Bally Sadharan Granthagar
Swapabani
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
উপহার।
tipT.
LY.
ন: উপন্যাস-সহিতে। এ গ
ভারত-বিত উপন্যাস লেখিকা
উপন্যাস-রাজ্যের পাটরাণী
শ্ৰীমতী ইন্দিরা দেবী প্রণীত
পরাজিতা
( অম'দের আ• -"র একবিংশ, সমাস)
“পরাজিতা" -কি কি কি? উঃ বিঃ বিন পানে
পরিণত হয়, তার বিচ্ছ: গর! •, 'য় সে
ক| ক মহাশ নেন।
সব দ্বন্দ সব গণ্ডগােল ; --নিমেষে মিটিয়া গেল । আমাদের ১, একটকা সংস্করণ উপন্যাস-সিরিজে ‘অনুরূপা দেবী। নব বঙ্গভাষা-প্র বরেণ্য। বঙ্গমহিলা প্রাচবঙ্গের জ্যোতির্ময় সাহিত্য- সাহিত-কল্যাণী – সাহিত্য-কলাবত'-মন্ত্রঃপুত কলমে হার অদ্ভুত সাদুকরী শক্তি ; ‘মন্ত্র শক্তি প্রণেত্ব সেই-সৎসাহিত মহ-মহিমা-মণ্ডিত উপন্যাল মহারাজী শ্ৰীমতী অনুরূপা দেবী প্রণীত ঐন্দ্রজালকি উপন্যাস মাষ্টারমশাই আমাদের ১১ একটাকা সংস্করণ উপন্যাস-সিরিজের মুখােজ্জল করিবার জন্য সাজসজ্জা করিতেছেন। সকলে সাদরে আহ্বান করুন।
সাহিত্য-গগনের কোন্ কোন্ উজ্জ্বল নক্ষত্র কমলিনী-সাহিত্য- মন্দিরের কীৰ্ত্তিজা আলােকিত করিতেছেন—তাহাই দেখুন। শ্রীযুক্ত। স্বর্ণকুমারী দেবী। শ্ৰীযুক্ত অনুরূপা দেবী। শ্ৰীযুক্ত নিরুপমা দেবী। শ্রীযুক্ত ইন্দিরা দেবী। শ্রীযুক্ত শৈলবালা ঘোষজায়া। শ্ৰীযুক্তা সরলীবালা বসু। শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। দুর্গাদাস লাহিড়ী। নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য বিদ্যাভূষণ। হরিসাধন মুখােপাধ্যায়। ', চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বি-এ। হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘােষ, বি-এ। দীনেন্দ্র কুমার রায়। কালী প্রসন্ন দাশ গুপ্ত, এ-:| সৌরীন্দ্রমােহম মুখােপাধ্যায়, বি এন । নবকৃষ্ণ ঘােষ, বি-এ। হেমেন্দ্রকুমার রায়। বিভূতিভূষণ ভট্ট, বি-এল। ক্ষেত্রমােহন ঘােষ। ব্রজমােহন দাস। 3, প্রফুল্লচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়। শরৎচন্দ্র পাল, পরিচালক। প্রতি মাসেই সাহিত্য-জগরেণ্য উল্লিখিত সুলেখক লেখিকা- বৃন্দের একপানি করিয়া নােম উপন্যাস-পূর্বের মতই আপনা- দের হাতে দিতে পারব। অধিকারী গ্রীগোষ্ঠবিহারী দত্ত, শরৎচন্দ্র পাল। কমলিনী-মাহিত্য-মন্দির । . - প্রমাণ। ‘বিচিত্রার পর ‘স্বপ্নবাণীর প্রকাশ--সে আজ কত দিনের ব্যবধান ! কিন্তু কি করিব–উপায় ছিল না। ‘স্বপ্নবাণী বিজ্ঞাপিত এই বার পর যখনই শুনিলাম, সাহিত্য-সম্রাজ্ঞী স্বর্ণকুমারী দেবী মহােদয় শয্যাশ্রয় লইয়াছেন, উৎকণ্ঠা-ব্যাকুল হৃদয় লইয়া সেই মুহুর্তে ছুটিয়া গিয়া সাহিত্য-দেবীর পদ প্রান্তে উপনীত হইলাম। বই ছাপা ত দূরের কথা; সে মূর্তি দর্শনে সেই সময় বাস্তবিকই শিহরিয়া উঠিয়াছিলাম । তাহার পর তুহিন-শীতল নিস্পন্দ বক্ষে প্রত্যাবর্তন করিয়া স্বপ্নবাণী' প্রকাশ সম্বন্ধে এক রূপ উদাসীন ছিলাম বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। মৃতু বিভীষিকা-দুষ্ট। পথ ভ্রান্ত দিশাহার। পান্থ-দূরাগত করে জীবন্ত শব্দ-ঝঙ্কা? শ্রবণে যেমন পুনর্জবন প্রাপ্তির আশ প্রাপ্ত হয়, তেমনি এক চিন্তামগ্ন স্তব্ধ সন্ধ্যায় স্বপ্নবাণী সদৃশ সাহিত্য- সম্রাজ্ঞীর অভয় পত্রবাণী’ সম্বল করিয়া আমরা পুনরায় সাহিত্য- সম্রাজ্ঞী-ভবনে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, বাংলার বীণাপাণি শয্যাশ ছাড়িয়া উঠিয়া বসিয়াছেন । আমাদের দেয়াই বীণা বিনিন্দিত কম-কণ্ঠে অমরার অমিয়া ঢালিয়া, বাংলার মাতৃময়ী ব্রত পারিণী সাহিত্য-জননী কহিলেন, “এসেছ ! আহা, বড় লােকসান হ'ল তােমাদের । { করি ব, শু শু : তোমাদের পূফ, দেখেছি, নিজের হাতে লিখ, একটুকু শেষ করে দে, এন ও এখন পাইনি-এন : পথ্য
পাইনি!-তবুও আজ লেখা শেষ করে দেবাে তােমাদের।
মুখে বলি আমি, লিখে যদি নিতে পারে তােমরা—”
ওঃ, গ্রাহক মনােরঞ্জনাৰ্থে কি কষ্টই না জানি দেবীকে সে দিন
দিয়া আসিয়াছি! শৰ্য্যানিম্নে সাহিত্য-সম্রাজ্ঞীর পদপ্রান্তে বসিয়া
তাঁহার আদিষ্ট শব্দ গুলি লিখিবার সময় মনে হইতেছিল, যেন
বঙ্গীয় উপন্যাস-সাহিত্য লিখন প্রণালীর ‘ক’ ‘খ’ শিখিতেছি।
যাই হোক, প্রকাশের বহু বিলম্ব হইলেও ‘স্বপ্নবাণীতে শ্রদ্ধেয়
স্বর্ণকুমারী দেবী মদেয়। যাহা দিয়া গেলেন ও পরিসমাপ্তিতে
যাহা দিতেছেন ;-বৰ্ত্তমান উপন্যাস-সাহিত্য যুগের প্রত্যেক
লেখক, লেখিকার তাহা দেখিয়া, লেখার প্রতিযােগীতায় ঈর্ষা
হওয়া উচিত।
পরিশেষে সৰ্বসাধারণ্যে ইহাই আমাদের বিনীত নিবেদন যে,
'স্বপ্নবাণী’ বইখানিকে কেবল নভেল’ পাঠোপযােগী মনে না
করিয়া ইহার মধ্য হইতে এই অবসরে সাহিত্যের সারাংশটুকু
বুঝিয়া লইয়া, সকলেই নিজের শিক্ষা ও অপরের শিক্ষার সুবিধা
করিয়া রাখিবেন—তাহা হইলেই যথেষ্ট হইবে ।
নববর্ষ-১৩৪৩
বিনীত প্রকাশক--
গোষ্ঠ বিহারী দত্ত,
শরৎ চন্দ্র পাল।
স্বপবাণী।
No text on this page.
প্রাণী (বিচিত্রার পরিসমাপ্তি) প্রথম পরিচ্ছেদ এর স্বপ্ন প্রভাতে মিলাইয়া যায়, মানসিক-কল্পনা নিবাসের কৰ্ম্মসংঘাতে মনের কোণে চাপা পড়িয়া থাকে । কিন্তু স্বভাবজাত আদশ আকাক্ষা বারম্বার প্রতিহত হইয়াও লক্ষ্যের দিকে মুখ ফিরাইগ্না রাখে। এ কয়েক দিন স্বপ্নের কথা জ্যোতির্ময়ী একরকম ভুলিয়া গিয়াছেন; কিন্তু যে আকাকাভাব প্রসুত তাহার ঐ স্বপ্ন, সেই ভাবটি মুথেষ্ট কৰ্ম্মনিবিড়তা সত্ত্বেও তাহার অন্তর-নিভৃতে অন্তঃ শীতারূপে প্রবাহিত। “এই বৈষম্যময় জগতে-মানবের এই স্বার্থপূর্ণ জীবন সংগ্রামে, সাম্যময় প্রেমনীতি কি সম্ভব ?” প্রশ্নটি যখন তখন তাহার মনে উঠাপড়া করিতে থাকে। যুক্তি 'উত্তরে কহে—সম্ভব নাহে, সম্ভব নহে!” কিন্তু তাহার অন্তরাত্মার মধ্য হইতে তৎক্ষণাৎ বিশ্বাসবাণীর প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠে—“সম্ভব, সম্ভব, এ যুগে না হউক কোন ভবিষ-যুগেও সম্ভব, তাহার জন্য প্রস্তুত হও। ঝড় ত চিরস্থায়ী নহে, ঝটিকাঝকা শান্তিরই বাহক, বৈষম্য সাম্যেরই সূচনা। গতি তরঙ্গসঙ্কুল, পথ কষ্টকর, কিন্তু লক্ষ্যস্থান সুন্দর প্রেম নিকেতন।
জীবকুমারী দেবী এণত বাণী “তবে হে পথ প্রদর্শক ধ্রুবজ্যোতি, অন্ধকার গগনভেদ করিয়া দশন দাও তুমি, দর্শন দাও।” তখন প্রত্যুষকা, জ্যোতিন্ময়ী পাঠগৃহে, বাতায়ন পার্শ্বে টেবিল প্রান্তে চৌকিতে বসিয়া পিতার একটি কবিতা নিজের খাতায় নিতেছিলেন। সম্মুখভাগে নি কলােজ্জা তটিনী প্রবাহিত, বেষ্টনীর মধ্য হই বিহঙ্গের গতিঝঙ্কার উথলিয়া উঠি: ছে, মৃদু সমীরহিল্লোলে, বাতায়ন নিম্নের প্রস্ফুটিত মাধবী লতা-কুঞ্জঙ্খিত ফুলগমাঝে থাঝে তাহার নাসিকাবিবরে ঝাপাইয়া পড়িতেছি, বাকি অনন্যমনে গানটি লিখিতেছিলেন। সহসা বাতান *শ্বের নারিকেহইতে একটা ছােট পাখী পরিচিত কণ্ঠ শিশ, নয় যেন ডাকিল-“জ্যোতির্ময়ী জাগে।” বালিক। চমকিয়? তমুখ উন্নত করিবামাত্র পাখীটি উড়িয়া দূরবর্তী আমবাগানের ঝোপের মধ্যে লুকাইয়া পড়িল। রাজকুমারী তখন আমগাছের দিকে তে করিয়া দেখিলেন, কি সুন্দর বরগুন : বর্ণ শাহর মৃঃনবৈচিত্রে পূর্ব- দক্ষিণ গগন কে! নে , ক'ও রেপাকারে, কোথাও অপূৰ্ব ছাপে সুরতি। এই উচ্ছা নেহিতাভ অতলে এক- খান প্রকাণ্ড রুমে ভাসি চাঁয়া। সুষ্যদেব দিগুণ্ডল হইতে উদ্ধে উঠতে উঠি বার বার তাহার মধ্যে আত্মগােপন করিতেছি, কি: খ !শের দিকে পড়ি, তখন সবিতৃদেব মেঘাচ্ছন্ন। জ্যোতির্ময়ী •ে কোন বন্ধুর দর্শন আশায় নিরাশ হইয়া একটা ক্লান্ত নিশ্বাস সহকারে আবার লেখনী মসীপূর্ণ । লিম হত্য-ননি,
১১
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
মণী
•
করিয়া লইয়া লিখিতে আরম্ভ করলেন। লেখা শেষ করিয়;
গানটি একবার পড়িয়া দেখিলেন,
মনটি ওরে, ভাল করে ভাসতে শেখাে ভাসতে শেখে ;
সরে উঠতে হবে কণে এই কটি মনে রেখে।।
জলের পথ । লম্বা বক, হথা নাইক নৌক। নাইক মাকে ।
চলতে গিয়ে গায়ের জােরে, এলিয়ে পড়বে জলের ধাের
হারিয়ে ফেলবে সকল শক্তি ; ঠিক দেখে। তাই ঠিক দেখে।
উঠতে যদি চাওরে কুলে, ভাসিয়েশখে। ভাসতে শেখে'।
ঐ দেখা যায় নদীতীরে সবখানি;
দেখতে কাছে, বয়সে মাঝে জোর পানি।
নিয়ে আসবে আঁধার খন, পিছিয়ে পড়বে শতেক যোজন,
ঘূর্ণিপাকে "বে থরে যদি একটুও বাকে।
আবৃত্তি শেষ করি। গানটি গুণ গুণ করয় গাইতে গাহিতে
আবার আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করি। এবারও জ্যোতির্ময়ী
সুৰ্য্যের দর্শন পাইলেন না। ভাস্করদেব তখন বাতায়ন উদ্ধে
উঠিয়া পড়িয়াছেন। বালিক। নিমীলি; নয়নে অন্তর্জোতিকে
ধ্যান করিয়া নে মনে কহিলেন, “হে বজ্যোতি ! প্রজন
থাকিও না তুমি, প্রকাশ ,
প্রকাশ হও, প্রকাশ হও! হে আমার
অন্তদেবতা, হে কবর ! এই রাকুল অকুলে হাল ধরিয়া
কূলপথে লইয়া ল তুমি।”
আকাশ তথন আর লােহিত সমু নহে, শুভ্র মেঘগুপে
সমুজ্জ্বল নীলাম্বর বক্ষ ; তাহার দুএকটি স্থান কৃষ্ণবর্ণ মেঘবেষ্টনে
১১৪ নং আহিরীটোলা ঠুট, কলিকাতা।
এমারী দেবী এত
১২
অতি রমণীয় দেখাইতেছিল। জ্যোতির্ময়ী তাহা দেখিয়া
ভাবিলেন, “হায়রে! এইরূপ প্ৰেমালিঙ্গনে আমাদের অন্তর্জাতিক
মিলন মহিমাময় হইবে কবে? দুরাশা কি?” আবার সেই
পাখীটি সহসা ডাকিয়া উঠিল। এবার বাতায়ন নিম্নের মাধবী-
লতাবল্পী হইতে সে শিস্ দিল ।
জ্যোতির্ময়ী বলিল-“পাখি, তুমি বল ত ভাই আমার আশা
সফল হইবে কি না?" পাখী উড়িল, উড়িতে উড়িতে উত্তর
দিয়া গেল—“কে জানে, কে জানে!”
বালিকা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া ভাবিলেন “হায়রে ! অন্তর্জাতিক
মিলন! জগতের সাম্যমৈত্রী ভাব! সত্যই বড় দুরাশা :
আমাদের নিজেদের মধ্যেই আগে মিলন হােক। উচ্চ স্তর
প্রত্যাশা করিবার পূর্বে নিম্নস্তর গঠনের আবশ্যক। এই যে
বঙ্গবিভাগ ঘটনা, হে ভারতের ভাগ্যনিয় পুরুষ, ইহা দ্বারা যেন
সেই মিলন সােপান গঠিত হয়।”
হঠাৎ চটিজুতার শব্দ শােনা গেল, অনাদি একখানা খবরের
কাগজ হাতে করিয়া হাঁপাইতে হাপাইতে উপস্থিত হইয়া কহিল,
“দিদিমণি, রাণীদিদি, রাজকুমারী ভাই পড়ে দেখ ??
বলিয়া কাগজখানা টেবিলের খাতাপত্রের উপর ফেলিয়া
জ্যোতির্ময়ীর পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। রাজকুমারী সেখান
সরাইয়া রাখিয়া সহাস্যে কহিলেন, “ব্যাপারখানা কি তুমিই বলনা
ওগাে গেজেটাবর ! চতুম্বুথের দর্শন পেয়ে আমি কি দুখের
আশ্রয় নিতে যাব। বলে ফেলো সব খবরগুলাে?”
কলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
কুমার সেবী এত
বাণী
অনাদি একটু চিন্তিতভাবে বলিল, “বঙ্গবিভাগ ত হয়ে গেল
দ?”
“সে খবর ত পুরান হয়ে গেছে, নতুন কিছু বল?”
অনাদি তাহার কেশহীন গুম্পে ত দিবার ভাণ করিয়া
কহিল, “আরে আরে-কি বলছিস দিদি ! এ কথা কি
কখনও পুরান হয় ? এই মহাকাণ্ডের উপর দিন দিন নতুন নতুন
ফ্যাকড়া গজিয়ে এটাকে যে চিরনবীন করে তুলেছে। বটানিকেলের
বটগাছ কি কারাে চোখে পুরা বলে ঠেকে, এইটে ৰ দেখি?
অথচ গাছটার না জানি আদি, না জানি অনাদি! পড় পড় ভাই
কাগজখানা, উপাধ্যায়ের বক্তৃতাটা একবার পড়ে দেখ। এ
লেখা কোনো মা পড়লে তার কোলের ছেলেরও রক্ত টগবক করে
ফুটে উঠবে।"
কাগজখানা টেবিল হইতে উঠাইয়া জ্যোতিষীর হাতের
কাছে অনাদি তুলিয়া ধরিল। জ্যোতির্ময়ী আড়নয়নে নামটা
দেখিয়া লইয়া সেখানা নিয়ে নিক্ষেপ পূর্বক কহিলেন, “এ রকম
মারকাটের কথায় তোমাদের তেজ বাড়ে, আমি ভাই নিজে,
হতাশ হয়ে পড়ি। কিছুদিন থেকে আমার মনে কি কথা
তোলাপাড়া করছে জান অনাদি?”
অনাদি শনিবার জন্য উৎকণ হইয়া উঠিল। জ্যোতির্ময়ী
বলিলেন, “আমরা ভাই অভিশপ্ত জাত, নৈতিক বল হারিয়েই
আমাদের এই দুর্দশা ! তুমি কি ভাব অত্যাচার যারা আমরা
জাতীয় জীবন লাভ করব? কখনই না। যারা রক্তপাতের
।
১১৪নং আহিরীটোলা ইট, কলিকাতা।
১৫
কুমী দেবী এত
বাণী
উপদেশ দিয়ে ছেলেদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছেন-তারা দেশের
সর্বনাশ করছেন।"
অনাদি ভূমিনিক্ষিপ্ত কাগজখানা উঠাইয়া ক্ষুদ্রাকারে ভাঁজ
করিতে করিতে কহিল, “না গাে না—রক্তপাতও চাই বই কি,
ফ্রান্সের দৃষ্টান্ত দেখ না ভাই, ওরা কি সহম দাসত্বমুক্ত হয়েছে?”
জ্যোতির্ময়ী উত্তেজিম্বরে কহিলেন, সে দৃষ্টান্ত আমাদের
আদর্শ হতে পারে না। সেই ভীম বীভৎস নিষ্ঠুরতা মনে করলেও
কষ্টে আতঙ্কে দেহের রক্ত জল হয়ে যায়—গাত্মা করুণায় বিগলিত
আর্দ্র হয়ে ওঠে। ওরকম বিজাতীয় অনুকরণের কথা ভুলেও
মনে এনেন ভাই। আমাদের বলীয়ান হতে হবে ধর্মের
বলে, নৈতিক বলে । দৈহিক বলের সার্থকতা সেইখানেই,
যেখানে এই শক্তি আধ্যাত্মিক বলের সহায় স্বরূপ। ইংরাজকে
মারাকাটা দূরে থাক, বিপন্ন হলে তাদেরও রক্ষা করতে হবে
আমাদের।”
“আরে তুমি যে যীশুখৃষ্ট হয়ে উঠলে ? কিন্তু তার follwer
মধেয় যারা-তারাও ওকথা মানছে না দিদি !”
তাদের অধঃপতন শুরু হয়েছে। কিন্তু আমরা পুরাতন যুগ
ফিরিয়ে আনতে পারব তখনই, যখন এই সত্য আমাদের মনে
আবার জেগে উঠবে। যুদ্ধ বিদ্রোহ তখন তােমাদের কিছু
করতে হবে না-সাম্যমৈত্রীর পতাকার নীচে তখন জাতি
বিজাতি এক হয়ে যাবে, ভারতবর্ষ বিনা রক্তপাতে, অঙ্গুলি-
গড়নে তখন বরাজ লা করবে।”
কগিনী-সাহিত্য-মনির,
ঐশ্বর্ণকুমাত্র দেবত ঘব অনাদি অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া কহিল, “আচ্ছা ভাই, তখন আমি সর্বাগ্রে নিশানহস্তে সেই পতাকার তুলে গিয়ে গড়া। এখন এস রাণীদিদিচ্ছি, তােমার হাতে রাখী বেঁধে দিই, দেশসুদ্ধ লােক এই রাখী পরে ভাই ভাই এক ঠাই হচ্ছে।” অনাদি পকেট হইতে এক গেচ্ছি। রাখ বাহির করিয়া টেবিলে ফেলিল এবং তাহার মধ্য হইতে সর্বোৎকৃষ্ট এক গাছি বাছিয়া জ্যোতির্ময়ীর হাতে ব্যাধিতে লাগিল। জ্যোতির্মিী পরিতে পরিত বলিলেন, “বাংলা দেশের এই রাখিবন্ধন ভারতের পক্ষে যেন শুভ হয় ভাই।” অনাদি তাড়াতাড়ি রাজ- কুমাবীর হাতে রাখিট কষিয়া দিয়া দুই হাত কেটে পূরিয়া দুই নেত্র বিস্ফারণ পূৰ্ব্বক জ্যোতির্ময়ীর দিকে চাহিয়া কহিল, “নিশ্চিন্ত হও দিদি। সে বিষয়ে এই শৰ্ম্ম। গ্যারান্টি। তুমি যে পথটা বাৎলালে, সেটা যে কি এবং কোথায়-ত। যদিও আমি ঠিক বুঝতে পারিনি,কিন্তু তুমি তাই দেখে নিও, আমাদের সংকল্পিত উপায়ে অল্পদিনের মধ্যেই ভারত বিদেশীবিবর্জিত হয়ে যাবে। দেশে হুলস্থুল বেধে গেছে, বিদেশী যা কিছু-সৰ বয়কট “এই যে পণ্ডিত মশায়।" “বন্দে মাতরম্” ধ্বনি করিতে করিতে পণ্ডিত মহাশয় গৃহ- প্রবেশ করিলেন। ১১৪ নং আহিরীটোলা টি, কলিকাতা।
বর্ণনায় এ খণত
পুবা
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
‘নমন্তে পণ্ডিতমহাশয়, আসতে আয় হােক।”
জ্যোতির্ময়ী এবং অনাদি উভয়েই এক সঙ্গে এই কথা বলি।
পণ্ডিত মহাশয়কে স্বাগত করিয়া লইলেন। পণ্ডিত মহাশয়
প্রত্যুত্তরে হাত তুলিয়া বস্তিবাচন করিবামাত্র অনাদি একগাছি
রাখি-হন্তে অগ্রসর হইয়া কহিল, “হাতটা আর নামাবেন না
পণ্ডিত মশায় ; আরাে একটু বাড়িয়ে দিন, আপনার হাতে
রাখি বেঁধে ধন্য হই।”
জ্যোতির্ময়ী তাড়াতাড়ি চৌকি হইতে উঠিয়া বলিলেন, ‘না
পণ্ডিত মশায়, আপনার হাতে রাখি পরার আগে আমি।”
বলিতে বলিতে পণ্ডিত মহাশয়ের নিকটবর্তী হইলেন; কিন্তু
অনাদি ততক্ষণ ভাবমহাশয়ের হাতটা অধিকার করিয়া লইয়া
বাঁধন সূৰ কষিতে আরম্ভ করিয়াছে, তিনি গ্রেপ্তার অবস্থাতেই
ৰামহন্তে আপনার দাড়ী টানিতেছেন। অনাদি রাজকুমারীর
দিকে ব্যঙ্গটা নিক্ষেপ করিয়া কহিল, “তুমি বাহুবল মানতে
চাও না দিদি, তােমার নৈতিক বল এখানে পরান্ত কি না তুমিই
বল? পণ্ডিত মহাশয় উত্তরে কহিলেন, “তবে কিনা বাহৰলের
কাৰ্য পদ্মপস্থিত জলবং ক্ষণস্থায়ী। এস রাষ্পকুমানি, তুমি না
হয় আমার এই বাঁ হাতটাতেই রাখি পরাও।” দাড়ীতে হাত
বুলাইবার এ হেন আৱেষ হইতেও আপনাকে বঞ্চিত
রাখিয়া পণ্ডিত মহাশ রাজকুমারীর দিকে বাম হাতটা বাড়াইয়া
খলনী-সাহিত্য-মৰি,
১৭
স্বর্ণালী দেবী প্রণীত
পুবালী
পরিলেন। জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া হাতটা ধরিয়া রাখি পরাইতে
প্রবৃত্ত হইলেন। পরাইতে পরাইতে বলিলেন, “দেখলে অনাদি
নৈতিক বলের আকর্ষণ ?”
অনাদির রাখি বন্ধন তখন শেষ হইয়াছে, পণ্ডিত মহাশয়ের
ডান হাতটা ছাড়িয়া দিয়া সে কহিল, “আচ্ছা, বেশ গাে বেশ!
কিন্তু একট। দূত পরাতে তুমি দিনটা কার করবে নাকি ?
থা? তােমার সুত বাঁধা, তুমি ততক্ষণ গান লেখ, সময়ের
সদ্ব্যবহার হাে।”
জ্যোতির্ময়ী বলিলেন, “তােমারই দোষ, এমন ছােট্ট রাখি
এনেছ যে টানাটানিতে এর ক্ষীণ জীবনটুকু বুঝিবা ছিড়ে যা!”
“দাও তবে আমাকে, এ রকম tug of war তােমার কী
নয়। দেশ আমার হাতের জোরে এই পাট সূতও কি কম লম্বা।
হয়ে পড়ে।
অনাদি সবলে পণ্ডিত মহাশয়ের হাতখানা টানিয়া লইয়া
রাখি কষিতে প্রবৃত্ত হইল। জ্যোতির্ময়ী হাল ছাড়িয়া দিয়া
কহিলেন, “আচ্ছা, অনাদি ওগাছা আপনার হাতে বেধে দিক,
আমার গাছ। আমি পরে পরিয়ে দেব, কি বলেন পণ্ডিত মশায় ?
“তােমার হাতের রাখি না পরে আমি এখান থেকে উঠব না
মা, তবে হাতটা যদি-আরে আরে কর কি বাপু-এখানা যে
একটা প্রাণবন্ত জীবের, এ কথাটা যে দেখছি একেবারেই ভুলে
যাচ্ছ?”
এমন বিকৃত মুখভঙ্গীতে পণ্ডিত মহাশয় এই আর্তনাদ করি-
১১৪ নং আহিৰীটোলা ট, কলিকাতা।
কুমারী দেবী প্রণীত পুবাণী লেন যে-কারুণ্যরস হাঙ্গরসে পরিণত হইল । জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া উঠিয়া কহিলেন- ‘বাহুবলের পরীক্ষায় অনাদি দেখছি আপনার নিকট সাটি- কিকেট আদায়ের চেষ্টায় আছে--" অনাদি আরাে একটু জোরে সূত; কষিয়া কহিল, “নিশ্চয়। পণ্ডিতজি হচ্ছেন-আমাদের ব্যায়াম সমিতির সেক্রেটারি, কুরু- ক্ষেত্রের যুদ্ধ যদি কখনো বাংলা দেশে যাবে, তবে আমাদের যে দ্রোণাচার্য্যের অভাব হবে না, এই আশায় আমরা বুক বেধে আছি, বুঝলেন ত পণ্ডিত মহাশর !” “বুঝেছি বাবা, তাহলে হাতটাকে অবিলম্বে রেহাই দিতে হচ্ছে; নইলে তােমাদের তথাকথিত সম্মান-আসন শূন্যই পড়ে “এই নিন আপনার হাত, দেখে নিন ভাল করে কোথায় একটু টোসকায় নি পৰ্য্যন্ত।” অনানির নিকট হইতে অব্যাহতি লাভে পণ্ডিত মহাশয় এইবার তার মুক্ত হয় দাড়ি পশ্লিচৰ্য্যায় নিযুক্ত করিয়া হাঁফ ফেলিয়া একপানা আরাম কেদারায় বসিয়া পড়িলেন। জ্যোতির্ময়ীও তাহার পূর্ব পরিত্যক্ত চৌকি পানা পুনরধিকার করিলেন, কেবল অনাদি বলি না। পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট দাড়াইয়া কহিল- “পণ্ডিত মহাশয়, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, বে-আদপী মাপ করবেন, বলুন ত আপনি স্বদেশী কিম্বা বিদেশী ?” পণ্ডিত মহাশয় দক্ষিণ হস্ত দাড়ি হইতে মুক্ত করিয়া বাড়াইয়া কমলিনী-সাহিত্যশবির,
&ণী শী এত
স্বাণী
ধরিয়া এবং বাম হস্ত টিকিতে বুলাইয়া বলিলেন, “এই শিশা এবং
চই ত তােমার প্রশ্নের উত্তর বাবাজি।”
অনাদি ঘাড় নাড়িয়া কহিল, “উহু, শুধু টিকিতে আর কালাে
রঙে আজকাল স্বদেশী হওয়া যায় না। স্বদেশীর ভাবার্থ
এখন বদল হয়ে গেছে। বিদেশী জিনিস ব্যবহার করবেন না
বলে শপথ করেছেন কি ?
“কই তাত করিনি বাপ।”
“করুন তবে। এই যে আপনার হাতের ক'গাছি কালাে
সুতো, শব-জাগান মন্ত্রে যেগুলি তৈরি- এই সুতাে হাতে বেঁধে
আপনি স্বদেশী তন্ত্রে বাঁধা পড়েছেন, বলেন ? এখন
পয়লা নম্বরে—আপনার গলার ঐ পৈ 5োচ্ছাটা আপনাকে
ছিড়ে ফেলে দিতে হচ্ছে।”
পণ্ডিত মহাশয় কহিলেন, “এ কেমন কথা! বাবাজি! আমি
ত ব্ৰহ্মজ্ঞানী নই ; কিম্বা সিদ্ধ পুরুষও হইনি এখনাে!''
এ ওজরে পার পাবেন না। গুরুজি ? সিদ্ধ অনিগ্ধ সকলের
পক্ষেই এখন বিদেশী পণ্য নিষিদ্ধ।”
খুব জোরে জোরে ঘাড় নাড়িতে নাড়িত সে এই কথা
বলিয়া চলিল, “জানেন ত, জার্মাণি দেশের মূতা থেকেই
আমাদের দেশের সব পৈতা তৈরি হয়। আপনি যতই কেন
হা-হুতাশ করুন না, স্বদেশী কালাপাহাড়দের হাত থেকে
কিছুতেই এ তাকে রক্ষা করতে পারবেন না; শেষে আপনার
গলাটায় পর্যন্ত টান পড়তে পারে।”
১১৪ নং আহিরীটোলা গট, কলিকাতা।
এশালী ৰেী এত পবাণী পণ্ডিত মহাশয় এতক্ষণ এক হাতেই দাড়ি টানিতেছিলেন, এইবার দুই হন্তই দাড়ি রক্ষণে নিযুক্ত করিয়া বিস্মিত স্বরে কহি- লেন, “জার্ষাণি সুতার উপৰীত ! সে গুলাে তাহলে বাবাজি তােমাদের রাজারাজড়ার গলায় শােভা পাবার উদ্দেশ্বেই প্রস্তুত হয়। কিন্তু আমার গলার এই গােচ্ছাটুকু খুড়িমার চরকা- কাটা ধন।” “তাই নাকি? আপনি দেখছি তবে ভাগ্যবান ! হতভাগ্য আমাকেই তাহলে দেখছি আত্মহত্যার পাপে লিপ্ত হ'তে হােল!” অনাদির গল্পবুদ্ধি নিয়ােজিত হত তৎক্ষণাৎ নিজের কথোপৰীত- গুচ্ছ আক্ৰমণ করিল। “আরে কবিস কি, করিস কি, অপগও বালক!” কিন্তু পণ্ডিতমহাশয়ের এই চীংকার-প্রতিবাদ ব্যর্থ করিয়া অনাদির ধর্ম এবং বর্ণব্যঞ্জক সূত্র বাতায়ন পথে মাধবীলতা কালের মধ্যে গতি লাভ করিল। জ্যোতিষীও প্রথমটা একটু আশ্চর্য্য হইলেন; কিন্তু সঙ্গে কহিলেন, “বাহারে! ব্রাহ্মণ পুত্র হয়ে অসঙ্কোচে পৈতা ত্যাগ করলি ! ত্যাগ স্বীকারের এ হাতে খড়ি নাকি?” অনাদির মনের গুপ্ত কথা যেন রাজকুমারী প্রকাশ করিয়া দিলেন ; সে তাড়াতাড়ি সেকথা চাপা দিয়া কহিল, “রাণী- ঠাকশ, এবার ভাই তােমার পালা! কাচের চুড়ি ও বিলাতি ফিতা মেয়ে-মহল থেকে একবারে উঠিয়ে দাও। ইলের মেয়েরা চরকা কাটে বটে; কিন্তু তাতেই শুধু হবে না, মলিনীসাহিত্য-মলি, विमानी बसे बर গায়ে গায়ে চৰকা ধরাও, ভাত ৰােনার ব্যবস্থা কর-অধিকন্তু এ রাজ্যে বিলিতি জিনিষ যেন আদৌ স্থান না পায়-দোকানদারদের উপর এইরূপ কড়া হুকুমজারি করে পাঠাও।” অনাদির উৎসাহে জ্যোতির্ময়ীও এতক্ষণ একটা আনন্দমত অনুভব করিতেছিলেন; কিন্তু অনাদির শেষ কথায় তিনি একটা চাপা দীঘ নিশ্বাস ফেলিয়া হতাশার সুরে কহিলেন, “আমাদের ব্যবহার্য সমস্ত জিনিষ যেদিন দেশ থেকেই পাওয়া যাবে-সেদিন সত্যই সত্যযুগ ফিরে আসবে। আসবে, সেদিন আসবে ভাই- এ আশা আমিও করি-কন্তু এখনাে বিলম্ব আছে। সেজন্য এত হ'তে এখনাে আমাদের অনেকটা সময় লাগবে।” অনাদি কহিল, “অর্জনে বিলম্ব থাকলেও বর্জনে ত আমি কোন বাধা দেপিনে। এক কাচের চুড়ি গুলো থেকেই কোটি কোটি টাকা বিলাতে চলে যাচ্ছে। এমন কত সখের জিনিষ, ফিতা, পাউডার, সেন্ট- পণ্ডিত মহাশয় অনাদিকে বাধা দিয়া কহিলেন, “ বাজি, সখের জিনিষকে তােমরা যতটা হেয়জ্ঞান কর, সহজ-ত্যজ্য ভাব আসলে তা মােটেই নয়। এই যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডৰূপ মহা সৃষ্টি, এটা বিধাতার সখ, ছাড়া আর কি বল ত হে বাপু? এই সৃষ্টির মূলে প্রয়ােজনটা যে কি ছিল, আজও পর্যন্ত কোন মুনি ঋষি তার সন্ধান পান নি।" জ্যোতিন্ময়ী কহিলেন, “তা সত্যি, সংসারে প্রয়ােজনীয় খরচের চেয়ে সখের খরচই বেশী তাতে সন্দেহ নেই।” ১১৩ নং আহিরীটোলা জট, কলিকাতা।
সীমারী দেবী এত
चलानी
এই অনুমােন বাক্যে পণ্ডিত মহাশয়ের আনন্দ, তাঁহার
দাড়ির টানকে দ্বিগুণিত করিয়া তুলিল, তিনি কহিলেন, “দেখেছ
ত মা হাড়ি ডােমের মেয়েদের আগে কাসার গহনার চাপ! সেই
সখের ভারকে তারা পালকের মতই লঘু জ্ঞান করে।”
অনাদি বলিয়া উঠিল,“ফিনফিনে বিলিতি কাচের চুড়ির চেয়ে
কাসার চাপও ঢের ভাল মশায়, সে যে আমাদের মাতৃভূমির দান!”
“আমিও বলি সে ঢের ভাল ।” পণ্ডিত মহাশয় উত্তেজিত
স্বরে কহিলেন, “কিন্তু জননী যার প্রতি বিমুখ, তার দান যে
হতভাগ্য পায়নি, তারও ত প্রাণে সখ আছে, তখন তার সখ
মেটাবার সহজ উপায়-স্বল্পমূল্য বিলিতি জিনিস ব্যবহার করা।
-জানত বাবাজি, সন্ন্যাসী ফকীরদেরও সখের হাত থেকে
অব্যাহতি নেই। লালা বাবুর গল্প শুনেছ বােধ হয়। তিনি
সংসারের মায়া ত্যাগ করেও ভােগ একেবারে ত্যাগ কবুতে
পারেন নি। গাছতলায় শুয়েও ইটের উপর মাথা রেখে নিদ্রা
দিচ্ছিলেন, তারপর পথিক স্ত্রীলােক দুইজনের 'ব্যঙ্গোকিতেই
নাকি এ ঘুম তার ভেঙ্গে যায়।”
অনাদি কহিল, “আপনিও এ সম্বন্ধে টোলের পণ্ডিতের নাম
রাখতে পারবেন। দেখেছ দিদি, পণ্ডিত মহাশয়ের দাড়িটা দিকে,
দিন কি রকম চকচকে হচ্ছে ? বিলিতি ৰসের টানটা এর
উপর যে ভাল করে পড়ছে তাতে সন্দেহ মাত্র নেই।” পণ্ডিত
মহাশর দেয়ালের আ:সির দিকে সচকিত দৃষ্টিপাত করিলেন।
কিন্তু তাহার মাথার অর্ধেক খানা ছাড়া আকাকিত প্রতিবিম্ব
কমলিনী-সাহিত্যমন্দির,
ঐশ্বর্ণকুমারী দে প্রণীত
স্বর্ণকুমারী
স্বপ্নবাণী
তাহাতে দেখিতে পাইলেন না । উনি একটু অপ্রস্তুত ভাবেই
উত্তর করিলেন, “বাবাজি, আমরা লঘু খড়, তােমাদের ইঙ্গিতেই
আমরা চলি কিরি, দৃষ্টান্ত দেখাও, গতি আপনা হতেই ফিবে।”
অনাদি বলিয়া উঠিল, “সেই কথাইত এতক্ষণ ধরে রাণী
দিদিকে বলছি।” “রাজকুমারী ভাই, দোকানদারদের ভাল
করে জানিয়ে দাও যে বিলিতি জিনিস রাখলে তাদের বিপদে
পড়তে হবে।”
রাজকুমারী উত্তর করিলেন, “না অনাদি, বিলিতি জিনিষ
একেবারে বর্জন করার সময় এখনো আসেনি। সেজন্য কিছুদিন
ধরে এখনো আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। ভেবে দেশ-দুলে।
দু’ মুষ্টি অন্ন যে সব লােকের মেলে না, তাতের দামী কাপড় কিনে
পরা কি তাদের সাধ্য ? তঁত-শিল্পকে উদ্ধার করবার সঙ্গে
সঙ্গে কলকারখানারও বিস্তৃত আয়ােজন চাই, নইলে বিলিতি
শস্ত জিনিসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমরাই হেরে যাব।”
অনাদি দমবার পাত্র নয় ; এই কথার উত্তরে মমান উৎসাহে
কহিল, “তা বুঝি হচ্ছে না ভাবছ? বঙ্গলক্ষ্মী মিলের বিজ্ঞাপনটা
পড়ে দেখ, তা 'চুড়া সাবান, দেশাই, কঁচের বাসন প্রভৃতি
প্রস্তুতেরও আয়ােজন হচ্ছে।”
আশানলে জ্যোতির্ময়ীর হৃদয় ভরিয়া গেল। তাহার সেই
অকাল-আনন্দ স্নান করিয়া দিয়া পণ্ডিত মহাশয় কহিলেন,.
“আরে অর্বাচীন, একটা বঙ্গলী মিল দেশের কত কাপড়
যােগা দেবে বল্ দেখি?”
১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
মামী ৰেী এত
পুবাণী
অনাদি রাগিয়া কহিল, “দেশের কোনাে খবর জানেন না
আপনি, অথচ একটা কথা বলে বসেন? কেন, বােম্বাই অঞ্চলের
কাপড়ের মিল গুলাে কি ধর্তব্যের মধ্যে নয় নাকি?”
কৃষ্ণশ্মরাজির মধ্য হইতে পণ্ডিত মহাশয়ের শেও দরাজি
প্রছন্ন ব্যঙ্গে বিকশিত হইয়া উঠিল,—তিনি হাসিয়া কহিলেন,
“ভারতের কোটি কোটি লোকের কাপড় •ােগানাে-বাংলা
বােম্বায়ের দুচারটি মিলের কর্ম নয় গাে !”
অনাদি চড়া মেজাজে কহিল, ‘ক্রমশঃ আরাে হবে।"
“আশা ত সেইরূপই করি। কিন্তু যতক্ষণ তা না হয়
অনাদি, ততক্ষণ ?"--এ কথা বলিলেন জ্যোতির্ময়ী আশা ভঙ্গের
সুরে। উত্তর হইল, “ততক্ষণ বিলিতি কাপড় গুলােকে কৰ্মনাশা
জলে নিক্ষেপ কর। ধ্বংসের উপর গঠন অারম্ভ চিরদিনই হস্ত্রে
আসছে। এর মধ্যেই এ কাজ শুরু হয়েছে। কলকাতার
ছেলেরা পথ দেখিয়েছে, বিষাদপুরেও শুনছি ইতিমধ্যে অগ্নিকাণ্ড
-লুটপাট হয়ে গেছে। বিজনকুমার এ দলের একজন গুপ্তনে,
তিনি এখন ঘাের স্বদেশী। এবার আমাদের পালা, আমরা সব
করে ছেলেরা এজন্য প্রস্তুত আছি। দোকানদারদের একবার
কেবল নােটিশ দিতে বাকী-আর রাজকুমারী দিদির হুকুমের
অপেক্ষা!
জ্যোতির্মরীর মুখমণ্ডল সহসা আরক্তিম হইয়া উঠিল, তিনি
ক্রোধদীপ্ত স্বরে কহিলেন, “অনাদি, ভুলে গেছ কি তােমাদের
শপথ ? অত্যাচার নিবারণ করাই তােমাদের ব্রত, তার পরিবর্তে
।
মলিনীসাহিত-খনি,
শ্রীকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
অযথা পীড়নে, পৈশাচিক উন্মাদনা কাণ্ড তােমরা প্রবৃত্ত হতে
যাচ্ছ। আর এ কাৰ্যে আমার অনুমােদন প্রত্যাশা কর?”
পণ্ডিত মহাশয় ‘বন্দে মাতরং” ধ্বনিতে সংক্ষেপে জ্যোতি-
স্ময়ীর পােষক করিয়া কহিলেন, “বংসে, আয়ুষ্মতী হও—”
এই সময় একজন দাসী আসিয়া সংবাদ দিল-“ডাক্তারবাবু
আসিতেছেন।”
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
শরৎকুমার গৃহাগত হইয়। অন্য দিনের ন্যায় সার অভ্যর্থনা
লাভ করিলেন না। এমন কি, তংকর্তৃক নমস্কৃত হইয়া রাজ
কুমারী তাহাকে প্রত্যভিবাদন করিতে পর্যন্ত ভুলিয়া গেলেন।
গৃহের এই অস্বাভাবিক মৌনভাব লক্ষ্য করিয়া শরৎকুমার
প্রথমটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। কিন্তু পর মুহূর্তেই
প্রকৃতিস্থ ভাবে অনাদিকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “ঘনের
আবহাওয়াট। বড় Stuffy বলে মনে হচ্ছে ; ব্যাপারটা কিহে
অনাদি?”
