Dipsikha Library, Howrah

Malancha Ed.1

Tagore, Rabindranath · 2010/04/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

৭। B.
4
1R
৪ •14
Dist. HOWRAH.
মাল
আত-খেবরে সে; : ২০
&},
/
y,

No text on this page.

মাল
রবীন্দ্রনাথপর
টি
शान्तिानकर
বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়
২১ নং কর্ণওয়াসি ফুট, কলিকাতা

•••••••••••এ।
কিভারতী গ্রন্থালয়
ওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা
কি কিশােরীমােহন সাতরা
.
মালঞ্চ
DIPSIKHA LIBRARY
প্রথম সংস্করণ (২১০) চৈত্র, ১৩৪০ সাল।
.
মূল্য=১০
• শান্তিনিকেতন প্রেস। শান্তিনিকেতন, ( বীরভূম)।
প্রভাতকুমার মুখােপাধ্যয় কর্তৃক মুদ্রিত।

মাল
DIPSIKHA LIBRARY.-.
1
Acc No.
20. 10, 3
পিঠের দিকে বালিশগুলো উচু করা। নীরজা
আধ-শােওয়া পড়ে আছে রােগশয্যায়। পায়ের
উপরে সাদা রেশমের চাদর টানা, যেন তৃতীয়ার ফিকে
জ্যোৎস্না হালকা মেঘের তলায়। ফ্যাকাসে তার শখের
মতাে রং, ঢিলে হয়ে পড়েছে চুড়ি, রােগা হাতে নীল
শিরার রেখা, ঘনপষ্ম চোখের পল্লবে লেগেছে রােগের
কালিমা।
মেঝে সাদা মার্বেলে বাঁধানাে, দেয়ালে রামকৃষ্ণ
পরমহংসদেবের ছবি, ঘরে পালঙ্ক, একটি টিপাই, দুটি
বেতের মােড়া আর এক কোণে কাপড় ঝােলাবার
আলনা ছাড়া অন্য কোনাে আসবাব নেই ; এক গেণে

২ মালঞ্চ পিতলের কলসীতে রজনীগন্ধার গুচ্ছ, তারি মৃদু গন্ধ বাঁধা পড়েছে ঘরের বদ্ধ হাওয়ায়। পূবদিকে জানলা খােলা। দেখা যায় নীচের বাগানে অরকিডের ঘর, ছিটে বেড়ায় তৈরী ; বেড়ার গায়ে গায়ে অপরাজিতার লত। অদূরে ঝিলের ধারে পাম্প, চলছে, জল কুলকুল করে বয়ে যায় নালায় নালায়, ফুলগাছের কেয়ারির ধারে ধারে। গন্ধনিবিড়, আমবাগানে কোকিল ডাক্‌ছে যেন মরিয়া হয়ে। বাগানের দেউড়িতে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজল বেলা দুপুরের। ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্রের সঙ্গে তার সুরের মিল। তিনটে পর্যন্ত মালীদের ছুটি। ঐ ঘণ্টার শব্দে নীরজার বুকের ভিতরটা ব্যথিয়ে উঠল, উদাস হয়ে গেল তার আয়া এল দরজা বন্ধ করতে। নীরু বলে, না থাক্। চেয়ে রইল যেখানে ছড়াছড়ি যাচ্চে রৌদ্র- ছায়া গাছগুলাের তলায় তলায়। ফুলের ব্যবসায়ে নাম করেছে তার স্বামী আদিত্য। বিবাহের পরদিন থেকে নীরজার ভালােবাসা আর তার স্বামীর ভালােবাসা নানা ধারায় এসে মিলেছে এই বাগানের নানা সেবায় নানা কাজে। এখানকার ফুলে পল্লবে দুজনের সম্মিলিত আনন্দ নব নব রূপ নিয়েছে মন।

মালঞ্চ নব নব সৌন্দর্য্যে। বিশেষ বিশেষ ডাক আসবার দিনে বন্ধুদের কাছ থেকে প্রবাসী যেমন অপেক্ষা করে চিঠির, ঋতুতে ঋতুতে তেমনি ওরা অপেক্ষা কবেছে ভিন্ন ভিন্ন গাছের পুঞ্জিত অভ্যর্থনার জন্যে। আজ কেবল নীরজাব মনে পড়ছে সেই দিনকার ছবি। বেশি দিনের কথা নয়, তবু মনে হয় যেন একটা তেপান্তবের মাঠ পেরিয়ে যুগান্তরের ইতিহাস। বাগানের পশ্চিমধারে প্রাচীন মহানিম গাছ। তারি জুড়ি আবাে একটা নিম গাছ ছিল ; সেটা কবে জীর্ণ হয়ে পড়ে গেছে ; তারি গুড়িটাকে সমান করে কেটে নিয়ে বানিয়েছে একটা ছােটো টেবিল। সেইখানেই ভােব বেলায় চা খেয়ে নিত দু’জনে, গাছের ফাঁকে ফাকে সবুজ ডালে-ছাঁকা রৌদ্র এসে পড়ত পায়ের কাছে ; শালিখ কাঠবিড়ালি হাজির হােতো প্রসাদপ্রার্থী। তার পবে দোহে মিলে চলত বাগানের নানা কাজ। নীরজার মাথার উপরে একটা ফুলকাটা বেশমের ছাতি, আর আদিত্যর মাথায় সােলাব টুপি, কোমরে ডাল- ছাঁটা কঁচি। বন্ধুবান্ধবরা দেখা করতে এলে বাগানের কাজের সঙ্গে মিলিত হােত লৌকিকতা। বন্ধুদের মুখে প্রায় শােনা যেত,—“সত্যি বলছি, ভাই, তােমার ৪ মাঞ্চ ; ডালিয়া দেখে হিংসে হয়।” কেউবা আনাড়ির মতাে জিজ্ঞাসা করেছে, “ওগুলাে কি সূর্যমুখী ?”—নীরজা ভারি খুসী হয়ে হেসে উত্তর করেছে, “না, না, ওতে গাঁদা।” একজন বিষয়বুদ্ধি-প্রবীণ একদা বলেছিল— “এত বড়াে মােতিয়া বেল কেমন করে জন্মালেন, নীরজা দেবী? আপনার হাতে জাদু আছে। এ যেন টগর।” সমজুদারের পুরস্কার মিল ; হল। মালীর ভ্রুকুটি উৎপাদন করে পাঁচটা টবসুদ্ধ সে নিয়ে গেছে বেলফুলের গাছ। কতদিন মুগ্ধ বন্ধুদের নিয়ে চলত কুঞ্জপরিক্রম, ফুলের বাগান, ফলের বাগান, সবজির বাগানে। বিদায়- কালে নীরজা ঝুড়িতে ভরে দিত গােলাপ, ম্যাগনােলিয়া, কানেশন,—তার সঙ্গে পেঁপে, কাগজি লেবু, কয়েৎ- বেল, ওদের বাগানের ডাকসাইটে কয়েৎবেল। যথাঋতুতে সব শেষে আস্ত ডাবের জল। তৃষিতেরা বলত, “কী মিষ্টি জল !” উত্তরে শুত, “আমার বাগানের গাছের ডাব।” সবাই বলত, “ওঃ, তাইতাে বলি !” সেই তােরবেলাকার গাছতলায় দার্জিলিং চায়ের বাষ্পে মেশা নানা ঋতুর গন্ধস্মৃতি দীর্ঘ নিশ্বাসের সঙ্গে মিলে হায় হায় করে ওর মনে। সেই সােনার রঙে

মালঞ্চ
:
রঙীন দিনগুলােকে ছিড়ে ফিরিয়ে আনতে চায় কোন্
দসু্যর কাছ থেকে। বিদ্রোহী মন কাউকে সামনে
পায় না কেন? ভালােমানুষের মতো মাথা হেঁট করে
ভাগ্যকে মেনে নেবার মেয়ে নয় ও তে। এর জন্যে
কে দায়ী? কোন্ বিশ্বব্যাপী ছেলেমানুষ ।
কোন
বিরাট পাগল!
এমন সম্পূর্ণ সৃষ্টিটাকে এতবড়াে
নিরর্থকভাবে উলটপালট করে দিতে পারূলে কে !
বিবাহের পর দশটা বছর একটানা চলে গেল
অবিমিশ্র মুখে।
মনে মনে ঈর্ষা করেছে সখীরা ;
মনে করেছে ওর যা বাজারদর তার চেয়ে ও অনেক
বেশি পেয়েছে।
পুরুষ বন্ধুরা আদিত্যকে বলেছে,
“লাকি ভগ,।”
নীরজার সংসার-সুখের পালের নৌকো প্রথম যে
ব্যাপার নিয়ে ধস্ করে একদিন তলায় ঠেল সে ওদের
“গুলি” কুকুর-ঘটিত। গৃহিণী এ সংসারে আসবার
পূৰ্বেই ডলিই ছিল স্বামীর একলা ঘরের সঙ্গিনী।
অবশেষে তার নিষ্ঠা বিভক্ত হােলাে দম্পতির মধ্যে।
ভাগে বেশি পড়েছিল নীরজার দিকেই। দরজার কাছে
সতে দেখলেই কুকুরটার মন যেত বিড়িয়ে।
ঘন ঘন ল্যাজ আন্দোলনে আসন্ন রথযাত্রার বিরুদ্ধে
গাড়ি

৬ মালঞ্চ আপত্তি উত্থাপন কত। অনিমন্ত্রণে গাড়ির মধ্যে লাফিয়ে ওঠবার দুঃসাহস নিরস্ত হােতো স্বামীর তর্জনী সঙ্কেতে। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ল্যাজের কুণ্ডলীর মধ্যে নৈরাশ্যকে বেষ্টিত করে দ্বারের কাছে পড়ে থাকত। ওদের ফেরবার দেরি হােলে মুখ তুলে বাতাস ঘ্রাণ করে করে ঘুরে বেড়াত, কুকুরের অব্যক্ত ভাষায় আকাশে উচ্ছসিত কত করুণ প্রশ্ন। অবশেষে এই কুকুরকে হঠাৎ কী রােগে ধরলে, শেষ পর্যন্ত ওদের মুখের দিকে কাতর দৃষ্টি স্তব্ধ রেখে নীরজার কোলে মাথা দিয়ে মারা গেল। নীরজার ভালােবাসার ছিল প্রচণ্ড জেদ। সেই ভালােবাসার বিরুদ্ধে বিধাতারও হস্তক্ষেপ তার কল্পনার অতীত। এতদিন অনুকূল সংসারকে সে নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করেছে। আজ পর্যন্ত বিশ্বাস নড়বার কারণ ঘটেনি। কিন্তু আজ ডলির পক্ষেও যখন মরা অভাবনীয়রূপে সম্ভবপর হােলাে তখন ওর ওর দুর্গের প্রাচীরে প্রথম ছিদ্র দেখা দিল। মনে হােললা এটা অলক্ষণের প্রথম প্রবেশ দ্বার। মনে হােললা বিশ্ব- সংসারের কর্মকর্তা অব্যবস্থিতচিত্ত,—তার আপাত- প্রত্যক্ষ প্রসাদের উপরেও আর আস্থা রাখা চলে না।

মালঞ্চ ৭ নীরজার সন্তান হবার আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছিল। ওদের আশ্রিত গণেশের ছেলেটাকে নিয়ে যখন নীরজার প্রতিহত স্নেহবৃত্তির প্রবল আলােড়ন চলেছে, আর ছেলেটা যখন তার অশান্ত অভিঘাত আর সইতে পারছে না এমন সময় ঘল সন্তান- সম্ভাবনা। ভিতরে ভিতরে মাতৃহৃদয় উঠল ভরে, ভাবীকালের দিগন্ত উঠল নবজীবনের প্রভাত-আভায় রক্তিম হয়ে, গাছের তলায় বসে বসে আগন্তুকের জন্যে নানা অলঙ্করণে নীরজা লাগল সেলাইয়ের কাজে। অবশেষে এল প্রসবের সময়। পাকূলে আসন্ন সঙ্কট। আদিত্য এত বেশি অস্থির হয়ে পড়ল যে ডাক্তার ভৎসনা করে তাকে দূরে ঠেকিয়ে রাখলে। অস্ত্রাঘাত করতে হােলো, শিশুকে মেরে জননীকে বাঁচালে । তারপর থেকে নীরজা আর উঠতে পারলে না। বালুশয্যাশায়িনী বৈশাখের নদীর মতাে তার স্বল্পরক্ত দেহ ক্লান্ত হয়ে রইল পড়ে। প্রাণশক্তির অজস্রতা একেবারেই হােলাে নিঃস্ব। বিছানার সামনে জানলা খােলা, তপ্ত হাওয়ায় আছে মুচুকুন্দ ফুলের গন্ধ, কখনো বাতাবীফুলের নিঃশ্বাস, ধাত্রী বুঝতে

৮
মালঞ্চ
যেন তার সেই পূৰ্ব্বকালের দূরবর্তী বসন্তের দিন
মৃদুকণ্ঠে তাকে জিজ্ঞাসা করছে, “কেমন আছ ?”
সকলের চেয়ে তাকে বাজল যখন দেখুলে বাগানের
কাজে সহযােগিতার জন্যে আদিত্যের দূর সম্পর্কীয়
বােন সরলাকে আনতে হয়েছে। খােল জানলা থেকে
যখনি সে দেখে অভ্র ও রেশমের কাজ-করা একটা
টোকা মাথায় সরলা বাগানের মালীদের খাটিয়ে
বেড়াচ্ছে তখন নিজের অকর্মণ্য হাত-পা-গুলােকে সহ্য
করতে পারত না। অথচ সুস্থ অবস্থায় এই সরলাকেই
প্রত্যেক ঋতুতে নিমন্ত্রণ করে পাঠিয়েছে
নতুন
চারারােপণের উৎসবে।
ভােরবেলা থেকে
চত। তারপরে ঝিলে সাঁতার কেটে স্নান, তারপরে
গাছের তলায় কলাপাতায় খাওয়া,
একটা
এ্যামােফোনে বাজত দিশি বিদিশি সঙ্গীত। মালীদের
জুটত দই চিড়ে সন্দেশ। তেঁতুলতলা থেকে তাদের
কলরব শােনা
ক্রমে বেলা আর্ত নেমে,
ঝিলের জল উঠত অপরাহ্রে বাতাসে শিউরিয়ে, পাখী
ডাকৃত বকুলের ডালে, আনন্দময় ক্লান্তিতে হােতো
দিনের অবসান।
ওর মনের মধ্যে যে-রস ছিল নিছক মিষ্ট, আজ

পাতা মুড়িনে না।
মালঞ্চ
থ
কেন সে হয়ে গেল কটু ; যেমন আজকালকার দুর্বল
শরীরটা ওর অপরিচিত, তেমনি এখনকার তীব্র নীরস
স্বভাবটাও ওর চেনা স্বভাব নয়। সে-স্বভাবে কোনো
দাক্ষিণ্য নেই। এক একবার এই দারিদ্র্য ওর কাছে
স্পষ্ট হয়ে ওঠে, লজ্জা জাগে মনে, তবু কোনােমতে
সামলাতে পারে না। ভয় হয়, আদিত্যের কাছে এই
হীনতা
ধরা পড়ছে বুঝি, কোন্‌দিন হয় তাে সে
প্রত্যক্ষ দেখবে নীরজার
আজকালকার মনখানা
বাদুড়ের চথুক্ষত ফলের মতাে, ভদ্র-প্রয়ােজনের
অযোগ্য।
বাজল দুপুরের ঘণ্টা। মালীরা গেল চলে। সমস্ত
বাগানটা নির্জন। নীরজা
নীরজা দূরের দিকে তাকিয়ে রইল,
যেখানে দুরাশার মরীচিকাও আভাস দেয় না, যেখানে
ছায়াহীন রৌদ্রে শূন্যতার পরে শূন্যতার অনুবৃত্তি।

১০
মালঞ্চ
যেন
নীরজা ডাল, “রােশনি”।
আয়া এল ঘরে। প্রৌঢ়া, কঁচা পাকা চুল, শক্ত
হাতে মােটা পিতলের কঙ্কণ, ঘাঘরার উপরে ওড়না।
মাংসবিরল দেহের ভঙ্গীতে ও শুষ্ক মুখের ভাবে একটা
চিরস্থায়ী কঠিনতা।
আদালতে এদের
সংসারের প্রতিকূলে ও রায় দিতে বসেছে। মানুষ
করেছে নীরজাকে, সমস্ত দরদ তার পরেই। তার
কাছাকাছি যারা যায় আসে, এমন কি, নীরজার স্বামী
পৰ্যন্ত, তাদের সকলেরই সম্বন্ধে ওর একটা সতর্ক
বিরুদ্ধতা।
এসে জিজ্ঞাসা করলে, “জল এনে দেব
খোঁখী।”
“না, বােস্।” মেঝের উপর হাঁটু উচু করে বল
ঘরে
নীরজার দরকার কথা কওয়া, তাই আয়াকে চাই।
আয় ওর স্বগত উক্তির বাহন।

মালঞ্চ ১১ নীরজা বললে, “আজ ভােরবেলায় দরজা খােলার শব্দ শুলুম।” আয়া কিছু বললে না, কিন্তু তার বিরক্ত মুখভাবের অর্থ এই যে, “কবে না শােনা যায় !” নীরজা অনাবশ্যক প্রশ্ন কল, “সরলাকে নিয়ে বুঝি বাগানে গিয়েছিলেন।” কথাটা নিশ্চিত জানা, তবু রােজই একই প্রশ্ন। একবার হাত উটিয়ে মুখ বাঁকিয়ে আয় চুপ করে বসে রইল। নীরজা বাইরের দিকে চেয়ে আপন মনে বলতে লাগল, “আমাকেও ভােরে জাগাতেন, আমিও যেতুম বাগানের কাজে, ঠিক ঐ সময়েই। সে তো বেশিদিনের কথা নয়।” এই আলােচনায় যােগ দেওয়া কেউ তার কাছে আশা করে না, তবু আয়া থাকতে পারলে না। বললে, “ওঁকে না নিলে বাগান বুঝি যেত শুকিয়ে।” নীরজা আপন মনে বলে চলল,-“নিয়ুমার্কেটে ভােরবেলাকার ফুলের চালান না পাঠিয়ে আমার এক- দিনও কাত না। সেই রকম ফুলের চালান আজও গিয়েছিল, গাড়ির শব্দ শুনেছি। আজকাল চালান কে দেখে দেয় রােশ, নি।”

১২
মালঞ্চ
এই জানাকথার কোনাে উত্তর কল না আয়া,
ঠোট চেপে রইল বসে।
নীরজা আমাকে বললে “আর যাই হােক, আমি
যতদিন ছিলুম, মালীর ফঁাকি দিতে পারেনি।”
আয় উঠল গুরিয়ে, বললে, “সেদিন নেই, এখন
লুঠ চলছে দু’হাতে।”
“সত্যি না কি ?”
“আমি কি মিথ্যা বলছি? কলকাতার নতুন বাজারে
ক’টা ফুলই বা পৌঁছয়। জামাইবাবু বেরিয়ে গেলেই
খিড়কির দরজায় মালীদের ফুলের বাজার বসে যায়।”
“এরা কেউ দেখে না?”
“দোর গরজ এত কার ?”
“জামাইবাবুকে বলিনে কেন?”
“আমি বলবার কে? মান বাঁচিয়ে চলতে হবে
তাে। তুমি বলাে না কেন? তােমারি তো সব।”
“হােক না, হােক না, বেশ তাে। চলুক না এমনি
কিছুদিন, তার পরে যখন ছারখার হয়ে আসবে আপনি
পড়বে ধরা। একদিন বােক্বার সময় আসবে, মায়ের
চেয়ে সৎমায়ের ভালােবাসা বড়ো নয়।
চুপ করে
থাক না।”

