Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah

Musafir

2010/05/3

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সুসাফির

No text on this page.

এই লেখকের লেখা
খোলী (বাজেয়াপ্ত)
ঘূর্ণীপথে
যন্ত্রপুরী
বেতার-গ্রাহক যন্ত্র
বেতা-যন্ত্র নির্মাণ
বেতার রহস্য
চলচ্চিন্ন প্রভৃতি

সত্যিকারের অলকাকে
ব? 1.
বেহালা
১১ই ভাদ্র ১৩৪২

সুসাফির বাড়ী আমায় ছাড়তে হােল- রাঙা মাটীর পথ আর সাঁওতালি বাঁশীর সুর আমায় হাতছানি দিয়ে ডাক দিল। আমি বেরিয়ে পড়লুম শীতের কুহেলী বিলীন এক সন্ধ্যায়,-অচেনা, অজানার উদ্দেশ্যে। এখন আমি শুধুই পথচারী আমার নাম নেই, থাম নেই–আছে শুধু অফুরন্ত সময়, তাজা দুই প্রাণ, খােলা মন আর যত রাজ্যের অদ্ভুত খেলকানার পক্ষীরাজ ঘােড়ায় চড়ে আমি যেন রূপকথার রাজপুত্তর- মন্ত্রীপুর গােছের কিছু একটা হয়ে পড়েছি। অস্তগামী দিনের দেবতাকে প্রণাম কোরে মনের মানুষ আমার বলে উঠলাে,উদযাচলের পথে আবার নূতনের সূৰ্য্য উঠবে-কিন্তু যে অতীত আজ অন্ত গেল—সে আর ফিরবে না—ফিরবে না। ভবিষ্যৎ কৌশিক নতুন মানুষ-আকাক্ষা তার দুর্জয় নাম তার দুর্জয় ষ্টেশনে এসে বহুদিনের বন্ধু ও সেবক লারকু, ভূখন আর ঝুমনকে যখন বিদায় দেবার সময় একবার জিজ্ঞাসা করলুম-‘সব ঠিক ত ভূখন ? লারকু উত্তর দিলে, ‘ড করিনা বাবু সে সব ঠিক আছে। লারকুর কথার ভঙ্গি: প্রাণে এসে লাগে, চমকে উঠি শুধুই-ভাবি, ‘স অব ঠিক আছে? সত্যিই যদি তাই থাকতো মুসাফির

তিন
গাড়ী তখন চলতে শুরু করে দিয়েছে
নিস্তব্ধ বনানীর ভিতর দিয়ে, জানলার ধারে বসে ঘন বনের
ভেতর দিকে চেয়েছিলুম একদৃষ্টেশীল, নীরব, নিথর
স্তব্ধ রাত আমার সামনে পডে—বিশ্বজগতের যত কিছু ভাবনা
চিন্তা তখন আমার মাথায় এসে বাসা নিল।
নির্জন সেকেণ্ড ক্লাস কামরটায়
শুয়ে তখন ভাবছি, আর কতদিন এই অন্ধকারে ব'সে ব'সে
মিথ্যার পূজা করতে হবে ? একটা মধুর সম্বন্ধের ভেতর দিয়ে
তার সঙ্গে আলাপ হয় চুপি চুপি, আমাদের যে পত্রালাপ
চলেছে -তাও চুপি চুপি, আজও এই যে অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা
এও তারই জন্য, এর মধ্যেও সেই গােপন।—অদ্ভুত দুনিয়া
যা চাওয়া যায—পাওয়া যায় ঠিক তার উল্টোটা।
০ ০ . ০
সারা বছর ধরে কলকাতায়
যখন পাই তাকে, তখন বুঝিনি যে কোন পথে ছুটে চলেছি।
সিনেমায় একদিন সুন্দরীশ্রেষ্ঠ। ভিলমার মহাজাগরণ
দেখতে গিয়েছিলুম তাকে সঙ্গে নিয়ে। কে জানত যে সেটা
আমাদের উভয়ের পক্ষেও ‘মহাজাগরণ হয়ে উঠবে।

গ সে রাতে যখন ডবল ডেকারে চড়ে ফিরছি, পাশাপাশি বসে- অলকার যৌবনতপ্ত দেহ আমার দেহ স্পর্শ করেছিল। আবছা আঁধারে তার সুগঠিত হাতখানি আমার কোলের উপর এসে পড়ে, আমার সর্বাঙ্গে একটা গভীর অনুভূতি জাগিয়ে দিল। আমি ধীরে অলকাকে আরও কাছে টেনে নিলুম, অলকা একটু হেসে আমার চোখ দুটোর ওপর চোখ রেখে বললে কী! আমার মাথাটার ভেতর হঠাৎ একটা উত্তেজনা ব’য়ে গেল,-সত্যিই তাে কী’!-কিছুই ন্য- তবে কেন এত চঞ্চল হয়ে উঠলুম। মহানগরীর জনাকীর্ণ রাস্তার ভিতর দিয়ে সাপের মত একে বেঁকে হু হু শব্দে বাসনা ছুটে চলেছে জ্যোৎস্নাভাসা নীল আকাশের দিকে চেয়ে কি ভেবে খানিক তারাগুলাের ঝিমিকানি দেখছিলাম: হাওয়ায় অলকার অশিষ্ট কেশপ্রান্ত ফুর ফুব কোরে তখন আমার গালে উড়ে এসে লাগছিল, সে একটা সুন্দরঅনুভূতি। অলকার মুখের দিকে চাইতেই দেখি তার মায়াময় চোখের চাউনি আমার মুখের উপর,এমন স্থির দৃষ্টি সে, বােধ হােল যেন আমার মনের ভিতরটা ও সব পড়ে নিচ্ছে। মুসাফির পচ তাৰ কোমল গােলাপী গালে গাল ঠেকিয়ে চুপি চুপি বললুম ‘এই, কি ভাবছ? সে উত্তর দিলে না। রাগের ভাণ করে সরে গেল একটু, তারপর চোখ ঘুরিয়ে বললে, ‘ভারি দুষ্ট, তাে! সত্যিই দুষ্টমী: কিন্তু এর পর থেকে সেটা বেড়েই চললাে•••'তবে ঠিক একা আমারই নয়, কেননা কুসুম-ভানু, গাছের শাখায় যখন অজানা পাখী মুখ-বিহবল হয়ে আশ্রয় নেয়, তখন দোষটা কি শুধু পাখীর নাগাছেরও। সুটকেশ থেকে তার চিঠিখানা বার করে পড়তে লাগলুম- যে কি ০ তােমায় সম্বােধনে ডাকি তা ভেবেই পাইনা ‘তুমি এত মিষ্টি, এত সুন্দর। চাদের আলাে যেন আমায় পাগল কোরে তুলেছে, আজ বােধ হয় পূর্ণিমা, ছাতে বসে বসে তােমায় চিঠি লিখছি, জ্যোৎস্নায় সারাদিক ভেসে যাচ্ছে। আমার রায়

ছ
০ ০
জীবনে চাঁদের আলাে বৃথাই গেলাে। তােমায় কেন ভালবাসি
বুঝি না, তুমি সুন্দর, তুমি মধুরতাই ভালবাসার
আস্বাদটাও সুন্দর।
সবাই এইমাত্র গেছে ঘুমােতে।
এখন ঠিক এই মুহূর্তেই যদি তুমি আসতে: তােমার
চুমাের জন্যে দেখছি পাগল হবাে 'কেন আমার লােভ
বাড়িয়ে দিলে সেদিন, এই দুষ্টু।
কতদিনই বা গেছ তুমি কিন্তু
মনে হচ্ছে কত যুগ তােমায় দেখিনি হয়তাে আমার
কথা তুমি ভাববে না, কত কি তােমার ভাববার আছে:
আমার কিন্তু কেবলই তােমার কথা পড়ছে মনে। কবির
এই দুটো লাইন যে আমার জীবনে এত মধুর রূপ ধরবে
তা কোনদিন ও ভাবিনি, সেই
‘আমায় ঘিরি আমায চুমি,
কেবল তুমি, কেবল তুমি
এই দুষ্ট! সত্যি কি তুমি আমায়
চাও: 'না, দুদিন পরে হারিয়ে যাবে ?
তুমি যেদিন
মুসাফির

সাত
চলে যাও সেদিন যেখানে শুয়ে আমায় আদর করেছিলে,
সেইখানে শুয়েই লিখছি।ভাবছি সেদিনের স্মৃতি
কি মিষ্টি ••
এ চিঠি তােমার হাতে পৌছবার
আগেই, আমি বহুদূরে চলে যাবাে• লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে
সবই, কিন্তু লেখা যে আসে না—শুধু একটি কথাই মনে
জাগছে যে, distance between us বেড়েই চলেছে।
ভবিষ্যতে আমার ব্যবহারে যদি আঘাত পাও তত ক্ষমা
কোরাে—মনে কোনাে যে সে আঘাত ইচ্ছে করে দিইনি••
বড় অসহায়, নিরুপায় আমার অবস্থা
চিঠিখানি পাবার পর থেকে এখন
পৰ্যন্ত কতবার যে পড়েছি, মুক্তোর মত লেখাগুলােকে কত
চুম্বনই যে করেছি তার ঠিক নেই•••আর ভেবেছিও কি
কম। রাতের আঁধারেরও শেষ হােল অবশেষে গ্রাম,
রায়

বন, ঘাট পার হয়ে ভােরের আলাের সঙ্গে ট্রেলখানা
তার পথের শেষে এসে থামলাে। বাইরে এসে পথ চলতে
চলতে নীল-সিন্ধুর একটানা রেখা দেখতে পেলুম। অনন্ত
বিস্তৃত এই মহানীল সমুদ্রের তরঙ্গরাশি কূলের কাছে
ব্যগ্র উচ্ছাসে আছড়ে পড়ছে, কত দিন ধ'রে—কে জানে!
সমুদ্রতীর থেকে আস্তে আস্তে সহরের দিকে চললুম
কিন্তু কোথায় তার খোঁজ কোরবাের তার ত ঠিকানা
আমার জানা নেই। যার ঠিকানা জানা থাকে না, সারা
জগৎ চিরক্তন কাল ধরে তাকেই খােজে। একমাত্র আশা
এই ছিল—হয়ত বা সে এই নীল সমুদ্রের লাস্যলীলা দেখবার
জন্য সন্ধ্যায় এদিকে বেড়াতে আসবে তাকে দূর থেকেই
শুধু দেখে যাব।
সহরে আর যাওয়া হােল না ।
সাগরিকার প্রেমেই পডলুম দেখতে লাগলুম শুত্র ফেনরাশির
ধরণীর বুকে মেহ-চুম্বন মনে হােল আবাব, একি সত্যিই
তাই পৃথিবীর পায়ের কাছে তার ব্যর্থতার আর্তনিবেদন ?
দুপুবের সময় সামনেই সমুদ্রতীরের
একটা হােটেলে এসে উঠলুম। খাওয়া দাওয়া শেষ কোরে
মুসাফির

আবার জলের ধারে গিয়ে বসূবৰ ব'লে বেরুচ্ছি, এমন
সময় অপ্রত্যাশিতভাবে অলকার দেখা পেলুম"সে তখন
স্নান সেরে আমার ঠিক পাশের ঘরটীতে ঢুকতে যাচ্ছে
আমায় দেখেই তাে অলকা থকে দীডালমুচকে হেসে
জিজ্ঞাসা করলে, • কখন এলে?
আমি তখনও নিজেকে সামলে
নিতে পারিনি : একদৃষ্টে সদ্যস্নাত অলকার রূপমাধুরী
উপভােগ কবছিলুম
৫
অলকা এক মধুর ভঙ্গিমায় ঘাড
নেড়ে বলে, থাকো খানিক ভাবুকের মত দাঁড়িয়ে, আমি
আসছি এখুনই, বুঝলে? বলেই, হাসতে হাসতে সে ঘরের
মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
আমি ভাবতে
লাগলুমমনের ডাকও তা হ'লে শােনা যায়। নইলে, এভাবে
হঠাৎ অলকার সঙ্গে দেখা হবে কেন?
বারান্দা থেকেই তখন শুনতে
পেলুম, পথ দিয়ে এক হিন্দুস্থানী ছােরা গেয়ে চলেছে

সখী রী মৈকা পীয়া বিন্ কছু না মুছায়ে ।
পুরীর সমুদ্রতটের বালি তেতে আগুন হয়ে উঠেছে, তা
সত্ত্বেও দুপুরে আমরা বেরিয়ে পডলুম, হােটেল ছেড়ে চলে
গেলাম বহুদূরে—flag-staff ছাড়িয়ে একেবারে লাইহাউসের
কাছে। সেখানে গিয়ে বসলুম এমন জায়গায়, যেখানে
ঢেউয়ের জল এসে আমাদের পাগুলি নিয়ে খেলা কোরতে
লাগল••••
বহুক্ষণ দুজনে কোন কথাই হােল
ন: অলকার হাত দুখানি ছিল আমার মুঠোর মধ্যে, তার
আঙ্গুলগুলাে নিয়ে
খেলা করছিলুম-মাঝে মাঝে তার
মােহময় স্বপ্নভরা প্রগাঢ় কালাে চোখদুটী, টযিজ শেলের
গােল চশমার ভেতর দিয়ে আমার মুখপানে ফিরে চাইছিল।
সমুদ্রের ভৈরব-গর্জনের ভেতর দিয়ে অলকার মনের কথার
আভাস পাওয়া গেল। ব্রাউনিং এর Last Ride Together
কবিতাটি আমার ভারী মনে পড়ে, এখনও হঠাৎ সেটা মনে
ওঠাতে ভাবলুম—এই প্রবল জলােচ্ছাস কি একবার পাগল
হয়ে ছুটে এসে আমাদের অসীম অশান্তের কোলে টেনে
নিয়ে যেতে পারে না?
মুসাফির

এগার
অলকাই কথা কইলে এবার, তার
সুন্দর সুগন্ধ কেশভার শুদ্ধ মাথাটা আমার কাঁধের ওপর
রেখে বাঁকা চাউনি হেনে বললে, “এই, কেন তুমি এলে
এখানে ? তােমায় তো আমি ঠিকানাও জানাই নি, তবে
এলে কি কোরে? সত্যি, তােমায় এমন ভাবে পেয়ে ভারী
আহলাদ হচ্ছে বটে •••কিন্তু কি
বিপদেই তুমি
আমায়
ফেললে।
অলকার মাথার ওপর গালটা রেখে
আস্তে আস্তে তার কপালে একটা
চুমাে দিয়ে বললুম, ‘এসেছি
শুধু এরই জন্য বুঝলে? আমি এলেই যত বিপদ যদি আসে,
বেশ তাে আর তা হলে••••
• কথায় কথায় রাগ অভিমান
লেগেই আছে। বলছিলুম কি জান, আমি এসেছি আমার
এক মামার সঙ্গে এখানে, এতক্ষণ যে না বলে ক’যে তােমার
সঙ্গে এই দুপুরে বেড়াতে বেরিয়েছি, ফিরলে কি বলবেন
বলতাে?
অলকা মুহূর্তের জ চুপ করলে,
তারপর স্থির দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চেয়ে বললে,তােমায়
রায়

বার
অবশ্য কিছু ভাবতে হবে না। হােটেলে তুমি আমার পরে
গিয়ে ঢুকো, আর আমায় চেন না এইভাব দেখিও, আর
এখন বাইরে থাকার যে explanation,সে আমিই দোবে—
মনটা বিশ্রী হয়ে গেল, বললুম,
অলক, এমন জানলে সত্যিই আমি তােমায় নিয়ে এখানে
বেড়াতে বেরুতাম না। শুধু তােমায় একবার দেখবাে বলেই
এসেছিলুম। দেখা পেয়েছি, এখন
দেখা পেয়েছি, এখন আর আমি হােটেলের
দিকেই যাচ্ছিনা, একেবারে ট্রেণে এই রাতেই রওনা হচ্ছি।
মাপ কোরাে, আমার জন্য তােমার যে এই বিপদটুকু
ঘটবে বলছে-
অলকা হেসে উঠে আমার হাত
দুটো জোর কোরে চেপে বললে, “ইস কি বীরপুরুষ।
একেবারে পলায়ন, তােমায় আমি একেবারে মামার কাছে
নিয়ে গিয়ে হাজির কোরব, বলবে এই আসামী হাজির
কোরেছি, আমার না ব'লে যাওয়ার জন্য দায়ী এ-ই।
হাসি ঠাট্টায় ঘণ্টার পর ঘন্টা গেল
নীল সমুদ্রের অপর পারে সূৰ্য্যদেব ক্রমে নেমে
কেটে
মুসাফির

যাচ্ছিলেন, উন্মত্ত সাগরের তাণ্ডবলীলাও তখন বেড়ে
চলছিলাে::::দূরে মুলিয়াদের সমস্ত দিনের মাছধরাও
গেল শেষ হয়ে।
আমাদের কথাবার্তা আবার হঠাৎ কখন
"সাঙ্গ হয়েছে: 'মহানীলের পাশে বসে নীলাকাশের সঙ্গে
এর যে অপূর্ব রঙের খেলা চলছিল তাইতেই দুজনে মগ্ন
ছিলুম। হু হু করে লবণাক্ত বাতাস এবার ব’য়ে আসতে
লাগল, ক্রমে তা" ঝডের আকার ধারণ করলে, অলকার
এস্তবাস ও কণ্ঠচ্যুত হল—ধীরে আমি তার বক্ষের উপকণ্ঠে
নিবিড়ভাবে চুম্বন করলুম। সারা অঙ্গ রক্তের উগ্রগতিতে
শিথিল হয়ে পড়লো। •••
সেই রাত্রেই সমুদ্রতীরের দেশ থেকে
বিদায নিযেছিলুম।

গে
কলকাতায় ফিরে এলুম আবার
কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা মন নিয়ে। চিরপরিচিত চায়ের
দোকানের আড্ডাটা আরও বেশী করে জমিয়ে তুললুম।
কলেজ ছেড়ে দিন নেই রাত নেই ছােট্ট ডায়েরীখানাকে
ভরে তুলতুম যত রকম মনের আজে-বাজে কথাতে, এই
দোকানের এক কোণে একটী ভাঙ্গা বেঞ্চে বসে—-
মুসাফির

৫
পােনর
দোকানের কর্তা রামগােপাল বাবু
প্রৌঢ় ভদ্রলােক। দারিদ্র্যের মালিন্যে তার বাইরেটা মলিন
হ'লেও হঠাৎ দেখলেই অতীত যে এর ভালােই ছিল,
এ কথাটা বিশেষভাবে মনে পড়ে। এখানে সে নিয়ে
কেউ কিন্তু গবেষণা করে না -সন্ধ্যার আমেজ পড়তে না
পড়তেই বনেদী খরিদ্দারের দল যে যার আস্তানা ছেড়ে
এখানে এসে জোটে, আর গবেষণা হয় তখন কোয়েটায়
ভূমিকম্প থেকে আরম্ভ করে বরিশালে নারী ধর্ষণ পৰ্য্যন্ত
এমন কি,
কমন্স ' সভার ইণ্ডিয়া-বিলবক্তৃতা পর্যন্ত
বাদ কিছুই যায় না। বটগাছের মাথায় সন্ধ্যা হওয়ার
সঙ্গে সঙ্গে উড়ােপাখীর কিচির-মিচির যেমন শুরু হয়
এও যেন ঠিক তাই:••
এ দল থেকে নিজেকে একটু দূরেই
রাখতুম। এদের মজলিস বসবার সঙ্গে সঙ্গে মালিকের
দশ বছরের মেয়ে মিনতি, সে এসে আমার সঙ্গে ভাব
করতাে। স্কুলের পড়া বুঝিয়ে নিত। মিনতি আমার
সঙ্গে ‘দাদা' পাতিয়ে ফেলে। বনেদী খরিদ্দারদের
কেউ বা তার কাকা, কারও সঙ্গে বা তার মামা

সম্পর্ক। বেশ স্বচ্ছ সরল মেয়ে, সঙ্গে তার দুদণ্ড কথা
কয়ে আমার এই খেয়ালী মন বেশ একটু শান্তি পেত।
দেশ বিদেশের গল্প, জাহাজ, এরােপ্লেন, বায়স্কোপ প্রভৃতির
যত রাজ্যের অদ্ভুত আর আজগুবি কাহিনী তাকে শােনাতুম ।
রােজকার মত সেদিনও মিনতির
সঙ্গে গল্প করছি। গল্পের ব্যাপার ছিল আমাদের সেদিন
ডাপিটে ' মেযেদের
কাণ্ড। ডানপিটে নামটা
অবশ্য মিনতিরই দেওয়া। প্রথমেই কুমারী
এমি জনসন
বলে যে ইংরেজ মেযে এক ইংলণ্ড থেকে এরােপ্লেনে
উডে অষ্ট্রেলিয়া গিযেছিল, তার কথা হােল--পরেই ‘গাউচো’
(Gaucho) নামক একটা বায়স্কোপের ছবিতে সেদিন চন্দ্র
ঘােষাল বাবু যে তাকে নিয়ে গিয়েছিল, তাতে সে, উ ,
‘লুপে ভেলে’ মেয়েটীকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে মিনতি
থেকে থেকে বলে, দেখ, দুর্জয়দা—আমি কি ঠিক কোরেছি
জান। নিজে মস্ত বড় একটা হােটেল চালাব সাহেবী
কায়দায়, তবে খাবার দেওয়া হবে বাঙ্গালীর ডাল, লুচি
কোপ্তা, পােলাও এই সবচীনেম্যানরা পর্যন্ত কি রকম
সুন্দর ভদ্রভাবে হােটেল চালাচ্ছে, আর আমাদের বাঙালীদের
মুসাফির

হােটেলে একটাতেও ঢুকবার উপায় নেই, এমনি নােংরা—
বাবাকে বলি, যে এ দোকান তুলে দাও, নয়তাে ঐ রকম
ভাল বেশ ইলেকট্রিক লাইট দিয়ে সাজান, চাপরাশী,
দরােয়ান শুদ্ধ একটা হােটেল খােলাে। বাবা কেবল হাসে,
বলে—পাগলী, টাকা কোথায় ? আচ্ছা, দুয়দা, খুললে
তাে তবে টাকা হবে? তুমিই বল!
মিনতির কথা শুনে হাসি, মনে
মনে ভাবি মেয়েটার সাহস আছে, বুদ্ধিও আছে, বলি,
‘মিনু, ঠিক বলেছ ! তুমি বড় হও, আমি তােমার হােটেলে
চাকরী নেবব, ঠিক বলছি। মিনতিও হাসে শেষটায়।
এত বড় একটা মতলব আঁটা তাে সােজা কথা নয়-
সুতরাং তারপর দুজনেই কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবছি, এমন
সময় হঠাৎ কাণে এল, কোথায় কার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে
তাই নিয়ে বনেদী খরিদ্দারদের দল যে জটলা পাকাচ্ছেন
তার দু চারটে খাপছাড়া কথা-কাণ খাড়া কোরে খানিক
শুনলাম তারপর তাদের তর্কে আমিও ভিড়ে গেলাম,
বললাম, কি বলছেন? আত্মহত্যা পাপ? নীতিবিদ্ধ ?
রায়

আঠার
ঠিক কি তাই? স্বেচ্ছায় জীবন দেওয়ার ভেতর কত বড়
একটা ত্যাগের মহ, আর সাহসের পরিচয় রয়েছে, সেটা
ততা স্বীকার করতে হবে।
চায়ের পেয়ালাটায় চুমুক দিতে
দিতে নামিয়ে রেখে চন্দ্র ঘােষাল বাবু একবার আমার দিকে
কটাক্ষপাত করলেন। 'ই', রক্ত গরম এখন বাবাজীর,
সাহসের পরিচয়ই বটে, আর নীতিবিরুদ্ধ অবশ্য বলা না
গেলেও, দুনীতির পরিচায়ক যে, তাতে আব সন্দেহ
নেই ঘােষাল মহাশয়ের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসির
রেখা ফুটে ওঠে। গণেশ মণ্ডল, হরিশ খুড়াে এবং আর
দুজন প্রৌঢ় ভদ্রলােক এর এই রসিকতায় একটু কাষ্ঠ
হাসি হাসলেন: 'তর্কটা চাপা না দিয়ে আমি বললুম
“দেখুন, এটা দুর্নীতি কিরূপে বলছেন, মেয়েটা পৃথিবীর ভার
বাড়িয়ে থাকা ভিন্ন, সে আর কোনও রকমে কারুর কোনও
উপকারেই আসতে পারবে না—এ অবস্থায় সে যে নিজেকে
সরিয়ে নিল এই
নিল এই খেলা থেকে—এতে তার হৃদয়ের
মহত্বের চিহ্ন। সে যদি অবশ্য সব দিক দিয়ে ভেবে
মুসাফির

निन
ধরে নিতে
দেখে থাকে, তাহলে একটু ভুল করেছে
হবে, তার বেশী কিছু না"এতে পাপই বা আছে
কেন, আর দুনীতিই বা কোথা থেকে এল••••
মিনতি তার শীর্ণ হাত দুখানি দিয়ে
আমার হাঁটু দুটো জড়িয়ে বসে একমনে আমার কথাগুলাে
শুছিল। বনেদী খরিদ্দারদের দলটীও এবার একটু বিশেষ
সজাগ হয়ে উঠলাে আমার দিকে ইঙ্গিত কোরে দু'চার জন
কানাঘুসােয় কি সব বলা বলি করছিল।
তাদেরই ভেতর থেকে সাড়া দিয়ে
নগেন মণ্ডল মহাশয় বলেন, “বেশ বেশ, ভগবানের দান
নিয়ে ছিনিমিনি খেলাই পাপ হে ছোকরা, পাপ কি আর
গাছের ফল ? আজকালকার ছােকরা তোমরা যত, ডে'পােমি
শিখেছ বই তাে নয়। কি বল, ঘােষালের পাে?
বললুম, উনি আর বলবেন কি?
দেখুন আপনারা বৃদ্ধ হ'লেও
চোখ খুলে দেখেন নি, আমি এই জীবনের সমস্যা নিয়ে
আজ কয়েক বছর ধরে ভাবছি, দেখছি এবং অনেক
রায়

কুড়ি
জিনিষ ভেবে পেয়েছি। আপনারা যে প্রত্যহ কেমন কোরে
দিন কাটান, তাও তাে ােেজ দেখছি
চন্দ্র ঘোেষাল বাবু আর নগেন মণ্ডল
দুজনে সমস্বরে বলে উঠলেন 'বাহ,কেলেবর ছােকরা, ভেবে
ভেবে কি পেযেছ এখন বলাে দেখি বড় ভাবুক লােক
তাে হে তুমি দেখছি ! ও রামগােপাল বাবু, ছােকরাকে
আমাদের তরফ থেকে এক কাপ চা দাও তাে হে:••
বললুম দেখুন, ঠাট্টা নয়।
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সুখের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছে।
ভাবে না যে মানুষের জীবনের মানেই আলাদা: •••সুখের
অর্থ হচ্ছে একেবারে শান্তি বা সম্পূর্ণ জডের অবস্থা
আর জড মানে যার জীবন নেই। সুতরাং জীবনই যার
রইল, সে কি করে সুখ পাবে জীবন থাকাতেই তাে
যতাে গণ্ডগােল দুঃখ যন্ত্রণা, ঘৃণা, হত্যা, জীবনে এ
সবই চাই:•••এই সৃষ্টিই যখন তাহলে আমাদের সুখের
শান্তির অন্তরায়, বৃথা জীবনে কেন তার পেছনে ছুটে
মুসাফির

॥
জালা বাড়াই। তাই আমার মত এই যে, মানুষ এখনও
বুঝুক যে ভবিষ্যতে তাদের পর আর সৃষ্টি যেন না
মিছিমিছি আবার কোটি কোটি তাদেরই মত
জন্ধুকে জীবনের জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরতে হবে।
ঘােষাল বাবু এইখানে বেঞ্চি থেকে লাফিয়ে উঠে বললেন,
‘বলি হে ছােরা! বড় যে বড় বড় কথা কইছে। বলি—
তােমার বয়সের ছেলের আবার মতবাদ কি হে?
তর্কটার অন্যরকম রূপ নেওয়ার
উপক্রম হচ্ছে দেখে হরিশ খুড়ে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন
‘থা থাক্‌, ঘােষাল মশাই ছেলেমানুষের সঙ্গে মাথা গরম
করে লাভ নেই। আজ তবে চলুম, রামগােপাল বাবু, ওঠ
হে সকলে
যাবার সময় আমার দিকে
চেয়ে তিনি একবার বলে গেলেন, “ওহে, তােমার মতবাদ
নিয়ে ভবিষ্যতে তােমার সঙ্গে কিছু আলাপ করবার
ইচ্ছে রইল। একথা ঠিকই, সবজিনিষই একটু নতুনভাবে
ভাবতে শেখা, জগতটাতে বেশ ফুর্তিতে চালিয়ে যাওয়া
রায়

