Makardah Saraswat Library, Howrah
Jhikimiki
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ঝিকিমিকি
প্রাসবিহারী মণ্ডল
ডি, এম, লাইব্রেরী
৪২, কর্ণওয়ালিস ঠাট
কলিকাতা
ডি, বি, ভট্টাচার্য্য
বাতায়ন পাবলিশিং হাউস
৮৫, বহুবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা
}
আশ্বিন, ১৩৪
দাম : পাচ সিকা
ইউনিয়ন প্রেস
প্রিন্টার : ডি, সি, ভট্টাচার্য্য
৮৫, বহুবাজার স্ট্রীট, কলিকাত;
No text on this page.
লেখকের অন্যান্য বইঃ
-
মাটির মেয়ে-২
অগ্নি পরীক্ষা-
দিদির বর-১
আঁকাবাঁকা-১০
পরাহত-১০
স্ফুলিঙ্গ
আগাছা-১
তিন ধাপ পাথরের সিড়ি বেয়ে সােজা তেলায় উঠে
ভদ্রলােক দরজার সামনে এসে থমকে দাড়ালাে। জোরে
জোরে গােটাকয়েক লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে সে দম নিলে, পকেট
থেকে রুমাল বে করে কপালের ঘাম মুছলে, তারপর কিছুক্ষণ
বিশ্রাম করে দরজার বুকে ধীরে ধীরে চাবি লাগালে।
দরজার ওপর একখানা ঝকঝকে পিতলের প্লেট,তার
ওপর কালাে মােটা হরফে লেখা রয়েছে, সহদেব সরকার।
শীতের রাত্রি। এরি মধ্যে চারিদিক স্তব্ধ হয়ে এসেছে।
সহরের ব্যবসা কেন্দ্রের বাড়ী, রবিবারে সন্ধ্যা না হতে হতেই
চারিদিক নিঝুম নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে।
সুইচ, টিপতেই ঘরখানা আলাের বন্যায় ঝলমল করে
উঠলাে। সাহেবী কেতায় ঘরখানি সাজানাে। মেঝের ওপর
পুরু বিচিত্র রঙের গালিচা। প্রত্যেক আসবাবপত্রটি দামী,
সুন্দরভাবে সাজানাে।
ঘরের মাঝে দাড়িয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে সহদেব
ঝিকিমিকি
একটা শােফার ওপর দেহটা এলিয়ে দিলে । আজ তার নিজেকে
ভারী ক্লান্ত, ভারী অবসন্ন মনে হলো। দেহ মন যেন অবসাদে
ভেঙ্গে পড়চে, অথচ এমন ভাবে ভেঙ্গে পড়বার মতাে তা কোন
কিছু ঘটেনি। সন্ধ্যায় ময়দানে খানিকটা ঘুরে ক্লার্ক সাহেবের
ওখানে ডিনার খেয়ে বাড়ী ফিরছে । এমন তাে প্রতি রবিবারেই
কোথাও না কোথাও নেমন্তন্ন থাকে, কিন্তু এমন ক্লান্তিতে তে
তাকে ঘেরে ফেলেনি কোনদিন। আজ যেন নিজেকে ভারী
শ্রান্ত মনে হলাে। সত্যিই সে শ্রান্ত! মৃত্যুর অবসাদ যেন তার
দেহমন পরিব্যাপ্ত করে ফেলে, তরল শিখার মতাে! তার
ওঠবার শক্তি নেই, উঠে বিছানায় গিয়ে শােবার মতাে শক্তিও
তার নেই।
কেন ?
এত ক্লান্ত কেন ?
-
সহদেবের মনে হলাে সে বুড়াে হয়ে যাচ্চে, মৃত্যুর সঙ্কেত
ধ্বনি তার কানের কাছে ঝি ঝি পােকার সুর তুলেছে।
সহদেবকে দেখলে বােঝা যায় না, বয়স তার গড়িয়ে গিয়ে
। কতদূরে পৌচেছে। গভীর চিন্তায় কৰ্ম্মশ্রান্ত সহদেবকে দেখলে
মনে হয় তার বয়স পঞ্চাশ বছরের কম হবে না। সাধারণত:
তার মুখে পঞ্চাশের ছাপ কিন্তু এখনাে পড়েনি। আবার যখন
সে হালকা মনে হাসির হিল্লোল তােলে, তখন কে বলবে তার
বয়স চল্লিশ পার হয়েছে ।
বাইরের স্তব্ধতার মতই তার মনটা ভারী হয়ে উঠলাে, সারা
দেহ অবসাদে ছেয়ে ফেললে । নিজেকে আজ ভারী নিঃসঙ্গ,
দুই
ঝিকিমিকি
“কয়া
ভারী নিঃসহায় মনে হলাে। বিস্তৃত শূন্য ঘরখানার মতো তার
অন্তরটা খা খা করতে লাগলো। রাত্রির স্তব্ধতা ঘরের মাঝে
ঘনকুয়াশার মতাে ঝুলতে লাগলো।
শক্ত পাথরের মতাে সে স্তব্ধ হয়ে রইলো।
কেমন একট।
আতঙ্কে তার দেহটা শির শির করতে লাগলো।
সে চোখ
বুজে স্মৃতির উৎক্ষিপ্ত তরঙ্গের মাঝে চিন্তারাশিকে ভাসিয়ে দিল ।
এই কথাটাই বারবার তার মনে হতে লাগলো, সে বুড়ো
হয়ে যাচ্চে, বয়স বাড়ছে, দিন ফুরিয়ে আসচে-
সত্যি ! সত্যিই তাে বয়স বাড়ছে, বুড়ো হয়ে যাচ্চি
চোখ খুলতেই তার দৃষ্টি পড়লাে শােফার ওপর নিজের
বিস্তৃত একখানা হাতের দিকে।
স্থির অবিচলিত দৃষ্টি দিয়ে সে হাতখানার পানে চেয়ে
রইলো। সমগ্র চেতনা দিয়ে সে যেন গভীরভাবে সেখানাকে
বিশ্লেষণ করতে চায়। কী অস্বাভাবিক সাদা! যেমনি শীর্ণ,
তেমনি বিশুষ্ক ! কালাে তারের মতাে শিরাগুলাে সােজা হয়ে
উঠেচে, চামড়াখানা লােল হয়ে এসেছে, নখের মাঝে সৰু সৰু
টেউ ফুটে উঠেচে,-বুড়াে মানুষের হাত ! মৃত্যুর প্রভাবস্পর্শ
সুস্পষ্ট।
স্থির দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে চেয়ে একসময় তার চোখ দুটি বুজে
এলাে, মাথাটা ঝুকে পড়লাে, সামনের পানে।
ঘুম তার আসেনি, শুধু সে ক্লান্ত ও দুর্বল।
সে মনের চোখ প্রসারিত করে স্তিমিত ঘােলা দৃষ্টি দিয়ে
তিল
ঝিকিমিকি
বিগত জীবনের পানে চেয়ে দেখলে, যতদূর দেখা যায়, বিস্মৃতির
কুয়াশা ঠেলে যতদূর দৃষ্টি চলে। কুয়াশা ঢাকা বিস্তৃত বনানীর
মতাে জীবনের বিগত দিনগুলাে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠলো।
কী করুণ, কী হতাশভরা দিনগুলাে।
তার মনে হলাে, জীবনটা তার একটা বিরাট পরাজয়, একটা
দুঃখের পাহাড়, যেমনি রুক্ষ, তেমনি শুষ্ক কঠিন ! এতটুকু
স্নিগ্ধতার আভাস নেই ।
এই দীর্ঘ জীবনে সে করলাে কি ? পেলে কি ? কিছু না
কিছু না। শুধু অপার শূন্যতা বয়েই জীবনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলাে।
নিঃসঙ্গ, নিঃসহায় ! আজকের রাতের এই নিদারুণ অবসন্নতার
মাঝে তার নিজেকে ভারী একা মনে হলাে। ভারী কম্বলের
মতাে এই নিঃসঙ্গতার অনুভূতি তার দম যেন বন্ধ করে দিল।
সহসা একটা ঝাঁকানি দিয়ে মাথাটা তুলে সােজা হয়ে
বসলাে। ভেতরে সে একটা কাঁপুনি অনুভব করলে।
কাছেই একটা টেবিলের ওপর সাজানাে রয়েছে, হুইস্কি
ভরা ডিকেন্টার, সােডার বােতল ও কাচের গ্লাস! ভারী চোখ
দিয়ে সহদেব টেবিলের পানে চেয়ে রইলো, অবসন্ন দেহমন
হয়তাে এমনি কিছু চায়, ডিকেন্টারের গর্ভনিহিত একটু তরল
পদার্থ তার দেহের এই অপরিসীম অবসাদ মুছে দিয়ে তাকে
সতেজ করে তুলবে।
সে ওঠবার চেষ্টা করলাে। কিন্তু, না, সে ভারী ক্লান্ত, ভারী
চার
ঝিকিমিকি
দুৰ্বল। ওঠবার মতাে শক্তিও তার নেই। এতখানি পরিশ্রম
তার অবসন্ন দেহ সইতে পারবে না।
নিস্পনের মতাে সে শােফার উপর আড় হয়ে শুয়ে রইলো।
মন ছুটলাে পেছনের পানে।
মাত্র ঘণ্টাখানেক পূর্বে যাদের সঙ্গ সুখ তাকে অজস্র আনন্দ
দিয়েছে তাদের কথা মনে পড়লাে। কিন্তু এরি মধ্যে তার?
মনের চোখে ঝাপসা ও অস্পষ্ট হয়ে এসেছে, তাদের যেন সে
মনে করতেই পারে না। কবে এক বিস্মৃত সন্ধ্যায় তাদের সাথে
দেখা হয়েছিল, আজ আর সে কথা ভেবে লাভ কি ? কতো
লােকই যে তার জীবন সমুদ্রে ফেনার মতো ফুটে উঠে মিলিয়ে
গেল, কে তার সন্ধান রাখে ? তাদের মনে রেখেই বা তার
লাভ কি? তাদের সাথে অন্তরের কতটুকু সম্বন্ধ ?
না, না, জীবনে সে কিছু পায় নি। স্নেহ, ভালবাসা, জীবনে
যা কিছু সান্ত্বনার, যা কিছু জীবনকে সরস করে তােলে তার
কোন সন্ধানই জীবনে তার মেলেনি।
সহদেবের জীবনে কি তবে মনে করে রাখবার মত কেউ
কোনদিন ছিল না? কোন আকর্ষণ ছিল না তার জীবনে ?
মন তার পিছু ফিরে তাকালাে, পঁচিশ বছর পূর্বের পানে।
পাঁচ
দুই
সহদেবের বয়স তখন মাত্র একুশ। সবেমাত্র বি, এ পাশ
করে একটা সামান্য মাইনের চাকরী পেয়েছে। বাল্যে
পিতৃমাতৃহীন, দূরসম্পর্কের এক কাকার বাড়ীতে থেকে লেখা-
পড়া শিখেছিল । স্নেহের কোন বন্ধনই তার ছিল না।
মন তখন তার অবারিত আকাশের মতই শুভ্র, নিম্মল
মনের আকাশে রূপ ও রঙ বাচ্চে ক্ষণে ক্ষণে।
অজস্র রঙীন
আলাে তার চোখে জাল বুনচে, বৈচিত্র্যের পিপাসায় সংসারের
যা কিছু সুন্দর, যা কিছু শুভ্র তারই পানে মন ছুটতে চায়।
-মনের আনাচে কানাচে তখন তার বসন্তশােভা।
পাশের বাড়ীর রায়বাহাদুরের কিশােরী মেয়ে মলিনা তার
চোখে দুর্ভেদ্য রহস্যের মতাে জটিল হয়ে উঠলাে।
প্রাণের প্রাচুর্য্যে সে অগাধ স্নেহ ও অপরিমিত শ্রদ্ধা ঢেলে
দিল মলিনার কানে কানে। প্রতিনিয়ত সে ইঙ্গিতে তার
অন্তরের গােপন ভাষাটি নিবেদন করে মেয়েটীর কাছে।
মলিনা লাজুক মেয়ে নয়, ভালাে লাগত তার এই
ছয়
ঝিকিমিকি
ছেলেটির মুখের হাসি, সকরুণ চোখের মিনতিভরা চাউনি।
মুখর আনন্দে মর্মরিত হয়ে পুষ্পস্তবকের মতাে হেলে দুলে
মদিনা চলে যায়। পিছনে ছড়িয়ে পড়ে তার লীলায়িত
অঙ্গধুৰ্য্য।
সহদেব বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।
অন্তরঙ্গতা ঘন হয়ে উঠলাে। রায়বাহাদুরের বাড়ী সহদেবের
অবাধ গতি। রায়বাহাদুরের পত্নী তাকে স্নেহ করেন। তাদের
অজ্ঞাতে সহদেব ও মলিনা পরস্পরের পানে এগিয়ে চললাে,
অসীম আগ্রহে।
সহসা একদিন সহদেব বুঝলো, মলিনাকে শুধু চোখ দিয়ে
দেখা চলতে পারে, কিন্তু আপনার করে পাওয়া যেতে পারে
না। কারণ সে গরীব, তার অর্থ নেই, মলিনাকে পাবার মতাে
কোন সঙ্গতিই তার নেই। সহদেবের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে
পড়লাে।
রায়বাহাদুর স্পষ্টই তাকে বুঝিয়ে দিলে, টাকা না হলে
ভালােবাসার কোন মূল্যই নেই।
অশ্রুসজল চোখে, কম্পিত গলায় সহদেব জানিয়ে দিল,
আপনার মেয়েও কিন্তু আমাকে ভালােবাসে।
ব্যঙ্গের হাসিতে মুখ ফিরিয়ে রায়বাহাদুর উত্তর দিল, মেয়ের
ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি তার বিয়ে দোব না। নিজের অবস্থা
ফেরাতে পার তাে তােমার হাতেই তাকে দেব ।
সহদেব নীরব, নিৰ্বাক।
ঝিকিমিকি
রায়বাহাদুর যেতে যেতে বলে, শুধু ভালােবাসার দোহাই
দিয়ে তাে তাকে তােমার হাতে উপােস করে ময়ূতে দিতে
পারি না।
সবার চোখের আড়ালে, অন্ধকারের গােপনতায় কত যে
অশ্রু সহদেব নিঃশব্দে ফেলেচে, শুধু সেই জানে, আর জানে
তার অন্তর্যামী।
কিন্তু শুধু চোখের জল ফেলেই সে ক্ষান্ত হয়নি।
প্রাণপাত পরিশ্রম করে নিজের অবস্থাকে উন্নত করতে
চেষ্টা করলাে।
কী প্রাণপাত পরিশ্রম সে! কী একাগ্র তপস্যা! বিদেশে
বিভূয়ে, অনাহারে অনিদ্রায়, উল্কার মতাে ছুটে বেড়ালাে সে
পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ।
মা লক্ষ্মী প্রসন্নদৃষ্টিতে চাইলেন। কিন্তু অর্থের মােহ তাকে
ভুলিয়ে দিল তার মলিনাকে। মলিনাকে পেতে হলে, তাকে
সুখী করতে হলে যে কতখানি সম্পদের প্রয়ােজন, তার পরিমাপও
ছিল না, সহদেবের জানাও ছিল না, কাজেই সহদেব অক্লান্ত
পরিশ্রমে শুধু অর্থ উপার্জনই করে গেল, দিনের পর দিন,
বছরের পর বছর। ভুলেই গেল সে মলিনার বাবার কাছে
আট
ঝিকিমিকি মলিনাকে চাইতে! কাজের ভিড়ে হৃদয়ের প্রচ্ছন্ন বেদী হতে মলিনা গেল অদৃশ্য হয়ে । সহদেবের অতীতটা গেল মরীচিকার মতাে মিলিয়ে, ভবিষ্যৎটা হয়ে উঠলাে, তীব্রোজল। তার পিছনের সবটাই অন্ধকার, গভীর নৈরাশ্যের ছায়া। ওর জীবনে অলবার যা কিছু ছিল, তা একবার মাত্র দপ করে জ্বলেই প্রবল ধাক্কা খেয়ে নিভে গেল। সেই আঁধারের ছায়ায় মলিনা গেল নুপ্ত হঠাৎ একদিন সহদেব সংবাদ পেলে, ম িসত্যই লুপ্ত হয়ে গেছে, শুধু তার অন্তর হ’তে নয়, নিখিল বিশ্ব হ’তে। তিন- দিনের জ্বরের তাপে অমলিন ফুলটি শুকিয়ে ঝরে গেছে। বিশ্বসংসার সহদেবের চোখে ঝাপসা হয়ে এল। রিক্ত বুকে, সিক্ত চোখে সহদেব ক'দিন গুম হয়ে রইল। কিন্তু সে ক’দিনই বা ! আবার গা ঝাড়া দিয়ে সহদেব কাৰ্য্যক্ষেত্রে নেমে পড়লাে। প্রতিদিনের বাধা কাজে জীবন আবার গড়িয়ে গেল। ব্যবসার চর্চায় অন্তরটা তার এমনি ঠাসা ছিল, আর অবকাশ তার এত প্রশস্ত ছিল না যে মলিনার স্মৃতি অবসরের ফঁাকে চঞ্চল হাওয়ার মত তার গভীর নিঃশ্বাসকে এলােমেলো করে দেবে। আর মনকে সেই এই বলে বােঝালে যে যখন নিজেকে বাঁচতেই হবে তখন মলিনার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকার চাইতে অন্য কোন অবলম্বনকে সম্বল করে বাচাই ঝিকিমিকি এগিয়ে চলাে। ভালাে। ঝাপসা আলাের দিকে অপলকে চেয়ে থাকার কোন মানে হয় না। কাজের মাঝে ডুবে সে অদ্ভুতভাবে নিজের জীবনকে গ; তুললে। কাৰ্য্যক্ষেত্র ছাড়া তার সমাজ রইল না, কৰ্ম্মই হল ধৰ্ম্ম, অর্থ ই হলাে একমাত্র উপাস্য। কাউকে সে চাইলে না, তাকেও কেউ চাইলে না। মনের সম্পর্ক কারুর সাথে সে পাতালে না, ভরসা করে কেউ তার কাছে এগােলাে না। নিৰ্বান্ধব, নিঃসম্পর্ক অবস্থায় সে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কাটিয়ে দিলে। জীবন সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে গা ভাসান দিয়ে সে দ্রুততালে ঐশ্বর্যের স্ত পের ওপর বসেও মৌন যােগীর মত সে ঐশ্বর্যেরই তপস্যা করলে, করলে, সারাটি জীবন। স্নেহ ভালবাসা আবাদের উপযোগী যে নরম জমীটুকু অন্তরের মাঝে ছিল, রিক্ততার কাঠিন্তে সে জমীটুকু ক্ৰমশঃ পাথর হয়ে গেল। জীবনটা সহদেবের সত্যিই ভারী অদ্ভুত! স্বেচ্ছায় চির- নিৰ্বাসন দণ্ড মাথায় নিয়ে সে জগতের বাইরে ঘুরে বেড়ালে। আজ পেছন পানে চেয়ে চেয়ে সে শিউরে উঠতে লাগলাে। স্তব্ধ রাত্রির মতাে পিছনের জীবনটাও তার বিশ্রী স্তব্ধ গুমােট ভরা। হাসি নেই, কান্নাও নেই। স্নেহ কাউকে সে দেয়নি, কারুর স্নেহ সে কুড়ােয়নি, জীবনের পিছনে এতটুকু কলরব কোলাহল নেই, মনে করে রাখবার মতাে কিছু নেই। তার মনে হলো জীবনের তার শিকড় নেই, আকর্ষণ নেই। নিজেকে দশ
ঝিকিমিকি
কেমন শ্রীহীন, ধর্মহীন মনে হতে লাগল। সারাজীবন সে
নিজেকে বঞ্চিত করে আত্মবিশ্বতির অন্ধকারে লুকিয়ে
খেচে। নিজের বিরুদ্ধে আজ মন তার বিদ্রোহের সূচনা
কলে।
সে ক্লান্ত। অপরিসীম ক্লান্তিতে তার দেহমন ভেঙ্গে
পড়লাে। সে বিশ্রাম চায়। নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম ।
এগার
তিন
পরদিন প্রভাতেই, ম্যানেজারের কাছে বিদায় নিয়ে সহদেব
এসে হাজির হলো, পশ্চিমের এই সহরে। সঙ্গে একটা চাকর
পৰ্যন্ত সে নিলে না।
পশ্চিমের সহ। সহরের কোলে ছােট পাহাড়ের ঘেঁষা-
ঘেষি। ঢেউ খেলানাে আঁকা বাঁকা রাস্তা। রাস্তার বুকে
কাকর বিছানাে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সহরটি। কঁকা মাঠের
বুকে ছবির মতাে রঙ বেরঙের বাঙলো। রাস্তার পাশের উচু
জমীতে সারি সারি দেবদারু আর ইউক্যালিপটাস্। কোথাও
শুধু পাথরের রাজত্ব, অতিকায় হাতির মতো গা ঢেলে দিয়ে
পড়ে আছে।
খুব একটা উচু জায়গায় পাথরের বুকের উপর ছােট বাঙলাে
‘লালকুঠি। সেই বাঙলো ভাড়া নিয়ে সহদেব এসে উঠলো।
প্রথম দিন দুই সহদেব বাঙলার আশে পাশে ঘুরে বেড়ালে।
সহরে ঢুকলো না, রাস্তায় নামলো না। প্রতিবেশী কারুর
সাথে আলাপ করলাে না, তারাও কেউ এলাে না তার সাথে
আলাপ জমাতে।
বার
ঝিকিমিকি
সহদেব লম্বা ড্রেসিং গাউনে দেহ ঢেকে বাঙলাের বারাণ্ডায়
সে চুরুট টানে। আশপাশের বাড়ীর লােকেরা বিস্ময়ে তার
মুখের পানে তাকাতে তাকাতে চলে যায়।
। সহদেব স্তব্ধ হয়ে বসে চুরুট টানে আর উর্দ্ধমুখে গাছের
নীল পাতার পানে চায়, ধূম ও ধূলিবিহীন নির্মল আকাশের
পানে চেয়ে দেখে। ঘুমের চমকভাঙা চোখে এমনি ভাবে সে
সবিস্ময়ে চেয়ে থাকে যেন সে অপ্রত্যাশিত কিছুর সন্ধানে
উদগ্রীব হয়ে আছে। এতদিন যাদের জানা উচিত ছিল
অথচ জান্বার চেম্বার অবকাশ মেলেনি, সেই সব না-জান।
-চেনা রহস্যের সন্ধান মিলেচে অপ্রত্যাশিতভাবে, তাদের
সাথে পরিচিত হতে চায় পরিপূর্ণভাবে ?
আকাশ এতাে উজ্জ্বল, এতাে নীল, গাছের পাতার ফাঁকে
আলাের উন্মাদনা, পাখীর কাকলীর মাঝে এমন সুরের ঝঙ্কার,
পাহাড়ের বুকে স্বপ্নজাল আঁকা ভােরের কুয়াশা,-এদের যেন
সহসা আজ সে আবিষ্কার করেছে। তার আড়ষ্ট চেতনা যেন
আজ আনন্দের স্পর্শ পেয়ে চিরপরিচিতের সাথে নতুন করে
পরিচয় করবার জন্যে আগ্রহে ফুলে ফুলে উঠছে।
সহদেব তাই সবিস্ময়ে ভাবে, এরা তাে চিরপরিচিত, কিন্তু
এরা সহসা এমনভাবে রূপ বলালে কেমন করে ?
দিন দুই পরে।
ঝিকিমিকি
শীতের ঘন কুয়াশা মাটির বুক হ’তে উঠে সারা সহরটাকে
আচ্ছন্ন করে ফেলছে। বেলা হয়তাে খানিকটা হয়েছে,
কুয়াশার ঘন পর্দার আড়াল ঠেলে সূৰ্য্য নিজেকে প্রকাশ করত
পারছে । চারিদিকে ঝাপসা গাছপালাগুলাে নিড়ি
অস্পষ্টতার মাঝে আবিদের মত স্তব্ধ হয়ে আছে।
সারা দেহ আলােয়ানে ঢেকে, হাতে একটা ছাতা নিয়ে
সহদেব বাঙলাের বাইরে এসে দাড়ালাে। নীচের রাস্তায়
লােকচলাচল আরম্ভ হয়েছে। সকলে চলটে বাজারের দিকে।
সহদেব ঢালু জায়গাটা অতিক্রম করে বড় রাস্তার মুখে এসে
দাড়ালাে। তারপর উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে সােজা রাস্তা ধরে
এগিয়ে চলাে। তার পাশ কাটিয়ে কত নরনারী রঙ বেরঙের
বেশভূষায় দেহ ঢেকে চলে যায়, সহদেবের চোখে চমক লাগে,
আড়ষ্ট চেতনায় আনন্দের ছোঁয়াচ লাগে ।
সে চলতেই থাকে, অপ্রত্যাশিত নতুনতরাে রহস্যের সন্ধানে।
সংসারে দেখবার ধন অনেক ছিল, দেখা হয়নি, চোখ মেলে
সে দেখেনি। পাবার মত অনেক কিছু ছিল, সে পায়নি, সে
চায়নি। কেন যে পায়নি, কেন যে চায়নি, তাই ভেবে মন
তার বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
রাস্তার পর রাস্তা পার হয়ে সহদেব বাজারের কাছে এসে
পেছিল। পথের বাঁকে একটা দোকান, সেখানে বেশ ভীড়
জমেচে। সহদেব অন্যমনস্কভাবে দোকানের সামনে এসে
থমকে দাড়ালাে।
}
চোদ
ঝিকিমিকি
বাঙালীর দোকান। মনােহারী, ষ্টোস, কাপড় জামা,
খবরের কাগজ, সবই পাওয়া যায় এই একটী দোকানে।
অকারণে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে সহদেবের কেমন
লজ্জা বােধ করলো। সে দোকানের ভিতরে গিয়ে একখানা
ইংরাজী সংবাদপত্র কিনলে।
দোকানের মালিক এক বৃদ্ধ ভদ্রলােক। সহদেব নতুন
লােক। কাজেই বৃদ্ধ দোকানদার সহদেবের সাথে আলাপ
করলে। বলে, নতুন এসেছেন বুঝি ? কোথায় এসে
উঠেচেন ?
সহদেব একখানা লােহার চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বলে,
ঐ লালকুঠিতে দিন দুই হলাে এসেচি-
দোকানদার জিগগেস করলে, আজই বুঝি প্রথম বাজারের
দিকে এলেন ?
সহদেব একটা চুরুট ধরিয়ে ঘাড় নাড়লে।
—দেখিনি কিনা, তাই জিগগেস করলুম। বাঙালী ভদ্রলােক
যে কেউ এখানে আসেন, গরীবের এ দোকানটীতে সকলেরই
পায়ের ধূলাে পড়ে।
সহদেব ঈষৎ হাসলে।
দোকানদার জিগগেস করলাে, এখন কিছুদিন থাকবেন
তাে? সপরিবারে এসেছেন নিশ্চয়ই।
সহদেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, আজ্ঞে না, আমি
পনের
ঝিকিমিকি
একাই এসেছি। ভালাে লাগলে কিছুদিন থেকে যেতেও
পারি। নইলে আবার কালই চলে যেতে পারি।
দোকানদার হেসে উত্তর দিল, আজ্ঞে না। মন টিকে যাবে,
আর এখানকার স্বাস্থ্য এখন চমৎকার।
এখানকার মানুষের সাথে সহদেবের এই প্রথম আলাপ
লােকটিকে বেশ লাগলো। সহদেবের। গভীর মনযােগ দিয়ে
দোকানের জিনিষপত্রগুলি দেখলে। সবরকম জিনিষই প্রায়
মজুত আছে দোকানটিতে। দোকানটির আর একটি আকর্ষণ,
দোকানের সংলগ্ন একটি ছােটখাট লাইব্রেরী আছে। ছােট্ট
সহরটিতে ঐ একটিমাত্র লাইব্রেরী, কাজেই সকাল সন্ধ্যায়
অনেকেই এসে ভিড় জমায় ঐ দোকানটিতে, বিশেষ করে তরুণ
তরুণীর দল।
দোকানদারের নাম দ্বিজেন ভাদুড়ী। দ্বিজেন বাবুর সাথে
দ্রুততালে সহদেবের আলাপ জমে উঠলো। প্রতিদিন দুটি
বেলা সহদেব দ্বিজেনবাবুর দোকানে আসর জমায়। আবশ্যক
অনাবশ্যক জিনিষপত্তর খরিদ করে। এমনি ভাবে একটি
সপ্তাহের মধ্যে দ্বিজেন বাবুর সাথে সহদেবের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে
উঠলাে।
দোকানের যেদিকটায় লাইব্রেরী সেটা একটা বেশ বড়
হল। হলের মাঝে লম্বা টেবিল, তার দুপাশে চেয়ার বসানাে।
ষােল
ঝিকিমিকি
সন্ধ্যের দিকে বেড়িয়ে ফেরবার পথে অনেকেই সেখানে বসে
জটলা করে। বাছাই করে বই নেয়, মাসিক পত্র পড়ে,
সাপ্তাহিকের ছবি দেখে। সহদেবও সন্ধ্যায় সেই হলের এক
কোণে বসে চুরুট টানে আর এটা ওটা পড়ে। কিন্তু নিজেকে
তার কেমন বিশ্রী খাপছাড়া ঠেকে সেই সব তরুণ তরুণীদের
মাঝখানে। সে যেন কুষ্ঠিত হয়ে ওঠে। ওদের অনর্গল উচ্ছসিত
হাসি সহদেবের অপরিচিত। ওরা যেন সহদেবের জগতের
নয়। সহদেব কুণ্ঠার চোখ দিয়ে স্তব্ধ বিস্ময়ে ওদের পানে
চায়। ওদের প্রাণের জোয়ার এসে সহদেবের বুকে আছড়ে
পড়ে। ওদের প্রাণের আলো ছটকে এসে সহদেবের বুকের
মাঝে প্রতিবিম্বিত হয় ! সহদেব জীবনের আভাস পায়, ওদের
মুখে, ওদের হাসিতে, ওদের কথা বলার ভঙ্গীতে, ওদের চলার
গতিতে।
সহদেবের চোখে নেশা ধরে, দেহের শিরায় শিরায় রক্তের
জোয়ার বয়ে যায়, আবার এক সময় চোখ দুটো জ্বালা করে
বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে আসে। আস্তে আস্তে সে উঠে বাইরে গিয়ে
বাড়ায়, আঁধারের আবছায়।
ভাদুড়ী জিগগেস করে, কেমন লাগছে জায়গাটা ?