মালঞ্চ “কিন্তু তাও বলি খোখি, তােমার ঐ হল মালিটাকে দিয়ে কোনাে কাজ পাওয়া যায় না।” হলার কাজে ঔদাসীন্যেই যে আয়ার একমাত্র বিরক্তির কারণ তা নয়, ওর উপরে নীরজার স্নেহ অসঙ্গতরূপে বেড়ে উঠছে, এই কারণটাই সব চেয়ে নীরজা বলে, “মালীকে দোষ দিইনে। নতুন মনিবকে সইতে পারবে কেন ? ওদের হােলল সাত- পুরুষে মালীগিরি, আর তােমার দিদিমণির বইপড়া বিদ্যে, হুকুম করতে এলে সে কি মানায়? হলা ছিষ্টি- ছাড়া আইন মানতে চায় না, আমার কাছে এসে নালিশ আমি বলি কানে আনিসূনে কথা, চুপ করে করে। থা।” “সেদিন জামাইবাবু ওকে ছাড়িয়ে দিতে গিয়েছিল।” “কেন, কী জন্যে ?” “ও বসে বসে বিড়ি টানছে, আর ওর সামনে বাইরের গােৰু এসে গাছ খাচ্চে। জামাইবাবু বললে, “গােরু তাড়াসনে কেন?” ও মুখের উপর জবাব করলে, “আমি তাড়াব গােৰু! গােৰুই তত তাড়া করে আমাকে। আমার প্রাণের ভয় নেই।”

১৪
মালঞ্চ
শুনে হাসলে নীরজা, বললে, “ওর ঐরকম কথা।
তা যাই হােক, ও আমার আপন হাতে তৈরি।”
“জামাইবাবু তােমার খাতিরেই তাে ওকে সয়ে
যায়, তা গােরুই ঢুকু আর গণ্ডারই তাড়া করুক।
এতটা আবদার ভালো নয়, তাও বলি।”
“চুপ কর রােশনি। কী দুঃখে ও গােরু তাড়ায়নি
সে কি আমি বুঝিনে। ওর আগুন জ্বলছে বুক।
যে হলা মাথায় গামছা দিয়ে কোথায় চলেছে। ডাক্
তাে ওকে।”
আয়ার ডাকে হলধর মালী এল ঘরে। নীরজা
জিজ্ঞাসা করলে “কী রে, আজকাল নতুন ফরমাস
কিছু আছে ?”
হলা বললে, “আছে বই কি। শুনে হাসিও পায়,
চোখে জল আসে।”
“কী রকম, শুনি।”
“ঐ যে সামনে মল্লিকদের পুরােনাে বাড়ি ভাঙা
হচ্চে, ঐখান থেকে ইটপাটখেল নিয়ে এসে গাছের
তলায় বিছিয়ে দিতে হবে। এই হােল ওঁর হুকুম।
আমি
বলুম, রােদের বেলায় গরম লাগবে গাছের। কান
দেয় না আমার কথায়।”

মালঞ্চ
“বাবুকে বলিনে কেন ?”
“বাবুকে বলেছিলেম। বাবু ধমক দিয়ে বলে,
চুপ করে থাক্। বৌদিদি, ছুটি দাও আমাকে, সহ
হয় না আমার।”
“তাই দেখেছি বটে, ঝুড়ি করে রাবিশ বয়ে
আছিলি।”
“বৌদি’দ, তুমি আমার চিরকালের মনিব।
তােমারই চোখের সামনে আমার মাথা হেঁট করে
দিলে। দেশের লােকের কাছে আমার জাত যাবে।
আমি কি কুলি মজুর ?”
“আচ্ছা এখন যা। তােদের দিদিমণি যখন তােকে
ইটসুকি বইতে বলবে আমার নাম করে বলি আমি
বারণ করেছি। দাড়িয়ে রইলি যে।”
“দেশ থেকে চিঠি এসেছে বড়াে হালের গােটা
মারা গেছে।” বলে মাথা চুলকতে লাগল।
নীরজা বললে, “না মারা যায় নি, দিব্যি বেঁচে
আছে। নে দুটো টাকা, আর বেশি বকিসনে।” এই
বলে, টিপাইয়ের উপরকার পিতলের বাক্স থেকে টাকা
বের করে দিলে।
“আবার কী?”

১৬
মালঞ্চ
“বউয়ের জন্যে একখানা পুরানাে কাপড়। জয়জয়-
কার হবে তােমার।” এই বলে পানের ছােপে কালো
বর্ণ মুখ প্রসারিত করে হাসলে।
নীরজা বললে, “রােশনি, দেতাে ওকে আলনার
ঐ কাপড়খানা।”
রােশনি সবলে মাথা নেড়ে বললে, “সে কী কথা
ওযে তােমার ঢাকাই সাড়ি !”
“হােক্ না ঢাকাই সাড়ি। আমার কাছে আজ
সব সাড়িই সমান। কবেই বা আর পর্ব।”
রােশনি দৃঢ়মুখ করে বললে, “না সে হবে না।
ওকে তােমার সেই লালপেড়ে কলের কাপড়টা দেব।
দেখ, হল, খোখিকে যদি এমনি জ্বালাতন করিস্ বাবুকে
বলে তােকে দূর করে তাড়িয়ে দেব।”
হলা নীরজার পা ধরে কান্নার সুরে বললে, “আমার
কপাল ভেঙেছে বৌদিদি।”
“কেনরে কী হয়েছে তাের।”
“আয়াজিকে মাসি বলি আমি। আমার মা নেই,
এতদিন জানতেম হতভাগা হলকে আয়াজি ভালো-
আজ বৌদিদি, তােমার যদি দয়া হােলল
উনি কেন দেন বাগড়া। কারাে দোষ নয় আমারি
বাসেন।

মালঞ্চ
কপালের দোষ। নইলে তােমার হলাকে পরের হাতে
দিয়ে তুমি আজ বিছানায় পড়ে।”
“ভয় নেইরে, তাের মাসি তােকে ভালােই বাসে।
তুই আসবার আগেই তাের গুণগান করছিল। রােশনি,
দে ওকে ঐ কাপড়টা, নইলে ও ধন্না দিয়ে পড়ে
থাকবে।”
অত্যন্ত বিরস মুখে আয় কাপড়টা এনে ফেলে
দিলে ওর সামনে। হল। সেটা তুলে নিয়ে গড় হয়ে
প্রণাম করলে। তারপরে উঠে দাড়িয়ে বললে, “এই
গামছাটা দিয়ে মুড়ে নিই বৌদিদি। আমার ময়লা
হাত, দাগ লাগবে।” সম্মতির অপেক্ষা না রেখেই
আলনা থেকে তােয়ালেটা নিয়েই কাপড় মুড়ে দ্রুতপদে
হলা প্রস্থান করলে।
নীরজা আয়াকে জিজ্ঞাসা কলে, “আচ্ছা আয়া,
তুই ঠিক জানিস্ বাবু বেরিয়ে গেছেন?”
“নিজের চক্ষে দেখলুম।
কী তাড়া। টুপিটা
নিতে ভুলে গেলেন।”
“আজ এই প্রথম হােলো। আমার সকাল বেলা-
কার পাওনা ফুলে ফাঁকি পড়লাে। দিনে দিনে এই
ফাকি বাড়তে থাকবে। শেষকালে আমি গিয়ে পড়ব

মালঞ্চ
আমার সংসারের আঁস্তাকুড়ে, যেখানে নিবে-যাওয়া
পােড় কয়লার জায়গা।”
সরলাকে আসতে দেখে আয়া মুখ বাঁকিয়ে চলে
গেল।
সরলা ঢুকল ঘরে।
তার হাতে একটি অকিড়।
ফুলটি শুভ, পাপড়ির আগায় বেগনির রেখা। যেন
ডানা-মেলা মস্ত প্রজাপতি। সরলা ছিপছিপে লম্বা,
সামলা রং, প্রথমেই লক্ষ্য হয় তার বড়ো ভিড় চোখ,
উজ্জ্বল এবং করুণ। মােটা খদ্দরের সাড়ি, চুল অযত্নে
বাধা, শ্লথ বন্ধনে নেমে পড়েছে কঁাধের দিকে। অসজ্জিত
দেহ যৌবনের সমাগমকে অনাদৃত করে রেখেছে।
নীরজা তার মুখের দিকে তাকালে না। সরলা
ধীরে ধীরে ফুলটি বিছানায় তার সামনে রেখে দিলে ।
নীরজা বিরক্তির ভাব গােপন না করেই বললে,
“কে আন্‌তে বলেছে ?”
আদিৎদা।”
“নিজে এলেন না যে?”
“নিয়ুমার্কেটের দোকানে তাড়াতাড়ি যেতে হােলদা
চা খাওয়া সেরেই।”
“এত তাড়া কিসের?”

মালঞ্চ
১৯
“কাল রাত্রে আপিসের তালা ভেঙে টাকা চুরির
খবর এসেছে।”
“টানাটানি করে কি পাঁচমিনিটও সময় দিতে
পারতেন না ?”
“কালরাত্রে তােমার ব্যথা বেড়েছিল। ভােৱবেলায়
ঘুমিয়ে পড়েছিলে। দরজার কাছ পর্যন্ত এসে ফিরে
গেলেন। আমাকে বলে গেলেন দুপুরের মধ্যে যদি
নিজে না আসতে পারেন এই ফুলটি যেন দিই
তােমাকে।”
দিনের কাজ আরম্ভের পূর্বেই রােজ আদিত্য
বিশেষ বাছাই-করা একটি করে ফুল স্ত্রীর বিছানায়
রেখে যেত। নীরজা প্রতিদিন তারই অপেক্ষা করেছে।
আজকের দিনের বিশেষ ফুলটি আদিত্য সরলার হাতে
দিয়ে গেল। একথা তার মনে আসেনি যে ফুল
দেওয়ার প্রধান মূল্য নিজের হাতে দেওয়া। গঙ্গার জল
হােলেও নলের ভিতর থেকে তার সার্থকতা থাকে না।
নীরজা ফুলটা অবজ্ঞার সঙ্গে ঠেলে দিয়ে বললে,
“জানাে মার্কেটে এ ফুলের দাম কত? পাঠিয়ে দাও
সেখানে, মিছে নষ্ট কবার দরকার কী?” বলতে বলতে
গলা ভার হয়ে এল।

२०
মালঞ্চ
সরলা বুঝলে ব্যাপারখানা। বুঝলে জবাব দিতে
গেলে আক্ষেপের বেগ বাড়বে বই কমবে না। চুপ করে
রইল দাড়িয়ে। একটু পরে খামখা নীরজা প্রশ্ন করূলে,
“জানাে এ ফুলের নাম?”
বললেই হােততা, জানিনে, কিন্তু বােধ করি অভিমানে
ঘা লাগল, বললে, “এমারিলিস।”
নীরজা অন্যায় উষ্মর সঙ্গে ধমক দিলে,“ভারি তাে
জানাে তুমি ; ওর নাম গ্র্যাণ্ডিফ্লোরা।”
সরলা মৃদুস্বরে বললে, “তা হবে।”
“তা হবে মানে কী। নিশ্চয়ই তাই। বলতে চাও,
আমি জানিনে ?”
সরলা জাত নীরজা জেনে শুনেই ভুল নামটা দিয়ে
প্রতিবাদ করলে।
অন্যকে জ্বালিয়ে নিজের জ্বালা
উপশম করবার জন্যে। নীরবে হার মেনে ধীরে ধীরে
বেরিয়ে চলে যাচ্ছিল, নীরজা ফিরে ডাল, “শুনে
যাও। কী করছিলে সমস্ত সকাল, কোথায় ছিলে?”
“অকিডের ঘরে।”
নীরজা উত্তেজিত হয়ে বললে, “অকিডের ঘরে
তােমার ঘন ঘন যাবার এত কী দরকার?”
“পুরােনাে অর্কিড, চিরে ভাগ
নতুন
করে

মালঞ্চ
২১
অর্কিড, করবার জন্যে আদিৎদা আমাকে
বলে
গিয়েছিলেন।”
নীরজা বলে উঠল ধমক দেওয়ার সুরে—“আনাড়ির
মতাে সব নষ্ট করবে তুমি। আমি নিজের হাতে
হলা মালীকে তৈরি করে শিখিয়েছি, তাকে হুকুম
কলে সে কি পারত না?”
এর উপর জবাব চলে না। এর অকপট উত্তরটা
ছিল এই যে, নীরজার হাতে হল। মালীর কাজ চত
ভালােই, কিন্তু সরলার হাতে একেবারেই চলে না।
এমন কি, ওকে সে অপমান করে ঔদাসীন্য দেখিয়ে।
মালী এটা বুঝে নিয়েছিল যে, এ-আমলে ঠিক
মতাে কাজ না করলেই ও-আমলের মনিব হবেন
খুসি। এ যেন কলেজ বয়কট করে পাশ না করার
দামটাই ডিগ্রি পাওয়ার চেয়ে বড়ো হয়েছে।
সরলা রাগ করতে পাত কিন্তু রাগ করূলে না।
সে বােঝে বৌদিদির বুকের ভিতরটা টনটন করছে।
নিঃসন্তান মায়ের সমস্ত হৃদয় জুড়েছে যে-বাগান, দশ
বছর পরে আজ এত কাছে আছে, তবু এই বাগানের
থেকে নির্বাসন। চোখের সামনেই নিষ্ঠুর বিচ্ছেদ।
নীরজা বললে, “দাও, বন্ধ করে দাও ঐ জানলা।”

২২ মালঞ্চ সরলা বন্ধ করে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, “এইবার কমলা- লেবুর রস নিয়ে আসি। “না কিছু আনতে হবে না, এখন যেতে পারে।” সরলা ভয়ে ভয়ে বললে, “মকরধ্বজ খাবার সময় হয়েছে।” “না দরকার নেই মকরধ্বজ । মকরধ্বজ। তােমার উপর বাগানের আর কোনাে কাজের ফমাস আড়ে না কি?” “গােলপের ডাল পুততে হবে।” নীরজা একটু খোটা দিয়ে বললে, “তার সময় এই বুঝি! এ বুদ্ধি তাকে দিলে কে, শুনি।” সরলা মৃদুস্বরে বললে, “মফঃস্বল থেকে হঠাৎ অনেক- গুলো অর্ডার এসেছে দেখে কোনােমতে আসছে বর্ষার আগেই বেশি করে গাছ বানাতে পণ করেছেন। আমি বারণ করেছিলুম।” “বারণ করেছিলে বুঝি! আচ্ছা, আচ্ছা ডেকে দাও হলা মালীকে।” এল হল মালী। নীরজা বললে, “বাবু হয়ে উঠেছ? গােলাপের ডাল পুততে হাতে খিল ধরে। দিদিমণি তােমার এসিষ্টেন্ট, মালী না কি ? বাবু সহর থেকে ফেরবার আগেই যতগুলো পারি ডাল পুতবি,

মাল
আজ তােদের ছুটি নেই বলে দিচ্চি। পােড় ঘাস
পাতার সঙ্গে বালি মিশিয়ে জমি তৈরি করে নিস্ ঝিলের
ডান পাড়িতে।” মনে মনে স্থির করূলে এইখানে শুয়ে
শুয়েই গােলাপের গাছ সে তৈরি করে তুলবেই। হলা
মালীর আর নিষ্কৃতি'নেই।
হঠাৎ হল প্রশ্রয়ের হাসিতে মুখ ভরে বললে,
“বৌদিদি, এই একটা পিতলের ঘটি। কটকের হরসুন্দর
মাইতির তৈরি। এ জিনিষের দরদ তুমিই বুঝবে।
তােমার ফুলদানি মানাবে ভালো।”
নীরজা জিজ্ঞাসা করলে, “এর দাম কত ?”
জিভ কেটে হলা বললে, “এমন কথা বােলাে না।
এ ঘটির আবার দাম নেব। গরীব আমি, তা বলে তাে
ছােটোলােক নই। তােমারই খেয়ে পরে যে মানুষ।”
ঘটি টিপাইয়ের উপর রেখে অন্য ফুলদানি থেকে
ফুল নিয়ে সাজাতে লাগল। অবশেষে যাবার-মুখাে
হয়ে ফিরে দাড়িয়ে বলে, “তােমাকে জানিয়েছি আমার
ভাগ্নীর বিয়ে। বাজুবন্ধুর কথা ভুলাে না বৌদিদি।
পিতলের গয়না যদি দিই তােমারি নিলে হবে। এত
বড়ো ঘরের মালী, তারি ঘরে বিয়ে, দেশসুদ্ধ লােক
তাকিয়ে আছে।”

২৪
মালঞ্চ
নীরজা বলে, “আচ্ছা তাের ভয় নেই, তুই এখন
যা !” হল। চলে গেল। নীরজা হঠাৎ পাশ ফিরে
বালিশে মাথা রেখে গুমরে উঠে বলে উঠল, “রােনি,
রােনি, আমি ছােটো হয়ে গেছি, ঐ হল মালীর মতােই
হয়েছে আমার মন।”
আয়া বললে, “ও কী বলছ খোখি, ছি ছি।”
নীরজা আপনিই বলতে লাগল, “আর পােড়
কপাল আমাকে বাইরে থেকে নামিয়ে দিয়েছে, আবার
ভিতর থেকে নামিয়ে দিলে কেন ? আমি কি জানিনে
আমাকে হল। আজ কী চোখে দেখছে। আমার কাছে
লাগালাগি করে হাসতে হাসতে বশিস্ নিয়ে চলে
গেল। ওকে ডেকে দে! খুব করে ওকে ধমকে দেব,
ওর সয়তানি ঘােচাতে হবে।”
আয়া যখন হলাকে ডাকবার জন্যে উঠল, নীরজা
বললে, “থাক্ থাক্‌ আজ থা!”

