Bally Sadharan Granthagar

Ehai Niyam

Gupta, Sri Ashis · 2009/09/7

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

ঐশষ গুপ্ত
ইহাই নিম
ইহাই নিয়ম
অন্তুরে বাহিরে
স্বামী-তীর্থ
বরণডালা
এক টাকা

শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ গুহ রায়
*, রমানাথ মজুমদার ধ্রুট,
কলিকাতা
সরস্বতী লাইব্রেরী।
৯, রমানাথ মজুমদার স্ট্রট,
কলিকাতা।
মুছাকর।
শ্রী রজনীকান্ত রাণা
সরস্বতী প্রেস লিমিটেড
১নং রমানাথ মজুমদার ফুট, কলিকাতা

সামতাবেড়, পাণিত্রাস
হাবড়া।
প্রিয় উপেন,
তােমার চিঠি পেলাম। শ্রীমান আশীষ গুপ্তের
গল্পের বই ইহাই নিয়ম’ মন দিয়ে পড়েছি। এর
ভাষা যেমন ঝরঝরে, লেখার ধরণটিও তেমনি
ভালাে। সব কটি গল্পই আমাকে আনন্দ ও
তৃপ্তি দিয়েছে। এই লেখকের ভবিষ্যৎ যে সত্যই
উজ্জ্বল এবং আশাপ্রদ একথা আজকালকার
দিনে অকপটে বলতে পারায় মন খুশি হয়ে
ওঠে। দেহটা মােটই ভালােভাবে চলছে না।
তােমার কেমন ?
ইতি ৩১শে জ্যৈষ্ঠ,
১৩৩৯
তােমাদের রং
-বাংলা উপন্যাসিক প্রযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মহাশয় কর্তৃক বিচিত্রা-সম্পাদক শ্রীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ
গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়কে লিখিত পত্রাংশ

No text on this page.

এই পুকাত গল্পগুলি ইতিপূর্বে
‘বিচিত্র', প্রবাসী’ ও ‘বজলী'তে
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হইয়াছিল।
প্রকাশক কর্তৃক সর্বস সংরক্ষিত।

No text on this page.

পিতৃদেবের শ্রীচরণােদ্দেশে

No text on this page.

. ন + ১
যে নৈতিক সাহস সম্বন্ধে অনেক ভালাে ভালাে কথা পুস্তকে
লেখা আছে, সেই সাহস দেখাইতে গিয়াই বিভ্রাট বাধিল।
সােমর দিনের বেলা সাড়ে-দশটা,অরিন্দম শীফিলে
আসিয়া নিজের চেয়ারটিতে বসিল, ক্রিং করিয়া স্বা
বাজাইল, বেয়ারা আসিয়া সেলাম ঠুকিলে তাহাকে
অনাবশ্যকভাবে মিনিট তিন-চার দাঁড় করাইয়া রাখি,
পা দুইটা টান করিয়া টেলের তলায় ছড়াইয়া চল, হাতের
আঙ্গুল মকাইল, আলস্য ভাজিল, শেৰে বলিল,
এ্যাকাউন্ট ফাইল
কি শান্তি! কি গৌরব! মাথার উপরে
জোরে ঘুরিতেছে, পাঁচটা পৰ্যন্ত ঘুরিৰেও আমি মনে মনে
হিসাব করে মাসে" কবি ই হবে কত টার বিল
ইরে ওই পাখাটা!

ইহাই নিয়ম
।
চারিটা টেবল দুরে হরিশবাবুর চেয়ারের কাছে দাঁড়াইয়া
জন কয়েক কেরাণী নিম্নস্বরে কি যেন একটা বলাবলি করিতেছিল।
অরিন্দম উঠিয়া দাড়াইল, নিকটে আসিয়া বলিল, “কি মশাই,
কিসের আলােচনা হচ্চে?”
“যােগেনকে হামফ্রিজ, সাহেব জবাব দিয়েছে।”
“জবাব দিয়েছে কি রকম ?-তার অপরাধ ?”
শনিবার দিন ড্রয়ারের ভিতর নভেল রেখে পড়ছিল।”
অরিন্দম বুকটা টান করিয়া হাত দুইটা পকেটে পূরিয়া দিল ;
মনে হইতেছিল সে-ই যেন হামফ্রিজ সাহেব। জিজ্ঞাসা করিল,
“তার হাতে কোন কাজ ছিল তখন ?”
“আফিস ছুটি হ’বার আর কতক্ষণ বাকী ছিল ?”
“আধঘণ্টা।”
“তখন আর নূতন কোন কাজের ভার তার হাতে দেওয়ার
সম্ভাবনা তাহলে একেবারেই ছিল না ?”
“নিশ্চয়ই না।”
“তাকে জবাব দেওয়া হয়েছে কখন?*
“সাহেব তাকে সেই দিনই ডেকে নিয়ে গিয়ে অনেক ধমক
ধামক করেছিল,আজ আফিসে এসে বসূতেই বেয়া তার
২

হই নিয়ম।
হাতে একটা ক্লিপ দিয়ে গেল; হামফ্রিজ শনিবার দিনই লিখে
রেখে গিয়েছে,-যােগেনের আর আফিসে আসার প্রয়ােজন,
নেই, এক মাসের মাইনে সে এমনিই পাবে। কোম্পানীর
চাকরী তার মতন দায়িত্বজ্ঞানহীন ফাকিবাজ লােকের জন্যে
নয়।
অরিন্দম কহিল, “এটা অন্যায়, তাকে ওয়ার্কিং দিয়ে দিলেই
যথেষ্ট হত।”
হরিশ কহিলেন, “এই বল ত ভায়া, আমিও সেই কথাই
এদের বলছিলাম। বেচারা যােগেন,-ওকে আমি এর আগে
কতদিন বলেছি, নভেল-টভেল পড়বি ত পড়, কিন্তু আমার
কাশিটার দিকে একটু কান রাখিস। দরজার কাছে বসি,
তােদর এই সামান্য উপকারটুকুও যদি আমার দ্বারা না হয়,
তাহলে শুধু শুধুই এতগুলাে বছর এখানে ভূতের বেগার খাটুছি।
কিন্তু কাশি ত কাশি, কানের কাছে কামান দাগলেও, বােধ হয়
ওর নভেল পড়ার সময় চৈতন্য হয় না। কিছু বললে বলে, সমস্ত
কাজ শেষ করে তবে ত বই পড়ি,আমার কোন কাজে
কোনদিন রুটি দেখেছেন ?—আর ক্রটি! হামফ্রিজ এসে
বইখানা ধরে যখন টা, ও তখন বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই
সাহেবের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “আরে যাও যাও, সব সময়
ইয়ার্কি ভালাে লাগে না। সাহেব যেই ঘোৎ করে চীৎকার ।
করে উঠল, ‘হােয়াট’, অমনি যােগেনের চোখ উপর দিকে
তাকিয়েই কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেল।-আমরা,
-

ক
ইন্নাই নিয়ম
ডেপুটেশান পাঠাব ভাঙ্গণফোগেনের জঙ্গে আমাদের কিছু
করা উচিত,আর বিনা ওয়ার্কিং-এ এত সহঃ যদি চাকরী
যায়, তাহলে ত পারা যায় না।”
অরিন্দম কহিল, “আমি রাজী আছি—এ রকম অন্যায়ের
একটা প্রতিকার হওয়া দরকার। চলুন আগে আমরা সাহেবের
কাছে যাই, তারপর খবরের কাগজে চিঠি লিখব। ডেপুটেশানে
কাকে কাকে নিতে চান্?”
* হরিশ কহিলেন, “আমি, সুধীর, প্রমথ, অবনীশ, আর তুমি।
তােমাকেই লীডার হতে হবে, ভায়া—বলতে কইতে পার,
ইংরেজীটার ওপরও একটু দখল আছে,তােমার পিছনে
আমরা থাকব।”
অরিন্দম বলি, “বেশ তাই হবে,যখন যাওয়া স্থির
করবেন আমায় জানাবেন।” বলিয়া নিজের জায়গায় গিয়া বসিল।
হরিশ ডাকিয়া বলিলেন, “ওহে, হামফ্রিজের আসার সময়
প্রায় হ’ল, যে যার কাজে যাও।”
বাবােটার সময় ডেপুটেশান হামফ্রিজের ঘরের দিকে অগ্রসর
হইল।. সর্বাগ্রে অরিন্দৰ বুক ফুলাইয়া চলিল।
পার্কে-শােনা বাটার প্রায় সব কথাগুলাই মনে আছে। সমত
শরীরে আগুনের ফুলকিগুলা যেন দিখিদিকে ছড়াইয়া পড়িতেছে,
৪

বাংলাদেশ অঙ্গিক্রম করিয়া, ভারতবর্ষ পার হইয়া বিশাল
পৃথিবীতে সেগুলা ব্যাপ্ত হইয়া পড়িবে; মহামারী কাণ্ড বাধাইয়া
বিবে বলিয়াই অরিন্দমের বিশ্বাস। গতকল্য বৈকালে পার্কের
বেঞ্চির উপরে উড়াইয়া বক্তৃবৃন্দও সেই কথাই বলিয়াছিলেন।
হামফ্রিজের ঘরের কাছে আসিয়া হরিশ অরিন্দমকে কহিলেন,
"তুমি প্রথমে যাবে, আমরা পৃষ্ঠরক্ষা করব,-সুত্বের যা নিয়ন।
যা বলবার তুমিই • বলবে, দরকার হলে আমরা তাল লিয়ে
যাব।”
একটা কাগজে নিজের এবং চাকুরীর নাম লিখিয়া বেয়ারার
হাতে দিয়া, অরিন্দম লবলসহ হাজির ডাকের অপেক্ষা
করিতে লাগিল।
আগুনের ফুলকিগুলার সংখ্যা যেন কমিয়া আসিতেছে,
সবগুলা কি সদেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে নাকি? পা দুইটা
থখর করে,-বুকের ভিতরে ঢিপ ঢিপ শ হইতেছে,
দামামাধ্বনি বলিয়া ত বােধ হয় না। ক্ষিটা শুকাইয়া
উঠিতেছে, রণ সৈনিকের জিতের ভন।-মিমের
wণ হইতে লাগিল যেন এ বৎসরের ভিতর সে জল
করে নাই।
হামফ্রি লাহেব জাকিয়া পাঠাইলে আমি ঘরে ঝুলি
ভাহার দুই চোখের দৃষ্টি তখন যশষ্ট গরিমাণে ঘােমাটো
উঠয়াছে।
পাবে কহিল, ইয়ে
৭

। বই নিয়ম প্রাণান্তকর চেষ্টায় অরিন্দম বলিল, “সাহেব, যােগেনকে ডিসমিস করা উচিত হয় নি,—তাকে অন্তত একটা চান্দ- সাহেবের চোখ মুখ লাল হইয়া উঠিল।অরিন্দমের সন্দেহ হইল যে, ইহা বােধ হয় তাহার প্রতি হামফ্রিজের সুনিবিড় প্রীতির লক্ষণ নহে। সে পিছন দিকে চাহিয়া, হরিশ অথবা অন্য কাহাকেও ঘরের ভিতরে দেখিতে পাইল না। তাহারা বােধ হয় বাহিরে দাঁড়াইয়া, অথবা নিজের নিজের জায়গায় বসিয়া পৃষ্ঠরক্ষা করিতেছিল। আর এসব ক্ষেত্রে ‘পৃষ্ঠ যে কতদূত্রে অবস্থিত সে সম্বন্ধে কোন ধরা-বাঁধা মাপ-জোক নাই।--সেইজন্য নিজের চেয়ারটিতে বসিয়াও বলা চলে, “পৃষ্ঠ রক্ষা করিতেছি”এবং হরিশের দলকে তজ্জন্য দোষ দেওয়া যায় না। হামফ্রি চীৎকার করিয়া উঠিল,-“ক্লিয়ার আউট” টেবলের উপর একটা প্রচণ্ড চাপড় মারিয়া বলিল, “আই সে, ক্লিয়ার আউট, ইউ” ( অরিন্দম দ্রুতকম্পিতপদে দরজার দিকে অগ্রসর হইল। একটা চেয়ারের কোণে পাঞ্জাবীর পকেটটা আটকাইয়া চেয়ারটা উলটাইয়া গেল,-পকেটটা বােধ হয় ছিড়িয়াছে! তাড়াতাড়ি শ্রিং-এর দরজা ঠেলিয়া বাহিরে আসিয়া পাড়াইতেই মনে হইল যেন পায়ের তলার হারানাে-মাটিটা আবার স্বস্থানে ফিরিয়া আসিতেছে। অরিন্দম পকেট হইতে রুমাল বাহির করিল,—ডানদিকের পকেটটা একেবারেই

গিয়াছে, উপর হইতে নীচ অবধি দুইখণ্ড হইয়া দুই দিকে
ঝুলিতেছে। নূতন জামাটা,চাকরী আরম্ভ করিবার মাত্র
সাতদিন পূর্বে কেনা!
অরিন্দম মুখটা ভালাে করিয়া মুছিয়া ফেলিয়া নিজের চেয়ারে
গিয়া বসিল। ডেপুটেশানের অন্যান্য মেম্বারদের দুর্নিবার
কৌতুহল কোনদিকে না তাকাইয়াও সে অনুভব করিতে
পারিতেছিল। হরিশ কহিলেন, “তােমার সঙ্গে একগাদা লােক
গিয়ে তােমাকে এমব্যারাস্ করে লাভ নেই ভায়া,
ডেপুটেশানের লীডারকেই প্র্যাকটিক্যালী ডেপুটেশান বলা চলে,
সেই জন্যেই ঘরে ঢুকলাম না হে। আমাদের মাল সাপাের্টের
দাম তাই বলে কিছু কম নয়,-তােমাকে একারিজ . কম
বেয়ারা আসিয়া অরিন্দমের হাতে এক টুকরা কাগজ দিল,
অরিন্দম পুনরায় সাহেবের ঘরে গিয়া প্রবেশ করিল। তাহার
দশ মিনিট পরে ক্যাশিয়ারের নিকট হইতে পঁয়তাল্লিশটা টাকা
লইয়া একেবারে সদর রাস্তায় নামিয়া পড়িল।
হরিশ তখন ডেপুটেশানের অন্যান্য মেম্বারদিগের কাছে
বলিতেছে, “সাত বছরের সার্ভিস হ’ল আমার এখানে তার
ভিতরে দু দুটো সাহেবকে পার করেছি কিন্তু এ-রকম

বদমাইস যাই হােক, ছােকরা খুৰ মৰল কায়ে
গেল কিন্তু
অরিন্দমের শূন্য কেদারার উপর পাখাটা পূরা
জােরে
ঘুরিতেছে; মাসের শেষে একটা মােটা টাকার বিল হইবে
বােধ হয়!
উ
অনেক কষ্টের চাকরী,—তিন জোড়া নূতন টায়ার-সােলর
জুতার সােলগুলা সম্পূর্ণরূপে ক্ষয় হইয়া যাইবার পর জুটিয়াছিল।
ইহার জন্য তাহাকে দুই তিনটা পরীক্ষাসাগর উত্তীর্ণ হইতে
হইয়াছে। তাহাকে বলা হইয়াছিল, শত্রুসৈন্য তাহাকে আক্রমণ
করিতে আসিতেছে, পালাইবার চার পাচটা রাস্তা আছে,প্রতি
রাস্তার সুবিধা অসুবিধাগুলি বিশদভাবে তাহাকে বুঝাইয়া
দিয়া জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল,—সে কোন্ রাস্তা দিয়া পলায়ন
করিবে।
অরিন্দম কপাল ঠুকিয়া একটা রাস্তার নাম করিতেই
প্রশ্নকর্জা সাহেবটি বলিয়াছিলেন, “হইল না। যুদ্ধক্ষেত্রে বলিয়াই
ভগবানের নিকট তােমার প্রার্থনা করা উচিত যেন তিনি
শত্রুসৈন্যদলের অন্তঃকরণে শুভ ধর্মবুদ্ধি এবং অহিত্ন ভাব
জাগরিত করেন, তাহা হইলেই তুমি বাঁচিৰে। অনন্ত করুণাময়
পরমেশ্বর ইচ্ছা করিলে কি না করিতে পারে ?”

