Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Shri Ramakrishna Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মরুন ।
শ্রীশ্রীব্লাম)-
শ্ৰইন্দ্রদয়াল)ভট্টাচার্য প্রণীত।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
বৈশাখ, সন ১৩২৭ সাল।
মূল্য।• চারি আনা মাত্র।
১নং মুখার্জি লেন, বাগবাজার,
কলিকাতা,
উদ্বোধন-কাৰ্যালয় হইতে
ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রকাশিত
এই পুস্তকের সমগ্ৰ আয় সিষ্টার নিবেদিতার
বিদ্যালয়ে অর্পিত হয়।
গৌরাঙ্গ প্রেস,
প্রিন্টার-সুরেশচন্দ্র মজুমদার,
৭১১নং মির্জাপুর ধ্রুটি, কলিকাতা।
• 1/4 14
No text on this page.
ভূমিকা
পাঠকের সম্মুখে
স্বল্পকায় হইলেও বর্তমান গ্রন্থ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের
অলৌকিক জীবনের একখানি ভাবশুদ্ধ বিশদ ছবি
ধারণ করিবে। তাহার অদৃষ্টপূৰ্ব্ব
ঈশ্বরানুরাগ, সাধনা, দর্শন এবং ধর্মমতের মুল কথাগুলি
গ্রন্থকার প্রাঞ্জল ভাষায় এমন সুসন্নিবেশিত করিয়াছেন
যে, তরলমতি বালকেরাও উহা অনায়াসে বুঝিতে
পারিবে। বালকদিগের জন্য এইরূপ পুস্তক লিখিতে
বসিয়া অনেকে ফেনিল ভাষায় কতকগুলি অনাবশ্যকীয়
কথা, ও সত্য হউক মিথ্যা হউক গল্পের অবতারণা
করিয়াই নিজ কর্তব্য শেষ হইল বিবেচনা করেন।
বর্তমান গ্রন্থকার কিন্তু তাহা করেন নাই ; বালকদিগের
জন্য লিখিতে বসিলেও, তিনি যে ঐ অলােকসামান্য
মহাপুরুষের জীবনচরিত লিখিতে বসিয়াছেন, একথা
বিস্মৃত হন নাই। গ্রন্থখানির বর্তমান সংস্করণে অনেক
বিষয় পরিবর্তিত ও সংযােজিত হইয়াছে। আশা করি,
সাধারণ পাঠকের নিকট ইহার অধিকতর সমাদর
হইবে।
শ্ৰীসারদানন্দ।
নিবেদন
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নাম বােধ হয়
সকলেই শুনিয়াছেন, কিন্তু তাহার জীবনের ঘটনাবলী
জানিবার সুযােগ সকলে পান নাই।
যাহা জানেন, তাহা ভ্রমপূর্ণ অথবা অসম্পূর্ণ।
স্বামী সারদানন্দ-প্রণীত ‘লীলাপ্রসঙ্গ’ ও শ্ৰীম-লিখিত
‘কথামৃত পাঠ করিলে ঐ বিষয়ক কথা সকল জানিতে
পারা যায়। কিন্তু যাঁহাদের সে সব বই পড়িবার
আপাততঃ সুযােগ নাই, তাহারা এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা পাঠ
করিলে পরমহংসদেবের জীবনের প্রধান প্রধান ঘটনা-
গুলি জানিয়া রাখিতে পারিবেন।
এই কয়েক পৃষ্ঠা পড়িয়া কাহারো মনে উক্ত মহা-
পুরুষ সম্বন্ধে আরাে বেশী জানিবার ইচ্ছা হইলে
আমাদের পরিশ্রম ও অর্থব্যয় সফল মনে করি।
এই গ্রন্থের আয় শ্ৰীমতী ভগিনী নিবেদিতা-
প্রতিষ্ঠিত বালিকাবিদ্যালয়ের জন্য উৎসর্গীকৃত হইল।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
প্রথম অধ্যায়
কামারপুকুর ও বাল্যজীবন
হুগলী জেলায় কামারপুকুর নামে একখানি গ্রাম
আছে। হাবড়া হইতে ‘বেঙ্গল-নাগপুর রেল লাইনের
বিষ্ণুপুর বা গড়বেতা ষ্টেশনে নামিয়া গরুর গাড়ীতে
কিম্বা পদব্রজে ঐ গ্রামে যাইতে হয়। গ্রামখানি
অতি সুন্দর—চারিদিকে মাঠ, পশ্চিম প্রান্তে একটা
তালপুকুর, উহার পশ্চিমে স্বল্প দূরে ‘ভূতির খাল নামে
একটি সংঙ্কীর্ণ খাল ও তাহার তীরে শবদাহের স্থান
এবং ঐ খালের পশ্চিমে কিছু দূরে মাঠের মধ্যে সুন্দর
আম বাগান। এই আম বাগানে শ্রীরামকৃষ্ণ ছেলবেলা
খেলা করিতেন। গ্রামে বহু জাতীয় লােকের বাস।
পূৰ্বে এই গ্রামে অনেক ধনী লােক ছিলেন, কিন্তু এখন
গ্রামের অবস্থা তত ভাল নহে। তদঞ্চলের লােকের
দেবদ্বিজে বড়ই উক্তি ছিল।
এই গ্রামে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় নামে একজন
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ দরিদ্র ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। তিনি সর্বদা ঈশ্বর- চিন্তায় মগ্ন থাকিতেন। কিন্তু দরিদ্র হইলেও তিনি কখন কাহারও নিকট কিছু চাহিতেন না, ভগবানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া থাকিতেন, আর তঁাহার ক্ষুদ্র সংসার কোনও রূপে চলিয়া যাইত। সামান্য কিছু জমি ছিল এবং একজন ভাগিনেয় কিছু কিছু সাহায্য করিতেন—উহাতেই ক্ৰিয়াকৰ্ম্ম, পূজা দান অতিথি- সেবা সকলই চলিত। অতিথি-সেবায় ক্ষুদিরামের অত্যন্ত অনুরাগ ছিল। তাহার কুটীরের কিছু দূরে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে পুরী যাইবার পথ। এই পথে সাধু-সজ্জন সৰ্ব্বদা যাতায়াত করিতেন এবং কখন কখন গ্রামে প্রবেশ করিয়া ভিক্ষা সংগ্রহ করিতেন অথবা লােকের দ্বারে অতিথিরূপে উপস্থিত হইতেন। ক্ষুদিরামের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করিয়া তাহারা তাহার আন্তরিক যত্নে পরম পরিতােষ লাভ করিতেন। তাঁহাদিগের কাহারও কোন অভাব দেখিলে ক্ষুদিরাম তাহা সাধ্যমত পূরণ করিয়া দিতেন। কেহ কোনও অসুবিধার কথা জানাইলে বহু ক্ষতি স্বীকার করিয়াও তাহা দূর করিয়া দিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। ক্ষুদিরাম উজ্জ্বল গৌরবর্ণ দীর্ঘকায় ছিলেন। তাঁহাকে খুব তেজস্বী ও গম্ভীর দেখাইত। সত্যবাদী, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ তপস্বী ও বাসিদ্ধ বলিয়া গ্রামের লােকে তাহাকে দেবতার মত ভক্তি করিত। তিনি গ্রামের হালদার পুকুরে স্নান করিবার কালে তাহার সহিত কেহ জলে নামিত না। তাহাকে প্রণাম করিয়া পায়ে হাত দিতে লােকে ভয় পাইত, তাহাকে রাস্তা দিয়া যাইতে দেখিলে সম্রমে সকলে দাড়াইয়া উঠিত। এক দিন ক্ষুদিরাম কোন কাৰ্য্যে গ্রামান্তরে যাইতে- ছিলেন, পথে এক গাছ-তলায় বিশ্রাম করিতে গিয়া ঘুমাইয়া পড়িলে শ্রীরামচন্দ্র স্বপ্নে দেখা দিয়া তাহাকে বলিলেন, তিনি নিকটবর্তী ভূমিতে বহু দিন যাবৎ পড়িয়া আছেন—অযত্নে অনাহারে তাহার বড়ই কষ্ট হইতেছে। ক্ষুদিরাম জাগিয়া চারিদিকে অনুসন্ধান করিয়া একটা শালগ্রাম পাইলেন এবং অত্যন্ত আনন্দের সহিত তাহাকে মাথায় তুলিয়া নিজ গৃহে লইয়া গেলেন। তদবধি এই পরিবারে উক্ত শালগ্রাম রঘুবীর’ নামে অভিহিত ও গৃহদেবতারূপে পূজিত হইয়া আসিতেছে। ক্ষুদিরামের পত্নী চন্দ্রমণি দেবী অত্যন্ত , সরল- প্রকৃতি ছিলেন। তাঁহার অত্যধিক সরলতা সময় সময় বােক্ৰামীর মতন দেখাইত। ভঁহার আপন-পর জ্ঞান ছিল না। অপরের সেবা করিতে তিনি এত ভাল- বাসিতেন যে কখন কখন নিজের অন্ন অতিথি বা ক্ষুধার্ত ঐশ্রীরামকৃষ্ণ WrW- প্রতিবাসীকে দিয়া প্রসন্নমনে উপবাসী থাকিতেন। তাঁহার অন্তরে রাগ দ্বেষ বা লােভের গন্ধমাত্র ছিল । আশ্চর্যের বিষয় এই, কেহ যে মিথ্যা বলিতে পারে, ইহা তিনি কিছুতেই বুঝিতে বা বিশ্বাস করিতে পারিতেন না ক্ষুদিরামের রামকুমার ও রামেশ্বর নামে দুই পুত্র ও কাত্যায়নী নামে এক কন্যা জন্মিবার পরে রামকৃষ্ণ জন্ম গ্রহণ করেন। সেদিন সন ১২৪২ সালের ৬ই ফান অথবা ইংরাজী ১৮৩৬ খৃষ্টাব্দের ১৭ই ফেব্রুয়ারী, শুক্লপক্ষ, বুধবার, দ্বিতীয়া তিথি। তঁাহার জন্ম রাত্রি- শেষে ব্রাহ্মমুহূর্তে হইয়াছিল।)পিতা মাতা তাহার নাম রাখিয়াছিলেন ‘গদাধর। পরে তােতাপুরী গােস্বামী সন্ন্যাস-প্রদান কালে রামকৃষ্ণ’ নামে তাঁহাকে অভিহিত করেন। এই নামেই তিনি লােকের নিকট পরিচিত। যিনি বেদান্তমতে ঈশ্বর-সাধনা করিয়া সিদ্ধিলাভ করেন তিনি সংসারের অসার বস্তু সকল ত্যাগ করিয়া সার ও সত্য বস্তু সৰ্ব্বদা দেখিতে পান ও গ্রহণ করেন, ঐজন্য শাস্ত্রে তাঁহাকে পরমহংস বলে, রামকৃষ্ণ ঐরূপ অবস্থা লাভ করিলে, তােতাপুরী গােত্মামী তাহাকে পরমহংস বলিয়া সম্বােধন করিতে থাকেন। এইরূপে তাহার নাম রামকৃষ্ণ পরমহংস হইয়াছিল। ৪