সহদেব ঈযৎ হেসে বলে, মন্দ কি! মনে কচ্চি এই খানেই
থেকে যাবে, ছােট খাটো একটা বাঙলাে কিনে।
কোথায় কোন্ বাঙলাে বিক্ৰী আছে তার সংবাদ ভাদুড়ীর
নখদর্পণে। ভাদুড়ী বলে, বাঙলাের অভাব কি ? হুকুম করলেই
২
সতের
ঝিকিমিকি
ঠিক করে দোব। একটা নতুন বাঙলাে বিক্রী রয়েছে, দামেও
~
সস্তা হবে ।
সহদেব বলে, আপনার সঙ্গে পরামর্শ না করে কিবে না।
এখনাে মন ঠিক করিনি, তবে শরীরও বেশ ভাল থাকছে এখানে,
আর আপনার সঙ্গে আলাপ করে এখানে দিনগুলােও একরকম
কাটচে মন্দ নয়।
ভাদুড়ী একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, সত্যিই জায়গাটা
ভাল। আমারাে ভাই প্রাণ কাঁদে জায়গাটা ছাড়তে। ত্রিশ
বছর একাদিক্রমে কাটিয়েছি এখানে।
সহদেবের মুখে ফুটে ওঠে বিস্ময়। জিগগেস করে, ছেড়ে
যাবেন কেন ?
ভাদুড়ী বিমর্ষ মুখে উত্তর দেয়, উপায় নেই। ছেলেটি আমার
চারী নিয়ে কলকাতায় রয়েছে। ছেলে, বউ কেউ চায় না।
যে আমি একলা থাকি এইখানে। আর বউমাটি আমার ভারী
মায়াবী। তাঁর স্নেহ-যত্নের আড়ালে থাকতে প্রাণ চায় না।
মেয়েটাকে কাছ ছাড়া করে প্রাণটা যেন হাঁপিয়ে ওঠে মাঝে
মাঝে।
সহদেবের মুখের চেহারাটা সহসা বদলে গেল ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে জোরে জোরে চুরুটটায় টান দিতে লাগলো।
ভাদুড়ী বলে, খােকার মার অসুখ। ডাক্তারের আদেশে
হাওয়া বদলাতে তাকে নিয়ে এখানে এলুম। তাকে আর ফিরতে
হলাে না, এইখানেই সে শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলে। থােক তখন
আঠার
ঝিকিমিকি
মাত্র দু’বছরের। আর দেশে ফিতে প্রাণ চাইলে না।
জীবনের একমাত্র অবলম্বন ঐ ছেলেটাকে নেড়েচেড়েই এই
ত্রিশটি। বছর কাটিয়েছি ।
কখনাে কাছ ছাড়া করিনি। তাই
ভাবচি জীবনের এই অবেলায় আর একলা এখানে পড়ে থাকি
কেন ?
ভাদুড়ীর চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলাে, একটা নিষ্ঠুর
ব্যথার ভারে তার বুকখানা ভারী হয়ে উঠলাে।
স্তব্ধ ঘরের দুঃসহ নীরবতা সহদেবের কানে এক বিচিত্র
অপরিচিত বার্তা নিয়ে এলো। সহদেব বাইরে আঁধারের পানে
চোখ মেলে দিয়ে অনুচ্চস্বরে বললে,হু !
পাশের লাইব্রেরী হ’তে ভেসে আসে স্ত্রীকণ্ঠের চাপা হাসি।
সহদেব সচকিত হয়ে ভাদুড়ীর মুখের পানে চায়।
ভাদুড়ী বলে, দোকানটা নিয়ে শুধু বিব্রত হয়ে পড়েছি।
নিজের হাতে-গড়া, চলতি দোকান,
সহদেব চোখদুটি বিস্ফারিত করে জিগগেস করে, দোকানটা
কি বিক্রী করবেন নাকি ?
ভাদুড়ী উত্তর দেয়, ভাল খদ্দের মিচে কৈ ! এতবড়
দোকান নেবার মতাে খদ্দের এখানে জুটছে না।
সহদেব প্রশ্ন করে, মালও আছে অনেক টাকার,-না ?
ভাদুড়ী উত্তর দেয়, এমন বেশী কিছু নয়। তবে কি জানেন,
এ সইরের এটি সম্পূর্ণ বাঙালী প্রতিষ্ঠান। অবাঙালী খদ্দের
অনেকেই আসছে। কিন্তু আমার ইচ্ছে নয় যে এটা অবাঙালীর
উনিশ
ঝিকিমিকি
হাতে পড়ে। প্রবাসী বাঙালীদের এটি একটি সমিতির মতাে।
বাঙালী কেউ নিলে, এটি ঠিক এমনিই থাকবে আশা করা যায়,
নইলে এর চেহারা বদলে যাবে দুদিনে—বাজারের আর
পাচটা দোকানের মতাে এও একটা দোকানই থেকে যাবে ।
এর বিশেষত্বটুকু নষ্ট হয়ে যাবে।
সহদেব কোন উত্তর না দিয়ে স্থির হয়ে বসে রইলো।
কুড়ি
চার
দিন দুই পরে।
সহদেব ভাদুড়ীর দোকানে ঢুকেই জিগগেস করলে, ভাদুড়ী
মশায় কি সত্যিই তা হলে এখান থেকে যাচ্ছেন ?
ভাদুড়ী সবিস্ময়ে সহদেবের মুখের পানে চেয়ে উত্তর দিলে,
আজ্ঞে হ্য, যাওয়া তাে ঠিক, কিন্তু এই দোকানের একটা ব্যবস্থা
করে তাে যেতে পারছি না।
সহদেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে জিগগেস করলে,
দোকানটা বিক্রী করাও তা হলে ঠিক ?
ভাদুড়ী উত্তর দিলে, আজ্ঞে হ্যা, তা ভিন্ন আর উপায় কি ?
সহদেব কথা প্রসঙ্গে প্রস্তাব করলে সে নিজেই দোকানটা
নিতে চায়, যদি ভাদুড়ী মশায়ের তরফ হতে কোন আপত্তি
থাকে।
ভাদুড়ী প্রথমটা বেশ একটু বিস্মিত হলো,কিন্তু শেষে সবিনয়ে
উত্তর দিলে, আমার আর এতে আপত্তি কি থাকতে পারে, বরং
আপনি যদি নিয়ে আমায় ছুটি দেন তাে আমি বেঁচে যাই।
ঝিকিমিকি
সহদেব অন্যমনস্ক। গাম্ভীর্যে মুখখানা ভরে বললে, হ্যা আমি
একরকম মন ঠিক করেছি। এখানে যদি থাকতেই হয়, একটা
কিছু নিয়ে না থাকূলে থাকব কেমন করে? তা ছাড়া এখানে
এসেই আপনার এই দোকানটার ওপর কেমন একটা মায়া পড়ে
গেল। আপনি যখন ছেড়েই দেবেন, তখন এটাকে বেহাত
করি কেন ?
সহদেব যখন বাইরে যাচ্চে, সেই সময় ভাদুড়ী তার সঙ্গে
সঙ্গে রাস্তা পর্যন্ত এসে জিগগেস করলে, তা হলে আর আমি
অন্য কারুর সঙ্গে কথা কইবাে না, নিশ্চিন্ত রইলাম ?
সহদেব যেন কথাটা ভুলেই গিয়েছিল, এমনি ভাবে তার
মুখের পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললে, ওঃ, দোকানের কথা
বলচেন ?
কথা যখন দিলুম তখন ঠিকই রইল,
কাল একসময় ব’সে দামটা ঠিক করা যাবে।
ভাদুড়ী বললে, আমিও মজুত মালের একটা লিষ্টি তৈরী
নিশ্চয় !
-বেশ।
সহদেব এগিয়ে গেল। ভাদুড়ী দোকানে এসে বসেচে
মাত্র, এমন সময় আবার সহদেব এসে তাকে ডাক দিলে।
ভাদুড়ী বাইরে আসতেই, সহদেব বললে, আমি ভুলে
বাইশ
ঝিকিমিকি
গিয়েছিলুম, কথা যখন পাকা হয়ে গেল তখন কিছু বায়না করাই
ভাল। এই নিন পাঁচশাে এক টাকা।
টাকাটা ভাদুড়ীর হাতে দিয়েই সহদেব আবার পিছু
ফিরলাে । ভাদুড়ী বললে, এর জন্যে আবার আপনার ফিরে
আসবার দরকার কি ছিলাে, আপনার কথাই যথেষ্ট।
- তত ঠিক, তবুও আপনার দিকটা তাে আমার ভাবা
উচিত, আরাে পাঁচ টা খদ্দের যখন আসছে।
ভাদুড়ী বললে, একবার তাহলে ভেতরে আসুন না, একটা
রসিদ লিখে দিই টাকাটার।
সহদেব বললে, রসিদ নেবার প্রয়ােজন বুঝলে, আমি নিজেই
বলতুম
সে জন্যে আপনি ব্যস্ত হবেন না। একেবারে একটা
লেখাপড়া করে নিলেই হবে।
সহদেব ভাদুড়ীকে কোন কিছু বলবার অবকাশ না দিয়েই
এগিয়ে গেল। ভাদুড়ী স্তব্ধ হয়ে পেছনে তার পানে চেয়ে
রইলো
কি জানি কেন সহদেব ভাদুড়ীর কাছ থেকে দোকানটা
কিনে নিয়ে স্থায়ীভাবে এখানে ব্যবসা শুরু করে দিলে।
ব্যবসা করবার জন্যে বা ব্যবসায় লাভবান হবার জন্যে নিশ্চয়ই
নয়।
বাঙলাে ছেড়ে দিয়ে সে আস্তানা পাতলে এই দোকানের
ভিতর। আত্মগােপন করে কলকাতার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী সহদেব
সরকার পশ্চিমের ছােট্ট একটা সহরে মনােহারীর দোকানে বসে
তেইশ
ঝিকিমিকি
ছােট ছােট ছেলে-মেয়েদের বিক্রী করে লজেঞ্জুস, বিস্কুট ও
চকোলেট। মেয়েদের বিক্রী করে সাবান, তরল আতা! ও মাথার
ফিতে! বিক্রী করে সহদেব, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সে দাম নিতে
ভুলে যায় বা চায় না। তাদের মুখের অনর্গল হাসি, সবৌতুক
চাউনি, লীলায়িত অঙ্গভঙ্গী, স্নিগ্ধ হাতের পরশ সহদেবের বিরুদ্ধ
মনের কপাট খুলে দেয়, তার নিদ্রিত চেতনাকে উদ্বুদ্ধ, উচ্চকিত
করে তােলে ! সুগভীর তৃপ্তিতে তার বুকের নীচেটা ফেনিয়ে
खर्ट
শুধু
এই ভেবে যে এরা দয়া করে তার দোকানে আসে।
মানুষের মাঝে থেকেও সংসারের আসল মানুষ যারা তাদের
থেকে চিরদিন দূরে ছিল তার স্থান! আজ যেন তাদের মাঝে
একটু ঠাই পেয়ে, তাদের আনন্দের ছোঁয়া পেয়ে সে ধন্য হয়ে
উঠলাে। সুগভীর মনােযােগ দিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করে,
তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে, সে কৃতার্থ হয়ে যায়।
সহদেব ঠিক এই চেয়েছিল। জীবনের স্বাদ সে কোনদিন
পায় নি, তাই সে এমনি একটা আবেষ্টনের মধ্যে দিয়ে জীবনের
সাথে পরিচিত হতে চায়। সে চায় মানুষের আসল
মানুষের অকুণ্ঠ জীবনের সাথে মেলামেশা করে নিজের ছন্দহীন
জীবনের মাঝে একটু আনন্দের স্পন্দন ! জীবিকার প্রয়ােজন
তার ছিল না, প্রয়ােজন তার জীবনের।
দোকানের মালিক বদলি হলাে, দোকান কিন্তু ঠিক পূর্বের
মতই চলতে লাগলাে। বরং পূর্বের চেয়ে দোকান আরাে
জমে উঠলো। সহদেব সদালাপী, মিষ্টভাষী। তার ওপর
সঙ্গ,
চব্বিশ
ঝিকিমিকি
দরদস্তুর করে না, ব্যবসার হিসেব রাখে না, লাভ লােকসানের
বালাই নেই। নিজের হাতে বিক্রী করতে পারলেই তার
আনন্দ। জীবনের উৎসব সভায় সে যেন ফুল সরবরাহ করবার
ভাগ পেয়েছে। মনের মত করে সাজি সাজাতে পারাই তার
আনন্দ। আনন্দের সেই চেতনাটুকু বুকের মাঝে নিয়ে মুগ্ধ
চোখে সে এই উৎসব সভার পানে
চেয়ে চেয়ে দেখে।
অতীতের গীতহীন, ছন্দহীন জীবনকে মরীচিকার মাঝে লুপ্ত
করে দিয়ে, জীবনে আনতে চায় আনন্দের শােভাযাত্রা, প্রবাহিত
রক্তের মাঝে আনন্দময় জীবনের স্পন্দন ।
কতাে রকমের জিনিষিই যে তাকে আমদানী করতে হয়।
এখানকার বাঙালীরা চায় প্রতিদিনকার জীবন যাত্রার
প্রয়ােজনীয় যা কিছু সবই এই একটি দোকান হতে পেতে।
দ্বিতীয় দিন আহাৱাদি শেষ করে সহদেব বাইরে এসে
দেখলে একটি ছােট মেয়ে দোরের কাছে পঁড়িয়ে আছে। সহদেব
বাইরে এসে জানতে পারলে, সে ভাদুড়ী মশায়কে খুজছে।
ভাদুড়ী মশায় যে চলে গেছেন একথা জানতে পেরে মেয়েটির
মুখখানি নিমেষে শুকিয়ে গেল। সে বিষমুখে জিগগেস করলে,
ভাদুড়ী মশায় কি আর আসবেন না?
সহদেব আশ্বাসের গলায় বললে, না। কিন্তু তােমার কি
দরকার আমায় বলােনা ?
সহদেব জানতে পারলে, মেয়েটি কিছু চাল ধার চায়।
সত্যিই সে একটু বিব্রত হয়ে পড়লাে,চাল তাে তার দোকানে
পঁচিশ
ঝিকিমিকি
৩
বিক্রী হয় না, তা ছাড়া নিজেরও খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা সে
নিজে করেনি, ভাদুড়ী মশায় করে দিয়েছে এক ভদ্র অথচ দরিদ্র
পরিবারে। তারাই সহদেবের খাবার দেয়। কাজেই সহদেবের
ভাড়ারে চাল থাকবে কোথা থেকে!
মেয়েটি ক্ষুন্ন হয়ে সহদেবের মুখের পানে তাকিয়ে চলে
যাচ্চে দেখে সহদেব তাকে জিগগেস করলে, ভাদুড়ী মশায় কি
চাল বেচতেন ?
মেয়েটি ভীরু চোখ দুটি একবার সহদেবের মুখের পরে তুলে
ধরেই আবার নামিয়ে নিয়ে নীচু গলায় বললে, তা জানি না,
তবে আমরা মাঝে মাঝে ধার নিয়ে যেতুম ।
'সহদেব প্রশ্ন করলে, কতােটা চাল হলে তােমার চলবে ?
মুখখানি নীচু করে মেয়েটি বললে, এক সের ।
সহদেব জিগগেস করলে, বাজারে এক সের চালের দাম
কতাে, জানাে?
জানি। দু’ আনা।
সহদেব মেয়েটির হাতে দু’ আনা পয়সা দিয়ে বললে, তুমি
বাজার থেকে আমার জন্যে এক সের চাল কিনে সেইটে তুমি ধার
নিয়ে যাও।
মেয়েটি হাতের মাঝে পয়সাগুলাে নিয়ে সহদেবের মুখের
পানে বিস্ময়ে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলাে।
সহদেব হাসতে হাসতে বলে, এতে বােধ হয় তোমার
ছাব্বিশ
ঝিকিমিকি
কোন আপত্তি নেই। যাও, বাজারে গিয়ে চাল কিনে নিয়ে
যাও। •
মেয়েটির মুখে কথা ফুটলো না, পেছন ফিরে সে তার ময়লা
জীর্ণ শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছলে।
আনন্দে সহদেবের চোখ দুটোও ভিজে উঠলো। সে স্তব্ধ
হয়ে রৌদ্রদীপ্ত জনশূন্য পথের পানে চেয়ে রইলাে।
সাতাশ
৫
পাঁচ
সন্ধ্যায় সহদেবের নিঃশ্বাস
ফেলবার অবসর মেলে না।
বেড়িয়ে ফেরবার পথে যত সব তরুণ তরুণী এসে জমা হয়
সহদেবের লাইব্রেরীতে বই নিতে। তাদের সাথে বই বাছাই
করা, তাদের মাঝে বসে তাদের মুখে বই-এর সমালােচনা শােনা
সে এক পরম আনন্দময় চেতনা ! সহদেবের সমস্ত শরীরটা
পাখার মত হালকা হয়ে ওঠে, উচ্ছসিত আনন্দে হাওয়ায় উড়ে
বেড়ায় এঘর হতে ওঘরে। গভীর মনোেযােগে, সমগ্র চেতনা
দিয়ে তাদের মাঝে সে নিজেকে বিলিয়ে দেয়, তাদের তুষ্টি
সাধনে প্রয়াস পায়।
পেট্রোম্যাঙ্ক আলাের নীচে বসে অনেকক্ষণ পর্যন্ত এরা জটলা
করে। সহদেব দূর হ’তে নির্নিমেষে এদের পানে চেয়ে দেখে ।
এদের প্রবাসের এই উচ্ছল আনন্দের জোয়ার তার রক্তের মাঝে
সঞ্চারিত হতে থাকে। ওদের আনন্দের উন্মাদনা তার রক্তের
মাঝে এসে পৌছায়।
তারপর গভীর রাত্রে যখন সহদেব অবসন্ন দেহটা লুটিয়ে দেয়
আটাশ
ঝিকিমিকি
বিছানার প্রান্তে, তখন তার মনে হয়, এদের মাঝে থেকে নিজের
পিছনের ব্যর্থতার মলিন দিনগুলােকে জীবনের পৃষ্ঠা হ’তে মুছে
ফেলা হয়তাে শক্ত নয়। এমনি চিন্তার মধ্যে দিয়ে সে ধীরে
ধীরে আবিষ্কার করছে তার জীবনের পথ।
সেদিন বিকেল হতেই বৃষ্টি নেমেছে। তার ওপর এলাে-
মেলাে ঝড়াে হাওয়া। পথ জনশূন্য। কচিৎ দুএকজন বর্ষাতি
গায়ে ছাতি মাথায় দিয়ে দ্রুতপায়ে পথ চলচে। দোকানে
লােকজন নেই। সহদেব দোকানের সামনের বারাণ্ডায় বসে
চুরুট টাচে আর আকাশবুকে মেঘের লীলা দেখচে। ঝড়ের
দাপটে লম্বা একহারা দেবদারু গাছগুলাে টলমল করছে-
ইউক্যালিপটসের শুক্ননা পাতাগুলো বৃষ্টর সাথে ছড়িয়ে
পড়চে! দূরে পাহাড়ের চুড়াগুলাে মেঘের পর্দা দিয়ে ঢেকে
ফেলেচে। বৃষ্টির জলে ধুয়ে পাহাড়ের কালো জঙ্গল বন নীল,
হয়ে উঠছে। মাটি ধুয়ে পাহাড়গুলাে আকাশের মতই কালাে
হয়ে উঠছে। আকাশ বাতাস যেন এক হয়ে ক্ষেপে উঠছে।
গিরিশৃঙ্গগুলাে উর্ধমুখে স্বপ্নবিষ্টের মতাে স্তব্ধ হয়ে শুচে
আকাশের দীর্ঘশ্বাস ! বেলা গড়িয়ে যাচ্চে দ্রুততালে, ঘড়ির
চেয়ে দ্রুততর তালে, আলো নিবে যাচ্চে মেঘের চাপে চাপে।
কেমন একটা সকরুণ আচ্ছন্নতার মাঝে বসে সহদেব চুরুট টানে
আর তাল তাল ধোয়া ছাড়ে। মেঘের চাপে যেমন আকাশ
আচ্ছন্ন, বৃষ্টির ধারায় যেমন বন-বনান্তর সব সকরুণ তেমনি
সহদেবের মনের আকাশও ঘােলাটে ভারী হয়ে উঠেছে।
উনত্রিশ
ঝিকিমিকি সহদেব বারাণ্ডায় এসে বৃষ্টির ঝাপটে খানিকটা ভিজে আবার ভেতরে গিয়ে বসলাে। চাকরটা দোকানে সন্ধ্যে দিলে । দু’ একজন ভিজতে ভিজতে সহদেবকে নমস্কার করে চলে গেল। সহদেব প্রতিনমস্কার করে উঠে দাড়ালো। কেউ এলােনা দেখে সহদেব ভেতরে গিয়ে বসলাে—পেছনে নিজের বসবার ঘরে। চাকর চা দিয়ে গেল । সহদেব যখন বাইরে এলাে, তখন অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে। ঝড়াে হাওয়াটা গেছে থেমে। আকাশে ছেড়া পালা মেঘ- গুলাে ভেসে বেড়াচ্চে। দু’একজন খদ্দের এলাে! সহদেব তাদের বিদায় দিয়ে ভেতরের পানে চেয়ে দেখলে, লাইব্রেরীর ঘরে। একটি মেয়ে বসে আছে। ভেতর থেকে মেয়েটি বললে, সরকার মশায়, বইখানা ফেরৎ দিতে এলুম। সহদেব নমস্কার করে জিগগেস করলে, আপনি কতক্ষণ এসেচেন ? মেয়েটি বলে, আপনি তখন ভেতরে ছিলেন। বইখানা ক’দিনই পড়ে রয়েছে, তাই ফেরত দিতে এলুম। আর একখানা বই নিয়ে যাবাে। সহদেব বইখানা আলমারীতে রাখতে রাখতে বললে, আপনি এই ঝড়বৃষ্টির মাঝেও বেরিয়েছেন ? মেয়েটি আলমারীর কাচের মধ্যে দিয়ে বই দেখতে দেখতে উত্তর দিলে, কী আর করি বলুন, বিদেশে বেড়াতে এসেও যদি ত্রিশ
ঝিকিমিকি
ঘরের মাঝে বদ্ধ হয়ে থাকতে হয়, তাহলে তো নাচার ! সমস্ত
দিন একা বসে বসে যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলুম, তাই মরীয়!
হয়ে বেরিয়ে পড়লুম ! তার ওপর একখানা বই পৰ্যন্ত নেই যে
সময় কাটে !
সহদেব একটা কাজ পেয়ে ও কথা বলবার সঙ্গী পেয়ে যেন
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাে। তার মনের মেঘ গেল পাতলা হয়ে।
মেয়েটি বললে, ঘরের মাঝে কোণ, ঠাসা হয়ে থাকতে
আমি মােটে পারি না। বিশেষ এই বাদলা দিনে। খােল।
আকাশের নীচে দাড়িয়ে যদি মেঘের লীলা না দেখলুম, মুক্ত
বাদল হাওয়ায় যদি দেহটাকে না ভেজালুম তবে বাদল দিনটা
বৃথাই গেল মনে হয়। বনবনান্তের মত উৰ্দ্ধমুখে যদি আকাশের
পানে হাত তুলে না দাঁড়ালুম তবে আর উপভােগ করলুম কি
বৃষ্টির ধারা ? বৃষ্টিধারায় যে আকুলতা, যে উন্মাদনা তা যদি
দেহের রক্তের মাঝে না পৌঁছাল তবে এর সার্থকতা কি?
সহদেব মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেয়েটির মুখের পানে চেয়ে রইলো।
মেয়েটি বললে, প্রকৃতির মত্ততার সাথে মানুষের মনের একটা
গভীর সম্বন্ধ আছে। প্রকৃতির তালে তাল রেখে মন মেতে
ওঠে ঝড়ের বেগে, দীপ্ত হয়ে ওঠে রৌদ্রের প্রখরতায়, স্নিগ্ধ
হয়ে আসে জ্যোৎস্নার বন্যায় ! মন চায় স্বাদ পেতে প্রকৃতির
সেই সৌন্দর্য্যের।
মৃদু হাসিতে মুখ ভরে সহদেব বললে, আপনি স্বভাব কবি ।
একত্রিশ
ঝিকিমিকি
আপনার বলার ভঙ্গীমায় এবং গলার স্বরে এমনি একটী মাধুৰ্য্য
আছে যা ঐ বৃষ্টিধারার ভাষার মতাে দুজ্ঞেয় অথচ শ্রুতিমধুর।
মেয়েটি হেসে বলে, তার মানে আপনি বল্তে চান যে
আমি আবােল-তাবােল বক্চি, যার সুর আছে কিন্তু মানে হয়
না। কবি আমি কোনকালেই নই বরং আপনিই কবি।' ঐ
যে বললেন না ‘বৃষ্টির ভাষা—চমৎকার ! সত্যিই বৃষ্টিধারার
ঐ বাণী যখন আমার কাণে এসে পৌছাল তখন আর কেউ
ধরে রাখতে পারলে না। পথের নির্জনতা নয়, শরীরের মমতা
নয়, মন্তু প্রকৃতির মতােই আমি ছুটে বেরিয়ে এলুম বদ্ধ ঘরের
জীর্ণ কোণ হতে। আপনার ভালো লাগে না, সত্যি বলুন,
ঐ বৃষ্টিধারার মুখে দেহটা পেতে দিতে ?
সহদেব সহসা উত্তর দিতে পারলে না, একটা লম্বা নিঃশ্বাস
ফেলে মেয়েটির মুখের পানে চাইলে ।
মেয়েটির সহদেবের মুখে
সেই জানে, তবে সে
সহসা প্রসঙ্গটা বদলে নিয়ে বলে উঠলাে, সরকার মশায়,
আপনার এখানে মােটেই ভালো বই নেই, যততা রাবিস,
সেকেলে বই কতকগুলো। এসব আর আজকাল চলে না।
সহদেব অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দেয়, তা ঠিক। নতুন বই
আসেনি বহুদিন। আর একে তাে ঠিক্ লাইব্রেরী বলা চলে না।
বাঙলা হ’তে যারা আসেন হাওয়া খেতে, সেই সব প্রবাসী
বাঙালী ভাইবােনদের সময় কাটাবার জন্যে বই রাখা। আমার
তাে বই সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই, আপনি.••আপনি এক কাজ
বত্রিশ
কি দেখলে
ঝিকিমিকি
করুন না। আমাকে আধুনিক বইয়ের একটা লিষ্ট তৈরী করে
দি, আমি এই সপ্তাহেই কলকাতা থেকে আনিয়ে দেব।
প্রস্তাবটী মেয়েটির মন্দ লাগলো না। সে তার ডাগর
চোখ দু’টি প্রসারিত করে জিগগেস করলে,-কত টাকার
কিতে পারবেন?
সহদেব গম্ভীর মুখে বললে, আপনি লিষ্ট দিন না—তারপর
আপনার কাছ থেকেই জানতে পারবাে কতাে টাকা দাম
লাগবে।
মেয়েটি হেসে বললে, বা, তাকি হয়! আপনি একটা
আন্দাজ দিন, আমি সেই মত লিষ্ট করে দেব।
সহদেব আতা আতা করে জিগগেস করলে, আন্দাজটা
আপনি দিন্ না কত টাকার বই হলে উপস্থিত একরকম চলুতে
পারে বা যে-সব বই আজকাল লােকেরা খুব পড়ে সেই সব
বইগুলো হতে পারে।
মেয়েটি একটু ভেবে উত্তর দিলে, তা এখন এ লাইব্রেরীকে
আপ-টু-ডেট করতে হলে অন্ততঃ পাঁচ সাতশাে টাকার দরকার।
সহদেব অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললে, বেশ, সেই রকমই
লিষ্ট করুন।
মেয়েটি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলাে, পরে মুখ
নীচু করে বললে, কিন্তু এটা তাে আপনার ব্যবসা সরকার মশায় ?
