Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Podmini

Basu, Mahendralal · 2009/09/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চিতাের রাজসতী
পদ্মিনী।
ঐতিহাসিক নাটক।
PODMINI
OR
THE JEWEL OF RAJASTHAN
A HISTORICAL DRAMA IN FİVE ACTS.
মহাত্মা কবৃনেল টড প্রণীত রাজস্থান হইতে সংগৃহীত।
মহেন্দ্রলাল বসু কর্তৃক প্রণীত ও প্রকাশিত
“গাইব, মা, বীররসে ভাসি,
মহাগীত।
মেঘনাদ বধ।
কলিকাতা
নূতন সংস্কৃত যন্ত্রে
গমথুরানাথ চট্টোপাধ্যায় দ্বারা মুদ্রিত।
সন ১২৮২ সাল।

No text on this page.

উপহার।
পূজ্যপাদ শ্রীল শ্রীযুক্ত রাজা হরেন্দ্রকৃষ্ণ দেব
বাহাদুর পিতৃপতি মহাশয়
চরণাজে।
তাতঃ!
আমার প্রতি আপনার মেহ ও যত্ন অসীম। বাল্যা-
বধি আমি পিতৃহীন, আপনিই আমার শিক্ষক, রক্ষক,
প্রতিপালক, সেই সাহসে আমার আদরের ধন চিতাের
রাজসতী পদ্মিনীকে আপনার হস্তে সমর্পণ করিয়া
নিশ্চিন্ত রহিলাম।
স্নেহাস্পদ
শ্যামবাজার।
১৫নং বলরাম ঘােষের স্ট্রীট।
২২ জুন ১৮৭৫ ।
মহেন্দ্র

No text on this page.

নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষগণ। ঐ মন্ত্রী। • ।।।। ০ ০ ০ ০ ০ ভীমসিংহ চিতােরের রাজা। অনঙ্গ পাল রণবীর সিংহ ঐ সেনাপতি। গোরা পদ্মিনীর পিতৃব্য। বাদল। গোরার ভ্রাতৃ পুত্র। (দ্বাদশ বর্ষবয়স্ক বালক) আলা উদ্দিন দিল্লির সম্রাট। রাজ পুত্রগণ, দূত, সন্ন্যাসী, দৌবারিক, রাজ পুত সৈন্য, যবন সৈন্য, নাগরিকগণ, অনুচর ইত্যাদি । ৩ ০ + ০ + স্ত্রীগণ। ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ পদ্মিনী বিমলাদেবী মালতী ভীমসিংহের পত্নী। গােরার စုံ পদ্মিনীর সখী। ••• নলিনী }.... ০৪ ০ ০ কপাল কুণ্ডলা তপস্বিনী। গোলাপমণি, কাদম্বিনী, বৰ্বন, ভৈরবীদ্বয়, ক্ষত্রিয় কুলকামিনীগণ ইত্যাদি।

No text on this page.

চিতাের রাজ সতী
।
পদ্মিনী নাটক।
প্রথম অঙ্ক
প্রথম গাঙ্ক।
চিতাের--মহাঞ্চালীর মন্দির সম্মুখ।
দুই জন সন্ন্যাসী ও দুই জন ভৈরবী আসীনা।
শিব-স্তোত্র গীত।
১ম ভৈর। গুৰুদেব কি আজ এই খানেই অবস্থান কৰ্বেন ?
১ম সন্ন্যা। না বৎসে ! এখান হতে আমাদের শীঘ্রই প্রস্থান
কৰ্তে হবে। আমাদের মত লােকের এ স্থানে থাকা কর্তব্য নয়,
যাহারা শান্তিরসের অনুসন্ধান করেন, নির্জন অরণ্যই তঁাদের
উপযুক্ত স্থান, কেবল তােমাদের তীর্থ পৰ্যটন-ব্ৰত সমাপন হয়
নাই বলেই আমি সেই শান্ত আশ্রম পরিত্যাগ করে বহির্গত
হয়েছি। ভগবতীর পাদপদ্ম দর্শন না করে যাওয়া উচিত নয়
বলেই এখানে এসেছি, তা না হলে এ নগরে এক্ষণে কখনই
প্রবেশ কৰ্তেম না।

१ পদ্মিনী নাটক ২য় সন্ন্যা। দেব! এ কি কোন পাপিষ্ঠের রাজত্ব ? তবে চলুন শীত্ৰ এখান হতে বিদায় হই। ১ম সন্ন্যা। নাবৎস, এখানকার ভূপতি অত্যন্ত ধর্মশীল, তিনি আজন্ম সনাতন হিন্দু ধর্ম পালন করে অপত্যস্নেহ সহকারে প্রজাপালন করে আসছেন, কিন্তু সম্প্রতি এদেশের ভয়ানক বিপদ উপস্থিত হবার সম্ভাবনা যে দুরাচার বিধৰ্ম্মী যবনের ভারতবর্ষ ছারখার কর্তে প্রবৃত্ত হয়েছে, সনাতন হিন্দু ধর্মের অব- মাননা কর্তে উদ্যত হয়েছে, মনুষ্য রক্ত পান করা যাদের ধর্ম, তারা এই নগরে প্রবেশ কৰ্বে। ঐ দুরাচারের যে প্রতিদিন কত শত স্ত্রীহত্যা, ব্রহ্মহত্যা, কত দেব দেবীর অবমাননা কৰ্বে—তা যাক বৎস! সে সকল পাপ কথা শুনে কাজনেই। ১ম ভৈ। গুৰুদেব! এ সব অত্যাচারে তাদের ফল কি ? আর আপনি কি রূপে জান্তে পাল্লেন ? ১ম সন্ন্যা। বৎসে! আমরা যখন এই নগরে প্রবেশ করি তখন (তােমাদের স্মরণ থাক্তে পারে) অকস্মাৎ মধ্যাহ্ন কালে শিবাগণ চীৎকার করে উঠলাে, আমি তখনই মনে কল্লেম্ যে কোন বিপদ পাতের সম্ভাবনা-পরে ধ্যান যােগেও দেখলেম-যা দেখলেম তাতে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। ২য় ভৈর। গুৰুদেব! আপনি এমন কি দেখলেন যাতে আপ- নার ন্যায় মহাপুৰুষের হৃদয় বিগলিত হলাে। ১ম সন্ন্যা। বসে! সে অতি ভয়ানক কথা, তা মনে কলে শরীর লােমাঞ্চিত হয়। দেখলে যেন মা চিতােরেশ্বরী উন্মতা বেশে নররক্ত পান কচ্চেন, ও চিতাের নর রক্তে প্লাবিত হয়েছে। আরাে দেখলে মা চিতােরেশ্বরী রণবেশে খড়গ হন্তে প্রলয় কালের ন্যায় সকলকে সংহার কচ্চেন, আরাে দেখলে যেন চিতােরে প্রথম অঙ্ক। ১ম সন্ন্যা। একটা অগ্নি প্রজ্বলিত হয়েছে, আর তাতে সমস্ত চিতােরের রমণীরা দগ্ধ হচ্ছে এবং যবনের চিতাের রাজ্য ছারখার কচ্চে। ২য় সন্ন্যা। প্রভু! চিতােরবাসীদের উপায় কি হবে, পাপিষ্ঠ • ভবনের কি শান্তি পাবে না। বৎস! এক দিন অবশ্যই দুষ্টের দমন হবে, কিন্তু এ যাত্ৰা আর চিতকারের রক্ষা নাই। সুন্দর অট্টালিকা, প্রশস্ত রাজ- বাটী, রমণীয় উদ্যান, পবিত্র দেবমন্দির সকলিই অল্প দিনের মধ্যে ভস্ম রাশিতে পরিণত হবে। যে স্থান এখন লক্ষ লক্ষ বীর পুৰুষ, সুন্দরী স্ত্রী ও প্রিয় দর্শন শিশুতে পরিপুরিত রয়েছে, অল্প দিনের মধ্যেই সেই স্থান বরাহ, শৃগাল প্রভৃতি বন্য পশুর আবাস ভূমি হবে। বৎস! দৈব এখন মহারাজ ভীম সিংহের প্রতিকূল। ২য় সন্ন্যা। সেকি দেব ! এমন পুণ্যাত্ম নরপতির প্রতি দেব প্রতিকুল ? ১ম সন্ন্যা। বৎস! দেবতারা মানুষের প্রগাঢ় ভক্তির পরীক্ষা করেন। যখনই অন্তঃকরণ ঐশ্বৰ্য্য মদে মত্ত হয়ে ঈশ্বরের পথ হতে দুরে যায় তখন দুঃখ দিয়ে ভগবান্ তাকে সাবধান করেন, বৎস! আমরা সামান্য মনুষ্য। দেবচরিত্র বিষয়ে আমাদের তর্ক করা উচিত নয়। চল আমরা আপন কৰ্তব্য কর্মে যাই বৃথা কাল হরণে ফল কি। সকলে। চলুন। হর হর বােম-বােম-বােম। [সকলের প্রস্থান।

[ ৪ ] প্রথম অঙ্ক দ্বিতীয় গৱকি। চিতের রাজসভা। ভীমসিংহ, সেনাপতি, মন্ত্রী ও সভাসদৃগণ আসীন। ভীম সিং। মন্ত্রি ! রাজ্যের সম্বাদ কি? প্রজারা সকলে তু কুশলে কাল যাপন কচ্চে? কর্মচারীরা ত প্রজাদের উপর অত্যাচার করে না? মন্ত্রী। প্রজারা বলে যে আমরা সকলে রামরাজ্যের তুল মহারাজের রাজ্যে পরমসুখে বাস কচ্চি; আপনাকে তাহারা দেব- তুল্য জ্ঞান করে। রাজা। মন্ত্রি ! আমিও তাদের সন্তানতুল্য ভাল বাসি, কিন্তু দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন রাজার প্রধান ধৰ্ম্ম, যাতে দুষ্ট লােক দমন হয়, ও শিষ্ট লােক সুখে থাকে তার বিশেষ চেষ্টা কৰ্বে আর কর্মচারীরা প্রজাদের উপর অত্যাচার করে আমাকে যেন কলঙ্কিত করে, তার উপর বিশেষ দৃষ্টি রাখবে। মন্ত্রী। এ দাস সে বিষয়ে বিশেষ যত্ন করে থাকে। এখন এ রাজসিংহাসনে সশক্তি ভাবে উপবেশন মাত্র। মন্ত্রী। কেন মহারাজ ? কেন তা আবার তুমি জিজ্ঞাসা কচ্চো? দুরাচার মুসলমানেরা সগর্বে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছে এবং ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষের সমুদয়, রাজত্বই প্রায় করতলস্থ করেছে, এখন বাকি

প্রথম অঙ্ক।
৫
কেবল আমি ও আর কয়েকটি ক্ষুদ্র রাজা ; কবে যে এসে আমার
রাজ্য আক্রমণ কৰ্বে তার কিছুই স্থিরতা নাই।
সেনা। তার জন্য চিন্তা কি মহারাজ, আক্রমণ করে-যুদ্ধ
কৰ্বো, আমাদের সৈন্যের অভাব কি, আমরা কি মানুষ নয় ?
ক্ষত্রিয় নয় ?
রাজা। সেনাপতি! আমি জানি তােমার সাহস অসাধারণ,
কিন্তু মুসলমানেরা যে পঙ্গপালের ন্যায় ভারতবর্ষে প্রবেশ করে
সােণর ভারত ছারখার কচ্চে এ কথা মনে কল্যেও শরীরের রক্ত
বিদ্যুতের ন্যায় ধাবিত হয়, ক্রোধানল প্রজ্বলিত হয়।
( এক জন দৌবারিকের প্রবেশ)
দৌবা। মহারাজ! ভগবতী কপালকুণ্ডলা, দ্বারে উপস্থিত,
রাজদর্শনে ইচ্ছুক।
রাজা। কি ভগবতী, কপালকুণ্ডলা! যাও মন্ত্রি দেবীকে
শীঘ্র নিয়ে এসাে।
(দ্বারবান্ ও মন্ত্রীর প্রস্থান ও মন্ত্রীর কপালকুণ্ডলাকে
লইয়া পুনঃপ্রবেশ।)
রাজা। (কপালকুণ্ডলাকে প্রণাম করিয়া) ভগবতি! বহুকালের
পর আপনার চরণ দর্শন করে এ দাস চরিতার্থ হলাে। এত
দিনের পর কি এ দাসকে মনে পড়েছে ? আপনি এত দিন কোন্
কোন্ তীর্থ পৰ্যটন করেছিলেন।
কপা। বৎস! চিরায়ুঃ হও; রাজ্যের কুশলত, দেবী পদ্মিনী
কেমন আছেন ? আহা বাছাকে আমি অনেক দিন দেখি নাই, মহা-
‘রাজ আমি অনেক তীর্থ পৰ্যটন করে একবার মা চিতােরেশ্বরীর

পদ্মিনী নাটক।
পাদপদ্ম বন্দন কর্তে এলে। আর তােমাদিগকেও একবার
দেখতে এলে।
রাজা। আমাদিগের পরম সৌভাগ্য যে আপনার মত
লােকের মনে আমরা স্থান পাই।
কপা। বৎস! তােমার এ সকল গুণ না থাকলে আমি উদা-
সিনী হয়ে আপনাদের দেখিবার জন্য এত ব্যস্ত হব কেন ? ধন্য
সেই রমণী যিনি আপনাকে গর্ভে ধারণ করেছেন। সে যাই হােক
আপনার রাজ্যের কুশল বার্তা বলুন।
রাজা। ভগবতি ! এখন পর্যন্ত তাে রাজমুকুট শিরে ধারণ
করে রয়েছি, কিন্তু মুসলমানদিগের যে রূপ দিন দিন অত্যাচার
বাড়ছে, তাতে কবে যে শিরভ্রষ্ট হবে তা কে বলতে পারে ?
আপাততঃ রাজ্যের কুশল।
কপা। বৎস! তুমিই কেবল একমাত্র হিন্দু সূৰ্য বৰ্তমান আর
প্রায় সকলেই মুসনমানদিগের পদানত।
রাজা। আমার এই সিংহাসনে বসা কেবল বিড়ম্বনা
মাত্র। আমার পূর্বপুরুষেরা অপ্রতিহত প্রভাবে রাজ্য করে
গেছেন, আর আমি কিনা মুসলমানদিগের ভয়ে শৃগালের ন্যায়
সদাই সশঙ্কিত
কপা। বৎস! তােমার কিছু আশঙ্কা নাই। মা চিতােরেশ্বরী
তােমাকে সর্বদা রক্ষা কচ্চেন। সে যা হােক, আমি একটী নূতন
গান রচনা করেছি, সেই গানটি প্রায় ভারত বর্ষের সমুদয় প্রদে-
শের লােকদের শুনিয়ে এসেছি, এখন তােমাকে একবার শােনা-
বার ইচ্ছা।
রাজু। আপনার আজ্ঞা শিরােধার্য্য।
কপা। তবে শুনুন, ( গীত )

প্রথম অঙ্ক।
৭
রাজা। দেবী! এ গান নয়—এ মধুবর্ষণ, এ গানে মৃত
ব্যক্তিও উৎসাহিত হয়, রণভূমিতে যদি এই গান কর্ণকুহরে
প্রবেশ করে, অসির শােণিত পিপাসা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায় ? যবন
বধের ইচ্ছা প্রবল হয়, শত যবনের স্থানে সহস্র যবন বধ করা
যায়।
নেপথ্যে। ( দুন্দুভি ধ্বনি)
সকলে। একি! একি!
রাজা। মন্ত্রী দেখতে এ দুন্দুভি ধ্বনি হলাে কেন, এ আবার
কি বিপদ উপস্থিত হলাে নাকি, যবনেরা এসে রাজ্য আক্রমণ
কল্লে বুঝি ? (মন্ত্রীর প্রস্থান) আ এখন এরূপ মঙ্গল ধ্বনি সচরাচর
ভারত বাসিদের কর্ণকুহরে প্রবেশ কৰ্বে—হায়-হায়-হায়।
মন্ত্রীর প্রবেশ।
রাজা। মন্ত্রি কি সমাচার।
মন্ত্রী। সমাচার মঙ্গল, দিল্লীশ্বর আপনার সম্মুখে কোন
বিশেষ কার্য্যের নিমিত্ত দূত প্রেরণ করেছেন।
রাজা। আচ্ছা তাকে লয়ে এসাে।
(মন্ত্রীর প্রস্থান ও দূতের সহিত পুনঃ প্রবেশ)
মহারাজের জয় হােক, মহারাজ দিল্লীর অধিপতি
আলাউদ্দিন সা আপনার নিকট এই পত্র প্রেরণ করেছেন।
(লিপিদান) তার আজ্ঞা অদ্যই আমাকে প্রত্যুত্তর লয়ে গমন
করতে হবে। মহারাজের কি অনুমতি হয়।
রাজা। (পত্র পাঠ করিয়া) যাও দূত—যবধম পিশাচকে
গিয়া বল, যে ক্ষত্রিয়েরা এত নির্বীৰ্য্য হয় নাই যে তার এই জঘন্য

