Makardah Saraswat Library, Howrah

Jagannather Rath Ed. 2nd

Sri, Arabinda · 2009/07/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

১৪৩০১,
জগন্নাথের রথ
শ্ৰীঅরবিন্দ
১৩৩৯
রামেশ্বর এণ্ড কোং
চন্দননগর

প্রকাশক
রামেশ্বর দে
চন্দননগর
প্রথম সংস্করণ
দ্বিতীয় সংস্করণ
আশ্বিন ২৮
মাঘ
প্রিন্টার—শ্রীশশধর ভট্টাচার্য্য
মাসপয়লা প্রেস
৯০৩ মেছুয়াবাজার স্ট্রীট কলিকাতা

বিষয়
জগন্নাথের রথ
আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয়
হিরােবৃমি ইতাে
দুর্গা-স্তোত্র
স্বপ্ন

No text on this page.

জগন্নাথের রথ
আদর্শ সমাজ মনুষ্য-সমষ্টির অন্তরাত্মা ভগবানের
বাহন, জগন্নাথের যাত্রার রথ। ঐক্য স্বাধীনতা
জ্ঞান শক্তি সেই রথের চারি চক্র।
মনুষ্যবুদ্ধির গঠিত কিম্বা প্রকৃতির অশুদ্ধ
প্রাণস্পন্দনের খেলায় সৃষ্ট যে সমাজ, তাহা
অন্য প্রকার । এটি সমষ্টির নিয়ন্তা ভগবানের
রথ নহে, মুক্ত অন্তর্যামীকে আচ্ছাদিত করিয়া
যে বহুরূপী দেব ভগবৎ-প্রেরণাকে বিকৃত

জগন্নাথের রথ
করে, ইহা সমষ্টিগত সেই অহঙ্কারের বাহন।
এটি চলিতেছে নানা ভােগপূর্ণ লক্ষ্যহীন কৰ্ম্মপথে,
বুদ্ধির অসিদ্ধ অপূর্ণ সঙ্কল্পের টানে, নিম্নপ্রকৃতির
পুরাতন বা নূতন অবশ প্রেরণায়। যতদিন
অহঙ্কারই কর্তা, ততদিন প্রকৃত লক্ষ্যের সন্ধান
পাওয়া অসম্ভব,—লক্ষ্য জানা গেলেও সেদিকে
সােজা রথ চালান অসাধ্য। অহঙ্কার যে
ভাগবত পূর্ণতার প্রধান বাধা, এই তথ্য যেমন
ব্যষ্টির, তেমনই সমষ্টির পক্ষেও সত্য।
সাধারণ মনুষ্যসমাজের তিনটি মুখ্য ভেদ
লক্ষ্য করা যায়। প্রথমটি নিপুণ কারিগরের
সৃষ্টি, সুঠাম চাকচিক্যময় উজ্জ্বল অমল সুখকর,
তাহাকে বহিয়া লইয়াছে বলবান্ সুশিক্ষিত
অশ্ব, সে অগ্রসর হইতেছে সুপথে সযত্নে
ত্বরাহিত অমন্থর গতিতে। সাত্ত্বিক অহঙ্কার
ইহার মালিক আরােহী। যে উপরিস্থ উত্তঙ্গ
প্রদেশে ভগবানের মন্দির, রথ তাহারই চারি-
দিকে ঘুরিতেছে, কিন্তু কিছু দূরে দূরে রহিয়া,

জগন্নাথের রথ
৭
সেই উচ্চভূমির খুব নিকটে সে পেঁৗছিতে পারে
। যদি উঠিতে হয়, তবে রথ হইতে নামিয়া
একা পদব্রজে উঠাই নিয়ম। বৈদিকযুগের
পরে প্রাচীন আৰ্যদের সমাজকে এই ধরণের
রথ বলা যায়।
দ্বিতীয়টি বিলাসী কৰ্ম্মঠের মােটরগাড়ী।
ধূলার ঝড়ের মধ্যে ভীমবেগে ব্ৰজনির্ঘোষে
রাজপথ চূর্ণ করিয়া অশান্ত অশ্রান্ত গতিতে
সে ধাইয়াছে, ভেরীর রবে শ্রবণ বধির, যাহাকে
সম্মুখে পায় দলিয়া পিষিয়া চলিয়া যায় ।
যাত্রীর প্রাণের সঙ্কট, দুর্ঘটনা অবিরল, রথ
ভাঙ্গিয়া যায়, আবার কষ্টেসৃষ্টে মেরামতের
পর সদর্প চলন। নির্দিষ্ট লক্ষ্য নাই, তবে যে
নূতন দৃশ্য অনতিদূরে চোখের সম্মুখে পড়ে,
“এই লক্ষ্য, এই লক্ষ্য” চীৎকার করিয়া রথের
মালিক রাজসিক অহঙ্কার সেই দিকে ছুটে। এই
রথে চলায় যথেষ্ট ভােগ সুখ আছে, বিপদও
অনিবাৰ্য, ভগবানের নিকট পৌছা অসম্ভব।

৮ জগন্নাথের রথ } আধুনিক পাশ্চাত্যসমাজ এই ধরণেরই মােটর- গাড়ী। তৃতীয়টি মলিন পুরাণ কচ্ছপগতি আধভাঙ্গা গরুরগাড়ী, টানে কৃশ অনশনক্লিষ্ট আধমরা বলদ, চলিতেছে সঙ্কীর্ণ গ্রাম্যপথে ; একজন ময়লাকাপড়পরা ভুড়িসর্বস্ব শ্লথ অন্ধ বৃদ্ধ ভিতরে বসিয়া মহাসুখে কাদামাখা হুকা টানিতে টানিতে গাড়ীর কর্কশ ঘ্যান্‌ ঘ্যান্ শব্দ শুনিতে শুনিতে অতীতের কত বিকৃত আধ আধ স্মৃতিতে মগ্ন। এই মালিকের নাম তামসিক অহঙ্কার। গাড়ােয়ানের নাম পুথি-পড়া জ্ঞান, সে পঞ্জিকা দেখিতে দেখিতে গমনের সময় ও দিক নির্দেশ করে, মুখে এই বুলি “যাহা আছে বা ছিল, তাহাই ভাল, যাহা হইবার চেষ্টা তাহাই খারাপ।” এই রথে ভগবানের নিকট না হৌক শূন্য ব্রহ্মে পৌছিবার বেশ আশু সম্ভাবনা আছে। তামসিক অহঙ্কারের গরুর গাড়ী যতক্ষণ

জগন্নাথের রথ
৯
গ্রামের কাচাপথে চলে, ততক্ষণ রক্ষা। যেদিন
জগতের রাজপথে সে উঠিয়া আসিবে যেখানে
ভূরি ভূরি বেগদৃপ্ত মােটরের ছুটাছুটি, তখন
তাহার কি পরিণাম হইবে, সে কথা ভাবিতেই
প্রাণ শিহরিয়া উঠে। বিপদ এই যে রথ
বদলানের সময় চেনা বা স্বীকার করা তামসিক
অহঙ্কারের জ্ঞান শক্তিতে কুলায় না। চিনিবার
প্রবৃত্তিও নাই, তাহা হইলে তাহার ব্যবসা ও
মালিকত্ব মাটি। সমস্যা যখন উপস্থিত, যাত্রীদের
মধ্যে কেহ কেহ বলে “না থাক, ইহাই ভাল,
কেননা ইহা আমাদেরই”—তাহারা গোড়া
অথবা ভাবুক দেশভক্ত। কেহ কেহ বলে,
“এদিক ওদিক মেরামত করিয়া লও না”—এই
সহজ উপায়ে নাকি গরুরগাড়ী অমনি অনিন্দ্য
অমূল্য মােটরে পরিণত হইবে;—ইহাদের নাম
সংস্কারক। কেহ কেহ বলে, “পুরাতন কালের
সুন্দর রথটি ফিরিয়া আক”—তাহারা সেই
অসাধ্য সাধনের উপায়ও খুঁজিতে মাঝে মাঝে

জগন্নাথের রথ
প্রয়াসী। আশার অনুরূপ ফল
যে হইবে,
তাহার বিশেষ কোন লক্ষণ কোথাও কিন্তু
নাই।
তিনটির মধ্যেই যদি পছন্দ করা অনিবার্য
হয়, আরও উচ্চতর চেষ্টা যদি আমরা পরিহার
করি, তবে সাত্ত্বিক অহঙ্কারের নূতন রথ নির্মাণ
করা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু জগন্নাথের রথ যতদিন
সৃষ্ট না হয়, আদর্শ সমাজও ততদিন গঠিত
হইবে না। সেইটিই আদর্শ, সেইটিই চরম,
গভীরতম উচ্চতম সত্যের বিকাশ ও প্রতিকৃতি।
মনুষ্যজাতি গুপ্ত বিশ্বপুরুষের প্রেরণায় তাহাকেই
গড়িতে সচেষ্ট, কিন্তু প্রকৃতির অজ্ঞানবশে
গড়িয়া বসে অন্যরূপ প্রতিমা—হয় বিকৃত অসিদ্ধ
কুৎসিত, নয় চলনসই অর্ধসুন্দর বা সৌন্দর্য্য
সত্ত্বেও অসম্পূর্ণ ; শিবের বদলে হয় বামন, নয়
রাক্ষস, নয় মধ্যম লােকের অর্পদেবতা।
জগন্নাথের রথের প্রকৃত আকৃতি বা নমুনা
কেহ জানে না, কোন জীবন-শিল্পী আঁকিতে

জগন্নাথের রথ
১১
পারগ নন। সেই ছবি বিশ্বপুরুষের হৃদয়ে
প্রস্তুত, নানা আবরণে আবৃত। দ্রষ্টা কা
অনেক ভগবদবিভূতির অনেক চেষ্টায় আস্তে
আস্তে বাহির করিয়া স্থূল জগতে প্রতিষ্ঠা করা
অন্তর্যামীর অভিসন্ধি ।
জগন্নাথের এই রথের আসল নাম সমাজ
নয়, সংঘ। বহুমুখী শিথিল জনসংঘ বা জনতা
নয় ; আত্মজ্ঞানের, ভাগবতজ্ঞানের ঐক্যমুখী
শক্তির বলে সানন্দে গঠিত বন্ধনরহিত অচ্ছেদ্য
সংহতি, ভাগবত সংঘ।
অনেক সমবেত মনুষ্যের একত্র কৰ্ম্ম
করিবার উপায় যে সংহতি, তাহাই সমাজ নামে
খ্যাত। শব্দের উৎপত্তি বুঝিয়া অর্থও বােঝ
যায়। সম্ প্রত্যয়ের অর্থ একত্র, অজ ধাতুর

১২ জগন্নাথের রথ অর্থ গমন ধাবন যুদ্ধ। সহস্র সহস্র মানব কৰ্ম্মার্থে ও কামাৰ্থে সমবেত, এক ক্ষেত্রে নানা লক্ষ্যের দিকে ধাবিত, কে আগে যায় কে বড় হয়, তাহা লইয়া ধ্বস্তাধ্বস্তি-competition- যেমন অন্য সমাজের সঙ্গে তেমন পরস্পরের সঙ্গেও যুদ্ধ ও ঝগড়াঝাটি—এই কোলাহলের মধ্যেই শৃঙ্খলার জন্য, সাহায্যের জন্য, মনােবৃত্তির চরিতার্থতার জন্য নানা সম্বন্ধ স্থাপন, নানা আদর্শের প্রতিষ্ঠা, ফলে কস্টসিদ্ধ অসম্পূর্ণ অস্থায়ী কিছু, ইহাই সমাজের, প্রাকৃত সংসারের চেহারা। ভেদকে ভিত্তি করিয়া প্রাকৃত সমাজ। সেই ভেদের উপর আংশিক অনিশ্চিত ও অস্থায়ী ঐক্য নির্মিত। আদর্শ সমাজের গড়ন ঠিক ইহার বিপরীত। ঐক্য ভিত্তি; আনন্দবৈচিত্র্যের জন্য—ভেদের নয়—পার্থক্যের খেলা। সমাজে পাই শারীরিক, মানসকল্পিত ও কৰ্ম্মগত ঐক্যের আভা আত্মগত ঐক্য সংঘের প্রাণ। ;