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
বাল্যকালে তিনি অত্যন্ত সুশ্রী ছিলেন ; তাহার সরল
ব্যবহারে ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হইয়া গ্রামের সকলে তাহাকে
বড় ভালবাসিত।
তাহার কণ্ঠস্বর অতি মিষ্ট ও স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ
ছিল। যে গানটী একবার শুনিতেন তাহা রাগিণীশুদ্ধ
মনে রাখিতে পারিতেন। কথকের মুখে পুরাণের গল্প
শুনিয়া তাহা অবিকল ভাবভঙ্গী সহকারে পুনরায় অভিনয়
করিতে পারিতেন। গ্রামে লাহাদের বাড়ীতে পূজা-
পার্বণে যাত্রাগান কথকতা হইতরামকৃষ্ণ বহুদিন
ব্যাপিয়া তাহার পুনরভিনয় করিয়া গ্রামের বালক বৃদ্ধ
স্ত্রী পুরুষ সকলকে আমােদিত করিতেন। তাহার সরল
ব্যবহার, প্রফুল্লভাব ও আমােদপ্রিয়তায় গ্রামের বালকগণ
তাঁহাকে অত্যন্ত ভালবাসিত ও সর্বদা তাঁহার সঙ্গে
সঙ্গে থাকিত। এইরূপে, ক্রমে ক্রমে তিনি গ্রামের
বালকদলের নেতা হইয়া উঠিলেন) গ্রামের পশ্চিম
প্রান্তে যে একটী আম বাগানের কথা উল্লেখ করা
হইয়াছে, তথায় তাহার প্রধান আচ্ছা ছিল। সেখানে
নানা প্রকার নূতন নূতন খেলার উদ্ভাবন করিয়া সঙ্গী-
দিগেকে লইয়া তিনি আনন্দ করতেন। যাত্রা গানের
পালা সকল তাহার কণ্ঠস্থ ছিল। তিনি বালকদল লইয়া
সময় সময় সেইগুলি অভিনয় করিতেন ; কৃষ্ণলীলায়
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
তিনি নিজে কৃষ্ণ অথবা রাধা ও রামলীলায় রাম
সাজিতেন। তাহার অভিনয় এত ঠিক ঠিক হইত যে,
যে দেখিত সে-ই মুগ্ধ হইত। অভিনয় করিতে করিতে
কখন কখন তিনি এত বিভাের হইয়া যাইতেন যে,
তাঁহার বাহ্যজ্ঞান থাকিত না। ইহাতে তাহার সঙ্গী
বালকগণ অত্যন্ত ভয় পাইত ও নিকটবর্তী ‘ভূতির খাল
হইতে জল আনিয়া তাহার চোকে মুখে দিত এবং
গাছের কচি কচি ডাল ভাঙ্গিয়া বাতাস করিত :
| লাহাদের বাটীর আটচালায় একটী গ্রাম্য পাঠশালা
বসিত। রামকৃষ্ণ তথায় পড়িতে যাইতেন। সেখানেও
ছাত্রবন্ধুদিগকে লইয়া তাহার গান অভিনয় চলিত। গুরু
মহাশয় সর্বদা শুনিতেন, গদাধর খুব গান গাহিতে
ও অভিনয় করিতে পারে—তাই, তিনি একদিন একটু
অভিনয় করিয়া দেখাইবার জন্য তাহাকে অনুরােধ
করেন। রামকৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ তাঁহার বন্ধুগণকে একটা
ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করিয়া গান জুড়িয়া দিলেন।
মহাশয় বালকের অদ্ভুত ক্ষমতা দেখিয়া ভাবিলেন, এ
বালক সামান্য নহে!
গদাধরের মুখে পুরাণের গল্প ও ধর্মবিষয়ক গান
শুনিতে গ্রামের স্ত্রী পুরুষ সকলে বড় ভালবাসিত।
তিনিও ঐ সকল আবৃত্তি করিয়া সকলকৈ আনন্দিত
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ করিতে ত্রুটি করিতেন না। গ্রামে এমন অনেক লােক ছিলেন যাঁহারা গদাধরকে না দেখিয়া অধিক ক্ষণ থাকিতে পারিতেন না—একবেলা না দেখিলে খুঁজিতে বাহির হইতেন। গদাধরের উচ্চ-নীচ জ্ঞান ছিল না। নীচ জাতীয়দের বাটীতে যাইয়াও তিনি প্রহলাদু-চরিত্র, ধ্রুব- চরিত্র বা রামায়ণ পাঠ করিয়া তাহাদিগকে শুনাইতেন। ঐরূপে গদাধর কামারপুকুর গ্রামকে চিরউৎসবময় করিয়া তুলিয়াছিলেন। তিনি মূর্তিমান উৎসবস্বরূপ ছিলেন-কিহ কোনও কারণে বিমর্ষ হইয়া তাহার নিকট আসিলে অচিরে তাহার বিষন্নভাব দূর হইয়া যাইত রামকৃষ্ণের সাত বৎসর বয়স কালে ক্ষুদিরাম দেহ, ত্যাগ করিলেন। রামকুমার ও রামেশ্বরের উপর এখন সংসারনির্বাহের ভার পড়িল। ক্ষুদিরামের সংসার ছিল যেন মহাদেবের সংসার—না ছিল সঞ্চয়, না ছিল কোন নির্দিষ্ট আয়। আবার, দানধৰ্ম্মের ত্রুটি ছিল না। পুত্র- গণের প্রকৃতিও পিতার ন্যায় ছিল-সৎকাৰ্য, দেবপূজা, অতিথিসেবা হওয়া চাই, কিন্তু কিরূপে অর্থোপার্জন করিতে হয় সে বিষয়ে আদতে জ্ঞান নাই! ক্ষুদিরামের স্বর্গারােহণের পর নানা কারণে ইহাদের আয় কমিয়া গেল, কিন্তু ব্যয় বাড়িয়া উঠিল। অভাবে পড়িয়া ৭ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ রামকুমার কিছু ঋণ করিয়া ফেলিলেন ঋণ পরিশােধের কোন উপায় নাই দেখিয়া আত্মীয়গণ অর্থোপার্জনের জন্য তাহাকে কলিকাতায় যাইতে পরামর্শ দিলেন তদনুসারে তিনি কলিকাতায় গিয়া ঝামাপুকুর নামক স্থানে একটী টোল স্থাপন করিলেন। রামকৃষ্ণের বয়স তখন চৌদ্দ বৎসর। ইতিপূর্বে নয় বৎসর বয়সে তাহার উপনয়ন হইয়া গিয়াছিল এবং তিনি বাড়ীতে রঘুবীরের সেবা-পূজা করিতেছিলেন। বাড়ীতে থাকিয়া রামকৃষ্ণের পড়াশুনা হইতেছে না দেখিয়া রামকুমার সতর বৎসর বয়স কালে তাহাকে কলিকাতায় লইয়া আসিলেন। তিনি ভাবিলেন এখানে তাহার পড়াশুনাও চলিবে, পূজা পাকশাক প্রভৃতিতেও কতক সাহায্য হইবে। বস্তুতঃ রামকৃষ্ণের দ্বারা তাহার বেশ সাহায্য হইতে লাগিল। কিন্তু পড়াশুনায় তাহার তেমন উৎসাহ দেখা গেল না। শিশুকাল হইতেই ধৰ্ম্ম- বিষয় ব্যতীত অন্য কিছুতে তাহার মন বসিত না। গান, খেলা, আমােদ, সকল বিষয়েই তাহার ঐ ভাব প্রকাশ পাইত তাহার দেহমন যেন ভক্তিতে গঠিত ছিল। এই জন্যই তিনি ভালরূপে লেখাপড়া শিখিতে পারিলেন না। ) ৮ * : খ-শ। ful " রাণী রাসমণিড়ী কলিকাতার জানবাজারে রায় রাজচন্দ্র দাস নামে একজন জমিদার ছিলেন। তঁাহার মৃত্যুর পর তদীয় পত্নী শ্রীমতী রাসমণি এমন দক্ষতার সহিত বিশাল জমিদারীটী পরিচালন করেন যে, লােকে তঁাহার তেজ- স্বিতা ও দয়া প্রভৃতি গুণে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে “রাণী নামে অভিহিত করিত। বস্তুতঃ তাঁহার প্রকৃতি ও চালচলন ঠিক রাণীর মতই ছিল। তাহার শৌর্যবীৰ্য্য পরােপকার দান ও অন্যান্য কীর্তির কাহিনী বঙ্গের সর্বত্র প্রসিদ্ধ আছে। রাসমণি কলিকাতায় তিন মাইল উত্তরে, গঙ্গাতীরে দক্ষিণেশ্বর নামক গ্রামে একখণ্ড ভূমি ক্রয় করিয়া বহু অর্থব্যয়ে একটী প্রকাণ্ড ঠাকুরবাড়ী নির্মাণ করেন। তাহার ইচ্ছা ছিল, শ্রী শ্রীরাধাগােবিন্দ ও ঐশ্ৰকালিকা- মাতার বিগ্রহ স্থাপন করিয়া তথায় শাস্ত্রবিহিত পূজার বন্দোবস্ত করিবেন এবং দেবতার প্রসাদের দ্বারা সাধু ব্রাহ্মণ ও দরিদ্রদিগের সেবা করা চলিবে। এ বিষয়ের
