্যে বহিষদ অসাধারণ ব্যক্তি। তাঁহার অন্য নাম প্রাচীনবহি। প্রাচীনবহি সমুদ্রকন্যা শতদ্রুতিকে বিবাহ করেন। শতদ্রুতির গর্ভে প্রাচীন বহির দশটী পুত্র জন্মে। পুত্রগণের সকলেরই নাম ‘প্রচেতা এবং সকলেই ব্রতধারী ও ধর্মপারদর্শী। এই দশ প্রচেতাই ভগবান্ বিষ্ণুর আদেশে কও মুনি ও প্রশ্নোচা নাম্নী অপ্সরা সংযােগ জাতা মারিষা নাম্নী পরন লাবণ্যবতী কন্যাকে (পঞ্চ পাণ্ডবের দ্রৌপদী বিবাহ করার ব্যায়) বিবাহ করেন। ঐ কন্যার গর্ভে দক্ষ উৎপন্ন হন। এই দক্ষ, ব্ৰহ্মার পুত্র ; কিন্তু ইনি পূর্বে একবার মহাদেবকে অবজ্ঞা করিয়াছিলেন, সেই অপরাধে এবার ক্ষত্রিয় বংশে তাহার জন্ম হইল। - সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.