বাইশ
-অবশ্য জীবনের দায়িত্বটুকু বর্জন না কোরে—খুব ভাল।
আচ্ছা, চম, মিনতি মা।'
এই এক
সকলে হাসাহাসি করতে করতে
রাস্তার অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন—যাবার সময়
হরিশ খুডাের শ্যেন দৃষ্টি যেন আমায় একেবারে বডশীর
মত গিথে রইল।
দিনের তর্কের আলাপে
আমার জীবনটায় যে কি একটা দাগ পড়ে গেল,
এতদিন বাদে বলা শক্ত। ছেলে বেলা থেকে এত সব
শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে এসেছে যে দুৰ্জ্জয়, সে-ও
আজ অবসন্ন হয়ে পড়ল।
মুসাফির

তেইশ
কম-সে-কম ছেচল্লিশটা বছর
যমের হাত এডিযে এই নশ্বর জগতে বেঁচে থাকায়, হরিশ
খুডাের আর কিছু লাভ থােক না হােক, এই বিশ্বের বাজারে
যা কিছু জিনিষ মেলে, তা যাচাই করবার একটা বিশেষ
ক্ষমতা জন্মেছিল-এক আঁচড়েই মাল বুঝে নিতে হরিশ
খুড়াে হয়ে গিয়েছিলেন ওস্তাদ। তাই আমার মত এই

চাবণ
।
পাগলাটের সাথে প্রথম দিনের কথাবার্তাতেই খুডাে টের
পেয়েছিলেন জিনিষটীতে বেশী ভেজাল নেই।
বাজারের হালচাল যে
তাতে হাতের মুঠো খাঁটি মাল পেয়ে, ঠেলে ফেলে দেওয়াব
মত মুখতা খুড়ার ছিল না। তাই আমার সঙ্গে প্রতিদিনই
তিনি সময় বুঝে খানিকক্ষণ গল্প ক'রে তবে বাড়ী ফিরতেন।
এই সব গল্পের মধ্যে থেকে খুড়ে যা’ পেলেন, তাতে দেখা
গেল, কোথায় যেন একটু বেসুরে, একটু খাপছাড়া ভাব
আছে।
খুডাে যে সুযােগ খুজছিলেন,
তা’ এবার পেলেন। কৰ্মীসংঘে'র নববর্ষের উৎসবের দিন
এগিয়ে এসেছে—তিনি সব পাণ্ডা ছেলেদের একদিন বলে
এলেন, “আজ একজন দুর্জয় কর্মীকে তােমরা দেখতে
পাবে, তাকে রাখতে পারলে কাজ হবে।'
ছেলের দল সমস্বরে খুড়াের কথা
সমর্থন করলে।
মুসাফির

পচিশ উৎসবের আড়ম্বর দেখে আমি বুঝে নিলুম যে ‘সংঘের অবস্থা আর যাই হােক, অর্থের দৈন্য মােটেই নেই। স্বেচ্ছাসেবক দলের পােষাক পরিচ্ছদে রীতিমত smurtness এব যে ছাপ আছে, তা অস্বীকার করবার উপায় ছিল না এবং গান বাজনা একেবারে প্রথম শ্রেণীর না হলেও সহরের বড় বড় যে অনেক সন্মিলনীই এরকম শিক্ষা পেলে ধন্য হয়ে যাবে অন্ততঃ প্রথম দিনের আভাসে আমার ঠিক এই ভাবটা মনে এসেছিল বলেই খুডাে ঠিক কোরেছিলেন। খুডাের হিসাবে যে বেশী ভুল হয়েছিল, তা বলছি না। তবে সভাপতি মহােদয়ের অভিভাষণ থেকে সংঘের কার্য- প্রণালী সম্বন্ধে যে ধারণা হল, তাতে অনেক শক্তি ও অর্থের যে অপচয় হচ্ছে তাতে আর সন্দেহ রইল না। সংঘের কর্মী’ নামে খ্যাত এইরূপ দু’চার জনের সঙ্গে খুডাের আড়ালেই কিছু আলাপ করা গেল খুটিনাটি জেনে নেওয়ার জন্যে। যা ধারণা করেছিলুম, সেটা তাতে আরও বদ্ধমূল হয়ে দাঁড়াল। স্থির করলুম ‘সংঘে’ রায়

ছাব্বিশ
থেকে এদের সঙ্গে মিশে, কাজ শেবে, তর্ক কোরে এদের
এ পথ থেকে ঘােমাতে হবে।
দলে তাই ভিডেই গেলুম। মাস
খানেক কাটলও বেশ হরিশপুড়াের সাথে। খুডাে খুসী
আমার কাৰ্যপ্রণালী দেখে। ‘অশনি’
দেখা নাের ভার শেষে খুজে তুলে দিলেন আমারই ওপর।
সংঘের সঙ্গে নিজে ক্রমশই বাঁধা হয়ে পড়ছিলুম। খুডাে
মনে মনে ঠাওরালেন,
-তিনি জিতলেন। আমিও কিন্তু শেষে
আমার কাজের ধারা স্থির কোরে নিলুম, ভাবলুম কয়েক
দিন, তারপর উঠে-পড়ে লাগলুম দেখাতে যে হরিশখুডাের
এত চেষ্টা সফল হলেও সার্থক হয় নি।
সে দিন বসলুম
হঠাৎ খুডোের সঙ্গে তর্ক করতে—“আচ্ছা খুডাে, এরকম
উদ্দেশ্যহীন হ'য়ে কাহাতক কাজ করা চলে?' খুডো শান্ত
ভাবে উত্তর দিলেন, কেন, দেশসেবাই তাে একটা উদ্দেশ্য।
স্বাধীনতার বাণী ব’য়ে এই যে সব বই এখানকার ছেলেদের
হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, এর কি কোন উদ্দেশ্য নেই
বলতে চাও?
মুসাফির

সাল
বাধা দিয়ে বলে উঠলাম, “কি
বললেন খুড়াে,স্বাধীনতা? ঐ কথাটার আর অবমাননা
করবেন না। আপনার শিষ্যবর্গের কোনটী স্বাধীন ? আপনি
কি মনে ভাবেন এদের সকলেই ভিতরকার একটা প্রেরণার
দরুণ এই সব কাজ করে চলেছে? মােটেই না খুডে,
এও একটা মােহের দাসত্ব মাত্র। পাশ করা বিদ্যার সঙ্কীর্ণ
গণ্ডীর বাইরে যারা ভাবতে পারে না, নিজের ভাই, বােন,
মা, বাপ ছাড়া বাইরে যাদের সংসার নেই, জীর্ণ পুথির ভারে
যাদের মাথা নীচু, বুক ফুলিয়ে সত্যের বড়াই পৰ্য্যন্ত করবার
যারা সাহস রাখে না—তারা হবে স্বাধীন?আরে ছাে!
খুডাে বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন,
‘দুর্জয়, এতদিনেও তােমার ছেলেমানুষী গেল না, উদ্ভট
আইডিয়া যতাে মাথায় পুরে:
‘তাইতো, উদ্ভট বই কি। বলি
খুভাে, এ সব নরম-গরম কলম-পেষা থেকে, এই ছেলে-
গুলােকে একটু রেহাই দিন। একটু ভাজা হয়ে উঠ।

আটাশ
দিন। বাইরেটা একবার দেখে নিক, মানুষ কোন পথে
ছুটচে, কি ভাবে। তারপর নিজেরা দেখুক, বুঝ
कि
চাই, আর কি নেই। তা না, চাই স্বাধীনতা আর তার
সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে অহিংসাব্রত। আচ্ছা, এতে
হাসি পাবে না। আমাদের দেশে বসে আমরা ছাড়া
অন্যলােকে বেশ আরামে আয়েসে লুটে খাবে—স্পষ্ট বলবে
আমাদের জোর আছে তাই জোরসে আমরা কোবাে
প্রভুত্ব, আমরাই রাজা—তাই তাে আপনার চেঁচাচ্ছেন,
স্বাধীন হ'বাে••••যে ঐ রকম মজায় আমরা ছাড়া ওরা
থাকতে পাবে না। খুডাে, এতাে পুরাে হিংসাবৃত্তি, ওরাও
মানুষ আমরাও মানুষ, ওদের বুদ্ধি আছে, ক্ষমতা আছে,
ওরা করছে প্রভুত্ব:: আপনারা যদি হা করে ঘরের
কড়িকাঠ গােণার মত আকাশের তারা গােণেন—সে দোষ
কারধরুণ, আপনার ভাই আজ যদি হঠাৎ কোনও
রকম বুদ্ধি খেলিয়ে লম্বা জমিদারী হাতিয়ে বসে। তারপর
মােটা মাইনের দরওয়ান দিয়ে জোরসে, খাজনা আদায়
করে: 'আর আপনি যদি তখন গাইতে বসেন “দাদা, এ
লে ভাল হচ্ছে না। ওদের জমী ওরা করে চাষ, ওরা
মুসাফির

উনত্রিশ তুলবে ফসল-তুমি তার থেকে জোর কোরে ভাগ বসাচ্ছ কেন?••••তাহলে আপনিই পরশ্রীকাতর হয়ে পড়েছেন বলে গাল খাবেন বলুন খুডাে, খাবেন কি না ? e খুড়াে প্রকাণ্ড একটা ঢােক গিলে জবাব দেবার মত জুৎসই কিছু ঠাওরে নেবার আগেই আমি আবার বলে উঠলাম এ সে যুগ নয় খুডে এ যুগের মহামন্ত্র হচ্ছে: Gold & Spced, কপেয়া লাও, আর দৌড়কে যাও। Dynamic তাল রেখে চলতে হলে ওরই সামঞ্জস্যে নতুন করে ভারতীয় শিক্ষা, সভ্যতা গড়ে তুলতে হবে। Static অবস্থায় ভাবুকের মত বসে থাকলে ভেবে ভেবে সমাধি লাভ ছাড়া আর বিশেষ কিছুর সম্ভাবনা নেই। খুড়াে এবার রেগে উঠলল তােমার মস্তিটা দেখছি একেবারেই পাশ্চাত্যের ভাবে ডুবে গেছে, দুজ্ঞয়, তােমার মাথার ভেতর সেই যে সর্বনেশে, সর্ব- ধ্বংসী theory সেটাও তােমার ওদেশ থেকে ধার করা। রায়

ত্রিশ
‘তাতে আর ক্ষতি কি খুডাে।
পূর্বের সূৰ্য্য যখন মেঘে ঢাকা, তখন পশ্চিমের অস্তগামী
সূৰ্য্য দেখলেও আনন্দ হয়, আমরা প্রত্যক্ষ কিছু চাই,
নইলে আমােদ পাই না।'
খুড়াের মুখ দিয়ে সবে বেরিয়ে
এসেছিল, থাক্ থাক্‌
“থাক থাক্‌ যথেষ্ট দার্শনিক
যথেষ্ট দার্শনিক তত্ত্বের পরিচয়
পাওয়া গেছে এমন সময় একটি ছেলে স্তভাবে ঘরে এসে
খবর দিলে ‘অশনির সম্পাদক টেলিফোন করলেন,
আপনাকে এখুনই যেতে
খুডাে প্রশ্ন করলেন, কি বলে?
উত্তরে সেই ছেলেটি জানালে, কারণ বলেন নি। জরুরী
আসতে বলেছেন।
খুডাের মুখের পেশাগুলাে একটু
কুঞ্চিত হয়ে উঠলাে। ঐ মাথার ভেতর তখন যে কত কি
ভাবের ওলট পালট হচ্ছিল, তা ঐ মস্তিজস্থিত জীবগুলি
ছাড়া আর কারুরই জানবার উপায় ছিল না।
মুসাফির

একত্রিশ
সাহিত্য চর্চা করার যে একটা
সুপ্ত বাসনা
মনের ভিতর লুকান ছিল খুড়াের সঙ্গে
যােগাযােগের পর সেটা আত্মপ্রকাশ করার অবসর পেল।
‘অশনির পরিচালনার ভারের সঙ্গে সম্পাদনার ভারও
পড়লাে আমার হাতে। এতে নিজেকে বেশ একটু গৌরবান্বিত
মনে করলুম। কাজের মধ্যে নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলুম বেশ

বত্রিশ পথ ধরলাে এখন থেকে। ফুর্তিতে, স্বাধীনতার একটা ভােলা হাওয়া যে কত মধুর তা এই প্রথম আস্বাদ করলুম। জীবনের ধারা সম্পূর্ণ এক নতুন ঘর বাড়ীর সম্পর্ক ত বহুদিনই ঘুচেছে, এখন মিনতিদের ‘রেস্তরা', কি কোনাে বন্ধুবান্ধবীর আস্তানায় আড্ডা দেওয়া তাও গিয়েছে। সঙ্গী এখন প্রেসের কালি, পথের ধূলি, আর আফিসের মােটা মােটা বই পত্র। মাস কয়েক এইভাবে কাজ করবার পর হঠাৎ একদিন গভীর রাতে খুডাে—এখন হরিশদা, এসে হাজির। বললেন “ওহে তােমায় এবার সংঘে থাকতে হবে। এতদিন এই সংঘের সম্বন্ধ ওপর ওপরই চলে আসছিল, সংঘটী যে এখন আমাকে পেয়ে বসবে এতে মন বিশেষ খুসী হােলনা, বরং আমি চঞ্চলই হয়ে উঠলাম। আমাদের গাড়ীখানি জনশূন্য মাঠ- ঘাট পার হয়ে চলাে সহরের বাইরে। জায়গাটা কিন্তু পল্লীগ্রাম নয় সহরতলী বলা চলতে পারে। তারই ভিতর এক জীর্ণ প্রাচীন বাড়ীর ধারে এসে আমাদের ট্যাক্সি ডালে, হঠাৎ দেখলে স্কটের উপন্যাস বর্ণিত দুর্গের কথা মনে পড়ে। মুসাফির

তেত্রিশ
চারিদিকে গভীর জঙ্গল। মস্ত একটা ভাঙ্গা দরজামাইরের
অংশ সবট। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা—তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা এক
ইঞ্চি পুরু ইট থেকে স্পষ্টই বােঝা যায় বাড়ীটী কোনও
বনেদি বংশের.•••
টর্চ জেলে আমায় পথ দেখিয়ে
হরিশদা চললেন এগিয়ে তাঁর অনুসরণ করে এঘর ওঘর
দিয়ে যেতে যেতে সমস্ত ঘর গুলো বেশ
নিলুম। ঘরের ভিতর মাদুর বিছিয়ে জনকয়েক ছেলে, কেউ
পড়ছে.. কেউ তর্ক কবচে....কেউ বা উদাসীনের মতাে
চিৎ হয়ে ‘সিলিং এর দিকে চেয়ে আছে। কোন ঘরে
ছােট ছােট মােজা ও গেঞ্জির কল নিয়ে কেউ কাজ
কচে, একটা ঘরে আবার ভাঙ্গা হারমনিয় নিয়ে গান
চলছে....কিছুরই অভাব নাই! অবশেষে একটা ঘরে
ঢুকলাম, সেখানে আমারই সমবয়সী জন তিনেক ছেলে
একরাশ কাগজ পত্র নিয়ে মনােযােগ সহকারে কি
পড়চে

চৌত্রিশ বিলাতি মমম মার্কা একখানি প্রাচীন পঞ্জীর অর্ধনগ্ন ছবি-একটী ন্যাশান্যাল ক্যালেণ্ডার দেয়ালটীর আপাদমস্তক চাপা দিয়ে নগ্নতা টেকটে। আমাকে সে ঘরে হঠাৎ দেখে কেহই বিস্মিত হােন্ন-আমি যেন ওদের বহু পরিচিত- এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। হরিশদাই আলাপ করিয়ে দিলেন—একজনের নাম সঞ্জীব। তার বাপ বাঙ্গালী, মা বার্মিজদুজনেই মারা গেছেন। হরিশদার কাছেই ও মানুষ, এখন সংঘের প্রচার বিভাগের কর্তা। আধুনিক যুগের সঙ্গে মন সমানভাবে তাল রেখে চলেনিতীক নিস্পৃহ: আর দুজনের মধ্যে—একজন রাখে হিসাব পত্র, আর এক জন, একে বেশ বড়দরের পাণ্ডা বলা যেতে পারে-কেন না ছেলে সংগ্রহে এই সংঘে এর মত পটু লােক নাকি আর নেই। আর গ্রামে গ্রামে তাদের নিয়ে সেবা সমিতি, যুবক সংঘ-এই সমস্ত গড়ার ব্যাপারে, ছেলেদের মন্ত্রণা দিতে ইনি একেবারে সিদ্ধহস্ত। এর নাম নিখিল। হিসাব রক্ষক মুসাফির পারিশ ভায়া যে রকম গভীর এবং অবসাদগ্রস্ত তার সঙ্গে আলাপ হওয়া দূরে থাকুকর্তার নামটা জানতেও সাহস হােলনা। সঞ্জীব আর নিখিলকে বেশ লাগলােকথাবার্তায় জমিয়ে নিলুম বেশ ছেলে এই সঞ্জীবটী-যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনি কথাবার্তা-পাচমিনিটে যে পরকে আপন করা যায়-এ আমার আগে জানা ছিল না আমাদের দেশের নানা সময় মাথা তুলে এলে সেই আলাপ আলােচনার মাঝে সঞ্জীবের প্রাণ গরীবের ব্যথায় ভরপুর- সঞ্জীব বলছিলাে-কুলি মজুরদের দুঃখে আমাদের প্রাণ কাঁদে না, কারণ তারা মিটিং করে নালােকজড়ো করে দুটো সস্তা বক্তিমে করে না কাজেই ধারা জগতে মানুষ বলে চলে আসছেন তারা আর ওদের মানুষ বলে গণ্য করেন না, প্রয়ােজন ন পড়লে ওদের কাছেই আমরা যাই না। । রা ছত্রিশ নিখিল বললাে, “ঠিক বলেচ সঞ্জীব, ছেলেবেলা থেকে কোনাে কাজে ঐটা হলে ‘বেটা চাবা’ বেটা চা' এই শুনে শুনে চাষারা যে কাজের লােক তা আমাদের ভদ্র দল ভুলে গেছে--রাজনীতির ওরা কি খার ধারে • • • আ-ই জানে না’ আমি বললুম, “দেখুন, ঐ খানেই আমাদের সকল স্বাধীনতা প্রচেষ্টার সর্বনাশ হয়েছে যারা বক্তৃতা করে বেড়ান, তারা মুখে লম্বা লম্বা কথা আওড়ালেও এই শ্রমিকদলের উন্নতির উন্নতির চেষ্টা কোনাে দিনও করেন নি!' ঠিক এই কারণেই আমরা দেশের শ্রমিকদলের sympathy হারিয়েছি তারা ভাবে ইংরেজ থেকেও যা, এই বাবুরা রাজা হলেও তাই। তবু ইংরেজী আদালত আছে বাবুদের কাছারীর জুতাের গুতো সামলানাে দায় হবে।'—সঞ্জীব বলে। নিখিল উত্তেজিত হয়ে বলল- তােমার কথা এক হিসাবে ঠিক, সঞ্জীব। আমাদের দেশ- মুসাফির

সাইত্রিশ
সেবীরা কেবল মতেই জানে দেশের হিতে সাধারণকে
দলে আনার তাদের চেষ্টা নেই, আনতে জানে না। তাই
দেশের লােকের যখন ঘুম ভেঙে ওঠা হয়নি তখনই
তাদেব হলো শেষ!
আমি সােৎসাহে বললুম,-“দেখুন,
দেবতা যেখানে তেত্রিশ কোটি, সেখানে কি শুধু ভােলানাথের
মাথায় বিবপত্র দিলে চলে-কালীর রসনাকেও সরস রাখতে
হবে। সাধারণের শক্তি সহানুভূতি না পেলে আমাদের কাজ
সব অকাজে দাঁড়াবে।
সঞ্জীব বললাে, আপনি আমাদের
এই আশ্রমের কাহিনী জানেন না হরিশদা বােধ হয় সব
ভেঙে বলেন নি। আমাদের policy
জনসাধারণকে নতুনের পথে শিক্ষা দেওয়া। এখানে এই যে
পল্লীমায়ের বুকে আমরা বসে আছি, এর কারণই তাই।
নিখিল অভিমানের সুরে বললো,
হরিশদা'র ওপর কিন্তু আমার মাঝে মাঝে রাগ হয়
এখানকার কাজ তিনি নিজের ইচ্ছামত চালাতে চান

আটত্রিশ
আমি সে দিন যে সব স্কীম দিলাম সেগুলো উনি ভেবেও
দেখেন নি বােধ হয় আজো-আমি চ্যালেঞ্জ কচি সে
কীমে আমি একলাই এরকম দশটা আম চালাতে
পারবো।
সঞ্জীব বলে, এ তােমার ক্ষমতা-
প্রিয়তার লক্ষণ— control আমি আজই ছেড়ে দিচ্চি তুমি
চালাও না, অভিমান কবার কিছু নেই।
এই সময নিখিল হঠাৎ উঠে
চলে গেল। কারণ আমাদের অজ্ঞাত রইলাে না।
কথায় কথায় বুঝলাম—সঞ্জীবের
এই গণ্ডীদেওয়া স্বাধীনতা পছন্দ নয়—সে বনের পাখী,
আকাশের নীলে তার পাখা মেলাতেই আনন্দ সােনার
খাচা তার জন্যে নয়।
অন্ধকার ঘনিয়ে এসেচে ভালাে
করেই সঞ্জীব উচ্ছসিত হ'যে বলে চলেছে ‘সব দলেরই
মূল কথা হচ্ছে। ‘মুক্ত হও, বুদ্ধ হও তাব
হও••••তাব পথ হচ্ছে
মুসাফির

উনচল্লিশ
জাগৃহি। বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, কবি, শিল্পী, সবাইএর
দলের মূল কথা ‘জাগাে’—নিজেকে যেমন করে তুমি জানো
তুমি শুধু তাই নও••••আঁধার তােমার পথ নয়-সকল
•সংশয় দূর করে—অজানার জয় গাইতে গাইতে বেরিয়ে আসাই
আসল।
বললুম, মানুষের সাধনাইত এই
জাগরণের সাধনা--প্রতি ক্ষণে আমাদের মন জানিয়ে যাচ্ছে ।
ওগাে জাগাে, জাগাে। সকালে হাসিমাখা দিনটীর পুলকরশ্মি
যখন এসে স্পর্শ দেয়—সেও বলে... ওগাে
জাগাে।
পাখীরা বনে আধারের ঘােমটা না উঠতেই গেয়ে ওঠে
জাগরণী গান-আবার দিনের দেবতা যখন অস্তাচলে যায়
সেও বলে যায—আজ তুমি জাগলে না-জানলে না নিজেকে।
মিশিয়ে যায় তার পাযের ধ্বনি। পাখীরা ফিরে যায়
নীডে....পাখার ঝাপটায় সেই প্রচ্ছন্ন তিরস্কার-জাগলে
নাতাে?
মুগ্ধ সঞ্জীব বলল ‘আপনি কবি,
আপনি শিল্পী, এতদিক থাকতে এই ঝড় ঝাপটা কন্টকময়
পথে এলেন কেন আপনি-আমি চাই দেশের বাঁধন কাটতে
রায়

চল্লিশ
কিন্তু আমি নিজেই জড়িয়ে আছি বাঁধনের নাগপাশে--তাই
ভাবি সমস্ত বন্ধন, সমস্ত জডতা আমার খসে যাক—আমার
চোখের সামনে নতুন জগৎ মুক্তির আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠুক।
বললুম, ‘তাই হবে ভাই, তােমার প্রাণ যখন স্বাধীনতার ডাকে
সাড়া দিয়েছে তখন তােমার ব্যক্তিগত অধীনতা তােমায় বেধে
রাখতে পাবে না।
সঞ্জীবকে আমার ভালাে লাগলাে
শঙ্কিত হরিণের মতাে দুটা চোখসুন্দর রেশমের মতো
চুলগুলি—প্রশস্ত ললাট—সারা দেহে একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ।
আকাশে মশঃ আধখানা চাঁদ
উঠছিলাে 'আঁধারকে দু'হাতে দূর করূতে করূতে যেন
জ্যোৎস্নারাণী রাতটাকে সুন্দর কতে
চাইচে•• সঞ্জীবের
মাথাটা আমার কোলে আমায় বাঁশীতে সে একটা সুব
ধরতে বললাে।
ওর ওপর প্রীতি ও প্রেমে আমার
সারা মন ভরে আছে তখন-রাজী হলুম। বেহাগের সুরে
মুসাফির

पकामिन বাণীতে ধলুম- “নিবিড় অমা তিমির রাতে বাহির হলাে জোয়ার স্রোতে শুক্লরাতে চাঁদের তরণী বাণীর ডাকে ও যেন আকুল হয়ে উঠলাে—বললাে,-“চলো ভাই, এ গণ্ডী কেটে আমরা চলে যাই বাইরে কোথাও—আর এ গতানুগতিক জীবন ভালাে লাগেনা—চলাে আজই তাকে শান্ত করুবার অই বললুম, যেতে আমি পারি সঞ্জীব—কিন্তু তুমি কি এই মায়া কাটিয়ে উঠতে পাবে? —কিসের মায়া হে তােমাদের আবার মায়াবাদে জড়ালে কে?'—হরিশদা হঠাৎ ঘরে ঢুকে এই কথা বললেন। হরিশদা বেশ হাসি দিয়ে তাঁর অন্তরকে ঢাকতে চাইলেও কিসের একটা শঙ্কা যেন তার মুখে , রায়

বেয়াল্লিশ
প্রট। আমায় বললেন,-“দেখ দুর্জয়, আমায় ত’ আজই
start করূতে হবে মাদ্রাজের দিকে—সেই যে ট্রেণ
সংক্রান্ত ব্যাপার-সম্ভবতঃ তারই একটা গণ্ডগােল হয়েছে
তা তােমাকে আমার প্রচারের কাজগুলাে ক’বতে হবে-
আশ্রমের ভার তােমার ওপর ‘অশনির সম্পাদনাও তােমায
চালাতে হবে। এক কথায় আমাকে তুমি oficiate কবে
সঞ্জীব অবশ্য সাহায্য কবে। বলল রাজী তত? বললুম
‘আমার ওপর এ গুরুভার না চাপালে কি চালে না
হরিশদা?
আর কেউ যদি
আমার কথা শেষ কতে না দিয়েই
হরিশদা বললেন, ‘আলাপ তােমার সঙ্গে অল্প দিনের হােলেও
তােমায় আমি জেনেছি-তুমি ছাড়া এ কাজ আর কাউকে
দিয়ে শান্তি পাবে না—তুমি রাজী
হও। লক্ষনীটী-
বুঝচো ত’ সব।
হেসে বললাম, আচ্ছা, ভাই হবে।'
এমন সময় বাহিরে কার পদশব্দ
পেয়ে চমকে চাইতেই দেখি নিখিল সবে গেল বিদ্যুৎ বেগে।
হরিশদা তখন চলে গেছেন ঘর ছেড়ে।
মুসাফির

তেতাল্লিশ
আমার হাতে ক্ষমতা আসাটা
তার প্রীতিপ্রদ হােল না—নিখিলের কাছে আমায় সাবধানে
চলতে হবে দেখচি।
সেই রাতেই সঞ্জীব এসে একবার
জাগিয়ে বললাে, “নিখিলকে একটু লক্ষ্য করে চলতে
হবে। ও এই কিছুক্ষণ আগে তােমার ওপর বিদ্রোহ
কতে বলছিলাে। সাবধান কিন্তু।
ঘুমের ঘােরে বললুম, তুমি আছো
প্রভাতের আলো যখন আমায়
এসে স্পর্শ করলাে তখন মনে হলাে জীবনের আজ নব
প্রভাত....আজ থেকে আমার জীবনের সকল চিন্তা,
সকল কাজ এই সংঘেব দিক থেকে পরিচালিত হবে।
আমি এখন বন্দী
।
পরক্ষণেই সকল উৎসাহ আমার
নিতে গেল—খামে মােড়া সঞ্জীবের এক চিঠি পেয়ে

সে লিখেচে- “দুর্জয়দা, স্বাধীনতার थामन রূপের সন্ধান পেয়েছিলুম, তােমার বাণীর ভেতর দিয়ে। আশা ছিল হয়তাে বা একদিন তােমারই সাহায্যে তা সার্থক হবে। কিন্তু দেখছি, তুমিই নিজেকে আরও বন্ধনের মধ্যে এনে ফেলছে। আমি চললুম অত্যন্ত স্বার্থ- পরের মত ক্ষমা কোরাে—সংঘ তােমার দ্বারাই সচল হবে। আমার খােজ যেন কেউ না নেয়।” ০ মুসাফির