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
যথাশাস্ত্র ব্যবস্থা করিবার জন্য রাণী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদিগকে
আহ্বান করিলেন। পণ্ডিতগণ সমবেত হইয়া রাণীর
উদ্দেশ্য শ্রবণ মাত্র একবাক্যে বলিলেন, রাণী কৈবৰ্ত্ত
বংশীয়া সুতরাং কোনও সাহ্মণই তাহার প্রতিষ্ঠিত
কালীর পূজা করিতে পারেন না এবং শূদ্ৰজাতি
প্রতিষ্ঠিত দেবতাকে অন্নভােগ কখনই দেওয়া যাইতে
পারে না।
ব্যবস্থা শুনিয়া রাণী বড়ই মর্মাহত হইলেন, তাহার
বড় আদরের শ্যামা ও শ্যামের সেবায় বড়ই বিঘ্ন
উপস্থিত ! রাণীর মন পণ্ডিতগণের এ ব্যবস্থায় প্রবােধ
মানিল না। শাস্ত্রে তাহার উদ্দেশ্য সিদ্ধির কোনও
উপায় অবশ্য মিলিবে, এই বিশ্বাসে তিনি নানা স্থানে
পণ্ডিতদিগের নিকট ব্যবস্থা চাহিয়া পাঠাইলেন,
কিন্তু কেহই রাসমণির ইচ্ছামত দেবসেবার সমর্থন
করিলেন না।
ঘটনাক্রমে রামকুমারের কর্ণে এই সংবাদ পৌঁছিল।
রামকুমার অত্যন্ত সরলবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি
ভাবিলেন, পণ্ডিতগণ নিশ্চয়ই ভ্রমে পতিত হইয়া-
ছেন—শাস্ত্র কি এমন ভাবে কাহাকেও দেবসেবায়
বঞ্চিত করিতে পারে ? অবশ্যই ইহার কোনও উপায়
আছে। অনেক চিন্তার পর তিনি ব্যবস্থা লিখিয়া
#
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
পাঠাইলেন,রাণী তাহার গুরুকে কালীবাড়ী দান
করিয়া ফেলিলে, গুরুর নামে প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর-বাটিতে
দেবতার পূজা ও অন্নভােগ দেওয়া যাইতে পারে। এই
ব্যবস্থা পাইয়া রাণী যার পর নাই সুখী হইলেন এবং
রামকুমারকে আশাতিরিক্ত পুরস্কার দিলেন।
রামকুমারের ব্যবস্থা অনুসারে শ্রীশ্রীরাধাগােবিন্দের
ও শ্ৰীশ্ৰীকালীমাতার প্রতিষ্ঠার জন্য একটী দিন নির্ধারিত
হইল। কিন্তু প্রতিষ্ঠা কাৰ্য্য সম্পাদন করিবার উপযুক্ত
লােক পাওয়া গেল না। কাজেই রামকুমারকে তাহা
করিতে হইল। সেদিন স্নানযাত্রা—সন ১২৬২ সালের
১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ইংরাজী ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দের ৩১শে মে। রামকৃষ্ণ
সেই দিন কালীবাড়ীর মহােৎসব দর্শন করিতে গেলেন।
কিন্তু সেখানে অন্নগ্ৰহণ করিলেন না--বাজার হইতে
মুড়িমুড়কি কিনিয়া খাইলেন।p/
উপযুক্ত পূজকের অভাবে রামকুমারকেই মা কালীর
পূজক হইতে হইল।
মন্দির-সংক্রান্ত সকল বিষয়
তত্ত্বাবধানের ভার লইলেন রাণীর জামাতা শ্ৰামান
মথুরামােহন বিশ্বাস। রামকৃষ্ণ কয়েক দিন কলিকাতায়
থাকিয়া কি করিবেন ভাবিতে লাগিলেন।
কৈবর্তের কালীপূজা, কৈবর্তের অনুগ্রহণ তিনি ধর্মসঙ্গত
মনে করিলেন না। রামকুমার অবশেষে তাহাকে নিকটে
a tv ****
কারণ
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
ডাকাইয়া শাস্ত্রের বিধান ও অন্য নানা উপায়ে বুঝাইয়া
দিলেন যে, মা কালীর পূজকের পদ ও প্রসাদ গ্রহণ
করিয়া তিনি কোনও অন্যায় কাজ করেন নাই। তখন
হইতে রামকৃষ্ণ ভ্রাতার সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে বাস করিতে
লাগিলেন।
(রামকৃষ্ণের আকৃতি প্রকৃতি দর্শনে মথুরবাবু তাঁহার
প্রতি আকৃষ্ট হইতে লাগিলেন। তাঁহার অপূর্ব সরলতা-
ব্যঞ্জক মুখখানি যে দেখিত সে-ই মুগ্ধ হইত। শেষ বয়সে
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল প্রভৃতি তাহার এই অদ্ভুত সরলতা
দেখিয়াই মুগ্ধ হইয়াছিলেন এবং তাঁহাকে প্রকৃতির
শিশু’ নামে অভিহিত করিতেন। একদিন মথুরবাবু
দেখিলেন রামকৃষ্ণ নিজের পূজার জন্য একটী শিবমূর্তি
গড়িয়াছেন। মূর্তিটী এত সুন্দর হইয়াছে যে, সচরাচর
এমন সুন্দর মূর্তি দেখিতে পাওয়া যায় না। মথুরবাবু
এই মূর্তিগঠনে বালকের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয়
পাইয়া অত্যন্ত মুগ্ধ হইলেন এবং রাণীকে মূর্তিটী দেখা-
ইয়া বালকের প্রতিভা, তেজোময় কান্তি, ধর্মভাব,
সরলতা প্রভৃতির বিষয় বলিলেন। তদবধি মথুরবাবু,
রামকৃষ্ণকে ঠাকুর-সেবার কোনও কাজে নিযুক্ত করিবার
চেষ্টা করিতে লাগিলেন; কিন্তু রামকৃষ্ণ কিছুতেই সম্মত
হইলেন না। তিনি মথুরবাবুর সম্মুখে যাইতেন না,
ঐশ্রীরামকৃষ্ণ পলাইয়া পলাইয়া থাকিতেন। অবশেষে পরিবারবর্গের অর্থাভাব, ভ্রাতার অনুরোেধ ও মথুরবাবুর আগ্রহ প্রভৃতি ভাবিয়া মা কালীর বেশকারীর কাৰ্য্য গ্রহণ করেন। তাহার ভাগিনেয় হৃদয় এই সময় কাৰ্যের অনুসন্ধানে আসিয়াছিলেন, তিনি রামকৃষ্ণের সহকারী নিযুক্ত হন। { রাধাগােবিন্দের পূজক একদিন শয়ন করাইবার কালে অসাবধানতা বশতঃ ঠাকুরকে হাত হইতে ফেলিয়া দিয়া তাহার একখানি পা ভাঙ্গিয়া ফেলেন। এই বিষয় লইয়া কালী বাড়ীতে মহা গােলমাল আরম্ভ হয়। কেহ বলিতে লাগিল ‘ভগ্নদেবতার পূজা নিষেধ, ইহাকে ফেলিয়া দিয়া অন্য মূর্তি স্থাপন করিতে হইবে। কেহ বা বলিল ‘দেবতা কি ফেলিয়া দেওয়া যায় ? শাস্ত্র- বিধান জানিয়া ঐ বিষয়ে নিজ কর্তব্য নির্ধারণের জন্য রাণী কয়েক জন পণ্ডিত ডাকাইলেন। পণ্ডিতগণ ভগ্ন- দেবতা ফেলিয়া দেওয়ার ব্যবস্থাই করিলেন। সর্বশেষে রামকৃষ্ণের মত জানিতে চাহিলে তিনি ভাবতন্ময় হইয়া বলিলেন যে, “আমাদের কোন আত্মীয়ের পা ভাঙ্গিলে কি আমরা তাহাকে পরিত্যাগ করি অথবা তাহার পা যাহাতে সারিয়া যায়, এইরূপ চিকিৎসা করি। এই বিষয়েও সেইরূপ করা হউক। ঠাকুরের পা ভাঙ্গি য়াছে বলিয়া ফেলিয়া দিব কেন ?” রাণী ও মথুরবাবু এই
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
ব্যবস্থা শুনিয়া খুব আনন্দিত হইলেন। আর, রামকৃষ্ণ
ঠাকুরের পা এমন নিপুণভাবে জুড়িয়া দিলেন যে
তাহা কখন ভাঙ্গিয়াছিল বলিয়া টের পাওয়া গেল না
অসাবধানতা অপরাধে রাধাগােবিন্দের পূজক পদচ্যুত
হইলেন এবং তাহার স্থলে রামকৃষ্ণ নিযুক্ত হইলেন
কিছুদিন পরে, রামকুমার দেহত্যাগ করিলে, রামকৃষ্ণ
মা কালীর পূজা করিতে লাগিলেন। )
১৪
তৃতীয় অধ্যায়
অপূৰ্ব পূজা ও অদ্ভুত
দর্শন
প্রতিষ্ঠা করিবার সময়ে প্রত্যেক দেব-দেবীর একটি
নাম দেওয়া হয়।
রাণী রাসমণি প্রতিষ্ঠিত মা
কালীর নাম শ্রীশ্রীভবতারিণী। রামকৃষ্ণ মা ভবতারিণীর
সেবায় ক্রমেই অত্যন্ত তন্ময় হইয়া যাইতে লাগিলেন।
সকালে ফুল তুলিয়া নিজ হাতে মালা গাঁথিতেন, স্নান
করিয়া পূজায় মনােনিবেশ করিতেন এবং পূজা শেষ
হইলে মাকে গান শুনাইতেন। রামপ্রসাদ, রাজা রামকৃষ্ণ
প্রভৃতি সাধকগণের মাতৃভাবপূর্ণ গান গাহিতে গার্তিতে
তিনি ভাবােন্মত্ত হইয়া যাইতেন, তাহার গণ্ড বাহিয়া
অনবরত অশ্রু ঝরিত। অপরাহে মাকে বাতাস করিতেন