মালঞ্চ
কিছুক্ষণ পরে ওর খুড়তুতাে দেওর রমেন এসে
বললে, বৌদি, দাদা পাঠিয়ে দিলেন। আজ আফিসে
কাজের ভিড়, হােটেলে খাবেন, দেরি হবে ফিরতে।”
নীরজা হেসে বললে, “খবর দেবার ছুতাে করে এক
দৌড়ে ছুটে এসেছ ঠাকুরপাে।
কেন আফিসের
বেহারাটা মরেছে বুঝি ?”
“তােমার কাছে আসতে তুমি ছাড়া অন্য ছুতাের
দরকার কিসের বৌদি ? বেহারা বেটা কী বুঝবে
এই দূত-পদের দরদ।”
“ওগাে মিষ্টি ছড়াচ্চ অস্থানে। এ ঘরে এসেছ কোন্
ভুলে ? তােমার মালিনী আছেন আজ একাকিনী
নেবু কুঞ্জবনে, দেখাে গে যাও।”
“কুঞ্জবনের বনলক্ষ্মীকে দর্শনী দিই আগে, তারপরে
যাব মালিনীর সন্ধানে।” এই বলে বুকের পকেট
থেকে একখানা গল্পের বই বের করে নীরজার হাতে দিল।

২৬
মালঞ্চ
নীরজা খুসি হয়ে বললে, “অশ্রু-শিকল” এই বইটাই
চাচ্ছিলুম। আশীৰ্বাদ করি, তােমার মালঞ্চের মালিনী
চিরদিন বুকের কাছে বাঁধা থাক্ হাসির শিকলে। ঐ
যাকে তুমি বলাে তােমার কল্পনার দোসর তােমার
স্বপ্ন-সঙ্গিনী। কী সােহাগ গো।”
রমেন হঠাৎ বললে, “আচ্ছা বৌদি, একটা কথা
জিজ্ঞাসা করি, ঠিক উত্তর দিয়ে।”
“কী কথা?”
“সরলার সঙ্গে আজ কি তােমার ঝগড়া হয়ে
গেছে?”
“কেন বলো তাে?”
দেখলুম ঝিলের ধারে ঘাটে চুপ করে সে বসে
আছে। মেয়েদের তত পুরুষদের মতাে কাজ-পালানাে
উড়ে মন নয়। এমন বেকার দশা আমি সরলার
কোনােদিন দেখিনি। জিজ্ঞাসা
করলুম,
কোন্‌দিকে ? ও বললে, “যেদিকে তপ্ত হাওয়া শুকনাে
পাতা ওড়ায় সেইদিকে। আমি বললুম,
‘ওটা হােলো
হেঁয়ালি। স্পষ্ট ভাষায় কথা কও। সে বললে, ‘সব
কথারই ভাষা আছে ? আবার দেখি হেঁয়ালি। তখন
গানের বুলিটা মনে পড়ল “কাহার বচন দিয়েছে বেদন।”

মালঞ্চ
२१
“হয়তো তােমার দাদার বচন।”
“হােতেই পারে না। দাদা যে পুরুষ মানুষ।
তােমার ঐ মালীগুলিকে হুঙ্কার দিতে পারে। কিন্তু
“পুরাশাবিবাগ্নি” এও কি সম্ভব হয় ?”
“আচ্ছা বাজে কথা বতে হবে না। একটা কাজের
কথা বলি, আমার অনুরােধ রাখতেই হবে। দোহাই
তােমার সরলাকে তুমি বিয়ে করো। আই-বড়া
মেয়েকে উদ্ধার করলে মহাপুণ্য।”
“পুণ্যের লােভ রাখিনে কিন্তু ঐ কন্যার লােভ
রাখি, একথা বলছি তােমার কাছে হলফ করে।”
“তা হােলে বাধাটা কোথায় ?
ওর কি মন
নেই?”
“সে কথা জিজ্ঞাসাও করিনি। বলেইছি-ততা ও
আমার কল্পনার দোসরই থাকবে, সংসারের দোসর
হবে না।”
হঠাৎ তীব্র আগ্রহের সঙ্গে নীরজা রমেনের হাত
চেপে ধরে বললে, “কেন হবে না, হােতেই হবে।
মরবার
অাগে তােমার বিয়ে দেখবই, নইলে
হয়ে তোমাদের
বলে
রাখছি।”

মালঞ্চ
নীরজার ব্যগ্রতা দেখে রমেন বিস্মিত হয়ে কিছুক্ষণ
তার মুখের
দিকে রইল চেয়ে। শেষকালে মাথা নেড়ে
বললে, “বৌদি, আমি সম্পর্কে ছােটো, কিন্তু বয়সে
বড়ো। (উড়াে বাতাসে আগাছার বীজ আসে ভেসে,
প্রশ্রয় পেলে শিকড় ছড়ায়, তারপরে আর ওপড়ায়
কার সাধ্যি।”
“আমাকে উপদেশ দিতে হবে না। আমি তােমার
গুরুজন, তােমাকে উপদেশ দিচ্চি, বিয়ে কয়ে।। দেরি
কোরাে না। এই ফাল্গুন মাসে ভালাে দিন আছে।”
“আমার পাঁজিতে তিনশাে পঁয়ষট্টি দিনই ভালো
দিন। কিন্তু দিন যদি বা থাকে, রাস্তা নেই। আমি
একবার গেছি জেলে, এখনাে আছি পিছল পথে জেলের
কবলটার দিকে। ও-পথে প্রজাপতির পেয়াদার চল
নেই।”
“এখনকার মেয়েরাই বুঝি জেলখানাকে
করে ?”
“না করতে পারে কিন্তু সপ্তপদী গমনের রাস্তা ওটা
নয়।
ও রাস্তায় বধুকে পাশে না রেখে মনের মধ্যে
রাখলে জোর পাওয়া যায়। রইল চিরদিন আমার
মনে।”

মালঞ্চ
২৯
হরলিস্ দুধের পাত্র টিপাইয়ের উপর রেখে সরল।
চলে যাচ্ছিল। নীরজা বললে, “যেয়ো না, শােনাে
সরলা, এই ফোটোগ্রাফটা কার? চিনতে পারো?”
সরলা বললে, “ও তাে আমার।”
“তােমার সেই আগেকার দিনের ছবি। যখন
তােমার জ্যাঠামশায়ের ওখানে তােমরা দুজনে বাগানের
কাজ করত। দেখে মনে হচ্ছে, বয়সে পনেরাে হবে।
মরাঠি মেয়ের মতাে মালকেঁচা দিয়ে সাড়ি পরেছ।”
“এ তুমি কোথা থেকে পেলে ?”
“দেখেছিলুম ওর একটা ডেস্কের মধ্যে, তখন ভালাে
করে লক্ষ্য করিনি। আজ সেখান থেকে আন্থে
নিয়েছি। ঠাকুরপো, তখনকার চেয়ে সরলাকে এখন
আরাে অনেক ভালাে দেখতে হয়েছে। তােমার কী
মনে হয়।”
রমেন বলে, “তখন কি কোনাে সরলা কোথাও
ছিল ? অন্তত আমি তাকে জানতুম না। আমার কাছে
এখনকার সরলাই একমাত্র সত্য। তুলনা করূব কিসের
সঙ্গে ?”
নীরজা বললে, “ওর এখনকার চেহারা হৃদয়ের
কোন একটা রহস্যে ঘন হয়ে ভরে উঠেছে—যেন যে

মালঞ্চ
মেঘ ছিল সাদা তার ভিতর থেকে শ্রাবণের জল আজ
ঝরি ঝরি করছে—একেই তােমরা রােম্যান্টি বলল,
না ঠাকুরপাে?”
সরলা চলে যেতে উদ্যত হােলো, নীরজা তাকে
বললে, “সরলা, একটু বােসো। ঠাকুরপাে, একবার
পুরুষ মানুষের চোখ দিয়ে সরলাকে দেখে নিই। ওর কী
সকলের আগে চোখে পড়ে বলো দেখি ?”
রমেন বললে, “সমস্তটাই একসঙ্গে।”
“নিশ্চয়ই ওর চোখ দুটো ; কেমন একরকম গভীর
করে চাইতে জানে। না, উঠো না সরলা। আর একটু
রােসােওর দেহটাও কেমন নিরেট নিটোল।”
“তুমি কি ওকে নীলেম করতে বসেছ নাকি বৌদি ?
জানােই তাে অমনিতেই আমার উৎসাহের কিছু কমতি
নেই।”
নীরজা দালালির উৎসাহে বলে উঠল, “ঠাকুরপাে,
দেখাে সরলার হাত দুখানি, যেমন জোরালো তেমনি
সুডােল, কোমল, তেমনি তার । এমনটি আর
দেখেছ ?”
রমেন হেসে বললে, “আর কোথাও দেখেছি কিনা
তার উত্তরটা তােমার মুখের সামনে রূঢ় শােনাবে।”

DIPSIKHA LIBRARY
মাল
Acc, No. ............C:20.lg.43
“অমন দুটি হাতের 'পরে দাবী কবে না?”
“চিরদিনের দাবী নাই করলেম, ক্ষণে ক্ষণে দাবী
করে থাকি। তােমাদের ঘরে যখন চা খেতে আসি
তখন চায়ের চেয়ে বেশি কিছু পাই ঐ হাতের গুণে।
সেই রসগ্রহণে পাণিগ্রহণের যেটুকু সম্পর্ক থাকে
অভাগার পক্ষে সেই যথেষ্ট।”
সরল • মােড়া ছেড়ে উঠে পড়ল। ঘর থেকে
বেরােবার উপক্রম করতেই রমেন দ্বার আগলে বললে,
“একটা কথা দাও তবে পথ ছাড়ব।”
“কী বলে?”
“আজ শুক্লা চতুর্দশী। আমি মুসাফির আস
তােমার বাগিচায়, কথা যদি থাকে তবু কইবার
দরকারই হবে না। আকাল পড়েছে, পেট ভরে দেখাই
জোটে না। হঠাৎ এই ঘরে মুষ্টিভিক্ষার দেখা,
মঞ্জুর নয়। আজ তােমাদের গাছতলায় বেশ একটু রয়ে
সয়ে মনটা ভরিয়ে নিতে চাই।”
সহজ সুরেই বললে,
বলে, “আচ্ছা এসাে
তুমি।”
রমেন খাটের কাছে ফিরে এসে বললে, “তবে আসি
বৌদি।”

মালঞ্চ
“আর থাকবার দরকার কী? বৌদিদির যে
কাজটুকু ছিল, সে তাে সারা হােলো।”
রমেন চলে গেল।

মালঞ্চ = রমেন চলে গেলে নীরজা হাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বিছানায় পড়ে রইল। ভাবতে লাগল, এমন মন- মাতানাে দিন তারও ছিল। কত বসন্তের রাতকে সে উতলা করেছে। সংসারের বারাে আনা মেয়ের মতাে সে কি ছিল স্বামীর ঘরকন্নার আসবাব। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কেবলি মনে পড়ে, কতদিন তার স্বামী তার অলক ধরে টেনে আজ্রকণ্ঠে বলেছে বলেছে “আমার রং- মহলের সাকি।” দশ বছরে রং একটু ম্লান হয়নি, পেয়ালা ছিল ভরা। তার স্বামী তাকে বলত, “সেকালে মেয়েদের পায়ের ছোঁয়া লেগে ফুল ধরূত অশােকে, মুখমদের ছিটে পেলে বকুল উঠত ফুটে, আমার বাগানে সেই কালিদাসের কাল দিয়েছে ধরা। যে পথে রোজ তােমার পা পড়ে, তারি দু-ধারে ফুল ফুটেছে রঙে রঙে, বসন্তের হাওয়ায় দিয়েছ মদ ছড়িয়ে, গােলাপ বনে লেগেছে তার নেশা।” কথায় কথায় সে বলত, “তুমি ৩৪ মালং থাকলে এই ফুলের স্বর্গে বেনের দোকান বৃত্রাসুর হয়ে দখল জমাতাে। আমার ভাগ্যগুণে তুমি আছ নন্দন- বনের ইন্দ্রাণী।” হায়রে, যৌবন তত আজও ফুরােয়নি কিন্তু চলে গেল তার মহিমা। তাই তো ইন্দ্রাণী আপন আসন আজ ভরাতে পারছে না। সেদিন ওর মনে কোথাও কি ছিল লেশমাত্র ভয়? সে যেখানে ছিল সেখানে আর কেউই ছিল না, ওর আকাশে ও ছিল সকাল বেলার অরুণােদয়ের মতাে পরিপূর্ণ একা। আজ কোনােখানে একটু ছায়া দেখলেই বুক দুরদুর করে উঠছে, নিজের উপর আর ভরসা নেই। নইলে কে ঐ সস, কিসের ওর গুমর? আজ তাকে নিয়েও সন্দেহে মন দুলে উঠছে। কে জাত বেলা না ফুরােতেই এত দৈন্য ঘটবে কপালে। এতদিন ধরে এত সুখ এত গৌরব অজস্র দিয়ে অবশেষে বিধাতা এমন করে চোরের মতাে সিধ কেটে দত্তাপহরণ করলেন। “রােশনি, শুনে যা।” “কী খেখি?” “তােদের জামাইবাবু একদিন আমাকে ডাক্ত রংমহলের রঙ্গিনী। দশবছর আমাদের বিয়ে হয়েছে সেই রং তো এখনও ফিকে হয় নি, কিন্তু সেই রংমহল?”

মালঞ্চ
“বাবে কোথায়, আছে তােমার মহল। কাল তুমি
সারারাত ঘুমােওনি, একটু ঘুমােও তো, পায়ে হাত
বুলিয়ে দিই।”
“রােশনি, আজ তো পূর্ণিমার কাছাকাছি। এমন
কত জ্যোৎস্না রাত্রে ঘুমােইনি।
দুজনে বেড়িয়েছি
বাগানে। সেই জাগা আর এই জাগা। আজ তো ঘুমােত
পারলে বাঁচি, কিন্তু পােড়া ঘুম আসতে চায় না যে।”
“একটু চুপ করে থাকে। দেখি, ঘুম আপনি
আসবে।”
“আচ্ছা ওরা কি বাগানে বেড়ায় জ্যোৎস্নারাত্রে ?”
“ভােরবেলাকার চালানের জন্য ফুল কাটতে
বেড়াবে কখন, সময় কোথায় ?”
“মালীগুলো আজকাল খুব ঘুমােচ্চে।
তা হোলে
মালিদের বুঝি জাগায় না ইচ্ছে করেই ?”
“তুমি নেই এখন ওদের গায়ে হাত দেয় কার
সাধ্যি।”
“ঐ না শুনলেম গাড়ির শব্দ ?”
“হা বাবুর গাড়ি এল।”
“হাতআয়নাটা এগিয়ে দে।
বড়ো গােলাপটা
নিয়ে আয় ফুলদানী থেকে, সেফটিপিনের বাজটা
দেখেছি।

৩৬
মাল
কোথায় দেখি। আজ আমার মুখ বড়াে ফ্যাকাশে হয়ে
গেছে। যা তুই ঘর থেকে।”
“যাচ্ছি কিন্তু দুধ বার্লি পড়ে আছে, খেয়ে নাও
লক্ষ্মীটি।”
“থাক্‌ পড়ে, খাব না।”
“দু’দাগ ওষুধ তােমার আজ খাওয়া হয়নি।”
“তাের বক্‌তে হবে না, তুই যা বলছি, ঐ জানলাটা
খুলে দিয়ে যা।”
আয়া চলে গেল।
ঢং ঢং করে তিনটে বাজল। আরক্ত হয়ে এসেছে
রােদুরের রং, ছায়া হেলে পড়েছে পূবদিকে, বাতাস
এল দক্ষিণ থেকে, ঝিলের জল উঠল টল টল করে।
মালীরা লেগেছে কাজে, নীরজা দুর থেকে যতটা পারে
তাই দেখে।
দ্রুতপদে আদিত্য ছুটে এল ঘরে। হাত জোড়া
বাসন্তী রংএর দেশী ল্যাবর্ণা ফুলের মঞ্জরীতে। তাই
দিয়ে ঢেকে দিল নীরজার পায়ের কাছটা। বিছানায়
বসেই তার হাত চেপে ধরে বললে, “আজ কতক্ষণ
তােমাকে দেখিনি নীরু।” শুনে নীরজা আর থাকতে
পালে না, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আদিত্য

মালঞ্চ
৩৭
খাটের থেকে নেমে মেজের উপর হাঁটু গেড়ে নীরজার
গলা জড়িয়ে ধলে, তার ভিজে গালে চুমাে খেয়ে
বললে, “মনে মনে তুমি নিশ্চয় জানাে আমার দোষ
ছিল না।”
“অত নিশ্চয় করে কী করে জাব বলো? আমার
কি আর সেদিন আছে ?”
“দিনের কথা হিসেব করে কী হবে? তুমি তো
আমার সেই তুমিই আছ।”
“আজ যে আমার সকলতাতেই ভয় করে।
পাইনে যে মনে।”
“অল্প একটু ভয় করতে ভালাে লাগে। না ? খোটা
দিয়ে আমাকে একটুখানি উকিয়ে দিতে চাও।
চাতুরী মেয়েদের স্বভাবসিদ্ধ।”
“আর ভুলে-যাওয়া বুঝি পুরুষদের স্বভাবসিদ্ধ
নয়?”
“ভুলতে ফুরসৎ দাও কই।”
“বােলল না বােলল না, পােড়। বিধাতার শাপে
লম্বা ফুরসৎ দিয়েছি যে।”
সুখের দিনে ভােলা যায়, ব্যথার
দিনে নয়।”
উল্টো বলে।

মাল
“সত্যি বলল আজ সকালে তুমি ভুলে চলে
যাও নি?”
“কী কথা বলো তুমি।
চলে যেতে হয়েছিল কিন্তু
যতক্ষণ না ফিরেছি মনে স্বস্তি ছিল না।”
“কেমন করে বসেছ তুমি। তােমার পা দুটো
বিছানায় ভােলাে।”
“বেড়ি দিতে চাও পাছে পালাই।”
“ বেড়ি দিতে চাই। জনমে মরণে তোমার পা
দুখানি নিঃসন্দেহে রইল আমার কাছে বাঁধা।”
“মাঝে মাঝে একটু একটু সন্দেহ কোরাে, তাতে
আদরের স্বাদ বাড়ায়।”
“না, একটুও সন্দেহ না। এতটুকুও না। তোমার
মতাে এমন স্বামী কোন্ মেয়ে পেয়েছে। তােমাকেও
সন্দেহ, তাতে যে আমাকেই ধিক্কার।”
“আমিই তা হােলে তােমাকে সন্দেহ কব, নইলে
জমবে না নাটক।”
“তা কোরাে, কোনাে ভয় নেই। সেটা হবে
প্রহসন।”
“বাই বলল আজ কিন্তু রাগ করছিলে আমার
পরে।”

মাল
|
।”
“কেন আবার সে কথা? শাস্তি তােমার দিতে
হবে না—নি এর মধ্যেই তার দণ্ডবিধান।”
“দণ্ড কিসের জন্য? রাগের তাপ যদি মাঝে মাঝে
দেখা না দেয় তা হােললা বুঝব ভালােবাসার নাড়ি
ছেড়ে গেছে।”
“যদি কোনও দিন ভুলে তােমার উপরে রাগ করি,
নিশ্চয় জেনাে সে আমি নয়, কোনাে অপদেবতা
আমার উপরে ভর করেছে
“অপদেবতা আমাদের সকলেরই একটা করে
থাকে, মাঝে মাঝে অকারণে জানান দেয়। সুবুদ্ধি
যদি আসে, রাম নাম করি, দেয় সে দৌড়।”
আয় ঘরে
বললে, “জামাইবাবু,
আজ সকাল থেকে খোখী দুধ খায়নি, ওষুধ খায়নি,
মালিশ করেনি। এমন করলে আমরা ওর সঙ্গে
পাব না।” বলেই হন্ হন্ করে হাত দুলিয়ে চলে
গেল।
শুনেই আদিত্য দাড়িয়ে উঠল, বললে “এবার তবে
আমি রাগ করি।”
স্থা করাে, খুব রাগ করে, যত পারো রাগ করে,
অন্যায় করেছি, কিন্তু মাপ কোরো তারপরে।”
এল।

৪০
মাল
আদিত্য দরজার কাছে এসে ডাক দিতে লাগ্ল--
“সরলা, সরলা।”
শুনেই নীরজার শিরায় শিরায় যেন ঝন্ ঝন্ করে
উঠল।
বুঝলে, বেঁধানাে কঁাটায় হাত পড়েছে।
সরলা এল ঘরে। আদিত্য বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন কলে,
“নীরুকে ওষুধ দাওনি আজ, সারাদিন কিছু খেতেও
দেওয়া হয়নি ?” নীরজা বলে উঠল, “কে বছ
কেন? ওর দোষ কী? আমিই দুষ্টমি করে খাইনি,
আমাকে বকে না। সরলা তুমি যাও। মিছে কেন
পঁড়িয়ে বকুনি খাবে?”
“যাবে কী, ওষুধ বের করে দিক। হরলিক্স্ মিল্ক,
তৈরি করে আনু।”
“আহা সমস্ত দিন ওকে মালীর কাজে খাটিয়ে মারাে
তার উপরে আবার নার্সের কাজ কেন? একটু দয়া
হয় না তােমার মনে ? আয়াকে ডাকো না।”
“আয়া কি ঠিকমতাে পাবে এ সব কাজ?”
“ভারি তাে কাজ, খুব পাবে! আরাে ভালােই
পারবে।”
“কিন্তু আবার কিসের। আয়া আয়।”

মালঞ্চ
৪১
“অত উত্তেজিত হােয়াে না। একটা বিপদ ঘটাকে
দেখছি।”
“আমি অয়াকে ডেকে দিচ্চি” বলে সরলা চলে
গেল। নীরজার কথার যে একটা প্রতিবাদ কবে,
সেও তার মুখে এল না। আদিত্যও মনে মনে আশ্চৰ্য্য
হেলে, ভাবলে সরলাকে কি সত্যিই অন্যায় খাটানাে
হচ্চে।
ওষুধ পথ্য হয়ে গেলে আদিত্য আয়াকে বলে
“সরলা দিদিকে ডেকে দাও।”
“কথায় কথায় কেবলি সরলাদিদি, বেচারাকে তুমি
অস্থির করে তুলবে দেখছি।”
“কাজের কথা আছে।”
“থাক্ না এখন কাজের কথা!”
“বেশিক্ষণ লাগবে না।”
“সরল মেয়েমানুষ, ওর সঙ্গে এত কাজের কথা
কিসের, তার চেয়ে হল। মালীকে ডাকো না।”
“তােমাকে বিয়ে করবার পর থেকে একটা কথা
আবিষ্কার করেছি যে, মেয়েরাই কাজের, পুরুষের
হাড়ে অকেজো। আমরা কাজ করি দায়ে পড়ে,
তােমরা কাজ করে প্রাণের উৎসাহে। এই সম্বন্ধে