পঁয়তাল্লিশ
সঞ্জীব যে বাইরের জগৎ দেখতে
চায়, আর খুডােই যখন তার বাধা, তখন প্রথমতঃ খুডাের
প্রতি ভারী একটা বিদ্বেষের ভাব এসেছিল। •••মানা যায়
সব-খুড়ে সঞ্জীবকে মানুষ কোরেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন,
একরকম নিজের কোরে তুলেছেন কিন্তু তাকে স্বেচ্ছায়
জীবনযাত্রার পথ বেছে নেবার সুযােগ দেননি, দেবেনও না •••
এ কি স্বাধীনতা প্রচারকের ব্যবস্থা।

ছেচল্লিশ
আজ ভাবি, তাকে বিদ্রোহ
করবার কল্পনা দিই আমি, তাকে শক্তি দিই আমি
সে গেল চ'লে •••আমি নিশ্চল হয়ে বসে •••কিন্তু
উপায় নেই। ভাবি আবার, এই সংঘে আমিই দেখছি
বিশ্বাসঘাতক, আমিই এখানকার বাৰুদ হয়ে দাড়াচ্ছি
যার বিস্ফোরণে হয়তাে এটী একদিন শেষ হয়ে যাবে। সঞ্জীব
নিখিলের ভাবান্তর লক্ষ্য করার কথা আমায় বলেছিল,
আমার বিরুদ্ধে যাতে সঞ্জীব দাড়ায়, বােধ হয় তাই ছিল তার
উদ্দেশ্য• • • •আজ সে সংঘের দিক থেকে আমাদের কাছে
বিদ্রোহী হয়েছে, কিন্তু আমার প্রেরণাই তাকে ওপথে
নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। হরিশ খুডাের কাছে জবাবদিহি
করতে হােলে, কি উত্তর দেবাে? সমস্ত মনটার ওপর
কেপে উঠলুম, হরিশপুডো-সঞ্জীব আর তার শৈশবের
কথা লাগলুম ভাতে। সে যে স্বাধীন পাখী, স্বাধীনতার
আবহাওয়ায় তার জন্ম, তার দেহে যে চঞ্চল রক্তের গতি
তা রোধ করার ক্ষমতা তো কার নেই। হরিশপুড়ে তাই
বলেছিল • • •‘দুর্জয়, ভাইটার বিষয় একটু সাবধানে
চোলাে তােমার হাতে একে সপে দিছি, জানি তুমিই
মুসাফির

সাতচল্লিশ
এর কদর হয়তাে একদিন বুঝবে।
জীবনে একটা ভুল
করেছিলুম তার ফলে, একেও এই আগুনে পড়তে হয়েছে:
কিন্তু উপায় নেই দুর্জয় ••••পথে আমাদের পথিকের
আনাগোনাকে বাধা দেবে কে?'
আচ্ছা সঞ্জীৰ কি ভেবেছিল
তখন বােধ হয় তার ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি।
পেরিয়েই সে দেখেছিল তার বাবা কিসের উদ্দেশ্যে একদিন
বেরিয়েছিলেন, কিন্তু অগস্ত্যমুনির মত তার সে যাত্রার
শেষ হয়নি।
‘মা-ফিন তার মা -বস্মী
যুবতী-পরিশ্রম করে দিন্ কাটায়—সেই স্বল্প অবসরের মধ্যেই
তাকে আদর করে,—গল্প বলে,—এইভাবে দিন কাটছিল
মন্দ নয়—শৈশব স্মৃতি যেন, সমস্ত মুছে গেলেও লুপ্ত হতে
চায় না।

আটচল্লিশ
তারপরে হঠাৎ পথহারা
হয়ে পেশুর সহরে ঘুরতে ঘুরতে অদ্ভুত এক মৌলভীর
সাথে আলাপ তার মার, তারও, লম্বা লম্বা তার চুল
পরণে ঢিলে আলখাল্লা-চোখে যেন কিসের অপূর্ব জ্যোতি।
তার পাল্লায় পডে ঘুরতে ঘুরূতে শেষে এই আড্ডায় এসে
পড়েছিল—সে হরিশখুডাের যৌবনের কথা-ফেরারী হয়ে
তখন দেশে দেশে বেডান ভিন্ন তার তখন আর কোনাে
পেশা ছিল না।
বহুকাল এই আড্ডায় কেটেছে
তাই এখানকার স্মৃতি একেবারে মুছে ফেলা সঞ্জীবের পক্ষে
নিশ্চয় অসম্ভব মনে হয়েছিল কিন্তু তাও
উঠছে
সে কাটিয়ে
আমার মনের মাঝে একটা বিপ্লব
চলছিল সঞ্জীবের এই হঠাৎ মুক্তির পথ নেওয়ায়, মনটাকে
নিজে নিজেই গম্ভীরভাবে একবার বললুম-“মায়া হচ্ছে ভাই ?
••• মন তার জবাব দিল না
মুসাফির

উনশঞ্চাশ
দিনের পর দিন কেটে যায়,
খুড়াের কোনও পাত্তাই নাই। সঞ্জীবের ভাবনাও মন থেকে
অনেকটা নেমে গেছে। মাদ্রাজে খবর নেওয়ার চেষ্টা কোরেও
যখন কোনও খবর পাওয়া গেল না, তখন দিন কতক খুড়াের
ফেরা সম্বন্ধে হতাশ হয়ে পড়লুম •ভাবতে লাগলুম,
আবার কি জ্বালা, সংসার ছেড়ে এসে এই বন্ধনের মধ্যে
ব

পঞ্চাশ
থাকতে হােলেই তাে গিছি। ইচ্ছে হােল এই সময়ে
ছেলেদের ওপর ভার দিয়ে একবার আবার বাড়ী ঘুরে আসি
কিই বা তারা আমার কোরেছে ?•••আর ফিরবােইতে
দু’চার দিনের ভেতর মনকে সংযত করলুম যে
তাড়াতাড়ি নয়':সব জিনিষ ভেবেচিন্তে কোরতে হবে ।
এত
একে বলে দিবাস্বপ্ন • কলকাতার
হাওয়া আমার মনকে একেবারে সেই পুরােণাে যুগে ফিরিয়ে
নিয়ে গেল জীবনের প্রথমে যে স্বপ্নের ঘােরে কিছুকাল
কেটেছিলাে, জানালার ভেতর দিয়ে জ্যোৎস্না আবার সেই
কথা মনে করিয়ে দিলে•••সে অনেক কালের কথা।
‘খেয়ালীর স্বপ্নকথা তখন শেষ
হয়েছিল •• কলােককে পডিয়ে শােনানও হয়ে গেছে।
সেদিন বুলাও শুনেছে নিজের মনে আজ বেশ একটুখানি
গর্ব অনুভব করছিলুম কারণ মস্ত নাকি সাহিত্যিক হতে
চলেছি-বুলে তােত ভারী খুশী হয়েছিল গল্প শুনে •••
ভাবছি, তবু যদি বলতুম এর অধিকাংশ নিজেরই আত্মকথা।
মুসাফির

पाव
1
ভরি
রি হযেছে
•বির বির করে
বাতাস বইছে, গাছের শুকনো পাতাগুলাে নৃতে নাচতে
চারদিকে লুটিয়ে পড়ছিল: ‘আস্তে আস্তে বেরিয়ে পড়লুম
বুলার বাড়ীর উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌছে সামনে একটা ছোট
ছেলেকে জিজ্ঞাসা কতেই সে তাে সােজা ওপরে নিয়ে গেল ।
বুলা এল, বললে ‘যাক, কি ভাগ্যি কথাটা রেখেছ।
তারপর, দিনগুলাে কাটাচ্ছ কেমনভাবে?
—“আশ্চৰ্য্য! তােমার কি আর
কিছু বলবার নেই, এই কথা কইবার জন্যে বাড়ী পর্যন্ত
টেনে আনবার কি দবকার
কুলা হেসে ফেললে, বলে, ‘আহা
আমার কোনই দরকার ছিল না, তোমার খেয়ালের সব গল্প,
মা, দিদি এরা শুনে আমায় একদিন তােমাকে আনতে
বলেছিল, তাই ডাকা •• এখন তাদেরই ডেকে দিচ্ছি,
আমার সত্যি কোনও দরকার নেই
কথাগুলি অতি সামান্য হলেও
আমাকে বিস্মিত করে দিলে। এই কয়দিনের মধ্যেই আমার

বাহায়
অনেক
জীবনে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে।
আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে এই মনে, এখন আবার নতুন
আলাপের সৃষ্টি: ''বেশী কিছু ভাববার আগেই হাসিমুখে
এক তরুণী এসে ঘরে ঢুকলেন, বুলার সঙ্গেই। -‘ইনি হচ্ছেন
আমার দিদি, এখন বি, এ পড়ছেন’: • •'কথাটা শেষ হবার
আগেই আর এক প্রোডা মহিলা এলেন। বুলা বললে
ইনি মা: যন্ত্রচালিতের মত দুজনেরই পায়ের ধূলাে নিলােম
কিন্তু তরুণীর বেলায় হাতটা যেন একটু কেপে উঠলাে।
ভাল করে কারুর মুখের দিকে আমি তখনও চেয়ে
দেখিনি •এবার নতুন ‘মা’র দিকে চাইতেই, তিনি
বললেন, 'এই যে বাবা, তােমার কথা বুলার মুখে শুনে
শুনে তাে পাগল হয়ে গেলুম। বলি, ছেলেটাকে নিয়ে
আসিস না একদিন, তা এমনি হিক, পাছে বা একটু
ভালবেসে ফেলি, এই ভয়ে আনবে না। •••হেসে ফেল্লাম
বললাম দেখুন তাে মা, কত ভাল ছেলে আপনার। আমরা
তাে সমস্ত জীবনে কাউকে ভালবাসতেই পারলুম না,
নিজেদের বখেয়ালগুলাে ছাড়া। বুলা এইসময, তোমরা
তাহ'লে গল্প করাে, আমি চলি'—এই বলে উঠে গেল।
মুসাফি-

মা. বললেন,
‘দেখলে তো,
ছেলে আমার সহ হােল না। আমায় আবার ভাবনায়
পেয়ে বলল। বাইরেও এত চমৎকার মা আছে।
জগতের অনেক কিছুই জীবন থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে দেখছি।
মা বললেন--“কি গাে দুয়, কি ভাবছে হ'য়ে ?
দিদি তার উত্তর দিলে --লেখক ছেলে তােমার মা, একটু
ভাবুক হবে না ? তরুণী দিদি চুলগুলাে ঘাড়ের উপর একবার
ফিরিয়ে নিয়ে আমার সামনেই মাদুরটার ওপরে এসে
বলল। তারপর বলে, তুমি নাকি ভারী একগুয়ে, বুল
বলছিল। কেবল বাড়ীর সঙ্গে ঝগড়া করে, আর বাড়ীতে
থাকে না। আমি যদি তােমার বােন হতুম তাে দেখতুম
একবার কেমন ঝগড়া করে পারাে।
'এমন মিষ্টি
আমি তাে অবাক
করে কথা তাে কেউ কখনও বলে নি। ম্লান হাসি হাসবার
চেষ্টা করে একবার তরুণীর মুখখানির দিকে শান্তভাবে
চাইলাম মেয়েটীর চোখ দুটা হাসিতে ঠিকরে পড়ছিল,
কালাে এলোচুলের রাশ বা পাশদিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে তিনি

চুলগুলি নিয়ে খেলা করছিলেন : আমি কি সম্ভাষণ
ক’রবাে। বুলার দিদি, সুতরাং একেও আপাতত তাই
বলে মেনে নিতে হবে। অতি কষ্টে ঢােক গিলে আমি
বললাম ‘পরকে নিজের করে নিতে পারলে তাে এখনও
পারেন, আপনি কি আমারও দিদি নন।' কথাগুলো
বলতে বলতে আমার ঠোট দুখানি কেপে উঠলাে::
মনটাকে স্থির করে নেবার জন্যে
আমি মার উদ্দেশ্যে ফিরে চাইলুম, দেখলুম তিনি
নেই সেখানে। এবার আমি সত্যি সত্যিই ঘেমে উঠলাম,
চোখ মুখ লাল হয়ে এল। আমি যদি জানতাম যে এই
তরুণী দিদিটী আমার সমস্ত হাবভাব লক্ষ্য করছে, হয়তাে
ছুটে পালিয়ে যেতাম। অলকা কি আর অত বােক।। বেশ
শান্তভাবেই বললে, বুল। যা’ বলে ঠিক। লােককে খুসী
করায় তুমি একেবারে সিদ্ধহস্ত। বেশ আলাপ করছে।
এখন, কলকাতায় ফিরে গিয়ে আব হয়তাে দেখাই করবে না।
অলকার রহস্যভরা চোখ আমার ওপর, তারপর নিজের
যৌবনােদ্ধত দেহখানি এক সুন্দর ভঙ্গিমায় দুলিয়ে, এলাে
T
মুসাফির

চুলের রাশ হাত ফিরিয়ে বাঁধতে বাঁধতে উঠে পড়লল, মিষ্টি
হাসির সাথে সুর মিলিয়ে বলে গেল ‘বােসে, পালিও
না যেন
আমার জীবন যাত্রায় এই এক
রহস্যময়ীর আবির্ভাব হােল। একা একা আমি সেখানে বসে
থাকতে পারলাম না, উঠে পড়ে জানালাটার ধারে দাঁড়িয়ে
বাইরে রাস্তার দিকে রইলাম চেয়ে। খট করে একটা শব্দ
হল, ফিরে চাইলাম,মা, দিদি দুজনেই। মার হাতে সাজান
খাবারের থালা। আমি প্রমাদ গুলাম অনেক ওজন
আপত্তির পর চা-টুকু আমি শেষ করলাম, তারপর বললাম
‘আজ চললুম, দেখা তাে হবেই আবার :-
তরুণী দিদি রঙীন চোখে চেয়ে
বললেন, “সে তােমার খুসী:
বিদায় আলাপন শেষ করে, আমি
নেমে এলাম। পেছন থেকে বুল। ছুটতে ছুটতে এসে
বললাে, “আহা, চলাে একটু এগিযেই দিই। পরে যেতে
যেতে আবার বলে, “মা কি বললে জানিস? আমারই মত
রায়

--
ছালার
কাপা, তবে আমার চেয়ে ভাল নিশ্চয় নস, তা বলে দিচ্ছি।
যাই হােক, এবার কলকাতায় গিয়েই তাে আমি বিদেশ
চলছি, তুই রােজ যাবি সেখানে, বুঝলি? মা, একটু তবু
কথা ক'য়েও খুসী হবে।
বুলার দিকে চাইলাম এ চাউনির
একটা অর্থ ছিল, বুলা বুঝলে না। মুখদিয়ে অস্পষ্টভাবে
বেল—“খুশী করাই আমার ব্যবসা কিনা? বুলা চকে
উঠলাে। এই স্বল্পপরিচিত তরুণী যেন একরাশি শিউলি
ফুলের গন্ধ নিয়ে জ্যোৎস্নারাতে মনের উপটে ছুটে এলো।
তাকে সরানাে যায় না, ভােলা যায় না,মনে পড়তে
লাগল তার সনে আলাপন, পরকে সহজভাবে আপন
করে নেবার অদ্ভুত ক্ষমতা। সে যেন চুম্বক, কিন্তু তার
সম্বন্ধে আর কিছু ভাবা যায় না। এ যেন সমুদ্রের
বেলাভূমে বসে রত্নরাজির স্বপ্ন দেখা,না, আর এর
কথা ভাববাে না।
মুসাফির

माण
আমি একটা স্বস্তির নিশ্বাস
ফেললাম: ‘ক’লকাতায় যখন ফিরেছিলাম তখন থেকেই
আমি যে আর আগেকার স্বরূপ নিয়ে ফিরিনি তা বাড়ীর
সকলেই টের পেয়েছিল। আমার নতুন রূপটা তখনও
বাড়ীর বা নিজের কাছে বােধগম্য হয়নি যখন, সেই সময়
হটাৎ একদিন সেই অতীত কালের হরিণখুডে এসে দেখা

কাটায়
দিলেন। আমার বুকটা গুর গুর করে একটা অজানা
ভযে কেঁপে উঠলাে:
সামনেই আমাকে পাওয়া যাবে
হরিশদা তা ভেবে পান নি। শান্তভাবে বললেন, ‘শীগগির
বেরিয়ে এসো, জামাটা গায়ে দিয়ে। আমি নিঃশব্দে হুকুম
পালন করে তার সঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।
B
তখনও সন্ধ্যা হয়নি।
দুজনে
খানিকক্ষণ কোনও কথা কইতে পারলাম না। শেষটায়
হরিশদাই একবার আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সঞ্জীব
কোথায় দুর্জয় ?
আমি চমকে উঠলাম। চেনা
লােকের কোনও জিনিস চুরি করে ধরা পড়লে যে
হয়—আমার ঠিক সেই অবস্থা।
সেই অবস্থা। আমার কাণে
বজের মত আওয়াজে যেন এল ‘উত্তর দাও
রইলে যে’• • •
চুপ করে
অজি বিবেকের কাছে আমি
নিজেকে হীন, পলাতক, বিশ্বাসঘাতক বলে ধরা পড়ে যাচ্ছি।
মুসাফির

উনষাট
৫
আমার পাদু’খানা ঠক্ ঠক করে কাঁপতে লাগলো।
হরিশদা’র মুখের দিকে চেয়ে মনে হােল যেন
আগুন জ্বলছে। তারপর সমস্ত ধোঁয়া •আগুনের আলাে
ঐমে অস্পষ্ট হতে হতে সমস্তটা কালাে ধোঁয়াতে ঢেকে
গেল আমি সেই ঘাের অন্ধকারের ভেতর কিছুই না
দেখতে পেযে টলে পড়ে গেলাম
রাস্তায় একটা হৈ চৈ পড়ে গেল।
হরিশদা ব্যাপারটা পাছে বেশী গণ্ডগােলের হয়ে পড়ে
এই ভেবে, তাড়াগডি একখানা ট্যাক্সিতে আমার জ্ঞানশূন্য
দেহখানা তুলে নিয়ে, একেবারে ‘আড্ডায় ফিরলেন
যখন জ্ঞান হােল, ভারি লজ্জিত
হয়ে পড়লাম। চোখ মেলে দেখি সামনেই একটা চেয়ারে
ব'সে, এক দৃষ্টে বাইরের কালাে মেঘের দিকে চেয়ে হরিশদা
কি ভাবছেন। ইচ্ছা হােল তার কাছে ক্ষমা চাই সঞ্জীবের
ব্যাপারের জন্য। প্রাণে লেগেছিল বলেই অমন একটা
কাজ সে হঠাৎ করে ফেলেছিল—আমি তো নিমিত্তের
ভাগী। আমি হড মুড কোরে বিছানা থেকে উঠে
রায়

যাট
পড়লাম: শব্দ পেয়ে হরিশদার চমক ভাঙলো, আহা,
করে কি, শুয়ে থাকো দুর্জয় ••••
ততক্ষণে
তার হাত দুখান
আমি ধরে ফেলেছি। বললাম ‘মাপ করুন, আমাকে। সঞ্জীবকে
আমিই লােভ দেখিয়ে, এইখান থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা
করেছিলুম কিন্তু তার উপকার
তার উপকার কোরতে পারিনি।
এখানকার বন্ধন ছেডে, কোথায় যে বাঁধা পড়েছে, তা
জানিনা। হরিশদা আমার মুখের পানে চেয়ে হাসলেন একটু
তারপর বললেন ‘দুজ্জ, তােমার মাথায় এখনও সেই
অদ্ভুত theory গুলাে আছে কি? থাকেতাে, কিছুদিনের
জন্য ভুলে যেতে চেষ্টা কবাে। আজ আমার সঞ্জীব থাকলে
এ সংঘের ভাবনা ভাবতে হােতনা। আমি অন্য কাজে
যাচ্ছি, তুমি অন্ততঃ ‘অশনির ভারটা নিয়ে আমায়
খানিকটা মুক্তি দাও। আমি তােমার সঙ্গে দেখা করেও
তােমার স্বাধীনতার পথের কন্টক হবে না। বুঝলে দুর্জয়।
এখন উত্তর দাও • • •অনেক কাল আমি আর ফিরবাে না।
আমি হাঁ করে খুড়োর কথা
গুলাে গিলছিলুম কি অদ্ভুত মানুষ। কি সহ গুণ।
মুসাফির

একটি
সঞ্জীবের মত ছেলেকে এর আমিই
ছেলেকে এর আমিই বিপথে চালিয়ে
দিযেছি: এখন সে বেচারীই বা কি কষ্টে আছে তাও
জানিনা। একেও জখম করেছি
মনে প্রাণে, তবুও
এত শান্ত, এত সুন্দর এর মন
ভাবতে ভাবতে বলে ফেললাম
‘আপনার কথাই রাখবাে। কাগজের সব ভার আবার আমি
নিচ্ছি।
হরিশদা আমার কাঁধটা ধরে
একবার ঝাঁকানি দিয়ে বললেন “যাক, খুডাের কাছে
দ্বিতীয়বার বিশ্বাস ভাঙবার সাহস রাখনি, ভালই
হতভম্ব হয়ে তার মুখের দিকে
শুধু চেয়ে রইলাম। খুড়াে হাসছেন
বাড়ী ছাড়লাম আবার। ভবঘুরে,
অশান্ত ছেলে থাকলেই জ্বালাতন, সুতরাং বাডী ছাড়াতে
সকলের একটু ফাঁকা ফাঁকা, একটু খাপছাড়া ভাব
দু’চারদিন থাকলেও সেটা আস্তে আস্তে মন থেকে তারা
ঠেলে ফেলে দিলে।
রায়

বাষী
আমি কেমন যেন হয়ে গিয়েছি।
জীবনে স্বল্প পরিসরের মধ্যে এতগুলাে বা খাওয়া, কতকটা
অবশ্য স্বেচ্ছায় এবং কতকটা বরাতের ফেরেই বলতে
হবে—যে সম্ভব তা আমার জানা ছিলনা। বছরটা সবে
ঘুরেছে কিন্তু আমার মধ্যে পরিবর্তন এনে দিয়েছে বােধ করি
বা একযুগের। সমস্ত কাজ কর্ম হাতছাড়া হওয়াতে মনটা
মুসাফির

এবার হয়ে পডেছে খালি, তাই পুবােনাে স্মৃতিগুলাে কোথা থেকে এসে ভাবি অস্থির কোরে তুললো। প্রেসের ঘটঘটানি থেমে গেছে বহুক্ষণ পৃথিবীর বুকে সন্ধ্যা নেমে আসে প্রায় কি ভেবে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম। এদিক সেদিক ঘুরতে ফিবতে কোথায় যে এসে পড়েছি খেয়াল নেই, হঠাৎ কাল বােশেখির মেঘের ধন ঘটা দ্যাখে কে! ঝোড়াে হাওয়ার সঙ্গে ধূলাে আর জল গায়ে এসে বিধতে লাগলাে, এগিয়ে যেতে যেতে একটী দরজার ওপর ইলেক্ট্রকের আলােয় বড় বড় অক্ষরে Metropole কথাটী জ্বলছে আর নিছে। কাছে এসে বুঝলুম হােটেল। ঢােকা গেল ভেতরে, আদব- কায়দা বেশ কেতাদুরস্ত বলেই মনে হাে’লবয়, মেনু (menu), কাটা, চামচ প্রভৃতির বাহুল্য। সৌখীন আসবাব আর পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা সহজেই লােকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দূরে কোণের দিকে একটা দরজায় ছােট ছােট লাল আলােয় Private rooms কথাটা লেখা রয়েছেও দেখলাম। রায় চৌষটি ব্যাপারটা ঠিক বােধগম্য হোল । বয়’কে চা টোষ্টের হুকুম করলুম যথাসময়ে জিনিষ এল। ভাবছি আজে বাজে 'কাণে গেল এবার আউর কুছ, হুজুর? দেখি চা, টোষ্ট একেবারে শেষ কোরেই ফেলেছি। উত্তর দিলাম ‘নেই, বিল লাও- ছেলেটা যে সেই গেল আর ফেরে না, এদিকে বাইরে বর্ষণও থেমেছে মনে হােল, তাই অপেক্ষা না কোরে এগিয়ে গেলুম Private rooms লেখা দরজার পাশে ‘office এর ঘরে—এক প্রৌঢ় ভদ্রলােক বসে সেখানে, বেশ গম্ভীর ভাব। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই ব্যস্তসমস্ত ভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন: ‘ব্যাপার কি? কিছু ক্ৰটী হয়েছে? বলুন। ভদ্রলােকের বিনয়ের আতিশয্যে বিস্মিত হলুম, বললুম, ‘না বহুক্ষণ বসে আছি, কিন্তু বিল আসে না, তাই ভদ্রলােক যেন আকাশ থেকে পড়লেন, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন ‘া, বলেন মুসাফির

“ইষষ্টি
কি? বিল পান নি ? অপেক্ষা করছেন আধঘণ্টা?
দেখি তো। ওহা 'হ্যা, ঠিক হয়েছে। আপনার বিল
• হ্যা হ্যা বৃদ্ধ খানিকটা উচ্চৈস্বরে হেসে বলে ওটা দিতে
হবে না। ভারী রাগ হােলাে, বললুম--দিতে হবে না মানে?
ঠাট্টা নাকি?'—আজ্ঞে না, এই কথা হচ্ছে আমাদের
বৃদ্ধের কথা ফুরােবার আগেই একটী প্রৌড রমণী ঘরে প্রবেশ
করলেন। রমণী যৌবনে যে অতি সুন্দরী ছিলেন তার যথেষ্ট
পরিচয় এখনও পাওয়া যায়, আদব কায়দা অতি হাল ফ্যাসানের,
rouge টুকুও বাদ পড়ে নি, চোখের সুরমাটিও নয়
দেহখানি নিটোল না রাখতে পারলেও একেবারে ভেঙ্গে
পড়ে নি•••
আমি তটস্থ হয়ে দাড়িয়েছিলুম:
প্রৌড়া হেসে এগিয়ে এসে বললেন ‘দুজ্জয়বাবু ওপরে
আসবেন একটু ভয়ে ও বিস্ময়ে আমি ঘেমে উঠলুম।
এ কি কুহকিনীর আড্ডাখানা! কথাটা না ক’য়ে সােজা,
ঝডের মত ঘর থেকে এলুম বেরিয়ে একেবারে রেস্তরার
বাইরে এসে দাড়ালুম

বাইরে আকাশ তখনও ঘনঘটা
কোরে রয়েছে। রাস্তায় এসে, কি ক’রবােপয়সাটা যে দেওয়া
হােল না, এই ভাবছি ওপর থেকে কিসের যেন শব্দ
পেলুম। চাইতেই, দোতালার জানালায় যাকে দেখলাম, তাতে
আমার শরীর অবশ হয়ে এল। সুন্দরী যে তথী তরুণী জলভরা
চোখে আমার যাত্রাপথের দিকে চেয়ে—সে মিনতি
‘তাহলে - না আর
গেল না। পাদটীকে যেন জোর কোবে টেনে নিয়ে যেতে
হচ্ছিল, মিনতির জলভরা চোখ কিন্তু তখন পেছন থেকে
বলছিল “তুমি চলে?
আবার ঝড় উঠলাে -এবার শুধু
বাইরে নয়, অন্তরেও। পেছনে ফেলে আসা দিনগুলাের
স্মৃতি জ্বালাময় হয়ে উঠলাে•••"সমস্ত অন্তরটা যেন কান্না
সুরু করবে এমনি ভাব •••আমি রাস্তা দিয়ে চলেছি যেন
ঠিক মাতালের মত। এগিয়েছি খানিকদূর, এমন সময়
চমকে উঠলুম হঠাৎ কঁাধে কার হাত পড়াতে। লােককে
ভূতে পেলে যে অবস্থা হয়, আমার হােল তাই
মুসাফির

সাত
আমি ফিরে চাইনি পৰ্যন্ত, তাই লােকটা যখন সামনে
এল দেখি আগেকার এক বন্ধু কল্যাণ, সম্পর্কে অলকার
ভাই।
কল্যাণই আলাপ শুরু করুলে-
তার বাক্যবাণে অস্থির হয়ে পড়লুম—বলতে লাগল
‘করছো কি আজকাল ? সবইতাে ছাড়লে বাড়ী-
পড়াশুনা, ঘুরে বেড়ান ‘মাসিকে লেখা তারপর কি
এক কাগজ বের করছিলে শুনলুম, দেখেছি অবশ্য। সব
পাগলামি, তাও তাে বন্ধ কোরে দিয়েছে এখন
একবার কি খোজ খবরাদি নিতে নেই?
“তুমিই বা কোথায় নিয়েছিলে?
যখন এত খবরই জান, একবার কাগজের আফিসে তাে
০
‘হ, তারপর তােমাদের সঙ্গদোষ
বাবা। বুঝলে তে, ছায়া মাড়িয়ে শেষটায় শ্রীঘর যেতে হবে,
ওটা হবেনা। যাক্, এখন তাে ওসব গিয়েছে, নতুন কিছু
কোরছ না কি? চলনা একদিন আমাদের ওখানে। মাসিমা,
অলকাদি খুসিই হবেন।

