Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Shibram Chakrabortir Moto Katha Balar Bipad Ed.1

Chakraborty, Shibram · 2010/04/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শিব্রাম্ চক্ৰৱৱতির মতাে
কথা বলার বিপদ।
ঐশিবরাম চক্রবর্তী
দি বুক এম্পরিয়ম লিমিটেড
কলিকাতা

প্রথম সংস্করণ-আশ্বিন ১৩৫২,
দাম-এক টাকা চার আনা
গি যুক্ত এম্পরিয়ম লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক বীরেন্দ্রনাথ ঘােষ, ২২১ কর্নওয়ালিস স্টীট,
দি প্রিন্টিং হাউসের পক্ষে মুদ্রাকর পুলিনবিহারী সামন্ত, • আপার সারকুলার রােড কলিকাতা।

তরুণ সংঘ
শক্তিসেবা সাহিত্য বিভাগ
সেবা
জয়নারায়ণপুর,
হাওড়া
হের
শর্মিষ্ঠা, শমিতা
গােপাল আর গীতা
এবং শ্ৰীমতী মিনিকে

এই বইয়ের
রূপার
শৈল চক্রবর্তী
প্রমােগশিল্পী
প্রশান্তকুমার সিংহ
২
০ ০ ০
૨૨
. . .
৩২
৪৬
৫৪
| ০ ০
১। শিব্রাম চকবতির মতাে কথা বলার বিপদ !•••
কোনাে খেলাই সহজ নয়
৩। পাগলামির মহৌষধ !
। বন্ধুত্বের জলাঞ্জলি !
৫। পরিত্যক্ত জলশা !
। ইদুরদের দূর করো!
আমার বইয়ের কাটতি ! কিম্বা কণ্ঠ তিও বলা যায় ৮
৮। পাকপ্রণালীর বিপদ।
১। নরহরিয় স্যাঙা।
১০। এক বেতার ঘটিত দুর্ঘটনা।
••• ১২০
১১। দ্বিধাগ্রস্ত আমি।
১২। প্রাণকেষ্টর কাও।
••• ১ঃ
১০।
રિ

نهج
از ط2ظون يعد
6)

আর কিছু না, বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেচি খালি : “চা
খাও আর না খাও, আমাকে তাে চাখাও ।”
অনি দোকানের ও-কোণ থেকে কে যেন তার কাণ
খাড়া কবুল, ছােট্ট একটি ছেলে, আমি লক্ষ্য কলাম ।
“দূর ! এই অবেলায় এখন চা খায় ? শুদ্ধ, এক গ্লাস
জল--আর কিছু না!” বন্ধুর জবাব এলাে : “আর—আর না
হয় ওই সঙ্গে একখানা বিস্কুট ! ভাগাভাগি করেই অবিশ্যি।”
“ভারী যে নিরাসক্তি । বাপু, আধখানা বিস্কুটে
আমার লােভ নেই, আর নীরেও আমার আসক্তি নেই তুমি
জানাে। আমার চা-ই চাই।”
কাণ-খাড়া-করা ছেলেটি এবার বলে উঠল : ‘য়া, কি
বল্লেন ?”
“তােমাকে তাে কিছু বলিনি ভাই।” আমি বল্লাম : “আমি
বচি এই—এই পাশের—আমার পাশের কী বলব একে ?
এই পার্শ্ববর্তীকে।”
“আপনি শিব্রাম্ চকবরতির মতাে কথা বল্লেন না?”
“য়া? কার মতাে কথা বল্লাম ?” আমার বেশ চমক
লাগে।
“শিব্রাম চকরবরতির মত।”
এবার আমি হচকিয়েই গেছি! বারে! আমি আবার
কার মতাে কথা বলতে যাব ? আমি কি বলতে কি—আমি
নিজেই কি উক্ত অভদ্রলােক—সেই শিব্রাম চকবরতি নই ?
শিব্রাম চকবরতির মতাে

“ওই রকম মিলিয়ে-মিলিয়ে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ল্যাজামুড়া
এক করে কথা বলা ভারী খারাপ! ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক।
বুঝলেন মশাই ?”
“তুমি কি—ঐ কি নাম বল্লে-সেই ভদ্রলােককে কখনন
দেখেচ ?”
“না দেখিনি, দেখবার আমার বাসনাও নেই। ঐ ভদ্রলােক
আমাকে যা বিপদে ফেলেছিলেন একবার ।”
“য়া, বলল কি? তােমাকে তিনি বিপদে ফেলেছিলেন ?”
আমি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ওকে পৰ্যবেক্ষণ করি : ‘কই, আমার
তাে তা মনে পড়ছে না।”
“উনি কি আর ফেলেছিলেন ? ওঁর মতাে কথা বলতে
গিয়ে আমি নিজেই ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম!” ছেলেটি
বল্ল ও হাড় কখানা আস্ত নিয়ে যে নিজের আস্তানায় ফিরতে
পেরেছি এই ঢের!”
'ও, বুঝেচি! সেই তরা, সেই সব বিচ্ছিরি লােক,
শিব্রাম চকরবরতির লেখা যারা একদম্ পছন্দ করে না, তারাই
বুঝি ? তারা তােমার কথা শুনে, তােমাকেই শিব্রাম চকবরতি
ভেবে, সবাই মিলে, ধরে বেঁধে বেশ এক চোট বেধড়ক
“উহুহু?” ছেলেটি বাধা দেয়। তারা কেন মারূবে ?
তারা কারা ? তারা কোথ থেকে এল ? না, তারা নয়।
সেই জন্যেই তত বারণ করচি, শিব্রাম চকবরতির মতো কথা
কক্ষণাে বলবেন না। ওই ধরণের কথা বলার বদভ্যাস ছাড়ুন,
কথা বলার বিপদ।

জন্মের মত ছেড়ে দিতা নাহলে আপনাকেও হয়তাে কোন্‌দিন আমার মতাে বিপদে পড়তে হবে।” বন্ধুর উদ্দেশে বল্লাম- তাহলে চা থা! খােকার গল্পটাই শােনা যাক ! বলল তো ভাই, কাণ্ডটা । ওই বিষয়ে বল্‌তে কি, সব চেয়ে বেশী আমারই আগে সাবধান হওয়া দরকার।” এবং আমার বন্ধু—যিনি এতক্ষণ চায়ের বিপক্ষে ছিলেন- চাউর করলেন ? “না, চা আমু। এবং তুমিও এসাে এই টেবিলে। ওহে তিন কাপ, চা, আর—আর তিন ডজন বিস্কুট ! চা খাই আর না খাই, তােমাদের তত—কি বলে গিয়ে—চা পান করাতে দোষ নেই ?” “খুব সামলে নিয়েছেন।” ছেলেটি আমাদের টেবিলে এসে বল । “বলতে পারতেন যে ঐটেই দস্তুর। ঐ সঙ্গে বলতে পারতেন আরো। কিন্তু খুব বাঁচিয়ে নিয়েছেন। শিব্রাম্ চকবরতি এখানে থাকলে, ঐ দোষের জন্যে, দস্যুকেও নিয়াস্- তেন বিনা দোষেই। ঐটেই ওঁর মস্ত দোষ। টেনে হিচড়ে কেমন করে যে তিনি এনে ফ্যালেন।” কি করে যে এত পারেন ভদ্রলােক, আমি আশ্চর্য্য হই।” আশ্চর্য হয়ে আমি বলি । “যেমন করে মুর্গিতে ডিম পাড়ে, তেমনি আর কি!” বন্ধুবরের অনুযােগ : “এমন কি শক্ত ?” ‘শক্ত ? কিছু না।” ছেলেটি বলে ? ‘আমরা সব্বাই শিৱ চকবরতির মতো

পারি।
আমাদের ক্লাসের পেত্যেক ছেলে। আমাদের
বাড়ীতে দাদারা, দিদিরা, এমন কি বৌদি পৰ্য্যন্ত। ওতাে
এন্তার পারা যায়, ঐ উনি যা বল্লেন—একেবারে মুর্গির
মতন। আস্ত ঘােড়ার ডিম। পেড়ে দিলেই হােলােপাতে
কি ! তবে লেখকের মধ্যে ঐ একজনই শুধু পারেন—কিন্তু
পাঠকের মধ্যে হাজার হাজার। পাঠকের মধ্যে এক আমিই
যা ঠেকে শিখেচি, আমি আর পারব না।” এই বলে ছেলেটি
নিজের অক্ষমতা জ্ঞাপন করে।
এরপর, আসল গল্পটা যতদূর সম্ভব ছেলেটির নিজের ভাষায়
বলার চেষ্টা করা যাক্
গরমের ছুটিটা কোথায় কাটানাে যায় ' ভাবলুন, অনেক
দিন তাে যাইনি, কাকার ওখানেই যাই” ছেলেটি মুক
কক্ল বলতে ‘অসান্সােলে গিয়ে সােলে শান্ দিয়ে আসি।
কলকাতার বাইরে ফাকাও হবে, আর আরাম করে থাকাও
হবে। একেবারে আমের আশা যে ছিল না তাও ন', তবে
মশাই, আমার আমাশা ছিল না। তবে, কাকার বাগানে
ঢুকে আম জাম যে বাগানাে যাবে সে আশা খুবই ছিল ।...”
ছেলেটি অম্লানবদনে অকাতরে বলে যাচ্ছিল, আর আমার
চোখ ক্রমশই বড়ো থেকে আরাে বড়ো হতে হতে, ছানাবড়া
কি, লেডিকেনি পৰ্য্যন্ত ছাড়িয়ে গেল। অবশেষে আমি আর
থাকতে পারুলেম না-
কথা বলার বিপদ ।

“থামাে থামে। তুমি বচ কি? তুমি কি বচ, তুমি
শিব্রাম চকবরতি নও? তুমি নিজেই নও? ঠিক বচ্চ?
ঠিক জানাে? আমার গুরুতর সন্দেহ হচ্ছে, তুমিই শিব্রাম্
চকরবরতি ?”
‘আমি ? আমি না।” ছেলেটি ম্লান একটুখানি হাল।
“বলল, নির্ভয়ে বলল, কোনাে ভয় নেই। লােকটার ওপর
রাগ আছে, আমাদেরও রাগ আছে, কিন্তু আমরা তােমাকে
ধরে’ ঠ্যাঙাব না।” আমার বন্ধুটি অভয় দিয়ে বলেন : “না,
এমন সামনে পেয়ে বাগে পেলেও না।”
“কী যে বলেন ! শিব্রাম চকরবরতি-লােকটি কি এতই
ছােট হবে ?এই বলে ছেলেটি আত্মরক্ষার খাতিরেই কিনা
বলা যায় না, অদূরবর্তী আয়নায় প্রতিফলিত নিজের প্রতি
আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল । চেয়ে দেখুন তাে !
আর শিব্রাম চকবরতির নাকি গোঁফ-দাড়ি একদম্ থাকবে
?”
“সে একটা কথা বটে।” আমি ঘাড় নাড়ি : “শিব্রাম
চকবরতি লােকটা এত ছােট না হওয়াই উচিত। এতদিনে
তাে সাবালক হবার কথা। তবে কিনা, ছােট লােকের
পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। তা ছাড়া, তা ছাড়া”—আমি
সন্দিগ্ধ হয়ে উঠি : “তুমি ঠিক ছদ্মবেশে আসসা নি তাে?
মানে কিনা,ভদ্র ভাষায় বলতে হলে—আপনি ছদ্মবেশে
আসেন নি তাে শিব্রাম বাবু ?”
শিৰাম চকবরতির মতো

ছেলেটি মুখ ভার করে ভাবতে লাগল, বােধহয় তার ধরা
পড়ে যাওয়া ছদ্মবেশের কথাই সে ভাবতে লাগল। আমিও
ভাবতে থাকি, ঐ শিব্রাম-হতভাগাটাকে অননুকরণীয় বলেই
আমার ধারণা ছিল। একটু অহঙ্কারও না ছিল তা নয় ! অননু-
করণীয়, মানে, অনুকরণের অযােগ্য। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে,
ওর সম্বন্ধে আমার, অনেকের মতাে আমারও একটা ভুল
ধারণাই এতদিন থেকে গেছে। অত্যন্ত সহজেই যে-কেউ ওকে
-মানে, ঐ-শিব্রামটাকে—টেকার পর টেক্কা মেরে বেটর
যেতে পারে। তবে আর কষ্ট করে ওর লেখা পড়া কেন ?
ছােঃ ! অন্ততঃ আমি তাে আর পড়ছিনে; ওর আজে-বাজে
যত বই, আজ থেকে সব তালাক দিলাম, তালাবন্ধ থাকলে
বাক্সে ।
‘আপনি বলছেন আমিই সেই ?” ছেলেটি আরাে একটু
মান হাল। ছদ্মবেশে এসেছি বলে আপনাদের মনে হচ্ছে?
বেশ, তাহলে আমার নাক কান টেনে টেনে দেখুন । দেখতে
পারেন টানাটানি করে। মুখখাস হলে তাে খুলে আসবে ?”
ছেলেটি তার মুখ বাড়িয়ে দিল। আমার হাত সুড় সুড়
করলেও আত্মসম্বরণ করে ফেললাম ঃ “আচ্ছা, পরে পরীক্ষা
করে’ দেখব’খন। এখন তােমার গল্প তত শেষ করাে?”
আরম্ভ কল ছেলেটি ।
“গেছিতত কাকার বাড়ী। নিরাপদেই পোঁছেচি। কাকা
তখন বেদানা খাচ্ছিলেন, কোনাে জ্বরজারি হয়নি, এমনিই
কথা বলার বিপদ।

সুস্থ শরীরে বেদানা দিয়ে ব্রেক ফাস করছেন, দেখেই বুঝতে পারলাম্। আমি যেতেই বল্লেন, “এইযে, এইযে! মন্ট, যে!! খবর কি? আছিস্ কেমন ? ‘খবর ভালল। সামার ভেকেশ আমার কি না! ভাবলুম, আসানসােলে এসে সােলে একটু কাকাবাবু বাধা দিয়ে বল্লেন ? ‘বেশ বেশ! এসেছি, বেশ করেছি। যখন পাবি তখনই আসবি। কাকা কাকীর বাড়ী সবাই আসে। আসে না কে ? ‘ডাকাডাকি না করেই তাে আসে। ঐ সঙ্গে এইটুকুও যদি যােগ করতেন কাকাবাবু, ভারী খুসী হতাম। কিন্তু কাকাবাবু ওর বেশী আর এগুলেন না, অধিক বলা বাহুল্য মাত্র ভেবে চেপে গেলেন একেবারে। বােধহয় শিব্রাম্ চকবুবতির বই ওঁর তেমন পড়া-টড়া ছিলনা। পায়ের ধুলাে নিতে না নিতেই তিনি গলে পড়লেনঃ এই নে। বেদানা খা। বেদানার অনুরােধে বেশ দমে গেলাম। ও-জিনিষ অসুখ- বিসুখে খেতেই যা বিচ্ছিরি, তার ওপর সুস্থ শরীরে খেতে হলেই তাে গেছি। বেদানাটা হাতে নিয়ে বল্লাম : ‘কাকাবাবু । বেদানা দিলেন বটে, কিন্তু বলতে কি, একটু বেদনাও দিলেন। কাকা আমার কথাটায় কাণই দিলেন না। ‘নে নে, খেয়ে ফ্যাশ! খেলে গায়ে জোর হয়। ভালো শিৱা চকবরতির মতাে

শরীরে খেলেই আরাে জোর বাড়ে। নে, ছাড়িয়ে খা । কাকা
বেদানা দিলে খেতে হয়।
মনে মনে আমি বলি, কাকস্য পরিবেদনা। এবং প্রাণপণে
বেদনা দূর করি, এক একটাকে পাড়ে, গলা ধরে দূর করে
দিই—একেবারে গালের ভেতরে। গরপরে আমার গলার
তলায়।
‘তুমি গলাধঃকরণ করাে। বুঝতে পেরেছি। আমি বলি।
“ঠিক বলেচেন ।
চমৎকার বলেছেন, কিন্তু’—ছেলেটি
উকে উঠেই তক্ষুনি আবার নিবু নিবু হয়ে আসে, কেমন যেন
মুষড়ে পড়ে। তার পরে শুনুন্ !
এমন সময়ে কাকীমা এসে পড়লেন। এসেই কাকার
কবল থেকে আমাকে উদ্ধার করলেন।
‘কী সকাল বেলায় ছেলেটাকে ধরে ধরে বেদানা
খাওয়াচ্ছ? ওসব ওদের কখনাে ভালাে লাগে ? রােচে কখনো?
মণ্ট, আয় চপ, খাওয়াব তােকে, ভালাে এঁচোড়ের চপ,
আমার নিজের তৈরী, রান্নাঘরে আয়।
পিতৃব্যস্নেহ থেকে পরিত্রাণ পেয়ে হাঁপ ছেড়ে রান্নাঘরে
গিয়ে উঠলাম। কাকীমা ছােট একটু পিড়ি দিলেন বসতে ।
‘বােস্।
‘না, এই ভুয়েই বসি। আমি বল্লাম : ‘পিঁড়ি দিয়ে কেন
আর পীড়িত করছেন কাকীমা ?
‘য়া, কি বলি ? কাকীমা কাণ খাড়া কলেন।
কথা বলার বিপদ।

‘পিড়ি তাে নয়, পীড়নের যন্ত্র। আমার পুনরুক্তি হােলাের ‘যন্ত্রণাও বলতে পারেন। আরাে ভালাে করে বল্লাম আবার। ‘না, কাকীমা, আমি প্রপীড়িত হতে চাইনে। কাকীমা যেন নিজের কাণকে বিশ্বাস করূতে পারেন না। ‘এসব আবার কেমন কথা? কাকীমা হা করে রইলেন ' ‘যন্ত্র আবার যন্ত্রনা কীসব যা তা বচি আবােল তাবােল ? কাকীমার দুই চোখ বিস্ময়ে চোখা হয়ে উঠলাে। ‘চপ, দিন, তাহলেই চুপ, করব। বল্লাম আমি। কাকীমা একটু ইতস্ততঃ করে চপের প্লেটা এগিয়ে দিলেন। কাড়াতে গিয়ে দেখি দাত বসে না। চর্ব্য-চোষ্য-লেহ- পেয়র বাইরে এ আবার কি জিনিষরে বাবা ? ‘কাকীমা, এ কী বানিয়েছেন? এ কি চপ, ? এর চাপ, তাে আমি সইতে পারছি না। আমি জানাই। এচোড়গুলাে আগে কিমা করে নেননি কেন কাকীমা ? এ যে চোরেরও অখাদ্য হয়েছে। এই চপের আঘাত না করে আমাকে চপেটা- ঘাত করূলেও পারতেন। আমি হাসিমুখে খেতাম। কাকীমার চোখ কপালে উঠে যায়, বহুক্ষণ তার মুখে কথা সরে না। তারপর তার সমস্ত মুখ কেমন-একটা আশঙ্কার আবছায়ায় ভরে ওঠে। তিনি ভয়ে ভয়ে জিগ্যে করেন। ‘ চের আগে তুই এ-বাড়ীর উঁচতলাটায় দাড়িয়ে ছিলি না? তুইই তাে? আমি ওপর থেকে দেখলুম যেন ? পিত্রা চকবাতির মতাে

হ্যা, ভাবছিলুম, আপনাদের নতুন দারােয়া বাড়ীতে
ঢুকতে দেবে কিনা! আমাকে দ্যাখেনিত আগে। আমি
কৈফিয়ৎ দিই? নাম লিখে পাঠাতে হবে ভেবে কাগজ
পেসিল খুঁজছিলাম, কিন্তু দরকার হােলাে না। সে একটু
কাৎ হতেই আমি তার পেছন দিক দিয়ে সৎ করে গলে
পড়েছি।
‘ছাঁচতলাতে তুইই দাড়িয়েছিলি? কাকীমার সমস্ত মুখ
ফঁ্যাকাসে হয়ে আসে। তাই তাে বলি । কেন আমার এমন
সর্বনাশ হােলাে।
কাকীমা পা টিপে টিপে পেছােতে থাকেন : ‘চুপ করে
বসে থাকে। নােড়ােনা যেন। আমি আচি এক্ষুনি।
কাকীমার এই অদ্ভুত বিহেভিয়া আমি যতই ভাবছি ততই
মনে মনে হেভিয়া হচ্ছি। ওরকম ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার
মানে? আমিও কি একটা এঁচোড়ের চপ, না কি ?
একটু পরে কে যেন দরজার ফাঁক দিয়ে উকি মারে।
আবার কে একজন, একটু গলা বাড়িয়েই সরে যায়। আমার
কাতুত ভাইবােন সব, বুঝতে পারি। কাকার আর সব
পরিবেদনা, কাকীমার অন্যান্য অনাসৃষ্টি। ইকোয়ালি অখাদ্য।
এক একটি পাকা এঁচোড়ের চপ, কেন বাপু, অমন উকি-
ঝুঁকি মারামারি কেন? আমি যদি এমনই দ্রষ্টব্য, সামনা
সানি এসে কি আমাকে দেখা যায় না?
ওদের সবার হাবভাব আমার ভারী খারাপ লাগে। কেমন
কথা বলার বিপদ!

কেমন ঠ্যাকে যেন। আশপাশ থেকে চাপা গলা কাণে আসে,
চারধার থেকে ফিস ফিস্ গুজগুজ শুনি, আর আমার দু হাত
নিসপিস্ করতে থাকে। ইচ্ছে করে, হাতের নাগাল না পাই,
কসে এক ঘা—এই চপ ছুড়েই লাগাই না কেন এক একটাকে ?
ভাবতে ভাবতে, যেনি না দরজা তাক করে একটা চপ,
নিক্ষেপ করেছি, ওই নেপথ্যের দিকেই—অনি হুটপাট বেধে
গেছে। হুড়মুড়, দুড় দুড়, হৈ হৈ, দুদ্দাড়-রৈ রৈ কাণ্ড!
“বাবারে! মারে। ধলে রে! গেছি রে? কী ভূত রে
বাবা খেয়ে ফেলে রে!” ভারী হৈ চৈ পড়ে গেল হঠাৎ।
আমি বিরক্ত হই। ভারী অসভ্য তাে এরা ! খেয়ে ফেল্লাম
কখন? ও-চপ, তােনা খেয়েই আমি ফেলেচি, ঐঠো তত
নয়, তবে কেন ?
অবশেষে কাকীমা এলেন। সঙ্গে সঙ্গে এলাে সনাতন।
সনাতন এ-বাড়ীর পুরাতন চাকর। সনাতন কাল থেকে ওকে
দেখচি।
দুজনেই সসঙ্কোচে ঢুকল।
সনাতন একেবারে আমার অদূরে এসে দাড়াল। কিরকম
চোখ পাকিয়ে কটমট করে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে।
যেন চিনতেই পারছে না আমায়।
পুরাণাে চাল যেমন ভাতে বাড়ে, পুরাণে চাকর তেমনি
চালে বাড়বে, এ আর বিচিত্র কি ? তবু আমি একটু অবাক
হলাম ।
শিব্রাম চকবরতির মতাে

‘কাকীমা এ কি? আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
কাকীমা কি রকম একটা সন্ত্রস্ত ভাবে দরজা ঘেষে দাড়িয়ে
ছিলেন, বেশী আর এগােনি। তিনি কোনাে জবাব দিলেন
। তাঁর পেছনে, চোখ বড়াে বড়াে করে বাড়ীর যত ছেলে
মেয়েরা, ঝি-চাকর যত।
সনাতন বিড়বিড় করে কী সব বকে, আর সষে ছুঁড়ে
ছুঁড়ে আমায় লাগায়। আমার সারা গায়ে।
আমার ভারী বিচ্ছিরি লাগে। এবং লাগেও মন্দ না।
‘সনাতন, এসব কি হচ্ছে ? তােমাদের সব মাথা খারাপ হয়ে
গেল নাকি? কী বিড়বিড় কচ ? তােমার ঐ কটাক্ষ আমার
একেবারেই ভালাে লাগছে না।
সনাতন তবুও বিড় বিড় করে।
‘কথং বিড় বিড়য়সিসনাতনং ? আমি সংস্কৃত করে’ বলি ।
‘সনাতন, তােমার এ বিড়ম্বনা কেন?
‘আপনি কে ? সনাতন এতক্ষণ পরে একটা কথা
বলে।
‘আমি—আমি তােমাদের মণ্ট। আমাকে চিনতে পাচ
, সনাতন ? আমি অবাক হয়ে যাই।
‘মন্ট, না হাতী । সনাতন বলে ? বলুন, আপনি কে ?
আপনি কি আমাদের বেলগাছের বাবা? দয়া করে এসেছেন,
পায়ের ধুলাে দিতে, আজ্ঞে ?
‘ওসব রসিকতা রাখখা। কারাে বাবা-টাবা আমি নই, তা
কথা বলার বিপদ ।
১৬

বেলগাছেরই কি আর তালগাছেরই কি। ওসব গেছে ছেলেদের
আমি ধার ধারিনে।
তবে কে তুমি? তুমি কি তাহলে আমাদের গােরস্থানের
মামদো? সনাতন একটু সভয়েই এবার বলে।
বচি না, আমি মন্ট? ন্যাকামি হচ্ছে নাকি? কদ্দিন
কতাে চকোলেট খাইয়ে তােমায় মানুষ কলাম । আমার
রাগ হয়ে যায়।
‘মন্ট, না ঘণ্টা। আমাকে আর শেখাতে হবে না। আমার
কাছে চালাকি ? ভূত চরিয়ে চরিয়ে আমার জীবন গেল ।
হাড় ভেঙে সুকি বানিয়ে দেব। ব, কোন ভূত আমাদের
মণ্টর ঘাড়ে চেপেচিস্ ? বল্ আগে?
“বােধ হয় কোনাে রামভূত!” আমি আর না বলে পারি
। আধা-গল্পের মাঝখানেই বাধা দিয়ে বলি। স্বনামধন্য
আমার নিজের প্রতিই কেমন যেন একটু কটাক্ষ হয়, কিন্তু না
বলে’ পারা যায় না।
‘‘সনাতুনও ঠিক ঐ কথাই বল্ল। বল্ল, ‘গিন্নীমা, এ হচ্ছে
কোনাে রামভূত। সহজে এ ছাড়বে না। রাম নামেও না ।
সরষে-পড়া নয়, এর অন্য ওষুধ আছে।
এই বলে—
ছেলেটি আরাে বিস্তারিত করে।
১০
শিৱাৰ চকবরতির মতাে

“সনাতন করুল কি, জলভর্তি বড়াে একটা পেতলের বড়া
এনে হাজির করুল আমার সামনে। বল্ল, ‘বুঝেচি তুই কে।
ঐ অ্যাশ শ্যাওড়ার শাকচুন্নী। টের পেয়েছি ঢের আগেই।
তােল, তাে এই ধড়া দাতে করে'।
“ভাবু দিকি, কী ব্যাপার! ঘড়া দেখেই তাে আমার চোখ
ছানাবড়া। আমাকে ওরা যে কী ঠাউরেছে তাও আর আমার
বুঝতে বাকী নেই। ওদের কাছে আমি এখন কিম্ভতকিমা-
কার। আমার প্রতি ওদের কারু যে মায়া দয়া হবে না তাও
বেশ বুঝতে পেরেছি। আমার ভূত না ছাড়িয়ে ওরা ছাড়বে
না।
তবু একবার কাকীমাকে ডাকি-শেষ ডাকা ডেকে দেখি ।
‘কাকীমা, এসব তােমাদের কি হচ্ছে? আমাকে তােমরা
পেয়েছ কি? এসব কি বাড়াবাড়ি? আমার একদম্ ভালাে
লাগছে না।
কাকীমা চোখের জল মুছে চুপ করে থাকেন।
তখন সনাতনকে নিয়েই শেষ চেষ্টা করতে হয়। তাকেই
বলি : ‘বাপু, তােমার এই সনাতন-পদ্ধতি অতিশয় খারাপ।
কী চাও বলো তাে? চকোলেটু না চারটে পয়সা ? তাই দেব,
ছেড়ে দাও আমায়।
‘শাকুচুন্নী ঠাকরুণ, আর নাকে কান্না কেঁদনি ! ভালাে
চান্ তাে যা বলি, তাই করুন্ দিকি এখন। এই বলে সনাতন
ঘড়াটাকে মন্ত্র পড়ায়।
কথা বলার বিপদ।

“আমার মাথা ঘুরে যায় ! জলভরা ঐ বড় ঘড়া--এক মণের
কম হবে না। দু’হাতেই কোনােদিন তুলতে পারিনি, আর
তাই কিনা, মুষ্টিমেয় এই কটা দাতে আমায় তুলতে হবে ?
জাতও গেল, দাতও গেল, প্রাণও যায় যায় !
ধমক লাগায় সনাতন : ‘ভালাে চা তাে ন্যাকাপন রাখ!
তাে দাতে করে। নইলে দেখেছি
বলতে না বল্‌তে সনাতন---
ছেলেটি থেমে যায়। মুখ চোখ তার লাল হয়ে ওঠে।
চকচকে চোখ ছলছল করতে থাকে।
আমার বন্ধুটি উৎসাহ দেয় বলল বলল-জমেছে বেশ।”
আমি কিছু বলতে পারি না। মুখ কাচুমাচু করে বসে
থাকি।
সব দায়, সমস্ত অপরাধ যেন আমার-আমারই
কেবল। এই কেবলি আমার মনে হতে থাকে।
“বলতে না বল্‌তে সনাতন ঘা কতক আমাকে লাগিয়ে
দ্যায় ! এই সনাতন, যাকে আমি কত চকোলেট খাইয়েছি,
ছােটবেলায় কত না ওর পিঠে চেপেছি, কতই না ওকে
পিটেছি, আর সেই কিনা.•••••!”
ছেলেটির কণ্ঠ রুদ্ধ হয়। আমার এক চোখ দিয়ে জল
গড়ায়। আমার বন্ধু রুমালে নাক মােছেন।
শিব্রাম চকবাতির মতাে