মেয়েটির মুখের দিকে চোখ দু’টি তুলে সহদেব প্রশ্ন করলে,
কেন ?
তেত্রিশ
ঝিকিমিকি
}
মেয়েটি উত্তর দিল, এখানে ক’জন লােকই বা পড়ে। তাই
ভাবচি এতগুলাে টাকা অনর্থক বদ্ধ করবেন ?
সহদেব অন্যমনস্কভাবে একখানা মাসিকের পাতা ওল্টাতে
ওটাতে বললে, আপনারা যদি চান, আমায় কতেই হবে,
নইলে আপনারা এখানে আসবেন কেন ?
মেয়েটি আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাে।
সহদেব জিগগেস করলে, আপনি বুঝি খুব পড়েন ?
মেয়েটি মুখ নীচু করে উত্তর দিল, খুব না, তবে কিছু কিছু
পড়ি নিশ্চয়ই। কারণ পড়ানােই আমার পেশা।
দুর্বোধ্য রহস্যভরা দৃষ্টি দিয়ে সহদেব মেয়েটির মুখের পানে
চেয়ে রইলো
।
মেয়েটি হেসে বলে, বুঝতে পারলেন না ? বালিকা
বিদ্যালয়ে মাষ্টারী করে আমায় জীবিকা অর্জন করতে হয়।
মেয়েটির ঠোট দু’খানি মৃদু কেঁপে উঠলাে, আরক্ত মুখখানি
ঈষৎ ঝুকে পড়লো।
সহদেব কুণ্ঠিত কৌতূহলী দৃষ্টি দিয়ে মেয়েটির আপাদ-মস্তক
নিরীক্ষণ করে জিগগেস করলে, আপনার আর কেউ নেই ?
পিছন দিকে মাথাটা একটু সরিয়ে নিয়ে মেয়েটি বললে, ও
কথা জিগগেস কচেন কেন ? স্বাধীনভাবে নিজের জীবিকা
অর্জন করি বলে ?
সহদেব সঙ্কুচিত হয়ে উঠল। দ্বিধায় ও কুণ্ঠায় তার মুখে
কথা ফুটলাে না।
চৌত্রিশ
সহদেবের কালাে চৈতন্যের পটে একটা উজ্জ্বল ছাপ রেখে
মেয়েটি বাদল রাতের স্যাতসেঁতে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মেয়েটিকে আরাে দু'একবার সহদেব দেখেচে তার লাইব্রেরী
ঘরে, কিন্তু এমন ভাবে চোখে পড়েনি কোনদিন—বােধ হয়
সুযােগ হয়নি বলেই চোখে পড়েনি। দেখাদেখির একটা
স্থানকাল বােধ হয় আছে।
তারই অপেক্ষায় চোখ দুটো
হয়তাে তার অন্ধ হয়েছিল। বাদল সন্ধ্যার সেই শুভ লগ্নটিতে
আকস্মিক বিদ্যুৎ-রেখার মততই তীব্র হয়ে তার চোখের সামনে
মেয়েটি উদ্ভাসিত হয়ে উঠলাে। তার অন্ধকার মনের মাঝখানে
একটা গভীর ছাপ পড়ে গেলো। পরিচয়ের সূত্রপাতেই মনে
হলাে যেন এ অনেক দিনের চেনা। এ তাে নতুন নয়, এ ছিল
মনের আকাশে, অন্ধকারের গােপনতায়—হঠাৎ চকিতে ফুটে
উঠলাে নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট মুহূর্তটিতে! অন্ধকারে হাতড়ে
হাতড়ে যাকে সে খুজে মছিল, হঠাৎ বিদ্যুতের আলো যেন
তাকে আবিষ্কার করে দিলে ।
পঁয়ত্রিশ
ঝিকিমিকি সমস্ত রাত ধরে সহদেব ভাবলে তারই কথা,-চপল পাখীর মতাে কথা বলার ভঙ্গীমা, স্নিগ্ধ হাসিমাখা মুখখানির প্রসন্নতা, টানা চোখের দীপ্তি। কণ্ঠের বাণীতে কেমন একটা মধুর অথচ তেজস্বী দৃপ্তি! সহদেবের মনে হলাে মেয়েটির কণ্ঠস্বরে এমনি একটি অপূৰ্ব্ব স্বাদ আছে যা সহজে ভােলা যায় না। মনের মাঝখানে যার সুর অনুরণিত হতে থাকে সর্বক্ষণ। মেয়েটির নাম ললিতা। ললিতাকে প্রথম প্রথম সহদেবের রহস্যময়ী মনে হয়েছিল, কিন্তু যতই অপরিচয়ের আড়াল ভেঙ্গে দু’জনে কাছাকাছি হতে লাগলাে, ততই সহদেবের মনে হলাে মেয়েটি স্পষ্ট, অতিরিক্ত স্পষ্ট, তাকে বােঝবার জন্যে এতটুকু কষ্ট করতে হয় না, সে আপনা আপনিই নিজেকে প্রকাশ করে দেয়। কুড়ি বাইশ বছর হলে কি হবে, স্বভাব তার নিতান্ত বালিকার মতই সরল। মুখখানি নধর, সে মুখে গােপনতার ছায়া নেই, ইঙ্গিত নেই। ডাগর দুটি চোখ, পদ্মপলাশের মতাে গভীরতায় অচঞ্চল! সে চোখে অগাধ মমতা, অপরিমিত শ্রদ্ধা। অন্তরের ভাষাটি চোখ দুটিতে সুপ্রকাশ! নিজের জীবন সম্বন্ধে সে কিন্তু ভারী উদাসীন, ভারী নির্লিপ্ত । প্রতিনিয়ত ললিতা আসে সহদেবের দোকানে। লাইব্রেরীর, মাঝে বসে পড়াশুনন করে, সহদেবের সাথে গল্প করে। সহদেবের কাছে নারী ছিল চির অপরিচিত, দুয়ে রহস্য- ভরা। চোখ দিয়েই চিরদিন নারীকে দেখে এসেছে সে, মন দিয়ে ছত্রিশ
ঝিকিমিকি
;
দেখবার অবসর কখন ঘটেনি। কিন্তু এই যে মেয়েটি ললিতা;
এ যেন ক’টি দিনেই সহদেবকে একান্ত আপন করে তুললাে,
তার সযত্ন স্নেহ দিয়ে, মমতা দিয়ে ; তার নিঃসঙ্গ আঁধার জীবনে
হাসির হিল্লোল তুলে। তার সারা জীবনের নির্বাসিত আনন্দকে
যেন এই মমতাময়ী মেয়েটি দুহাত প্রসারিত করে ফিরিয়ে
আনতে চায়—নিরানন্দ মূক জীবনকে তার নিজের আনন্দ
দিয়ে মুখর করে তুলতে চায়।
খােদ্দেরের ভিড় কেটে গেলে, সহদেব সেদিন ঘরে ঢুকে
দেখলে ললিতা লাইব্রেরী ঘরের এক কোণে বসে কি-সব খাতাপত্র
দেখচে।
সহদেব তার কাছে গিয়ে দাড়াতেই, ললিতা চোখ তুলে
তার মুখের পানে চেয়ে বললে, এতগুলাে টাকার বই তাে
আনালেন সরকার মশায়, কিন্তু চঁাদার খাতায় দেখলুম চাঁদা তাে
আদায় হয় না মােটেই, অনাদায়ের সংখ্যাই তত বেশী ।
সহদেব যেন আকাশ হ’তে পড়লাে, এমনি মুখের ভাবটা
করে বলে উঠলাে, লাইব্রেরীর চঁাদার একখানা খাতা আছে
নাকি ? তা তাে জানি না।
ললিতা তাে হেসে কুটিকুটি।
সহদেব মুগ্ধ বিস্ময়ে তার মুখের পানে চায়।
একসময় ললিতা বলে, ভাল ব্যবসা করচেন তাে সরকার
মশায় ! দোকানের হিসেব পত্রের খাতা আছে, না, তাও
জানেন না ?
সঁইত্রিশ
ঝিকিমিকি
সহদেব হেসে উত্তর দেয়, তুমিও যেমন, ঐ হিসেব পত্রের
ঝঞ্চাট করতে গেলেই আবার একজন সরকার রাখতে হয়।
সে আবার একটা বাজে খরচ।
ললিতা বাঁকা চাউনিতে হাসি ফুটিয়ে বলে, তা মন্দ নয়।
সহদেব বলে, একলা মানুষ, অতাে ঝঞ্চাট পিরবাে কেন ?
তার চেয়ে মানুষকে বিশ্বাস করাই ভালাে।
ললিতা নিঃশব্দে কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টি দিয়ে সহদেবের
মুখের পানে চায়। সহদেব ছেলেমানুষের মতাে খিল খিল
করে হাসে।
ললিতা একসময় বলে, আমাকে মাইনে দিয়ে রাখুন না, তা
ছ’লে না হয় আমি এখানে থেকে যাই ।
সহদেব সঙ্কুচিত হয়ে বলে, তােমাকে ?
তােমাকে মাইনে
দিয়ে রাখবার মতাে শক্তি বা স্পর্ধা আমার নেই।
ললিতা হেসে বলে, নিশ্চয়, বাজে খরচ হবে।
ললিতা লক্ষ্য করে অকারণে মাঝে মাঝে সহদেবের মুখের
রেখায় কেমন একটা বিষন্নতা ফুটে ওঠে। সে স্তব্ধ বিস্ময়ে তার
পানে চেয়ে থাকে, বুঝতে পারে না কিসের এই ব্যথা, অথচ
এটুকু সে বুঝতে পারে যে একটা নিষ্ঠুর ব্যথা তার বুকের এক
কোণে বিঁধে আছে ; আর তারি নিদারুণ যন্ত্রণা তাকে অধীর
করে তােলে।
ললিতা একদিন নিরালায় সহদেবকে বলে, দেখুন সরকার
মশায়, আপনার মুখ দেখে মনে হয় আপনার মনের মাঝে অনেক
আটত্রিশ
ঝিকিমিকি
কথা জমা হয়ে আছে, আর সেই সব কথা বলবার জন্যে আপনি
মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে ওঠেন, অথচ বলেন না-
সহদেব প্রসারিত দৃষ্টি দিয়ে ললিতার মুখের পানে চায়।
ললিতা সস্নেহ কণ্ঠে জিগগেস করে, কেন বলেন না?
বলবেন না?
সহদেব চুপ করে থাকে। কী যে উত্তর দেবে ভেবে
পায় না!
ললিতা কুটি করে চোখের ইঙ্গিতে তাকে শাসায়।
ললিতার মুখের আলােয় সহদেবের দৃষ্টি প্রখর হয়ে ওঠে।
তার মনে হয় ললিতার এ নিঃশব্দ আহ্বানকে বুঝি বা উপেক্ষা
করা চলে না। হঠাৎ সে একটা পাগলামী করে না বসে।
কিন্তু সঙ্কোচ তাকে আড়াল করে দাঁড়ায়।
আধ-আঁধার ঘরের মাঝে দুজনে পাশাপাশি অনেকক্ষণ চুপ
করে বসে রইলাে। একসময় সহদেবের মুখের দিকে মুখ তুলে
ললিতা বলে, একদিন কিন্তু শুনবােই আপনার মনের কথা।
আজ না হয় রেহাই পেলেন, কিন্তু প্রস্তুত হয়ে থাকবেন,
শােনাতেই হবে একদিন আপনার কথা।
ললিতা তার রূপের মাধুৰ্য ছড়িয়ে হেলতে দুলতে চলে
যায়, সহদেব নিঃশব্দে তাকে অর্ধেক রাস্তা পৰ্যন্ত এগিয়ে দিয়ে
আসে।
ললিতা একসময় বলে, আর আসবেন না আপনি, ঠাণ্ডা
লাগবে।
উনচল্লিশ
ঝিকিমিকি
হদেব থমকে দাড়ায়। রাত্রির পুঞ্জ পুঞ্জ অন্ধকারে নিমেষে
ললিতা অদৃশ্য হয়ে যায়।
ঘরের মাঝের অখণ্ড রিক্ততা সহদেবকে বিব্রত করে তােলে,
ললিতার আসতে দেরী হলে সে হাঁপিয়ে ওঠে—উদ্বেগে আশায়
কেমন যেন ছটফট করতে থাকে। ললিতা আসে, তার মর্মরিত
আনন্দে, লীলায়িত অঙ্গভঙ্গীতে ঘরটি ভরে যায়। সহদেব স্বস্তির
নিঃশ্বাস ফেলে, নিশ্চিন্ত আরামে তার কাছটিতে বসে গল্প করে।
কত সে কথা, ললিতা অনর্গল ব’কে যায়, সহদেব বিস্মিত পুলকে
তার মুখের পানে চেয়ে থাকে। ললিতার প্রসন্ন মূখের শুভ্র
হাসি, স্নেহ-সজল চোখের চাউনি সহদেবের মনের কন্দরে
এক অপরিচিত পুলকের বার্তা নিয়ে এসে দাপাদাপি সুরু
করে।
সহদেবকে বসিয়ে রেখে ললিতা পাশের ঘরে গিয়ে ষ্টোভ
জ্বেলে চা তৈরি করে, সহদেব সতৃষ্ণনয়নে চেয়ে চেয়ে দেখে
তার প্রতিটি অঙ্গসঞ্চালন, যেন পদ্মের দলের মত তারা বিকশিত
হচ্ছে একটির পর একটি। তার সুগঠিত অনাবৃত বাহুটি নাচতে
থাকে চায়ের টেবিলের ওপর, সহদেবের মনের আকাশে চমক
লাগে। ললিতার অসত ঘন চুলের সুবাসে ঘরের বাতাস
ভারী হয়ে ওঠে, সেই হাওয়া গায়ে লেগে সহদেবের সমস্ত
শরীরটা দুলে দুলে ওঠে ; তার দেহের আলাে সহদেবের
রক্তের মাঝে প্রবেশ করে তার শিরায় শিরায় সঞ্চারিত করে
এক অভিনব উত্তেজনা। অতীতের ভগ্নস্তুপের মধ্য হতে জেগে
চল্লিশ
ঝিকিমিকি
উঠে সহদেব, নিজেকে দেখতে পায় বাস্তবরূপে, আর পাঁচজনের
মতাে এই রূপ-রস-গন্ধে ভরা সংসারের মাঝে।
সহদেবের বয়স হয়েছে, কিন্তু বয়স তার দেহকে শিথিল
করেমি। সারাজীবনের সংযম তার মনকে যেমন অসামান্য
শুভ্রতা দিয়েছে, দেহ হতে তেমনি নিশ্চিহ্ন করে মুছে ফেলতে
পারেনি যৌবনের প্রভাব। অস্ত গেলেও এখনাে গােধূলির
স্তিমিত আলাের মতাে যৌবন ছুয়ে আছে তার দেহের আকাশ।
অন্ধকার নিবিড় হয়ে এখনাে তার মনের আলােকে অদৃশ্য করতে
পারেনি। তাই ললিতার আকস্মিক আবির্ভাব মাঝে মাঝে
চঞ্চল হাওয়ার মতো তার মনটাকে এলােমেলো করে দিয়ে
যায়।
একচল্লিশ
সাত
ললিতার বাড়ী সহদেবের মধ্যাহ্ন ভোজনের নেমন্তন্ন
ললিতা নিজের হাতে রেখেছে।
আয়ােজনের ঘটা দেখে সহদেব বিস্মিত হয়ে বললে, বি, এ
পাশ মেয়ে যে এমন রান্ন: করতে পারে এ আমার ধারণাই ছিল
।
ললিতা সাড়ীর আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে উত্তর দিলে, তবে
কি আপনার মতে বি, এ পাশ করলে মেয়েরা পুরুষ হয়ে
যায় ?
সহদেব হাসতে হাসতে বললে, তা ঠিক নয়। তবে বি, এ
পাশ করা মেয়েরা চা তৈরি কলে কিংবা বড় জোর দু’পানা
মামলেটু ভাজলে। তারা যে এমন ডালনা, চচ্চরি রাঁধবে এ
আমি ভাবতেও পারি নি।
যাক, তবু ভাল যে বি, এ পাশ মেয়েদের সম্বন্ধে ধারণাটা
আপনার বদলে গেল।
সহদেব দু’আঙুলের মাঝে সিগারেটটা টিপে ধরে ছাই ঝাড়তে
বিয়াল্লিশ
ঝিকিমিকি ঝাড়তে বললে, বি, এ পাশ মেয়েদের সম্বন্ধে ধারণা না বদলালেও, অন্ততঃ তােমার সম্বন্ধে ধারণাটা বদলে গেলো। ললিতা ঈাতে ঠোট চেপে হাসতে হাসতে বলে, কিন্তু আমার সম্বন্ধে আপনার অমন উল্টো ধারণাটা জন্মালে কেমন করে আমি শুধু তাই ভাচি। সহদেব বলে, উল্টো কেমন করে, আমার তত মনে হয় ঐটেই স্বাভাবিক, সাধারণ হ’তে ঐটুকুই তার স্বাতন্ত্র্য। -ওই ডালনা, চচ্চরি না রাঁধা?—ললিতা উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলাে। সহদেব দলে না। বললে, শুধু কি তাই? সেবার প্রবৃত্তিটাও আমার মনে হয় তাদের মন থেকে অলক্ষ্যে উবে যায়। জ্ঞানের চর্চায় তাদের মনের কোমল বৃত্তিগুলাে সব কঠিন হয়ে যায়। সেগুলাের চর্চা করবার অবসর পায় না তারা কোন- দিন। চাষ না করে তাে তুমি ফসলের আশা করতে পারাে না। ললিতা বিস্ময়ে ডাগর চোখ দু’টি প্রসারিত করে বললে, তার মানে আপনি বলতে চান যে জ্ঞানের চর্চা করে মেয়েরা স্ত্রী বা মা হবার অযােগ্য হয়ে যায় ? সহদেব মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, একরকম তাই বইকি, অন্ততঃ আমাদের দেশে। স্ত্রী বা মা হবার উপযােগী যে জমীটুকু, এ দেশের মেয়েদের মনের মাঝে সেইটুকুই সব চেয়ে কোমল। সে জমীটুকু সময়ে আবাদের অভাবে যদি পােড়াে জমীর মতাে তেতাল্লিশ
ঝিকিমিকি
কঠিন ও শুকনাে হয়ে যায়, তবে সে নারী স্ত্রী বা মা হবার
অযােগ্য।
কিছু না বলে ললিতা হাসলে।
সহদেব জিগগেস করলে, হাসলে যে ?
ললিতা সাড়ীর আঁচলটা কাঁধের ওপর গােছাতে গােছাতে
বললে, আপনার গভীর গবেষণা শুনেও গম্ভীর হতে পারলুম
। ওটা আমার একটা বদ অভ্যেস্।
সহদেব জিগগেস করলে, কথাটা বুঝি মনে ধরলাে না?
ললিতা বলে, যা সত্যি নয় তা মনে ধরবে কেমন করে ?
স্বীতত্ত্ব সম্বন্ধে আপনার মােটেই অভিজ্ঞতা নেই। আপনি স্ত্রী
শিক্ষার বিরােধী বলেই এ কথা বচেন। নইলে সত্যি কথাটা
হচ্চে এই : নারী হয়ে যে জন্মেচে সে চিরদিনই নারী, যতই
সে লেখাপড়া শিখুক আর যতই সে বাইরে পুরুষের সাথে
মেলামেশা করুক। নারী হয়ে যেদিন সে সংসারের আলাে
দেখেচে সেইদিনই হয়েছে সে মা, সেইদিনই হয়েছে সে স্ত্রী।
ভােরের আলো যেমন, যতােই স্পষ্ট হােক, তীব্রোজ্জ্বল সে হতে
পারে না তেমনি নারী চিরদিনই নারী, জ্ঞানচর্চা করে যতই
কেন মনটাকে বােঝাই করুক না, তবুও সে পুরুষ হবে না।
ঘােষ্টা তার মুখ না ঢালেও মনকে তার ঢাকবেই একদিন।
নইলে সৃষ্টির অপমান করা হবে। দেহকে নতুন নতুন পােষাক
পরাতে পারেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকে কিংবা স্বভাবের নিয়মকে
বদলাতে পারেন না।
চুয়াল্লিশ
ঝিকিমিকি
সহদেব অবনত মুখে বসে রইলাে। ললিতাও “উদগ্রীব
হয়ে তার উত্তরের আশায় থমকে দাড়াল। উত্তর কিন্তু এলাে
। ললিতাই আবার প্রশ্ন করলে, আচ্ছ। সরকার মশায়,
আপনি বুঝি স্ত্রী শিক্ষার বিরােধী ?
সহদেব যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে উত্তর দিলে, মােটেই না,
তবে স্ত্রী শিক্ষা কেন, স্ত্রীলােক সম্বন্ধে আমি মাথা ঘামাই নি
কোনদিন, তারা আমার কাছে দুর্ভেদ্য রহস্য।
ললিতা জিগগেস করলে, আপনার স্ত্রীও ছিলেন আপনার
কাছে রহস্যময়ী ?
—স্ত্রী আমার ছিল না কোন দিন। সে সৌভাগ্য আমার,
হয় নি।
ললিতা প্রচণ্ড বিস্ময়ে চোখ দু’টি বিস্ফারিত করে সহদেবের
পানে চাইলে। অপরাধীর মত সহদেবের মুখখানা আর
হয়ে উঠে মুহূর্তে পাংশু হয়ে গেল। মুখের রেখায় ফুটে
উঠলাে অব্যক্ত কাতরতা। ললিতার কৌতুহলী দৃষ্টির নীচে
সহদেব হাঁপিয়ে উঠলাে। সহদেবের মুখের ভাবে ললিতার
মনে হলো, লােকটা জীবনে অনেক দেখেচে, অনেক কিছু
শিখেচে, কিন্তু জীবনে পায়নি সে কিছুই। এই নাপাওয়ার
ব্যথাটাই সহদেবের মুখের রেখায় রেখায় অঙ্কিত হয়ে উঠেছে।
সেই ব্যথার ছায়া ললিতার মুখখানিকেও বিষন্ন করে তুললে,
কিন্তু সেই বিষণ্ণতার মাঝে এমনি একটি স্বচ্ছন্দ শান্তির ভাব
ফুটে উঠলাে যে সহদেব বিস্ময়ের আতিশষ্যে নির্বাক হয়ে
পয়তাল্লিশ
ঝিকিমিকি
লি। সহদেব জীবনে অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখেছে কিন্তু
এমন শান্তির রূপ কখনাে তার চোখে পড়েনি! ললিতা রূপসী
নয়, তবুও সে সুন্দরী—অপরূপ মাধুৰ্য্য তার চোখের স্নিগ্ধাজ্জ্বল
তারা দুটিতে।
ললিতার মুখের পানে চেয়ে সহদেবের চোখ দুটো কেঁপে
কেঁপে সহসা সজল হয়ে উঠলাে।
ললিতা বােধ হয় লক্ষ্য করলে, তাই তাকে সামলাবার
অবকাশ দিয়ে সে ত্রস্তপদে বাইরে যেতে যেতে বললে, আপনি
একটু বসুন, আমি খেয়ে আসছি এখুনি।
খাওয়া দাওয়া সেরে ললিতা এসে দেখলে, সহদেব নিঝুম
হয়ে তার বিছানার ওপর শুয়ে আছে। ঠিক বােঝা গেল না
সে ঘুমিয়েছে কি জেগে আছে। ললিতা রুদ্ধ নিঃশ্বাসে তার
মুখের পানে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলাে, যদি ঘুমিয়ে
থাকে এই ভেবে তাকে সে ডালে না। ঘরের মাঝে সে
পায়চারী করে বেড়ালাে কিছুক্ষণ, তারপর এখানা চৌকি
টেনে নিয়ে ঘরের এক কোণে স্থির হয়ে বসে রইলাে। সহদেবকে
কেন্দ্র করে রাশি রাশি চিন্তা এসে তাকে অভিভূত
ফেললে।
ললিতার মনে হলাে, এই লােকটি প্রথম পরিচয়ের দিনটা
হতেই যেন তাকে আকর্ষণ করেছে আনন্দে, বেদনায়। কেন ?
সে নিজেই ভেবে উঠতে পারে না, অথচ অস্বীকার করতেও
পারে না। চিরদিন সে সংযমী, অন্তরের চঞ্চলতাকে সে কোন
ছেচল্লিশ
ঝিকিমিকি
*
দিনই প্রশ্রয় দেয়নি। পুরুষের সঙ্গে মেলামেশায় সে ভ্যস্ত
কিন্তু অসতর্ক নয় সে কোনদিনই। কোন পুরুষ সহসা তার
জীবনকে এলােমেলাে করে দিতে পারে না, এই ছিল তার
অহঙ্কার। কত পুরুষ তাদের অটুট যৌবন, ভুবনমােহন রূপ
নিয়ে তার চোখের সামনে এসে দাড়িয়েছে, তার অন্তরে উচ্চাশার
বাণী বিঘঘাষিত করেচে—কিন্তু ললিতা তাদের পরিহাস করেছে
চিরদিন। একজনও তার মনের মাঝে ছাপ রেখে যেতে পারে
নি। সেও কারুর জন্যে বেদনা উপলব্ধি করেনি, কারুর জন্যে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নি। কিন্তু এই লােকটীর সাথে পরিচয়ের
সূত্রপাতেই ললিতা বুঝেছিল যে ওর ওই হাসির অন্তরালে
একটা গভীর বেদনা প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেই বেদনাটুকুকে
সে উপেক্ষা করতে পারলে না, নিজের অন্তরের ব্যথা দিয়ে
সেই বেদনাটুকুকে সে গ্রহণ করলে। এবং পরিচয় যত ঘন
হয়ে উঠতে লাগলাে ততই সে তার নিজের প্রাণের মমতা
ঢেলে দিয়ে সহদেবের নাপাওয়ার ব্যথাকে নিশ্চিহ্ন করে
মুছে দিতে চাইলে। তার জন্যে সে অনুতাপ করেনি একটি
দিনও বরং তার মুখে হাসি ফুটিয়ে সে আনন্দই পেয়েছে।
তাই সহদেবের এই আকস্মিক ভাবান্তর আজ ললিতাকে
ব্যথিত ও কৌতূহলী করে তুললে। ললিতা যদি জানতে না
পারে সহদেবের অন্তরের কথা,—কিসের ব্যথা, কাকে না
পাওয়ার ব্যথা তার অন্তরে পুঞ্জীত হয়ে আছে, কেমন করে
ঘােচাবে সে তার এই নিঃস্বত্ব।
সাতচল্লিশ
ঝিকিমিকি
ললিতা অপলক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সহদেবের মুখের পা।ে
চেয়ে রইলাে। সে তাকে আজ জানতে চায় পরিপূর্ণভাবে,
জানবার মতাে অনেক কথাই আছে তার অন্তরে পুঞ্জীভূত হয়ে।
ললিতা ভুলে গেল তাদের বয়সের পার্থক্য। প্রাণের সমস্ত
দরদ দিয়ে, প্রিয়তম বান্ধবীর মত সে সাগ্রহে শুনলে সহদেবের
জীবনের রােমান্স, সেই তার প্রথম যৌবনের ভালবাসার ছােট্ট
কাহিনীটী। তারপর সারাজীবন সে একা, সে নিঃসহায় !
ঐশ্বর্যের স্তুপের ওপর বসেও সে নিঃস্ব।
সহদেবের চোখে এল জল, বলতে পাওয়ার আনন্দে।
এতদিন এ সৌভাগ্যও তার হয়নি, শােনাবার লােক মেলে নি।
ললিতারও চোখের পিছনে অশ্রুর ধাকা !