পদ্মিনী নাটক।
প্রস্তাবে সম্মতি দান কৰ্বে, ওঃ মন্ত্রি ! নরাধমের সাহস দেখ। এই
পত্র পাঠ কর ।
মন্ত্রী। (পত্র পাঠ) “বীরকুল পূজনীয় শ্ৰীমন্মহারাজ ভীম সিং
প্রবল প্রতাপেয়ু।
মহারাজ! লােক পরম্পরায় আপনার মহিষী পদ্মিনীর রূপ
লাবণ্যের কথা শ্রবণ করিয়া, আমার সাতিশয় ইচ্ছা যে তিনি
আমার গৃহ উজ্জ্বল করেন, অতএব পত্র পাঠ মাত্র পদ্মিনীকে দিল্লী
প্রেরণ করিবেন তাহা হইলে আমি আপনাকে সর্বশ্রেষ্ট রাজা
করিব, আপনার নিকটবর্তী রাজ্য সমূহ আপনাকে প্রদান করিব,
ও অঙ্গীকার করিতেছি যে আপনার বিৰুদ্ধে অস্ত্রধারণ কখনই
করিব না। আর যদি আমার প্রস্তাবে সম্মতি দান না করেন তাহা
হইলে আমি স্বয়ং গমন করিয়া চিতাের ভস্মসাৎ করিয়া
পদ্মিনীকে নিজালয়ে লইয়া আসিব।”
রাজা। উঃ নরাধম আপনাদের মতন সকলকে দেখে, পিশাচ
সকলকেই পিশাচের মত দেখে।
সেনা। কি এত বড় আস্পর্ধা! ভারতভূমি কি বীরশূন্য
হয়েছে! না ক্ষত্রিয় বীৰ্য্য শূন্য হয়েছে ! যে মুসলমানদের এত অপমান
সহ কৰ্বে ! জগদীশ্বর মুসলমানদিগের পিশাচ রূপে সৃজন করে-
ছেন—না পিশাচেরাও এমন বাক্য উচ্চারণ কত্যে পারে।
যবনের। পিশাচের অধম।
রাজা। চলে যাও দূত। তােমার সম্রাটকে বলল, যে
চিতােরের বৃদ্ধ যুবা বালক স্ত্রীলােক সকলেই তার বিরুদ্ধে অস্ত্র
ধারণ কৰ্ত্তে প্রস্তুত।
দূত। মহারাজ! দিল্লীশ্বরকে আপনারা এরূপ বাক্য প্রয়োেগ

প্রথম অঙ্ক।
কচ্চেন!, আপনারা প্রস্তুত হয়ে থাকুন, মৃত্যু আপনাদের অতি
নিকট!
[ দূতের প্রস্থান।
রাজা। সেনাপতি! সমরের নিমিত্ত প্রস্তুত হও, যাতে সৈন্যের
সংখ্যা বৃদ্ধি কর্তে পার তার বিশেষ চেষ্টা দেখ, আর নগরের চতু
র্দিকে সৈন্য প্রেরণ কর, রাত্রিকালে সকলকে রণসজ্জায় সজ্জিত
হয়ে নিদ্রা যেতে বােলাে, নগর তােরণ বিশেষ রূপে রক্ষা কবার
আদেশ দাও গে।
সেনা। যে আজ্ঞা মহারাজ। ক্ষত্রিয়-শােণিত বিন্দুমাত্র বহবান
থাক্তে পাপাচার যবনেরা কখনই চিতােরে প্রবেশ কর্তে পর্বে
। আমি এখন চল্লেম।
[ সেনাপতির প্রস্থান।
নেপথ্যে (সভাভঙ্গসূচক গীত )
রাজা। বেলা অনেক হয়েছে, এখন সভা ভঙ্গ করা যাক।
ভগবতি ! এই দেখুন বলতে বলতেই এক ঘাের বিপদ উপস্থিত।
ওঃ যে ভারত ভূমিতে চিরশান্তি বিরাজ করুত, নরাধমেরা এসে
সেই শান্তি ভঙ্গ কল্লে ! এখন এই বিপুল রাজকুলের ও আমার
অদৃষ্টে,কি আছে তা ঈশ্বরই জানেন। আসুন দেবী অন্তঃপুরে
যাই।
সকলে। জয় মহারাজ ভীমসিংহের জয়।
[ সকলের প্রস্থান।
২

[ ১০ ] প্রথম অঙ্ক। তৃতীয় গাঙ্ক। চিতােররাজ অন্তঃপুর। রাজার প্রবেশ। রাজা। একি মানুষে পারে—এমন কর্ম চণ্ডালেও কর্তে পারে ! আর চণ্ডাল তাে মানুষ, পশু পক্ষিরাও কর্তে বিমুখ হয়। পদ্মিনী আমার সর্বোৎকৃষ্ট রত্ন, তার কাছে ধন তুচ্ছ, রাজ্য তুচ্ছ, রাজসিংহাসন তুচ্ছ। আমি যদি পৰিনীকে লয়ে বনে বনে ভ্রমণ করি, বৃক্ষ মূল আমার রাজ-অট্টালিকা হবে। যদি বল্কল পরিধান করে যােগীর ন্যায় ভ্রমণ করি, তাতেও তার মুখ চন্দ্র দেখে আমি রাজা, আর আমাকে দেখে তিনি রাণী। আমার রাজ্য যায় যাক আমি এমন কর্ম কর্তে কখনই পার্বো না। এই যে পদ্মিনী ভগ- বতীর সঙ্গে এই দিকেই আসূচেন। ( পদ্মিনী ও কপালকুণ্ডলার প্রবেশ ) পরি। (রাজার হস্তধারণ পূৰ্ব্বক ক্রন্দন) নাথ ! এই অভা- গিনীর জন্যই আপনাকে এই বিপদ সাগরে পড়তে হলাে। রাজা। দেবি ! তােমার দোষ কি—সকলি আমার অদৃষ্টের পঘি। নাথ! আমার মৃত্যুর আয়ােজন করে দিন, আমি মলে আপনাকে এ সকল কষ্ট পেতে হবে না। আমি মলে সেই নরাধম মুসলমান সম্রাট চিতাের আক্রমণে ক্ষান্ত হবে। কপা। ছি! ছি! মহিষি! ও কথা কি মুখে আন্তে আছে ?

প্রথম অঙ্ক।
১১
সংসারের নিয়মই তাে এই,কখন হর্ষ কখন বিষাদ, কখন সুখ
কখন শােক আছেই তাে।
পদ্মি। (সবােদনে) ভগৰতি! আমার আর বেচে সুখ কি ?
আমার জন্য এই ঘাের যুদ্ধ উপস্থিত—আমার জন্য যে কত
নরহত্যা হবে তার সংখ্যা নাই।
রাজা। দেবি! তুমি কেন আপনাকে আপনি দোষী
ভাবছো, তুমি সরলা অবলা, তােমার কি কিছু দোষ সম্ভবে ?
পমি। মহারাজ! আমিই তাে সকল বিপদের মূল, আমি
যদি এখন মরি তাহলে লক্ষ লক্ষ লােকের প্রাণ রক্ষা হয়।
আমার মরাই শ্রেয়। আরাে দেখুন যখন মৃত্যু সকলের ভাগ্যে
অবশ্য ঘটবে তখন লক্ষ লক্ষ লােকের প্রাণ রক্ষা করে যশেভূষণে
ভূষিত হয়ে চিরস্মরণীয় নাম রেখে মরাই ভাল।
কাপা। ছি ছি মহিষি ও সকল কথা ছেড়ে দিন। দেখুন
দেখি আপনার ওরূপ বাক্যে মহারাজ বড় কষ্ট পাচ্ছেন।
পদ্মি। ভগবতি! আমাদের উপায় কিহবে?
কপাল। তার ভয় কি মহিষি! আপনাদের কিসের অভাব?
আপনাদের সেনাপতি রয়েছে—সেনা রয়েছে-
[ নেপথ্যে দুন্দুভি ধ্বনি।
রাজা। একি একি আবার কি নুতন বিপদ উপস্থিত হলাে ?
দেবি! আমায় কিঞ্চিৎ কালের নিমিত্ত বিদায় দেও।
যে আজ্ঞে।
পদ্মি।
[ রাজার প্রস্থান ।
কপাল। বাছা তুমি এখন বিশ্রাম কর, আমি একবার কুটীর
থেকে আসি।

১২. পদ্মিনী নাটক। পদ্মি। যে আজ্ঞা আনুন। [ কপালকুণ্ডলার প্রস্থান। পঘি। (যােড় হস্তে উৰ্দ্ধমুখে) মা চিতােরেশ্বরি ! চিতাের রাজ্যের মঙ্গল কর, মহারাজের মঙ্গল কর, দাসীর অমুল্যনিধি সতি রত্ন রক্ষা কর। মাগাে তুমি বিঘ্ন বিনাশিনী-তােমার দাসী কাতর- স্বরে ডাকচে এক বার মুখ তুলে চাও। মা! এই মহৎ রাজকুলের মান রক্ষা কর। ওঃ কেন আমার জন্ম হয়েছিল? কেন আমাকে পরমেশ্বর সুন্দরী করে সৃজন করেছিলেন? তাতেইতাে প্রাণনাথ এই বিষম বিভ্রাটে পতিত হলেন। এখন মা চিতােরেশ্বরী তুমিই রক্ষা কর। [ মেঘগর্জন ও বজ্রপাত। পদ্মিনী। ( সভয়ে ). একি একি মা চিতােরেশ্বরী কি আমার প্রার্থনা গ্রাহ্য কল্লেন না! ( উর্ধে দৃষ্টি) উঃ কি ভয়ানক মুর্তি! ( মুচ্ছা) (আকাশে কোমল বাদ্য) দ্বিতীয় অঙ্ক। প্রথম গাঙ্ক। দিল্লি-সম্রাট আলাউদ্দিনের প্রমােদ গৃহ। ( আলিউদ্দিনের প্রবেশ । আলা। (স্বগতঃ ) পদ্মিনীর রূপ লাবণ্যের কথা শুনে পৰ্য্যন্ত আমি একেবারে পাগলের ন্যায় হয়েছি। যত দিন না সেই রমণী রত্নকে দেখতে পাবো ততদিন আর আমার এ পৃথিবীতে সুখ নাই।

দ্বিতীয় অঙ্ক। ১৩ সেই রূপবতীকে পেলে মনের সাধে হৃদয়ে লয়ে তার মুখ চুম্বন করব, সুন্দরীকে আমার প্রধান পাটরাণী করব। খুদ্র চিতােরের সিংহাসন পদ্মিনীর উপযুক্ত নয়, আমি প্রণয়নীকে দিল্লির সিহাসনে বসাব। শৃগাল ভীমসিংহ তার উপযুক্ত পাত্র নয়, তার উপযুক্ত পাত্র দিল্লির সম্রাট সেকেনর সানি। ভীম সিংহ যদি সহজে আমায় পদ্মিনী সমর্পণ করে তাহলে আমি তার উপর কখন শত্রু- তাচরণ করব না। চিতাের রাজ্যের উপর কখন হস্তক্ষেপ করবাে না। আর যদি আমার আজ্ঞা অবহেলা করে, তাহলে চিতােরকে ভস্মসাৎ করবে। (কিঞ্চিৎ কাল চিন্তা) তাইতাে দূত,এখনাে চিতাের হতে প্রত্যাগমন কচ্চে না কেন? এত বিলম্বের কারণ কি? বােধ করি পদ্মিনীকে সঙ্গে করে নিয়ে আসছে? আহা আমার এমন শুভ দিন, কি হবে যে বিনা বিগ্রহে পদ্মিনী লাভ করবাে, কেনই বা না হবে ? দিল্লির অধীশ্বরের আদেশ কি কেউ লঙ্ঘন কর্তে পারে? ভীমসিংহ এত মুখ নয় যে আমার আজ্ঞা অবহেলা করে আপনার মৃত্যুকে আপনি ডাকবে। আর যে রূপ পত্র লিখেচি তাতে বিলক্ষণ লােভ আর ভয় দেখান হয়েচে।—হু-আমায় যেন কে বলছে আমি নিশ্চয়ই পদ্মিনীকে পাব। পদ্মিনী চিন্তায় শরীরটা অবসন্ন হয়েছে একটু বিশ্রাম করা যাক। (শয়ন) কে আছিস রে— ( এক জন ভৃত্যের প্রবেশ) ভৃত্য। সম্রাট! কি আজ্ঞা হয়। আলা। আমার হিন্দু বেগম গােলাপ আর কাদম্বিনীকে একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দে। [ ভৃত্যের প্রস্থান। আলা। (স্বগত) মেয়ে মানুষের কদর কাফের হিন্দুরা কি (১৪ পদ্মিনী নাটক। বুঝবে ? মেয়ে মানুষকে কিরকম ভােয়াজে রাখতে হয় তা আমরা যেমন জানি পৃথিবীর মধ্যে অন্য কোন জাতিতে সেরূপ জানে না। পদ্মিনীর সঙ্গে যদি এক দিন আমি রসিকতা কত্তে পাই তা হলে সে আমাকে আর ভুলতে পারে না। উঃ কতক্ষণে আমাদের মিলন হবে ?—ভারতবর্ষের যেখানে যা ভাল ভাল পুষ্প ছিল তা সকল ফুলের মধু পান করেছি, এখন বাকি কেবল পদ্মিনী, এ ফুলটির মধু কিছু রয়ে বসে খেতে হবে। (গােলাপমণি, কাদম্বিনী ও বব্বনের প্রবেশ) আলা। এস এস, ভাল আছতাে বিবিযান ? গােলাপ। ভাল আর কেমন করে। (গােলাপ ও কাদ- ঘিনীর উপবেশন) (স্বগত) ভাল—এখন তােমার হাত থেকে এড়াতে পারলে। আলা। কেন কেন ? গােলাপ। আপনি তাে দাসিদের একবারে ভুলে গিয়ে ছেন, আজ পনরাে দিন আমরা আপনার দর্শন সুখে বঞ্চিত। (স্বগতঃ) পামর যবন! তুই আমাদের সতিত্ব নষ্ট করে কলঙ্কিত করলি! হিন্দু রমণী হয়ে যবনী হলেম! পিঞ্জরের বিগিনীর ন্যায় কাল যাপন কচি-চণ্ডালের সেবাতে দিন যাপন কতে হচ্চেওঃ কবে যে মৃত্যু হবে ! আলা। (হাস্য করিয়া) তােমাদের কি ভুলতে পারি সুন্দরি ! তবে কি জান আজ কদিন ধরে শরীরটা অসুস্থ ছিল তাইতে তােমা- দের ডেকে পাঠাইনি, তা যাক ও সকল কথা এখন ছেড়ে দাও এসাে একটু আমােদ করা যাক। কাদ। আপনার আজ্ঞা শিরােধার্য্য। (স্বগত) পিশাচের আজ্ঞা—উঃ হিন্দু রমণী হয়ে যবনের দাসী—কি বিড়ম্বনা-মনে- দ্বিতীয় অঙ্ক। ভাব গোপন রেখে পামরের সেবা করতে হচ্ছে, ইচ্ছা করে পাম- রকে কোন প্রকারে বধ করে গায়ের জ্বালা মিটাই ; কিন্তু কিছু তেই সুযােগ পাচ্চিনি। আলা। বন্ধন। বন। দাসি হাজির-সম্রাটের কি অনুমতি হয়। আলা। পেয়ালা আর সিরাজ থেকে যে মদ এসেছে তাই নিয়ে আয়। ববন। সম্রাটের আজ্ঞা শিরােধার্য্য। [ বব্বনের প্রস্থান। আলা। গােলাপ! তুমি একটি গাও, তােমার গান শুনতে আমি বড় ভালবাসি। গােলা। সম্রাটের আজ্ঞা শিরােধার্য। আলা। গানটা নাচের সঙ্গে হলেই ভাল হয়। কাদু! তুমি গােলাপের সঙ্গে নাচ। কাদ। যে আজ্ঞা। (নৃত্য ও গীত ) আলা। শুভান আল্লা বহুত আচ্ছা হয়। গােলাপ, তােমার ওয়াস্তে হাম যান দেগা। গােলাপ। (স্বগত) পরমেশ্বর যেন তাই করেন, যে দিনে তােমার রক্তে স্নান করতে পারবে সে দিনে আমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। ( নেপথ্যে দুন্দুভি ধ্বনি) আলা। এ কি! দুন্দুভির ধ্বনি কিসের! বােধ হয় চিতাের

