Makardah Saraswat Library, Howrah

Chua Chandan Ed. 1st

Bandyopadhyay, Saradindu · 2009/08/1

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চুয়া-চন্দন
শ্ৰীশরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
পি সি সরকার এণ্ড কোং লিঃ
কলিকাতা

প ধ ম স ক র ণ
অ এ হা •ণ
১৩৪২
দেড়টা
৬৫, সীতারাম ঘােষষ্ট্রট, কলিকাতা। শ্রীকালী প্রেস হইত পরমানন্দ সিংহ
বায় কর্তৃক মুদ্রিত ও ১৮ শ্যামাচরণ দে ঐট, কলিকাতা, পি সি সরকার এণ্ড কোং
লিঃ হইতে শ্রীপ্রভাতচন্দ্র সরকার কর্তৃক প্রকাশিত।

No text on this page.

No text on this page.

সূচি
১
বাঘের বাচ্ছ।
রক্ত-খদ্যোত
কৰ্ত্তার কীর্তি
२१
৪৩
রক্ত-সন্ধ্যা
মরণ-ভােমরা
চুয়া-চন্দন
১১৭

No text on this page.

বাঘের বাচ্ছা

No text on this page.

পুনা গ্রাম হইতে প্রায় সাত আট ক্রোশ দক্ষিণ পশ্চিম দিকে উপত্যকা হইতে বহু ঊদ্ধে গিরিসঙ্কটের ভিতর দিয়া দুইজন,সওয়াব নিম্নভিমুখে অবতরণ করিতেছিল । চারিদিকেই উচ্চচ ছােটবড় পাহাড়ের শ্রেণী,—যেন কতক গুলাে অতিকায় কুম্ভীর পরস্পর ঘেষাঘেষি হয়। তাল পাকাইয়া এই হেমন্ত অপরাহের সােনালী রোদে শুইয়া আছে ! তাহারি মধ্যে পিপীলিকার মত দুইটি প্রাণী সূয্যের দিকে পশ্চাৎ করিয়া ক্রমশঃ দীর্ঘায়মান ছায়া’ সম্মুখে ফেলিয়া ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতেছিল। এখান হইতে উপত্যকা দৃষ্টিগােচর নয়, পথের ও কোনাে চিহ্ন কোথাও বিদ্যমান নাই। চতুর্দিকে কেবল উলঙ্গ কর্কশ পাহাড়, মাঝে মাঝে দুই একটা খর্বাকৃতি কণ্টক গুল্ম। এই সকল চিহ্ন ছাড়া পথিককে বহু দূরস্থ জনপদে পরিচালিত করিবার কোনো দর্শন নাই,-অনভিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে এরূপ স্থানে দিকভ্রান্ত হইবার সম্ভাবনা অত্যন্ত অবিক। অশ্বারােহী দুইজন যে পথ দিয়া নামিতেছিল তাহাকে পথ বলা চলে •, বর্ষার জল চূড়া হইতে নামিবার সময় পর্ধ্বতগাত্রে যে উপলপিচ্ছিল প্রণালী রচনা করে এ সেইরূপ একটি প্রণালী, পাহাড়ের শীর্ষ হইতে প্রায় ঋজুরেখায় পাদমূল পৰ্য্যন্ত নামিয়া গিয়াছে। সওয়ার দুইজন ঘােড়ার বরা ছাড়িয়া দিয়া পরস্পর বাক্যালাপ করিতে করিতে চলিয়াছিল, খদে রােমশ পাহাড়ী ঘােড়া স্বেচ্ছামত সেই ঢালু বিপজ্জনক পথে সাবধানে অবতরণ করিতেছিল। স্থানে পথ এত বেশী ঢালু যে একবার অশ্বের পদখলন হইলে আরােহীর মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু সেদিকে আরােহীদের দৃষ্টি নাই। আরােহীদের মধ্যে একজন প্রাচীন বয়স্ক ; মাথার চু ও গোঁফ পাকা, বর্ণ এত বয়সেও তপ্তকাঞ্চনের ন্যায়। কপালের এক প্রানু হই, ৪ চুয়াচন্দন । অন্য প্রান্ত পর্যন্ত শ্বেত-চন্দনের দুইটি রেখা বােব করি জরাজনিত ললাট রেখাকে, ঢাকিয়া দি "ছে। মস্তকে শুভ্র কার্পাসবস্ত্রের উষ্ণীষ ; দেহে তুল আঙরাখার ফাকে বামস্কন্ধের উপর উপবীতের একাংশ যাইতেছে। চোখেমুখে একটি দৃঢ় অচঞ্চল বুদ্ধির প্রভা। দেখিলেই বুঝা যায় ইনি একজন শাস্ত্রাধ্যায়ী অভিজাত বংশীয় ব্রাহ্মণ। ইহার হস্তে কোনো অস্ত্র নাই, কিন্তু যেরূপ স্বচ্ছন্দ নিশ্চিন্তার সহিত অবতরণ- শীল অশ্ব পৃষ্ঠে অটল হইয়া বসিয়া আছেন তাহাতে মনে হয় কেবল ব্ৰহ্মবিদ্যার অনুশীলন করিয়াই ইনি জীবন অতিবাহিত করেন নাই। দ্বিতীয় আরােহাটি ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত। বয়স বােধকরি ষােল বৎসর ও অতিক্রম করে এই ; দেহের বর্ণ শ্যাম কিন্তু মুখের গঠন অতিশয় ধারালো। মৃদঙ্গ সদৃশ মুখের মধ্যস্থলে শ্যেনচঞ্চুর মত নাসিকা এই অল্প বয়সেই তাহার মুখে শিকারীর মত একটা শাণিত তীব্রতা আনিয়া দিয়াছে। চক্ষুটি বড় বড়, চক্ষুতারকা নিবিড় কৃষ্ণবর্ণ ; বালকসুলভ চঞ্চলতা সত্ত্বেও দৃষ্টি অতিশয় তীক্ষ ও মৰ্ম্মভেদী ওষ্ঠের উপর ও চিবুকের নিম্নে ঈষন্মাত্র রােমরেখা দেখা দিয়াছে, তাহাও বর্ণের মলিনতার জন্য স্পষ্ট প্রতীয়মান নয়। জ্ব-যুগল সূক্ষ্ম ও দূর প্রসারিত। সহসা এই বালকের মুখ দেখিলে একটা অপূৰ্ব বিভ্রম জন্মে, মনে হয় যেন একখান। তীক্ষ্ণধার বাঁকা কৃপাণ সূর্যালােকে ঝক ঝক্‌ করিতেছে। মুখ হইতে দৃষ্টি নামাইয়া দেহের প্রতি চাহিলে কিন্তু আরাে চমক লাগে। মুখের মত দেহের সৌষ্ঠব . নাই, প্রস্থের তুলনায় দৈর্ঘ্যে দেহ অত্যন্ত খৰ্ব্ব। প্রথমেই মনে হয়, অতিশয় বলশালী। কটি হইতে পয়ের তােল নাগরা জুতা পৰ্যন্ত প্রাণসার অথচ ক্ষীণ, মৃগচরণের মত যেন অতি দ্রুত দৌড়িবার জন্যই সৃষ্ট হইয়াছে।

বাঘের বাচ্ছা কিন্তু কটি হইতে উর্জে দেহ ক্রমশঃ প্রশস্ত হইয়া বক্ষস্থল এরূপ বিশাল আয়তন ধারণ করিয়াছে যে বিস্মিত হতে হয়। আরাে অদ্ভুত তাহার দুই বাহু ; আজানুলম্বিত বলিলেও যথেষ্ট হয়না, সন্দেহ হয় ঘােড়ার পিঠে বসিয়া হাত বাড়াইলে মাটি হইতে উপলখণ্ড তুলিয়া লইতে পারে। তাহার উপর যেমন সুপুষ্ট তেমনি পেশীবহুল ; দুই বাহু দিয়া কাহাকেও সবলে জড়াইয়া ধরিলে তাহার পঞ্জর ভাঙিয়া যাওয়া অসম্ভব নয়। এই বালক হাসিতে হাসিতে চতুর্দিকে •চঞ্চল চক্ষে দৃষ্টিপাত করিতে করিতে নামিতেছিল। ঘােড়ার রেকাব নাই, লাল রেশমের জরিমােড়া মােটা লাগামও ছাড়িয়া দিয়াছে, অথচ কম্বলের জিনের উপর এমন ভাবে বসিয়া আছে যেন সে আর ঘােড়া পৃথক নয়- কোনাে ক্রমেই তাহাদের বিচ্ছিন্ন করা যাইবে না। বামহস্তে আগাগােড়া লােহার ভারী বল্লমটা এনি অবহেলা অবহেলা ভরে ধরিয়া আছে যেন পাগড়ীর উপর খেলাচ্ছলে রােপিত শুকপুচ্ছটার চেয়েও সেটা হাল্কা । ঘােড়া দুইটি পাহাড়ের পাদমূলে আসিয়া দাঁড়াইল। সম্মুখে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে আর একটা পাহাড় আরম্ভ হইয়াছে, এবার সেইটাতে চড়িতে হইবে। সূৰ্য্য পিছনের উচ্চ পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করিল, শীঘ্রই তাহার আড়ালে ঢাকা পড়িবে । বালক চতুর্দিকে চাহিয়া যেন প্রাণশক্তির আতিশয্য বশতঃই উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল, তারপর বলিল,-‘দাদো, প্রতিধ্বনি শুনবে? হােয়া হাে হাে হাে হাে! চুপ! এইবার শােনন। কয়েক মুহূর্ত পরেই তিনদিক হইতে ভৌতিক ভৌতিক শ ফিরিয়া আসিল-হােয়া ! হাে হাে হাে! - চুয়াচন্দন বলিক অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া উত্তর দিকের একটা উচ্চ পৰ্বতশৃঙ্গ দেখাইয়া বলিল,-“ঐটে সব চেয়ে দূরে ! আওয়াজ ফিরে আসতে কত দেরী হল দেখলে ? চোখে দেখে কিন্তু বােঝা যায়না কোন্টা কাছে কোন্টা দূরে। অন্ধকার রাত্রে পথ হারিয়ে গেলে প্রতিধ্বনি ভারি কাজে লাগে-না দাদো ? বৃদ্ধ মৃদুহাশ্যে উত্তর করিলেন,‘তা লাগে। কিন্তু অন্ধকার রাত্রে এরকম যায়গায় পথ হারিয়ে যাবার তােমার কোনাে সম্ভাবনা আছে কি? বালক বলিল,-“তা নেই। তুমি আমার চোখ বেঁধে দাও, দেখ আমি ঠিক পুনায় ফিরে যেতে পারব। বৃদ্ধ বলিলেন,-“সে আমি জানি। লেখাপড়ার দিকে তােমার একেবারে মন নেই, কেবল দিবারাত্রি পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে পেলেই ভাল থাকে। তােমার বাবা যখন আমার কাছে কৈফিয়ৎ চাইবেন তখন যে আমি কি কৈফিয়ৎ দেব তা জানি না। বালকের মুখে একটা দুষ্টামির হাসি খেলিয়া গেল, সে বৃদ্ধের দিকে আড়চোখে কটাক্ষপাত করিয়া বলিল,—“আচ্ছা দাদো, ‘আলিফ ভাল না ‘অ’ ভাল ? বা দিক থেকে ডান দিকে লেখা সুবিধে না ডান দিক থেকে বাঁ দিকে ? বৃদ্ধ বিরক্ত হইয়া বলিলেন,-“সে তুমি বুঝতে পারবে না। যােলাে বছর বয়স হল এখনাে নিজের নাম সহি করতে শিখলে না। তােমার লেখাপড়ার চেষ্টা করাই বৃথা!—কিন্তু শিকারের দিকেও ত তােমার মন নেই দেখতে পাই। আজ সারাদিন ঘুরে একটা খরগােসও মারতে পারলে না। বালক, আক্ষেপে হস্ত উৎক্ষিপ্ত করিয়া বলিল,-“খরগােস আমি মারতে পারি না, আমার ভারি মায়া হয়। ঐটুকু জানােয়ার, তার বাঘের বাচ্ছা ওপর হিংসার লেশ তার শরীরে নেই—খালি প্রাণপণে পালাতে জানে। বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করিলেন,-“তবে কোন জানােগ্নর মারতে চাও শুনি -বাঘ! উৎসাহ প্রদীপ্ত চক্ষে কিশাের বলিল,-“হ বাঘ। এ পাহাড়ে বাঘ পাওয়া যায় না দাদো ?” বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়া বলিলেন,-না।শুনেছি আরাে দক্ষিণে পাহাড়ের গুহায় বাঘ আছে। কিন্তু তুমি বাঘ মারবে কি করে? কিশোের বলিল,-“কেন, এই বল্লম দিয়ে মারব। মাটিতে সামনা- সামনি দাড়িয়ে মারব। ‘ভয় করবে না ? ‘ভয় ? বালকের উচ্চহাস্য আবার চারিদিকে প্রতিধ্বনি তুলিল-- ‘আচ্ছা দাদো, ভয় জিনিষটা কি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারাে? সকলের মুখেই ওই কথাটা শুনতে পাই কিন্তু ওটা যে কি পদার্থ তা বুঝতে পারি না। ভয় কি ক্ষুধার মত একটা প্রবৃত্তি ? দাদো বলিলেন,-ভয় কি তা বুঝতে পারবে যেদিন প্রথম যুদ্ধে নামবে, যেদিন হাতিয়ারবন্দ, শত্রুকে সামনে দেখতে পাবে। বালক কি একটা বলিতে গেল কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সম্বরণ করিয়া লইয়া চুপ করিয়া ভাবিতে লাগিল। দাদো বলিলেন,-“আমি বড় বড় বীরের মুখে শুনেছি যে তারাও প্রথমে শত্রুর সম্মুখীন হয়ে ভয় পেয়েছেন। এতে লজ্জার বিষয় কিছু নেই; সেই ভয়কে জয় করাই প্রকৃত বীরত্ব। সূৰ্য্য গিরিশৃঙ্গের অন্তরালে অদৃশ্য হইল, সঙ্গে সঙ্গে নিম্নভূমির উপর একটা ছায়ার সূক্ষ্ম যবনিকা পড়িয়া গেল। শুধু উর্ধ নগ্ন গিরিকুট এবষ্ণ

চুয়াচন্দন
আরো উদ্ধে নীল আকাশে একখণ্ড মেঘ সিন্দুরবর্ণ ধারণ করিয়া জ্বলিতে
লাগিল।
দাদো নিজের অব সম্মুখে চালিত করিয়া কহিলেন,—“আর দেরী
নয়। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, এখনাে দুটো পাহাড় পার হতে বাকী।
পুনা পৌছতে রাত হয়ে যাবে।
বালক তাহার অনুগামী হইয়া বলিল,-“তা হলেই বা, আমি
তােমাকে পথ দেখিয়ে ঠিক নিয়ে যাব।
দাদো বলিলেন,-‘রাত্রে এসব পাহাড়-পূৰ্কত নিরাপদ নয়।
শােনােনি, এদিকের গায়ে-বস্তিতে আজকাল প্রায় লুঠতরাজ
ম
বালক ভারি বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিল,-“তাই নাকি? কৈ
আমি ত শুনিনি। কারা লুঠতরাজ করছে ?
দাদো বলিলেন,—“তা কেউ জানেনা। বােধহয় এই দিকের বুনো
পাহাড়ী মাওলীরা ডাকাতি করছে। বিজাপুর এলাকার তিনটে বড়
বড় গ্রাম গত চারমাসের মধ্যে লুঠ হয়ে গেছে। শুনতে পাই তাদের
সর্দার একজন ছােকরা, লােহার সাঁজোয়া আর মুখােশ পরে ঘােড়ায়
S୨ লুঠেরাগুলােকে ডাকাতি করতে নিয়ে যায়। ছোঁড়াটা নাকি
ভঙ্কর কালে। বেঁটে আর জোয়ান।
বালক তাহার হাতের বল্লমটা খেলাচ্ছলে ঘুরাইতে ঘুরাইতে
তাচ্ছিল্যভরে জিজ্ঞাসা করিল,-“তাই নাকি? তুমি এত কথা কোথা
থেকে জানলে দাদো ?”
দাদো পাহাড়ে ঘােড়া চড়াইতে চড়াইতে বলিলেন,-“ও অঞ্চলের
দেশমুখরা দরবারে নালিশ করতে এসেছিল। তাদের বিশ্বাস ডাকাতের
সর্দার পুনার লােক।
A

বাঘের বাচ্ছা ৮" দাদোর পশ্চাতে বালকও পাহাড়ে উঠতে উঠিতে জিজ্ঞাসা করিল, ‘তােমরা দরবার থেকে কি ব্যবস্থা করলে ? দাদো বলিলেন,—“কিছু করা হয়নি। দেশমুখদের তােমার বাবার কাছে বিজাপুরে পাঠিয়ে দিয়েছি। বালক পশ্চাতে থাকিয়া মিটিমিটি হাসি:তছিল, দাদো তাহা দেখিতে ইলেন না। কিছুক্ষণ কোনাে কথা হইল না। পাহাড়ের পিঠের উপর উঠিয়া দুইনে ক্ষণকাল পাশাপাশি দাড়া- ইলেন। এখানে আবার কিরণ আসিয়া বালকের বল্লমের ফলায় এখন আগুন ধরাইয়া দিল । সম্মুখের পাহাড়তলীতে তখন ঘোর-ঘোর হইয়া আসিয়াছে, নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বালক বলিল,-“আচ্ছা দাদো, এখন যদি আমাদের ডাকাতে আক্রমণ করে তুমি কি কর ? দাদো ক্ষিপ্রদৃষ্টিতে একবার চতুর্দিকে চাহিয়া বলিলেন,—“কি আর করি। তাদের সঙ্গে লড়াই করি। ‘তারা যদি পঞ্চাশজন হয় ?” ‘তা হলেও লড়ি। বালক বলিল,-“কিন্তু সে যে ভারী বােকামি হবে দাদো। পঞ্চাশ- জনের সঙ্গে লড়াই করে তুমি পারবে কেন ? দাদো বলিলেন,—“তাতে কি? নাহয় লড়াই করতে করতে মরব। বালক বিস্মিত হইয়া বলিল,-“কিন্তু এরকম মরে লাভ কি দাদো? তারপর মাথা নাড়িয়া বলিল,-“আমি কিন্তু লড়ি না, তীরের মত এই ধার বেয়ে পালাই। এত জোরে পালাই যে ডাকাতের বর্শা আমাকে ছুঁতেও পারবেনা।

চুয়াচন্দন
ক্ষুব্ধ বিস্ময়ে দাদো বলিলেন--ক্ষত্রিয়ের ছেলে তুমি, দুষমনের সামনে
থেকে পালাবে ? এই না বলছিলে, ভয় কাকে বলে জানাে না।
বালক বলিল,-'ভয় ! পালানাের সঙ্গে ভয়ের সম্পর্ক কি?
পালাবাে কারণ পালালেই আমার সুবিধা হবে, পরে ডাকাতদের জব্দ
করতে পারব। আর লড়ে যদি মরেই যাই তাহলে ত ডাকাতদের জিৎ
হল।
যে বীর
মায়ের দিক
দাদো মাথা নাড়িয়া বলিলেন,-“না না, এসব শিক্ষা তুমি কোথা
থেকে পাচ্ছ ? না লড়ে পালিয়ে যাওয়া ভয়ঙ্কর কাপুরুষতা।
সে কখনো পালায় না। রাজপুত বীরদের গল্প শােনােনি ?
বালক বলিল,-“রাজপুতদের গল্প শুনলে আমার গা জ্বালা করে।
তারা শুধু লড়াই করতে পারে, বুদ্ধি এতটুকু নেই। যিনি যতবড় বীর
তিনি ততবড় বােকা।
দাদো খোচা দিয়া বলিলেন,-“তুমিও ত রাজপুত !
থেকে তােমার গায়েও ত যদুবংশের রক্ত আছে।
বালক সবেগে শিরঃসঞ্চালন করিয়া বলিল,-“না আমি রাজপুত
হইতে চাই না, আমি মারাঠী। বালকের ললাট মেঘাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল
কিন্তু পরক্ষণেই সে হাসিয়া উঠিয়া বলিল,-“আচ্ছা দাদো, তােমার কাছে
ত বড় বড় যুদ্ধের গল্প শুনেছি কিন্তু একটা কথা কিছুতেই বুঝতে
পারি না। সম্মুখ যুদ্ধ করবার মানে কি?
দাদো সহসা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিলেন না। শেষে বলিলেন,-
‘সম্মুখ যুদ্ধ মানে সামনা সামনি শক্তি পরীক্ষা। যার শক্তি বেণী সেই
জিতবে।
‘আর যার শক্তি কম সে যদি চালাকি করেজিতে খায়।
‘সে ত আর ধৰ্ম্মযুদ্ধ হল না।

বাঘের বাচ্ছা ১১ নাইবা হল ! যুদ্ধে হার জিতই ত আসল—ধর্মযুদ্ধ হল কি না তা দেখে লাভ কি ? দাদো অনেকক্ষণ বালকের জিজ্ঞাসু মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন, শেষে দুঃখিতভাবে ঘাড় নাড়িয়া বিড় বিড় করিয়া বলিলেন,-“বাপের স্বভাব যােল আনা পেয়েছে, তেমনি ধূর্ত আর হুসিয়ার-সৰ্ব্বদাই লাভ লােকসানের দিকে নজর । আর শুধু বাপ কেন, বংশটাই ধূর্ত! মালােজী ভোসলে যদি চালাকি করে যদুবংশের মেয়ে ঘরে না আনতে পারত তাহলে ভোলে বংশকে চিন্ত কে ? আর শাইবা এতবড় জায়গীরদার হত কোথা থেকে ? পলকের মধ্যে বালকের সংশয় প্রশ্নপূর্ণ মুখভাবের পরিবর্তন হইল। বালােকোচিত কৌতুহলে দাদোর নিকটে সরিয়া গিয়া সানুনয়কণ্ঠে বলিল, —“দাদো, তুমি যে আমার মা'র বিয়ের গল্প বলবে বলেছিলে, কৈ বললে ? বল না, দাদো, কি করে ঠাকুর্দা যদুবংশী মেয়ে ঘরে আনলেন। এই সময় নিম্নের ছায়াচ্ছন্ন প্রদোষান্ধকার হইতে গাভীর হারব ভাসিয়া আসিল। বালক সচকিত হইয়া বলিয়া উঠিল,-ঐ শােনাে দেওরামের গরু ঘরে ফিরে এল। চল চল দাদো; আর দেরী নয় ; সমস্তদিন ঘুরে ঘুরে ভারি ক্ষিদে পেয়ে গেছে—এতক্ষণ তা লক্ষ্যই করিনি। দেওরামের মেয়ে মুন্নার সঙ্গে সেই যে সকালবেলা তেতুলবনের ধারে দেখা হয়েছিল, সে বলেছিল ফেরবার সময় তাজা দুধ খাওয়াবে। জয় ভবানী। বালক দুই পা দিয়া ঘােড়র পেট চাপিয়া ধরিতেই ঘােড়া লাফাইয়া সম্মুখদিকে অগ্রসর হইল। আঁকিয়া বাঁকিয়া পার্বত্য হরিণের মত পাথর হইতে পাথরের উপর ধাপে ধাপে লাফাইয়া পড়িয়া বিদ্যুদ্বেগে নীচের দিকে অদৃশ্য হইল।

১২ চুয়াচন্দন দাদো বালকের উচ্চকণ্ঠস্বর দূর হইতে শুনিতে পাইলেন,—“চলে এস দান্নো, দেওরামের ঘর ঝর্ণাতলার টীলের উত্তর দিকে কুলগাছের জঙ্গলের মধ্যে ; যদি খুজে না পাও হাঁক দিও—মুন্না এসে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।” বৃদ্ধ পর্বত অবতরণ করিয়া বদরীবনের মধ্যে যখন দেওরামের কুটীর অঙ্গনে পৌছিলেন তখন দেখিলেন একটি বারো-তেরাে বছরের মাওলী চাষার মেয়ে একটা ক্ষুদ্রকায় গাভীকে দোহনের চেষ্টা করিতেছে এবং বালক ঘােড়া ছাড়িয়া দিয়া অদূরে দাড়াইয়া সকৌতুকে সেই দৃশ্য দেখিতেছে। গাভীটা বােধ হয় অপরিচিত ব্যক্তি ও ঘােড় দেখিয়া ভয় পাইয়াছে তাই কিছুতেই স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া দুগ্ধ দোহন করিতে দিতেছে না, চেষ্টা করিবামাত্র সরিয়া! সরিয়া যাইতেছে। মেয়েটি বিব্রত হইয়া বলিল,-“তুমি ওর শিংদুটা একবার ধর না, নইলে বজাত গরু কিছুতেই দুইতে দেবেনা। বালক গরুর শিং ধরিবার কোনো চেষ্টা না করিয়া তামাসা করিয়া বলিল,-“তুই কেমন মাওলার মেয়ে—গাই দুইতে জানিস না? দাড়া, বিশুয়াকে বলে দেব সে আর তােক বিয়ে করবে না। ক্ষুব্ধ লজ্জায় মুন্না এতটুকু হইয়া গিয়া বলিল,-“তােমার ঘােড়া দেখেই ত আজ ও অমন করছে নইলে আমিই ত রােজ দুই। বালক মুরুব্বিয়ানা দেখাইয়া বলিল,-“হ্যা দুই ! আর বড়াই করতে হবে না। দে আমায় ঘটি আমি দুয়ে দিচ্ছি। মুন্না বলিল,-“তুমি পারবে না। আমি আর বাবা ছাড়া কেউ ওকে দুইতে পারে না। তােমাকে ও এখনি ফেলে দেবে। বালকের আত্মাভিমানে ভীষণ আঘাত লাগিল, সে তৰ্জন করিয়া বলিল,‘কি! ফেলে দেবে ! দেখি ত কেমন তাের গরু। দে ঘটি।

বাঘের বাচ্ছা মুন্নার হাত হইতে জোর করিয়া ঘটি কাড়িয়া লইয়া বালক দুগ্ধ দোহন করিতে বসিল। গরুটা ঘাড় বাঁকাইয়া একবার দোহনকারীকে দেখিয়া লইয়া চক্রাকারে ঘুরিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু বালক ও ছাড়িবার পাত্র নয়, ঘটি লইয়া মুখে নানা প্রকার প্রীতি?চক শব্দ করিতে করিতে তাহার পশ্চাতে ঘুরিতে লাগিল। অবশেষে কি মনে করিয়া গাভীটা দাড়াইয়া পড়িল। তখন বালক সন্তর্পণে তার দেহে হাত বুলাইয়া দিয়! গাভীর পাদ্দিকে বসিয়া দুই জামুর মধ্যে ভাণ্ডটি ধরিয়া যেমন গাভীর উবসের দিকে হাত বাড়াইয়াছে অমনি গাভী এক চরণ তুলিয়া তাহাকে এরূপ সবেগে পদাঘাত করিল যে বালক ভাণ্ড সমেত চিং হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। মুন্না কলকণ্ঠে উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল। গাভীটা। যেন কৰ্তব্যকৰ্ম্ম সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া স্থির হইয়া দাড়াইয়া রােমন্থন করিতে লাগিল । বৃদ্ধ দাদো অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া বালকের কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,-লেগেছে নাকি ? বালক অঙ্গের ধূলা ঝাড়িতে ঝাড়িতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল,-- ‘গরু নয়—ঘােড়া। গরু কখনাে অমন চাট ছেড়ে ? নে মুন্না তাের ঘটি, আমি ঘােড়ার দুধ খেতে চাই না। বাড়ী চলুন। বালক অশ্বপৃষ্ঠে উঠিতে যা দেখিয়া মুন্না মিনতি করিয়া বলিল,- ‘আর একটু দাড়াও না, বাবা এল বলে। বড় ক্ষিদে পেয়েছে বলছিলে ঘরে বাজরার রুটি আছে এনে দেব ?” বালক বলিল,-না তাের রুটি দুধ কিছু খেতে চাইনা। আমি চলুম। এমন সময় কুটির পশ্চাতের ঘন ঝােপের ভিতর হইতে দুইটি লােক বাহির হইয়া আসিল। আসিল। একজন খর্বকায় বৃষস্কন্ধ মধ্যবয়স্ক লােক, অপরটি ১৪ চুয়াচন্দন পচিশ চাব্বিশ বছর বয়সের দৃঢ় শরীর যুব।। হাতের বল্লম কুটীরের গায়ে হেলাইয়া রাখিয়া মধ্যবয়সী লােকটি দ্রুতপদে আসিয়া বালকের ঘােড়ার রাশ ধরিল। বালক তখন ঘােড়র উপর চড়িয়া বসিয়াছে, লােকটি সানুনয় নিম্নকণ্ঠে বলিল,-“রাজা, ঘােড়া থেকে নামাে, দুধ না খেয়ে যেতে পাবে না। যুবকটিও এতক্ষণে সসম্ভ্রম হাস্যাদ্ভাসিত মুখে নিকটে আসিয়া দাড়াইয়াছিল। বালক একলক্ষে ঘােড়া হইতে নামিয়া দৌড়িয়া গিয়া মুন্নার চুলের মুঠি ধরিল, তাহাকে চুল ধরিয়া টানিতে টানিতে যুবকের সম্মুখে লইয়া গিয়া প্রায় তাহার বুকের উপর ফেলিয়া দিয়া বলিল,- ‘এই নে বিশুয়া, এটাকে তুই ঘরে নিয়ে যা, তাের সঙ্গে ওর বিয়ে দিলুম। যদি বজ্জাতি করে, খুব পিটুবি। আর ওই হতভাগা গরুটাকেও তুই নিয়ে যা, ওটা হল তাের বিয়ের যৌতুক । মুন্না বালকের হাত ছাড়াইয়া কুটীরের ভিতর পলাইয়া গেল। বিশুয়া হাসিতে হাসিতে হেঁট হইয়া বালকের পদস্পর্শ করিয়া বলিল,- ‘তুমি যখন দিলে রাজা তখন আর আমার ভাবনা কি! এবার ঘােড়ার পিঠে তুলে ওকে ঘরে নিয়ে যাব। কি বল দেওরাম ? দেওরাম গম্ভীর ভাবে একটু হাসিয়া বলিল,-“তা যা। রাজা যখন তাের হাতে মুন্নাকে দিয়েই দিয়েছে তখন আর আমি কি আর, আমি মুন্নার মন জানি, সেও তােকেই বিয়ে করতে চায়। এই সময় মুন্নার হাসিমুখ কুটীরের ভিতর হইতে পলকের জন্য দেখা গেল। সে সশব্দে কুটীর দ্বার বন্ধ করিয়া দিল । দেওরাম ভূপতিত ঘটিটা তুলিয়া লইয়া দুগ্ধ দোহনে প্রবৃত্ত হইল। গাভীটা এবার আর কোনাে আপত্তি করিল না। বলব ?

বাঘের বাচ্ছা ১৫ বৃদ্ধ দাদো এতক্ষণ অদূরে দাঁড়াইয়া ইহাদের কথাবার্তা শুনিতে ছিলেন। তাহার মুখে সংশয় ও সন্দেহের ছায়া ঘনীভূত হইতেছিল। এই নির্জন বনের মধ্যে একটিমাত্র কুটীর তাহার, অধিবাসী এই ভীমকায় দেওরাম। ইহারা কে এবং বালকের সহিত ইহাদের পরিচয় হইল কিরূপে? তিনি অগ্রসর হইয়া বিশুয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তােমরা একে চিলে কি করে ? নিমেষের জন্য বিশুয়া ও বালকের চোখে চোখে একটা ইঙ্গিত খেলিয়া গেল। বিশুয়ার মুখ ভাবলেশহীন হইয়া গেল, সে কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিল, ‘দরবারে ওঁকে দেখেছি, উনি জাগীরদারের ছেলে। বৃদ্ধ সন্দিগ্ধভাবে পুনশ্চ প্রশ্ন করিলেন,-“তােমরা ওঁকে রাজা বলে ডাকছ কেন?” বিশুয়া কোনাে উত্তর খুঁজিয়া পাইল না ; দুগ্ধদোহন করিতে করিতে দেওরান জবাব দিল,—‘জাগীরদারের ছেলে, উনিই একদিন মালিক হবেন তাই রাজা বলে ডাকি। দাদো উত্তরে সন্তুষ্ট হইলেন না, বলিলেন,—“ইনি জায়গীরদারের মেজো ছেলে তাও জান না? সে যাক বালকের দিকে ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,--‘কিন্তু তুমি এদের চিনলে কি করে জিজ্ঞাসা করি ? বালক অত্যন্ত সরলভাবে উত্তর করিল,—“শিকার করতে এসে এদের সঙ্গে ভাব হয়েছে দাদো। তুমি ত আর প্রত্যেকবার আমার সঙ্গে আসসা না তাই জানাে না। কতবার শিকার করে ফেরবার মুখে দেওরামের জোয়ারী রুটি খেয়েছি—দেওরাম আমাকে ভারি যত্ন করে।

চুয়াচন্দন দাদো বালকের ছলনাহীন মুখের দিকে কিয়ৎকাল তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিয়া শুধু কহিলেন,-“হু। মনে মনে ভাবিলেন, তােনার গতিবিধির উপর এখন হইতে একটু বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হইবে। ব্যাপার ঠিক বুঝ! যাইতেছে না। ধাররাষ্ণ দুগ্ধের পাত্র অনিয়া দে ওরাম বালকের হাতে দিল। বালক জিজ্ঞাসা করিল,-“দাদো, তুমি পাবে না ? দাদো কহিলেন,-“না তুমি খাও। আমার এখনাে আহ্নিক বাকী। দুগ্ধপাত্র দুই হস্তে ধরিয়া বলক অদূরে একটি শিলাখণ্ডের উপর গিয়া বসিল। দেওরামও তাহার অনুবর্তী হইয়া পাশে গিয়া দাঁড়াইল। এক চুমুক দুগ্ধ পান করিয়া বালক অন্যমনস্কভাবে আকাশের দিকে তাকাইয়া নিম্নস্বরে বলিল,-“পরশু অমাবস্যা। দেওরামও অলসভাবে উদ্ধে দৃষ্টি করিয়া অস্ফুটস্বরে বলিল,-‘ই। লােক সব তৈরী আছে। কোথায় থাকতে হবে ? ‘রাক্ষসমুখখা গুহার মধ্যে। আমি দেড় পহর রাত্রে আসব। পঁচিশ জনের বেশী লােক যেন না হয়। ‘বেশ। এবার কোনদিকে যাওয়া হবে ? ‘উত্তর দিকে। দক্ষিণে আর নয়, সেদিকে বড় হৈ চৈ হয়েছে । দরবার পর্যন্ত খবর গেছে। দাদো তাহাদের দিকে লক্ষ্য করিতেছেন দেখিয়া দেওরাম প্রকাণ্ড একটা হাই তুলিয়া অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে বলিল,-“আচ্ছা। হরিণ কিন্তু এ দিকে পাওয়া যায় না। বালক বাকী দুগ্ধটুকু নিঃশেষে পান করিয়া উঠিয়া দাড়াইয়া সহজ- ভাবে, বলিল,-“আজ তা হলে চলুম দেওরাম। মুন্নার বিয়ের দিন বাঘের বাচ্ছা ১৭ আমাকে খবর দিও—আমি দাদাকে নিয়ে আসব। দাদো একজন ভারী শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত জানাে ত ? উনিই মুন্নার বিয়ে দেবেন। ঘােড়ার পিঠে একলাফে উঠিয়া বালক বলিল,—“আর যদি হরিণ- ছানা পাও, পুনায় নিয়ে যেও। আর দেরী করব না, রাত হয়ে এল। দাদোর আবার ভারি ডাকাতের ভয় ! বিশুয়া ও দেওরাম দাঁড়াইয়া রহিল, অশ্বারােহী দুইজনে বদরীকানন পার হইয়া ঝর্ণার সঞ্চিত অগভীর ক্ষুদ্র জলাশয়ের পাশ দিয়া আবার পাহাড়ে উঠিতে আরম্ভ করিলেন। এইটি শেষ পাহাড়---ইহার পরই উপত্যকা। কিছুক্ষণ কোনাে কথা হইল না, দুইজনেই স্ব স্ব চিন্তায় মগ্ন। এদিকে অন্ধকার গাঢ় হইয়া আসিতেছে। ঘােড়া দুটি সতর্কভাবে পর্বতগাত্র আরােহণ করিতেছে। হঠাৎ চমক ভাঙিয়া বালক দাদোর দিকে দৃষ্টিপাত করিল, দেখিল দাদো তাহারই মুখের প্রতি সন্দেহাকুল চক্ষে চাহিয়া আছেন। বালক অপ্রতিভ হইয়া পড়িল, তারপর জোর করিয়া হাসিয়া বলিল,-“কি দেখছ দাদো? এবার আমার মা’র বিয়ের গল্প বল। বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস মােচন করিয়া কিয়ৎকাল নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন, আপনার মনে বলিলেন—‘বংশের ধারা বদলান যায় না; বাঘের বাচ্ছ। বাঘই হয়, শৃগাল হয় না-ঈশ্বরের এই বিধান। কে জানে, হয় ত এর মধ্যে মঙ্গলেরই বীজ নিহিত আছে। বালক তাহাকে দীর্ঘকাল চিন্তা করিবার অবকাশ না দিয়া পুনশ্চ কহিল,-“বল না দাদো! দাদো আবার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন,-- ‘গল্প অতি সামান্যই। কিন্তু তােমার ঠাকুর্দা মালােজী ভোসলে যে কি রকম চতুর ছিলেন, এই গল্প থেকে তার পরিচয় পাওয়া যায়। ২ ১৮ চুয়াচন্দন ‘তােমার মাতুলবংশের মত এতবড় বিখ্যাত যশস্বী বংশ দাক্ষিণাত্যে খুব অল্পই আছে। আজ থেকে নয়, চারশ' বছর আগে আলাউদ্দিন খিলিজির আমল থেকে দেবগিরির যদুবংশের নাম দাক্ষিণাত্যের পাথরে পাথরে তলােয়ার দিয়ে খােদাই হয়ে আসছে। ‘অতীতের কোন যুগে এই যদুবংশ রাজপুতনা থেকে এসে দেওগিরিতে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে কাহিনী লুপ্ত হয়ে গেছে। দেওগিরির রাজ্যও আর নেই। কিন্তু বীরত্বে ধৰ্ম্মনিষ্ঠায় মহানুভবতায় এই বংশ আজ পর্যন্ত হিন্দুমাত্রেরই আদর্শ হয়ে আছে। ‘এ হেন বংশে তােমার দাদামশায় লখুজী যদুরাও একজন পরাক্রম- শালী মহাতেজস্বী পুরুষ ছিলেন। দশ হাজার সিপাহী নিত্য তার রুটি খেত। বিজাপুর গােলকুণ্ডা তাকে যমের মত ভয় করত, আমেদনগর রাজ্যের তিনি ছিলেন প্রধান স্তম্ভ। মালিক অম্বর যদি তার সঙ্গে কপটাচারিতা না করত—কিন্তু সে অন্য কথা। এখন আসল গল্পটা বলি । ‘সে আজ বহুদিনের ঘটনা, তখন আমার বয়স দশ এগারাে বছরের বেশী নয়। কিন্তু সেদিনকার প্রত্যেক ঘটনাটি স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন ছিল ফানী পৌর্ণমাসী, রাজপুতদের একটা মস্ত উৎসবের দিন। দাক্ষিণাত্যে দোলপূর্ণিমার দিন আবীর খেলার প্রথা এই যদুবংশই প্রচার করেছিলেন। সেদিন দেশের সমস্ত গণ্যমান্য লােক, এমন কি বিজাপুর গােলকুণ্ডা আমেদনগর দরবারের বড় বড় হিন্দু আমীর-ওমরা এসে লখুজীর কেল্লার মত বিশাল ইমারতে জমা হতেন। সমস্ত রাত্রিদিন ব্যাপী উৎসব চলত, ফাগ, রঙ, এবং সুরার স্রোত বয়ে যেত। ‘সেবার লখুজীর প্রকাণ্ড প্রাসাদের দরবার ঘরে মজলিস বসেছে। মেঝের উপর পার্শী গালিচা পাতা, তার উপর অনেকে বসেছেন ; দরবার বাঘের বাচ্ছা ১৯ লােকে লােকারণ্য। সিপাহী থেকে সর্দার পর্যন্ত সকলের অবাধ যাতায়াত। সামান্য সৈনিক পচহাজারী সর্দারের মুখে আবীর মাখিয়ে দিচ্ছে, মসবদার সিপাহীকে মাটিতে ফেলে তার মুখে মদ ঢেলে দিচ্ছে। হাসির হররা ছুটছে ! ছােট বড় উচ্চনীচ কোনো প্রভেদ নেই, এই একদিনের জন্য সকলে সমান। সবাই আমােদে মত্ত। ‘সভার মাঝখানে মস্তবড় একটা চাদির থালায় আবীর স্তুপীকৃত রয়েছে, সেই থালা ঘিরে প্রধান প্রধান অতিথিরা বসেছেন। পানদান গুলাবপাশ আতরদান চারিদিকে ছড়ানাে রয়েছে। স্বয়ং লখুজী এখানে আসীন ; তােমার ঠাকুর্দা মালােজীও আছেন। মালােজী তখন লখুজীর অনুগৃহীত একজন সামান্য সর্দার মাত্র। কিন্তু তার কূটবুদ্ধি ও রণনৈপুণ্যের জন্য লখুজী তাকে ভারি স্নেহ করতেন। তাই মালােজও সাহস করে এই সভায় এসে বসেছেন। সকলের মুখেই আবীরের প্রলেপ, দেহের বস্ত্র এবং মিরজাই রঙে রক্তবর্ণ, চক্ষু ঢুলু ঢুলু। এখানে গানের মজলিস বসেছে ; আরাে অনেক লােক চারিদিকে ঘিরে দাড়িয়ে গান শুনছে এবং মজা দেখছে। ‘গান গাইছেন আমেদনগরের একজন বুড়ো ওমরা-- তার নাম ভুলে গেছি। মস্ত ওস্তাদ বলে তার খ্যাতি ছিল। গড়গড়া টানতে টানতে হঠাৎ তিনি বসন্তরাগের এক তান মারলেন—সুরের ধমকে পাকা গোঁফ থেকে একরাশ আবীর উড়ে গেল। তােমার ঠাকুর্দা মালােজী সারঙ্গী কোলে করে ওস্তাদের পিছনে বসে ছিলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গত আরম্ভ করলেন। লখুজী নিজে মৃদং বাজাতে লাগলেন। ‘গান থামলে প্রশংসাধ্বনির একটা ঝড় বয়ে গেল, লখুজী পাথােয়াজ ফেলে প্রায় এক তােলা অম্বরী আতর পলিত কেশ গায়কের কাফে ২০ চুয়াচন্দন মাখিয়ে দিয়ে দাড়ি ধরে নেড়ে দিয়ে বলে,-“কং কিয়া বিবি। আর একটা ফৰ্ম্মাও। ‘বৃদ্ধ দন্তহীন হাসি হেসে চোখ ঠেরে আবার গান ধরলেন, ‘চোলিমে ছিপাউ কৈসে যােবনা মােরি। ‘বিরাট হাসির একটা হল্লা পড়ে গেল। লখুজী ওস্তাদকে কোলে তুলে নিয়ে নৃত্য শুরু করে দিলেন।—কি আনন্দের দিনই গিয়েছে; এখন সব স্বপ্ন বলে মনে হয়। দাদো একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন। ঘােড়া দুইটি ইতিমধ্যে পৰ্বত পার হইয়া উপত্যকায় নামিয়া আসিয়াছে কিন্তু পথ এখনাে শিলা-সঙ্কুল। আশে-পাশে মাটি কাটিয়া বড় বড় খাদ রচনা করিয়াছে। শুষ্ক পয়ঃপ্রণালীর মত এই খাদগুলি অন্ধকারে বড়ই বিপজ্জনক, ঘােড়া একবার পা ফস্কাইয়া উহার মধ্যে পড়িলে কোথায় অন্তর্হিত হইবে তাহার স্থিরতা নাই। এদিকে দিবার দীপ্তিও সম্পূর্ণ নিভিয়া গিয়াছে, কেবল সম্মুখে বহুদূরে পুনার দীপগুলি মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছে। বালক একাগ্ৰমনে গল্প শুনিতেছিল, দাদো থামিতেই সাগ্রহে গল। বাড়াইয়া বলিল, তারপর ? দাদো বলিলেন,-“হুসিয়ার হয়ে পথ চল, রাস্তা বড় খারাপ। তারপর গল্প আরম্ভ করিলেন,-“দু’টি ছােট ছােট ছেলে-মেয়ে এই দরবার ঘরের চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছিল, দু’জনেরই লাল বেনারসী চেলীর জোড় পরা, কানে কুণ্ডল হাতে বালা গলায় হার। ছেলেটির বয়স পাঁচ বছর আর মেয়েটির তিন। ‘এদের দিকে কারাে দৃষ্টি ছিল না, এরা নিজের মনে ঘরময় খেলে বেড়াচ্ছিল। কখন এক সময় মেয়েটি দূর থেকে ছেলেটিকে দেখতে 19. বাঘের বাচ্ছা পেয়ে তার সামনে এসে দাড়াল, গম্ভীর মুখে ছেলেটির আপাদমস্তক দেখে নিয়ে আধাে আধাে ভাষায় প্রশ্ন করলে,-“তুমি কে ? ‘ছেলেটিও মেয়েটির দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে বললে,-“আমি শাহু। আমি তীর ছুড়তে পারি। তুমি কে ? ‘মেয়েটির দুই চক্ষু সন্ত্ৰমে ভরে উঠল, সে ফুলের মত ঠোট দুটি খুলে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আস্তে আস্তে বললে,-“আমি দিদা। তারপর একটু ভেবে আবার বললে,-“আমার বাবাও তীর ছুড়তে পারে। ‘অতঃপর এই বীর এবং বীরকন্যার মধ্যে ভাব হতে বেশী দেরী হল না। শাহ গিয়ে মেয়েটির গলা জড়িয়ে নিলে, মেয়েটিও শাহুর কোমর জড়িয়ে ধরলে। এইভাবে তারা অনেকক্ষণ দরবার-ঘরের চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তাদের মধ্যে চুপিচুপি কি কথা হল তারাই জানে। খুব সম্ভব শাহু তার অসামান্য শৌর্য বীর্যের কথা খুব ফলাও করে ব্যাখ্যা করে মেয়েটির ছােট্ট প্রাণটুকু জয় করে নিচ্ছিল। আর মেয়েটিও বােধ হয় নিঃসংশয় সহানুভূতি এবং প্রশংসা দ্বারা শাহুর বীর- হৃদয় সম্পূর্ণ বশীভূত করে ফেলছিল। ‘এদিকে গানের মজলিশ তখন ঢিলে হয়ে এসেছে ; বৃদ্ধ গায়ক তিন পাত্র গুলাবী সরবত খেয়ে কিংখাপের তাকিয়া হেলান দিয়ে বসে হাঁপাচ্ছেন, এমন সময় এই দুটি ছেলেমেয়ে গলা-জড়াজড়ি করে তাদের মাঝখানে গিয়ে দাড়াল। এতগুলো লােক চারিপাশে বসে আছে কিন্তু সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই, নিজেদের কথাতেই তারা মশগুল। বৈঠকে যারা বসেছিলেন সকলের মুগ্ধদৃষ্টি একসঙ্গে তাদের উপর গিয়ে পড়ল। এ কি এ কি অপূৰ্ব আবির্ভাব ! আজ দোলের দিনে সত্যই কি বৃন্দাবন লীলা তাদের চোখের সামনে অভিনীত হচ্ছে ? সকলে, চোখ চুয়াচন্দন মুছে দেখলেন,—তাইত! ছেলেটির বর্ণ নবজলধরাম আর মেয়েটি বিদ্যুল্লতার মত গৌরী! ‘মেয়েটির হঠাৎ কি খেয়াল হল, সে আতর দানে তার ছোট্ট চাপার কলির মত আঙুল ডুবিয়ে শাহর নাকের নিচে আঙুলটি বুলিয়ে দিলে । শাহুও আদর-আপ্যায়নে কম যাবার পাত্র নয়, সে চাদির থালা থেকে এক মুঠি আবীর তুলে নিয়ে সযত্নে মেয়েটির মুখে কপালে মাখিয়ে দিলে। ‘সকলে আনন্দে জয়ধ্বনি করে উঠলেন,-রাধা-গােবিন্দজী কি জয়! ‘লখুজী আর মালােজী ছাড়া আর কেউ জানতেন না এ ছেলেমেয়ে দুটি কে? লখুজী উচ্চহাস্য করে উঠলেন, তারপর দুটিকে কাছে টেনে নিয়ে নিজের কোলে বসিয়ে বললেন,—“রাধাগােবিন্দজী নয়, এরা আমার মেয়ে আর মালােজীর ছেলে। বন্ধুগণ, এদুটির বিয়ে হলে কেমন মানায় বলুন ত ? ‘লখুজী পরিহাসচ্ছলেই কথাটা বলেছিলেন, তাছাড়া গুলাবী সরবতের নেশাও অল্পবিস্তর ছিল। তার কথা শুনে সকলে হেসে উঠলেন ; কিন্তু মালােজী ভোঁসলে তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠে করজোড়ে সকলকে বললেন,-“মহাশয়গণ আপনারা সাক্ষী থাকুন, লখুজী তাঁর কন্যাকে আমার পুত্রের সঙ্গে বাগদত্ত করলেন। ‘সকলে অবাক হয়ে রইলেন, লখুজীর নেশা ছুটে গেল। তার মুখ আবীর প্রলেপের ভিতর থেকে ক্রোধে কালাে হয়ে উঠল। তার মেয়েকে দেবগিরির রাজবংশের মেয়েকে যে মালােজীর মত একজন সামান্য প্রাণী নিজের পুত্রবধূ করবার স্পর্ধা করতে পারে এ তার কল্পনারও অতীত। কিন্তু তবু কথাটা যে তার মুখ থেকেই বেরিয়ে গেছে একথাও অস্বীকার করা চলে না। মালােজর দিকে কটমট করে চেয়ে লখুজী v:

