Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Ramtanu Lahiri
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
.
fe sta24
8
,
ল ,
।
'vM
৯ । -ঠen in
রামতনু লাহিড়ী
৭ । re***
No text on this page.
তিন-আনা সংস্করণ “কল্পতরু” গ্রন্থাবলী
নং
২৪
মভলু লাহিড়ী
“য যদচিরতি শ্রেষ্ঠত্তদেবেতনরা জন ।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লােকস্তবত্ততে।”
"Lives of great men all remind us
We can make our lives sublime.”
শ্ৰীশরচ্চন্দ ঘােষ-গুণী
ভট্টাচার্য্য এণ্ড সম্
ময়মনসিংহ, কলিকাতা ও ঢাকা
১২৮
মূল্য তিন আনা
কলিকাতা
৬৫নং কলেজ স্ট্রীট, ভট্টাচাৰ্য এণ্ড সন্এর পুস্তকালয় হইতে
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক প্রকাশিত
১০৮ নং নারিকেলডাঙ্গা মেন রােড, স্বর্ণপ্রেসে
করুণাময় আচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত।
Copyright held by the publisher.
No text on this page.
ارمادا الى ما وراء ام لالان دادن بر
রামতনু লাহিঙ
এ জগতে মানুষের জীবন খুব অল্প। কমই হউক, আর বেশীই হউক,
এমন কেহ নাই যিনি রােগ, শােক প্রভৃতি বিপদাপদ হইতে নিস্তার
পাইয়াছেন। কিন্তু ইহাতে নিরাশ হইবার কিছু কারণ নাই, কারণ
কবি বলিয়াছেন :—
বলাে না কাতরস্বরে
বৃথা জন্ম এ সংসারে
এ জীবন নিশার স্বপন।
দারা পুত্র পরিবার
তুমি কার কে তােমার
বলে জীব করাে না ক্রন্দন।
মানব জনম সার
এমন পাবে না আর
বাহ্যদৃশ্যে ভুলােনারে মন ।
কর কম্ম হবে জয়
জীবন নিত্য নয়
*
প
সংসারে সংসারী সাজ
কর নিত্য নিজ কাজ
ভবের উন্নতি যাতে হয়।
२ রামতনু লাহিড়ী এ জগতে কি ধনী, কি দরিদ্র, কি বৃদ্ধ, কি যুবা সকলেরই নির্দিষ্ট কৰ্তব্য কৰ্ম্ম আছে এবং তাহা করিতে পারিলে সকলেই সংসার- সংগ্রামে জয়ী হইতে পারে। একমাত্র কর্মের উপরই সমস্ত নির্ভর করে ; হাজার শক্ত হইলেও যাহা কর্তব্য, যাহা সৎকৰ্ম্ম তাহা যদি নির্ভয়ে করা যায়, তাহা হইলে অপর কোন গুণ না থাকিলেও মানুষ অমর হইতে পারে। বড় বড় ললাকের জীবনী এই জন্যই লােকে আলােচনা করিয়া থাকে। তাহারা তাহাদের পিছনে যে মধুর স্মৃতি রাখিয়া যান, মানুষে তাহা স্মরণ করিয়া তাহাদের জন্য কঁদিয়া থাকে। শুধু যে তাহাদের নাম লােকে স্মরণ করে তাহা নহে; তাহাদের জীবনের ইতিহাস পড়িয়া আরও দশজনে ধৰ্ম্ম এবং নীতি শিক্ষা পায়। সাধুলােকের জীবনী আলােচনা করিবার ইহাও একটি প্রধান কারণ। কি পুরাকাল, কি বর্তমান কাল সকল সময়ের সকল জাতির ইতিহাস আলােচনা করিলে এইরূপ দৃষ্টান্ত অনেক পাওয়া যায়। কত হাজার হাজার, শত শত বৎসর আগে রামচন্দ্র, বুদ্ধদেব প্রভৃতি মহাপুরুষগণ জন্মিয়াছিলেন। তাহারা যে দেশে জন্মিয়াছিলেন, সেই অযযাধ্যা, সেই কপিলাবস্তুর চিহ্নমাত্র ও বর্তমান নাই। কিন্তু তাহাদের নাম আজিও সকলে বিশেষ ভক্তির সহিত উল্লেখ করিয়া থাকে। রামচন্দ্রের অত্যক্তৃত পিতৃভক্তি, ভ্রাতৃভক্তি, প্রজাম্নেহ প্রভৃতি সকলে আদর্শ বলিয়া ধরিয়া থাকে। বুদ্ধদেবের “অহিংসা পরমােধৰ্মঃ” এই উপদেশের প্রভাব আজিও বর্তমান আছে। তঁাহারা সাধারণ হিসাবে মৃত হইলেও, তাহাদের অলৌকিক কৰ্ম্মবলে আজিও তাঁহারা অমর হইয়া আছেন, এবং তাহাদের জীবনের প্রভাব আজিও ধর্ম এবং নীতি শিক্ষা দিতেছে। আজ যে মহাপুরুষের জীবনী আলােচনা করিতেছি, তাহার দৈনিক কাৰ্য্যাবলীর ভিতরেও এইরূপ প্রভাব বিশেষ ভাবে দেখিতে পাওয়া যায়। অনেক অর্থ রােজগার করিয়া অকাতরে ধন দান করিবার, সুযােগ তঁাহার কখনও হয় নাই, সুতরাং তিনি দাতা বলিয়া বিখ্যাত রামতনু লাহিড়ী নাই। নহেন। তিনি বড় বড় উপাধিতে ভূষিত হয়েন নাই সুতরাং সে হিসাবে তাঁহার খ্যাতি নাই। দেশসংস্কারক, সমাজসংস্কারক, সুলেখক বা সুবক্তা প্রভৃতি নাম পাইবার জন্য কেহ কখন তাঁহাকে চেষ্টা করিতে দেখে তবে কিসের জন্য তাঁহার খ্যাতি এবং কি জন্যই বা তাহার জীবনী পাঠ করা আবশ্যক এই প্রশ্ন স্বভাবতই মনে হইতে পারে। তাহার জীবনী পড়িলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, সামান্য অবস্থায় থাকিলেও লােকে অনায়াসে কর্মবীর হইতে পারে। সত্যবাদিতা, পবােপকারিতা প্রভৃতি গুটিকতক সাধারণ গুণ আছে যাহা সকলেরই পালন করা উচিত এবং একমাত্র তাহার জোরেই মানুষ সকলের শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র হইতে পারে। এই সকল গুণের জন্য তাহার জীবন শুধু বে আলােচনা করিবার যােগ তাহা নহে, তাহা সকলের অনুকরণ করা উচিত। স্বর্গীয় রামতনু লাহিড়ী মহাশয়ের একটি বিশেষ গুণ এই ছিল যে, তিনি অর্থ ভালবাসিতেন না। সাধারণ গৃহস্থের খাওয়া পরার মতন টাকা উপায় হইলেই তিনি তাহা বথেষ্ট মনে করিতেন। তাঁহার সময়ে ইংরাজী শিক্ষা সবে মাত্র আরম্ভ হইয়াছে, কাজেই সামান্য রকম ইংরাজী শিখিতে পারিলে লােকে অনায়াসে বড় চাকরী পাইত। সেকালের এবং একালের অবস্থার মধ্যে একটি পার্থক্য এইখানে বেশ দেখিতে পাওয়া যায়। এখনকার চাকরীর বাজার কিরূপ তাহা অনেকেই অল্পই হউক বা অধিকই হউক, জানেন। এখন সকলকেই চাকরীর উমেদারী করিতে হয় ; বড় চাকরী বা ঘােট চাকরী, বড় লোেক বা গরীবলােক বলিয়া কোন তফাৎ নাই। তখনকার কালে ইহার ঠিক বিপরীত অবস্থা ছিল, তখন চাকরীই লােকের উমেদারী করিত। রামতনু লাহিড়ী মহাশয়ও ইচ্ছা করিলে এরূপ সুযােগে অনায়াসে বড় চাকরী করিয়া, বিলক্ষণ পয়সা রােজগার করিতে পারিতেন। কিন্তু তিনি সেরূপ t রামতনু লাহিড়ী প্রকৃতির লােক ছিলেন না। বিলাসিতা বা জাঁকজমক তিনি মােটেই ভাল বাসিতেন না। গবর্ণমেন্টের অধীনে বা অপর কোন জায়গায় বড় চাকরী করিয়া পয়সা রােজগার দ্বারা দশজনের কাছে সুনান কেনা তঁাহার ভাল লাগিল না। অনেকের কাছে হয়ত তাহার এই কাজ অদ্ভুত রকম লাগিতেছে। কিন্তু তিনি ভিতরে ভিতরে একজন বিশেষ দেশহিতৈষী লােক ছিলেন। তিনি দেখিলেন দেশে ইংরাজী শিক্ষার সবেমাত্র নূতন আমদানী হইয়াছে। দেশে প্রচলিত শিক্ষা- পদ্ধতিও বিশেষ ভাল নহে। শিক্ষকেরও বিশেষ অভাব। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে সুশিক্ষা দ্বারা বালকদিগকে উন্নত করিতে পারিলে দেশের যেরূপ উপকার হইবে, অপর কোনও কার্যের দ্বারা সেরূপ সম্ভব নহে। দেশের প্রকৃত উপকার করিতে হইলে ছােট ছােট শিশুগণকে সৎশিক্ষা দেওয়া বিশেস দরকার, কারণ তাহাদের উপরই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। মহাপুরুষদিগের জীবনের সদুপদেশ ও দৃষ্টান্ত দ্বারা সুশিক্ষক ছাত্রগণের মনে যেরূপ উচ্চ আশা ও আকাঙ্গার সৃষ্টি করিতে পারেন এবং ধর্ম ও নীতি শিক্ষা দিতে পারেন, তাহা অপর কোনও উপায়ে সম্ভব নহে। এই লাহিড়ীবংশের আলোচনা করিলে আমরা দেখিতে পাই সদাশয়তা, সত্যপ্রিয়তা, পরােপকারিতা প্রভৃতি গুণগুলি তাহাদের বংশের সকলেরই ছিল। তাদের বংশ বহুবিস্তৃত ছিল। কম্মোপলক্ষে অনেকেই নানাস্থানে ভ্রমণ করিয়াছেন। কিন্তু যিনি যেখানে থাকুন, সদ গুণ দ্বারা সকলেই লােকের শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র হইয়াছিলেন। এইরূপ বংশে জন্মিয়া যে লাহিড়ী মহাশয় লােকপূজ্য হইবেন ইতে আশ্চর্যের বিষয় কিছুই নাই। ১৮১৩ খৃষ্টাব্দের চৈত্র মাসে কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী বারুইহুদ। নামক গ্রামে মাতুলালয়ে রামতনু বাবুর জন্ম হয়। যে সময় লাহিড়া রামতনু লাহিড়ী নহাশয় জন্মগ্রহণ করেন, সে সময় তাঁহার পিতা রামকৃষ্ণ দেশবিখ্যাত লালাবাবুদের জমিদারীতে কাৰ্য্য করিয়া যৎসামান্য রােজগার করিতেন। তাহারে যে কিছু পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি ছিল তাহা হইতেও কিছু কিছু আয় হইত। যদিও ইহাতে সংসারের সকল অভাব বেশ ভাল ভাবে পূরণ হইত না, তাহা হইলেও তিনি বড় ধার্মিক লােক ছিলেন এবং সেই জন্য কখনও অন্যায়ভাবে এক পয়সাও রােজগার করিতে চেষ্টা করিতেন না। জমিদারীতে কাজ করিলে প্রায়ই অনেকে গরীব প্রজাদের নিকট হইতে দোল, দুর্গোৎসব প্রভৃতি বারমাসে তের পার্বণের বকশিস্ পাইয়া থাকেন। কিন্তু রামকৃষ্ণ এইরূপে পয়সা লওয়া অন্যায় কাৰ্য মনে করিতেন। শুধু যে তিনি নিজে লইতেন না তাহা নহে, কাহাকেও এইরূপ কাৰ্য্য করিতে দেখিলে তিনি তৎক্ষণাৎ বাধা দিতে চেষ্টা করিতেন । তাহার এই সদয় ব্যবহারে প্রজারা এরূপ বশীভূত হইয়াছিল যে, কখন কোনও কারণে দরকার হইলে তাহারা প্রাণের সহিত যত্নে তাহার কাজ করিতে কুণ্ঠিত হইত না। সংসারে নানারূপ কষ্ট থাকিলেও তিনি নিজের ধৰ্মকৰ্ম্ম লইয়াই বাস্ত থাকিতেন। সকালে উঠিয় প্রথমে স্নান করিয়া পরে পূজা করিতে বসিতেন। পূজা শেষ হইলে প্রথমে কোন গরীব, দুঃখী বা অতিথির সেবা করিয়া তবে তিনি নিজ হাতে রাঁধিয়া খাইতেন। আহারের পরও ধৰ্ম্মগ্রন্থ পাঠ বা শাস্ত্রালােচনা করিয়া সময় কাটাইতেন। এই সকল দেখিলে স্পষ্টই বুঝিতে পারা যায় যে তিনি কিরূপ ধর্মভীরু লােক ছিলেন। রামতনুবাবুর মাতার নাম জগদ্ধাত্রী দেবী। কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত রাজবাটীর দেওয়ান রাধাকান্ত রায় তাঁহার পিতা। রায় বংশের অনেকেই অনেক পূৰ্ব্ব হইতে রাজসরকারে কাজ করিতেছিলেন। সুতর। তাহারা সকলেই ধনী বলিয়া বিখ্যাত ; কিন্তু বড় লােক হইলেও তঁাহারা বিশেষ ধার্মিক ছিলেন।