সে একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাে। সহদেব জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিয়ে তার
মুখের পানে চাইলে ললিতা বললে, আপনি একটু বসুন, আমি
চা নিয়ে আসি। তারপর দুজনে একসঙ্গে বেরােবাে।
ললিতা চলে গেলে। সহদেবের মনে হলাে, ললিতা যেন
অকস্মাৎ বিকশিত হয়ে উঠেছে। পাপড়ী খুলে রূপ তার ঝলমল
করচে। শুভ্রতায়, শুচিতায় সে রূপ
সহদেবের চোখ দিল
ধাঁধিয়ে। নারীকে সে সম্ভ্রমের চোখে দেখে এসেচে চিরদিন,
কিন্তু এতখানি শ্রদ্ধা আদায় করতে পারেনি আর কোন নারী
তার কাছ হতে।
আটচল্লিশ
ঝিকিমিকি
। সহদেবও চায়, এই মেয়েটির সান্নিধ্য। একে সম্বল কবেই
সে জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলতে চায়। তার দু’কুল ভাঙা
জীবন-নদীতে যদি ঐ মেয়েটি পাল তুলে পাড়ি দেয়, তবে সত্যিই
তার এই জীর্ণ-দেহে আবার রক্তের জোয়ার বইবে। জীবনের
এই শােধূলিতৈও অস্তরাগের আলাের মতাে ললিতা তার
হৃদয়াকাশে সমারােহের সৃষ্টি করবে।
দু’হাতে দু’পেয়ালা চা নিয়ে ললিতা ঘরে ঢুকলাে। সহদেব
দেখলে তার মুখের পানে চেয়ে। সেখানে আলাের প্রখর
প্রকাশ, ক্ষীণ রশ্মিরেখা নয়।
কারুর মুখে কোন কথা নেই, সাসানি বসে দুজনে
চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেয় এবং করুণ চোখে পরস্পরের মুখের
পানে চায়। ভাষা যেন তারা হারিয়েছে, খুঁজে পাচ্ছে না
সেই ভাষাটি যা নিয়ে তারা সুরু করতে পারে। সহদেব
আভাহীন আতুর চোখে ললিতার মুখের পানে চেয়ে থাকে।
চোখের ভাষায় গভীর নৈরাশ্য, এই কথাটাই যেন শুধু প্রকাশ
পায় যে সারাজীবনটা তার ব্যর্থ হয়ে গেছে—এই বাক্যময়ী
বিপুলা পৃথিবীতে সেই শুধু একা, তার বলবার মতাে জীবনে
কিছু নেই, কোন কিছু ঘটেনি।
আর ললিতা
ললিতার চোখে বিশ্বের করুণা। কি-একটা কথা বলবার
জন্যে মন তার অশান্ত হয়ে উঠেচে অথচ বলবার সাহস হচ্চে
, বর ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না সে
৪
উনপঞ্চাশ
ঝিকিমিকি
মানুষের নিজের অজ্ঞাতে কখন যে কার ডাক এসে অন্তরনে
মথিত করে তােলে তার ঠিকানা পাওয়া যায় না। সে-ভাকে
মন তার সাড়া দেবে কিনা তাই ভেবে সে আকুল হয়ে ওঠে।
তার মীমাংসা করতে করতে শেষে মন যখন গড়িয়ে যায় সেই
দিকে তখন সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে ভাবে, কেমন করে মন
তার এ পথে এসে ভিড়লো ?-এর ডাক কেমন করে তাকে
আকুল করে তুললাে ?
ললিতার মনের অন্দরে ঠিক এমনি একটা সমস্যা! সে তার
জীবনের পাথেয়, তার সঙ্গতি, তার নারী জীবনের সকল গৌরব
হারাতে বসেছে—আর ঐ লােকটা দু’হাত প্রসারিত করে
নিঃশেষে তার সমস্ত সম্পদ বুক ভরে নেবার জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা
কচে।
সহদেবের ক্ষুব্ধ, বিমূঢ় মুখের পানে চেয়ে ললিতার মন
কিন্তু বেদনায় রক্তহীন হয়ে ওঠে। সেই নিঃশব্দতার অন্তরালে
কাকুতিতে মন তার কলরব করে ওঠে। অপরিচয়ের
পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে সে নিঃস্ব হয়ে ছুটে যেতে চায় সহদেবের
কাছে।
সহদেবের এই জাগরণ অস্বাভাবিক কি না জানি না, কিন্তু
অদ্ভুত! অনন্ত সুপ্তির মাঝে যে চেতনা চিরদিন সমাধিস্থ
হয়েছিল, সেই চেতনাকে ললিতা যে কেমন করে জাগ্রত করে
তুললে তাই ভেবে বিস্ময়ে এবং তততধিক্ লজ্জায় সে অভিভূত
হয়ে পড়ে।
পঞ্চাশ
ঝিকিমিকি
অন্তরের মাঝে সুপ্ত দানব প্রচণ্ড রক্তপিপাসায় সহসা জেগে
উঠে ললিতাকে গ্রাস করতে চায় ।
দুঃসহ নিঃশব্দতা ভেঙ্গে সহদেব একসময় প্রশ্ন করলে,
ললিতা, তুমি কখনাে কাউকে ভালােবেসেছো ?
আট
ললিতার বুকের
ললিতা তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ালো। দীপ্ত চোখ সহদেবের
মুখের ওপর রেখে বললে, একথা জিগগেস কচেন কেন
সরকার মশায় ?
—আমার জীবনের কথাটুকু যেমন তুমি জেনে নিলে,
তেমনি আমারে জানতে ইচ্ছে করে ললিতা তার মনের
কথাটি। তাছাড়া আমার জীবনের ঐখানেই মস্ত একট: ফঁাক।
নীচেটা ফুলে ফুলে উঠলো, মুখ দিয়ে কথা
বেরােলাে না।
সহদেব অকুণ্ঠিত আবেগে বলে, ভালােবাসার কথা শুতে
কে চায়না ললিতা, কার না আগ্রহ হয়, বিশেষ তােমাদের
কাছে। সারা পৃথিবীকে ডেকে শােনাতে ইচ্ছে করে,
ভালােবাসার কাহিনী। শােনাচ্চে, শুনে আসছে, সকলেই
যুগযুগান্ত ধরে ঐ কাহিনী। কাব্যের প্রাণ ঐ কাহিনী, কত
গাথা, কত গানই যে রচিত ঐ কাহিনীকে ভিত্তি করে
ললিতার মন বলে, সত্যি, সত্যি, জীবনে সত্যি শুধু ঐ
বাহায়
ঝিকিমিকি ভালোবাসা, সত্যি যেমন মৃত্যু ! মুখে বললে, আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি, কিন্তু তাই বলে আপনার সঙ্গে ওসব আলােচনা করতে অশোভন ঠেকে ; কারণ আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করি-ভক্তি করি। নিজের বুকের শূন্যতা পূর্ণ করতেই সহদেবের ও-কথার অবতারণা, কিন্তু এরপর আর সহদেব বলবার কিছু খুঁজে পেলে না, দিশেহারার মতাে ললিতার মুখের পানে চেয়ে চোখ দুটি নামিয়ে নিলে। আর অনুরােধ করল না। সহদেবের আতুর চোখের অপরাধী দৃষ্টি কিন্তু ললিতার মৰ্ম্মের আকাশ জুড়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলাে। অশান্ত অধীর মন নিয়ে সহদেবের সানে বসে থাকা তার পক্ষে দুৰ্ব্বহ হয়ে উঠলো। সহসা একসময় মৰ্ম্ম-যন্ত্রণায় অধীর হয়ে ললিতা জিগগেস করলে, আপনি কি ভাবছেন বলুন তাে? —ভাববাে কি ? কিছুনা। –কিছু ভাবছেন না ? সত্যি বলুন- -না। অভিযােগের ধারালাে কাটা নিয়ে কথাটা এসে ললিতার বুকে বিধলাে, তীক্ষভাবে। ললিতা সহদেবের ব্যথিত মুখের পানে চাইলে অপার বিস্ময়ে ! কিছুক্ষণ পরে নিম্নস্বরে অনুযােগ করলে, ভাবছেন কিছু নিশ্চয়ই, তবু বলবেন না। তিপায়
ঝিকিমিকি
একবার বাইরে
–ভাবনা মানুষ মাত্রেরই আছে। বলে কি হবে ?
ললিতা রূঢ় স্বরে বললে, তা বলবেন কেন ?—শুনবেন
কেবল অপরের কথা।
সহদেব ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেল ললিহার হংসনার
দৃষ্টিটা।
সে চোখ নামিয়ে রইলাের মনে হলে। ললিতার
নিষ্পলক চোখদুটি তার জীবনের গভীরতম ব্যর্থতাকে লক্ষ্য করে
ব্যঙ্গের হাসি হাসছে।
সহদেবের মনটা কুণ্ঠার গ্লানিতে এবং ললিতার প্রতি
বিরূপতায় ভরে গেল।
ললিতা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাে।
হতে খানিকটা ঘুরে এলো।
আবার এসে সহদেবের কাছে
একখানা চৌকি টেনে নিয়ে বসলাে।
সহদেব একখানা মাসিকের খােলা পাতার ওপর চোখ
বুলিয়ে যাচ্ছিল। সে চোখ তুলে চাইলে না।
ললিতার চোখের পাতা ভিজে এলাে। সহদেব লক্ষ্যও
করলে না।
দুজনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে হঠাৎ এক সময়
ললিতা সহদেবের হাত হতে বইখানা কেড়ে নিয়ে প্রশ্ন করলে,
বেশ মানুষ আপনি সরকার মশায়। কথায় কথায় আপনার
এমন অভিমান আসে কোথা হতে বলতে পারেন ? আপ নি
বেশ চুপ করে থাকতে পারেন, কিন্তু আমি তাে পারি না।
চুয়ায়
ঝিকিমিকি
সহদেব গম্ভীর ভাবে বললে, চেষ্টা করলেই পাবে।
—চেষ্টা করলে তাে পারবাে নিশ্চয়ই, কিন্তু চেষ্টা করতে
পারি কই ? চেষ্টা করতে পারি না কেন জানেন? আপনার
মনের গড়নটা ভারী নরম, ঠিক্ ছেলেমানুষের মতাে, আর
তাইতে সেইটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে আমি ভারী আনন্দ পাই।
সহদেবের মুখের ফঁাকে ফুটে উঠলে ফিকে হাসির রেশ।
সে-হাসি চাপতে চেষ্টা করে সহদেব বললে, কথা বলে চমক
লাগিয়ে দিতে তুমি ওস্তাদ।
ললিতা আঁচলের খুটটা পিঠের ওপর ফেলে দিয়ে বললে,
তা যদি পারতুম তা হলে তো বাঁচতাম—পারি না বলেই তো
এতাে ভালা।
হদেব চোখ তুলে ললিতার মুখের পানে চাইলে, ললিতার
মুখখানা ব্যথায় ঘােরালো হয়ে উঠেছে।
ললিতা বলে, আপনার কৌতুহল ঝরনার মতােই উজ্জ্বল।
পাথরের আড়াল দিলেও তাকে ধরে রাখা যায় না।
সহদেবেব কাছ হতে কোন জবাব এলাে না দেখে, ললিতা
ক্ষুন্ন হলো। সে নিঃশব্দে বসে রইলাে আনত মুখে। উত্তেজনায়
আরক্ত মুখ সাদা হয়ে গেল। বিরােধী মন তার বিধ্বস্তের মতাে
নিমিষে কঁকড়ে মাথা নীচু করলে।
এমন ভাবে বসে থাকতে সহদেব পারে, কিন্তু ললিতা ধৈৰ্য্য
হারালো। সে সহসা উঠে দাঁড়ালাে এক সময় এবং সহদেবের
মুখের পানে না চেয়েই ঘর হতে বেরিয়ে গেল। যাবার ভঙ্গীমায়
পায়
ঝিকিমিকি
ঝড়ের গতি! যেতে যেতে বললে, না। এ পাথর সরিয়ে
ফেলতে হবে, ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে হবে।
কথার ঝাঁজে সহদেবের সর্বাঙ্গে আগুন ছড়িয়ে গেল। কিন্তু
কী যে ললিতা বলে গেল সে তার মানে বুঝলে না। বিস্ময়ের
আতিশয্যে তার সর্বাঙ্গ কাটা দিয়ে উঠলো। নিদারুণ লজ্জায়
সে মাথা তুলতে পারলে না।
ললিতার সাথে অন্তরঙ্গতা যে অতর্কিতে এমনি রূপ
বদলাবে এ সহদেব ধারণা করতে
পারে নি।
নিজেকে
সে হারিয়ে ফেলবে এমনি অতর্কিতে এও সে ধারণা করতে
পারে নি। চিরদিনের সংযম ও তার বয়স তাকে সংযত
করেচে-নারী সম্বন্ধে উদাসীন সে চিরকাল। সারা জীবনের
পৃষ্ঠাগুলি ওতপ্রােত ভাবে পরীক্ষা করলে এমন দৃষ্টান্ত কোথাও
মিলবে না যে নারীর রূপের জলুষ বা একটু করুণার কটাক্ষ
সহদেবকে চঞ্চল করে তুলেছে !...আজ এই অবেলায় সে একী
কাণ্ড করে বসলাে। এ যে তার বয়সের পক্ষে অশােভন,
লজ্জাকর। ললিতা তাে স্পষ্টই তার মুখের ওপর বলে, তার
কৌতুহল উচ্ছল । ললিতার বয়সের মেয়ের মনের কথা
জানবার এ অদম্য কৌতুহল তার বয়সের পুরুষের পক্ষে মােটেই
সুষ্ঠু ও সুশােভন নয়। কী অধিকারে সে ললিতার কাছে অমন
গহিত এবং অসঙ্গত দাবী করতে গেল। দুদিনের পরিচয়, একটু
ছাপার
ঝিকিমিকি । স্নেহ ও করুণ; ঢেলে দিয়ে তার তৃষা শুষ্ক জীবনকে সে সরস করে তুলতে চেয়েছিল, আর সে এমনি ভাবে তাকে অপমান করলে যে সে অপমানের জ্বালায় সে দীশাহীন হয়ে গেল। ললিতা শত্ত মেশ্নে, চোখের জল সে চেপে রাখতে জানে তাই, নইলে হয়তো অনর্থ বাধিয়ে দিত। সহদেবের বুকখানা কেঁপে ওঠে। আত্মগ্লানিতে ও ধিক্কারে মুখখানা মরার মতাে পাংশু হয়ে ওঠে। কাজে মন বসলাে না। রাত্রি গভীর হয়ে এলো, অন্ধকারের নিঃশব্দ শূন্যতায় সহদেব হাঁপিয়ে উঠলাে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে শয্যার প্রান্তে সে নিজেকে মিশিয়ে নিল। অনিদ্রায় চোখদুটো কাঠ হয়ে এলাে। অপমানে, বিক্ষোভে অন্তরাত্মা ককিয়ে উঠলাে। সারারাত্রি সে অনুশােচনার আগুনে পুড়ে নির্জীবের মতাে বিছানায় পড়ে রইলাে। এর পর আর সে এখানে থাকতে পারবে না, একটি দিনও নয়। ললিতাকে হারিয়ে তার ঘৃণা কুড়িয়ে সে এখানে থাকতে পারবে না। হয়তো ললিতাও এরপর এখান হতে চলে যাবে। তার আত্ম- সম্মানে সে আঘাত দিয়েছে। গত সন্ধ্যায় ললিতা আসে নি, আজো এবং আর কখনাে যে সে আসবে না, সে সম্বন্ধে সহদেবের এতটুকু সন্দেহ ছিল না। ভােরের দিকে সহদেব ঘুমিয়ে পড়েছিল, এবং অনেকখানি বেলা পর্যন্ত সে বিছানা হতে উঠলাে না। যখন তার ঘুম সায়
ঝিকিমিকি
ভাঙলো তখন কিন্তু তার বিস্ময়ের অবধি রইলো । ঘুম
বিজড়িত চোখে বারবার সে ঘরের মাঝে চাইতে লাগলো।
তৃপ্তির পুলকে তার মুখখানি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। শিয়রে
কখন ললিতা এসে বসেছে।
ললিতা জিগগেস করলে,এখনাে শুয়ে আছেন যে! শরীর
ভাল আছে তাে?
ললিতার স্বর স্নিগ্ধ, স্নেহসজল !
সহদেব কথা বলতে পারলে না, শুধু ঘাড় নেড়ে জানলে,
শরীর ভালােই আছে।
ললিতা লক্ষ্য করলে সহদেবের চোখদুটী ভারী ও বাষ্পাচ্ছন্ন
হয়ে আসছে। প্রভাতের এই দীপ্তি পাছে আবার কুয়াসায়
ঢেকে ফেলে, তাই সে সহদেবকে কোন কিছু বলবার অবকাশ ল
দিয়ে বললে, শীগগির করে উঠে মুখহাত ধুয়ে তৈরী হয়ে
নিন্। আমি তৈরী হয়ে এসেছি, আজ খুব লম্বা পাড়ি দিতে
হবে, হয়তাে এবেলা ফেরা না হ’তেও পারে। নি, উঠুন
শীগগিরী, দেরী করলে চলবে না, রােদে ভারী কষ্ট হবে ।
সহদেব উঠে বসলাে। ললিত বললে, যা, আপনি
শীগগিরি সেরে নি। আমি চায়ের জল গরম করি।
ললিতা ঘর হতে বেরিয়ে গেল। সহদেবকে কে যেন হাত
ধরে টেনে তুলে দিল।
আটায়
নয়
—স্থির হয়ে বসুন, এই পাথরের ওপর। তারপর মনযােগ
দিয়ে শুনুন, আমার জীবনের কাহিনী। যা না শুনে আপনার
কাল ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছে।
পাহাড়ের কোলে গড়িয়েপড়া একখানা অতিকায় কালো
-পাথরের ওপর পা ছড়িয়ে বসে আঁচলে মুড়ি নিয়ে ললিতা
তাই চিবুচ্ছিল। পাথরের আশে পাশে পেছনে সামনে চারা
শালগাছ। গাছের ফাকে ফাকে সােনালী বােদ এসে ছড়িয়ে
পড়েছে, ললিতার পায়ের ওপর এবং শাড়ীর আঁচলে। তারই
দু’একটা ছিটে এসে লেগেচে তার নিবিড় কালাে চুলে এবং
কপােলে। সহদেব পাশে দাড়িয়ে নির্নিমেষে দেখছিল, বনস্থলী
আলােকরা বনদেবীর মধ্যে সেই অপরূপ রূপ।
ললিতা তার মুখের পানে চেয়ে বললে, অমন করে দাড়িয়ে
রইলেন কেন? বসুন না, এই পাথরখানার ওপর। জায়গাটা
বেশ নিরিবিলি না ?
সহদেব বললে, চমৎকার ! কিন্তু এত নিরিবিলিও ভাল
উনষাট
ঝিকিমিকি
নয়।
ওপরের পাহাড়ের ঐ জঙ্গল হতে চাইকি নিরিবিলি
আলাপ করবার জন্যে পাকা ছ’হাত লম্বা, গায়ে গুলসাননা
জানােয়ার বিশেষ হালুম্ করে আমাদের পায়ের তলায় এসে
ফ্যাল ফ্যাল করে আমাদের মূখের পানে চেয়ে লেজ নাড়তে
পারে।
ললিতা চোরা চাউনীতে সহদেবের পানে চেয়ে মুখ টিপে
হাসূলে।
সহদেব একটা গাছের ডাল ধরে পাথরের ওপর উঠে বসে
চাপা গলায় বললে, ওই ওপর থেকে কেমন একটা বোটকা গন্ধ
ভেসে আসছে না ?
ললিতা মুহূৰ্ত্ত কেঁপে উঠেই আবার নিঃশব্দে সহদেবের মুখের
পানে চাইলে।
সহদেব হাসলে। ললিতা বলে, আমার ভয় দেখিয়ে কোন
লাভ নেই। আর বাঘের চাইতে মানুষকে আমি ভয় করি
বেশী।
সহদেব বললে, এতই যদি ভয় একা আমার সঙ্গে এলে
কেন ?
ললিতা কুটি করে বললে, মানুষ বলতেই তাে আর
আপনাকেই বােঝায় না। কথা বােঝবার শক্তি নেই এক কড়াও,
অথচ সব কথায় খুৎ ধরা চাই।
সহদেব বিস্ময়ে ললিতার মুখের পানে চাইলে এতবড়
কথা আর কেউ সহদেবের মুখের ওপর বল্তে সাহস করে নি।
যাট
ঝিকিমিকি
তাই প্রথমটা সহদেব বাতিয়ে গেল, কিন্তু অন্তরে সে একটা
অভিনব পুলক অনুভব করলে। যতই রুক্ষ হাে কথাটার মাঝে
সস্নেহ অনুযােগ রয়েছে।
সহদের বললে, অপরাধ হয়েছে—মাপ চাইচি।
ললিতা রুক্ষস্বরে বললে, মাপ অতত সস্তা নয় ! ওঁকে আবার
আমায় ভয় করতে হবে ! আশ্চর্য্য! দাদামশায়ের বয়সের লােক,
তার সঙ্গে চলাফেরা করতে ভয় ! মানুষের দেহের শক্তিকে
আমি ভয় করি না, আমি ভয় করি মানুষের অন্তরকে। শুধু
ভয় করি না, ঘৃণা করি ।
সহদেব হাসিমুখে গ্রহণ করলে, ললিতার এ আঘাত।
ললিতা বােধ হয় নিজের আচরণে লজ্জিত হয়েই হাসলে।
ললিতা বললে, দেখুন সরকার মশায় কাল হ’তে আমাদের
‘কলহ-চন্দ্র’ যাচ্চে, তাই কথায় কথায় আমাদের ঝগড়া বাধছে।
না, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আর ঝগড়া করবো না। আপনাকেও
সাবধান করে দিচ্চি, যা তা বলে আমার মাথা গরম করে
দেবেন না।
সহদেব একটা হাভানা সিগারের মুখটা ছুরী দিয়ে কাটতে
কাটতে জিগগেস করলে, আচ্ছা ললিতারাণী, যদি কিছু মনে না
করাে তাে একটা কথা জিগগেস করি—
ললিতা বলে, ভূমিকা ছেড়ে বলুনই না
সহদেব সিগারটা দাতে টিপে ধরে বললে, এই হঠাৎ মাথা গরম
হওয়াটা কি তােমার নিজস্ব না এটা তােমাদের স্ত্রীজাতির বিশেষত্ব ।
একষটি
ঝিকিমিকি ললিতা চোরা কটাক্ষ হেনে সহদেবকে শাসাতে গিয়ে হেসে ফেললে। সহদেব সিগারটা ধরিয়ে গম্ভীর ভাবে বললে, তুমি হাতে পারাে, কিন্তু আমার যখন জানা নেই, তখন জিগগেস করতে আমার লজ্জা নেই। স্ত্রীচরিত্র সম্বন্ধে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই কারণ আমি ঘনিষ্ঠভাবে কোনদিন কোন নারীর সাথে মিশি নি। আমি সেই অভিজ্ঞতাটুকু অর্জন করতে চাই তােমার কাছ হ’তে। যে জানে তার কাছে আমার শিখতে কোন লজ্জা নেই, হােক না সে আমার চেয়ে বয়সে ছােট- ললিতা বললে : আমি ত আর মাষ্টারী করতে আসিনি এখানে। উঃ! আমার ভারী তেষ্টা পেয়েছে। ললিতা উঠে দাড়ালো। সহদেব বলে, চলাে, ওপরে একটা ঝনা আছে সেইখানে জল খাবে। দুজনে ওপরে উঠে গেল। ওঠার পথে একটা টিনের চালা। যাত্রীদের বিশ্রামস্থান। সেখানে একদল নরনারী ‘পিনি’ করচে। দুটি তরুণী আহারের ব্যবস্থা করচে। সহদেব একটা দীর্ঘ- শ্বাস ফেলে বলে, নারী ভিন্ন আহারের ব্যবস্থাটা অমন সুচাৰু ভাবে করতে আর কেউ পারে না। ললিতা উঠতে উঠতে নীচুগলায় উত্তর দিলে, যদি না তারা বি, এ পাশ করা হয়। বাষট্টি
ঝিকিমিকি
সহদেব বললে, মেয়েটিকে দেখে তাই মনে হলো।
গ্রাজুয়েট তো নয়ই।
ললিতা জিগগেস করলে, কী করে বুঝলেন ?
সহদেব বললে : দেখলেই বােঝা যায় । না হােক্ গ্রাজুয়েট,
কিন্তু বেশ লক্ষ্মীর মতাে স্ত্রী আর বেশ গােছালো।
ললিতা
বলে,
বি-এ পাশ করলেই বুঝি অগােছাল হয়, নয় ?
সহদেব নিঃশব্দে সিগারেটে ঘন ঘন টান দিল ।
ললিতা জোরে জোরে পা চালিয়ে বললে, নির্ভাবনায় একজন
পুরুষের কাধে চেপে জীবনটা কাটাতে পেলে অমন সবাই
গােছালাে হতে পারে।
সহদেব হাসলে। বললে, ইচ্ছে করলে তুমিও পারতে!
ললিতা অগ্নিময় দৃষ্টি দিয়ে পিছন পানে চেয়ে জিগগেস
করলে, বললেন ?
সহদেব তার দৃষ্টির নীচে সঙ্কুচিত হয়ে গেল।
তার মুখের চেহারা দেখে ললিতা হেসে ফেললে।
সহদেব সাহস সঞ্চয় করে উত্তর দিল, বলছিলুম ইচ্ছে করলে
তুমিও তাে পারতে। তােমার যা রূপ আর বুদ্ধি তাতে তােমার
মতাে স্ত্রীকে
ললিতা বাধা দিয়ে বলে, মাথায় করে রাখতে, এই না?
কিন্তু দুঃখের বিষয় আপনি ছাড়া আর কেউ আমার কদর বুঝলে
। দয়া করে আপনি ঘটকালী করুন না। একটা উপকার
করা হবে
की
তেষট্টি
ঝিকিমিকি
ফিকে হাসিতে সহদেবের মুখখানা ভরে গেল, কিন্তু ভেতরে
সে হাঁপিয়ে উঠলো।
ঝরনার ধারে একটা গাছের নীচে বসে ললিতা বলে,
সরকার মশায়, ইচ্ছে করলেই সব জিনিষ ঘটে না। বিশেষ
বাঙলার হিন্দু সমাজে অভিভাবকহীন অজ্ঞাতকুলশীলা মেয়ের
বিয়ে হয়না। সমাজের অতখানি সাহস এবং উদারতা এখনো
হয়নি।
সহদেব বিস্ময়ে তার মুখের পানে চাইলে, ললিতার সকরুণ
গলার সুর আর্তনাদের মত তার বুকের মাঝে আছড়ে পড়ল।
ললিতা বললে, দারিদ্রের কাঠফাটা রােদে পুড়ে পুড়ে জীবনের
সকাল বেলাটি কেটেছে। একমাত্র অভিভাবক পিতা–কাজ
করতেন জামালপুরের রেলওয়ে ওয়ার্কসপে। মার মৃত্যুর পর
তিনি এক খৃষ্টান আয়াকে করলেন বিয়ে, এবং আমায় এক
মিশনারী বাের্ডিংএ দিলেন ভর্তি করে। সেখানে আমি
লেখাপড়া শিখ ছিলুম কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই বাবার
মৃত্যু হলো, এবং আমাকে এক মিশনরী orphanageএ পাঠিয়ে
দিল সেখানকার কর্তৃপক্ষরা। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কত
চাকরীর চেষ্টাই না করেচি, কোথাও জোটেনি। শেষে অনাহারে,
অর্ধাহারে কতদিন কেটেছে। বাবার পরিচিত এক ফিরিঙ্গী
Foremanএর বাড়ীতে শিক্ষয়িত্রীর কাজ জুটিয়ে প্রাইভেট
ইন্টারমিডিয়েট একজামিন দেবার জন্য তৈরি হতে লাগলুম।
আমার দুঃখ দারিদ্র সহজেই ঘুচতে যদি আমি ধর্মান্তর গ্রহণ
চৌষটি
ঝিকিমিকি দিল না। করতুম। খৃষ্টানও হলুম না অথচ হিন্দু সমাজও আমায় আশ্রয় একটা টুইশনি জুটিয়ে কলকাতার কলেজে ভর্তি হলুম বি-এ, পড় বার জন্য। সেখানে আমার ভক্ত জুটলাে অনেক, ছাত্র থেকে প্রফেসার পর্যন্ত। কিন্তু দুঃখের কথা বল্ব কি সরকার মশায়, সকলেই চাইলে আমার দেহটাকে, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কেউই এলাে না। সে সম্মান দিতে কেউ রাজী হলো না। তারা চাইলে আমার দারিদ্র ঘােচাতে, আমার যৌবনের বিনিময়ে। এই তাে আপনাদের সমাজ । সেই সময় মাঝে মাঝে মনে হতাে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেখতে—একজনও এমন কেউ আছে কি না যে আমায় জীবন- সঙ্গিনী করে নিতে চায় । ললিতার দুচোখ জলে ভরে এলাে তবু সে হাসতে চেষ্টা করল। সহদেবের বুকের নীচেটা ব্যথায় ফেনিয়ে উঠলো, কম্পিত কণ্ঠে বলে, ললিতা, চলাে নেমে যাই। ললিতা আঁচলে চোখ মুছে উঠে দাড়ালাে। নামবার পথে ললিতা একসময় সহদেবকে জিগগেস করলে, আচ্ছা সরকার মশায়, দরিদ্র হওয়া কি পাপ ? সহদেব কী যে জবাব দেবে বুঝতে পারলে না। ললিতার প্রশ্নটা কিন্তু সহদেবের বুকের মাঝে বি ধূলাে ধারালাে তীরের মতাে। দারিদ্র্য কি পাপ ? ভাববার কথা বটে! জীবনের প্রভাতে পঁয়ষটি ৫
ঝিকিমিকি
.