পদ্মিনী নাটক
হতে দূত ফিরে এলাে। গােলাপ যাও তােমরা এখন বিশ্রাম
করগে, আমায় এখন রাজ সভায় যেতে হবে।
গােলা। যে আজ্ঞে আমরা এখন চল্লেম ; কিন্তু দাসিদের
যেন মনে থাকে।
আলা। তােমাদের কি ভুলতে পারি, কে আছিসরে।
কাদ। (স্বগত) ক্ষণকালের জন্যে নরক হতে উদ্ধার হলেম।
[ উভয়ের প্রস্থান।
( এক জন ভৃত্যের প্রবেশ)
ভৃত্য। সম্রাট কি আজ্ঞা হয়।
আলা। দেখতে কিসের দুন্দুভিধ্বনি হলাে।
যে আজ্ঞা।
[ প্রস্থান।
ভৃত্য।
আলা। বোধকরি দূতরাজ পদ্মিনীকে সঙ্গেকরে এনেছেন।
( ভৃত্যের প্রবেশ) :
ভৃত্য। চিতাের হতে দূতরাজ প্রত্যাবর্তন করেছেন।
আলা। সঙ্গে আর কেউ এসেছে?
ভৃত্য। আজ্ঞে না, তিনি একা ফিরে এসেছেন।
আলা। (আশ্চৰ্য্য ভাবে) একক!
ভৃত্য। আজ্ঞে হাঁ।
আলা। আচ্ছা যা।
[ ভৃত্যের প্রস্থান।
আলা। (স্বগত) তবে কি ভীমসিংহ পদ্মিনীকে প্রেরণ
করেননি, যদি এরূপ হয়ে থাকে তবে তার আর রক্ষা নাই।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
১.
চিতােরের সকলকেই বধ করব, যাই রাজসভায় দূতের মুখে
সবিশেষ শুনিগে।
[ প্রস্থান।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় গাঙ্ক।
চিতাের-পদ্মিনীর যন্ত্রাগার।
নলিনী ও মালতী আসীনা।
নলিনী। মুসলমানদের সঙ্গে কি যুদ্ধই বাংল! এর কি
আর শেষ হবে না? কত লােক যে এই যুদ্ধে প্রাণ ক্ষোয়াচ্চে
তার আর সংখ্যা নাই।
মালতী। আহা সােনার চিতােরকে ছারখার করে ফেলেছে।
নলিনী। দেখ সখি যত দিন হতে এই যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে
আর মুসলমানেরা এসে যত. দিন চিতর আক্রমণ করেছে, তত
দিন থেকে মহারাজের আহার নিদ্রা পরিত্যাগ হয়েছে।
মালতী। দেখ নলি, প্রিয় সখি পদ্মিনীও দিন দিন মলিনা
হয়ে যাচ্চেন, দিন রাত্রি কান্না তার ব্রত হয়ে পড়েছে। কাদেন
আর বলেন আমার জন্যেই মহারাজ এত কষ্ট পাচ্চেন, চিতাের
বাসিরা জ্বালাতন হচ্ছে, আমার মরাই ভাল।
নলিনী। তা ভাই তার দোষ কি?
মালতী। দোষ!-দোষ কাকে বলে তিনি কি তা জানেন।
'নলিনী। নরাধম যবনের সমস্ত ভারতবর্ষ ছারখার করলে,

১৮
পদ্মিনী নাটক
তবুও নিস্তার নাই। শেষে আমাদের একমাত্র হিন্দুরাজা-তার
উপর এসে পীড়ন আরম্ভ করেছে।
মালতী। আহা প্রিয় সখির দুঃখ দেখলে বুক ফেটে যায়
যবনের আসা পর্যন্ত তিনি আর এ যন্ত্রাগারে আসেন না।
নলিনী। আগে তিনি আমাদের সঙ্গীত শিখাবার জন্য কত
যত্ন করতেন, সঙ্গীত চর্চায় তাঁর বিশেষ আমােদ ছিল।
মালতী। আজ তাঁকে আমি এখানে আসবার জন্য বিশেষ
অনুরােধ করেছি।
নলিনী। (বিশেষ আগ্রহের সহিত) তিনি কি স্বীকার
করেচেন ?
মালতী। না কিছুতেই তিনি স্বীকার পেলেন না।
নলিনী।
তবে চল এখন একবার এর কাছে যাই।
[ উভয়ের প্রস্থান।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
তৃতীয় গাঙ্ক।
চিতােররাজসভা।
(মহারাজ ভীমসিংহ, অনঙ্গপাল, রণবীর সিংহ।
ও সভাসদু বর্গ)
বল কি অনঙ্গপাল, তুমি কি তবে আমায় তাঁর ওরূপ
জঘন্য প্রস্তাবে সম্মত হতে বল? ওরূপে রাজার রাজ মকুট রক্ষা
করা অপেক্ষা দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে উদর পূরণ করা সৰ্বাংশে
ভাল। তােমার ভয় হয়ে থাকে তুমি গিয়ে পাঠানের শরণাপন্ন
ভীম।

দ্বিতীয় অঙ্ক। হও। মনুষ্য রক্ত যার শরীরে আছে সে এমন কায করতে পারে না। অনঙ্গ। দেব! এমন নরাধম কে আছে যে সন্তান হয়ে -জননীকে দত্যু হস্তে সমর্পণ করতে পরামর্শ দেয় ! আমি আপনার জন্য বলছি না, ওরূপ স্বার্থপরতা যে মুহূর্তে আমার মনে উদয় হবে সেই মুহূর্তে যেন আমার মস্তকে বজ্রপাত হয়। আমার বলার তাৎপৰ্য্য এই যে, সংগ্রামে তাে ক্ষতি ভিন্ন লাভ নাই, দেখুন দিন দিন কত কত প্রাণিহত্যা হচ্ছে, কত কত বীর এর মধ্যেই অনন্তু শয্যায় শয়ন করেছেন, রাজকোষ ক্রমে অর্থ শূন্য হচ্চে, নগর একবারে শ্রীহীন হয়ে গেছে, বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে, কৃষি কাৰ্য্য রহিত হয়েছে, আরাে কিছু দিন এই যুদ্ধ চললে ভবিষ্যতে যে কি হবে তা ভাবলে অন্তঃকরণ শুষ্ক হয়। তাই বলেছিলেম যখন আলা- উদ্দিন সন্ধি করতে সম্মত আছেন তখন একবার চেষ্টা করে দেখতে হানি কি! আমি তাঁর জঘন্য পশুবৎ প্রস্তাবে সম্মত হতে বলছি না, বিচার করে যা সঙ্গত বােধ হয়, এবং মহারাজের যে রূপ অনুমতি হয় সেই রূপ কোন প্রস্তাব রাজপক্ষ হতে কে লিখে পাঠান হােক। তাতে তিনি সম্মত হন উত্তম নচেৎ অন্যোপায় দেখা যাবে। সেনা। মন্ত্রীমহাশয়! আপনি বিজ্ঞ, পণ্ডিত, বহুদর্শী। আমাদের ন্যায় সামান্য বুদ্ধির লােকের আপনার বাক্যের প্রতিবাদ করা যুক্তি বিৰুদ্ধ। তবে আপনার অমায়িকতা ও স্নেহের উপর নির্ভর করে গুটি কত কথা বলতে সাহস করিছি। মহাশয় আপনি বল্লেন যে “তাঁর জঘন্য প্রস্তাবে না সম্মত হয়ে আমাদের পক্ষ হতে কোন প্রস্তাব করে পাঠান হােক” তাতে বােধ হয় কতক গুলি অর্থ দিয়া পাঠান দস্যুর পদানত হওয়া আপনার অভিমত, D

২০
পদ্মিনী নাটক
মহাশয়, রাজপুতগণ এখনও এত নিস্তেজ হয়নি। চিতাের
এখনাে অতুরালয় হয়নি। আপনি যান—সৈন্য দলের মধ্যে প্রত্যে-
ককে জিজ্ঞাসা করুন—প্রত্যেক নগরবাসিকে জিজ্ঞাসা কৰুন
কেও এ প্রস্তাবে সম্মত কিনা? তাদের মধ্যে এমন এক
জন দেখান যে চিতাের রক্ষাৰ্থ অস্ত্র ধারণ করে প্রাণ দিতে
অসম্মত। আপনি ভবিষ্যত চিন্তা কচ্চেন, ভবিষ্যতে যে, কি হবে
তা ভবিষ্যতের হৃদয় করে নিহিত। মনুষ্যের মান আপেক্ষা
প্রাণ কি অধিক প্রিয়তর। আলাউদ্দিন্ যে কোন্ সাহসে
বিনা কারণে বিনা উত্তেজনায় আমাদের জননী রাজমহিষীর
অবমাননা করে, কোন সাহসে সে পুণ্য ভূমি বীর ভুমি চিতােরের
অপমান কল্পে,—সে কি মনে করেছে যে চিতােরে শুদ্ধ স্ত্রীলােকে
বাস করে, আর, তাহলেও রাজপুত কুলকামিনীরা কি যবন
অত্যাচারীকে ভয় করে। আপনি এক বার ঘােষণা করে দিন
এখনি দেখবেন সহস্র সহস্র চিতােররমণী অসি হন্তে যুদ্ধে
প্রবৃত্ত হবে। আমরা যদি এক্ষণে পদানত হয়ে যবনের সহিত
সন্ধি করি, তাহলে সেই সকল বীৰ্য্যবতী রমণীগণ আমাদিগকে
ধিক্কার দেবে, কি সহ কতে পারা যাবে। মহারাজু সৈন্য
গণ এখন উৎসাহে জ্বলন্ত প্রায়, যবন নিপাত যবনক্ষয় এই
তাদের এখন ইষ্ট মন্ত্র, তারা কেই বেতনভােগী বলে যুদ্ধ কচ্চে
না, তারা সকলেই এখন নিজ নিজ উৎসাহে উৎসাহিত, তারা
সকলেই এক বাক্যে বলচে যে চিতকারের জন্য প্রাণ দিব,
স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিব, এমন সময় এমন সৈন্যগণকে
যুদ্ধ হতে নিরস্ত কল্পে তাহাদের প্রতি মহারাজের নিষ্ঠুর
আচরণ করা হয়। মন্ত্রী মহাশয় এক বার ভেবে দেখুন দেখি,
নরপ্রেতের এ অত্যাচারের উদ্দেশ্য কি পরস্ত্রী হরণেচ্ছা! ওঃ

দ্বিতীয় অঙ্ক।
২১
এমন মানুষকে জীবিত থাকতে দিলে জগদীশ্বরের কাছে
অপরাধী হতে হবে। মহারাজ অনুমতি কৰুন আমি আপনার
সমক্ষে প্রতিজ্ঞা করছি হয় সেই পাঠান দুরাচারের বক্ষ পদাঘাতে
বিদীর্ণ করে সেই বক্ষের রক্তে অবগাহন করে তার পাপ
কলুষিত রসনা সমূলে উৎপাটন করে মহারাজের চরণ প্রান্তে
উপহার দিব, নয় এই অকিঞ্চিৎকর জীবন সমরে বিসর্জন দিব।
পাপিষ্ঠ দস্যুর সহিত সন্ধি?
ভীম। রণবীর! তােমার প্রতিজ্ঞাতে আমি অত্যন্ত প্রীত হলেম,
ভরসা করি তােমার এই প্রতিজ্ঞা কাৰ্য্যে পরিণত হবে ; তােমারই
বাহুবলে এতদিন চিতাের রক্ষা হয়েছে। যবনের এত করেও
নগরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় নাই। এ তুমুল সংগ্রামে তুমিই
আমার প্রধান ভরসা, যদি এ যুদ্ধে জয় লাভ করতে পার তবে
ভারতবর্ষ চিরকাল তােমার যশ ঘোষণা করবে।
( এক জন ভৃত্যের প্রবেশ)
ভৃত্য। (যােড় করে) মহারাজ যবন শিবির হতে পত্ৰ হন্তে
এক জন দূত এসেছে, রাজ দর্শনে অভিলাষ করে।
ভীম। তাকে এখানে আনতে পার। ( ভৃত্যের প্রস্থান
আবার আলাউদ্দিন কি নিমিত্ত দূত প্রেরণ করেছে ?
মন্ত্রী। আমার বােধ হয় তিনি পুনরায় সন্ধির প্রস্তাব করে
পাঠায়েছেন।
( দূতের প্রবেশ)
দূত। মহারাজ সম্রাটের অভিপ্রায় সমস্তই এই পত্রে ব্যক্ত
আছে। পত্রদান )
ভীম। মন্ত্রী পাঠ কর।

পদ্মিনী নাটক।
মন্ত্রী। (পত্র পাঠ)
বীর কুল পূজনীয় শ্ৰীমন্মহারাজ।
রাণ ভীম সিংহ প্রবল প্রতাপে।
রাজ।
দৈব দুর্বিপাক বশতঃ আমরা পরস্পরের শত্রু এবং সেই শত্রুতা
আমার দুর্মতির বিষময় ফল, এক্ষণে তাহা আমি , বিলক্ষণ
অবগত হইয়াছি। আমি দুষ্ট সয়তানের কুহকে পতিত হইয়া যাের
নারকীর ন্যায় অন্যায় আচরণ করিয়াছি। এক্ষণে অনুতাপানলে
হৃদয় দগ্ধ হইতেছে। যুদ্ধে মহারাজেরও ক্ষতি হইয়াছে, কিন্তু
তুলনা করিয়া দেখিলে বােধ হয় আমার ক্ষতির দশমাংশের
একাংশও মহারাজের হয় নাই। অতএব আমার একান্ত
বাসনা যে আপনি সন্ধি প্রস্তাবে সম্মত হয়েন। আমি কোন
রূপ ক্ষতি পূরণের প্রার্থনা করি না, আসুন আমরা শত্রুতা
বিস্মৃত হইয়া উভয়ে উভয়কে মিত্র বলিয়া সঘােধন করি।
কেবল আপনার সমক্ষে এক মাত্র নিবেদন, যে যাহার জন্য,
এত পরিশ্রম এত কষ্ট স্বীকার করিলাম, এত সৈন্যক্ষয় করিলাম,
একবার সেই রমণী কুল শিরােমণি রাজসতী পদ্মিনীকে দর্শন
করিব। আমি সাক্ষাৎ দর্শনেচ্ছা করিতে সাহস করিনা, কেবল
মাত্র মুকুরে তঁাহার প্রতিবিম্ব দর্শন করিব। ভ্রাতঃ যদ্যপি অসন্তুষ্ট
হইয়া আমার এই সামান্য প্রস্তাবে সম্মত হন তাহ-হইলে
এই দূত প্রমুখাৎ সংবাদ পাঠাইবেন। আমি অল্পমাত্ৰ অনুচর
সঙ্গে লইয়া নগর প্রবেশ পূর্বক রাজ মহিষীর চরণ দর্শন করিয়া
তৎপরদিবসই সসৈন্যে স্বীয় রাজধানী প্রস্থান করিব। ইতি
প্রণয়াভিলাষী।
সেকেন্দর সানি।