রামতনু লাহিড়ী জগদ্ধাত্রী দেবী বড়লােকের কন্যা, শৈশব হইতে চাকর, চাকরাণীর সেবা পাইয়াছেন কিন্তু তিনি শ্বশুরালয়ে গরীবানার মধ্যে থাকিতেই ভালবাসিতেন। সে সময়ে কৌলিন্য মৰ্য্যাদা খুব প্রচলিত ছিল । এখনও আছে বটে কিন্তু তত আর নাই। কৌলিন্য প্রথা অনুসারে জগদ্ধাত্রী দেবী ইচ্ছা করিলে অনায়াসে বাপের বাটীর পরম সুখের মধ্যে থাকিতে পারিতেন। কিন্তু পাছে নিজ স্বামীর আত্মসম্মান আঘাত পায় এই জন্য তিনি স্বামীগৃহে থাকিতে ভাল বাসিতেন। তিনি নামে যেমন জগদ্ধাত্রী কাজেও সেইরূপ ছিলেন। বড় লােকের মেয়ে বলিয়া শাশুড়ী যদি কখন কোন কাজ করিতে বারণ করিতেন তাহা হইলে তিনি সে কথা শুনিতেন না। গৃহস্থালীর সামান্য সামান্য কাজগুলি ও এমন সুন্দরভাবে করিতেন যে, অপর কেহ দেখিলে মনে করিত তিনি গরীবের মেয়ে, ছেলেবেলা হইতে করিয়া আসিতেছেন কাজেই তাহার অভ্যাস হইয়া গিয়াছে। সংসারের সকল কাজকৰ্ম্ম করিয়া নিজ পুত্রকন্যা প্রভৃতি লালনপালন করিতে হইলেও কেহ কখন তাঁহাকে বিষয় দেখিতে পাইত না। বরং কেহ যদি তাঁহাকে কাজ করিতে দেখিয়া দুঃখ করিত তাহা হইলে তিনি বিরক্ত হইতেন। একদিন তিনি ধান ভানিতেছেন এমন সময় তাঁহার পিতৃগৃহের একজন চাকরাণী তাঁহাকে দেখিতে আসিল। তিনি তাহাকে দেখিয়া কাজ হইতে বিরত না হইয়া তাহার সহিত কথা কহিতে কহিতে ধান ভানিতে লাগিলেন। দাসী তাহাতে দুঃখ প্রকাশ করিলে তিনি গসিতে হাসিতে বলিলেন “আমার কোন কষ্টই নাই, মাকে বলিও আমি বেশ সুখে আছি।” এইরূপ রূপেগুণে সাক্ষাৎ লক্ষীরূপা এবং স্বামীগৌরবে গৌরবিনী মাতা এবং রামকৃষ্ণের ন্যায় পরম ধার্মিক পিতার নিকট যাহার শৈশবশিক্ষা আরম্ভ হইয়াছে, সেই রামতনু যে পরে কর্তব্য এবং ধৰ্ম্মনীতির আদর্শরূপে দশজনের বিশেষ পরিচিত হইবেন ইহাতে বিচিত্রতা কিছুই নাই।
রামতনু লাহিড়ী '৭ রামকৃষ্ণের আটটী পুত্র এবং দুইটী কন্যা জন্মে। রামতনু বাবু তাহার, পঞ্চম সন্তান। তাহার অগ্রে দুই ভ্রাতা ও দুই সহােদরা জন্মেন। তাহাদের মধ্যে কেবল মাত্র বেশবচন্দ্র নামে একটি ভ্রাতা এবং ভবসুন্দরী নামে একটি ভগিনী ব্যতীত অপর সকলে অল্পবয়সে মারা যান। কেশবচন্দ্র পরে বিশেষ যশস্বী পুরুষ হইয়া উঠেন। ইংরাজী এবং পারশী এই দুই ভাষা তিনি বেশ ভাল জানিতেন। প্রথমে কলিকাতায় কিছুদিন কেরাণী- গিরি করিবার পর, তিনি যশােহরে সেরেস্তাদারি কাজের ভার পাইয়া সেইখানে বাস করেন। পিতা রামকৃষ্ণের স্থায় তিনিও বিশেষ ধর্মভীরু লােক ছিলেন। যাহা বাহা কিছু উপার্জন করিতেন তাহাই পিতামাতা এবং ভগিনীদের পালনে ব্যয় করিয়া অবশিষ্ট অর্থ দীন দুঃখীদের দান করিতে কখন কুষ্ঠিত হইতেন না। তিনি এরূপ পিতৃভক্ত ছিলেন যে, তাহার চিঠি পাইলেই আগে তাহা মাথার উপর রাখিয়া পরে তাহা পড়িতেন। এরূপ শুনা যায় যে তিনি দেবপূজার তাকুণ্ডে জোর করিয়া মাতার পা রাখিয়া তাহা পূজা করিয়াছিলেন। যে মহাপুরুষ দেবতা অপেক্ষা মাতাকে অধিক ভক্তির চক্ষে দেখিয়া পূজা করিয়াছেন, তাঁহার দৃষ্টান্ত ও সহবাস জনিত পুণ্যের প্রভাব যে কনিষ্ঠ রামতনুর জীবনেও সুস্পষ্ট রেখাপাত করিয়াছিল তাহা তাঁহার জীবনে বেশ দেখা যায়। যে মহাপুরুষ ভূমের্গরীয়সী মাতা এই সাধুবাক্যের অনুসরণ করিয়া মাতৃপূজা করিতে পারিয়াছেন তিনিই ধন্য । পূৰ্বে বলিয়াছি রামতনু বাবু পিতার পঞ্চম সন্তান। তাহার আর তিন সহােদর জন্মেন—তাহাদের নাম রাধাবিলাস, শ্রীপ্রসাদ এবং কালীচরণ। ইহাদের মধ্যে কালীচরণ মেডিকেল কলেজ হইতে বিশেষ কৃতিত্বের সহিত পরীক্ষাত্তীর্ণ হইয়া কৃষ্ণনগরে ডাক্তারী করিতে আরম্ভ করেন। ইনিই পরে কৃষ্ণনগরে সর্বপ্রধান চিকিৎসক হইয়া উঠেন। দীনদরিদ্রের কাতরতা দর্শনে তাঁহার হৃদয় দয়ায় ভরিয়া উঠিত।
রামতনু লাহিড়ী
খে।
সময়ে তিনি কোন একটি দরিদ্র রােগীকে একখানি ব্যবস্থাপত্র দেন।
তাহার ঔষধালয়ে ঐ ব্যক্তি তাঁহার স্বাক্ষরিত কাগজ লইয়া গেলে তাতে
দেখা গেল ঔষধের নীচে “এক গাড়ি খর” লেখা আছে। ইহার মধ্যে
যে কি রহস্য আছে তাহা বুঝিতে না পারিয়া সকলেই হাসিতে লাগিলেন।
পরে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন “আমি উহার বাটা গিয়া
দেখিলাম উহার ঘরের চাল খড়শূন্য। এরূপ অবস্থায় ঠাণ্ডা লাগিলে ঔষধে
রােগীর কোন উপকার হইবে না, সেই জন্য এই ব্যবস্থা। এই সহৃদয়তা
গুণে তিনি কৃষ্ণনগরের সকলের কাছে বিশেষ প্রিয়পাত্র হইয়াছিলেন।
তাঁহার গুণে লােকে এরূপ আকৃষ্ট ছিল যে, তিনি গৃহে পদার্পণ করিলেই
রােগ নিশ্চয় সারিয়া যাইবে ইহা সকলের দৃঢ় বিশ্বাস হইয়াছিল।
তাহার উল্লেখ করিয়া কবি বলিয়াছেন,
“কোমল স্বভাব গর মধুর বচন,
ছেলেরা আনন্দে নাচে পেলে দরশন,
ছেলেদের কালীবাবু, ছেলেরা কালীর
উভয়েতে মিশে যায় যেন কারে নীর।”
তাঁহার ভ্রাতা রামতনু সম্বন্ধেও কবি বলিয়াছেন,----
পরম ধার্মিকবর এক মহাশয়,
সত্যবিমণ্ডিত তার কোমল হৃদয়।
একদিন তার কাছে করিতে গমন,
দশদিন ভাল থাকে দুর্বিনীত মন
বিদ্যবিতরণে তিনি সদা হরষিত
তাঁর নাম রামতনু সকলে বিদিত।”
যাহার কাছে একদিন গেলে দশদিন মন ভাল থাকে সেরূপ
লোক কি প্রকৃতই একজন মহাপুরুষ নহেন ? প্রকৃত পক্ষে এ কথার
সত্যতা কিছু থাকুক বা না থাকুক তাহাতে কি আসিয়া যায়; কিন্তু তিনি
রামতনু লাহিড়ী ৯ যে বাস্তবিক লােকের অকৃত্রিম ভক্তি আকর্ষণ করিতে পারিয়াছিলেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী এই জন্যই কবির কথায় বলা যায়--- “জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা রবে তাহার উপর রােগ, শােক প্রভৃতির হাত এড়াইতে পারিয়াছেন এরূপ লােক নাই বলিলেই হয়। কিন্তু দশজনের হৃদয়ের ভালবাসা পাওয়া কয়জনের ভাগ্যে ঘটে ? সেরূপ ভাগ্যবান্ কয়জন আছেন ? লােকের উপর এই প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা মহাপুরুষের চিহ্ন। রামতনু বাবুর জীবনের মহত্ত্ব এইখানে। কয়েকটা পুত্র কন্যার মৃত্যু হওয়াতে রামতনু কিছু অধিক মাত্রায় পিতামাতার আদর যত্ন লাভ করেন। ক্রমে রামতনু পাঁচ বৎসরের হইলে শাস্ত্র অনুযায়ী তাহার হাতে খড়ি হইল। স্বগ্রামে দেবীপ্রসাদ চৌধুরী মহাশয়ের পাঠশালায় তাঁহার লেখাপড়া আরম্ভ হই। কিরূপ ভাবে ঠাহাব বিদ্যাশিক্ষা আরম্ভ হই তাহা একবার আলােচনা করা দরকার। তখনকার প্রথা এবং এখনকার প্রথা এই দুয়ের অনেক প্রভেদ দেখা যায়। প্রথমতঃ আজকাল যেমন বড় বড় বাড়ী, তাহার মধ্যে বড় বড় বড়, চেয়ার টেবিল এবং ছাত্রদের বসিবার জন্য বেঞ্চ থাকে তখন সেরূপ কিছু ছিল না। হয়ত বা কাহারও বাটীর চণ্ডীমণ্ডপে, না হয় কোন বড় গাছের তলায় গুরুমহাশয় তাহার শিষ্যদের পড়াইতেন। সেকালের গুরু- মহাশয়ের রুদ্রমূর্তি এবং হাতের বেত দেখিলে রাস্তা হইতে ছেলেদের মুখ ভয়ে শুকাইয়া যাইত। তাহাদের বসিবার জন্য মাদুর পাতা থাকিত, তাহাতে বসিয়া সকলে নিজ নিজ পড়া আরম্ভ করিত। ছােট ঘােট ছেলেরা তালপাতায় কঞ্চি বা সরের কলমে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, যুক্তাক্ষর, মােটামুটা চিঠিপত্র এবং হিসাব লিখিত। অপেক্ষাকৃত বড় ছেলেরা প্রায়ই ছােট রামতনু লাহিড়ী হইত। ছেলেদের উপর কর্তৃত্ব করিত। মােটামুঢ়ীহিসাবে লিখিতে, পড়িতে এবং হিসাব শিখিতে পারিলে পাঠশালার পড়া শেষ হইত। তাহার পরে যে যেমন ইচ্ছা পড়া চালাইত। ব্রাহ্মণদের ছেলেরা তখন টোলে সংস্কৃত পড়িত। আজকাল যেমন ইংরাজী, রাজার জাতির ভাষা বলিয়া আদর পাইতেছে, তখনও পারস্য ভাষার ঐরূপ আদর ছিল। কাজেই যাহারা পরে রাজসরকারে বড় কাজকৰ্ম্ম যােগাড় করিবার ইচ্ছা করিত হােৱা অনেকেই পারসী পড়িত। তখনকার কালে গুরুমহাশয়কে কোন নির্দিষ্ট বেতন দিতে হইত না। যাহার যেরূপ অবস্থা গুরুমহাশয় তাহার নিকট হইতে সেইরূপ লইতেন। কিন্তু তাহার কোন পূজা বা পাৰ্বণ বাদ যাইত না। প্রত্যেক সময়েই গুরুমহাশয়ের কিছু কিছু দক্ষিণা ছেলেদের নিকট হইতে আদায় তাহা ছাড়া তাহার উপরি পাওনাও বেশ ছিল। সকলেই তাহাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য শাক সবজী, ফল মূল, তামাক প্রভৃতি পিতামাতার অজ্ঞাতসারে লইয়া আসিত। তাহাদের গুরুভক্তি এরূপ প্রবল ছিল যে, পিতামাতাকে লুকাইয়া আনিতে তাহারা কখনও কুণ্ঠিত হইত না। কারও আসিতে দেরী হইলে সে বৃদ্ধি করিয়া গুরুমহাশয়কে কিছু উপরী আনিয়া দিত, তিনিও মা সন্তুষ্ট হইতেন। যে আনিতে পারিত না তাহার সেইদিন প্রত্যেক বিষয়েই গুরুমহাশয় ভুল দেখিতে পাইতেন এবং তা সংশােধনের জন্য বেত্রাঘাত করিতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্তই বদলাইয়া যায়। আজকাল স্বাধীনতার দিন। সকলেই, সমান পংক্তির ব্যবহার চায়। তখনকার কালে গুরু ভাবিতেন আমি শিক্ষক কাজেই বেত্রাঘাত করিতে হইবে, ছাত্রেরা ভাবিত গুরুমহাশয় গুরুজন কাজেই তাহার প্রহার সহ্য করিতে হইবে। আজকাল ছেলেরা মনে করে উভয়ের মধ্যে সমান সম্পর্ক, তিনিও মানুষ, আমরাও মানুষ, তিনি মাহিনা পাইতেছেন, আমরা সকলে দিতেছি, কাজেই তাহারা রামতনু লাহিড়ী ১১ সমান সমান ব্যবহার চায়। প্রহারের ব্যবস্থা ত এখন নাইই। অনেক সময় বিপরীত বাবস্থাও হয়। ছাত্রেরা এখন শিক্ষকের দোষ দেখিলে তঁাকে বয়কট করে, অনেকে আবার ক্ষমা চায়, দু এক জায়গায় হার দিতেও কুষ্ঠিত হয় না। তখন অসভ্যতার দিনে শিষ্য প্রহার খাইত, এখন পুরা সভ্যতা, গুরু শিষ্যের সহিত ভয়ে ভয়ে কথা কহেন, সৰ্ব্বদাই শঙ্কিত পাছে কোন দোষের কথা বলিয়া ফেলেন। সে যাহাই হউক, মােটামুটা দেখিতে গেলে পূর্বেকার পদ্ধতি অনুসারে শিক্ষা প্রকৃত পক্ষে খুব কম হইত একথা অস্বীকার করা যায় না। দুই এক বিষয়ে যে তাহা খারাপ ছিল তাহাও বলিতে হইবে। তাহার পরিবর্তনে আজকাল অনেক ভাল হইলেও তাহা যে একেবারে সকল গুণন্য ইহা বলিলে নিতান্ত অন্যায় হয়। এই পদ্ধতি অনুসারেই, শিক্ষা আরম্ভ হইল। বেত্রাঘাতের ভয়ে তিনিও অন্যান্য ছেলেদের মত অনেক সময় পাঠশালা হইতে পলাইয়া যাইতেন বটে, কিন্তু কখনও পাঠে অমনােযােগী ছিলেন । শেষ বয়সে লাহিড়ী মহাশয় নিজে অনেককে বলিতেন যে, তাঁহার এই পলায়ন ব্যাপারে রামকৃষ্ণ বড় মনঃকষ্ট পাইতেন। তঁাহার একজন সহপাঠী চুরি বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী ছিল। তাহার সঙ্গে থাকিয়া তিনিও উহা শিখেন। রামকৃষ্ণ দেখিলেন এইরূপ সংসর্গে কখনই প্রকৃত শিক্ষা হওয়া সম্ভব নয়। তিনি পুত্রের জন্য বিশেষ চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। কেশবচন্দ্র এই সময়ে আলীপুরে কাজ করিতেন। পিতামাতা উভয়কে উৎসুক দেখিয়া কেশবচন্দ্র রামতনুকে