Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Madhabnarayan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মাধবনারায়ণ।
শ্রীশিশিরকুমার মিত্র বি, এ,
প্রণীত।
#ঃ-
১৩৩৬, ১লা আশ্বিন
3
মুল্য ১ম এক টাকা মাত্র।
প্রিন্টার—শ্রীগােষ্ঠবিহারী মান্না,
মিত্র প্রেস
৩১।১, গ্রে ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
উনসর্গ
পরম শ্রদ্ধাস্পদ
শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব মহাশয়ের
শ্রীচরণকমলে
মহাশয়,
আপনি কায়স্থ কুলচূড়ামণি ! “মাধবনারায়ণের जौरनौ
আপনার নিকটে সাদরে গৃহীত হইৰে জানিয়া শ্রদ্ধার অঞ্জলি-
স্বরূপ এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি আপনার করকমলে অর্পণ করিলাম।
বাণী-সাহিত্যমন্দির,
বিনয়াবনত নিবেদক
১৯৭, কর্ণওয়ালিস্ স্ত্রী।
শ্রীশিশিরকুমার মিত্র।
No text on this page.
ভূমিকা। ১৩২৩ সালে এই জীবনী খানির ঘটনাবলী সংগ্রহে আমি প্রথম প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। তখন রায়েরকাঠী-গ্রামের প্রাচীন লােকদিগের মধ্যে শ্ৰীযুত অম্বুজনারায়ণ রায় চৌধুরী ও শ্ৰীযুত কৈলাসচন্দ্র মিত্র মহাশয়য় মাত্র জীবিত ছিলেন। তাঁহাদের নিকট হইতে কতকগুলি তথ্য সংগ্রহ করিয়াছিলাম। তন্মধ্যে শ্ৰীযুত অম্বুজনারায়ণ রায় চৌধুরী মহাশয়ের নিকট হইতেই অনেক বিষয় জ্ঞাত হই। কিন্তু দৈবদুর্ঘটনা- বশতঃ তখন আমার এই পুস্তক সঙ্কলনে বাধা পড়িল। অতঃপর ১৩৩৪ সালে পুনরায় ইহার উপাদান সংগ্রহে প্রবৃত্ত হই। দুঃখের বিষয় তখন আর শ্ৰীযুত অম্বুজনারায়ণ রায় চৌধুরী ও শ্ৰীযুত কৈলাসচন্দ্র মিত্র মহাশয়দ্বয় জীবিত ছিলেন না। সুতরাং ভগ্ন-হৃদয়ে আমি ইহা সঙ্কলনে আবার নিবৃত্ত হইবার উপক্রম করি। কিন্তু সেই সময় অবগত হইলাম যে শ্ৰীযুত নগেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী মহাশয় পুরাতন বহু বংশের ও রায়েরকাঠীর রাজবংশের ইতিবৃত্ত অবগত আছেন। তাঁহার নিকট আমার মনােগত অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। তিনি উৎসাহ সহকারে যাহা যাহা জানেন তাহা আমাকে জ্ঞাপন করেন ও তৎসঙ্গে তাহাদের বংশের প্রাচীন হস্তলিখিত ইতিহাসখানি আমাকে প্রদান করেন। তাহাতেই আমি এই গ্রন্থ-প্রণয়নে সমর্থ হইলাম, নচেৎ কোনক্রমেই পারিতাম না। v অদ্বৈতনারায়ণ রায় চৌধুরী মহাশয়ের পৌত্র শ্ৰীযুত নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর নিকটও ইহার • উপাদান বিষয়ে কতক সাহায্য পাইয়াছি এবং কলিকাতা সিটি কলেজের বাঙ্গলা ও সংস্কৃতের প্রধানতম অধ্যাপক শ্ৰীযুত উপেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বিদ্যাভূষণ শাস্ত্রী মহাশয় ইহার সঙ্কলনে আমাকে নানাপ্রকারে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। এ জন্য আমি ইহাদের সকলের নিকটে চির- কৃতজ্ঞ। সত্য ঘটনা লিপিবদ্ধ করিতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। কিন্তু মুদ্রাঙ্কনে স্থানে স্থানে ভ্ৰম প্রমাদ রহিয়াছে। সহৃদয় পাঠক- পাঠিকাগণ তাহা নিজ গুণে ক্ষমা করিবেন। মাধবনারায়ণের ফটোর জন্য আমি বিশেষ চেষ্টা করিয়াছিলাম। দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁহার কোন ফটো পাইলাম না। তবে তাহার পরিবারবর্গের মধ্যে যাহার যাহার ফটো ও দেবমন্দিরাদির ফটো যাহা পাইয়াছি তাহা পুস্তকে সন্নিবেশিত করিলাম। ভগবৎকৃপায় এক্ষণে “মাধবনারায়ণ” পুস্তকখানি জনসমাজে আদৃত হইলে কৃতার্থ হইব এবং পরিশ্রম সফল মনে করিব।
রায়েরকাঠীর রাজবংশের বংশ-তালিকা।
কান্যকুজাগত রমানাথ সেন হইতে প্রথম পর্যায় লেখা হইল।
(১ প) রমানাথ সেন
(২ প) পুরন্দর সেন
(৩ প) মাধবচন্দ্র সেন
(৪ প) রামনারায়ণ সেন
(৫ প) দিবাকর সেন
(৬ প) ভাস্কর সেন
(৭ প) শ্ৰীমান সেন
(৮ প) মালাধর সেন
(৯ প) হরিহর সেন
(১০ প) রামগােপাল সেন
(১১ প) শিবভদ্র সেন (দৈত্যারি সেন
হের সেন
(১২ প) যজ্ঞেশ্বর সেন
(১৩ প) শিবশঙ্কর সেন
(১৪ প)
রত্নেশ্বর সেন
বনমালী
গােপাল
(১৫ প) ভূঞিয়াকিঙ্কর রায়
(১৬ প) মদনমােহন
(১৭ প) • শ্ৰীনাথ
(১৮ ) রাম
No text on this page.
মাধবনারায়ণ < প্রথম পরিচ্ছেদ। জন্মভূমি ও বংশের পরিচয়। ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী মহর্ষি বাল্মীকি। বরিশাল জেলার অন্তর্গত রায়েরকাঠী গ্রাম রায়চৌধুরী-বংশীয় যে সকল কার্তিমান্ পুরুষের অশেষ যশােরশ্মি প্রভাবে বিশদ প্রতিষ্ঠা অর্জন করি- আছে, যাঁহাদের মহত্ত্ব, উদারতা, মহানুভবতা, বিদ্যোৎসাহিতা ও ধর্মপরা- য়ণতা গুণে রায়েরকাঠীর রায়চৌধুরা-বংশ সমাজে প্রভূত খ্যাতি লাভ করিয়াছে, যাঁহাদের আবির্ভাবে রায়েরকাঠী ধন্য ও তত্ৰত্য রায়চৌধুরী-বংশ গৌরব ও মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরােহণ করিয়াছে, মাধবনারায়ণ তাহাদের অন্যতম। তাহার আদর্শ জীবনের বিবরণ প্রত্যেক ব্যক্তিরই অবশ্য- জ্ঞাতব্য। এই মাধবনারায়ণেরই পূৰ্বপুরুষ কায়স্থ-কুলাবতংশ শ্রীরাম রায় চৌধুরী বন কাটাইয়া গ্রামের পত্তন করিয়াছিলেন বলিয়া এই স্থানের নাম রায়েরকাঠী হইয়াছে। মাধবনারারণ এই রায়েরকাঠী গ্রামের রায়চৌধুরী- বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
২ মাধবনারায়ণ গেজ বাদসাহদিগের আমােল হইতে বিশ্ববরেণ্য ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের সুবিশাল সাম্রাজ্য-পত্তনের সূচনাপর্যন্ত রায়েরকাঠী সমগ্র পূর্ববঙ্গের মধ্যে একটী বিশিষ্ট সমৃদ্ধিশালিনী নগরী বলিয়া সুপ্রসিদ্ধ ছিল। কাল- চক্রের বিচিত্র বিবর্তনে রায়েরকাঠী এক্ষণে একটা নিতান্ত নিঃস্ব দুরবস্থাপন্ন গ্রামে পরিণত হইয়া পড়িয়াছে। ইদানীং উহার স্থানে স্থানে ভগ্নপ্রাসাদমালার ইষ্টকরাশি, সংস্কারের অভাবে জীর্ণশীর্ণ দেবমন্দিরাবলী এবং পঙ্কপূর্ণ শুষ্ক প্রায় দীর্ঘিকাদি সুদীর্ঘ অতীতের ঐশ্বৰ্য্য ও সৌভাগ্যের সাক্ষিস্বরূপ বিদ্যমান। মােগলরাজত্বের শেষভাগে সুবে বাঙ্গালার শাসনকর্তা নবাব আলিবর্দি খাঁর প্রিয়তম দৌহিত্র নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরম সুহৃৎ আগা বাখর খাঁ যখন সেলিমাবাদ পরগণা অন্যায়পূৰ্ব্বক অধিকার করেন, তখন তিনি একটি গঞ্জ স্থাপনা করিয়াছিলেন। উহা তাহারই নামানুসারে বাখরগঞ্জ নামে অভিহিত হয়। ক্রমে ঐ গঞ্জ ব্যবসায়- বাণিজ্যাদির প্রধান কেন্দ্র হইয়া উঠে এবং একটা প্রসিদ্ধ নগরে পরিণত কালক্রমে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি বাখরগঞ্জে জেলা স্থাপন করেন। মাধব নারায়ণের পুণ্য-জন্মক্ষেত্র রায়েরকাঠী প্রথমে বাখরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত ছিল। পরে গভর্ণমেন্টের শাসন ও সংরক্ষণের সুবিধার জন্য সহরটি বাখরগঞ্জ * কাহারও কাহারও মতে সম্রাট গিয়াসুদ্দীন টোগলগ যখন বঙ্গ পরিদর্শনে আসিয়া- ছিলেন; তখন ঐ স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও অতুল উৰ্ব্বরতা দর্শনে মুগ্ধ হইয়া তাহার নৈক বান্ধবের নামে উহার ন্যমকরণ করিয়াছিলেন। আবার কেহ কেহ বলেন;—সমাই আলতামাদের জামাতা পাঠান সম্রাট গিয়াসুদ্দীন বুলবনের পুত্র সাহজাদা বাখর খা যখন বাঙ্গালার নবাব ছিলেন, সেই সময়ে তাহার নামানুসারে বাখরগঞ্জ নামক গঞ্জ স্থাপিত হইয়াছিল।
মাধবনারায়ণ হইতে বরিশালে স্থানান্তরিত হয়। রায়েরকাঠী তদবধি বরিশাল জেলার অন্তঃপাতী পিরােজপুর মহকুমার এলেকাভুক্ত একটি গণ্ডগ্রাম মাত্র। পিরােজপুর মহকুমা রায়েরকাঠীর অতি সন্নিকটে অবস্থিত। দামােদর নদ উভয়ের মধ্যে ব্যবধানমাত্র। এই নদ বঙ্গভাগ্যলক্ষ্মী বিশালসলিল পদ্মার অন্যতম উপনদ বলেশ্বর হইতে নির্গত হইয়া কালীগঙ্গা নাম্নী উপনদীর সহিত মিলিত হইয়াছে। রায়েরকাঠীর সমৃদ্ধিসময়ে দামােদর বিশাল- কলেবর তরঙ্গসমাকুল দুস্তর নদ ছিল। এক্ষণে উহা একটি সামান্য শীর্ণকায় পয়ঃপ্রণালীতে পরিণত হইয়া স্বীয় জরাজীর্ণ বার্ধক্যের পরিচয় প্রদান করিতেছে মাত্র। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মত একটি লৌহ সেতু উখিত হইয়া এক্ষণে রায়েরকাঠী ও পিরােজপুরের সংযােজক হইয়া রহিয়াছে। উত্তরে টেনা নদী, পূর্বে কালীগঙ্গা, দক্ষিণে দামােদর এবং পশ্চিমে বলেশ্বর ও নীমার খাল দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া রায়েরকাঠী পুরাকালের স্বভাবরক্ষিত পুরের ন্যায় সৰ্বরূপে সুরক্ষিত ছিল। রায়েরকাঠী শুদ্ধ একটী গ্রাম নহে, অনেকগুলি গ্রাম লইয়া উহা গঠিত হইয়াছিল। গ্রামের মধ্য বাহিয়া কয়েকটী সুপ্রশস্ত খাল লহরালীলা-বিলসিত হইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পল্লীগুলির স্বাস্থ্য ও শস্যসম্পং সুবিধান করিতে করিতে চারিদিকের নদনদীতে মিলিত হইয়াছিল। একদিন রায়েরকাঠী-নিবাসিগণ স্বাস্থ্যবলে বলীয়ান্ সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা জন্মভূমির ঐশ্বৰ্য্যবলে নিয়ত হর্ষোৎ- ফুল্ল থাকিয়া সর্বদা সৰ্ব্বদেশের জনগণের আদর্শ বলিয়া পরিগণিত হইতেন। কিন্তু কালের করাল বিবর্তনে এক্ষণে রায়েরকাঠী তাহার সমগ্র পূর্বতনী সৌভাগ্যলক্ষ্মীর সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসম্পং: হারাইয়া বিশ্ববিনাশক ম্যালেরিয়া, কলেরা, বসন্ত প্রভৃতি ব্যাধির কবলগত। প্রচণ্ড ব্যাধির ৪ মাধবনারায়ণ ফলত যে তাড়নে গ্রামবাসীর আর সেই হৃষ্টপুষ্ট দেহ, প্রফুল্ল বদনকান্তি, কর্মকুশলতা প্রভৃতি কিছুই নাই। পয়ঃপ্রণালীগুলি শুষ্ক হইয়া যাওয়ায় গ্রামের উর্বরতাও একেবারে যাইতে বসিয়াছে। সুপেয়-স্বাদু-সলিলনিকেতন বায়েরকাঠী এক্ষণে বিস্বাদ লবণাক্ত অস্বাস্থ্যকর সলিলের নিলয় হইয়া পড়িয়াছে। গ্রামের গৌরব কৃষককুল নিৰ্ম্মলপ্রায় ; শ্রমিকদল দুষ্প্রাপ্য। রায়েরকাঠী একদিন দশ সহস্রাধিক অধিবাসীতে সর্বদা পরিপূর্ণ থাকিয়া একটা সুসমৃদ্ধিশালিনী নগরীরূপে পূর্ববঙ্গের সর্বত্র আদর্শ পুরী বলিয়া পরিগণিত হইত, যথায় নদ নদী খাল ও পয়ঃপ্রণালী সুব্যবস্থিত থাকায় নানা দেশের পণ্যপূর্ণ তরণীমালায় মণ্ডিত হইয়া হাট ও বাজারগুলি সর্বদা সৰ্ব্বদেশীয় জনবৃন্দের প্রীতিকলরােলে মুখরিত হইত, যথায় রাজ- বাড়ীর কাছারীগুলি শতসহস্ৰ কৰ্মার্থী পুরুষে পরিবৃত হইয়া প্রভাত হইতে নিশীথ কাল পর্যন্ত লােক-সমাগমে পরিপূরিত থাকিত। হায় সেখানে আজ তাহার কিছুই নাই ! আছে কেবল শূন্য হাট, বিস্বাদ ও অস্বাস্থ্যকর সলিলযুক্ত শুষ্কপ্রায় খাল, পঙ্কময় নদীতট, আর সর্বহারী বিভীষণ শানঘাট পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে, রায়েরকাঠী বলিলে মাত্র একটা গ্রাম বুঝায় না। পুণ্যতােয়া কালীগঙ্গার পশ্চিম তীর হইতে বিশালকায় ভৈরবরাবী বলেশ্বরের পূৰ্ব্বতীরস্থিত যাবতীয় গ্রামগুলিই সৰ্ব্বত্র রায়েরকাঠী বলিয়া দেশ-বিদেশে সুপরিচিত। বস্তুতঃ ছত্রজিংপুর, শিকারপুর, ঝাটকাঠী, কুমারখালি, ঘােট খলিশাখালি, বড় খলিশাখালি, নরখালি, ওধনকাঠী, লখাকাঠী, মূলগ্রাম, বনবাড়ী, ব্রাহ্মণকাঠী, খুমরীয়া, মুক্তারকাঠী, আলামকাঠী, পাহাডুবী প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামগুলির মধ্যবর্তী রায়েরকাঠী তাহার ঐশ্বর্যের দিনে তারকা-মালা-পরিবেষ্টিত নিশামণির ন্যায় বিরাজিত ছিল। ইতিহাস-প্রসিদ্ধ স্বাদশ ভূঞিয়ার অন্যতম কিঙ্কর রায়ের প্রপৌত্র রাজা রাম রায় মাধবনারায়ণ প্রথম আবাদ করাইতে আরম্ভ করিয়াছিলেন বলিয়া উহার রায়েরকাঠী ( রায়ের কাটী) আখ্যা হয়, ইহা পূর্বেই বলা হইয়াছে ।* এই স্থান পূর্বে সুন্দরী, কেওয়া, গরাণ প্রভৃতি বন্যবৃক্ষে পরিপূর্ণ ও ব্যাঘ্র, মহিষ প্রভৃতি হিংস্র জন্তুর আবাসভূমি ছিল। মহাত্মা ভূঞিয়া কিঙ্করের পুত্র মদন মােহন, তাহার পুত্র শ্রীনাথ ও পৌত্র শ্রীরাম ক্রমে ক্রমে এই সব দেশে নানা সমাজ হইতে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, রজক, পরামাণিক ও বিবিধ শ্রেণীর হিন্দু ও মুসলমানদিগকে আনয়ন করিয়া কাহাকেও নিষ্করে এবং কাহাকেও বা অল্প করে তাহাদের জমিদারী সেলিমাবাদ প্রভৃতি পরগণার নানাস্থানে বাস করাইতে আরম্ভ করেন। রায়েরকাঠী সেলিমাবাদ পরগণার অন্তর্গত। মােগলসম্রাট আকবরের পুত্র সাহজাদা সেলিমের নামানুসারে এই পরগণার নাম সেলিমাবাদ হয়। ঢাকা নগরী পূর্ববঙ্গের রাজধানী ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে উহার নাম জাহাঙ্গীরনগরে পরিবর্তিত হয়। সেলিমাবদ পরগণা ঢাকার সুবাদার বা নবাবের এলেকাভুক্ত ছিল। মহাত্মা রাজা শ্রীনাথ নবাবের নিকট হইতে সেলিমাবাদ প্রভৃতি চতুর্দশ পরগণার মালেকানাস্বত্বের সনদ প্রাপ্ত হইয়া উহাদের শাসন-সংরক্ষণে নিয়ােজিত হন। ক্রমে তাঁহার বংশধরগণ পরগণাগুলিকে শাসন-সংরক্ষণের সুবিধার জন্য এরূপ ভাবে মিলিত করিয়া ফেলেন যে, এখন আর এক একটী পরগণার পৃথক সীমানির্দেশের চেষ্টা বিফল। আজকাল জমীদারীর কাগজপত্রে “পরগণে সেলিমাবাদ ও গয়রহ” বলিয়াই লিখিত হইয়া * ইহার অধিকাংশ স্থান নবাব-প্রদত্ত শ্রীরাম রায়ের তালুকের অন্তর্গত। ইহা ব্যতীত স্যান্য স্থানেও শ্রীরাম রায়ের তালুক আছে।
মাধবনারায়ণ রায়েরকাঠীর রায়চৌধুরী বংশের আদিনিবাস দেগঙ্গা পূৰ্বে হুগলির অন্তর্গত ছিল। এক্ষণে উহা ২৪ পরগণার অন্তর্গত হইয়াছে। এই বংশ দক্ষিণরাঢ়ীয় গােষ্ঠীপতি মৌলিকরাজ বলিয়া সৰ্বত্ৰ সুবিদিত। বস্তুত দক্ষিণ রাঢ়ীয় কায়স্থ সমাজে এমন লােক কেহই নাই যিনি রায়েরকাঠীর রায়চৌধুরীদের পুরাতন কীর্তি-কথা অবগত নহেন। পূৰ্বে সেলিমাবাদ প্রভৃতি পরগণা দুৰ্বত্ত আরাকানী, পুর্তগীজ ও পাঠান দস্যদিগের অত্যাচারে একরূপ জনশূন্য হইয়া পড়িয়াছিল। মুদুর দেগঙ্গা কিংবা ভুঞিয়া রাজকিঙ্করের পরিগৃহীত আবাসভূমি জগদীশ- পুর হইতে জলযানে অসিয়া ঐ সব দুৰ্ম্মদ দস্যুদলন করিয়া দেশরক্ষা বড়ই অসুবিধাজনক ছিল। রাজা শ্রীরামের মৃত্যুকালে তিনি তাঁহার পুত্র রুদ্র- নারায়ণকে এতদ্দেশে নিয়ত বাসের জন্য বলিয়াছিলেন। পিতৃভক্ত পুত্র পিতার ঔদ্ধ দৈহিক ক্রিয়াসমাপনান্তে স্থায়িবাস-মানসে প্রথমতঃ তাহার এলেকাভুক্ত চিরলিয়া পরগণার অন্তর্গত কেঁাদলা গ্রামের সন্নিকটে স্থিত একটী রমণীয় স্থানে বসতি-বাটী নিৰ্মাণাভিলাষী হইয়া উহার চতুর্দিকে গড় খনন করিতে আরম্ভ করেন। কতিপয় মাসান্তে প্ৰােক্ত মহালে বাস করিয়া অন্যান্য পরগণাগুলির শাসন ও সংরক্ষণ অসুবিধাজনক দেখিয়া সেলিমাবাদ পরগণার অন্তর্গত একটি সুচারু স্থান মনােনীত করিয়া তথায় কাহারী-বাটী নির্মাণ করাইয়া বাস করিতে লাগিলেন। কিন্তু ঐ স্থানে আপাততঃ পােয্য পরিবারবর্গ আনয়ন স্থগিত রাখিয়া গ্রামটিকে জন-মানব- পরিপূরিত করিবার জন্য বিবিধ শ্রেণীর ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, ধােপা নাপিত, মুসলমান প্রভৃতিকে অল্প করে কিংবা বিনা জমি বণ্টন পূৰ্ব্বক বসবাস করাইতে লাগিলেন। পূর্বে কোদলার সন্নিকটে যে স্থানে গড় কাটাইয়াছিলেন ইহার নাম খাসবাটি রাখিলেন এবং যে স্থানে বাটানিৰ্মাণ করিয়া বাস করিতেছিলেন উহার নাম রাজা রুদ্রনারায়ণের মাধবনারায়ণ ৭ মহিমা-খ্যাপনার্থে রাজাপুর হইল। রাজাপুরে কাছারী করিবার সময়ে এক রজনীতে রাজা রুদ্রনারায়ণের প্রতি স্বপ্নাদেশ হইল, “ দক্ষিণে দামােদর নদ, পূৰ্বে কালীগঙ্গা নদী এবং পশ্চিমে বলেশ্বর ও নীমার খাল দ্বারা বেষ্টিত ভূভাগে যাইয়া চিরবাস করিলে দৈনন্দিন শ্রীবৃদ্ধি হইবে।” তদনুযায়ী রাজা রুদ্রনারায়ণ নির্দিষ্ট ভূভাগে গমন করিয়া আবাদ করাইতে আর করিলেন। রাজা যে স্থানে উঠিয়া প্রথম আবাদ করাইয়াছিলেন তাহার নাম রাখিলেন মুলগ্রাম এবং ঐ স্থানের যে দিকে কাছারী-বাটী নির্মিত করিলেন তাহার নাম হইল নূতন বাটী। তিনি আবাদকালীন ধীবরদিগের জালে কালীগঙ্গা নদীতে একখানি পস্তর প্রাপ্ত হন। পরম বিস্ময়ের বিষয় এই যে, সেই রাত্রেই রাজা রুদ্রনারায়ণের প্রতি স্বপ্নাদেশ হইল, “নদীগর্তে প্রাপ্ত প্রস্তর দ্বারা কালীমাতার মূর্তি প্রস্তুত করাইয়া প্রতিষ্ঠিত কর, তােমার বংশ এস্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত হইবে।” ঠিক সেই রাত্রিতেই রাজপুরােহিত রূপচক্রবর্ত্তী মহাশয়ও কূৰ্মচক্র করিয়া কালিকা-বিগ্রহ এতিষ্ঠার নিয়ম ও ক্রমপদ্ধতি সমুদায় স্বপ্নযােগে অবগত হন। পুরাে হিত মহাশয় প্রভাতে শয্যাত্যাগ করিয়া স্বপ্নদৃষ্ট সমুদয় বৃত্তান্ত রাজা নারায়ণের শ্রুতিগােচর করিলেন। রাজাও তাঁহার স্বপ্নবৃত্তান্ত তাঁহাকে বলিলেন। অতঃপর মুর্তি-নির্মাতা ভাস্করের বিষয় আলােচিত ইতে হইতে হঠাৎ এক ব্যক্তি আসিয়া কর্মঠ ভাস্কর বলিয়া আত্ম- পরিচয় দিল। রাজাও দৈবপ্রেরিত মনে করিয়া সেই ভাস্করকে প্রস্তরখণ্ড প্রদানপূর্বক দেবী কালিকার বিগ্রহ নিৰ্মাণ করিতে আদেশ করিলেন। তার গল্পকালে শাস্ত্রসঙ্গত মহাকালােপরি দণ্ডায়মানা পরমসুন্দরী কালিকামূর্তি ও দেবীর দুই পার্শ্বে দুই শিবলিঙ্গ নির্মিত করিয়া রাখিয়া কোথায় যে অদৃশ্য হইয়া গেল বহু অনুসন্ধানেও উহার তত্ত্ব নির্ণীত হইল না। ইহাতে রাজা বড়ই চিন্তাকুল হইয়া পড়িলেন। পরিশেষে ভগবতী মাধবনারায়ণ কালিকাদেবী রাত্তিতে স্বপ্নযােগে দেখা দিয়া বলিলেন-“বৎস, তােমার ধর্মনিষ্ঠা ও সত্যপরায়ণতায় আমি পরম প্রীত হইয়া তােমাকে স্বপ্ন প্রদান করিয়া এখানে আনিয়াছি এবং আমায় ইচ্ছায়ই এই কালীমূর্তি নির্মিত হইয়াছে। তােমার চিন্তিত হইবার কোনই কারণ নাই। এই বিগ্রহ এখানে এতিষ্ঠিত করিয়া বংশপরম্পরাক্রমে সুখে স্বচ্ছন্দে বাস কর। কোনও ভীতি বা আশঙ্কার কারণ নাই। তুমি যথন যে বিপদে পড়িবে কিন্তু আমি রক্ষা করিব। তােমার বংশধরগণও সুখে ও স্বচ্ছন্দে থাকিবে। কৌলিক আচার ও ধর্মাচরণে ভ্রষ্ট হইলেই উহাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।” রাজা প্রাতঃকৃত্য সমাপনান্তে পুরােহিত ও কর্মচারীদের তাবৎ স্বপ্নবৃত্তান্ত আপন করিলেন। জগন্মাতা কালীমূৰ্ত্তি অদ্যাপি রায়েরকাঠীতে বিদ্যমান আছেন। আব্রাহ্মণ সৰ্বশ্রেণীর লােকের পূজার 'ও ভােগদানের সুবিধার ন্য বিগ্রহ পুরােহিত রূপচক্রবর্তীর নামে প্রতিষ্ঠিত হইল। পুরােহিত রূপচক্রবর্তী এখানে যােগসিদ্ধ হইয়াছিলেন বলিয়া রায়েরকাঠীর দেবীবিগ্রহ সিন্ধেী বলিয়া সর্বত্র বিদিত। রাজা রুদ্রনারায়ণ নদীর তীর হইতে গ্রামের চারিদিক মুসলমান অধিবাসীদিগের যারা বেষ্টিত করিয়াছিলেন। মুসলমানদিগের পর নমঃশূদ্র, তার পর বাজীবী, কুম্ভকার, কর্মকার, তৈলিক, মালাকার, শিবিকা-বাহক, চর্মকার, যােগী, রজক ও পরামাণিক, পরে ব্রাহ্মণ এবং একদিকে বঙ্গজ ফায় এবং মধ্যস্থলে রাজবাটী প্রতিষ্ঠিত করিলেন। রাজবাড়ীর চারিদিকে অক্ষিণ রাঢ়ীয় কায়স্থ কুলীন মহাশয়দের বাসস্থান নির্দিষ্ট হইল। রাজবাড়ীর পশ্চিমে দক্ষিণ রাঢ়ীয় মৌলিক কায়স্থ দেওয়ান মহাশয়দের বাটাকরাইয়া ছিলেন। রাজগুরু পূজ্যপাদ ষষ্ঠীদাস ন্যায়ালঙ্কার মহাশয় সপরিবারে জবাড়ীর পূর্বদিকে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। এইরূপে রাজা রুদ্রনারায়ণ ক্রমে রচিত বাসস্থানকে একটা সৰ্বাঙ্গসম্পন্ন নগরীতে উন্নীত মাধবনারায়ণ করিয়াছিলেন। পুষ্করিণী, দীঘিকা, দেবালয়, পান্থশালা, আয়ুর্বেদ- চিকিৎসালয়, সংস্কৃত চতুষ্পঠী প্রভৃতিতে পরিশােভিত রাজার রায়েরকাঠী সৰ্বত্ৰ সুবিখ্যাত হইয়া উঠিল। মুসলমান ও নমঃশূদ্রগণ লাঠিয়ালের কাৰ্য্য করিত এবং অস্ত্রচালনা ও মল্লযুদ্ধ শিক্ষা করিত। চতুর্দিকে নদীক্ষিত হওয়ায় রায়েরকাঠীর জন্য আর কৃত্রিম গড়খননের আবশ্যকতা হইল না।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। মাধবনারায়ণ বঙ্গাব্দ ১২৪০ সালে রায়েরকাঠী নিজ বাটীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাহার জনক মহেন্দ্রনারায়ণ এবং জননী মহেন্দ্রনারায়ণের দ্বিতীয় পত্নী অম্বিকা চৌধুরাণী । মহেন্দ্রনারায়ণের প্রথম পত্নী তারা- সুন্দরী গৌরসুন্দরীনাম্নী এক কন্যা ও রাজেন্দ্রনারায়ণ নামে এক পুত্র রাখিয়া অকালে পরলােক গমন করেন। সাধ্বী পত্নীর আকস্মিক অকালমৃত্যুতে মহেন্দ্রনারায়ণ বড়ই বিপন্ন হইয়া পড়েন। এক দিকে বিপুল দায়িত্বপূর্ণ জমিদারি-সংক্রান্ত কাৰ্য-কৰ্ম্ম-পৰ্যবেক্ষণ, অপর দিকে সুবৃহৎ পরিবারের বিবিধ কর্তব্য-পালন এবং মাতৃহীন কন্যা ও পুত্রের লালন- পালন, সর্বোপরি দারুণ পত্নী-বিয়ােগ শােক—এই সকল কারণে বস্তুত মহেন্দ্রনারায়ণের গৃহ হতশ্রী হইয়া পড়িল , অতঃপর নিতান্ত অনন্যোপায় হইয়া মহেন্দ্রনারায়ণ বাঘুটিয়া-নিবাসী কনিষ্ঠ কুলীন জগনােহন ঘােষ মহাশয়ের সর্বসুলক্ষণা কন্যা শ্ৰীমতী অম্বিকার পাণিগ্রহণ করেন। অম্বিকা বাস্তবিকই অম্বিকা, রূপে ও গুণে অনুপমা এবং দয়া-মায়ার প্রতিমারূপিণী ছিলেন। তাঁহার আগমনে মুহমান মহেন্দ্র-নিকেতন প্রীতির আলােকে ও স্বস্তির বাতাসে আবার প্রফুল্ল হইয়া উঠিল। কালক্রমে অম্বিকা চৌধুরাণীর গর্ভে চারি কন্যা ও তিন পুত্র জন্ম গ্রহণ করেন। গৃহলক্ষ্মী পুত্র ও কন্যাদের দ্বারা পূর্ণ করিয়া গৃহের শােভা শতগু সংবর্ধিত করিলেন।
মাধবনারায়ণ মহেন্দ্রনারায়ণও নবপত্নীর অপার্থিব পবিত্র প্রেমে, সাধারণ গৃহ-রক্ষায় নৈপুণ্যে এবং সপত্নী-পুত্রকন্যাগণের লালন-পালনে নিদারুণ পত্নীশােক ক্রমশঃ বিস্মৃত হইতে লাগিলেন। অম্বিকার প্রথমা কন্যা সখীসুন্দরী, দ্বিতীয়া হরসুন্দরী, তৃতীয়া বামা- সুন্দরী এবং চতুর্থ ক্ষমাসুন্দরী। পুত্রদিগের মধ্যে প্রথম প্রহ্লাদ-নারায়ণ ১২৫০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন এবং যৌবনের প্রারম্ভে দারগ্রহণের পূর্বেই ১৭৬৭ শকে (বাঙ্গালা ১২৫২ সালে) কালকবলে নিপতিত হন। প্রলাদ- নারায়ণ অতি সুপুরুষ ছিলেন। দ্বিতীয় মাধবনারায়ণ ও তৃতীয় নরনারায়ণ সুদীর্ঘ কাল সংসার-ধৰ্ম্ম পালন করেন। প্রথম পক্ষেব পুত্র রাজেন্দ্রনারায়ণ অপুত্রক ছিলেন। সারদাসুন্দরী নাম্নী একমাত্র কন্যাই তাহার বংশধরী ছিলেন। প্রহলাদনারায়ণের মৃত্যুর দুই বৎসর অতীত হইতে না হইতেই ১৭৬৯ শকাব্দে (বাঙ্গাল ১২৫৪ সালে ) আশ্বিন মাসে মহানবমী তিথিতে রাজেন্দ্রনারায়ণ পরলােক গমন করেন। দ-তস্করগণ তঁাহার শাসন-ভয়ে সর্বদা শঙ্কিত থাকিত। তিনি একটি হাট বসাইয়াছিলেন ; উহার নাম রাজার হাট ছিল। এই হাটের বালাম চাউলের সবিশেষ খ্যাতি ছিল। উপর্যুপরি দুই পুত্র-শশাকে মহেন্দ্রনারায়ণ অতিশয় কাতর হইয়া পড়িলেন। তাহার শরীর ভগ্ন হইল, বিপুল মানসিক শক্তি বিলয় প্রাপ্ত হইল। প্রহ্লাদের শােক-সম্বরণে সমর্থ হইলেও কুল-প্রদীপ জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজেন্দ্রের শােক আর তিনি সহিতে পারিলেন না। দুই বৎসর অতীত হইতে না হইতেই ১৭৭১ শকাব্দে ( বাঙ্গালা ১২৫৬ সালে ১লা শ্রাবণ আষাঢ়ী কৃষ্ণ একাদশী তিথিতে ৬৫ বৎসর বয়সে মহাপুরুষ মহাপ্রস্থান করিলেন। ---মহেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী-বংশের মধ্যে একজন ক্ষমতাশালী ও সম্পত্তিশালী জমিদার ছিলেন। তিনি অপত্যনিৰ্বিশেষে প্রজাপুঞ্জের পালনে যেমন বিচক্ষণ ছিলেন, শাসন-সংরক্ষণেও সেইরূপ তেজী পুরুষ • মাধবনারায়ণ ছিলেন। এই বিচক্ষণতা ও তেজস্বিতা-গুণে তিনি বিপুল সম্পত্তি অর্জন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। মহেন্দ্রনারায়ণ যেরূপ সুশ্রী ও গৌরকায় পুরুষ ছিলেন সেইরূপ অসাধারণ শারীরিক বলেও বলীয়ান ছিলেন। সর্বোপরি সত্যবাদিতায় তিনি একজন আদর্শ পুরুষ ছিলেন। সুচিক্কণ ভ্রমর-নিন্দিত কেশরাশি তাহার পৃষ্ঠদেশ পর্যন্ত বিলম্বিত ছিল। * দীর্ঘ বাহু, গৌরকলেবর, প্রশস্তললাট মহেন্দ্রনারায়ণের সৌন্দর্যের প্রশংসা সকলেই করিত এবং তাহার জ্ব-যুগ্ম-শশাভিত নয়নদ্বয় ও সুবিশাল বক্ষস্থল তঁাহার বীরােচিত ভাব ব্যক্ত করিত। মহেন্দ্রনারায়ণের নিত্য হাস্যময় মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ সকলে শুভ বলিয়া মনে করিত। কন্যাদায়, মাতৃ-পিতৃ শ্রাদ্ধদায়, কি যজ্ঞােপবীত কিংবা অন্য কোন গুরুতর দায়গ্রস্ত হইয়া যাহারা মহেন্দ্রনারায়ণের নিকট উপস্থিত হইতেন, তিনি জাতিনিৰ্বিশেষে তাহাদিগকে বিপদ হইতে উদ্ধার করিতে কুণ্ঠাবােধ করিতেন না। এরূপ পরােপকারী দাতার মৃত্যুতে এদেশস্থ ও অন্যদেশস্থ অনেকেই অবর্ষণ করিয়াছিলেন। দানবীর মহেন্দ্রনায়ায়ণ এইরূপ অবিরত বদান্যতায়, জ্ঞাতি-বিরােধে এবং অন্যান্য জমিদারদিগের সহিত বিরােধে প্রায় দুই লক্ষ টাকা ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়েন। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছায় ঋণ-পরিশােধের ব্যবস্থা করিবার সময়েই কঠোর কাল তাহাকে ইহলােক হইতে অপসারিত করেন। মহেন্দ্রনারায়ণের জীবদ্দশাতেই তাহার প্রথম পক্ষের পুত্র ও কন্যাগণের শুভবিবাহকাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছিল। প্রথম পক্ষের প্রথমা কন্যা গৌরসুন্দরীর বিবাহ দেন যশােহর জেলার অন্তর্গত বাঘুটিয়া-নিবাসী প্রকৃত কুলরাজ * তখনকার দিনে মস্তকে দীর্ঘ কেশ রাখিবার প্রথা ছিল। ভদ্রলােকের ভিতরে এ প্রথার ব্যতিক্রম ছিল না। এমন কি রাজপুতনার ক্ষত্রিয় রাজগণ মস্তকে দীর্ঘকেশ ধারণ করিতেন। এখনও শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রথা বিদ্যমান আছে।
মাধবনারায়ণ চণ্ডীচরণ ঘােষের পুত্র কৃষ্ণচরণ ঘােষের সহিত এবং পুত্র রাজেন্দ্র নারায়ণের বিবাহ দেন যশােহর জেলার অন্তর্গত জঙ্গলবাদাল-নিবাসী শম্ভুচন্দ্র বসুর কন্যা শিবশঙ্করীর সহিত। শিবশঙ্করীর পুত্রসন্তান না হওয়ায় খুলনা জেলার অন্তর্গত গােটাপাড়া-নিবাসী মধ্যাংশ দ্বিতীয়ের পাে কুলীন মামাদ বসুর কন্যা দয়াময়ীর সহিত পুনরায় বিবাহ দিলেন। দ্বিতীয় পক্ষের তৃতীয় কন্যা বামাসুন্দরী বিবাহের পূর্বেই ইহলােক ত্যাগ করিয়া ছিলেন। দ্বিতীয় পক্ষের প্রথমা কন্যা অনুপমরূপলাবণ্যবতী সখীসুন্দরীর বিবাহ দিয়াছিলেন হুগলি জেলার অন্তর্গত কোন্নগর-নিবাসী সহজ মুখ্য কুলীন কালীপ্রসন্ন ঘােষ মহাশয়ের সঙ্গে ; দ্বিতীয়া কন্যা সৰ্বাঙ্গসুন্দরী হর- সুন্দরীর সহিত হুগলি জেলার দশঘরা-নিবাসী কোমল মুখ্য কুলীন ঈশান- চন্দ্র ঘােষের পুত্র উমাচরণ ঘােষ মহাশয়ের শুভবিবাহকাৰ্য্য সম্পন্ন করেন; চতুর্থী দুহিতা সুশীলা ক্ষমাসুন্দরীকে কোন্নগর-নিবাসী কোমল মুখ্য কুলীন হরিমােহন ঘােষ মহাশয়ের সহিত বিবাহ দিলেন। এই সকল বিবাহ উপলক্ষে মহেন্দ্রনারায়ণ জামাতা ও কন্যাদিগকে যেমন বহুমুল্য বস্ত্রালঙ্কার প্রদান করিয়াছিলেন, তদনুরূপ ভােজন এবং আমােদ-প্রমােদ ও বাজি-বাজনা ইত্যাদিতেও প্রচুর অর্থব্যয় করেন। দ্বিতীয় পক্ষের পুত্রদ্বয় নাবালক থাকা হেতু মহেন্দ্রনারায়ণ তাহাদিগের শুভবিবাহকাৰ্য্য সম্পাদন করিয়া যাইতে পারেন নাই। প্রথম পক্ষের কন্যা ও জামাতাকে তাহার তেলিখালি নামক তালুক হইতে বাৎসরিক এক হাজার টাকা আয়ের সম্পত্তি প্রদান করেন।* অন্যান্য জামাতা ও কন্যাদিগের প্রত্যেককে তাহার জোলাগাতি ও চিংড়াখালি এবং নাগুলি ও মুক্তার কাঠি নামক * এই সম্পত্তি এখনও উক্ত ঘোষ মহাশয়ের বংশধর বাঘুটিয়া-নিবাসী শ্ৰীযুক্ত রাজেন্দ্র- শাল ঘােষ প্রতি ভোগদখল করিতেছেন।
১৪ মাধবনারায়ণ তালুক হইতে পাঁচ শত টাকা করিয়া বাৎসরিক আয়ের সম্পত্তি দিয়াছিনে কীর্তিমান কিঙ্কর ভূঞিয়ার বংশে জ্যেষ্ঠ-গৃহে মাধবনারায়ণ জন্মগ্রহণ করেন। তখন তাঁহার পিতা মহেন্দ্রনারায়ণ ও অগ্রজ রাজেন্দ্রনারায়ণ পূর্ণ প্রতাপবা, জননী অম্বিকা চৌধুরাণী, ভগিনীত্রয় ও অন্যান্য আত্মীয়- স্বজনগণে গৃহ পরিপূর্ণ। এই সময়ে তাহার জন্ম হওয়ায় গৃহমধ্যে কিরূপ প্রীতি ও উৎসবের উৎস সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা কেবল কল্পনার বিষয়। অন্নপূর্ণা-মূর্তি জননী অম্বিকার অঙ্কমধ্যে নবােদিত শশিকলার ন্যায় শিশুকে বিজিত দেখিয়া পিতা কি অপার অপার্থিব প্রীতি-পারাবারে নিমগ্ন হইয়া ছিলেন তাহা কল্পনাতীত। অগ্রজ ও সহােদরাগণ অপার আনন্দোৎসবে চারিদিকে ছুটিয়া বেড়াইতেছিলেন; এমন কি নব অতিথির আগমনে গৃহমধ্যে কি সুখ-সুধাসাগর উথলিত হইয়াছিল তাহা বর্ণনার অতীত, শুধু প্রণিধানযােগ্য। ঢাক, ঢােল, টিকারা, কাড়া, শানাই প্রভৃতির উন্মাদন বাদ্য, স্তব, স্তোত্র, সঙ্গীত প্রভৃতির মধুর ধ্বনি, প্রভূত অন্নবস্ত্র ও ধনরতুবিতরণ এবং সংখ্যাতীত লােকজনের প্রীতি-কলরবে বড় হিস্যা কয়েক দিন যাবৎ যে কিরূপ পরিপূরিত ছিল তাহা বলাই বাহুলা। । দ্বিতীয় পক্ষের ক| সখীসুন্দরী ও ক্ষমাসুন্দরীর ওয়ারিসগণ উক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া যান। কিন্তু হরসুন্দরীর অন্য কোনও ওয়ারিস না থাকায় তাহার মৃত্যুর সময়ে তিনি তাঁহার সম্পত্তি নরনারায়ণ রায়চৌধুরীর কন্যা কুসুমকুমারীকে দান করিয়া যান।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ মহেন্দ্রনারায়ণের পরলােক-প্রাপ্তির পর তাঁহার নিতান্ত হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধুগণ তাহার পুত্রযুগলকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তঁাহার এষ্টেট গুরুতর ঋণভার- গ্রস্ত দেখিয়া বড়ই চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। অম্বিকা চৌধুরাণী দেবী অন্নপূর্ণার ন্যায় নিরাশ্রয়ের আশ্রয় ছিলেন বটে, কিন্তু বিষয়-কাৰ্য্যের কিছুই জানিতেন না; বিশেষতঃ আশ্রয়-শাল-তরুর নিপাতে নাবালক পুত্রদিগকে লইয়া তিনি বড়ই বিপন্ন হইয়া পড়িলেন। তখন স্বর্গীয় রাজার* নিতান্ত হিতকাজী সুহৃৎ ভূকৈলাসের রাজা বাহাদুর সত্যশরণ ঘােষাল, বরিশালের ডেপুটী কলেকটর রেলি সাহেব, কাউখালি সব ডিভিশনের মুসেফ শ্ৰীযুক্ত গােবিন্দচন্দ্র বিদ্যারত্ন ও জজ কোর্টের উকীল মৌলবী তােফেল মহম্মদ মহেন্দ্রনারায়ণের এষ্টেট কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের হস্তে প্রদান করিয়া উহা রক্ষা করিবার জন্য চেষ্টিত হইলেন। এদিকে কর্মচারিগণ * যদিও রায়েরকাঠীর রায়চৌধুরীদিগের রাজা উপাধি রাজা জয়নারায়ণ হইতে চিরতরে বিলুপ্ত হইয়াছিল, তথাপি পরগণশুদ্ধ লােক, এমন কি, ভিন্ন পরগণার লােকেরাও উহা- দিগকে রাজা বলিয়াই সম্বােধন করেন। এই জেলার ডিপুটী ও মুনসেফ বাবুরা, কি অন্যান্য ব্যক্তিরাও এখনও ইহাদিগকে রাজা বলিয়া সম্বােধন করেন এবং ইহাদিগের বাটীকে রাজবাটী বলিয়া থকেন। । তিনি পরে বরিশালের সদর আলা (সাব জজ) পদে উন্নীত হন।