দ্বিতীয় অঙ্ক । দূত। এক্ষণে মহারাজ অধীনের প্রতি কি আজ্ঞা হয়। রাজা। মন্ত্রী এপত্রের মর্ম কিবুঝলে! ভাষায় তাে সরলতা ও বিনয়ের অপ্রতুল নাই। কিন্তু শঠের হৃদয়ের সহিত লেখনীর ও রসনার সম্পর্ক কি? শঠতা যবনদিগের অভ্যন্ত। রণ। মহারাজ আমার বােধ হচ্ছে দুষ্ট পাঠান এক্ষণে বিলক্ষণ বুঝাতে পেরেছে রাজপুত জাতির কত বল, তাই কৌশলে আমাদের অনিষ্ট করবার চেষ্টা করছে। মহারাজ বিধৰ্ম্মীর কথায় কখন বিশ্বাস করা উচিত নয়। ও রূপ অন্যায় অত্যাচারীকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া কোন মতেই কর্তব্য নয়। মন্ত্রী। বরং ভাবুন না কেন পাঠান সম্রাট এক্ষণে বেশ বুঝতে পেরেছেন যে রাজপুত জাতির কত বল তাই মহারাজের পদানত হয়ে সন্ধি প্রার্থনা করেছেন। সহসা কুভাব লওয়াটা কিছু নয়। রণ। আর সহসা বিশ্বাস করাটাও কিছু নয়। মন্ত্রী। অবশ্য,কিন্তু বিবেচনা করে দেখুন এ বিশ্বাস করায় আমাদের কিছু মাত্র হানি হতে পারে না। আমরা কিছু তার হস্তগত হতে যাচ্ছিনা যে তিনি আমাদের উপর বিশ্বাস- ঘাতকতা করবেন বরং তিনিই সহায় সম্পন্ন হীন হয়ে আমাদের নগরে প্রবেশ করতে চাইতেছেন তখন তাঁর মনে ভয় নাই যে কোন অন্যায়াচরণ করলে তাকে সমূহ বিপদে পড়িতে হবে? রণ। যবনের এতদুর স্পর্ধা যে হিন্দু মহিলা দেখতে অভি- পাষ করে ? মন্ত্রী। যবন কি মনুষ্য নয়—দেবতা দর্শনে কেন অভিলাষী আর কেই বা বঞ্চিত ? রাজা। মন্ত্রী এই যুক্তিটা আমার সঙ্গত বলে বােধ হচ্ছে। দেখ রণবীর, ক্ষত্রিয় যে কেবল যুদ্ধ অভ্যাস কর্বে এমন নয়, বিনয়

২৪
পদ্মিনী নাটক।
অভ্যাস করাও বিশেষ কৰ্তব্য -শান্তি অপেক্ষা সুখ আর পৃথিবীতে
নাই। ভগ্নশান্তিসংস্থাপনাশয়েই শান্তিভঙ্গকারীর সহিত যুদ্ধ করবে,
নচেৎ অকারণ নরহত্যা যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। যেমন আক্রমণ
কারী অত্যাচারীর প্রতি ব্যাবৎ ব্যবহার করবে, সেই রূপ পদানত,
শত্রুকে ভ্রাতৃ আলিঙ্গন করবে। যখন আলাউদ্দিন আমাকে ভ্রাতা
সম্বােধন করেছেন তখন তাকে অবহেলা করলে আমার অভদ্রতা ও
রাজধৰ্মবিৰুদ্ধ কাৰ্য করা হয়। প্রথম, আমার মনেও তােমার ন্যায়
সন্দেহ উপস্থিত হয়ে ছিল, কিন্তু এক্ষণে বিবেচনা করে দেখলেম
যে অনঙ্গ পাল যে যুক্তি প্রদর্শন করলে তা অযথা নয়। অতএব
স্থির করলেম যে সম্রাট আলাউদ্দিনের সন্ধি প্রস্তাবে আমি
সম্মত। মন্ত্রী তুমি এই মর্মে এক খানি পত্র লিখে পাঠাও।
দূত তুমি এখন বিশ্রাম করছে। অদ্য সভা ভঙ্গ হউক।
[ সকলের প্রস্থান।
।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
চতুর্থ গাঙ্ক।
চিতাের রাজ অন্তঃপুর। নলিনী ও মালতীর
প্রবেশ।
নলিনী। আজ আমি অনেক করে অনুরােধ করাতে, তিনি
সঙ্গীতশালায় আসতে সম্মত হয়েছেন। আহা মহিষীর দুঃখ
দেখলে বুক ফেটে যায়। আগে আগে তিনি মহারাজকে সঙ্গে
লয়ে সর্বদাই এখানে আসতেন, গান শুনতে কত ভাল বাসতেন,
এখন সর্বদাই একলা বসে বসে ভাবেন, কেবল বলেন যে

দ্বিতীয় অঙ্ক।
আমারই জন্য এই অনর্থ ঘটল; আর তাঁর চোক দিয়ে টসটস
করে জল পড়তে থাকে।
মাল। আহা! অমন সয়লা স্ত্রীলােক আর কি আছে? এমন
মায়ার শরীর কখন দেখি নাই। রাজ মহিষী বলে একটা দিনও
অভিমান নাই, আমাদের সঙ্গে এমনি ব্যবহার করেন যেন আমরা
তার মার পেটের ভগ্নী। কাল আমায় বলছিলেন “মালতি আমার
জন্যই মহারাজের এই বিপদ।”
নলি। মহারাজেরও ভাই বড় অন্যায়, আজ কদিন একবারও
বাড়ীর ভিতর পা দেন না। স্ত্রী লােকের হাজার দুঃখ হােক
স্বামী কাছে থাকলে মন অনেক শান্ত থাকে।
মাল। নলিন! তুমি ভাই পাগল, মহারাজ কি ইচ্ছে করে
মহিষীর কাছে আসেন না? তার কি তিলব্ধি অবকাশ আছে?
কিসে যুদ্ধে জয় লাভ হবে, কিসে রাজ্য রক্ষা করবেন এই ভেবে
ভেবে তার আহার নিদ্রা পরিত্যাগ হয়েছে।
নলি। তা ভাই এ পােড় যুদ্ধের কি শেষ হবে না? আমা-
দের সৈন্যেরা কি যবনদের সঙ্গে পারবে না? এমন অন্যায় যুদ্ধ ত
কখন দেখি নাই! দেশ কাড়া কাড়ী নিয়েই রাজায় রাজায় যুদ্ধ
হয় ! ওমা একি ঘৃণা! এ পাপ মুসলমান জাতের গায়ে কি মানুষের
চামড়া নাই ? রাজার রাণী কেড়ে নেবে,-সতীর সর্বনাশ করবে,
এরা কি রাবণের বংশ! তা সতীর চক্ষের জল ফেলিয়েছে,
সহজ কথা নয়। রাবণের মতন যবনের বংশও উচ্ছন্ন যাবে।
মাল। দিদি ! এমনি কাল, এখন কি আর ভাল মানুষের দিন
আছে-এখন পাপেরই রাজত্ব! তা যাক বব এখন রাজমহিষী
কিসে ভাল থাকেন আমাদের তাই করা উচিত। তাঁকে সর্বদা
অন্যমনস্ক রাখতে হবে। ও রকম রাত দিন ভাবলে কি তাঁর শরীরে
৪

পদ্মিনী নাটক।
কিছু থাকবে ? তঁাকে একলা থাকতে দিব না, তঁার সঙ্গ ছাড়বাে না,
তিনি যেখানে যাবেন আমরাও সেখানে যাব।
নলি। এই যে মহিষী এখানে আসছেন, তবে আমার কথা
রেখেছেন।
( পদ্মিনীর প্রবেশ)
পদ্মিনী। নলিন! তুমি আমায় আজ এখানে আসতে বলে-
ছিলে, তা আমার মনে ছিল না। সুকুমারীকে দেখে মনে হলাে
তাইতে দেরী হয়েছে, কিছু মনে করাে না।
নলি। রাজমহিষি! আপনি যে দাসীর অনুরােধ রেখেছেন
এই যথেষ্ট। এতে যে আমার মনে কত আহলাদ হচ্ছে বলতে
পারি না।
পদ্মি। ছি নলিন অমন কথা বলাে না; তােমাদের কথা
রাখযাে না? এ দুঃখের সময় তােমরা আমার এক মাত্র জুড়াবার
স্থান। তা তুমি আজ কেন আমাকে এখানে আসতে অনুরােধ
করেছিলে? তােমাদের সঙ্গীত শিক্ষা কেমন হচ্ছে? যে দুরবস্থায়
পড়ে আছি একবারও তােমাদের তত্ত্ব নিতে পারি না।
মাল। রাজমহিষি! আপনি কেন এত অনর্থক চিন্তা করেন।
যুদ্ধ বিগ্রহ কিছু রাজপুতদিগের মধ্যে নুতন প্রথা নয়। আর
আমাদের মহারাজ নিজে এক জন অদ্বিতীয় বীরপুৰুষ, আর তাঁর
সৈন্য বল, অর্থবল কিছুরই অভাব নাই। তা এর জন্য আপনার
রাত দিন ভেবে শরীর নষ্ট করা উচিত নয়।
নলি। রাজমহিষি। আমরা আর আপনাকে ভাবতে দিব না,
সেই জন্য আপনাকে এখানে আসতে মিনতি করেছিলাম। আমা-
দের নিতান্ত ইচ্ছা যে আপনি পূর্বের ন্যায় গান বাজনা শুনে

দ্বিতীয়-অঙ্ক।
:
আমােদে থাকেন। সঙ্গীতে যেমন মন শান্ত করে তেমন আর
কিছুতে নয়। রাজমহিষি আমাদের কথা রাখুন, আমরা যে
প্রকারে পারি আপনাকে সন্তুষ্ট রাখবে।
পয়ি। নলিন তােমর যে আমার মনের কষ্ট দূর করতে
চেষ্টা করবে তার আর বিচিত্র কি ? কিন্তু সখি আমার কি আর
আমােদ প্রমােদে মন যায়, আমার জন্যই প্রজাদের সুখ, শান্তি
ভঙ্গ হয়েছে, আমার জন্যই রাজ্যে বিপদ উপস্থিত হয়েছে, আমার
নিমিত্তই মহারাজ আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করেছেন! আহা
তাঁর মুখ পানে চাইলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। এ সকলের মূল
আমিই। বল দেখি আমি কি করে আমােদ প্রমােদে মন দি?
মাল। মহিষ কেন বৃথা আপনাকে এবিষয়ে দোষী করেন।
এতে আপনার দোষ কি? সকলি অদৃষ্টের দোষ।
পদ্মি। (নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ) ভগবতী কপালকুণ্ডলা
এদিকে আসছেন।
(কপালকুণ্ডলার প্রবেশ)
কপা। মহিষি আপনি যে দিন রাত্রি কেঁদে কেঁদে সারা
হলেন !
পদ্মি। ভগবতি! আমি কঁদবার জন্যই জন্ম গ্রহণ করেছি।
কপা। দেবি! আমি চির উদাসিনী তবু আপনাদের দুঃখ দেখে
আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়, আপনি শান্ত হন। এ যুদ্ধে মহারাজ
নিশ্চয়ই জয় লাভ করবেন।
পদ্মি। ভগবতি। এ হতভাগিনীর জন্যই মহারাজ এত কষ্ট
পাচ্ছেন। এ হতভাগিনী যদি মহারাজের প্রণয়িনী না হত, তা
হলে মহারাজ এ বিষম বিভ্রাটে পড়তেন না। তা আমার পক্ষে
এখন মৃত্যুই শ্রেয়।

পদ্মিণী নাটক।
•
কপা। দেবি! আপনি এত উতলা হবেন না, মহারাজ সর্বদা
আপনাকে এ অবস্থায় দেখলে তাঁর কষ্ট আরাে বৃদ্ধি হবে। রাজ্ঞি।
আপনি শান্ত হন। এই যে মহারাজ এদিকে আসছেন।
(রাজার প্রবেশ ও সকলের উত্থান।)
রাজা। দেবি! তুমি এখানে? আমি তােমার অন্বেষণে
এখানে এলেম। আমি তােমাকে অন্তঃপুরের সকল স্থানে অন্বে-
ষণ করেছি।
পদ্মি। মহারাজ, আমি উদ্যানে ছিলাম।
রাজা। দেবি বসে। ভগবতি আসন পরিগ্রহ করুন।
কপা।
যে আজ্ঞা। (সকলের উপবেশন)
পমি। মহারাজ যুদ্ধের সংবাদ কি ?
রাজা। এখন পর্যন্ত মুসলমানেরা চিতােরে প্রবেশ করতে
পারে নাই, কিন্তু আর রাখতে পারি না। আমার সৈন্য সকলই নষ্ট
হয়েছে।
পরি।
তবে আমাদের উপায় কি হবে?
রাজা। ভগবানই জানেন। কিন্তু আলাউদ্দিন সন্ধির
প্রস্তাব করে পাঠিয়েছে।
পমি। মহারাজ সেত সুখের বিষয়। আপনি সন্ধি করুন
কেন।
রাজা। আমি সন্ধি করতে প্রস্তুত, কিন্তু যে পণে সন্ধি করতে
চেয়েছে, সে পণে কি রূপে সম্মত হই।
পন্সি। কি পণে মহারাজ ?
রাজা। ওঃ সে অতি নিদারুণ কথা, আমি কেমন করে বলব।
সে লিখে পাঠিয়েছে, তােমার প্রতিমূর্তি একবার দর্পণে দেখে
সসৈন্যে ফিরে যাবে।

তৃতীয় অঙ্ক।
২৯
পত্তি। এ আর নিদারুণ কথা কি মহারাজ! আমি আপনার
জন্য জীবন পৰ্য্যন্ত বিসর্জন দিতে পারি, এত তুচ্ছ কথা।
রাজা। দেবি! আমি জানি তুমি আমাকে কত ভাল বাস।
পদ্মি। মা চিতােরেশ্বরী এত দিনের পর জুঝি মুখ তুলে
চাইলেন।
রাজা। তবে দেবি! আমাকে এক্ষণে বিদায় দাও। আমি
মন্ত্রীকে পত্র প্রেরণের আদেশ দিইগে। আমি এখন চল্লেম।
কপা। যে আজ্ঞা। (সকলের উত্থান)
[ রাজার প্রস্থান।
পদ্মি। ভগবতি ! চলুন একটু উদ্যানে বেড়িয়ে আসিগে।
নলিনী, মালতী তােমরাও এস।
উভয়ে। চলুন।
[ সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রর্থম গাঙ্ক।
চিলের রাজপথ।
দুই জন নাগরিকের প্রবেশ।
১ম না। মহাশয় আপনারতো রাজসভায় সর্বদা যাওয়া
আসা আছে, সুতরাং আমাদের অপেক্ষা রাজ্য সম্বন্ধীয় বিষয়
আপনার অধিক জানা সম্ভব। তা সন্ধির বিষয় কিরূপ শুনলেন
বলুন দেখি।