“জগতের এই নিয়ম।” বর্ষণমুখর চোখটা মুছে ফেলে
আমি দার্শনিক হবার চেষ্টা করি। “তুমি কেঁদ না, কেঁদনা
তােমরা,-সনাতন রীতিই এই! আজ তুমি যার পিঠে চাপছ,
কাল সেই ভােমার পৃষ্ঠপােষক। উপায় কি ?” এই বলে
আমার যথাসাধ্য ওদের সান্ত্বনা দিই।
ছেলেটি ম্লান একটুখানি হেসে আবার শুরু করে ।
“বেশ বােঝা যায়, সনাতন আমার হাতে যত না মার
খেয়েছে এর আগে, এখন বাগে পেয়ে সে সবের শােধ তুলে
নিচ্ছে। এই সুযােগে এক ছুতাে করে বেশ এক্ চোট হাতে
সুখ করে নিচ্ছে। সুদে আসলে পুষিয়ে নিচ্ছে, বেশ বুঝতে
পারি।
কি করি? কাহাত মার খাবাে? প্রাণের দায়ে স্বড়াকে
মুখে তুলতে যাই। কিন্তু পারব কেন? একটু আগে আমি
যে চপেই দাত বসাতে পারিনি—কিন্তু সে তত এর চেয়ে
ঢের নরম ছিল। আর এর চেয়ে হাল্কা তাে বটেই।
সনাতন কিন্তু ঘড়ার চেয়েও কড়া। সে ধ করে তার
ওপরেই
ছেলেটি আর বলতে পারে না।
“বলতে হবে না। আবার বা কত বুঝতে পেরেছি।”
আমার বন্ধুটি ভগ্নকণ্ঠে বলেন। এবং রুমালে নিজের চোখ
মুছতে ভুল করে তাঁর পাশের আরেক জনের মুখ মুছিয়ে দ্যা।
কথায় সায় বিপদ।

আমার অপর চোখটি দিয়ে এবার জল গড়াতে থাকে। “তখন আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। এই ধাক্কায় মূচ্ছিত হয়ে গেলে কেমন হয় ? তাহলে হয়তাে এ-যাত্রা বেঁচে যেতেও পারি। রােজার হাত থেকে ডাক্তারের খপরে পড়ব, হয়তাে ইনজেই লাগবে, তেঁতত ওষুধ গেলাবে, কিন্তু সেও ঢের ভালাে এর চেয়ে। বা, অনি আমি পতন ও মূচ্ছ—একেবারে নট নড় চড়, নট কিচ্ছ?” এই বলে এতক্ষণ পরে ছেলেটি একটু হাল্ল, এবার আত্ম- প্রসাদের হাসি ! “মূৰ্চ্চার মধ্যেই আমি শুনতে থাকি, চোখ বুজেই শুতে পাই, সনাতন বলছে : গিন্নীমা, আমার মনে হয় ভূত নয়। ভূত হলে আলবৎ দাতে করে তুত। এর চেয়ে ভারী ভারী ঘড়া অৱেলেশে তুলে ফ্যালে। আমার নিজের চোখেই দ্যাখা ! আমার মনে হয় মন্টুবাবুর মাথা বিগড়ে গেছে ! যা বড় বড় চুল, এই গরমে, তাই হবে। আপনি কঁচিটা আমায় দিতাে! চুলগুলাে কদম হাঁ করে মাথায় ঠাণ্ডা গােবর লাগালে দুএক দিনেই খােকাবাবু শুধরে উঠবেন। এই কথা যেই না আমার কানে যাওয়া, আমি তাে আর আমাতে নেই। যা, আমার এমন সাধের একচোখ-ঢাকা চুল—শিব্রাম চকবরতির দেখাদেখি কত করে’ বাড়িয়েছি— ১৮ শিব্রাম চকবাতির মতাে

আমি বাধা দিয়ে বলি : “তবে যে তুমি বল্লে, শিব্রাম
চকবরতিকে কখনাে দ্যাখােনি?”
ঠিক স্বচক্ষে দেখিনি। তবে আজকাল ওর যত বইয়ে
ওঁর চেহারার যে সব কটুন বেরয় তাই দেখেই আন্দাজ করে
রেখেছিলাম। আপনিও তাে মশাই প্রায় তাঁর মত করেই চুল
রেখেচেন দেখা যাচ্ছে!” আমার প্রতি কটাক্ষ করে দীর্ঘ
নিশ্বাস ছাড়ে ছেলেটি : কত কষ্ট করে’ কত বকুনি সয়ে,
কত সমাদরে বাড়ানাে এই চুল, তাই যদি গেল, তাহলে
আর আমার থাকল কি?”
“সনাতনের গিন্নীমা কঁচি আনতে গেছেন, আর আমি
এদিকে চোখ টিপে টিপে চেয়ে দেখলাম, সনাতন ধড়াটা
সরাচ্ছে, সেই সুযােগে আমি না, একলাফে তিড়িং করে না
উঠে, চৌকাঠ পেরিয়ে, কাতুত রাঙ্কোসদের এক ধাক্কায়
কক্ষচ্যুত না করে সিড়ি ডিঙিয়ে একেবারে সেই সদরে
দারােয়ানু হতভাগা, দ্বারে যার ওয়ান্ হয়ে সব সময়ে
খাড়া থাকার কথা, সেব্যাটা তখন জিরাে হয়ে পড়েছিল।
ইংরিজি ওয়ান-এর বদলে, বাংলা ১ বনে গিয়ে পা গুটিয়ে,
দেয়ালে ঠেস দিয়ে জিয়ােচ্ছিল, আমি না সেই ফাকে---
‘ধ ধ ধ ধ ধ ! সােগােল উঠল চারদিকে।
আর ধর্ । এই ধুরন্ধর ততক্ষণে—” ছেলেটি থেমে গেল।
গল্পটাকে সুচারুরূপে শেষ করার জন্য, কপাল কুঁচকে, যুৎসই
একটা কথা খুজতে লাগল মনে হয়।
কথা বলার বিপদ।
১৯

“পালিয়ে এসেচ। বুঝতে পেরেছি, আর বলতে হবে
।” আমার বন্ধুটিই পালা শেষ করেন। “পালানাে হচ্ছে
একটা লম্বা ড্যাশ-ওর কোথাও ফুলষ্টপ, নেই।”
“তােমার নামটি কি?” আমি জিগ্যেস করি ! “মন্ট তে
বলেছ। কিন্তু ভালাে নামটি কি তােমার ?”
বেশ।”
“বাঃ, বেশ।”—বন্দুতে গিয়ে আমার বলা হয় না। গলায়
আটকায়।
ও সং
সেবাসত বিভাগ
নং-
নারায়ণপর,
হাওড়

زه له /ته وه শরীর সুস্থ রাখতে ব্যায়ামের দরকার। আর ব্যায়ামটা যদি খেলাধুলার ছলে নিজের অগােচরে হয়ে যায় সেটা ভালাে আরাে। কিন্তু সব খেলাধুলা আবার আমার পােয় না । লুডাে, দাবাবােড়ে, স্নেক্ এ্যাণ্ড ল্যাডার এ সব খেলাকে সহজেই আমি পােষ মানাতে পারি বটে, কিন্তু ওগুলােতে তেমন নাকি ব্যায়াম নেই। এধারে ফুটব, ক্রিকেট—এসব খেলার সঙ্গে গায়ের জোরে আমি পেরে উঠিনে ‘রাগবি ? ওবাবা । রাগবি খেলায় লাগবার মতাে রাগবার অতাে ক্ষমতা নেই আমার । রেগেমেগে কিছু করা আমার অসাধ্য। রাগ- রাগিনী-রাগ বি-এসব আমার সয় না। অবশেষে ব্যাডমিন্টনকেই অনেক বেছে ধরা গেল। এক- কালে এই খেলাটারই যা একটু আমার অভ্যেস ছিল। এই খেলাটাই ধরা যাক্ ? কিন্তু আমার সঙ্গে এ বিষয়ে উদ্যোগী হবে এমন আরেকজনকেও ধরা চাই তত? মুস্কিল হয়েছে, ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে এমন একটা লােকও এ পাড়ায় নেই। অনেক করে ধরাধরি করে অশােককে পাওয়া গেল অবশেষে। অশােক কিন্তু গাঁইগুই করে, কিছুতেই খেলতে রাজি হয় । বলে, “আমি ভাই ও খেলার কিছুই জানিনে।” “শিখে ফেলতে পারবে। শিখতে কতক্ষণ ?” আমি ওকে উৎসাহ দিই; সত্যি বলতে আমার নিজেরও তাে সবেমাত্র শুরু। ক'মাসই বা খেলছি। অবিশ্যি আগের একটু অভ্যাস ছিল কিন্তু সেও কতকাল আগে। দু'একদিন অভ্যেস শিব্রাম চকবুবতির মতাে

T
করলে তুমিও আমার মতন ভাল--কিম্বা আমার মতই খারাপ
খেলতে পারবে। আশ্চৰ্য্য নয়।
অশােক তবুও ঘাড় নাড়ে। খেলাধূলায় এতদূর নারাজ
হতে পারে এমন ছেলে এর আগে আমার নজরে পড়েনি।
খেলাধূলা আমি চিরদিনের মত ছেড়ে দিয়েছি ভাই।”
বল্ল অশােক : 'খেলে আমার ভারী মন খারাপ হয়।
আমি যে হেরে যাই কি খারাপ খেলি তার জন্যে না। খারাপও
খেলি না, আর হারিও না বড় একটা, তবে বড় ভুল খেলে
থাকি। এই জন্যই মনকষ্ট পাই। অনর্থক মনকে আর কষ্ট
দিতে ভাল লাগে না।” এই বলে সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস
ছাড়ল।
“ভুল খ্যালাে, তার মানে ?” আমি জিজ্ঞেস না করে
পারিনা।
“ছােটবেলা থেকেই ভুল খেলি—যে খেলাই খেলতে যাই।
তার জন্য ওস্তাদদের কাছ থেকে কী কম বকুনিটাই খেয়েছি।
প্রথম যখন ক্রিকেট খেলতে ধরলাম, ইস্কুলে পড়ি তখন।
আমাদের গেম্ মাষ্টার বল্লেন, অশােক, তুমি ব্যাট ঠিক ধরতে
পারছ না। আমি তাে ভারী ধাঁধায় পড়ে গেলাম। ধরেছি
তাে, আবার কি করে ব্যাট ধরতে হয়? আমার নিজের
ধারণামত ব্যাটুকে আমি দস্তুরমতই ধরেছিলাম।
ধরা কেন, পাকড়ে ছিলাম বল্লেই ঠিক হয়। কিন্তু ওই ধরণের
ব্যাটু-ধারণ গেম মাষ্টারের মনঃপুত নয় ।
তিনি বলেন,
কথা বলার বিপদ!

=
ধরতে পেরেছি। কেন তােমার এই ধারা গলদ হচ্ছে এরা
গেছে। তুমি কি কখনাে ভাণ্ডাগুলি খেতে ? খেলতে
নাকি? ‘এক আধটু’—আমি স্বীকার করলাম, কখন সখনাে-
এই পাড়ার ছেলেদের সঙ্গেই। “বােঝা গেল এইবার।”
বল্লেন গেম মাষ্টার, “সেই ডাণ্ডাগুলির ডাণ্ডার মতােই তুমি
ব্যাটু পাড়েছ বটে। ও ভাবে ধরা নিয়ম নয়। ক্রিকেট
খেলার একটা ষ্টাইল আছে। সে ষ্টাইলই হােলল আলাদা।”
এই বল্লেন গেম্ মাষ্টার।” বলতে বলতে অশােক থামল।
“গেম মাষ্টার ঠিক কথাই বলেছিলেন। আমি বল্লাম।
সে কথার আমি প্রতিবাদ করি না। গেম্ মাষ্টার আরাে
বল্লেন যে ক্রিকেটে আমি কোনােদিন শাই করতে পারব
—যদি না ঐ ভাবে ব্যাট ধরার বদভ্যাস আমি ছাড়তে
পারি। অবশি, তাঁর ঐ বলার পরেই পর পর আমি চারটে
বাউণ্ডারি করে দিলাম তার দেওয়া বলের বিরুদ্ধেই, ঐ ভাবে
ব্যাট ধরেই যদিও। কিন্তু তবু তিনি খুসি হলেন না বা তার
মত, বদলানাের বিশেষ কোন কারণ খুঁজে পেলেন না।”
অশােক মুখভার করে তার শােকাবহ জীবনীকাহিনী ব্যক্ত
করে চলল।
ঐ ক্রিকেট-কাণ্ডের কয়েক মাস পরে (অশােক বল্ল অমায়)
সে একবার টেনিস খেলা ধরেছিল। এমন কি, একটা ইটার
স্কুল টেনিস প্রতিযােগিতায় নেমেছিল পৰ্যন্ত। এই প্রতি
যােগিতায় যে ছেলেটি তার প্রতিদ্বন্দ্বী দাড়ায় তার বাবা
শিৰাম চৰাতির মতাে

বিখ্যাত ফরাসী প্লেয়ার কোশের সঙ্গে একহাত খেলেছিলেন- কোশে যখন কলকাতায় এসেছিল সেই সময়ে। কাজেই, তাকে যে কোনাে ছেলে হারাতে পারবে এ আশা কেউ করেনি, সে নিজেও না, আশােকও নয়। কিন্তু, কি আশ্চৰ্য্য, কি করে বলা যায় না, অশােক তাকে সব কটা সেটেই হারিয়ে দিল। সেই ছেলেটি, খেলা শেষ হয়ে গেলে, অশােককে ডেকে বলেছিল, “খােকা, তােমার বয়েসের তুলনায় তুমি ভালােই খ্যালাে একথা বলতে আমার বাধা নেই, কিন্তু আমার ভয় হয়, কোনােদিনই তুমি প্রথম শ্রেণীর টেনিস প্লেয়ার হতে পারবে । কোশের মত হওয়া দূরে থাক, আমার বাবার মতও নয়। তুমি যে ভাবে ব্ল্যাকেট ধরেছিলে অমন করে র্যাকেট ধরতে এর আগে আর কাউকে আমি দেখিনি। তুমি কি কখনো ক্রিকেট খেলতে?” “কিছুদিন আগে খেলেছিলাম।” হােলাে অশােককে ? ' এক আধবার। সে নামমাত্র। কবে ছেড়ে দিয়েছি।” শােনবামাত্রই ছেলেটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সে বলল, “ধরেচি ঠিক। কেন যে তুমি র্যাকেটের প্রতি ক্রিকেট ব্যাটের মত ব্যবহার করছিলে এখন তা টের পাওয়া গেল।” এই বলে সেই ছেলেটি একটু মুচকি হেসে, অশােকের সমস্ত জয়গৌরব স্নান করে দিয়ে চলে গেল। এর ফলে অশােক তার হৃদয়ের দুর্বল স্থানে দারুণ আষাৎ কথা বলার বিপদ!

|
পেয়েছিল, বলাই বাহুল্য। ব্যাকেটের প্রতি ব্যাটের মত
ব্যবহার করা—দুর্ব্যবহার করা ছাড়া আর কি? ভগ্নহৃদয়ে
সেই দণ্ডেই সে টেনিস খেলা ছেড়ে দিল চিরদিনের মতন।
এবং একটু আশান্বিত চিত্তে ফের সে ফিরে গেল ক্রিকেটে
তারপর। আর যাই হােক, র্যাকেটের দৌলতে, ব্যাট
ধরবার কায়দাটা ত সে শিখতে পেরেছে-সেটাও বড় কম
লাভ নয়। এবং ক্রিকেট খেলাতেও কি কোশের তুল্য বিখ্যাত
কেউ নেই—যারা কষে ব্যাট হাঁকড়ে পুনঃ পুনঃ সেঞ্চুরি করে’
অমর হয়েছেন। তাঁদের একজনের সমকক্ষ হতে পারলেও
তত হয়! ইকি কিছু কম না কি ? এবং তা কি সে হতে
পারবে না কোনাে দিন ? টেনিসে অনুযােগ লাভ করে ফিরে
এসে সে ক্রিকেটে যােগদান করল।
এবং এবারেও একাদিক্রমে কয়েকটা বাউণ্ডারি আর অসংখ্য
রা তুলে ফেলবার পরে গেম্‌ মাষ্টার এগিয়ে এলেন। এসে
বলেন, “অনর্থক তুমি খেলতে নেমেছ। ক্রিকেট তােমার
দ্বারা হবার নয়। তােমার হাত দেখছি বিগড়েছে আরাে।
ঠিক টেনিস ব্যাকেটের মতই তুমি ব্যাট ধরছ এখন। এবং এটা
আগের চেয়েও খারাপ।”
অশােক দমে গেল খুব। যতই না সে জিতুক, লােকে ঘাড়
নাড়তে থাকে। বলে, ও কিছু না, কিছু হচ্ছে না। জিতলে
কি হবে, ওর খেলায় কোনাে ষ্টাইল নেই। আর ষ্টাইলই যদি
থাকল তাহলে আর খেলার থাকল কি?
শিম চকয়তির মত

এতদূর পৰ্যন্ত উল্লেখের পর অশােক আমার মুখের দিকে
তাকালাে। “এ বিষয়ে তােমার কি মত? ঐ লােকদের
কথাই কি ঠিক না?”
আমি উক্ত লােকদের উক্তিতে সায় দিতে বাধ্য হলাম।
বল্লাম, “ঠিকই বলেছে ওরা। খেলায় হারজিত বড় নয়। এমন
কি, খেলাটাও কিছু না। খেলার চেয়ে খেলার কায়দাটাই
হােলাে আসল। সেইটাই বড় কথা। কায়দা করে খেলে
মােহন বাগান কততবার তত হেরে গেছে, দ্যাখাে নিকি ?
কিন্তু তাতে কি তার মাহাত্ম একটুও ক্ষুন্ন হয়েছে ?
যাকগে, তুমি কি তার পরে ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিলে
একেবারে ?”
‘জমের মত।” বল্ল অশােক : ন্যাড়া আবার কবার
বেলতলায় যায় ?”
এর পরের বৃত্তান্তটাও শুনলাম অশােকের। সব শেষে,
খেলাধুলা সমস্ত ছেড়ে সে একটা কুস্তির আখড়ায় ভর্তি
হয়েছিল। দেহচর্চার জন্য একটা কিছু করা চাই তাে।
কিন্তু যেমনি সে মুগুর ভাজতে সুরু করেছে আখড়ার
ওস্তাদ হাঁ হাঁ করে ছুটে এলেন—“ওকি? ওকি হচ্ছে ?
করছ কি ? মুগুরের অমন করে অপমান করছ কেন?”
অশােক ভাবল, ঘােরাবার মুখে মুগুরটা পায়ে ঠেকেছিল
বলেই বােধহয় ঘাট হয়েছে। অনি সে ভয়ে ভয়ে মুগু
মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করল। মুগুরের পায়ে মাথা ঠুকতে
কথা বলায় বিপদ ।

বাধ্য হলো, কি করবে? ওস্তাদের চেহারা মুগুরের চেয়েও
গুরুতর ছিল কি না।
কিন্তু তাতেও ওস্তাজী শান্ত হবার ন। তিনি কেবল
আপসােস্ করেন—“এ কি রকম মুগুর ভাজা তােমার ?
এরকম তাে কেউ মুগুর ভাঁজে না। তুমি কি কখনাে ক্রিকেট
খেতে নাকি? ব্যাটের মতাে মুগুরটাকে হাঁকড়াচ্ছে বলে
যেন বােধ হচ্ছে।”
এই কথা শুনে মুগুর ফেলে সেই যে অশােক সেখান থেকে
দৌড় মেরেছে আব তাকে আখড়ার ত্রিসীমানাতেও কেউ
দ্যাখেনি। এই তার খেলাধুলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, —এসব
শুনে’ এর পরেও কি তাকে আমি ব্যাডমিন্ট খেতে বলি ?
সে আমায় প্রশ্ন করে। আমি হয়ত বলতে পারি কিন্তু তার
মােটই আর সাহস হয় না। সে নিজেই নিজের উত্তর
দিয়ে দেয়।
‘খালাে না, ক্ষতি কি ?” আমি প্রত্যুত্তরে বলি “যত
খুসি তুমি ভুল খেলতে পারাে তাতে আমার কিছু যায় আসে
না। এবং আমার কোনাে আপত্তি নেই। তুমি যদি খেলার
দোষে হেরে যাও তাহলে আমি খুসিই হবে।
খুসিই হবে। হারাতে
পারলে আমার ভারী আনন্দ হয়।”
আর কিছু না, কেবল আমাকে আনন্দদানের জন্যেই
নিস্বার্থপর হয়ে অশােক খেলতে নামল। কিন্তু আনন্দ দেওয়া
দূরে থাক, একটার পর একটা, ও নিজেই ‘গেম্‌ আপ করে
শিৰাম চকবতির মতাে

অল্প কিছুদিন খেলাটা ধরলেও, এর মধ্যেই বেশ আমি
রপ্ত হয়েছিলাম বলে ধারণা হয়েছিল, কিন্তু প্রথম নেমেই
আমার সে ধারণা টলিয়ে দিতে থাকে।
পরের পর ওর কাছে পরাজয় লাভ করে আত্মসম্বরণ
করা কঠিন হয়ে উঠল আমার পক্ষে। আমি না বলে আর
পারলাম না ।
‘অশােক, তুমি খেলছ খ্যালাে, কিন্তু এ কী রকম খেলা
তােমার? ব্যাডমিন্টন্ কি ওই রকম করে খ্যালে? এ যদি
ব্যাডমিন্ট হয় তাহলে ওয়া মিন্ট কাকে বলে আমি
জানিনে। এমন কি, তােমার খেলাকে ওয়াস্ট মিট
বললেও অত্যুক্তি হয় না।”
“কেন, আমার কী দোষ হােলল ভাই? আমি জিতছি
ততা।”ও কাচুমাচু হয়ে বলল।
“ওটাই তাে তােমার মহন্দোষ। বেতালা খেলেও জিতে
যাচ্ছ, তাতেই তাে রাগ হচ্ছে আরাে। র্যাকেটটাকে, মনে
হচ্ছে, যেন ঠিক মুগুরের মতই তুমি ভাজতে লেগেছে।”-বলি
t
আমি।
যেই না বলা, আর মুগুরের কথা যেই না কানে যাওয়া
ওর, ব্ল্যাকেট ফেলে কানে আঙুল দিয়ে সেই যে অশােক
আমার কাছ থেকে উধাও হয়ে গেছে আর তার কোনাে পাত্তা
পাই নি।
কথা বলার বিপদ।

উদয়নারায়ণপুর, হাওড়া
তরুণ সব
শনিসাহিত্য বিভাগ
ন"

..”
RECRUITING OFFICE
mqwm8qอติ,

বিখ্যাত সাহিত্যিক অমুক চন্দ্র অমুক জাত নম্বর ঠিকানা হইতে
জানাইয়াছেন যে আমাদের মােক্ষ রসায়নের এক শিশি
মাত্র সেবন করিয়াই তাঁহার পাগলামি সম্পূর্ণরূপে সারিয়া
গিয়াছে—এই ধরণের একটা বিজ্ঞাপন, ট্রামে কিম্বা বাসে,
খবরের কাগজে কিম্বা পি এম্ বাকীর পাঁজিতে, সিনেমা
স্লাইডে কিম্বা ইষ্টিশনের প্ল্যাটফর্মে, কোথাও না কোথাও
হয়ত তােমরা দেখে থাকবে।
বলাবাহুল্য, উক্ত অমুক চন্দ্র অমুক আর কেউ না, স্বয়ং
আমি।
তবে বিখ্যাত সাহিত্যিক আমি কোনদিনই
ছিলুম না। অন্ততঃ ওই বিজ্ঞাপনের আগে তাে নয়ই।
যদ্দর জানা যায়, যত জনা আমার বই পড়েছে তার চেয়ে
ঢের বেশী, হাজার গুণ লাখগুণ বেশী লােক, ট্রাম বাসে চড়ে,
খবর কাগজ পড়ে, পাঁজি ওটায়, সিনেমা দ্যাখে আর হাওড়া
শেয়ালদায় দৌড়াদৌড়ি করে মরে। তারা সবাই ওই
বিজ্ঞাপন পড়েছিল। আর বলতে কি, তার ফলেই এই যা
একটু আমি বিখ্যাত হয়েছি। আমার প্রশংসাপত্রে ওষুধটার
কিছু সুবিধা হয়েছিল কি না জানি নে তবে ঐ বিজ্ঞাপনের
দৌলতে আমার বইয়ের এক আধটু কাটুতি হয়ত হয়ে
থাকবে।
কিন্তু পাগলামি আমার ছিল কি না, কি থাকলেও
সেয়েছিল কি না, এবং সারলেও সম্পূর্ণরূপেই সেরে গেছে
কিনা সে কথা আমি কতে পারব না। যদি বলে যে পরের
শিৰাম চকতির মতো

কার প্রত্যাশা করাটাই পাগলামি তাহলে বৰশালী কি
কারা পর? মালী যে মার চেয়েও আপনার গাে।
এইত যুদ্ধের কিছুদিন আগের কথা বলছি। সেই সময়ে
আমি এক পাবলিসিটি আপিসের জন্য বাড়ী বসে বিজ্ঞাপনের
কপি লিখতাম। ( জীবনে কতাে কাজই
গেছে !) ঘি-তেল, সন্দেশ, ওষুধ, বিস্কুট-বার্লি লােহা-লক্কর
সব কিছুর বিজ্ঞাপনই আমাকে লিখতে হােততা। ওটা ছিল
আমার গল্প লেখার উপরি পাওনা। সারাদিন যে ব্যক্তি কামার
শালায় হাতুড়ি পেটে, সেও যেমন সন্ধ্যাবেলায় তাস পিটতে
বসে—আহা, তারও তাে কোনাে সময়ে ব্যায়াম করা দরকার।
—আমারও তেমনি, এই কাজটা, গল্পলেখার ওপরে হলেও,
এতে দস্তুরমত এক্সাসাইজ, হােত। তাসখেলার
কিছুমাত্র কম নয়।
প্রথম বিজ্ঞাপন লেখার কাজ আমার হাতে এল ঐ মােক্ষ
রসায়নের মারফতে। অতএব ওকেই প্রথম এক হাত নিলুম।
প্রচারের সবচেয়ে বড় আর্ট আত্মপ্রচার, কাজেই ওষুধের
সঙ্গে নিজেকে জাহির করতে ছাড়লুম না। বুধদেখার
সাথে কলাবেচার এই সুযােগ নিয়ে নিজের সর্বনাশ যে
নিজেই ডেকে আনছি তা যদি তখন জানতাম । উক্ত মহৌষধ
খেয়েই ওর সাহায্যে যে আমারও পাগলামি সারবে তা
কে ভাবতে পেরেছিল।
তারপর এইতাে সেদিন, শশার সঙ্গে দেখা। আমার
বলার বিল।
৫

এক রেস্তরাঁয় বসে চা খাচ্ছি, শশাঙ্ক এসে উদার
হােলাে। তাকে দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বল্লাম, ‘ভাই,
জীবনে ছােটখাট ব্যাপারে যা বিপর্যয় আনে বড় বড় কাণ্ডও
তার কাছে লাগে না। এমন কি এত বড় যুদ্ধও তার কাছে
কিছু নয়।”
“যাও, তােমাকে চা খাওয়াতে হবে না।” শশাঙ্ক রাগ
করে বল্ল :
‘সামান্য এক কাপ চা খাওয়াবে তার জন্য
এত কথা !”
শশাঙ্ককে দেখে সশঙ্কিত হইনি বলাই বাহুল্য।
সে কথা
তাকে বল্লাম। বল্লাম : “তােমার কথা বলুছি না। আমার
এক মাসির কথাই বছি। তিনকুলে তাঁর কেউ নেই।
থাবার মধ্যে এক বােনুঝি—আমাদের বিনি—আর তস্য
ভ্রাতা ক্রমান্
“বুঝেছি।” বল্ল : “তস্য ভ্রাতাকে বুঝতে পেরেছি। আর
কষ্ট করে বলতে হবে না ”
“তাঁর অগাধ টাকা। তিনকূলে থাকবার মধ্যে এই।
মাসির বয়েস শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে প্রায় সত্তর, কিন্তু গত
পনের বছর ধরে তিনি শয্যাগত। মৃত্যুমুখে উপনীত হয়ে
রয়েছেন বলা চলে। কখন্‌ যা কিছু ঠিক নেই। থাকেনও
খুব দূরে নয়, কাছাকাছিই, এই তারকেশ্বরে। নিজেও যেমন
সেকেলে, তেমনি এক সেকেলে জরাজীর্ণ অট্টালিকায় বাস
করেন। একালের যা কিছু তার দুচোখের বিষ। আজকালকার
শিৰাম চৰৱতির মতাে

নজেলে, বিশেষ করে আমার বইয়ে যেসব মেয়েদের দেখা
যায়, তাদের ওপর তিনি হাড়ে-চটা। সেই জন্যে আমার
বই ভুলেও কখনাে তাঁকে উপহার পাঠাইনে।
সে যুগের
ঠাকুমাদের দেখেছ? আমার মাসিমা তাঁদেরই এক রাজ সংস্করণ
কিম্বা রাণী সংস্করণ যা বলল । তার ডাক্তারগঙ্গারাম না কী
যেন নাম র—তিনি আবার আমার মাসির চেয়েও বয়সে
ভারী। দেখলে মনে হয় ধড়াচূড়া পড়ে বঙ্কিমবাবুর উপন্যাস
থেকে সদ্য সদ্য বেরিয়ে এসেছেন—পাতা ছিড়ে একেবারে।”
“ইয়া ইয়া দাড়ি গোঁফ ?” শশাঙ্ক বাধা দিয়ে জানতে চায়।
“ইয়া দাড়ি, ইয়া গােফ! আর তার চিকিৎসাও তেনি
সেকেলে ধরণের। তাঁর চিকিৎসাগুণে মাসিমা গত পনের
বছরের মধ্যে বিছানা থেকে একবারও নড়েছেন কিনা সন্দেহ।
কেউ তাঁকে একদণ্ডের জন্যও রুগ্নকক্ষের বাইরে আসতে
দ্যাখেনি।”
Love is baland
“তা যাই হােক, তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে তাে ঠিক ?
চিকিৎসার বাহাদুরি আছে বই কি?”
কাজেই আমিই গিয়ে মাঝে মাঝে মাসিমাকে দেখা
দিয়ে আসি। মাসিক আর হয়ে ওঠে না, এই ন'মাস ছ'মাস
অন্তুরের টান অবহেলা করা যায় না, রুগ্ন
মাসির দেখা শােনা করতেই হয়।”
“মাসির অনেক টাকাকড়ি আছে বল্লে না?” শশাঙ্ক
জিতে করে । “মাসি মারা গেলে তােমরাই তাে পাবে?”
কথা বলার বিশুদ।