জগন্নাথের রথ চঞ্চল। আংশিকভাবে সঙ্কীর্ণক্ষেত্রে সংঘস্থাপনের নিষ্ফল চেষ্টা কতবার হইয়াছে, হয় তাহা বুদ্ধি- গত চিন্তার প্রেরণায়—যেমন পাশ্চাত্যদেশে, নয় নির্বাণােম্মুখ কৰ্ম্মবিরতির স্বচ্ছন্দ অনুশীল- নার্থে—যেমন বৌদ্ধদের, নয় বা ভাগবত ভাবের আবেগে—যেমন প্রথম খৃষ্টীয় সংঘ। কিন্তু অল্পের মধ্যেই সমাজের যত দোষ অসম্পূর্ণতা প্রবৃত্তি ঢুকিয়া সংঘকে সমাজে পরিণত করে। বুদ্ধির চিন্তা টেকে না, পুরাতন বা নূতন প্রাণ প্রবৃত্তির অদম্য স্রোতে ভাসিয়া যায়। ভাবের আবেগে এই চেষ্টার সাফল্য অসম্ভব, ভাব নিজের খরতায় পরিশ্রান্ত হইয়া পড়ে । নির্বাণকে একাকী খোজা ভাল, নির্বাণ- প্রিয়তায় সংঘসৃষ্টি একটা বিপরীত কাণ্ড। সংঘ স্বভাবতঃ কৰ্ম্মের, সম্বন্ধের লীলাভূমি। যেদিন জ্ঞান কৰ্ম্ম ও ভাবের সামঞ্জস্যে ও একীকরণে আত্মগত ঐক্য দেখা দিবে, সমষ্টি- গত বিরাটপুরুষের ইচ্ছাশক্তির প্রেরণায়, ২ ১৪ জগন্নাথের রথ সেদিন জগন্নাথের রথ জগতের রাস্তায় বাহির হইয়া দশ দিক আলােকিত করিবে। সত্য- যুগ নামিবে পৃথিবীর বক্ষে, মৰ্ত মানুষের পৃথিবী হইবে দেবতার খেলার শিবির, ভগবানের মন্দির-নগরী, temple city of God —আনন্দপুরী।

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয় ‘কারাগৃহ ও স্বাধীনতা' শীর্ষক প্রবন্ধে আমি কয়েকজন নিরপরাধী কয়েদীর মানসিক ভাব বর্ণনা করিয়া ইহাই প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিয়াছি যে, আৰ্যশিক্ষার গুণে কারাবাসেও ভারতবাসীর আন্তরিক-স্বাধীনতারূপ মহামূল্য পৈতৃকসম্পত্তি বিনষ্ট হয় না—উপরন্তু ঘাের অপরাধীর মধ্যেও সেই সহস্ৰবৰ্ষসঞ্চিত আৰ্য- চরিত্রগত দেবভাবও ভগ্নাবশিষ্টরূপে বর্তমান থাকে। আৰ্য্যশিক্ষার মূলমন্ত্র সাত্ত্বিকভাব। যে সাত্ত্বিক, সে বিশুদ্ধ, সাধারণতঃ মনুষ্যমাত্রেই অশুদ্ধ। রজোগুণের প্রাবল্যে, তমােগুণের ঘাের নিবিড়তায় এই অশুদ্ধি পরিপুষ্ট ও বর্ধিত জগন্নাথের রথ মনের মালিন্য দুই প্রকার,জড়তা, বা অপ্রবৃত্তিজনিত মালিন্য ; ইহা তমােগুণ- প্রসূত। দ্বিতীয়,উত্তেজনা, বা কুপ্রবৃতিজনিত মালিন্য ; ইহা রজোগুণপ্রসূত। তমােগুণের লক্ষণ অজ্ঞানমােহ, বুদ্ধির স্থূলতা, চিন্তার অসং- লগ্নতা, আলস্য, অতিনিদ্রা, কৰ্ম্মে আলস্যজনিত বিরক্তি, নিরাশা, বিষাদ, ভয়, এক কথায় যাহা নিশ্চেষ্টর পরিপােষক তাহাই। জড়তা ও অপ্রবৃত্তি অজ্ঞানের ফল, উত্তেজনা ও কুপ্রবৃত্তি ভ্রান্তজ্ঞানসম্ভূত। কিন্তু তমােমালিন্য অপনােদন করিতে হইলে রজোগুণের উদ্রেক দ্বারাই তাহা দূর করিতে হয়। রজোগুণই প্রবৃত্তির কারণ এবং প্রবৃত্তিই নিবৃত্তির প্রথম সােপান। যে জড়, সে নিবৃত্ত নয়, জড়ভাব জ্ঞানশূন্য ; আর জ্ঞানই নিবৃত্তির মার্গ। কামনাশূন্য হইয়া যে কর্মে প্রবৃত্ত হয়, সে নিবৃত্ত ; কৰ্ম্মত্যাগ নিবৃত্তি নয়। সেই জন্য ভারতের ঘাের তামসিক অবস্থা দেখিয়া স্বামী বিবেকানন্দ বলিতেন, “রজোগুণ চাই, ;

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয়
১৭
দেশে কর্মবীর চাই, প্রবৃত্তির প্রচণ্ড স্রোত বহুক।
তাহাতে যদি পাপও আসিয়া পড়ে, তাহাও এই
তামসিক নিশ্চেষ্টতা অপেক্ষা সহস্র গুণে ভাল।”
সত্যই আমরা ঘাের তমােমধ্যে নিমগ্ন
হইয়া সত্ত্বগুণের দোহাই দিয়া মহাসাত্ত্বিক
সাজিয়া বড়াই করিতেছি। অনেকের এই মত
দেখিতে পাই যে, আমরা সাত্ত্বিক বলিয়াই
রাজসিক জাতিসকল দ্বারা পরাজিত, সাত্ত্বিক
বলিয়া এইরূপ অবনত ও অধঃপতিত। তাহারা
এই যুক্তি দেখাইয়া খৃষ্টধৰ্ম্ম হইতে হিন্দুধর্মের
শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করিতে সচেষ্ট। খৃষ্টানজাতি
প্রত্যক্ষফলবাদী, তাহারা ধর্মের ঐহিক ফল
দেখাইয়া ধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠ প্রতিপাদন করিতে
চেষ্টা করেন ; তাহারা বলেন—খৃষ্টান জাতিই
জগতে প্রবল, অতএব খৃষ্টান ধৰ্ম্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
আর আমাদের মধ্যে অনেকে বলেন—ইহা ভ্রম;
ঐহিক ফল দেখিয়া ধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা নির্ণয় করা
যায় না, পারলৌকিক ফল দেখিতে হয়, হিন্দুরা

১৮ জগন্নাথের রথ ; অধিক ধাৰ্মিক বলিয়া, অসুর প্রকৃতি বলবান পাশ্চাত্যজাতির অধীন হইয়াছে। কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে আৰ্যজ্ঞানবিরােধী ঘাের ভ্রম নিহিত। সত্ত্বগুণ কখনই অবনতির কারণ হইতে পারে এমনকি সত্ত্বপ্রধান জাতি দাসত্ব-শৃঙ্খলিত হইয়া থাকিতে পারে না। ব্ৰহ্মতেজই সত্ত্ব- গুণের মুখ্যফল, ক্ষত্ৰতেজ ব্ৰহ্মতেজের ভিত্তি। আঘাত পাইলে শান্ত ব্ৰহ্মতেজ হইতে ক্ষত্র- তেজের স্ফুলিঙ্গ নির্গত হয়, চারিদিক জ্বলিয়া উঠে। যেখানে ক্ষতেজ নাই, সেখানে ব্ৰহ্মতেজ টিকিতে পারে না। দেশে যদি একজন প্রকৃত ব্রাহ্মণ থাকে সে এক শ’ ক্ষত্রিয় সৃষ্টি করে। দেশের অবনতির কারণ সত্ত্বগুণের আতিশয্য নয়, রজোগুণের অভাব, তমােগুণের প্রাধান্য। রজোগুণের অভাবে আমাদের অন্তর্নিহিত সত্ত্ব ম্লান হইয়া তমােমধ্যে গুপ্ত হইয়া পড়িল । আলস্য, মােহ, অজ্ঞান, অপ্রবৃত্তি, নিরাশা, বিষাদ, নিশ্চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে দেশের দুর্দশা অবনতিও আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয় ১৯ বৰ্ধিত হইতে লাগিল। এই মেঘ প্রথমে লঘু ও বিরল ছিল, কালের গতিতে ক্রমশঃ এতদূর নিবিড়তর হইয়া পড়িল, অজ্ঞান অন্ধকারে ডুবিয়া আমরা এমন নিশ্চেষ্ট ও মহতাকাঙক্ষাবর্জিত হইয়া পড়িলাম যে ভগবৎপ্রেরিত মহাপুরুষগণের উদয়েও সেই অন্ধকার পূর্ণ তিরােহিত হইল না। তখন সূর্য-ভগবান রজোগুণজনিত প্রবৃত্তি দ্বারা দেশরক্ষার সঙ্কল্প করিলেন। জাগ্রত রজঃশক্তি প্রচণ্ডভাবে কার্যকরী হইলে তমঃ পলায়নােদ্যত হয় বটে কিন্তু অন্য- দিকে স্বেচ্ছাচার, কুপ্রবৃত্তি ও উদ্দাম উচ্ছঙ্খলতা প্রভৃতি আসুরিক ভাব আসিবার আশঙ্কা। রজঃ- শক্তি যদি স্ব স্ব প্রেরণায় উন্মত্ততার বিশাল প্রবৃত্তির উদরপূরণকেই লক্ষ্য করিয়া কাৰ্য্য করে, তাহা হইলে এই আশঙ্কার যথেষ্ট কারণও আছে। রজোগুণ উচ্ছঙ্খল ভাবে স্বপথগামী হইলে অধিককাল টিকিতে পারে না, ক্লান্তি আসে, তমঃ আসে, প্রচণ্ড ঝটিকার পরে আকাশ জগন্নাথের রথ নিৰ্ম্মল পরিষ্কার না হইয়া মেঘাচ্ছন্ন বায়ুস্পন্দন- রহিত হইয়া পড়ে। রাষ্ট্রবিপ্লবের পরে ফ্রান্সের এই পরিণাম হইয়াছে। সেই রাষ্ট্রবিপ্লবে রজোগুণের ভীষণ প্রাদুর্ভাব, বিপ্লবান্তে তাম- সিকতার অল্পাধিক পুনরুত্থান, আবার রাষ্ট্রবিপ্লব, আবার ক্লান্তি, শক্তিহীনতা, নৈতিক অবনতি, ইহাই গত শতবর্ষে ফ্রান্সের ইতিহাস। যতবার সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতারূপ আদর্শজনিত সাত্ত্বিক প্রেরণা ফ্রান্সের প্রাণে জাগিয়াছে, ততবারই ক্রমশঃ রজোগুণ প্রবল হইয়া সক্কসেবাবিমুখ আসুরিকভাবে পরিণতি লাভ করিয়া স্বপ্রবৃত্তি- পূরণে যত্নবান হইয়াছে। ফলতঃ, তমােগুণের পুনরাবির্ভাবে ফ্রান্স তাহার পূর্বসঞ্চিত মহাশক্তি হারাইয়া ম্রিয়মাণ বিষম অবস্থায় হরিশ্চন্দ্রের মত না স্বর্গে না মর্ত্যে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। এইরূপ পরিণাম এড়াইবার একমাত্র উপায় প্রবল রজঃশক্তিকে সত্ত্বসেবায় নিযুক্ত করা। যদি সাত্ত্বিকভাব জাগ্রত হইয়া রজঃশক্তির