বাঘের বাচ্ছা বলেন,—‘মালােজী, তুমি পাগলের মত কথা বলছ । আমার মেয়ে রাজার ঘরে পড়বে। ‘ মালােজী পূৰ্ববং জোড়করে বললেন,—‘আমার ছেলে আপনার মেয়ের মুখে আবীর দিয়েছে, আপনার মেয়ে আমার ছেলের মুখে আতর দিয়েছে, তারপর আপনি তাদের কোলে নিয়ে যা বলেছেন তা উপস্থিত সকলেই শুনেছেন। ধৰ্ম্মতঃ আপনার মেয়ে আমার ছেলের বাগদত্তা। এখন যদি আপনি সে কথা প্রত্যাহার করতে চান, করুন, আমার আপত্তি নেই। ‘ক্রোধে লখুজী আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, কিন্তু মুখ দিয়ে তার কথা বেরুল না। একবার সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন কিন্তু তাদের মনােভাব বুঝতেও বিলম্ব হল না ; সকলেই নীরবে মালােজার কথার সমর্থন করছেন। লখুজী নিজের মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে ঝড়ের মত অন্তঃপুরে চলে গেলেন। ‘মালােজীও ছেলে নিয়ে ঘরে ফিরে এলেন। চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল যে লখুজীর মেয়ে প্রকাশ্য দরবারে মালাের্জীর ছেলের বাগদত্ত। হয়েছে। কথাটা অবশ্য বেশী দিন চাপা থাকত না, প্রকাশ হয়ে পড়তই ; কিন্তু এমনি ভােমার ঠাকুর্দার উদ্যম আর তৎপরতা যে সপ্তাহ মধ্যে মহারাষ্ট্রের সর্বত্র এই সুসংবাদ প্রচার হয়ে পড়ল, জন প্রাণীরও জানতে বাকী রইল না। ‘লখুজী নিস্ফল ক্রোধে ফুলতে লাগলেন। মালােজীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়ে গেল, এমন কি মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন মালােজীর মত ধড়িবাজ অকৃতজ্ঞ লােককে আর তিনি কোনাে সাহায্য করবেন না, বরং তার যাতে অনিষ্ট হয় সেই চেষ্টাই করবেন।

২৪ চুয়াচন্দন ‘তার প্রতিজ্ঞা কিন্তু রইল না। যতই বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগল ততই তিনি বুঝতে পারলেন চতুর মালােজী তাকে কি বিষম ফাদে ফেলেছে। তিনি বুঝলেন অন্যত্র মেয়ের বিয়ে বিলে মেয়ে সুখী হবে না, যত তার বয়স বাড়ছে শাহ ছাড়া আর কেউ যে তার স্বামী হতে পারে না এ ধারণা তার মনে ততই দৃঢ় হচ্ছে। তাছাড়া অন্যের বাগদত্তা মেয়ে কেউ জেনে শুনে বিয়ে করতে চায় না, দু'চারটে ঘরানা ঘরে সম্বন্ধ করতে গিয়ে লজ্জা পেয়ে খুজীকে ফিরে আসতে হল। শেষ পর্যন্ত তিনি দেখলেন শাহু ছাড়া জিজার গতি নেই। ‘এইভাবে নয় দশ বছর কেটে গেছে। মালােজী কপালের জোরে এবং বুদ্ধিবলে খুব উন্নতি করেছেন, বিষয়-সম্পত্তিও হয়েছে। লখুজীর বিদ্বেষ ও অনিচ্ছা ক্রমেই কমে আসতে লাগল তারপর একদিন মালজীকে নিজের বাড়ীতে ডেকে পাঠিয়ে তাকে আলিঙ্গন করে বলেন, ‘ভাই, আমারই ভুল ; জিজাকে তুমি তােমার ছেলের জন্যে নিয়ে যাও। ‘ব্যাস্, আর কি ! এইখানেই গল্প শেষ। মালােজীর মতলব সিদ্ধ হল, মহা ধুমধাম করে তােমার বাপের সঙ্গে তােমার মা’র বিয়ে হয়ে গেল। তখন তােমার মা’র বয়স তেরো বৎসর আর শাহর পনেরাে। বিয়ের রাত্রে তােমার মা’র গৰ্ব্বোজ্জ্বল হাসিভরা মুখ আমার আজও মনে আছে। ‘তবে একথা ঠিক যে জন্মান্তরের সম্বন্ধ না হলে এত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে এতবড় সামাজিক পার্থক্য লঙ্ঘন করে এ বিয়ে কখনই হতে পারত না। তােমার মা-বাবা পূৰ্বজন্মেও স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। বৃদ্ধ দাদো মৌন হইলেন। কিছুক্ষণ কোন কথা হইল না, দুইজনে নারবে চলিলেন। অন্ধকার তখন বেশ গাঢ় হইয়াছে, পাশের লােকও

বাঘের বাচ্ছা
২৫
স্পষ্ট দেখা যায় না। দাদো লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন, বালক দুই কর যুক্ত
করিয়া ললাটে ঠেকাইয়া বারম্বার কাহার উদ্দেশ্যে নমস্কার করিতেছে।
পদো কথা কহিলেন না, অপূৰ্ব আবেগভরে তাহার শরীর রােমাঞ্চিত
হইয়া উঠিল।
কিয়ৎকাল পরে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া অস্ফুটস্বরে বালক
বলিল,-“কি সুন্দর গল্প ! আমার না’র মত এমন মা এ পৃথিবীতে
আর কারো নেই—না দাদো?’
দাদো সংযতকণ্ঠে বলিলেন, না।
তােমার মায়ের মত এমন
অসামান্যা নারী আর কোথাও নেই। সেই তিন বছর বয়স থেকে আজ
পর্যন্ত দেখে আসছি, এমনটি আর দেখিনি।
পূর্ণ হৃদয় লইয়া দুইজনে নীরব রহিলেন। ক্রমে পুনার আলােক
নিকটবর্তী হইতে লাগিল, পথ সমতল ও অনুদঘাত হইল। অশ্বদয় আও
গৃহে পৌছিবার আশায় দ্রুতবেগে চলিতে আরম্ভ করিল।
পুনা পৌছিতে যখন পদক্রোশ মাত্র বাকী আছে তখন কে একজন
সম্মুখের অন্ধকার হইতে উচ্চকণ্ঠে হাকিল,‘হাে শিব্বা হাে! হাে
দাদো জী!
বালক শিব্বা চমকিয়া উঠিয়া সানন্দে চীৎকার করিয়া উঠিল,—
তানা ! তারপর তীরবেগে সম্মুখে ঘােড়া ছুটাইয়া
‘তানা !
দিল।
অন্ধকারে তানাজী মালেশ্বর ঘােড়ার উপর বসিয়া ছিল, শিব্বা প্রায়
তাহার ঘাড়ের উপর গিয়া পড়িল ।
তানজী তিরস্কারের সুরে বলিল,—“আজ কি আর, বাড়ী ফিরতে
হবে না? কোথায় ছিলে এতক্ষণ? মা কত ভাবছেন, শেষে আর
থাকতে না পেরে আমাকে পাঠালেন।

২৬
চুয়াচন্দন
শিব্বা ঘােড়র উপর হইতেই তানাজীর গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল,
-“মা কোথায় রে না ?”
তীনাজী বলিল,-“কোথায় আবার—বাড়ীতে । দোর গােড়ায়
দাড়িয়ে পথের পানে চেয়ে আছেন। তােমার এত দেরী হল কেন?
গলা খাটো করিয়া বলিল,-“দেওরামের সঙ্গে দেখা হল নাকি ?
ওদিকের কি খবর ? কবে ?
শিব্বা অন্যমনস্কভাবে বলিল,-“খবর ভাল। অমাবস্যার রাত্রে সব
ঠিক হয়েছে।—চল তানা, শিগগির বাড়ী যাই। মাকে সমস্তদিন
দেখিনিভারি মন-কেমন করছে।
দুই কিশোের বন্ধু তখন নীড়-প্রতিগামী পাখীর মত দ্রুতবেগে গৃহের
দিকে অগ্রসর হইল ।
বৃদ্ধ দাদোজী কো বহুদূর পশ্চাতে পড়িয়া রহিলেন।

রক্ত-খদ্যোত

No text on this page.

সন্ধ্যার সময় প্রাত্যহিক অভ্যাসমত গুটিকয়েক সভ্য ক্লাবঘরের মধ্যে
সমবেত হইয়াছিলাম ।
বরদ। সিগারেটের ক্ষুদ্র শেষাংশটুকুতে লম্বা একটা সুখটান দিয়া
সেটা সযত্নে য্যাশ-ট্রের উপর রাখিয়া দিল। তারপর আস্তে আস্তে
ধোয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল,-ভূতের গল্প তােমরা অনেকেই শুনেছ,
কিন্তু ভূতের মুখে ভূতের গল্প কেউ শুনেছ কি ?
অমূল্য এক কোণে বসিয়া একখানি সচিত্র বিলাতী মাসিকপত্রের
পাতা উল্টাইতেছিল। বলিল,-অসম্ভব একটা কিছু বরদার বলাই
চাই।
বরদা বলিল,-আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাটা অসম্ভব বলে মনে হতে
পারে বটে, কিন্তু বাস্তবিক তা নয়। তবে বলি শােন--
অমূল্য তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল,-না, না, আজ যে আমাদের
সাহিত্য-সভার অধিবেশন। অতুল, তােমার সাহিত্যেবস্তুতন্ত্র প্রবন্ধটা
তাহলে-
হৃষী বলিল,-কাল হবে। বস্তুতন্ত্রের চেয়ে বড় জিনিষ আজ এসে
পড়েছেন। বরদা, তােমার গল্প আরম্ভ হােক।
অমূল্য অস্থির হইয়া বলিল,-আজ তাহ'লে বরদার কতকগুলো
মিথ্যে কথা শুনেই সন্ধ্যাবেলাটা কাটাতে হবে ?
প্রশান্তকণ্ঠে বরদা বলিল,-কথাটা শুনে তারপর সত্যিমিথ্যে বিচার
করা উচিত। তাহ'লে আরম্ভ করি। গত বৎসর
অমূল্যর নাসারন্ধ হইতে একটা সশব্দ দীর্ঘশ্বাস বাহির হইল ।
বরদা বলিল,-গত বৎসর আমার প্ল্যাঙ্কেটে ভূ৩ নবার সখ
হয়েছিল, বােব হয় তােমাদের মনে আছে। যারা জানে-শােনে তাদের
০

! চুয়াচন্দন পক্ষে ভূত-নামাননা অতি সহজ ব্যাপার। দরকারী আসবাবের মধ্যে কেবল্প একটি তেপায়া, টেবিল অমূল্য বিড় বিড় করিয়া বলিল,-আর একটি গুলিধাের। বরদা ওদিকে কর্ণপাত না করিয়া বলিতে লাগিল,একদিন একটা ছােট দেখে তেপায়া টেবিল যােগাড় করে সন্ধ্যের পর আমাদের তেতালার সেই নিরিবিলি ঘরটায় বসে গেলুম-আমি, আমার বউ, আর পেঁচো- অমূল্য বলিল,-এই বয়স থেকেই ছােট ভাইটির মাথা খাওয়া হচ্ছে কেন ? বউয়ের কথা না হয় ছেড়ে দিই, কারণ যেদিন তােমার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে সেদিনই তার যা হবার হয়ে গেছে বরদা বলিল,-পেঁচোকে নেবার কারণ তিন জনের কমে চক্র হয় । তাছাড়া সে ছেলেমানুষ, সুতরাং মিডিয়ম হবার উপযুক্ত। সে যাক, মেঝের উপর টেবিল ঘিরে ত বসা গেল—কিন্তু ভাবনা হ’ল কাকে ডাকি! ভূত ত আর একটি-আধটি নয়, পৃথিবীর আরম্ভ থেকে আজ পৰ্য্যন্ত যত লােকের ঈশ্বরপ্রাপ্তি ঘটেছে সকলের দাবি সমান। এখন কাকে ফেলে কাকে ডাকি। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বরদা বলিল,-আমাদের সুভাষকে চেন তজুনীয়র‘উকিল? তার ভগিনীপতি সুরেশবাবু হাওয়া বদলাতে এসে গত শীতকালে নিউমােনিয়ায় মারা যান, বােধ হয় তােমাদের স্মরণ আছে। অমূল্য, তুমি ত পােড়াতে গিছলে। হঠাৎ সেই সুরেশবাবুকে মনে পড়ে গেল। তখন তিনজনে, আলােটা কমিয়ে দিয়ে টেবিলের উপর আঙুলে আঙুল ঠেকিয়ে সুরেশবাবুর ধ্যান সুরু করে দিলুম। বেশীক্ষণ নয় ভা, মিনিট পাঁচেক চোখ বুজে থাকবার পর চোখ চেয়ে দেণি পচুটা কেমন যেন জবুথবু হয়ে গেছে, কশ বেয়ে নাল গড়াচ্ছে,

রক্ত-খদ্যোত
চোখ শিবনেত্র, বিজ বিজ করে কি বছে ! “কি রে ! বলে তাকে
একটা ঠেলা দিলুমকাত হয়ে পড়ে গেল ! বউ ত ‘বাবাগো' বলে
আমাকে খুব ঠেসে জড়িয়ে ধরলে।
হৃষী বলিল,-বস্তুতন্ত্র এসে পড়ছে। এবার আসল গল্পটা আরম্ভ
হােক।
বরদা বলিল,-বুঝলুম ভূতের আবির্ভাব হয়েছে। পেচোকে অনেক
প্রশ্ন করলুম, কিন্তু সে জড়িয়ে জড়িয়ে কি যে উত্তর দিলে বােঝা গেল
। বড়ই মুস্কিল। তখন আমার মাথায় এক বুদ্ধি গজাল। কাগজ
পেনসিল এনে কেঁচোর হাতে ধরিয়ে দিলুম। পেনসিল হাতে পেয়ে
পেচো সটান উঠে বসল। উঠে বসে লিখতে আরম্ভ করে দিলে। সে
এক আশ্চর্য ব্যাপার ! কেঁচোর চোখ বন্ধ, মুখ দিয়ে নাল গড়াচ্ছে,
আর প্রাণপণে কাগজের ওপর লিখে যাচ্ছে ।
পকেট হইতে একতাড়া কাগজ বাহির করিয়া বলিল,-আবার
হাতের লেখা দেখে অবাক হয়ে যাবে, দস্তুরমত পাকা হাতের লেখা।
কে বলবে যে পেচো লিখেছে ?
অমূল্য লেখাটা তদারক করিয়া বলিল,-পেঁচো লিখেছে কেউ
বলবে না বটে, কিন্তু তােমার লেখা বলে অনেকেরই সন্দেহ হতে পারে।
বরদা বলিল,-এই লেখা হাতে পাবার পর আমি সুভাষের বাড়ি
গিয়েছিলুম। সুরেশবাবুর পুরােণ একখানা চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে
দেখলুম অবিকল তার হাতের লেখা। বিশ্বাস না হয় তােমরা যাচিয়ে
দেখতে পার।
অমূল্য বলিল,-অবশ্য দেখব।
হৃষী বলিল,-সে যাক। এখন তুমি কি বলতে
চাও যে ঐ
কাগজের তাড়াটা সুরেশবাবুর প্রেতাত্মার জবানবন্দী ?

চুয়াচন্দন বরদ। বলিল,-এটা হচ্ছে তার মৃত্যুর ইতিহাস। পুরােপুরি সত্যি কি না সে-কথা কেউ বলতে পারে না, কিন্তু গােড়ার খানিকটা যে সত্যি তা সুভাষ সেদিন স্বীকার করেছিল। এইবার তবে আসল গল্পটা শােন—এই বলিয়া বরদা কাগজের তাড়াটা তুলিয়া লইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। যাহারা মুঙ্গের সহরের সহিত পরিচিত তাঁহারা জানেন যে উক্ত শহরে ‘পিপর-পাতি’ নামক যে বিখ্যাত বীথিপথ আছে, তাহার পশ্চিম প্রান্তে গঙ্গার কূলে মুসলমানদের একটি অতি প্রাচীন গােরস্থান আছে । বােধ করি এই গােরস্থানের সব গােরগুলিই শতাধিক বর্ষের পুরাতন। স্থানটি অনাদৃত। কঁাটাগাছ ও জঙ্গলের ফাকে ফাকে অস্থিপঞ্জর প্রকট করিয়া এই কবরগুলি কোনও রকমে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখিয়াছে। এই গােরস্থানের এক কোণে একটি কষ্টিপাথরের গাের আছে। এই গােরটি সম্বন্ধে সহরে অনেক ভূতুড়ে গল্প প্রচলিত ছিল। এই সব আজগুবি গল্প শুনিয়া আমি কৌতূহলী হইয়া উঠিয়াছিলাম। আমার জ্যেষ্ঠ শ্যালক বলিলেন যে, গােরটা সজীব। পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে নাকি এক সাহেব ঐ গাের লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুড়িয়াছিল। গুলির আঘাতে পাথর ফাটিয়া ঝলকে ঝলকে রক্ত উঠিয়াছিল ; সে রক্তের দাগ এখনও মিলায় নাই, গােরের গায়ে তেমনি শুকাইয়া গড়াইয়া আছে। আর, যে নাস্তিক সাহেব গুলি করিয়াছিল সেও প্রাণে বাঁচে নাই, সেই রাত্রেই ভয়ঙ্কর ভাবে তার মৃত্যু হইয়াছিল। একদিন শীতের সন্ধ্যায় শ্যালককে সঙ্গে লইয়া গােরটি দেখিতে গেলাম। শ্যালক আমারই সমবয়সী, প্রেত-যােনিতে অটল বিশ্বাস। আমি কিছুদিন যাবৎ মুঙ্গেরে আসিয়া শ্যালক-মন্দিরেই বায়ুপরিবর্তন করিতেছিলাম। সঙ্গে স্ত্রী ছিলেন। ;

হইলাম ।
চোখে
।
রক্ত-খদ্যোত
গােরস্থানের নিকটে গিয়া দেখিলাম স্থানটি কাটা গাছের বৰ্ম্মে প্রায়
দুর্ভেদ্য হইয়া আছে। অনেক যত্নে অনেক সাবধানে পা ফেলিয়া এবং
কাপড়চোপড় বাচাইয়া সেই ভূতুড়ে গােরটির সম্মুখীন
পাথরের গাের, আপাতদৃষ্টিতে ভৌতিকত্ব কিছুই
পড়িল না।
হঠাৎ, যখন আমরা গােরটির একেবারে নিকট আসিয়া পৌছিয়াছি,
তখন সেই কাল পাথরের উপর শায়িত আর ও কাল একট! জন্তু, বােব হয়
আমাদের পদশব্দে জাগিয়া উঠিয়া, একবার আমাদের মুখের উপর তাহার
চক্ষু দুটা মেলিয়া ধরিয়া, আস্তে আস্তে গােরের অন্তরালে মিলাইয়া গেল।
দেখিলাম একটা কুকুর । রং কুচকুচে কাল, শরীর যে হিসাবে লম্বা
সে হিসাবে উচু নয়—পা-গুলা বাঁকা বাঁকা এবং অত্যন্ত খৰ্ব। কিন্তু
সবচেয়ে ভয়াবহ তাহার চক্ষু দুটা-হলদে রঙের সহিত ঈষং রক্তাভ এবং
মণিহীন। পলক ফেলিলে মনে হয় যেন অন্ধকার রাত্রে খদ্যোত
জলিতেছে।
শ্যালক বলিলেন-লােকে বলে ওই কুকুরটাই সাহেবের টুটি ছিড়ে
মেরে ফেলেছিল।
আমি বলিলাম,—পঞ্চাশ বছর আগে ? কিন্তু কুকুরটাকে ত অত
প্রাচীন বলে বােধ হ’ল না।
আমরা কবরটার একেবারে পাশে গিয়া দাড়াইলাম। দেখিলাম
কুকুরটা যেস্থানে শুইয়াছিল ঠিক সেই স্থানে পাথরের খানিকটা চটা উঠিয়া
গিয়াছে এবং তাহারই চারি পাশে লাল রঙের একটা পদার্থ শুকাইয়া
আছে—হঠাৎ রক্ত বলিয়া ভ্রম হয়। যেন ঐ কুকুরটা সমাধির রক্তাক্ত
ক্ষতটাকে বুক দিয়া আগলাইয়া থাকে।
শ্যালক জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি রকম বােধ হচ্ছে ?

৩৪ চুয়াচন্দন আমি বলিলান,-আশ্চৰ্য্য বটে । আমার মনে হয় খুব গরম একটা ধাতু, দরে এই পাথরে আঘাত করা হয়েছিল তাতেই এই রকম হয়েছে। আমার মন্তব্য শুনিয়া শ্যালক আধ্যাত্মিকভাবে একটু হাসিলেন । বলিলেন, “তা হবে। কিন্তু তাহা যে একেবারেই হইতে পারে না তাহা তাহার কণ্ঠস্বরের ভঙ্গীতে বেশ বুঝা গেল । কোনও একটা তর্কাধীন বিষয়ের আলােচনায় মানুষ যখন উচ্চঅঙ্গের হাসি হাসিয়া এমন ভাব দেখায় যেন অপর পক্ষের সঙ্গে তর্ক করাটাই ছেলেমানুষী, তখন অপর পক্ষের মনে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। আমার ও একটু রাগ হইল। কিন্তু যে-লােক তর্ক করিতে অসম্মত তাহাকে প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা বুঝাইয়া দেওয়া ছাড়া অন্য পথ নাই। তাই আমি বলিলাম,---আচ্ছা এক কাজ করা যাক, আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। এই পাথরটা ভেঙেই দেখা যাক না, ঝলকে ঝলকে রক্ত বেরােয় কি না। প্রত্যক্ষের বড় ত আর প্রমাণ নেই- নিকটেই একখণ্ড পাথর পড়িয়া ছিল, আমি সেটা তুলিয়া লইয়? গােরে আঘাত করিতে উদ্যত হইয়াছি এমন সময় সেই কুকুরটা কোথ। হইতে ছুটিয়া আসিয়া একটা বিশ্রী রকমের চীৎকার করিয়া উঠিল এবং সমস্ত দাত বাহির করিয়া অত্যন্ত অত্যন্ত হিংস্রভাবে আমাকে শাসাইয়া দিল। শ্যালক আমার হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে বলিলেন,—চলে এস, চলে এস। কি যে ভােমার পাগলামি--- কুকুরটার আকস্মিক আবির্ভাবে আমার শ্যালক মহাশয় যতটা অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন বাস্তবিকপক্ষে আমি ততটা হই নাই। অথচ একট। হিংস্র কুকুরকে অযথা ঘটামাে বিশেষ যুক্তির কাজ নয়। তাই পরীক্ষা-কাৰ্য্য অসম্পূর্ণ রাখিয়া আমরা যখন গৃহে ফিরিয়া আসিলাম রক্ত-খদ্যোত তখন তুমুল তর্ক বাধিয়া গিয়াছে ; কুকুরের জীবনের স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে বিজ্ঞানের শাণিত যুক্তিগুলি শ্যালকের কুসংস্কারের বৰ্ম্মের উপর আছড়াইয়া পড়িয়া ভগ্নোদ্যমে ফিরিয়া আসিতেছে। বাড়ি ফিরিতেই আমার শালাজ এবং যাহার সম্পর্কে শালার সহিত সম্বন্ধ তিনি আসিয়া যুদ্ধে যােগ দিলেন। দুজনেই নবীন, বিদুষী-প্রতীচ্যের আলােক তাহাদের চোখে সােনার কাঠি স্পর্শ করাইয়াছে--তঁহারা আসিয়াই আমার পক্ষে যােগ- দান করিলেন। শ্যালক বেচারীর বৰ্ম্ম তীক্ষ অস্ত্রাঘাতে একেবারে ক্ষত- বিক্ষত হইয়া উঠিল। তর্কে যে ব্যক্তি হারে তাহার জিদ বাড়িয়া যায়। যুক্তির দিকে তখন আর তাহার হৃক্ষেপ থাকে না। শ্যালক শেষে চটিয়া উঠিয়। বলিলেন,-মাতে না চাও মেনে না। কিন্তু দুপুর রাত্রে একলা ঐ জায়গায় যেতে পারে এমন লােক ত কোথাও দেখি না। শালাজ উৎসাহদীপ্ত চক্ষে কহিলেন,---আচ্ছা, এমন লােক যদি পাওয়া যায় যে যেতে পারে, তাহলে ত মাবে যে তােমার ভূত শুধু তােমার সাড়েই ভর করে আছে—আর কোথাও তার অস্তিত্ব নেই ? শ্যালক গাম্ভীৰ্য্য অবলম্বন করিয়া কহিলেন,-একলা রাত্রে সেখানে যেতে পারে এত সাহস কারুর নেই ; আর যদি-বা কেউ যায়, সে সে ফিরে আসবে এমন কোনও সম্ভাবনা দেখি না। আমি বলিলাম,-সকলের সাহস এবং সম্ভাবনা সমান নয়। আমি যেতে প্রস্তুত আছি। শ্যালক অতি বিস্ময়ে কিছুক্ষণ নির্বাক থাকিয়া বলিলেন,-তুমি প্রস্তুত আছ ? রাত্রি বারটার সময় একলা তাহার মুখে আর কথা সরিল না। ;

চুয়াচন্দন আমি হাসিয়া বলিলাম,—নিশ্চয়। খােট্টার দেশে বেশী দিন থাকিনি বলেই বােধ হয় আমার সে সাহসটুকু আছে। তাহলে আজই ভাল। আজ বােধ হয় অমাবস্যা। শাস্ত্র অনুসারে রাজ্যের ভূতপ্রেত দৈত্যদানা আজ সবাই এই মর্ত্যভূমিতে ফিরে এসে দিগ্বদিকে নৃত্য করে বেড়াবেন। অতএব এ সুযােগ ছাড়া অনুচিত। শ্যালক ভীত চক্ষে চাহিয়া বলিলেন,-গোয়ার্তুমি করাে না সুরেশ, ভারি খারাপ জায়গা। এ সব বিষয়ে তােমার অভিজ্ঞতা নেই- তীব্র হাস্যোজ্জ্বসিত কণ্ঠে শালাজের নিকট হইতে প্রতিবাদ আসিল,- ভয় পাবেন না সুরেশবাবু, আপনার জন্য একটা খুব ভাল প্রাইজ ঠিক করে রাখলুম। আপনি জয় করে ফিরে এলেই এ বাড়ির কোনও এক মহিলা তার বিম্বাধরের রক্তিমরাগে আপনার কপালে লাল টিকা পরিয়ে দেবেন। ভূতজয়ী বীরের সেই হবে রাজটীকা । আমি উৎসাহ দেখাইয়া বলিলাম,-লােভ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। মহিলাটি কে শুনি? তিনি হাসিয়া বলিলেন,-তার সঙ্গে কারুর তুলনাই হয় না।—বলিয়া আমার গৃহিণীর দিকে কটাক্ষপাত করিলেন। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলাম,ঐ জাতীয় প্রাইজ যদিও আমার ভাগ্যে খুব দুলর্ভ নয়, (গৃহিণী জনান্তিকে,আঃ,—কি বকছ- দাদা রয়েছেন। তবু অধিকের প্রতি আমার বিরাগ নেই। তাহলে চুক্তি পাকা হয়ে গেল—আজ রাত্রেই যাব। কিন্তু আমি যে সত্যি সত্যিই কবরের কাছে গিয়েছি, এদিক-ওদিক ঘুরে বাড়ি ফিরে আসিনি, এ কথা শেষকালে আপনাদের বিশ্বাস হবে ত ? শালাজ অতি দূরদর্শিনী, বলিলেন, আপনার মুখের কথা আমরা বিশ্বাস করব নিশ্চয়, কিন্তু যাকে বিশ্বাস করানাে দরকার তিনিই হয়ত

রক্ত-থদ্যোত
৩৭
করবেন না। অতএব আপনাকে একটি কাজ করতে হবে। খড়ি দিয়ে
গােরের ওপর নিজের নাম লিখে আসতে হবে।
‘তথাস্তু, গৃহিণীর দিকে ফিরিয়া
বলিলাম,-তােমার দাদার
প্রেততত্ত্বের মাথায় বজ্রাঘাত করে দিয়ে আসা যাক্‌-কি বল ?
অল্প দ্বিধাজড়িত হাসি ভিন্ন আর কোন জবাব পাওয়া গেল না।
শ্যালক বলিলেন,-ফাজলামি ছাড়। আমি তােমাকে কিছুতেই
যেতে দিতে পারি না।
শ্যালকের কথা শুনিলাম না। কারণ অনেক ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া যত
সহজ, পশ্চাৎপদ হওয়া তত সহজ নয়।
রাত্রি সাড়ে এগারটার সময় গরম জামায় আপাদমস্তক আবৃত করিয়া
একটা কড়া গােছের বা চুরুট ধরাইয়া বাহির হইলাম । এতক্ষণে
গৃহিণীর মুখ ফুটিল। প্রতীচ্য বিদ্যায় জলাঞ্জলি দিয়া বলিলেন, থাক,
গিয়ে কাজ নেই।
আমি হাসিয়া উঠিলাম,পাগল ! ভাই বােন দুজনকার ধাত একই
রকম দেখছি।
শ্যালক নিরতিশয় ক্ষুব্ধস্বরে কহিলেন, “তুমি এমন একগুয়ে জালে
কোন্ শালা তর্ক করত।
এমন বিশ্রী অন্ধকার বােধ করি আর কখনও ভােগ করি নাই।
একটা গুরুভার পদার্থের মত অন্ধকার যেন চারিদিকে চাপিয়া বসিয়া
আছে। পথ চলিতে চলিতে পদে পদে মনে হয় বুঝি পরমুহূর্তেই একচাপ
অন্ধকারে ঠোকর লাগিয়া হুড়ি খাইয়া পড়িয়া যাইব।
চুরুটে লম্বা লম্বা টান মারিয়া মনে প্রফুল্লতা ও উৎসাহ সঞ্চয় করিতে
লাগিলাম। সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলি অজ্ঞাতসারে এমন সতর্ক ও সন্দিগ্ধ হইয়া

৩৮ চুয়াচন্দন উঠিল যে নিজের পদধ্বনি শুনিয়া নিজেই চমকিয়া উঠিলাম, মনে হইল ক যে চুপি চুপি পিছন হইতে আমার অত্যন্ত কাছে আসিয়া পড়িয়াছে । কিন্তু তথাপি অকারণে ভয় পাইবার পাত্র আমি নই। মনে মনে বেশ বুঝিতে পারিলাম দ্বিপ্রহর রাত্রির এই অন্ধকার, এই স্তব্ধতা, এই বিজনতা সকলে মিলিয়া আমার আন্তরিক সাহসকে একটা দুচ্ছেদ্য ষড়যন্ত্রের জালে ধীরে ধীরে জড়াইয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতেছে। একটা অলৌকিক মায়া যেন আমার চেতনাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিতেছে। মাকড়সা যেমন শিকারকে প্রথমে সূক্ষ্ম তন্তুর সহ পাকে জড়াইয়া পরে ধীরে ধীরে জীর্ণ করিয়া ফেলে, তেমনি এই অদৃশ্য শক্তি আমার সহজ সত্তাকে ক্রমে ক্রমে অভিভূত করিয়া ফেলিতেছে । ক্রমে ‘পিপর-পাতি’ রাস্তার পূর্বপ্রান্তে আসিয়া পড়িলাম । ইহারই অপর প্রান্তে কবরস্থান। রাস্তার দুইপাশে বড় বড় গাছ, মাথার উপর বহু উর্ধে তাহাদের শাখাপ্রশাখা মিলিয়াছে । অন্ধকার আরও জমাট বঁধিয়া আসিল। হঠাৎ ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা নিঃশ্বাসের মত একটা স্পর্শ পাইলাম । শরীরের সমস্ত বােম শক্ত হইয়া দাড়াইয়া উঠিল । পরক্ষণেই একটা খুব লঘু পদার্থ পিঠের উপর দিয়া খড়, খড়, শব্দে নীচে গড়াইয়া পড়িল । বুঝিলাম ভয় পাইবার মত কিছু নয়, মাথার উপর যে ঘনপল্লব শাখাগুলি আলিঙ্গনকে নিবিড় বিচ্ছেদবিহীন করিয়া রাখিয়াছে তাহারই একটি শুষ্ক পাতা ঝরিয়া পড়িয়াছে। আরামের নিঃশ্বাস ফেলিয়া চলিতে লাগিলাম। লম্বা টানের চোটে চুরুটটা প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছিল। অন্য সময়ে হইলে ফেলিয়া দিতাম, কিন্তু আজ সেটাকে কিছুতেই ছাড়িতে পারিলাম না। তাহার অগ্নিদীপ্ত প্রান্তটুকুতে যেন একটু প্রাণের সংস্রব ছিল। এই নিঃসঙ্গ অন্ধকারের মধ্যে আমার সমস্ত অন্তরাত্মা যখন সঙ্গীর জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিতেছিল, তখন ওই ক্ষীণ রশ্মিটুকুই জীবন্ত সঙ্গীর মত প্রাণের মধ্যে ভরসা জাগাইয়া রাখিয়াছিল। এটাকে ফেলিয়া দিলে যে অনেকখানি সাহসও চলিয়া যাইবে তাহা বেশ বুঝিতেছিলাম। কিন্তু ক্রমে যখন আঙুল পুড়িতে লাগিল তখন সেটাকে ফেলিয়া দিতেই হইল। একবার বেশ ভাল করিয়া টানিয়া লইয়া সন্মুখের দিকে কিছু দূরে ফেলিয়া দিলাম । ফেলিয়া দিবামাত্র মনে হইল, যে-আঙুল দুটা দিয়া চুরুট ধরিয়াছিলাম তাহাদের মধ্যে কোনও ছিদ্র পাইয়া খানিকটা ঠাণ্ডা বাতাস শরীরের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। আমার দৃষ্টি ছিল নিক্ষিপ্ত চুরুটটার উপর—সেটা মাটিতে পড়িবামাত্র আগুন ছিটকাইয়া উঠিল। তারপর এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটিল। ছিটকানন! আগুনটা মধ্যপথে দুটা আকৃতি ধরিয়া পাশাপাশি একসঙ্গে নড়িতে আরম্ভ করিল। মাটি হইতে প্রায় একহাত উপরে থাকিয়া পরস্পরের চারি আঙুল ব্যবধানে এই ক্ষুদ্র অগ্নিগােলক দুটা একজোড়া লাল জোনাকির মত সম্মুখ দিকে চলিতে আরম্ভ করিল এবং মাঝে মাঝে মিটমিট করিতে লাগিল। আমার মাথা বােধ হয় গরম হইয়া উঠিয়াছিল। কি জানি কেন আমার ধারণা জন্মিল যে, ওই মিটমিট করা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দুটা আর কিছুই নয়, দুটা চক্ষু, আমার পানে তাকাইয়া আছে, এবং এই চক্ষু দুটার পশ্চাতে একটা খর্বাকৃতি কুকুরের কালাে রং যে অন্ধকারে মিশাইয়া আছে তাহা যেন মনে মনে স্পষ্ট অনুভব করিলাম। চলিতে চলিতে কখন দাড়াইয়া পড়িয়াছিলাম লক্ষ্য করি নাই, চক্ষু দুটাও সম্মুখে কিছুদূরে দাঁড়াইল। তারপর কতক্ষণ যে নিষ্পলকভাবে আমার মুখের দিকে দৃষ্টি ব্যাদান করিয়া রহিল জানি না, “নে হইল ৪০ চুয়াচন্দন বহুক্ষণ পরে সেই চক্ষুর পলক পড়িল । তখন সেটা আবার চলিতে আরম্ভ করিল। আমিও পশ্চাং পশ্চাৎ চলিলাম। দেহের উপর তখন কোনও অধিকারই নাই। স্বপ্নে বিভীষিকার সম্মুখ হইতে পলাইবার ক্ষমতা যেমন লুপ্ত হইয়া যায়, আমিও তেমনি নিতান্ত নিরুপীয়ভাবে ওই চক্ষুর পশ্চাদ্বী হইলাম। স্বাধীন ইচ্ছ। তখন একেবারে জড়ত্বপ্রাপ্ত হইয়াছে, আছে কেবল সমস্ত চেতনাব্যাপী দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য ভয়। কতক্ষণ এই অগ্নিচক্ষুস্মান, আমাকে তাহার আকর্ষণ প্রভাবে টানিয়া লইয়া গিয়াছিল আমার ধারণা নাই। একবার চেতনার অন্তরতম প্রদেশে যেন ক্ষীণ অনুভূতির ছায়া পড়িয়াছিল যে পাকা রাজপথ দিয়া চলিতেছি না ; আর একবার মনে হইয়াছিল বুঝি একটা গাছের মােটা শিকড়ে ঠোক্কর খাইলাম। কিন্তু সে-সব আমার ইন্দ্রিয় উপলব্ধির বাহিরে। হঠাৎ একটা বড় রকমের ঠোক্কর খাইলাম। এটা বেশ স্মরণ আছে। তারপর হুমড়ি খাইয়া পড়িয়াই নীচের দিকে গড়াইতে সুরু করিলাম। কোথায় পড়িতেছি কোনও ধারণাই ছিল না ; অন্ধকারে দেখাও অসম্ভব । কিন্তু এই পতন যে অনন্তকাল ধরিয়া চলিতে থাকিবে এবং পতনের লক্ষ্যও যে একটা অতলস্পর্শ স্থানে লুকাইয়া আছে তাহা মনের মধ্যে বদ্ধমূল হইয়া গেল। অথচ কি নিদারুণ সেই পতন! গড়াইতে গড়াইতে এক ধাপ হইতে অন্য ধাপে পড়িতেছিলাম এবং প্রত্যেক স্তরে অববােহণের সঙ্গে সঙ্গে দেহের অস্থিগুলা যেন একবার করিয়া ভাঙিয়া যাইতেছিল। এই অববােহণের শেষ ধাপে যখন আসিয়া পেছিলাম তখন জ্ঞান বিশেষ ছিল না, কিন্তু একটা অনন্ত যন্ত্রণার পথ যে অতিক্রম করিয়া আসিয়াছি তাহা সমস্ত শরীর দিয়া অনুভব করিতে লাগিলাম। অনেকক্ষণ পরে চক্ষু মেলিলাম। সেই দেহহীন লা চক্ষু দুটা আমার মুখের ত্যন্ত নিকটেই ঝুকিয়া পড়িয়া কি যেন নিরীক্ষণ করিতেছে।

রক্ত-খদ্যোত ৪১ দেহের রক্ত ত জল হইয়া গিয়াছিলই, এবার তাহা একেবারে বরফ হইয়া গেল। একটা অসহ্য শীতের শিহরণ সমস্ত দেহটাকে যেন ঝকানি দিয়া গেল। তারপর আর কিছু মনে নাই। সূর্যোদয়ের কিছু পূৰ্বে জ্ঞান হইল। কল্যকার রাত্রি যে স্বাভাবিকভাবে কাটে নাই এই চিন্তা লইয়া চক্ষু মেলিলাম। ঘাসের উপর শুইয়া আছি দেখিয়া তাড়াতাড়ি উঠিতে গেলাম “উঃ! গায়ে দারুণ বেদনা। আবার শুইয়া পড়িলাম। তখন ক্রমশঃ সব মনে পড়িল, ঘাড় না নাড়িয়! যতদূর সাধ্য দেখিয়া বুঝিলাম, ‘পিপরপাতি’ রাস্তার পাশে পাশে কেল্লার যে শুষ্ক গড়খাই গিয়াছে তাহারই তলদেশে বাবলা গাছের ঝােপের মধ্যে পড়িয়া আছি। সূৰ্য্য উঠিল। এখানে সমস্ত দিন পড়িয়া থাকিলে ও কেহ সন্ধান পাইবে না ইহা স্থির। শরীরে ত নড়িবার শক্তি নাই। প্রচণ্ড এক হেচকা মারিয়া উঠিয়া দাড়াইলাম ; চক্ষু হইতে আরম্ভ করিয়া দেহের সমস্ত বােম বেদনায় টন্ টন্ করিয়া উঠিল। কিন্তু বাড়ি গিয় । পৌছিতেই হইবে। অসীম বলে বলে মৃতপ্রায় দেহটাকে টা নিতে টানিতে কি করিয়া বাড়ীতে পৌছিলাম তাহা প্রকাশ করিবার আমার সাধ্য নাই। বাড়ী যাইতেই সকলে চারিদিক হইতে ছুটিয়া আসিল এবং উৎকণ্ঠিত প্রশ্নে আমার ক্ষীণ চেতনা আবার লুপ্ত করিয়া দিবার যােগাড় করিল। শ্যালক সকলকে সরাইয়া দিয়া আমাকে একটা ইজিচেয়ারে বসাইয়া ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন,—সারা রাত কোথায় ছিলে ? আমরা সকলে তােমার জন্যে উত্তর দিতে গেলাম, কিন্তু কি ভয়ানক! গলার স্বর একেবারে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। প্রাণপণ চেষ্টা করিয়া একটা কথাও উচ্চারণ করিতে পারিলাম না। শালক আমাকে দুধ ও ব্রাণ্ডি খাওয়াইয়া ডাক্তার ডাকিতে গেলেন।

৪২
চুয়াচন্দন
৫
ডাক্তার যখন আসিলেন তখন বিছানায় শুইয়া আছি—ভয়ানক কম্প
দিয়া জ্বর আসিতেছে। স্ত্রী ও শালাজ মলিন মুখে মাথার শিয়রে
বসিয়া আছেন।
ডাক্তার পরীক্ষা করিয়া বলিলেন,—দুটো লাঙ্গসই য়্যাফেক্ট করেছে।
নিউমােনিয়া।
তারপর আবার অচেতন হইয়া পড়িলাম।
ঘুম ভাঙিয়। দেখি শরীর বেশ ঝরঝরে হইয়া গিয়াছে—কোথাও
কোনও গ্লানি নাই।
কে একজন পিছন হইতে জিজ্ঞাসা করিল,—কেমন বােধ হচ্চে?
ফিরিয়া দেখি বিনােদ,-আমার ছেলেবেলার স্কুলের বন্ধু। অনেক
দিন পরে তাহাকে দেখিয়া বড় আনন্দ হইল। বলিলাম, বেশ ভালই
বােধ হচ্ছে ভাই। বুকের ওপর যে একটা ভার চাপানাে ছিল সেটা
আর টের পাচ্ছি না।
বিনােদ মৃদু হাসিয়া বলিল,-প্রথমটা ঐ রকম বােধ হয় বটে।
আমার যখন কলেরা হয়-
হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল—তাই ত। বনােদ ত আজ দশ বৎসর
হইল কলেরায় মরিয়াছে ; আমি স্বহস্তে তাহাকে দাহ করিয়াছি। তবে
সে এখানে আসিল কি করিয়া ! মহাবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিলাম,
বিনােদ, তুমি ত বেঁচে নেই—তুমি ত অনেক দিন মারা গেছ!
বিনােদ আসিয়া আমার দুই হাত ধরিল। কিছুক্ষণ আমার মুখের
দিকে চাহিয়া থাকিয়া আস্তে আস্তে বলিল,-তুমিও আর বেঁচে
==
।
নেই বন্ধু!

কর্তার কীৰ্ত্তি

No text on this page.