কলিকাতায় লইয়া আসিলেন। চেতলার বাসায় আসিয়া রামতনু অবস্থান করিতে লাগিলেন। কেশবচন্দ্রের আয় সামান্য এবং নিজ বাসার খরচ কুলাইয়া এবং পিতামাতার সাহায্যের জন্য কিছু কিছু পাঠাইয়া কিছুই অবশিষ্ট থাকিত না। সেইজন্য তাহাকে দু একটা উপরি কাজ করিতে হইত। তাহা করিয়াও যে সময় রামতনু লাহিড়ী পাইতেন তাহা ভ্রাতার শিক্ষা কাৰ্য্যে কাটাইতেন। কিন্তু তিনি দেখিলেন এরূপে ভালরূপ উন্নতি হইবে না। তাহা ছাড়া সে সময় ইংরাজী শিক্ষা নূতন আরম্ভ হইতেছে। তিনি দেখিলেন একটু ভাল করিয়া ইংরাজী শিখিতে পারিলে বিশেষ সুবিধা, সুতরাং রামতনুকে ভাল করিয়া ইংরাজা শিখাইবার ইচ্ছা তাহার প্রবল হইল। তৎকালে দেশমান্য হেয়ার সাহেবের স্কুল বাতীত ইংরেজী শিখিবার অপর কোনও বিদ্যালয় ছিল না। সদাশয় হেয়ার সাহেব একজন ইউরােপ- বাসী হইলেও তিনি অত্যন্ত উদারচেতা লােক ছিলেন। তিনি ভারতকে নিজের দেশের স্থায় জ্ঞান করিতেন। কিসে এদেশের উন্নতি হইবে, কিসে এদেশ বাসীরা বিদ্যাশিক্ষা করিতে পারিবে ইহার উপায় উদ্ভাবনে সারা জীবন অকাতরে পরিশ্রম করিয়াছেন। তিনি একজন ঘড়ি ব্যবসায়ী ছিলেন। নিজে প্রভৃত অর্থ উপার্জন করিলেও এদেশের উপকারের জন্য তার সমস্তই দান করিয়া পরে নিজে একটি বন্ধুর বাটীতে থাকিতেন । তাহার ন্যায় উদারচেতা লােক জগতে বিরল। একমাত্র তাহারই চেষ্টায় সেই সময়ে ইংরাজী শিখাইবার জন্য একটি বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছিল। শুধু যে ছেলেরা বিনা বেতনে পড়িতে পাইত তাহা নহে অনেকে আবার আবশ্যক মত পুস্তকাদিও পাইত। কেশবচন্দ তাঁর ভ্রাতাকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু ছাত্রসংখ্যা নির্দিষ্ট থাকায় তিনি অনেক চেষ্টাতেও কৃতকার্য হইতে না পারায় চিন্তিত হইলেন। কেশবচন্দ্র ভ্রাতাকে হেয়ার স্কুলে ভর্তি করিবার জন্য চিন্তিত, ঠিক সেই সময়ে কালীশঙ্কর মৈত্র নামে একব্যক্তি কর্মোপলক্ষে তাহার নিকট সহায়তার জন্য আসেন। তার এক আত্মীয় হেয়ার সাহেবের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। কেশবচন্দ্র তাঁহাকে সহায্য করিবেন স্বীকার করিলেন কিন্তু কথা থাকিল বে প্রতিদানস্বরূপ রামতনুকে হেয়ার স্কুলে । your school হইল । রামতনু লাহিড়ী ভর্তি করাইয়া দিতে হইবে। কালীশঙ্কর আত্মীয়ের দ্বারা রামতনুকে ভর্তি করিয়া দিবার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও কিছু করিয়া উঠিতে পারিলেন না। সে সময় ছাত্রদিগের নিকট হইতে বেতন লওয়া হইত না। নির্দিষ্টসংখ্যক অবৈতনিক ছাত্র ভর্তি হইয়া গিয়াছিল বলিয়া হেয়ার সাহেব নূতন ছাত্র লইতে চাহিলেন না। হেয়ার সাহেব নূতন ছাত্র ভর্তি করিতে রাজী নহেন কিন্তু তাহার মত সদাশয় লােককে ছেলেরা ছাড়িবে কেন ? হেয়ার পাল্কী করিয়া বাটীর বাহির হইলে বালকগণ তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিত এবং কেহ কেহ me pour hoy, have pity on me, take me in বলিত। পরামর্শানুসারে রামতনুকেও এই মহাজন পন্থা অবলম্বন করিতে এইরূপে প্রায় দুই মাস রামতনু ছুটাছুটী করিলেন। ইহা তার অদম্য অধ্যবসায়ের পরিচয়। বাল্যকাল হইতেই তাঁহার লেখা পড়া শিখিবার কেমন এক গভীর ইচ্ছা ছিল। তাহা না হইলে কি কেহ পরের কথায় আহারনিদ্রা ছাড়িয়া এত কষ্ট করিতে পারে। তাহার আগ্রহ তিশয্য দর্শনে হেয়ার সাহেব তাহাকে ভর্তি করিয়া লইলেন। সেই সঙ্গে আর একটি ছাত্রও প্রবেশ লাভ করিল। পরবর্তীকালে ইনিই রাজা দিগম্বর মিত্র নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। স্কুলে ভর্তি হইবার পর কেশবচন্দ্র দেখিলেন আরও এক মুস্কিল উপস্থিত। রামতনু, কালীশঙ্কর বাবুর আত্মীয় বিদ্যালঙ্কার মহাশয়ের বাটীতে থাকিয়া পড়িতেছিলেন। সেখানে তাঁহাকে রন্ধন এবং অন্যান্য দু’একটি কাজও করিতে হইত। তদুপরি বিদ্যালঙ্কার মহাশয়ের চরিত্রও ভাল ছিল না। রামতনুর পড়াশুনার ব্যাঘাত দেখিয়া কেশবচন্দ্র তাহাকে স্বীয় পিতার মাতুলপুত্র রামকান্ত খাঁ মহাশয়ের শ্যামপুকুরস্থিত বাসায় রাখিয়া আসিলেন। খাঁ মহাশরের গৃহিণী রামতনুকে পুত্রনিৰ্বিশেষে ভাল বাসিতেন। তাহা ছাড়া এখানে দিগম্বর মিত্র ও ক্রমে তাহার মাতার ১৪ রামতনু লাহিড়ী স্কুল সােসাইটী সহিত রামতনুর পরিচয় হয়। দিগম্বরের মাতা তাঁহাকে নিজ পুত্রের মত আদর যত্ন করিতেন। এই সস্নেহ ব্যবহার রামতনু ইহ জীবনে কখনও ভুলিতে পারেন নাই, বৃদ্ধ বয়সেও তাহা কৃতজ্ঞতার সহিত উল্লেখ করিতেন। ১৮২৮ খৃষ্টাব্দে রামতনু হেয়ার সাহেবের স্কুল হইতে হিন্দু কলেজে আসিলেন। তখন নিয়ম ছিল, অগ্রগণ্য ছাত্রের হেয়ার স্থাপিত স্কুল সােসাইটীর স্কুল হইতে হিন্দু কলেজে পড়িবে। দরিদ্র ছাত্রদের বেতনও দিতেন। রামতনু অবৈতনিক ছাত্র হইলেন, দিগম্বর মিত্রও তাঁহার সহিত ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হইলেন। কলেজে যে সকল সহাধ্যায়ীর সহিত রাত মিলিত হইলেন তাঁহাদের মধ্যে রামগােপাল ঘােষ পরে বিশেষ খ্যাতনামা হইয়াছিলেন। তাহ ছাড়া দেশের আরও অনেক কৃতবিদ্য ব্যক্তি তখন অসাধারণ প্রতিভাবান এবং বঙ্গের নব যুগের প্রবর্তক ডিরােজিও সাহেবের শিষ্য ছিলেন। ক্রমে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হহইলে রামতনু তাহার জ্যেষ্ঠতাত ঠাকুরদাস লাহিড়ীর পাথুরিয়াঘাটার বাসায় আসেন। প্রথম শ্রেণীর পরীক্ষায় রামতনু ১৬ টাকা বৃত্তি লাভ করিয়া তার অপর দুই ভ্রাতাকেও কলিকাতায় লইয়া আসেন। ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে রামতনু পাঠ শেষ করিয়া ৩ টাকা বেতনের এক শিক্ষকতা গ্রহণ করিলেন। ইচ্ছা করিলে তিনি গবর্ণমেন্টের অধীনে কোন একটা বড় চাকরী অনায়াসে লাভ করিতে পারিতেন। কারণ আজ কালকার মত তাহা এত কষ্টসাধ্য ছিল না। কিন্তু তিনি অর্থ ভালবাসিতেন না। দেশে সুশিক্ষকের অভাব দেখিয়া শিক্ষকতা কাৰ্য্যে জীবন যাপন করাই স্থির করিলেন। মাসিক তেত্রিশ টাকার ভরসাতেই তিন ভ্রাতা কলিকাতায় থাকিতেন। কেবল তাহাই নহে, এই কৰ্ম্ম পাইবা মাত্র গাহার বাসা নিরাশ্রয় ও আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তিগণের আশ্রয়স্থান হইয়া উঠিল। আপনাদের খরচ বাদে যাহা বেশী থাকিত তাহা পিতামাতাকে পাঠাইতেন রামতনু লাহিড়ী । তাহ ছাড়া দুঃখী লােকদিগকে দান করিবার জন্য মাঝে মাঝে কিছু খরচ করিতেন। হেয়ার সাহেবের স্কুলে ইংরাজী পড়াইবার জন্য যে সকল শিক্ষক ছিলেন তাহাদের মধ্যে ডিরােজিওকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা উচিত। একে তিনি একজন ইংরাজ যুবক, তাহার উপর আবার ফরাসী বিপ্লবে সাম্য, মৈত্রী ভবপূর্ণ পুস্তকও অনেক পড়িয়াছিলেন। কাজেই তিনি একজন বিশেষ স্বাধীনতাপ্রিয় লােক হইয়া পড়িয়াছিলেন। কোনরূপ বাঁধাবাঁধি নিয়মের অধীন হইয়া থাকা তিনি নিজে পছন্দ করিতেন না এবং ছেলেদেরও তাহা শিখাইতেন না। তিনি প্রায় ছেলেদের বলিতেন “যখন কোন কাজ করিতে হইবে, তাহা আগে নিজে নিজে বিচার করিয়া তবে করা উচিত। ইহা অনেকদিন ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে বলিয়াই যে তাহা করিতে হইবে তাহার কোন মানে নাই। আমার পক্ষে তাহা ঠিক কি না, যথার্থই তাহা ভাল কি না, তা দেখিয়া তবে করা আবশ্যক।” তাঁহার এই উপদেশের ফলে বাঙ্গলায় যেন এক নুতন যুগ আসিল। ইংরাজী শিক্ষা এবং ডিরােজিওর উপদেশে মাতিয়া উঠিয়া বিদ্যালয়ের ছেলেরা সকলেই নিজ নিজ সমাজের আচার ব্যবহারের প্রতি বিরক্ত হইয়া উঠিল। এই বিদ্রোহের সূচনা হইতেই বাঙ্গালার নূতন যুগের আর বলিয়া ধরা হয়। বিদ্যালয়ের ছাত্রগণ দেখিতে পাইলেন, সামাজিক আচার ব্যবহার প্রভৃতির যে ধরাবাধা নিয়ম আছে, তাহাতে স্বাধীনভাবে কাজ করিবার পক্ষে বিশেষ অসুবিধা। তখন তাহারা দেখিলেন এ সকল বাধাবাঁধি বদলান দরকার। তাঁহারা ধূয়া ধরিলেন “একটা নূতন কিছু করিতে হইবে ; আগে হইতে চলিয়া আসিতেছে বলিয়া যে তাহা মানিতে হইবে সে দিন আর নাই।” এই নূতন কিছু করার মধ্যে যে সকল মহাত্মাদের নাম দেখা যায় তাহাদের মধ্যে রামমােহন রায়ের • রামতনু লাহিড়ী নাম বিশেষ প্রসিদ্ধ। এক পক্ষে দেখিতে গেলে তিনিই এই বিদ্রোহের প্রধান নেতা। কিন্তু তাহার সহিত অপর সকলের তুলনা করিলে একটু প্রভেদ দেখা যায়; তাহা এই যে নূতন কিছু করিতে গিয়া তিনি পুরা- তনকে একেবারে অশ্রদ্ধা করেন নাই। তিনি হিন্দুদের জাতীয় পদ্ধতির যে ভিতরকার একটা মহত্ব তাহা দেখিতে পাইয়াছিলেন বটে, যদিও শিক্ষকের নিকট প্রাপ্ত স্বাধীনতাবৃত্তির ভাব তিনি ছাড়িতে পারেন নাই। ছােটই হউক আর বড়ই হউক যে কোন একটা সামাজিক বিপ্লব হইলেই তাহার ফলে এক গণ্ডগােল উপস্থিত হওয়া স্বাভাবিক। প্রাচীন লােকগণ দেখিলেন যে ছেলেরা কিছু বেশী মাত্রায় নূতন ভাবের পক্ষপাতী হইয়াছে। তঁাহারা তাহা ভাল নয় বিবেচনা করিয়া ছেলেদের বাধা দিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু বাধা পাওয়াতে ছেলেদের উৎসাহ যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। তাহাদের মনে দৃঢ় ধারণা হইল যাহা কিছু পুরাতন তাহাই মন্দ, যাহা নৃতন তাই ভাল। সকল প্রকার কুসংস্কার, প্রচলিত পূজাপদ্ধতি এবং অপরাপর প্রথা উঠাইয়া দিবার জন্য তাহার উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। সকলেই স্ব স্ব প্রধান হইয়া নিজ ইচ্ছা মত কাৰ্য্য করিতে লাগিলেন। সমাজে ধােরর আন্দোলন উপস্থিত হইল। ইহার ফল ভাল হইল কি মন হইল তাহা বলিবার আবশ্যকতা নাই। পর্যন্ত বলা উচিত যে, তাহারা নূতন কিছু করিবার উৎসাহে একেবারে অন্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। দেশ কাল এবং পাত্র ভেদে যে অবস্থাভেদ হয় ইহা তাহারা বিবেচনা করিবার সময় পাইলেন না। একেত ইংরাজী শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে দেশের শিক্ষিত যুবকদের মনের অবস্থা এইরূপ, তাহার