রাজকুমারীর ভংসনাঘাত একেবারে ব্যর্থ হয় নাই। কিন্তু
বীর বালক অনাদি মৌনতায় সে অভিমান-জ্বালা গোপন রায়।
দেয়াল উদ্ধে সুৰ্যোদয়-তৈলচিত্রের নিম্নদেশে রক্ষিত বিবেকানন্দ
১১৪ নং আহিরীটোলা মট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
পবাসী
এবং
স্বামীর সুন্দর প্রতিমূর্তি পানির দিকে গুরুভাবে চাহিয়াছিল।
এই অপ্রকাশ্য জ্বালার যত কিছু চাপভার সবটা ডান পদের বৃদ্ধাঙ্গুঠে
চাপিয়া ধরিয়া প্রতিশােধ স্পৃহা-পরত নাজ্জার-শাবকের ন্যায়
তদ্বারা মেজিয়ার বহুমূল্য কোমল কার্পেটের পশমগুলিকে
আক্ৰমণ-বিধবস্ত করিয়া তুলিয়াছিল। গৃহে ঢুকিয়াই দেশী চটি জুতা
জোড়াটাকে চৌকীর তলায় সে বিশ্রাম প্রদান করিয়াছিল
আজকাল অনাদি বিলাতী জুতা ত্যাগ করিয়াছে।
অনাদির অভিমানে দুঃখ অপেক্ষা ক্রোধের ঝাঁজটাই ছিল
বেশী। “স্ত্রীলােকের কি একটুও মতি-স্থিরতা নাই। এতদিন
ধরিয়া স্বদেশানুরাগে হৃদয় জালাইয়া তুলিয়া, দেশের কাজে জীবন
উৎসর্গ করিতে শিখাইয়া আজ যখন ঠিক কাজ করিবার সময়টি
আসিয়া দেখা দিল, তখন কিনা জ্যোতির্ময়ী বলিয়া বসিলেন,
‘বিলিতি জিনিষ বস কোয়ােনা। হে চাণক্যদেব, কি সার
কথাই তুমি বলিয়া গিয়াছ ! তোমার বুদ্ধিকে নমস্কার! স্ত্রীবুদ্ধি
প্রলয়ঙ্করী বলিয়া প্রলয়ঙ্করী ! বিশ্বাস করিও না তাহাকে-কেই
বিশ্বাস করিও না, কখনাে না, এ জীবনে না, পরজীবনেও না।”
শরৎকুমারের প্রশ্নে তাহার কুদ্ধ চিন্তায় বাধা পড়িল।
তাঁহার দিকে চাহিয়া কি উত্তর দিবে-ভাবিয়া ঠিক করিয়া
লইবার পূর্বেই রাজকুমারী উত্তরস্বরূপ কহিলেন, “এরা বিদেশী
অনুকরণে পীড়ন নীতি অবলঙ্গন করে দেশী হতে চান।
দোকানদারদের যত বিলিতি পণ্য ঐ জালিয়ে দেবার মতলব
এটেছেন। জুলুম করে এর দেশোদ্ধার করবেন, হায় রে !
কমলিনী-সাহিত্যমশিন,
২৭
কুমারী মেৰা এত
স্বপ্নবাণী
কার উপর যে আশা বঁাধব! আপনিও কি এই অত্যাচার অকু-
মােন করেন ডাক্তার-দা?”
উত্তর হইল-মােটেই না।” উচ্চারণে বেশ জোর দিয়াই
শরৎকুমার এই কথা বলিলেন। হঠাৎ যেন দক্ষিণা বাতাসের
একটা ঝাপটা আসিয়া গৃহের উত্তপ্ত রুদ্ধবায়ুকে ছিন্নভিন্ন
করিয়া উড়াইয়া দিল, সেই স্বাস্থ্যপূর্ণ স্নিগ্ধ বায়ু বােগীর ন্যায়
সজোরে নিশ্বাসে গ্রহণ করিতে করিতে হত-আশা পুনলাভ
করিয়া রাজকুমারী অনাদির দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন।
দৃষ্টির অর্থ-শুনিলে ত অনাদি, কি বল তুমি ইহাতে ?”
ডাক্তারের এই জোর কথায় অনাদির মনটাও যেন ডিগবাজি
খেলিয়া ঠিক স্থানটির উপর গিয়া পড়িল।
শরৎকুমারের বিদ্যাবুদ্ধির উপর তাহার সুগভীর শ্রদ্ধা।
তিনিও যখন তাহাদের কল্পিত কায্যকে দেশের পক্ষে অহিতকর
বলিয়াই জ্ঞান করিতেছেন, তখন অপর যে যাহাই বলুক, সে
কাৰ্য্য তাহার পরিত্যজ্য। এই ভাব মনে নাসিবামাত্র পাথরের
মত শক্ত রাগটাও তাহার জল হইয়া পড়িল। টেবিলের ঘড়িটা
ইং করিয়া উঠিয়া জানান্ দিল—“সময় বহিয়া যায় যে ভাবনাতেই
দিন কাটাইলে চলিবে না ত !
অনাদি ঘড়ির দিকে চাহিয়া অতঃপর সহজ জবেই বলিল,
“দিদি ভাই, ৮ টা বাজলাে, স্কুলে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে
নিইগে। আমাদের কর্তব্য, রাণীদিদি, তােমরা দুজনে মিলে
মীমাংসা করে রাখ।
১৯৪ নং আহিরীটোলা মট, কলিকাতা।
ঐশ্বরী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
রাজকুমারী বুঝিলেন, অনাদির মনের গতি ফিরিয়াছে।
শরৎকুমারকে এজন্য স্বগত ধন্যবাদ দিয়া প্রকাশ্যে হৃষ্টচিত্তে
অনাদিকে কহিলেন, “তুমি ভাই স্কুলে গিয়ে ব্যায়াম সমিতির
ছেলেদের আজ বিকালে বাগানে আসতে বলল। ব্যায়াম
খেলার দিন আজ নয় ; না ডাকলে কেউ এদিকে আসবে না।
আমার রাখি-বন্ধনের নিমন্ত্রণ সবাইকে জানিয়ে দিও।”
“যে আজ্ঞা” বলিয়া অনাদি তাহার চটি জুতা জোড়ার খোঁজে
প্রবৃত্ত হইল। এই সসম্মান স্বীকারােক্তিতে রাজকুমারীকে সে
নিরুত্তর করিয়াছে বলিয়াই মনে করিয়াছিল,কিন্তু তাহার
ভুল ভাঙ্গাইয়া জোতির্ময়ী আবার কহিলেন, “যে আজ্ঞে নয়!
আমার হাতের রাখী’ পরে আজ তােমাদের আর একবার
শপথ করতে হবে যে ; দেশের নামে তােমরা কোন অত্যাচার
করবে না। ব্যায়াম সমিতির উদ্দেশ্য যদি তােমরা কেউ ভুল
বুঝে থাক ত সে ভুল আজ ভেঙ্গে যাক্। বুঝলে ত অনাদি ?”
“বুঝেছি, বুঝেছি আর বেশী বলতে হবে না। আর একটা
কি কথা সে বলিতে যাইতেছিল—কিন্তু চাপিয়া লইয়া করায়ত্ত
জুতা জোড়াকে পদায়ত্ত করিয়া চটুপটু গৃহ নিষ্ক্রান্ত হইল। পণ্ডিত
মহাশয় বলিলেন, “আমায়ও এখনি যেতে হবে, নটা বাজলেই
উঠব। মায়ের কাছে এলে আর যেতে ইচ্ছা করে না। শরৎ
কুমার বলিলেন, “যেতে হবে সকলেরই এক সময়ে ব্যস্ত হচ্ছেন
রাজকুমারীর এতক্ষণে হুস হইল, শরৎকুমার আসিয়া পর্যন্ত
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
অস্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
বসেন নাই, অনুশােচিত চিত্তে উঠিয়া দাড়াইয়া বলিলেন,
“ডাক্তার-দা, বসুন, কি বর্বর আমি। অতিথিকে অভ্যর্থনা
করতে পৰ্যন্ত ভুলে যাই। মাপ কৰ্বেন।”
শরৎকুমার একটা চৌকীর মাথায় হাত রাখিয়া যেমন দাড়াইয়া
ছিলেন, তেমনি রহিলেন ; বসিবার কোন লক্ষণই প্রকাশ না
করিয়া সহাস্যে কহিলেন, “ভয়ে ক’ব, না নিয়ে, অজ্ঞা করুন।”
উত্তর হইল—“অবশ্য নির্ভয়ে।”
আশ্বস্ত হইয়া শরৎকুমার কহিলেন, "আমাদের শাস্ত্রকারগণ
যেহেতু শিষ্টাচার প্রয়ােগে সাধারণ আলাপের মধ্যে ক্ষমা প্রার্থনার
যুক্তি দিয়ে যা নি, সেই হেতু বর্তমানে আপনার ভাষাকে
বিদেশী অনুকরণভাব-দুষ্ট বলা যায় কিনা? পণ্ডিত মহাশয় তাহার
বিচার করুন।”
পণ্ডিত মহাশয় বলিলেন, “এ বিচারের ভার এখনি আমি
গ্রহণ করতে অপারক। মনুসংহিতা এবং পাণিনি-এই উভয়-
বিধ শাস্ত্র আয়ত্ত করে নিয়ে তবে এ প্রশ্নের উত্তর দান করা
যেতে পারে, একটু অপেক্ষা করতে হবে বাবাজি।
জ্যোতির্ময়ী সহাস্যে কহিলেন, “আচ্ছা, ক্ষমা করতে হবেনা,
বসুন ডাক্তার-দা?”
ডাক্তার বলিলেন, “ক্ষমা করবার অধিকারও ত আমাদের
নেই রাজকুমারী। মানুষে দোষ করে-দেবতারা ক্ষণা করেন,
আমরা মানুষ—আপনারা দেবী-ক্ষমা করতে হয় যদি, সেও
আপনারাই কৰ্বেন -
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
কুমারী দেবী প্রপাত স্বপ্নবাণী } পণ্ডিত মহাশয় লােকটি রসগ্রাহী; ডাক্তারের বাক্যে প্রীত হইয়া হস্তোতােলন পূর্বক কহিলেন, “সাধু-সাধু!” ডাক্তার মস্তক আনতিতে তাহাকে ধন্যবাদ প্রদান পূর্বক জ্যোতির্ময়ীর দিকে চাহিয়া আবার কহিলেন, “আমায় এখনি যেতে হবে রাজকুমারী, বসবার ত বেশী সময় নেই। তা ছাড়া গৃহকত্রী যখন বাড়িয়ে আছেন-তখন-- জ্যোতির্ময়ী বলিলেন, হ্যা, তখন আপনি বসেন কি করে ? আপনি যে মূর্তিমান বিনয়-সে কথাটা ভুলে যেতে হয়।” কথা কহিতে কহিতে একগাছি ‘রাখি তুলিয়া লইয়া জ্যোতির্ময়ী দুই এক পদ অগ্রসর হইলেন ; মনের ইচ্ছা রাখি গাছটি শরৎকুমারের হাতে বাধিয়া দেন। কিন্তু সে ইচ্ছাটা কাৰ্যে পরিণত করিতে মনের মধ্যে কি যে একটা সঙ্কোচ আসিয়া বাধা দিল ; তিনি রাখিগাছ। ডান হাতের অঙ্গুলি দ্বারা বাম হন্তের তর্জনীতে পাকাইতে পাকাইতে কহিলেন- “ডাক্তার। তবে কি- তাহার কথা অসমাপ্ত রহিয়া গেল – এই সময় নয়টার প্রথম ঘণ্টা পড়িবামা পণ্ডিত মহাশয় তাড়াতাড়ি জ্যোতির্ময়ীর কাছে আসিয়া হাতটা বাড়াইয়া কহিলেন তােমার হাতের রাখি না প'রে যেতে পারছিনে মা। মনের আবেগে এই তৃতীয় ব্যক্তিটির অস্তিত্ব জ্যোতির্ময়ী সহসা তুলিয়া গিরছিলেন, সচকিত লজ্জিত ভাবে হাসিয়া বলিলেন- । কনলিনী-সাহিত্য-মন্দির, কুমারী দেবী এণ প্নবাণ “আসুন পণ্ডিতমহাশয়, রাখি পরিয়ে দিই।” হাতের সে রাখি গাছটি টেবিলে রাখিয়া তিনি আর এক গাছি রাখি তুলিয়া লইয়া পণ্ডিত মহাশয়ের হস্তে কসিয়া দিতে দিতে কহিলেন -- “উপদেশ দিন্ এখন গুরুজি, আমার কাজ কি ?” রাখি ধারণ করিয়া পণ্ডিত মহাশায় বলিলেন, ‘মা, তােমাকে উপদেশ দিই এমন সাধ্য আমার কি ! তুমি স্বয়ং শক্তিরূপা ভগবতী! তুমিই আমাকে আদেশ করিবে, আমি পালন করিয়া চলিব।” গুরুদেব গম্ভীরভাবেই এই কথাগুলি বলিলেন। জ্যোতির্ময়ী হাস্য-পরিহাসে এই গুরুগম্ভীর বাক্যভার লঘুতরল করিবার উদ্দেশে খুব খানিক হাসিয়া লইয়া কহিলেন, “দেখুন ডাক্তার- সাহেব, গুরুজির কথার ?” ডাক্তার তাহার মনের ভাবটা ধরিয়া লইয়া পরিহাস পূর্বক কহিলেন, “গুরুজি ত ঠিক কথাই বলেছেন। আপনি কি মনে করেন, আপনার গুরুজি তিত-বিহারী মহা-উপদেশের অতীত?” 0 পণ্ডিতমহাশয় দুইগাছা রাখিতে কিরূপ শােভা হইয়াছে তাহা দেখিতে বাম হাতটা দাড়ি হইতে নামাইয়া ছিলেন, পুনরায় হন্ত যথানিয়ােজনে নতমুখ উন্নত করিয়া বলিলেন, “মায়ের উপদেশ বাবাজি, মহাত্মাদেরও শিরােধার্য। আদেশ কর মা তুমি আমাকে, কি করিব?” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা। 3ও।
- ৮ স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী শরৎকুমার কহিলেন, “ওঁকে তবে আদেশ করুন রাজকুমারী, উনি যেন ঘরের পােযাগীটাকে পাপড়ীর নাম ডাকতে শেখা।” পণ্ডিতমহাশয় হঠাৎ ‘গ’ হইয়া গেলেন. দাড়ী হইতে হাতটা সহ নামি পছিল। জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া কহিলেন, “ডাক্তারদা -কি যে বলেন আপনি ?” “আচ্ছা, পণ্ডিতমহাশয়কেই জিজ্ঞাসা করুন কথাটা ঠিক কি না ?” পণ্ডিতমহাশয়ের কণা ফুটলক পরিষ্কার করিয়া লইয়া বলিলেন, “পাড়াপড়শীর নাম ডাকতে শেখাই আমি! এ কি বিশ্বাসের কথা মা? কে বম্নে বলত হে?” উত্তর হইল—“র নামে পাখী বুলি ধরেছিল সেই বলছিল।” সেই বলছিল । লােকটা কে শুনি ! নামটাই বলনা !” “সে কথা আমার চেয়ে আপনিই ভাল জানেন।” পণ্ডিতমহাশনের অতঃপর ধৈর্য্যচ্যুত হইল, চড়ামেজাজে কহি- লেন, “আমি কিছু জানি টানিনে বাপু, তুমি কি জেনেছ, শুনেছ তুমিই বলতে পার।” “নিতান্তই শুনবেন সেকথা!" বেশ গম্ভীর হইয়া শরৎকুমার এ কথা বলিলেন—“শুনুন তবে। কাল সকালে আমি যাচ্ছিলুম যখন আপনার বাড়ীর পাশ দিয়ে হাসপাতালে, আপনার পাখীটি তখন মনের সুখে বুলি ধরেছে-আর রাস্তার ধারে দাড়িয়ে এক- জন স্ত্রীলোেক গালে হাত দিয়ে বলছে—কি ঘেন্না গাে কি আঙ্কেল, কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী এ
স্বপ্নণী
দেবদেবীর নাম রইল শিকেয় ভােলা—আর পাখী ধরেছে বিন্দুর
নাম।”
শরৎকুমার যে সরস অভিনয়ে কিরূপ গল্প জমাইতে পারেন
রাজকুমারী আজ তাহার প্রথম পরিচয় পাইলেন, হাস্যোশ্লাসে
গৃহ পূর্ণ হইল। কিন্তু পণ্ডিত মহাশয় ইহাতে যােগ দিতে
পারিলেন না, তিনি ক্রুদ্ধস্বরেই কহিলেন, “দেখেছ বিন্দু-
ময়রাণীর স্পর্ধা! পাখীকে আমি কি না তার নাম্ গান করতে
শেখাব !"
“কিন্তু আমারাে মনে হােল, পাখী বিন্দু বিন্দু বলেই যেন
ডাকছে।” এই সমর্থন বাক্য পণ্ডিতমহাশয়ের অসন্ত হইয়া উঠিল।
সক্রোধে বলিলেন, “দাড়াওনা গলাটি পাখীটাকে মেরে ফেলছি
গিয়েই।”
শরৎকুমার পূর্ববং গম্ভীরভাবেই বলিলেন, “কি বলেন
গুরুজি! রাখিবন্ধনের উপদেশ এক মুহুর্তেই ভুলে গেলেন!
পণ্ডিতমহাশয়ের ওষ্ঠাধর এইবার হাস্যরেখায় উন্মীলিত হইল,
সহাস্যে কহিলেন, “জানেন ডাক্তার সাহেব,আমি শেখাচ্ছিলুম
পাখীটাকে ফুলের নাম ?”
‘ফুলের নাম!” শরৎকুমার বঅক্ষর আদি ফুলের নাম মনে
করিতে চেষ্টা করিলেন—“বকুল, বেলা, বনতুলসি, বংশীবট, কই
ব-ওয়ালা ফুলের নাম ত বেশী মনে আসছে না গুরুজি? তবে
বধূ বলে অভিধানে একটা কথা আছে, কাব্যকারগণ ফুলের সঙ্গে
তার তুলনা করে থাকেন বটে!”
১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা
ঐণকুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী পণ্ডিত মহাশর যে বিপত্নিক তাহা শরৎকুমার জানিতেন । গুরুজি একটু অপ্রতিভ হইয়া উত্তরে কহিলেন,- “কেন, বন্ধু শব্দ! আসল ব্যাপারটাও বাবাজি তাই। এই এইধর অরবিন্দ। আমি তাকে হৃদয় বন্ধু বলে মনে করি কিনা -তার প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধাভক্তি। কে জানে তা থেকে এমন উল্টো উৎপত্তি হবে। উপর অংশ বাদ দিয়ে পাখী হত- ভাগাটা কিনা শেষটুকুই ধরলে !” “ভবিষ্যতে সাবধান হবেন,-দেখছেন ত কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। কোন দিন শেষে সাগরিকার সাবির মত আপনার পাখী একটা কাণ্ড কারখানা করে বসবে।” এই কথা বলিয়া শরৎকুমার জ্যোতির্ময়ীর দিকে চাহিয়া বিনয়পূর্বক বলিলেন, “আপনার গুরুজিকে উপদেশ দিতেও সাহসী হচ্ছি রাজকুমারী, দেখছেন ডাক্তারের ও মতিভ্রম হয়।” পণ্ডিত মহাশয় বলিলেন, “মতিভ্রম নয়, ঠিক বলেছ বাবাজি,আমার মনের মধ্যে একটা ভাবনা সরে গেল! এখাে মা, একথাটা যেন কৃন্দের কাণে না যায়। তিনি ত এ থেকে উল্টো বুঝতে পারেন!” তাহার এই অনুনয় ভঙ্গীতে কণ্ঠাগত হাস্যোচ্ছাসকে বহু কষ্টে চাপিয়া ইয়া রাজকুমারী কহিলেন, “কু-দিদির বাড়ী থেকে আসতে এখনাে দেরী আছে, তিনি যতদিনে আসবেন, ততদিনে এ কথাটা চাপা পড়ে যাবে।” রাজকুমারীর এ প্রসঙ্গ ভাল লাগিতেছিল না, তিনি অতঃপর কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণ হবে ; ইহা বন্ধ করিবার অভিপ্রায়ে শরৎকুমারের দিকে চাহিয়া গম্ভীর- ভাবে কহিলেন,- “ডাক্তার-দা আপনি এখানে হঠাং এ সময় কেন এলেন তা ত এখনাে বল্লেন না।” পণ্ডিত মহাশয় একবার ঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “আমারও যে কৌতূহল জন্মল,-এখনাে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে পারি, কথাটা শুনেই যাই। সকলের কৌতুহল নিবারণ করিয়া শরৎকুমার উত্তর করিলেন, “রাজাবাহাদুরের দৌত্য নিয়ে এসেছি। আগামী সপ্তাহের রবিবারে প্রসাদপুরে বঙ্গবিভাগ-প্রতিবা-কনফারেন্স অতিথিসম্বৰ্ধনার জন্য আপনি প্রস্তুত হয় নি। সভার প্রােগ্রামও আপনাকেই ঠিক করতে হবে।” জ্যোতির্ময়ী সােংসাহে বলিয়া উঠিলেন, “সত্যি! বেশ বেশ! অতিথিসৎকারের জন্য ভাবিনে ডাক্তার-না। সে বন্দবস্ত ত আপনারাই করবেন, কিন্তু গানের রিহাসের জন্য সময়টা যেন একটু সংক্ষেপ মনে হচ্ছে।” শরৎকুমাক বলিলেন, “আজ শুক্রবার, এখনো পূর্ণ ১০টা নি হাতে আছে ; তার মধ্যে আপনার রিহাসেন খুব হয়ে যাবে।” পণ্ডিত মহাশয় এইবার প্রস্থানেদ্দেশে পদ বাড়াইয়া বলিলেন, “ভাবিত হয়ে না মা, আমরা তােমার সহায় আছি। এখন আসি তকে, বিকালে সর্বাগ্রে ছুটে আসব।” ১১৪নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
পণ্ডিত মহাশয় চলিয়া গেলেন। জ্যোতির্ময়ী বলিলেন,
আমার বড় আহলাদ হচ্ছে ডাক্তার-দা; অনেকদিন ধরে এখানে
একটা জতীয় ওভা আহবান করবার কথা আমি বাবাকে বলছি।
দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিশেষত সুরেন্দ্র বাবুর সঙ্গে আলাপ
করার ইচ্ছ। বহুদিন ধরে আমার মনে জেগেছে, তা বােধ হয়
আগেই একদিন আপনাকে বলেছি। খুব সুখবর ডাক্তার-দা!”
“আরও একটি সুখবর আছে রাজকুমারী। মকদ্দমায় আমরা
বেকসুর মুক্তি করেছি।”
রাজকুমারীর মুকান্তি জ্যোতির্ময় হইয়া উঠিল, তিনি পূর্ণানন্দে
কহিলেন, “ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব সত্যই ন্যায়াবতার। কালই
বিকালে গিয়ে আমি তাদের রাখি পরিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে আসব।
আর দেখব ঘনি এই প্রতিবাদ কারেন্সের প্রেসিডেন্ট তাকেই
করতে পারি। ডাক্তার-দা, আজ বিকালে রাখিবন্ধনের সময়
আপনিও আসছেন ত?”
নিশ্চয়। কিন্তু না, সম্ভবতঃ আসতে পারব না, হাসপাতালে
আজ বিকালে একট। অচিকিৎসা আছে।
রাজকুমারী একটু ক্ষুন্ন হইয়া পড়িলেন, দু-এক মুহুর্ত সময়
ইয়া বলিলেন, “তবু চেষ্টা করবেন, আমি অপেক্ষা করব-ফিরতে
যদি সন্ধ্যা হয়ে যায়-তবুও আমি অপেক্ষা করব।”
একি মধুরতা! এ কি মাদকতা! এই দুই চারিটী কথায় শরং-
কুমারের মননাপ্রাণ সহসা অমৃত ধারায় ভরিয়া গেল। তিনি ধীরে
ধীরে মুগ্ধের ন্যায় কহিলেন ; "Caseট। বড় কঠিন, আমার মনে
;
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী এত স্বপ্নবাণী হচ্ছে ফিরতে রাত হয়ে যাবে, অপেক্ষা করবেন না রাজ- কুমারী।” রাজকুমারী বলিলেন, “বেশ, অপেক্ষা করব না তবে। তবুও পারেন ত আসবেন ডাক্তার-দা। অনাদির ভাব দেখে আমার মনে ভারী একটা আতঙ্ক উপস্থিত হয়েছে। আমি যদি ভাল করে ছেলেদের বােঝাতে না পারি, আপনি একটু বুঝিয়ে বলবেন যে, তারাই যথার্থ দেশভক্ত, সাধক রা” জ্যোতির্ময়ী হঠাৎ থামিয়া পড়িলেন, কি বলি! এই বাক্য সমাপ্ত করিবেন যেন ভাষা খুঁজিয়া পাইলেন না.। শরৎকুমার সে অভাব পূরণ করিয়া কহিলেন, “তাহারাই বথার্থ দেশভক্ত, সাধক,যাহাদের মূলমন্ত্র রক্তপাত নহে আত্মপাত। শােণিতা মাতৃভূমি সুখে গ্রহণ করেন না, তাহলে তাকে কলঙ্কিত করা হয়।” কি সুন্দর কথা ! জ্যোতির্ময়ী কি স্বপ্নবাণী শুনিলেন। চতুর্থ পরিচ্ছেদ! অনারি স্কুলে গিয়া দেখিল, ব্যায়াম সমিতির অনেক ছেলেই অনুপস্থিত। শুনিল, ন্যাসন্যাল শিল্পের প্রতিষ্ঠা উৎসবে যােগদান করিতে তাহারা কলিকাতায় গিয়াছে। অগত্যা স্বল্পসংখ্যক মাত্র ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
কুমারী দেবী প্রণীত অপবাণী ; বন্ধুবান্ধব লইয়াই বিকালে অনাদি জ্যোতির্ময়ীর নিমন্ত্রণ রক্ষায় আসিল। অতিথিগণ আসিবার বহু পূর্ব হইতেই আতিথ্যকারিণী বাগানে আসিয়া আয়ােজন কার্যে নিযুক্ত হইয়াছেন। দাসদাসী- গণ তঁাহার আদেশে ও উপদেশে খাদ্যসম্ভার তরুকুঙ্গে টেবিলে সাজাইয়া রাখিতেছে, কী স্বয়ং স্বহস্তে সরবং প্রস্তুতভার গ্রহণ করিয়াছেন। এতই নিবিষ্ট চিত্তে তিনি একাষ্য করিতেছিলেন যে ইতি মধ্যে হরিরাম কখন যে নিকটের তরুপার্থে আসিয়া দাড়াইয়াছে তাহা তিনি জানিতেও পারেন নাই। হরিরামের স্কন্ধে এক বৃহৎ লৌহ ধনুকছিলা; আসিবার পথে ইহার দুটী গুলা সজোরে নাড়াইয়া আপনার আগমন সংবাদ জাপন করতে সে ত্রুটি করে নাই। কিন্তু এ শব্দেও রাজকুমারীকে তাহার অস্তিত্বে সচেতন করিতে পারে নাই দেখিয়া অতঃপর নিঃশব্দেই কিছু দূরে দাঁড়াইয়া কাৰ্য্যর সেই লক্ষ্মী মূর্তিকে প্রীতিনয়ন ভরিয়া দেখিতেছিল। এই অসামান্য রূপ- লাবণ্যময়ী বালিকা শিশুকালে তাহারি ক্রোড়ে মানুষ হইয়াছে— ইহা ভাবিয়া গৰ্বাননে তাহার বক্ষ জোয়ারের, জলের মতই ফাপিয়া উঠিতে লাগিল। জ্যোতির্ময়ী কাৰ্যান্তে হাত ধুইয়া আর একবার উত্তমরূপে টেবিল-সজ্জা পৰ্যবেক্ষণ করিয়া লইয়া একখানি লৌহ-চৌকিতে আসিয়া যখন বসিলেন ; তখন হরিরাম নিকটে আসিয়া নমস্কার পূর্বক কহিল, “এই দেখ রাণি-মা, তােমায় আদ্য পুরুষের সেই নামজাদা ধনুক।” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী এত
লী
জ্যোতির্ময়ী আহ্লাদ প্রকাশ করিয়া কহিলেন, “এত দিনে
খুঁজে পেয়েছ, হরিরাম?
“পাব না? মা আমার আজ্ঞা করলেন-খুজি আন সে
পুরাতন ধনু ; হরিরাম কি আর চুপ করি থাকৃতি পারে?
বলব কি মা দুখের কথা, তােষাখানার হইচে যে নৰ কৰ্মকর্তা,
সেটা একটা আস্ত জাম্বাে।”
জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া বলিলেন, “জাম্বো কি হরিরাম?”
“এই তােমরা যানারে কও জান্থবান, আমরা তানারেই কই
জাম্বাে! সেডাকি বােজে -মতির মালা. আর ইটপাটকেলের
তফাৎ! এই ধছিলাটা কিনা ফেলি রাখচে কতক ভাঙ্গা-চোরা
জিনিষ পত্তরের মদ্দি -
“তা পেয়েছ ত, সেই ভাল।”
“ তা পাইচি। না পালি বড় খারাবি হােত। ঠাউর
মশয় লিখি থুইচে যে, এ ধনুতে রাজি বদলি হইবে। রামধনুক
ভাজি তবে ত সীতারে পাইচিলেন মা!”
জ্যোতির্ময়ী হরিরামকে এবিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা হইতে নিবৃত্ত
করিবার অভিপ্রায়ে কহিলেন, “হরিরাম, তুমি এতদিন ছেলেদের
লাঠিখেলা শিখিয়েছ, এইবার তােনার কাজ বাড়লাে, এবার
ধনুর্বাণ ছুড়তে শেখাও।”
“তা শিখাব বইকি! কিন্তু তাহলে ধনুক তৈরি করাও মা, এ
ধ-ছিলা তুলতি পারে এমন জন ত এয়ানে দেহি নে। এ ধংক
হইচে সনাতন চৌধুরীর হাতের ধনুক ; এই ছিলায় বহন
*•.
• •
১১৪ নং আহিরীটোলা ফ্রট, কলিকাতা।
কুমারী দেবী প্রণীত
অথবাণী
'।
বাণ ছুটত, তহন বন জঙ্গলের কোন জানােয়ারই রেহাই
পাত না।”
কৌতুহলপরায়ণা শশীদাসী রাজকুমারীর পশ্চাতে আসিয়া
দাড়াইয়াছিল, সে বলিয়া উঠিল—“সতি রাণীদিদি, ঠিক কথা।
পাড়ের মুখেও এই কথা শুনেছি।”
হরিরাম বলিল, “পুথির কহন কি মিথ্যা হয় ! শােন ও
বাকি! গণক ঠাউর রজপুথিতে এই সব লিখি থুইচে। দুটো
কুদো বাঘ গাঁ উজোর করি যহন ফ্যাক্সে, তহন প্রজারা কাঁদি
কাটি রামপুরের রাজার পা চাপি ধরলো; ঠিক কি না তুই ক ?”
শশীদাসী কহিল, “রামপুর নয়গাে-রাজপুর।
হরিরাম রাগিয়া বলিল, “রামপুর হইল জিল। আর রাজপুর
হইল-রাজার পাটস্থান ! মেয়ে জাত এমন আম্মক তাত এই
দেহি। রাজা পাটে বসি হুকুম দিলেন, এ বাঘ যে মারি আনবে
সে প্রসাদপুর বসিস পাবে। সনাতন চৌধুরী খবর শুনিত ভারী
খুসী-রাজদরবারে আলি কইলেন—আমারে দানপত্র ব্লিখিয়া
দেওয়া হােক।”
এতক্ষণ জ্যোতির্ময়ী নীরব হাস্যমুখে তাহার দীর্ঘকাহিনী
শুনিয়া যাইতেছিলেন। এই বার তাহার উপন্যাস সংক্ষেপ
করিয়া কহিলেন, “তারপর সনাতন চৌধুরী বাঘ শীকারের
পুরস্কার স্বরূপ রাজ্য এবং রাজকন্যা এক সঙ্গে লাভ করিলেন ?
এই না হরিরাম?”
কিন্তু এত সহজে হরিরাম নিবৃত হইবার নহে; সে কহিল,
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
এ মামী নেী এক স্বপবী “কহন কথা আরাে কইচে যে, সনাতন চৌধুরী হাতির পিঠে চড়ি—রাজপুরীতে আইলেন।” রাজকুমারী বলিলেন, “শ্বেত হাতীর পিঠে অবশ্য।” “ মা! রাজা বাঘ দু’টারে মাইর ছিলায় বঁধবার কালে—ধনুকের ঘুষ্টির রবে জঙ্গল ভইরা উঠলাে; আর মনি দাসী বলিল, “ঘুরি রবে না বংশীধ্বনিতে? সবাই কয় রাজা খুব বাশি বাজাতে পারতেন।” “শােন বাকি। ঘুণ্টির রব বংশীধ্বনির চেয়ে কম নাকি?” হরিরাম ধনুকের ঘুণ্টি গুলা ঝনঝন্ করিয়া বাজাইয়া দিল- রাজকুমারী হাসিয়া কহিলেন, “আমার ত এ ধ্বনি বাঁশির সুরের চেয়েও সুমধুর মনে হচ্ছে।” আহলাদে হাবিকশিত হইয়া উঠিয়া হরিরাম কহিল, “এই ঘুন্টির রবে বেতহস্তী বনের বাহিরে আইসা, চৌধুরী মশয়কে ওড়ে তুইলা পিঠে চড়ায়ে রাজার কাছে আইনা হাজির করলেন, রাজা ত দেইখা শুইনা অবাক, তিনি কইলেন—ওগাে সনাতন চৌধুরী, তুমি ত দেহি ব্রাহ্মণ সন্তান—তােমারেই আমি কন্যাদান করব। রাজমাতা আপুনি আইসা তহন বরণ কইয়া হাতি খে নামাইলেন। পুথিখান একবার পইড়া দেহ মা!” “পুথি পাওয়া যাচ্ছে না হরিরাম!” “পুথি পাওয়া যায় না!-আশ্চর্য প্রকাশ করিতে গিয়া হরিরামের চক্ষু জলে ভরিয়া গেল, সে বলিল,- ১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
:
কুমারী দেবী প্রীত
স্বপ্নবাণী
;
“এ সেই দুর্জন বেটার কীর্তি ! চুরিয়ে রাখছে। আজকের
মা, তার ভিটে পুড়িয়ে পুথি আনি।”
জ্যোতির্ময়ী বলিলেন, “না, সে সব কিছু করতে হবে না;
তার কাছেই থাক না; ক্ষতি কি তাতে। হরিরাম তুমি ধনুকটা
কাধ থেকে নামাও ত, দেখি আমি তুলতে পারি কি না?”
হরিরাম “হা হা” করিয়া হাসিয়া ধনুক নামাইয়া ভূমে
রাখিল। জ্যোতির্ময়ী উঠাইতে চেষ্টা করিয়া বিফলপ্রযত্ন হইয়া
কহিলেন, “তাই ত ভয়ানক ভারী! ব্যায়ামের দিনে এবার এর
দ্বারা আমার ছেলেদের শক্তি পরীক্ষা করতে হবে।”
হরিরাম বলিল, “মা জননি, ঠাউরের সে আজ্ঞে নেই; এ
ধনুক যারে তারে ধরতে দিতে নিষেধ। এমন কহন আছে,
বাজার ঘরে যদি পুত্র সন্তান না হয়, ত এই ধনুক যে বেটা ধারণ
;
এ কাহিনী শােনার দায় হইতে নিষ্কৃতিলাভের অভিপ্রায়ে
রাজকুমারী তাড়াতাড়ি বলিলেন, “আচ্ছা হরিরাম, ও ধনুক ,
তুমি নিয়ে গিয়ে হাতিয়ারশালায় দেয়ালে সাজিয়ে রাখগে-
আমার এখন একটু কাজ আছে।”
হরিরাম আর কোন কথা না কহিয়া ভূমিপতিত ধনুক
সজোরে স্কন্ধে ধারণ করিল। এই সময় রূপসিংহ দ্বারবান
আসিয়া সৈনিক প্রথায় সম্মান প্রদর্শনপূর্বক রাজকুমারীর নিকট
একখানি পত্র-পাত্র পরিল। রাজকুমারী পত্ৰখানি তুলিয়া হন্তে
গ্রহণ করিবামাত্র যে আর একবার কায়দাসহকারে তাহাকে
. কমলিনী-সাহিত্যমন্দির,
কুমারী দেবীণত
বাণী
সেলাম করিয়া চলিয়া গেল। পত্রখানি পণ্ডিত মহাশয়ের।
লিখিয়াছেন, আজ বিকালে তিনি সম্ভবতঃ জ্যোতির্ময়ীর নিমন্ত্রণে
আসিতে পারিবেন না। কারণ, দুপুরের পর হইতে তাঁহার
পাখীটির বুলি সহসা বন্ধ হইয়া পড়ায় তিনি বড়ই ভাবিত
আছেন। যতক্ষণ তাহার বুলি না ফোটে—ততক্ষণ তাঁহার
গতিবিধি সমস্তই অনিশ্চিত।
এই সংবাদে জ্যোতির্ময়ীও ভাবিত হইয়া পড়িলেন, তিনি
জানেন, পাখীটি পণ্ডিত মহাশয়ের প্রাণের ধন, তাহার মৃত্যু
হইলে পণ্ডিত মহাশয়ের বড়ই কষ্ট হইবে। তিনি গমনােত
হরিরামকে ডাকিয়া কহিলেন, “পণ্ডিত মহাশয়ের পাখীটার
অথ করেছে-তুমি ত হরিরাম একজন শীকারী, পাখীর
। চিকিৎসা জান বােধ হয় ?”
হরিরাম মাথা নাড়িয়া বলিল,-“উই; আমি জানিনে ;
হাতেম মিঞা জানে। সে আমার বাড়ীর কাছেই থাকে।”
জ্যোতির্ময়ী সানুনয়ে কহিলেন, “যাও হরিরাম, এখনি তাকে
নিয়ে গিয়ে পণ্ডিত মশায়ের পাখীটিকে দেখাও। বলল, সারাতে
পারলে খুব বকুসিস, পাবে।”
হরিরাম যে আজ্ঞা' বলিয়া অভিবাদনপূর্বক দুটি বাজাইতে
বাজাইতে চলিয়া গেল।
অপরাহ্নে যথাসময়ে নিমন্ত্রিত বালকগণ আম বাগানে আসিয়া
সমবেত হইল। জ্যোতির্ময়ী স্বয়ং তাহাদিগকে রাখি পরাইবেন,
তাহাদের আনন্দ-উৎসাহ দেখে কে? বন্দেমাতরম ধ্বনি তুলিয়া
১১নং আহিরীটোলা ইট, কলিকাতা।
;
:
:: স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত বাণী তাহারা প্রবেশ করিল; বন্দেমাতরম্ ধ্বনিতে রাখি পরিয়া আনতমস্তকে তাঁহাকে নমস্কার অভিবাদন করিল। জ্যোতি শ্রয়ীর জীবন মাতৃভাবে সার্থক হইয়া উঠিল। তিনি রাখিবন্ধন শেষে প্রত্যভিবাদনে আর একবার তাহাদিগকে নমস্কার করিয়া কহিলেন, “আজকের রাখিবন্ধন-উৎসব আমাদের ব্যায়াম উৎসবেরই একটি অঙ্গ। সমিতির প্রতিষ্ঠা দিনের শপথ তােমাদের মনে আছে ত?” ইহার উত্তরে বহুকঃ একই কষ্ঠের মত ধ্বনিত হইয়া উঠিল— “মনে নেই সে শপথবাক্য ! কি বলেন রাজকুমারি ?” সকলে থামিলে, বসন্তকুমার নামে সমিতির একজন তেজস্বী বলবান যুবক উত্তর করিল, দেশের কাজে যদি কোনদিন এই বাহুবল সার্থক করতে পারি তবেই সে শপথ ভােলার দিন আসবে ; তার আগে নয়।” রাজকুমারী নীরব হইয়া পড়িলেন ; বসন্তকুমারের একথার অর্থ তিনি ঠিক হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলেন না। কিছু পরে ধীরে ধীরে বলিলেন, “বাহুবলের সার্থকতাই ত আমাদের কাৰ্য্যের উদ্দেশ্য নয়-বসন্ত ; আমাদের পথ ত অতাচারের পথ নয়। আমাদের জীবনের সার্থকতা, কাৰ্য্যের সফলতা আত্মপাতে ; রক্ত- পাতকে কখনাে যেন আমরা গৌরবের কাৰ্য্য বলে বিবেচনা না করি।” সহসা সুপ্তি ভজে অতিথির দল যেন চমকিয়া উঠিল। ব্যায়াম সমিতি প্রতিষ্ঠার দিনে তাহারা কি শপথ করিয়াছিল অক্ষরে ; কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির, . ৪৫ ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত বাণী ; অক্ষরে তাহা কাহারো স্মরণ ছিল না; দেশের জন্য কাজ করিতে তাহারা শপথবদ্ধ—এই কথাই মাত্র তাহাদের মনে জাগরূক ছিল। অনাদি কেবল প্রাতঃকালে তাহার বিস্তৃত স্মৃতি পূর্ণমাত্রায় ফিরিয়া পাইয়াছে। অন্য কেহ কোন কথা কহিবার পূর্বেই সে জ্যোতির্ময়ীর নিকট আসিয়া নতমস্তকে বলিল, “যথাদেশ রাজকুমারী ; রক্তপাতকে অবজ্ঞা করিয়াই আমরা চলিব।” ‘কিন্তু যদি আবশ্যক হয় !” একটা ক্ষীণদেহ অল্পবয়স্ক বালক পশ্চাং হইতে এই প্রশ্ন ; করিল। জ্যোতির্ময়ী উত্তরে কহিলেন, “আত্মরক্ষার জন্য, দুলরক্ষার জন্য বাহুবলের আশ্রয় গ্রহণ ত অনিবাৰ্য, কিন্তু রাজকুমারী এই পর্যন্ত বলিয়া সহসা থামিয়া গেলেন - অনাদি তাঁহার প্রতিনিধি স্বরূপ কহিল, “কিন্তু রক্তপাতে দেশ ব্রত উদযাপন-সঙ্কল্প আমাদের মনে যেন না জাগে। রাজ- কুমারী এই কথাই বলছেন আর এই ভাবের শপথেই আমরা পূর্ব হতে নিজেদের আবদ্ধ করেছি। অযথা বল প্রকাশ বা দ্বন্দ্ব করিবে না। ইহা আমাদের নিয়মাবলীর একটি সূত্র।” সকলেরই মনে হত স্মৃতি পুনর্জাগরিত হইয়া উঠিল। ব্যায়াম প্রতিষ্ঠাদিনের আনন্দ উচ্ছ্বাসের কথা মনে পড়িল-উৎসাহ ভাবে নীয়মান হইয়া সম্মুখের বালকশ্রেণী অবনত মস্তকে বলিল, ১১৪ নং আহিরীটোলা টি, কলিকাতা।
এরী কে এত বল্পবাণী “আমরা রাজকুমারীকে গুরু বলিয়া জানি, গুরু বলিয়া মানি, তাঁহার আদেশ সর্ব সময়েই শিরােধার্য।” এই বলিয়া বন্দেমাতরম, ধ্বনিতে তাহারা জয়ধবনি তুলিল। পশ্চাতের দুই চারিজন বালকের নীরবতা সেই জয়ধ্বনির মধ্যে কেহ লক্ষ্য করিল না। ইহার পর বালকগণ আনন্দ কোলাহল করিতে করিতে ভােজর দিকে মননানিবেশ করিল। যখন বিহঙ্গ বৈতালিকগণ সন্ধ্যাবন্দনায় কানন মুখরিত করিয়া তুলিল, পান ভােজনাদি শেষ করিয়া বালকগণও তখন বন্দেমাতরং গীতে আগমনী গাহিল। বন্দনাগীতি-স্বাগত সন্ধ্যারাণী, শান্তিময় আশীষালােকে ভুবন ভরাইয়া তুলিয়া ধরণীতে পদার্পণ করিলেন। এই কল্যাণ- রূপিনী জননীর স্নেহ-ক্রোড়ে রাজকুমারীকে সংরক্ষিত করিয়া বালকগণ প্রসন্নমনে বিদায় গ্রহণ করিল। * সন্ধ্যা বহুক্ষণ উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। জন শূন্য কানন তলে লৌহাসনে আসীনা রাজকন্যা আকাশের দিকে চাহিয়া চিন্তামগ্ন। সন্ধ্যা পূর্ব হইতে দ্বিতীয়ার চন্দ্রকলা দিব্যরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়া এখন আত্মগােপন প্রয়াসে আকাশের শেষপ্রান্তে প্রায় নামিয়া পড়িয়াছে ; ঐ ডুবিল, ঐ নিবিল ! সন্ধ্যাতারার উল রূপ সহসা উজ্জলতর হইয়া উঠিল, পার্শ্বের ক্ষীণকান্তি মঙ্গলগ্রহ অপেক্ষাকৃত সুস্পষ্টভাবে নেগােচর হইল। তাহার দিকে চাহিয়া জ্যোতির্ময়ী ভাবিতে লাগিলেন “মঙ্গলগ্রহে বার্তা প্রেরণের জন্য কত জ্যোতিষী প্রাণান্ত প্রয়াস করিতেছেন, ; কলিনী-সাহিত্য-মন্দির, ৭ मानी जाती অপবা চিরদিন কি তাহাদের চেষ্টা নিল রহিবে! না কোন সৌভাগ্য- শালী একদিন এই বহু চেষ্টাগঠিত সােপানাবলী চড়িয়া মঙ্গলে পৌছিতে পারিবেন ?” জ্যোতির্ময়ীর দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল। অদূরে শুকনাে পাতা দলিত জুতার মচমচনির মধ্যে, তাহার নিশ্বাসের মৃদু ধ্বনি ধীরে মিশাইয়া গেল। জ্যোতির্ময়ী সেই দিকে আকুল প্রত্যাশায় কর্ণপাত করিলেন, ডাক্তারদা কি এতক্ষণে আসিতেছেন! তাহার হাতে এখনাে রাখি বাঁধা হয় নাই; বিকালের আনন্দ তাই অসম্পূর্ণ রহিয়া গিয়াছে। পদশব্দ যতই নিকটবর্তী হইতে লাগিল, ততই তাহার হৃদয়-শােণিত বেগে উঠিতে পড়িতে লাগিল, একটা লজ্জা চাঞ্চল্যের আবেগে মুখমণ্ডল আরক্তিম হইয়া উঠিল ! জ্যোতির্ময়ী প্রকৃতিস্থ হইবার চেষ্টায় উঠিয়া দাঁড়াইয়া লতামণ্ডপ হইতে ফুলগুচ্ছ চয়নে রত হইলেন। মূর্তি নয়ন গােচর হইল, “ইনি ত ডাক্তার নহেন,-পিতা যে!” রাজা আসিয়া কহিলেন, “আমি জানতুম এখানে এলেই রাণীর দেখা পাব।” রাজকুমারী লজ্জাবনত দৃষ্টিতে ফুলগুলি তাহার হাতে দিয়া বলিলেন, “আজকে বাবা আমি ছেলেদের রাখি পরিয়ে দিলুম।” রাজাবাহাদুর কন্যার পিঠে অন্য হাত রাখিয়া আদরে বলিলেন, “শুনেছিস ত সব কথা ! এখানে কনফারেন্স হবে ; খুসী ত রাণী !” রাজকুমারী সমুৎসাহে কহিলেন, “খুব !” পূর্বের নৈরাশ্য বেদনা তাহার হৃদয় হইতে মুছিয়া গেল। রাজা বলিলেন, ১১৪ নং আহিরীটোলাইট, কলিকাতা।
:
এইমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
“চল রাণি ঘরে ; প্রােগ্রাম ঠিক করি গে। ম্যানেজার
আবার আমাকে জোর তলব করেছেন, কাল আর হবে না,
পরশু নাগাদ আমাকে দু’চার দিনের জন্য একবার কলকাতায়
যেতেই হবে।”
দুজনে হাত ধরাধরি করিয়া গৃহাভিমুখী হইলেন। যাইতে
যাইতে রাজকুমারী কহিলেন, “তাহলে কাল একবার মাজিষ্ট্রেটের
বাড়ী চল না বাবা।”
রাজা কহিলেন, “আমার খুকীটির মনের ভাব বুঝে আমি
আগে থাকতেই সেই প্রােগ্রাম ঠিক করেছি। ম্যাজিষ্ট্রেট-পত্নী
জানেন যে কাল আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে যাব।”
জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া আনন্দ প্রকাশ করিয়া কহিলেন,
“ম্যাজিষ্ট্রেটকে আমি কিন্তু কনফারেন্সের প্রেসিডেন্ট হতে নিমন্ত্রণ
কৰ্ব বাবা-
রাজা কহিলেন, “তিনি প্রেসিডেন্ট হলে ত খুবই ভাল হয়।
কিন্তু তাকি হবেন ?”