বর্ধমান জেলার ধনী ও বনিয়াদী জমিদার বাবু হৃষীকেশ রায় তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হেমন্তকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিয়াছিলেন। ইহার কারণ, সে তাহার মনােনীত পাত্রীকে উপেক্ষা করিয়া একটি আই-এ পাস করা মেয়েকে নিজে পছন্দ করিয়া বিবাহ করিয়াছিল। ভয় নাই, ইহা পিতৃতরাষপীড়িত হেমন্তের দুর্দশার করুণ কাহিনী নয় । হেমন্তকে শেষ পর্যন্ত অর্থাভাবে স্ত্রীপুত্রকে পথে বসাইয়া উদ্বন্ধনে প্রাণত্যাগ করিতে হয় নাই। বিবাহের পূর্বেই সে কলিকাতার একটা বড় কলেজে অধ্যাপনার কাজ পাইয়াছিল ; তাহা ছাড়া পরীক্ষার কাগজ দেখিয়া ও ঘরে বসিয়া শিক্ষকতা করিয়াও যথেষ্ট উপার্জন করিত। সুতরাং পিত ত্যাজ্যপুত্র করিয়া ঘরের বাহির করিয়া দিলেও, অর্থের দিক দিয়! অন্তত তাহার কোনাে ক্লেশ হয় নাই। হৃষীকেশ বাবুর মত বদ রাগী অগ্নিশর্মা লােক আজকালকার দিনে বড়-একটা দেখা যায় না। পুরাকালে বদ-মেজাজী বলিয়া দুর্বাসা মুনির একটা অপবাদ ছিল বটে, কিন্তু তিনিও অকারণে কাহাকেও অভিসম্পাত দিয়াছিলেন বলিয়া আমাদের জানা নাই। হৃষীকেশবাবুর কারণ-অকারণের বালাই ছিল না, তিনি সর্বদাই চটিয়া থাকিতেন। শুনা যায়, সতের বৎসর বয়সে তাহার একবার টাইফয়েড হয়, সারিয়া উঠিয়া তিনি তেঁতুলের অম্বল দিয়া ভাত খাইবার ইচ্ছা জ্ঞাপন করেন। ডাক্তারের আদেশে তাহার সে ইচ্ছা পূর্ণ হইল না, ফলে সেই যে তিনি চটিয়া গিয়াছিলেন সে-রাগ তাহার এখনও পড়ে নাই। একাদিক্রমে এত বৎসর রাগিয়া থাকার ফলে তাহার গোপ সমস্ত পাকিয়া গিয়াছিল এবং মাথার সম্মুখ দিকে চুল উঠিয়া পরিষ্কার ও চিক্কা হইয়া গিয়াছিল। চক্ষু দুটি সৰ্ব্বদাই কষায়িত হইয়া থাকিত।

৪৬ চুয়াচন্দন রাগের মাত্রা বাড়িয়া গেলে তিনি ঘরের আসবাব-পত্ৰ ভাঙিতে আরম্ভ করিতেন। বাড়ির ভঙ্গপ্রবণ জিনিষগুলি প্রায় শেষ করিয়া আনিয়াছিলেন, এমন সময় একদিন দৈবক্রমে হাতের কাছে একটা কাচের গ্লাস পাইয়া প্রথমেই সেটা ভাঙিয়া ফেলিলেন। ইহাতে ইন্দ্রজালের মত কাজ হইল । কাচ-ভাঙার শব্দে কৰ্ত্তার অর্ধেক রাগ পড়িয়া গেল—সেদিন আর তিনি অন্য কিছু ভাঙিলেন না। অতঃপর তাহার রাগের মাত্রা চড়িয়া গেলেই বাড়ীর যে কেহ একটা কাচের গেলাস তাহার হাতে ধরাইয়া দিয়া সবেগে প্রস্থান করিত। তিনি সেটা মেঝেয় আছড়াইয়া ভাঙিয়া ফেলিতেন। এই অভিনব উপায়ে বাড়ির টেবিল, চেয়ার, আয়না, ঝাড় ইত্যাদি দামী আবার অনেকগুলি রক্ষা পাইয়াছিল। দুই মাস অন্তর কলিকাতা হইতে এক গ্রাস করিয়া নূতন কাচের গেলাস আনান হইত। তাহাতেই কোনাে রকমে কাজ চলিয়! যাইত। রাগ যখন কম থাকিত তখন তিনি তাহার খাসবেয়ার। গয়ারামকে ‘শূয়ারকা বাচ্চা না বলিয়া স্রেফ ‘ হারামজাদা’ বলিয়া ডাকিতেন। তখন বাহিরের গােমস্তা হইতে ভিতরে গৃহিণী পর্যন্ত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়ঃ বচিতেন। দুই বৎসর পূর্বে হেমন্ত যখন জানাইল যে, সে পিতৃনিৰ্বাচিত কলাবতী নাম্নী একাদশবর্ষীয়া মেয়েটিকে বিবাহ করিবে না, পরন্তু বেথুন কলেজের একটি অষ্টাদশী মাতৃহীনা কুমারীকে বধূরূপে মনােনীত করিয়াছে, তখন কৰ্ত্তা দ্রুতপরম্পরায় তেইশটা গেলাস ভাঙিয়া ফেলিলেন। কিন্তু তাহাতেও যখন ক্রোধ প্রশমিত হইল না তখন তিনি হেমন্তের ঘরে ঢুকিয়া একখানা ছয় ফুট লম্বা ভিনীসিয় আয়না পদাঘাতে ভাঙিয়া ফেলিয়া দ্বারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশপূৰ্ব্বক নির্দেশপূৰ্ব্বক ঘাের গর্জনে কহিলেন, “বেরিয়ে যা যা কৰ্ত্তার কীৰ্ত্তি ४१ তোর মত এখনি আমার বাড়ি থেকে, এককাপড়ে বেরিয়ে যায়। শূয়ারের মুখ দেখতে চাই না। বলিয়া হেষাধ্বনির মত একটা শব্দ কম্বুিলেন। হেমন্ত সেই যে এককাপড়ে বাহির হইয়া গেল, তাহার পর আজ পর্যন্ত পিতৃভবনে পদার্পণ করে নাই। হেমন্তর বিবাহের সমস্ত ঠিক হইয়াই ছিল,-তাহার মাসীর বাড়ী হইতে বিবাহ হইবে। বিবাহের দিন-দুই পর্বে গৃহিণী কঁপিতে কাপিতে কর্তার নিকট গিয়া বলিলেন, “আমি কালীঘাট বাব-মানত আছে। শিশিরের সঙ্গে আমায় পাঠিয়ে দাও। রাগী হইলেও হৃষীকেশবাবু অত্যন্ত কূটবুদ্ধি ; গৃহিণীর আর্জি শুনিয়া তিনি হে ষাধ্বনিবৎ শব্দ করিলেন, কটমট করিয়া তাকাইয়া বলিলেন, ‘মানত আছে, শিশিরের সঙ্গে পাঠিয়ে দাও! চালাকি ! আচ্ছা, আমিই সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। দেখি কেমন কালীঘাটের নানত!-গ।' শাৰক বাচ্চা কোথায় গেল~- গৃহিণী চক্ষে অঞ্চল দিয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিলেন । গয়া দ্বারের বাহিরে এক গেলাস সরবং হাতে লইয়া দাড়াইয়াছিল, ঘরে ঢুকিয়া কৰ্ত্তার হাতে দিতেই তিনি সেটা দেয়ালে মারিয়া ভাঙিয়া ফেলিলেন, স-গর্জনে বলিলেন, ‘ম্যানেজারকে ডাক্। ম্যানেজার আসিলে তাহাকে হুকুম দিলেন,--খিড়কি আর সদর দেউড়িতে চারটে করে খােট। দারােয়ান বসাও। বুড়ী না পালায় !--আর গয়া হারামজাদা তামাক দিয়ে যাক। হারামজাদা শুনিয়া সকলে বুঝিল গৃহিণীর চক্রান্ত ধরিয়া ফেলিয়া কৰ্ত্তা মনে মনে খুশী হইয়া উঠিয়াছেন। গৃহিণীর কালীঘাটে পূজা দিতে যাওয়া হইল না। বিবাহ হইয়া গেল। এদিকে হেমন্তর ৪৮ এমন কি চুয়াচন্দন ইহার পর দুই বৎসর কাটিয়াছে। গৃহিণী বাড়ির মধ্যে কৰ্ত্তার নজরবন্দী আনেন, একদিনের জন্যও কোথাও যাইতে পান নাই । ভগিনীপতির অতবড় অসুখেও তাঁহাকে বােনের বাড়ি যাইতে দেওয়া হয় নাই। কিন্তু শিশিরকে বাড়ীর মধ্যে অন্তরীণ রাখা শক্ত। কলেজে পড়ে তাই বাধ্য হইয়া তাহাকে কলিকাতায় মাসীর বাড়ী থাকিতে দেওয়া হইয়াছে। যা হােক, হৃষীকেশবাবু তাহাকে ডাকিয়া শাসাইয়া দিয়াছেন যে কোননাদিন যদি সে হেমন্তর বাড়ীতে যায়কিংবা তাহার সহিত বাক্যালাপ করে তাহা হইলে তাহাকেও তিনি ত্যাজ্যপুত্র করিয়া বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিবেন। কিন্তু সম্প্রতি কয়েকদিন হইতে বাড়ির মধ্যে ভিতরে ভিতরে কি- একটা ষড়যন্ত্র চলিতেছে কৰ্ত্ত৷ তাহা বেশ বুঝিতে পারিয়াছেন। গত শনিবার শিশির আসিয়াছিল, সে মার কানে ফু ফুস্ করিয়া কি বলিয়া গেল সেই অবধি গৃহিণী অতিশয় চঞ্চল ও বিনা হইয়া বেড়াইতেন। গৃহকর্মে তাহার মন নাই ; একদিন ক্রন্দনরত অবস্থায় কর্তার কাছে ধরা পড়িয়া গিয়াছেন। কিন্তু বহু উৎপীড়ন ও তর্জন করিয়াও কৰ্ত্তা ভিতরের কথা কিছুই বাহির করিতে পারেন নাই। তাঁহার সকল প্রশ্নই গৃহিণী উদাস মৌনব্রত অবলম্বন করিয়া সহ্য করিয়াছেন'। তাহাতে আর কিছু না হােক, বাড়িতে কাচের গেলাসের সংখ্যা ভয়ানক দ্রুত কমিয়া আসিতেছে। একে ত এইরূপ অবস্থা, তাহার উপর আজ সকালে উঠিয়াই কৰ্ত্তা একেবারে সপ্তমে চড়িয়া গিয়াছেন। হতভাগ্য সরকার সকালবেলা হুকুম লইতে আসিয়া কৰ্ত্তার সম্মুখেই হাঁচিয়া ফেলিয়াছিল। আর যায় কোথা? কর্তা একেবারে হুঙ্কার দিয়া উঠিলেন-‘বেয়াদব, উল্লুক কোথাকার! এত বড় আস্পর্ধা! গয়া শূয়ারকা বাচ্ছা কোথায় গেল? •| কৰ্ত্তার কীৰ্ত্তি ৪৯ সরকার ত প্রাণ লইয়া পলায়ন করিল কিন্তু কৰ্ত্তার সে রাগ সমস্ত দিনে পড়িল না ! আজ কি-না সন্ধ্যার সময় আবার শিশির আসিল। নিজের বন্সিবার ঘর হইতে তাহার গলার আওয়াজ শুনিতে পাইয়া কৰ্ত্তা তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। শিশির ঘরে ঢুকিতেই তিনি আরম্ভ করিলেন- ‘তুই হেমন্তর বাড়িতে যাস? সত্যি বথা বল হতভাগা, নইলে আজ তােকে মেরেই খুন করব।” কুড়ি বছরের ছেলে শিশির পিতার মুখের পানে হতভম্ব হইয়া তাকাইয়া রহিল, তাহার প্রশ্নের হা-না কোনাে উত্তরই দিতে পারিল না। হৃষীকেশবাবু তাহার কণ্ঠস্বর তারা গ্রামের ধৈবতে তুলিয়া বলিলেন,--- ‘কার হুকুমে তুই সেখানে গিয়েছিলি রে পাজি, নচ্ছার ! কি বলেছিলাম তােকে আমি ! আমার হুকুম হুকুম নয়, বটে ? শিশির গোঁজ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। হৃষিকেশবাবু এক পদাঘাতে জ্বলন্ত কলিকাসুদ্ধ গড়গড়াটা দূরে ফেলিয়া দিয়া বলিলেন,-“কি করতে তুই গিয়েছিলি সেখানে বল্ আমাকে ! আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন ! নিজের মা'র কাছে এসে ফিস্ ফিস্ করে কি বলেছিস? বল শিগগীর হতভাগ!, নইলে গাছে বেঁধে তাের গায়ে জলবিছুটি দেওয়া। শিশির ভিতরে ভিতরে মরিয়া হইয়া উঠিল। সে দু-হাত শক্তভাবে মুঠি করিয়া বলিল,-“আমি এখন থেকে দাদা বৌদিদির কাছেই থাক্ব ঠিক করেছি। আর—আর মাকেও তাদের কাছে নিয়ে যাব। হৃষীকেশবাবু একেবারে লাফাইয়া দাড়াইয়া উঠিলেন, “কী, এত বড় আম্পর্ধা! শিশির গো-ভরে বলিয়া চলিল,-“আমাকে থাকতেই হবে, বৌদিদির শরীর খারাপ, তার-তঁার—ছেলে হবে- - চুয়াচন্দন হৃষীকেশ আবার চীৎকার করিবার জন্য হাঁ করিয়াছিলেন, সেই অবস্থাতই হঠাৎ বসিয়া পড়িলেন ! সংবাদটা পরিপাক করিতে মিনিট- খানেক সময় লাগিল, তারপর পুনশ্চ গর্জন ছাড়িলেন,—‘ছেলে হবে ত তাের কি রে শূয়ার। শিশির বলিল,-“দাদা সমস্ত দিন বাড়ি থাকেন না, বৌদি একলা, তাই আমাকে থাকতে হবে। আর মাকেও ‘বেবােও! বেরােও ! এইদণ্ডে আমার বাড়ি থেকে দূর হ— নইলে চাবকে লাল করে দেব। শূয়ার পাজি বােম্বেটে কোথাকার! যাবিনে? গয়া শূয়ারকা বাচ্ছা কোথায় গেল, নিয়ে আয় আমার হান্টার শিশির আর অপেক্ষা করিল না, যেমন আসিয়াছিল তেমনি বাহির হইয়া গেল। মা’র সহিত সাক্ষাৎ পৰ্য্যন্ত করা হইল না। সমস্ত রাত্রি হৃষীকেশ বাড়িময় দাপাইয়া বেড়াইলেন। সেদিন আর ভয়ে কেহ তাহার কাছে গেলাস লইয়াও অগ্রসর হইতে পারিল না। পরদিন বেলা নয়টার সময় স্নানাহার করিয়া তিনি ম্যানেজারকে ডাকিয়া পাঠাইলেন, বলিলেন, “আমি কলকাতায় যাচ্ছি, সন্ধ্যে নাগাদ ফিরব। তুমি সাবধানে থেকো–গিন্নী না পালায়। আর শিশির লক্ষ্মীছাড়া যদি বাড়ি ঢুকতে চায় মেরে তাড়াবে।-গাড়ী যুততে বল। ম্যানেজার ভয়ে ভয়ে বলিলেন,—‘মােটর-কোম্পানীর এজেন্টকে আজ ডেকেছিলেন, সে এসেছে। তাকে হৃষীকেশবাবু বলিলেন, ‘তাকে চুলােয় যেতে বল। আমি কলকাতায় যাচ্ছি, নিজে দেখে মােটর কিব। গাড়ী যুততে বল। বলিয়া চেক বহিখানা পকেটে পূরিলেন। ম্যানেজার ‘যে আজ্ঞে’ বলিয়া প্রস্থান করিলেন। *, কর্তার কীর্তি গাড়ীতে ষ্টেশনে যাইতে যাইতে হৃষীকেশ নিজের মনে গর্জিতে লাগিলেন,—“কি আস্পর্ধা! আমার সঙ্গে চালাকি ! দেখে সৈব। আমার বৌ-আমার নাতি! আমি হৃষীকেশ রায়—দেখে নেব কে কি করতে পারে। বেলা প্রায় দেড়টার সময় একখানা ঝকঝকে নৃতন ফিয়েট গাড়ী কলিকাতায় প্রফেসার হেমন্ত রায়ের বাড়ির সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। গাড়ীর আরােহী গলা বাড়াইয়া দেখিলেন, ছােট্ট সুদৃশ্য বাড়িখানি, চারি ধারে একটুখানি সঙ্কীর্ণ ঘাসের বেষ্টনী ; সামনে লােহার ফটক বন্ধ। হ্রেষাধ্বনি করিয়া হৃষীকেশবাবু গাড়ী হইতে নামিলেন। ফটক খুলিয়া সম্মুখের বন্ধ দরজায় সজোরে কড়া নাড়িলেন। একটা ছােকরা গােছের চাকর দ্বার খুলিয়া সম্মুখে কষায়িত-নেত্ৰ বৃদ্ধ ও তাঁহার পিছনে একখানি দামী নূতন মােটরকার দেখিয়া সসম্ভ্রমে জিজ্ঞাসা করিল, ‘কি চাই বাবু? হৃষীকেশবাবু উত্তর না দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন। চাকরটা বলিল,-“বাবু বাড়ি নেই, কলেজে গেছেন। তার ফিরতে দেরী আছে। হৃষীকেশ কর্ণপাত না করিয়া ভিতরের দিকে চলিলেন। চাকরটা এই অদ্ভুত বৃদ্ধের আচরণ দেখিয়া তাড়াতাড়ি তাহার সম্মুখের পথ আগলাইয়া রুক্ষস্বরে কহিল, ‘ওদিকে কোথায় চলেছেন ! ওটা অন্দরমহল। বাবু বাড়ি নেই এসময় আপনি কি চান ? আপনার নাম কি ? হৃষীকেশ শুধু একটি হেষাধ্বনি করিয়া চাকরটার কর্ণধারণপূর্বক চুয়াচন্দন একধারে সরাইয়া দিলেন। তারপর সম্মুখের সিড়ি দিয়া গ গ করিয়া উপরে উঠিতে লাগিলেন। উপরের একটা ঘরে তখন মেঝের উপর মাদুর বিছাইয়া পা ছড়াইয়া বসিয়া প্রতিমা ভেলভেটের জুতার কাপড়ে রেশমের ফুল তুলিতেছিল। কৃশাঙ্গী সুন্দরী, বুদ্ধির বিভায় মুখখানি জ্বলজ্বল, চুলগুলি পিঠের উপর ছড়ান, নৃতন সৌভাগ্যের কোনাে লক্ষণই এখনও দেহে প্রকাশ পায় নাই; তাহাকে দেখিলেই মন খুশী হইয়া উঠে। তাহার হাঁটুর কাছে মাথা রাখিয়া শিশির কড়িকাঠের দিকে চোখ তুলিয়া লম্বা ভাবে শুইয়া ছিল। গতকল্য বাবার সহিত যে ব্যাপার ঘটিয়া গিয়াছে তাহা বৌদিদিকে বলা যাইতে পারে কি-না, সে মনে মনে তাহাই গবেষণা করিতেছিল। কিছুক্ষণ ভাবিয়া সে স্থির করিল—না, বলিয়া কাজ নাই । বৌদিদি দুঃখ পাইবেন মাত্র, আর কোন ফল হইবে না। দাদাকে চুপি চুপি এক সময় বলিলেই হইবে । বৌদিদির সন্তান-সম্ভাবনার কথা গত সপ্তাহে দাদার মুখে শুনিয়। শিশির আপনা হইতে ছুটিয়া মার কাছে গিয়াছিল। মাও শুনি। আনন্দে ও আশঙ্কায় অতিশয় চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু কর্তার রােষ-বহ্নি ডিঙাইয়া কিছু করিতে সাহস করেন নাই। গতকল্য শিশির দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া আবার বাড়ি গিয়াছিল—যেমন করিয়াই হউক মাকে লইয়া আসিবে। তারপরেই সেই বিভ্রাট! মা’র সঙ্গে শিশির দেখা পৰ্য্যন্ত করিতে পাইল না। এই কথাটাই মনের মধ্যে ভােলাপাড়া করিতে করিতে শিশির বলিল, “আচ্ছা বৌদি, মা যদি এখন কোনাে রকমে হঠাৎ এসে পড়েন ? সম্মুখের দেয়ালে শ্বশুর ও শ্বাশুড়ীর এলার্জ করা ফটোগ্রাফ টাঙানাে ছিল। সেই দিকে চোখ তুলিয়া কিছুক্ষণ শাশুড়ীর ছবির দিকে চাহিয়া কর্তার কীর্তি থাকিয়া একটি ক্ষুদ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া প্রতিমা বলিল,-“তা যদি হত ঠাকুরপাে– শিশির সহসা কনুইয়ে ভর দিয়া উঠিয়া বলিল,-“আচ্ছা, মাকে যদি চুরি করে নিয়ে আসি—বাবা কিছু টের না পান ? জিভ কাটিয়া প্রতিমা বলিল,-“বাপ রে ! তাহলে কি আর রক্ষে থাকবে। বাবা তাহলে কাউকে আস্ত রাখবেন না। বস্তুত, চোখে না দেখিলেও শ্বশুরের • মেজাজ সম্বন্ধে কোনাে কথাই প্রতিমার অজ্ঞাত ছিল না। তাহাকে বিবাহ করার ফলেই যে স্বামীর সহিত শ্বশুরের এমন বিচ্ছেদ ঘটিয়াছিল তাহা সে বিবাহের সময় হইতেই জানে। হেমন্ত অবশ্য কোনােদিন এসম্বন্ধে তাহাকে কোন কথা বলে নাই, কিন্তু শ্বশুরঘরের জন্য সর্বদাই প্রতিমার প্রাণ দিতে থাকিত। রাগী হউন কিন্তু শ্বশুর যে কখনই মন্দ লােক নহেন ইহা তাহার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল। শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর আদরে বঞ্চিত হইয়া এই মেয়েটি যে মনের মধ্যে কতখানি বেদনা পােষণ করিয়া রাখিয়াছিল তাহা তাহার স্বামীও কোনদিন জানিতে পারেন নাই। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী বলিয়া সে ও-ভাব কখনও ইঙ্গিতেও প্রকাশ করে নাই, পাছে স্বামী উদ্বিগ্ন হন। শিশির আবার কড়িকাঠের দিকে চাহিয়া শুইয়াছিল, প্রতিমা ছলছল চক্ষে বলিল,-“আমার ভাগ্যে সে কি আর হবে ঠাকুরপাে। বাবা-মা'কে আমি এজন্মে চোখে দেখতে পাব না।' বলিয়া একটা উচ্ছসিত দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিল। এমন সময় নীচে হ্রেষাধ্বনির মত শব্দ শুনিয়া শিশির তড়াক করিয়া উঠিয়া বসিল। এ শব্দ ত ভুল হইবার এ শব্দ ত ভুল হইবার নয়। সে প্রতিমার কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া বলিল—বাবা ! বাবা এসেছেন? বলিয়াই একলাফে পাশের ঘরে ঢুকিয়া ভিতর হইতে দরজা বন্ধ করিয়া দিল।

৫৪ চুয়াচন্দন প্রতিমার মুখ সাদা হইয়া গেল, বুক ঢিব, ঢিব করিয়া উঠিল। উঠিয়া দাড়াইয়া মাথায় আঁচল টানিয়া দিতেই হৃষীকেশবাবু ঘরের মধ্যে আসিয়া দাড়াইলেন। প্রতিমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া বজ্রগম্ভীরস্বরে কহিলেন, “আমার নাম শ্ৰহৃষীকেশ রায়। আমি বর্ধমান থেকে আছি।'—বলিয়া একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া তাহাতে উপবেশন করিলেন। এইখানে প্রতিমা একটু অভিনয় করিল। মনে যে ভয়ের সঞ্চার হইয়াছিল তাহা জোর করিয়া চাপিয়া সে সচকিতে ফিরিয়া মুখের ঘােমট। সরাইয়া দিল। বিস্ময়-আনন্দ-ভক্তি-লজ্জা-মিশ্রিত চক্ষে হৃষীকেশবাবুর মুখের দিকে এক মুহূর্ত চাহিয়া থাকিয়া অর্ধস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করিল--- ‘বাবা। তারপর গলায় আঁচল দিয়া তাহার পায়ের উপর মাথা রাখিয়া প্রণাম করিল। অগ্নদগারী ভিসুভিয়াসের মাথার উপর উত্তর-মেরুর সমস্ত বরফ চাপাইয়া দিলে কি ফল হয় বলিতে পারি না, হৃষীকেশবাবুরও মুখের কোনাে ভাব-পরিবর্তন দেখা গেল না। তিনি ক্ষীণভাবে একটু হ্রেষাধ্বনি করিয়া বলিলেন, “তুমিই আমার পুত্রবধু? তােমার নাম কি ? ‘আমার নাম প্রতিমা’ বলিয়া সে তাহার পায়ের কাছেই বসিয়া পড়িল। এইটুকু অভিনয় করিয়াই তাহার উরুদুটা থর-থর করিয়া কাপিতেছিল। হৃষীকেশবাবু চাহিয়া দেখিলেন—হ নাম সার্থক বটে। বধুর মুখ দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায়। শুনিয়াছিলেন বধূ আই-এ পাস, কিন্তু কই তাহার আচরণে বিদ্যাভিমানের কোন চিহ্নই ত নাই। তিনি এক দর্পিত তীক্ষ্ণভাষিণী যুবতী মনে মনে কল্পনা করিয়া রাখিয়াছিলেন। কিন্তু এ কি? হৃষীকেশবাবু মনে মনে একবার হে ধ্বনি করিলেন, কিন্তু তাহাপুত্রদের উদ্দেশে। হতভাগারা তাঁহাকে বলে নাই কেন কৰ্ত্তার কীর্তি ৫৫ প্রতিমা শ্বশুরের মুখের দিকে একবার চাহিয়া, উঠিয়া দাঁড়াইয়া মৃদুকণ্ঠে বলিল, “আপনি বড় ঘেমেছেন, জামাটা খুলে ফেললে হত না বাবা, হাতপাখা আনিয়া সে বাতাস করিবার উপক্রম করিতেই স্বষীকেশবাবু বলিয়া উঠিলেন, “থাক থাক, তােমায় আর কষ্ট করতে হবে না মা। আমি নিজেই বাতাস খাচ্ছি, বলিয়া ফেলিয়াই হৃষীকেশবাবু একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। এ ধরণের কথা গত তেত্রিশ বৎসরের মধ্যে তাহার মুখ দিয়া একবারও বাহির হয় নাই। পাশের ঘরের দরজায় কান লাগাইয়া শিশির নিস্পন্দ বক্ষে এতক্ষণ শুনিতেছিল ; এবার সে পা টিপিয়া টিপিয়া সরিয়া গিয়া দেয়ালে-টাঙানে৷ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ছবির সম্মুখে দাঁড়াইয়া প্রাণপণে দুর্গানাম জপ করিতে লাগিল। হৃষীকেশবাবু গায়ের জামা খুলিয়া মাদুরের উপর বসিলেন, পাখার হাওয়া খাইতে খাইতে জিজ্ঞাসা করিলেন, সে শয়তানটা ফিরবে কখন ? তােমাকে বুঝি এই রকম একলা ফেলে রেখে যায় ? চোখের জল ও মুখের হাসি একসঙ্গে নিরুদ্ধ করিয়া প্রতিমা নিরুত্তরে বসিয়া রহিল। হৃষীকেশবাবু গলা একপর্দা চড়াইয়া দিয়া বলিলেন, ‘ইপিড বদমায়েস সব ! শিশিরটাকেও বাড়ি থেকে দূর করে দিয়েছি। এমন বৌ আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। আজই আমি তােমাকে বাড়ি নিয়ে যাব, দেখি কোন্ ব্যাটা কি করতে পারে। শ্বশুরের মুখের দিকে চাহিয়া প্রতিমা আর অশ্রু সংবরণ করিতে পারিল , ঝর ঝর করিয়া কাদিয়া ফেলিল। হৃষিকেশবাবু তাহাকে কোলের কাছে টানিয়া আনিয়া নিজের থানের খুট দিয়া তাহার চোখ মুছাইয়া দিয়া সগর্জনে কহিলেন,‘কেঁদো না। আমি এই হেমন্তটাকে দেখে নেব।

। চুয়াচন্দন সব ঐ ছোড়ার শয়তানী—আমি বুঝেছি। গিন্নিও এর মধ্যে আছেন। আমাকে এতদিন বলেনি কেন? ষড়যন্ত্র ! যত-সব চোর বােম্বেটের দল নইলে এই বৌকে আমি দু-বচ্ছর বাইরে ফেলে রাখি? প্রতিমা শ্বশুরের কোলের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া রুদ্ধস্বরে বলিল,- ‘বাবা, আমাকে বাড়িতে মার কাছে নিয়ে চলুন। যাবই ত। এখনি নিয়ে যাব। আমি হৃশীকেশ রায়, আমি কি কারু ভােয়াক্কা রাখি? জামাটা গায়ে দিতে দিতে পুনরায় বলিলেন,- ‘তােমায় নিয়ে যাব ব'লে নতুন মােটর কিনে নিয়ে একেবারে এসেছি। ট্রেনে ত আর তােমার যাওয়া হতে পারে না। হৃষীকেশ উঠিয়া দাড়াইলেন। প্রতিমা থতমত ভাবে একবার তােক গিলিয়া বলিল,--‘এক্ষুনি? কিন্তু বাবা - হৃষীকেশবাবু চড়া সুরে বলিলেন, কিন্তু কি ? সেই রাস্কেলটার অনুমতি নিয়ে তবে তােমাকে নিয়ে যেতে হবে ? (হ্রেষাধ্বনি করিলেন । আমি এই তােমাকে নিয়ে চললাম, ওদের যদি ক্ষমতা থাকে মােকদ্দমা করুক গিয়ে। প্রতিমা আর দ্বিরুক্তি করিল না, যেমন ছিল তেমনি বেশে শ্বশুরের সঙ্গে নামিয়া চলিল। সদর দরজা পর্যন্ত গিয়া হৃষীকেশবাবু, থমকিয়া দাড়াইয়া পড়িলেন। উদ্বিগ্নভাবে পুত্রবধুর দিকে তাকাইয়া কহিলেন, কিন্তু শুনেছিলাম—ঐ শিশির হতভাগা বলছিল যে তুমি নাকি-তােমার নাকি? কোনাে ভয়ের কারণ নেই ত মা ? মােটরে প্রায় ষাট মাইল যেতে হবে। যদি কষ্ট হয়—যদি কোনােরকম আরক্ত মুখ কোনােমতে ঘােমটায় ঢাকিয়া প্রতিমা তাড়াতাড়ি গাড়িতে গিয়া উঠিল কর্তার কীর্তি তিনটার সময় হেমন্ত বাড়ি ফিরিতেই শিশির ছুটিয়া গিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিল,-“দাদা, বাবা এসেছিলেন, বৌদিকে বাড়ি নিয়ে গেছেন। বলে গেছেন আমাদের ক্ষমতা থাকে ত যেন মােকদ্দমা করি। বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল। ভাইয়ের কাছে সমস্ত আদ্যোপান্ত শুনিয়া হেমন্ত স্মিতমুখে বলিল, ‘সব ত তুই-ই করলি। এখন আমি কি করব উপদেশ দে। অতঃপর দুই ভায়ে আধঘণ্টা ধরিয়া পরামর্শ করিয়া বিকাল পাঁচটার গাড়ীতে বর্ধমান রওনা হইল। রাত্রি আটটার সময় বৌমার তত্ত্বাবধান করিবার জন্য অন্দরে প্রবেশ করিয়া কৰ্ত্তা দেখিলেন দুই ভাই হেমন্ত ও শিশির মায়ের ঘরের মেঝেয় আহারে বসিয়াছে। গৃহিণী সম্মুখে বসিয়া খাওয়াইতেছেন এবং নববধূ একখানা রেকাবি হস্তে দ্বারের পাশে দাঁড়াইয়া আছে। সীকেশবাবু ভীষণ ভ্রুকুটি করিয়া কহিলেন,-এ দুটোকে কে বাড়ি ঢুকতে দিলে ? নিশ্চয় খিড়কী দিয়ে ঢুকেছে! হু—আস্পর্ধা! এখনি ওদের বেরিয়ে যেতে বল।” হেমন্ত ও শিশির কথা কহিল না, হেঁটমুখে আহার করিতে লাগিল। গৃহিণী বলিলেন,-“কেন যাবে--যাবে না। আর যায় যদি, বৌমাকে নিয়ে যাবে। আমিও যাব। দেখি তুমি কি করে আটকাও ! হৃষীকেশবাবু কটমট করিয়া তাকাইয়া বলিলেন,—“হু। ভারি আস্পর্ধা হয়েছে। আচ্ছা, এখন কিছু বলছি না, বৌমার শরীর খারাপ, কিন্তু এর পরে-- বৌমা তুমি শােও গে যাও, হতভাগাদের আর চুয়াচন্দন পরিবেশন করতে হবে না। বলিয়া মধ্যম রকমের একটা হেষাধ্বনি করিয়া তিনি প্রস্থান করিলেন। কিছুক্ষণ পরে বৈঠকখানা হইতে কৰ্ত্তার গলা শুনা গেল,-“গয়া হতভাগা কোথায় গেল, তামাক দিয়ে যা। গয়ারামের এতবড় সৌভাগ্য জীবনে কখনও হয় নাই। সে নববধূ ঠাকুরাণীর পায়ের কাছে ঢিব করিয়া একটা গড় করিয়া বাহিরে ছুটিল । হেমন্ত ও শিশির মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া হাসিল। গৃহিণী ‘খের জল মুছিয়া ভাঙা গলায় বলিলেন, “যাও বৌমা তােমার শ্বশুর হুকুম দিয়ে গেলেন, আজকের মত শুয়ে পড়গে মা, কাল তখন ওদের পরিবেশন করে খাইও।

রক্ত-সন্ধ্যা

No text on this page.

তবে মানুষের সহজ সাধারণ বৈচিত্র্যহীন জীবনযাত্রার মাঝখানে ভূমিকম্পের মত এমন এক একটা ঘটনা ঘটিয়া যায় যে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার সহিত তুলনা করিয়া সেটাকে একটা অসম্ভব অঘটন বলিয়া মনে হয়। গল্পটা আজ বলিতে বসিয়াছি, সেটাও একদিন এমনই অকস্মাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে আমার জীবনে আসিয়া হাজির হইয়াছিল। যদিও শুধু দর্শক হিসাবে ছাড়া এ গল্পের সঙ্গে আমার কোনও সংশ্রব নাই, তবু ইহা আমার মনের উপর এমন একটা গভীর দাগ কাটিয়া দিয়াছে—যাহ! বােপ করি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুছিবে না। যে লােকটার কাহিনী আজ লিপিবদ্ধ করিতে বসিয়াছি, আজ সাত দিন হইল সে হাইকোর্টের রায় মাথায় করিয়া পালােকে যাত্রা করিয়াছে । সুতরাং সাক্ষীসাবুদ উপস্থিত করিবার আমার আর উপায় নাই। সংবাদ পত্রের নথি হইতে এবং আসামীর বিচারের সময় সাক্ষীদের মুখের যে যে কথা এই গল্পে কাজে আসিতে পারে, তাহা প্রয়ােজনমত ব্যবহার করিব। বিশ্বাস আমি কাহাকেও করিতে বলি না এবং নিছক গাজ বলিয়া যাহারা উড়াইয়া দিতে চাহেন, তাহাদের বিরুদ্ধে আমার কোন নালিশ নাই। আমি শুধু এইটুকুই ভাবি যে, সে লােকটা মরিবার পূর্বে নিজের দোষ-ক্ষালনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করিয়াও এতগুলি অনাবশ্যক মিথ্যা কথা বলিয়া গেল কেন? এই সময় দৈনিক সংবাদপত্র ‘কালকেতুতে, এই ঘটনার যে বিবরণ বাহির হইয়াছিল, তাহাই সর্বাগ্রে উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি :- “গতকল্য বেলা প্রায় সাড়ে নয়টার সময় কলিকাতার দুর্গাচরণ ব্যানার্জীর লেনে এক কষাইয়ের দোকানে ভীষণ হত্যাকাণ্ড, সটীত হইয়া গিয়াছে। দোকানের মালিক গােলাম কাদের অন্য দিনের ন্যায় যথারীতি মাংস বিক্রয় করিতেছিল। দোকানে কয়েকজন ফিরিঙ্গী ও মুসলমান ।। চুয়াচন্দন খরিদ্দার উপস্থিত ছিল। এমন সময় একজন অপরিচিত ফিরিঙ্গী দোকানে প্রবেশ করিয়া কিছু গােমাংস খরিদ করিতে চাহে। তাহাকে য়াই দোকানদার গােলাম-কাদের ভীষণ চীৎকার করিয়া মাংস কাটা ছুরি হস্তে তাহার উপর লাফাইয়া পড়ে এবং নৃশংসভাবে তাহার বুকে, পেটে, মুখে ছুরিকাঘাত করিতে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি মাটীতে পড়িয়া যায়, তখন গােলাম কাদের তাহার বুকের উপর বসিয়া এক একবার ছুরিকাঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বলিতে থাকে,—‘ভাদাে-ডা-গামা, এই আমার স্ত্রীর জন্য—এই আমার কন্যার জন্য-এই আমার বৃদ্ধ পিতার জন্য। দোকানে যাহারা ছিল সকলেই এই ললামহর্ষণ কাণ্ড দেখিয়া দ্রুত পলায়ন করিয়া পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ আসিয়া যখন গােলাম কাদেরকে গ্রেপ্তার করিল, তখনও সে মৃত দেহের উপর ছুরী চালাইতেছে ও পূৰ্ববং বকিতেছে। সন্দেহ হয় যে, গােলাম-কাদের হঠাৎ পাগল হইয়া গিয়াছে। কারণ, হত ব্যক্তির সহিত পূৰ্ব্ব হইতে তাহার পরিচয় ছিল বলিয়া জানা যাইতেছে না এবং তাহার স্ত্রী, কন্যা বা বৃদ্ধ পিতা কেহই বর্তমান নাই। অনুসন্ধানে জানা গিয়াছে যে, গােলাম-কাদের প্রায় পনের বৎসর পূর্বে বিপত্নীক হইয়াছিল। তাহার স্ত্রী এক মৃত কন্যা প্রসব করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তাহার পর সে আর বিবাহ করে নাই। পুলিশ-তদন্তে বাহির হইয়াছে যে, হত ব্যক্তি গােয় হইতে নবাগত এক জন পর্তুগীজ, ফিরিঙ্গি ব্যবসায় উপলক্ষে কয়েকদিন পূর্বে কলিকাতায় আসিয়া এক ক্ষুদ্র হােটেলে বাস করিতেছিল। তাহার নাম গেব্রিয়েল ডিরােজা। গােলাম কাদের এখন হাজতে আছে। ডিবােজার লাস পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে প্রেরিত হইয়াছে।” ঘটনাস্থলের খুব কাছেই আমার বাড়ী এবং অনেকদিন হইতে এই রক্ত-সন্ধ্যা গােলাম-কাদের লােকটার সহিত আমার মুখচেনাচিনি ছিল বলিয়াই ব্যাপারটা বেশী করিয়া আমাকে আকৃষ্ট করিয়াছিল। তাহা ছাড়া আর একটি জিনিষ আমার কৌতূহল উদ্ৰিক্ত করিয়াছিল, সেটা ভাস্কো-ডা-গামার নাম। ছেলেবেলা হইতেই আমি ইতিহাসের ভক্ত, তাই হঠাৎ কষাইখানার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে এই ইতিহাস-প্রসিদ্ধ নামটা উঠিয়া পড়ায় আমার মন সচকিত ও উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল। ভাস্কো-ডা-গামা’ সাধারণ প্রচলিত নাম নহে; একজন অশিক্ষিত মুসলমান কষাইয়ের মুখে এ নাম এমন অবস্থায় উচ্চারিত হইতে দেখিয়া কোন এক গুপ্ত ‘রােমান্সের গন্ধে আমার মনটা ভরিয়া উঠিয়াছিল। কি অদ্ভুত রহস্য এই বিশ্রী হত্যাকাণ্ডের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন হইয়া অাছে ? কে এই গেব্রিয়েল ডিরােজা-যাহাকে হত্যাকারী ভাস্কো-ডা-গামা বলিয়া সম্বােধন করিল ? সত্যিই কি ইহা কেবলমাত্র এক বাতুলের দায়িত্বহীন প্রলাপ ? তা সে যাহাই হউক, কৌতূহল আমার এতই বাড়িয়া গিয়াছিল যে, যে দিন এই মােকর্দমা করােনারের কোটে উঠিল, সেদিন আমি একটু সকাল সকাল আদালতে গিয়া হাজির হইলাম। করােনার তখনও উপস্থিত হন নাই; কিন্তু আসামীকে আনা হইয়াছে। চারিদিকে পুলিশ গিশ গিশ, করিতেছে। আসামীর হাতে হাতকড়া—একটি টুলের উপর চুপ করিয়া বসিয়া আছে। আমাকে দেখিয়া সে চিনিতে পারিল এবং হাত তুলিয়া সেলাম করিল। পাগলের লক্ষণ কিছুই দেখিলাম না, নিতান্ত সহজ মানুষের মত চেহারা। মুখে ভয় বা উৎকণ্ঠার কোনও চিহ্নই নাই। দেখিয়া কে বলিবে, এই লােকটাই দুইদিন আগে এমন নির্দয়ভাবে আর একটা লােককে হত্যা করিয়াছে। করােনার আসিয়া পড়িলেন। তখন কাজ আরম্ভ হইল। প্রথমে ডাক্তার আসিয়া এজাহার দিলেন। তিনি বলিলেন, লাসের গায়ে শুদ্ধ ৬৪ চুয়াচন্দন সাতটী ছুরিকাঘাত পাওয়া গিয়াছে। এই সাতান্নটির মধ্যে কোটী মৃত্যুর কারণ, বলা শক্ত। কারণ, সবগুলিই সমান সাংঘাতিক। ডাক্তারের জবানবন্দি শেষ হইলে জর্জ ম্যাথুস নামক একজন দেশী খৃষ্টানকে সাক্ষী ডাকা হইল। অন্যান্য সওয়াল জবাবের পর সাক্ষী কহিল,—“আমি গত দশ বৎসর প্রায় প্রত্যহ গােলাম-কাদেরের দোকানে মাংস কিনিয়াছি ! কিন্তু কোনও দিন তাহার এরূপ ভাব দেখি নাই। সে স্বভাবতঃ বেশ শান্ত শিষ্ট লােক।” প্রশ্ন—আপনার কি মনে হয়, সে যেসময় হত ব্যক্তিকে আক্রমণ করে, সে সময় সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলনা? উত্তর--হতব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করিবার আগে পর্যন্ত সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল—আমাদের সঙ্গে সহজভাবে কথাবার্ত। কহিতেছিল। কিন্তু ডিবােজাকে দেখিয়াই একেবারে যেন পাগল হই। গেল। প্রশ্ন—আপনার কি বােধ হয়, আসামী হত ব্যক্তিকে পূৰ্ক হইতে চিনিত ? উত্তর-হ্যা। কিন্তু তাহার আসল নাম না বলিয়া ভাস্কো-ডা-গান বলিয়া ডাকিয়াছিল। প্রশ্ন—ডিরােজা আক্রান্ত হইয়া কোন কথা বলিয়াছিল ? উত্তর। প্রশ্ন—আসামী মদ বা অন্য কোনও নেশা করে, আপনি জানেন ? উত্তর—আমি কখনও তাহাকে নেশা করিতে বা মাতাল হইতে দেখি নাই। প্রশ্ন—আসামীর ভাবে ইঙ্গিতে কি আপনার বাে হইয়াছিল যে, সে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার জন্য ডিরােজাকে খুন করিতেছে ?

রক্ত-সন্ধ্যা উত্তর-হ। তাহার কথায় ও মুখের ভাবে আমার মনে হইয়াছিল যে, ডিবােজা পূর্বে তাহার স্ত্রী কন্যা ও বৃদ্ধ পিতার উপর কোনও অত্যাচার করিয়া থাকিবে। জর্জ ম্যাথুসের পরে আরও কয়েকজন সাক্ষী প্রায় ঐ মৰ্ম্মে এজেহার দিবার পর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার এজেহার দিতে উঠিলেন। তিনি বলিলেন যে, গােয় হইতে খবর পাইয়াছেন যে, ডিরােজা সেখানকার এক জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জাতিতে ফিরিঙ্গি পর্তুগীজ,বয়স বিয়াল্লিশ বৎসর। সে পূৰ্বে কখনও গােয়া ছাড়িয়া অন্যত্র যায় নাই-জীবনে এই প্রথম কলিকাতায় পদার্পণ করিয়াছিল। আসামী সম্বন্ধে ডেপুটী কমিশনার বলিলেন,—আসামীর আত্মীয়-স্বজন স্ত্রী-পুত্র পরিবার কেহ নাই, অনুসন্ধানে জানা গিয়াছে যে, গত ত্রিশ বৎসরের মধ্যে সে কলিকাতা ছাড়িয়া কোথাও যায় নাই। তাহার বয়স অনুমান সাতচল্লিশ বৎসর। সুতরাং ডিরােজার সহিত তাহার যে পূৰ্বে কখনও দেখা-সাক্ষাৎ হইয়াছিল,তাহা সম্ভব বলিয়া বােধ হইতেছে না। আসামী এতক্ষণ চুপ করিয়া দাড়াইয়াছিল। এবার সে কথা কহিল ; বলিল, “ডা-গামাকে আমি অনেকবার দেখিয়াছি। মুহুৰ্তমধ্যে ঘর একেবারে নিস্তব্ধ হইয়া গেল। করােনার ডেপুটী কমিশনারকে চুপ করিতে ইঙ্গিত করিয়া আসামীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি ডিনােজাকে পূর্ব হইতে জান ? আসামী।-ডিরােজাকে আমি কখনও দেখি নাই—আমি ভাস্কো-ডা- গামাকে চিনি। ভাস্কো-ডা-গামা ছদ্মবেশে আমার দোকানে মাংস কিনিতে আসিয়াছিল। করােনার তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আসামীর দিকে চাহিয়া বলিলেন,—“আচ্ছা ভাস্কো-ডা-গামাকে তুমি কোথায় দেখিয়াছ?

চুয়াচন্দন আসা কহিল, প্রথম দেখি কালিকটের বন্দরে-শেষ দেখি সমুদ্রের বুকের উপর এই পর্যন্ত বলিয়া আসামী হঠাৎ থামিয়া গেল। দেখিলাম, তাহার মুখ-চোখ লাল হইয়া উঠিয়াছে, মুখ দিয়া কথা বাহির হইতেছে না। সে অবরুদ্ধকণ্ঠে একবার ‘ইয়া খােদা’ বলিয়া দুই হাতে মুখ গুজিয়া বসিয়া পড়িল-আর কোনও কথা বলিল না। তারপর করােনার যথাসময় রায় দিলেন যে, “ক্ষণিক উন্মত্ততার বশে গােলাম কাদের ডিরােজাকে খুন করিয়াছে।” কোট হইতে যখন বাহিরে রাস্তায় আসিয়া দাড়াইলাম, তখন আমার মাথার ভিতর ঝ1-ঝ। করিতেছে। কালিকট’ ‘সমুদ্রের বুকের উপর আসামী এ সব কি বলিল ? আরও কত কথা, না জানি কোন্ অপূৰ্ব্ব কাহিনী এই মূখ নিরক্ষর কসাই গােলাম-কাদেরের বুকের মধ্যে লুকানে: আছে। কারণ, সে যে পাগলামীর ভাণ করিতেছে না, তাহ নিঃসন্দেহ। কোনও কথা বা কাজই তাহার পাগলের মত নহে। অথচ দুই একটা অসংলগ্ন কথার ভিতর দিয়া অতীতের পর্দার একটা কোণ তুলিয়া ধরিয়া এ কি এক আশ্চৰ্য্য রূপকথার ইঙ্গিত দিয়া গেল ! ইহার পর গােলাম-কাদেরের ভাগ্যে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, তাহা বিস্তারিতভাবে বলিবার কোনও প্রয়ােজন দেখিতেছি না। দায়রা সােপর্দ হইয়া মামলা হাইকোর্টে উঠিলে হাইকোর্টের জজবাহাদুর গােলাম-কাদেরকে একমাস ডাক্তারের নজরবন্দীতে থাকিবার হুকুম দিলেন। এক মাস পরে ডাক্তারের রিপােট আসিলগােলাম-কাদের সুস্থ সহজ , মানুষ, পাগলামীর চিহ্নমাত্র তাহার মধ্যে নাই। তার পর • বিচার। বিচারে গােলাম-কাদের নিজের উকীলের পরামর্শ অগ্রাহ করিয়া স্পষ্ট ভাষায় বলিল, --“আমি খুন করিয়াছি, সে জন্য বিন্দুমাত্র রক্ত-সন্ধ্যা দুঃখিত বা অনুতপ্ত নই। আবার যদি তাহার সহিত দেখা হয়, আবার তাহাকে এমনই ভাবে হত্যা করিব।” হাইকোর্ট নিরুপায় হইয়া তাহার ফাসীর হুকুম দিলেন । আমি শেষ পর্যন্ত আদালতে উপস্থিত ছিলাম। গােলাম কাদেরের জীবননাট্যে বিচারের অঙ্কটা শেষ হইয়া গেলে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া দাড়াইলাম। বিচারে তাহার মুক্তির প্রত্যাশা কোন দিনই করি নাই, কিন্তু তবু অকারণে মনটা অত্যন্ত খারাপ হইয়া গেল । বুকের নিভৃত স্থানে যেন একটা সংশয় লাগিয়াই রহিল, যে, এ সুবিচার হইল না, কোথায় যেন কি একটা অত্যন্ত জরুরী প্রমাণ বাদ পড়িয়া গেল। এই সব নানা কথা ভাবিতেছি, এমন সময় কয়েক জন পুলিসের লােক আসামীকে বাহিরে লইয়া আসিল। আমি গােলাম কাদেরের মুখের নিকে চাহিতেই সে ইসারা করিয়া আমাকে কাছে ডাকিল। তারপর গল। নামাইয়া বলিল, “বাবুজী আপনি আমার মকদ্দমার সুরু হইতে শেষ পর্যন্ত আছেন, তাহা আমি দেখিয়াছি। আমি ত চলিলাম, আমার একটি শেষ আর্জি আছে—একবার জেলে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবেন, আমার কিছু বলিবার আছে।” আমি বলিলাম, “নিশ্চয় করিব।” গােলাম-কাদের হাতকড়া-বাঁধা দুই হাত তুলিয়া আমাকে সেলাম করিয়া জেলের গাড়ীতে চড়িয়া চলিয়া গেল । তার পর কি করিয়া কর্তৃপক্ষের অনুমতি লইয়া জেলে তাহার সহিত দেখা করিলাম, সে বিবৃতি এখানে অনাবশ্যক। শুধু কন্‌ডেমড় আসামীর কক্ষে বসিয়া মৃত্যুর দুই দিন পূর্বে সে আমাকে যে গল্প বলিয়াছিল, তাহাই বাংলাভাষায় অনূদিত করিয়া আনুপূর্বিক উদ্ধত করিতেছি।

৬ চুয়াচন্দন গােলাম-কাদের বলিল, “বাবুজী, আমার এই কাহিনী আপনি বিশ্বাস -রুন আর নাই করুন, আমি যে পাগল নই আমার এই কথাটি আপনি অবিশ্বাস করিবেন না। সত্য কথা বলিতে কি, আমার কাছেও ইহা এক অদ্ভুত ব্যাপার। আমি কিতাব পড়ি নাই, আজীবন মাংস বিক্রয় করিয়াছি। গল্প বানাইয়া বলিবার শক্তি আমার নাই। যাহা আজ বলিব, তা আমি নিজে প্রত্যক্ষ করিয়াছি বলিয়াই বলিব। অথচ এ সকল ঘটনা আমার—এই গােলাম কাদেরের জীবনে যে ঘটে নাই, তাহাও নিশ্চিত। আপনাকে কেমন করিয়া বুঝাইব জানি না, আমি মুখ লােক । শুধু এইটুকু বলিতে পারি যে, ইহা আজিকার ঘটনা নয়, বহু বহু যুগের পুরাতন । তবে সুরু হইতেই কথাটা বলি। পনের-ষােল বৎসর পূর্বে আমার স্ত্রী এক কন্যা প্রসব করিতে গিয়া মারা যায়, মেয়েটিও মারা গেল । কি করিয়া জানি না, আমার মনের মধ্যে বদ্ধমূল হইয়া গেল যে, কোনও দুষমন আমার স্ত্রী-কন্যাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করিয়াছে। শশাকের অপেক্ষা ক্রোধ ও প্রতিহিংসায় আমার অন্তঃকরণ অধিক পূর্ণ হইয়া উঠিল ; সৰ্ব্বদাই মনে হইত, যদি সেই অজ্ঞাত দুষমনটাকে পাই, তাহা হইলে তাহার প্রতি অঙ্গ ছিড়িয়া ছিড়িয়া ইহার প্রতিশােধ লই। এই ভাবে কিছুদিন কাটিবার পর ক্রমে বুঝিতে পারিলাম যে, ইহ আমার ভ্রান্তি—সত্যের উপর ইহার কোনও প্রতিষ্ঠা নাই। তার পর যত দিন কাটিতে লাগিল, আস্তে আস্তে শােক এবং ক্রোধ দুই ভুলিতে লাগিলাম। কিন্তু আর বিবাহ করিতে পারিলাম না। শেষ পর্যন্ত হয় ত জীবনটা আমার এমনই সহজভাবে কাটিয়া যাইত, যদি না সে দিন অশুভক্ষণে সেই লােকটা আমার দোকানে পদার্পণ করিত। শুনিয়াছি, মানুষ জলে ডুবিলে তাহার বিগত জীবনের সমস্ত ঘটনা