পদ্মিনী নাটক। ২য় না। মহাশয় কি এ বিষয়ের কিছু শুনেন নাই ? সম্রাট আলাউদ্দিন মহারাজের নিকট অতি বিনীতভাবে এক খানি পত্র লেখেন, তাতে এই প্রস্তাব করেন যে তিনি একবার রাজমহিষীর দর্শন পেলেই সসৈন্যে নিজ রাজধানীতে প্রত্যাগমন করবেন। ১ম না। তা মহারাজ কি এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন? ২য় না। হা স্থির হয়েছে যে অদ্য যবন সম্রাট সামান্য ভাবে অল্প মাত্র লােক সমভিব্যাহারে রাজবাড়ীতে এসে দর্পণে রাজ- মহিষীর প্রতিমূর্তি দর্শন করবেন। ১ম না। রাজুমহিষী এতে কোন আপত্তি করেন নাই। ২য় না। মহাশয় আপনি আমাদের রাজমহিষীকে জানেন না, তঁার মতন সরল, পতিরতা রমণী, রমণীকুলে দুল্লভ। আমি তাঁর এক জন পরিচারিকার মুখে শুনলাম যে মহারাজ তার নিকট এ বিষয় ব্যক্ত করতে অত্যন্ত কুণ্ঠিত হয়েছিলেন ; তাতে মহিষী বল- লেন “মহারাজ আপনি এই সামান্য বিষয়ের জন্য কেন এত কুণ্ঠিত হচ্ছেন, যদি আমার প্রাণ দিলে আপনার ও রাজ্যের বিপদ দূর হয়, আমি তাতেও প্রস্তুত আছি। ১ম না। যথার্থ পতিভক্তি, প্রগাঢ় প্রজাবৎসল্য; এইরূপ রাজমহিষী প্রজাগণের যথার্থ জননী স্বরূপা। আহা, আমাদের মহারাজ কি পুণ্যবান্, যে এরূপ রমণীরত্ব লাভ করেছেন। ভাৰ্য্যা গুণবতী না হলে সংসারে সকলই বিষময় বােধ হয়। সে যা হেকি এই যুদ্ধ বিপ্লবের মে সহজে শান্তি হলাে এ পরম সুখের বিষয়। ২য় না। তার আর সন্দেহ কি, এ যুদ্ধ রহিত না হলে চিতােরের যে কি দুর্দশা হতাে তা আর বলা যায় না। স্নেচ্ছেরা আজ কাল যেরূপ পরাক্রান্ত হয়ে উঠেছে, তাদের আক্রমণ হতে চিতাের রক্ষা করা বড় সহজ ব্যাপার হতাে না। আমাদের প্রতি তৃতীয় অঙ্ক। ভগবতী, মহাকালীর অত্যন্ত কথা বলতে হবে, যে সহজে,আমরা এ ঘাের বিপদ হতে উদ্ধার হলেম। ( সভা পণ্ডিতের প্রবেশ) সভা। (স্বগত) আঃ বাঁচলেম, আরে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের কি ওসব সাজে! পুজা, আশ্রয় করলেম, আহারাদি সচ্ছন্দে হলাে, দুটো একটা শাস্ত্রালাপ করলেম, জোর তাতে একটু তর্ক যুদ্ধ কর- লেম, খানিকটা গলা বাজি হলাে চুকে গেল, তা নয় আবার কি অসি যুদ্ধ, রক্তারক্তি ব্যাপার! আবার সেনাপতিটের বুদ্ধি দেখ দেখি, বলে সকলকে যুদ্ধ করতে হবে, বলে চিতােরের যে যেখানে আছে,বৃদ্ধ, যু, বালক, সকলকেই অস্ত্রধারণ করতে হবে, ব্রাহ্ম- ও বাদ নাই। বেটা কাট গোয়ার, মররি বেটা আপনি মর, আবার পাঁচ জনকে জড়াস কেন? সে দিনে তলয়ার খানা তুলতে গিয়ে দেখি যে দেড় মণ ভারি, আমার হাতের কবজিতে, আজও বেদনা রয়েছে। চাগতেই পাল্লেম না আবার তাই নিয়ে যবন বধ করব কি? এখন, সন্ধি হলাে বাঁচা গেল কিন্তু মহারাজের সম্মুখে বলা হবে না যে আমি যুদ্ধে ভয় পেয়েছিলাম। এখন রাজ সভায় যাওয়া যাক। [ প্রস্থান । ১ম। মহাশয় সভা পণ্ডিত মহাশয়ের সাহসের কথা শুন- লেন । ২য় না। ওসব জানাই আছে ওদের বীরত্ব যত বাহ্মণীর কাছে। চলুন এক বার রাজদর্শনে যাওয়া যাক। ১ম না। চলুন। [ উভয়ের প্রস্থান

[ ৩২ ]
তৃতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্বাক।
চিতাের—রাজভবন।
(মন্ত্রীর প্রবেশ।)
মন্ত্রী। স্বগত) আলাউদ্দিন , বন্ধু ভাবে মহারাজকে লয়ে
গিয়ে বন্দী করলে। মহারাজ স্বপ্নেও জানতেন না যে এরূপ
হবে,তিনি জানতেন না যে যবনেরা তাঁর সহিত শঠতাচরণ
করবে, তাকে বন্দী করবে, তা হলে কি তিনি সে স্থলে
যান না তারা তাকে বন্দী করতে পারে ?, দুরাচারেরা রাজ্ঞীকে
দেখতে চাইলে, তিনি দেখালেন-সন্ধি হলাে, পরে যে এরূপ
বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা কে জানে? এখন কি উপায়ে মহা
রাজকে উদ্ধার করা যায়। (বিমর্ষভাবে অবস্থিতি )
( সেনাপতির প্রবেশ'।)
সেনা। মন্ত্রী মহাশয় মহারাজের উদ্ধারের কি উপায়
স্থির করলেন?
মন্ত্রী। কিছুই স্থির করতে পারি নাই, আপনি কি পরামর্শ
দেন।
সেনা। আমি এই বলি, আপনি আজ্ঞা কৰুন, অদ্যই
এই মুহূর্তে যবন শিবির আক্রমণ করে যবনদিগকে ছারখার
করে তাকে উদ্ধার করি।
মন্ত্রী। সেরূপ উপায় অবলম্বন করে মহারাজকে উদ্ধার
করা যাবে না, কারণ আমাদিগের সৈন্য-বল তত নাই। এখন অন্য

৩৩ তৃতীয় অঙ্ক। কোন উপায়ে সন্ধির প্রস্তাব করা ভাল। এখন যথেষ্ট অর্থ লয়ে যদি মহারাজকে মুক্ত করে দেয় তাহারই প্রস্তাব করে পাঠান যাক। সেনা। মহাশয় যবন সম্রাট অর্থ লােভে চিতাের আক্র- মণ করে নাই যে প্রচুর অর্থ পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে সন্ধি করবে। আর যবনের সহিত সন্ধি,-না, তা হতে দিব না ! যবনের পদানত হয়ে সন্ধি করলে আমাদের অপমানের আর সীমা থাকবে না, আর তাতে মহারাজও সন্তুষ্ট হবেন না। মন্ত্রী। সেনাপতি মহাশয়, ক্ষত্রিয় মাত্রেরই এইরূপ সাহস হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি করা কর্তব্য। { রণবেশে পদ্মিনী এবং গােরা ও বাদলের প্রবেশ।) পদ্মিনী। মন্ত্রী মহাশয়, মহারাজ তত বন্দী হয়েছেন, এখন তাঁকে মুক্ত করবার উপায় কি ? মন্ত্রী। কি উপায়ে যে মহারাজকে উদ্ধার করবে, তা এখনও কিছুই স্থির করতে পারি নাই। পদ্মি। আচ্ছা আলাউদ্দিনকে এই মর্মে এক খানা পত্র লিখুন আমি তাতে স্বাক্ষর করি। মন্ত্রী। কি লিখিব আজ্ঞা কুন। পী। লিখুন “আমি তাকে আত্ম সমর্পণ করতে প্রস্তুত” কারণ এ ভিন্ন আর রাজার উদ্ধারের উপায় নাই—“অদ্য আমি তার শিবিরে যাত্রা করব ; আমার সঙ্গে এক সহস্র পরিচারিকা দাসী যাবে। আর আমি পঁহুছিয়া স্বামীর সহিত সাক্ষাৎ করে শেষ বিদায় গ্রহণ করব।” সেনা। রাণী মা বলেন কি ?

পদ্মিনী নাটক।
পদ্মি। যা বলি তা কৰু। মন্ত্রী মহাশয় এক সহস্র শিবিকা
আনয়ন কৰুন, পরে যা করতে হয় পরে জানতে পারবেন। সেনাপতি
মহাশয়, আমি আপনাকে কিঞ্চিৎ পরে যেরূপ বলে পাঠাব সেই
রকমে প্রস্তুত হয়ে থাকবেন।
সেনা। যে আজ্ঞা।
মন্ত্রী।
এর তাে কিছু ভাব বুঝতে পাল্লেম না। আসুন মহা-
শয়, রাজ্ঞীর আজ্ঞামত কাজ করিগে।
সেনা। চলুন।
[ উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয়
অঙ্ক।
তৃতীয় গৰ্ভীক।
যবন শিবির।
চারিজন পাঠান সৈন্য মদ্য পানে রত।
১ম সৈ।
এসাে বাবা আজ কসে আমােদ করা যাক।
২য় সৈ। আজ বাদসাহের হুকুম যে, যে যত পার আমােদ
১ম সৈ। তা আর বলতে, যার জন্য এই লড়াই সে নিজে
এসে আমাদের বাদশাহের হচ্ছে।
৩য় সৈ। আবার শুনলেম তার সঙ্গে এক হাজার দাসী
আসচে।
৪র্থ সৈ। বলিস কিরে সত্যি নাকি ?
৩য় সৈ। সত্যি নয় তাে কি মিথ্যা বলছি।

তৃতীয় অঙ্ক। ১ম সৈ। তবে তাে ভারি মজা, তার ভেতর থেকে দুই একটা পাব না ? ২য় সৈ। আমাদের সম্রাটেরই আঁটবে না। ৪র্থ সৈ। আমার ত একটা বাবা নিতেই হবে। বালাম ১ম সৈ। নে নে এখন বাজে কথা রাখ, একটু মদ দে ( মদ্য- পান) হুসেন বক্স একটা গাও না ভাই। ৪র্থ সৈ। কি গাইব ? ১ম সৈ। যা তাের প্রাণ চায়। ৪র্থ সৈ। আচ্ছা এক গ্লাস দাও গলাটা সাফ করা যাক। ১ম। এই নে খা। ৪র্থ। (মদ্য পান) আচ্ছা ভাই তবে ঢালটা নে। ১ম। আচ্ছা। ৪র্থ। (গীত)। ১ম। বেশ ২ বেড়ে গেয়েছ। ২য়। মাইরি ভাই হিঁদু বেটাদের মেয়ে গুল বেশ। ৩য়। ওরে তা যদি না হবে তাহলে বাদ সাহেব কোথায় দিল্লী থেকে চিতােরে এসে উপস্থিত হবে কেন? এক মেয়ে মানু- ষের জন্য বই ত নয় ! ৪র্থ। আমা বেটাদের কিন্তু খুব জোর কপাল। মৈ। কেন বল দেখি? ৪র্থ। কেন আবার জিজ্ঞাসা করিস? এই নগরে কত লােক মােললা তার ঠিকানা নাই। কিন্তু আমাদের গায়ে একটু আঁচও লাগেনি। ২য়। লাগতাে কি না দেখতে পেতিস, যদি পদ্মিনী বাদশার হবে বলে না চিটি লিখত।

পদ্মিনী নাটক।
।
১ম।
৪র্থ। আরে তাইতে”বলছি জোর কপাল।
৩য়। আচ্ছা চুড়িও যে ভীম সিংকে ছাড়তে রাজী হলাে।
ওরে বাদশার মাগ হওয়া বড় অল্প ভাগ্যের কথা নয়,
‘আমার মাগ কি আর কারাে উপর যদি বাদশার নজর পােড়তাে,
তাহলে আমি বাবা বলে দিতুম।
তা হলে তুই একটা বড় ওমরাহ হয়ে যেতিস।
৪থ। এখন বাজে কথা রেখে এক গেলাস খাওয়া যাক।
তবে একটু খেয়ে নি।
গীত
( সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম পর্ব।
আলা উদ্দিনের শিবিরস্থ একটী গৃহ।
রাজু ভীম সিংহ বন্দী অবস্থায় আসীন।
রাজা। (স্বগত)। ওঃ দুরাচার যবন কৌশল ক্রমে আমাকে বন্দী
করলে। নরাধমের কি চতুরতা, পাপিষ্ঠ সন্ধির প্রস্তাব করে পদ্মি-
নীকে দর্পণে দেখতে চাইলে, আমিও তাই করলেম।
ভাবে আমাকে শিবিরে লয়ে এসে বন্দী করলে। আমি যখন
যবন শিবিরে আসি তখন আমার কিছু মাত্র সন্দেহ হয় নাই ।
আমি জানি মানুষের যে কথা সেই কাজ, বিশেষ রাজাদের।
পরে বন্ধু

চতুর্থ অঙ্ক।.
৩৭
নরাধমের এত শঠতা তা আমি সপ্নেও ভাবি নাই। এর কি
মনুষ্য, না এরা মনুষ্যের আকারে প্রেত। (কিঞ্চিৎ চিন্তা করিয়া)
ওঃ চিতােরে যে কি হচ্ছে তা আমি কিছুই জানতে পাচ্ছি না।
তবে অনঙ্গ পাল আছে, রণবীর আছে। এরা থাকতে যবনেরা
চিতাের জয় করতে কখনই পারবে না। (চিত্তা) ওঃ নরাধম এক
এক বার এসে আমাকে যে রকম কথা বলছে, তা শুনলে শরীর
ক্রোধে কম্পিত হয়, ইচ্ছা হয় দুরাচারের মুও পদতলে দলিত করি।
ওঃ আমার অদৃষ্টে এই ছিল—যবন হন্তে বন্দী হলেম। যদি এই
পিঞ্জর থেকে কখন মুক্ত হতে পারি, তা হলে দুরাচারদের সমুচিত
শাস্তি দিবই দিব। সমুদয় ভারতবর্ষের দেশে দেশে, নগরে নগরে,
গ্রামে গ্রামে, গৃহে গৃহে গিয়ে সকলকে উত্তেজিত করবাে, যেমন
করে পারি মাতৃভুমি হতে দুরাচারদের দূর করব। এই যে পিশাচ
এই দিগে আসছে।
(আলাউদ্দিনের প্রবেশ)
আলা।
মহারাজ এখনও আপনার পদ্মিনীকে দিতে সম্মত
ইন।
রাজা। দূর হ নরপ্রেত-দূর হ।
আলা। এখনও যদি সম্মত হােস তবে তাের মঙ্গল, নতুবা
অগ্রে তাের জীবন নাশ করব, পরে চিতরকে ভস্মসাৎ করে
পদ্মিনীকে হস্তগত করব। আর মনের সাথে তাকে লয়ে কাল
যাপন করব।
রাজা। দুষ্ট যবন এই কি যােদ্ধার ধর্ম? এই কি রাজনীতি ?
তােদর কোরাণে একেই কি ধৰ্ম্ম বলে? বন্ধুভাবে আমাকে এখানে
এনে বন্দী করলি! সতীর, সতীত্ব নাশ করতে অভিলাষ ! পাজী

৩৮
পদ্মিনী নাটক।
M
পৃথিবীতে এখনও ধৰ্ম আছেন। তাের এমন কি সাধ্য যে তুই
সতীর সতীত্ব নষ্ট করবি?
আলা। দূর মূখ পৃথিবীতে কি সতী আছে, তা হলে আমি
পদ্মিনীর জন্য চেষ্টা করতেম না।
পামর তােদের মুসলমানজাতির মধ্যে না থাকতে
পারে ! পদ্মিনী আমার সতীত্বের আদর্শ স্বরূপ।
আলা। (হাস্য করিয়া) হা! হা! তাের পদ্মিনী সতীত্বের
আদর্শই বটে। শুন মহারাজ পদ্মিনী আমার হয়েছে। যে
পদ্মিনীর জন্য কত শত জীব হত হয়েছে, যার জন্য তুমি এত কষ্ট
করতেছ, সেই পদ্মিনী আমাকে কি বলে চিঠি লিখেছে এক বার
দেখ। স্পষ্টাক্ষরে লিখে পাঠিয়েছে, যে আমার প্রণয়িনী হবে।
এই দেখ পদ্মিনীর স্বাক্ষর, আর মােহর। (পত্র দান)
রাজা। (পত্র পাঠ করিয়া) ওঃ তাইতাে পৃথিবীতে কি প্রলয়
উপস্থিত। (মূচ্ছ।)
আলা। মহারাজ আর মুচ্ছ গেলে কি হবে ? তুমিত এত
দিন ভােগ করেছ, এখন আমি কিছু দিন ভােগ করি। আহা
আমার কি শুভদৃষ্ট! এত কষ্টের পর পদ্মিনীকে পাব। আজ
আমার মনটা মুখসাগরে তার দিচ্ছে, যাকে পাবার জন্য এত
কষ্ট পেয়েছি, যাকে দর্পণে দেখে অবধি আমি একেবারে পাগলের
ন্যায় হয়ে ছিলাম, আজ আমি অনায়াসে তাকে হৃদয়ে রেখে মনের
সাধে মুখ চুম্বন করব-থাক তুই পড়ে থাক আমি এখন চল্লেম।
[ প্রস্থান ।
রাজা। (মুচ্ছাভঙ্গে সচকিতে) বিধির কি বিড়ম্বনা। ওঃ
আমার অদৃষ্টে এই ছিল। পদ্মিনী আমাকে প্রবঞ্চনা করলে ।
সতী অসতী হলাে, সত্য মিথ্যা হলো। এতদিনে জানলেম পৃথি-