“নিশ্চয়ই হবেন, তুমি দেখে নিও।”
বলিতে বলিতে হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি তুলিয়া মঙ্গল গ্রহের
দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন!
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
পঞ্চম পরিচ্ছেদ। বহুদূর বিস্তৃত জনশূন্য পতিত প্রান্তর ; ত্রিসীমা দিয়া প্রায় লােক যাতায়াত করে না। ইহারই এক স্থলে বন্য গাছপালা-প্ৰচ্ছন্ন বহু পুরাতন একটি মন্দিরের ভগ্নস্তপ । ইষ্টক আবর্জনারাশি নির্মিত প্রাকার বেষ্টনে মধ্যের অঙ্গন ভাগ এমন গুপ্ত গুহাকারে পরিণত হইয়াছে যে, ইহার ঠিক বহির্দেশে আসিয়া দাঁড়াইলেও কেহ অন্তর্বিভাগের পরিচয় পায় না। এই গুপ্তস্থান বিদ্রোহী যুবকদলের দুর্গ—নাম মাতৃমন্দির। অন্তবিভাগ দুইটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত; একটি নব বালকদিগের শপথগৃহ এবং এইখানেই মাটীর নীচে চোরাই অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে; অন্যাংশ বিস্ফোটক পৰীক্ষাগার। এ মন্দিরে প্রবেশ-অধিকারীর নাম সেবাধারী। শনি রবিবারেই এখানে ছেলেদের আমদানী অধিক, অস্ত্রশস্ত্রের কসরৎ এবং রাসায়নিক পরীক্ষাকাৰ্য্য এই দু'দিন বেশ রীতিমত ভাবে এখানে চলে । পূৰ্বকথিত রাখিবন্ধনের পরদিন পড়িয়াছে একটি শনিবার, কিন্তু তথাপি আজ এখানে সেবাধারীর সংখ্যা খুবই কম। বিবেকানন্দ স্বামীর শিষ্যদলের অনুকরণে গৈরিক পরিচ্ছদধারী দলপতিমহাশয়ের হন্তে এক- খানি প্রণালী-পুস্তক; পরীক্ষাকাষে রত কয়েকটি বালকের নিকটে দাঁড়াইয়া প্রকরণে ভুলচুক দেখিলে তিনি মাঝে মাঝে ১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
এখলামী দেবী এত পবাণ তাহা সংশোধন করিয়া দিতেছেন এবং অবসর মত গুহার বাহিরে থাকার নিয়ে আসিয়া কণ্ঠসংলগ্ন ক্ষুদ্র বাশি বাজাইয়া অনাগতদিগকে জানাইয়া দিতেছেন যে পথ নিরাপদ। এখানে দলবদ্ধভাবে আসিবার নিয়ম নাই, এক সময়ে দুই একজন মাত্র সতর্কতা অবলম্বনে প্রকার দ্বারে আসিয়া দাঁড়ায়, তাহার পর গুপ্ত পথে ভিতরে প্রবেশ করে। রাজবাড়ীর বড় ঘড়িতে সজোরে চারিটার ঘণ্টা পড়িল শূন্য প্রান্তরস্থিত ভগ্নদুর্গে সে আওয়াজ তােপের-ন্যায় প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল। আশ্বিনের বেলা অবসান প্রায়। দলপতি উৎসুক- ভাবে বাহিরে আসিয়া পাড়াইলেন। “আর কি কেহ তবে আসিবে ! যে দুই জন নৃতন বালকের আজ মন্দিরে আসিবার কথা আছে—তাহারাও ত কই এখনো আসিল না । ভয়ে পিছাইল কি?” তিনি বেশ একটু চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। সহসা অদূরে সাঙ্কেতিক বংশীধ্বনিতে আগমনবার্তা বিজ্ঞাপিত হইল। অল্পক্ষণের মধ্যেই অনাদি ও বসন্তকে সঙ্গে লইয়া একজন সেধারী আসিয়া উপস্থিত হইল, এবং দুর্গহিদ্বারে দণ্ডায়মান দলপতির নিকটে ইহাদিগকে পেীছিয়া দিয়া সরিয়া পড়িল। দলপতি প্রফুল্প হইয়া উঠিলেন। ইহাদের সহিত পরিচয়ে ইনি বুঝিয়াছিলেন যে, এই উৎসাহী যুবকদ্বয়কে দলভুক্ত করিতে পারিলে, তাহারা অসাধ্য সাধনে কুষ্ঠিত হইবে না, দেশের নামে প্রাণপাত করিতে ইয়াবা পা বাড়াইয়া আছে। তিনি উৎসাহ- * কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
কুমারী দেবী এত
পণ
ৰচনে কহিলেন, “বহুক্ষণ থেকে তােমাদের অপেক্ষায় আছি।
এত দেরী যে? যা তাতে ক্ষতি নেই—আজ ত কেবল ভর্তির
দিন; দেশের কাজে মায়ের চরণে জীবন উৎসর্গ করে আজ
তােমরা নবজীবন লাভে ধন্য হবে।”
দলপতি তাহাদিগকে অনুবর্তী হইতে সঙ্কেত করিয়া দুই এক
পদ অগ্রসর হইলেন। অনাদি নিৰ্বাক নিস্পন্দভাবে দাঁড়াইয়া
রহিল, বসন্ত সাহসপূৰ্ব্বক কহিল,
“গুরুজি, আমাদের ক্ষমা করবেন, এ মন্দিরের সেবাধারী হতে
আমরা পারব না।”
অনাদির জড়তা ঘুচিয়া গিয়াছে, সে বলিয়া উঠিল, “আর
সেই কথা বলতেই কেবল আমরা এখানে এসেছি।”
“বটে।”
দলপতির এই ক্ষুদ্র বাক্যে নৈরাশ্য বা বিস্ময়ের সহিত ভয়
প্রদর্শনের সুরও মিশ্রিত ছিল।
বসন্ত বলিল, “সন্তোষ ইচ্ছা করলেই যদিও আমাদের হয়ে
আপনাকে একথা জানাতে পারত কিন্তু আপনাদের সমিতির
খাতায় নাকি এ নিয়ম লেখে না তাই আমাদেরই একথা বলতে
এখানে আসতে হােল।”
অনাদি বলিল, “নইলে খুব সম্ভবতঃ আপনি ভাবতেন-ভয়
পেয়েই আমরা এলুম না।”
দলপতি উথলিত নৈরাশ্য-ক্রোধ সবলে দমন করিয়া যথা
সম্ভব ধীরভাবে বলিলেন, “কিন্তু তােমরা জান না বােধ হয়
১১৪ নং আহিরীটোলা টি, কলিকাতা।
৫২
বর্ণকুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী
যে, একবার এ চক্রের মধ্যে পা দিলে আর পিছু হটার
যােনেই।”
বসন্তের মত সাহসী বালকের মুখও সহসা পাংশুবর্ণ হইয়া
গেল—এ কথাত তাহাদের মনে হয় নাই। সে ঢােক গিলিয়া শুষ্ক
কণ্ঠ ভিজাইয়া লইয়া কহিল, “কিন্তু আমৰাত চক্রে পা দিই নাই,
শপথে নিজেদের বাধিনি এখনো।
দলপতি উত্তেজিত কণ্ঠে উত্তর করিলেন, “যেদিন এই মাতৃ-
মন্দিরের সংকল্প শুনে, বুঝে এ দলে মেশবার অভিপ্রায়
প্রকাশ করেছ—সেইদিনই চক্রে পা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ
আজ ত আমাদের আজ্ঞা পৰ্যন্ত দেখলে, এখন আর ফেরার
পথ নেই ; দলভুক্ত হতে হবে—না হয় দণ্ড গ্রহণ করতে
;
।
দলপতি কটিবন্ধ-বস্ত্রে হত্যাৰ্পণ করিলেন। অনাদি বসন্ত
উভয়েই ইহার অর্থ বুঝিল; কিন্তু জ্যোতির্ময়ীর শিক্ষাদান নিল
হয় নাই। পূর্বের ক্ষণিক ভয় অবসাদ ইতিপূৰ্বেই তাহাদের
মন হইতে অন্তর্হিত হইয়াছিল ; এখন সম্মুখ বিপদে উভয়েরই
তেজ শতগুণে বাড়িয়া উঠিল। ব্যায়াম-সমিতির প্রণালী
অনুসারে উভয়েই উভয়কে রক্ষা সংকল্পে—আক্রান্ত ব্যাঘ্ৰী যেমন
শাবককে আশ্রয়দানে শীকারীর সম্মুখে দাঁড়ায়—সেইরূপভাবে
দাঁড়াইল। সশস্ত্র দলপতি এই নিরস্ত্র বালকদিগের শৌর্যে এমনি
বিস্মিত হইয়া পড়িলেন যে, তাহার নিজের অজ্ঞাতসারে হাত
কটিবদ্ধ বস্ত্র হইতে নীচে নামিয়া পড়িল।
কমলিনী-সাহিত্যমনির,
শ্রীকুমারী দেবী প্রণীত বাণী বসন্ত সদর্পে কহিল, “প্রাণভয় দেখিয়ে আমাদের দলভুক্ত করতে পারবেন না।” অনাদি বলিল, “আর একথাটাও মনে রাখবেন (ব—আমাদের মেরেও কখনাে নিস্তার পাবেন না; ফলে তাতে আপনার দলের সমূল উচ্ছেদ সাধন হবে।” “উঃ, এই অপগণ্ড বালকদিগের কি প্রতাপ ! বলে ত ইহাদের পাওয়াই যাইবে না, ছলে কৌশলে কি হয় দেখা যাক।” দলপতি নরম সুরে বলিলেন, “খুন করাইত আমার জীবনের ব্ৰত নয়, তবে মঙ্গল উদ্দেশ্যে যদি তা করতে হয় তাতে আমি পিছপাও নই। আর কারাে তা হওয়া উচিত না এই উপদেশই আমি দিয়ে থাকি। তােমরাও দেশসেবক আমরাও দেশসেবক। আমাদের উভয়ের ইচ্ছা ও সঙ্কল্প একই। এ অবস্থায় আমরা যদি মিলে মিশে কাজ করি তবেই ত মায়ের মলিন মুখ একদিন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।” বসন্ত বলিল, “কিন্তু আমাদের মিলনের আশা নেই- আমাদের পথ একেবারেই স্বতন্ত্র। রক্তপাতে আমরা দেশসেবা করতে পারব না।” অনাদি বলিল, “কারণ আমরা অন্যরূপ শপথে আবদ্ধ। দলপতি তাহার ক্রোধাবেগ চাপিতে মুহূর্তকাল সময় গ্রহণ করিয় বলিলেন, “কিন্তু ইতিপূর্বে ত তােমাদের মুখে এরকম কথা শুনি নাই। আমার কথায় তখন তােমরা ত পূর্ণভাবেই সায় দিয়ে গেছ?” ১১৪ নং আহিরীটোল বট, কলিকাতা।
৫
একুমারী দেবী প্রণীত
ঘবাদী
বসন্ত বলিল, “আপনার উত্তেজনায় আমরা আনহারা হয়ে
পড়েছিলুম।”
অনাদি বলিল, “গুরুর কৃপায় আমরা পুনরায় চেতনা লাভ
করেছি। তিনি আমাদের সাবধান করে দিয়েছেন।”
প্রশ্ন হইল “কে তােমাদের গুরু।”
একটু ইতস্ততঃ করিয়া অনাদি বলিল, “রাজকুমারী।”
দলপতি গম্ভীর হইয়া গেলেন, কিছুপরে বলিলেন, “হ্যা,
শুনেছি তিনি স্বদেশব্রত গ্রহণ করেছেন। আচ্ছা আমি যদি
তঁার মত পরিবর্তন করে দিতে পারি ?
অনাদি কহিল, “তাহলে আমাদেরও মত পরিবর্তন হতে
পারে, আমরা তাঁরই শিষ্য।”
দলপতি অল্পক্ষণ নীরব হইয়া রহিলেন, পরে গভীর ভাবে
বলিলেন, “একটা কড়ারে তােমরা মুক্তিলাভ করতে পার।”
উভয়ে একই সঙ্গে সােংসুক কণ্ঠে প্রশ্ন করিয়া উঠিল—“কি
কার ?”
“রাজকুমারীর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেবে-এই শপথে
তােমাদের অব্যাহতি দিতে পারি।”
অনাদির মনের বিপদপাষাণ মুহূর্তে যেন তুলার ন্যায় হালকা
হইয়া গেল। সে উচ্ছাসরে বলিয়া উঠিল, “সে ত সহজেই হতে
পারে। আগামী কারেল দিনে তার সনে পরিচয় করিয়ে দেব।”
দলপতি বলিলেন, “না, আমি নিরিবিলি একলা তার দর্শন
পেতে চাই, নইলে কথা কবার সুবিধা হবে না।”
কবি-সাহিত্যগলি,
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী অনেকদিন হইতে দলপতির মনে যে ইচ্ছা জাগিয়া উঠিয়াছে হঠাৎ তাহা পূর্ণ করিবার সুযােগ তিনি দেখিতে পাইলেন। অনাদি বলিল, “আচ্ছা, বেশ তাই হবে।” আহলাদে দলপতির শ্যামলবর্ণে লালের আভা ফুটিল। তিনি শ্যামসুন্দর হইয়া সহাস্যে কহিলেন— “কড়ার ভঙ্গের শাস্তি কিন্তু ভয়ানক; এ কথা আগে থেকে বলে রাখছি। আর এক কথা, চলে যাবার আগে মায়ের নামে শপথ করতে হবে যে, এখানকার কোন কথাই কোন দিন তােমরা প্রকাশ করবে না।” বালক দুইজন শপথ করিয়া বিদায় হইয়া গেলে সন্তোষ দল- পতির নিকট আসিয়া দাড়াইল। দলপতি তাহাকে বলিলেন, “এখানে এদের নিয়ে এসে বড়ই বুদ্ধির কাজ করেছিলে। নইলে একেবারেই এরা আমাদের হাতছাড়া হয়ে যেত। দলবৃদ্ধি করতে পারলে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। যাহক ছাের। দুটর উপর “চোখ রেখে—যদি তেমন তেমন বােবােতবে বুঝলাে ত সন্তোষ ?” “আজ্ঞে হা বুঝেছি; আর বেশী বলতে হবে না। অতঃপর নীরবে তাহারা ভিতরে প্রবেশ করিলেন। এদিকে বসন্ত ও অনাদি মুক্তিলাভ করিয়া উশ্বাসে ছুটিল, পশ্চাতে একবার চাহিয়া দেখিতেও তাহাদের সাহসে কুলাইল না। প্রেতরাজ্য ছাড়াইয়া একেবারে ক্রোশখানেক পথ দূরে আসিয়া তবে যেন একবার হাঁপ ফেলিবার হারা অবসর পাইল। তাহার ; ১১৪ নং বাহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী প্রীত
স্বপ্নবাণী
••
পর আরাে খানিকটা চলিয়া নদী কিনারে আসিয়া বাধাঘাটের
উপর দুইজনে বসিয়া পড়িল। নদী, আকাশ, জীবজন্তু গাছপালা
সহসা তাহাদের নেত্রে এক অপূর্ব মহিষায় প্রকাশিত হইয়া উঠিল,
নবজীবনের চক্ষু দিয়া আজ তাহারা এ সকল প্রত্যক্ষ করিল
তাহারা ত মৃত্যুমুখ হইতে—যমপুরী হইতেই ফিরিয়া আসিতেছে।
অনাদি খানিকক্ষণ পরে বলিয়া উঠিল—
“এ সব কথা কাউকেই বলতে পারব না, বসন্ত-দা?”
“অবশ্যই না।”
“রাণীদিদিকেও না?”
“না। আমরা যে শপথে আবদ্ধ।”
“আমার বড় দুঃখ হচ্ছে বসন্ত-দা।”
বসন্ত বলিল, “আমার দুঃখ হচ্ছে যে কত ছেলেকে ওরা
সর্বনাশের পথে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের সাবধান করে দেবার উপায়
নেই।”
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
পরদিন রাজাবাহাদুর জ্যোতির্ময়ীকে সঙ্গে লইয়া যথাসময়ে
ম্যাজিষ্ট্রেট ভবনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বাগানে টেবিল
চৌকি পাতা, চায়ের আয়ােজন, বাহিরের লোেকও আজ এখানে
কেহ নাই, পিতা কাকে দেখিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট দম্পতি সাতিশয়
আনন্দ প্রকাশ করিলেন। মেম সাহেব নূতন বাংলা শিখিতে-
মলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
সাের যে প্রণীত স্বপ্ন বাণী ছিলেন,-জ্যোতির্ময়ীকে আলিঙ্গনপাশে বদ্ধ করিয়া মুখ চুম্বন- পূৰ্ব্বক কহিলেন, “তােমাকে বড় অধিক দেখতে ইচ্ছা করছিলাম, আমার প্রিয়তম সন্তান। ( My Dearest Child) ঠিক হইল কি?” জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া কহিল, “খুব ঠিক হয়েছে, মাদার।” জ্যোতির্ময়ী ইহাকে মাদার বলিয়াই সম্বােধন করিত। মেম- সাহেব জ্যোতির্ময়ীকে বাহুপাশ হইতে মুক্তিদান পূর্বক সকলকে আসন গ্রহণ করিতে বলিয়া পেয়ালাতে চা ঢালিতে ব্যস্ত হইলেন। সাহেব জ্যোতির্ময়ীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার সমিতি কেমন চলছে, My dear girl, জ্যোতির্ময়ী বলিল, “ভালই। কাল ছেলেদের হাতে আমি রাখি বেধেছি ; আজ আপনাদের জন্য এনেছি।” জ্যোতির্ময়ী দুইগাছি রাখি নিজের কর-প্রকোষ্ঠে বাঁধিয়া আনিয়াছিল ; তাহার একটি খুলিয়া প্রথমে ম্যাজিষ্ট্রেটকে পরাইল। পরাইতে পরাইতে বলিল, “আমি বিপদে পড়িলেই আপনাকে কিন্তু উদ্ধার করিতে হইবে। বুঝিলেন ত?” ম্যাজিষ্ট্রেট হাসিয়া বলিলেন, “All right, এই অধিকারে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলেই মনে করছি।” জ্যোতির্ময়ী আহলাদের হাসি হাসিয়া তাঁহাকে ছাড়িয়া ‘মাদারের কাছ ঘেসিয়া বসিয়া তাঁহার হাতে রাখি বাঁধিতে প্রবৃত্ত হইল। তিনি রাখি পরিয়া তাহাকে চুম্বন দান পূর্বক তাহার হাতে চাপূর্ণ একটি পেয়ালা উঠাইয়া দিলেন। ১১৪নং আহিরীটোলা ইট, কলিকাতা।
বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী রাজা পূর্বেই মিসেস, ক্লাউডেনের টেবিলের কাছে বসিয়া চা পান আৰম্ভ করিয়াছিলেন। ক্লাউজেন সাহেবও পাশের চৌকি- খানি অধিকার করিয়া, এক পেয়ালা চা হাতে তুলিয়া লইয়া রাজার দিকে চাহিয়া বলিলেন,- “By the bye রাজা, ডাক্তার চৌধুরী-উৎসব দিনের সেই hero তিনি কি এখনাে এখানে আছেন ? ইচ্ছা ছিল তাকে একদিন ডাকি, কিন্তু এই আপিলটা হাতে আসায় তা offa i He is a fine fellow and has got nice manners, •• এই কথায় রাজকুমারীর মুখ ঈষৎ রক্তিম হইয়া উঠিল। কিন্তু সে লজ্জা-রাগ অপর কেহই লক্ষ্য করিল না ; সকলেই তখন নিজেকে লইয়া ব্যস্ত। রাজা হাতের পেয়ালা হইতে সন্তর্পণে বেশ সুন্দর কায়দার সহিত একটুখানি চা মুখে গ্রহণ করিলেন। ইংরাজী দস্তুরে পেয়ালার চামচ খানা এ সময় একরকম অনাবশ্যক শােভ স্বরূপ। চিনি ঘাটার কাজে লাগা ছাড়া ইহা চা পানের কাজে লাগেনা। তাহার পর ম্যজিষ্ট্রেটের কথার উত্তরে কহিলেন- “ডাক্তার এখনাে এখানেই আছেন ; মকদ্দমায় নিষ্কৃতি লাভ করে তিনি আপনাকে সর্বান্তকরণে ধন্যবাদ প্রদান করেছেন।” ম্যাজিষ্ট্রেট বলিলেন, “এমন পচা মকদ্দমা আমার জীবনে আসে নাই ! কি করে যে মুন্সেফ বাদীকে জিতিয়ে দিলেন। কমলিনীসাহিত্য-মন্দির, কুমারী দেবী প্রণীত ঘবাণী রাজা আর দুই এক ঢােক চা গলাধঃকরণ করিয়া কহিলেন, “কিন্তু সুজন রায়ের দল আপনার নামে নানা কথা রচনা করবে। “Indeed ! কিন্তু সে ভয়ে ত আমি ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে পারিনে!” জ্যোতির্ময়ীর মুখকান্তি একটি অপ্রাকৃত জ্যোতিঃ-সৌন্দর্যে উজ্জল হইয়া উঠিল। সে গম্ভীরভাবে কহিল, “আপনার এই ন্যায়পরতা জগতের অস্থিমজ্জায় স্থান পা আমি সৰ্বান্তঃকরণে ইহাই প্রার্থনা করি।” জ্যোতির্ময়ীর বাললাচিত সরল উৎসাহে মুগ্ধ হইয়া ক্লাউডেন সাহেব তাহার পিঠে হাত রাখিয়া আদর করিয়া কহিলেন- “Thank you dear girl” বলিয়া পত্নীর দিকে চায়ের পেয়ালাটা বাড়াইয়া দিলেন। মেমসাহের স্বামীর শূন্য পেয়ালাটি পূর্ণ করিয়া দিয়া রাজাকে কহিলেন, “আর এক পেয়ালা রাজাবাহাদুর ?” রাজার পেয়ালা তখন নিঃশেষ হইয়া আসিয়াছিল—তিনি মেমসাহেবের অনুরোধ অগ্রাহ করিলেন না। তাঁহাকে চা ঢালিয়া দিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট-পত্নী জোতির্ময়ীকে বলিলেন,- “তােমার আধ পেয়ালা চা-ও ত এখনো শেষ হােল না, আর কখনাে যে শেষ হবে না, তাও জানি।” তিনি কতকগুলি চকোলেট-মিষ্ট জ্যেতির্ময়ীর পিরিচে = ১১৪নং আহিরীটোলা জট, কলিকাতা।
আলী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
তুলিয়া দিলেন। সাহেব বলিলেন, “ঠিক হয়েছে; sweets to the
sweet".
জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া কহিল, “আমি কি এখনাে ছেলেমানুষ
আছি মিষ্টার ক্লাউডেন ?”
সাহেব কহিলেন, “By Jove, তুমি কখনই ছেলেমানুষ
ছিলে না—তুমি একজন born sage, একটি ক্ষুদ্র লামা।”
রাজা বলিলেন, “ঠিক বলেছেন মিষ্টার ক্লাউডেন। জানেন ত
ও যখন তিন বছরের মেয়েটি, তখন আমাকে কি রকম জব্দ
করেছিল ?”
শৈশবে নৃত্য করিতে অনুরুদ্ধ হইয়া কিরূপ অটল ভাবে
জ্যোতির্ময়ী রাজার সে অনুবােধ অগ্রাহ্য করিয়াছিল, রাজা সেই
গল্পটি পুনৰ্বার করিলেন।
জ্যোতির্ময়ী হাসিয়া কহিল, “জানেন মিষ্টার ক্লাউডেন, আমি
আমাদের দেশের খ্রী-জাতির ‘প্রেষ্টিজ’ রক্ষা করেছিলুম।”
“হ্যা ঠিকই করেছিলে, বিজ্ঞব্যক্তির (sage) মতই কাজ
হয়েছিল।”
জ্যোতির্ময়ী কহিল, “হ্যা, যেমন দেশের লােকের সহ অনু-
রােধ অগ্রাহ করে গভর্ণমেণ্ট বঙ্গবিভাগ সম্বন্ধে নিজের প্রেষ্টিজ
রক্ষা করলেন।
কথার গতি ফিরিল; ম্যাজিষ্ট্রেট কহিলেন, “বঙ্গবিভাগে ত আমি
কতি দেখি না। তবে দেশের লোেক যখন এই বিভাগের বিরােধী,
তখন গভর্ণমেন্টের এ থেকে নিরস্ত হওয়াই উচিত ছিল।”
কমলিনীতিশলি,
স্বর্ণকুমারী এবী এত স্বপ্নবাণী রাজা কহিলেন, “আমাদেরও ত আপত্তির প্রধান কারণ আপাতত তাই। জানেন মিষ্টার ক্লাউডেন, প্রসাদপুরেই এবার প্রতিবাদ কনফারেন্স হচ্ছে ?” জ্যোতির্ময়ী বলিয়া উঠিল, “আর আপনাকেই প্রেসিডেন্ট হতে হবে মিষ্টার ক্লাউডেন। বলুন হবেন?” ক্লাউডেন সাহেব একখানা “স্যাণ্ডউইচ,” মুখে পুরিয়া দিয়া পেয়ালার চিনিটা চামচ দিয়া নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন, “তােমার কথা রাখিতে পারিলে খুবই খুসি হইতাম, dear girlie, কিন্তু আমরা হচ্ছি রাজভৃত্য, তাদের মতলবের বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে পারি নে। প্রেসিডেন্ট হওয়া আমার কর্তব্য হবে না।” জ্যোতির্ময়ী নিরাশ হইয়া চুপ করিয়া গেল! বুঝিল, তিনি যাহা বলিলেন তাহার উপর আর কথা চলে না। অতঃপর সকলের চা পান শেষ হইলে, খানসামা টেবিল সর- জামউঠাইয়া লইয়া গেল, ক্লাউডেন সাহেব ও রাজাবাহাদুর উভয়ে “হােম-পলিটিক্স” প্রভৃতি নানা প্রসঙ্গ ধর্মিলেন; এই অবসরে মেম সাহেব জ্যোতির্ময়ীকে তঁাহার বাগান দেখাইতে লইয়া গেলেন। স্থান নির্জন দেখিয়া ক্লাউডেন সাহেব রাজাকে বলিলেন, “একটি কথা বলি রাজা, যেন প্রকাশ না হয়। সম্ভবত প্রসাদপুর থেকে আমার বদলি হবে, আমার কাৰ্যকলাপ গবর্ণমেন্টের মনের মত হচ্ছে না।” ১১৪ নং আহিরীটোলাট, কলিকাতা।
কুমারী দেবী প্রণীত বাণী রাজা নীরব হইয়া গেলেন ; বজ্রাতের মত কথাটা তাহার প্রাণে গিয়া বাজিল। উভয়ে অনেকক্ষণ ধরিয়া নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন। আশ্বিনের প্রায় শেষ। বাগানের কেয়ারিতে, রাস্তার পটিতে রকম বিরকম বিলাতি ফুলের বসন্ত বাহার এখন জমিয়া নাই। জিনিয়া, দোপাটি প্রভৃতি দুইচারি রকমের ফুল সবে মাত্র এখন অল্প অল্প ফুটিতে আরম্ভ করিয়াছে! গােলাপফুলই এখন ফুলবাগানের প্রধান শােভা। কিন্তু জয় এসময় সবজি বাগানেরই। কপি, শালগম, বিট, গাজর, পেঁয়াজ, মটর প্রভৃতি নানাবিধ তরকারীতে মিসেস, ক্লাউডেনের সবজি-বাগান ভরপুর। ফুল- বাগান ও সবজি-বাগানের মধ্যস্থিত বাঁশের খিলান-দরজার উপরে ‘মার্সেল-নিল’ গােলাপ ল ফুলে ফুলে ভরা। এই লতা- গাছ দুটি রাজকুমারীর উপহার। রাজবাগানের দুইটি কলম আনিয়া একবৎসর পূর্বে নিজের হাতে জ্যোতির্ময়ী খিলানের প্রান্তে পুতিয়া দিয়াছিল। মেমসাহেবের যত্নে এত শীঘ্র সেই কলম দুইটির এখন এমন মধুর রূপ। এখনাে প্রত্যহ তিনি এই গােলাপ গাছে স্বহস্তে জল সিঞ্চন করেন। তাহারা বাগানে আসিবামাত্র মালী ঘােট জল পাত্র একটি আনিয়া ধরিল। এই জলপাত্র লইয়া তাহাদের উভয়ের মধ্যে কাড়াকাড়ি পুড়িয়া গেল। মালী বেগতিক দেখিয়া আর একটি পাত্র আনিয়া দিল। বয়স্যার মতই হাসি গল্পে, বিবাদ কৌতুকে উভয়ে বাগানে ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। অলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
'৬৬
স্বর্ণকুমারী দেবী শ্ৰণীত
স্বপ্নবাণ
;
বাগানের আশে পাশে ক্রমশঃ হাসনুহানা ও রজনীগন্ধার দলও
খুলিতে আরম্ভ হইল। সুবাসপূর্ণ মুক্তবায়ুর সহিত মিসেস,
ক্লাউডেনের মেহাদর এক নিশ্বাসে গ্রহণ করিয়া জ্যোতির্ময়ীর
বালসুলভ হৃদয় মুক্তিরচ্ছন্দে নাচিয়া উঠিল ।
কিছু পরে রাজাবাহাদুরের সহিত ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবও এইখানে
আসিয়া দেখা দিলেন। রাজা বলিলেন, “রাণি, আজ একটু
সকাল সকাল বাড়ী ফিরতে চাই।”
জ্যোতির্ময়ী একবার আকাশের দিকে চাহিল। পশ্চিমে নদীর
পরপারে সূৰ্যদেবের ধ্যানমগ্ন প্রশান্ত তপস্বীমূর্তি, তৎবিকীর্ণ
আলােকে দিগদিগন্ত লালে লালে সমুজল ; নদীর জল বিদ্যুৎকণায়
প্রবাহিত। জ্যোতির্ময়ী ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ
করিল, কে জানে কেন ?
মেমসাহেব ক্ষুন্নমনে বলিলেন, “এখনি যাবেন রাজা-সাহেব ?”
রাজা আবার ঘড়ি দেখিয়া বলিলেন, “কাল কলকাতায় যেতে
হবে মিসেস, ক্লাউডেন, নইলে এমন সঙ্গ ত্যাগ করতে চাই।
এখনি !”
ম্যাজিষ্ট্রেট দম্পতি উভয়েই গাড়ী পর্যন্ত আসি তাদের
বিদায় দিলেন।, মেমসাহেব জ্যোতির্ময়ীকে পুনরায় সন্মেহে
আলিঙ্গন পূর্বক চুম্বন করিলেন।
এবার রাজা নিজে মােটারের কল ধরিলেন। শরতের বেলা
সূৰ্য্য এখন দিগন্তনিমে, তবুও সায়ানুগগন উল আলােকে
দীপ্তিমান! বিলাতের twilight কি এই রকমই ?
১১৪ নং.আহিরীটোলা টি, কলিকাতা।
শ্রীকুমারী দেবী প্রণীত বাণী ম্যাজিষ্ট্রেটের কমপাউণ্ড ছাড়াইয়া জা ঘড়ি দেখিয়া বলিলেন, ‘মিনিট পাচেক আমরা আন্তে যেতে পারি।” নদীর ধার দিয়া তাহারা ধীরে ধীরে চলিলেন। ওপারে কাশফুলের কি সুন্দর শােভা! মাঝে মাঝে বাতাস শেফালি ফুলের গন্ধ বহন করিয়া আনিতে লাগিল। একজন মালী কেতকীফুল মাথায় লইয়া মন্দিরের দিকে যাইতেছিল, তাহার সৌরভ পথে ছড়াইয়া দিয়া গেল। নদীর ধারে একটি বটগাছের তলায় একখানা সিন্দুরলেপিত প্রস্তরমূর্তি। এ মূর্তি কাহার স্থাপনা কেহ জানেনা; পথিকজন অন্নপূর্ণার মূর্তি বলিয়া ইহাকে প্রণাম করিয়া যায়। এই প্রস্তর সন্নিধানে বসিয়া একজন ভিখারী খঞ্জনী বাজাইয়া গান করিতেছিল, মঙ্গল শখ বাজে ঘরে ঘরে, এলেন আনন্দময়ী ভুবন আলাে করে ! আজি আলােকে ঝলকে আনন্দ, বহে কুসুমে মধুর গন্ধ, উথলে দিকে দিকে গীতিছন্দ- বরষ দিবস পরে। রাজা গাড়ী থামাইয়া চাপরাশিকে দিয়া তাহাকে পারি- তােষিক পাঠাইলেন। গানটি রাজারই চিত। প্রথম যে আশ্বিনে তাহার দুই কন্যা পশুরহ হইতে পিতৃভবনে আসিয়াছিল, সেই সময় তিনি এই কমলিনী-সাহিত্য-গলি, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত অথবাণী গানটি রচনা করেন। পুরাতন কত স্মৃতি ইহার সহিত জড়িত, তাহার চক্ষু জল পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। জ্যোতির্ময়ী পাশ হইতে তাহা দেখিতে পাইল না। গানটি শুনিতে শুনিতে সে বলিয়া উঠিল, “আশ্বিন মাস পড়েছে বুঝি!” রাজা চক্ষুর জল চক্ষেই ধরিয়া বলিলেন, “রাণীর কাছে সে খবর পৌছয়নি এখনাে ? মাস যে শেষ হতে চ'লো।” রাণী হাসিয়া পিতাকে আদরের বাহুপাশে জড়াইল, রাজা পুরাতন দুঃখ ভুলিয়া গেলেন। চাপরাশি ফিরিয়া আসিলে এবার তিনি সতেজে মােটার চালাইয়া দিলেন। সপ্তম পরিচ্ছেদ। শ্যামাচরণের কনিষ্ঠা কন্যা অণুভার সহিত বৰ্বাধিক কাল হাসির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নরেন্দ্রের বিবাহ ঠিক হইয়া আছে, কিন্তু কাৰ্য সমাধার জন্য কন্যাকর্তার নিকট হইতে এ পর্যন্ত কোনদিনই তাগিদ আসে নাই। বরপক্ষ (অর্থাৎ মুখখাপাধ্যায়-গৃহিণী, ) তাহাতে সন্তুষ্ট বই অসন্তুষ্ট নহেন, মনে করিতেছেন, 'সে ভালই, হাসির বিবাহটা আগে হইয়া যাক না। অণুভা যােড়শী অথচ পিতা কেন যে এ সম্বন্ধে নীরব, তাহা পাঠক অবগত আছেন। তিনি মনে আঁটিয়াছিলেন- আরও দুই বৎসর কাল এজন্য তাঁহাকে অপেক্ষা করিতে হইবে, ১১৪ নং আহিরীটোলাট, কলিকাতা।
৬৬
স্বর্ণকুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী
কারণ শরৎ বিলাত হইতে ফিরিয়া আসিলে তিনি বিবাহের
ব্যয়ভার বহনে সক্ষম হইবেন না। কিন্তু মানবের এবং দেবতার
সঙ্কল্প যে এক নহে ইহা পুরাণ-প্রবচন।
রাজভবনে শরতের প্রতিষ্ঠা দেখিয়া শ্যামাচরণ হাওয়ার গতি
বুঝিয়া লইয়াছেন। রাজার নিকট হইতে এমন চিঠি আসে না
যাহার মধ্যে শরতের বিদ্যাবুদ্ধির প্রশংসা না থাকে। রাজকন্যার
মাল্যদান-বিবরণও ইতিমধ্যে বিচিত্র ছন্দোবন্ধে তাহার কর্ণ
গােচর হইয়াছে। অতএব, তাহার পুত্রতুল্য প্রিয় ভাগিনেয় যে
অবিলম্বে রাজা অতুলেশ্বরের জামাতা হইবে, ইহাতে তিনি
সংশয়-রহিত চিত্ত। এই বিশ্বাসে তাঁহার হৃদয়-মন আনন্দে
পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে । যে শক্তিরূপ ঘটকপুরুষ এইরূপ
অসম্ভাবিত যােগাযােগ ঘটাইয়া, সংসারের কন্টকসঙ্কুল পথ পরি-
স্কার করিয়া দেন, শ্যামাচরণের পজিটিভিজম’ আপনার অজ্ঞাতে
তাঁহার দিকে মস্তক অবনত করিল।
এতদিনে অণুভার পিতা অণুভার বিবাহের কথা ভাবিবার
অবসর পাইলেন। এতদিনের পর কন্যার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া
সহসা আবিষ্কার করিলেন যে, তাইত, অণুভ যে বড় হইয়া
উঠিয়াছে। ইহার পর একদিন গাঙ্গুলি মহাশয় বেশ খোস
মেজাজে মনের প্রস্তাব মুখে প্রকাশ করিবার জন্য মুখখাপাধ্যায়-
ভবনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
নরেন্দ্র কলিকাতায় থাকে না।' ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করিবার
পরই সে বােৰাই সহরে টাটা মিলে কাজ লইয়াছে। এখন
কলিনী-গাহিত্যমন্দির,
এমারী দেবী:এর্ণত,
অপবাণী
নরেন্দ্র সেখানে হেভ ওভারসিয়ার ;কিন্তু কর্তৃপক্ষগণ তাহার
কাৰ্যদক্ষতায় সন্তুষ্ট হইয়া আশ্বাস দিয়াছেন যে, আগামী
জানুয়ারীতেই মােটা বেতনে আসিষ্টান্ট ম্যানেজারের পদে
তাহাকে উন্নীত করিবেন। আগামী আশ্বিনে ১০/১২ দিনের
ছুটিতে যখন নরেন্দ্র বাড়ী আসিবে—খুব সম্ভব তখনই এই
নিয়ােগপত্র সঙ্গে আনিতে পারিবে, এইরূপই সকলে আশা
করিতেছেন।
কৃষ্ণলাল মুখােপাধ্যায়ের স্ত্রীই বাড়ীর প্রকৃত কী। তাঁহার
ইচ্ছাতেই মুখুয্যে-সংসার কেন্দ্রে ধৃত এবং কক্ষে ঘূর্ণমান । দিদিমা
আপনার তপ-জপ, পুরাণাদি পাঠ, এবং হাসিকে লইয়াই থাকেন,
সংসারের কোন কথায় পারত পক্ষে যােগ দেন না। আর কর্তা,
এ বাড়ীর বরেণ্য যিনি,-প্রয়োজনে মাত্র তিনি শরণ্য অন্য
সময় সাক্ষীস্বরূপ নগণ্য মধ্যে গণ্য।
তবে বাহিরের লােক ঘরের কথা অতশত কি জানে; শ্যামা-
চরণ সর্বাগ্রে গেলেন দিদিমার নিকট, হিন্দু-বাড়ীর প্রথানুসারে
কীর সম্মান সর্বাগ্রে তাহারই ত প্রাপ্য। দিদিমা তখন প্রাতঃ-
আনান্তে-তপজ শেষ করিয়া নিরামিষ হেঁসেলে যাইবার উদ্যোগ
করিতেছিলেন। তাহার হাতে জলে-ভেজান বাদাম পেস্য
একটি বাটী,আর তাহার দাসীর হাতে তালের মাড়ীসহ
একখানা থালা,—উভয়ে দালান পার হইয়া নীচের সিড়ির দিকে
অগ্রসর হইতেছিলেন।-ভাদ্র মাস আরম্ভ হইতেই দিদিমার
রান্নাঘরে সপ্তাহে অন্তত দুই তিন দিনও তালৰড়া, তা-ক্ষীরাদি
১১৪ নং আহিরীটোলা এট, কলিকাতা।
।
৬৮ কুমারী দেবী প্রণীত বাণী হয়। কেন না, ছানার মিষ্টান্ন হইতে দিদিমার হাতের তাল- মিষ্টান্ন হাসি অধিক তারিফ করিয়া খায়। সহসা জুতার শব্দ কাণে গেল,সেই দিকে চাহিয়া দালান- প্রান্তে শ্যামাচরণকে দিদিমা দেখিতে পাইলেন, তিনি দাসীকে তখন রান্নাঘরে যাইতে আদেশ করিয়া তাহার অপেক্ষায় দালানেই দাড়াইলেন। শ্যামাচরণ নিকটে আসিয়া প্রণাম করিলে—তিনি আশীর্বাদপূর্বক কহিলেন,- এত সকালে যে বাবা!” শ্যামাচরণ হাস্যমুখে বলিলেন,- “একটু কাজে এসেছি মা।” দিদিমা অনুমান করিয়া লইলেন, কি কাজ। তিনিও হাস্যমুখে বলিলেন, “এস বাবা, বসবে এস।” এই বলিয়া দিদিমা তাহাকে সঙ্গে লইয়া পুনরায় নিজের গৃহ- বারান্দায় আসিয়া পেীছিলেন। এই বারান্দা-ঘর বাড়ীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় দালান। ভােজপৰ্বের সময় সর্বাগ্রে এখানে আসন পড়ে। কিন্তু অন্য সময় ইহাই দিদিমার বৈঠকখানা। মুখুয্যেবাড়ীর কর্তীপদবাচ্য পরমপূজ্যা মহিলার এই ড্রয়িং রুমের সাজসজ্জা দেখিলে কোন ইংরাজ মহিলা সম্ভবতঃ চমকিয়া উঠবেন। এই দালানের সর্বপ্রধান আসবাব একখানিমাত্র নাতিবৃহৎ পরীবাহন তক্তপোষ-ইহাই দিদিমার রাজ এবং অতিথি সিংহাসন। ইহা ছাড়া আরও যে দুইটি গৃহস্রব্য এখানে দেখিতে পাওয়া যায়,-তাহা হইতেছে-হাসির একটি সেতার এবং বহির ক্ষুদ্র সেফ। এ দুইটির কোনটিই মেলিয়া ভুক্ত ই কমলিনীসাহিত্যশলি, বর্ণকুমারী দেবী এত প্নবাণ নহে, দুইটিই দেয়ালে আলম্বিত। হাসি যখন এখানে আসে তখন দিদিমাৰ ইচ্ছামত কখনও বা সেতার বাজাইয়া, কখনও বা কোন বই পড়িয়া তাহাকে শুনায়। দিদিমার পরী-সিংহাসনে বিছাইবার জন্য নিজের হাতে হাসি একখানা পশমের গালিচা ও দুইখানা রেশমের কুসন প্রস্তুত করিয়া দিয়াছে। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই এ সকল দ্রব্য পুঞ্জীকৃত অবস্থাতে তক্তাপ্রান্তের শােভা বর্ধন করে। “ছিঃ, এত বাহারে জিনিষ ব্যবহার করা তাের বুড় দিদিমার কি সাজে লা ! হাসি উপদ্রব করিলে দিদিমা এই শান্তিবাক্যে তাহাকে অবােধ মানা- ইতে চাহেন।কিন্তু হাসি ত এ কথা মানিবার পাত্র নহে, সে যখন এখানে উপস্থিত থাকে তখন গালচে এবং বালিশগুলা একটু আরামে হাত পা ছড়াইয়া বাঁচে, কিন্তু সে চলিয়া গেলেই আবার তাহারা পূর্বাবস্থা প্রাপ্ত হয়। অতিথি অভ্যাগত কেহ আসিলে যখন দিদিমা তাহার সম্মানার্থে নিজের হাতেই তক্তার উপর গালিচা বিছাইয়া দেন- তখন সুদশার পরিবর্তে তাহাদের দশা সমধিক বিষয় হইয়া উঠে অতিথিকে গালিচার উপর বসিতে বলিয়া নিজের বসিবার স্থানটা যখন তিনি গালিচাশূন্য করিতে থাকেন—তখন অতিথিও তাঁহার দৃষ্টান্ত অনুকরণ করে। উভয় পক্ষের ঠেলাঠেলিতে তখন সেখান তাকার প্রান্তদেশের পরিবর্তে মধ্যদেশে পুটুলি বাঁধিতে থাকে। যদি ইতিমধ্যে হাসি আসিয়া উপস্থিত হয়—তবেই তাহার হাসির সঙ্গে সঙ্গে এই সব বিশৃখলা অবিলম্বে শৃখলায় পরিণত হয়। ১১৪ নং জাহিরীটোলা মট, কলিকাতা।
বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
অপবাদ
সৌভাগ্যবশতঃ আজ তার গালিচা ও কুসন রৌদ্রে দেওয়া
হইয়াছিল সুতরাং তাহাদের আর ঠেলাঠেলির মধ্যে পড়িতে
হইল না। দিদিমার ইচ্ছা ছিল-শ্যামাচরণ তক্তার উপর বসেন,
আর তিনি পাশে দাড়াইয়া তাঁহার বক্তব্য শােনেন,কিন্তু
শ্যামাচরণকে সে আদেশ মানাইতে না পারিয়া অবশেষে তাঁহার
অনুরােধই তিনি মানিতে বাধ্য হইলেন। দিদিমা তক্তায়
বসিলে পর শ্যামাচরণও বসিয়া-কন্যার বিবাহের কথা
পাড়িলেন।
দিদিমা শুনিয়া বলিলেন, “হ্যা, তােমার মেয়েটি ত বড় হয়ে
উঠেছে, অঘ্রাণে বিয়ে হলেই ভাল হয় বই কি। তবে কি জান
বাবা শ্যামাচরণ, হাসির বিয়েটাও সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেই যেন
ঠিক হােত।”
শ্যামাচরণ বলিলেন, “তাতে আর বাধা কি! শুনেছি ত
বিজনের সঙ্গে সম্বন্ধ পাকা হয়ে আছে।”
দিদিমা একবার চারিদিকে চাহিয়া দেখিয়া মৃদুকণ্ঠে বলিলেন,
“গুজব কথা শ্যাম। দিনকতক বিজনকুমার এখানে যাতায়াত
ক'ত-তাই কথাটা উঠেছিল, কিন্তু আজকাল ত তাকে দেখতেই
পাইনে। তবে বৌমার সেই ইচ্ছে এখনাে চার পােয়া।”
শ্যামাচরণ বলিলেন, “মন্দ ইচ্ছা ত নয়; হলে ত ভালই
হয়।”
“হ্যাঁ, আমার এই ইটের বারাও যদি সােনার হয়ে যায়-
তা হলে কি আমি মন্দ বলব। কিন্তু সম্ভব অসম্ভব ত একটা
ললিনী-সাহিত্য-শি,
৭১
কুমারী নারী এই
স্বল্পবাণী
আছে। রাজা-রাজড়াকে মনে পােষা কি আমাদের মত লােকের
সাজে! বৌমার যদি এতটুকু বুদ্ধি আছে। অমন সােণার ছেলে
শরৎ, তাকে কি না অগ্রাহ্য করলে! সেই পাপেই এখন এত
নিগ্রহ।”
বলিতে বলিতে দিদিমার যেন কণ্ঠবােধ হইয়া আসিল।
শ্যামাচরণ মাথা চুলকাইতে লাগিলেন,-মনে মনে কথাটা
সত্যতা অনুভব করিলেন,—কিন্তু নিজের ভাগনের প্রশংসার
কথায় ত আর নিজে সায় দিতে পারেন না।
দিদিমা আবার কাতর অনুনয়-ভরা কণ্ঠে কহিলেন, “এখন
কি তা হয় না বাবা? তুমি যদি বল ত তােমার ভাগনে কি সে
কথা ঠেলতে পারে ?”
