Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Malya O Nimarlya Ed. 2nd

2009/11/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

মাল্য ও নির্মাল্য।
আলাে ও ছায়া এণেতৃ-প্রণীত।
দ্বিতীয় সংস্করণ
কলিকাতা
ইং ১৯১৮।

কলিকাতা
১১৫ সি, আমহাষ্ট্রীট, একৃমি প্রেসে
এ, রহমান দ্বারা মুদ্রিত ও
১৮ নং বেলতলা রােড,
শ্রীসুধীরকুমার সেন, বি, এ, দ্বারা
প্রকাশিত।

** মাল্য ও নির্মাল্য। সূচীপত্র । বিষয়। পৃষ্ঠা। মাঙ্গলিক ••• মালা ••• ০ ০ • আমারি ভুল . ০ ০ তিরস্কার ••• কে যেন সে ভালবাসে ••• ••• ••• ••• ••• ৭ ০ ০ • ••• ১ ০ ০ ০ শৃঙ্খলিত। বিস্মিত। হৃতাভিজ্ঞান ক’রন জিজ্ঞাসা ভিখারিণী ফিরিবে না * * ০ ০ ০ ৩ ০ ০ ০ .

বিষয়। পৃষ্ঠা ••• ৮০ কর্তব্যের অন্তরায় দাড়াও | | ••• ••• হাত . . ••• ১৭ ১৭ পুষ্প প্রভঞ্জন ••• ••• চির দূরত্ব ১১ . . . ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ পদধ্বনি এসাে একবার একটি বাসনা উপেক্ষিত ২৪ ••• ভালবাসা ••• ••• ১৮ # # ৬ ••• . এ. ••• থাকুক ঋণ প্রতিভার প্রতি প্রেম ০ ১ ০ ৩১ •• ••• *•• পঞ্চ ও পঙ্কজ আশীৰ্বাদ ••• ••• ••• ••• কবির কামনা আত্মবিস্মৃত বুঝিবে যেমন বার মন হাসাে কোথা ছায়া আবি। ••• ••• * * * ••• ৪২ | বিষয়। পৃষ্ঠা। আধঘুমে ০ ০ ০ ৪৫ ১৬ ৪। ৪৮ ০ ০ ০ ••• ৪১ ০ ০ ০ কি জানি কি শুভ যােগ কোথা বাঁধা আছে স্বাধীন এ হিয়া •• আমি এ অতৃপ্ত অপূর্ণ আমি প্রাণপণ করে কাছে আসি ঘনীভূত অন্ধকারে ফেলে আমি এত করে আপনারে শাসি তােমার লাগিয়া দূরে ফেলে দিনু... আর কি আসিবে, আর কি হাসিবে তােমাদের মাঝে তােমাদের কাজে আলিতে বলিলে যদি মনােনীত, তুমি যবে হলে অদর্শন তুমি যে ফিরিবে তাহা জানিতাম মনে ••• কেমনে গাহিব আমি গান ? ১ । । ১২ ৩ . . ••• ৭ উপকথা ৫. এ ••• . . ৭০ তিন কন্যা ইন্দু ও যামিনী... যত যায় দিন আকাঙ্ক্ষা t at ••• বিষয় । পৃষ্ঠা নীরবে = ৩০ ••• ৮ঃ ••• ••• সংসার জ্ঞান ৮ ৮ ৬. . | ০ ০ ••• ••• ০ ০ ০ ৪০০ ••• ••• ••• ••• ৮ ০ ০ আক্ষেপ উষার মরণ সৌন্দৰ্য্য ও ভালবাসা আমাদের কেহ তুমি নও সংশয় নির্ণয় নববর্ষ সংকীর্ণ স্বাতন্ত্র মিলন মহত্ত্ব বিদেশী ১৪ ৪ . . ১৭ • ••• ১৮ ৮ ••• r ০ ০ অনাদৃত তােমাদেরে ভালবাসি । . . কি গাব? . . . ১৫১ trE . . . . cs । । বাঁধন না মানে ঝাঁপ প্রায়শ্চিত্ত বুঝিবা হ'ল না ০ ০ ০ ৮ ০ ০ বিষয়। পৃষ্ঠা। ঢেউ ০৫০ ০ ০ ০ সম্মুখ ও পশ্চাৎ ৮০০ ৫ . * ••• ৮০০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ১০৮ nE ••• ৮ ০ ০ প্রবাসে বনদেবীর গান লইবে কি ? চাই দেশালাই গিরিদেশে বর্ষা সাগরে সঙ্গীত অজানারে হবে জানিতে ঝাপ দিয়া পড় শারদীয়া ১১১ ০ ০ ৮. . ১১২ ০ ১১৭-১২৮ যাত্রা ১১৭ ০ ০ ০ . ৮ । কি দেখাব ? ১১৮ পান্থশালা ১১১ ০ ০ ০ ৮০০ ••• ••• ১২ । ১২২ ৮০০ ••• যমুনা-কল্পনা निवौ স্মৃতি চিহ্ন ... সাজাহান প্রাচীন কীর্তি দর্শন কুমারী কমল ১২৪ ০ ০ ০ ••• ০০০ .

বিষয়। পৃষ্ঠা। ••• উৎকণ্ঠা প্রিয় গ্রন্থগণের প্রতি | নারীর অভিমান ••• ••• ••• p পুরুষের সান্ত্বনা ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৪ . . ৫ । ১৩৮ ৪ ৫ ৬ ১৮ ১৪০ s pr ১৪৬ ৮ ০ ০ . অযােগ্য ও যােগ্য প্রেম নিরুপায় যবে ছিল ভালবাসা বর্ষশেষে ••• পরিণতি একদিনের ছুটা ••• হিসাব ••• কেহতো জানে না •• দীনের বাসনা কোথা ছিঃ আসিনু কোথায় পিতা তুমি অভাব কি থাকে অপূরণ নব উপহার পুরাতন বর্ষের প্রতি নববর্ষ আবাহন ও ৫০ ৮ । । । ০ ০ ০ ১৪ ৪ . . ০ ০ ৫ ০ ০ ১৫৮ ৮০ . . .

মাল্য ও নির্মাল্য
মাঙ্গলিক ।
আসিল কি মধুমাস ধরণীর দেহ হতে
অপসারি নিদারুণ শীত?
আজি এই উষালােকে কোথা হতে আসে ভেসে
বসন্তের সুমঙ্গল গীত ?
“যে দেশে আছিস্ তাের সৌন্দর্য্যের শেষ নাই,
জরা সেথা শিশু যউবন,
পুরাতন নাহি সেথা, নূতনের চিরলীলা,
জীবনের জনক মরণ।
সরিতে
নূতন
নীর, ফুলবনে নব ফুল,
ঘরে ঘরে শিশুদের হাস,
মানবের হিয়া মাঝে উদিছে নৃতন আশা
যেমন বরষ দিন মাস।”

২
মাল্য ও নির্যাল্য।
মালা।
যেমন ঝরিছে ফুল, তেমনি ত্বরিত
বন লক্ষ্মী ফুটাইছে আর,
বিহগ সঙ্গীতে বন করে মুখরিত,
আয়ুঃ খানি কত দীর্ঘ তার?
দেখে কি না দেখে কেহ, ফুটুক জীবন,
শশানে কি না শশানে, গান গাও;
এক সুত্রে জন্ম মৃত্যু, আনন্দ বেদন,
মালা গাঁথি শ্রীচরণে দাও।
তামারি ভুল।
সকলি আমার মানসের ভ্ৰম ?
বিষাদ বিকল আঁখির ভুল ?
আমার নয়নে সবাই কাদিছে,
পৃর্থীর বাতাসে শােকের ধূল।

তিরস্কার।
মেঘের চরণে কাতরে কাদিছে,
চাতক, নিদাঘে পিপাসাকুল,
প্রভাতে ফুটেছি, শুকাব সন্ধ্যায়
বলি, নতশিরে কঁদিছে ফুল,
কি জানি কি বলি তটিনী কঁদিছে,
ধীরে নিশ্বসিছে বিটপি কুল ;-
আমারি নয়নে বিষাদের ছায়া,
এ শুধু আমারি পরাণে ভুল।।
১৮৮২।
তিরস্কার ।
কুসুম কহিছে মােরে, “বৃথায় ফুটি,
কোমল নহিল তাের কঠিন হৃদয়।”
তটিনী কহিছে, “গাহি বৃথায় ছুটি,
রয়ে গেলি শ্রোতােহীন বদ্ধ জলাশয়।
কহিছে তারকারাজি, “ভাের মুখ চেয়ে
বৃথা হ’ল রাশি রাশি আলাে বরিষণ,
প্রকৃতি যে দেছে দীপ তাহে নিবাইয়ে,
হৃদয়ে আঁধার যদি করিস্ পােষণ।
জুন, ১৮৮২।

মাল্য ও নির্মাল্য।
কে যেন সে ভালবাসে।
কে যেন সে ভালবাসে, আমি নাহি জানি তায়,
কে যেন সে ভালবেসে লুকায়ে থাকিতে চায়,
কে যেন ফুলের মত পাঠায় সুরভি ঘ্রাণ,
আসেনাকো কভু কাছে চাহিবারে প্রতিদান।
নীরবে নিভৃতে, তবু যেন সে নিকটে রহে,
স্নেহ-আকর্ষণে তার হৃদয়ে জোয়ার বহে ;
বুঝি তার ভালবাসা, চিনি তার হিয়া খানি
কিবা নাম, কোথা ধাম, কত দূরে, নাহি জানি।
জুন, ১৮৮৬ ।
লুক্কা।
চুপি চুপি আয়রে হৃদয়,
প্রাণে তার উকি দিয়ে আসি ;
কথা লােকে কতই না কয়,
কথা মােরা কেমনে বিশ্বাসি?
রাজপথে গেয়ে যায় গীত,
অর্থ তার বােঝেনা, যে গায়,
ভাবের তরঙ্গে তরঙ্গিত
শ্রোতায় উদাসী কয়ে যায়।

লুক্কা।
হাসি তার অমৃতের ঢেউ,
দৃষ্টি তার শান্ত সুমধুর,
মাের তারে চিনি না যে কেউ,
তাই তারে রাখি দূর দূর।
সেও বুঝে রাখে ব্যবধান,
লাগে ব্যথা, জাগে সংশয় ;
কে বলেছে তার সেই গান
হৃদয়ের প্রতিধ্বনি নয়?
রুমে সে যে হইছে নীরব,
প্রভাহীন হইতেছে আঁখি,
হাসিটুকু মুছে গেছে সব,
তবু মােরা দূরে দূরে থাকি।
চুপি চুপি আয়রে হৃদয়,
প্রাণে তার উকি দিয়ে আসি,
বলিবার হয়নি সময়
আমরা যে তারে ভালবাসি?
১১।

মাল্য ও নির্মাল্য।
শৃঙ্খলিতা।
তােমার হৃদয়ে আসি,
তােমার প্রেমের লােলভতে ;
শান্তি তৃপ্তি দুই নাশিনু,
কেঁদে মরি সেই ক্ষোভেতে।
স্বপন যেমন আসে গাে,
এ ঘুম ঘােরে ভাসিয়া,
বাঁধিলে কঠিন পাশে গাে,
অতিশয় ভাল বাসিয়া।
এ শৃঙ্খল ভার বহিব,
যাবনা আকাশে উড়িয়া
জন্ম জন্মান্তর রহিব
তােমার পিঞ্জর জুড়িয়া।
বড় গান গেছি ভুলিয়া,
মৃদু প্ৰেম বুলি গাহিব,
পক্ষ কণ্ঠ দুই খুলিয়া
উদিকে নাহি চাহিৰ।

বিস্মিতা।
অথবা যে দিন কহিবে,
সে দিন যাইব চলিয়া,
শেষ গতি মাের বহিবে
অশ্রু জলে জলে গলিয়া।
বিস্মিত।
আমি চেয়ে ছিনু থাকিতে দূরে,
আপন গােপন স্বপন-পুরে,
তুমি কোন পথে, কত সে ঘুরে,
সহসা আসিয়া দাঁড়ালে কাছে ?
মাের আশা ছিল, তপস্যা ফলে
লভি রূপ গুণ, চরণ তলে
ধরিব তােমার; তুমি কি হলে
এনে দিলে তব যা কিছু আছে ?
আমার এ সুখ, অসীম সুখ,
ধরে হৃদয়ে, গলে বা বুক,
তয় কয় কানে, হলে বিমুখ
কেমনে বাঁচিৰে ইহার পরে?”

মাল্য ও নিমাল্য।
সেই ছিল ভাল, বিজন বাসে,
জন্ম জন্মান্তরে পাবার আশে,
তােমার নামটি প্রতি নি সে
করিতাম জপ আনন্দ ভরে।
যারে এ জনমে পাবার নয়,
তারে হারাবার ছিলনা ভয়,
ছিল দীপ্ত প্রেম জীবন-ময়,
জলন্ত অঙ্গারে অনল সম।
পূর্ণ কি তপস্যা এত সত্বর ?
এসেছ কি তুমি দেবের বর ?
হয়েছে কি তবে সুন্দর-তর
সমস্ত অন্তর বাহির মম ?

তাভিজ্ঞান।
একি কথা সুধাইছ, এত কাছে আনি
কোথা ছিনু, কেন এনু, কোথা আমি যাব?
তুমি কি চেননা মােরে ? কহ সত্যবাণী ;
আমি যে ভেবেছি আমি তােমারে সুধাব।
তােমার কণ্ঠের স্বর, তব দৃষ্টি খানি,
মনে হয়, আমি যেন চিরদিন জানি
আশা হ’ল তােমা হ’তে ভাল করে পাব
আপনার পরিচয় ; ওগাে তুমি ভাব।
তুমি কি জাননা, কোথা মাের জন্মভূমি?
জানিয়া কুল শীল, ডাকিলে কি কাছে ?
জনম পত্রিকা মাের পড় নাই তুমি,
দেখ নাই কোন স্থানে কোন গ্রহ আছে ?
তবে তুমি আবােহিয়া সৌভাগ্যের পােতে
চলি যাও, ভাসি আমি অদৃষ্টের স্রোতে।
১৭

১•
মাল্য ও নির্মাল্য।
কর’না জিজ্ঞাসা।
মােরে প্রিয় কর’না জিজ্ঞাসা,
সুখে আমি আছি কি না আছি।
ডরি আমি রসনার ভাষা ;
পেঁহে যবে এত কাছাকাছি,
মাঝখানে ভাষা কেন চাই,
বুঝাবার আর কিছু নাই ?
হাত মাের বাঁধা তব হাতে,
প্রান্ত শির তব স্কন্ধোপরি,
জানিনা এ সুন্নিগ্ধ সন্ধ্যাতে
অ কেন ওঠে আঁখি ভরি।
দুঃখ নয়, ইহা দুঃখ নয়,
এই টুকু জানিও নিশ্চয়।
নীলাকাশে ফুটিতেছে তারা,
জাতি, যুথী, পল্লব হরিতে;
অতি শুভ্র, অত্যুজ্জল যারা,
আসে চলি আঁধার তরীতে।
ভেসে আজ নয়নের জলে
কি আসিছে, কে আমারে বলে?

কর’না জিজ্ঞাসা ।
( ২ )
খসে কেমন যাদুকর,
তাকাইলে হয় অন্তর্ধান,
ডাকিলে সে দেয়না উত্তর,
চাহিলে সে করে না তো দান।
দুঃখও যে হইলে অতীত
সুখ বলি হয়গো প্রতীত।
সুখ সাথে আছে, কি না আছে,
কাজ নাই প্রশ্ন মীমাংসার,
চলিছে সে পার্শ্বে, কিবা পাছে ;-
সুখ দুঃখ চেনা বড় ভার;
আমরা দুজনে দুজনার,
পিছে পাশে দৃষ্টি কেন আর ?
ওগাে প্রিয়, মাের মনে হয়,
প্রেম যদি থাকে মাঝখানে,
আনন্দ সে দুরে নাহি রয়।
প্রাণ যবে মিলে যায় প্রাণে,
সঙ্গীতে আলােকে পায় লয়,
যত ভয়, যতেক সংশয়।

মাল্য ও নিমাল।
ভিখারিণী ।
এসেছি ভিখারিণী, ভাের হতে বহিদ্বারে
একলা আছিঃ প্রতীক্ষায়ে,
এ হৃদয় ভিক্ষাপাত্র প্রেমে পূর্ণ করিবারে
নীরবে রাখিতে তব পায়ে।
শুনিলাম পদধ্বনি, তুলিনু চকিত আঁখি,
ধীরে ধীরে হিয়া খানি পদপ্রান্তে দিনু রাখি ;
সম্মুখে পাইলে যাহা মৃদু হেসে তুলে নিলে ;-
হেরিলে আনন্দ মাের, তাই ফিরে নাহি দিলে ?
তােমারি সে অনুগ্রহ, দরিদ্রের উপহার
তুলে নিলে ;-ভুলে গেনু কি করিতে হবে আর।
এসেছিঃ ভিখারিণী দীনা,
ভিক্ষাবৃত্তি ছিলনা তত জানা,
জানিনি তাে এত যে কঠিন
প্রাণ দিয়ে প্রাণ টেনে আনা।
ও কিছু”-নারিনু কহিতে,
শিখি নাই চাহিবার ভাষা
ভাল হ’লগিয়ে ভিক্ষা নিতে
যা আছিল সব দিয়ে আসা !

ফিরিবে না।
ভাল হল, তুমি জান নাই
এজনের দরিদ্রতা কত,
ক্ষুধা ঢেকে ঘরে ফিরে যাই,
গান গেয়ে খিদের মত।
ফিরিবে না।
নিকটে আছিল যবে দেখিলেনা চেয়ে,
দূরে গিয়ে আজ তারে চাহ
ভাসাইয়া দিলে তরী, চলিয়াছে ধেয়ে,
ফিরিবে না ঘটনা প্রবাহ।
আর ফিরিবেনা তরী, ফিরাওনা মুখ,
চলে যাও, যথা চলেছিলে,
ভুলে যাও, যারে তুমি দিয়াছিলে দুখ,
স্নেহ যার পায়ে দলেছিলে।
যে দিকে চলিয়াছিলে, চল সেই দিক,
ইতস্ততঃ করনা আবার,
ভুল যদি করে থাক, ভুলে থাকা ঠিক,
ভুল হতে ভুলেতে যাবার

১৪
মাল্য ও নির্মাল্য।
নাহি কাজ। এ জীবন বুদু প্রমাণ
নীরধি সে নিরবধি কাল,
হয়তাে এ দেহ সাথে নির্মোক সমান
খসি যাবে প্রমাদের জাল।
যেখা নাই দেহ, নাই জরা নাই জাতি,
নয়নের মােহ কিবা মানসের ভ্ৰম,
একে অপরেতে মিলে যেথা পূর্ণ ভাতি
আত্মা উঠে উন্নতির ক্রম,
সেথায় হবে না ভুল। ভুলে একে একে
কত বর্ষ হয়েছে তাে পার,
এ যাত্রার আর যত ভুল চুক থেকে
এক ভুল করুক উদ্ধার।
কর্তব্যের অন্তরায়।
কে তুমি দাড়ায়ে কর্তব্যের পথে,
সময় হরিছ মাের ;
কে তুমি আমার জীবন ঘিরিয়া
জড়ালে স্নেহের ডাের,
চির নিদ্রাহীন নয়নে আমার
আনিছ ঘুমের ঘাের ?

কর্তব্যের অন্তরায়।
দুনয়ন হ’তে দূরস্থ আলােক
কেন কর অন্তরাল ?
কেমনে লভিব লক্ষ্য জীবনের
পথে কাটাইলে কাল?
আমার রয়েছে কঠোর সাধনা,
ফেলনা মায়ার জাল।
তােমারে দেখিলে গত অনাগত
যাই একেবারে ভুলে
মুগ্ধ হিয়া মম চাহে লুটাইতে
তােমার চরণ মূলে,
ফেলে যাও তারে, দলে যাও তারে,
নিওনা, নিওনা তুলে।
তােমার মমতা অকল্যাণময়ী,
তােমার প্রণয় জ্বর,
যদি লয়ে যায় ভুলাইয়া পথ,
লয়ে যাবে কত দূর?
এই স্বপ্নাবেশ রহিবার নয়,
চলে যাও হে নিষ্ঠুর ।

মাল্য ও নির্মাল্য।
দাড়াও।
দাড়াও, এ হাত খানি ছুয়ােনাকো হাতে
আপনার হিয়া পানে চাও,
ভেবে দেখ, কোথা ছিলে জীবন প্রভাতে,
মধ্যাহ্ন এ, মনে রাখ তাও।
-
;
তুমি চলে যাও শুধু বাসনার সাথে
চিন্তাহীন, শুধু চলে যাও,
নাহি লক্ষ্য, কিবা আছে, নীত প্রতিবাতে
চিন্তা, পন্থা সকলি হারাও ?
বােঝা পড়া হয়ে যাক্ তােমাতে আমাতে,
হাত কেন? ছুয়ো না, দাড়াও।
ডাকিয়া এনেছি আমি, তুমি দূরে ছিলে ;-
দূরে ছিলে ? ঠিক তাহা নয় ;
দেখা দিতে আধ আধ। যদি দেখা দিলে,
জেনে লই তােমারে নিশ্চয়
তুমি ভালবাসা পেয়ে, দাও ভালবাসা,
ভাসিবারে চাহ স্বপ্ন স্রোতে;
আমার প্রেমের সাথে অনন্ত পিপাসা,
মিটিবে কি তাহা তােমা হতে ?