'
সাজােবাকে পাদ্রী বলিয়াই অরিন্দমের বিশ্বাস হইয়াছিল,
কিন্তু তাহার ধারণা সম্পূর্ণরূপে ঠিক না-ও হইতে পারে।
তাহাকে Szekesfchervar জায়গার নামটি নির্ভুলভাবে
উচ্চারণ করিতে বলা হইয়াছিল। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা,
হইয়াছিল, ‘টিটিকাকা কোথায়, 'আদ্যশ্ৰাদ্ধ বােড় কোথায় ?
সে জানিত না, আন্দাজী উত্তর দিয়াছিল,সাহেব জ কুঞ্চিত
করিয়াছিলেন। অরিন্দম মনে মনে বুঝিল যে, চাকরীর আশা
ভরসার আদ্যশ্রাদ্ধও সঙ্গে সঙ্গে হইয়া গেল। কিন্তু অনন্ত
করুণাময় পরমেশ্বর’ ইচ্ছা করিলে কি না করিতে পারে।
সাহেব হঠাৎ একটা এক পয়সা দামের তারের ধাঁধা বাহির
করিয়া কহিলেন, “এটা খুলিতে পার?”
মরিয়া হইয়া অরিন্দম সেটা লইয়া টানাটানি করিতে
লাগিল,কোথা দিয়া যে সেটা কখন কেমন করিয়া খুলিয়া
গেল, তাহা সে টেরও পাইল না। কিন্তু তাহার পরীক্ষা
নিমেষে সন্তুষ্ট হইয়া উঠিলেন, কহিলেন “তুমি পারিরে” : কি।
পারিরে কে জানে! তবে আপাততঃ ত সে ‘টিটিকাকা’র দায়
হইতে রক্ষা পাইয়া বাঁচিয়া গেল।
ইহার নাম সাধারণ জ্ঞান! অন্ততঃ প্রশ্নকর্তা সাকেটি
তাহাই বলিতে চাহিয়াছিলেন। অরিন্দম ঠিক জােৰ নাই যে,
কেরাণীগিরির সহিত এইগুলার প্রকৃত সটা কি। মি
এ ত অনেক কিছুই বােঝে না, এবং তাহার না-ধাের
বিশেষ কিছু যায়-আসে না।

हमार विनय তাহার পর একদিন ডাক্তার তাহার চোখ দেখিল, জিভ টানিল, পেট টিপিল, হাট পরীক্ষা করি শেষে জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার প্রপিতামহ কি রােগে মারা গিয়াছিলেন?” অরিন্দম জনিত না, বর্তমান জগতের কেহই সে-সংবাদ জানে না,কিন্তু তাহাতে কিছু আটকায় না; এক পক্ষ যখন ইচ্ছা করিয়া মিথ্যা শুনিতে চাহে, তখন অপরপক্ষের উত্তরদানে বিলম্ব করা ত উচিত নয়ই, বােধ হয় ভদ্রতাসঙ্গতও নয়। —এত কাণ্ডকারখানা করিবার পরেও কেবলমাত্র সহি সুপারিশের জোরেই চাকরীটা জুটয়াছিল,—মাসে পঁয়তাল্লিশ টাকা মাহিয়, সেটিও গেল। t কল্যকার পার্কে-শােনা বক্তৃতাটা মনের মধ্যে ঘােরাফেরা করে। বেঞ্চের উপর দাড়াইয়া লােকটা বলিয়াছিল, “হে তরুণ, আজ সৰ্বস্ব ছেড়ে, সমস্ত লাভের আশা ত্যাগ করে সর্বহারার বেশে পথে বেরিয়ে এস। চারটি করে অন্ন খেয়ে জীবন- ধারণ করাই কি তােমাদের জীবনের চরম সার্থকতা হবে? তিরিশ টাকা মাইনের কেরাণীগিরিই কি তােমাদের জীবনের লক্ষ্য হবে ?-হে তরুণ, হে দেশের ভবিষ্যৎ ভরসাস্থলী যুবকবৃন্দ, হে অনাগত কালের নাগরিক, ওঠ, জাগ,আজ

পথের ডাক কান পেতে শােন,চাকরীর মােহ, দাসত্বের
মােহ, কোন-মে-বেঁচে-থাকবার মােহ, সকল ছাড়িয়ে,
সর্বধ্বংসী মেহের বাধা এড়িয়ে সৰ্ব্বরিক্ততার বেশে বার
;
-না, লােকটা বলিতে পারে বটে,হাত নাড়িয়া, পা
নাড়িয়া, বিচিত্র মুখভঙ্গী করিয়া যেন আগুন ছুটাইয়া দিল।
সভার সমুদয় শৃঙ্খলা-রক্ষার এবং বক্তা-সংগ্রহের প্রধান ভার
ছিল সুবােধের উপর। সে অরিন্দমের কানে কানে কহিল,
দশ টাকা চেয়েছিল এক ঘণ্টার জন্যে,অনেক দরকষাকষি
করে তবে আট টাকায় নিরাজী করা গেছে।
বললে তাতে টাকাটা সার্থক হবে, কি বলিস?”
অরিন্দম মাথা নাড়িয়া সায় দিয়াছিল ; মনে মনে হিসাব
করিয়াছিল, ঘণ্টায় আট টাকা রােজগার হইলে সাড়ে দশটা
হইতে পাঁচটা পর্যন্ত কত হইতে পারে, তিরিশ দিনে গিয়া কত
দাড়ায়,—“সৰ্ব্বরিক্ত, সর্বহারা গােছর কোনও একটা সংখ্যা
বােধ হয় নহে !
কিন্তু খাসা বলিয়াছিল লােকটা!
অরিন্দম জোরে জোরে পা ফেলিয়া ফুটপাথের উপর দিয়া
চলিতে লাগিল। সে তরুণ, তরুণ হইতে হইলে এক, দাড়িও
খরচ করিতে হয় না-মানবজন্ম পরিগ্রহ করিলেই একদিন না
একদিন তরুণ হইতে পারা যায়, যদি না এই জীর্ণ দেহের
মায়াটা তৎপূৰ্বেই ছাড়িয়া যাইতে হয়। অথচ এই তরুণরাই
*
১১

নাকি পৃথিবীর ইতিহাস রচনা করিয়া চলে!
ভাবিতেছিল, সেই ইতিহাস হয়ত সেই বানাইবে। কে জানে!
মনে মনে সে আবৃত্তি করিতে লাগিল, “আমি আমার
কৰ্তব্য করিয়াছি,চাকরী গিয়াছে তাহার জন্য দুঃখ নাই—
কিন্তু জোর পাইল না, কেমন যেন লজ্জা বােধ হইতে লাগিল,-
মনে হইল, বাজে কথা, শুধু ফাকি,গর্ব করিবার মতন কিছু
ঘটে নাই, লজ্জা করিবার মতন ঘটিয়াছে ।
.
চাকরী সুরু করিবার সময় মাতা কহিয়াছিলেন, “কাজ আরম্ভ
কবার আগে বিয়েটা করে নিলে পারতিস, অরু। পঁয়তাল্লিশ
টাকা মাইনের চাকরী করি, একথা শুনলে কেউ ত বেশী টাকা
দিতে চাইবে না, তার চাইতে কলেজ থেকে বেরিয়ে চাকরী
বাকরীর মতলব করছিস্ বললে, ঢের বেশী টাকা পাওয়া যেত।”
কথাটার যুক্তি অরিন্দম অস্বীকার করে নাই। জলের কালা
যতদিন জলে থাকে ততদিন পর্যন্ত এ কথা সকলেই বিশাল
করে যে, সেটা বাড়িতে থাকিরে, এবং বাড়িতে বাড়িতে
সেটা যে কত বড় পৰ্য্য হইতে পারে, সে সম্বন্ধে নার
করিয়া কেহ কিছু বলে না; কিন্তু সেটাকে ভাঙ্গায় টানিয়া
খুলিলেই তাহার অভিনের সম্বনে শেষ কথা বলা হই
আজ-ইহাত সকলেই জানে। কিন্তু শুধু আমি বিবাহ

আপত্তি করিত। বিবাহ সম্বন্ধে সুদৃঢ় কোন মতামত পোষণ
করিত, বলিয়া কে তাহার আপত্তি, তাহা নহে। তাহায়
আপত্তি অনেকটা আপত্তি করিবার জন্ধ, এবং সে বলিতে চাহিত
যে, সে আধুনিক, অতএব নিজের পায়ে ভর দিয়া দাড়াইতে না
পারিলে সে বিবাহ করিবে না।
কিন্তু কোন আপত্তিই আর এবার টিকিল না। এবং পাছে
আবার অরিন্দমের চাকরী জুটিয়া যায়, এই ভাবনায় জননী
অতিশয় শঙ্কিত হইয়া উঠিলেন।
শুভদিনে অরিন্দমের শুভ বিবাহ হইয়া গেল। দুই হাজার
টাকা নগদ এবং গহনা, দানসামগ্রীসহ নববধূ কল্যাণীকে লইয়া
অরিন্দম গৃহে ফিরিল। মাতা আর বিলম্ব করিলেন না ;-নৰ
বধুর গহনা, দানসামগ্রী এবং পণের টাকা সমান দুইভাগে ভাগ
করিয়া, নিজের অবশিষ্ট কন্যা দুইটিকে মাসখানেকের ভিতরেই
দুইটি ডাঙ্গায়-ভােলা কাৎলার হস্তে সমৰ্পণ করিলেন, কিন্তু
কাৎলাদের বােধ হয় হত থাকে না, অতএব গলায় গাথিয়া
দিলেন বলাই ভাল।
হিরের রৌদ্রে ফুটপাথগুল তাতিয়া আশ হইয়া আছে।
গিছ-ঢালা রাস্তার উপর দিয়া থার্ডক্লাশঘােড়র গাল দিলে

হাই নিয়ম
শব্দ হয় না—এই একটা সুবিধা,-কিন্তু যে উত্তপ্ত হাওয়া সেখান
হইতে উঠিতে থাকে, তাহার কাছে তরুণবাহিনীর ভিতরকার
অগ্নি খুব সম্ভব পাত্তা পায় না।
অরিন্দম ফুটপাথ দিয়া হাটিয়া চলিয়াছিল, দ্রুতপদে নহে,
ধীরে ধীরে প্রকাও আফিস-বাড়ী, গােটা পচিশ আফিল
বােধ হয় সেই বাড়ীটার মধ্যে আছে,খুব কম করিয়া ছয় শ’
লােক সেই বাড়ীটায় কাজ করে।-অরিন্দম লিফটে গিয়া চড়িল।
লিফটম্যান তাহার পােষাক পরিচ্ছদের দিকে তাকাইয়া রহিল,
মনে মনে হত ভাবিতেছিল, তাহাকে নামিয়া যাইতে বলিবে
কি না। লােকটার ইতস্ততঃ ভাব দেখিয়া অরিন্দমের কান
পৰ্যন্ত লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল, লিফট, হইতে নামিয়া, সে সিড়ি
দিয়া উপরে উঠিয়া গেল।
দরজার গায়ে পিতলের প্লেটগুলা ঝক ঝক্ করিতেছে,
উর্দিপরা চাপরাস-আঁটা বেয়ারাগুলা চলাফেরা করে,—যেন কত
মন্তবড় এক একজন ব্যক্তি অত্যন্ত ব্যস্ত রহিয়াছেন! ভিতরে
টাইপরাইটার মেসিগুলার খটাস্ খটাস্ শব্দ, দুই একটা দরজায়
বড় বড় ইংরেজী অক্ষরে লেখা,-নাে ভেকেন্সি।
কোনও আফিসে একটা কাজের সন্ধান পাওয়া গিয়াছিল।
অরিন্দম তাহারই দরজার নিকটে গিয়া দাঁড়াইল। টুলের উপর
t
১৪

ইহাই নিয়ন
বসিয়া একটা চাপরাসী ঝিমাইতেছিল, চোখ মেলিয়া সােজা
ইয়া বসিয়া কহিল, কেয়া মাতা?’
পকেট হইতে এক টুকরা কাগজ বাহির করিয়া নিজের নামটা
লিখিয়া দিয়া অরিন্দম বলিল, “বড়বাবুকে দিয়ে দাও।”
কিছুক্ষণ পরে লােকটা ফিরিয়া আসিয়া তাহাকে ভিতরে
যাইতে বলিল।
ভিতরে প্রবেশ করিতে করিতে অরিন্দম মনে মনে বলিতে
থাকে, একদিন আমিও আফিসে কাজ করিয়াছি। ঘণ্টা আমিও
বাজাইতাম, চাপরাশী আমায়ও সেলাম ঠুকিত। আজই আমার
কাপড় জামাগুলায় ঘামের গন্ধ হইয়াছে, এত কালাে হইয়াছে
এইগুলা আজকালই, কিছুদিন আগেও এমনটি ছিল না। কিন্তু
মনটা আবার গ্লানিতে ভরিয়া উঠে।
—“কি চাই আপনার ?”
গুটি দশেক লােক বড়বাবুর টেবলের আশপাশে দাঁড়াইয়া-
ছিল। তাহাদের দিকে চাহিয়া অরিন্দমের মনে হইতে লাগিল
যেন আয়নাতে নিজের মুখ দেখিতেছে। প্রত্যেক ব্যক্তির মুখে
এবং চেহারায় নিদারুণ অসহায়তা এবং কাতরতার এমন একটা
ছাপ মারা ছিল যে, লক্ষ লােকের মধ্য হইতেও তাহাদিগকে
চিনিয়া লইতে বিলম্ব হয় না।
অরিন্দম বলিল, “আপনাদের আফিসে চাকরী খালি আছে
শুনলাম,-আমি সেইজন্যেই একটু চেষ্টা করিতে চাই। আমি
একজন গ্রাজুয়েট -আগে চাকরী করতাম এই আমার সব

টেষ্টিমােনিয়াল”—বলিয়া সে পকেট হইতে একতাড়া কাগজ
বাহির করিল।
সেইগুলার দিকে চাহিয়া বড়বাবু চোখের চশমাটা খুলিয়া
ফেলিলেন, কেঁাচার খুটটা দিয়া কঁাচগুলা পরিষ্কার করিতে
করিতে কহিলেন, “কোখেকে যে এসৱ উড়ো খবর আপনারা
পান, তা আপনারাই জানেন।-আজ সকাল থেকে আরম্ভ করে
কমসেকম একশ’ লােক আমাকে এসে বিরক্ত করেছে,
আফিসে ঢুকে অবধি আজ একবার কলম ছুতে পারিনি। না
মশাই, চাকরীটারী আমাদের এখানে খালি নেই। চাকরীর
বাজার আজকাল এত সস্তা নয়। কত বি-এ, এম্-এ পাসকরা
লােক রাস্তায় রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ায় একটা যা-তা
কাজের জন্যে।-আচ্ছা আপনারা তাহলে এখন যেতে পারেন।”
অরিন্দম এবং অন্য লােকগুলা বাহির হইয়া আসিল,-
পিছনে বড়বাবু হাকিয়া বলিলেন, “বেয়ারা দরওয়াজামে ‘নাে
তেকেলি বাের্ড লাগাও।”
তাহারা সিঁড়ি দিয়া নীচে নামিল। সময়ের ভাবনা নাই,
অষ্ট পড়িয়া আছে, কিসে খরচ করিবে ভাবিয়া পায় না।
খানিকক্ষণ পাঁচতলা পর্যন্ত নাম ওঠা করিলে তবু যাহ’ক
একটা কাজের সন্ধান মেলে,—লিফটে চড়িয়া তাড়াহুড়া করা
'
বড়বাবু উঠিয়া দাঁড়াইলেন ; ঘণ্টা বাজাইয়া বেয়ারাকে
ভাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, লােকগুলি চলিয়া গিয়াছে কি না।

।
তাহার পরে উঠিয়া আফিসের ছােট অংশীদার ব্লাডলী সাহেবের
ঘরে গেলেন। কহিলেন, “স্যার, সকালবেলা আপনাকে আমার
জামাইটির কথা বলেছি,খাসা ছেলে,-আমাদের অফিসের জন্যে
যেমনটি দরকার ঠিক তেমনি। গ্র্যাজুয়েট দিয়ে আমাদের কোন
দরকার নেই, এটা ত কলেজ নয়, আফিস।—আমার জামাইটি
পা-টা কিছু নয়, কিন্তু প্রাকটিক্যাল নলেজ অসাধারণ।
আমি ওকে ঠিক তৈরি করে নেব, সাহেব। আপনি ওর
এ্যাপয়েন্টমেন্ট, লেটারটা আমায় দিয়ে দিন।”
বাড়লী কহিল, “বাবু, মিষ্টার হিগ নসের সঙ্গে পরামর্শ
করে কাল তােমায় চিঠি দেব। ভাবনা কোরাে না,
তােমার জামাই ছাড়া আর কাকেও এ কাজ দেওয়া হবে
না ।”
বড়বাবু ব্র্যাড়ীকে বুঝাইতে লাগিল, লােকের অভাবে
তাহার অসুবিধা হইতেছে,—অনর্থক বিলম্বে প্রয়ােজন কি ?
মিষ্টার ব্র্যান্ডলীর কথার উপরে মিষ্টার, হিগস কোনদিনই
কিছু বলেন না, আর এই তুচ্ছ ব্যাপারেই কি বলিবেন ?
মিষ্টার হিগ্‌ন আজ আফিসে থাকিলে বড়বাবু নিজেই: উঁহাকে
বলিতেন, এবং যখন সাক্ষাৎ হইবে তখন তাঁহাকে সমস্ত কথা
বুঝাইয়া বলিবার দায়িত্বও তিনি লইতেছেন।
ব্র্যাড়লী হাসিতে লাগিল, একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার
লিখিয়া দিল ;-বড়বাৰু সেটা পকেটে পুরিয়া বাহির হইয়া ,
আসিল।
১৭