রক্ত-সন্ধ্যা
ছবির মত চোখের পর্দার উপর দেখিতে পায়। এই লােকটাকে
দেখিবামাত্র আমারও ঠিক তাহাই হইল। এক মূহুর্তের মধ্যে চিনিয়।
লইলাম—এই সেই নৃশংস রাক্ষস, যে আমার স্ত্রী-কন্যা এবং পিতাকে
ত্য করিয়াছিল ! ছবিত মত সে সকল দৃশ্য আমার চোখের উপর
জাগিয়া উঠিল । নঈমান জাহাজের উপর সেই মরণােখ অসহায়
যাত্রীদের হাহাকার কাণে বাজিতে লাগিল। ভাস্কো-ডা-গামার সেই
ঐ র হাসি আবার দেখিতে পাইলাম ।
আমার জজ সাহেবর হত্যার কারণ খুঁজিতেছিলেন, কৈফিয়ং
চাহিতেছিলেন। বাবুর্চী, আমি কি কৈফিয়ৎ দিব, আর দিলেই বা
তাহ! বুঝিত কে ?
আপনি হয়ত বুঝিবেন। আপনার চোখে মুখে আমি তাহার পরিচয়
ইয়াছিলাম, তাই আপনাকে এই কষ্ট দিয়াছি। ইহাতে ফল কিছু
হইবে না জানি কিন্তু আমার হৃদয়ভার লাঘব হইবে; এ ছাড়া আমার অন্য
স্বার্থ নাই।
আমার এই কশাই-জীবনের ইতিহাসটা এখানেই শেষ করিতেছি।
এবার যাহার কথা আরম্ভ করিব, তাহার নাম মির্জ। দাউদ বিন্ গােলাম
‘সদকা। আমিই যে এই মির্জা দাউদ, তাহা এখন ভুলিয়া যান । মনে
করুন, ইহা আর কাহারও জীবনের কাহিনী।
*
*
*
কালিকটের নাম আপনি শুনিয়া থাকিবেন। । মালাবার উপকূলে
অতি সূন্দর মহার্ঘ মণিখণ্ডের মত একটি ক্ষুদ্র নগর। মােরগের ডাক
যতদূর শুনা যায়, ততদূর তাহার নগর-সীমানা।
তাহার নগর-সীমানা। নগরের পশ্চাতে
ছােট ছােট পাহাড় উপত্যকা, কঙ্করপূর্ণ সমতল ক্ষেত্র, এবং তাহার পশ্চাতে

; চুয়াচন্দন অভ্রভেদী পশ্চিমঘাট সমস্ত পৃথিবী হইতে যেন এই স্থানটুকুকে পৃথক করিয়া ঘিরিয়া রাখিয়াছে সম্মুখে অপার সমুদ্র ভিন্ন কালিকটে প্রবেশ বা নিষ্ক্রমণের অন্য সুগম পথ নাই। এই সমুদ্রপথে অসংখ্য বাণিজ্যতরণী কালিকটের বন্দরে প্রবেশ করে, আবার পাল তুলিয়া সমুদ্রে বিলীন হইয়া যায়। কালিকট যেন পৃথিবীর সমগ্র বণিক-সমাজের মােসাফিরখানা। পীতবর্ণ চৈনিক, তাম্রবর্ণ বাঙালী, লােহিতবর্ণ পারসীক ও কৃষ্ণবর্ণ মূর--সকলেই কালিকটের পথে সমান দর্পে পা ফেলিয়া চলে, কেহ কাহারও অপেক্ষা হীন নহে। চীন হইতে লাক্ষা, দারুশিল্প ; ব্রহ্ম হইতে গজদন্ত ; মলয়দ্বীপ হইতে চন্দন ; বঙ্গ হইতে ক্ষৌম পট্টবস্ত্র, মলমল, ব্যাঘ্রচর্ম ; চম্পা ও মগধ হইতে চামর, কস্তরী, চারুকেশরার পুস্পবীজ ; দাক্ষিণাত্য হইতে অগুরু, কপূর, দারুচিনি ; লঙ্কা হইতে মুক্তা আসিয়া কালিকটে পীভূত হয়। পশ্চিম হইতে তুরস্ক, পারসীক, আরব ও মূর সওদাগর তাহাই স্বর্ণের বিনিময়ে ক্রয় করিয়া জাহাজে তুলিয়া, কেহ বা পারস্যোপসাগরের ভিতর দিয়া ইউফ্রাটেস্ নদের মােহনায় উপস্থিত হয়, কেহ বা লােহিত সাগরের উত্তর প্রান্তে নীলনদের সন্নিকটে গিয় তরণী ভিড়ায়। তথা হইতে প্রাচী’র পণ্য সমগ্র পাশ্চাত্যখণ্ডে ছড়াইয়া পড়ে। কালিকটের রাজা ‘সামরী’ বাণিজ্যতরণীর শুল্ক আদায় করিয়া রাজ্যের ব্যয়ভার নির্বাহ করেন। রাজকোষ সৰ্ব্বদা সুবণ-মণিমাণিক্যে পূর্ণ। রাজ্যে কোথাও দৈন্য নাই, অশান্তি নাই, অসন্তোষ নাই; ইতর-ভদ্র সকলেই সুখী। মির্জা দাউদ এই কালিকটের এক জন সম্রান্ত ব্যবসায়ী। তাঁহার একুশখানি বাণিজ্যতরী আছে,-হােয়ংহ হইতে নীলনদের প্রান্ত পৰ্য্যন্ত তাহাদের গতিবিধি । যখন এই তরণী সকল শুভ্র পাল তুলিয়া শ্রেণীবদ্ধ ;

রক্ত-সন্ধ্যা ৭১ ; ভাবে সমুদ্রযাত্রায় বাহিত হয়, তখন মনে হয়, রাজহংসশ্রেণী পক্ষবিস্তার করিয়া নীল আকাশে ভাসিরা চলিয়াছে। মির্জাদাউদ জাতিতে মূর। কালিকটে তার শ্বেত-প্রস্তরের প্রাসাদ-মূর প্রথায় নিম্মিত। সুদূর মরক্কো দেশে এখনও তাহার বৃদ্ধ পিতা বৰ্তমান কিন্তু তিনি কালিকটকেই মাতৃভূমিত্বে বরণ করিয়াছেন। অনেক বৈদেশিক সওদাগরই এরূপ করিয়া থাকেন। মির্জা দাউদ ধম্মে মুসলমান হইলেও একপত্নীক।, সম্প্রতি চৌত্রিশ বৎসর বয়সে প্রথমে একটি কন্যা জন্মিয়াছে। কন্যার জন্মদিনে মির্জা দাউদ এক সহস্র তাল! সুবর্ণ বিতরণ করিয়াছেন---তার পর তাহার গৃহে সপ্তাহব্যাপী উৎসব চলিয়াছিল। নগরে ধন্য ধন্য পড়িয়া গিয়াছিল। বস্তুত মজ্জা দাউদের মত সৰ্বজনপ্রিয় বহু-সম্মানিত ব্যক্তি নগরে আর দ্বিতীয় নাই। উচ্চ-নীচ, পনি-নিধন সকলেই তাহাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান স্বয়ং রাজা সামরী তাহাকে বন্ধুর মধ্যে গণ্য করেন। এ দিকে ব্যবসায়ে দিন দিন অধিক অর্থাগম হইতেছে। মানুষ পৃথিবীতে যাহা কিছু পাইলে সুখী হয়, কিছুরই তাহার অভাব নাই । এক দিন গ্রীষ্মের সায়াহ্নে পশ্চিম দিগ্বলয় রঞ্জিত করিয়া সূৰ্যাস্ত হইতেছে। সমুদ্রের জল যতদূর দৃষ্টি যায়, রাঙা হইয়া টলটল করিতেছে। দুর লাক্ষাদ্বীপ হইতে সুগন্ধ বহন করিয়া স্নিগ্ধ বায় বহিতে আরম্ভ করিয়াছে। আকাশ মেঘ-নিম্মুক্ত। সমস্ত দিন গরম ভােগ করিয়া নগরের নরনারী শীতল ব্যয় সেবন করিবার জন্য এই সময় বন্দরের ঘাটে আসিয়া জমিয়াছে । বহু দূর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অর্ধচন্দ্রাকৃতি ঘাট-বড় বড় চতুষ্কোণ পাথর দিয়া বাধান। পাথরের উপর সারি সারি জাহাজ বাঁধবার লােহার কড়া। জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল উক্ত ঘাটের কানায় কানায় ভরিয়া উঠে, আবার ভাটার সময় সিক্ত १२ চুয়াচন্দন বালুকারাশি মধ্যে রাখিয়া দূরে সরিয়া যায়। এই ঘাটই নগরের কর্মকেন্দ্র। ক্রয়-বিক্রয়, দরদস্তুর, আমােদ-প্রমােদ সমস্তই এই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। তাই সকল সময় এখানে মানুষের ভিড়। সে সময় ঘাটে একটিও নবাগত কিম্ব বহির্গামী বানিজ্যতরী ছিল না। কাজকৰ্ম্ম কিছু শিথিল। নাগরিকগণ নান৷ বিচিত্র বেশ পরিধান করিয়া কেহ সস্ত্রীক সপুত্রকন্যা পদচারণ করিতেছে, কেহ উচ্চৈঃস্বরে গান পরিয়াছে। চঞ্চলমতি কিশােরগণ ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিতেছে আবার কেহ বা গ্লাট হইতে সমুদ্রের জলে লাফাইয়া পড়িয়া সন্তরণ করিতেছে। চীনদেশীয় এক বাজীকর প্রকার অদ্ভুত খেল। দেখাইতেছে। জনতার মধ্য হইতে মাঝে মাঝে উচ্চ হাসির রােল উঠিতেছে। বাজীকর একজন স্থূলকায় প্রৌঢ় সিংহলীকে ধরিয়া তাহার কানের মধ্যে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল, তােমার মাথার মধ্যে ২৫৬টি পাথরের কুড়ি রহিয়াছে, বলত বাহির করিয়া দিই। অমনিই জমত সােল্লাসে চীৎকার করিয়া উঠিল, ‘বাহির কর, বাহির কর। তখন বাজীকর ক্ষিপ্রহস্তে ক্ষুদ্র চিটা দিয়া তাহার কর্ণ হইতে সুপারীর মত বড় বড় অংসখ্য পাথর বাহির করিয়া মাটীতে পীভূত করিল। প্রৌঢ় সিংহলী বিস্ময়ে বিহ্বল হইয়। চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া তাহা দেখিতে লাগিল। ভারি হাসির একটা ধুম পড়িয়া গেল। একজন পরিহাস করিয়া বলিল,-- ‘শেঠ, তােমার মাথা যে এত নিরেট, তাহা জানিতাম না। ক্রমে সূর্য অস্তমিত হইল। সমুদ্রের গায়ে সীসার রং লাগিল। দিগন্তরেখার যে স্থানটায় সূর্য অস্ত গিয়াছিল, তাহাকে কেন্দ্র করিয়া সন্ধ্যার রক্তিমাভা ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হইয়া আসিতে লাগিল।

রক্ত-সন্ধ্যা এমন সময় দূর সমুদ্রবক্ষে সেই রক্তিমাভার সম্মুখে তিনটি কৃষ্ণবর্ণের ছায়া আবির্ভূত হইল। সকলে দেখিল, তিনখানি জাহাজ বন্দরের মধ্যে প্রবেশ করিতেছে। তখন, জাহাজ কোথা হইতে আসিতেছে, কাহার জাহাজ, ইহা লইয়া 'ৰাটের দর্শকদিগের মধ্যে তর্ক চলিতে লাগিল। কেহ বলিল, আরবী জাহাজ, কেহ বলিল চীনা। কিন্তু অন্ধকার ঘনাইয়া আসিতেছিল—কোন্ দেশীয় জাহাজ, নিশ্চয়রূপে কিছু বুঝা গেল না। মির্জা দাউদ ঘাটে ছিলেন। তিনি বহুক্ষণ একদৃষ্টে সেই জাহাজ তিনটির প্রতি চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে তাঁহার মুখে উদ্বেগের চিহ্ন দেখা দিল। তিনি অস্ফুটস্বরে কহিলেন,--‘পুত্ৰুগীজ জাহাজ !—কিন্তু ফিরিঙ্গি কোন পথে আসিল ? তার পর গগন প্রান্তে দিবা-দীপ্তি নিভিয়া যাইবার সঙ্গে সঙ্গে তিনটি জীর্ণ সিন্ধুবিধ্বস্ত ক্ষুদ্র পােত ছিন্ন পাল নামাই। কালিকটের বন্দরে আসিয়া ভিড়িল । পরদিন প্রভাতে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মির্জা দাউদ বন্দরে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন—কয়েকজন বিদেশীকে ঘিরিয়া ভারী ভিড় জমিয়া গিয়াছে। ফিরিঙ্গিগণ অপরিচিত ভাষায় কি বলিতেছে, কেহই বুঝিতেছে না এবং প্রত্যুত্তরে নানা দেশীয় ভাষায় তাহাদের প্রশ্ন করিতেছে। মির্জা দাউদ ভিড় ঠেলিয়া তাহাদের সম্মুখীন হইলেন । তাহাকে আসিতে দেখিয়া সকলে সসম্মানে পথ ছাড়িয়া দিল। আগন্তুকদিগের মধ্যে একজন বলিল,-'এখানে পােব্ৰুগীজ ভাষা বুঝে, এমন কেহ কি নাই ? আমি জামেরিণের সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাই- দোভাষী খুজিতেছি। মির্জা দাউদ দেখিলেন, বক্তা শালপ্রাংশু বিশালদেহ এক পুরুষ।

৭৪ চুয়াচন্দন ” তপ্ত কাঞ্চনের ন্যায় বর্ণ, দীর্ঘ স্বর্ণাভ কেশ এবং হ্রস্ব সূচ্যগ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল। উর্ধাঙ্গে সােণার জরীর কাজ করা অতি মূল্যবান্ মখমলের অঙ্গরক্ষা, কটি হইতে 'জানু পর্যন্ত ঐ মখমলের জাঙ্গিয়া এবং জানু হইতে নিম্নে পদদ্বয় চৰ্ম্মনিৰ্ম্মিত খাপে আবৃত। মস্তকে টুপীর উপর কঙ্কপত্র বক্রভাবে অবস্থিত ; এই পুরুষের সহিত অন্য পাঁচ ছয় জন যাহার রহিয়াছে, তাহারাও প্রায় অনুরূপ বেশধারী। সকলের কটিবন্ধে তরবারি। মির্জা দাউদ এই প্রধান পুরুষের আপাদ-মস্তক নিরীক্ষণ করিয়া গম্ভীর স্বরে কহিলেন,--‘আমি পর্তুগীজ ভাষা বুঝি। নবাগত কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে মির্জা দাউদের মুখের প্রতি চাহিয়, রহিল। তাহার মুখ অন্ধকার হইল। সে ধীরে ধীরে কহিল,-“তুমি দেখিতেছি মূর! এই তিনটি শব্দের অন্তর্নিহিত যে সুতীক্ষ ঘৃণা, তাহা মির্জা দাউদকে বিদ্ধ করিল। তিনিও মনােগত বিদ্বেষ গােপন করিবার চেষ্টা না করিয়া কহিলেন ‘হ, আমি মূর। তােমরা দেখিতেছি পাের্নগীজ-জলদস্য ; তােমাদের সহিত পরিচয় আমার প্রথম নহে, কিন্তু ফিরিঙ্গির সঙ্গে আমাদের সদ্ভাব নাই। এতক্ষণে দ্বিতীয় একজন পাের্তুগীজ কথা কহিল। তাহার বয়স অল্প, উদ্ধত কণ্ঠে বলিল,-“মূর-কুকুরের সহিত আমরা সদ্ভাব রাখি না— মুরের উচ্ছেদ করাই আমাদের ধর্ম। নিমেষ মধ্যে মির্জা দাউদের কটি হইতে ছুরিকা বাহির হইয়া আসিল, দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু পরক্ষণেই আগন্তুকদিগের প্রধান ব্যক্তি হাত তুলিয়া তাহাকে নিরস্ত করিল। বিনীতস্বরে কহিল,-“মহাশয়, আমার এই স্পর্ধিত সঙ্গীকে ক্ষমা করুন। আপনি মূর এবং আমরা রক্ত-সন্ধ্যা ৭৫ পাের্তুগীজ বটে ; কিন্তু আমরা উভয়েই ব্যবসায়ী, জলদস্যু নহি। অন্যত্র যাহাই হােক, এখানে আমার সহিত আপনাদের বিবাদ নাই। বরঞ্চ আপনার হৃদ্যতা লাভ করিলেই আমরা কৃতার্থ হইব। তারপর নিজ সঙ্গীর দিকে ফিরিয়া বলিল,-পেড্রো, আর কখনও যদি তােমার মুখে এরূপ কথা শুনিতে পাই, তোেমার প্রত্যেক অস্থি চাকায় ভাঙ্গিয়া তারপর ডালকুত্তা দিয়া খাওয়াইব। ভয়ে পড্রোর মুখ পীতবর্ণ হইয়া গেল। কিন্তু তথাপি সে কম্পিত বিদ্রোহের কণ্ঠে কহিল,—“আমি সত্য কথা বলিতে ভয় করি না। মুরাত্রেই আমাদের ঘৃণার পাত্র। আপনি নিজেও ত মূরকে—'তাহার কথা শেষ হইবার পূর্বেই প্রথম ব্যক্তি বিদ্যুতের মত দুই হাত বাড়াইয়া তাহার কণ্ঠ চাপিয়া ধরিল। বজ্রমুষ্টিতে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ তাহার কণ্ঠনালী চাপিয়া থাকিবার পর ছাড়িয়া দিতেই পেড্রো হতজ্ঞান হইয়া মাটীতে পড়িয়া গেল। তাহার প্রতি আর দৃকপাত না করিয়া প্রথম ব্যক্তি মির্জ দাউদের দিকে ফিরিয়া ঈষৎ হাস্যে কহিল,--‘মিথ্যাবাদীর দণ্ডদান সাম্মিকের কর্তব্য। এখন দয়া করিয়া আমার সহিত জামােরিণের নিকট গিয়া আমার নিবেদন তাহাকে বুঝাইয়া দিলে আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিব। বলিয়া মাথার টুপী খুলিয়া আভূমি লুষ্ঠিত করিয়া অভিবাদন করিল। দর্শকবৃন্দ—যাহারা পর্তুগীজ ভাষা বুঝিল না, তাহারা অবাক্‌ হইয়া এই দুর্বোধ্য অভিনয় দেখিতে লাগিল। মির্জা দাউদ আগন্তুকের মিষ্টবাক্যে ভুলিলেন না, অটল হইয়? দাড়াইয়া রহিলেন। শেষে ধীরে ধীরে কহিলেন, ‘ফিরিঙ্গি’ তুমি অতি ধূৰ্ত্ত । কি জন্য সামরীর রাজ্যে আসিয়াছ, সত্য বল। ‘বাণিজ্য করিতে। ‘খৃষ্টান, আমি তােমাদের চিনি। কলহ তােমাদের ব্যবসায়, লােভ ৭৬ চুয়াচন্দন তােমাদের ধৰ্ম্ম, পরশ্রীকাতরতা তােমাদের স্বভাব। এ রাজ্যে কলহ-বিদ্বেষ নাই—হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, হিব্রু নির্বিবাদে শান্তিতে ব্যবসায় বাণিজ্য করিতেছে। সত্য বল, তােমরা কি উদ্দেশ্যে এই হিনে পদার্পণ করিয়াছ ? ফিরিঙ্গির মুখ রক্তহীন হইয়া গেল। শুধু তাহার চক্ষুযুগল জ্বলন্ত অঙ্গারের মত নিস্ফল ক্রোধ ও হিংসা বিকীর্ণ করিতে লাগিল। কিন্তু পরক্ষণেই আপনাকে সম্বরণ করিয়া কণ্ঠবিলম্বিত সুবর্ণ-ক্রুশ হস্তে তুলিয়া বলিল, এই ক্রুশ স্পশ করিয়া সত্য করিতেছি—সকলের সহিত সদ্ভাব রাখিয়া বাণিজ্য করা ব্যতীত আমাদের আর অন্য উদ্দেশ্য নাই! ক্ষণকাল নিঃশব্দে তাহার মুখের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া মির্জা দাউদ কহিলেন, “তােমার কথা বিশ্বাস করিলাম। চল, সামরীর প্রাসাদে তােমাদের লইয়া যাই। তখন বিদেশীরা মির্জা দাউদের অনুসরণ করিয়া রাজপ্রাসাদ অভিমুখে চলিল। পেড্রোর সংজ্ঞাহীন দেহ ঘাটের পাথরের উপর মূতবং পড়িয়া রহিল। প্রাসাদে উপস্থিত হইয়া সামরীর সম্মুখে নতজানু হইয়া, তাহার বস্ত্র প্রান্ত চুম্বন করিয়া পাের্তগীজ বণিকদিগের অধিনায়ক বলিল, “আমার নাম ভাস্কো-ডা-গামা—আমি পাের্ত গালের রাজদূত। আপনার নিকট কালিকটে বাণিজ্য করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিতেছি।” এই বলিয়া পর্তুগাল-রাজ-প্রেরিত মহার্ঘ উপঢৌকন সকল সামরীর সম্মুখে স্থাপন করিতে সঙ্গিগণকে ইঙ্গিত করিল। ০ মুখে যাহাই বলুন, সন্দেহ এবং অবিশ্বাস মির্জা দাউদের অন্তর হইতে দূর হইল না। তিনি ফিরিঙ্গিকে পূর্ব হইতেই চিনিতেন—মুরমাত্রেই রক্ত-সন্ধ্যা ৭৭ । চিনিত। স্বদেশে বহু সংঘর্ষের ভিতর দিয়া এই পরিচয় ঘনিষ্ঠ হইয়াছিল। তাহারা জানিত যে ফিরিঙ্গি অতিশয় অর্থলিপু, ও ভােগলুব্ধ। ইহাদের জন্মভূমি অর্থ প্রসূ নহে; তাই অন্নের জন্য ইহাদিগকে দৈহিক ও মানসিক কঠোরতার মধ্যে জীবনযাপন করিতে হয় বটে, কিন্তু এই জন্যই ইহার অপেক্ষাকৃত ধনী মুসলমানদিগকে অত্যন্ত ঈর্ষা করে। পরের উন্নতি ইহাদের চক্ষুশূল। কোথাও একবার ধনরত্ন-ঐশ্বর্যের সন্ধান পাইরে ইহাদের লালসা ও ক্ষুধা এত উগ্র, নিৰ্ম্মম হইয়া উঠে যে, কোনও মতে সেখানে প্রবেশ লাভ করিয়া নিজেকে একবার ভালরূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলে শক্ৰমিত্রনির্বিচারে সকলের উপর দুর্বিনীত বাহুবল, স্পর্ধা জুলুম প্রকাশ করিতে থাকে। ইহারা নিরতিশয় কলহপ্রিয় ও যুদ্ধনিপুণ। স্বার্থরক্ষার জন্য এমন কাজ নাই যাহা ইহারা পারে না এবং স্বজাতির স্বার্থবর্ধনের জন্য প্রাণ পৰ্য্যন্ত উৎসর্গ করিতে ইহারা তিলমাত্র কুণ্ঠিত নহে। পাের্তুগাল হইতে সমুদ্রপথে আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করিয়া আজ পয্যন্ত কেহ ভারতবর্ষে আসে নাই, এ পথ এতদিন ভাস্কো-ডা-গামা সেই পথ ইউরােপীয়দের জন্য উন্মুক্ত করিয়া দিয়া বহু নূতন সম্ভাবনা ও দুর্ভাবনার সৃষ্টি করিল। সম্প্রতি ভাস্কো-ডা-গামার উদ্দেশ্য নিশ্চয়ভাবে বুঝা যায় না। অথচ উদ্ধত ও কটুভাষী পেড্রোর কণ্ঠবােস করিয়া সে যে একটা গূঢ় অভিপ্রায় গােপন করিয়া গেল, তাহাও বুঝিতে মির্জ। দাউদের বিলম্ব হইল না। শঙ্কা ও সংশয়ের মেঘ তাহার মন আচ্ছন্ন হইয়া রহিল । পাের্তুগীজগণ কালিকটে বাস করিতে লাগিল এবং দিন দিন নৃতন পণ্যে তরণী পূর্ণ করিতে লাগিল। অতি অপদার্থ পণ্য দ্বিগুণ চতুগুণ মূল দিয়া কিনিতে লাগিল। ইহাতে নির্বোধ ব্যবসায়ীরা যতই উৎফুল্ল হউক না কেন, মিজ্জ। দাউদের ন্যায় বহুদর্শী শ্রেষ্ঠিদের মনে সন্দেহ ততই অজ্ঞাত ছিল।

৭৮ চুয়াচন্দন ঘনীভূত হইয়া উঠিল। উচিত মূল্যের অধিক মূল্য দিন্ন পণ্য ক্রয় করা ব্যবসায়ীর স্বভাব নহে, অথচ নবাগতরা অব্যবসায়ী বা নির্বোধ নহে। এ ক্ষেত্রে বানিজ্য স্থলমাত্র, অন্য কোনও দুরভিসন্ধি তাহাদের অন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে, ইহা অনুমান করিয়া বিচক্ষণ ব্যবসায়ীদের চিন্তা ও উৎকণ্ঠার অবধি রহিল না। এইরূপে কিছুকাল বিগত হইল। কালিকটের জীবন প্রবাহ পূৰ্ববং প্রশান্তভাবে চলিতে লাগিল। একদিন শরৎকালে মেঘমাজ্জিত আকাশে শুভ্র পাল উড়াইয়া দুইটি জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করিল। সঙ্গে সঙ্গে নগরে রাষ্ট্র হইয়া গেল যে, বঙ্গদেশ হইতে প্রভাকর শ্রেষ্টীর নৌকা আসিতেছে। প্রভাকর শেঠ অতি প্রসিদ্ধ বণিক-প্রতি বৎসর এই সময় লক্ষাধিক মুদ্রার বস্ত্রাদি পণ্য পণ্য বহন করিয়া তাহার তরণী কালিকটে উপস্থিত হয়। কাশ্মীরের শাল, বারাণসীর চেলী, কৌশেয় পট্ট, বাঙালার মলমল কিনিবার জন্য কালিকটের সওদাগর-সমাজে হুড়াহুড়ি পড়িয়া যায়। এত সুন্দর এবং এত মূল্যবান বস্তু কেহই আনিতে পারে না, সে জন্য প্রভাকরের এত খ্যাতি। প্রভাকরের নৌকা ঘাটে লাগিবার পূর্বেই নগরের বড় বড় ব্যবসায়ীরা ঘাটে সমবেত হইয়াছিলেন। প্রভাকর নৌকার উপর পাড়াইয়া পরিচিত সকলকে নমস্কার-সম্ভাসনাদি করিতে লাগিল। সে অতিশয় বাটু ও রহস্যপ্রিয়, এজন্য সকলেই তাহাকে ভালবাসিত। হিব্রু মূশা ইব্রাহিম তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন: প্রভাকর, এবার তােমার দেরী দেখিয়া আমরা ভাবিয়াছিলাম, বুঝি আর আসিলে না— পথে তােমাদের সুন্দরবনের কুমীর তােমাকে পেটে পূরিয়াছে। প্রভাকর হাসিয়া বলিল, “মৃশা সাহেব, পেটে পুরিলেও কুমীর আমাকে হজম করিতে পারিত না-এই যে মির্জ। সাহেব! আদাব আদাব রক্ত-সন্ধ্যা ৭১ -শরীর-গতিক সব ভাল ত? এবার আপনার ফরমাসী জিনিষ সমস্ত আনিয়াছি, কত লইতে পারেন দেখিব। আপনার কোমরে তলােয়ার- পানি নৃতা দেখিতেছি, ডামাস্কাশের বুঝি ? আমার কিন্তু এক যােড়া চাই—গৌড়েশ্বরের কাছে বাক্যদত্ত হইয়া আছি। ভাল কথা, পথে আসিতে শ্রীখণ্ডের নিকট আপনার যবদ্বীপ যাত্রী জাহাজের সঙ্গে দেখা হইয়াছিল—খবর সব ভাল। হায়দার মুস্তাফা যে, ইতিমধ্যে কয়টি সাদি করিলেন? এবার কিন্তু ইস্পাহানী আঙ্গুরের রস না খাওয়াইলে বড়ই অন্যায় হইবে।-জাম্বো, শাঁখালুর মত দাঁত বাহির করিয়া হাসিস না— দড়িটা ধর। নৌকা বাঁধা হইলে প্রভাকর ঘাটে নামিয়া সকলের সহিত আলিঙ্গনাদি করিল। তখন মিজ্জ দাউদ জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘প্রভাকর, কি কি সওদ। আনিলে ? প্রভাকর বলিল, এবার যে মলমল আনিয়াছি, মির্জ। সাহেব, তেমন মলমল আজ পর্যন্ত কখনও চোখে দেখেন নাই। মাকড়শার জালের চেয়েও নরম, কাশফুলের চেয়েও হাল্কা-মুঠির মধ্যে দেড়শ গজ কাপড় ধরা যায়। কিন্তু এক থান কাপড়ের দাম পাচ ভােলা সােনা, তার কমে দিতে পারিব না। কোচিনে চার ভােলা পর্যন্ত দিতে চাহিয়াছিল—আমি লই নাই। শেষে কি লোকসান দিয়া ঘরে ফিরিব ? শেঠনী তাহা হইলে আমার মুখ দেখিবে না। মির্জ। দাউদ হাসিয়া বলিলেন, ‘তা না দেখুক। তােমার মুখ না দেখিলেও শেঠনীর কোনও লােকসান হইবে না।--এখন তােমার সওদা দেখাও। প্রভাকর বলিল, বলেন কি মির্জা সাহেব, লােকসান হইবে না? শেঠনীর এখন যৌবনকাল, কাচা বয়েস ; কাচা বয়েস ; এখন স্বামীর মুখদর্শন না ০ ৮০ চুয়াচন্দন করিলে জীবন-যৌবন সমস্তই লােকসান হইয়া যাইবে যে !-ভাল কথা, গতবারে শুনিয়াছিলাম, আপনার বিবি-সাহেবা না কি অসুস্থ। কোনও শুভ সংবাদ আছে না কি ? মির্জ। দাউদ বলিলেন,-খােদার দয়ায় একটি মেয়ে হইয়াছে— প্রভাকর বলিল,---‘এত বড় আনন্দের সংবাদ এতক্ষণ চাপিয়; রাখিয়াছিলেন । আমাদের দেশে বলে, মেয়ে হইলে পিতার পরমায় বৃদ্ধি হয়। তাহা হইলে আজ রাত্রে আপনার দৌলতখানায় আমার নিমন্ত্রণ রহিল। দেশে কুকুটাদি ভােজনের সুবিধা হয় না—দুষ্প্রাপ্য ও বটে, বটে, আর ব্রাহ্মণগুলা বড়ই গণ্ডগােল করে। বাবা, এটি আবার কে ? মির্জা সাহেব ? এ রকম পােষাক-পরিচ্ছদ ত কখনও দেখি নাই। ইহারা কোথা হইতে আসিল ? মির্জ। দাউদ ফিরিয়া দেখিলেন, ভাস্কো-ডা-গামা দুই জন সহচর সঙ্গে সেই দিকে আসিতেছে। ইতিমধ্যে কালিকটের পথে ঘাটে দুই জনের দেখা-সাক্ষাৎ ঘটিয়াছে বটে, কিন্তু কোন পক্ষেই সৌহার্দ বর্ধনের আগ্রহ দেখা যায় নাই। বরঞ্চ উভয়ে উভয়কে যথাসম্ভব এড়াইয়: চলিয়াছে। প্রভাকরের প্রশ্নের উত্তরে মিজ্জ। দাউদ কহিলেন, “ইহারা পাের্তুগীজ। ক্রমে পরিচয় পাইবে। ইত্যবসরে প্রভাকরের নৌকা হইতে পণ্যসামগ্রী সকল পরিদর্শনের জন্য ঘাটে নামানো হইতেছিল। সওদাগররা ভিড় করিয়া তাহাই দেখিতেছিলেন। মির্জ। দাউদও যােগ দিলেন। অন্যদিক হইতে ভাস্কো-ডা-গামাও আসিয়া মিলিত হইল। মলমলের নমুনা দেখিয়া মির্জা দাউদ কহিলেন, “অতি উৎকৃষ্ট মলমল। প্রভাকর, এ জিনিষ কত আনিয়াছ ? সেই সঙ্গে বক্ত-সন্ধ্যা ৮১ ” প্রভাকর সগর্বে বলিল, ‘পূরা এক জাহাজ। দাউদ কহিলেন, “ভাল, আমি এক জাহাজই লইলাম। দরদামের কথা আজ রাত্রে স্থির হইবে।” ভাস্কো-ডা-গামা এরূপ অপূৰ্ব সূক্ষ্ম মলমল পূৰ্ব্বে কখন ও দেখে নাই। বস্তুতঃ এত মহার্ঘ মলমল পারস্য দেশ ভিন্ন অন্য কোথাও যাইত না। পাের্টুগাল, স্পেন, ফ্রান্স প্রভৃতি পাশ্চাত্যদেশে যাহা যাইত, তাহা অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট শ্রেণীর মলমল । ডা-গামার অন্তর লুব্ধ হইয়া উঠিল। পােপ এবং রাজা ইম্যানুয়েলকে নজর দিতে হইলে ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট 'বস্তু আর কি আছে। সে বলিল, “এ মলমল আমি কিনিব। মির্জা দাউদ হাসিয়া বলিলেন, “আর উপায় নাই। এই মলমল আমি কিনিয়াছি। ডা-গামা প্রভাকরের দিকে ফিরিয়া বলিল, “আমি অধিক মূল্য দিব। মিজ্জ। দাউদ বলিলেন, ‘অধিক মূল্য দিলেও পাইবে না- এ মলমল এখন আমার। ডা-গামা সে দিকে কর্ণপাত না করিয়া প্রভাকরকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, ‘আমি দ্বিগুণ মূল্য দিব। ” মিজ্জ। দাউদ বিরক্ত হইয়া বলিলেন, ‘শতগুণ দিলেও আর পাইবে । ডা-গামা বিদ্যুদবেগে মির্জ। দাউদের দিকে ফিরিল। 'কর্কশকণ্ঠে কহিল, ‘মূর, চুপ কর—আমি মালের মালিকের সহিত কথা কহিতেছি। প্রভাকর বুদ্ধিমান, মিজ্জ। দাউদ তাহার পুরাতন খরিদ্দার, অথচ এই ব্যক্তিকে সে চেনেও না। সে বলিল’, ‘উনিই এখন মালের মালিক, আমি কেহ নই। উনি যদি আপনাকে বিক্রয় করিতে ইচ্ছা করেন, করিতে পারেন।

চুয়াচন্দন ডা-গামার অশিষ্ট কথায় কিন্তু মির্জ। দাউদের মুখ ক্রোধে কৃষ্ণবর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল । তিনি তিক্তকণ্ঠে কহিলেন, ‘ডা-গামা, পূৰ্বেও বুঝিয়াছিলাম, কিন্তু আজ তাের প্রকৃত স্বরূপ ধরা পড়িল। ব্যবসায় তাের ভাণমা, তুই তস্কর। নচেৎ অনুচিত মূল্য দিয়া বাণিজ্য নষ্ট করিবি কেন ? আহত ব্যাঘ্রের মত গজ্জন করিয়া ভাস্কো-ডা-গামা নিজ কটি হইতে তরবারি বাহির করিল। দন্তে দন্তে ঘর্ষণ করিয়া ক্রোধকষাইত নেত্রে কহিল, ‘স্পদ্ধিতু মূর, আজ তাের রক্তে তরবারির কলঙ্ক ধৌত করিব। মিজ্জ। দাউদও তরবারি নিষ্কোষিত করিয়া কহিলেন, “বৰ্বর ফিরিঙ্গি, আজ তােকে জাহান্নমে পাঠাইব। মুহূৰ্ত্তমধ্যে ব্যগ্র জনতা চতুর্দিকে সরিয়া গিয়া মধ্যে বৃত্তাকৃতি স্থান যুযুৎসুদের জন্য ছাড়িয়া দিল। শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হইলেও এরূপ ব্যাপার কালিকটে একান্ত বিরল নহে। কলহ যখন তরবারি পর্যন্ত পৌছায়, তখন তাহা ভঞ্জন করিবার প্রয়াস যে শুধু নিস্ফল নহে, অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাহা কাহারও অবিদিত ছিল না। তাই সকলে সরিয়া দাড়াইয় অস্ত্র দ্বারা উভয় পক্ষকে বিবাদের মীমাংসা করিবার সুবিধা করিয়া দিল । ভাস্কো-ডা-গামা ও মির্জা দাউদ প্রথম দৃষ্টিবিনিময়েই পরস্পরকে যে বিষদৃষ্টিতে দেখিয়াছিলেন, সেই বিষ উভয়ের অন্তরে সঞ্চিত হইয়া আজ সামান্য সূত্র ধরিয়া দুর্নিবার বিরােধরূপে আত্মপ্রকাশ করিল। এ কলহ যে এক জন না মরিলে নিবৃত্ত হইবে না, তাহা উভয়েই মনে মনে বুঝিলেন। নিস্তব্ধ জনতার কেন্দ্রস্থলে অসিধারী দুই জন দাড়াইলেন। ভাস্কো-ডা-গামা বিশালকায়, প্রস্তরের মত কঠিন, হস্তীর মত বলশালী। মির্জা দাউদ অপেক্ষাকৃত কৃশ ও খর্ব ; কিন্তু বিষধর কালসর্পের মত - ; ক্ষিপ্র তেজস্বী ও প্রাণসার । ভাস্কো-ডা-গামার তরবারি বেত্রবং ঋজু, তীক্ষাগ্র ; মির্জ। দাউদের তরবারি ঈষৎ বক্র ও ক্ষুরধার। নগ্ন কৃপাণ- হস্তে ক্ষণকালের জন্য দুইজন পরস্পরকে নিরীক্ষণ করিয়া লইলেন। তারপর ঝছের মত তরবারিকে অগ্রবর্তী করিয়া ভাস্কো-ডা-গামা আক্রমণ করিল। কিন্তু ডা-গামার তরবারি মির্জ। দাউদের অঙ্গ স্পর্শ করিবার পূর্বেই তিনি ক্ষিপ্রহস্তে নিজ তরবারি দ্বারা তাহা অপসারিত করিয়া সরিয়া দাড়াইলেন এবং পরক্ষণেই তঁাহার বক্ৰ অসি বিদ্যুতের মত একবার ডা-গামার জানু দংশন করিয়া ফিরিয়া আসিল। ডা-গামা পিছু হটিয়া আত্মরক্ষা করিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। তাহার জানুর চৰ্মাবরণ ধীরে ধীরে রক্তে ভিজিয়া উঠিল ডা-গামা সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করিল না; কিন্তু সাবধান হইল। সংযত ও সতর্কভাবে অসিচালনা করিতে লাগিল। সে বুঝিল যে, বিপক্ষকে অবজ্ঞা করিলে চলিবে না। মিজ। দাউদের অসি কৌশল অসাধারণ, তাহার সম্মুখে দ্বিতীয়বার ভুল করিলে আর তাহা সংশােধনের অবকাশ থাকিবে না। এ দিকে মির্জ। দাউদও বুঝিলেন যে ডা-গামা অসি-কৌশলে তাহার সমতুল্য কিন্তু তাহার অপেক্ষা দ্বিগুণ বলশালী। আবার সে তাহার মত ক্ষিপ্রগামী ও লঘুদেহ নহে বটে, কিন্তু তাহার তরবারি ঋজু এবং দীর্ঘমিজ্জ! দাউদের তরবারি বক্র এবং খর্ব। তাহাদের যুদ্ধরীতিও সম্পূর্ণ পৃথক। এ ক্ষেত্রে, মির্জা দাউদ দেখিলেন, ডা-গামার জয়ের সম্ভাবনাই অধিক। মির্জ। দাউদ অত্যন্ত সাবধানে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। সর্প এক নকুলের যুদ্ধে যেমন উভয়ে উভয়ের চক্ষুতে চক্ষু নিবদ্ধ রাখিয়া • নিস্পন্দ জনবহ ৮৪ চুয়াচন্দন পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকে এবং সুযােগ পাইবামাত্র তীরবেগে আক্রমণ করিয়া আবার স্বস্থানে ফিরিয়া আসে, ডা-গামা ও মির্জ। দাউদও সেইরূপে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। অস্ত্রে অন্ত্রে প্রতিরুদ্ধ হইয়া মুহুর্মুহুঃ ঝনৎকার উঠিতে লাগিল , চঞ্চল অসিফলকে সূর্যকিরণ পড়িয়া তড়িৎরেখার মত জ্বলিয়া উঠিতে লাগিল। সহস্রচক্ষু হইয়া এই অদ্ভুত যুদ্ধ দেখিতে লাগিল। যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে মির্জা দাউদ বাক্যশূলে ডা-গামাকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন ;---‘ফিরিঙ্গি দস্যু, চাহিয়া দেখ, তাের রক্ত মানুষের রক্তের মত লাল নয়, শয়তানের রক্তের মত নীল! খৃষ্টান কুত্তা, এখনও ক্ষমা প্রার্থনা কর- তাের প্রাণ ভিক্ষা দিব!' ডা-গামা কোনও উত্তর না দিয়া নিঃশব্দে যুদ্ধ করিতে লাগিল। শ্লেষ করিয়া মির্জ। দাউদ যে তাহার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটাইবার চেষ্টা করিতেছেন, চতুর গা-ডামা তাহা বুঝিয়া ছিল। যুদ্ধ ক্রমে আরও প্রখর ও তীব্র হইয়া উঠিল। দুই যােদ্ধারই ঘন ঘন শ্বাস বহিল। সর্বাঙ্গে ঘাম ঝরিতে লাগিল। কিন্তু উভয়েই যেন এক অদৃশ্য বৰ্ম্মে আচ্ছাদিত। ডা-গামার তরবারি বার বার মির্জ। দাউদের কণ্ঠের নিকট হইতে, বক্ষের নিকট হইতে ব্যর্থ হইয়া ফিরিয়া গেল, মির্জ। দাউদের অসি ডা-গামকে ঘিরিয়া একঝাক কুদ্ধ মৌমাছির মত গুঞ্জন করিয়া ফিরিতে লাগিল, কিন্তু কোথাও হুল ফুটাইতে পারিল না। সহসা এক সময় গা-ডামা সভয়ে দেখিল যে সে ঘুরিতে ঘুৰিতে " একবারে ঘাটের কিনারায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, আর এক পা পিছাইলেই সমুদ্রের জলে পড়িয়া যাইবে। মির্জ। দাউদ তাহার মুখের ভাব দেখিয়া উচ্চহাস্য করিয়া উঠিলেন। বিদ্রুপ-বিষাক্ত কণ্ঠে কহিলেন—“ফিরিঙ্গি, * রক্ত-সন্ধ্যা ৮৫ ইদুরের আজ তােকে ঐ সমুদ্রের জলে চুবাইব । তারপর মরা মত তাের রাজা ইম্যানুয়েলের কাছে তােকে বখশিশ পাঠাইয়া দিব। এতক্ষণে মির্জ। দাউদ যাহা চাহিতেছিলেন তাহাই হইল— ভাস্কো-ডা-গামা ধৈৰ্য্য হারাইল। উন্মত্ত বন্যমহিষের মত গজ্জন করিয়া অসি উদ্ধে উত্তোলন করিয়া সে মির্জ। দাউদকে আক্রমণ করিল। ইচ্ছা করিলে মির্জ। দাউদ অনায়াসে ডা-গণাকে বধ করিতে পারিতেন ; কিন্তু তাহা না করিয়া তিনি তরবারির উল্টা পিঠ দিয়া-ডা-গামার দক্ষিণ মুষ্টিতে দারুণ আঘাত করিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাহার তরবারি হস্তমুক্ত হইয়া উদ্ধে উংক্ষিপ্ত হইয়া দূরে গিয়া পড়িল। অকস্মাৎ অস্ত্রহীন হইয়া ডা-গামা থাকিয়া দাড়াইয়া পড়িল । ডা-গামার দুই জন সহচর এতক্ষণ সকলের সঙ্গে দাড়াইয়া যুদ্ধ দেখিতে ছিল। প্রভুর অপ্রত্যাশিত বিপৎপাতে তাহারা সাহায্য করিতে অগ্রসর হইল। কিন্তু দুই পদ অগ্রসর হইবার পূর্বেই, অতি বিশাল-কলেবর নিকষকৃষ্ণ হাব শী জাম্বাে মাস্তুলের ন্যায় দুই হস্ত বাহির করিয়া তাহাদের কেশ বরিয়া ফিরাইয়া আনিল এবং নিরতিশয় শুভ্র দুইপাটি দন্ত বিনিষ্ক্রান্ত করিয়া যাহা বলিল, তাহার একটি বর্ণও তাহারা বুঝিতে না পারিলেও জাম্বোর মনােগত অভিপ্রায় অনুধাবন করিতে তাহাদের বিন্দুমাত্র ক্লেশ হইল না। মির্জ। দাউদ তরবারির ধার ডা-গামার কণ্ঠে স্থাপন করিয়া কহিলেন, ‘ডা-গামা, নতজানু হ, নহিলে তােকে বধ করিব। ডা-গামা নতজানু হইল না—বাহুদ্বয়ে বক্ষ নিবদ্ধ করিয়া বিকৃতমুখে হাস্য করিয়া কহিল,-“মূর, নিরস্তুকে হত্যা করা তােদর স্বভাব বটে। মির্জ। দাউদ কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন,-“ভাল, তােকে ছাড়িয়া দিব--কিন্তু প্রতিজ্ঞা কর- ৮৬ চুয়াচন্দন ডা-গামা কহিল,—‘আমি কোন প্রতিজ্ঞা করিব না, তাের যাই । ইচ্ছা কর। মির্জ। দাউদ বলিলেন, ‘শপথ কর যে, আজ হইতে সপ্তাহ মধ্যে সদলবলে এ দেশ ছাড়িয়া যাইবি, আর কখনও ফিরিবি না। ডা-গামা উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল, কহিল,—“মূর, তুই অতি নির্বোধ ! আমি শপথ করিব না, আমাকে বধ কর। আমার রক্তে কালিকটের মাট ভিজিলে হিলে ইম্যানুয়েলের জয়ধ্বজা সহজে রােপিত হইবে। মির্জ। দাউদ হাস্য করিয়া কহিলেন,—এতদিনে নিজ মুখে নিজের অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলি। কিন্তু তাহা হইতে দিব না। ইম্যানুয়েলের জয়ধ্বজা কালিকোট রােপিত হইবে না। কালিকট চিরদিন পৃথিবীর সমস্ত জাতির মিলন ক্ষেত্র হইয়া থাকিবে। প্রতিজ্ঞা কর নচেং- ডা-গামা কুটি করিয়া কহিল,-“নচেৎ ? নচেৎ পাের্তুগালে ফিরিয়া যাইতে একটি প্রাণী ও জীবিত রাখিব না। তােদর জাহাজ পুড়াইয়া এই একশত ত্রিশ জন লােককে কাটিয়া সমুদ্রের জলে ভাসাইয়া দিব। ডা-গামা স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া রহিল। কোন উত্তর দিল না। মিজ্জ। দাউদ পুনশ্চ কহিলেন,-“ডা-গামা, এখনও শপথ কর -তাের ধৰ্ম্মের উপর বিশ্বাস করিয়া ছাড়িয়া দিব।-ভাবিয়া দেখ, তাের। মরিলে কে তাের দেশবাসী ভিক্ষুকদের দেখাইয়া লইয়া , আসিবে ? ডা-গামা অবরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল,—“শপথ করিতেছি-- মির্জ। দাউদ কহিলেন,-“তােদের যে শুর জননী মেরীর নামে শপথ কর। ডা-গামা তখন কম্পিত ক্রোধ-জর্জরিত কণ্ঠে শপথ করিল যে সপ্তাহ মধ্যে পথ রক্ত-সন্ধ্যা ৮৭ এ দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে এবং আর কখনও ভারত ভূমির উপর পদার্পণ করিবে না। ডা-গামাকে ছাড়িয়া দিয়া মির্জ। দাউদ ও মারও প্রধান প্রধান নাগরিকগণ সামরীর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। সমস্ত বিবরণ আদ্যোপান্ত শুনিয়া সামরী কহিলেন,—“যত দিন উহারা আমার রাজ্যের কোনও প্রকাশ্য অনিষ্ট করিতেছে, তত দিন শুধু সন্দেহের উপর নির্ভর করিয়া আমি উহাদিগকে রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিতে পারি না। তবে কেহ যদি তােমাদের ব্যক্তিগত অনিষ্ট করিয়া থাকে, তােমর প্রতিশােধ লইতে পার, আমি বাধা দিব না। সকলে সামরীকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন যে, ইহারা অত্যন্ত কুটবুদ্ধি ও যুদ্ধনিপুণ, তাহাদের কামান, বন্দুক, গােলাগুলী আছে ; সুযােগ পাইলেই তাহারা বাহুবলে এই সােনার রাজ্য অপূর্ব অমরাবতী গ্রাস করিবে। সানরী হাসিয়া উত্তর করিলেন, 'আমার সৈন্যবল নাই সত্য, কিন্তু এই সানরী বংশ পঞ্চদশ শতাব্দী ধরিয়া এই মসলন্দে রাজত্ব করিতেছে- কেহ তাহাকে রাজ্যভ্রষ্ট করে নাই। আমার সিংহাসন সুশাসন ও জনপ্রিয়তার উশর প্রতিষ্ঠিত। উহার। আমার কি করিতে পারে ? সকলে নিরাশ হইয়া ফিরিয়া গেলেন। সপ্তাহ পরে স্বর্ণপত্রে লিখিত সামরীর সন্ধিলিপি মস্তকে বরণ করিয়া ভাস্কো-ডা-গামা অনুচরসহ জাহাজে উঠিল। মির্জ। দাউদ বন্দর হইতে ডাকিয়া বলিলেন,-‘ডা-গামা শপণ স্মরণ রাখিও। ক্রর হাস্য ডা-গামার মুখের উপর খেলিয়া গেল, মিজ্জ। দাউদের একটা انا চুয়াচন্দন প্রতি স্থিরদৃষ্টি রাখিয়া সে বলিল,-‘মিজ্জ। দাউদ,আবার আমাদের সাক্ষাৎ হইবে। মির্জ। দাউদ হাসিয়া উত্তর দিলেন,‘সম্ভব নয়। আমি মুসলমান , —বেহেস্তে যাইব। ডা-গামা দুই চক্ষুতে অগ্নিবর্ষণ করিয়া কহিল, ‘ইহজন্মেই আবার আমাদের সাক্ষাৎ হইবে। তারপর ধীরে ধীরে তাহার তিনটি জাহাজ তিনটি জাহাজ বন্দরের বাহির হইয়া গেল। চারি বৎসর অতীত হইয়াছে। এই চারি বৎসরে যাহা যাহা ঘাটয়াছে, তাহা এই কাহিনীর অন্তর্গত না হইলেও সংক্ষেপে বর্ণিত হইল। ভাস্কা-ডা-গামা কালিকট ত্যাগ করিবার দুই বৎসর পরে আবার পাের্ত্তগীজ জাহাজ ভারতবর্ষে আসিল। এবার পাের্তুগীজদের অধিনায়ক আলভারেজ কেল্লার নামক একজন পাদ্রী এবং তাহার অধীনে নয়খানি জাহাজ। পাদ্রী আভারেজ কালিকট বন্দরে প্রবেশ করিয়াই জাহাজ হইতে নগরের উপর গােলাবর্ষণ আরম্ভ করিলেন। ফলে বহু নাগরিকের প্রাণনাশ হইল, অনেকে আহত হইল এবং কয়েকটি অট্টালিকা চূর্ণ হইয়া গেল। এইরূপে রাজা-প্রজার মনে ভীতি ও কর্তব্যজ্ঞান সঞ্চারিত করিয়া পাের্তগীজরা আবার ভারত ভূমিতে পদার্পণ করিল। রাজা সামরী আগন্তুকদিগকে সম্মান দেখাইলেন ও তাহাদের বাসের জন্য নগরের বাহিরে ভূমিদান করিয়া কুঠিনিৰ্মানের অনুমতি দিলেন। কিন্তু পােব্ৰুগীজদিগের এই অহেতুক জিঘাংসা ও নিষ্ঠুরতায় কালিকটের জনসাধারণের মন তাহাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষে পূর্ণ হইয়া উঠিল।