দরিদ্র যে তার কত বড় দুঃখময় চেতনা তা উপলব্ধি করে সহদেব
শিউরে উঠলাে; শিরা উপশিরা গুলো মৰ্ম্মান্ত বেদনায় টনটন
করতে লাগলাে। দারিদ্র্য ! দারিদ্রই তার জীবনকে শ্মশান
করে দিয়েছে। দারিদ্র ঘােচাতে গিয়ে মনের সমস্ত সম্পদ
সে হারিয়ে ফেলেছে। দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে কী সে
পেলে আর কী সে হারালে ! যা সে হারিয়েছে এ জীবনে
আর সে ফিরে পাবে না।
ললিতার বিশুষ্ক ম্লান মুখের পানে চেয়ে সহদেবের মনে
হলাে, দারিদ্রের অন্ধকারে এই মেয়েটির জীবনও ব্যর্থ
হতে বসেছে। জীবনের বসন্ত নিঃশ্বাস ফেলে সরে যাচ্ছে,
ফোবার অবকাশ পেলে না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সহদেব বলে, দারিদ্র্য পাপ
কি না বলতে পারি না ললিতা, কিন্তু একটা মস্ত অভিশাপ।
দারিদ্রের যে কী জালা ললিতা তােমার চেয়ে আমি কম বুঝি
না, কিন্তু অনুশােচনা করে লাভ কি ? মনের দারিদ্র্যকে
আমি পাপ বলতে কুণ্ঠিত নই। মনের সম্পদই মানুষের আসল
সম্পদ।
ললিতা নিঃশব্দে নাতে লাগল।
সহদেব বললে, দারিদ্র মুর্তি-ধরে - আমায় গ্রাস করতে
এসেছে, আমি ভয় পাইনি, হাসিমুখে তাকে পরিহাস করেছি।
একদিকে যেমন সে আমার কাছে পরাভূত হয়েছে, অন্যদিকে
সে আমায় তেনি সর্বহারা করেছে।
হেষ
ঝিকিমিকি
ললিতা চোখদুটি প্রসারিত করে সহদেবের ব্যথিত মুখের
পানে চাইলে ।
সহদেব বলে, জীবনের সমস্ত সুখদুঃখ ঐশ্বর্য্যের ওপর
নির্ভর করে না ললিতা, যেটাকে আমরা চরম দুর্ভাগ্য মনে করি
সেটা কিন্তু ঠিক তা নয়। খুঁজে নিতে পালে দারিদ্র্যের
মাঝেও যথেষ্ট সুখ মেলে।
ললিতা ম্লান হাসিতে মুখখানি ভরে বললে, ওসব ওমর
খৈয়ামের দর্শনবাদ । আমাদের বিশ্বকবিও ঐ কথাই বলেছেন।
ললিতা সুর করে আবৃত্তি করলে :
“—রিক্ত যারা সৰ্বহারা
সৰ্বজয়ী বিশ্বে তারা
গৰ্বময়ী ভাগ্যদেবীর
নয়কো তারা ক্রীতদাস ।
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে
করবাে মােরা পরিহাস।”
সহদেব বললে, মানুষের কথাই ওই। চিরন্তন শাশ্বত বাণী।
সাতষট্টি
দশ ললিতা সেদিন সহদেবকে জানালে তার ছুটির আর সপ্তাহ- মাত্র বাকি। সপ্তাহ পরেই তাকে ফিতে হবে। সহদেব এর জন্য মােটেই প্রস্তুত ছিল না এবং এ কথাটা সে ভুলেই গিয়েছিল যে ললিতাকে ছুটি ফুরােলেই ফিরতে হবে । ললিতার সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতা এমনি ঘন হয়ে উঠেছিল যে, একথা ভাববার মতাে তার মনে এতটুকু ফাক ছিল না যে, ললিতা এখানে চিরদিনের জন্য আসেনি এবং আবার দুদিন বাদে সে এখান হতে চলে যাবে। তাই সংবাদটা সহদেবকে আঘাত করলে, একটা আকস্মিক দুর্ঘটনার মতাে। কিছুক্ষণ আনত মুখে বিমূঢ়ের মতাে বসে থেকে ধীরে ধীরে সে সেখান থেকে উঠে গেল, ধাক্কার প্রথম বেগটা সামলাবার জন্যে। সহদেব উঠে যেতেই ললিতার মুখে ফুটে উঠলো হাসির হিল্লোল, অশ্রুর আভাসে চোখদুটো কিন্তু চক্ চক্ করে উঠলাে ; রৌদ্রদীপ্ত আকাশ হ’তে বৃষ্টি নামলাে। ললিতা মুখ তুলে এক- দৃষ্টে চেয়ে রইলাে অবসন্ন দিনের পাণ্ডুর আলাের দিকে। আটষটি
ঝিকিমিকি
এর নীচে
চোখের জলে সামনের সব কিছুই অস্পষ্ট হয়ে উঠলাে।
উল্লাসে কিন্তু থেকে থেকে তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠতে লাগলাে।
তার বিরহ যে কাউকে এমন ভাবে ব্যথিত করে তুলতে পারে
এ সংবাদেকার মনে না উল্লাস হয় ? ললিতার নারীজীবনে
এ একটা নূতনতর চেতনা। ললিতাকে বেশ একটু ভাবিয়ে
তুলে। ঘুমন্তকে আচমকা জাগিয়ে তুললে যেমন হয় মুখের
ভাবটা ঠিক তেমনি করে ললিত। নিঃশব্দ বিস্ময়ে দাড়িয়ে
রইলাে।
এর সবটাই যেন তার কাছে অপরিচয়ের রহস্য দিয়ে
ঘেরা। অথচ দাম হিসাবে জিনিষটা সস্তা নয়।
ব্যথা যততাই থাক আনন্দও বড়াে কম নয়।
বয়সের কথা সহদেবের সব সময় মনে থাকে না, কাজেই
তাকে অনেক সময় ললিতার কাছে আঘাত পেতে হয়। সহসা সে
এমনি চঞ্চল ও এলােমেলাে হয়ে পড়ে যে ললিতার হাসি চেপে
রাখা দায় হয়ে ওঠে। আবার দুঃখও হয় তার এই স্বভাবের
জন্যে । ভাবতে ভাবতে দুঃখটুকু পৰ্য্যবসিত হয় মায়ায়।
লােকটির এই ছেলেমানুষীটুকু ললিতার মনকে স্পর্শ করে।
তার বয়সের তরুণীর পক্ষে সহদেবকে মেনে নেবার মতাে কোন
আকর্ষণই নেই, তবু তার সদা অসতর্ক মনের চাঞ্চল্যটুকু
ললিতার বুকের মাঝে হাতুড়ী পিটতে থাকে ।
সহদেব যে মূর্তি নিয়ে সহসা ঘর হতে বেরিয়ে গেল, তা
একেবারে নতুন এবং ললিতার কল্পনাতীত ! সহদেব যেদিকে গেল
সেইদিকে কান পেতে ললিতা লাইব্রেরী ঘরে গিয়ে বসলাে।
উনসত্তর
ঝিকিমিকি
অনেকক্ষণ কেটে গেল। সহদেব কিন্তু ফিরলো না।
ললিতা একখানা বই খুলে পড়ার চেষ্টা করলে, কিন্তু
সহদেবের এই আকস্মিক পরিবর্তন কিছুতেই তার মস্তিষ্কের
সীমা ছাড়তে চাইলে না। দুচারজন লােকও এলাে গেল,ললিতা
কিন্তু নির্বাত আকাশের মতই নিশ্চল হয়ে বসে রইলো। তার
বিরহের বেদনা একজন পুরুষের বুকে নিবিড় হয়ে উঠেছে এই
কথাটাই তার যৌবনের মনে উত্তাল হয়ে উঠলো। যৌবনের
আবেগ যদিও তার দেহতটের অনেক নীচে শীতের শীর্ণকায়।
নদীর মতাে ক্ষীণস্রোতে ব’য়ে যাচ্ছিল, তবুও সহদেবের এই
আকস্মিক ভাবান্তর তার যৌবনকে উদ্দাম করে তুললে।
ললিতা বসে থাকতে পারল না। কে যেন চাবুক মেরে
তাকে উঠিয়ে দিল। সে নিঃশব্দে পা টিপে টিপে সহদেবের
ঘরের চৌকাঠে এসে দাড়াল।
আধ-আঁধার ঘরের কোণে একটা প্যাকিং কেশের ওপর
পা ঝুলিয়ে মাথা নীচু করে সহদেব বসে আছে, নিরাশ্রয়ের
মতাে। উদাস মুখের রেখায় অখণ্ড রিক্ততা! জীবনের সব
উৎসাহ গেছে নিভে। কে যেন তার জীবনের অহঙ্কারে প্রচণ্ড
আঘাত করেছে।
ললিতা যে চৌকাঠে এসে দাড়িয়েছে সহদেব জানতেও
পালে না, সে তেমনি নিঃশব্দে বসে রইলাে। ললিতাও
দাড়িয়ে রইলো রুদ্ধ নিঃশ্বাসে। অন্ধকারে তার চোখদুটো চক চক
করতে লাগলাে।
ঝিকিমিকি
ললিতা ধীরে ধীরে একসময় তার সামনে এসে দাড়াল।
সহদেব দেখলে তাকে, কিন্তু মুখ তুলে তাকালে না।
সহদেব কি বলতে চাইলে কিন্তু ললিতার চোখের জ্বলন্ত
দৃষ্টি তাকে অতর্কিতে যেন একটা আবর্তের মধ্যে ফেলে দিল,
পাক খেয়ে খেয়ে সে হাঁপিয়ে উঠলো।
ললিতা জিগগেস করলে, কী ভাবছেন এ বসে?
সহদেব অসহিষ্ণু কণ্ঠে উত্তর দিল, ভাবচি তুমি চলে গেলে
তােমার বিরহে আত্মঘাতী হব কি না ?
ললিতার মুখে ফুটে উঠলাে ব্যঙ্গের হাসি। বলে, আমি
কে যে আপনি আমার জন্যে আত্মঘাতী হবেন ?
—আমি তো জানি তুমি আমার কেউ নও, কিন্তু তােমার
ধারণা তুমি আমার সব এবং তুমি না হলে আমার এক দণ্ডও
চলবে না।
সহদেবের গলার স্বর রুক্ষ, নালিশ ভরা।
ললিতা শুধু মনে মনে মলে হাসলে। রাগ যে তার না হলে
এমন নয় কিন্তু সহদেবকে আয়ত্ত করবার একটি মাত্র রাস্তা সে
জানে, তা হ’ল শাসন। সহজেই সে শাসনের অধীন, অন্ততঃ
ললিতার শাসন সে মানে, হয়তাে তার শাসন সে পছন্দও করে।
সাধারণ মেয়ের মতাে রাগ বা অভিমান করে থাকলে তাকেই
পরাস্ত হতে হবে। ললিতা সে জাতের মেয়ে নয়।
কিছুতেই হার মানতে চায় না। বিশেষ যাকে সে ভক্তি করে,
শ্রদ্ধার চোখে দেখে তাকে কিছুতেই সে অশ্রদ্ধার নিম্নস্তরে নামতে
ঝিকিমিকি
দিতে চায় না। সে-অসম্মান থেকে বাঁচাবার জন্যে তাকে
যত কঠিনই হতে হয় সে হবে, প্রশ্রয় দিতে সে পারবে না।
তাই সে সহদেবের এই অবজ্ঞাকে গায়ে মাখলে না, তার কথার
ঝাঁজে সে চমকে উঠেছিল এবং মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়ে
ছিল, কিন্তু মুখে সে ভাবটুকু ফুটে ওঠবার আগেই সে নিজেকে
সামলে নিয়ে শুধু মনে মনে হাসলে, তারপর শান্ত, সংযত গলায়
বলে, কথাটা কি মিছে ? আমি জানি এবং তােমার অন্তরাত্মা
জানে আমি তােমার কে এবং আমাকে না হলে তােমার চলতে
পারে কিনা। আমার বিরহের কল্পনাতেই যার এই অবস্থা
বাকিটুকু আর ললিতা বলতে পারলে না, মুখে আঁচল দিয়ে
হেসে উঠলাে।
সহদেব অবাক হয়ে গেল। এনি প্রসন্নমুখে এমনি হাসি,
এ তত সহদেব আশা করে নি। সে আঘাত করতে চেয়েছিল
কিন্তু যাকে আঘাত করবে সে বাধা দিলে না, হাসিমুখে বুক
পেতে আঘাত সহ্ন করলে, ব্যথা এতটুকু পেলে না। এ যে
কত বড় শক্তি তাই ভেবে সহদেব অবাক হয়ে গেল ।
উল্টো ধাক্কাটা নিজেকেই আঘাত করলে।
ললিতা বললে, তােমার মন যে কত কাচা, দুদিনের
আলাপেই তা বুঝতে পেরেচি ! কিন্তু এই দুঃখ পাওয়াটা
নিজের সৃষ্টি। দুঃখ কষ্ট মানুষকে পেতেই হয়, কিন্তু তাই বলে
বিদ্রোহ করা চলে না। এই সব ছেলেমানুষী দেখলে আমার
এমনি হাসি পায় !
বরং
বাহাত্তর
ঝিকিমিকি
সহদেবের মুখখানা লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠলাে।
ললিতা গলায় বেশ জোর দিয়েই বললে, চিরদিন আপনাতে
আপনি খাড়া ছিলে, কিন্তু আমাকে দেখবার পর থেকেই তুমি
নিজেকে আত্মা দিলে, এবং আমাকে আশ্রয় করে জীবনটা
কাটাতে চাইলে, কাজেই এখন আর আমাকে বাদ দিয়ে তােমার
চলতে পারে না।
সহদেব বুঝলে ললিতা তার সবটুকু দুর্বলতা ধরে ফেলেছে,
তবুও যে স্বল্প আবরণটুকু দিয়ে ঢেকে রেখেছিল, আজ ইচ্ছে
করেই স্পৰ্দ্ধার সঙ্গে সেই আবরণটুকু সে সরিয়ে দিল।
ললিতা বললে, ঘরে আলাে জ্বেলে দিই—
সহদেব করুণমুখে সঙ্কোচের সুরে বললে, থাক্, দরকার
নেই।
ললিতা যেতে যেতে আবার পিছন ফিরে দাড়িয়ে বললে,
এতই যদি লজ্জা, তবে এ ছেলেমানষীর দরকার কি ছিল ?
আলােতে চোখ মেলে চাইতেই যত লজ্জা না? লজ্জা আমার
নেই ? মনের মধ্যে সমস্ত গুছিয়ে নিয়ে তবে আজ এখানে
এসেছিলুম তােমাকে যাওয়ার কথা বলতে, কিন্তু এমনি কাণ্ডটি
করে বলে যে আমাকে নির্লজ্জের মত স্পষ্ট করে দিলে ।
ললিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।
সহদেব কাঠের মূর্তির মতো শক্ত হয়ে বসে রইলাে।
আলাে নিয়ে ললিতা ঘরে ঢুকলাে। সহদেব নতনেত্রে স্থির
হয়ে রইলো।
তিয়াত্তর
ঝিকিমিকি
ললিতা আলােটা টেবিলের ওপর রেখে সহদেবের কাছে
বাক্সর ওপর এসে বসল। ললিতার সান্নিধ্য সহদেবকে চঞ্চল
করে তুললাে। তার প্রতি আকর্ষণ দুনিবার বেগে প্রবল হয়ে
উঠলাে।
ললিতা আর একটু কাছে সরে এসে নীচুগলায় জিগগেস
করলে, আজ সত্যি বলাে-লুকিয়াে না।
সহদেব জিজ্ঞাসু চোখে ললিতার মুখের পানে চাইলে। সেই
নির্জন ঘরের স্বল্প আলােয় ললিতার মুখের পানে চেয়ে তার
বিস্ময়ের অবধি রইল না। সহদেব ওকে যেন আজ নতুন করে
দেখলে। কী অপরূপ আবির্ভাব ! দীর্ঘায়ত চোখদুটিতে
প্রশান্ত স্নিগ্ধ দীপ্তি। মুখে চোখে অভিমানের চিহ্নটুকু নেই ;
মুখের মধ্যে একটি অনির্বচনীয় শাস্ততা।
ললিতা বলে, তুমি বলতে চাও আমাকে তােমার ভালাে
লাগে ?
সহদেব অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠলো, আমায় মাপ করাে,
আমি এর উত্তর দিতে অক্ষম। আমি পারবাে না-বলতে
পাবাে না ।
সহদেবের
উত্তেজিত
ললিতা ধম্কে
গেল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার ললিতা জিগগেস করলে,
এখন কি করতে চাও আমায় বলল। তুমি যা বলবে তাই
আমি করবাে। তােমাকে দুঃখ দিতে চাই না বলেই জিগগেস
চুয়াত্তর
ঝিকিমিকি
করছি, নইলে এমনভাবে নিজের সম্মানকে কারাে কাছে ক্ষু
হ’তে দিইনি কোন দিন ।
সহদেবের মনের মেঘটা পালা হয়ে এসেছিল। মুখের
প্রসন্নতা-ফির এসেছিল। সে প্রসন্নদৃষ্টি দিয়ে ললিতার মুখের
পানে চাইলে। তার বুকের মাঝে রক্ত তােলপাড় করতে লাগল।
সেই মুখটি কেন যে মনকে এমন প্রবল শক্তি দিয়ে টানে
তাই সহদেব ভাবতে লাগলাে তার মুখের পানে অপলক দৃষ্টি
ললিতা বললে, কী বলাে, অমন চুপ করে থাকলে চলবে না।
ঘরের কোণে একটা কেরােসিনের হারিকেন জ্বলছিল,
সহদেব সেই দিকে মুখ ফিরিয়ে উত্তর দিল, বলবার কিছু নেই,
তােমার ইচ্ছায় বাধা দেবার অধিকার তাে আমার নেই।
ললিতা কৃত্রিম ক্রোধের স্বরে বললে, সেই অভিমানের কথা।
উঃ ! আমার মাথা খুঁড়ে মরুতে ইচ্ছে করে।
সহদেবের মনটা
মনটা খুশীতে ভরে উঠলাে, সে মনে মনে
হাসলে।
ললিতা বলে, আমি অতত বাধ্যবাধকতার ধার ধারিনে।
অধিকার কোথায় কার কতটুকু আছে তা নিজের অগােচরেই
প্রকাশ পেয়ে যায়। মুখে বড়াই করবার প্রয়ােজন হয় না।
ললিতার বলবার ভঙ্গীতে একটি অনায়াস ও তেজোময়
দৃঢ়তা। তার দৃপ্ত অচপল ও অকুণ্ঠিত আত্মপ্রকাশের সৌন্দর্য্যে
সহদেব মুগ্ধ হয়ে গেল। ললিতা গরিব, নিজের জীবিকা
পঁচাত্তর
ঝিকিমিকি
বললে,
নিজেকে অর্জন কতে হয় তাতে তার এততটুকু দুঃখ নেই,
লজ্জা নেই। তার অন্তরের ঐশ্বর্যেই সে জীবনে পূর্ণতা লাভ
করেছে। বলবার মতাে অনেক কথাই তার মনের মাঝে
হাঁসফাস করছিল, কিন্তু বলবার ফুরসৎ সে পেলে না—মধ্য
পথেই যবনিকাপাত হলাে।
ললিতার কাহার চাকরটা এসে সংবাদ দিল, একখানা তার
এসেছে, জরুরী ভেবে পিয়নকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
ললিতা রুদ্ধনিঃশ্বাসে জিগগেস করলে, আমার তার ? তারপর
নিয়ে এসাে।
চাকরটা বাইরে গেলে ললিতা সহদেবকে বলে, বুঝতে
পারচেন ? ডাক এসেছে।
তারটা খুলে পড়ে ললিতা একটা আরামের দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বললে, যা ভাবছিলুম তা নয়, এক বন্ধু তার করেছে, তিনি
আসচেন কাল এখানে, ভােরের ট্রেনে এসে পৌছবেন, ষ্টেশনে
যাবার হুকুম হয়েছে।
সহদেবের হাতে টেলিগ্রামটা দিয়ে ললিতা বললে, আমার
ছুটি এলাে ফুরিয়ে আর এই সময় ভদ্রলােকের আসবার সময়
হলাে। কী করি বলুন তাে?
দরখাস্ত করে ছুটি বাড়িয়ে নাও।
ললিতা চোরা চানীতে সহদেবের মুখের পানে চাইলে।
ছিয়াত্তর
এগারাে
ট্রেণটা ষ্টেশনে এসে পৌঁছায় ভোের ছটায়। শীতের দিনে
ছটার সময় বেশ অন্ধকার থাকে। তারো ঘণ্টাখানেক পূর্বে
ললিতা শয্যা ছেড়ে উঠে সাজগােছ করে ষ্টেশনের পথে বেরিয়ে
পড়লাে। নিঝুম, নিস্তব্ধ পথ। শীতের ঘন কুয়াসা অন্ধকারকে
পাৎলা হতে দিচ্ছে না। দূরসন্ধিৎসু দৃষ্টি প্রতিহত হয়ে ফিরে
আসে। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বুকের হাড়গুলােকে পৰ্য্যন্ত
কাঁপিয়ে তােলে। পথের ওপর টর্চের আলাে ফেলে দ্রুতপায়ে
ললিতা এগিয়ে চললাে। খুব কম হলেও মাইল দুই পথ।
কুয়াসার বুক চিরে টর্চের তীব্র আলো সেই গভীর আচ্ছন্নতাকে
টুকরাে টুকরাে করে দিচ্ছে। আঁধার অপসারিত হচ্ছে তার
সামনে হ’তে, পাশের ও পিছনের আঁধারকে ঘনতর করে
তুলে। আপাদমস্তক আলােয়ানে ঢেকে ললিতা চলতে থাকে।
সামনে আরাে একদল নরনারীর কলকণ্ঠ শােনা যাচ্চে। তারাও
ষ্টেশনে যাচ্ছে, বােধ হয় প্রিয়জন কেউ তাদের আচে। ললিতার
বুকের নীচেটা আগ্রহে কাঁপছে। ভােরের বাতাসের মাদকতা
সাতাত্তর
ঝিকিমিকি
অনাবৃত মুখের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে আর তার বুকের স্পন্দন
বাড়িয়ে তুলচে। ঐ এঞ্জিনের বাঁশী বাজলল, তীক্ষ্ণ, কর্কশ
স্বর! ললিতার বুকে এসে আচমকা বি ধূলে কার আকুল
আহ্বানের মতাে, করুণ সুরে। তবে কি ট্রেন এসে পড়লো,-
ললিতা চলার গতি দিল বাড়িয়ে। ঐ না দূরে সিগনলের নীল
আলাে দেখা যাচ্চে ! এখনাে যে ললিতা আধেক পথ পার
হতে পারেনি। সে পৌছবার
সে পৌছবার পূর্বেই ট্রেন এসে পড়বে।
তাকে না দেখতে পেলে তার বন্ধু ভাববে কি ? বেচারা
অনর্থক খুঁজে খুঁজে হয়রান হবে।
আধেক পথে, চৌমাথার বাঁকে সহদেবের দোকান।
সেখানে পৌছবার পূর্বেই তার দেহের ওপর ছড়িয়ে পড়লাে।
তীব্র আলােকরশ্মি! টর্চের আলাে !
ললিতার দুর্ভাবনা গেল কেটে। সে ভেবেছিল হয়তাে
সহদেবকে ডাকাডাকি করে জাগাতে হবে! কিন্তু, না, সহদেব
তৈরি হয়ে তার অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
সামনে এসে ললিতা বললে, শীগ্গিরী আসুন, গাড়ী আসতে
আর দেরী নেই।
সহদেব হাতদুটো ঘসতে ঘসতে বললে, সারারাত ঘুম
হয়নি তােমার নিশ্চয়ই। কিন্তু ব্যস্ত হবার প্রয়ােজন নেই,
ট্রেন আসতে এখনাে তিন কোয়াটার বাকি।
সহদেব টর্চের বােম টিপে হাতঘড়িটার ওপর আলাে
ফেললে।
আটাত্তর
ঝিকিমিকি
ললিতা ঘড়ির পানে চেয়ে সহদেবের মুখের পানে চাইলে।
দুজনে পাশাপাশি চললো। ললিতার চলার গতি গেল
কমে। সহদেব সিগার ধরিয়ে বলে, উঃ! কী হাড়ভাঙ্গা শীত।
ললিতা বললে, একটু চললেই কমে যাবে। মাইল খানেক
হেঁটে আমার শীত গেছে কমে।
সহদেব অন্ধকারে হাসলে।
খানিকক্ষণ নিঃশব্দে চলার পর সহদেব জিগগেস করলে,
তােমার বন্ধুর নাম কি ললিত ?
ললিতা অন্ধকারে সহদেবের মুখ দেখতে পেলে না, গলার
স্বরেই তার কি-জানি-কেন মনে হ’ল সহদেবের কণ্ঠস্বরে ব্যঙ্গের
আভাস!
ললিতা তেতে উঠলাে। রূঢ়ম্বরে উত্তর দিলে, কতবার
বলতে হবে । কাল তাে বললুম, এবং ‘র’ও নিজে দেখলে ।
—মাপ করাে ভুলে গেছি তাই জিগগেস কছি।
ললিতা বিরক্তির কণ্ঠে উত্তর দিল, নীতিশ চন্দ্র বসু।
-নীতিশ, নীতিশ ! আমার স্মরণশক্তি ভারী দুৰ্বল।
আবার দুজনে নীরবে চললো।
ললিতা বলে, একটু পা চালিয়ে চলুন, আবার প্লাটফর্মের
টিকিট কিনতে হবে।
সহদেব বলে, সে জন্যে তােমার মােটেই দুর্ভাবনা নেই।
আমি নিরাপদে তােমাকে প্লাটফর্মে নিয়ে যাবে এবং নীতিশ
বাবুকে খুজে বের করাে।
উনআশী
ঝিকিমিকি
ললিতা নিঃশব্দে চলে ।
সহদেব বলে, নীতিশ বাবু যে-কদিন এখানে থাকবেন, সে
কটা দিন অন্ততঃ তােমায় এখান থেকে যেতেই হয়, কি বল ?
—সে পরে বিবেচনা করা যাবে । আর আমি ইচ্ছে
করলেই তাে থেকে যেতে পারিনে। পরের চাকরী !
সহদেব ডালে, ললিতা ।
?
-কি ?
জিগগেস করতে পারি কি, কত টাকা মাইনে তুমি
পাও?
-বতে আমার কোন আপত্তিই নেই। আশী টাকা।
—তুমি চাক্রী ছেড়ে দাও।
-পাগল ! আমার চলবে কেমন করে ?
-সে ভাবনা আমি ভাববাে।
অন্ধকার না হলে দেখা যেতো ললিতার মুখের চেহারা
কী রকম বদলে গেছে। পাংশু, বিবর্ণ মুখে রক্তের লেশমাত্র
নেই। ঠোট দুখানা কঁপছে ঝড়ের মুখে ছেড়া পাতার মতাে।
সে কম্পিত কণ্ঠে উত্তর দিল, আপনার এ পাগলামীর কোন
মানে হয় না, আমার ভাবনা আপনি ভাববেন কেন ?
সহদেব বলে, তুমি অধিকার দিলে আমি সানন্দে সে ভার
গ্রহণ করবাে।
ললিতা বুঝলে, স্নেহপ্রাচুর্য্যে সহদেবের কণ্ঠস্বর উদ্বেল ।
ললিতা প্রশ্ন করলে, কী রকমে ?
আশী
ঝিকিমিকি
সহদেব কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল, ধরাে, আমি যদি তােমায়
চারী দিই, এবং ওর চেয়ে ভালাে ব্যবস্থা করে দিই।
-ভালাে ব্যবস্থা হলে নিশ্চয়ই আমি সম্মতি দেব, কিন্তু
কী চাকুরী আমায় দেবেন? আপনার লােকের কি প্রয়ােজন ?
—ধরে, যদি বলি আমার সেক্রেটারী হিসেবে তুমি আমার
সমস্ত কাজকর্ম দেখবে।
ললিতা সশব্দে হেসে উঠলাে।
সহদেব জিগ্গেস করলে, হাসলে যে ?
—আপনার সেক্রেটারীর কাজ তো আপনার দোকানে বসে
গল্প করা, লাইব্রেরীটা বড় জোর একটু দেখাশুনো করা আর
চা তৈরি করে খাওয়ানাে
সহদেব গম্ভীর হয়ে বাধা দিয়ে বললে, ধরাে তাই, তাতে
তুমি রাজী নও?
—তার জন্যে কত টাকা আমায় মাইনে দেবেন শুনি
—কত টাকা হলে তুমি থাকতে পারে ?
—আমি কেন বলবাে? আপনার প্রস্তাবটা কি আপনিই বলুন।
সহদেব বললে,ধরাে,আরম্ভ করলে আড়াই'শােতে,তারপর
কাজ দেখে বাড়বে।
সহদেব ললিতাকে বেশ একটু চমকে দিল। প্রথমটা সে
যেন কেমন একটু থতমত খেয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সে সংযত
হ’য়ে অকুণ্ঠিত স্বরে প্রশ্ন করলে, মনে কিছু কবেন না সরকার
মশাই, কিন্তু জিগগেস করতে পারি কি আপনার দোকানের আয়
একাশী
ঝিকিমিকি
কতাে যে আপনি আমাকে আড়াই’শাে টাকা মাইনে দেবেন ?
ললিতার প্রশ্ন ধারালাে ছুরীর মতাে সহদেবের বুকের অতি-
বড় অহঙ্কারের স্থানটিতে আঘাত করলে। সে নিতান্ত অসহায়ের
মত ছটফট কবৃতে লাগলাে, না পারল প্রতিবাদ করতে, না
পারল সন্তোষজনক কোন উত্তর দিতে।
ষ্টেশনে পৌঁছে সহদেব বললে, নিজের আয়ব্যয় সম্বন্ধে
বিবেচনা করূব আমি নিজে। সে ভাবনা তােমার
তােমার কাছে জানতে চাই, তুমি এতে রাজী কি না ?