পুষ্প প্রভঞ্জন।
১৭
নিরমল শুভ্র যাহা সুন্দর মহা,
দিবালােকে হেরিব নির্ভয়,
তাই প্রতি গ্রহ-যােগ্য, না লইব আন্,
থাক–যাও—যাহা মনে লয়।
হাত।
দুখানি সুগােল বাহু, দুখানি কোমল কর,
স্নেহ যেন দেহ ধরি সেথায় বেঁধেছে ঘর,
রূপ নাকি কাছে টানে, গুণ বেঁধে রাখে হিয়া,
আমারে সে ডাকিতেছে ছছাট হাতখানি দিয়া
এ দুখানি শুভ্র বাহু মালা করি পরি গলে,
এ হাত উঠাবে স্বর্গে, ডুবাবে বা রসাতলে।
পুষ্প প্রভঞ্জন।
লঙ্ঘি কোন সাগর উত্তাল,
এলে তুমি ভীম প্রভঞ্জন,
ঘন কৃষ্ণ মেঘ-জটাজাল
আবরিছে অদৃশ্য আনন।

১৮
মাল্য ও মির্মাল্য।
বিদ্যুৎ হানিছে দৃষ্টি তব,
অশনি কহিছে রােষ-বাক্,
আজ আমি নতশিরে রব,
ওষ্ঠাধর খাজ রুদ্ধ থাক্।
আছাড়ি, আস্ফালি, চূর্ণ করি,
শ্রান্ত হয়ে করিবে শয়ন,
নিদ্রা শেষে শান্ত রূপ ধরি
সম্ভাষিবে, প্রসন্ন নন।
চুমা দিয়া আমার আঁখিতে,
দুলাইতে চুলক গুলি,
হাসি আনি নারিব ঢাকিতে,
অধর আপনি যাবে খুলি!
আপনি আসিবে বাহিরিয়া
হৃদয়ের নিভৃত সুবাস,
তুমি মাের ঘিরিয়া ঘিরিয়া
ফেলিবে অতৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস।
কাল,দিব রূপ গন্ধ রস,
মেঘ বৃষ্টি হইলে অতীত,
অরূপের মৃদুল পরশ
আমারে করিবে পুলকিত।
১৯১২

চির দূরত্ব
আমি যে হেথায় তাহারে খুজি
সে নাহি জানে ;
তবু ভেবেছিনু, আসিবে বুঝি
প্রাণের টানে।
আমার সমস্ত আকুল প্রাণ
*এসগো এসগাে” এক আহবান
তাহার পানে।
দূরে যে রয়েছে দূরেই থাকে,
টলেনাতে প্রাণ প্রাণের ডাকে,
প্রেমের গানে।
মিছা কথা সে যে ভাবুকে কহে,
হৃদয় হইতে হৃদয়ে বহে
গভীর প্রীতি
ডাকিলে তবু আসিবে কাছে,
মুখ ফিরাইলে ফিরিবে পাছে,
ধরার রীতি ?

মাল্য ও নির্মাল্য।
অপূর্ণ দু আধা পূর্ণতা লাগি,
পরস্পরের সঙ্গম মাগি,
জনম ধরে ;
এ উহার তরে, দুইটি আধা,
মিলনের পথে আসিলে বাধা
কঁাদিয়া মরে ;
তাও মিথ্যা বলি মনেতে লাগে,
আত্মার আত্মীয় থাকেনা আগে,
হয় না পরে।
কে কাহারে চেনে, চিনিতে চায় ?
স্রোতে ভেসে এসে পরশি যায়
মুহূৰ্ত্ত তরে।
পদধ্বনি।
১
চারিদিকে বাজে পদধ্বনি,
বার বার চমকে হৃদয়,
কখন বা আবরি নয়ন,
প্রত্যাশার কি জানি কি হয় !

পদধ্বনি।
মুখে বলি, সে তত আসে নাই,
মন বলে “বুঝি আসিয়াছে।”
পুনঃ ভাবি আশা রাখিব না,
নিরাশ হইতে হয় পাছে।
তাই বলি, “ভুলে আছে মােরে,
বলি, আর প্রতীক্ষায় থাকি,
আমি তাে রাখিনা কোন আশা
তবুও সে দেখা দিবে নাকি ?
শুনিয়াছি ব্যাকুলে ডাকিলে
হৃদে যায় হৃদয়ের ডাক,
এ আহ্বান পৌছিয়াছে তবে,
এ বিশ্বের যেথাই সে থাক।
চারিদিকে এত পদধ্বনি,
এত লােক করে যাতায়াত,
মুখ তুলে পথপানে চেয়ে
অধধামুখে করি অশ্রুপাত।
তার পদে সঁপিয়া জীবন
পর পদধ্বনি গােণ কাজ।
কোথা তুমি, কোথা হে অস্তক,
অন্ত কর জীবনের লাজ।

স
মাল্য ও নির্মাল্য।
যেথা পদধ্বনি নাই, কোথা সেই স্থান ?
সেথায় বাঁধিব আমি ঘর,
সৃষ্টির আরম্ভ হতে প্রলয় অবধি
পশে নাই, পাশিবে না নর।
সেই স্তব্ধতার দেশে ফেলিতে চরণ
প্রত্যাশার লাগিবে তরাস,
এ চির বিরহ লয়ে, স্থির নিরাশায়
সেথায় করিব গিয়া বাস।
মুহুর্ভে উঠিছে জীয়া হিয়া মৃতপ্রায়,
মুহূর্তে আবার ম্রিয়মাণ,
তার চেয়ে চির মৃত্যু বহুগুণে শ্রেয়,
করিবে সে চির শান্তি দান।
শব্দহীন, জনহীন, সন্ধ্যাহীন দেশে
ভুলি যাব এক চিন্তা-ঐ আসিছে সে।

এসো একবার।
তুমি শুধু একবার এসাে,
শুধু একবার।
মুখ তুলি চাহি নাই কিছু,
লাজে অভিমানে,
এ প্রাণের ব্যাকুল বাসনা
মিশে আছে প্রাণে,
বেশী কিছু চাহিব না আর,
এসাে শুধু, শুধু একবার।
পুঞ্জীকৃত অতৃপ্ত কামনা,
এই ব্যথা ভার
লয়ে আমি কেমনে হইব
বৈতরণী পার ?
এর মােরে ফিরায়ে আনিবে,
রাখিবে ধরিয়া,
এ জীবনে শান্তি না পাই,
পাবনা মরিয়া ?
না ছাইতে মৃত্যুর আঁধার
এসাে তুমি এসাে একবার।

२४
মাল্য ও নির্মাল্য।
সেই দিন বুঝায়ে বলিব,
বাকী যা বলিতে,
সেই দিন কাহারেও নাহি
চাহিব ছলিতে,
খুলে দিব হৃদয়ের দ্বার
এ তুমি, এসাে একবার ।
একটা বাসনা।
কুরু কুরু শীত শীতল সমীর
বহিয়া আসিছে ধীরে,
অলস কৌমুদী শুভ্র উপাধানে
ব্যথিত তাপিত শিরে ;
শান্তি দিবসের ঘুমায়ে পড়িছে
মধুর পরশে তার,
শাস্তি জাগিতেছে অন্তরে বাহিরে,
একটি বাসনা আর।
সে বাসনা এই আমার হৃদয়
উত্তাপ বিহীন হােক
চন্দ্রের শীতল কিরণ মণ্ডিত,
৫
মৃত অপগত শোক।

উপেক্ষিতা।
২৫
দিবসের শেষে যবে পশিবে সে
দূরে আপনার গেহে,
গবাক্ষের পথে চন্দ্রকর মালা
যেমন ঘিরিবে দেহে,
হৃদয়ে তাহার তেমনি নীরবে
ছায় যেন স্মৃতি মাের,
থাকে যেন তাতে শুদ্ধ মধুরতা,
শুধু আরামের ঘাের।
প্রশান্ত আমার জীবনের ছায়ে
সে যেন গাে শান্তি পায়,
পনেও যেন আমার বেদনা
ব্যথিত না করে তায়।
উপেক্ষিত।
গত যা তা গত প্রিয়,
কেন ভাব আর?
এ নহে সে ক্ষত, প্রিয়,
দাগ শুধু তার।

মাল্য ও নির্যাল্য।
দিন, মাস, বর্ষ, প্রিয়,
কেহ না দাড়ায়,
অবসাদ হর্ষ, প্রিয়,
সাথে লয়ে যায়।
স্বপনের ব্যথা ভয়
রহে কত ক্ষণ ?
সেই ঘােয় দুঃসময়,
ভাবিনি তখন,
স্বপ্নের স্মৃতির মত
কভু ই’তে পারে,
দগ্ধ হৃদয়ের ব্যথা
পারে জুড়াবারে।
মধু মাসে ফুটে ফুল,
ছুটে কত গান,
নিদাঘে পিপাসাকুল
তাধীর গরাণ!
তারপর হৃদাকাশ
ঘন মেঘে ছায়,
অশ্রুধারা দীর্ঘশ্বাস
কত বহি যায়।

উপেক্ষিত।
আজি নিশি শরতের,
শান্তি, পূর্ণ চাঁদ,
ভাবিছ পাতিবে ফের
কুসুমের ফঁাদ?
চলে গেছে মধুমাস
ফুলে ফুলময়,
এ তাে আকাশের হাস,
ধরণীর নয় ।
ফুল্ল জীবনের মায়া
কেটে
দূরে গেলে,
আজ মরণের ছায়া
দেখিবারে এলে ?
আজ ছেড়ে দাও, প্রিয়,
নয়নে আমার
কি দেখিতে সও, প্রিয়,
কেন অশ্রুধার ?
নূতন প্রভাতে নিতে
এসেছে মরণ,
কাল থেকে শান্তচিতে
করিব স্মরণ

২৮
মাল্য ও নির্মাল্য।
জীবনের পূর্বভাগ।
জাননা কি হবে ?
গেছে ক্ষত, এই দাগ,
এও নাহি রবে।
ঘন বাস্পভার আনি
কেন আঁখি লক ?
অচেনা এ হিয়া আনি
আজ চিনে রাখ।
ফিরে দেখা হলে,-হেন
অসম্ভব নয়,
এ জন্মের ভুল যেন
আর নাহি হয়।
জানুয়ারী ১৮৯১।
ভালবাসা।
তবে কি গাে ভালবাসা বাঞ্ছিত উদ্দেশে ভাসা,
ফেলি কুল, ভুলি দিক, গতি নিরুদ্দেশ ?
প্রবৃত্তি পাষাণে ঠেকি পুণ্যের বিনাশ সেকি ?
অকালে অকূলে ইহ জীবনের শেষ ?
মরণ সঙ্কুল ভবে লাগে ভালবাসা তবে
কোন কাজে ? আছে হেথা বাসনার ক্লেশ,

ভালবাসা।
নিতে মৃত্যু অভিমুখ, আছে ভাসিবার সুখ
আত্মার জড়তা, আছে কত ভীরু ভয়, "
দেখায়ে সুখের লােভ, হৃদয়ে বাড়াতে ক্ষোভ
নরের দেবত্ব টুকু করিবারে ক্ষয়,
বাড়াতে ধরার ভার আছে কত কিছু আর,
এই ভালবাসা পুনঃ নহিলে কি নয়?
আমি ভাবি ভালবাসা ভাল হইবার আশা
পরের ভিতরে পেয়ে ভালর সন্ধান,
তার ভালটুকু নিয়া সঞ্জীবিত রার্থি হিয়,
আপনার ভাল যাহা সব তারে দান;
তাহারে নিকটে আনি, অথবা নিকটে জানি,
পূর্ণ করা জীবনের যত শূন্য স্থান।
তােমাদের মনে হয়, এ তাে ভালবাসা নয়,
এ ভাষা সে নাহি কয়, প্রেমিক যে জন,
প্রেম শুধু কাছে টানে, ভাল মন্দ নাহি জানে,
চোখে চোখে রাখিবারে চাহে অনুক্ষণ ;
সে সমস্ত দেহ প্রাণ বিনা অঙ্গীকারে দান,
সে ভীতি ভাবনা হীন আত্ম বিসর্জন।
১২।

৩০
মাল্য ও নিল্য।
থাকুক ঋণ।
সুহৃৎ, আমারে করন মার্জনা,
থাকুক ঋণ,
এ দিনের শেষে যদিইবা থাকে
আর এক দিন,
যদি মনে থাকে অতীত মমতা,
অতীত সুখ,
যদি হৃদে জাগে তাপিত জনের
মলিন মুখ ;
করুণা ও ক্ষমা মহতের হিমা
ভাসায়ে বয়,
তােমাতে আমাতে তবে দেখা শুনা
যদি বা হয়।
যদি দেখা পাই বলে বিচরিব
নগর বন,
প্রতি পথ পাশে প্রতীক্ষা করিব
ব্যাকুল মন,
সহসা আমার তৃষিত আঁখির
মিটাতে আশ,
হৃদয়েতে ক্ষম, নয়নে করুণা,
অধরে হাস,

প্রতিভা ও প্রেম।
দুই খানি হাত বাড়ায়ে ধরিবে
দু’খানি হাত,
কহিবে, “হয়েছে সব অপরাধ
হেথায় শুধিলে সেথা কি আসিবে
ক্ষমার সুখ ?
ভিন্ন দেশবাসী কেহ কি দেখিব
কাহার ও মূখ।
--
০১।
প্রতিভার
প্রতি প্রেম।
তুমি আলােকের মালা, তুমি সকলের তরে
আমি ক্ষুদ্র শুধু আপনার,
সকলে পশ্চাতে রাখি, দাঁড়ায়ে সম্মুখে তব
ধন্য হব, ভুল নাই তার।
তুমি তাে পড়িবে ধরা, দীর্ঘ তব কর জাল,
লােক চক্ষুঃ চেয়ে রবে যত,
আমি যে উঠিব জাগি নিৰ্ম্মল হৃদয়ে তব
এক খণ্ড আঁধারের মত।

মাল্য ও নির্মাল্য।
সমুজ্জল মধ্য তব আমি রাহু ছেয়ে রব,
আমি ক্ষুদ্র, ভূমা ধরাতল,
সকলের আলােভাগ এতখানি আগুলিয়া
জন্ম তব করিব বিফল?
তার চেয়ে দূরে যাই, সকলের চেয়ে দুর,
মুক্ত হােতব রশ্মিজাল,
তােমার আমার মাঝে সমস্ত ব্ৰহ্মাণ্ড যােক
দুল্য, দুর্ভেদ্য অন্তরাল।
কাছ থেকে দূরে গিয়ে বাড়িবে আঁধার মাের,
তুমি তত হইবে উজ্জ্বল,
সবার পশ্চাতে থাকি শুনিব তােমার হয়,
সম্মুখের হর্ষ কোলাহল।
১৯১।

৩
পরু ও পঙ্কজ।
পঙ্ক হতে যথা উঠে পঙ্কজিনী, ভূই চাপা ছাড়ি হই,
আমার হৃদয়ে মূলটুকু রাখি তেমনি উঠিলি তুই,
ততার সাথে মাের জীবনের যােগ, তবু এক নহি, দুই।
জীবনের তক প্রথম অক্ষুর উঠেছে আমারি দেহে,
যতদিন আছ, জীবনের মূল গুপ্ত এ আঁধার গেহে।
যত দূরে যাও আলােক সন্ধানে, বঞ্চিত হবেন। মেহে।
তােমার সৌন্দৰ্য্য যবে উর্ধদিকে উঠিতেছে থরে থর, .
তােমার সৌরভ ছুটিছে বাতাসে, দূর হতে দূরতর, '
শিকড় কখানি বুকে ধরে আমি পুলকিত কলেবর।
তােমারি গৌরব, আঁধার ভেদিয়া উঠেছ আলাের দেশ,
মাটীতে জনমি, বিমল শরীরে রাখনি মাটীর লেশ,
তােমার গৌরব, আমার গৌরব ভাবি আমি নিৰ্বিশেষ।
আশীৰ্বাদ।
বরষ ঘুরিয়া পুনঃ আনিয়াছে, হে কল্যাণ, জন্ম দিন তব,
আমার আশীষ আজ, প্রতি জন্ম দিনে তুমি নব জন্ম লভ।
নির্মল জীবন তব যুথিকা কানন সম উঠুক ফুটিয়া,
নিরুপম শােভা আর মধুর সৌরভ ভার সমীরে ছুটিয়া
৩

মাল্য ও নির্মাল্য।
ভরি দিক দিগ্‌-দশ। যত স্নেহপূর্ণ আঁখি চেয়ে আশা ভরে
তােমার প্রতিভা 'নব উষাসম অবতরি তাদের উপর
করুক আনন্দ বৃষ্টি।
কি আর কহিব আমি, নাহি মাের ভাষা,
বিধাতা জানেন শুধু অন্তরের যত ঈ, যত কিছু আশা।
সাধ্য নাহি পারি আমি ঘুচাইতে কোন ব্যথা, শুধু দিতে পারি
অবিরল আশীৰ্বাদ,-করুন তােমারে রক্ষা সৰ্ব্ব দুঃখহারী,
সর্ব অমঙ্গল হতে। সৰ্ব্ব শােকতাপ যেন লভে অবসান
জীবন্ত সঙ্গীত স্রোতে ; জুড়াইয়া চারিধারে শােক দগ্ধ প্রাণ,
শান্তি দিয়া লভে শান্তি।
অয়ি বরণীয়ে, আমি জানাইব আজ
মাের ভিক্ষা, লহ দীক্ষা, নত শিরে তুলে লও তােমার যা কাজ
আপনার অযােগ্যতা আজিকার দিনে আর কর’না স্মরণ,
ভক্তিভরে আপনাতে প্রতিষ্ঠিত দেবতারে করগাে বরণ।
আছে শক্তি তােমা মাঝে, করিও না অবহেলা দেবের সে দান,
তােমারি ভিতর দিয়া তােমার বাহিরে তাহা সাধিবে কল্যাণ।
দেখিয়াছ এ জীবনে যায় কত মাস, যায় কত সম্বৎসর,
বিস্তৃত স্বপন সম, একটি মুহূর্ত হয় দীর্ঘ যুগান্তর।
তেমনি সফল, সত্য, ব্ৰহ্ম-মুহূৰ্ত্তক যত জীবনের তব
একটি একটি করি করিবে তােমাতে সৃষ্টি দৃষ্টি অভিনব।

কবির কামনা।
দিব্য দৃষ্টি, দিব্য কণ্ঠ, অক্ষয় জীবন লয়ে, মন্দাকিনী সম
বহাও নির্মল ধারা আতপ্ত ধরণী বক্ষে, স্নিগ্ধ নিরুপম
করিয়া উভয় কূল, হরিয়া মালিন্য ভার; নিজে চলে যাও
অনন্ত জলধি পানে, সকল পিয়াসা তব সেথায় মিটাও
গাহি যাও প্রীতিগীতি, বেগবতি, ভােগবতি, বিষ্ণুপাদ-ভবে,
তােমা হতে ভস্মসার কত সগরের বংশ সমুদ্ধার হবে।
অক্টোবর ১৮৯১
কবির কামনা।
মায়ের বুকের শুভ্র ক্ষীরধারা
যেই কণ্ঠে করিয়াছি পান,
সেই কণ্ঠে যেন গেয়ে যেতে পারি
অনিন্দ্য মধুর গান।
এ আননে আছে পিতৃ-মুখচ্ছবি,
অঙ্গে অঙ্গে ছায়া মার,
আসিবে না প্রাণে দুইটি আত্মার
মিলিত গৌরব ভার ?

মাল্য ও নির্মাল্য।
===
পসে রত মায়ের হাতের
পরশ রয়েছে শিরে,
জনকের শত পুণ্য অভিলাষ
মােরে রেখেছিল ঘিরে।
সদা মাের গীতে হউক ধ্বনিত
সেবার বাসনা মার,
পিতার জলন্ত দুর্নীতির ঘৃণা,
অটলতা প্রতিজ্ঞার।
শুনে যেন কহে পরিচিত জন
“তাদেরি তাে সন্তান,
সুধায় অপরে, কোন প্রবণে
এ করেছে সুধাপান?”
১১।
}
-
==
আত্মবিস্মৃত।
এত চেষ্টা করি
বহুবর্ষ ধরি «
বুঝি নিজ মন,
আপনার বুলি
বলি অর্থ তুলি
বল দেখি এ কেমন?

আত্মবিস্মৃত।
কন্তু মনে হয়
স্বদেশ
বদেশ এ নয়,
কোথায় স্বদেশ-জন ?
বিদেশীর মাঝে
এ কোন বলে
কবে তার সমাপন?
কার কাছে যাই, কার কাছে পাই,
ইতিবৃত্ত আপনার,
কি করিতে এসে
রয়েছি বিদেশে
কে দিৰে আভাস তার?
ক
যুগ যুগ পরে,
ইষ্টকে প্রস্তরে
মৃত ভাষা আবিষ্কার
অসব নয়,
আমারি হৃদয়
পড়া কি হবে না আর ?