82
মালঞ্চ
একটা থসিস্ লিখব মনে করেছি । আমার ডায়রি
থেকে বিস্তর উদাহরণ পাওয়া যাবে।”
“সেই মেয়েকেই আজ তার প্রাণের কাজ থেকে
বঞ্চিত করেছে যে-বিধাতা, তাকে কী বলে নিলে কব।
ভূমিকম্পে হুড়মুড় করে আমার কাজের চূড়া পড়েছে
ভেঙে, তাইতো পােড় বাড়িতে ভূতের বাসা
হােলো।”
সরলা এল। আদিত্য জিজ্ঞাসা করলে, “অর্কিড,
ঘরের কাজ হয়ে গেছে ?”
“স্থ হয়ে গেছে।”
“সবগুলো?”
“সবগুলােই।”
“আর গােলাপের কাটিং?”
“মালি তার জমি তৈরি করেছে।”
“জমি। সে তো আমি আগেই তৈরী করে
রেখেছি। হলা মালীর উপর ভর দিয়েছ, তা
হােলেই দাতন কাঠির চাষ হবে আর কী!”
কথাটাতে তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে নীরজা বললে,
সরলা, যাও তাে, কমলালেবুর রস করে নিয়ে এসে
গে, তাতে একটু আদার রস দিয়ে, আর মধু।”

মালঞ্চ
৪৩
সরলা মাথা হেঁট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নীরজা জিজ্ঞাসা করলে, “আজ তুমি ভােরে
উঠেছিলে যেমন আমরা রােজ উঠতুম?”
“হ। উঠেছিলুম।”
“ঘড়িতে তেমনি এলামের দম দেওয়া ছিল ?”
“ছিল বৈ কী?”
“সেই নীমগাছতলায় সেই কাটা গাছের গুড়ি।
তার উপরে চায়ের সরঞ্জাম। সব ঠিক রেখেছিল বাসু?”
“রেখেছিল। নইলে খেসারতের দাবীতে নালিশ
রুজু করতুম তােমার আদালতে।”
“দুটো চৌকিই পাতা ছিল ?”
“পাতা ছিল সেই আগেকার মতােই। আর ছিল
সেই নীল-পাড়-দেওয়া বাসন্তী রংএর চায়ের সরঞ্জাম।
দুধের জ্যগ রূপাের, ছােটো সাদা পাথরের বাটিতে
চিনি, আর ড্রাগন-আঁকা জাপানী ট্রে।”
“অন্য চৌকিটা খালি রাখলে কেন?”
“ইচ্ছে করে রাখিনি। আকাশে তারাগুলাে
গােণাগুণতি ঠিকই ছিল, কেবল শুরু পঞ্চমীর চাঁদ
রইল দিগন্তের বাইরে। সুযােগ থাকলে তাকে
আনতেম ধরে।”

৪৪
মালঞ্চ
“সরলাকে কেন ডাকো না তােমার চায়ের টেবিলে ?”
এর উত্তরে বললেই হােতো, তােমার আসনে আর
কাউকে ডাকতে মন যায় না। সত্যবাদী তা না বলে
বললে, “সকালবেলায় বােধ হয় সে জপ তপ কিছু
করে, আমার মতাে ভজনপূজনহীন ম্লেচ্ছ তাে নয়।”
“চা খাওয়ার পরে আজ বুঝি অর্কিড়ঘরে তাকে
নিয়ে গিয়েছিলে ?”
“হাঁ, কিছু কাজ ছিল, ওকে বুঝিয়ে দিযেই ছুটতে
হােললা দোকানে।”
“আচ্ছ। একy, er। জিজ্ঞাসা করি, সরলার সঙ্গে
রমেনের বিয়ে দাও না কেন ?”
“ঘটকালি কি আমার ব্যবসা ?”
“না, ঠাট্টা নয়। বিয়ে তাে কতেই হবে, রমেনের
মতো পাত্র পাবে কোথায়?”
“পাত্র আছে একদিকে, পাত্রীও আছে আর-এক
দিকে, মাঝখানটাতে মন আছে কি না সে খবর নেবার
ফুরসৎ পাইনি। দূরের থেকে মনে হয় যেন ঐখানটাতেই
খটুকা।”
একটু ঝাঁঝের সঙ্গে বললে নীরজা-“কোনাে খট্‌কা
থাকত না যদি তােমার সত্যিকার আগ্রহ থাক্ত।”

৪৫
মালঞ্চ
“বিয়ে করূবে অন্য পক্ষ,
সত্যিকার আগ্রহটা থাকবে
একা আমার, এটাতে কি কাজ চলে? তুমি চেষ্টা
দেখাে না।”
“কিছুদিন গাছপালা থেকে ঐ মেয়েটার দৃষ্টিটাকে
ছুটি দাও দেখি, ঠিক জায়গায় আপনি চোখ পড়বে।”
“শুভদৃষ্টির আলােতে গাছপালা পাহাড় পর্বত
সমস্তই স্বচ্ছ হয়ে যায়। ও একজাতের একসূরেজ,
আর কী।”
“মিছে ৭ছ।
আসল কথা, তােমার
ইচ্ছে নয়
বিয়েটা ঘটে।”
“এতক্ষণে ধরেছ ঠিক। সরলা গেলে আমার
বাগানের দশা কী হবে বলো। লাভ লােকসানের
কথাটাও ভাবতে হয়।
ও কী ও, হঠাৎ তােমার
বেদনাটা বেড়ে উঠল না কি ?”
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল আদিত্য নীরজা রুক্ষ গলায়
বললে, “কিছু হয় নি। আমার জন্যে তােমাকে অত
ব্যস্ত হােতে হবে না।”
স্বামী যখন উঠি-উঠি করছে, সে বলে উঠল
“আমাদের বিয়ের পরেই ঐ অর্কিড়, ঘরের প্রথম পত্তন,
ভুলে যাওনি তাে সে কথা ? তারপরে দিনে দিনে

৪৬
মালঞ্চ
আমরা দুজনে মিলে ঐ ঘরটাকে সাজিয়ে তুলেছি।
ওটাকে নষ্ট করতে দিতে তােমার মনে একটুও লাগে না।”
আদিত্য বিস্মিত হয়ে বলে, “সে কেমন কথা?
নষ্ট হােতে দেবার সখ আমার দেখলে কোথায়?”
উত্তেজিত হয়ে নীরজা বললে, “সরলা কী জানে
ফুলের বাগানের।”
“বলো কী? সরলা জানে না? যে-মেসোমশায়ের
ঘরে আমি মানুষ, তিনি যে সরলার জ্যাঠামশায়। তুমি
তো জানােতঁারি বাগানে আমার হাতেখড়ি। জ্যাঠামশায়
বলতেন, ফুলের বাগানের কাজ মেয়েদেরি, আর গােৰু
দোওয়ানাে। তাঁর সব কাজে ও ছিল তার সঙ্গিনী।”
“আর তুমি ছিলে সঙ্গী।”
“ছিলেম বৈ কী। কিন্তু আমাকে করতে হােতাে
কলেজের পড়া, ওর মতাে অত সময় দিতে পারিনি।
ওকে মেলােমশায় নিজে পড়াতেন।”
“সেই বাগান নিয়ে তােমার মেলােমশায়ের সর্বনাশ
হয়ে গেল। এমনি ও মেয়ের পয়। আমার তাে তাই
ভয় করে। অলক্ষুণে মেয়ে। দেখাে না মাঠের মতো
কপাল, ঘােড়ার মতন লাফিয়ে চলন। মেয়ে মানুষের
পুরুষালি বুদ্ধিটা ভালাে নয়। এতে অকল্যাণ ঘটায়।”

মালঞ্চ
৪৭
“তােমার আজ কী হয়েছে বলো তাে নী? কী
কথা বলছ? মেসােমশায় বাগান করতেই জানতেন,
ব্যবসা করতে জানতেন না। ফুলের চাষ করতে তিনি
ছিলেন অদ্বিতীয়, নিজের লােকসান
নিজের লােকসান করতেও তার
সমকক্ষ কেউ ছিল না। সকলের কাছে তিনি নাম
পেতেন দাম পেতেন না। বাগান করবার জন্যে আমাকে
যখন মূলধনের টাকা দিয়েছিলেন আমি কি জানতুম
তখনি তার তহবিল ডুবােডুবাে। আমার একমাত্র
সান্ত্বনা এই যে, তার মরবার আগেই সমস্ত দিয়েছি
শােধ করে।
সরলা কমলানেবুর রস নিয়ে এল। নীরজা বললে,
“ঐখানে রেখে যাও।” রেখে সরলা চলে গের্ল। পাত্রটা
পড়ে রইল, ও ছুলােই না।
“সরলাকে তুমি বিয়ে করলে না কেন?”
“শোনাে একবার কথা। বিয়ের কথা কোনােদিন
মনেও আসেনি।”
“মনেও আসেনি! এই বুঝি তােমার কবিত্ব।”
“জীবনে কবিত্বের বালাই প্রথম দেখা দিল যেদিন
তােমাকে দেখলুম।
তার আগে আমরা দুই বুনােয়
মিলে দিন কাটিয়েছি বনের ছায়ায়। নিজেদের ছিলুম

৪৮
মালঞ্চ
ভুলে। হাল আমলের সভ্যতায় যদি মানুষ হতুম তা
হােলে কী হােতো বলা যায় না।”
“কেন সভ্যতার অপরাধটা কী?”
“এখনকার সভ্যতাটা দুঃশাসনের মতাে হৃদয়ের
বস্ত্রহরণ করতে চায়। অনুভব করবার পূর্বেই সেয়ানা
করে তােলে চোখে আঙুল দিয়ে। গন্ধের ইসারা ওর
পক্ষে বেশি সূক্ষ্ম, খবর নেয় পাপড়ি ছিড়ে।”
“সরলাকে তো দেখতে মন্দ নয়।”
“সরলাকে জানতুম সরলা বলেই। ও দেখতে ভালাে
কি মন্দ সে তত্ত্বটা সম্পূর্ণ বাহুল্য ছিল।”
“আচ্ছা, সত্যি বলাে, ওকে তুমি ভালােবাসতে না?”
“নিশ্চয়ন্ত্ৰালােবাসতুম। আমি কি জড় পদার্থ, যে,
ওকে ভালােবা না? মেসােমশায়ের ছেলে রেঙ্গুনে
ব্যারিষ্টারী করে, তার জন্যে কোনাে ভাবনা নেই। তার
বাগানটি নিয়ে সরলা থাকবে এই ছিল তার জীবনের
সাধ। এমন কি তার বিশ্বাস ছিল, এই বাগানই ওর
সমস্ত মনপ্রাণ অধিকার কবে। ওর বিয়ে করবার
গরজ থাকবে না। তারপরে তিনি চলে গেলেন, অনাথা
হােলো সরলা, পাওনাদারের হাতে বাগানটি গেল
বিকিয়ে। সেদিন আমার বুক ভেঙে গিয়েছিল, দেখােনি

মালঞ্চ
৪৯
কি তুমি ?
ও যে ভালােবাসার জিনিষ, ভালােবাস
না ওকে? মনে তো আছে একদিন সরলার মুখে
হাসিখুসি ছিল উচ্ছ্বসিত। মনে হােতে যেন পাখী
ওড়া ছিল ওর পায়ের চলার মধ্যে। আজ ও চলেছে
বুকভরা বোেঝা বয়ে বয়ে, তবু ভেঙে পড়েনি। একদিনের
জন্যে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে নি আমারও কাছে, নিজেকে
তার অবকাশও দিলে না।”
আদিত্যেৰ কথা চাপা দিয়ে নীরজা বললে, “থামাে
গগা থামো, অনেক শুনেছি ওর কথা তােমার কাছে,
আর বলতে হবে না। অসামান্য মেয়ে। সেইজন্যে
বলছি ওকে সেই বারাসতের মেয়ে-স্কুলের হোমট্রেস
করে দাও। তারা তো কতবার ধরাধরি করেছে।”
“বারাসতের মেয়ে ইস্কুল ? কেন আগুামানও
তাে আছে।”
“না, ঠাট্টা নয়। সরলাকে তােমার বাগানের আর
যে-কোনাে কাজ দিতে হয় দিয়ে। কিন্তু ঐ অর্কিত
ঘরের কাজ দিতে পারবে না।”
“কেন হয়েছে কী?”
“আমি তােমাকে বলে দিচ্ছি, সরলা অর্কিড, ভালাে
বােবে না।”
৪

মাল
“আমিও তােমাকে বলছি, আমার চেয়ে সরলা
ভালাে বােঝে। মেসােমশায়ের প্রধান সখ ছিল
অফিডে। তিনি নিজের লােক পাঠিয়ে সেলিবি
থেকে, জাভা থেকে, এমন কি চীন থেকে অর্কিড,
আনিয়েছেন, তার দরদ বােঝে এমন লােক
ছিল না।”
কথাটা নীরজা জানে, সেই জন্যে কথাটা তার
তখন
অসহ।
“আচ্ছা, আচ্ছা, বেশ বেশ, ও না হয় আমার চেয়ে
ঢের ভালাে বােঝে এমন কি তােমার চেয়েও।
হােক্, ভৰু বলছি ঐ অর্কিডের ঘর শুধু তােমার আমার,
ওখানে সরলার কোনাে অধিকার নেই। তােমার
সমস্ত বাগানটা ওকেই দিয়ে দাও না যদি তােমার
নিতান্ত ইচ্ছে হয় ;
কেবল খুব অল্প একটু কিছু রেখে
যেটুকু কেবল আমাকেই উৎসর্গ-করা। এতকাল পরে
অন্তত এইটুকু দাবী করিতে পারি। কপালদোষে না
হয় আজ আছি বিছানায় পড়ে, তাই বলে-” কথা শেষ
করতে পারলে না, বালিশে মুখ গুজে অশান্ত হয়ে
কাঁদতে লাগল।
স্তম্ভিত হয়ে গেল আদিত্য। ঠিক যেন এতদিন

মালঞ্চ
জন্যেও।
স্বপ্নে চলছিল, ঠোকর খেয়ে উঠল চকে। ७ को
ব্যাপার! বুঝতে পাল এই কান্না অনেকদিনকার।
বেদনার ঘূর্ণিবাতাস নীরজার অন্তরে অন্তরে বেগ পেয়ে
উঠছিল দিনে দিনে, আদিত্য জানতে পারেনি মুহুর্তের
এমন নির্বোধ যে, মনে করেছিল, সরলা
বাগানের যত্ন করতে পারে এতে নীরজা খুসি। বিশেষত
ঋতুর হিসাব করে বাছাই-করা ফুলের কেয়ারী সাজাতে
ও অদ্বিতীয়, আজ হঠাৎ মনে পড়ল, একদিন যখন
কোনও উপলক্ষ্যে সরলার প্রশংসা করে ও বলেছিল,
“কামিনীর বেড়া এমন মানানসই করে আমি তাে
লাগাতে পারতুম না”, তখন তীব্র হেসে বলেছে নীরজা,
“ওগো মশায়, উচিত পাওনার চেয়ে বেশি দিলে আখেরে
মানুষের লােকসান করাই হয়।” আদিত্যের আজ মনে
পড়ল, গাছপালা সম্বন্ধে কোনও মতে সরলার একটা
ভুল
যদি ধতে পাত নীরজা উচ্চহাস্যে কথাটাকে ফিরে
ফিরে মুখরিত করে তুলত। স্পষ্ট মনে পড়ল, ইংরেজি
বই খুজে খুজে নীরজা মুখস্থ করে রাখত অল্পপরিচিত
ফুলের উদ্ভট নাম ; ভালােমানুষের মতাে জিজ্ঞাসা
কত সরলাকে, যখন সে ভুল কত, তখন থামতে চাইত
ওর হাসির হিল্লোল ; “ভারি পণ্ডিত, কে না জানে

মাল
ওর নাম ক্যাসিয়া জাভানিকা। আমার হল মালী
বলতে পাত।”
আদিত্য অনেকক্ষণ ধরে বসে ভাবলে। তারপরে
হাত ধরে বললে, “কেঁদো না নীরু, বলো কী করব।
তুমি কি চাও সরলাকে বাগানের কাজে না রাখি ?”
নীরজা হাত ছিনিয়ে নিয়ে বললে, “কিছু চাইনে,
কিচ্ছু না, ও তো তােমারি বাগান। তুমি যাকে খুসি
রাখতে পারে আমার তাতে কী?”
“নী, এমন কথা তুমি বলতে পালে, আমারই
বাগান? তােমার নয়। আমাদের মধ্যে এই ভাগ
হয়ে গেল কবে থেকে?”
“যবে থেকে তােমার রইল বিশ্বের আর সমস্ত কিছু
আর আমার রইল কেবল এই ঘরের কোণ। আমাৰ
এই ভাঙা প্রাণ নিয়ে দাড়াব কিসের জোরে তােমার ঐ
আশ্চর্য সরলার সামনে। আমার সে শক্তি আজ
কোথায় যে তােমার সেবা করি, তােমার বাগানে
কাজ করি ?”
“নীরু, তুমি তাে কতদিন এর আগে আপনি
সরলাকে ডেকে পাঠিয়েছ, নিয়েছ ওর পরামর্শ। মনে
নেই কি এই কয়েক বছর আগে বাতাবী নেবুর সঙ্গে

মালঞ্চ
৫৩
কলম্বা লেবুর কলম বেঁধেছ দুইজনে, আমাকে আশ্চর্য্য
করে দেবার জন্যে।”
“তখন তাে ওর এত গুমাের ছিল না। বিধাতা যে
আমারি দিকে আজ অন্ধকার করে দিলে, তাই তাে
তােমার কাছে হঠাৎ ধরা পড়ছে, ও এত জানে ও তত
জানে, অর্কিড, চিনতে আমি ওর কাছে লাগিনে। সেদিন
তো এসব কথা কোনও দিন শুনিনি। তবে আজ
আমার এই দুর্ভাগ্যের দিনে কেন দুজনের তুলনা কতে
এলে? আজ আমি ওর সঙ্গে পাব কেন? মাপে
সমান হব কী নিয়ে?”
“নী, আজ তােমার কাছে এই যা সব শুনছি তার
জন্য একটুও প্রস্তুত ছিলুম না। মনে হচ্চে এ যেন
আমার নীরুর কথা নয়, এ যেন আর কেউ।
“না গো না সেই নীরুই বটে। তার কথা এতদিনেও
তুমি বুঝলে না। এই আমার সব চেয়ে শান্তি। বিয়ের
পর যেদিন আমি জেনেছিলেম তােমার বাগান তােমার
প্রাণের মতো প্রিয়, সেদিন থেকে ঐ বাগান আর
আমার মধ্যে ভেদ রাখিনি একটুকুও। নইলে তােমার
বাগানের সঙ্গে আমার ভীষণ ঝগড়া বাত, ওকে সইতে
পারতুম না।
ও হােতো আমার সতীন। তুমি তো

৫৪
মাথ
জাননা, আমার দিনরাতের সাধনা। জাননা কেমন করে
ওকে মিলিয়ে নিয়েছি আমার মধ্যে। একেবারে এক
হয়ে গেছি ওর সঙ্গে।”
জানি বই কী। আমার সব কিছুকে নিয়েই যে
তুমি।”
ও সব কথা রাখো। আজ দেখলুম ঐ বাগানের
মধ্যে অনায়াসে প্রবেশ কলে আর একজন । কোথাও
একটুও ব্যথা লাগল না। আমার দেহখানাকে চিরে
ফেলবার কথা কি মনে করতেও পারুতে, আর কারু
প্রাণ তার মধ্যে চালিয়ে দেবার জন্যে।
আমার ঐ
বাগান কি আমার দেহ নয়? আমি হােলে কি এমন
কতে পারতুম ?”
“কী করতে তুমি?”
“বলব কী করতুম ? বাগান ছারখার হয়ে যেত
হয়তো। ব্যবসা হােতে দেউলে। একটার জায়গায়
দশটা মালী রাখতুম কিন্তু আসতে দিতুম না আর
কোনাে মেয়েকে। বিশেষতঃ এমন কাউকে যার মনে
গুমর আছে সে আমার চেয়েও বাগানের কাজ ভালাে
ওর এই অহঙ্কার দিয়ে তুমি আমাকে অপমান
করবে প্রতিদিন, যখন আমি আজ মরতে বসেছি,
জানে।