রক্ত-সন্ধ্যা । তারপর কলহ বাধিতে বিলম্ব হইল না। দাম্ভিক বিদেশীদের প্রতি যাহাদের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ জন্মিয়াছিল , তাহারা ঝগড়া বাধাইয়া রক্তপাত করিতে লাগিল। পাের্তুগীজরাও জবাব দিল। ক্রমে ভিতরে বাহিরে আগুন জ্বলিয়া উঠিল। একদিন নাগরিকগণ পাের্ভুগীজদিগের কুঠিতে অগ্নিসংযােগ করিয়া সত্তর জন ফিরিঙ্গিকে হত্য করিল। অবশিষ্ট পলাইয়া জাহাজে উঠিল এবং জাহাজ হইতে গােলা মারিয়া নগরের এক অংশে আগুন লাগাইয়া দিল। তার পর সেই যে তাহায় কালিকট ছাড়িয়া গেল, দুই বৎসরের মধ্যে আর ফিরিয়া আসিল, না। কালিকটের রাজা-প্রজা নিশ্বাস ফেলিয়া ভাবিল -আপদ দূর হইয়াছে, আর ফিরিবে না। শেষােক্ত ঘটনার বংরেক পরে নি। দাউদ স্ত্রী-কন্যা লইয়া তাহার জন্মভূমি মরক্কো দেশে গেলেন। সেখানে কিছু দিন অবস্থানের পর বৃদ্ধ পিতাকে সঙ্গে লইয়া মক্কাশরীফ দর্শন করিলেন। তারপর তীর্থ-দর্শন শেষ করি। সকলে মিলিয়া। কালিকটে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন। কথা ছিল, মক্কাশরীক হইতে মির্জা দাউদ কালিকটে আসিবেন, তাঁহার পিতা মােরােকে দেশে ফিরিয়া যাইবেন। কিন্তু পিতা স্থবির ও জরাগ্রস্থ হইয়া পড়িয়াছেন—অধিকদিন পরমায়ু নাই। পুনরায় মােরােক্কো যাইবার সুযােগ হয় ত শীঘ্র হইবে না, ততদিন পিতা বাঁচিবে কি মা, এই সকল বিবেচনা করিয়া মির্জা দাউদ তাহাকে ছাড়িলেন না, নিজের সঙ্গে কালিকট লইয়া চলিলেন। বৃদ্ধ ও ইদের চাদের মত সুন্দর ক্ষুদ্র নাতিনীটিকে দেখিয়া ভুলিয়াছিলেন—তিনিও বিশেষ আপত্তি করিলেন না। মক্কাশরীফ দর্শনের সময় কালিকটের কয়েক জন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সহিত মিজ্জ। দাউদের সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তিনি তাহাদের বলিলেন, আপনারা চুয়াচন্দন ও কালিকটে ফিরিতেছেন—আমার জাহাজেই চলুন। তাহারা আনন্দিত হইয়া সপরিবারে মির্জ। দাউদের জাহাজে আশ্রয় লইলেন। মকা হইতে কালিফট তিন মাসের পথ। জাহাজ যথা সময়ে আরব উপকূল ছাড়িয়া লােহিত সাগর পার হইল। ক্রমে পারস্য উপসাগর উত্তীর্ণ হইয়া ভারত সমুদ্রে আসিয়া পড়িল। মহাসাগরের বুকের উপর বায়ু-বৰ্ত্তলিত পালের ভরে মির্জ। দাউদের তরণী দক্ষিণাভিমুখে চলিয়াছে, চারিদিকে অতল জল দুলিতেছে ফুলিতেছে—লক্ষকোটিখণ্ডে বিচূর্ণিত দর্পণের মত রবিকরে প্রতিফলিত হইতেছে ! পূর্ণ দিগন্তরেখা অখণ্ডভাবে তরণীকে চারিদিকে বেষ্টন করিয়। আছে। কেবল বহুদূরে পূৰ্বচক্ৰবালে মেঘের মত কচ্ছভূমির তটবনানী ঈষত্র দেখা যাইতেছে। জাহাজে যে অভিজ্ঞ আড়কাঠি আছে, সে বলিয়াছে যে বায়ুর দিক এবং গতি পরিবর্তিত না হইলে অষ্টাহমধ্যে কালিকটে পৌছানাে যাইবে। আশু যাত্রাশেষ কল্পনা করিয়া আরােহীরা সকলেই হৃষ্ট হইয়া উঠিয়াছেন। সে দিন শুক্রবার, সূৰ্য ক্রমে মধ্যগগন অতিক্রম করিয়া পশ্চিমে ঢলিয়া। পড়িল। জাহাজের বিস্তৃত ছাদের উপর মির্জা দাউদ, তাঁহার পিতা ও আর আর পুরুষগণ দ্বিপ্রহরিক নমাজ প্রায় শেষ করিয়াছেন। জাহাজের নিয়ামক সম্মুখে স্থিরদৃষ্টি করিয়া হালের নিকট নিশ্চলভাবে দাড়াইয়া আছে। চারিদিক নিস্তব্ধ, শুধু তরণীর বেগবিদীর্ণ জলরাশি ফেন-হাশ্যে কল শব্দ করিতেছে। এমন সময় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করিয়া মেগগজ্জনের ন্যায় ভীষণ শব্দে সকলে চমকিত হইয়া দেখিলেন, পশ্চাৎ হইতে পাচখানা ফিরিঙ্গি জাহাজ সমস্ত, পাল তুলিয়া দিয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে অগণ দাড় বাহিয়া যেন বহুপদবিশিষ্ট অতিকায় জলজন্তুর মত ছুটিয়া আসিতেছে। অতর্কিতে এত } রক্ত-সন্ধ্যা নিকটে আসিয়া পড়িয়াছে যে, জাহাজের মানুষগুলাকে পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। এই আকস্মিক দৃশ্য দেখি", সকলেই বুদ্ধিভ্রষ্টের মত সেই দিকে নিস্পলকভাবে তাকাইয়া রহিলেন । বিস্মিত হইবার মত দৃশ্য বটে। দুই দণ্ড পর্বেও চতুর্দিকে কোথাও একটা ভেলা পৰ্যন্ত ছিল না। সহস! সমুদ্রের কোন্ অতল গুহা হইতে এই পাচটা ভীষণ দৈত্য বাহির হইয়া আসিল ? নিজা দাউদের মন বলিল, আজ আর রক্ষা নাই। কামান দাগিয়, ইহারা নিজ আগমনবার্তা ঘােষণা করিয়াছে—আজ তাহারা দয়ামায়া দেখাইবে না। মূরের রক্তে হিংসা চরিতার্থ করিবার আজ তাহাদের সুয মিলিয়াছে । এরূপ ঘটনা প্রতীচ্যখণ্ডের সমুদ্রবক্ষে পূর্বে কখনও ঘটে নাই। স্মরণাতীত কাল হইতে এই পথে শত শত তরণী অবাধে যাতায়াত করিয়াছে। চীন হইতে কাস্পীয় হ্রদ ব্যন্ত কে কখন হিংস্লিকা বা বােম্বটের নাম পৰ্য্যন্ত শুনে নাই। স্থলপথ অপেক্ষা জলপথ অধিক নিরাপদ ছিল বলিয়াই জলবাণিজ্য এত প্রসার লাভ করিয়াছিল। কিন্তু আজ যুগযুগান্তরের বাহিতপণ্য অব্যাহত পথে হান্ধ ফিরিঙ্গি তাহার অগ্নি-অস্ত্র লইয়! পথরুদ্ধ করিয়া দাড়াইল। কিন্তু যুদ্ধদান করা মির্জ। দাউদের পক্ষে অসম্ভব। তাহার জাহাজ তীর্থযাত্রীর জাহাজ, তাহাতে বারুদ-গোল কিছুই নাই। আছে কেবল কতকগুলি অসহায় যুদ্ধানভিজ্ঞ ধৰ্ম্মপরায়ণ তীর্থযাত্রী এবং তদপেক্ষাও অসহায় কতকগুলি নারী ও শিশু। এরূপ অবস্থায় পাঁচখান! রণপােতের সঙ্গে যুদ্ধ করা বাতুলতা ভিন্ন আর কিছুই নহে। এক উপায় পলায়ন। কিন্তু মির্জা দাউদের জাহাজ কেবল পালের ভরে চলে—বিপক্ষের পাল দাড় দুই আছে ; এ ক্ষেত্রে পলায়নও সাধ্যাতীত। মিউ দাউদ ক্ষণকাল শুদ্ধভাবে চিন্তা করিলেন। একবার আকাশের চুয়াচন্দন দিকে দৃষ্টি করিলেন। আকাশ নিৰ্ম্মেব—বেলা প্রায় তৃতীয় প্রহর। রাত্রি হইতে বিলম্ব আছে । তিনি নাবিককে ডাকিয়া সমস্ত পাল তুলিয়া প্রাণপণে জাহাজ ছুটাইত আজ্ঞা দিলেন ! কিন্তু এই আজ্ঞা পালিত হইতে না হইতে জলদস্যদিগের পাঁচখানা জাহাজ হইতে একসঙ্গে কামান ডাকিল। একটা গােলা বড় পালের ভিতর ছিদ্র করিয়া জাহাজের পরপারে গিয়া সমুদ্রগর্ভে প্রবেশ করিল, অন্যগুলা জাহাজের চারিদিকে জলের উপর পড়িল। কোনটাই কিন্তু জাহাজকে গুরুতর জখম করিতে পারিল না। জাহাজের পুরুষ যাত্রিদের মুখ শুকাইল। নিম্ন হইতে ভীত শিশু ও নারীগণের আর্তস্বর ও ক্রন্দন উঠিল। দন্তে দন্তে চাপিয়া মির্জা দাউদ নাবিকদের হুকুম দিলেন,—“যতক্ষণ পায়রা, জাহাজ চালাও, ফিরিঙ্গি দস্যুর হাতে ধরা দিব না। এমন সময় মির্জা দাউদের চারি বৎসরের কন্যা হাঁপাইতে হাপাইতে উপরে উঠিয়া আসিয়া পিতার জানু জড়াইয়া ধরিল। বলিল, “বাবা না তােমাকে ডাকছেন। বলিয়া পিতার মুখের দিকে চোখ তুলিয়াই উচ্চৈঃস্বরে কঁদিয়া উঠিল, “বাবা, আমার বড় ভয় করছে। মির্জা দাউদ কন্যাকে দুই হাতে তুলিয়া বুকে চাপিয়া ধরিলেন। তাহার কাণে কাণে কহিলেন’ ‘হারুণ, কঁদিস না। তুই মুরের কন্যা-- তাের কিসের তয় ? আজ আমরা সকলে একসঙ্গে বেহেস্তে যাইব। কন্যাকে পিতার ক্রোড়ে দিয়া মির্জা দাউদ নীচে নামিয়া গেলেন । সমুখেই আকুল-নয়না স্ত্রীর সহিত সাক্ষাৎ হইল। নিজ কটি হইতে ক্ষুদ্র মাণিক্যখচিত ছুরিক পত্নীর হস্তে দিয়া সংযত কণ্ঠে কহিলেন,—“শালেহা, বােধ হয় আজ অন্তিমকাল উপস্থিত হইয়াছে। বােম্বেটে জাহাজ পিছু লইয়াছে। যদি উহারা এ জাহাজে পদার্পণ করে, রক্ত-সন্ধ্যা এ ছুরী নিজের উপর ব্যবহার করিও। তার পূর্বে কিছু করিও না। অার অন্যান্য স্ত্রীলােকদের আশ্বাস দিও, অকারণে ভয় না পায় ! চলিলাম। এই বলিয়া মুহূর্তকালের জন্য পত্নীর মস্তক বক্ষে চাপিয়া ধরিয়? মির্জা দাউদ উপরে ফিরিয়া গেলেন। উপরে উঠিয়া দেখিলেন, এই অল্পকাল মধ্যে দ্যজাহাজ গুলি অর্ধচন্দ্রাকারে তাহাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। এত নিকটে আসিয়া পড়িয়াছে যে, তাহাদের কণ্ঠস্বর পর্যন্ত স্পষ্ট শুনা যাইতেছে। মিচ্ছ। দাউদ দেখিলেন, প্রত্যেক জাহাজ হইতে কামানের মুখ তাহাদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া আছে। এত নিকট হইতে এবার আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হইবে না। মির্জা দাউদের পিতা আসিয়া বলিলেন, ‘দাউ, আর উপায় নাই। ধরা না দিলে জাহাজডুবি হইয়া মরিতে হইবে। মির্জা দাউদ কহিলেন, ‘ধরা দিলেও নিশ্চয় মরিতে হইবে, তাহার অপেক্ষা ডুবিয়া মরাই শ্রেয়। পিতা বলিলেন, সে কথা ঠিক। কিন্তু সঙ্গে শিশু ও স্ত্রীলােক রহিয়াছে। তাহাদের রক্ষা করিবার চেষ্টা করা উচিত নহে কি ? মির্জা দাউদ কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, কিন্তু দস্তর। শিশু ও নারীদের দয়া করিবে কি ? বরঞ্চ পিতা কহিলেন, ‘ফিরিঙ্গি অর্থলােভী, অর্থের বিনিময়ে তাহাদের ছাড়িয়া দিতে পারে। অন্যান্য পুরুষগণও বৃদ্ধের বাক্য সমর্থন করিলেন। মির্জ। দাউদ তখন কহিলেন, “ভাল, চেষ্টা করিয়া দেখা যাক। ঠিক এই সময় একখানা জাহাজ হইতে আবার কামান দাগিল। এবার গােলার আঘাতে প্রকাণ্ড মাস্তুল পাল শুদ্ধ মড়মড় শব্দে ভাঙ্গিয়া পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে শু পীকৃত পালের কাপড়ে আগুণ লাগিয়া গেল।

৯৪ চুয়াচন্দন রমণীর! এতক্ষণ পর্যন্ত তাকে রক্ষা করিয়া জাহাজের খােলর মধ্যেই ছিল, কিন্তু এবার আর লজ্জার বাদ মানিল না। সন্তানবতীরা সন্তান কোলে লইয়া, যাহাদের সন্তান নাই—তাহারা যে যেমন ভাবে ছিল, উচ্চৈঃস্বরে কাদিতে কাদিতে উপরে উঠিয়া আসিল। সকলেই ভয় বিলা। কেহ উদ্ধ-মুখী নতজানু হইয়া ঈশ্বরের নিকট প্রাণের আকুল আবেদন জানাইতে লাগিল, কেহ শিশুসন্তানকে দুই হাতে উচ্চে তুলিয়া পরিয়া জলদদিগকে দেখাইয়: তাহাদের কপা আকর্ষণের চেষ্টা করিতে লাগিল। এ দিকে পালের আগুন ক্রমে বাড়িয়া উঠিয়া জাহাজময় ব্যাপ্ত হইবার উপক্ৰম করিল। পুরুষগণ তখন সমুদ্র হইতে জল তুলিয়া অগ্নিনির্বাণের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। বহু কষ্টে অনেক জল ঢালিবার পর অগ্নি নিৰ্বাপিত হইল। তখনকার মত জাহাজ রক্ষা পাইল । একখানা ফিরিঙ্গি জাহাজ মির্জ। দাউদের জাহাজের একবারে পাশে আসিয়া পড়িয়াছিল । मादा भाव একশত গজের ব্যবধান। কামান পুরাইয়া তাহারা আবার গােল চুড়িবার উদ্যোগ করিতেছিল। তখন মির্জা দাউদ উচ্চকণ্ঠে তাহাদিগকে ডাকিয়া কহিলেন,‘গােলা ছডিও না--আমরা আত্মসমর্পণ করিতেছি ! কামান ছাড়িয়া তাহার উল্লাসধ্বনি করিয়া উঠিল । তাহাদের মধ্যে একজনবোধ হয়, সেই প্রধান নাবিক-কহিল,-“তােমাদের জাহাজে যত অস্ত্র আছে, জলে ফেলিয়া দাও-নহিলে কামান ছুড়িব। মির্জা দাউদ কহিলেন,—“আমাদের সঙ্গে কোনও অস্ত্র নাই। ইহা তীর্থযাত্রীর জাহাজ। যাহা কিছু ধনরত্ন সঙ্গে, আছে, দিতেছি—আমাদের ছাডিয়া দাও। এইরূপ কথাবর্তা হইতেছে, এমন সময় আক্রমনকারী জাহাজের ভিতর রক্ত-সন্ধ্যা হইতে এক জন পুরুষ উপরে উঠিয়া আসিল। অতি মহার্ঘ বেশভূষায় সজ্জিত বিশালদেহ এক পুরুষ। তাহাকে দেখিয়া মির্জ। দাউদের বুকের রক্ত সহসা যেন স্তব্ধ হইয়া গেল। চিনিলেন—ভাস্কো-ডা-গামা । তাহার মুখের উপর কৃষ্ণ কালসর্পের মত হিংসা যেন কুণ্ডলিত হইয়া আছে। মিজ্জ। দাউদকে দেখিয়া ভাস্কো-ডা-গামা হাসিল! মাথার কঙ্কপত্রযুক্ত টুপি খুলিয়া তাহা আভূমি সঞ্চারিত করিয়া বলিল, মিজ্জ। দাউদ, সুপ্রভাত ! স্মরণ আছে, বলিয়াছিলাম আবার দেখা হইবে ? মির্জ। দাউদের মুখ দিয়া সহসা কণা বাহির হইল না। ভাস্কো-ডা-গামা তখন পূর্বোক্ত প্রধান নাবিকের দিকে ফিরিয়া কঠোর কণ্ঠে কহিল,-কাপ্তেন, কামান নীরব কেন? আমার হুকুম কি ভুলিয়া গিয়াছ ? ভীত কাপ্তেন বলিল,—প্রভু, উহারা ধনরত্ন দিয়া পরিত্রাণের আজী করিতেছে । দুই জাহাজ ক্রমে আর ও নিকটবর্তী হইতেছি। ডা-গামা আবার মিজ্জ। দাউদের দিকে ফিরিয়া শ্লেষতীক্ষ কণ্ঠে কহিল, “মূর, ধনরত্ন দিয়া প্রাণভিক্ষা চাও? মির্জ। দাউদ কহিলেন, নিজের প্রাণভিক্ষা চাহিনা ! আমাদের সর্বস্ব লইয়া বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের ছাড়িয়া দাও। ডা-গামা শত্রুর লাঞ্ছনার মিষ্ট রস অল্প অল্প করিয়া পান করিতে লাগিল, কহিল,—‘বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের ছাড়িয়া দিব? কিন্তু তাহাতে আমাদের লাভ ? বরঞ্চ তােমরা যুবতী নারীদের আমাদের নিকট পাঠাইয়া দিয়া পুরুষগণ প্রাণ বাঁচাইতে পার। আমাদের জাহাজে স্ত্রীলােকের কিছু প্রয়ােজন হইয়াছে। আমার নিজের জন্য নয়— খালাসীদের জন্য। আমার নারীতে রুচি নাই। ক্রোধে অপমানে মির্জ। দাউদের মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল ।

৯৬ চুয়াচন্দন বুঝিলেন, ডা-গামা তাহাকে লইয়া খেলা করিতেছে। অতি কষ্টে আত্মদান করিয়া কহিলেন, “ডা-গামা, তােমার প্রস্তাবের উত্তর দিতে ঘণ৷ হইতেছে। যদি অভিরুচি হয়, আমাদের সহিত যাহা মূল্যবান সামগ্রী ও স্বর্ণ রৌপ্য আছে, তাহা লইয়া আমাদের নিতি দাও। নতুবা কিছুই পাইবেনা। ‘ডা-গামা ভ্রুকুটি করিয়া কহিল, কিছুই পাইব তার অর্থ ?” মি। দাউদ কহিলেন, তার অর্থ—জোর করিলে আমাদের মারিয়া ফেলিতে পারিবে, কিন্তু কিছু লাভ করিতে পারিবে না। যদি আমার জাহাজে চড়াও করিবার চেষ্টা কর, তক্তা খুলিয়া জাহাজ ডুবাইয়া দিব। মির্জা দাউদের কথা শুনিয়া ডা-গামার ভ্রুকুটি গভীরতর হইল, সে নতমুখে চিন্তা করিতে লাগিল। এদিকে জাহাজের মাস্তুল ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় মির্জা দাউদ পঙ্কে নিবন্ধ হস্তীর মত চলচ্ছক্তিহীন। ফিরিঙ্গির পাচােনা জাহাজ ধীরে ধীরে তিন দিক হইতে ঘিরিয়া আরও নিকটবর্তী হইতে লাগিল। মির্জ। দাউদ অধীর হইয়া কহিলেন, “ডা-গামা, যাহা করিবে, শীঘ্র কর। আমাদের সহিত বারশত তােল সােনা আছে—আরও অন্যান্য মহার্ঘ বস্তু আছে ; যদি পাইতে ইচ্ছা কর, শীঘ্র বল। অধিক বিলম্ব করিলে সব হারাইবে। ডা-গামা বলিল,-“রমণীদের দিবে না ? মিজ্জা দাউদ গর্জিয়া উঠিলেন ;-না, দিব না। আমরা স্ত্রী-কন্যার ব্যবসা করি না। ডা-গামা কহিল,-“মূর, এখনও তাের স্পর্ধা কমিল না!—ভাল,

বক্ত-সন্ধ্যা
৯৭
অর্থই লইব। তােনার জাহাজে যাহা কিছু আছে, ভেলায় করিয়া
আমার জাহাজে পাঠাও।
“যাহা কিছু আছে, পাইলে ছাড়িয়া দিবে ?
‘দিব।
তােমাকে বিশ্বাস কি ?
‘আমি মিথ্যা কথা বলি না।
‘মিথ্যাচারি, শপথ করিয়াছিলে কখনও হিলে পদার্পণ করিবে না
তাহার কি হইল ?
ডা-গামা
বলিল,---‘এখনও হিন্দে পদার্পণ করি
নাই।
মির্জা দাউদ তখন অন্যান্য সকলের সহিত পরামর্শ করিলেন।
সকলেই কহিলেন, উহাদের কবলে যখন পড়িয়াছি, তখন উহাদের
কথায় বিশ্বাস করা ভিন্ন উপায় নাই। অগত্যা মির্জা দাউদ সম্মত
সম্মত
হইলেন।
তখন এক ভেলা প্রস্তুত করিয়া তাহারই উপর যাহা কিছু ছিল, এমন
কি, নারীগণের অলঙ্কার পর্যন্ত তুলিয়া ডা-গামার জাহাজে পৌছাইয়া
দেওয়া হইল।
ডা-গামা জিজ্ঞাসা করিল,---“তােমাদের আর কিছু নাই ?
“না।”
‘আবার জিজ্ঞাসা করিতেছি-নারীদের দিবে না ?
অসহ্য ক্রোধে মির্জা দাউদের বারুদ্ধ হইয়া গেল।
চক্ষুদ্বয় অগ্নিশিখার মত জলিতে লাগিল।
ভাস্কো-ডা-গামা কালকূটের হাসিল। বলিল,-“ভাল,
তােমাদের যেরূপ অভিরুচি। তারপর কাপ্তেনের দিকে ফিরিয়া
শুধু তাহার
৭

১৮ চুয়াচন্দন বলিল,-“কাপ্তেন, গােলা মারিয়া উহাদের জাহাজে আগুন লাগাইয়া দাও। আজ মুসলমান কুকুরগুলাকে পুড়াইয়া মারিব। মির্জা দাউদ চীৎকার করিয়া উঠিলেন,—“শঠ ! বিশ্বাসঘাতক! মিথ্যাবাদী শয়তান ! ডা-গামা কহিল,—“মির্জা দাউদ, তাের প্রাণরক্ষা করিতে পারে, এত অর্থ পৃথিবীতে নাই। তবে তুই তাের স্ত্রীর বিনিময়ে এখনও প্রাণরক্ষা করিতে পারিস। তাের স্ত্রীকে আমি বাদী করিয়া রাখিব।” মির্জা দাউদ উন্মত্তের মত গর্জন করিতে লাগিলেন,—“শয়তান। শয়তান! জাহাজে ভীষণ কোলাহল উঠিল। নর-নারী সকলে পাগলের মত চারিদিকে ছুটাছুটি করিতে লাগিল। সকলেই যেন এই অভিশপ্ত জাহাজ হইতে পলাইবার চেষ্টা করিতেছে। চতুর্দিক হইতে আর্তব উঠিল ; রক্ষা কর! দয়া কর । প্রাণ বাঁচাও। এই আকুল প্রার্থনার জবাব আসিল। সহসা শিলাবৃষ্টির মত জাহাজের উপর বন্দুকের গুলী পড়িতে লাগিল। কেহ হত, কেহ আহত হইয়া পড়িতে লাগিল। মৃত্যুর বিভীষিকা যেন ভীষণভর রূপ ধরিয়া দেখা দিল। মির্জা দাউদের পিতা ক্ষুদ্ৰ হাৰুণাকে বক্ষে লইয়া কাপিতে কাপিতে পুত্রের পাশে আসিয়া দাড়াইলেন। ঋলিত কণ্ঠে একবার শুধু ডাকিলেন —“দাউদ ! দুর্দম আবেগে মির্জা দাউদ এক সঙ্গে পিতা ও কন্যাকে জড়াইয়া ধরিলেন। এমন সময় লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়া শালেহা আসিয়া স্বামীর হন্ত ধরিয়া দাড়াইলেন। > মির্জা দাউদ বাষ্পচ্ছন্ন চোখে একবার তিন জনের মুখের দিকে চাহিলেন। তারপর অবরুদ্ধ স্বরে কহিলেন,‘পিতা, ঈশ্বর কি নাই ? সহসা হারুণ ক্ষুদ্র একটী কাতরােক্তি করিয়া এলাইয়া পড়িল। কন্যাকে নিজের ক্রোড়ে লইয়া মির্জা দাউদ দেখিলেন, তাহার দেহে প্রাণ নাই। নিষ্ঠুর গুলী তাহার বক্ষে প্রবেশ করিয়াছে । তারপর দ্রুত অনুক্রমে স্ত্রী ও পিতা গুলীর আঘাতে মাটিতে পড়িয়। গিয়া মরণ-যন্ত্রণায় ছট ফট করিতে লাগিলেন। ভাস্কো-ডা-গামা তখন স্বয়ং ধূমায়িত বন্দুক হাতে করিয়া পিশাচের মত উচ্চ হাসি হাসিতেছে। সূৰ্য্য তখন পশ্চিম দিগন্তরেখা স্পর্শ করিয়াছে। আকাশ এবং সমুদ তপ্তরক্তের মত রাঙা হইয়া উঠিয়াছে। সাগরবক্ষে সূৰ্যা? এইবার পাচােনা জাহাজ হইতে এককালে কামান ডাকিল। সংঘাতে শীতার্ত বৃদ্ধের মত মির্জা দাউদের জাহাজখানা কাপিয়া উঠিল । পালের কাপড়ে দপ করিয়া আবার আগুন জ্বলিয়া উঠিল। ধীরে ধীরে টলিতে টলিতে জাহাজ নিমজ্জিত হইতে লাগিল। আবার কামান গর্জিল। এবার জাহাজের সম্মুখদিকটা ছিন্নভিন্ন হইয়া উড়িয়া গেল। কঙ্ক শব্দে জল ঢুকিতে লাগিল। তারপর নিমেষের মধ্যে সমস্ত শেষ হইয়া গেল। আরােহীদের মিলিত কণ্ঠ হইতে এক মহা হাহাকার-ধ্বনি উঠিল । জ্বলন্ত জাহাজ অকস্মাৎ জীবিতবং সােজা দাঁড়াইয়া উঠিল ; তারপর সবেগে সমুদ্রগর্তে প্রবেশ করিল। যাত্রীদের উদ্ধোখিওঁ কণ্ঠস্বর সহসা স্তব্ধ হইয়া গেল। মুহূর্তপূৰ্ব্বে যেখানে জাহাজ ছিল, সেখানে আবর্তিত তরঙ্গশীর্ষ জলরাশি ক্রীড়া করিতে লাগিল।

১০০
চুয়াচন্দন
ফিরিঙ্গি জাহাজগুলি চিত্রার্পিতবং স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া রহিল।
প্রায়ান্ধকারে তাহাদিগকে যেন অন্যজগতের কোন ভৌতিক তরণীর মত
দেখাইতে লাগিল। ।
ক্ষণকাল পরে সান্ধ্য নীরবতা বিদীর্ণ করিয়া ভাস্কো-ডা-গামার জাহাজ
হইতে দামামা ও তুৰ্য্য বাজিয়া উঠিল।
সূৰ্য্য তখন সমুদুপারে অস্তমিত হইয়া অন্য কোন্ নূতন গগনে উদিত
হইয়াছে।
৫

মরণ ভােমরা

No text on this page.

বড়দিনের ছুটি শেষ হইতে আর দেরী নাই। গত কয় দিন হইতে ‘পছিয়। বাতাস দিয়া দুর্জয় শীত পড়িয়াছে। সন্ধ্যার পর আমরা মাত্র তিনজন ক্লাবের সভ্য চারিদিকের দরজা-জানালা বন্ধ করিয়া দিয়া চিমনীর পৰ্গনে আগুনের সম্মুখে বসিয়াছিলাম। বাহিরের আকাশে ছেড় ছেড়া মেঘ ও প্রবল বায়ু মিলিয়! একট, দুযােগ সৃষ্টির চেষ্টা করিতেছিল। অমূল্য বলিল—“আজ আর কেউ আছে না, চল, বাড়ী ফেরা যাক। তিন জনে ভূতের মত ব'সে থেকে কোনও লাভ নেই-চার জন হলেও না হয় বুজ, খেলা যেত।” বরদা স্তিমিতনেত্রে আগুনের পানে চাহিয়া বসিয়াছিল, কতকটা যেন অন্যমনস্কভাবেই বলিল,-“সেবারে এই ডিসেম্বর মাসে কসসালী গিয়েছিলুম-বাপ ! কি শীত! মাথার ঘিলু পয্যন্ত জমে যাবার উপক্রম। পালিয়েই আস্তুণ-যদি না একটা ভারী আশ্চার্য্য ব্যাপার ঘটে সব ওলট-পালট করে দিত।—আচ্ছা, কত বড় গঙ্গাফড়িং তােমরা দেখেছ বল দেখি?” অমূল্য বলি,-“হু", আষাঢ়ে গল্প ফাদবার মৎলব। ওসব চালাকী চলবে না বরদা, আমি উঠলুম।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,-“কসৌলী গিয়েছিলে কেন?” বরদ। বলিল,---“কুকুরে কামড়েছিল ; সেই কথাই ত—” অমূল্য বলিল,-“জানি, সে বিষ এখনও তােমার শরীর থেকে বেরােয় নি। আমি আর এখানে থাকছি না, তােমার গঙ্গাফড়িং নিয়ে তুমি থাক।” অমূল্য উঠিয়া পড়িল, শালখান ভাল করিয়া গায়ে জড়াইয়া ঘােমটার মত করিয়া মাথায় দিয়া দ্বারের দিকে অগ্রসর হইল ।

১০৪ চুয়াচন্দন দ্বার বড় ছিল, ঠেলা দিয়া খুলিয়াই অমূল্য চমকিয়া বলিয়া উঠিল --“মশায়, আসতে পারি কি?” অপরিচিত কণ্ঠস্বরে ফিরিয়া দেখিলাম, ওভারকোট ও মঙ্কি ক্যাপে সৰ্ব্ব অবয়ব আচ্ছন্ন করিয়া একটি লােক দ্বারের সম্মুখে দাড়াইয়া আছে। মুখচোখ কিছুই দেখা গেল না, শুধু ব্যালাক্লাভা ও ওভারকোটের কলারের অন্তরালে একজোড়া কাল গোঁফের আভাস পাওয়া গেল মাত্র। অমূল্য জিজ্ঞাসা করিল, “কি চান?” লােকটি বলিল, “এইটা কি বাঙালীদের ক্লাব ?” বরদা আহ্বান করিয়া বলিল, “হ্যা, আসুন, ভেতরে এসে বসুন। অমূল্য, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এসাে হে, ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে।” লােকটি ঘরে আসিয়া প্রথমে মঙ্কি ক্যাপ ও পরে ওভারকোট খুলিয়া চেয়ারের পিঠের উপর রাখিল ; তখন প্রকাণ্ড খােলর ভিতর হইতে অতি ক্ষুদ্র শামুকের মত তাহার চেহারাখানা প্রকাশ হইয়া পড়িল। মানুষ যে এত শীর্ণ হইয়াও বাঁচিয়া থাকিতে পারে, তাই এই লােকটিকে না দেখিয়? ধারণা করা কঠিন। বয়স বােধ করি পয়ত্রিশ ছত্রিশের বেশী নয়, কিন্তু কোনও দুরারােগ্য ব্যাধি বা মানসিক দুশ্চিন্তা তাহার নরতিশয় ক্ষীণ শরীরটির প্রত্যেক অবয়বে যেন জরার ছাপ মারিয়া দিয়াছে। মাংসহীন মুখের উপর ঘনধষ্ণ একজোড়া গোঁফ মুখখানাকে আরও শুষ্ক শ্রীহীন করিয়া তুলিয়াছে। কপালে গভীর কালাে রেখা--মুখের রং ফ্যাকাশে পীতবর্ণ। মাথার পাশে বড় বড় একজোড়া কাণ যেন পাখা মেলিয়া উড়িবার উপক্ৰম করিতেছে। তাহার মুখের সমস্ত প্রত্যই মৃত বলিয়া মনে হয়-- কেবল কালিমাবেষ্টিত বড় বড় দুইটা চক্ষু যেন দেহের শেষ প্রাণশক্তিটুকু হরণ করিয়া জল-জত্ করিয়া জ্বলিতেছে।

মরণ-ভােমরা অজীর্ণ, মালেরিয়া প্রভৃতি ব্যাধির তাড়ায় যাহারা শীতকালে সুজলা বাংলা দেশের মায়া কাটাইয়া পশ্চিমে বেড়াইতে আসেন, তাহাদের মধ্যে এই ধরণের চেহারা দুই একটা যে দেখি নাই এমন নয়। বুঝিলাম, ইনিও একজন স্বাস্থ্যান্বেষী বায়ুভু জীব। মনে মনে ভাবিলাম, কেবলমাত্র মুঙ্গেরের জলহাওয়া এই কঙ্কালে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করিতে পারিবে কি? ঘাের সন্দেহ হইল। অমূল্য জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কি ক্লাবের কোনাে সভ্যকে খুজছেন ?” লােকটি একবার আমাদের তিন জনের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল, তাহার গোঁফ-জোড়া নড়িয়া উঠিল। তারপর অদ্ভুত রকমের একটা হাসি হাসিয়া বলিল,-“তা হতেও পারে, এখনও ঠিক বলতে পারছি না।” আমরা অবাক হইয়া রহিলাম। লােকটি পুনশ্চ বলিল,---“আমি এ সহরে নবাগত। আজ তিনদিন হ’ল এসেছি—ডাক বাংলােয় আছি। কিন্তু এ ক’দিন বাঙালীর সঙ্গে কথা না কয়ে হাপিয়ে উঠেছি, মশায়। আজ সন্ধ্যাবেলা বেয়ারার কাছে খবর পেলুম, এখানে বাঙালীদের একটা ক্লাব আছে, তাই খোঁজ করতে করতে এসে হাজির হয়েছি। আর থাকতে পারলুম না।” আমি বলিলাম, “বেশ করেছেন। যতদিন থাকেন, নিয়মিত আবেন, আমরা খুব খুসী হব। তা—স্বাস্থ্য উপলক্ষে 'এখানে আসা হয়েছে বুঝি ?” লােকটি বলিল’ “না, স্বাস্থ্য ত আমার বেশ ভালই।”—কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া হঠাৎ তাহার উজ্জ্বল চক্ষু দুইটা তুলিয়া বলিল—“সে জন্য নয়, মশায় ; মৃত্যু আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাই ভারতবর্ষময় ছুটোছুটী করে বেড়াচ্ছি; কিন্তু রেহাই নেই। যেখানেই ১০৬ চুয়াচন্দন যাই, মৃত্যু আমার পিছনে লেগে আছে। মনে ভাবি, আর বাঙালীর সঙ্গে দেখা করব না; কিন্তু পারি না, প্রাণ হাপিয়ে ওঠে। কথাটা খাপছাড়া ঠেকিল, কিন্তু তবু মৃত্যু যে তাহাকে তাড়া করিয়াছে এবং অচিরাৎ ধরিয়া ফেলিবে, সে বিষয়ে অন্ততঃ আমার মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। তথাপি তাহাকে সান্ত্বনা দিবার অভিপ্রায়ে বলিলাম, “এখানকার জলহাওয়া খুব ভাল, কিছু দিন থাকুন, নিশ্চয় সেরে উঠবেন।” লােকটি পকেট হইতে একটা চামড়ার সিগার-কে বাহির করিয়া বলিল, “ধূমযাত্রা করেন কি ?”—বলিয়া তিনটী ভীষণদর্শন সিগার আমাদের তিন জনকে দিয়া একটি নিজে ধরাইয়া টানিতে আরম্ভ করিল। আমরা নিৰ্বাক্ হইয়া তাহার মুখেরদিকে চাহিয়া রহিলাম। এই শরীরের উপর এইরূপ বিকটাকৃতি বিষাক্ত কড়া সিগার টানিয়া লােকটা কয় দিন বাঁচিবে ? আমাদের মুখের প্রতি কিন্তু তাহার নজর ছিল, সে ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “আপনারা ভুল করছেন। আমি দেখতে একটু রােগা বটে, কিন্তু আমার শরীরে কোনও রােগ নেই। ধরুন ত আমার পাঞ্জা।”--- এই বলিয়া কাঠির মত অঙ্গুলিযুক্ত কঙ্কালসার হাতখানা আমার দিকে বাড়াইয়া দিল। পাগল না কি? আমি তাড়াতাড়ি বলিলাম, “না, না, সে কথা বলি নি। আমি বলছিলুম” “ধরুন পাঞ্জা—“লােকটার চক্ষু দুটা ধধ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল । আমরা মনে মনে প্রমাদ গণিলাম ; কোথা হইতে একটা উন্মাদ আসিয়া জুটিল ! আমরা পরস্পর মুখ-কাকি করিতেছি দেখিয়া লােকটা নাছােড়বান্দা হইয়া বলিল, “আপনারা ভাবছেন, বােগা বলে আমার ;

মরণ-ভােমরা ১০৭ গায়ে জোর নেই। ভুল ! ভুল! পাঞ্জায় গামা পালােনও আমাকে হারাতে পারে না। ধরুন পাঞ্জা।” কি করি, নিরুপায় হইয়াই তাহার পাঞ্জা ধরিলাম। নিজের দৈহিক শক্তি সম্বন্ধে ভাল ধারণাই ছিল ভয় হইল, বুঝি একটু চাপ দিলেই ঐ প্যাকাটির মত আঙ্গুল গুলা মটমট করিয়া ভাঙ্গিয়া যাইবে । কিন্তু তাহার হাতে হাত দিয়াই বুঝিলাম, সে আশঙ্কা অমূলক। তাহার আঙ্গুলগুলা ইস্পাতের তারের মত আমার আঙ্গুলগুলাকে জড়াইয়া ধরিল। আমি যতই বলপ্রয়ােগ করি তাহার কজি ততই লােহার মত শক্ত হইতে থাকে। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল ! চাহিয়া দেখিলাম, আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখ নিব্বিকার, দাতে সিগার চাপিয়া স্বচ্ছন্দে ধূম উদিগরণ করিতেছে। ক্রমে আমার হাত অসাড় হইয়া আসিতে লাগিল। তারপর সবিস্ময়ে দেখিলাম, হাতখানা অজ্ঞাতসারে ঘুরিয়া যাইতেছে । আমার কজির কাছে মট, করিয়া একটা শব্দ হইল। “ব্যাস! কাবার !” বলিয়া লােকটা। পাঞ্জা ছাড়িয়া দিল। আমি স্তম্ভিতভাবে অবশ হাতখানা তুলিয়া বসিয়া রহিলাম । খানিকক্ষণ কেহ কোনও কথা কহিল না, লােকটা অৰ্দ্ধমুদিতনেত্রে সিগার টানিতে লাগিল । অবশেষে অমূল্য জিজ্ঞাসা করিল, “মশায়ের নামটি কি ?” সে বলিল,-“ভূতনাথ সিকদার। দেখলেন ত, যা বলুম সত্যি কি ? রােগ আমার শরীরে নেই মশায়, রােগ এইখানে।” বলিয়া নিজের কপালে তর্জনী ঠেকাইল। বরদা নিজের চেয়ারখানা ভূতনাথ সিকদারের পাশ হইতে একটু সরাইয়া লইয়া বলিল,—“আপনি যে অদ্ভুত শক্তির পরিচয় দিলেন, তা ৫ ১০৮ চুয়াচন্দন ত চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না ; ডােজবাজী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু শরীর যদি আপনার নীবােগই হয়, তবে আপনি এত বােগা কেন ? মাথার কি কোনও অসুখ আছে?” ভূতনাথ সিকদার বলিল, “মাথার অসুখ নেই, অসুখ আমার কপালের, ভাগ্যের। বলছি ত, মৃত্যু আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে।” বরদা বলিল, “কথাটা আর একটু ভােলা করে না বল্লে ঠিক বুঝতে পারছি না।” সিকদার চুরুটে তিন চারটা টান দিয়া যেন কি চিন্তা করিল, শেষে বলিল, “আচ্ছা, বলছি, কিন্তু এ কথা শােনবার পর আর আপনারা আমার মুখদর্শন করিতে চাইবেন না। এই ভয়েই ত দেশদেশান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি—বাঙালীর ছায়া মাড়াতে চাই না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে উঠি । আপনারা আমায় মাফ করবেন, আমি একটা মহা অলক্ষণ, যাদের সঙ্গে মিশি, তাদেরই অমঙ্গল হয়।” তাহার কথাগুলা এমন একটা অবসন্ন করুণ রেশ রাখিয়া গেল যে কিছু না বুঝিয়াও আমার হৃদয় সহানুভূতিতে ভরিয়া গেল। লােকটি জীবনে অনেক দুঃখশােক পাইয়াছে, তাই মাথাটা কিছু খারাপ হইয়া গিয়াছে—মনে করে, যাহার সহিত কথা কহিবে তাহারই অমঙ্গল ঘটিবে। আমার এক দূর-সম্পৰ্কীয়া পিসীমার এইরূপ হইয়াছিল। বৎসরের মধ্যে স্বামী, তিন পুত্র ও সাতটি নাতি-নাতনী হারাইয়া তিনি প্রায় পাগল হইয়া গিয়াছিলেন, সৰ্ব্বদা চোখে কাপড় বাধিয়া বসিয়া থাকিতেন, বলিতেন—আমি কাহারও মুখ দেখিব না, আমার দৃষ্টি যাহার উপর পড়িবে, সে আর বাঁচিবে না। ভূতনাথ সিকদারেরও হয় ত সেই রকম কিছু হইয়া থাকিবে।

মরণ-ভােমরা ১৯ আমি বলিলাম, “তা হােক, আপনি বলুন। ও সব অলক্ষণ-কুলক্ষণ আমরা মানি না।” সিকদার বলিল, “আপনাদের তরুণ বয়স, ও সব না মানাই স্বাভাবিক। ভূত-প্রেত, পরকাল, সূক্ষ্মদেহ এ সব আপনাদের মানতে লছি না, কিন্তু আসন্ন দুর্ঘটনা যে আগে থাকতে মানুষের জীবনে ছায়াপাত করে, এ কথাও কি আপনারা স্বীকার করেন না ?” আমরা চুপ করিয়া রহিলাম। সিকদার বলিতে লাগিল, “তবে ব্যাপারটা গােড়া থেকেই বলি। আমার জীবন কেন যে মনুষ্যসমাজ থেকে একটা উদ্ধশ্বাস পলায়ন হয়ে দাড়িয়েছে, তা শুনলে আপনারা হয়ত আমাকে পাগল মনে করবেন ; কিন্তু বাস্তবিক আমি পাগল নই, আপনাদের মত সহজ মানুষ। পাচ জনের সঙ্গে মিলে মিশে, হেসে-কেঁদে সাধারণ মানুষের মত জীবন কাটাতে চাই ; কিন্তু পারি না। কেন পারি না, জানেন ? ভয় ! দারুণ ভয়ে আমি কারুর সঙ্গে মিশতে পারি । একটা মহা আতঙ্ক সব সময় আমাকে গ্রাস করে আছে। যখন একলা থাকি বেশ থাকি, কিন্তু আপনারাই বলুন ত, মানুষ একলা সঙ্গিহীনভাবে কত দিন থাকতে পারে? তাই মাঝে মাঝে ছুটে বেরিয়ে পড়তে হয়। “আমি বিবাহ করি নি, কেন করি নি তা সহজেই বুঝতে পারবেন। বাপ-মা অনেক দিন গত হয়েছেন, আত্মীয়স্বজনও এখন বড় কেউ নেই, চিৎপুর রােডের পৈতৃক বাড়ীখানা এখনও বিক্রী করি নি, টাকাও যথেষ্ট আছে, কিন্তু তবু একটা সৃষ্টিছাড়া অন্ধকার ধূমকেতুর মত কেবল শূন্যের মাঝখানে ছুটে বেড়াচ্ছি—কেন? “যখন আমার ষােলাে বছর বয়স, তখন এক দিন গ্রীষ্মের দুপুরবেলা তিন জন সমবয়স্ক বন্ধুর সঙ্গে আমি আমাদের বাড়ীর তে-তলায় একটা ১১০ চুয়াচন্দন ঘরে বসে তাস খেলছিলুম। সেই দিনটা হচ্ছে আমার জীবনের একটা অভিশাপ। স্কুলে গরমের ছুটি হয়ে গেছে, রােজই আমাদের এই রকম খেলা বসে। তেলার এই ঘরটি দিব্যি নিরিবিলি, চীৎপুর রােডের চীৎকার সেখান পর্যন্ত পৌছায় না, শুধু মাঝে মাঝে ট্রামের ঢং ঢং শব্দ শােনা যায়। সে দিন আমরা চার জন নিবিষ্টমনে বসে খেলছি, এমন সময় খােলা জানালা দিয়ে একটা কালাে ভােমর ঘরে ঢুকে আমাদের ঘিরে ভন্ করে ঘুরতে লাগল। খেলায় এত তন্ময় ছিলুম যে প্রথমটা লক্ষ্যই করি নি, কিন্তু সেটা যখন মাথার চারিদিকে ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করলে, তখন আমরা চার জনেই উঠে তাকে তাড়াবার চেষ্টা করতে লাগলুম। কিন্তু সেও কিছুতেই যাবে না; পাখা দিয়ে—ব্যাডমিন্টনের ব্যাট দিয়ে যতই তাকে মারবার চেষ্টা করি, সেও ততই আমাদের লক্ষ্য এড়িয়ে কখনও নীচুতে, কখনও প্রায় কড়িকাঠের কাছে উঠে ঘুরতে থাকে । আমরা যেই আবার খেতে বসি, অনই আমাদের কাণের কাছে এসে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে উড়তে আরম্ভ করে। “প্রায় আধ ঘণ্টা তার পিছনে লেগে থাকবার পর যখন আমরা হয়রাণ হয়ে পড়েছি, তখন, ভােমরাটা ভণণ করে এসে একবার আমাদের মাথার চারদিকে চক্র দিয়ে নিজে থেকেই জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইরের তপ্ত বাতাসে তার ক্রুদ্ধ গুঞ্জন ক্রমে ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে } গেল। “গােপাল বললে-দেখ ভাই, আশ্চৰ্য্য ভােমরা। একবার আমি ব্যাডমিন্টন ব্যাট দিয়ে মারলুম, ঠিক মনে হ’ল ভােমরাটা ঠাতের ভেতর দিয়ে গলে গেল। “বীরেন বললে—‘দূর ! অত বড় ভােমরা কখনও অতটুকু ফাক দিয়ে গতে পারে ?