আটষতি
গল্প কোরতে কোরতে কিছুদূর
যাওয়া গেল কল্যাণের সঙ্গে যাবার সময় বলে গেল
‘বেশ বেশ, আবার কি বেশে জগতের সামনে হাজির হও
দেখা যাবে। বেড়ে আছে কিন্তু। বহুরূপী সাজতে পটু
এমন দ্বিতীযটী আর দেখলুম না -তাহলে কাল সন্ধ্যায়
অপেক্ষা করছি, মাসিমার ওখানে। যাচ্ছ তাে ঠিক ?
মনটা আবার ভাবনার ঘােরে
পড়লে "কল্যাণ অস্থির হয়ে বললে, “ওহে ভাবুক সাহেব
এত ভাববার কি আছে? বলি, ইচ্ছে না হয়, যেয়াে না
খােসামুদি করার মত বড় গােছের কেউ একটা তুমি এখনও
হও নি, বুঝলে?
কথাটা বলে হাসতে হাসতে সে
অপর ফুটপাথে গিয়ে উঠলাে•••
শেষ কানে এল দুটো কথা—“চলি
তাহলে
মুসাফির

উনসতর
প্রেসের ওপরে অফিসঘরের
পাশেই আমার শশাবার ঘর। ফিরে এসে ঘডিটার দিকে
চাইলুম যখন, দেখি রাত এগারােটা': কল্যাণের কাছ থেকে
বিদায় নেওয়া হয়েছে আন্দাজ রাত আটটার সময়,
এতক্ষণ শুধুই তাহলে ভবঘুরের মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে
বেড়িয়েছি: ভাবতে ভাবতে বিছানায় গিয়ে শেষে আশ্রয়
র

নিলুম, অসংলগ্ন বহু কথাই মনে আসতে লাগল সেই
পুরােণাে চায়ের দোকান, আর তার জায়গায় এই হােটেল।
তখনকার সরলা বালিকা মিনতি—আর আজকের সুন্দরী
নারী মিনতি কোথায় রামগোপাল বাবু * প্রৌঢ়া
রমণীটাই বা কে? সঙ্গে সঙ্গে মনে এল বুলা, কল্যাণ
আর সব চেয়ে বেশী করে অলকার কথা:
বিছানায় শুয়ে
শুধু ছটফট
করতে লাগলুম। সে রাতে ঘুম আর এল। ভাবনার খেই
হারিয়ে গেল হঠাৎ কিসের একটা শব্দ আসাতে
আন্তে উঠলাম, পাশের জানালাটা দিলাম খুলে, সামনের নীল
নীরব নিথর নিশীথের সৌন্দৰ্য্য মুগ্ধ নেত্রে উপভােগ করতে
লাগলুম' সারা শহরটা ঘুমিয়ে রয়েছে
যেন বিরাট
স্বপ্নপুরী
রাত তখন
প্রায় শেষ হয়ে
এসেছে : ভােরের ক্ষীণ আলাে যেন দেখা যায় সেই সময়
বােধ হয় আমার ক্লান্ত দেহখানি বিছানার উপর
উপর তুলে
মুসাফির

একাত্তর
পড়লাে। উঠতেও তাই প্রচুর বেলা হলাে সেদিন-প্রসের
কাজগুলাে সব বুঝিয়ে দুপুরে বেরুলুম একবার মিনতির
খোঁজ নিতে সেই Metropole এর দিকে : বিদ্যুতের
আলাের লেখাগুলাে আমার মাথার ভেতর যেন দপদপ,
করছিল তখনও। দরজার সামনে এসে একবার এদিক ওদিক
চেয়ে নিয়ে হােটলে প্রবেশ করলুম। অকারণেই মনে কত
সন্দেহজনক ভাবের উদয় হচ্ছিল। মিনতি কি
শেষটা আমি আবার ভাবতে পারলুমনা, কি কোরে যে
তার সঙ্গে দেখা করবে, সেই হােল আমার আসল চিন্তা।
টেবিলের তলায় ইলেকট্রিক সুইচটা সবে টিপলুম একটা
‘বয়' ডাকবার জন্য, ঠিক সেই সময় পিঠে কে আস্তে
একটা চাপড় দিলে, পেছন ফিরে চেয়ে দেখি তিনি সঞ্জীব
'আমাদের সংঘেরই। বললুম, “কি রকম, এখানে যে?
এতকাল কোন খববাদি পাইনি, মাঝে কোথায় যেন একটা
গুজর শুনলুম তুমি নাকি কুসঙ্গে পডেছ' ইত্যাদি : সঞ্জীব
তােত হাে হাে কোরে হেসে উঠলে, তারপর বললে, ‘চলল
ভেতরে যাই, সেখানে সব কথা হবে। বলতে যাব, ভেতরে
মানে : '?' কিন্তু বলা আর হােলনা, সঞ্জীব হিড হিড়
০

বাহার
কোরে টানতে টাতে একেবারে ‘offic' এর ভেতর দিয়ে
একটা সুসজ্জিত ঘরে নিয়ে গিয়ে হাজীব করলে। সঞ্জীবের
এত প্রতিপত্তি এখানে কি কারণে তা ভেবে ঠিক করার
আগেই মিনতি এসে হাজিব সেখানে সে আর তখন
বালিকাটী নয়, তার ভরা দেহে যৌবন উপছে পড়ছে
সুঠাম সুন্দর দেহখানি সুন্দর ভঙ্গিতে দুলিয়ে কালো
এলাে চুলের বাশ হাত ফিরিযে বুনতে বুনতে ম্লানহাসি
হেসে মিনতি বললে, ‘ব সাে দুয়দা আছি আমি,
পালিও না যেন লক্ষীটি।
মিনতি চলে গেল। মুখখানা
এত তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে নিলে, যে জলভরা চোখ দুটোর
কি ভাব প্রকাশ পাচ্ছিল , আর আমার বিচার করার
সুযােগ হােল না। নিজের মনের ভাবটা গােপন করার
জন্যে সঞ্জীবকে জিজ্ঞাসা করলুম ‘আচ্ছা, হবিশদা’র খবর
জান?
“ কি না, একটা উত্তর তখুনই
পাওয়া উচিত ছিল কিন্তু না পাওয়াতে আশ্চর্য হয়ে
মুসাফির

তিয়াত্তর
সঞ্জীবের মুখের দিকে লক্ষ্য করে দেখি, ওরও মনে
একটা যেন কিসের আন্দোলন চলছে। চোখের দৃষ্টির
মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তির ও (বলে মিথ্যা হবে না)
অবিশ্বাসের ভাব ফুটে উঠেছে
অনেকদিন পরে আজ দুজনে
আমবা নিজেদের এত কাছাকাছি পেয়ে, মাঝে
একটা মস্ত ব্যবধানে সৃষ্টি কোবে ফেলেছি। কেউই আমরা
আর কথাবার্তা কইছি না। যখন মিনতি এসে সেখানে
আবার উপস্থিত হােল আমাদের দুজনকে এই রকম
বিসদৃশভাবে পঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কি ভাবল জানি না,
তবে তখুনি বলে দুৰ্জ্জয়দা' সঞ্জীবের সঙ্গে তােমার তাহলে
আলাপ আছে দেখছি, আচ্ছা কেমন লােক উনি বলল
ততা ? আমি ওঁকে আয্য-সমাজী মতে বিবাহ করেছি
কাউকে জানাতে ওঁর বারণ ছিল নইলে তােমায় দেখবার
জন্য মনটা ভারী উৎসুক হয়েছিল, শেষটা
কাল যে তুমি
এসেই চলে যাবে অমন ভাবে, তা ভাবিনি। আচ্ছা,
দুর্জয়া, তুমি কি ভেবেছিলে আমায় কাল, সত্যি বলতাে?

চুয়াত্তর
একটা কুচরিত্রা নারি! কেমন ? ছিঃ, দুর্জয়া! তােমার
শিক্ষায় আজ আমি এত বড় হয়েছি , আর এই দেখ
কেমন সুন্দরভাবে নিজে একা বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে
ব্যবসা চালাচ্ছি। আমার মনের সমস্ত ইচ্ছাই কাজে
লাগিয়েছি। কেবল তােমার অভাবটাই মনে একটা খটকা
লাগিয়েছিল : 'আর তােমায় ছাড়বাে না, এখন থেকে
তুমি আমার অতিথি হবে । তারপর
তারপর সঞ্জীবের মুখের
দিকে চেয়ে বললে ‘কিগাে, আপত্তি আছে? না ভয় হচ্ছে
এ আবার কি? আমি এবার না হেসে থাকতে
পারলুম না। তার এই যত্নের, এই আদরের জন্যে
মনে মনে তাকে সহ ধন্যবাদ দিলুম। সঞ্জীবও
জীবনের পথে এমন এক সঙ্গিনীর অবলম্বন পেযেছে যার
জন্যে তাকে আর ভবিষ্যতে চিন্তা করতে হবেনা দেখে খুসীই
হলুম। ভগবান যেন ওদের সুখে শান্তিতে রাখেন, এই
প্রার্থনা কোরে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিলুম। -বিদায়
বেলায় সে বার বার বললে, ‘মিনতিকে ভুলো না যেন
দাদা, তােমার কথা চিরকাল আমার মনে জাগবে -সময়
পেলেই এ অভাগীর সঙ্গে দেখা কোনাে তার চোখের
জল আমারও চোখে জল এনে ফেললে
মুসাফির

পচাত্তর
সে রাতে জীবনটার গতি সম্বন্ধে
মনে মনে বহু তর্ক বিতর্ক ও চিন্তা করলুম। কিন্তু যা
হয়েই থাকে, শেষে কোন সিদ্ধান্তেই আসা, গেল না।
মুসাফির মনকে এ জমটা ফকিরী কোরে কাটাবার উপদেশ
দিয়ে তক্তপােষের ওপর বিছানাটা পেতে নিয়ে গা ঢেলে
দিলুম ঘুম আর আসে না চিন্তার ধারা ক্রমশ যেন
০

ছিয়াত্তর শতমুখী হয়ে উঠলাে:::মিনতি, সঞ্জীব, বুল, হরিশদা এবং সবচেয়ে বেশী কোরে অলকার কথা আজ আমায় অস্থির কোরে তুললল। বহুক্ষণ একভাবে শুয়ে শুয়ে শেষে স্থির করলুম কলকাতায় আব থাকা চলতে পারে না অলকাকে মন এত চাইলেও, এত কাছে থেকেও যে তাব কাছে যাওয়া অসম্ভব, তা কি কল্যাণ জানে ? জানাই ভাল তাই অলকাকে একখানা চিঠি লেখাই যুক্তিযুক্ত মনে করলুম। আর কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার যায়গা স্থির করলুম কাশী। দেখা শেষ হােল- লা, এখন নিশুতি রাত চারিদিক স্তব্ধ, নীচে এখন প্রেসের ঘটঘটানি, কঁাচকেঁচ সব বন্ধ। এই সময়টা আমার জীবনে ভাববার সময় আর ঠিক এই সময়টুকুই তােমার কথা ভেবে কেটে যায়। আজ রাতে আমার বিশেষ কোরে কত কথাই না মনে পড়ছে। সেই তােমায় নিয়ে ডবল ডেকার মুসাফির

সাতাত্তর
বাসে বেড়ান ; নদীর ধারের চুমু সমুদ্রতীরের দেশের
কাহিনী • আরও কত কি! কেন জান? আজ কল্যাণ এসে
আমায় তােমার এবং তােমার মার সঙ্গে দেখা করবার
অনুরােধ করে গেছে। কিন্তু সে তাে জানে না, নিজের
সমস্ত বিসর্জন দিয়েও অলকাকে আমার পাবার উপায়
নেই। এমন কি তাকে চোখে দেখলেও না কি আমার
দোষ অলকা, আজ আবার মনে পড়ে, চুপচাপ ব'সে
ব'সে Bertrand Russel আলোচনা, তারপর Philosophy
of Rabindranath, coma 8 Freud, Adler, Junge
এসেছেন নিজেদের খেয়াল খেলার কথা।
যাক, সে সব তত ভুলতেই হুকুম দিয়েছ, কিন্তু
ভুলতে পারা কি অত সােজা ? তুমিই কি ভুলেছ অলকা,
সত্যি
ভেবে নিজের
মনে। বন্ধুর
কথা রাখতে
গেলে তােমার কথা হয় না রাখা , তাই কলকাতা ছেড়ে
কাশীতে যাচ্ছি, মনটাকে আর কিছুদিন শান্তিতে রাখার
অভিপ্রায়ে ।
তােমারই-জয়

আটাত্তর
পুনঃ তােমার কথামত অনেকটা স্বাধীন হতে
পেরেছি। কিন্তু তুমি নিজে হতে পারনি।••• জয়
ভােরের দিকে আস্তানা ছেড়ে
বেড়িয়ে পড়লুম। কলকাতায় কাজ কর্মের সব ব্যবস্থাদি
করে দেবার জন্যে। সারা দিন পথে পথে ঘুরে বেড়ান’র
পর বিকেলে আবার ফিরে এসে, নিজেব সুটকেসটী আর
বাঁশীটী নিয়ে সেই রাতেই কলকাতা ছাডলম'
সকালে কাশীতে এসে পৌছলাম। শহরের এক প্রান্তে
এক বন্ধুর বাঙ্গলােট পেয়েছিলাম কয়েকদিনের জন্যে।
এখানে এসে কিছু নির্দোষ সাহিত্যচচ্চায় মনটাকে একটু
সজীব ও চঞ্চল করে নেওয়ার যথেষ্ট সুযােগ পাওয়া গেল।
সাঝের উতল হাওয়া এখানে আমার চুলগুলির সঙ্গে
খেলা শুরু করে দেয়। দূরে হিন্দুস্থানী ঢলের সঙ্গে
দেয় গান জুড়ে • : আর আমার মন ডুবে থাকে ভবিষ্যতের
স্বপ্নে। তাতে থাকে অলকা, সঞ্জীব, হরিশখুড়ো আর মিনতি।
এই সব স্বপ্নের মধ্যে, মাঝে মাঝে মনে হয় সবদিক ছেড়ে
৪
মুসাফির

अनचाली দিয়ে ভবঘুরে মত জীবনটা কাটালে কেমন হয় ? কেমন যে হয়, তা ভেবে ঠিক করার মত মন থাকে না, ভাবনার খেই যায় হারিয়ে—আমি বাঁশীটাতে ফু দিয়ে নিজের সুরে নিজেই উঠি মেতে দেওয়ার মতাে। == একটী বন্ধু জুটলাে পাশের বাংলাে থেকে—ফুটফুটে ছােট্ট ছেলে দুষ্টমীতে ওস্তাদ। সমস্তক্ষণ কিছু একটা চাইই চাই তাকে ডাকতুম ‘লঙ্কাফেরৎ নামে। একটা ছেলেদের মাসিকে দুষ্টমী ভরা এক গল্প বেরিয়েছিল, তার নায়ক একটী অতি দুষ্ট, এই রকমই ছােট্ট ছেলে। গল্পটী অমলেব ভারী ভাল লেগেছিল, তাই থেকে আমার কাছ থেকে ও, ঐ গল্পের নায়কের নামটী পেল ‘লঙ্কাফেরৎ'। বিস্কুট, টফি, চকোলেট, লজেঞস রকম- বিরকমের তার জন্যে সব সময়েই কেনা থাকতাে আজও রােজকার মতাে সে এসে কোলের কাছে ঘেসে বসে বললে ‘কাকাবাবু, মা বাবাদের সঙ্গে আজ আর বেড়াতে গেলুম না, আজ তােমার কাছে যুদ্ধের গল্প শুনূবাে। আচ্ছা কাকাবাবু, ব্রেজিল কোথায় বলতে পারাে।

আশী
লঙ্কাফেরতের মুখের দিকে দৃষ্টি
রেখে হেসে বললুম কেন?
- ম৷ বলছিল, সেখানে নাকি
ভারী লড়াই হ'চ্ছে•••বিপ্লব চলেছে, আচ্ছা লােকগুলাে এত
ঝগল করে কেন ?
আরে রক্ত।
এবে বাবা-
লঙ্কাফেরতেব মুখের ভঙ্গি এসমযটা
দেখবার মত। হাসলাম, বললুম, ‘মানুষ ভাবা হিংসুক কিনা’
বলেই থেমে গেলুম হঠাৎ••••তারপর আবার বললুম
‘লঙ্কাফেরত’ ওসব গল্প আজ থাক্‌, খানিক বাঁশী বাজাই,
শােন কেমন ?
সতরঞ্চিখানা একটু দূরে সরিয়ে
নিয়ে গেলুম হাহা ঝােপের ধারে' আকাশে ম্লান
জ্যোৎস্না ফুটে উঠেছে তখন। এই মধুর সাঁঝে আজ একরকম
নিরালায়ই বাঁশীতে সুর ধরলুম চললুম একধাব থে
সব বাজিয়ে সুরট মল্লার, কানে, মালকোষ প্রভৃতি,
আমায় যেন সুরের নেশায় পেয়ে বসেছিল।
মুসাফির

একাশি
যখন চমক ভাঙলাে, তখন দেখি
লঙ্কাফেরতের মাথাটি আমার কোলে, অশান্ত বালককে
বাঁশীর সুর শান্ত কমে ঘুমপাড়িয়ে দিয়েছে স্নান দের
আলো তার মুখে এসে পড়েছিল, সেই সুন্দর মুখখানিতে
কয়েকটা চুমাে দিতেই অমলের ঘুম গেল ভেঙ্গে •
বললুম....‘বেশ, কিন্তু আমার বাঁশী যে কেবল বাতাসে
আর জ্যোৎসাতেই উপভােগ করলে’:::লঙ্কাফেরৎ ফিক
কোরে শুধু হেসে ফেললাে। দুষ্ট, বন্ধুটাকে আমার,
এবার বাড়ী পৌছে দিযে এলুম। তারপর ফিরে এসে
নতুন ধরণের কি বই লেখা যায় তাই ভাবতে ভাবতে
সেই সতরঞ্চিটায়ই শরীরটা এলিয়ে দিলুম।
''একটা মধুর অবসাদ সমস্ত
দেহটার ওপর আমার সােনার কাঠির পরশ দিয়ে গেল • • •
আমি অস্পষ্ট দেখতে লাগলুম-ঘােট একটা পাহাড়ে নদী
ত শুরু করে বয়ে যাচ্ছে, তার নির্মল ক্ষটিকের মত জল
পাথরের ওপর পডে টুকরাে টুকরাে হয়ে চারিদিকে পড়ছে
ছড়িয়ে আশে পাশে জঙ্গল প্রচুর তারই মাঝে
সুন্দর একটা কুঁড়ে ঘরে একটা মানুষ শুয়ে চোখ মেলে

বিরাশি
দেখি—আঁা, এ যে আমিই। 'আমি অসুস্থ, লঙ্কা-
ফেরৎ মাথার কাছে বাতাস করছে: দুরে যেন সঞ্জীবও
दम
হরিশদাও যে ফিরে এসেছেন। পােষাক বলেছেন
দেখতে পাচ্ছি : 'আবার মিনতির সঙ্গে দেখি অলকা ও
রয়েছে, এক কোণে দুজনে দাড়িয়ে • রাগে দুঃখে আমি
উত্তেজিত হয় উঠেছি, বলুন হবিশনকে ‘আয়, মেয়েরা কেন
এখানে? ঠাট্টার ব্যাপার নাকি, আমি আর কতক্ষণই বা আছি,
ওরা কেন জ্বালাতে এসছে এখন': পরক্ষণেই হরিশদ।
জলহাতে কোরে ছুটে এলেন আমার মুখে ছিটিয়ে দিতে,
আমি মৃত্যু যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছি তখন
স্বপ্নের ঘাের গেল কেটে ভীষণ এক
বাকানি খেয়ে, চেয়ে দেখি কল্যাণ আর তার সঙ্গে সঞ্জীব।
অবাক হয়ে গেলাম বললুম, “দেখ, স্বপ্ন দেখছিলাম তােমাদেরই
‘হ্যা, তা বুঝেছি। থাক এখন
গল্প কথা বলি এমন সুন্দর সন্ধ্যায় লোকে বাড়ী ব'সে
ঘুমোয় কখনও। আস্থা অদ্ভুত লোক তাে তুমি ! এই
মুসাফির

তিরাশি
নাও চিঠি, একরকম নেমন্তন্ন’রই বলা যায়। অলকা তােমায়
হঠাৎ এখানে একনি বেড়াতে দেখে আমায় খোঁজ নিতে
বলে, বহুকষ্টে আজ পেলুম। অবশ্য আন্দাজটা তারই-বে
ক্যান্টনমেন্টের দিকে থাকবে।
০
মনে মনে হাসলুম, অলকা তত
সবই জানে—ইচ্ছে কোরে বলেনি। ভালই, চিঠিটা পডি।
মাত্র দুটী লাইন ‘তােমাকে দেখার বিশেষ দরকার, মারও
ইচ্ছা। পার তাে এসাে’। চিঠিতে নাম নেই কার, সইও
নেই। এও এক চাল।
বললুম কল্যাণকে, আচ্ছ, কালই
সকালে যাব। কলকাতায় থাকতে
কলকাতায় থাকতে তুমি অবশ্য যেতে
বলেছিলে, যেতে পারিনি তজ্জন্য দুঃখিত।
পারিনি তজ্জন্য দুঃখিত। এবার কথা
হ্যা, হঠাৎ সঞ্জীবের সঙ্গে আলাপ হােলে।
কি কোরে ?
বাখবাে ঠিক
সঞ্জীব রাগের ভাণ কোরে জবাব
দিলে, “কেন? হেতে নেই?' বললুম, 'শুনিই না, কি করে ?

চুরাশি
কল্যাণ উত্তর দিলে আজ রাত
হেলাে। এখান থেকে নদীর ধার যাওয়া তাে আর সােজ
নয়। আজ চলুম—এসব গল্প, আর এক দিন চলবে, বুঝলে।

পাণি
হবার আগেই উঠ
পড়েছিলুম। মনটা হয়ে উঠেছিল অতিরিক্ত চঞ্চল ; কাগজের
টুকরােটা পকেটে নিয়ে শিষ দিতে দিতে বেরিয়ে পড়লাম
বাড়ীটা যে গলিতে তার নাম ‘টেরেনিম’বহুকষ্টে তো সেটা
খুজে পাওয়া গেল। দরজার কাছে গিয়ে অতি সন্তর্পণে
কড়াটা নাড়া দিতেই সেটা খুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে এক
बाय

ছিয়াশি
মূহুর্তও দেরী হােলনা, মনে হলাে যেন এই শব্দেরই সে
প্রতীক্ষা করছিল
অলকা তার বাসি
চুলের শি
হাত ফিরিয়ে বাঁধতে বাঁধতে হাজীর হােল, সঙ্গে আমাদের
দুজনেরই বন্ধু স্প্যানিয়েলটী, নাম ‘কেট। বহুদিন পরে
দেখা, অলকার মুখের দিকে চোখ মেলে চাইতেও যেন আমার
কি রকম মনে হচ্ছিল। কেট’ তাে গায়ের ওপর লাফিয়ে
লাফিয়ে অস্থির কোরে তুললো। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে
বাঞ্ছিতকে চোখের সামনে পেলে মানুষেব যা অবস্থা হয়
অলকার দীপ্তচাখে সেই বিভােল চাউনি।
মৃদু হেসে
বলল “কিগাে, অমন করে দাড়িয়ে রইলে যে?-ভেতরে চলে
তার ছাযা অনুসরণ করে চলাম
ওপরে
প্রিয় সাথীর মতো সঙ্গে রইলাে কেট
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নিজের মৌনতায় নিজেই
বিরক্ত হয়ে শান্তভাবে প্রশ্ন করলাম 'কল্যাণ কোথায়
অলকা? উত্তর এলাে—এই ভােরেই, তােমার প্রাণ যেমন
উতলা হয়ে উঠেচে কল্যাণ ত’ আর তােমার মতাে আকুল
মূলাফির

সাতাশি হ'য়ে ওঠেনি। তিনি মাঠের ডাকে বেরিয়েছেন পাগলকরা মায়াময় চাউনি সেই চটুল চোখে। একটা চেযার আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে, তার একটা চোর, ও বলল বললাে ‘বপর দিনগুলাে কাটচে কেমন? হেসে বললাম, এই অমূল্য প্রশ্নের জন্যই কি এত জরুরী তলব ? বেশ একটা যুৎসই উত্তর অলকার মুখে এসেছিল কিন্তু সেটা সে বেশ পটুতার সঙ্গে সালিয়ে নিলাে। মুখে তার সারাদেহের শােণিত যেন উপছে পড়ছিল,আহত অভিমানে কিন্তু তখই তা স্নেহ ও প্রীতির আবরণে চাপা দিয়ে ও বলল ‘এল একলা ভালাে লাগছেনা বুঝি? দাড়াও মাকে ডেকে আনি। চঞ্চলা বন- হরিণীর মতো আঁচল দুলিয়ে ও গেল চলে ভাবতে লাগলাম। তাই তাে মা তাে আমাদের মনের সম্বন্ধ কতদূর এগিয়েছে সে সন্ধান জানেন না••••জানবার প্রয়ােজনও ছিলনা। মার সামনে আমায় নতুন ভাবে অভিনয় করতে হবে দেখচি ।

আটলাশি
এমন সময় উচ্ছসিত ঝবণ ধারার
মতল একগাল হেসে চিবটপল শিশুর মতো যে ঘরে এলো
সে যেন অলকাদি না। 'তাব সাথে এলেন মা। ও বলল
‘এই যে আমাদের শ্রীযুক্ত মাতা ঠাকুবাণী এসেছেন।
সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পড়েও অলকার
কথার ভঙ্গীতে ন| গেসে থাকতে পারলুম না—সবাই হাসতে
লাগলো ও যেন আমার তরুণী দিদি।
T
মা প্রসন্ন হাসি হেসে বল্লেন•••
‘দুজ্জয় তােমাকে ত’ বহুকাল পরে দেখলাম কল্যাণের
কাছেও তােমার কথা শুনতে পাই বটে কিন্তু শােনা আর
দেখায় প্রভেদ আছে, কি বলাে? আর তা ছাড়া শুছি তুমি
নাকি বাড়ীঘর ছেড়ে এক বিদ্রোহ উপস্থিত করেছ
সিদ্ধার্থের মতাে বৈরাগ্য নেবে নাকি বাড়ীর লােকের মনে
কষ্ট ও অশান্তি লাগিয়ে কিছু লাভ আছে? তারপর ঐ, মা’র
কথাও তাে একটু মনে করতে হয়।
স্তব্ধ হয়ে ভেবেই চলেছি
মুসাফির

উননব্বই
মা’র সতর্ক দৃষ্টিতে তা ধরা
‘অতাে ভাবুকই বা হলে কবে
বললেন:
পড়লাে।
থেকে ?
আমাৰ বিস্মিত করে অলকা বা
তরুণী দিদি বললাে “লেখক ছেলে মা তােমার ভাবুক
হবে বৈকি ? বিস্তর চিন্তা ওর ঐ ছােট্ট মাথাটাতে 'কম
ভাবনা ওর ।
মা অলকার দিকে চেয়ে বললেন
কল্যাণ গেল কোথায় ? এই তো সন্ধান করে ডেকে
পাঠালো। বুলার মত ও ভাবে, যে আমি যেন ওদের
একলারই সম্পত্তি অন্যকে মেহের অংশীদার কোরতে ও
রাজী নয় মােটেই।
০
বললাম আমি কিন্তু ঠিক আগেরই
মত আছি নিজের বদখেয়াল গুলাে নিয়ে কাউকে ভাল
বাসতেই পালাম না, পেলামওনা কাকর’
তরুণী দিদি অলকা দুষ্টমীর হাসি
হেসে বললো “এই যে কথা ফুটেছে দেখছি।'
রায়