যখন উপায় নেই নিজের শক্তি প্রমাণ করবার ? এমনটা
কেন হােতে পাল, বলব?”
“বলাে।”
“তুমি আমার চেয়ে ওকে ভালােবাসাে বলে।
এতদিন সেকথা লুকিয়ে রেখেছিলে।”
আদিত্য কিছুক্ষণ মাথার চুলের মধ্যে হাত গুজে
বসে রইল। তারপরে বিহ্বলকণ্ঠে বললে—“নীরু, দশ
বৎসর তুমি আমাকে জেনেছ, সুখে দুঃখে নানা অবস্থায়
নানা কাজে, তারপরেও তুমি যদি এমন কথা আজ
বলতে পারে তবে আমি কোনো জবাব কব না।
চললুম। কাছে থাকলে তােমার শরীর খারাপ হবে।
ফর্শারীর পাশে যে জাপানী ঘর আছে সেইখানে থাকব।
যখন আমাকে দরকার হবে ডেকে পাঠিয়ে।”

৫৬
মালঞ্চ
দীঘির ওপারের পাড়িতে চালতা গাছের আড়ালে
চাঁদ উঠছে, জলে পড়েছে ঘন কালো ছায়া। এ পারে
বাসন্তী গাছে কচি পাতা শিশুর ঘুমভাঙা চোখে মতাে
রাঙা, তার কাঁচাসোনার বরণ ফুল, ঘন গন্ধ ভারি হয়ে
জমে উঠেছে, গন্ধের কুয়াশা যেন। জোনাকীর দল
ঝলমল করছে জারুল গাছের ডালে। শান-বাঁধানো
ঘাটের বেদীর উপর স্তব্ধ হয়ে বসে আছে-সরল।
বাতাস নেই কোথাও, পাতায় নেই কাপন, জল যেন
কালো ছায়ার ফ্রেমে বাঁধানো পালিস-করা রূপাের
আয়না।
পিছনের দিক থেকে প্রশ্ন এল “আসতে পারি
কি?
সরলা স্নিগ্ধ কঠে উত্তর দিলে, “এসাে।” রমেন বসন্স
ঘাটের সিড়ির উপর, পায়ের কাছে। সরলা ব্যস্ত হয়ে
বললে “কোথায় বলে রমেন দাদা, উপরে এসো।”
রমেন বলে জানাে দেবীদের বর্ণনা আরম্ভ পদপল্লব

খাতা মুড়িবে ।
মালঞ্চ
থেকে। পাশে জায়গা থাকে তাে পরে বসব।
তােমার হাতখানি, অভ্যর্থনা শুরু করি বিলিতি মতে।”
সরলার হাত নিয়ে চুম্বন করলে। বললে “সাম্রাজ্ঞীর
অভিবাদন গ্রহণ করে।”
তারপরে উঠে দাড়িয়ে অল্প একটুখানি আবির নিয়ে
দিলে ওর কপালে মাখিয়ে।
“এআবার কী?”
“জানাে না আজ দোলপূর্ণিমা। তোমাদের গাছে
গাছে ডালে ডালে রঙের ছড়াছড়ি। বসন্তে মানুষের
গায়ে তো রঙ লাগে না, লাগে তার মনে। সেই রংটাকে
বাইরে প্রকাশ করতে হবে, নইলে, বনলক্ষ্মী, অশোকবনে
তুমি নির্বাসিত হয়ে থাকবে।”
“তোমার সঙ্গে কথার খেলা করি এমন ওস্তাদি নেই
আমার।”
“কথার দরকার কিসের। পুরুষ পাখীই গান করে
তােমরা মেয়ে পাখী চুপ করে শুনলেই উত্তর দেওয়া
হােলো। এইবার বসতে দাও পাশে।”
পাশে এসে বসল। অনেকক্ষণ চুপ করে রইল
দুইজনেই। হঠাৎ সরলা প্রশ্ন করলে রমেনদা, জেলে
যাওয়া যায় কী করে, পরামর্শ দাও আমাকে।”

মাল
“জেলে যাবার রাস্তা এত অসংখ্য এবং আজকাল
এত সহজ যে কী করে জেলে না যাওয়া যায় সেই
পরামর্শই কঠিন হয়ে উঠল। এ যুগে গােরার বাঁশি ঘরে
টিকতে দিল না।”
“না আমি ঠাট্টা করছিনে, অনেক ভেবে দেখলুম
আমার মুক্তি ঐখানেই।”
“ভালাে করে খুলে বলো তােমার মনের কথাটা।”
“বলছি সব কথা। সম্পূর্ণ বুঝতে পারুতে, যদি
আদিদার মুখখানা দেখতে পেতে।”
‘আভাসে কিছু দেখেছি।”
“আজ বিকেল বেলায় একলা ছিলেম বারান্দায়।
আমেরিকা থেকে ফুলগাছের ছবি-দেওয়া ক্যাটালগ
এসেছে ; দেখছিলেম পাতা উলটিয়ে, রােজ বিকেলে
সাড়ে চারটার মধ্যে চা খাওয়া সেরে আদিদা আমাকে
ডেকে নেন বাগানের কাজে। আজ দেখি অন্যমনে
বেড়াচ্চেন ঘুরে ঘুরে ; মালীরা কাজ করে যাচ্চে তাকিয়েও
দেখছেন না। মনে হােলাে আমার বারান্দার দিকে
আসবেন বুঝি, দ্বিধা করে গেলেন ফিরে। অমন শক্ত
লম্বা মানুষ, জোরে চলা, জোরে কাজ, সবদিকেই সজাগ
দৃষ্টি, কড়া মনিব অথচ মুখে ক্ষমার হাসি ; আজ সেই

মালঞ্চ
৫৯
মানুষের সেই চলন নেই,দৃষ্টি নেই বাইরে কোথায় তলিয়ে
আছেন মনের ভিতরে। অনেকক্ষণ পরে ধীরে ধীরে এলেন
কাছে। অন্যদিন হােলে তখনি হাতের ঘড়িটা দেখিয়ে
বলতেন, সময় হয়েছে, আমিও উঠে পড়তুম। আজ তা
বলে আস্তে আস্তে পাশে চৌকি টেনে নিয়ে বসলেন।
বললেন ক্যাটালগ দেখছ বুঝি। আমার হাত থেকে
ক্যাটালগ নিয়ে পাতা ওলটাতে লাগলেন। কিছু
যে দেখলেন তা মনে হােলাে না। হঠাৎ একবার আমার
মুখের দিকে চাইলেন, যেন পণ করলেন আর দেরী না
করে এখনি কী একটা বলাই চাই। আবার তখনি
পাতার দিকে চোখ নামিয়ে বললেন, “দেখেছ সরি, কত
বড়ো ন্যাসটার্শিয়া। কণ্ঠে গভীর ক্লান্তি। তারপর
অনেকক্ষণ কথা নেই, চল পাতা ওলটানাে।
একবার হঠাৎ আমার মুখের দিকে চাইলেন, চেয়েই ধা
করে বই বন্ধ করে আমার কোলের উপর ফেলে দিয়ে
উঠে পড়লেন। আমি বললেম, যাবে না বাগানে ?
আদিদা বললেন, “না ভাই বাইরে বেরােতে হবে, কাজ
আছে” বলেই তাড়াতাড়ি নিজেকে যেন ছিড়ে নিয়ে
চলে গেলেন।”
আর

মালঞ্চ
০
“আদিদা তােমাকে কী বলতে এসেছিলেন ; কী
আন্দাজ করো তুমি।”
“বলতে এসেছিলেন আগেই ভেঙেছে তােমার এক
বাগান, এবার হুকুম এল, তােমার কপালে আর এক
বাগান ভাঙবে।”
“তাই যদি ঘটে, সরি, তাহোলে জেলে যাবার
স্বাধীনতা যে আমার থাকবে না।”
সরল ম্লান হেসে বলল “তােমার সে রাস্তা কি
আমি বন্ধ কতে পারি ? সম্রাটবাহাদুর স্বয়ং খােলাসা
রাখবেন।”
“তুমি বৃন্তচ্যুত হয়ে পড়ে থাকবে রাস্তায়, আর
আমি শিকলে ঝংকার দিতে দিতে চমক লাগিয়ে চলৰ
জেলখানায়, একি কখনাে হােতে পারে ? এখন থেকে
তা হোলে যে আমাকে এই বয়সে ভালাে মানুষ হােতে
শিখতে হবে।”
“কী কবে তুমি?”
“তোমার অশুভগ্রহের সঙ্গে লড়াই ঘােষণ করে
দেব। কুষ্টি থেকে তাকে তাড়াব। তারপরে লম্বা
ছুটি পাব, এমন কি কালাপানির পার পর্যন্ত।”
“তােমার কাছে কোনাে কিছুই লুকোতে পারিনে।

মালঞ্চ
একটা কথা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কিছু দিন
থেকে। আজ সেটা তােমাকে বলব, কিছু মনে কোনো
না।”
“না বলে মনে কব।”
“ছেলেবেলা থেকে আদিৎদার সঙ্গে একত্রে মানুষ
হয়েছি। ভাই বােনের মতাে নয়, দুই ভাইএর মতো।
নিজের হাতে দুজনে পাশাপাশি মাটি কুপিয়েছি, গাছ
কেটেছি। জেঠাইমা আর মা দু তিন দিন পরে পরে
মারা যান টাইফয়েডে, আমার বয়স তখন ছয়। বাবার
মৃত্যু তার দু’বছর পরে, জেঠামশাইএর মস্ত সাধ ছিল
আমিই তার বাগানটিকে বাঁচিয়ে রাখব আমার প্রাণ
দিয়ে। তেমনি করেই আমাকে তৈরি করেছিলেন।
কাউকে তিনি অবিশ্বাস করতে জানতেন না। যে বন্ধুদের
টাকা ধার দিয়েছিলেন তারা শােধ করে বাগানকে
দায়মুক্ত করবে এতে তার সন্দেহ ছিল না।
করেছেন কেবল আদিদা, আর কেউ না। এই ইতিহাস
হয়তাে তুমি কিছু কিছু জানাে কিন্তু তবু আজ সব কথা
গােড়া থেকে বলতে ইচ্ছে করছে।”
“সমস্ত আবার নূতন লাগছে আমার।”
“তারপরে জানে হঠাৎ সবই ডুবল। যখন ভাঙায়

মাল
এর
|
টেনে তুললে বন্যা থেকে, তখন আর একবার আদিদার
পাশে এসে ঠেকল আমার ভাগ্য। মিললুম তেমনি
করেই,আমরা দুই ভাই, আমরা দুই বন্ধু। তারপর
থেকে আদিদার আশ্রয়ে আছি এও যেমন সত্যি, তাঁকে
আশ্রয় দিয়েছি সেও তেমনি সত্যি। পরিমাণে আমার
দিক থেকে কিছু কম হয়নি এ আমি জোর করে বলব।
তাই আমার পক্ষে একটুও কারণ ঘটেনি সঙ্কোচ
করবার। আগে একত্রে ছিলেম যখন, তখন
আমাদের যে বয়স ছিল সেই বয়সটা নিয়েই যেন
ফিরলুম, সেই সম্বন্ধ নিয়ে। এমনি করেই চিরদিন চলে
যেতে পাত। আর বলে কী হবে।”
“কথাটা শেষ করে ফেলল।”
“হঠাৎ আমাকে ধাক্কা মেরে কেন জানিয়ে দিলে যে
আমার বয়স হয়েছে। যেদিনকার আড়ালে একসঙ্গে
কাজ করেছি সেদিনকার আবরণ উড়ে গেছে এক
মুহূর্তে। তুমি নিশ্চয় সব জানাে রমেনদা, আমার
কিছুই ঢাকা থাকে না তােমার চোখে।
আমার উপরে
বৌদির রাগ দেখে
প্রথম প্রথম ভারি আশ্চৰ্য্য
লেগেছিল, কিছুতেই বুঝতে পারিনি। এতদিন দৃষ্টি
পড়েনি নিজের উপর, বৌদিদির বিরাগের আগুনের

মালঞ্চ
আভায় দেখতে পেলেম নিজেকে, ধরা পড়লুম নিজের
কাছে। আমার কথা বুঝতে পারছ কি?”
“তােমার ছেলেবেলাকার তলিয়ে-থাকা ভালােবাসা
নাড়া খেয়ে ভেসে উঠছে উপরের তলায়।”
“আমি কী করব বলাে? নিজের কাছ থেকে নিজে
পালাই কী করে।” বলতে বলতে রমেনের হাত চেপে
বলে।
রমেন চুপ করে রইল। আবার সে বললে “যতক্ষণ
এখানে আছি ততক্ষণ বেড়ে চলেছে আমার অন্যায়।”
“অন্যায় কার উপরে ?”
“বৌদির উপরে।”
“দেখাে সরল, আমি মানিনে ওসব পুথির কথা।
দাবীর হিসেব বিচার করবে কোন্ সত্য দিয়ে? তােমাদের
মিলন কত কালের ; তখন কোথায় ছিল বৌদি?”
“কী বলছ রমেনদা। আপন ইচ্ছের দোহাই দিয়ে
এ কী আবদারের কথা? আদিৎদার কথাও তত
ভাবতে হবে।”
“হবে বই কী। তুমি কি ভাবছ, যে-আঘাতে
চমকিয়ে দিয়েছে তােমাকে, সেই আঘাতটাই তাকে
লাগেনি।”

৬৪
মালঞ্চ
“মেন নাকি?” পিছন থেকে শােনা গেল।
“ই। দাদা।” রমেন উঠে পড়ল।
“তােমার বৌদি তােমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, আয়া
এসে এইমাত্র জানিয়ে গেল।”
রমেন চলে গেল, সরলাও তখনি উঠে যাবার
উপক্রম করলে।
আদিত্য বলে “যেয়ো না সরি, একটু বােসে।”
আদিত্যের মুখ দেখে সরলার বুক ফেটে যেতে চায়।
ঐ অবিশ্রাম কর্মরত আপনা-ভােলা মস্ত মানুষটা এতক্ষণ
যেন কেবল পাক খেয়ে বেড়াচ্ছিল হালভাঙা ঢেউখাওয়া
নৌকার মতো।
আদিত্য বলে, “আমরা দুজনে এসংসারে জীবন
আরম্ভ করেছিলেম একেবারে এক হয়ে। এত সহজ
আমাদের মিল যে এর মধ্যে কোনও ভেদ কোনও
শারণে ঘটতে পারে সেকথা মনে করাই অসম্ভব। তাই
কি নয় সরি?”
“অঙ্কুরে যা এক থাকে, বেড়ে উঠে তা ভাগ হয়ে
যায় একথা না মেনে তত থাকবার জো নেই আদিদা।”
“সে ভাগ তো বাইরে, কেবল চোখে দেখার ভাগ।
!
ধরে তো প্রাণের মধ্যে ভাগ হয় না। আজ তােমাকে

মালঞ্চ
আমার কাছ থেকে সরিয়ে নেবার ধাক্কা এসেছে।
আমাকে যে এত বেশি বাজবে এ আমি কোনােদিন
ভাবতেই পারতুম না। সরি, তুমি কি জানাে কী
ধাক্কাটা এল হঠাৎ আমাদের পরে ?”
“জানি ভাই, তুমি জানবার আগে থাকতেই ?”
সইতে পারবে সরি ?”
“সইতেই হবে।”
“মেয়েদের সহ্য করবার শক্তি কি আমাদের চেয়ে
বেশি, তাই ভাবি।”
“তােমরা পুরুষ মানুষ দুঃখের সঙ্গে লড়াই করো,
মেয়েরা যুগে যুগে দুঃখ কেবল সহই করে। চোখের
জল আর ধৈৰ্য, এ ছাড়া আর তাে কিছু সম্বল নেই
'তাদের।”
“তােমাকে আমার কাছ থেকে ছিড়ে নিয়ে যাবে
এ আমি ঘটুতে দেব না,—দেব না। এ অন্যায়, এ নিষ্ঠুর
অন্যায় !”—ব’লে মুঠো শক্ত করে আকাশে কোন
অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে প্রস্তুত হােলাে।
সরলা কোলের উপর আদিত্যের হাতখানা নিয়ে
তার উপরে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
বলে গেল যেন আপন মনে ধীরে ধীরে,-“ন্যায় অন্যায়ের

৬৬
মাল
কথা নয় ভাই, সম্বন্ধের বন্ধন যখন ফাস হয়ে ওঠে তার
ব্যথা বাজে নানা লােকের মধ্যে, টানাটানি পড়ে
নানাদিক থেকে, কাকেই বা দোষ দেব?”
“তুমি সহ্য কতে পারবে তা জানি। একদিনের
কথা মনে পড়ছে। কী চুল ছিল তােমার, এখনাে
আছে। সেই চুলের গর্ব ছিল তােমার মনে। সবাই
সেই গর্বে প্রশ্রয় দিত। একদিন ঝগড় হােলল
তােমার সঙ্গে। দুপুরবেলা বালিশের পরে চুল মেলে
দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে, আমি কঁচি হাতে অন্তত
আধহাতখানেক কেটে দিলাম। তখনি জেগে তুমি
দাড়িয়ে উঠলে, তােমার ঐ কালাে চোখ আরাে কালো
হয়ে উঠল। শুধু বললে—মনে করেছ আমাকে জব্দ
কবে ? বলে আমার হাত থেকে কঁচি টেনে নিয়ে
ঘাড় পর্যন্ত চুল কেটে ফেললে কচকচ করে। মেসাে
মশায় তােমাকে দেখে আশ্চৰ্য্য। বললেন “একী কাণ্ড।”
তুমি শান্তমুখে অনায়াসে বললে, “বড়াে গরম লাগে।”
তিনিও একটু হেসে সহজেই মেনে নিলেন।
করলেন না, ভৎসনা করলেন না, কেবল কঁচি নিয়ে
সমান করে দিলেন তােমার চুল। তােমারই তো
জ্যাঠা মশায়।”

সরলা হেসে বলে “তােমার যেমন বুদ্ধি! তুমি ভাবছ এটা আমার ক্ষমার পরিচয়? একটুকুও নয়। সেদিন তুমি আমাকে যতটা জব্দ করেছিলে তার চেয়ে অনেক বেশি জব্দ করেছিলুম আমি তােমাকে। ঠিক কিনা বলো।” “খুব ঠিক। সেই কাটা চুল দেখে আমি কেবল কঁতে বাকি রেখেছিলুম। তার পরদিন তােমাকে মুখ দেখাতে পারিনি লজ্জায়। পড়বার ঘরে চুপ করে ছিলেম বসে। তুমি ঘরে ঢুকেই হাত ধরে আমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলে বাগানের কাজে, যেন কিছুই হয়নি। আরএকদিনের কথা মনে পড়ে, সেই যেদিন ফান মাসে অকালে ঝড় উঠে আমার বিছন লাগাবার ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়েছিল তখন তুমি এসে”- “থা আর বলতে হবে না আদিদা” বলে দীর্থ- নিঃশ্বাস ফেললে,-“সে সব দিন আর আসবে না” বলেই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। আদিত্য ব্যাকুল হয়ে সরলার হাত চেপে ধরে বললে, “না যেয়াে না, এখনি যেয়াে না, কখন এক সময়ে যাবার দিন আসবে তখন, .