মরণ-ভােমরা ১১১ “হরিপদ বললে—‘কিন্তু এই কলকাতা সহরে ভােমরা এল কোথেকে ভাই ? কাছে-পিঠে কোথাও বাগান ও ত নেই। “সত্যি ত, ভােমরা এল কোত্থেকে? আমরা নানারকম আঁচ-আন্দাজ করতে লাগলুম, কিন্তু কোনটাই বেশ লাগসৈ হ’ল না। তখন আমাদের বয়স কম, ভােমরা কোথা থেকে এল, এ সমস্যা নিয়ে বেশী মাথা ঘামালুম । কিন্তু ভােমরাটাকে মন থেকে সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলতেও পারলুম না। “পরদিন দুপুরে গােপাল তাস পেতে এল না। তিন জনে খেলা ভাল জমল না, সারা দুপুর গল্প করে আর গােপালকে গালাগাল দিয়ে কাটিয়ে দিলুম। “গােপাল গ্রে ট্রিটে থাকত। বিকেলবেলা তার বাড়ী গিয়ে দেখলুম, সে বিছানায় শুয়ে আছে, মাথায় বরফ দেওয়া হচ্ছে। আমায় দেখে চিনতে পারলে কি না বােঝা গেল না, চোখের দৃষ্টি ঘােলাটে লাল শুধু একবার গেঙিয়ে গেঙিয়ে কি একটা কথা বলে--মনে হল যেন বলে-ভােমরা ! “তার চারিদিকে ডাক্তার আর বাড়ীর লােক ভিড় করেছিল । কিন্তু কাউকে জিজ্ঞাসা করতে পারলুম না, গােপালের কি হয়েছে। শুনেছিলুম-সর্দিাশ্মি। সাষ্ট্ৰোক্‌। “আমি চুপি চুপি চোরের মত বাড়ী ফিরে এলুম ; তার সেই অস্পষ্ট কথাটা আমার মাথার মধ্যে কেবলই গুমরে গুমরে উঠতে লাগল— ভােমরা ! ভােমরা ! “পরদিন গােপাল মারা গেল। সেই থেকে, কি করে জানি না, আমার মনে গেঁথে গেল যে, সেই ভােমরাটা ছিল মৃত্যুর দূত। গােপালের দিন যে ফুরিয়ে এসেছে, এই খবরটা সে আমাদের দিতে এসেছিল।

১১২ চুয়াচন্দন “তারপর থেকে এই কুড়ি বছরের মধ্যে কতবার ভােমরা দেখেছি জানেন?—তিন’শ একুশবার। আর, একবারও আমার ভােমরা দেখা নিষ্ফল হয় নি।” নিৰ্বাপিত সিগারটা আগুনের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া সিকদার আর একটা সিগার ধরাইল। আমরা নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলাম । সিকদার বলিল, “প্রথম প্রথম মনে হত, বুঝি আমার মনের ভুল। কিন্তু তা নয়—ভােমরাটাকে সকলেই দেখতে পায় এবং দেখার তিনদিনের মধ্যে যারা দেখেছে, তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু অনিবার্য। বাবা মারা যাবার আগে ভােমরা দেখলুম,—মা’র বেলাতেও দেখা পেলুম। “ক্রমে মানুষের সঙ্গ আমার কাছে ভয়াবহ হয়ে উঠল সৰ্ব্বদাই আতঙ্ক, কি জানি কখন ভােমরা দেখে ফেলি। হয় ত পাঁচ জন বন্ধু-বান্ধব মিলে গল্প করছি, হঠাৎ ভােমরা দেখা দিলেন। দুম করে বুকের মধ্যে হাতুড়ির ঘা পড়ল। আমার এই সুস্থ সবল বন্ধুদের মধ্যে একজনের মেয়াদ ফুরিয়েছে—তিন দিনের মধ্যে তাকে যেতে হবে। “একটা উৎকট কৌতুহল হত ; জানতে ইচ্ছা করত, এদের মধ্যে কাকে ভােমরা নােটশ দিয়ে গেল। মনে মনে আন্দাজ করবার চেষ্টা করতুম—এবার কার পালা। কিন্তু আন্দাজ ঠিক হ'ত না। ভােমরার মৃত্যু-পরােয়ানার মধ্যে ঐটুকুই ছিল কৌতুককার উপর সমন জারি ক'রে গেল, শেষ পর্যন্ত বােঝা যেত না। “একবারকার ঘটনা বলি। বর্ধমানে মামার বাড়ী গিয়েছি ; মামার অনেকগুলি ছেলে-মেয়ে। পৌছনাের পরদিন সকালবেলা আমরা সকলে মিলে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি, এমন সময় ভােমরার আবির্ভাব হ’ল। আমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। সুবী বলে মামার একটা বছর দশেকের মেয়ে দেয়ালের ধারে বসে চা অৈবী করছিল, মরণ-ভােমরা ভােমরাটা উড়তে উড়তে দেয়ালে ঠোকর খেয়ে টপ, ক'রে পড়ল একেবারে সুবীর মাথায়। সুবী হাউমাউ করে উঠে দাঁড়াতেই জলন্ত ষ্টোভটা উন্টে গিয়ে তার কাপড়ে আগুন ধরে গেল। ভােমরা ভোঁ ক'রে উড়ে পালাল। “আমরা পাঁচ জনে মিলে সুবীর কাপড়ের আগুন নেবালুম বটে, কিন্তু তার পা দুটে। ঝসে শাদা হয়ে গেল। ডাক্তার এসে ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করে বলে গেলেন--- সিরিয়া কিছু নয়, খুব বেঁচে গেছে। “আমি মনে মনে বললুম-বেঁচে মােটেই যায় নি,এ ভােমরার নােটিশ, ব্যর্থ হবার নয়। ঘা থেকে সেপটিক্‌, তার পরেই সাফ। “দুপুরবেলা সুবী’র জ্বর এল। সন্ধ্যের সময় আমি একটা ছুতে করে উদ্ধশ্বাসে বর্ধমান ছেড়ে পালালুম। সুবীটা বড় ভাল মেয়ে ছিল, মামাত ভাইবােনের মধ্যে তাকেই সবচেয়ে বেশী ভালবাসতুম। “বাড়ী ফিরে এসে কাউকে কিছু বললাম না। যথাসময় টেলিগ্রাম এল—সুবীর কিছু হয় নি, মামা হঠাৎ হার্ট ফেল করে মারা গেছেন । “ভােমরার অভিসন্ধি বােঝবার চেষ্টা করেছিলুম, তাই সে আমার সঙ্গে একটু ইয়াকি ক'রে গেল। “আমার মনের অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন,--সর্বদা যেন মৃত্যুর দূতকে সঙ্গে করে নিয়ে বেড়াচ্ছি। অনেক ভেবে ভেবে একটা মৎলব ঠিক করলুম,—দিনের বেলা যতদূর সম্ভব একলা থাকতুম, রাত্তিরে বাড়ী থেকে বার হতুম । মনের ভাবটা এই যে, রাত্তিরে ত আর ভােমরা আসতে পারবে না ! “কিন্তু আমার ফন্দি খাল না। দিন-রাত্রি নির্বিচারে ভােমরা আসতে লাগল—রাত্তিরে কানামাছির মত টাউরি খেতে খেতে আসে, আবার টাউরি খেতে খেতে চ'লে যায় ।

১১৪ চুয়াচন্দন “আমার মানসিক অবস্থা ক্রমে লােকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগল, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলেই জিজ্ঞাসা করে, তুই অমন কুনাে হয়ে যাচ্ছিস কেন? চেহারাটাও দিনদিন ভূতে পাওয়া গােছের হয়ে যাচ্ছে। হয়েছে কি ? “আমি চুপ করে থাকি—কি বলব? সত্যি কথা কিছুতেই মুখ ফুটে বলতে পারি না। “অতঃপর বাবা-মা মারা যাবার পর থেকে এই নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু হয়েছে। মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি, কিন্তু মৃত্যু-দূত আমার সঙ্গ ছাড়ে না। এক এক সময় হাত যােড় • করে ডাকি, মরণ ভােমরা! তুমি এবার আমাকে নাও, এই দুঃসহ শাস্তি থেকে আমাকে নিষ্কৃতি দাও।—কিন্তু আমার প্রার্থনা মঞ্জুর হয় না। এ সংসারে কেবল আমিই যেন অমর, আর সকলের মৃত্যুর পরােয়ানা বয়ে বেড়াচ্ছি।” সিকদারের কণ্ঠস্বর একটা গভীর নিরাশার মধ্যে মিলাইয়া গেল। তাহার কথাগুলা ঘরের মধ্যে যেন একটা অবাস্তব দুঃস্বপ্নের জাল বুনিয়া দিয়াছিল। আমরা আগুনের দিকে তাকাইয়া মােহাচ্ছমের মত বসিয়া রহিলাম। কিছুক্ষণ পরে অমূল্য জিজ্ঞাসা করিল,-“আপনি শেষ কবে মরণ ভােমরা দেখেছেন ?” সিকদার চোখের উপর দিয়া ডানহাতখানা একবার চালাইয়া বলিল, “সাত দিন আগে, আগ্রায়। তাজ দেখতে গিয়েছিলুম, সেখানে একটি বাঙালী দম্পতির সঙ্গে দেখা হ’ল। স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে তাজ দেখতে এসেছে ছেলেমানুষ, নবপ্রণয়ী। প্রণয়ের মহাতীর্থে নিজেদের সম্মিলিত ভালবাসা বােধ হয় নিবেদন করতে এসেছিল। তার পর...ভােমরা... সেই রাত্রেই আগ্রা ছেড়ে চলে এলুম।”

মরণ-বােমরা
১১৫
}
চার জনেরই সিগার নিভিয়া গিয়াছিল, পুনশ্চ ধরাইয়া নিঃশব্দে
টানিতে লাগিলাম।
মিনিট পনের সকলেই চুপচাপ ।
হঠাৎ সিকদার বলিল, “একটু গরম বােধ হচ্ছে না? জানালাট।
খুলে দিতে পারি ?”
বদ্ধ ঘরে সিগারের কটু ধোয়া ও আগুনের উত্তাপে সত্যই দম বন্ধ
হইবার উপক্রম হইয়াছিল। আমরা ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি দিতেই সিকদার
উঠিয়া পশ্চিমদিকের জানালাটা খুলিয়া দিল।
বরদা আমার কাণে কাণে বলিল, “একেবারে বন্ধ পাগল
মনােমানিয়া। ওর চোখের চাউনি দেখছ ?”
সিকদার জানালা খুলিয়া দিতেই একটা এলােমেলাে কনে হাও?
ঘরে ঢুকিয়া আমাদের উত্তপ্ত মুখের উপর যেন ঠাণ্ডা হাত বুলাইয়া
দিল। টেবিলের উপর আলােট। নিব-নিব হইয়া আবা জলি।
উঠিল ।
সিকদার ফিরিয়া আসিয়া চেয়ারে বসিয়াছে, এমন সময়
ভ---
ও কিসের শব্দ ? চারি জনেই চেয়ারের উপর সােজ। শক্ত হয়
বসিলাম।
পরক্ষণেই খােলা জানালা দিয়া একটা কালো কুচকুচে ভােমরা
পাখার শব্দে আমাদের মগজ ভরিয়া দিয়া ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল।
মন্ত্রমুগ্ধের মত আমরা তাহার দিকে তাকাইয়া রহিলাম ।
ভােমরা টেবলের উপরের বাতিটাকে একবার প্রদক্ষিণ করিল ; তার
পর সে। করিয়া উপরে উঠিয়া গিয়া ছাদে বাধা পাইয়া টপ করিয়া মেঝেয়
পড়িয়া গেল। কিছুক্ষণ তাহার গুঞ্জন নিস্তব্ধ।

চুয়াচন্দন
আবার ভন্ করিয়া শব্দ হইল। ভােমরা মেঝে হইতে উঠিয়া
একবার বিদ্যুদ্বেগে ঘরময় উড়িয়া বেড়াইল। তার পর আমাদের কাণের
পাশ দিয়া ছুটিয়া গিয় জানালা দিয়া বাহির হইয়া গেল। তাহার গুঞ্জন
ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া অবশেষে মিলাইয়া গেল।
সিকদার উঠিয়া দাড়াইল, তাহার চোখ দুটা পাগলের মত। প্রায়
চীৎকার করিয়া বলিল—“ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন—আমি একটা
অভিসম্পাত।
কখনও আমার দেখা পাবেন না।”—বলিয়া
ওভারকোট ও টুপী ফেলিয়াই ঝড়ের মত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
আমরা তিন বন্ধু বিহ্বল জিজ্ঞাসুভাবে পরস্পরের মুখের পানে
চাহিলাম। বুকের ভিতর তােলপাড়, করিতে লাগিল।
তিন দিনের মধ্যে কাহাকে যাইতে হইবে ?

চুয়া-চন্দন

No text on this page.

এক দিন গ্রীষ্মের শেষভাগে, সূৰ্য্য মধ্যাকাশে আরােহণ করিতে তখনও দণ্ড, তিন-চার বাকি আছে, এমন সময় নবদ্বীপের স্নানঘাটে এক কৌতুকপ্রদ অভিনয় চলিতেছিল। ভাগীরথীর পূৰ্ব্বতটে নবদ্বীপ। স্নানের ঘাট ও অতি বিস্তৃত-এক গঙ্গাঘাটে লক্ষ লোেক স্নান করে। ঘাটের সারি সারি পৈঠাগুলি যেমন উত্তর-দক্ষিণে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত, তেমনি প্রত্যেকটি পৈঠা প্রায় সে-কালের সাধারণ রাজপথের মত চওড়া। গ্রীষ্মের প্রখরতায় জল শুকাইয়া প্রায় সব পৈঠাই অহির হইয়া পড়িয়াছে—দু’এক ধাপ নামিলেই নদীর কাদা পায়ে ঠেকে। স্নানের ঘাট যেখানে শেষ হইয়াছে, সেখান হইতে বাঁধানো খেয়াঘাট আরম্ভ। তথায় খেয়ার নৌকা, জেলে ডিঙ্গি, দুই-একটা জার-মণী মহাজনী ভড় বাধা আছে। নৌকাগুলির ভিতরে দৈনিক রন্ধনকায্য চলিতেছে,---ছৈ ভেদ করিয়! মৃদু মৃদু ধূম উখিত হইতেছে। বহুজনাকীর্ণ স্নান-ঘাটে ব্যস্ততার অন্ত নাই। আজ কৃষ্ণা চতুর্দশী । নাটের জনতাকে সমগ্রভাবে দর্শন করিলে মনে হয়, মুণ্ডিতশীর্ষ উপবীত-ধারী ব্রাহ্মণ ও প্রৌঢ়-বৃদ্ধা নারীর সংখ্যাই বেশী । ছেলে-ছােকরার দলও নেহাৎ কম নয় ; তাহারা সাতার কাটিতেছে, জল তােলপাড় করিতেছে। নারীদের স্নানের জন্য কোনও পৃথক ব্যবস্থা নাই, যে যেখানে পাইতেছে সেখানেই স্নান করিতেছে। তরুণী বধূরা ঘােমটায় মুখ ঢাকিয়া টুপ টুপ ডুব দিতেছে। পর্দা প্রথা বলিয়া কিছু নাই বটে, তবু অবগুণ্ঠন দ্বার। শালীনতা-রক্ষার একটা চেষ্টা আছে ; যদিও সে চেষ্টা তনু-সংলগ্ন সিক্তবস্ত্রে বিশেষ মর্যাদা পাইতেছে না। সেকালে বাঙালী মেয়েদের দেহলাবণ্য গােপন করিবার সংস্কার বড় বেশী প্রবল ছিল না; গৃহস্থ কন্যাদের কাচুলি পরিবার রীতিও প্রচলিত হয় নাই।

১২০ চুয়াচন্দন যে যুগের কথা বলিতেছি, তাহা আজ হইতে চারি শতাব্দীরও অধিককাল হইল অতীত হইয়াছে। সম্ভবতঃ আমাদের উদ্ধতন পঞ্চদশ পুরুষ সে সময় জীবিত ছিলেন। তখন বাঙলার ঘাের দুর্দিন যাইতেছিল। রাজশক্তি পাঠানের হাতে ; ধৰ্ম্ম ও সমাজের বন্ধন বহু যুগের অবহেলায় গলিত রজ্জ্ব-বন্ধনের ন্যায় খসিয়া পড়িতেছে। দেশও যেমন অরাজক, সমাজও তেমনি বহুরাজক। কেহ কাহারও শাসন মানে না মৃত বৌদ্ধধর্মের শবনির্গলিত তন্ত্রবাদের সহিত শাক্ত ও শৈব মতবাদ মিশ্রিত হইয়া যে বীভৎস বামাচার উখিত হইয়াছে—তাহাই আকণ্ঠ পান করিয়া বাঙালী অন্ধমত্ততায় অধঃপথের পানে স্থলিতপদে অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে। সহজিয়া সাধনার নামে যে উচ্ছঙ্খল অনাচার চলিয়াছে, তাহার কোনও নিষেধ নাই। কে কাহাকে নিষেধ করিবে? যাহারা শক্তিমান্, তাহারাই উচ্ছস্থলতায় অগ্রবর্তী। মাতৃকাসাধন পঞ্চমকার উদ্দাম নৃত্যে আসর দখল করিয়া আছে। প্রকৃত মনুষত্বের চর্চা দেশ হইতে যেন উঠিয়া গিয়াছে। তখনও স্মাৰ্ত্ত রঘুনন্দন আচারকে ধৰ্ম্মের নিগুঢ় বন্ধনে বাধিয়া সমাজের শােধন-সংস্কার আরম্ভ করেন নাই। কাণভট্ট রঘুনাথ মিথিলা জয় করিয়া ফিরিয়াছেন বটে, কিন্তু নবদ্বীপে সরস্বতীর পীঠ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্টিত হয় নাই। নদে’র নিমাই তখনও ব্যাকরণের টোলে ছাত্র পড়াইতেছেন ও কান্না প্রকার 'ছেলেমানুষী করিতেছেন। তখনও সেই হরিচরণত , প্রেমের বন্যা আসে নাই—বাঙালীর ক্লেদকলুষিত চিত্তের বহু শতাব্দী সঞ্চিত মলামাটা সেই পূত প্রবাহে ধৌত হইয়া যায় নাই। ১৪২৬ শকাব্দর প্রারম্ভে এক কৃষ্ণা চতুর্দশীর পূর্বাহে বাঙলার কেন্দ্র নবদ্বীপের ঘাটে কি হইতেছিল, তাহাই লইয়া এই আখ্যায়িকার ' আরম্ভ।

চুয়াচন্দন ১২১ •• ঘাটে যে সকলেই স্নান করিতেছে, তাহা নয়। এক পাশে সারি সারি নাপিত বসিয়া গিয়াছে ; বহু ভট্টাচাৰ্য গোঁসাই গলা বাড়াইয়া ক্ষৌরী হইতেছেন। বুরুজের গােলাকৃতি চাতালে একদল উলঙ্গপ্রায় পণ্ডিত দেহে সবেগে তৈলমর্দন করিতে করিতে ততােধিক বেগে তর্ক করিতেছেন। বাসুদেব সাৰ্বভৌম মিথিলা হইতে সৰ্ববিদ্যার পারঙ্গম হইয়া ফিরিয়া আসিবার পর হইতে নবদ্বীপে বিদ্যাচর্চার সূত্রপাত হইয়াছিল। কিন্তু বিদ্যা তখনও হৃদয়ে আসন স্থাপন করেন নাই; তাই বাঙালী পণ্ডিতের মুখের দাপট কিছু বেশী ছিল । শাস্ত্রীয় তর্ক অনেক সময় আঁচড়া-কামড়িতে পরিসমাপ্তি লাভ করিত। তৈল-মসৃণ পণ্ডিতদের তর্কও ন্যায়শাস্ত্রের সীমানা ছাড়াইয়া অরাজকতার দেশে প্রবেশ করিবার উপক্রম করিতেছিল। এক জন অতি গৌরকান্তি যুবা-বয়স বিশ বছরের বেশী নয়--তর্ক বাধাইয়া দিয়া, পাশে দাড়াইয়া তাহাদের বিতণ্ডা শুনিতেছিল ও মৃদু মৃদু হাস্য করিতেছিল। তাহার ঈষদরুণ আয়ত চক্ষু হইতে যেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, পাণ্ডিত্যের অভিমান ও কৌতুক এক সঙ্গে রিয়া পড়িতেছিল । জলের কিনারায় বসিয়া কেহ কেহ পায়ে ঝামা ঘষিতেছিল। নারীরা বস্ত্রাবরণের মধ্যে ক্ষার-খৈল দিয়া গাত্র মার্জনা করিতেছিল। কয়েক জন বর্ষীয়ান্ ব্রাহ্মণ আবক্ষ জলে নামিয়! পূৰ্বমুখ হইয়া আহ্নিক করিতেছিলেন। এই সময় দক্ষিণদিকে গঙ্গার বাকের উপর দুইখানি বড় সামুদ্রিক নৌকা পালের ভরে উজান ঠেলিয়া ধীরে ধীরে নবদ্বীপের ঘাটের দিকে অগ্রসর হইতেছিল—অধিকাংশ স্নানার্থীর দৃষ্টি সেই দিকেই নিবদ্ধ ছিল। সমুদ্রযাত্রী বাণিজ্য তরীদের দেশে ফিরিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে; প্রতি সপ্তাহেই দুটি একটি করিয়া ফিরিতেছিল।

১২২ চুয়াচন্দন ; ক্রমে নৌকা দুটি খেয়ার ঘাটে গিয়া ভিড়িল। মধুকর ডিঙ্গার ছাদের উপর একজন যুবা দাড়াইয়া পরম আগ্রহের সহিত ঘাটের দৃশ্য দেখিতেছিল ; পাল নামাইবার সঙ্গে সঙ্গে সেও তীরে অবতরণ করিবার জন্য ছাদ হইতে নামিয়া গেল। বড় নৌকা ঘাটের নিকট দিয়া যাইবার ফলে জলে ঢেউ উঠিয়া ঘাটে আঘাত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল ; অনেক ছেলে-ছােকরা কোমরে গামছা বাঁধিয়া ঢেউ খাইবার জন্য জলে নামিয়াছিল। ঢেউয়ের মধ্যে বহু সন্তরণকারী বালকের হস্তপদসঞ্চালনে ঘাট আলােড়িত হইয়া উঠিয়াছিল। হঠাৎ তীর হইতে একটা গেল গেল রব উঠিল। যে গৌরকান্তি যুবাটি এতক্ষণ দাঁড়াইয়া তর্করত পণ্ডিতদের রঙ্গ দেখিতেছিল, সে দুই লাফে জলের কিনারায় আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল,—“কি হয়েছে ?” কয়েক জন সমস্বরে উত্তর দিল,-“কানা-গোঁসাই এতক্ষণ জলে দাড়িয়ে আহ্নিক করছিলেন, হঠাৎ তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। ভাবে ভােলা মানুষ, হয় ত নৌকার ঢেউ লেগে তলিয়ে গেছেন।” যুবা কোমরে গামছা বাঁধিতে বাঁধিতে শুনিতেছিল, আদেশের স্বরে কহিল,-“তােমরা কেউ জলে নেমাে না, তা হলে গণ্ডগােল হবে। আমি দেখছি।” বলিয়া সে জলে ঝাপাইয়া পড়িল। গ্রীষ্মকালে ঘাটে স্নান করা ভাবে-ভােলা মানুষদের পক্ষে সর্বদা নিরাপদ নয়। কারণ, জলের মধ্যে দুই ধাপ সিড়ি নামিয়াই শেষ হইয়াছে—তার পর কাদা। এখানে বুক পর্যন্ত জলে বেশ যাওয়া যায়, কিন্তু আর এক পা অগ্রসর হইলেই একবারে ভুবজল। যুবক জলে ঝাঁপ দিয়। কয়েক হাত সাঁতার কাটিয়া গেল, তার পর অথৈ জলে গিয়া দিল ।

চুয়াচন্দন কিছুক্ষণ তাহার আর কোনও চিহ্ন নাই। ঘাটের ধারে কাতার দিয়া লােক দাড়াইয়া দেখিতেছে। সকলের মুখেই উদ্বেগ ও আশঙ্কার ছায়া। কয়েক জন প্রৌঢ়। স্ত্রীলােক ক্রন্দন-করুণ সুরে হা হা-হুতাশ করিতে আরম্ভ করিয়া দিল। পঞ্চাশ গণিতে যতক্ষণ সময় লাগে, ততক্ষণ পরে যুবকের মাথা জলের উপর জাগিয়া উঠিল। সকলে হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিলত-কিন্তু পরক্ষণেই আবার নীরব হইল। যুবক নিমজ্জিত ব্যক্তিকে খুঁজিয়া পায় নাই, সে বারকয়েক সুদীর্ঘ নিশ্বাস টানিয়া আবার ডুব দিল । এবারও সমধিক কাল ডুবিয়া থাকিয়া এসে আবার উঠিল ; একবার সজোরে মস্তক সঞ্চালন করিয়া এক হাতে সাঁতার কাটিয়া তীরের দিকে অগ্রসর হইল । সকলে সচীৎকারে প্রশ্ন করিল,-“পেয়েছ? পেয়েছ ?” যুবক হাঁপাতে হাপাইতে বলিল,-“বলতে পারি না। তবে এক মুঠো টিকি পেয়েছি।” যুবক যখন তীরে আসিয়া উঠিয়া দাড়াইল, তখন সকলে বিস্মিত হইয়া দেখিল, তাহার বামমুষ্টি এক গুচ্ছ পরিপুষ্ট শিপা দৃঢ়ভাবে ধরিয়া আছে এবং নিমজ্জিত পণ্ডিতের দেহসমেত মুণ্ড উক্ত শিখার সহিত সংলগ্ন হইয়া আছে। কিয়ৎকাল শুশ্রুষার পর পণ্ডিতের চৈতন্য হইল। তিনি কিছু জল পান করিয়াছিলেন, তাহা উৎক্ষিপ্ত হইবার পর চক্ষু মেলিয়া চাহিলেন। যুবক সহাস্য-কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “শিরােমণি মশায়, বলুন দেখি বেঁচে আছেন না মরে গেছেন? আপনার নব্য ন্যায়শাস্ত্র কি বলে ?” শিরােমণি একচক্ষু দ্বারা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া থাকিয়া ক্ষীণকণ্ঠে কহিলেন,—“কে—নিপাতনে সিদ্ধ? ডুবে গিয়েছিলুম-না?

ন্যায়ের
১২৪
চুয়াচন্দন
তুমি বাঁচালে?” যুবককে শিয়ােমণি মহাশয় ‘নিপাতনে সিদ্ধ’ বলিয়া
ডাকিতেন। একটু ব্যাকরণের খােচাও ছিল ; কূটতর্কে অপরাজেয়
শক্তির জন্য সমাদরমিশ্রিত হেও ছিল।
নিপাতনে সিদ্ধ হাসিয়া বলিল,-“বাঁচাতে পেরেছি কি না,
সেই কথাই ত জিজ্ঞাসা করছি। যদি বেঁচে থাকেন,
প্রমাণ দিন।
কাণভট্ট ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিলেন। এইমাত্র মৃত্যুর মুখ হইতে
ফিরিয়া আসিয়াছেন—শরীরে বল নাই ;- কিন্তু তাহার এক চক্ষুতে প্রাণময়
হাসি ফুটিয়া উঠিল ; তিনি বলিলেন,—“প্রমাণ নিষ্প্রয়ােজন। আমি
বেঁচে আছি-এ কথা স্বয়ংসিদ্ধ। আমি বেঁচে নেই, এ কথা যে বলে,
সে তৎক্ষণাৎ প্রমাণ করে দেয় যে, সে বেঁচে আছে। বাজীকর যত
কৌশলী হােক, নিজের স্কন্ধে আরােহণ করতে অক্ষম ; মানুষ তেমনি
নিজেকে অস্বীকার করতে পারে না।”
নৈয়ায়িকের কথায় সকলে হাসিয়া উঠিল। নিপাতনে সিদ্ধ বলিল,--
“যাক, তা হলে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।--এখন উঠতে পারবেন কি ?”
শিরােমণি তাহার হাত ধরিয়া দাড়াইলেন, বলিলেন,—“হঠাৎ হাতে
পায়ে কেমন খিল ধরে গিয়েছিল। নিপাতন, তুমিই জল থেকে টেনে
তুলেছনা ?”
নিপাতন বলিল,-“উহু। আপনাকে টেনে তুলেছে আপনার প্রচণ্ড
পাণ্ডিত্যের বিজয়-নিশান।”
“সে কি ?”
“আপনার নধর শিখাটিই আপনার প্রাণদাতা। ওটি না থাকলে
কিছুতেই টেনে তুলতে পারতাম না।”
“জ্যাঠা ছেলে।”
।

চুয়াচন্দন . “আপনার পৈতে চুয়ে বলছি—সত্যি কথা।কিন্তু সে যা হক, একলা বাড়ী ফিরতে পারবেন ত ?” “পারব, এখন বেশ সুস্থ বােধ করছি”--তার পর তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন,-বিশ্বম্ভর, এত দিন জানতাম তুমি নিপাতনেই সিদ্ধ, কিন্তু এখন দেখছি প্রাণদানেও তুমি কম পটু নও। আশীৰ্বাদ করি, এমনি ভাবে মজ্জমানকে উদ্ধার করেই যেন তােমার জীবন সার্থক হয়।” নিপাতন হাসিয়া বলিল,-“কি সর্বনাশ! শিরােমণি মশাই, ও আশীৰ্বাদ করবেন না। তা হলে আমার ব্যাকরণ টোলের কি দশা হবে ?” ও দিকে নৌকার মালিক যুবকটি এ সব ব্যাপার কিছুই জানিতে পারে নাই। সে নগর-ভ্রমণের উপযুক্ত সাজসজ্জা করিয়া ঘাটে নালি। স্নান-ঘাটের দিকে দৃষ্টি পড়িতেই সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। দেখিল, এক অতি গৌরকান্তি সুপুরুষ যুবা এক জন মধ্যবয়স্ক একচক্ষু ব্যক্তির সহিত দাড়াইয়া কথা কহিতেছে। এই গৌরাঙ্গ যুবকের অপূর্ব দেহসৌষ্ঠব দেখিয়া সে মুগ্ধ হইয়া গেল। সে পৃথিবীর অনেক দেশ দেখিয়াছে ; সিংহল, কোচিন, সুমাত্রা, যবদ্বীপ কোথাও যাইতে তাহার বাকি নাই। কিন্তু এমন অপরূপ তেজোদীপ্ত পুরুষমূর্তি আর কখনও দেখে নাই। একজন জেলে মাঝি নিজের ক্ষুদ্র ডিঙ্গীতে বসিয়া জাল বুনিতেছিল, যুবক তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল,—“বাপু, ঐ লােকটি কে জান ?” জেলে একবার চোখ তুলিয়া বলিল,-“ঐ উনি? উনি নিমাই পণ্ডিত।” যুবক • ভাবিল—পণ্ডিত! এত অল্পবয়সে পণ্ডিত! যুবকের নিজের ১২৬ চুয়াচন্দন পাণ্ডিত্যের সহিত কোনও সুবাদ ছিল না। সে বেণের ছেলে, বুদ্ধির বলেই সাত সাগর চষিয়া সােণাদানা আহরণ করিয়া আনিয়াছে। সে আর একবার নিমাই পণ্ডিতের অনিন্দ্য দেহকান্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া হৃষ্টচিত্তে নগর পরিদর্শনে বাহির হইল। ২ বেণের ছেলের নাম চন্দনদাস। বেশ সুশ্র চোখে-লাগা চেহারা ; বয়স একুশ বাইশ। বুদ্ধিমান, বাকপটু, বিনয়ী—বেণের ছেলের যত প্রকার গুণ থাকা দরকার, সবই আছে ; বরং দেশ-বিদেশে ঘুরিয়া নানাজাতীয় লােকের সহিত মিশিয়া আরও পরিমার্জিত হইয়াছে। বেশভূষাও ঘরবাসী বাঙালী হইতে পৃথক। পায়ে সিংহলী চটি, পরিধানে চাপা রঙের রেশমী ধুতি মালসাট করিয়া পরা ; স্কন্ধে উত্তরীয়। দুই কাণে হীরার লবঙ্গ ; মাথার কোকড়া চুল কাধ পর্যন্ত পড়িয়াছে-মাঝখানে সিথি। গলায় সােনায় হার বণিকপুত্রের জাতি-পরিচয় দিতেছে। চন্দনদাস অগ্রদ্বীপের প্রসিদ্ধ সওদাগর রূপচাদ সাধুর পুত্র। রূপচাঁদ সাধুর বয়স হইয়াছে, তাই এবার নিজে না গিয়া উপযুক্ত পুত্রকে বাণিজ্যে পাঠাইয়াছিলেন। এক বৎসর নয় মাস পরে ছেলে বিলক্ষণ দু'পয়সা লাভ, করিয়া দেশে ফিরিতেছে। বহুদিন একাদিক্রমে নৌকা চালাইয়া মাঝি-মাল্লারা ক্লান্ত ; তাই একদিনের জন্য চন্দনদাস নবদ্বীপে নৌকা বাঁধিয়াছে। কাল প্রভাতেই আবার গৃহাভিমুখে যাত্রা করিবে। চন্দনদাস হরষিত-মনে গঙ্গাঘাটের পথ ধরিয়া নগর দর্শনে চলিল। সে-সময় নবদ্বীপের সমৃদ্ধির বিশেষ খ্যাতি ছিল। পথে পথে নাটশালা, চুয়াচন্দন পাঠশালা, চূর্ণ-বিলেপিত দেউল, প্রতি গৃহচূড়ায় বিচিত্র ধাতু-কলস, প্রতি দ্বারে কারু-খচিত কপাট ; বাজারের এক বিপণিতে লক্ষ তঙ্কার সওদা কেনা যায়। পথগুলি সঙ্কীর্ণ বটে, কিন্তু তাহাতে নগরী আরও ঘনীভূত হইয়াছে। রাজপথে বহু লােকের ব্যস্ত যাতায়াত নগরকে সজীব ও প্রাণবন্ত করিয়া তুলিয়াছে । অনায়াস-মন্থরপদে চন্দদাস চারিদিকে চাহিতে হিতে চলিয়াছিল ; কিছুদূর যাইবার পর একটি জিনিষ দেখিয়া হঠাৎ তাহার বাইশ বছরের মুণ্ড ঘুরিয়া গেল ; সে পথের মাঝখানেই মন্ত্রমুগ্ধবং দাড়াইয়া পড়িল। বেচারা চনদাস, সাত সাগর পাড়ি দিয়াছে, কিন্তু সে বিদ্যাপতির কাব্য পড়ে নাই—‘মেঘমাল সঞ তড়িতলতা জনু হৃদয়ে শেল দেই গেল’ এরূপ ব্যাপার যে সম্ভবপর, তাহা সে জানিত না। বিদ্যাপতি জানা থাকিলে হয় ত ভাবিতে পারিত--- অপরূপ পেপলু রামা কনকলতা অব- হরিণহীন হবামা। কিন্তু চনদাস কাব্যরসবঞ্চিত বেণের ছেলে, আত্মবিশ্বতভাবে হাঁ করিয়া তাকাইয়া রহিল। প্রভাতে সে কাহার মুখ দেখিয়া উঠিয়াছিল কে জানে, কিন্তু আজ তাহার সুন্দর মুখ দেখিবার পালা। যাহাকে দেখিয়া চন্দনদাসের মুণ্ড ঘুরিয়া গিয়াছিল, সে মেয়েটি এক জন বয়স্কা সহচরীর সঙ্গে ঘাটে স্নান করিতে যাইতেছিল। পূর্ণযৌবনা ঘােড়শী--তাহার রূপের বর্ণনা করিতে গিয়া হতাশ হইতে হয়। বৈষ্ণব রসসাহিত্য নিঙড়াইয়া এই রূপের একটা কাঠামাে খাড়া করা যাইতে পারে ; হয় ত এমনই কোনও গােয়ােচনা গােরী নবীনার নববিকশিত রূপ দেখিয়াপ্রেমিক বৈষ্ণব কবি তাহার রাই কমলিনীকে গড়িয়াছিলেন, লম্বনে উয়ল ১২৮ চুয়াচন্দন কে বলিতে পারে ? মেয়েটীর প্রতি পদক্ষেপে দর্শকের হৃৎকমল দুলিয়া দুলিয়া উঠে, যেন হৃৎকমলের উপর পা ফেলিয়া সে চলিয়াছে। তাহার মদির নয়নের অপাঙ্গদৃষ্টিতে মনের মধ্যে মধুর মাদকতা উন্মথিত হইয়া উঠে। কিন্তু এত রূপ সত্বেও মেয়েটীর মুখখানি ম্লান, যেন তাহার উপর কালাে মেঘের ছায়া পড়িয়াছে। চোখ দুটি অবনত করিয়া ধীরপদে সে চলিয়াছে ; তৈলসিক্ত চুলগুলি পিঠের উপর ছড়ানো ; পরণে আটপৌরে রাঙাপাড় সাড়ী। দেহে একখানিও গহনা নাই, এমন কি, নাকে বেসর কাণে দুল পয্যন্ত নাই। কেবল দুই হাতে দু’গাছি শঙ্খ। মেয়েটীর সঙ্গে যে সহচরী রহিয়াছে, তাহাকে সহচরী না বলিয়া প্রতিহারী বলিলেই ভাল হয়। সে যেন চারিবি হইতে তাহাকে আগলাইয়া চলিয়াছে। তাহাকে দেখিলেই বুঝা যায়, বিগত-যৌবনা ভ্ৰষ্টা স্ত্রীলােক। আঁটসাঁট দোহার গঠন, গােলাকৃতি মুখ, কলহপ্রিয় বড় বড় দুটা চোখ যেন সর্বদাই ঘুরিতেছে। চন্দনদাস হা করিয়া পথের মধ্যস্থলে দাড়াইয়া রহিল, মেয়েটা তাহার পাশ দিয়া চলিয়া গেল। পাশ দিয়া যাইবার সময় একবার চকিতের ন্যায় চোখ তুলিল, আবার তৎক্ষণাৎ মাথা হেট করিল। সঙ্গিনী স্ত্রীলােকটা কটমট করিয়া চন্দনদাসের পানে তাকাইল , তাহার আত্মবিস্মৃত বিহ্বলতার জন্য যেন কিছু বলিবে মনে করিল। কিন্তু চন্দনদাসের বিদেশীর মত সাজ-সজ্জা দেখিয়া কিছু না বলিয়া সমস্ত দেহের একটা স্বৈরিণীসুলভ ভঙ্গী করিয়া চলিয়া গেল। চন্দনদাসও অমনই ফিরিল। তাহার গর ভ্রমণের কথা আর মনে ছিল না, সে একদৃষ্টে মেয়েটার দিকে তাকাইয়া রহিল। মেয়েটীও কয়েক পা গিয়া একবার ঘাড় বাঁকাইয়া পিছু ফিরিয়া চাহিল। ‘গেলি কামিনী, • চুয়াচন্দন ১২৯ গজহু গামিনী, বিহসি পালটা নেহারি'—চন্দনদাসের যেটুকু সৰ্ব্বনাশ হইতে বাকি ছিল, তাহাও এবার হইয়া গেল। সেও গঙ্গাঘাটের দিকে ফিরিল ; অগ্রবর্তিনী নার্থিনীদের দৃষ্টি-বহির্ভূত হইতে না দিয়া তাহাদের পিছু পিছু চলিল। ক্রমে তাহারা ঘাটের সম্মুখে পৌছিল। এখানে চন্দনদাস আবার নিমাই পণ্ডিতকে দেখিতে পাইল। তিনি স্নান শেষ করিয়া বােধ হয় গৃহে ফিরিতেছিলেন ; ভিজা গামছা গায়ে জড়ানাে। চন্দনদাস লক্ষ্য করিল, মেয়েটীর প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই নিমাই পণ্ডিতের মুখে একটা ক্ষুব্ধ কারুণ্যের ভাব দেখা দিয়াই মিলাইয়া গেল। তিনি অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিলেন। অতঃপর স্ত্রীলােক দুইটী ঘাটে গিয়া স্নান করিল। চন্দনদাস একটু আড়ালে থাকিয়া চোরা চাহনিতে দেখিল। চন্দনদাস দুষ্মন্ত নয়, “অসংশয়ং ক্ষত্রপরিগ্রহক্ষমা” তাহার মনে আসিল না ; কিন্তু না ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারণে তাহার ধারনা জন্মিল যে, মেয়েটী বেণের মেয়ে, তাহার স্বজাতি। কিন্তু একটা কথা সে কিছুতেই বুঝিতে পারিল না, এত বয়স পর্যন্ত মেয়েটি অনূঢ়া কেন? বিধবা নয়, হাতের শঙ্খ ও রাঙা পাড় সাড়ী তাহার প্রমাণ। তবে যােলল সতের বছরের মেয়ে বাঙালা দেশে অবিবাহিত থাকে কি করিয়া ? কিন্তু সে যাহা হউক, স্নান সারিয়া তাহার যখন ফিরিয়া চলিল, তখন সেও তাহাদের পিছু লইল। চন্দনদাসের ব্যবহারটা বর্তমানকালে কিছু বর্বরােচিত বােধ হইতে পারে। কিন্তু এ কালের রুচি দিয়া সে কালের শিষ্টাচার বিচার করা সৰ্বথা নিরাপদ নয়। তা ছাড়া, উপস্থিত তা ছাড়া, উপস্থিত ক্ষেত্রে শিষ্টাচারের সূক্ষ্ম অনুশাসন মানিয়া চলিবার মত হৃদযন্ত্রের অবস্থা চন্দনদাসের ছিল না।

চুয়াচন্দন তাহার কাচা হৃদ্যন্ত্রটা একেবারেই অবশ হইয়া পড়িয়াছিল। বিশেষ দোষ দেওয়াও যায় না। অনুরূপ অবস্থায় পড়িয়া সে কালের ঠাকুর-দেবতারাও কিরূপ বিহ্বল বে-এক্তিয়ার হইয়া পড়িতেন, তাহা ত ভক্ত কবিগণ লিপিবদ্ধ করিয়াই গিয়াছেন। —“এ ধনি কে কহ বটে!” মােট কথা, চন্দনদাস তাহার মন-চোর মেয়েটীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল । এ পথ হইতে ও পথে কয়েকটা মােড় ফিরিয়া প্রায় একপােয় পথ অতিক্রম করিবার পর মেয়েটী এক গলির মধ্যে প্রবেশ করিল। চন্দনদাস দেখিল, পাড়াটা অপেক্ষাকৃত গরীব বেণে-পাড়া। অধিকাংশ বাড়ীর খড়ের বা খােলার চাল। গলির মধ্যে কিছুদূর গিয়া মেয়েটি এক ক্ষুদ্র পাকা বাড়ীর দালানে উঠিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। বাড়ীটা পাকা বটে, কিন্তু অতিশয় জীর্ণ ও শ্ৰহীন। বাড়ীর সম্মুখীন হইয়া চন্দনদাস দেখিল, দালানের উপর একটি ক্ষুদ্র তেণের দোকান। আদা, মরিচ, হলুদ, লঙ্কা ছােট ছােট ধামিতে সাজানাে আছে ; এক জন বৃদ্ধা স্ত্রীলােক বেসাতি করিতেছে। দালানের পশ্চাদ্ভাগে একটি দ্বার, উহাই অন্দরে প্রবেশ করিবার পথ। চন্দনদাস বুঝিল, ঐ পথেই ঐ পথেই মেয়েটি ও তাহার সঙ্গিনী অন্দরে প্রবেশ করিয়াছে। চন্দনদাস বড় সমস্যায় পড়িল। সে কোন মৎলব স্থির করিয়া ইহাদের অনুসরণ করে নাই, গুণের নৌকার ন্যায় অদৃশ্য রজ্জবন্ধন তাহাকে, টানিয়া আনিয়াছে। কিন্তু এখন সে কি করিবে ? কেবলমাত্র মেয়েটির বাড়ী দেখিয়া ফিরিয়া যাইবে? চন্দনদাস বাড়ীর সম্মুখ দিয়া কয়েকবার অলসভাবে যাতায়াত করিয়া কর্তব্য স্থির করিয়া লইল। তাহার হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, তাহার মা তাহাকে নবদ্বীপ হইতে ভাল চুয়া কিনিয়া আনিতে বলিয়াছিলেন। সেকথা সে ভুলে নাই, আজ “নগর-ভ্রমণের 5 চুয়াচন্দন সময় কিনিয়া লইবে স্থির করিয়াছিল। কিন্তু চুয়া কিনিবার অছিলা এমনভাবে সদ্ব্যবহার করিবার কথা এতক্ষণ তাহার মনেই আসে নাই। সে দৃঢ়পদে দোকানের সম্মুখীন হইল ; মিঠা হাসিয়া বুড়ীকে জিজ্ঞাসা করিল, “হ্যাগাে ভাল মানুষের মেয়ে, তােমার দোকানে ভাল চুয়া আছে?” । যে বৃদ্ধা বেসাতি করিতেছিল, তাহার দেহ-যষ্টিতে বিন্দুমাত্র রস না থাকিলেও প্রাণটা তাজা ও সরস ছিল। চন্দনদাসকে বাড়ীর সম্মুখে অকারণ ঘুরঘুর করিতে দেখিয়া বুড়ী এই অনিশ্চিত যােরাঘুরির গূঢ় কারণটি ধরিয়া ফেলিয়াছিল এবং মনে মনে একটু আমােদ অনুভব করিতেছিল। পাড়ার কোনও চ্যাংড়া ছোড়া হইলে বুড়ী মুখ ছাড়িত ; কিন্তু এই কান্তিমান সুদর্শন ছেলেটির বিদেশীর মত সাজ- পােক দেখিয়া সে একটু আকৃষ্ট হইয়াছিল। চন্দনদাসের প্রশ্নের উত্তরে সে বলিল, “আছে বৈ কি বাছা। এসসা, বােসাে। চন্দনদাসও তাই চায়, সে দালানে উঠিয়া জলচৌকির উপর চাপিয়া রসিল। জিজ্ঞাসা করিল,হা গা, তােমাদের বাড়ীতে কি পুরুষমানুষ নেই ? তুমি নিজে বেসাতি করছ যে?” বৃদ্ধা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল,-“সে কথা আর বােলো না বাছা , একটা ব্যাটাছেলে ঘরে থাকলে কি আজ আমাদের এমন খােয়ার হয়?” --তারপর কথা পাল্টাইয়া বলিল,-“ত হঁ্যা বাছা, তােনাকে ত আগে কখনও দেখিনি, নদের লােক নও বুঝি ?”