অরিন্দম রাস্তা দিয়া টিয়া চলে। বড় বড় বাড়ী মাথা উচু করিয়া দাড়াইয়া আছে, হাজার হাজার লােক ওইখানে কাজ করে,-উইদের মধ্যে একজন হইতে পারিলে সে আজ খুশী হয়। পৃথিবীর ইতিহাস বানানােতে নহে, বিশ্বজয়ের অভিযানে নহে, একখানা ছারপােকাসঙ্কুল কেদারায় বসিয়া ঝুকিয়া পড়িয়া একটা টেবলের উপর খান- কতক কাগজ রাখিয়া কয়েকটা অপরে-বলা কথা নকল করিয়া যাওয়া, একটা লাল ফিতা দিয়া সেগুলাকে বাঁধিয়া রাখা, ইহাতেই সে তাহার জীবনের সর্বোত্তম সুখের স্বাদ লাভ করিতে পারে ; ক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষা তৃপ্ত হয় এত অল্প পাইলেই। কিন্তু অরিন্দম উহাদের একজনও নহে,—চাপরাসী বেয়ারাটি পৰ্যন্ত না। ক্রিং করিয়া ঘণ্টা বাজাইয়া কেহ তাহাকে ডাকিলে হয়ত খুসী হইয়া উঠিবে,—কিন্তু সেটুকুও কেহ করে না। অরিন্দম ভাবিতে লাগিল। সমস্ত নীল আকাশটার মাঝে মাঝে সাদা মেঘের টুকরাগুলা, কোথাও বড়, কোথাও ঘােট,-তাহারই মধ্য হইতে সূর্যের আলােটা ঠিকরাইয়া আসিতেছে,-চেয়ারে-বসা উপরে নহে,-অরিন্দমের গায়ে। অযাচিত করুণা, অনাবশ্যক “উগ্রতা, প্রয়ােজনাতিরিক্ত ব্যয়। মনে হইল, একবার ডাক দিয়া বলে, তেজ একটু কমাও, বেশ দিন বাঁচিৰে—”

সম্মুখে একটা ক্ষোঙ্কার, তাহারই মাঝখানে একটা কীৰি।
স্কোয়ারের ভিতরকার গাছগুলার তলায় ছায়া পড়িয়াছে।
অরিন্দম সেইখানে গিয়া বসিল। দীঘির জলটা পরিষ্কার,
চাহিয়া থাকিলে ৰােধ হয় তলা পর্যন্ত দেখা যায়-অরিন্দম,
নিজের জামাটার দিকে চাহিল, চতুর্দিকের পরিচ্ছন্ন সুতার
মাঝখানে নিজের জামার মলিনতা এবং দুর্গন্ধ তাহাকে পীড়িত
করিয়া তুলিল। সেটাকে খুলিয়া ফেলিয়া জড়াইয়া গােল
রয়া রাখিল, তাহার পর তাহার উপর মাথা রাখিয়া
ইয়া পড়িল।
-কিছুদূরের গির্জার ঘড়িতে দুইটার ঘণ্টা শােনা যায়।
মােটরের হর্ণের চীৎকার, ট্রামের শব্দ হঠাৎ এক সময় বাজে,
কমে।
ভিতরে টাকাগুলা ঝন্ঝ
করিতেছে,-কাহাকেও চুড়িয়া মারিলে মাথা ফুটা হইয়া যাইবে।
সেইগুলা লইয়া ছিনিমিনি খেলা চলিতেছে ওই বাড়ীটার
ভিতর। অরিন্দম মনে মনে হিসাব করে, কত টাকা আছে এই
চারিপাশের ব্যাঙ্কগুলিতে, কত খরচ হইয়াছে এই পাচতলা, ওই
ছয়তলা, ওখানকার শেষের সাততলা বাড়ীটা বানাইতে, কত
টাকার সম্পত্তি আছে এই জায়গার মধ্যে। সুক্ষ্ম হিসাব,
গাণিতিক ব্যায়াম,—বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরকালটা
পূরা নম্বর পাইয়া আসিয়াছে!
-অরিন্দম একবার উঠিয়া বসিল, জামাটার পকেট হাত ভাইয়া
বাহির হইল কতকগুলা প্রশংসাপত্র,-মূল্যবান জিনিষ। শেষে
এক সময়
ব্যাঙ্কের

বাহির হইল একটা আধলা। অরিন্দম সেটাকে পুনরায় পকেটে
পুরিয়া রাখিল, টেটিমােনিয়ালগুলা যত্ন করিয়া ভাজ করিল,
তাহার পর আবার শুইয়া পড়িল।
-গির্জার ঘড়িটায় কোয়ার্টার বাজে, আঁধঘণ্টা বাজে,-দেহ
মন ক্লান্তিতে ভরিয়া আসে,-চোখের পাতা দুইটা আপনা-
আপনি বন্ধ হইয়া আসিতে চায়।
দুপুর বেলা অরিন্দমের ভাগিনেয়ী মায়া বলিতেছিল,“মামিমা,
আজকে মামা নিশ্চয়ই একটা কিছু ঠিক করে’ আসবেন, নয়?”
কল্যাণী অন্যমনস্কভাবে জবাব দিল, “হ্যা, ইত বলেন।”
বৃষ্টি নামিয়াছিল। গির্জার ঘড়িতে পাঁচটা বাজিয়া গেছে।
অরিন্দম জামাটা গায়ে দিয়া একটা আফিসের সিড়ির উপরে
উঠিয়া দাড়াইল। কেরাণীগুলা ভিড় করিয়া পাড়াইয়াছে,
রাস্তার ধারে লাইনবন্দী মােটর গাড়ী। এক একজন বড়
কর্মচারী, বড় সাহেব জুতা মমম্ করিয়া আসেন, সন্ত্রস্ত
কেরাণীকুল রাস্তা ছাড়িয়া দেয়, চাপরাশী মাথায় ছাতা ধরে,
আড়ীর দরজা খুলিয়া দেয়, মােড়ের মাথায় পুলিশটা তাহার
এতে ফু দেয়, গাড়ী ছাড়ে।
২

ইহাই নিয়ম
অরিন্দমের চোখের সামনে সমস্তটা যেন বায়স্কোপের ছবির
মতন ভাসিতে থাকে। মনে করে, আফিসের সিড়ির উপরে
গড়াইয়াছি,—পরিচিত লােকে দেখিলে বুঝিবে যে, চাকরী .
করিয়া বাহির হইতেছি!-যাহাদের সময়ের মূল্য আছে,
মাসকাবারী মাহিনার ভরসা আছে, তাহাদের সঙ্গে গা ঘেসা-
ঘেসি করিয়া আছি,কেহ চলিয়া যাইতে বলিতেছে না,
দাড়াইয়া থাকিতে বারণ করিতেছে না,—“চাকরীর বাজার বড়
আক্রা,”—এ উপদেশ কেহ দেয় না,শুভ লক্ষণ!
দুইজন কেরাণী আলাপ করিতেছিল। শীর্ণ, মলিন তাহাদের
চেহারা, ছেড়া জমা, বগলে তালি-দেওয়া ছাতা।
প্রথম জন কহিল, “যত বৃষ্টি কি বাবা, বাড়ী ফেরবার
বেলা!—আফিসে আসবার সময় কি একবার জোর করে নামতে
পার না,সেই ছুতোয় আধঘণ্টা ঘুমিয়ে বাঁচি যে তাহ'লে।”
অন্যজন বলিল, “অমন প্রার্থনা ঠাট্টার ছলেও কোরােনা
হে, কেউ শুনলে হয়ত ঘুমােবার জন্যে অনন্ত অবসরই মিলে
খাবে।”
প্রথম লােকটা ছাতাটি শক্ত করিয়া বগলে চাপিয়া ধরি,
পথ-চলতি অসংখ্য গাড়ীগুলার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চাহিয়া
বলিল, “আমার গাড়ীটা হস করে’ আসে,চট্ করোেতাটা
নিয়ে উঠে পড়ি-চোখ বুজে বাড়ী গিয়ে হাজির হই, বৃষ্টি ত
বৃষ্টি,-ছেঃ!”
দ্বিতীয় লােকটি হাসি, নীরসকষ্ঠ কহিল, “গাড়ী

বই নিয়ম
এখানেও কড়িকাঠ, বাড়ীতেও কড়িকাঠ! গাড়ী গালে উত্তর,
দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম বঙ্গের বন্যা, পদ্মার ভাঙ্গ, এটল্যাক
ওশানের ঢেউ এই সবই গ্রাহ্য করতাম না, ত বৃষ্টি!”
অরিন্দম চাহিয়া রহিল। ইহারা গাড়ী চাহিতেছে!
ইহারা খাইতে পায়, পেট ভরিয়া নহে--কিন্তু তবু পায়, অরিন্দম
আজকাল তাহাও পায় না, কিন্তু যদি পাইত তাহা হইলে হয়ত
একখানা গাড়ী চাহিত। হুস্ করিয়া আসে, চট্ করিয়া
সে উঠিয়া পড়ে ঘেঁড়া ছাতাটা বগলে করিয়া,—কিন্তু বগলে
করিবার মতন একটা ছেড়া ছাতাও নাই !
অরিন্দম হাসিতে লাগিল। পাশের দুই একটা লােককে
বিতি চোখে তাহার পানে চাহিতে দেখিয়া সে আর সেখানে
গড়াইল না।
তখন বৃষ্টি থামিয়া গেছে,-তাহার আন্তা-চলা আবার আজ
সন্তদিন কিছু খাওয়া হয় নাই।-পকেটে হাত পূরিঙ্গ
দিয়া, আখলাটাকে শক্ত করিয়া রিয়া সে নিজের মনে বলি,
গ্রাও হােটেল, ব্রিট হােটেল, কাৰে সেন্ট্রাল, গ্রেট
ইষ্টার্ণ হোটেল-কোথায় যাই? নিউমার্কেটে যাব? কি
কি কি এই আধটা বিৰে? খাবার। তাই সাহেবের ঝড়ী।

ইনি ভিক্টোরিয়া মেমােরিয়াল? ইণ্ডিয়ান মিউজিয়াম ? সে আবার হাসিতে লাগিল। একটা উড়িয়ার দােকানের সম্মুখে আসিয়া অরিন্দম আঁড়াইল, আধ-পয়সার মুড়ি কিনিয়া গােগ্রাসে খাইতে আরম্ভ করিল। মুড়িতে যে এত রস থাকিতে পারে, সে গােপন খবর ধন- কুবেররা এখন পর্যন্ত টের পান নাই। অরিন্দম যখন ফুটপাথের উপর দাঁড়াইয়া মুড়ি খাইতে ব্য, তখন একটা পাগল রাস্তার মাঝখান দিয়া চলিয়া যায়, দুইটা হাত, খুব জোরে জোরে নাড়িয়া বলিতে বলিতে যায়, “কলকাতাতেও টাকা দিয়ে ভাত, রাওলপিণ্ডিতেও টাকা দিয়ে ভাত, তবে কিসের মুড়ি খাওয়া ভুলিয়া অরিন্দম একদৃষ্টে সেই দিকে তাকাইয়া রহিল। লােকটা দ্রুতপদে চলিতেছিল, শীঘ্রই দূরে মিলাইয়া গেল,-ময়লা খদ্দরের কোট গায়ে, সম্মুখে-ৰুকিয়া-পড়া দেহ। রাস্তার ধারে ধারে প্রাসাদোপম বাড়ী, তাহাদের সৌন্দৰ্য- বৃদ্ধি করিবার জন্য সম্মুখে ছোট বড় বাগান, কৃত্রিম প্রৰণ, মর্মর মূর্তি, প্রকাণ্ড লােহার সিংহ, তাহারই সথে বন্দুক ঘাড়ে করিয়া সিপাহী সান্ত্রীর দল পাহারায় নিযুক্ত থাকে। . ধরে ধরে খেত পাথরের মেঝে, সুচিত্রিত দেওয়াল, বিচিত্র

शरमिंद्रम
বর্ণের ছাদ, মোজেকের সিড়ি, বহুমুল্যবান ছবি,-একটার দামে
হয়ত একশতটা লােক ছয়মাসের জন্য প্রতিপালিত হইতে
পারে! আসবাবগুল পালিশের ঔজ্জ্বল্যে ঝকঝক করিতেছে।
বিদ্যুতের আলােকগুলি অদ্ভুত, তাহাদের আধারগুলি অদ্ভুত,
চতুর্দিকে তাকাইলে চমক লাগে-বিলাসের আশ্চৰ্য্য সম্ভার ।
বাহিরে বাহিরে ক্রন্দন, একটু সঁাড়াইবার স্থানের জন্য
মারামারি, দুই মুঠা অন্নের জন্য হাহাকার। দিনান্তে কতজনের
ভাবনা ভাবিতে হয়। মনে হয়, পয়সা দিয়া ভাত এখানেও,
রালপিণ্ডিতেও, তবে কিসের?
বাকী ধারণাটা পরিষ্কার নহে, আধলার জন্য কাকুতি যেখানে,
সেখানে পয়সার ধারণা পরিষ্কার হয় না।
গরম দেশ,—বস্ত্রের বাহুল্য কমিয়া আসিতেছে, অন্নের
ভাবনা কমিয়া আসিতেছে, মােক্ষলাভের পথ পরিষ্কার হইয়া
আসিতেছে।
ওই বাড়ীগুলা, ওই গাড়ীগুলা, ওই সিপাহী সান্ত্ৰীগুলার
পানে চাহিয়া অরিন্দমের চোখ দুইটা বােধ হয় অকারণেই
অলিতে লাগিল।
অনাবশ্যকভাবে হাঁটি হাঁটিয়া অরিন্দম রাত্রি নয়টার সময়
বাড়ী ফিরিল।
বাড়ীতে লােকের সংখ্যা কম নহে; ঘােট ঘােট ছেলে
২৪

মেয়েও কয়েকটি আছে। তাহাদের ভিতরে কোনটাই ঠিকমত খাইতে পায় না। শুধু গলার কাছে প্রাণটুকু ধুকধুক করে বলিয়াই যেন তাহার জগৎ-সংসারকে কৃতার্থ করিয়াছে, এনি তাহাদের প্রত্যেকটির চেহারা। কিন্তু কল্যাণীর শিক্ষায় বাড়ীর সবগুলি ছেলেমেয়েই এতদুর সংযত হইয়া উঠিয়াছে যে, সংসারের ক্ষুদ্রতম হইতে বৃহত্তম শিশুটি পৰ্যন্ত কোন অভাব অভিযােগের কথা অরিন্দমের কানে তােলে ; এবং এমন কি সে যতক্ষণ গৃহে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যথা- সম্ভব চুপ করিয়া হাসিমুখে খেলা করিতে চেষ্টা করে। অরিন্দম বিস্মিত হয়,মনে মনে যে ব্যথা অনুভব করে, তাহার কোন ভাষ নাই। অরিন্দম গৃহে ফিরিতেই মায়া আসিয়া কাছে দাঁড়াইল। মাতুলের মুখের দিকে চাহিয়া কোন প্রশ্ন না জিজ্ঞাসা করিয়াই কহিল, “মিছরীর সরবৎ করে রেখেছিলাম মামা, তুমি বিকেল- বেলা ফিরবে বলে।কাপড়-চোপড় ছেড়ে মুখ হাত ধুয়ে এস, এনে দিই।” মায়া বাহির হইয়া গেল। তাহার গমন-পথের দিকে চোখ রাখিয়া অরিন্দমের এতক্ষণের শুষ আঁখি দুইটা জলে ভরিয়া উঠিল। তাহার বড়দি’ এষার একমাত্র কন্যা। বিবাহের তিন বৎসর পরে শিশু মায়াকে কোলে লইয়া তিনি বিধবার বেশে পিতৃগৃহে ফিরিয়া আসেন। তাহার পর আর একবারও শশুর- বাড়ী যাওয়া ঘটিয়া উঠে নাই। -

শৈশব হইতেই মায়া তাহার ছােটমামার স্নেহের একটা বড়
অংশ জুড়িয়া আছে। অরিন্দমের মতলব ছিল, সে খুব লেখা-
পড়া শিখিবে, অন্তরের মাধুৰ্য্যে স্বভাবের উৎকর্বে সকলের স্নেহ
আকর্ষণ করিবে। নিজের মতে সে তাহাকে গড়িয়া তুলিয়াছিল।
পয়সার অভাবে স্কুলে পাঠাইতে পারে নাই, নিজেই অবসর মত
ঘরে পড়াইয়াছে। তাহার জন্য মনে মনে বরও ঠিক করিয়া
রাখিয়াছিল—খুব কম করিয়া একজন সত্যার বিন অধ্যাপক,
না হয় সমকেল ব্যারিষ্টার। ইহার পানে চাহিয়া তাই চোখে
এল আসে। অ'জ হয়ত খানিকটা সাগু খাইয়া কাটাইয়াছে,
কিংবা তাহাকে যেটুকু দেওয়া হইয়াছিল সেটুকুও কল্যাণীকে
গোপন করিয়া ছোটদের দলের মধ্যে ভাগ করিয়া দিয়াছে।
কিন্তু
মায়া ফিরিয়া আসিল। হাতের একটা বাটীতে দুইটা
ইয়ের শোয়া, এবং গেলাসে মিছরীয় সরবৎ। জিনিষ দুইটা
মেঝেতে রাখিয়া, অরিন্দমকে একভাবে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া
গালে হাত দিয়া মায়া বলিল, “ওমা জামাটা পৰ্যত এখনও
ছাড়নি! কি ছেলে বাপু তুমি! ওঠ, ওঠ, যাও শীগগির করে’
হাত মুখ ধুয়ে এস।” বলিয়া তাহার হাত ধরিয়া একপ্রকার
জোর করিয়াই তাহাকে টানিয়া তুলিল।
অরিন্দম জিজ্ঞাসা করিল, “মায়া, দিদি বৌদি কোথায়
রে?-তাের ছােট মামীমাই বা কোথায় গেল?"
“সৰ ওঘরে” বলিয়া মায়া খিলখিল করিয়া হাসিল।