শ্যামাচরণ বলিলেন, “আমি যতদূর বুঝতে পারছি, তা হবে
মা। সম্ভবতঃ রাজবাড়ীতেই তার বিয়ে হবে! আর সেই
টেই তার পক্ষে মঙ্গল,আমি ত তাতে নারাজ হতে পারিনে
মা!” দিদিমার সদাপ্রফুল্ল মুখকান্তি নৈরাশ্যমান হইয়া পড়িল।
মনের কোণে তিনি শরৎকেই নাতজামাইরূপে প্রতিষ্ঠা করিয়া-
ছিলেন,-এই কথায় আশাহত হইয়া তাহার অতল হইতে
বেদনার দীর্ঘনিশ্বাস উঠিল। কিন্তু সে নিশ্বাস-হাহাকার সবলে
চাপিয়া ধরিয়া তিনি প্রশান্ত ভাবেই বলিলেন, “তাই হােক
তবে,-আশীর্বাদ করি শরৎ সুখী হােক। আহা পিতৃমাতৃহীন
বালক-ভগবান তার মঙ্গল করুন। চিরদিনই আমি মনে জানি
একদিন সে বড়লােক হবে,-বাছার যেমন বুদ্ধি, তেমনি
১১৪নং আহিরীটোলা টি, কলিকাতা।
વર
নারী দেবী এত
বাণী
তেজ। এমন হীরের টুকরাে ছেলে হাসির অদৃষ্টে হােল না।
হায়রে ?
অনিচ্ছা সত্ত্বেও এইরূপ দুঃখের উক্তি দিদিমার মুখ হইতে
বাহির হইয়া পড়িল। শ্যামাচরণ সান্ত্বনা বাক্যে কহিলেন,
“ভাবছেন কেন মা ; হাসির ভাগ্যে ভাল বরই মিলবে।
সংসারে যােগ্যতর বরও ত ঢের আছে ;-দেখবেন একটি
মিলে যাবে।”
“সেই আশীৰ্বাদই কর বাছা। তােমার উপরই এ ভার
রইলাে, একটি ভাল ঘর বর দেখে দু’হাত এক করে দাও। এই
কাজটি তােমার করতেই হবে।” বলিতে বলিতে আগ্রহে নিকটে
আসিয়া দুই হাতে শ্যামাচরণের হাত ধরিলেন। শ্যামাচরণ
ধীরে ধীরে আক্রান্ত হাতখানি ছাড়াইয়া লইয়া যুক্তকরে শিরস্পর্শ
করিয়া কহিলেন, “গুরুজনের হাত ছুয়ে শপথ করতে ভয় পাই
মা, কিন্তু আপনার আদেশ মাথায় রাখলুম।”
শ্যামাচরণ দিদিমার নিকট হইতে বিদায় লইয়া গৃহিণীরু মহলে
গেলেন। গৃহিণীর তরকারী কোটা তখন শেষ হইয়া গিয়াছে।
তিনি বারান্দায় বটির উপর বসিয়া ঠাকুরকে থালায় রক্ষিত
বিভিন্ন ব্যঞ্জন-বিভাগ বুঝাইয়া দিতেছেন, আর অদুরে তােলা
উনুনে বি রাবড়ি করিতেছে ; তাহারই দিকে বারবার দৃষ্টি
নিক্ষেপ করিতেছেন। শ্যামচরণ দূর হইতেই হুঙ্কার ছাড়িলেন,
“বলি বৌঠাকরুণ-ঘয়ে আছেন ত?”
কৃষ্ণলাল সম্পর্কে শ্যামাচরণের শ্যালকশ্রেণীভুক্ত, তাই তিনি
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
কুমারী ৰে
স্বপ্নবাণী
গৃহিণীকে বৌ-ঠাকরুণ বলিয়াই ডাকেন। বামুনকে থালা উঠাইয়া
লইয়া যাইতে ইঙ্গিত করিয়া গৃহিণী তাড়াতাড়ী মাথায় কাপড়
টানিয়া দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া যখন বলিলেন-এস ভাই” তখন
শ্যামাচরণের মস্তক তাঁহার পায়ের দিকে অবনত হইয়াছে।
গৃহিণীকে প্রণাম করিয়া উঠিয়া দাসীর দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া
তিনি বলিলেন, “ঘরে আসবেন বােঠান, কথা আছে একটু।”
পাশেই অন্তঃপুরের বসিবার ঘর, ঘরের এক ধারে নীচে
গালচে পাতা, অন্যধারে দুইচারি-খানা চৌকি-কৌচের ব্যবস্থা।
গৃহিণী শ্যামাচরণকে ঘরে আনিয়া একখানি গদিটা বড়
চৌকিতে বসিতে অনুরােধ করিলেন। শ্যামাচরণ না বসিয়া
চৌকির পিঠে একখানা হাত রাখিয়া বলিলেন, “আর ব’সব না
বােঠান, দাঁড়িয়েই কথাটা সেরে নিই, বেলা হয়ে গেছে; এখনি
যেতে হবে।” .
“কথাটা কি শুনি?”
“আপনার হকুম নিতে এসেছি বােঠান ; হুকুম পেলেই
আগামী অম্রাণেই বিয়ের একটা দিন স্থির করে ফেলতে পারি।”
গৃহিণী একহাতে আলম্বিত অঞ্চলের খুটটা ধরিয়া অন্যহাতে
তাহা পাকাইতে পাকাইতে নতদৃষ্টি হইয়াই কহিলেন, “আর
একটু দেরী কর না ভাই, হাসির বিয়েটা হয়ে যাক না আগে।”
শ্যামাচরণ কহিলেন, “পাত্র কি ঠিক আছে?”
গৃহিণী মুখ তুলিয়া তাহার দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন; সে দৃষ্টি
ক্রোধপূর্ণ। তিনি ক্রুদ্ধ স্বরে কহিলেন,
১১৪ নং আহিরীটোলা মট, কলিকাতা।
এর যে এত
৭
সুখবাণী
“কি ক'রে ঠিক হবে? কতঠিন থেকে কাকে বলছি
বিজনকুমারের বাপের কাছে একটি বার যাও, গিয়ে বিয়েটা ঠিক
করে এস ; তা ওঁকে কি বাগাতে পারছি ? তুমি ভাই যদি এ
ভারটি গ্রহণ কর।” শ্যামাচরণ সভিীতের ন্যায় সহসা সবেগে
দুইহাত তফাতে সরিয়া দাড়াইয়া কহিলেন, “বাসরে! তার কাছে
কি আমি এগােতে পারি ? সে ক্ষমতা আমার নেই, মাপ
করবেন বােঠান, আর যা বলবেন- বরঞ্চ আমি ঘাড় পেতে
মেনে নেব।”
গৃহিণী নিরাশ হইয়া বলিলেন, “কি বলব আর ঠাকুরজামাই
তবে,হাসির অদৃষ্টে যা আছে হবে। তবুও বলে রাখছি একটি
ভাল পাত্রের চেষ্টায় থেকো ভাই।”
“সে কথা আর আমাকে অধিক বলতে হবেনা বােঠান,
হাসিকে নিজের মেয়ের তুল্যই দেখি।”
এই কথা এইরূপে শেষ করিয়া শ্যামাচরণ নিজের মেয়ের
বিবাহ-প্রসঙ্গ তুলিলেন। বলিলেন, “অঘ্রাণে বিয়ে দিতেই হবে
বােঠান; আপনারা শাজি-পূথি দেখে দিনটা স্থির করে আমাকে
বলে পাঠালেই আমি প্রস্তুত হয়ে নেব! নৱে আশ্বিন মাসে
এখানে ত আসছে,-সেই সময় আমি একদিন এসে আশীর্বাদ
করে যাব। এই কথা রইল, কেমন?”
এতদিন বিবাহের সম্বন্ধ হইয়া আছে কিন্তু এ-পৰ্যন্ত আশী-
র্বাদ পানপত্রাদিও হয় নাই। যথাসময়ে হইবে এইরূপ মনে
করিয়া উভয়পক্ষই নীরব ছিলেন।
কমলিনী-সাহিত্য-মণি,
৭
এমার কী
স্বপ্নবাণ
গৃহিণীর সম্মতি আদায় করিয়া লইয়া শ্যামাচরণ আর একবার
গেলেন কর্তার নিকট। এ বাড়ীতে আসিয়া প্রথমে যখন তিনি
কর্তার ঘরে যান, তখন তিনি ছিলেন স্নানের ঘরে। শ্যামাচরণ
কাজের লােক, তাঁহার অপেক্ষায় বসিয়া না থাকিয়া ইতিমধ্যে
অন্তঃপুরটা ঘুরিয়া আসিলেন।
এখানে আসিয়া দেখিলেন, কর্তা তাহার লেখার টেবিলের
নিকট বসিয়া ও শব্দ চিত্ৰিত একখানি কাগজ হস্তে ধরিয়া পার্শ্বে
উপবিষ্ট হাসিকে দর্শন তত্ত্ব বুঝাইতে ব্যস্ত আছেন।
শ্যামাচরণকে দেখিয়া তিনি অস্বস্তি বােধ করিলেন, তাঁহার
নমস্কারটা পর্যন্ত ফিরাইয়া দিতে ভুলিয়া গিয়া অধীর ভাবে
বলিলেন,
“একটু কাজে আছি ভাই, বাড়ীর ভিতরটা একবার বেড়িয়ে
এস না।”
শ্যামাচরণ হাসিয়া বলিলেন, “বাড়ীর ভিতর থেকেই আসছি।
অঘ্রাণেই অণুভার বিয়ে।”
কৰ্ত্তা কাগজের দিকেই দৃষ্টি রাখিয়া বলিলেন, “বিয়ে! নিমন্ত্রণ
করতে এসেছ বুঝি! বিয়েতে কিন্তু অর্থও আছে অনর্থও আছে।”
বাবার কথায় হাসি হাসিয়া অস্থির হইল; তখন লাল মুখ
তুলিয়া নিজেই হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। শ্যামাচরণ
হাসিয়া বলিলেন, “শুধু নিমন্ত্রণ করতে নয়, নিম নিতেও
এসেছি। অত্রাণে তােমার ছেলের সহিত আমার যেয়ের বিয়ে
ঠিক হয়ে গেল-বুঝলে ত?”
১১৪ নং জাহিরীটোলা চট, কলিকাতা।
মামীলীতে অথবাণী কৃষ্ণলাল বলিলেন, “এত শীগগির! তা গিন্নি কি বল্লেন।” ‘ার মত না নিয়ে কি তােমার কাছে এসেছি?” কর্তা অধীর অনয়ে কহিলেন, “গন্নি মত দিয়েছেন, তাহলেই হােল। আজ একটু ব্যস্ত আছি বুঝলে ভাই, আর একদিন এস, এ-কথা হবে এখন। বােস হাসি!” হাসি ইতিমধ্যে উঠিয়া শ্যামাচরণকে প্রণাম করিয়া পাড়াইয়া ছিল। শ্যামাচরণ বলিলেন, “বােস’ হাসি-তােমার বাবার শাপের পাত্র করােনা আমাকে। আমি চলুম-আচ্ছা আর একদিন আসব।” বলিয়া শ্যামাচরণ দ্রুতপদে চলিয়া গেলেন, কৃষ্ণলাল নিশ্চিন্ত- চিত্তে হাসিকে তাহার দর্শন-তত্ত্ব বুঝাইতে লাগিলেন। কৃষ্ণলাল যতই ভাবিতেছেন, যতই শাস্ত্রালােচনা করিতেছেন ততই ওঙ্কার শব্দের মাহাত্ম্য তাহার মনে বদ্ধমূল হইয়া বসিতেছে। ঋষিদের এই ওঙ্কার প্রতিপাদ্য লুপ্ত জ্ঞান যদি তিনি জন-সমাজে পুনঃ প্রচার করিতে পারেন—তবেই তাহার জীবন জন্ম সার্থক। কি তাহার এই মহদুদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে বাধা বিঘ্ন বিস্তর। প্রঞ্চ বাধা-বিষয় কার্যের জাল, কিছু না করিলেও কাগজ পত্রগুলাও ত সই করিতে হয়। দ্বিতীয় এবং চুড়ান্ত বাধা স্বয়ং তাঁহার গৃহিণী। কৰ্ত্তা যখনই বেশ সংষত চিত্তে তাহার প্রতিপাদ্য বিষয় সম্বন্ধে কোন একটি জটিল সমস্যা পুরণ করিতে বসেন—আশ্চৰ্য্য! তখনই কি গৃহিণীর মাথায় টনক নড়ে! ভুযুণ- যারে অবিলম্বে তাহার আগমন বার্তা ঘােষিত হইয়া উঠে, * কমলিনীসাহিত্য-গলি,
৭.
এষােৰী দেবী
প্নবাণ
আর কর্তার আমূল চিন্তা-বিকারগ্রস্ত, বিপৰ্য্যন্ত, বিল হইয়া
পড়ে।
একদিন বড় দুঃখে তাঁহাকে বলিতে শুনিয়াছিলাম, “এমন
কাৰ্য্য জীবনে যদি আর কক্ষপণ করি ত আমার নামই মিথ্যা।”
আমি সভয়ে সঙ্কোচে জিজ্ঞাসা করিলাম-“কি কাৰ্য্য করবেন
আর মুকুয্যেম’শায় ? এবার কি তবে লেখনী ছাড়বেন?
মুকুয্যে-মােয় রাগিয়া আগুন হইয়া উঠিলেন। তাহার এমন
রাগ আমি জীবনে কখনাে দেখি নাই;-মুখ লাল করিয়া কহি-
লেন, “আরে মুখ ? তা নয়। লেখা ছাড়লে বাঁচব কি নিয়ে?”
“তবে কি একটুকু বুঝিস-নে রে নির্বুদ্ধি, জীবনে আর
কখনাে দার পরিগ্রহ করব না।”
উত্তরে বলিলাম, “ধন্য ধন্য ! সাধু-সাধু! এতদিনের পর
একটা কথার মত কথা শােনা গেল !”
কিন্তু মনের ভিতরকার সংশয় তবু মিটিলনা। অবস্থান্তরে
সর্বদাই ত লােকের মতান্তর ঘটিয়া থাকে। এই ত সেদিন পত্নী-
প্রেমগগচিত্ত আমাদের সদাই ভক্ত—নাতির জন্য ক’নে জিতে
গিয়া নিজেই-যাক সে কথা !
সকাল বেলাটা কর্তা একরূপ নিরাপদ। কাজ ক ফেলিয়া
গিন্ধি বড় একটা এদিকে ঘেঁসেন না—তাই এ-সময়টা তাঁহার দশ
নতত্ত্বের মীমাংসায় বুজিটা বেশ খেলিতে থাকে। কিন্তু এই
সময়ে তিনি একজন শ্রোতার বড় অভাব অনুভব করেন।
১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
৭৮ এরী দেবী. প্রণীত পবাণী কিছুদিন হইতে হাসি তাহার এই অব দূর করিয়াছে। তাহাকে বেশ একটি সমজদার সহিষ্ণু শ্রোতারূপে তিনি পাইয়াছেন। ইহার নিকট ব্যাখ্যা করিতে করিতে তাহার জটিল তত্ত্বসূত্রও সহজে উন্মুক্ত হইয়া আসে। তাই প্রাতঃকালটা এ-কাৰ্যে বাধা পড়িলে—তিনি বড়ই উদভ্রান্ত হইয়া উঠেন। আপাতত কাগজে লিখিত ওঁ শব্দটি লেখনীর অগ্রভাগ- নির্দিষ্ট করিয়া হাসিকে বলিতেছিলেন, “বুঝলে ত হাসি ?” হাসি অক্ষরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়াই কহিল, “কতক “আচ্ছা, তাহলে গােড়া থেকে বলছি, ভাল করে বােঝ মা। শাস্ত্রমতে পরমাত্মার হৃদয়-আকাশ হইতে উৎপন্ন অ, উ, এই ত্রিবর্ণের সন্ধিজাত ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বর এই ত্রিগুণাত্মক ব্ৰহ্মবােধক ওম্ শব্দ, বেদের সনাতন বীজমন্ত্র এবং জীবাত্মার হৃদয়ে স্বতঃ বিরাজমান ও স্বতঃ প্রকাশমান। এখন বিচার করে দেখ, অ উ এই শব্দ দু’টি কি ? স্বরবর্ণ, কেমন ? "হ্যা ” আর মু?” ব্যঞ্জনবর্ণ ।” “আচ্ছা বেশ,-ব্যঞ্জনের কি স্বরবর্ণ ছাড়া পৃথক অস্তিত্ব আছে ? “না, তাদের আলাদা উচ্চারণ হয় না।” “সেইজন্য পরমাত্মা স্বর—এবং জীবাত্মা ব্যঞ্জনবাচক এবং কমলিনীসাহিত্য-মন্দির, ৭৯ স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত বা পৃথক হইয়াও পরস্পর সংযুক্ত। অন্য ভাষায়,—বিন্দুর সমষ্টিতেই যেমন এই বিশাল পরিদৃশ্যমান জগৎ, সেইরূপ পরমাত্মারূপ বিশ্ব- কোষে অবস্থিত সৃজনশক্তির বশবর্তী এই জীবাত্মা-বিন্দু মানব- দেহে স্বাতজ্ঞ লাভ করিবামাত্র ওম্ শব্দের উচ্চারণে ভগবানের সহিত আপনার একাত্মতা প্রতিপাদন দ্বারা তাহার বশ্যতা স্বীকার করে। বুঝলে ত হাসি ? হাসি হাসিয়া বলিল, “মনে ত হচ্ছে এইবার বুঝেছি!” কৃষ্ণলাল সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, “ওম্ অক্ষরের প্রথম গ্রন্থি- বিন্দু পরমাত্মবাচক চিহ্ন, মধ্যবিন্দু, পরমাত্মা ও জীবাত্মার মিনগ্রন্থি চিহ্ন। আর যদি ওকার শব্দের আদ্যোপান্ত এইরূপে মিলিত কর তখন ইহা চক্ররূপ ধারণ করে। এই চক্রান্তের মধ্যে নিখিল বিশ্ব স্থিত, রক্ষিত ঘূর্ণমান। বুঝলে হাসি?” “হ্যা বাবা! আমার বড় ভাল লাগছে।” “আর ও শব্দের মাথার উপর এই যে চন্দ্রবিন্দু, এর অর্থ কি জান ? জীবাত্মা-আমরা যখন পরমাত্মাকে আপনাতে অভব, করি—তখন তিনি ওস্কার পুরুষ—আর যখন তা করিনে তখন আমরা তাহার অর্ধরূপই দেখতে পাই। তখন তিনি চন্দ্রবিন্দু আকারে সাক্ষীস্বরূপ রূপে আমাদের উদ্ধে বিরাজিত থাকেন। বুঝলে মা ?” “কিন্তু জীবাত্মা ও পরমাত্মার এই একাত্মতা অনুভব করব কিরূপে ?” এই প্রশ্নে কৃষ্ণনাথ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন,-কহিলেন, ১১নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
मानी जीवणे
বাণী
আঃ সেই ত কথা! গার্গীও ঠিকতােমারই মত এইরূপ প্রশ্ন
করেছিলেন। আমার ইচ্ছা কি জান-হাসি? তুমি যদি
গাগীর মত
ঠিক এই সময় কি গৃহিণী সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইবেন! তাহার
অন্ধকার মুখ দেখিয়া কৰ্ত্তার বাবােধ হইয়া গেল। হাতের
কলমটা টেবিলে ফেলিয়া শশাচনীয় দৃষ্টিতে পত্নীর দিকে চাহিয়া
রহিলেন। কিন্তু এ দৃষ্টিতে গিন্নির পাষাণ হিয়া গলিলনা। তিনি
হাসিকে চলিয়া যাইতে অনুজ্ঞা করিয়া দৃঢ় গম্ভীরস্বরে স্বামীকে
কহিলেন, “অ্যাণেই নরেন্ত্রের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল—কিন্তু তার
আগে হাসির একটি পাত্র ঠিক করা চাই-ই চাই। সুজন রায়ের
ওখানে আজ তােমাকে যেতেই হবে।”
কর্তা মুখটি চুন করিয়া বলিলেন, “সে কথা কি আমার মনে
নেই? আমি সেজষ্ট দিনের মধ্যে পঞ্চাশবারের জায়গায়
একশবার হেমকে তাগিদ দিচ্ছি।”
গৃহিণী চড়ামুরে কহিলেন, “হেমটেম আমি জানিনে-
তােমাকেই নিজে আজ সেখানে যেতে হবে।
যেন কৰ্ত্তার সুজন রায়ের বাড়ী না যাওয়াতেই বিবাহটা বন্ধ
আছে!
“আচ্ছা বেশ, তাই যাব—কিন্তু একটু সময় দাও, লক্ষ্মীটি,
একলা ত যেতে পারিনে,-হেম আসুক।”
আবার বলছি হেম আসবে কি না আসবে-আমি মানিনে
-আমি শুধু জানতে চাই—তুমি আজ সেখানে যাবে
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
১
এময়িী এ
কিনা? বিকাল পর্যন্ত আমি সময় দিচ্ছি,আর যদি না যাও
কর্তা ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিয়া বলিলেন, “আর বলতে হবে না
-আমি ঠিকই যাব, আজই যাব, নিশ্চয়ই যাব।-শী-শশে
শশধর, শশাঙ্কলান-কোথায় তুমি?”
কর্তাবাবুর ডাক হাকে তাঁহার ভৃত্য শশী আসিয়া উপস্থিত
হইল ক্রুদ্ধ গৃহিণী কষ্টে হাস্য সম্বরণ করিয়া এই সময় সরিয়া
পড়িলেন।-শশীর প্রিয় মুখ দর্শনে কৃষ্ণলালের রুদ্ধ আলামুখী
উচ্ছ্বাস হৃদয়ে উথলিয়া উঠিল ; তিনি চীৎকার করিয়া
কহিলেন, “কোথায় ছিলি এতক্ষণ অজ বুদ্ধি গজানন ?”
“এজ্ঞে এইখানেই ত আছি।”
“এইখানেই ত আছিস, তবে ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না
কেন? হেমকে ডেকে নিয়ে আয়।”
“এজ্ঞে, তিনি এখনাে আইসেন নি।”
“এখনাে আসেনি। আজকাল ত দেখছি তার বড় গাফেলি
হয়েছে। তুই তবে যা—
“এজ্ঞে চল্লাম-”
“অমনি চল্লাম ! কি বলছি আগে শােন।”
বলতে আজ্ঞে হােক
“এখনি গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে আয়,-বুবলি ত? খবরদার
দেরি করিসনে।”
যে আয়ে বলিয়া সে দ্রুতপদে অদৃশ্য হইয়া গেল, এবং ইহার
১১৪ নং আহিরীটোলা টি, কলিকাতা।
s এমাজ সেবী এত স্বপ্নবাণী পর-বার বার-কর্তাবাবুর উচ্চ কণ্ঠনিসৃত আদরের এবং অনা- দরের ডাক হাকেও তাহার সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না,তিনি হতাশচিত্তে দ্রুত নিশ্বাস ফেলিতে ফেলতে চৌকিতে বসিয়া চক্ষু মুদ্রিত পূর্বক ধ্যানমগ্ন হইলেন। অষ্টম পরিচ্ছেদ। | হেম কৃষ্ণলাল বাবুর প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ভ্রাতা—অতএব স্মৃতি এবং সম্পর্কের বন্ধনীশ্বরুপ। এক সময় কৰ্ত্তাবাবু ইহার অভিভা- বক ছিলেন—এখন কৰ্ত্তারই ইনি সর্বেসর্বা দক্ষিণ হস্ত । হেম নহিলে ত তাহার বিষয়কৰ্ম্ম চলেই না,-তাহা ছাড়া অন্য অনেক কাজেই হেম তাহার নির্ভরস্থল,-এক কথায় হেম তাঁহার সর্ব- বিষয়ের ম্যানেজার। লােকটি যেমন কম্মিষ্ঠ তেমনি খাটি, হিসাব নিকাশে এক আধলার গরমিল হইলে সেদিন তাহার আহার নিদ্রা বন্ধ হয়। এইরূপ কাজের লােককে কাজে পাইয়া কৃষ্ণাল কিন্তু একেবারেই অকেজো হইয়া পড়িয়াছেন। চেকের ফরম পৰ্যন্ত তিনি নিজে লেখেন না, সই করিয়া দিয়াই নিশ্চিন্ত হন। বাবুকে বিষয়-কর্মে ‘ওয়াকিভ করিতে হেমের পক্ষ হইতে কিছুমাত্র ক্রটি নাই। কিন্তু তাঁহার দর্শন-চিন্তার নিগড়বাধা মনের মধ্যে বৈষয়িক চিন্তাকে ঠেলিয়া প্রবেশ করান একরূপ দুঃসাধ্য ব্যাপার। ব্যাঙ্কে কত টাকা আছে না আছে,-ভাড়াটে কমলিনীসাহিত্য-মন্দির, একুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী বাড়ীর কোটার ভাড়া আছে কোটা বা খালি, ধার দেওয়া টাকার মধ্যে কোনস্থলে কত সুদ বাকী পড়িল—কখন বা কোষ্টার নালিসের সময় আসিল,-এই সকল খবর জানাইয়া নানা কাৰ্য্য সম্বন্ধে আদেশ ও উপদেশ লইবার জন্য খাতা পত্র এবং চিঠি পত্রাদি সহ যথাসময়ে হেম প্রতিদিন দ্বিপ্রহরের পর তাঁহার নিকট আসিয়া হাজির হয়—কিন্তু কোনদিনই প্রায় পুত্থানুপুঙ্খরূপে কোন বিষয় শুনিয়া কিংকর্তব্য ঠিক করিবার অবকাশ তঁাহার ঘটে না। কোন বিষয়ের আধখানা পর্যন্ত না শুনিয়াই-অধীর চিত্তে কৃষ্ণলাল বলিয়া উঠেন, “বুঝেছি বুঝেছি, আর বলতে হবে না, আমার আদেশ এবং উপদেশ এই যে—এ সম্বন্ধে তােমার বুদ্ধিতে যা ভাল মনে হয় তাই করাে। হেম হতাশভাবে গোঁপে তা দিতে দিতে,-খাতাপত্রের তাড়া গুলা বহিয়া দপ্তরখানায় পুনঃ প্রবেশ করে। গোপে তা দেওয়াটাই হেমের জীবনের মধ্যে একটা বদ অভ্যাস—ইহাই তাহাকে সুখে উত্তেজিত এবং দুঃখে সান্ত্বনা প্রদান করে। কারণ মদ্যপান বা তামাকু সেবনে পর্যন্ত সে : অনভ্যন্ত। কখনাে কেন দুর্দিনে বা দুঃসময়ে সহসা যখন কাবাবুর সুপ্তি ভাঙ্গিয়া যায় তখন হেমের আরও বিপদ। এই চেত- নারূপ আধিভৌতিক ঘটনাকে দুঃস্বপ্ন বােধে, ইহা হইতে নিষ্কৃতি লাভের জন্য তখন সমধিক ব্যাকুলভাবে তিনি হেমের শরণাপন্ন যেন হেমই সেই ঘটনার সংঘটক,-এবং ইহার প্রতিবিধানও তাহার হস্তে। আজও গৃহিণীর নিকট কৰ্ত্তব্য- হন। ১১৪নং আহিরীটোল ফ্লট, কলিকাতা।
কুমারী দেবী এত স্বপ্নবাণী ভঙ্গের অপরাধে অভিযুক্ত হইয়া তিনি দায়ী করলেন- হেশকে ! হেম আসিবামাত্র চীংকার-তৎসনা তাহাকে কহিলেন, “কি রকম এ কাণ্ড কারখানা তােমার হে? কতদিন থেকে বলছি, বিজন কুমারের সঙ্গে হাসির বিবাহটা ঠিক করে ফেলে,-তা করছ কেন বলত? সেদিকে ত তােমার এক বিন্দু চেষ্টাও দেখতে পাইনে।” হেম হাসিতে লাগিল। বাবুর ভৎসনায় কেহ রাগ করে না, তাহা নির্বিষ ; বরঞ্চ তাহার মধুটুকুই লােকে উপভােগ করে। কৃষ্ণলাল বলিলেন, “তুমি ত হেসে নিশ্চিন্ত—আর এদিকে যে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত।” হেম আবার হাসিয়া কহিল, “আমি ইতিমধ্যে দুই তিন দিন সেখানে গিয়েছিলুম,—কিন্তু রায়মশায়ের দেখা পাইনি-শুনলুম তিনি বাড়ী নেই। আবার না হয় আজ খবর নেব।” “ও সব ওজরে আমি ভুলিনে, তােমার উপর এতটুকুও বিশ্বাস আর আমার নেই ! খবর নিলেই বুঝি কাৰ্যসিদ্ধি হােয়ে গেল। শরীরটা দিন দিন যেমন সুন্ন হচ্ছে বুদ্ধিটাও তেমনি তর দাড়াচ্ছে। আজই চল,-এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে তােমায় এখনি সেখানে যেতে হবে-বুঝলে ত?” “আরে তাই যাব। কিন্তু এখন ত সকলের আহারের সময় হয়ে এল—এখন ১১টা বেলা,এখন সেখানে গিয়ে হয়ত শুনবেন -বাবু খেতে বসেছেন,-এখন দেখাই হবে না।” অলিনী-সাহিত্য-গলি, ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী এত অথবাণী “তা নাই হােল দেখা। সে জন্য ত তােমাকে ভাবতে বলিনি। তবে চলুন, আমি প্রস্তুত আছি।” কৃষ্ণলাল গাড়ি প্রস্তুত করিতে বলিয়া শুনিলেন,-কোচম্যান হাজির নাই, সে বাসায় খাইতে গিয়াছে ! এ সংবাদে একটু আরামও বােধ করিলেন; এখনি যাইবেন বলিয়া ফেলিয়া পরমুহূর্তেই অনুতপ্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু এ যাত্রা তবুও রক্ষা পাইলেন না, অন্তঃপুরে আহারে যাইবামাত্র আবার এক দফায় গৃহিণীর তাড়া খাইয়া বিকালবেলা অগত্যা কোমর বাঁধিয়া সেনাপতিরূপে রণযাত্রায় নির্গত হইয়া পড়িলেন। তাহা ছাড়া আর গত্যন্তর কি ? গাড়ীতে বসিয়া সারাপথটা মনে মনে প্রার্থনা করিতে লাগি- লেন—আজও যেন সুজন রায় বাড়ী না থাকেন। গৃহিণীর নিকট কৈফিয়ং দিতে পারিলেই ত তাহার কর্তব্যের শেষ ।কিন্তু হায়রে! এমনি অদৃষ্ট! খােলা, ল্যাণ্ডোখানা রায়-ভবনের কম- পাউণ্ডে প্রবেশ করিতে না করিতে রায় মহাশয়ের জীর্ণ দেহ শীর্ণ . মুখ তঁাহার নেত্রগােচর হইল। সুজন রায় তখন ছাতে রাস্তা- অভিমুখী হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন, যেন কাহারও আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। কৃষ্ণলালকে দেখিয়া তিনি তাড়াতাড়ি নীচে নামিয়া আসিলেন। “এই যে দাদা, আসতে আজ হােক আসতে আজ্ঞা হােক”-বলিতে বলিতে নমস্কার অভিবাদন সহকারে গাড়ী হইতে নামাইয়া ড্রয়িং রুমে আমিয়া বসাইয়া বলিলেন, “আজ আমার পরম সৌভাগ্য! দাদার পদধুলিতে গৃহ ১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
লাক্সী দেবী এত
অপবাণী
পবিত্র হয়ে গেল।
বাড়ীর মঙ্গল ত? হেম ভাল আছে
কর্তার এইরূপ সৌজন্য-সমাদরে কলাল এরূপ মুগ্ধ অভিভূত
হইয়া পড়িলেন যে, ইহার প্রতিব্যবহারে তাঁহার মুখ হইতে
যেরূপ ভদ্রতার কথা শােভনীয় হইত, সেরূপ কিছুই এস্কলে
বলা হইল না। তবে তিনি এখানে আসিয়া সঙ্কোচের পরিবর্তে
ক্রমশঃ বেশ স্মৃৰ্ত্তির ভাবই বােধ করিতে লাগিলেন এবং মাঙ্গলিক
শেষ করিয়া সুজন রায় যখন অন্য কথা পাড়িলেন, তখন ক্রমশ
তাহার কথাও যােগাইতে লাগিল।
সুজন রায় কহিলেন, নরেন্দ্র ত বােম্বাই গিয়েছে শুনেছি
শচীন কি করছে এখন।” কৃষ্ণলাল বুঝিলেন--বিজন কুমারের
নিকট হইতে সুজন রায় তঁাহার ঘরের অনেক খবর পান।
তাঁহার প্রশ্নের উত্তরে তিনি কহিলেন, “শচীন এখন বি-এ
পাশ দিয়াছে।
‘বিএ পাশ দিয়েছে। তা বেশ বেশ! শুনলেও আহলাদ হয়।
আমার ছেলেটাত একেবারেই অকালকুণ্ড! আমি তাই
গিন্নিকে বলি—তােমার ছেলের বৌ মিলবে না।”
হেম এই অবসরটা বৃথা যাইতে দিল না—বলিল, “তার পাশের
কি দরকার বলুন ? বাপের জমিদারীই তার পাশ। বিজন
ত আমাদের বাড়ীতে প্রায়ই যাওয়া আসা করে—বৌঠাকরুণ ত
রূপেগুণে মুগ্ধতার ভারী ইচ্ছা তাকে জামাই করেন।
সুজন রায় বুঝিয়া লইয়াছিলেন—ইহাদের আগমনের উদ্দেশ্য
কমলিনী-সাহিত্য-গলি,
৮৭
আলী লেবণত
স্বপ্নবাণী
কি, সুতরাং তিনি এজন্য প্রস্তুত ছিলেন। হেমের কথার উত্তরে
বিনয় সহকারে বলিলেন, “আমার ছেলে দাদার,তার মেয়ে
আমার আপনার হবে, এর চেয়ে আর কি সৌভাগ্য হতে পারে
বল ? তবে ছেলেটাকে কোন একটা কাজে ঢুকিয়ে দিয়ে
তবে এ কাজ করব ভাবছি।” সুজন রায়ের মনােনয়নে তখন
জ্যোতির্ময়ীর জ্যোতিঃ জাগিতেছিল ।
দাদা ইহাতে সায় দেওয়া ছাড়া আর কি বলিতে পারেন ?
হেম এই সময় কি একটা কথা বলিতে যাইতেছিল, তংপূর্বেই
সুজন রায় আবার বলিলেন,
“আগে ইচ্ছা ছিল ওকে বিলাত পাঠাব—কিন্তু এখন মনে হয়
দেশে থেকেও কাজ করা যায়। দেশের iudustryর দিকে
লক্ষ্য দেওয়াই আপাততঃ আমাদের প্রধান কর্তবা। একটা
দেশলাইএর কাটিও আমাদের বিদেশ থেকে আসছে। বঙ্গবিভাগ
নিয়ে দেশের লােক ক্ষেপে উঠেছে,কিন্তু এসব কাৰ্য্য নিয়ে
ক্ষেপছে কজন বলত দাদা ? অথচ এই পথই আমাদের দেশের
প্রকৃত মুক্তির পথ।”
কৃষ্ণলাল প্রশংসাপূর্ণ দৃষ্টি তাঁহার মুখের উপর স্থাপিত করিয়া
কহিলেন, “সে ত ঠিক কথা!”
“তুমি ত দাদা বল্লে ঠিক কথা। আমাদের জমিদার
ভায়ার। এদিকে মােটেই ঘেসতে চান না। তাঁরা পলিটিকস
নিয়েই ব্যস্ত।
অতুলেশকে লক্ষ্য করিয়াই তিনি এই কথা বলিলেন।
১১৪নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী ৰেী এত অপবাণ হেম বলিল, “হ্যা, আপনি শুনেছি—পলিটিক্সের ভেতর যেতে চান না।” “আমি মনে করি,ওসবের মধ্যে যাওয়াটা নিতান্ত নির্ব- চিতা,-লাভ কিছু নেই, লােকসান সমূহ।” কৃষ্ণলাল বলিলেন, “কথাটা আমি সঙ্গত বিবেচনা করি। আজকালকার ছেলেরা পলিটীকৃস, নিয়ে কেন যে এত মাথা ব্যথা করে বুঝতেই পারিনে। আমরা বল্লেই কি ইংরাজরা ভারতবর্ষ আমাদের ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে?” হেম বলিল, “না, তা কেউ ত চায় না। আমরাত ইচ্ছা করিনে যে ইংরাজেরা যাক ;-রাজ্য শাসনে সমক্ষমতা আমরা পেতে চাই,-যে সব অন্যায় রাজনৈতিক নিয়ম দেখতে পাই তার প্রতিবিধান চাই,—এই মাত্র।” কৃষ্ণলাল বলিলেন, “হ্যা, সে ত হওয়া উচিতই,-তাতে ত ইংরাজদেরও আপত্তি হবার কোন কারণ দেখিনে।” সুজন বলিলেন, “তােমার মত সরল মন তাদের কি দাদা! তারা ভাবে বেশী ক্ষমতা আমাদের হাতে দিলে ক্রমশঃ একেবারেই তাদের ক্ষমতা চলে যাবে-তাদের দিকটাও বুঝে দেখ।” হেম বলিল, “তাদের দিক ত তারা খুব বেশী করেই দেখছে, আমাদের দিক যে একটুও দেখতে চায় না।” “কিন্তু ভায়া আমরা বল্লেই কি তারা দেখবে? “সে কথা পলিটিসানরাই বলতে পারেন, তবে আমাদের মত আনাড়িরা এইটুকু বােঝে যে, বলাতেও ত সুখ একটা আছে।” কমলিনী-সাহিত্যমন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী এ
স্বপ্নবাণী
“আমি বলি ওতে সুখবােধ না হয়ে দুঃখবােধ হওয়াই উচিত।
বেশী কথার দরকার কি-কাজেই যােগ্যতা দেখাও না?”
হেম একথার সত্যতাটা মনে মনে বুঝিয়া গোঁপে তা দিতে
প্রবৃত্ত হইল। সুজন বলিলেন, “আমি ত আগেই বলেছি, যাতে
ব্যবসা বাণিজ্য ও শ্রম-শিল্পের বৃদ্ধি হয় এই সব দিকে দৃষ্টি
দেওয়াই আমাদের এখন প্রধান কর্তব্য। আর আমার সাধ্যমত
শক্তি আমি এইদিকে অর্পণ করেছি। একটি চা-বাগানে আমি
সহস্র সহস্র মুদ্রা ঢাছি—তবুও আশানুরূপ শ্রীবৃদ্ধি করতে
পারছিনে। এ সব কাৰ্য ব্যাঙ্কের সাহায্য ব্যতীত চলতে পারে
না। কিন্তু বলব কি দুঃখের কথা, একজন একবস্তু ইংরাজকেও
তারা যেরূপ সাহায্য করে, আমাদের মত লােককে তার শতাং-
শের একাংশও করে না। আমার চা ব্যাঙ্কের নাম শুনেছ বােধ
হয়? দাদা, বড় দুঃখে আমি ঐ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু
দেশের লােকই বা কজন এ সম্বন্ধে আমাকে সাহায্য করছেন?”