“আহা, সেইজন্যেই যাই নাকি! তাই তুমি বলতে
চাও ?” আহত কণ্ঠে আমি বলি : “অবশ্যি, মেলােমশাই
যেসব শেয়ার কিনে রেখে গেছেন, এই যুদ্ধের দরুণ তাদের
অনেকগুলাের দর এখন ভয়ঙ্কর চড়েছে সন্দেহ নেই, তাছাড়া
থােক দশ বিশ হাজার নগদ যে নেই তাও নয়, কিন্তু তাই
বলে আমাকে অতটা স্বার্থপর তুমি ভেব না। অমন টাকাকড়ি
থাকলেও মাসিকে দেখতে আমি তবুও যেতাম। অমনিই,
যেম। তবে কি না, সময়াভাবে গত সাত আট মাসের
মধ্যে আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি।”
তােমার সময়াভাব ?” শশাঙ্ক অবাক হয়ে যায়।
“ভারী আমার সময় দেখেচ ! বলে, ভাব করবারই সময়
পাচ্ছিনে। কিন্তু সে কথা যা। হয়েচে কি, কাল হঠাৎ
সেই মাসির এক চিঠি এসে হাজির। দিনকতর জন্য তিনি
কলকাতায়
আমাদের
বাসাতেই উঠবেন
লিখেছেন।”
“তিনি শয্যাগত না, বল্লে না তুমি?” শশাঙ্ক প্রশ্ন করে।
“শয্যাগতই বই কি।” আমি জবাব দিই : “আর তাতেই
তত বিনি আর আমি অবাক হয়ে গেছি। তিনি খুলে তােত
কিছু লেখেন নি। আচেন, এই মাত্র। অ্যাম্বুলেন্স গাড়ীতে
আসবেন কি স্ট্রেচারে করে আসবেন কে জানে?
“ভারী মুক্তিলের কথা তত।” শশাঙ্কর মন্তব্য হয়।
“মুস্কিলের কথাই বটে। সত্যি বলতে, আমরা যেকোনাে
আসচেন।
শিব্রামু চকবরতির মতাে

মুহূর্তে তার শােকসংবাদ শােনার জন্যেই এতদিন প্রস্তুত হয়ে
ছিলাম,তিনি যে এভাবে এসে আমাদের দেখা দেবেন তার
জন্য কখনই—
“তৈরী ছিলে না।” শশাঙ্ক আমাকে বল্‌তে বাধা দেয় ।
“বুঝতে পেরেছি। খুবই দুঃখের কথা, তােমার এই হতাশায়
সান্ত্বনা দানের আমার ভাষা নেই। কিন্তু কি করবে বলে
ভাই । দুনিয়াটাই এই রকম। রবীন্দ্রনাথেব কবিতায় পড়ে
তাে, যাহা চাই তাহা ভুল করে’ চাই, যাহা পাই তাহা চাই না ?
এও সেই রকম। বব কি তােমায়, আমারও এক প্রমাতামহ,
এত বুড়াে যে তাকে বৃদ্ধ প্রমাতামহও বলা যায়, পাকা আমটি
যেন, বিস্তর বিষয় আশয় আগলে দিব্যি টিকে রয়েছেন।
তাঁর সম্পত্তি পাবার আশায় আশায় আমার পিতামহ মারা
গেলেন, পিতাও গেলেন—এখন আমি তার একমাত্র প্রতি
কায়ক্লেশে কোনাে রকমে বেঁচে আছি। খুব সম্ভব, আমাকেও
মেবে তিনি মরবেন না। দীর্ঘনিশ্বাস ফেল শশাঙ্ক।
“না আমার সে কথা নয়।” আমারে চমকাতে হয় ।
“মাসি দেহরক্ষা করুন তা আমি চাই না। বরং আরাে
দীর্ঘজীবিনী হয়ে সুখে-স্বচ্ছন্দে আরাে সুদীর্ঘ কাল তিনি বেঁচে
থাকুন। অন্ততঃ আয়াে ন মাস কি ছ মাস কি মাস আড়াই
তিনি বাঁচুন, আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তার এই
কলকাতায় আসা—এতেই আমি এত ঘাবড়ে গেছি। তিনি
রাণী ভবানীর আমলের মানুষ—একেলের আমাদের চালচলন
কথা বলার বিপদ ।

সইতে পরেবেন কিনা কে জানে! বিনির জন্যেই আমার ভাবনা আরাে, গঙ্গারাম ডাক্তারের কাছে একবার সগর্বে ওঁকে বলতে শুনেছিলাম, আমার বােঝি মােটেই একেলে মেয়ের মতাে না। সে যুগের সেই দময়ন্তী না কার মতন যেন । এখন, বিনি যা আপ টুডেট মেয়ে, তাকে কি দমন করা, আই মী, দময়ন্তী করা যাবে ?” “বুঝিয়ে বলল ! বুঝিয়ে বলো ভালো করে”। বলাে যে, মাসি চটে গেলে তােমাদের উড়িয়ে দিয়ে পােষ্যপুত্র নিয়ে বতে পারেন, চাইকি, যাদবপুরের হাসপাতালের টাকাটা দিয়ে ফেলা শক্ত নয়—অবিশ্যি, তা দিয়ে গেলেও, যক্ষ্মা বানিয়ে সেখানে গিয়ে সম্পত্তির উপসত্ত্ব তােমার উপভােগ করতে পারো, কিন্তু অততা ঘুরপাকে যাবার দরকার কি? তার চেয়ে সব কথা বিনিকে—সােজা করে’ বােঝাও। বিনি আমাদের অবুঝ নয়।” শশাঙ্ক বলে। “তাছাড়া, বাড়ী ঘরের কথাও ভাবতে হয় । কোথাও যদি সেকেলে কিছুর একটু ছিটে ফোটাও থাকে ! সব একেলে আদাব, আর্টিষ্টিক ছবি যত দেয়ালে, বুঝতেই তাে পারছ ? আমার নামটা ছাড়া চারিদিকেই একেবারে আধুনিক আবহাওয়া। এসব নিয়ে এখন কি করি, কোথায় যাই- আর কালই আবার তিনি আছেন। দ্বিতীয় ভাগ না প্রথম ভাগে কোথায় যেন পড়েছিলাম, মাসি তুমিই আমার ফাঁসির কারণ—তাই বর্ণে বর্ণে সত্য হােলাে দেখছি।” == শিম চকবরতির মতো

শশাঙ্ক বিস্তর সহানুভূতি প্রকাশ করল। তাতে কান না
দিয়ে, চায়ের দাম না দিয়েই আমি বিমষ মুখে রেস্তরাঁ। ছেড়ে
উঠে এলাম।
হপ্তাখানেক পরে আবার শশাঙ্কর সঙ্গে দেখা। সেই
রেস্তরাঁতেই। আমি সরবৎ পান করছি—ঢাউস্ এক গ্লাস
সরবৎ নিয়ে মনের দুঃখে অপােবদনে সিপ, কছি নিজেকে
সান্ত্বনা দিচ্ছি সাধ্যমত, এমন সময়ে শশাঙ্ক এসে হাজির।
“কি হে, কি খবর ? তােমার সেই মাসি নিরাপদে এসে
পৌছেচেন তাে ?” শশাঙ্ক আমাকে সম্ভাষণ করল।
-“দ্যাখাে, পাগলামির একটা সীমা থাকা দরকার। আই
করে’ পাগলামি করার নির্দিষ্ট একটা বয়স বেধে দেয়া উচিত।
দেয় না কেন আমি তাই ভাবি।”
“য়, আমার পাগলামি হােললা ? তুমি বলেছিলে
বলেই আমার জিজ্ঞেস করা।” শশাঙ্ক ক্ষুন্ন হয়—বেশ, আমার
ঘাট হয়েছে, মাপ করাে।”
“তােমার কথা বলছিনে। একাত্তর বছর পেরিয়ে কেউ
যদি—
তােমার মাসির কথা বলুচ ?” শশাঙ্ক বাধা দিয়ে বলে ?
তিনি আবার কি পাগলামি করনে ? তিনি তাে শয্যাগত
বলেই শুনেছি।”
“শয্যাগত?” আমি তপ্ত কণ্ঠে বলি : “শয্যাগতই বটে।
কথা বলার বিপদ!

ষ্ট্রেচারে শুয়ে নয়, ফড়িংএর মতই উড়তে উড়তে বলা উচিত
ইষ্টিশন্ থেকে সটান্ হেঁটে এসে তিনি হাজির ! আধুনিক
কায়দায় শাড়ী ব্লাউজ পরণে, মুখে হিমানী, ফেস্ পাউডার,
এমন কি, পায়ে হাই হীল্ জুতাে পৰ্য্যন্ত ! চেনাই যায় না
মাসিকে বয়েস যেন চল্লিশ বছর কমে গেছে এম্‌নি চেহারা আর
তেমনি উৎসাহ ”
“আঁ?” শশাঙ্কর চোয়াল ঝুলে পড়ে।
“তবে আর বছি কি? এধারে গােদের ওপর বিষ
ফোড়াবিনি আর আমি, সারাদিন ধরে খেটে খুটে, প্রাণান্ত
পরিচ্ছেদ করে’-একেলে আসবাবপত্র সব সরিয়ে সেকেলে
সতরঞ্চি, আসন, পিড়ি এইসব আমদানি করে’ ঘরগুলােকে
কোনােরকমে দময়ন্তীর যুগে এনে দাড় করিয়েছি
—আর্টিষ্টিক ছবি আর আধুনিক সিনেমা ষ্টারদের হটিয়ে,
শকুন্তলা, সূপনখা, সীতার পাতালপ্রবেশ ইত্যাদি সব সাজিয়ে
গুজিয়ে রাখা হয়েছে—এমন কি, বান্নাঘরের দেয়ালে একখানা
বড় সাইজের হনুমানের লঙ্কাকাণ্ড এনে টাঙিয়ে দিয়েছি
পৰ্য্যন্ত—”
“কী সর্বনাশ?” চোয়াল গুটিয়ে নিয়ে শশাঙ্ক বল্লে ।
“সর্বনাশ বলতে! আর তাই না দেখে তিনি এমন নাক
উঁচু করলেন যে আমাদের ঘাড় হেঁট করতে হলাে।
বাস করে’ সেকেলে মেয়ের মত অপদার্থ হয়ে থাকার জন্যে
বিনিকে কী যাচ্ছেতাই না তিনি করলেন ! আর আমাকে
এ যুগে
৪০
শিৱা চকবরতির মতাে

বল্লেন কূপমণ্ডুকএবং এটা যে বিংশ শতাব্দী এই কথাটাই পুনঃ পুনঃ—অন্ততঃ উনবিংশবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন।” “কী —সব বােনাশ, ” শশাঙ্কর আবার চোয়াল ঝুলে যায়। “তবে রান্নাঘরের লঙ্কাকাণ্ডের ছবিটা মাসীর খুব পছন্দ হয়েছে। হনুমানের মুখখানা নাকি বুড়াে গঙ্গারাম ডাক্তারের মতত। সেই হতভাগা ডাক্তারই নাকি তাকে তিলে তিলে খুন্ করছিল। প্রায় নাকি মেরে এনেছিল-মাসীর নিজের মুখের কথাই বচি। খুব তার বরাত জোর তাই গঙ্গাযাত্রার হাত থেকে বেঁচে গেছেন।” ‘তাহলে তােমার মাসী কী করচেন এখন?” শশাঙ্ক জিগ্যে করে । “কী আর করবেন ? সারাদিন টো টো করে’ সহরময় ঘুরছেন। মিউনিসিপ্যাল্ মার্কেট থেকে একেলে জিনিষপত্র কিনে এনে ঘর দোর বােঝাই করছেন। নিজেকে সাজাচ্ছেন গােজাচ্ছেন আর আধুনিক লেখকদের উপন্যাস কিচেন- প্রেমেন মিত্তির ইত্যাদির ! সারা রাত জেগে তাই পড়ছেন, আর সারাদিন ধরে উঠে পড়ে বিনিকে মডাণ মেয়ে বানাতে লেগেচেন। বিনির তাে প্রাণান্ত।” “আহা!” শশাঙ্ক আমার বােনের দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করে—“আর তােমার দশা ?” - কথা বলার বিপদ! ১১ “এককালে আমি শুধুই গৃহান্ত। বাইরে বাইরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। তারপর শুনছি নাকি তিনি ন্যাশনাল্ ওয়ার ফ্রন্ট, না কি জনযুদ্ধ কিসে যােগদান করবেন ! অরেডি মেয়েদের এ-আর- পি-তে নাম লিখিয়েছেন। জাপানীদের না তাড়িয়ে তিনি ক্ষান্ত হবেন না। ঘােতর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।” "তা উনি পারবেন, আমার বিশ্বাস। যােয়ান্ অব আর্কের মত--এই সত্তর বছরের যুবতীর পক্ষে---কিচ্ছ, অসম্ভব ।” বল্ল শশাঙ্ক।—“কিন্তু এ রকম আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন কিসে হােলাে, তাই ভেবে আমার তাক্‌ লাগছে।” “আমার জন্যই। সখেদে আমি জানালাম । মােক্ষ রসায়ন বলে একটা ওষুধের আমি বিজ্ঞাপন লিখে দিয়েছিলাম। পাঁজির পাতায় সেই রসায়নের প্রশংসাপত্র কবে জানি না মাসীমার চোখে পড়ে। আমার প্রশংসাপত্র দেখেই আমরা তাঁর বিশ্বাস হয়। মােক্ষ রসায়ন হচ্ছে পাগলামির মহৌষধ। অন্ততঃ ওষুধওলারাতাে তাই বলে রটিয়ে’ থাকে। বিজ্ঞাপনটা পড়ে মাসীর হঠাৎ ধারণা হােললা যে গঙ্গারামের চিকিৎসাটা আসলে পাগলামি ছাড়া কিছু না। গঙ্গারামের পাগলামি --অথবা পাগলামির কুফল দূর করার জন্য মাসীমা ওষুধটা আনিয়ে খেতে আরম্ভ করেন। উচিত ছিল গঙ্গারামকে খাওয়ানাে, কিন্তু তা না খাইয়ে নিজেই খেতে শুরু করে দ্যানু। আর তার ফলে “আর বলতে হবে না, বুঝতে পেরেছি—সেই রসায়নের { স ৪২ শিৱা চকবরতির মতো

ফলেই এই মােক্ষলাভ।” বলে’ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে শশাঙ্ক
উঠে পড়ে, আমাকে কিছু আর বলতে দেয় না। আমাকে
সরবতের দাম না দেবার অবকাশ না দিয়েই উঠে যায়।
কথা বলার বিপদ!

No text on this page.

அழுது বন্ধু আমার বন্ধুই ছিল—সেদিন পর্যন্ত। তার বন্ধুত্ব এবং তাকে যে এক সঙ্গে আমায় জলাঞ্জলি দিতে হবে একথা কোনােদিন ভাবিনি। বন্ধুও ভাবেনি বােধ হয়। কিন্তু এই পৃথিবীতে অভাবিত কত কী-ই তাে ঘটে থাকে, বন্ধুর স্থলে বন্ধুর অভাব হয়ত সেই রকমই একটা অভাবনীয় দুর্ঘটনা। কে—কী-কেন—কবে—কোথায় ?-এই জাতীয় এক- খানা বই কদিন ধরে তার বগলে বগলে দেখছিলাম, তখন কি আর জানি যে ও তার সর্বাধুনিক সংস্করণ হবার সাধনায় আছে। কিন্তু অচিরেই জানতে হােলল—এবং সেই জ্ঞান- লাভের সাথে সাথে আরাে এই জানতে পারলাম ধরাধামে যে সব লােক জলাঞ্জলি যাবার জন্যেই জন্মেছে বন্ধু তাদের অন্যতম। আর তৎক্ষণাৎ তাকে জলে ফেলে দিতে দ্বিধা করলাম না । জ্ঞানযােগের সঙ্গে সঙ্গেই কৰ্ম্মযােগ—এমন যােগাযােগ আমার জীবনে প্রায়শঃ ঘটে না,-কার জীবনেই বা ঘটে ?--- কিন্তু বন্ধু-যােগে সমস্তটাই যেন বিদ্যুদ্বেগে ঘটে গেল। বন্ধু সেদিন কার্জন পার্কে পেয়েছিল আমায়। দেখা মাত্রই তার প্রথম কথা : “আচ্ছা, ওই মনুমেন্টটা যদি ভেঙে পড়ে লম্বালম্বি হয়ে পড়ে যদি—তাহলে লাট সাহেবের বাড়ী পৰ্যন্ত তা পড়বে কি না, বল্‌তে পারাে ?” “কি জানি। ওর শেষ ইটখানা হয়ত হাইকোর্টে গিয়েই ৪৬ শিৰা চকবরতির মতাে

পৌছুতে পারে।” মানসাঙ্ক কষে’ আমি জানাই। “কোথায়
ওর চূড়ান্ত হবে বলা যায় না তাে।”
“তােমার ভুল।” বন্ধু আমায় বল্ল ঃ “কাৰ্জ পার্কের
কিনারা অবধি আসবে কিনা সন্দেহ। এমন কি, আমার তাে
মনে হয়, উচুতে যতই হােক পড়তে গেলে নিজের চারপাশেই
ওর ছড়িয়ে পড়তে হবে—নিজের পঞ্চাশ হাতের মধ্যেই
স্তুপাকার হয়ে থাকতে হবে ওকে।•••মাধ্যাকর্ষণ নেই ?”
‘আচ্ছা বলাে দেখি”, বঙ্ক আরম্ভ করল আবার : “মনু-
মেণ্টের মাথা থেকে কেউ যদি এখন তীর ছোড়ে, সে তীর
কদর যেতে পারে বলে তােমার ধারণা ?”
গঙ্গার তীর পর্যন্ত ?” আমি প্রশ্নের সুরেই উত্তরটা
পাগল । গঙ্গা পশ্চিম দিকে না পশ্চিম দিক থেকেই
বাতাস বইছে না এখন ? গঙ্গার দিকে তীর ছুঁড়লেও সে তীর
হাওয়ার জোরে ঘুরে গিয়ে হােয়াইটওয়ে লেড়ল’র ছাতে এসে
আটকে যাবে। বুঝেছ ?”
তারপর সে আমাকে বল্ল কলকাতায় এমন কোনাে রাস্তা
নেই যার কোনাে না কোনাে জায়গা থেকে একটা না একটা
গাছ চোখে না পড়ে। আবার আমি মাথা ঘামাই, আমার
মনে মনেই। যতগুলাে রাস্তা আমার ধারণায় ছিল আর
আমার মনে পড়ল, একে একে মন দিয়ে দেখবার চেষ্টা করি-
কিন্তু বন্ধুর কথাই ঠিক—যেমন যেমন সেই রাস্তাগুলাে আমার
কথা বলার বিপদ।
৪৭

মানসপটে উদিত হতে থাকে, তার কোথাও না কোথাও
একটা না একটা গাছ আমার মনশ্চক্ষে পড়ে যায়।
“বিদ্যাসাগর কলেজের কাছে কটা রেস্তরাঁ। জানা
আছে ?” সে জিজ্ঞেস করল আমাকে।
আমি বল্লাম : “তিনটে।
সে বল্লে ঃ “উহু, দুটো। তৃতীয় যেটাকে তুমি আন্দাজ
করছ, সেটা কলেজের কাছে নয়, একটু দূরে, ট্রাম রাস্তা
পেরিয়ে গিয়ে ওধারে। আর আজকাল যে রকম মিলিটারী
লরীর হুড়াে, ট্রাম রাস্তা পেরুতে গিয়ে ওটা যে তুমি পাবে তার
ঠিক কি? রেস্তরাঁ-প্রাপ্তির পূর্বেই তােমার মিলিটারী-যােগ
ঘটতে পারে।”
সে জিজ্ঞেস করল, “হাওড়া ষ্টেশনে কটা প্লাটফর্ম শুনি ?”
আমি বল্লাম, “সতেরটা।” আন্দাজেই বল্লাম অবশি।
এবং আবার ভুল হােলা। এবং সেই দণ্ডেই ওকে জলাঞ্জলি
দেবার বাসনা আমার হৃদয়ে বলবৎ হােলাে।
“আচ্ছা, এ আর পি-রা পুলিশের মত বেল্ট লাগায়
কিনা তােমার জানা আছে ?” জিজ্ঞেস করল সে ?
আমার উত্তর ভুল হােললা, আবার যেমন হয়ে থাকে।
“আচ্ছা, পুলিসরা কোথায় বেল্ট লাগায়?”
“স্বদেশীওলাদের পিঠে ?”
“তােমার মাথা। নিজেদের কোমরে। কেন, কখনাে
চোখেও দ্যাখােনি?”
3
শিৱা চকবুবতির মতো

সত্যি বলতে, কক্ষণাে না। পুলিস দেখলেই আমি পালিয়ে
যাই।
কবে যেন একবার কোন্ হুজুগে বন্দে মাতরম্ বলে
চঁাচাতে গিয়ে পুলিসের ঐ বেল্ট নিজের পিঠের ওপর
দেখেছিলাম—তারপর থেকে পুলিস এবং বেল্ট, পরস্পর কি
ভাবে সম্বদ্ধ তা দেখবার জন্যে মুহূৰ্তমাত্র পঁাড়াইনি।
“আচ্ছা, বাসের কণ্ডাক্টারা কোন্ ধারে তাদের ব্যাগ,
ঝোলায়—বতে পারো ?”
আবার আমার ভুল হােলাে। হবার কথাই। ভালাে
ভালাে পিপকেটরাই এর নিখুঁত উত্তর দিতে পারবে--যারা
ঐ ঝোলা বাগাবার উচ্চাকাঙক্ষা মনে মনে পােষণ করছে ।
বাসে উঠলে, যাত্রী ভর্তির ফঁাকে কোথায় একটা খালি সীট এবং
কোন্ সীট টা খালি মেয়েদের নয় সেই দিকেই আমি
নজর দিই, কণ্ডাক্টারের ঝােলানাে ব্যাগের কথা আমার
মনেই থাকে না।
“বলল দেখি, এটা পারে কিনা? ধৰ্ম্মতলা-চৌরঙ্গীর
মােড় থেকে পার্ক স্ত্রী কাছে, না, ধর্মতলা-মৌলালির মােড়
থেকে পার্ক টু কাছে ?”
বলা বাহুল্য, এবারও আমি সদুত্তর দিতে পারলাম না।
“আচ্ছা, এই কাৰ্জ পার্ক থেকে কোন্ পথে সব চেয়ে চট
করে’ লেকে পৌছনাে যায় ? লেকে তাে তােমার যাতায়াত
আছে, এটা তুমি বলতে পারবে নিশ্চয় ?”—বন্ধু আমায়
ওকালাে।
কথা বলার বিপদ!

অনেক ভেবে চিন্তে একটা পথ আমি বার করলাম।
ওর চেয়ে শর্টকাটু আর হতে পারে না। বন্ধু কিন্তু হাতে
লাগল হি হি করে’—“এই তােমার সােজা পথ ?
হা হা হা।”
“এর চেয়ে সােজা পথ আছে নাকি ?” এবার আমি চটে
যাই।
“তাড়াতাড়ি পৌছতে হলে সব চেয়ে সােজা পথ হচ্ছে
ট্যাক্‌সি।” বন্ধু আবার ফ্যা ফ্যা করে’ হাতে সুরু করে।
আমার অসহ্য হয়ে উঠল। আমি বল্লাম - “এবার আমার
পালা। আমি জিজ্ঞেস করব তােমায়।”
“স্বচ্ছন্দে। তােমার যা খুসি । কলকাতা কেন—এই
পৃথিবীর যেখান থেকে খুসি : বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও কোনাে
কিছু আমার অজানা নেই।”
এই বলে বন্ধু আবার বিমল-হাসি হাসতে থাকে।
“আচ্ছ,, লেকের সেই পুলের ওপর থেকে ভিটোরিয়া
মেমােরিয়াল দেখা যায় কি যায় না?”
“যায় না।” বল্ল বন্ধু।
আমি বল্লাম : “যায়।”
“কক্ষনাে না।” বল্ল বন্ধু। “কি করে দেখা যাবে ?”
আমি বল্লাম : “লে তাে খুব দূরে নয়। ট্যাসিও
রয়েছে-সােজা পথ সামনেই। গিয়ে দেখলেই হয়, দেখা
যায় কিনা।”
৫০
শিব্রামু চকতির মতো

পুলের ওপরেই
বন্ধু বল্ল “বেশ, তাই হােক্, দেখবার ভার এবং ভাড়া
তোমার।”
ট্যাসিতে যাবার সময়ে বন্ধু আবার তার বিদ্যার বহর
বিস্তার করতে লাগল। ট্যাসির নম্বর আর ড্রাইভারের
লাইসেন্স নম্বর এক কিনা জিজ্ঞাসা করল আমাকে। আমি
বল্লাম, “এক।” ও বল্ল, “না।” ও আরো বল্ল, “বলো তাে আমি
ড্রাইভারের কাছ থেকে যাচাই করে জানিয়ে দিচ্ছি এখনই।”
আমি কিছু বল্লাম না। যাচাই করে আর কি হবে ?
আমার যা বার, যা আমি চাই, লেকের সেই
বলা যাবে। দূর তো নয়। দেরি কি ?
অবশেষে আমরা লেকের কাছে পৌছলাম। ট্যাকসি
ছেড়ে দিয়ে দাড়ালাম গিয়ে পুলের ওপর। বন্ধুকে ধার
ঘেঁষে দাড় করিয়েছি-ঠিক মাঝখানে । এক ধাক্কায় জলে
ফেলে দেবার পক্ষে এমন আদর্শস্থল বােধ হয় আর নেই।
হতভাগা কিন্তু হাসছে তখনো।
“দেখাও তাে আমাকে, এখান থেকে কোথায় তােমার
ভিক্টোরিয়া মেমােরিয় দেখা যায়।” বলে আবার হা হা
করে হাসতে লাগল।
“এই যে দেখাচ্ছি।” বলে’ এক ধাক্কায় বলতে না বলতে
বন্ধুকে লেকের গর্ভে বিসর্জন দিয়েছি।
দুঃখের বিষয়, পড়বার সময় আমাকে টেনে নিয়ে ও জলে
পড়ল। আরাে দুঃখের কথা, ওকেই আবার আমায় টেনে
কথা বলার বিপদ ।

তুলতে হােলো। ও-ই আমাকে জল থেকে-সলিল-সমাধি
থেকে উদ্ধার করল। যেমন অনেক কিছুই আমি জানিনে,
তেমনি বলব কি, সাতারও আমার জানা ছিল না।
এর পর আর বন্ধুর সঙ্গে কি করে বন্ধুত্ব রাখা যায় ?
তােমরাই বলাে?

পাতি জলশা “হরিনাথবাবু ক্ষেপেছেন আবার !” ফিসফিসিয়ে বলেন, সেকেন্ পণ্ডিত। হরিনাথবাবু আমাদের স্কুলের হেড মাষ্টার—এবং হেড- মাষ্টারের পক্ষে কতদূর ভালাে হওয়া সম্ভব তিনি তার অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় তিনি ছেলেদের শাসন করতে জানেন না। অবিশ্যি আর, যারই হােক, এটা আমাদের ছেলেদের দুঃখের বিষয় নয়। ছাত্রদের তাড়না করবার প্রেরণা নেই বলে আর সব মাষ্টাররা আপসােস্ করেন। আপসােস্ করেন আর নিসৃপিস্ করতে থাকেন, এমন কি, এ-স্কুলে মাষ্টারি করে আর কী লাভ, এমন কথাও সময়ে-অসময়ে তাদের মুখ ফসূকে শােনা যায় । এবার, কলকাতার শিক্ষক-সম্মেলনের কেতা হরিনাথ- বাবু নতুন এক আইডিয়া মাথায় করে এসেছেন। তাঁর মতে, আইডিয়া ; অন্যান্য মাষ্টারের মতে—আরেক তাঁর খেয়াল । তাঁর ধারণায়, আমাদের জীবনে আমােদ প্রমােদের ব্যবস্থা না থাকায় সব উৎসাহ জুড়িয়ে জল হয়ে যাচ্ছে। এই জন্যে মাঝে মাঝে এক আধটা জলসা হওয়ার দরকার। সেকেন্ পণ্ডিত বলেছেন—“এটাও তাঁর সেই ব্যাটুবল খেলার মত হবে।” হ্যা, এর আগের বারে তিনি ক্রিকেটের আইডিয়া নিয়ে ফিরেছিলেন। ঠিক মাথায় করে নয়, কিম্বা মাথায় করে’ বল্লেই বােধ হয় ঠিক হয়। এক রাজ্যের উইকেট, ব, ব্যাট, শিৰাম চকবরতির মতো পায়ে-পরা প্যাড ইত্যাদির বােঝা নিয়ে যখন তিনি ফিরলেন, তখন বলতে কি, আমাদের বেশ উৎসাহই হয়েছিল। কিন্তু পরে যখন দেখা গেল বগুলাে এক মণ করে’ ভারী, ছুড়তে ছুড়তে হাত ব্যথা হয়ে যায় আর তিন দিন ধরে সেই ব্যথা যথাস্থানে জমে থাকে, আর এধারে যতই কায়দা করে’ ছােড়াছুড়ি করাে না কেন, উইকেটের এক মাইলের মধ্যে দিয়ে কিছুতেই তারা যাবার পাত্র না, তখন আমাদের সব উৎসাহ জল হয়ে গেল। তার ওপরে আবার ব্যাটের দুর্ব্যবহার আছে, একজন ব্যাট্‌কীপার-ব্যাট্‌কীপার ছাড়া আর কীই বা বলা যায় ?-কখনাে ব্যাট দিয়ে তাে ওকে একখানা বলের প্রতিও বলপ্রয়ােগ করতে দেখা যায় না-হঁ্যা, একদিন একজন ব্যাটকীপা করল কি, একটা আগন্তুক বকে হাঁড়াতে না গিয়ে বল্ তার দেড় মাইল দূর দিয়ে যাচ্ছিল- নিজের মাথায় ব্যাটু মেরে বল। নিজের কপালে ব্যাটাঘাতেও তেমন কিছু ক্ষতি ছিল না, সে করল কি, ঘূতির মুখে, সেই ব্যাটু দিয়েই উইকেকীপারের এক পাশের এক গাদা দাত খসিয়ে দিলে । আমরা খুব চটে গেলাম। চট্‌বই তাে, আমাদের সন্দেহ হােললা, হেড মাষ্টার মশাই হাতে মেরে এই ভাবে ব্যাটবলের সাহায্যে আমাদের দুরন্ত করছেন। দাতে মারছেন আমাদের । উইকেট আর ব্যাটুকীপার দুজন সেই ধাক্কায় সেই যে শয্যা নিল আর তার উঠল না। ক্রিমাসের ছুটি পর্যন্ত তারা পাল্লা দিয়ে কথা বলার বিপদ!