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয়
চালক হয়, তাহা হইলে তমােগুণের পুনঃ
প্রাদুর্ভাবের ভয়ও নাই, উদ্দাম শক্তিও শৃঙ্খলিত
নিয়ন্ত্রিত হইয়া উচ্চ আদর্শের বশে দেশের
ও জগতের হিতসাধন করে। সঙ্গেদ্রেকের
উপায় ধর্মভাব—স্বার্থকে ডুবাইয়া পরার্থে সমস্ত
শক্তি অর্পণ-ভগবানকে আত্মসমর্পণ করিয়া
সমস্ত জীবনকে এক মহা ও পবিত্র যজ্ঞে পরিণত
করা। গীতায় কথিত আছে সত্ত্বরজঃ উভয়ে
তমঃ নাশ করে ; একা সত্ব কখন তমঃকে
পরাজয় করিতে পারে না। সেইজন্য ভগবান
অধুনা ধর্মের পুনরুত্থান করাইয়া আমাদের
অন্তর্নিহিত সত্ত্বকে জাগাইয়া পরে রজঃশক্তিকে
দেশময় ছড়াইয়া দিয়াছেন। রামমােহন রায়
প্রভৃতি ধৰ্ম্মোপদেশক মহাত্মাগণ সত্বকে পুনরুদ্দী-
পিত করিয়া নবযুগ প্রবর্তন করিয়া গিয়াছেন।
ঊনবিংশ শতাব্দিতে ধৰ্ম্মজগতে যেমন জাগরণ
হইয়াছিল, রাজনীতি বা সমাজে তেমন হয়
নাই। কারণ ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল না, সেইজন্য

২২
জগন্নাথের রথ .
প্রচুর বীজ বপিত হইয়াও শস্য দেখা দেয় নাই।
ইহাতেও ভারতবর্ষের উপর ভগবানের দয়া ও
প্রসন্নতা বুঝা যায়।
রাজসিক ভাবপ্রসূত
জাগরণ কখনও স্থায়ী বা পূর্ণ কল্যাণপ্রদ হইতে
পারে না। তৎপূর্বে জাতির অন্তরে কতকাংশে
ব্ৰহ্মতেজ উদ্দীপিত হওয়া আবশ্যক। সেইজন্য
এতদিন রজঃশক্তির স্রোত রুদ্ধ ছিল। ১৯০৫
খৃষ্টাব্দে রজঃশক্তির যে বিকাশ হইয়াছে তাহা
সাত্ত্বিকভাব পূর্ণ। এই নিমিত্ত ইহাতে যে
উদ্দামভাব দেখা গিয়াছে তাহাতেও আশঙ্কার
বিশেষ কারণ নাই, কেননা ইহা রজঃসাত্ত্বিকের
খেলা ; এ খেলায় যাহা কিছু উদ্দাম বা উচ্ছ জ্বল
ভাব তাহা অচিরে নিয়মিত ও শৃঙ্খলিত হইবেই।
বাহ্যশক্তি দ্বারা নহে, ভিতরে যে ব্ৰহ্মতেজ,
যে সাত্ত্বিকভাব, তাহা দ্বারাই ইহা বশীভূত ও
নিয়মিত হইবে। ধর্মভাব প্রচার করিয়া আমরা
সেই ব্ৰহ্মতেজ ও সাত্ত্বিকভাবের পােষকতা
করিতে পারি মাত্র।

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয় পূর্বেই বলিয়াছি পরার্থে সর্বশক্তি নিয়ােগ করা সজোদ্রেকের এক উপায়। আর আমাদের রাজনীতিক জাগরণে এই ভাবের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু এই ভাব রক্ষা করা কঠিন যেমন ব্যক্তির পক্ষে কঠিন জাতির পক্ষে আরও কঠিন। পরার্থের মধ্যে স্বার্থ অলক্ষিত ভাবে ছুটিয়া আসে এবং যদি আমাদের বুদ্ধি বিশুদ্ধ না হয়, এমন ভ্রমে পতিত হইতে পারি যে আমরা পরার্থের দোহাই দিয়া স্বার্থকে আশ্রয় করিয়া পরহিত, দেশহিত, মনুষ্যজাতির হিত ডুবাইব অথচ নিজের ভ্রম বুঝিতে পারিব না। ভগবৎসেবা সত্ত্বোদ্রেকের অন্য উপায়। কিন্তু সেই পথেও হিতে বিপরীত হইতে পারে, ভগবৎসান্নিধ্যরূপ আনন্দ পাইয়া আমাদের সাত্ত্বিক-নিশ্চেষ্টতা জমিতে পারে, সেই আনন্দের আস্বাদ ভােগ করিতে করিতে দুঃখ- কাতর দেশের প্রতি ও মানবজাতির সেবায় পশ্চাৎমুখ হইতে পারি। ইহাই সাত্ত্বিকভাবের

২৪
জগন্নাথের রথ
বন্ধন। যেমন রাজসিক অহঙ্কার আছে, তেমনি
সাত্ত্বিক অহঙ্কারও আছে। যেমন পাপ মনুষ্যকে
বন্ধ করে, তেমনই পুণ্যও বদ্ধ করে। সম্পূর্ণ
বাসনাশূন্য
হইয়া অহঙ্কার ত্যাগ পূর্বক
ভগবানকে আত্মসমর্পণ না করিলে পূর্ণ স্বাধীনতা
নাই। এই দুটি অনিষ্ট ত্যাগ করিতে হইলে
প্রথম বিশুদ্ধ বুদ্ধির দরকার। দেহাত্বক বুদ্ধি
বৰ্জ্জন করিয়া মানসিক স্বাধীনতা অর্জন করাই
বুদ্ধি-শােধনের পূর্ববর্তী অবস্থা। মন স্বাধীন
হইলে জীবের আয়ত্ত হয়, পরে মনকে জয়
করিয়া বুদ্ধির আশ্রয়ে মানুষ স্বার্থের হাত
হইতে অনেকটা পরিত্রাণ লাভ করে। ইহাতেও
স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে আমাদিগকে ত্যাগ করে না।
শেষ স্বার্থ মুমুক্ষুত্ব, পরদুঃখকে ভুলিয়া নিজের
আনন্দে ভাের হইয়া থাকিবার ইচ্ছা। ইহাও
ত্যাগ করিতে হয়। সর্বভূতে নারায়ণকে
উপলব্ধি করিয়া সেই সৰ্বভূতস্থ নারায়ণের
সেবা ইহার ঔষধ ; ইহাই সত্ত্বগুণের পরাকাষ্ঠা।

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয় ২৫ ইহা হইতেও উচ্চতর অবস্থা আছে, তাহা সত্ত্বগুণকেও অতিক্রম করিয়া গুণাতীত হইয়া সম্পূর্ণভাবে ভগবানকে আশ্রয় করা। গুণা- তীত্যের বর্ণনা গীতায় কথিত আছে, যেমন- নান্তং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি । গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সােহধিগচ্ছতি ॥ গুণানেনতীত্য ত্ৰী দেহী দেহসমুদ্ভবা। জন্মমৃত্যুজরাতুঃখৈর্বিমুক্তোহমৃতমতে। প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মােহমেব চ পাণ্ডব । ন দ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্গতি। উদাসীনবদাসীনাে গুণেৰ্যো ন বিচাল্যতে। গুণা বৰ্ত্তন্ত ইত্যেবং যােহবতিউতি নেঙ্গতে ৷ সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলােঞ্ছাশ্মকাঞ্চন। তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়াে ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ | মানাপমানয়ােস্তুল্যস্থল্যো মিত্রারিপক্ষয়ােঃ। সৰ্বারম্ভ পরিত্যাগী গুণাতীতঃ স উচ্যতে। মাঞ্চ যােহব্যভিচারেণ ভক্তিযােগেন সেবতে। স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।

জগন্নাথের রথ “যখন জীব সাক্ষী হইয়া গুণত্রয় অর্থাৎ ভগবানের ত্রৈগুণ্যময়ী শক্তিকেই একমাত্র কর্তা বলিয়া দেখে এবং এই গুণত্রয়েরও উপর শক্তির প্রেরক ঈশ্বরকে জানিতে পারে, তখন সে ই ভগবৎ সাধৰ্ম্ম লাভ করে। তখন দেহস্থ জীব স্থূল ও সূক্ষম এই দুই প্রকার দেহসস্তৃত গুণ- ত্রয়কে অতিক্রম করিয়া জন্ম-মৃত্যু জরা-দুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া অমরত্ব ভােগ করে। সত্ত্বজনিত জ্ঞান, রজোজনিত প্রবৃত্তি বা তমাে- জনিত নিদ্রা নিশ্চেষ্টা ভ্ৰমস্বরূপ মােহ আসিলে বিরক্ত হয় না, এই গুণত্রয়ের আগমন নির্গমনে সমান ভাব রাখিয়া উদাসীনের ন্যায় স্থির হইয়া থাকে, গুণগ্রাম তাহাকে বিচলিত করিতে পারে , এই সবই গুণের স্বধৰ্ম্মজাত বৃত্তি বলিয়া দৃঢ় থাকে। যাহার পক্ষে সুখ-দুঃখ সমান, প্রিয়- অপ্রিয় সমান, নিন্দা-স্তুতি, সমান, কাঞ্চন-লােষ্ট্র উভয়ই প্রস্তরের তুল্য, যে ধীর-স্থির, নিজের মধ্যে অটল, যাহার নিকট মান-অপমান একই, আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয় २१ মিত্রপক্ষ ও শত্রুপক্ষ সমান প্রিয়, যে স্বয়ং প্রেরিত হইয়া কোন কাৰ্যারম্ভ করে না, সকল কৰ্ম্ম ভগবানকে সমর্পণ করিয়া তাহারই প্রেরণায় কৰ্ম্ম করে, তাহাকেই গুণাতীত বলে। যে আমাকে নির্দোষ ভক্তিযােগে সেবা করে, সে-ই এই তিন গুণকে অতিক্রম করিয়া ব্ৰহ্মপ্রাপ্তির উপযুক্ত হয়।” এই গুণাতীত অবস্থা লাভ সকলের সাধ্য না হইলেও তাহার পূর্ববর্তী অবস্থা লাভ সত্ত্বপ্রধান পুরুষের অসাধ্য নহে। मानिक অহঙ্কারকে ত্যাগ করিয়া জগতের সকল কার্য্যে ভগবানের ত্রৈগুণ্যময়ী শক্তির লীলা দেখা ইহার সর্ব প্রথম উপক্রম। ইহা বুঝিয়া সাত্ত্বিক কর্তা কর্তৃত্ব-অভিমান ত্যাগে ভগবানে সম্পূর্ণ আত্ম- সমর্পণ পূর্বক কৰ্ম্ম করেন। গুণত্রয় ও গুণাতীত্য সম্বন্ধে যাহা বলিলাম, তাহা গীতার মূল কথা। কিন্তু এই শিক্ষা সাধারণতঃ গৃহীত হয় নাই, আজ পর্যন্ত যাহাকে