নব্বই
মেয়ের কথার ছিরি দেখ না-
বলে রাগের ভাণ কোরে মা গেলেন ভেতবের দিকে। যেতে
যেতে বললেন ‘তােমর গল্প গুজব কর দুর্জয়। আমি একটু
চাযের জোগাড় করি।
-
খানিকক্ষণ আবাব স্তব্ধতায় কেটে
গেল। আমিই এবার আগে সুরু করলাম, 'অলা, মন নিয়ে
খেলা করে তােমার কি লাভ বলতাে ? আবাৰ ডালেই বা
কিসের জন্য ? তােম। এমনি জাত অলকা, তােমাদের সব
পাওয়া যায় কিন্তু মন পাওয়া যায় না। অথচ তাও
পেয়েছিলুম, অন্ততঃ জানিয়েছিল তাই এখন আবাব পাওয়া
পাওয়ার ঘানিতে ঘুরিয়ে এ সামান্য প্রাণীকে আব কেন
দুঃখ দাও। নিজেকে সামলে নিলুম-অকবি চোখ দুটো
যেন ছল ছল করছিলা, হয়তো আমার চোখও জলে ভরে
এসেছিলো। তার মুখ
দিযে শুধু বেরুল, ‘দুর্জয়, তােমাকে
ভাবা দিয়ে বােঝব আমার মনের কথা, সে সাধ্য আমার নেই,
নইলে এভাবে আঘাত কোরে তুমি আমায় চলে যেতে
পারতে না। সবই জানবে একদিন।
মুসাফির

একানব্বই
মা চা এনে উপস্থিত কোরলেন।
পেয়ালাটা সবে মুখে তুলতে যাব, এমন সময় মার কথা শুনে
চোখ ফেরালুম-দুর্জয়। অলকাতে মাস খানেক পরেই বিদেশে
চললাে একা। কলকাতায় গিয়ে এবার থেকে এই মাটীর একটু
খবরাদি নিও। জানি আমার সব ছেলেরাই দুষ্ট-তাহলেও
একলাটী এবার বড় খারাপ লাগবে। তােমরা এলে তবু
একটু শান্তি পাব।
প্রশ্নে কোরে বুঝলাম ‘বিদেশ
মানে একেবারে সাগরের অপর পার ‘পিলাত'। খবরটাতে
এতদিন জানি নি-আমার চিঠি লিখে এখানে আসাটা তাহলে
সার্থক হযেছে বলতে হবে। অলকার এখানে আমার সন্ধান
নওয়ার কারণটাও এতক্ষণে স্পষ্ট বােঝা গেল।
মনটা
মুষডে
গিয়েছিলাে প্রথমটা,
অলকার স্পর্শেই আবার তা সজাগ হয়ে উঠল। সন্ধ্যায়
সেদিন দুজনে নদীর ধারে বেড়াতে যাওয়া গেল, বহুকাল পরে
দুটী হৃদয়ের ভাঙ্গা তারে জোড়া লাগলােত ঘুরতে ফিরতে
রাত হােল বেশ। আমি একটু চঞ্চল হয়ে উঠেছিলুম, হঠাৎ

বিরেনব্বই
অলকার আজ একি হােললা ? বাড়ী ফেরার কথাই তােলে না
যে! আর সেদিন কলকাতাষ থাকতে ‘হসন্তিকা’য় ওদের
ক্লাসেরই এক মেয়ে মনীষাকে নিয়ে ঠাট্টা করে কে কি
লিখেছিল, তারই ভাবনায় ও ভয়ে আমার সঙ্গে দিনে আর
বেড়াতে বেরুতেই রাজী হয় নি•• তারপর আজকাল কি
আর বাড়ীর কাছে একে xেplanation (ওর ভাষায়ই বলছি )
দিতে হয় না। কিছুই বললুম না কিন্তু, রাস্তা দিয়ে হেটে
ফিরছি। সিনেমাটার সামনে এসে ও বলে, তােমার কি ক্ষিদে
পেয়েছে। আমি এ প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে হেসে বললুম-কেন?
-“না, জেনে নেওয়া ভাল। চল এই টা দেখে আসি।
বললুম ‘চল,' ছবিখানির নাম Madan Butterfly
play (Free Cars Grant 25. Sylvia Sidney
আজকের দিনে ছবিখানি বেশ সুন্দরই লেগেছিল। বললুম
‘অলক, আচ্ছা Sylvia কে কি fine দেখাচ্ছে এই অভিমানের
সময় বেশ বেশ তােমার Sylviaকেই তাহলে ভাল লাগুক
বলে অলকা মুখ ঘুরিয়ে বসে আমি আস্তে তার কোমল
হাতখানা মুঠোর মধ্যে চেপে ধরি: অলকা তার মাথাটা আস্তে
আস্তে আমার কাঁধের ওপর রাখে funএর হাওয়ায় চুলগুলি
মুসাফির

তিরেনব্বই
ফুরফুর করে আমার গালে চুম্বন দিয়ে যায় অলকাব কেশের
গন্ধ আমায করে পাগল তার সারা অঙ্গে শিহরণের ঢেউ
বইতে থাকে।
অনেককাল পরে আজ অলকাকে একান্ত
ভাবে নিজের কোরে পাই •••এতে কিন্তু না পাওয়ার চেয়ে দুঃখ
হােল বেশী কারণ বায়স্কোপ তার কিছু পরেই ভাঙ্গলে।
অলকা জানালে, দেখ, আর আমাদের বাড়ী এসে না,
রাজনীতি জিনিষটাকে বাবা ভারী ভয় করেন, আমি শীগগির
ভায়ের কাছে বিলেত যাচ্ছি। তাই তােমার সঙ্গে আলাপ
হয়েছে, বিশেষতঃ মা তােমায় এত ভালবাসেন বলে বাবা
স্পষ্ট কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু তােমার রাজনৈতিক
দলের সঙ্গে সম্বন্ধটা মােটেই বাবার কাছে প্রীতিকর নয়
আর আমাদের এতটা বন্ধুত্ব তিনি পছন্দ করেন না।
ভেতর থেকে আমি যেন কেঁপে
উঠলাম। রাস্তার অন্ধকারে নিঃশব্দে এখন আমরা
চলছি-অলকার হাতখানি মুঠোয় চেপে, আমি বললাম
‘অলকা, আচ্ছা, তাহলে বিদায়। আমায় ভুলে যেও।
আমি ঠিক থাকবে।
থাকব। মাকে আমার কথা বােলাে

চুনরানব্বই
আমি এভাবে কি করে আর থাকি, তাই-ই ভাবছি। আমার
পথে এসে ভারী ভুল করিয়ে দিয়েছ। অলকার শীর্ণ
কোমল হাতখানি আমি চুম্বন করতে যাই। অলকা রাস্তার
ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে স্থিরভাবে সেই আঁধারের মধ্যেও
আমার পানে চায় একদৃষ্টে বলে, 'এরই মধ্যে চলে যাবে ?
অন্ধকারের ভেতর মিটমিটে আলােতে অলকার চোখে
দুটো মুক্তো উলমল করছিল
০
মুসাফির

পঁচানব্বই
এবং
কলকাতায় ফিরে এলাম
ফিরে এসেই একেবারে হরিশদার সাক্ষাৎ পেয়ে আশ্চর্য
হলাম । জীবনে আমার নিজের কোন অবলম্বন না
থাকলেও, ভেতরে ও বাইরে এমনি ভাবেই জড়িয়েছিলুম
যে জীবনে কোনদিন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচবাে এমন
সম্ভাবনা দেখছিলাম না। হরিশদাকেও ঠিক এসময়ে ফিরে
রায়

ছিয়ানব্বই
পাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না একটা অজানা আশঙ্কায়
বুকটা তাই দুরু দুরু কেপে উঠলেও, ভরসা পেলাম এই ভেবে
যে, হয় তত বা এবার কিছুদিনের জন্য নিজেকে একটু
নিরালায় সরিয়ে নিয়ে যেতে পারবাে।
কলকাতার অফিসে হরিশদাও
ফিরেছেন কবে’, তা আমার জানা ছিল না। হরিশদাও ভেবে
পান নি যে এত সহজেই আমার দেখা পাওয়া যাবে।
আমার মুখখানার দিকে তীক্ষদৃষ্টিতে একবার চেয়ে বেশ
শান্ত ভাবেই তিনি বললন 'বোসো, কথা আছে অনেক।
৪
E
প্রশ্ন করলেন ‘আচ্ছা সঞ্জীব
এখন কোথায় •? আমার কাণে কথাটা যেন বক্তপাতের
মতন শশানাল। শুনলাম আবার •••• চুপ কোরে রইলে
যে উত্তর দাও, কোন খবর পেয়েছ ?
উত্তর দেওয়া বড় সােজ ব্যাপার
হােত না, যদি না হঠাৎ তার সাথে দেখা হােয়ে যেত।
হরিশদার কাছে নিজেকে অতি হীন ও বিশ্বাসঘাতক মনে
মুসাফির

সাতানই
হওয়া ঠিক আগের মতই-খুব
স্বাভাবিক। তাঁর চোখ
থেকে তখন যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছিল। সে দৃষ্টির
সামনে আমি সঙ্কুচিত হয়ে পড়লেও, তৎক্ষণাৎ নিজেকে
সামলে নিয়ে বললুম, 'মাপ করুন আমায়। বলেই তাে
ছিলাম, আমিই তাকে লােভ দেখিয়ে এই উদ্দেশ্যহীন
জীবন যাত্রা থেকে সরিয়ে নিতে গিয়েছিলুম, কিন্তু সে আমার
অপেক্ষা না করেই গিয়েছিল। এখানকার বাধন থেকে
মুক্ত হয়ে সে যে এখন’: •••
কথাটা আর শেষ করতে না
দিয়ে হরিশদা বললেন—“আবার সেই পুরােণাে তর্কের গােলে
আমি ঢুকতে চাই না, তােমার এই ভূত মাথা থেকে না
গেলে তুমি শান্ত হয়ে কাজ করতে পারবে না। আমি
বাধা দিয়ে কি বলতে যাব, কিন্তু দাদা উঠলেন লেগে। তিনি
বললেন-'তােমায় দেখচি পাশ্চাত্য সভ্যতার খােলসটা
বেশ ঢেকে ফেলেছে। তােমার মাথার ভেতরকার যে সব
আইডিয়া তুমি ভাবছ নিজের, আসলে তা ওদেশ থেকেই
ধার করা নিজের দিকে, নিজের দেশের দিকে, বিশেষ

আটানব্বই
কোরে একবার আমাদের অতীত গৌরবের দিকটা ভেবে
দেখাে দেখি।••প্রাচীন ভারতে’••
দাদাকে
মে করতে
দিলুম না। বললুম, কবে আমার পূর্বপুরুষ, ডঙ্ক।
বাজিয়ে লঙ্কা জয় করেছিলেন সে কথা ভেবে মস্তিষ্কে
দাম্ভিকতা সঞ্চার করার প্রয়ােজন বুঝিনে "গৌরব বর্তমানে
অতীত, সে ত কালেব গরে তা আবার প্রাণ কোথায় ?
দাদা কি ভাবলেন হঠাৎ জানি না,
বললেন 'দেখ, তর্ক কোরে ফল নেই। তােমার এই অদ্ভুত
আইডিগুলাে ছাড়াে। তোমার এই মুধুমীর দরুণ কত ক্ষতি
হয়েছে তা জানাে? আমার সমস্ত আশ্রমটী গেছে ভেঙ্গে
এতদিন ধরে যা গড়ে তুলেছিলুম, তা এখন দশ বছর
আগেকার অবস্থায় ফিরে যাবার মত দাড়িয়েছে। আর
সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে আজ আমার সঞ্জীবকে হারিয়ে ।
সে নিজেই নিজের পথ দেখেছে, সুতরাং দুঃখ করবার কিছু
নেই। তবে কি জাননা দুষ্ক্রয় ? • তাকে আমিই এ
জগৎকে-দেখতে, বুতে, শিখিয়েছি•••কিন্তু আমাকে
মূৰিৱ

নিরানব্বই চেনাবার প্রয়ােজন বােধ করিনি। দুর্জয় ! সঞ্জীব আমারই ছেলে: আজ প্রথম জেনে নাও আমিই তার বাপ। দাদার চোখ দুটী জলে ভরে এল। আমি হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইলাম যবে বজ্রপাত হ'লেও মানুষ এতটা নিঃসাড় হযে পড়ে না। আমাকে নিজের আগেকার অবস্থায় ফেরবার সুযোগ না দিয়েই হরিশদা আবার বলেন “দেখ, দুষ্ক্রয়। দেখলাম তুমি বেশ লিখতে শিখেছ। তােমার বই ‘নিগ্রহ পড়লম, তাতে আমাদের আশ্রমের ব্যাপারাদি রয়েছে, ভাল করেনি ভাই। ভবিষ্যতে আমাদের কথা কিছুতে ঘুণাক্ষরেও বার করে না, এইটুকু আমার অনুবােধ •• তোমার আর কোন স্বাধীনতায় হাত দেওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। যেখানেই থাক, সঞ্জীবকে আমি ফেরাববাই- দাদা ঝডের মতই অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি বিছানাটার ওপর নিজেকে একটু হেলিয়ে দিয়ে ভাবতে লাগলুম'ব্যাপার কি? করাই বা বায় কিছু স্থির এ সম্বন্ধে করার আগেই দরজায আবার খট খট শব্দ হােল, উঠে গিয়ে দেখি পিওন। চিঠিখানি হাতে নিয়েই বুঝলাম কা’র। অনেকদিন পরে অলকার মুক্তোর মত অক্ষরগুলিতে আবার আমার নাম ফুটে উঠেছে। বেশ একটা আনন্দের ঢেউ মুহুর্তের জন্যে আমার এই ছােট্ট অফিস ঘরটুকুকে ভাসিয়ে গেল। অতি সন্তর্পণে চিঠিখানি খুলে পড়লুম, মুখখানি আমার কাল হয়ে গেল। ঘরে লােক থাকলে ভাবতে, আমায় বােধ হয় ভুতে পেয়েছে—অলকা লিখেছে। তােমার বন্ধু সঞ্জীব বাবুর সৌভাগ্যে সুখী হয়েছি তাদের পরস্পবের নির্বাচনের ক্ষমতা নিয়ে বৃথা মন্তব্য না কোরে। আমার সে রাতের দুর্বলতা কিন্তু çfa man Cat671-I was not myself that night- মুসাফির

এক এক
আকাশের অস্পষ্ট আলাে তােমার চোখে যে মায়ার সৃষ্টি
করেছিল তারই মাধুরীতে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলে
ছিলাম। আমার সেই দুর্বলতার স্মৃতি আমায় যন্ত্রণা দিচ্ছে।
সঞ্জীব ও মিনতির কাহিনী যেমন আজ লােকের মুখে পল্লবিত
হচ্ছে' •••আমাদের কথাও যদি তেমনই হতে থাকে, তবে
আমার একমাত্র আশ্রয় হচ্ছে মরণ ••••
সে রাতের অর্থ যে এই দাড়াবে
তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারতুম না। মিনতি ও
সঞ্জীবের কাহিনী যে এক অদ্ভুত রঙে অলকার কাছে বর্ণিত
হযেছে, এ সম্বন্ধে কোনও ভুলই নেই। কিন্তু তাতে
অলকার কি?
রাতটা কোনরকমে কাটিয়ে, সকালে
একবার অলকার সঙ্গে যে দেখা কোরতে হবে, শুধু এই স্থির
করাই হােল মন থেকে হরিশদা, আম, আর, আর সমস্ত
ব্যাপার-সব তখন একেবারে মুছে গিয়েছে।
-बार

নিশুতি রাত, নিঃসাড়ে ঘুমুচ্ছি।
हीर
ঘুম ভেঙ্গে গেল, দরজায় যেন কে ‘টোকা মারছে
চুপটা কোরে শুয়ে খানিক শুলুম, বুঝলুম সত্যিই কেউ
আমাকে চায় তবে এত রাতে কে? হরিশদা নাকি ?
ধড়মড়িয়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখি প্রেসের জমাদার আমেদ।
মুখে শঙ্কার ভাব এবং ঠোটের ওপর আঙ্গুল রেখে ইঙ্গিতে
মুসাফির

একশ তিন
জানালে যে
কথাটা যাতে না কই এবং ঘরের ভেতরে
এসে কিছু বলবে।
ভেতরে ঢুকে দরজাটায়
দরজাটায় নিজের
হাতেই নিঃশব্দে খিল লাগিয়ে আমেদ বলাে ‘বাবু, পুলিশে
সমস্ত বাড়ী ঘেরাও কোরেছে, রাত দুটো এখন। কর্তাবাবু
পুলিশ আসার ঠিক আগে পর্যন্ত নীচের ঘরে কি সব কাগজপত্র
গুছিয়ে নিয়ে আমাদের সজাগ থাকতে বলে চলে গেলেন।
আর বলেছেন কিছু গােলমাল হলেই আপনাকে যেন তখুনি
এসে খবর দিই, যাতে, তিনি আপনাকে পালাবার যে যায়গা
দেখিয়ে দিয়েছেন সেইখান দিয়ে চলে যেতে পারেন, তাঁর
সঙ্গে দেখা করার জন্যে ভাবতে হবে না। দরকারও নেই।
আমি যেন একেবারে আকাশ
থেকে পড়লুম। হরিশদা যখন এত কথাই বলে গেলেন তখন
তত তিনি নিশ্চয় এ সম্বন্ধে সব খবরই রাখতেন, তবে
আমাকেই বা জানান নি কেন? ব্যাপারটা না বুঝলেও
সেখানে অপেক্ষা করে বিপদ বাড়াবার প্রয়ােজন দেখলুম না।
আমেদকে বললাম আচ্ছা, তুমি নীচে যাও, আমার জন্যে
রায়

একচার
কিছু ভাবতে হবে না।' বেচারী ভয়ে জড়সড় হয়ে আর
কথাটা না বােলে আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দিকে নেমে
গেল। আমি তার নেমে যাওয়া পর্যন্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে
রইলুম, তারপর ঝট কোরে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে
কোণের দিকের দেয়াল-আলমারির মাথার ওপরের তক্তা
খানি খুলে ফেলতেই সােজা ছাতে যাবার গর্তটা পেলুম
দেখতে। আলমারির আর একখানি থাক খুলে গর্তটার
ভেতর দিয়ে খানিকটা উঠে সযত্নে তক্তাদুখানি আবার ঠিক
খাপে লাগিয়ে দিলুম ওপর থেকে। বাইরে ছাতের ওপর
এসেই এছাত থেকে ওছাত লাফিয়ে দুতিনটে বাড়ী পেরিয়ে
এসে, একবার নিজেদের বাড়ীর নীচটার দিকে নজর দিয়ে
দেখলুম : পুলিশ মহাপ্রভুরা তখন চারিদিকে বেশ পরিপাটী
রকমে পাহারা বসিয়ে ফেলেছে। আরও গােটা চারেক ছাত
পেরিয়ে একটা প্রায় ছয় ফুট লাফ দিয়ে মতি নস্করের গলি পার
হােয়ে, আমাদের সংঘের ছেলেদের মেসের ওপরে এসে হাজির
হওয়া গেল। তাদের আর বিরক্ত কোরে রাতটা ছাতে শুয়েই
কাটিয়ে দিন। ভাের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ছেলের
ঘরের ওপর ঠক ঠক আওয়াজ কোরে তাকে জাগা।
মুসাফির

এক পাচ
সমস্ত খবর তাকে দিয়ে সাবধান থাকতে বােলে শেষে বড়
রাস্তায় পডম বেরিয়ে। এইবার প্রথম চিন্তা হল, যাই
কোথায়?
মিনতির হােটেলে তাে আস্তানা
মিলবেই, তাছাড়া বুলাদের বাড়ীতেও তাে যাওয়া যেতে পারে,
অলকার কথাও মনে এল কিন্তু টেকল না। বহুকালের
ঘরছাড়া মন আজ আমায় আবার ঘরের কথা মনে করিয়ে
দিলে। মা, কাকাবাবু, কাকীমা এই তিনজনের একমাত্র ছেলে
আমি-তবু ঘরছাড়া হয়ে ভবঘুরের মত ঘুরে মরি কেন?
আমার মনের মধ্যে বহুবার এই কেন জেগে উঠেছে, বহু
লােকের মুখ থেকে এই একই প্রশ্নে বিব্রত হয়েছি তবু
সােজাভাবে, সােজা কথায় এর সমাধান করার উপায় কখনও
ভেবে উঠতে পারি নি। আজ সহসা কেমন মনে হােল, আচ্ছা
অলকা কি স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে একরকম বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের
ওপর নির্ভর, একটা secured অবস্থা চেয়েছিল? পরক্ষণেই
মনে হয় আবার, দূর ছাই, কেবল অলকা! পাগলামির
একটা শেষ কোরতে হবে। বেশ গম্ভীরভাবে নিজেকে এবার

সংযত কোরে নিয়ে একটা রেস্তরাঁয় ঢুকে কিছু খেয়ে নেওয়া
গেল•••পয়সাটা দেবার সময় একবার মনে হােল, খরচটা
একদম বাজে। মিনতির Metropoleএ গেলে পয়সাও লাগত না,
খাতিরও কোরতাে। মনকে ধমকালুম, আবার পাগলামি।
রাস্তায় বেরিয়ে এক পয়সার একখানা ‘বঙ্গবার্তা
কিনলুম, তারপর উঠে পড়লুম একখানা চলতি বাসে। যাবে
যে কোথায় তাও জানি না।
কাগজখানির ওপর চোখ পড়তেই
চমকে উঠলুম। প্রথম পাতায়ই বড় বড় অক্ষরে দেখলাম
সারা বাংলায় খানাতলাসী”
‘অশনি’ পত্রিকার উপর অর্ডিনান্স
‘বপী সমিতির অফিসের প্রতি
শাখাপ্রশাখা আজ সকালে পুলিশ অনুসন্ধান করিয়াছে।
প্রকাশ বরিশাল ও খুলনা শাখার পাঁচ জন কর্মী গ্রেপ্তার
হইছেন। আসানসােলের ট্রেণ ডাকাতি এবং বাজপুরের
ৰােমার মামলার সম্পর্কেই নাকি ইহাদের ধরা হইয়াছে।
মুসাফির

একলাত
সবটা আর পড়া হােল না।
অফিস যে এখন একেবারেই ছাড়তে হল সে সম্বন্ধে আর
কোন সন্দেহই রইল না। একরকম ভাল যে, কাগজখানি
অর্ডিনালে বন্ধ। সুতরাং আমার কাজ তত আপনা হতেই শেষ
হয়ে গেছে। আমি তাহলে আর ভয়ে পালাইনি, এখন আমি
সত্যিই বেকার • মুক্ত। এও একটা সান্ত্বনা। মনটা হাল্ক
হয়ে গেল অনেকটা। কাল রাত থেকে আজকের এই দুপুর
পৰ্যন্ত চিন্তার যে ধারা চলছিল, হঠাৎ তাতে বাধা পডে
সমস্ত ভাবনা চিন্তা তােলপাড় কোরে মনে এখন জাগছিল
খালি--মা আর অলকা

একটি
হঠাৎ যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছি।
সমস্ত রাতটা সেদিন ছটফটানিতে গেল কেটে।
মনে পড়ছিল! বহুদিনের পেছনে ফেলে
আসা জগতটার সামনে আজ হঠাৎ এসে হাজির হয়েছি।
আমি ভাবি, আর মাঝে মাঝে ভেতর থেকে সমস্ত
শরীরটা আমার ডুকরে কাঁদার মত এক একবার যেন
কঁপিয়ে ওঠে
মূলাকিব

একশন
খট্ কোরে একটা শব্দ হল:
কটমট করে সামনের দিকে চাই সমস্ত অন্ধকার। আবার
চোখটা বুজুই মনে হােতে থাকে, জগতটা হঠাৎ যেন শুকিয়ে
ছােট্ট হয়ে আছে, আলো নেই, হাওয়া নেই, স্থান নেই
তারপরেই কিসের একটা আলােড়ন সোঁ সোঁ শব্দে একেবারে
পাতালের দিকে কিসে যেন গড়িয়ে নিয়ে চললাে। মনে হয়
অন্ধকার ক্রমেই যেন আসে থিতিয়ে, তার গভীরতা শেষটায়
এতবেশ হােয়ে ওঠে, যে আমি উঠি হাঁফিয়ে। সেই অন্ধকারের
মধ্যে কিছু একটা আঁকড়ে ধরবার জন্যে কাতর হয়ে হাতড়াতে
থাকি।''আর একটা শব্দ হােল সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যাওয়ার গতি
হঠাৎ যেন গেল কমে, সমস্ত দেহটা টলমল করে উঠলাে।
তন্দ্রার চম ভাঙ্গলাে পড়ে যাই আর কি, ইজি-চেয়ারখানা
আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে, সামনের
জানলাটা খুলে দিলুম ‘ভােরের ক্ষীণ আলাে দেখা দিয়েছে।
এক ঝাপ্টা ঠাণ্ডা হাওয়া আমার মুখে এসে লাগলাে । খােলা
জানলা দিয়ে শহরের ছােট ছােট অসংখ্য বাড়ীর

নিদ্রিত অবস্থার দিকে রইলুম চেয়ে। বহুদূরে ধোয়ার এক আবছা ছাউনী আরও কতকগুলিকে ঢেকে রেখেছে জানলার গরাদে দুটো ধরে স্থির শান্ত প্রকৃতির দিকে রইলুম একদৃষ্টে চেয়ে। নিজের ভারেই মাথাটা আমার সুযে পড়লাে গরাদেব ওপর। নিজেকে আজ অতি নিবাশয় বলে মনে হােল। অশান্ত মন আমার চারিদিকের এই শান্তির ভেতর স্থির থাকতে পারলে না নিঃশব্দে সিড়ি দিয়ে নেমে এসে রাস্তায় বেরিয়ে পলুম- খামখেয়ালী ভাৰে বহুক্ষণ ঘুরে বেড়িয়ে যখন রােদের তাপে বুঝলুম বেলা হয়ে গেছে তখন দেখলুম যে হ্যারিসন রােডের কাছে। হঠাৎ মাথায় নতুন এক খেয়াল চাপলাে। একটু এগিয়ে গিয়েই, একটা ছোট্ট গলির সামনে এসে ভাল করে জায়গাটা দেখে নিকুম, তারপর ভেতরের দিকে এগিয়ে গিয়ে ছােট্ট একটা লাল বাড়ীর দরজার কডাটা ধরে খানিক দিলুম নাড়। ভেতর থেকে একটা আওয়াজ এল ‘কে? দাড়ান একটু। খুব সামান্য সময় কিন্তু তাই-ই আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন একটা যুগ। ফির

এক-এগার
আর সহ্য করতে পারলুম না।
কাপা গলায় ডাকলুম ‘বুলা ভাটা পথভােলা পখিকের
হতাশা আর শান্তির দীর্ঘশ্বাস মাখান। এর বেশী যেন আর
তার প্রকাশ নেই।
চশমা চোখে একটা ছেলে বেরিয়ে
এল। সঙ্গে এল একটা কুকুর। আমাদের পরিচিত কেট নয়:
কুকুরটীব মাথায় হাত বুলােতে যেতেই সেটী ঘেউ-উ-উ কোরে
তীব্র আপত্তি জানালে। ছেলেটি বললে, “দাদাকে চান ?
দাদাতে বহুদিন বিলাতে।' বললুম, ‘কল্যাণ আছে কি?
ছেলেটি একটু ভাবলে, পরক্ষণেই হাে হাে করে হেসে উঠলাে
বললে ‘আসুন, বসুন আপনি, আমি আছি। কথাটা বলেই সে
ছুটে ওপরে চ'লে গেল।
মনটা তখন আমার শঙ্কার দোলায়
দুলছিল। ভাবলাম ধ্যেৎ, গড়িয়ে লাভ কি? ফিরতে যাব তাই
—এমন সময় বাতাসটা কি একটা সুগন্ধের আবেশ এনে
ঘরটাকে মাতিয়ে তুললে"আমার চোখের ওপর সুন্দরের যেন
রায়

একবার
করণ বয়ে এল। “ফেরা আর হােলদা :
অলকাকে আজ এক নতুন রূপে দেখলাম। মুখের ওপর
এলােমেলাে ভাবে চুল ছড়িয়ে পডে, সবে ঘুম ভাঙ্গার শ্লথভাব
তখনও ছাডে নি। • কাপড়টার পাশ ফিরিয়ে নিয়ে, চেয়ারটার
হাতটা ধরে এসে সে দাড়ালাে। বললে বেশ তত। এতদিন
ছিলে কোথায়? কাগজে সব ব্যাপার দেখে মামণি
বড় ভড়কে গিয়েছিলেন তবে খোজ আর নেব কোথায় বল ?
বললুম ‘খােজের কি দরকার ছিল
কি 'অলকা? সামলে নিলুম, কারণ সেও চমকে উঠেছিল
আমার কণ্ঠস্বর শুনে বললে—“তুমিই জানি।
অলকার চোখদুটো টলমল করছিল।
' তার উদাস দৃষ্টি কোথায় কার পাণে ছুটেছে, তা আমার
ভবঘুরে মন ঠাওরালেও ভাবতে পারছিল না 'অলকা বললে
দেখ ‘লক্ষীটি, আর নিজেকে এভাবে চালিওনা- দুর্জয় !
আমি আর সহ্য করতে পারছি না। কটা দিন আছি তােমায়
মুসাফির