মাল্য ও নির্মাল্য।
বুঝিবে যেমন যার মন।
আমি কোন জন্মান্তর হতে
এনেছি কি অপরাধ বয়ে,
আমি কি এসেছি এ জগতে
কারামুক্ত-চোর-খত লয়ে,
আমারে যে চলিতে হইবে
সচকিত উৎকণ্ঠিত হয়ে ?
মাঝে মাঝে বলে যেতে হবে
কোথা থাকি, কি যে করি কাজ,
কোন খানে যেতে হলে পরে
কৌতুহলী বান্ধব সমাজ
জানিয়া জানাবে অনুমতি
তবেই পরিব পান্থ সাজ?
এ সকল কিছু না করিব,
আমি কারাে রাখিনাকো ভর,
জন্মিয়াছি পবিত্র স্বাধীন,
চলে যাব সত্যে করি ভর,
তবে নাকি মানব দুর্বল,
ভ্রান্তি শ্রান্তি হয় সহচর।
গিরি পথ উঠিতে উঠিতে
থামি কভু বিশ্রামের তরে,

বুঝিবে যেমন যার মন।
৩৯
কিম্বা যবে কুঙ্কুটিকা আসে,
সম্মুখেতে দৃষ্টি নাহি সরে,
আলােকের প্রতীক্ষায় বসি,
নিরানন্দ আলস্যের ভরে,
নানা সুরে গেয়ে নানা গান,
হাসি আনি আপন অধরে,
ভাবিনাকো সে কালে আমারে
কোন জন কি যে মনে করে।
আমূল হৃদয় খানি মাের
দেখে নিলে লাজ নাহি পাই,
ব্যস্ত নহি লুকাতে আমায়
জানাতে ও চেষ্টা কভু নাই,
আপনার লক্ষ্য পানে চেয়ে
আপনার পথে চলে যাই।
কাল ছিনু উত্তরের পথে,
পূরবে চলি কেন আজ,
সে দিনের অশ্রুভরা চোখে
অ কেন করেনা বিরাজ,
পথে পথে বলে যেতে হবে ?
সে কথায় সকলেরি কাজ?
।

মাল্য ও নির্মাল্য।
আমি তত আসিনি এ জগতে
মানবের লইতে বিচার,
আপনার প্রতি আচরণ
বুঝয়ে বলিতে অনিবার,
বুঝিবে যেমন যার মন,
বেশী বােঝে সাধ্য আছে কার ?
১১।
হাসাে।
দেখ চেয়ে দেখ, সখি, হাসে ফুলদল
অণু অণু বিতরণ করে পরিমল ।
আতপের তাপে কভু আনন শুকায়,
শিশির
মুকুতা পরি কভু শােভা পায়,
মৃদুল অনিল কভু আদরে দোলায়
ঝটিকায় প্রাণবৃন্ত কভু ছিড়ে যায় ;
যতদিন বেঁচে থাকে মুখে থাকে হাস,
স্বজনে বিজনে ঢালে প্রাণের সুবাস।
হাসাে, সখি, মহাবনে আঁধার, নিভৃত
এই ক্ষুদ্র প্রান্তটুকু হােক কুসুমিত।
১৮৮২।
;

কোথায় ছায়া ?
মধুর প্রভাত বেলা,
তরুণ জীবন
অরুণ কিরণে
করিতে করিতে খেলা,
নূতন আশায় ভরিয়া উঠিল, কহিল নূতন ভা,
চারি দিকে তার ফুটিল সহসা, ছিল যাহা অপ্রকাশ।
বাড়িতে লাগিল বেলা,
বাড়িতে লাগিল তপনের তাপ,
ভাঙ্গিতে হইল খেলা,
চলিতে হইল অচেনা পথেতে
খুজিতে ছায়ার দেশ ;
আসিল সে পথে
আনন্দ, বিস্ময়,
কভু ক্লান্তি কভু ক্লেশ ;
কত না উঠিল হাসি অ গান,
দিবানিদ্রা কত বার
কত না দেখাল
সুখের স্বপন,
বিভীষিকা কত আর।
সৰ কাটাইয়া চলেছে পথিক পুঁজিতে ছায়ায় দেশ,
কোথা ছায়া? রবি যবে অন্ত যাবে, রৌদ্র তাপ হবে শেষ।

ર
মাল্য ও নির্মাল্য ।
আবিষ্ট।
আমার কি হল ভাই,
তােমাদের এমন কি হয় ?
জনতার প্রবাহ মাঝারে
ছেড়ে যদি দিই আপনারে,
তীরে কে সে দাড়াইয়া রয়,
শঙ্কিত নয়নে ফিরে চাই।
কেমন যে হয় ভাই,
সতারিতে দেহ নাহি সরে,
ভাসিবারে গিয়া যাই থেমে,
অবসন্ন দেহ আসে নেমে,
ভয়ে, লাজে, অসন্তোষ ভরে,
কুলে উঠি, গৃহে ফিরি যাই।
পাষাণ সে জন, ভাই,
গলেনা টলেনা তার প্রাণ ;
আমি যদি হাসি খল খল,
কিবা ঢালি নয়নের জল,
সে শুধু নীরবে চেয়ে রয়,
হাসি অক্ষ কিছু তার নাই।
কেমন যে রীতি তার
সদা মাের সাথে সাথে ফিরে,

আবিষ্ট।
৪৩
পিছে পাশে রাখে মােরে ঘিরে,
আমি যেন নহি আপনার,
প্রাণে মাের অশান্তি সদাই।
তার উপস্থিতি ভাই,
নিতান্ত অসহ্য হয় কভু
বলি, তুমি কেনহে এমন
সাথে থাকি কর উৎপীড়ন ?
আমি মাের আপনার প্রভু,
তােমার কি কাজ মাের ঠাঁই?
কি আমি বলিব ভাই,
সাধ্য নাহি যাই তারে ফেলে,
সেই তার আঁখি নির্নিমেষ
হৃদয়ে বিধায় তীক্ষ ক্লেশ,
আলিঙ্গিতে যাই বাহু মেলি,
পড়ি তার চরণে লুটাই।
বুঝিয়া না বুঝি ভাই,
সে আমারে কি করিতে চায়,
একা পেলে আকাশের তলে
কাণে প্রাণে কি যে কথা বলে,
কি চেতনা প্রাণ মন ছায়-

মালা ও নির্মাল্য।
অনুভবি কেবল জীবন,
অতীত সে হয় অন্তর্ধান,
নেহারি অনন্ত বর্তমান,
অমৃত পূরিত ত্রিভুবন।
সে শুভ মুহূর্তে ভাই,
আপনারে যাই আমি ভুলে,
অর্গপানে দুটি আঁখি তুলে
বিধাতার যেন দেখা পাই।
কে মােরে বলিবে ভাই,
কে সে জন সাথে ফিরে হেন,
সম্মুখে কি পার্শ্বে কেন রয়,
ছায়াহীন কায়া জ্যোতির্ময়,
আমাতে মিলিত নহে কেন ?
তুমি কহ, তােমারে সুধাই
ওহে মম নিত্য সহচর,
ওহে মাের ভৃত্য কিবা স্বামী,
কেন মাকে রাখ এ অন্তর
ওগাে মাের আমা-হতে-আমি ?

৪৫
আধ ঘুমে
কি জানি কি শুভযােগ, বিপুল জনতা রাজপথে,
আগ্রহ উৎসাহ দীপ্ত, কেহ হাঁটে, ঘােটে কেহ রথে,
সবারি সম্মুখে লক্ষ্য আনন্দ অথবা কোন কাজ,
এমন সময়ে গেহে, একলা তুমিই আছ আজ।
আধ জাগি, আধ সুপ্ত, কুটীর সােপানে সমাসীন,
চরণে আলস্য ডাের, উদ্বিগ্ন হৃদয় শান্তিহীন,
এবশ পথের দিকে দৃষ্টি নত আপন অঙ্গনে,
কেন বসে? চলে যাও, চলে যাও সকলের সনে।
কেহ বা চলেছে দশের ঠেলায়, কেহ বা যশের তরে,
কেহ বা চলেছে চলার আনন্দে, তুমি কেন বসে ঘরে ?

মাল্য ও নির্যাল্য।
একবার আমি যেন শুনেছিনু কার
আহ্বান সঙ্গীত—এস’। খুলি গৃহদ্বার
দাড়ানু সােপনে যেই, জনকোলাহলে
ডুবে গেল ধ্বনি, তুলি হৃদয়ের তলে
‘যাই যাই’—ব্যাকুলতা, তাই পাতি কান
বসে আছি, যদি ফিরে শুনি সেই গান,
তার দিক লক্ষ্য করি চিনে যাব পথ,
তবেই সার্থক হবে সৰ্ব্ব মনােরথ ।
কোথা বাঁধা আছে স্বাধীন এ হিয়া,
জানে কি কেউ?
অশান্তির তলে মরে গরজিয়া
কত যে ঢেউ ?
উদাসীন এই আচার ব্যভার
আবরি রয়
কত অনুরাগ, দুস্পরিহার
কত না ভয়।

আধ ঘুমে।
পারি না পরিতে একা একসনে
দুয়ের সাজ,
পারি না করিতে খেটে প্রাণপণে
দ্বিবিধ কাজ।
পারি না চলিতে মাঝামাঝি পথ
কিনারে পড়ি,
আপনার হাতে ভাঙ্গি মনােরথ
আবার গড়ি।
যাহা পেতে চাই, যাহা হাতে পাই
সদা ভিন্ন এ উভয়
বাঞ্ছিত প্ৰকৃত, স্বপ্ন জাগরণ
কোথা গেলে এক হয়?
আমি এ অতৃপ্ত অপূর্ণ আমি
আমার সম্পূর্ণ আমারে চাই,
দেবের প্রসাদে যাহা হতে পারি,
আজিও যে আমি আমাতে নাই।
অথবা রয়েছে আধ বর্তমান
আলােক-অস্পষ্ট ছবির সমান।

ক.
মাল্য ও নির্মাল্য।
বীজে যথা করে অঙ্কুর বাস,
অঙ্কুরে নিদ্রিত পুষ্পের হাস।
কামনা সাগরে স্বপ্নের দেশে
কল্পনা তরণী বাহিয়া গেলে,
সহসা সে মাের পূর্ণ প্রতিমার
কভু দরশন মেলে।
জড়ের মাঝারে শকতি যেমন,
দেহের মাঝারে প্রাণ,
তেনি এ মাের মাঝারে তাহারে
নেহারি বর্তমান।
অর্ধ সত্য সেই অবিদিত মােরে
ডাকিতেছি আমি চির দিন ধরে।
কবেরে বিকাশি সত্য সে হবে,
আনন্দ সঙ্গীত গাহিব ভবে ?
.
প্রাণ পণ করে কাছে আসি
আবার পিছায়ে চলে যাই,
যত দিন মর্তের প্রবাসী
তত দিন বুঝি শান্তি নাই।

আধ ঘুমে।
৪৯
এই চির ব্যাকুল হৃদয়,
এই নিত্য মিলনেয় সাধ,
যবে একীভূত হয় হয়,
ঈপ্সিত ও প্রকৃতে বিবাদ
তবে থাক্।
তবে চল যাই।
এ জীবন মিথ্যা কভু নয়,
মাঝে মাঝে যদি দেখা পাই,
থেকে থেকে ধরি ধরি হয়।
যত দিন চোখে দৃষ্টি থাকে,
যত দিন চলে এ চরণ,
অনুসরি চলিব তাহাকে
আত্মা যারে করেছে বরণ।
ঘনীভূত অন্ধকারে ফেলে
ওগাে তুমি কোথা চলে গেলে,
আজ আমি কার মুখ চাই ?
প্রতিপদে পতনের ভয়,
প্রতি ক্ষণে জাগিছে সংশয়,
কোথা যাই, কোথায় দাড়াই?

মাল্য ও নির্মাল্য।
হেথা পথ অতীব বন্ধুর,
বন্ধু মাের থাকিও না দুর,
হস্ত তব দুৰ্ব্বলে বাড়াও,
যতক্ষণ থাকে অন্ধকার
থামাওনা তব গীতধার,
প্রীতি আন, ভীতির তাড়াও
দৃষ্টি আসি
পাব আমি দাড়াবার স্থল,
ফিরে পাব প্রতিজ্ঞার বল,
মুছে
দিবে মােহ,
হে সুন্দর, তব অনুরাগে
দিব ঢেলে, যদি কাজে লাগে,
বিন্দু বিন্দু জীবনের লােহ।
আমি এত করে আপনারে শাসি,
সহসা কি স্রোতে কোথা যাই ভাসি,
প্রতিজ্ঞ। আমার বাঁধ বালুকার
এই শ্রোতাে মুখে রবে কি ?

আধ ঘুমে।
প্রখর প্রবাহে বুঝি ভেসে যাই,
এ কি হাবু ডুবু, কি যাতনা পাই,
আমি ভেসে ভেসে কোথা যাব শেষে
আর তীরে উঠা হবে কি ?
কে আমার আছে ঋপি দ্রুত স্রোতে
আমারে বাঁচাবে মৃত্যু মুখ হ'তে ?
এত বল কার ? থাকিলেও ভার
সাধ করে পিঠে লবে কি ?
যাহার আহ্বানে বাহিরিনু পথে,
ভ্ৰমিনু নগর অরণ্য পৰ্বতে,
সে আমার আছে ভেবেছিনু কাছে,
ভুল করেছি তবে কি ?
তােমার লাগিয়া দুরে ফেলে দিমু
সুখের ভােগের সাধ,
প্রেমের চরণে কতনা করি
তব হেতু অপরাধ।

মাল্য ও নির্মাল্য।
কেহ রহিল না বলিতে আপন,
তুমি পর হ’তে পর ;
লভিতে তােমার প্রাসাদ স্বপন
ত্যজিনু সুখের ঘর।
হৃদয়ের ব্যথা চাপিয়া অঞ্চলে,
করতলে অশ্রুজল,
অন্ধকার পথে ঝটিকার তলে
বাহিরিনু নিঃসম্বল।
আর কি আসিবে,
আর কি হাসিবে
সস্নেহে নেহারি মুখ,
বেদনা জানিবে
সান্ত্বনা আনিবে
হৃদয়ে ঢালিবে সুখ?
বহু দিন গেল,
'কত কেহ এল,
অচেনা, অপরিচিত,
তােমার লাগিয়া
রয়েছি জাগিয়া
ওহে চির প্রত্যাশিত।

আধ ঘুমে।
তুমি কত দূরে
কোন্ সৌরপুরে,
কোন্ দীর্ঘ পথ ধরি
শূন্য সিন্ধুবেলা
আলােক তরঙ্গে ভরি ?
আসিছ একেলা
তােমাদের মাঝে তােমাদের কাজে
আমারে লহ গাে ডাকি,
তােমাদের মত খাটি অবিরত
তােমাদেরি হয়ে থাকি।
আমি নিজ নাড়ী নিজ হাতে গুণি,
হিয়ার স্পন্দন কান পেতে শুনি,
করমের করি ফাকি।
নিরজনে থাকি স্বপ্ন মুর্তি আঁকি
তারি সদা করি ধ্যান,
নিতান্ত সে ছায়া,
দানবীর মায়া,
শুধু বধিবারে প্রাণ।
দীপ্ত দিবালােকে করম প্রহরী
নেহারি কুহক দূরে যাবে সার
পাব চির পরিত্রাণ ।

মাল্য ও নির্মাল্য।
আমারে ডাকিছে লয়ে নাম,
সুধীর স্বর
“তুমি বুঝি খুজিছ আরাম,
বাধিছ ঘর ?”
এ আরাম ফেলে চলে যাই
দলিয়া সুখ,
হেথা হতে দেখিতে না পাই
তাহার মুখ।
ঘন মেঘ সম দোহার মাঝ
এ যদি রয়,
তােমাদের হােক, কভু এ কাজ
আমার নয়।
আসিতে বলিলে যদি
এই আমি আসিতেছি তবে
বল দেখি কোন দেশে,
কত দূরে যাইবার হবে ?

আধ ঘুমে।
পরবা এ আত্মায়
রােধিতে নারিনু আমি আর ;
আবার ডাকিলে যদি,
ইন্দ্রজাল করিলে বিস্তার !
লােকান্তরে দাড়াইয়া
‘এস’ বলি ডাক যদি মােরে,
পারিব কি এ জগতে
আমারে রাখিতে আমি ধরে ?
জড় দেহ ভেঙ্গে যাব
এ পিঞ্জর আগুলিলে পথ
তােমার নিদেশ যাহা
তাহাই আমার মনােরথ ।
মনােনীত, তুমি যবে হলে অদর্শন,
অপাতে অন্ধ হয়ে গেল দু’নয়ান,
অকালে ত্যজিল মােরে আমার যৌবন,
কাছে আছিলনা বলে তােমার বয়ান,
সরল মধুর হাস, আঁখি দূরগামী,
স্নেহ মৃদু, দৃঢ় বাহু, অখল ৪রণ,
লাগে নাই ধূলি যাহে ধরণীতে নামি,
তােমার বক্ষের ছায়া, আমার শরণ।

মাল্য ও নির্মাল্য।
প্রিয়তম, আজ তুমি আসিয়াছ ফিরে,
আমার জীবন, ফেলে যেওনাকো আর,
ফেলে যেওনাকো অন্ধ অনন্ত তিমিরে,
জাগ্রত, উত্তপ্ত, দীর্ঘ মরণ মাঝার।
ধর এ কম্পিত কর, চালাও চরণ,
ধূলে ঢাকা, অবসন্ন স্থালিত বিক্ষত,
ব্যথিত ললাটে রাখ মধুর চুম্বন,
তােমার নামের গাঢ় মুদ্রাঙ্কন মত।
আমার ললাটোপরি তােমার অধর
ধরার ললাট ছেয়ে নভঃ যথা রয়,
হৃদয়ে বিম্বিত মাের হবে নিরন্তর
সুদূর
স্বর্গের
গুঢ় তত্ত্ব সমুদয় ।
তুমি যে ফিরিবে তাহা জানিতাম মনে,
সে বিশ্বাস চিরদিন আছিল নিশ্চয়,
চিনিতে পারূিবে কি না পুনঃ এই জনে
আমার আকুল প্রাণে ছিল এই ভয়।
বিরহ সন্তাপে, সখে, সব শুকাইল
আমার সৌন্দৰ্য্য, অতি সামান্য যা ছিল।

আধ ঘুমে।
আজ এই বড় দুঃখ, তুমি ফিরে এসে
আমায় হেরিলে রূপে আমাে হীনতর,
তবুতে এসেছ তুমি, আমি অনিমেষে
দেখিতেছি শত গুণে তােমারে সুন্দর।
কর বাড়াইলে আমি পাই তব কর,
তােমার সান্নিধ্যে পূর্ণ আমার অন্তর।
দুই কর বন্দী মম দুই করে তব,
আঁখি মাঝে পাইয়াছ কিসের সন্ধান
প্রিয়তম? দেখিছ, কি কিছু অভিনব ?
নয়নে আনন্দ তব, বুঝিয়াছি প্রাণ,
হরিতে আবৃত মরু তােমার পরশে,
পল্লবিত কুসুমিত, সিক্ত প্রাণরসে।
মাের গান শুনিবার তরে
দাড়ায়ে কি আগ্রহের ভরে ?
সখা মাের অতি পূর্ণ প্রাণ
কেমনে গাহিব আমি গান।

মাল্য ও নির্মাল্য। বুঝাইব কোন কথা দিয়া, এ আমার সমুদয় হিয়া তােমারে যে করিয়াছি দান, কেমনে গাহিব আমি গান ? কোন ভাষা করিবে প্রকাশ এ আমার আনন্দ-উচ্ছাস, মিলন মিলিত ব্যবধান, কেমনে গাহিব আমি গান ? এ জগতে আছে কোন লয় ধ্বনিতে এ ব্যথা মধুময়, এই হালি অশ্রুর সমান, কেমনে গাহিব আমি গান ? যাও সখা, আগে আগে যাও, কেন থাম, ফিরে ফিরে চাও, থামিবার নহেতাে এ স্থান- কেমনে গাহিব আমি গান? করিব কি সমগ্র চরিত পদাবলী শুদ্ধ সুললিত, নীরবতা রাগ লয় তান? এমনে গাহিব আমি গান ?

আধ ঘুমে। জগতের আর কোন জন করে কিবা না করে শ্রবণ, তুমিতাে করিবে অবধান- এমনে গাহিব আমি গান। তুমি যেন শুনে প্রিয়তম, ভুলে যাও দীর্ঘপথশ্রম, সন্মুখেতে হও আগুয়ান, এমনে গাহিব আমি গান ১৮৯১-৯২

পরীক্ষা।
উপকথা।
কহিছে কোবিদ-ভুজঙ্গী রমণী
প্রত্যয় কর’না তায়,
সুলভ প্রণয় বস্ত্র অলঙ্কারে
তার কাছে কেনা যায়।
আত্ম বিস্মৃতির প্রতিমাটি যেন,
দেবতা নিন্দিত মুখ,
হৃদয়ের মাঝে স্বার্থের নরক,
ভাবে আপনার সুখ।
ভাবিল কুমার-“জগতের মাঝে
আছয়ে যতেক নারী,
বসন ভূষণে বঁধা পতিপদে ?
বিস্ময় হইছে ভারী।
আভরণহীনা বাসে না কি ভাল
দরিদ্র পতিরে তার ?
দরিদ্র হইয়া আপনি হেরিব
রমণীর ব্যবহার।”

উপকথা।
পাতার কুটীরে রাজার কুমার
হরষে করিছে বাস,
তরুবর হৃদে হের লতাবালা
জড়ায়েছে প্রেমপাশ।
ভাবে রাজসুত-“দুকুল বসন
দিইনি’ মুকুতা হার,
তবু পতিপ্রাণা, পতিহিতে রতা,
বধূ মম নারীসার।
রাজার উদ্যানে মােপিব এ লতা,
দেখিবেক বুধ জন
আজিও বসুধা ধরিতেছে বুকে
এহেন রমণীধন।”
গাহি প্রেমগীতি, দিবা অবসানে
মিশিয়া কৃষকদলে,
কুটীরের পানে প্রফুল্ল পরাণে,
নৃপতি নন্দন চলে।
জ্বালায়ে প্রদীপ, সাজায়ে আহার,
আনন্দের হাসি মুখে,
"দেখে প্রতিদিন, যােড়শী বধূটি
দুয়ারে দাড়ায়ে থাকে।

মাল্য ও নির্মাল্য।
কহে একদিন—“কত ভালবাস,
বল, প্রিয়ে, সত্য করে”—
কত ভালবাসি ?” উত্তরিল বালা,
“তখানি হৃদে ধরে।”
“রতন কাঞ্চন, মাণিক মুকুতা
ইহাদের কার সম?”
“এদের অভাব বুঝি নাই কভু,
মাণিক মৃত্তিকা মম।”
“আমার অভাব বলতে কেমন ?”
“ওকথা সুধাও কেন ?
তােমার অভাব, সুখের অভাব,
প্রাণের অভাব যেন।”
স
“বিধবা হইলে কি করিবে ধনি ?
ক্ষীণ-আয়ুঃ তব স্বামী-
“ওকি কথা প্রিয় ?”—“অতি সত্য কথা।”
“হােক,-সাথী হব আমি।”
রজনী প্রভাতে চলিল কুমার,
পরীক্ষিতে নারী-প্রেম,
সেকি বাছল, সেকি মায়াজাল
ধরিতে রজত হেম?

উপকথা।
কপট বিষাদে, আবরি বদন
রমণীরে ধীরে কয়,
“দুঃস্বপন বড় দেখিনু নিশীথে,
হৃদয়ে হতেছে ভয়।
জনক জননী রাজধানী মাঝে
জানতে কনে বাস,
তাদের তেয়াগি বিদেশে রয়েছি
বর্ষ দুই, দুই মাস ।
তাহাদের তরে, আকুল পরাণ,
দশদিন ছুটা দাও।”
সজল নয়নে কহিল বালিকা,
“আমারেও লয়ে যাও।”
“আজ থাক, প্রিয়ে, দশদিন পরে
ফিরিয়া আসিব যবে,
যাইবে তখন জননীর কোলে
কতই আদরে রবে।”
নয়নের জল লুকাবার তরে
একটি না কহি কথা,
সরলা বালিকা দিল। অনুমতি,
ঈষৎ হেলায়ে মাথা ।

৬৪
মাল্য ও নির্মাল্য।
গেছে দশদিন, আসিয়াছে লিপি,
“যুবরাজ সখা করি
রেখেছেন কাছে, অনুবােধ তার
এড়াইতে বড় ডরি।
থাক মাস দশ, বিরহ সহিয়া,
শীতঋতু-অবসানে,
রাজবধূ সম আসিবে হেথায়
আরােহি রজত-যানে।”
.
দশ মাস পরে এল দাস দাসী,
রজতনিৰ্ম্মিত যান,
গুরুমুখভরে উথলি উঠিল
নয়নে ভরল প্রাণ।
রাজবধূ বলি প্রণমিল সবে,
লিপি এক দিল হাতে,
“মরেছে কৃষক, যুবরাজ প্রিয়া
তুমি এবে,” লেখা তাতে।
কম্পিত হৃদয়ে, স্ফারিত নয়নে,
সাধ্বস-বিকৃত স্বরে
কহিল রমণী—“কাহার এ লিপি?
এসেছিস কার তরে?”