অথবা মার প্রীতির জন্য কোন না কোন কাৰ্য্যে
নিযুক্ত থাকিতেন। রাত্রে ‘শীতল’ দেওয়া হইলে প্রসাদ
পাইয়া শয়ন করিতেন, কিন্তু কাল কিরূপ সেবা করিয়া
মাকে সুখী করিবেন এই চিন্তায় তঁাহার ঘুম আসিত
। এইরূপে দিন রাত্রি মার চিন্তায় কাটিয়া যাইতে
লাগিল।
দিনে দিনে তাহার তন্ময়তা ক্রমে এত বাড়িয়া গেল
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যে, গান করিতে বসিলে আর গান শেষ হয় না, মার চিন্তা করিতে বসিলেই গভীর ধ্যানে মগ্ন হইয়া যান, আরাত্রিক করিতে গিয়া যন্ত্রের মত বহুক্ষণ ধরিয়া আরতি-প্রদীপ চালনা করিতে থাকেন—প্রদীপ নিভিয়া যাইত, বাদকেরা ক্লান্ত হইয়া কাঁসার ঘড়ি রাখিয়া দিত, কিন্তু আরতি ফুরাইত না। পাষাণময়ী মূৰ্ত্তির সেবা এবং কল্পিত রূপের ধ্যান করিতে রামকৃষ্ণের এখন আর ভাল লাগিল না। মাকে সাক্ষাৎ—জীবন্তরূপেপাইবার জন্য তাঁহার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল।পূৰ্ব্বে তিনি লীলাচঞ্চল সদানন্দ ছিলেন, এখন কেমন বিমনা গাম্ভীৰ্য্যময় হইয়া গেলেন। সকলে ভাবিল বয়সের সঙ্গে এমন পরিবর্তন হইয়া থাকে। এখন যে স্থানে পঞ্চবটী আছে সেই স্থানটীর পার্শ্ব- দেশ তখন নীচু ও জঙ্গলপূর্ণ ছিল এবং তাহার ভিতরে একটী আমলকী বৃক্ষ ছিল। রামকৃষ্ণ এই সময় রাত্রে ঐ গাছের তলায় বসিয়া ধ্যান করিতেন। পূজা, ধ্যান ও সেবা করিতে করিতে তাহার ব্যাকুলতা ক্রমে অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল। মনের ভাব আর চাপিয়া রাখিতে পারিলেন না! আহার নিদ্রা ভুলিয়া দিন রাত মা মা বলিয়া ধূলায় লুটাইয়া কঁদিতে লাগিলেন। পুত্রশােকে মাতা যেমন অধীর হন অথবা, মাতৃহীন শিশু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যেমন চারিদিক অন্ধকার দেখে, তিনি তাহা হইতেও অধিকতর অধীর হইয়া উঠিলেন। তাঁহার আর্তনাদ শুনিয়া কেহ অশ্রু সম্বরণ করিতে পারিত না, বােধ হইত যেন সত্যই তাহার বুক পুড়িয়া যাইতেছে। ক্রমে যখন তাহার এমন অবস্থা হইল যে, মাকে না দেখিলে আর এক দণ্ড ও বাচিয়া থাকিতে পারেন না, তখন ত্রিভুবন আলো করিয়া মা দেখা দিলেন। রামকৃষ্ণ দেখিলেন,—জগতের সমুদয় রূপ যেন একত্রিত ও ঘনীভূত হইয়া শ্যামারূপ ধরিয়া আসিয়াছে, তাহার চাহনিতে যেন জগৎটা নড়িতেছে--সেই দৃষ্টি যেন সকল লােকের হৃদয়ের অভ্যন্তর পর্যন্ত স্পর্শ করিতেছে। রামকৃষ্ণ মায়ের এই রূপ দেখিতে দেখিতে আত্মহারা হইয়া গেলেন, দুই তিন দিন আর বাহ্যজ্ঞান রহিল না। আমরা সামান্য রূপবান্ বা গুণবান্ লােককে ভাল- বাসিয়া তাহার বিরহে কত কষ্ট পাই, আর যিনি সকল রূপের ও সকল গুণের আধার তঁাহার বিরহ না জানি কতই কষ্টকর। মা’কে একবার মাত্র দেখিতে পাইয়া রামকৃষ্ণের প্রাণ তাহাতেই মগ্ন হইয়া যাইল, এবং কিছুক্ষন মা’কে, না দেখিলে তিনি যেন আর জীবন ধারণ করিতে পারেন না—এইরূপ হইতে লাগিল। তাহার সে অধীরত। এক আশ্চর্য ব্যাপার।—তিনি গঙ্গাতীরে * - ঐশ্রীরামকৃষ্ণ ; যেখানে সেখানে ধূলায় পড়িয়া ‘মা মা করিয়া গভীর আর্তনাদ করিতেন। লােকে তাহার এই কষ্টের কথা কিছুই বুঝিতে পারিত না ; কেহ ভাবিত তাহার শূল- ব্যথা আছে, কেহ ভাবিত এ পাগল। বিরহ-ব্যথায় কখন কখন তিনি আছড়াইয়া পড়িতেন, কখন বা গঙ্গার তীরে কাদায় পড়িয়া ছটফট করিতেন। মাকে না দেখিতে পাইলেই তাহার ঐরূপ যন্ত্রণা হইত। কিন্তু ঐ যন্ত্রণা যখন অসহ্য হইত তখনই মা দেখা দিয়া তাহাকে নানাপ্রকারে সান্ত্বনা দিতেন। ক্রমে মা ঘন ঘন দেখা দিতে লাগিলেন এবং বুঝাইয়া দিলেন যে, তিনি দূরে চলিয়া যান না, তাহার হৃদয়মধ্যে ও ঠাকুরঘরের মূর্তিতে তিনি জীবন্তরূপে সর্বদা বিরাজ করেন। মা যেমন ছেলেকে লইয়া আনন্দ করেন, মা ভবতারিণী তেমনই রামকৃষ্ণকে লইয়া আনন্দ করিতে লাগিলেন। এক্ষণে তাহার অধীরতা-ব্যাকুলতা দূর হইল বটে কিন্তু তাহার মা ভবতারিণীর প্রতি ভালবাসা আর এক নূতন মাকারে প্রকাশ পাইল। তিনি পাষাণময়ী কালীর সঙ্গে কথা বলেন, হাস্য করেন, তাঁহাকে নৈবেদ্য খাও- যাইতে যান, মার বিছানায় শুইয়া থাকেন। থাকেন। কখন মার নৈবেদ্য কাক বিড়ালকে খাওয়ান, কখন বা নিজেই খাইতে থাকেন; মার পায়ে ফুল না দিয়া নিজের মাথায় ১৮
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
দেন, আবার কখন বা চারিদিকে ছড়াইয়া ফেলেন।
মন্দিরের কর্মচারিগণ এই সকল অত্যন্ত অনাচার মনে
করিলেন। কিন্তু রামকৃষ্ণের ভাবােন্মত্ত তেজোময়
চেহারা দেখিয়া তাহার সঙ্গে কথাবার্তা বলিতে, এমন
কি, তাহার নিকটে যাইতেও সাহস করিলেন না।
তাহারা মথুরবাবুকে জানাইলেন যে, রামকৃষ্ণ বদ্ধ
পাগল হইয়া কালীমন্দিরে যা ইচ্ছে তাই করিতেছেন ;
সত্বর তাহাকে মন্দির হইতে দূর না করিলে দেবতা
ভঁহার অনাচারে রুষ্ট হইবেন।
হৃদয়, মাতুলের অসুখ হইয়াছে মনে করিয়া, প্রথমে
তাঁহার চিকিৎসার বন্দোবস্ত করিলেন। কিছুতেই
কিছু হইল না। তিনি কোনরূপে মার পূজা চালাইয়া
মাতুলের কাজটী বহাল রাখিবার চেষ্টা করিলেন।
কিন্তু, অবশেষে মাতুলের পাগলামি চাপা দিয়া রাখা
অসম্ভব হইয়া উঠিল। মথুর বাবু রামকৃষ্ণের অসুখের
বিষয় জানিতেন, তিনি মনে করিয়াছিলেন উহা সারিয়া
যাইবে। কিন্তু, যখন শুনিলেন রামকৃষ্ণ একেবারে
বদ্ধ পাগল হইয়া গিয়াছেন, তখন তিনি চিন্তিত হইলেন
এবং কালী বাড়ীতে আসিয়া রামকৃষ্ণের কাৰ্যকলাপ
পৰ্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। মথুরের বুঝিতে বিলম্ব
হইল না যে, মা কালী কৃপা করিয়া রামকৃষ্ণের সঙ্গে
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
সত্য সত্যই মায়ের মত ব্যবহার করেন! মথুরের হৃদয়
ভক্তিতে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। তিনি রামকৃষ্ণকে আপন
ইষ্টদেবতার ন্যায় জ্ঞান করিয়া তদনুরূপ ব্যবহার করিতে
লাগিলেন। মন্দিরের কর্মচারিগণ এই উল্টা উৎপত্তি
দেখিয়া অবাক্ হইয়া রহিল।
মথুর বাবু অতি আনন্দের সহিত রাণীকে এই সংবাদ
দিলে, রাণী রামকৃষ্ণের এই অপূৰ্ব্ব ব্যবহার দেখিতে
আসিলেন। মন্দিরের কর্মচারিগণ ভাবিলেন রামকৃষ্ণ
কোন ‘গুণ’ করিয়া মথুরকে ভুলাইয়াছেন, কিন্তু রাণী
আসিয়া তাহাকে নিশ্চয়ই মন্দির হইতে বাহির করিয়া
দিবেন। শুনিয়াছি—যে দিন রাণী আসিবেন শুনা
গেল সেই দিন মন্দিরের কোন কর্মচারী রামকৃষ্ণকে
ভয় দেখাইয়া বলিয়াছিল যে, রাণী আসিয়া তাহাকে
মন্দির হইতে বাহির করিয়া দিবেন। তিনি ইহা
শুনিয়া বড়ই ভীত হইলেন এবং পাঁচ বৎসরের বালকের
ন্যায় পরণের কাপড় বগলে করিয়া মা কালীর আঁচল
ধরিয়া প্রতিমার পেছনে লুকাইয়া রহিলেন। রাণী
আসিলে আরও জড়সড় হইয়া আঁচল প্রাণপণে
আঁটিয়া ধরিলেন এবং ভীত চকিত নয়নে মার আড়াল
হইতে মাঝে মাঝে রাণীর গতিবিধি দেখিতে লাগিলেন।