হেম বলিল, “কয়েকবার দেশী ব্যাঙ্ক ফেল হয়েছে কিনা, তাই
প্রথমটা সবাই ভয় পায়। দিন কতক চালিয়ে যদি সুনাম রক্ষা
করতে পারেন-তখন আপনা হতেই কত লােক যেতে এসে
আপনার ব্যাঙ্কে টাকা রাখবে। বাস্তবিক এরকম ব্যাঙ্ক একটার
বড়ই অভাব আমাদের দেশে। এ সম্বন্ধে আমিও ভুক্তভোগী।
রাণিগঞ্জে কর্তা, মহাশয়ের একটা সম্পত্তি আছে—জানেন ত ?
তাতে মাঝে মাঝে কয়লার টুকরাও পাওয়া যাচ্ছে। লাখ চার
টাকা হলেও আমরা কাজ আরম্ভ করতে পারি, কিন্তু অনেক
১১৪ নং আহিরীটোলা চটি, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রীত
বাণী
চেষ্টাতেও কোন ব্যাঙ্কারকে হাত করতে পারছিনে। তারা
সকলেই একবাক্যে জয়েন্ট ষ্টক কোম্পানি খুলে কাজ আরম্ভ
করতে বলে।আসল কথা, কৃতকার্য হলে তখন এরা টাকা
দিবে।”
সুজন রায়ের লােভ-রসনা লালায়িত হইয়া উঠিল। । রাজা
অতুলেশ্বরের রাণিগঞ্জে সম্পত্তি আছে আর তাঁহার নাই, এ
হীনতাটা তাহাকে বড়ই আঘাত দেয়। এই অভাব দূর করিবার
জন্য রাণিগঞ্জে দু একবার জমী দেখিতেও তিনি গিয়াছিলেন।
কৃষ্ণলালের জমীটা তঁাহার বড়ই পছন্দ হইয়াছিল। কিন্তু সন্ধান
লইয়া জানিয়াছিলেন—ও জমী বিক্রয় হইবে না। হেমের কথার
উত্তরে তিনি কহিলেন, “এস্থলে কোম্পানী খােলার আমি ত
সার্থকতা বিশেষ কিছু দেখিনে। জমী তােমাদের, অথচ লাভ যা
হবে—তা পঞ্চ ভূতে মিলে খাবে। তার চেয়ে আমাকে যদি
lease দাও ত আমি খনন ব্যয়ভার সব বহন করব—তারপর
লাভ যখন হবে, তখন খরচটা উঠিয়ে নিয়ে আধা আধি আমরা
ভাগ নেব।”
কৃষ্ণলাল বলিলেন, “বাঃ সে ত বেশ কথা-জমীটাত এখন
বলতে গেলে পড়েই আছে, তার আয় অতি সামান্য। এ রকম
সৰ্তে দিতে আমি এখনি প্রস্তুত; কি বলহে হেম?”
হেম বলিল, “এসব কথায় ত এক মুহুর্তে উত্তর দেওয়া যায়
; ভেবে চিন্তে পরে উত্তর দেওয়াই ঠিক।”
সুজনরায় আর অধিক গরক্ত দেখান বিবেচনাসঙ্গত তান
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
এজমা দেবী প্রীত।
স্বপ্নবাণী
করিলেন না -কহিলেন, “হ্যা, হেম ঠিক কথাই বলছেন। তবে
আমার বলা রইল—জমীটা যদি বিক্রয় করতে চান বা lease দিতে
প্রস্তুত থাকেন ত আমাকে জানাবেন ; আপনার সুবিধামত
সর্তেই আমি বন্দোবস্ত করে নেব।”
কৃষ্ণলাল আবার হেমের দিকে চাহিলেন। সুজনরায় হাসিয়া
বলিলেন, “হেমই বুঝি দাদার হর্তা কর্তা বিধাতা!”
কৃষ্ণলাল বলিলেন, “ভাগ্যিস ওকে পেয়েছি ভাই, ধড়ে
প্রাণ আছে, নইলে যে আমার কি দশা হােত ; মনে করতেও
আতঙ্ক উপস্থিত হয়।”
সুজন রায় মনে মনে বলিলেন, “তবেই বিষয় রেখেছ তুমি।”
আত্মবং মন্ততে জগৎ! স্বয়ং ধর্মরাজ আসিয়া তাহার কর্মচারী
হইলেও সুজন তাহাকে পরিপূর্ণ বিশ্বাস করিতে পারিতেন না।
হেম বলিল, “দর্শনতত্ত্ব চিন্তাতেই উনি সমগ্র আপনাকে
ঢেলে দিয়েছেন। আমরা যদি তা থেকে এক মুহূর্তও ওঁকে এদিকে
টানি তাহলেও উনি বিরক্ত বােধ করেন।”
সুজন রায় হাসিয়া বলিলেন, “হাঁ শুনেছি বটে দারা কি
একটা বই লিখছেন,এখনাে শেষ হয় নি?”
কৃষ্ণলাল বলিলেন, “জটিল তত্ত্ব ভাই, সাধারণের বােধগম্য
ক'রে লিখতে একটু সময় চাই। জীবাত্মা ও পরমাত্মার একাত্ম
বাদই আমার প্রতিপাদ্য বিষয়। ঋষিগণ ওঁ শব্দকে বীজমন্ত্র করে
যে ইহাই স্বীকার করে গেছেন এইটে আমি বােঝাতে চাই।
সুজন রায় নেত্র বিস্ফারিত করিয়া বলিলেন, “দাদা—তুমি এই
১১৪নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
এমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
মরজগতে অমর কীর্তি রেখে যাবে দেখছি ! ঋষিদের আধ্যা-
ত্মিকতা যদি তুমি আবার জাগিয়ে তুলতে পার,—সত্যযুগ ফিরে
আসবে!”
কৃষ্ণলাল উৎসাহিত হইয়া কহিলেন, “তােমার এ বিষয়ে এমন
interest তা আমি জানতুমনা—এত আহলাদ হচ্ছে আমার !
আমি তােমাকে দু’কথায় এর মূলতত্ত্বটা এখনি বুঝিয়ে দিতে
পারি-একটা কাগজ পেন্সিল যদি আনতে বল।”
সুজন রায়ের প্রশংসার পরিণাম এতদূর গড়াইবে তাহা তিনি
বুঝেন নাই। এখন কিরূপে ইহা হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিবেন
ভাবিতেছেন এমন সময় তাহাকে রক্ষা করিলেন-তাহার ম্যানে
জার। তিনি এই সময় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সুজন রায়
অনেকক্ষণ হইতে ইহারই আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন।
সুজন রায় বলিলেন, “দেখ দাদা পুণ্য কার্যে কত বাধা।
এস ডিক্রুজ সাহেব, এদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।”
এই ডিক্রুজ সাহেব আর কেহ নহেন, শরৎকুমার ও অনাদির
ট্রেনের বন্ধু। ডিক্রুজ বেশ বাঙ্গলা বলেন-তিনি বাঙ্গলাতেই
ইহাদের সহিত কথা বার্তা কহিতে লাগিলেন। হেমের নিকট
ইনি অপরিচিত নহেন, অনেকবার ট্রেনে দেখা শুনা হইয়াছে।
সুজন রায় কথা-প্রসঙ্গে বলিলেন, “দেখ দাদা, ইনি একজন মন্ত
ফিলজফার লােক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সব ফিলজফিই এর কণ্ঠস্থ।
তােমার দর্শনতত্ত্ব যদি একে দিয়ে ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়ে
নিতে পার তু মন্ত একটা কাজ হয়।”
কমলিনীসাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত স্বপবাণী এই বাসনা, কৃষ্ণলালের মনেও মাঝে মাঝে উদয় হইয়াছে। সহসা তাহা পূর্ণ হইবার মূর্তিমন্ত উপায় সম্মুখে উদিত দেখিয়া তিনি আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিলেন। ডিক্রুজ বলিলেন, “আপনারা দুজনেই দেখছি born patriot ! একজন দেশে ধনাগমের চেষ্টা করছেন-আর-একজন জ্ঞান বিস্তারের চেষ্টা করছেন। দেশের পক্ষে দুই-ই দরকার। আমার সৌভাগ্য যে আজ আপনার সঙ্গে পরিচিত হলেম।” আরও দুই একটা এইরূপ মিষ্ট সম্ভাষণ করিবার পর সুজন রায়কে তিনি বলিলেন, “আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে, আমায় এখনি আবার একবার ব্যাঙ্কে যেতে হবে।” হেম এই ইঙ্গিত গ্রহণ করিয়া কহিল, “তবে আজ ওঠা যাক মুখুয্যেমশায় ; সন্ধ্যা ত হয়ে এল। মুখুয্যেমশায় আসিবার সময় যেরূপ অনিচ্ছার সহিত গাড়ীতে উঠিয়াছিলেন ; যাইবার সময়ও সেইরূপ অনিচ্ছাতে চৌকি হইতে উঠিলেন। সুজন বলিলেন, “বসুন না আর একটু ; এখনি যাবেন? মুখুয্যে মশায়ের ইচ্ছামত কাজ হইলে তিনি এই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিতেন; কিন্তু এই কথা বলিতে বলিতে গৃহগামী স্বয়ং উঠিয়া দাঁড়াইলেন ; হেম, ভিকুজ সবাই উঠিয়া দাড়াইল, সুতরাং কৃষ্ণলালের মনের ইচ্ছা মনেই রহিয়া গেল। উঠিয়া দাড়াইয়া সুজন রায় কহিলেন, “তুমি তা হলে ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হচ্ছ দাদা? এতে ক্ষতি, কিছুই নেই—শুধু নামটা দেওয়া মাত্র। তাহলেই লােকে ব্যাঙ্কের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারবে। ১১৪নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
৯ঃ
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
**
কৃষ্ণলাল উত্তর করিলেন, “অবশ্য অবশ্য, আমার ত সেটা
কর্তব্য কাজ।”
সুজন কৃষ্ণলালকে গাড়ীতে পৌছিয়া দিবার সময় নীচে
আসিয়া আবার বলিলেন, “ব্যাঙ্কের কথাটা ভুলাে না দাদা।
টাকাকড়ি এই ব্যাঙ্কে রেখে তুমি বেশ নিশ্চিন্ত থাকতে
পারবে। রাণিগঞ্জের সম্পত্তি সম্বন্ধে যে প্রস্তাব করেছি সে
বিষয়েও ভেবে-চিন্তে একবার দেখাে। ছেলেটাকে এই রকম
কাজে লাগিয়ে দিয়ে তখন ঘরে বৌ আনব এই মনে করে
আছি।”
আশাতীত সফলতা ! হাসিকে বৌ করিবেন বলিয়াই তাহা
হইলে সুজন রায় কথা দিলেন। ইহা হইতে স্পষ্ট উক্তি আর কি
হইতে পারে। কর্তা বলিলেন, “কবে আসবে ভায়া! তুমি
বুঝি হাসিকে দেখনি?”
“একদিন অবিলম্বে যাব ; তােমার-দৰ্শনতত্ত্বও সেইদিন শুনব,
আজ ত আর ভাগ্যে সে আনন্দলাভ ঘটলাে না।”
কৃষ্ণলাল আনন্দে গলিয়া গেলেন—তাহাদের গাড়ীতে বসাইয়া
সুজন শেষে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কখন গেলে কথাবার্তার সুবিধা
হবে দাদা ?”
কৰ্ত্তা বলিলেন, “সকালেই আমি লেখা পড়া করি, দর্শনতত্ত্ব
শুনতে চাও ত সেই সময়ই এস।”
“আর যদি কাজের জন্য যাই?
“তাহলে বিকালের দিকে আসাই ভাল। হেম আহারান্তে
কমলিনীসাহিত্য-মলি,
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত অথবাণী আমার ওখানে আসেন , আজ তােমার কাছে সকালেই আসব ভেবে ধরা পাকড়া করে ১১টার মধ্যেই ওঁকে আনিয়েছিলুম- শেষে কিন্তু সকালে আর এখানে আসাই হােলনা।” শেষ কথা শেষ হইতে না হইতে কোচমান গাড়ী হাঁকাইয়া দিল। কৰ্ত্তা বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া গৃহিণীকে সুসংবাদ দান করিলেন -গৃহিণী আহলাদিত হইয়া বলিলেন, “দেখলে,-আমি ত বলে ছিলুম, তুমি গেলেই কাৰ্যসিদ্ধি হবে। কথা শােননা—এই বড় ; হাসি ছাড়া আর সকলেই জানিল ; বিজনকুমারের সহিত তাহার শীঘ্রই বিবাহ হইবে। গ: কৃষ্ণলালের সৌভাগ্যের সীমা নাই। ২৪ ঘণ্টাও অতিবাহিত হয় নাই, কেবল রাত্রিটা মাত্র কাটিয়াছে অমনি প্রাতঃকালে ম্যানেজার ডিক্রুজ সাহেব কৃষ্ণলালের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন! অভিপ্রায় কি ? না, তাহার দর্শনতত্ত্ব শুনিবেন। কৃষ্ণলালের বুঝি, এত আনন্দ জীবনে কখনাে হয় নাই। তিনি ওঙ্কার শব্দলিখিত কাগজখানি সাহেবের চোখের উপর খুলিয়া রাখিয়া প্রথমে ওঙ্কার শব্দের অর্থ এবং মাহাত্ম ব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত হইলেন। সাহেব তাহার প্রতি ব্যাখ্যায় বার বার মুগ্ধতাবাচক শব্দের ব্যবহার করিতে লাগিলেন—এবং তর্জমা করিবার অভিপ্রায়ে নােট লইতে লাগিলেন। ১১৪নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
বাণী
কিছুক্ষণ পরে সহসা ঘড়ি দেখিয়া ব্যস্তভাবে উঠিয়া দাড়াইয়া
বলিলেন, “আজ আর সময় নাই, অন্য কাজে যেতে হবে এখনি।
এমন interesting কথা ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না—কিন্তু কি
করি? আবার কাল আসব।”
পরে পরস্পরের ধন্যবাদ বিনিময় শেষ হইয়া গেলে বলিলেন,
“ব্যাঙ্কে কি টাকা রাখা হবে ? মিষ্টার রায় জানতে চেয়েছেন।”
কৃষ্ণলাল বলিলেন, “অবশ্যই হবে, আজই হতে পারত, কিন্তু
হেম ত এখন নেই।”
হেম আসিলে ব্যাঙ্কে যে টাকা দেওয়া হইবেনা তাহা সাহেব
বিলক্ষণ জানিত, জানিয়াই সকালে আসিয়াছিল। সে বলিল—
“হেম না এলে কি কোন কাজ হয় না—টাকা ব্যাঙ্কে দেওয়া ত
কঠিন কথা কিছু নয়। আমাকে যদি একটা চেক সই করে
দেন ত–
“তা দিতে পারি—দিতে পারি । কিন্তু চেক বই যে হেমের
কাছে--সে এলে চেক পাঠিয়ে দেব
ডিজ বুঝিল, এ আশাটা ত্যাগ করিতে হইবে।
বলিল, “বেশ, হেমকে দিয়েই পরে ব্যাঙ্কে চেক পাঠালে চলবে ;
কিন্তু আপনি ত ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হবেন বলেছেন—তাহলে
এই কাগজটা যদি সই করে দেন। কাগজখানা পকেট হইতে
বাহির করিয়া সে তাহাকে দিল—তিনি টেবিলের উপর
রাখিয়া নাম সই করিলেন,-ডিক্রুজ বলিল, “পড়ে দেখবেন
না ?”
কমলিনী-সাহিত্যমন্দির,
৯৭
স্বর্ণকুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী :
কৃষ্ণলাল বলিলেন, “পড়ে আর দেখব কি? তােমরা কি
আর আমাকে ঠকাবে?”
সাহেবের কঠিন হৃদয়ও সহসা একটু খানি করুণা হইয়া
উঠিল। এই চিত্তবিকারে মনে মনে একটু হাসিয়া তাড়াতাড়ি
কাগজখানা লইয়া সে চলিয়া গেল।
হেম পরে আসিয়া এই সংবাদে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া
পড়িল। ইহার পর ম্যানেজার বা সুজন রায়ের টিকিও আর
দেখা গেল না। পনেরাে দিন না যাইতেই
পনেরাে দিন না যাইতেই খবর পাওয়া গেল,
সুজন রায়ের ব্যাঙ্ক ফেল হইয়াছে।
নবম পরিচ্ছেদ।
কৃষ্ণলাল প্রত্যহ সকালে একবার দু-চার মিনিটের জন্য খবরের
কাগজে চোখ বুলাইয়া লন। আজ বেঙ্গলিখানা খুলিতেই
প্রথমে নজরে পড়িল—“রায়-ব্যাঙ্ক ফেল হইয়াছে।”
একটা মুক্তির দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া তিনি ভাবিলেন, “ভাগ্যিস
ও ব্যাঙ্কে টাকা রাখা হয় নাই। এই সময় হাসি আসায় তিনি
সে চিন্তা ভুলিয়া গেলেন। কাগজখানা ফেলিয়া দিয়া হাসিকে
দর্শন-তত্ত্ব বুঝাইতে বসিলেন। সবে মাত্র ওঁ শব্দের প্রথম
গ্রন্থির সহিত মধ্য গ্রন্থির যােগাযােগ ব্যাখ্যা আরও
করিয়াছেন,-ভৃত্য আসিয়া খবর দিল-“রায়-মশায় এসেছেন।”
১১৪ নং আহিরীটোলা কট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রীত স্বপ্নবাণী বলিতে বলিতে সে ভুপতিত খবরের খাগজখানা কুড়াইয়া ভাজ করিতে প্রবৃত্ত হইল। কর্তা জিজ্ঞাসা করিলেন, “রায় মশায় ! রায় মশায় কে? কোন্ রায় মশায় ?” ভৃত্য কোনও উত্তর দিবার পূর্বেই স্বয়ং সুজন রায় মূর্তিমন্ত রূপে আবির্ভূত হইয়া তাহার সমস্যা পূরণ করিয়া দিলেন। ভৃত্য তখন কাগজখানা পাশের টেবিলে রাখিয়া নীরবে সরিয়া পড়িল। “একি, তুমি ভায়া !” আনন্দ-বিস্ময়-গদগদ চিত্তে কৃষ্ণলাল উঠিয়া দাড়াইলেন, হাসি আগেই উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল। কর- মর্দনে সুজন রায়কে সাদৃত করিয়া কৃষ্ণলাল কহিলেন, “এই আমার কন্যা হাসি! প্রণাম কর মা।” সুজন রায় যে হাসিকে দেখিবার অভিপ্রায়েই এখানে। আসিয়াছেন, কৰ্ত্তার মনে তাহাতে সন্দেহ মাত্র ছিল না। হাসি প্রণাম করিয়া উঠিয়া দাড়াইলে—সুজন রায় কহিলেন, “বেশ বেশ! বেশ মেয়েটি! তা মা তােমার বাবার সঙ্গে একটু কাজের কথা আছে।” হাসি একটু সলজ্জ হাসি হাসিয়া চলিয়া গেল। হাসির প্রতি এইরূপ সম্বর্ধনা কৰ্ত্তার কিন্তু ভাল লাগিল না! যদিও তিনি জানিতেন বিবাহের দিন ক্ষণ ঠিক করিবার জন্যই সুজন রায় এইরূপ ব্যস্ত ভাবে হাসিকে বিদায় করিলেন, তবুও অরসিকের প্রতি রহস্য নিবেদনের ন্যায়—এই ঘটনায় তিনি ক্ষুন্ন হইয়া পড়িলেন। বেশ একটু উত্তেজিত ভাবেই কহিলেন, “এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? জান ত ভায়া,আমার ঐ কমলিনীসাহিমন্দির,
৯৯
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী এ
স্বপ্নবাণী
একটা মেয়ে, ছাড়তে মন চায় না। তা-একটু দেরী তােমাকে
করতেই হবে?”
সুজন রায়ের ওষ্ঠাধরে আগত বিদ্রুপহাস্যকুঞ্চন সরলরেখায়
মিলাইয়া পড়িল—তিনি গম্ভীর স্বরে কহিলেন, “হ্যা, দেরী ত
হয়েই পড়লাে-শুনেছ ত দাদা, আমার ব্যাঙ্ক ফেল হয়েছে।”
“এইমাত্র কাগজে দেখলুম।”
সুজনরায় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “বেশী বিশ্বাস
কাউকে করতে নাই দাদা, তাহলেই ঠকতে হয়। তােমার
যেমন হেম, আমার সেইরূপ ছিল ডিক্রুজ সাহেব। আমার
আহাম্মকিরই এই ফলভােগ !”
কৃষ্ণলাল বিস্ফারিতনেত্রে কহিলেন, “সত্যি।”
হ্যা ঠিক কথাই বলছি দাদা। যাহ’ক তুমি ভয় পেয়ে
,-আমি থাকতে তােমার কোন ক্ষতি হবে না, সেই কথাই
তােমাকে বলতে এসেছি”
কৃষ্ণলাল বলিলেন, “আমার টাকা ত ব্যাঙ্কে দেওয়া
হয়নি,-সে কথা বুঝি ডিক্রুজ তােমাকে বলেনি? আমার ত
ক্ষতির কোনই সম্ভাবনা নেই ?”
“কিন্তু তুমি যে একজন ডিরেক্টার,-তারও এক দায়িত্বটা
আছে ত ?
কৃষ্ণলালের বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল—তিনি ভীতচিত্তে
কহিলেন, “তােমার কথায় তখন ত বুঝেছিলাম—টাকা কড়ি
সম্বন্ধে আমার দায়িত্ব কিছু থাকবে না।”
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী এণত
বাণী
“ঠিকই বুঝেছিলে দাদা। নাম থাকবে তােমার আর দায়িত্ব
বহন করব আমি-বরাবরই আমি এই মনে করে আছি।”
কৃষ্ণলাল তাহার সৌজন্য সাধুতায় মুগ্ধ হইয়া কহিলেন,
“তােমর কি খুবই ক্ষতি হলে ভায়া ?”
‘ক্ষতি সবই। ব্যাঙ্কে যে টাকা রেখেছিলুম সে সবই
গেল,-তা ছাড়া অন্য লােকের গচ্ছিত টাকার জন্যেও আমাকে
দায়ী হতে হচ্ছে।”
কৃষ্ণলাল ইহা শুনিয়া আশ্বস্তভাবে কহিলেন, “তা বাইরের ।
লােকের টাকা ত এখানে বেশী নেই শুনেছি! হেম ত বলছিল
ব্যাঙ্ক তােমার টাকাতেই চলছে।”
সুজনরায় খনখনে হাসি হাসিয়া কহিলেন, “ব্যাঙ্কিং
বিজনেস, যে হেম কত বােঝে—এ কথায় তা বােঝা যাচ্ছে।
বাইরের লােকের টাকা বেশী নেই এটা ঠিক, তাড়াতাড়ি টাকা
অনেকেই তুলে নিয়েছে—তবুও যে টাকার জন্যে দায়ী আমি
সেও ত নিতান্ত কম নয়।”
কৃষ্ণলালের দৃষ্টিতে সহানুভূতি প্রকাশিত হইল। সুজন
আবার কহিলেন, “এদানি যেমন ব্যাঙ্কটি জমে আসছিল, অমনি
ভিতরে ভিতরে লুটও চলছিল। আহাম্মকি দাদা! চার পাে
আহাম্মকি আমার! আমি সুজনরায় কিনা—একটা ফিরিঙ্গি
বাচ্চার হাতের লাড্ড, হলুম! তবে আমি কারাে টাকা রাখব
না-চিরদিনই ধর্মের পথ ধরে চলেছি—এখনাে চলব।”
কৃষ্ণলাল তাহার সাধুতায় মুগ্ধ হইয়া বলিলেন, “ধন্য !”
০
কমলিনীলাহিত্যন্দির,
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী
“কিন্তু সাধুতার কি একালে আদর আছে ভাই? আজকাল
জিনিষ বিকোয় চটকে-চকচকে ঝুটোর দরই বেশী। একটি
কথা শুনে বড় আশ্চর্য হয়েছি ; আমাকে কথা দিয়ে তুমিও নাকি
অতুলের কাছে রাণীগঞ্জের সম্পত্তি বিক্রী করছ—তুমিও দাদা কথা
ভাঙ্গলে ?”
কৃষ্ণলাল আকাশ হইতে পড়িলেন, বলিলেন, “কই আমি ত
এর বিন্দুবিসর্গ কিছুই জানিনে ? এ দেখছি হেমের কাণ্ড।”
অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া সুজনরায় কহিলেন, “হেম যদি
তােমার অমতে একাজ করে থাকে ত কাজটা বন্ধ করতে
কতক্ষণ? তুমি না সই করলে ত কাজ হবে না?”
কৃষ্ণলাল মুস্কিলে পড়িলেন। হেমের কর্তৃত্বের উপর যে তিনি
হস্তক্ষেপ করিতে অক্ষম একথা বিশ্বাস করিবে কে? আর
বলিবার কথাও ত নয় ! তবুও বলিলেন, “আচ্ছা ভায়া, হেমকে
জিজ্ঞাসা করে আমি এ বিষয়ে উত্তর দেব । হেমের অমতে
ত আমি বিষয় কৰ্ম্ম কিছুই করতে পারিনে। আর সে আমার
আমমােক্তার নামার বলে সব কাজই করতে পারে।”
সুজন রায় অনুনয়ের স্বরে কহিলেন, “দেখ ভাই, তােমাকে
স্পষ্ট করে বলি -যদি তােমার এই সম্পত্তিটা পাই তবেই
আমার উদ্ধার, নচেৎ আমাকে সর্বস্বান্ত হতে হবে। তােমার
দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করার শক্তিও আমার থাকবে না, এটাও
বুঝা।”
এতক্ষণ সুজন রায়ের বাক্যে প্রকাশিত সাধুতার পরিচয়ে
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
১২
এমারী দেবী প্রীত
স্বপবাণী
••
কৃষ্ণলালের মন ভক্তি-আত্ৰ হইয়া উঠিয়া ছিল কিন্তু এই কথায়
রায় বাহাদুরের মনের আসল রূপ যেন ধরা পড়িল ;
; কৃষ্ণলালের
বিশ্বাসে সহসা সন্দেহ ছিদ্র প্রবেশ করিবামাত্র সুজনের অনুরােধ
অনুনয় আর তাহার হৃদয় স্পর্শ করিল না, তিনি অটল ভাবেই
কহিলেন, “আমিত বক্সেম ভাই, হেম যা করেন তার বিরুদ্ধে
আমি কিছুই করতে পারি নে।”
সুজন জানিতেন হেম ইহাতে আপত্তি করিবেন; যদি
এখনি কাজ বাগাইতে পারেন ত ভাল, নচেৎ আশা নাই।
এই ভাবিয়া তিনি বায়নানামা লিখিয়া পর্যন্ত সঙ্গে আনিয়া-
ছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণলালের অটল ব্যবহারে তঁাহার ধৈৰ্য্যচ্যুতি
ঘটিল ; তাহার ভিতরের সর্প ফণা বাহির করিয়া কহিল, “আচ্ছা
বেশ! সুজন রায় সুজনের সঙ্গে সুজন বােলে যে দুর্জনের সঙ্গে
দুর্জন হ'তে জানে না তা মনে করাে না। তােমার দুর্বুদ্ধিতার
ফলে দেখাে তােমার ঘরের কড়িকাঠখানাও থাকবে না।”
সুজন রায় চলিয়া গেলেন, তাহার ক্রোধ উদগীরিত গরলে
কৃষ্ণলালের শাদা মন ঋণায় কালো হইয়া উঠিল। উঃ, এই
কাল সর্পকে তিনি কিনা দেবতা মনে করিতেছিলেন!
মােহমুক্ত হইয়া মনে মনে তিনি ভগবানকে ধন্যবাদ প্রদান
করিলেন। হেম থাকিতে সুজন তাহার সর্বনাশ করিতে
পারিবেন না, ইহাতে তিনি বেশ আশ্বস্ত রহিলেন। হেমের
প্রতি এইরূপ বিশ্বাস তাহার বৃথা হইল না !
ব্যাঙ্ক যে ফেল হইবে, বিশ্বস্তসূত্রে আগেই হেম সে খবর
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী এত স্বপ্নবাণী পাইয়াছিলেন এবং এজন্য যাহাতে কৃষ্ণলালকে কোন ক্ষতি সহ করিতে না হয়, শ্যামাচরণ গাঙ্গুলির সহিত পরামর্শ করিয়া তাহারই উপায় অবলম্বনে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। রাণীগঞ্জের সম্পত্তি অতুলেশ্বরকে lease দিবার পরামর্শ তিনিই দান করেন। এই জন্যই শ্যামাচরণ রাজাকে কলিকাতা আসিতে লেখেন। ব্যাঙ্কের কোন দায়িত্ব কৃষ্ণলালের উপর আসিবার পূর্বেই তাঁহার এ সম্পত্তি হস্তান্তর করা উচিত বলিয়া তিনি মনে করিলেন। বাড়ী-ঘর প্রভৃতি অন্যান্য সম্পত্তি কৃষ্ণলালের পিতা পৌলদিগের নামে রাখিয়া গিয়াছিলেন। সুতরাং কৃষ্ণলালকে ডিরেক্টারের দায়িত্বে লিপ্ত করিয়া মকদ্দমায় আনিলেও যে সুজন রায় তাহার বিশেষ ক্ষতি করিতে পারিবেন না,বরঞ্চ এরূপ মকর্দমায় তাহার নিজের প্রতারণাজাল প্রকাশিত হইয়া পড়িবে, উকীল ব্যারিষ্টারগণ একবাক্যে কৃষ্ণলালকে এইরূপ আখাস প্রদান করিলেন। দশম পরিচ্ছেদ। রাজা অতুলেশ্বরের কলিকাতা নিবাস মাণিকতলায়। ইহা একটি বিচিত্র উদ্যান ভবন। বাড়ীর চারিদিকেই সবুজ ঘাসের ময়দান; আশেপাশে ফুলের কেয়ারি ; স্থানে স্থানে প্রস্তর-মুর্তির বিচিত্র শােভা, ফোয়ারার উৎস এবং যত্রতত্র বসিবার আসন। ১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত বগবাণী উদ্যানের পশ্চিম প্রান্তে স্বচ্ছসলিল সুবিশাল একটি হ্রদ; জ্যোতি য়ী ইহার নামকরণ করিয়াছেন ‘কিরহ্রদ। এইনামানুযায়ী এ হ্রদে কিয়বাহন জলিবােট একখানি স্থানলাভ করিয়াছে। উদ্যানের মধ্যস্থলে রাজপ্রাসাদ ; আর উদ্যানপ্রান্তে একটা ছােট দ্বিতল ভবনে বাস করেন ম্যানেজার। এতদসংলগ্ন একটি স্বতন্ত্র একতল গৃহ ম্যানেজারের আফিস। রাজা আসিয়াছেন ; দ্বিপ্রহরের পর হইতে আজ আফিসে লােক সমাগম চলিতেছে। কৃষ্ণলালের রাণীগঞ্জের সম্পত্তির লেখাপড়া হইয়া গেল। কাৰ্য- সমাপ্তিতে হেম নিশ্চিন্ত মনে কাগজের তাড়া লইয়া উকিলের সহিত গাড়িতে উঠিলেন, রাজা ও শ্যামাচরণ প্রাসাদ অভিমুখে যাত্রা করিলেন। অপরাহুকাল-আশ্বিনের দিবসান্তে কনক রৌদ্র তরুশীর্ষ হইতে শীর্ষান্তরে লুকোচুরি খেলিতে খেলিতে কিরদে ঝাপাইয়া পড়িতেছিল। ইচ্ছা—ডুব-সাঁতারে হ্রদপারে যাইবে। কিন্তু কিন্নরনৌকার দাড়াহত বারিকণিকাপুঞ্জ পথিমধ্যে সহসা তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়া ফেলিয়া সকৌতুকে তাহার কনক কান্তি রজত উচ্ছাসে ভাসাইয়া তুলিতেছিল। নৌকা বাহিত হইতেছিল আজি কাহার হতে? কে উহারা, মানবী বা কিন্নরী? অণুভা ধরিয়াছিল হাল আর পাড় বাহিতেছিল হাসি। হাসি প্রায়ই এই উদ্যান-ভবনে বেড়াইতে আসে। কিন্তু তাহাকে এখানে টানিবার পক্ষে কাহার আকর্ষণ-বল অধিক কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
১৫
এবার বে এ
স্বপ্নবাণ
অণুভার বা এই কিন্নর-নৌকার তাহা ঠিক বলা যায় না। অণুভা
যখন অভিমানভরে সখীকে এইরূপ অনুযােগ প্রশ্ন করে তখন হাসি
উত্তর না দিয়া-কখনাে বা মৃদুমধুর হাসিতে কখনাে বা চুল
টানিয়া কখনাে বা চুম্বনে তাহার মুখ বন্ধ করে।
নাবিকতায় উভয়েই সুদক্ষ। প্রথম প্রথম একজন মাঝি
তাহাদের সঙ্গে থাকিত—আজকাল মাঝিকে তাহারা নৌকায় লয়
;-বেলা শেষে নৌকা কূলে ভিড়িলে মাঝি নৌকা টানিয়া
যথাস্থানে লাগায়।
হাসি দাড় টানিতে টানিতে গান ধরিয়াছিল ;
আহা মরি মরি আজি জোয়ারে লেগেছে ঢল।
ওরে স্রোত তরী মাের চল্ বেগে ছুটে চল।
এ কি রঙ্গ কি কৌতুক ক্ষুদ্র আমি বারিটুক
ধরেছি তর রূপ-যৌবনে টলমল ।
চস্রোত তরী মাের, বেগে চল ছুটে চল।
নভ আজ রঙে ভরা-কি সুন্দর বসুন্ধরা !
কনক ভাদরে ক্ষণে-চমকে বাদল জল ।
চল তােত তরী মাের চল বেগে ছুটে চল!
ঐ যে মেঘের নীচে, ঘাটের সীমানা পিছে-
কদম্ব কি কৃষ্ণতরু? কিবা ওর নাম বল ?
শাখা-ঢাকা ফুলে ফুলে, ডাকে মােজ দুলে দুলে
জানে না কি বন্দী আমি? বলহীন কণা-জল ।
আজি মুক্ত প্রাণ দেহ, রাখিতে কি পারে কেহ ?
১১৪ নং আহিরীটোলা ইট, কলিকাতা।
এষর্ণমারী দেবী প্রণীত বাণী এখনি উচ্ছাসনীরে লুটিব চরণ-তল! শােত ওরে তরী মাের চল বেগে ছুটে চল। রাজা তখন খামাচরণের সহিত এই পথে আসাদে যাইতে ছিলেন; গান শুনিয়া তীরে দাড়াইয়া শ্যামাচরণকে বলিলেন- “বেশ ত মিষ্টি গলা! তােমার মেয়ে গাচ্ছে বুঝি? আমি ত জানতাম না অণুভা গাইতে পারে?” শ্যামাচরণ বলিলেন, “না অণুভা নয়, গান করছে হাসি-কৃষ্ণ- লালের মেয়ে—ও গান বাজনা বেশ শিখেছে।” এই সময় বােটের মুখ ফিরিল,হাসির চোখ পড়িল তীরদেশে রাজার দিকে,-সহসা তাহার গান থামিয়া গেল।রাজা তাহার লজ্জা বুঝিয়া সেখান হইতে চলিয়া গেলেন। অণুভার চোখ ছিল তীরের বিপরীত দিকে, সে কহিল, “গান বন্ধ করলে যে ?” হাসি এ প্রশ্নের উত্তর না করিয়া কহিল, “কে ভাই উনি ?” অনুভা তখন ঘাড় ফিরাইয়া তীরের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল, “কই, কাউকে ত দেখছিনে ?” “চলে গেলেন যে,—তােমার বাবাও সঙ্গে ছিলেন। উনি ভাই?” “হতে পারেন রাজা-জান না? প্রসাদপুরের রাজা- এসেছেন যে।” “রাজকুমারীর বাবা ? তিনি হতেই পারেন না,-এ একজন পুরুষ মানুষ।” অণুভাসিয়া কহিল, “রাজা কি স্ত্রীলােক হয় নাকি?” = কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী নেৰী এই
বাণী
৩
হাসি এ-কথায় খুব, খানিকটা হাসিল; তারপর কহিল,
“না গাে না, তা নয়, আমি বলছি ইনি একজন যুবাপুরুষ।”
“রাজা হলেই বুঝি বুড়াে হতে হয়।”
“আঃ, তা কে বলছে— তবে রাজকুমারীর বাবা নন ইনি
নিশ্চয়ই, দেখতে একে অনেক ছােট।
"তবে বােধ হয় কুমার অনাদি-দা, রাজার সঙ্গে প্রতিবারই ত
উনি আসেন, এবারেও বােধ হয় এসেছেন। এর সঙ্গে তাের
বিয়ে হলে ভাই বেশ হয়। রাজকুমারী এখনাে বিয়ে করলেন
, রাজা বােধ হয় অনাদি-দাকেই পুষ্টি নেবেন-এইরূপ ত
গুজব। বিয়ে করবি ভাই তাঁকে ?” এবার যে অনাদি রাজার
সঙ্গে কলিকাতায় আসেন নাই—সে খবরটা অণুতা রাখে নাই।
হাসি সে কথায় মন না দিয়া কহিল, “কি রং ভাই ?” অণুভ।
কহিল, “রাজবাড়ীর সকলেই সুন্দর! রাজার রংও চমৎকার।
তুই অনাদি-দাকে বিয়ে কর ভাই, আমরা সম্বন্ধ করি। রাণী হবি
তুই, আমরা বলব রাণী দিদি।”
অণু দূরে বসিয়াছিল—তাহার গাল টিপিতে পারিল না
হাসি ;কিন্তু হাসির চুলে অণু যে ফুলগুচ্ছ পরাইয়া দিয়াছিল,
তাহা খুলিয়া সে দুড়িয়া মারিল। অনুভা আবার সেই ফুলে
তাহাকে বিধিবার চেষ্টা করিল। এইরূপ ফুল সন্ধানে হারা
বেশ যখন মাতিয়া উঠিয়াছে—তখন তীর হইতে শ্যামাচরণ
কিলেন, “অণু ? সন্ধ্যা হয়ে আসছে ফের এবার।”
মুহূর্তে তাহাদের হাসি-কৌতুক বন্ধ হইল এবং নৌকাও
১১৪ নং আহিরীটোল টি, কলিকাতা।
আমার এত
১৮
কুলের দিকে ফিরিল। অল্পক্ষণের মধ্যে সংযত শিষ্ট শান্ত মেয়ে-
দুইটি ঘাসের উপর শ্যামাচরণের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল
খামাচরণ কহিলেন, “রাজা বাইরে যাচ্ছেন-আমারও সঙ্গে
যেতে হবে,-একটা কথা বলতে এলুম হাসি। তােমার মাকে
বললা-মা ; পরও আমি নরেনকে আশীর্বাদ করতে যাব।” হাসি
বলিল, “আচ্ছা বলব। আপনি তাহলে বােধহয় শীঘ্র ফিরবেন
; প্রণাম করে নিই।হাসি প্রণাম করিল।
শ্যামাচরণ আর একবার বলিলেন, হাসি, তাহলে বলল মা
তােমার মাকে যে, পরশু বিকালের দিকে আমরা যাব ।
বেশী আয়ােজন যেন না করেন। আশীর্বাদে সমারােহ পর্ব
কিছু থাকবে না,-বড় জোর দু-একটি বন্ধুকে মাত্র সঙ্গে নিতে
পারি।”
হাসি যথাসময়ে বাড়ি আসিয়া সকলকে এই খবর দিল।
একাদশ পরিচ্ছেদ।
শ্যামাচরণ আজ নরেনকে আশীর্বাদ করিতে আসিবেন,
অন্তঃপুরে রন্ধনের ধুম লাগিয়াছে। যদিও শ্যামাচরণ বলিয়াছেন
সঙ্গে বেশী লােকজন আনিবেন না, তবুও গােণাগুন্তি গােটাকতক
করিয়া বাজারে জলখাবারেই ত আর পাত সাজান যায় না।
আর শ্যামাচরণৰে বিশাসই বা কি? শেষ প্রহরে য িমত
কমলিনীসাহিত্য-মন্দির,
আমাৰী ৰেী এই স্বপ্নবাণী পরিবর্তন করিয়া সবন্ধুবান্ধবেই আসিয়া হাজির হন। তখন মুখুয্যে বাড়ীর সুনাম রক্ষা হইবে কিরূপে? বিশেষত রন্ধনকলার পরিচয় প্রদানের এই ত উত্তম অবসর-এ বাড়ীর মেয়েরা এমন নির্বুদ্ধি কেহ নহেন যে শ্যামাচরণের কথায় এই সুযােগটি খােয়াইবেন দ্বিপ্রহরের পর হইতে মুখুয্যে-ঘরণী পােলাও কালিয়া কোথা প্রভৃতির আয়ােজনে ব্যস্ত—আর মিষ্টান্ন প্রস্তুতের ভার গ্রহণ করিয়া ছিলেন হাসি ও হাসির দিদিমা। দুজনে মিলিয়া রসগােঙ্গা খাজা, পান্তুয়া, সন্দেশ, সরভাজা, মালাইভােগ, এ সকল প্রস্তুত করিয়া ফেলিয়াছেন, বাকি কেবল বাদসাহী মিঠাই। বেশনের বড় বড় দানা তপ্তকড়া হইতে ঝাঝরিযােগে উঠাইয়া সবে মাত্র এখন দিদিমা তাহা রসে ফেলিতেছেন। পরে ইহার সহিত সর ক্ষীর প্রভৃতি নানা মসলা মিশাইয়া রন্ধন-কাৰ্য্য সমাধা করিবেন। এই মিষ্ট ভােগ • মুখুয্যে বাড়ীর নিজস্ব কলা। এই বিদ্যালাভ পিপাসায় অনেক ঘরণী ইহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছেন বটে, কিন্তু কেহই এ পর্যন্ত গুরুমৰ্যাদা রক্ষা করিতে পারেন নাই। এক এক রকম মিষ্টান্ন যেমন প্রস্তুত হইতেছে অমনি নাতনীর রসনারূপ কষ্টিপাথর যােগে দিদিমা তাহার ভাল মন্দ যাচাই করিয়া লইতেছেন। মিষ্ট চাকিতে চাকিতে বেচারী হাসির কণ্ঠ পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। বিদ্রোহী হইয়াও ফল নাই, অনুযােগ অনুরােধের দায়ে তাহাকে শেষে বশ মানিতেই হইবে। ১১৪নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মালৰ এখত
ঘরবাগ
এই ঝগড়া ঝাটির মধ্যে পড়িয়া তাঁহাদের হাতের মিষ্টগুলা কিন্তু
অধিকতর মিষ্টতা লাভ করিয়াছে।
বেলা যখন প্রায় ছয়টা তখন শচীন রন্ধন শালায় গিয়া মাকে
বলিল, “গাঙ্গুলি মহাশয় এসেছেন।”
মুখুয্যেঘরণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কজন তারা?”