মালঞ্চ
বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল “কোনো-
দিন কেন যেতে হবে! কী অপরাধ ঘটেছে! ঈর্ষা।
আজ দশবৎসর সংসারযাত্রায় আমার পরীক্ষা হােলো
তারি এই পরিণাম! কী নিয়ে ঈর্ষা? তাহােলে তাে
তেইশ বছরের ইতিহাস মুছে ফেলতে হয়, যখন থেকে
তােমার সঙ্গে আমার দেখা ?”
“তেইশ বছরের কথা বলতে পারিনে ভাই, কিন্তু
তেইশ বছরের এই শেষ বেলাতে ঈর্ষার কি কোনও
কারণই ঘটেনি? সত্যি কথা তাে বলতে হবে। নিজেকে
ভুলিয়ে লাভ কী? তােমার আমার মধ্যে কোনও কথা
যেন অস্পষ্ট না থাকে।”
আদিত্য কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, বলে উঠল
“অস্পষ্ট আর রইল না। অন্তরে অন্তরে বুঝেছি তুমি
নইলে আমার জগৎ হবে ব্যর্থ। যার কাছ থেকে,
পেয়েছি তােমাকে জীবনের প্রথম বেলায়, তিনি ছাড়া
আর কেউ তােমাকে কেড়ে নিতে পারবে না।”
‘কথা বােললা না আদিদা, দুঃখ আর বাড়িয়ে
। একটু স্থির হয়ে দাও ভাবতে।”
“ভাবনা নিয়ে তাে পিছনের দিকে যাওয়া যায় না।
দুজনে যখন জীবন আরম্ভ করেছিলেম মেসােমশাইএর

পাতা মুড়িলেন।
মালঞ্চ
৬৯
কোলের কাছে, সে তাে না ভেবে চিন্তে। আজ কোনও
বকমের নিড়নি দিয়ে কি উপড়ে ফেলতে পারবে সেই
আমাদের দিনগুলিকে? তােমার কথা বলতে পারি নে,
সরি, আমার তাে সাধ্য নেই।”
“পায়ে পড়ি, দুর্বল কোরাে না আমাকে। দুর্গম
কোরাে না উদ্ধারের পথ।”
আদিত্য সরলার হাত চেপে ধরে বললে-“উদ্ধারের
পথ নেই, সে পথ আমি রাখব না, ভালােবাসি তােমাকে।
একথা আজ এত সহজ করে সত্য করে বলতে পারছি
এতে আমার বুক ভরে উঠেছে। তেইশ বছর যা ছিল
কুঁড়িতে, আজ দৈবের কৃপায় ফুটে উঠেছে। আমি
বছি, তাকে চাপা দিতে গেলে সে হবে ভীরুতা, সে
হবে অধর্ম।”
“চুপ চুপ, আর বােলল না। আজকের রাত্তিরের
মতো মাপ করে, মাপ করে আমাকে।”
‘সরি, আমিই কৃপাপাত্র, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত
আমিই তােমার ক্ষমার যােগ্য। কেন আমি ছিলুম
অন্ধ? কেন আমি তােমাকে চিনলুম না, কেন বিয়ে,
করতে গেলুম ভুল করে ? তুমি তাে করােনি, কত পাত্র
এসেছিল তােমাকে কামনা করে, সে তত আমি জানি।”

মালঞ্চ
“জ্যাঠা মশায় যে আমাকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন
তার বাগানের কাজে, নইলে হয় তাে-
“না না-তােমার মনের গভীরে ছিল তােমার
সত্য উজ্জ্বল।
না জেনেও তার কাছে
তুমি বাঁধা
রেখেছিলে নিজেকে। আমাকে কেন তুমি চেতন করে
দাওনি? আমাদের পথ কেন হােলো আলাদা?”
“থাক, থাক, যাকে মেনে নিতেই হবে তাকে না
মানবার জন্য ঝগড়া করুছ কার সঙ্গে। কী হবে মিথ্যে
ছটফট করে। কাল দিনের বেলায় যা হয় একটা
উপায় স্থির করা যাবে।”
“আচ্ছা, চুপ করলুম। কিন্তু এমন জ্যোৎস্না রাত্রে
আমার হয়ে কথা কইবে এমন কিছু রেখে যাব তােমার
কাছে।”
বাগানে কাজ করবার জন্য আদিত্যের কোমরে
একটা বুলি থাকে বাঁধা, কিছু-না-কিছু সংগ্রহ করবার
দরকার হয়। সেই ঝুলি থেকে বের করুলে ছােটো
তােড়ায় বাধা পাচটি নাগকেশরের ফুল। বলে,
“আমি জানি নাগকেশর তুমি ভালােবাসাে। তােমার
কাঁধের ঐ আঁচলের উপর পরিয়ে দেব। এই এনেছি
সেফটিপিন্।”

- - * * * *
১NABA ।।
HASTUNNIS
মাল
৭১
সরলা আপত্তি করলে না। আদিত্য বেশ একটু
সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পরিয়ে দিলে। সরলা উঠে
দাড়াল, আদিত্য সামনে দাড়িয়ে, দুই হাত ধরে, তার
মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেমন তাকিয়ে আছে
আকাশের চাঁদ। বললে, “কী আশ্চৰ্য্য তুমি সরি, কী
আশ্চৰ্য।”
সরলা হাত ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
আদিত্য অনুসরণ করলে না, যতক্ষণ দেখা যায় চুপ
করে দাড়িয়ে দেখলে। তারপরে বসে পড়ল সেই
ঘাটের বেদীর পরে। চাকর এসে খবর দিল “খাবার
এসেছে”। আদিত্য বলল “আজ আমি খাব না।”
sb:14
0:st. Cvir, s.
.

१२
মালঞ্চ
রমেন দরজার কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করলে “বৌদি
ডেকেছ কি?” নীরজা রুদ্ধ গলা পরিষ্কার করে নিয়ে
উত্তর দিলে, “এসাে।”
ঘরের সব আলো নেবানাে। জানলা খোেলা,
জ্যোৎস্না পড়েছে বিছানায়, পড়েছে নীরজার মুখে, আর
শিয়রের কাছে আদিত্যের দেওয়া সেই ল্যাবান গুচ্ছের
উপর। বাকী সমস্ত অস্পষ্ট। বালিশে হেলান দিয়ে
নীরজা অর্ধেক উঠে বসে আছে, চেয়ে আছে জানলার
। সেদিকে অর্কিডের ঘর পেরিয়ে দেখা যাচ্চে
সুপারি গাছের সার। এইমাত্র হাওয়া জেগেছে,
দুলে উঠছে পাতাগুলাে, গন্ধ আসছে আমের বােলের।
অনেক দূর থেকে শব্দ শােনা যায় মাদলের আর
গানের, গােরুর গাড়ির গাড়ােয়ানদের বস্তিতে হােলি
জমেছে।
মেঝের উপর পড়ে আছে মালাই বরফি
আর কিছু আবির। দারােয়ান দিয়ে গেছে উপহার।
বাইরে।

মালঞ্চ
৭৩
তার পরে
রােগীর বিশ্রামভঙ্গের ভয়ে সমস্ত বাড়ি আজ নিস্তব্ধ।
এক গাছ থেকে আর এক গাছে ‘পিয়ুহা’ পাখীর
চলেছে উত্তর প্রত্যুত্তর, কেউ হার মান্‌তে চায় না।
রমেন মােড়া টেনে এনে বল্ল বিছানার পাশে। পাছে
কান্না ভেঙে পড়ে এই ভয়ে অনেকক্ষণ নীরজা কোনও
কথা বললে না।
তার ঠোট কাপতে লাগল, গলার
কাছটাতে যেন বেদনার ঝড় পা খেয়ে উঠছে। কিছু
পরে সামলে নিলে, ল্যাবানম্ গুচ্ছের দুটো খসে-পড়া
ফুল দলিত হয়ে গেল তার মুঠোর মধ্যে।
কোনাে কথা না বলে একখানা চিঠি দিলে রমেনের,
হাতে। চিঠিখানা আদিত্যের লেখা। তাতে আছে-
“এতদিনের পরিচয়ের পরে আজ হঠাৎ দেখা গেল
আমার নিষ্ঠায় সন্দেহ করা সম্ভবপর হলো তােমার
পক্ষে। এ নিয়ে যুক্তি তর্ক কবুতে লজ্জা বােধ করি।
তােমার মনের বর্তমান অবস্থায় আমার সকল কথা
সকল কাজই বিপরীত হবে তােমার অনুভবে। সেই
অকারণ পীড়ন তােমার দুর্বল শরীরকে আঘাত কবে
প্রতি মুহুর্তে। আমার পক্ষে দূরে থাকাই ভালাে, যে
পর্যন্ত না তােমার মন সুস্থ হয়। এও বুঝলুম,
সরলাকে এখানকার কাজ থেকে বিদায় করে দিই,

৭৪
মালঞ্চ
ধন
এই তােমার ইচ্ছা। হয়তো দিতে হবে। ভেবে
দেখলুম তা ছাড়া অন্য পথ নেই। তবু বলে রাখি,
আমার শিক্ষা দীক্ষা উন্নতি সমস্তই সরলার জ্যাঠা-
মশায়ের প্রসাদে ; আমার জীবনে সার্থকতার পথ
দেখিয়ে দিয়েছেন তিনিই।
তারই মেহের
সরলা সর্বস্বান্ত নিঃসহায়। আজ ওকে যদি ভাসিয়ে
দিই তাে অধৰ্ম্ম হবে। তােমার প্রতি ভালােবাসার
খাতিরেও পাব না।
অনেক ভেবে স্থির করেছি, আমাদের ব্যবসায়ে
নতুন বিভাগ একটা খুলব, ফল সবজির বীজ তৈরির
বিভাগ। মাণিকতলায় বাড়িসুদ্ধ জমি পাওয়া যেতে
পারবে। সেইখানেই সরলাকে বসিয়ে দেব কাজে।
এই কাজ আরম্ভ করবার মতাে নগদ টাকা হাতে নেই
আমার। আমাদের এই বাগানবাড়ি বন্ধক রেখে
টাকা তুলতে হবে। এ প্রস্তাবে রাগ কোরাে না এই
আমার একান্ত অনুরােধ। মনে রেখাে, সরলার
জ্যাঠামশায় আমার এই বাগানের জন্যে আমাকে
মূলধন বিনাসুদে ধার দিয়েছিলেন, শুনেছি তারও কিছু
অংশ তাঁকে বার কতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়,
কাজ শুরু করে দেবার মতো বীজ, কলমের গাছ, দুর্লভ

৭৫
ফুলগাছের চারা, অর্কিড, ঘাসকাটা কল ও অন্যান্য
অনেক যন্ত্র দান করেছেন বিনামূল্যে। এত বড়াে
সুযােগ যদি আমাকে না দিতেন, আজ ত্রিশটাকা
বাসাভাড়ায় কেরাণীগিরি করূতে হােত, তােমার সঙ্গে
বিবাহও ঘটুত না কপালে। তােমার সঙ্গে কথা
হবার পর এই প্রশ্নই বার বার মনে আমার উঠেছে,
আমিই ওকে আশ্রয় দিয়েছি, না আমাকেই আশ্রয়
দিয়েছে সরল ?
এই সহজ কথাটাই ভুলেছিলেম,
তুমিই আমাকে দিলে মনে করিয়ে। এখন তােমাকেও
মনে রাখতে হবে। কখনাে ভেবাে না সরলা আমার
গলগ্রহ।
শােধ কতে পাব না
কোনােদিন, ওর দাবীরও অন্ত থাকবে না আমার পরে।
তােমার সঙ্গে কখনন যাতে ওর দেখা না হয় সে চেষ্টা
রইল মনে। কিন্তু আমার সঙ্গে ওর সম্বন্ধ যে বিচ্ছিন্ন
হবার নয় সেকথা আজ যেমন বুঝেছি এমন এর আগে
কখনাে বুঝিনি। সব কথা বলতে পারলুম না, আমার
দুঃখ আজ কথার অতীত হয়ে গেছে। যদি অনুমানে
বুঝতে পারে। তাে পারুলে, নইলে জীবনে এই
প্রথম আমার বেদনা, যা রইল তােমার কাছে
ওদের
ঋণ

মালঞ্চ
রমেন চিঠিখানা পড়লে দুইবার। পড়ে চুপ করে
রইল।
নীরজা ব্যাকুলস্বরে বললে “কিছু একটা বলে।
ঠাকুরপাে।”
রমেন তবু কিছু উত্তর দিলে না।
নীরজ। তখন বিছানার উপর লুটিয়ে পড়ে বালিশে
মাথা ঠতে লাগল, বললে, “অন্যায় করেছি, আমি
অন্যায় করেছি। কিন্তু কেউ কি তােমরা বুঝতে
পারে না কিসে আমার মাথা দিল খারাপ করে ?”
“কী কছ বৌদি? শান্ত হও, তােমার শরীর যে
যাবে ভেঙে।”
“এই ভাঙা শরীরই তাে আমার কপাল ভেঙেছে,
গুর জন্য মমতা
তঁার পরে আমার
অবিশ্বাস-এ দেখা দিল কোথা থেকে? এ যে অক্ষম
জীবন নিয়ে আমার নিজেরই উপরে অবিশ্বাস। সেই
তার নীরু আজ আছে কোথায়, যাকে তিনি কখনাে
বলতেন ‘মালিনী’, কখনাে বলতেন ‘বনলক্ষ্মী’!
কে নিলে কেড়ে
তার উপবন ? আমার কি
একটাই নাম ছিল ? কাজ সেরে আসতে যেদিন তার
দেরী হােতত আমি বসে থাকতুম তঁার খাবার আগলে,
কিসের ?

মালঞ্চ
৭৭
তখন আমাকে ডেকেছেন ‘অন্নপূর্ণা । সন্ধ্যাবেলায়
তিনি বসতেন দীঘির ঘাটে, ছােটো রূপাের থালায়
বেলফুল রাশ করে তার উপরে পান সাজিয়ে দিতেম
তঁাকে, হেসে আমাকে বলতেন, “তাম্বুলকরঙ্কবাহিনী।
সেদিন সংসারের সব পরামর্শই আমার কাছ থেকে
নিয়েছেন তিনি। আমাকে নাম দিয়েছিলেন ‘গৃহসচিব,
কখনাে ধা, হোন্ সেক্রেটারি।
আমি যেন সমুদ্রে
এসেছিলেম ভরা নদী, ছড়িয়েছিলেম নানা শাখা নানা
দিকে, সব শাখাতেই আজ একদণ্ডে জল গেল শুকিয়ে,
বেরিয়ে পড়ল পাথর।”
“বৌদি আবার তুমি সেরে উঠবে—তােমার আসন
আবার অধিকার কবে পূর্ণশক্তি দিয়ে।”
“মিছে আশা দিয়াে না ঠাকুরপাে। ডাক্তার কী বলে
সে আমার কানে আসে। সেইজন্যেই এতদিনের সুখের
সংসারকে এত করে আঁকড়ে ধরূতে আমার এই
নৈরাশ্যের কাঙালপনা।”
“দরকার কী বৌদি? আপনাকে এতদিন তত ঢেলে
দিয়েছ তােমার সংসারে। তার চেয়ে বড়ো কথা আর
কিছু আছে কি? যেমন দিয়েছ তেমনি পেয়েছ, এত
পাওয়াই বা কোন্ মেয়ে পায়? যদি ডাক্তারের কথা

মালঞ্চ
সত্যি হয়, যদি যাবার দিন এসেই থাকে, তাহােলে যাকে
বড়ো করে পেয়েছ, তাকে বড় করে ছেড়ে যাও।
এতদিন যে গৌরবে কাটিয়েছ সে গৌরবকে খাটো করে
দিয়ে যাবে কেন?
এ বাড়িতে তােমার শেষ স্মৃতিকে
যাবার সময় নূতন মহিমা দিয়ে।”
“বুক ফেটে যায় ঠাকুরপাে, বুক ফেটে যায়। আমার
এতদিনের আনন্দকে ফেলে রেখে হাসিমুখেই চলে যেতে
পারতুম। কিন্তু কোনওখানে কি এতটুকু ফাক থাকবে
যেখানে আমার জন্যে একটা বিরহের দীপ টিমটিম
করেও জ্বলবে ? একথা ভাবতে গেলে যে মরুতেও ইচ্ছে
করে না। ঐ সরলা সমস্তটাই দখল করবে একেবারে
পুরােপুরি, বিধাতার এই কি বিচার ?”
“সত্যি কথা বলব বৌদি, রাগ কোরো না। তােমার
কথা ভালাে বুঝতেই পারিনে। যা নিজে ভােগ কতে
পাবে না, তাও প্রসন্ন মনে দান কতে পারে না যাকে
এতদিন এত দিয়েছ ? তােমার ভালােবাসার উপর এত
বড় খোটা থেকে যাবে ? তােমার সংসারে তােমারই
শ্রদ্ধার প্রদীপ তুমি আপনিই আজ চুরমার করতে
'বসেছ। তার ব্যথা তুমি চলে যাবে এড়িয়ে, কিন্তু চিরদিন
সে আমাদের বাজবে যে। মিনতি করে বলছি তােমার

মাল
বল।
সারা জীবনের দাক্ষিণ্যকে শেষ মুহুর্তে কৃপণ করে
যেয়ো না।”
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল নীরজা। চুপ করে
বসে রইল রমেন, সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা মাত্র কলে না,
কান্নার বেগ থেমে গেলে নীরজা বিছানায় উঠে
বললে “আমার একটি ভিক্ষা আছে ঠাকুরপাে।”
“হুকুম করে বৌদি।”
বলি শোনাে। যখন চোখের জলে ভিতরে ভিতরে
বুক ভেসে যায় তখন ঐ পরমহংসদেবের ছবির দিকে
তাকিয়ে থাকি। কিন্তু ওঁর বাণী তো হৃদয়ে পৌছয়
না । আমার মন বিশ্রী ছােটো। যেমন করে পারো
আমাকে গুরুর সন্ধান দাও। না হােলে কাটবে না বন্ধন।
আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ব।
যে সংসারে সুখের জীবন
কাটিয়েছি, মরার পরে সেইখানেই দুঃখের হাওয়ায়
যুগযুগান্তর কেঁদে কেঁদে বেড়াতে হবে; তার থেকে উদ্ধার
করাে আমাকে, উদ্ধার করে।”
“তুমি তাে জানাে বৌদি শাস্ত্রে যাকে বলে পাষণ্ড,
আমি তাই। কিছু মানিনে। ভাস মিত্তির অনেক
টানাটানি করে একবার আমাকে তার
কাছে নিয়ে গিয়েছিল। বাঁধা পড়বার আগে

মালঞ্চ
দিলেম দৌড়। জেলখানার মেয়াদ আছে, এ বাঁধন
বেমেয়াদি।”
“ঠাকুরপাে তােমার মন জোরালো, তুমি কিছুতে
বুঝবে না আমার বিপদ। বেশ জানি যতই আঁকুবাকু
কছি ততই ডুবছি অগাধ জলে, সামলাতে পাছিনে।
“বৌদি, একটা কথা বলি শােনাে। যতক্ষণ মনে
করবে তােমার ধন কেউ কেড়ে নিয়ে যাচ্চে ততক্ষণ
বুকের পাঁজর জ্বলবে আগুনে পাবে না শান্তি। কিন্তু
স্থির হয়ে বসে বলো দেখি একবার,‘দিলেম আমি।
সকলের চেয়ে যা দুৰ্ম্মল্য তাই দিলেম তাকে যাকে
সকলের চেয়ে ভালােবাসি’,সব ভার যাবে এক মুহূর্তে,
নেমে।
মন ভরে উঠবে আনন্দে। গুরুকে দরকার
নেই। এখনি বলে,—দিলেম, দিলেম, কিছুই হাতে
রাখলেম না, আমার সব কিছু দিলেম, নিৰ্ম্মক্ত হয়ে
নিৰ্ম্মল হয়ে যাবার জন্যে প্রস্তুত হলেম, কোনাে দুঃখের
গ্রন্থি জড়িয়ে রেখে গেলেম না সংসারে।”
“আহা, বলো, বলো ঠাকুরপাে, বার বার করে
শােনাও আমাকে। কে এ পর্যন্ত যা কিছু দিতে
-পেরেছি তাতেই পেয়েছি আনন্দ, আজ যা দিতে
পারছিনে, তাতেই এত করে মারছে। দেবো, দোবো,
-