১২ চুয়াচন্দন চন্দনদাস বলিল,-না, আমার বাড়ী অগ্রদ্বীপ।” বুড়ী বলিল—“ও তাই। কথায় বার্তায় যেন বেণের ছেলে ব'লে মনে হচ্ছে।” চন্দনদাস তখন জাতি-পরিচয় দিল, নিজের ও পিতার নাম উল্লেখ করিল। বুড়ী দু’দণ্ড বসিয়া গল্প করিবার লােক পায় না, সে আহলাদে গদগদ হইয়া বলিল,-“ও মা, তুমি ত আমাদের ঘরের ছেলে গাে স্বজাত। আহা যেমন সােনার কার্তিকের মত চেহারা, তেমনি মা’র কোল জুড়ে বেঁচে থাক ।-কোথায় বিয়ে-থা করেছ ?” চন্দনদাস কহিল,—“তের বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল আয়ি, এক বছর পরেই বৌ মরে যায়। তারপর আর বিয়ে করিনি।” বুড়ী একটু বিমনা হইল ; তার পর উৎসুক ভাবে নানা কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। চনদাস কথাপ্রসঙ্গে বলিল,-“সমুদ্রে গিয়েছিলাম আয়ি, দু’বছর পরে দেশে ফিরছি। তা ভাবলাম, নদেয় একদিন থেকে যাই; মা’র বরাত আছে চুয়া কেনবার, চুয়া কেনাও হবে, একটু জিরেণ দেওয়াও বুড়ী বলিল,-“তা বেশ করেছ বাবা, ভাগ্যিস এসেছিলে তাই ত অমন চাদমুখখানি দেখতে পেলাম—” বুড়ী একটা নিশ্বাস ফেলিল। তাহার প্রাণের ভিতরটা হায় হায় করিয়া উঠিল। আহা, যদি সম্ভব হইত। ৫ চন্দনদাস এতক্ষণ ফঁাক খুজিতেছিল, জিজ্ঞাসা করিল,-“আয়ি, তােমার আপনার জন কি কেউ নেই ?” “একটি নাতনী আছে, আর সব ম'রে হেজে গেছে। পােড়া-কপালী ছুড়ীর কপাল !” বলিয়া বুড়ী আঁচলে চোখ মুছিল। f ১. ।”; সে চুয়াচন্দন “নাতনী ।”—চন্দনদাস সচকিত হইয়া উঠিল ; তবে বুড়ীর নাতনীকেই সে দেখিয়াছে।—“তবে তুমি বুড়ো মানুষ দোকান দেখ কেন? সে দেখতে পারে না?” বুড়ী উদাস আশাহীন সুরে বলিল,-“সে অনেক কথা, বাছা। । আমাদের দুঃখের কাহিনী কাউকে বলবার নয়। সমাজ আমাদের বিনা দোষে জাতে ঠেলেছে, মুখ তুলে চাইবার কেউ নেই। আর কাকেই বা দোষ দেব, সব দোষ ঐ হতভাগীর, কপালের। এমন রূপ নিয়ে জন্মেছিল, ঐ রূপই ওর শত্তর চন্দনদাসের কৌতূহল ও উত্তেজনা বাড়িয়াই চলিয়াছিল। সাগ্রহে প্রশ্ন করিল,—“কি ব্যাপার আয়ি ? সব কথা খুলেই বল না।” বুড়ী কিন্তু রাজি হইল না, বলিল,-“কি হবে বাবা আমাদের লজ্জার কথা শুনে ? কিছু ত করতে পারবে না, কেবল মনে দুঃখ পাবে।" “কে বললে, কিছু পারব না?” “না বাবা, সে কেউ পারবে না।—আহা! সােণার প্রতিমা আমার কালই জলে ভাসিয়ে দিতে হবে রে—” বলিয়া বুড়ী হঠাৎ মুখে কাপড় চাপা দিয়া কাদিয়া উঠিল। চন্দনদাস বুড়ীর হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল,-“আয়ি, আমি বেণের ছেলে, তাের গা ছুয়ে বলছি, মানুষের যা সাধ্য আমি তা করব। তাের নাতনীর কি বিপদ বল।” বুড়ী উত্তর দিবার পূর্বেই, বােধ করি তাহার ক্রন্দনের শব্দে আকৃষ্ট হইয়া সেই বিগতযৌবনা প্রহরিণী বাহির হইয়া আসিল, কর্কশ- কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল—“কাদছিস কেন রে, বুড়ী ? কি হয়েছে?” বুড়ী বিলক্ষণ বুদ্ধিমতি, তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া আমতা আমতা ২৩৪ চুয়াচন্দন করিয়া বলিল,-“কিছু নয় রে চাপা—অমনি। এই ছেলেটি দূর-সম্পর্কে আমার নাতি হয়, অনেক দিন পরে দেখলুম—তাই— চাপ চদনদাসের দিকে ফিরিল, বৃহৎ সুবর্ভুল চক্ষু তাহার মুখের উপর স্থাপন করিয়া বুড়ীর উদ্দেশে বলিল,-“হু-নাতি!-তাের নাতি আছে, আগে কখনও বলিস নি ত ?” বুড়ী কম্পিতস্বরে বলিল,-“বললুম না দূর-সম্পর্কে। আনার পিসতুত বােনের চাপা বলিল,-“বুঝেছি”—তারপর চন্দনদাসকে প্রশ্ন করিল,- “তােমাকে আজ পথে দেখেছি না ?” চন্দনদাস সটান মিথ্যাকথা বলিল,-“কৈ, না ! আমার ত মনে পড়ছে না!” চাপা তীক্ষ্ণ-চক্ষুতে আরও কিছুক্ষণ চন্দনদাসকে নিরীক্ষণ করিল, শেষে মুখে একটু হাসি আনিয়া বলিল,-“তবে আমারই ভুল। বুড়ী, তুই তা হলে তাের নাতির সঙ্গে কথা ক'—আমি একটু পাড়া বেড়িয়ে আসি। তাের নাতি আজ এখানে থাকবে ত? দেখিস, ছেড়ে দিনি যেন, এমন রসের নাতি কালেভদ্রে পাওয়া যায়।” বলিয়া চোখ ঘুরাইয়া বাহিরের দিকে প্রস্থান করিল। চাপা দৃষ্টিবহির্ভূত হইয়া গেলে চন্দনদাস জিজ্ঞাসা করিল,-“এটি বুড়ীর তখনও হৃৎকম্প দূর হয় নাই, সে বলিল,-“ও মাগী যমের দূত। বাবা, এমন ভয় হয়েছিল—এখনি টুটি টিপে ধরত। তুই যা দাদা, আর এখানে থাকিস নি। ওরে, তুই আমাদের কি ভাল করবি, ভগবান্ আমাদের ভুলে গেছেন। তুই এখান থেকে পালা, শেষে কি মায়ের নিধি বেঘােরে প্রাণ দিবি ?”

* চুয়াচন্দন ১৩৫, চন্দনদাস বলিল,-“সে কি ঠানদি, নাতিকে কি এমনি করেই তাড়াতে হয়? একটা পান পৰ্য্যন্ত দিতে নেই। তা ছাড়া চুয়া কিনতে এসেছি, চুয়া না দিয়েই তাড়িয়ে দিচ্ছিস? তুই কেমন বেণের মেয়ে ?” বুড়ী এবার হাসিয়া ফেলিল। এই ছেলেটির মুখের কথা যতই সে শুনিতেছিল, ততই তাহার মন ভিজিতেছিল। তাহার প্রাণের একান্তে বিদলিত মুহ্যমান আশা একটু মাথা তুলিল। তবে, কি এই শেষ সময়ে ভগবান্ মুখ তুলিয়া চাহিলেন? বুড়ী মনে ভাবিল,-যা হয় তা হয়, একবার শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিব । কে বলিতে পারে, হয়ত অভাগিনীর ভাগ্যে চরম দুর্গতি বিধাতা লেখেন নাই; নচেৎ নিরাশার গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে এই অপরিচিত বন্ধু কোথা হইতে আসিয়া জুটিল ? তখন বুড়ী সঙ্কল্প স্থির করিয়া বলিল,-“ও মা, সত্যি ত! চুয়ার কথা মনেই ছিল না। তা দেব দাদা—কিন্তু বড় দামী জিনিষ, দাম দিতে পারবে ত?” “দাম কত?” “জীবন যৌবন মন প্রাণ সব দিলেও সে জিনিষের দাম হয় না।” চন্দনদাস একটু অবাক হইল, কিন্তু হারিবার পাত্র সে নয়, বলিল,-- “আচ্ছা, আগে জিনিষ দেখি।” “এই যে দেখাই। ওলাে ও চুয়া, একবার এ দিকে আয়,ত দিদি।” . চন্দনদাস তড়িৎস্পৃষ্টের মত চমকিয়া উঠিল। তবে মেয়েটির নাম চুয়া! আর সে চুয়া কিনিতে এখানে আসিয়াছে। এ কি দৈব যােগাযােগ ! “কি বলছ ঠাদি”—বলিতে বলিতে চুয়া। অন্দরের দরজার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। চন্দনদাসকে দেখিয়া সে চমকিয়া বুকের উপর হাত রাখিল। চন্দনদাস সেই দিকেই তাকাইয়াছিল, দেখিল, চুয়ার কুমুদের মত ১৩৬ চুয়াচন্দন গাল দুটিতে কে যেন কঁচা সিদূর ছড়াইয়া দিল। তার পর ম্রিয়মাণ লজ্জায় তাহার চোখদুটি ধীরে ধীরে নত হইয়া পড়িল। চন্দনদাস বুঝিল, চুয়া তাহাকে চিনিতে পারিয়াছে ; পথের ক্ষণিক-দেখা মুগ্ধ পান্থকে ভূলে নাই। বুড়ী বলিল,-“চুয়া, অতিথি এসেছে ; একটু মিষ্টি মুখ করা, পাণ দে।” চুয়া মুখ তুলিল না, আস্তে আস্তে চন্দনদাসের সতৃষ্ণ চক্ষুর সম্মুখ হইতে সরিয়া গেল । কিছুক্ষণ কোনও কথা হইল না। চন্দনদাস দ্বারের দিকেই তাকাইয়া রহিল। শেষে বুড়ী বলিল,-“আমার চুকে দেখলে ?” “দেখলাম—আগেও যে দেখিয়াছে, তাহা আর, চন্দনদাস ভাঙিল না। বুড়ীও সে দিক্ দিয়া গেল না, বলিল—“কেমন মনে হ’ল ?” “মনে হ’ল-” সহসা চন্দনদাস বুড়ীর দিকে ঝুকিয়া ব্যগ্রকণ্ঠে বলিয়া উঠিল,-“ঠাদি, চুয়ার কি বিপদ, আমায় বল। কেন তােনাদের সবাই জাতে ঠেলেছে? ওর এখনও বিয়ে হয়নি কেন?” দ্বারের নিকট হইতে জবাব আসিল,-“কি হবে তােমার শুনে ?” এক হাতে ফুল-কাসার ছােট রেকাবির উপর চারখানি বাতাস ও দুটি পাণ, অন্য হাতে জলের ঘটি লইয়া চুয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। চন্দনদাসের শেষ কথাগুলি সে শুনিতে পাইয়াছিল'; শুনিয়া লজ্জায় ধিকারে তাহার মন ভরিয়া উঠিয়াছিল। কেন এই অপরিচিত যুবকের এত কৌতুহল ? তাহাকে বলিয়াই বা লাভ কি?—চুয়া রেকাবি ও ঘটি চন্দনদাসের সম্মুখে নামাইয়া আরক্ত-মুখে তীব্ৰ অধীর স্বরে বলিল,-“কে তুমি ? কোথা থেকে এসেছ? কি হবে তােমার আমাদের কথা শুনে ?” ক্ষণকালের জন্য চনদাস বিস্ময়ে হতবাক হইয়া রহিল ; তার পর উঠিয়া দাড়াইয়া চুয়ার মুখের উপর চোখ রাখিয়া শান্ত সংযত স্বরে বলিল,-“চুয়া, আমি তােমার স্বজাতি ; আমার বাড়ী, অগ্রদ্বীপ। •

চুয়াচন্দন
১৩৭
নবদ্বীপের ঘাটে আমার ডিঙ্গা বাধা আছে।
তােমার কি বিপদ, আমি
জানি না; কিন্তু আমি যদি তােমার সাহায্য করতে চাই, আমার সাহায্য
কি নেবে না?”
চুয়ার মুখ হইতে সমস্ত রক্ত নামিয়া গিয়া মুখখানা সাদা হইয়া গেল।
তাহার চোখে পরিত্রাণের ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা ও গণ-বিস্ফারিত আশার
আলো ফুটিয়া উঠিল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য তাহার মুখ দিয়া কথা বাহির
হইল না। তার পর সে রুদ্ধস্বরে বলিয়া উঠিল,-“কেন আমাকে মিছে
আশা দিচ্ছ ?” বলিয়া দাতে ঠোট চাপিয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।
৪
চন্দনদাস বসিয়া পড়িল। কিয়ৎকাল বসিয়া থাকিয়া অন্যমনস্কভাবে
একখানা বাতাসা তুলিয়া লইয়া মুখে দিল ; তার পর আলগােছে ঘটির
জল গলায় ঢালিয়া জলপান করিল। শেষে পাণদুটি মুখে পূরিয়া বুড়ীর
দিকে তাকাইয়া মৃদুহাশ্যে বলিল,-“ঠাদি, এবার তােমার গল্প বল।”
“বলব, কিন্তু তুমি আগে একটা কথা দাও।”
“কি ?
তুমি ওকে উদ্ধার করবে ?”
“করব। অন্ততঃ প্রাণপণে চেষ্টা করব।
“বেশ, উদ্ধার করা মানে ওকে এ দেশ থেকে নিয়ে পালাতে হবে।
পারবে ?”
“পারব-খুব পারব।”
“ভাল, কিন্তু তার পর ?”
“তার পর কি ?”

১৮ চুয়াচন্দন বুড়ী একটু দ্বিধা করিল; শেষে বলিল,-“কিছু মনে করাে না, সব কথা স্পষ্ট করে বলাই ভাল। তুমি জোয়ান ছেলে, চুয়াও যুবতী মেয়ে, তুমি ওকে চুরি করে নিয়ে যাবে। তার পর ?” চন্দনদাস জিজ্ঞাসুনেত্রে চাহিয়া রহিল। বুড়ী তখন স্পষ্ট করিয়া বলিল,-“ওকে বিয়ে করতে পারবে ?” চন্দনদাসের চোখের সম্মুখে যেন একট নূতন আলাে জ্বলিয়া উঠিল ; সে উদ্ভাসিত-মুখে বলিল,-“পারব।” “তােমার বাপ- মা-” “তাঁরা আমার কথায় অমত করবেন না।” বৃদ্ধা কম্পিত স্বরে বলিল,--“বেঁচে থাকো দাদা, তুমি বড় ভাল ছেলে। কিন্তু ছুড়ীর যা কপাল- বুড়ী তখন চুয়ার কাহিনী বলিতে আরম্ভ করিল। চন্দনদাস করতলে কপােল রাখিয়া শুনিতে লাগিল। শুনিতে শুনিতে সে টের পাইল, চুয়া কখন্ চুপি চুপি আসিয়া দ্বারের পাশে দাঁড়াইয়াছে। চুয়ার বাপের নাম কাঞ্চনদাস। বেণেদের মধ্যে সে বেশ সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ ছিল। চুয়ার বয়স যখন সাত বৎসর, তখন কাঞ্চনদাস বাণিজ্যের জন্য নৌকা সাজাইয়া সমুদ্রযাত্রা করিল। কাঞ্চনদাসের নৌকা গঙ্গার বাঁকে অদৃশ্য হইয়া গেল—আর ফিরিল না। সংবাদ আসিল, নৌকাডুবি হইয়া কাঞ্চনদাস মারা গিয়াছে। এই ঘটনার এক বৎসর পরে চুয়ার মাও মরিল। তখন বুড়ী ছাড়া চুয়াকে দেখিবার আর কেহ রহিল না। বুড়ী কাঞ্চনদাসের মাসী -আট বছর বয়স হইতে সে হাতে করিয়া চুয়াকে মানুষ করিয়াছে। 1. নৌকাডুবিতে কাঞ্চনদাসের সমস্ত সম্পত্তিই ভরা-ডুবি হইয়াছিল ;

চুয়াচন্দন ১৩৯, কেবল এই ভদ্রাসনটি বাঁচিয়াছিল। বুড়ী দোকান করিয়া কষ্টে সংসার চালাইতে লাগিল। এই ভাবে বৎসরাধিক কাল কাটিল। চুয়ার বয়স যখন দশ বছর, তখন এক গৃহস্থের ছেলের সঙ্গে তার বিবাহের সন্ধ হইল। এই সময় এক দিন জমিদারের ভ্রাতুস্পুত্র ঘােড়ায় চড়িয়া এই পথ দিয়া যাইতেছিল। চুয়াকে বাড়ীর সম্মুখে খেলা করিতে দেখিয়া সে ঘােড়া হইতে নামিল। দুর্দান্ত জমিদারের মহাপাষণ্ড ভাইপাে মাধবের নাম শুনিয়া দেশের লােক ত দূরের কথা, কাজী সাহেব পৰ্যন্ত থর থর করিয়া কঁপে। রাজার শাসন-সমাজের শাসন কিছুই সে মানে না। জাতিতে ব্রাহ্মণ হইলে কি হয়, স্বভাব তার চণ্ডালের মত। সে দশ বছরের চুয়াকে চিবুক তুলিয়া ধরিয়া দেখিল, তার পর বাড়ীতে আসিয়া তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিল। বুড়ী ভয়ে ভয়ে পরিচয় দিল। শুনিয়া মাধব বলিল, এ মেয়ের বিবাহ দেওয়া হইবে না, ইহাকে দৈবকার্যের জন্য মানত করিতে হইবে । ষােল বছর বয়স পর্যন্ত মেয়ে কুমারী থাকিবে, তার পর মাধব আসিয়া তাহাকে লইয়া যাইবে। তান্ত্রিক সাধনায় উত্তরসাধিকার স্থান অধিকার করিয়া কন্যার ষােল বছরের কৌমাৰ্য্য সার্থক হইবে। সাধক-- স্বয়ং মাধব। এই হুকুমজারি করিয়া মাধব প্রস্থান করিল। বাড়ীতে কান্নাকাটি পড়িয়া গেল ; তান্ত্রিক সাধনার গৃঢ় মর্মার্থ বুঝিতে কাহারও বাকি রহিল । বক্সিমাজ মাধবের বিরুদ্ধে কিছু করিতে সাহস করিল না, তাহারা চুয়াকে জাতিচ্যুত করিল। বিবাহও ভাঙিয়া গেল। ক্রমে চুয়ার বয়স বাড়িতে লাগিল-বারাে বছর বয়স হইল। বুড়ী দেশে কাহারও নিকট সাহায্য না পাইয়া শেষে চুয়াকে লইয়া দেশ ছাড়িয়া পলাইবার, মতলব করিল। কিন্তু বুড়ীর হাতে পয়সা কম, আত্মীয়বন্ধুরও p ;

-১৪০ চুয়াচন্দন একান্ত অভাব। হার মতলব সিদ্ধ হইল না ; মাধবের কাণে সংবাদ গেল। মাধব আসিয়া বুড়ীকে পদাঘাত মুষ্ট্যাঘাত দ্বারা শাসন করিল ; পর চুয়াকে পাহারা দিবার জন্য চাপাকে পাঠাইয়া দিল। নাপিত-কন্যা চাপা চুয়ার অভিভাবিকাপদে অধিষ্ঠিত হইল। চাপা বয়সকালে তান্ত্রিক সাধন-ভজন করিয়াছিল, এখন যৌবনান্তে ধর্মকর্ম ত্যাগ করিয়াছে। সে চুয়া ও বুড়ীর উপর কড়া নজর রাখিতে লাগিল। এইভাৰে চারি বৎসর কাটিয়াছে কয়েক দিন আগে মাধব আসিয়াছিল। সে চুয়াকে দেখিয়া গিয়াছে এবং বলিয়া গিয়াছে যে, আগামী অমাবস্যার রাত্রিতেই চুয়াকে দৈবকাৰ্য্যে উৎসর্গ করিতে হইবে -সে জন্য যেন সে প্রস্তুত থাকে। অনুষ্ঠানের যাহাতে কোনও ত্রুটি না হয়, এ জন্য মাধব নিজেই সমস্ত বিধান দিয়া গিয়াছে। অমাবস্যার সন্ধ্যার সময় চুয়া গঙ্গার ঘাটে গিয়া স্নান করিবে ; স্নানান্তে রক্তবস্ত্র, জবামাল্য ও রক্তচন্দনের ফোটা পরিয়া ঘাট হইতে একেবারে সাধনস্থলে অর্থাৎ মাধবের উদ্যানবাটিকায় উপস্থিত হইবে। সঙ্গে ঢাক-ঢােল ইত্যাদি বাজিতে বাজিতে যাইবে। মাধব এইরূপ শাস্ত্রীয় ব্যবস্থা দিয়া চলিয়া যাইবার পর পাঁচ দিন কাটিয়া গিয়াছে। আজ”কৃষ্ণ চতুর্দশী- কাল অমাবস্যা। গল্প শেষ করিয়া বুড়ী কাদিতে দিতে বলিল,-“দাদা, সব কথা তােমায় বললুম। এখন দেখ যদি মেয়েটাকে উদ্ধার করতে পার। তুমি ছাড়া ওর আর গতি নেই।” গল্প শুনিতে শুনিতে চন্দনদাসের বুকের ভিতরটা জ্বালা করিতেছিল, ঐ দানব-প্রকৃতি লােকটার বিরুদ্ধে ক্রোধ ও আক্রোশ অগ্নিশিখার মত তাহার দেহকে দাহ করিতেছিল। সে দাতে দাতে চাপিয়া বলিয়া উঠিল, চুয়াচন্দন ১৪১ -“আমি যদি চুয়াকে বিয়ে ক'রে কাল আমার নৌকায় তুলে দেশে নিয়ে যাই-কে কি করতে পারে ?” দ্বারের আড়ালে চুয়ার বুক দুরু দুরু করিয়া উঠিল। কিন্তু বুড়ী মাথা নাড়িয়া ক্ষুব্ধস্বরে বলিল,-“তা হয় না দাদা। চাপা রাক্ষুসী আছে- সে কখনই হতে দেব না।” চন্দনদাস বলিল,-“চাপাকে সােণায় মুড়ে দেব। তাতে রাজি না হয়, মুখে কাপড় বেঁধে ঘরে বন্ধ করে রাখব।” বুড়ী কঁপিতে লাগিল, এভখানি দুঃসাহস তাহার পক্ষে কল্পনা করাও দুষ্কর। কিন্তু বুড়ীর প্রাণে আশা জাগিয়াছিল, আশা একবার জাগিলে সহজে মরিতে চায় না। তবু বুড়ী কাপিতে কঁপিতে বলিল,-“সে যেন হ’ল, কিন্তু বিয়ে হবে কি করে? বিয়ে দেবে কে ?” “কেন-নদেয় কি পুরুত নেই ?” বৃদ্ধা মাথা নাড়িয়া বলিল,-“তুমি মাধবকে জানে না। তার ভয়ে কোনও বামুন রাজি হবে না।” চন্দনদাস আশ্চৰ্য্য হইয়া বলিল,-“এখানকার বামুনরা এত ভীরু ?” “কার ঘাড়ে দশটা মাথা আছে দাদা যে, জমিদারের ভাইপাে’র শত্রুতা করবে ? তবে শুনেছি, জগন্নাথ ঠাকুরের ছেলে নিমাই পণ্ডিত বড় ডাকাবুকো ছেলে, কাউকে ভয় করেন না। বয়স কম কিনা!—কিন্তু তিনি কি রাজি হবেন ?” চন্দনদাস মহা উৎসাহে দাড়াইয়া উঠিয়া বলিল,-“ভাল মনে করিয়ে দিয়েছ, ঠানদি,—নিমাই পণ্ডিতই উপযুক্ত লােক। তাকে আমি আজ গঙ্গাঘাটে দেখেছি; ঠিক দেবতার মত চেহারা—তিনি নিশ্চয় রাজি হবেন।-ঠান্‌দি, আমি এখন তার খোঁজে চললাম, ওবেলা সব ঠিক করে আবার তাসব। তখন • ১৪২ চুয়াচন্দন “কিন্তু তিনি যদি রাজি না হন ?” চনদাস চিন্তা করিল,—“যদি রাজি না হন — তিনি রাজি হােন বা না হােন, রাত্রিতে কোনও সময় আমি আসবই।-নাই বা হ’ল বিয়ে ? আজ রাত্রিতে চুয়াকে চুরি করে নিয়ে যাব। তারপর দেশে গিয়ে বিয়ে করব-কি বল ?” বুড়ীর মুখে আশঙ্কার ছায়া পড়িল। চন্দনদাসের যে কোনও দুরভিসন্ধি নাই, তাহা সে অন্তরে বুঝিতেছিল ; কিন্তু তবু–চন্দনদাস একেবারে অপরিচিত । সেও যে একজন ধূৰ্ত্ত প্রবঞ্চক নয়, তাহা বুড়ি কি করিয়া জানিবে? বারবার দাগ পাইয়া বুড়ীর মন বড় সন্দিগ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। সে ইতস্ততঃ করিতে লাগিল। এই সময় চুয়া দরজার আড়াল হইতে বাহির হইয়া আসিল। সংশয় সঙ্কোচ করিবার তাহার আর সময় ছিল না। এক দিকে অবশ্যম্ভাবী সর্বনাশ, অন্যদিকে সম্ভাবনা। চুয়া সজল চক্ষু চন্দনদাসের মুখের উপর রাখিয়া কম্পিতকণ্ঠে কহিল,—“তুমি আজ রাত্তিরে এসাে৷ নিমাই পণ্ডিত যদি রাজি না হন, তবু, তােমার ধর্মের ওপর বিশ্বাস করে আমি তােমার সঙ্গে যাব।” চন্দনদাসের বুক নাচিয়া উঠিল। সে আনন্দের উচ্ছাসে কি বলিতে যাইতেছিল—এমন সময় বাধা পড়িল। গলির মধ্যে দ্রুত অশ্বখুর-ধ্বনি শুনা গেল। চুয়া একটা আর্ত চীৎকার গলার মধ্যে রােধ করিয়া ছুটিয়া পলাইয়া গিয়া ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া, চুয়াচন্দন ১৪৩ দিল । বুড়ী থরথর করিয়া কঁপিয়া দুই হাটুর মধ্যে মুখ গুজিয়া বসিয়া পড়িল। পরক্ষণেই এক জন অশ্বারূঢ় ব্যক্তি বাড়ীর সম্মুখে আসিয়া ঘােড়! থামাইল। লােকটার গায়ে লালরঙের কোর্তা, কোমরে তরবারি, মাথায় পাগ নাই, ঝাঁকড়া রুক্ষ চুল কঁধ পর্যন্ত পড়িয়াছে ; কপালে প্রকাণ্ড একটা সিন্দুরের ফোটা ফোটার নীচে বিশাল ভাঁটার মত চোখ দুটাও প্রায় অনুরূপ রক্তবর্ণ। মুখে ঘনকৃষ্ণ গোঁফ এবং গালে গালপাট্টা। বয়স বােধ করি পঁয়তাল্লিশ । এই ভীষণাকৃতি লােকটার মুখের প্রতি অবয়বে যেন জীবনব্যাপী দুস্কৃতি ও পাপ পঙ্কিল রেখায় অঙ্কিত হইয়া আছে। এমন দুষ্কাৰ্য্য নাই- যাহা সে করে নাই; এমন মহাপাতক নাই—যাহা সে করিতে পারে না। একটা ঘৃণার শিহরণ চন্দনদাসের দেহের উপর দিয়া বহিয়া গেল ; সে চিনিল, ইনিই জমিদারের দুর্দান্ত ভ্রাতুস্পুত্র মাধব। মাধব একলাফে ঘােড়া হইতে নামিয়া ঘােড়া ছাড়িয়া দিয়া দালানের উপর উঠিল। সম্মুখেই চন্দদাস ; রক্তচক্ষু দ্বারা আপাদ-মস্তক তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া স্বভাবকর্কশ ভয়ঙ্কর সুরে মাধব প্রশ্ন করিল—“তুই কে?” চন্দনদাসের ইচ্ছা হইল, মাধবের দম্ভীত পৈশাচিক মুখে একটা লাথি মারে; কিন্তু সে তাহা করিল না। তাহার মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মত চিন্তাকাৰ্য চলিতেছিল। মাধবের অভাবনীয় আবির্ভাবে তাহার সমস্ত মতলব পণ্ড হইয়া গিয়াছিল ; সে ভাবিতেছিল, এ অবস্থায় কি করিলে সব দিক্‌ রক্ষা হয়? মাধবের সঙ্গে একটা গণ্ডগােল বাধাইলে লাভ হইবে না, বরং বিশেষ অনিষ্টের সম্ভাবনা। উপস্থিত ক্ষেত্রে কোনও হাঙ্গামা না করিয়া অপহৃত হওয়াই সুবিবেচনার কাজ। অথচ এই পাষণ্ডটার মুখ দেখিলে ও কথা শুনিলে মেজাজ ঠিক রাখা দুষ্কর। চুয়ার ।

১৪৪ চুয়াচন্দন সৰ্ব্বনাশ করিবার জন্যই এই নরপশু তাহাকে ছয় বৎসর জিয়াইয়া রাখিয়াছে, ভাবিতে চন্দনদাসের চোখের দৃষ্টি পৰ্য্যন্ত রক্তাভ হইয়া উঠিল। তবু সে যথাসাধ্য আত্মদমন করিয়া মাধবের কথার উত্তর দিল, বলিল, “সে খোঁজে তােমার দরকার কি?” মাধৰ একটা অকথ্য গালি দিয়া বলিল, “তুই এখানে কি চাস?” চন্দনদাস আৰু ধৈৰ্য্য রক্ষা করিতে পারিল না, তাহার মাথায় খুন চাপিয়া গেল। সে প্রত্যুত্তরে মাধবের নাসিকায় বজ্রসম কিল বসাইয়া দিয়া বলিল, “এই চাই।” এই নিরীহ-দর্শন যুবকের নিকট হইতে মাধব এত বড় দুঃসাহসিক কাৰ্য একবারে প্রত্যাশা করে নাই, সে সরিষার ফুল দেখিয়া মাটিতে বসিয়া . পড়িল। চন্দনদাস দেখিল, আর বিলম্ব করা সমীচীন নয় ; সে নিরস্ত্র, মাধবের কোমরে তরবারি রহিয়াছে। ঘােড়াটা সম্মুখেই দাড়াইয়াছিল, সে দালান হইতে লাফ দিয়া তাহার পিঠে চড়িয়া বসিল। এই সময় মাধব ষণ্ডের মত গর্জন করিয়া কোমর হইতে তরবারি বাহির করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু তাহার নাগালে পৌছিবার পূর্বেই চন্দনদাস তেজী ঘােড়ার পেট দুই পায়ে চাপিয়া ধরিয়া সবেগে ঘােড়া ছুটাইয়া দিল। = কেহ কেহ লুকাইয়া পাপাচরণ করে। কিন্তু ধর্ম ও সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া পাশবিক বলে প্রকাশ্যভাবে পাপানুষ্ঠান করিতে যাহারা অভ্যস্ত, তাহাদের অপরাধ-ক্লান্ত জীবনে এমন অবস্থা আসে, যখন কেবল মাত্র রমণীর সর্বনাশ করিয়া আর তাহারা তৃপ্তি পায় না। তখন তাহারা চুয়াচন্দন ১৪৫ পাপাচারের সহিত পম্মের ভণ্ডামি মিশাইয়া তাহাদের দুস্কার্যের মধ্যে এক প্রকার নূতন রস ও বিলাসিতা সঞ্চারের চেষ্টা করে। মাধব এই শ্রেণীর চন্দনদাস তাহারই ঘােড়ায় চড়িয়া তাহাকে ফাকি দিয়া পলায়ন করিবার পর মাধব নিস্ফল আক্রোশে আর কাহাকেও সম্মুখে না পাইয়া বুড়ীকে ধরিল ; বুড়ীর চুলের মুঠি ধরিয়া তলােয়রি দিয়া তাহাকে কাটিতে উদ্যত হইল। কিন্তু কাটিতে গিয়া তাহার মনে হইল, বুড়ীকে নারিলে হয় ত সেই ধৃষ্ট যুবকের পরিচয় অজ্ঞাত রহিয়া যাইবে। কিল খাইয়া কিল চুরি করিবার লােক মাধব নয় ; তখনও তাহার নাকের রক্তে গোঁফ ভাসিয়া যাইতেছিল। সে বুড়ীর চুল ধরিয়া টানিতে টানিতে ভিতরে লইয়া চলিল। আঙ্গিনার মাঝখানে বুড়ীকে আছড়াইয়া ফেলিয়া তাহার শীর্ণ হাতে একটা মােচড় দিয়া মাধব বলিল, “হারামজাদি বুড়ী, ও ছেড়া তাের কে বল।” পূৰ্বেই বলিয়াছি, বুড়ী বুদ্ধিমতী ; তাই ভয়ে প্রাণ শুকাইয়া গেলেও তাহার চিন্তা করিবার শক্তি ছিল। সে বুঝিয়াছিল, কোনও কথা না বলিলেও প্রাণ যাইবে এবং ষড়যন্ত্র প্রকাশ করিয়া ফেলিলেও প্রাণ যাইবে; সুতরাং মধ্যপথ অবলম্বন করাই যুক্তি। সর্বনাশ উপস্থিত হইলে পণ্ডিতগণ অর্ধেক ত্যাগ করেন, বুড়িও তেমনই ষড়যন্ত্রের অংশটা বাদ দিয়া আর সব সত্য কথা বলিবে স্থির করিল। তাহাতে আর কিছু না হউক, মাধবের হাতে প্রাণটা বাচিয়া যাইতে পারে । বুড়ী তখন অকপটে চন্দনদাসের যতটা পরিচয় জানিতে পারিয়াছিল, তাহা মাধবের গােচর করিল। চাপা পাছে অনর্থক হাঙ্গামা করে, এই ভয়ে মিছামিছি চন্দনদাসকে নাতি বলিয়া পরিচিত করিয়াছিল, তাহাও ১৪৬ চুয়াচন্দন স্বীকার করিল। কাদিতে দিতে, অনেক মাথার দিব্য চোখের দিব্য দিয়া বলিল যে, চন্দনদাসকে সে পূর্বে কখনও দেখে নাই, আজ প্রথম সে তাহার দোকানে আসিয়া মিষ্ট কথায় তাহার সহিত আলাপ করিতে আরম্ভ করে। তাহার কোনও দুরভিসন্ধি ছিল কি না, তাহাও বুড়ির অজ্ঞাত। চাপা মাধবের বাড়ীতে খবর দিতে গিয়াছিল, এতক্ষণে এক ঝাঁক পাইক সঙ্গে লইয়া • পদব্রজে ফিরিল। পাইকদের হাতে সড়কী, ঢাল ; জাতিতে তেঁতুলে বাগদী। ইহাদেরই বাহুবলে মাধব দেশটাকে সন্ত্রস্ত করিয়া রাখিয়াছিল। প্রভু ও ভৃত্যে অংস্থাভেদ ছাড়া প্রকৃতিগত পার্থক্য বিশেষ ছিল না। বুড়ীকে নানা প্রশ্ন করিয়া শেষে বােধ হয় মাধব তাহার গল্প বিশ্বাস করিল। চাপা যাহা বলিল, তাহাতে বুড়ীর কথা সমথিত হইল। ছাড়া মাধবের রক্তচক্ষুর সম্মুখে বুড়ি মিথ্যা কথা বলিবে, ইহাও দান্তিক মাধব বিশ্বাস করিতে পারে না। সে এদিক-ওদিক তাকাইয়া বলিল, “তাের নাতিনী কোথায় ?” বুড়ি বলিল; ‘ঘরেই আছে বাবা।” মাধব চাপাকে হুকুম করিল, “দেখে আয়।” চাপা দেখিয়া আসিয়া বলিল, চুয়া ঘরেই আছে বটে । মাধবের তখন বিশ্বাস জন্মিল, চুয়া সম্বন্ধে ভয়ের কোনও কারণ নাই । তবু সে দুইজন পাইককে বুড়ীর বাড়ী পাহারা দিবার জন্য নিযুক্ত করিল, বলিল,-“কাল সন্ধ্যে পর্যন্ত এ বাড়ীতে কাউকে ঢুকতে দিবিনে। যদি কেউ ঢুকতে চায়, তার গলায় সড়কি দিবি।” এইপে বাড়ীর সুব্যবস্থা করিয়া মাধব বাহিরে আসিল। এই সময় একবার তাহার মনে হইল, আর বৃথা দেরী ন! করিয়া আজই চুয়াকে নিজের প্রমােদ-উদ্যানে টানিয়া লইয়া যায়। কিন্তু তাহা হইলে এত বৎসর ধরিয়া যে চরম বিলাসিতার চুয়াচন্দন ১৪৭ আয়ােজন করিয়াছে, তাহা ব্যর্থ হইয়া যাইবে। মাধব নিরস্ত হইল ! তৎপরিবর্তে যে স্পদ্ধিত বেণের ছেলেটা তাহার গায়ে হাত তুলিতে সাহস করিয়াছে, তাহার নৌকা লুঠ করিয়া তাহাকে নিজের চক্ষুর সম্মুখে কোমর পর্যন্ত মাটীতে পুতিয়া কুকুর দিয়া খাওয়াইবার আয়ােজনে দিনটা সদ্ব্যয় করিতে মনস্থ করিল । এটাও একটা মন্দ বিলাসিতা নয়। বাহিরে আসিয়া মাধব তাহার সর্দার পাইককে বলিল,-“বদন, তুই তুই দশ জন পাইক নিয়ে গঙ্গাঘাটে যা। সেখানে চন্দনদাস বেণের নৌকা আটক কর। আমি যাচ্ছি।” আমি যাচ্ছি।”, বলিয়া আর এক জন পাইককে সােড় আনিতে পাঠাইল। বদন সর্দার প্রভুর আজ্ঞা শিরােধার্য্য করিয়া যখন ঘাটে পৌছিল, তখন চন্দনদাসের নেকা দুখানি ভাগীরথীর বক্ষে শুভ্র পাল উড়াইয়া উজান বহিয়া চলিয়াছে ; বহুপদবিশিষ্ট বিরাট জল-পতঙ্গের মত তাহাদের দাড়গুলি যেন গঙ্গার উপর তালে তালে পা ফেলিতেছে। ৭ ওদিকে চন্দনদাস তীরবেগে ঘােড়া ছুটাইয়া দিয়াছিল । দ্বিপ্রহর অতীত হইয়া গিয়াছে, পথে লােকজন কম। চন্দনদাস পাবমান ঘােড়ার পিঠে বসিয়া চিন্তা করিতেছিল—এখন কর্তব্য কি ? প্রথমতঃ চুয়াকে রক্ষা করিতে হইবে। মাধবের নাকে কিল মারার ফলে তাহার ক্রোপ কোন পথ লইবে, অনুমান করা কঠিন ; মাধব চুয়ার কথা ভুলিয়া তাহার প্রতি ধাবমান হইতে পারে ; তাহাতে চুয়া কিছুক্ষণের জন্য রক্ষা পাইবে। দ্বিতীয়তঃ তাহার নৌকা বাঁচাইতে হইবে। ক্রোধান্ধ মাধব প্রথমে ১৪৮ চুয়াচন্দন ; তাহাকেই ধরিতে আসিবে ; তখন তাহার অমূল্য পণ্য ও সােনাদানায় বােঝাই নৌকা লুষ্ঠিত হইবে। মাধব রেয়াৎ করিবে না। ঘাটে পৌছিবার পূর্বেই চন্দনদাস কর্তব্য স্থির করিয়া ফেলিল। অখ-শাখায় ঘােড় বাঁধিয়া সে দ্রুতপদে নৌকায় গিয়া উঠিল ; দেখিল, মাঝি-মাল্লারা আহার করিতে বসিয়াছে। চন্দনদাস সর্দার মাঝিকে ডাকিয়া পাঠাইয়া বলিল,-“এখনি নৌকা খুলতে হবে।” হতবুদ্ধি মাঝি বলিল,-“এখনি? কিন্তু “শােননা, তর্ক করবার সময় নেই। এই দণ্ডে নৌকা খােলল—পাল আর পাড় দুই লাগাও। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত যতদূর সম্ভব উজান বেয়ে যাবে, তারপর গাঙ্গের মাঝখানে নােঙ্গর ফেলবে। আমি যতদিন না ফিরি সেই খানে অপেক্ষা করবে। বুঝলে?” “আপনি সঙ্গে যাবেন না ?” ‘না। এখন যাও, আর দেরী করাে না। যতদিন আমি না ফিরি, সাবধানে নৌকা পাহারা দিও।” ‘যে আজ্ঞা বলিয়া প্রাচীন মাঝি চলিয়া গেল। মুহূর্ত পরে দুই নৌকার মাঝি-মাল্লার হাঁকডাক ও পালতােলার হুড়াহুড়ি আরম্ভ হইল। এই অবকাশে চন্দনদাস নৌকার পশ্চাতে মাণিকভাণ্ডারে গিয়া কিছু জিনিষ সংগ্রহ করিয়া লইল। প্রথমে সিন্দুক হইতে মােহর-ভরা একটা সর্পাকৃতি লম্বা থলি বাহির করিয়া কোমরে জড়াইয়া লইল। যে কাৰ্যে যাইতেছে, তাহাতে কত অর্থের প্রয়ােজন কিছুই স্থিরতা নাই; অথচ বােঝ বাড়াইলে চলিবেনা। চন্দনদাস ভাবিয়া চিন্তিয়া একছড়া মহামূল্য সিংহলী মুক্তার হার গলায় পরিয়া লইল। যদি মােহরে না কুলায়, হার বিক্রয় করিলে যথেষ্ট অর্থ পাওয়া যাইবে। এ ছাড়া আরও দুইটা জিনিষ চনদাস সঙ্গে লইল। একটা ইস্পাতের চুয়াচন্দন ১৪৯ উপর সােনার কাজ করা ছােট ছােরা ; এটি সে কোচিনে এক আরব বণিকের নিকট কিনিয়াছিল। দ্বিতীয়,—এক কাফ্রির উপহার একটি লােহার কটা। কৃষ্ণবর্ণ দ্বিভুজ লােহার কাটা, সেকালে সৌখীন স্ত্রী পুরুষ এইরূপ কাটা চুলে পরিত। এই কটার বিশেষত্ব এই যে, ইহার তীক্ষ অগ্রভাগ শরীরের কোনও অংশে ফুটিলে তিনবার নিশ্বাস ফেলিতে যতক্ষণ সময় লাগে, ততক্ষণের মধ্যে মৃত্যু হইবে।' চন্দনদাস কাটার সূক্ষ্মাগ্র সােনার খাপে ঢাকিয়া সাবধানে নিজের চুলের মধ্যে গুজিয়া লইল। নৌকা হইতে নামিয়া চন্দনদাস নগরের ভিতর দিয়া আবার হাটিয়া চলিল। ঝ"-ঝ। দ্বিপ্রহর, আশে-পাশে দোকানের মধ্যে দোকানী নিদ্রালু ; মধ্যাকাশ হইতে সূৰ্য্যদেব প্রখর রৌদ্র ঢালিয়া দিতেছেন। গাছ-পালা পর্যন্ত নিঝুম হইয়া পড়িয়াছে মানুষ গৃহতলের ছায়ার আশ্রয় লইয়াছে। কিছুদূর যাইবার পর একটা মােড়ের মাথায় পৌছিয়া চন্দনদাস এবার কোন পথে যাইবে ভাবিতেছে, এমন সময় তাহার চোখে পড়িল, একটা নয়- দশ বছরের কটিবাস পরিহিত শীর্ণকায় বালক প্রচণ্ড মার্তণ্ড-ময়ূখ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া পথের মধ্যে একাকী ডাণ্ডাগুলি খেলিতেছে। চন্দনদাস হাতছানি দিয়া তাহাকে ডাকিল। বালক ক্রীড়ায় বিরাম না দিয়া, যষ্টির আঘাতে ক্ষুদ্র কাষ্ঠখণ্ডটিকে চন্দনদাসের দিকে তাড়িত করিতে করিতে তাহার সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। তারপর প্রবীণের মত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চন্দনদাসের বেশভূষা নিরীক্ষণ করিয়া বলিল,-“সওদাগর ! সমুদুর থেকে আসছ-ন্যা?” বালকের ভাষা ও বাক্প্ৰণালী অতি অদ্ভুত-আমরা তাহা সরল ও সহজ-বােধা করিয়া দিলাম।

চুয়াচন্দন
চন্দনদাস বলিল,-“ই।। নিমাই পণ্ডিতের বাড়ী কোথায় জানিস্ ?”
বালক বলিল,-“হিঃ-জানি।”
“আমাকে সেখানে নিয়ে চল।”
বালকের ধূর্ত মুখে একটু হাসি দেখা দিল, সে এক চক্ষু মুদিত করিয়া
বলিল,-“ডাংগুলি খেছি যে।
“পয়সা দেব।”
আকর্ণ দন্তবিকাশ করিয়া বালক হাত পাতিল,-“আগে দাও!”
চন্দনদাস তাহাকে একটা কপর্দক দিল, তখন সে আবার ডাংগুলি
খেলিতে খেলিতে পথ দেখাইয়া লইয়া চলিল।
বেশীদূর যাইতে হইল না ; নিম্ববৃক্ষচিহ্নিত একটা বাড়ী যষ্টি-নির্দেশে
দেখাইয়া দিয়া বালক প্রস্থান করিতেছিল; চন্দনদাস তাহাকে ফিরিয়া
ডাকিল, বলিল,-“তুই যদি আর একটা কাজ করতে পারি, তােকে
চারটে পয়সা দেব।”
••
“কি ?”
‘কাঞ্চন বেণের বাড়ী জানিস ?”
বালকের চক্ষু
চক্ষু -
উজ্জ্বল হইল,-“চুয়া ? মায়ের
মায়ের কৈ মাছ ?
জানি।--হি হি!”
চন্দনদাসের ইচ্ছা হইল, অকালপক্ক ছোড়ার গালে একটা চপেটাঘাত
করে ; কিন্তু সে কষ্টে ক্রোধ সম্বরণ করিয়া বলিল,-“হ চুয়া। শােন্,
তার বাড়ীর সামনে দিয়ে যাবি, কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করবি না, কেবল
দেখে আসবি, সেখানে কি হচ্ছে। পারবি?”
বালক বলিল,-“হিঃ-পয়সা দাও।”
চন্দনদাস মাথা নাড়িয়া বলিল,-“না, আগে খবর নিয়ে আবি,
তবে পয়সা পাবি। আমি এইখানেই থাকব।”

চুয়াচন্দন বালক – কুঞ্চিত করিয়া মনে মনে গবেষণা করিল, চন্দনদাসকে বিশ্বাস করা যাইতে পারে কি না ? শেষে ঘাড় নাড়িয়! সম্মতি জানাইয়া পূৰ্ব্ববৎ ডাংগুলি খেলিতে খেলিতে প্রস্থান করিল। চন্দনদাস তখন নিমাই পণ্ডিতের গৃহে প্রবেশ করিল। সম্মুখেই টোলের আটচালা ; ছাত্ররা কেহ নাই, নিমাই পণ্ডিত একাকী বসিয়া আছেন। তাহার কোলে তুলটের একখানি নুতন পুথি ; পাশে লেখনী ও মসীপাত্র। চন্দনদাসের পদশব্দে নিমাই পণ্ডিত মুখ তুলিলেন ; প্রশান্ত বিশাল চক্ষু হইতে শা-চিন্তজনিত স্বাচ্ছন্নতা দূর করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—“কাকে চান্?” চন্দনদস বলিল,-“নিমাই পণ্ডিতকে ” ‘আমিই নিমাই পণ্ডিত।” পাদুকা খুলিয়া চন্দন দাস গিয়! নিমাই পণ্ডিতকে প্রণাম করিল। নিমাই পণ্ডিত বয়সে তাহার অপেক্ষা ছােট হইলেও ব্রাহ্মণ। তুলসী পাতার ছােট বড় নাই। নিমাই পণ্ডিত প্ৰণাম গ্রহণ করিয়া বলিলেন,---“দেখেছি বলে মনে, হচ্ছে—আপনিই কি আজ দুখানি নােক নিয়ে সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরেছেন ?” চন্দনদাস বিনীতভাবে বলিল,-“আজ ই, আমিই।” নিমাই পণ্ডিত হাসিয়া বলিলেন,-“আজ আপনার মৌকার ঢেউয়ে নবদ্বীপের একটি অমূল্য রত্ন ভেসে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে রক্ষা করা গিয়েছে। যা হােক্, আপনি?” চন্দনদাস নিজের পরিচয় দিয়া শেষে করযােড়ে বলিল,-“আপনি নাহ্মণ এবং মহাপণ্ডিত, আমাকে ‘আপনি’ সম্বােধন কবৃলে আমার অপরাধ হয়।”