শচীন উত্তর করিল, “ আমি দেখিনি। তােমার কথামত
তার গাড়ীখানা বাড়ী ঢুকতেই আমি খবর দিতে এলুম। মােট
দেখলুম একখানা গাড়ী; তাহলে চারজনের বেশী লােক ত নয়ই।
মা বলিলেন, “তুই যা শচীন, দৌড়ে তাের দাদাকে পাশের
বাড়ী থেকে ডেকে নিয়ে আয়, লক্ষ্মীছেলে।
অমলের সঙ্গে সে
দেখা করতে গেছে। ডাকলেই আসবে বলেছে।”
রান্না ঘরের ঠিক পাশেই মিষ্টাৱের ঘর। শচীনের গলা শুনিয়া
দিদিমা ভাকিলেন, “শচীন এসেছিস? আয়, আয়, মিষ্টি গােটা-
কতক চেকে যা।
হাসির মা শাশুড়ীর উদ্দেশে একটু উচ্চ গলায় কহিলেন,
“ঠাকুর জামাই এসেছেন মা, শচীন যাক-নরেনকে ওবাড়ী থেকে
ডেকে আনুক। ফিরে এসে মিষ্টি চাকবে এখন।”
কিন্তু শচীন লােভ সম্বরণে কর্তব্য পালন করিবার ছেলে নয়।
সে তাড়াতাড়ি দিদিমার কাছে হাজির হইল। তখন চুলা হইতে
মিঠাইর খােল নামিয়াছে, তিনি বন্ধনের ভার হাসিকে অর্পণ
করিয়া সরভাজা বসগােঙ্গা ও পান্তুয়া এক একটা শচীনের হাতে
দিয়া বলিলেন,"খামাচরণ এসে পড়লাে, এখনও নরেনের দেখা
লিন-হিত্য-মন্দির,
এমারী দেবী এত
এবাণী
নেই! আচ্ছা ছেলে যাহােক ! খেয়ে নিয়ে শীঘ্র যা, ডেকে নিয়ে
আয় তাকে।”
শচীন বলিল, “যাচ্ছি যাচ্ছি—এত তাড়াতাড়ি কি! বাবা
ত ঘরে আছেন; জলে ত পড়েননি তারা। আমাকে আর
দুখানা সরভাজা আর দুট পান্তুয়া দাও।”
দিদিমা তাহার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়া বলিলেন, “এইবার যা
ডেকে নিয়ে আয় দাদাকে! একখানা রেশমী কাপড়, একটু
ফোটা চন্দনও ত তার পরতে হবে।”
শচীন অবশিষ্ট পান্তুয়াটা মুখে পুরিয়া দিয়া বলিল, “দাদা
কক্ষণাে ও সব পরবে না।”
“না পরবেনা ! তুমি সবজান্তা ! দাদা না পরে তােমাকে
পরিয়ে ছাড়ব। এখন যাও তাকে ধরে নিয়ে এস।”
শচীন গামলার জলে হাতটা তাড়াতাড়ি চুবাইয়া চলিয়া যাইতে
যাইতে দিদিমার কথার উত্তরে বলিল, “আমি বাড়ী থাকলে ত।
আমি যাচ্ছি এখনি বায়স্কোপ দেখতে, দাদাকে ডেকে দিয়েই
চলে যাব।”
বলিয়া সে দ্রুত পদে প্রস্থান করিল।
দিদিমা কষ্ট পরে আপন মনেই বলিলেন, “আজকালকার
ছেলেরা যে সব কি রকম হয়েছে। শ্বশুর এসে বসে রইল
আশীৰ্বাদ নেবেন যিনি, তিনি যে কোথায়, তার ঠিক নেই।
আর ভাইটিও তেমনি! ঘরে যাহােক একটা ক্রিয়া-কৰ্ম-অতিথি
অভ্যাগতকে আদর অভ্যর্থনা করতে হবে—তা না, চনে তিনি
১১৪ নং আহিরীটোলা এট, কলিকাতা।
'
১১
কর্ণকুমারী দেবী এণত
স্বপ্নবাণ
বায়স্কোপ দেখতে! বেশ সব শিক্ষা হচ্ছে ! যা হাসি দিদি,
মিঠাই গুলাে বেঁধে কাপড় ছেড়ে নে। তােকেই পরিবেষণ
করতে হবে-জানিস, ত। উৎসবের দিনে আজ লাল কাপড়
একখানা পরিস।”
হাসি উঠিয়া দাড়াইল, দাসী এক থালা ফুলের মালা আনিয়া
বলিল, “মালী দিয়ে গেল গাে।”
দিদিমা বলিলেন, “বাইরে আলাদা একথালা দিয়েছে ত?
আশীর্বাদের সময় দরকার হবে যে।”
দাসী বলিল, “তা দিয়েছে ।
*দেখদেখি তবে কছড়া গােড়ে ওতে আছে ?”
দাসী মালাগুলা একে একে হাতে উঠাইতে লাগিল। “দিদিমা
দেখিয়া বলিলেন, “মােট একটি ছড়া গড়ে দেখছি—আর সবই
সরু মালা। শশুরের গলায় ঐ ছড়াটা খাবার পরে তুই পরিয়ে
দিস, হাসি।
এই সময় হাসির মা পলায়ের জন্য পেস্তা বাদাম চাইতে
এই ঘরে আসিয়া কহিলেন, “হাসি কেন দেবে—আমিই বুড়াের
গলায় মালা পরিয়ে দেব মা?
দাসী কি শুনিতে কি বুঝিয়া বলিয়া উঠিল, “বুড়াের গলায়
কেন মালা দেবে? দিদিমণি আমাদের রাজরাণী হবে গাে,
দেখে নিও!”
দিদিমা বলিলেন, “তােরা সেই আশীৰ্বাদই কর সবাই। যা,
মালার থালাটা উপরে নিয়ে গিয়ে হােট কুটরীতে রেখে দে এখন।”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
কুমারী ৰেী এশীত
ঘপবাণী
দাসী চলিয়া গেল-দিদিমাও উঠিয়া দাঁড়াইয়া হাসির
হাসিমুখ চুম্বন করিয়া বলিলেন, “কোন্ রাজা তপস্যা করছে
আমার নাতনীর জন্য, কে জানে।
হাসির মনে পড়িয়া গেল ;-হ্রদের ধারের সেই যুবক মুর্তি-
যাহাকে অণুভা রাজকুমার বলিয়া পরিচয় দিয়াছিল।
সে প্রফুল্লভাবে কহিল, “আমাকে তবে তােমরা বনে পাঠাও
দিদিমা,-তবে ত রাজপুত্র আমাকে উদ্ধার করতে আসবে।”
দিদিমা র মিষ্টহাতেই মিষ্টভাবে নাতনীর গাল টিপিয়া
কহিলেন, “ছি রূপসীমণি, ও কথা কি বলে ?
এই কমল
সরােবরে নেমেই তােমার রাজা তােমাকে বুকে তুলে নেবে।”
হাসি হাসিয়া চলিয়া গেল ; দিদিমা মিষ্টগুলি থালায় সাজা-
ইতে বসিলেন। কাজ করিতে করিতে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া
আবার সেই কথাই ভাবিলেন, “বৌমার যদি একটুও বুদ্ধি আছে।
অমন সােনার ছেলে শরৎ তাকে কি না হাত ছাড়া করলে।
বিজনের সঙ্গেও ত আর বিয়ের আশা নেই। সে কিন্তু ভালই
হােয়েছে ; বাপটা যে ভয়ানক লােক।”
দিদিমার কাজ শেষ হইবার পূর্বেই হাসি যখন একখানি লাল
বারাণসী সাড়ি পরিয়া তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল, তখন
তাহার মনে হইল, যেন মূর্তিমতী লক্ষ্মীদেবী স্বয়ং তাঁহাকে আসিয়া
দেখা দিলেন।
বহির্বাটিতে বিনাড়ম্বরে নরেন্দ্রের আশীৰ্বাদ-পর্ব সমাধা
হইল। সন্ধ্যার সময় বিদায় গ্রহণ করিয়া নরেন্দ্ৰ পূৰ্ব্ব বন্দোবস্ত
১১৪ নং আহিরীটোলা ফ্রীট, কলিকাতা।
নারী সেবী এত বাণী অনুসারে তাহার একটি বন্ধুর বাড়ী নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে গেল ; আর অতিথি দুইজনকে সঙ্গে লইয়া কৃষ্ণলাল অপুরে আগমন করিলেন। দিদিমার দালানের আজ বাহার দেখে কে? একটি চন্দন- কাষ্ঠ-যবনিকায় বিভক্ত দালানের এক অংশ আজ ভােজন- স্থান—অপর অংশ বসিবার স্থান রূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে। ড্রয়িংরুম বিভাগে দিদিমার তক্তাপােষখানির উপর গালিচা কুশনের সজা, আশে পাশে কয়েকখানি কৌচ চৌকি এবং মাঝে মাবে এক একটি ক্ষুদ্র টেবিল। টেবিলগুলি ফুলভরা ফুলদানিতে ফ্রেম-আঁটা ছবিতে সাজান একটি টেবিলে রূপার থালায় কয়েকগাছি ফুলমালা অতিথিগণের সম্মানার্থে রক্ষিত। থামের মাথায় মাথায় কুঞ্চিত রঙিন রেশমী পরদা ঝুলিতেছে, দেয়ালে দেয়ালে সেতার এসরাজ প্রভৃতি যন্ত্রাদির মাঝে মাঝে নানারূপ চিত্ৰলেখ্য, অধিকাংশই হাসির হন্তাকিত। কৃষ্ণলালের অনুবর্তী অতিথি দুইজন মধ্য-পথে উপবেশন গৃহে সমাগত হইলেন। এই সরল সুন্দর অথচ অনাড়ম্বর গৃহ-সজ্জা দেখিয়া নবাগত অতিথি রাজা অতুলেশ্বর মনে মনে গৃহকত্রীর রুচির প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারিলেন না। মাচরণ এখানে আসিয়াই অন্তঃপুনিকাগণের সহিত প্রথমে দেখা করিতে গেলেন এবং সেখানে প্রণাম সভষণাদি শেষ করিয়া দিদিম ও হাস্থিকে লইয়া পুনরায় দালানে প্রবেশ করিলেন। অতপুরের ভােজে পরিবেষণ করা দিদিমার একটি কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
এখণকুমারী ৰেী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
কর্তব্য কাজ ছিল। গৃহিণী দ্বারান্তরালে আসিয়া উকি দিতে
লাগিলেন।
রাজা তখন চিত্ৰলেখ্য দেখিতেছিলেন, ফিরিয়া দাঁড়াইবামাত্র
শ্যামাচরণ দিদিমার দিকে দৃষ্টিনির্দেশ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন,
“ইনি কৃষ্ণলালের মাতা, আর এই আমাদের হাসি-ওরফে সুপা।
প্রণাম কর মা একে-
হাসি তৎক্ষণাৎ মুখভরা হাসি হাসিয়া ভূ-নত হইল। রায়
ব্যতিব্যস্ত ভাবে বলিয়া উঠিলেন, “করেন কি,করেন কি?”
কিন্তু তাহার মুখের কথা মুখে শেষ হইতে না হইতে হাসি পদধূলি
গ্রহণ পূর্বক উঠিয়া দাড়াইল।
আজ পুরাতন ফ্যাসানের ঝড় লণ্ঠন এবং দেয়ালগিরির
মধ্যে বিজুলী বাতি জ্বলিতেছিল। হাসি প্রণামান্তে উঠিয়া
চকিত দৃষ্টিদানে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার ন্যায় উজ্জ্বল সেই আলােকে
রাজাকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিয়া লইল। “এ কি, রাজকুমার
অনাদি-দা নাকি?” সেইদিন হইতে হাসি ইহাকে এই নামেই
স্মরণ করে। সেদিন দূর হইতে যাহার প্রতিবিম্ব মাত্র
দেখিয়াছিল, আজ তাহার প্রকৃত রূপ দেখিয়া স্তম্ভিত হইল।
এ ত অল্পবয়স্ক যুবকের মূর্তি নহে। ইনি যে মহামহিম
জ্যোতির্ময় পুরুষ ! কি সৌম্য সুন্দর ! হাসির কল্পনা প্রকৃতের
নিকট পরাজয় মানিল।
বস্তুতঃই রাজা আদর্শ সুপুরুষ চিত্রাঙ্কন তুল্য এমন
সৰ্বাঙ্গসুন্দর মূর্তি কদাচিৎ নয়নে পড়ে। তাঁহার ক ইরাণীর
১১৪ নং জাহিরীটোলা মিট, কলিকাতা।
বর্ণমালী এবী এত পবাণী ন্যায় স্বর্ণপ্রজ, ক্ষুরধারমুণ্ডিত শহীন পরিষ্কার মুখ রমণীর ন্যায় কমনীয়, দেহ সুগঠিত, অঙ্গুলিগুলি পৰ্যন্ত চম্পককোরক তুল্য সুঠাম—এমন কি কেশরাশিও রেশম কোমল লালিত্য- পূর্ণ। তাঁহার ললাট বুদ্ধিবৃহৎ, নয়ন ভাবজ্যোতিঃপূর্ণ এবং ওষ্ঠাধর কারুণ্যরেখা-গঠিত। এই ত্রিভাবের সলিনে তাঁহার রাজজনােচিত গাভীৰ্য কবি-অনােচিত সরল মাধুর্যে এমন বিয় করিয়া তুলিয়া ছিল যে বয়সে তিনি চল্লিশের কাছাকাছি হইলেও তাহাকে দেখিতে পয়ত্রিশের অধিক দেখাইত না। রাজাকে একবার দেখিলে নয়ন পুনঃ পুনঃ সেই দিকে আকৃষ্ট হইত। বলা বাহুল্য দিদিমাও তাহার রূপে মুগ্ধ হই- লেন। রাজা তাহাকে প্রণাম করিবার পর প্রসন্নচিত্তে তিনি কহিলেন, “মঙ্গলহােক”। তাহার পর শ্যামাচরণের দিকে দৃষ্টি- পাত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার কে হন ইনি শ্যামা- চরণ? পূৰ্বে ত একে দেখিনি।” আত্ম-পরিচয়-দানে ইহাদের ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিতে রাজার ইচ্ছা ছিলনা, তাই আগে হইতেই এসম্বন্ধে শ্যামা- চরণকে তিনি সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন। দিদিমার প্রশ্নের উত্তরে শ্যামাচরণ কহিলেন, “ইনি দূর সম্পর্কে আমার একরূপ ভাই হন,-নাম অতুল রায়, বিদেশেই বাস করেন, কাৰ্যোপলক্ষে কলকাতায় এসে আমার ওখানেই উঠেছেন।” “অতুল রায় ?” দিদিমা একটু ভাবিয়া বলিলেন, “নিখিল রায়ের কেউ হন কি ইনি? তিনি সম্পর্কে আমার ভাই-পো হন। কমলিনী-সাহিত-মন্দির, ২১৭ এণকুমারী দেবী প্রীত অবাণী রাজা একটু হাসিয়া কহিলেন, “রায়ে রায়ে একটা সম্পর্ক খুজে পাওয়া অসম্ভব নয়। আমাকেও না হয় ভ্রাতুস্পুত্র বলেই মনে করবেন।” কথাটি দিদিমার বড় মিষ্ট লাগিল। কৃষ্ণলাল মাতার কথার প্রতিবাদ পূৰ্বক কহিলেন, “নিখিল রায় তােমার ভাই পােনা আমার ভাই পাে? তার ছেলে আমাকে ত দাদা দাদা করে।” দিদিমা বলিয়া উঠিলেন, “হ্যা তাইত ঠিক। বাবা, বুড়াে হয়ে যাচ্ছি-অত শত মনে রাখতে পারিনে।” রাজা হাসিয়া কহিলেন, “তাহলে আপনারা সকলেই আমাকে স্নেহ-চক্ষে দেখবেন।” তাহার মধুর সৌজন্যে মাতা পুত্র উভয়েই আপ্যায়িত হইলেন। ব্রাহ্মণ ভৃত্য প্রায় তখনি যবনিকান্তরাল হইতে জানাইয়া দিল যে—আহাৰ্য প্রস্তুত। দিদিমার অনুবর্তিতায় সকলে ভােজন-গৃহে উপনীত হইলেন। দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। আজ-কাল বাঙ্গালী ধনী-গৃহে বিবাহ ভােজ অপেক্ষা আশীৰ্বাদ- ভােজ খাদ্যোপকরণের অধিক বাহুল্য দেখা যায়। কারণ, স্বল্পতর অতিথির তুষ্টিসাধন পক্ষে বড়ম্বর লঘু আয়াসসাধ্য। এক্ষেত্রেও অন্তঃপুরিকাগণ শ্যামাচরণের নিষেধ সত্ত্বেও ভূরি আয়ােজনের কিছুমাত্র ত্রুটি করেন নাই। রৌপ্যথালের তিনদিকব্যাপী ১১৪নং আহিরীটোলা জট, কলিকাতা।
वैपरिमांजो दावोस অপবাণী সুবিস্তৃত ব্যঞ্জন ও মিষ্টান্ন পাত্রের সকল স্তরে নাগাল পাওয়া দীর্ঘ- হন্ত রাজার পক্ষেও দুঃসাধ্য হইয়া উঠিয়াছিল। দিদিমা কাছে বসিয়া দূরের বাটিগুলি তাহার হাতের নিকটে ধরিয়া দিতে দিতে সকল ব্যঞ্জনই একটু একটু চাকিবার জন্য মৃদুস্বরে অনুরােধ করিতেছিলেন। রাজা যেটি খাইয়া বিশেষ পরিতােষ প্রকাশ করিতেছিলেন সেটি যে হাসিরই প্রস্তুত, ইহাও অসঙ্কোচে রাজাকে জানাইয়া দিতেছিলেন ; আর হাসি দিদিমার প্রতি ক্রুদ্ধ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়াও রাজার প্রশংসা বেশ হাস্য মূখেই আত্মসাৎ করিতেছিল। এবাড়ীর এই দর, ভাল রান্নাগুলি মা দিদিমা দুজনেই হাসির নামে চালাইয়া অধিকতর পরিতৃপ্তি লাভ করেন। কথােপকথন সুখে বঞ্চিত হাসির মাতা দুরে বসিয়া মূক- বধিরের ন্যায় অতিথি দর্শন সুখেই আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিতে- ছিলেন। রাজা দক্ষিণ হস্তে সদাসর্বদা বহুমূল্য দুইটি হীরক অঙ্গুরী ধারণ করিতেন। তিনি যখন পাত্র হইতে পাত্ৰান্তরে হস্ত-চালনা করিয়া ব্যক্ষন গ্রহণ করিতেছিলেন, তখন সেই অঙ্গুরী দুইটির জ্যোতি তারকাজ্যোতির ন্যায় ঝলমল করিয়া উঠিতেছিল। গৃহিণী একবার রাজার মুখের দিকে একবার তাঁহার হাতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে করিতে ভাবিতেছিলেন, " ঠিক যেন কোন ছদ্মবেশী রাজপুত্তর। হাসির যদি এই রকম একটি বর হয় ! ঠাকুরজামাই একে কি গােপনে ক'নে দেখাইতেই এনেছেন নাকি? তাই যেন হয় বিধাতাপুরুষ। গৃহিণী যখন, এইরূপ তপস্যা করিতেছিলেন, তখন হাসি কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
১১৯
অমান্য সেবা প্রীত
স্বপ্নবাণী
নিবিষ্ট চিত্তে অতিথির আহার-সৌষ্ঠব দেখিতেছিল। কিরূপ
ধীরে ধীরে স্বল্পমাত্রায় তিনি আহাৰ্য্য মুখে গ্রহণ করিতেছেন।
মুখে হাত উঠাইবার কি সুচারু ভঙ্গী! আহাৰ্য্য মুখে লইবার
পর ওষ্ঠাধর নিমীলিত হইয়া পড়িতেছে, চর্বনে শব্দ নাই;
হস্তলেহনের বিকৃত দৃশ্য নাই! আহার-ক্রিয়ার মধ্যে এতটা
সৌন্দৰ্য যে লুক্কায়িত আছে—ইতিপূর্বে ইহা তাহার নজরে
কখনাে পড়ে নাই ত !
অব্যঞ্জন ত্যাগ করিয়া রাজা যখন মিষ্টান্নে হন্ত দান করি-
লেন তখন শ্যামাচরণ বলিলেন, “জানেন—রারা রায়মশায়, এ
বাড়ীর মিষ্টি খেলে আর কখনও ভুলতে পারবেন না; চিরদিনই
মুখে সে মিষ্টতা লেগে থাকবে।
রাজা বলিলেন, “সেত উত্তম কথা। এত রকম মিষ্টায়
রয়েছে এখানে, কোটি আগে নেব বলে দিন ত, আমি এ সম্বন্ধে
বড়ই অজ্ঞ।”
শ্যামাচরণ বলিলেন, “আমিত খাচ্ছি সরভাজা। দিদিমা
অনুনয় করিয়া কহিলেন, “সবই একটু করে চেকে দেখ আছা,-
নইলে আমাদের দুঃখ হবে!”
কৃষ্ণলাল বলিলেন, “মালাইভােগটা মা ওঁকে আয়ে দাও।
তােমার এত মিষ্টান্ন কি একসঙ্গে লােকে খেতে পারে। পরে
বরঞ্চ সঙ্গে ওদের কিছু দিও।”
রাজা কহিলেন, “হ্যা, তাহলে বিদায় দক্ষিণাটাও বাকী থাকে
? ইতিমধ্যে হাসি মালাইভােগের
মালাইভােগের বাটিগুলি তিনজনের
১১৪ নং আহিরীটোলা ফ্রীট, কলিকাতা।
মাল বেত
পবাণী
পাতের কাছে ধরিয়া?দিল। শ্যামাচরণ খাইতে খাইতে বলিলেন,
“বড়ই উপাদেয় হয়েছে—তুমি তৈরি করেছ বুঝি মা?”
হাসি একটু হাসিল, দিদিমা তাড়াতাড়ি বলিলেন, “হা,
হাসিই করেছে ওটা।”
এবার দিদিমা সত্য কথাই বলিলেন; এ জিনিষটা সম্পূর্ণ
ভাবেই হাসির হাতের প্রস্তুত। কারণ ইহাতে বন্ধন-কাৰ্য
কিছুই ছিল না, মালাই, ক্ষীর, ছানা, রস প্রভৃতি সংযােগে ইহা
একটা কেমিকেল উপাদান মাত্র। রাজা খাইয়া বলিলেন,
“যিনি এর গুণ নাম দিয়েছিলেন, তিনি নিশ্চয়ই দিব্য দর্শক
ছিলেন।
এইরূপ বিনাড়ম্বর সহজ হাসি-গল্প আদর-আপ্যায়নে অতিথি
এবং আতিথ্যকারী উভয়পক্ষই যথােচিত . আনন্দ
করিলেন। আহারের পর দিদিমা হাসিকে লইয়া বিদায় গ্রহণ
করিতে উদ্যত হইলে শ্যামাচরণ তাহাতে আপত্তি প্রকাশ
করিলেন; কৃষ্ণলাল সেই আপত্তি গ্রাঙ্ক করিয়া মাতাকে টানিয়া
আনিয়া বড় চৌকিখানার উপর বসাইয়া দিলেন। হাসি পাশে
বসিল।
মাচরণ তাহাদিগকে লইয়া বিদেশী পণ্য বয়কট সম্বন্ধে গল্প
ফাদিয়া বসিলেন আর-রাজা কৃষ্ণলালের সঙ্গে পুনরায় দেয়ালের
চিত্ৰলেখ্যগুলি দেখিতে লাগিলেন। বড় দরজার মাথার সূচি-
কাৰ্য-রচিত ওঁ শব্দটি প্রথমেই কৃষ্ণল তাহাকে দেখাইলেন,
রাজার প্রশংসা শুনিতে পাইলে পর তিনি ইহার অর্থ ব্যাখ্যায়
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
১২। গ্রীকুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী। প্রবৃত্ত হইতে পারেন। কিন্তু তাহাকে নিরাশ করিয়া অতিথি আর একখানি ছবি মনােনিবেশ সহকারে দেখিতে দেখিতে কহিলেন, “এই ছবিখানি দেখিতে বড় সুন্দর, কিন্তু ইহার পরিকল্পনা ঠিক বুঝতে পারছি নে।' কৃষ্ণলাল ডাকিলেন, “হাসি, তোমার ছবিখানির অর্থ রায়মশায়কে বুঝিয়ে দাও ত মা।” হাসি নিকটে আসিয়া দাড়াইল, কৃষ্ণলাল ওঁ শব্দের দিকে চাহিয়া রহিলেন। রাজা কহিলেন, “আপনি ত খুব সুন্দর ছবি আঁকেন? ছবিখানি ঠিক স্বপ্ন-দৃশ্যের মত দেখাচ্ছে।” হাসি বিস্ময় প্রকাশ করিয়া কহিল, “ঠিক ত ধরেছেন আপনি। সত্যই ওখানি আমার স্বপ্নচিত্র। আমি স্বপ্ন দেখেছিলুম- যেন ছােট্ট একখানি নৌকা করে সমুদ্রে ভেসে চলেছি। হঠাং সমুদ্রট। আকাশ হয়ে গেল, আর নৌকাখানা আকাশ- পথে উড়ে চলতে লাগলাে। চলেছি ত চলেছি, উড়ন্ত নৌকায় ছুটে ছুটে চলেছি,-আর থামার সাধ্য নেই,- নামার সাধ্য নেই,“আকাশের তারা গুলাে সব আমাকে ঘিরে দাড়িয়েছে ;-আমার মাথা ঘুরে উঠলো, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল,- প্রাণ আকুলি ব্যাকুলি করতে লাগলাে, হঠাৎ একখানা কাল মেঘের ভিতর থেকে কার বাঁশি বেজে উঠলো, আর আমার ঘুমও ভেঙ্গে গেল !” রাজা স্বপ্ন-কথা নিবিষ্টচিত্তে শুনিতে লাগিলেন, হাসির কাহিনী শেষ হইলে, রাজা সহাস্যে কহিলেন, স্বপ্নটি যেমন বিচিত্র, তারা-জগতের মধ্যে স্বপ্ন-দেবীর এই ১১৪নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
নারী সবী প্রণীত
পবাণী
মূর্তিটিও সেইরূপ চমৎকার ! আপনি বুঝি সেই সন্ধ্যায় কিন্নর-হ্রদে
বেড়াচ্ছিলেন? হাসির মনে পড়িল গত পূর্ব-অপৰাহ্নের কথা, সে
সলজে কহিল, “ঠিক মনে পড়ছে না।” রাজা কহিলেন,
“আপনার ছবিখানি দেখে আমার একটি পান মনে পড়ছে।
ছবিটির সঙ্গে গানটির যে বিশেষ মিল আছে তা নয়, কিন্তু
ছবিখানি দেখছি আর সেই গানটি আমার মনে আসছে।
হাসি অনুনয়ের স্বরে কহিল, “আপনি গাবেন সেই গানটি ?”
এমন মধুর দৃষ্টিতে চাহিয়া তাহাকে হাসি এই অনুরােধ
করিল যে, সেই দৃষ্টিতে দৃষ্টিনিবদ্ধ করিয়া সহসা রাজা আত্মহারা
হইয়া পড়িলেন, তাঁহার সর্বাঙ্গে বহুদিনের বিস্মৃত পুলক-শিহরণ
উঠিল। রাজা কোন উত্তর করিবার পূৰ্বেই শ্যামাচরণ কহিলেন,
“রা-রা রায়বাহাদুর বেশ গাইতে পারেন। ছেড়ােনা মা ওঁকে,
ধরে পড়।” আজ সহসা শ্যামাচরণ তােতলা হইয়া পড়িয়াছেন,
রান্তমহাশয়ের নামটা ক্রমাগতই তাঁহার মুখে বাধিয়া যাইতেছে।
শ্যামাচরণ কাজের মানুষ, এই কথা বলিতে বলিতে দেওয়ালের
বড় তানপুরাটা খুলিয়া তার উপর রাখিয়া দিলেন। হাসি
আবার, বলিল, “গান না আপনার মনের গানটি ?” রাজা
কহিলেন, আমারও কিন্তু অনুরোধ আছে, তারপর আপনাকেও
গাইতে হবে !”
এই সময় শ্যামাচরণ ওঁ শব্দের দিক হইতে মুখ
ফিরাইয়া একবার বলিয়া উঠিলেন, “আপনি হাসিকে আপনি
আপনি করন --বড় বেমানান শােনাচ্ছে, তুমিই বলবেন
ওকে।”
কালিন-সাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী এত স্বপ্নবাণী রাজা এ কথার কোন উত্তর না করিয়া তায় আসিয়া বসিয়া তানপুরাটা হাতে তুলিয়া লইলেন। কিছুক্ষণ তাহার কাণ টেপাটুপি করিয়া সুর মিলাইয়া গান ধরিলেন- কে আমারে বারেবারে করুণ সুরে ডাকে সূদূরে ? ভবনবাসী মন আমার ভুবন পানে উড়ে। চিনেছিগাে বাঁশিটি কার, সুরে শুনি হাসিটি তার, পারে যেতে বারেক শুধু দেখেছি বঁধুরে, সেই বিদেশী বঁধুরে ; সে ধে স্মৃতি খেয়া বেয়ে চলে স্বপ্ন-নদীর পুরে! ওগাে কেমন করে মিলবে তারে হায় ? যেমন করে সন্ধ্যা-তারা, পূব-গগনে দিশাহারা, ভোরের বেলা অরুণ-ধারায় মিলাইয়া যায়, তেমনি করেই মিলবে, তাহার লুটবে পায়ে ঘুরে। সে যে স্মৃতির খেয়া বেয়ে চলে স্বপ্ন নদীর পুরে। মিলবে তারে কবে ওগাে কখন ? ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
বর্ণকুমারী দেবী প্রণত স্বপ্নবাণী তখন ওগাে তখন- ফাগুন হাওয়া আগুন হয়ে, কাল-বশেখের দোলা বয়ে চলবে যখন ঝড়ের আগে আগে, ঘন ঘটা অাধার মেঘে ইন্দ্রধনু চুপে চুপে, প্রকাশ হয়ে মােহন রূপে লুকিয়ে পড়বে যখন পুনঃ নিবিড় অনুরাগে, তখন ওগাে তখ,- রুদ্রতলে বন্ধু তােমার নাচবে মধুরে বেজে উঠবে তুমি তাহার চরণ পূরে; সে যে স্মৃতির খেয়া বেয়ে চলে স্বপ্ন-নদীর পারে । রাজা তালমান দিয়া চক্ষু বুজিয়া গানটি গাহিতে লাগিলেন, হাসি তন্ময় হইয়া শুনিতে লাগিল। রাজা যখন থামিয়া পড়িলেন তখনও সেই গীততান তাহার কর্ণে বাজিতেছিল ! A - . কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
১২৫
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
ঘরবাণী
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
গৃহের কুহকবদ্ধ নীরবতা ভঙ্গ করিয়া শ্যামাচরণ প্রথমে
কহিলেন, “এইবার তােমার পালা মা, অতিথি-সম্বর্ধনা কর।”
হাসি একেবারেই বাঁকিয়া বলিল, এত ভাল গানের পর আর কি
সে গায়িতে পারে ! সে বলিয়া উঠিল, “আমি আজ মােটেই
গাইতে পারব না। রাত্রে ঠাণ্ডা লেগে গলাটা একেবারেই ধরে
গেছে।”
কিন্তু দিদিমা, কৃষ্ণলাল, শ্যামাচরণ ইহাদের সকলেরই ইচ্ছা
হাসি গান গায় ; গান শিখিয়া হাসি যদি গান শুনাইবার এমন
অবসর ছাড়িবে তবে শিখিয়াই বা লাভ কি!
পিতা বলিয়া উঠিলেন, 'গাও হাসি, বলছেন উনি গাও।”
হাসি দিদিমার পাশে আসিয়া বসিয়াছিল, তিনি অলক্ষ্যে, তাহাকে
বেশ একটু টিপনি দিয়া মৃদু স্বরে কহিলেন, “গাইতে আরম্ভ
করলেই গলা খুলবে, দেমাক রাখ।” কিন্তু তথাপি হাসি চুপ
করিয়া রহিল, তাঁহাদের আজ্ঞা পালনের কোন লক্ষণই একাশ
পাইল না। তখন অতিথি অনুনয় কণ্ঠে কহিলেন,-
“আপনি না গাইলে কিন্তু বড় দুঃখিত হব।” হাসি মত মুখ
উন্নত করিয়া তাহার দিকে চাহিল। রাজা আবার বলিলেন,
“নিশ্চয়ই আপনাকে গাইতে হবে, এত অনুবােধ অগ্রাহ করবেন
আপনি?” এই দৃঢ়তাপূর্ণ অনুনয়-বাক্য রাজাদেশের ন্যায় তাহার
১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
১২৬ কুমারী দেবী প্রণীত ঘবাণী •• কর্ণে ধ্বনিত হই। রাজা তক্তা হইতে উঠিয়া বলিলেন, “আপনি এই আসন গ্রহণ করুন।” হাসি বলিল, “ও তানপুরাটা ত আমার নয়, ওস্তাদের। ছােট তানপুরাতেই আমি গাই।” রাজা নিজেই তখন দেয়াল হইতে ছােট নপূরাটি খুলিয়া তার এক ধারে রাখিলেন। হাসি বিনাবাক্যব্যয়ে ধীরে ধীরে তার উপর আসিয়া বসিল, বসিয়া অনবরত তানপুরাটার কাণ টিপিতে লাগিল। কিছুতেই যে আজ তাহা সুরে মিলিতে চায় ! রাজা হাসিয়া নিজেই তপন তানপুরাটার সুর বাঁধিয়া দিলেন। হাসির হস্তে কিন্তু তবুও তাহার সুর খুলিল না ; ম্যাও ম্যাও করিরা সেটা কাদিতে লাগিল। এ কি জালা ! কোনও গান ত মনে আসিতেছে না আজ। দিদিমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “বল না দিদিমা- কোনটি গাৰ ,' দিদি তাহার ধরণ ধারণ দেখিয়া মনে মনে জ্বলিতেছিন, কিন্তু সংযত ভাবেই কহিলেন, “সেই আগমনীটা গাও ?" “কোন্ আগমনীটা? মনে পড়ছে না ত?” শ্যামাচরণ হাসিয়া বলিলেন, “তবে অাগমনী থাক, একটা বিসর্জনী গাও।” কোনও বিসর্জনী গীতও আজ তাহার মনে পড়িল না। কুষ্ণ- লাল বলিলেন, “একটী ব্রহ্মসঙ্গীত গাও তবে। প্রথম নাম ওঙ্কার’ গানটি জানত? হাসি ঘাড় নাড়িয়া জানাইয়া দিল যে ‘জানি না। রাজা বলিলেন, “আপনি কি কোন জাতীয় সঙ্গীত জানেন?” কমলিনীলাহিত্য-মন্দির,
এশারীকাৰী প্ৰণীত
স্বপ্নবাণী
;
হাসি ইহার উত্তর না দিয়া হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “আচ্ছ। গাচ্ছি,
আমার মনে পড়েছে একটা গান।”
বলিয়া গায়িতে আরম্ভ করিল,--
আশার বীণা মাের হাতে
মধুর অতি সাজিছে!
আমার বাণী তােমার
গানে মধুর কিবা বাজিছে-
দুই ছত্র গাইয়াই হাসি গান বন্ধ করিল; কথাও আর মনে
পড়িল না, সুরটাও একেবারেই ভুলিয়া গেল, বিরস লজ্জিত ভাবে
সে তানপুরা হইতে হাতটা সরাইয়া লইল। রাজা কৃপাপরবশ
হইয়া বলিলেন, “থাক; তবে আজ দেখছি দেবী সরস্বতী
আমাদের প্রতি বিমুখ। বলিয়া রাজা গিলাকুঞ্চিত শুভ্র
পিরাণের ক্ষুদ্র পকেট হইতে তাহার ঘড়ি বাহির করিয়া দেখিয়া
বলিয়া উঠিলেন, “একি দশটা বেজে গেছে। আমাকে ত আজ
রাত ১১টার ট্রেণ ধরতে হবে। আর আপনারাও নিশ্চয়ই এখনাে
খাননি; সে কথা ভুলে গিয়ে আত্মসুখেই বিহ্বল হয়ে আছি।”
রাজা দিদিমার দিকে চাহিয়া এই কথা বলিলেন।দিদিমা
শশব্যস্তে বলিয়া উঠিলেন, “সে কি কথা, বােসে বােসসা, আমরা
দেরীতেই খাই।" রাজা দাঁড়াইয়া কহিলেন, “মাপ করবেন,
উনি শ্যামাচরণ বাবু, বড় দেরী হয়ে গেছে।”
তখন সকলেই উঠিয়া দাড়াইলেন। হঠাৎ পাশের টেবিলের
দিকে দিদিমার দৃষ্টি পড়িল, এতক্ষণ ফুলের মালার কথাটা
;
১১৪ নং হিরীটোলা টি, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
একেবারেই তাঁহারা ভুলিয়া গিয়াছিলেন। শ্যামাচরণের দিকে
চাহিয়া বলিলেন, “আজকের দিনে যে বরের শ্বশুরকে মালা
পরাতে হয়-দে না হাসি মালা পরিয়ে !”
হাসি এক গাছি গড়ে মালা উঠাইয়া শ্যামাচরণের দিকে
অগ্রসর হইবামাত্র তিনি এক পা দূরে সরিয়া গিয়া কহিলেন,
“মােটে ত
তােমার পুজি দেখছি ঐ এক গাছি মালা,
আমি ত ঘরের লােক, অতিথিকে ত সর্বাগ্রে সম্মানিত করা
উচিত, ওঁকেই দাও মালাগাছি।”
হাসি কিংকর্তব্য ভাবে মালা হস্তে তাহার দিকে দৃষ্টিপাত
করিল। রাজা নিঃসঙ্কোচে বেশ সহজ ভাবেই স্বয়ং অগ্রসর
হইয়া আসিয়া কঠ বাড়াইয়া দিয়া কহিলেন, “তােমার হাতে
ভাতৃবরণ মাল্য সাদরে গ্রহণ করি। পরিবর্তে কি আর দিব,
আর কিছুই ত সঙ্গে নাই-এই আংটিটি আমার স্নেহাশীৰ্বাদ
রূপে গ্রহণ কর।”
রাজা আংটি খুলিয়া তাহাকে পরাইয়া দিলেন। শ্যামাচরণ
তাহা দেখিয়া মুখ টিপিয়া হাসিলেন। বাজাকে এখানে আনিবার
উদ্দেশ্য তাহার নিষ্ফল হয় নাই। কৃষ্ণলাল সহসা ওঁ শব্দ
ছাড়িয়া এদিকে দৃষ্টিপাত করিলেন, বরকন্যার ন্যায় উভয়কে
মাল্যাঙ্গুরি-বিনিময় করিতে দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন,
এ ঘটনা তাঁহার মনঃপুত হইল কি না বুঝা গেল না।
দিদিমাও হাসিবেন বা কাদিবেন, বুঝিতে না পারিয়া নীরব হইয়া
রহিলেন। দ্বারান্তরালে দাড়াইয়া গৃহিণীই কেবল আনন্দচিত্তে
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
প্নবাণী
ভগবানকে স্মরণ করিলেন। মাতার ন্যায় দিব্যদর্শক সংসারে
কে আছে!
রাজা যখন বিদায় গ্রহণ করিয়া চলিয়া গেলেন, দালান শূন্য
হইয়া পড়িল, তখন দিদিমার মুখ ফুটিল। তিনি হাসিয়া
বলিলেন,-
“অজানা অচেনা কার গলায় মালা দিলি লল। রূপসি নাতনি!
তাের রাজা এল নাকি?”
আজ আর হাসির হাসি-ঠাট্টা ভাল লাগিল না—গম্ভীর মুখে
বলিল, “দিদিমার সব তাতে ঠাট্টা!”
এই সময় গৃহিণী দালানে আসিয়া দাঁড়াইলেন, আর শচীনও
বায়স্কোপ রঙ্গালয়ের রঙ্গ দর্শনান্তে এখানে আসিয়া হাজির হইল।
দিদিমা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তাের সঙ্গে ওদের দেখা
হােল ?”
‘হ। দেখলুম, তারা গাড়ীতে উঠছেন।
“কে উনি জানিস ?”
শচীন বুঝিল, কাহার সম্বন্ধে এ প্রশ্ন, আশ্চর্য হইয়া বলিল ;
জাননা নাকি? রাজা যে?”
শচীন প্রসাদপুরে গিয়াছিল তাহা পাঠক জানেন। দিদিমা
সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিলেন, “রাজা! কোথাকার রাজা রে ?”
উত্তর হইল, “প্রসাদপুরের।”
•
১১৪ নৎ আহিরীটোলাট, কলিকাতা।
এশীকুমারী দেবী প্রণীত
বাণী .
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
রাজা অতুলেশ্বর কলকাতায় গিয়া ভাগ্যবলে সুখ ও সমৃদ্ধি
এই দ্বিবিধ প্রসাদই লাভ করিলেন।
অনেকদিন হইতে তিনি লোকালয় সংস্পর্শরহিত ভাবে
প্রসাদপুরের নির্জন নীড়ে বাস করিতেছিলেন। দেশের
রাজনৈতিক বিপ্লব-বারতা সংবাদপত্র হইতে তিনি পাইয়া
থাকেন; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সমাজবায়ুও যে কিরূপ ঘূর্ণিত-বেগে
আললাড়িত হইয়া উঠিয়াছে, দূর হইতে এতদিন তাহার সুস্পষ্ট
স্পর্শ লাভ করেন নাই। হাসিকে দেখিয়া বুঝিলেন যে, তিনি
একা নহেন, দেশের ঘরেঘরেই সম্ভবত নারী গঠনের একটা
প্রয়াস চলিতেছে। তঁাহার জীবনব্যাপী উদ্দেশ্যের সফলতা
যেন হাসিতে তিনি প্রত্যক্ষ করিলেন। কলিকাতা প্রবাসের
এই ক্ষণস্থায়ী ক্ষুদ্র দিনগুলা সুখ স্মৃতিতে তাহার মনে স্থায়ীত্ব
লাভ করিল।
কিন্তু জ্যোতির্ময়ীর ভাগ্যলিপিতে বিধাতাপুরুষ অন্যরূপ
লিখিয়াছিলেন। এ সময়টা রীতিমত কষ্টের ভাবেই তাহার
কাটিল।
ট্রেনে ডিক্রুজ সাহেবের কুকড়িতে শরৎকুমারের হাতে যে
আঘাত লাগিয়াছিল ;-তাহার ক্ষত শুকাইবার পরও মাঝে
মাঝে সেই স্থানে তিনি বেদনা অনুভব করিতেন।
কমলিনীসাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রতি স্বপ্নবাণী সম্প্রতি রাখিবন্ধনদিনে হাসপাতালে অস্ত্রচিকিৎসা করিবার সময় দৈবক্রমে ছুরির সামান্য স্পর্শ লাগিব মাত্র উক্তস্থান ঈষৎ উন্মুক্ত হইয়া পড়িল। । কিন্তু রাজকুমারী তাহার অপেক্ষায় থাকিবেন বলিয়াছেন, যথারীতি ঔষধাদি গাইতে গেলে বিলম্ব হইয়া পড়িবে, তিনি হাসপাতালের কাৰ্য্যশেখে তাড়াতাড়ি সামান্য জলপটিতে মাত্র ক্ষত বাঁধিয়া লইয়া চলিয়া গেলেন । বাগানে আসিয়া দেখিলেন যে কেহই সেখানে নাই। রাজকুমারী গৃহে যাইবার সময় যে গ্রহটির দিকে ফিরিয়া ফিরিয়া দৃষ্টিপাত করিয়াছিলেন, শরৎকুমার না আনিয়াও তাহারি দিকে চাহিয়া একটা চাপা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন, সঙ্গে সঙ্গে আত্ম-তিরস্কারের ক্ষীণ হাস্যরেখা তাহার ওষ্ঠাধরে ফুটিয়া উঠিল ;-“এত রাত্রি পর্যন্ত রাজকুমারী এখানে থাকিবেন, এমন ভুল করিলেন তিনি কি করিয়া ?” সেই রাত্রেই তাঁহার সামান্য একটু জ্বর ভাব হইল কিন্তু পরদিন সকালে ক্ষতস্থানে যথাবিধি ঔষধাদি লেপনের পর শরীর এতদূর সচ্ছল বােধ করিলেন যে, সন্ধ্যাকালে রাজা বাহাদুরকে ট্রেনে পৰ্যন্ত, উঠাইয়া দিয়া আসিলেন। বাড়ী ফিরিয়া কিন্তু অবসন্ন হইয়া পড়িলেন। রাত্রিকালে এরও বেশ প্রবল হইয়া উঠিল। তখন নিজের চিকিৎসা আর নিজের হাতে রাখা যুক্তিযুক্ত জ্ঞান না করিয়া অন্য ডাক্তারের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। সৌভাগ্যক্রমে বাজার একজন প্রবীন আক্তার আত্মীয় এই সময় বায়ু পরিবর্তন- ১১৪নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
কুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী উপলক্ষে প্রসাদপুরে আসিয়া প্রাসাদেই বাস করিতে ছিলেন। তিনি দেখিয়া শুনিয়া শরৎকুমারের সহিত একমত হইলেন। বিষাক্ত কুকড়ির আঘাত হইতেই যে ক্ষতের উৎপত্তি তিনিও এইরূপ অনুমান করিয়া আশ্বাস প্রদানে কহিলেন, ক্ষতের লক্ষণে বুঝা যায় উহা সাংঘাতিক বিষ নহে। সম্ভবতঃ পণ্ডবধের পর কুকড়িখানা ভালরূপ পরিষ্কৃত হয় নাই—প্রধানতঃ এই কারণে, তাহা ছাড়া বােগী সুস্থ সবল বলিয়াও এই বিষের কাৰ্য্যফল প্রকাশে বিলম্ব হইয়া পড়িয়াছে। যাহাহউক ভয়ের কোন কারণ নাই। সামান্য অস্ত্র চিকিৎসা দ্বারাই রােগী সম্ভবতঃ আরােগ্য লাভ করিবেন। অস্ত্রোপচার হইবার পর শরতের অবস্থা প্রথম দিন খুব খারাপ ছিল ; দ্বিতীয় দিন অপেক্ষাকৃত ভাল, কিন্তু এখনাে আশানুরূপ ভাল নয়। সেবার ত্রুটি নাই,-অনাদির সহিত আরও দুই একটি বালক তাহার শুশ্রুষায় নিযুক্ত। কিন্তু অনাদি যেরূপ প্রাণপণে সেবা করিতেছে, মাতা ভগিনী স্ত্রী তদপেক্ষা অধিক যত্নে সেবা করিতে পারে না। দ্বিতীয় রাত্রি ও কোনরূপে কাটিয়া গেল। তৃতীয় সন্ধ্যায় ডাক্তার প্রফুল্ল মুখে ভরসা দিয়া গেলেন। জ্যোতির্ময়ী অন্যদিনের ন্যায় সেদিননা সেই সময়ে ধীরে ধীরে বারাণ্ডার আসিয়া দাড়াইলেন। গৃহে তখন অনাদি ছাড়া আর কেহ ছিল না । সে নিকটে আসিয়া বলিল, “আসবে দিদিমণি ঘরে ? কেউ নেই এখন,এস।” বালিকা বলিল, “একটু ভাল দেখছ, অনাদি ?” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
বােগীর মুখ
“নিশ্চয়। আজ আর তেমন ছটফট করছে না, তেমন
অচেতন-ভাবও নেই, সহজভাবে যেন ঘুমচ্ছেন।-এস না রাণি-
দিদি ঘরে - আজ দেখে খুসী হবে।”
জ্যোতির্ময়ী শিয়রে আসিয়া দাড়াইলেন।
প্রশান্ত, তিনি যেন কি স্বপ্ন দেখিতেছিলেন,-তাঘােরে বলি-
লেন, “হাসি তুমি? আর ঐ তারাটি, ঐ উজ্জ্বল,—তােমার চেয়েও
উজ্জল বড় তারাটিকে ও? চেন না, হাসি ? জ্যোতির্ময়ী উনি
রাজকুমারী।" জ্যোতির্ময়ীর অশ্রুজল সম্বরণ দুঃসাধ্য হইয়া উঠিল।
তিনি আত্মবিস্মৃত হইয়া রােগীর কপালে স্নেহহ বুলাইলেন।
সে স্পর্শে শরৎ চক্ষু উন্মীলিত করিলেন, রাজকুমারীর দিকে দৃষ্টি-
পাত করিয়া মৃদু দুর্বল কিন্তু স্বাভাবিক স্বরে কহিলেন, “তুমি
রাজকুমারি ?” রাজকুমারি আহলাদগগদ-কণ্ঠে কহিলেন,
“চিনিয়াছেন ?” একটু বিস্ময় প্রকাশ করিয়া শরং কহিলেন,
“চিনব না কেন? আমার কি হয়েছে?”