ভক্তিমতী রাণী এ দৃশ্য দেখিয়া কঁদিতে লাগিলেন।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ তিনি বুঝিতে পারিলেন, মা ভবতারিণীকে সত্য সত্য মা বলিয়া না দেখিলে রামকৃষ্ণ কখন ঐরূপ শিশুর মত আচরণ করিতে পারিতেন না। তাহার এত অর্থব্যয় করিয়া মাকে প্রতিষ্ঠা করা আজ সার্থক হইল ভাবিয়া তিনি নিজকে কৃতার্থ মনে করিলেন। মন্দিরের মূখ কর্মচারিগণ মথুর অপেক্ষা রাণীকে অধিকতর মুগ্ধ হইতে দেখিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া রহিল। এখন হইতে মা ভবতারিণী আর পাষাণের প্রতিমা রহিলেন না, তিনি চিন্ময়ীরূপে রামকৃষ্ণকে ধরা দিয়া আপনার লালারসে তাহাকে ডুবাইয়া রাখিলেন। মন্দিরে প্রচলিত নিয়ম সকল মানিয়া প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে ভবতারিণী দেবীর পূজা ভােগ আরতি ও অন্য সকল সেবার কাৰ্য করা তঁাহার পক্ষে সম্ভবপর নয় দেখিয়া রাণী হৃদয়কে এখন হইতে মা কালীর নিত্য- পূজায় নিযুক্ত করিলেন। ইহার পরে রাণী রাসমণি ও মথুরবাবু যতদিন জীবিত ছিলেন প্রাণপণে রামকৃষ্ণের সেবা করিয়াছিলেন। মথুর বাবুর দেহত্যাগের পর তাহার পুত্রগণও রামকৃষ্ণের সেবায় ত্রুটি করেন নাই। ২১
মাকে
চতুর্থ অধ্যায়
সকল প্রকার ধর্মসাধন
মা বারম্বার দেখিতে পাওয়ায় রামকৃষ্ণের
অধীরতা অনেকটা দূর হইল। তিনি এখন বুঝিতে
পারিলেন যে তাহার লােভ ও অভিমান সমূলে বিনষ্ট
হয় নাই, সেই জন্যই মাকে ইচ্ছামাত্র সর্বদা দেখিতে
পান না। তাই লােভ দূর করিবার জন্য এক হাতে
একটী টাকা ও অপর হাতে একটী মাটীর ঢেলা লইয়া
গঙ্গাতীরে বসিয়া এইরূপ বিচার করিতে লাগিলেন--
টাকার দ্বারা অনেক সৎকাৰ্য্য হইতে পারে বটে কিন্তু
উহা দ্বারা অনেক দুষ্কাৰ্যও হইয়া থাকে। বিশেষতঃ,
টাকা হাতে থাকিলে বড়ই অভিমান হয় এবং টাকার
লােভ বিন্দুমাত্ৰ থাকিলে ভগবান লাভ হয় না। অতএব
যে ভগবান লাভের চেষ্টা করে তাহাকে মাটির ঢেলাটি
যেমন কোন সাহায্য করিতে পারে না, এই টাকাও
তেমনি কোন সাহায্য করিতে পারে না।
টাকাতে আর মাটীর ঢেলাতে কোনও তফাৎ নাই।
এই ভাবিয়া ‘টাকা-মাটী-মাটী-টাকা' বলিতে বলিতে
যখন ভগবান-লাভের পথে টাকা ও মাটীর মূল্য
অতএব এই
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
সমান বােধ হইল তখন মাটীর ঢেলা এবং টাকা গঙ্গার
জলে ফেলিয়া দিলেন। অভিমান-ত্যাগের জন্য কাঙ্গালী-
দের এটো পাত মাথায় করিয়া ফেলিলেন এবং তিনি
মেথরের চাইতেও বড় নহেন, এই কথা ভাবিয়া স্বহস্তে
ঝটা লইয়া পাইখানা পরিষ্কার করিলেন।
ঐরূপ নানা সাধনা দ্বারা তাঁহার হৃদয় সম্পূর্ণ নির্মল
হইয়া গেল, লােভের বা অভিমানের আভাস মাত্রও
রহিল না।
এখন হইতে তাহার আশ্চর্য্য বিনয় দেখিয়া
অতি বড় দাম্ভিকেরও দম্ভ চূর্ণ হইত, তাহার লােভহীন
চরিত্র দেখিয়া অর্থলােভীর মােহ দূর হইত। তিনি
দীন কাঙ্গালের মত দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে পড়িয়া
থাকিতেন, তাহাকে সামান্য লােক ভাবিয়া যে সে তাহার
কাছে গিয়া সরলভাবে ধৰ্মালাপ করিত এবং তাহার
জ্ঞানসিন্ধুর বিন্দুমাত্র পান করিয়া লােকের জীবন পরি-
বর্তিত হইয়া যাইত।
একদিন রামকৃষ্ণ মা কালীকে বলিলেন, “মা আমি
মূখ, লেখা পড়া জানি না, শাস্ত্র জানি না। তুই দয়া
করিয়া আমায় সকল ধর্মেরসৈকল শাস্ত্রের সার জানাইয়া
দে।” জগজ্জননী প্রিয় পুত্রের অভিলাষ পূর্ণ করিবার
জন্য তাঁহাকে একে একে সর্বপ্রকার ধর্মমতে সাধনা
করাইয়া সকল ধর্ম এক ভগবানের কথা নানারূপে
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেছে, এই মহাসত্য শিক্ষা দিলেন না কালীর কৃপায় রামকৃষ্ণ বুঝিতে পারিলেন,সকল ধর্মের দ্বারাই ঈশ্বর লাভ করা যায়,—“যত মত তত পথ। ঐ সময়ে সর্বপ্রথমে তিনি তাহার কুলদেবতা রঘু- বীরের আরাধনায় নিযুক্ত হন। শ্রীরামচন্দ্রের প্রধান ভক্ত হনুমান যে ভাবে রামকে চিন্তা করতেন তিনি সেই ভাবে রঘুবীরের উপাসনা আরম্ভ করেন। আত্ম- বিস্মৃত হইয়া তিনি এখন আপনাকে রামচন্দ্রের দাস হনুমান বলিয়া মনে করিতে থাকেন। তঁাহার আকৃতি প্রকৃতির পরিবর্তন হইয়া যায়, তিনি বৃক্ষে আরােহণ করিয়া বসিয়া থাকিতেন, বানরের মতন চঞ্চল হইয়া গাছের ডালে লাফালাফি করিতেন, খােসা-শুদ্ধ ফল ভিন্ন অন্য কিছু খাইতেন না। তাহার এই অবস্থা দেখিয়া হৃদয় প্রভৃতি অত্যন্ত ভীত হইয়াছিল। তিনি ভূতগ্রস্থ হইয়াছেন, এমত আশঙ্কাও কাহারাে কাহারাে মনে উঠিয়াছিল। রামকৃষ্ণের ভাবােন্মত্ততার কথা তাহার মাতা প্রভৃতি আত্মীয়গণ শুনিয়া অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়াছিলেন। প্রথম বার, তিনি যখন একটু শান্ত হইলেন তখন তাহারা মনে করেন, রােগ সারিয়া যাইতেছে। কিন্তু উহার কিছু দিন পরে তিনি হনুমানের ভাবে ঐরূপ বিকট २8 শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কাণ্ড করিতে আরম্ভ করিয়াছেন—সংবাদ পাইয়া চন্দ্রাদেবী ও রামেশ্বর অত্যন্ত ভয় পাইলেন। কনিষ্ঠ সন্তানের উপর পিতা-মাতার একটু বেশী স্নেহ থাকে—বিশেষতঃ, গদাধরের অতি সরল প্রকৃতি মনকে সহজেই আকর্ষণ করিত। একে ত বিদেশে বাস করায় চন্দ্রাদেবী সৰ্ব্বদাই রামকৃষ্ণের জন্য চিন্তিত থাকিতেন, তাহাতে আবার তাহার ঐরূপ আচরণের কথা শুনিয়া তিনি অধীর হইয়া উঠিলেন। তাহাকে কামারপুকুরের বাড়িতে আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। রামকৃষ্ণও ইতিমধ্যে হনুমান- ভাবে সিদ্ধিলাভ করিলেন এবং পূর্বের ন্যায় শান্ত হইয়া বাড়িতে আসিলেন। রামকৃষ্ণের আগমন-সংবাদ শুনিয়া প্রতিবাসিগণ তাঁহাকে দেখিতে আসিলেন। কেন না তাহারা ইহার সম্বন্ধে ইতিপূৰ্ব্বে কত কথাই শুনিতেছিলেন। তাহারা দেখিলেন পূৰ্ববং সরল ও প্রফুল্ল থাকিলেও তাহাদের গদাই যেন এখন ভগবানের ভাবে ডুবিয়া গিয়াছে, ভগবানের কথা বই অন্য কথা বলে না, কখন কখন ভাবে বিভাের হইয়া অচেতন হইয়া যায়। তাঁহার আত্মীয়গণ বিলেন এত ভাবভক্তি ভাল নহে, ইহার শীঘ্র শীঘ্র বিবাহ দেওয়া উচিত। তাহা হইলে সংসারে মন আসিবে, এসব পাগলামীও দূর হইয়া যাইবে। ঐ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরামর্শ স্থির করিয়া তাহারা কামারপুকুরের চারি মাইল পশ্চিমে জয়রামবাটী গ্রামের শ্রীযুক্ত রামচন্দ্র মুখখাপাধ্যায়ের পঞ্চম বর্ষীয়া কন্যার সঙ্গে তাহার শুভ বিবাহ সম্পন্ন করলেন। {বাড়ীতে আসিয়াও রামকৃষ্ণ সর্বদ। ধ্যানচিন্তায় মগ্ন থাকিতেন। রাত্রি হইলে গ্রামের বাহিরে “ভূতীর খালের” অথবা “বুধুই মােড়লের’ শ্মশানে গিয়া ধ্যান করিতেন। সেখানে নাকি তাহার অতি অদ্ভুত ভৌতিক ব্যাপার সকল দর্শন হইত। কেহ সেই স্থানের নিকট- বৰ্ত্তী হইলে পাছে সে ভূত দেখিয়া ভয় পায়, এই জন্য তিনি তাহাকে সত্বর দূরে চলিয়া যাইতে বলিতেন। কিছুদিন পরে রামকৃষ্ণ কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলেন। এই সময় একজন সন্ন্যাসিনী দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হন। তিনি রামকৃষ্ণকে দেখিবামাত্ৰ মহাপুরুষ বলিয়া চিনিতে পারেন এবং তাহাকে তান্ত্রিক প্রণালী অনুসারে সাধনা শিক্ষা দেন। তান্ত্রিক সাধনা বড়ই কঠিন, অত্যন্ত জটিল ও গােপনীয় বলিয়া জগতে ইহার প্রচার খুব অল্পই হইয়াছে। অতি উচ্চ প্রকৃতির সাধক না হইলে ইহাতে সহজেই বিপথগামী হইবার আশঙ্কা। ইহা দ্বারা অতি সহজে ঈশ্বর লাভ হয়, শুনা যায় কিন্তু সেই সব সাধনপ্রণালীর নাম শুনিলেও ভয় হয়।