একশতের
পেযে এ কটাদিনও অন্ততঃ শান্তি পাব। দুর্জয়, তুমি কি
আমায় আবার সেই আগেকার রূপে ফিরে পেতে চাও না ?
তার ঠোঁট দুটো থ থ কোরে
বাঁপছিল বললে, মা আজই ফিরছেন সিলেট থেকে, আমি
তাে আর মাস খানেক পরেই সাগরপারে রওনা হচ্ছি-মন
কিন্তু চায় না। জানন দুর্জয়, ভাবি, তােমায় যদি সত্যিকারের
পেতুম অন্ততঃ কিছুদিনের জন্যেও,
জীবনটা সার্থক হােত।
একটা ক্র হাসি আমার ঠোটের
ওপর ফুটে উঠলাে। বলতে যাচ্ছিলুম, অলক, আমার ভেতরটা
সে শেষ কোরে দিয়েছিলে। আবার এ কি খেলা সুরু কোরলে।
এ ভবঘুরেকে আর কেন বাঁধছে?
অলকার গাল বেয়ে তখন মুক্তোর
মত দুটো ফোটা গড়িয়ে পড়ছে আমার সংযম আর রইল
না, তাকে জড়িয়ে ধরে, রুমালটা দিয়ে তার চোখের জলটা
মুছে ফেললুম, আমার বুকে সে মুখ লুকালে, ভবঘুরে,
ছাহাজ আমার কাছে এ চায় আশ্রয় : 'হ ভগবান।

একশ'চোল
সে যখন মুখ তুললে
আবেগে তাকে চুম্বন করলুম, বললুম।
‘অলক, হার
মেনেছিলাম আগে, আজও মানলুন। জগতের যেখানেই
থাক অলক, আমি ভেবে চলবে তুমি যেন আমার পাশেই
আছে•••তােমার এই মায়াময চাউনি আমার চোখের ওপর
যেন সদাই খেলা করছে।
মুসাফির

একপনের
সকালে উঠেই অলকার চিঠি
পেলাম।
লিখেছে,
‘তােমায় বেশী কিছু লেখবার সময়
নেই। কাল আমার যে কি অশান্তিতেই কেটেছে, কি বলবাে।
আমার জীবনের অসীম সুখের সঙ্গে তােমার জীবনের দুঃখের
রায়

একশ'যােল
তুমি তুলনা করেছ• 'আমি কোনাে প্রতিবাদ করতে চাইনা।
বাইরের লােকচক্ষ জানুক আমি আনন্দে দিন কাটাই, কিন্তু
আমার ব্যর্থতার বেদনা প্রকাশ করতে আমি নারাজ। তুমি
লিখেছ এমন মা থাকতে আমাদের মিলন হবে না, আশ্চয্য।
তুমি একেবারে শিশু, মানবচরিত্র সম্বন্ধে—তাই একথা লিখেছ
•মা তােমায় ভালবাসেন, প্রায় বুলার পাশেই তােমার স্থান।
• কিন্তু মা তােমায আমার দিক দিয়ে একটুও চান না।
এটা তুমি এখন না বুঝলেও পরে বুঝবে। যে যন্ত্রণা আমি
ভােগ কচি, ভেবে দেখলুম তা শুধু আমার দুর্বলতার জন্যে।
প্রথম দুর্বলতা তােমাকে ভালােবাসা এবং দ্বিতীয়টী
হচ্ছে প্রকাশ কতে কোন লজ্জা নেই, তবে ভয় আছে
কার জন্যে জানাে ? তিনি বাবা: "বাবার কথা তুমি বা
লিখেছ তা ঠিক। তিনি যে শুধু আমায় ভালবাসেন তা নয়,
তার সকল রকম দুঃখের সান্ত্বনাই হচ্ছি আমি
তারই জন্য আমায় সবচেয়ে কঠিন ত্যাগ স্বীকার কোরতে হবে
কিন্তু কৃতজ্ঞতার দাবীর কাছে কি হৃদয়ের আহবান হার যাবে।
e |
. .
চিঠিটা এই খানেই শেষ
কচ্ছিলুম। কিন্তু না, তােমায় দুঃখ দিতে চাই না-দেখাে,
মুসাফির

এ’সতের
সারাদিন সারারাত কেবল তােমায
কেবল তােমায ভাবছি তােমার
প্রথম চুমার সুধা এখনও ভুলতে পারিনি : মনে বুঝচি
কাজটা অন্যায় হয়েছে
হযেছে কিন্তু মনের ক্ষুধা মিটছে না
কিছুতেই। তােমার বুকে মুখ রেখে সে দিন যদি জীবনের
শেষ হােতাে বাঁচতাম আমি
আমি অলকাকে চাই মনে প্রাণে,
--অলাও আমাকে চায় সর্বস্ব দিয়ে, কিন্তু দুজনের
মাঝখানে আছে হিমালয়ের মত বাধা। কিন্তু দুর্জয়
নাম কে রেখেছিল আমার ? বাধার সঙ্গে লড়াই করা
আমার ধর্ম হয়ে গেছে।
সে যে পথের পথচারিনী,
আমিও সে পথে তার অনুসরণ করবে। একটা জীবনেও
তাকে না পেলে, আবার পরজন্মের আশায় ছুটে চলবাে-
ব্রাউনি যেমন লিখে গেছেন ‘এভেলি হােপের সম্বন্ধে।
অলকার প্রতিভায় ভাস্বর সুন্দর মুখ আমায় পাগল করেছে।
তার হাতের কোমল পরশ আমার মনের তারে ঝঙ্কার দিয়ে
বলে,
রায়

একশ’আঠার
“যেন সেই বেদন, ফুলে শিশির কণা।”
আচ্ছা, বেদনা এত মধুর হয় কেন ? গ্ৰীশ দেশের একজন
প্রাচীন স্ত্রী কবি সাফো প্রেমের সম্বন্ধে লিখেছিলেন যে প্রেমে
আছে তিক্ততা আর মধুরতা। অলকার কথা ভাবলেই
মনে পড়ে সাফোর glukopikros,-তাকে সর্বস্ব দিয়ে
ফতুর হবার যে প্রচণ্ড বাসনা, তাই আমাকে দেশ
ছাড়া করলে। সে যে দেশে যাবে, আমি আগেই সেখানে
যাব,—সেখানে গিয়ে তার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকব।
তাই আজ ভারতের বেলাভূমি
যখন Ballard Pierএর কাছে ক্ষীণ উপবীতের মত মিলিয়ে
গেল, তখন আমার বুক কটুও দমে যায়নি, আমি যে
তারই পথে চলেছি প্রেমের বাতি জ্বালিয়ে ।
মুসাফির

একশউনিশ ডেক চেয়ারে যে পড়তে লাগলুম- “আজ তােমায় যে সম্বােধন করছি, তার অনেক গভীর অর্থ আছে হয়তাে ইতিপূর্বে এই নামেই তােমায় ডেকেছি : কিন্তু সে সব দিনের সম্বোধনে ঠিক আজিকার আন্তরিকতা ছিল না। তুমি যদি বিশ্বাস নাও করাে, আমার লিখতে হচ্ছে, যে আমি ততটা crul বা heartless dirt নই যতটা তুমি ভাবাে।আমার মনে হয় আমি যদি shrewd player হতে পারতুম, তাহলে

একশ'বুড়ি
হয়ত ভালাে হত—এরকম কোরে প্রতি মূহুর্তে নিজেকে
kill কোর্নে হােত না।
তােমার সঙ্গে বহুদিন, কে জানে,
কতকাল দেখা হবে না কিন্তু তােমায় আমি বলছি, বিশ্বাস
GPIC I am yours and not for a day or a year
but as long as I live : দ্যাখ, যদি কোনও কারণে
বিদেশে আমার যাওয়ার বা ঘটে •• এমন দুর্ভাগ্য যদি
আমার আসে.. .আমি ঠিক করেছি যে, কোন কলেজে
কাজ নেবাে . .তাতে যত বড়ই অশান্তির
সৃষ্টি হােক না
কেন? যদি কাজ নিতেই হয়....আমাদের মিলনের কোন
বাধা থাকবে না। তােমার কাছে আমার মিনতি..
তুমি সত্যিকারের কিছু একটা করে। ••••জগতে তােমায়
আমি বড়াে কোরে দেখতে চাই। তুমি ভেবােনা আমার
বিয়ের কোন আসল চেষ্টা বাবা করবেন না -সে খরচটা
বুলার জন্যে কোরলে
একটা বড় কিছু
উপার্জনক্ষম হয়ে আসবে.. তাই আসুক। আমি তাই-ই
চাই। তবে মার পক্ষ থেকে বিয়ের তলব এসে এসে
কোনও হৃদয়বান ব্যক্তি হয়তাে প্রস্তুত হতে পারেন
সে ফিরে
মুসাফির

একশ’একুশ আমার উদ্ধারে কিন্তু আমার ভয় নেই তখনই সময় আসবে either to revolt or to die : আমায় তুমি আংটা উপহার না দিয়ে, এমন কিছু যদি দিতে যাতে নিজেকে এক মিনিটে শেষ করতে পারি আমি বাঁচতুম। কাল রাত থেকে মনে হচ্ছে, নিষ্ঠুর নিয়তি তার হাত থেকে আমার মুক্তি নেই মুক্তি নেই যদি মুক্তি না পাই আমি স্বয়ং তার ব্যবস্থা কোরব। তুমি হয়তাে কষ্ট পাবে আমি কিন্তু সুখী হযেছি জেনে খুশী হয়ে আজকাল মনে হয় যে কি মিথ্যা শিক্ষার গৌরবই না এতকাল করেছি। আমাদের এই উদার- পন্থী লােকেরা যারা মেযেদের লেখা পড়া শেখানাের পক্ষপাতীwhat fools they are ! মেয়েদের মনের সহজ ভাবে যারা বাধা দেয়, তারা যেন আর enlightened ব'লে গর্ব না করে।) এবার কিছুটা তুমি দেখছ তাে! আমার চারিদিকে দৃষ্টি মাও মেশাটা যেন পছন্দ করছেন না বাবা যে কেন আমায় এত বড় কোরে education বুঝিনা ..আর এ অত্যাচার সহ হ্য.••• দিলেন, রায়

একশ'বাইল
lmit reach কোরে গেছে।
যদি তােমায় কখনও পাই
তাে বাড়ী ছাড়তে হবে। বাড়ী মানে, মা ও বাবা
ভাযেরা আমায় ভালবাসে। তারা হয়তাে অামায নাও
ছাড়তে পারে। বুলাকে কিন্তু চাই, আমাদের জীবনের
পথে তার আন্তরিকতার দরকার খুব বেশী—কিন্তু সেও
যদি না আসে ত’ ক্ষতি নেই দুজনে দুজনই যথেষ্ট।
হয়তাে, বহুদিন আর তােমায় কিছু লিখতে পাৰ্বোনা।
তুমি চিঠিটা পড়ে কি ভাববে, মােটেই ভাবছিনা,-তুমি চলে
যাচ্ছ এই কথাটাই বড় হয়ে মনে লাগছে-
শরীরের যত্ন নিয়ে । তােমায়
আমার নিজের করে যেদিন পাবে।•• 'সেদিন থেকে তােমার
ভার যেন আমিই বহন করি: দুষ্ট, তােমার মিষ্টি চুমােয়
চিঠি ভরিয়ে দিয়েছ ''আমি কি দেব?
জীবনের অ
আমার শুরু হচ্ছে আজ থেকে- দুর্জয় আজ পয্যটক।
মুসাফির

একশ তেইশ
E
সােনার বাংলার গণ্ডী ছাড়িয়ে বহুশত মাইল দূরে এসে পড়েছি
মাঝে আছে নীল মহাসমুদ্রের জলরাশি • 'তার ঢেউগুলো
আছাড়ি পাছাডি খেয়ে কেবলই আমায় জানিয়ে যাচ্ছে ‘ওগাে,
খেয়ালী, ও ভবঘুরে। চলে এসো তােমায আমরা কোলে তুলে
নিই—নিয়ে বাই সেই দেশে যেখানে কেবল এই শ্বেত শুভ্র
ফেনার নাচন আছে। নীল অসীমের মায়াময় সৌন্দর্য্যের ওপর,
চন্দ্র সূর্যের রঙের খেলা আছে। • • 'আর আছে একটা বিরাট
মহাশান্তি, তারা কেবলই আমায হাতছানি দিয়ে ডাকছে,
কেন ? ওদের এতো কিসের গরজ ? •••
ওরা কি জানে?
চেনে ?
চুপটী কোরে বােসে ভাবি
চারিদিকটা। হঠাৎ কিরকম কালাে, ঘন মিশমিশে কালাে মেঘে
ঢাকা পড়ে গেল দূরে যে অসীমের মধ্যেও একটা সীমার
রেখা দেখা যাচ্ছিল সেটা গেল মিলিযে। কে যেন কাল ওড়না
দিয়ে আমাদের এই ক্ষুদ্র আশ্রযটাকে ঘিরে রইল"তারপর

একচব্বিশ
সে কি ভীষণ গর্জন! দূরে কোন্ ক্ষেপার ঘুম ভেঙ্গেছিল,
চারিদিকে ফোস ফোস কোরে রাগে সে ঘুরে বেড়ায়, একবার
যেন পেলে হয়: জাহাজ লােক ভয়ে কাঁপে, আমি হাসি
''অলকাও যেন হাসছে। হাওয়ার মাঝে এই সময় তার
চুলগুলাে কেমন উড়তে • 'তাকে নিশ্চয় পাগলীর মত
দেখাতে এই সময় •••কি যে সব ভাবি ছাই তার ঠিক
নেই:
বহুদূরে মেঘমালা চিরে বিজুলী
তার রক্তরাঙা আঁখি মেলে এক একবার দেখে নিচ্ছে,
কোথায় কি ভাব। একটা কড়, কড়, কোরে আওয়াজ
হলাে, ক্ষেপা বুঝি ছুটেই এল। কাল ওড়না ছিডে এবার
অঝাের ঝরে কান্না শুরু হােলাে। আমারও চোখে জল এসে
পড়লাে• ভাবি, আরে ছি। দুর্জয় তুমি এতই দুর্বল ?
কেপার তাণ্ডব নৃত্য কমে না ওড়না ছেড়া পেয়ে সে যেন
আরও উদ্দাম উচ্ছল হয়ে ওঠে। ছুটে গায়ে পড়ে আর কি।
আরে, আমায় কি আলিঙ্গন কোরবে না কি? ছপাৎ কোরে সে
এসে আছড়ে পডে ঢােকের ওপর আবার যায় দূরে সরে,
তারপর থেমে, দূরে গিয়ে নেচে নেচে চলে যায়। বলে, কি গাে
মুসাফির

এশ পচিশ
বন্ধু,
কি ভাব ব'সে এখনও এস, আমাদের এ খেলায় যােগ
দাও হাসি আমি, আর ভাবি। নীল আকাশের বুক চিরে
আলােকের ঝরণা ধারা এসে এবার নাচে যােগ দিলে।
ফুলে ফুলে দুলে দুলে সমুদ্র তার গান গেয়ে চলেছে একটা
অপূৰ্ব তালের, ছন্দের সুর আমার প্রাণের তারে এসে
আঘাত করে সে সুর অসীমের
ভাব জগতের ঘাের কাটতে দেরী
হয় না। সমস্ত জাহাজখানা দোলনার মত সমুদ্রের বুকে নাচছিল
তখন। ঝড়বৃষ্টি আবার ঘুরে ফিরে এসে হাজীর হােল শরীর
মন অবশ হয় ঋকানি আর দোলানির সাথে চলার নেশা
যেন কাটে
.
নিজের কুঁড়ে ঘর, মা বােনের আদর,
ভায়েদের, বন্ধুদের কথা এই সময় মনে পডে। cabinএ ফিরি,
দেখি একটী বাঙালী ছেলে আমার বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে
লস্কর ইসুফ তার মাথায় ল্যাবের জল দেয়
ইসুফের কথা ভাবি এই একই নেশার ঘােরে সে বেরিয়ে-
ছিল বাড়ী ছেড়ে চাচার সাথে, ঝগড়া হয়েছিল বাবু ভাই

একশ'ছাব্বিশ
এলুম নয়ী কোরতে নইলে কিসের অভাব ছেল না বাবু।
কি বােলবাে এমনই বরতিবছর বাদ দেশে ফিরে ঘরকে
গেলুম বন্যায় সব ধুয়ে মুছে গেছে মা বুন, সব কোথায়, খোজ
পাইনি।
সে আজ দশ বছরের কথা—তােমার মত ছেলে ছিল
একটী। সেও কোথায় গেছে ভেসে সেই থেকে এই
চিরকালের বন্যা যেখানে ডাকে, এই দরিয়ায় কাম নিয়েছি।'
বুডাের চোখ বেয়ে টস্ টস কোরে জল গড়ায় তারই ওপর স
হেসে, বলে—‘ডর কি, বাবু নাব! দো তিন রােজমে সব ঠিক
যে জায়গা। খারাব মালুম হােনেসে, ইসুফকে পুছে
বুড়াের সাথে মেলে আমার
তার কথায় আমার চোখ জলে ভাসে। এক হাওয়া, এক
মাটী, এক জলে মানুষ আমরা "তাই না এত টান। চলার
নেশা দুজনেরই। দুজনে তাই কত সময় ভাবি-হাসি আর
কাঁদি। আমি, ইসুফ আর এই দরিয়া আমাদের জগতে
চলার নেশা ছাড়া আর কিছু স্থান নেই।
সিকদার ছিল ফাষ্ট ক্লাসে। কদিন
ঝড় ঝাপটা খেয়ে, আমার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে এখন।
মুসাফির

একশ'সাতাশ
ছােট খাট প্রশ্নে তার, জাহাজের সকলে অস্থির হয়ে
উঠেছিল মুখে যেন খই ফুটছে। বললুমবাড়ী কোথায়
তােমার?
--‘ছিল বাংলাদেশে। মাদ্রাজ
থেকে আপাততঃ রওনা। পােড়া জায়গা মশাই কথা বলে
আঁড়, আলু, মুড়, আর
আর ফুলস্টপ কমা নেই। বলি
থাম বাপু, একটু দম নাও। তা শুবে না’:::
মনে ভাবি বলি,-তােমারই বা
কমা ফুলষ্টপের কি বালাই আছে! কিন্তু চুপ করে থাকি।
এ ই সময়।
ইফ আমার খাবার নিয়ে এল
সে নিজেই
আমার জন্যে সারেঙ্গদের ঘর থেকে
রেধে আততা। ঘি ভাত, ডাল, ডিম, আলুভাজা-ছেলেটী
দেখলে, বললে “দাদা, বেশ তাে সংসার পেতেছে সমুদ্রের
মাঝে এসব পাও কোথায় ? না দাদা, তােমার দলেই
দেখি জুটতে হচ্ছে।' হেসে বললুম না হে সিকদার, পহেলা
নশ্বরকা যাত্রী তুমি, তােমার আবার ভাবনা কি?

এক'আটাশ —“আরে কি বলবো দাদা, এমন ব্যবস্থা তােমার হাতে জানলে কি আর ওদিকে পা বাড়াই। একেবারে অভাগার খাদ্য দাদা।-মাছ, বলে কিনা বছর দুই টিনের ভেতর শুনাে’ প্রথম দিন মুখে দেওয়ার পর মনে হােলল অন্নপ্রাশনের ভাত শুদ্ধ বুঝি বা উঠে আসে। একটু মুচকে হেসে বললুম ‘সাহেব হেতে যাচ্ছ ভায়া, অভ্যাস করে নাও সেখানে আর ডাল ভাত কে রেখে দেবে? হাসূছে যে বড, তুমিও কি দাদা পাবে নাকি? সত্যি, কি দুঃখেই না Galsworthy তার White Monkey তে ইংরেজকে উদ্দেশ কোরে লিখে গেছেন যে এত হৈ চৈ, এত রাজনৈতিক ওলট পালট- ভাল কোরে রেখে খেতে শেখার একটু ব্যবস্থা করে দেখি ! দেখাে দাদা, তুমি বিলেতে গিয়ে, একটা ভাল খাবারের আস্তান এই রেস্তরা খােলদা। না, হােলে ভাই ওদেশে থাকা অসম্ভব। কই বাবা, মূলাফি

একশ’উনত্রিশ
সিকদারের ব্যাপার দেখে তাে
হেসে ফেলুম। বললুম ‘চলা, পরে দেখা যাবে, এখন তাে
এখানে খাও
মিনতির কথা আজ পড়ে যায়
•আর তার Hotel Metropolo••
মনে

একশ'ত্রিশ
ডাঙ্গায় পা দিলুম' সাদার দেশে
পৌছেচি আজ। বিকৃত মন বােধ হয় আমার, বিশেষ
পরিবর্তন তাে চোখে পড়ে না। ধুতির যায়গায় পাৎলুন আর
কাল’র যায়গায় কটা রঙ দেখতে পাচ্ছি। মাসে বন্দরে ঢুকে
‘গ্যাংওয়ে দিয়ে নামবার পথে দেখলুম ঠোঁটের সিদুরের বা
লিপষ্টিকএর ছড়াছড়ি। এটা একটা নতুন জিনিষ, আমাদের
মূকাফির

একশ’একত্রিশ
৪ ।
অনভ্যস্ত চোখে। অল্প সময়ে সহরটা একবার পাক খেয়ে
নেওয়ার লােভ সম্বরণ করা, এ ভবঘুরের পক্ষে অসম্ভব
প্রথমেই ঢুকলাম
একটা
Cathedrala
সমুদ্রের ধারে
চমৎকার পাথরের গিজ্জ, ভেতরটা অদ্ভুত গাম্ভির্য্যে ভরা
চারিদিকে বাতি জ্বলছে, মাঝখানে সোনার মেরী মূর্তি।
এরই কাছে আছে একটা জিনিষ, যা এই বিদেশের সঙ্গে
আমার আত্মীয়তা ঘনিয়ে তােলায সাহায্য করেছিল, সেটা
হচ্ছে মহাযুদ্ধের স্মৃতিফলক। এর সব ওপরে খােদাই করা
ভারতের নাম। এখান থেকে সহরের ভেতর দিয়ে ঘুরে ফিরে
যখন চলছি, দেখলুম কোন কোন পল্লীতে, এমন পাথরের উচু
নীচু রাস্তা, আর এত অলি গলি,-যে তার ময়লা ও অন্ধকার
আর পাশের বাড়ীগুলাের অসূর্যম্পশ্যা অবস্থা অনেকটা
আমাদের কাীর গঙ্গাতীরের সহরের সঙ্গে মিল খায়।
ভিখারীর সংখ্যাও বিশেষ কম নয়। দেশটা বাইরে থেকে
যুদ্ধের, ও পাছে আবার যুদ্ধ হয় তার ভারে বেশ
একটু ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এতদিনের দরিয়ায় ব্যবধান
আজ যেখানে এনে উপস্থিত কোরেছে, সেখানে রঙের দিক
ছাড়া আর কোনও নূতনত্বের সন্ধান এখনও আমার খেয়ালী মন
পায়নি। আমি রওনা হলুম ট্রেনে লণ্ডনের পথে

একবত্রিশ
‘ভিক্টোরিয়ায় নেমেই বুলার সঙ্গে
দেখা বলে প্রথমেই “কি রে, বন্ধুরা সব নিশ্চয়ই তাের
ব্যাপারে curious হয়ে উঠেছে দেশে, না?' ••আমি
চমকে উঠলুম। বুলা কি জানে না কি। অলকা তাহলে ওকে
লিখেছে। উত্তর দিলুম মানে ? ঠিক বুঝছি না তােমার
কথা।'বুলা বললে ‘চ’ বাড়ী গিয়ে আগে ঠাণ্ডা হয়ে বসি।
পরে গল্প করা যাবে
দশমিনিটের পথ, মােটরে অবশ্য ।
Shepherd's Bushএ ‘গােও ষ্টুডিয়োর কাছেই বাড়ী। একটা
ইঙ্গ-রুষ পরিবারে বুলা থাকে দোতলায় তেতালায় একখানি
আমার ব্যবস্থা করেছিল কয়েকদিনের জন্যে।
বিদেশে এই বুলাই হোল আমার পথ প্রদর্শক 'আপাততঃ ।
বিশ্রাম কোরে সেই দিনই বিকেলে বুল আমায় নিয়ে
হাইড পার্কে একটা বেঞ্চে বসে
কথা আরম্ভ হােলে সে বললে ‘এলি যে, কবি কি এখানে?
বললুম ‘সবে ত পা দিয়েছি,
পা দিয়েছি, আজ রাতে ভাববে।
মুসাফির

একাতেত্রিশ
সে বললে-
“দেখ, এ দেশটার ধারা সম্পূর্ণ
আলাদা। ভাবুকের মন নিয়ে দিন কাটাস যদি, তত তার
কুলাে পাবিই না, মুস্কিলে পড়বি যথেষ্ট। আচ্ছা এই,
একটা কথা বলি। জানিস্ তত দিদি মাসখানেকের ভেতর
এখানে আসছেন ? :
বুলা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার মুখের
পানে চেয়ে। বললুম, হ, এইমাত্র তাে জানলুম। কি
কোরবেন এখানে এসে ?
e
বুলা আমার দিকে ঘুরে বলে
দৃঢ়স্বরে বলে, 'এলে পর কি কোরবেন জানি না, তবে
যতদূর জানি, তাতে তােমার সঙ্গে আর মেশামিশি কোরতে না
দেওয়াটা যে আমার ওপর পড়ছে, সেইটুকুই
সপাং কোরে চাবুকের ঘা খেলে
লােকের যে অবস্থা হয় আমার ঠিক তাই হােল 'যা বলতে
রায়

একণ’চৌত্রিশ
যাচ্ছিলুম গলায় গেল আটকে, বিএভাবে বেরিয়ে এল ‘লজ্জা
করে না। তাের না দিদি।
বুলা কথাটা কেড়ে নিয়ে গম্ভীর
ভাবে জবাব দিলে ‘ঠিক সেই জন্যেই।'—কারুর মুখ দিয়ে আর
কোন কথা ফুটলে না। বিদেশে প্রথম দিনেই আমরা উভয়ের
মধ্যে একটা বাধার পাঁচিল তুলে ফেললাম।
ফিরলাম যখন, রাত তখন অনেক
হয়েছে: বাড়ীতে ফিরে এলাম আমরা যেন সম্পূর্ণ দুটী
অজানা, অচেনা লােক। দুজনের মনের ভেতরটায় তখন কত
বছরের, কত জায়গার, কত রকমের চিন্তা যে তােলপাড়
করছিল, তার ইয়ত্ব ছিল না
সিডির ওপরে উঠেই করিডরের
সামনে দেখি বাথরুম থেকে নাইট-গাউন-জড়িত অবস্থায় এক
অন্ধবিবসনা নারী একমাথা ভিজে চুল টাওয়েল দিযে
মুছতে মুছতে বেরুচ্ছে : * ডানহাতে জলশুদ্ধ স্কাফখানা তার
মুসাফির

একশ’পত্রিশ
গলা পর্যন্ত উট, কোরে ধর, বুকের প্লট কুমযুগল উদ্যত
[ হয়ে আছে রূঢ় নিষেধের মত
।
আমরা দুজনেই দুজনের দিকে
খানিক স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলুম : বিদেশিনী সুন্দরীকে মাখা
মুইয়ে গুড নাইট’ বলে নিজের ঘরের দিকে চললুম এগিয়ে।
সেও উত্তর দিলে, ভাষাটা কিন্তু অন্য, অথচ জানা জানা মনে
হােল পরে জেনেছিলুম, জাৰ্মান। মুখে একটা বিয়ের
আকুলভাব নিয়ে সে আমার দিকে চাইতে চাইতেই অপরদিকে
ঘরে ঢুকল: ‘লকারের আওয়াজে বুঝলাম দরজাটা সে
বেশ কোরে বন্ধ করেই দিয়েছে।
০
মনে মনে হাসলুম।
ভাবতে
লাগলুম কিন্তু বহুক্ষণ ধরে, সেই নামহীনা অপরিচিতার কথা
আমার ঘরের আলােটা পর্যন্ত নেইনি সে রাতে••••
তার প্রােজ্জ্বলধারা ছিটিয়ে পড়ছিল ‘স্যাশ দিয়ে, তারই ঘরের
ভিতর হয়তো তারই অঙ্গ বেয়ে ভেসে যাচ্ছে, তার কানে
কানে সুর মিলিয়ে বলছে হয়তাে জাগাে, জাগাে, সুন্দরি।
রায়