২৮
জগন্নাথের রথ
আমরা আৰ্য্যশিক্ষা বলি, তাহা প্রায় সাত্ত্বিক
গুণের অনুশীলন। রজোগুণের আদর এই
দেশে ক্ষত্রিয়জাতির ললাপে লুপ্ত হইয়াছে।
অথচ জাতীয় জীবনে রজঃশক্তিরও নিরতিশয়
প্রয়ােজন আছে। সেই জন্য গীতার দিকে
লােকের মন আজকাল আকৃষ্ট হইয়াছে। গীতার
শিক্ষা পুরাতন আৰ্যশিক্ষাকে ভিত্তি করিয়াও
অতিক্রম করিয়াছে। গীতােক্ত ধৰ্ম্ম রজোগুণকে
ভয় করে না, তাহাতে রজঃশক্তিকে সত্ত্বসেবায়
নিযুক্ত করিবার পন্থা আছে, প্রবৃত্তি মার্গে মুক্তির
উপায় প্রদশিত আছে। এই ধৰ্ম্ম অনুশীলনের
জন্য জাতির মন কিরূপে প্রস্তুত হইতেছে, তাহা
জেলেই প্রথম হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলাম।
এখনও স্রোত নিৰ্ম্মল হয় নাই, এখনও কলুষিত
ও আবিল, কিন্তু অতিরিক্ত বেগ যখন অল্প
প্রশমিত হইবে, তখন তাহার মধ্যে যে বিশুদ্ধ
শক্তি লুক্কায়িত, তাহার নিখুঁত কাৰ্য্য হইবে

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয় ২৯ যাহারা আমার সঙ্গে বন্দী ও এক অভিযােগে অভিযুক্ত, তাঁহাদের মধ্যে অনেকে নির্দোষী বলিয়া মুক্তি পাইয়াছেন, আর সকলে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলিয়া দণ্ডিত। মানবসমাজে হত্যা হইতে গুরুতর অপরাধ হইতে পারে না। জাতীয় স্বার্থপ্রণােদিত হইয়া যে হত্যা করে, তাহার ব্যক্তিগত চরিত্র কলুষিত না হইতে পারে কিন্তু তাহাতে সামাজিক হিসাবে অপরাধীর গুরুত্ব লাঘব হইল না। ইহাও স্বীকার করিতে হয় যে হত্যার ছায়া অন্তরাত্মায় পড়িলে মনে যেন রক্তের দাগ বসিয়া থাকে, ত্রুরতার সঞ্চার হয়। ক্রুরতা বর্বরােচিত গুণ, মনুষ্য উন্নতির ক্রম- বিকাশে যে সকল গুণ হইতে অল্পে অল্পে বজ্জিত হইতেছে, সেই সকলের মধ্যে ত্রুরতা প্রধান। ইহা সম্পূর্ণ বৰ্জ্জন করিতে পারিলে মানব- জাতির উন্নতির পথে একটি বিঘ্নকর কণ্টক উন্মলিত হইয়া যাইবে। আসামীর দোষ

জগন্নাথের রথ
ধরিয়া লইলে ইহাই বুঝিতে হইবে যে, ইহা
রজঃশক্তির ক্ষণিক উদ্দাম উচ্ছ ঙ্খলতা মাত্র।
তাহাদের মধ্যে এমন সাত্ত্বিক শক্তি নিহিত যে
এই ক্ষণিক উচ্ছলতার দ্বারা দেশের স্থায়ী
অমঙ্গল সাধিত হইবার কোনও আশঙ্কা নাই।
অন্তরের যে স্বাধীনতার কথা পূর্বে
বলিয়াছি, আমার সঙ্গীগণের সে স্বাধীনতা
স্বভাবসিদ্ধ গুণ। যে কয়েকদিন আমরা একসঙ্গে
এক বৃহৎ দালানে রক্ষিত ছিলাম, আমি তাহাদের
আচরণ ও মনের ভাব বিশেষ মনােযােগর
সহিত লক্ষ্য করিয়াছি। দুইজন ভিন্ন কাহারও
মুখে বা কথায় ভয়ের ছায়া পর্যন্ত দেখিতে পাই
নাই। প্রায় সকলেই তরুণ বয়স্ক, অনেকে অল্প
বয়স্ক বালক, যে অপরাধে ধৃত সাব্যস্ত হইলে
তাহার দণ্ড যেরূপ ভীষণ তাহাতে দৃঢ়মতি
পুরুষেরও বিচলিত হইবার কথা। আর ইহারা
বিচারে খালাস হইবার আশাও বড় রাখিতেন
না। বিশেষতঃ ম্যাজিষ্ট্রেটের কোটে সাক্ষী

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয় লেখাসাক্ষ্যের যেরূপ ভীষণ আয়ােজন জমিতে লাগিল, তাহা দেখিয়া আইন-অনভিজ্ঞ ব্যক্তির মনে সহজেই ধারণা হয় যে, নির্দোষীরও এই ফাদ হইতে নির্গমনের পথ নাই। অথচ তাঁহাদের মুখে ভীতি বা বিষন্নতার পরিবর্তে কেবল প্রফুল্লতা, সরল হাস্য, নিজের বিপদকে ভুলিয়া ধৰ্ম্মের ও দেশের কথা। আমাদের ওয়ার্ডে প্রত্যেকের নিকট দুই-চারিখানি বই থাকায় একটি ক্ষুদ্র লাইব্রেরী জমিয়াছিল। এই লাইব্রেরীর অধিকাংশই ধর্মের বই, গীতা, উপনিষদ, বিবেকানন্দের পুস্তকাবলী, রামকৃষ্ণের কথামৃত ও জীবনচরিত, পুরাণ, স্তবমালা, ব্রহ্ম- সঙ্গীত ইত্যাদি। অন্য পুস্তকের মধ্যে বঙ্কিমের গ্রন্থাবলী, স্বদেশী গানের অনেক বই, আর রােপীয় দর্শন, ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ক অল্পস্বল্প পুস্তক। সকালে কেহ কেহ সাধনা করিতে বসিত, কেহ কেহ বই পড়িত, কেহ কেহ আস্তে গল্প করিত। সকালের এই শান্তিময় ৩২ জগন্নাথের রথ ; নীরবতায় মাঝে মাঝে হাসির লহরীও উঠিত। “কাচেরী” না থাকিলে কেহ কেহ ঘুমাইত, কেহ কেহ খেলা করিত—যে দিন যে খেলা জোটে, আসক্তি কাহারও নাই। কোন দিন মণ্ডলে বসিয়া কোন শান্ত খেলা—কোন দিন বা দৌড়াদৌড়ি লাফালাফি, দিন কতক ফুটবল চলিল, ফুটবলটা অবশ্য অপূর্ব উপকরণে গঠিত। দিন কতক কাণামাছিই চলিল ; এক একদিন ভিন্ন ভিন্ন দল গঠন করিয়া একদিকে জুজিৎসু শিক্ষা অন্য দিকে উচ্চ লম্ফ ও দীর্ঘ লক্ষ আর একদিকে drafts বা দশপঁচিশ। দুই চারিজন গম্ভীর প্রৌঢ় লােক ভিন্ন সকলেই প্রায় বালক- দের অনুরােধে এই সকল খেলায় যােগ দিতেন। দেখিলাম ইহাদের মধ্যে বয়স্ক লােকেরও বাল- স্বভাব। সন্ধ্যাবেলায় গানের মজলিস জমিত। উল্লাস, শচীন্দ্র, হেমদাস, যাহারা গানে সিদ্ধ, তাহাদের চারিদিকে আমরা সকলে বসিয়া গান শুনিতাম। স্বদেশী বা ধৰ্ম্মের গান ব্যতীত অন্য

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয়
কোনরূপ গান হইত না। এক একদিন কেবল
আমােদ করিবার ইচ্ছায় উল্লাসকর হাসির গান,
অভিনয়, Ventriloquism, অনুকরণ গেঁজেলের
গল্প করিয়া সন্ধ্যা কাটাইত। * *
* মােকদ্দমায় কেহ মন দিত না, সকলেই
ধৰ্ম্মে বা আনন্দে দিন কাটাইত। এই নিশ্চিন্ত
ভাব কঠিন কুক্ৰিয়াভ্যস্ত হৃদয়ের পক্ষে অসম্ভব ;
তাহাদের মধ্যে কাঠিন্য,
ক্রুরতা, কুক্ৰিয়াসক্তি,
কুটিলতা লেশমাত্র ছিল না। কি হাস্য কি কথা
কি খেলা তাহাদের সকলই আনন্দময়, পাপহীন,
প্রেমময়।
এই মানসিক স্বাধীনতার ফল অচিরে
বিকাশ প্রাপ্ত হইতে লাগিল। এইরূপ ক্ষেত্রেই
ধৰ্ম্মবীজ বপন হইলে সর্বাঙ্গসুন্দর ফল সম্ভবে।
যীশু কয়েকজন বালককে দেখাইয়া শিষদিগকে
বলিয়াছিলেন “যাহারা এই বালকের তুল্য,
তাঁহারাই ব্ৰহ্মলােক প্রাপ্ত হন।” জ্ঞান ও
আনন্দ সত্ত্বগুণের লক্ষণ। যাহারা দুঃখকে দুঃখ

৩৪
জগন্নাথের রথ
জ্ঞান করেন না, যাঁহারা সকল অবস্থায় আনন্দিত
প্রফুল্লিত, তাহাদেরই যােগে অধিকার। জেলে
রাজসিক ভাব প্রশ্রয় পায় না, আর নিন
কারাগারে প্রবৃত্তির পরিপােষক কিছুই নাই।
এই অবস্থায় অসুরের মন চিরাভ্যস্ত রজঃশক্তির
উপকরণের অভাবে আহত ব্যাঘ্রের ন্যায়
নিজেকে নাশ করে। পাশ্চাত্য কবিগণ যাহাকে
Eating one's own heart বলেন, সেই অবস্থা
ঘটে। ভারতবাসীর মন সেই নিৰ্জ্জনতায়,
সেই বাহ্যিক কষ্টের মধ্যে চিরন্তন টানে আকৃষ্ট
হইয়া ভগবানের নিকট ছুটিয়া যায়। আমাদের
ইহাই ঘটিয়াছে। জানি না কোথা হইতে
একটি স্রোত আসিয়া সকলকে ভাসাইয়া নিয়া
গেল। যে কখনও ভগবানের নাম করে নাই,
সেও সাধনা করিতে শিখিল। আর সেই পরম
দয়ালুর দয়া অনুভব করিয়া আনন্দমগ্ন হইয়া
পড়িল। অনেক দিনের অভ্যাসে যােগীর যাহা
হয়, এই বালকদের দু’চারি মাসের সাধনায়