অরিন্দম তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল,-চোখের কোণে
কালি পড়িয়াছে, সমস্ত মুখখানা অসম্ভব রকমের বক্তলেশশূন্য।
অরিন্দম ভাবে, সেই মায়া এখন কি হইয়া গেছে। কিন্তু তবু
মুখের হাসিটুকু ঠিক সেই রকমই আছে!—আশ্চৰ্য্য!
‘ওর কথাটার মানে অতীতের রঙ্কন এবং বর্তমানে
শয়ন গৃহ। দৰ্মার বেড়া, খােলার ছাদ,-আগে সেইখানেই
রান্না হইত, কিন্তু আল্ড মাস দুই হইল ও-বালাই আর নাই,
বড়-জোর গাছতলা হইতে কুড়াইয়া আনা গােটাকতক পাতা
সিদ্ধ, নয়ত বার্লির রাজভােগ, অথবা মুড়ি,-তজ্জন্য সেটাকেও
আজকাল শয়নঘরস্বরূপ ব্যবহার করা হইতেছে।
অরিন্দমের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মায়া জড়াইয়া
রহিল, শেষে বাহির হইয়া গেল।
ঘরের মধ্যে একটা মাটির প্রদীপ জ্বলিতেছিল,-একটা
লম্বা দড়িতে বাড়ীযুদ্ধ সমস্ত লােকের কাপড় জামা টাঙান।
একশ’টা ফুটা, একশ’টা শেলাই হয়ত প্রত্যেকটার ভিতর
হইতে বাহির হইবে; ছয় মাসের মধ্যে, ধােপাবাড়ী ত দূরে
কথা, সাবানের মুখও দেখিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। কিন্তু
হৰু সেগুলার পানে চাহিলে তাহাদিগকে দুর্গন্ধবিহীন করিবার
একটা বিপুল প্রয়াসের পরিচয় পাওয়া যায়। ঘরের মেঝেতে
গুটি তিনচার ছিয় মাদুর, এক কোণে একটা পিড়ির উপরে
আনকয়েক ই এ খাতা গুছন, আর কোনও কিছু
নাই।
১৭

।
ইনি
মায়া একখানা ছেড়া ইংরেজী বই হাতে ফিরিয়া আসিল।
মাতুলকে প্রদীপের নিকট টানিয়া লইয়া গিয়া বইয়ের একখানা
পাতা খুলিয়া কহিল, “দেখ তােমার ভাগ্নের কীর্তি !”
ইতিহাসের বই, মাঝে মাঝে ছবিও আছে, প্রত্যেক
ছবির নীচে অরিন্দমের সেজদি উষার দ্বিতীয় পুত্ৰ শ্ৰীমান
পৃথ্বীশ ওরফে বুলু'র একটি করিয়া টিপ্পনী লেখা আছে।
বুলুর জীবনের উপর দিয়া মাত্র আটটি বর্ষা কাটিয়াছে ;
কিন্তু তাই বলিয়া রসগ্রহণের ক্ষমতা যে তাহার কিছুমাত্র কম,
একথা মনে করিবার কোন কারণ নাই।
একজন নাবিকের ছবির তলায় লিখিয়াছে, “তােমার টুপি
নাই?”–একজন সৈনিকের মর্মমূর্তর তলায় লেখা, “তােমার
বন্দুক কই ?”—মাঠের মাঝে একটা তঁাবুর ছবি; কিছুদূরে
কয়েকটা সৈনিক মিলিয়া কি যেন একটা রান্না করিতেছে,
অল্পদূরে একজন লােক একা বসিয়া।তাহার ভাবী দেখিয়া,
সে যে কোন পদস্থ ব্যক্তি, এ ধারণা বুলুর মনেও হইয়াছে,
ভাহার নীচে সে লিখিয়াছে, “সেনাপতি, ভাত খাইবে বলিয়া
তােমার জিভ দিয়া জল পড়িতেছে?”
অরিন্দম বাহিরের বারাটুকুর নিবিড় অন্ধকারের পানে
তাকাইয়া রহিল,-মনে মনে হিসাব করিতে লাগিল, বুলু আজ
ভাত খায় না কতদিন ?
পাতাটা উলটাইয়া মায়া হাসিতে লাগিল, কহিল,
“মামা, ' দেখ?*--রাজার ছবি-সিংহাসনে উপবিষ্ট, হাতে
২৮

হযই নিয়ম',
রাজদণ্ড, মাথায় মুকুট,বুলু তাহার তলায় অভিমত প্রকাশ
করিয়াছে, “রাজার পােষাক আর কিছুদিন পরে আমাকে দিয়া
দিবে।”
–অরিন্দমের চোখের পাতা দুইটা আবার ভিজিয়া উঠিল।
।
জানে!
অনেকগুলি লােক,স্ত্রী, দুটি বড় বােন, বিধবা বৌদিদি,
মায়া
এবং
আরও
অনেকগুলা কাচ্চাবাচ্চা। অরিন্দমের
বিবাহের মাস চারেক পরেই জননী মারা গিয়াছিলেন।
বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলেন, অনাবশ্যক বােঝ, অবিবেচক কুপােষের
দল,-অবশ্য তাহারা স্ত্রীকে বাদ দিয়াই বলেন।
অরিন্দম মনে মনে হাসে, পােয় ! কে কার পােয় কে
মাল সেলাইয়ের
পয়সায়, নানারকম জামা এবং
অন্যান্য সেলাই প্রভৃতির মূল্যে কল্যাণী, মায়া এবং তাহার
বৌদি, দিদিরা যে কেমন করিয়া তাহাকে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে
সে খবর তাহাদের শত যত্ন সত্ত্বেও অরিন্দমের অজ্ঞাত ছিল না, :
এবং বােধ করি সেইজন্যই দুঃখেরও তাহার সীমা ছিল না।
ইহারা যদি নিত্য নিয়ত অভাব অভিযােগের কথা শুনাইতে
বসিত, তাহা হইলে সে সকল কথা একান্ত সত্য হওয়া সত্বেও
হয়ত অরিন্দমের মনে বিরক্তির কারণ ঘটাইত। কিন্তু যে-
অভাবের কথা নিজেদের বুকের রক্ত দিয়া তাহারা তাহার
২১

হাইলিশ
চোখের আড়ালে রাখিতে চাহিত, তাহাই যখন তাহাদের
অনিচ্ছাতে এবং অজ্ঞাতসারে তাহার চোখে পড়িত তখন
তাহার বেদনার অবধি থাকিত না। তাই অরিন্দম সর্বদা
ইহাদের কথা মনে করিয়া শ্রদ্ধাবনতচিত্তে নীরব হইয়া
-বাহিরের মানুষের হৃদয়ের দুয়ার আজ বন্ধ।-সহস্র
প্রকারের ফন্দী-ফিকির, অসংখ্য রকমের চালবাজীতে আজ
মানুষের মস্তিষ্ক ভরিয়া আছে। আদবকায়দা এবং বাহিরের
জাঁকজমক অতিক্রম করিয়া কাহারও কাছে গিয়া পৌছানই এক
বিরাট ব্যাপার, কিন্তু তাহার পরেও তাহার সাড়া মেলে না।
বহু মিনতির শেষে যদি বা ঘরের দরজা পার হইয়া ঘরে ঢােকা
যায়, তাহা হইলেও অন্তঃকরণের নিকটে গিয়া সভয়ে পিছাইয়া
আসা ছাড়া গত্যন্তর নাই।
অরিন্দম কোন দিকে চাহিয়া কোন পথই যেন আর খােলা
দেখিতে পায় না।
ট
আবার দিবা প্রিহর-বড় রাস্তার ফুটপাথ,একটা কলের
কাছে গিয়া অরিন্দম জল খাইবার চেষ্টা করিল,কিন্তু একফোটা

*,
p
ইহাইলিয়ন
এলও কলটার ভিতর হইতে বাহির হইল না। সূর্যের দিকে
চাহিয়া মনে হইল, বেলা তিনটার বেশী ছাড়া কম হইবে না-
কিন্তু তবুও জলের দেখা নাই!-কৰ্তব্যপরায়ণ মিউনিসিপ্যালিটি।
সম্মুখে একটা ঘড়ির দোকান,-অরিন্দম সেখানে একবার
ঘড়ি দেখিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু সেখানকার ঘড়িতে একটা
হইতে আরম্ভ করিয়া বারোটা পর্যন্ত সমস্ত কিছুই বাজিতে-
ছিল,—অতএব বেলা টের পাওয়া গেল না।
অরিন্দম জলের কলটার কাছে দাড়াইয়া, আর একবার
সেটাকে খুলিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু ফল পূৰ্ব্বাপেক্ষা ভাল
হইল না।-কলট। বােধ হয় খারাপ, কিংবা হয়ত আসল পাইপের
সহিত যােগ করা নাই,—কিছুই ঠিক করিয়া বলা যায় না।
কন্তব্যপরায়ণ মিউনিসিপ্যালিটি!-
তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিয়া যাইতেছে। একবার টেক
গিলিয়া গলাটা ভিজাইয়া লইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু বিশেষ
কোন উপকার হইল না।—অরিন্দম আবার চলিতে থাকে।
রাস্তার উপরেই একটা প্রকাণ্ড বাড়ী,সেইটার দিকে
তাকাইয়া সে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় স্তম্ভিত হইয়া রহিল। বাহিরের ,
একটা ঘরের রাস্তার দিকের জানালাগুলা খােলা ছিল, তাহার
মধ্য দিয়া ঘরের ভিতরের সমস্ত জিনিষই চোখে পড়ে।
ঘরটা অতিরিক্ত আসবাবপত্রে পরিপূর্ণ,-মাঝখানে একটা
গােল শ্বেতপাথরের টেবল, তাহার উপৱে প্লেট, ডিস,
গেলাস এবং কাটা চামচ ইত্যাদি ছড়ান অৰয়ায় রহিয়াছে,

বই নিয়ম
সেখানে কিংপূর্বে ভােজনের সুস্পষ্ট চিহ্নসকল বিদ্যমান।
উপরে বৈদ্যুতিক পাখাটা পুরা জোরে ঘুরিতেছে,—ঘরে একটাও
লােক নাই।
চাহিয়া চাহিয়া অরিন্দম মুগ্ধ হইয়া গেল। তাহার
বারেবারেই মনে হইতে লাগিল, ইহাদের ষােড়শােপচার ভােজনে
এতগুলা টাকা খরচ হইয়া গেছে, এখন অনাবশ্যকভাবে
পাখাটা ঘুরিতেছে !-খুব সম্ভব ভ্রমক্রমে কেহ বন্ধ করিয়া যায়
নাই।
ইহাদের ব্যয়বাহুল্য এবং বেহিসাবের বহর দেখিয়া অরিন্দম
অত্যন্ত অস্বস্তি বােধ করিতে লাগিল। সে ভাবিল, ফটক ত
খােলাই রহিয়াছে, সােজাজি প্রবেশ করিয়া ওই-ঘরের পাখাটা
বন্ধ করিয়া দিয়া আসিলে কেমন হয়! তাহার মনে হইল,
সেটাকে থামাইতে না পারিলে যেন সে বাঁচিবে না!—এত
অমিতব্যয়িতা অসহ!
কিন্তু পাখাটা তখনও ঘুরিতেছে। সেইটার দিকে চাহিয়া
চাহিয়া অরিন্দমের যেন নেশা লাগে,—শত ইচ্ছা সত্ত্বেও সেখান
হইতে সে নড়িতে পারে না,শুধু ভাবে, অনর্থক টাকাগুলা
নষ্ট করা,-মাসের শেষে একটা মােটা টাকার বিল নিশ্চয়ই
হইবে!

অন্তরে বাহিরে
বাহিরে
সাইবাের্ড-ওয়ালাটাকে সাইনবাের্ডটা লিখিতে দেওয়ার
সময় অনেক চিন্তা করিয়াছি। লােকটা অক্ষর-পিছু চার চারটা
পয়সা করিয়া চার্জ করিয়াছে। নিজের নামটা তাই অনেক
ইতস্ততঃ করিয়া বাদ দিয়াছি। কম পয়সায় নাম লিখান যাইবে,
এমন নামও পিতামাতা রাখেন নাই, কুলকুণ্ডলিনীপ্রসাদ
বন্দ্যোপাধ্যায়,—ইহার উপরে বাংলায় স্বত্বাধিকারী না লিখিয়া,
ইংরেজী কেতায় ‘প্রােঃ লিখিলে মােটমাট দাড়ায় ষােলাটা
অক্ষর, তাহার সহিত যদি যােগ করি M. A., তবে হয়
আঠাৱােটা, যদি করি এম্-এ, তবে হয় উনিশ। সর্বশেষে,
যদি নিজেকে প্রীমণ্ডিত করি, তাহা হইলে গিয়া দাঁড়ায়

কুড়িটাতে। এই সকলই বাদ দিয়াছি, পাচলিক আশা
পয়সা বাঁচিয়াছে।
মােহনলাল সাহা লেন, আর পিন্ট, বসু স্ট্রীট, এই দুইটি
আটহাত চওড়া গলির মােড়ে, যে-কোনও চক্ষুম্মান ব্যক্তিই
‘দ্য গ্রেট ডিফারেন্‌শ্যাল অল্পসূর্ণা ষ্টোস’-এর সাইনবাের্ড দেখিতে
পাইবেন। চাল, ডাল, তেল, ঘি হইতে আরম্ভ করিয়া কাগজ,
কলম, দোয়াত, পেন্সিল, হেজলিন, পমেড, পাউরুটি, বিস্কিট,
লেমনেড, বিড়ি, সিগারেট-সকলই পাওয়া যায়।
যদি কিছু
না মেলে, তবে পূর্বাহ্নে সংবাদ দিলে যত্বের সহিত মাল
সরবরাহ করিয়া থাকি, ভেজাল দিই না একটুও।—পরীক্ষা
প্রার্থনীয়।
-খােলার ঘর, মাসে ছয় টাকা করিয়া ভাড়া। সামনে
খোলা নর্দমা। কাদার উপর দিয়া ভাতের ফ্যান, আঁস্তাকুড়ের
আবর্জনা গড়াইয়া চলে। একখানা পুরু তা নর্দমার এধার
হইতে ধার অবধি ফেলা আছে। কিছু দূরে একটা জলের
কল, সকাল হইতে বলা দশটা পর্যন্ত সেখানে অবিশ্রান্ত ভিড়,
কোলাহল এবং গালাগালির বিরাম নাই। চারিদিকে খােলার
সকালৰেলা, সবেমাত্র ঘুম হইতে উঠিয়া, অন্নপূর্ণা ষ্টোল’-এয়
খপ খুলিয়া গাজলের ছিটা দিয়াছি, এমন সময় সহৰে
৩৪

আসিয়া হাত কচলাতে কচলাইতে হাসিমুখে কহিল, এতাে
পেয়াম দাঠাকুর, শরীল গতিক ভালাে ত?”
উপরেয়-তাকে-রাখা একটা লাল-সাদা রং করা গণেশ
মূর্তিকে নমস্কার করিতে করিতে জানিলাম যে, আজ যদি
সহদেবকে ধারে পাচ সের চাল দিই, তাহা হইলে সে ওই
নর্দমার উপর পড়িয়া গােহত্যা, ব্রহ্মহত্যা হইবে, এবং সে সকলের
দরুণ যাহা কিছু পাপ সকলই নাকি আমাকে স্পর্শ করিবে।
-সহদেব ছিল কণ্ডাক্টার, মাসে উনিশ টাকা মাহিনা পাই,
চোখ দুইটা দেখিলে ভয় হইত, যেন ভিতরকার সমস্ত বন্ধন
ছাড়াইয়া তাহারা বাহির হইয়া আসিবে। সামনের গুটিতিনেক
দাত নীচের পুরু ঠোটটা ছাড়াইয়া অগ্রসর হইয়া আসিয়াছিল।
গাঢ় হলুদ সেইগুলার রং, সমস্তটা মিলিয়া মনে হইত, যেন একটা
হিংস্র রক্তলােলুপ জীব, যে-কোন মুহূর্তেই ঘাড়
পারে।
সহদেব হাসিতে লাগিল, বলিল, “মাইরি দা’ঠাকুর, শাম
আপিসে গেল মাসে পাঁচ পাঁচটা টাকা ফাইন করে দিলে
তাইতেই ত ধার চাইছি, নইলে,-আচ্ছা, তুমিই বল না, পিলে,
সহৰে কি কোনদিন কারও ঠেয়ে এক পয়সা ধার করেছে, মা,
কারও একমুঠো খেয়েছে। হাজার হােক একটা পিজিলিল
আছে ত।”
হৰে বলিত, সেফায়েতের ছেলে, কুলীল কায়েস
র্ডে চাল অবধি পড়িয়াছে।
৩