একশ'ছত্রিশ
বাইরে ঝড় উঠলাে• 'সারারাত
ধরে জানলার ওপর অদ্ধজাগ্রত অবস্থায় তাদের অজানা
সুরের গান শুনেছি মনে মনে চলে গেছি কত দূরে,
ওরই সাথে কৌতুহলী মন চায় জাতে, কোথা ওর দেশ
কি নাম 'ওর সঙ্গে মিতালী পাতালে বেশ হয়। পরদিন
সকালে ড্রেসিং গাউনটা চাপিয়ে ওর ঘরের লকারের শব্দ
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলুম করিডরে তার সঙ্গে
দেখা। ভেবে চিন্তে জার্মান ভাষায় বললুম, ‘গুটেন মরগেন
(সুপ্রভাত) সে চমকে উঠলাে, তার মুখ দিয়ে অস্পষ্টভাবে
কয়েকটা কি কথা বেরিয়ে এল বোঝা গেল না। মনের
বেদনা যখন গভীর হয়, তখন সে ভাষা না পেয়ে যায়
নির্বাক হয়ে। তার টানাটানা চোখে কৌতুকমাখা চটুলতা,
একমাথা ঘন নিবিড কালো চুল, চিবুকৰ গঠনে শ্লাভােনিক
আন্তরিকতা। ভাবি এ কি রাশিয়ান তরুণী ?
মন প্রশ্ন করে নাম কি জিজ্ঞাসা
করলুম জার্মানে:
উত্তর আসে
ভাঙ্গা জার্মান
ভাঙ্গা রাশিয়ানে, বােঝাই
বােঝাই যায় না। তার গলায় রাখা
মুসাফির

একশ সাইত্রিশ
টকটকে এক মাফলার, বুকের মাঝখানে চেরী ফুলের
যুবক। সে একেবারে
সে একেবারে তৈরী হয়ে বেরুচ্ছে কাজে বােধ
হয়। পরিচযের ঘনিষ্ঠতা কি আর এত শীঘ্র হয়? মুখ
ফুটে তাকে বলতেই পারি না—ওগাে, তুমি কে?
চায়ের পরে এসে আবার দেখা।
সেইখানে জানলুম, তার নাম সােনিয়া আর্জেয়িনা।
সকলে ‘সােনিয়া', আর অতি অন্তরঙ্গ যাব। তারা সােনি' বলে
ডাকে। জাতে রাশিয়ান, বাড়ী মক্কাউ শহরের কাছাকাছি
এক পল্লীতে। তার ভাই পড়ে গ্লাসগাে-তে, আর সে
করে লণ্ডনের এক কষ ইঞ্জিনীয়ারের অফিসে ড্রাফটসমানের
চোখের চাউনি আর হাতের পেলবতা দেখলে
শিল্পী মনের আভাস পাওয়া যায়। হাতের আঙ্গুলগুলি সুপুষ্ট,
নখের গড়ন সূচ্যগ্র। কথায় কথায় সে হাতের আঙ্গুল ঘুরিয়ে
অজ্ঞাত ভাষায় ব্যক্ত ভাবটা বেশ সুগৃহিনীর মত বায়ু,
মণ্ডলে একে একে বুঝিয়ে দেয়। মুখে হাসিটী লেগেই
আছে,যেন ঝরণার অবিশ্রান্ত ধারা। চার টেবিলে লক্ষ্য
করলুম সে দুগ্ধহীন ষ্ট টি পান করলে। জানালার বাহিরে

একশ’আটত্রিশ ল্যাণ্ডলেডীর ক্যানারি পাখীরা তাদেরই ভাষায় গান ধরেছে, আর আমাদের দুজনের কাঁটা চামচের টুং-টাং শব্দ। এ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই- সমস্ত বাড়ীট। সকাল সাড়ে আটটাতেও ঘুমে আচ্ছন্ন। বুলাও ঘুমুচ্ছে দোতালায় ভাষার বিভ্রাট আমাদের এই দুটা প্রাণীর মাঝখানে পর্বতের আড়াল তুলে দিয়েছে। তাকে ইংরেজীতে জিগ্যেস করি, ‘নাম কি তােমার ? সে হাসে, আর বলে—ইয়া ! তার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলি, ‘এটাকে কি বলে? সে হেসে কুট-কুটী। নিজের বুকে হাত ‘ও—আমি। সােনিয়া—সসানি- অড্রেয়িভনা। জার্মান কিছু বুঝি তাই সােনিয়ার আহলাদ ভাব আমাকে মাতিয়ে তােলে মনে করিয়ে দেয় একটা সুন্দর পরিষ্কার পল্লী। বেড়-দেওয়া একটি ছােট বাংলাের মত বাড়ী। সেইখানে তার বুড়ো বাবা মােটা ওভারকোট পরে পাড়াপড়শীদের সঙ্গে বলে মুসাফির

একশ’উনচল্লিশ
চাষবাসের সম্বন্ধে কথা কইছে, তার মা তার ছােট
বনের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিয়েছে, মেয়েদের স্কুলে যাবার প্রয়ােজন
আছে কি না! তার হােট বােনের বয়েস আঠারে, তার
ছবিখানি সে আমায় দেখিয়েছিল, ঠিক তারই মত দেখতে,
তবে আরও সুন্দর। রাতের অন্ধকারে বুঝতে পারিনি,
কাছে
আসায় দেখলুম যে সােনিযা যে-কোন
শিল্পীর শ্রেষ্ঠ ‘মডেল হতে পারে। কিন্তু বিপুল
কেশরাশ সেই মুখটাকে পাতার মধ্যে
ফুলের মত
ঘিরে আছে।
মধ্যে অনেক
ভাঙ্গা জাৰ্মাণ ও আকারে ইঙ্গিতে
একটু একটু করে আমাদের
হলাে, অবিশ্যি প্রথম পরিচয়ে যতদূর হওয়া সম্ভব।
সােনিয়া এবার হাত-ঘড়ির দিকে চেয়েই উঠে দাড়ালো,
বললে, 'আউফ ভিডারসেহেন (আবার দেখা হবে। আমিও
বৈকলুম কাজের খোঁজে
৩
রায়

একশ’চল্লিশ
নানা যায়গায় ঘুরে এই প্রকাণ্ড
ন সহরটা একরকম তােলপাড় করেই ফেলেছি,
কোথাও একটা চুকরী পাবার চেষ্টায়। শেষে অপ্রত্যা-
শিতভাবে একটা কাজও গেল জুটে। মাহিনে আড়াই পাউণ্ড
সপ্তাহে। দেশে থাকতে ‘ছবির সম্বন্ধে অনেক গবেষণা,
আলােচনা, তর্ক বিতর্ক করা গিছল , আর আজ হাতে-
মুসাফির

একশ’একচল্লিশ
নাতে কাজ করবার সুযোগ পেয়ে বিশেষতঃ এই ঠেক
খাওয়া অবস্থায় নিজেকে ধন্য মনে করলুম। ছবির
বৈজ্ঞানিক অংশ জানবার মাল-মশলা জোগাডের জন্যে
Foyles ওখান থেকে কতকগুলো বই কিনে
বাসায় ফিরলাম।
এর
দিন দুই পবে আবার টি-পার্টিতে
সােনিয়ার সঙ্গে দেখা। হাতে দেখি ইংরাজী-জাৰ্মান্
কথাবার্তাব একখানি বই। ভারী আনন্দ হােল সােনিয়া
তাহলে আমার সঙ্গে ভাব করতে চায় ? সত্যি, আজ তার
কথাবার্তায় আন্তরিকতা যেন বেড়েছে ••ভাবও অনেকটা
পরিষ্কার। যেখানে ভাষার দূবত্ব, সেখানে অঙ্গভঙ্গী সে অংশটুকু
বুঝিয়ে দেয়। আমি আজ তাকে আরও নিকটে
দেখলুম ও পেলুম। তার পায়ে আজ মােজা নেই-তার
পাযের গঠন দেখলে মনে হয় যেন পাথর কেটে কোন শিল্পী
তা গড়েছে—সুঠাম সুন্দর ও নিখুত। একটা মৃদু গন্ধের
আমেজ আসছে তার দেহ হতে, যেন সুদূরের স্বপ্ন দুপুরের
ঘুমের সঙ্গে ধীরে ধীরে মনের মাঝে উকি দিচ্ছে। আজ সে

একশ’বোলিশ
অনেক ফুল এনেছে টেবিলে—ক্রাইসেনথিমম যুবক, তার
বুকের মতই সুন্দর।
অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর তাকে
জিগ্যেস করলুম, ছবি দেখতে ভাল লাগে সােনিয়া ?”
সােনিয়ার প্রাণমাতানাে হাসি, সেই হাসির প্রবল বন্যায় সব
ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সােনিয়া জার্মান-ইংরাজী মিশিয়ে
জানালে যে ‘পিকচা” তার ভাল লাগেনা, সে গাঁযের মেয়ে,
খােলা যায়গায় সে মানুষ হয়েছে বন-হরিণীর মত।
বায়ােস্কোপের বদ্ধ বাড়ীতে তার নিশ্বাস আসে বন্ধ হয়ে।
মাঠে ঘাটে গান গেয়ে:এ্যাক্টডিয়াে (হাত-হাম্মোনিযম )
বাজিয়ে বেড়াতে তার ভাল লাগে :
বললুম, সােনিয়া, চল
চল আজ
বিকেলে আমরা ‘
মাল আর্চ রিগ্যালে যাই। সেখানে
তােমার দেশেরই একখানি ছবির ট্রেড-শাে হবে। বুঝলে।
সে ছবি বােধ হয় সাধারণে দেখাতে দেবেনা। আমি অফিস
থেকে admit আবাে যাবে ?
মুসাফির

একশতেতাল্লিশ
আমার এই সাদর সম্ভাষণে
সােনিয়া একটু বিহ্বল হয়ে পড়ল। তার স্বভাবসিদ্ধ আঙ্গুল
নাড়ার ভঙ্গী করে সে জানালে-“দ্যাঙ্কে শুইন ( মাপ
কর, বন্ধু)। বললুম শােনন, শােনন, আমাদের দেশে অনুরােধে
লােকে অনেক কিছু করে থাকে। আর ছবি দেখার আনন্দ
—অর্থাৎ দুজনে—তােমার ভাল লাগবে?
ছুটি পাই। বন্ধু,
• দেখি যদি
তােমার নামটা কি তাতে আমায় বললে না ?
হেসে ফেললে।
বলে সােনি
‘আমার নাম ? যদি না বলি ?
সােনিয়া অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাে।
তার চোখে ভীকতার ভাব ফুটে উঠলে তাকে আরও
সুন্দর দেখায়। হয়ত তার বয়েস বাইশ কি তেইশ, কিন্তু
সে মনে মনে এখনও খুব ঘােট। যেন সুন্দর লতায়
মুকুল বিকশিত হয়ে উঠেছে, সন্ধ্যায় দক্ষিণ বাতাসে সেই
নব মুকুল একেবারে পুষ্পিত হয়ে উঠবে। এর খ
বসন্তের মৃদু জাগরণ, কিন্তু এর চঞ্চলত।

একশ'চুয়াল্লিশ
আব আনন্দ একে যেন শীঘ্রই জাগিয়ে তুলবে। সােনিয়ার
ঠোটে মাখা আছে শ্লাভজাতের সহজ সরলতা, তাতে
একটুও ছলনা নেই। এবা যাকে ভালবাসে, তাকে দেহে-
মনে আত্মসমর্পণ করে-বাঙ্গালী বধূর মত নয়, সমান
ধৰ্ম্মা বন্ধুর মত। সােনির সঙ্গে কথা কইতে কইতে
তাকে ষ্টাডি' করে যাচ্ছিলুম ছবির মত। একে পিকচার
গ্যালারীতে সাজিয়ে রাখলেও
অনেক আর্টিই
হয়তাে এর আলাে-ছায়ার বিকাশ ধরতে পারতো না।
যেন মূর্তিমতী প্রহেলিকা, উত্তবের সুদূর দেশ থেকে ভেসে
এসেছে একটা প্রশ্নের মত ।
চলত।
সােনি রাজী হলো।
জানতে চেয়েছিলে সােনি ? নাম ‘জয় ইংরিজিতে আনন্দ
আর আমার ভাষায় বােঝায় জেতা অর্থাৎ উভয়তঃ
জেতার আনন্দ। তারচেয়ে আমাকে বন্ধু বলেই ডেকো।
আজ হতে আমি তােমার বন্ধু।
সােনিয়া একট, হেসে চলে গেল
নিজের ঘরে।
মুসাফির

একশপঁয়তাল্লিশ
বিকেলে সােফায় পড়ে একখানা
বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি অন্যমনে, এমন সময় দরজায়
আস্তে ঠক্ ঠক্ কোরে শব্দ হল। খুলে দেখি সােনিয়া।
সােনিয়া যখন চলা-ফেরা করে, তখন একটা অন্তচেতনার
মণ্ডল নিয়ে চলে, সেকালের ইয়ােরােপের সন্ন্যাসিনীদের
মত। এই মণ্ডলে একবার এসে পডলৈ মুগ্ধ না হয়ে
থাকা যায় না। ঘরে ঢুকেই সােনিয়া জিজ্ঞাসা করলে
‘ফেরটিক' (তৈরি ত)।
কিছুক্ষণ পরেই রাস্তায়।
সােনি আজ থেকে আমার বান্ধবী। সে আমার
পাশেই চলেছে—আজ এইটকুই আমার কাছে মস্ত বড় সত্য।
তার বুকের চেরী-ফল মধুর হয়ে উঠেছে, তার টানা চোখে
আছে মদের
নেশা, তার নিবিড় কেশ আমার অঙ্গ
স্পর্শ করছে, তার দীর্ঘ অঙ্গুলি যেন অদ্ভুত বাকশক্তি
পেযেছিল••••আমরা পরস্পরের কথা আজ বেশ বুঝতে
পারছি। সত্যিকারের পরিচয় ভাষার নিগড় মানে না-এক

একশছেচল্লিশ
জলধারা আর এক জলধারার সঙ্গে মেশবার সময় এক
মুহূর্তও ভেবে দেখে না-কোনটা কালাে আর কোনটা ভাল।
দুজনে চলেছি: কথা নেই, বার্তা
নেই, উপাযও নেই। সে মেয়ে আর আমি ছেলে ।
রূপকথার রাজপুরীর গল্প মনে পড়ে যায় পাশে নদী
যায় ব'য়ে, তার ধার দিয়ে সােজা ঘন বনের মধ্যে
দিয়ে রাস্তা গেছে চলে। সন্ধ্যে হয়ে গেলেও, བ།
আছে আলাে পথ দেখাবার, না দেখা যায় কোন মানুষ।
প্রথমটা বড় ভয় লাগে, সােনিয়া আমার বাঁ হাতখানা
জডিযে চেপে ধরেছিল। কিসের জন্য, ভয়ে না ভাবে ?
মনে পড়ে, অদূরেই নদীর অপর পার থেকে একটু গেলেই
তত বৈদ্যুতিক রেলের ঘড়ঘড়ানি, মাথার ওপর এরােপ্লেনের
রাগের গোঙানি, মােটরের হুটারের শব্দ, আর একটা বিপুল
জনস্রোতের আওয়াজ শােনা যাবে সে আর এক ভাব।
নদীর এপারে স্বপ্নপুরী আর ওপারে প'ডে যন্ত্রপুরী ! মাঝে
আছে সে অনন্তকাল ধরে নিজের কলকণ্ঠের
কলকরে কল্লোলে
নিজেকে মাতিয়ে, ভাসিয়ে, সাগরের অসীমের মধ্যে মিলিয়ে
মুসাফির

6
একশ’সাতচঙ্গিশ
নিয়ে চলেছে-তাকে যন্ত্রও বাঁধে নি, স্বপ্নের মােহেও সে পডে
নি। একলা চলার অসহ্য সুখে সে দিনরাত ছট্‌ফট্‌ কোরে চঞ্চল
ঢেউযের সাথে চির-মিতালি পাতিয়েছে। স্বপ্নপুরীতে এসে
সে রাতে ভারতকে যেন ফিরে পেলুম।- ভাঙ্গা জাৰ্ম্মানে
সােনিয়াকে বললুম ‘দেশের কথা মনে পড়ছে সােনিয়া?
তােমরা যন্ত্রপুরীর ভাবে, ঘােরে, ডুবে থাক। তােমাদের রক্তের
চঞ্চলতায় তারই আভাষ সর্বদা প্রকাশ পায় আমরা স্বপ্ন
পুরীর অলসতা, জডতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকি কি মনে হয়
জানাে সােনিয়া? তুমি যে এই তরণী বেয়ে চলে যাচ্ছ আর
এই স্বপ্নপুরীর মাঝে, একা আমি বিদেশী, যেন চেয়ে আছি
জীর্ণ ভাঙ্গা পুরাতনের এক স্মৃতিতীর্থের দিকে। নদীর কলকণ্ঠের
সরে যেখানে মাঝে মাঝে বেসুরো তান বেজে উঠছে মন
আমার বলে ওঠে-
“হঁগাে, এ কাদের দেশে
বিদেশে নামিনু এসে”
( হেথায়) নামিছে নীরব ছায়া ঘন বন শয়নে
এদেশ লেগেছে ভাল নয়নে।
রায়

একশ'আটচল্লিশ
সােনিয়া আমার কোলে মাথা
রেখে ঘাসের ওপর শুয়ে নীল আকাশের জ্যোৎস্নার খেলা
দেখছিল সাদা মেঘের সাথে। দূরে কিসের একটা ঘণ্টার
আওয়াজ শুনে মনে মনে দেশের সন্ধ্যারতির কাসর ঘন্টার
কথা ভাবছি
হঠাৎ সােনিয়া তার বাহুদুটো
দিয়ে লতার মত আমার গলাটা জড়িয়ে মুখখানী আমার
মুখের কাছে এনে, অতি সন্তর্পণে তার সিদুরে ঠোঁট দুটো
আস্তে আস্তে আমার ঠোট দুটোর ওপর চেপে ধরলে তার
যৌবনেট বৃদ্বয় আমার বুক স্পর্শ করে নাচছিল
mapper
অস্ফুটস্বরে শুধু বেরিয়ে এল
‘সাে-ইয়া!"সমস্ত শরীরটা পরক্ষণেই যেন টুকরাে টুকরাে
হয়ে ভেঙ্গে পড়লাে• 'আমি অব সােনিয়া: 'এ জগৎ থেকে
যেন লুপ্ত হয়ে গেছি
রাত বারোটার একটা বিকট হুইল্প,
বেজে উঠলো•• ধড়মডিয়ে দুজনে উঠে পড়লুম। সােনিয়ার
মুসাফির

একাউনপঞ্চাশ
চুলগুলাে এলােমেলাে, বসন বিশু, দুষ্টমীর হাসি হেসে
আমার ফ্যাকাশে মুখের দিকে চেয়ে। মানে হারিয়েছি
তো, কেমন ?
কচি মেযের মত লাফিয়ে উঠে
আমাকে জড়িয়ে ধরে একরকম বয়ে নিয়েই সে চললাে। ভাঙ্গা
জার্মানে বললো হেসে এই বিদেশী, রাগ করলে না তাে?
তােমায় ভারী ভাল লাগে, মনে হয় পিশে ফেলে দিই।
০
হেসে বলি ‘সর্বনাশি। বলল কি?
সমস্ত দেহ বেযে তার খুসী যেন
উপছে পড়ছিল।
র

একশ’পঞ্চাশ বুলা ও আমার মধ্যে ছাত্র- ছাড়িটা ক্রমে বেড়েই চললাে— দিনে বেরিয়ে যেতুম ষ্টুডিয়াের কাজে আর সন্ধ্যার সঙ্গিনী সনিয়া • একমাত্র রাতে খাবার টেবিলে যা দেখা হওয়ার সম্ভাবনা, সেটাও ঠিক তখন ভেবে দেখিনি, পরে বুঝেছিলুম, বুলাই এমন সময়ে অসময়ে খেয়ে নেবার ব্যবস্থা করেছিল যে আমার সাথে একরকম তার মুসাফির

একশ'একান্ন
দেখাই হােত না। এক সপ্তাহও কাল না, হঠাৎ একদিন
সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে এসে শুনলাম Landlady’র কাছে—বুলা
সেদিন থেকে বিদায় নিয়েছে, বাসা নিযেছে যেখানে তার
ঠিকানা দিয়ে যায় নি। আমি বিশেষ আগ্রহও দেখালুম না।
সােজা পােক ছাড়তে ওপরে ঘরে চলে গেলুম, ঢুকেই
অবাক হলুম সুটকেশটা খােলা দেখে। যা ভেবেছিলুম ঠিক
তাই অলকার চিঠিগুলি সব বুলা সরিয়ে নিয়ে গেছে। কেবল
তার একটা ছােট ফটো, সেটাকে বেখে গেছে ওপরের দিকে
সামনেই। মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল, বুলার এই অভদ্র
ব্যবহারে। ভাবতে চেষ্টা করলুম এর ভেতর অলকার বাড়ীর
হাত আছে কি না থাকাই সম্ভব। কিন্তু সে ভেবে আর
লাভও নেই ভাববার সময়ও নেই আমার দেরী দেখে
সােনিয়া অসহিষ্ণু হয়ে উঠে ঘরে এসে ঢুকুলাে : “কি জয়।
করাডের বাড়ীর দূরত্বটার ধারণা আছে কি? আমাদের জন্য
বেচারীকে না খাইয়ে বসিয়ে রাখাটা ভাল দেখাবে না’
.
‘চল, সােনি, আমি প্রস্তুত’••••
স্বরটায় সােনিয়া উঠলে চমকে। জিজ্ঞাসুনেত্রে আমার

একবাহা
দিকে চাইল নিজেকে আমি সামলে নিলুম। উঠে গিয়ে
সুটকেসটা বন্ধ কোরে বললুম কিছু না, চল। কতকগুলো চিঠি
কে যেন সরিয়েছে।
কি রকম? এমন তাে কখনও
শুনিনি? ব্যাপারটা ঘুরিয়ে নেবার জন্য বললাম “যা
সােনি, ও ভেবে লাভ নেই। চল, আজকের এমন রাতটা
আর মাটী করা হবে না। জানতাে কালই আমায় বার্লিন
ছুটতে হবে অফিসের কাজে। দেখা হবে না মাসখানেক।
‘বল কি জয়! একমাস আগে
বলনি কেন? এমন জানলে ছােঃ, কাডের বাড়ীতে আজ
সময় নষ্ট করতে কে যেত ?সত্যি, বলছি, তুমি’ ‘সােনিয়ার
গলার স্বর ভারী হয়ে এল। একি এরাও কাঁদতে পারে'।
তাও একটা কালাে বিদেশীর জন্যে।
বিছানাটার কোনটায় সােনিয়া
বসে পড়লাে--বললে জয়, তুমি আসার আগে পর্যন্ত
আমার জীবন কি ছিল, তা তুমি ধারণা কোরতে পারবেনা।
তুমি এখন জানাে যে তােমায় আমার অদেয় কিছু নেই।
মুসাফির

একাভিলাম
তবে আমি আর ‘We liveas we dream - alone এ
ভাবে জীবন কাটাতে পারবাে না। আমি কি মনে ভেবেছি
জান জয়। তােমাকে ভিয়েনায় নিয়ে যাব আমার বাবার
কাছে। তােমার ফিমের কাজের সুবিধা হবে। আমাকেও
তাহলে তােমার সঙ্গ ছাড়া হতে হয় না।
গম্ভীর হবার ইচ্ছা থাকলেও পারা
গেল না। একটা হাসির ঠাট বজায় বেখে বললাম ‘বেশ
সােনা, তুমি যে দেখছি, তােমার পথ একেবারে ছকে ফেলেছ।
এ ভবঘুরেকে বাঁধাধরা পথ ছকে ফেলে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার
মত দুঃসাহসের তােমার প্রশংসা কোরতে হয়। কিন্তু আর
ততা এভাবে ঘরে বন্ধ হয়ে থাকা যায় না, চল বেরিয়ে পডি-
যেখানে থােক।
সােনিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে বললে যাও
তােমার যেখানে খুসী। আমি রইলুম এখানে।' বলেই পা
দুটী সে এমন ভাবে ছুড়লে যে জুতােজোড়া খুলে গিয়ে
একটা ঠেকল জানালার ওপরে আর একটা লাগল ইলেকট্রিক
বালবে। আজও সে মােজা পরে নি। ধবধবে সাদা
সুন্দর পা দুখানি তার খাটের ধারে বুলছিল। চমৎকার।

একশ চুয়ান্ন আমি আস্তে আস্তে বিছানার ধারে এসে দাডালুম। সােনাকৈনা তার জ্যান্ত শরীরটাকে দৃষ্টির ভেতর দিয়ে উপভােগ করছি। আমাকে জয় করতে দেবার জন্যেই আমি প্রস্তুত হয়ে ছিলাম। ছেলেমানুষের মত তােক কোরে লাফিয়ে শার্টের কলারটা ধরে সে আমায় বিছানায় টেনে নিলে এইবাব। আর কোথা যাও।''আমি মােটেই বাধা দিলুম না সােনিয়া আমার মুখখানিকে দুহাতে চেপে ধরে 'চুম্বনে ভরিয়ে ফেললো আমার পা’থেকে মােজা দুটো হঠাৎ সে দিলে খুলে। তারপর পায়ে পা জড়িযে • এক হাতের ওপর আমার মাথাটা রেখে, অপর হাত দিয়ে আমার চুলগুলি নিয়ে খেলা করতে লাগল। সােনিয়া আর কিছুই চায় না, বলে 'জয়, তােমাকে নিয়ে এই রকম খেলা কোরতে ভারী মজা। নিঃশব্দে কেটে যায় অনেকক্ষণ- লণ্ডনের Twilight ফুরিয়ে আসছিল তার আলাে তখন নিবে যাচ্ছে প্রায়। অন্ধকারটা হঠাৎ মুসাফির

একশ'পঞ্চান্ন
কেমনতর এসে পড়ে এই সময়। আমাদেরও চমক ভেঙ্গে
গেছে। মনে পড়ে গেল হঠাৎ, সােনিয়ার জুতো ইলেকট্রিকের
আলেটী দিযেছে শেষ কোরে। আধ'অন্ধকার সম্পূর্ণ উপভােগ
কবে নেওয়া গেছে, এখন ঘন আঁধারের মধ্যে মুখােমুখি হয়ে
বেশীক্ষণ থেকে সমস্ত জিনিষটার মাধুৰ্য্য নষ্ট করার ইচ্ছা নেই।
তার ঠোট থেকে ঠোঁট দুটো তুলে নিয়ে চুপি-চুপি বললুম
‘সােনি, চলল, ডিনার বােধ হয় রেডি। খাওয়া শেষ কোরে
একটু খােলা হাওয়ায় বেড়ান যাবে, কেমন?
कस

একশ'ছাপা
লণ্ডন ছেডেচি মাত্র দিন তিনেক।
খুব অল্প সময় বটে, মনে হয় কিন্তু বহুকাল হােল।
কাজের তাড়ায় জার্মাণিতে এসে পড়েছিলুম। আড্ডা
এখন ফ্রিডি সাসের এক আফিসে। মনটা যখন হাপিয়ে
ওঠে কাজের চাপে, তখন একটু স্বস্তির নিশ্বাস পেলেই
মনে জেগে ওঠে যত রাজ্যের পুরােনা কথা। ফরাসী
মুসাফির

একসাম
দেশের কোন বিখ্যাত গন্ধের মৃদু আমেজের মত আমার
মনে তখন পূর্বের স্মৃতি-গন্ধ নিবিড হয়ে ওঠে। আমি
ভাবি সেই সহজ সুন্দর কষ মেয়েটার কথা।আমার
‘সােনয়া’!—আজ আমায় এই নামের মােহ পেয়ে বসেছে।
হােটেলের নিভৃত ঘরে বসে এই বিদেশিনীর কথা ভাবি-
আমার মধ্যে সে তাকে মিলিয়ে নিতে চায়-কাল’য় সদায়
কি কখনও মেলে? সােনিয়া যেন সােনা, তাতে কলাই
করার বিপদ আছে—চটা উঠে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা
সম্পূর্ণ। আচ্ছা এখনও কেন সােনিয়ার কোন খবর নেই ?
সে তাে নিজে থেকেই কত কী বলেছিল! আসবার সময়..
কত অভিনয়ই করেছিল। আর আজও এক লাইন লিখতে
পারল না ? জগতটা দেখছি নিতান্তই বন্ধুহীন!
অলকার কথা মনে পড়ে এই
সময়, বেশ বেশী কোরেই—তার মায়াময় চাউনির জালে
জড়িযেছি কয়েক বছর থেকে যখন সে ছিল পােষ্ট
গ্রাজুয়েটের ছাত্রী। দৃঢ় ওষ্ঠতলে যে আত্মনির্ভরতার অদম্য
তেজ ছিল তা আমার কাছে হার মেনেছিল, আমিও