আৰ্য আদর্শ ও গুণত্রয়
তাহা হইয়া গেল। রামকৃষ্ণ পরমহংস একবার
বলিয়াছিলেন, “এখন তােমরা কি দেখছ—ইহা
কিছুই নয়, দেশে এমন স্রোত আছে যে, অল্প
বয়সের ছেলে তিন দিন সাধনা করে সিদ্ধি
পাবে।” এই বালকদিগকে দেখিলে তাহার
ভবিষ্যদ্বাণীর সফলতা সম্বন্ধে সন্দেহ মাত্র থাকে
। ইহারা যেন সেই প্রত্যাশিত ধৰ্ম্মপ্রবাহের
মুৰ্ত্তিমন্ত পূর্বপরিচয় ; এই সাত্ত্বিকভাবের তরঙ্গ
কাঠগড়া বহিয়া চারপাঁচজন ভিন্ন অন্য সকলের
হৃদয় মহানন্দে আপ্লুত করিয়া তুলিত। ইহার
আস্বাদ যে একবার পাইয়াছে সে কখনও
তাহা ভুলিতে পারে না এবং কখনও অন্য
আনন্দকে ইহার তুল্য বলিয়া স্বীকার করিতে
পারে না। এই সাত্ত্বিকভাবই দেশের উন্নতির
আশা। ভ্ৰাতৃভাব, আত্মজ্ঞান, ভগবৎ প্রেম
যেমন সহজে ভারতবাসীর মনকে অধিকার
করিয়া কাৰ্যে প্রকাশ পায়, আর কোনও
জাতির তেমন সহজে হওয়া সম্ভব নয়। চাই

জগন্নাথের রথ তমােবন, রজোদমন, সত্ত্বপ্রকাশ। ভারত- বর্ষের জন্য ভগবানের গৃঢ় অভিসন্ধিতে তাহাই প্রস্তুত হইতেছে।

হিরােবৃমি ইতাে
মানবজাতির মধ্যে দুই প্রকার জীব জন্মগ্রহণ
করে। যাঁহারা আস্তে আস্তে ক্রমবিকাশের
স্রোতে অগ্রসর হইয়া অন্তর্নিহিত দেবত্ব প্রকাশ
করিতেছেন, তাহারা সাধারণ মনুষ্য। যাঁহারা
সেই ক্রমবিকাশের সাহায্যার্থ বিভূতিরূপে
জন্ম গ্রহণ করেন, তাঁহারা স্বতন্ত্র। তাহারা যে
জাতির মধ্যে ও যে যুগে অবতরণ করেন, সেই
জাতির চরিত্র ও আচার, সেই যুগের ধর্ম
গ্রহণ পূর্বক ঐশ্বরিক শক্তি ও স্বভাবের বলে
সাধারণ মানবের অসাধ্য কৰ্ম্ম সাধন করিয়া
জগতের গতি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করিয়া ইতিহাসে
অমর নাম রাখিয়া স্বলােক গমন করেন।

৩৮
জগন্নাথের রথ
হাদের কৰ্ম্ম ও চরিত্র মানুষের প্রশংসা ও
নিন্দার অতীত। প্রশংসা করি বা নিন্দা করি,
তাঁহারা ভগবদ্-দত্ত কাৰ্য্য করিয়া গিয়াছেন,
মানবজাতির ভবিষ্যৎ সেই কাৰ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
হইয়া নির্দিষ্ট পথে খরস্রোতে বহিবে। সীজার,
নেপােলিয়ন, আকবর,শিবাজী এইরূপ বিভূতি।
জাপানের মহাপুরুষ হিরােবৃমি ইতােও এই
শ্রেণীর ভুক্ত এবং যাহাদের নাম উল্লেখ করিলাম,
তাহাদের একজনও গুণে, প্রতিভায় বা কর্মের
মহত্ত্বে ও ভবিষ্যৎ ফলে ইতাের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ
ছিলেন না। ইলাের ইতিহাসে ও জাপানের
অভ্যুদয়ে তাহার প্রধান স্থান সকলেই অবগত
আছেন, কিন্তু সকলেই না-ও জানিতে পারেন
যে ইতােই সেই অভ্যুদয়ের ক্রম, উপায় ও
উদ্দেশ্য উদ্ভাবনা করিয়া শেষ পর্যন্ত একা এই
মহৎ পরিবর্তন করিয়াছেন, জাপানের আর
সকল মহাপুরুষ তাহার হস্তের যন্ত্র মাত্র।
ইতােই জাপানের ঐক্য, জাপানের স্বাধীনতা,

হিববৃমি ইতাে জাপানের বিদ্যাবল, সৈন্যবল, নৌসেনাবল, অর্থবল, বাণিজ্য, রাজনীতি মনে কল্পনা করিয়া কাৰ্যে পরিণত করিয়াছিলেন। তিনিই ভাবী জাপানের সাম্রাজ্য প্রস্তুত করিতেছিলেন। যাহা করিয়াছেন, প্রায়ই অন্তরালে দাড়াইয়া করিয়াছেন। জাৰ্ম্মাণীর কাইসার ওয়িলহেম বা বিলাতের লয়েড জর্ড যাহা করিতেছেন, যাহা ভাবিতেছেন, সমস্ত জগৎ তখনই তাহা জানিতে পারে। ইতাে যাহা ভাবিতেছিলেন, যাহা করিতেছিলেন, কেহ জানিত না—যখন তাঁহার নিভৃত কল্পনা ও চেষ্টা ফলীভূত হইল, তখন জগৎ বিস্মিত হইয়া বুঝিতে পারিল, ইহাই এতদিন প্রস্তুত হইতেছিল। প্রকাণ্ড কাৰ্য, কি অদ্ভুত প্রতিভা সেই কাৰ্য্যে প্রকাশ পাইতেছে! যদি ইতাে নিজে মনের কল্পনা করিতে অভ্যস্ত হইতেন, সমস্ত জগৎ পদে পদে তাঁহাকে উন্মত্ত অসাধ্য-সাধন-প্রয়াসী ও ব্যর্থ- স্বপ্নের অনুরক্ত Idealist বলিয়া উপহাস করিত। অথচ কি

৪০
জগন্নাথের রথ
কে বিশ্বাস করিত যে পঞ্চাশ বৎসরের মধ্যে
জাপান দুােভ স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া সমস্ত
পাশ্চাত্য সভ্যতা আয়ত্ত করিবে, ইংলও জাৰ্মাণী
ফ্রান্সের সমকক্ষ প্রবল পরাক্রমশালী জাতি
হইবে, চীনকে পরাভূত করিবে, রুষকে পরাভূত
করিবে, দূর দেশ-বিদেশে জাপানী বাণিজ্য,
জাপানী চিত্রকলা, জাপানী বুদ্ধির প্রশংসা ও
জাপানী সাহসের ভয় বিস্তার করিবে, কোরিয়া
অধিকার করিবে, ফারমােজা অধিকার করিবে,
বৃহৎ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করিবে, একতা,
স্বাধীনতা, সাম্য, জাতীয় শিক্ষার চরম উন্নতি
সাধিত করিবে। নেপােলিয়ন বলিতেন, আমার
শব্দকোষে অসাধ্য কথা বাদ দিয়াছি। ইতো
সেই কথা বলেন নাই, কিন্তু কাৰ্যে তাহাই
করিয়াছিলেন। নেপােলিয়নের কাৰ্য অপেক্ষা
ইতাের কাৰ্য বড়। এইরূপ মহাপুরুষ হত্যা-
কারীর গুলিতে নিহত হইয়াছেন, ইহাতে
কাহারও দুঃখ করিবার কারণ নাই। যিনি

হিরােবৃমি ইত
৪১
জাপানের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করিয়াছেন,
জাপানই যাঁহার চিন্তা, জাপানই যাহার উপাস্য
দেবতা, তিনি জাপানের জন্য প্রাণত্যাগ
করিয়াছেন, ইহা বড় সুখের কথা, সৌভাগ্যের
কথা, গৌরবের কথা। হতাে বা প্রাপ্যসি স্বর্গং,
জিহ্বা বা ভােক্ষ্যশ্যে মহীম্। হিরােবৃমি ইতাের
ভাগ্যে এই দুইটি পরম ফল এক জীবন-বৃক্ষে
পাওয়া গেল।

দূর্গা-স্তোত্র
মাতঃ দুর্গে ! সিংহবাহিনি সর্বশক্তিদায়িনি
মাতঃ শিবপ্রিয়ে ! তােমার শক্ত্যংশজাত আমরা
বঙ্গদেশের যুবকগণ তােমার মন্দিরে আসীন,
প্রার্থনা করিতেছি,শুন, মাতঃ, উর বঙ্গদেশে,
প্রকাশ হও।
মাতঃ দুর্গে ! যুগে যুগে মানবশরীরে
অবতীর্ণ হইয়া জন্মে জন্মে তােমারই কাৰ্য
করিয়া তােমার আনন্দধামে ফিরিয়া যাই।
এইবারও জন্মিয়া তােমারই কাৰ্যে ব্ৰতী আমরা,
শুন, মাতঃ, উর বঙ্গদেশে, সহায় হও।

দুর্গা-স্তোত্র ৪৩ মাতঃ দুর্গে ! সিংহবাহিনি, ত্রিশূলধারিণি, বৰ্ম্ম-আবৃত-সুন্দর-শরীরে মাত; জয়দায়িনি । তােমার প্রতীক্ষায় ভারত রহিয়াছে, তােমার সেই মঙ্গলময়ী মূর্তি দেখিতে উৎসুক। শুন, মাতঃ, উর বঙ্গদেশে, প্রকাশ হও। মাতঃ দুর্গে ! বলদায়িনি, প্রেমদায়িনি, জ্ঞানদায়িনি, শক্তিস্বরূপিণি ভীমে, সৌম্য-রৌদ্র- রূপিণি ! জীবন-সংগ্রামে ভারত-সংগ্রামে তােমার প্রেরিত যােদ্ধা আমরা, দাও, মাতঃ, প্রাণে মনে অসুরের শক্তি, অসুরের উদ্যম, দাও, মাতঃ হৃদয়ে বুদ্ধিতে দেবের চরিত্র, দেবের জ্ঞান। মাতঃ দুর্গে ! জগৎশ্রেষ্ঠ ভারতজাতি নিবিড় তিমিরে আচ্ছন্ন ছিল। তুমি, মাতঃ, গগনপ্রান্তে অল্পে অল্পে উদয় হইতেছ, তােমার স্বর্গীয় শরীরের তিমির বিনাশী আভায় উষার প্রকাশ হইল। আলােক বিস্তার কর, মাতঃ, তিমির বিনাশ কর ।

৪৪
জগন্নাথের রথ
মাতঃ দুর্গে! শ্যামলা সর্বসৌন্দৰ্য-অলঙ্কতা
জ্ঞান প্রেম শক্তির আধার বঙ্গভূমি তােমার
বিভূতি, এতদিন শক্তিসংহরণে আত্মগােপন
করিতেছিল। আগত যুগ, আগত দিন, ভারতের
ভার স্কন্ধে লইয়া বঙ্গজননী উঠিতেছে, এস,
মাতঃ, প্রকাশ হও।
মাতঃ দুর্গে! তােমার সন্তান আমরা,
তােমার প্রসাদে, তােমার প্রভাবে মহৎ কার্যের
মহৎ ভাবের উপযুক্ত হই। বিনাশ কর ক্ষুদ্রতা,
বিনাশ কর স্বার্থ, বিনাশ কর ভয়।
মাতঃ দুর্গে ! কালীরূপিণি, নৃমুণ্ডমালিনি
দিগম্বরি, কৃপাণপাণি দেবি অসুরবিনাশিনি !
ক্রনিনাদে অন্তঃস্থ রিপু বিনাশ কর। একটিও
যেন আমাদের ভিতরে জীবিত না থাকে, বিমল
নিৰ্ম্মল যেন হই, এই প্রার্থনা, মাতঃ, প্রকাশ
হও।