উপর আবার সেই সময় লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক ভারতবর্ষের বড়লাট হইয়া আসিলেন। বেন্টিঙ্ক বাহাদুর কিরূপ ভারতবাসীর প্রিয় ছিলেন তাহা ইতিহাসপাঠক মাত্রেরই জানা আছে। সেই সময় কতকগুলি প্রথা সমাজে চলিত ছিল, যথা-সহমরণ প্রথা তবে এই রামতনু লাহিড়ী '১৭ অর্থাৎ কোন লােক মরিলে তাহার স্ত্রী স্বামীর সহিত এক চিতায় আরােহণ করিয়া পুড়িয়া মরিত, অনেকে অপুত্রক অবস্থায় গঙ্গাদেবীর নিকট পুত্রকামনা করিয়া মানস করিত যে, তাহার প্রথম সন্তান হইলে তাহাকে গঙ্গাসাগরে বিসর্জন দিবে। বেন্টিঙ্ক বাহাদূর এই সকল প্রথা রােধ করিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। একদিকে রামমােন রায়ের নেতৃত্বে সমাজসংস্কারের চেষ্টা এবং তাহার ফলে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম স্থাপন, অপরদিকে বেন্টিঙ্কের সহমরণ প্রভৃতি কুপ্রথা আইনের সাহায্যে উঠাইয়া দিবার চেষ্টা; যেন মণি-কাঞ্চন সংযােগ হইল। বিধাতা যেন ইচ্ছা করিয়াই একই সময়ে দুয়ের আয়ােজন করিলেন। এই সুবর্ণ সুযােগ উপস্থিত বুঝিয়া রামমােহন রায় ব্ৰহ্ম উপা- সনার মন্দির স্থাপনা করিলেন। রামতনু লাহিড়ী এবং তাহার সহপাঠী অনেকে তাহাতে বিশেষ আনন্দের সহিত যােগদান করিয়া রামমােহনকে বিশেষ উৎসাহ দিতে লাগিলেন। তাঁহাদের মন্দিরে প্রায়ই সভা হইত। সেই সভায় দেশের আচার, ব্যবহার, রীতি, নীতি প্রভৃতি সকল বিষয়ের আন্দোলন করা সকলের এক প্রকার কাৰ্য্য হইয়া পূজা-পদ্ধতি, উপবীতধারণ প্রভৃতিকে কুসংস্কারের অন্ধবিশ্বাস বলিয়া ধারণা এবং প্রতিমাপূজা প্রভৃতির সম্বন্ধে তর্কবিতর্ক করিতে দেখিয়া সমাজের গোঁড়া শােকগণ বিরক্ত হইয়া উঠিলেন। সুরাপান ব্যাপার ও তাহাদের মধ্যে অল্লাধিক পরিমাণে ঢুকিয়াছিল। প্রবীণ লােকগণ সকলেই ভাবিতে লাগিলেন ইংরাজী শিক্ষা পাওয়াতে ছেলেরা এইরূপ মাতিয়া উঠিয়াছে। ইংরাজী শিক্ষকদের মধ্যে ডিয়ােজিও সাহেবকে সকলে দোষী করিলেন। তাহারা ভাবিলেন যে ডিরােজিও সাহেব ছেলেদের মনে এই বিদ্রোহের ভাব প্রবেশ করাইয়াছেন। হিন্দু কলেজ কমিটীয় সভ্যগণ একটি সভা আহ্বান করিলেন। সেই সভায় দেব পূজা, পিতামাতার প্রতি ভক্তি প্রভৃতির বিরােধী হইবার জষ্ঠ শিক্ষা উঠিল।
১৮ রামতনু লাহিড়ী দিয়াছেন এই দোষ দেখাইয়া তাহাকে পদচ্যুত করাইলেন। ডিরােজিও সাহেব প্রকৃতপক্ষে দোষী কিনা ইহা তাহারা ভাল করিয়া বিচার করিয়া দেখিলেন না। ডিরােজিও সাহেব এই সংবাদ শুনিয়া তাহার এক সাহেব বন্ধুকে একখানি পত্র দেন। তিনি তাহাতে লিখিয়াছিলেন পিতা-মাতাকে অভক্তি করিতে শিখান দূরে থাকুক, আমি তাহা- দিগকে বরাবরই পিতামাতাকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করিতে শিখাইয়াছি। আমি কেবলমাত্র তাহাদের বলিয়াছি, যে কাজ করিতে হইবে তাহা কখন সংস্কারবশে করা উচিত নহে; ভাল মন্দ বিচার করিয়া তবে করা উচিত। একটি ছাত্র এক সময়ে তাহার পিতার নিকট তিরস্কার এবং মার খাইরা বাটী হইতে পলাইয়া যাইবার ইচ্ছা করিয়া আমার কাছে পরামর্শের জন্য আসিয়াছিল। তাহাকে উৎসাহ দেওয়া দূরে থাকুক, আমি তাহাকে তজ্জন্য তিরস্কার করিয়া বলিয়া দিলাম যে, সে যদি বাটী ফিরিয়া না যায় তাহা হইলে আমি তাহাকে কোনরূপ পরামর্শ দিতে পারি না।” সে যাহা হউক, ডিরােজিও পদচ্যুত হইলেন। কিন্তু সভ্যগণ যে আশা করিয়াছিলেন তাহা হইল না। তিনি ছেলেদের মনে যে বিদ্রোহের ভাব বপন কবিয়াছিলেন তাহা তাহারা দ্বিগুণ উৎসাহে চালাইতে লাগিলেন। রামতনু বাবুর হিন্দু কলেজে শিক্ষকতা গ্রহণের দুই বৎসর পরে অর্থাৎ ১৮৩৫ খৃঃ অব্দে আর একটি স্মরণীয় ঘটনা উপস্থিত হইল। কোন্ ভাষায় শিক্ষাপ্রচারের ব্যবস্থা করিলে দেশের কল্যাণ হইবে ইহা লইয়া এক তর্ক উপস্থিত হইল। কেহ বলিতে লাগিলেন ইংরাজী ভাষার প্রচলন হওয়া দরকার, আবার যাঁহারা পুরাতন মতের পক্ষাবলম্বী তঁাহারা বলিলেন বাঙ্গালী বালকদিগের শিক্ষার জন্য বাঙ্গালা ভাষার সাহায্য লওয়া দরকার। কিন্তু তখন ইংরাজী শিক্ষা প্রচারের জন্য কলেজের ছাত্রদল এবং তাহাদের দলের সকলে “ইংরাজী শিক্ষা চাই” বলিয়া রব তুলিলেন। উভয় পক্ষ রামতনু লাহিড়ী হইতেই আবেদনপত্র গবর্ণমেন্টের নিকট পাঠান হইল। মেকলে নামে বিশেষ জ্ঞানবান্ একজন সাহেব সেই সময়ে বড়লাট সভার সভ্য ছিলেন। তিনি অনেক যুক্তিতর্ক করিয়া দেখাইলেন যে বাঙ্গালা ভাষায় শিক্ষা প্রচলন উচিত নহে। সমাজে প্রচলিত কু-অভ্যাস এবং কুরীতি ইংরাজী ভাষার সাহায্যে দূর করা সম্ভব। বাঙ্গালা ভ যায় তাহা হইবে না। বড়লাট বেন্টিঙ্ক সাহেবেরও সমাজ সংস্কার করিবার বিশেষ ইচ্ছা ছিল। তিনি মেকলে সাহেবের সঙ্গে একমত হইয়া প্রচার করিলেন যে ইংরাজী ভাষায় শিক্ষা দেওয়াই আবশ্যক এবং গবর্ণমেন্টের অর্থ ইংরাজী ভাষার শিক্ষার জন্য বায় করা হইবে। নূতন দলের লোকগণ এই ব্যাপারে মহাসন্তুষ্ট হইয়া বলিতে লাগিলেন “মেকলে সাহেব যাহা বলিয়াছেন তাহা ঠিক। এক আলমারী ইংরাজী বই পড়িলে যে জ্ঞানলাভ হওয়া সম্ভব, বাঙ্গলার সমস্ত সাহিত্য পড়িলে ও তাহা হইতে পারে না।” এই মতের সহিত একমত হইতে না পারিলেও ইহা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ইংরাজী শিক্ষা প্রচারের সঙ্গে আমাদের দেশের অনেক উন্নতি হইয়াছে। বাঙ্গালা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধূসূদন দত্ত প্রভৃতির নাম অনেকেই শুনিয়াছেন। যদি ইংরাজী ভাষা থাকিত তাহা হইলে তাহাদের যে সকল উপন্যাস বা কবিতায় বাঙ্গালা সাহিত্যের এত উন্নতি হইয়াছে তাহাও হইত না। ইংরাজী শিক্ষিত ছাত্রদল এবং মেকলের মতাবলম্বী লােকৰিগের দোষ দেখা যায় না, তাঁহারা যেরূপ শিক্ষা পাইয়াছিলেন সেইরূপই করিয়াছিলেন। এই সময় হইতে কলিকাতায় দুই একটি করিয়া কলেজ স্থাপিত হইতে লাগিল। এই সূত্রে কৃষ্ণনগরেও একটি কলেজ খােল। হইলে লাহিড়ী মহাশয় সেখানকার দ্বিতীয় শিক্ষকের পদ পাইয়া কৃষ্ণনগরে চলিয়া গেলেন। তাহার বন্ধুগণ সকলেই লাহিড়ী মহাশয় আসিতেছেন শুনিয়া বিশেষ আনন্দিত হইলেন এবং পরম সমাদরে তাহাকে অভ্যর্থনা করিলেন ।
রামতনু লাহিড়ী বাল্যকালের পুরাতন কাহিনী স্মরণ করিয়া তাঁহারা লাহিড়ী মহাশয়ের সহিত কিছুক্ষণ অবর্ষণ করিতে লাগিলেন। দলাদলি তখন সকল জায়গায় অল্প বা অধিক পরিমাণে চলিতেছিল। লাহিড়ী মহাশয়ের আসার পর হইতে কৃষ্ণনগয়েও তাহা আরম্ভ হইল। কিন্তু রামতনু বাবু কোন দলাদলি ভালবাসিতেন । তিনি প্রায়ই তাহার বন্ধুদের বলিতেন “তােমরা ব্রাহ্মধৰ্ম্ম ভাল দাস ব্রাহ্মের মত থাক, তপরের সহিত দলাদলি করিও না। যাহা তুমি ভাল বােঝ কর, অপরে যাহা ভাল বােঝে করুক। দলাদলি করিলে অপরের সহিত ঝগড়া বা বকাবকি ছাড়া ত আর কিছু লাভ নাই।” তিনি বরাবর এই মত অনুযায়ী কাজ করিয়াছেন। কখনও তিনি অপর সম্প্রদায় বা লােকবিশেষের বিরুদ্ধে মত বা অমত প্রকাশ করেন নাই। এই ন্যায়পরতার জন্য সকল দলের লােকই তাহাকে সমানভাবে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিত। হেয়ার সাহেব এবং ডিরােজিওর নিকট তিনি যে শিক্ষা এবং উপদেশ পাইয়াছিলেন, কৃষ্ণনগরে আসিয়া তিনি তাহা প্রচার করিতে আরম্ভ করিলেন। তঁাহার বন্ধুগণও ডিরােজিওর নিকট হইতে প্রাপ্ত যুক্তি অনুসারে কাৰ্য্য করিতে শিক্ষা প্রাপ্ত হইয়া দেখিলেন কৃষ্ণনগরে সমাজের গোঁড়ামী বিশেষ ভাবে বর্তমান। তাহারাও তাহা ভাঙ্গিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। তাহাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যে কুরীতির পরিবর্তে যাহা ন্যায়সঙ্গত তাহা প্রচার করিতে হইবে। কিন্তু কাৰ্যগতিকে তারা যেন একেবারে সমাজবন্ধন ভাঙ্গিয়া দিবার জোগাড় করিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবা বিবাহ শাস্ত্রানুমােদিত হইলেও, তাঁহাদের আন্দোলন করিতে দেখিয়া সমাজের নেতারা তাঁহাদের সহিত একমত হইতে পারিলেন না। তাঁহারা রামপ্রমুখ নব্যতন্ত্রের লােকদিগের উপর চটি উঠিয়া অনিষ্টশনে বদ্ধপরিকর হইলেন। এক সুযােগও উপস্থিত রামতনু লাহিড়ী হইল। একটি সভায় আহুত হইয়া কলিকাতা হইতে কালীকৃষ্ণ মিত্র কৃষ্ণনগরে আসেন। তাঁহার সম্বর্ধনার জন্য একটি বনভােজনে ছাগ- হত্যা করা হয়। কুচক্রীরা প্রচার করিয়া দিলেন যে বনভােজনে গগাহত্যা করা হইয়াছে। অপর একজন বলিল সে মৃত গােৰৎস বক্ষে লম্বমান দেখিয়াছে। ইহা ক্রমে লােকমুখে নানাভাবে ছড়াইয়া পড়ায় এক গােলযােগ উপস্থিত হইল। এই সকল ব্যাপারের সহিত অম্লাধিক পরিমাণে সংশ্লিষ্ট থাকায় রামতনু দেখিলেন কৃষ্ণনগরে থাকা তঁাহার পক্ষে সুবিধাজনক নহে। একে ত পিতার মনঃকষ্ট, তদুপরি সামাজিক নির্যাতনও যে হয় নাই তাহা বলা যায় না। তিনি চেষ্টা করিয়া ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে বর্ধমানে হেডমাষ্টারের পদে বদলী হইলেন। কৃষ্ণনগরে অবস্থানকালে লাহিড়ী মহাশয়কে দুইটী শােক পাইতে হইয়াছিল। ১৮৪২ খৃ: অঝে তাহার শিক্ষাগুরু হেয়ার সাহেব ওলাউঠা রােগে আক্রান্ত হইয়া পরলােক গমন করায় তিনি হৃদয়ে বিশেষ আঘাত পাইলেন। ছাত্ররূপে কলিকাতায় অবস্থানকালে রামতনু পীড়িত হইলে হেয়ার সাহেব পুত্ৰাধিক সেবা করিয়া তাঁহার চিকিৎসা করাইয়াছিলেন। বিদ্যা, বুদ্ধি, সুখ, সমৃদ্ধি সকল বিষয়েই রামতনু হেয়ার সাহেবের নিকট ঋণী ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে হেয়ার সাহেবের কথা মনে হইলে অনেক সময় তাঁহার হৃদয় কাতর হইয়া উঠিত। তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কেশবচন্দ্র এই সময়ে পরলােক গমন করিলেন। তিনি কেশবচন্দ্রকে প্রাণাপেক্ষা প্রিয় জ্ঞান করিতেন। তাহার মৃত্যুতে রামতনু বাবু যে গভীর শোেক পাইলেন তাহা আর কথায় বলিবার নহে। তদুপরি আবার কিছু দিনের মধ্যেই জগদ্ধাত্রী দেবী পীড়িত হইলেন। রামতনু যেন চারিদিকে অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন। দিবারাত্রি আহারনিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া প্রাণপণে সেবা করিলেও, সমস্ত চেষ্টা বিফল হইল। কালের কুটীল কালের কুটীল গতি রােধ করা কাহার সাধ্য ? যে রামতনু লাহিড়ী মাতাকে দুইভ্ৰাতায় দেবতার অধিক জ্ঞানে পূজা করিতেন, তাঁর মৃত্যুতে রামতনু স্পন্দহীন হইয়া কিয়ৎক্ষণ বসিয়া রহিলেন। কিন্তু শশাকের বেগ চিরকাল থাকে না। ক্রমশঃ তাহা কমিয়া গেল বটে কিন্তু তাহা বাহিরে। ভিতরে ভিতরে তিনি যতদিন বাঁচিয়া ছিলেন ততদিনই তাহাদের কথা মনে হইলে নীরবে বসিয়া অশ্রুপাত করিতেন। আমরা পূৰ্বে দেখিয়াছি যে কৃষ্ণনগরে বাস বিশেষ ক্লেশকর বােধ হওয়াতে রামতনু চেষ্টা করিয়া বর্ধমানে বদলী হইলেন। কিন্তু সুগন্ধ পুষ্প যেমন যেখানেই থাকুক না কেন সুগন্ধ বিস্তারে সকলকে আমােদিত করিয়া থাকে, লাহিড়ী মহাশয়ও বর্ধমানে তাহার স্বাভাবিক সরলতা এবং সৌজন্য গুণে সকলকে মুগ্ধ করিলেন। একটি ঘটনা হইতে এই ব্যাপার বেশ দেখিতে পাওয়া যায়। বর্ধমানে তিনি গমন করিবার পর বিদ্যালয়ের সকল শ্রেণীর অনেক ছাত্র কিরূপ নুতন শিক্ষক আসিয়াছেন তাহা দেখিতে আগেকার পাঠশালা এবং বিদ্যালয়সমূহে গুরু মহাশয়গণ ছেলেদের মনে কিরূপ ভসঞ্চার করিতেন তাহা পূর্বে দেখিয়াছি। বর্ধমানেও শিক্ষক মহাশয়গণ ছাত্রদের সঙ্গে এইরূপ ব্যবহার করিতেন। তাঁহাদের দু একজনকে ছেলেরা এরূপ ভয় করিত যে, তাহাদের দেখিতে পাইবামাত্র তৎক্ষণাৎ চুপ করিয়া এক কোণে বসিয়া থাকিত। শিশুদের মুখের সে সুন্দর হাসি, যাহা দেখিলে স্বগীয় আনন্দ অনুভব করা যায়, তাহা যেন কোথায় চলিয়া যাইত। রামতনু বাবু প্রথম দিন আসিয়া আফিসঘরে কাজ কর্ম দেখিয়েছেন। ছেলেরা সকলে দলে দলে ভিড় করিয়া তাহাকে দেখিতে আসিল। সকলেই দ্বারে দাড়াইয়া ছিল; কিন্তু তাহার সৌম্যমূৰ্ত্তিতে আকৃষ্ট হইয়া একটী বালক তাহার চাপকান ধরিয়া একটু টানিল। তিনি বালকটার দিকে চাহিয়া কেবলমাত্র একটু হাসিলেন। বালক বাটী যাইয়া গল্প করিল “এবার একজন মুসলমান হেডমাষ্টার আসিয়াছেন।” পিতা বলিলেন “কই তাত শুনি নাই।” বালক বলিল “পূর্বে যাহারা আসিল।
রামতনু লাহিড়ী আসিয়াছেন আমি কখনও তাঁহাদের কাছেও যাইতে পারি নাই। আজ আমি নূতন মাষ্টার মহাশয়ের কাপড় ধরিয়া টানাতে তিনি কেবল একটু হাসিলেন, কিছুই বলিলেন না।” বলা বাহুল্য, বালকের ধারণা ছিল যে হিন্দু শিক্ষক কখনও এরূপ ব্যবহার করিতে পারেন না। কঠোর শাসনই শিক্ষকের চিহ্নস্বরূপ বলিয়া বালকের ধারণা ছিল। বালকের পিতা তাহাকে বুঝাইয়া দিলেন যে, শিক্ষিত হইলেই লােকের ক্ষুদ্রত্ব চলিয়া যায়। তিনি তখন সকলকেই সমান চক্ষে দেখেন। ভয়ে ভক্তি অপেক্ষা ভালবাসার ভক্তিই এই বালককে আজীবন লাহিড়ী মহাশয়ের নিকট শ্রদ্ধা করিয়া রাখিয়াছিল। একদিন গ্রীষ্মকালের দুপুরবেলায় লাহিড়ী মাশয় তাহার পাল্কীর বাহকদিগকে দেখিতে না পাইয়া বিদ্যালয়ের ছুটীর পর দাড়াইয়া আছেন। কয়েকজন ছাত্র বাহকদিগের সন্ধান করিতে গিয়া দেখিতে পাইল তাহারা এক বৃক্ষের ছায়ায় নিদ্রামগ্ন। পাছে বালকগণ তাহাদের ডাকে এইজন্য লাহিড়ী মহাশয় ছাত্রদিগকে নিষেধ করিলেন । একজন বালক বলিল “কেন ডাকব না, আপনি দাড়াইয়া থাকিবেন আর ওরা ঘুমুবে ?” রামতনু যেন অন্তরে ব্যথা পাইলেন, বলিলেন “কর কি কর কি ? এমন কাজ করতে আছে ? ওরা কত পরিশ্রম করে একটু ঘুমিয়েছে, থাক না। আমি ততক্ষণ তােমাদের সঙ্গে একটু গল্প করি।” কিছুক্ষণ পরে নিদ্রোথিত বাহকগণ তাঁহাকে দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া অপ্রতিভ হইল এবং তাড়াতাড়ি সব ঠিক করিয়া লইল। কঠোর তাড়না অপেক্ষা দয়ার শাসন যে কত অধিক কার্যকরী তাহা লাহিড়ী মহাশয় বেশ ভাল করিয়া বুঝিয়াছিলেন। আর একদিন আতা খাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে একটি বালক স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া আতা কিনিয়া আনিতে প্রস্তুত হইয়া বলিল “আমি কিনিয়া আনিতেছি। আপনি কিনিতে গেলে ঠকিয়া আসিবেন।” রামতনু বাবু তাহাকে বলিলেন “আমি আনিতেছি, তুমি তাহাকে ২৪ রামতনু লাহিড়ী ঠকাইয়া বেশী আনিবে।” তিনি একপয়সায় দুটী আতা কিনিয়া আনাতে সকলে হাসিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া তিনি কিছুমাত্র কুষ্ঠিত না হইয়া বলিলেন “আমি কাহাকেও ঠকাইয়া বা অন্যায়রূপে এক কপর্দকও লইতে ভালবাসি না।” তাঁহার পিতার ন্যায় তিনিও ন্যায্য প্রাপ্যের বেশী লওয়া অন্যায় বিবেচনা করিতেন। তাঁহার এইরূপ ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া ছাত্রের। তাহার কথা উঠিলে বলিত “অমন খাটী মানুষ আর দেখিলাম না। অমন মানুষ কি আর হয় ?” একদিন তিনি স্কুলে পড়াইতেছেন, এমন সময়ে তাহার নিকট খবর আসিল যে তাহার ছােট ছেলেটীর আঘাত লাগিয়াছে। একে তিনি ছােট ছেলেটাকে খুব ভালবাসিতেন তাহার উপর একমনে ছাত্র- দিগকে পড়াইতেছিলেন। হঠাৎ বাধা উপস্থিত হওয়ায় তিনি বিরক্ত হইয়া বাটা চলিয়া গেলেন। সেখানে শুনিলেন যে, চাকর ছেলেটাকে লইয়া খেলা করিতেছিল। হঠাৎ অসাবধানে পড়িয়া গিয়৷ আঘাত পাইয়াছে। গৃহিণী তাহাকে কোলে করিয়া ভুলাইবার চেষ্টা করিতেছেন কিন্তু সে যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া আরও জোরে জোরে কঁদিতেছে। দেখিয়া রামতনু চাকরকে বলিলেন “বাপু তুমি অন্য কোথা ও কাজের চেষ্টা দেখ। তুমি যদি ও ইচ্ছা করিয়া ফেলিয়া দাও নাই, তথাপি উহার কষ্ট দেখিলে আর স্থির থাকা যায় না। এরূপ অসাবধান হওয়া অন্যায়। তােমাকে দেখিলেই ছেলের কষ্টের কথা মনে হয় এবং মন খারাপ হয়।” চাকর এই কথা শুনিয়া আর কি বলিবে। রামতনু যদি তাহাকে কড়া কথা বলিতেন তাহা হইলে সে উত্তর দিতে পারিত। মুখে যেরূপ বলিবেন কাজেও ঠিক সেইরূপ করিবেন ইহাই তাহার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। তিনি যাহা বলিতেন বা বিশ্বাস করিতেন তাহাই কার্যে পরিণত করিতে বল হইতেন। তঁাহার বাৎসরিক মাতৃশ্রাদ্ধের সময় একটি বালক দ্বারে দাড়াইয়া বলিতে লাগিল “এদিকে ত বেশ বলা হয় আমরা কিছু রামতনু লাহিড়ী মানি না, ওদিকে শ্রাদ্ধ করতে বলা হয়েছে, পৈতাটীও বেশ ঝুলচে।” বালক কথা বলিয়া চলিয়া গেল কিন্তু বালকের বিদ্রুপ তঁাহার হৃদয়ে আঘাত করিয়া বহু অশান্তির কারণ হইল। এই কারণে তাহার মনে উপবীত রাখিবেন কি না এই প্রশ্ন উপস্থিত হয়। ইহার সহিত আর একটি গল্পও প্রচলিত আছে। একবার পূজার ছুটীতে তিনি বন্ধুদের সহিত নৌকাযােগে বেড়াইতে যাইতেছিলেন। পথে মাঝিদের প্রস্তুত আহাৰ্য্যই খাওয়া চলিতেছিল। সহচরদিগের মধ্যে একজন কৌতুক করিয়া বলিলেন “আমরা মুসলমান মাঝিদের হাতে খাইতেছি আবার পৈতাও রাখিয়াছি। রামতনু বাবুর হৃদয়ে আত্মগ্লানি উপস্থিত হইল। তিনি ভাবিলেন তবে আমরা খাটি হইয়া কাজ করিতেছি না। এদিকে নব্যতন্ত্রের উপাসক হইয়াও আমরা প্রাচীন কুসংস্কার এখনও ছাড়ি নাই। এই একটি কৌতুকে ভ্রম বুঝিতে পারিয়া তিনি চিরদিনের মত উপবীত ত্যাগ করিলেন। সমাজ তাঁহার এই কার্যে কিরূপ মতামত প্রকাশ করিবে বা আত্মীয় স্বজনেরাই বা কি বলিবেন ইহা ভাবিবার তাঁহার অবসর হইল না। দ্বৈধভাবাপন্ন হওয়ায় যে মানসিক অশান্তি হইয়াছিল তাহা দূর করিবার জন্যই তিনি উপৰীত ত্যাগ করিলেন। তিনি যখন বর্ধমানে ফিরিয়া আসিলেন তখন কি কষ্টই না সহ করিতে হইয়াছিল। কোন চাকর তাহার কাজ করিতে চাহিল না। সকলেই ছাড়িয়া গেল। তিনি যেন কতই অন্যায় কাজ করিয়াছেন সকলে এরূপ ভাবিতে লাগিল। কুলীন সন্তান বলিয়া অল্পবয়সেই তাহার বিবাহ হয়। সেই পত্নী মারা যাওয়ায় তিনি দ্বিতীয় দারপরিগ্রহ করেন। তাহারও মৃত্যু হইলে হাবড়া জেলার সাঁতরাগাছি গ্রামনিবাসী কৃষ্ণকিশাের চৌধুরী মহাশয়ের কন্যা গঙ্গামণি দেবীকে তিনি বিরাহ করিয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি নিতান্ত অল্পবয়স্ক।। তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র নবকুমারও শিশু। বালকের রক্ষণাবেক্ষণ এবং গৃহস্থালীর কাৰ্য লােকাভাববশতঃ তাঁহাকেই করিতে হইত। এত কষ্টে পতিত হইয়াও রামতনু লাহিড়ী লাহিড়ী মহাশয় কখন কাতর হন নাই। বরং তাঁহার পত্নী পাড়ার দশজনের কথায় ব্যথিত হইলে তিনি তাকে মিষ্টকথায় সান্ত্বনা দিতেন। তিনি পৈতা ফেলিয়া দিয়াছেন এই খবর ক্রমে কৃষ্ণনগরে পৌছিল। সমাজের লােকগণ দল বাঁধিয়া তাহার জন্য নির্যাতন করিতে উদ্যত হইলেন। লাহিড়ী মহাশয় বর্ধমানে ছিলেন, কাজেই তাঁহাকে হাতের নিকট না পাইয়া তাঁহার পিতা রামকৃষ্ণের উপর অত্যাচার আরম্ভ হইল। রামকৃষ্ণ স্বভাবতঃ ধর্মভীরু লােক ছিলেন। তিনি কাহাকেও কিছু না বলিয়া সমস্ত কষ্ট নীরবে সহ্য করিতে লাগিলেন। পরে ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দের চৈত্রমাসে ইষ্টদেবতার নাম গ্রহণ করিতে করিতে ইনি প্রাণত্যাগ করেন। এক সর পরে লাহিড়ী মহাশয় উত্তরপাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক হইয়া সেখানে চলিয়া আসিলেন। এইখানে আসার পর তার সামাজিক কষ্ট কিছু পরিমাণে কমিল। কলিকাতার নিকটবর্তী বলিয়া তাহার অনেক বন্ধু-বান্ধব, কখনও বা চাকর, কখনও বা রাঁধিবার লােক জোগাইয়া দিতে লাগিলেন। বাঙ্গলার বালকগণের চিরপরিচিত বিদ্যাসাগর মহাশয় এই সময়ে তাকে দ্রব্যসামগ্রী প্রভৃতি বপন বাগ দরকার হইত তাহা দিয়া সাহায্য করিতে লাগিলেন। তাঁহার বন্ধুদের মধ্যে অনেকে এই সকল অসুবিধা ভােগ করিতে দেখিয়া পুনরায় পৈতা গ্রহণের জন্য তাহাকে অনুরােধ করি- তেন। কিন্তু লাহিড়ী মহাশয় কিছুতেই তাহা করিতে স্বীকার করিলেন না। এলিতেন “তখন যখন ভাল বিবেচনায় পৈতা ফেলিয়া দিয়াছি এখন আর তাহা ফিরিয়া লইব না। যাহা হইবার, তাহা হইয়াছে। আমার মত আর বদলাইতে পারিব না।” এই সময়ে লীলাবতী ও ইন্দুমতী নামে হার দুইটা কন্যা হয়। উত্তরপাড়া অবস্থানকালে