একশ'আটান্ন
হেরেছিলুম। এখন ভাবি, সে কি আমায় সকল দিক দিয়ে
ঠকিয়ে গেল। তার হাতে লেখা কবিতা, তার মনের
হাসি-কান্নার ঢেউ যে কাগজে লিপিবদ্ধ ছিল, তারই বােঝ
ৰ'য়ে বেড়িয়েছি ও তাতেই ছিলাম খুসী। আজ তার থেকেও
অব্যাহতি। বুলার কৃপায় একরকম সম্পূর্ণভাবে নিঃস্ব হওয়াটা
কেমন লাগে, তা উপলব্ধি করার সুযোেগ পাওয়া গেছে।
বু সেই
খুব একচোট ফঁকা হাসি হেসে
নেও গেল মনে মনে। কিসের জন্যে কোথায় কি ভাবে
যে মানুষ ছােটে। আমি হাসি- আরে, আমি না দুর্জয়।
সােনিয়ার কাছে যদিও নিজে শুধু জয' টাই বজায় রেখেছি,
দূরের স্মৃতির ইঙ্গিত আমায় ইসারা কোরে
ডাকে? কেন? ‘
বির হাউসের দিকে বেরিয়ে পড়লুম।
আনমনে চলেছি। কিছুরই টান নেই বাধাও তত নেই
কিছুর। পার্কের ধারে একটা কাফেতে ঢুকে পড়লুম। চারিদিকে
ফুলের জোয়ার আর খুসির ঢেউ বইছে। এ জাতটা প্রাণ
খোলা হাসতে পারে এদের জীবনযাত্রার ধরণেও বেশ
হৃদ্যতা আছে 'অতি কচলানাে তেতো ভাবটার অভাব
মুসাফির

একশ'উনষাট এখানে যথেষ্ট। এক ডাবব বিয়ার নিয়ে বসে পড়লুম না ভেবেই এক চুমুক দিলুম যেন ‘চিরেতার জল খাচ্ছি, হরি হরি! সামনের দিকে চোখ পড়লাে। দেখি একটা বেশ চটপটে জার্মান ছােরা আর একটা তারই সমবয়সী তরুণী আমায লক্ষ্য কোরে কি যেন বলছে। আমি চাইতেই তাদের দিকে, ছােরাটী উঠে এগিয়ে এল আমার সানে-প্ৰশ্ন কবলে হ্যালাে, আপনার দেশ ? ছোকরাটীকে এক ঝলক বেশ কোরে দেখে নিলুম। বয়স সাতাশ -আটাশ, নীল চোখে রাজ্যের দুরুহ প্রশ্ন ও কৌতহল। ছোটীর সর্বাঙ্গে চঞ্চলতা আর অসহিষ্ণুভাব যে কোন সময়েই যে কোন কাজে লাফিয়ে পড়ার শক্তি ও ইচ্ছা এর পুরাে মাত্রায় বর্তমান। “হিন্দুস্থান আসছি। ফিলমের কাজে আছি লণ্ডনে''তবে কবে যে কোথায় থাকি স্থিরতা নেই। আপনি কি করেন। নাম?' তার ভাষা জার্মানেই কথা বললুম- থেকে রায়

একশ’ষাট
ছােরা বললে আমি পাইলট,
(উডিয়ে) নাম মায়ার—আর ইনি (মেয়েটাকে লক্ষ্য করে)
আমার প্রদেশেরই এক পরিচিত মেয়েমিউনিকের ছাত্রী।
বেড়াতে এসেছেন এখানে।
‘জেমা উঠে
এল। আমি
চেয়ারটা দিলুম এগিয়ে। বললুম ‘বসুন, আপনার বন্ধুর সঙ্গে
আলাপ কছি।
মেয়েটী বললাে আমাদের ভাষা
জানেন দেখছি। কতদিন আছেন এখানে?
বললাম মাত্র তিনদিন। আগে
শেখা ছিল।
‘আপনারা ভারী চমৎকার লােক।
আপনাদের কথা আমি পড়েছি। আপনাদের দেশে যেতে
খুব ইচ্ছে হয়। আমার বাড়ী জানেন? Beyreuth এ••
'ওবেরামারগাউয়ের কথা শুনেছেন? টাউবেরের নাম ?
মুসাফির

একশ’একষতি
ক্রাইষ্টের পার্ট প্লে করেছিল, অপূর্ব।
ছােকরাটা তার
কথার ওপর কথা ক’য়ে উঠলো। বলে উঠলাে, ‘হের
(মিষ্টারের বদলে) জয়, আপনার হিন্দুস্থানের মেয়েদের
কেমন দেখতে। আচ্ছা, তারা নাকি ঘরের বাইরে বেরুতে
পারে না। জেলা হেসে ফেলো, বলে তোমার কি
তাতে?
আমি মনের ভেতর ক’সে মেজে
উত্তরগুলো তৈবী বােরে নিচ্ছি। জেলমা বলে উঠলাে
‘অচ্ছা হে জয়, আপনাদের দেশে ‘ফাইং হয়। আর
‘ফ্লাই করার ইচ্ছে হয় না?
এতগুলাে প্রশ্নের ব্যাটারির কাছে
দাড়ানাে শক্ত। ম্যায়ার ও জেলা যেন জীবন্ত
তাদের সঙ্গে অনেক আলাপ হােলো। ম্যারের সঙ্গেই
কথা হয় বেশী। জেম মাঝে মাঝে উৎসাহের সঙ্গে আলাে-
চনায় যােগ দেয় তার চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলছে, তা
ঝলসায় না, ধাধিয়ে দেয়।
বার্লিনের ওপরটা একবার উডে
দেখবার জন্যে মায়ার আমায় নেমন্তন্ন করলে।
রা

একবাষটি
চারদিনের দিন, সােনিয়ার চিঠি
পেলুম-লণ্ডন থেকে। ছােট চিঠিতে অনেক খবর, এক
বেঁটা এসেন্সের মত। সে লিখেছে অশুদ্ধ ইংরাজীতে
“জয়, তােমার ব্যাপার কি? ক দিন
মা তো, তাও তােমায় ছেড়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। তােমার
মুসাফির

একতেষট্টি দরজার কাছে ক্যানারি পাখীটা ডেকে ডেকে সারা হােল। তােমার সেই ভারতীয় বন্ধু একজন হিন্দু তরুণীকে সঙ্গে করে তােমার সন্ধানে এসেছিল। মেয়েটার চোখ দুটী খুব টানা, তার চাউনিতে আকাশের গভীরতা , আর মাথায় কালাে চুল একরাশ। তাকে তুমি চেনো না কি ?-দেখ জয়, আমার চুল রাঙ্গা, আমার চোখ অত টানা নয়, তােমার কি ভাল লাগে না । আমি এমবেসির দৌলতে আসছে সপ্তায় প্যারিসে যাচ্ছি উড়ে। তােমাকে দেখতে চাই ব'লেই ভারটা নিলুম-এসাে নিশ্চয়। বাবার চিঠি পেয়েছি। ভিযেনায় নেমন্তন্ন করেছেন তােমায়। ভুলাে না জয়! প্যারিসে যেন দেখা পাই- তােমার বিদেশিনী 'সােনা ম্যায়ারের সঙ্গে কথা ছিল আজ বার্লিনে উড়ােজাহাজের আড্ডাখানার মাঠ টেম্পলহয়ে এ যাওয়ার। সে সব গুলিয়ে যাবার যােগাড় হল সােনিয়ার চিঠি পেযে। তার চিঠিতে কথিত ঐ যে বান্ধবী, সে যে রায়

একশ’চৌষটি
অলকা, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তার ওপর সােনিয়ার
দেখছি নজর পড়েছে মেয়েরা কি হিংসুক। বেশ হয়েছে।
এতদিন পরে মনটা একটু খুসী হােল—আর এ একা নয়।
কিন্তু বুলার অলকার সঙ্গে হঠাৎ আমার উদ্দেশে আসবার
কারণ কি? ঝগড়া করার মতলব।
জানে ?
, বেরিয়ে পড়া যাক:
টেম্পলহয়েফ-এ গিয়ে দেখি
চারিদিকে ওড়বার ধূম পড়ে গেছে। এরােড্রোমের
রেস্তরার বারাণ্ডার কাছেই জেমা আমাকে সাদর অভ্যর্থনা
করে একটা টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসাল। শুনলাম
মায়ার একখানা ক্লেম’ মেশিনে সবে ওপরে উঠেছে।
Templehof-আশ্চৰ্য্য এই উড়ােজাহাজের আড্ডাখানা।
এখানকার আকাশ সর্বদাই শব্দ-মুখর হয়ে থাকে ইঞ্জিন,
প্রপেলারে তাল, ছন্দ বজায় রেখে নেচে চলার যে গান,
তার সুরের সমঝদার মাত্র এই বিমানবীরেরা। भवर
এরােড়োমিটার ওপর দিয়ে এই যে সুরের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে,
মুসাফির

একশপইঘটি
প্রত্যেক ‘উড়িয়ে’র মনের তারে তা' আঘাত করে কোথাও
বেসুরাে বাজাের যাে-টী নেই। প্রপেলারের ঘূর্ণী আমার
শরীরে এক অপূর্ব উত্তেজনার সৃষ্টি কোরলে এখানে এসে
মরণের সঙ্গে খেলা কোরে বেড়ান’র জাত—এই বৈমানিকদের
জীবনটার অভিনবত্বটুকুর সন্ধান পেলুম। কবে তার আস্বাদ
পাবদা তারই ভাবনায় পড়া গেল ।
সােনালী চুলের গােছা দুলিয়ে
জেলা এবার জিগ্যেস করলে ‘হে জয়, আপনি তা হলে
ফ্লাইং শিখচেন।
দিলুম ‘ভেবে দেখি ।
অবিশ্যি আমার আপত্তি নেই। তবে অন্য কাকর তাে
থাতে পারে।
উত্তর দিলুম
জেমা ঈষৎ হেসে বলে কার ?
আপনি বিবাহিত ? না, প্রেমে পড়েছেন। আর তাতে
আপত্তিই বা কি ?
বললুম এর কোনটাই আমার
মৃত্যুর সঙ্গে খেলা করার সঙ্গী হবার পথের বাধা নয় বাধা

একশহেত
হচ্ছে, বুড়ী মা। আমার কাকার তাে এ কাজ নিলে খুশীই
হকে ভাববেন আমার আসল সময় বেশ ঘনিয়ে এসেছে।
মা যে নূবে না।'
‘আপনার কি আর কেউ
নেই? জেমার চোখ দুটীর ওপর দৃষ্টি রেখে বললুম না,
ছিল একজন সে সরে গেছে।' জেলমা বুঝেও যেন বুঝলে
, চেয়েছিল জিজ্ঞাসুনেত্রে। বললুম তাই, ‘প্রেমের কথা
কইছিলে না। এই আকস্মিক দুর্ঘটনা, আমার জীবনে ঘটেই
তাে আজ তােমাদের কাছ পর্যন্ত ঠেলে এনেছে। জান
জেলা, আমার আর ফেরার পথ নেই। ভাবি কি জান,
রাতের ঘনীভূত অন্ধকারে নর-নারী যদি পরস্পরকে চুম্বন
বিনিময় কোরে দিনের আলােয় বিস্মৃত হতে পারে, তার চেয়ে
কি বিস্ময়ের কিছু আছে। তবে এই সুদূর বিদেশে এসে এ
ধারণার উভয় দিকই দেখছি। সময় হােলে, বলবাে একদিন
সে কথা। প্রেমাস্পদকে ছাড়তে আমায় হয়েছে বটে, তাতে
দুঃখ নেই। কিন্তু এই যে জগতে আমায় বাস করতে হচ্ছে, তার
রােমাঞ্চকর বৈচিত্র্য আর কোনদিন আমার চোখে স্বপ্নের
মায়া-কাজল আঁকতে পারবে না।
।
মুসাফির

একসা
জেলা স্তব্ধ হয়ে আমার কথাগুলাে
শুনছিল। আমি থামতেও হঠাৎ সে কিছু কইতে পারলে না।
শুধু বললে ‘হে, জয়, আপনার কাহিনী একদিন শুতেই
হচ্ছে। কথাগুলো ভারী অদ্ভুত বলেন আপনি। মায়ার
হাসিমুখে এই সময় আমাদের পাশে এসে বসলাে। তার
উজ্জ্বল মুখে বিশ্বভােলা আনন্দ। এত আনন্দ এরা পায়
কোথা থেকে ?
আমরা সবাই মিলে চা খাচ্চি,
ম্যায়ারের দৃষ্টি কিন্তু রয়েছে আকাশের দিকে। অন্য সব
বিমানবিহারীরা এক এক প্লেনে ওঠা-নামা করছে ক্ষিপ্রগতিতে।
চারদিকে কর্মপ্রেরণার সাড়া পড়ে গেছে। রৌদ্রের প্রখরতাও
বেড়ে চলেছে, শীতের আমেজ ও কেটে আসছিল। আমি
ম্যায়ারের হাতে হাত রেখে বললাম, “দেখ, আমি তােমার ছাত্র
হবাে’ আমি ফুাইং শিখবই।
সানন্দে সে আমার পিঠে এক ঘুসি
মেরে বলে, “বহুৎ আচ্ছ। এই ত চাই।

একশ’আটষট্টি
জেলমা এবার একটু অন্য রকম
হাসি হাসলে। পরে বললে ম্যায়ারের তাহলে দুজন ছাত্র
হলাে আজ। দেখা যাক, কার ওপর তার দরদ বেশী।
ম্যায়ার হাে হাে করে হেসে উত্তর
দিলে, “দেখচেন হে মেয়েদের ‘জেলসি’?
এয়ারােস্লোমের এই খোলা মাঠে
প্রাণ খােলা আজ হাসি হাসতে পারলুম অনেক দিন পরে।
মুসাফির

একশ’উনসত্তর সােনিয়ার আহ্বান এড়িয়ে চলা অসম্ভব। সােনি দেখছি সত্যিই মরে, আমায় ভালবেসে ফেলে। প্যারিসে যাবার জন্যে তৈরি হতে লাগলুম- “বঁধুর দিঠি মধুর হয়ে আছে সেই অজানার দেশে” -- প্যারিসে এসে পৌছুলুম যখন তখন বিকেল হয়ে গেছে। একেবারে স্টেশনের হােটেলে লাঞ্চ শেষ করে এয়ারােড্রোমে গিয়ে হাজির হলুম। যেখানেই যাই ভাষার বিট আমায় বিভ্রান্ত করে তােলে। হেস্টার জল চাইতে গিয়ে ‘ভাসে’ কথাটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, তখনও জাৰ্মানীর আমেজ মাথা থেকে কাটেনি। ওয়েটার- পুজবও এক গ্লাস ‘ভিচি ওয়াটার এনে হাজির । কি বিপদ! -“অ' ( eau) কথাটা ভুলেই গিছলুম, নিগ্রহের একশেষ। কোনরকমে ‘আকারৈরিঙ্গিতৈর্গত্যা’ কাজ সেরে চলেছি ফাঁকি মনে হয়, ভাষার পার্থক্য ভগবানেরই কারসাজি , সব দেশের লােকেই যদি এক ভাষায় কথা কইত, মানুষের মধ্যে রেবারিধি ও গণ্ডগােল তাহলে বেড়ে যেত বেজায়। ভাষার ব্যবধান মানুষকে রক্ষা করেছে অনেক বিপদ থেকে। দিয়ে। নক্ষত্রবিদ্ যেমন উচুমুখে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, আমিও এযারােডােমে গিয়ে বিরাট বিমান জগতের দিকে চেয়ে আছি সােনিয়ার প্লেনের প্রত্যাশায়। আজ মনে হচ্ছে, আশায় বেঁচে থাকা কি সুখের। সেটা বােঝা মুসাফির

এক-একাত্তর
যায় তখন, যখন জানি যে আমার জন্যে আর একজন ব্যাকুল
হয়ে ছুটে আসছে দূর-দূরান্তর থেকে। সেই জানার মধ্যে কি
অপূর্ব সুখ, কি অসম্ভব তৃপ্তি! যাকে চাই, তাকে পেলে
যতখানি তৃপ্তি, তা বােধ স্থায়ী হয় না অনেকক্ষণ , কিন্তু পাওয়া
পাওয়ার মধ্যে দিয়ে আশার আনন্দে যতক্ষণ কাটে ততক্ষণই
মধুর।
এয়ারােড্রোমে হঠাৎ একটা নিদারুণ
চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলাে। ফ্রেঞ্চ কর্তারা দেখি সব ছুটোছুটি জুড়ে
দিয়েছে। চারিদিকেই উত্তেজনা। ব্যাপার কি । দেখলুম
সকলেই ছুটে চলেছে ওয়ারলেসের কামরার দিকে।
পরক্ষণেই দু’খানা মােটরে বােকই হ'য়ে অফিসারেরা ছুটে
বেরিয়ে পড়ল সহরের পথে। জিগ্যেস করি একজনকে
‘ব্যাপার কি?' শুনি একখানি লওনের আয়ােহী-শুদ্ধ
মেল-প্লেন যন্ত্রবিভ্রাটে কাছেই পাঁচ ছ মাইল দূরে এক গাঁয়ে
ভেঙ্গে পড়েছে।
আমার মাথার ভেতর রক্ত চন্ মন্
করে উঠল। ভাববার ক্ষমতা প্রায় শেষ হয়েই এসেছিল।
রা

একশ’বাহাত্তর
চারদিকে ফুটে উঠল।
এ কি
আকাশের ধূসর রং
সােনিয়ার প্লেন ?
ওয়ারলেশ, আফিসের ঘরে অসম্ভব
ভিড। সেখানে একজন অফিসাব দরজার কাছে দাড়িয়ে
ভাঙ্গা ইংরাজীতে জানালেন যে একখানি প্লেন প্যাসেঞ্জার ও
মেল নিয়ে লণ্ডন থেকে প্যারিসে আসবার পথে পাঁচ ছ মাইল
দূরে এঞ্জিনের গােলমালে ভেঙ্গে পড়েছে। যেখানে এই
দারুণ বিভীষিকা ঘটেছে সেটা এক ছােট গ্রাম। পাইলট
প্রাণ দিয়েছে প্লেনখানিকে বাঁচাতে গিয়ে। জিগ্যেস করি
সে প্লেনে কোন মেয়ে ছিল কি?—‘সােনিয়া নাম। হা
তিনটী মেয়ে ছিল, দু’জন মৃতকল্প অবস্থায়, নাম এখনও
পাওয়া যায়নি। গায়ের কাছেই একটী ছােট হাসপাতালে
পাঠানাে হয়েছে। ঠিকানা বলেই দিলেন -
তিনখানা ট্যাক্সি বােঝাই হয়ে
আমরা ভয়ঙ্কুল মনে ছুটে চললুম হাসপাতালের দিকে।
কারাে মুখে কোন কথা নেই। একজন ফরাসী বুড়ি প্রায়
মুসাফির

একশতিয়াত্তর
অর্ধ অচেতনভাবে আমাদের গাড়ীতে উঠল, আর দুজন
প্রৌঢ়া মেয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। হাসপাতালের দরজার কাছে
এসে আমাদেব টাক্সি দাড়াল। গায়ের লােকে ভিড়
কোরে আছে খুব, আমার তখনও মাথার ঠিক ছিল না।
রাস্তার ওপর সারি সারি খাট। নাসের নির্বাকভাবে কাজ
করে যাচ্ছে। তিনটী মেযে-আরোহীকে আলাদা ঘরে রাখা
হয়েছে জানলুম, সােনিয়া তাদের মধ্যে একজন।
বিদেশী আমি, ঘরের কাছে এগিয়ে
যেতে বিশেষ আপত্তি হােল না। একজন ডাক্তার আমার
কথাবার্তা শুনে সাদবে একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। হা এই
ঘবেই বােধ হয় সােনি আছেন।
এক মিনিট মশিযে,
একটী হাট ইনজে দেওয়া হচ্ছে, এক মিনিট-- আপনি
তাব কে ৮ নির্বাক হয়ে গেছি তখন আর কেউ তাই প্রশ্ন
করলে না। নাসটা বেরিয়ে এসে বললে, মহিলাটীর নাম
আমরা জানতে পেরেছি তার লাগেজ থেকে সােনিয়া
আিেযভন। এইমাত্র জ্ঞান হযেছল, খুব সামান্য।
তিনি চোখও চেযেছিলেন একটু আগে, অতি কষ্টে একবার
ডেকেছিলেন ‘জোয়া বলে
০
করার

একশ’চুয়াত্তর আর অপেক্ষা কোরতে পারলুম । ছুটে সেই ঘরটার ভেতর চলে এলুম। সামনেই চাদের মত পাণ্ডুর মুখে মরণের কালিমা দ্রুত নেমে আসছে ছায়ার মত। ভেতর থেকে একটা দারুণ টান উঠছে জীবনের শেষ ' বায় বেরিয়ে যাবার প্রবল চেষ্টায়। আমি তার হাতখানি নিয়ে আমার বুকের ওপর রাখলাম, তার মৃত্যু-বিবর্ণ ওষ্ঠযুগলে দীর্ঘ চুম্বন করার প্রচণ্ড ইচ্ছা হােল। তার মুখের ওপর থেকে ভিজে ভিজে চুলগুলি সরিয়ে দিলাম। দু’গাল বেয়ে আমার ঝর ঝর কোরে জল পড়তে লাগল। যে নার্সটা মাথায় আইস- ব্যাগ দিচ্ছে, সেও আর এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলনা, উঠে গেল ভােলা জানলার কাছে, চেয়ে রইল সুদূর মাঠের পানে। আমার সােনিয়া আমার কাছেই এসেছে—কিন্তু তার সেই ঝরণা-ভেঙ্গে-পড়া হাসি কই? তার মুখের বাণী কই ? তার সেই উচ্ছসিত আলাপ কই ? বহু দূরের যাত্রী সে, এখন তাকে অনেক দূর যেতে হবে আমি তার হিম-শীতল কপালে হাত রেখে কতক্ষণ বসেছিলাম জানিনা। সন্ধ্যার মসীজাল সাল্লর ঢুকে এলে চোরের মত মুসাফির

একশ'পঁচাত্তর
ধীরে ধীরে। মাথার কাছে একটা ক্ষীণ ইলেকটিক আলো জ্বলে
উঠল, সে যেন বলতে এলো—“ওগাে শ্রান্ত দূর পথের যাত্রি,
ভয় কি? এই ত এসেছি তােমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে,
এসাে আমার হাত ধরে। পিছনে চেয়ােনা আব, এই দেখ
সামনের রাস্তা -এ পথ চলে গেছে মৃত্যুহীনের রাজ্যে, সেখানে
তােমার জন্যে আছে বাগানভরা ফুল, শাখাভরা পাখী।
নার্স আমায় হাত ধরে বাইরে নিয়ে
যেতে চায়। তার কাছ থেকে মনের মানসীকে আমার শেষ
চুম্বন করার অনুমতি নিই-বরফের মত ঠাণ্ডা ঠোঁটদুটী সােনার,
ভেতরটাকে আমার জ্বালিয়ে দিল। আর চাইতে পারলুম না,
এভাবে মুখখানি ফিরিযেনিলুম সে মুখ কিন্তু আমার চোখের
সামনে পর্দায় কাঁপছিল। সােনা, তােমায় যে এখন অনেক
দূর যেতে হবে, একলা, আতিহীন, বন্ধুীন নির্বান্ধবের দেশে।
নার্স, জানলা খুলে দাও সব। আকাশের নীল আলাে আসতে
দাও, সাঁঝের বাতাস আসতে দাও, তারাগুলাে আমার
‘সােনা’র সুন্দর মুখখানি চিনে রাখুক।
बाब

একশ’ছিয়াত্তর
নার্স আমার কথা রেখেছিল।
সাদা আস্তরণে আকণ্ঠ আবৃত করে সে আমায় বাইরে নিয়ে
এল। সেখানে একখানি চোরে আমি মাতালের মত বসে
পড়লুম। আর আমার বুকের ভেতর থেকে কান্না আসছে না,
চোখ ফেটে জল বেরুচ্চে না, আমি কেবলই ভাবছি,-এ কি।
এর মাঝে কি কোন অজানা শক্তির কারসাজি আছে। আমার
সংযম হার মানলাে আমার বুদ্ধিশক্তি লােপ পেয়েছে,
আমি অঝােরে কেঁদে ফেললুম। নাস বললে,এ কি মসিয়ে
আপনি না পুরুষ মানুষ ?
মুসাফির

একশ’সাতাত্তর
সােনিয়ার ‘আটা-শে’র ভেতর
থেকে পাওয়া গেল দুখানা চিঠি। একখানা তার বুজে বাপকে
লেখা আর একখানা আমার উদ্দেশে অলকার চিঠি।
সােনিয়া তার বাপকে আমার প্রতি ভালবাসার কথা জানিয়ে
লিখেছে যে তার মন এক ভারতীয় হিন্দু চুরি কোরেছে
তিনি যেন ফিরে পাবার চেষ্টা না করেন? ছােট্ট মিনতিরা
চিঠিখানি।

একটাত্তর
অলকার চিরকুটটিও পেলুম –
পণ্ডিতিভাব। আমি যেন বিবাহ করে সুখী হই, আর যেন
ভবঘুরের মত তার পিছনে না ছুটি। তার জীবনের গতি
আলাদা। সে তার অপরিপক্ক মনকে ঠিক বুঝতে পারেনি।
আমায় সে বন্ধুভাবে নিতে পারে, প্রণয়ীভাবে নয়। তারপর
পুরুতের মত খানিকটা লেকচার চিঠিখানা টুকরা টুকরা করে
ছিড়ে পথের ধূলায় লুটিয়ে দিলুম।
সােনিয়ার ভাই লিওনিড গ্লাসগাে
থেকে পরদিন সকালেই এসে পৌছুল। সে যখন ব্যাপার
সব জানলে, তখন পাগলের মত কাঁদতে লাগল। আমরা
দুজনে সােনিয়ার শেষ কাজ সমাপ্ত করে যখন হােটেলে ফিরে
এলুম, তখন বিকেল হয়ে গেছে। লিওনিড বাপকে এত শীঘ্র
খবর দিতে রাজী হলোনা।
বলে, “দেখুন, মিষ্টার জয়, আর
আমার কিছু ভাল লাগছেনা। সােনিয়া ছিল আমার বুকের
রক্ত। দুজন ভাই-বােনে মিলে আমরা বছর দুই ইংলণ্ডে এসেছি।
আমাদের দেখােনা হােত খুবই কম, কিন্তু আমার ছোট
মুসাফির

একশ’উনয়াশি
বােন বলে তাকে কতখানি যে ভালবাসতুম, তা আপনাকে
বােঝাতে পারবে না। আপনি কি ইংলণ্ডে আর
ফিরছেন না?
‘না, লিওনিড, আমি চিরকেলে
ভবঘুরে। মুসাফির মন আমার। হয়ত সােনিয়াই একে বাঁধতে
পারত—তার ভালবাসার বাধনে। আজ সে বাধনের দায়
থেকে আমায় মুক্ত করে সে চলে গেছে। আমার কাজ
হবে এখন এগিয়ে চলা-মােহের ফেরে পডে যে পথের
পথিক না হয়ে ও, সে পথহারা হয়ে নিজেকে হারিয়ে
ফেলল—আজ হতে আমিও সে পথের পথিক।
লিওনিডকে সন্ধ্যায় মেট্রেণে তুলে
দিলুম। তারপর পাড়ি দিলুম এবােপ্লেনের আড়াখানার পথে ।
রেলের চাকা অবিশ্রান্তগর্জনে তখন ছুটে চলেছে, পালমান
কারে আমি একা আরােহী। ধারাবী বৃষ্টির আঘাত
পড়ছে কাচের জানলাগুলার ওপরে। আমি ভাবছি হরিশ
খুড়াের কথা, মিনতির কথা, কাকাবাবুর কথা আর আমার
রায়

একশ'শি বুড়ী মা'র কথা। মায়ারকে কথার ছলে বলেছিলুম, ফ্লাইং শিখবােঐ আমার সােনার পথ ' দুনিয়াশুদ্ধ আজ তমার চোখের কাছে ছায়ার মত ভেসে চলেছে,—আকাশে বজের বিঃৎ-বিকাশ, মনে উঠেছে ঝড়, মাথায় জেগেছে ঘুণী। মণ ভোলাবার ওষুধ আছে সঙ্গেই, সারা পথ সেই ওষুধে মনের যন্ত্রণাকে দাবিয়ে রেখেছি, হিংস্র পশুকে সার্কাস-প্লেয়ার :যমন ব্যাটারিচার্জে দাবিয়ে রাখে। অলকার চিঠির কথা হঠাৎ একবার মনে পড়ায় আনম অট্টহাসি হেসে উঠলাম। মুসাফির মন চমকে ওঠ- এ আবার কি দুঃস্বপ্ন। সবশেষ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Musafir

Author
Not Available
Title
Musafir
File name
Musafir
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2010/05/3
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
192
Library
Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Musafir
DLI number
515069
Barcode
4990010016798.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
iWSahEM3B7v
Download PDF

Musafir