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ এই সন্ন্যাসিনী তন্ত্রশাস্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন এবং সাধনরহস্যও জানিতেন। তাহার উপদেশ মত রামকৃষ্ণ প্রধান প্রধান চৌষট্টি খানা তন্ত্রের সমুদয় সাধন- প্রণালী একে একে অবলম্বন করিয়া প্রত্যেকটীতে সিদ্ধিলাভ করেন। এই সময়ে কত অদ্ভুত কাণ্ড হইত তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। সমস্ত দিন রামকৃষ্ণ নানা ভাবে বিভাের হইয়া থাকিতেন, আর সন্ন্যাসিনী সাধনার প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করিতেন। সন্ধ্যা হইতে ক্রিয়াকলাপ আরব্ধ হইত এবং প্রভাতে শেষ হইত। . কালী বাড়ীর ঈশান কোণে বিশ্ববৃক্ষ-মূলে পাঁচটী মড়ার মাথা পুতিয়া ‘পঞ্চমুণ্ডী’ আসন করা হয় এবং সেই স্থানেই শ্মশান-সাধনা নামক জগতে সব চেয়ে আশ্চর্য সাধনা অনুষ্ঠিত হয়। গঙ্গাতীরে পঞ্চবটী ও তুলসী কানন করিয়া রামকৃষ্ণ নানা ভাবে সাধনা করেন। . তান্ত্রিক সাধনার পর তিনি বৈষ্ণব শাস্ত্র অনুসারে সাধনা করিয়া ভগবান লাভ করেন। শান্ত, দাস্য প্রভৃতি পাঁচ- ভাবের প্রত্যেক ভাবেই সাধনা করিয়াছিলেন আবার পঞ্চরাত্র গৌড়ীয় প্রভৃতি বিভিন্ন পন্থারও অনুসরণ করিয়াছিলেন পূর্বোক্ত সন্ন্যাসিনী বৃন্দাবন-লীলার গান গাহিতেন আর শুনিতে শুনিতে রামকৃষ্ণ সমাধিমগ্ন হইয়া যাইতেন। যখন যে ভাবের সাধনা করিতেন
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
তাহার সর্বপ্রকার নিয়ম-প্রণালী তিনি মানিয়া চলিতেন।
মধুরভাবে সাধনাকালে শ্রীরাধার সখি ভাবিয়া
স্ত্রীলােকের পােষাক পরিয়া থাকিতেন এবং কৃষ্ণপ্রেমের
জন্য দিবারাত্রি শ্রীরাধার নিকট ব্যাকুল ভাবে প্রার্থনা
করিতেন। গৌরাঙ্গের ধ্যান-চিন্তা করিয়া তাহার
দর্শন পাইয়াছিলেন, ভাবের চক্ষে শ্রীগৌরাঙ্গের মহা-
সঙ্কীর্তন দেখিয়াছিলেন। হনুমানের ভাবে শ্রীরামের
উপাসনার কথা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। এখন
আবার বাৎসল্যভাবে শ্রীরামের উপাসনা করিয়া তাহাকে
লাভ করেন। ইহার পর শৈব সাধনা করিয়াছিলেন।
সৰ্বশেষে নাগা সম্প্রদায়ের উলঙ্গ সন্ন্যাসী যতিরাজ
শ্রীশ্রীমৎ তােতাপুরী স্বামী পরমহংস পরিব্রাজক মহা-
রাজ স্বেচ্ছাক্রমে ভ্রমণ করিতে করিতে দক্ষিণেশ্বরে
আসিয়া উপস্থিত হইলেন। রামকৃষ্ণকে দেখিয়া তিনি
তাঁহাকে বেদান্ত-সাধনার উচ্চ অধিকারী বলিয়া চিনিতে
পারেন এবং জ্ঞানযােগ সাধন করিবেন কি না তাহাকে
জিজ্ঞাসা করেন। রামকৃষ্ণ স্বীকৃত হইলে, তাহাকে
যথাবিধি সন্ন্যাস ও সন্ন্যাসাশ্রমের নাম ( রামকৃষ্ণ)
প্রদান করিয়া বেদান্ত শাস্ত্রের উপদেশ দিতে লাগিলেন।
একটু আধটু উপদেশ দিতে না দিতেই তােতা দেখিলেন
রামকৃষ্ণ নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন হইয়া গিয়াছেন।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
সমাধি লাভ করিতে তাহার চল্লিশ বৎসরের প্রাণপণ
চেষ্টার প্রয়ােজন হইয়াছিল, রামকৃষ্ণ তাহা অনায়াসে
দুই তিন দিনেই লাভ করিলেন দেখিয়া মহাজ্ঞানী তােতা
চমৎকৃত হইলেন। তাঁহার ইচ্ছা ছিল দুই তিন দিন
এখানে থাকিয়া চলিয়া যাইবেন কিন্তু এই আশ্চর্য্য
শিষ্যটীকে পাইয়া এগার মাস রহিয়া গেলেন।
এইরূপে মাত্র দ্বাদশ বৎসরে রামকৃষ্ণ ভারতবর্ষে
প্রচলিত সর্বপ্রকার ধর্মমতের সাধনায় সিদ্ধিলাভ
করেন। ঐ সকল মতের এক একটীতে সিদ্ধিলাভ করিতে
তাহার তিন দিনের অধিক সময় লাগে নাই। যখন
যে ভাবে সাধনা করিতে তাহার ইচ্ছ। হইত ভগবানের
কৃপায় তাহার অনুকূল বিষয়সমূহ তখনি আসিয়া
উপস্থিত হইত এবং উপযুক্ত উপদেষ্টাও আসিয়া
জুটিতেন। এক একটী মতে সিদ্ধিলাভ করিয়া তিনি কিছু
দিন ঐ ভাবে বিভাের হইয়া থাকিতেন। তখন সেই মতের
সিদ্ধ ও সাধক পুরুষগণ আসিয়া সেই বিষয়ের আলাে-
চনায় তাহার সহিত আনন্দ করিতেন ও তাহার নিকটে
উপদেশ গ্রহণ করিতেন। এই দ্বাদশ বৎসর তিনি এক
নিমেষের জন্যও নিদ্রা যান নাই। ঐকালে তাহার
আহারাদির কোনও নিয়ম ছিল না, কোথা দিয়া
দিন রাত্রি চলিয়া যাই অনেক সময় তাহার জ্ঞান
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
থাকিত না এবং মাথার চুলে
জটা বাঁধিয়াছিল। পঞ্চবটী
তলায় ধ্যানস্থ রামকৃষ্ণকে জড়বস্তু মনে করিয়া পক্ষিগণ
তঁাহার মাথায় বসিয়া খেলা করিত। এক সময়ে এমন
গভীর ধ্যানে মগ্ন হইয়াছিলেন যে, তাঁহাকে দেখিয়া
সকলে মৃত মনে করে। ভাগ্যে একজ; সাধু তখন
কালী বাড়ীতে আসিয়াছিলেন, তিনি বুঝিতে পারিলেন
যে, এই মহাপুরুষ সমাধিস্থ। অনেক দিন এইরূপ
থাকিলে দেহত্যাগ হইবে, তাই তিনি ছয় মাস তাহার
নিকটে থাকিয়া অতি কষ্টে তাহার সমাধি ভঙ্গ করিয়া
সময় সময় কিছু কিছু খাওয়াইতেন। সাধনাকালে
তাহার ঐরূপ কত প্রকারের অলৌকিক ‘অবস্থা’ হইয়া-
ছিল তাহা এই ক্ষুদ্র পুস্তিকায় বর্ণনা করা অসম্ভব।
যাহারা বিশেষ জানিতে চাহেন তাঁহারা শ্ৰীমৎ স্বামী
সারদানন্দ বিবৃত “লীলাপ্রসঙ্গ” নামক পুস্তকগুলি
পাঠ করিবেন।
এই সকল কঠোর সাধনায় তাহার দেহ এবং মনের
এক আশ্চৰ্য্য অবস্থা হইয়াছিল। শরীরটী শিশুর মত
কোমল হইয়া গিয়াছিল। আমরা যেমন শৈত্য ও
উষ্ণতা অনুভব করিয়া থাকি, নিকটে আসিক মাত্র তিনি
তেমনই অপরের শরীর-মনের পবিত্রতা-অপবিত্রতা
অনুভব করিতেন। কোন খারাপ লােক তাঁহার দেহ
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
স্পর্শ করিলে তিনি যেন জ্বলন্ত অঙ্গারের স্পর্শ অনুভব
করিতেন। ধাতুনির্মিত কোন বস্তু স্পর্শ করিতে
পারিতেন না—নিদ্রিত অবস্থায়ও তাঁহার হস্তে টাকা-
মােহর ছোঁয়াইলে শিঙ্গিমাছের কাঁটা ফোটার ন্যায় কষ্ট
পাইতেন। তাহার মনটী
সমুদয় জগতের দর্পণস্বরূপ
হইয়া গিয়াছিল। ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান তিনি সম্মুখস্থ
পদার্থের ন্যায় স্পষ্ট দেখিতে পাইতেন। মনের এমন
শক্তি হইয়াছিল যে ইচ্ছামাত্র যে কোনও লােকের মনে