মাধবনারায়ণ দেখিলেন, এষ্টেট কোর্ট অফ ওয়ার্ডসে যাইলে তাহাদের অর্থাগমের উপায় ও প্রভুত্ব সকলই চলিয়া যায়, এই তাহারা উহা যাহাতে কোর্ট অফ ওয়ার্ডস-ভুক্ত না হয় তাহার জন্য নানাবিধ ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন। গ্রামের দুই চারিজণ সেকালের বৃদ্ধ—যাঁহারা এখনও জীবিত আছেন, তাঁহারা বলিয়া থাকেন যে, দুষ্ট কৰ্মচারিগণ যখন দেখিলেন, এষ্টেট কোট অফ ওয়ার্ডসের হাত হইতে কিছুতেই রক্ষা করিতে পারিতেছেন , তখন তাহারা রাণী অম্বিকা চৌধুরাণীর নিকটে গিয়া তাহাকে বুঝাইলেন, রাজার সম্পত্তি কোট অফ ওয়ার্ডসে যাইলে রাজাবাবুদের ঢাকায় লইয়া যাইবে, রাণীমা আর তাহাদিগকে দেখিতে পাইবেন না, এমন কি, দেহ-ত্যাগের পর মুখাগ্নিকাৰ্যও পুত্রগণ দ্বারা হইবে না। তার পর বিষয়- সম্পত্তিও আর রাজাবাবুরা কখনও ফিরিয়া পাইবেন না। পুত্রবৎসলা ধর্মপ্রাণা সরলহৃদয়া রাণী অম্বিকা চৌধুরাণী স্বার্থপর দুরাত্ম। কৰ্মচারীদিগের দুরভিসন্ধি বুঝিতে না পারিয়া তাহাদের কথায় বিশ্বাস স্থাপনপূর্বক এষ্টেট কোট অফ ওয়ার্ডসে দিবার প্রতিপক্ষে দণ্ডায়মান হইলেন। পুত্র-বিচ্ছেদ ও স্বর্গীয় পতির বিষয়-সম্পত্তি চিরতরে সরকার বাহাদুরের হস্তগত রাখা তাঁহার পক্ষে নিতান্ত অসহ হইল। সুহৃগণও এষ্টেট কোট অফ ওয়ার্ডসে প্রদানে রাণীমার অমত জানিয়া উহা হইতে বিরত হইলেন। সুতরাং মাধব-জননী রাণী অম্বিকা নাবালকদিগের অভিভাবিকা হইলেন এবং মন্দমতি দুষ্ট কর্মচারীদিগের ষড়যন্ত্র সিদ্ধ হইল। ইহার ফলে তাহাদের নির্বিবাদে অসদুপায়ে অর্থাগমের পথ পরিষ্কৃত হইল। রাণী অম্বিকা যথা সময়ে স্বর্গগত স্বামীর আত্মশ্রাদ্ধ বংশানুক্রমিক নিয়মে পুত্রদিগের দ্বারা সম্পাদিত করাইলেন। এই শ্রাদ্ধ উপলক্ষে গো, হস্তী, শিবিকা, নৌকা, শালগ্রাম, স্বর্ণরৌপ্যনির্মিত যোড়শ্ন দান ও বৃযােৎসর্গ মাধৰনারায়ণ ১৭ । - পূর্ণোপচারে হইয়াছিল। কাশী, কাঞ্চী, মিথিলা, দ্রাবিড়, নবদ্বীপ এবং বঙ্গের অন্যান্য দেশবাসী পণ্ডিতমণ্ডলীকে নিমন্ত্রণ করিয়া তাঁহাদের যাবতীয় পাথেয় ও ২০ টাকা হারে দাশ করিলেন এবং ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও নানা শ্ৰেণীস্থ লােকদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া পরিতােপূর্বক ভােজন করাইলেন। এতদ্ব্যতীত গরীব-দুঃখীদিগকেও প্রচুর অর্থদান ও ভােজন করাইয়া মুক্ত আত্মার আঙ্গকৃত্য সমাপন করিলেন। রাণী অম্বিকা স্বামীর শ্রাদ্ধাদি কাৰ্য্য সমাপন করিয়া পুত্রদিগের শিক্ষার অন্য প্রথমতঃ একজন গুরুমহাশয় নিযুক্ত করিলেন। তাহার নিকট পাঠ সমাপন হইলে একজন সুচরিত্র এবং সুশিক্ষিত মুন্সী নিযুক্ত করিলেন । উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় তুরীয়াংশের প্রথম ভাগে মাধবনারায়ণের জন্ম সে সময়ে ও বর্তমান কালে সামাজিক শিক্ষাদীক্ষা, জীবনযাপন, সভ্যতা ও অন্যান্য বিষয়ে বিষম পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তাই আমরা মাধবনারায়ণের বাল্য ও কৈশােরের আখ্যান প্রদান করিবার পূর্বে সেকালের সমাজসম্বন্ধে দুইচারিটি কথা লিপিবদ্ধ করিতেছি; কেন না, এইকথাগুলি পূর্বে না জানিলে তাহার জীবনী বুঝিতে পাঠকবর্গের নিতান্ত অসুবিধা হইবে। আজকাল যেমন ইংরাজী শিক্ষা এবং য়ুরােপীয় সামাজিক বিধান দ্বারাই মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার পরিমাপ হইয়া থাকে, তখন মুসলমান- শাসনকাল শেষ হইয়া গেলেও পারসী ও আরবিক শিক্ষা লােকের জ্ঞান ও সভ্যতার পরিমাপক ছিল। উহার সঙ্গে সংস্কৃত শিক্ষা ও উহার অনুশীলন থাকিলে সােনায় সােহাগার ন্যায় আর কোনই কথা থাকিত না। এখন যেমন কোট, প্যান্ট, হাট, বিলাতী জুতা প্রভৃতি পরিধান উচ্চ সভ্যতার পরিচায়ক, তখন তেমনি মােগলাই কেতায় সরু ইজার, আচকান, তাজ, নারাই জুতা পরিধানই নাগরিক সভ্যতার সূচনা করি। এখন যেমন মাবিনারায়ণ প, কাটলেট, রােষ্ট, কারি, ই, ডেভিল ও অন্যান্য য়ুরােপীয় আহাৰ্য অতি উচ্চাঙ্গের খাদ্য বলিয়া পরিগণিত, তখন••তেমনি লুচী, মােগা, পােলােয়া, খিচুড়ী, সন্দেশ, রসগােল্লা, কালিয়া, কোপ্তা, ও অন্যান্য নানাবিধ মােগলাই আহাৰ্য্য বড় লােকের খাদ্য বলিয়া গণ্য হইত। এখন যেমন সংবাদপত্রে প্রত্যহ পৃথিবীর সর্বদেশের সমুদায় খবর পাঠ করিয়া লােকে তৃপ্তি পায়, তখন তেমনি গ্রামে গ্রামে প্রতি আয় বসিয়া কিংবা বড়- লােকের বৈঠকখানায় বসিয়া পাঁচ জনে মিলিয়া সংসারের সমস্ত খবরের আলােচনা করিত। এখন যেমন ছেলেদের পাঁচ বৎসর হইতে না হইতে নকজননী তাহাদিগকে ইংরাজী বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট করাইয়া নিশ্চিন্ত হন, তখনও তেমনি পাঁচ বৎসরে হাতে খড়ি দিয়া পিতামাতা ছেলেদের ফুলীমহাশয়ের পাঠশালায় পাঠাইয়া দিতেন। সেখানে বাঙ্গালা, পারসী ও আরবী শিক্ষা দেওয়া হইত। এখনকার মত তখন শিক্ষা এত সুগম ছিল না ; নিতান্ত বড় লােক বা নিতান্ত মেধাবী ভিন্ন অন্য কোন বিদ্যার্থী উচ্চ বিদ্যালাভ করিতে পারিত না। তখনও সৰ্বত্ৰ রেলপথ প্রসারিত এ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় নাই এবং সরকার বাহাদুর উচ্চ শিক্ষার আর উন্মুক্ত করিতে পারেন নাই। কেবল বড় লােকই গ্রামের পাঠশালা বিদ্যালাভ শেষ করিয়া দুরতর সহরে যাইয়া উচ্চ অধ্যয়ন পরিসমাপ্ত করিতে পারিত। এখন সুদূর পল্লী পৰ্যন্ত রেল ও ষ্টীমার দ্বারা যাতায়াতের সুবিধা এবং গ্রামে গ্রামে উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় গ্রামের ও সহরের শিক্ষা- দীক্ষা ও সভ্যতার তাদৃশ প্রভেদ বা বৈলক্ষণ্য পরিলক্ষিত হয় না। তখন কিন্তু এমন ছিল না ; গ্রামের লােকে ও নাগরিকে বিষম বৈষম্য পরিদৃষ্ট হইত। শিক্ষা ও সভ্যতার সঙ্গে আমােদ-উৎসবেরও বিলক্ষণ এভভদ ছিল। যাতায়াতের সুবিধা না থাকায়, নদীমাতৃক দেশবাসী সইর হইতে শিক্ষা ও সভ্যতার অনেক নিম্নস্তরে অবস্থান কবিত। কবি, তরল, ;
মাধবখামায়ণ বান ছিল। ঝুমুর, ভাড়, মাচ প্রভৃতি নিতান্ত অশ্নীল সঙ্গীত-উৎসবে পিতা পুত্র, ভাই তাই একত্র হইয়া যােগদান করিতে একটুও ইতস্তত করতেন না। গ্রামে যাতায়াতের পথ-ঘাট প্রায় থাকিত না। তবে তখনকার গ্রামবাসী দের প্রাণ ছিল; গ্রামের হিতকল্পে সকলেই সর্বদা প্রস্তুত থাকিতেন। সরলতা, সত্যনিষ্ঠা, নির্ভীকতা, পয়ােপকার প্রভৃতি সম্ভাবগুলি গ্রামের সর্বত্র প্রায় সর্বজনে লক্ষিত হইত। গার্হস্থ্য পূজা, উৎসৰ প্রভৃতি কাৰ্য্যে বড় লােকের বাড়ীতে ইতর লােকগণ সাদরে গৃহীত ও আপ্যায়িত হইত। তখন সমাজ গাবিত ছিল, সুতরাং সমাজ প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গও স্বাস্থ্য- কন্যাদায়গ্রস্ত কাহাকেও তখন অহিফেন সেবনে কি। উনে পিতা ও পুত্র উভয়ের প্রাণের মেহ চিরনিৰ্বাপিত করিতে হইত না। যে কেহ যেকোন দায়ে পড়িয়া ক্ষমতাবানের আশ্রয় চাহিতেন, তিনি খনই তাহাকে আশ্রয় দিয়া তাঁহার সেই অভাব মােচন করিতেন; কেন না, তখন যাঁহার আশ্রয়ে সর্বাপেক্ষা অধিক লােক থাকিত, সমাজে তিনিই শেঠ বলিয়া গণ্য হইতেন। এই সমাজ ও সভ্যতার যুগে মাধবনারায়ণ ধনী জমীদারগৃহে জন্মগ্রহণ করেন। পুরাতন খ্যাত জমীদারের আদরেরপুল, সুতরাং তার শিক্ষা ও মনুষত্বের জন্য কত যত্ন ও অর্থব্যয় হইয়াছিল তাহা সহজেই অনুমেয়। অভিজ্ঞ সুবিদ্বান চরিত্রবান মুন্সী রাখিয়া তাঁহার লেখাপড়া আরম্ভ হয়। মাধবনারায়ণ তঁাহার নৈসর্গিক বর্ণে ও অঙ্গসৌষ্ঠবে রূপবান মহে- নারায়ণকেও অতিক্রম করিয়াছিলেন। বাল্যকালেই তাঁহাকে দেখিয়া আর কেহ চোখ ফিরাইতে পারি না। আবার যেমন দেবদুলভ তাহার আকৃতি, সেইরূপ কথাগুলিও অতি মধুর, সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার মেধা ও ধীশক্তি অনন্যসাধারণ ছিল। অতি অল্পবয়সেই তিনি মুন্সী সাহেবের নিকট পারসী ও আরবী এবং হিন্দীশিখিয়া ফেলিলেন। • হিন্দু গুরুমহাশয়ের মুখবনারায়ণ নিকটে তিনি বাঙ্গালা রামায়ণ, মহাভারত পাঠ করিতে শিক্ষা করিলেন এবং সমাজারী ও মহাজনী শিক্ষায়ও সুদক্ষ হইলেন। তঁাহার শিক্ষা আজকালকার ন্যায় অসম্পূর্ণ ছিল না। তিনি যেমন পারসী, আরবী ও হিন্দী গ্রন্থের অর্থ বুঝিতে পারিতেন, সেইরূপ পাকা মুন্সদের ন্যায় ঐ তিন ভাষায় প্রবন্ধ রচনা ও বক্তৃতা করিতে পারিতেন। হিসাব-পত্রেও তাঁহার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। এই সমুদায় শিক্ষা সমাপ্ত হইলে মাতা অম্বিকা চৌধুরাণী মাধবনারায়ণের শিক্ষার জন্য একজন সুদক্ষ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত নিযুক্ত করিলেন। তিনি মাধবনারায়ণকে বাঙ্গালা ও সংস্কৃত পড়াইতেন। মাধবনারায়ণ অতি অল্প কালেই ক্রমে বাঙ্গালা ও সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্য লাভ করিলেন। সংস্কৃত-পাঠাভ্যাস তঁাহার শেষ জীবন পৰ্যন্ত ছিল। তাঁহার মেধাশক্তি এরূপ ছিল যে, সংস্কৃত পণ্ডিতগণ তাহাকে ঐতিধর বলিতেন। আজকাল যেমন মিশ্র সুরের, প্রবাহে প্রকৃত সুরজ্ঞের অসদ্ভাব ঘটিতেছে, সে কালে তাহা ছিল না। প্রকৃত খাটি সুরের শিক্ষা খাঁটি সুরজ্ঞের নিকট শিক্ষা করিতে হইত, সুর-সমুদ্রের অগাধ সলিলে সন্তরণপটু হইতে হইত। সফরীর ন্যায় গণ্ডুষজলে ফর-ফরায়মাণ ব্যক্তি অতি হেয় বলিয়া বিবেচিত হইত। রসজ্ঞ মাধুৰনারায়ণ সঙ্গীত-চর্চায়ও পরান্মুখ ছিলেন না। প্রত্যুত সেতার-যন্ত্র-বাদনে তিনি যেরূপ সিদ্ধহস্ত হইয়া ছিলেন, সেরূপ বাদ্যকর আজকাল বিরল। দুর দুরান্তর হইতে সঙ্গীতজ্ঞগণ তাহার সেতারের ঝঙ্কার ও মুচ্ছনা শুনিবার নিমিত্ত রায়েরকাঠীতে প্রায়ই আসিতেন ও মুগ্ধ হইয়া কিরিতেন। বিধাতার সৃষ্টিতে রূপ ও গুণের একাধারে সমাবেশ, প্রায়ই দৃষ্টিগােচর হয় না। কিন্তু এই অনন্যসাধারণ দুইটি ধৰ্ম্ম একমাত্র মাধবনারায়ণেই পরিলক্ষিত হইত। সুতরাং যৌবন- প্রারম্ভের পূর্বেই তাহার যশােরাশি দেশ-দেশান্তরে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। পিতার তৃতীয় পুত্র বলিয়া তিনি লােকের নিকট সোজা নামে অভিহিত মাধবনারায়ণ ২১ হইতেন এবং তাহার কনিষ্ঠ নরনারায়ণকে লােকে ছােট রাজা বলিত। এ দিকে জননী রাণী অম্বিকা পুত্র মাধবনারায়ণকে নানা সঙ্গুণসম্পন্ন দেখিয়া ১৭৭৩ শকাব্দের (১২৫৭ সালের) বৈশাখ মাসে যশােহর জেলার মাগুরা গ্রাম-নিবাসী কোমল মুখ্য কুলীন কাশীনাথ বসু মহাশয়ের পরমা- সুন্দরী ও অশেষগুণবতী কামিনী নাম্নী কন্যার সহিত শুভ-বিবাহ সম্পাদন করিলেন। মাধব ও কামিনী-সম্মিলন আত্মীয়গণের পরম প্রীতিপদ হইল। মাধবনারায়ণও অভিমত ভাৰ্য্যা-লাভে যারপরনাই সুখী হইলেন। রাণী অম্বিকা সপত্নাপুত্র প্রতাপশালী রাজেন্দ্রনারায়ণের কন্যা সারদাসুন্দরীকে বিবাহের উপযুক্তা দেখিয়া বাঘুটিয়া-নিবাসী সহজ মুখ্য কুলীন কিঙ্কর- ঘােষের পুত্র কেদারনাথ ঘােষের সহিত তাহার পরিণয়কাৰ্য্য সমাধা করিলেন। এই সকল বিবাহেও অন্নবস্ত্র বিতরণ এবং গান বাজনা ইত্যাদি আমােদ-প্রমােদের কোনটির ত্রুটি হয় নাই। রাণী অম্বিকা সপত্নী-পুত্র- বধূ ও সারদাকে নিজের পুত্রবধূ ও পৌত্রীর ন্যায় ভালবাসিতেন ; কোনও পার্থক্য রাখিতেন না। তিনি সৰ্বগুণলত পুত্রবধু ও জামাতা পাইয়া বড়ই আনন্দলাভ করিলেন। এই সময় স্বার্থর কর্মচারিগণ প্রজাদিগের উপর এরূপ অত্যাচার আরম্ভ করিল যে, প্রজাগণ দলবদ্ধ হইয়া কর-প্রদান বন্ধ করিল। ঋণ- পরিশােধ করা দুরের কথা, কর্মচারিগণ কতগুলি মােকদশার সৃষ্টি করিয়া বসিল, নিরর্থক খরচ বৃদ্ধি হইল। উত্তমর্ণণও ক্রমশঃ নালাশ ও ডিক্রী করিয়া সম্পত্তি নিলাম করিবার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। এই সময়ে মহেন্দ্রনারায়ণের নিতান্ত আত্মায় খানাকুল কৃষ্ণনগর- নিবাসী শ্ৰীযুক্ত দীননাথ বসু সৰ্বাধিকারী মহাশয় মুনসেফী কৰ্ম্ম হইতে অৰসর গ্রহণ করিয়া নিজ বাটীতে পেন্স ভােগ করিতেছিলেন। সাধু সুবিধা সৰ্বাধিকারী মহাশয়, অহেন্দ্রনারায়ণের পত্নী ও পুত্রদ্বয়ের এতাদৃশ বিপদের ২২ মাধবনারায়ণ কথা শুনিয়া রায়েরকাঠী রাজবাটীতে আগমন করিলেন এবং রাী অম্বিকার সহিত পরামর্শ করিয়া ম্যানেজার-রূপে এষ্টেটের সমূদয় কাৰ্য্য পৰ্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। সৰ্বাধিকারিমহাশয়ের সুদক্ষতায় এষ্টেটের কাৰ্যকৰ্ম্ম পুনরায় সুশৃঙ্খলভাবে চলিতে লাগিল। প্রজাগণও রীতিমত করপ্রদান করিতে আরম্ভ করিল। সংসারের খরচ চলিয়া গিয়া ঋণও কিছু কিছু পরিশােধ হইতে লাগিল। এই সময়ে রাণী অধিকা তাহার তেলিখালি নামক তালুকে একাণী মাতার বাটীর সন্নিকটে একটী দীর্ঘিকা খনন করাইয়া উৎসর্গ করেন। এই উৎসর্গ উপলক্ষে তাহার পুত্রবধূ এবং পুত্রগণ ও অন্যান্য কর্মচারিগণ তাহার সঙ্গে তথায় গমন ক রয়াছিলেন। সেখানে প্রতিষ্ঠা-উপলক্ষে তিনি প্রজাগণ ও তাহাদের রমণীগণকে পূর্ণপরিতােষে ভােজন কবাইয়াছিলেন। আসিবার সময় পথে নব পুত্রবধু উৎকট হিষ্টিরিয়া পীড়ায় আক্রান্ত কন, তাহাতে কোন চিকিৎসায় তাহার রােগ ভাল হইল না। পরিশেষে তার পাশা-নিবাসী তারাচাদ চট্টোপাধ্যায় নামক এক ব্যক্তি দৈব ঔষধে তাহার আনােগ্য করেন। রাণী অম্বিকা তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে শতাধিক টাকা পারি- * এই শ্ৰীশ্ৰীকালী বিহ তাহার দা খণ্ডর ধার্মিকশ্রেষ্ঠ প্রাণনারায়ণ প্রতিষ্ঠিত করেন এবং সেবার-জন্য করিকা-নিবাসী জনৈক বৈদিক ব্রাহ্মণকে ২৪ বিঘা ব্ৰহ্মাত্তর ও ১০ যিথ সেবােত্তর জমী দান করেন। এতদ্ব্যতীত মন্দিরের কার্যাদি করিবার ও বেতার সেবায় নিমিত্ত পুষ্প, বিৰূপত্রাদি যােগাইবার জন্য জনৈক পরামাণিককে ১২ বিঘা এবং মন্দির ও আঙ্গণাদি পরিষ্কার করণের জন্য জনৈক ডুমালীকে ১২ বিঘা জমি নিকর দান করেন। ৭ এত্ত-নির্মিত শ্ৰীশ্ৰীকালীমাতা এখনও বর্তমান আছেন এবং ঐ ব্রাহ্মণ সেবাইত । পরিচারকগণের বংশধরের কালীমাতার পুজা-অর্চনাদি ও মন্দির-সংক্রান্ত অন্যান্য কাব্যাদি সম্পাদনপূর্বক ঐ সমস্ত জমী ভােগ করিতেছেন। দুঃখের বিষয়, এই সকল অমিয় কিয়দংশ নদীতে ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।
মাধবনারায়ণ ২৮ তােষিক প্রদান করেন এবং প্রতি বৎসর দুইটী টাকা করিয়া পাইবার ব্যবস্থা করিয়া দেন। তাহার বংশধরগণ এখনও ঐ বার্ষিকের টাকা মাধবনারায়ণের পুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণ ও নগেন্দ্রনারায়ণ প্রভৃতির নিকটে পাইতেছেন। মাধবনারায়ণ পিতৃপিণ্ডদানহেতু গয়াক্ষেত্রে গমন করিবার জন্য জননীর অনুমতি চাহিলেন। রাণী অম্বিকা পুত্রের এতাদৃশ পিতৃভক্তি- দর্শনে একান্ত প্রীত হইয়া পুত্রকে গয়াক্ষেত্রে পাঠাইবার উদ্যোগ করিলেন। তখন রেলের পথ ছিল না, নৌকাই তার্থাদি গমনাগমনের সুগম পন্থা ছিল। পথে চোর-ডাকাত ও ঝড়-তুফানের ভয় ছিল এবং অনেক বাধা-বিঘ্ন অতি- ক্রম করিতে হইত। সৰ্বাধিকারী মহাশয়ের উপদেশমত রাণী অম্বিকা অনেক লােক জন ও বড় বজরা এবং ছােট ছােট কয়েকখানি নৌকা সঙ্গে দিয়া পুত্রকে গয়াক্ষেত্রে প্রেরণ করিলেন। মাধবনারায়ণ গয়াক্ষেত্রে গমন করিয়া পিতৃপিণ্ডদান এবং যােড়শাদি পাৰ্বণ শ্রদ্ধও সমাপন করিলেন। পরে মাতার আদেশ অনুযায়ী গয়াস্থ ৩৫০ ঘর গয়ালীর প্রত্যেকে এক একটি টাকা প্রণামী ও এক একখা ন পিত্তলের থালা ক্ষীরের পেড়া স 'দান করিলেন। তিনি নিজ গয়ালীকে এক বিঘা জমী ও বাৎসরিক টাকা দিবারও ব্যবস্থা করেন। সুফল ইত্যাদির দরুণ মাধবনারায়ণ গয়ালী (গয়ার পুরােহিত) বুলুকলাল পাঠকমহাশয়কে ৫০০ টাকা প্রণামী দিয়াছিলেন। গয়াক্ষেত্র হইতে আসিবার সময়ে তিনি একটা সুশিক্ষিত সুন্দর ঘােটক ও একজন ঘােড়ার সহিস সঙ্গে আনিয়াছিলেন। বাটী আসিয়া তিনি মাতা ও ভগিনীর চরণে প্রণিপাত করিলেন। মাতা পুত্রকে নিরাপদে বাটীতে প্রত্যাগত দেখিয়া আনন্দ-সাগরে নিমগ্ন হইলেন। * এই জমীর খাজনা ও বার্ষিকের টাকা মাধবনারায়ণের গয়ালী বুনুকলাল পাঠকের ওয়ারিস মােহনলাল পাঠককে অস্থপৰ্য্যন্ত মাধবনারায়ণের পুত্রগণ শ্রীযুক্ত গিরীন্দ্রনারা, নগেন্দ্রনারায়ণ প্রতি দিতেছেন। । এই সুন্দর সুশিক্ষিত সর্বাঙ্গসুন্দর ঘােড়াটা সিড়ি বাহিয়া দ্বিতলে উঠিতে পারিত।
মাধনারায়ণ সৰ্বাধিকারী মহাশয় কর্তৃক সুশৃঙ্খলভাবে এষ্টেটের কাৰ্য্য পরিদর্শনের ফলে কর্মচারিগণের অসদুপায়ে অর্থ উপার্জনের পথ রুদ্ধ হইল। তাহাতে তাহারা আর ম্যানেজার মহাশয়ের চোখে ধূলি দিয়া সৰ্বগ্রাস করিতে সমর্থ হইলেন না; সুতরাং তাঁহারা সকলে মিলিয়া সৰ্বাধিকারী মহাশয়ের বিরুদ্ধে নানারূপ ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন । সৰ্বাধিকারী মহাশয় ইহাতে বিপদের আশঙ্কা উপলব্ধি করিয়া নিতান্ত বিরক্ত হইলেন এবং স্বদেশে চলিয়া গেলেন। বৈষয়িক কাৰ্যকৰ্ম্ম আবার সেই দুষ্ট কর্মচারিগণের হন্তে আসিল ; ফলে মহেন্দ্রনারায়ণের এষ্টেটের বিশৃঙ্খলতা আবার পূর্ণ মাত্রায় প্রকটিত হইল। নড়াইলের জমীদার হরনাথ রায় মহাশয়ের নিকট মহেন্দ্রনারায়ণের অনেক টাকা ঋণ ছিল। রায়মহাশয় এক্ষণে মহেন্দ্রনারায়ণের এষ্টেট এতাদৃশ গােযােগর বিষয় অবগত হইয়া তাহার প্রাপ্য টাকার জন্য আদালতে নালিশ করিলেন। মাধবনারায়ণ তখন নাবালক হইলেও অসাধারণ বুদ্ধিমান্ ছিলেন এবং তাহার বুদ্ধিশক্তির প্রখরতা ক্রমেই প্রস্ফুটিত ইতেছিল। তিনি এই নালিশের বিষয় অবগত হইয়া জননীর অনুমতি হণপূর্বক নড়াইলে যাইলেন এবং হরনাথবাবু ও খ্যাতনামা রামরতনবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। উভয়েই সঁহাকে মহাসমাদরে গ্রহণ করিলেন। কামরতনবাবু মাধবনারায়ণের নিকট সমুদয় বিবরণ শুনিয়া হরনাথবাবুকে বলিলেন, “বড় বিপদে পড়িয়া আজ সেজ রাজা আমাদের এখানে উস্থিত (ইয়াছেন ; তুণি এখন ইহার স্বর্গগঃ পিতার উত্তমর্ণ। যাঁহাকে আমরা * দীননাথ বসু সৰ্বাধিকারী শ্ৰীনাথ সৰ্বাধিকারীর বংশধর। শ্রীনাথ সৰ্বাধিকারী ধিবনারায়ণের পিতামহ প্রাণনারায়ণের জামাতা। প্রাণনারায়ণ এই জামাতাকেও ভুত বিষয় সম্পত্তি দিয়াছিলেন। এখনও তাঁহার বংশধরগণ উহা ভােগ করিতেছেন।
মাধবনারায়ণ ২৫ কোনও দিন পরম যত্নেও এখানে আনিতে পারি নাই, আজ তিনি রং বিনা নিমন্ত্রণে আমাদের গৃহে অতিথি। ইনি প্রধান ভুঞিয়া কিঙ্কর রায়ের বংশধর রাজা চন্দ্রনারায়ণের সাক্ষাৎ সপিণ্ডাধিকারী। ইহারা আমাদের দক্ষিণ রাঢ়ীয়-সমাজের শ্রেষ্ঠ গােষ্ঠীপতি মৌলিক। ইহার পিতা মহেন্দ্র- নারায়ণের দানশীলতা চিরপ্রসিদ্ধ ছিল। ইহারা আমাদের অপেক্ষা অনেক প্রাচীন জমীদার। এমন কি, ইহার চন্দ্রদ্বীপ ও যশােহরের রাজগণ অপেক্ষাও প্রাচীন। ইহাদের পূর্বপুরুষগণ অনেক ব্রাহ্মণকে অনেক ব্রহ্মোত্তর এবং কায়স্থ ও অন্যান্য শ্রেণীর লােকদিগকে অনেক নিষ্কর ভূমি দান করিয়াছেন। এমন কি, মুসলমান ফকির ও গরীবদিগকেও বিস্তর নিষ্কর “চেরাকি” (চেরাকনামীয় দান ) দান করিয়াছেন। ইহার পিতা মহাত্মা মহেন্দ্রনারায়ণ এক সময়ে আমাদের ও শােভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিশেষ সম্মান রক্ষা করিয়াছিলেন। ইহার পিতা আমাদিগকে সাহায্য না করিলে আমাদের উভয়কেই বিশেষ অপদস্থ হইতে হইত। কলিকাতানিবাসী বাবু আশুতােষ দেব (সাতুবাবু) যখন “একজাই” করিতে উদ্যোগী হইয়ছিলেন, তখন কলিকাতা শশাভাবাজার-নবাসী রাজা রাধাকান্ত দেব ও আমি আশুতোষবাবুর বিরােধী হইয়াছিলাম। কিন্তু আমরা এবং আমাদের আত্মীয়স্বজন বড় বড় কুলীনগণ পরামর্শ করিয়া দেখিলাম যে, আমাদের দ্বারা সাতুবাবুর একজাই বন্ধ করা সম্ভব হইবে না। ইহা বুঝিয়া আমরা ম্রিয়মাণ হইলাম। তখন হঠাং আমাদের পক্ষয় একজন প্রটিন কুলান কায়স্থ বলিলেন, “রায়ের কাঠীর খ্যাতনামা মহেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী কালীঘাটে আছেন। সমাজের অনেক শ্রেষ্ঠ কুলনি তাহার আশ্রিত, বাধ্য ও বৃত্তিভােগী, তাহাকে আমাদের দলভুক্ত করিতে পারিলে নিশ্চয়ই “একজাই” বন্ধ হইবে, নচেৎ কিছুতেই বন্ধ করিতে পারিবেন না। ইহা শুনিয়া রাজা রাধাকান্ত মাধবনারায়ণ দেব বাহাদুর তদীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র কুমার মহেন্দ্রনারায়ণ দেববাহাদুরকে আমার সঙ্গে মহেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরীর নিকটে পাঠাইয়া দিলেন। তাহাকে আমরা আমাদের সভায় সভাপতি হইবার প্রস্তাব এবং মনােমও অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। প্রথমে তিনি অমত প্রকাশ করিলেন, তৎপরে আমাদের বিশেষ অনুরােধে স্বীকৃত হইলেন। "একজাই” একটি বিশেষ সম্মানের কাৰ্য্য, তজ্জন্যই একের সেই সম্মান-লাভে অন্যে প্রতিবন্ধক হইত। আমরা মহেন্দ্রনারায়ণকে এইরূপে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করাইয়া অসিবার পরেই এই ঘটনা সর্বত্র প্রচার হইল। আশুতােষ দেব বড়ই চিন্তিত হইলেন এবং তাহার পুত্র গিরীশ বাবুকে মহেন্দ্রনারায়ণের নিকট সাহায্য পাইবাব জন্য পাঠাইলেন, এবং বলিয়া দিলেন, মহেন্দ্রনারায়ণ সহজে স্বীকৃত । হইলে তুমি তাহার নিকটে তাহার সমুদয় ঋণ বিনা সুদে ও সহজ কিস্তি- বন্দীতে শােধ লইবার প্রস্তাব করিবে। গিরীশবাবু মহেন্দ্রনারায়ণের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া পিতার কথানুযায়ী সমুদয় চেষ্টাই করিলেন। তাহাতে মহেন্দ্র- নারায়ণ বলিলেন, টাকার লােভে আমি কখনই প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গ করিতে পারি । আপনি পূর্বে আসিলে আমি তাহাদের পক্ষে যাইতাম না এবং আপ- সাকে এরূপে ঋণ-পরিশােধের প্রস্তাবও করিতে হইত না। আমি টাকার কাঙ্গাল নই। ইহা শুনিয়া গিরিশবাবু বড়ই দুঃখিত হইয়া ফিরিয়া আসিলেন এবং পিতাকে সমুদয় জানাইলেন। এদিকে রাজা রাধাকান্ত দেব এ বিষয় অবগত হইয়া মহেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরীকে লইয়া আসিবার জন্য পুনরায় তাঁহার মধ্যম পুত্র কুমার রাজেন্দ্রনারায়ণ দেব বাহাদুরকে কালীঘাটে পাঠাইলেন। মহেন্দ্রনারায়ণ শােভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরে বাটাতে আসিলেন এবং সকলের ইচ্ছানুসারে সভার সভাপতি-পদ গ্রহণ করিলেন অনেক তর্ক-বিতর্কের পর সর্বসম্মতিক্রমে “একজাই” বন্ধ করা স্থির * রাজেন্দ্রনারায়ণ দেব বাহাদুর পরে রাজা উপাধিতে ভূষিত হইয়াছিলেন।
মাধবনারায়ণ ২৭ হইল। অপর পক্ষে সাতুবাবুও দক্ষিণ ব্রাঢ়ীয় সমুদয় সমাজের কুলীন- দিগকে তাহার “একজাই”তে যােগ দিবার জন্য অজস্র টাকা ব্যয় করিতে লাগিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু ফল হইল না। কতিপয় কুলীন লইয়া- ছিলেন বটে; কিন্তু সকল সমাজের সব শ্রেণীর কুলীন একত্রীভূত করিতে পারিলেন না; সুতরাং তাহার “একজাই” ও সম্পূর্ণ হইল না। সেই মহাত্মা মহেন্দ্রনারায়ণের পুত্র মাধবনারায়ণ আজ আমাদের এখানে আসিয়াছেন; তাহার কিরূপ উপকার করিলে পরিশােধ করিতে পারি, তাহা আমি বিবেচনা করিতে পারিতেছি না।” অতঃপর হরনাথবাবু বলিলেন, আমি আমার পাওনা কিস্তিবন্দী করিয়া লইতে সম্মত আছি এবং সমস্ত টাকা পরিশােধের সময়ে আমি কিছু টাকা রেহাই দিতে সম্মত আছি; কিন্তু আমাকে কতক টাকা নগদ দিতে হইবে। বিশ্বস্তসুত্রে অবগত হইয়াছি, ইহাদের এষ্টেটে বড়ই বিশৃঙ্খলতা উপস্থিত হইয়াছে। যাহা হউক, ইহার মাতা চৌধুরাণীর মত করিয়া এষ্টেটের ভার যদি আমার উপর অর্পণ করেন, তবে আমি ইহাদের সমুদয় খণ পরিশােধ করিয়া দিয়া ইহাদের এষ্টেট হইতেই আমার পাওনা টাকা আদায় করিয়া লইব এবং এষ্টেটের যাহাতে উন্নতি ও সুশৃঙ্খলতা হয়, তাহার বিশেষ চেষ্টা করিব ও ইহাদের ভরণপােষণ ও বার্ষিক, দেবার্চনা, ক্রিয়া- কর্মের জন্যও পৃথক বন্দোবস্ত করিয়া দিব। রুতনবাবু ও হরনাথবাবু মাধবনারায়ণকে যথেষ্ট আদর আপ্যায়ন করিলেন এবং মাধবনারায়ণের অতুলনীয় সৌন্দর্য্যে ও মিষ্টালাপে তাহায় প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট হইয়া এষ্টেট রক্ষার নিমিত্ত কৃতসঙ্কল্প হইলেন। তাঁহারা বলিলেন, আপনি বাটী যাইয়া আপনার মাতার ইহাতে মত করাইতে বিলম্ব করিবেন না। বিলম্বে এষ্টেট রক্ষা করা দুর্ঘট হইবে। মাধবনারায়ণ ৰাটাতে আসিয়া মাতা, ভ্রাতা ও ভগিনীকে সমুদয় বিবরণ বলিলেন।
মাধবনারায়ণ ভগিনী হরসুন্দরী বিধবা হইয়া পিতৃগৃহে বাস করিতেছিলেন। হরসুন্দরী মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণের অপেক্ষা বয়সে অনেক বড় ছিলেন। মাধব- নারায়ণের নিকট সকল বিবরণ অবগত হইয়া তাহারা প্রথমত বড়ই আনন্দিত হইলেন এবং নড়াইল-নিবাসী খ্যাতনামা জমীদার হরনাথ রায় মহাশয়ের প্রতি সম্পত্তির ভার ব্যস্ত করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। বার্থপর দুষ্ট কর্মচারিগণ যখন দেখিলেন যে, তাহাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র পণ্ড হয়, তখন তাহারা অম্বিকা চৌধুরাণ ও হরসুন্দরীকে বুঝাইলেন যে, ‘নাথবাবু লােভী জমীদার, তাহার প্রতি সম্পত্তির ভারাপণ করিলে সকল সম্পত্তিই তিনি আত্মসাৎ করিবেন; আপনারা আর কিছুই ফিরিয়া পাইবেন না; পুত্রদ্বয়কে পথে দাঁড় করাইবেন। আমরা বিশেষ চেষ্টা করিলে দেনা পরিশােধ করিয়া সমুদয় সম্পত্তি রক্ষা করিতে পারি। অম্বিকা চৌধুরাণীর চিত্ত ইহাতে দোদুল্যমান বুঝিয়া কৰ্মচারিগণ গােপনে রসুন্দরীকে বুঝাইতে আরম্ভ করিলেন। হরসুন্দরী চতুরা বুদ্ধিমতী হইলেও দুষ্ট কৰ্মচারদিগের কুটিলতা বুঝিতে পারিলেন না। প্রথমত তিনি কর্মচারীদিগের প্রস্তাবে অসম্মত হইলেন বটে; তৎপরে দুই কর্মচারীগণ অশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন,-“আমাদের ফয়েক পুরুষ এই অম্নে প্রতিপালিত, অন্য হাতে ধরিয়া সমুদয় সম্পত্তি পরকে দেওয়া হইতেছে, ইহা কি প্রকারে সহ্য করিব ? বিশেষতঃ তিনি পাওনাদার ও লােভী জমাদার। আপনার ভ্রাভার নিরন্ন হইবেন, ইহা ভাবিয়াই আমরা আকুল। হরসুন্দরী তাহাদের অবর্ষণে বিচলিত হইয়া তাহাদের কুটিল জালে নিপতিতা হইলেন। যখন তাহার মত পরিবর্তন হইল, তখন মাতা চৌধুরাণীর মত পরিবর্তন করিতে তাহাদের আর কোনই কষ্ট পাইতে হল না। হরনাথবাবুর প্রতি এষ্টেটের ভার অৰ্পণ করিবার সঙ্কল্প রহিত হইল। এদিকে পূর্ব প্রস্তাবানুসারে এষ্টেটের মাধবনারায়ণ, কাগজপত্র বুঝিয়া লইবার নিমিত্ত একজন উপযুক্ত, কর্মচারী হরনাথৰাৰু পাঠাইলেন। কর্মচারী রায়েরকাঠীতে উপস্থিত হইলে মাধবনারায়ণ মাতা ও ভগিনীকে বিশেষ করিয়া বুঝাইলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। কর্মচারী নড়াইলে প্রত্যাবর্তন করিয়া রামরতমবাবু ও হরনাথবাবুকে সকল বিষয় জানাইলেন। রামতনবাবু শুনিয়া বড়ই দুঃখিত হইলেন এবং একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, “যাহা ঘটিবে, তাহা কেঅন্যথা করিবে? হরনাথবাবু পূর্বেই তাহার পাওনা টাকার নালিশ করিয়াছিলেন। কিছুদিন পরে সেই টাকার ডিক্রী হইল। নগদ টাকা দিয়া যে কিস্তিবন্দী করার কথা হইয়াছিল তাহাও তাঁহাকে দেওয়া হইল না। ক্রমে সেই ডিক্রীতে তেলিখালি, সেলিমাবাদ প্রভৃতি পরগণায় সওয়া দশ গণ্ডা জমিদারীর অংশ, ১৮ গণ্ডা জমীদারী: ও তাহার অধীন জোলাগাতী প্রভৃতি অনেক উৎকৃষ্ট মূল্যবান সম্পত্তি নিলাম হইল। ঢাকা-নিবাসী নবাব গণি মিঞা সাহেব * তাহা ক্রয় করিলেন। ইহার অল্প দিন পরেই অন্যান্য দেনাতেও রামচন্দ্রপুর, পত্তাশী, শিয়ালকাঠী, ছাগলকান্দা, শশীদ প্রভৃতি অনেক সম্পত্তি নিলাম হইতে লাগিল। বসতি বাটী পর্যন্ত নিলাম হইল। কৰ্মচারিগণ ডিক্রিতে জমা দিবার জন্য যে টাকা অম্বিকা চৌধুরাণীর নিকট হইতে লইয়া যাইতেন তাহা তঁাহারা জমা না দিয়া পরস্পরে ভাগ করিয়া লইতেন। এমন কি, এমন কি, ঘুষ লইয়া অপর পক্ষকে ঐ সকল সম্পত্তি ক্রয় করাইয়া দিতেও কুণ্ঠিত হইতেন না। এই সময়ে মাতা অম্বিকা চৌধুরাণী নিজের অর্থে কতিপয় ভূসম্পত্তি ও বসতি-বাটী অন্য নামে ক্রয় করিয়া রাখিলেন। এতদ্ব্যতীত তাহার নিজেরও কিছু সম্পত্তি ছিল। সুবুদ্ধি ও বিদ্বান্ মাধবনারায়ণ অল্পবয়স্ক হইলেও * এই সম্পত্তিগুলি যখন গণি মিঞা সাহেব ক্রয় করেন, তখন তিনি নবাব উপাধি লাভ করেন নাই। পরে তিনি নবাৰ উপাধিতে ভূষিত হইয়াছিলেন। ।
মাধবনারায়ণ ৬০ চারদিগের বিশ্বাসঘাতকতা সমন্ত বুঝিনে; কিন্তু জননী ও ভগিনী কর্মচারীদিগের উপর এমনই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তাহার কথায় কিছুই কাৰ্য্য হইত না। এক্ষণে বিষয় নীলাম হইয়া যাওয়ায় রাণী অধিকা কর্মচারীদিগের ধূর্ততা বুঝিতে পারিলেন এবং তাদের উপর নিতান্ত বিরক্ত হইলেন। এদিকে মাধবনায়ায়ণও সাবালক হইলেন। রাণী অম্বিকা পুত্রকে কার্যক্ষম বুঝিয়া তাহার উপরই সমূদয় কাৰ্যৰ অৰ্পণ করিলেন।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। মাধবনারায়ণ অল্পবয়স্ক হইলেও জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিচারে প্রবীণ ছিলেন। সম্পত্তি পৰ্যবেক্ষণ করিতে আরম্ভ করিয়া তিনি স্বল্পকাল মধ্যে উহাতে সুশৃঙ্খল আনয়ন করিলেন। রাতিমত কিস্তিতে কিস্তিতে কর আদায় হইতে লাগিল। উত্তমর্ণগণও সেজ রাজার সঙ্গে কিস্তিবন্দীমত তাহাদের প্রাপ্য টাকা পাইতে লাগিলেন। বড় হিস্যা হইতে আবার অভাব বিশৃখলা চলিয়া গেল। গৃহ শান্তি ও লক্ষ্মীর আবাসভূমি হইল। রাণী অম্বিকা পুত্রের অসাধারণ ক্ষমতা-দর্শনে পরম প্রীত হইয়া নিশ্চিঙচিত্তে চন্দ্রনাথ, শ্রীক্ষেত্র প্রভৃতি তীর্থ-পরিভ্রমণে বহির্গত হইলেন। মাধবনারায়ণয়ের বিদ্যাভ্যাস ও জ্ঞান-লাভ আজকালকার শিক্ষিতদের ন্যায় আত্মসুখ-সম্ভোগে পর্যবসিত হইত না। প্রকৃত জ্ঞানবানের গায়, তিনি যেমন নিজেদের এষ্টেটের শাসন ও সংরক্ষণে নিবিষ্টচিত্ত ছিলেন, সেইরূপ কিরূপে গ্রামের প্রকৃত উন্নতি ও লােকসাধারণের উপকার হয় তাহা সর্বদা চিন্তা করিতেন। রায়েরকাঠী গ্রামটি চতুর্দিকে নদীবেষ্টিত এবং পথঘাটশূন্য ছিল। তিনি রাজবাটী হইতে দক্ষিণ দিকে দামােদর নদ পৰ্যন্ত প্রায় দেড় ক্রোশব্যাপী একটি প্রশস্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করাইয়া পথের দুই পার্শ্বে ঝাউ প্রভৃতি ছায়াতরু রােপণ করাইয়া দিলেন এবং ঐ রাস্তা হইতে আর একটা পাকা রাস্তা কালীমাতার বাটী পৰ্য্যন্ত বৈয়ারী করাইলেন। পূর্ব দিকেও একটী পাকা রাস্তা মদনমােহন সরকারের বাটী পৰ্যন্ত নির্মাণ করিয়া দিলেন। রাস্তা-নিৰ্মাণ-উপলক্ষে জ্ঞাতিদিগের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমায় তাহার প্রচুর অর্থব্যয় হইয়াছিল। কিন্তু দেশের উহাতে পরম উপকার হইবে বলিয়া তিনি ঋণগ্রস্ত হইয়াও এবং জ্ঞাতি-বিরােধ সত্ত্বেও রাস্তা-নির্মাণে পরাধ হইলেন না।