উপকথা।
“তােমারে লইতে আসিয়াছি, দেবি —*.
বলে, “ত্বরা উঠ যানে,
নিজে যুবরাজ অপেক্ষা করিছে
ক্রোশ সাত ব্যবধানে।”
“রাজা যুবরাজ থাকুক না কেন
সপ্ততাল ব্যবধানে,
প্রাণেশে আমার, ক্ষত্রিয় কৃষকে,
দেখেছি কোনখানে?”
“রাজকুলবধূ তুমি, বরাননে,
আজ বাদে রাণী হবে,
কৃষকের কথা কি কহিছ, ধনি?”
বিস্ময়ে কহিল সবে ।
কি কথার পথে দাড়াইল ক্রোধ,
রাঙ্গিয়া উঠিল মুখ,
চাহি চারিদিক অমনি আবার
কাপিতে লাগিল বুক।
“মরেছে কৃষক? নিদ্রিত কি আমি ?
নহে কি এ দুঃস্বপন ?
পীড়িত
জনের
বিকৃত কল্পনা ?
বিকল হইল মন?”

মাল্য ও নির্মাল্য।
প্রতিবেশী যত কৃষকের শিশু
আসে আসে ফিরে যায়,
উদ্ভ্রান্ত বালিকা ডাকে তাহাদেরে,
“আয় তােরা, হেথা আয়।”
আগন্তুকগণে আড়ে আড়ে হেরি,
মুখেতে আঙ্গুল দিয়া,
একে একে তারা সরলার পাশে
নীরবে দাড়ায় গিয়া।
কহিল তখন,-“এ নহে স্বপন,
যুবরাজ দুরাচার
বধিয়া কৃষকে, অভিলাষী এবে
লভিতে বণিতা তার।
পাপিষ্ঠের তােরা দাস দাসী যত
ফিরে যা প্রভুর কাছে,
অসহায়া যারে ভেবেছিস তার
মরণ সহায় আছে।
অই দেখ চেয়ে কাহার পাদুকা
রেখেছি যতন করে,
পতির উদ্দেশে উঠিব চিতায়,
ও পাদুকা বুকে ধরে।”

উপকথা।
কহে মুখ্যদাসী, “প্রভুর আদেশ,
‘বিনয়ে বুঝাবে তায়,
হবে সাবধান, রজু কিবা বিষ
পরমাদ না ঘটায়।
আজিকার দিনে শতেক প্রহরী
রহিবেক চারি পাশে,
কাল যুবরাজ যথা অভিরুচি
করিবেন নিজে এসে।”
কৃষকেরা সবে করে কাপাকাণি,
কৃষকবধূরা কঁাদে,
শােকে ভয়ে হেথা মূচ্ছিতা হরিণী
আপনার গৃহ ফঁাদে।
দিবা অবসানে উঠিয়া বসিল,
আব্দুল কাটিয়া পাতে,
বাসন্তী রঙ্গের বসন নামায়ে
রুধিরে লিখিল তাতে--
“দ্বিপ্রহর রাতে সাজাইয়া চিতা
থেকো মাের প্রতীক্ষায়।”-
কহিল দাসীরে, “শাড়ী, বালা মাের
পিতৃগৃহে দিয়ে আয়।

মাল্য ও নির্মাল্য।
বিধবা হয়েছি, কিবা রাজবধূ,
এ সকলে কাজ নাই,
ভাতৃ জায়াটিরে বস্ত্র অলঙ্কার
যাহা আছে দিয়ে যাই।”
নিশীথে সে শশানে অদুর প্রান্তরে
রমণী-রােদন-রােল,
পরিচিত স্বরে উঠিতেছে ঘন
“বল হরি হরি বােল!”
দেখে উঠি বালা দাসীরা সকলে
বিচেতন চারিপাশে,
কুটীর বাহিরে কোন বা প্রহরী
স্বপনে অস্ফুট ভাষে।
হরিবােল ধ্বনি মৃদুতর রবে।
ক্রমশঃ নিকটে এল,
কুটীরের কোণে বৃতির সংযােগ
ছট ছট খুলে গেল।
“এস বােন।”—“দাদা!—একটু দাড়াও,
পাদুকা লইয়া আসি।”
“অনুমৃতা কেন হইবি ভগিনি,
হব মােরা পুরবাসী।

উপকথা।
“কোথা যাব ছেড়ে রাজার দখল,
বৈকুণ্ঠে না যদি যাই?”
বলিতে বলিতে চিতার নিকট
এল দুই বােন ভাই।
জনক জননী আছিলা সেথায়,
দুই প্রতিবেশী আর ;
“চল অন্য দেশে,” কহিলা জননী
বরষিয়া অশ্রুধার।
“বিধবার দেশ ইহলােক নহে,
আমারে বাঁচাও আজ।”
বলি অশ্রুমুখী প্রণমি সবারে
ঝাপিল আনল মাঝ।
কৌতুকে উল্লাসে যবে যুবরাজ
ধরে কৃষিজীবি-বেশ,
চিতাভস্ম হেরি হাসে মান হাসি
দ্বাদশীর নিশি-শেষ।
কৃষ্ণনগর,
মে ১৮৮।

•
মাল্য ও নির্মাল্য।
তিন কন্যা।
তুষারশােভিত অচলশিখরে
দেবগৃহ, মণি-কিরণ-ময়,
কনক দেউটি শােভে থরে থরে, ,
পদে শুভ্রনদী মৃদুলে বয়।
''
হেথায় হােথায় গিরিকুটরাজি
স্থির দাড়াইয়া প্রহরী শত,
তনুশুভ্র হিম-উত্তরীয়ে সাজি,
নীলাকাশ শিরে উষ্ণীষ মত ;
একলা কে বালা ধায় গিরিপথে,
আঁখি বাঁধা তার দেউল পানে,
চলে অবিরাম, দ্রুত মনােরথে,
তুষার, প্রস্তর বাধা না মানে।
শুভ্র পরিধেয়, রুক্ষ কেশপাশে
চলিছে বাতাসে উড়ায়ে নিয়া,
চলিছে সে, যেন হিমানীর বাসে
ঢাকা একখানি জলস্তু হিয়া।

তিন কন্যা।
ক
হেরিতে গঠন, বরণ, বয়ান
অবসর নাহি আছিল ভাল,
উষ্কাপিণ্ড সম করিল পয়ান
মুহূৰ্ত্তেক পথে ছড়ায়ে আলাে।
'একই পথ ধরি কে এ পুনঃ আসে,
চলে আর থামে, থামিয়া যায়,
আকাশে বাতাসে যেন প্রেমপাশে
রূপ-ইন্দ্রজালে ধরিতে চায়।
সুগােল গঠন, মৃদু কৃশ তনু,
বরণের আভা 'চলিছে আগে,
তুলিকা চিত্রিত ভুরু যুগ ধনু ,
আঁখি ইন্দীবরে স্বপন জাগে
মৃদু বিম্বাধরে মুকুতার হাস,
হৃদয়ে কুসুমমালিকা দুলে,
ক্ষীণমধ্য বেড়ি সূক্ষ্ম নীলবাস
মুরছি পড়িছে কণ্ঠের মূলে।
কুন্তল তরঙ্গ পৃষ্ঠ-আবরণ
নাচিয়া নাচিয়া চুমিছে জানু,
: অলক্ত রঞ্জিত নধর চরণ
জপা-কুসুমিত করিছে সানু।

+
মাল্য ও নির্মাল্য।
উন্নত পৰ্বত-বিটপি যতেক
সম্ভমে নীরবে নােয়াল মাথা,
বরষিল পদে কুসুম শতেক,
শাখে শাখে পাখী গাহিল গাথা।
অদূরে অচল শিখর উপরে
দেবীর মন্দির দাঁড়ায়ে আছে,
ধীরে ধীরে মণি সােপানের স্তরে
উঠিল রূপসী। বেদিকা কাছে,
অবনতমুখী দেখিনু চাহিয়া
তুহিন-বসনা সেই সে বালা,
উমার চরণে পুস্পাঞ্জলি দিয়া
জানায় কাতরে প্রাণের জালা।
কহিছে,-“প্রসীদ, মহেশমােহিনি
প্রসীদ চরণ-আশ্রিত জনে,
নিবার পিপাসা, প্রেম প্রবাহিনি,
বিতর আলােক আঁধার বনে।
ত্রিদিব সৌন্দৰ্য্য সারভূতা তুমি,
রূপ ইন্দ্রজাল কেমনে পাই?
চাহিনা দেবত্ব, অশ্ব গজ ভূমি,
একটি হৃদয়ে রাজত্ব চাই।

E
তিন কন্যা।
একটি হৃদয় প্রার্থিত আমার,
সে হৃদয়, দেবি, আমারে দাও,
ঘুচায়ে ঘৃণিত কুরূপের ভার
এ মুখের পানে বারেক চাও।
কতখানি প্রেম এ হৃদয়ে আছে
জান যদি, কৃপা নয়নে চাও,
কেন দাসী দীনা রূপধন যাচে,
জান যদি, দেবি, সুরূপ দাও।”
এত বলি নমি উমার চরণে
রাখিয়া অশ্রুর মুকুতা মালা,
বাহিরিল ধীরে, তুহিনাবরণে
আপাদ মস্তক আবরি বাল ।
অমনি দ্বিতীয়া হ’ল অগ্রসর,
শােভনা, সুখিনী প্রণয় সুখে,
করি যােড় কর, মাগিলেক বর,
লাজে গদ গদ প্রসন্ন মুখে।
“সৌন্দৰ্য্যললাম, যােগীবাঞ্ছিতে,
কানে দাসী তার সৌন্দর্য আছে,
তবু ক্ষণে ক্ষণে ভয় হয় চিতে,
এরূপ আমার ফুরায় পাছে।

৭৪
মালা ও নির্মাল্য।
এ হৃদয় যারে করিয়াছি দান,
তাহার হৃদয় আমারি আছে,
কি জানি, সৌন্দৰ্য্য করিলে প্রস্থান
সে হৃদয় আমি হারাই পাছে।
তাহারি নয়ন তুষিবার তরে
রাখি সযতনে সুন্দর দেহ
তাহারি অঙ্গুলি চিকুর ভিতরে
খেলে বলে কেশে আমার স্নেহ।
দেবতার রূপ অক্ষয় অমর,
সৰ্বার্থদায়িনি, এ মর জনে
পারে কি যাচিতে সে রূপের বর?
ভুঞ্জিব কি সুখ নির্ভর্য মনে ?”
নীরবিলা বালা। মন্দির ভিতরে
কে শুভা রমণী বসিয়া ছিল,
অঞ্জলি অঞ্জলি কুসুমের থরে
উমার চরণ ছাইয়া দিল।
কহিল মধুরে, “শিবান্ধ-জীবন,
সুরূপ কুষ্প কিছু না জানি,
যেই
মুখ
দেখি পতি প্রীত হন,
সেই মুখখানি সুন্দর মানি।

ইন্দু ও যামিনী ।
৭৫
দেহে যাহা আছে থাক্‌ কিবা যাক,
কিছুতে না কিছু আসে না যায়,
প্রাণেশের হিয়া প্রেমে-ভরা থাক,
এ মুখ সুন্দর রহিবে তায়।
দেহ এই বর, জননি, শঙ্করি,
তােমার চরণে থাকুক মতি,
তােমারে পৃজিয়া স্বামী সেবা করি,
প্রসন্ন থাকিও, থাকুন পতি।”
দািিলং
৩০।
ইন্দু ও যামিনী।
নিদাঘের দিবা শেষে
গগাধূলি বালিকাবেশে
বসে যেন বকুল তলায়,
ফুল বাঁধি পত্রোপরে
কঙ্কণ রচনা করে,
মালা গাঁথি পরিছে গলায় ।
হাতে বাজু, কাণে দুল, ; তবু কোল ভরা ফুল,
কি করিবে ভাবিয়া না পায় ;
পিপলী দশন সয়ে, খুটে খুটে, হেঁট হয়ে,
তুলেছে যা ফেলা নাহি যায়।

মাল্য ও নির্মাল্য।
পুনরায় মালা গাঁথে
সূতা টানি, ক্ষিপ্র হাতে
এ ছড়াটি আরাে মনােহর ;
গ্রন্থি দিয়া সাঙ্গ করে দুই হাতে তুলে ধরে,
মনে কেন পড়ে স্বয়ম্বর।
মহাভারতেব কথা
মাসিমা পড়েন যথা
দুপুরেতে দিদিমার কাছে,
রাজস্থত অগণন
উজলিয়া সিংহাসন
কন্যা পানে চেয়ে বসে আছে।
মুখগুলি চেয়ে চেয়ে
ধীরে ধীরে আসে মেয়ে,
দেখে দেখে আগে চলে যায়,
বরে ছিল মনে যারে যেমন নেহারে তারে,
থমকিয়া অমনি দাড়ায়।
পশ্চাতে হেলিয়া মাথা স্থির দুটি আঁখি পাতা
হাসি টুকু আধ ফোটা ফুল,
স্বর্ণ-মেঘ-সিংহাসনে হেরে মনােনীত জনে-
সন্ধ্যা-আগে স্বপনের ভুল।
তারে মালা দিবে বলে, উচু করে ধরে তােলে,
শূন্যে ছেড়ে চমকিয়া চায় ;
মাসিমা ডাকিতে এসে, পিছে থেকে দেখে শেষে
মৃদু হেসে সম্মুখে মৃধায়,

ইন্দু ও যামিনী ।
“একলা বকুল তলে মালা দিলি কার গলে ?
ভূয়ে যে সে গড়াগড়ি যায়।”
আবার সুধালে পরে কহে ইন্দু লাজ ভরে,
“গলায় না, রেখে গেনু পায় ।
আকাশের সভা ঘরে,
সােণালি মেঘের থরে,
নল আর অর্জুন সমান
রাজপুত্র শত শত,
যে আমার মনােমত
এ মালা করিমু তারে দান।”
মাসি বােঝিতে ধীরে আলয়ে এসেছে ফিরে,
স্নেহ ভরা আঁখি মাসিমার,
ভীতি বিষাদের ভরে বালিকার মুখােপরে
আসিয়া বসিছে বার বার।
ইন্দুর বিমল হিয়া রেখে গেছে আলােকিয়া
একাদশ শরতের ভাতি,
যুবতী-যামিনী-চিত হিমজালে আবরিত
শিশিরের পূর্ণিমার রাতি।
পাশাপাশি দুটী মাথা,
মাঝে দুটী হাত গাঁথা
কি ভাবনা ভাবে দুইজন,
এ হাসে কল্পনা সুখে,
যামিনীর কণ্ঠে বুকে
চাপে আসি কি যেন বেদন;

৭৮ মাল্য ও নির্মাল্য। দেখে, শূন্যে, সিংহাসনে ইন্দু মনােনীত জনে মালা দিতে তােলে দুটি কর, লাগাল না পায় তার, ধূলে পড়ে ফুল হার- ইন্দুর এমনি স্বয়ম্বর ! আঁখি দুটী স্নেহমাখা ঘন বাষ্পে পড়ে ঢাকা মৃদু ভাযে কহে বালিকারে, “ইন্দু, স্বয়ম্বর নাই, স্বপ্নেও দিওনা ঠাই আমাদেৱ হতে যে তা পারে।” “মাসিমা ভেবেছি আমি যে আমার হবে স্বামী নিজে আমি বেছে নিব তায় ; বেছে কিনি থালা বাটী, নিজে বেছে লই সাটী থালা ভাঙ্গে, শাড়ী ছিড়ে যায় ; যে আমার স্বামী হরে, চিরদিন স্বামী রবে বিবাহতাে ঘুচাবার নয় ; যারে বেছে দিবে পরে, মনে যদি নাই ধরে, সাবিত্রীর মত যদি হয় আগে আমি কোন জনে বরিয়াছি মনে মনে, বরমাল্য দিব কি অপরে?” “মিছা আশা, ভয় মনে কুলীনের কুলবনে সত্যবান্ নাহি তাের তরে।

ইন্দু ও যামিনী।
আমি ভাবি পুথি পড়ে কল্পনায় স্বামী গড়ে,
সে প্রতিমা ভাঙ্গিবার বেলা
ভাঙ্গিয়া বা যায় হিয়া
গৃহ কাজে মন দিয়া
ভুলে যা এ কল্পনার খেলা।
যে অদৃষ্ট আমা সবে
পাঠায়েছে এই ভবে
কুলীনের গৃহে কলিকালে,
অলঘ্য সে দুর্ণিয়তি জুটাইবে যােগ্যপতি
বুদ্ধ, মুখ যাহা আছে ভালে।
1%
।
আপন হৃদয়খানি
অজ্ঞাত জনের জানি
তার লাগি রাখ সাবধানে,
পবৎ হাে হেয়
প্রাণ প্রেম তারে দেয়,
পূজনীয় ইষ্টদেব জ্ঞানে।”
“প্রাণ প্রেম সে জনায় যদি মাের নাহি চায় ?”
“তবু সেই হবে
বৈধপতি,
দূরে রহি সে চরণ
বেয়াইলে আমরণ
জন্মান্তরে হবে শুভগতি।”
ভবিষ্যের কথা কয়ে,
আধ নিশি গেল বয়ে,
অশ্রুসিক্ত একই উপাধানে,
ঘুমাইল দুটা মাথা, মাঝে দুটি হাত গাঁথা,
একসাথে উঠিল বিহানে।

মাল্য ও নির্মাল্য।
সেদিন দুপুরে ঘরে,
সবে পুথি খুজে মরে
কত দুঃখ করিছেন মাতা,
ইন্দু জানে চুল্লী মাঝে কয়লার ভাঁজে ভাঁজে
পুড়ে গেছে একেকটি পাতা।
কুমারীরা পুণ্যফলে
বর্ষ শেষে বৃদ্ধ গলে
মালা দিয়া হইল উদ্ধার,
ইন্দুর সৌন্দৰ্যজালে
বাঁধা পড়ি বৃদ্ধকালে
বর দেশে ফিরিল না আর।
তিলে তিলে, দিন দিন, ইন্দুলেখা হয় ক্ষীণ
রােগ শােক নাহি দেখে কেহ,
জীবনে অরুচি তার, ত্যজিয়াছে নিদ্রাহার,
ঘৃণা করে রূপে ভরা দেহ।
অরুচি অশুচি জ্ঞান
হ’ল শেষে অবসান
চিতানলে আর গঙ্গাজলে ;
দিন যায় গৃহ কাজে
যামিনী কেবল সাঁঝে
কাদে আসি বকুলের তলে।
কলিকাতা,
১৯।

দিন।
যত যায়
যত যায় দিন, মােরে ঘিরে অন্ধকার,
হেরি সে দিব্য জ্যোতিঃ, না শুনি সে বাণী।
শৈশব কল্পনা স্বপ্ন ভাবি কতবার
সে সকলে; ইচ্ছা হয় সত্য বলে মানি
বর্তমান দশা মাের, অনেকের মত
চলি ফিরি করি কাজ ;~-হায় কাজ মাের
ভেবেছিনু আর কিছু মহৎ উন্নত,
চেয়ে দেখি হাতে মাের শৃঙ্খল কঠোর।
অক্ষমতা এ জীবন করি অধিকার,
নিয়ত রাজত্ব করে ; বিন্দু শক্তি নাই
যুঝিবারে তার সাথে ; হাহাকার সার,
প্রাণের মাঝারে বসি নৈরাশ সদাই।
বাহিক বিষাদ চিহ্ন ঘুচায়েছি সব,
রােধিয়াছি নেত্রবারি, নিশ্বাস বিলাপ ;
হাসি, যবে হাসে সবে; কিন্তু অসম্ভব
নিত্য আত্ম বিস্মরণ ; কোন গূঢ় তাপ
আমারে জাগায়ে রাখে ; সাগরের জলে
তপ্ত অন্তঃস্রোত সম গােপনে অন্তরে,
বহিঃশান্ত জীবনের আনন্দের তলে
বিষাদ প্রবাহ এক বহে বেগভরে।

মাল্য ও নিল্য।
আকাঙক্ষা।
এ জীবন শুধু কি স্বপন
সবি কিগাে ছায়ামাত্র সার ?
তবে কেন তবে কেন মন
কাদিয়া কহিছে অনিবার
জনম লভিনু অকারণ,
সাধ এক মেটেনি আমার।
কি যেনগাে কি যেনগো চাই
স্বপনের ছায়া তাহা নয়,
এত খুজি তবু নাহি পাই,
তারি তরে তৃষিত হৃদয়।
নিরবলম্বন সম প্রাণ
কি যেন ধরিতে সদা চায়,
পেলে যেন তাহারি সন্ধান
সুখে সুখে দিন কেটে যায়।
কি যেন করিতে চাহি আমি,
কল্পনা সে স্বপন-সে নয়,
তুমিতাে জানিছ অন্তর্যামী,
প্রাণ মাঝে কি যে মাের হয়,

সুলভ।
৮
প্রাণে কিবা জলে হুতাশন,
ভাবি যবে স্বপন মিছায়
এত দিন কাটানু জীবন,
বিনা কাজে দিন আসে যায় ।
যাই করি কিছু যেন করি,
স্বপন না ভাল লাগে আর
সাধিয়া একটি ক্ষুদ্র ব্রত
সাঙ্গ হােক জীবন আমার।
২৫শে নবেম্বর ১৮৮২।
সুলভ।
তােমাদের পদমান তােমাদেরি থাক
এ জনায় লয়ে কেন কর টানাটানি ?
কারাে কাছে গেলে যদি হয় মান হানি,
তােমরা যেওনা, ভাই, যে চাহে সে যাক্।
দূরে থেকে তােমাদের বাড়ে যদি দাম,
পড়ে যদি পুস্পাঞ্জলি অবজ্ঞার পায়,
দূরে থেকে লহ পূজা-কাহার কি তায়?
পরের সাধের সাথে কর’না সংগ্রাম।

৫
মাল্য ও নির্মাল্য।
কেহ আসে পূজা নিতে সিংহাসনােপরে
দূর হতে আলগােছে চাহে ভিক্ষা দিতে,
জীবনের প্রতিদিন স্নেহ কুড়াইতে
ভিখারী সমান কেহ যাবে ঘরে ঘরে।
সুলভ সমীর, রবিচন্দ্রমা-কিরণ,
কি সুলভ বিধাতার প্রেমের সমান,
যে হবে দুর্লভ হয়ে যােক মূল্যবান,
আশীর্বাদ কর হােক সুলভ এ জন।
৩০শে জানুয়ারী ১৮৮৯।
নীরবে ।
বড় পাষাণের মত কত দুঃখ ভার
আমরণ অশ্রুপাতে নাহি পায় ক্ষয়,
কত দুঃখ আছে ঘন কঠিন তুষার,
কোন দিন অশ্রু হয়ে গলিবার নয়।
কত শেল বুকে করি জনতার মাঝে
দীন-আঁখি, ম্লানমুখ ফিরে নারীন,
ভাবে কবে শান্তিনীড়ে অন্ধকার সাঁঝে
ঘুমাইবে চিরতরে জীবিত জর্জর।

ভুল চুক।
তুমি আমি আমাদের শােকগীতি নাই,
চরণে বিঁধিলে কাটা আঁখি ছল ছল,
নিরাশার সে পাষাণ আমাদের নাই,
বাক্যাতীত অনির্বাণ অন্তর অনল ।
নীরব অধর যেথা, নয়ন মলিন,
ললাটে গভীর শান্তি মরণ সমান,
একবার দুইবার, চেও বার তিন,
আড়ালে নীরবে অশ্রু কর তারে দান।
-
ভুল চুক।
এই মায়াময় পুরে
কত কেহ মরে ঘুরে
আজীবন বিরাম না পায়,
সলিল আছিল কাছে, ছুটে মরীচিকা পাছে
পথ ভুলি অপথে বেড়ায়।
চোখে কিবা আবরণ
চেনে না আপন জন
আত্মীয় ঠাহরে বিদেশীরে,
ফুল দেখি আসে ছুটে সুতী কণ্টক ফুটে
শূন্য হাতে ব্যথা লয়ে ফিরে।

৬
মাল্য ও নির্মাল্য।
যাহাদের আঁখি আছে অনুদিন কাছে কাছে
অন্ধদের দৃষ্টি হয়ে থেকো ;
ভুলে যে ফেলিয়া যায়, ভুলিতে দিওনা তায়,
কাছে গিয়ে নাম ধরে ডেকো।
স্নেহেতে পুরিয়া বুক
ক্ষমা ক’র ভুল চুক
কর’না কর’না অভিমান ;
এত বড় এ ধরায়
যেজন হারায়ে যায়,
আর তার মিলে কি সন্ধান ?
হয়তাে তােমারি প্রতি প্রীতি পরিপূর্ণ অতি
চলিয়াছে তােমারি উদ্দেশে,
কাছ দিয়া যবে যায়, তােমা না দেখিতে পায়,
খুঁজিয়া বেড়ায় দেশে দেশে।
দেখ না হৃদয় তার
হের শুধু ব্যবহার,
অভিমানে দাড়াও আড়াল,
আজ যে চলিয়া যায়, পাবে কিনা পাবে তায়,
খুজিতে ফুরাবে আয়ুষ্কাল।
১ই মার্চ ১৮৯০।
.