ধৰ্মভাবের সঞ্চার করিয়া দিতেন।
এইবার, মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা কি ভাবে ভগবান
লাভ করেন, দেখিতে ভঁহার সাধ হইল। তাই তিন
দিন ঐ ভাবে থাকিয়া দেখিলেন, মুসলমানের খােদাতে
আর হিন্দুর ঈশ্বরেতে কেবল ভাষারই ভেদ, মূলবস্তু
এক-ই। এইরূপে খ্রীষ্টানদের ভাবেও তিন দিন ছিলেন
এবং দেখিলেন ঐ ধৰ্ম্মপথেও ভগবানকে পাওয়া
যায়।
সর্ববিধ সাধনায় সিদ্ধি লাভের পর তাহার ভয়ানক
উদরাময় পীড়া হইল। বহু চিকিৎসাতে অসুখ না সারায়
সকলে পরামর্শ দিল, দেশে গিয়া দিন কতক থাকিলে
জল হাওয়া পরিবর্তনে রােগ সারিতে পারে। তদনু-
সারে মথুর বাবু ঠাকুরের সর্বপ্রকার ব্যয়ের বন্দোবস্ত
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
করিয়া হৃদয়কে সঙ্গে দিয়া তাহাকে স্বদেশে পাঠাইলেন।
দিন কতক সেখানে থাকায় তাহার পেটের অসুখ
সারিয়া গেলে তিনি আবার কলিকাতায় ফিরিয়া
আসিলেন।
ইহার পর মথুর বাবুর সঙ্গে তিনি কাশী প্রভৃতি
তীর্থস্থান দর্শন করিতে যান। কাশীতে বিশ্বনাথ
দর্শন করিতে যাইবার সময় পথে শিবের চিন্তা করিতে
করিতে সমাধিস্থ হইয়া গেলেন। আর, বাহচক্ষুতে
বিশ্বনাথ দর্শন হইল না, জ্ঞানচক্ষুতে তাহার চিন্ময় মূর্তি
দেখিতে পাইলেন। কোন দেবতা-দর্শনে যাইলে
তিনি প্রায় এইরূপে সমাধিস্থ হইতেন, আর বাহচক্ষে
দেবদর্শন হইত না। কিন্তু যিনি হৃদয়মধ্যে জীবন্ত
ভগবানকে দেখিতে পান তাহার শিলাস্তরের মূর্তি
দেখিবার কি প্রয়ােজন! বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের লীলাস্থল
দেখিয়া ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলিয়া কাঁদিয়া আকুল হইয়া-
ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের
গঙ্গামাতা নাম্নী
সন্ন্যাসিনী: তাহাকে বৃন্দাবনে রাখিয়া দিবার জন্য বড়ই
জেদ করিয়াছিলেন।
পঞ্চম অধ্যায়
ধৰ্ম্মপ্রচার দেহরক্ষা ও শেষ কথা
নরেন্দ্রনাথ
ফুল ফুটিলে যেমন আর ভ্রমরকে ডাকিয়া আনিতে
হয় না তেমনি মানবহৃদয়ে ভগবানের যথার্থ প্রকাশ
উপস্থিত হইলে সাধুভক্তগণ আপনা হইতেই তাহাকে
খুজিয়া বাহির করেন। রামকৃষ্ণের নিকট ভারতের
সর্বপ্রকার ধর্মসম্প্রদায়ের সিদ্ধপুরুষ ও সাধকগণ
আসিতেন, একথা আমরা পূৰ্বে বলিয়াছি। এখন
কলিকাতা ও নিকটবর্তী স্থান সমূহের ধৰ্ম্মপরায়ণ ব্যক্তি
মাত্রই তাঁহার নিকট আসিতে লাগিলেন।
প্রভৃতি তাঁহার প্রধান শিষ্য সকলে এই সময়ে
আসেন।
ব্রাহ্ম সমাজের কেশবচন্দ্রের সহিত তাহার সাক্ষাৎ
হইলে কেশব তাঁহার পাঁচ বছরের বালকের মত সরল
ভাবে ভগবানকে ‘মা’ ‘মা’ বলিয়া ডাকা ও তাহার উপর
সম্পূর্ণ নির্ভরের ভাব দেখিয়া একান্ত মুগ্ধ হইলেন।
তিনি তাঁহার প্রচারিত খবরের কাগজে এই আশ্চৰ্য্য
সাধুর কথা লিখিতে লাগিলেন, আর দলে দলে লােক
যাইয়া তাহার করুণা-সরলতা মাখা পবিত্র মূর্তি, উদার
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
মন ও অদ্ভুত ঈশ্বরানুরাগ দেখিয়া জীবন সার্থক করিতে
লাগিল।
তখন অনেক শিক্ষিত হিন্দু ধর্মের মূলতত্ত্ব বুঝিতে
পারিয়া একবারে নাস্তিকের মত হইয়া গিয়াছিলেন।
তাঁহারা রামকৃষ্ণের নিকট গিয়া দেখিতেন তিনি দিবা-
রাত্র ভগবানের ভাবে আনন্দে মগ্ন! তঁাহার ভগবৎপ্রেম
দেখিয়া তাহাদের সন্দেহ দূর হইয়া যাইত। গিরিশ
ঘােষ, ডাক্তার রামচন্দ্র, প্রফেসার মহেন্দ্র গুপ্ত প্রভৃতি
তাহার উদার ধর্মভাবে মুগ্ধ হইয়া তাহার শিষ্যত্ব গ্রহণ
করেন। এই মহেন্দ্রবাবুই ‘কথামৃত' লিখিয়াছেন।
তিনি রামকৃষ্ণের মুখে যে সব অপূৰ্ব্ব উপদেশ শুনিতেন,
বাড়ীতে আসিয়া নিজের আনন্দের জন্য, তাহা লিখিয়া
রাখিতেন। এখন তাই
এখন তাই প্রকাশ করিয়া বাংলাদেশ
মাতাইয়া তুলিয়াছেন। মহাত্মা দুর্গাচরণ নাগ প্রভৃতি
মহাপুরুষগণ এই সময়েই ইহার ত্যাগের আদর্শ গ্রহণ
করেন। মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী তাহার নিকট
গিয়া ধর্মকথা শুনিতেন। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মধু-
সূদন দত্ত প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণ এই মূখ ব্রাহ্মণের
অগাধ জ্ঞান দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দের পূর্ব নাম ছিল শ্রীনরেন্দ্রনাথ
দত্ত। তিনি শিশুকাল হইতে লক্ষ্য করিতেন, সকলেই
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ধর্মের কথা বলে, কিন্তু ভগবাকে দেখিয়াছে এমন কথা কেহ বলে না—যেন ধর্ম কেবল কথার কথা, কেবল আলােচনারই বিষয়! আবার কেহ বা একটু আচার- অনুষ্ঠান, ধ্যান-চিন্তা করে বটে কিন্তু ভগবান্কে লাভ করিবার জন্য ব্যস্ত নহে। তাহার আশৈশব সত্যলাভের, ধৰ্ম্ম লাভের জন্য একটা ব্যাকুলতা ছিল। কিন্তু এই সব দেখিয়া তিনি হতাশ হইয়া গিয়াছিলেন। ঘটনাচক্রে রামকৃষ্ণের নাম শুনিয়া তিনি তাহার নিকট গিয়া দেখি- লেন, সেই মহাপুরুষ সৰ্বস্বত্যাগ করিয়া কেবল ভগ- বাকে লইয়া আছেন—কথা বলিতে বলিতে হৃদয়মধ্যে ভগবাকে দেখিতেছেন, আর সমাধিস্থ হইতেছেন। দিবারাত্র ভগবানের কথাই বলেন, পাঁচ বছরের বালক যেমন মা বই আর কিছুই জানে না, তেমনি তিনি ভগবান্ বই আর কিছুই জানেন না! আবার সকল ধর্মই তাহার নিকট সমান—কৃষ্ণ, খােদা, গড, কালী—তাহার নিকট সকলই এক। সকল মানুষের ভিতরই তিনি ভগবান দেখেন, এমন কি, ভগবানের মূৰ্ত্তি জ্ঞানে জগতের সকল বস্তু ও ব্যক্তিকে প্রণাম করেন! নরেন্দ্রনাথ তাঁহার জীবনের পূর্ণ আদর্শ রামকৃষ্ণের নিকট পাইয়া তাহার শ্রীচরণে মনপ্রাণ সঁপিয়া দিলেন। রামকৃষ্ণও উপযুক্ত শিষ্য পাইয়া তাহাকে তাঁহার মহাসমন্বয় ধর্মে দীক্ষিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ * করিলেন এবং জগতে তাহা প্রচারের জন্য তাঁহাকে প্রস্তুত করিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে রাখাল প্রভৃতি সংসারবিরাগী শুদ্ধচিত্ত বালকগণ তাহার শিষ্যত্ব স্বীকার করিলেন।' রামকৃষ্ণের শরীরের ধাতু বালকের ন্যায় ছিল, একটুতেই ঠাণ্ডা লাগত। একদিন ঠাণ্ডা লাগিয়া তাহার গলার বীচি সকল ফুলে, ইহা বাড়িয়া ক্রমে ঘায়ে পরিণত হইল। শিষ্যগণ চিকিৎসার সুবিধার জন্য তাঁহাকে কলিকাতার শ্যামপুকুর নামক পল্লীতে রাখিয়া বড় বড় ডাক্তারকে আনাইয়া চিকিৎসা করাইতে লাগিলেন, কিন্তু রােগ ক্রমশঃ বাড়িতেই লাগিল। অবশেষে তাহারা কলিকাতার উত্তর প্রান্তে কাশীপুরে একটা বাগানবাড়ী ভাড়া করিয়া তাহাকে তথায় লইয়া গিয়া প্রাণপণে শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন; কিন্তু কোনও ফলই দেখা গেল না। এই সময়েও তাহার নিকট অনেক লােক আসিত। তঁাহার এত অসুখ, তবু লােককে উপদেশ দিতে বিরত হইতেন না। যখন একেবারে কথা বলিতে পারিতেন