চতুর্থ অঙ্ক । বীতে প্রলয় উপস্থিত। স্ত্রীলােককে কে সরলা জাতি বলে ? আমাকে প্রতারণা করবার জন্য পদ্মিনী দর্পণে তার প্রতিমূর্তি দেখিয়েছিল। ধিক পদ্মিনি, তুই মানবী মূর্তিতে কাল নিশা- “চরী! তাের হৃদয় পাষাণ অপেক্ষাও কঠিন। তাের মায়া রাক্ষ- সীর মায়ার ন্যায় ! তাের চেয়ে নিশাচরী, পিশাচীরাও শ্রেষ্ঠু, হিড়িম্বী রাক্ষসী—তারও পতি ভক্তি ছিল। তুই আজ চিতকারের নিষ্কলঙ্ক কুল কলঙ্কিত কুরলি, ওঃ তুই শেষে মুসলমানী হলি! (ক্ষণেক চিত্তা)। না, এমন কি হতে পারে ? পত্রে লিখেছে প্রথমে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। জন্মের মত আমার কাছে বিদায় লবে। এ কথার ত কিছু ভাব বুবতে পারি না। যদি যবনকে আত্ম সমর্পণ করবে, তবে আমার কাছে আসবে কেন ; আবার লিখেছে যে এক সহস্র দাসী তার সঙ্গে আসবে। ওঃ তাদের মধ্যে কি এক জনও ধাৰ্ম্মিক নাই, এই বিধৰ্ম্মীরা কি এত কাল চিতােরে বাস করত, ধর্ম একেবারে পৃথিবী ত্যাগ করে পলায়ন করেছে। (রণবেশে পদ্মিনীর প্রবেশ।) পদ্মি। মহারাজ এত দিনের পর দাসী আপনার চরণ দর্শন করে চরিতার্থ হলো। নাথ রাজা। পাপীয়সি, যবনানি ! যাও তােমার প্রভু আলাউদ্দি- নের কাছে যাও। (রাজার ক্রোধ ও দুঃখ প্রকাশ) পমি। হৃদয়েশ! প্রাণ নাথ! দাসী তােমারই, মহারাজ আপনি ভয়ানক ভ্রমে পতিত হয়েছেন। আপনার উদ্ধারের এই কৌশল অবলম্বন করেছি। অধিক কথার আর সময় নাই। কারা- গারের সম্মুখে সজ্জিত অশ্ব আছে, সচ্ছন্দে চিতােরে গমন করুন, আমি পরে গমন করছি।

৪৫
পদ্মিনী নাটক।
রাজা। বল কি পদ্মিনী ? ওঃ আমি কি নরাধম, তােমার
উপর আমার কি ভয়ানক সন্দেহই হয়েছিল, তােমাকে কত কটু
কথা বলেছি, কত তিরস্কার করেছি, আমাকে ক্ষমা কর ।
পঘি। মহারাজ এখন এসব কথার সময় নয়।
রাজা। প্রিয়ে, তােমায় ছেড়ে আমি কেমন করে যাই ?
বিশেষ এ শত্ৰু পুরী—আর তুমিই বা কি রূপে যাবে?..
পদ্মি। মহারাজ তার জন্য আশঙ্কা করবেন না, আমার
সঙ্গে বহু সংখ্যক সৈন্য এসেছে।
রাজা। তারা কোথায় ?
পঘি। তারা কারাগারের সম্মুখেই আছে, আপনি এই তরবারি
নিন, পথে যদ্যপি কেহ বাধা দেয়, তা হলে এর সাহায্যে মুক্ত
হবেন, এখন যান আর বিলম্ব করবেন না, বােধ হয় কে যেন এই
দিকেই আসছে।
রাজা। আচ্ছা আমি সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হইগে।
[ প্রস্থান।
( আলাউদ্দিনের প্রবেশ )
. আলা। প্রিয়ে, আজ তােমার আগমনে, আমার শিবির
পবিত্র হলো, তা তােমার স্বামীর নিকট বিদায় লওয়া হয়েছে।
পদ্মি। মহারাজ ভীম সিংহ এখানে নাই।
আলা। সে কি আমি যে তাকে এই মাত্র এখানে দেখে
যাচ্ছি। তবে তুমি, বােধ হয়, তাকে ছেড়ে দিয়েছ।
পঘি। হাঁ দিয়েছি।
আলা। তা দিয়েছ দিয়েছ, তাকে আমার আর কি দর
কার, তােমাকে ত পেয়েছি তা এস প্রিয়ে তােমায় একবার আলি-

চতুর্থ অঙ্ক।
৪১
জন করি, আলিঙ্গন করে আমার বহু দিনের আশা পূর্ণ করি।
(আলিঙ্গনে উদ্যত )
পরি। (অসি নিকোষিত করিয়া) নরাধম আমায় স্পর্শ
করিস না, এই মুহূর্তেই তােকে বধ করতে পারি, কিন্তু তাের
মত অধর্মাচারী পশুকে বধ করে আমার অসি কলুষিত করবে
না, চলে যা, তাকে ক্ষমা করলেম !
আলা। (স্বগত) কি আশ্চর্য্য, বলে কি? (প্রকাশ্যে) ছি প্রিয়ে
ওরকম কথা কি বলতে আছে ? আমি তােমাকে সমস্ত ভারত
বর্ষের অধীশ্বরী কৰ্বে।। এস আমার হৃদয়ে এসে আমার তাপিত
হৃদয় শীতল কর। (আলিঙ্গনে উদ্যত )
পমি। (পশ্চাৎ গমন) পামর আজ ভাের নিস্তার নাই।
দুরাচার লােভী। আমি মহারাজ ভীম সিংহের পত্নী, সিংহল -
রাজের দুহিতা, যবন আমি কি তােকে ভয় করি ? এখনও
বলছি চলে যা, পুনর্বার যদি ওরূপ কথা বলবি তা হলে এক
আঘাতে তােকে নরকে পাঠাব ।
আলা। বটে।' কে আছিস রে? এই স্ত্রী লােককে শীঘ্র
বন্দী কর।
পরী। নরাধম, আমিও একক আসি নাই, আমার সঙ্গে
সহস্র বীর দাসী বেশে শিবিকায় এসেছে, আর ছয় সহস্র সৈন্য
বাহক 'বেশে এসেছে।
(৪ জন যবন সৈন্যের প্রবেশ ও পদ্মিনীকে বন্দী
করিবার চেষ্টা।)
ক্ষত্রিয় বীরগণ, বাদল, গােরা, আমাকে এসে সাহায্য কর।
(নেপথ্যে)। জয় ভারতবর্ষের জয়।
আলা। শীঘ্র বন্দী কর।

82
পজিনী নাটক।
পদ্মি। নরপ্রেত ঘন, ভীমসিংহের পত্নী ক্ষত্রিয় কন্যা।
সমরে ভয় করে না। সাধ্য হয় পরাস্ত করে আমায় বন্দী কর।
(যুদ্ধ ১ জন যবনের পতন)। জয় ভারতের জয়। আয় নরাধম
তােদেরও যমালয়ে পাঠাই।
আলা। দেখিস ওর গায়ে যেন অস্ত্রের আঘাত না লাগে।
কৌশলে ধরবার চেষ্টা কর।
পরি। ক্ষমতা থাকে বন্দী কর। (২য় যবনের পতন) জয়
মহারাজ ভীম সিংহের জয়।
নেপথ্যে। জয় মহারাজ ভীম সিংহের জয়।
{ স্ত্রী বেশে গােরা, বাদল ও কয়েক জন ক্ষত্রিয় সৈন্যের
প্রবেশ)
গােরা। মা, আমরা থাকতে আপনি সংগ্রাম কচ্ছেন।
চিতরে প্রস্থান করুন। আজ আমরা সবন শিবির ছার খার
আলা। ইত, বড় বিপদ উপস্থিত। সৈন্যগণকে প্রস্তুত
হতে বলিগে। তারা সকলে আমােদ সালাদে মত্ত রয়েছে।
[ বেগে প্রস্থান।
পদ্মিনী। তবে আমি এখন চঙ্গে।
[ তরবারি ঘুরাইতে ঘুরাইতে প্রস্থান।
সকলে। জয় মহারাজ ভীম সিংহের জয়।
বাদল। আয় নরাধম তােদর যমালয়ে পাঠাই। (দুই জন
বনের পতন)
ধন্য পুল, এই রূপে বন বিনাশ করে কল কুলের

চতুর্থ অঞ্চ।
গৌরব রক্ষা কর ও তােমার নাম চিরস্মরণীয় কর। চল বীরগণ চল,
মুসলমানদের সৈন্য, শিবির আক্রমণ করিগে।
সকলে। জয় ভারতের জয়।
নেপথ্যে। জয় ভারতের জয়।
( সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ অঙ্ক।
০
দ্বিতীয় গাঙ্ক।
রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি এবং সভাসদ্‌গণ আসীন।
মন্ত্রী। চিতাের আজ আনন্দ সাগরে মগ্ন হয়েছে, মহারাজের
কারামুক্ত হওয়াতে প্রজাদের আর আনন্দের সীমা নাই! তারা
রাজ মহিষীকে শত শত ধন্যবাদ দিচ্ছে।
রাজা। কিন্তু আমার আর এ পৃথিবীতে সুখ নাই।
মন্ত্রী। কেন মহারাজ ?
রাজা। কল্য রাত্রে আমি এক অদ্ভুত ব্যাপার দর্শন করেছি,
তা স্মরণ হলে এখনও শরীর লােমাঞ্চিত হয়। উঃ চিতােরের আর
রক্ষা নাই।
মন্ত্রী। মহারাজ এমন কি অদ্ভুত ব্যাপার দর্শন করেছেন,
যাতে আপনি এত বিপদ আশঙ্কা করছেন।
রাজা। কল্য রাত্রে দুর্ভাবনায় চক্ষে নিদ্রা আসে নাই, কিঞ্চিৎ
পরে একটু নিদ্রা এলাে, কিন্তু তখনি একটা বিকট চীৎকারে
নিদ্রাভঙ্গ হলাে। দেখি, রণ রঙ্গিণী বেশে কালী মুর্কি সম্মুখে
বিরাজমানা। ভয়ে আমার শরীর কাঁপতে লাগলাে।

৪৪
পদ্মিনী নাটক।
মন্ত্রী। তার পর, তার পর।
রাজা। তার পর দেবী গম্ভীর স্বরে আমাকে বল্লেন শুন
ভীম সিংহ, যদি আমার ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পার, তবে তােমার
মঙ্গল। ক্ষুধায় জ্বলে মরি, ত্বরায় আমাকে নররক্ত উপহার দাও :
আমার ক্ষুধা নিবৃত্তি কর।
সেনা। কি ভয়ানক! কি আশ্চর্য্য! তার পর।
রাজা। তারপর আমি যােড় হন্তে বল্লেম অগণ্য সৈন্য মুণ্ডে
কি আপনার ক্ষুধা
নিবৃত্তি হলাে না ? সকলই তো আপনাকে
দিয়েছি। এই সম্প্রতি আপনার উদ্দেশে আট সহস্র বীরের
পতন হয়েছে, তথাপি আপনার ক্ষুধা নিবৃত্তি হলাে না?
মন্ত্রী। শুনে শরীর লােমঞ্চিত হচ্ছে। তার পর?
রাজা। তারপর দেবী বজ্র গম্ভীর স্বরে বল্লেন “মহাভাগ
আমি রাজ বলির অভিলাষী। তােমার দ্বাদশ পুত্র আছে, তাদের
একে একে আমার গ্রাসে অর্পণ কর। তবে আমার ক্ষুধার শাস্তি
হবে। ছত্র, চামর ও কিরণে সুসজ্জিত করে প্রতি দিন চিতকারের
সিংহাসনে এক এক নুতন রাজাকে অভিষিক্ত করবে, তিন দিন
পৰ্য্যন্ত তাহার আজ্ঞা সম্যক প্রতিপালিত হবে, তারপর চতুর্থ
দিবসে শত্ৰু সন্মুখীন হয়ে সমরে ঐ রাজা প্রাণ ত্যাগ করবে।
তা হলে আমি গিলােট কুলে অবস্থান করতে পারি।” এই
বলে দেবী মূর্তি অন্তহিত হলেন। অনঙ্গপাল, আমার ‘অদৃষ্টে
যে আরাে কত দুঃখ আছে তা কিছু বলতে পারি না।
মন্ত্রী।
এ যে ভয়ানক অদ্ভুত ব্যাপার তার আর নেই
নাই।
রাজা। মন্ত্রি, এমন ভয়ঙ্কর রূপ কখন দেখি নাই যে দেবী
আমার দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী, আমার মঙ্গলের কারণ, তিনিই আমাকে

চতুর্থ অঙ্ক। ৪৫. ভীম বেশে দেখা দিয়ে এরূপ নিষ্ঠুর আদেশ করলেন। ওঃ আমি পূৰ্ব জন্মে কত পাপ করেছিলাম, তাই পদে পদে আমার এই সকল প্রমাদ ঘটছে। হায় হায় এখন কি করি ? দেবী নিশাচরীর ন্যায় হয়ে পুত্রগণকে খেতে চাইলেন। কত শত লােক যাগ, যজ্ঞ, হােম প্রভৃতি অনুষ্ঠান করেও যে পুত্রের মুখা- বলােকন করতে পারে না, আর আমি সেই পুত্রগণকে অনায়াসে মহাকালীর করাল গ্রাসে নিক্ষেপ করব ? একি সামান্য দুঃখের বিষয়! মন্ত্রী। মহারাজ, এত উতলা হবেন না। আমার বােধ হয় দেবীর অবির্ভাব প্রকৃত ঘটনা নয়। আপনার অনাহার, অনিদ্রা, আর দুর্ভাবনায়, চক্ষে ও রূপ ভ্রম দৃষ্টি হয়েছে, আর যে সব বাক্য শুনেছিলেন সে সকলও ভ্রান্তি বােধ হয়। বিশেষতঃ চিতােরেশ্বরী এরূপ নিষ্ঠুর বাক্য কখনই বলবেন না। আপনি এসকল বিষয় আর চিন্তা করবেন না। ( দৈববাণী ) * ওরে পাপিষ্ঠগণ ! তােরা আমার কথা অবিশ্বাস করলি ; এই পাপে চিতােরের সর্বনাশ হবে! (ঝড়, বৃষ্টি, মেঘ গর্জন, বজ্রাঘাত ইত্যাদি) সকলে। কি সর্বনাশ, কি আশ্চর্য্য। রাজা। একি প্রলয় উপস্থিত হলাে না কি? মন্ত্রি কুমার- দের এক বার শীঘ্ৰ ডেকে আন! মন্ত্রী। যে আজ্ঞা। [ প্রস্থান। রাজা। রণবীর, কেন আমি পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করেছিলাম।

০৩
পদ্মিনী নাটক।
।
আমি কি ইচ্ছা পূর্বক আমার স্নেহ পুত্তলিকাদের মহাকালীর
করাল গ্রাসে নিক্ষেপ করিতে পারি?' কিন্তু কি করি? মা
চিতােরেশ্বরীর আজ্ঞা, কার সাধ্য লঙ্ঘন করে ! হে বিধাতঃ শেষে
আমার অদৃষ্টে কি এই লিখেছিলেন?
(মন্ত্রীর সহিত তিনজন রাজপুত্রের প্রবেশ ।
রাজা। বৎসগণ, আর বিলম্বে প্রয়ােজন নাই, সকলে অস্ত্র ধারণ
কর; এই নবীন বয়সে সকল সুখ, সকল আশা পরিত্যাগ করে,
প্রাণপণে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও, ক্ষত্রিয়ের ধর্ম রাখ, দুরাচার বন
দিগকে ভারতবর্ষ হতে দূরীভুত করবার চেষ্টা দেখ। মাতৃভূমি
চিতলরকে যবন হত্ত হতে রক্ষা কর। তােমরা জীবিত থাকতে
তােমাদের মাতা যবনের দাসী হবে, তাহা কি তােমরা সহ করতে
পারবে?
রাজপুত্রগণ। মহারাজ! আমরা জীবিত থাকতে কখনই
চিতােরকে পরাধীনতা শৃঙ্খলে বদ্ধ হতে দিব না। মাতৃ ভূমির
জন্য প্রাণ দিব।
১ম রাজপুত্র। মহারাজ! আমাকে অদ্য সেনাপতি পদে
বরণ কৰুন, আমি অদ্যই যুদ্ধ যাত্রা করব। দুরাচার যবনদিগকে
সমুচিত শান্তি দিব। তাদের ভারত ভুমি হতে দূর করবই করব,
পামরেরা কি জানে না, যে ভারত ভূমি যত বীরের জননী,
আজ যবন রক্তে বসুমতীকে উর্বরা করব।
২য় রাজপুত্র। মহারাজ! আমিও দাদার সঙ্গে যুদ্ধে যাব।
একবার গিয়ে দেখবাে যবনেরা কত বল ধারণ করে, আর নয়া-
থমদের দেখাবাে যে ক্ষত্রিয়ের কত তেজ।
৩য় রাজপুত্র। পি আমাকেও. আজ্ঞা কৰুন আর্মিও