বন্তির সরকারী পিসে কালীচরণ ঘরামি এবং মহাশয়
ব্যক্তি। সমস্ত শাস্ত্র সে জানে, ব্যাখ্যা করিতে পারে। রামায়ণ
এবং মহাভারত ত তাহার জিহ্বাগ্রে। একদিন সে আমাকে
জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “আচ্ছা দাঠাকুর, তুমি ত লোপড়া জান,
এবাের অগ্নিপরীক্ষের পর রামায়ণে কি হ’ল বল দিনি।”
আমি জবাব দিতে পারি নাই, সেই হইতে আমার
বিদ্যাবুদ্ধির সত্যতা সম্বন্ধে কালীচরণের একটা সন্দেহ জন্মিয়া
গেছে।
কালীচরণ কহিল, “তা সেকথা সত্যি দাঠাকুর, সদার
আমাদের সে গুণটো আছে। দিয়ে দাও, দাঠাকুর, পাঁচ
সের চাল, ছেড়া বেঁচে থাকলে তােমার পয়সা মারা যাবে না।”
সহদেবের কাছে, আমার হিসাবমত, আঠারাে টাকা
হাড়ে-পাঁচ আনা পাওনা হইয়াছিল। খুচরা পয়সা কয়টা
ছাড়িয়া দিয়া, তাহার নামে আঠারাে টাকার জন্য নালিশ
করিব স্থির করিয়া রাখিয়াছিলাম। কহিলাম, “শালার
আপিসে ত প্রত্যেক মাসেই তােমার পাঁচ পাঁচটা টাকা ফাইন্
করে সহদেব,তুমি তাহলে নগদ দাম দিয়ে চাল কিনবে
কবে?-পাঁচ সের চাল তােমায় এখন ধারে দিতে পারব না,
বড়জোর আধ-সের পর্যন্ত পারি, যদি রাজী হও ত নিয়ে যাও।
তবে পয়সাটা একটু শীগগির দিয়ে।”
সহদেবের বহির্গমনােত চোখ দুইটা আর কোটরের ভিতর
থাকিতে চাহিল বা। স্বাভাবিক তিনটার স্থানে দুইপাটির

।
“ও,
অন্তরে বাহিরে
বত্রিশটা হলু রং-এর পাতই কালাে মােটা ঠোট দুইটা অতিক্রম
করিয়া যেন আমাকে আক্রমণ করিতে আসিল। সে কহিল,
কি মস্ত বড় বাবু রে! একটা ভদ্দোর সন্তানকে পাঁচ
সের চাল দিয়ে বিশ্বেস করতে পারেন না, উনি আবার
অন্নপূন্নো!—আচ্ছা দাও দাও, আধ-সেরই দাও, আমিও দেখে
নেব তােমার দোকান এখানে কদ্দিন থাকে-হ্যা বাবা,
সহদেব সে ছেলেই নয়-
সহদেব আমায় প্রায়ই ভয় দেখাইত, সে দেখিয়া লইবে আমি
কেমন করিয়া এ পাড়ায় থাকি। তাহার এবং আরও অনেকের
আস্ফালন-সত্ত্বেও এখানে টিকিয়া আছি আজ পাঁচ বছর।
চাল ওজন করিয়া দিয়া বলিলাম, “আধ-সের চালের দাম
আট পয়সা, সহদেব। দশ টাকা হিসেবে মণ দিতে হবে, দাম
বেড়ে গিয়েছে।”
“আচ্ছা, দাও দাও-এ মাসের মাইনে পেলে কোন্ শালা
আর তােমার পয়সা ফেলে রাখে।” বলিয়া সে চলিয়া গেল।
এই চালই সে অন্যত্র ছয় টাকায় পাইতে পারিত। আমি
ধরিলাম চার টাকা বেশ। এক টাকা তাহার রক্তচক্ষুর খেসারত,
এক টাকা তাহার ধারের সুদ, দুই টাকা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের
ডিগ্রীর মূল্য। এই রেটেই সকলের কাছ হইতে লইয়া থাকি।
যদিও অপরের বেলায় রক্তচক্ষুটা বাদ যায়। এম-এ পাশের
খরচ উঠিয়া গেলে সকল জিনিষের দর সুবিধা করিয়া দিব,
নগদ পয়সায় লইলে আরও কিছু সস্তায় পাইবে।
৩৭

रेशर विवव
বেলা বাড়িতে লাগিল। রাজমিস্ত্রী, দুতােরমন্ত্রী,
গাড়ােয়ান, মােটরগাড়ীর ড্রাইভার, ঘামি, ডকের কুলী,
মজুর, মেছুনী, বি, ভিখারী প্রত্যেকেই আপন আপন কাজে
বাহির হইয়া গেল। কিছু দূরের ডাক্তারবাড়ীর অহীনবাবুর
ছেলে কুমার আসিয়া বলিল, “প্রসাদবাবু, বাবা বললেন যে,
আমাদের একটা চাকর কাল পালিয়ে গিয়েছে কিনা, একটা
ঠিকে বি যদি আপনি জোগাড় করে দিতে পারেন, তাহলে
খুব ভালাে হয়।”
জবাব দিলাম, “আচ্ছা--"
*
এলােকেশীকে ঝি’র সর্দারণী বলিয়াই জানি। সকালবেলা
লাৰ আন করিতে আসিয়া একবার দােকানের ঝাপটার
কাছে দাঁড়ায়, চট্ করিয়া নারিকেল তেলের কলসীর ভিতর
হইতে পলাটা আচমকা তুলিয়া লইয়া, বা হাতের চেটোয়
জেল চালিজা লয়। বাখায় মাঝখানটায় একটা প্রকাও টাক
পড়িয়া গেছে, ঠিক সেইখানে সমস্তটা তেল কালিয়া দিয়া,
যাটা অদ্ভুতভাবে চাপড়াইতে চাপড়াইতে বলে, “শরীলটা
বড়ই কাহিল হয়ে পড়েছে, ' ঠাকুর।”

আড়চোখে তেল লওয়ার বহর দেখি, চালের দাম
ধরি, ছয় টাকার জায়গায় এগারাে টাকা, সরিষার তেলের দাম
খরি সাড়েন আনার জায়গায় বারাে আনা। দুই পয়সা
দামের লাল, নীল, গােলাপী, সবুজ গায়ে-মাখিবার সাবানের
নাম ধরি চার পয়সা করিয়া !—এই প্রকারেই বাঁচিয়া আছি।
সন্ধ্যাবেলায় ‘অন্নপূর্ণা ষ্টোস’-এর পিছনের খােলার ঘরে
কালীচরণের শাচর বৈঠক বসে, সঙ্গে সঙ্গে চলে সীত।
এলােকেশীকে সেখানে বসিয়া অত্যন্ত গভীর মুখে মং, পশল্পের
শাত্মব্যাখ্যা করিতে শুনি প্রায় প্রত্যাহ। সেইদিন সন্ধ্যাবেলা
তাহাকে ডাকিয়া বলিলাম, “এলােকেশী, আমাকে একটি ঠিকে
ঝি জোগাড় করে দিতে পারবে, বাছা? অহীনৰুদের
দরকার, আমাকে বলেছেন।”
কথা শুনিয়া এলােকেশী চোখে কাপড় দিল, ফোপাইতে
ফোপাইতে বলিল, “যেমন ধরাত করে এইচি, দু-ঠাকুর
তােমাদের এই তুরু কথাটিও যে রাখব, ভগবান কি সেই
সুখটুকুনই আমার কপালে নিকেচেন ? হারামজাদীয়া কি
আজকাল আর বাসন মাজতে চায় গাে, দাঠাকুর। বললে,
বলে কি জান? কালীঘাটে মা’র মন্দির আছে, সকালে বিকেলে
তারই দোরগােড়ায় যদি বসি, চোখ বুজে যদি বলি, দোহাই
গাে বাবু, দোহাই গাে মা, এই গরীব, অন্ধ, অনাথাকে একটি
পয়সা দিয়ে যাও গাে দয়া করে, এক গুণ দিলে সহল হবে
ধনেপুকে লক্ষ্মীলাত হবে, তাহলে দু’ বেলায় কিছু না হলে

ইলিশ
একটা টাকা ভিক্ষে মেলে—গতর খাটাতে কোল জুখে,
বলিতে বলিতে এলােকেশী কাদিয়া ফেলিল আর কি!
অনেক কষ্টে তাহাকে থামাইয়া বলিলাম, “তারা যদি
কাজ করে, তবে তুমি আর কি করবে বাছা! তােমার
আর দোষ কি? তুমি নিজের কাজে যাও এলােকেশী, আমি
অহীনবাবুদের বলব’খন যে, ঝি পাওয়া গেল না।”
কিন্তু, আমার এই “তুশ্চ” কথাটা পর্যন্ত না রাখিতে
পারিয়া, সে আবার চোখে আঁচল দিয়া, অতীতকালের সমস্ত ঝি
এবং বর্তমানকালের ভিখারিণীদের উদ্দেশে অযথা বহু কটুকাটব্য
করিয়া অতিশয় ধীর পাদবিক্ষেপে প্রস্থান করিল।
-যথেষ্ট চেষ্টা করিলাম কয়েক দিন ধরিয়া, কিন্তু বেশ মােটা
মাহিনা কবুল করিয়াও একটা ঝি জুটাইতে পারিলাম না।
দোকানের সম্মুখের নর্দমাটার বিষাক্ত দূষিত বাতাস সমস্ত
পত্নীটাকে ছাইয়া ফেলিয়াছে। নিশ্বাস টানিতে ভয় হয়, মনে
হয় যে কখন কি অঘটন ঘটিয়া বসিবে! ইহারই মধ্যে দুইটা
পয়সা সঞ্চয় করিবার আশায় চোখ কান বুজিয়া অগ্রসর হইয়াছি।
সন্ধ্যাবেলা, ধুনা দেওয়া হইয়া গেছে। একটা কেনােসনের
আলাে মাচার সহিত বুলাইয়া দিয়াছি। তাহারই নীচে একটা

অন্তরে বাহিরে
সিকা দামের কর উপরে বসিয়া স্পেন্সারের “ফেয়ারি
কুইন খুলিয়া বসিয়া মনে মনে হাসিতেছি।
সহদেব আসিয়া ঘরে ঢুকিল। গায়ে তাহার ছেড়া জামা,
চোখ দুইটা আরও ভয়ানক বলিয়া বােধ হইতেছিল, ঠোটের
কোণ দুইটা দিয়া পানের কস্ গড়াইয়া পড়িতেছিল, হলদে রং-এর
দাঁতগুলাতে লালের ছােপ লাগিয়া একটা অসহ্ কদৰ্য্যতার সৃষ্টি
করিয়াছিল,সমস্ত মুখখানার দিকে যেন তাকাইতে পারা
গেল না। মাথার চুলগুলা উষ্কখুষ্ক, জুতাটার পিছনের চামড়া
হিল হইতে একেবারে আগ্ম হইয়া গিয়াছিল, পাটাকে
ছেচড়াইয়া হেঁচড়াইয়া সেটাকে বহন করিতে হয়।
সহদেব আমার অত্যন্ত কাছ ঘেঁসিয়া আসিয়া বসিল।
ভারি আত্মীয়ের মতন কানের গােড়ায় মুখ আনিয়া বলিল,
“বড় মজা দাঠাকুর—তুমি যদি দেখতে“মাইরি বলছি, এমন
খাসা লাগল,কচি গলা, গাড়ীটাতে টেরও পেলুনি কোনও
কিছুর ওপর দিয়ে যাচ্ছি, বেশ হয়েছে, শালার ছোড়ারা যেমন
বদমাল-রােজ বারণ করি, বলি, বাচাধন, যে দিন ধরতে
পারব, সে দিন মজাটা টের পাইয়ে দেব।'—এখন, লাও হালা।”
অবাক হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম, তাহা
সৌন্দৰ্য দেখিয়া নহে, তাহার কথা শুনিয়া বিস্ময় লাগিল।
একটা অতিশয় কালাে রুমাল পকেট হইতে বাহির করিয়া
কপালের ঘাম মুছিতে মুছিতে সহদেব বলিল, “এক, শীলার
ধরে ফেলেছিল আর একটুকুন হলে দাঠাকুর, আরে
৪১

ফতােয় আছি আজ বিশ বছর
তেমনি কচি
ছেলে?” বলিয়া সে হা হা করিয়া হাসিতে লাগল।
মালটা পকেটে রাখিয়া দিয়া আবার বলিল, “পাঁচ সাত
শালা তেড়ে এল, দিলে হারামজাদা ব্যাটার জামাটা ছিড়ে,
এই দেখ না দাঠাকুর” বলি, সে অত্যন্ত কাতর মুখ করিয়া
জামার ছি৷ স্থানগুলি দেখাইল।
“তারপর এ-গলি, সেপলি,-লে শারা এখন কি কবি
ফ।* সহদেব অত্যন্ত হাসিতে আরম্ভ করিল, সে হাসি আর
এমিতে চায় না।
খ করিয়া এক ভ্যালা থুথু ঠোট ডিজাইয়া চিবুকের উপর
গড়াইয়া আসিল,ডান হাতের জামার আন্তিনটা দিয়া সেটা
মুছিয়া ফেলিয়া সহদেব বলিল, “দাও দিগিনি, দাঠাকুর,
মাকোল দড়িটে এগিয়ে, একবার বিড়িটে ধরাই।”
তাহার কথা কিছু বুঝি নাই ;-এতক্ষণ পরে প্রথম জিজ্ঞাসা
করিলাম, “কিন্তু সহদেব, ব্যাপারখানা কি বল ত পরিষ্কার
প্রচণ্ড এক টানে বিড়ির মাথায় আগুনটাকে তলায়
নামাইয়া আনিয়া, কর করুণ করিয়া সহদেৰ কহিল, “আর
থাকব না এ শালার দেশে, দাঠাকুর-এখানে ভালাে মানুষের
কদর নেই-শথিলী হ’ৰ। মাইরি বছি, জা'ঠাকুর, আজই
রাত্রি বেলা এখান থেকে চলে যাৰ, বিৰা হ'ৰা-ওই যে গাে
তােষর অহীনবাবু না কহীনবাৰু, তারই এগন্ধে ৰাৱে ৰচ্ছৱেৱ
৪২

অবাহিরে
ছেলেটা, মােক দিয়ে গাড়ী চড়ে’ ইস্কুলে যায় আসে।
আছে আবার দেয়। যখন টিকিট কাটতে যাই, অমনি
কোথেকে এসে উঠে পড়ে, টিকিট কাটা রেখে তেড়ে গেলেই
ৰূপ করে নেমে যায়। বােজ বলি, যেদিন ধরতে পারব সেদিন
ফঁদ দেখিয়ে ছাড়ব। তা ব্যাটাদের ধরূতে গেলেই চটপটু সরে
পড়ে। কিন্তু কতদিন আর ফাকি দেবে? আজ ধলুম ওই
তােমার অহীনবাবু? ছেলেকে, বাকী সব কটা. পালাল।
বললুম, বাচাধন, এবার কি হয় ? ছোঁড়াটা চৌধ ৰাঙিয়ে
বল, ‘ভালাে চাও ত ছেড়ে দাও বলছি। আরে, মুনিবের
নিমক খাই, রোজ রোজ চালাকি। কিন্তু এত কৰি শালা
মুনিবের জন্যে, তবু বলে, ‘তােমাকে দিয়ে কাজ হবে না, সুর
করে দেব একদিন। আর ছোঁড়াটা কি বদমাইস দেখ দা-
ঠাকুর! একফোটা বিষ নেই, কুলােপানা চক! গাড়ী
ছাড়ল ফুল ইম্পিডে, শালার ছেলেকে বললুম, এইবার
ঠ্যালাখানা বােঝ’-আস্তে আস্তে ধরে মারলুম জোরে এক
ধাক্কা,পড়ল চাকার তলায়। রাস্তা গেল লালে
হুররেরে! দাও দিকিনি, দাঠাকুর, একটা কচি
সিগরেট, একটু মুখ বদলাই।”
বাহিরের আকাশ বৈশাখের শুকনা মেঘে ফালােয় কালাে
হইয়া গেছে। ঝড়ের সম্মুখের পাতাগুলা উড়িয়া আসে হা হা
করিয়া, ধূলার কণাগুলা দেখে মূখে আসিয়া লাগে, যেন
কাহাকে ক্ষমা করিবে না।

ইহাই নিয়ম
সহদেব সিগারেট ফুকিতে লাগিল। বলিল, “আজই
যাচ্ছি, দাঠাকুর, ছিচরণে কত অপরাধ করে গেং, কিছু যেন
মনে কোরােনি।”
সেই ছেলেটির কথা মনে পড়িল, অহরহ কত ছুটাছুটি
করিতে দেখিয়াছি কাছাকাছি রাস্তা দিয়া, সারাদিনের মধ্যে
কত অসংখ্যবারই না তার উল্লাসচঞ্চল খেলাধূলা চোখে
পড়িয়াছে! উজ্জল, সঙ্কোচহীন, বুদ্ধিদৃপ্ত দৃষ্টি-সপ্রতিভ হাস্যমুখর
বাক্য।
ছাতাটা হাতে করিয়া উঠিয়া দাড়াইলাম, দোকানের ঝাঁপ
বন্ধ করিয়া অহীনবাবুর বাড়ী গেলাম, থানায় গেলাম। ঘণ্টা-
খানেক পরে দারােগা আসিল, কষ্টেবল আসিল।
আস্তিন গুটাইয়া সহদেব বলিল, “ওই বজ্জাত বামুন-শালাকে
খুন করে’ ফাসী যাব।”
আকাশে আকাশে মেঘের খেলা, বিদ্যুতের খেলা, বেফ,
খেলা, শুধু খেলা,দুই একটা বাজ পড়ে না, তাকেও না, আকাশ
যায় পরিষ্কার হইয়া! অন্নপূর্ণা ষ্টোস’-এর পিছনে কালীচরণের
শব্যাখ্যা চলে!
৪৪