মাধবনারায়ণ ৩২ ইহার কিছুকাল পরে রাণী অম্বিকা চৌধুরাণী তীৰ্থপৰ্যটনান্তে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। দেশহিতকর কাৰ্যে কৈশােরেই পুত্রের এতাদৃশ অনুরাগ ও দক্ষতা দেখিয়া মাতা অধিকা তাহার নিজের মূল্যবান্ অলঙ্কার মধ্যে একখানি অলঙ্কার মাধবনারায়ণকে প্রদান করিয়া পাকা রাস্তার মধ্যে যে তিনটি কাষ্ঠের পুল ছিল তাহার প্রথমটির উপরে একটি পাকা সেতু নিৰ্মাণ করিয়া দিতে অনুমতি করিলেন। পুত্র মাতার আশীর্বাদস্বরূপ অলঙ্কারখানি গ্রহণ করিয়া উহার মূল্যে একটী সুপ্রশস্ত পাকা সেতু ও ঐ সেতুর নিম্নে খালের উভয় পার্শ্বে দুইটী কক্ষ নির্মাণ করাইয়া দিলেন। বিদেশীয় লােকসাধারণ রায়েরকাঠীতে আসিলে প্রােক্ত কক্ষের একটীতে রন্ধনকাৰ্য্য ও অপরটীতে শয়ন করিতে পারিতেন। উহাতে অতিখি- অভ্যাগতের যে কি উপকার হইয়াছিল তাহা বর্ণনাতীত ।* মাতার এই সদনুষ্ঠান দেখিয়া ভগিনী হরসুন্দরী ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃজায়া শিবশঙ্করী যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেতু দুইটা পাকা করিয়া দিয়া উৎসর্গ করেন। এক্ষণে রাজবাটী হইতে তিন মাইল পর্যন্ত দামােদর-তীরে যাতায়াতের পথ নিতান্ত সুগম হওয়ায় গ্রামের যে কি মহৎ উপকার হইল তাহা কিশাের মাধৰনারায়ণের প্রতিপক্ষের প্রৌঢ়গণও উপলব্ধি করিয়া লজ্জিত হইলেন। সেকাল ও একালের বিষয়পরিচালনের মধ্যে বিষম বৈলক্ষণ্য পরিলক্ষিত হইবে। তখন প্রজাদের কি ফৌজদারী, কি দেওয়ানী সমুদয় অভিযােগেরই জমীদার-সরকারে বিচার হইত। প্রজাগণ নিজ নিজ জমীদারকে পিতার স্যায় শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিত এবং তাহাদের রক্ষক বলিয়া জানিত। জমীদারগণও প্রজাগণকে অপত্যনির্বিশেষে রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। প্রজার গৃহে কোনও দ্রব্য জন্মিলে বা আনিলে উহার অগ্রভাগ তাহারা নিজ নিজ *এই রাস্তাটি এক্ষণে জেলাবাের্ডের অধীন হইলেও সেতু কয়েকটা এখনও বর্তমান আছে।
মাধবনারায়ণ জমীদারকে না দিয়া নিজেদের ভােগে লাগাইত না। জমীদারগণও প্রজাদিগের বিপদ নিজেদের বিপদ আন করিয়া উহার প্রতিকারে প্রাণপণে প্রবৃত্ত হইতেন। প্রজাদের অন্নক উপস্থিত হইলে নিজেদের জিনিষপত্র বন্ধক দিয়া, এমন কি উত্তমর্ণকে ও দিয়াও তাহাদের জন্য ধান্যাদি ক্রয় করিয়া তাহাদের অন্নকষ্ট নিবারণ করিতেন। প্রজাদের স্ত্রী-কন্যাগণ জমীদারদগের কন্যার ন্যায় স্নেহ ও আদর পাইত ; তাহারাও জমীদারদিগকে পিতার ন্যায় শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিত। প্রজা ও জমীদারের মধ্যে সেই অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ কিরূপে বর্তমানে একেবারে লােপ পাইয়াছে ও কিরূপে সেই শ্রদ্ধা, ভক্তি ও মেহের বন্ধন ছিন্ন হইয়া গিয়াছে তাহা কি কেহ একবারও ভাবিয়া দেখিয়াছেন ? এক্ষণে প্রজাগণ জমীদারগণকে কিরূপে বিপদাপন্ন করিবে, এমন কি গােপনে খুন করিবে, তার জন্য কেন চেষ্টিত হয় এবং জমীদারগণও কিরূপে প্রজাদের উদ্বাস্তু করিয়া নূতন প্রজানে নূতন প্রজা-নে বিশিষ্টরূপে লাভবান হইবেন এরূপ অহর্নিশ কল্পনায় জল্পনায় ব্যাপৃত থাকেন, তাহা কি কেহ একবারও ‘চন্তা করেন ? বাঙ্গালার প্র ণ জমীদার ও প্রজাবর্গের এই প্রবল দ্বন্দ্বে সোণার বাঙ্গালা ক্রমে ক্রমে ছারখার ইয়া যাইতেছে, তাহা কি কেহ লক্ষ্য করিতেছেন? বস্তু ও জমীদার প্রজাবর্গের মধ্যে পূর্বের চায় পুনরায় স্ত্রী বন্ধন প্র িষ্ঠিত হইলে বাঙ্গালীর ভাগ্য-পরিবর্তনের আর কোনই আশা নাই। প্রকৃত পক্ষে পরস্পরের যে পরস্পরের সাহায্য ব্যতীত অ শুত্ব নাই উহা কেহই বুঝেন বুঝিবার চেষ্টাও কনে । ফলে জমীদার ও প্রজা উভয়ে ক্রমে সকস্বাক্ত হইতেছেন। প্রজাগণ খাজনার একটি টাকাও সহজে দিবে না ; ঐ এক টাকার জন্য আদালতে এক শত টাকা ব্যয়েও কুঠি ৩ হয় না। এদিকে জমীদার- ;
৩৪ মাধৰনারায়ণ গণেরও এক টাকা পাওনা স্থানে দশ টাকা দাবি করিয়া মিথ্যা নালীশ রুজু করিতে একটুও বিবেকে বাধে না। বৎসরান্তে চৈত্রমাসের শেষ দিন জেলা ও মহকুমার আদালতগুলি অনুসন্ধান করিলেই ইহার যথার্থতা উপলব্ধি হইবে। কি আশ্চর্য্য! ভিন্নদেশীয় লােকের সঙ্গে লােকের যেরূপ সৌহার্দ থাকে, একদেশে এক গ্রামে থাকিয়াও প্ৰজা ও জমীদারে তাহার শতাংশও নাই। জমীদার পীড়ার প্রকোপে জীবনান্ত হইতে বসিলেও প্রজাগণ একবার ডাকিয়াও জিজ্ঞাসা করে না। আবার প্রজারা দুর্ভিক্ষে প্রপী ভূত হইলেও জমীদার উহাতে নিতান্ত উদাসীন। উহার ফলে পুৰ্ব্বকার অন্নাভাব-পরিশূন্য শান্তিময়ী স্বাস্থ্যময়ী বঙ্গভূমিতে বার মাস দুর্ভিক্ষ, অশান্তি ও পীড়া লাগিয়াই রহিয়াছে। প্রজা ও জমীদারের পরস্পরের অনুরাগাভাবে গ্রাম্য খালগুলি ভরাট হইয়া জল-চলাচলের ব্যাঘাত ঘটাইতেছে ; ফলে ম্যালেরিয়া আমাদের নিত্যসঙ্গী হইয়া পড়িয়াছে। প্রায় সর্বত্র জঙ্গল ও আবর্জনাপূর্ণ । গ্রামের পুরাতন পুষ্করিণীগুলি সংস্কারভাবে পঙ্কিল ও শুষ্ক প্রায়। গাে, ছাগ প্রভৃতি গৃহপালিত পশুগুলি চরিবার স্থানাভাবে অস্থিচর্ম- সার হইয়া নিতান্ত অস্বাস্থ্যকর জীবন বহন করিতে করিতে অকালে কালকবলে নিপতিত হইতেছে। পল্লীগ্রামের অবস্থা দিন দিন শশাচনীয় হইয়া উঠিতেছে। গ্রামের বর্ধিষ্ণু ব্যক্তিরা সহরে আসিয়া কোন মতে বাস করিতেছেন এবং গরীব বাসিন্দারা গ্রামে থাকিয়া ম্যালেরিয়ায় ক্রমশঃ কবলিত হইতেছেন। জমীদার ও প্রজার মধ্যে অনৈক্যে দেশের ঘাের সর্বনাশ ঘটিতেছে। মাধবনারায়ণ ক্রমশঃ দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পলিন করিয়া দেশমধ্যে প্রতিষ্ঠাবান হইয়া হইয়া উঠিলেন। দেশে দতঙ্করের উপদ্রব কমাইলেন। কুলমহিলাদের সম-রক্ষার পক্ষেও মাধবনারায়ণ তিনি বিশেষ যত্নবান্ ছিলেন। মাধবনারায়ণ এমনি প্রতাপৰা হইলেন যে, তাঁহার ভয়ে দুষ্ট বদমাইস চোর ডাকাত গ্রাম ত্যাগ করিতে লাগিল। প্ৰজাদিগের মধ্যে কোনও বিবাদ-বিসম্বাদ উপস্থিত হইলে উহার বিচার-মীমাংসা তিনিই করিতেন। তাহার কোন প্রজাই ফৌজদারী কিংবা দেওয়ানী আদালতে মােকদ্দমা করিতে যাইত না। ক্রমে বিচারকার্যে তাহার এরূপ সুনাম প্রচারিত হইল যে, অন্যান্য সরিকদিগের এবং বিভিন্ন জমিদারের প্রজাগণও পরস্পর বিবাদ স্থলে সেজ- রাজার নিকট বিচারপ্রার্থী হইত। তিনি ও নিজ প্রজা-নির্বিশেষে উক্ত প্রজাদের বিবাদ মীমাংসা করিয়া দিতেন। মাধবনারায়ণ বিষয়-কর্মে নিরত থাকিলেও তঁাহার বিদ্যানুরাগ সর্বদা তাহাকে জ্ঞানীদিগের সংসর্গ হইতে দূরে থাকিতে দিত । প্রত্যহ সন্ধ্যার পর সংস্কৃতশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত এবং ও আরব্যভাষাবিৎ মৌলবীদিগের সঙ্গে শাস্ত্রালােচনায় কালাতি- পাত করিতেন। সেইজন্য দেশ-বিদেশ হইতে সংস্কৃতশাস্ত্রবিৎ পণ্ডিত এবং আরব্য ও পারস্য ভাষাভিজ্ঞ মৌলবীগণ মাধবনারায়ণের সভায় উপস্থিত হইতে আরম্ভ করিলেন। সেজরাজাও সন্ধ্যার পর তাঁহাদের সঙ্গে শাস্ত্রানুশীলনে কালযাপন করিয়া প্রত্যেককে তাহার বিদ্যানুরূপ পুরস্কারদানে পরিতুষ্ট করিয়া বিদায় দিতেন। কোটালীপাড়া-নিবাসী প্রধান বৈয়াকরণ বিশ্বেশ্বর তর্কপঞ্চানন, কেওড়া- নিবাসী দুর্গাচরণ সেন কবীন্দ্র এবং যশিরকাঠী-নিবাসী খ্যাতনামা বৃন্দাবন সেন কবিরত্ন সেজরাজার সভাপতি ছিলেন। সঙ্গীতানুশীলনও * বিশ্বেশ্বর তর্কপঞ্চানন কোটালীপাড়া পরগণার জমিদারীর অংশীদার ও বিশিষ্ট সম্মানভাজন ব্যক্তি ছিলেন। কোটালীপাড়ার লােকে ইহাকে বিশ্বের চৌধুরী বলিত। কোটালীপাড়ার অন্তর্গত উনুসিয়া গ্রামে ইহার বাটী ছিল। দুর্গাচরণ সেন মহাশয় আয়ুর্বেদশাস্ত্রে এবং পাণিনি ও কলাপ ব্যাকরণে সবিশেষ বুৎপন্ন ছিলেন।
মাধবনারায়ণ তাহার পরম আদরের বস্তু ছিল। দেশ-বিদেশের নানাবিধ বাদ্যজ্ঞ, নৃত্যজ্ঞ ও সঙ্গীতজ্ঞগণ আসিয়া সেজ রাজার নিকটে কলাবিদ্যা প্রদর্শন করিতেন। তিনিও তাদের অভিজ্ঞতা পরীক্ষা করিয়া বিদ্যানুরূপ পুরস্কার প্রদান করিতেন। গুণীর গুণের আদরে তাহার যশােরাশি অচিরে সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িল। বিশেষত গুণিগণ সকলেই জানিতে পারিলেন যে, মাধবনারায়ণ যুবা হইলেও, কি শামীমাংসায় কি আরব্য, পারস্য, উর্দ ও হিন্দী ভাষা-জ্ঞানে, কি সঙ্গীতে, কি বাদ্যে সর্ববিষয়ে জ্ঞানী, অথচ নিয়গুণে তিনি নিজের পাণ্ডিত্য-প্রকাশে একেবারে বিমুখ। মাধবনারায়ণের পূর্বপুরুষগণের সময় হইতে নিয়ম ছিল যে, শ্ৰীশ্ৰীশার- দীয়া পূজা উপলক্ষে না দশল্প ওইতে শতাবৃত্তি চণ্ডীপাঠ হইত। বিষয়- সম্পত্ত যখন বিভক্ত হইতে লাগিল, তখন দুর্গাজা ও শতাবৃত্তি চণ্ডীপাঠও পৃথক হইয়া পড়িল। তখনও মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণের দুর্গাপূজা এক সঙ্গেই হইত ; পরে উভয়ে পৃ অম্ন হইলে পূজাও পৃথক হইয়া যায়। এই সময়ে মাধবনারায়ণ নিয়ম করিলেন যে, সংস্কৃতভিজ্ঞ ব্ৰহ্মণ পণ্ডিত ব্যতীত কেহই শতাবৃত্তি চণ্ডীপাঠ করিতে পারিবেন না। এইরূপ নিয়ম করিবার তার দুইটা উদ্দেশ্য ছিল। প্রথম উদ্দেশ্য – চণ্ডী শুদ্ধরূপে পাঠ এবং দ্বিতীয় উপ-সংস্কৃত শিক্ষায় ব্রাহ্মগণকে উৎসাহ-দান। তাহার প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রেও ইহার সমধিক অধিকার ছিল। কলিকাতা ক্যাম্বেল মেকাল স্কুলে ইনি নেটিভ ডাক্তা । পরক্ষা পাশ করিয়াছিলেন। ইনি ঢাকা বিভাগের খাতনামা চিকিৎসক ছিলেন। ইহার এই প্রসিদ্ধ চিকিৎসক শ্ৰীযুত নগেন্দ্রনাথ সেন। বৃন্দাবন চন্দ্র সেন মহাশয়ের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ও ব্যাকরণে সুগভীর পাণ্ডিত্য ছিল। ইনি মস্তিষ্কবিকৃত ও বাত ব্যাধির চিকিৎ•ায় সিদ্ধংও ছিলেন। ইহার এক পুত্র বরিশালের ভূতপূর্ব জেল-জজ শ্ৰীযুত অন্ন চৰণ সেন। অপর পুত্র যুত অক্ষ কুমার সেন বরিশালের সুপ্রসিদ্ধ উকলি, আর এক পুত্ৰ শ্ৰীযুত গোপালগগাবিন্দ সেন কবিরাজ আয়ুৰ্বেদ শাস্ত্রে সুপণ্ডিত। উক্ত তিনজন সভাপণ্ডিতই সে রাজার পরলােকের পর লােকান্তরিত হয়েন।
মাখনারায়ণ এই নিয়ম তিনি স্বগ্রাম ও অন্যান্য গ্রামের জ্ঞাতিবর্গ এবং জলাবাড়ী কাঙি পাশা, আমড়াজুলি, বাসা প্রভৃতি স্থানের সম্পন্ন ব্য ক্তগণকে অনুসরণ করিতে অনুরােধ করিলেন। এই নিয়ম সকলেই সাদরে গ্ৰণ করিলেন এবং স্থির করিলেন যে, নবদ্বীপ হইতে কোন ব্রাহ্মণসন্তান পাঠ সমাপন করিয়া ফিরিলে প্রথমতঃ মাধবনারায়ণের সভায় তাহাকে পাণ্ডিত্যের পরিচয় প্রদান করিতে হইব . তাঁহার সভা তাহাকে পণ্ডিত বলিয়া গ্রহণ করিলে প্রথমে তাহাকে মাধবনারায়ণের বাটীতে শতাবৃত্তি চণ্ডীপাঠে নিযুক্ত হইতে হইবে এবং তাকে গুণানুযায়ী বাষিক দিবার ব্যবস্থা হইবে। মাধবনারায়ণ যাহাকে পণ্ডিত বলিয়া বিবেচনা না করিবেন, তিনি কোনও স্থানে চণ্ডীপাঠে ব্রতী হইতে পারিবেন না এবং বার্ষিকও পাইবেন না। তাহাতে মাধবনারায়ণ নিয়ম করিলেন যে, নবদ্বীপের পাঠ-সমাপনান্তে যে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত প্রথম বৎসর তঁাহার সভায় পাণ্ডিত্যের পরিচয় প্রদান করিবেন, সভা তাহাকে পণ্ডিত বলিয়া গণ্য করিলে প্রথম বৎসর তিনি পাথেয় ব্যতীত আর কিছু পাইবেন না; দ্বিতীয় বৎসরে তিনি শতাবৃত্তি চণ্ডীপাঠ নিযুক্ত হইবেন এবং গুণানুসারে বরাবর বার্নিও পাইবেন। তাহার বাটীতে ব্ৰতী হইলে ও বার্ষিক পাইলে আর কোনও স্থানেই চণ্ডীপাঠ ও বাষিক-প্রাপ্তিতে তাহার বাধা এটি ত না। এই নিয়ম অদ্যাপি তাহার পুত্র নগেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী অক্ষুন্ন রাখিয়াছেন। মাধৰনারায়ণের সময়ে যে সকল প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ছিলেন তাহাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখিত হইল -কমলাকান্ত সার্বভৌম, চণ্ডীচরণ তর্কবাগীশ,কাশীশ্বর আয়,প্রসন্ন শিরােমণি,মহামগেপাধ্যায় রামনাথ সিদ্ধান্তপঞ্চানন,কালীনথ তর্কপঞ্চানন হরকুমার কীর্থ তারাপ্রসন্ন বিদ্যারত্ব পণ্ডিত রাসন্ন বিদ্যারত্ন চন্দ্রদ্বীপের রাজবংশের শুরু।
মাধবনারায়ণ প্রভৃতি। নগেন্দ্রনারায়ণের সময়ে কমলাকান্ত সার্বভৌম ব্যতীত অপর সকলে জীবিত ছিলেন। এখন যে সকল পণ্ডিত চণ্ডীপাঠে ব্রতী আছেন ও বার্ষিক পাইয়া থাকেন তাঁহাদের মধ্যে আশুতােষ স্মৃতিতীর্থ, রামলাল স্মৃতিতীর্থ, গ্লোপালচন্দ্র স্মৃতিতীর্থ, গিরীশচন্দ্র স্মৃতির, নীলমাধব স্মৃতিতীর্থ, শশকান্ত তর্কতীর্থ প্রভৃতির নাম উল্লেখযােগ্য। এতদ্ব্যতীত সেজরাজ। তাঁহার স্বর্গীয় পিতার ন্যায় বদান্যতায় যৌবনেই অশেষ কীৰ্ত্তি অর্জন করিয়াছিলেন। পিতৃ-মাতৃ-দায়গ্রস্ত, কন্যাদায়গ্রস্ত, ঋণগ্রস্ত কিংবা কোনও বিপদগ্রস্ত যে কোন লােক তাহার শরণাপন্ন হইতেন, তঁাহাদের কাহাকেও তিনি বিমুখ করিতেন না। নিজে কাহারও সমুদয় দায় দূর করিতে না পারিলে জ্ঞাতিদিগের নিকটেও তাহার দায় বিমােচনের সাহায্যের জন্য অনুরােধ করিতে ইতস্তত করিতেন না। এইরূপে যুব হইলেও মাধবনারায়ণের কর্মদক্ষতার খ্যাতি অল্প দিন মধ্যেই এতদূর পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িল যে, রায়েরকাঠা, বনগ্রাম, চিংড়াখালী ও মঘিয়ার জ্ঞাতিগণ সকলেই তাহাকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিতে লাগিলেন। দিব্যমূৰ্ত্তি, সৰ্ব্ববিদ্যার আধার, কলকান্ত, পিককণ্ঠ যুব সেজ রাজার সঙ্গে যাহার একবার ঘটনাক্রমে আলাপ হইত তিনি জীবনে আর তাহাকে বিস্মৃত হইতে পারিতেন না। বিনা কাৰ্যেও শুধু তার মধুময় কথা শুনিবার জন্য ও তাহার নিরুপম কান্তি দর্শনের জন্য সেই ব্যক্তিকে পুনঃ পুনঃ সেজরাজার নিকট আসিতে মাধবনারায়ণ নানা কার্যের মধ্যেও পশুপক্ষী-পালনের বড়ই পক্ষপাতী ছিলেন। সেজ রাজার চিড়িয়াখানা তখন উক্ত জেলাস্থ সকলের একটা প্রধান দর্শনীয় বস্তু হইয়া উঠিয়াছিল। উহাতে হাতী, ঘােড়া, বাঘ, নানা জাতীয় কুকুর ও কাকাতুয়া, ময়না, হীরামন, লালমােহন, টীয়া ও অপরা- মাধনারায়ণ পর পাখী, খরগােস, গিনিপিগ, বিলাতী ইন্দুর প্রভৃতি অনেকগুলি প্রাণীরও সমাবেশ করিয়াছিলেন। কলিকাতা হইতে তিনি এক খানি পালকী গাড়ী ও একখানি বগী গাড়ী আনাইয়াছিলেন। উহাতে চড়িয়া তিনি ভ্রাতাকে ও জ্ঞাতিদিগকে লইয়া দামােদর-তীরে সমীর- সেবনে বাহির হইতেন। কখন বা তিনি সভ্রাতৃক জ্ঞাতিগণসহ হস্তি- পৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া বিচরণ করিতেন। মাধবনারায়ণের আরও দুইটা চড়িবার ঘােড় ছিল। তিনি ঘোড়ায় চড়িতে এবং তীর-ধনুকে ও ব্যায়ামে পারদর্শী ছিলেন। তিনি বন্দুক ছুড়িতেও বিশেষ অভ্যন্ত ছিলেন। তাহার শারীরিক বলও বিলক্ষণ ছিল। অলসতা তাহার চক্ষু শূল ছিল । নাধবনারায়ণ ধৰ্ম্মনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ মহাপুরুষ ছিলেন। শত বিপদ- পাতের সম্ভাবনা হইলেও তিনি তাহার ধর্মনিষ্ঠা বা ন্যায়পরায়ণতা হইতে পরান্মুখ হইতেন না। মাধবনারায়ণের সুব্যবস্থায় পৈতৃক ঋণ যাহা বাকী ছিল তাহা ক্রমশঃ পরিশোেধ হইয়া আসিতে লাগিল। এই সময়ে এক ব্যক্তি তাঁহার নিকট কৰ্ম্মপ্রার্থী হইয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি পূৰ্বে মাধবনারায়ণের জ্ঞাতির নিকট কৰ্ম্ম করিতেন। মাধবনারায়ণ তাহাকে উপযুক্ত দেখিয়া কার্যে নিযুক্ত করিলেন। উত্তরকালে এই কর্মচারী দ্বারাই তাহার যে সর্বনাশ হইয়াছিল তাহা পরে বিবৃত হইল। এদিকে আবার তিনি যে সমুদয় সম্পত্তি নিলাম হইয়া গিয়াছিল, উহাদেরও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সেজ রাজা দেখিলেন, তঁহার গ্রামটি একটি ছােট খাট সহর হইলেও উহাতে একটি বাজার না থাকায় লােক জনের বড়ই অসুবিধা হইতেছিল। যে দুই চারিখানি সামান্যমাত্র দোকান ছিল, উহাতে গ্রামস্থ লােকের দৈনিক অভাবও দূর হইত না। বিশেষ কোনও উৎসব কিংবা কর্ম পড়িলে তাহাদিগকে সুদূর হাটে বা ৪০ মাধবনারায়ণ বাজারে যাইতে হইত। কেবল গ্রামস্থ লােক লইয়াই রায়েরকাঠী গ্রাম তখনও গঠিত হয় নাই; বহু বিদেশী লােক আসিয়াও নানা কার্য-ব্যপদেশে রায়েরকাঠীতে প্রায় বার মাস বাস করিত। তাই সেজ-রাজা তাহার পাকা রাস্তার প্রথম ও দ্বিতীয় সেতুর মধ্যবর্তী স্থানে রাস্তার দুই পার্শ্বে একটি বাজার বসাইলেন। বাজারটি প্রত্যহ সকালে বসিত এবং প্রায় প্রিয় পৰ্য্যন্ত থাকিত। এই বাজারে গৃহস্থালীর উপযুক্ত সমুদয় জিনিষই পাওয়া যাইত। বিস্তর বিদেশী দোকানী আসিয়া সেজ রাজার অনুমতিক্রমে বাজারে গৃহ নির্মাণ করিয়া দোকান পাতিয়া বসিল। উহাতে ডাইল, চাল তৈল, লবণ, মরিচ, গুড়, বাতাসা, চিনি প্রভৃতি মুদীর ও সন্দেশ, রসগােল্লা ও অন্যান্য মােদকের দোকানের জিনিস দিবারাত্র সব সময়েই পাওয়া যাইত। বাজারটি ক্রমশঃ একটি উচ্চ শ্রেণীর কারবারের স্থান মধ্যে গণ্য হইয়া উঠিল। তখন সে রাজা ঐ বাজার হইতে মজুমদার-বাড়ী পর্যন্ত ব্যাপী স্থান লইয়া সপ্তাহে একদিন করিয়' দিবা দ্বিপ্রহর হইতে রাত্রি টা পর্যন্ত স্থায়ী একটি হাট পত্তন করিলেন। রায়েরকাঠীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী ঐশ্রী কালী মাতার নামানুসারে ঐ টের নাম হইল, “কালীগঞ্জের হাট। ঐ হাটে নানা দেশ-দেশান্তর হ'তে নানাবিধ দ্রব্যসম্ভার আমদানি হইত এবং এ দেশাত দ্রব্যসকল দেশ-বিদেশে রপ্তানি হইত। মাধবনারায়ণের কীত্তি- নিদর্শন এই হাট ও বাজার আর এখন বিদ্যমান নাই। এই হট ও বাজার যে ভাবে নষ্ট হইয়াছিল তাহার বিবরণ পরে যথাস্থানে লিপিবদ্ধ হইল। ছােট রাজা সৌন্দর্য্যে অগ্রজ অপেক্ষা কিঞ্চিৎ নৃন হইলেও অসাধারণ সুন্দর পুরুষ ছিলেন। তিনি বঙ্গভাষা ও সঙ্গীতশায়ে সবিশেষ ব্যুৎপত্তি ও দেশ-বিদেশে অসামান্য খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। তাহার পাখা- মাখনারায়ণ ৪১ রা, তবলা, ঢোলবাদ্য যে একবার শুনিয়াছে তাহার পক্ষে উহা বিত হইবার উপায় ছিল না। তাহার হাতের বােলগুলি এমন স্পষ্ট ও মধুর ছিল যে, সমস্ত বাঙ্গালা দেশ কেন, সমগ্র ভারতে এরূপ সুস্পষ্ট অথচ মধু পাখােজ, তবলা, ঢোলবাদ্য কেহ কখনও শুনেন নাই। বন্ধ ভাষানুশীলনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংস্কৃত-চর্চাও করিতেন। অগ্রজের গায় তার কথাগুলিও বড় মিষ্ট ছিল। যাহার সঙ্গে একবার তার কোন প্রসঙ্গে আলাপ ইত, তিনি আর ছোট বাজার পক্ষপাতী না হইয়া থাকিতে পারিতেন না। তিনি বাল্যকাল হইতেই অতিশয় আমােদপ্রিয় ছিলেন। তাহার বৈঠকখানা সৰ্ব্বদ। আমাদ, প্রমােদ, কৌতুক, তামাসায় মুখরিত থাকিত। পরােপকার-বিষয়েও ছোট রাজা মুক্ত ছিলেন। কিন্তু প্রবৃত্ত-শাসন তাঁহার কখনও অভ্যস্ত হয় নাই; তাই খেয়ালবশে অনেক সময়ে অনেক অবিবেচনার কাৰ্য্য করিয়া পরে দারুণ অনুশােচনা ভােগ করতেন। কষ্ঠি পুত্রকে বিস্ত ও গুণসম্পন্ন নিয়া জননী রাণী অম্বিকাসুন্দরীর আগ্রহাতিশয্যে মাধবনারায়ণ নাবালক বয়সেই তাহার বিবাহ দিয়াছিলেন। ১৯৬৪ সালে যশোর জেলার অন্তর্গত ষােলখা গ্রাম নিবাসী “মধ্যাংশ দ্বিতীয়েৰ পাে” কুলীন শ্রীযুক্ত মধুসূদন ঘোষ মহাশয়ের কন্য। সর্ব গুণা তা শ্ৰীমতী বসন্তকুমারীর সঙ্গে তাহার শুভ-বিবাহকার্য সম্পাদন করাই ছিলেন। মধুসূদন বাবু তখন বাখরগঞ্জের অন্তর্গত পিরােজপুরে মুলেফের কাৰ্য্য করিতেন। এই বিবাহোপলক্ষে বাণী অধিকা রাজবাড়ীর উপযুক্ত আমোদ-প্রমােদ ও সমাজশুদ্ধ লােকের ভােজন প্রভৃতিতে প্রভূত অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন। পতি-গৃহ-শােভিনী বসন্তকুমারী কালে কালে নানাবিধ নানাবিধ শিরবিদায় এবং বাঙ্গালা সাহিত্যানুশীলনে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। তঁাহার রচিত “বাসা এবং রুগ্নাবস্থায় লিখিত “রােগাতুয়া বসন্ত ৪২ মাধবনারায়ণ কুমারী গীতি-কাব্যসাহিত্যে প্রশংসনীয় স্থান অধিকার করিয়াছিল। পতি নরনারায়ণও খ্যাতনামা সাহিত্য-সেবক হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাঁহার বিরচিত “সুনীতি নাটক”, “বাস বিজয় নাটক”, “ধ্রুব-চরিত্র “যােষিবিজ্ঞান” প্রভৃতি গ্রন্থগুলি তাহার সাহিত্য-সাধনার পরিচায়ক। ফলত যোগ্য পতি ও পত্নীর মিলনে উহাদের দাম্পত্য আদর্শস্থানীয় হইয়াছিল। পতি ও পত্নী এক প্রাণ ও একধৰ্ম্ম হইয়া আজীবন দাম্পত্য- সুখে কাটাইয়া গিয়াছেন। সন ১৩১৬ সালের ১৪ই অগ্রহায়ণ নর- নারায়ণের মৃত্যু হয়। কি আশ্চর্য! বৃদ্ধ বয়সে পতির মৃত্যুৰ্তা শুনিয়া পতিপ্রাণ বলিলেন, “তিনি একটু অগ্রে গিয়াছেন। আমিও সত্বর যাইব, আবার মিলন হওয়া চাই”। এই বলিয়া তিনি যে শয্যায় করিলেন তাহা হইতে আর উঠিলেন না। ১ মাস ১৮ দিনের দিন অর্থাৎ ১৩১৬ সালের ২রা মাঘ রাত্রি ১১টার সময়ে হার প্রাণপাখী দেহপিঞ্জর হইতে মুক্ত হইয়া পরলােকগত পতির মুক্তাত্মার সঙ্গে মিলিত হইল। এরূপ আদর্শ দাম্পত্য আজকাল জগতে নিতান্ত বিরল। নরনারায়ণ ও বসন্তকুমারী বিলাতের সুপ্রধান কবি-দম্পতী রবার্ট ব্রাউনিঙ, ও এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিঙের ন্যায় আদর্শ দাম্পত্যসুখের অধিকারী হইয়াছিলেন। তাহারা বাঙ্গালা সাহিত্যের যে যুগে সাহিত্য- সেবায় নিরত ছিলেন তখন এদেশে সাহিত্যিকের সংখ্যা নিতান্ত বিরল ছিল। বরিশাল জেলার সর্বত্রই ছোট রাজা ও ছােট রাণীর বিরচিত গ্রন্থগুলি সাদরে অধীত হইত। গ্রন্থগুলিও ভাষা-গাম্ভীর্যে, ভাববৈভবে, এবং হৃদয়ভাব-জ্ঞাপনে সদ্গ্রন্থমালার মধ্যে স্থানলাভ করিবার সম্পূর্ণ যােগ্য। উহাদিগের বিশেষ মহত্ত্ব এই যে, স্ত্রীশিক্ষার সেই শৈশব-যুগে উহারা লােকনয়নে সমাজকল্যাণের জন্য স্ত্রীশিক্ষার উপযােগিতা বিশদভাবে দেখাইয়া দিয়াছেন। বাসন্তিকা’র কবিতাগুলি এখনও অনেকে পরমা- মাধবনারায়ণ ৪৩ নন্দে আবৃত্তি করিয়া থাকেন। কিন্তু ছোট রাজার বাস্তবিষয়ক পাণ্ডিত্যই দেশ-বিদেশে সর্বত্র তাঁহাকে অমর করিয়া রাখিয়াছে। তদানীন্তন প্রিন্স অফ ওয়েলস সপ্তম এডওয়ার্ড যখন কলিকাতায় আগমন করেন, তখন তাহার অভ্যর্থনার জন্য যে সকল দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ও বাদকের সমাবেশ হয় উহাতে নরনারায়ণ একজন প্রধান বাদ্যকার মধ্যে পরিগণিত হইয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত যখন তিনি কলিকাতায় আসিতেন তখন যেখানেই উচ্চ শ্রেণীর বাদ্যযন্ত্র-বাদনের ব্যবস্থা হইত সেখানেই ছােট- রাজার নিমন্ত্রণ থাকিত এবং সর্বত্রই হার বাদ্যশ্রবণে শ্রোতাগণ মুগ্ধ হইতেন। এইরূপে ভারতীয় সঙ্গীতচর্চায় সর্বস্থানেই ছােট-বাজার নাম প্রধান যন্ত্রবাদক বলিয়া তৎকালে কীৰ্ত্তিত হইত। তাঁহার সমসাময়িক মুরলী বাবু, কেশব মিত্র ও গােপাল মল্লিক প্রভৃতি প্রসিদ্ধ বাদকগণ সকলেই একবাক্যে নরনারায়ণের বাজনার প্রশংসা করিতেন। মাধবনারায়ণের সর্ববিষয়ে কাৰ্যদক্ষতায় আত্মীয়স্বজন ও তাঁহার পরিচিত ব্যক্তিমাত্রই পরম প্রীতিলাভ করিতেন বটে; কিন্তু ইহাতে তাঁহাদের এষ্টেটের ধূৰ্ত কৰ্মচারিগণ বড়ই শান্বিত হইয়া পড়িলেন। ধীমান্ চতুর মাধবনারায়ণ তাহাদের ধূৰ্তামি ও এষ্টেটের অর্থ আত্মসাৎ করণের বিষয় না জানিতেন এমন নহে, তবে একেবারে তাহাদের নিকট হিসাব-নিকাশ ইত্যাদি চাহিলে উহারা গৃহবিচ্ছেদ ঘটাইয়া সর্বনাশ উপস্থিত করিতে পারেন, এই মনে করিয়া উহাদের নিকটে পূর্বের কোনও হিসাব-নিকাশ চাহিলেন না। কিন্তু তিনি এমনভাবে তাঁহার সমস্ত কাৰ্যকৰ্ম্ম চালাইতে লাগিলেন যে, উহাদের আর অবৈধ আয়ের পথ রহিল না। তখন দুর্ব ও কর্মচারিগণ যড়যন্ত্রে প্রবৃত্ত হইল। তাহারা প্রথমে নরনারায়ণের নিকট মাধবনারায়ণের বিরুদ্ধে নানাপ্রকার দোষারােপ ৪৪ মাধবনারায়ণ করিতে আরম্ভ করিল এবং তাঁহাকে বুঝাইতে লাগিল, মেলার আপনাকে বঞ্চনা করিবার চেষ্টা করিতেছেন। আমরা তাহার দুরভিসন্ধির খবর পাইয়াছি। এইরূপে বুঝাইয়া যখন নরনারায়ণকে তাহারা আপনাদের মতাবলী করিয়া হস্তগত করিল, তখন রাণী অধিকার নিকটেও মাধবনারায়ণের বিরুদ্ধে তাহার। নানারূপ অভিযােগ করিতে লাগিল। ক্রমে তাহাকেও বিশ্বাস করাইল যে, সে রাজা ছোট রাজাকে প্রতারিত করিয়া পথে বসাইবার চক্রান্ত করিতেছেন। আমরা আপনাদের উভয়ের কৰ্মচারী, উভয়ের অনে প্রতি পালিত, একজনে অপরকে বঞ্চনা করি- তেছে, আপনি কিছুই দেখেন না, আপনাকে আপনার ভ্রাতা বনা করিবেন, ইাতে আমাদের যােগ দেওয়া অধ, তাই আপনাকে জামাই বে, এখনও পৃথক হন, নচেৎ একেবারে পথে দাঁড়াইবেন। তীবুদ্ধি মাধবনারায়ণ লােক-প্রমূখাৎ কৰ্মচাৰীদিগের এই কুটিল বডষর কথা জানিতে পারিয়া মর্মাহত ও নিতান্ত ক্লিষ্ট হইলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলিলেন না। এই যড়যন্ত্রে যে দুর্লভ কর্মচারী দিগের অনেকেই লিপ্ত আছেন তাহা বুঝিতে তাহার একটুও বিল হইল না। তিনি গুপ্ত অনুসন্ধানে অবগত হইলেন যে, দুই তিনজন সাধারণ কর্মচারী ব্যতীত আর সকলেই তাহার প্রতিকূলে এই ৰৰ যােগদান যােগদান করিয়াছেন। এমন কি, তাঁহাদের দেওয়ান এবং তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজেন্দ্রনারায়ণের বিধবা পত্নী শিব- শরীর কর্মচারী পর্যন্ত উতে লিপ্ত হইয়াছে। একদিন মাধব নারায়ণ যাহাকে নিতান্ত দুরবস্থা দেখিয়া আশ্রয় দিয়াছিলেন এবং যাহার কার্যে সন্তুষ্ট হইয়া, যার উপর প্রভূত বিশ্বাস স্থাপন করিয়া প্রধান কর্মচারিপদে উন্নীত করিয়াছিলেন, সেই ব্যক্তি মাধনারায়ণ এবং মদনমােহন চক্রবর্তী নামক অপর একজন দুষ্ট ৰাহ্মণ কৰ্মচারী এই ষড়যন্ত্রের প্রধান নেতা হইয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন, তাঁহার স্বৰ্গগত পিতার পাৰ সংসার-গগনে বিপত্তির কাল মেঘ ঘনীভূত হইয়াছে। বিষম ঝঞ্জাবাত্যার আর বড় বিলম্ব ন্যই। ইহাতে তাদের সােণার সংসার একেবারে ছারখার হইবে। রাণী মা যাইবেন, প্রাণের ছে ট ভাই নরনারায়ণ ৰাইবে, তিনিও যাইবেন; কেহই থাকিবে না। এ যে করাল কালরূপী মহাভূমিকম্প! মাধবনারায়ণ কিয়ৎকাল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া রহিলেন ও পবিত্রতারূপিণী জননীর মশ্চাঞ্চল্য লক্ষ্য করিয়া তিনি ক্ষণকালের জন্য অত্যন্ত কাতর হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি আশৈশব অতীব ধৈৰ্যশালী ছিলেন; এই অলৌকিক ধীরত। তাহার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁহাকে ত্যাগ করে নাই। তিনি স্থিরবুদ্ধিতে ভবিষ্যতের দিকে চাহিলেন। দেখিলেন, অভন্নতর পন্থ: দারুণ কণ্টকাকীর্ণ, বিষ-সম্পত্তি বিষম বাত্যা-বিক্ষোভ-ম্যবর্তী, রক্ষার আর কোনও উপায় নাই ; এমন কি আপনার প্রাণ পৰ্য্যন্ত সঙ্কাপন্ন। তঁাহার এই ভূয়োদর্শন পরে বর্ণে বর্ণে ফালগছিল। মাধবনারায়ণ তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। প্রাণের ভাই প হইবে, তাহার সঙ্গে বিরােধ করিতে হইবে; এই সমস্ত কথা ভাবিয়া তাহার চিত্ত নিতান্ত কাতর হইয়া পড়িল। তিনি কনিষ্ঠকে আহ্বান করিয়া বিরলে তঁাহাকে অনেক বুঝাইলেন এমন কি তাহাকে বলিলেন, ‘ভাই, তুমিই বিষয়-কর্মের কর্তৃত্ব কর । আমাকে এখানে থাকিতে বল থাকিব ; না হয়, বিদেশে গিয়া বাস করিব। ভাই, তুমি ও আমি এক রক্ত-মাংসে গঠিত ; আমাদের মধ্যে কি কোনও রূপে মনোমালিন্য বা বিরােধ হইতে পারে ? মাধবনারায়ণের কথায় নয়নারায়ণ কর্মচারীদিগের মন্ত্রণার কথা ভুলঃ ;
৪৬ মাধনারায়ণ গেলেন। দাদার কথাই ঠিক বুঝিয়া লইলেন। কিন্তু দাদার নিকট হইতে বাহির হইবামাত্র দুই কর্মচারিগণ আবার তাহাকে জ্যেষ্ঠের প্রতিকূলে কুমন্ত্রণা দিতে আরম্ভ করিল। তাহার ফলে তিনি দাদার কথাগুলি সব ভুলিয় গিয়া আবার তাহাকে প্রবল শত্রু মনে করিলেন। মাধবনারায়ণ যখন তিন চারি বার এইরূপে কনিষ্ঠকে বুঝাইয়াও বিফল মনােরথ হইলেন, তখন জননী রাণী অম্বিকার নিকটে গিয়া তাহার চরণ- যুগল ধারণপূর্বক অপূর্ণনেত্রে সমুদয় নিবেদন করিলেন। মাতা পুত্রের তাদৃশ ব্যাকুলতা দেখিয়া অসম্বরণ করিতে পারিলেন না। তিনি পুত্রের প্রতিকূলে সমস্ত অভিযােগ ভুলিয়া গেলেন এবং কর্মচারীদিগের তদৃশ ব্যবহারের কথা জানিয়া উহাদের উপর অত্যন্ত বিরক্ত ও রুষ্ট হইলেন। মাধবনারায়ণ মাতার পদধূলি গ্রহণ করিয়া বাহিরে গমন করিলেন। মাতা ও পুত্রের পুনরায় মিলনে সংসার শান্তিময় হইল। কর্মচারীরা যখন দেখিল,-রাণী অম্বিকা ও তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র মাধব- নারায়ণে পুনরায় মিলন হইল, তখন তাহারা বুঝিল, এইবার তাহাদের সর্বনাশ হইবে। সেইজন্য তাহারা কনিষ্ঠ নরনারায়ণকে নানাবিধ কুপরামর্শ দিয়া জ্যেষ্ঠের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিল এবং তাহাকে সঙ্গে করিয়া সকলে রাণী অম্বিকা চৌধুরাণীর নিকটে উপস্থিত হইল। নরনারায়ণ মাতার নিকটে আসিয়া অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন এবং কর্মচারিগণ ও নরনারায়ণের ভবিষ্যৎ অমঙ্গলের আশঙ্কার বিষয় উত্থাপিত করিয়া কপট অবর্ষণে গণ্ডদেশ ভাসাইয়া দিল। সরলা জননী কর্মচারীদের কুটিল বাক্যজাল ভেদ করিয়া প্রকৃত রহস্য বুঝিতে অক্ষম হইয়া কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। তিনি একে ত নিতান্ত ধৰ্ম্ম- প্রাণা সতী সাধ্বী রমণী ছিলেন, ধৰ্মকৰ্ম্ম ব্যতীত আর কিছুই তাহার চিত্তে স্থান পাইত না। তাঁহার হৃদয় অকপট ছিল। জটিলতা কুটিলতা মাধবনারায়ণ ৪৭ তঁাহার বুদ্ধির অগম্য। তাঁহার সত্যনিষ্ঠা, ধৰ্ম্মপ্রাণতা, শ্রদ্ধা ও ভক্তির জন্য সকলে তাহাকে দেবী বলিয়া মনে করিতেন। পুত্ৰয় পৃথক হইবে এবং পরস্পরে বিবাদ করিবে, ইহা ভাবিয়া জননীর প্রাণ নিতান্তই আকুল হইয়া পড়িল। দৈবের গতি অব্যাহত, কে তাহা রােধ করিবে? মাধবনারায়ণ অসাধারণ পুরুষকারসম্পন্ন লােক হইলেও দৈবের গতি রােধ করিতে পারিলেন না। মাতার চরণে পুনঃ পুনঃ নিবেদন করিয়া, কনিষ্ঠকে শতবার বুঝাইয়া, কুচক্রীদের ষড়যন্ত্র ভেদ করিতে পারিলেন না। কর্মচারীদের দিবারাত্র কুমন্ত্রণায় জননীর মন মাধবনারায়ণের প্রতিকূলে ধাবিত হইল; ফলে কর্মচারীদের প্ররােচনায় নরনারায়ণ মাধবনারায়ণের সহিত পৃথক হইলেন। দৈবের জয় হইল, কুচক্রীদের মনস্কামনা পূর্ণ হইল। মাধবনারায়ণের জীবনের ভীষণ পরীক্ষা আরম্ভ হইল। ভগবান, বিপদে ফেলিয়া লােককে শ্রেষ্ঠ করেন। মাধবনারায়ণের পক্ষেও বােধ হয় তাহাই ঘটিল। ;