না, তখনও কাহাকে স্পর্শ করিয়া, কাহারও প্রতি কৃপাদৃষ্টি করিয়া, কাহাকেও বা আশীর্বাদ করিয়া মনে ধৰ্ম্মভাব সঞ্চার করিয়া দিতে লাগিলেন। বাজারে আসিয়া ফল- শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ গেলেন। বিক্রেতা যেমন প্রথমে দর কষাকষি, ওজন হিসাব করিয়া ফল বিক্রয় করে, কিন্তু যখন সন্ধ্যা হইয়া আসে তখন বাড়ী ফিরিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া যাহা তাহা লইয়া অব- শিষ্ট ফল একরূপ বিলাইয়াই দিয়া যায়, সেইরূপ রাম- কৃষ্ণ শীঘ্রই দেহত্যাগ হইবে জানিয়া যাহাকে পাইলেন তাহাকেই ধর্মভাব দিতে লাগিলেন। একদিন রাত্রে তিনি গভীর সমাধিতে মগ্ন হইয়া সকলে ভাবিলেন শীঘ্রই আবার বাহ্যজ্ঞান আসিবে, কিন্তু রাত্রি চলিয়া গেল তাহার সমাধিভঙ্গ হইল না, অধিকন্তু দেহে মৃতের লক্ষণ প্রকাশ পাইতে লাগিল। সে দিন সন ১২৯৩ সালের ৩১শে শ্রাবণ, ইংরাজী ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দের ১১ই আগষ্ট। শিষ্যগণ জীবনের কর্ণধার প্রেমময় গুরুদেব মহাসমাধিমগ্ন হইয়াছেন বুঝিতে পারিয়া অত্যন্ত শােকাৰ্ত্ত হইলেন এবং পর দিন সন্ধ্যাকালে গঙ্গাতীরে অপাপবিদ্ধ গুরুদেহের সৎকার করিয়া শূন্যমনে গৃহে ফিরিয়া গেলেন। বালকভক্তগণ গুরু বই আর কিছুই জানিতেন না। তাহারা আর সংসার করিতে পারিলেন না-বাড়ী ঘর ছাড়িয়া সকলে একস্থানে সমবেত হইয়া সন্ন্যাসীর মত জীবন যাপন করিতে লাগিলেন। কয়েক বৎসর কঠোর সাধনা করিয়া তাহারা গুরুর উপদেশসমূহ কার্য্যে
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
পরিণত করিলেন। তখন তাঁহারা এই মহান্ আদর্শ
জগতে প্রচার করিবার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করিতে
লাগিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ (নরেন্দ্রনাথ ) পৃথিবীর
সৰ্ব্বস্থানে ঘুরিয়া হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন।
একে একে ভারতবর্ষে নানা স্থানে মঠ স্থাপিত হইতে
লাগিল। এই সকল মঠে বাস করিয়া রামকৃষ্ণের
সন্ন্যাসী শিষ্যগণ ধর্মপ্রচার করিতেছেন এবং বহুলােক
তাঁহাদের ত্যাগের আদর্শ গ্রহণ করিয়া ধন্য হইতেছে ।
এখন পৃথিবীর অনেক দেশে এবং ভারতের প্রায়
সকল প্রসিদ্ধ স্থানে, রামকৃষ্ণের ভক্তগণ সেই মহান
আদর্শ অনুসারে নিজ নিজ জীবন গঠন করিবার চেষ্টা
করিতেছেন।
সমাপ্ত।
উদ্বোধন s স্বামী বিবেকানন্দ-প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ-মঠ’ পরিচালিত মাসিক পত্র। অগ্রিম বার্ষিক মূল্য সডাক ২, টাকা। উদ্বোধন-কাৰ্যালয়ে স্বামী বিবেকানন্দের ইংরাজী ও বাঙ্গালা সকল গ্রন্থই পাওয়া যায়। উদ্বােধন”গ্রাহকের পক্ষে বিশেষ সুবিধা। নিয়ে ব্য: সাধারণের গ্রাহকের পুস্তক পক্ষে পক্ষে বাঙ্গালা রাজঘােগ ( ৪র্থ সংস্করণ। জ্ঞানযােগ (৬ষ্ঠ ঐ ) ১) ভক্তিযােগ ( ৭ম সংস্করণ : কর্মযোগ (৫ম ঐ ) পত্রাবলী ১ম ভাগ, (৩য় সংস্করণ) ২য় ভাগ (৩য় সংস্করণ) ৩য় ভাগ (২য় সংস্করণ। ভক্তি-রহস্য (৩য় সংস্করণ) চিকাগাে বক্তৃতা ( ৪র্থ সংস্করণ) ভাববার কথা (৪র্থ সংস্করণ ) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য (৫ম সংস্করণ) ন পরিব্রাজক (৩য় সংস্করণ) ভারতে বিবেকানন্দ (৪র্থ সংস্করণ) ১৮ বর্তমান ভারত (৫ম সংস্করণ) মদীয় আচার্যাদেব (২য় সংস্করণ) বিবেকবাণী (৪র্থ সংস্করণ) শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুথি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ উপদেশ— পকেট এভিশন) (৯ম সং) স্বামী ব্রহ্মানন্দ সঙ্কলিত, মূল্য।• আনা। ভারতে শক্তিপূজাস্বামী সারদান-প্রণীত মূল্য • উদ্বোধন-গ্রাহক-পক্ষে• আনা। মিশনের অন্যান্য গ্রন্থ এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ও স্বামী বিবেকানন্দের নানা রকমের ছবির ক্যাটালগের জন্য পত্র লিখুন। হিন্দুধর্মের নবজাগরণ—স্বামী বিবেকানন্দ প্রণীত মূল্য • আনা। : • ন ২, ye টাকা। স্বামিজীর সহিত হিমালয়ে—সিষ্টার নিবেদিতা প্রণীত 'Notes on Some Wanderings with the Swami Vivekananda নামক পুস্তকের বঙ্গানুবাদ। এই পুস্তক পাঠক স্বামিজীর বিষয়ে অনেক নুতন কথা জানিতে পারিবেন, ইহা নিবেদিতার ডায়েরী হইতে লিখিত। সুন্দর বাধান, মূল্য • বার আনা মাত্র। ভারতের সাধনা—স্বামী প্রজ্ঞানন্দ প্রণীত- রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পাদক, স্বামী সারদানন্দ লিখিত ভূমিকাসহ ) ধৰ্ম্মভিত্তিতে ভারতের জাতীয় জীবন গঠন--এই গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। পড়িলে বুঝা যায়, স্বামী বিবেকা- নন্দ জাতীয় উন্নতিসম্বন্ধে যে সকল বক্তৃতা করিয়াছিলেন, সেইগুলি উত্তমরূপে আলােচনা করিয়া গ্রন্থকার যেন তাহার ভাষ্যস্বরূপ এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। ইহার বিষয়গুলির উল্লেখ করিলেই পাঠক পুস্তকের কিঞ্চিৎ আভাস পাইবেন :- প্রাচীন ভারতে নেশন-প্রতিষ্ঠা, ভারতীয় জাতীয়তার বিশেষত্ব, ভারতীয় নেশনে বেদমহিমা ও অবতারবাদ, নেশনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা { ধৰ্ম্মজীবন, সন্ন্যাসাম, সম সমাজ-সংস্কার, শিক্ষা, শিক্ষাকেন্দ্র, শিক্ষাসংঘর্ষ, শিক্ষাসমন্বয়, শিক্ষাপ্রচার ও শেষ-কথা। গ্রন্থকারের একখানি প্রতিকৃতি এই পুস্তকে সংযােজিত হইয়াছে। ক্রাউন ২৫৬ পৃঃ-উত্তম বাঁধান। মুল্য ১, স্বামি-শিষ্য-সংবাদ—শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী প্রণীত- ৩ সংস্করণ।) স্বামিজী ও তাহার মতমাত জানিবার এমন সুযােগ পাঠক ইতিপূর্বে আর কখন পাইয়াছেন কিনা সন্দেহ। পুস্তকখানি দুই খণ্ডে বিভক্ত। প্রতি এণ্ডের মূল্য •। নিবেদিতা-শ্ৰীমতী সরলাবালা দাসী প্রণীত ( ৪র্থ সংস্করণ) (স্বামী সারদানন্দ লিথিত ভূমিকা সহিত) বঙ্গসাহিত্যে সিষ্টার নিবেদিতা-সম্বন্ধীয় তথ্যপূর্ণ এমন পুক আর নাই। বসুমতী বলেন- এ পৰ্য্যন্ত ভগিনী নিবেদিতা সম্বন্ধে আমরা যতগুলি রচনা পাঠ করিয়াছি, খ্ৰীমতী সরলাবাসার “নিবেদিতা” তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, তাহা আমরা অসঙ্কোচে নির্দেশ কম্নিতে পারি। * মূল্য।• আনা। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুথি— ভগবান্ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের চরিতামৃত) অক্ষয়কুমার সেন প্রণীত। সংসারের শােকাপের পক্ষে শ্রীশ্রীরাম- ( কৃষ্ণ-চরিত সুধাস্বরূপ। আর রয়েল আট পেজী, ৫৭৯ পৃষ্ঠা। মুল্য ২ টা, উদ্বোধন-গ্রাহক পক্ষে ) দুই টাকা। ঠিকানা উদ্বোধন কায্যালয়, ১নং মুখার্জি লেন, বাগবাজার, কলিকাতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.