অন্তরে বাহির
।
বিচারের দিন, আদালতে গেলাম। বিচারকের পাশে ।
একখানি কেদারায় বসিয়া ছিলেন সবিতা দেবী,অহীন্দ্রবাবুর
স্ত্রী। বছর ত্রিশ বত্রিশ বয়স হইবে মেয়েটির। বহু চিন্তা
করিয়া তাহার চোখ দুইটি কোন্ এক শিল্পী গড়িয়াছিলেন,
দুই চোখের দৃষ্টি দিয়া সমস্ত পৃথিবীটাকে যেন তিনি গ্রহণ করিয়া
লইতে পারেন। গভীর কালাে তাহার দৃষ্টি, তাহার ভাবের
কূল যেন পাই-পাই করিয়াও পাওয়া যায় না। সরু তুলির
নিপুণ হাতের দুই টানে সবিতার ভ্র দুইটি আঁকিয়া তাঁহার
সৃষ্টিকর্তা বােধ হয় নিজেই মুগ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন।
কিন্তু এখন সে চোখের পানে চাহিলে ভয় হয়,-দুইটা
চোখের স্থির পলকহীন দৃষ্টি সহদেবের মুখের উপর নিবদ্ধ ছিল।
সহদেবের বুকে লাগিল ভয়, লাগিল শঙ্কা। মনে হইতেছিল,
ইহার কাছ হইতে লেশমাত্র দয়াও মিলিবে না, ইহার নিকটে
ক্ষমার প্রস্তাব বাতুলেও করিতে পারে কিনা
মাথা নীচু করিল।
সবিতা দেবীর চোখের দিকে চাহিয়া আমার বিস্ময় লাগে।
সমস্ত হৃদয়ের রুদ্ধ বেদনা তাহাদের পারে. আসিয়া থমকাইয়া
আছে, সামান্য একটু নাড়া পাইলেই ঝরিয়া পড়িবে।
মুখের কথায় নানারকম ভাষা চলে, সুবিধামতন অর্থ করিয়া
লইয়া প্রয়ােজন হইলে মনকে চোখ ঠারাও যে না যায়, এক্ষনও
৪৫

।
ই নিয়ম
নয়। কিন্তু সবিতা দেবীর সে-দৃষ্টিকে ভুত্ব বুঝিবার উপায় ছিল
। মুখের ভাষার অপেক্ষা ঢের বেশী ভােয়ালে ভাষায় বিতা
সহদেবকে বলিতেছিলেন, “তােমাকে নখে করিয়া সহস্র সহস্র
টুকরাতে যদি ছিড়িয়া ফেলিতে পারিতাম, তাহার প্রতি,
টুকরাটিকে যদি অনন্ত নরককুণ্ডে নিক্ষেপ করিতে পারিতাম,,
তাহা হইলে
পাইতাম। কিন্তু তাহাও
কতটুকু?”
রায় বাহির হইল, পৃথিবীর বিচারক তাহার আইন-কানুন
ঘাটিয়া এক্ষেত্রে যাহা চরম করিতে পারেন, তাহাই করিলেন,-
সহদেব যাবজ্জীবনের জন্য দ্বীপান্তর গেল।
অহীনবাবু সবিতা দেবীকে লইয়া আদালতের বাহিরে
আসিলেন, আমার পায়ের উপরে মাথা লুটাইয়া সবিতা পড়িয়া
রহিল।
হয়ত শাস্তি
সবিতা তাহার ছেলের জামা, কাপড়, শার্ট, প্যান্ট্যালুন, জুতা,
মােজা ইত্যাদি জড়াে করিয়া লইল। বই, খাতা, পেনসিল,
দোয়াত,ম সব এক জায়গায় গুছাইয়া আখি, কুমারের ছােট
লাইব্রেরীর সমস্ত বইগুলি বাড়িয়া মুছিয়া পরিক্ষায় কল্পিল,
আলমারীগুলার লা লা করিয়া, কাচ পরিষ্কার করিয়া ব্যকঝকে
চিল তুলিল।

অরেবারি
ছেলের জামা কাপড়, ছেলের বই খাতা প্রভৃতি লইয়া
মাথায়, মুখে, বুক, হাতে স্পর্শ করাইয়া সবিতা ধীরে ধীরে
ভাকে, “কুমার, কুমার,-খােকা, বাবা আমার, মাণিক আমার,
সােন্তা আমার
কুমারের খেলায় জিনিষগুলা একত্র করিয়া তুলিয়া রাখিয়া
সে আস্তে আস্তে বলে, “খােকা দুষ্ট, ইস্কুলের ৰেলা হয়ে যাচ্ছে,
লাইখেলা এখন থাকু-
সবিতা নিষ্পলকনেত্রে চাহিয়া থাকে, তাহার বিশাল চোখ
ইটি শুনা খটখটে হইয়া আছে, আনাচে-কানাচে কোথাও
এক ফোটা জলের সন্ধান নাই—কুমার কোন্ ফাক দিয়া কেমন
করিয়া পালাইবে তাহাই দেখিবার জন্য যেন সে অতিশয়
তাহার কোলের মধ্যে মুখ গুজিয়া ইলা কঁাদিয়া বলে
“কাকিমা
ইলার মাথার উপর নিজের ডান্ হাতখানি রাখিয়া সবিত
দিন কাটায়। একদিন আমাকে আসিয়া বলিল, “দাদা, পুজোর
ছুটির সময় আমরা সবাই মধুপুর গিয়েছিলাম,-কুমার কিছুতেই
গেল না, বল, সবাই কে বলে যে, ও নাকি মা’কে ছেড়ে
থাকতে পারে না।' সেইই ও এবার আমার সঙ্গে না গিয়ে
কলকাতা থেকে সকলকে দেখিয়ে দেবে যে, সে কথা সত্যি নয়।
আমি কত বােক্সালাম, উনি কত বলেন, কিন্তু দুই ছেলে
কিছুতেই যেতে চাইল না। শেষে ওকে মিহির বিআৰু
২৭

ऐसारं विनम
রেখে, মিহিরকে ভালাে করে’ বলে’ ক’য়ৈ উনি, আমি আর ইলা
ঠাকুর চাকর সঙ্গে নিয়ে চলে গেলাম। কিন্তু মােটে চারদিন,
তার ভিতরেই আমি উঠলাম অস্থির হয়ে, খােকাও তার চিঠিতে
লিখল, “মা, তুমি কি শীগগির আসবে না?'—আমি ফিরে
এলাম, থােকাও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারল না, আমিও না।”
সবিতা ম্লান হাসিল, সে যেন হাসি নয়, ঠোটের কোণে
দাড়াইয়া, “আচ্ছা, তাহলে চাম” বলিবার জন্য যেন প্রস্তুত
হইয়াই থাকে।
সবিতা বলিল, “খােকা আমায় চিঠি লিখেছিল, তােমায়
পড়ে শােনাব, দাদা ?”
বলিলাম, “পড়”
ব্লাউজের ভিতর হইতে সবিতা একখানা চিঠি বাহির করিয়া
বলিল, “আমার কুমার, কত তার বুদ্ধি, লেখাপড়ায় কত তার
আগ্রহ! একটু দুষ্টু, একটু দুরন্ত, কিন্তু সকলের জন্যে কত তার
টান-”
চিঠিটা খুলিয়া ঠিক করিয়া লইয়া, সবিতা বলিল, “দাদা, তুমি
পড়, আমি শুনি
পড়িতে লাগিলাম,শিশু হাতের গােটা গােটা অক্ষর, কিন্তু
কোথাও একটা ভুল নাই। পত্রখানির ভিতর দিয়া একটি
তীক্ষ্ণধী বালকের হাস্যসমুজ্জল মূর্তিটি বার বার মনে পড়িয়া গেল,
চারিদিক হইতে উকি-ঝুকি মারিয়া সে যেন চোখের সম্মুখে
খেলিয়া বেড়াইতে লাগিল। আমি পড়িলাম—
৪৮

অন্তরে বাহিরে “আচরণেষু, মা, তােমাদের পৌছা খবর এইমাত্র পেলাম। তুমি আমায় বলে গিয়েছিলে ত যে আমি যেন তােমার চিঠি পাওয়ামাত্রই উত্তর দিই,-সেইজন্যেই এক্ষুনি তােমার চিঠির উত্তর দিচ্ছি। নইলে খেয়ে দেয়ে তারপরে দিতাম। তুমি আরও বলেছিলে ত আমি যেন সমস্ত দিনের সব কথা লিখি, একটুও যেন বাদ মা দিই। তাই লিখব,-তুমি দেখো। তােমরা ত চলে গেলে সাড়ে-আটটার সময়, তারপর মিহির-দা’ একটি পরামাণিক ডেকে নিয়ে এসে চুল কাটতে বলেন, সাড়ে-ন’টার সময় চুলছাটা শেষ হ’লএবার গানের পালা। আমি বিষ্টুদের বাড়ী গেলাম ক্যারা খেলতে। প্রায় সাড়ে-দশটার সময় ফিরে এসে দেখি মিহির-’ বৈঠকখানা- ঘরে নাক ডাকিয়ে ঘুমােচ্ছন, আর ঝি এসে রান্নাঘর ঘােয়া আর উনুনের ছাই ভােলা আরম্ভ করে দিয়েছে। বুঝলামু, মিহির দা'র খাওয়া হয়ে গিয়েছে। ঝি’র ঘর বােয়া শেষ হলে আমি হাঁড়িটা দেখতে গেলাম তার ভিতরে কি আছে। একটা থালাতে ভাত, ডাল, ডিম- ভাতে, আর আলু-ভাতে নিয়ে খেতে বসলাম। লছমী সিং তােমাদের গাড়ীতে তুলে দিয়ে ফিরে এল। আমি বললাম, ‘লছমী সিং, তােহারা আজ ছুটি, যাও—তব, সাজা বাখৎ ফিকে আও, হাম্‌ ভাসান দেখতে যায়েগা। লছমী বলল, “বহুৎ আচ্ছা, খোকাবাবু’বলে চলে গেল। ৪ ৪৯

নিয়ন
আচ্ছা মা, ঠিক করে বােলােত, আমি যে হিন্দীতে লছমীর
সঙ্গে কথা কইলাম, সে-হিন্দীটুকু ঠিক হয়েছে কি না।
মা, তুমি যেন এ হিশীর কথা কাউকে বােলল না, বিশেষ
করে দিদিমণির কানে যেন না যায়। সেবার ত ও-ই শুধু শুধু
আমার হিন্দী নিয়ে ঠাট্টা করেছিল, বলেছিল না, থােকা, তুই
একটা হিন্দীতে বই লেখ, ভাই, আমি কাকাকে বলে সেটা
ছাপিয়ে দেব ?
সেইদিন থেকেই ত আমি লছমী সিং ওদের সঙ্গে পৰ্যন্ত
বাংলায় কথা কই। কিন্তু সেদিন আমি কি বলেছিলাম জান,
মা ?
-লছমী সিং এসে আমায় বলল যে, বাবা ওকে শ্যামবাজার
পাঠাচ্ছেন, কিন্তু ও জানে না যে, কোথায় গিয়ে ট্রামে চড়র।
দিদিমণি আর আমি তখন অঙ্ক কষছিলাম। আমি লছমীকে
বললাম, “দেখ লছমী স্টি, বড় রাস্তকা মােপর গিয়ে’-বলেই
দেখি যে দিদিমণি আমার দিকে খুব ভালমানুষের মত তাকিয়ে
যেন হাজার জন্য একেবারে রেডি হয়ে রয়েছে।
আমি ঘাবড়ে গেলাম, তারপর যা থাকে কপালে ভেবে,
খুব জোরের সঙ্গেই বলে উঠলাম, “খামারকা গাড়ীপর
উঠে পড়। অমনি দিদিমণি যেন হাসির চোটে ফেটে পড়ল,
আর তার ফলে যা হয়েছে তা ত তুমি জানই মা!—দিদিমণির
ক্লাশের মেয়েরা আমার হিন্দীৰ কথা অনেছে, বাবার বন্ধুরা
সবাই শুনেছেন, তােমার বন্ধুরা অনেছেন। যিদিমণি যত

অন্তরে বাহি
লােককে চেনে, সঙ্কলকে বলেছে! ভয়ানক মেয়ে মা ও !
যেন তুমি কোনমতেই এবারকার হিন্দীর কথা বলাে না,
তাহলে কল্কাতায় ফিরে, ও আর আমায় আস্ত রাখবে না।
আমি অ হিন্দী বতামও না ওর ভয়ে,কিন্তু তখন
দেখলাম কি, কেউ কোখাও নেই, তাই ভাবলাম এই ফাকে
যদি একটু হিন্দী শিখে ফেলতে পারি তাহলে তােমরা ফিলে
পরে দিদিটাকে আচ্ছাজ করা যাবে।
-আচ্ছা, তুমি বল ত মা, ওই হিন্দীটুকুর ভিতরে কি
কোনও ভুল হয়েছে ? বােধ হয় হয়নি, না ?
কিন্তু আমার খাওয়ার কথা বল্‌তে বলতে থেমে গেলাম
বেশ মজা, না ?
-আমার খাওয়া শেষ হ’ল। গয়লা দুধ নিয়ে এল, আমি
কড়াটা দিলাম, গয়লা দুধ দিয়ে গেল। কিন্তু দুধ গরম করব
কি করে ? উনুন ত ঝি বেশ পরিষ্কার করে রেখেছে।
আমি বিষ্টদের বাড়ী গেলাম, লীলাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,
ওদের বাড়ীর উনুনে আগুন আছে কি না। লীলা বলল :
যে আছে, কিন্তু এখনও রান্না শেষ হয়নি—যখন শেষ হবে
তখন দুধ নিয়ে যাবে গরম করবার জন্যে।
আমি রান্নাঘরে দুধটা ঢাকা দিয়ে রেখে ঝি’র বাসন মাজা
শেষ হয়েছে দেখে বললাম, ‘পচার মা, বাসমগুলাে ওপরে দিয়ে
যাও, আর রান্নাঘরের কোলে কালকের রাত্তিরের লুচি আছে
নিয়ে যাও।

ইহাই নিয়ম ঝি বাসন রেখে গেল, লুচি নিয়ে গেল। মিহির-দা’র ঘুম তখনও ভাঙ্গেনি। আমি লাইব্রেরী-ঘরে অঙ্ক কষতে বসলাম। বেলা তখন বােধ হয় একটা, নীচে বৈঠকখানা-ঘর থেকে চেয়ার সরানাের যে-রকম শব্দসাড়া উঠতে লাগল, তাতে আমার মনে হল যে, মিহির-দা’ নিশ্চয়ই উঠেছেন। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লীলা বলল, “মিহির-দা, খােকা বছিল দুধ গরম করবার কথা। আমাদের উনুন এতক্ষণে খালি হ’লদুধটা এনে দিন। আশ্চর্য হয়ে মিহির-দা’ বলেন, “দুধ ? এn, দুধ কি দিয়ে গিয়েছে নাকি ? লীলা ব, ‘হ্যা, দিয়ে গিয়েছে ত, আপনি এনে দিন। মিহির-দা’ খুব সম্ভব রান্নাঘরে গিয়ে দুধটা এনে দিলেন। খানিক বাদে লীলা এসে আবার জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘মিহির-দা’ দুধ কেটে গেল, তা মা জিজ্ঞেস্ কলেন, একটুখানি মিষ্টি দিয়ে ওই দুধটুকু কি জ্বাল দিয়ে ঘন করে দেবেন ? উত্তর না দিয়ে মিহির-দা’ ডাকলেন, ‘খােকা, খােকা'- লাইব্রেরী থেকেই চেঁচিয়ে বললাম, “কি?” শুনে যাও- বৈঠকখানায় গিয়ে হাজির হতেই মিহির-দা’ বললেন, ভাড়ার ঘরের কোথায় চিনি থাকে জানত? আমি বললাম, আমি ঠিক জানি না ত’--তারপর লীলাকে

অত্তরে বাহিরে
বলাম, লীলা ভাই, সইমা’কে ওটা চিনি দিয়ে জ্বাল দিয়ে দিতে
বলে গে’
লীলা লাফাতে লাফাতে চলে গেল, আমিও ফিরে এসে
লাইব্রেরী ঘরে বাম।
তুমি ত জান মা, মিহির-দা’কে আমার একটুও ভালাে লাগে
না। এই যে কিছু দিন আগে, দেশের থেকে বাবা গড়খালি
যাচ্ছিলেন প্রজাদের সঙ্গে কি একটা মারামারি না কি হয়েছে
শুনে, তখন ত আমি তার সঙ্গে গেলাম, না ?--সেখানে যেতে
সবাই বাবাকে বল যে, মিহির-দা’ নাকি শুধু শুধু সব লােকেদের
ঘরদোর জ্বালিয়ে দিয়েছেন, দয়ােয়ানদের দিয়ে তাদের জিনিষপত্তর
লুঠ করিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেও নাকি
মিছিমিছি সব বলেছেন যে তারা টাকা দেয়নি।
বাবা সব শুনলেন, নায়েব-মশাইকে ডেকে সব জিজ্ঞেস
করলেন, গড়খালির মােড়ল-মশাইকে ডেকে পাঠানে, শেষে
মিহির-দা’কে খুব বকে’ দিলেন। কিন্তু এসব ত তুমি নেছই,
মা। এবার তুমি যে কথা জান না, সে কথা বন্ধ।
যেদিন বাবা মিহির-দা’কে বলেন, সেইদিন বিকেলবেলা
বাবা গিয়েছিলেন চরণপুর, আমি ছাদের ওপর বেড়াচ্ছিলাম।
হঠাৎ ঘাটের কাছে একটা ছেলের চীৎকার শুতে পেলাম,
‘ওগাে বাৰু গাে, আর করব না গাে, মরে গেলুম গাে আর
একটা লােক বলছে, এবার ছেড়ে দিন বাব. আর করবে না
বাবু-