সহদেবের
কণ্ঠের দৃঢ়তা ললিতাকে দমিয়ে দিল । সে প্রচণ্ড
বিস্ময়ে সহদেবের মুখের পানে চেয়ে বলে, আমাকে ভাবার
সময় দিন।
আমি ভেবে উত্তর দেব ।
নয়।
ইন্টার ক্লাশের একটা কম্পার্টমেন্ট হতে মােটঘাট নিয়ে একটা
দীর্ঘাঙ্গ, পাৎলা ছিপছিপে যুবক নেমে এলাে। ললিতা তাকে
সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে সহদেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
ললিতা নীতিশকে বলে, সারারাত ঘুমুতে পাওনি তাে,
চোখমুখ ব’সে গেছে।
নীতিশ ম্লান হাসি হেসে উত্তর দিল, ইন্টার ক্লাশের যাত্রীর
আবার ঘুম! বসবার ঠাই মেলে না।
ললিতা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেল্লে।
বিরাশী
১
ঝিকিমিকি
ষ্টেশনের বাইরে এসে যখন তিনজনে দাড়ালাে, অন্ধকার
অনেকটা পাৎলা হয়ে এসেছে, দিগন্তে আলাের রেখা ফুটে
উঠেছে, স্পষ্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারছে না কুয়াশার জাল
ছিড়ে। সেই অস্পষ্ট আলাের স্নিগ্ধতায় ললিতাকে দেখাচ্চে
তাজা বিকশিত ফুলের মতাে। সেই অস্পষ্টতার মাঝে সে যেন
স্পষ্ট হয়ে উঠলো। পুষ্পিত শাখার মত সারা শরীরে জেগে
উঠেছে মৃদু চাঞ্চল্য—দীর্ঘায়ত চোখে ফুটে উঠেছে অপরূপ দীপ্তি।
তার কল্পনার রঙীন আকাশে কাপছে নীতিশ, স্তিমিত হয়ে
আসছে সহদেব।
মুটের মাথায় বিছানা ও সুটকেশ দিয়ে তিনজনে চলতে
লাগলাে। নীতিশের গা ঘেঁষে ললিতা চলেছে তার পাশে
পাশে। ললিতা চপল পাখীর মত নীতিশকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন
করে যাচ্ছে, নীতিশ কোনটার উত্তর দিচ্ছে মিহিসুরে, কোনটার
উত্তর দিচ্চে ঘাড় নেড়ে, চোখের ইঙ্গিতে। সহদেব তাদের
পিছনে চুরুট টাছে একাগ্র মনে। অতল সমুদ্রের মতই সে
গম্ভীর ও করুণ! ললিতা কিনারার ঢেউ-কল্লোল তুলছে,
ফুলে উঠছে, গড়িয়ে যাচ্ছে।
সহদেবের দোকানে এসে তারা উঠলাে।
ললিতা গেল চায়ের জোগাড়ে। সহদেবের সঙ্গে অল্পক্ষণেই
নীতিশের আলাপ জমে উঠলাে। সহদেব দেখলে ছেলেটি
মিষ্টভাষী, আলাপ জমাতে ওস্তাদ। নীতিশ পুঙ্খানুপুঙ্খ দৃষ্টি
দিয়ে সহদেবের দোকানটা দেখলে।
তিশী
ঝিকিমিকি চায়ের টেবিলে বসে সহদেব একাগ্র দৃষ্টি দিয়ে নীতিশের দিকে চেয়ে রইল। জাগরণক্লিষ্ট শ্রান্তমুখে উদ্দীপ্ত প্রতিভা, চোখ- দুটি চঞ্চল, দীপ্ত, তেজোময়। আয়ত ললাট কামনায় জ্বল জ্বল করছে। গরীব ব’লে যেমন তার কুণ্ঠা নেই, সঙ্কোচ নেই, শিক্ষার অহঙ্কারও নেই তেনি। সদাই সপ্রতিভ হবার একটা নিজস্ব ভঙ্গি আছে যা সকলকে মুগ্ধ করে। পরণে মােটা খদ্দরের ধুতি, গায়ে খদ্দরের পাঞ্জাবীর ওপর একখানা আলােয়ান। নাকের ওপর মােটা সেলের চশমা। সৌন্দৰ্য্যবােধ আছে কিন্তু সৌন্দৰ্য্য পিপাসার উচ্ছলতা তাকে অশােভন করে তােলে নি, দীনতা আনে নি। দেহের কিনারায় অজস্র যৌবন কিন্তু সেই অজস্রতার মাঝে লুকিয়ে আছে সংযম, যা তার যৌবনকে উচ্ছল হতে দেয় নি, মাতাল করে তােলে নি। সহদেবের ছেলেটিকে ভালাে লাগলাে। সহদেবের লাইব্রেরী ঘরটি দেখাতে দেখাতে ললিতা এর সঙ্গে আমার এত বন্ধুত্ব জমেছে কেন বুঝতে পারছাে? এই দু’টি মাস ইনি আমার মনের খােরাক জুগিয়েছেন। স্বাস্থ্য ফিরে পাবার জন্যে এখানে আসা বটে কিন্তু মনকে একেবারে উপবাসী রেখে স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার তাে কোন মানে হয় না। এর আশ্রয় আমার সেই দিকটা বাঁচিয়েছে। এখানে আমার বন্ধু বলতে ইনিই একা। নীতিশ বলে, চমৎকার ! মস্তিষ্কের খােরাক না হলে কি : নীতিশকে বলে, চুরাশী
ঝিকিমিকি
মানুষ বাঁচে! পশ্চিমের হাওয়া খেয়ে দেহ ফুলতে থাকবে আর
মস্তিষ্কটা নিষ্ক্রিয় হয়ে একপাশে পড়ে থাকবে, তা কি চলে!
মাপ করবেন মিঃ সরকার, যদি কিছু মনে না করেন, যে ক’দিন
এখানে থাকি দুপুরটা আমি এখানেই কাটাব। মাঠে-ঘাঠে
দুপুরের হাওয়া খাওয়া আমার পাতে সইবে না।
ললিতা উচ্চ হাসিতে ঘরখানা প্রকম্পিত করে তুলে বললে,
তা হলেই শরীর সেরেছে আর কি ? শীতের দিনে, দুপুরে
ঘুরে বেড়ানাে চমৎকার ! লম্বা পাড়ি দিতে হলে দুপুরে ভিন্ন
সময় হবে কেন ?
সহদেব বললে, তা ঠিক। তবে আপনার বন্ধুটির যেরকম
ঘুরে বেড়াবার বাতিক, দুদিন ওঁর সঙ্গে বেড়ালেই আপনার সখ
মিটে যাবে। বৃষ্টি বাদলের হাওয়া খেতেও ওঁর বাধে না।
নীতিশ চশমাটা রুমালে মুছতে মুছতে বাঁকা চাউনীতে
ললিতার পানে চাইলে
ললিতা সলজ্জ হাসিতে মুখ ভরে বললে, বাঃ রে, তা না
হলে টাকা খরচ করে এখানে আসবার দরকার কি?
সহদেব ও নীতিশ হাসলে ললিতাকে কেন্দ্র করে।
সঁচালী
বাবাে
-
এতদিন ছিল ললিতা একা, সহদেবের কল্পনায়, স্বপ্নে, জাগ্রত
চিন্তায়। নীতিশ এসে ভিড় বাড়ালে, সহদেবের কল্পনায়-গড়া
সংসারটিতে। সংসারের শ্রী বাড়লাে নূতন অতিথির আগমনে।
সহদেবের চিন্তার গতি ধারা বদলালে। নূতনভাবে নূতনতর
পথে ললিতাকে ও নীতিশকে পাশাপাশি নিয়ে সহদেবের চিন্তা
পাখা মেলে দিল। ললিতাকে আর একা ভাবা চলে না,
ললিতাকে ভাবতে গেলেই ললিতার সঙ্গে আসে নীতিশ ।
তাকে কিছুতেই দূরে রাখা যায় না।
বাস্তবেও ঠিক তাই।
ললিতা আর একা আসে না। আসে নীতিশের সঙ্গে,
লাইব্রেরীতে বসে পড়াশুনাে করে, আলােচনা করে নীতিশের
সঙ্গে, ফিরে যায় নীতিশের সঙ্গে।
কাজেই সহদেব আর শুধু ললিতাকে মনে করতে পারে না।
নীতিশের সাহচর্যে ললিতা যেন সহসা বিকশিত হয়ে
উঠলাে। যৌবন তার বিস্ফারিত হয়ে উঠলাে দেহের কানায়
ছিয়াশী
ঝিকিমিকি
কানায়, বর্ষার নদীর মতাে। লজ্জার আভা তার সারা দেহ
রাঙিয়ে দিল। সহদেব ভাবে এত রঙ, কোথা লুকিয়েছিল।
কিশলয়হীন তরুশাখা যেন কার প্রভাব স্পর্শে সহসা ফুলে-ফলে
রাঙা হয়ে উঠলাে। সহদেব বিস্ময়ে ললিতার পানে চায়।
ললিতা উদ্দাম নদীর মতাে তর তর করে ছুটতে থাকে।
তার অবসর নেই, বিশ্রাম নেই, শূন্যে পাখা মেলে দিয়ে সে শুধু
উড়তেই থাকে।
নীতিশ কিন্তু গভীরতায় অচঞ্চল। তার মাঝে চাঞ্চল্যের
সাড়াটুকু নেই। সে যেন আপনভােলা।
সহদেব লক্ষ্য করে, নীতিশ বই পেলে ললিতাকে ভুলে যায়,
বিশ্বসংসার ভুলে যায়। নীতিশ যখন বইয়ের মাঝে মগ্ন হয়ে
যায়, ললিতা তার সঙ্গে কথাটি বলতে ভরসা করে না।
নীতিশ বলে, খাসা লােক, ললিতা, তােমার এই সরকার
ললিতা ঘাড় নেড়ে উত্তর দেয়, চমৎকার ! মানুষ হিসেবে
ওর তুলনা নেই। তা না হলে আর আমি বেছে বেছে ওর
সঙ্গে বন্ধুত্ব করি ।
নীতিশ প্রশ্ন করে, ওর আর কে আছে ললিতা ?
-কেউ নেই।
--আমার মনে হয়, ললিতা, ভদ্রলােকের জীবনের অন্তরালে
অনেক ব্যথা জমা হয়ে আছে। দুঃখের অভিজ্ঞতাই ওঁকে মানুষ
করে তুলেছে।
সাতাশী
ঝিকিমিকি —এতদিনেও ওর ঠিক পরিচয় সংগ্রহ করতে পারিনি, তবে দুঃখের সঙ্গে যে ওর ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে সে কথা উনি নিজেই বলেছেন। দুঃখের সঙ্গে লড়াই করে উনি জয়ী হয়েছেন। -আর্থিক অবস্থা এখন ভাল মনে হয়। ললিতা একটু ভেবে উত্তর দেয়। বলে, স্বচ্ছল মনে হয়। তবে ঠিক কেমন করে জানুবাে। উনি আমায় আড়াইশাে টাকা মাইনে দিয়ে ওর সেক্রেটারী রাখতে চান, যদি আমি আমার চাকরী ছেড়ে দিতে রাজী হই- নীতিশ বিস্ময়ে ললিতার পানে চেয়ে বলে, বলল কি? ওঁর সেক্রেটারী ? '—তাই তাে বলেন। নীতিশ বলে, তদ্রলােকের আর কোন কাজকর্ম আছে না শুধু এখানের এই দোকান ? —ঠিক বুঝতে পারি নি। তবে এখানের দোকানে যা আয় হয় তাতে আড়াইশাে টাকা মাইনে দিয়ে লােক রাখা চলে না। নীতিশ নিঃশব্দে ললিতার পানে চায়। ললিতা বলে, সরকার মশায়ের অন্তরটা একেবারে ছেলে মানুষের মতন। আমার ভারী ভালাে লাগে। ললিতা কি ভেবে সহসা উচ্চ হাসিতে ঘরখানা কাপিয়ে তুলে নীচু গলায় নীতিশকে বলে, আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি ভদ্রলােকের প্রেমে পড়ছি। অষ্টশী
ঝিকিমিকি
নীতিশ হেসে বলে, মন্দ কি! সত্যিই আমি তােমার
সৌভাগ্য কামনা করি।
ললিতা বলে, যদি প্রেমে পড়তে হয়তাে ঐ রকম একজন
রাশভানী লােকের প্রেমে পড়াই ভালাে।
নীতিশ বলে, প্রেমটা খুব গভীর হয়, আর অবসর প্রচুর
মেলে।
ললিতা নীতিশের গায়ে ধাক্কা দেয়।
নীতিশ প্রশ্ন করে, তা তুমি একাই প্রেমে পড়ছ না, ওদিকেরও
সাড়া পাচ্ছ ?
চোখ মুখ ঘুরিয়ে ললিতা বলে, তবে না তাে কি! আমি
একাই বুঝি ?
নীতিশ মনে মনে হাসে আর মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে ললিতার
সলজ্জ যৌবনশ্রী !
ললিতা এক সময় নীতিশের গা ঘেসে নীচু গলায় জিগগেস
করে, সত্যি একটা পরামর্শ দাও না, কী করা যায় ?
নীতিশ প্রসারিত স্তব্ধ দৃষ্টি দিয়ে ললিতার মুখের পানে
ইস!
ায়।
ললিতা বলে, কী যে হাঁ করে মুখের পানে চেয়ে থাকো,
ভাল লাগে না। বল না সত্যি, কী করা যায় ?
নীতিশ প্রশ্ন করে, কিসের পরামর্শ ? ওর প্রেমে পড়বে
এ কিন্তু চমৎকার ! পরামর্শ করে প্রেমে পড়তে আজ
পৰ্য্যন্ত কাকে শুনি নি।
কি না ?
উননববই
ঝিকিমিকি
ললিতা চোখ রাঙিয়ে বললে, যাও! তুমি ভারী দুষ্ট, হােচ্ছ !
আমি কি তাই বলছি ?
নীতিশ অপাঙ্গে ললিতার পানে চেয়ে গম্ভীর হয়ে জিগগেস
করলে তবে ?
-বলছিলুম কি, ঐ যে উনি চাকরী ছেড়ে দিয়ে ওর সেক্রেটারী
হবার কথা বলছেন, তার কি করা যায় ?
ও সেক্রেটারী হওয়ার চেয়ে একেবারে পাকাপাকি ব্যবস্থা
করে নিয়ে চাকরী ছেড়ে দেওয়াই ভালাে
–কি রকম ?
—এদিকে তাে খুব বুদ্ধি আছে আর এই সাদা কথাটা
বুঝতে পারলে না? সেক্রেটারী হওয়াটা কি জানােএই যাকে
বলে ' প্রস্তাবনা, তারপর আসল নাটক হবে সুরু এবং
উপসংহারে মিস্ সেক্রেটারী হবে মিসেস সরকার। আমার
মনে হয় কাজ কি অত ঝঞ্চাটে, তার চেয়ে একেবারে
মিসেস্ সরকার হয়ে ওঁর স্কন্ধে নিশ্চিন্তে আরােহণ করাে।
দেখবে আর কোন গােলযােগ থাকবে না।
ললিতা কুটি করে বললে, সে ত আমার সৌভাগ্য!
নিশ্চয়! বৃদ্ধের তরুণী ভাৰ্যা।
বুড়াে ব’লােনা বলছি। বুড় কিসে দেখলে ? ও বয়সে
বিয়ে সব দেশেই হয়ে থাকে, তারা তাে বুড়াে ভাবে না!
নীতিশ হেসে উঠলাে।
ললিতা আরাে একটু উত্তেজিত স্বরে বললে, আমিই বা কী
নব্বই
ঝিকিমিকি
?
এমন কচিখুকী। এদেশের ব্যবস্থা ধরলে তাে আমারাে বিয়ের
বয়স পার হয়ে গেছে।
নীতিশ বললে, চমৎকার হবে ললিতা, খাসা হবে। ও
আমি ঠাই করছিলুম, বুঝলে না?
ললিতা সাড়ীর আঁচলটা পিঠের ওপর গোছাতে গােছতে
জিগগেস করলে, তাহলে তােমার অমত নেই
—মােটেই না। তােমার মতেই আমার মত।
—আচ্ছা তা হলে বসো। চা নিয়ে আসি আর দেখে
আসি সরকার মশায়ের ছুটি হলো কিনা।
নীতিশ বললে, শুধু চা না কিছু মিষ্টি মুখের ব্যবস্থা আছে ?
চায়ে বেশী করে চিনি দোব’খন।
চঞ্চল লীলাভঙ্গীতে ললিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নীতিশ মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে।
খানিক পরে ললিতা এসে বললে, চলাে, আজ ফাকায়
বসে চা খাওয়ার সখ হয়েচে। টেবিল সাজিয়ে সরকার মশায়
বসে আছেন।
নীতিশ বললে, তা হলে ব্যবস্থাটা ভালই হবে নিশ্চয়।
জায়গায়টার জলের গুণ আছে, এই ভাবে খিদে বাড়লে
ভাবনার লক্ষণ।
ললিতা জিগগেস করলে, কী রকম?
—এরকম খিদে নিয়ে কারুর অতিথি হয়ে থাকা, যেন
কেমন কেমন ঠেকে।
একানব্বই
ঝিকিমিকি
-তা হলে কী করতে চাও?
-করতে আমি কিছু চাইনি, তবে অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই
তার চক্ষুলজ্জায় বাধতে,—অবশ্য যার চক্ষুলজ্জা আছে।
—তুমি বলতে চাও তােমার চক্ষুলজ্জা নেই ?
নীতিশ গম্ভীর ভাবে ঘাড় নেড়ে বললে, না, ও বালাই
আমার নেই।
ললিতা হাসলে।
বিরানব্বই
তেরাে
অনেকখানি রাত্রি হয়েছে।
সহদেব আপাদমস্তক কম্বলে ঢেকে বিছানায় শুয়ে শুয়ে
ভাবছে। ঘুম আসছে না। চিরসুপ্ত যৌবন তার জেগে
উঠেছে। সে ঘুমােতে চায় না। কিছুতেই তাকে সে ঘুমােত
দেবে না।
ললিতাকে ঘিরে তার যৌবন উত্তাল হয়ে ওঠে। ললিতা
তার মস্তিষ্কের অলিতে-গলিতে তরল বহ্নিস্রোতের মতাে গড়িয়ে
বেড়ায়।
নিস্পন্দের মতাে শুয়ে শুয়ে সে ভাবে ললিতাকে—কেমন
করে তার যৌবনের গােধূলিতে তার প্রথম আবির্ভাব হলাে,
কেমন করে সে রাঙিয়ে তুললে তার যৌবনের আকাশকে !...
ঘুমকাতর দেহ তার অবসাদে এলিয়ে পড়ে, মন তার চিন্তার
উত্তেজনায় সােজা হয়ে ওঠে।
মাঝে মাঝে তার চিন্তার খেই হারিয়ে যায়। নীতিশ এসে
ললিতাকে আড়াল করে দাড়ায়। এই নীতিশ তার উচ্ছল
তিরানব্বই
ঝিকিমিকি
যৌবন আর অপৰ্যাপ্ত তারুণ্য নিয়ে ললিতাকে তার কাছ হতে
ছিনিয়ে নিতে যায়। সহদেবের মস্তিষ্কে আগুন ধরে ওঠে।
একটা কুগ্রহের মত কোথা হতে এই নীতিশ এসে জুটলো!
ললিতা যদি চলে যায়। তার প্রাণের সমস্ত আলো যাবে
নিভে। তার জীবন দুৰ্ব্বহ হয়ে উঠবে।
রাত্রি গভীর হতে গভীরতর হয়ে আসছে। বাইরে
স্তব্ধতার প্রকাশ প্রখর হয়ে উঠছে। নিজের নিশ্বাসের শব্দ
আঁধার ঘরের স্তব্ধতায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে।
সহদেব শিউরে ওঠে।
কখন এক সময় সহদেব তন্দ্রার ঘােরে অচেতন হয়ে গিয়ে-
ছিল, তার ঘুম ভেঙ্গে গেল কিসের শব্দে।
তার বাইরের জালায় কে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে তাকে ডাকছে।
সহদেব ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাে।
-বাবুজী ? বাবুজী ?
আলাে জ্বেলে সহদেব দরজা খুলে দিলে ।
-কিষণ কী খবর রে কিষণ ?
কিষণ ললিতার চাকর।
কিষণ বলে, মা’জি আপনাকে ডেকে পাঠালেন, তারী
জরুরী দরকার।
সহদেব বিস্ময়ের আতিশয্যে স্তব্ধ হয়ে গেল।
কিষণ বলে,-যে বাবু এসেছেন সেদিন, তার বিমারী
হয়েছে, তাই মা’জী আপনাকে ডাকলেন।
চুরানব্বই
৫
?
ঝিকিমিকি
সহদেব কাপড়টা বদলে নিয়ে তাড়াতাড়ি কিষণের সঙ্গে
বেরিয়ে পড়লাে।
নীতিশের এমন কি ব্যারাম হতে পারে, যার জন্যে ললিতা
এমন আকুল হয়ে তাকে এই রাত্রে ডাক দিল ! রাত্রি ন'টা
পৰ্যন্ত তাে সে ললিতার সঙ্গে লাইব্রেরীতে বসে পড়াশুনন
করেছে, সহদেবের সঙ্গে গল্প করেছে। এমনি সহস্র ভাবনার
মাঝে ডুবে সহদেব পথ চলতে লাগলাে। রাত্রি প্রায় দু’টো।
জনহীন পথ,-স্তব্ধ, অন্ধকার। গাছের মাথায় পাতার মৃদুমৰ্ম্মর
ও পাখীর ডানা-ঝাপ্টানীর শব্দ। সহদেব দ্রুতপায়ে এগিয়ে
চললো। গতির তালে তার দেহে শক্তিসঞ্চার হচ্চে, উত্তেজনায়
শিরায় শিরায় রক্তের জোয়ার বইছে। মাথার ওপর নিকষ
কালাে আকাশ, মাঝে মাঝে ছেড়া পাঁশুটে রঙের মেঘ জমেছে।
এক কোণে ক’টা তার অলচে মিট মিট করে। সহদেবের
ওপরপানে চেয়ে মনে হয় অবসাদে চুলে ঢুলে আকাশটা
যেন অনেকখানি নীচে ঝুলে পড়েছে। এতাে কাছে যে
এর দূরত্ব মাপ করা চলে। পায়ের নীচে পৃথিবীর পানে
চেয়ে আবার মনে হয় পৃথিবীটা যেন ঝিমুচ্চে আর
ওপরপানে উঠছে। আকাশটা আসচে নীচের পানে আর
পৃথিবীটা উঠছে উপরপানে, আকাশে পৃথিবীতে মিলতে
চায়।
সহদেব চলার গতি দিল বাড়িয়ে। উদ্ধশ্বাসে স্খলিত চরণে
সে চললাে।
পঁচানব্বই
ঝিকিমিকি
সানের কম্পাউণ্ডটা পার হয়ে উঠানের সিড়ি বেয়ে উঠতে
উঠতে সহদেব উৰ্দ্ধস্বরে ডাকলে, ললিতা?
পাশের একটা দরজা খুলে ললিতা বলে, ভেতরে আসুন,
নীতিশ বাবুকে নিয়ে বড় মুস্কিলে পড়েচি-
—হঠাৎ তঁার হলো কি ? সন্ধ্যেবেলা তো তাকে মােটেই
অসুস্থ মনে হলো না।
-না, পথে আসতে আসতে বললে, মাথটা কেমন করছে।
তারপর এখানে আসার ঘণ্টাখানেক পরেই অজ্ঞান হয়ে
গেলাে।
ললিতার মুখে আতঙ্কের ছায়া, চোখদু’টি অশ্রুতে টলমল
করছে।
সহদেব ঘরের মাঝে ঢুকে অচেতন নীতিশের বিছানার পাশে
গিয়ে বসলাে। নীতিশের মুখে যন্ত্রণার রেখা, কণ্ঠনালীর মাঝে
একটা ঘড় ঘড়, করে আওয়াজ হচ্চে, চোখদুটো জবার মতাে
লাল হয়ে উঠেছে। মুখের পানে চেয়ে সহদেব শিউরে
উঠলাে।
ললিতা নিতান্ত অসহায়ের মতাে আর্তস্বরে বলে, কী হবে
সরকার মশায় ?
সহদেব জিগ্গেস করলে, ডাক্তার ডেকেছিলে ?
—হ্যা, হােমিওপ্যাথী ওষুধ খাইয়েছি, ডাক্তার বললেন,
সন্ন্যাসবােগ। মাথায় বরফ দিতে বললেন, কিন্তু বরফ এখানে
পাই কোথায় ?
ছিয়ানববই
ঝিকিমিকি
সহদেব বলে, তুমি ব্যস্ত হয়ােনা, মাথায় জল দিয়ে হাওয়া
করাে, আমি হাসপাতালের ডাক্তারকে নিয়ে আসছি।
তিন দিন তিন রাত্রি মৃত্যুর সঙ্গে সমানভাবে যুদ্ধ করে চতুর্থ
দিনে নীতিশের জ্ঞান ফিরে এলো। ললিতার অক্লান্ত সেবা
ও সহদেবের অকাতর পরিশ্রম ও অজস্র অর্থব্যয় নীতিশকে
মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনলে।
দ্বিতীয় দিন রাত্রে কলকাতা থেকে এলাে সাহেব ডাক্তার ও
মেম নাশ ! নার্শের হাতে নীতিশের সেবার ভারটুকু তুলে দিয়ে
ললিতা ছুটি পেলে। ছুটি পেলে কিন্তু সে হাঁপ ছাড়তে পারলে
, রুদ্ধনিঃশ্বাসে উদ্বিগ্ন ও সজাগ হয়ে রইলাে। ডাক্তার
আশ্বাস দেয় তবুও যেন ললিতা বিশ্বাস করতে পারে না। সে
ছটফট করে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়ালে। রোগীর পাশের
ঘরে দেখা মিললাে সহদেবের। শ্রান্ত দেহটা একখানা
তক্তপােষের ওপর এলিয়ে দিয়ে সে আড় হয়ে শুয়ে আছে।
ললিতার ডাক পড়লাে।
বিশুষ্ক মুখে ললিতা এসে সহদেবের মাথার কাছে দাড়ালাে।
সহদেব বলে, বসাে।
ললিতা নিঃশব্দে তক্তপােষের প্রান্তে বলো। রুক্ষ্ম চুলগুলাে
মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়লাে।
তার মুখের ভাব দেখেই
সহদেব বুঝেছিল সজল মেঘের মতােই মনটা তার ভারাক্রান্ত
৭
সাতানব্বই
ঝিকিমিকি
চোখের পিছনে অশ্রুর সমুদ্র। হলােও ঠিক তাই! সহদেব
নিজের হাতের মাঝে ললিতার একখানি হাত তুলে
নিতেই ললিতার গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়লো ফোটায় ফোঁটায়
অশ্রু। ললিতার অন্তরে যে ব্যথা ফেনিয়ে উঠেছে তার
আন্দোলনটা এসে লেগেচে ওর মনে। ললিতার সম্বন্ধে সহদেবের
ধারণা ছিল, সে শক্ত-অধীর নয়, কিন্তু নীতিশের ব্যারামের
পর প্রথম দর্শনেই তার ধারণা উলটে গেল। স্বভাবের নিয়মই
নিয়ম। নারী নারীই! ললিতা অঝোরে কাঁদলে। যা-তা
একটা কিছু বলে সহদেব তাকে সান্ত্বনা দিতে চাইলে, কিন্তু
তার কণ্ঠরােধ হয়ে এল, কোন কথাই তার মনে এলো না।
সে শুধু নিজের মুখের উপর ললিতার হাতখানাকে শক্ত করে
চেপে ধরে স্বপ্নের ঘোর-লাগা চোখে ললিতার মুখের পানে
চেয়ে রইলাে।
এক সময় ললিতার মুখের ওপর থেকে রুক্ষ উড়ে চুলগুলােকে
সরিয়ে দিতে দিতে সহদেব বলে, বিপদের মুখে ভেঙ্গে পড়া
তাে তােমার মত মেয়ের উচিত নয়। যারা সাধারণ, অতি
সাধারণ তারাই দিশেহারা হবে বিপদে। বিপদ যখন এসেছে
তখন তাকে মেনে নিতে হবে, এবং তার সঙ্গে বীরের মতো
লড়াই দেবার জন্যে প্রস্তুত হতে হবে।
ললিতা চোখ নীচু করে বসে রইলাে, জবাব দিলে না ।
সহদেব প্রশ্ন করলে, নীতিশের আত্মীয়ের মধ্যে এমন কেউ
আছেন, যাকে সংবাদ দেওয়া প্রয়ােজন মনে করাে ?
আটানব্বই
ঝিকিমিকি
ললিতা তেমনি চোখ নীচু করে উত্তর দিলে, ঠিক জানি
।
—আমি শুয়ে শুয়ে তাই ভাবছিলুম।
ললিতা। সহসা সহদেবের বুকের উপর ঝুকে পড়ে ভিজে
গলায় বললে, আপনার চেয়ে পরমাত্মীয় আমাদের কেউ নেই।
যদি বাঁচে সে শুধু আপনার জন্যে।
সহদেবের চোখ দুটো ভিজে উঠলো। তার দুরন্ত মন ফুলে
ফুলে কেঁপে উঠলাে। সে সহসা দু’হাত দিয়ে ললিতার ঝুকে
পড়া দেহটাকে নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরলে
ললিতা নড়লাে না, ওঠবার চেষ্টা করলাে না, তার শ্রান্ত
দেহটা সহদেবের বুকের উপর নরম হয়ে এলাে। সে কম্পিত
ভাঙ্গা গলায় বললে, কিন্তু কেন এমন হলাে সরকার মশাই ?