পঞ্চম পরিচ্ছেদ জননী রাণী অৰিকা কোনও পুত্রের পক্ষাবলম্বন করিলেন না। তাহার নিজের সম্প,ত্তর অয় হইতেই তাহার সচ্ছলে চলিয়া যাইত। মাধবনারায়ণ ৰহাটার দোতলায় কাছারী করিতেন, নর-নারায়ণ নীচের তলায় কাছারী করিতে লাগিলেন। দুষ্ট কর্মচারীদিগের প্ররােচনায় প্রায় রােজই উভয় পক্ষের মধ্যে দারুণ দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও গােলযােগ হইতে লাগিল। মাধবনারায়ণ ক নিষ্ঠকে ডাকিয়া সকল বিষয়ের মীমাংসা করিয়া দিতেন। নরনারায়ণ প্রথম প্রথম দাদার কথায় সমস্ত গোলযােগ মিটাইয়া লইতেন। কিন্তু শেষে কৰ্মচারীদিগের অলীক কথায় বিশ্বাস করিয়া তগ্রজকে আর বিশ্বাস করিতেন না। ক্রমে গােলমাল বাড়িরা যাইতে লাগিল; মাতা কিংবা অগ্রজের কথায় আর কোনও ফল হইত না। ফল হইত না। তখন জননী, গুরুদেব, পুরােহিত মহাশয় ও বিশেষ বিশেষ অ ত্মীয়গণকে আনন করা স্বামীর অস্থাবর জিনিসপত্র, প্রাচীন হস্তলিখিত পুরাণ ও তা দ এবং নীলামের অবশিষ্ট বিষয়-সম্প ত্ত ও যে সকল সম্পত্তি তিনি নিজের অর্থে নলামে ক্রয় করিয়াছিলেন সেই গুলি উভয় পুত্রের মধ্যে পূঘপুরুষদিগের প্রানুযায়ী বিভাগ করিয়া দিবার প্রস্তাব করিলেন। তদনুযায়ী প্রথমে সমুদয় অস্থাবর সম্পত্তির বিভাগ হইল। এই বংশের পূৰ্বপুরুষ দগের ব্লীতি-অনুযায়ী বণ্টনকারিগণ মাধ-নারায়ণকে কিছু অধিক দলে; কিন্তু মাধবনারায়ণ তাহা লইলেন না। কনিষ্ঠের প্রতি তঁর এমনই স্নেহ ও মমতা ছিল যে, তিনি বট কারিগকে তুল্য ভাগ করতে বললেন। তুল্য ভাগ হইলে এক ভাগ তিন গ্রহণ করলেন এং বাটা ও বাটীর দালান-কোঠও ঘর-দরজা সমভাগে বিভক্ত হইল।
মাধবনারায়ণ। ৪৯ ; অতঃপর বিষয়-সম্পত্তিও অর্ধাংশ লইতে চাহিলেন; কিন্তু গুরু, পুরােহিত ও আত্মীয় স্বজনগণের নিতান্ত অনুরােধে পূর্বপুরুষদিগের রীতি অক্ষুন্ন রাখিতে নামমাত্র জ্যেষ্ঠোর গ্রহণে সম্মত হইলেন, উহাতে বণ্টককারিগণ বগা-নামক একখানি সামান্য আয়ের সম্পত্তি জ্যেষ্ঠোত্তর নির্দিষ্ট করিয়া বাকি সম্পত্তি তুল্য ভাগ করিয়া দিলেন। * পূর্বে এই বংশের নিয়ম ছিল যে জ্যেষ্ঠ পুত্ৰই সম্পত্তির অধিকারী হইতেন, অন্য পুত্রগণ তাহার অধীন থাকিয়া জায়গীর-স্বরূপ কতক ভূসম্পত্তির ভােগ দখল করিতেন। কয়েক পুরুষ গত হইলে আত্ম কলহে এই নিয়ম ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। অতঃপর জ্যেষ্ঠ দুই ভাগ ও অন্যেরা সম- ভাগে পৈতৃক বিষয় সম্পত্তি ভােগ দখল করিতেন। এই দুই ভাগের এক ভাগ জ্যেষ্ঠোত্তর বলিয়া জ্যেষ্ঠ পুত্র পাইতেন। কালক্রমে জ্যেষ্ঠ একখানি করিয়া শ্রেষ্ঠ তালুক জ্যেষ্ঠোত্তর পাইতেন। মাধব নারায়ণের এই সৌজন্যে ও ভাতৃস্নেহে সকলেই মােহিত ও চমৎকৃত হইলেন। মাধব নারয়েণের পর হইতে সেই জ্যেষ্ঠোর প্রথাও উঠিয়া গিয়াছে।। এক্ষণে সকল পুত্ৰই পৈতৃক সম্পত্তি সম অংশে ভােগ দখল করেন। ভূসম্পত্তির বিভাগ সুবিধা জনক হইল না। মাধব নারায়ণ মহালে মহালে ভাগের জন্য বিশেষ চেষ্টা করিলেন, কিন্তু দুষ্ট কর্মচারীদিগের প্ররােচনায় নর নারায়ণ কিছুতেই বাধ্য * এই বগা তালুক এখন মাধব নারায়ণের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্ৰীযুত গিরীন্দ্র নারায়ণের ভােগ দখলে আছে। গিরীন্দ্র নারায়ণ রাজা বাবু নামেই খ্যাত। + এই বংশে ক্ষত্রিয় রাজোচিত কতিপয় প্রথা এখনও বিদ্যমান আছে। যথা বিজয়া দশমী উপলক্ষে তরবারি লইয়া যাত্রা করা, মধ্যে মধ্যে মৃগয়ায় বহির্গত হওয়া, বিবাহ সভায় জ্যেষ্ঠ পুত্র বর্তমান থাকিতে তদপেক্ষা অধিক-বয়স্ক বা সম্পর্কে গুরুস্থানীয় জ্ঞাতিগণের মাল্য চন্দন লাভে অনধিকার ইত্যাদি।
মাধবনারায়ণ। হইলেন না। প্রতি মহালের প্রতি প্ৰজাই নরনারায়ণের এজমালী রহিল অর্থাৎ প্রতি মহালের প্রতি প্রজার নিকট হইতেই উভয়ে আপন আপন সম পরিমাণ খাজনা আদায় করিতেন। এইরূপ বিভাগের মূলেও দুষ্ট ষড়যন্ত্রকারী কর্মচারিগণ ছিলেন, কেন না মহালে মহালে বিভাগ হইয়া গেলে আর কোনই গােলমাল থাকিত না। তাহা হইলে তাহাদের অসদুপায়ে উপার্জনের পথ সঙ্কীর্ণ হইয়া যাইত এবং উহাদের আদর ও কমিয়া যাইত। সুতরাং পৃথক হইয়াও ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের নিবৃত্তি হইল না ; বরং উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। শান্তির সংসারে অশান্তির চির আবাস বিরাজিত রহিয়া গেল। মাধব নারায়ণ রায়ের কাটীতে যে একটা বাজার ও কালীগঞ্জের হাট নামক একটী হাট বসাইয়াছিলেন, খাল মজিয়া আসায় সেই হাটের অবস্থা খারাপ হইয়া আসিতেছিল। তাহার উপর নরনারায়ণের কর্মচারীদের অত্যাচারে হাটটা একেবারে উঠিয়া গেল। মাধব নারায়ণ ইহাতে বড়ই দুঃখিত হইলেন। বাজারটীর প্রতিও উক্ত কর্মচারিগণের অত্যাচার চলিয়াছিল; কিন্তু মাধব নারায়ণ বাজারের দোকানী পশারীদের অনেক বুঝাইয়া এবং কর্মচারিগণ কৃত ক্ষতি নিজ হইতে পূরণ করিয়া দিয়া তাহার জীবিত কাল পৰ্যন্ত বাজারটীর অস্তিত্ব রক্ষা করিয়া ছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর পর নর নারায়ণের কর্মচারী ও ভৃত্যদের অত্যাচারে বাজারটা উঠিয়া যায়। রাজা মহেন্দ্র নারায়ণের ষ্টেটের সদর কাচারিতে ৰাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্য ব্যতীত অপর জাতীয় কোন কর্মচারী ছিল না, কেন না মহেন্দ্রনারায়ণের বিশ্বাস ছিল যে উচ্চবর্ণের কর্মচারিগণ কখন অবিশ্বাসী হইবে না। কিন্তু দারুণ অর্থ লােভে তাহাদিগকে এমনই বিচলিত করিয়াছিল যে তাহারা ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্ধ হইয়া প্রভুর প্রতি কর্তব্য ও কৃতজ্ঞতা একেবারে মাধবনারায়ণ। বিস্মৃত হইয়া গিয়াছিলেন । পিতার অধিক প্রভুর অনিষ্ট-পাতে তাহাদেরও নিপাত যে অবশ্যম্ভাবী ইহা এই সকল দুষ্ট কর্মচারীরা বুঝিতে পারিতেন না। পারিলে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এষ্টেটটী অতলে ডুবাইয়া দিতে বসিতেন না। হায়, অর্থ লালসা ! তুমি নর- সমাজে বিদ্যমান থাকিয়া ভগবানের শ্রেষ্ঠ জীব মানবকে প্রতিপদে পশুরও অধম করিতেছ। ধন্য তােমার দুর্দমনীয়া শক্তি ও অপরাজেয় আকর্ষণ ! রাজা মহেন্দ্র নারায়ণের অনেকগুলি কর্মচারী ও দাস দাসী ছিল। এই ভ্রাতৃ বিভাগে পুরাতন কর্মচারী ও দাস দাসীদিগেরও বিভাগ হইল। কর্মচারীদিগের বিভাগ হইবার পূর্বেই মাধব নারায়ণের সেই নব নিয়ােজিত প্রধান কর্মচারী ও মদন মােহন চক্রবর্তী নামক জনৈক ব্রাহ্মণ কর্মচারী উভয়েই নর নারায়ণের কৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রথমেই তাঁহারা নর নারায়ণকে লইয়া পৃথক হন। জ্যেষ্ঠ যাহাদিগকে বিভাগে পাইয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে প্রধান প্রধান কর্মচারীদের অনেকেই রাত্রে গােপনে অপর পক্ষের কর্মচারীদিগের সঙ্গে যােগ দান করিতে লাগিলেন। মাধব নারায়ণের কুশাগ্র বুদ্ধির নিকটে তাহাদের কোনও দুরভিসন্ধি অজ্ঞাত রহিল না। তাঁহার নিয়ােজিত চরের মুখে সকলই তিনি জানিয়া পরে সুযােগমত উহার প্রতিবিধান করিয়াছিলেন। রাজা মহেন্দ্রনারায়ণের দেড়শত খানসামা ছিল। মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণের সময়ে উহাদের সকলে জীবিত ছিল না। পুরাতন ও নূতন নিয়ােজিত খানসামায় তখন ৮২ জন ছিল। উহাদের ১১ জন নরনারায়ণ বাছিয়া লইলেন, বাকী ৪১ জন নাবনারায়ণের রহিল।
মাধবনারায়ণ। এই সকল খানসামাদের মধ্যে অনেকে আবশ্যক মত লাঠিয়ালের কাৰ্যও করিত। ইহারা সাহসিকতা ও কর্তব্য-নিষ্ঠায় স্ব স্ব প্রভুর নিতান্ত বিশ্বাসভাজন ছিল। শিক্ষিত সদ্বংশজাত কৰ্মচারিগণ মধ্যে যে মনুষ্যত্ব একেবারে লােপ পাইয়াছিল, নিরক্ষর, নীচ-বংশ-সস্তৃত এই খানসামাদের মধ্যে সেই প্রভুভক্তি ও মনুষ্যত্ব অনেক সময় অভাবনীয় রূপে পরিলক্ষিত হইত। পৈতৃক পরিচারিকাদের মধ্যে অভয়া দাসী মাধব নারায়ণকে প্রতিপালন করিয়াছিল, সে মাধব নারায়ণের পক্ষেই রহিল। সুমিত্রা নরনারায়ণকে প্রতিপালন করিয়াছিল, সে নরনারায়ণের পরিবারভুক্ত হইল। অন্যান্য পরিচারিকা ও পাচক ব্রাহ্মণগণ দুই ভাগে তুল্যরূপে বিভক্ত হইল। এতদ্ব্যতীত লাঠীয়াল, দ্বারবান, সর্দার প্রভৃতিও সম বিভক্ত হইয়া দুই পক্ষে আশ্রয় পাইল। ঐ সব বিভক্ত লাঠিয়াল এবং সর্দারগণের মধ্যে কেহ কেহ কখন কখনও অর্থলােভে বশীভূত হইয়া এক পক্ষ ছাড়িয়া পক্ষান্তরে যােগ দিত বটে, কিন্তু পরিচারক ও পরিচারিকাগণ আজীবন স্ব স্ব প্রভুর কাৰ্য বিশ্বস্তরূপে নিৰ্বাহ করিয়া গিয়াছে। অম্বিকা চৌধুরাণীর কর্তৃত্ব কালে কর্মচারীদের ষড়যন্ত্রে যে সকল সম্পত্তি নিলাম হইয়া গিয়াছিল উহার উল্লেখ আমরা পূর্বেই করিয়াছি। সেই সকল সম্পত্তির মধ্যে তেলিখালি তালুক ও সেলিমাবাদ পরগণার (১০) গণ্ডা জমিদারির অংশ এবং ১৮ গণ্ডা জমিদারি ও উহার অন্তর্গত জোলাগাতী ও দৈহাড়ী তালুক ঢাকার নবাব খাজে আবদুল গণি নিলামে ক্রয় করিয়াছিলেন। মাধব নারায়ণ তদীয় অনুজ নরনারায়ণ ও মাতা অম্বিকা চৌধুরাণীর নিকটে প্রস্তাব করিলেন যে তাঁহারা দুই ভাই একবার ঢাকায় যাইয়া নবাব বাহাদুরকে ধরিয়া দেখিবেন, যদি তিনি টাকা পাইলে তাহাদিগের মাধবনায়ায়ণ। সম্পত্তিগুলি ছাড়িয়া দেন। হয়ত তাহাদের অনুরােধে নবাব বাহাদুর দয়া প্রণােদিত হইয়া টাকা পাইলে ছাড়িয়া দিতেও পারেন। কনিষ্ঠকে লইয়া ঢাকায় যাইবার অপর উদ্দেশ্যও ছিল। সেজ রাজা * মনে করিলেন আমরা দুই ভাই এখানে না থাকিলে বিবাদ বিসংবাদ কম হইবে, এবং বিদেশে একত্র থাকায় হয়তাে দুই ভাইয়ের মধ্যে সমুদয় মনােমালিন্য একেবারে মিটিয়া যাইবে। সুতরাং ঢাকা যাইবার প্রস্তাবটী তঁাহার অনেক চিন্তার ফল। এদিকে প্রজাগণ তাহাদিগকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করিত। তাহারা বলিয়াছিল যে নবাব সাহেবের ঐ সকল সম্পত্তি ফিরাইয়া দেওয়ার অভিমত হইলে তাহারা পরস্পরে চাদা করিয়া উহার অধিকাংশ টাকা দিবে। মাধব নারায়ণ এই প্রস্তাব অবশ্য সর্বাগ্রে জননীকে জানাইয়া ছিলেন এবং মাতা অম্বিকাও সানন্দে উহাতে অভিমত প্রদান করিলেন। কিন্তু অনুজের এষ্টেটের কর্মচারীদিগের বিনা অনুমােদনে ঘােটরাজা পদ মাত্ৰও সঞ্চালনে অক্ষম। সেই জন্য মাধবনারায়ণ ভাগিনী হরসুন্দরীকে দিয়া এই প্রস্তাব কনিষ্ঠের নিকট জানাইলেন। হরসুন্দরী এই প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করিলেন, কেন না তেলিখালি তালুকের অধীন তাঁহার পিতৃদত্ত যে সম্পত্তি ছিল তাহাও এই প্রস্তাবে মুক্ত হইবার সম্ভাবনা। তেলিখালি ভ্রাতারা মুক্ত করতে না পারিলে তাহার পক্ষে প্রবল-প্রতাপ নবাবের কবল *এখন হইতে আমরা স্থানে স্থানে মাধব নারায়ণকে সেজ রাজা ও নরনারায়ণকে ছােট রাজা নামে অভিহিত করিব, কারণ জনসাধারণের মধ্যে তাঁহারা এই নামেই পরিচিত।
৫৪ মাধবনারায়ণ। হইতে তদধীন সম্পত্তি ভােগ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ; সুতরাং তিনি হৃষ্ট মনে ছােট রাজাকে, সেজ রাজার এই প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া ঢাকায় যাইতে বলিলেন। এদিকে সেজরাজার আশ্রিত সম্প্রতি হােট রাজার পক্ষভুক্ত সেই কর্মচারী যখন এই সংবাদ শ্রবণ করিলেন তখন তাহার ভয় হইল, যে ঢাকায় একত্র অবস্থানে উভয় ভাতার পূৰ্ব সম্প্রীতি আবার জাগিয়া উঠিবে এবং তাঁহাদের কর্তৃত্ব যাইবে। এই আশঙ্কায় তিনি কয়েক জন দুষ্ট কর্মচারী ছােট রাজার সঙ্গে দিলেন এবং বলিয়া দিলেন সেইখানে যাইয়া যাহাতে দুই ভাতার মিলন না হয় তাহার ব্যবস্থা তােমরা করিবে। অতঃপর দুই ভ্রাতা জননীর পদধূলি গ্রহণ পূর্বক ঢাকা যাত্রা করিলেন । তখন ঢাকা সহরের অন্য নাম জাহাঙ্গীর নগর ছিল। উভয় ভ্রাতা জাহাঙ্গীর নগরে পৌছিয়া নবাব সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলেন। নবাব সাহেবও বিশেষ সম্মান-সহকারে তাঁহাদের অভ্যর্থনা করিলেন। অতঃপর মাধব নারায়ণের নিকট তাহাদের আগমনের কারণ শুনিয়া তিনি বলিলেন, আপনাদিগকে এখানে কিছু দিন যাপন করিতে হইবে। ইতিমধ্যে আমার কর্মচারীদিগের নিকট হইতে সমুদয় বিষয় অবগত হইয়া, আপনাদের প্রস্তাবের উত্তর দিব। নবাব সাহেবের উত্তরের প্রতীক্ষায় উভয় ভ্রাতাকে জাহাঙ্গীর নগরে কিছুদিন থাকিতে হইল। মাধব নারায়ণের আন্তরিক বাসনা ছিল ঐ সময়ে তাহারা উভয় ভ্রাতা একত্র বাস করেন। কিন্তু দুষ্ট কর্মচারিগণ পূর্ব হইতেই উহারা যাহাতে একত্রে বাস করিতে না পারেন তাহার ব্যবস্থা করিলেন। তাহারা নর নারায়ণের জন্য একটা পৃথক বাটা ভাড়া করিয়া তাহাকে ইয়া তথায় বাস করিতে লাগিলেন। নবাব সাহেব মধ্যে মধ্যে উহাদের উভয়ের বাসা বাটীতে আসিয়া সাক্ষাৎ করিতেন। উভয় মাধবনারায়ণ'। সহােদরও নবাব সাহেবের বাটীতে যাইয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ কৰিতেন। তিনি অপরাহে উহাদের উভয় সহােদরের পরিভ্রমণের জন্য প্রত্যহ হাতী, ঘোড়া, কিংবা ঘােড়ার গাড়ী পাঠাইয়া দিতেন এবং উভয় ভ্রাতা উহাতে চড়িয়া সহরের নানাস্থানে পরিভ্রমণ করতেন। “ঘােড় দৌড় প্রভৃতি আমােদ প্রমােদেও নবাব সাহেব উহাদের নিমন্ত্রণ করিতেন। মাধব-নারায়ণ তখন সদ্যো- বিজ ম্ভিতযৌবন এবং নর-নারায়ণ কৈশোের ও যৌবন-সন্ধি মধ্যস্থ ছিলেন। উভয় ভ্রাতার অলােক-সামান্য কর্পকম কান্তি নবাব সাহেবের চিত্ত এতদূর আকৃষ্ট করিয়াছিল যে, তিনি প্রায় সব সময়ে অন্তঃপুরে গিয়া বেগম মহলে মাধব নারায়ণের অদৃষ্ট-পূৰ্ব তপ্তকাঞ্চন কান্তি ও নির্দোষ রমণীয় কলেবরের প্রশংসা করিতেন। প্রধান বেগম সাহেবা তাদৃশ অপূৰ্ব্ব মনােহর দিব্য কান্তি পুরুষকে একবার দেখিবার জন্য নবাব সাহেবের নিকট বাসনা প্রকাশ করিলেন। তিনি উভয়-ভ্রাতাকে একদিন নিজ বাটীতে নিমন্ত্রণ করিলেন। উভয় ভাতা নবাব বাটীতে উপস্থিত হইয়া স্ব স্ব আসন পরিগ্রহণ করিলেন। বেগম সাহেবা অন্তরাল হইতে মাধব নারায়ণকে দেখিয়া নবাব বাহাদুরকে অন্দরমহলে আহ্বান করিলেন এবং বলিলেন ‘নিঃসন্দেহ আপনার অতিথি রঙ মাখিয়া আসিয়াছেন, তাহা না হইলে কি মানুষ এমন হইতে পারে? নবাব বাহাদুর উচ্চ হাস্য পূর্বক বলিলেন-“বেগম, তােমার ভুল হইয়াছে। রাজা বাবুর স্বাভাবিক বর্ণই এইরূপ তপ্ত কাঞ্চনের মত। আমি উহাকে রােজই ঐরূপ দেখিতেছি।” বেগম সাহেবা কিন্তু কিছুতেই উহা বিশ্বাস করিলেন না। তিনি একখানি রেশমের রুমাল গােলাপ জলে ভিজাইয়া নবাব বাহাদুরের হস্তে প্রদান করিয়া বলিলেন, “আপনি এই রুমালখানি দ্বারা আপনার অতিথির গাত্র মার্জনা করিয়া মাধবনারায়ণ। আমাকে ফিরাইয়া দিলে আমি বুঝিব উনি গায়ে রঙ মাখিয়াছেন কি না।” নবাব বাহাদুর উহা ভদ্রোচিত ব্যবহার নয় জানিয়াও বেগম- সাহেবার কৌতুহল নিবারণের জন্য, বিশেষতঃ তাহাকে মাধব নারায়ণের স্বাভাবিক রূপ-মাধুৰ্য প্রত্যক্ষ করাইবার জন্যই রুমাল খানি লইয়া বাহিরে আসিলেন। নানারূপ মধুর বাক্যে অতিথিকে প্রীত করিয়া শেষে বেগম সাহেবার কৌতুহলের কথা সমুদয় মাধব নারায়ণকে খুলিয়া বলিলেন। মাধব নারায়ণ হাস্য মুখে রুমালখানিদ্বারা নিজে গাত্র পুনঃ পুনঃ মার্জনা করিয়া উহা নবাব বাহাদুরকে প্রত্যর্পণ করিলেন। নবাব বাহাদুর উহা বেগম সাহেবকে পাঠাইয়া দিলেন। বেগম সাহেবা রুমালে কোন রূপ রঙ লাগান না দিখিয়া অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হইলেন এবং একবাক্যে স্বীকার করিলেন যে, তিনি সত্য সত্যই এরূপ রূপবান্ পুরুষ কখনও দেখেন নাই। নবাব বাহাদুর উহাদের উভয় ভ্রাতা অপেক্ষা অনেক বয়োেজ্যষ্ঠ ছিলেন। তিনি উভয় ভ্রাতাকে পরম যত্নে, আদরে ও আপ্যায়নে জাহাঙ্গীর নগরে রাখিলেন বটে; কিন্তু যে কার্যের জন্য তাঁহারা তথায় আসিয়াছিলেন উহার কিছুই হইল না। সুচতুর নবাব বাহাদুরের মধুর বাক্যে ও আদর আপ্যায়নে মুগ্ধ হইয়া উভয় ভ্রাতা ঢাকা নগরীতে চারি মাস কাল অতিবাহিত করিলেন। মহালের কর্মচারী দিগকে আনাইয়া হিসাব পত্র দেখিয়া মীমাংসা করিব বলিয়া নবাব বাহাদুর দিনের পর দিন কাটাইয়া দিতে লাগিলেন। এদিকে ইহরা নবাব বাহাদুরকে যে টাকা পরিশােধ করিয়া বাকি টাকার কিস্তিবন্দী করত সম্পত্তিগুলি ছাড়াইয়া লইবেন মনে করিয়া আসিয়াছিলেন, সেই টাকাগুলিও ক্রমশঃ খরচ হইয়া যাইতে লাগিল। ইতি মধ্যে বাটীতে উভয় পক্ষীয় দুষ্ট কৰ্মচারিগণ মাধবনারায়ণ। পরস্পর দলবদ্ধ হইয়া নানারূপ বিবাদ বিসংবাদ আরম্ভ করিল এবং নিজ নিজ প্রভুর নিকটে বিপক্ষের নামে দোষারােপ করিয়া উত্তেজনাপূর্ণ পত্র লিখিতে লাগিল। উভয় ভ্রাতাকেই বাধ্য হইয়া গৃহে প্রত্যাবৃত্ত হইতে হইল। ফলতঃ নবাব বাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও পরিচয়ই সার হইল। গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া সুবুদ্ধি মাধব নারায়ণ উভয় ভ্রাতার মধ্যে বিবাদগুলির মীমাংসার জন্য বহু চেষ্টা করিলেন বটে; কিন্তু কাৰ্যতঃ কিছুই হইল না, বরং বিবাদনল প্রচণ্ডবেগে প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। অবিরত দাঙ্গা হাঙ্গামায় পাইক, ঢালি ও লাঠীয়ালগণের বেতনে এবং ফৌজদারী মােকদ্দমায় উভয় পক্ষের জলের মত অজস্র অর্থব্যয় হইতে লাগিল। এই প্রসঙ্গে তখনকার লাঠীয়ালদের সম্বন্ধে দুই চারিটি কথা উল্লেখযােগ্য। এখন যেমন বিবাদের সম্ভাবনা হইলেই উভয় পক্ষ পুলিসের শরণ গ্রহণ করে, তখনকার দিনে বলে ও অর্থে নিতান্ত অক্ষম না হইলে কেহই পুলিশে যাইতেন না। জমীদারগণ এখনকার মত নিস্তেজ ছিলেন না। এই ভাতৃ-বিরােধে প্রতি পক্ষেই সর্বদা দুই তিন শত লাঠীয়াল প্রস্তুত থাকিত। তদ্ব্যতীত আবশ্যক মত পাঁচ সাত শত পাইক ও লাঠীয়ালের যােগাড় রাখিতে হইত। মাধব নারায়ণের জহিরদী খাঁ নামে একজন বিখ্যাত লাঠীয়াল ছিল। সে চারিটী বর্ষা একেসঙ্গে চালাইতে পারিত। মাধব নারায়ণের দ্বারবানদিগের মধ্যে শীতল সিংহ কুস্তি ও তরবারি ক্রীড়ায় সুদক্ষ ছিল। বস্তুতঃ তখনকার জমিদারগণকে দস্য, তস্কর ও অন্যান্য দুষ্ট প্ৰজাদিগকে আয়ত্ত করিবার জন্য সর্বদা এই সব লাঠীয়াল, ঢালী ও তরবারি-চালক লােক নিযুক্ত রাখিতে হইত। প্রকৃত প্রস্তাবে উহারা সৈন্য পদবাচ্য না হইলেও এই সব ঢালী, পাইক ও, লাঠীয়াল জমিদারদিগের পক্ষে সৈন্যের কাৰ্যই মাধবনারায়ণ। করিত। সৈন্যদিগের ন্যায় ইহারা ও মাসিক বেতন ব্যতীত প্রতি বিজয়কার্যে ভূরি ভূরি পারিভােধিক পাইত। মাধব নারায়ণ দেখিলেন, এইভাবে কিছুকাল ভ্রাতৃবিবােধ চলিতে থাকিলে পৈতৃক ঋণ পরিশোেধ হওয়া ত দূরের কথা, যাহা কিছু বিষয় সম্পত্তি এখনও বিদ্যমান আছে তাহাও নষ্ট হইয়া যাইবে। তিনি পুনরায় মীমাংসার প্রস্তাব করিয়া বলিলেন,-“এই বিবাদ আমাদের দুই সহােদরের মধ্যে না করিয়া নবাব সাহেবের সঙ্গে করিলে হয়ত নষ্ট সম্পত্তির কতেক উদ্ধারও হইতে পারে।” এই কথা নর নারায়ণ এবং বিশেষতঃ ভগিনী হরসুন্দরীর মনােমত হইল। তাঁহারা উভয়ে হৃত- সম্পত্তির প্রজাগণকে আহ্বান করিলেন। আহুত প্রজাবর্গ সকলে রাজবাড়ীতে আসিয়া একবাক্যে প্রতিজ্ঞা করিল, তাহাদের বসতি বাটা পৰ্যন্ত ত্যাগ করিতে হইলেও তাহারা তাহা করিবে, কিছুতেই তাহার নবাব বাহাদুরকে কবুলিয়ত দিবে না ও তঁাহার বাধ্য হইবে না। আমার পূর্বেই বলিয়াছি, তখনকার প্রজাগণ জমিদারগণকে নিতান্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিত ; জমিদারগণও প্রজাদিগকে অপত্য- নির্বিশেষে পালন করিতেন। বিশেষতঃ রায়ের কাঠীর রাজারা প্রজাদিগের প্রকৃত পিতামাতার স্থান অধিকার করিয়াছিলেন; প্রজারাও তাঁহাদিগকে পিতামাতার ন্যায় ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিত এবং প্রাণপণে তাঁহাদের আদেশ পালন করিত। । বিশাই মাল, তিতাই মাল, জহির * মাসিক মাহিয়ানা যাহাদের ছিল তাহারা ব্যতীত যাহারা নগদ টাকা লইয়া লাঠীয়ালের কাৰ্য করিতে আসিত তাহাদিগকে পূর্ব বঙ্গে নগদী বলিত। + যে সকল সম্পত্তি রায়ের কাঠীর রাজাদের হস্তচ্যুত হইয়াছে সেই সকল সম্পত্তি প্রজাগণ এখনও তাহাদের পুরাতন মনিবের জঙ্ক অঙ্গবিসর্জন করে। বিশেষতঃ রায়ের কাঠীর রাজবাটীর বড় হিস্যার জমিদারগণ পূর্ব হইতে এখন পর্যন্ত প্রজাপালনে চির প্রসিদ্ধ।
মাধবনারায়ণ চাকর প্রভৃতি বলবান লাঠীয়ালগণ প্রজােিগর নেতৃস্থান অধিকার করিয়া নবাব সাহেবের প্রতিকূলে দলবদ্ধ হইল, পূর্বোক্ত লাঠীয়ালগণ মহেন্দ্র নারায়ণের আমােলে তাহার নিতান্ত বিশ্বাসী ভৃত্য-ও-প্রজা ছিল। মধাবনারায়ণ ও নরনারায়ণের বিরােধ সময়ে উহারা কোন পক্ষই অবলম্বন করে নাই। বিশাইমাল তখন ঐ অঞ্চলে শ্রেষ্ঠ লাঠীয়াল বলিয়া গণ্য ছিল। শালপ্রাংগু, আজানুলম্বিত বাহু, বিশালবক্ষা, সিংহ-পরাক্রম বিশাইমাল যেমন সাহসিকতায়, বুদ্ধিমত্তায় ও কাৰ্যদক্ষতায় সর্বাগ্রগণ্য ছিল, সেইরূপ অসাধারণ প্রভুভক্তও ছিল। প্রভুর জন্য প্রাণ দিতে বিশাই কোন কালেই কুষ্ঠিত হইত না। বিশাইমালের অসাধারণ শক্তি সম্বন্ধে অনেক কাহিনী এখনও রায়েরকাঠী গ্রামে সর্বদা কথিত হয়। উহাদের মধ্যে একটি কাহিনী এখানে উল্লিখিত হইতেছে। মহেন্দ্রনারায়ণের জীবদ্দশায় একদা শ্মশানকালী পূজা উপলক্ষে ইষ্টদেবতা ঠাকুর বাড়ীর খােলায় (বাবােয়ারী তলায়) কবিগান হইতেছিল। কবিগানের বড় সমাদর ছিল। উক্ত কবি শুনিতে হিন্দু মুসলমান বিস্তর লােক সমবেত হইয়াছিল। রাজবাড়ীরও অনেকে তথায় উপস্থিত ছিলেন। রাজা মহেন্দ্র নারায়ণ স্বয়ং তথায় উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ মুসলমান শ্রোতাদিগের মধ্যে পরস্পরে কলহ হইয়া ভীষণ দাঙ্গা উপস্থিত হইল। অন্যান্য শ্রোতারা ছত্রভঙ্গ হইয়া ভয়ে পলায়নের উপক্ৰম করিল। তখন রাজা মহেন্দ্রনারায়ণ বিশাইমালকে গােলমাল থামাইতে আদেশ করিলেন। বিশাই একটী গােটা বাঁশ লইয়া প্রায় দুইশত কিংবা আড়াই শত মুসলমানকে একদিকে চাপিয়া সভা মণ্ডপের বাহির করিয়া দিল। বিশাইমালের তাদৃশ বিক্রম-দর্শনে সভাস্থ সকলেই বিস্ময়ে অবাক হইয়া রহিলেন। গােলােযােগকারী মুসলমানগণ আর কিছু করিতে সাহসী ঐ সময়ে মাধবনারায়ণ। হইল না; বিবাদ সহজে মিটিয়া গেল। সকলেই সানন্দে আবার কবি শুনিতে লাগিল। প্রজাগণ এই বিশাইমাল, তিতাইমাল এবং জহির চাকর প্রভৃতির নেতৃত্বে নবাব সাহেবের প্রতিকূলে দলবদ্ধ হইল *। নবাব বাহাদুরও স্বীয় লাঠীয়ালগণ দ্বারা উহাদিগকে বশ করিতে চেষ্টিত হইলেন ।। উভয় পক্ষের পুনঃ পুনঃ বীৰ্য পরীক্ষা হইতে লাগিল। উহাতে শত শত লােক হতাহত হইল। ফৌজদারী মােকদ্দমারও টী হইল না। মহেন্দ্রনারায়ণের সময় হইতে নিয়ােজিত ঐ সকল মহালের নায়েব বরিশাল জেলার অন্তর্গত মৈশানি গ্রাম নিবাসী রামরাজা পালিত ও কৃষ্ণকান্ত পালিত নবাব সাহেবের নিকট হইতে উৎকোচ গ্রহণ করিলেন এবং সমুদয় কাগজ পত্র হিসাবাদি নবাব সাহেবকে প্রদান করিয়া তাহারই বাধ্য হইলেন। নবাব বাহাদুরও তাহাদের উভয়কে ঐ সকল মহালের নায়েব-পদে নিয়ােজিত করিলেন। এই রামরাজা পালিত ও কৃষ্ণকান্ত পালিত মহেন্দ্রনারায়ণের অন্নে প্রতিপালিত। তাহারই প্রসাদে উহাদের বিপুল বিষয়-সম্পত্তি ও ক্রমােন্নতি হইয়াছিল। তাহারই চাকরি করিতে করিতে তাহাদের ক্রমে দশসহস্রাধিক মুদ্রা বার্ষিক আয়ের সম্পত্তি হইয়া- ছিল। কিন্তু কালের কি বিচিত্র পরিবর্তন! আজ মহেন্দ্রনারায়ণের পুত্র- দের দুঃসময়ে সেই রামরাজা ও কৃষ্ণকান্ত সমুদয় নিমকের বিষয় একেবারে বিস্মৃত হইয়া উৎকোচ লােভে শক্ত নবাব সাহেবের পক্ষে গমন করিলেন। অম্বিকা চৌধুরাণী লােকদ্বারা রামরাজাকে আনাইয়া তাহার পুত্রদের পক্ষ * ইহাদের দলে অনেক লাঠীয়াল ছিল। * এখনকার মতন তখন নবাবের সম্পত্তি ছিল না ; তখনও সম্পত্তিশালী ও ধনী ছিলেন কিন্তু এখনকার মত নয়।
মাধবনারায়ণ। গ্রহণের জন্য বিশেষ অনুরােধ করিলেন। কিন্তু উহাতে কিছুই ফল হইল না। ইহাতে ধর্মপ্রাণা চৌধুরাণী প্রাণে বড় ব্যথা পাইলেন এবং উক্ত রামরাজাকে অভিসম্পাত করিলেন,-“দেখ পালিত, তােমাদের অভীষ্ট কিছুতেই সিদ্ধ হইবে না, সত্বরই তােমরা অতি দীন নিরন্ন অবস্থায় পতিত হইবে। তমাদের পাপের ইয়ত্তা নাই।” বলা বাহুল্য, সতী সাধ্বীর এই অভিসম্পাত বর্ণে বর্ণে ফলিয়াছিল। এই পালিতদের বিপুল বিষয় সম্পত্তি ক্রমশঃ কপূরের মত কোথায় উড়িয়া গেল ; এমন কি শেষ অবস্থায় তাহাদিগকে মধ্যে মধ্যে উপবাসেও দিন কাটাইতে হইয়াছিল এবং তাঁহাদের দুর্দশার সীমা ছিল না। মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণের সঙ্গে বিবাদে নবাব সাহেবের অজস্র অর্থব্যয় হইতে লাগিল। বিবাদ-বিসংবাদের অনন্য-সহচর ফৌজদারী মােকদ্দমাও অবিশ্রাম চলিতে লাগিল। প্রতি মােকদ্দমায়ই বিশাই একজন প্রধান আসামী মধ্যে গণ্য হইতে লাগিল। অবশেষে আসামী- দিগকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য পুলিশ নিয়ােজিত হইল। আসামী শ্রেণীর বিস্তর লােক পুলিশ কর্তৃক ধৃত হইল বটে; কিন্তু বহু চেষ্টাতেও পুলিশ বিশাইকে ধরিতে পারিল না। একদিন দারােগা মহাশয় (সব ইনস্পেক্টর) প্রায় দুই তিনশত লােকসহ রাত্রির শেষ প্রহরে বিশাই মালের বাটী ঘিরিয়া রহিলেন। দারােগা মহাশয় স্থির করিয়াছিলেন যে, প্রত্যুষে তাহাকে গ্রেপ্তার করিবেন। বিশাই সমুদায় জানিল ; সেও রাত্রিতে বাহির হইল না বা পলাইবার চেষ্টা করিল না। অতি প্রত্যুষে তাহার দুই স্ত্রীকে দুই স্কন্ধোপরি স্থাপন করিয়া, এক হাতে একটী বন্দুক ও এক হাতে একখানি রাম দা ( ছাগ, মেষ, বলি দিবার বড় দাওকে ঐ দেশে রাম দা বলে) লইয়া বিশাইমাল “আলি আলি” ডাক ছাড়িয়া বাহির হইল। তাস্কার তৎকালের সেই ভীষণ মূর্তি দেখিয়া পুলিশ ৬২ মাধবনারায়ণ। কিংবা দায়ােগা মহাশয় কেহই তাহার সম্মুখীন হইতে সাহসী হইলেন না। সে নিরাপদে নদী পার হইয়া স্ত্রীদ্বয়কে লইয়া চলিয়া গেল। সকলে ভয়, বিস্ময়ে একদৃষ্টে সেই দৃশ্যটি দেখিতে লাগিল। বিশাই এমনি বীর ছিল ! আবার আচার, ব্যবহারে, বিনয় ও শিষ্টাচারে সে ভদ্র- লােকের স্থান অধিকার করিয়াছিল। কবি ভবভূতি সত্যই বলিয়াছেন- “বাদপি কঠোরাণি মৃদূনি কুমাদপি, লােকোরাণাং চেংসি কোমু বিজ্ঞতুমহতি ॥” বিশাই গ্রেপ্তার হইল না ; সুতরাং বিবাদ বিসংবাদ পূর্ণ মাত্রায়ই চলিতে লাগিল। রােজ রােজ খুন, জখম বিস্তর হইতে লাগিল। নবাব সাহেব মহাল দখল করিতে পারিলেন না। মাধব নারায়ণের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিশাই মালের অসাধারণ সাহস ও কাৰ্যদক্ষতা নবাব সাহেবকে অত্যন্ত চিন্তাকুল ও উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিল। জলের মত অর্থ ব্যয় ও অগণ্য লােজন ও লাঠীয়াল নিয়ােজিত করিয়াও তিনি কিছুই করিয়া উঠিতে পারিলেন না। অবশেষে অনন্যোপায় হইয়া তিনি মীমাংসার প্রস্তাব করিলেন। নবাব সাহেব প্রস্তাব করিলেন- “তেলিখালি প্রভৃতি তালুক ব্যতিরেকে সেলিমাবাদের (১০ গণ্ডা জমি- দারীর খরিদা অংশ এবং ১৮ গণ্ডা জমিদারী ও তদধীন জোলাগাতী ও দৈহাড়ী তালুক আমি বিনা টাকায় রাজাদের ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত আছি। এতদ্ব্যতীত তেলিখালি তালুকের অধীন শ্রীযুক্তা হর সুন্দরীর যে সম্পত্তি আছে তাহারও উপযুক্ত মূল্য প্রদানে ক্রয় করিতে সম্মত আছি। রাজারা অনুগ্রহ পূর্বক সমুদয় বিবাদ বিসংবাদ মিটাইয়া ফেলুন।” হরসুন্দরী প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং নরনারায়ণকেও সম্মত করাইলেম। কিন্তু মাধবনারায়ণ কিছুতেই ভঁহার প্রাণের তেলিখালী ছাড়িতে সম্মত হইলেন না। অতঃপর, হরসুন্দরী নরনারা- মাধবনারায়ণ। গণকে সঙ্গে করিয়া মাধবনারায়ণের নিকটে যাইয়া তাহাকে বলিলেন, “ভাই, আমার কথা শুন। নবাব সাহেব একজন ধনবানব্যক্তি ; জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট, কমিশনার প্রায়ই তার বাটীতে নিমন্ত্রিত হয়েন। তাঁহার সঙ্গে বিবাদ বা মােকদ্দমায় পরিণামে আমরা নিশ্চয়ই নিষ্ফল হইব। ফলে যাহা তিনি খরিদ করিয়াছেন তাহা তাহারই থাকিবে। তথাপি দয়া পরবশ হইয়া আমাদিগকে বিনা অর্থে তেলিখালী বাদে আর সমুদয়ই ছাড়িয়া দিতে সম্মত আছেন। ইহাতে কি তােমার মত বুদ্ধিমান ব্যক্তির অমত করা উচিত? ভাই, তুমি সম্মতি দাও। মাধবনারায়ণ বলিলেন, “দিদি। এক তেলিখালীর সঙ্গে আর সমস্তের তুলনাই হয় না, কেননা তেলিখালিতে অনেক কর্মচারী আত্মীয় স্বজন চাকর, নাপিত, ধােপা, ভুইমালী প্রভৃতি আমার পিতামহের ও পিতার দত্ত জমি প্রাপ্ত হইয়া সুখস্বচ্ছন্দে ভােগ করিতেছে ও আমাদের কাৰ্য্য কৰ্ম্ম সম্পাদন করিয়া আসিতেছে। ঐ তালুক আমরা ত্যাগ করিলে গণি মিঞা সাহেব তাহাদের উহা কি ভােগ করিতে দিবেন? তাহারা কি খাইবে ? তাহারা পরিবার পরিজন নিয়া কোথায় দাড়াইবে ? আমাদেরও মান সম্রম বজায় থাকিবে না। তাহা আপনি জানেন। উহা ছাড়িয়া দিয়া বাকী সম্পত্তি আনিয়া আমাদের কি ফল হইবে ? উহাতে আমাদের বংশােচিত মান-সম্ভ্রম কিছুই রক্ষিত হইবে না; অথচ নবাব সাহেবের অনুগ্রহ প্রদত্ত দাসত্ব গ্রহণ করিতে হইবে। তাহার পর জানিবেন, ইহা নবাব সাহেব দয়া করিয়া দিতেছেন না, তিনি যেমন বিবাদে পারিয়া উঠিতেছেন না, সেই- রূপ মােকদ্দমায়ও নিশ্চয়ই সুফল পাইবেন না, নীলাম রদ হইয়া যাইবে। তাই স্বতঃ প্রবৃত্ত হইয়া এইরূপ আপাত-প্রীতিকর অনুগ্রহ প্রকাশের প্রস্তাব করিয়াছেন।”“হরসুন্দরী মাধবনারায়ণের কথার সারবত্তা ভাবিয়া ;
৬৪ মাধবনারায়ণ। দেখিলেন না। তিনি কেবল নিজের বিত্ত গুলির মূল্য স্বরূপ নগদ টাকার কথা ভাবিতে লাগিলেন। তাই যখন দেখিলেন মধিবনারায়ণ সহজে অভিমত দিবেন না; তখনই তাঁহার অমােঘ অস্ত্র প্রয়ােগ করিলেন। বুদ্ধিমতী নারী জানিতেন যে, মাধব নারায়ণ ভ্রাতার সঙ্গে একত্ৰ থাকিতে পারিলে সৰ্বস্ব ত্যাগেও কাতর হইবেন না, তাই তিনি রাজনীতি বিশারদ মন্ত্রীর ন্যায় বলিলেন, “দেখ ভাই আমি আর তােমাকে বেশী কি বুঝাইব? তবে এটি স্থির জানিও যে, তুমি এই মীমাংসায় সম্মত না হইলে নরনারায়ণ তােমার সঙ্গে আর যােগদান করিবে না। সে পৃথক ভাবে নবাব সাহেবের সঙ্গে মীমাংসা করিয়া লইবে। তােমায় একাকী নবাব সাহেবের সঙ্গে বিবাদ ও মােকর্দমা করিতে হইবে। আমার অভিমত মত কাৰ্য্য করিলে আর ভ্রাতৃ- বিবােধ থাকিবে না। তােমরা দুই ভাইয়ে একত্র হইয়া ঋণ পরিশােধ করিয়া হত সম্পত্তির অপেক্ষা আরও অনেক সম্পত্তি বাড়াইতে পারিবে। দেখ, এখন যাহা ভাল মনে কর তাহা কর।” ভগিনীর এই প্রস্তাব সম্বন্ধে তিনি অনেক ভাবিলেন। তাহাদের এষ্টেটটীও ঋণজালে জড়িত; একাকী বিশিষ্ট ধনপতিনবাবের প্রতিকূলে বিবাদ ও মােকর্দমা পরিচালনা অসম্ভব। অগত্যা তাহাকে ভগিনীর উপদেশ গ্রহণ করিতে হইল। অতঃপর নানারূপ পরামর্শ করিয়া স্থির হইল যে নরনারায়ণের কর্মচারী মহাশয় দুই ভ্রাতার প্রতিনিধি-রূপে জাহাঙ্গীর নগরে যাইয়া মীমাংসা করিয়া আসিবেন। তদনুযায়ী দুই ভাই তাহাকে আম মােক্তার নামা দিয়া লােকজন সহ নবাব দরবারে পাঠাইয়া দিলেন। এই সমস্ত কাৰ্যে মাধবনারায়ণের অবশ্য সরল মত ছিল না। কিন্তু অনন্যগতি হইয়া ও সর্বোপরি পুনরায় সৌভাত্রের আশায় উৎফুল্ল হইয়া তিনি মাধবনারায়ণ ভ্রাতার কথানুযায়ী তাহারই কর্মচারীকে মীমাংসার জন্য ঢাকা সহরে পাঠাইতে বাধ্য হইলেন। উক্ত কর্মচারী ঢাকায় রওনা হইবার কিয়ৎদিবসন্তে মাধবনারায়ণ তাহার খুল্লতাত পুত্ৰ শ্ৰীযুত চন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী * মহাশয়ের সঙ্গে এইরূপ ধাৰ্য্য করিলেন যে নবাব সাহেবের নিলাম খরিদা তেলিখালি তালুকের চারি আনা অংশ তাঁহারা দুই ভাই তাহাকে দিবেন এবং নীলাম রদের মােকদ্দমায় উচ্চতম আদালত পর্যন্ত যাবতীয় খরচ চন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী দিবেন। । চন্দ্রনাথের অবস্থা তখন ভাল ছিল এবং ঘরেও তাহার বিস্তর টাকা মজুত ছিল। মাধব নারায়ণ চন্দ্রনাথের সঙ্গে সমস্ত স্থির করিয়া নরনারায়ণ ও হরসুন্দরীর অভিমত করাইলেন। বরিশালের উকিলগণও নিলাম রদ হইবে বলিয়া তাহাদিগকে একরূপ নিশ্চিন্ত করাইয়া ছিলেন। অতঃপর উভয় ভ্রাতা একযােগে বরিশাল আদালতে নবাব সাহেবের বিরুদ্ধে নিলাম রদের মােকদ্দমা উপস্থিত করিলেন। এদিকে একজন কর্মচারীকে জাহাঙ্গীরনগরে প্রেরণ করিলেন। সেখানে পূর্ব প্রেরিত কর্মচারী মহাশয়ের নিকটে সমস্ত কথা লেখা হইল এবং মীমাংসা না করিয়া তাহাকে ফিরিয়া আসিতে আদেশ করা হইল। কিন্তু মানুষ ইচ্ছা করিতে পারে মাত্র, গড়িবার হাত একমাত্র ভগবানের। সেই কর্মচারী আমমােজার নামার বলে নবাব সাহেবের সঙ্গে তাহার পূর্ব প্রস্তাবানু- * ইনি শিবনারায়ণের তৃতীয় পুত্র বিশ্বনাথের পৌত্র। তিনি একজন তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। + তখন চন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী অপেক্ষা মাধবনারায়ণ ও নররায়ণের বিষয় সম্পত্তি অধিকতর থাকিলেও উহারা তখন ঋণজালে বড়ই জড়িত ছিলেন এবং ঘরেও টাকা ছিল না।