বিছানায় শুয়ে কাটিয়ে দিলে, তারপর তারা সেই ক্রিকেটের দৌলতেই ক্লাস্ প্রমােশন আদায় করে’ ( আফটারঅ ইট ওয়াজ, নটু ক্রিকেট :)-রুগ্ন শয্যা পরিত্যাগ করে লাফাতে লাফাতে বাড়ী চলে গেল। ফিরে এল ছুটি খতম্ করে’, নতুন বছরে—এসেই তারা ফের ক্রিকেট খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, কিন্তু ক্রিকেট তখন কোথায় ? আমরা ব্যাট, ব, পায়ে বাঁধা প্যাডের বালিশ সবশুদ্ধ-( মাথায় যখন বা ব্যাটুরা এসে লাগে তখন নাইক্ পায়ে বালিশ জড়িয়ে ফল ? -হতে হলে আপাদমস্তক বালিশ-বন্দী হতে হয়)—সর্বসমেত পদ্মার গর্ভে জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছি। বস্তুতপক্ষে, ক্রিকেটকে, তারা দুজন ছাড়া আমরা কেউই যখন ঠিকমত ব্যবহার করতে পারলুম না—ক্রিকেট নিজগুণে আপনা থেকেও আমাদের কারাে কাজে যখন লাগল মা-আর কোনাে কারুকাৰ্যই হােল না যখন ওকে দিয়ে—তখন আর অনর্থক গায়ের ব্যথা বাড়িয়ে লাভ ? “ভদ্রমহােদয়গণ, আমার কি মনে হয় জানেন ?” হেড- মাষ্টার মশাই অন্যান্য মাষ্টারদের ডেকে জানালেন : “এই রকম প্রায়শঃ জস প্রভৃতির দ্বারা কেবল যে ছেলেদের জীবনে উদ্দীপনা বাড়ানাে হবে তাই নয়, এতে করে পারস্পরিক ভাবের আদান-প্রদানের ফলে শিক্ষক ও ছাত্রর সম্বন্ধ আরাে মধুরতর হয়ে উঠবে। তাদের সম্ভাবও ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাবে।” শিৰাম চকবরতির মতো

এই ছােট্ট বক্তৃতাটি দেবার পরই তিনি আমাদের তা
করে একটা প্রশ্ন ছুড়লেন—“এখন তােমরা কে কি করতে
পায়রা বলল দেখি?”
আমরা এতক্ষণ ধরে একজোট হয়ে তার বক্তব্য থেকে
জার ব্যাপারটা কী জেনে নৈবার চেষ্টা কছিলাম—জা
হলেও জলের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই, এমন কি,
জলযােগের সঙ্গেও সম্পর্ক নেই কোনো-না-যাত্রা না-থিয়েটার
-ভােজবাজি—অথচ সব কিছুর গরুমি এই বিষয়টা ধীরে
ধীরে আমাদের কাছে প্রাঞ্জল হয়ে আসছিল তখন।
“আমি হয়ত গান গাইতে পারি।” সাহস করে আমি
বল্লাম।
“আমরাও সেই ভয় করেছি।” বল্লেন হরিনাথবাবু।
“বেশ, তুমিই তাহলে এই সব কাণ্ডের কর্মকর্তা হলে।
তােমাকেই মনিটার করে দিলুম। তুমি যখন গান গাইতে
পারে তখন তােমার অসাধ্য কিছু নেই। তুমি সব পারবে।”
তারপর তিনি আমাদের বাদবাকীদের প্রতি ক্ষেপ
করতে লাগলেন। তােমাদের কেউ হারমােনিয়ম
বাজাতে জানাে নাকি?”
“আমি সা, একটা টেনিব আমার দাড়ির ওপর দাড়
করিয়ে রাখতে পারি।” বল্ল ফটিক “হাত দিয়ে ধরা
নেই, ছোয়া নেই, ভারী শক্ত।”
“আমি হারমােনিয়ম বাজাতে জানিনে বটে, তবে বাজালে
?
কথা বলার বিপদ!

বাজাতে পারব।” বল্ল রহমান।—“যদি হারমােনিয়ম পাই
আর যদি সেটা বাজতে চায়।”
'কী বাজাবে ?” হেড মাষ্টার মশাই আগ্রহান্বিত হলেন :
“কোনাে গৎ টৎ জানা আছে তােমার ? কনসার্টের মত একটা
কিছু না হলে জল্স জবে কেন?”
“হ্যা, গৎ জানি বই কি সা!” রহমান অম্লানবদনে
জানালাে। “আকাশের চাঁদ ছিলরে '--এই গৎটাই আমি
বাজাব।”
“কেন?” জিজ্ঞেস করলেন হরিনাথবাবু। “ঐটেই
কেন?”
“এই গৎটাই আমি জানি যে।” বল্ল রহমান : “এ ছাড়া
আর কোনাে গৎই আমার জানা নেই।”
“ওকে ওইটেই বাজাতে দিন্ সার।
ও বেশ ভালােই
বাজাবে।” ফটিক সায় দিয়ে বল্ল । “ও কালো ঘর গুলােও
বাজাতে পারে আমি দেখেছি। কালাে ঘর বাজানাে ভারী
কঠিন।”
ছােট্ট মুকুল, এক পাশ থেকে বলে উঠল হঠাৎ : “আমি
বেশ ভালাে হাঁস ডাকতে পারি কিন্তু।”
“দেখাও আমাদের”—হুকুম্ করলেন হেড মাষ্টার।
“ডেকে দেখাও।”
মুকুল একে ছােটো তার ওপরে একটু লাজুক, সহসা এই
আক্রমণে কেমন বিব্রত হয়ে পড়ল। কোনাে শিল্পীকে যদি
৫
শিৰাম চকতির মতাে

তড়িঘড়ি তার শিল্পসাধনার পরিচয় দিতে হয় তার নিজ
নৈপুণ্য প্রকট করার যতই প্রবল বাসনা থানা এবং যত বড়
শিল্পীই হােক না কেন, স্বভাবতই একটু না ঘাবড়ে গিয়ে
পারবে না।
মুকুল হাঁস ডাতে ইতস্ততঃ করে।
“কই, তােমার হাঁসের ডাক শুনি।” হেড মাষ্টার মশাইও
ছাড়বার পাত্র নন্শােনার জন্য তিনি হাস্ স্ করতে
থাকেন।
“প্যাক্প্যাক্-প্যা”—ডাকল মুকুল।
এবং একবার কোনাে শিল্পী উকে উঠলেই মুসকিল।
তখন তার পঁক প্যাকানি থামানাে যায় না।
“থামাও তােমার হাঁসের বাদ্যি।” কুঞ্চিত করে বল্লেন
হেড মাষ্টার ।
যাই হােক্, কোনাে রকমে একটা প্রােগ্রাম্ তো খাড়া
করা হােলাে-
ফাজিলাবাদ ইস্কুলের ছেলেদের
-সম্মিলিত জলসা
হেড মাষ্টার মহাশয়ের বক্তৃতা
শ্রীমান্ মুকুল মৈত্র : হাঁসের ডাক
হেড মাষ্টার মহাশয়ের : বক্তৃতা
রহমানের হারমােনিয়ম্ কন্সার্ট:
( ‘আকাশের চাদ ছিল রে !)
কথা বলার বিপদ।

ফটিক চন্দ্রের : ম্যাজিক
( হাতে ধরা নেই, ছোয়া নেই, ভারী শক্ত)
—ইন্টাভা -
চকবরতির গানের গুততা ও
‘সেথা আমি কী গাহিব গান !
সেই সঙ্গে
রহমানের হারমােনিয়সঙ্গত,
( ‘আকাশের চাঁদ ছিল রে’
ফটিক চন্দ্রের পুনশ্চ ম্যাজিক
শ্রীমান মুকুল মৈত্র আরাে হাঁসের ডাক
মাষ্টার মহাশয়ের আবার বক্তৃতা
হেড,
অবশেষে
।
বন্দে মাতরম্
মনিটার হিসেবে জলসার উদ্যোগ-আয়ােজনের সব ভার
আমার ওপর। আমাদের ছােট্ট টাউনের একমাত্র সিনেমা
হাউসটি আমি ভাড়া করে ফেল্লাম। কিন্তু মুকুল বল্লে, “এই
ছােট্ট হলে আমাদের সবাইকে ধরবে না সার।”
মুকুল অবিশ্যি খুব ছােট্ট আর আমি নিশ্চয়ই খুব বড়াে,
ফাস্ট ক্লাসেই পড়ি যখন, তবু মুকুলের এই অপ্রত্যাশিত
সম্বােধনের সারাংশে সদ্যলব্ধ মনিটারির আত্মপ্রসাদে আমি
আত্মহারা হয়ে গেলাম। কিন্তু ও-ছাড়াও, মুকুলের মন্তব্য
অন্য দিক দিয়েও সারগর্ভ বই কি? ঠিক কথাই বলেছে ও,
শিব্রাম চকবরতির মতাে

আর
কিন্তু সারা টাউনে এই একটি মাত্র পাবলিক হ—অথচ এর
মধ্যে স্কুলের আদ্ধেক ছেলেকেও গুতাে গুতি করে’ আটানাে
যায় কিনা সন্দেহ।
সমস্যাটা হেড মাষ্টার মশায়ের কাছে এনে উপস্থিত করা
যােলা।
তিনি বল্লেন ? “তাতে কি হয়েছে ? জা তা বলে
বন্ধ করা যায় না। আদ্ধেক ছেলেই দেখবে—কি করা
যাবে ? কারা দেখবে, তােমরা নিজেদের মধ্যে লটারি করে’
ঠিক করে নাও।”
এ ব্যবস্থা, বলতে কি, ছেলেদের বেশ মনঃপূত হােলাে।
ছেলেরা লটারি করতে যেমন ভালােবাসে, তেমন
কিছু না। এমন কি ফুটবল খেলার গােলটা ঠিক ঠিক হয়েছে
কি না, সে বিষয়েও তারা রেফারির চেয়ে লটারির ওপরেই
বেশি নির্ভর করে।
অবশেষে সেই জলসা-রজনী এল। প্রত্যেকেই উৎসাহে
আগ্রহে অধীর। ফটিকচন্দ্র তার বক্রীড়া নিখুৎ করবার
আয়ােজনে চোখ খইয়ে ফেলছে। সন্ধ্যে থেকেই সবলে সে
শেষ-চেষ্টায় লেগেছে। মুকুল ষ্টেজের পেছনে গিয়ে নেপথ্য
থেকে হংসধ্বনির রিহার্সা দিচ্ছিল। আর রহমান এদিকে
হারমােনিয়ম নিয়ে (সাদা কালাে সব ঘরেই সে হাত চালাতে
সমান ওস্তাদ) ক্ষেপে উঠেছিল—“আকাশের চাদের ভেতর
থেকে সে এমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত সুর বার করে এনেছে যা সে
কথা বলার বিপদ!

কোনােদিন পারবে বলে আশা করতে পারেনি। চতি
সিনেমার সমস্ত চালু সুরকে সে ওই একটামাত্র গতের মধ্যে
এক সঙ্গে আমদানি করতে পারছিল ।
আমার নিজের গানটাও এক আধ বার ভেজে নেবার
দরকার ছিল কিন্তু রহমানের অত্যাচারে তার ফঁাক পাচ্ছিনে
একটুও। রহমান রপ্ত করেই চলেছে, ওর সুরের আমদানি-
রপ্তানির বহরে এধারে আমার তাে যায়-যায় অবস্থা। ওর সঙ্গতের
সঙ্গে আমার সঙ্গীত যে কি করে খাপ খাওয়াবাে তাই ভেবে
আমি কাহিল হচ্ছি। আমার গানের সাথে, রচনার ভাষাতেই,
একটু সাফাই দেয়া আছে এইটুকুই যা আমার সান্ত্বনা।•••
সবাই কৌতূহলে উদ্দীপ্ত, হেড মাষ্টার মশাইও কারাে চেয়ে
কিছু কম নন্-কিন্তু দর্শকদের মধ্যে কেমন যেন লালসার
অভাব ! কি রকম যেন মনমরা-মনমরা ভাব : এমন একখানা
জা-
এখানে এই শতাব্দীতে এই প্রথম--তার সঙ্গে
জলযােগের কোনাে সম্পর্ক নাই বা থাল, তা বলে ছেলেদের
স্বভাবসুলভ উৎসাহ লােপ পাবে, এই বা কেমন ?
ছেলেরা ম্রিয়মাণ মুখে একে একে সিনেমা হলে ঢুকছিল।
ঠিক যেমন করে পাঠারা খাঁড়ার তলায় পঁাড়ায়। তাদের
হৈ হুল্লোড় কিচ্ছু নেই, টিকেট করে’ সিনেমা দেখার সময়ে
অন্ততঃ যতটা দেখা যায় তার একশ ভাগের এক ভাগও এই
বিনে-পয়সার জলসার বেলায় কেন দেখা যাচ্ছে না, এটা একটা
বিস্ময়ের বিষয় বলেই বােধ হতে লাগল ।
শিব্রাম চকতির মতাে

ব্যাপার কি, জাতে আমি উগ্রীব হলাম।
হেড মাষ্টার মশায়ের দৃষ্টি অতিশয় যে তীক্ষ্ণ তা বলা
যায় না, কিন্তু তার নজরেও কেমন যেন এটা খেচাচ্ছিল।
তিনি মুখে কিছু বলছিলেন না বটে, কিন্তু একটা প্রশ্নপত্র
চোখে নিয়ে ঘুরছিলেন। অবশেষে সেকেন্ পণ্ডিতকে
সামনে পেয়ে তিনি আর আত্মসম্বরণ করতে পারলেন না।
খচ খচ করে উঠলেন।
“কী হয়েছে মশাই ? ছেলেরা সব মুখ কালাে কালাে
করে আসছে কেন? লটারিতে কি কোনাে গােলমাল---?”
“কিছু না। গােলমাল কি হবে ? লটারিতে গােলমালের
কি আছে ?
“যাক্, তবু ভালল।” দিল দরিয়া একখানা হাসিতে
হরিনাথবাবুর সারা মুখ ভরে গেল ? “লটারিতে কোনাে
ত্রুটি হয়নি যে তবু ভালাে। আপনার ওপর যখন লটারির
ভার দিয়েছিলাম তখনই জানি সুষ্ঠুভাবে ওটা আপনি সুসম্পন্ন
করবেন। যাক্, কারা কারা লটারি জিতেছে দেখা যাক।”
-“উহু, আপনি একটু ভুল করছেন।” হেড মাষ্টারের
কানে কানে ফিস্ ফিস্ করলেন সেকেন্ পণ্ডিত, সে
ফিফিসানি আমার কান অবধি এসে পৌছল। এর মধ্যে
লটারি-জেতারা কেউ নেই। তারা সবাই হােসটেলে পিকনিক
করছে এখন।
এরা লটারি-হারার দল।”
কথা বলার বিপদ।

No text on this page.

غ
من در جهان
مه
i

আমার জীবনস্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন-করা একটি পৃষ্ঠা-এক ছিন্নপত্রের কাহিনী এখানে বলব। আমার জীবন স্মৃতির সঙ্গে এই ছিন্নপত্রটি জােননা। সবে ইস্কুল ছেড়ে মফস্বলের এক কলেজে ঢুকেছি- হােষ্টেলে থাকি। এক এক ঘরে, চারজন ছ’জন আটজনের সী। সীটের পাশেই পড়ার টেবিলের ওপরে আমাদের বইগুলি ইতস্ততঃ ছড়ানাে, কিম্বা এখানে ওখানে পুজি করা। অথচ কিছুদিন আগে পর্যন্ত, আমাদের কাছে পড়ার বইয়ের কী মৰ্য্যাদাই না ছিল ! ইস্কুলে পড়তে, ছােট্ট টেবিলের ওপরে, আমাদের বইগুলি মলাটের ওপর খবরের কাগজের মােড়ক পরে সুসজ্জিত হয়ে শােভা বিস্তার কতাে, এখনাে মনে পড়ে। কেউ যদি তখন খবর-কাগজের বদলে, দেয়াল- ক্যালেণ্ডারের বাতিল-করা পাতায় পড়ার বই মােড়ার সুযােগ পেয়েছে তার সৌভাগ্যকে অকপটে আমরা ঈর্ষা করেছি। কিছুদিন আগেও, বইয়ের চেয়ে তার জড়ােয়া গয়নার দামই বােধহয় বেশী ছিল। অবশ্যি বইয়ের খাতিরেই—কিন্তু এখন? এখন মলাট দূরে থাক্‌, বইয়ে পৰ্য্যন্ত ক্ৰক্ষেপ করার আমাদের ফুসৎনেই। বইয়ের চেয়ে তার নােটের দামই এখন বেশী আমাদের কাছে। কিন্তু সে কথা নয়, সে দুঃখ জানিয়ে কি হবে, পুথিপত্র ছেড়ে এখন আমাদের গল্পের ছিন্নপত্রে যাওয়া যা একদিন সকালে আমার ছােট্ট টেবিলটার ওপর ঝুকে শিব্রাম চকবুবরতির মতো

আগের রাত্রে যে একটা কিছুতেই কষতে পারিনি তাই
নিয়ে কাতর হয়ে রয়েছি এমন সময়ে
ঢং ঢং-টাং টং ঢং ঢং
সকাল সাতটা না বাজতেই খাবারের ঘণ্টা?
তবু, খাবারের ঘটা হচ্ছে খাবারের ঘটা-তা ভাের
ছ’টাতেই হােক্, বা দিনে দুবার করেই হাে-কিম্বা দিন
ভােরই হতে থাক্ ! তাকে grudge করবার-গ্রাহ্য না
করবার আমাদের ক্ষমতা ছিল না । কেননা, আমাদের পেটে
খিদের ঘটা সব সময়েই বাজতাে।
ঘটাধ্বনি কানের ভেতর দিয়ে মরমে ভালাে করে প্রবেশ
করতে না করতেই, সব ছেলে আমরা, সােরগােল করে’
হােষ্টলের হেঁসেল ঘরে গিয়ে হাজির।
কিন্তু না, দুঃখের বিষয়, খাবার ঘ টা নয় !
হােষ্টেলের সুপারিন্টেণ্ডেটের নিজের কি এক দরকার
পড়েছে তাই তিনি ঘটার মারফতে সমবেত আমাদের উদ্দেশে
এই ভাবে হাঁক ডাক ছেড়েচেন। সেই কারণেই এই এক
চিঠিতেই সকলের আমন্ত্রণ !
খাবারের ঘ টা নয়-বরং খাবারের বেলায় ঘটা । ভারী
দমে গেলুম।
ভােগ নেই কিছু নেই, তেমন ঘণ্টাকর্ণপূজায়
আমাদের উৎসাহ নেই-সার্বজনীন হলেও না। ভারী মন
খারাপ হয়ে গেল। বেয়ারিং পােসটে ফের
যে নিজের
বিছানায় ফিরে আবােযথাস্থানে ফেরৎ এসে চিৎপাত হয়ে
কথা বলার বিপদ!

মনের দুঃখ লাঘব করব তারও যাে নেই—ঠিকানা বদলি হয়ে ক্ষুগ্ন- মনে সবাইকে সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের ঘরে গিয়ে জমা হতে হােলো। “দেখেচ ? দেখে কাণ্ডখানা ? ইদুরের বাঁদরামিটা দেখে একবার ? যাবামাত্রই, এই প্রশ্ন মুখে করে সুপারিন্টেটে মশাই আমাদের সবাইকে অভ্যর্থনা জানালেন। এবং বলতে না বলতে, ইদুরে-কুরে-খাওয়া, প্রায় সাড়ে তিনভাগ সাবড়ে-দেয়া, একখানা খামের চিঠি আমাদের সবার নাকের সামনে তিনি তুলে ধরলেন। “দেখেচ। চিঠিখানার কিছু রাখেনি! হাড় পাঁজর ঝরঝরে করে দিয়েছে। আগাপাশতলা সব খতম্ । ! দ্যাখাে দেখি একবার ! চেয়ে দ্যাখো ! আমরা, রবীন্দ্রনাথের কৃত নয়, ইদুরের কাণ্ড—সেই ছিন্ন- পত্র—উক্ত দুষ্কৃতকর্ম দুচক্ষে নির্নিমেষে তাকিয়ে দেখলাম । আহত খামখানাকে খামােখা দুঃখের ভান করে দেখবার চেষ্টা করতে লাগলাম। “আমার বাড়ীর চিঠি ! পারিবারিক চিঠি আমার। ভয়ঙ্কর জরুরি চিঠি ! এখনাে এর জবাব দেয়া হয় নি-দ্যাখাে তাে কী—কাণ্ড?” “খারাপ : খুবই খারাপ?” আমাদের মধ্যে থেকে মনি- টার বলে উঠল আগে : “ইদুদের এ খুব অন্যায় কাজ একথা বতে আমি বাধ্য।” শিব্রাম চকবুবতির মতো “ইদুরদের এটা উচিত হয়নি।” আমিও না বলে থাকতে পারিনে ? “খামটার ওপরে কি ‘প্রাইভেট’ বলে কিছু লেখা ছিল না নাকি?” “থাকলেই বা কি? কী তাতে? ইদুররা কি প্রাইভেট পার্সনাল, এসব কিছু মেনে চলে ?” সুপারিন্টেণ্ডেট আমার কথায় ভারী খাপপা হয়ে উঠলেন ? “তারা কি ইংরেজি পড়তে পারে ? না, পড়লে বুঝতে পারে ? মাথামুণ্ডু সাহিত্যের কোনাে কিছু কি বােঝে ওরা ?” “ওর কথা ধরবেন না সার। ও নেহাৎ ছেলে মানুষ।” বল্লে মনিটার । “হায় হায় ! এখন আমি কী যে করি। কী করে এর উত্তর দিই! কী যে জবাব দেবার ছিল, চিঠিটার বিন্দু বিসর্গ কিছুই আমার মনে নেই—কিচ্ছু মনে পড়ছে না। চিঠিটার ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে গেছি কেবল,-কে জানে এমন হবে ? প্রকাণ্ড একটা কেনাকাটার ফর্দ ছিল এইটুকুই শুধু স্মরণে আছে।” ইদুরদের অমানুষিক আচরণে, ইতর প্রাণীসুলভ এই নিতান্ত অভদ্রতায়, সুপারিটেণ্ডেট মশাই এমনই কাতর হয়ে পড়েন যে মর্মাহত সমস্ত ছেলের সমবেদনা, আমার সহানুভূতি, মনিটারের সান্ত্বনা কিছুই তাকে শান্ত করতে পারে না। বিস্তর হাহুতাশের পর অবশেষে তিনি প্রকাশ করেন- “কিন্তু বারম্বার এরকম হলে তাে চলবে না। জরুরি চিঠিপত্র কথা বলার বিপদ।

সব আমার! কখন আসে তার ঠিক নেই, ইদুরদের তাড়াবার
তােমরা ব্যবস্থা করাে?
এতদিন আমরা সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের রুদ্র মূর্তিই দেখে এসেছি,
তাঁর বীরােচিত হাবভাব দেখতেই অভ্যস্ত ছিলাম, সামান্য
একটা পত্রের বিরহে তার যাবতীয় বীরত্ব যে এভাবে খসে
পড়বে, সমস্তটা এতখানি করুণ হয়ে দেখা দেবে কে ভাবতে
পেরেছিল ?
কিন্তু আস্তে আস্তে তার বীর-রস ফিরে আসতে থাকে--
হঠাৎ তিনি ভয়ঙ্কর চোটপাট করে ওঠেন।
-না-না-না ! ওসব কথা শুছিনে! ইদুরদের
দূর করে। এক্ষুনি তাড়াও ওদের। মেরে ধরে যেমন করে’
পারাে ভাগাও । আগে ওরা বিদায় নেবে তারপরে আমি
জলগ্রহণ করব।”
মনিটারকে লক্ষ্য করে কেবল এই হুকুমই নয়, একটা
হুমকিও তিনি ত্যাগ করলেন।
“আজ্ঞে“আজ্ঞেকি করে তাড়াব ?” মনিটার ভারী
কিন্তু-কিন্তু হয়ে পড়ে। -“ওরা কি যাবার ?
“নােটিশবাের্ডে একটা নােটিশ, লটকে দিলে হয় না?” কে
একজন বলে ওঠে আমাদের ভেতর থেকে।
“তাছাড়া, তাড়ালে কি ওরা যাবে? মানে, মানে—
তাড়ানো কি যাবে ওদের ?”
মনিটার আতা আমতা করে বলবার চেষ্টা পায়।
শিব্রাম চকবুবতির মত

মনের সংশয় ওর চোখে মুখে আর প্রত্যেক কথায় ফুটে উঠতে
থাকে।
“মানে মানে না যায়, অপমান করে তাড়াও।” আমি
বাৎলাই। আমাকে ছেলেমানুষ’ বলার জন্যে মনিটারের
ছেলেমানুষির প্রতিশােধ নিই।
মনিটার আমার দিকে কটমট করে তাকায় ।
“হ্যা, আমারও সেই কথা !” সুপারিন্টেন্টে আমার
কথায় সায় দ্যা ঃ “সহজে না যায়, উত্তম মধ্যম দিয়ে যেমন
করে পারো দূর করাে ? হাঃ, ওদের আবার মান অপমান?”
“দেখুন সা, ইদুরদের আমরা যতই ডিস্লাইক্ করিনে
কেন, ওরা হয়তাে আমাদের ততটা অপছন্দ নাও করতে
পারে-এই ধরুন, যেমন ছারপােকারা”
মনিটার ওঁকে বােঝাবার চেষ্টা করে ? “আমরা দূর করতে
চাইলেও ওরা হয়তাে আমাদের ছেড়ে যেতে চাইবে না। কারণ,
—কারণ--
“কারণ ওদের তত হােষ্টেলে থাকা-খাওয়ার খচা দিতে
হয় না। কারণটা কোন্ একটি ছেলে ভিড়ের ভেতর থেকে
বিশদ করে’ দ্যায় ।
“আর অখাদ্য খেয়েও ওরা টিকে থাকতে পারে।” আমি
বলে উঠি । “ঠিক আমাদের মতন নয়।”
“ওসব আমি জানিনে! হয় ইদুরদের তাড়াও যেমন করে’
পারাে-নয়তাে তােমার মনিটারিও গেল ?”
কথা বলার বিপদ!

সুপারিন্টেন্টে এই শব্দভেদী বাণ ছেড়ে-মনিটারের মর্মভেদ করে’, ছিন্নপত্র হাতে, প্রিন্সিপালের ঘরের দিকে রওনা দিলেন। আর আমরা সবাই খুসিতে টইটুম্বুর হয়ে উঠলাম। এই ছেলেটির মনিটারির ওপরে আমরা সবাই হাড়ে হাড়ে চটে ছিলাম। খারাপ খাওয়াতে এরকম ওস্তা আর দুটি ছিল না। অখাদ্য তবু বা কোনােরকমে সওয়া যায়, কিন্তু তার ওপরে-- তারও ওপরে-বােঝার উপরন্তু শাকের আঁটিটির মতাে— হােষ্টেলের ডিউ আদায় করতে যা জোর জুলুম লাগাতে তা অসহ। সারা মাস ধরে এক ঘাট-চচ্চড়ির গাদা আর সারা মাস ধরে একই তাগাদা খেয়ে খেয়ে আমরা তাে অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। যাক্, ইদুর আর সুপারিন্টেন্ডেন্ট- এই দুই জবরদস্তের পাল্লায় পড়ে হতভাগা এবার খুব জব্দ হবে, ভেবে আমাদের এমন আনন্দ হােললা যে কী ব! অসহায় দৃষ্টিতে মনিটার একবার আমাদের সবাকার দিকে তাকালো। তারপর সকাতর কণ্ঠে বল্লে : “ইদুর তাড়াতে হলে কি করতে কি করে থাকো তােমরা ? “কিচ্ছু করিনা।” আমরা একবাক্যে বলে দিই। “তাছাড়া, সে মাথা ব্যথা তাে আমাদের নয় ; তােমার।” “হু, হয়েছে ।” বড়দরের আবিস্কারকের মত মুখখানা করে মনিটার অকস্মাৎ লাফিয়ে ওঠে : “ইদুরধ কল। শিম চকবরতির মতাে জাতিকল যার নাম “তাই : তাইতো দরকার ! এক্ষুনি বাজারে গিয়ে আমি কিনে আছি গােটাকতক।” এই বলে ভুরু কুঁচকে, আমাদের দিকে দু চোখের দারুণ বিষদৃষ্টি হেনে, হন্ হন্ করে বেরিয়ে গেল মনিটার। সেই সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যের মুখে এক ঝাঁকা জাতিকল ঘাড়ে করে মনিটার ফিরে এল । এক আধটা নয়, আট- চল্লিশটা আঁাতিকল, কেবল বাজারে কুলােয়নি, বাড়ী বাড়ী ঘুরে যােগাড় করতে হয়েছে। ইদুরদের বজ্জাতির বিরুদ্ধে মনি- টারের এই বিজাতীয় অভিযান। জাতিকলগুলাের মাথায় ঘােট ঘােট চালের পুটুলির নিমন্ত্রণপত্র লাগিয়ে এখানে ওখানে সেখানে স্থানে অস্থানে চারধারে সে চারিয়ে দিল। ইদুরদের জন্য ওৎ পেতে রাখল সব জায়গায়। এমন সব জায়গায়, যেখানে কোনাে ভবঘুরে ইদুরও ভুলেও কখনো পা বাড়ায় না। আর পা বাড়ালেও এই সব পাতানাে সম্পর্কে—এই ধরণের ফঁাদে মাথা গলাবে কিনা আমার ঘােরতর সন্দেহ ছিল। বরং, আজকালকার চালাক চতুর যত ইদুর—এই সেকেলে ব্যবহারে চটে যদি নাও যায়, একটু মুচকি হেসেই চলে যাবে, এই আমার বিশ্বাস। আমাদের মনিটার কিন্তু খুব সিরিয়স্। এই সব ক্রিয়া- কাণ্ড সেরে ইদুর পড়ার প্রতীক্ষায় সে উৎসুক--একাগ্র— উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল । বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হােলল না। খানিক পরেই কথা বলার বিপদ!