মালঞ্চ
দেবে সব দেবব আমার,-আর দেরি নয়, এখনি।
তুমি তাকে ডেকে নিয়ে এসাে।”
“আজ নয় বৌদি, কিছুদিন ধরে মনটাকে বেঁধে
নাও, সহজ হােক্ তােমার সঙ্কল্প।”
“না, না, আর সইতে পারছিনে।
যখন থেকে
বলে গেছেন এ বাড়ি ছেড়ে জাপানী ঘরে গিয়ে থাকবেন
তখন থেকে এ শয্যা আমার কাছে চিতাশয্যা হয়ে
উঠেছে। যদি ফিরে না আসেন এ রাত্তির কাটুবে না,
বুক
ফেটে মরে যাব। অমনি ডেকে এনে সরলাকে,
আমি শেল উপড়ে ফেলব বুকের থেকে, ভয় পাব না,
এই তােমাকে বলছি নিশ্চয় করে।”
“সময় হয়নি, বৌদি; আজ থাক্।”
“সময় যায় পাছে এই ভয়। এক্ষণি ডেকে
আনাে।” পরমহংসদেবের ছবির দিকে তাকিয়ে দুহাত
জোড় করে বললে, “বল দাও ঠাকুর, বল দাও, মুক্তি
দাও মতিহীন অধম নারীকে। আমার দুঃখ আমার
ভগবানকে ঠেকিয়ে রেখেছে, পূজা অর্চনা সব গেল
আমার। ঠাকুরপাে একটা কথা বলি, আপত্তি
কোরাে না।”
“কী বলল।”

৮২
মাল
“একবার আমাকে ঠাকুরঘরে যেতে দাও দশ
মিনিটের জন্যে, তাহােলে আমি বল পাব কোনও ভয়
থাকবে না।”
“আচ্ছা, যাও, আপত্তি করব না।”
আয়া।”
“কী খোখী।”
“ঠাকুর ঘরে নিয়ে চল আমাকে।”
“সে কী কথা। ডাক্তারবাবু
“ডাক্তারবাবু যমকে ঠেকাতে পারবে না আর
আমার ঠাকুরকে ঠেকাবে ?”
“আয়া তুমি ওঁকে নিয়ে যাও ভয় নেই, ভালােই
হবে।”
আয়াকে অবলম্বন করে নীরজা যখন চলে গেল
এমন সময় আদিত্য ঘরে এল।
আদিত্য জিজ্ঞাসা করলে “এ কী, নীরু ঘরে নেই
কেন?”
“এখনি আসবেন, তিনি ঠাকুর ঘরে গেছেন।”
“ঠাকুর ঘরে? ঘর তত কাছে নয়। ডাক্তারের
নিষেধ আছে যে।”
নাে না দাদা। ডাক্তারের ওষুধের চেয়ে কাজে

মালঞ্চ
লাগবে। একবার কেবল ফুলের অঞ্জলি দিয়ে প্রণাম
করেই চলে আসবেন।”
নীরজাকে চিঠি লিখে যখন পাঠিয়ে দিয়েছিল তখন
আদিত্য স্পষ্ট জাত না যে অদৃষ্ট তার জীবনের পটে
প্রথম যে লিপিখানি অদৃশ্য কালিতে লিখে রেখেছে,
বাইরের তাপ লেগে সেটা হঠাৎ এতখানি উঠবে উজ্জ্বল
হয়ে। প্রথমে ও সরলাকে বলতে এসেছিল—আর উপায়
নেই, ছাড়াছাড়ি কতে হবে। সেই কথা বলবার
বেলাতেই ওর মুখ দিয়ে বেরােলো উল্টো কথা।
তারপরে জ্যোৎস্না রাত্রে ঘাটে বসে বসে, বারবার করে
বলেছে, জীবনের সত্যকে আবিষ্কার করেছে বিলম্বে,
তাই বলেই তাকে অস্বীকার করতে পারে না। ওর তাে
অপরাধ নেই, লজ্জা করবার নেই কিছু। অন্যায় তবেই
হবে, যদি সত্যকে গােপন কতে যায়। কবে না
গােপন, নিশ্চয় স্থির ; ফলাফল যা হয় তা হােক। এ
কথা আদিত্য বেশ বুঝেছে যে, যদি তার জীবনের কেন্দ্র
থেকে কৰ্ম্মের ক্ষেত্র থেকে সরলাকে আজ সরিয়ে দেয়,
তবে সেই একাকিকতায়, সেই নীরসতায় ওর সমস্ত নষ্ট
হয়ে যাবে, ওর কাজ পৰ্যন্ত যাবে বন্ধ হয়ে।
“রমেন,তুমি আমাদের সব কথা জানাে,আমি জানি।”

৮৪
মাল
স্থা জানি।”
“আজ চুকিয়ে দেবাে সব,আজ পরদা ফেলব উঠিয়ে।”
“তুমি তাে একলা নও দাদা। বােঝা ঘাড় থেকে
ঝেড়ে ফেললেই তাে হােলল না। বৌদি রয়েছেন
ওদিকে।
সংসারের গ্রন্থি জটিল।”
“তােমার বৌদির আর আমার মধ্যে মিথ্যাকে খাড়া
করে রাখতে পাব না। বাল্যকাল থেকে সরলার সঙ্গে
আমার যে সম্বন্ধ তার মধ্যে কোনো অপরাধ নেই সে
কথা মানে তাে?”
“মানি বই কি।”
“সেই সহজ সম্বন্ধের তলায় গভীর ভালােবাসা ঢাকা
ছিল, জানতে পারিনি, সে কি আমাদের দোষ ?”
“কে বলে দোষ ?”
“আজ সেই কথাটাই যদি গােপন করি তাহােলই
মিথ্যাচরণের অপরাধ হবে। আমি মুখ তুলেই বলব।”
“গােপনই বা কতে যাবে কী জন্যে, আর সমারােহ
করে প্রকাশই বা কবে কেন? বৌদিদির যা জানার
তা তিনি আপনিই জেনেছেন।
আর কটা দিন পরেই
তাে এই পরম দুঃখের জটা আপনিই এলিয়ে যাবে।
তুমি তা নিয়ে মিথ্যে টানাটানি কোরাে না। বৌদি যা

মালঞ্চ
বলতে চান শােননা, তার উত্তরে তােমারাে যা বলা
উচিত আপনিই সহজ হয়ে যাবে।”
নীরজাকে ঘরে আসতে দেখে রমেন বেরিয়ে গেল।
নীরজা ঘরে ঢুকেই আদিত্যকে দেখেই মেঝের
উপরে লুটিয়ে পড়ে পায়ে মাথা রেখে অশ্রুগদগদ কণ্ঠে
বললে “মাপ করে, মাপ করাে আমাকে, অপরাধ
করেছি।
এত
দিন পরে ত্যাগ কোরাে না আমাকে,
দূরে ফেলাে না আমাকে।” আদিত্য দুই হাতে তাকে
তুলে ধরে বুকে করে নিয়ে আস্তে আস্তে বিছানায়
ইয়ে দিলে। বললে, “নীরু, তােমার ব্যথা কি আমি
বুঝিনে।” নীরজার কান্না থামতে চায় না। আদিত্য
আস্তে আস্তে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
নীরজা আদিত্যের হাত টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধলে,
বললে, “সত্যি বলে আমাকে মাপ করেছ। তুমি প্রসঙ্গ
হােলে মরার পরেও আমার মুখ থাকবে না।”
“তুমি তো জানাে নীরু, মাঝে মাঝে মনান্তর হয়েছে
আমাদের মধ্যে,কিন্তু মনের মিল কি ভেঙেছে তা নিয়ে।”
“এর আগে তো কোনাে দিন বাড়ি ছেড়ে চলে
যাওনি তুমি। এবারে গেলে কেন? এত নিষ্ঠুর
তােমাকে করেছে কিসে?”

মালঞ্চ
“অন্যায় করেছি নীরু মাপ করতে হবে।”
“কী বলাে তার ঠিক নেই। তােমার কাছ থেকেই
আমার সব শাস্তি, সব পুরস্কার। অভিমানে তােমার
বিচার কতে গিয়েই তাে আমার এমন দশা ঘটেছিল।
–ঠাকুরপােকে বলেছিলুম, সরলাকে ডেকে আতে,
এখনাে আনলেন না কেন?”
সরলাকে ডেকে আবার কথায় ধক্ করে ধী লাগল
আদিত্যের মনে। সমস্যাকে অন্তত আজকের মতো
কোনাে ক্রমে সরিয়ে রাখতে পারুলে সে নিশ্চিন্ত
হয়। বললে, “রাত হয়েছে এখন থাক।” এমন সময়
নীরজা বলে উঠল, “ঐ শােনাে আমার মনে হচ্চে ওর
অপেক্ষা করছে দরজার বাইরে। ঠাকুরপাে ঘরে এসাে
তােমরা।”
সরলাকে নিয়ে রমেন ঘরে ঢুল। নীরজা বিছানা
ছেড়ে উঠে দাড়াল। সরলা প্রণাম কলে নীরজার পা
ছুয়ে। নীরজা বললে “এসাে বােন আমার কাছে এসাে।”
সরলার হাত ধরে বিছানায় বসালাে। বালিশের
নীচে থেকে গয়নার কেস টেনে নিয়ে একটি মুক্তোর
মালা বের করে সরলাকে পরিয়ে দিলে। বললে “একদিন ,
ইচ্ছে করেছিলুম, যখন চিতায় আমার দাহ হবে এই

মালঞ্চ
৮৭
মালাটি যেন আমার গলায় থাকে। কিন্তু তার চেয়ে
এই ভালাে। আমার হয়ে মালা তুমিই গলায় পরে
থাকো, শেষ দিন পর্যন্ত। বিশেষ বিশেষ দিনে এ মালা
কতবার পরেছি সে তােমার দাদা জানেন। তোমার
গলায় থাকলে সেই দিনগুলি ওঁর মনে পড়বে।”
“অযােগ্য, আমি দিদি, অযােগ্য, কেন আমাকে
লজ্জা দিচ্চ।”
নীরজা মনে করেছিল, আজ তার সৰ্ব্বদানযজ্ঞের এও
একটা অঙ্গ। কিন্তু তার অন্তরতর মনের জ্বালা যে এই
দানের মধ্যে দীপ্ত হয়ে প্রকাশ পেল সে কথা নিজেও
স্পষ্ট বুঝতে পারেনি। ব্যাপারটা সরলাকে যে কতখানি
বাজল তা অনুভব করলে আদিত্য। বললে ঐ মালাটা
আমাকে দাও না সরলা। ওর মূল্য আমার কাছে
যতখানি, এমন আর কারাে কাছে নয়। ও আমি আর
কাউকে দিতে পারব না।” নীরজা বললে “আমার
কপাল। এত করেও বােঝাতে পারলুম না বুঝি। সরলা,
শুনেছিলেম এই বাগান থেকে তােমার চলে যাবার কথা
হয়েছিল। সে আমি কোনাে মতেই ঘটুতে দেবাে না।
তােমাকে আমি আমার সংসারের যা-কিছু সমস্তর সঙ্গে
রাখব বেঁধে, ঐ হারটি তারই চিহ্ন। এই আমার বাঁধন

৮
মাল
তােমার হাতে দিয়েছিলাম যাতে নিশ্চিন্ত হয়ে মরুতে
পারি।”
“ভুল কছ দিদি,আমাকে বাঁধতে চেয়াে না, ভালো
হবে না তাতে।”
“সে কী কথা?”
“আমি সত্যি কথাই বলব।
এতদিন আমাকে
বিশ্বাস কতে পারতে। কিন্তু আজ আমাকে বিশ্বাস
কোরাে না, এই আমি তােমাদের সকলের সামনে
বলছি। ভাগ্য যে দান থেকে আমাকে বঞ্চনা করেছে,
কাউকে বঞ্চনা করে সে আমি নেব না। এই রইল
তােমার পায়ে আমার প্রণাম। আমি চললেম।
অপরাধ আমার নয়, অপরাধ সেই আমার ঠাকুরের
যাঁকে সরল বিশ্বাসে রােজ দুবেলা পূজা করেছি। সেও
আজ আমার শেষ হােলা।”
এই বলে সরলা দ্রুতপদে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদিত্য নিজেকে ধরে রাখতে পাল না, সেও গেল
চলে।
“ঠাকুরপো, এ কী হােলো ঠাকুরপাে।
ঠাকুরপাে একটা কথা কও।”
“এই জন্যেই বলেছিলেম আজ রাত্রে ডেকো না।”

মালঞ্চ
“কেন মন খুলে আমি তাে সবই দিয়েছি।
তাও বুঝল না?”
“বুঝেছে বই কি। বুঝেছে যে মন তােমার খােলে
নি। সুর বাজল না।”
“কিছুতে বিশুদ্ধ হােলাে না আমার মন। এত মার
খেয়েও!
কে বিশুদ্ধ করে দেবে?
ওগাে সন্ন্যাসী,
আমাকে বাঁচাও না। ঠাকুরপাে, কে আমার আছে কার
কাছে যাব আমি?”
“আমি আছি বৌদি। তােমার দায় আমি নেব।
তুমি এখন ঘুমােও।”
“ঘুমােব কেমন করে? এ বাড়ি থেকে আবার যদি
উনি চলে যান তাহলে মরণ নইলে আমার ঘুম
হবে না।”
“চলে উনি যেতে পারবেন না; সে ওঁর ইচ্ছায় নেই,
শক্তিতে নেই। এই নাও ঘুমের ওষুধ, তােমাকে ঘুম
পাড়িয়ে তবে আমি যাব।”
“যাও ঠাকুরপাে তােমরা যাও, ওরা দুজনে কোথায়
গেল দেখে এসাে, নইলে আমি নিজেই যাব, তাতে
আমার শরীর ভাঙে ভাঙুক।”
আচ্ছা, আচ্ছা, আমি যাচ্ছি।”

মাদক
আদিত্য ওর সঙ্গে এল দেখে সরলা বললে, “কেন
এলে ? ভালাে করেনি। ফিরে যাও। আমার সঙ্গে
তােমাকে এমন করে দেবে না জড়াতে।”
“তুমি দেবে কি না সে তত কথা নয়, জড়িয়ে যে
গেছেই। সেটা ভালাে হােক্ বা মন্দ হােক্ তাতে
আমাদের হাত নেই।”
“সে সব কথা পরে হবে, ফিরে যাও রােগীকে শান্ত
করাে গে।”
“আমাদের সেই বাগানের আর একটা শাখা বাড়বে
সেই কথাটা—”
“আজ থাক্। আমাকে দু-চার দিন ভাবার সময়
দাও, এখন আমার ভাববার শক্তি নেই।”
রমেন এসে বললে, “যাও, দাদা, বৌদিকে ওষুধ
খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও গে, দেরি কোরো না।
কিছুতেই কোনো কথা কইতে দিয়াে না ওঁকে। রাত
হয়ে গেছে।”
আদিত্য চলে গেলে পর সরলা বললে—“শ্ৰদ্ধানন্দ
পার্কে কাল তােমাদের একটা সভা আছে না ?”

মালঞ্চ
৯১
“আছে।”
“তুমি যাবে না?”
“যাবার কথা ছিল। কিন্তু এবার আর যাওয়া
হােলাে না।”
“কেন?”
“সে কথা তােমাকে বলে কী হবে?”
“তোমাকে ভীতু বলে সবাই নিলে কবে।”
“যারা আমায় পছন্দ করে না তারা আমায় নিলে
কবে বই কি।”
কথা,
“তাহােলে শােনাে
তােমাকে মুক্তি দেবে।
আমার
আমি
সভায় তােমাকে যেতেই
“আর একটু স্পষ্ট করে বলে।”
“আমিও যাব, সভায় নিশেন হাতে নিয়ে।”
“বুঝেছি।”
“পুলিসে বাধা দেয় সেটা মানতে রাজি আছি কিন্তু
তুমি বাধা দিলে মা না।”
“আচ্ছা বাধা দেবাে না।”
“এই রইল কথা।”
“ইল।”

মাল
“আমরা দুজন একসঙ্গে যাব কাল বিকেল পাঁচটার
সময়।”
“হ যাব, কিন্তু ঐ দুর্জনরা তারপরে আমাদের আর
এক সঙ্গে থাকতে দেবে না।”
এমন সময় আদিত্য এসে পড়ল। সরল জিজ্ঞাসা
কলে, “ওকী, এখনি এলে যে বড়াে ?”
“দুই একটা কথা বলতে বলতেই নীরজা ক্লান্ত হয়ে
ঘুমিয়ে পড়ল, আমি আস্তে আস্তে চলে এলুম।”
রমেন বললে “আমার কাজ আছে
আছে চললুম।”
সরলা হেসে বললে,
“বাস। ঠিক
ভুলাে না।”
“কোনাে ভয় নেই।
চেনা জায়গা।” এই বলে
সে চলে গেল।

মালঞ্চ
সরলা বসেছিল, সে উঠে দাড়াল, বললে, “যে সব
কথা বলবার নয় সে আমাকে বােলল না আজ, পায়ে
পড়ি।”,
“কিছু বলব না ভয় নেই।”
“আচ্ছা তাহােলে আমিই কিছু বলতে চাই শােননা,
বলাে কথা রাখবে।
“অরক্ষণীয় না হােলে কথা নিশ্চয় রাখব তুমি তা
জানাে।”
“বুঝতে বাকী নেই আমি কাছে থাকলে একেবারেই
চলবে না। এই সময়ে দিদির সেবা করূতে পালে
খুসী হতুম, কিন্তু সে আমার ভাগ্যে সইবে না।
আমাকে অনুপস্থিত থাকতেই হবে। একটু থামাে,
কথাটা শেষ কতে দাও। শুনেইছ ডাক্তার বলেছেন
বেশি দিন ওঁর সময় নেই। এইটুকুর মধ্যে ওঁর মনের
কাটা তােমাকে উপড়ে দিতেই হবে। এই কয়দিনের
মধ্যে আমার ছায়া কিছুতেই পড়তে দিয়ো না ওঁর
জীবনে।”

৯৪
মাল
“আমার মন থেকে আপনিই ছায়া যদি পড়ে,
তবে কী করতে পারি।”
“না না নিজের সম্বন্ধে অমন অশ্রদ্ধার কথা বােলো।
। সাধারণ বাঙালী ছেলের মতাে ভিজে মাটির
ততলে মন কি তােমার ? কক্ষণাে না, আমি তােমাকে
জানি।”
আদিত্যের হাত ধরে বললে, “আমার হয়ে এই
ব্রতটি তুমি নাও। দিদির জীবনান্তকালের শেষ ক’টা
দিন দাও তােমার দাক্ষিণ্যে পূর্ণ করে। একেবারে
ভুলিয়ে দাও যে আমি এসেছিলেম ওঁর সৌভাগ্যের ভরা
ঘট ভেঙে দেবার জন্যে।”
আদিত্য চুপ করে দাড়িয়ে রইল।
“কথা দাও ভাই।”
“দেবাে কিন্তু তােমাকেও একটা কথা দিতে হবে।
বলাে, রাখবে।”
“তােমার সঙ্গে আমার তফাৎ এই যে, আমি যদি
তােমাকে কিছু প্রতিজ্ঞা করাই সেটা সাধ্য, কিন্তু তুমি
যদি করাও সেটা হয়তাে অসম্ভব হবে।”
না হবে না।”
“আচ্ছা বলাে।”

মাল
৯৫৮
“যে কথা মনে মনে বলি সে কথা তােমার কাছে
মুখে বলতে অপরাধ নেই! তুমি যা বলছ তা নেব
এবং সেটা বিনা ত্রুটিতে পালন করা সম্ভব হবে যদি
নিশ্চিত জানি একদিন তুমি পূর্ণ কবে আমার সমস্ত
শূন্যতা। কেন চুপ করে রইলে?”
“জানিনে
যে ভাই প্রতিজ্ঞা পালনে কী বিপ্ন
একদিন ঘটতে পারে।”
“বিপ্ন তােমার অন্তরে আছে কি? সেই কথাটা
বলো আগে।”
“কেন আমাকে দুঃখ দাও? তুমি কি জানাে না
এমন কথা আছে ভাষায় বললে যার আলাে যায়
নিভে।”
“আচ্ছা এই শুলুম, এই শুনেই চললুম কাজে।”
“আর ফিরে তাকাবে না এখন ?”
“না, কিন্তু অব্যক্ত প্রতিজ্ঞার শিলমােহর করে নিতে
ইচ্ছা কছে তােমার মুখটিতে।”
“যা সহজ তাকে নিয়ে জোর কোরাে না। থাক্‌
এখন।”
“আচ্ছা, তবে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, এখন কী
কবে, থাকবে কোথায়?”