মাধবনারায়ণ। যায়ী মীমাংসা করিয়া ফেলিলেন, সমস্ত চেষ্টাই বিফল হইল। এই সম্বন্ধে নানারূপ উক্তি গ্রামময় রাষ্ট্র আছে। কেহ কেহ বলেন কর্মচারী মহাশয় নবাবের নিকটে ৫০০০, পাঁচ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণে রাজাদের প্রেরিত পত্র পাইয়াও মীমাংসা পত্র রেজিষ্টরী করেন। কর্মচারি-মহাশয় রায়ের কাঠী প্রত্যাগমন করিয়া বলিলেন,-পত্ৰ পাইবার পূর্বেই মীমাংসাপত্র রেজিষ্টরি হইয়াছে এবং দেনা পাওনা শােধ হইয়াছে। কেহ কেহ আবার বলেন যে উক্ত উৎকোচের টাকার কিয়দংশ পত্ৰবাহী কর্মচারীও পাইয়াছিলেন। তবে প্রকৃত রহস্য নিগূঢ় অন্ধকারে বিলীন। ফলতঃ মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণ বিষম ক্ষতিগ্রস্ত হইলেন। নিয়তি কেন বাধ্যতে। মাধবনারায়ণ প্রথমতঃ উকিলদের সহিত পরামর্শ করিয়া সব দিক বজায় রাখিয়া নিলাম রদের মােকদ্দমা চালাইবেন স্থির করিলেন, কিন্তু নরনারায়ণের কর্মচারী মহাশয় উহাতে রাজী হইলেন না। তিনি বুঝিলেন, উহাতে প্রথমেই তাহাকে বিপদে পড়িতে হইবে; কেননা তিনিই আমমােজার নামার বলে দলিল স্বাক্ষর করিয়া নবাব সাহেবকে দিয়া আসিয়াছেন; এক্ষণে মকদ্দমা হইলে তাঁহারই বিপদ। তজ্জন্য তিনি নরনারায়ণকে নানা ভোকবাক্যে ভুলাইয়া নিলাম রদের মামলা চালাইতে অস্বীকৃত করাইলেন। চন্দ্রনাথও ইহাদের ভ্রাতাদের মধ্যে পরস্পরে অনৈক্য দেখিয়া টাকা দিতে চাহিলেন । কথায় বলে “দশচক্রে ভগবান্ ভূত” হয়েন ; মাধবনারায়ণেরও তাহাই ঘটিল তাহাকে পাকে চক্রে পড়িয়া নিলাম রদের মােকদ্দমা •• * ইনি মৃত্যুকালে বিষম আত্মগ্লানির জ্বালায় অধীর হইয়া উৎকোচ গ্রহণের বিষয় স্বীকার করিয়া ছিলেন।
মাধবনারায়ণ। হইতে বিরত হইতে হইল। অদৃষ্ট বিরূপ হইলে এইরূপই হয়। নীতিকার ঠিকই বলিয়াছেন- “প্রতিকূলতা উপগতে হি বিধৌ বিফলত্ব এসড়ি বহুসাধনতা”। নরনারায়ণ ও মাধবনারায়ণ তেলিখালী হইতে চিরতরে বঞ্চিত হইলেন। কিন্তু তাঁহাদের পিতামহ প্রাণনারায়ণ-প্রদত্ত তেলিখালীর অন্তর্গত সম্পত্তি মাধবনারায়ণের পিসামহাশয় খানাকুল কৃষ্ণনগর- নিবাসী প্রকৃত মুখ্য কুলীনগ্রণী নাথ সৰ্বাধিকারী মহাশয়ের উত্তরাধি- কারিগণ ভােগ করিতেছিলেন। কয়েক বৎসর গত হইল তাহারা উহা নবাব সাহেবকে বিক্রয় করিয়াছেন। কিন্তু মহেন্দ্রনারায়ণ প্রদত্ত সম্পত্তি বাগুটীয়া-নিবাসী চণ্ডীচরণ ঘােষ মহাশয়ের বংশধরগণ শ্ৰীযুত রাজেন্দ্র কুমার ঘােষ প্রভৃতি এখনও ভােগ করিতেছেন। নবাব সাহেব কিছুতেই উহা হইতে তাহাদিগকে বঞ্চিত করিতে পারেন নাই। এক তেলিখালী হইতে নবাব সাহেবের উত্তরাধিকারীবৃন্দের বার্ষিক আয় ৫০,০০০ টাকার অধিক। রায়ের কাঠির রাজবংশের অন্যান্য জমিদারের সহিত বিবাদে ইহাদের সম্পত্তি নষ্ট হয় নাই, বরং প্রতি বিবাদেই ইহারা জয়ী হইয়াছিলেন। কিন্তু আত্ম কলহ এবং কর্মচারী দিগের বিশ্বাসঘাতকতাই ইহাদের সর্বনাশের হেতু এবং এখনও সেই কালাগ্নি ধিকি ধিকি জলিতেছে। পূর্বোক্ত তেলিখালীতে মাধব নারায়ণের পিতামহ মহাত্মা প্রাণ- নারায়ণ কালিকা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করিয়া কালী মাতার দৈনিক পূজার জন্য যে ১•• বিঘা জমী দেবত্র ও পূজক ব্রাহ্মণকে তাঁহার বেতন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য ২৪ বিঘা জমী ব্রহ্মের ও পরিচৰ্যাকারক- দিগকে নিষ্কর জমি দান করিয়াছিলেন, নবাব গণিমিঞার সহিত নিষ্পত্তির সময়ে সেই সকল জমি নবাব সাহেব খাস করিবেন না, এবং ৩৮ মাধবনারায়ণ। যাহাতে সুশৃঙ্খলে পূজার কার্য সম্পন্ন হয় তাহার প্রতি মনােযােগ রাখিবেন, এইরূপ চুক্তি ছিল। তদবধি নবাব সাহেব কিংবা তাহার উত্তরাধিকারিগণ ক্লেহই উক্ত শ্ৰীশ্ৰীকালীমাতার পূজার কোনও ব্যাঘাত করেন নাই। নবাব গণি মিঞার সময়ে দেবীর মন্দির নদী কবলে নিপতিত হইতেছিল, ইহা জানিয়া নবাব সাহেব নদী হইতে দূরবর্তী স্থানে নূতন মন্দির নির্মাণ করাইয়া তথায় শ্ৰীশ্ৰীকালীমাতার বিগ্রহ স্থানান্তরিত করাইয়াছিলেন। তদবধি কালী মাতার পূজা নবনির্মিত মন্দিরেই হইয়া আসিতেছে। রাজা প্রাণনারায়ণের সময়ে যেরূপ পূজা হইত, এখনও তথায় সেইরূপ পূজাই হয় এবং প্রতি অমাবস্যায় ছাগাদি বলি হইয়া থাকে। মুসলমান হইলে কি হয়, ধর্মের প্রকৃত মর্ম অবগত হইতে পারিলে কোনও ধর্মের প্রতি কাহারও বিদ্বেষ থাকিতে পারে না। বরং সকল ধর্মের প্রতিই শ্রদ্ধার সঞ্চার হয়। নবাব গণি মিঞার সহিত ইহাদের মীমাংসা হইয়া যাইলে তিনি কৃষ্ণকান্ত পালিত ও রামরাজা পালিতকে এক বৎসরের বেতন অগ্রিম দিয়া কৰ্মচ্যুত করেন এবং বলেন,-“তােমরা চিরকাল যাহার অন্নে প্রতিপালিত, সামান্য অর্থলােভে যখন তাহাদের বিরুদ্ধাচরণ করিতে পারিয়াছ, তখন তােমাদিগকে বিশ্বাস করা যায় না।”
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। পূর্ব পরিচ্ছেদে যে ভ্রাতৃবিরােধের কথা উল্লিখিত হইয়াছে উহাতে মাধব নারায়ণ কিরূপ বিষম বিপদের মধ্যে নিপতিত হইয়াছিলেন উহার দুই একটা দৃষ্টান্তের উল্লেখ ব্যতিরেকে পাঠকবর্গের উহা সম্যক হৃদয়ঙ্গম হইবে না মনে করিয়া আমরা সর্বাগ্রে দুই একটির উল্লেখ করিতেছি। ইহা হইতেই উপলব্ধি হইবে, যে অমৃতে কিরূপ ভীষণ গরল-উৎপত্তি হইতে পারে। মাধব নারায়ণের নিয়ম ছিল যে, তিনি প্রত্যহ একস্থানেই ক্রিয়া সম্পাদন করিতেন। আহার কালে যে সমস্ত গৃহপালিত মার্জার তথায় উপস্থিত হইত তাহাদিগকে পৃথক করিয়া ব্যঞ্জনাদি-মিশ্রিত অ খাইতে দিতেন। পরিবার বর্গের উহাতে বিরক্তি দর্শন করিলে তিনি বলিতেন, ইহারাও ভগবানের সৃষ্ট জীব। আমরা সকলেই, যদি ইহা দিগকে খাইতে না দিয়া তাড়াইয়া দিই তাহা হইলে ইহারা কোথায় যাইবে, কিরূপে বাঁচিবে? মূক জীব মাত্ৰকেই আমাদের আহার দান কর্তব্য। উহাতে আর কেহ তাহার নিকটে বিড়াল, কুকুর কিংবা অন্য কোনও গৃহপালিত পশুপক্ষীকে আহারও পানীয় দানে বিজি প্রকাশ করিত না। সুতরাং সেজরাজার আহারকালে প্রত্যহ দশ পনেরটি বিড়াল আসিয়া একত্র হইত। সেজন্ধা অন্তঃপুরে ভােজন করিতে আসিয়াছেন উহা যেন বিড়ালগুলি গণনা দ্বারা স্থির করি রাখিয়াছিল; কারণ তাহারা ঠিক সময়ে আসিয়া হাজির হইত। প্রতিপক্ষেরা জানিত যে, সেজ বা রােজই এক নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়া আহার করিয়া থাকেন। দুষ্ট কর্মচারীরা পরামর্শ করিয়া লােক ৭০ মাধবনারায়ণ। যারা তাহার বসিবার দক্ষিণ দিকের প্রাচীরের অপর দিকের কয়েকখানি ইষ্টক বাহির করিয়া সামান্যমাত্র অবশিষ্ট রাখিয়া দিলেন। উদ্দেশ্য এই—যাহাতে মাধব নারায়ণের প্রকোষ্ঠ হইতে উহা দেখিতে পাওয়া না যায়। সেজরাজা প্রতিদিন যেমন রাত্রিকালে আহার করিতে অন্তর্বাটীতে যাইতেন ও যে কক্ষের যে নির্দিষ্ট স্থানে বসিতেন, সেই রাত্রিতেও তিনি নিয়ম মত ভােজনে উপবিষ্ট হইলেন। একটি চলিত কথা আছে-“রাখে কৃষ্ণ মারে কে, মারে কৃষ্ণ রাখে কে”। মাধব- নারায়ণের উপর আজ এই কথাটি পূর্ণ মাত্রায় খাটিয়া গেল। দৈবাৎ নির্দিষ্ট স্থান হইতে একটু সরাইয়া আজ বসিবার আসন বিন্যস্ত হইয়াছিল। মাধব নারায়ণও উহা লক্ষ্য না করিয়া আসনে উপবিষ্ট হইলেন। বিপক্ষের চর দেখিয়া গিয়াছিল যে, তিনি আহারের জন্য অন্তঃপুরে গিয়াছেন। চরের কথানুসারে প্রতিপক্ষ-নিয়ােজিত হত্যাকারী আততায়ী আহারের সময় নিরূপণ করিয়া প্রাচীর গাত্রে নব বিরচিত বন্ধু-পথে মাধব নারায়ণকে লক্ষ্য করিয়া একটি সুতীক্ষ্ণ বর্ষা চালনা করিল। মাধৰ নারায়ণ দৈবাৎ সে দিন তাহার পােয় বিড়ালগুলিকেই সে দিকে আহার দিয়া ছিলেন। ঐ বর্ষার আঘাতে একটি বিড়াল বিদ্ধ হইয়া তৎক্ষণাৎ মেও মেও করিতে করিতে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। অন্যান্য বিড়ালগুলি ভয়ে লাফাইয়া উঠিয়া সেজ- রাজার অল্প ব্যঞ্জনাদির উপরে পড়িয়া গেল ; গ্লাসের জল চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। অবাক হইয়া মাধব নারায়ণ আহাৰ্য্য পরিহার পূর্বক উঠিয়া দাড়াইলেন। তৎপরে লক্ষ্য করিয়া সমস্ত বুঝিতে পারিলেন এবং অবিলম্বে ভােজন কক্ষ ত্যাগ করিলেন। তদবধি তিনি রন্ধন- শালায় বসিয়াই আহার করিতেন ও চারিদিকে লােক রাখিয়া প্রহরীর কাৰ্য করাইতেন।
মাধবনারায়ণ। ৭১ দুষ্ট কর্মচারিগণ ইহাতে বিফল-মনােরথ হইয়া নূতন ষড়যন্ত্রে প্রবৃত্ত হইলেন। সেজরাজাকে হত্যা করিবার জন্য নূতন হত্যাকারী নিয়ােজিত করিলেন। ঐ ঘাতক একদা রাত্রিকালে অন্যের অলক্ষিত ভাবে একখানি শাণিত রামদা হন্তে মাধব নারায়ণের দোতলার শয়নকক্ষে তাহার পালঙ্কের নিম্নে লুকাইয়া রহিল। রাত্রি তৃতীয় প্রহরে যখন বাটীস্থ সকলেই নিদ্রায় শান্তিময় জোড়ে শয়িত, তখন দুরাত্মা শয্যাতল হইতে বাহির হইল এবং হত্যা করিয়া পলাইয়া যাইবার জন্য কক্ষের কপাট উন্মুক্ত করিল। মাধবনারায়ণ যে গৃহে শয়ন করিতেন তথায় সমগ্র রাত্রি একটা আলাে প্রজ্বলিত থাকিত। ঘাতক পূর্বেই সেই আলাে নির্বাণ করিয়া দিয়াছিল। কপাট খুলিবার শব্দে তাহার পত্নী শ্রীমতী কামিনী চৌধুরাণীর নিদ্রা ভঙ্গ হইল। তিনি জাগরিত হইয়া দেখিলেন ঘরের আলাে নির্বাপিত; কিন্তু দরজা খােলা, তাহার পর বিশেষ নিরীক্ষণে দেখিলেন, কমধ্যে পালঙ্কের অনতিদূরে উজ্জ্বল রামদা হন্তে এক দীর্ঘকায় দস্যু। উহা দর্শন মাত্র প্রত্যুৎপন্নমতি মাধব-পত্নী তাহার লেপখানি দ্বারা স্বামীর সর্বাঙ্গ আবৃত করিয়া দিয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন। গৃহ-কীর আর্তনাদে গৃহের অন্যান্য কক্ষের লােক-সকল জাগরিত হইল, তখন চারিদিক হইতে লােক আসিয়া পড়িল ; ঘাতক প্রাণভয়ে পলায়ন করিল। বহু অনুসন্ধানেও সে যে কে, এবং রাত্রির অন্ধকারে সে যে কোথায় লুকাইয়া পড়িল তাহা কেহ জানিতে পারিল না। তদবধি মাধৰ নারায়ণ আজীবন শয়নকক্ষের সম্মুখে বাহিরের দিকে একা হিন্দুস্থানী দ্বারবানকে প্রহরীর কাৰ্য্যে নিয়ােজিত রাখিতেন এবং শয়ন করিবার পূর্বে গৃহের সমুদয় স্থান অনুসন্ধান করিয়া দেখিতেন।
१२ মাধবনারায়ণ। মাধব-ভগিনী হরসুন্দরী একজন অশেষ কীর্তিমতী মহিলা বলিয়া পরিগণিত হইয়া গিয়াছেন। উহার ভূয় ভূয়ঃ নিদর্শন সর্বত্র আছে। অল্প বয়সেই তাহাকে দারুণ বৈধব্য যন্ত্রণা ভােগ করিতে হইয়াছিল। পিতৃ-প্রদত্ত সম্পত্তি ও যৌতুকাদির উপ ভােগদখল করিয়া তিনি পিতৃ-সংসারেই জননীর পদসেবার রত থাকিতেন। তিনি ক্ষেত্র, চন্দ্রনাথ, গয়া, কাশী, প্রয়াগ, বৃন্দাবন, মথুরা, কুরুক্ষেত্র, হরিদ্বার প্রভৃতি নানা তীর্থক্ষেত্ৰ পৰ্যটন এবং সেই সকল স্থানের ক্রিয়া-কর্মে প্রভূত অর্থব্যয় করিয়াছিলেন। অতঃপর গৃহ-প্রত্যাগতা হইয়া রায়ের কাঠীতে সিদ্ধেশ্বরী মাতার ৰাটীর উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা সুবৃৎ নবরত্ন * প্রস্তুত করাইয়া উহার, উপরি তলায় প্রস্তর নির্মিত শ্রীরাধিকা ও শ্রীমদনমােহন বিগ্রহ ও নিয় তলায় প্রস্তর-নিৰ্মিত শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত করেন। ঐ উপলক্ষে তিনি একটি নবাগ্নি যজ্ঞ সম্পাদন করিয়াছিলেন। তােক্ত যজ্ঞে কাশী, কাঞ্চী, ভ্রাবিড়, মিথিলা এবং বঙ্গদেশের পণ্ডিত ব্রাহ্মণ মণ্ডলী নিমন্ত্রিত হইয়া ১৬ টাকা হারে বিদায় প্রাপ্ত হন। উহাদের যাতায়াত ও রায়ের কাঠীতে অবস্থানের জন্য প্রত্যেকের দূরত্ব ও সম্মান অনুযায়ী পাথেয় দেওয়া হইয়াছিল। রাঘব, রবাহুত, ভট্ট এবং দরিদ্রগণ মনােমত অর্থ ওৰত্ৰ লাভ করিয়া ছিল। ১৭৭৭ শকাব্দের বৈশাখে (বাঙ্গালা ১২৬ সাল) এই মন্দিরােৎসর্গ ও উক্ত ক্রিয়া সম্পাদিত হয়। গ্রামস্থ প্রাচীন লােকদিগের নিকটে শ্রুত হওয়া যায় যে, এই মন্দির নির্মাণে চারি। * ১৩০৪ সালে ২া জ্যৈষ্ঠ যে ভূমিকম্প হয় উহাতেই, এই কীর্তিত নবরত্নী নষ্ট হইয়াছিল।
হরসুন্দরীর নবরত্ন। অভয়াদাসীর শিবমন্দির।
No text on this page.
মাধবনারায়ণ। ১৭৯ বৎসর লাগিয়াছিল। এই মন্দির খুব উচ্চ ও সুবৃহৎ এবং নানারূপ কাৰুকাৰ্য ভূষিত ছিল। হর-সুন্দরীর বিপুল কীর্তির নিদর্শন সেই নবরত্ন এখন কল কালের ধ্বংশ লীলায় বিধ্বস্ত। রাশি রাশি ধ্বংশাবশেষ এক্ষণে দর্শকদিগের কৌতুহল নিবৃত্তি করিতেছে। হরসুন্দরীর পতিকুল বৈষ্ণব ছিলেন, সেই জন্যই তিনি বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া উক্ত নবরত্নের উপরের তলায় তাহার ইষ্টদেব রাধিকা ও মদনমােহনের প্রস্তর-নির্মিত বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত করেন। এই প্রতিভাময়ী মহিলা শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ লবণান্তে উদযাপন করিয়া প্রভূত অর্থ ব্যয় করেন। অতঃপর তিনি বহু ব্যয়ে ধৰ্মঘট ব্রত করিয়া উহার প্রতিষ্ঠা করেন। হরসুন্দরীর কীর্তি কেবল মন্দির উৎসর্গে ও ব্রত নিয়ম-উদঘাপনে নিবদ্ধ ছিল না, লােকহিতকর কর্মেও এই মহীয়সী নারীর কীর্তি সর্বাগ্রে ঘােষণীয়। শকাব্দে (বাঙ্গালা ১২৭৫ সালে) রাজবাটীর সম্মুখে তিনি একটা সুদীর্ঘ দীর্ঘিকা খনন করাইয়া উহার তিন পাড়ে তিনটা সুবৃহৎ ইষ্টক নির্শিত ঘাট নির্মাণ করাইয়া- ছিলেন ; ইহাতে রাজবাটীর শােভা বিশেষ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। তিনি উহার প্রতিষ্ঠা কাৰ্য্যে অনেক অর্থ ব্যয় করেন। এই দীঘিকার সলিল-পানে অনেক দূরবর্তী গ্রামের লােকেরাও উপকৃত হইয়াছে ও হইতেছে। হরসুন্দরীর দীর্ঘিকা ও সেতু অদ্যাপি বর্তমান রহিয়া তাহার বিপুল কীর্তি- মেখলা বিঘােষিত করিতেছে। এতদ্ব্যতীত এই করুণাময়ী মহিলা কন্যাদায়গ্রস্ত, পিতৃমাতৃদায়গ্রস্ত বিস্তর লােকের দায় উদ্ধার করিয়া দিতেন। ব্রাহ্মণের উপনয়ন ও শুভ বিবাহ সম্পাদন তাহার বড়ই ঐতিকর ছিল। বলা বাহুল্য, এই সকল পুণ্য-কাৰ্যাবলিতে তাঁহার দুই সহােদর মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণ তঁার দুই হস্ত স্বরূপ ছিলেন।
৭৪ মাধবনারায়ণ। মধুবনারায়ণের হৃদয় কিরূপ মহৎ ও উচ্চ ছিল তাহার একটা দৃষ্টান্ত এইখানে লিপিবদ্ধ হইতেছে। মাধবনারায়ণ আপনাদের বাটীর পূর্বদিকে মদন সরকারের বাটী পৰ্য্যন্ত একটা রাস্তা ইতি- পূৰ্বেই তৈরী করাইয়াছলেন। লােকের সুবিধার জন্য সেই রাস্তাটা পূর্বদিকে ইষ্টদেবতা-ঠাকুর বাড়ী পর্যন্ত বাড়াইয়া দেওয়া তাহাতে সরিকগণের সহিত এজমালি ধােপাবাড়ীর কিয়দংশ ঐ রাস্তায় পড়ে। রাজকুমার রায় চৌধুরী প্রভৃতি তিন সরিক অর্থাৎ মেজ, সেজ এবং ছােট হিস্যার সরিকগণ রাস্তাটি নষ্ট করিয়া দিতে উদ্যত হন। এইজন্য তাহারা বিস্তর লাঠিয়াল ও সড়কিওয়ালা সংগ্রহ করিলেন। মাধবনারায়ণের পক্ষেও রাস্তাটা রক্ষা করিবার জন্য বহু লাঠিয়াল ও সড়কিওয়ালা নিযুক্ত হইল। মাধব- নারায়ণ ভাবিয়া দেখিলেন যে, এই বিবাদে বহু লােক হতাহত হইবে এবং ফৌজদারী মামলায়ও বিস্তর টাকা নষ্ট হইবে। তাই তিনি ডেপুটীমাজিষ্ট্রেটের নিকট শান্তিরক্ষার উদ্দেশ্যে পুলিশ মােতায়েন করি- বার জন্য দরখাস্ত করিলেন। হাকিম দরখাস্ত গ্ৰাহ করিলেন। ফলে একজন দালােগা ও দুইজন কনষ্টেবল শান্তিরক্ষাৰ্থ তথায় প্রেরিত হইল। কিন্তু পুলিশ দেখিয়াও বিপক্ষগণ ভীত হইল না; বরং উহাদিগকে আক্রমণ করিয়া তাহারা দারােগাকে অপমানিত করিল ও কনষ্টেবল দুইজনকে প্রহার করিল। মাধব নারায়ণ মনে করিয়াছিলেন, শান্তি রক্ষার জন্য যখন পুলিশ আসিয়াছে তখন আর দাঙ্গা-হাঙ্গামা হইবে না। এই ভাবিয়া তিনি তাহার পক্ষের অধিকাংশ লাঠিয়াল ও সড়কীওয়ালাকে বিদায় দিয়া- ছিলেন। কিন্তু তাহার বিপক্ষগণের দলে তখন বিস্তর লাঠীয়াল ও সড়কীওয়ালা ছিল, উহারা মাধব নারায়ণের রাস্তাটা কাটিয়া নষ্ট করিয়া মাধবনায়ায়ণ। ৭৫ দিতে আরম্ভ করিল। মাধব নারায়ণের পক্ষে যে অল্প সংখ্যক লাঠীয়াল ও সড়কীওয়ালা ছিল, তাহারা সাহসে ভর করিয়া এবং দারােগা ও ও মনিবের উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া বিপক্ষের বহুসংখ্যক লাঠিয়াল ও সড়কি ওয়ালার সম্মুখীন হইল। দাঙ্গা কমে বাটীর নিকটে আসিয়া পড়িল। উভয় পক্ষেই বহুলােক আহত হইতে লাগিল। বিপক্ষে বাটী লক্ষ্য করিয়া ইষ্টক নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিল। তখন উপায়ান্তর না দেখিয়া মাধবনারায়ণ বৈঠকখানার দোতলা দালানের ছাদের উপরে উঠিয়া তীর ছুড়িতে লাগিলেন ও বিপক্ষের অনেক লাঠীয়ালকে আহত করিলেন। প্রতিপক্ষের দাঙ্গাকারীরা সম্মুখ দিকে সুবিধা হইল না দেখিয়া অন্দর মহলের দিকে চড়াও হইল। সেই সময়ে অবস্থা সঙ্কটাপন্ন দেখিয়া মাধবনারায়ণের বিশ্বস্ত অনুচর গােরাদ ঢাণী বন্দুক লইয়া গুলি করে। ঐগুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া বিপক্ষের নিরীহ কর্মচারী রসময় মিত্রের দেহে বিদ্ধ হয় ও মিত্র মহাশয় সংজ্ঞাশূন্য হইয়া ভূপতিত হন। লােকে মনে করিল, তিনি মারা গিয়াছেন। তখনই ‘খুন হইয়াছে, ‘খুন হইয়াছে বলিয়া রব উঠিল। ফলে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় স্বপক্ষ ও বিপক্ষ উভয় পক্ষেরই লাঠিয়াল প্রভৃতি পলায়ন করিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই বিরধীয়স্থল এক প্রকার জনশূন্য হইল। দাবােগা তখন মাধবনারায়ণের বিপক্ষ পক্ষীয় দুই তিন জন লােককে গ্রেপ্তার করিলেন ও রসময় মিত্রকে হাসপাতালে পাঠাইলেন। যে সময়ের ঘটনা, সেই সময়ে পুলিশের অত্যন্ত প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল। পুলিশই তখন গ্রামের হর্তা-কৰ্ত্তা বিধাতা ছিল। পুলিশের রিপাের্ট তখন বেদবাক্য বলিয়া হাকিমেরা বিশ্বাস করিতেন। কাজেই পুলিশেরও তখন উৎকোট গ্রহণের প্রভূত সুবিধা ছিল।
৭৬ মাধবনারায়ণ। এ ক্ষেত্রেও ইহার অপব ঘটিল না। দাবােগা স্থির করিলেন, রাজকুমার রায় চৌধুরী ও ঈশ্বরচন্দ্র রায় চৌধুরী প্রভৃতির বিরুদ্ধে রিপােট দিবেন। ইহা শুনিয়া তাঁহারা দারােগার নিকটে লােক পাঠাইলেন এবং উৎকোচের বলে যাহাতে তিনি বিপরীত রিপাের্ট দেন সে পক্ষে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। দারােগা বলিলেন,-সদর মহকুমা নিকটে ; এত বড় ঘটনা চাপিয়া রাখা যাইবে না। তবে কর্তারা যাহাতে বাঁচিয়া যান সেজন্য চেষ্টা করিব। কিন্তু ৫০০০ টাকা দিতে হইবে। দাবােগার দাবীর পরিমাণ দেখিয়া রাজকুমার রায় চৌধুরী, দুর্গানারায়ণ রায় চৌধুরী ও ঈশ্বরচন্দ্র রায় চৌধুরী-প্রমুখ বিপক্ষ পক্ষের জাতিগণ মাধবনারায়ণের নিকটে আসিয়া বলিলেন, আমরা তােমা অপেক্ষা বয়সে জ্যৈষ্ঠ হইলেও তুমি আমাদের জ্যেষ্ঠানুযায়ী বংশধর এবং ধারাবাহিকরূপে বংশের শ্রেষ্ঠ পদের অধিকারী তুমিই। এ অবস্থায় আমাদিগকে কারাগারে পাঠাইলে তােমারই অখ্যাতি হইবে। আমরা যদি কেহ কাহারও বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ও প্রমাণ না দিই, কেহ কাহাকেও জব্দ করিবার চেষ্টা না করি, তাহা হইলে দাবােগা আমাদের কি করিতে পারিবেন ? মাধব নারায়ণ বিপন্ন জ্ঞাতিবর্গের অনুরােধ রক্ষা করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। তিনি দারােগার নিকটে বলিয়া পাঠাইলেন, ব্যাপারটা যাহাতে মিটিয়া যায় সেইরূপ ব্যবস্থা আপনি করুন। কিন্তু দারােগা তাহাতে অসম্মত হইয়া মাধব নারায়ণ ও তাহার জ্ঞাতিবর্গ—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই গবর্ণমেন্টকে বাদী করিয়া রিপাের্ট দাখিল করিলেন। ফলে আতিবর্গের সহিত নিরপরাধ মাধবনারায়ণ ও আসামী-শ্রেণীভুক্ত হইলেন। জ্ঞাতিবৃন্দকে বিপদ হইতে উদ্ধার করিবার জন্য তিনি স্বেচ্ছায় বিপদকে আলিঙ্গন করিলেন। বরিশাল আদালতে এই দাঙ্গা '। মাধবমারায়ণ। ৭৭ মামলা চলিতে লাগিল। বিচারফলে রাজকুমার রায় চৌধুরী ও ঈশ্বরচন্দ্র রায় চৌধুরীর দণ্ডভােগ হইয়াছিল এবং মাধব নারায়ণ ও দুর্গানারায়ণ প্রভৃতি মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন। মাধবনারায়ণ কিরূপ জনপ্রিয় ছিলেন তাহার প্রমাণ এই মামলায় পাওয়া যায়। বরিশালের আদালতে যখন মাধবনারায়ণের মামলা চলিতেছিল, তখন তাঁহার মামলা শুনিবার জন্য বিপুল জনসমাগম হইত। যে দিন তিনি মুক্তিলাভ করেন সেই দিন এজলাসে এক পাগলিনী উলুধ্বনি এবং সমবেত লােকগণ জয়ধ্বনি করিয়াছিল। বাঙ্গালা ১২৬৫ সালের ১৩ই কার্তিক সেজ রাজার প্রথম পুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণ জন্মগ্রহণ করেন। পৌত্র-মুখ অবলােকন করিয়া রাণী অম্বিকা পরম প্রীতিলাভ করিলেন। ধর্মপ্রাণ অম্বিকা পৌত্ররত্ন সর্শনে নিজেকে কৃতকৃতার্থ মনে করিলেন। পতির পরােলােক- প্রাপ্তির পর হইতেই তিনি অত্যাগ করিয়াছিলেন। দিবারাত্র ধর্মকর্মেই তিনি কাল যাপন করিতেন। এই সময়ে তিনি লখাকাঠী হাটে একটি সুবৃহৎ পুষ্করিণী খনন করাইয়া উহার প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ পুষ্করিণীর একটা পাকা ঘাট প্রস্তুত করাইয়া দিলেন ; উহাতে উক্ত গ্রামস্থ লােকের জলকষ্ট দূরীভূত হইল। লকাঠী পুষ্করিণীর ন্যায় জোলাগাতী প্রভৃতি অন্যান্য গ্রামেও তিনি কয়েকটি দীর্ঘিকা খনন করাইয়া উহাদের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। এই সকল পুষ্করিণী এবং দীর্ঘিকা এখনও বর্তমান থাকিয়া অতীতের সেই স্মৃতি রক্ষা করিতেছে। তাহার নিজ সম্পত্তির আয় হইতে অনেক অর্থ গুরু, পুরােহিত ও নিঃস্ব ব্রাহ্মণদিগকে দান করিতেন। বিশেষত ব্ৰহ্মণের যজ্ঞােপবীত ও পরিণয় উপলক্ষে তিনি প্রভূত অর্থ প্রদান করিতেন। অনেক দাস-দাসী থাকা সত্বেও এই ধর্মনিষ্ঠা সত্বেও এই ধর্মনিষ্ঠা মহীয়সী নারী ;
মাধবনারায়ণ। প্রত্যহ স্বহস্তে পূজার উপকরণ লইয়া সিদ্ধেশ্বরী মাতার মন্দিরে যাইতেন এবং তথায় পূজা ও আরাধনায় অনেক সময় অতিবাহিত করিতেন। রামায়ণ ও পুরাণাদি শ্রবণে দিবসের পঞ্চম বেলা পর্যন্ত কাটাইয়া শাস্ত্রানুমত ষষ্ঠ বেলায় ব্রহ্মচারিণীর আহাৰ্য্য গ্রহণ করিতেন। রাত্রিকালেও এইরূপ দ্বিপ্রহর পর্যন্ত সন্ধ্যা-আত্মিক ও ধর্মকথা শ্রবণে অতিবাহিত করিয়া কিঞ্চিৎ দুগ্ধপান-পূৰ্ব্বক শয়ন করিতেন। আবার এদিকে রাত্রির চতুর্থ যামেই তিনি শয্যা ত্যাগ করিয়া আহ্নিক ইত্যাদিতে রত হইতেন। ইহার কিছু দিন পরে তিনি একদিন প্রাতঃকালে পুত্র, পুত্রবধু, আত্মীয়-স্বজন এবং কর্মচারী সকলকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, তিনি সিদ্ধেশ্বরী দেবীর আদেশ প্রাপ্ত হইয়াছেন যে, শীঘ্রই তাঁহাকে পতিলোকে গমন করিতে হইবে। অতএব সেই রাত্রিতেই তিনি কাশীধাম যাত্রা করিবেন। এই বলিয়া তঁাহার নিজের যে সমুদয় অলঙ্কার ছিল, তাহা পুত্রবধূদ্বয়কে অর্পণ করিয়া তাহাদিগকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, আমার দেহান্তে আমার নিজ বিষয়-সম্পত্তি যাহা কিছু আছে তাহা তােমরা তুল্য অংশে বিভাগ করিয়া লইবে। জননীর এতাদৃশ অদ্ভুত অলৌকিক বাক্য শুনিয়া উপস্থিত সকলেই স্তম্ভিত হইলেন। কিন্তু মাতৃভক্ত পুত্রদ্বয় তাহার বাক্যে কোনরূপ অবিশ্বাস করিলেন না। তাহারা তখন ইষ্টমন্ত্রদাতা গুরুদেব, মাধব নারায়ণের দেওয়ান শ্রীশ্রীনাথ সিংহ-রায়, মােকার শ্রীকমলাকান্ত বসু ও কয়েকজন পরিচারক ও পরিচারিকা সহ জননীকে কাশীধামে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলেন। হরসুন্দরী ও মাতার সঙ্গে কাশী যাত্রা করিলেন। তখন বারাণসী যাইবার রেলপথ হয় নাই, নৌকাতেই যাইতে হইত। রাণী অম্বিকা প্রথমে কালীক্ষেত্র (কালীঘাট) গমন মাধবনারায়ণ। পূৰ্ব্বক সেখানে কালীমাতাকে দর্শন করিয়া, তীর্থ-শ্রদ্ধ, ব্রাহ্মণভােজন এবং আনুসঙ্গিক নানারূপ দানাদি করিয়া তথা হইতে কাশী রওনা হইলেন। পথিমধ্যে গয়াক্ষেত্র প্রাপ্ত হইয়া গুরুদেবের অনুরােধে তথায় যােড়শাদি তীর্থকৃত্য এবং ব্রাহ্মণভােজন করাইলেন। এই সঙ্গে তাহার সহগামী লােক দিগের গয়ার সমুদয় কাৰ্য সমাপন করিবার অর্থ প্রদান করিলেন। গয়া হইতে ক্রমে তিনি কাশীধামে পেীছিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া কাশীখণ্ড শ্রবণ করিয়া উহার উদযাপন করিলেন। এবং অর্ধ প্রসূতা ধেনু ও তুলা দান এবং কাশীধামস্থ ব্ৰাহ্মণ ও পণ্ডিত- মণ্ডলীকে দশ টাকা হারে বিদায় প্রদান করিলেন। ইহার অল্প কয়েক দিবস পরে তাহার সামান্য জ্বর হইল; পর দিবস তিনি তাহার সঙ্গী লােকদিগকে ডাকিয়া বলিলেন “আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি, আমাদের কুলদেবী শ্ৰীসিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা আমার নিকটে আসিয়া আমাকে বলিতেছেন, বিশ্বেশ্বর কল্যই তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করিবেন। অতএব আমাকে অবিলম্বে মণিকর্ণিকার ঘাটে লইয়া চল।” সঙ্গী লােকেরা তাহাকে দেবী বলিয়া মনে করিতেন। সুতরাং তাহার কথায় আর কেহ কোনরূপ দ্বিধা না করিয়া তাহাকে লইয়া মণি- কণিকার ঘাটে গমন করিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া তিনি ৫০০, পাঁচ শত টাকার চাউল, টাকা, সিকি ও দুয়ানি কাঙ্গালীদিগকে বিতরণ করিলেন। অতঃপর কাশীনাথ নামক যাত্ৰাওয়ালা, গঙ্গাপুত্রগণ, গুরুদেব এবং দেশীয় যে সকল ব্রাহ্মণ তথায় উপস্থিত ছিলেন তাঁহাদিগকে নিজ বিষয় হইতে কিছু কিছু ভূমি দান করিলেন এবং দক্ষিণা-স্বরূপ প্রত্যেককে এক একখানি মােহর দিলেন। তিনি স্বয়ং তথায় গমন- পূৰ্ব্বক শয়িত হইয়া ইষ্টমন্ত্র জপ করিতে করিতে গুরুদেবের চরণতলে মস্তক রাখিয়া মানবলীলা সংবরণ করিলেন।
মাধবনারায়ণ। ১৭৮২ শকাব্দে (বাঙ্গালা ১২৬৭ সাল) জ্যৈষ্ঠ মাসে কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে জগদম্বা-রূপিণী জননী অম্বিকা লীলাক্ষেত্র ভবধামপ রিত্যাগ করিয়া নিত্যানন্দ শিবধামে প্রস্থান করিলেন। উপস্থিত জনবৃন্দ জননীর স্বজ্ঞানে স্বর্গপ্রাপ্তি সন্দর্শন করিয়া সানন্দে শিব নাম করিতে করিতে আপনাদিগকে কৃতকৃতার্থ মনে করিতে লাগিল । দেওয়ান শ্ৰীনাথ সিংহ রায় মহাশয় ( অপর নাম হরিচরণ রায়) এই সংবাদ রায়ের কাঠীতে সেজ রাজা ও ছােট রাজার নিকটে প্রেরণ করিলেন। রাণী অম্বিকা চৌধুরাণীর মৃত্যুর তিন চার মাস পরে শ্রীনাথ সিংহরায় মহাশয়ও কাশীধামে ইহলীলা সংবরণ করেন। অতঃপর হরসুন্দরী তদীয়া সঙ্গিগণ সহ রায়ের কাঠীতে প্রত্যাবর্তন করেন। মাতৃবিয়ােগে মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণ উভয়েই সবিশেষ শােকাকুল হইয়াছিলেন। কিন্তু শােকের প্রাবল্য চিরদিন থাকে না ; ক্রমে উহা হ্রাস প্রাপ্ত হয়। ইহাই বিধাতার বিধান। সুতরাং ইহাদেরও শােকাবেগ কমিয়া আসিল এবং যথাসময়ে ইহার স্বর্গগতা জননীর শ্রাদ্ধকাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিলেন। শ্রাদ্ধে রূপার ঘােড়শ, একোদ্দিষ্ট, বৃষােৎসর্গ, ব্রাহ্মণ-দম্পতী পূজা, মচলন্দ প্রভৃতি এবং গাে-দান, অশ্ব-দান, পাল্কী দান, শালগ্রাম-শিলা দান, নৌকা দান ইত্যাদি কোন অনুষ্ঠানই বাদ যায় নাই। শ্রাদ্ধোপলক্ষে কাশী, দ্রাবিড়, নবদ্বীপ, বিক্রমপুর সােহ্মারকুল, বাকলা, বাঙ্গড়া, সাহাজাদপুর প্রভৃতি স্থানের ব্রাহ্মণ- পণ্ডিতগণ নিমন্ত্রিত হইয়া রায়ের কাঠীতে আগমন করিয়াছিলেন। তাহাদের যথাযােগ্য পাথেয় ও ভােজ্য ইত্যাদি এবং প্রত্যেককে ১৬, টাকা হারে ‘বিদায় দেওয়া হইয়াছিল। দেশ-বিদেশের বহু ভদ্রলােক নিমন্ত্রিত হইয়া রায়ের কাঠীতে উপস্থিত হইয়াছিলেন। ব্রাহ্মণগণ, মাধবনারায়ণ ব্রাহ্মণগণ, জাতি-নির্বিশেষে নিমন্ত্রিত বহুলােক ও কাঙ্গালিগণ সকলেই ভূরি ভােজনে পরিতৃপ্তি প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহারা সকলেই একবাক্যে পুনঃ পুনঃ প্রশংসা করিয়া বলিয়া গিয়াছিলেন যে, এরূপ বিপুল আয়ােজন এবং বিরাট অনুষ্ঠান তাহারা অতি অল্প শ্রদ্ধেই দেখিয়াছেন। ৬ সপ্তম পরিচ্ছেদ পূর্ববর্তী সদর ও মফস্বলের কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় অনেকেরই পরলােক প্রাপ্তি হইল। কেবলমাত্র জলাবাড়ী নিবাসী মদনমােহন বিশ্বাস ও তদীয় ভ্রাতা জগমােহন বিশ্বাস এবং রায়েরকাঠীর পূর্বপাড়া- নিবাসি ব্রাহ্মণ আনন্দচন্দ্র রায়, মৃধাদিগের (বরকন্দাজ) মধ্যে বড়খলিশাখালি নিবাসী আহাম্মদালী তালুকদার ও কুমারখালি নিবাসী আব্বাচ কাজী * এবং মফস্বলস্থ কর্মচারীদের মধ্যে চিঙড়াখালী নিবাসী রামজীবন দে জীবিত রহিল। * ইহারা আজীবন নিজপ্রভুর কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিয়া গিয়াছেন। এই সময় সেজরাজার সদর ও মফঃস্বলের কতকগুলি কর্মচারী এবং মৃধা রাখিবার আবশ্যক হইল। তাহাতে সেজরাজা রায়েরকাঠীর তাহাদের দেওয়ান বংশ হইতে কৃষ্ণকান্ত রায়কে দেওয়ান পদে নিযুক্ত করিলেন। অল্পদিন পরেই কৃষ্ণকান্ত রায়ের মৃত্যু হইলে তাহার স্থলে ঐ বংশের কাশীশ্বর রায়কে নিযুক্ত করেন। * ইহার পৌত্র শাতু ও এচমাইল কাজি প্রভৃতি এখন বর্তমান আছে। + রামজীবনদে চিঙড়াখালি মহলে নায়েব ছিলেন। তাহার পুত্র গােবিন্দচন্দ্র দে ও তাহার পৌত্র প্রকাশচন্দ্র দে ইহারা সকলেই বিশ্বাসী ভাবে কাৰ্য্য করিয়া গিয়াছেন রামজীবনের প্রপৌত্র প্রফুল্লচন্দ্র দে প্রভৃতি বর্তমান আছে। ইহারা সকলেই বিশ্বাসী এবং প্রভুভক্ত। মাধবনারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁহার স্ত্রী শ্রীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণীর ষ্টেটে ও তাহার পুত্র শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর ষ্টেটে গােবিন্দচন্দ্র দে হইতে ইহারা বিশ্বাসী ভাবে কাৰ্য্য করিয়াছে এবং করিতেছে। এই ষ্টেটে কাৰ্য্য করিয়াই ইহাদের উন্নতি হইয়াছে। * কাশীশ্বর রায়ের পুত্র শ্রীযুক্ত বসন্তকুমার রায় ও সতীসচন্দ্র রায় জীবিত আছেন।