তিনি শয্যায় উঠিয়া বসিবার চেষ্টা করায় রাজকুমারী তাঁহাকে,
নিবৃত্ত করিয়া কহিলেন, “কিছু হয় নাই, কিন্তু উঠবেন না,
আপনি ঘুমােন, আমি যাই।”
‘যাবেন না রাজকুমারী, বসুন আপনি।” তাহার রুগ্ন
কণ্ঠ একান্ত অনুরােধপুর্ণ।
অনাটিনিকটে একখানা চৌকি আনিয়া দিল, জ্যোতির্ময়ী
বসিলেন। শরৎ বলিলেন, “রাজকুমারি ?”... বলিয়া চক্ষু মুদ্রিত
করিয়া নিস্তব্ধ হৰা বহিলেন। জ্যোতির্ময়ী ভীতস্বরে কহিলেন,
* :
'।
১১৪ মা আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
; এমারী দেবী প্রণীত, বাণী “ভাক্তার-দা?” শরৎ আবার কথা কহিলেন, বলিলেন, “রাজ- কুমারি-বড় দুর্বল, বড় একলা মনে হচ্ছে, আপনার হাতখানি দিন।” রাজকুমারী তাহার হাতখানি ধরিলেন, অশ্রুতে সে হাত সিক্ত হইয়া উঠিল; অনাদিও বালকের ন্যায় মুখ ঢাকিয়া কাঁদিতে লাগিল। জ্যোতির্ময়ীর হাতখানি হাতের মধ্যে ধরিয়া রােগী আবার ঘুমাইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ কিছুক্ষণ পরে হাতখানি আস্তে আস্তে টানিয়া লইয়া জ্যোতির্ময়ী ধীরপদে গৃহত্যাগ করিলেন। পরদিন শরৎকুমারের জর ত্যাগ হইল ;-বিপদ-মেঘ কাটিয়া গেল। রাজা আসিয়া দেখিলেন, শরৎকুমার সারিয়া উঠিতেছেন। তিনি খবর দিলেন যে, প্রসাদপুরে কনফারেন্স বসিতে প্রায় মাস খানেক বিলম্ব হইয়া পড়িল। তৎপুর্বে বাঙ্গলার প্রধান প্রধান পলিটি-কাল নেতাগণ সকলে এখানে সম্মিলিত হইতে পারিবেন । শুনিয়া জ্যোতির্ময়ী খুসীই হইলেন, তাহার মনে হইল ততদিন শরৎকুমার বেশ সবল হইয়া উঠিতে পারিবেন। কমলনী-সাহি পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। জ্যোতির্ময়ী এইবার আপনার দিকে দৃষ্টিপাত করিবার পাইলেন।-কি দুশ্চিন্তা, কি ঔৎসুক্যের মধ্যে সপ্তাহ কাল কাটিয়া গিয়াছে! এমন কি, ব্যায়ামসমিতি কনফারেন্স কিছুই এ কয়দিন তাঁহার মনে পড়ে নাই। এ কিরূপ তন্ময়তা! কই পিতার অসুখের সময় ত জ্যোতির্ময়ী এত কাতর হইয়া পড়েন নাই। তাহার লজ্জাসঙ্কুচিত মন উত্তর স্বরূপ কহিল, “কোন কারণ ছিল ত তাহার, পিতার ত জীবনসংশয় হয় নাই।তবুও ইহার অর্থ,-তবুও একজন আত্মীয়, পরের জন্য এত কেন ভাবনা! প্রতিদিন ৩ বােগে তাপে পৃথিবীর কত লােক মৃত্যু গ্রাসে পড়িতেছে ; কে কার জন্য এত ভাবে? এস্থলে মৃত্যুর কথাটা মনে আসিবামাত্র বালিকার মনের মধ্যে একটা কষ্টের শিহরণ উঠিল ! তখন দ্বিপ্রহর অতীত হইয়া গিয়াছে। আহারাদিঃ পর সােফায় শুইয়া জ্যোতির্ময়ী বিশ্রাম করিতেছিলেন। পাশেই হাতের কাছে একটি টেবিলে, ফুলভরা ফুলদানী একটির চারি- দিকে নানারকম কাগজ পত্র, বহি সাজান। জ্যোতির্ময়ী তাহার মধ্য হইতে একখানি থিয়সফিঃ পত্ৰ টানিয়া লইয়া পড়িতে আরম্ভ করিলেন। একটা প্রবন্ধ আগাগোড়া শেষ করিয়া তখন তাঁহার হস হইল,-এক অক্ষরও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে নাই। পাঠিকা, ১৮ নং আহিরীটেল ফ্লট; কলকাত'।
বর্ণকুমারী দেবী এত স্বপ্নবাণী মূল অক্ষি বহির পাতায় নিবদ্ধ ছিল বটে—কিন্তু সূক্ষ্ম অখি ঘুরিতেছিল অন্য ঘরে। আজ ইচ্ছা করিয়াই প্রাতঃকালে শরৎ- কুমারকে রাজকুমারী দেখিতে যান নাই, -ভাল আছেন ত তিনি। তিনি কি জ্যোতির্ময়ীর প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, তাহাকে দেখিতে চাহিতেছিলেন ? এ কিরূপ প্রশ্ন? রাজকুমারী তাহাকে দেখিবার জন্য ব্যাকুল বলিয়া তিনিও কি ব্যাকুল থাকিবেন? এ কি পিপাসা! এখন ত তিনি আরাম হইয়া উঠিয়াছেন - এখনো তাহার চিন্তাতেই জ্যোতির্ময়ী মগ্ন কেন? তাঁহার সান্নিধ্য লাভের জন্য কেন তিনি এত তৃষাতুর ? এ কি সর্বগ্রাসী ভাব? ইহাই কি প্রেম ? ক্ষতি কি? প্রেমদেবতাকে মনে মনে পূজা করিতে ক্ষতি কি? কিন্তু ইহার পরিণাম ? এই আকাক্ষা—এই চিন্তা, এই পূজার পরিণাম ? লােকে বলে বিবাহ। জ্যোতির্ময়ী হাতের বই- খানা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন।-“না তাহা হইতে পারে না পারে না,-আমি জ্যোতির্ময়ী—চিরকুমারী ব্রত গ্রহণ করিয়াছি— দেশের জন্য জীবনদান করিয়াছি-আমি ব্যক্তি বিশেষের পরিণীতা পত্নী!—অসম্ভব, -- অসম্ভব !” একবার তিনি অতি চুপে চুপে স্বগত উচ্চারণ করিলেন, “মিসেস চৌধুরী” “তাহার চিন্তা-মলিন মুখে সহসা কৌতুক হাসি ফুটিয়া উঠল। ঘরের বারান্দায় খাঁচায় রক্ষিত পােষ কোকিলটি এই সময় কুহু কুহু করিয়া উঠিল, বাহিরের আম-বাগানে দুই চারিট। কোকিল এক সঙ্গে ইহার উত্তর গাহিল ; সহসা-কুহু কুহুতানে আকাশ ভরিয়া গেল।--জ্যোতির্ময়ী মনে কমলিনা-সাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
বাণী
মনে বলিলেন,-“বনের পাখী তােমরা খাঁচার পাখীকে ধরা দিতে
চাও ত দাও, আমি কিন্তু ধরা দিব না। তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন
আজ সন্ধ্যাতেও শরৎকুমারকে দেখিতে যাইবেন না। ভাবিতে
ভাবিতে অন্যমনস্কভাবে জ্যোতির্ময়ী ফুলদানীর একটি ফুল
তুলিয়া লইয়া আঘ্রাণ করিলেন। ঠিক দুইটার সময় কুন্দ গৃহে
আসিয়া হাজির হইল। আজই সকালে সে বাড়ী হইতে
ফিরিয়াছে। হাসির চিঠিখানা, রাজকুমারীর হাতে দিয়া কহিল,
“এই লও রাজকুমারী। চিঠিখানি তােমার হাতে ধরে
দিতে আমি প্রতিশ্রুত আছি। আজ দায়মুক্ত হলুম।”
জ্যোতির্ময়ী চিঠিখানা গ্রহণ করিলেন, কুন্দ থিয়ফিষ্টােনা
কুড়াইয়া যথাস্থানে রাখিয়া, আলমারি খুলিয়া রাজকন্যার বৈকা-
লিক সাজসজ্জার আয়াজনে রত হইল। আজ তাহাদের ম্যাজি-
স্ট্রেটের বাড়ী চা-পানের নিমন্ত্রণ।
হাস্থির চিঠিখানা পড়িয়া জ্যোতির্ময়ী বলিলেন,
“গুণা দেবী -কে কুল দিদি? আমাকে তিনি এত প্রশংসা
করে লিখেছেন - লজ্জা করে যে।”
কুন্দ বলিল, “ও আমাদের হাসি । সকলে ওকে হাসি
বলেই ডাকে। এমন সুন্দর মেয়েটি, কি বলব! তাকে যদি
দেখ রাজকুমারী ত তুমিও ভাল বাসবে।”
শরৎকুমার প্রলাপের ঘােরেধে হাসির নাম উচ্চারণ করিতেন
সেই হাসি নয় ত এ? একটা কিরূপ অসুখ চাঞ্চল্য রাজকন্যার
মন দিয়া বহিয়া গেল।—ইহা কি ঈর্ষার আন্দোলন ?
=
১১৪ নং আহিরীটেলা ইট, কলিকাতা।
১৩৮
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
অপবাণী
জ্যোতির্ময়ী বলিলেন, “বিয়ে হয়নি বােধ হয় তার ?”
“না। কোন বরকেই যে তার বাপমার মনে ধরে না। যা
হক, এবার শুনেছি একটি মনের মত পেয়েছেন, সম্বন্ধ চলছে
তার সঙ্গে।”
“কে সে ভাগ্যবান ?” জ্যোতির্ময়ীর বক্ষে শােণিতপ্রবাহ
সহসা বন্ধ হইয়া গেল,–এই প্রশ্নের উত্তরে শরৎকুমারের নাম
শুনিবার জন্য তিনি অপেক্ষা করিয়া রহিলেন। কুন্দ বলিল,
“তিনি আপনাদেরই আত্মীয়, বিজনকুমার রায়।”
বালিকার রুদ্ধনিশ্বাস ধীরে ধীরে মুক্তি লাভ করিল,-সে
হাসিয়া কহিল, “তা বেশ, হ'লে মন্দ হয় না। আমি বরণ করে
কনেকে ঘরে তুলে নেব। তােমাদের হাসি, ডাক্তারদা’র কে
হন কুলদিদি?”
‘জানিনে ঠিক, একটা দূর সম্পর্ক থাকতে পারে। কই তার
কথা ত হাসির কাছে কখনাে শুনিনি। তবে আমার সঙ্গে
হাসির দেখা শুনা খুব কমই হয়, বেশী কথা ক'বার অবসরই
ঘটে না।
“সম্বরে কথা কার কাছে শুনলে ?
কে আনে কেন জ্যোতির্ময়ীর মন বলিতেছিল-খবরটা
ঠিক নয়।
কুন্দ কয়েকখানা কাপড় ও জ্যাকেটের সুট মিলাইতে মিলাইতে
বলি-
“ওকথা অবশ্য হাসির কাছে শুনিনি। বিদায় নিতে যাবার
কমলিনী-সাহিত্য-মণি,
শীর্ণকুমারী দেবী প্রণীত বাণী সময় দিদিমা বলেছিলেন। বিকালের জন্য কোন্ কাপড়খানা রাখব রাজকুমারি ?” “দেখ কুলদিদি, কতবার তােমাকে বলেছি, ওকথা আমাকে জিজ্ঞাসা কোরাে না, তােমার যেখানা ইচ্ছে, “না না বলতে হবে, কোন্খানা রাখব।” “আচ্ছা, শাদা রঙের যা হয় একখানা রাখ।*. “রাজাবাহাদুর কিন্তু রঙিন্ কাপড়ই পছন্দ করেন।” “তবে তাই রাখ।” “ফিকে নীল বা গােলাপী কি দেব ?” “তােমার সঙ্গে আর পারা যায় না—আচ্ছা, নীলই রাখ। চিঠিখানা পড়েছ কুলদিদি ?” “না। মতির মালা আর “সে হবে এখন ; চিঠিখানা আগে পড় না ! কলকাতায় গিয়ে সর্বাগ্রে এবার তােমার হাসির সঙ্গেই দেখা করব।” “তখন সে তােমারও হাসি হয়ে যাবে।” “মতির মালা ও ব্রেসলেট জোড়াই তাহলে বার করে রাখছি। অন্য কিছু ত তুমি পরতে ভাল বাস না।” একথার কোন উত্তর না দিয়া জ্যোতির্ময়ী হাসির চিঠিখানা বাড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, “এই নেও।” কুল নিকটে আসিয়া পত্ৰখানা লইয়া তাহাতে নেত্রপাত করিল। জ্যোতির্ময়ী বলিলেন, “চেচিয়ে পড়না কুন্দদিদি।” কুল পড়িতে লাগিল- ১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
১৪০
কুমারী দেবী প্রণীত
বাণী
সম্মানীয়া রাজকুমারি—
আপনার সহিত আমার চাক্ষুষ আলাপ নাই, কিন্তু
আপনার গুণের কথা এত শুনিতে পাই যে না দেখিয়াও
আপনাকে ভাল বাসিয়াছি। আপনাকে বড় দেখিতে
ইচ্ছা করে। যখন কলিকাতায় আসিবেন, একবার
দেখা, দেন ত পরমানন্দ লাভ করিব। সত্য কথা বলি-
তেছি, বিশ্বাস করিবেন।
ইচ্ছা করে, আপনার নিকট আমিও দেশব্রতম
গ্রহণ করি, আমার শক্তি অতি সামান্য কিন্তু আপনার
মত গুরুর উপদেশে সেই ক্ষুদ্র শক্তিও সার্থক হইয়া
উঠিতে পারে।
আপনি বয়সে ছােট হইয়াও জ্ঞান বুদ্ধিতে আমার
অনেক বড়, তাই পরিপূর্ণ প্রতিভক্তি ভরে আপনাকে
নমস্কার করিতেছি, আমাকে ছােট বােন বলিয়াই মনে
করিবেন।
আপনার গুণমুগ্ধা ভগিনী
ঐ সুগুণা দেবী
শর-দা যদি এখনাে সেখানে থাকেন ত আমার
নমস্কার দিবেন।
চিঠিখানি পড়া হইলে কুন্দ তাহা রাজকন্যাকে ফিরাইয়া
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
১ঃ
শীর্ণকুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী
দিয়া কহিল, “সুন্দর লিখেছে; চিঠিখানি পড়ে যেন ঠিক
চোখের উপর তাকে দেখতে পাচ্ছি।”
“ভাষার ঘনঘটা নেই এইটে আমার বড় ভাল লেগেছে।”
“কেবল তাই কি? চিঠিখানি আগাগােড়া আন্তরিক
শ্রদ্ধার ভাবে পূর্ণ, সেইটেই আমার বেশী ভাল লাগছে।”
“এই শ্রদ্ধা দিয়ে—তিনিই আমার শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছেন।”
“যেমন গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজো সেই রকম আর কি!”
“উপমাটা এখানে ঠিক সঙ্গত হলাে না কুন্দদিদি, পণ্ডিত
মহাশয় শুনলে নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করতেন।”
এই সময় একজন দাসী পণ্ডিত মহাশয় আইছেন গাে?”
বলিয়া চীৎকার করিতে করিতে গৃহপ্রবেশ করিল। বাঙ্গালী
ঘরে রাজা সম্রাটের আলয়েও দাসী চাকরের আদব কায়দার বড়
একটা আড়ম্বর দেখা যায় না।
পণ্ডিত মহাশয়ের নাম শুনিয়া কুন্দ বলিয়া উঠিল, “নাম
করতেই হাজির তিনি, লােকটার আয়ু দেখছি অনেক।
জ্যোতির্ময়ী দাসীকে বলিল, “আচ্ছা লক্ষ্মীর মা, তােমাকে
কতবার বলেছি অত চেঁচিয়ে কথা কবে না, - কিছুতে কি শিক্ষা
হবে না তােমার ?”
লক্ষ্মীর মা শিরে করাঘাত করিয়া কহিল, “হায়রে কপাল !
তােমারে ঘরে আইনা শিখাইলাম আমি, আর আমারে শিখাইতে
চাও এখন তুমি—সেদিনকার খুকী, পলতে দিয়ে যারে কত
দুধ খাওয়াইয়াছি! ঘাের কলিকালই হইছে বটে।”
১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
১ মামী নবী এত বাণী “বেশ বেশ আরবকতে হবে না, তােমার ও নাকি গান আমার ভাল লাগে না। যাও, পণ্ডিতমহাশয়কে বল গিয়ে, আমরা আসছি এখনি।” লক্ষ্মীর মা তবুও বিড় বিড় করিয়া বকিতে বকিতে সােণার তাগা পরা হাত দুলাইয়া চলিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে সােণার কষ্ট- মালা ও কোমরের রূপার চাবি-শিকলিও দুলিয়া উঠিল। জ্যোতির্ময়ী পণ্ডিত মহাশয়ের নিকটে যাইবার অভিপ্রায়ে কুন্দর সহিত বারান্দায় আসিয়া দাড়াইয়াছেন, এই সময় অনাদির আবির্ভাব হইল। তাহাকে দেখিয়া রাজকন্যার বুকটা কাপিয়া উঠিল, প্রথমেই মনে হইল,ভাল আছেন ত তিনি? কিন্তু কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিবার পূর্বেই অনাদি কহিল, “একটা কথা আছে দিদিমণি।” রাজকন্যা কুম্বকে বলিলেন, “বাও কুলদিদি, তুমি পণ্ডিত মহাশয়ের কাছে বসে একটু গল্প কর গে, আমি এখনি আসছি।” কুন্দ চলিয়া গেলে জ্যোতির্ময়ী কণ্ঠাগত ভাষা রসনামুক্ত করিয়া দিয়া কহিলেন, “ডাক্তারদা ভাল আছেন ত অনাদি-দা?” “হ্যা ভাল আছেন,কিন্তু তুমি আজ সকালে তাকে দেখতে যাওনিতাই তিনি বড় ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। তিনি ভাবছেন—তােমার বুঝি কোন অসুখ করেছে-তিনি তােমাকে দেখতে আসতে চান। জ্যোতির্ময়ীর পণ ভঙ্গ হইল-বলিলেন, “না না তার আসতে হবেনা ....চল আমিই গিয়ে এখনি আঁকে একবার দেখে আসি। কমলিনী-সাহিত-মন্দির,
১৩
জীবক মারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
পণ্ডিতমহাশয় যে তাহার অপেক্ষায় আছেন সেকথা জ্যোতির্ময়ী
একেবারেই ভুলিয়া গিয়া অনাদির অগ্রবর্তী হইয়া চলিলেন।
রাজকুমারী গৃহে প্রবেশ করিবামাত্র—তাহাকে সম্মান
প্রদর্শনার্থে শরৎকুমার শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন।
অসুস্থতার পর এই প্রথম তাহার স্থির হইয়া দাঁড়াইবার প্রয়াস,
পা কঁপিয়া উঠিল ; দেহ ঈষৎ টলমল করিতে লাগিল। কিন্তু
এই কম্পন কি কেবলই দুর্বলতা-জনিত, কি আনন্দের
অধীরতাও ইহার মধ্যে অনেকখানি লুক্কায়িত ছিল? রাজকুমারী
উদ্বিগ্নভাবে অনুনয়ের স্বরে বলিলেন, “কি করেন ডাক্তারদা,
বসুন বসুন-দাড়াবেন না?”
“আমি ভাল হয়ে উঠেছি রাজকুমারী।”
“তবুও বন ; এখনো বিছানা থেকে ওঠবার অবস্থা আপনার
ঠিক হয়নি,-- পা কাপছে আপনার।”
“আপনি বসুন আগে।” প্রত্যুত্তরে এইরূপ অনুরুদ্ধ হইয়া
রাজকুমারী আর কথা বাড়াইলেন না; শরৎকুমারের শয্যার
নিকটেই তাহার জন্য অনাদি একখানি চৌকি আগে হইতেই
রাখিয়া দিয়াছিল, সেই পানিতে বসিয়া পড়িলেন। শরৎকুমার
তখন শয্যায় উপবিষ্ট হইয়া বলিলেন, “আপনি সকালে
আসেননিতাই মনে হচ্ছিল-”
শরৎ হঠাৎ থামিয়া গেলেন, রাজকুমারী বলিলেন, “না,
আমার কোন অনুখ করেনি,ভালই আছি।--আপনি ত ভাল
হয়ে উঠেছেন—তাই আর
১১৪নং আহিরীটোলা ঔাট, কলিকাতা।
১৪
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
বাণী
রাজকুমারীরও কথাটা এইখানে বাধিয়া গেল—কেননা
যাহা বলিতে যাইতেছিলেন, তাহা সত্য নহে। শরৎকুমার
তাহার পালায় রাজকন্যার অসম্পূর্ণ কথা সম্পূর্ণ করিয়া দিয়া
কহিলেন,
“তাই আর আসার দরকার মনে করেন নি ?” বলিতে
বলিতে তাহার রুগ্ন মুখ -একটা ব্যথার ভাবে আচ্ছন্ন হইয়া
পড়িল। জ্যোতির্ময়ীর হৃদয়-তন্ত্রীতেও সে বেদনার সুর ধ্বনিত
হইল। তিনি কথাটা চাপা দিবার অভিপ্রায়ে হাসির চিঠিখানা
শরৎকুমারের হাতে দিয়া বলিলেন, “দেখুন দেখি চিঠিখানা পড়ে
ডাক্তারদা; আপনার ভাল লাগবে মনে করে এনেছি।”
শরৎকুমার চিঠিখানি গ্রহণ পূর্বক পড়িয়া রাজকন্যার হাতে
প্রত্যর্পণ করিয়া কহিলেন, “বিনি লিখছেন—তিনি দেখছি
গুণগ্রাহী।”
“তিনি আপনাকে নমস্কার জানিয়েছেন - দেখেছেন ত? কি
উত্তর দেব?”
ফিরিয়ে দেবেন নমস্কারটা।” এমন ঔদাসীন্যের সহিত
কথাটা শরৎকুমার বলিলেন যে, জ্যোতির্ময়ীর পূর্বগঠিত বিশ্বাস
বৈশ একটু টলমল করিয়া উঠিল। বলিলেন, “চিঠি পড়ে ত মনে
হয়—আপনার সঙ্গে তার বিশেষ আত্মীয়তা আছে।”
“কুল আপনার।-মােটই না।” বিদায়-দিনে হাসির
প্রত্যাখ্যানের কথা মনে জাগিয়া উঠিল,—কিন্তু আজ আর সে
বৃতিতে তাহার দীর্ঘ নিশ্বাস পড়িল না। শরৎকুমার নিজেই
কমলিনীলাহিত্যমন্দির,
১৫
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
যেন তাহাতে একটু বিস্মিত হইলেন। জ্যোতির্ময়ী বলিলেন,
“আপনার আত্মা কিন্তু চুপি চুপি অন্য কথাই প্রকাশ করেছে।”
“কি রকম?”
“অসুখের সময় অনেকবারই হাসির নাম আপনার মুখে
শুনেছি।”
শরৎকুমারের রক্তহীন পাংশুমুখে সহসা লজ্জার আভা চমকিয়া
গেল ! “সত্যি না কি ? প্রলাপের ঘােরে কি কথা না জানি
শরৎকুমার বলিয়াছেন—আর রাজকুমারী তাহা শুনিয়া কি না
জানি মনে করিয়াছেন, ছি-ছিঃ!” সব কথা রাজকন্যাকে ধুলিয়া
বলিতে তাঁহার ইচ্ছা হইল। কিন্তু চালােকে বা স্নান দীপশিখার
নিকট বসিয়া যে সব কাহিনী বলা যায়,-দিনের ফ্যাকু-ফ্যাকে
উজ্জ্বল আলােক তাহার পক্ষে প্রতিকুল।—তাহা ছাড়া অনাদি
ছােকরা ঘরের কোণে বসিয়া আছে, যদিও সে নভেল পাঠে মগ্ন -
তবুও ত একজন তৃতীয় ব্যক্তি ঘরে উপস্থিত।
শরৎকুমার মৌন হইয়া রহিলেন—তাহার ভাষা এই সঙ্কটের
সময় তাহাকে পরিত্যাগ করিল,-ঘড়িটাও কি ছাই এই মুহূর্তে
তাঁহার শত্রুতা করিবে-সশব্দে এই সময় ৪টা বাজিয়া উঠিল।
জ্যোতির্ময়ী উঠিয়া দাড়াইয়া কহিলেন, “উঠি তবে আজ, ৪টে
বেজে গেল, আমাদের আবার আজ চায়ে যেতে হবে। একটু
সাবধানে থাকবেন, এখনাে দুৰ্বল আছেন।”
উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই বালিকা চলিয়া গেল। শরৎ
চোখ বুজিয়া শয্যায় শুইয়া পড়িলেন। একটা কষ্টের অবসাদে
১১৪ নং আহিরীটোলা হীট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী
তাঁহার দুর্বল শরীর একান্ত ক্লান্তিপূর্ণ হইয়া উঠিল যে সত্য
এতদিন তাহার নিকট লুক্কায়িত ছিল—আজ তাহাতে তিনি
সচেতন হইয়া উঠিলেন, বুঝিলেন, অসুখের পূর্বে যে-তিনি
ছিলেন—আজ সে-তিনি নাই। হাসির যে হাসিটুকু তিনি এত
দিন হৃদয়নিভৃতে লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন আজ ত আর তাহার
সন্ধান পাইতেছেন না! জ্যোতির্ময়ীর জ্যোতিঃসাগরে তাহার
শেষ রশ্মিটুকুও যে সহসা মিলাইয়া পড়িয়াছে! কেমন করিয়া
কোন্ মুহর্তে এ ঘটনা ঘটিল তাহা তিনি বুঝিলেন না,
এইটুকু শুধু বুঝিলেন যে, জ্যোতির্ময়ী এখন তাহার মনে একমাত্র
জাগ্রত দেবতা !
অদৃষ্টের এ কি নিছুর উপহাস! তিনি হাসিকে ভুলিতে
চাহিতেছিলেন সত্য, কিন্তু এমনি করিয়া তপ্ত হইতে তপ্ততর
অনলদাহের মধ্যে ডুবিয়া কি ? হাসিকে যখন তিনি ভাল
বাসিয়াছিলেন, তখন তাকে দুষ্প্রাপ্য মনে করেন নাই, সেইজন্য
তাহাকে অত্মসমর্পণ করিতে কখনও তাহার কুণ্ঠা বােধ হয় নাই,
কিন্তু জ্যোতির্ময়ী যে তাঁহার পক্ষে একান্তই দুভ বস্তু ; তাহার
কাছে আত্মবেদনা জানাইতেও যে সাহস নাই, জ্যোতির্ময়ী
স্বর্গের ৫ তারকা-আর শরৎকুমার মরে মানব ! চিরদিন
এই অনলদাহ নীরবে তাহাকে হৃদয় মধ্যে বহন করিতে
হইবে যে !
“ভগবান, এমন নিষ্ঠুর তুমি ! অথবা ইহাই তােমার করুণা?
গৃহী হইবার জন্য আমাকে তুমি সৃষ্টি কর নাই। এজীবন
কমলিনীহিত্য-মন্দির,
১৭ একুশায়ী যে এত স্বপ্নবাণী পরার্থে দান করিতেই তুমি ইঙ্গিত করিতেছ। তাহাই হউক, তমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক, বল দাও প্রভুবল দাও।” জ্যোতির্ময়ীও বেশ সচ্ছন্দমনে গৃহে ফিরিলেন না। অন্য- দিন শরৎকুমারের অজ্ঞাতে তাহার উচ্ছসিত আনন্দ-বিকিরণ হইতে তিনি যে কণিকারাশি কুড়াইয়া আনেন সেই আলােকে অনেকক্ষণ ধরিয়া তাহার হৃদয় আলােকিত করিয়া রাখে, কিন্তু আজ তাহার পরিবর্তে একটা অন্ধকার বেদনা ভার লইয়া সেখান হইতে তিনি বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন। তাহাদের দুজনের মধ্যে এ কি কুয়াসার ব্যবধান আজ ! তাহার অন্তপ্রাণ “হায় হায় করিয়া উঠিল, কিন্তু তিনি তাহাকে সবলে কশাঘাত করিয়া—শাসন বাক্যে বারবার করিয়া কহিতে লাগিলেন, “ভালই ত সে ভালই! রে অবােধ মন,তুমি এতদিন যাহা চাহিয়াছিলে, ভগবান আজ তাহা গ্রাহ করিলেন,এখন দুঃখ করিলে চলিবে কেন ? তাহার মঙ্গলদান কৃতজ্ঞ হৃদয়ে গ্রহণ করিয়া সুখ অনুভব কর। ব্যক্তি বিশেষের জন্য হা হুতাশ করা তােমার জীবনের উদ্দেশ্য নহে। তুমি দেশের কাজে জীবনদান করিয়াহ ইহা ভুলিও না গাে-ভুলিও না।” জোতির্ময়ী’গৃহে ফিরিয়া দেখিলেন, কুন্দ উপস্থিত নাই-যে দাসী তাহার অপেক্ষায় ছিল-সে বলিল, “কু-দিদি এসে চলে গেলেন,আপুনি এলে ডাকতে বলেছেন। জ্যোতির্ময়ী বলিলেন, “না ডাকতে হবে না—” দাসী কঁকুইখানা লইয়া তাহার চুল আচড়াইতে গেল। জ্যোতির্ময়ী তাহাকে নিরক করিয়া ১১৩নং আহিরীটোলাইট, কলিকাতা।
১৪৮
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
৩
নিজেই তাড়াতাড়ি কোনরূপে দীর্ঘ কেশদাম সংবৃত করিয়া
বাঁধিয়া লইলেন। তাহার পর যথাসাধ্য বিনাড়ম্বরে-এবং অল্প
সময়ের মধ্যে সাজপৰ্ব সমাধা করিয়া লইয়া পিতার নিকট ছুটি-
লেন। যাইবার সময় দাসীকে বলিয়া গেলেন, “পণ্ডিতমহাশয়কে
গিয়ে বল, আজ আর পড়ব না, তিনি ঘরে যেতে পারেন।”
পিতৃকক্ষে আসিয়া জ্যোতির্ময়ী দেখিলেন, রাজা তখনন
প্রস্তুত নহেন, তিনি বেশ মগ্নভাবেই খাতার উপর কলম
চালাইতেছেন। তঁাহার জন্য পিতা অপেক্ষা করিয়া নাই দেখিয়া
তিনি সন্তুষ্ট হইলেন,-কোন কথা না কহিয়া ধীরপদে আসিয়া
তাঁহার স্কন্ধের উপর হাত রাখিয়া দাড়াইলেন। রাজা তখন
মুখ তুলিয়া, ঘড়ির দিকে চকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন,
“তাই ত—৪টে বেজে গেছে যে! আচ্ছা তুই একটুখানি অপেক্ষা
কর রাণী, আমি এখনি আসছি।” জ্যোতির্ময়ী দেখিলেন,
টেবিলের উপর খুব দামী ফ্রেমে আঁটা কালীঘাটের দুই পয়সা
মূল্যের একখানি কালীর পট। সেই ছবিখানি হাতে লইয়া
তিনি মনােনিবেশ পূর্বক দেখিতে লাগিলেন।-
এ কি ভীষণ মূর্তি জগদম্ব। প্রকৃতির! শিবকে পদদলিত করিয়া
তিনি এখন ভয়ঙ্করা-নিষ্ঠুর! কিন্তু প্রকৃতির পক্ষে এই নিষ্ঠুর
ভাবেরও যে প্রয়ােজন। প্রয়ােজন সিদ্ধ করিবার জন্যই অন্যায়
দমনকারিণী প্রকৃতি এখন মুণ্ডমালিনী, ভীমা !
দেয়ালে আধুনিক কোন চিত্রকর-অঙ্কিত মাতৃমূর্তির একখানি
পট টাঙ্গান ছিল। নয়ন তুলিয়া একবার মুগ্ধ দৃষ্টিতে তিনি তাহার
!
কমলিনীশাহিত্য-মন্দির,
১৯
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
দিকে নিরীক্ষণ করিলেন। বিশ্বমাতার এই স্নেহ করুণারূপিণী
ভাব কি সুন্দর! -তাহার এই ভুবনমােহিনী মাধুরীই ত
প্রয়ােজনে করালী কালীরূপে রূপান্তরিত হইয়াছে! বালিকার
জীবনের মধুর ভাবও প্রয়ােজনের পদতলে সম্ভবতঃ এইরূপ
বিসর্জন দিতে হইবে,-মাতৃরূপা হইবার সৌভাগ্য লইয়া ত
সকলে জন্ম গ্রহণ করে না।”
জ্যোতির্ময়ীর কোমল মধুর স্বভাবের অংশে একটা দারুণ
শিহরণ উঠিল,-তিনি চক্ষু মুদ্রিত করিলেন। রাজা সেই সময়
প্রস্তুত হইয়া দ্বারদেশে পদার্পণ করিয়া বলিয়া উঠিলেন, " পট,
খানি মা আমাকে বাঁধাবার জন্যে দিয়েছিলেন, বেঁধে এসেছে,
তাকে পাঠাতে ভুলে গেছি।” জ্যোতির্ময়ী ছবিখানি টেবিলে
রাখিয়া কহিলেন, “এখন এইখানেই থাকু। ফিরে এসে আমি
ঠাকুরমার কাছে নিজেই এখানি নিয়ে যাব।”
যােড়শ পরিচ্ছেদ।
পণ্ডিত মহাশয় ও কুলবালার গল্পও বেশ জমিয়া উঠিয়াছিল।
রাজকুমারী পড়িতে না আসায় দুজনের কেহই ক্ষতি বিবেচনা
করেন নাই। ব্যায়াম-উৎসবে কুল উপস্থিত না থাকায় যােব
আনা উৎসবই যে শাস্ত্রীমহাশয়ের পক্ষে বৃথা গিয়াছে এই কথাই
তিনি পুনঃ পুনঃ বলিতেছিলেন। এই পৌনরুক্তিতে অসহিষ্ণু
১১৪ নং আহিরীটোলা জট, কলিকাতা।
একমাত্ৰী ৰেী প্ৰণীত
অপবাণী
স্বভাব কুলবালার যে ধৈৰ্য্যচ্যুতি হইতেছিল না—ইহাই
আশ্চর্য !
পণ্ডিতমহাশয় তাহার বিলম্বিত দাড়িতে হাত বুলাইতে
বুলাইতে শতবারের পর আর একবার বলিলেন, “ সত্যি
বলছি কুন্দ, তুমি ছিলে না—আমি দুই চক্ষে অন্ধকার
দেখেছি।
কুন্দ বলিল, “কিন্তু এতে আপনি দুঃখ করছেন কেন? দুঃখ
করবার কথা ত আমারি। এমন মহাসমারােহ আমি চর্মচক্ষে
দেখতে পেলাম না! আপনি বরঞ্চ সেদিনের বিবরণ খুঁটিনাটি
করে বর্ণনা করুন—আমি কাণে শুনেও তৃপ্তিলাভ করি।”
“তা যদি বল,-এমন নূতন কিছু বলার কথা নেই,—সবই
গতানুগতিক অনুবৃত্তি; অভিনন্দন,অভিভাষণ,-ব্যায়াম আর
বাহবা প্রদান,-এই চতুর্বিধ বিধানেরই আবর্তন বিবর্তন ;-
!
“থামলেন যে? বলুন না!”
“একটি মাত্র আকস্মিক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছিল।”
“বলুন না ! আগ্রহে যে দম ফেটে উঠলাে। দেখবেন শেষে
নারীবধের পাতক লাগবে আপনাকে।”
“আহা! ও কি কথা কুদ! শােন, আগেই বােধহয়
শুনেছ,-রাজকুমারী শরং আক্তারকে মাল্যদান করেছিলেন—
“এই কথা! কিছু ত আশ্চর্য হলুম না। যে জেতে, তাকে
মাল্যদান করাই ত আমাদের দেশের সনাতন পদ্ধতি।”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রত
প্নবাণী
“হঁা, স্বয়ম্বরা হওয়াও আমাদের দেশের সনাতন পদ্ধতি,
এস্থলে ফাকা মাল্যদানটাই কেমন ফাকা ফাকা ঠেকছে।”
“সােজা লাঠি গাছটাকেও এমন সহজে আপনারা বাঁকিয়ে
ধনুক করে তোলেন,-- আশ্চর্য !
“আরে সংসারটাই এই রকম—লােকের মুখ তুমি ত চেপে
রাখতে পার না!”
“বেশ,-লােকে যা বলে বলুক,আপনি আর এ নিয়ে মাথা
ব্যথা করেন কেন ?”
“রাম? মােটেই না। আমি কেবল তােমাকে বলছি।
দেখ কুন্দ, তােমাকে কোন কথা না বলে আমি থাকতে পারিনে,
-তুমি ত কই আমাকে কিছু বল না?”
কিছু ত বলার নেই আমার।”
“তা ত সত্যি। বিশেষ এবার যে রকম গম্ভীর দেখছি তাতে
মনে হয় যেন মৌনব্রত গ্রহণ করেছ।”
কুন্দ হাসিয়া বলিল, “জীবনটা কি হেসে খেলে কাটাবার
জিনিষ পণ্ডিতমশায় ?
“জীবনটা কাজ করবারই জিনিস,—কিন্তু হেসেখেলেই কাজ
গল হয়।
“ভিন্ন মতও ত থাকতে পারে ?
“অবশ্যই। পৃথিবী যে বিপুলা,-তাতে সন্দেহ নেই।”
পণ্ডিতমহাশয়ের হন্তে তাহার বিপুল প্রবল ভাবে
আন্দোলিত হইতে লাগিল।
১১৪নং আহিরীটোলা কীট, কলিকাতা।
বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত স্বপ্নবাণী স কুন্দ তাহা দেখিতে দেখিতে হাসিমুখে বলি, “রাজকুমারী ত এখনাে এলেন না,একবার খোঁজ নিয়ে আসি।” “দরকার কি কুন্দ ! তাতে তুমি শুদ্ধ অন্তর্ধান হয়ে পড়বার আশঙ্কা আছে- কুল সে অনুরােধ অগ্রাহ করিয়া চলিয়া গেল,-কিন্তু অল্প- ক্ষণের মধ্যেই ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতমহাশয়ের অন্ধকার মুখ হাস্যোজ্জল করিয়া কহিল, “রাজকুমারী ঘরে নেই ! বােধ হয় রাজাবাহাদুরের কাছে গেছেন।” “পাশের ঘরও বেশী দূরে নয় কুন।” দেখুন পণ্ডিতমশায়, এ রকম ঠাট্টাইটি করলে আমি কিন্তু চলে যাব।” “আরে ঠাট্টা কে করছে ? আমি জন্মে কখনও কোন বিদূষকের পাঠ অভিনয় করিনি। কখনাে তা পারব বলে কল্পনাও ছিল । , তবে আজ তােমার প্রশংসাবাদে প্রাণের মধ্যে হঠাৎ একটা আশাতীত আশার উদ্রেক হয়ে উঠছে বটে ! কে জানে হয় ত কোন দিন গােপাল ভাঁড়ের আসনও অধিকার করে বসতে পারি। কিন্তু আপাততঃ যা বলছি, এটা পরিহাস নয়। রাজ- কুমারীর মনের গতিক বড় ভাল মনে হচ্ছে না। পড়া-না ত বন্ধ হয়েইছে, সমিতিটা কবে বন্ধ হয় এখন এই ভয়! ছেলেদের উপর হুকুম জারি হয়েছে যে, তারা যেন বিলিতি জিনিষ বংস না করে—কেননা ডাক্তার এটা ভাল বলেন না।” “রাজকুমারীকে আমি এই কথা বলব।” কমলিনী-হিত্য-মন্দির,
এয়ী যে এত
বাণী
“রক্ষা করপেলে কু?”
“না কেপিনি,আমি তাকে বলব-তিনি যে পথে চলেছেন
সেটাগ্রত দেখােমতির পথ নয়। এ কাজে গুরুর উপদেশ চাই।
“আঃ তাই বল। তা কুটুমির মত গুরু পেলে মন্দ হয় না
বটে। পেয়েছ নাকি?”
“মনে ত হচ্ছে।”
“সর্বনাশ! গুরুদেব তেমারঋন্ধে ভর করলে আমরা দাড়াই
কোথায়? কিন্তু ব্রাহ্মেরা ত আমি জানি শুরু মানেন না?”