ধারালাে একটা তার-স্বর চারিধার বিদীর্ণ করে ফেটে পড়ল।
কিন্তু, কোনাে ইদুরের কণ্ঠনিসৃত নয়, খােদ আমাদের
সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের।
মনিটার ইদুর-তাড়াবার কী যেন সব করেছে তার কানে
গেছল, তারফলে কতগুলি ইদুর এতক্ষণে বিদূরিত হােলা
জানবার জন্যে তার তর সইছিল না। মনিটারের সঙ্গে সাক্ষাতের
লালসায় দোতলা থেকে তিনি তর তর করে’ নামছিলেন, এমন
সময়ে সিড়ির ধাপে, লুক্কায়িত ভাবে অপেক্ষমাণ একটা জাতি-
কলে তার পা আটকে যাওয়াতেই এই আর্তনাদ ! সুপারি-
টেণ্ডেন্ট-নিৰ্গত এই তীব্র নিনাদ।
মনিটারের প্রথম শিকার—সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের তিন তিনটে
পায়ের আঙুল !
“কী কাণ্ড! উঃ, কি কাণ্ড !”-চেঁচিয়ে হােষ্টেল ফাটিয়ে
মনিটারকে সামনে পেয়ে তেলে বেগুনে তিনি জ্বলে উঠলেন ?
“এই তােমার ইদুর তাড়ানাে? কী সব মারাত্মক যন্ত্র :
এক্ষুনি এইসব যন্ত্রণা এখান থেকে খেদিয়ে দাও। হােষ্টেলের
কোথ থাও যেন এসব যন্ত্রপাতি না থাকে। নইলে তােমার
মনিটারি তাে গেলই, তুমিও গেলে ! ইদুর তাড়াতে না পারি,
তােমাকে আমি তাড়াবে।
জাতিকলটাকে সুপারিইেণ্ডেণ্টের পা থেকে ছাড়িয়ে এনে
নিঃশব্দ অধােমুখে মনিটার যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে গেছল।
তার কোনাে সাড়া পাওয়া গেল না।
শিৰাম চকতির মতাে

আর সেই যে সুপারিন্টেন্টে চূড়ান্ত কথাটি বলে দিয়ে আহত আঙুল তিনটি স্বহস্তে ধারণ করে’-তখনাে তারা পদচ্যুত হয়নি একেবারে—ঠায় এক পায় দাড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ না মনিটার তার সমস্ত ভয়াবহ কলকৌশল কুড়িয়ে বাড়িয়ে হােষ্টেলের ত্রিসীমানার বাইরে একেবারে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে নিক্ষেপ করে ফিরে এল, ততক্ষণ সিড়ির সেই ধাপটি থেকে আর এক পাও তিনি নড়লেন না। জাতিকলরা চলে গেল কিন্তু ইদুরজাতি গেল না—মনি- টারের মুরুব্বিগিরি এদিকে যায় যায় ! কী করে বেচারী। তক্ষুনি আবার সে বাজারের দিকে রওনা দিল। সেই রাত্রেই নিয়ে এল একগাদা ইদুর-মারা বিষ—আর দ্বিগুণ উৎসাহে তাই সে ছড়িয়ে দিল হােষ্টেলের দিগ্বিদিকে। “এত গন্ধ কেন ?” পরদিন সকালে তদারকে সুপারিন্টেন্টে মশাই জিজ্ঞেস করলেন সবাইকে । “এমন বিচ্ছিরি গন্ধ কিসের?” ‘মনিটারের গন্ধ সার।” আমরা জানালাম। ‘‘মনিটারের গন্ধ ? তার মানে ?” সুপারিন্টেন্টে নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারেন না। বােধ হয় তার নিজের নাকের ওপরেও অবিশ্বাস জন্মে যায়। “আজ্ঞে, মনিটারের নিজের গন্ধ না।” আমাকেই তার নাসিকা-কর্ণের বিবাদভঞ্জন করে দিতে হয় । “ইদুর- তাড়ানাের জন্যে চার ধারে সে কী সব ছড়িয়েছে তারই সৌরভ।” কথা বলার বিপদ।

“সৌরভ! ছি ছি ছি !” সুপারিন্টেন্টে একবাক্যে
ছি ছি করতে লাগলেন : “ভারী বিচ্ছিরি তােমাদের রুচি।
নাক বলে কিছু কি নেই তােমাদের ? কোথায় গেল সে
নাক-না-ওয়ালা ?
হাঁক পড়তেই ‘সে’ হাজির।
কী এসব ছড়িয়েচ ? দুর্গন্ধে আমার গা বমি বমি করছে।
অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে এল বলে। এক্ষুনি এই সব গন্ধমাদন
হটাও এখান থেকে।” সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের গলায় করাত ।
“আগে হটাও, তারপরে অন্যকথা।”
“কি করে হটাবােসা ?” কঁদো-কঁদো হয়ে বল্ল
মনিটার । “এতত জাতিকল না যে সরিয়ে ফেলব। ইদুর
মারা বিষ ! ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, লেপটে সেটে গেছে
মাটিতে—এখন একে তুলি কি করে ?”
“এনি না ওঠে, না উঠতে চায় যদি তুমি চেটে শেষ
করা ; অতশত আমি জানিনে ?” এই বলে’ চটে মটে,
চাবার ব্যবস্থাপত্র দিয়ে, নাকে রুমাল চেপে চলে গেলেন
সুপারিন্টেণ্ডেট ।
যতই চাটুকারিতা থাক, বিষ চেটে সাবাড় করা কোনাে
মনিটারের কৰ্ম্ম না।
জনমজুর ডাকিয়ে চারশাে বাতি জল ঢেলে সমস্ত দিন
হন্তদন্ত হয়ে হােষ্টেল সাফ করতে হলাে মনিটারকে।
দিনের এই পরিশ্রমেই আধখানা হয়ে গেল বেচারা !
শিৰাম চকবরতির মতাে

ইদুর-মারা বিষ দূরীভূত হােলাে। আমরা নিশ্বাস নিয়ে
বাঁচলাম।
ইদুররা কি করে এতক্ষণ কাটিয়েছে ওরাই জানে, কিন্তু
কাল রাত থেকে রুদ্ধ নিশ্বাসে বাস করে’ কী কষ্ট যে গেছে
আমাদের, ভাবতেও—উঃ ।
মনিটার কিন্তু বেপরােয়া। যে করেই হােক, ইদুর
তাড়িয়ে তার মনিটারি বজায় রাখবেই—যেনি মরিয়া তেমনি
সে ছােড়বান্দা! তৃতীয় দিনে বাজারে গিয়ে সে একটা
হুলাে বেড়াল পাড়ে নিয়ে এল। মিশমিশে কালাে
বেড়াল। “এইবার জব্দ হবে ইদুর!” মনিটারের চোখেমুখে
পরিতৃপ্তির হাসি ছড়িয়ে পড়ে । “এই বেড়ালেই ওদের
জলযােগ করে’ ফিনিশ করবে।”
কিন্তু দুঃখের বিষয়, ইদুরদের পিকনিক করার দিকে
বেড়ালটির তেমন উৎসাহ দেখা গেল না। ইদুরের চেয়ে
রান্নাঘরের মাছের দিকেই ওর বেশী আগ্রহ প্রকাশ পেল।
এমন কি, তার ফিনিশিং টাচ, দিতেও সে দ্বিধা করল না।
খােদ সুপারিন্টেন্ডেটের পাত থেকেই মাছের মুড়ােটা থাবা
মেরে তুলে নিয়ে সটকান্ দিল একদিন !
সুপারিন্টেন্টে কঠোর মন্তব্যে মনিটারের কুরুচির প্রতি
ক্র কটাক্ষ করলেন—ধেড়ে ছেলের বেড়াল পােষবার সখ
দ্যাখাে। এসব মামার বাড়ীর আবদার এখানে শােভা পায়
, স্পষ্ট ভাষাতেই জানিয়ে দিলেন। এবং বেড়ালটার প্রতি
কথা বলার বিপদ

।
!
কেবলমাত্র কটাক্ষ করলেন, তার বেশী আর কিছু করলেন
করবার ছিলও না কিছু, কেননা, নাগালের বাইরে
গিয়েই মুছােটাকে গালের ভেতরে বাগাবার চেষ্টায় সে ব্যস্ত
ছিল তখন।
কিন্তু যেদিন রাত্রে অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে বেড়ালটার
তিনি ল্যাজ মাড়িয়ে দিলেন আর বেড়ালটা খাক করে তাকে
আঁচড়ে কামড়ে একশা করল সেদিন আর রক্ষা থাল না !
সারা হােষ্টেলময় সমস্ত রাত তিনি দাপাদাপি করে’
বেড়ালেন !—-“কী সর্বনাশ, দ্যাখাে দিকি ! বেড়ালে কামড়ালে
কী হয় কে জানে! কুকুরে কামড়ালে তাে জলাতঙ্ক হয়,
ইদুরে কামড়ালে র্যাট ফিভার হয়ে যায়—এখন বেড়ালের
কামড়ের ফলে--কী জানি কী যে হবে ” এই কামড়
কতদূর যে গড়াতে পারে ভেবে ভেবে তিনি আকুল হয়ে ওঠেন।
“হয়তাে স্থলাতঙ্ক হতে পারে।” ওরকম ব্যাকুলতা দেখে,
তার দুর্ভাবনা দূর করার মানসেই সান্ত্বনাচ্ছলে আমি বলি।
“তার বেশী কিছু হবে না সার
।”
“য়া? কি বল্লে ? স্থলাতঙ্ক ? তাহলেই তাে গেছি।
বেড়াল কামােনােয় স্থলাতঙ্ক হয় না কি ? কী সর্বনাশ!
তাহলে কোন্ স্থলে গিয়ে বাঁচবাে? এবার আমি
মরলুম
সত্যিই মারা গেলুম এবার। এতদিন বেঁচে থেকে আর বাঁচা
গেল না। এই মনিটারটি আমায় মারল। ওর বােকামির
জন্যেই এইভাবে বেঘােরে আমায় মরতে হােললা ?”
শিা চকতির মতাে

মনিটার যতই তাঁকে বােঝায় বেড়ালে কালে কিস্সু
হয় না, সমস্ত কেবল আমার চালাকি, ততই তিনি আরাে
ক্ষেপে ওঠেন ও
“হ্যা, কিন্তু হয় না : হয় না ! তােমার মাথা! তুমি
জানাে? তুমি জাননা সব ! ফের যদি তােমার ঐ ইপিট
বেড়ালকে এই হােষ্টেলে দেখি তাহলে দেখে নেব ! এতই
যদি তােমার বেড়াল পাের বাতিক, নিজের বাড়ী নিয়ে গিয়ে
সখ মেটাও না বাপু!”
এ পর্যন্ত মনিটার কোনাে রকমে সয়েছিল - -এত
লাঞ্ছনাতেও কিছু বলে নি, কিন্তু নিজের সখের খাতিরে ওর
বেড়াল পাের বাতিক এই অভিযােগে এমন ও শক্ পেল যে
ওর মাথা খারাপ হয়ে গেল। আর সহ্য করতে না পেরে,
এক পদাঘাতে, সানের মুক্ত দ্বারপথে বেড়ালটাকে বিবাগী
করে দিল। টি-এ-ও করে দিল তৎক্ষণাৎ।
এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, পেছনের দরজা দিয়ে ফিরে এল
বেড়ালটা ?
মনিটার এবার ওকে করায়ত্ত করে ক্রিকেটবলের মতাে
হাঁড়ে ফের আবার বার করে দিল।
এবং পুনরায় সে ঘুরে এল-এবার এল জানালা দিয়ে।
মনিটার তার দিকে তাক করে’ বই খাতা ছুড়ে লাগায়
আর সেও যার পা সামনে পায় আঁচড়ে কামড়ে তার শােধ
তােলে। এইভাবে সে একবারে খােদ্ প্রিন্সিপালের পা সম্মুখে
কথা বলার বিপদ!

পেয়ে গেল—এমন হৈ-চৈ-কাণ্ডটা কিসের এই খোঁজ নিতেই
আসছিলেন-এখন নিজের পায়েই তার পরিচয় পেয়ে,
লেটেসট নিউজ বহন করে বিরক্ত হয়ে তিনি চলে গেলেন।
যাবার সময়ে শাসিয়ে গেলেন, কালকেই তিনি রাষ্টিকেট
করে ছাড়বেন।
তারপর সত্যিই যেন স্থলাতঙ্ক বেধে গেল ! বেড়ালতাে
ক্ষেপে ছিলই, মনিটারও ক্ষেপে গেল যেন ! প্রিন্সিপাল
পরিষ্কার করে না বলে গেলেও, বেড়াল যে নয়, ওর বরাতেই
যে উক্ত রাজটীকা উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, কেমন করে যেন ওর
ধারণা হয়ে গেছল। চেঁচিয়ে মেচিয়ে তুলতামাল, করে’
তীরবেগে বেরিয়ে গেল মনিটার।
তারপর, বহুক্ষণ বাদে, টলতে টলতে, কোথ থেকে এক
ঘেঁকি কুকুর নিয়ে এসে সে হাজির হােলাে।
“কই, কোথায় গেল সেই অপয়া হতচ্ছাড়া ?” এসেই,
চোখ মুখ পাকিয়ে, চারধারে সে বেড়ালের খোঁজ করতে
থাগল।
তারপর থেকে ঘটনার গতি দ্রুতবেগে ধাবিত হােলল ।
এবং বেড়ালটাও। কুকুরের আভাস দেখবামাত্রই সে উধাও
হয়েছিল। আর বেড়ালের অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গে পলকের
মধ্যে, ইদুররা সদল-বলে ফিরে এল আবার। প্রকাশ্যভাবেই
তারা পায়চারি করতে আরম্ভ কল-কুকুরটার চোখের
সামনেই অসঙ্কোচে এধারে ওধারে ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল।
শিমু চকবরতির মতো

এবং সেই খেকি কুকুরটা ইতিমধ্যে আর কোনাে কাজ না পেয়ে
সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের অন্য পায়ে কামড়ে দিয়েছে, খাবার ঘরের
বাসনপত্র ভেঙে চুরে তছনছ করে একাকার করেছে আর
রান্নাঘরের অধিষ্ঠাতা দেবতা উড়ে ঠাকুরকে (কুকুরের ধমক
শােনবামাত্রই তাে সে উড়ে দৌড় !) পেয়ারা গাছের মগডালে
তুলে রেখে এসেছে।
এবং দুর্ঘটনার ওপর দুর্ঘটনা ! সুপারিন্টেটের বিপদের
বার্তা পেয়ে, বেড়ালের কামড়ের পরে কুকুরের কাম্পানির
কথা তার কানে যেতেই—স্বয়ং প্রিন্সিপাল, মনিটারকে
পরদিবসে রাষ্টিকেট করবার কর্তব্য আপাতত মুলতুবি রেখে,
চারিতে ইস্তফা দিয়ে তলপি তলপা গুটিয়ে সেই দণ্ডেই সরে
পড়েছেন শােনা গেল।
আর সুপারিন্টেন্টেও, এক পায়ে বেড়ালের, অন্য পায়ে
কুকুরের দংশন-চিহ্ন ধারণ করে, অনন্যোপায়।
প্রিন্সিপালের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন কি না স্থির করতে
লাগলেন। তার পোঁটলা পুটুলি বাধতেই যা বাকী : আর
মনিটার ? তার কোনাে পাত্তা নেই। খুব সম্ভব, কুকুরকে
নিষ্কাশিত করার মৎলবে, হাতীঘােড়া একটা কিনে আনবার
জন্যেই সে বাজারের দিকে ধাওয়া করেছে এবার।
আমার তাে তাই ধারণা।
আমরা বিছানার ওপর টেবিল চাপিয়ে যে যার ছােট্ট
টেবিলের ওপরে কম্পান্বিত কলেবরে দাড়িয়ে আছি।
হয়ে
৮১
কথা বলার বিপদ ।

এদিকে ইদুররাও সগৌরবে আনাচে কানাচে সর্বত্র ফের
ঘু ঘুর করতে শুরু করেছে ! কোনাে দিকে তাদের কোনাে
হৃক্ষেপ নেই।
আর এধারে কুকুরের লম্ফ ঝম্প দ্যাখে কে !
এক
সেবাহিক ‘শগ
উদয়না,
ক

fলম
চা-
igue PREL NICO
(কিম্বকাঠ-তিও বন২০)

আমার পাশের চেয়ারের লােকটি যে ত্রিভঙ্গিম, টের
পেলাম অনেক পরে। কি করে’ আন্দাজ করবে বলে ?
ত্রিভঙ্গিমের এ-ভঙ্গিমা কখনাে দেখিনি, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি
কোনােদিন। ত্রিভঙ্গিম হেয়া কাটিং সেলুনে বসে নিজের
পয়সা খসিয়ে এত ঘটা করে চুল ঘঁটাবে—একথা ধারণা
করতেই মাথা ঘুরে যায়।
কিন্তু সত্যিই তাই। এতক্ষণ ধরে আমারই পাশের চেয়ার
দখল করে চুল ঘঁটানাে, দাড়ি কামানো, নােখ চঁছানাে
থেকে শুরু করে মাথায় দলাই-মলাই, শ্যাম্পু এবং হেয়ার
ড্রেসিং-মায় মুখে পাউডার মাখানাে পৰ্যন্ত একটার পর একটা
অবাধে বিনা প্রতিবাদে যিনি করিয়ে নিচ্ছিলেন তিনিই
আমাদের ত্রিভঙ্গিম। নিজের চুলক্ষয়ে—নিজের মাথার উপরে
কাচির খচখচানি, শুনে তন্ময় হয়েছিলাম তাই এতক্ষণ ওকে
লক্ষ্য করিনি—এখন লক্ষ্য করে মাথা ঘুরে গেল।
দুজনে এক সঙ্গেই সেলুন থেকে বেরুলুম। বেরিয়েই,
সামনে চায়ের দোকান দেখে, ত্রিভঙ্গিম বল্ল : “একটু চা খাওয়া
যা—এসাে।
আমার চমক লাগল। য়া? এ কি ?
ত্রিভঙ্গিম ?
চা-খানায় বতে না বসতেই ত্রিভঙ্গিম বলে: “আর, কী
খাবে বলল? ওলেট ? পােচ? টোষ্ট ? কিচ্ছু খাবে
না? আমার পয়সা কিন্তু ?”
বলে কী
3
শিা চকবুবতির মতো

বিস্ময়ের ওপর বিস্ময় আমায় মুহ্যমান করে দেয়।
সুবিন্যস্ত কেশ, মুক্তহস্ত, বন্ধুবৎসল ত্রিভঙ্গিম আমার একেবারে
অজ্ঞাত। যে ত্রিভঙ্গিমকে আমি চিনি, হাড়ে হাড়েই চিনি-
ইনি ত তিনি নন্ ! ওর শরীর সুস্থ আছে কি না, সুকৌশলে
জানতে চেষ্টা করলাম। শরীরের কথাটা জেনে নিয়ে তারপরে
ওর মাথার ঠিক আছে কি না জানতে চাইব।
“শরীর ? শরীর আমার ভীষণ ভালাে যাচ্ছে আজকাল।
বিশেষ করে কবিরাজ হারণ সেনের চার বােতল সেই
দ্রাক্ষরিষ্ট খাবার পর থেকে—পা বােতল দেড় টাকা—এমন
তােফা রয়েছি এখন-যে কী ব !”
‘জলের মতো টাকা ওড়াচ্ছ বলে আমার বােধ হচ্ছে।”
আমি বল্লম।
“টাকা নয়, বই।” বল্ল ত্রিভঙ্গিম। “তােমারই বই।
তােমার সেই গল্পের বইটা—ওই যে----কী---কথা বলার বিপদ
—নাকি ?
“আমার সদ্যপ্রকাশিত বইটা ? প্রকাশকের দেয়া তার
কপিগুলাে কি তােমার বাসাতেই ফেলে এসেছিলাম নাকি ?
য়া? তাই নাকি?” আমি চীৎকার করে বলে উঠি ।
“কোথায় যে ফেল্লাম কপিগুলো ভেবে ভেবে এদিকে আমি
কাহিল হচ্ছি।”
“পঁচিশখান কপি তত মােটে : মােমাট পঁচিশটিমাত্র--
আমি বেশ করে’ গুণে দেখেছি।”
?
কথা বলার বিপদ!

T “কপিগুলাে কি তুমি বেচে দিয়েছো নাকি?” আমার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস । “হায়, সেই চেষ্টাই করেছিলাম প্রথমে।” দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বল্লে ত্রিভঙ্গিম: “ভেবেছিলাম অসংখ্য বন্ধু আমার। পঁচিশটা কপিই তাে ! একটা পাচার করে দিতে আমার কতক্ষণ ! আর তুমি যখন ভুলে ফেলেই গেছ, তােমাকে ফের মনে করিয়ে দিয়ে অনর্থক কেন কষ্ট দেওয়া ?--মনঃ- পীড়া দেওয়া বইতে না?” “বেচে দিয়েছ—সব?” আমি বাধা দিয়ে জানতে চাই। “বেচতে আর কই পারুলাম । কেউ কিনলে তাে ! শুনেছিলাম তােমার বইয়ের নাকি খুব কাটুতি ::::তােমার মুখেই শুনেছিলাম।''ভুলিয়ে ভালিয়ে ভুজুং দিয়ে আমাকে তােমার প্রকাশক করবার তালে ছিলে কিনা খােদাই জানেন ? কিন্তু বন্ধ কি, তােমার বই কাটাতে গিয়ে আমার অনেক বন্ধু কেটে গেল—বিস্তর-বিস্তর বন্ধু-বিচ্ছেদ হয়ে গেল।” “বলল কি?” ওর বন্ধু-পাতের কথা শুনে আমার বই- সােপাটের কথাও ভুলে যাই। “ডজন ডজন বন্ধু ছিল আমার, বন্ধু হে ! কিন্তু তারা কী পরিমাণ বন্ধু, বই বেচতে গিয়েই টের পেয়েছি। পাঁচ সিকেও দাম নয় কারো বন্ধুত্বের ! নগদ মূল্যে দুখানা কেবল বেচতে পেরেছি ভায়া–পাঁচ সিকে করে’ আড়াই টাকা পেয়েচি মবলগ। তারপর ভাবলাম বাটা-সীটে করে’ শিব্রাম চকবরতির মতাে ন

দেখলে কেমন হয়-মালের বদলে মাল। আমার প্রথম বধ্য
হচ্ছে এই চা-খানার মালিক—অদ্য যেখানে বসে চা পান
করছি আমরা। কী, আরেক কাপ, চা চাই নাকি?”
“না, থাক্।” কষ্টে-সৃষ্টে আমি জানাই : “ধন্যবাদ !”
“প্রথমে লােকটা রাজি হতে চায়নি। বই নিতে রাজি
হয়নি গােড়ায়। বলেছিল, তার চা যে সুখাদ্য এ বিষয়ে সে
নিঃসন্দেহ, কিন্তু বইটা ততখানি সুখাদ্য কিনা সে বিষয়ে তার
সন্দেহ আছে।''কী : আমার বন্ধুর বইকে অখাদ্য বলা !
রাগ হয়ে গেল আমার। তক্ষুনি আমি স্পষ্টাস্পষ্টি তাকে
জানিয়ে দিলাম, তাহলে আজ থেকে আমার-আমারও এই
দোকানে ইস্তফা ! কাল থেকে ঐ সানের চা-খানাতেই চা
খাবাে !
বন্ধু-বান্ধবদের চাখাববা! এইভাবে হুমকি
দেওয়ার ফলে চায়ের বদলি একখানা বই ও নিয়েছে নিতে
বাধ্য হয়েছে।
।”
এই পর্যন্ত বলে’ ত্রিভঙ্গিম দোকানের এক কোণে
কোনঠাসা চায়ের মালিকের দিকে আড়চোখে তাকায়।
আমিও ওর প্রথম নিহতটির দিকে তাকিয়ে বিষন্ন হই।
সেই দুর্বাধ্য লােকটি তার ছােট্ট টেবিলের উপরে দুর্বোধ্য
বইটির দিকে ম্রিয়মান হয়ে তাকিয়ে আছে দেখতে পাই।
“চায়ের বদলে বই-বলাবলি সীটেমে।
সীসৃটেমে। বইয়ের
বদলে চা। এ পর্যন্তু আমি এই কদিন ধরে তােমার বইটার
পাঁচটা গল্প পর্যন্ত পান করতে পেরেছি, তােমাকে আমাকে
এবং
স
কথা বলার বিপদ!
৮৭

৫
।
দুজনকে জড়িয়ে এই এখন অবধি বইটার সাড়ে সাত আনা
উঠলাে--” ত্রিভঙ্গিম দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে: “আরে---
এখনো সাড়ে বারাে আনা বাকী !••••••দেবে আরেক কাপ, ?”
‘তােমার হেয়ার কাটিং সেলুনের অত সমারােহ যে কেন
তাও আমার কাছে বেশ পরিস্ফুট হচ্ছে এখন।” আমি বলি ।
“হ্য', তাইই। ঠিকই ধরেচ। কিন্তু সেলুনের লােকটা
এ-লােকটার চেয়েও বেশি আনাড়ি। কথা বলার বিপদ
নামটা দেখেই বল্লে, এ বই তার কোনাে কাজে লাগবে না।
চুল হেঁটেই ওদের ফুসৎ নেই, কথা কইবে কখন? কথা বল্পে
তাে বিপদ! এ-বইয়ের মধ্যে ওর শেখবার কী আছে জানতে
চাইল। কী করি ? বল্লাম যে, মেয়েদের ববছাট ছেলেদের
ঘাড়ে চাপানাের কৌশল এতে বিশদরূপে বিবৃত করা রয়েছে।
এই বলে’-অনেক বলে কয়ে তাে খান্ দুই ওকে গছিয়েছি।
ও কিন্তু এই সৰ্তে রাজি হয়েছিল যে বইয়ের বলি আড়াই টাকা
দামের চুল ছাঁটাই দাড়ি কামাই শ্যাম্পু ইত্যাদি সব আমায়
এক চোটে তুলে নিতে হবে। রােজ খুচ খাচ,
চলবে না ! কি করি বলল—এক নাগাড়ে বসে তিন বার
চুল ছাটালুম, পাঁচবার হেয়ার ড্রেসিং করে দিলে, সাত বার
দাড়িকামাতে হােলাে। নােখ, কাটাই হােললা বার দশেক।
সেই সকাল থেকেই চলেছে ! উঃ ! যা জছে সারা মুখ।
তেমনি আবার নােখের ডগা গুলাে ।
সান্ত্বনাচ্ছলে ওর গালে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছা করল—
শিব্রাম চকবরতির মতাে
৮৮

এবং সেই
কাজ না করে।
সাতবার কামানাে হলে মসৃণতা কেমন হয় জাবার কৌতুহলও
যে একটু না জাগল তা নয়, কিন্তু আমার যতো বিপদ উদ্ধার
করেই যে ওর এই দাড়িশূণ্যতার বিলাসিতা একথা ভাবতেই
ওর প্রতি হস্তক্ষেপ করবার উৎসাহ আমার লােপ পায়।
হাতের সঙ্গে গালের প্রায় এক ইঞ্চির সমান্তরাল রেখে,
ও নিজেই নিজের সারা মুখে হাত বুলাতে থাকে।
হাত বুলােনােতেই সুকর্তিত নােখের মুখে এমন আঘাত লাগে
যে পুনঃ পুনঃ ফু দিতে হয়। তারপর ক্ষুরের মতো ধারালাে
এক দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করে’ ও বলে ? উঃ ! পরের বই
কাটানাে যে কী ঝারি : আর কেউ যেন কখনাে এমন
এর চেয়ে বই দুটোর পেজ, বাই পেজ দিনের
পর দিন দেড় বছর ধরে বাড়ী বসে দাড়ি কামিয়ে কাটাতে
পারলেও আমার কোনাে ক্ষতি ছিল না।•• উঃ।”
“এইভাবে আর কতােগুলি কপির হাত থেকে তুমি রেহাই
পেয়েছ ?” আমি জিজ্ঞেস করি । “কততগুলি বইকে মুক্তি-
দান করেছ আমার ?”
“ওষুধের দোকান বােস্ কোম্পানিতে চেষ্টা করেছিলাম।
খান্ চারেক বইয়ের বিনিময়ে পাঁচ টাকা দামের টুথপেষ্ট,
হেয়ার ক্রি, ওভালটিন্ আর লিলিবিস্কুট এই সব পাওয়া যায়
কি না—খোজ করেছিলাম। তাদের মুখে আশ্চর্য এক
বিস্ময়ের চিহ্ন দেখলাম—এবং চিহ্নটি কেবল চিহ্নমাত্র না থেকে
নৈঋৎ কোণের মেঘের মত ক্রমশই এত বদ্ধিত হতে লাগল যে
কথা বলার বিপদ।