তিনি যে সরল চিত্তের পরিচয় দিয়াছেন তা ইতর, ভদ্র কেহ কখন ভুলিতে পারিবে না। কলিকাতা হইতে মাঝে মাঝে তাঁহার বন্ধুগণ উত্তরপাড়ায় কোন কাজকর্ম করিবার জন্য রামতনু লাহিড়ী ২৭ বা বেড়াইতে আসিলে তাঁহার সঙ্গে দেখা করিতে যাইতেন। একদিন তাহারা লাহিড়ী মহাশয়ের বাসায় আসিয়া দেখিলেন তিনি বেড়াইতে বাহির হইয়া গিয়াছেন। তাহারা গঙ্গার ধারে বেড়াইতে যাইতেছেন, সন্ধ্যা হইয়াছে এমন সময় দেখিতে পাইলেন লাহিড়ী মহাশয় ফিরিতেছেন। তাঁহারা জিজ্ঞাসা করিলেন “আপনি গঙ্গার ধারে কি জন্য বেড়াইতে গিয়া- ছিলেন। তিনি বলিলেন “সন্ধ্যার সময় গঙ্গার ধারে বেশ ফুরফুরে হাওয়া নয়, তা ছাড়া মাঝিদের সরল আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া তাহাদের সঙ্গে তাহাদের কাজকৰ্ম্ম সম্বন্ধে কথাবার্তা কহিতেছিলাম।” এই সাধাসিধে কথা শুনিয়া বন্ধুরা সকলেই মুগ্ধ হইলেন। যে সময় সিপাহী বিদ্রোহ আরম্ভ হয় তখন রামতনু বাবু বারাসতে ছিলেন। এইখানে অবস্থানকালে তাঁহার পুত্র শরৎকুমারের জন্ম হয়। দেড় বৎসর পরে তিনি কয়েক মাসের জন্য কৃষ্ণনগরে যান। সেখান হইতে কলিকাতার দক্ষিণবর্তী রসাপাগলা নামক স্থানে টিপুসুলতান বংশীয়দিগের শিক্ষা দিবার জন্য স্থাপিত বিদ্যালয়ে তিনি বদলী হইলেন। তিনি প্রথম শ্রেণীতে ভূগােল ও ইতিহাস পড়াইতেন। আজকাল ছেলেরা ইতিহাস বিশেষতঃ ভূগােলের কথা শুনিলেই ভয় পায়। কিন্তু রামতনু বাবুর পড়াইবার এমন এক সুন্দর পদ্ধতি ছিল যে এরূপ কঠিন বিষয়ও ছাত্রেরা সহজে বুঝিতে পারিত। ১৮৬০ খৃঃ অব্দে তিনি তিন মাসের জন্য বরিশালে গমন করিলেন। অতি অল্পকালের জন্য সেখানে থাকিলেও তিনি ছাত্রগণের মনে তাঁহার স্মৃতি রাখিয়া আসিয়াছেন। প্রত্যহ বিদ্যালয়ের সম্মুখস্থ ঘাটের উপর বসিয়া কথােপকথাচ্ছলে নানা তত্ত্ব সম্বন্ধে আলােচনা করিতে তিনি বড় ভালবাসিতেন। শিক্ষাদিবার পদ্ধতি এবং সমেহ ব্যবহার ছাদিগকে তাঁহার প্রতি একান্ত অনুরক্ত করিয়াছিল। শিক্ষা দিবার সময়ে পবিত্রতা, সত্যনিষ্ঠা ও কর্তব্য সম্বন্ধে আলােচনা করা তাহার প্রধান লক্ষ্য ছিল।
২৮ রামতনু লাহিড়ী তাহার শিক্ষাপদ্ধতি এমন সুন্দর ছিল যে তাহা আর বলিবার নহে। তিনি কখনও ছাত্রদের তিরস্কার করিতেন না। এইজন্য অনেক ছাত্র তাঁহাকে আরও বেশী ভয় করিত। ইতিহাস এবং ভূগােল প্রায়ই অনেকে মুখস্থ করিয়া থাকে। পাছে ছাত্রের মুখস্থ করিয়াও লিখিবার সময় ভুল লিখে এইজন্য তিনি তাহাদের খাতায় লিখিবার অভ্যাস করাইতেন। দু’একটি ছাত্র কিছু না লিখিতে পারিলে বা ভুল লিখিলে তিনি তাহাকে প্রথম বা দ্বিতীয় দিন কিছু বলিতেন না। পরে যদি পুনরায় একই রকম ভুল হইত তাহা হইলে তিনি আর তাহার খাতা দেখিতেন না। সরল প্রকৃতি এবং ক্রোধশূন্য শিক্ষকের এই প্রত্যাখ্যানে ছাত্রেরা মনে, বড়ই কষ্ট অনুভব করিত। পরে সেই ছাত্রই আবার দ্বিগুণ উদ্যমে নিজ পাঠ অভ্যাস করিয়া শিক্ষকের ননস্থষ্টি করিতে চেষ্টা করি। তখন রামতনু বাবু আবার সেই বালককে দৃষ্টান্ত স্বরূপে দেখাইয়া অপর ছাত্রগণকে বলিতেন “তােমাদের মনঃসিংহকে উত্তেজিত কর, তাহা হইলেই আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে।” এইরূপে সুশিক্ষার সহিত নীতিবীজ বপন করাই তাঁহার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। ৩২ বৎসর কাজ করিবার পর বায়ান্ন বংসর বয়সে অবসর গ্রহণের জন্য তিনি আবেদন করিলেন। সেই সময়ে মিঃ আলফ্রেড স্মিথ তার উপরিতন কর্মচারী ছিলেন। তিনি আবেদনপত্র পাঠ করিয়া তাহা ডিরেক্টর বাহাদুরের নিকট পাঠাইবার সময় লিখিয়া দিলেন—রামতনু বাবুর ব্যয় কর্তব্যকর্মসম্পাদনে যত্নবান খুব কম লােককেই দেখা যায়। উৎসাহ এবং একাগ্রতার সহিত নীতি শিক্ষা দিবার জন্য কেহই তাহার ন্যায় প্রয়াস করেন নাই। রামতনু বাবুর কৃতীছাত্ৰ ক্ষেত্রমােহন বসু তাঁহার শিক্ষা দিবার পদ্ধতি সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন তাহার কিয়দংশ আমাদের জানা দরকার। তিনি বলেন- রামতনু লাহিড়ী “তিনি প্রত্যেক ছাত্রের নাম, বাড়ী, অভিভাবক কে, তাঁহার অবস্থা কেমন এ সকল সমাচার অনুসন্ধান করিয়া জানিতেন। আহারের পরই মানসিক চিন্তা অস্বাস্থ্যকর এই জন্য স্কুল আরম্ভ হইলেই প্রথমে লিখিবার পদ্ধতি করিয়াছিলেন। আধ ঘণ্টা লেখার পর পড়া আরম্ভ হইত। পড়ার প্রথম অঙ্গ আবৃত্তি। যতক্ষণ না উচ্চারণশুদ্ধি ও যতিচ্ছেদ ঠিক হইত ততক্ষণ আবৃত্তি করিয়া শিখাইতে তিনি ক্রুটী করিতেন না। পাঠের অনেক অংশ তাঁহার আবৃত্তি গুণে সহজে বােধগম্য হইত। আবৃত্তির পর ব্যাখ্যা আরম্ভ হইত। শব্দের প্রতিশব্দ বলিলেই অর্থ হয় না। প্রথমে সহজ ভাষায় অর্থ বলা হইত। তারপর প্রশ্ন দ্বারা লেখকের ভাব ছাত্রদের বুঝাইবার চেষ্টা করিতেন। অপর বিষয় কিছু বলিবার থাকিলে পরে আলােচনা ছাত্রের বুঝিতে পারুক বা না পারুক জোর করিয়া শিখাইতে হইবে ইহা তিনি ভালবাসিতেন না। ছাত্রেরা যাহাতে আপনারাই শিখিবার জন্য চেষ্টা করে এবং বাহাতে শিক্ষার ফল তাহারা কার্যে পরিণত করে এই সকল বিষয়ে তাহার বিশেষ চেষ্টা ছিল। পাঠ্য পুস্তকের অতিরিক্ত বায়রণ, কাউপার, টমসন, বারণ প্রভৃতি কবিগণের কবিতা বাছাই করিয়া পড়িতেন। ছাত্রের হাতে ইংরাজী সাহিত্যের ভিতরে প্রবেশ করিতে পারে সে বিষয়ে তিনি বিশেষ যত্নবান্ ছিলেন। রামতনু বাবুর শিক্ষকতা কাৰ্যে সফলতার আর একটি কারণ ছিল। ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে শিক্ষা দিবার জন্য চেষ্টা করিতেন। তিনি চির জীবনই ছাত্র ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সেও কাহারও নিকট কোন একটি নূতন তথ্য শুনিলে তাহা সযত্নে ডায়েরীতে লিখিয়া রাখিতেন। উচ্চারণশুদ্ধির প্রতি তাঁহার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। সামান্য ব্যতিক্রমও তিনি ধরিতে পারিতেন। প্রথমে তিনি ছাত্রদের মনে কৌতূহল রামতনু লাহিড়ী জন্মাইবার চেষ্টা করিতেন। সেই সঙ্গে নানা কথা বলিয়া সমস্ত বিষয়টা তাহাদের সমক্ষে উপস্থিত করিতেন। তাহারা জিজ্ঞাসু হইলে তাহাদের মুখ হইতেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করিয়া দরকারী বিষয় বাহির করিবার চেষ্টা করিতেন। এইরূপে পাঠ্যগ্রন্থের উন্নতি খুব কম হইলেও যাহা পড়া হইত তাহাতে সকলেই বুৎপত্তি লাভ করিত। শরীররক্ষা বিষয়েও তিনি বিশেষ যত্নবান ছিলেন। ছাত্রদিগকে শিক্ষা দিবার জন্য তিনি নিজেই তাহাদের সহিত ব্যায়াম করিতেন। জন্যই শেষ বয়স পর্যন্ত তাহার শরীর সবল ছিল। তিনি যে সময় বরিশালে অবস্থান করেন তখন সেখানে খুব ম্যালেরিয়া হইতেছিল। লাহিড়ী মহাশয় ঐ রােগে আক্রান্ত হইলেন এবং কিছু দিনের মধ্যেই তাহার স্বাস্থ্য ভঙ্গ হইল। অবসর গ্রহণের পর বায়ুপরিবর্তনের জন্য তিনি ভাগলপুর গমন করিলেন। কিছু দিন পরে তিনি কৃষ্ণনগরে ফিরিয়া আসিলেন এবং জীবনের অবশিষ্ট অংশ কিছু দিন কৃষ্ণনগরে ও কিছু দিন কলিকাতায় থাকিয়া কাটাইয়া দিলেন। পেনসন গ্রহণের পরও তিনি ৩২ বৎসর জীবিত ছিলেন। এই দীর্ঘ জীবনের একমাত্র কারণ এই যে তিনি সকল সময়ে এবং সকল অবস্থাতেই নিয়মিতভাবে কাৰ্য্য করিতেন । সকল সময়েই তিনি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করিয়া প্রাত ভ্রমণে বাহির হইতেন। পাখীদিগের প্রভাতী সঙ্গীত ও সূর্যোদয়ের পূর্বে লাল আভায় চিত্রিত আকাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মেঘ গুলির অপূৰ্ব শােভা তাকে বিশেষ আনন্দিত করিত। সহপাঠী ও বন্ধুদিগের প্রতি লাহিড়ী মহাশয়ের শ্রদ্ধা, ভক্তির অবধি ছিল না। তাহার উত্তরপাড়া অবস্থানকালে কোন এক ব্যক্তি কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক পুত্র লইয়া তাহার নিকট উপস্থিত হন । পত্র দেখিবামাত্র তিনি তাহা মাথার উপরে রাখিয়া বলিলেন, “আমার গুরুর পুত্র”, পরে তাহা পাঠ করিলেন।
রামতনু লাহিড়ী তাঁহার সরলতা ও অপার স্নেহের গুণে সকল ছাত্রই তাঁহাকে বথেষ্ট শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিত। চাকরী হইতে পেন গ্রহণের পর তাঁহার পুরাতন ছাত্রদের মধ্যে অনেকে সকল সময় তাঁহাকে অকুণ্ঠিতচিত্তে অর্থ বা শারীরিক পরিশ্রম দিয়া পুত্ৰাধিক সাহায্য এবং সেবা করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে রাজা প্যারীমােহন মুখােপাধ্যায়ের নাম বিশেষ উল্লেখযােগ্য। তাহার পুত্র নবকুমারের যক্ষ্মারােগ হইলে রামগােপাল ঘােষের বাসায় থাকিয়াই তাহার চিকিৎসা চলিতে থাকে। পরে নবকুমার আরােগ্য না হওয়াতে ইনিই চেষ্টা করিয়া এবং অর্থ সাহায্য করিয়া তাহাকে নানাস্থানে বায়ুপরিবর্তনের জন্য পাঠান। লাহিড়ী মহাশয়ের অপর পুত্র শরৎকুমার প্রথমে কেরাণীগিরি কাৰ্য্য করিতে থাকেন। কিন্তু তাহা সুবিধাজনক নহে বুঝিয়া চাকরী ছাড়িয়া দেন এবং স্বাধীনভাবে বই বিক্রয়ের কাৰ্য্য আরম্ভ করেন। প্যারীমােহন বাবু এই সময়ে যে পরিমাণে পৃষ্ঠপােষকতা করিয়াছেন তাহা না করিলে তিনি কখনই ব্যবসায়ে উন্নতি করিতে পারিতেন না। তাঁহার সাধুতার গুণে শুধু যে নিজ পরিচিত আত্মীয় বন্ধুগণ মুগ্ধ হইয়াছিলেন তাহা নহে, তিনি যখন যেখানে গিয়াছেন কি ইতর কি ভদ্র সকলেই তাঁহাকে সমান ভাবে শ্রদ্ধা করিত। এক সময় শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় কৃষ্ণনগরের পাশের কোন গ্রামের ভিতর দিয়া যাইতেছিলেন। হঠাৎ তাঁহার মনে কি এক কৌতূহল উপস্থিত হইল। তিনি কিছুদূর গিয়া দেখিতে পাইলেন জনকয়েক কৃষক লাঙ্গল কঁাধে করিয়া আসিতেছে। তিনি কিছুক্ষণ দাড়াইয়া থাকিলেন। পরে তাহার কাছে আসিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন “তােমরা কি কৃষ্ণনগরের লােক ?” উত্তর হইল “আজ্ঞে হাঁ, কৃষ্ণনগরেরই বলিতে হইবে, এই পাশের গ্রামের।” শান্ত্রীমহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন“তােমরা রামতনু লাহিড়ীকে চেন?”