মাধবনারায়ণ নবকান্ত মিত্র, ব্রাহ্মণ দুর্গাবর রায়, মথুরানাথ বসু, তারা চক্রবর্তী অধিকারী, ফকিরচাদ ঘােষ, দ্বারিকানাথ রায়, হরমােহন দাস, ব্রজনাথ সিকদার, রাজকিশাের সিকদার, ভােলানাথ বিশ্বাস প্রভৃতিকে সদর ও মফস্বলের কর্মচারী নিযুক্ত করিলেন। বরিশালের মামলা, মােকদ্দমা চালাইবার জন্য বৈকুণ্ঠনাথ সমদ্দারকে মােক্তার এবং খ্যাতনামা উকিল দুর্গামােহন দাসকে ষ্টেটের উকিল পদে নিযুক্ত করেন। পিরােজপুরে গুরুচরণ দাসকে মােক্তার ও বিখ্যাত উকিল ভােলানাথ বন্দ্যোপাধ্যাকে ষ্টেটের উকিলের পদে নিযুক্ত করেন। গড়ঘাটা নিবাসী কোমর সর্দার এবং জোলাগাতী নিবাসী জরাপ খ, তরাপ খা, মুনিরদ্দি খােন্দকার ও রায়েরকাঠী নিবাসী সমস খা, খােসাল মিরা আর্জান উল্লা প্রভৃতি অনেককে মৃধার কার্যে নিযুক্ত করিলেন। দুর্গমােহন বাবু বরিশাল হইতে কলিকাতায় চলিয়া আসিলে তখনকার বরিশালের শ্রেষ্ঠ উকিল পিয়ারীলাল রায় মহাশয় উকিল পদে নিযুক্ত হন। তৎপর মৌলবী ওয়াজেদ মিঞাকে উকিল পদে নিযুক্ত করেন। ওয়াজেদ মিঞ। গভর্ণমেন্টের উকিল ছিলেন। তিনি অতি চরিত্রবান্ ও ধার্মিক লােক, তিনি মাধবনারায়ণকে জ্যেষ্ঠভ্রাতার ন্যায় ভক্তি করিতেন। মাধবনারায়ণের মৃত্যুর পরতে তিনি গিরীন্দ্রনারায়ণ ও নগেন্দ্রনারায়ণ প্রভৃতির ষ্টেটেও ওকালতির কাৰ্য্য করিতেন। মাধব- নারায়ণের মৃত্যুর পর যখন গিরীন্দ্রনারায়ণ ও শ্রীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরানীর আত্মকলহ উপস্থিত হইয়া ষ্টেটটা ধ্বংশ হইবার উপক্রম হয় তখন শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর বিশেষ চেষ্টায় ও উক্ত ওয়াজেদ মিঞার অক্লান্ত পরিশ্রমেই মীমাংসা কাৰ্য সুসম্পন্ন হয়। এই ওয়াজেদ মিঞার পুত্রই হাইকোর্টের খ্যাতনামা উকিল ও কাউন্সেলের মিনিষ্টার কজলাল হক। ০ ৮৪ মাধবনারায়ণ আহাম্মদালীর পিতামহ সােনা উল্লা মাধবনারায়ণের প্রপিতামহ শিবনারায়ণের জমাদার ছিল। শিব নারায়ণের চাকরী করিয়াই তাহার সৌভাগ্যের সূচনা হয় এবং এই সময় হইতেই তাহাদের জমাদার উপাধি হয়। সেই সময় হইতেই তাহাদের বাটীকে জমাদার বাটী বলা হইয়া থাকে। আহাম্মদালীর পুত্ৰই আবি আবদুল্লা। আহাম্মদাসীর সময় হইতেই উহাদের তালুক জমাজমী অনেক বৃদ্ধি হয়। আবি আবদুল্লার পুত্র এখন পিরােজপুরে অনারারী ম্যাজিষ্ট্রেটের কাৰ্য্য করিতেছেন। আবি আবদুল্লা এখন জমিদারী ও অনেক খারিজ। তালুক খরিদ করিয়া বেশ অবস্থাপন্ন হইয়াছেন। আহাম্মদালীর মৃত্যুর পর আবি আবদুল্লা মাধবনারায়ণের পুত্র শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনারায়ণ, যতীন্দ্র নারায়ণ, জীবেন্দ্রনারায়ণ এবং সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর ষ্টেটে পৈতৃক মৃধার (বরকন্দাজ) কাৰ্য্য করিত, কিন্তু নিজে আসিত না। তাহার প্রতিনিধি স্বরূপ মেহেরালী মৃধা নামক জনৈক লােককে রাখিয়া দিয়াছিল এবং পৈতৃক বেতনের টাকা গ্রহণ করিত। সে বলিত ইহাই আমাদের ভাগ্যলক্ষ্মী। সেজ রাজার সময় আহম্মদালী নিজে সর্বদা আসিত না তাহার পক্ষের লােক থাকিত, আবশ্যক মত লাঠিয়াল ও জিনিষপত্র সরবরাহ করিত এবং বিশেষ আবশ্যক হইলে নিজে আসিত; তাহার পিতা এবং পিতামহ শিবনারায়ণ ও মহেন্দ্রনারায়ণের নিকট সর্বদা আসিয়া কাৰ্য্য করিত। মৃধা দুই রকম ; এক রকম লাঠিয়ালের কাৰ্য্য করে এবং অবাধ্য প্রজাকে ধরিয়া আনে ও প্রজার খাজনা আদায় করে। অবাধ্য প্রজা শাসন তাহাদের দ্বারাই হয়। অন্যরকম নিজেরা লাঠীয়ালের কাৰ্য্য করে না, লাঠীয়াল সরবরাহ করে এবং আবশ্যক মতন বিবাদ মীমাংসা করে, আবশ্যকীয় জিনিষপত্র সরবরাহ করে। শােনাউল্লা হইতে আবিখাবদুল্লার প্রথম সময় পর্যন্ত তাহারা শেষােক্ত মৃধার কাৰ্য্য করিত।
মাধবনারায়ণ রাণী অম্বিকা চৌধুরাণীর শ্রাদ্ধের কিছুদিন পরেই মাধবনারায়ণের একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহার পত্নী শ্ৰীমতী কামিনী চৌধুরাণী প্রসবান্তে রােগাক্রান্তা হইলেন এবং অল্পদিন রােগ- ভােগের পর ইহলােক হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিলেন। পত্নীবিয়ােগে মাধবনারায়ণ অতিশয় কাতর হইয়া পড়িলেও এই দারুণ শােক তিনি নীরবে সহ্য করিলেন। বাহিরে কোনওরূপ উদ্বেগ বা চাঞ্চল্য তিনি প্রকাশ করিলেন না এবং শশাকে কর্তব্য ভ্রষ্ট হইলেন না। পত্নীর চন্দনধেনু সম্পাদন করতঃ পুত্রের দ্বারা যথাবিহিত শ্রাদ্ধকাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিলেন। পত্নীশােক শেলবিদ্ধ মাধবনারায়ণ অসাধারণ সহিষ্ণুতার সহিত বৈষয়িক কৰ্ম্মগুলি পত্নী বিদ্যমান থাকিতেও যেরূপ ভাবে সম্পন্ন করিতেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পরেও ঠিক সেই ভাবেই সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। কিন্তু গৃহলক্ষ্মীর অভাবে গৃহকর্মে বিশৃঙ্খলা ঘটিতে লাগিল। নবপ্রসূত। কন্যা শিশুপুত্রের লালনপালন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলেন। মাধবনারায়ণ ভগবানে নির্ভরশীল ও ধৈর্য্যশীল পুরুষ ছিলেন। তিনি নিজের ক্লেশ অম্লানবদনে সহ করিতে পারিতেন। কিন্তু বিধাতা যাহাদের ভার তাহার উপরে ন্যাস্ত করিয়াছেন তাহাদের বিন্দুমাত্র কষ্টের সম্ভাবনা দেখিলেই তিনি তদ্দণ্ডেই উহার প্রতিবিধানে ব্রতী হইতেন। সদ্য মাতৃহীনা কন্যাকে স্তন্য দুগ্ধ পান করাইলে তাহার জীবন রক্ষা দুষ্কর বিবেচনা করিয়া তিনি বহু অন্বেষণে একটি দুগ্ধবতী দরিদ্র গৃহস্থ বধূকে শুন্য দানের জন্য নিযুক্ত করিলেন; এবং কন্যা ও পুত্রের রক্ষণাবেক্ষণের ভার মাধব- নারায়ণের নিজ ধাত্রী অভয়া দাসীর উপর অর্পণ করিলেন। কিন্তু এত চেষ্টা করিয়াও মাধবনারায়ণ কন্যাটিকে রক্ষা করিতে পারিলেন না, কিছুকাল পরে সে তাহার মাতার অনুগমন করিল।
মাধবনারায়ণ অভয়া দাসী ধাত্রী হইলেও ইহার সম্বন্ধে কিছু বিবরণ প্রদান করা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। তিনি মাধবনারায়ণ ও তাহার পুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণ উভয়কেই লালনপালন করেন। তিনি মহেন্দ্রনারায়ণের সময় হইতেই এই বাড়ীতে কাজ করিয়া অনেক টাকা উপার্জন করিয়া ছিলেন। সেই টাকার কিয়দংশ দ্বারা তিনি কিছু ভূসম্পত্তি খরিদ করেন। মাধবনারায়ণ তাহার এই ধাত্রীকে বহু দুৰ্গম তীর্থাদি পৰ্যটন করাইয়া আনিয়াছিলেন। অভয় তীর্থাদি ভ্ৰমণান্তে ১৭৭৬ শকাব্দে বা ১২৬১ সালে রায়েরকাঠীর কালীবাড়ীতে একটি ইষ্টক নির্মিত মন্দির নির্মাণ করাইয়া উহাতে শিব প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়ে মাধবনারায়ণও এক শিব-প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই শিবও ঐ মন্দির- মধ্যে স্থাপিত হয়। শিব-প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে অভয়া সুন্দরী একাগ্নি যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। এতদুপলক্ষে সােন্ধারকুল পরগণাস্থ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত মণ্ডলী ও দেশস্থ নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ, ভট্ট ও রাঘব প্রভৃতিকে প্রচুর অর্থদানে ও ভােজনে পরিতুষ্ট করেন। তখনকার পরিচারিকারাও যে সকল সৎকাৰ্য্য করিতেন, এখনকার উচ্চপদস্থ ব্যক্তিগণের ভাৰ্যারাও তাহা করেন না। তখনকার লােকের তীর্থাদিতে যেরূপ আস্থা ছিল এখনকার লােকের সেরূপ আস্থা নাই। এখনকার দিনে মা ভগিনীগণ বস্ত্রালঙ্কার ও সাজ- সজ্জা লইয়াই ব্যস্ত ; যদি কচিৎ তাহারা কোনও তীর্থস্থানে গমন করেন তাহা হইলে তাহা তীৰ্থ করিবার উদ্দেশ্য নয়—বায়ু পরিবর্তনের জন্য। বুদ্ধিমন্ত ঘােষও মাধবনারায়ণকে ছেলেবেলায় প্রতিপালন করিয়া- * রায়েরকাঠীর পশ্চিম পাড়ায় উহার বাড়ী ছিল, এই ছিল। ন বুদ্ধিমন্ত মহেন্দ্রনারায়ণের আমােলের ভৃত্য। তাহার সময় হইতেই এই বাড়ীতে কাৰ্য করিত ইহার পৌত্র পূর্ণচন্দ্র ঘােষ এখন বর্তমান আছে।
মাধবনারায়ণ ৮৭ বাড়ীতে অভয়া দাসী এক পুষ্করিণী খনন ও প্রতিষ্ঠা করেন। এই পুষ্করিণী দ্বারা সেই বাটীর ও পার্শ্ববর্তী বহুলােকের জলকষ্ট দূরীভূত হয়। অভয়া দাসী বেবাগদীর খ্যাতনামা বিশ্বেশ্বর কথক চুড়ামণি ও কোটালিপাড়া নিবাসী প্রধান বৈয়াকরণিক বিশ্লেশ্বর তর্কপঞ্চাননকে কথক ও পাঠক নিযুক্ত করিয়া রামায়ণ শ্রবণ করেন। এইরূপে অভয়া দাসী ব্রত, পাৰ্বণাদি ধৰ্ম্ম কাৰ্য্যে ও নানাবিধ সদনুষ্ঠানে বহু অর্থ ব্যয় করিয়া যান। তাহার প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দির ও পশ্চিম পাড়াস্থিত সেই পুষ্করিণী তঁাহার পুণ্যকীর্তির নিদর্শন স্বরূপ অদ্যাপি বিদ্যমান রহি- আছে। অভয়া দাসী মৃত্যুকালে তাহার অবশিষ্ট ধন সম্পত্তি গিরীন্দ্র নারায়ণকে দান করিয়া গিয়াছেন। মাধবনারায়ণের স্ত্রী ও নবজাত কন্যার মৃত্যুর পর কিছুদিন অতি- বাহিত হইলে মাধবনারায়ণের আত্মীয়বর্গ তাঁহাকে পুনরায় দার পরিগ্রহ করিতে সনির্বন্ধ অনুরােধ করিতে লাগিলেন। তিনি প্রথমে তাহাদের অনুবােধ পালনে অক্ষমতা জ্ঞাপন করেন, কিন্তু যখন তাহারা সকলেই বুঝাইতে লাগিলেন যে, তিনি দার-পরিগ্রহ না করিলে গৃহ-কর্মে অত্যন্ত বিশৃঙ্খলা ঘটিবে ও সেজন্য সংসারে অশান্তিও ঘটিবে, তখন মাধবনারায়ণ ভাবিয়া দেখিলেন যে, তাহাদের কথা অতিশয়ােক্তি নহে। অবশেষে পুনরায় দার পরিগ্রহে তিনি সম্মতি দিলেন। বিবাহ ব্যাপারে মাধবনারায়ণের পারিবারিক প্রথা পূৰ্ব্ব হইতে এইরূপ চলিয়া আসিতেছিল যে, ছেলেরই বিবাহ হউক বা মেয়েরই বিবাহ হউক তাহারা কাহারও বাড়ীতে গিয়া বিবাহ করিতেন না। অপর পক্ষ তাহাদের বাড়ীতে আসিয়া বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন করাইতেন। কুলীনগণও ইহাতে অসম্মত হইতেন না বা কোনওরূপ অনুযােগ প্রকাশ অথবা অপমান বােধ করিতেন না, কারণ তাহার পূর্ব পুরুষ কিঙ্কর ৮৮ মাধবনারায়ণ সেন * যখন একযায়ী করেন তখন কুলীনগণ তাহাকে সৎক্রিয়ান্বিত ও কুলীন প্রতিপালক জানিয়া এবং তাহার বিনয় ও নম্রতায় মুগ্ধ হইয়া তাহাকে এই সম্মান প্রদান করিলেন যে—“পাত্রপক্ষ পাত্রীর বাটা যাইয়া বিবাহ দেওয়ার নিয়ম প্রচলন আছে; এখন হইতে পাত্রীপক্ষ পাত্রী সহ আপনার কি আপনার বংশধরের বাটী যাইয়া বিবাহ দিতে কোন কুলীনই অসম্মত হইবেন না।” তদবধি কুলীনগণ পাত্র কি পাত্রী সহ ইহাদের বাটী আসিয়া বিবাহ দিতেছেন। ইহারা দক্ষিণ রাঢ়ীয় মৌলিক কায়স্থ দিগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মৌলিক ও সম্মানীয় বংশ, মাধবনারায়ণের পূর্বপুরুষগণ নানাস্থানের নানা শ্রেণীর কুলীন কায়স্থগণকে বহু নিষ্কর ভূমি দান করিয়াছিলেন। এবং অনেককে অনেক এবং অনেককে অনেক ভূসম্পত্তি দিয়া স গ্রামে বাস করাইয়া ছিলেন। + রায়েরকাঠীর পূর্বপাড়া নিবাসী ব্রাহ্মণ দুর্গাবর রায় মাধবনারায়ণের কর্মচারী ছিলেন। তিনি মাধৰনারায়ণের জন্য পাত্রী অনুসন্ধানে ব্ৰতী হইলেন। মাধবনারায়ণের বিবাহ যে সে ঘরে হইতে পারে না এই জন্য পাত্রী অনুসন্ধানের ভার এই বিচক্ষণ ব্রাহ্মণ কৰ্মচারীর উপরই •• * এই একযায়ীতে কিঙ্কর গােষ্ঠীপতিত্ত লাভ করিয়াছিলেন। কিঙ্কর দিল্লীর বাদসাহ- কর্তৃক ভূক্রিয়া ও রায় উপাধি প্রাপ্ত হন। + কুলীন কায়স্থ ব্যতীত ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য জাতীয় লােকদিগকেও অনেক নিষ্কর জমি দান করিয়া গিয়াছেন, তাঁহাদের বংশধরেরা এখনও উহা সুখস্বচ্ছন্দে ভােগ করিতেছেন। * দুর্গাবর রায় সদালাপী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি চিরকুমার ছিলেন। তাঁহার ভ্রাতুষ্পত্ৰ শ্ৰীযুক্ত প্রিয়নাথ রায় এখনও মাধবনারায়ণের কনিষ্ঠ পৌত্র শ্রীযুক্ত গােপেন্দ্রনারায়ণের কর্মচারী পদে নিযুক্ত আছেন। t মাধবনারায়ণ ৮৯ ন্যস্ত হইয়াছিল। দুর্গাবর রায় ইতস্ততঃ পাত্রীর সন্ধান করিতে করিতে জেলা ২৪ পরগণার অন্তর্গত পানিহাটা গ্রামে কোমল মুখ্য কুলীন কালীকৃষ্ণ ঘােষ মহাশয়ের বাটীতে উপস্থিত হইলেন। তাহার সৰ্ব্বসুলক্ষণা তৃতীয়া কন্যা শ্ৰীমতী জগৎমােহিনীর সহিত মাধবনারায়ণের বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করিলেন। কালীকৃষ্ণ ঘােষ মহাশয় পূর্বে কলিকাতার রেলিব্রাদার্স কোম্পানীর মুৎসুদ্দি ছিলেন। তাহার বিষয় সম্পত্তিও যথেষ্ট ছিল। তিনি সবিশেষ উদার প্রকৃতি ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ আশুতােষ দেব মহাশয় (সাতু বাবু) এই কালীকৃষ্ণ ঘােষ মহাশয়ের ভগিনীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। তখনকার দিনে সাতুবাবুর নাম কেবল কলিকাতায় কেন বঙ্গদেশের সূৰ্ব্বত্র সুপরিচিত ছিল। মাধবনারায়ণের বিবাহ তাঁহাদের পারিবারিক প্রথানুযায়ী রায়ে- কাঠীতে মাধবনারায়ণের পিশীমা দুর্গামণির বাড়ীতে ১৭৮২ শকাব্দে ( বাঙ্গলা ১২৬৭ সাল) ফান মাসে নিষ্পন্ন হয়। দুর্গামণি জগৎ- মােহিনীকে তাহার বাটীর সংলগ্ন দক্ষিণ দিকে একখণ্ড জমি যৌতুক স্বরূপ দান করেন। * কালীকৃষ্ণ ঘােষ মহাশয় তদীয় কন্যাকে লইয়া রায়েরকঠীতে আগমন করিয়া শুভ বিবাহ সম্পন্ন করেন। এই বিবাহে ঘােষ মহাশয় বহু অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন। তিনি মাধব- নারায়ণকে যৌতুক স্বরূপ প্রভূত স্বর্ণ রৌপ্য, বহুমূল্য বরাভরণ ও বর- সজ্জা এবং কন্যা জগৎমােহিনীকেও স্বর্ণরৌপ্যের বহু অলঙ্কার প্রদান * এই জমিখণ্ডে মাধবনারায়ণ একখানি মনােরম বাগান প্রস্তুত করিয়াছিলেন এখন আর বাগানের সে শােভ নাই তবুও পূৰ্ব বিটপী ও বসিবার বঁাধান স্থানগুলির কতক বর্তমান থাকিয়া অতীতের স্মৃতি উদয় করিয়া দিতেছে।
মাধনারায়ণ করিয়াছিলেন। মাধবনারায়ণও কাযাত্ৰী দিগের কুলমৰ্যদা ও যাতায়াতের ব্যায় ইত্যাদিতে অনেক টাকা খরচ করেন। শ্ৰীযুক্তা দুর্গামণি প্রাণনারায়ণের কন্যা এবং মহেন্দ্রনারায়ণের ভগিনী। প্রাণনারায়ণ তাহার এই কন্যাকে রায়েরকাঠীতে বসতিবাটী এবং ইন্দুর কানি, ধরা ধােয়া প্রভৃতি গ্রামে বিস্তর ভূসম্পত্তি দান করিয়াছিলেন। দুর্গামণি নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁহার ঐ সকল সম্পত্তি যশােহর জেলার অন্তর্গত ইতনা গ্রাম নিবাসি শ্ৰীযুক্ত বন্ধুবিহারী ঘােষ ও প্রকাশচন্দ্র ঘােষ প্রভৃতি ওয়ারিশ ক্রমে ভােগদখল করিতেন। * এক্ষণে ঐসকল সম্পত্তি চারুচন্দ্র ঘােষ প্রভৃতি ভােগ করিতেছেন। বিবাহের এক বৎসর পরে মাধবনারায়ণ তঁাহার শ্বশুর মহাশয়ের সবিশেষ অনুরােধে নৌকাযােগে পাণিহাটিতে গমন করেন। তিনি দুর্গাবর রায় এবং দ্বারবা, চাকর, কি, প্রভৃতিকে সঙ্গে লইয়াছিলেন। তিনি শশুর বাটীতে আসিলে তাহার শ্বশুর কালীবাবু ও কালীবাবুর জ্যেষ্ঠতাতভ্রাতা রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের জামাতা শ্রীনাথ ঘােষ মহাশয় এবং অন্যান্য ভদ্রলােক তাহার অভ্যর্থনা করিয়াছিলেন। তিনি পাণিহাটির প্রত্যেক ব্রাহ্মণকে একটা করিয়া টাকা প্রণামী ও একথালা সন্দেশ দিয়াছিলেন। কেবল প্রণামী দিতেই তাহার ৫০০ টাকা ব্যয় হইয়াছিল। শ্বশুর শ্বাশুড়ীর অগ্রহাতিসহে তিনি ১০ দিন পাণিহাটী গ্রামে অবস্থান করিয়াছিলেন। স্ত্রীকে লইয়া রায়েরকাঠী রওনা হইবার সময়ে শ্বশুর বাটীর দ্বারকান ভৃত্য প্রভৃতিকে পুরস্কার দিতেও ক্ৰটী করিলেন না। • শ্রীযুক্ত প্রকাশচন্দ্র ঘােষ মাধবনারায়ণের জামাতা।
মাধবনারায়ণ ; •• কথায় বলে,-“ভাগ্যে ধন”। মাধবনারায়ণের পক্ষে এক্ষণে এই প্রবাদ বচন অক্ষরে অক্ষরে ফলিয়া গেল। জগৎমােহিনীর সহিত বিবাহের পূর্বে পিতৃঋণ ও গৃহবিবাদ হেতু তাহার অবস্থা বড়ই অস্বচ্ছল ছিল; কিন্তু তাহার সহিত বিবাহ হইবার পর হইতেই মাধবনারায়ণের অবস্থার উত্তরােত্তর উন্নতি হইতে লাগিল। তাঁহার বৃদ্ধির সূত্রপাত হইল। তাহার যে সকল সম্পত্তি নিলাম হইয়াছিল সে গুলির কতক কতক তিনি কেতাদিগের নিকট হইতে পুনরায় ক্রয় করিয়া লইলেন। তিন চারি জন ব্যতীত অপর সকল মহাজনই তাহাদের পাওনা টাকার কিন্তীবন্দী করিলেন। তিনি জায়গা জমির জরিপ করাইলেন ফলে তাহার আয় বৃদ্ধিও হইল। সেজরাজা তন্ত্রশাস্ত্রের বড়ই অনুরাগী ছিলেন এবং উহার অনুশীলন করিতে ভাল বাসিতেন। চলিশা গ্রামনিবাসী শিবচন্দ্র তর্কালঙ্কার মহাশয় তাহার সভায় তন্ত্রের প্রধান পণ্ডিত ছিলেন। যশােহর জেলার চাচড়া-গ্রাম-নিবাসী সুবিখ্যাত তন্ত্রশাস্ত্র বিশারদ ও ধার্মিক রাজা বরদাকান্ত তন্ত্রশাস্ত্রের আলােচনার জন্য মাধবনারায়ণের বাটীতে উপস্থিত হন। তিনি রাজা বরদাকান্তকে সাদর অভ্যর্থনায় সম্বর্ধিত করেন। কয়েকদিন তিনি মাধবনারায়ণের বাটীতে অবস্থান করিয়া তন্ত্রশাস্ত্রের আলােচনা করেন এবং প্রত্যাবর্তনের সময়ে শিবচন্দ্র তর্কালঙ্কার মহাশয়কে সঙ্গে করিয়া লইয়া যান। তাঁহাকে কিছুদিন আপনার নিকটে রাখিয়া রাজা বরদাকান্ত তাহার নিকট হইতে তন্ত্রশাস্ত্রের বহু নিগূঢ় তত্ত্ব শিক্ষা করেন। তৎপরে তিনি তর্কালঙ্কার মহাশয়কে নানাবিধ পারিভােষিক প্রদান পূর্বক রায়েরকাঠীতে পাঠাইয়া দেন। প্রবাদ আছে,-তর্কালঙ্কার মহাশয় যখন রায়েরকাঠীস্থ ঠাকুর বাড়ীর শ্মশানকালী পূজা করেন সেই সময়ে তিনি দেবীর আবির্ভাব অনুভব মাধবনারায়ণ করেন। পর দিবসই তিনি মাধবনারায়ণকেও তাহার অন্যান্য আত্মীয়- গণকে বলেন, “মা আমাকে অনুগ্রহ করিয়াছেন, সত্বর আমাকে ইহজগৎ হইতে বিদায় গ্রহণ করিতে হইবে, আপনারা আমাকে গঙ্গার তীরে পাঠাইয়া দিন।” তাহার কথানুসারে মাধবনারয়ণ তর্কালঙ্কার মহাশয়ের ভাগিনেয় দুর্গাচরণ চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে দিয়া তাঁহাকে কলিকাতা কালীঘাটে পাঠাইয়া দিলেন। তখন রায়েরকাঠী হইতে কলিকায় যাইতে হইলে নৌকাযােগে যাইতে হইত এবং ৬৭ দিনের পূৰ্ব্বে কলিকাতায় পৌছিতে পারা যাইত না। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কালীঘাটে পহুছিবার পরদিবসই তর্কালঙ্কার মহাশয়ের সজ্ঞানে গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়। দুর্গাচরণ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তন্ত্রশাস্ত্রে সুপণ্ডিত না হইলেও তন্ত্রোক্ত বিধানমতে ক্রিয়াদি করিতে পরাদশী ছিলেন। তিনি শান্তি-স্বস্ত্যয়নাদি করিয়া প্রত্যক্ষ ফল দেখাইতে পারিতেন। অতঃপর মাধবনারায়ণ তাহাকেই তান্ত্রিক পণ্ডিতপদে নিযুক্ত করিলেন। কালক্রমে জগৎমােহিনীর গর্ভে মাধবনারায়ণের একটী কন্যা ও পাঁচট পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন ; তন্মধ্যে একটা শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অবশিষ্ট কন্যা ও পুত্রগণের নাম যথাক্রমে-মানদাসুন্দরী, নগেন্দ্রনারায়ণ, যতীন্দ্রনায়ণ, জীবেন্দ্রনারায়ণ ও সুরেন্দ্রনারায়ণ। ইহাদের মধ্যে নগেন্দ্রনারায়ণের নাম দেশ-বিদেশে সুপরিচত। যশােহর জিলাস্থিত নড়াইলের বিখ্যাত জমিদার শ্রীযুক্ত উমেশচন্দ্র রায়ের সহিত তাহার অন্যতম সরিক শ্ৰীযুত কালিদাস রায়ের ঘােতর * মানদা সুন্দরী বাঙ্গালা ১২৭২ সালে আশ্বিন মাসে, নগেন্দ্রনারায়ণ ১২৭৪ সালে, যতীন্দ্রনারায়ণ ১২৭৫ সালে ৩০শে কার্তিক, জীবেন্দ্রনামায়ণ ১২৭০ সালে ভাদ্র মাসে এবং সুরেন্দ্রনারায়ণ ১২৭৯ সালে অগ্রহায়ণ মাসে জন্মগ্রহণ করেন।
মাধবনারায়ণ বিবাদ ছিল। বিবাদ চলিতেছে এইরূপ অবস্থায় উমেশবাবু দুইটা নাবালক পুত্রসন্তান রাখিয়া পরলােকগমন করেন। অতঃপর তাহার সম্পত্তি কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের হাতে যায়; কিন্তু ইহাতেও দুই সরিকের বিবাদ না মিটিয়া উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাইতেই লাগিল। এই সময়ে মাধবনারায়ণের যথেষ্ট প্রতিপত্তি ও নামডাক হইয়াছিল। কাজেই কালিদাদ বাবু তাহার বাটীতে আসিয়া তাহার সাহায্যপ্রার্থী হইলেন। অপরদিকে কোট অফ ওয়ার্ডসের ম্যানেজার সাহেবও এই সংবাদ পাইয়া মাধবনারায়ণের বাটীতে উপস্থিত হইলেন। মাধবনারায়ণ তখন উভয় সঙ্কটে পড়িলেন। সুতরাং তিনি কালিদাস বাবুকে বুঝাইয়া বলিলেন,-“আপনারা দুইপক্ষই আমার আত্মীয়, বিশেষতঃ উমেশবাবুর পুত্রের নাবালক ; এ অবস্থায় উভয়ের সহিত সদ্ব্যবহার করাই আমার কৰ্ত্তব্য। অতএব এমন ব্যবস্থা করুন, যাহাতে আপনাদের উভয়পক্ষের সঙ্গেই আমার চিরকাল সৌহার্দ বজায় থাকিতে পারে। মাধবনারায়ণের মুখে এইরূপ যুক্তিযুক্ত কথা শুনিয়া কালিদাস বাবু, আর কোনও উচ্চবাচ্য করিলেন না, অপর পক্ষীয়েরাও সন্তুষ্ট হইয়া চলিয়া যাইলেন। কালিদাসবাবু প্রায় একপক্ষ কাল মাধবনারায়ণের আতিথ্য স্বীকার করিয়াছিলেন এবং তাহার দ্বারা স্বীয় অভীষ্ট সিদ্ধি না হইলেও বাটী প্রত্যাবর্তনের সময়ে তিনি তঁাহার আদর-আপ্যায়নের উল্লেখ করিয়া বলিয়া যান,-“আপনি আমার সাহায্য করিলেন না সত্য, কিন্তু আপনার আদর-যত্ন ও সুমধুর বাক্যালাপ এবং বিজ্ঞতার বিষয় আমি জীবনেও ভুলিতে পারিব না।” * ইহাকে লােকে ছােট কালীবাবু বলিত। ইহাদিগের বরিশাল জেলায়ও সম্পত্তি ছিল। এমন কি, মাধবনারায়ণের সম্পত্তির অধীনও তাহাদের কতক সম্পত্তি ছিল। এখনও সেই সম্পত্তি মাধবৃনারায়ণের পুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণ ও সুরেন্দ্রনারায়ণের অধীন আছে।
১৪ মাধবনারায়ণ লখাকাঠীতে সেজরাজা ও ছােটরালার একটা হাট ছিল। যতদিন রাণী অম্বিকা চৌধুরাণী জীবিত ছিলেন ততদিন সেজরাজা ও ছােটরাজা পৃথক হইলেও এই হাট লইয়া কোনও গণ্ডগােল হয় নাই। রাণী অম্বিকা চৌধুরাণীর মৃত্যুর পর নরনারায়ণের কর্মচারীরা লাখাকাঠীর হাটে গিয়া অত্যাচার আরম্ভ করে। উহারা জোর করিয়া অত্যধিক তােলা তুলিয়া এবং খাজনা আদায় করিয়া দোকানদার ও হাটুয়াগণকে উৎপীড়িত করিত। দোকানদারেরা আসিয়া সেজরাজাকে এই বিষয় জানাইল। সেজরাজা তাহার ভ্রাতাকে এই অত্যাচারের কথা বলিলেন; দোকানদারগণও ছােটরাজার নিকটে বিস্তর কান্নাকাটী করিল। কিন্তু তাহাতে কোনও ফল হইল না। তখন উপায়ান্তর দেখিয়া মাধবনারায়ণ লখাকাঠী-নিবাসী তঁাহার প্রজা ও বিশ্বাসভাজন কর্মচারী ভােলানাথ বিশ্বাসের দামােদর তীরে যে জমি ছিল তাহা বন্দোবস্ত করিয়া লইলেন এবং সেইখানে নৃতন হাট বসাইলেন। উৎপীড়িত দোকানদারগণ সেজোরাজার এই নৃতন হাটে আসিয়া দোকান করিয়া বসিল। তখন ছােটরাজা এই হাটের সন্নিকটে তাহার জনৈক প্রজার কিছু জমি ক্রয় করিয়া লইয়া আর একটি হাটের পত্তন করিলেন। এই দুই হাট লইয়া উভয়পক্ষে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মামলা- মকদ্দমা যথেষ্ট হইয়াছিল ; জলের মত টাকা খরচ হইয়াছিল ; কিন্তু সেজরাজার নূতন হাটের কোনও ক্ষতি হইল না ; ঘােটরাজার নৃতন হাটটাই উঠিয়া গেল। এই বিবাদ-বিসম্বাদের সময়ে মাধবনারায়ণের বিশ্বাসী কর্মচারী ও প্রজা ভােলানাথ বিশ্বাস প্রাণপণ করিয়া প্রভুর কাৰ্য্য সম্পাদন করিয়াছিল। এমন কি, সে প্রভুর জন্য কারাগারে যাইতেও সতত প্রস্তুত থাকিত। কর্মচারীর এই প্রভুভক্তি বৃথা যায় নাই।সেজরাজা মাধবনারায়ণ প্রজাগণকে পুত্রবৎ স্নেহ করিতেন। তিনি প্রভুভক্তির পুরস্কার স্বরূপ এই হাটের।• ছয় আনা স্বত্ব তাহার কর্মচারী ভােলানাথ বিশ্বাসকে দান করেন; তাহার বংশধরেরা আজিও সেই ছয় আনা স্বত্ব ভােগ করিতেছে। এই হাটের ॥• দশ আনা স্বত্ব তিনি তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র গিরিন্দ্রনারায়ণকে দান করেন। এই নূতন হাটের নাম হইল—দামু- গঞ্জের হাট। এই হাটে যাতায়াতের জন্য মাধবনারায়ণ ইষ্টদেবতা ঠাকুরদের বাটী হইতে হাট পর্যন্ত একটি কাঁচা রাস্তা তৈয়ারী করাইয়া দেন; উহা দৈর্ঘ্যে প্রায় সওয়া ক্রোশ। বিজয়াদশমীতে মাধব- নারায়ণ এই হাটে একটি মেলা বসাইয়াছিলেন। এখনও প্রতি বিজয়া- দশমীতে এই মেলা বসিয়া আসিতেছে। ইহার নাম দশহরার মেলা। নরনারায়ণ দামুগঞ্জের হাট নষ্ট করিবার জন্য আর একবার একটি নূতন হাট বসাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং সেই সম্পর্কে বিস্তর মামলা-মকদ্দমাও হইয়াছিল, কিন্তু তিনি কৃতকাৰ্য্য হইতে পারেন নাই। দামুগঞ্জের হাটটা বহুদিন পর্যন্ত দামােদর ও কালীগঙ্গা নদীদ্বয়ের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ছিল। সেজরাজার মৃত্যুর পর দামােদর ও কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থল মজিয়া যাওয়ায় দোকানদারগণের নৌকা প্রভৃতি যাতায়াতের অসুবিধা ঘটে ও উহাতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষতি হইতে থাকে। সেইজন্য গিরীন্দ্রনারায়ণ ও ভােলানাথ বিশ্বাসের পুত্র ভগবান বিশ্বাসের চেষ্টায় দামুগঞ্জের হাট কালীগঙ্গা নদীর তীরে সরাইয়া আনা হয়। স্থান-পরিবর্তনের সহিত উহার নামেরও পরিবর্তন হইয়াছে। এখন ঐ হাট হুলার হাট নামে অভিহিত। এই হাটে একটি ষ্টীমার । ষ্টেশন আছে; উহার নাম হুলারহাট ষ্টেশন।. এই ষ্টেশন হইতে অনেকগুলি উমার যাতায়াত করে, অনেকগুলি ষ্টীমার ধরে—যথা বাগেরহাট ষ্টীমার, বানরীপাড়া ষ্টীমার, খুলনা-বরিশাল এক্সপ্রেস ও মাধবনারায়ণ মেল ষ্টীমার প্রভৃতি। এই অঞ্চলে নদীর বাঁককে লােকে হুলা বলিয়া থাকে। হাটটী নদীর বাঁকের উপরে অবস্থিত বলিয়া লােকে উহার নাম হুলারহাট দিয়াছে। # সেজরাজা দিল্লী নিবাসী হােচন্খা নামক একজন বিখ্যাত সেতারী ও খেয়াল ধ্রুপদ গায়ককে রাখিলেন। এই সময় ঘােটরাজা একটা সখের যাত্রার দল করিলেন এবং দেশস্থ সকলকে সঙ্গীত-বিদ্যায় বিশারদ করিবার চেষ্টা করিলেন। দেশে সঙ্গীতের চর্চা খুব আরম্ভ হইল। ইহাদের জ্ঞাতি উপেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী ও বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ চন্দ্রমােহন সাপলাকে রাখিয়া তাহার নিকট হইতে সঙ্গীত শিক্ষা করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইহাদিগের সমবেত চেষ্টায় দেশের ব্রাহ্মণ কায়স্থ হইতে ধােপ নাপিত পৰ্য্যন্ত অনেকে, কেহ গানে, কেহ .বাজনায় সুপারগ হইয়াছিল। যদিও বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞগণ কেহ কালে, কেহ অকালে কালের করাল-কবলে নিপাতিত হইয়াছিল তথাপি অতীতের স্মৃতি রক্ষার মতন ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ধােপা, নাপিত ও মুসলমানদিগের মধ্যে এখনও কিছু কিছু পরিমাণে সঙ্গীতের চর্চা দেখা যায়। মাধবনারায়ণ দেশের উন্নতির জন্য সর্বদা মুক্তহস্ত ছিলেন। তিনি একটী নৈশ-বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন এবং তাহাতে একজন ইংরাজি ভাষার শিক্ষক নিযুক্ত করিলেন। তখন নানাদেশে ইংরেজী শিক্ষা আরম্ভ হইয়াছিল। মাধবনারায়ণ নিয়ম করিলেন যে ভদ্রলােকেরা দিনের * হুলার হাটের দশ আনা সত্ব শ্ৰীযুত বাবু গিরীন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর সত্ব, বাকী বাকী ছয় আনা ভােলানাথ বিশ্বসের বংশধরগণ ও তদীয় ভ্রাতার বংশধরগণ ভােগ করিতেছে।
মাধবনারায়ণ, বেলায় বিষয়-সম্পত্তি পৰ্যবেক্ষণ ও অন্য সব কাৰ্য্য করিবেন এবং রাত্রি- কালে দুই ঘণ্টা করিয়া ইংরেজি শিক্ষা করিবেন। গ্রামস্থ-লােকের স্কুলের প্রতি তাদৃশ সহানুভূতি ছিল না; কাজেই স্কুলটা কিছুদিন চলিবার পর বন্ধ হইয়া গেল। রায়েরকাঠী তখন বড়ই সুখ ও আরামের স্থান ছিল; খাইবার পরিবার ভাবনা কাহারও ছিল না; এমন রাত্রি ছিল না যে রাত্রিতে বিদেশীয় গায়কগণের গান-বাজনা, বাই, খেমটা, যাত্রা ইত্যাদি কোন না কোনটীর অনুষ্ঠান হইত না। বিদেশীয় আত্মীয়-স্বজনে ও অতিথি- অভ্যাগতে রায়েরকাঠী সৰ্ব্বদ। পরিপূরিত থাকিত। পরিপূরিত থাকিত। এখন আর সে দিন নাই। মাধবনারায়ণের দেশ ও দেশের সন্নিকটস্থ গ্রামের লােকেরা তাঁহাকে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি-শ্রদ্ধা করিত। কাহারও বৃক্ষে ফস ধরিলে প্রথম ফলটী মাধবনারায়ণের মাধবনারায়ণের নামে মানসিক করা হইত; শেষে অফলন্ত বৃক্ষেও ফল দেখা দিত। আম, কাঠাল, বেল, পেপে এবং নারিকেল প্রভৃতি মানসিক ফল প্রত্যহ বিস্তর তাঁহার নিকট উপস্থিত হইত; কিন্তু তিনি সে সকলের একটাও ভক্ষণ করিতেন না, সমুদয় ফলই রায়েরকাঠীর অধিষ্ঠাত্রী সিদ্ধেশ্বরী- মাকে নিবেদনের জন্য পাঠাইয়া দিতেন। কাহাকেও পাগলা কুকুরে কামড়াইলে মাধবনারায়ণ ইক্ষুগুড়-পড়া দিতেন। তঁাহার এই গুড়-পড়া খাইয়া সহস্র সহস্র কুকুর-দষ্ট ব্যক্তি আরােগ্যলাভ করিয়াছে। এই গুড়-পড়া তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্ৰ শ্ৰীযুক্ত গিরীন্দ্রনারায়ণ শিখিয়া ছিলেন। তিনি এক্ষণে ঐ গুড়-পড়া দ্বারা বহু কুকুর-দষ্ট লােক নিরাময় করিতেছেন। মাধবনারায়ণ প্লীহারােগের এক অব্যর্থ ঔষধ জানিতেন ; এক টুকরা শিকড় তামার মাদুলীতে পূরিয়া প্লীহারােগীকে ধারণ করতে দিতেন ; ৭ মাধবনারায়ণ । তাহাতেই প্লীহাবােগ দূরীভূত হইত। কত প্লীহারােগী যে এই ঔষধে রােগমুক্ত হইয়াছে তাহার সংখ্যা নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। মাধবনারায়ণের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই অব্যর্থ প্লীহাররাগের ঔষধ লয়- প্রাপ্ত হইয়াছে। উদারতায় মাধনারায়ণ সকলের আদর্শস্থানীয় ছিলেন। নিম্নলিখিত ঘটনা হইতেই তাহা বেশ বুঝিতে পারা যায়। মহারাণী ভিক্টোরিয়া যখন ভারত-সম্রাজ্ঞী উপাধি ধারণ করেন, সেই সময়ে দিল্লীসহরে যেমন দরবার বসিয়াছিল, বাঙ্গালা দেশের প্রত্যেক জেলাতেও তাহারই আদর্শে একটি করিয়া ঘােট রকমের দরবার হইয়াছিল। বরিশাল জেলা-সদরেও এইরূপ একটা দরবার বসিয়াছিল। জেলার জজ ও ম্যাজিষ্ট্রেট এই দরবারের অনুষ্ঠাতা ছিলেন। দরবারে জেলার জমিদার, তালুকদার, উকীল প্রভৃতি গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। দরবারে পদমর্যাদানুযায়ী আসন নির্দিষ্ট হইয়াছিল। জজ ও ম্যাজিষ্ট্রেট উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলীর অভিমত অনুসারে মাধবনারায়ণের জন্য সর্বপ্রথম স্থান নির্দিষ্ট করেন ; কিন্তু মাধবনারায়ণ সভাস্থ সকলকে চন্দ্রদ্বীপাধি- পতির ওয়ারিশকে প্রথম স্থান প্রদান জন্য অনুরােধ করেন এবং সভাস্থ সকলের অভিমত গ্রহণপূর্বক প্রথম আসন চন্দ্রদ্বীপাধিপতির ওয়ারিশকে প্রদান করিয়া নিজে দ্বিতীয় আসনে উপবিষ্ট হন। তাহার এই প্রকার মহত্ত্ব ও উদারতা দর্শনে দরবারে সমবেত সকল ব্যক্তিই তঁাহার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। এক সময়ে বরিশাল জেলায় ব্রাহ্মধর্মের অত্যন্ত প্রাদুর্ভাব হইয়া- ছিল। ঐ সময় ঐ জেলার লাখুটীয়া গ্রাম নিবাসী প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ জমিদার রাজচন্দ্র রায় মহাশয়ের পুত্র রাখালচন্দ্র রায় ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েন এবং বরিশালের ডাক্তার জগৎচন্দ্র দাস গুপ্ত বিধবা বিবাহ মাধবনারায়ণ করেন। এইরূপে সমস্ত জেলার ভিতরে ব্রাহ্মধর্মের ঢেউ খেলিতে লাগিল। গ্রামে গ্রামে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক দল গঠিত হইল। রায়ের কাঠীতেও এইরূপ একটা দল গঠিত হইয়াছিল। তাহাদের প্রেরণায় বহু ভদ্র বংশীয় হিন্দু ম্লেচ্ছাচার-সম্পন্ন হইয়া উঠিতে লাগিলেন। অনেকেই হিন্দুধৰ্ম্ম-বিগর্হিত ভােজ্য গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিলেন কেহ কেহ তাচ্ছিল্য ভরে দেব দেবীকে অগ্রাহ্য করিতে উদ্যত হইলেন। কেহ কেহ দেব দেবীর পূজা পর্যন্ত বন্ধ করিলেন। এই বিষম সঙ্কট কালে মাধবনারায়ণ হিন্দুধর্মকে রক্ষা করিতে অগ্রসর হইলেন। তিনি খটা হিন্দু ছিলেন ; তাহার মাথায় শিখা ছিল। এক একবার সন্ধ্যা করিতে তাহার প্রায় ১ ঘণ্টারও অধিক সময় লাগিত। সন্ধ্যা সমা- পনান্তে যখন তিনি অপরাধ ভঞ্জনের স্তব পাঠ করিতেন তখন তাঁহার আবৃত্তি ও ঐকান্তিক ভক্তিভাব দেখিলে নিতান্ত মূঢ়ের ও ভক্তির উদ্রেক হইত। তিনি একটী ধর্ম সভা স্থাপন করিয়া রায়েরকাঠীর হিন্দু সমাজকে উদ্ধার করিলেন। তিনি অর্থ ব্যয় করিয়া পারদর্শী পুরাণ-পাঠক ও কথক আনাইয়া এই সভায় নিয়মিত রূপে পুরাণ-পাঠ ও কথকতা আরম্ভ করাইলেন। কেবল তাহাই নহে, জলাবাড়ী, কেওরা, কীর্তিপাশা প্রভৃতি পার্শ্ববর্তী গ্রাম সমূহে কয়েকজন সদ্বক্তা প্রেরণ করিলেন। তাহারা বক্তৃতা দ্বারা হিন্দুধৰ্ম্মের গূঢ় তত্ত্ব সকল জনসাধারণকে বুঝাইতে লাগিলেন। ফলে যে সকল হিন্দু সন্তান স্বধর্মের প্রতি আস্থাহীন * খ্যাতনামা দুর্গামােহন দাসের বিমাতাকে বিবাহ করেন। সেই জগৎবাবুর ঔরসজাত ও দুর্গামােহন বাবুর বিমাতার গর্ভসস্তৃত পুত্রগণ হইতেছেন মিঃ নলিনীভূষণ দাস গুপ্ত সি-আই-ই, শ্ৰীযুত বিনয়ভূষণ দাস গুপ্ত এবং ইন্দুভূষণ দাস গুপ্ত।