১৫২ চুয়াচন্দন নিমাই পণ্ডিত বলিলেন,—“বেশ, কি ব্যাপার বল ত?” চন্দনদাস বলিল,-“একটা কাজে আপনার সাহায্য চাইতে এসেছি। নবদ্বীপে কাউকে আমি চিনি না, কেবল আপনার নাম শুনেছি। শুনেছি, আপনি শুধু অপরাজেয় পণ্ডিত নন, সংকাৰ্য্য করবার সাহসও আপনার অদ্বিতীয়। আমাকে সাহায্য করবেন কি ?” নিমাই পণ্ডিত বুঝিলেন, বণিকতনয় আজ গুরুতর কোনও কাজ আদায় করিতে আসিয়াছে, মৃদুহাস্যে বলিলেন,-“তােমার নম্রতা আর বিনয় দেখে ভয় হচ্ছে। যা হােক, প্রস্তাবটা কি শুনি।” চন্দনদাসও হাসিল ; বুঝিল, নিমাই পণ্ডিতকে মিষ্ট চাটুকথায় বিগলিত করা চলিবেনা, তাহার সহিত অকপট ব্যবহার করাই শ্রেয়। সে ক্ষণেক চিন্তা করিয়া বলিল,-“আপনি কাঞ্চনবেণের মেয়ে চুয়াকে জানেন ?” নিমাই পণ্ডিত তীক্ষদৃষ্টিতে চন্দনদাসের মুখের পানে চাহিলেন। তাঁহার মুখ ঈষৎ গম্ভীর হইল, বলিলেন,-“জানি। চুয়ার কথা নবদ্বীপে সকলেই জানে।” চন্দনদাস বলিয়া উঠিল,—“তবু তাকে উদ্ধারের চেষ্টা কেউ করে না। নিমাই পণ্ডিত স্থির হইয়া রহিলেন, কোনও উত্তর দিবেন না। চন্দনদাস তখন বলিল, “আমি চুয়াকে বিয়ে করতে চাই। আপনি সহায় হবেন কি? নিমাই পণ্ডিত বিস্মিত হইলেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া কোল হইতে পুথি নামাইয়া ধীরে ধীরে বলিলেন, “কিন্তু চুয়া সম্বন্ধে সব কথা তুমি জান কি?” “যা জানি, আপনাকে বলছি”—এই বলিয়া আজ নৌকা হইতে নামিবার পর এ পর্যন্ত যাহা যাহা ঘটিয়াছিল সমস্ত সবিস্তারে বর্ণনা

চুয়াচন্দন
করিল ; শেষে কহিল, “এই নিৰ্বান্ধব পুরীতে চুয়া যেমন একা, আমি
ও তেমনি একা। এখন আপনি যদি সাহায্য করেন, তবেই কিছু
করতে পারি। নচেৎ একটি বালিকার সনাশ হয়।"
নিমাই পণ্ডিত ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া চিন্তামগ্ন হইলেন।
এই সময় সেই বালক ডাংগুলি হস্তে ফিরিয়া আসিল। চনদাস
সাগ্রহে তাহাকে কাছে ডাকিতেই সে বলিল, “চুয়ার বাড়ীর সামনে দুটো
পা বসে আছে ; যে যাচ্ছে, তারে হুমকি দিচ্ছে।”
“আর কি দেখলি?”
“চুর আর তার ঠাদি ঘরে আছে। চাপ! নাপতিনী বুড়ীর সঙ্গে
কেঁাদল করছে।”
“আর কিছু ?"
“আর মাধাই চনুন বেণের ডিgী লুঠ করতে গেছে। পয়সা দাও।”
খুসী হইয়া চন্দনদাস বালককে চার পয়সার স্থলে দু’গণ্ডা ছিল। অষ্ট
বালক তীক্ষুম্বরে একবার “উ-” বলিয়া উল্লাস জ্ঞাপন পূর্বক ডাংগুলি
থেলিতে খেলিতে প্রস্থান করিল।
“
বালককে বিদায় করিয়া চন্দনাস নিমাই পণ্ডিতের দিকে ফিরিতেই
তিনি উদ্দীপ্তকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, “আমি তােনাকে সাহায্য করব।
তােমার উদ্যম প্রশংসনীয় ; আমরা গায়ের নােক যা করিনি, তুমি বিদেশী
তাই করতে চাও। তােমার স্বার্থ আছে জানি কিন্তু তাতে তােমার
মহত্ত্বের কিছু মাত্র হানি হয় না। আমি কি করতে পারি বল।”
চন্দনদাস বলিল, “তা আমিও জানি না। আপাততঃ পরামর্শ দিতে
পারেন।”
“বেশ, এস, পরামর্শ করা যাক। মাধব যে রকম দুর্ধর্ষ পাষণ্ড, তার
বিরুদ্ধে বলপ্রয়ােগে কোনও ফল হবে না। আমার মনে হয়”

১৫৪
চুয়াচন্দন
চন্দনদাস বলিল, “একটি নিবেদন আছে। আমার বড় কৃষ্ণ
পেয়েছে ; ব্রাহ্মণবাড়ী একটু পাদোদক পেতে পারি ?”
নিমাই সচকিত হইয়া বলিলেন, “তুমি এখনও আহার করনি ?”
চন্দনদাস হাসিয়া বলিল, “না, কেবল চুয়ার দেওয়া একখানি বাতাস
খেয়েছি।”
“কি আশ্চর্য! এতক্ষণ বলনি কেন ? দাঁড়াও, আমি দেখি”
বলিয়া খড়ম পরিয়া ত্বরিতে অন্দরে প্রবেশ করিলেন।
বেলা তখন তৃতীয় প্রহর। বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী ভৃত্য পরিজন সকলকে
খাওয়াইয়া নিজে আহারে বসিতে যাইতেছিলেন, নিমাই গিয়া বলিলেন,
“এক জন অতিথি এসেছে। খেতে দিতে পাববে ?”
বিষ্ণুপ্রিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “পারব।” তার পর ক্ষিপ্রহস্তে
দালানে জল-ছড়া দিয়া পিড়ি পাতিয়া নিজের অব্যঞ্জন অতিথির জন্য
ধরিয়া দিয়া স্বামীর মুখের পানে চাহিলেন।
নিমাই দাড়াইয়া দেখিতেছিলেন, স্মিতমুখে চন্দনদাসকে ডাকিতে
গেলেন। এই নীরব কৰ্ম্মপরায়ণা অনাদৃতা বধূটি ক্ষণকালের জন্য নিই
পণ্ডিতের মন হইতে লক্ষ্মীদেবীর স্মৃতি মুছিয়া দিল।
অতঃপর চন্দনদাস পরিতোষপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণগৃহে প্রসাদ পাইল ।
পরামর্শ স্থির করিতে অপরাহু গড়াইয়া গেল। যে সকল ছাত্র টোলে
পড়িতে আসিল, নিমাই পণ্ডিত তাহাদের ফিরাইয়া দিলেন।
সঙ্কল্প স্থির করিয়া নিমাই বলিলেন, “এ ছাড়া আর ত কোনও উপায়
দেখি না। তৃতীয় ব্যক্তিকে দলে টানতে ভয় করে ; কথাটা জানাজানি

চুয়াচন্দন ১৫৫ হয়ে যদি মাপবের কাণে ওঠে, তা কোনও ভরসা থাকবে না।” চন্দনদস জিজ্ঞাসা করিল, “এদেশের মাঝি-মাল্লাদের বিশ্বাস করা পেতে পারে ?” “অন্য ব্যাপারে বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু যে ব্যাপারে মাধব আছে, তা কাউকে বিশ্বাস করা চলে না। ঘুণাক্ষরে মামাদের মতলব টের পেলে তারা আমাদেরই মাধবের হাতে করিয়ে দেবে।” নিমাই হানিয়া বলিলেন,-“হঁ্যা, মাঝি-মাল্লার কাজ আমাকেই করতে হবে। কাণভট্টের আশীর্বাদ দেখছি এরি মধ্যে ফলতে আরম্ভ করেছে।” চন্দনদাস বলিল,-“চুয়াকে খবর আমি দেব । শেষ রাত্রির দিকে পাইকরা ঘুমিয়ে পড়বে—সেই উপযুক্ত সময়। কি বলেন?” “হ্যা। তুমি তোমার নৌকা পাঠিয়ে দিয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ মাধব নিশ্চিন্ত থাকবে, হয়ত রাত্রিতে চুয়ার বাড়ীতে পাহারা ন থাকতে পারে।" “অতটা ভরসা করি না। যা হােক দেখা যাক।” সন্ধ্যার প্রাক্কালে দুই জন বাহির হইলেন। ব্রাহ্মণপল্লী হইতে অনেকটা উত্তর গঙ্গাতীরে নো-কর সূত্ৰধরদের বাস। সেখানে উপস্থিত হইয়া দুই জনে দেখিলেন, রাশি রাশি স্তুপীকৃত শাল, পিয়াল, সেগুণ, জারুল কাষ্ঠের প্রকারের মধ্যে ছােট বড় নানাবিধ নৌকা তৈয়ার হইতেছে। কোনটির কঙ্কালমাত্র গঠিত হইয়াছে, কোনটি পাটাতনে শশাভিত হইয়া পূর্ণাঙ্গ হইয়া উঠিতেছে। বড় বড় বজরা-পঞ্চাশ দাড়ের নৌকা-কাহারও হাঙ্গর-মুখ, কেহ বা ময়ূর পক্ষী, কেহ বা হংসমুখী। আবার ক্ষুদ্রকায় ডিঙ্গী, সঙ্কীর্ণদেহ ছিপও আছে। কোনটি সম্পূর্ণ হইয়াছে, কোনটি এখনও অসম্পূর্ণ।

; চুয়াচন্দন দুই জনে অনেক নৌকা দেখিয়া শেষে একটি ছােট ডিঙ্গী পছন্দ করিলেন। ডিঙ্গীর সুন্দর গঠন, আড়াই হাত চওড়া, আট হাত লম্বা--- শােলার মত হাল্কা। মাত্র চারি জন লােক তাহাতে বসিতে পারে। নিমাই পণ্ডিত ছুতারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “দাম কত ?” ছুতার কিন্তু ডিঙ্গী বেচিতে রাজি হইল না ; বলিল, ফরমাসী ডিঙ্গী। চন্দনদাস জিজ্ঞাসা করিল,—“এ ডিঙ্গীর জন্য কত দাম পাবে ?” ছুতার একটু বাড়াইয়া বলিল;—“তিন তঙ্ক।।” চন্দনদাস নিঃশব্দে তাহার হাতে এক মােহর দিল। ছুতার স্বপ্নেও এত মূল্য কল্পনা করে নাই, সে কিছুক্ষণ হতবাক্ থাকিয়া মহানন্দে ডিঙ্গীর মালিকত্ব চন্দনদাসকে সমর্পণ করিল। ডিঙ্গী তৎক্ষণাং গঙ্গার জলে ভাসানাে হইল। নিমাই পণ্ডিত ও চনদাস তাহাতে আরোহণ করিয়া দুই জোড়া দাড় হাতে লইলেন। দাঁড়ের আগতে ডিঙ্গী জ্যা-মুক্ত তীরের মত জলের উপর ছুটিয়া গেল। কিছুক্ষণ গঙ্গাবক্ষে দাঁড় টানিয়া উভয়ে দেখিলেন, ডিঙ্গী নির্দোষ ও অতি সহজে নিয়ন্ত্ৰণযােগ্য। দুই জনে সন্তুষ্ট হইয়া তীরে ফিরিলেন । তার পর নৌকা ছুতারের তত্ত্বাবধানে রাখিয়া নিমাই পণ্ডিত বলিলেন,- “কাল বৈকালে আমি এসে ডিঙ্গী নিয়ে যাব।” ছুতার আহলাদে এক দিনের জন্য নৌকা রাখিতে সম্মত হইল। অতঃপর নিমাই পণ্ডিত গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। চন্দনদাসের তখনও কাজ শেষ হয় নাই, সে গঙ্গার ধার দিয়া ঘাটের দিকে চলিল। যে ঘাটে দ্বিপ্রহরে নৌকা বাধিয়াছিল, সেই ঘাটে যখন উপস্থিত হইল, তখন সন্ধ্যার ছায়া ঘনীভূত হইয়া আসিতেছে। . ঘাটে কয়েকটি ক্ষুদ্র ডিঙ্গী বাধা ছিল ; চনদাস কয়েক জন মাঝিকে ডাকিয়া জিজ্ঞাস। করিল,-“বাপু, তােমরা জেলে ত?”

চুয়াচন্দন
১৫৭
“আজ্ঞে, কৰ্ত্ত।।”
“তােমাদের মােড়ল কে ?”
একজন বৃদ্ধ গােছের জেলে বলিল,-“আজ্ঞে কর্তা, আমি মোড়ল।
আমার নাম শিবদাস।”
“বেশ। তােমার সঙ্গে আমি কিছু কারবার করতে চাই। এখানে
যত জেলে আছে, সবাই তােমার অধীন ত?”
“আজ্ঞে।”
“কত জেলে ডিঙ্গী তােমাদের আছে ?”
তাত্রিশ চল্লিশখানা হবে।”
“বেশ। শশানে; তােমাদের যত জেলে ডিঙ্গি আছে, সব আমি
ভাড়া করলাম। তােমরা জেলে-মাঝির দল কাল বেলা তিন পহরের সময়
বেরুবে ; বেরিয়ে সটান স্রোতের মুখে দক্ষিণে গিয়ে শান্তিপুরের ঘাটে
নৌকা বাঁধবে। তারপর সেখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করবে।
পর্যন্ত আমি যদি না যাই, তা হলে আবার ফিরে আসবে।
-বুঝলে ?”
“বুঝলাম কৰ্ত্তা। কিন্তু কাজটা কি, তা ত এখনও জানতে পারিনি।”
“কাজের কথা শান্তিপুরের ঘাটে জানতে পারবে। কেমন, রাজি
আছ?”
“আজ্ঞে, গররাজি নই। কিন্তু ধরুন, শান্তিপুরের ঘাটে যদি আপনার
দেখা না পাই?”
“বলেছি ত, তা হলে ফিরে আসবে।”
“কিন্তু আমাদের যাওয়া আসা যে তা হলে না-হক হয়রানি হয়,
কৰ্ত্তা। আপনাকে তখন পাব কোথায় ? আপনাকে ত চিনি না।”
চন্দনদাস হাসিয়া বলিল,-“তা হলেও তােমাদের লােকসান হবে না।

১৫৮ চুয়াচন্দন তােমাদের অর্ধেক ভাড়া আমি আগাম দিয়ে যাব। সব নৌকা শান্তিপুরে যাওয়া আসার জন্যে কত ভাড়া লাগবে?” শিবদাস মােড়ল বিবেচনা করিয়া বলিল,-“আজ্ঞে, দশটি তঙ্কার কমে হবে না।” চন্দনদাস একটু ব্যবসাদারী করিল। কারণ, এক কথায় রাজি হইয়া গেলে জেলেরা কিছু, সন্দেহ করিতে পারে। কিছুক্ষণ কসমাজার পর নয় তঙ্কা ভাড়া ধার্য্য হইল । চন্দনদাস পাঁচ তঙ্কা শিবদাস মােড়লের হাতে দিয়া বলিল,-“এই নাও। কিছু কথার নড়চড় যেন না হয়।” “আজ্ঞে”—শিবদাস মুদ্রা গণিয়া লইল -‘আপনি নিশ্চিন্দি থাকুন কত্তা, ঠিক সময়ে আমরা শান্তিপুরের ঘাটে হাজির থাকব “সব ডিঙ্গি নিয়ে যাবে, একখানাও বাদ না পড়ে। “আজ্ঞে, একখানাও বাদ পড়বে না।” এই সাপে নবদ্বীপ হইতে সমস্ত ডিঙ্গি তফাৎ করিবার বন্দোবস্ত করিয়া চন্দনদাস কতকটা নিশ্চিন্তমনে নিমাই পণ্ডিতের গৃহে ফিরিল সেইখানেই তাহার রাত্রিতে থাকিবার ব্যবস্থা হইয়াছিল। রাত্রি তিন প্রহরে, চুয়ার বাড়ীর দালানে পাইক দুই জন বসিয়া বসিয়াই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। একজন দেয়ালে ঠেস দিয়া পদযুগল প্রসারিত করিয়া দিয়াছিল। দ্বিতীয় ব্যক্তি ঘুমের ঘােরে কখন্ কাৎ হইয় শুইয়া পড়িয়াছিল ; তাহার নাসারন্ধ হইতে কামারের হাপরের মত এক প্রকার শব্দ'নির্গত হইতেছিল। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার ; কিন্তু অন্ধকারে চক্ষু অভ্যস্ত হইলে কিছু চুয়াচন্দন কিছু দেখা যায় । চন্দনদাস নিঃশব্দে ছায়ার মত দালানে আসিয়া দাড়াইল । তাহার বা হাতে সেই ক্ষুদ্র ছােরা। কিয়ৎকাল মূর্তির মত দাড়াইয়া সে পাইকের নাসিকাধ্বনি শুনিল , তারপর দালানের গাঢ়তর অন্ধকারের ভিতর তাহার চক্ষু বস্তু নির্বাচন করিতে আরম্ভ করিল। যে পাইকটা বসিয়া বসিয়া ঘুমাইতেছে, তাহার পদদ্বয় ঠিক দরজায় সম্মুখে প্রসারিত; ভিতরে প্রবেশ করিতে হইলে তাহাকে লঙ্ঘন করিয়া যাইতে হইবে । তা ছাড়া দরজার কবা ভেজানো রহিয়াছে, ভিতর হইতে অর্গলবদ্ধ কি না, বুঝা যাইতছে না। চন্দনদাস ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পণে হাত বাড়াইয়া কবাট একটু ঠেলিল । মরিচ!-পর। হাঁস-কলে ছু' চার ডাকের মত শব্দ হইল । দরজা ঈষং খুলিল । হাস-কলের শব্দে পাইকের হাপর হঠাং বন্ধ হইল। হঠাৎ বন্ধ হইল। চন্দনদাস স্পন্দিত-বক্ষে ছােরা দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিয়া দাড়াইয়া রহিল। কিন্তু পাইক জাগিল না, আবার তাহার নাক ডাকিয়া উঠিল। চন্দনদাস তখন আবার কবাট একটু ঠেলিল, কবাট খুলিয়া গেল। এবারও একটু শব্দ হইল বটে, কিন্তু কেহ জাগিল না। তখন চন্দনদাস ইষ্টদেবতার নাম স্মরণ করি। নিঃশব্দে পাইকের পদযুগল লঙ্ঘন করিয়! ভিতরে প্রবেশ করিল। আঙ্গিনায় উপস্থিত হইয়া চন্দনদাস চারিদিকে চাহিল। সম্মুখে কয়েকটা ঘর অস্ফুটভাবে দেখা যাইতেছে। কিন্তু কোন্ ঘরে চুয়, সুমাইতেছে? চাপাও বাড়ীতে আছে ; চুন্নাকে খুজিতে গিয়া যদি চাপ জাগিয়া উঠে, তবেই সর্বনাশ। চন্দনদাস কি করিবে ভাবিতেছে, এম সময় তাহার হাতে মৃদু স্পর্শ হইল । চন্দনদাস চমকিয়া উঠিয়া অজ্ঞাতসারেই ছাের: তুলিল। এই সময় তাহার কাণের কাছে মৃদুশব্দ হইল----“এসেছ?”

১৬০ যায় না। চুয়াচন্দন চুয়া! কোমরে ছােরা রাখিয়া চন্দনদাস দুই হাতে চুয়ার হাত ধরিল, বলিল,-“চুয়া! এসেছি।” চুয়ার নিশ্বাসের মত মৃদু চাপা স্বর থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল ; সে বলিল,-“তুমি আব বলেছিলে, তাই আমি তােমার জন্যে সারারাত জেগে আছি।” অন্য সময় কথাগুলি অভিসারিকার প্রণয়বাণীর মত শুনাইত ; কিন্তু বিপদের মাঝখানে দাড়াইয়াও চন্দনদাসের মনে হইল, এত মধুর শব্দসমষ্টি সে আর কখনও শুনে নাই। চুয়ার মুখখানি দেখিবার জন্য তাহার প্রাণে দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা জাগিতে লাগিল। অথচ অন্ধকারে কিছুই দেখা চন্দনদাস চুয়ার কাণে কাণে বলিল,-“চুয়া, একটা আলাে জ্বলতে পারাে না? তােমাকে বড় দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।” দু’জনে অন্ধকারে হাত ধরাধরি করিয়া দাড়াইয়া ছিল, চুমা ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বলিল,-“আচ্ছা, এস”—বলিয়া হাত ধরিয়া লইয়া চলিল। চন্দনদাস তেমনই মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল,-“চাপা কোথায় ?” “ঘুমুচ্ছে।” ‘ঠাদি ?” “ঠান্‌দিও ঘুমিয়ে পড়েছে!” গােহালের মত একটা পরিত্যক্ত ঘরে লইয়া গিয়া চুয়া চকমকি ঠুকিয়া আলাে জ্বালি। তথন প্রদীপের ক্ষীণ আলােকে চুয়ার মুখ দেখিয়া চন্দনদাস চমকিয়া উঠিল। চোখদুটি জবাফুলের মত লাল, চোখের কোলে কালি পড়িয়াছে ; আশা, আশঙ্কা ও তীব্রোৎকণ্ঠার দ্বন্দ্বে চুয়ার অনুপম রূপ যেন ছিড়িয়া ভাঙিয়া একাকার হইয়া গিয়াছে। চন্দনদাসের বুকে বেদনার শূল বিধিল, সে বাষ্পকুলকণ্ঠে বলিয়া উঠিল,-“চুয়া!”

চুয়াচন্দন } চুয়া মাটীতে বসিয়া পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল ; যােদনরুদ্ধ স্বরে বলিল,-“তােমার নৌকা চলে গেছে শুনে এত ভয় হয়েছিল- চন্দনদাষ চুয়ার পাশে বসিয়া আকণ্ঠে বলিল,-“চুয়া আর ভয় নেই। তােমার উদ্ধারের সমস্ত ব্যবস্থা করেছি।” চুয়া চোখ মুছিয়া মুখ তুলিল,-"কি?” চন্দনদাস বলিল,-“বলছি। আগে বল দেখি, তুমি সাঁতার কাটতে জানাে ?” অবসাদভরা সুরে চুয়া বলিল,-“জানি। তাই ত ডুবে মরুতে পারিনি। কতবার সে চেষ্টা করেছি।” চন্দনদাসের ইচ্ছা হইল, চুয়াকে বুকে জড়াইয়া লইয়া সান্ত্বনা দেয়। লােভ সম্বরণ করিল, বলিল,-“ও কথা ভুলে যাও। চুয়া, বুকে সাহস আনে। আমি এসেছি দেখেও তােমার সাহস হয় না ?” চুয়া কেবল তাহার কালিমালিপ্ত চোখদুটি তুলিয়া চন্দনদাসের মুখের পানে চাহিয়া রহিল ; হয় ত নিজের একান্ত নির্ভরশীলতার কথা প্রকাশ করিয়া বলিতে চাহিল, কিন্তু বলিতে পারিল না। চন্দনদাস তখন সংক্ষেপে প্রাঞ্জলভাবে উদ্ধারের উপায় বিবৃত করিয়া বলিল ; চুয় ব্যর্থ বিস্ফারিতনয়নে শুনিল। শুনিতে শুনিতে তাহার চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। চন্দনদাসের বিবৃতি শেষ হইলে চুমা কিছুক্ষণ হেটমুখে নীরব হইয়া রহিল। লজ্জা করিবার সে অবকাশ পায় নাই, হৃদয়ের তুমুল আন্দোলনের মধ্যে এই তরুণ উদ্ধারকর্তাটিকে সে যে কি দৃষ্টিতে দেখিয়াছে তাহা নিজেই জানিতে পারে নাই। তাই উদ্ধারের আশা যখন তাহার সংশয়ময় চিত্ত আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিল, তখন সে আর আত্মসম্বরণ . ১৬২ চুয়াচন্দন করিতে পারিল না, চন্দনদাসের পায়ের উপর আছাড়িয়া পড়িল। দুই হাতে পা জড়াইয়া কঁদিয়া কহিল,--“একটা কথা বল।” চন্দনদাস চুয়ার মুখ তুলিয়া ধরিবার চেষ্টা করিতে করিতে বলিল,- “চুয়া, চুয়া, কি কথা?” “বল, আমায় বিয়ে করবে? তুমি আমায় প্রবঞ্চনা করছ না?” চন্দনদাস জোর করিয়া চুয়ার মুখ তুলিয়া তাহার চোখের উপর চোখ রাথিয়া বলিল,-“চুয়া, আমার মা’র নামে শপথ করছি, তােমাকে যদি বিয়ে না করি, যদি আমার মনে অন্য কোনও অভিসন্ধি থাকে, তবে আমি কুলাঙ্গার।” চুয়ার মাথা আবার মাটীতে লুটাইয়া পড়িল। তার পর সে চোখ মুছিয়া উঠিয়া বসিল ; বলিল,-“তবে আমাকে এখনই নিয়ে যাচ্ছ না কেন ?” চণদাসের ইচ্ছা হইতেছিল, এখনই এই কারাগার হইতে চুয়াকে মুক্ত করিয়া লইয়া পলায়ন করে। কিন্তু সুবুদ্ধি নিষেধ করিল। রাত্রি শেষ হইয়া আসিতেছে, ধরা পড়িবার সম্ভাবনা বড় বেশী। সে মাথা নাড়িয়া বলিল,—“না—এখন ভরসা হয় না। বাড়ীর দোরে পাহারা--- যদি ওরা জেগে ওঠে; কিন্তু আমার এখানে আর থাকা বােধ হয় নিরাপদ নয়-চাপার ঘুম ভাঙতে পারে।” বলিয়া চন্দনদাস অনিচ্ছা ভরে উঠিয়া দাড়াইল। চুয়ার মনে আবার ভয় প্রবেশ করিল। সম্মুখে সমস্ত দিন পড়িয়া আছে ; কি জানি কি হয় ! সে ভয়-কাতর চক্ষু দুটি তুলিয়া বলিল, “যাচ্ছ ?--কিন্তু “কোনও ভয় নেই, চুয়া।” “কিন্তু—যদি বিঘ্ন হয়,যদি—একটা জিনিষ দিতে পারবে ?” “কি ?” ;

চুয়াচন্দন ১৬৩ '। “একটু বিষ । যদি কিছু বিঘ্ন হয় --" চন্দনদাস কিছুক্ষণ শক্ত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর ধীরে ধীরে নিজের চুল হইতে সেই কাটা বাহির করিয়া দিল। গাঢ়স্বরে বলিল,- “চুয়', যদি দেখ কোনও আশা নেই তবেই ব্যবহার করে, তার আগে নয়।” বলিয়া কাটার ভয়ঙ্কর কার্যকারিতা বুঝাইয়া দিল। এতক্ষণে চুয়ার মুখে হাসি দেখা দিল। সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া প্রােজ্জ্বল চক্ষে বলিল,-“আর আমি ভয় করি না।” চন্দদাসের মুখে কিছু হাসির প্রতিবিম্ব পড়িল না। দে চুন্নার দুই হাত লইয়া নিজের বুকের উপর রাখিয়া বলিল,--‘চুম! -- " বাক্‌পটু চন্দনা ইহার অধিক আর কথা খুঁজিয়া পাইল না। চুন্না অশ্রু আর হাসিমুখ একবার চন্দনদাসের বুকের উপর রাখল, অস্ফুটস্বরে কহিল,-“চু। নয়- চুমা বৌ। এই আমাদের বিয়ে। ঘরের বাহিরে আসির পর একটা কথা চন্দনাসেন মনে পড়িল, সে বলিল,-“ঠাদি’র কণ" ভুলে গিয়েছিলাম। তাকে বােলোকাল সন্ধ্যার পর বাড়ী থেকে পালিয়ে যেন নিমাই পণ্ডিতের বাড়ীতে যায় । সেখানে দু’এক দিন লুকিয়ে থাকবে, তারপর আমি তাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করব।” গ্রীমের হ্রস্ব রাত্রি তখন শেষ হইয়া আসিতেছে! কাক-কোকিল ডাকে নাই, কিন্তু বাতাসে আসন্ন প্রভাতের স্পর্শ লাগিয়া আছে। পূৰ্বাকাশে শুকতারা দপ দপ করিয়া জ্বলিতেছে। আঙ্গিনায় দাইয়া চন্দনদাস আর একবার চুয়ার দুই হাত নিজের বুকে চাপিয়া লইল।, তারপর যে ভাবে আসিয়াছিল, সেই ভাবে ছায়ামূত্তির মত বাহির হইয়া গেল। পাইক দুই জন শেষ রাত্রির গভীর ঘুম ঘুমাইতে লাগিল ।

অমাবশ্যার সংশয়পূর্ণ দিবস ধীরে ধীরে ক্ষয় হইয়া আসিল। অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটিল না। কেবল দ্বিপ্রহরে মাধব চুয়ার গৃহে আসিয়া তদারক করিয়া গেল ও জানাইয়া গেল যে, তাহার প্রদত্ত শাস্ত্রীয়-বিধান যেন যথাযথ পালিত হয়। এখানে চাপার কাজ শেষ হইয়াছিল ; মাধবের অনুমতি পাইয়া সে প্রমােদ-উদ্যানে পূজার আয়ােজন করিতে গেল। সায়াহ্নে নবদ্বীপের ঘাটে আনার্থীর বিশেষ ভিড় ছিল না। দুই চারি জন নারী গা ধুইয়া যাইতেছিল, কেহ কেহ কলসে ভরিয়া গঙ্গাজল লইয়া যাইতেছিল। পুরুষের সংখ্যা অল্প। কেবল এক জন পুরুষ অধীরভাবে সােপানের উপর পদচারণ করিতেছিল ও মাঝে মাঝে স্থির হইয়া উৎকর্ণভাবে কি শুনিতেছিল। তাহার গলায় মুক্তাহার বিলম্বিত—অন্যথা সাধারণ বাঙালীর বেশ। বলা বাহুল্য, সে চন্দনদাস। ক্রমে সূৰ্য্য নদীর পরপারে অস্তমিত হইল। নিদাঘকালের দ্রুত সন্ধ্যা যেন পক্ষ বিস্তার করিয়া আসিয়া ভাগীরথীর জলে ধূসর ছায়া বিছাইয়া দিল। পাশে নৌকাঘাট নির্জন ও নিস্তব্ধ। জেলে ডিঙ্গি একটিও নাই। দুই একখালি স্কুলকলেবর মহাজনী কিস্তি নিঃসঙ্গ অসহায়ভাবে বিস্তীর্ণ ঘাটে লাগিয়া আছে। গঙ্গাবক্ষেও নৌকা নাই। কেবল দূরে উত্তরে একটা ক্ষুদ্র ডিঙ্গী স্রোতের মুখে ভাসিয়া আসিতেছে। অস্পষ্ট আলােকে মনে হয়, একটি লােক দাড় ধরিয়া তাহাতে বসিয়া আছে। ক্রমে ডিঙ্গী মাঝগঙ্গা দিয়া ঘাটের সম্মুখীন হইল ; কিন্তু ঘাটের t চুয়াচন্দন ১৬৫ নিকটে আসিল না, গঙ্গাবক্ষে স্থির হইয়া রহিল। নৌকারূঢ় ব্যক্তিমাঝে মাঝে দাড় টানিয়া নৌকা ভাসিয়া যাইতে দিল না। চন্দনদাস চিন্তিতমুখে অধীরাদে ঘুরিতে ঘুরিতে হঠাৎ থমকিয়া দাড়াইয়া পড়িল--ঐ আসিতেছে। পথে দূরাগত বাদ্যোথম শুনা গেল। চন্দনদাস একবার গঙ্গাবক্ষস্থ ডিঙ্গীর দিকে তাকাইল, তারপর স্পন্দিতবক্ষে একটা গােলাকার বুরুজের উপর গিয়া বসিল। বাদ্যবনি ক্রমশ: কাছে আসিতে লাণিল। মহারােলে কাসর-ঘণ্টা শিঙা-ঢােল বাজিতেছে। তামাস দেখিবার জন্য বহু স্ত্রীপুরুষ বালক জুটিয়াছিল, তাহারে কলরব সেই সঙ্গে মিশিয়া কোলাহল তুমুল হঈমা. উঠিয়াছে। ঘাটের শীর্ষে আসিয়া কোলাহল থামিল ; বাজনা বন্ধ হইল। চন্দনদাস দেখিল, কৌতূহলী জনতাকে দ্বিধা বিভক্ত করিয়া দুই সারি ঢাল-সড়কীধারী পাইক নামিয়া আসিতেছে। তাহাদের দুই সারির মধ্যস্থলে কেশ। জবামান্য পরিহিত চুয়া। চন্দনদাস ও কৌতুহলী দর্শকের মত দাঁড়াইয়া উঠিয়া এই বিচিত্র শশাভাযাত্রা দেখিতে লাগিল। পাইকগণ সদম্ভে অস্ত্র আস্ফালন করিয়া দর্শকদের ঠেলিয়া সরাইয়া দিয়া ঘাটের দিকে নামিতে আরম্ভ করিল। তাহাদের মধ্যবর্তিনী মন্থরপদে এদিক ওদিক চাহিতে চাহিতে সােপান অবরােহণ করিতে লাগিল। তারপর চন্দনদাসের সঙ্গে তাহার চোখাচোখি হইল। নিমেষের দৃষ্টি-বিনিময়ে যে ইঙ্গিত খেলিয়া গেল, আর তাহা দেখিল না। বুরুজের পাশ দিয়া যাইবার সময় চন্দনদাস অগ্রগামী পাইককে উচ্চৈঃস্বরে জিজ্ঞাসা করিল,-“হ্যা সর্দার, এ তােমাদের কিসের মিছিল ?

চুয়াচন্দন বদন সর্দার প্রশ্নকারীর দিকে ভ্রুকুটি করিয়া তাকাইল, তাহার গলায় দোদুল্যমান মুক্তার হার দেখিল, তারপর রূঢ়স্বরে কহিল,-“তাের অত খবরে দরকার কি?” চন্দনদাস মুখে বিনীতভাব প্রকাশ করিয়া বলিল,-“না না, তাই জিজ্ঞাসা করছি।” মনে মনে বলিল,-“মালিক আর চাকরের রা দেখি একই রকম। দড়াও, তােমার মুণ্ডপাতের ব্যবস্থা করছি।” পরবর্তী পাইকগণ সকলেই চোখ পাকাইয়া চন্দনদাসের দিকে তাকাইল তাহার গলার লােভনীয় মুক্তাহার কাহারও দৃষ্টি এড়াইল না। দুর্দান্ত প্রভুর উচ্ছল ভৃত্য-হারছড়া কাড়িয়া লইর জন্য সকলেরই হাত নিশপিশ করিতে লাগিল। জলের কিনারায় গিয়া পাইকের দল থামিল। চুয়া সােপান হইতে ঝুকিয়া গঙ্গাজল মাথায় দিল ; তাহার ঠোট দুটী অব্যক্ত প্রার্থনায় একটু নড়িল । তারপর সে ধীরে ধীরে জলে অবতরণ করিল। হাটু, ক্রমে এক কোমর, শেষে বুক পর্যন্ত জলে গিয়া দাঁড়াইল। গলার মালা জলে ভাসাইয়া দিয়া ডুব দিল । পাইকেরা কিনারায় কেহ বসিয়া কেহ দাড়াইয়া গল্প করিতে করিতে গোফে মােচড় দিতে লাগিল। এই সময় একটি ক্ষুদ্র ব্যাপার ঘটিল। চন্দনদাস ইতিমধ্যে বুরুজ হইতে নামিয়া পাইকদের পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল ; হঠাৎ ব্যাকুলস্বরে বলিয়া উঠিল, “ঐ যা।” একজন পাইক ফিরিয়া দেখিল, চন্দনদাসের গলার মুক্তাহার ছিড়িয়া গিয়াছে এবং মুক্তাগুলি সূতা হইতে ঝরঝর করিয়া ঘাটের শাণের উপর ঝরিয়া পড়িতেছে। সে লাফাইয়া আসিয়া মুক্তা কুড়াইতে লাগিল। তাহাকে মুক্তা কুড়াইতে দেখিয়া বাকি কয় জন পাইক হুড়মুড় করিয়া প্রথমে এক । ৫ চুয়াচন্দন ১৬৭ . আসিয়া পড়িল। মুক্তার হরির লুট—এমন সুযােগ বড় ঘটে না। সকলে কাড়াকাড়ি করিয়া মুক্তা চুনিতে লাগিল, ঠেলা খাইয়া চন্দনদাস বাহিরে ছিটকাইয়া পড়িল । পাইকের মুক্তা কুড়াইছে, দর্শকেরা তাহাদের ঘিরিয়া লুচক্ষে দেখিতেছে। কেহ লক্ষ্য করিল না যে, এই অবকাশে চন্দনদাস গঙ্গায় নামিল। চুমা তখন সাঁতার দিতে আরম্ভ করিয়াছে। চুয়া ও চন্দনদাস পাশাপাশি সাঁতার কাটিয়া চলিল। অন্ধকার হইয়া আসিয়াছে ; তাহাদের কালো.. মাখা দুটী কেবল জলের উপর দেখা যাইতেছে। চু। চলনদাশের পানে তাকাইল, তাহার সিক্ত মুখের উচ্ছলিত হাসি চন্দনদাসকে পুরস্কৃত করিল। তাহারা সন ঘাট হইতে প্রায় চল্লিশ হাত গিয়াছে, তখন ঘাটে একটা হৈ-হৈ শব্দ উঠিল। তারপর “ধর পর পালালাে পালালো---” কয়েক জন পাইক জলে লাফাইয়া পড়িল ; কয়েক জন নৌকার সন্ধানে ছুটিল। কিন্তু নৌকা কোথায় ? বদন সর্দার বড়ের মত চেঁচাইতে লাগিল। গঙ্গার বুকে যে ছােট্ট ডিঙ্গি ভাসিতেছিল, তাহা ক্রমে নিকটবর্তী, হইতে লাগিল। চন্দনদাস বলিল, ‘চুয়া, যদি হাঁপিয়ে পড়ে থাকো, আমার কাধ ধর।” চুয়া বলিল, 'না, আমি পারবা।” চন্দনদাস পিছু ফিরিয়া দেখিল, যে পাইকগুলা জলে প দিয়াছিল, তাহারা সজোরে সাঁতারিয়া আসিতেছে। কিন্তু তাহারা এখনও অনেক দূরে, নৌকা সম্মুখেই। কয়েক মুহূর্ত পরে দু'জনে একসঙ্গে গিয়া নৌকার কানা ধরিল । নিমাই পণ্ডিত দাঁড় ছাড়িয়া চুয়াকে ধরিয়া নৌকায় তুলিলেন। চন্দনদাস তাহার পরে উঠিল।

চুয়াচন্দন যে পাইকটা সৰ্ব্বাগ্রে আসিতেছিল, সে প্রায় বিশ হাতের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছিল৷ সে হাত তুলিয়া ভাঙা গলায় চীৎকার করিয়া কি একটা বলিল। প্রত্যুত্তরে চন্দনদাস উচ্চ হাসিয়া দুখানা দড়ি হাতে তুলিয়া লইল। নিমাই পণ্ডিতও ড় হাতে লইতে ।। দুই জনে একসঙ্গে দাড় জলে ডুবাইয়া টানিলেন। প্রদোষের ছায়ালােকে ক্ষুদ্র ডিঙ্গী পাখীর মত উড়িয়া চলিল। ১১ বদ্বীপ হইতে পাচ ক্রোশ উত্তরে গঙ্গাবক্ষে চন্দনদাসের দুই সমুদ্রতরী নােঙর করা ছিল। অন্ধকারে তাহাদের একচাপ গাঢ়তর অন্ধকারের মত দেখাইতেছিল। রাত্রি এক প্রহরকালে ক্ষুদ্র নৌকা গিয়া চন্দনদাসের মধুকর ডিঙ্গার গায়ে ভিড়ি। মাঝিরা সজাগ ও সতর্ক ছিল ; মুহূৰ্তমধ্যে সকলে বড় নৌকায় উঠিলেন। নিমাই পণ্ডিত বলিলেন, “আমার কাজ ত শেষ হ’ল, আমি এবার ফিরি।” চন্দনদাস হাত ঘােড় করিয়া বলিল, “ঠাকুর, এত দয়া করলেন, একটু বিশ্রাম করে যান।” নৌকায় দুইটি কুঠুরী, একটা মাণিকভাণ্ডার অপরটা চন্দনদাসের শয়নকক্ষ। শয়নকক্ষের মেঝেয় রঙ্গীন পল সূতীর আস্তরণ। দীপ জ্বলিতেছিল ; সকলে তাহাতে প্রবেশ করিলেন। চুয়া এক কোণে জড়-সড় হইয়া অর্ধশুষ্ক বসন গায়ে জড়াইয়া দাঁড়াইল। চন্দনদাস তাড়াতাড়ি পেটারি হইতে নিজের একখানা ক্ষোমবস্ত্র বাহির চুয়াচন্দন করিয়া চুয়ার গায়ে ফেলিয়া দিল। চুয়া কাপড় লইয়া পাশের ঘরে গেল। নিমাই পণ্ডিত আস্তরণের উপর আসন গ্রহণ করিয়াছিলেন ; চুয়া প্রস্থান করিলে চন্দনদাস চুপি চুপি বলিল,-“ঠাকু, বিয়েটা আজ রাতেই দিয়ে দিলে ভাল হয়।” নিমাই হাসিয়া বলিলেন,-“এত তাড়া কিসের ? বাড়ী গিয়ে বিয়ে কোরো।” চন্দনদাস ভারি ভাল মানুষের মত বলিল,-“না ঠাকুর, চুয় যদি কিছু মনে করে ?-তা ছাড়া, নৌকায় একটি বৈ শােবার ঘর নেই।” নিমাই বলিলেন,—“কিন্তু বিয়ে দিই কি করে ? উপকরণ কৈ ?” “ঠাকুর, আপনি পণ্ডিতমানুষ, সামান্য পুরুত ৩ নন। আপনি ইচ্ছে করলে শুধু-হাতেই বিয়ে দিতে পারেন।” নিমাই স্মিতমুখে চিন্তা করিয়া বলিলেন,-“মন্দ কথা নয়। তুমি কন্যাকে হরণ করে এনেছ, সুতরাং তােমাদের রাক্ষস-বিবাহ হ'তে পারে। রাক্ষস-বিবাহে কোনও অনুষ্ঠানের দরকার নেই।” চন্দনদাস মহা উল্লাসে উঠিয়া গিয়া চুয়ার হাত ধরিয়া লইয়া আসিল ; বলিল,-“চুয়া, ঠাকুর এখনই আমাদের বিয়ে দেবেন।” পট্টাম্বরপরিহিত চুয়া নত-নয়নে রহিল। নিমাই হাসিতে হাসিতে বলিলেন,-“চন্দনদাস নাছােড়বান্দা, আজই বিয়ে করে তবে ছাড়বে’ চুর্যার মুখে অরুণরাগ দেখিয়া বুঝিলেন তাহার অমত নাই, বলিলেন, “বেশ। ফুলের মালা না, দু’ছড়া হার যােগাড় কর।” পুলকিত চন্দনদাস মাণিকভাণ্ডার হইতে দুগাছা মুক্তার মালা বাহির করিয়া দিল। তখন বিবাহ-ক্রিয়া আরম্ভ হইল। ।

'১৭০
চুয়াচন্দন
নিমাই একটা হার চুয়ার হাতে দিয়া বলিলেন,-দু’জনে দু'জনের
'গলায় দাও।”
উভয়ে মালা বদল করিল।
নিমাই বলিলেন, “ঈশ্বর সাক্ষী ক'রে
গঙ্গার বুকের উপর
ব্রাহ্মণ-সাক্ষাতে আজ তােমরা স্বামি-স্ত্রী হলে। আশীৰ্বাদ করি, তােমাদের
মঙ্গল হােক।”
উভয়ে নতজানু হইয়া ভক্তিপূত-চিত্তে এই দেবকল্প তরুণ ব্রাহ্মণের
পদধূলি লইল।
তারপর উঠিয়া চন্দনদাস বলিল,-“ঠাকুর, এ বিয়ে
বিয়ে লােকে
মবে 'ত?”
নিমাই পণ্ডিতের নাসা স্ফুরিত হইল, তিনি গর্বিতস্বরে বলিলেন,-
নিমাই পণ্ডিত যে বিয়ের পুরুত, সে-বিয়ে অমান্য করে কে?”
চন্দনদাস তখন নিমাই পণ্ডিতের পদতলে একমুঠি মােহর রাখিয়া
বলিল,-“দেবতা, আপনার দক্ষিণা।”
নিমাই এইবার হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন,-“ঐটি পারব না।-যাক
আজ উঠলাম। বুড়ীকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা শীঘ্র
আর, বাড়ী গিয়ে যথারীতি লৌকিক বিবাহ ক'কে। অধিকন্তু ন
দোষায়।”
“তা করব। কিন্তু ঠাকুর, আপনি ক্লান্ত, পাচ-ছয় ক্রোশ দাড় টেনে
এসেছেন, আজ রাত্রিটা নৌকায় কাটিয়ে গেলে হত না?”
“না-আজই আমায় ফিরতে হবে। রাত্রিতে না ফিরলে মা চিন্তিত
হবেন। তা ছাড়া, তােমার নৌকায় ত,একটী বৈ ঘর নেই।” বলিয়া
মৃদু হাসিলেন।
চন্দনদাস একটু লজ্জিত হইল।

চুয়াচন্দন ১৭১ তারপর সেই মসীকৃষ্ণ অমাবশ্যার মধ্যযামে 'নিমাই পণ্ডিত ডিঙ্গীতে উঠিয় একাকী নবদ্বীপের পানে ফিরিয়া চলিলেন। যতক্ষণ তার পড়ে? শব্দ শুনা গেল, চুয়া ও চন্দন যােড়হস্তে তগতচিত্তে নেক'র পাশে দাঁড়াইয়া বাহিরের দিতাকাইয়া রহিণ। -শেষ-

No text on this page.

শ্ৰীশরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত জাতিস্মর { অতীত ভারতের গৌরবময় যুগের বিস্ময়কর গল্প-কাহিনী | ...প্রাগৈতিহাসিক যুগ, বৌদ্ধযুগ ও চন্দ্রগুপ্তের কথা লইয়া লেখক তিনটি উপাখ্যান রচনা করিয়াছেন, লেখকের রচনাভঙ্গি সুন্দর, গল্প বলিবার কৌশল তাহার আছে, ঐতিহাসিক আবহাওয়াও তিনি সৃষ্টি করিতে পারেন ; তুর মনুষ্য-চরিত্র আঁকিতে তাহার হাত কাপে না।••• তিনি যে শক্তিমান লেখক, তাহা স্বীকার করিতে হইবে। শরদিন্দুবাবু ইতিহাসের কঙ্কালে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করিতে পারিয়াছেন। প্রবাসী The book first draws our attention by the uniqueness of the subject. The author who is already well-known as a powerful storyteller in the realm of modern Bengali literature, has in this book, carried us back to the dini, old past of India, the India of our drranis that we cannot. visualise through the dry Pages of history. Mr, Bancrjec with considerable command ()ver language breathes life into the dry bones of history, apd his characters live and talk vibrating with life and emotion. -Amrita Bazar Patrika. -দেড় টাকা- পি সি সরকার এণ্ড কোং লিঃ শ্ৰীশরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ব্যোমকেশের ডায়েলী ব্যোমকেশের কাহিনী | বাংলাভাষায় সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক ডিটেটিভ, গল্পের বই । ‘ব্যোমকেশের ডায়েরী’ পড়িয়া যাহারা আনন্দলাভ করিয়াছেন, উহার দ্বিতীয়খণ্ড পড়িয়া তাহারা আরও মুগ্ধ হইবেন। অভিনব ঘটনা সৃষ্টির দ্বারা রহস্যজালের উদঘাটনে লেখক সিদ্ধহস্ত, তাহার কলাকুশলী হয়ে চত্রগুলি উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়াছে। চোরাবালির, রহস্য সমাধানে অথবা পনী করালীবাবুর মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে যে অদ্ভুত বুদ্ধির তীক্ষ্মতা গ্রন্থকার লিপিচায্যে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন, তাহা বাস্তবিকই পাঠকের স্মিয় উৎপাদন করে। উচ্চাঙ্গের ডিটেকটিভ, গল্প বাংলাভাষায় নিতান্ত বিরল ; গ্রন্থকারের এই শ্রেণীর আখ্যায়িকা সেই অভাব পূর্ণ করিবে। -প্রবাস শরদিন্দু বাবুর ডিটেকটিভ, গল্পের অভিনবত্বের দাবী বড় স্বল্প নয় , ব্যোমকেশের কাহিনীতেও তার লেখার উৎকর্ষ বজায় রেখেছেন।•••একটু আশ্চর্যের কথা যে বাংলা ডিটেকটিভ গল্পরচনায় এ পণালী এতদিন অনুসৃত হয়নি। এ প্রণালী অনুসরণে প্রথম যশলাভের কৃতিত্ব শরদিন্দু বাবুর যােগ্যরূপেই প্রাপ্য ; অধিকন্তু তাঁর ভাষা সুন্দর ও বাহুল্য বজ্জিত।•••ব্যোমকেশ ও তার বন্ধু, Sherlock IIolmes ও Wats0:1 এর মত বাংলা ডিটেকটিভ উপন্যাসে স্বায়িত্ব লাভ করবে আশা করা অন্যায় হবেনা। —‘পরিচয় প্রতিখণ্ড দেডটাকা ; পি সি সরকার এণ্ড কোং লিঃ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Chua Chandan Ed. 1st

Author
Bandyopadhyay, Saradindu
Title
Chua Chandan Ed. 1st
File name
Chua Chandan Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/08/1
Publisher
P. C. Sarkar And Co., Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
188
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Short stories
DLI number
550642
Barcode
4990010021064.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
iJt4QIKaY2h
Download PDF

Chua Chandan Ed. 1st