বইৰিয়ৰ
কি হয়েছে দেখবার জন্যে আমি দৌড়তে দৌড়তে নীচে
নামলাম, তারপর তিন লাফে ঘাটের কাছে গিয়ে হাজির
গিয়ে দেখলাম যে, মিহির-দা’ পাড়িয়ে রয়েছেন,
তার পায়ের কাছে পড়ে একটা বুড়াে মুসলমান খুব ফাদছে,
আর কাশিম খাঁ খুব জোরে জোরে একটা ছেলের পিঠে
জলবিছুটি লাগাচ্ছে। আমায় দেখে কাশিম একটু থামল।
আমি অবাক হয়ে মিহির-দা’কে জিজ্ঞাসা করলাম, “কি হয়েছে
মিহির-দ’?
মিহির-দা’ কিছু বদ্বার আগেই সেই বুড়াে মুসলমানটা
একেবারে হাউমাউ করে উঠল, আর আমার পা-দুটো জড়িয়ে
ধরে একসঙ্গে অনেক কথা বলে ফেল।
ক্রমে ক্রমে আমি বুঝলাম যে, তার নাম আহম্মদ শেখ,
তার ছেলে ঘাটের পাশের গােলাপ গাছ থেকে আজ দুপুরে দুটো
গােলাপ ফুল ছিড়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই কথা জাতে পেরে
ম্যানেজার-বাবু রহমাকে ধরে এনে জলবিছুটি লাগাচ্ছেন।
খুব রেগে গিয়ে আমি মিহির-দা’র দিকে তাকিয়ে বললাম,
‘বেশ করেছে, গােলাপ ফুল নিয়েছে, আরও নেবে, রােজ নেবে,
আপনি তাতে জলবিছুটি লাগাবার কে?
তারপর কাশিম খা’র হাত থেকে জলবিছুটিটা কেড়ে নিয়ে
বললাম, ‘ফের যদি আপনি কাকেও মারধাের করেন, তাহলে
আমি বাবাকে বলে এইটে দিয়ে পিষ্টতে পিইতে আপনাকে
থানায় দিয়ে আসব।

অন্তরে হিট
চেয়ে দেখি কাশিম আর সেই ছেলেটা, দুজনেই কখন
সরে’ পড়েছে। মিহির-দা’ও কিছু না বলে চলে গেলেন,
আমার ওপর খুব রেগেছিলেন, বােধ হয়। বুড়াে কেবল তখনও
ছিল আমাকে বাদ দেওয়ার জন্থে। সে যা আনন্দের চোটে
করতে লাগল মা, আমায় সমস্ত পৃথিবীটা দিতে বলতে লাগল
তার খােদাতালাকে, আর এমন করে বলতে লাগল যে, আমি
ভাবলাম লােকটা বুঝি-বা ক্ষেপেই গেল! আমি শুধু বললাম,
‘আচ্ছা হয়েছে হ'য়েছে,“তুমি রহমাকে বােলল সে যেন রােজ
ফুল নিয়ে যায়, ভয় পায় না যেন।
তবু কি সে যেতে চায়! কত করে তবে তার হাত
থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম।
তুমি আমায় প্রায়ই বল না, মা,-খােকা, দুঃখীর দুঃখ দূর
করিস বাবা, নিজের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য না রেখে, যখন
ব্যথিতের চোখের এক ফোটা জল মুছিয়ে দিবি, তখন ভগবানের
দরবারে তাের নামে এমন একটা জিনিষ জমা হয়ে থাকবে
যার তুলনা এ পৃথিবীতে কোথাও মিলবে না?
তােমার মুখে কোন কথা একবার শুনলেই ত সেটা আমার
মুখ হয়ে যায়। তােমার কোন কথা আমি ভুলি না , আর
একথা ত তােমার কাছ থেকে কতবার শুনেছি। কিন্তু কিছুটি
বুঝিনি ভগবানের গরৰার’ কি? ‘ব্যর্থ কাকে বলে ? কি
জমা হবে। কিছু বুঝি না। কিন্তু তোমার মুখে তে এত
গলাে লাগে! আচ্ছা মা, কল ত, সেদিন কি জান তুই

হয়েছিলেন? আর ভগবান তুষ্ট হয়েছিলেন কি না, তা আমি
জানতেও চাইনে,-তুমি সেদিনকার কথা শুনে খুসী হচ্ছ কি
না বল ত, মা-মণি !”
সবিতা কহিল, “আমি , খুসী হয়েছি খােকা-ভগবানও
হয়েছেন, সােনা আমার, মার সব কথা তাের মনে থাকে ?”
আমি চুপ করিয়া রহিলাম।
সবিতা বলিল, “থামলে কেন, দাদা? । পড়ে—
আমি আবার পড়িতে লাগিলাম,—“কিন্তু আমি আবার
আমার চিঠির মাঝখানে থেমে গিয়েছি,খুব অদ্ভুত, না?
-তােমাকে এতদিন এ কথা বলিনি কেন জান? আমার বােজ
ইচ্ছে কবুত, তােমাকে বলি, কিন্তু ভারী লজ্জা কত, সেইজন্যই
বলিনি, আজকে ত বল্লাম। আগে বলিনি বলে তুমি যেন
দুঃখ কোরাে না লক্ষ্মীটি মা—একথা ছাড়া আর সব দিন ত
সব কথা..তােমাকে বলেছি। তুমি যেন রাগ কেরাে না,
মা-মণি
“আমি লাইব্রেরী-ঘরে গিয়ে অঙ্ক করতে বলাম।
তখন দুটো। বিধুদের বাড়ী বিষ্ঠুকে ডাকতে গেলাম, বাইরের
ঘরে দেখলাম মিহির-দা’ ঘুমােচ্ছন।
বেলা তখন বােধ হয় সাড়ে তিনটে, আমি বিন্ধুদের
বাড়ী থেকে ফিরে এলাম, মিহির-দা’ তখনও ঘুমােচ্ছন।
রামায়ণের কুম্ভকর্ণ ত ছ'মাস ঘুমােত, সে ত আর এখন
বেঁচে নেই, কিন্তু যদি সে এখন থাকত আর তার সঙ্গে

অন্তরে বাহিরে
মিহির-দা’র ঘুমের কম্পিটিশান হত, তাহলে কে জিতত
বল ত !—আমি বল?—মিহিরদা।
আমি আবার অঙ্ক কষতে বস্লাম। চারটে বাজে, আমার
ক্ষিধে পেয়েছে। ঝি ত আসেনি, খাবার আনবে কে? ভাবতে
ভাবতেই ঝি এল । ও অনেকদিন বাঁচবে, না মা?-আমি
টাকা দিলাম, ও খাবার নিয়ে এল। কিছু ভেবাে না, মা,
মুখুয্যেদের দোকান থেকেই এনেছে। আমার খাওয়া শেষ হ’ল।
জলের গেলাস নিয়ে এসে ঝি জিজ্ঞেস করল, ‘খােকাবাবু, দুধ ত
ছানা হয়ে রয়েছে, কিন্তু ওটাকে চিনি দিয়ে ঘন করল কে?
আমি বললাম, ‘সইমা।”
বুঝলাম যে লীলা ওটা একসময় দিয়ে গিয়েছে। বিকে
জিজ্ঞেস করতে গেলাম যে, ওরা কখন ভাসান দেখতে যাবে।
মিহির-দা’ ঘুমােচ্ছন।
বেলা সাড়ে পাঁচটা, বাড়ী ফিরে এলাম, মিহির-দা’,খবরের
কাগজ পড়ছেন। লছমী সিং এখনও ফেরেনি।
সক্ষ্যে ছটা, মিহির-দা’ ভাসান দেখতে বার হলেন।
একটু পরেই বিষ্ট, লীলা, খুকু, বিশু রুচি ওরা সব হুড়মুড়
করে’ লাইব্রেরী-ঘরে এসে ঢুকূল, সবকটাতেই একসঙ্গে চীৎকার
করে উঠল, ‘খােকা, শগগির কর, বাবা দাড়িয়ে রয়েছেন,
আমরা ভাসান দেখতে যাব।
আমি দেখলাম, লছমী সিং-এর জন্যে বসে থাকলে চলবে
না। চটপট করে কাপড়, জামা, জুতাে পরে বিষ্টদের সঙ্গে

}
देश मिजान
ঠাকুর দেখতে বেরােলাম, গেটে তিনটে তালা দিয়ে। বোের
আগে একবার বৈঠকখানা-ঘরটার ভিতরে ঢুকতেই দেখতে
পেলাম, একটা কাচের
গেলাসে আধ-গেলাস জল, সেটা
মেঝেতে পড়ে রয়েছে,-মিহির-দা’ জল খেয়ে রেখে গিয়েছেন
তক্তপােষগুলাের উপর আর
মেঝের উপর
কতকগুলাে বাংলা খবরের কাগজ ছড়ান।
ঘরের কোণে সেই
যে মান্ধাতার ঢের আগের আমলের টেবটা আছে, তার ওপরে-
পাতা খবরের কাগজগুলােতে অনেক পান তার চূণের দাগ।
বাংলা খবরের কাগজগুলাে ‘হােয়াট-নটটার নীচের তাক থেকে
‘পড়ি-পড়ি’ করছে। কতকগুলাে জুতাের পাটি ঘরময় ছড়ান।
মিহিদা’র বড় দামী ভাঙা আয়নাটার খোজ নেই, বােধ হয়
তলায় পড়ে গিয়েছিল।
কৌচটার ওপর
কতকগুলো মােজা গেঞ্জির খালি বাক্স ছড়ান।মিহির-দা’
কিন্তু একটু অপরিষ্কার আছেন, না ?
আমরা ভাসান দেখতে গেলাম। যখন বাড়ী ফিরে এলাম,
তখন সাড়ে আটটা হবে। দরজার তালা সবেমাত্র খুলেছি,
এমন সময় মিহির-দা” এসে বললেন, ‘খােকা, তুমি এই আছ?
আমি অনেকক্ষণ এসেছি, দরজায় তালা দিয়ে গিয়েছিলে,
তাই ধীরেশবাবুদের বৈঠকখানায় বসে গল্প করছিলাম।
কাপড় জামা ছেড়েই তাড়াতাড়ি সইমা’কে বিজয়ার প্রণাম
করতে ছুটলাম। সেখানে খানিকক্ষণ হুটোপাটি করলাম। বাড়ী
ফিরে এসে শুনলাম যে, পিসিমা খাবার পাঠিয়ে দিয়েছেন।

অন্তরে বাহিরে
আবার একটু খাবার খেলাম। তারপর এই ভেবে রাজাঘরে
ঢুকলাম যে, জাল-দেওয়া দুধটুকু খাব। কিন্তু দেখলাম, কড়াইটা
বেশ পরিষ্কার, আর তার ভিতর জল ঢালা রয়েছে। মিহির-দা’
খেয়ে গিয়েছেন নিশ্চয়। আমার বেশ হাসি পেল ! মিহির-দা’
কিন্তু বেশ লােভী আছেন, না ?
লছমী সিং বাইরে থেকে ডাক দিল, ‘খোকাবাবু--
আমি বারান্দায় বেরিয়ে হিন্দীতে বললাম, লছমী সিং,
তােমায় না আমি সন্ধ্যের আগে ফিরতে বলেছিলাম?
লছমী সিং অনেক কাকুতি মিনতি করে বলতে লাগল যে
অনেকদিন পরে তার কোন্ এক দেশকা আদমী’র সঙ্গে নাকি
দেখা, সে কিছুতেই ছাড়তে চায় না, তাই দেরী হয়ে গিয়েছে।
তার অন্যায় হয়েছে, এমন আর কোন দিন হবে না, এইবারটা
খােকাবাবু তাকে মাফ করুন।
লছমী সিং চলে গেল। আমি হাত পা ধুয়ে এসে ঘুমিয়ে
পড়লাম।
-বিজয়ার দিন সকালবেলা ত তােমরা গিয়েছ, এই ত
সেদিনকার সমস্ত খবর। তুমি আমায় বলেছিলে ত সমস্ত
দিনের সব কথা লিখতে। ঠিক তাই লিখেছি। কিচ্ছুটি
যে বাদ দিয়েছি সে কথা আর কাউকে বলতে হয় না। কিন্তু
চিঠিটা কত বড় হয়েছে দেখেছ, মা?
তােমরা কেমন আছ? আমি ভালাে আছি। তুমি আমার
ঙ্গি এষ, ভালবাসা, ভক্তি সব নিয়ে। বাবাকে আমার
৫১

मिनाम
)
ইহই নিয়ম
বিজয়ার প্রণাম দিয়াে। দিদিমণিটাকে দেবে?আচ্ছা দিয়ে।
দিদিমণির কাছে যে চিঠিটা লিখলাম, সেটা ওকে দিয়ে। ঠাকুর,
ঝড়ুয়া, কেষ্টা, ওদের সবাইকে বােলাে যে, খােকাবাবু বিজয়ার
শুভেচ্ছা জানিয়েছে। চিঠি পাওয়ামাত্র উত্তর দিয়ে।
মা, আমার বড় মধুপুর দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।
আমি ত
দু’তিনবার মধুপুর গিয়েছি, কিন্তু তবু আমার এবারও যেতে
ইচ্ছে হচ্ছে। তােমার জন্যে মন-কেমন করছে বলে যেতে চাইছি
না,—আমি এখানে থাকতে পারি, তােমার জন্যে কষ্ট হচ্ছে, তবু,
আমি থাকতে পারি। তুমি যদি মধুপুরে যেতে বল তবে আমি
যাব মিহির-দা’র সঙ্গে। একথা কিন্তু আর কাউকে বােলাে না।
-তােমার খােকা
পু-আচ্ছা মা, তােমরা যদি এখন ফিরে আস, তাহলে
ত এর পরে বড়দিনের ছুটির সময় আমরা সবাই মধুপুর যেতে
পারি,-আমিও সুদ্ধ। বড়দিনের সময় যদি আবার যাওয়া
হয় তাহলে মিছিমিছি ওখানে এখন বেশীদিন থেকে আর কি
হবে? তােমরা কালই চলে আসতে পারবে না?
-তােমার খােকা
পুঃ-মা, তুমি কি শীগগির আসবে না?
পত্র পড়া শেষ করিয়া চুপ করিয়া রহিলাম। আমার কিছু
বলিবার ছিল না। কোন কথা না সয়া সবিতা আমার হাত

অন্তরে বাহিরে হইতে চিঠিখানা গ্রহণ করিয়া সযত্নে ভাঁজ করিতে করিতে উঠিয়া গেল। আমার মনে হয়, কুমার যেন অকস্মাৎ সিড়ি দিয়া উঠিয়া আসিবে, লঘুচরণে আসিয়া সবিতাকে বলিবে, “মা, তােমার ছেড়ে আমি থাকতে পারি,-বড় হয়েছি কিনা, সেইজন্যে তােমার জন্যে মন-কেমন করে, তবু আমি থাকতে পারি। আমি এসেছি, তােমার জন্যে বড় কষ্ট হয়, কিন্তু সেজন্যে আসিনি, এই এলুম, এখনি- কুমার চলিয়া গেল,সহদেবের দ্বীপান্তরবাসের সঙ্গে সঙ্গেই সবিতার বাহিরের দুঃখও যেন আর তিল মাত্র অবশিষ্ট রহিল, না। তাহার অন্তরের মন্দিরে আজ শিশুদেবতার পূজা চলে। উপকরণ সব কুমার নিজেই রাখিয়া গিয়াছে, তাহার জুতা, মােজা, তাহার খাতা, বই, দোয়াত, কলম, তাহার মাতৃস্নেহ- লোভাতুর মন, তাহার সব-ভুলান “মা” ডাক। আয়ােজনের ক্রটি নাই, নিষ্ঠারও অভাব হয় না। কিন্তু সবিতার চোখে রাস্তার পাশে পাশে কুমারের রক্ত দেখা যায়। বােন আমার শান্তি পায় না।

হাই নিয়ম
তারপর সেই আগেকার মতনই দিন কাটিয়া যায়, পুরাপুরি
চৰিবশ ঘণ্টাই লাগে, না কম, না বেশী। কিন্তু আমি সবিতার
দাদার স্থান জুড়িয়া থাকি।
আমার কাঠখােট্টা চোখে জল আসে। ছােট্ট ছেলেটি, •
হাসিমুখে আসিত, বলিত, “পাঁচ পােয় আলু চাই।”
দাম ধরিতাম, আমার কেনা দামের অপেক্ষাও কম।
ইউনিভার্সিটির ডিগ্রীর দাম, আমার লােকসানের দাম তাহার
হাসির মূল্যে শােধ পাইয়াছি।

স্বামী-ভীব ছােট মেয়েটা সকাল হইতেই ‘জুতা ব্রুশ’ খাওয়ার জন্য বায়না ধরিয়াছিল। রাস্তা দিয়া কোন জিনিষই ডাকিয়া যাইবার জো নাই-ভাঙ্গা ঘটি বাটি সারানওয়ালা গলি দিয়া ডাকিয়া, গেলে, সে তাহাই খাইতে চাহিবে,-“চুড়ি চাই, বালা চাই’ জাকিলে, তাহাও তাহার খাওয়া চাই-মুচি যদি কুতী শ’ বলিয়া হাঁকিয়া যায়, তাহা হইলে দৌড়াইয়া আসিয়া মায়ের আঁচল ধরিয়া নাছােড়বান্দা হইয়া বলে, “মা, জুতাে শ’ খাব।” গলির মােড়ের মােয়াকাটতে বসিয়া বসিয়া দেখে, একজন পরামাণিক হাতে বা ঝুলাইয়া নিঃশব্দে চলিয়া যায়,—জিজ্ঞাসা করে, “তােমার হাতে ওটা কি ?” উত্তর পায়, বাক্স। গুটিয়া বীতে গিয়া বলে, “মা, যা খাব।”