দুর্গা-স্তোত্র ৪৫ মাতঃ দুর্গে ! স্বার্থে ভয়ে ক্ষুদ্রাশয়তায় ম্রিয়মাণ ভারত। আমাদের মহৎ কর, মহৎ- প্রয়াসী কর, উদারচেতা কর, সত্যসঙ্কল্প কর । আর অল্লাশী, নিশ্চেষ্ট, অলস, ভয়ভীত যেন হই। মাতঃ দুগে ! যােগশক্তি বিস্তার কর। তােমার প্রিয় আৰ্য-সন্তান, লুপ্ত শিক্ষা, চরিত্র, মেধাশক্তি, ভক্তিশ্রদ্ধা, তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য, সত্য- জ্ঞান আমাদের মধ্যে বিকাশ করিয়া জগৎকে বিতরণ কর। মানব সহায়ে দুর্গতিনাশিনি জগদম্বে, প্রকাশ হও। মাতঃ দুর্গে ! অন্তঃস্থ রিপু সংহার করিয়া বাহিরের বাধা-বিঘ্ন নিৰ্ম্মল কর । বলশালী পরাক্রমী উন্নতচেতা জাতি ভারতের পবিত্র কাননে, উর্বর ক্ষেত্রে, গগনসহচর পর্বতলে, পূতসলিলা নদীতীরে একতায় প্রেমে, সত্যে

৪৬
জগন্নাথের রথ
শক্তিতে, শিল্পে সাহিত্যে, বিক্রমে জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ
হইয়া নিবাস করুক, মাতৃচরণে এই প্রার্থনা,
প্রকাশ হও।
মাতঃ দুর্গে ! আমাদের শরীরে যােগবলে
প্রবেশ কর । যন্ত্র তব, অশুভ-বিনাশী তরবারী
তব, অজ্ঞান-বিনাশী প্রদীপ তব আমরা হইব,
বঙ্গীয় যুবকগণের এই বাসনা পূর্ণ কর। যন্ত্রী
হইয়া যন্ত্র চালাও, অশুভ-হন্ত্রী হইয়া তরবারী
ঘুরাও, জ্ঞানদীপ্তিপ্রকাশিনী
হইয়া প্রদীপ ধর,
প্রকাশ হও।
মাতঃ দুর্গে । তােমাকে পাইলে আর
বিসৰ্জ্জন করিব না, শ্রদ্ধা ভক্তি প্রেমের ডােরে
বাঁধিয়া রাখিব। এস মাতঃ, আমাদের মনে
প্রাণে শরীরে প্রকাশ হও।
বীরমাগপ্রদর্শিনি, এস ! আর বিসর্জন
করিব না। আমাদের অখিল জীবন অনবচ্ছিন্ন

দুর্গা-স্তোত্র
৪৭
দুর্গাপূজা, আমাদের সর্ব কাৰ্য অবিরত পবিত্র
প্রেমময় শক্তিময় মাতৃসেবাব্রত হউক, এই
প্রার্থনা, মাতঃ, উর বঙ্গদেশে, প্রকাশ হও।

স্বপ্ন
একটি দরিদ্র লােক অন্ধকার কুটরীতে বসিয়া
নিজ শােচনীয় অবস্থা এবং ভগবানের রাজ্যে
অন্যায় ও অবিচারের কথা ভাবিতেছিল। দরিদ্র
অভিমানের বশীভূত হইয়া বলিতে লাগিল,
“লােকে কর্মের দোহাই দিয়া ভগবানের সুনাম
বাঁচাইতে চায়। গত জন্মের পাপে যদি
আমার এই দুর্দশা হইত, আমি যদি এতই পাপী
হইতাম, তাহা হইলে নিশ্চয় এই জন্মে আমার
মনে পাপ চিন্তার স্রোত এখনও বহিত, এত
ঘাের পাতকীর মন কি একদিনে নিৰ্ম্মল হয় ?
আর ওই পাড়ার তিনকড়ি শীল, তাঁহার যে ধন
দৌলত স্বর্ণরৌপ্য দাসদাসী কৰ্ম্মফল সত্য হইলে

স্বপ্ন
৪৯।
নিশ্চয়ই পূর্ব জন্মে তিনি জগদ্বিখ্যাত সাধু মহাত্মা
ছিলেন, কিন্তু কই তাহার চিহ্ন মাত্রও এই জন্মে
দেখি না। এমন নিষ্ঠুর পাজী বদমায়েস জগতে
নাই। না, কৰ্ম্মবাদ ভগবানের কঁকি, মনভুলান
কথা মাত্র। শ্যামসুন্দর বড় চতুর চূড়ামণি, আমার
কাছে ধরা দেন না, তাই রক্ষা—নচেৎ উত্তম
শিক্ষা দিয়া সব চালাকী বাহির করিতাম।” এই
কথা বলিবা মাত্র দরিদ্র দেখিল হঠাৎ তাহার
অন্ধকার ঘর অতিশয় উজ্জ্বল আলোকতরঙ্গে
ভাসিয়া গেল, অল্পক্ষণ পরে আলােকতরঙ্গ
অন্ধকারে মিলাইয়া গেল, আর সে দেখিল
তাহার সম্মুখে একটি সুন্দর কৃষ্ণবর্ণ বালক
প্রদীপ
দাড়াইয়া রহিয়াছে—মৃদু
হাসিতেছে, কিন্তু কোনও কথা কহিতেছে
না ! ময়ূরপুচ্ছ ও পায়ে নূপুর দেখিয়া দরিদ্র
বুঝিল স্বয়ং শ্যামসুন্দর আসিয়া তাহাকে ধরা
দিয়াছেন। দরিদ্র অপ্রতিভ হইল, একবার ভাবিল
প্রণাম করি, কিন্তু বালকের হাসিমুখ দেখিয়া

জগন্নাথের রথ
কিছুতেই প্রণাম করিবার প্রবৃত্তি হইল না,শেষে
মুখ হইতে এই কথাই বাহির হইয়া গেল “ওরে
টো, তুই এলি কেন?” বালক হাসিয়া বলিল,
“কেন, তুমি আমাকে ডাকিলে না ? এইমাত্র
আমাকে চাবুক মারিবার প্রবল বাসনা তােমার
মনে ছিল ! তা, ধরা দিলাম, উঠিয়া চাকাও
।” দরিদ্র আরও অপ্রতিভ হইল, ভগবানকে
চাবুক মারিবার ইচ্ছার জন্য অনুতাপ নহে, কিন্তু
স্নেহের পরিবর্তে এমন সুন্দর বালকের গায়ে
হাত লাগানটা ঠিক রুচি সঙ্গত বলিয়া বােধ হইল
। বালক আবার বলিল, “দেখ, হরিমােহন,
যাহারা আমাকে ভয় না করিয়া সখার মত
দেখে, স্নেহভাবে গাল দেয়, আমার সঙ্গে খেলা
করিতে চায়, তাহারা আমার বড় প্রিয়। আমি
খেলার জন্যই জগৎ সৃষ্টি করিয়াছি, সর্বদা খেলার
উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজিতেছি। কিন্তু, ভাই, পাইতেছি
। সকলে আমার উপর ক্রোধ করে, দাবী
করে, দান চায়, মান চায়, মুক্তি চায়, ভক্তি চায়,

স্বপ্ন কই আমাকে ত কেহ চায় না। যাহা চায়, আমি দিই। কি করিব সন্তুষ্টই করিতে হয়, নহিলে আমাকে ছিড়িয়া খাইবে। তুমিও দেখিতেছি, কিছু চাও। বিরক্ত হইয়া চাবকাই- বার লােক চাও, আমাকে সেই সাধ মিটাইবার জন্য ডাকিয়াছ । চাবুকের প্রহার খাইতে আসিয়াছি—যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে। তবে যদি প্রহারের আগে আমার মুখে শুনিতে চাও, আমার প্রণালী বুঝাইয়া দিব। কেমন রাজী আছ ?” হরিমােহন বলিল, “পারিবি ত ? দেখিতেছি বড় বকিতে জানিস, কিন্তু তাের মত কচি ছেলে যে আমাকে কিছু শিখাইতে পারিবে, তাহা বিশ্বাস করিব কেন ?” বালক আবার হাসিয়া বলিল, “এস, দেখ, পারি কি না।” এই বলিয়া শ্ৰীকৃষ্ণ হরিমােহনের মাথায় হাত দিলেন। তখনই দরিদ্রের সর্ব শরীরে বিদ্যুতের স্রোত খেলিতে লাগিল, মূলাধারে সুপ্ত কুণ্ডলিনী শক্তি অগ্নিময়ী ভূজঙ্গিনীর

জগন্নাথের রথ
আকারে গজ্জন করিয়া ব্ৰহ্মরন্ধে ছুটিয়া আসিল,
মস্তিষ্ক প্রাণশক্তির তরঙ্গে ভরিয়া গেল। পর
মুহূর্তে হরিমােহনের চারিধারে ঘরের দেওয়াল
যেন দূরে পলাইতে লাগিল, নামরূপময় জগৎ
যেন তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া অনন্তে লুক্কায়িত
হইল। হরিমােহন বাহ্যজ্ঞান শূন্য হইল। যখন
আবার চৈতন্য হইল, সে দেখিল কোন অচেনা
বাড়ীতে বালকের সঙ্গে দাঁড়াইয়া আছে, সম্মুখে
গদীতে বসিয়া গালে হাত দিয়া একজন বৃদ্ধ
প্রগাঢ় চিন্তায় নিমগ্ন রহিয়াছেন। সেই ঘাের
দুশ্চিন্তা বিকৃত হৃদয়বিদারক নিরাশ বিমর্ষ
মুখমণ্ডল দেখিয়া হরিমােহন বিশ্বাস করিতে চায়
নাই যে এই বৃদ্ধ গ্রামের হর্তাকর্তা তিনকড়ি
শীল। শেষে অতিশয় ভীত হইয়া বালককে
বলিল, “কি করিলি কেষ্টা, চোরের মত ঘাের
রাত্রিতে পরের বাড়ীতে ঢুকিলি ? পুলিশ
আসিয়া ধরিয়া প্রহারের চোটে দুইজনের প্রাণ
বাহির করিবে যে ! তিনকড়ি শীলের প্রতাপ

স্বপ্ন
জানিস না ?” বালক হাসিয়া বলিল, “খুব
জানি। কিন্তু চুরি আমার পুরাতন ব্যবসা,
পুলিশের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা আছে,
ভয় নাই। এখন তােমাকে সূক্ষদৃষ্টি দিলাম,
বৃদ্ধের মনের ভিতর দেখ। তিনকড়ির প্রতাপ
জান, আমার প্রতাপও দেখ।” তখন হরিমােহন
বৃদ্ধ তিনকড়ির মন দেখিতে পাইল। দেখিল,
যেন শত্ৰু-আক্রমণে বিধ্বস্ত ধনাঢ্যা নগরী, সেই
তীক্ষ ওজস্বিনী বুদ্ধিতে কত ভীষণ মূর্তি পিশাচ
ও রাক্ষস প্রবেশ করিয়া শান্তি বিনাশ করি-
তেছে, ধ্যানভঙ্গ করিতেছে, সুখ লুণ্ঠন করি-
তেছে। বৃদ্ধ প্রিয় কনিষ্ঠপুত্রের সঙ্গে কলহ
করিয়াছেন, তাড়াইয়া দিয়াছেন ; বৃদ্ধকালের
স্নেহের পুত্রকে হারাইয়া শােকে মিয়মাণ, অথচ
ক্রোধ, গর্ব, হঠকারিতা হৃদয়দারে অর্গল দিয়া
শান্ত্রী হইয়া বসিয়া আছে। ক্ষমার প্রবেশ
নিষেধ করিতেছে। কন্যার নামে দুশ্চরিত্রা
বলিয়া কলঙ্ক রটিয়াছে, বৃদ্ধ তাহাকে বাড়ী হইতে
;