মাবধনারায়ণ ; হইয়া পড়িয়াছিল তাহারা পুনরায় স্বধর্মে আস্থাবান হইতে লাগিলেন। কাহাকে কাহাকেও আবার প্রায়শ্চিত্ত করাইয়া হিন্দু সমাজে গ্রহণ করাইলেন। এইরূপে তাহার ঐকান্তিক আগ্রহ ও যত্নে রায়েরকাঠীতে হিন্দু ধর্মের প্রভাব অক্ষুন্ন রহিল এবং কীর্তিপাশা, জলাবাড়ী প্রভৃতি গ্রামে ব্রাহ্ম্যধৰ্ম্মের যে ঢেউ উঠিয়াছিল তাহাও থামিয়া গেল। মাধবনারায়ণের পৈতৃক ঋণের মধ্যে যে গুলির কিস্তিবন্দি হয় নাই সেই গুলির জণ্ঠ নালিস হইল। এইরূপ একটী ঋণের পাওনাদার ছিলেন কীর্তিপাশা নিবাসী প্রসন্নকুমার সেন। সেন মহাশয়ের মৃত্যুর পর তাহার পত্নী ষষ্ঠীপ্রিয়া নাবালক পুত্রগণের অবিভাবিকা-স্বরূপ ষ্টেটের কাৰ্য্য পরিচালনা করেন। কর্মচারীদের প্ররােচনায় পড়িয়া তিনি মাধবনারায়ণের নামে পাওনা টাকার জন্য নালিস করেন। কিন্তু এই দুই বংশের মধ্যে চিরদিন যে সম্বন্ধ রহিয়াছে তাহা ভাবিয়া যদি তিনি প্রথমে কৰ্ম্ম করিতেন তাহা হইলে এই নালিস কখনই হইত না। ষষ্ঠীপ্রিয়া অতিশয় বুদ্ধিমতী ছিলেন। তিনি পরে এই ভ্রম সংশােধন করিলেন। প্রসন্নকুমারের পূর্ব পুরুষ রামজীবন সেন রাজা রুদ্রনারায়ণের নিকটে কৰ্ম্ম করিতেন; অতঃপর রাজা রুদ্রনারায়ণের পুত্র রাজা নবােওমের সময়ে রামজীবনের পুত্র রত্নেশ্বর পিতৃ-কাৰ্যে বহাল থাকেন। রাজা নরােত্তমের পুত্র শত্রুজিতের সময়েও রত্নেশ্বর কিছুকাল কাৰ্য্য করেন। রত্নেশ্বরের পরলােক গমনের পর কৃষ্ণরাম সেন সেই কাৰ্য্যে নিযুক্ত হন। ইনি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও কর্মপটু ছিলেন বলিয়া নায়েবের ; * ইনি জাতিতে বৈদ্য ছিলেন। রাজা শত্রুজিৎ ইহাদিগকে মজুমদার উপাধি দেন। তদবধি ইহাদের বাটী মজুমদার বাটী নামেই খ্যাত। ৪ মাধবনারায়ণ ১•১ পদে উন্নীত হইয়াছিলেন। রাজা শত্রুজিতের পুত্র রাজা জয়নারায়ণের সময়ে কৃষ্ণরাম সেন লােকাতীত প্রভুভক্তি ও বিশ্বস্ততার পুরষ্কার স্বরূপ প্রভূত ভূসম্পত্তি লাভ করেন। এই সময় হইতেই সেন বংশের সৌভাগ্যের সূত্রপাত হয়। রাজা জয়নারায়ণের পুত্র শিবনারায়ণ, কৃষ্ণরামের পুত্র রাজা-রাম সেনকে পিতৃ পদে নিযুক্ত করেন। ইহার পর হইতে সেন বংশীয়দের মধ্যে আর কেহই রায়েরকাঠীতে আসিয়া কাৰ্য করেন নাই; কেননা রাজারামের মৃত্যু-সময়ে তঁাহার পুত্র নাবালক ছিলেন এবং সেই সময় তাঁহাদের বিস্তর অয়ও ধন সম্পত্তি হইয়াছিল। কিন্তু প্রসন্নকুমার সেন পর্যন্ত তৃৈক বেতনের টাকা আগ্রহ সহকারে গ্রহণ করিতেন। এই বেতন যে তাহারা অভাবের জন্য গ্রহণ করিতেন তাহা নহে, উহার গ্রহণ তাহারা গৌরবজনক মনে করিতেন এবং তাহাদের দৃঢ় ধারণা ছিল যে, এই বেতনের টাকা তাহাদের লক্ষ্মী” স্বরূপ অর্থাৎ সেন বংশের সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধির মূল। প্রসন্নকুমারের স্ত্রী ষষ্ঠীপ্রিয়া মাধবনারায়ণ ও নরনারায়ণ উভয় ভ্রাতার নামেই নালিস করেন। মহেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর তাহার যাবতীয় সম্পত্তি নিলামে উঠে। সেই সময় তাহার স্ত্রী অম্বিকা চৌধুরাণী বসতি-বাটী ও কতক সম্পত্তি কর্মচারীদিগের নামে ক্রয় করেন। তৎপরে আরও কিছু সম্পত্তি নিজ নামে ক্রয় করিয়া উহার সহিত সম্মিলিত করিয়া দেন। অতঃপর এই সম্পত্তি মাধৰনারায়ণ ও নর- নারায়ণ উভয় ভ্রাতাই সমান ভাবে ভােগদখল করিতে থাকেন। কিন্তু প্রসন্নকুমারের স্ত্রী নালিস করিলে পর নরনারায়ণ আদালতে জবাব দিলেন, “আমি পৈতৃক সম্পত্তি ভােগ করি না।” এই সঙ্গে তিনি প্রমাণাদিও দাখিল করিলেন। উহাতে তিনি অব্যাহতি পাইলেন। মাধবনারায়ণও ইচ্ছা করিলে এইরূপে অব্যাহতি লাভ করিতে মাধবনারায়ণ পারিতেন। তাহার কর্মচারীরা ও আত্মীয়গণ তাহাকে এইরূপে অব্যাহতি পাইবার জন্য উপদেশ প্রদান ও অনুরােধ করিয়াছিলেন। কিন্তু মাধবনারায়ণ সে প্রকৃতির লােকই ছিলেন না। তিনি তাহাদিগকে বুঝাইয়া বলিলেন “বিষয় সম্পত্তি অন্য নামে থাকিলেও যখন পিতার টাকা দ্বারাই এই সকল রক্ষা পাইয়াছে তখন আমি কিছুতেই তাহা অস্বীকার করিতে পারিব না; ইহাতে ভগবানের যাহ। ইচ্ছা তাহাই হউক।” মাধবনারায়ণ এই বলিয়া আদালতে জবাব দাখিল করেন যে, “এই নালিস অমূলক। প্রসন্নকুমার আমাদের আপনার লােক। আমার পিতা তমসুকে উষুল না দিয়া বিশ্বাস করিয়া অনেক টাকা দিয়া গিয়াছেন তাহা উযুল না দিয়া এই নালিস রুজু করিয়াছে। বস্তুতঃ উহাদিগের অনেক টাকা পরিশোধ করা হইয়াছিল। এই সময় ১২ বৎসরে তামাদী, এই আইন প্রচলিত হয় এবং উভয় পক্ষে কিছুদিন মােকদ্দমা চলিতে থাকে। অবশেষে দুই পক্ষেরই উকিলগণ একত্র হইয়া মীমাংসার প্রস্তাব করেন। ষষ্ঠীপ্রিয়া সুবিবেচিকা ছিলেন। তিনি সকল দিক বুঝিয়া দেখিয়া মীমাংসায় সম্মত হইলেন এবং মাধব- নারায়ণের রূপ ও গুণের কথা শুনিয়া তাহাকে একবার স্বচক্ষে দেখিবার জন্য তিনি অত্যন্ত উৎসুক হইলেন। কিন্তু মাধবনারায়ণ প্রথমতঃ কীর্তিপাশায় যাইতে আপত্তি করিলেন। ষষ্ঠী প্রিয়া যখন তাহাকে লইয়া যাইবার জন্য একটা সুবিবেচক কর্মচারী পাঠাইলেন এবং বলিয়া দিলেন যে তাহাদের প্রজা ও চিরানুগত কর্মচারীর বাড়ীতে আসিলে সেজ-রাজার সম্মানের কোনই লাঘব হইবে না, বরং উহাদিগকে অনুগৃহিত করা হইবে, তখন বরিশাল জেলার অন্তর্গত কেওড়াগ্রাম নিবাসী বহুদর্শী ও খ্যাতনামা চিকিৎসক মাধবনারায়ণের সভাসদ দুর্গাচরণ সেন কবীন্দ্র মহাশয় ও পিরােজপুর মহকুমার ষষ্ঠীপ্রিয়ার মাধবনারায়ণ বিচক্ষণ মােক্তার হরকুমার দাস ও তাহার অন্যান্য শুভানুধ্যায়ী সদ্বিবেচক বন্ধুবর্গ কীর্তিপাশায় যাইবার জন্য পরামর্শ দিলেন। মাধবনারায়ণ ষষ্ঠী- প্রিয়ার অনুরােধ রক্ষা করিলেন। মাধবনারায়ণ কীর্তিপাশায় উপস্থিত হইলে ষষ্ঠীপ্রিয়া তাহাকে রাজোচিত সমাদরের সহিত অভ্যর্থনা করেন। তিনি ভােজন আপ্যায়নেরও জুটি করেন নাই। মাধবনারায়ণকে নৌকা হইতে বাটীতে লইয়া যাইবার জন্য তাহার পুত্রগণ নজর দিলেন। নৌকা হইতে বাড়ীতে যাইবার পথের দুই পার্শ্বে কদলী বৃক্ষ রােপিত ও পূর্ণ কুম্ভ সমূহ স্থাপিত হইয়াছিল। তাঁহারা বাদ্য ইত্যাদিরও সবিশেষ আয়ােজন করিয়াছিলেন। সক্ষেপতঃ বলিতে হয় যে মাধবনারায়ণ রাজ-সম্মানে সম্মানিত হইয়া তাহাদের বাড়ীতে উপনীত হইলেন। সেখানেও তাহার পদোচিত সম্বর্ধনা হইয়াছিল। বস্তুতঃ তাঁহার যত্ন-আদর ও সেবা শুশ্রুষার যতদূর সুব্যবস্থা হইতে পারে, তাহা তাহারা প্রাণপণ শক্তিতে করিয়াছিলেন। ষষ্ঠীপ্রিয়া যেরূপ কাৰ্য-দক্ষা ও বুদ্ধিমতী ছিলেন সেইরূপ গুণবতীও ছিলেন। তিনি মানীর আদর করিতে জানিতেন। তাঁহার নম্র ও শিষ্টাচারপূর্ণ মধুর ব্যবহারের প্রসংশা তঁাহার শত্রুগণও পর্যন্ত করিতেন। মাধবনারায়ণ বাটীতে পদার্পণ করিলে তিনি তাহাকে নিজ দেওয়ান ও প্রধান প্রধান কর্মচারীদিগের দ্বারা নজর দেওয়াইলেন এবং পরিশেষে বিনয়ের সহিত ‘সেজ রাজাকে নিবেদন করাইলেন “আমাদের পূর্বপুরুষগণ রাজার পূর্বপুরুষগণের অন্নে প্রতিপালিত ; রাজাদের নিকটে কাৰ্য্য করিয়াই আমাদের অবস্থা উন্নত হইয়াছে। এরূপ অবস্থায় রাজবংশধরেরা আমাদের ব্যবহারে ক্ষুর বা অসন্তুষ্ট হইলে আমাদের মঙ্গল হইবে না। আমাদের পাওনা টাকা ছাড়িয়া দিলেও আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য তাঁহাদের নিকটে যে ১০৪ মাধবনারায়ণ অচ্ছেদ্য ঋণ জালে আবদ্ধ তাহার কণমাত্ৰও পরিশােধ হইবে না, সে কৃতজ্ঞতার ঋণ অপরিশােধনীয়। বিশেষতঃ আমার শ্বশুর রাজার পিতাঠাকুর মহাশয়ের নিকট হইতে সুদ বাবদ অনেক টাকা পাইয়াছেন, কাজেই এখন রাজা সন্তুষ্ট চিত্তে যাহা দিতে স্বীকৃত হইবেন আমি নাবালকের ষ্টেটের অছি স্বরূপ তাহাতেই সম্মত হইব। তিনি যদি খতের আসল ১৫০০ টাকা দেন তবে আমি বাকি টাকার দাবী ত্যাগ করিতে স্বীকৃত আছি। ইহাতে যদি তিনি অসন্তুষ্ট হন তাহা হইলে এই টাকা আমি নিজ হইতে ষ্টেটে জমা দিব, রাজার নিকট হইতে এক পয়সাও লইব না এবং সমস্ত দাবী ছাড়িয়া দিব।” মাধবনারায়ণ দেখিলেন যে টাকার নালিশ হইয়াছে তাহা সমস্ত ডিক্রী হইলে তাহাকে ভয়ানক বিপদে পড়িতে হইবে। তিনি ষষ্ঠী- প্রিয়ার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং ১৫০০ টাকা দিতে স্বীকৃত হইলেন। কিন্তু তখন তাহার তহবিলে টাকা ছিল না বলিয়া এই টাকার জন্য একখানি রেজেষ্ট্রীকৃত তমসুক লিখিয়া দিবার প্রস্তাব করিলেন। ষষ্ঠীপ্রিয়া ইহাতে সম্মত হইলেন। অতঃপর মাধবনারায়ণ রায়েরকাঠীতে প্রত্যাগমন করিলেন। প্রতিশ্রুতিমত যথাসময়ে উক্ত তমসুক রেজিষ্ট্রী করিয়া পাঠাইয়া দিলেন। এই তমসুক পাইয়া ষষ্ঠীপ্রিয়া মামলা উঠাইয়া আনিলেন। মাধবনারায়ণ এই তমসুকের টাকা শীঘ্রই পরিশােধ করিলেন। প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠীপ্রিয়া মাধবনারায়ণকে সুদবাবদ অনেক টাকা ছাড়িয়া দিলেন। মাধবনারায়ণ ষষ্ঠীপ্রিয়ার এইরূপ ভদ্র ব্যবহারে মুগ্ধ হইলেন এবং আজীবন তাহার প্রশংসা করিতেন। কীর্তিপাশার সেনবংশ অতি ধার্মিক ও সত্যবাদী। ইহারা ভদ্র ও নম্র ব্যবহারে বরিশাল জেলায় সুবিখ্যাত। ইহাদের ভূসম্পত্তিও যথেষ্ট। মাধবনারায়ণ কীর্তিপাশায় মাধবনারায়ণ উপস্থিত হইলে ষষ্ঠীপ্রিয়া দেবীর ছয় আনীর অংশীদার শশিভূষণ সেনের মাতাও তাহাকে পরম সমাদরের সহিত অভ্যর্থিত করিয়াছিলেন। কেবল তাহাই নহে, তিনি নিজ পােষ্যপুত্র শশিকুমার সেনকে দিয়া নজর দেওয়াইয়া ছিলেন এবং নিমন্ত্রণ করিয়া নানাবিধ উপাদেয় ভেজে পরিতৃপ্ত করাইয়া ছিলেন। ক্রমে মাধনারায়ণের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও কন্যার বিবাহ দিবার সময় উপস্থিত হইল। খুলনা জেলার অন্তর্গত বনগ্রাম-নিবাসী সহজ মুখ্য কুলীন শ্রীযুক্ত প্যারীমােহন মিত্র মহাশয়ের সর্ব-সুলক্ষণা কন্যা শ্ৰীমতী চন্দ্রমােহিনীর সহিত জ্যেষ্ঠপুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণের বিবাহ দিলেন। যশােহর জেলার অন্তর্গত ইতনা গ্রাম নিবাসী সহজ মুখ্য কুলীন মহেশচন্দ্র ঘােষ মহাশয়ের তৃতীয় পুত্র শ্রীমান প্রকাশচন্দ্র ঘােষের সহিত কন্যা শ্ৰীমতী মানদাসুন্দরীর শুভ পরিণয়কার্য সম্পন্ন করেন। এই উপলক্ষে তিনি দেশস্থ ও সমাজস্থ লােকদিগকে ভূরি ভােজনে আপ্যায়িত করেন। কন্যা জামতাকে বংশের চির-প্রথা অনুযায়ী বরাভরণ, বরশয্যা, অলঙ্কার এবং নিজ তালুক জোলাগাতী হইতে কতেক ভূসম্পত্তি দান করেন। এই সম্পত্তি অদ্যাপি তাহার কন্যা ও দৌহিত্রেরা ভােগ করিতেছেন। এই বংশে * স্বপৰ্য্যায়-বিবাহ সম্পন্ন হইত। মাধবনারায়ণের পুত্র ও কন্যা ২৭শের পৰ্য্যায় ছিলেন। কাজেই তাহার পুত্রবধু ও জামাতা এই পৰ্য্যায় হইয়াছিলেন। এইরূপ পৰ্য্যায় মিল করিয়া বিবাহ দক্ষিণ- রাঢ়ীয় মৌলিক সমাজে খুবই কমই দৃষ্ট হয়। এখন কেহ কেহ এই নিয়ম মানিয়া চলেন না। দুঃখের বিষয় এই যে মাধবনারায়ণ এই বিবাহে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহকাৰ্য সম্পন্ন করাইতে পারেন নাই। : প্রথম পুরুষ হইতে যত পুরুষ হয় তাহাই বংশের পৰ্যায়।
১০৬ মাধবনারায়ণ তাহাকে তখন কয়েকটী গুরুতর মামলার জন্য বরিশাল সহরে যাইতে হইয়াছিল। তাহার বুদ্ধিমতী সহধর্মিণী ও প্রধান প্রধান কর্মচারীরা ১৭৯৮ শকাব্দে বাঙ্গলা ১২৮৩ সালে এই বিবাহ কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিয়াছিলেন। মাধবনারায়ণের ভ্রাতা নরনায়ণ নিজগ্রামে শিক্ষার প্রচলন মানসে ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে (বাঙ্গালা ১২৬৬ সালে) “মডেল স্কুল” নাম দিয়া একটা স্কুল প্রতিষ্ঠিত করেন। এই স্কুলটা ১৮৬১ খৃষ্টাব্দে (বাঙ্গালা ১২৬৮ সালে) মধ্যইংরেজীস্কুলে পরিণত হয়। তখনকার দিনে সমগ্র বরিশাল জেলায় দুই তিনটীর অধিক মধ্যইংরেজীস্কুল ছিল কিনা সন্দেহ। স্কুলটীতে বাঙ্গালা শিক্ষার জন্য দুইজন এবং ইংরেজী শিক্ষা দিবার জন্য ৩ জন শিক্ষক নিযুক্ত করা হইয়াছিল। এই স্কুলে গবর্ণমেন্ট সাহয্য প্রদান করিতেন। তাহাতে ও ছাত্রদের বেতনে স্কুলের ব্যয় সঙ্কুলন হইত ; সেইজন্য বক্রী টাকা যাহা লাগিত তাহা নরনারায়ণ যােগাইতেন। তিনি অনেকদিন পর্যন্ত এই খরচ চালাইয়া ছিলেন। ক্রমে গবর্নমেন্ট প্রদত্ত সাহায্যের টাকার পরিমাণ ৪০ টাকা পর্যন্ত হইল। কিন্তু নরনারায়ণের আর্থিক অবস্থা ক্রমশঃ মন্দ হইতে মন্তর হইতে লাগিল। এই সময়ে তাহার অন্য সরিক চন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী মহাশয় অপর একটী স্কুল স্থাপন করিলেন, কিন্তু তাহাও স্থায়ী হইল না। এদিকে প্রতি যােগিতার ফলে কয়েক বৎসর পরে অর্থাভাবে নরনারায়ণকে নিজ স্কুলটী বন্ধ করিতে হইল। এই সময়ে চন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী মহাশয় * জীবিত ছিলেন না। তাহার পত্নীদ্বয় শ্রীযুক্ত মনােমমাহিনী চৌধুরাণী ও শ্ৰীযুক্তা বসন্তকুমারী * তাঁহার পুত্র খ্যাতনামা রায় সত্যেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বাহাদুর বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য এবং উকীল।
মাধবনারায়ণ ১০৭ চৌধুণী নাবালক পুত্রদ্বয়ের ষ্টেটের একজিউট্রী কাৰ্য্য চালাইতেন। শ্ৰীযুক্তা বসন্তকুমারী চৌধুরাণী যেরূপ বুদ্ধিমতী সেইরূপ পরােপকার- পরায়ণা ছিলেন। তিনি, শ্ৰীযুক্ত অদ্বৈতনারায়ণ রায় চৌধুরী এবং শ্ৰীযুক্ত প্রসন্নকুমার মিত্ৰ একত্র হইয়া মাধবনারায়ণকে অনুরােধ করিলেন,—“আপনি স্কুলটী পুনরায় স্থাপন করুন।” ইহাতে মাধবনারায়ণ বলিলেন,-“আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা এই স্কুলটীর জন্য বিস্তর টাকা খরচ করিয়াছে ; সে যদি সন্তুষ্টচিত্তে আমাকে এই কার্যের ভার লইতে বলে তবেই আমি তাহা লইতে পারি।” নরনারায়ণ সন্তুষ্টচিত্তে তাহাকে স্কুল পুনঃ স্থাপনের জন্য অনুরােধ করিলেন। তখন মাধবনারায়ণের সবিশেষ চেষ্টায় স্কুলটা পুনঃ স্থাপিত হইল। মাধবনাৰণ স্বয়ং স্কুলটীর সেক্রেটারী হইলেন; শ্ৰীযুত অদ্বৈতনারায়ণ রায় চৌধুরী সহকারী সেক্রেটারী এবং শ্রীযুক্তা বসন্তকুমারী চৌধুরাণী, শ্রীযুক্ত প্রসন্নকুমার মিত্র ও শ্রীযুক্ত সখানাথ মিত্র প্রভৃতি স্কুল-পরিচালন-কমিটীর মেম্বার হইলেন। ইংরাজী ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে (বাঙ্গালা ১২৮৫ সালে) স্কুলটা পুনঃ স্থাপিত হয়। এই সময়ে মেম্বারগণের প্রদত্ত চাঁদা ও ছাত্রদিগের প্রদত্ত সামান্য বেতনের টাকায় স্কুলের খরচ পােষাইত না; কাজেই স্কুল পরিচালনার জন্য যখন যে টাকার দরকার হইত মাধবনারায়ণ স্বয়ং তাহ দিতেন। এইরূপে কিছুকাল স্কুল চলিলে পর ২১, টাকা সরকারী সাহায্য মঞ্জুর হয়; পরে সাহায্যের পরিমাণ ২৪ টাকায় উঠে। প্রথম অবস্থায় স্কুলে দুইজন বাঙ্গালা ও দুইজন ইংরেজী শিক্ষক ছিলেন। বিক্রমপুরের অন্তর্গত সুবর্ণগ্রাম-নিবাসী (সােণার ।) নিবাসী কালী- কিশাের দে মহাশয় হেড পণ্ডিত এবং ফরিদপুর জেলার কুলপন্দি গ্রাম- নিবাসী কৈলাসচন্দ্র বসু মহাশয় হেড মাষ্টার ছিলেন। ক্রমে ক্রমে * ইনি পরে মাদারীপুরেরর অন্যতম প্রসিদ্ধ উকীল হইয়াছিলেন।
১০৮ মাধবনারায়ণ স্কুলটা উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে লাগিল; স্কুলের ছাত্রসংখ্যাও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল; বহু ছাত্রও এই স্কুল হইতে ছাত্রবৃত্তি ও মাইনর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে লাগিল। * স্কুলটী ভালরূপে চলিতেছে দেখিয়া মাধবনারায়ণ অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন। রাজবংশীয় খ্যাতনামা রায় সত্যেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বাহাদুর এই স্কুল হইতে মাইনর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া প্রথম বৃত্তিলাভ করেন। বিদেশে ছেলে রাখিয়া শিক্ষা দিতে হইলে অনেক টাকা খরচ পড়ে এবং তথায় অভিভাবকহীন হইয়া ছেলেরাও উচ্ছ ঙ্খল হইতে পারে এই মনে করিয়া অভিভাবকগণ মাধবনারায়ণকে অনুরােধ করিলেন, “আপনি স্কুলটাকে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে পরিণত করুন।” এদিকে শ্ৰীযুক্ত অদ্বৈতনারায়ণ রায় চৌধুরী, শ্ৰীযুক্ত প্রসন্নকুমার মিত্র ও যুক্তা বসন্তকুমারী চৌধুরাণী অগ্রণী হইয়া স্কুলটী যাহাতে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে পরিণত হয় সেই বিষয়ে মাধবনারায়ণকে বিশেষ করিয়া ধরিয়া বসিলেন ও তাঁহাকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। শ্ৰীযুক্ত অদ্বৈত নারায়ণ রায় চৌধুরী মহাশয় তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মাধবনারায়ণকে বিশেষ ভক্তি-শ্রদ্ধা করিতেন, মাধবনারায়ণও তাহাকে বিশেষ স্নেহ করিতেন। এই সম্ভাব মাধবনারায়ণের জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও ছিল। তিনি মাধবনারায়ণের বংশধরগণকেও স্নেহের চক্ষে দেখিতেন এবং তাহাদের উপকার করিতে তিনি কদাপি পরাজুখ হইতেন না। মাধবনারায়ণ ইহাদিগকে এই কাৰ্যে অগ্রণী দেখিয়া ১৮৮২ * সিটি কলেজের সংস্কৃত ও বঙ্গভাষার প্রধান অধ্যাপক পণ্ডিত উপেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বিদ্যাভূষণও এই ফুলের ছাত্র। এই স্কুল হইতে অনেক ছাত্র পরীক্ষাভীণ হইয়া কেহবা হাইকোর্টের উকিল কেহবা ডাক্তার হইয়াছেন।
মাধরনারায়ণ ১০৯ খৃষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারী মাসে (বাঙ্গালা ১২৮৯ সালে) মধ্য ইংরেজী স্কুলটীকে উচ্চ ইংরেজী স্কুলে পরিণত করিলেন। বাসণ্ডাগ্রাম নিবাসী শ্ৰীযুক্ত রসিক চন্দ্র দাস হেড মাষ্টার নিযুক্ত হইলেন। মাধবনারায়ণের সভাপণ্ডিত প্রসিদ্ধ বৈয়াকরণিক বিশ্বেশ্বর তর্ক পঞ্চানন মহাশয়কে হেডপণ্ডিত-পদে নিযুক্ত করা হইল। স্কুলে তখন ইংরেজী শিক্ষক ছিলেন মােট ৪ জন এবং সংস্কৃত ও বাঙ্গলা শিক্ষক ছিলেন দুইজন। সুপ্রসিদ্ধ শশিশেখর দত্ত মহাশয় এই সময়ে পিরােজপুরের সব ডিবিসন্যাল অফিসার অর্থাৎ মহকুমা-হাকিম ছিলেন। তিনিও ঠিক এই সময়েই পিরােজপুরের মাইনর স্কুলটাকে এন্ট্রান্স স্কুলে পরিণত করেন। যাহাতে রায়েরকাঠীর এন্টন্সি স্কুলটী না থাকে সেই জন্য শশীবাবু প্রাণপণ চেষ্টা আরম্ভ করিলেন; কারণ, এই স্কুলটা বন্ধ না হইলে পিবােজপুরের স্কুলটীর উন্নতি হইতে পারে না। দুইটী স্কুলেই যােরর প্রতিযােগিতা চলিতে লাগিল। শশীবাবু মাধবনারায়ণকে জব্দ করিবার উদ্দেশ্যে তাহার প্রস্তুত রাস্তাটী মেরামত করিয়া দিবার জন্য ডিষ্ট্রিক্ট বাের্ড হইতে এই মর্মে নােটীশ দেওয়াইলেন যে, হয় রাস্তাটি ডিষ্ট্রিক্ট বাের্ডের হাতে দেওয়া হউক, নতুবা মেরামত করা হউক। ভ্রাতার সহিত পৃথক হইবার পরেও মাধবনারায়ণ একবার দক্ষিণ দিকের রাস্তাটা মেরামত করিয়া- ছিলেন। পুনরায় রাস্তাটা খারাপ হইয়াছিল। এখন মজুরী ও মাল মসলার অত্যধিক মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মাধবনারায়ণ রাস্তাটী আর মেরামত করিতে পারিলেন না। তিনি বাধ্য হইয়া রাজবাটীর সম্মুখস্থ রাস্তাটুকু বাদ রাখিয়া বাকী সমস্ত রাস্তা ডিষ্ট্রিক্ট-বোর্ডের হস্তে অৰ্পণ করিলেন। ডিষ্ট্রিক্ট বাের্ড রাজবাটীর সম্মুখস্থিত রাস্তাটুকু বাদ রাখিয়া হরসুন্দরী- পুষ্করিণীর পূৰ্বদিক্ হইতে নূতন রাস্তা করিয়া পুরাতন রাস্তার সহিত মাধবনারায়ণ সংযুক্ত করিয়া দিলেন এবং সমুদায় রাস্তাটি মেরামত করাইলেন। রাজবাটীর সম্মুখস্থিত যে রাস্তাটুকু ডিষ্ট্রিক্ট বাের্ডকে দেওয়া হয় নাই, তাহা রায় সত্যেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বাহাদুর ও নগেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর চেষ্টায় মিউনিসিপ্যালিটী ও সেটেলমেন্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক “মাধবনারায়ণ রােড” নামে অভিহিত হইয়াছে। শশীবাবু চেষ্টা করিয়া পিরােজপুরের স্কুলটীর জন্য সরকারী সাহায্য পাইলেন; কিন্তু বিস্তর চেষ্টা করিয়াও রায়েরকাঠীর স্কুলটীতে সরকারী সাহায্য মিলিল না। পুনঃ পুনঃ ইনস্পেক্টর ও ডিরেক্টরের নিকটে দরখাস্ত পাঠাইয়াও কোনও ফল হইল না। এমন কি মাইনর স্কুলে যে সাহায্য ছিল ইনস্পেক্টর ও ডিরেক্টরের সুবিবেচনার ফলে তাহা পর্যন্তও মিলিল না। তখন গ্রাম্য লােকদিগের উৎসাহ হ্রাস পাইল; সকলেরই মন ভাঙ্গিয়া গেল। যাহাদের শিক্ষা দিবার উৎসাহ ও ইচ্ছা ছিল তাহারা এই স্কুলে সাহায্য নাই দেখিয়া ছেলেদের প্রাইভেট স্কুলে পড়াইতে অনিচ্ছুক হইলেন। ছাত্রদিগের মধ্যে শিক্ষার জন্য কতক বরিশালে, * কতক পিরোজপুরে ও কতক কলিকাতায় প্রেরিত হইল। একেই স্কুলে ছাত্র-বেতন অত্যল্প ছিল ; তাহার উপর এইরূপে ছাত্র- সংখ্যাও হ্রাস পাইল। সুতরাং স্কুলের আয় অত্যন্ত কমিয়া গেল। মেম্বারগণ মধ্যেও অনেকে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করিলেন। ইহার পরেও তিন বৎসর মাধবনারায়ণ স্বয়ং স্কুলটীর খরচ চালাইয়া উহাকে বজায় রাখিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন তিনি দেখিলেন যে, এই স্কুলের দ্বারা গ্রামের লােকদিগের কোনও উপকার হইতেছে না, বরং বৃথা অর্থ্যবয় * তখন বরিশাল জেলায় জেলাস্কুল ব্যতীত আর এন্ট্রান্স স্কুল ছিল না এবং প্রাইভেট স্কুলকে লােকে স্কুলই মনে করিত না।
মাধবনারায়ণ ১১১ হইতেছে, তখন তিনি উপায়ান্তর না দেখিয়া স্কুলটাকে আবার মাইনর স্কুলে পরিণত করেন। নড়াইল-নিবাসী শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ ঘােষ নামক এন্টেন্স স্কুলের জনৈক শিক্ষককে স্কুলের হেড মাষ্টার এবং অশ্বিনীকুমার সরকার মহাশয়কে হেড পণ্ডিত নিযুক্ত করেন। অনেক চেষ্টার পর স্কুলে ১৮ টাকা সরকারী সাহায্য বরাদ্দ হয়। এই স্কুলটীকে মাধবনারায়ণ তাহার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রাণপণে রক্ষা করিয়া গিয়াছেন। তাহার মৃত্যুর পরে তাহার পত্নী শ্ৰীযুক্তা জগৎমােহিনীও তিন বৎসর স্কুলটীকে রক্ষা করেন। এই সময়ে পূর্ণমাত্রায় গৃহবিবাদ আরম্ভ হইল। সরিক জ্ঞাতিদিগের মধ্যে কেহ কেহ হিংসা-প্রণােদিত হইয়া স্কুলটীর পর্যন্ত অনিষ্ট সাধন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। শ্ৰীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী তখন একে দেবতুল্য স্বামী-বিয়ােগে কাতরা, তদুপরি গৃহ-বিবাদ ও জ্ঞাতি-বিরােধে সর্বদাই উত্ত্যক্ত ও অতিষ্ঠ ; কাজেই তিনি অনন্যোপায় হইয়া অবশেষে স্কুলের তদানীন্তন হেড মাষ্টার শ্রীযুক্ত যজ্ঞেশ্বর রক্ষিত মহাশয়ের পরামর্শে এবং জ্যেষ্ঠপুত্ৰ শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী ও জামাতা পিরােজপুরের উকীল শ্ৰীযুক্ত প্রকাশচন্দ্র ঘােষ মহাশয়ের সম্মতিক্রমে স্কুলের সেক্রেটারী পদ ত্যাগ করেন এবং ঐ পদ তাহার দেবর নরনারায়ণকে প্রদান করেন। কিন্তু তাহারও আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল না থাকায় তিনিও বেশীদিন স্কুলের খরচ জোগাইতে সমর্থ হইলেন না ও সেক্রেটারী-পদ ত্যাগ করিলেন। পরে দুর্গানারায়ণ রায় চৌধুরী * স্কুলের সেক্রেটারী হন; সম্প্রতি তাঁহার পুত্র শ্রীযুক্ত সারদারঞ্জন রায় চৌধুরী স্কুলের সেক্রেটারী-পদে নিযুক্ত আছেন। * শ্রীদুর্গানারায়ণ রায় চৌধুরী মহাশয় অতি নিরীহ ও সাধু প্রকৃতির লােক ছিলেন।
অষ্টম পরিচ্ছেদ। সন ১৯৯১ সালের পৌষ মাসে জুবার্ট সাহেবের তত্ত্বাবধানে কলি- কাতায় একটী একজিবিশন বা প্রদর্শনী হয়। মাধবনারায়ণ একজিবিশন দেখিবার জন্য তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও মধ্যম পুত্রকে সঙ্গে লইয়া কলিকাতায় গমন করেন। সে সময় কলিকাতায় যাইবার জন্য রেল-ষ্টীমারের সুবিধা ছিল না। কাজেই তঁাহাকে নৌকাযােগেই কলিকাতায় যাইতে হইয়াছিল। সঙ্গে পুত্রদ্বয় ব্যতীত কর্মচারী, ভৃত্যাদি বহুলােক ছিল। তাঁহার কলিকাতায় যাইবার কয়েক মাস পরে কলিকাতা হইতে খুলনা পৰ্য্যন্ত রেল লাইন এবং খুলনা হইতে পিরােজপুর ও বরিশাল পর্যন্ত ষ্টীমার লাইন খােলা হয়। ফ্লোটীলা কোম্পানী প্রথমে ষ্টীমার চালাইতে আরম্ভ করেন। রায়ের কাটাতে ফিরিবার সময়ে মাধবনারায়ণ কলি- কাতা হইতে খুলনা পর্যন্ত রেলেই ফিরিয়াছিলেন। মাধবনারায়ণ যখন কলিকাতায় গমন করেন তখন তাহার ভ্রাতা নরনারায়ণও পৃথক বজরায় কলিকাতায় যাত্রা করেন। কলিকাতায় পৌছিবার কিছু দিন পরে তঁাহার শ্বশুর মধুসূদন ঘােষ মহাশয়ের পরলােকপ্রাপ্তি হয়। মাধব- নারায়ণ ও নরনারায়ণ দুই ভাই সেই সময় উপস্থিত থাকিয়া তাহার সৎকারকার্য সম্পন্ন করেন। এই কাৰ্যে চেৎলার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি যােগদান করিয়াছিলেন। কলিকাতায় অবস্থান করিবার সময় মাধব- নারায়ণ ঠনঠনিয়ার খ্যাতনামা রায় গিরীশচন্দ্র দাস বাহাদুরের বাটীতে বিবাহ উপলক্ষে নিমন্ত্রিত হন। ইহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হেরম্বচন্দ্র দাস মাধবনারায়ণ ১১ মহাশয় মাধবনারায়ণের ভায়রাভাই ছিলেন। যথা-সময় তিনি বিবাহ-সভায় উপস্থিত হন। ময়ূরভঞ্জের মহারাজ এবং কলিকাতার বহু গণ্যমান্য লােক এই সভায় : সমবেত হইয়াছিলেন। তাঁহার সকলেই মাধবনারায়ণের সহিত আলাপ-পরিচয় করিয়া তাহার বিজ্ঞতা দর্শনে প্রীত হইলেন। দীনবন্ধু ঘটক এবং ঈশানচন্দ্র ঘটকও এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। মালা-চন্দন দিবার কথা উঠিলে তঁাহারা প্রস্তাব করিলেন যে মাধবনারায়ণকেই মালা-চন্দন দেওয়া হউক, কারণ তিনি গােষ্ঠীপতি মৌলিক এবং সৰ্বগুণালঙ্কত, বিশেষতঃ তাহার পূর্বপুরুষগণ বহু ব্রাহ্মণ ও কুলীনের প্রতিপালক ; সুতরাং তিনি এখানে উপস্থিত থাকিতে অন্য কোনও মৌলিক মালা-চন্দন পাইতে পারেন না। অতঃপর সর্বসম্মতিক্রমে মাধবনারায়ণকেই মাল্য চন্দনে ভূষিত করা হয়। + এই ঘটনার কয়েক দিন পরে শশাভাবাজারের শ্রীযুক্ত কালিদাস মল্লিক মহাশয় কালীঘাটে মাধবনারায়ণের বাসায় উপস্থিত হন এবং তাহাকে ও তদীয় পুত্রগণকে নিমন্ত্রণ করেন। কালীবাবু এই সময়ে তঁাহার শ্বশুর স্বর্গীয় প্রসন্নকুমার দেব রায় বাহাদুরের বাটীতে বাস করিতেন, কেননা তিনি শ্বশুরের মৃত্যুর পর নাবালক শ্যালকদের অভি- ভাবক স্বরূপ তাহাদের বিষয়-সম্পত্তি তত্ত্বাবধান করিতেন। মাধব- • রায় গিরিশচন্দ্র দাস বাহাদুর গভর্ণমেন্টের তােষাখানার দেওয়ান ছিলেন। ঠনঠনিয়ায় যে হেরম্বদাসের লেন আছে তাই গিরিশবাবুর অগ্রজ হেরম্ববাবুর নামেই হইয়াছে। ইহারা ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন এবং কলিকাতাস্থ দক্ষিণ রাঢ়ীয় সমাজে বিশেষ সুপরিচিত। এই মাল্যচন্দন কায়স্থ মৌলিকদিগের বড়ই সম্মানের বস্তু।