রামতনু লাহিড়ী তাহারা বলিল—“তাঁকে কে না চেনে?” পুনরায় প্রশ্ন হইল—“তিনি কেমন মানুষ? উত্তর হইল-“তাঁর কথা কি আর বলতে হয় মহাশয়। তিনি কি মানুষ? তিনি দেবতা। প্রশ্ন হইল—“সে কি হে! পৈতা ফেলা লােক, হাঁস মুরগী খান, দেবতা কি রকম।” অমনি তাহারা ফিরিয়া দাড়াইল—“কে গাে মশাই, আপনি বােধ হয় এদেশের লােক নন।” “না বাপু, আমি এদেশের লােক নই।” উত্তর “ও তাইতে, আপনি যে সব বল্লেন ও সব অন্যের পক্ষে করা অন্যায়, ওঁর পক্ষে দোষ নয়, উনি যা করেন তাই শশাভা পায়।” বলা বাহুল্য যে আত্মীয় বন্ধুগণের সুখ্যাতি হইতে সামান্য ক্লকের এই মতের মূল্য অনেক বেশী। ভাগ্যবান রামতনু যেখানেই গিয়াছেন সেইখানেই এই সুখ্যাতি পাইয়াছেন। রামতনু কিরূপ সরলচে লােক ছিলেন তাই একটি ঘটনা হইতে বেশ বুঝা যাইবে। একদিন তাঁহার স্ত্রী বলিলেন, সকলেই গহনা পরিয়া বেড়ায়, আমার কিছুই নাই। কাহারও বাড়ীতে যেতে হলে খালি গায়ে যাওয়া যায় না, পাঁচ জনে পাঁচ কথা বলে। আমাকে এক জোড়া বালা গড়াইয়া দাও।” রামতনু দেখিলেন কথাটা ঠিক। পরদিনই গহনার ফরমায়েস হইয়া গেল। সপ্তাহকাল পরে তাঁহার বন্ধু রামগােপাল বালা আনিয়া দিলে তিনি তাহার গৃহিণীকে দিলেন। তিনি তাহা মহা আনন্দের সহিত পরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। দুইদিন পরে পাড়ার স্ত্রীলােকেরা বালার মধ্যে কোন গােলমাল আছে সন্দেহ করিয়া তাহা গিল্টি করা বলাতে তিনি তাহা স্বামীকে জানাইলেন, রামতনু তা কাণেই তুলিলেন না। বলিলেন “রামগােপাল দিয়াছেন, রামতনু লাহিড়ী উহা কি পিতলের হইতে পারে।” পরম বন্ধু রামগােপাল হাতে করিয়া দিয়াছেন বলিয়া তাঁহার মনে কোন সন্দেহ স্থান পাইল না। পুনরায় পাড়ার স্ত্রীলােকদের কথা রামতনু বাবু তাঁহার স্ত্রীর নিকট শুনিয়া নিতান্ত অনিচ্ছার সহিত রামগােপালকে ঐ কথা বলিলেন। তিনিও কৌতুক এতদিনে ধরা পড়িয়াছে দেখিয়া হাসিয়া উঠিলেন। তৎক্ষণাৎ সােণার বালা আনা হইল এবং লাহিড়ী মহাশয় তাহা স্ত্রীকে দিলেন। নিতান্ত সরল প্রকৃতির এবং শান্ত স্বভাবের হইলেও রামতনুবাবুর থেষ্ট আত্মসম্মানজ্ঞান ছিল। বিদেশে অবস্থানকালে তিনি কোন এক কাজের জন্য একজন উচ্চপদের সাহেবের বাড়ী গিয়াছিলেন। সেইখানে কথায় কথায় ক্রমে হিন্দুজাতি সম্বন্ধে কথা উঠিলে, উক্ত সাহেবের একজন বন্ধু বাঙ্গালী জাতি সম্বন্ধে নিন্দাজনক দু'একটি কথা বলেন। লাহিড়ী মহাশয় বিনাকারণে এই নিন্দা শুনিয়া সহ করিতে পারিলেন না। তিনিও ঐ সাহেবকে রাগিয়া দু চারি কথা শুনাইয়া দেন। পরে উচ্চপদস্থ সাহেবটী দুজনকে বুঝাইয়া বিবাদ মিটাইয়া দেন। এই ব্যাপারের বহুদিন পরে রামতনু বাবু একদিন রাস্তা দিয়া যাইতে ছিলেন, এমন সময় একটি সাহেব আসিয়া তাহাকে নমস্কার করিয়া বলিল “কি মাশয়, আমায় চিনিতে পারেন। অনেক দিন আগের দেখা শুনা কাজেই লাহিড়ী মহাশয় প্রথমে চিনিতে পারিলেন না। পরে সাহেবটী পরিচয় দিলে তিনি চিনিতে পারিলেন যে, ইনিই পূৰ্ব্বে তাহার নিকট নিন্দা করিয়া- ছিলেন। তখন উভয়ে কিয়ৎক্ষণ ধরিয়া আলাপ পরিচয় হইল । পুরাতন দিনের কথাবার্তা হইবার পর উভয়ে বন্ধুভাবে নমস্কার করিয়া চলিয়া গেলেন। রামতনু বাবু সাহেবটীর ব্যবহারে খুব আপ্যায়িত হইলেন। তিনি অত্যন্ত সত্যপ্রিয় লােক ছিলেন, যাহা কাজে করিব তাহা OS রামতনু লাহিড়ী অপরের কাছহইতে লুকাইয়া রাখিব ইহা তিনি ভালবাসিতেন না। আবার তিনি যাহা ভালবাসিতেন না তাহা স্পষ্টই বলিতেন, লােকে নিন্দা করিবে এই ভয়ে তাহা কখন লুকাইয়া রাখিতেন না। এক সময়ে তাহার একটি বন্ধুর বাটীতে বসিয়া গল্প হইতেছে, এমন সময় চাকর তাহার বন্ধুর নিকট হুক সাজিয়া লইয়া আসিল। বন্ধু বয়সে ছােট ছিলেন এবং লাহিড়ী মহাশয়কে বিশেষ ভক্তি করিতেন। সেই জন্য তিনি চাকরকে তামাক লইয়া যাইবার জন্য ইসারা করিলেন। লাহিড়ী মহাশয় তাহা বুঝিতে পারিয়া বলিলেন “আমাকে দেখে ওটা লুকালে কেন ? যদি ভাল বুঝ তবে সাক্ষাতে খাও। আর যদি তা না হয় তবে একেবারে ছাড়িয়া দাও। লুকানর দরকার কি ?” ভগবানের নামকীর্তন শুনিলে ভক্তিতে তাহার হৃদয় উথলিয়। উঠি, তিনি অনেক সময় কঁদিয়া ফেলিতেন । তিনি ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে গবর্ণমেন্ট কর্তৃক গােবরডাঙ্গার জমীদার বাবুদের নাবালক পুত্রের অভিভাবক হইয়া সেখানে গমন করিলেন। তাঁহার আহ্বানে যাঁহারা কখন উপাসনায় বােগ দেন নাই এমন অনেক লােক ও তাহার সহিত উপাসনা করিতে আসিতেন। তিনি নিজে কোনরূপ বিচার না করিয়া অবিচ্ছিন্নভাবে সকলের সহিত মিশিতেন। তিনি যে কোন দলাদলি ভালবাসিতেন না তাহা উল্লেখ করা হইয়াছে। ভগবানের নাম কীৰ্ত্তন করিবার সময় দলাদলি বা অভিমান ত্যাগ করা উচিত ইহাই তাহার বিশ্বাস ছিল। তিনি বলিতেন “পবিত্র নামােচ্চারণের পূর্বেই পবিত্রতা সৰ্ব্বতােভাবে পালন করিতে হইবে। ঈশ্বরের নাম বৃথা লইও না।” এই উপদেশ তিনি এরূপভাবে পালন করিতেন যে, যখন তখন ঈশ্বরের নাম শুনিতে চাহিতেন না। এক- সময় কোন একজন সুগায়ককে একটি গান করিতে বলিবামাত্রই তিনি গুণ গুণ সুর আরম্ভ করিলেন। রামতনু বাবু তখন চা খাইতেছিলেন। তিনি মহা অস্থির হইয়া বলিয়া উঠিলেন “মশাই একটু অপেক্ষা করুন।
রামতনু লাহিড়ী আমি এখন নাম শুনিবার অবস্থাতে নাই।” এই বলিয়া তিনি গললগ্নী- কতবাসে উপবেশন করিয়া বলিলেন “এখন গান করুন।” একদিন তিনি একটি বন্ধুর সহিত গঙ্গার ধার হইতে বেড়াইয়া ফিরিবার সময় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন একজন সাধুপুরুষকে দেখে আজকার দিনটা সার্থক করিবে ?” বন্ধু বলিলেন “এর চেয়ে সৌভাগ্য আর কি আছে।” পরে উভয়ে একটি পাদরীর নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাকে এরূপভাবে আলিঙ্গন করিলেন ও শ্রদ্ধা, ভক্তি প্রদর্শন করিলেন যে তাহা দেখিয়া তাহার বন্ধু একেবারে মুগ্ধ হইয়া গেলেন। তিনি নিজে যেমন সাধু ছিলেন, অকৃত্রিম সাধুতা দেখিলে অকপটে সেইরূপ শ্রদ্ধা ভক্তিও দেখাইতেন। কিন্তু অসাধুতা তিনি মােটেই দেখিতে পারিতেন না। অনেক সময় শাক বা তরিতরকারী বিক্রয়কারিণীরা তাঁহার বাটীতে গৃহিণীর নিকট বিক্রয় করিতে যাইত। রামতনু বাবু তাহাদের মধ্যে ও একজনকে খারাপ লােক বলিয়া জানিতেন, সেই জন্য তিনি প্রায়ই তাহাদের আসিতে বারণ করিয়া দিতেন। গৃহিণী বলিতেন “ওরা খারাপ তাতে কি হয়েছে, আমিত খালি ওর কাছে কিনিব বইত নয়” ? রামতনু তাহাতে উত্তর দিতেন “ওরূপ খারাপ লােকের সহিত কোন সংস্পর্শ রাখা উচিত নয়।” পরিচারিকার প্রায়ই ছােট ছেলে কঁদিলে বলিত “চুপ কর সন্দেশ আনিয়া দিব।” রামতনু একদিন ঐ কথা শুনিয়া তাহাকে বলি- লেন “সন্দেশ দিব যখন বলিয়াছ তখন এখনই আনিয়া দিতে হইবে। তাহ না হইলে মিথ্যা কথা হইবে। এইরূপেই ছেলেরা মিথ্যা শিখিয়া থাকে।” এইরূপে মুখে একরূপ ভাব মনে অন্যরূপ ইহা তিনি দেখিতে পারিতেন না। যথার্থ সাধুলােক দেখিলে জাতিবিচার করিতেন না। তাহার কাছে হিন্দু মুসলমান বিচার ছিল না, সকল সম্প্রদায়ের মধ্যেই তঁাহার বন্ধু ছিল। সকল শ্রেণীর লােককেই তিনি ভালবাসিতেন ; ইহাই তাহার চরিত্রের মহত্ত্ব।
রামতনু লাহিড়ী ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে কৃষ্ণনগরে তাহার তৃতীয় পুত্র বিনয়কুমারের জন্ম হয়। ইহার কিছুদিন পরেই জনকয়েক ব্রাহ্ম, স্ত্রীলােকদিগের শিক্ষা দেওয়া প্রভৃতি বিষয়ের আন্দোলন করেন। রামতনু বাবু মেয়েদের লেখাপড়া শেখান ভালবাসিতেন। তাহারা যে মূর্থ হইয়া থাকিবে ইহা তিনি পছন্দ করিতেন না। মেয়েদের জন্য প্রথম স্কুল হইলেই রামতনু নিজ কন্যা ইন্দুমতীকে তাহাতে ভর্তি করিয়া দিলেন। এইরূপে নিশ্চিন্তে অধিক দিন বাস করা তাহার ভাগ্যে ঘটিল না। সূৰ্য্য উঠিলে তাহা পুনরায় অস্তগিয়া থাকে, আলােকের পর অন্ধকার হয়, এগুলি যেমন স্বাভাবিক নিয়ম, সেইরূপ মানুষের জীবনেও সুখের পর দুঃখ এবং দুঃখের পর সুখ হইয়া থাকে। রামতনু বাবুর জীবনে যদিও প্রকৃতপক্ষে সুখ ভােগ করা খুব কম দেখিয়াছি, তথাপি তিনি যে শান্তিতে বাস করিতেছিলেন ইহা বলিলে কোন ভুল হইবে না। এখন হইতে দুঃখের পালা আসিল। তার পুত্র নবকুমার এই সময়ে মেডিকেল কলেজে পড়িতেন। ছেলেদের মধ্যে প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায় যে, পরীক্ষা নিকট হইলেই তাহারা খুব বেশী পরিশ্রম করিয়া থাকে। তারা বুঝে না যে প্রত্যহ নিয়ম করিয়া পরিশ্রম করিয়া, শরীরকে কিছু ক্ষণের জন্য বিশ্রাম দেওয়া দরকার। মানুষের শরীরও যন্ত্রবিশেষের ন্যায়। উপযুক্ত বিশ্রাম এবং সময়মত আর বিহারের অভাবে যে কাৰ্যকরী শক্তি নষ্ট হয় ইহা নবকুমার ভুলিয়া গিয়া পরিশ্রম করিতে লাগিলেন। ফলে তিনি রােগে আক্রান্ত হইলেন। ক্রমে তাহা যক্ষ্মা রােগে দাড়াইল। লাহিড়ী মহাশয়কে চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে কলিকাতায় আসিতে হইল। কলিকাতায় রােগের উপশম না হওয়ায় তাঁকে ভাগলপুর পাঠান হইল । কিছুদিন সেখানে থাকিবার পর নবকুমার একটু আরাম হইলেন। লাহিড়ী মহাশয়ের প্রাণে আশার সঞ্চার হইল। চলিত কথায় বলে বিপদ কখন একাকী আসে না। এই রামতনু লাহিড়ী সময়কার লাহিড়ী মহাশয়ের জীবনের ইতিহাসও ঠিক সেইরূপ। একেত তিনি পুত্রের অসুস্থতায় বিশেষ চিন্তান্বিত। তদুপরি তিনি সংবাদ পাইলেন তাঁহার জামাতা কি কারণে জীবনে বীতস্পৃহ হইয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন। লাহিড়ী পরিবার একেবারে শশাকে অভিভূত হইয়া পড়িল। তাঁহার বিধবা কন্যা লীলাবতী ছয় বৎসরের পুত্রকে লইয়া পিতার আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। কিছুদিন ভাল থাকিবার পর নবকুমারের পীড়া পুনরায় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল। লাহিড়ী মহাশয়ের কন্যা ইন্দুমতী প্রাণপণে ভ্রাতার সেবা করিতে লাগিলেন। আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া দিবারাত্র রােগীর পার্শ্বে বসিয়া থাকার জন্য তাঁহারও শরীর খারাপ হইতে লাগিল, দু’চার দিন পরে দেখা গেল