সংসার জ্ঞান।
দিদি, তাকি বুঝিবার বাকী কিছু আছে আর,
ভেঙ্গে গেছে প্রভাতের স্বপন মধুর,
বিষাদ সন্তাপ ভরা
নিতান্ত মলিন ধরা
এ নহে সে কল্পনার পুণ্যময় পুর।
প্রবাসি-দেবতা যারে ভেবেছিনু এ সংসারে
নিতান্তই ধূলিময় দুর্বল সে জন,
কুসুম অঞ্জলি সম
বালিকা হৃদয় মম
করেছিনু মৃন্ময়ের পায়ে বিসর্জন।
ভকতি অপরিমিত প্রীতি নিত্য উচ্ছ্বসিত
অর্পি’ছিনু অপাত্রেতে বিশ্বাস অপার,
খদ্যেতেরে তারা ভুলে
নিয়াছিন্ন প্রাণে তুলে,
আজো কি বুঝিতে, দিদি, বাকী আছে আর?
মাের সুখ ছিল যবে তােমরা বলিতে সবে,
“এতটুকু নাহি ওর সংসারের জ্ঞান।”
ছিল, কি ছিল ক্ষতি ? একি নিদারুণ অতি
জ্ঞান বিষ, মরে প্রেম, ভেঙ্গে যায় প্রাণ !
বিফল স্বপন ভরা, নিতান্ত দুঃখের ধরা,
প্রেম পুণ্য অরগের, এ দেশের নয় ;
দেখিয়াছি রঙ্গ মাঝে গরিবেরে রাজ-সাজে,
মানবের জীবনেও সেই অভিনয়।

মাল্য ও নির্মাল্য
২
আছে প্রেম পুণ্য শান্তি আমারি হয়েছে ভ্রান্তি ?
তাই ভাল, দিদি,—দিদি, তাই সত্য হােক ;
আমি শুধু না বুঝিয়া দহিয়াছি নিজ হিয়া,
আর কেহ না জানুক এ সন্তাপ শােক।
কেন, দিদি, বার বার ওকথা বলিছ আর,
সংসারের বাঁধে কেন বাঁধিবারে চাও ?
শতধা হৃদয়ে মাের কোথায় বাঁধিবে ডাের ?
স্মৃতির শ্মশানে মােরে একা রেখে যাও।
আছে প্রেম থাক, দিদি, এ মাের ভগন হদি
আরতত প্রণয় কভু পাবেনাকো স্থান ;
আনন্দের নিশি মাের
বিষাদে হয়েছে ভোের,
আমার হয়েছে, দিদি, সংসারের জ্ঞান।
ত, ১৮৮

৮৯
আক্ষেপ।
কল্পনার তুলি দিয়া
হৃদয়ের হিয়া মাঝে
রচিয়াছি যেই সুর পুর,
আশৈশব নিরজনে নেহারি মােহিত যারে
ত। কেনগাে দূর হতে দূর?
সেথাকার ভালবাসা,
সেথাকার আশা তৃষা,
সকলি সুন্দর নিরমল ;
দেবতার আঁখি লয়ে
মানবেরা দেখে চেয়ে
অনবদ্য মাধুরী কেবল।
হেথায় দূষিত আঁখি দোষ খোঁজে, দোষ বােঝে
হেরে সবি মলিনতাময়,
এই মানবের দেশে আলােকে আঁধার দেখে
এ নহে সে প্রেমের আলয়।
জগত হইত যদি
কেবল হৃদয়ময়
হ'ত শুদ্ধ আত্মার আলম,
মলিন ধূলির স্তুপ
না থাকিত দেহ যদি
ধরা বুঝি হত সুখময়।
স্বচ্ছ হৃদি দরপণে
পরের হৃদয় ছায়া
প্রতিভাত হইত কেমন,
নয়নের স্কুল দৃষ্টি
ভ্রান্ত না করিত কভু,
ঘুচিত সন্দেহ আবরণ।

মাল্য ও নির্মাল্য।
আমার হৃদয় মাঝে
যে দেশের ছবি জাগে
সে কি শুধু কল্পনার দেশ ?
কৈশাের স্বপন মাঝে
সে কিরে বিরাজে শুধু
স্বপনেই আদি মধ্য শেষ?
উষার মরণ।
দিনেশে দেখিবে বলে
অন্ধকার পথ চলে,
উষাবাল দাড়ায়েছে আসি,
আঁখি প্রান্তে শ্রান্তি রেখা যায় কিনা যায় দেখা,
অধরেতে লাজে মাখা হাসি।
গগণ ধরণী আলা
দাড়ায়ে রয়েছে বালা
হাতে মালা, তাহারে বরিবে,
সমগ্ৰ হৃদয়খানি
নয়নে এনেছে টানি,
ভাল করে দেখিয়া মরিবে।
জানে সে তা জানে মনে, দিনেশের দরশনে
অমনি ফুরাবে আয়ুঃ তার,
প্রাণে শান্তি, নাহি ভয়,
এ মরণ সুখময়
বিলীনতা মিলন মাঝার।
১ই মার্চ, ১৮৯০।

৯১
সৌন্দর্য্য ও ভালবাসা
বহুদিন এ জগতে আসিয়াছি দুই জনে,
কোথা ছি, কোথা ছিলে,—জীবনের শুভক্ষণে
সহসা দাড়ালে আসি বিস্মিত নয়নে মম,
শত শত জনমের সুকৃতির ফল সম।
নয়ন চাহেনি যবে শান্ত মুখ পানে তব
এমন সুন্দর বুঝি আছিল না বিশ্ব ভব ।
এ আকাশ, এ বাতাস, উষার সন্ধ্যার রবি,
তটিনী-তরঙ্গ-লীলা, সুপ্ত নিশীথের ছবি,
ইহাদের সাথে প্রেম এতটা কি ছিল আগে
রঞ্জিত ছিল না আঁখি যবে তব অনুরাগে ?
তরী বয়ে লয়ে যায় কত না অচেনা মুখ,
তীরে বসি ভাবি আমি কার কিবা দুঃখ সুখ ;
আঁধার হিয়ার মাঝে আলাে হয়ে প্রবেশিতে
সাধ যায়,—চিরদিন এ সাধ কি ছিল চিতে ?
কি আছিল, কি না ছিল, আজ নাহি পড়ে মনে,
জীবনের পুনর্জন্ম তব দরশন সনে।
সঙ্গীতে গগন পূর্ণ, বুঝিতে না পারি ভাষা,
দুটি কথা বুঝি শুধু-সৌন্দর্য্য ও ভালবাসা।

মাল্য ও নির্মাল্য।
'
}
আমাদের কেহ তুমি নও।
ধীরে ধীরে কাছে এসে,
তােমারে বুঝেছি শেষে,
জানিয়াছি, আর যাই হও,
কবির কল্পনা-ছবি,
কিবা দেবী, কি মানবী,
আমাদের কেহ তুমি নও।
ও আননে খেলা করে
আলাে ছায়া থরে থরে,
দু'নয়নে ইন্দ্রজাল রেখেছ বাঁধিয়া,
হৃদয় করুণাময়।
তাহে প্রতিভাত রয়,
স্নাত যেন মনে হয় অশ্রুবারি দিয়া
সে অশ্রু পড়ে না ভূয়ে,
পরের শ্রবণ দুয়ে
হাসি ডরে, পাছে তার মলা লাগে গায়,
তাই অধরের তীরে
উকি দেয় ধীরে ধীরে
হৃদয়ের অন্তঃপুরে আবার লুকায়।
আমাদের অশান্ত হৃদয়
তৃষা ব্যাকুলতা ভরা, আবৰ্ত্ত-তরঙ্গময় ;
নিরাশা ঝটিকা বহে, অশ্রুজলে নদী হয় ,
আমাদের উন্মত্ত প্রণয়
দিতে চায়, নিতে চায় তনু, মন সমুদয়-
নেহারি জাগে কি ঘৃণা ? কিবা মনে লাগে ভয়?

সংশয়।
সেথা শুধু প্রাতঃ সন্ধ্যা, নিশি পূর্ণিমার,
মধ্যাহু তপন নাই, অমার আঁধার ;
প্রেমে শান্তি, নাহি দুঃখ, বাসন প্রবল,
অভিমান, অবিচার, ঈর্ষা হলাহল।
আমি যে বিদেশী সেথা,-যদি ভয় পায়,
গােধূলির ঘর তার যদি ভেঙ্গে যায়
আমার মৃত্তিকা ভারে,-সদা ভাবি তাই,
দূরে দূরে থাকি হেন, কিবা কাছে যাই?
অপাঙ্গে চাহেনা সে তাে আঁখি ভরি চায়,
জানেনা লইতে হবে, দুহাতে বিলায় ।
গােপন পিপাসা ক্লেশ, অতি তৃপ্তি আর,
শিশিরের শুষ্ক খাত, স্রোতঃ বরিষার,
হেথাকার ধূলি কাদা কিছুই না জানে।
মাের স্নেহ যদি তারে হেথা টেনে আনে,
এ মাটিতে
মূল
তার হবে
কি সঞ্চার,
ভাবের কলিকা-রাজী ফুটিবে কি আর?
ত্রিদিব-লতিকা সেই বুঝি স্থান হবে,
হায় এ প্রেমের মাের কিবা ফল তবে।

১ঃ
মাল্য ও নির্মাল্য।
নির্ণয়।
বলি যদি, আপনারে কর মােরে দান,
বুঝিব সে বিস্মিত হইবে,
আমি যদি তার পায়ে ঢেলে দিই প্রাণ,
লইবে কি—সে কি তা লইবে ?
আমি প্রাণপণে যত কাছে যেতে চাই,
ব্যবধান তত বেড়ে যায়,
আপনি কি ধরা দিবে, ফেলে যদি যাই?
ফেলে বাই শকতি কোথায় ?
জানে না মুগুধা বালা প্রভাব আপন,
তাই কাছে- এত কাছে আসে,
ধরিতে চাহিলে দূরে করে পলায়ন,
ত্রাসে যেন ভাল নাহি বাসে।
এ জগত্ শুধু তার আনন্দ-কানন,
সৌন্দর্যের করে সমাদর,
মহত্ত্বের পূজা করে ; কোন একজন
নহে অতি আপনার, নহে অতিপর।

নববর্ষ ।
পূরব গগনে নেহারি কার
স্নিগ্ধ রূপরাশি আলােক ভার,
কষ্ঠে পারিজাত কুসুম হার,
বিশদ বাস ?
!
মৃদুল চরণ চলিছে ধীরে,
সুকুমার জটা দুলিছে শিরে,
ধরণী-তীরে
ছুটিছে সুদূর
মধুর হাস।
সুন্দর ত্রিদিব তেয়াগি দূরে,
মানব নিবাস অবনীপুরে
সুশােভন হেন দেব শিশু কেন
আসিছে আজ?
অরুণ-বসনা দাড়ায়ে উষা,
নব-প্রস্ফুটিত-প্রসূন-ভূষা,
নীরদ আসন দিগ্বধূগণ
উঠিল ত্যজি;

মাল্য ও নির্মাল্য।
"যাও বৎস যাও, তােমার তরে
চেয়ে আছে যারা আগ্রহ ভরে,
আনন্দ কিরণ তাদের ঘরে
বহিতে থাক।
“গলে দি তাের বিজয় মালা,
আশার মুকুলে পূরিত থালা
ধরণীরে দিস্ ; দেবের আশীষ
পুরতঃ যাক্।
“জাগাে ধরাবাসী, খােলগাে দ্বার,
গৃহে লহ নব আলােক ভার,
হৃদি প্রীতি, সাধু সংকল্প, আর
নূতন আশ।
“দেখ ধরাবাসী দুয়ারে তব
মহেশ-প্রেরিত বরষ নব,
আশীর্বাদ তাঁর বিলাবার ভার
দ্বাদশ মাস।”
*
কহিলেন উষা মধুর স্বরে,
কিরণের রাশি কিরণ’পরে
ছুটিল ভেদিয়া নীরদ থরে
ধরার গায়।

সংকীর্ণ স্বাতন্ত্র।
উজল পূরব পথেতে আসি
হের বর্ষ-শিশু দাড়াল হাসি,
চারু থালা হাতে, কত কিছু তাতে,
দেখিকি আয়।
সংকীর্ণ স্বাতন্ত্র্য।
ভুলে ওরা বর্তমান গাহে অতীতের গান,
আঁখি দুটি পিছু পানে চায়,
চরাচর নিরন্তর
হইতেছে অগ্রসর,
সে কথা কেবলি ভুলে যায়
ক্ষুদ্র রেখাটির মত
থেকে যাবে অল্লায়ত
মৃদু গতি, অতি অগভীর।
বহুল সরিতে মিশে
জানেনা হইবে কিসে
মহানদ বিশাল-শরীর ।
জানে না যে কি নীরধি:
বক্ষঃ পাতি সকলেরেলয়,
সংকীর্ণ স্বাতন্ত্র তরে,
এরা যে শুকায়ে মরে,
অৰ্দ্ধ পথে কিবা পড়ে রয়।
সম্মুখেতে নিরবধি

মাল্য ও নিল্য।
মিলন মহত্ত্ব।
;
দেখ চেয়ে চারি ভিতে
এ জগতে দিতে নিতে
সকলের উন্মুক্ত হৃদয় ;
আঁধারে থেকনা ঘুমে,
দেখ চেয়ে রঙ্গভূমে
মিলনান্ত মহা অভিনয়।
সম্মুখেতে দেখ চেয়ে,
কি আনন্দে যায় বয়ে
একীভূত শতেক সরিত্ ;
কিবা সুবিশাল হিয়া, ধরারে জীবন দিয়া
চলিয়াছে, গাহি কিবা গীত।
সে গীতের আগে পাছে
অতীত ভবিষ্য আছে,
মাঝে তার মহা বর্তমান ;
সংকীর্ণ অতীত ধারা
পরস্পরে হয়ে হারা
বর্তমানে করেছে মহান্।

অনাদৃত।
বিদেশী।
ভারে কেন টেনে আনে
জনতার মাঝখানে
নিরজনে নীরবে যে থাকিবারে ভালবাসে?
উপহাস ভয়ে তার
শুষ্ক হয় অশ্রুধার
ক্ষীণ হাসি তােমাদেরি কুটীর ভয়ে হাসে।
যারা এ দেশের নয়
তাদের কি প্রাণে সয়
এ দেশের রৌদ্রতাপ, এ দেশের ভূমি বায় ?
গিরি-বন লতাবলী
উদ্যানে এনেছ তুলি
কি হেতু দুষিবে তারে সে যদি শুকায়ে যায় ?
অনাদৃত।
আদরে স্নেহের মালা পরালি যাদের গলে,
তারাইগাে গেল চলে’ দলে’ মালা পদতলে ;
যাদের অমিয় ভাষ ভাবিলি জুড়াবে কাণ,
তাদেরি নিঠুর বাণী চূরে দিল ভাঙ্গা প্রাণ ;
সমদুঃখে যাহাদের অশ্রুরাশি পাবি যবে
উত্তপ্ত এ মরুভূমি ভাবিলি শীতল হবে,
তারাই তারাই হায় ! তারাই গাে গৈল চলে,
তাের সে স্নেহের মালা খুলে ফেলে পায়ে দলে

মাল্য ও নির্মাল্য
তােমাদেরে ভালবাসি।
তোমাদেরে ভালবাসি,
পরাণে লাগিলে ব্যথা তােমাদের কাছে আসি।
আকুল পরাণ লয়ে তােমাদেরি মুখ চাই,
তাকালে স্নেহের চোখে মরমে গলিয়া যাই ;
শত ব্যথা ভুলে যেয়ে, মুখপানে থাকি চেয়ে,
জন্ম জন্ম দুঃখ পেয়ে চাহি ওই মেহরাশি।
১৮৮৪।
০
কি গাব ?
কি গাব? নূতন গীতি জানিনা তত আর,
পুরাণ সে গীতে বহে বিষাদের ধার।
হেথা এত হাসি খেলা, হেথা আনন্দের মেলা,
হেথা কেন নামাইব বেদনার ভার ?
হাসি ভরা মুখশশী
আমি দেখি দূরে
বসি
খেলুক স্বপন শত প্রাণে একবার;
সপ্তমে তুলিয়া তান গাহ হরষের গান,
হয়তাে বাশুষ্ক নদে ছুটিবে জোয়ার।
১৮৮৪।

ঝাঁপ
বঁধন না মানে।
৫
আমি কেমনে বাঁধিব প্রাণে, বাঁধন না মানে।
ওগাে বাধন না মানে প্রাণে, প্রবােধ না জানে।
আমি যতই আঁটি, যতই বধি, যতই সাবধানে,
আমার দেহ ছেড়ে প্রাণ যেতে চায়, কি জানি কোন খানে।
আমার বিভাের শ্রবণ কার প্রেমের আহ্বানে,
যদি দূরে থাকে, কেন ডাকে, আকুল করে প্রাণে?
আমি ধরা খুজি, গগন খুজি, খুঁজি সৰ্ব্বস্থানে,
আমার জীবন গেল, যৌবন গেল তাহারি সন্ধানে।
৮৮৪।
ঝাপ।
পশ্চিমে আশার রবি ডুবেছে আমার,
ঢাকিছে জীবন ক্রমে গাঢ় অন্ধকার ;
বিষাদের বােঝ শিরে বসিয়ে সাগর তীরে,
ভাসিতেছি অশ্রুনীরে, কিসে হই পার ?