সহদেব শুধু স্তব্ধ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঝড়ের
বেগে সে-দীর্ঘশ্বাস সহদেবের পাঁজর ক’খানাকে এবং ললিতাকে
সবেগে কাঁপিয়ে তুললে।
নিরানব্বই
নীতিশ আরােগ্যের পথ ধরলে, সহদেব আশ্বস্ত হলাে এবং
ললিতার মুখে হাসি ফুটলাে। জ্যোৎস্নার ধারার মত সে-হাসি
সহদেবের হৃদয়-আকাশ ছেয়ে ফেলে। প্রাণের প্রাচুর্যে ললিতা
যেন ধৈৰ্য্য হারিয়ে ফেলে। বিপদের দিনে যেমন আঁধারের
ছায় তার মুখখানিকে কালাে করে দিয়েছিল, তেমনি সেই
বিপদের অবসানে চঞ্চল প্রজাপতির মত সে রঙের বৈচিত্র্যে উড়ে
বেড়াতে লাগল মহাননে। সহদেব ভাবের আবেগে অপলকে
চেয়ে থাকে ললিতার মুখের পানে। নীতিশের ব্যারামের সময়
ললিতা ওর বুকের মাঝে নিবিড় হয়ে একান্তভাবে আশ্রয়
নিয়েছিল, কোন কথাই সে সহদেবকে বলেনি, অথচ কোন
কথাই তার কাছে সে গােপন রাখে নি। সেই দিনই ওর
জীবনটা অকস্মাৎ নিজের কাছে দেখা দিয়েছিল নানা রঙে,
নানা বর্ণে। সেই দিনের পর থেকেই সে নিজের অস্তিত্বের
সার্থকতা বুঝেছিল, এবং সেই পরম মুহূর্তটীকেই পাথেয় করে
জীবন নদীতে পাড়ি দিতে পারে। আর তার জীবনে কোন
একশাে
ঝিকিমিকি
প্রার্থনা নেই, কোন কামনা নেই। ললিতা ঐ একটি দিনে
তাকে অনেকখানি পথ এগিয়ে দিয়েছে। এতদিন যা কঠিন
ছিল, আজ তা নিঃশ্বাসের মত সহজ ও হাসির মতাে সরল
হয়ে উঠেছে ।
ললিতা বলে, নীতিশকে বাঁচিয়েছেন আপনি।
সহদেব মনে মনে বলে, নীতিশের অসুখ আমার জীবনকে
সফল করেছে। সারা জীবনের ব্যর্থতা ঘুচিয়েচে।
আর নীতিশ ?-নীতিশ বিহ্বল দৃষ্টি দিয়ে তাদের মুখের পানে
চেয়ে থাকে। কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে চোখ দুটী ভারী হয়ে ওঠে।
নীতিশের জন্যে ললিতার বেড়াতে যাওয়া হয় না। সহদেবও
দিনের অধিকাংশ সময় ললিতার বাসাতেই থাকে, মাঝে
মাঝে দোকানে গিয়ে দেখাশুনা করে আসে। সে সময়টুকুও
তার মন পড়ে থাকে ললিতার বাসায়।
নার্শকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। নীতিশের সেবার ভার নিয়েছে
ললিতা, কাজেই ললিতা চব্বিশঘণ্টাই ব্যস্ত থাকে নীতিশকে
নিয়ে। মাঝে মাঝে নীতিশ যখন সুস্থ হয়ে ঘুমােয়, ললিতা
চঞ্চল হাওয়ার মতাে ছুটে আসে সহদেবের কাছে। ললিতা
তার কথায়, হাসিতে, চাঞ্চল্যে সহদেবের স্নেহাসক্ত মনকে উধাও
করে নিয়ে যায়। সহদেব সুখস্বপ্নে বিভাের হয়ে ললিতার
মুখের পানে চেয়ে থাকে।
ললিতা কণ্ঠস্বরে খুব খানিকটা স্নেহ ঢেলে বলে, তাের
গলায় পড়ে কী কষ্টটাই তােমায় দিলুম এবং দিচ্চি।
৩
একশাে এক
ঝিকিমিকি
চেষ্টা করে
নি।
সে বলে, দৈবাৎ
সহদেব বলে, আজো যে একেবারে তােমার কাছে সস্তা
হয়ে যাইনি, সেই আমার সৌভাগ্য
ললিতা জিগগেস করে, কী রকম?
সহদেব ললিতার হাতখানা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে,
আমার দাম সংসারে কেউ বােঝে নি, তুমি ছাড়া
—সেটা এমন আশ্চর্যের কথা নয়।
কারণ ?
কারণ, আমি যে-চোখে তােমায় দেখেচি, যেমন করে
তােমায় চিনেছি, তেমন ভাবে আর কেউ তােমায় দেখবার বা
চেম্বার
সহদেবের মুখখানা আরক্ত হয়ে ওঠে। সে বলে,
এমন ভাবে আমাকে তুমি বেছে নিলে কেন ললিতা?
-পাঁচজনের মধ্যে থেকে চিন্তে তােমায় কষ্ট হলো না
মােটেই। দেখেই তােমায় চমকে উঠেছিলুম, বেশ বুঝেছিলুম এ
মানুষটি একেবারে নিজের মতাে।
সহদেব তাকে কাছে টেনে নিয়ে নিচু স্বরে জিগগেস করে,
আর এখন?
ললিতা তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে, জানি না, যাও।
ললিতা হাসতে হাসতে বেরিয়ে আবার নীতিশের ঘরে গিয়ে
দেখে নীতিশ জেগেছে কিনা। হয়তাে নীতিশ তখনাে ঘুমুচ্চে।
ললিতা নিঃশব্দে তার বিছানার ধারে এসে বসে। অলস
মনকে ভাসিয়ে দেয় অবারিত আকাশের বুকে ঐ ছেড়া
একশাে দুই
ঝিকিমিকি
পাতলা মেঘের মত। কিছুতেই এক হয়ে তাদের জমতে
দেয় না।
তার মনের মাঝে অসাধারণের ছােয়াচ লেগেছে, সাধারণের
বেড়া ভেঙ্গে যে স্বর্গে বিচরণ করছে, সেখান থেকে সে নামতে
চায় না। নীতিশের শীর্ণ ঘুমন্ত মুখের পানে চেয়ে দেখে, মেঘে
আকাশটা যেমনি স্নান, নীতিশের মুখের চেহারাটাও তেমনি।
সে মুখে আবার হাসি ফোটাতে হবে তাকে, আলাের দীপ্তি
আনতে হবে তাকে। সংসারে আপন জন বলতে তার কেউ
নেই। বড় নিঃসহায় সে। ললিতার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে
আসে—ভাবের আবেগে তার মুখখানা লাল হয়ে ওঠে। সে
নিজের মুঠোর ভেতর ঘুমন্ত নীতিশের একখানা হাত তুলে নিয়ে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনের কথা ব্যক্ত করে। সহসা নিজের গণ্ড
আর্দ চোখের ওপর সেই আলগা হাতখানির স্পর্শ ঠেকিয়ে ধীরে
ধীরে হাতখানিকে নামিয়ে রাখে। চোখ তুলে দেখে, দরজার পাশে
দাড়িয়ে সহদেব। কখন যে সে এসে দাড়িয়েচে ললিতা জানতেও
পারে নি, তাই সে অপ্রতিভ ও কুন্তিত হয়ে চোখ দু’টি নামিয়ে
নেয়। আনত মুখের রক্তিম আভা আস্তে আস্তে যায় মিলিয়ে,
বিবর্ণ গণ্ড বেয়ে দু’চোখ থেকে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়ে।
তার কুষ্ঠিত ব্যথিত মূর্তি, সজল চোখের নিষ্প্রভ চাউনি
সহদেবকে আকুল করে তুললে। অথচ ঠিক্ সে বুঝে উঠলাে
এরই মধ্যে এমন কি কারণ ঘটলাে যা ললিতাকে এমনি ভাবে
বিভ্রান্ত করে ফেললে।
একশাে তিন
ঝিকিমিকি
সে আস্তে আস্তে ললিতার একখানি হাত ধরে নীতিশের
ঘর থেকে তাকে তুলে নিয়ে এলাে।
৩
ললিতা ব্যথিত স্বরে বলে, তােমায় সব কথা বলবো কেমন
করে আমি ?
সহদেব ব্যাকুল হয়ে মিনতি করলে, বলো ললিতা, তােমায়
অনুনয় কচি, আমার কাছে গােপন করাে না।
ললিতা বলে, আমায় মাপ করাে, মিছে কথা বলার চেয়ে
গোপন রাখা ঢের ভালো-
এর পর আর সহদেবের মুখে কথা ফুটলাে না। বেলাশেষের
অস্তরাগ রঞ্জিত নিঃশব্দ আকাশের পানে মুখ রেখে দু’জনে থেমে
গেল।
এর পর পীড়াপিড়ী করা ওর পক্ষে নির্লজ্জতা, কাজেই শরীর
ও মনের উপর একটা বেদনা ব’য়ে নিঃশব্দে সহদেব ক'টা দিন
কাটিয়ে দিলে।
ললিতা লক্ষ্য করে, তার মুখের উপর একটা স্লান ছায়া
পড়েছে। সে কিন্তু নিজের মনকে সংযত করে ফেলেছে।
তার মুখে
একটি নির্লিপ্ত শান্তি !
সহদেব অন্যমনস্ক গাম্ভীর্য্যে তার মুখের পানে চেয়ে দেখে।
সায়াহ্নের অস্তগামী সূর্যের শেষ চিহ্নটুকু তখনাে আকাশের
বুক থেকে মুছে যায় নি। বারাণ্ডার এক কোণে একখানা
একশাে চার
ঝিকিমিকি আরাম চৌকিতে নীতিশ শুয়েছিল। পাশে ললিতা তার মাথার চুলে আঙুল ডুবিয়ে তার সঙ্গে গল্প করছিল। নীতিশ বলে, মিঃ সরকারের চেহারাটা কিন্তু কদিন থেকে যেন ভাল দেখাচ্চে না, কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছেন আর ভারী অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছেন। ললিতা বললে, কই আমি তাে লক্ষ্য করি নি—ও কিছু না! নীতিশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে জিগ্গেস করলে, আচ্ছা ললিতা, এই ব্যারামে ভদ্রলােক যে এতগুলাে টাকা খরচ করলেন, ললিতা মুখখানা শক্ত করে বলে, তা কি হবে ? —ভাচি, এ ঋণ শােধ করবাে কেমন করে? —সে পরে বোঝা যাবে। উনি ত আর উকিলের চিঠি দিয়ে তাগাদা করছেন না। নীতিশ নিঃশব্দে হাসলে। একসময় নীতিশ আবার ডালে, ললিতা! ললিতা পা ঝুলিয়ে আরাম চৌকির হাতলের উপর বসলো। নীতিশ তার কোলের উপর একখানি হাত রেখে ব্যথিত স্বরে বললে, দরিদ্র হয়ে বেঁচে থাকার কী জালা ললিত! তাই ভাচি, যন্ত্রণা সইতে কেন আবার বেঁচে উঠলুম- ললিতা বাধা দিয়ে ধমক দিলে, ঐ সব কথা শোনবার জন্যে তো আমি তােমার পাশে পাশে ঘুচি না। আমি এক্ষুনি চলে যাবাে। একশাে পঁচ
ঝিকিমিকি
নীতিশের চোখ দু’টি জলে ভরে এলাে। ললিতা তার মুখের
উপর ঝুকে পড়ে আঁচলে চোখের জল মুছে দিলে।
সন্ধ্যার পরে সহদেব এলাে। কম্পাউণ্ডে বেড়াতে বেড়াতে
ললিতা একসময়ে বলে, মানুষ নিজেকে না সস্তা করলে কেউ
তাকে সস্তা করতে পারে না।
সহদেব জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ললিতার মুখের পানে চাইলে ।
ললিত। একখানি উচু পাথরের ধারে দাড়িয়ে বললে, হঠাৎ
মাঝে মাঝে এমনভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেল কেন বলতাে?
কী যে ছেলেমানুষী করাে !
বলতে বলতে ললিতার গলা ভারী হয়ে এলাে। অতি কষ্টে
কোন রকমে চোখের জল সে সামলে নিলে।
জ্যোৎস্নায় সমস্ত আকাশটা মুখর হয়ে উঠেছিল, ফুলের
সুবাসে ও বর্ণ সুষমায় কম্পাউণ্ডটা ভরে গিয়েছিল । ললিতা
উর্ধমুখে আকাশের পানে চেয়ে বলে, আমি যে লজ্জায় অপমানে
মরে যাই।
—অপমান ? আমি তােমাকে অপমান করবার কল্পনাও
যে মনে ঠাই দিতে পারি না ললিতা।
ললিতা বলে, কিন্তু ঐ রুগ্ন লােকটি পৰ্যন্ত বুঝেছে যে
একটা কিছু হয়েছে আমাদের ! ওর কাছে এর কৈফিয়ৎ
দিতে আমি লজ্জায় মরমে মরে যাই।
সহদেব নিঃশব্দে দাড়িয়ে রইলাে।
ললিতা বলে, এর কী ছাই কৈফিয়ৎই বা দেব, বলবার
একশাে ছয়
ঝিকিমিকি
কিছু থাকলে তাে বলবাে। নিজে বুঝলে তবে তো পরকে
বােঝাবে।
সহদেব একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার কাছ হতে সরে
যাবার চেষ্টা করলে। ললিতা তার একখানা হাত চেপে ধরে
তাকে বাধা দিয়ে বললে, যাচ্চো কোথা?
সহদেবের সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো, চোখ দু’টি স্তিমিত
হয়ে এলাে
—বলবে না আমায়, কি করেছি আমি ? শাস্তি দেবে, অথচ
বুঝতে দেবে না অপরাধটা কি ?
ললিতা দাতে ঠোট চেপে মুখখানা শক্ত করে দাড়িয়ে
রইলো। চাদের আলোয় তার চোখ দুটো ঝ ঝক্ করে জ্বলে
উঠলাে।
সহদেব পাথরখানার একপাসে বসে পড়লো। ললিতা
তেমনি তার হাতখানা ধরে তার সামনে দাড়িয়ে রইলাে।
সহদেব কথা কইতে পারলে না।
ললিতা তেমনি রুঢ়স্বরে বললে, কতাে বড় নিষ্ঠুর তুমি
বুঝতে পারছো কি? আঘাত করে যে মানুষ আনন্দ পায়, এই
আমি প্রথম দেখলুম।
সহদেবের চোখ দুটো জলে ভরে এলাে, সে মুখখানা নত
করে মাটির পানে ঝুকে পড়লো।
ললিতা যেন আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে। সহসা দু’হাতে
তার মুখখানি তুলে ধরে বললে, অমন করে পাশ কাটালে চলবে
একশাে সাত
ঝিকিমিকি
না, আজ আমি জানতে চাই আমার অপরাধটা—যার জন্যে তুমি
আমায় এমনভাবে শাস্তি দিচ্চ।
সহদেবের গণ্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে চাদের আলােয় চক্
চক্ করে উঠলো।
ললিতা একটু দমে গেল তার চোখে জল দেখে, কিন্তু সে
তখনি নিজেকে সামলে নিলে সে একেবাবে না-ছােড়-বান্দা।
বেশ জোর গলায় বললে, ও চোখের জলে আমি ভিজবাে !
পুরুষ মানুষের কান্নাকে আমি ঘৃণা করি। জোর থাকে, সে
জোর গলায় আপত্তি জানাবে, বাবা দেবে, হাল ছেড়ে দিয়ে মেয়ে
মানুষের মতাে কাদবে না।
সহদেব চোখের জল মুছতে মুছতে মুখ ফিরিয়ে বললে,
কঁদে, হাতি চোরা বালিতে পা দিয়ে যখন অতলের পানে
নামতে থাকে তখন সেও কঁাদে।
ললিতা নিঃশব্দে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইলাে সহদেবের পানে
একদৃষ্টে চেয়ে। তারপর সহদেব যখন তার পানে চাইলে,
ললিতা শুধু বলে, আমি বুঝি চোরা বালি ! পরীক্ষা না করে
পা দিলে কেন ?
সহদেব চেয়ে দেখলে ললিতার মুখে জ্যোৎস্নাস্নাত আকাশের
ছায়া। নিৰ্ম্মল, শান্ত, আলাে ঝলমল করছে। জ্যোৎস্নার
পরিপূর্ণতার মতই; সে হাসির তরঙ্গ তুলে বলে, না-জেনে
-চিনে যখন পা দিয়েছো তখন ডুবতেই হবে, উপায়
নেই। যে যখন ডােবে তখন অমনি করেই না-চেনার
একশাে আট
ঝিকিমিকি
কাছে বন্দী হওয়ার মাঝে রােমান্স আছে। সে বড় কড়া
বাঁধন !
ললিতা হঠাৎ থেমে দু’হাতের বাঁধন দিয়ে সহদেবের কণ্ঠটি
বেষ্টন করলে। তার পরে নিজের মুখখানিকে উচু করে, আস্তে
আস্তে সহদেবের মুখখানিকে নামিয়ে এনে তার সঙ্গে মিলিয়ে
দিলে।
ঠিক সেই সময়ে মাথার উপর কোথা থেকে একখানা ছেড়া
মেঘ ভেসে এসে চঁাদকে আড়াল করে দাড়ালো।
একশাে নয়
পনেরাে
ভয়ে
একখানা ইজিচেয়ারে শুয়ে নীতিশ একখানা বইয়ের পাতা
উটে যাচ্ছিল। উলটেই যাচ্ছিল পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা, মনের সঙ্গে
কিন্তু তার কোন সংযােগ ছিল না। মন দু’হাতে চিন্তার ভিড়
ঠেলে ঠেলে দৌড় দিচ্ছিল, কিন্তু পথ এমনি দুর্গম যে মাঝে
মাঝে থমকে তাকে দাড়াতে হচ্ছিল পিছন পানে চেয়ে।
তার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠচে, কান্না করে কাছ পৰ্যন্ত স্তব্ধ
হয়ে যাচ্ছে। জানলার নীচে ঘন হয়ে উঠেছে চারা গাছের
জঙ্গল, তারি পাশে কাকড় বিছানো পথ। সেই পথ সোজ।
চলে গেছে কতাে অসম্ভব দূরে। বইখানা খোলা পড়ে রইলো।
কোলের ওপর, দৃষ্টি মিশে গেল পথের মাঝে। কতাে লােক
যাচ্ছে, আসছে। কিন্তু ফিছে না শুধু ললিতা! অভিমানে
তার বুকখানা ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। নিজের একাকীত্ব
স্মরণ করে প্রাণটা তার হাঁপিয়ে উঠতে লাগলাে।
আকাশে মেঘ জমেছে। ঘরের মাঝে তার ছায়া এসে
পড়েছে। আলো মেঘের চাপে স্তিমিত হয়ে আসছে। শে।
একশাে দশ
ঝিকিমিকি
শাে করে এলােমেলো হাওয়া বইছে, হয়তাে রাত্রে বৃষ্টি হতে
পারে।
উদ্বেগে মন তার অধীর হয়ে উঠলাে।
বাইরে পায়ের শব্দ শোনা খেল। নীতিশ আশ্বস্ত হয়ে
ঘন ঘন বাইরের পানে চাইতে লাগলো। কিন্তু যার অপেক্ষায়
উদ্গ্রীব হয়ে এতক্ষণ সে পথ চেয়েছিল, সে এল না, তার
বদলে ভেজানাে দরজা ঠেলে ঘরের মাঝে এসে দাড়ালাে
সহদেব।
নীতিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, আসুন। ললিতা
কোথায় ? সহদেব তার কাছে এসে জিগগেস করলে, কেমন
আছেন ? ললিতা এখনাে ফেরেনি ?
-না।
সহদেব বললে, তা হলে আর কোথাও গেছে। ক'দিন
পরে আজ বেরিয়েছে, ফঁাকা পাহাড়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্চে
প্রাণভরে। তবে আসবে এখুনি, আপনাকে একটু ‘ওভালটিন’
তৈরি করে দিই ?
নীতিশ বাধা দিয়ে বলে, না, না, এখন দরকার নেই।
সহদেব তাসতে হাসতে বলে, কিন্তু আমার একটু চায়ের
বিশেষ দরকার, কাজেই জল একটু গরম করতেই হবে। একটু
বসুন না, এলুম বলে।
সহদেব ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নীতিশ আড় হয়ে
ইজি চেয়ারের বুকে গা ঢেলে দিলে। সঙ্গে সঙ্গে রাশি রাশি
একশাে এগারাে
ঝিকিমিকি
চিন্তা এসে তার মনের মাঝে ভীড় জমালে। সেই সব চমৎকার
চিন্তার হাতে আত্মসমর্পণ করে সে শুয়ে রইলো মৌন যােগীর
মতাে ধ্যানস্থ হয়ে। কিন্তু ধ্যান তার ভেঙ্গে গেল সহদেব ঘরে
ঢুকতেই, এবং তাকে সম্বর্ধনা করতে সে অসংযত হয়ে উঠে
বসলাে।
সহদেব আরাম চৌকির হাতলের উপর কাপ দু’টো নামিয়ে
একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাে। নীতিশ আলােয়ানখানা
পায়ের উপর মেলে দিয়ে সােজা হয়ে বসলো।
সহদেব চায়ের পেয়ালাটা তুলে নিয়ে বলে, নিন্ ওভালটি।
আমিও চাটা খেয়ে নিই।
নীতিশ পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বললে, এখানে এসে
কী কষ্টটাই আপনাদের দিলুম ! এখন মনে হয়, না এলেই
ছিল ভালো।
সহদেব নিলিপ্তের মতাে বললে, নিজের কথা আমি বলতে
পারি, আমাকে কোনাে কষ্টই দেনি, এবং তার জন্যে কুণ্ঠার
কোন কারণই নেই। তবে ললিতার কথা সে নিজে বলবে।
কিন্তু আমার মনে হয় আপনাকে সেবা কবুবার এমনি একটা
সুযােগ পেয়ে সে নিজেকে ধন্য জ্ঞান করেছে। তার সারা
জীবনের কামনা কানায় কানায় ভরে উঠেছে।
নীতিশ রুদ্ধ নিঃশ্বাসে সহদেবের পানে চাইলে, আস্তে
আস্তে তার মুখখানা আরক্ত হয়ে উঠলাে।
সহদেব একটা সিগার ধরিয়ে হাসলে।
একশাে বারাে
ঝিকিমিকি
নীতিশ বলে, কিন্তু আপনার ঋণ আমি শােধ দেব কেমন
}
—তার উত্তরও পাবেন শ্ৰীমতী ললিতার কাছে।
নীতিশ মুখ ফিরিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে, আমি যে এর জন্যে
মােটই প্রস্তুত ছিলুম না।
দু’জনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাে,-খােলা জাল্লাটা দিয়ে
অবারিত আকাশের পানে চেয়ে।
সহদেব এক সময় জিগ্গেস করলে, নীতিশবাবু, কাউকে
ভালবেসেছেন কখনাে?
নীতিশ চোখদুটো প্রসারিত করে উত্তর দিল,কেন বলুন তাে?
-এমনি জিগগেস কচি। চুপচাপ্ কতােক্ষণ বসে থাকা
যায়, তার চেয়ে যা-হােক একটা আলােচনা করা ভালাে, তবু
সন্ধ্যেটা কাটবে একরকম।
নীতিশের মুখে ফুটে উঠলো একটা অস্পষ্ট হাসি। একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্ষীণ গলায় বললে, আকাশে মেঘ জমেছে,
এক পশলা বৃষ্টি নামলে মন্দ হয় না, ভালোবাসার কাহিনীটা
জমে ভালো।
সহদেব চুরুটের একতল ধোয়া ছেড়ে উচ্চ হাসিতে ঘরখানা
কাপিয়ে তুললে ।
নীতিশও তার হাসিতে যোগ দিয়ে বলে, তবে আমাদের
শ্ৰীমতী বাইরে, হঠাৎ বৃষ্টি নামলে পথের মাঝে তাকে বিব্রত
হয়ে পড়তে হবে।
একশাে তেরাে
ঝিকিমিকি
|
সহদেবের দৃষ্টিটা সহসা প্রখর হয়ে উঠলাে, সে অপলকে
নীতিশের মুখের পানে চাইলে
নীতিশ বোধহয় সহদেবের ভাবান্তর লক্ষ্য করেই বললে,
অনুমতি করেন তাে ভালােবাসার কাহিনী আরম্ভ করি। মনটাকে
সহজ করবার জন্যে আমারাে এমনি একটা আলােচনার দরকার।
সহদেব তাকে বাধা দিয়ে বললে, শপ করূবেন, আমি
ভালােবাসার থিসিস শুনতে চাই না, আমি শুনতে চাই আপনি
কাউকে কখনাে ভালােবেসেছেন কি না?
নীতিশের মুখখানা লাল হয়ে উঠলাে। সে একটু ভেবে
উত্তর দিলে, ঠিক তা বলা বড় শক্ত। তবে ভালবাসার আকাঙ্ক্ষা
যে মনে জাগেনি, এ কথা বলতে পারি না। দেহের রক্তে
যৌবন জেগে রয়েছে, এবং তার ক্ষুধা আছে। সেই ক্ষুধা
মেটাতে হলে ভালবাসতে হবে এবং ভালবাসা পেতে হবে।
তবে মনে যে আগুন জ্বলে ওঠে, তাকে জীবনের শেষ পর্যন্ত
জ্বালিয়ে রাখবার জন্যে তেলের প্রয়ােজন। তা যদি না থাকে
জ্বলে জ্বলে আপনিই তা নিভে যাবে। আমার জীবনেও
ভালবাসা তেল হীন প্রদীপের মতাে জ্বলে জ্বলে নিভে যেতে
বসেছে।
-কেন?
—আকস্মিক ভাবে ভালবাসার আকাঙ্ক্ষা জাগলাে, কিন্তু
দৈন্যের ধাক্কায়, অভাবের তাড়নায় সে অঙ্কুরেই শুকিয়ে গেল,
প্রসার লাভ করতে পারলে না।
একশাে চৌদ্দ
ঝিকিমিকি
—যাকে ভালবাসলে সে বুঝি ধরা দিলে না ?
নীতিশ হাসলে। বলে, না, বরা যে দিল না তা নয়,
তার পানে এগােতে পা উঠলাে না। নিজের দৈন্য সর্বাঙ্গ
অবশ করে দিল। মুখ ফুটে বলতেও পারলুম না, সাহসও
হলো না। দারিদ্র মানুষের মনকে পিষে মেরে ফেলে। বিধাতাই
যাকে ভালবাসলেন না, অনাদরে সংসারে পাঠালেন, তাকে,
ভালবাসবে কে ?
নীতিশের গলা ভারী হয়ে এলাে।
সহদেব জিগগেস করলে, আপনি যাকে ভালবেসেছিলেন
সে কি ধনীর মেয়ে ?
—তা ঠিক নয়, কিন্তু সে তাে সজীব মানুষ, তাকে বাধবে।
কি দিয়ে আমি ? সে সঙ্গতি, সে সামর্থ্য আমার কোথায় ?
সহদেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে তার মুখের পানে
চাইলে। অতীতের রুদ্ধ দ্বার ভেঙ্গে মনের মাঝে জেগে উঠলো
পঁচিশ বছর পূর্বের কথা! মনের আকাশে ভেসে উঠলে
মলিনা। নীতিশও আনত মুখে স্তব্ধ হয়ে রইল।
বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। গাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দ সুরের
ইন্দ্রজাল রচনা করচে। আদ্র বায়ু হু-হুচ্ছাসে খােলা জানালা
দিয়ে ঘরের মাঝে ছড়িয়ে পড়লাে। সহদেবের চেতনাকে তা
স্পর্শ করতে পারলে না।
নীতিশ বাইরের পানে চেয়ে বললে, ললিত! তো এখনে;
ফিরলাে না।
একশাে পনেরাে
ঝিকিমিকি
সহদেব চমকে বলে উঠলো, কী, ললিতাকে আপনি
ভালবাসেন ?
-না তা বলিনি, সে এখনো ফিরলাে না কেন তাই বলছি।
নীতিশের বুকের মাঝে অস্থির অপেক্ষা। সে উদগ্রীব হয়ে
ঘন ঘন বাইরের পানে চাইতে লাগলাে।
সহদেব নীতিশের কথায় লজ্জিত একটু হয়েছিল, কিন্তু
তার চেয়ে বেশী হলাে আশ্বস্ত। ভাগ্যি নীতিশ বলেনি
যে ললিতাকে সে ভালবাসে, তাহলে সহদেব কী বলতাে, কী
করতাে সে !