এমন
চার
জবাব জানবার জন্যে বেশিক্ষণ আমার দাড়াবার সাহস হােলল
না। নিশ্চিহ্ন হবার ভয়ে পালিয়ে এসেছি তৎক্ষণাৎ ?”
“ভালােই করেছ। বটকেষ্ট পালে একবার ঢু মালে না
কেন? তাদের দোকান তাে আরাে বড় ?”
“নাঃ, ঢু মেরে ফল নেই। ফয়দা নেই দাদা-আমি
বুঝতে পেরেছি। অ্যালােপ্যাথিক ওষুধ-ওলারা কোনাে কাজের
নয়। আমাদের কবিরাজরা ওদের চেয়ে ঢের ভালাে।
বিচক্ষণ ! এই জন্যেই অনেকে কবিরাজির পক্ষপাতী।
কি আমাকেও হতে হয়েছে। চারটে কপির বদলে কবিরাজ
হারাণ সেন বড় বড় চার বােতল দ্রাক্ষারিষ্ট দিয়েছেন।
চার বােতল ! হাতে হাতে। তাও আবার হাফ প্রাইসে—
মুক্ত হস্তেই দিয়ে দিলেন। কথা পাড়বা মাত্রই যেন লুফে
নিলেন বই কখানা ! কবিরাজ অথচ সাহিত্যরসিক, এমনটি
এর আগে আমি আর দেখিনি। বল্লেন, কাগজ যা আক্রা
আজকাল, আর, এমন ভালো কাগজে ছেপেছে । আবার
ছবিও আছে দেখচি । বাঃ! তারপর
তারপর—” ত্রিভঙ্গিম থেমে
যায় ঃ “তারপর আর যা বল্লেন, বলব?”
আমি জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাই—আমার বাক্যঘূৰ্ত্তি হয় না।
“বল্লেন, ওষুধের পুরিয়া বাঁধবার খাসা মােড়ক হবে।”
বল্প ত্রিভঙ্গিম: “যথার্থই লােকটা সাহিত্য-রসিক। আমার
শ্রদ্ধা হচ্ছে।”
কবিরাজ হারাণ চন্দ্র সেন ভিষগ-রত্নের সাহিত্য-রসিকতা
বিত্ৰাম চকবরতির মতো

নিয়ে আমি মনে মনে একটু নাড়াচাড়া করি, তারপর ভগ্নকণ্ঠে
বলি ! “মমাটমাটু কখানা কাটিয়েছ এই করে ?
এই করে’ ? নগদ মূল্যে
তাে দুখানা,-চায়ের বদলি এক, চুল ছাঁটুতে দুই-আর
কবিরাজখানায় চার—সবশুদ্ধ নখানা গেল ? তাই না ?”
“নখানা ? নখানা মােটে ? সব কখানাই গেছে। কিন্তু
যাওয়াতে যা বেগ পেতে হয়েছে আমাকে—যা করে’ যাইয়েছি
—তা কেবল এক খােদাই জানেন।” ত্রিভঙ্গিম দীর্ঘনিশ্বাস
ফেন্স, আর—আর আমিও জানি কিছু কিছু ?”
“একখানাও আর বাকী নেই ?” আমার ভগ্নতর কণ্ঠ
থেকে বেরয়।
“আর একখানাই কেবল বাকী আছে।” এই বলে
ত্রিভঙ্গিম পকেট থেকে—পঁচিশ খানার ধ্বংসাবশেষ--সেই
একমাত্র কপিটিকে টেনে বার করল : “এইটাই কেবল
কাটাতে বাকী ?”
“এটা নিয়ে কোথাও চেষ্টা করাে নি ?” আমার গদ্গদ
গলা থেকে বার হয়।
“করিনি আবার ? কমলালয়ের রিডাকশন সেলে কপাল
ঠুকে ঢুকেছিলাম—এর বদলে একখানা রুমালও পাওয়া যায়
যদি। তাঁরা বল্লেন, রিডাকশন্ সে বটে, মালপত্রের দামও
খুব কমানাে হয়েছে সেকথাও সত্যি—কিন্তু তা বলে’ অততদূর
কমানো হয়নি। খুব কঠোর ভাষাতেই তঁারা এই কথা বল্লেন।
আমি বল্লাম, খদ্দেরদের সঙ্গে তাঁদের যদি এই ধরণের ব্যাভার
কথা বলার বিপদ!

হয়, তাহলে তাদের দোকানে এই আমার শেষ পদার্পণ।
তাঁরা জানালেন, “আমার মতাে বহুমূল্য খদ্দের হারাণো খুবই
দুঃখের কথা নিঃসন্দেহ, কিন্তু কি করবেন, তারা নাচার—এত
বড় দুঃখও তাদের বুক পেতে সইতে হবে। উপায় কি ?
এই না শুনে আমি তৎক্ষণাৎ বই নিয়ে চলে এসেছি।”
আমার মনে হয় মেছােবাজারে মেছুনীদের কাছে একবার
চেষ্টা করুলে পারতে।
তা কি আর করা হয়নি ? বইয়ের কথা শুনতেই তারা
রাজি নয়। আলুপটল-ওলাদেরও বাজিয়ে দেখেছি। কিন্তু
সব বৃথা! মাংসওলাকেও বলা হয়েছিল—কাটারি নিয়ে
মায়ূতে আসে আর কি ? এখন শুধু শ্ৰমাণী মার্কেটের
মশ লাওরা বাকী আছে কেবল । চলােনা একবার চেষ্টা
করে দেখি গে।”
ওই ভেতরে যায় বই নিয়ে—আমি বাজারের গেটে--
গেটের বাইরেই দাড়াই। হাতাহাতিতে যােগ দেয়া তাে দুরে,
মারামারির সাক্ষী হবারও আমার সামর্থ্য নেই। কিন্তু বেশীক্ষণ
দাড়াতে হয় না, একটু পরেই ও ম্লান মুখে বেরিয়ে আসে।
“উহু, হােলােনা। বইটার বদলে, পাচ সিকে তাে পরের
কথা-বারাে আনাছ আনা -এমন কি দু আনা দামেরও
লবঙ্গ এলাচ তেজপাতা ইত্যাদি দিতে প্রস্তুত নয়। উলটে
যা তেজ দেখাচ্চে-বাপ, । কেবল একজন লােক একটু আশা
দিয়েছে। গেটের মুখে যে লােকটা মাখন বিক্রি করে-সে-ই !
শিম চকবরতির মতাে

সে বলেছে মাস কয়েক পরে আসতে--ততদিনে মাখন পচলে,
পচা মাখনের বদলে হয়ত নিতে পারে। য়া, কি বলছ ?
কয়েক মাস পরে কেন ? ও !ইতিমধ্যে ওর পুত্র-তুলাভের
সম্ভাবনা আছে কি না। ছেলের দুধ গরমের জন্যেই নেবে
তখন। হাঃ, তার জন্যে আমি তদ্দিন বসে থাকব না-কি ?
আবদার দেখনা ! তার চেয়ে উইয়ের হাতেই কাটতির ভার
দেব নাহয় । তাতেও আমার লােকান্ নেই !”
তরুণ সং
সেবা,সাহিত্য বিভাগ
শ
লয়
নারায়ণপুর, হাওর
কথা বলার বিপদ!

No text on this page.

|eugelapseus KLIKE

“তুমি রাঁধতে জানো দাদা ?” সকলে চা খাবার সময়ে
বিনি জিগ্যেস করল।
“রাঁধতে জানিনে ? কী বলিস।” সগর্বে আমি বলি ।
“এক্ষুনি একটা ডিম সেদ্ধ করে তােকে দেখিয়ে দেব?”
ডিম তাে নিজগুণেই সেদ্ধ হয়, তার মধ্যে আবার দেখাবার
কী আছে ? ওটা কি একটা রান্না?”
“হংসডিম্ব আর পরমহংসরা অন্যের অনায়াসে স্বয়ংসিদ্ধ
হয়ে থাকেন, মানি একথা, কিন্তু তা বলে ষ্টোত ধরাতে হয়
? স্পিরিট যােগাড় করতে হয় না বুঝি ? তাছাড়া,
আরাে কত ইত্যাদির যােগাযােগ নেই ?” খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে
এসবের কথাও ওকে জানাতে হয়।
“তবে আর কি, তাহলে তুমি পারবে। রান্না কিছু না,
তার যােগাড়যন্ত্রটাই আসল, তাই যখন তুমি পারাে, তখন
উনুনে কড়া চাপিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করার যন্ত্রণা তা আর
তােমার পক্ষে এমন কি?”
“কেন, এসব কথা কেন হঠাৎ ?” আমাকে সন্দিগ্ধ হতে
হয়।
'মামার বডড অসুখ, ভাবচি একবার মামার বাড়ী যাব ।
এই দিন দশ বারাের জন্যই। সেবা-শুশ্রষার হাঙ্গাম্মামীমা
পেরে উঠচেন না একলা।”
“মামাকে দেখতে যাবে? আর এধারে আমাকে কে
দ্যাখে ?”
শিৱাম চকবরতির মতো

“আয়না রইলাে। নিজেই দিন কতক নিজেকে একটু
দেখলে না হয়। বিনি হাসে। “ভাড়ার ঘরে চাল ডাল
নুন লঙ্কা পেঁয়াজ আটা ঘি ময়দা গুড়াে মশলা—চিনি বাদে-
আর সবই মজুদ রইলাে। কোটা কি চিনতে পারবে নিশ্চয়।
তাছাড়া একখানা পাকপ্রণালীও কিনে রেখে গেলাম। ইচ্ছে
মত পাকাবে, খাবে।”
“কী সর্বনাশ !” পাকানাের কথায় আমি ককিয়ে উঠি।
“সর্বনাশটা কি ? মরুভূমিতে পড়ােনি যে হাহাকার
দশ বারাে দিন নিজেকে নাইয়ে খাইয়ে টিকিয়ে
রাখতে পারবে না ? কিসের মানুষ তবে? রবিন্স ক্রুসাের
নতন যদি বিজন দ্বীপে একলাটি গিয়ে পড়তে হতে কী
করতে ?”
কঁদতাম, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতাম।” একটা সত্যি
কথা বলে ফেলি।
অনেক বল্লাম, অনেক করে বােঝালাম, অনেক অনেক
কাকুতি-মিনতি করলাম, দীর্ঘ দশ বারাে দিনের জন্যে একটি
অসহায় অনাথ বালককে এভাবে একলা পরিত্যাগ করে চলে
যাওয়া তার উচিত হচ্ছে না, হয়তাে আমিও এক অসুখে
পড়তে পারি—মামার চেয়েও ঢের শক্ত অসুখে,-নানাদিক
থেকে নানারকমে ওর প্রাণে সমবেদনা জাগানাের চেষ্টা
করলাম, কিন্তু কোনাে ফল হােলো না। বিনি চলে গেল।
লেখকদেরও পৌরুষ বলে একটা জিনিষ থাকে ।
কথা বলার বিপদ।

পাওয়া না গেলেও থাকতে পারে । এবং অনেক সময়ে গিয়েও যায় না। রবিন্স ক্রুসাের মত মহাপুরুষ নহলেও, আপাত- দৃষ্টিতে তারা যতই অপদার্থ মনে হােক, কোনাে কোনাে লেখকের মধ্যে, লেখা ছাড়াও অন্যান্য সদ্গুণের এক-আধটু ছিটে ফোটা থাকা সম্ভব। এই যেমন আমি। আমার নিজের মধ্যে পৌরুষের কোনাে সম্ভাবনা কখনই আমি সন্দেহ করিনি, কিন্তু দেখলাম আছে। দেখা গেল, মরিয়া হয়ে উঠলে আমি রাঁধতেও পারি । এবং রাঁধতামও, শেষ পর্যন্ত ; যদি না মাঝখানে ঐ আছাড়টা আমাকে খেতে হােতো। বিনির অন্তর্ধানের পরদিন সকালে বিছানা থেকে উঠেই চমৎকার করে এক কাপ চা বানিয়েছি। একজোড়া ডিম সেদ্ধ করতেও দ্বিধা করিনি। অবশেষে সড়িম্ব সেই চায়ের পাত্র বিছানায় নিয়ে এসে আরাম করে খেয়ে আবার এক ঘুম লাগিয়েছি। হজম করতে হলে ঘুমােননা দরকার। উত্তম- রূপে পরিপাকের জন্য উত্তমরূপ নিদ্রার প্রয়ােজন। আর আমার মতে, ঘুমােনাের জন্যেই আমাদের খাওয়া। খালিপেটে থাকলে খিদে পায়, আর খিদে পেলে ঘুম পায়না বলেই নেহাৎ কষ্ট করে আমাদের দুবেলা কি তিনবেলা কিম্বা চারবেলা খেতে হয়। তাই না ? তারপর এগারােটার পর ঘুম থেকে উঠে পাকপ্রণালীটা হাতে করেছি। ষ্টোভটা পায়ের কাছেই রয়েছে-ধরাতে যা দেরি। পাকপ্রণালীটার পাতা ওল্টাচ্ছি, আজ আর বেশি শিব্রাম চকবরতির মতো

কিছু না, বিশেষ কিছু নয়, সবচেয়ে সােজা রান্না একখানা বেধে
সােজা-সুজি খেয়ে সহজভাবে শুয়ে পড়ব। তারপর ওবেলা
রেস্তরাঁ। দেখলেই হবে। তারপর-কালকের কথা আবার
কাল। এই করে এই দশ বারাটা দিন তাে তুড়ি দিয়ে
উড়িয়ে দিতে পারব। বিনিকে আমি দেখিয়ে দিতে চাই।
চাই কি, নিজেকেও একহাত দেখাতে পারি—চটেমটে হয়ত
পােলাও কালিয়াও রেধে ফেলতে পারি—এর মধ্যেই একদিন
কিছু আশ্চৰ্য্য নয়।
পেঁয়াজের সুপ, রান্নার সহজ প্রণালীটাই সবচেয়ে আমার
লাগসই লাগল। পেঁয়াজের সুপ সাহেবি রেস্তরায় বহুৎ
খেয়েছি—চমৎকার লাগে। তাই না হয় বানিয়ে খাওয়া যাক
আজকে। খেতেও ভালো, রাঁধতেও শক্ত না-যেমন পুষ্টিকর
তেমনি উপাদেয়।
বইটায় দেখলাম, পেঁয়াজের সুপকে নামমাত্র খরচায় অল্প
পরিশ্রমে প্রস্তুত বিলাসিতার চূড়ান্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
আমি বিলাসিতার পক্ষপাতী নই, তবু বাধ্য হয়ে আজ একটু
বিলাসিতাই করতে হবে, কি করা যাবে? আর এই বিলাসিতা
সমস্তটা একলাই উপভােগ করতে হবে আমায়, উপায় নেই।
আমার রান্নার সৌরভ যে কতদূর যাবে জানিনে, তবু কোন
বন্ধু যে গন্ধ পেয়ে আমার পেঁয়াজের ঝােলে ভাগ বসাতে
আসবেন তা মনে হয় না। সমস্ত সুরুয়াটা এক এক চুমুকে
চেখে চেখে আর তারিয়ে তারিয়ে--একটুও তাড়াতাড়ি না
কথা বলার বিপদ !

করে’—সুরু থেকে শেষ পর্যন্ত—সুরুৎ সুরুৎ আওয়াজে একাই
আমি আত্মসাৎ করতে পাবাে। কেউ বাগড়া দেবার বখরা
নেবার নেই। আহ।
পাকপ্রণালীর নিয়মাবলী অনুসরণে লাগা গেল। ষ্টোভটা
ধরিয়েছি এবং বিছানা থেকে বেশ দূরে সরিয়ে এনেছি--পাছে
বিছানাটিছানা ওর অনুকরণে ধরে যায়। আগুনরা ভারী
সংক্রামক। সাবধানতা ভালাে।
“প্যানে আন্দাজমতে জল দাও”-বলেছে পাক প্রণালী।
আন্দাজমতে জল দিলাম—যতদূর আন্দাজ করতে পারা
গেল।
“জল ফুটতে থাকুক।” থাকুক আমার কোন আপত্তি নেই।
“আধসেরটাক পেঁয়াজ কুঁচিয়ে ফ্যালো। একেবারে
কুচি কুচি করে।”
তথাস্তু। কিন্তু এইটেই এর মধ্যে সবচেয়ে শ্রমসাপেক্ষ
দেখা যাচ্ছে। এবং একটু বিপজ্জনকও বই কি। পেঁয়াজের
সঙ্গে নিজের কড়ে আঙুলটাও প্রায় কুঁচিয়ে ফেলেছিলাম একটু
হলে : আর পেঁয়াজ কুঁচাতে বসলে, কেন জানিনা, ভারী কান্না
পায়। আজই প্রথম এটা দেখতে পাচ্ছি--এমনকি, চোখের
জলে ভালাে দেখতেই পাচ্ছিনে। কোথ থেকে চোখে এত
জল আসে আর এমন চোখ জ্বালা করে ! যারা মারা গেছেন,
মারা, দিদিমারা,—দিদিমার মা আর মার দিদিমারা সব একে
একে স্মরণ পথে আসতে থাকেন। ভারী কান্না পায়, আরাে
১০০
শিব্রাম চকবরতির মতাে

দিই।
চোখ জ্বলে, এবং আরো কান্না হাউ হাউ করে’ ঠেলে আসে
সেই শশাকের উজান ঠেলে অবশেষে দিদিমার দিদিমারা পৰ্যন্ত
ভেসে আসেন। কান্না আর থামে না। গাল বেয়ে, গলা
জড়িয়ে দরবিগলিত ধারে বুক ভাসিয়ে দেয় । কান্নার
আবেগে আরাে কঁদি। অকারণে কাদি। অপ্লুত হয়ে
পেঁয়াজ কুচি করি।
হাপুস্ হয়ে কেঁদে নেয়ে পেঁয়াজ কুঁচিয়ে উঠি। উঠে চোখ
মুছে প্যানের ফুটন্ত জলে সেই কুঁচানাে পেঁয়াজদের জলাঞ্জলি
দিয়ে আবার চোখ মুছি। এমন কি, ওই পেঁয়াজদের
দশা ভেবে—ওদের জন্যও চোখে জল আসে আবার। কঁদতে
কাদতে বইয়ের পাতা ওল্টাই।
এইবার কয়েকটা গােল আলু ওর মধ্যে ছুড়ে দাও।
গােল আলুগুলাে খােসা-ছাড়ানাে হওয়া দরকার।” -বইয়ে
বাৎলায় ।
সারা ভাঁড়ার ঘর আঁতি পাতি করে খুজি, কিন্তু খােসা
ছাড়ানাে গােল আলু একটাও আমার চোখে পড়ে না। প্রত্যেক
আলুর গায়েই খােস। লাগানন । অথচ বইয়ে লিখেছে, খােস
ছাড়ানাে আলুই চাই। তা না হলে--অন্য আলু দিয়ে হবে
। কী মুস্কিল দ্যাখাে দিকি ? কী যে করি এখন!
সুশীলাদির বাড়ী ছুটতে হয়। সুশীলাদি আমার রান্না
বান্নায় ওস্তাদ। আলুপটলদের নাড়ীনক্ষত্র ওঁর নখাগ্রে--
ওদের স্বভাব চরিত্রের সব রহস্য ওঁর জানা।
L
কথা বলার বিপদ!

“দিদি, আমাকে গােটাকতক খােসা ছাড়ানাে আলু দিতে পারাে ? ভারী দরকার। অথচ বাজারে কি কোথথাও পাওয়া যাচ্ছে না।” বতেই সুশীলাদি হাসতে হাসতে তাঁর রান্নাঘর থেকে ঐ আলু আধ ডজন আমার হাতে তুলে দ্যা। আমিও আর দ্বিরুক্তি না করে দৌড়াতে দৌড়তে ফিরে আসি। এসে, দেখি সারা প্যান্ দিব্যি আনন্দে টগবগ করছে ! গন্ধ ভু এবার আলুগুলাে ওর ভেতরে ছুড়ে দাও।” ছুঁড়ে দেবার চেষ্টা করি—কিন্তু একটার পর একটা, চারটেই তা ফসকে গেল দেখে—বাকী দুটোকে আর ছুড়ে দিয়ে, এগিয়ে গিয়ে, প্যানের ভেতরে ছেড়ে দিই। পাক- প্রণালীর উপদেশের অন্যথা করা হােলো, অন্যায় হােলাে বুঝলাম। কিন্তু কি করব, পাকা রাঁধুনির মত হাতের তা যদি আমার না থাকে, ( থাকা স্বাভাবিকও নয়, ) তাহলে কি করা যায় ? সবাই কি দূর থেকে তা মাফিক ছুড়তে পারে ? “এইবার অল্প করে গােলমরিচের গুড়াে ছিটিয়ে দাও।” অল্প করে’ গােলমরিচের গুড়াে কখনাে ছিটিয়েচ ? ছিটিয়ে দেখেচ কী হয় ? রান্নার কী হয় তা বচিনে, রাঁধুনির কী হয়, তাই আমার বক্তব্য। এক কথায়—হাঁচি হয়, দুর্দান্ত রকমের হাঁচি। মশলার কৌটো ছিটকে যায় কোথায় যায় শিব্রাম চকবাতির মতো

অক্ষরে
জানা যায় না-খুনৃতি উড়তে থাকে—আত্মসম্বরণ করা কঠিন
হয়ে পড়ে।
হাঁচির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে কোনােরকমে সামলে
প্রায় তিনশাে হাঁচি হাঁটার পর চোখ খুলতে পেরেচি-চেয়ে
দেখি, পেঁয়াজের কারি প্যানের গলা ছাড়িয়ে উঠছে। আধ
প্যানের বেশি জল দিইনি, অথচ তাই যে, এতক্ষণ ফুটেও কি
করে’ এক প্যান্ হয়ে উঠল-প্যাটা নেহাৎ ছােট ছিল নাতাে
-তাই দেখে আমার তাক্ লাগে। আর সেই কারির টগবগানি
কি ! কী তার লম্ফ ঝম্ফ । বইয়ের কথা তো
অক্ষরে পালন করেছি, তব কোথায় যে কী গলদ ঘটল আমি
বুঝি না।
দেখতে দেখতে সেই সুপ, প্যান্ ছাপিয়ে ষ্টোভ, ছেয়ে
গেল। ষ্টোভ, ছেয়ে উপচে পড়তে লাগল। আর অত
উপচেও প্যাভর্তি কারির কিছু কমতি দেখা গেল না।
আশ্চৰ্য্য কারিকুরি ! এবং এর ওপরে ফেঁাস্ ফোসানিও তার
যেন বেড়ে গেল আরাে আরো বেশি লাফাতে শুরু করে
দিল আবার। আমাকে দেখেই কিনা কে জানে ?
অবশেষে সেই সুপআগ্নেয়গিরির লাভাপ্রবাহের মত
ছড়িয়ে পড়তে লাগল ইতস্ততঃ।
যেতে পারে। তীরবেগে ছুটে এসে আমার পায়ে ছাৎ করে
লাগতেই আমি এক লাফ মেরেছি। আর তার পরেই পিছন
ফিরে দে-ছুট ।
স্ততঃর মধ্যে আমাকে ধরা
কথা বলার বিপদ।

কিন্তু ছুটু দিলে কি হবে, একশ গজের দৌড়ে কোনাে
দিনই আমি পুরস্কার পাই নি। সুপের সঙ্গে দৌড়েও আজ
হেরে গেলাম। সুপ আমার আগে আগে যাচ্ছিল তার গায়ে
পা লেগে পেল্লায় এক আছাড় খেয়েছি। আর সেই এক
আছাড়েই বিছানায় এসে আমি ধরাশায়ী। আমার ঘরের
ওধার থেকে এধার পর্যন্ত-পেঁয়াজের কারি থই থই করছে-
কোথাও পা ফেলার যাে নেই—কিন্তু ভয় নেই আর--আমি
এখন বিছানার ওপরে—যতই লাফাক্‌, য়্যাতােদূর ওরা লাফিয়ে
উঠতে পারবে না নিশ্চয়।
সুপের থেকে ভীত নেত্র সরিয়ে বইয়ের পাতায় রাখতেই
চোখে পড়ল, সব শেষে লেখা আছে, “এইবার বারাে জনের
উপযুক্ত চমৎকার পেঁয়াজের সুপ বানানো হােলা।”
ও সং?
সেবাসহ বিভাগ
ন
উদয়নারায়ণপুর,
হাও

নারায়ণপুর, হাওড়া
তরুণ স
* এতে
শক্তিসেবা শাহিত্য বিভাগ
M
-
পহার পটভ,

মিঠে হয়ে
টেলিফোটা ঝনঝনিয়ে উঠল পাশের ঘরে। সবে মাত্র
ভাের তখন,—বিছানা ছেড়ে উঠতে তখনাে আমার বেশ
খানিক দেরি। তার ওপরে কাল রাত্রে এক
নেমন্তন্নে
বেজায় খাওয়াদাওয়া হয়েছিল, বেশিই একটু, তখন তার
রেশ কাটেনি। সেই অসভ্য সময়ে টেলিফোনের ডাকে
লেপের মায়া কাটিয়ে উঠতে হােলাে ।
“হ্যালাে!” কণ্ঠস্বরটা একটু কড়াই হয়ে গেল বুঝি।
“তা-লাে” নরহরির গলা কানে এলাে।
আর মােলায়েম হয়ে।
নরহরি উঠেচে এত সকালে ! তাজ্জব, ? কাল রাত্রে
নেমন্তন্ন-বাড়ী এত বেশী ও খেয়েছিল যে নড়াচড়ার শক্তি ছিল
ওর। নড়ানাে চড়ানােও শক্ত ছিল ওকে। পাতা থেকে
তােল্লাতুল্লি করে ওকে রিয় ওঠানাে হয়েছিল এবং রিক্স
থেকে এক রকম ধরে বেঁধে, যেমন করে ক্রেন দিয়ে মাল
তােলে তেমনি করে ওর বাড়ীতে ওকে তুলতে হয়েছে।
“ওহে শােনাে !” বল্লে নরহরি : “এক বন্ধুকে আমি
পাঠাচ্ছিলাম তাের কাছে-তােমার সঙ্গে প্রাতরাশ
করতে।”
“কার বন্ধু ?” ঘুমের জড়তা ভালাে করে তখন আমার
কাটে নি।
“আমার আবার কার ? হরেকৃষ্ণ পতিতুণ্ডি, মােকাম
জব্বলপুর। আজ সকালের গাড়ীতে পশ্চিম থেকে তাঁর
শিৰাম চৰাতির মতাে

নেই।
চাই।
পেঁছিবার কথা। এই এসে পড়লেন বলে। আমাকে তাে
ভাই বিশেষ জরুরি কাজে একটু বর্ধমানে যেতে হচ্ছে-
এক্ষুণিই—কখন্ ফিরব—এম কি কবে ফিরব তার স্থিরতা
তােমার ওপরেই তার দেখাশােনার ভার দিয়ে যেতে
তােমার মত বন্ধু আমার আর কে আছে বলে ?”
“দাড়াও দাড়াও : আমাকেও যে--” আমারাে যে গন্তব্য
স্থল ছিল একটা, সুদূরতরই ছিল আরাে, কিন্তু চট্ করে সেটা
আর মনে আসতে চায় না। আর সেই ফঁাকে নরহরি বাধা
দিয়ে বলে ওঠে : “জিওমেটি পড়ে ত ? মনে আছে
নিশ্চয় ? এ ফ্রেণ্ড, হু ইজ এ ফ্রেণ্ড টুআদার ফ্রেণ্ড, আর অল্
ইকোয়ল টু ওয়ান অ্যানাদার । অ্যাংগল ট্যাংগ দিয়ে
ওই রকম কী একটা বলে না জিওমেটিতে? সে হিসেবে
হয়েকেষ্টকে তােমার আপন বন্ধু বলেও গণ্য করতে পারাে।
আমার আপত্তি নেই।”
কিন্তু আমার আপত্তি ছিল। কিন্তু সে কথা ভাষায়
প্রকাশ করার আগেই নরহরি চেঁচাতে থাকে “ভালাে কথা,
তােমাকে জানানাে দরকার। আমার বন্ধুটি হচ্ছেন পাক্কা
নিরামিষাশী-এক নম্বরের গোঁড়া যাকে বলে। তার পাতের
গােড়ায় আমিষ কোনাে দ্ৰব্য দেয়া দূরে থাক—মাছ মাংসের
কথাই তাঁর কাছে তুলে না । ভয়ঙ্কর প্রাণে আঘাত পাবেন
তাহলে। আর হ্যাঁ, দেখা শােনার ভারই কেবল নয়,
দেখানাের শােনানাের ভারও থাকলে তােমার ওপর।
কথা বলায় বিপদ ।

কিনা!
কলকাতার যা কিছু দ্রষ্টব্য আর জ্ঞাতব্য আছে-যে ক’দিন
তােমার ওখানে থাকেন, থাক্‌তে চান্ স্বেচ্ছায়, সেই সব
দেখিয়ে শুনিয়ে এখানে ওখানে ভরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে বেড়াতে
দ্বিধা কোরাে না। আচ্ছা, আসি। ট্রেন ধরার সময় হয়ে এল
আমার। তাঁর ট্রেন আর আমার ট্রেন এক সঙ্গেই ধরতে হবে
হাওড়ার প্ল্যাটফর্ম থেকেই তাকে তােমার ঠিকানায়
রিডিরেক্ট করে দিয়ে তবে আমার বর্ধমানের গাড়ী ধরা।
আচ্ছা আসি। কিছু মনে কোরাে না ভাই।”
মনে কত কিছুই না করি, না করে পারি না। মনের
কোনাে দোষ নেই, বন্ধুর মন হলেও মানুষের মন তো ! সামনে
পেলে নরহরিকে চিবিয়ে খাবার ইচ্ছাও মনে হয়। আগের
রাত্রের ওই ভূরিভােজনের পর কারাে বন্ধুর সঙ্গে অত সকালে
প্রাতরাশ করতে আদৌ আমার মেজাজ ছিল না, কিন্তু
নরহরিকে পাল্টা টেলিফোন্ করতে গিয়ে আর তার পাত্তা
অগত্যা, চট্‌পট্‌ হাতমুখ ধুয়ে, প্রাতঃকৃত্য সেরে,
কাপড় চোপড় বদলে তৈরী হয়ে পড়তে হােলাে। হরেকেষ্ট
বাবু কখন এসে পড়েন বলা যায়না; হয়তাে সূর্যের আগেই
তার উদয় হবে পশ্চিম দিক থেকে।
এবং কেবল প্রাতরাশই নয়। সারাদিন ধরেই কলকাতার
চারধারে তাঁর সঙ্গে রাসলীলা করে বেড়াতে হবে। আর
ট্রামে বাসেও আজকাল যা রাশ, তা কহতব্য নয়। পদব্রজে
ব্রজলীলা করতে হলেই আমার হয়েছে।
নেই।
Sob
শিৰাম চকবরতির মতো

বিষাক্ত মনে এই সব ভাবছি এমন সময় সদর দরজার
কড়া-আওয়াজ কানে এল। দৌড়ে গিয়ে কপাট খুলতেই
নরহরির বন্ধু ভজহরি—আই মীন-হয়রকেষ্টকে দ্বারদেশে
দণ্ডায়মান দেখলাম। জাব্বাজোব্বা আটা,জব্বলপুরের আন্দানি
দেখলেই বােঝা যায় ।
“আপনি ?.. ও আপনিই।” ভদ্রলােকের গদ্গদ কণ্ঠ :
“কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব জানিনা। আপনি
আমার রক্ষণাবেক্ষণের ভার নিয়ে যে কী বিপদ থেকে আমায়
বাচিয়েছেন কী বব ! নটা কী এক তাড়ায় কোথায় যেন
চলে গেল কবে ফিরবে কে জানে।”
“যাক্ গে, যেতে দি। আপনি আমাকেই আপনার নরুর
তুল্য বিবেচনা করবেন । নরু আদৌ না ফিরলেও আমার
কোনাে দুঃখ নেই। বরং আর সে না ফিরুক। আপদ গেলেই
বচি :...তবে আপনাকে দেখে আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে,
দয়া করে পায়ের ধূলাে দিয়ে ভেতরে আসুন,
আপনার প্রাতরাশ প্রস্তুত। একটু জলযােগ করে নি
আগে। আপনি চা খান্ তাে চা না কফি না কোকো?
কী ?”
“স্রেফ, দুধ।” বলতে গিয়ে ভদ্রলােককে যেন একটু
দ্বিধান্বিত দেখা গেল । ‘‘মানে প্রাতরাশের কথাই বছি।
নইলে অন্য অন্য সময়ে অন্যান্য জিনিষ খাই।” টোক গিলে
তিনি বল্লেন।
কী বলব :
১০
কথা বলার বিপদ!