মাল্য ও নির্মাল্য।
ভীষণ গর্জন তুলি
ছুটিছে তরঙ্গগুলি,
সম্মুখে তরণী নাহি, নাহি কর্ণধার ;
উর্দ্ধে নাহি চন্দ্র তারা,
দিশাহারা, লক্ষ্যহারা
আঁধারে জলধি জলে দিব কি সাঁতার ?
করি দেবতার নাম,
এই তবে ঝাঁপিলাম,
ডুবিব, বা পরপারে উঠিব আবার।
| اطر
প্রায়শ্চিত্ত।
(সুকুমণির মৃত্যু উপলক্ষে রচিত কোন কবিতার শেষভাগ।)
নয়ন স্ফুলিঙ্গ রাশি নয়নেই বেঁধে রাখি,
ঘৃণা ক্ষোভ অন্তর্দাহ নীরবেই সয়ে থাকি,
কি হইবে অশ্রুজলে, কি হইবে অভিশাপে ?
সহি এ নরকজালা পূর্ব পুরুষের পাপে।
কে জানে এ প্রায়শ্চিত্ত কত কালে হবে শেষ,
কবে নব পুণ্যফলে নিষ্কণ্টক হবে দেশ।
কঠোর তপস্যা সাধি আয় বােন, আয় ভাই,
ভারতের শুভ লাগি বিধাতার বর চাই।
১৮৮।

ঢেউ।
১৩।
বুঝিবা হ’ল না।
বুঝিবা হ’ল না গাওয়া সে গীত আমার,
একে একে দিনগুলি অতীতে হইল লীন,
ভগন এ ক্ষীণ কণ্ঠ আরাে হইতেছে ক্ষীণ,
একটি একটি করে’
ধূলায় পড়িছে ঝরে’
• বাসনা মুকুলগুলি দেখি প্রতিদিন ;
একটু একটু করে
অন্ধকার অগ্রসরে,
উজল মানসনভঃ করিয়া মলিন,
আশার তারকা শশী কোথায় পড়িছে খসি;
মাথার উপরে ঝড়, ধারা করকার,
সে গান গাহিতে বুঝি নারিলাম আর ।
১১।
কেন পরাণ চঞ্চল ?
গভীরা যামিনী ওরে, বন্ধু মােরে বল্।
আশায় বিষাদে ভরা, এই যে অস্থিরা ধরা
জ্বালাইতে জুড়াইতে কি জানে কৌশল।

১০৪
মাল্য ও নির্মাল্য।
'
সন্ধ্যায় যাতনা ঘােরে, কঁদিতেছিলাম পড়ে
নিশীথে কে দগ্ধ প্রাণ করিল শীতল?
তুলেছি দুঃখের কথা, চলে’ যেন গেছে ব্যথা,
মুহূর্তে স্তম্ভিত চিত, মুহূর্তে উতল ;
আবার একি এ যেন, শূন্য শূন্য প্রাণ কেন?
প্রাণে প্রাণে এত ঢেউ, হব কি পাগল?
১৮১।
সম্মুখ ও পশ্চাৎ।
এইতাে সংসার, আর এই খেলা তার
নেহারি আলােকরাশি
সম্মুখে ছুটিয়া আসি,
দূরে গিয়া ফিরে চাই, সকলি আঁধার ;
সম্মুখে দিবস আলা,
পশ্চাতে রজনী কালা,
এত ছুটি তবু যেন অললা রাশি পাই না
থামিতে ঘদি বা যাই,
দাড়াবার সাধ্য নাই,
আছাড়ি পশ্চাতে পড়ি-দাড়াইতে চাইনা।

i. প্রবাসে।
অদৃশ্য আশার টানে
আকর্ষিত প্রাণে প্রাণে,
অন্যত্র নাহিক পথ। আলােক আঁধার
এক আগে আর পিছু,
বুঝিতে না পারি কিছু
কোথায় মিশেছে তারা, কোথা শেষ কার !
১৮৮১।
প্রবাসে।
মিছার লাগিয়া ঘুরি জগৎ
তৃষা সমাকুল হায়!
মনের মতন না পাই মন,
পাইব কি কভু তায়?
কাহারও লাগিয়া কেহ যেন স্বয়
সবাই—সবাই পর,
সবাই যেন গাে প্রবাসে ঘুরিছে
নাহি বন্ধু নাহি ধর।

মাল্য ও নির্মাল্য।
কারাে মন হেথা কেহ নাহি চিনে,
বুঝে না আঁখির ভাষ,
বিশুষ্ক বয়ানে প্রাণের পিয়াস
শতধা ভগন আশ।
কঁদিয়া কাঁদিয়া কহিছে পরাণ
এ দুঃখ কহিব কায়,
মন বুঝিবার দেশে দেশে মাের
কেহ না মিলিল হায় !
বনদেবীর গান।
( বাল্যরচিত কোন নাটিকা হইতে উদ্ধত।)
কাননে কুসুম হাস
আকাশে কৌমুদী ভাস
তটিনীর স্বচ্ছ হৃদে তরঙ্গ চঞ্চল,
হেরিব লাে আঁখি ভরি,
চল যাই ত্বরা করি
হেসে হেল, নেচে গেয়ে, ছুটে ছুটে চল ;
গানে দুঃখের গীতি,
জাগানে সুপ্ত স্মৃতি,
ফেলিসনে ভুলে যেন নয়নের জল।

বনদেবীর গান।
১০৭
২
হরষে দুলিছে শাখী
হরষে গাহিছে পাখী
উজল চাদের করে বিভ্রান্ত এমন,
রজনীরে দিন বলে
সাড়া দেয় ডালে ডালে
আদরের পিক মাের কাননের ধন ;
রজনীরে দিন বলে
আপনি আপনা ভুলে,
আয় গাই প্রাণ খুলে পাখীর মতন।
গাহিবি এমনি গান
তুলিবি এমনি তান,
চন্দ্রিকার প্রতি অণু আসিবেক ছুটি
ছাড়ি শুভ্র শৈল শির,
তটিনী ভাসায়ে তীর
মুগুধা চরণে আসি পড়িবেক লুটি ;
মুদিত মুকুলগুলি
ধীরে ধীরে মাথা তুলি,
মধুর মধুর হেসে উঠিবেক ফুটি।
;
১৮৮১।

মাল্য ও নির্মাল্য
লইবে কি ?
লইবে কি, বালা, এই হৃদয় আমার ?
হইবে কি আজীবন সহচরী মম ?
সম্পদের সিংহাসনে,
অথবা বিজন বনে,
আনন্দে মিশায়ে হাসি, দুঃখে অশ্রুধার
রহিবে কি সাথে সাথে ছায়াটির সম ?
দিবে কি আমারে, বালা, হৃদয় তােমার ?
অমৃতের পথে হবে সহযাত্রী মম ?
কণ্টকসঙ্কুল স্থলে
প্রেম ইন্দ্রজাল বলে
দিবে কি ফুটা’য়ে শত কুসুমের ভার,
আঁধারে ঢালিবে আলাে চন্দ্রিকার সম ?
বহিবে কি, বালা, মাের জীবনের ভার ?
বাসিব ভােমারে ভাল পরাণের সম
এক পথে এক সাথে,
যাব, হাত বাঁধা হাতে,
শ্রান্ত হলে কাছে বসি রহিব তােমার,
নিয়ােজিব তব সুখে সরবস্ব মম।

চাই দেশালাই।
দেখ তবে ভাল করে হৃদয় আমার,
নিভৃত অন্তরে দেখ কি রয়েছে মম,
ফুল হােক, কাটা হােতূ,
ভাল মন্দ যাই নােক,
তুমি দেখ, তুমি বল, কি করিব আর, .
থাক হেথা অধিষ্ঠাত্রী দেবতার সম।
চাই দেশালাই।
মুক্ত রাজ পথ, দৃশ্য পুরাতন,
সহস্র আসিছে সহস্র যায়,
নিজ প্রয়ােজনে অগ্রসর সবে,
অপরের পানে কেহনা চায়।
ধনী, ধনহীন, সুন্দর কুরূপ
যায় দ্রুত পদে আপন মনে,
কেহই থামে না। কেনই থামিবে ?
আমারি কি কাজ এদের সনে ?
অনেকে এসেছে, একটি বালক
এখনাে আসেনি, আসিলে পরে
অইখানে আসি থামিত চরণ,
ফিরিত আনন আগ্রহভরে

১১•
মাল্য ও নির্মাল্য।
ফুল্ল আঁখি দুটি বাতায়ন পানে
তুলিত ছুটিত বিজলী মত
প্রীতির চমক সারাখানি মুখে,
সরমে নয়ন হইত নত।
কত কেহ আসে, কত কেহ যায়,
চঞ্চল নয়নে, মলিন বেশে,
চাই দেশালাই আসেনি আমার
হাসাতে আমায় যাইতে হেসে।
একদিন সবে ডেকেছিনু ওরে,
কয়েছিনু স্নেহে দুইটা কথা,
একদিন যবে চবণ স্থলনে
পড়ি ভূমিতলে পাইল ব্যথা।
তুলি বাছারে, দি মুছাইয়ে
সম্বেদ রক্তাক্ত সরল মুখ,
বিক্ষিত ললাটে একটি চুম্বন,
জীবনের সেই নূতন সুখ।
দেশলাই ক’টি দিলাম গুছায়ে
হাসিল বালক সজল আঁখি,
হাসিলাম, ধীরে চলিল বালক,
ফিরে ফিরে চাহে খানিক থাকি।
বরিশাল ফেব্রুয়ারী ১৮৮১।

গিরিদেশে বর্ষা।
ধীরে ধীরে অতি ধীরে বহিছে শীতল বায়,
কাপে শ্বেত উত্তরীয়
সুদূর
গিরির গায় ।
কোথা হতে ধীরে ধীরে অতি শুভ্র ধূমরাশি
সম্মুখের তরুরাজি ছাইয়া ফেলিছে আসি ;
সহ সা এ কোথা হতে আসিতেছে অন্ধকার,
ভাসায়ে সংকীর্ণ পথ বহিছে বরযা ধার,
ঝম্ ঝম্ গৃহ চুড়ে নাচিতেছে শিলাগুলি,
ধূম
নির্গমন পথে কঁাদে বায়ু পথ ভুলি।
বায়ু বহে অতি শীত, ঘন বরিষার ধারা,
গিরি গিরি মেঘমাল! ছুটে উন্মাদিনী পারা,
চপলা চমকি যায় এদিক ওদিক্‌ দিয়া,
মাতিয়াছে গিরিদেশ উন্মাদক সুরা পিয়া
গুরু গুরু ঘনধ্বনি
সুদূরে
থামিয়া যায়,
মহাশিলা খণ্ড ঝাঁপি পড়িল গিরির গায় ;
চারিদিক্‌ আঁধারিত শব্দিত মথিত করি,
ছুটিতেছে মহারঙ্গে জীবনের কি লহরী।
থামিয়াছে বর্ষা বায়ু জীবন জাগায়ে দিয়া,
উদ্যমে ছুটিছে হের শত নিঝরের হিয়া
ܗܿ،
১৩ই মে, ১৮৮৬।

মাল্য ও নির্মাল্য ।
সাগরে সঙ্গীত ।
গভীর নিশীথে সাগরের নীরে,
চলিছে তরণী হেলি দুলি ধীরে,
রয়েছি মগন সুপ্তি সুগভীরে
সহসা ভাঙ্গিল ঘুম।
কি যেন শুনিনু ত্যজিনু শয়ন,
কি নব আলােকে জাগিল নয়ন,
নব রূপােচ্ছাসে দেখিলাম ভাসে,
নিদ্রিত ধরা নিঃঝুম।
সেই সে নিশীথে হয়েছি পাগল,
উড়ু উড়, প্রাণ চঞ্চল উতল,
থেকে থেকে কাণে বাজিছে কেবল,
প্রতিধ্বনি রব তার।
চমকি চমকি ভাঙ্গিছে স্বপন,
ক্ষণেকে হারাই, ফিরে পাই মন,
জেগে উঠে কোন্ নিভৃত বেদন,
হিয়া মাঝে হাহাকার।
আধ ঘুমঘােরে বিধবা রমণী
শুনি স্বপ্নভুলে পতিকণ্ঠ ধ্বনি,
চমকি যেমন জাগে সে অমনি,
আজিও তেমনি হায়

সাগরে সীত
তেমনি যখন নিদ্রিতের কাণে
সে গীত লহরী স্বপনেরা আনে,
ঘুম যায় ছুটি, শিহরিয়া উঠি,
চেয়ে থাকি নিরাশায়।
পরাণ আমার, পাগল পরাণ,
চিত্ত উন্মাদক ওরি মত গান,
মরম স্পরশী ওরি মত তান
আবার শুনিতে চায়।
সাধ হয় ওই সাগরের বুকে
বিছানা বিছায়ে, শুয়ে থাকি সুখে,
গাঁথি কভু আর কবিতার হার
সুখ অশ্রু মুকুতায়।
স্বপনেতে শুধু জাগিবে অতীত,
ভবিষ্য ভাবনা করিবে না ভীত,
ভুলে যাব শেষে ছিনু যে এ দেশে,
দুঃখময় ধরাতলে।
দেখিব জীবন শান্তি নিকেতন,
দেখিব হৃদয় প্রেমে সুশােভন,
দেখিব সংসার ত্রিদিব ভুবন
অমনি তাড়িত বলে,-

*১১৪
মাল্য ও নির্মাল্য।
উঠিবে'চমকি নিদ্রিত শরীর,
শিরায় শিরায় ছুটিবে রুধির,
বিস্মিত শ্রবণে বাজিবে গম্ভীর
পরিচিত গীতধার;
উঠিবে কাপিয়া বায়ুর মণ্ডল,
উচ্ছসি উঠিবে সাগরের জল,
সহসা হৃদয় হইবে চঞ্চল,
ঘুচিবে ঘুমের ভার।
ক্রমে ক্রমে যবে স্তরে-স্তরেস্তর,
উঠিবে সঙ্গীত গগন উপরে,
অন্তর অন্তরে দ্বিগুণিত স্বরে
তারি প্রতিধ্বনি হবে ;
নিশীথ সমীরে যবে ধীরে ধীরে
নামিবে সে গীত স্তরে স্তরে স্তরে,
পরাণ আমার বিহ্বলতা ভরে
আবার ঘুমায়ে রবে।
বরিশাল
ডিসেম্বর ১৮৮৫।

১১৫,
অজানারে হবে জানিতে।
সেই অজানারে হবে জানিতে,
যে পলায় দূরে, তারে বিশ্ব ঘুরে,
নিজ পুরে হবে আনিতে।
দেখা দিয়া যায়, নাহি দেয় ধরা,
বিজলির মত কভু সে প্রখরা,
স্বপনের মত বিহ্বলতা-ভরা,
খেলে এ হৃদয় খানিতে;
ভাল করে হবে জানিতে।
কেউ বলে, “বঁধু, দেখিবার ভুল,”
কেউ বলে, “হায়! হয়েছ বাতুল,
বাসনা সাগরে কে পেয়েছে কুল ?”
নারি কারো কথা মানিতে ;
অজানারে হবে জানিতে।
লক্ষ ঢেউ আসি পড়িছে বেলায়,
কোন্ মায়াবিনী তা’ লয়ে খেলায়,
কোথা হতে উঠি, কোথা ফিরে যায়,
কাহার অমােঘা বাণীতে ?-
তাহারে হইবে জানিতে।
...

মাল্য ও নির্মাণ্য।
ঝাপ দিয়া পড়।
শুধু আয়ােজন, কাজ হ’ল কই ?
নাহি প্রবাসের দিন দুই বই,
জাগ না?
আশে পাশে চেয়ে ভেবনাকো আর,
কাজের মাঝারে লাগ এই বার,
লাগনা ?
ভাবনা গণনা দূর করে ফেল,
তুলিতে মাপিতে সব চলে গেল
ক্ষমতা।
তীরে সন্তরণ শেখা নাহি হয়,
ছাড় আপনার প্রতি অতিশয়
মমতা।
ঝাঁপ দিয়া পড়, ঠিক মধ্য স্রোতে,
পাইবে নিস্তার বাধা বিঘ্ন হতে,
ভাসিবে।
পাছে মারা যাই বুঝি এই ভয় ?
মারা ত যাবেই, না গেলেই নয়,
নূতন জীবন, শকতি অক্ষয়,
তা না হলে কেন আসিবে?

শারদীয়া।
(দুর্গা পূজার ছুটী-১৮৮৯)
যাত্রা।
কোন্ দিকে মহাবেগে বায়ু বহমান,
ক্ষুদ্র পালখের মত উড়ায়ে আমায় ;
কোন্ হােত ভাসাইয়া তৃণের সমান,
জন্মতীর-ক্রোড় হতে দূরে লয়ে যায়?
শারদ গগনে স্থির স্বর্ণ-মেঘচ্ছবি,
বহে কি না বহে বায়ু, নিদ্রা বিচেতন,
পূরব-দক্ষিণ-মূখী কালিন্দী, জাহ্নবী,
উজানে টানিছে মােরে শকতি নূতন।
দূর কর পুথি পত্র ; অসিত অক্ষর
গুণি গুণি অহরহ ব্যথিত নয়ন
বিশাল প্রকৃতি-গ্রন্থ, প্রাণ তৃপ্তিকর,
উজ্জল বরণ, চল, করি অধ্যয়ন।
••

১১৮
মাল্য ও নির্মাল্য।
চারি প্রাচীরের মাঝে অবরুদ্ধ প্রাণ,
ধরিয়া রাখিতে তারে পারিনাকে। আর
বাহিরের মুক্ত বায়ু করিবারে পান
কাটিয়া শৃঙ্খল পাখী ছুটিল এবার।
কি দেখাব ?
আমারে কেনগাে, বিভু, হেন আঁখি দিলে,
দৃষ্টি যার ক্ষীণ অতি, দূরে নাহি যায় ?
আকাশ অবনী কেন এত কাছে মিলে,
কত কি আড়াল করি, সম্মুখে দাড়ায় ?
তােমার সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টি এ ক্ষুদ্র অন্তরে
ওহে দেব, প্রাণপণে সঞ্চিবারে চাই,
এ নয়নে, এ হৃদয়ে যতটুকু ধরে,
ভয় হয়, তাও পাছে নিতে ভুলে যাই।
প্রকৃতির শােভা হতে কিছু আভা তার
হৃদয়ে পড়িয়া আঁজি উজ্জল হৃদয়,
এ সৌন্দৰ্য, এ আনন্দ আমার মাঝার
রহিবে না চিরদিন ? পাইবে কি লয় ?

।
শারদীয়
চিরতরে এ হৃদয় দাও উজলিয়া,
যাদেরে ফেলিয়া
দূরে
ভ্রমিতেছি আমি
কি দেখাব তাহাদেরে, ঘরে ফিরে গিয়া,
এ আলাে না যদি মাের হয় অনুগামী ? .
পান্থশালা।
কারাে
পথশ্রমে প্রান্ত অতি মােরা দিন কত,
হেথায় দিবস দুই করিব বিশ্রাম,
এখানিত গৃহস্থের আলয়ের মত
লােকপূর্ণ,-গৃহ নহে, শুধু পান্থধাম।
নহে গৃহ,-পান্থশালা, লােকে ভরপুর,
এক আসে, আর যায়, কেহ নয়,
দিনেকে নিকটে অতি, দিনান্তে বা দূর ;
মিছা নহে এ মিলন, এই পরিচয়।
সৌন্দৰ্য প্লাবিত-কান্তি, প্রিয় দরশন,
সুজনে সুজনে কত হইছে সাক্ষাৎ
দুদণ্ডের দেখা শুনা, প্রিয় সম্ভাষণ,
জীবন নাটকে করে নব অঙ্কপাত।

মাল্য ও নির্মাল্য।
আনমনে চেয়ে চেয়ে কত দেখে লয়,
আনমনে মন ভরি লয় জ্ঞান ভার,
তাই বুঝি জগতেরে পান্থবাস কয়,
ক্ষণিক মিলন-ভূমি, শিক্ষার আগার ?
-
যমুনা কল্পনা।
তার কূলে কূলে বুঝি বকুল তমাল
করে স্কুল ছায়া দান,
তার জলে জলে ছুটে প্রেমের স্মিরিতি
কল্লোলে বিরহ গান ;
সেথা সমীর হিল্লোলে বাজেবা বাঁশরী
পরাণ উদাসী করা,
সেথা দিবসের আলাে গােধূলি-কোমল,
আঁধার কৌমুদী-ভরা ;
বুঝি আয়াস বিহীন
মধুর
জীবন,
মুখের স্বপন মত,
হয় সে ভূমি পরশে সুদুর স্বপন
জীবনেতে পরিণত ;

শারদীয়া।
রাজে হৃদয় কাননে চির মধুমাস,
ভাব ফুলে ফুলময়,
माना চামেলীর বাসে কোকিল কাকলি
সুরভিত হয়ে রয়।
কাল সেই সে যমুনা হেরিবে দু’ আঁখি,
তাই তারা নিশি জাগে,
আমি কেহ না উঠিতে ত্যজিব শয়ন,
জাগিবে না উষা আগে ;
ধীরে উষাকর ধরি সেই পুণ্য জলে
নামিয়া করিব স্নান,
আমি সেই বারিপানে বিশ্বের পীরিতি-
অমিয় করিব পান।
কাল প্রভাত মারুতে, অরুণ কিরণে,
কালিন্দীর শ্যাম কূলে,
বুঝি ধরার বাঁধন আঁখি হতে মাের
সহসা যাইবে খুলে।

১২
মাল্য নির্মাল্য
দিল্লী।
ভূবন বিদিত দিল্লী, এই কি সে স্থান,
মায়ার নগরী, রূপ ঋদ্ধির ভাণ্ডার ?
আজি গত দুদিনের চিহ্নমাত্র সার,
গৌরব কঙ্কালে ভরা, শােভার শ্মশান!
কত কীর্তি-অত্যুদয়, কত অবসান,
শশাণিত সাগর তীরে, হায় কতবার
দেখিয়াছে, কত ভূষা দেছে অঙ্গে তার
পাণ্ডব, কুতব, পৃথী, সের, সাজাহান।
নরের সৃষ্টির এই প্রলয় মাঝার
উথলি উঠিছে প্রাণ সাগরের মত,
রােধিতে না পারি অশ্রু, দুঃখের নিশ্বাস,
বুঝিয়াছি মানবেরুবৃথা অহঙ্কার,
খেলানা করিয়া তারে খেলিছে নিয়ত
মহাকাল,-মানবের এই ইতিহাস।

শারদীয়া। •
স্মৃতি চিহ্ন।
ওরা ভেবেছিল মনে, আপনার নাম
মনােহর হৰ্ম্যরূপ বিশাল অক্ষরে
ইষ্টক প্রস্তরে রচি, চিরদিন তরে
রেখে যাবে! মূঢ় ওরা, ব্যর্থ মনস্কাম।
প্রস্তর খসিছে ভূমে প্রস্তরের পরে,
চারি দিকে ভগ্ন স্তুপ, তাহাদের তলে
লুপ্ত স্মৃতি; শুষ্ক তৃণ কাল-নদী-জলে
ভেসে যায় নামগুলি, কেবা রক্ষা করে।
মানব হৃদয় ভূমি করি অধিকার,
করেছে প্রতিষ্ঠা যারা দৃঢ় সিংহাসন,
দরিদ্র আছিল তারা, ছিল না সম্বল
প্রস্তরের এত বােঝা জড়াে করিবার ;
তাদের রাজত্ব হের অক্ষুন্ন কেমন,
কাল স্রোতে ধৌত নাম নিত্য সমুজ্জ্বল।

২৪
মাল্য ও নির্মাল্য।
সাজাহান।
এই সৌধজি পানে চাহি যত বার ও
অতল বিস্ময় মাঝে তত ডুবে যাই।
সৌন্দর্য্যে পুণ্যের বাস। ভাবিয়া না পাই,
ভ্রাতৃরক্তে সিংহাসনে অভিষেক যার,
এত শুভ্রতার মাঝে কেমনে বিহার
করিত সে। বিধি, যারে ষেই দাও নাই,
তারে কেন আঁখি দিলে, তােমারে সুধাই ?
অথবা প্রস্তরে হিয়া গঠেছিলে তার?
মুছে গেছে ধরা হ’তে শােণিতের দাগ,
রুধির-রঞ্জিত হন্ত ধূলি-পরিণত,
সে হস্তের খেত,শােভ করিতে প্রচার,
এই উচ্চ কীর্তিস্তম্ভ রয়েছে সজাগ ;
প্রিয়ার প্রণয় তার জানাইছে কত
তাজ, দীন ভারতের রত্ন অলঙ্কার।

শারদীয়া।
১২৫
*
প্রাচীন কীর্তি দর্শন।
বিস্ময়ে বিপুলীভূত দুটি আঁখি লয়ে,
ছােট এক মন লয়ে আর,
ভ্রমিতেছি দিশি দিশি ভাব-ভার বয়ে,
আসি, দেখি, চলি পুনঃবার।
তােমরা জানিতে চাহ সূক্ষ্ম বিবরণ
কি য়ে দেখি, কিবা নাম কার,
কে গড়েছে, ইট কিম্বা মর্মরে গড়ন,..
কিবা দৈর্ঘ্য, কতবা বিস্তার।
“থি যদি পড় খুলে পাবে এ সকল,
মাপজোপ আমি নাহি জানি ;
আঁমি দেখি মানবে গুঢ় অন্তস্তল,
সেথাকায় সৌন্দৰ্য্য বাখানি।"..
নরের স্বজাতি বলে বাড়ে অহঙ্কার,
হিন্দু ম্লেচ্ছ নাহি জানি ভেদ,
এ উহার সৃষ্ট শােভা করে ছারখার
দেখি যবে, উপজয়ে খেদ ;
দেখে কভু আসে হাসি, স্নাত অশ্রুজলে,
মানবের কীৰ্ত্তি-অভিলাষ,
এত চেষ্টা রেখে যেতে নাম ধরাতলে,
আপনি যে মরণের দাস।
"

মাল্য ও নির্মাল্য।
কুমারী কমল।
গুজরানওয়ালা-বাসিনী কোন বঙ্গ-রমণীর উদ্দেশে )
সলিল-বহুল শ্যাম বঙ্গ হতে তুলে,
প্রাচীন এ সরােহ, ভূষিত এ ফুলে,
কে হেথা রােপিল আনি পঞ্চনদ দেশে ?
কে জানিত, ভ্রমি বহু, আমি অবশেষে
হেথায় দেখিব, যাহা দেখি নাই আর ?
সত্য একি, নহে কি এ ছবি কল্পনার ?
জীর্ণ দুর্গ, ভগ্ন মঠ, সরসী সােপানে
এই রূপসীর হাট, এর মাঝ খানে
শীতল সৌরভে পূর্ণ কুমারী কমল,
তুমি মাের তীর্থ-শত-ভ্রমণের ফল।
শিখ ইতিহাস মনে রবে কি না রবে,
তােমার মধুর স্মৃতি চিরসঙ্গী হবে।

উৎকণ্ঠা।
১২
স্মৃতি পুস্তক।
নিয়ে এমু সাথে করে’, সদা কাণে কাণে তাের,
দেখি শুনি যত কিছু, সকলি বলিব বলে,
আপনার ভাবে, ভাই, এমনি রয়েছি ভাের
বলিতে সময় নাহি, দেখি আর যাই চলে।
দেখি আর প্রাণ-মাঝে কতই তরঙ্গ খেলে,
ভাষার বরণ দিয়া আঁকিতে না জানি তায়,
এত গীত ঘুরে মরে, পথ কেন নাহি মেলে,
আটকিয়া রহে বুঝি অতিশয় জনতায়।
এতটুকু মসীলেখা এবিদেশে তব দেহে
পড়িল না, সে প্রতিভা আমারে দেছে কি বিধি ?
যেমন আসিলি, সখা, তেমনি ফিরিবি গেহে,
স্মৃতি মাের এ ক’দিন হাে ােের প্রতিনিধি।
উৎকণ্ঠা।
দাড়ায়ে কি আছে তারা মাের প্রতীক্ষায়;
ওষ্ঠাধর মাঝে হাসি আর পরকাশ,
স্নিগ্ধ দৃষ্টি ধুয়ে অশ্রু বাহিরিতে চায়,
আধ রুদ্ধ, আধ ফুট কুশল সম্ভাষ ?