৫৪ জগন্নাথের রথ তাড়াইয়া প্রিয়কন্যার জন্য কাঁদিতেছেন ; বৃদ্ধ জানেন সে নির্দোষ, কিন্তু সমাজের ভয়, লােক- লজ্জা, অহঙ্কার, স্বার্থ স্নেহকে চাপিয়া ধরিয়াছে। সহস্র পাপের স্মৃতিতে বৃদ্ধ ভীত হইয়া বারবার চমকিয়া উঠিতেছে, তথাপি পাপ প্রবৃত্তির সংস্কারে সাহস বা বল নাই। মাঝে মাঝে মৃত্যু ও পরলােকের চিন্তা বৃদ্ধকে অতি নিদারুণ বিভীষিকা দেখাইতেছে। হরিমােহন দেখিল, মরণ-চিন্তার পশ্চাৎ হইতে বিকট যমদূত কেব- লই উকি মারিতেছে ও কপাটে ঠক্ ঠক্ করি- তেছে। যতবার এইরূপ শব্দ হয় বৃদ্ধের অন্ত- রাত্মা ভয়ে উন্মত্ত হইয়া চীৎকার করিয়া উঠে। এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখিয়া হরিমােহন আতঙ্কে বালকের দিকে চাহিয়া বলিল, “এ কিরে কেষ্টা, আমি ভাবিম বৃদ্ধ পরম সুখী।” বালক বলিল, “ইহাই আমার প্রতাপ। বল দেখি কাহার প্রতাপ বেশী, ও-পাড়ার তিনকড়ি শীলের, না বৈকুণ্ঠবাসী শ্ৰীকৃষ্ণের ? দেখ, হরিমােহন, স্বপ্ন আমারও পুলিশ আছে, পাহারা আছে, গবর্ণ- মেন্ট আছে, আইন আছে, বিচার আছে, আমিও রাজা সাজিয়া খেলা করিতে পারি, এই খেলা কি তােমার ভাল লাগে।” হরিমােহন বলিল, “না বাবা। এ ত বড় বদ খেলা। তাের বুঝি ভাল লাগে ?” বালক হাসিয়া বলিল, “আমার সব খেলা ভাল লাগে। চাবকাইতেও ভাল- বাসি, চাবুক খাইতেও ভালবাসি।” তাহার পর বলিল, “দেখ হরিমােহন তােমরা কেবল বাহিরটা দেখ, ভিতরটা দেখিবার সূক্ষদৃষ্টি এখনও বিকাশ কর নাই। সেইজন্যই বল, তুমি দুঃখী, আর তিনকড়ি সুখী। এই লােকটির কোনই পার্থিব অভাব নাই—অথচ তােমার অপেক্ষা এই লক্ষ- পতি কত অধিক দুঃখ-যন্ত্রণা ভােগ করিতেছে। কেন, বলিতে পার ? মনের অবস্থায় সুখ, মনের অবস্থায় দুঃখ । সুখ দুঃখ মনের বিকার মাত্র। যাহার কিছু নাই বিপদই যাহার সম্পত্তি, ইচ্ছা করিলে সে বিপদের মধ্যেও পরম সুখী হইতে

জগন্নাথের রথ
পারে। আবার দেখ তুমি যেমন নীরস পুণ্যে
দিন কাটাইয়া সুখ পাইতেছ না, কেবল দুঃখ
চিন্তা করিতেছ, ইনিও সেইরূপ নীরস পাপে
দিন কাটাইয়া কেবলই দুঃখ চিন্তা করেন। তাই
পুণ্যের ক্ষণিক সুখ ও পাপের ক্ষণিক দুঃখ বা
পুণ্যের ক্ষণিক দুঃখ পাপের ক্ষণিক সুখ। এই
দ্বন্দ্বে আনন্দ নাই। আনন্দ আগারের ছবি
আমার কাছে ; আমার কাছে যে আসে, যে
আমার প্রেমে পড়ে, আমাকে সাধে, আমার
উপর জোর করে, অত্যাচার করে সে আমার
আনন্দের ছবি আদায় করে।” হরিমােহন
আগ্রহপূর্বক শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনিতে লাগিল।
বালক আবার বলিল, “আর দেখ হরিমােহন,
শুষ্ক পুণ্য তােমার নিকট নীরস হইয়া পড়িয়াছে
অথচ সংস্কারের প্রভাব তুমি ছাড়িতে পার না ;
সেই তুচ্ছ অহঙ্কার জয় করিতে পার না। বৃদ্ধের
নিকট পাপ নীরস হইয়া পড়িয়াছে অথচ
সংস্কারের প্রভাবে তিনিও তাহা ছাড়িতে না
পারিয়া—ইহজীবনে নরকযন্ত্রণা ভােগ করিতে-

ছেন। ইহাকে পুণ্যের বন্ধন পাপের বন্ধন
বলে। অজ্ঞানজাত সংস্কার সেই বন্ধনের রজ্জ্ব
কিন্তু বৃদ্ধের এই নরক যন্ত্রণা বড় শুভ অবস্থা।
তাহাতে তাহার পরিত্রাণ ও মঙ্গল হইবে।”
হরিমােহন এতক্ষণ নীরবে কথা শুনিতে-
ছিল, এখন বলিল, “কেষ্টা, তাের কথা বড়
মিঠে, কিন্তু আমার প্রত্যয় হইতেছে না। সুখ
দুঃখ মনের বিকার হইতে পারে, কিন্তু বাহ্যিক
অবস্থা তাহার কারণ। দেখ, ক্ষুধার জ্বালায়
মন যখন ছটফট করে, কেহ কি পরম সুখী
হইতে পারে ? অথবা যখন রােগে বা যন্ত্রণায়
শরীর কাতর হয়, তখন কি কেহ তাের কথা
ভাবিতে পারে ?” বালক বলিল, “এস,
হরিমােহন, তাহাও তােমাকে দেখাইব। এই
বলিয়া বালক আবার হরিমােহনের মাথায় হাত
দিল, স্পর্শ অনুভব করিবামাত্র হরিমােহন দেখিল
আর তিনকড়ি শীলের বাড়ী নাই, নির্জন সুরম্য
পর্বতের বায়ুসেবিত শিখরে একজন সন্ন্যাসী

৫৮ জগন্নাথের রথ আসীন, ধ্যানে মগ্ন, চরণ প্রান্তে প্রকাণ্ড ব্যাঘ্র প্রহরীর ত্যায় শায়িত। ব্যাঘ্র দেখিয়া হরিমােহনের চরণদ্বয় অগ্রসর হইতে নারাজ হইল, কিন্তু বালক তাহাকে টানিয়া সন্ন্যাসীর নিকট লইয়া গেল। বালকের সঙ্গে জোরে না পারিয়া হরিমােহন অগত্যা চলিল। বালক বলিল, “দেখ হরিমােহন।” হরিমােহন চাহিয়া দেখিল, সন্ন্যাসীর মন তাহার চক্ষের সামনে খােলা খাতার মত রহিয়াছে, তাহার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় শ্রীকৃষ্ণ নাম সহস্রবার লেখা। সন্ন্যাসী নির্বিকল্প সমাধির সিংহদ্বার পার হইয়া সূৰ্য্যা- লােকে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়া করিতেছেন। আবার দেখিল, সন্ন্যাসী অনেকদিন অনাহারে রহিয়াছে, গত দুই দিন শরীর ক্ষুৎপিপাসায় বিশেষ কষ্ট পাইয়াছে। হরিমােহন বলিল, “এ কিরে কেষ্টা? বাবাজী তােকে এত ভাল- বাসেন, অথচ ক্ষুৎপিপাসা ভােগ করিতেছেন। তাের কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নাই! এই নির্জন

স্বপ্ন
ব্যাসঙ্কুল অরণ্যে কে তাঁহাকে আহার দিবে ”
বালক বলিল, “আমি দিব, কিন্তু আর এক মজা
দেখ।” হরিমােহন দেখিল, ব্যাঘ্ৰ উঠিয়া তাহার
বাবার এক প্রহারে নিকটবর্তী বল্মীক ভাঙ্গিয়া
দিল। ক্ষুদ্র শত শত পিপীলিকা বাহির হইয়া
ক্রোধে সন্ন্যাসীর গায়ে উঠিয়া দংশন করিতে
লাগিল। সন্ন্যাসী ধ্যানমগ্ন, নিশ্চল, অটল ।
তখন বালক সন্ন্যাসীর কর্ণকুহরে অতি মধুর
স্বরে একবার ডাকিল, “সখে !” সন্ন্যাসী চক্ষু
উন্মীলন করিলেন। প্রথমে মােহ-জ্বালাময়
দংশন অনুভব করেন না, তখনও কর্ণকুহরে সেই
বিশ্ববাঞ্ছিত চিত্তহারী বংশীরব বাজিতেছে—যেমন
বৃন্দাবনে রাধার কানে বাজিয়াছিল। তাহার
পরে শত শত দংশনে বুদ্ধি শরীরের দিকে
আকৃষ্ট হইল। সন্ন্যাসী নড়িলেন না—সবিস্ময়ে
মনে মনে বলিতে লাগিলেন, “এ কি ? আমার
এমন ত কখন হয় নাই। যাক, শ্রীকৃষ্ণ আমার
সঙ্গে ক্রীড়া করিতেছেন, ক্ষুদ্র পিপীলিকাচয়রূপে

জগন্নাথের রথ আমাকে দংশন করিতেছেন।” হরিমােহন দেখিল, দংশনের জ্বালা বুদ্ধিতে আর পৌছে না, প্রত্যেক দংশনে তিনি তীব্র শারীরিক আনন্দ অনুভব করিয়া কৃষ্ণনাম উচ্চারণপূর্বক অধীর আনন্দে হাততালি দিয়া নৃত্য করিতে লাগিলেন। পিপীলিকাগুলি মাটীতে পড়িয়া পলাইয়া গেল। হরিমােহন সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিল, “কেষ্টা, এ কি মায়া !” বালক হাততালি দিয়া দুইবার এক পায়ের উপর ঘুরিয়া উচ্চহাস্য করিল। “আমিই জগতের একমাত্র যাদুকর ! এ মায়া বুঝিতে পারিবে না, এই আমার পরম রহস্য। দেখিলে ? যন্ত্রণার মধ্যেও আমাকে ভাবিতে পারিলেন ত! আবার দেখ।” সন্ন্যাসী প্রকৃতিস্থ হইয়া আবার বসিলেন ; শরীর ক্ষুৎ- পিপাসা ভােগ করিতে লাগিল, কিন্তু হরিমােহন দেখিল সন্ন্যাসীর বুদ্ধি সেই শারীরিক বিকার অনুভব করিতেছে মাত্র, কিন্তু তাহাতে বিকৃত বা লিপ্ত হইতেছে না। এই সময়ে পাহাড় হইতে