...... চতুর্থ অঙ্ক। ৪৭ যবনদের সঙ্গে সম্মুখ সংগ্রাম করব। জননীর অপমান, পিতার অপমান, সন্তান হয়ে কখনই সহ্য করতে পারব না ! নেপথ্যে। পিতা আমাদেরও আজ্ঞা করুন, আমরাও যবন- দিগকে ছারখার করে ক্ষত্রিয়ের গৌরব রক্ষা করি। ১ম রাজপুত্র। মহারাজ আমরা একে একে যুদ্ধে গমন করি, অদ্য যদি আমি সংগ্রামে প্রাণত্যাগ করি, তা হলে, আমার কনিষ্ঠকে কল্য সেনাপতি করে পাঠাবেন। রাজা। ধন্য রাজকুলতিলক কুমারগণ, এত দিনে জান- লাম যে, চিতাের পরাধীন হবার কোন আশঙ্কা নাই। মন্ত্রি ! আজ অরি সিংহকে সিংহাসনে অভিষেক করলেম। এস বৎস, সিংহাসনে উপবেশন কর। (কুমারের হস্ত ধারণ করিয়া সিংহা- সনে উপবেশন) আজ হতে তােমার আজ্ঞা তিন দিন পর্যন্ত সম্যক প্রতিপালিত হবে, পরে চতুর্থ দিবসে শত্রু সম্মুখীন হয়ে, অস্ত্র শিক্ষার বিশেষ পরিচয় দিবে। সকলে। জয় মহারাজ অরি সিংহের জয়। [ সকলের প্রস্থান।

[৪৮] পঞ্চম অঙ্ক প্ৰথম গৰ্বাক। চিতাের,-অন্তঃপুর রাজ উদ্যানবাপীট। শিলাসনে আলুলায়িত কেশা করতলে কপােল বিন্যাস করিয়া পদ্মিনী আসীনা। অদ্মি। (রােদন স্বরে গীত) মাগাে চিতােরেশ্বরি! এত নর রক্ত পান করেও কি তােমার ক্ষুধা নিবৃত্তি হলাে না মা! একে একে একাদশ রাজপুত্র তােমার করাল গ্রাসে পতিত হলাে, এখন একটি মাত্র অবশিষ্ট, তাকে মহারাজ প্রাণের সহিত ভাল- বাসেন,“ওঃ চিতাের ছারখার হলাে, চিতােরে এমন অট্টালিকা নাই, গৃহ নাই, কুটীর নাই যার ভিতর হতে যােদনধ্বনি প্রতি- ধ্বনিত না হচ্ছে। যে চিতাের নাট্যশালা সম উজ্জ্বল ছিল, সে চিতাের আজ শ্মশান ভূমি—যে চিতাের নৃত্যগীত আমােদা- নন্দে দিবারাত্ৰ মগ্ন থাকত সে চিতােরে আজ পতি পুত্র বিহীনা স্ত্রীলােকদের ক্রন্দনধ্বনি ভিন্ন আর কিছুই শােনা যাচ্চে না! ওঃ রাজভাণ্ডার অর্থশূন্য, দুর্গ সৈন্যশূন্য ; কি কুক্ষণে যবনের ভারতবর্ষে পদার্পণ করেছিল ! এরা ভারতবর্ষের বিন্দুমাত্র সুখ সচ্ছলতা থাকতে পরিত্যাগ কৰ্বে না, পামরেরা পুনঃপুনঃ হিন্দু রাজাদের উপর অত্যাচার কচ্চে। ওঃ মহারাজের মুখ দেখলে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়, আহা সে সােণার শরীর একেবারে কালী হয়ে গেছে, এই অভাগিনীই প্রাণনাথের যত কষ্টের কারণ। জগদীশ্বর ! কেন এ হতভাগিনীকে সুন্দরী করে সৃজন করেছ ?

পঞ্চম অঞ্চ।
৪৯
আমি যদি কুরূপা হতেন, তা হলে মহারাজকে এত কষ্ট পেতে
হতাে না। (উদ্ধত ভাবে) পণ্ড আলাউদ্দিন ! এক দিন মতে
হবে, তা কি ভুলেও ভাবিস না, (দণ্ডায়মান হইয়া) না তা হবে না,
পারবি না, ক্ষত্রিয় কন্যার জীবন থাক্তে নয়, তার অর্থেই জীবন
বিসৰ্জন কৰ্বো, অমুল্য সতীত্ব নিধি রক্ষা কর্পো! (উপবেশন)
(শিমলা ও রক্তাক্ত কলেবরে বাদলের প্রবেশ।)
বিমলা। বল বৎস! আমার প্রভু তােমার পিতৃব্য সমরক্ষেত্রে
কিরূপ ব্যবহার করে ছিলেন ?
বাদল। মাতঃ! তিনি রণক্ষেত্রে অসংখ্য শত্রু বধ করে-
'ছেন, আমি তাঁর অনুগামী ছিলাম মাত্র, তঁার আক্রমণ হতে
কদাচিত যে দুই একটি যবন খুলিত হয়েছিল, আমি তাদেরই
বধ করেছি, তিনি শত্রুদের মৃত দেহে বিচিত্র গালিচা প্রস্তুত
করে এক জন যন রাজকুমারের মৃত দেহে মস্তক রেখে বীরাে-
চিত গৌরব সয্যায় শয়ন করেছেন। (অশ্রুমােচন)
পদ্মি। (দণ্ডায়মান হইয়া) কি কাকা সংগ্রামে পতিত হয়ে
চেন? চিতােরে প্রলয় উপস্থিত নাকি ?
বিমলা। বাদল! পুনর্বার বল আমার স্বামি আর কি কি
কাৰ্য্য করেছিলেন।
বাদল। মাতঃ ! পিতৃব্যের কার্য্যের আর কি বর্ণনা কৰ্বো,
তাঁর বিক্ৰমে যবনেরা বিস্মিত ও বিভ্রান্ত হয়েছিল।
পদ্মি। কাকা! ভােমার যশাে শৌরভে ভারতবর্ষ পুলকিত
হচ্ছে, ক্ষত্রিয় কুলের মুখােজ্জ্বল করে দন্তের সহিত প্রাণ ত্যাগ
করেছ, আমার পিতৃকুলের গৌরব বৃদ্ধি করেছ।
বিমলা। প্রাণনাথ ! জন্ম জন্মান্তরে যেন তােমার মতন

পদ্মিনী নাটক।
স্বামী পাই। (ক্ষিপ্তপ্রায়) প্রভু আমার বিলম্বে ক্রুদ্ধ হচ্চেন,
আমার আর বিলম্ব করা উচিত নয়, যত শীঘ্র তার সঙ্গে মিলিত
হতে পারি তার চেষ্টা করিগে। (বেগে প্রস্থান)
পন্সি। দেবি! কোথায় যান? দাড়ান, দাঁড়ান।
[ পদ্মিনীর প্রস্থান।
( অপর দিক দিয়া রাজা ও অজয় সিংহের প্রবেশ।)
অজয়। মহারাজ! এ দাসকে বাধা দেবেন না, আমাকে
যুদ্ধে যেতে আজ্ঞা দিন, ভারতভূমির চিরশত্রু বধে নিষেধ
কৰ্ব্বেন না, যদি মাতৃভূমির হয়ে অল্প সংখ্যক যবন বিনাশ করে
যুদ্ধে প্রাণ যায় সেও ভাল, অসংখ্য মুসলমানদিগকে ভারতবর্ষ
হতে দূর কত্তে পারি আর নাই পারি, চেষ্টা করা কর্তব্য।
রাজা। না বৎস! তােমায় আমি কখনই যুদ্ধে যেতে দিব
, চিতাের রক্ষার উদ্দেশে আমিই শেষ বলি, রণক্ষেত্রে সকল
পুত্ৰই প্রাণ ত্যাগ করেছে এখন তুমিই কেবল এক মাত্র বংশধর,
তােমাকে কখনই যেতে দিব না, আমি আজ স্বয়ং যুদ্ধে যাব।
অজয়। মহারাজ! অনুচিত কথা বলবেন না, পুত্র জীবিত
থাকতে পিতার রণক্ষেত্রে যাওয়া কখনই উচিত নয়, বিশেষতঃ
চিতােরেশ্বরীর আজ্ঞা। আপনি দ্বাদশ পুত্রকে রণক্ষেত্রে প্রেরণ
কৰ্বেন তা হলে চিতােরের মঙ্গল হবে। তা আপনি যদি নিজে
সংগ্রামে প্রবৃত্ত হবেন তবে মঙ্গল আর কার জন্যে পিতঃ ।
অনুমতি দিন, আপনার কাৰ্যে যবন বধ করে সংগ্রামে জীবন
বিসর্জন দিয়ে বীরলােকে গমন করি।
ধন্য পুত্র, তােমার এ কথা শুনে কোন্ বীরের হৃদয়
উত্তেজিত হয়।

পঞ্চম অঙ্ক। অজয়। তবে মহারাজ অনুমতি কৰুন আমি যুদ্ধে যাই। রাজা। না বৎস! আমি আজ স্বয়ং যুদ্ধে যাব, তােমায় কখনই যুদ্ধে যেতে দেব না, আমার মৃত্যুই মঙ্গল। (পদ্মিনীর প্রবেশ। দেবি ! এসেছ ভালই হয়েছে। রাজ্ঞি! আজ আমি স্বয়ং যুদ্ধে যাব, চিতাের রক্ষার্থে আমিই শেষ বলি। (হস্ত ধারণ পূৰ্ব্বক) প্রিয়ে ! আমাকে এখন জন্মের মত বিদায় দাও, এজন্মে আর দেখা হবে না। পরি। (রােদন করিতে করিতে রাজার গলদেশ ধারণ পুৰ্বক) নাথ! আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চলুন, আপনাকে ছেড়ে দাসী এক দণ্ডও প্রাণ ধারণ কত্তে পাৰ্বে না। রাজা। দেবি! তুমিও জহরতের আয়ােজন কর, সতীর সতীত্ব রক্ষা করা প্রধান ধর্ম। পামর ববনদের হস্ত হতে রক্ষা হবার আর এ ভিন্ন উপায় নাই, চিতােরের সমস্ত রাজপুতকুল- কামিনীদের সঙ্গে লয়ে চিতানােহন করগে, পাপিষ্ঠ যবনেরা দেখুক হিন্দু কুল কামিনীরা কিরূপে সতীত্ব রক্ষা করে। পমি। মহারাজ! আপনার ন্যায় বীরের এ উপযুক্ত প্রস্তাব আর ক্ষত্রিয় কন্যাদের এই উপযুক্ত কাজ। রাজা। (হস্ত ধারণ পূৰ্ব্বক) দেবি! আমি আর বিলম্ব কতে পারি না, আমাকে বিদায় দাও, আমাকে এখনি যুদ্ধক্ষেত্রে গমন কতে হবে, আর মন্ত্রীকে তােমাদের জহরব্রতের অনুষ্ঠান কতে আদেশ দিতে হবে, শত্রুর আক্রমণ হতে সতীর সতীত্ব রক্ষার এই চরম উপায়। চিতকারে এই ব্ৰতানুষ্ঠানের আবশ্যক হয়েছে। এস প্রিয়ে তােমাকে এক বার জন্মের মত আলিঙ্গন করি। ( আলিঙ্গন ও মুখ চুম্বন) তবে প্রিয়ে এখন চল্লেম, শীঘ্রই

২.
পদ্মিনী নাটক।
পন্সি।
পরলােকে গিয়ে দুজনে মিলিত হব, এখানে আর আমাদের
থাকা উচিত নয়। ভারতভূমি এখন প্রেতের আবাস স্থান হয়েছে।
যান মহারাজ! শীঘ্র গমন কৰুন, শত্রু রক্তে
পৃথিবীকে প্লাবিত কৰুন গে, পরে পরলােকে সাক্ষাৎ হবে।
রাজা। দেবি ! চল্লেম।
[ প্রস্থান ।
অজয়। মাতঃ! আমাকেও বিদায় দিন। পিতা আমাকে
যুদ্ধে যেতে আজ্ঞা দিলেন না, কিন্তু আমি পিতৃ আজ্ঞা লঙ্ঘন
জনিত পাপ মন্তকে সয়ে যবন শিবির আক্রমণ করিগে।
[ প্রস্থান।
বাদল। দাড়ান রাজকুমার আমিও আপনার সাহায্যে
গমন কর্পো।
[ প্রস্থান।
পদ্মি। যাও বৎস! চিতাের আজ একেবারে ছারখার হক।
আমিও মন্ত্রীকে আদেশ করিগে যেন এই মুহূর্তেই ঘােষণ করে
দেন, যে চিতােরের সমস্ত কুল কামিনীগণ চিতাবােন করে
প্রাণত্যাগ করবার জন্য প্রস্তুত হয়।
[ প্রস্থান

[ : ৫৩, 1
পঞ্চম অঙ্ক।
দ্বিতীয় গাফ।
চিতাের—যুদ্ধক্ষেত্র।
(ক্ষত্রিয় সেগণ শ্রেণীবদ্ধ ভাবে দণ্ডায়মান ও
কপালকুণ্ডলার প্রবেশ।)
কপ। জয় ভারতের জয়।
সৈন্য। জয় ভারতের জয়।
কপা।
(গীত)
মিলে সবে ভারত সন্তান,
এক তান মনে প্রাণ,
গাও ভারতের যশাে গান।
ভারত ভূমির তুল্য আছে কোন স্থান,
কোন অদ্রি হিমাদ্রি সমান,
ফলবতী বসুমতী, শ্রোতস্বতী পুণ্যবতী ;
শত খনি রত্নের নিদান।
কপা-সৈন্য। হােক ভারতের জয়,
জয় গরতের জয়,
গাও ভারতের জয়,
কি ভয়, কি ভয়,
গও ভারতের জয়।

পদ্মিনী নাটক।
কপা।
রূপবতী সাধী সতী ভারত ললনা,
কোথা দিবে তাদের তুলনা,
শর্মিষ্ঠা সাবিত্রী সীতা,
দময়ন্তি পরিতা,
অতুলনা ভারত ললনা।
কপা-সৈন্য। হােক ভারতের জয়,
জয় ভারতের জয়,
গাও ভারতের জয়,
কি ভয়, কি ভয়,
গাও ভারতের জয়।
কপা।
ভীয় দ্রোণ ভীমার্জন নাহি কি স্মরণ,
আর যত মহাবীরগণ,
ভারতের ছিল সেতু,
ঋপু দল ধুমকেতু
আত্ম বন্ধু দুষ্টের দমন।
কপা-সৈন্য। হােক ভারতের জয়,
জয় ভারতের জয়,
গাও ভারতের জয়,
কি ভয়, কি ভয়,
গও ভারতের জয়।
কপা। কেন ডর ভীরু কর সাহস আশ্রয়,
কপা-সৈ। যতাে ধৰ্ম্ম তত জয়,”

পঞ্চম অঙ্ক।
৫৫
কপা।
ছিন্ন ভিন্ন হীন বল,
ঐক্যেতে পাইবে বল,
মায়ের মুখ উজ্জ্বল করিতে কি ভয়।
এ।
কপা-সৈন্য। যােক ভারতের জয়,
জয় ভারতের জয়,
গাও ভারতের জয়,
কি ভয়,
কি ভয়,
গাও ভারতের জয়।
সৈন্যগণ। মাতঃ! আপনার এ গান শুনে কে না অনায়াসে
সমর ক্ষেত্রে প্রাণ দিতে পারে? যে ডরে সে ভীৰু, পুণ্যভূমি
ভারত ভূমিকে কখনই পরাধীন হতে দিব না।
কপা। বীরগণ ! ক্ষত্রিয়ের ন্যায় কাৰ্য্য কর, যবনদিগকে
সমুচিত শাস্তি দাও। যুদ্ধক্ষেত্রের অপর ভাগে যে সৈন্য আছে
তাদের আমি উৎসাহিত করিগে—আমি এখন চল্লেম।
[নিম্ন লিখিত কয়েকটী চরণ গাইতে গাইতে প্রস্থান।
হােক ভারতের জয়,
জয় ভারতের জয়,
গাও ভারতের জয়,
কি ভয়, কি ভয়,
গাও ভারতের জয়।
হােক ভারতের জয়,
জয় ভারতের জয়,
সৈন্য।