১২৮
মাল্য ও নির্মাল্য।
আঁখি পাশে শান্তি রেখা হেরি, ভীতিভরে
“ভাল ছিলে?” জিজ্ঞাসিলে, কি দিব উত্তর ?
কি দেখাব, “কি এনেছ আমাদের তরে?”
বলি, হেসে বাড়াইলে সুকোমল কর ?
ভাল ছিনু, সুখে ছি, তােমাদেরি তরে
মনটা চঞ্চল হ’ত কোন কোন দিন,
তাই পিঞ্জরের পাখী এনেছি পিঞ্জরে
আরআনিয়াছি গল্প ঝুড়ি দুই, তিন।
দাড়ায়ে কি আছে তারা? যতগুলি মুখ
রেখে গেছি, ততগুলি দেখিব নিশ্চয় ?
সহসা ভাবনা ঝড়ে কেন কাঁপে বুক?
হায়রে পাগল প্রাণ, কেন এ সংশয় ?
প্রিয় গ্রন্থগণের প্রতি।
এস যত সখা সখী, তােমাদের ছেড়ে
দূরে দূরে আইলাম ঘুরে,
আমারে সকলে মিলে রেখেছিলে বেড়ে
চিন্তা আর স্বপনের পুরে।

শারদীয়া।
বাহিরে বিহার করে প্রিয় দরশন
বঁধূ মাের আরাে কত শত,
সঙ্গীত-অমৃত-ধারা করে বরষণ
প্রাণ মাঝে তােমাদেরি মত ;
নয়নেতে লয়ে গেনু তােমাদেরি আলল,
করিয়াছে পথ প্রদর্শন,
তােমাদেরি প্রাণ লয়ে বাসিয়াছি ভাল,
চিনিয়াছি প্রিয় অগণন।
বাহিরিয়া, তাহাদের পেয়ে পরিচয়,
তােমাদেরে চিনেছি আবার,
জগতে বিফলে দান যাইবার নয়, .
দিলে, শােধ দুনা পাবে তার।
হৃদয়ের ভাগ দিয়া অল্প এ হৃদয়
বেড়ে গেছে, হের, সুদে মূলে,
তােমাদের ধ্যানে ছিল ক্ষীণ আঁখিদ্বয়,
দূর দৃষ্টি গেছে তাহে খুলে।
এই বড় প্রাণ আর, বড় আঁখি নিয়া
ধরা দিতে আসিয়াছি দাস,
তােমাদের পাতে পাতে রাখগো গাথিয়া
শরৎ না আসে যত মাল।

মাল্য ও নির্মাল্য।
নারীর অভিমান।
বুঝিলে কি অবশেষে, অবােধ হদয়,
সম্পূর্ণ কাহারাে নহ, কেহ তব নয় ?
কাছে থাক দূরে যাও, প্রাণ দাও, প্রেম দাও,
সে তােমারে এতটুকু করে না প্রত্যয় ;
যত চল বাড়ে পথ, পূরেনাকো মনােরথ,
তৃষা বাড়ে, শান্তি মরে, জনমে সংশয়।
বুঝিলে কি অবশেষে, বুঝিলে কি হয় !
কায়া বলি অনুসরি চলিছ ছায়ায় ?
কখন বা সুপ্তি আসে, অসত্য বাহুর পাশে
অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা ভাব আপনায়,
ছুটিলে ঘুমের ঘাের, টুটে যায় বাহুডাের,
আঁধারে একলা পড়ি কঁাদ অসহায়।
বর্ষ বর্য হদয়ের প্রত্যেক স্পন্দন
একটি একটি করি করালে শ্রবণ,
সুখ দুঃখ উর্মিলীলা সঙ্গীতে গাঁথিয়া দিলা,
বুঝিয়াছে সে তােমার কত খানি মন?
বিমল দর্পণ হয়ে, তার ছায়া বুকে লয়ে,
দিবালােকে সম্মুখেতে দাঁড়ালে যখন,
দেখিল সে কত বার, সে বুঝি স্বপন তার,
তাই এত শত প্রশ্ন করে অনুক্ষণ?

পুরুষের সান্ত্বনা।
১৩১
আর কেন, চলে এস, কত কথা কবে ?
তােমার ফুরাবে কথা, তার প্রশ্ন রবে।
কথায় কি হবে আর, জীবন মেনেছে হার,
হিয়া নাহি অনুভবে, কথায় কি হবে ?
নিবিড় সায়াহ্ন তলে, উত্তাল সিন্ধুর জলে,
নীরব নিশীথে তুমি ভাবিয়াছ যবে
এক হয়ে গেছ দোঁহে,—তুমি মুগ্ধ ছিলে মােহে,
অনন্ত দূরত্ব মাঝে, আর কেন তবে?
১৮৯১।
পুরুষের সান্ত্বনা
অয়ি সূনৃতে তােমার প্রত্যেক বচন
বেদের সমান জানি,
তবু তুমি ভালবাস আমা হেন জন,
একথা কেমনে মানি ?
তাই প্রতি দিবা নিশি তােমারে সুধাই,
তাই যত শুনি, তত শুনিবারে চাই,
এতাে অবিশ্বাস নহে, রাণি।
যাহা সুজন-দুর্লভ এজন তা পায়,
এ বুঝি স্বপন হবে,

১২
মাল্য ও নির্মাল্য।
মাের
দেবি,
বু
বুঝি
শঙ্কিত হদয় সদাই সুধায়,
“রবে, এ সৌভাগ্য রবে ?”
তােমারি কি আঁখি স্বপ্ন মােহময়,
তুমি সত্য ভাব, সত্য যাহা নয় ?
জাগিয়া উঠিবে যবে,
অচেনার মত মুখ পানে চাবে,
ঘৃণায় লজ্জায় দূরে সরে যাবে,
আমার কি হবে তবে?
কেন আপনারে ভুলায়ে রেখেছ,
বাতুল করিছ মােরে ?
বল, আঁখি খুলে আমারে দেখেছ,
হায়
তুমি
রহ নাই
ঘুম ঘােরে।
এ মুখে ঢালিয়া আপনার আলাে
আলােকিত মােরে বাসিততছ ভাল,
যেওনা যেওনা সরে’।
১৮৯১।

অযােগ্য ও যােগ্য প্রেম। অযােগ্য ও যােগ্য প্রেম । নারিনু বুঝিতে, ভদ্র, তােমার প্রণয়, লগ্ন যাচ্ছে এত লাজ ভয়। আত্মার গৌরব প্রেম, আনন্দ-আধার, লজ্জার ধারেনা সে তাে ধার। ভালবাসা সে কি চুরি, সে কি মিথ্যাবাদ, কৃতঘ্নতা, অন্য অপরাধ? যারে পূজা কর সে কি পূজনীয়া নয়? কেনই বা তাহে লাজ ভয় ? ভাল চোখে দেখিয়াছ কিছু ভাল তার, দেখে নাই অন্য কেহ আর, বিধাতার এ জগতে কে আছে সে জন, বাঁধিতে পারে না কোন মন ;- কে আছে সে, সৌন্দর্য্যের গুপ্তখনি যার করে নাই কেহ আবিষ্কার ? আপনা অযােগ্য ভাব তাই এ সরম ? পূজকের এই তত ধরম। প্রেম দিয়া করিছ কি কোন অপকার- পরের অথবা আপনার ? ';

১৩৪
মাল্য ও নির্মাল্য।
.
অমঙ্গল সত্য যদি বুঝে থাক মনে,
উপাড়িয়া ফেল সযতনে ;
দূর কর হেন প্রেম, পুরুষ হৃদয়
স্পর্শিবার যােগ্য তাহা নয়।
(২)
হয় লইমু মানি, আমি মূর্খ নারী,
নারীর হৃদয় জানি, যদি কিছু জানি ;
আমার শকতি নাই বুঝিবারে পারি
জটিল পুরুষ চিত্ত,—লইলাম মানি।
অনেক সহজ সত্য, বিধাতার ছলে,
শিশু, পশু নারী হৃদে আছে বদ্ধমূল,
করতে স্বীকার তুমি? আমি তার বলে
চিনি পুরুষের প্রেম, হয়নাকো ভুল।
পুরুষের প্রেম সেও পুরুষের মত
সুবল, সহিষ্ণু, ধীর, উদার নির্ভীক,
মস্তক উন্নত, চক্ষু প্রভাময় স্বতঃ;
কাপুরুষ ভয়ে লাজে চাহে চারিদিক
একপদ অগ্রসরি করে ইতস্ততঃ,
কোন পথে যাবে যেন আকাশে সুধায়,
লুকাচুরি আপনার সাথে অবিরত,
লুকাচুরি তার সাথে যারে পেতে চায়।

নিরুপায়।
পুরুষের প্রেম দেয় নিজ পরিচয়
জীবনের প্রতি কাজে, রণে যথা বীর,
সেততা নহে বহুভাষী, ভীরু, ক্ষুদ্রাশয়,
আপনার সুখ লাগি সে নহে অস্থির।
নিরুপায় ।
প্রিয়তম, কহ তুমি যাহা ইচ্ছা তব,
যত রুক্ষ তীক্ষ্ণ বাণী আছে গাে ভাষায়
সব আনি হান প্রাণে, আমি সয়ে রব
সিক্ত চোখে, মৌন মুখে, আমি নিরুপায়।
তুমি পতি, তুমি প্রভু; মন, মান মম
সকলি তােমার হাতে , দল যদি হায়,
এই রমণীর মন, তাহা, প্রিয়তম,
তােমারি চরণ প্রান্তে লুটাবে ধরায়।
করি যদি অপরাধ, তার যথােচিত
বিধান তােমারি কাছে তােমার উপরে
কেহ নাই, যার দ্বারে হব উপনীত
তব অবিচার হ’তে বিচারের তরে।

মাল্য ও নির্মাল্য।
৫
তােমারে দূষি না, মাের নিয়তির দোষ ;
কেমনে বুঝিব আমি কিসে যে কি হয়,
এক কালে যে আলাপে লভিতে সন্তোষ,
আজ তার প্রতিবর্ণ লাগে বিষময়।
এক কালে-হায় স্মৃতি! কাহারে কহিব ?
তব তপ্ত অশ্রুসিক্ত এ চরণ ধরি
কহিয়াছ, “যত দুঃখ আনন্দে বহিব,
এতটুকু স্থান আমি শুধু ভিক্ষা করি
তােমার হৃদয় প্রান্তে ; যদি তাহা পাই,
এতটুকু প্রেম যদি কর মােরে দান,
সমস্ত জগৎ যদি তখনি হারাই,
তবু আপনারে আমি মানি ভাগ্যবান্।”
তার পর সেই প্রেম, সেই ক্ষুদ্র হিয়া
করিয়াছ অধিকার ; জগতে তােমার
যা ছিল সকলি আছে , আমারে লভিয়া
হয় নাই কোন ক্ষতি, কোন অপকার
তবে যদি নিত্য দৃষ্টি, নিত্য সহবাস
চক্ষে এনে দেয় তৃপ্তি, হৃদয়ে বিরাগ,
আমি তার কি করিব? আমি বারমাস
তােমার পিঞ্জরে পাখী, ওহে মহাভাগ।

নিরুপায়।
১৭
আগে কিছু চাহ নাই আমা ব্যতিরেকে,
ভেবেছিনু মােরে লভি ঘুচিবে বেদন,
মিথ্যা আশা,আকাঙ্ক্ষিত লভি একে একে,
নূতন অভাব স্মরি করিছ রােদন।
আমারে আমারি তরে চেয়ে ছিলে আগে,
তার কোন কথা আজ নাহি জাগে চিতে,
আজ পুরাতন মােরে ভাল নাহি লাগে,
নৃতন আকারে মােরে চাহ গড়াইতে।
আগে মােরে বরেছিলে হৃদয়ের রাণী,
আমারি সেবক হতে ছিল তব সাধ,
আজ শত কর্তব্যের মাঝখান আনি,
গুণিতেছ মাের ভ্রান্তি, রুটি, অপরাধ।
কর তুমি, প্রিয়তম, যা হয় বিহিত
তােমার বিচারে ; মাের কেহ নাহি আর
এ ধরায়, যার দ্বারে হব উপনীত
তব অবিচার হতে লভিতে বিচার।

১৩৮
মাল্য ও নির্মাল্য।
যবে ছিল ভালবাসা।
প্রাণে যবে ছিল ভালবাসা চোখে সব লেগেছিল ভালাে,
ভালবাসা জীবনের মধু, ভালবাসা নয়নের আলাে।
ভিতরে বাহিরে, প্রিয়, মাের কোন কিছু হয়নি বদল
তুমি প্রেম হারাইলে বলে, মাের চোখে বহাইলে জল।
সৰ্ব্ব অঙ্গীকার হতে তােমা মুক্তি দিয়া, জনমের মত,
আমি যদি চলে যাই আজ, বুকে ঢেকে অতীব বিক্ষত
মুমুর্ষ আনন্দটুকু, প্রিয়, সহসা কি মুহূর্তের লাগি
অতীতের প্রেমােন্মাদ তব স্মৃতি তলে উঠিবেনা জাগি ?
বুঝিবে না, আমি যাহা আছি, তাই আমি ছিনু চিরদিন,
বিচিত্ৰ তােমারি প্রেমালােকে লভেছিনু মাধুরী নবীন?
আমিও যে পেরেছি দাড়াতে সে আলােকে কোনাে শুভক্ষণে,
সেইটুকু নারী জীবনের সফলতা জানিতেছি মনে।
বর্ষশেষে।
তােমার সে প্রেম হতে যেটুকু পেয়েছে ক্ষয়
আজ আমি সেইটুকু চাই,
জেনেছি তা এ জনমে আর ফিরিবার নয়,
আঁখি ভরি অশ্রু আসে তাই।

বর্ষশেষে।
যে দিন গােলাপ ফুটে, সে দিনের শােভা তার
সে দিনের সৌরভ অতুল,
পরদিন নাহি থাকে, এ কথা অজানা কার ?
তবু মনে করেছিনু ভুল।
মনে করেছিনু প্রিয়, অমর আত্মার প্রীতি
অক্ষয় মাধুর্যে ভরপুর,
মৃত্যু-পরিবর্তশীল জড় জগতের রীতি
তাহা হতে রহে বহুদূর।
পৃথিবীর শত কবি লক্ষ লক্ষ কবিতায়
যে প্রেমের গুণ গায় কত,
সে প্রেম শুকায়ে যায়, নাহি জানিতাম হায়, ,
বসন্তের ফুলটির মত।
বর্ষ শেষে বড় দুঃখে লভিয়াছি এই জ্ঞান,
ঘুচিয়াছে অযথা গরব,
তাই, অবনত মুখে মুছে ফেলে অভিমান,
বসে আছি পদতলে তব।
আজ যতটুকু পার ততটুকু দিও স্নেহ,
ততটুকু আদর সােহাগ,
কোন দিন দিয়াছিলে সব ধল মন দেহ,
সমস্ত প্রাণের অনুরাগ।

১৪০
মাল্য, ও নির্মাল্য।
;
পরিণতি।
হে কল্যাণ, এ নহে সে নবীন যৌবন,
উদ্যমে উচ্ছাসে যবে পূর্ণ ছিল মন ;
তড়িতের বাতি যেন জ্বলিত অটল,
হৃদয়ে অসীম আশা-অনাহত বল ।
তখন জগৎ ছিল অনাবৃত দ্বার
সৌভাগ্য ভাণ্ডার যেন, বাসনা যাহার
তারি লুণ্ঠনের তরে; ভবিষ্য জীবন
ছিল মাের একখানি উজ্জ্বল স্বপন,
পূর্ণ হইবার লাগি প্রতীক্ষা করিত
সুমুহূর্ত।
এ হৃদয় আনন্দে ভরিত
জড়ের সৌন্দৰ্য হেরি, নরের গৌরবে ;
আপনারে মনে হত এ বিপুল ভবে
একটি অমর শক্তি, বিধাতার বরে
জগতের অকল্যাণ বিনাশের তরে
অবতীর্ণ। সেই কালে দেখিতাম আশা
প্রতি মানুষের মুখে, শুভ্র ভালবাসা
প্রতি রমণীর বুকে ;
আপনার প্রাণ
গাহিয়া উঠিত নিত্য আনন্দের গান।
তখন হইতে মনে, এ মনের মত
পাই যদি নারী, তারে পূজিব সতত,

পরিণতি।
১৪১
দেবীরূপে, প্রেম দিব অজস্র ধারায়
এ অক্ষয় উৎস হতে। মলয়ের বায়
ফুটাইতে আসে যথা বসন্তের ফুল,
তেমনি পরশ তার হৃদয় আকুল
করি দিবে, কুসুমিত শত নব ভাবে,
অপূর্ণ জীবন মাের পূর্ণ হয়ে যাবে
দিনে দিনে। তার প্রেম মানব আমারে
দিবে দেবতার জ্যোতিঃ। যবে পাব তারে,
সফল স্বপন হতে অকস্মাৎ জাগি
দেখিব, বসিয়া ছিনু যে মুহূৰ্ত্ত লাগি
এই সেই সুমূহুর্ত।
সৌভাগ্য আমার
সেই প্রেম সেই পূজা দিছি একবার ?
সেই প্রেম, সেই পূজা মানবের তরে
জীবনে বারেক আসে। বৎসরে বসরে,
উদ্বোধন, আবাহন, তিন দিনে পূজা
সাঙ্গ করি, বিসর্জিছে যথা দশভূজা
দেবতারে নদীগর্ভে, উপেক্ষার নীরে
বিসর্জে গৃহস্থ তার মনসী দেবীরে।
সে দেবী ও দুঃখ শশাকে, হেমন্ত শিশিরে
মাঝে মাঝে ক্ষণ তরে দেখা দেন ফিরে।

১৪২
মাল্য ও নির্মাল্য।
শুকাইয়া পড়ে পাতা, ফুল যায় ঝরে,
তেমনি এ চিত্ত হতে আশা গেছে সরে,
প্রেমের সে রূপ রস। কিছু থেকে যায়,
হৃত-পুষ্প-তরু-দেহে, ফুলে যা’ হারায়
তার বেশী পায় ফলে। ক্ষীণ দেহবল
নীরবে সঞ্চিয় যায় জ্ঞান সমুজল ;
ভগ্ন আশা দিয়া যায় ধৈৰ্য সুমহান্,
বেদনা রাখিয়া যায় স্নেহ ভরা প্রাণ।
চলিতে পারে না দ্রুত, খঞ্জ যেই জন,
আঁখি তারে ঠিক পথ করি প্রদর্শন
বিফল প্রয়াস আর বিপথ হইতে
সদা রক্ষা করে। তাই সকৃতজ্ঞ চিতে
আমি, বৎস, বিধাতারে নমি ভক্তিভরে,
পূর্ণ হােক লিপি তার অক্ষরে অক্ষরে।
যাত্রা শেষে এই এক ভিক্ষা আমি চাই,
নিয়তি যে পরিণতি বুঝে যেন যাই।
১৮৯৭।