“আজ্ঞে, আমিও তাই। দুধের দ্বারাই আমার প্রাতঃ-
কালীন জলযােগ। দুধের মতাে জিনিষ আছে ? মানে, জলীয়
জিনিষ।”
চাকরকে ডেকে বলে দিলাম—পােচ, নয়, ওমলেট নয়,
মাছ ভাজা নয়,-শুদ্ধ দু গ্লাস দুধ-চা ফা কিছু না। টো?
টোস্ট কি আমিষ বস্তুর মধ্যে ধৰ্ত্তব্য ? কে জানে, কাজ নেই ?
সন্দেহবশে টোসও বাদ দেওয়া গেল। অকারণে কারাে প্রাণে
আঘাত দিতে আমার ভালো লাগে না।
দুধের গ্লাস নিঃশেষ করে হরেকেষ্টবাবু বিচ্ছিরি এক ভেঁকুর
তুললেন। এক নিশ্বাসে যেমন কেঁৎ কেঁাৎ করে সবটা
গিলে ফেল্লেন দেখলে অবাক হতে হয় । কেবল নিরামিষাশী
বল্লে একে কম করে বলা হয়, কিছুই বলা হয় না,আসলে
ইনি ঘাের নিরামিষাসক্ত।
কিন্তু আমি তাে আর অতটা শক্ত নই, অমন শক্তি রাখিনে,
কাজেই, পাঁচন যেমন করে গেলে মানুষ, তেমনি করে একটু
একটু করে এক আধ টোক্ গিলছি, এত কায়ক্লেশে যে কী
বলব।
“আপনি সত্যিই একজন নিরামিষের ভক্ত বটে, স্বচক্ষেই
তাে দেখতে পাচ্ছি। এযুগে এরকমটি দেখতে পাব, কোথাও
যে এ জাতীয় কেউ এখনাে কেউ টিকে আছে তা আমার আশা
ছিল না। কিন্তু না-দেখলে আনন্দ হয় ?
যেমন করে’
রসিয়ে রসিয়ে অমৃতের মত এক এক চুমুক মারছেননাঃ,
১১০
শিৰাম চকবরতির মতো

সত্যি, আপনি দুগ্ধরসিক বটে!” হরেকেষ্টবাবু বিগলিত হয়ে
বলেন।
উচ্চ প্রশংসালাভ করে’ দুধে বিতৃষ্ণা আমার আরাে যেন
বেড়ে গেল। পেটের ভেতরে কাকের রাতের মাংসেরা “ব্য
ব্যা--অর-কোকোর কেঁ। ?” নিজের নিজের জাতীয়
ভাষায় আলাপ লাগিয়ে দিয়েছে মনে হলাে। আমি গেলাস
নামিয়ে রাখলাম।
“দুধ খায় বাছুরে।” আরেকটা বিচ্ছিরি ভেঁকুর তুলে মুখ
বিকৃত করলেন হরেকেষ্টবাবু ।
‘য়া ?” আমার চমক লাগল হঠাৎ।
“না, না। আমি আপনাকে মীন্ করিনি। আপনার
প্রতি কটাক্ষ করে কিছু বলছিনে।” তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন
তিনি। “আসলে গােরুর দুধ তার নিজের বাছুরের জন্যেই
সৃষ্টি তত? তাই নয় কি? সেই কথাই আমি বলছিলাম।”
‘তা যা বলেন । আপনার আসার আগেই আমার
আরেক গ্লাস হয়ে গেছে কিনা, পেটে আর জায়গা নেই।”
এই বলে’ বাকী দুধের দিকে আমি আর দৃকপাত করিনে,
গেলাস ছুইনে আর।
“আহা খেলেন না ! যতটুকু দুধ ততটুকুই রক্ত যে?” তার
আক্ষেপ হতে থাকে।
“রক্ত জলকরা। কলকাতার দুধ কিনা।” আমি বলি ।
“রক্ত একেবারে জলবৎ-না খেলেও তেমন ক্ষতি নেই।”
কথা বলার বপদ!

দুগ্ধগ্রাস থেকে মুক্তিলাভ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
কলকাতার রাস্তায় ইতােনঃস্ততােভ্রষ্ট হয়ে বেড়াতে লাগলাম ।
পথে-বিপথে চার দিকেই কতত
কতাে রেস্তরাঁ। কাফে আর
কেবি—কিন্তু সবখানেই তাে মৎস্য-মাংসঘটিত ব্যাপার।
কোথাও পা দেবার যাে নেই। তার ওপরে নিরামিষ আহারের
উপকারিতার বিষয়ে হরেকৃষ্ণবাবুর বক্তৃতা শুনতে শুনতে
চলেছি।
অগত্যা তার সহানুভূতি আকর্ষণ করতে আমিষ-আহারের
বিষময় ফল নিয়ে আমিও কিছুকিছু বল্লাম।
বল্লাম। আমিষ হজম
করতে যে পরিমাণ শক্তি যায় ঐ খাদ্য হতে সে পরিমাণ শক্তি
আসে না, তার ফলেই আমিষাশীরা অল্প দিনে মারা পড়েন ।
এক কথায় আমিষ খাওয়া আর খাবি খাওয়া এক। (অবিশ্যি,
নিরামিষাশীরা বহুকাল বেঁচে থাকেন, কিন্তু মাছ মাংস ছেড়ে
দিয়ে কিসের আশাতেই বা তঁারা বাঁচেন ? কোন্ সুখেই বা,
আমি তাই ভাবি !)
কিন্তু মুস্কিল হােলো খাওয়া নিয়ে। কী যে তাকে
খাওয়ানাে যায় আর কোথায় বা খাওয়াবাে : সত্যি, কোথায়
যে খাওয়া দাওয়া করি । মৎস্য-মাংসবিবর্জিত একটাও
পাকস্থলী তাে ( না কি, পাকস্থল ?) কলকাতায় নেই---অন্ততঃ
জানাশােনার মধ্যে নেই। কোথায় আমাদের নিয়ে যাই ?
অবশেষে, ভেবে দেখলাম ফলমূলই প্রশস্ত। মূল কোথায়
মেলে জানিনা, মুলাের বাজারেই হয়তো বা, কিন্তু ফল
শিৰাম্ চকরবরতির মত।

ততা সর্বত্র। প্রায় সব রাস্তার মোড়েই ফিরিওয়ালার হেফাজতে ছড়ানাে রয়েছে ফল। ছড়ানাে এবং ছাড়ানো । বাতাবি , নেবু, কমলা, কলা আর পেঁপে। আনারসেরও অভাব নেই ! পয়সা ফেল্লেই পাওয়া যায়। তাই খাওয়া যেতে লাগল। হযখন তখন—দুজনে মিলে। সারা দুপুরটা এইভাবে ফলবান হয়ে—লক্ষ্মণ আর গাছ- পালার মত বারম্বার ফল ধরতে বাধ্য হয়ে বিকেলের দিকে হরেকেষ্টকে একটু যেন ব্যাজার দেখা গেল। ‘ফল পায় বাদরে এই ধরণের একটা মন্তব্যও যেন ফসূকে এল তার মুখ থেকে। অবিশ্যি, সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুদ্ধিপত্রে প্রকাশ করে দিলেন—আমাদের নিজেদের প্রতি কোনো অবজ্ঞা তিনি দেখাচ্ছেন না। আসলে, ফল তাে গাছেই ফলে, আর বাঁদরদেরও গাছেই বসবাস তে—কাজেই প্রথম ফলাওয়ের মুখে তাদের বরাতেই ফললাভ ঘটে থাকে। আমি বলুম । মা ফলেষু কদাচন। : “মা ফলেষু কদাচন। তাহলে আব ফার করে’ কাজ নেই। খুব হয়েছে।” মনে মনেই বল্লুম যদিও। এখন বৈকালিক জলযােগ কি করা যায় ? এক পাঞ্জাবী দোকানে গিয়ে দু গ্লাস—বেশ বড় বড় দুগ্লাস—লস্যি নেওয়া গেল। সেই ঘােল না খেয়ে হরেকেষ্টবাবু ঘা হয়ে পড়লেন অনেকক্ষণ পরে দম নিয়ে তিনি বল্লেন : “ঘােল খায় যতাে বােকায়।” বলে তিনি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেন। “কেন, খেতে কি তালাে না? আমার তাে খাসা লাগলাে।” কথা বলার বিপদ!

“খাসা বইকি! খুবই চমৎকার ! খেয়ে খুব তৃপ্তি পেয়েছি,
বলাই বাহুল্য। আমাদের আমি বােকা বছি তা ভাববেন না।
বােকারা ঘােল খায় বলে একটা কথা ছিল না? কথাটার
মানে কী, তাই আমি ভাবছিলাম।”
দুধের যত প্রকার অপভ্রংশ হতে পারে তার মধ্যে ঘােলটাই
যে একমাত্র নয়—তা ছাড়া ছাতার বাঁটও আছে--তবে
ঘােলটাই সবচেয়ে অম্লমধুর আর বেশ সুস্বাদুও—বৈজ্ঞানিকের
মতাে আমি তাঁকে বােঝাবার চেষ্টা করি। দুধের ছানা-অংশ
থেকে ছাতার বাঁঢ় হয়ে থাকে একথা শুনে হরেকেষ্টবাবু তাে
হা হয়ে গেলেন। বল্লেন, “ছাতার বাঁট কিন্তু তেমন সুস্বাদু
নয়। আমি শিশুকালে খেয়েছি মশাই, এখনাে আমার মনে
আছে।”
“অবশ্যি, ঘােল যেমন পেটে লাগে ছাতার বাঁট তেমন নয়।
ওকে বরং পিঠে লাগানো যায়।” আমি অনুযােগ করি।
এবং পরবর্তী সুযােগে নরহরি আর ছাতার বাঁটকে দ্বন্দ্বসমাসে
নিয়ে আসা যায় কিনা মনে মনে ভাবি।
সমস্ত দর্শন-প্রদর্শন সমাধা করতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। ক্লান্ত
হয়ে পড়লাম আমি। হরেকেষ্ট বল্লেন আর একটা জায়গা
দেখলেই তাঁর হয়ে যায়। গুলুওস্তাগরের গলির যে বাড়ীর
একতলায় তিনি জন্মেছিলেন সেইখানটা।
তার সেই সাধটাই বা না মেটে কেন? ঠিকানা বাৎলে
সেই জন্মস্থানে তাঁকে নিয়ে গেলাম। খুব বেশি খোঁজাখুঁজি
১১৪
শিব্রাম চকবয়তির মতাে

; করতে হােলোনা। কিন্তু জায়গাটা দেখে হরেকেষ্টবাবু অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। সেই একতলাটা এখন একটা চপ, কাটলেটেব দোকানে পণিত হয়েছে দেখা গেল। “ভেতরে গিয়ে দেখবার ইচ্ছা ছিল একবার ; কিন্তু কি দুঃখের বিষয়—” ভগ্নকণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করলেন । “আসুন না, যাওয়া যাক। দেখতে দোষ কি ? না খেলেই হােলাে।” ভেতরে গেলাম আমরা এবং একটা টেবিল নিয়ে বল্লাম- ঠিক যেখানটিতে হরকেষ্টবাবু স্বর্গচ্যুত হয়ে ইহলােকে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন সেইখানে। দুটো লেমােনড নিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করা গেল। কেবল চপ কাটলেটই নয়, সব কিছুই ছিল হােটেলটায়। মাংসের কারি, কোর্মা, রােষ্ট, কাবাব, দোপেঁয়াজী, পােলাও পর্যন্ত। আর এমন খাসা গন্ধ ছেড়েছিল। সেই গন্ধে তাে আমার জিভে জল এসে গেল। আর হরেকেষ্টবাবুর (সেই গন্ধেই কিনা বলতে পারি না) চোখ লাগল চক্ চক্ করতে। কেন যে মানুষ এই সব ছাইপাশ খায়—এই যতাে চপ, কাটলেট খেয়ে কী সুখ পায় জানিনে ?” বল্লেন হয়েকেষ্ট । “কি রকম খেতে কে জানে!” একটা নিয়ে চেখে দেখা যাক না কেন ?” আমি বলি। বাস্তবিক, অভিজ্ঞতা-অর্জনে দোষ কি? সব রকমেরই কথা বলার বিপদ ।

অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়—আসক্ত হয়ে না পড়লেই
হােলাে। সেকথাও আমি বলি ।
“আচ্ছা বেশ, অভিজ্ঞতালাভের জন্য সামান্য কিছু খেয়ে
দেখা যাক্ নাহয়। একটা চপ, আর একটা কাটলেট—কি
বলেন ?” নিরাজি হলেন হরেকেষ্ট।
“নিশ্চয় নিশ্চয়। আরাে গােটা দুই বেশি করে নেয়া
যাক—আমিই বা কেন অভিজ্ঞতায় বঞ্চিত হই ?” আমি সায়
দিয়ে বল্লাম।
চপ কাটলে এসে পড়ল। হরেকেষ্ট বল্লেন - ও জিনিষ
আর হাত দিয়ে ছুতে চাইনে। ছুরি কাটা আছে ?” ছুরি
কাটাও এসে গেল। দুপ্রস্থই এল। দুজনেই আমরা অভিজ্ঞ
হতে লাগলাম।
ওঁর ছুরি-কাটা-চালানাের কায়দা দেখে তাে আমার তা
লেগে গেল। অবশেষে না বলে আর পারলাম না “কিছু
মনে করবেন না হরেকেষ্টবাবু, নরহরির কথায় কিন্তু আমার
সন্দেহ হচ্ছে। ঘােতর সন্দিহ। সে আমাকে বল্ল যে
আপনি নাকি মাছ মাংস স্পর্শও করেন না, কিন্তু ছুরি কাটায়
আপনাকে যেরকম ওস্তাদ দেখছি
নরহরি বল্ল ?” হরেকেষ্টবাবু বাধা দিয়ে বল্লেন সবিস্ময়ে
“নরহরি বল্ল এই কথা? আমি মাছ মাংস ছুইনে বল্ল সে?
বরং মাছ মাংস ছাড়া আর কিছুই আমি ছুইনে। আপনিই
নাকি নিরামিষের ভীষণ ভক্ত নরহরি আমায় বলেছে। আর
শিৰাম চকবরতির মতাে

বলেছে যে মাছ মাংসের কথা কানে তুলতেও প্রাণে আপনি
ব্যথা পান। কি তবে সত্যি নয়-য়া ?”
আর য়া। তারপরে দুজনে মিলে নবহরির যা একখানা
শ্রাদ্ধ করা গেল! প্রাণ খুলেই করলাম। শ্রাদ্ধশান্তি সেরে
তখন একধার থেকে চপ কাটলেট, বােসট, কারি, কাবাব,
কোম্মা, দোপেঁয়াজি, মাছের পােলাও, মাংসের পােলাও যা
কিছু ছিল সেই হােটেলে, সব সেই টেবিলে এসে জড়াে হােলদা।
শ্রাদ্ধের পরে নিয়মভঙ্গে লাগা গেল প্রাণপণে ।
এবং তারপরে ? খাওয়া দাওয়া শেষ হলে নকর বন্ধু
হককেও তােল্লাতুল্লি করে’ বিসয় টেনে তুলতে হলাে। ঠিক
আগের রাতের নরহরিব মতই।
আমাকেই টানাটানি করতে হােলাে—আমার অদৃষ্ট।
গুরু ভােজনের পরে গুরুতর পরিশ্রম আমার পােষায় না-
কিন্তু কবব কি ? পতিতুণ্ডি মশাইকে তো গুলু ওস্তাগরের
হােটেলে ফেলে আসা যায় না অধঃপতিত অবস্থায় ? নরহরি,
যে আমার বন্ধু আর ইনি, যিনি নরহরির বন্ধু—ফলতঃ, উনি
আর আমি এবং আমরা সবাই পরস্পর সমান এবং বন্ধুবৎ নই
জিওমেটি তে কী বলে ? ?
!
কি ?
কথা বলার বিপদ!

No text on this page.

08@ดลงรู

অ্যাম্বুলেন্স চাপা পড়ার মত বরাত বুঝি আর হয় না। মােটর
চাপা পড়া গেল অথচ অ্যাম্বুলেন্স আসার জন্য তর সইতে
হােলাে না—যাতে চাপা পড়লাম তাতেই চেপে হাসপাতালে
চলে গেলাম। এর চেয়ে মজা কি আছে ?
ভাগ্যের যােগাযােগ বুঝি একেই বলে। অবিশ্যি, কচিৎ
এরূপ ঘটে থাকে—সকলের বরাত তত আর সমান হয় না।
অবিশ্যি এর চেয়েও অ্যাম্বুলেন্স চাপা পড়ার চেয়েও, আরাে
বড়ো সৌভাগ্য জীবনে আছে । তা হচ্চে রেডিয়ােয় গল্প
পড়তে পাওয়া।
দুর্ভাগ্যের মত সৌভাগ্যরাও কখনাে একলা আসে না।
যখন আসে, এপিডেমিকের মতই আসে । রেডিয়াের গল্প
আর অ্যাম্বুলেন্স, চাপা—এই দুটো পড়াই একযােগে আমার
জীবনে এসেছিল। সেই কাহিনীই বলছি।
কোন্ পূণ্যবলে রেডিয়ােয় গল্পপাঠের ভাগ্যলাভ হয় আমি
জানিনে, পারৎপক্ষে তেমন কোনাে পুণ্য আমি করিনি।
অন্ততঃ আমার সজ্ঞানে তাে নয়, তবু হঠাৎ রেডিও অফিসের
এক আমন্ত্রণ পেয়ে চমকাতে হােলাে। আমন্ত্রণ এবং চুক্তিপত্র
একসঙ্গে গাঁথা—দক্ষিণ পর্যন্ত বাঁধা-শুধু আমার সই করে
স্বীকার করে নেওয়ার অপেক্ষা কেবল। এমন কি, রেডিয়াের
কর্তারা আমার পঠিতব্য গল্পের নামটা পৰ্যন্ত ঠিক করে
দিয়েছেন। “সৰ্বমত্যন্ত।” এই নাম দিয়ে, এই
শিরােনামার সঙ্গে খাপ খাইয়ে গল্পটা আমায় লিখতে হবে।
শিত্ৰা চকবুবতির মতো

৩ , আমার একজন লিখিয়ের পক্ষে এ আর
এমন শক্ত কি ? আগে গল্প লিখে পরে নাম বসাই, এ না হয়,
আগেই নাম ফেঁদে তারপরে গল্পটা লিখলাম। ছেলে আগে
ছেলের নাম আগে, ঘােড়া আগে না ঘােড়ার লাগাম আগে,
কারো কারাে কাছে সেটা সমস্যারূপে দেখা দিলেও একজন
লেখকের কাছে সেটা কোনো প্রশ্নই নয়। লাগামটাই যদি
আগে পাওয়া গেল, তার সঙ্গে ধরে বেঁধে একটা ঘােড়াকে
বাগিয়ে আনতে আর কতক্ষণ?
প্রথমেই মনে হােলো, সব আগে সৌভাগ্যে কথাটা শত্রু
মিত্রনিৰ্বিশেষে সবাইকে জানিয়ে ঈর্ষান্বিত করাটা দরকার।
বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। বন্ধু বান্ধব, চেনা আধচেনা, চিনি-
চিনি সন্দেহজনক যাকেই পথে পেলাম, পাড়ে দাড় করিয়ে
এটা-সেটা একথা সেকথার পর এই রোমাঞ্চকর কথাটা
জানিয়ে দিতে দ্বিধা করলাম । অবশেষে পই পই
করে বলে দিলাম-- “শুনে। কিন্তু ! এই
এই শুক্রবারের
পরের শুক্রবার–সাড়ে পাঁচটায়--শুনে বলবে আমায় কেমন
হােলাে।”
“শুনব বইকি! তুমি গল্প বল্‌বে আর আমরা শুনবাে না,
তাও কি হয় ? রেডিয়ে কেনা তবে আর কেন ?
কি না, রেডিয়ােটা কদিন থেকে আমাদের বিকল হয়ে
রয়েছে-কে যে বিগড়ে দিয়েছে বােঝা যাচ্ছে না ঠিক।
গিন্নির সন্দেহ অবশ্যি আমাকেই—যাক, এর মধ্যে ওটা সারিয়ে
কথা বলার বিপদ!

ফেলব’খন! তুমি গল্প পড়ছ, সেটা শুনতে হবে তাে।”
একজনের আপ্যায়িত-করা জবাব পেলাম।
আরেকজন তাে আমার কথা বিশ্বাসই করতে পারেন না ।
“বলল কি ? আরে, শেষটায় তুমিও! তােমাকেও ওরা
গল্প পড়তে দিলে ? দিনকে দিন কী হচ্ছে কোম্পানীর ।
আর কিছু বােধ হয় পাচ্ছে না ওরা-নইলে শেষে কিনা
তােমাকেও--ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! ! !–অধঃপাতের আর বাকী কি
রইলাে হে ? নাঃ, এইবার দেখবে অল ইণ্ডিয়া রেডিয়ো উঠে
যাবে, আর বিলম্ব নেই।”
বন্ধুবরের মন্তব্য শুনে বেশ দমে গেলাম—তথাপি আম
আমতা করে বল্লাম—“রেডিয়াের আর দোষ কি দাদা?
খােদার দান। খােদা যখন দ্যা ছাপ্পর ফুড়ে দিয়ে থাকেন,
জানাে তাে ? এটাও তেমনি আকাশ ফুড়ে পাওয়া--হঠাৎ
এই আকাশবাণীলাভ।”
“আচ্ছা, শুব’খন। তুমি যখন এত করে’ বলছ। অ্যাস্
পিরিন, স্মেলিং সল্ট—এসব হাতের কাছে রেখেই শুনতে
হবে। তমার গল্প পড়লে তাে-সত্যি বলছি, কিছু মনে
কোরােনা—আমার মাথা ধরে যায়—শুনলে কী ফল হবে কে
জানে?” মুখ বিকৃত করে বন্ধুটি জানিয়ে গেলেন।
তবু আমি নছােড়বান্দা। পথে ঘাটে যাদের পাওয়া গেল
তাদের বাড়ী ধাওয়া করে সুখবরটা দিলাম। কিন্তু কি
আশ্চৰ্য, উক্ত শুক্রবারে সেই মুহূর্তে সকলেই শশব্যস্ত।
১২২
শিব্রাম চকবুবতির মতাে

কারাে ছেলের বিয়ে, কারো মেয়ের পাকা দেখা, কার আবার
কিসের যেন এনগেজমেন্ট, কাউকে খুব জরুরি দরকারে
কলকাতার বাইরে যেতে হচ্ছে। এমনি কত কি কাণ্ডে সেই
দণ্ডে সবাই বিজড়িত-রেডিয়ােয় কর্ণপাত করার কারাে
ফুরসৎ নেই। কী মুস্কিল, দ্যাখাে দেখি। আমি গল্প বলব কেউ
শুনবে না। আমার জানাশােনারা শুনতে পাবে না--এর
চেয়ে দুঃখ আর কী আছে ? আমার গল্পপড়ার দিনটিতেই
যে সবার এত গােলমাল আর জরুরি কাজ এসে জুটবে তা কে
জানত!
আর তাছাড়া, রেডিয়াের সময়টাতেই তারা কেন যে এত
ভেজাল জোটায় আমি তল ভেবে পাই না। পূর্বজন্মের তপস্যার
পূণ্যফলে রেডিয়ােকে যদি ঘরে আনতে পেরেছি-তাই
নিয়েই দিনরাত মশগুল্ থাকত না।—অন্ততঃ প্রােগ্রামের
ঘটায় যে কক্ষনাে কক্ষচ্যুত হতে নেই একথাও কি তােদর
বলে দিতে হবে ? আর সব তালে ঠিক আছিস্ কেবল
রেডিয়াের ব্যাপারেই তােরা আরেডি—সব তােদের
উল্টোপাল্টা !
সত্যি, আমার ভারী রাগ হতে লাগল। অবিশ্যি, ওদের
কেউই আমাকে আশ্বাস দিতে কসুর করল না যে যত
ঝামেলাই থাক, যেমন করে হােক, আমার গল্পটার সময়ে
অন্ততঃ ওরা কান খাড়া রাখবে—যত কাজই থাকন, এটাও তাে
একটা কাজের মধ্যে। বন্ধুর প্রতি কর্তব্য তােত।
এমন কি
কথা বলার বিপদ!
১৩

কলকাতার বহির্গামী সেই বান্ধবটিও ভরসা দিয়ে গেলেন যে
ট্রেন ফেল করার আগের মিনিট পর্যন্ত কোনাে চুল-ছাঁটা
সেলুনের সামনে দাড়িয়ে যতটা পারা যায় আমার গল্পটা শুনে
তবেই তিনি রওনা দেবেন।
সবাইকে ফলাও করে জানিয়ে ফিরে এসে গল্পটা ফলাতে
লাগা গেল। “সৰ্বমত্যন্ত” এর সঙ্গে যুতমতো, মজবুত
একটা কাহিনীকে জুড়ে দেয়াই এখন কাজ।
কিন্তু ক্রমশঃ দেখা গেল কাজটা মােটেই সহজ কাজ নয়।
গল্প তাে কতই লিখেছি, কিন্তু এধরণের গল্প কখনো লিখিনি ।
ছোট্ট একটুখানি বীজ থেকে নাকি বড় বড় মহীরূহ গজিয়ে
ওঠে, লােকে বলে থাকে। আমি নিজের চোখে কখনাে
দেখিনি বটে, তবে লােকের কথায় অবিশ্বাস করতে চাইনে।
তবুও, একথা আমি বলব, যে গাছের বেলা তা হয়ত সত্যি
হলেও একটুখানি বীজের থেকে একটাগল্পকে টেনে বার করে’
আনা দারুণ দুঃসাধ্য ব্যাপার ।
বলব কি ভাই, যতই প্লট ফঁাদি আর যত গল্পই বাঁধি, আর
যত রকম করেই ছকতে যাই, কিছুতেই ওই “সৰ্বমত্যন্ত”-
সঙ্গে খাপ খাওয়ানাে যায় না। একটা গল্প লিখতে গিয়ে
ভাবতে ভাবতে একশটা গল্প এসে গেল, মনের মধ্যে গল্পের
একশা, আর মনের মত তার প্রত্যেকটাই, কিন্তু নামের মত
একটাও না।
১২৪
শিম চকবরতির মতাে