১১৪ মাধবনারায়ণ নারায়ণ তদীয় মধ্যমপুত্র নগেন্দ্রনারায়ণকে সঙ্গে লইয়া নিমন্ত্রণ রক্ষা করিবার জন্য স্বগীয় প্রসন্নকুমার দেব রায় বাহাদুরের বাটীতে উপস্থিত উপস্থিত হন। জ্যেষ্ঠপুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণ অসুস্থ ছিলেন বলিয়া নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে পারেন নাই। ভােজনান্তে মাধবনারায়ণ কালীবাবুকে বলিলেন,-রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের মধ্যমপুত্র রাজা রাজেন্দ্র- নারায়ণ দেব বাহাদুর ও ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের সহিত আমার বিশেষ সৌহার্দ আছে। রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের বাটীতেই তাহাদের উভয়ের সহিত সাক্ষাৎ হইবে; অতএব চলুন তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আণি।” তখন কালীবাবু মাধবনারায়ণ ও তাহার মধ্যম পুত্রকে লইয়া গিয়া রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণের সহিত সাক্ষাৎ করাইলেন। এই সময়ে রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণের দৃষ্টিশক্তি লােপ পাইয়াছিল। তিনি কালীবাবুর নিকটে মাধবনারায়ণ ও তাহার পুত্রের আগমনের কথা শুনিয়া পরম আনন্দিত হইলেন এবং মাধবনারায়ণকে বিশেষরূপে অভ্যর্থনা করিয়া নিজ গদীর উপর এবং তদীয় পুত্র নগেন্দ্রনারায়ণকে গদীর উপর নিজ ক্রোড়ে উপবেশন করিতে বলিলেন। কিন্তু মাধব- নারায়ণ অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। তিনি বলিলেন,-“আপনি আমার বয়ােজ্যষ্ঠ, আমি কখনই আপনার সহিত একাসনে বসিতে পারি না।” রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ কিছুতেই তাহার কথা শুনিলেন না, বরং বলি- লেন-“আপনি জ্যেষ্ঠানুক্রমে ভূঞিয়া কিঙ্করের বংশধর এবং আমাদের চেয়ে অনেক প্রাচীন জমিদার, আপনি এই গদীতে আমার নিকটে বসিলে কোন দোষই হইতে পারে না।” উপায়ান্তর না দেখিয়া তখন মাধব- নারায়ণ গদীর এক পাবে উপবেশন করিলেন, কিন্তু তাহার পুত্র নগেন্দ্র- নারায়ণ কিছুতেই ক্রোড়ে উপবেশন করিলেন না, তিনি তাহার নিকটে গদীর নিম্নে ফরাসের উপর বসিয়া রহিলেন। দুইজনে বহুক্ষণ ধরিয়া মাধবনারায়ণ ১১৫ আলাপ চলিল। অতঃপর ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হইল। ঈশ্বরচন্দ্র মাধবনারায়ণের বাল্যবন্ধু এবং দক্ষিণ রাঢ়ীয় কায়স্থ সমাজে সবিশেব সম্মানাহ ও মুখ্য কুলীন ছিলেন। তিনি পাশীতে ও ইংরাজিতে বিশেষ পাণ্ডিত্য লাভ করিয়াছিলেন। বিদায় গ্রহণের সময়ে রাজ। রাজেন্দ্রনারায়ণ দেব বাহাদুর মাধবনারায়ণকে বলিলেন,-“আমি এখন বৃদ্ধ হইয়াছি, দৃষ্টিশক্তিও লােপ পাইয়াছে, আপনার বাটীতে যাইয়া দেখা করিবার সাধ্য আমার নাই, অতএব আপনি যতদিন কলিকাতায় আছেন আমার সহিত মধ্যে মধ্যে অনুগ্ৰহ করিয়া সাক্ষাৎ করিলে কৃতার্থ হইব।” এই সময়ে, মাধবনারায়ণ ভূকৈলাসের রাজা সত্যবাদী ঘােষাল মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ করেন। তিনি মাধবনারায়ণের গুণের বড়ই পক্ষপাতী ছিলেন এবং তাহার বড়ই প্রশংসা করিতেন। মাধবনারায়ণের শ্বশুর পাণিহাটী নিবাসী খ্যাতনামা শ্রীযুক্ত কালীকৃষ্ণ ঘােষ মহাশয় তখন কলিকাতায় নন্দরাম সেনের গলিতে বাস করিতে- ছিলেন। জামাতা কলিকাতায় আগমন করিয়াছেন শুনিয়া তিনি তাহাকে নিজবাটীতে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যাইলেন। তিনি বহুদিন পরে জামাতাকে দেখিতে পাইয়া পরম আনন্দিত হইলেন এবং মধ্যে মধ্যে তঁাহার সহিত দেখা করিতে বলিলেন। শ্বশুরের কথানুযায়ী মাধবনারায়ণ মধ্যে মধ্যে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেন। মাধবনারায়ণের মধ্যমপুত্র নগেন্দ্রনারায়ণের সহিত মজিলপুর-নিবাসী বিখ্যাত জমীদার হেমচন্দ্র দত্ত মহাশয়ের বন্ধুত্ব হেমবাবু ইংরেজী, বাঙ্গালা সংস্কৃত ভাষায় সবিশেষ পারদর্শী, সুগায়ক ও সৰ্বগুণে অলঙ্কত ছিলেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলন। নগেন্দ্রবাবুর সহিত বন্ধুত্ব হইয়া ছিল বলিয়া হেমবাবু এই সময়ে ১১৬ মাধবনারায়ণ মাধবনারায়ণকে পিতার ন্যায় ভক্তি করিতেন এবং সময়ে সময়ে মামলা মােকদ্দমা-সংক্রান্ত পরামর্শ গ্রহণ করিতেন। হেমবাবু যতদিন কালীঘাটে ছিলেন, প্রায়ই মাধবনারায়ণ ও নগেন্দ্রনারায়ণকে নিমন্ত্রণ করিয়া নানাবিধ উপাদেয় সামগ্রী ভােজন করাইতেন। মাধবনারায়ণের নিকট তিনি ধর্মোপদেশও গ্রহণ করিতেন। মাধবনারায়ণের বাসা-বাটীর সংলগ্ন অন্য একটী মহলে তিনি বাস করিতেন। উভয় বাটীতে প্রবেশ করিবায় একটাই সিড়ি ছিল। কালীঘাটের নির্মল হালদার মহাশয় এই বাটীর মালিক ছিলেন। এই বাটী দুইখানিঅদ্যাপি কালীঘাটের রাস্তার উপর বর্তমান আছে। একজিবিশন শেষ হইলে মাধবনারায়ণ কলিকাতা-স্থিত আত্মীয় ও বন্ধুবর্গের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া রায়েরকাঠীতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। সেজ রাজা ও তদীয় ভ্রাতা ছােট রাজা বৈষয়িক কাৰ্য্য উপলক্ষে একবার জলাবাড়ী গিয়াছিলেন, তখন শ্ৰীযুক্ত কালিনাথ বিশ্বাস জীবিত ছিলেন না। তাঁহার মধ্যম ভ্রাতা শ্ৰীযুক্ত বৈকুণ্ঠনাথ বিশ্বাস এবং তাহার ভ্রতাগণ জীবিত ছিলেন; কিন্তু তাহাদের ষ্টেটের কর্তা তখন বৈকুণ্ঠ বাবুই ছিলেন। বৈকুণ্ঠ বাবু সেজরাজা ও ঘােটরাজার আগমন বার্তা শ্রবণ করিয়া ভ্রাতৃগণ সহ তাঁহাদের খালঘাট পর্যন্ত আসিয়া সেজরা ও ছােটরাজাকে নজর প্রদান করতঃ অভিবাদন করিলেন, বাদ্য বাজনা করিয়া তাহাদের বাটীতে লইয়া গেলেন এবং রাজসম্মান সহকারে ইহাদের সম্বর্ধনা ও ভােজনাদির প্রচুর আয়ােজন করিলেন। বৈকুণ্ঠ বাবু অতি বিনয়ী এবং বিলক্ষণ বৈষয়িক ক্ষমতাপন্ন জমিদার। বরিশাল জেলার মধ্যে তাহাদের সম্পত্তির আয় সমুদয় জমিদার ও তালুকদারের আয় অপেক্ষা অধিক। বৈকুণ্ঠ বাবুর পিতামহ প্রাণনারায়ণ ও প্রতাপনারায়ণ ;
মাধৰনারায়ণ ১১৭ বিশ্বাস সেজরাজা ও ছােটাজার বৃদ্ধপ্রপিতামহ জয়নারায়ণ ও প্রপিতামহ শিবনারায়ণের চাকুরী করিয়াই অনেক ভূসম্পত্তি লাভ করেন। সেই জন্যই ঐ বিশ্বাসবংশধরগণ অদ্যাপি রায়েরকাঠীস্থ রাজবংশের সকলকেই যথেষ্ট সম্মান করিয়া আসিতেছেন। বাবু, বৈকুণ্ঠনাথ বিশ্বাস সেজরাজার মধ্যমপুত্র নগেন্দ্রনারায়ণকে বিশেষ ভক্তি শ্রদ্ধা করিতেন। যখনই তাহার সহিত দেখা হইত বিনয় সহকারে নজর প্রদান করিতেন ও বলিতেন “আপনাদের আশীৰ্বাদই আমাদের ভাগ্যলক্ষ্মীর প্রধান কারণ। আমরা যখন আপনাদের সম্মান করিব না তখন আমাদের কিছুই থাকিবে না। আপনাদের পূর্বপূরুষের অনুগ্রহই আমাদের এই সকল উন্নতির মূলীভূত কারণ।” মাধবনারায়ণের জ্ঞাতি রাজা নরেন্দ্রনারায়ণের বংশধরগণ এই সময়ে ঘােরর আত্মকলহে প্রবৃত্ত হন। তাঁহারা খুলনা জেলার অন্তর্গত বনগ্রামে বাস করিতেছিলেন। বাগেরহাটের ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট রামচরণ দত্ত মহাশয় অনেক চেষ্টা করিয়াও এই বিবাদ মিটাইতে পারিলেন না। এই সময়েই মাধবনারায়ণের মহল চিংড়াখালি গ্রামের প্রজাদিগের একটী ফৌজদারী মােকদ্দমা হয়। রামচরণ বাবু তাহা- দিগকে বলেন,-তােমর একপক্ষ মাধবনারায়ণকে সাক্ষী মান্য কর। তাহারা তাহাই করিল এবং যথাসময়ে আদালতে হাজির হইবার জন্য মাধবনারায়ণের নিকট সাক্ষীর শমনও প্রেরিত হইল। মাধবনারায়ণ ‘শরীর অসুস্থ সুতরাং আদালতে হাজির হইতে পারিব না এই মর্মে এক দরখাস্ত পেশ করিলেন। কিন্তু তাহার দরখাস্ত অগ্রাহ্য হইল। মাধবনারায়ণ তখন বাধ্য হইয়া নৌকাযােগে বাগেরহাটে উপস্থিত হইলেন। ডেপুটী বাবুও তাহার আগমন-সমাচার পাইয়া নৌকায় যাইয়াই তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন এবং বলিলেন,-“আপনাকে ১১৮ মাধবনারায়ণ এখানে আনিয়া বড়ই কষ্ট দিয়াছি, এজন্য আমাকে ক্ষমা করিবেন। আপনার জ্ঞাতিগণ পরস্পর বিবাদ করিয়া ধ্বংশ প্রাপ্ত হইতে চলিয়াছেন, আপনি ব্যতীত তাহাদের বিবাদ অপর কেহ মিটাইতে পারিবে না।” বাস্তবিকই রামচরণ বাবুর মত বিচক্ষণ ডেপুটী অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। কেবল আইন অনুযায়ী বিচার করিয়া রায় লিখিলেই প্রকৃত বিচারক হওয়া যায় না, লােকের সহিত মিলামিশা করিয়া বিচাৰ্য বিষয়ের প্রকৃত তথ্য অবগত হওয়া বিচারকের পক্ষে অবশ্য প্রয়ােজনীয়। এই উপায়ে অনেক সময়ে অভিজ্ঞ বিচারকগণ সূক্ষ্ম বিচার করিতে সমর্থ হইয়া থাকেন। অনেক সময়ে দেখা যায়, বিচার লাভের জন্য মােকদ্দমায় প্রবৃত্ত হইয়া উভয় পক্ষই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। দুই পক্ষকে ধ্বংস পথে প্রেরণ করিবার সুযােগ দিলেই যে বিচারের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয় তাহা নহে; দুই পক্ষকে বজায় রাখিয়া যাহাতে বিচারকার্য্য নিষ্পন্ন হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখিয়া যিনি বিচার করিতে পারেন তিনিই প্রকৃত বিচারক। রামচরণ বাবুর হৃদয়ে প্রকৃত বিচারকের গুণাবলী বিদ্যমান ছিল। তিনি উভয় পক্ষকে ডাকাইয়া মাধবনারায়ণকে সালিশ মান্য করিতে বলিলেন। তাঁহারাও সানন্দ চিত্তে মাধবনারায়ণকে সালিশ মানিয়া লইলেন। রামচরণ বাবু আপন বাসায় মাধবনারায়ণকে নিমন্ত্রণ করিলেন। তাহার বাসায় অনেক উকীল, মােক্তার এবং মুন্সেফ প্রভৃতির সহিত মাধবনারায়ণের পরিচয় করাইয়া দিলেন। তাহারা সকলেই মাধব- নারায়ণের সহিত আলাপ করিয়া পরম প্রীত হইলেন। অতঃপর তিনি রামচরণ বাবুর নিকটে বিদায় গ্রহণ করিয়া রায়েরকাঠীতে ফিরিয়া আসিলেন। প্রত্যাবৃত্ত হইবার ৭৮ দিন পরেই বনগ্রামের জ্ঞাতিগণ উঁহাকে লইয়া যাইবার জন্য উপযুক্ত লােক পাঠাইলেন। তিনিও মাধবনারায়ণ ১১৯ তাহার সহিত বনগ্রামে উপস্থিত হইলেন। জ্ঞাতিগণ তাহার উপ- স্থিতিতে অতীব আনন্দিত হইলেন এবং সকলেই যথেষ্ট আদর অভ্যর্থনা করিলেন। প্রত্যেকেই পৰ্যায়ক্রমে তাহাকে নিমন্ত্রণ করিয়া ভূরি ভােজনে পরিতৃপ্ত করিলেন। মাধবনারায়ণ সবিশেষ দক্ষতার সহিত নিরপেক্ষ ভাবে তাহাদের বিবাদ মিটাইয়া দিলেন। তাহারা সকলেই তঁাহার ন্যায়পরায়ণতা ও পক্ষপাতপরিশূন্য বিচারবুদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করিলেন। সেজরাজা শ্রীযুক্ত হরচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয়ের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় অতি ধার্মিক এবং সত্যনিষ্ঠ লােক ছিলেন। তিনি চৈতন্যদেবের দীক্ষা-দাতা কেশব ভারতীর বংশধর। এই বংশের অবিলম্ব সরস্বতী সিদ্ধপুরুষ ছিলেন। ইহারা রায়েরকাঠীস্থ রাজ- বংশের দীক্ষা গুরু। শ্ৰীযুক্ত জগৎচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য সেজরাজার পুরােহিত ছিলেন। এই বংশের মহাত্মা রাজা জয়নারায়ণ তার-পাশা গ্রামে ইহাদের বাসস্থান নির্দিষ্ট করেন। ইহারা অদ্যাপি রাজপুরােহিত বলিয়া অভিহিত হইতেছেন। মাধবনারায়ণের প্রকৃতি গভীর এবং ধৈৰ্য্য ও সহিষ্ণুতা তাহার আজীবন সহচর ছিল। মহা বিপদে পতিত হইলেও তিনি ধৈৰ্য্যচ্যুত হইতেন না। বিপদ উপস্থিত হইলে যেন কিছুই ঘটে নাই এইভাবে কোন প্রকার চাঞ্চল্য প্রকাশ না করিয়াই তিনি নিজ কার্য সম্পন্ন করিয়া যাইতেন। তিনি প্রায়ই বলিতেন,‘যে বিপদের মধ্যে একটি রাত্রিও পাওয়া যায় সে বিপদকে বিপদ জ্ঞান করা যায় না, কারণ এক রাত্রিতে কি না ঘটিতে পারে। সুতরাং বিপদে অভিভূত হইয়া পড়া কাহারও উচিত নহে।' তিনি সদা প্রফুল্ল ছিলেন, কেহ কখনও তাহাকে বিষন্ন দেখে নাই। তিনি যেরূপ সুশ্রী ও বলিষ্ঠ ছিলেন, সেইরূপ সাহসীও ১২০ মাবধনারায়ণ ছিলেন। যৌবনে তিনি নিয়মিত ব্যায়াম করিতেন। মঙ্গ-ক্রিয়ায় এবং বন্দুক ও তীর চালনায় তিনি সবিশেষ অভ্যস্ত ছিলেন। গভীর বনে প্রবেশ করিয়া শিকার করিতে তিনি বড়ই ভাল বাসিতেন। তাহার শিকারে হত হরিণের শৃঙ্গ ও গণ্ডারের খর্গের কোষা কোশী অদ্যাপি তাহার বাটীতে বিদ্যমান আছে। ব্যা, মহিষ, হরিণ, কুম্ভীর প্রভৃতি তিনি যে কত শিকার করিয়াছিলেন তাহার সংখ্যা হয় না। ডাহুক, কোড়া, শিকরা ও তুরমতী প্রভৃতি পক্ষীর শিকার দেখিতে তিনি খুব ভাল বাসিতেন। অনেক লােক এই সকল পাখী লইয়া তাহার নিকটে আসিত এবং উহাদের শিকার দেখাইয়া তাহার আনন্দ বিধানের চেষ্টা করিত। তিনি শিকারী পাখীগুলির গুণানুসারে মালিকদিগকে পুরস্কার দিতেন। তিনি পাখীর লড়াই দেখিতে এবং পাখী ও জীবজন্তু পােষিতে বড়ই ভাল বাসিতেন। বুলবুল ও তিতুর পাখী পুষিয়া তিনি উহাদের লড়াই দেখিতেন। তাঁহার বাড়ীতে যে কাকাতুয়া, হিরামন, ভীমরাজ প্রভৃতি পক্ষী এবং পােষা কুকুর, হরিণ, খরগােস, গিনিপিগ প্রভৃতি ছিল, এই গুলিকে তিনি সবিশেষ যত্ন করিতেন। বাঙ্গলা ১২৯৩ সালে মাধবনারায়ণ মধুমেহ রােগাক্রান্ত হন। ভাক্তার ও কবিরাজগণের সুচিকিৎসায় তিনি প্রথমে অনেকটা সুস্থ হইয়া উঠিলেন বটে, কিন্তু সকলেই বলিতে লাগিলেন যে, এ রােগ একেবারে দূর হইবার নয়। এই কথা শুনিয়া তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন এবং তাহার জীবদ্দশাতেই পুত্র নগেন্দ্রনারায়ণের বিবাহ দিলেন। তিনি স্বয়ং এই বিবাহে কলিকাতায় উপস্থিত হইতে পারেন নাই। বিবাহের ভার তাহার শ্যালিকা হেমাঙ্গিনী ও শশুর মহাশয়ের উপরেই ন্যস্ত করিলেন এবং তাহাদের তত্ত্বাবধানেই শুভ বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছিল। এই শ্যালিকাই ঠঠনিয়ার হেরম্ব,দাস মহাশয়ের স্ত্রী শ্রীযুক্ত।
মাধবনারায়ণ * ১২৯৩ হেমাঙ্গিনী। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও কর্মকুশলা ছিলেন। মাধব- নারায়ণ বিবাহ অনুষ্ঠানে আভদয়িক কাৰ্য্য করিবার জন্য রায়েরকাঠী হইতে তাহার জ্ঞাতি-ভ্রাতা শ্রীযুক্ত যজ্ঞেশ্বর রায় চৌধুরীকে এবং দেওয়ান কাশীশ্বর সিংহরায়, পুরাতন বিশ্বাসী, ভৃত্য মহিমচন্দ্র ও পরিচারিকা মুক্তকেশীকে কলিকাতায় পাঠাইয়া ছিলেন। মহিমচন্দ্র ও মুক্তকেশী উভয়েই নগেন্দ্রনারায়ণকে প্রতিপালন করিয়াছিল। সালের শ্রাবণ মাসে ঠঠনিয়া-নিবাসী নির্দোষ মধ্যাংশ দ্বিতীয়ের পাে কুলীন পূর্ণচন্দ্র বসু মহাশয়ের মধ্যমা কন্যা শ্ৰীমতী বসন্তকুমারীর সহিত নগেন্দ্রনারায়ণের বিবাহকাৰ্য্য সম্পন্ন হয়। বন্ধু মহাশয় কন্যা ও জামাতাকে স্বর্ণ, রৌপ্য ও মুক্তার বহুবিধ অলঙ্কার, মূল্যবান বরজ্জা, বিস্তর তৈজস- পত্র প্রদান করিয়াছিলেন। বসন্তকুমারীর অন্য নাম ছিল মনােরমা। বিবাহের পর মাধনারায়ণের লােকজন ও শ্ৰীযুতা হেমাঙ্গিনী বর-বধূকে সঙ্গে লইয়া রায়েরকাঠীতে আগমন করিলেন। মাধব- নারায়ণ পুত্রবধূকে জোলাগাতি নামক তালুক হইতে ১০০ টাকা আয়ের সম্পত্তি ও ১খান মােহর যৌতুক স্বরূপ দান করেন । বসন্ত- কুমারী ॥ প্রথম যাত্রাতেই শ্রদ্ধা-ভক্তি ও সেবা-যত্ন দ্বারা শ্বশুর ও শশ্রু- * এতদ্ব্যতীত পদ্মমণি নামী পরিচারিকাও নগেন্দ্রনারায়ণ ও তদীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুরেন্দ্রনারায়ণকে প্রতিপালন করিয়াছিলেন। + পিতার মৃত্যুর পর শ্রীযুত নগেন্দ্রনারায়ণ ভ্রাতৃস্নেহ বশতঃ ঐ সম্পত্তি ভ্রাতাদিগের সহিত তুল্য ভাগে বিভক্ত করেন। * বসন্তকুমারীর মৃত্যুর পর তাঁহার স্বামী নগেন্দ্রনায়ায়ণ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হন্তে “বসন্তকুমারী চৌধুরাণী প্রাইজ” নামক এক পুরস্কার দানের ব্যবস্থা করিয়াছেন। বরিশাল জেলার ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে যে কেহ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সংস্কৃতে প্রথম স্থান অধিকার করিবে, সেই এই পুরস্কার প্রাপ্ত হইয়া থাকে। বসন্তকুমারী আদর্শচরিত্রা ছিলেন বলিয়া সিটিকলেজের প্রধান সংস্কৃতধ্যাপক পণ্ডিত উপেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ তাঁহার জীবন-চরিত রচনা করিয়াছেন।
১২২ মাধবনারায়ণ ঠাকুরাণীর স্নেহ ও প্রতি আকর্ষণে সমর্থ হইয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত। হেমাঙ্গিনী কিছুদিন রায়েরকাঠীতে অবস্থান করিয়া বসন্তকুমারী ও নগেন্দ্রনারায়ণের সহিত কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। শ্রাবণ মাস এইরূপে বিবাহ-ব্যাপারেই অতিবাহিত হইল। ভাদ্র- মাসে মাধবনারায়ণ বেশ সুস্থ হইয়া উঠিলেন। এই সময়ে কেহ তাহাকে দেখিয়া তাহার শরীরে কোনও রােগ আছে ইহা বলিতে পারিত না। কেওরা গ্রাম-নিবাসী বিখ্যাত ড ক্তার ও কবিরাজ শ্ৰীযুক্ত দুর্গাচরণ সেন কবীন্দ্র ও ঝাউকাঠি নিবাসী ডাক্তার ঐ যুক্ত কালীকান্ত সেন মহাশয়ের সুচিকিৎসাগুণে তিনি এইরূপ আরােগ্যলাভ করেন। ইহারা ব্যতীত তাহার গৃহ-চিকিৎসক রায়েরকাঠী-নিবাসী শ্ৰীযুক্ত উমেশচন্দ্র মিত্র মহাশয় প্রতিনিয়তই তাহাকে দেখা-শুনা করিতেন। ক্রমে ক্রমে আশ্বিন মাসে তিনি পূর্ণ সুস্থকায় ও বলিষ্ঠ হইলেন। এই সময়ে জৌশিকাঠি-নিবাসী প্রসিদ্ধ কবিরাজ শ্ৰীযুক্ত বৃন্দাবনচন্দ্র সেন কবিরত্ন মহাশয় মাধবনারায়ণকে দেখিয়া শুনিয়া বলেন, -“আমার বিবেচনায় এইরূপ আবােগ্য প্রকৃত আরােগ্য নহে। রােগ ভাল হইলে শরীর শুষ্ক হইত। ঔষধের গুণে কেবল বাহিরে বাহিরে শরীর ভাল দেখাইতেছে বটে; কিন্তু ভিতরে রােগের মূল এখনও রহিয়া গিয়াছে। উহা আবার দেখা দিতে পারে ; তবে ভগবান যদি দয়া করেন তাহা হইলে স্বস্ত্র কথা। বস্তুতঃ তঁাহার কথা ফলিয়া গেল। কোজাগর লক্ষ্মীপূজার পর রােগ আবার দেখা দিল। প্রথমে মাধবনারায়ণ সামান্যরূপ অসুস্থতা বােধ করিলেন; কিন্তু ১০/১৫ দিনের মধ্যেই রােগ উৎকট হইয়া দাঁড়াইল। প্রসিদ্ধ ডাক্তার কালীকান্ত সেন ও কবিরাজ দুর্গাচরণ সেন কবীন্দ্র মহাশয়কে আহ্বান •• মাধবনারায়ণ করা হইল। তিনি রােগীকে পরীক্ষা করিয়া বলিলেন,-“রােগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন, আশা-ভরসা বড় কম।” প্রসিদ্ধ কবিরাজ বৃন্দাবন সেন কবিরত্ন মহাশয়কেও আনয়ন করা হইল। তিনিও ঐ একই কথা বলিলেন। সকলে প্রাণপণ চেষ্টায় চিকিৎসা করিতে লাগিলেন। লক্ষণ কিছুই ভাল দেখা যাইল না। রােগ উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাইলে লাগিল। বিধাতার-বিধানে যে কালরোগ মাধবনারায়ণের শরীরে প্রবেশ করিয়া তাহাকে ইহলােক হইতে অপসারিত করিবে বলিয়া নির্ধারিত হইয়াছে, সে রােগের চিকিৎসা করিবে কে ? স্বয়ং ধন্বন্তরি আসিয়া চিকিৎসার ভার গ্রহণ করিলেও বিধাতার বিধান খণ্ডন করা অসম্ভব। পরপার হইতে মাধবনারায়ণের ডাক আসিয়াছিল। সে ডাক ব্যর্থ হইবার নয়। অথবা অমরধামের কোনও কার্যের জন্য মাধবনারায়ণের ন্যায় ন্যায়- পরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ, ধার্মিক ব্যক্তির প্রয়ােজন হইয়াছিল বলিয়া দেবতারা তাহাকে আহ্বান করিয়াছিলেন। দেবতাদের আহ্বান কি প্রত্যাখ্যাত হইতে পারে? কাজেই মানুষের চিকিৎসা ব্যর্থ হইল। অবশেষে ১২৯৩ সালের ১১ই অগ্রহায়ণ রাত্রি ১১ ঘটিকার সময়ে মাধবনারায়ণ পরিবারবর্গ, বন্ধুবান্ধব ও বরিশাল জেলার লােকদিগকে শােক-সাগরে নিমজ্জিত করিয়া ইহলােক পরিত্যাগ পূর্বক অমরধামে প্রস্থান করিলেন। যে দীপ্তিমান্ জ্যোতিষ্কের উজ্জ্বল দ্যুতিতে সমগ্র বরিশাল জেলা আলােকিত ছিল তাহা চিরকালের জন্য নির্বাণ প্রাপ্ত হইল। আবাল বৃদ্ধ বনিতা মাধবনারায়ণের পরলােক-গমনে প্রিয়-বিয়ােগ বেদনা অনুভব করিল এবং অশ্রুপাত করিতে লাগিল। এই শােক-সংবাদ বিদ্যুৎগতিতে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হইল। নরনারী-নির্বিশেষে দলে দলে লােক আসিয়া রায়েরকাঠীর রাজবাড়ীতে সমবেত হইতে লাগিল। সকলেই শ্মশানযাত্রার প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। তাঁহার শবাগমনে ১২৪ মাধবনারায়ণ যেরূপ বিপুল লােক-সমাগম হইয়াছিল তাহা এতদঞ্চলে অতি অল্পই দৃষ্ট হয়। এইরূপ পরােপকারী নিয়ত আশ্রিতবৎসল অতিথিসেবা-পরায়ণ মাধবনারায়ণের পরলােক-প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে দেশ হইতে সমুদায় সদাচার লােপ হইয়া গেল মনে করিয়া গ্রামস্থ, জেলাস্থ সকলে পরম বিষাদাপন্ন হইয়া হাহাকার করিতে লাগিলেন। এক মাস অতীত হইলে পর তাহার উপযুক্ত পুত্রগণ যথাবিধানে শ্রদ্ধকাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিলেন। শ্রাদ্ধে শালগ্রাম, ঘােড়া, পাল্কী নৌকা বিলক্ষণ দান যােড়শ, মসলন্দ, বৃষােৎসর্গ, তােরণকল্পবেদী প্রভৃতি কোন অনুষ্ঠানেরই ক্রুটা হয় নাই। নিমন্ত্রিত, অনিমন্ত্রিত, দূরদেশাগত লােকদিগকে ও গ্রামস্থ সকল শ্রেণীর লােককে ভূরিভােজনে পরিতৃপ্ত করা হইয়াছিল। * সম্পূর্ণ। * পূর্বে ব্রাহ্মণ ভােজনে দক্ষিণা দুই আনা কি চারি আনা ছিল। মাধবনারায়ণের পুত্রগণ এই প্রথম ॥• আনা ভােজন-দক্ষিণা দিলেন। এখন যাহার বড়রকম শ্রাদ্ধ করেন উহার ব্রাহ্মণজেনে।• আনা দক্ষিণা দিতেছেন।
উপসংহার। মাধবনারায়ণ তাহার মৃত্যু সন্নিকট জানিয়া মৃত্যুর ২৩ দিন পূর্বে একটী উইল করিয়া যান। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল যাহাতে এষ্টেটটা একত্র থাকে এবং পূজা প্রভৃতি ক্রিয়া-কৰ্ম্মগুলির সুচারুরূপে নিৰ্বাহ হয়। বিশেষতঃ দ্বিতীয় পক্ষের তিনটী পুত্ৰই তখন নাবালােক ছিল। তখন পর্যন্ত তাহাদের চূড়াকরণ বিবাহ ইত্যাদি কিছুই হয় নাই। মাধবনারায়ণ উইলে তাহার পত্নী শ্ৰীযুতা জগৎমােহিনী চৌধুরাণীকে তাহার জীবিতকাল পর্যন্ত এষ্টেটের একজিকিউটিক্স নিযুক্ত করেন। পুত্রগণ আবশ্যকীয় ব্যয় এবং বিবাহাদি কার্যের ব্যয় এষ্টেট হইতে পাইবেন; কিন্তু পুত্রগণ পৃথক্ অন্ন হইলে কেবলমাত্র চূড়াকরণ ও বিবাহের ব্যয় ও নির্দিষ্ট মাসহারা পাইবেন। মাধবনারায়ণের মৃত্যুর পর তদীয় জ্যেষ্ঠপুত্র, কর্মচারী ও কোন কোন আত্মীয়-স্বজনের প্ররােচনায়, উইল জাল বলিয়া মােকদ্দমা করেন। উইলে বিশিষ্ট ডাক্তার কবিরাজ এবং জ্ঞাতিগণ স্বাক্ষী ছিলেন বলিয়া বরিশাল জজকোর্টেই উইল সাব্যস্ত হইল। তবুও হাইকোর্ট পর্যন্ত মােকদ্দমা . চলিবাব বাধা হয় নাই। জেলাকোর্টের মােকদ্দমায় বরিশালের খ্যাত- নামা শ্রেষ্ঠ উকিল বাবু প্যারীলাল রায়, বাবু দীনবন্ধু সেন, মৌলৰী ওয়াজেদ মিঞা, রায় বাহাদুৰ দ্বারিকানাথ দত্ত প্রভৃতি উভয় পক্ষে নিযুক্ত ছিলেন। হাইকোর্টের মােকদ্দমায়ও বাবু শ্ৰনাথ দাস, বাবু রাসবিহারী ঘোষ প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ উকিলগণ উভয় পক্ষে নিযুক্ত হইয়া- ছিলেন। মােকদ্দমায় উইল প্রমাণিত হইল এবং জগৎমােহিনী মাধবনারায়ণ চৌধুরাণীর জিত হইল। ফৌজদারী ও অন্যান্য দেওয়ানী মােকদ্দমাও যথেষ্ট হইয়াছিল। লাঠীয়াল খরচাও কম হয় নাই। এই গৃহবিবাদ চারি বৎসর চলিয়াছিল। তাহাতে উভয় পক্ষের ৪০০০০ টাকার ক্ষতি হইয়াছিল। পিরােজপুর সভ ডিভিসনের খ্যাতনামা ডিপুটি বাবু শশীশেখর দত্ত এবং ধাৰ্মিকাগ্রগণ্য উকিল বাবু দীননাথ দাস রায়েরকাঠী আসিয়া প্রথমে ইহাদিগের মীমাংসার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছিলেন। তখন কিছুতেই কিছু হইল না। গ্রামস্থ মাধবনারায়ণের প্রিয় সুহৃদ্ ও জ্ঞাতি শ্ৰীযুক্ত অদ্বৈত নারায়ণ রায় চৌধুরী এবং ষষ্টিবর মিত্র মহাশয়ও মীমাংসার জন্য অনেক চেষ্টা করিয়াছিলেন। তাহাতেও মীমাংসা হইল না। জ্যেষ্ঠপুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণ অতি সরলবিশ্বাসী লােক, পরে দুষ্ট লােকের চক্রান্ত বুঝিলেন এবং মীমাংসার জন্য উদ্যােগী হইলেন। মাধৰ- নারায়ণের মধ্যম পুত্র নগেন্দ্রনারায়ণ ও বরিশালের খ্যাতনামা উকিল মৌলবি ওয়াজেদ মিঞার একান্ত চেষ্টা ও পরিশ্রমে ১২৯৭ সালের ৭ই আষাঢ় গিরীন্দ্র নারায়ণের সহিত সম্পত্তি বিভাগ হইয়া মীমাংসা হইয়া গেল। এই বিবাদ উপলক্ষে কোন কোন কর্মচারী বিশ্বাসঘাতকতার যথেষ্ট পরিচয় দিয়াছিল। প্ৰজাদিগেরও অনেকে একপক্ষ ছাড়িয়া অপর পক্ষে এবং অপর পক্ষ ছাড়িয়া অন্য পক্ষে যােগদান করিত। গিরীন্দ্রনারায়ণকে সম্পত্তি বিভাগ করিয়া দেওয়ার পর ১৩১৪ সাল পৰ্য্যন্ত শ্ৰীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী তাহার গর্ভজাত চারিপুত্র নগেন্দ্র- নারায়ণ, যতীন্দ্রনারায়ণ, জীবেন্দ্রনারায়ণ এবং সুরেন্দ্রনারায়ণের পক্ষে একজীকিউটিকস ছিলেন। শ্রীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী এজি- কিউটিক্স থাকিবার সময় তদীয় জ্যেষ্ঠপুত্র নগেন্দ্রনারায়ণ এষ্টেটের কাৰ্য্য সম্পন্ন করিতেন। গিরীন্দ্রনারায়ণের সহিত বিভাগ সময়ে ষ্টেটে ২০০ ০০ মাধবনারায়ণের স্ত্রী শ্ৰীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী ৬২ বৎসর বয়ঃক্রমের প্রতিমূর্তি।
No text on this page.
মাধবনারায়ণ • টাকার দেনা ছিল। মাধবনারায়ণের মৃত্যুর সময় প্রায় ১২০০০ টাকা ঋণ রাখিয়! যান। তৎপর এই বিবাদে ঋণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাইয়াছিল। গিরীন্দ্রনারায়ণ তঁাহার অংশের দেনার দরুণ কতেক সম্পত্তি ভাতাদিগকে ভাতাদিগকে ছাড়িয়া দিয়া নিৰ্দাইক ছাড়িয়া দিয়া নিৰ্দাইক অবস্থায় বাকি সম্পত্তি গ্রহণ করেন। নগেন্দ্রনারায়ণ এই গুরুতর দেনা সত্ত্বেও বাৎসরিক ২০০০ টাকা আয়ের সম্পত্তি বৃদ্ধি করিয়াছিলেন এবং দেনাও প্রায় অনেক পরিশােধ করিয়াছিলেন। পিতার নামে কোন দেনা রাখিলেন না, সকল দেনা নিজেদের নামে করিয়া লইলেন। ভ্রাতাগণ বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছে দেখিয়া নগেন্দ্রনারায়ণ ভ্রাতাদিগের চূড়াকরণ প্রভৃতি কাৰ্য্য সম্পাদন করেন এবং বনগ্রাম নিবাসী কোমল মুখ্য কুলীন বাবু সত্যচরণ বসু মহাশয়ের দ্বিতীয় কন্যা শ্ৰীমতী পঙ্কজিনী চৌধুরাণীর সহিত যতীন্দ্রনারায়ণের, রায়েরকাঠী নিবাসী কোমল মুখ্য কুলীন চন্দ্রকান্ত বসুর কন্যা অক্ষয়কুমারীর সহিত জীবেন্দ্রনারায়ণের এবং বাঘুটিয়া গ্রাম নিবাসী সহজ মুখ্যাগ্রগণ্য রাজেন্দ্রকুমার ঘােষের কন্যা হেমবালার সহিত সুরেন্দ্রনারায়ণের শুভ বিবাহকার্য সম্পন্ন করাইলেন। এই সকল বিবাহ উপলক্ষে ভােজনাদিতে অনেক টাকা ব্যয় করিয়াছিলেন। শ্ৰীযুতা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী রায়েরকাঠী থাকিতে যে সকল ব্ৰত উদ্যাপন করিয়াছেন তন্মমধ্যে ধর্মঘটের ব্রতই উল্লেখযােগ্য। ঐ ব্রতােপলক্ষে গ্রামস্থ সমুদয় ব্রাহ্মণ, দেশের দক্ষিণ রাঢ়ীয় সমাজস্থ সকল এবং ভিন্ন শ্রেণীস্থ অনেক লােককে পরিতােষপূৰ্ব্বক ভােজন করাইয়াছিলেন। দেশস্থ প্রত্যেক ব্রাহ্মণ ঘরে ১টা করিয়া পিত্তলের কলসী প্রদান করেন। ইহা ব্যতীত আরও অনেক ব্রাহ্মণকে অনেক পিতলের কলসী প্রদান করিয়াছিলেন। তরুণ-কল্প বেদী করিয়া প্রতিষ্ঠা কাৰ্য্য সমাপন করেন। ইহাতে অনেক টাকা ব্যয় হইয়াছিল। ০ মাধবনারায়ণ মাধবনারায়ণের মৃত্যুর সময় নগেন্দ্রনারায়ণের বয়স ১৯ বৎসর পূর্ণ হয় নাই। এই অল্প বয়সে তাঁহার সৰ্বগুণালঙ্কত পিতার মৃত্যুতে নগেন্দ্রনারায়ণ বড়ই কাতর হইয়া পড়িলেন। এ দিকে ভ্রাতাগণও তখন পৰ্যন্ত নাবালক। তাহাতে আবার ভয়ঙ্কর গৃহ বিবাদ ও জ্ঞাতি- বিরােধ। ইহার উপর এষ্টেটা দেনায় জড়িত। এই অবস্থায় এষ্টেট রক্ষার জন্য তাঁহাকে অমানুষিক পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল। ক্রমিক নগেন্দ্রনারায়ণের শরীর ভগ্ন হইল ও দেহ রােগাক্রান্ত হইল। তাহার কোন সন্তান ছিল না। তিনি মনে করিয়াছিলেন ভ্রাতারা কার্যক্ষম হইলে তাহাদের প্রতি সম্পত্তির-পৰ্যবেক্ষণের ভারাৰ্পণ করিয়া তীর্থাদি পরিভ্রমণ করিবেন ও নিজ চিকিৎসা করাইবেন। এক্ষণে ভাতাদিগকে উপযুক্ত দেখিয়া তিনি ভ্রাতাদিগের মধ্যে জীবেন্দ্রনারায়ণকে বৈষয়িক কাৰ্য্যক্ষম জানিয়া তাহার প্রতি সম্পত্তি পৰ্যক্ষেণের ভার প্রদান করেন। অবশ্য ইহাতে তাহাদের মাতা ও ভ্রাতা যতীন্দ্রনারায়ণের সম্পূর্ণ মত ছিল। সন ১৩১২ সালে তিনি কলকাতায় চলি। আসেন এবং তথায় থাকিয়া নিজ চিকিৎসা করাইতে আরম্ভ করেন ও মধ্যে মধ্যে তীর্থাদি পরিভ্রমণ করিতেন। মানুষ আশা করিতে পারে মাত্র, পূর্ণ করিবার কৰ্ত্তা এক ভগবান। নগেন্দ্রনারায়ণের আশা পূর্ণ হইল না। ক্রমে তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ও অন্যান্য ভাতাদিগের মধ্যে পরস্পর বিশেষ মনোমালিন্য উপস্থিত হইল। তাহা শুনিয়া তিনি বাটী আসিলেন এবং ভ্রাতাদিগের মধ্যে যাহাতে পরস্পর সৌহার্দ থাকে তাহার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিলেন। এমন কি মাতামহ শ্ৰীযুক্ত কালীকৃষ্ণ ঘােষ মহাশয়ের দ্বারা পত্র লেখাইয়া ইহাদিগকে কলিকাতায় আনাইলেন এবং মীমাংসার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। একবার মীমাংসা হয় আবার বিবাদ বৃদ্ধি পায়। অবশেষে তিনি অনন্যোপায়
এযুক্ত নগেন্দ্রনারায়ণ ও তাহার পারিষদ বর্গ ।
৫০ বৎসর বয়ঃক্রমের প্রতিমূর্তি।
শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্রনারায়ণ।
৪৮ বৎসর বয়ঃক্রমের প্রতিমূর্তি।
No text on this page.
মাধবনারায়ণ হইয়া সম্পত্তি-বিভাগের প্রস্তাব করেন অনেক কষ্টে ও পরিশ্রমে সম্পত্তি-বিভাগ হইল। ইহাতেও আত্মীয় জনগ্ন কেহ কেহ ক্ষতি করিতে পরান্মুখ হন নাই। ইহাতে তাঁহাদের ১৮ হাজার টাকার ক্ষতি হইয়াছিল। ইহাদের মাতা শ্রীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী জিলার জজ সাহেবের অনুমতি লইয়া একজিকিউটিক্সের পদ পরিত্যাগ করিলেন এবং পুত্রদিগকে বিষয় সম্পত্তি এবং অস্থাবর জিনিষ পত্র সমুদয় বিভাগ করিয়া দিয়া ১৩১৪ সালের কার্তিক মাসে কলিকাতায় আসিলেন। তদবধি তিনি কখনও নগেন্দ্রনারায়ণের সমভিব্যাহারে কখনও বা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে নানা তীর্থ পরিভ্রমণ করিতেছেন। সেই সময় হইতে অদ্য পর্যন্ত তিনি আর কখনও রায়েরকাঠীতে প্রত্যাবর্তন করেন নাই। শ্ৰীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী রায়েরকাঠীতে বাসকালে গঙ্গাসাগর ও ব্রহ্মপুত্র স্নানে গিয়াছিলেন। তখন ঢাকায় ঢাকেশ্বরী দর্শন করিয়া- ছিলেন। নগেন্দ্রনারায়ণ মাতাকে তাঁহার ভ্রাতা জীবেন্দ্র নারায়ণ, পুরােহিত, কর্মচারী ও চাকর প্রভৃতিকে সঙ্গে দিয়া ঐ দুই তীর্থে পাঠাইয়াছিলেন। জগৎমােহিনী বাটী হইতে চলিয়া আসিবার পর হইতে চন্দ্রনাথ, কামো, কাশী, অযােধ্যা, বিন্ধ্যাচল,জয়পুর, বৃন্দাবন, মথুরা, কখল এবং কুম্ভমেলা উপলক্ষে হরিদ্বার ও প্রয়াগ প্রভৃতি মনুষ্যগম্য নানা তীর্থাদি পরিভ্রমণ করিয়াছেন ও এখনও করিতেছেন এবং তীর্থাদির শাস্ত্র-বিহিত-কাৰ্য্য সকল সমাপন করিয়াছেন। কলিকাতায় আসিয়া তিনি দুইটী ব্রত উদযাপন করিয়াছেন। তাহাতেও ব্রাহ্মণ, আত্মীয়-স্বজন প্রভৃতিকে তৃপ্তি সহকারে ভােজন করাইয়াছেন। তাহার বয়ঃক্রম এখন ৮০ বৎসর। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, তিনি রায়েরকাঠী হইতে চলিয়া আসিবার পর ক্রমিক তাহার তৃতীয়, চতুর্থ ও দ্বিতীয় পুত্র[অকালে loo মাধবনারায়ণ এমন কি কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন। এখন তাহাদের পুত্র সকল বর্তমান আছেন। শ্ৰীযুক্তা জগৎমােহিনী চৌধুরাণী নিতান্ত ধর্মপ্রাণ ও সঞ্চয়- বুদ্ধিশালিনী। সংসারের কুটিলতা তিনি কিছুই বুঝেন না। চাটুকারের তােষামদ-বাক্যে ভুলিয়া কখনও বিশ্বাসীকে অবিশ্বাস করেন এবং অবিশ্বাসীকে বিশ্বাস করেন। ইহাতে তাহার প্রভূত অর্থও নষ্ট হইয়াছে। মাধবনারায়ণের জ্যেষ্ঠপুত্র গিরীন্দ্রনারায়ণ ও মধ্যমপুত্র নগেন্দ্রনারায়ণ এক্ষণে জীবিত আছেন। গিরীন্দ্রনারায়ণের তন্ত্র-শাস্ত্রে বিলক্ষণ অধিকার আছে। নগেন্দ্রনারায়ণ একজন ক্ষমতাশালী ও জনপ্রিয় জমিদার । তিনি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে কখনও পরাজুখ হন নাই। ১৩২৫ সালে তাঁহার পত্নী-বিয়ােগ হয় ; তদবধি তিনি বিষয়-কাৰ্য্য হইতে এক প্রকার অবসর হইতে ছিলেন। এক্ষণে একবারে অবসর গ্রহণ করিয়াছেন এবং রায়েরকাঠী-বাসও একপ্রকার ত্যাগ করিয়া অবশিষ্ট জীবন শান্তিতে যাপনের বাসনায় নানা তীর্থাদি পরিভ্রমণ করিতেছেন এবং সর্বদা সদনুষ্ঠানে ব্রতী হইয়াছেন। । সম্পূর্ণ
No text on this page.
No text on this page.