একদিনের ছুটী।
১৪৩
একদিনের ছুটী ।
যদি একদিন শুধু জীবনে ছুটী পাই,
জগতের সীমাশেষে দু’জনে মিলে যাই;
বিধাতার আঁখি ছাড়া দ্বিতীয় নাহি কেহ,
সন্ধ্যারূপে ঘিরে রবে দুজনে তার স্নেহ ;
জানিব দুজনে দোহে, জগৎ কিছু নয়,
কিসের বা অভিমান, সন্দেহ, লাজ, ভয় ?
মাঝখানে কিছু নাই, মিলিত হিয়া দুটি,
যত আবরণ বাঁধ সহসা গেছে টুটি;
সেথায় দু’জনে দেহে খুলিয়া দিব প্রাণ,
চিরতরে ভুলভ্রান্তি করিতে অবসান।
সে দিনের মিলনের আনন্দ অশ্রু দিয়া
ধীরে ধুয়ে দিব তার শশানিত-লিপ্ত হিয়া,
তদুপরি লেপি দিব শীতল অনুরাগ,
চন্দন সুরভি, স্নিগ্ধ ; রবেনা কোন দাগ।
একা চলি দীর্ঘ পথ ব্যথিত তনু তার,
এ বুকে মাথাটি রাখি ঘুচাবে শ্ৰম ভার,
একবার প্রাণ দিয়া করিবে অনুভব,
আমার যা কিছু বল, তাহারি তরে সব ;
প্রাণের যেটুকু প্রেমে ত্রিদিব পুষ্পবাস,
সেটুকু তাহারি তরে ফুটিছে বারমাস।

১৪৪
মাল্য ও নির্মাল্য।
1.
আমি যে করেছি ভুল, করিতে প্রতীকার
একটি দিবস চাহি, বেশী না চাহি আর।
ব্যথা আছে, হেথা তারে দেখাতে বাসি লাজ,
কেমনে কহিব কথা, করিতেছিল কাজ।
আমি যে দিয়াছি ব্যথা, ঘুচাতে হবে তায় ,
কবে ?—আজকাল করি দিবস চলি যায়।
সে মাের নিজস্ব কিনা, সুধাতে হবে ফিরে,
অতীতের, ভবিষ্যের, মৃত্যুর, উভতীরে।
দুই মুখে দুইজন, নীরবে চলি পথ
দূর হতে দূরতর পূরে না মনােরথ ।
ধরণীর দায় মাঝে দুজনে দুই পার,-
কিসের দায়িত্ব ? মােরা ধারিনা কারাে ধার।
ঝেড়ে ফেলি প্রেম হতে উপেক্ষা পাংশু জাল
ছিড়ে ফেলি একটানে মাঝের অন্তরাল।
হিয়া ধায় হিয়া পানে, কেনই দিই বাধা
শূন্য লাগে সুখ যত, জীবন লাগে আধা।
রীতির বন্ধন জীর্ণ ছিড়িতে কতক্ষণ?
তবুও ছিড়িতে কেন সরে না কভু মন।
কি জানি নীতির ডর কাহার ছুটে যায়,
কৰ্ত্তব্য-কঠিন-বন্ধ কাহার টুটে যায়।

এ দিনের ছুটী ।
১৪৫
যদি জগতের গ্রন্থে লেখাজোখা না থাকে,
ভুলায়ে বিপথে যদি কাহারেও না ডাকে,
এ সুখ না কাড়ে যদি কাহারাে সুখ-ভাগ,
এ প্রেম হৃদয়ে কারাে না রেখে যায় দাগ,
ধরণীর রীতি নীতি অক্ষত রাখি যায়,
তবে গাে মিলন সুখ চাহি এ ধরায়।
জীবন জটিল অতি, বুঝাতে নাহি পারি,
কি বুঝিতে কি বুঝিবে, হৃদয়ে ভয় ভারী,
শুধু দিবসের তরে বারেক ছুটী চাই,
জগতের সীমা শেষে দু’জনে মিলে যাই।
সে দিন হবে না হায়, জীবনে নাই ছুটী,
নিতান্তই পর হেথা আত্মীয় মােরা দুটি।
জানুয়ারী ১৮৯১।

মা ও নির্মাল।
হিসাব।
আমি ছিনু এক দরিদ্র যুবক, ধনীর কুমারী তুমি,
তােমার আমার ছিল না জগতে দাঁড়াবার সমভূমি।
ভালবাসা আসি ভাসাল আমারে, করাইল কত ভুল,
চলিল হৃদয় করি অতিক্রম ধনগৰ্ব্ব, জাতি, কুল ;
দাড়াল আসিয়া তােমার দুয়ারে, অসংকোচ, নিঃসংশয়,
সে নাহি জানিত প্রেমের লাগিয়া প্রেম কেহ নাহি লয়।
তুমি বুঝাইলে আমার হয়েছে হিসাবে দারুণ ভ্রম,
প্রাচীন প্রাচীর উল্লঙ্ঘিতে নাহি প্রণয়ের পরাক্রম।
কুসুম কাননে লতার মণ্ডপ চালােকে শােভা ধরে,
দুদণ্ড সেথায় বসি ঘরে যায়, কে সেথা বসতি করে ?
কুসুমের মধু মধু বটে, নহে জীবনের অন্ন পান,
নিতান্ত বিস্বাদ অমিশ্র লবণ, করে অন্যে স্বাদ-দান ;
তুমি বুঝাইলে, প্রণয় তেমন, দিতে শােভা, দিতে স্বাদ,
শুদ্ধ প্রেম লাগি করা ভাল নয় এত বাদ বিসম্বাদ।
যত তৃষ্ণা ক্ষুধা আছে মানবের, এক প্রেমে নাহি যায়,
। রবে সুখ, স্বজনেরা যদি মুখ তুলে নাহি চায় ?

হিসাব।
১৪৭
নব পরিবার গঠনে উপায়, প্রেম তত উদ্দেশ্য নয়,
নূতন যৌবনে, কবিত্বে, স্বপনে, একে আর মনে হয়।
যৌবন ফুরালে, কভু না ফুরাতে, মায়া মােহ ভেঙ্গে যায়,
বুভুক্ষু মানব কহে—“এই ভুল না যদি হইত হায়।”
কত অঙ্ক কসি, ভাবিয়া গণিয়া, হৃদয় করিয়া রােধ,
আমারে তাড়ালে লুব্ধ ভিক্ষু সম, তাড়ালে জন্মের শােধ।
কত বা করুণা কত না গরব, অনুরাগ লাজ ভয়,
তােমার আছিল, আমার প্রণয়, ছিল সে খাটি প্রণয়।
আমার শুকাল কুসুম কানন, ফুরাল সকল ক্ষুধা,
জীবনের স্বাদ কিসে ধুয়ে গেল, কর্মের আনন্দ সুধা।
.
সে দিন হইতে বিদেশে প্রবাসে করি আয়ুঃ অতিপাত,
ধনের আকর চরণের তলে, চলিতে চাহে না হাত।
যত দূরে যাই, তােমার সংবাদ লয়ে থাকি চিরকাল,
তােমারে ধরিতে কে কত ফেলিয়া, ছিড়িয়া এনেছে জাল।
যাহা চেয়েছিলে আসিয়াছে কাছে, অন্নপান সমুদয়,
তবে কি লাগিয়া আশা নিরাশায় জীবন করিছ ক্ষয়?
এত বৰ্ষ যায়, তােমার চরণে লয়ে ধন কুলমান,
কত কেহ আসে,-কেন কাহারেও কর নাই পাণি দান?

১৪
মাল নির্মাল্য।
জীবনের ভােজে লবণ নির্মল, লয়ে সুমধুর মধু
আসেনি কি তবে তাহাদের কেহ তােমারে করিতে বধূ ?
এত দিনে তবে বুঝেছ কি মনে, আমি যা বুঝেছি আগে,
এ লবণ বিনা বিদ জীবন, কোন কাজে নাহি লাগে ?
বুঝেছ কি মনে, এ নহে সুলভ, অমাশুল না বিকায়,
যাহারে তাহারে যে সে বেচিবারে অধিকার নাহি পায় ?
বুঝেছ, লবণ কারাে গৃহে যদি থাকে শত মণ ভার,
অতিরিক্ত পড়ি দৈনিক ব্যঞ্জন করে না বিস্বাদ তার?
বেশী ফুল ফোটে বাগানে তােমার, তাহাতে কাহার ক্ষতি,
অতিশয় ধন পারে না বহিতে, বিতরিতে ধনপতি ?
বেশী প্রেম হলে তাতে নাহি ভয়, না থাকিলে বৃথা সব,
সুখের লাগিয়া অন্য আয়ােজন, ধন মান বৈভব।
ধন ল’য়ে যবে আসে ধনেশ্বর, কুলীন কুলের মান,
তাই অনাদরে কর প্রত্যাখ্যান জীবনের অন্নপান।
প্রেম চাহি সাথে লবণের মাপে, তাহাদের নাহি তাও,
আশ্চর্য ব্যাপার, সেথা তাহা চাও, যেথা যাহা নাহি পাও।
আমার আছিল অনেক প্রণয়, সামান্য ঐশ্বৰ্য্য মান,
তাই বা কেমনে?-দূরদেশে যার সহস্র বাণিজ্য যান,

হিসাব।
যার অধিকৃত নিভৃত খনিতে রয়েছে সহস্র মণি,
বহু ধনে যার উত্তরাধিকার, সে জন কি নহে ধনী?
প্রাণ-ভরা প্রেমে আছিল সঞ্চিত অদম্য উৎসাহ বল ;
স্থির লক্ষ্য যার তাহার জীবনে কৃতার্থতা অবিচল।
তােমারে পাইতে, তােমারে রাখিতে, বাড়াতে তােমার সুখ,
এমন দুঃসাধ্য কি ছিল, যা হ’তে ফিরাতাম এই
মুখ?
তুমি লক্ষ্মীরূপা গৃহে দাড়াইলে, চরণ-পরশ-ভরে
ধরণী ফাটিয়া ফুটিয়া উঠিত ঐশ্বৰ্য্য দীনের ঘরে ;
কুলীন না হই, আমা হতে হত প্রতিষ্ঠিত মহাকুল,
আপনি ভুলিয়া হায়রে আমারে হিসাবে করালে ভুল !
গৌরবে গরবে কি লইয়া আজ তােমার সম্মুখে যাই?
শুভক্ষণ মাের বহিয়া গিয়াছে, যৌবনের বল নাই ;
আছে কিনা আছে সে প্রেম উচ্ছাস নাহি জানি অনিশ্চয়,
এবে কি ফিরাবে প্রেম নাই বলে ? আর নয়, আর নয়।
জুন, ১৮৯২।

মাল্য ও নির্মাল্য।
কেহতো জানে না।
সজনে বিজনে
কি বেদনা ভার
করে হিয়া অবনত,
কথার অতীত
বিষাদ আমার
কথায় বুঝাব কত।
কেহতাে শােনে না
কি জপ ধেয়ান মম,
দেখে না কি আশা
অশ্রুধারা সনে
চমকে চপলা সম।
নিশি যদি জাগি, “সুখ শয্যা লাগি”--
বলে ওরা,—“কাদে মন।”
বিশ্রাম লভিয়া
কি যে শ্রান্ত হিয়া,
বােঝে না তা কোন জন।
কতটুকু মনে কত বড় সাধ, দীন আত্মা, হীনবল,
প্রসাদ লভিতে করি অপরাধ, প্রভুপদে অবিরল !
সুদিনের তরে বসি প্রতীক্ষায় সংসার-সাগর-পারে,
দিন আসে আর দিন চলে যায়, নয়ন শুকাতে নারে।
শৃঙ্খলিত পাখী নীলাকাশ চাহি, কাদে বুঝি এই মত,
দেহ হতে তার যত দিনে নাহি হয় প্রাণ বহির্গত।

১১
দীনের বাসনা।
রাজা রাজধানী মাঝে স্বর্ণ সিংহাসনে,
দীন প্রজা সাম্রাজ্যের দূর প্রান্ত হতে
বর্ষে বর্ষে রাজকর করে নিবেদন ;
দৈবাৎ কখনাে যদি করে আগমন
রাজপুরে, লােকারণ্যে দূরে দাঁড়াইয়া,
একবার রাজমূৰ্ত্তি হেরে কি না হেরে ।
রাজার নির্দেশ মানে, সুশাসনে তার
রহে সুখে ; কখনাে বা দুই হাত তুলে
ধন্যবাদ করে ঔারে। ওহে বিশ্বরাজ,
চিরদিন দীন প্রজা দূর হ’তে আমি
নিবেদিব রাজ-পূজা, উদ্দেশে তােমারে
করিব প্রণাম প্রাতঃ সন্ধ্যা ? সিংহাসনে
তুমি নৃপ, ক্ষুদ্র আমি পড়ে আছি দূরে
প্রভাময়ী মূর্তি তব পাবনা দেখিতে
আঁখি ভরি ? রাজপথে জনতার মাঝে
“অই রাজা” বলি যবে অঙ্গুলি নির্দেশি
অপরে দেখায়, নাহি পাই দেখিবারে,
চলে যাও জ্যোতির্ময়, নিমেষের মাঝে ,
দূরে পরিচ্ছদ-শােভা দেখি যদি কভু,
-

মাল্য ও নির্মাল্য।
ভাবি মনে লভিয়াছি রাজ-দরশন,
অতৃপ্তপরাণ ফিরি গৃহে। ওহে দেব,
তুমি না কি জগতের পিতা? তুমি নাকি
স্নেহ করুণার খনি জীবের জননী ?
তবে কেন দূরে রাখ সন্তানে তােমার ?
কাছে ডাক, হে জননি, অথবা আপনি
নিভৃত কুটীরে থাকি দাও দরশন ;
শুনাও বচন তব, মস্তকে আমার
আশীৰ্বাদ-হস্ত তব রাখ মেহ-ভরে ;
তব রূপ, স্পর্শ তব, স্বর মধুময়,
জানাইবে কাছে তুমি জননী আমার ।
কোথা ছিনু আসিনু কোথায়।
নীরব আঁধার ঘরে
কোমল শয়নােপরে
কত সুখে আছি শয়ান,
বাহিরের কোলাহল, ঝঞ্চাবাত, বৃষ্টিজল
পারে নাই ব্যথিতে এ কাণ।
সহসা কি বরবে কেঁপে গেল হিয়া,
কে ডাকিল, “উঠে এস, এস বাহিরিয়া।”

কোথা ছিনু আনি কোথায়।
১৫৩
সবলে রুধিয়া দ্বার
রহিলাম, বার বার
“এস, এস” শুনিবারে পাই;
একি শয্যা, একি সাজ, একি ঘুম? ছি ছি সাজ।
জীবনে কি কোন কাজ নাই?”
কহিনু “নীরব ঘরে,
পুষ্প আস্তরণ’পরে
আমি সুখে ঘুমাইতে চাই ;
কে তুমি ডাকিছ সেথা, যেথা দিনরাত
রহে খর রৌদ্র, কিবা বহে ঝঞ্চাবাত।”
আগুলি রহিনু দ্বার,
কি আঘাত বারবার,
ঘরখানি যায়, ভেঙ্গে যায়-
ওই গেল সৰ্ব্বনাশ একি আলাে পরকাশ?-
কোথা ছিঃ আসিনু কোথায়?
একি খেলা হে ঈশ্বর,
ভাঙ্গিয়া সুখের ঘর
অন্ধ চক্ষে কর দৃষ্টি দান ।
যেথায় আতপ তাপ,
অশনি ঝটিকাদাপ,
সেথা আসি হও দীপ্তিমান্।
তবে ঘর ভাঙ্গা থাক, আঁধারের সুখ
নাহি চাহি, প্রিয়তম, হেরি তব মুখ

মাল্য ও নির্মাল্য।
পিতা তুমি।
পদে পদে পড়িবার ভয়,
তাই অতি ব্যাকুল হৃদয়,
তাই বলি, তুমি ধর হাত ;
তবু কেন হাত ছেড়ে দাও?
তবু কেন দূরে সরে যাও?
কত আর সহিব আঘাত ?
পড়ে গেলে এস একবার,
তুলিয়া মুছাও অশ্রুধার,
ভাবি বুঝি চির তরে এলে ;
সুখ অশ্রু বহিবারে রয় ;
আঁখি তুলি চাহি যে সময়,
দেখি, তুমি গেছ একা ফেলে
পড়ে গিয়ে যদি কাছে পাই,
তবে পড়ি তাতে দুঃখ নাই,
কিন্তু কেন সাথে নাহি রও?
ভয়ে দুঃখে অভিভুত প্রাণ,
নাহি বুঝি তােমার বিধান,
জানি শুধু, পিতা তুমি হও

অভাব কি থাকে অপূরণ ?
তুমি প্রভু, আমি দাস তব,
জীবন নিজস্ব মাের নয় ।
. যাহা আজ্ঞা শিরে ধরি লব,
তুমি জান কিসে ভাল হয়।
তুমি জান কবে, কোন্ স্থানে,
কোন্ কাজে আসিবে এ জন
আর কেহ জানে বা না জানে,
তুমি জান মাের প্রয়ােজন।
শক্তিময় তুমি মহারাজ,
ইচ্ছায় শাসিছ ভূমণ্ডল,
ছােট হাতে দেছ ছােট কাজ,
ভার বুঝি প্রাণে দেছ বল।
জ্ঞান আঁখি সর্বতঃ তােমার,
জাগরূক আছে অনুক্ষণ
আমারি নয়নে অন্ধকার,
তাই মাের ব্যাকুলিত মন।
কাদি হেরি কার্য্য অগণন
শকতির অতীত আমার ;

মাল্য ও নিমাল্য।
মিছা চিন্তা,-আর কোন জন
শক্তিমান্, পেয়েছে সে ভার।
আমা হতে যেই কাজ হয়,
তাহে ঢালি দিই তনু মন,
তােমার জগতে প্রেমময়,
অভাব কি থাকে অপূরণ?
;
নূতনতা তার
নব উপহার।
বরষ নূতন বেশে
প্রভুহে তােমার
দাড়াইয়া চরণের পাশে
সেইতো জগৎ আছে,
বর্ষে বর্ষে কোথা হতে আসে?
যে বসন্ত গিয়াছিল, আসিয়াছে ফিরে,
লয়ে ফুল-কিশলয়-ভার ;
অতীতে যে পুস্পাঞ্জলি অর্পিয়াছে ধীরে,
নিবেদন করে নাকো আর।
আঁচল ভরিয়া ধরা
নব উপহার
আচরণে করিছে অর্পণ,
আমি খুঁজে খুঁজে এ
সর্বশ্ব আমার
সকলি-সকলি পুরাতন !

নৰ উপহার।
১৫।
সেই পুরাতন কথা, সেই অশ্রু জল,
সেই মাের সকরুণ গান ;
সেইতাে সংকল্প শত,
প্রতিজ্ঞা দুৰ্বল,
সেই ক্ষত বিক্ষত পরাণ ।
একটি প্রার্থনা মাের আছে গাে নূতন,
সে প্রার্থনা আপনি পূরাও ;
দুঃখ আছে,—দুঃখ সাথী হােক আজীবন,
নব বর্ষে নব দুঃখ দাও।
মিছাই যুঝিব কেন?
লভিয়া বিজয়
নব রণে অবতীর্ণ হব ;
ব্যথা পাই ক্ষতি নাই, মরণে কি ভয় ?
পরাজয় লাজ নাহি সব।
এক শত্রু বিনাশিতে
আয়ুঃ কেন যায় ?
যুঝি যুঝি হব অগ্রসর,
রুধিরাক্ত তনুখানি, রাজা, তব পায়
আনি দিব প্রত্যেক বছর।
নব অস্ত্র-লেখা বুকে
দেখিবে অঙ্কিত,
নব আনন্দের ভরে নব অশ্রুধার,
নববর্ষে মুক্ত কণ্ঠে
গাব নব গীত,
জীবন তােমারে দিব-নব উপহার।
এপ্রিল ১৮৯০।

১৫৮
মাল্য ও নির্মাল্য।
পুরাতন বর্ষের প্রতি।
আজ তবে তব শেষ দিন,
ওহে বর্ষ, নিশা হলে তাের
গত গর্ভে হইবে বিলীন,
শেষ অ লয়ে যাও মোের।
লয়ে সুখ, লয়ে অশ্রু মাের,
পুরাতন, তুমি চলে যাবে,
লেপি দিয়া বিস্মৃতির ঘাের,
নব আসি ব্যথা কি জুড়াবে ?
তুমি যাবে, নিতান্তই যাবে,
সুখে ফিরে চাহিব না আর,
অশ্রু মাের হয়তাে শুকাবে,
স্মৃতিটুকু-সে টুকু আমার ।
তার সাথে ব্যথা যদি রহে,
রহুক সে প্রাণে চির দিন,
অঞ যদি তারে ঘিরে বহে,
বহুক সে নিয়ত নবীন।
হাজারিবাগ, এপ্রিল ১৯১৩।

নব আবাহন।
এসগাে বরষ নব,
আমরা তােমারে আশার কিরণে
বরণ করিয়া লব ;
আমরা তােমারে আদরে সােহাগে
সুখের স্বপন কব,
তােমারে নেহারি, নূতন
জীবনে
মােরা সঞ্জীবিত হব,
এসগাে বরষ নব।
অতীতের নব আজ দূর গত,
নবীন নূতন আসে,
মরা ঝরা ফুল ধূলে পরিণত,
নূতন ফুলেরা হাসে।
ধূলার
উপরে
মাটী হয়ে গেছে গলিয়া,
তাহারে হাসিটি নূতনের মুখে
নীরবে এসেছে চলিয়া।
যে ফুল পড়িয়া
এসগাে বরষ নব,
মরণের কথা তুলিব না আজ,

মাল্য ও নির্মাল্য।
জীবনের কথা কব ;
হারিবার ব্যথা স্মরিবনা, জানি
আমরা বিজয়ী হব;
আনন্দ ঘুচাবে যতেক বেদনা,
জয়, সৰ্ব্ব পরাভব।
এসগাে বরষ নব,
আজি এ আলােকে গত সৰ্বশোক,
মঙ্গল-পূরিত ভব।
তােমার হৃদয়ে শায়িত অতীত,
তুমি চির আয়ুস্মান্,
তােমার স্বপনে জাগে ভবিষ্যৎ।
জাগরণে বর্তমান
চির বহমান জীবন প্রবাহে
লহগাে তােমার স্থান,
চির সঞ্চিতের মাঝখানে রাখ
তােমার মেহের দান।
এসগাে বরষ নব,
আজি নিদাঘের সুগন্ধি কুসুমে
তােমারে বরিয়া লব।
হাজারিবাগ, এপ্রিল ১৯১৮
;

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Malya O Nimarlya Ed. 2nd

Author
Not Available
Title
Malya O Nimarlya Ed. 2nd
File name
Malya O Nimarlya Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1918
Published
2009/11/11
Publisher
Sudhirkumar Sen
Language
Sanskrit
Pages
172
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Malya O Nimarlya
DLI number
512897
Barcode
4990010019927.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
iDZRgWIa2no
Download PDF

Malya O Nimarlya Ed. 2nd