সহদেবের মনে অনেক কথা জমা হয়েছিল, নীতিশকে
একা পেয়ে অনেক কথাই সে বলতে চেয়েছিল, এবং আরম্ভও
করেছিল, কিন্তু মাঝ পথে এসে সব তালগােল পাকিয়ে গেল।
যা জানতে চেয়েছিল, সবই গুলিয়ে গেল। সে সজোরে ঘন
ঘন সিগারে টান দিতে লাগলো।
নীতিশ তার ভাবান্তর লক্ষ্য করলে কিনা কে জানে, কিন্তু
তাকে ভারী অন্যমনস্ক মনে হলাে।
দু’জনে চুপচাপ বসে থাকা ভারী বিশ্র।
একজ• চেয়ে
আছে বাইরের বৃষ্টিধারার পানে, একজন দেখছে অবারিত
আকাশবুকে মেঘের চপললীলা।
প্রায়ান্ধকার ঘরের মাঝে এমনি নিঃশব্দে ব'সে ব'সে একসময়
হাঁপিয়ে উঠে সহদেব জিগগেস করলে, নীতিশবাবু, আপনি
কিসে এম, এ, ?
একশাে ষােল
ঝিকিমিকি
—ইংরেজী সাহিত্যে।
—ফাষ্ট ক্লাস পেয়েছিলেন ?
—আজ্ঞে না, সে সৌভাগ্য হয় নি।
হয় নি। তাহলে আর স্কুলে
মাষ্টারি করতে হতাে না, একটা প্রােফেসারি পাবার আশা
থাকতো। সেকেণ্ড ক্লাস ফাষ্ট হয়েছিলুম।
বলে সহদেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললে। সহসা
উঠে ঘরের মেঝেয় পায়চারী করতে করতে সে জিগগেস করলে,
আপনার আর কে আছে, নীতিশ বাবু ?
—আজ্ঞে, কেউ না। আমি আমার পিতামাতার একমাত্র
সন্তান। যখন আমার বয়স আট বছ; সেই সময় একদিনে
আমার বাপ মা দু’জনেই স্বর্গারােহণ করেন।
-একদিনে ? কী রকম?
—আজ্ঞে হঁা, আমার পিতার মৃত্যুর মিনিট কয়েক পূর্বে
তিনি আত্মহত্যা করেন। এবং এক চিতায় দু’জনকে দাহ করা
সেকালে যেমন সতীদাহ হতাে। সংসারে আর এমন
কেউ ছিল না যে আমার ভার নিয়ে আমায় প্রতিপালন করে।
আশ্রয় বলতে, আত্মীয় বলতে, সমাজ বলতে আমার কিছুই ছিল
না।
সহদেব জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিয়ে নীতিশের মুখের পানে চাইলে।
নীতিশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। সে বললে, ছিল না যে
কেউ তা নয়, ছিল সবাই; কিন্তু কেউই তাদের আশ্রয় দেয় নি,
কেন জানেন ? তাদের বিয়ে হয়নি, লােকাচার তার মানেন
একশাে সতের
ঝিকিমিকি
নি। ধৰ্ম্ম মতে তারা ছিলেন স্বামী-স্ত্রী, কিন্তু সমাজ সে বিবাহ
অনুমােদন করে নি। অসবর্ণ বিয়ে সমাজ অগ্রাহ্য করলে
কারণ সে বিয়ের ভিত্তি ছিল প্রেম, মন্ত্র নয়।
-তাই নাকি ?
সহদেব বিস্ফারিত দৃষ্টি দিয়ে নীতিশের মুখের পানে চাইলে।
নীতিশ বললে, আজ্ঞে হ্যা। জানিনা আমার সম্বন্ধে আপনি
কি ভাবছেন, সংসারে বিধাতা পাঠালেন অনাদরে, সমাজ দেখলে
ঘুণার চোখে, কিন্তু তবুও আমার পিতামাতার কথা মনে হলে
গৌরবে ও গর্বে আমার বুকখানা ফুলে ওঠে। মা ছিলেন আমার
সতী।
নীতিশ সহসা থামলাে। সহদেব নিঃশব্দে অপলকদৃষ্টি দিয়ে
'তার পানে চেয়ে রইলাে।
নীতিশ বললে, তারপর এই দীর্ঘ পনেরোটি বচ্ছর নিজের
ওপর নির্ভর করে কী ভাবে যে দেহ ও মনকে একত্র রেখেচি,
সে একটা ইতিহাস !
—ইতিহাস বলবেন পরে এখন ওষুধ খাবার সময় হয়েছে,
দয়া করে ওষুধটা খেয়ে ফেলুন দিকি—
পাশের ঘরে ললিতার কণ্ঠস্বর শােনা গেল। দু’জনে চেয়ে
দেখলে ললিতা পাশের ঘরে দরজার কাছে দাড়িয়ে চুলগুলো
পিঠের ওপর এলিয়ে দিয়ে শুকনাে
তােয়ালে দিয়ে
মুছচে।
সহদেব জিগগেস করলে, খুব ভিজেছো ?
একশাে আঠারাে
ঝিকিমিকি
—তা একটু ভিজেছি বৈকি। শীতের দিনের বৃষ্টি বলেই যা,
নইলে বৃষ্টির মুখে ভেজার আনন্দ আছে।
নীতিশ বললে, অসুখ হবারও ‘চান্স’ যথেষ্ট আছে।
এলে তুমি ?
ললিতা উত্তর দিল, অনেকক্ষণ এসেছি, দরজার পাশে দাড়িয়ে
দাড়িয়ে তােমার ইতিহাস শুনছিলুম।
নীতিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ।
ললিতা বললে, ওষুধটা খেয়ে নাও। আমি আলো জ্বেলে
অনি আর একটু চা তৈরী করি ।
ললিতা গুন্ গুন্ করে কি একটা গান গাইতে গাইতে ঘর
হতে চলে গেল।
সহদেব উঠে দাড়িয়ে ঘরের মেঝেয় পায়চারী করতে
লাগলো।
পাশের বারন্দা হ’তে অস্পষ্ট গানের সুর ভেসে এলাে :
ললিতা গাইছে ।
মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে,
আমায় কেন বসিয়ে রাখো একা ঘরের পাশে ।
নীতিশ একটু হেসে বললে, ইস্, শ্ৰীমতীকে আজ হঠাৎ
গানে পেয়ে বসলো যে! ব্যাপার কি বলুন তাে, মিঃ সরকার ?
সহদেব থমকে দাড়ালাে।
দাড়ালাে। মনের উদ্বেগ চাপা দেবার
জন্যে সে কথা বলতে চাইলে, কিন্তু কথা জোগাল না।
নীতিশ বলে, মনে বাদল হাওয়ার ছোয়াচ লাগলো নাকি ?
একশাে উনিশ
ঝিকিমিকি
সহদেব প্রবল বেগে মাথা নেড়ে শুধু হাসলে।
নীতিশ বাইরের পানে তাকালে। বৃষ্টি থেমে গেছে। ভিজে
ভারী মেঘে আকাশটা থমথম্ করচে। ভিজে গাছের পাতা হতে
ফোটায় ফোটায় জল ঝরে পড়চে ! পাথরের বুক বেয়ে
চড়াই হ’তে জল নামচে ক কল শব্দ করে। স্তব্ধ অন্ধকারের
বুকে সেই শব্দ ধারালাে হয়ে উঠচে সমুদ্র কল্লোলের মতাে।
নীতিশ একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, সহসা সহদেব
এসে তার কাঁধের ওপর একখানা হাত রেখে উত্তেজনার কণ্ঠে
বলে, নীতিশ বাবু, আপনি এক কাজ করুন না ।
নীতিশ তার কণ্ঠস্বরে চমকে উঠে বলে, বলুন।
-আপনি বিলেত যান না। সেখানকার একটা ডিগ্রী নিয়ে
ফিরতে পারলে অনেকখানি সুবিধে হতে পারে।
নীতিশ বিহ্বল বিস্ময়ে তার মুখের পানে চেয়ে বললে,
আপনি কি আমাকে উপহাস করচেন মিঃ সরকার? সামান্য
একটা স্কুল মাষ্টার আমি! আশী টাকা সই করে যাট, টাকা
মাইনে আমার বরাদ্দ, আমার বিলেত যাওযার স্বপ্ন দেখা দুরাশা
নয় কি ?
বলতে বলতে চোখ দু’টী তার ছল ছলিয়ে এলাে। ব্যাপারটা
যে এমনি বিশ্রী ও অসম্মানজনক হয়ে দাড়াবে সহদেব ভাবতেও
পারেনি।
ব্যাপারটাকে সহজ করে নেবার জন্যেই সহদেব সহসা
নীতিশের পিঠ চাপড়ে বলে, তা কথাটা মিছে নয়, বিলেত
একশাে কুড়ি
ঝিকিমিকি
যাবার কথা উঠলেই, প্রথমে মনে জাগে ঐ খরচের ভাবনাটা।
নীতিশ গম্ভীর হয়ে বলল, নিশ্চয়ই।
সহদেব হো হো করে হেসে ঘরখানাকে কাপিয়ে
তুললে
একটা ট্রেতে চা আর বিস্কুট নিয়ে ললিত ঘরের মাঝে
এসে থমকে দাড়ালো : সহদেবর হাসির কারণটা নির্ণয় করতে
তাকে বেশ একটু বেগ পেতে হলো।
ললিতা টেখানা নামিয়ে জিগগেস করলে, ব্যাপারটা কী?
নীতিশ বললে, ব্যাপারটা এমন কিছু শক্ত নয়, কুঁজোর
চিৎ হয়ে শশাওয়ার ব্যাপার। রাণাঘাট হাই স্কুলের মাষ্টার
‘হয়ার স্টাডির জন্যে য়ুরোপ যাচ্ছে।
সহদেব গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলে, আর তার সমস্ত ব্যয়ভার
বহন করচে সহদেব সরকার।
ললিতা একখানা চে'র টেনে নিয়ে বসলো এবং একখানা
বিস্কুটে কামড় দিয়ে বললাে, ক্ষিদেয় 'অনার পেট জ্বলে যাচ্ছে,
মাপ চাইচি, আমি অপেক্ষা করতে পারলুম না। মশায়র।
যতক্ষণ স্বপ্ন দেখবেন, আমি ততক্ষণ দু’ পেয়ালা চা নিঃশেষ
করে ফেলবাে।
সহদেব বললে, আমাদের হাতে কোন আপত্তি নেই। তবে
এ কথা সত্যি,নীতিশ বাবু বিলেত চলেন, একটু শরীরটা সারলেই।
চায়ের একটা পেয়ালা তুলে নিয়ে সহদেব বললে, আপনি
মন ঠিক করে ফেলুন নীতিশ বাবু। অন্য কোন চিন্তা আপনাকে
করতে হবে না—সেখানে গিয়ে কি পড়বেন ঠিক করুন।
একশাে একুশ
ঝিকিমিকি
ললিতা চায়ের বাটীতে চুমুক দিতে দিতে চোরা চাউনীতে
সহদেবকে কুটি করলে।
সহদেব বললে, হাঁ, একটা কথা বলা ভালাে নীতিশবাবু,
আপনার যদি মনে কোন রকম সঙ্কোচ জাগে যে আপনি আমার
টাকা নেবেন কেন, তাহলে তার উত্তরে আমি বলবাে, এ টাকা
অমি আপনাকে দেব বৃত্তি হিসেবে।
নীতিশ ও ললিতা মুখ চাওয়া চাওয়ি করলে।
সহদেব সহসা ললিতার একখানা হাত ধরে বললে, কী
বলো তুমি ললিতা, তােমার কি মত? অমন একটা জীবন
কেন অনর্থক নষ্ট করবেন ?
ললিতা সহসা সহদেবের মুখের পানে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে
চেয়ে থেকে বলে, আচ্ছা সরকার মশায়, কতো টাকা আপনার
আছে যে আপনি নীতিশ বাবুকে বিলেত পাঠাবেন, আবার
আমাকে সেক্রেটারী রাখবেন আড়াইশাে টাকা মাইনে দিয়ে ?
সহদেবের মুখখানা সহসা আরক্ত হয়ে উঠলো, সে কম্পিত
ঝাঝালো গলায় উত্তর দিলে, যদি জানাবার দিন আসে তােমায়
জানাবাে একদিন, সে কথা জানবার জন্যে এত ব্যস্ত কেন ?
সহদেব উঠে দাড়ালো এবং ধীরে ধীরে কোন কিছু না
বলে ঘর হতে বেরিয়ে গেল।
নীতিশের কাছে সরে গিয়ে ললিতা বলে, কী ভাবছো ?
ও সব কথা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না, ও যেমন পাগল ।
—পাগল বলে কিন্তু আমার মনে হয় না, তাই আমি
একশাে বাইশ
ঝিকিমিকি
ভাবছি, আশ্চর্য্য! মানুষের দারিদ্র্য অনুমান করা যত সহজ,
আসল মূল্য অনুমান করা তত সহজ নয় !
ললিতা বললে, যত বেশী সূক্ষ্ম করে কথাটাকে ভাবচে।
আসলে ওটা তত সূক্ষ্মা নয়। সামান্য একটা ছােট্ট ব্যাপার থেকেই
এর মীমাংসা করা যায়। যেমন, অসাধারণ যদি কিছু হতে
তাহলে এখানে মনােহারী দোকান করতাে না।
নীতিশ বললে, ও যুক্তির কোন অর্থ হয় । টাকা
আছে বলে টাকা রোজগার করবে না, এটা হচ্ছে আমাদের
মতাে যারা, তাদের যুক্তি,-অপরের নয়। আমার এক বন্ধু
বলেছিল, এখনো একটা রিষ্ট ওয়াচ রয়েছে, এবং একটা
পারকারের কলম রয়েচে, অতএব দু’চার দিন ভাববার কোন
দরকারই নেই।
ললিতা বাধা দিয়ে বললে, ভারী নতুন কথা বলে, আমার
এক বন্ধু আংটি বিক্রী করে কাটলেট আর বিয়ার খেয়েছিল।
একশাে তেইশ
যােল
সেই দিন রাত্রে।
নীতিশ অকাতরে ঘুমুচ্চে। পাশের ঘরে ললিতা পড়বার
চেষ্টা করছিল, কিন্তু মন বসছিল না। সহদেব ঘুমিয়েছে কিনা
দেখবার জন্যে হঠাৎ ললিতা সহদেবের ঘরের দোরে
ধাক্কা
দিলে। দরজা ভেতর হতে বন্ধ ছিল না, ধাক্কা দিতেই খুলে
গেল। দেখলে, ঘরে আলাে জ্বলছে, বিছানার ওপর সহদেব
পাথরের মত স্তব্ধ হয়ে বসে আছে । দরজা খােলার শব্দে সহদেব
ধড়মড়িয়ে উঠে দাড়ালো, এবং ললিতার কাছে ধরা পড়বার
ভয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলে। কিন্তু ললিতার তীক্ষ দৃষ্টি
সে এড়াতে পারলে না, ললিতা দেখলে সহদেবের চোখে
জল। ললিতা মুহূৰ্ত্ত থমকে দাড়ালো, সহদেব চকিতে কেঁচার
খুটে চোখের জল মুছে নিলে ।
ললিতা কোন কিছু না বলে ধপ করে সহদেবের বিছানার
প্রান্তে বসে পড়লাে।
সহদেব ভাঙ্গা গলায় জিগ্গেস করলে,এত রাত্রে উঠে এলে যে ?
একশাে চব্বিশ
ঝিকিমিকি
ললিতা গম্ভীর গলায় উত্তর দিলে, তুমি ডাকছিলে যে !
-কই না !
আবার মিছে কথা ? ললিতা ধমক দিলে ।
সহদেব থতিয়ে গেল, উত্তর দিতে পারলে না।
ললিতা তার একখানা হাত ধরে বললে, বসাে।
সহদেব অভিভূতের মত ললিতার পাশে বসলাে। ললিতার
হাতের মাঝে সহদেবের হাতখানা ঠক ঠক করে কেঁপে উঠলে।।
ললিতা নচু গলায় জিগগেস করলে, বলে ডাকনি ।
তবে কি না ডাকতেই আমি এসেছি ?
সহদেব শুধু বিলের মত তার মুখের পানে চাইলে ।
ললিতা বললে, বলাে না ডাকছিলে কিনা ? ডাকছিলে
সহদেব মন্ত্রাভিভূতের মত ঘাড় •াড়লে, হ্য।।
ললিতা সকরুণ সুরে বললে, তা আমি জানি, তাই আমার
পড়ায় নন বলে না, উঠে এলুম।
সহদেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার বুকের মাঝে অনন
নিবিড় হয়ে এল, কন্ন! স্তব্ধ হয়ে গেল।
ললিতা আবার বললে, আরো গোটা কয়েক তােমার মনের
কথা আমি জানতে চাই, বনে কি ?
-বলবো। আজ তোমাকে কোন কথা লুকবাে না ।
—নীতিশকে তুমি অমন করে নাচা কেন ?
–আমি ? নীতিশকে নাচাচ্চি।
একশাে পঁচিশ
ঝিকিমিকি
-তবে না তাে কি আমি ! তুমি তাকে য়ুরোপ পাঠাচ্চো।
-তুমি অন্য রকম ভাবতে পার, আমি কিন্তু মােটই অন্য
রকম ভাবি নি।
তার মানে ? আমায় বিশ্বাস করতে বলে যে তুমি
টাকা খরচ করে ওকে বিলেত পাঠাবে ?
—অবিশ্বাস করবার এর মাঝে কিছু আছে কি?
—ধরলুম নেই, এবং তোমার যথেষ্ট টাকা আছে, কিন্তু ওর
জন্যে খরচ করবে কেন ?
সহদেব প্রথমটা কি উত্তর দেবে ভেবে পেলে না, একটু
ভেবে বললে, তার মাঝে আমার স্বার্থ আছে, গভীর স্বার্থ আছে ।
–কি রকম?
-তােমাকে পাবার পথটা সহজ করে আনা। তােমার
কাছ থেকে তাকে দূরে পাঠানাে।
ললিতা স্তব্ধ একাগ্র দৃষ্টি দিয়ে সহদেবের পানে চেয়ে
রইল।
সহদেব হাসতে হাসতে বললে, অবাক হয়ে ভাবচো কতো
হীন আমি, কিন্তু উপায় নেই। অনিশ্চিতের মধ্যে ধাঁধায়
পড়ে দিন কাটানাে যায় না। লােভ বেশী তােমার পের, টাকার
মায়া করলে চলবে না।
—অর্থাৎ ঘুষ দিয়ে ওর কাছ থেকে আমায় আদায় করতে
চাও ?
1, ঠিক তা নয়। ওর কাছ থেকে তােমাকে ভিক্ষাও
একশাে ছাব্বিশ
ঝিকিমিকি
চাইবাে না, জোর করে ছিনিয়েও নেব না।
তোমার সত্তা যদি
স্বাধীন না হয়, তাহলে আমি তােমায় চাইবে না।
-আমি তাে তা বলিনি।
ললিতা লজ্জিত হয়ে পড়লাে।
সহদেব বললে, তবে তুমি কেন বলতো ওর কাছ থেকে
তােমায় আদায় করতে হবে।
—তবে তুমিই বা ওকে দাম দেবে কেন ?
—আমি দাম দিচ্ছি না। আমাদের মাঝে ও আমি
সইতে পারছি না, তাই ওকে দূরে সরতে চাইচি।
ললিতা হাসলে। বললে, কিন্তু ও তাে আমাদের কে
ক্ষতি করেনি।
-ও তােমায় চায় বা তােমার আশা রাখে।
—আর আমি ?
—তোমার কথাও তাে আমি জানতে চাই ; আমার জান
দরকার।
—অবিশ্যি । যদি বলি আমি সারা জীবন তোমায় সুখী
করবার চেষ্টায় প্রাণপাত করবাে, তােমায় জীবনে কখনো কি
দেব না, তবুও কি তুমি ওর ভয় করবে?
—কিন্তু ওকে দূরে পাঠাতে তোমার আপত্তি আছে ? ওকে
যদি তুমি না ভালবাসে, না চাও তবে তুমিই বা ওকে নিয়ে
এই নিষ্ঠুর খেলা খেলচো কেন ?
খেলা খেলচো কেন ? ওকে ধরে রাখচো কেন ?
-ও তাে আমায় তেমন ভাবে চায় না, ওর সঙ্গে আমার
একশাে সাতাশ
ঝিকিমিকি
পাঁচ বছরের আলাপ, কিন্তু কোন দিন তো আমাকে সে আভাস
দেয় ।। ও মাটির মানুষ, ওর ওপর কোন রকম অত্যাচার
করতে আমার মন ওঠে না। তবে ওকে মেনে নিতে হয়,
ওকে কাছে না পেলে আমার চলবে না, ওর মনের সঙ্গে মিশে
স্বপ্ন হয়েই থাকবাে। আসল মানুষটাকে চাইবাে না।
—চাইতে গেলে ললিতা সবটাই চাইতে হয়, খানিকটা বাদ
দিয়ে চাওয়া চলে না।
ললিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, আচ্ছা দু’জনকে
ভালবাসা চলো না ?
সহদেব নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লে।
ললিতা অশান্ত হয়ে বললে, কেন চলে না? দুজনকে নিয়ে
সংসার পাতা চলে না হয়তাে, কিন্তু তাই বলে দুজনকে ভালবাসা
চলে না কেন?
—কিন্তু দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হয়।
—তা যেন হয় একটা বাসা বাঁধবার জন্যে, কিন্তু দুজনকে মন
দিয়ে ভালবাসা চলবে না কেন?
সহদেব অসহিষ্ণু কণ্ঠে উত্তর দিল, তা না হয় চলতে পারে,
কিন্তু তুমি কি বলতে চাও, বলোনা
-তুমি ভয় করােনা। তােমায় আমি কোনদিন দুঃখ
দিতে পারবাে না। ওর সঙ্গে আমার নেওয়া-দেওয়ার কোনাে
সম্বন্ধ নেই, ওকে একেবারে আমার কাছ ছাড়া করতে চেওনা, ও
বড় নিঃসহায়।
একশাে আটাশ
ঝিকিমিকি
ললিতা সহসা সহদেবের কোলের ওপর মুখ গুজে ফুপিয়ে
*পিনে বালিকার মতাে কাদলে।
সহদেব তার বিস্রস্ত চুলের মাঝে হাত ডুবিয়ে অবাক হয়ে
বসে রইল।
পরদিন।
ললিতার উঠতে অনেকখানি বেলা হয়ে গেল। বাইরে
এসে দেখলে বারাণ্ডায় নীতিশ পায়চারি করচে। সহদেবের
ঘরের মাঝে এসে সহদেবকে খুজে পেলে না। নীতিশও কোন
সন্ধান দিতে পারলে না।
শূন্য ঘরখানার মাঝে ঢুকে ললিতা থমকে দাড়ালাে। আতঙ্কে
তার বুকখানা কেঁপে উঠলো। টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে
একখানা খােলা চিঠি। কম্পিত হাতে চিঠিটা তুলে নিয়ে ললিতা
লােহার খাটখানার উপর বসে পড়লাে। খাটখানা সশব্দে
আর্তনাদ করে উঠলো।
চিঠিখানা এই :—
ভয় করােনা, কোন প্রার্থনা নেই, কোন নালিশ নেই
ললিতা! তােমায় মুক্তি দিয়ে এখান হতে পালিয়ে চললুম।
তুমি আমায় হাত ধরে পথের মাঝে টেনে এনে যাত্রা শুরু
করিয়েছিলে, তােমার সঙ্গে পথ চলে জীবনে যে-আনন্দের
স্বাদ অপরিচিত ছিল তার আস্বাদ পেয়েছি। তবে যেখানে
একশাে উনত্রিশ
ঝিকিমিকি
পৌছবাে বলে যাত্রা শুরু করেছিলুম, সেখান পৰ্যন্ত যেতে
তােমার পা উঠলো না। মাঝ পথে থমকে দাড়ালে, পিছন
ফিরে।
তােমার মাঝে যে রত্ন আবিষ্কার করেছিলুম, তা চাইনি
বলে চলে যেতে পারি, এমন শক্তি বা অহঙ্কার নেই। তুমি
আমার জীবনের পরম বন্ধু, পরমাত্মীয়।
এ বন্ধুত্বের দাম
দিতে পারি এমন সঙ্গতি আমার নেই। নীতিশকে সুখী
করাে, জীবনের সমস্ত সম্পদ দিয়ে তাকে মেনে নিয়ে।
জীবনের শেষ দিনটি পৰ্যন্ত তােমার স্মৃতিটুকু বীজমন্ত্রের
মতো জপ করবাে। তােমার প্রতিবিম্ব যা আমার মনের
আয়নায় জ্বল জ্বল করছে তার পানে চেয়েই আমার বাকি
জীবন কাটবে।
সহসা আমায় পথ বদলাতে হলাে, তার জন্যে ধাক্কা খেতে
হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু এখানকার এই ক’টি দিনের আনন্দ যা তুমি
পরিবেশন করেছিলে তার চেতনাই আমার সকল ব্যথাকে রঙীন
করে রাখবে।
আমি নীতিশকে বিলেত পাঠাতে চেয়েছিলুম, তােমার
কাছ হতে দূরে সরিয়ে দিয়ে তােমাকে পাবার পথটী সহজ করে
নেবার জন্যে, কিন্তু তার প্রয়ােজন নেই। তােমাকে তারই
হাতে দিয়ে যাচ্চি, তার যতটুকু পরিচয় এ কদিনে পেয়েছি,
তাতে আমার মনে হয় তােমাকে তার চেয়ে বেশী যত্ন করতে
কেউ পারবে না।
তাকে য়ুরােপ যাত্রার ব্যবস্থা করতে
একশাে ত্রিশ
ঝিকিমিকি
ব’লাে, এ আমার অনুরােধ, এবং সঙ্গে যেও তুমি। যাবার
আগেই বিয়ের ব্যাপারটা এইখানে সেরে যেও। আমার তরফ
হতে যা প্রতিজ্ঞা করেছি তা সেখানে গিয়েই আমি ব্যবস্থা
করবো।
আমার খোজ করাে না। তােমর, এখান হতে চলে
গেলে আবার আমি এখানে ফিরে আসবো, এবং বাকী
দিনগুলাে এখানেই কাটাবাে। এখানকার দোকান-যেখানে
হাতড়ে হাতড়ে তােমায় আবিষ্কার করেছি, সেটা আমার
কাছে মন্দিরের মতাে পবিত্র, তাই সে বাড়ীটি আমি কিনে
নিয়েচি, অবশ্য খুব চড়া দামে।
আমার কথা ভেবে যেন তােমাদের প্রেম বিস্বাদ হয়ে না
ওঠে, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা। তুমি সুখী হও, ললিতা
বন্ধু আমার ! বিদায়।
সহদেব সরকার
চোখের জলে ললিতার সামনের সবই অন্ধকার হয়ে এল।
মুখের সমস্ত রক্ত গেল উবে, পাথরের মূর্তির মত সাদা গাল
বেয়ে দরদর ধারে অশ্রু গড়িয়ে পড়লাে। মনের মাঝে
উঠলাে সহদেবের ব্যথিত কুণ্ঠিত মূৰ্ত্তি !
নীতিশ কখন এসে ঘরের মাঝে দাঁড়িয়েছে ললিতা তা
জানতে পারে নি, জানতে পারলে, যখন সে তার কোলের উপর
তুলে
হতে চিঠিখানা
নিলে।
একশাে একত্রিশ
ঝিকিমিকি
ললিতা নীতিশের মুখের পানে চেয়ে ভেঙ্গে পড়লাে। দুহাতে
মুখ ঢেকে সে অঝােরে কাঁদলে।
নীতিশের মুখে কথা জোগালে। না, সে স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে
রইলাে।
সপ্তাহ পরে রেজেষ্টারী ডাকে একখানা চিঠির সঙ্গে খুব বড়
এখানা খাম এলাে। ললিতা নীতিশের মুখের পানে তাকিয়ে
সই করে নিলে।
চিঠি খুলে দেখলে, কলিকাতার এক এটর্নি বাড়ী হতে চিঠি
এসেচে। সহদেব সরকারের এটর্ণি তাদের অফিসে দেখা করবার
জন্যে এদের অনুরােধ করেছে। মি: সরকার তাদের বিলাত
যাত্রার ব্যবস্থা করবার জন্যে তার এটর্ণিকে সমস্ত উপদেশ
দিয়ে গেছেন এবং টমাস কুকের ব্যাঙ্কে টাকা গচ্ছিত রেখে
গেছেন। তাদের উপদেশ পেলেই এটর্ণি তাদের যাত্রার ব্যবস্থা
করবেন।
দ্বিতীয় বড় খামখানি খুলে দেখা গেল, একখানি দান পত্র।
তাদের বিবাহের যৌতুক স্বরূপ তিনি ভবানীপুর বেলতলা
রােডের একখানি সুবৃহৎ বাড়ী তাদের দান করেছেন।
তার দাম হবে আন্দাজ পঞ্চাশ হাজার টাকা। এটর্নি
লিখেছে, তারা ফিরলেই তিনি তাদের
বাড়ীর দখল
দেবেন।
ললিতা নীতিশের মুখের পানে চাইলে, বিস্ময়ের আতিশয্যে।
নীতিশের অশ্রুভরা চোখে তার চেয়েও প্রচণ্ড বিস্ময়।
ললিতা সইতে পারলে না, সে নীতিশের কোলের উপর
মূৰ্জিত হয়ে পড়লাে।
শেষ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.