ভাবতে ভাবতে সাত রাত্রি ঘুম নেই, এমন কি, দিনেও
দু চোখে ঘুম আসে না। চোখের কোলে কালি পড়ে গেল
আর মাথার চুল সাদা হতে সুরু করল। অর্ধেক চুল টেনে
টেনে ছিড়ে ফেল্লাম—আর কামড়ে কামড়ে ফাউণ্টেনের
আধখানা পেটে চলে গেল। কত গল্পই এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এল
আর গেল কিন্তু কোনােটাই ওই নামের সঙ্গে খাটল না।
তখন আমি নিজেই খাইলাম—আমাকেই খাটিয়া নিতে
হােলো শেষটায়।
শুয়ে শুয়ে আমার খাতার শুভ্র অঙ্কে—আমার অনাগত
গল্পের অষ্টে-পৃষ্ঠে-ললাটে কত কী যে আঁকলাম ! কাগের
সঙ্গে বগ জুড়ে দিয়ে, বাঘের সাথে কুমীরের কোলাকুলি
বাধিয়ে, হনুমানের সঙ্গে জাম্বুবানকে জর্জরিত করে সে এক
বিচ্ছিরি ব্যাপার ।
সব জড়িয়ে এক ইলাহী কাণ্ড! কী যে ওই সব ছবি--
তার কিচ্ছু বুঝবার যো নেই, অথচ বুঝতে গেলে অনেক কিছুই
বােঝা যায়। গুহা মানুষেরা একদা যে সব ছবি আঁকতাে, এবং
মানুষের মনের গুহায়, মনশ্চক্ষুর অগোচরে এখনাে যে সব ছবি
অনুক্ষণ অঙ্কিত হচ্ছে, সেই সব তন্তরের অন্তরালের ব্যাপার ।
মানুষ পাগল হয়ে গেলে যে সব ছবি আঁকে অথবা যে সব ছবি
আঁকবার পরেই পাগল হয়ে যায় । সৰ্বমত্যন্ত-- ড্যাশ,
—উইদিন ইভার্টেড, কমার শিরােনামার ঠিক নীচে থেকে
শুরু করে’ গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় আমার নাম-স্বাক্ষরের ওপর
কথা বলার বিপদ ।
১৭৫

অবধি কেবল ওই সব ছবি-ওই পাগলকরা ছবি সব ! পাতার
দুধারে মার্জিনেও তার বাদ নেই-~-মার্জনা নেই কোনােখানে।
তােমর হাসছাে? তা হাসতে পারে। কিন্তু ছবিগুলাে
মােটেই হাসবার মতাে নয়—দেখলেই টের পেতে। ওই সব
ছবির গর্ভে যে নিদারুণ আর্ট নিহিত রইলাে, আমার আশা,
সমঝদারের সাহায্যে (রাচির
বাইরেও তারা থাকবেন
নিশ্চয় !) একদিন তার তত্ত্ব উদঘাটিত হবে—হবেই—চিরদিন
কিছু তা ছলনা করে’ নিগূঢ় হয়ে থাকবে না। আমার গল্পের
জন্য, এমন কি, আমার কোনাে লেখার জন্য কখনাে কোনাে
প্রশংসা না পেলেও, ওই সব ছবির খাতিরে খ্যাতি আমার
আছেই—ওদের জন্য একদিন না একদিন বাহবা আমি পাবই।
ওরাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে--আজকে না হলে আগামী
কালেমানুষের দুস্বপ্নের মধ্যে অন্ততঃ--এ বিশ্বাস আমার
অটল।
অবশেষে ‘সৰ্বমত্যন্ত-এর পরে ড্যাশের জায়গায় শুধু
‘গর্হিত'—কথাটি বসিয়ে রচনা শেষ করে আমার গল্পের
সেই চিত্ররূপ নিয়ে নির্দিষ্ট দিনক্ষণে রেডিয়ো ষ্টেশনের দিকে
দৌড়ালাম।
ভেবে দেখলে সমস্ত ব্যাপারটাই গর্হিত ছাড়া কি ?
আগাগােড়া ভালাে করে ভেবে দেখা যায় যদি, আমার পক্ষে
রেডিয়াের গল্প পড়তে পাওয়া, এবং যে দক্ষিণায় গল্প বেচে
থাকি, সেই গল্প পড়তে গিয়ে তার তিনগুণ দাক্ষিণ্যলাভের
শিব্রাম চকবরতির মতাে

সুযােগ পাওয়া দস্তুরমত গর্হিত বলেই আমার মনে হতে
থাকে। এবং যে গল্প আমি চিত্রাকারে, মিকি মাউসের সৃষ্টি
কর্তাকে লজ্জা দিয়ে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ধরে কেঁদেছি তার দিকে
তাকালে-না, না এর সমস্তটাই অত্যন্ত—অতিশয় অত্যন্ত
এবং কেবল অত্যন্ত নয়, অত্যন্ত গর্হিত ?
তারপর? তারপর সেই গল্প নিয়ে হন্যে হয়ে যাবার
মুখে আমার দুনম্বর বরাত এসে দেখা দিল। আমি অ্যাম্বুলেন্স
চাপা পড়লাম।
হাসপাতালে গিয়েও, হাত পা ব্যয় না করে নিজে বাজে
খরচ না হয়ে, অটুট অবস্থায় বেরিয়ে আসাটা তিন নম্বর বরাত
বলতে হয়। কিন্তু সশরীরে সর্বাঙ্গীণরূপে লােকালয়ে ফিরে
এসে ভাগ্যের ব্র্যহস্পর্শের কথাটা যে ঘটা করে যাকে তাকে
বলবাে, বলে’ একটু আরাম পাবে তার যাে কি ! যার দেখা
পাই, যাকেই বলতে যাই কথাটা, আমার সূত্রপাতের আগেই
সে মুক্তকণ্ঠ হয়ে ওঠে।
“চমৎকার! খাসা! কী গল্পই না পড়লে সেদিন যেমন
লেখায় তেম্‌নি পড়ায়—লেখাপড়াতে যে তুমি এমন ওস্তাদ
তার পরিচয় তাে ইস্কুলে কোনােদিন দাওনি হে ! সব্যসাচি
যদি কাউকে বলতে হয় তাে সে তােমায় । আমাদের সবাইকে
অবাক করে দিয়েছ, মাইরি !”
কথা বলার বিপদ ।
১২।

তবে আমিও কম অবাক হইনে। প্রতিবাদ করতে যাব, কিন্তু হাঁ করবার আগেই আরেকজন হাঁ হাঁ করে এসে পড়েছেন। “তােমার গল্প অনেক পড়েছি। ঠিক পড়িনি বটে, শুনতে হয়েছে। বাড়ীর ছেলেমেয়েরাই গায়ে পড়ে শুনিয়ে দিয়েছে। শােনাতে তারা ছাড়েনা— সে শােনাও পড়ার মতই। কিন্তু যা পড়া সেদিন তুমি পড়লে তার কাছে সে সব কিছু লাগে না। আমার ছেলে মেয়েদের পড়াও না। হ্যা, সে পড়া বটে একখান্ ! আহা, এখনাে যেন এই কানে- এইখানে লেগে রয়েছে হে!” তার মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে বল্লেন আরেকজন : গল্প শুনে তাে হেসে আর বাঁচিনে ভায়া : আশ্চৰ্য্য গল্পই পড়লে বটে ! বাড়ী শুদ্ধ, সবাই—আমার দুধের ছেলেটা পর্যন্ত উৎকর্ণ হয়েছিল, কখন্ তুমি গল্প পড়বে । আর যখন তুমি আরম্ভ করলে সেই শুকুরবার না কোন্‌বারে--বিকেলের দিকেই ?--আমরা তাে শুনবামাত্র ধরতে পেরেছি—এমন টক- মিষ্টি-ঝা- ঝানােন্তা গলা আর কার হবে ? আমার কোলের মেয়েটা পর্যন্ত ধরতে পেরেছে যে আমাদের রামদার গলা ?” রামদা-টা গলা থেকে তুলতে না তুলতেই অপর এক ব্যক্তির কাছে শুতে হােলাে : “বাহাদুর, বাহাদুর ! তুমি বাহাদুর । রেডিয়াের গল্প পড়ার চান্স পাওয়া সহজ নয়, কোন্ ফিকিরে কি করে জোগাড় করলে তুমিই জানাে ! তারপরে সেই গল্প ১২৮ শিব্রাম্ চকবরতির মতো

মাইকের সামনে দাড়িয়ে ওগরানাে-সে কি চাটুটিখানি ?
আমার তাে ভাবতেই পা কঁপে, মাথা ঘুরতে থাকে । কি করে
পারলে বলােত? আর পারা বলে পারা—অমন নিখুৎ ভাবে
পারা--যা একমাত্র কেবল হাঁসেরাই পারে। আবার বলি, তুমি
বাহাদুর ?”
তারাই আমায় তাক লাগিয়ে দিল। রেডিয়াের স্বর্গে
যাবার পথে উপসর্গে আটকে অ্যাম্বুলেন্স চেপে আধুনিক
পাতালে যাওয়ায় অমন গালভরা খবরটা ফাস করার আর
ফাক পেলাম না।
কথা বলার বিপদ ।

No text on this page.

(

এটা হাসির গল্প নয়। করুণ গল্পও না, তােমাদের কাছে
নয় অন্ততঃ। যদি কারাে কাছে করুণ হয় তােত কেবল আমার
কাছেই।
খুব সম্ভব এটা ভূতের গল্প । এবং এই গল্পের এর ভূত
বােধ হয় আমি। আমিই স্বয়ং। দশচক্রে নয়, নিছক
নিজের চক্রান্তে !
সেদিনের সেই ঘটনার পরে সশরীরে আমি টিকে আছি
একথা ভাবতে পারি না। মরে গিয়ে ভূত হয়ে এই নশ্বর জগতে
বিচরণ করছি বলেই আমার সন্দেহ হয়। অবিশ্যি, আলােয়
আমার ছায়া আর আয়নায় প্রতিচ্ছায়া পড়তে দেখা গেছে
কিন্তু তাহলেও এখনাে আমার ঐ দ্বিধা দূর হয় নি।
এবং মারা যাবার আগে হয়ত বা হবে না।
তবে—আমি
-আমি কি আবার মারা যাবে? হয় আমি কবে মরে গেছি
নয় তাে আমি অমরদের মধ্যেই গণ্য হয়ে রয়েছি। মার
যাবার পরে প্রায় সবাই তাে অমর ? কজন আর বেঁচে উঠে
পুনরায় মরবার সুযােগ পায় বলে ?
এখন আসল কথায় আসা যাক—সেদিনের ঘটনাটা
বলি।
বেশ কিছুদিন আগের কথাই। কলকাতার বড় ডাকঘরের
কাছে একবার একটা সুড়ঙ্গ বেরিয়েছিল, তার খবর কি তােমরা
কেউ রাখাে? তােমাদের মধ্যে যারা বেশ বড় হয়েছে আর
খুব ছােট বেলাতেও কাগজ পড়তে অভ্যস্ত ছিলে তাদের কারাে
শিব্রাম চকবরতির মতো

যে সময়ে কারাে হয়ত মনে পড়তে পারে। সেই সুড়ঙ্গ নিয়ে সেই সময়ে ভারী হৈ চৈ পড়ে গেছল। জি-পি-ওর দিকে মুখখামুখি দাড়ালে ওর ডান ধারের যে কাষ্টম্ হাউস্টা এখন চোখে পড়ে সেইখানে আগে পুরণাে কেল্লা বাড়ীটা ছিল। সিরাজদ্দৌলার আমলের বাড়ী। সেই বাড়ী ভেঙে এই কাষ্টম্ হাউস্ গড়বার সময়েই এই সুড়ঙ্গটা বেরিয়ে পড়েছিল। মিস্ত্রী মজুররা শাবল-গাইতি দিয়ে গভীর করে’ ভিৎ খুঁড়তে খুঁড়তে সুড়ঙ্গটাকে হঠাৎ বার করে”ফ্যালে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছিলেন যে উক্ত সুড়ঙ্গের ঐ গুপ্ত পথেই নবাবের বেগমরা গঙ্গাস্নানে যেতেন—ওর আরেক মুখ আছে নাকি গঙ্গার দিকে। হয়ত বা গঙ্গাগর্ভেই এখন । এই সব নিয়ে কাগজে কাগজে হট্টগােল চলছিল তখন কে ভেবেছে যে নবাবের বেগম না হয়েও আমাকেও ঐ পথে অচিরে গঙ্গাযাত্রায় যেতে হবে। আমিই কি ভেবেছিলাম । দুয়েকদিনের মধ্যেই অবিশ্যি ঐ সুড়ঙ্গ বৃজিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু সেটা আমি চিরকালের মত চোখ বুজবার পরেই ! ঐ সুড়ঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে আমিও যে কাষ্টম্ হাউসের কুক্ষিগত হয়ে গেলাম—-কবরস্থ হয়ে রইলাম—সেকথা কি তখন কারাে মনে হয়েছে ? কোনাে কাগজে কি বেরিয়েছিল সে খবর ? হায়, কেউই তা জানেনা; অদ্য তারিখের আগে আমার এই মরণ- বৃত্তান্ত প্রকাশের পূর্বে এই চরাচরের কেউ সেকথা জানতে পায়নি। কথা বলার বিপদ!

উল্লিখিত সুড়ঙ্গের আবিষ্কারের খবরটা তার আগের দিনের
কাগজে পড়েছিলাম। সেদিনের সংবাদপত্র খুলে সব প্রথমে •
তারই এক ছবি দেখা গেল—চমৎকার এক সুড়ঙ্গীন ছবি।
ঠিক এই সময়টায়ই টেলিফোনের ঘণ্টা বেজে উঠল—ক্রিং
ক্রিং ক্রিং—-
টেবিলের ওপাশের রিসিভারকে হাত বাড়িয়ে করায়ত্ব
করে’ কানে আনলাম-“হালাে।”
উত্তর 'এল-“হ্যালো!” অবিকল আমার গলায় ।
আওয়াজ শুনে চমকে যেতে হােলো। কানের গলদ মনে
করে’ গলা ছাড়লাম ফের-“হ্যালাে, কে তুমি?”
“আমি শিব্রাম্।” একেবারে আমার গলায় যেন আমারই
প্রত্যুত্তর।
বন্ধুবান্ধব কেউ ছদ্মগলায় রসিকতা করছে ভেবে খুব হাসি
পেল আমার।
“শিব্রাম্ তত বুঝলাম, কিন্তু বহু কোথ থেকে ?” প্রশ্ন
করলাম আমি।
“ভারী বিপদে পড়েছি ভাই। সিরাজদ্দৌলার সুড়ঙ্গের
ভেতর থেকে কথা বলছি এখন।”
তখন আর আমার বুঝতে বাকী থাকল না যে ককুশলী
কোনাে বন্ধুর নিতান্তই এটা সুড়ঙ্গ-রস। অকারণ আমার
উৎকণ্ঠা-সৃজনের অপচেষ্টা।
“তা, ওখানে মরতে গেছ কেন? মরবার কি আর কোথাও
১৩৪
শিম চকবুবরতির মতাে

1: জায়গা ছিল না ?” জবাব দিলুম আমি।—“আর গেলেই বা কি করে ওখানে ?” “ঠাট্টার সময় নয়, আমার মৃত্যু আসন্ন।” অত্যন্ত কাতর- কণ্ঠে জানালো শিব্রাম। সেই শিব্রাম্। আমার মত স্বরে হুবহু আমার ব্যঞ্জনা দিয়ে বলল। কারাে মৃত্যু আসন্ন দেখলে মনে ঘা লাগে। নিজেরই কি আর পরেরই কি বিশ্বাস না হলেও জিগ্যেস করলাম । “সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলো দেখি, কিছুই আমি ঠিক ঠাওর করতে পারছিনা।” একটু কৌতূহলও যে না হয়েছিল তা নয় । 'সে সব কথা পরে ব, অনেক বৃত্তান্ত, আমাকে বাঁচাও আগে এখন। সুড়ঙ্গে আমি আটকা পড়েছি। বেরােবার পথ পাচ্ছিনে। আমার টর্চের আলােও নিভে আসছে। সুড়ঙ্গের মুখ বুজিয়ে দিয়েছে কি না কে জানে! আমাকে যদি বাঁচাতে চাও তাে এক মুহূর্তও আর দেরী কোরাে —ঐ যা : নিভে গেল টচ্চটা : চারধারে অন্ধকারের ঘুটঘুট্টি : ওঃ : কে যেন আমার গলা চাপছে•••আমার গলা••• এই অন্ধকার বলতে বলতে আমার সেই নামান্তর—-বিকল্প আমার আর থেমে গেল হঠাৎ। তার টর্চের সঙ্গে সঙ্গে তার এবং, আমার টর্চার (torture) থেকে রেহাই পেলাম। ব্যক্তিটি যেই হােক্ সে যে চমৎকার পিলে-চমকানো কথা বলার বিপদ ! ১৩৫

অভিনয় করতে পারে তার ত আর ভুল নেই ! তার ওস্তাদিকে
বাহবা দিতে হয় !•••আমার মৃত্যু আসন্ন জেনে আমার নিজেরই
হাসিই পেল এমন! আরে, আমি তাে জলজ্যান্ত এখানে
বৰ্ত্তমান, আজকের খবরের কাগজের সামনে, আমি আবার
কি করে অন্যত্র খরচ হয়ে যেতে পারি ?
যাই হােক, সুড়ঙ্গটা আমার মনে বেশ কৌতূহল জাগিয়েছিল
কালকের কাগজে বার্তাটা পাবার পর থেকেই ওটা দেখবার
আমার, লালসা জেগেছে । আজকের ওর চিত্ররূপ দেখে
অবধি আর আমি আত্মসম্বরণ করতে পারছিনে।
গ্রহ কিনা
কে জানে, কিন্তু আমার আগ্রহ বেড়ে গেছে দশগুণ। দেখেই
আসা যাক না কেমন সুড়ঙ্গটা।
এক্ষুনি গিয়ে দেখলেই হয়। কত লােকই তাে যাচ্ছে ।
যাচ্ছে না কি ?
সে কথা সত্যি। গিয়ে দেখলাম বেজায় ভীড়। বিস্তর
লােক সুড়ঙ্গের বাইরে দাড়িয়ে উকি ঝুকি মেরে ভেতরের
রহস্য চক্ষুগােচরের চেষ্টা করছিল। একটু ভেতরে গিয়ে দেখা
যায় না? এই একটুখানি কয়েক হাত অন্ততঃ ?
পাহারােলা কিন্তু ছাড়বার পাত্র নয়। কিছুতেই সে যেতে
দেবে না।
পাও নয়।
রবীন্দ্রনাথের মেয়ের মত
‘যেতে নাহি দিব’ মেজাজ। সে বল্ল, আজই এটা বুজিয়ে ফেলা
হবে। এইএকটু বাদেই। আমি বল্লাম, আমি কি আর ভেতরে
যাচ্ছি? এতই বােকা কি আমি? এই সামনে থেকেই-একটু
শিৰাম চকবরতির মতাে

এগিয়ে উকি ঝুকি মেরে চলে আসব এক্ষুনি। অনেক বলে অনেক কয়ে’ পাহারােলাকে খুসি করে তাে সুড়ঙ্গে টোকা গেল। একজন অ্যাংলাে ইণ্ডিয়ান্ ছেলের হাতে একটা টর্চ ছিল- নগদ মূল্য দিয়ে কিনে সেটা নিলাম। আলাে নাহলে দেখব কি করে ? কয়েক পা এগিয়ে কিন্তু দেখলাম, বেশ পরিষ্কার পথ। রসাতলের পথ বলে আদৌ সন্দেহ হয় না। ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। হয়ত নবাবী ধনরত্নলাভের দুরাশায় সরকারপক্ষ থেকেই পরিষ্কাররূপে এটা পরীক্ষা করা হয়েছিল। ইতিমধ্যেই এর গর্ভে টেলিফোনের লাইন ও পাতা হয়েছে দেখলাম। আরাে ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে টেলিফোনের তবে আবার ভয় কিসের ? মানুষ তাে গেছে এর ভেতরে। সরকারী লােকরাই গিয়েছে। গেছে এবং ফিরেও এসেছে। আমারই বা শেষ পর্যন্ত দেখে শুনে ফেরৎ আসতে দোষ কি? সিরাজদ্দৌলার আমলে আমি সজীব ছিলাম কি না জানিনে, কেবল ত্রিকালজ্ঞরাই তা বলতে পারেন, কিন্তু এখন নিজের আমলে সিরাজদ্দৌলার কীর্তি পেয়ে, হাতে নাতে পেয়ে, না দেখে ছেড়ে দেব কেন ? আস্তে আস্তে টর্চ হাতে এগুলাে গেল। এঁকে বেঁকে কিছুদূর গিয়ে একটা ঘরের মত পাওয়া গেল। চোর কুঠরির মত অনেকটা। সুড়ঙ্গটা এইখানেই এসে শেষ কথা বলার বিপদ !

হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়। টেলিফোনের লাইনটাকে এখন পর্যন্ত টেনে আনা হয়েছিল । কুঠরিটায় অদ্ভুত একটা কী গন্ধ, একটু-ক্ষণেই নেশা ধরিয়ে দেয় যেন। অনেক দিন-মাস-বছর কোনাে এক- খানে এসে জমাট বেঁধে গেলে এম্‌নি গন্ধ ছাড়ে বােধহয়। । ঘরের মাঝখানে মর্মরের বেদীর মতাে বাঁধানে তার একধারে আমি বলাম । বস্ত বতেই কেমন ঘুম পেতে লাগল। কিরকম ক্লান্তি বােধ করতে লাগলাম। কোনাে লোক যদি কয়েক শতাব্দী ধরে ক্রমাগত বেঁচে থাকে—অবশ্যি, থাকে না কেউ--- তাহলে সে যেমন সর্বাঙ্গে ভীষণ একটা অবসাদ বােধ করে- বিষাদ আর অবসাদ যুগপৎসেই রকমেরু আশ্চর্য এক অনুভূতি ধীরে ধীরে আমাকে আচ্ছন্ন করতে লাগল। কতক্ষণ ঐ ভাবে ছিলাম জানিনা। হঠাৎ চম ভাঙতেই দেখলাম আমার টর্চ প্রায় নিবু নিবু । উঠতে গিয়ে দেখি শরীর অবশ, তবু উঠলাম কোনাে- গতিকে। কিন্তু পথ কই ? সুড়ঙ্গের বহির্মুখটা কোন্ দিকে ছিল মনে পড়ছেনা। টর্চের ক্ষীণ আলােয় চারধারই তাে বন্ধ দেখছি। তবে কি তবে কি এর মধ্যেই সুড়ঙ্গের পথ ওরা বুজিয়ে দিয়েছে নাকি ? ভাবতেই আমার বুক কেঁপে উঠল। কী সর্বনাশ । শিব্রাম চকবরতির মতাে কিন্তু এখনাে বোধ হয় সম্পূর্ণ সর্বনাশ হয়নি। টেলি- ফোনের যন্ত্রটা তাে এখনাে রয়ে গেছে দেখছি—হাতের কাছেই ত আছে। টেলিফোনে হাঁক ডাক ছাড়া যা.. খবর পাঠাই বাইরে...নিজের বাড়ীরই কাউকে ডাকি•••এখনই ভীত হবার কি আছে ? •••এখনই কি ?•••এহেন এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যযুগে এত সহজে এমন অবলীলায় কখনাে কারো জীবন্ত সমাধি হতে পারে না। যতদূর সম্ভব শান্তভাবে রিসিভারটা হাতে নিয়ে নিজের বাড়ীর নম্বর চাইলাম••••••হালাে••• ডাকতে ডাকতেই সাড়া এলো হালাে••• যাক, সাড়া পেয়েছি যখন, তবে আর কি ? বেঁচে গেছি হলে । এবারের মত বাচলাম । কিন্তু হঠাৎ আমার খট্‌কা লাগে। জবাবের অাওয়াজটা আমার নিজের গলার মতাে নয় কি? কানের ভ্ৰম বােধ হয়।••• এবারে ওধার থেকে প্রশ্ন এল- “হ্যালাে, কে তুমি?” প্রশ্নটা অবিকল আমার গলায়। “আমি–আমি শিব্রাম। জবাব দিলাম আমি। নিজের সম্বন্ধে আমার বিশেষ দ্বিধা ছিল, বরাবরই ছিল, কিন্তু এতটা দ্বিধাগ্রস্ত আমি কখনাে হইনি। শিব্রাম্ তত বুঝলাম, কিন্তু বছ কেথ থেকে ?” টেলি- ফোনের ওপার হতে জিজ্ঞাসা এল এধারে। আমার ঘরে বসে’ কে এমন করে আমার সঙ্গে ছলনা কথা বলার বিপদ

তবে ।
করছে ? মৃত্যুমুখে দাড়িয়ে এই দুঃসময়ে এমন রসিকতা
ভালাে লাগে না। সত্যি বলতে, আমার কান্না পেতে
লাগল।
আৰ্ত্ত কণ্ঠে আমি বল্লাম । “ভারী বিপদে পড়েছি ভাই।
সিরাজদ্দৌলার সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কথা বছি এখন।”
হঠাৎ আমার মনে হােসল, সমস্তটাই মায়া নয়তাে ? আমি
যদি এখানে, তাহলে আমার বাড়ীতে বসে আমার মত ও কে
ওখানের ওই-আমি যদি সত্যিই আমি হই তাহলে
এখানকার এই-আমি কে আবার ? ভারী গােলমালে পড়ে
গেলাম।
যথার্থই যদি উর্ধ জগতে একজন আমি এখন বজায় থেকে
থাকি তাহলে এখানে রসাতলগর্ভে এই আমি গােল্লায় গেলেই
বা কি হয় ? একজন আমি তাে বেঁচেই রইলাম ।
কিন্তু আমার মন না না করে উঠল । আমার সমস্ত
অস্তিত্ব—যার কোনােখানেই মায়া নেই—চিটি কাটলে
সবখানেই যার লাগে—একথা ভাবতেই হাহাকার করে উঠল।
হা হা করে উঠল যেন। ~~-না, আমাকে বাঁচতে হবে--
এই আমাকেও। ওপরের ঐ আমি টিকে থাকা এ আমার
কোনই সান্ত্বনা নয়, ও যদি সত্যিই আমি হই, তবুও। আমার
নিজের মতে, এই আমিই সত্যি। পুরােপুরি আসল।
ছাড়া আর কোনো-আমির অন্য কোনাে অস্তিত্ব আর কোথাও
থাকতে পারে না।
১৪o
শত্ৰাম চকবরতির মতে।

ফের আমার মনে হয়, বেশ, ঐ উর্ধ লােকের আমি যদি
সত্যিই আমি হই, অন্ততঃ আমার নিকটাত্মীয়ও হই, তাহলে
সে কেন এখানে এসে এখন এই মৃত্যুগহবর থেকে আমাকে
উদ্ধার করুক্ না !
বাধা কি তার ? নিজের
সাক্ষাৎলাভে সুখীই হওয়া যাবে। পরস্পরের মুখােমুখি
আসতে চক্ষুলজ্জা কিসের ?
এদিকে আমার টর্চের আলাে নিভে আসতে থাকে।
আর কয়েক মুহূর্তই হয়ত।
মুহূৰ্ত্তই হয়ত । তারপর আর আমার পাত্তা
পাওয়া যাবে না--ও-ও পাবে না, আমিও না । আমি
পরিত্রাহি ডাক ছাড়ি...হ্যালো••••••বাঁচাও আমাকে। শীগগির
এসাে। সুড়ঙ্গে আমি আটকা পড়েছি বেরুবার পথ পাচ্ছি
। আমার টর্চের আলােও
আলােও নিভে আছে: :
को
অন্ধকার..উঃ..
০ ০ ০ ০
কথা বলার বিপদ!
১৪১

No text on this page.

T
}
পরে লণ্ড/

- কথায় বলে-কীর্ত্যিস্য স জীবতি। কিন্তু আমাদের প্রাণ- কেষ্টর বেলা তার অন্যথা দেখা যাচ্ছে। কীর্তি করে সে মারা যাবার দাখিল ; ফাসি ঠিক না হলেও, , নিজেকে ফাঁসিয়েছে যে, তার ভুল নেই। যে পথ দিয়ে লােকে ফাসি যায় এবং তার চেয়ে কাছাকাছি আরাে যেসব তীর্থক্ষেত্র—জেল হাজত ইত্যাদি বাস করে-সেই আদালতেই তাকে হাজির হতে হয়েছে। বসেচে। কেন যে তার ধৈৰ্য্যচ্যুতি হােলাে বলা যায় না, বাসে যেতে যেতে, মােটা সােটা এক মেমকে হঠাৎ সে এক চড় মেরে এবং তার ফলে,আহত ব্যতিটি স্কুল বলে’ নয়, মেম্ বলেই, বেজায় হুলুস্থুল পড়ে গেছে। সবাই এসে বল্‌ছে, প্রাণকেষ্ট, এমন কাজ তুমি কেন করলে ? এ কাজ তােমার উপযুক্ত হয়নি।” প্রাণকেষ্টর কিন্তু কোনাে জবাব নেই। তােমার মাথা খারাপ হয়ে গেছল না কি? নইলে হঠাৎ অমন ক্ষেপে ওঠবার কারণ ?” জিগ্যেস করে একজন। প্রাণকেষ্ট চুপ করে থাকে। ‘না কি—মে তােমাকে মারতে এসেছিল বুঝি ? তাই বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার খাতিরেই বােধ করি?” আরেকজন সংশয় প্রকাশ করে। “নাকি কামড়াতেই এসেছিল? কিন্তু মেম্ তাে সচরাচর কাউকে কিছু বলে না।” প্রাণকেষ্ট রা কাড়ে না কোননা। ১৪৪ শিব্রাম চকবরতির মতো

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Shibram Chakrabortir Moto Katha Balar Bipad Ed.1

Author
Chakraborty, Shibram
Title
Shibram Chakrabortir Moto Katha Balar Bipad Ed.1
File name
Shibram Chakrabortir Moto Katha Balar Bipad Ed.1
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2010/04/22
Publisher
Book Emporium , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
159
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Novel
Keywords
Chakraborty, Shibram
DLI number
515197
Barcode
4990010016828.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
irbEpLJaq6v
Download PDF

Shibram Chakrabortir Moto Katha Balar Bipad Ed.1