তাহারও বক্ষ্মারােগ হইয়াছে। এদিকে নবকুমারের অসুখ কিছুমাত্র আরােগ্য হইল না। লাহিড়ী মহাশয় যেন পাগলের মত হইয়া গেলেন ; কি যে করিবেন তাহা কিছু ভাবিয়া পাইলেন না। তাঁহার বন্ধুরা এই সময়ে চেষ্টা করিয়া রােগীদিগকে আরায় পাঠাইলেন। সেখানে গিয়া তাঁহার কনিষ্ঠ কন্যার খুব প্রবল জ্বর হইল এবং কয়েকদিন পরে পিতার ক্রোড়ে মস্তক রাখিয়া তাহার আশীৰ্বাদ গ্রহণ করিতে করিতে তিনি প্রাণত্যাগ করলেন। ইন্দুমতীর জীবনেরও কোন আশা রহিল না, তিনিও তাহার পরেই মারা গেলেন। ভগিনীর মৃত্যুতে নবকুমার বিশেষ আঘাত পাইলেন। তাহার সেবা করিতে গিয়া ভগিনী রােগাক্রান্ত হইয়া মারা গিয়াছেন, ইহা অনবরত তাহার মনে হওয়াতে তিনিও জীবনে হতাশ হইলেন। পিতামাতার সমস্ত চেষ্টা বিফল করিয়া ১৮১৮ খৃঃ অব্দে তাহারও মৃত্যু হইল। লাহিড়ী মহাশয়ের এই সময়ের অবস্থা আলােচনা করিলে বড় বিস্মিত হইতে হয়। তিনি একবারও কঁদিলেন না। এতগুলি প্রিয়তম পুত্র কন্যার মৃতুতেও তিনি বিচলিত হইলেন না। এইরূপ অবস্থায় তঁাহার ৩৮ রামতনু লাহিড়ী ন্যায় ধীরভাবে কে শােক সহ্য করিতে পারে ? শুধু তাহাই নহে, গৃহিণী শােক কাতর হইয়া কাদিলে “তিনি তাকে সান্ত্বনা করিয়া বলিতেন “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও যে তিনি উহাদের যন্ত্রণার হাত হইতে উদ্ধার করিয়া নিজের মঙ্গলময় ক্রোড়ে তুলিয়া লইয়াছেন।” এই সময় কোন এক বন্ধুকে পত্র লিখিবার সময় তিনি বলিলেন “তুমি শুনিলে সুখী হইবে ইন্দুমতীর রােগের উপশম হইয়াছে।” কি ধীরতা! আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে তিনিই আবার কারও সামান্য ক্লেশ দেখিলে দুঃখে অভিভূত হইতেন। তাহার এই স্থির, সোমা ভাব দেখিলে বােধ হয় যেন তিনি বলিতেছেন- “ওহে মৃতু তুমি মােরে কি দেখাও ভয় ও ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়”। বাহিরের অবস্থা এরূপ হইলেও ভিতরে যে প্রবল ঝটিকা বহিতে- ছিল তাহা অস্বীকার করিতে পারা যায় না। শত শত গৃহকাৰ্যের মধ্যে পুত্র কন্যার দুঃখময় স্মৃতি ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিত। তদুপরি গৃহিণীর করুন ক্রন্দন। অগত্যা বাধ্য হইয়া তাহাকে কলিকাতায় আসিতে হইল। তাহার সেই সময়কার আর মাত্র পেনসনের টাকা কয়টি, তিনি একবার ভাবিয়াও দেখিলেন না যে এই অল্প আয়ে কি করিয়া খরচ চালাইবেন। এক মাত্র করুণাময় ঈশ্বরের করুণায় নির্ভর করিয়া তিনি চলিয়া আসিলেন। যাহা হউক পুত্ৰাধিক ছাত্রগণের এবং প্রিয়বন্ধু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সদাশয়তায় হাকে একদিনের জন্য ও সাংসারিক অসচ্ছলতার কথা ভাবিতে হইল না। তিনি আশ্চৰ্য্য হইয়া গেলেন যে এতগুলি লােক একান্ত মনে তাঁহার কষ্ট দূর করিবার জন্য চেষ্টিত। এই সকল বিপদের মধ্যেও তার পুত্র শরৎকুমার প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া এক, এ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন। কিন্তু তাহাকে সে সঙ্কল্প ত্যাগ করিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কলেজে লাইব্রেরি স্থানের কাজ গ্রহণ করিতে হইল।পাচ বৎসর পরে তিনি স্বাধীন ভাবে রামতনু লাহিড়ী পুস্তকের ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। সামান্য অবস্থা হইতেও যে কেবল মাত্র অদম্য উদ্যম, অধ্যবসায় ও সততার গুণে জীবনে উন্নতি করা সম্ভবপর তাহার জ্বলন্ত দৃষ্টান্তরূপে তাঁহার সুবৃহৎ অট্টালিকা ও বহুকর্মচারী পরিচালিত পুস্তকের দোকান দণ্ডামান থাকিয়া যেন অঙ্গুলী নির্দেশ করিয়া সকলকে বলিয়া দিতেছে—“কর কৰ্ম্ম হবে জয়”। এই সময়ে ব্যবসায়ের উন্নতির সহিত সাংসারিক ক্লেশ কম হইল বটে কিন্তু পুত্রকন-বিয়ােগ দুঃখে কাতর গঙ্গামণি দেবী এ সৌভাগ্য অধিক দিন ভােগ করিতে পাইলেন না। নিরহৃদয় কাল তাহার এই সৌভাগ্যোদয়ে হিংসাপরায়ণ হইয়াই যেন তাহাকে লইয়া চলিয়া গেল। এই শেষ জীবনে লাহিড়ী মহাশয়কে আরও বেশী শােক পাইতে হইয়াছিল। তাহর পুত্ৰাধিক প্রিয়ছাত্র কালীচরণ—যাহার সাহায্য এবং ভরসায় রামতনু বাবু তাঁহার পুত্র কন্যার রীতিমত চিকিৎসা করাইতে পারিয়াছিলেন, বিনি সকল সময়ে পিতার অপেক্ষা অধিক ভক্তির সহিত তাহার অসুবিধা দূর করিবার জন্য সর্বদ। লালায়িত থাকিতেন, যিনি লাহিড়ী মহাশয়ের সামান্য রকম কষ্ট দূর করতে সক্ষম হইলে নিজেকে সুখী মনে করিতেন, সেই পরমবন্ধু কালীচরণ পরােলােক গমন করিলেন। তাহার উপর আবার শুধু লাহিড়ী মহাশয়ের উপকারী নহেন, সমগ্র বাঙ্গলা দেশের দীনদুঃখীর পরম আত্মীয় দয়ার সাগর, বিদ্যাসাগর মহাশয়েরও মৃত্যু হইল। তাহাদের শােক লাহিড়ী মহাশয়কে একেবারে বিচলিত করিল। নিজের প্রিয় পুত্র এবং দুইটা কন্যার শােক তিনি এক রকম সহ্য করিয়াছিলেন, কিন্তু নিজ পত্নী এবং সকল দুঃখকষ্টের মধ্যে সহায় এবং পরামর্শদাতা দুই বন্ধুর বিয়ােগ তিনি আর সহ্য করিতে পারিলেন না। হাজার ধৈর্য্যশীল হইলেও মানুষ আর কত সহ্য করিতে পারে? একটি নয়, দুইটী নয়, ছয়টী প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় লােকের মৃত্যু হওয়াতে লাহিড়ী মহাশয়ের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল।
৪ ০ রামতনু লাহিড়ী লাহিড়ী মহাশয় যেন এখন স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন যে এইবার তঁাহারও শেষ দিন নিকট হইয়া আসিতেছে। একজন ভক্ত কবি গাহিয়াছেন “শেষের সে দিন মন কররে স্মরণ, ভবধাম যবে ছাড়িবে।” তিনি যেন তাহা মনে করিয়া দিবারাত্র ভগবানের নাম স্মরণ করিয়া কাটাইতে লাগিলেন। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দের প্রথমে একদিন তিনি অসাবধানে খাট হইতে পড়িয়া যাওয়ায় তাহার পা ভাঙ্গিয়া গেল। অনেক দিন ঔষধ দেওয়া হইল, পা আর কিছুতে সারিল না। ক্রমে মৃত্যুর দিন নিকট হইলে তিনি এক দিন তার বন্ধুদের ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাঁহারা সকলে উপস্থিত হইলে তিনি তাদের একটি গান গাহিতে বলিলেন। তিনি কথা কয়েকটা উচ্চারণ করিলেন বটে কিন্তু তাহার ঠোঁট নড়িল মাত্র, স্বর বাহির হইল না। তাহার একজন বন্ধু প্রায়ই রামতনু বাবুকে একটি গান করিতে শুনিতেন। সেই গানটী তিনি বড় ভালবাসিতেন। ইঙ্গিত বুঝিয়া তিনি গাহিতে আরম্ভ করিলেন “মলিন পঙ্কিল মনে কেমনে ডাকিব তােমায়।” দেখা গেল যেন লাহিড়ী মহাশয়ও সেই কথা কয়টি উচ্চারণ করিতে চেষ্টা করিতেছেন। এইরূপে ভগবানকে ডাকিতে ডাকিতে ১৩ই আগষ্ট তারিখে তাহার জীবনলীলা শেষ হইল। সকলেই বুঝিল দেশের একজন আদর্শ পুরুষ তাদের কাছ হইতে বিদায় লইলেন। এইরূপে অনেক দুঃখ, কষ্ট ভােগের পর রামতনু বাবুর মৃত্যু হইল। সাধারণ হিসাবে আমরা সকলেই বলিয়া থাকি যে সুখের পর দুঃখ এবং দুঃখের পর সুখ হইয়া থাকে। লাহিড়ী মহাশয়ের জীবন আলােচনা করিয়া আমরা দেখিয়াছি যে তাহাকে সকল সময়েই কোন না কোন অভাবের মধ্যে বাস করিতে হইয়াছে। রামতনু বাবুর শেষ জীবনে যে দুঃখের মাত্রা খুব বেশী হইয়াছিল ইহা স্পষ্টই দেখিতে পাওয়া যায়। ছেলে বেলায় তাহাকে লেখা পড়া প্রভৃতি করিবার জন্য অনেক অসুবিধা এবং অনেক কষ্ট সহ্য করিতে হইয়াছে ইহাও আমরা দেখিয়াছি, রামতনু লাহিড়ী ৪১ মধ্য বয়সে নিজে অর্থ রােজগার করলেও তাঁহাকে নানা রকম সামাজিক নির্যাতন পাইতে হইয়াছে। এক কথায় বলিতে গেলে জীবনের প্রায় কোন অংশেই সুখ ভােগ করা তাহার ভাগ্যে লটে গভীর দুঃখ পতা এবং পিতামহের নিকট হইতে প্রাপ্ত গভীর ধর্মবিশ্বাস বরাবর তার মধ্যে সমান ভাবে বৰ্তমান ছিল। এব° শােকের মধ্যেও এই ধৰ্ম্মবিশ্বাস হইতে তিনি কখন বিচলিত হন নাই । জীবনে অনেক বড় বড় কাজ করিয়া যাওয়া তাহার ভাগ্যে ঘটে অল্প হিনার শিক্ষকতা করিয়া তিনি যে কৰ্তব্য কর্মে ভক্তি, সত্যপ্রিয়ত। এবং পরােপকার প্রভৃতি সদগুণের দৃষ্টান্ত রাখিয়া গিয়াছেন হাতে বিস্মিত হইতে হয় । শনে তাহার সুখ্যাতি করুক বা কাহারও কাছে নাম জাহির কর। তিনি পছন্দ করতেন না। তাহার বন্ধুদের মধ্যে অনেকে সভা সমিতি করতেন; তিনিও নে, হাতে যােগ দিতেন না তাহা নহে। কিন্তু কেহ কখনও তাকে দশ জনের সামনে নাম কিনিবার জন্য বক্তৃতা দিতে দেখে নাই। রাহ্ম হইলেও তান কখন অপর ধম্মের নিন্দা করিতেন না। তার বন্ধুদের কাহারও এরূপ দোষ দেখিলে তিনি তাহাদের বারণ করতেন। তিনি বলতেন “বে, যে ভাবেই ডাকুক না ভগবানের উপর বিশাস পাকিলেই ইল। অপর যদি ভাবে যে অন্য রকমে ডাকিলে তাহাকে পাওয়া যাইবে তবে তাহাকে সেই রূপেই ডাকিতে দাও, বাধা দিও না।” ব্রহ্মদিগের মধ্যে কখন কোন দোষ দেখিলে তিনি তাহা শােধরাইবার চেষ্টা করিতেন। এইরূপ সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করিয়াও লাহিড়ী মহাশয়ের
৪২
রামতনু লাহিড়ী
নাম স্মরণীয় কি জন্য? ইহার এক মাত্র কারণ তিনি চরিত্রবান্ পুরুষ
ছিলেন। এই চরিত্রবলেই তিনি আপামরসাধারণ সকলের শ্রদ্ধা এবং
ভক্তির পাত্র ছিলেন। কৰ্ত্তব্য, ধৰ্ম্ম এবং নীতি শিক্ষা দেওয়া তাহার
জীবনের প্রধান কার্য ছিল।
সম্পূর্ণ
No text on this page.
তিন-আনা সংস্করণ কল্পতরু গ্রন্থাবলী ১। বিদ্যাসাগর ২। মাইকেল মধুসূদন ৩। বঙ্কিমচন্দ্র রাজা রামমােহন রায় ৪। ৬। ঠাকুর রামকৃষ্ণ ৭। নেপােলিয়ান রমেশচন্দ্র দত্ত ১৬। লর্ড কিনার ১৭। বিবেকানন্দ ১৮। ভূদেব ১৯। জেমসেজী টাটা ২০। গােত্থলে ২১। দ্বিজেন্দ্র লাল ২২। হেমচন্দ্র ২৩। ডেভিড় হেয়ার ২৪। রামতনু লাহিড়ী ২৫। লােকমান্য তিলক ২৬। শিবনাথ শাস্ত্রী ২৭। বিসমার্ক ২৮। গারফিল্ড ২৯। ম্যাটিসিনি এব্রাহাম লিঙ্কলন রামদুলাল সরকার ১০। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ১১। কৃষ্ণদাস পাল ১২। হাজিমহম্মদ মহসীন ১৩। আনন্দমােহন বসু ১৪। জর্জ ওয়াশিংটন ১৫। প্যারীচরণ সরকার ভট্টাচাৰ্য্য এণ্ড সন ৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা । ময়মনসিংহ লাইব্রেরী, ময়মনসিংহ। পাটুয়াটুলী—ঢাকা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.