৯৬
মাল
“সে ভার নিয়েছেন রমেনদা।”
রমেন তােমাকে আশ্রয় দেবে ? সে লক্ষ্মীছাড়ার
চালচুলাে আছে কি?”
“ভয় নেই তােমার, পাকা আশ্রয় তার নিজের
সম্পত্তি নয়, কিন্তু বাধা ঘটবে না।”
“আমি জানতে পাব তাে?”
“নিশ্চয় জাতে পাবে কথা দিয়ে যাচ্ছি; কিন্তু
ইতিমধ্যে আমাকে দেখবার জন্যে একটুও ব্যস্ত হােতে
পাবে না এই সত্য করাে।”
“তােমারাে মন ব্যস্ত হবে না?”
“যদি হয় অন্তর্যামী ছাড়া আর কেউ জানতে
পাবে না।”
“আচ্ছা, কিন্তু যাবার সময় ভিক্ষার পাত্র একেবারে
শূন্য রেখেই বিদায় দেবে ?”
পুরুষের চোখ ছল ছল করে উঠল। সরলা কাছে
এসে নীরবে মুখ তুলে বলে।

মালঞ্চ
“ওর সব তাতেই গায়ে-পড়া বাহাদুরী। বেহায়া-
গিরির একশেষ। বাগান থেকে আরম্ভ করে জেলখানা
পর্যন্ত। মতে মতেও দেমাক ঘােচে না।”
আয়ার মনে পড়ল জাফরাণি রঙের শাড়ীর কথা।
বললে, “কিন্তু খোখি, দিদিমণির মনখানা দরাজ।”
কথাটা নীরজাকে মস্ত ধাক্কা দিলে ।
সে যেন হঠাৎ
জেগে উঠে বললে “ঠিক বলেছিস রােশনি। ঠিক
বলেছি। । ভুলে গিয়েছিলুম। শরীর খারাপ থাকলেই
মন খারাপ হয়। আগের থেকে যেন নীচু হয়ে গেছি।
ছি ছি নিজেকে মারতে ইচ্ছে করে। সরলা খাঁটি মেয়ে,
মিথ্যে কথা জানে না। অমন মেয়ে দেখা যায় না ।
আমার চেয়ে অনেক ভালাে। শীগগির আমাদের
গণেশ সরকারকে ডেকে দে।” আয়া চলে গেলে ও
পেন্সিল নিয়ে একটা চিঠি লিখতে বসল। গণেশ এল।
তাকে বললে, “চিঠি পৌছিয়ে দিতে পারবে জেলখানায়
সরলা দিদিকে ?” গণেশ গাঙ্গুলীর কৃতিত্বের অভিমান
ছিল। বললে, “পাব। কিছু খরচ লাগবে। কিন্তু
কী লিখলে মা শুনি, কেননা পুলিসের হাত দিয়ে যাবে
চিঠিখানা। নীরজা পড়ে শােনালে, “ধন্য তােমার,
মহত্ত্ব। এবার জেলখানা থেকে বেরিয়ে যখন আসবে,

মালঞ্চ
তখন দেখবে তােমার পথের সঙ্গে আমার পথ মিলে
গেছে।” গণেশ বললে “ঐ যে পথটার কথা লিখেছ
ভালাে শশানাচ্চে না। আমাদের উকীলবাবুকে দেখিয়ে
ঠিক করা যাবে।”
গণেশ চলে গেল। নীরজা মনে মনে রমেনকে
প্রণাম করে বললে, “ঠাকুরপাে, তুমি আমার গুরু।”

পাতা মুড়িৰেন ১
মালঞ্চ
১০
আদিত একটা পেয়ালায় ওষুধ নিয়ে ঘরে এসে
প্রবেশ করলে।
নীরজা বললে, “এ আবার কী ?”
আদিত্য বললে “ডাক্তার বলে গেছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়
ওষুধ খাওয়াতে হবে।”
“ওষুধ খাওয়াবার জন্য বুঝি আর পাড়ায় লােক
জুটল না। না হয় দিনের বেলাকার জন্যে একজন নার্স
রেখে দাও না, যদি মনে এতই উদ্বেগ থাকে।”
“সেবার ছলে কাছে আসবার সুযােগ যদি পাই
ছাড়ব কেন?”
“তার চেয়ে কোনাে সুযােগে তােমার বাগানের
কাজে যদি যাও তত ঢের বেশি খুসি হব। আমি
পড়ে আছি, আর দিনে দিনে বাগান নষ্ট হয়ে
যাচ্ছে।”

১০২
মাল
এখন মন
“হােক না নষ্ট। সেরে ওঠে। আগে, তারপর
সেদিনকার মতাে দুজনে মিলে কাজ কব।”
“সরলা চলে গেছে, তুমি একলা পড়েছ, কাজে মন
যাচ্ছে না। কিন্তু উপায় কী? তাই বলে লােকসান
কতে দিয়াে না।”
“লােকসানের কথা আমি ভাবছিনে নীরু। বাগান
করাটা যে আমার ব্যবসা সে কথা এতদিন তুমিই
'ভুলিয়ে রেখেছিলে, কাজে তাই সুখ ছিল।
যায় না।”
“অমন করে আক্ষেপ কছ কেন ? বেশতো কাজ
কছিলে এই সেদিন পর্যন্ত। কিছু দিনের জন্যে যদি
বাধা পড়ে তাই নিয়ে এত ব্যাকুল হােয়য়া না।”
“পাখাটা কি চালিয়ে দেবাে?”
“বাড়াবাড়ি কোরো না তুমি, এ সব কাজ তােমাদের
এতে আমাকে আরাে ব্যস্ত করে তােলে। যদি
কোনাে রকম করে দিন কাটাতে চাও তো তােমাদের
তাে হর্টিকালচরিস্ট ক্লাব আছে।”
“তুমি যে রঙীন লিলি ভালােবাসো, বাগানে অনেক
খুজে একটাও পাই নি। এবারে ভালাে বৃষ্টি হয়নি
বলে গাছগুলোর তেজ নেই।”
নয়।

শাল
“কী তুমি মিছিমিছি বহু। তার চেয়ে হলাকে
ডেকে দাও, আমি শুয়ে শুয়েই বাগানের কাজ কব।
তুমি কি বলতে চাও আমি শয্যাগত বলেই আমার
বাগানও হবে শয্যাগত? শােননা আমার কথা। শুকনাে
সীজ ফুলের গাছগুলাে উড়িয়ে ফেলে সেখানে জমি
তৈরি করিয়ে নাও। আমার সিঁড়ির নীচের ঘরে
শর্ষের খােলের বস্তা আছে। হলার কাছে আছে তার
চাবী।”
“তাই নাকি, হল তো এতদিন কিছুই বলেনি।”
“বলতে ওর রুচবে কেন ? ওকে কি তােমরা কম
হেনস্তা করেছ ? কঁাচা সাহেব এসে প্রবীণ কেরাণীকে
যে রকম গ্রাহ্য করে না সেই রকম আর কী।”
“হলা মালী সম্বন্ধে সত্য কথা বলতে যদি চাই তবে
সেটা অপ্রিয় হয়ে উঠবে।”
“আচ্ছা, আমি এই বিছানায় পড়ে থেকেই ওকে
দিয়ে কাজ করাব, দেখবে দুদিনেই বাগানের চেহারা
ফেরে কি না। বাগানের ম্যাট। আমার কাছে দিয়ে।
আর আমার বাগানের ডায়রীটা। আমি ম্যাপে
পেন্সিলের দাগ দিয়ে সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবে।”
“আমার তাতে কোনাে হাত থাকবে না।”

১০৪
মালঞ্চ
“না। যাবার আগে এ বাগানে সম্পূর্ণ আমার ছাপ
মেরে দেবে। বলে রাখছি রাস্তার ধারের ঐ বল
পাগুলাে আমি একটাও রাখব না।
ওখানে ঝাউ,
গাছের সার লাগিয়ে দেবাে। অমন করে মাথা নেড়াে
। হয়ে গেলে তখন দেখো। তােমাদের ঐ লন্টা
আমি রাখব না, ওখানে মাৰ্বলের একটা বেদী বাঁধিয়ে
দেবাে।”
“বেদীটা কি ও জায়গায় মানাবে ? একটু যেন
যাকে বলে শস্তা নবাবী।”
“চুপ করাে। খুব মানাবে। তুমি কোনাে কথা
বলতে পাবে না। কিছুদিনের জন্যে এ বাগানটা
হবে একলা আমার, সম্পূর্ণ আমার।
তারপর সেই
আমার বাগানটা আমি তােমাকে দিয়ে যাব।
ছিলে আমার শক্তি গেছে। দেখিয়ে দেবাে কী কতে
পারি। আরাে তিনজন মালী আমার চাই, আর মজুর
লাগবে জন ছয়েক। মনে আছে একদিন তুমি
বলেছিলে বাগান সাজিয়ে তােলার শিক্ষা আমার
হয়েছে কি না তার পরীক্ষা দিয়ে যাব।
ডােমাকে মনে রাখতেই হবে যে এ আমার বাগান,
আমারই বাগান, আমার স্বত্ব কিছুতে যাবে না।”
হয়নি।

মালঞ্চ
“আচ্ছা সেই ভালো, তাহােলে আমি কী করব?”
“তুমি তােমার দোকান নিয়ে থাকো; সেখানে
তােমার আপিসের কাজ তাে কম নয়।”
“তােমাকে নিয়ে থাকাও তাহোলে নিষিদ্ধ ?”
“হাঁ, সৰ্ব্বদা কাছে থাবার মতাে সে আমি আর
নেই—এখন আমি কেবল আর একজনকে মনে করিয়েই
দিতে পারি—তাতে লাভ কী?”
“আচ্ছা বেশ। যখন তুমি আমাকে সহ্য করতে
পাবে তখনি আস্ব। ডেকে পাঠিয়ে আমাকে।
আজ সাজিতে তােমার জন্য গন্ধরাজ এনেছি, রেখে যাই
তােমার বিছানায়, কিছু মনে কোরােনা।” বলে
আদিত্য উঠে পড়ল।
নীরজা হাত ধরে বললে “না যেয়াে না, একটু
বােসো।” ফুলদানীতে একটা ফুল দেখিয়ে বললে,
“জানাে এ ফুলের নাম ?”
আদিত্য জানে কী জবাব দিলে ও খুসি হবে,
তাই মিথ্যে করে বলে, “না জানিনে।”
“আমি জানি। বলব, পেটুনিয়া। তুমি মনে
করাে আমি কিছু জানিনে, মূখু আমি।”
আদিত্য হেসে বললে, “সহধর্মিণী তুমি, যদি মূখ

মাল
শ
হও অন্তত আমার সমান মূখ। আমাদের জীবনে
মূখতার কারবার আধাআধি ভাগে চলছে।”
“সে কারবার আমার ভাগ্যে এইবারে শেষ হয়ে
এল। ঐ যে দারােয়ানটা ঐখানে বসে তামাক
কুটছে, ও থাকবে
দেউড়িতে, কিছুদিন পরে আমি
থাকব না। ঐ যে গােরুর গাড়ীটা
পাথুরে কয়লা
আজাড় করে দিয়ে খালি ফিরে যাচ্চে ওর যাতায়াত
চলবে রােজ রােজ, কিন্তু চলবে না। আমার এই হৃদয়-
যন্ত্রটা।” আদিত্যের হাত হঠাৎ জোর করে চেপে
ধলে, বললে, “একেবারেই থাকব না, কিছুই থাকব
? বলাে আমাকে, তুমি তাে অনেক বই পড়েছ,
বলল না আমাকে সত্যি করে।”
“যাদের বই পড়েছি তাদের বিদ্যে
যতদূর
আমারও
যমের দরজার কাছটাতে এসে থেমেছি
আর,এগােয়নি।”
“বলো না তুমি কী মনে করাে । একটুও থাকব
না? এতটুকুও না?”
“এখন আছি এটাই যদি সম্ভব হয়, তখন থাক্ব
সৈও সম্ভব!”
“নিশ্চয়ই সম্ভব, ঐ বাগানটা সম্ভব, আর আমিই

মাল ১০৭ অসম্ভব, এ হােতেই পারে না, কিছুতেই না । সন্ধ্যেবেলায় অমনি করেই অস্পষ্ট আলােয় কাকেরা ফিবে বাসায়, এমনি করেই দুলবে সুপুরিগাছের ডাল ঠিক আমারই চোখের সামনে। সেদিন তুমি মনে রেখো, আমি আছি, আমি আছি, সমস্ত বাগানময় আমি আছি। মনে কোরাে বাতাস যখন তােমার চুল ওড়াচ্ছে আমার আঙুলের ছোঁওয়া আছে তাতে। বলাে, মনে করবে ?” আদিত্যকে বলতে হােলো “। মনে কব।” কিন্তু এমন সুরে বলতে পালে না যাতে তার বিশ্বাসের প্রমাণ হয়। নীরজা অস্থির হয়ে বলে উঠল, “তােমাদের বই যারা লেখে ভারী তাে পণ্ডিত তারা, কিচ্ছু জানে না। আমি নিশ্চয় জানি, আমার কথা বিশ্বাস করো। আমি থা, আমি এইখানেই থাকব, আমি থাব, একেবারে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এই তােমাকে বলে যাচ্চি, কথা দিয়ে যাচ্ছি তােমার বাগানের গাছ- পালা সমস্তই আমি দেখব, যেমন আগে দেখতুম তার চেয়ে অনেক ভালাে করে দেখব। কাউকে দরকার হবে না। কাউকে না।” তােমারই কাছে

মালঞ্চ
;
বিছানায় শুয়েছিল নীরজা উঠে বালিশে ঠেসান
দিয়ে বল, বললে আমাকে দয়া কোরাে দয়া কোরাে।
তােমাকে এত ভালােবাসি সেই কথা মনে করে
আমাকে দয়া কোরাে। এতদিন তুমি আমাকে যেমন
আদরে স্থান দিয়েছ তােমার ঘরে, সেদিনও তেমনি
করেই স্থান দিয়ে। ঋতুতে ঋতুতে তােমার যে সব
ফুল ফুটবে তেমনি করেই মনে মনে তুলে দিয়ে আমার
হাতে। যদি নিষ্ঠুর হও তুমি, তা হলে তাে এখানে
আমি থাকতে পারব না। আমার বাগান যদি কেড়ে
নাও তাহােলে হাওয়ায় হাওয়ায় কোন্ শূন্যে আমি
ভেসে বেড়াব ?” নীরজার দুই চক্ষু দিয়ে জল ঝরে
পড়তে লাগল।
আদিত্য মােড়া ছেড়ে বিছানার উপর উঠে বল ।
নীরজার মুখ বুকে টেনে নিয়ে আস্তে আস্তে হাত
বুলােত লাগল তার মাথায়। বললে “নীরু শরীর নষ্ট
কোরাে না।”
“যাক্ গে আমার শরীর। আমি আর কিছু চাই
নে আমি কেবল তােমাকে চাই এই সমস্ত কিছু নিয়ে।
শােননা একটা কথা বলি, রাগ কোরাে না আমার উপর
রাগ কোরােনা,” বলতে বলতে স্বর রুদ্ধ হয়ে এল।

মালঞ্চ
একটু শান্ত হােলে পর বললে “সরলার উপর অন্যায়
করেছি। তােমার পায়ে ধরে বলছি আর অন্যায়
কনা। যা হয়েছে তার জন্যে আমাকে মাপ কারাে।
কিন্তু আমাকে ভালােবাসো, ভালােবাসো তুমি, যা
চাও আমি সব কব।”
আদিত্য বললে, “শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মন ছিল
অসুস্থ, মীরু তাই নিজেকে মিথ্যা পীড়ন করেছ।”
“শােনো বলি। কাল রাত্রি থেকে বারবার পণ
করেছি, এবার দেখা হলে নিৰ্ম্মল মনে ওকে বুকে
টেনে নেব আপন বােনের মতাে। তুমি আমাকে এই
শেষ প্রতিজ্ঞা রক্ষায় সাহায্য করাে। বলো,
বলল, আমি
তােমার ভালােবাসা থেকে বঞ্চিত হব না, তা হােলে
সবাইকে আমার ভালােবাসা দিয়ে যেতে পাব।”
এ কথার কোনাে উত্তর না করে আদিত্য বারবার
চুম্বন ককূলে ওর মুখ, ওর কপাল। মুদে এল নীরজার
চোখ। খানিক বাদে নীরজা জিজ্ঞাসা
করলে,
কবে খালাস পাবে সেইদিন গুণছি। ভয় হয় পাছে
তার আগে মরে যাই। পাছে ব'লে যেতে না পারি
যে আমার মন একেবারে সাদা হয়ে গেছে। এইবার
“সরল।
আলাে জ্বালাও।
আমাকে পড়ে শােনাও অক্ষয়

১১০
মালঞ্চ
বড়ালের ‘এষা।” বালিশের নীচ থেকে বই বের করে
দিলে। আদিত্য পড়ে শােনাতে লাগল।
শুনতে শুনতে যেই একটু ঘুম এসেছে আয়া ঘরে
এসে বলল, “চিঠি”, ঘাের ভেঙে নীরজা চমকে উঠল।
বড় বড় কতে লাগল তার বুক ।
কোনাে বন্ধু
আদিত্যকে খবর দিয়েছে, জেলে
জেলে স্থানাভা। তাই
যে-কয়টি কয়েদীকে মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার আগেই ছেড়ে
দেওয়া হবে সরলা তার মধ্যে একজন। আদিত্যের
মনটা লাফিয়ে উঠল। প্রাণপণ বলে চেপে রাখলে
মনের উল্লাস। নীরজা জিজ্ঞাসা করলে, “কার চিঠি,
কী খবর?”
পাছে পড়তে গেলে গলার আওয়াজ যায় কেঁপে,
চিঠিখানা দিলে নীরজার হাতেই। নীরজা আদিত্যের
মুখের দিকে চাইলে। মুখে কথা নেই বটে কিন্তু কথার
প্রয়ােজন ছিল না। নীরজার মুখেও কথা বেরােলাে না
কিছুক্ষণ। তারপরে খুব জোর করে বললে, “তাহােলে
তাে আর দেরি নেই। আজই আসবে। ওকে আবে
আমার কাছে।”
“ও কী! কী হােলাে নীরু ! নার্স! ডাক্তার
আছেন?”
-

মালঞ্চ
পাতা মুড়িকে ।
বলে, “জায়গা হবে না তাের রাক্ষসী, জায়গা হবে না।
আমি থাকব, থাকব, থাকব।”
হঠাৎ ঢিলে সেমিজ-পরা পাণ্ডুবর্ণ শীর্ণমূর্তি বিছানা
(ড়ে খাড়া হয়ে দাড়িয়ে উঠল। অদ্ভুত গলায় বললে
‘পালা পালা পালা এখনি, নইলে দিনে দিনে শেল
তাের
বুকে, শুকিয়ে ফেলব তাের রক্ত।”
বলেই পড়ে গেল মেঝের উপর।
গলার শব্দ শুনে আদিত্য ছুটে এল ঘরে, প্রাণের
সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে ফেলে দিয়ে নীরজার শেষ কথা
তখন তব্ধ হয়ে গেছে।
বিধব
- এ
wn
fr

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Malancha Ed.1

Author
Tagore, Rabindranath
Title
Malancha Ed.1
File name
Malancha Ed.1
Text
OCR done
Citation
1933
Published
2010/04/28
Publisher
Biswabharati Granthalay, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
124
Library
Dipsikha Library, Howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Tagore, Rabindranath
DLI number
515013
Barcode
4990010016793.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
inKFpIaVwc3
Download PDF

Malancha Ed.1