স্বপ্ন
কে বংশীবিনিন্দিত স্বরে ডাকিল, “সখে !”
হরিমােহন চমকিল। এ যে শ্যামসুন্দরেরই মধুর
বংশীবিনিন্দিত স্বর। তাহার পরে দেখিল,
শিলচয়ের পশ্চাৎ হইতে একটি
उन्नाव
কৃষ্ণবর্ণ বালক থালায় উত্তম আহার ও ফল লইয়া
আসিতেছে। হরিমােহন হতবুদ্ধি হইয়া
কষের দিকে চাহিল । বালক তাহার পার্শ্বে
দাড়াইয়া আছে, অথচ যে বালক আসিতেছে,
সেও অবিকল শ্ৰীকৃষ্ণ। অপর বালক আসিয়া
সন্ন্যাসীকে আলাে দেখাইয়া বলিল, “দেখ, কি
এনেছি।” সন্ন্যাসী হাসিয়া বলিলেন, “এলি ?
এতদিন না খাওয়াইয়া রাখিলি যে ? যাক,
এলি ত বােস, আমার সঙ্গে খা।” সন্ন্যাসী
ও বালক সেই থালার খাদ্য খাইতে বসিল,
পরস্পরকে খাওয়াইতে লাগিল, কাড়াকাড়ি
করিতে লাগিল । আহার শেষ হইলে বালক
থালা লইয়া অন্ধকারে মিশিয়া গেল।
হরিমােহন কি জিজ্ঞাসা করিতে যাইতে-

জগন্নাথের রথ
সে একটি
ছিল, হঠাৎ দেখিল শ্রীকৃষ্ণ আর নাই, সন্ন্যাসীও
নাই, ব্যাঘ্রও নাই, পর্বতও নাই।
ভদ্র পল্লীতে বাস করিতেছে ; বিস্তর ধনদৌলত
আছে, স্ত্রী-পরিবার আছে, রােজ ব্রাহ্মণকে দান
করিতেছে, ভিক্ষুককে দান করিতেছে, ত্রিসন্ধ্যা
করিতেছে, শাস্ত্রোক্ত আচার সযত্নে রক্ষা করিয়া
রঘুনন্দন প্রদর্শিত পথে চলিতেছে, আদর্শ পিতা,
আদর্শ স্বামী, আদর্শ পুত্র হইয়া জীবন যাপন
করিতেছে। কিন্তু পর মুহূর্তে ভীত হইয়া
দেখিল যে যাহারা সে ভদ্রপল্লীতে বাস করে
তাহাদের মধ্যে লেশমাত্র সদ্ভাব বা আনন্দ নাই,
যন্ত্রবৎ বাহিরের আচার রক্ষাকেই পুণ্যবৎ জ্ঞান
করিতেছে। প্রথমটা হরিমােহনের যেমন আনন্দ
হইয়াছিল, এখন তেমনি যন্ত্রণা হইতে লাগিল।
তাহার বােধ হইল যেন তাহার বিষম তৃষ্ণা
লাগিয়াছে, কিন্তু জল পাইতেছে না, ধূলি
খাইতেছে, কেবলই ধূলি কেবলই ধূলি অনন্ত
ধূলি খাইতেছে। সেই স্থান হইতে পলায়ন

করিয়া সে আর এক পল্লীতে গেল, সেইখানে
একটি প্রকাণ্ড অট্টালিকার সম্মুখে অপূর্ব জনতা
ও আশীর্বাদের রােল উঠিতেছিল। হরিমােহন
অগ্রসর হইয়া দেখিল, তিনকড়ি শীল দালানে
বসিয়া সেই জনতার মধ্যে অশেষ ধন বিতরণ
করিতেছেন, কেহই নিরাশ হইয়া ফিরিতেছে
। হরিমােহন উচ্চহাস্য করিল, সে ভাবিল,
“একি স্বপ্ন ! তিনকড়ি শীল আবার দাতা ?”
তাহার পরে সে তিনকড়ির মন দেখিল। বুঝিল,
সেই মনে লােভ, ঈর্ষা, কাম, স্বার্থ ইত্যাদি সহস্র
অতৃপ্তি ও কুপ্রবৃত্তি দেহি দেহি রব করিতেছে।
তিনকড়ি পুণ্যের খাতিরে, যশের খাতিরে,
গর্বের বশে সেই ভাবগুলি ছাপাইয়া রাখিয়াছেন,
অতৃপ্ত রাখিয়াছেন, চিত্ত হইতে তাড়াইয়া
দেন নাই। এই সময় আবার কে হরি-
মােহনকে ধরিয়া তাড়াতাড়ি পরলােক ভ্রমণ
করাইয়া আনিল। হরিমােহন হিন্দুর নরক,
খৃষ্টানের নরক, মুসলমানের নরক, গ্রীকদের

৬৪ জগন্নাথের রথ নরক, হিন্দুর স্বর্গ, খৃষ্টানের স্বর্গ, মুসলমানের স্বর্গ, গ্রীকদের স্বর্গ, আর কত নরক, কত স্বর্গ দেখিয়া আসিল। তাহার পরে দেখিল, সে নিজ বাড়ীতে পরিচিত ছেড়া মাদুরে ময়লা ততাসকে ভর দিয়া বসিয়া আছে সম্মুখে শ্যামসুন্দর । বালক বলিল, “বড় রাত্রি হইয়াছে, বাড়ীতে না ফিরিলে সকলে আমাকে বকিবে, মারামারি আরম্ভ করিবে। সংক্ষেপে বলি। যে স্বর্গ নরক দেখিলে, সে স্বপ্ন জগতের, কল্পনাসৃষ্ট। মানুষ মরিলে স্বর্গ নরকে যায়, গত জন্মের ভাব অন্যত্র ভােগ করে। তুমি পূর্বজন্মে পুণ্যবান ছিলে, কিন্তু প্রেম তােমার হৃদয়ে স্থান পায় নাই, না তুমি ঈশ্বরকে ভাল- বাসিয়াছ, না মানুষকে। প্রাণত্যাগের পরে স্বপ্নজগতে সেই ভদ্রপল্লীতে বাস করিয়া পূর্ব জীবনের ভাব ভােগ করিতে লাগিলে, ভােগ করিতে করিতে সে ভাব আর ভাল লাগে না, প্রাণ আকুল হইতে লাগিল, সেখান হইতে গিয়া

স্বপ্ন
ধূলিময় নরকে বাস করিলে, শেষে জীবনের
পুণ্যফল ভােগ করিয়া আবার তােমার জন্ম
হইল। সেই জীবনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৈমিত্তিক দান
ভিন্ন, নীরস বাহ্যিক ব্যবহার ভিন্ন কাহারও
অভাব দূর করিবার জন্য কিছু কর নাই বলিয়া
এই জন্মে তােমার এত অভাব। আর এখনও
যে নীরস পুণ্য করিতেছ, তাহার কারণ এই যে
কেবল স্বপ্ন জগতের ভােগে পাপ পুণ্য সম্পূর্ণ
ক্ষয় হয় না, পৃথিবীতে কৰ্ম্মফল ভােগে ক্ষয় হয়।
তিনকড়ি গত জন্মে দাতাকর্ণ ছিলেন, সহস্র
ব্যক্তির আশীর্বাদে এই জন্মে লক্ষপতি ও
অভাবশূন্য হইয়াছেন, কিন্তু চিত্তশুদ্ধি হয় নাই
বলিয়া অতৃপ্ত কুপ্রবৃত্তি এখন পাপ দ্বারা তৃপ্ত
করিতে হইয়াছে।
হইয়াছে। কৰ্ম্মবাদ বুঝিলে কি ?
পুরস্কার বা শাস্তি নহে—কিন্তু অমঙ্গলের দ্বারা
অমঙ্গল সৃষ্টি, এবং মঙ্গল দ্বারা মঙ্গল সৃষ্টি। ইহা
প্রাকৃতিক নিয়ম। পাপ অশুভ, তাহা দ্বারা দুঃখ
সৃষ্ট হয়; পুণ্য শুভ, তাহার দ্বারা সুখ সৃষ্ট হয়।

জগন্নাথের রথ এই ব্যবস্থা চিত্তশুদ্ধির জন্য, অশুভ বিনাশের জন্য। দেখ হরিমােহন, পৃথিবী আমার বৈচিত্র্যময় জগতের অতি ক্ষুদ্র অংশ, কিন্তু সেখানে কর্ম দ্বারা অশুভ বিনাশ করিবার জন্য তােমরা জন্ম- গ্রহণ কর। যখন পাপ পুণ্যের হাত হইতে পরিত্রাণ পাইয়া প্রেমরাজ্যে পদার্পণ কর, তখন এই কাৰ্য্য হইতে অব্যাহতি পাও। পরজন্মে তুমিও অব্যাহতি পাইবে। আমি আমার প্রিয় ভগিনী শক্তি ও তাহার সহচরী বিদ্যাকে তােমার কাছে পাঠাইব, কিন্তু দেখ, এক সৰ্ত্ত আছে, তুমি আমার খেলার সাথী হইবে, মুক্তি চাহিতে পারিবে না। রাজি ?” হরিমােহন বলিল, “কেষ্টা, তুই আমাকে গুণ করিলি । তােকে কোলে লইয়া আদর করিতে বড় ইচ্ছা করে, যেন এই জীবনে আর কোন বাসনা নাই।” বালক হাসিয়া বলিল, “হরিমােহন, কিছু বুঝিলে ?” হরিমােহন বলিল, “বুঝিলাম বই

স্বপ্ন
কি।” তাহার পরে একটু ভাবিয়া বলিল, “ওরে
কেষ্টা আবার ফাঁকি দিলি । অশুভ সৃজন
করিলি কেন, তাহার ত কোন কৈফিয়ৎ দিস্
নি।” এই বলিয়া সে বালকের হাত ধরিল ।
বালক হাত কাড়িয়া লইয়া হরিমােহনকে
শাসাইয়া বলিল, “দূর হ !
এক ঘণ্টার মধ্যে
আমার সব গুপ্তকথা বাহির করিয়া লইবি ?”
বালক হঠাৎ প্রদীপ নিবাইয়া সরিয়া সহাস্যে
বলিল, “কই, হরিমােহন, চাবুক মারিতে
একেবারে ভুলিয়া গেলে যে। সেই ভয়ে তােমার
কোলে বসিলাম না, কখন বাহিক দুঃখে চটিয়া
আমাকে উত্তম শিক্ষা দিবে ! তােমার উপর
আমার লেশমাত্র বিশ্বাস নাই।” হরিমােহন
অন্ধকারে হাত বাড়াইল, কিন্তু বালক আরও
সরিয়া বলিল, “না, সে সুখ তােমার পরজন্মের
জন্য রাখিলাম। আসি।” এই বলিয়া অন্ধকার
রজনীতে বালক কোথায় অদৃশ্য হইয়া গেল।
হরিমােহন নূপুরধ্বনি শুনিতে শুনিতে জাগিয়া

৬৮
জগন্নাথের রথ
উঠিল। জাগিয়া ভাবিল, “এ কি রকম স্বপ্ন
দেখিলাম ! নরক দেখিলাম, স্বর্গ দেখিলাম,
তাহার মধ্যে ভগবানকে তুই বলিলাম, ছােট
ছেলে বুঝিয়া কত ধমক দিলাম। কি পাপ !
যা হােক, প্রাণে বেশ শান্তি অনুভব করিতেছি।”
হরিমােহন তখন কৃষ্ণবর্ণ বালকের মােহন মুর্তি
ভাবিতে বসিল এবং মাঝে মাঝে বলিতে লাগিল,
“কি সুন্দর ! কি সুন্দর !”

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Jagannather Rath Ed. 2nd

Author
Sri, Arabinda
Title
Jagannather Rath Ed. 2nd
File name
Jagannather Rath Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2009/07/16
Publisher
Sri Rameswar Dey, Chandan Nager
Language
Sanskrit
Pages
76
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Other Hindu Sects
Keywords
Devotion to God
DLI number
550819
Barcode
4990010021080.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
iIRNktzrYLJ
Download PDF

Jagannather Rath Ed. 2nd