পদ্মিনী নাটক।
গাও ভারতের জয়,
কি ভয়, কি ভয়,
গাও ভারতের জয়।
(ভীমসিংহের প্রবেশ।
সৈন্য।(অসি নিস্কাসনপুৰ্বক) জয় মহারাজ ভীমসিংহের জয়।
রাজা। “বীরগণ ! পুত্রগণ ! করহ শ্রবণ
ভারতের সুখ শশি গ্রাসিছে যবন।
সৈন্য। (উৎসাহের সহিত) বলুন, বসুন, নাশিব যবন কিম্বা
ত্যজিব জীবন।
রাজা। “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়।
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায়।
কোটি কষ্প দাস থাকা, নরকের প্রায়।
দিনেকের স্বাধীনতা, স্বর্গ সুখ তায়।
এ কথা যখন হয় মানসে উদয় ।
পাঠানের দাস হবে ক্ষত্রিয় নয়।
তখনি জ্বলিয়ে উঠে হৃদয় নিলয়।
নিবাইতে সে অনল বিলম্ব কি সয় ?
আমাদের মাতৃ ভুমি রাজপুতানার।
সকল শরীরে ছছটে রুধিরের ধার ।
সার্থক জীবন আর বাহুবল তার।
আত্ম নাশে যেই করে দেশের উদ্ধার।
কৃতান্ত কোমল কোলে আমাদের স্থান।
এস তায় সুখে সবে হইব শয়ান ।

পঞ্চম অঙ্ক।
৫৭
৮
কে বলে শমনসভা ভয়ের নিধান।
ক্ষত্রিয়ের জ্ঞাতি যম বেদের বিধাম।
স্মরহু ইক্ষাকু-বংশে কত বীরগণ।
পর হিতে, দেশ হিতে ত্যজিল জীবন।
অরহ তাদের সব কীৰ্ত্তি বিবরণ।
বীরত্ব বিমুখ কোন্ ক্ষত্রিয়নন্দন।
অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই।
দেশহিতে মরে যেই তুল্য তার নাই।
যদিও যবনে মারি চিতাের না পাই।
স্বর্গ সুখে সুখী হব এস সবে যাই।”
০
=
।
নেপথ্যে। কেন ডর ভীৰু কর সাহস আশ্রয় “যতত ধৰ্ম্মস্তত
জয়ঃ।”
রাজা। সৈন্যগণ! চিতােরের আজ শেষ যুদ্ধ, সকলে প্রাণ
পণে যবনবধে প্রবৃত্ত হও, তােমাদের মাতৃভূমিকে দাসত্ব শৃঙ্খলে
বদ্ধ করবে তাকি তােমরা স্বচক্ষে দেখতে পারবে ? তােমাদের
স্ত্রীপুত্র পরিবারদের অপমান করবে তাকি তােমরা সহ্য কর্তে
পারবে? দুরাচার যবনের চিতাের প্রায় ছারখার করেছে এখনও
‘পার যদি রক্ষা কর।
সৈন্যগণ। আমরা একজনমাত্ৰও জীবিত থাক্তে যবনেরা
কখনই চিততরে প্রবেশ কর্তে পারবে না। হয় আমরা আজ
যবনদের নিধন কৰ্বো আর তা না পারি এই অকিঞ্চিৎকর জীবন
রণক্ষেত্রে বিসর্জন দিব।
রাজা। বীরগণ! আর বিলম্ব নাই, যবনের কোলাহল ক্রমেই
নিকটবর্তী হচ্ছে—প্রস্তুত হও।

৫৫
পদ্মিনী নাটক।
সৈন্যগণ। আমরা সকলেই প্রস্তুত আছি; যবনেরা আসবা
মাত্র খণ্ড খণ্ড করে ফেলবাে।
নেপথ্যে। (জয় সম্রাট সেকেন্দর সানির জয়-জয় মহারাজ
ভীম সিংহের জয় ও ঘাের কোলাহল।)
সৈন্যগণ। জয় ভারতের জয়।
নেপথ্যে। (কোলাহল)
*
(কয়েক জন মুসলমান সৈন্যের সহিত যুদ্ধ করিতে
করিতে সেনাপতির প্রবেশ)
সেনা। দুরাচার যবন আজ ক্ষত্রিয়বাহুবলের বিশেষ পরি-
চয় দিব।
১ম যবন সৈন্য। কাফের মুসলমানেরও বাহুবল দেখ (যুদ্ধ
ও প্রথম যবনের পতন )
সেনা। “জয় ভারতের জয়।”
২য় যবন সৈন্য। নরাধম সহস্রাধিক সৈন্য লয়ে আজ যুদ্ধ
ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলি, তার মধ্যে তুই কেবল একক জীবিত
আছিস, তবুও তাের বিক্রম কমলাে না! আয় কাফের এই বারে
তােকে শমন ভবনে প্রেরণ করি।
সেনা। সাধ্য থাকে তাই কর (যুদ্ধ, যবন সৈন্যের পতন)।
সেনা। জয় চিতকারের জয়।
রাজা। ধন্য রণবীর।
৩য় যবন সৈন্য। কাফের এই বার তােক নিয়শ্চই মারবাে।
সেনা। তবে এই আঘাতে যমালয়ে যা। (যুগ্ধ ও যবন সেনার
পতন।)

পঞ্চম অঙ্ক।
( অসংখ্য যবন সৈন্যের সহিত আলাউদ্দিনের প্রবেশ)
যবন সৈন্যগণ। জয় দিল্লীশ্বরের জয়।
ক্ষত্রিয় সৈন্যগণ। জয় মহারাজ ভীমসিংহের জয়।
আলা। সৈন্যগণ ! ভীম সিংহকে বধকরে চিতাের ছারখার
কর'।
ক্ষত্রিয় সৈন্য। আমরা থাকতে কার সাধ্য মহারাজ ভীম
সিংহের এক গাছি কেশ স্পর্শ করে ?
রাজা। সৈন্যগণ ! চিতােরবাসিগণ ! প্রিয় পুত্রগণ। যবন
বধে প্রবৃত্ত হও! পবিত্র ক্ষত্রিয় নামের সার্থকতা কর! মাতৃ-
ভূমিকে দ-হস্ত হতে রক্ষা কর !
ক্ষত্রিয় সৈন্য। মাতৃভূমিকে দহন্ত হতে রক্ষা কর
(উৎসাহের সহিত) আজ যবনদের নিস্তার নাই। জয় মহারাজ ভীম
সিংহের জয়।
আলা। বীরগণ ! কাফের দিগকে বধ কর।
ক্ষত্রিয় সৈন্যগণ। আয় তবে (ঘাের যুদ্ধ ও যুদ্ধ করিতে
করিতে মুসলমান সৈন্যগণের পশ্চাৎ গমন।)
[ সকলের প্রস্থান।
(দুই জন শব বাহকের প্রবেশ)
১ম বাহক। কি ভয়ানক যুদ্ধই হচ্ছে, আজ স্বয়ং আমাদের
সম্রাট, আর ভীম সিংহ যুদ্ধ কচ্চেন।
২য় বাহক। আজ কত লােক যে মরবে তার ঠিকানা নাই।
মড়া বয়ে বয়ে প্রাণটা গেল।
১ম বাহক। আর ভাবলে কি হবে এখন এস এক একটা
করে নিয়ে যাওয়া যাক (এক একটা করিয়া মৃত দেহ লইয়া
প্রস্থান)

[ ৬ ]
পঞ্চম অঙ্ক
তৃতীয় গাঙ্ক।
চিতাের,-গহ্বর সম্মুস্থ ভূমি।
( প্রজ্জ্বলিত বৃহৎ চিতা)
( কপালকুণ্ডলার প্রবেশ।)
কপা।
(গীত)
তিলককমদ,-ঝাপতাল।
৫
“মলিন মুখ চন্দ্রিমা ভারত তােমারি।
রাত্র দিবা ঝরিছে লােচন বারি।
চন্দ্র জিনি কান্তি নিরখিয়ে ভাসিতাম আনন্দে ;
আজি এ মলিন মুখ কেমনে নেহারি।
এ দুঃখ তােমারি, হায় রে, সহিতে না পারি।”
এখানে আর আমার থাকা উচিত নয়, যবনের চিতাের রাজ্য
একেবারে ছারখার করে ফেললে! এই বিপুল হিন্দুরাজকুল একে-
বারে ধ্বংস হলাে! চিতাের রাজ সতী আজ অনলে প্রাণত্যাগ
কৰ্বেন! এখন আমার নিবিড় বন, কিম্বা তমােময় গিরিগুহাই
উপযুক্ত স্থান।
[ প্রস্থান ।
( মেঘগর্জন ও বজ্রাঘাত)

পঞ্চম অঞ্চ।
পদ্মিনী, বিমলাদেবী, নলিনী, মালতী ও অসংখ্য
ক্ষত্রিয় কুলকামিনী গণের রণবেশে প্রবেশ)
পদ্মি। ( উৎসাহের সহিত) সহচরিগণ ! প্রিয় ভগ্নিগণ! এস,
সকলে হুতাশনে প্রাণ পরিত্যাগ করে অমরপুরীতে গমন করি।
সতীর সতীত্ব রক্ষা করাই স্ত্রী জাতির প্রধান ধৰ্ম্ম।, যে স্ত্রীলােক
সতীত্ব রক্ষা করিতে অক্ষম তার নরক ভিন্ন আর স্থান নাই। ভগ্নিগণ !
আজ আমাদের শুভদিন, এরূপ দিন আর হবে না। এস আমরা
অনলে জীবন সমর্পণন করে চিতাের রাজ্যের মুখােজ্জ্বল করি,
সমস্ত ভারত ভূমির গৌরব বৃদ্ধি করি ! স্ত্রীলােকের পতিই ধৰ্ম্ম,
পতিই স্বর্গ, পতিই জীবন। যবনদের হস্ত হতে অমুল্য সতীত্ব
রত্ন রক্ষা করবার জন্য জহরব্রতের অনুষ্ঠান ভিন্ন আর কোন উপায়
নাই। অতএব এস, অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে সতীত্ব ভূষণে মণ্ডিত
হয়ে অমর লােকে গমন করি।
( আকাশে কোমল বাদ্য)
কামিনী গণ। দেবি ! আমরা সকলে প্রস্তুত।
(মেঘগর্জুন ও বজ্রপাত)
নেপথ্যে। (কোলাহল)
( রক্তাক্ত কলেবরে বাদলের প্রবেশ)
বিমলা। বৎস বাদল, যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে কি জন্য
এখানে এসেছ? যবনের ভয়ে কি রণ ভূমি পরিত্যাগ করেছ ?
তা যদি হয় তােত যাও ঐ চিতা প্রজ্জ্বলিত রয়েছে পুড়ে মরগে।
বাদল। মাতঃ, আমি ক্ষত্রিয় সন্তান, আমি মরতে ভয়
করি না। যুদ্ধ ক্ষেত্রের সংবাদ আপনাদের দিতে এসেছি।

পদ্মিনী নাটক।
পরি। বাছ শীঘ্র বল, কি সংবাদ এনেছ ?
বাদল। মহারাজ, যবন দিগকে ভয়ানক পরাক্রমের সহিত
আক্রমণ করেছেন, যবনগন পরান্ত প্রায়।
পদ্মি। (উচ্চৈঃস্বরে) মা চিতােরেশ্বরী বুঝি মুখ তুলে
চাইলেন।
[ বাদলের প্রস্থান।
সকলে। ধন্য বীরকুলচূড়ামণি ভীমসিংহ।
পদ্মি। মা চিতােরেশ্বরি, চিতাের রাজ্য রক্ষা কর, মা এ
বিপুল রাজকুলের প্রতি একবার মুখ তুলে চাও !
( একজন দূতের প্রবেশ)
নলি। দূত! সমর ক্ষেত্রের সংবাদ কি ?
দূত। মা আমাদের জয়ের কিঞ্চিৎ মাত্র বাকি আছে এমন
সময় অসংখ্য যবন সৈন্য এসে ঘােরতর যুদ্ধ আরম্ভ করলে, এবং
সেই যুদ্ধে সেনাপতি রণবীর প্রাণত্যাগ করেছেন, কিন্তু মহারাজ
পুনৰ্বার চতুগুণ উৎসাহের সহিত মুসলমানদিগকে আক্রমণ করে-
ছেন, ঘােরতর যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে।
পদ্মি। যাও দূত পুনৰ্বার সম্বাদ নিয়ে এস।
[ দূতের প্রস্থান।
নেপথ্যে। আল্লা আল্লা হে, জয় সম্রাট সেকেন্দর সানির
জয়।
সকলে। একি একি মুসলমানদের অকস্মাৎ আনন্দধ্বনির
কারণ কি?
পন্সি। বােধ হয় সকল আশাই ফুরালাে!

পঞ্চম অঙ্ক।
'}
( বাদলের প্রবেশ)
বাদল! শীঘ্র কি সংবাদ বল ?
বাদল। রােদন) মা আর কি বলব! যা কেহ কখন ভাবেনি,
আশা করেনি—তাই আজ হলাে—মহারাজ সংগ্রামের
পঘি। থাক—বুঝতে পেরেছি। মহারাজ সংগ্রামে পতিত
হয়েছেন আর আমাদের বিলম্ব করা উচিত নয় ! ভগ্নিগণ
এস স্বর্গে সকলের সহিত মিলিত হইগে।
নেপথ্যে। আল্লা আল্লা হাে, সম্রাট সেকেন্দর সানির জয়!
আজ চিতােরে কারাে রক্ষা নাই।
বাদল। মা আপনারা আর বিলম্ব করবেন না। যৰনেরা
আগত প্রায়।
(নিষ্কোষিত অসি হন্তে দুই জন যবনের প্রবেশ)
১যবন। এই যে, এই খানে বিবিরে জড় হয়েছে। এর ভেতর
বােধ হয় পদ্মিনীও আছে।
২যবন। এস এদের ধরে নিয়ে যাওয়া যাক।
বাদল। দুরাচার, এখানে একজন ক্ষত্রিয়কুমার উপস্থিত
আছে ? আয় তােদের যমালয়ে পাঠাই।
(যুদ্ধ ও ১ম যবনের পতন )
বাদল। জয় ভারতের জয়!
( যুদ্ধ ও ২য় যবনের পতন )
বাদল। জয় ভারতের জয় ! দেবি আপনারা অনলে
প্রবেশ করুন। আমি যুদ্ধে প্রাণ দিইগে।
[ বাদলের প্রস্থান।
পদ্মি। (উচ্চৈঃস্বরে) চিতােরেশ্বরি পাষাণি তােমাকে কেও

৬৪
পদ্মিনী নাটক।
যেন আর আরাধনা না করে, চিতােরের অধিষ্ঠাত্রী দেবা হয়ে,
চিতাের ছারখার করলে! (উন্মাদপ্রায়) আর বিলম্ব করা উচিত
নয়, প্রাণনাথ এতক্ষণ অনেক দুর গিয়েছেন। (অত্যুচ্চৈঃস্বরে)
দুরাচার যবন ! দেখ ক্ষত্রিয়কুলকামিনীরা কিরূপে সতীত্ব রক্ষা
করে! নিষ্ঠুর—পামর-নৃশংস তােদের কীর্তিস্তম্ভ দেখে যা (বেগে
অনলে পতন ও অকাশে কোমল বাদ্য)
বিমলা। চল, দেবি আমিও তােমার অনুগামিনী হলেম।
অনলে পতন, আকাশে কোমল বাদ্য)
নলিনী। প্রিয়দখি আমাদের ফেলে যেতে পাৰ্বেনা। (অনলে
পতন )
মালতী। সখি ! ডাকছ, তােমার দাসী পশ্চাৎ যাচ্চে। (অনলে
পতন )।
এক জন ক্ষত্রিয় কামিনী।' ধন্য রাজসতী পদ্মিনী ( পতন )
২য় ক্ষত্রিয়কামিনী। ধন্য ভারত ভূমি।
(একে একে সকলের পতন )
যবনিকা পতন।
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Podmini

Author
Basu, Mahendralal
Title
Aitihasik Natak
File name
Podmini
Text
OCR done
Citation
1875
Published
2009/09/12
Publisher
Mahendralal Basu
Language
Sanskrit
Pages
79
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Padmini
DLI number
513061
Barcode
4990010020074.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ioI4daD6njV
Download PDF

Podmini