কেন মানবেন না? এতদিন ত আপনাকেই গুরু বলে
মেনেছি।”
তবু ভাল, কিন্তু গুরু ত জীবনে একজনই হয়।
তােমাদের রীতি স্বতন্ত্র হতে পারে,তােমরা একাধিক দামী
গ্রহণ করে থাক।”
“দেখুন পণ্ডিতমশায়, ও-রকম রসিকতা করবেন না-আমার
ভাল লাগে না।”
কুন্দের নয়ন ক্রোধদীপ্ত হইয়া উঠিল—সে চলিয়া যাইতে
উদ্যত হইল। পণ্ডিত মহাশয় কাতর অনুনয় করিয়া কহিলেন,
"ক্ষমা কর কুল, এটা যে দোষের কথা তা আমি বুঝতে পারিনি।
বামী-গ্রহণে দোষ হয় না, আর বলেই দোষ হয় ? ৰস, ব’ ,
রাগ কোরাে না-
ফুল বসিয়া কহিল, “আপনার যে আজ কি হয়েছে—স কথাই
বিকৃত করে বলছেন ;-সত্যি কিন্তু আমার বড় রাগধরছ।”
১১৪নং কাহিনীটোল টি, কলিকাতা।
১৪ স্বর্ণকুমারী ৰেী এগীত পী “রাগ কোর’ না কুন্দ-তা হলে মরে যাব।তােমাদের অভিধানে কোন্ কথা যে শীল এবং কোন্ কথাই বা অশ্লীল, সমন্ত পাণিনী শাস্ত্র উল্টে তা আমার কাছে দূজ্ঞেয় রয়ে গেছে। এ সম্বন্ধে আমি একেবারেই গণ্ডমুখ-একটা গল্প করব কুন্দ?” কুন্দ চুপ করিয়া রহিল,-তাহার আজ্ঞার অপেক্ষা না করিয়াই পণ্ডিত মহাশয় বলিলেন, “দেখ, একবার আমি একটি ব্রাহ্ম- বাড়ীতে পুরাণ-ব্যাখ্যা করতে যাই।” “ঐটেই যা আপনার আসে,—কিন্তু সমিতি হওয়া পর্যন্ত পুরাণ-পাঠও ত আপনি ছেড়ে দিয়েছেন।” “তবু ভাল,-আমারও একজন মল্লিনাথ আছে; কিন্তু তুমি যাই বল, মেমসাহেব সেদিন আমাকে বড়ই অপদস্থ করেছিলেন।” কুল তাহার কথার ভঙ্গীতে না হাসিয়া থাকিতে পারিল না, হাসিয়া কহিল, “তঁার কি আর কোন নাম নেই ?” পণ্ডিতমহাশয় উৎসাহিত হইয়া কহিলেন, “সত্যি কথা যদি বলতে হয়, তাঁর বা তাঁর স্বামীর আসল নাম যে কি তা আমি ঠিক বলতে পারব না। যে বন্ধুটি আমাকে তাদের কাছে নিয়ে গিয়ে ছিলেন, তিনি পরিচয় করিয়ে দেবার সময় মিসেস টবাল ৰা ঘটকাল এই রকম কি একটা নাম যেন গিমিঠাকরুণের বলেছিলেন ; কিন্তু সে নামটা আমার মাথা থেকে করবৎ একেবারেই উপে গেছে। মনে আছে কেবল একটুকু যে, তাঁর বাড়ীর চাকর করা যেমলাহে বলে তাকে সম্ভাষণ করছিল।” ‘া বেশ! এখন আসল গরে নামুন।” কালিমাহিত্য-মন্দির,
১৫
কুমারী দেবী প্রণীত
স্বপ্নবাণী
“সে লজ্জার কথা আর কোন্ মুখে বলি! অভিমন্যুবধ ব্যাখ্যার
ভূমিকায় যেমন বলেছি যে, অভিমনু যখন গর্ভে ছিলেন তখন
পিতা মাতার আলাপ প্রসঙ্গে তিনি বৃহপ্রবেশ নিয়ম শিক্ষা করে-
ছিলেন,-অমনি মেমসাহেব ত্রস্তভাবে ছােট ছেলেমেয়েদের সেখান
থেকে উঠিয়ে দিলেন,-আমার সহসা বাকৃরােধ হয়ে গেল, কি না
জানি অজ্ঞানকৃত মহাপাপে এরূপটা ঘটলাে বুঝে উঠতে পারলাম
! ছেলেরা চলে যেতে মেমসাহেব বল্লেন, ‘ওরূপ খারাপ
কথা ছেলেদের কাছে বলা ঠিক নয়। আমার কণ্ঠতালুকা শুক
হয়ে উঠলাে-মনে করতে চেষ্টা করলুম খারাপ কথাটা কি
বলেছি। কিন্তু মস্তিষ্ক তখন শুন্য, কিছুতেই তা বােধগম্য
হােলনা। পুরাণ পাঠ ঐখানেই শেষ করে আমার সেদিন চলে
আসতে হোেল। তাই তােমাকে বলছি—তােমাদের মীল
ভাষার অভিধানখানা আমাকে তুমি পড়াবে কুন্দ ?”
কি যে বলেন পণ্ডিত মশায়?”
“না, আমি ঠিকই বলছি। আমি তােমার গুরু হতে চাইনে
তুমিই আমার গুরু হও।”
পণ্ডিতমহাশয়ের অনুরাগরঞ্জিত স্বর কুরে খারাপ লাগিলনা;
এই শবহুল বিজ্ঞ ব্যক্তিরও যে তাহা হইতে গাম্ভীৰ্য্য নষ্ট হইয়াছে
ইহাতে সে বেশ একটু গর্ব বোধ করিল। পণ্ডিত মহাশয় তাহার
যৌনতায় সাহস পাইয়া আবার বলিলেন, “আমি প্রাণের কথা
বলছি, তুমি আমার মনো-আসনে দেৰীজপে অধিতি হও,
নইলে আমার জীবন ব্যর্থ হবে।
১১৪নং আহিরীটোলা মট, কলিকাতা।
ময়ী যে এত অথবী নিজের এই উচ্ছ্বসিত বাগ্মিতায় পণ্ডিত মহাশয় নিজেই অবাক হইয়া গেলেন, কুলও অসন্তুষ্ট হইলনা কিন্তু তুষ্টির ভাৰ গােপন করিয়া তুফীভাব ধারণ করিয়া কহিল, “কি যে বলেন আপনি?” সুঝতে পারছ না কুল! তুমি বিনা আমার জীবন বৃথা।” কুল হাসিয়া ফেলিল, বলিল, “আমি যে ব্রাহ্ম পণ্ডিত- মহাশয়,আপনার জাত যাবে যে ?” তােমারি পাদপদ্মে জাত ধর্ম অনেকদিন মনে মনে অঞ্জলি দান করেছি কুক।” “কিন্তু আমি ত তা করিনি। আমি যে হাতে থাকতে চাই।” হরি হরি। পণ্ডিতমহাশয় এতক্ষণ নিজের দিকটাই দেখিতে ছিলেন, স্কুলের তরফ হইতে এ-রকম আপত্তি উঠিতে পারে তাহা মনে করেন নাই। তাঁহার বিশিত মনের আবেগ হন্তের সাহায্যে রাশিকে ঘন ঘন দোল দিতে লাগিল। কিছু পরে বুলিলেন, “ঠাট্টা করছ ?" “না ঠাট্টা নয়। দেখুন পণ্ডিতমহাশয়, এরূপ কথা শােনা আমাদের অভ্যাস নাই, লজ্জা করে, অন্য কথা বলুন।” পণ্ডিতমহাশয় হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলেন, আপাততঃ দাড়ী- বেচারীও নিষ্কৃতি পাইল। তাহার পুরাতন কথা স্মরণ হইল। মলিনীবাতলি,
একমারী দেব এত
বাণী
লজ্জা ভাদাইতে অনেকটা সময় লাগিয়াছিল বটে, তার চেয়ে তৰু
এটা সহজ মনে হইতেছে। তিনি প্রকাশ্যে বলিলেন, “কিন্তু
অনভ্যাসকেও অভ্যাসে আনা চাই !”
“দরকার দেখি না।”
কিন্তু পণ্ডিতমহাশয় নাছােড়বান্দা, বলিলেন, “কিসের
দরকার নাই? প্রেমানুরাগের?”
কুন্দ হাসি চাপিয়া কহিল, “ধরুন তাই ?”
“আরে—বিশ্বসংসার যে প্রেমে চলছে, তােমার আদেশ ত
সে মানবে না কুল।
“কি নীরব ভালবাসাই শ্রেষ্ঠ ভালবাসা, প্লেটনিক প্রেমই
পবিত্র প্রেম। প্রকাশে তার মাহাত্ম্য চলে যায়।”
“তুমি কি সৃষ্টিলােপ করতে চাও কুন্দ? এই বিশ্বসংসারই
প্রেমের প্রকাশ।”
“কিন্তু, নীরবতায় কি প্রকাশ নেই ?”
“থাকতে পারে-কি-কিন্তু অল্পবুদ্ধি মানব এখনাে সে
পাঠ শেখেনি। সেই জন্যই ভাব ভাষা চায়,-অনুরাগ মিলন চায়,
আর জীবজগতে এই মিলনের পরিণতিই বিবাহ।
এমন মূক্তকণ্ঠ কোর্টসিপ কুন্দের ভাল লাগিল না। যে সময়
বিবাহের নামে বেথুন স্কুলের মেয়েরা খড়গহস্ত হইয়া উঠিত—সেই
সময়ে কুল সে দলের মধ্যে একজন প্রধান ছিল। অবস্থাকে,
বয়সে, নে, তাহার এই মতের হাস্যকারিতা সে বুঝিতে আরম্ভ
করিয়াছে—তবুও সে ভাব তাহার মন হইতে একেবারে মুছিয়া
১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা।
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
১৫৮
এলবাগ
যায় নাই। পণ্ডিতমহাশয়ের অনুরাগ প্রকাশে তাহার মন
আপত্তি বােধ করিতেছিল না, কিন্তু প্রকাশের পথটা একটু বাঁকা
হইলেই তাহার মনঃপুত হইত। সে বিরক্তির স্বরে কহিল,
“পণ্ডিত মশায়, ওসব কথা বলবেন না, আমি মিনতি করছি।”
“কেন? এতেও কি দোষ আছে?”
“আছে।”
“কিন্তু তােমার বাপ-মাও ত বিবাহ করেছেন ; তারা ত দোষ
বিবেচনা করেন নি।”
কুন্দ এ কথায় সত্যসত্য রাগিয়া গেল,-বলিল, “ঘারা দোষ
মনে করেন না তারা ত বিবাহ করছেনই এবং করবেনই। আমি
দোষ মনে করি,-আমি করব না।”
পণ্ডিত মহাশয় হতাশ ভাবে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন,
“কি করবে তুমি?”
“দেশের কাজ করব।”
‘‘আমিও ত সেই পথের পথিক।”
“কিন্তু আপনারা ভুল পথে চলেছেন,-আমাকে গুরুদেবের
আ'মেনে চলতে হবে।”
পণ্ডিতমহাশয় প্রমাদ গণিলেন। কুন্দের স্বরে-তাহার
ভাবে-ভঙ্গীতে তিনি একটা দৃঢ়তা দেখিলেন। তাঁহার মন
বলিতে লাগিল—কুল কি একটা বিপদচক্রের মধ্যে পা দিতে
বসিয়াছে—তিনি কোট সিপ ভুলিয়া গিয়া বলিলেন, “তুমি
কি করে জানলে যে তাদের পথ ঠিক ?
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
১৯
सारी को बन
খবণ
“ঠিক জানি আমি। সন্তোষ-মা বলেছে।”
তিনি বুঝিলেন, কুন্দকে এ পথ হইতে দূরে রাখা এখন
তাহার সাধ্যাতীত, তাহাদের দলে প্রবেশ করিয়াই তাহাকে
রক্ষা করা ছাড়া অন্য উপায় নাই। বলিলেন, “বেশ, আমিও
তােমার গুরুর শিষ্য হব। গুরুর দেখা পাব কোথায় ? কি
করতে হবে ?
কুন আজাদের সহিত বলিল, “গুৰু এই খানে শীঘ্র আসবেন
বলেছেন। তখনই বুঝবেন কি করতে হবে, না হবে—আমি
আর কিছু বেশী বলতে পারব না।”
এই সময় দাসী আসিয়া বলিল, “রাজকুমারী আজ পড়বেন
নাই। আপুনি বাড়ী যাও গাে।”
পণ্ডিতমহাশয় উঠিয়া দাড়াইয়া দীর্ঘ নিশ্বাস সহকারে
কুন্দকে বলিলেন, “চল্লেম তবে, গুরুদেব এলে যেন খবর
পাই।”
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।
ম্যাজিষ্ট্রেট ভবনে গিয়া আজ প্রথম জ্যোতির্ময়ী নিলেন।
যে তাহারা বদলি হইয়া প্রসাদপুর হইতে চলিয়া যাইতেছেন।
রাজকুমারী মর্মাহত হইয়া পড়িলেন।
গৃহে ফিরিয়া
খানিকক্ষণ ধরিয়া কাদিলেন, তাহার পর বৈকালিক বেশভূষা
১১৪নং আহিরীটোলা ৪ট, কলিকাতা।
এযমারী দেবী অণত ৰপৰাণী খুলিয়া ফেলিয়া মন্দিরে যাইবার সাজ পরিয়া লইয়া কালীর পটখানি আনিবার জন্য রাজার ঘরে গেলেন। তিনি তখন সে ঘরে ছিলেন না, পাশেই শরৎকুমারের ঘর, হয় ত ব এখন তিনি বারান্দাতেই আসিয়া বসিয়াছেন,-একবার বারান্দায় আসিয়া বড়াইবার জন্য মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। কিন্তু হাতের কালী- মুক্তির দিকে চাহিয়া সেই বিষম পিপাসাও সবলে চাপিয়া লইয়া তিনি গৃহ নিরুান্ত হইয়া দিদিমার মহলে প্রবেশ করিলেন। দিদিমা মন্দির গমন উদ্দেশে তখন বারান্দায় পদার্পণ করিয়াছেন- জ্যোতির্ময়ীকে দেখিয়া, চরণ সংযত করিয়া কহিলেন, “আজ যে আমার রাধারাণীর অসময়ে উদয় ?–মন্দিরে যাবি বুঝি? সাজসজা যে সেই রকম?” “হ্যা ঠাকুর-মা, অনেকদিন দেব দর্শনে যাইনি তাই আজ ইচ্ছে হােল। দেখ দেখি তােমার জন্যে কি এনেছি। ঠাকুরমা ছবিখানি হাতে লইয়া পুনঃ পুনঃ প্রণাম করিয়া আলাদ সহকারে কহিলেন, “ঠিক সময়েই এনেছিল বাণি, -এখনি মন্দিরে গিয়ে টাঙ্গিয়ে দেব। কালী মূর্তি সেখানে এক- খানিও নেই। তাই বুঝি দেবী আমাকে স্বপ্নে দেখা দ্বিয়েছিলেন! স্বপ্ন দেখার পরই পটখানি কালীঘাট থেকে আনিয়েছি।” আচ্ছা দাও ঠাকুর-মা,-আমি নিয়ে যাচ্ছি।” বলিয়া জ্যোতির্ময়ী ছবিখানি তাহার হাত হইতে স্বহস্তে পুনগ্রহণ করি- লেন। ঠাকুর-মা তখন তাহার দিকে ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিয়া কহিলেন, “দিন দিন যে কিয়ে যাচ্ছিস নাতনি! বিরহলা কমলিনীসাহিঙমন্দির
কুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী
পুষছিস যে বুকে তা বেশ বােঝা যাচ্ছে। কিন্তু সবাই যা বােঝে
তাের বাপ ত তা বােবে না। বাপের তাের ধনুর্ভঙ্গ পণ যে
অর্জুন জামাই করবে। আরে ঐ ত সেই !—যুদ্ধ জিতলে, মালা
নিলে,—ছদ্মবেশী অর্জনই ত সে,-তাের বাপকে কে তা বােঝাই
বল দেখি?
জ্যোতির্ময়ীর মনের বেদনা মুখে রক্ত রাগে ঝাপাইয়া উঠিল
পাছে ঠাকুরমা তাহা লক্ষ্য করেন -তাই তাহার গলা জড়াইয়া
ধরিয়া বলিলেন, “না ঠাকুর-মা, আমি বিয়ে করব না।”
“কেন লাে ?”
“সবাই যে বিয়ে করে।”
দিদিমা খুব হাসিয়া উঠিলেন,-নাতনির পিঠ চাপড়াইয়া
বলিলেন, “ওঃ সেইজন্যে ? যেমন বাপ ঠিক তেমনি মেয়ে।
সবাই যা করে তা করতে নেই—কেমন ? সেইজন্যে তাের বাপও
ত বিয়ে করলে না।”
মেয়ে বলিল-“আন্ধা ঠাকুর-মা, বাবা বিয়ে করেননি বলে
তােমার এত দুঃখ, আমি সে দুঃখ নিবারণ করতে প্রাণপণে চেষ্টা
করব। আমারও অনেক সময় মনে হয়—বাবার বিয়ে হলে ভাল
হােত। তুমি একটি ভাল মেয়ে দেখতারপর এবার আমরা
দুজনে মিলে বাবাকে ধরে পড়ব।”
ঈর্ষার পরিবর্তে নিজেই যে জ্যোতির্ময়ী পিতার বিবাহের ইচ্ছ।
প্রকাশ করিতেছে ইহাতে ঠাকুরমা অত্যন্ত আহলাদিত হইলেন।
মনে মনে বলিলেন,-হ্যা, অসাধারণ মেয়ে বটে। মুখে বলি
১১৪ নং আহিরীটোলাট, কলিকাতা।
বয়াৰী ৰে এক বুধবাণী লেন, “বেশ কথা! আগে ত তাের হাতে বান পড় ক—তখন বাপের চাদরেও গিরে দিস।” রসুন-চৌকীর পূরবীরাগ সহ মন্দিরের আহ্বান ঘণ্টাধ্বনির মধ্যে থামিয়া পড়িল। রাজমাতা বলিলেন, “চল রাণি চল, আরতির সময় হােল, ফিরে এসে এ পরামর্শ করা যাবে।” মন্দির অঙ্গনে পেীছিয়া প্রথমেই রাজমাতা কালী মূর্তিখানি একজন সেবকের হস্তে দিয়া, কোথায় ইহা টাঙ্গান হইবে তাহা বলিয়া দিলেন। পুরােহিত এবং অন্যান্য রাজআত্মীয়গণ এতক্ষণ রাজ মাতার আগমন অপেক্ষায় ছিলেন। তাহারা মন্দিরে আসিবা- মাত্র স্তোত্রপাঠ এবং আরতি আরম্ভ হইল। রাজকুমারীর সহিত মহারাণী সপ্তাের দেব প্রদক্ষিণ করিয়া দেব সম্মুখে প্রণত হইলেন। প্রণামান্তে জ্যোতির্ময়ী নতজানু হইয়া করঘােড় মূর্তি যুগলের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। প্রকৃতি পুরুষের মিলন ভাব—এই যুগল মূর্তিতে আজ তিনি সর্বপ্রথমে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিলেন। এই মিলনরূপ —কি সুমধুর, -কি মনােমােহন! জ্যোতির্ময়ী মনে করিয়া আসিয়াছিলেন, শ্যামসুন্দরের চরণতলে তাহার উন্মােষিত প্রেমকে আজ অঞ্জলিদান করিয়া—চির কৌমাৰ্য ৰতে শপথ-বদ্ধ হইবেন। পারিলেন না—তাহা পারিলেন না। ভগবানের প্রেম- মিলনরূপে তন্ময় হইয়া মােহাচ্ছন্ন ভাবে করযােড়েই তিনি বসিয়া রহিলেন। আরতি শেষ হইয়া গেল, স্তোত্র পাঠ বন্ধ হইল— ঠাকুর-মা তখনও রাজকন্যাকে সেই ভাবে বসিতে দেখিয়া একটু যেন ভীতভাবে তাকিলেন, “রাণি ?” রাণী চমকিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন। কমলিনীসাহিত্য-মন্দির, কুমারী দেবী প্রণী রাজা তখন গীতগৃহে ঢালা বিছানায় বসিয়া তানপুরার সুরে গান করিতেছিলেন। জ্যোতির্ময়ী মন্দির হইতে ফিরিয়া গৃহ প্রবেশকালে দূর হইতেই গীতবাদ্যধ্বনি শুনিয়া এমন নিঃশব্দে পিতার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইলেন যে, তিনি তাহা জানিতেও পারিলেন না; আত্মহারাভাবে মুদ্রিত নয়নে তিনি গায়িতে লাগিলেন- বড় একেলা গাে বড় একেলা ! - দুপুর সন্ধ্যা সকাল- তার অমৃত-কিরণ মাখা আকাশ-ভরা চোখের দেখা ধরার পানে ফিরলাে না ত হায়রে। একটি বারও একটি বেলা। মূলতান রাগিণীতে তাঁহার ভাববিহ্বল কঠোখিত পুনঃ পুনঃ উচ্চারিত এই কয়েকটি ছত্র গৃহে একটি মধুর বিষাদােন বর্ষণ করিতে লাগিল,-শুনিতে শুনিতে জ্যোতির্ময়ীর নেত্র অশ্রুতে ভরিয়া উঠিল, নিজেকে অপরাধী বলিয়া মনে হইল । তিনি যে পিতার নিকট হইতে দূরে পড়িয়াছেন—এই গানটি যেন ভাল করিয়া তাহাকে এই কথা বুঝাইয়া দিল। গানের সুরতান-ভরা প্রত্যেক শব্দটি কি তাহার প্রতি ভৎসনা মহে! রাজকন্যা একরূপ মােহাচ্ছন্ন ভাবেই নতজানু হইয়া পিতার পৃষ্ঠে মুখ রক্ষা করিলেন। রাজা চমকিয়া গান বন্ধ করিয়া কহিলেন, “রাণি !” সে স্বর কি স্নেহানন্দপূর্ণ! এই কণ্ঠ হইতেই কি ১১৪ নং আহিরীটোলা ঐট, কলিকাতা।
;
অনুযায়ী দেবী
১৬৪
বাণী
মুহূর্ত-পূর্বে অমন বুকফাট। বিষাদবেদনা, ধ্বনিত হইয়া
উঠিয়াছিল।
রাণী কোন উত্তর করিলেন না, পিতার গলা জড়াইয়া ধরিয়া
চুপ করিয়া রহিলেন ; উত্তপ্ত অশ্রু বিন্দুতে রাজার দেশ
ভিজিয়া গেল। তিনি বুঝিলেন, তাহার দুঃখের গানে বালিকা
ব্যথা পাইয়াছে। তাহাকে কাছে টানিয়া লইয়া শিশুম্বন
পূর্বক ভুলাইবার ছলে সহাস্যে বলিলেন,
“কে মেরেছে রাণীকে মাের, কে কোয়েছে মন্দ,
তার সঙ্গে কোমর বেঁধে করব গিয়ে এল।
রাণী তখন হাসিলেন। রাজা বলিলেন, “অনেকদিন সেতার
বাজাসনি-রাণিবাজা দেখি?
জ্যোতির্ময়ীর সেতার তানপুরাও ভৃত্য সেইখানে আনিয়া
রাখিয়াহিল-রাজা সেতারটি তাহার হাতে তুলিয়া দিলেন।
জ্যোতির্ময়ী সেতার ধরিয়া একটু বিষ হাসি হাসিয়া কহিলেন,
“বাৰা »
“কেন রাণি ?”
“ও গানটি কি তুমি সম্প্রতি রচনা করেছ ?”
রাজা তাহার মনের ভাব বুঝিলেন,—বুঝিয়া বলিলেন,
না রাণি—অনেক দিন।
জ্যোতির্ময়ী আর কোন প্রশ্ন করিলেন না, বুঝিয়া
লইলেন—এই অনেকদিনের অর্থ কি! তখন যেন একটু
সুবােধ করিলেন। সেতারটার পরদাগুলা ঠিক করিতে করিতে
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
अपमानो वादी बनेक অপবাণী কহিলেন, “বাবা, আমি তােমার পুরাণ গানের খাতা থেকে একটি গান পেয়েছি—ঠিক আমার মনের মত।” রাজা কহিলেন, “আমার কোন গানটি তাের মনের মত নয়—সেইটি বল দেখি, রাণি ?” *এ গানটি বাবা-সব-চেয়ে আমার মনে বসেছে। যেন আমারি মনের কথা তুমি প্রকাশ করেছ। একটি সুর বসিয়ে নিয়েছি,শুনবে বাবা, গানটি ? তাহার পৃষ্ঠে সাদর হস্ত বুলাইয়া কহিলেন, “বেশ, গাও হে তুমি গুণী আমার গানটি তােমার তানে ভাল করে নি। সেতারের পরিবর্তে তানপুরাটা হাতে তুলিয়া লইয়া তাহাতে ঝঙ্কার দিয়া রাজকুমারী গান ধরিলেন- বড় সাধ, বড় আশা, বড় আকিঞ্চন, পরাতে, জননি, তােরে রত্ন আণ ! জানি দীন-হীন অতি, ক্ষুদ্ৰবল ক্ষুদ্র মতি, অপার আকাঙ্গা তবু না মানে বারণ! বাসনার বলে বলী, কেবলি আপনা ছলি অসাধ্য-সাধন-তরে প্রয়াস যতন। শান্ত ক্লান্ত প্রতিদিন, নিরাশায় আশাক্ষীণ তবুও দুরাশা মনেনহে সম্বরণ ! এ দুর্বল বা জোরে বিদরি ভূধর বরে তুলিবারে চাহি হীরা মাণিক রতন। ১১৪ নং মাহিরীটোলাট, কলিকাতা।
এমারী দেবী এণত
স্বপ্নবাণ
মাটী তুলি ফেলি আর উঠে কাচ-শিলা তার
তাহাই চরণে আনি করি সমর্পণ।
মাগাে, এ জীবন সারা-কাটিবে কি এই ধারা !
প্রাণের বাসনা আশা শুধু কি স্বপন?
গান শেণ করিয়া তানপুরাটা যখন জ্যোতির্ময়ী নামাইয়া
রাখিলেন, তখন তাহার নজরে পড়িল, বিছানার এক প্রান্তে
শরৎ ও অনাদি আসিয়া বসিয়াছেন। রাজাও সেইদিকে
চাহিয়া আহলাদসহকারে বলিয়া উঠিলেন, “আরে, ডাক্তার
যে !” শরং হাসিয়া বলিলেন, “গান শােনার লােভ সম্বরণ
দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিলো-ক্ষমা করবেন।”
“ক্ষমা ! আজ আমাদের গানের মজলিস যথার্থ ই সার্থক।
কতদিন তুমি আসনি, বলদেখি! ওঃ, কি ভাবনাটাই লাগিয়ে
দিয়েছিলে হে!”
শরৎকে দেখিয়া জ্যোতির্ময়ীর হৃদয় আনন্দে উথলিয়া
উঠিল, কিন্তু মেবগ্ৰন্ত পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায়--সে আনন্দ 'সহসা
নিরানন্দের মধ্যেই ঢাকিয়া পড়িল।
শরৎ যখন বলিলেন, “রাজকুমারি, আর একবার গানটি
গাবেন ?”
তখন রাজকুমারী কহিলেন, “বড় শান্ত মনে হচ্ছে ডাক্তার-দা,
গাইতে ইচ্ছা হচ্ছে না আর।”
শরৎ আর কিছু বলিলেন না। রাজা বলিলেন, “আজ যে
তোমার মামা তােমাকে দেখতে আসছেন শরৎ। প্রতি মুহুর্তে
কমলিনীশৱিত্যশি,
বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
খবাণী
তার অপেক্ষা করছি—এতক্ষণ ত আসা উচিত ছিল, বােধ হয়
ট্রেণ,লেট হয়েছে।”
বিষাদকাতর মন লইয়া রাজকন্যার আর এখন অন্য
কাহারও সহিত দেখা করিতে ইচ্ছা হইল না। তিনি তাড়াতাড়ি
বলিলেন, “তবে আমি এখন যাই বাবা। তােমরা ত কাজ কর্মের
কথায় ব্যস্ত থাকবে,-খাবার সময় তার সঙ্গে দেখা হবে।”
নিমন্ত্রণ আমন্ত্রণ ব্যতীত প্ৰা । দিনই প্রায় রাঙ্গাবাহাদুর
অন্তঃপুরে মাতার নিকট বসিয়া ভোন করিতেন।
আহারান্তে অন্তপুর হইতে বৈঠকখানায় আসিয়া বৈষয়িক
প্রসঙ্গ উত্থাপনের পূর্বে শ্যামাচরণ কহিলেন, “তারা যে বড়
তাগিদ দিচ্ছেন ?” বলা বাহুল্য তাগিদদার আর কেহই নহেন,
শ্যামাচরণই স্বয়ং এখানে কন্যাকর্তা।
রাজা মুখের মত বলিলেন, “আপনিও উকীলদের তাগিদ
দিন, টাকা মজুত ত?”
শ্যামাচরণ মাখা চুল কাইয়া কহিলেন, 'না, আমি আর এক
কথা বলছি। মেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ; আর তারা কাল বিলম্ব
করতে চান না, আমাকে বলে দিলেন অভ্রাণেই দিনটা ঠিক
করে যেতে। কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা না কয়ে ত আমি
মহারাণীকে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারিনে।”
রাজা এইবায় কথাটা বুঝিলেন, বিশিত ভাবে কহিলেন,
‘নে আপনি?”
“আমি কেপিনি, কিন্তু ক্ষেপিয়ে তুলেছেন তাদের আপনি?
T =
১১৪ নং:আহিরীটেট, কলিকাতা।
वामांबीवी बनेर অথবাণী “আমি তাদের ক্ষেপিয়ে তুলেছি? অশ্যার্থ ?” কথাটা কি এতই দুর্বোধ্য ! যে মূহর্তে আপনি কন্যার মালা গ্রহণ করে-তার হাতে আংটি পরিয়ে দিয়েছেন সেই মুহর্তেই আপনার ভাবীপত্নী বলে তাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।” রাজা সতেজে কহিলেন, “আমার মনে সেরূপ কোন অভিসন্ধিই ছিল না—আপনারা দেখছি বিলিতি” শ্যামাচরণ কাণে আঙ্গুল দিয়া বলিয়া উঠিলেন, “ছিঃ ছিঃ- ও কথা বলবেন না। এ কথা শুনলে—তারা কন্যাকে চিরকুমারী রাখবেন, তবু আপনাকে কন্যা দান করবেন না এতক্ষণে শ্যামাচরণ কন্যাপকের তরফ হইতে একটা সত্য কথা কহিলেন। রাজা লজিত হইলেন,-শ্যামাচরণ বলিলেন, “আপনি বিজ্ঞ পুরুষ, আপনার ব্যবহারে লােকে বালকের অবিবেচনা প্রত্যাশা করে না। এখন যদি আপনি তাকে প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে আপনার ব্যবহার দুমন্তের ন্যায় অনুচিত হবে। রাজা গভীর হইয়া পড়িলেন—কিছু পরে বলিলেন, , “অসন্তৰ- অসম্ভব, ইচ্ছা থাকলেও আমার পক্ষে বিবাহ করা এখন অসম্ভব।” “কেন?” উগ্র ধরে রাজা উত্তর করিলেন, “আপনি ত আমার চেয়েও বিজ্ঞ—আর এইটুকু বুঝতে পারেন না? রাণী-মা আমার অবিবাহিত আর তার বুড় বাপ বিয়ে ক'রে কনে ঘরে আনবে?” কমলিনহিত-মন্দির,
১৬৯
ঐশ্বর্ণকুমারী দেবী এত
স্বপ্নবাণী
?
খামাচরণ হাসিয়া কহিলেন, “বয়সেই যে লােকে বৃদ্ধ হয় না
আজ আপনি তার অকাট্য প্রমাণ দিচ্ছেন। শিশু সুলত স্বভাব
নিয়ে আপনি দেখছি, কল্পনাকাশেই বিচরণ করে বেডু
বেল
পৃথিবীর মাটীর দিকে মোটেই নজর পড়ে না আপনার।”
রাজাও এইবার একটু হাসিয়া বলিলেন, “অত ভণিতার
আবশ্যক কি? খুলেই বলুন না আপনার মনের কথাটা?”
“আপনার কন্যা যে ধরা পড়েছেন, বিশ্বশুদ্ধ লােকে সে
খবর জানে—আর আপনি জানেন না ?
“শরৎকুমারকে মালা উপহার দেওয়াতে কথাটা রটেছে বােধ
হয়—কিন্তু আমি ত রাণীর ভাবে সে রকম কিছু বুঝিনি,
দেশমঙ্গল কাৰ্য্যেই ত সমস্ত প্রাণ মা উৎসর্গ করেছেন। আপনি
বা বলছেন তা যদি সত্য হয়, তাহলে আমি খুবই সুখী হই।”
“সর্বতােভাবেই আপনি সুখী হবেন রাজাবাহাদুর। অণুভার
বিবাহে আপনারা সকলেই ত আসছেন—তখন বুড়’ শ্যামাচরণকে
ঘটক বিদায় দেবেন।”
রাজা হাসিয়া বলিলেন, “বেশ, তাই হবে।”
.
সে রাত্রি জ্যোতির্ময়ীর অনিদ্রায় কাটিল। সন্ধ্যার সমস্ত
ঘটনা কখনাে সংলগ্ন ভাবে কখনো অসংলগ্ন ভাবে তাহার মাথায়
ঘুরিতে লাগিল। কালীমুৰ্ত্তি আর শ্যামসুন্দর ও রাধারাণীর
যুগলমূৰ্ত্তি, শরতের সুন্দর রূপ আর পিতার বিষাদপূর্ণ কণ্ঠধ্বনির
মধ্যে তাহার বিভ্রান্তচিত্ত-কখনাে আনন্দে, কখনাে নিরানন্দে
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
অপবাণী
--
আত্মহারা হইয়া ফিরিতে লাগিল।
পাশের গলিপে কুন্দ যে
শুইয়া আছে, সে কথা ভুলিয়া গিয়া মৃদু গুণগুণ কণ্ঠে তিনি
একবার গান ধরিলেন
বড় সাধ, বড় আশা, বড় আকিঞ্চন -
দুই চারি লাইন গায়িবার পর তাহার মনে পড়িয়া গেল
কুন্দ জাগিয়া উঠিতে পারে—গান থামিয়া গেল। কুন্দ তখন
ডাকিল, রাজকুমারি !”
জ্যোতির্ময়ী এতক্ষণ বিছানায় শুইয়াছিলেন, উঠিয়া বসিয়া
বলিলেন, “তােমাকে জাগিয়ে দিলুম কুন্দদিদি?”
“না রাজকুমারি, আমারও ঘুম হচ্ছে না, গানটি ভাল করে
গাও না ভাই, শুনি?”
“না কুল দিদি, কি হবে গেয়ে? গানে ত আমার বাসনা
পূর্ণ হবে না।”
কুন্দ বুঝিল-কতখানি নৈরাশ্যে তাহার মৰ্ম্মাহ হইতেছে ।
সে কহিল, “একটি কথা বলব রাজকুমারি ? 'কিছু মনে করবে
?”
“ল ভাই, বল ! কিছুতে আর কিছু মনে করব না, মনে
করবার বলটুকুও হারিয়েছি।”
কুল ব্যথিতচিত্তে কহিল, “আমরা যে পথে মুক্তি চাচ্ছি, সে
পথে দেশের মুক্তি নেই রাজকুমারী।”
“বল দিদি, কোন পথ ধরব তবে?”
“আমরা জানিনে সে পথ। আমরা অন্ধ,
কমলিনী-শাহিত্যমন্দির,
১৭১
স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত
অপবাণী
পথ দেখিয়ে দিতে পারেন।
গুরুর ইঙ্গিতে আমাদের চলতে
হবে।”
।
জ্যোতির্ময়ীর ক্ষুব্ধ বায়ুস্তরঙ্গিত অশান্ত হৃদয়ের উপর দিয়া
সহসা আশার মুহিল্লোল বহিয়া গেল,—তিনি শান্তভাবে
কহিলেন, “তেমন গুরু কোথায়?”
উত্তর হইল—“আছেন, আছেন !”
“পেয়েছ তুমি?”
“পেয়েছি।”
“আমিও কি পাব ?”
“নিশ্চয়-নিশ্চয়। অন্তর থেকে যে যাহা প্রার্থনা করে
ভগবান তাকে তা মিলিয়ে দেনই দেন।”
“কবে পাব?”
“তিনি শীঘ্র এখানে আসবেন। তিনিও এই পথের পথিক।”
“কোন্ পথের পথিক ?”
“দেশ-উদ্ধার তঁাদের ব্রত। তারা পথ চিনেছেন তাদের
নেতৃত্বে আমরাও পথ পাব।”
অধীর বালিকা নিজের শয্যা ত্যাগ করিয়া কুলের শয্যায়
আসিয়া আবেগভরে জিজ্ঞাসা করিল, “ঠিক বলছ কুল দিদি ?
বাসনা সফল হবে আমার? পারব আমি-পারব--আপনাকে
দিতে পারব ?”
বালিকা আর পারিলেন না—তাহার হৃদয়ের বিপ্লব অশ্রুধারে
উথলিয়া উঠিল,কুলের পাশে শুইয়া তিনি রােদন করিতে
১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
কুমারী নাৰী এণত
স্বপ্নবাণী
১১২
লাগিলেন। কুন্দ রাজকুমারীর বাক্যের মর্ম, অশ্রুধারার অর্থ ঠিক
বুঝিল না, স্নেহে মাতার ন্যায় তাহার মাথায় হাত বুলাইতে
বুলাইতে তাহার প্রশ্নের উত্তরে আবার সে কহিল, “নিশ্চয়,
নিশ্চয়,আশ্বস্ত হও রাজকুমারী।”
রাজকুমারীর অ স্তিমিত লােচনে ধীরে ধীরে পূর্বের স্বপ্নদৃষ্ট
দেবী মূর্তি বিভাসিত হইয়া উঠিলেন। জ্যোতির্ময়ী বিস্ময় আকুল
ভাবে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি ! তুমি মাতা সাম্য মৈত্রীর
অধিশ্বরী, দেবী বিচিত্রা! বল,বল দেবী, সেদিন কি আবার
আসিবে! তােমার অরুণ চরণ স্পর্শে ভারত ভাগ্য-গগন পুনরায়
কি পুণ্য প্রভাত-মহিমায় সমুজ্জল হইয়া উঠিবে ?
দেবী মৃদু হাসি হাসিয়া অন্তর্ধান হলেন-স্বপ্নলীন
হইয়া পড়িল বালিকার স্বপ্নবাণী।
(বিচিত্রার পরিসমাপ্তি)
সাহিত্য-সম্রাজ্ঞী স্বর্ণকুমারী দেবী মহােদয়া প্রণীত
স্বপ্নবাণীর পরিসমাপ্তি
মিলন-ব্রাজি
তিনি সুস্থ হইলেই প্রকাশিত হইবে।
উপন্যাস পাঠেছু সাহিত্যামোৰী মাত্রেই তাহার সত্বর আরােগ্য কামনা করুন।
. “। উপন্যাস-সিরিজ-১ম বর্ষ আশ্বিন সংখ্যায় প্রথম উপন্যাস চৈত্র সংকার সপ্তম উলঙ্গাস দার্শনিক পণ্ডিত উপন্যাস-ধুরন্ধর শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্রমােহন ভট্টাচাৰ্য্য শ্ৰীযুক্ত ক্ষেমোহন ঘােম প্রণীত প্রণীত ৭। দীপালি। ১। পাষানী। মূল্য ১, এক টাকা না | মূল্য ১, এক টাকা মা। এভবৈ!খের নব-উপন্যাস কাঠক সংখ্যার দ্বিতীয় উপন্যাস সাহিত্যসম্রাজ্ঞী মঞ্চসম্পাদক যুক্ত কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত যুক্তা স্বর্ণকুমারী দেবী গ্রথিত ৮। বিচিত্রা। এম-প্রণীত মূল্য ১, এক টাকা মা ০ ল্য : এক ট! মা • জৈষ্ঠ সংখ্যার নবম উম্মস গ্রহায়ণ :্যায় তৃতীয় উপহাস উপন্যাস-যাদুকর বসুমতী-সম্পাদক মুক্ত প্রফুল্লচন্দ্র বসু প্রণীত যুক্ত হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘােষ ১! বাঙর, : বি-এ প্রণীত মূল্য ১ এক টাকা । ৩। চোরাবালি। আষাঢ় সংখ্যার ঘম উপন্যাস মূল্য ১ এক টাকা মা। উপন্যাসকেশরী পৌষ সংখ্যার চতুর্থ উপন্যাস শ্রীযুক্ত নবকৃষ্ণ ঘােষ, বি-এ প্রণীত যুক্তা শৈলবালা যােজায়া সরস্বতী প্রথিত ১০। গোধুলি। ৪। মহিলাদেবী। মূল্য ; এক টাকা মা: lo মুলা ১ এই টাকা মা; lo শ্রবণ সং•ার এ উপন্যাস আর্য সংখ্যার পঞ্চম উপন্যাস উপন্যাসাচাৰ্য্য ভারতী-সম্পাদক, পণ্ডিত শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য শ্ৰীযুক্ত সৌরীন্দ্রমােহন মুখোপাধ্যায় প্রণীত বি-এল প্রণীত ১১। ভূদের সুদ। ৫। দরদী। মূল্য ১, এক টাকা মা। ভদ্র সুখ্যায় দশ পয়স কৰ সংখ্যা উপলদি পরিতলায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য স্বাধিকারী ও পৰিচালক শ্ৰীযুক্ত শরৎচন্দ্র পাল প্রণীত ১২। অমএগােজী। ১১ এ গা মto , উপন্যাস-সিরিজ-২য় বর্ষ । বঙ্গ-বিজেতৃ উপন্যাস লেখিকা ফান সংখ্যার অষ্টাদশ উপসি ঔপন্যাস-ম্রাজ্ঞী সর্বজনশ্রদ্ধেয় শ্ৰীযুক্তা নিরুপমা দেবী প্রণীত শযুক্ত দুর্গাদাস লাহিড়ী প্রণীত ১৩। উচ্চঙ্গন। . ১৮। মণবেগম। মুল্য ১ টাকা ম। মু: ১, টাফ। । কার্ত্তিক সংখ্যার চতুর্দশ উপন্যাস “চৈ সংখ্য: উনবিংশ উপস্থ’স যুক্ত,সরসীলা বসু প্রণীত সাহিত্য-সম্রাট ১৪। এতষ্ঠা। বঙ্কিমচন্দ্রের ভুতুষ্পৌত্র মূল্য ১ টকা ; শ্ৰীযুক্ত প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায় । হায়ণ সংখ্যার পঞ্চণ উপস শ্ৰীযুক্তা শৈলবালা ঘােষজায়া সরস্বতী প্রণীত ১৯।'রাঙ্গতের মেয়ে। মু* ১ : মা'। ১৫। ঘণহতা মুল্য ১ টাকা । গুত বৈশ বিংশ উপস পৌষ সংখ্যার দশ উপন্তান উপন্যাসাচাৰ্য্য পণ্ডিত নারায়ণচন্দু ভট্টাচার্য উপন্যাসাচার্য প্রণীত পণ্ডিত শ্রীনারায়ণ চন্দ্র ভট্টাচার্য প্রণীত ২০। লক্ষীৰ কোটা। ১৬। কালোমেয়ে। মূল্য ১ টায় ঃ 1o মূল্য ১ টাকা মা | জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় এক৭িংশ উপন্যাস মাঘ সংখ্যার সপ্তদশ উপন্যাস সাহিত্য-সম্রাজ্ঞী। যুক্ত সরসীবালা বসু প্রণীত শ্ৰীযুক্তা স্বর্ণকুমারী দেবী প্রণীত ১৭। চরকার উৎসব। ২১। স্বপ্ন। মুস} ১ টা। নাঃ 0 মুগ ১২ টাকা আ: ০ প্রতি মাসেই একখানি করিয়া নূতন উপন্যাস প্রকাশি হয়। আমাদের উপন্যাস-সিরিজের নিয়মিত প্ৰাহক হইলে প্রত্যেক খন ঘরে বসিয়া সভাক ১/• এক টাকা এক অনায় পাইনে! সন ১৩২ সালের আশ্বিন, হইতে বর্ষ আরম্ভ হইয়াছে। গােষ্ঠবিহারী দত্ত, স্বত্বাধিকারী-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির, শরৎ চন্দ্র পাল ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ক্রট, কলিকাতা।
যৌতুক দিবার জন্য ১১ দামের এই বইখানিই খুব সরেশ ! শরৎচন্দ্র পাল প্রণীত জন্ম-এরােজী। জন্ম-এয়ােস্ত্রী জন্ম-এয়ােস্ত্রী স্ম-এয়ােস্ত্রী জন্ম-এয়ােস্ত্রী জন্ম-এয়ােস্ত্রী ‘জন্ম-এয়ােস্ত্রী’ হাতে দিয়া.নব-বধুকে আশীর্বাদ করিতে হয় । ‘জন্ম-এয়ােন্ত্রী হাতে পাইয়াই বধূ মাতার—উপহার দাতাকে নমস্কার করিবেন- ৰাবীদের সহিত গল্প করিবার সময় বিয়ের সময় একখানা বই পেইছি, সেখানার নাম “জন্ম-এমােন্ত্রী”—এ কথাও উত্থাপন করিতে পারেন। ‘বই ত বই, জগৎ-সংসারে এমন অনেক বই-ই পয়সা দিলে মেলে’- ‘জন্ম-এয়ােস্ত্রী’ সম্বন্ধে যাহারা এ কথা বলিবেন ; তৎক্ষণাৎ জন্ম-এয়ােস্ত্রীর যে কোন দু একটা পরিচ্ছেদ পড়িয়া নাইবেন, অদৃষ্ট পূর্ব সমালােচক মহাশকে সলজ্জহাশ্যে বলিতেই হইবে - “ত, তা আগে ত জানতুম না, তা দেখ ! বইখানা কোথায় পাওয়া যায় যা ?” অপ্রস্তুত না হইয়া তখনি ঠিকানা বলিয়া দিবেন। কমলিনী-সাহিত্যবি-১১৮ নং আহিরীটোলা ফ্রীট, কলিকাতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.