ইহইলিয়ম সমস্ত পৃথিবীর সহিত তাহার একটি সহজ সম্বন্ধ আছে এবং সেটা উদরের সম্বন্ধ,-ইহা ছাড়া আর কোন ধারণাই তাহার সূত্র মস্তিষ্কটিতে প্রবেশ করে না। কন্যার পিঠের উপর ঠাস করিয়া একটা চড় বসাইয়া দিয়া মাতা কহিলেন, “পাজী মেয়ে, কেবলই ‘খাই খাই’‘জুতােশ খাব’, খেয়াে’খন জুতাে ব্রুশ-আজ ভাল করে খাওয়াব-” বারান্দার মাথায় শক্ৰমাতাঠাকুরাণীকে আসিতে দেখিয়া বধুর, কন্যাকে শাসন করিবার স্পৃহা মুহূর্তে বিলীন হইল,জোরে জোরে মশলা বাটিতে লাগিল। মেয়ে পিঠের উপর ঝুকিয়া পড়িয়া বলিল, “মা মশলা খাব।”-হতাশ হইয়া মাতা ফিস ফিস্ করিয়া তৰ্জন করিলেন। কিন্তু শ্বাশুড়ীর চোখ এড়াইল না—অগ্রসর হইয়া আসিয়া নাত্নীকে কোলে তুলিয়া লইয়া তিনি কহিলেন, “ছেলে মেয়ে আমাদেরও একদিন ছােট ছিল মেজবউ, বায়না তারাও কত- কিন্তু এ-রকম লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলে ঠেঙিয়ে বাইরে ভালমানুষির ভড়ৎ করতে আমাদের বাপ-চোদ্দপুরুষও কখনও পারত না।” বধূহেঁটমুখে নিজের কাজ করিতে লাগিল,কোন উত্তর দিল না। । বড়লােকের ঘরের কন্যা,অতএব অদিতির এই গৃহে পড়িবার খুব সঙ্গত কোন ছিল না। কিন্তু সময়ে ৩৪

সকল জিনিষের কারণ খুঁজিয়া পাওয়া সহজ নহে, এবং এক্ষেত্রেও
সেটা অনায়াসসাধ্য হইবে না।
মােটর উপর ধনী এবং সন্ত্রান্ত পিতার কন্যা অদিতি এই
সর্বপ্রকারে একান্ত দরিদ্রের গৃহে একদিন বধূবেশে প্রবেশ
করিল এবং পিত্রালয়ে একদিনের জন্যও আর ফিরিল না।
কিন্তু দুঃখ সেজন্য নহে—সর্বপ্রকার অভাবের আবহার
মাঝে নিজেকে মিশ খাওয়াইয়া লওয়ার মত এমন একটি সুস্থ
মনের গতি মেয়েটির মধ্যে ছিল যে, কোনও পরিশ্রমেই তাহার
মুখ কালাে হইয়া উঠিত না।
স্বামীর নাম বিশ্বতোষ—যদিও তুষ্ট সে বড় একটা কাহাকেও
করে নাই, বি ত ঢের দূরের কথা!
বিবাহের পূর্বে তাহার চেহারা যেন অন্যরকম ঠেকিত।
অদিতির পিতা পবিত্ৰকুমার বিশ্বতােষের বিনয়ন ব্যবহারে
অত্যন্ত মুগ্ধ হইয়াছিলেন,-তাহার মতে, আজকালকান্থ দিনে
এইরূপ চরিত্রের পাত্র পাওয়া নাকি একান্ত দুর্ঘট ছিল । পিতার
এই সিদ্ধান্তই অদিতিকে স্বামী-সৌভাগ্যবতী করিয়া তুলিল।
ইহা ছাড়া অদিতির এই গৃহে আগমনের আর কোন সহজ
কারণ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।
শশুর এবং শাড়ীতে সেদিন বিপ্রহরে তুমুল কলই
বাখিয়াছিল। শাশুড়ী কহিতেছিলেন, কাল সকালে তুরি

ইনিয়ম যখন কলতলায় আঁচাচ্ছিলে, তখন শকুড়ি জল ছিটকে এসে চৌবাচ্চার গায়ে লেগেছিল—সেই চৌবাচ্চার জল দিয়ে আজ চান্ করে এসে লেপ, তােষক ছিষ্টি ছুঁয়ে দিলে ত! এই বিষ্টির দিনে এই সব ধুয়ে শুকোতে গা-গতরের কি অবস্থা হবে সেটুকুন বিবেচনাও কি এই বয়সে হ’ল না গা!-বুড়ো হয়ে মরতে চলে, আঙ্কেল আর গজাবে কবে ?” বিছানাটা ভালাে করিয়া পাতিয়া লইয়া, হাত-পা ছড়াইয়া শুইয়া পশুর মহাশয় বলিলেন, “আমি গরীব মানুষ, এসব লেপ তােষক ধুয়ে বর্ষার দিনে পচতে দেবার মতন অবস্থা আমার নয়!”—বলিয়া হঠাৎ তিনি কি ভাবিয়া উঠিয়া বসিলেন, দ্রুতগতিতে দাড়াইয়া উঠিয়া বাকী সমস্ত বিছানাগুলা, কম্বল, বালিশ, কাথা, কাপড় প্রভৃতি হাত দিয়া স্পর্শ করিতে করিতে কহিলেন, “এই ত সমস্তই ছুঁয়ে দিলুম,—দেখি তুই কি করিস?” করােষে ফুলিতে ফুলিতে শ্বশুড়ী বলিলেন, “ম মিলে, তুই-তােকারি করি কেন?” শরমহাশয় পরিতােষবাবু তখন মাঝখানে দাড়াইয়া আর কোন্ জিনিষ স্পর্শ করিলে স্ত্রীকে বেশ খানিকটা জব্দ করা যাইবে তাহাই ভাবিতেছিলেন ;-এক ধারে একটা পুরানাে ষ্টীলট্রাঙ্ক ছিল,হঠাৎ অগ্রসর হইয়া আসিয়া সেইটার উপরে হাত রাখিলেন, তাহার পর দ্রুতপদে আসিয়া সহধর্মিণী নয়নতারার চুলের গােছাটা শক্ত করিয়া ধরিলেন,-ভীষণ- ভাবে হাসিয়া পিঠে একটা কিল বসাইয়া দিয়া কহিলেন, “এই ও

** ,
স্বামী-
তােকেও ছুয়ে দিলুম,—এইবার এই বাদলার দিনে আবার
চান করে’ মগে যা, হারামজাদী!”
এইবার নয়নতারার মুখ ছুটিল, -সে কি ভাষা! সে কি
গালাগালি !
পরিতােষবাবু বিছানায় গিয়া পুনরায় শয়ন করিলেন।
নয়নতারার দিকে চাহিয়া অত্যন্ত পরিতৃপ্তভাবে হাসিতে
লাগিলেন, কহিলেন, “তাের বাবার বিছানা?—এ সব তাের
বাবার জিনিষ, যে তুই নষ্ট করবি?” বলিয়া পাশ ফিরিয়া
শুইলেন,—মিনিটখানেকের মধ্যেই সিংহনাদের ন্যায় তাঁহার
নাসিকাগজ্জন শােনা যাইতে লাগিল। নয়নতারা দাড়াইয়া
দাড়াইয়া তারস্বরে চীৎকার করিতে লাগিলেন, কিন্তু ও-তরক
হইতে আর প্রত্যুত্তর আসিল না।
-এই ভাষা, এই আচরণ পূৰ্বে অদিতিকে পলে পলে আবাত
করিত, সে প্রাণপণে চোখ বুজিয়া কানে আঙ্গুল দিয়া থাকিত।
এখন সে নিয়ত মনে করিতে চেষ্টা করে যেন এ সকল ঘটনা,
এ সকল কুৎসিত বাক্য তাহার গা-সহা হইয়া গেছে, কিন্তু
কোথা হইতে দুস্তর লজ্জা আসিয়া তাহার মাথা হেঁট করাইয়া
শৈশবের সংস্কার মানুষের মনে যে শৃঙ্খলের সৃষ্টি করে,
তাহার বাঁধন কাটাইয়া বাহির হওয়া একেবারে অসম্ভব নয়,
হইলেও যথেষ্ট পরিমাণে কঠিন-অদিতি মনে মনে বলে,
আমি এ গৃহের বধু, আমার এ ভদ্রতার এবং
विमान

रेशर विनय
কেন? আমিও ইহাদেরই একজন-ইহাদের ভিতরে পৌছিষার
সহজ রাস্তাটি জানিতাম, অভিমন্যুর ন্যায় বৃহপ্রবেশে কোন
বাধাই তাই হয় নাই,কিন্তু এখান হইতে বাহির হইবার পথ
এখনও জানি না,সে মন্ত্র আজও শিখি নাই—অতএব
নীতির আড়ম্বর আমায় সাজে না।
-শ্বাশুড়ী আসিয় ফিফিস্ করিয়া কহিলেন, “আমি চান্
করে এসেছি মেজ-বউ-তুমি ও-ঘর থেকে বালিশবিছানা-
গুলাে সব বার করে নিয়ে এস দিকিনি বাছা-প্যারাটাও
এনাে-শব্দ-ট যেন না হয়, মিন্সের ঘুম ভেঙে গেলে আবার
কেলেঙ্কারী বাধাবে।”
অদিতি বিনাবাক্যব্যয়ে অগ্রসর হইতেই কাছে আসিয়া
কহিলেন, “আর দেখ, অনি ওর মাথার বালিশটাও নিয়ে
এসস,আস্তে আস্তে কোণটা ধরে টেনো, ওর ঘুম ভাঙবে
না, ত নাক-ভাকা নয় যমের ডাক,এত লােক মরে, এ
হতচ্ছাড়ার কি মরণ নেই গা?—আমার যে তাহলে হাড়ে
বাতাস লাগে !”
ভীতকষ্ঠে অদিতি কহিল, “কাজ নেই মা ও-বালিশটা
এনে,যদি জেগে ওঠেন—”
তীব্রভাবে নয়নতারা বলিলেন, “নেকী !-মুখে মুখে চোপা ?
শিলনােড়া দিয়ে খােতা মুখ ভোঁতা করে দেব।”
অদিতি ঘরের ভিতর হইতে সমস্ত বিছানা, বালিশ, কাপড়,
বাক্স প্রভৃতি সংগ্রহ করিয়া বাহিরে আনিয়া রাখিল। খাড়ী
৩

আবার কহিলেন, “এইবার ওর মাথার বালিশটা নিয়ে এস মেজবউ, ওর বিছানাগুলাে ত আর এখন আনা যাবে ,সে না হয় ও উঠলে পরে এক সময় মুকিয়ে-লুকিয়ে হবে।” অদিতি ঘরের ভিতরে ঢুকিয়া, নিদ্রিত শ্বশুরের পানে চাহিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল ;-দ্বারের কাছ হইতে ক্রমাগত হস্তেঙ্গিতে শ্বমাতাঠাকুরাণী কিন্তু তাহাকে শক্ত কাজ হাসিল করিবার জন্য তাড়া দিতে লাগিলেন, এবং অস্ফুট- স্বরে যে সকল উক্তি করিতে লাগিলেন, তাহাতেও অদিতির আনন্দিত হইবার মতন বিশেষ কিছু বােধ হয় ছিল না। কোন প্রকারে সাহসে বুক বাঁধিয়া অদিতি অগ্রসর হইল, বালিশের একটা কোণ ধরিয়া আস্তে আস্তে টান দিতেই পরিতােষের নাসিকাধ্বনি বন্ধ হইয়া গেল, দুই হাত দিয়া বালিশটা আঁকড়াইয়া ধরিয়া নিদ্ৰাবিজড়িত স্বরে মুদিতনেজেই তিনি কহিলেন, “কে?” ভয়ে অদিতির হৃৎস্পন্দন মিয়া গেল,-অতি সন্তর্পণে পা টিপিয়া টিপিয়া বাহিরে আসিয়া যেন প্রাণ ফিরিয়া পাইল। কহিল, “পারলাম না মা,উনি টের পেয়ে গেলেন।” নয়নতারা বিচিত্র মুখভঙ্গী করিয়া কহিলেন, “কাড়ি কাড়ি গিলবার বেলা তু পার বাছা, আর একটা কাজের কথা বলেই কি গৱে আগুন লেগে যায় ?” বলিয়া, একটু থামিয়া কহিলেন, “একটা সেফটিপিন দাও দিকিনি, দেখি আমিই যদি আতে পাৰি।” । ৬৯

ইহাই নিয়ম
হাতের শাখাটাতে গােটা তিন-চার সেফটিপিন প্রায়ই আঁটা
থাকে, নিজের ছেলেমেয়েগুলার পােষাকপরিচ্ছদের হাঙ্গামা
বড় বেশী নাই, এবং কখন-সখন যেসব ফুটা-ছেড়া কোনও
ঐক, ইজের-বডি অথবা পেনি পরান হয়, সেগুলারও বােতামের
সন্ধান কদাচিৎ মেলে, অতএব সেফটিপিনের রসদ অদিতি
হাতের কাছেই সংগ্রহ করিয়া রাখে। তাহারই ভিতর হইতে
একটা খুলিয়া লইয়া শ্বাশুড়ীর হাতে দিল।
নয়নতারা ঘরে ঢুকিয়া বাঁ-হাতে বালিশের একটা কোণ
ধরিয়া সজোরে টান দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ডান-হাতের সৈফটিপিনটা
দিয়া বালিশের কোণ খানিকট। ছিড়িয়া ফেলিয়া যেন কতকটা
নিজের মনেই বলিলেন, “ইস, বালিশ ফেটে একেবারে তুলে
বেরিয়ে গেছে! যাই এটাকে এইবেলা সেলাই করে রাখিগে,
যেদিকে নিজে না দেখব”
হঠাৎ মাথার বালিশ টানিয়া লওয়াতে পরিতােষের ঘুম চটিয়া
গিয়াছিল, এবং মাথাটা বিছানার উপরে অতর্কিত ভাবে পড়ার
জন্য তিনি কতকটা বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টিতেই নয়নতারার দিকে
তাকাইয়া রহিলেন। কিন্তু কোন প্রকারে বালিশটাকে
বগলদাবা করিয়া নিজের মনে বকিতে বকিতে বাহির হইয়া
আসিতে পারিলেই নয়নতারা তখনকার মতন বাচিয়া যান,
অতএব তিনি আর পরিতােষের দিকে ফিরিয়া তাকানাের
প্রয়ােজন অনুভব করিলেন না।
বাহিরে আসিয়া বালিশটা অদিতির দিকে ছুড়িয়া ফেলিয়া
৭০

सामो-डोर्ष
কষ্টমুখে তিনি কহিলেন, “নাও গাে মহারাণী, এবার এটাকে দয়া
করে সেলাই করে’, ধুয়ে দিতে পারি কি না একবার দেখ,
এই ছিষ্টি আমায় দিয়ে ছোয়ালে ত, আর একবার
করতে হবে, এই যা হ’ল লাভের মধ্যে।
এক পুত্র, তিন কন্যা;-পুৰট বড়। দশটি গ্রীষ্ম, বর্ষা,
শরৎ, হেমন্তের প্লীহালিভার-পরিপূর্ণ চেহারা। তিনটি
আট, ছয় এবং চার বৎসরের পৃথিবীর আশীর্বাদ পাইয়াছে-
নােগা সৰু আকৃতি, কাঠি কাঠি হাত-পা, ঢাকাই জালার
মতন পেটগুলা নানাবিধ অখাদ্য, কুখাদ্য এবং কুপথ্যে দিবারাত্র
পূর্ণ।
বড়-যা অনঈমােহিনী নিজের এবং দেবরের পুত্রকন্যাগুলিকে
এক জায়গায় সংগ্রহ করিয়া লইয়া, বেলা দুইটার সময়ে এক
ধামা মুড়ি খাওয়াইতেছিলেন। মুড়িগুলা দেখিতে দেখিতে
উবিয়া গেল এই শীর্ণ-বিশীর্ণাকৃতি শিশুগুলার শরীরের কোন
স্থানে যে অতগুলা জিনিষ কেমন করিয়া স্থান পাইল, সে কথা
মনে করিলেও বিশিত হইতে হয়।
অনঙ্গমােহিনী অদিতিকে ডাকিয়া বলিলেন, “মেজ-বউ,
সকালের ভাত-ডাল কি কিছু আছে?”
অদিতি কহিল, “আছে।”
৭১

।
ইলিয়ম
“নিয়ে এস , ওদের এইবেলা খাইয়ে দিই।
অদিতি এক গামলা ভাত আনিয়া কাছে রাখিল। মিনিট
দু’ তিন পরে চালের বাটিটা হাতে লইয়া আসিয়া দেখি,
এক গামলা ভাতের একটাও অবশিষ্ট নাই! বড়-যা মুখ
ঘুরাইয়া বলিলেন, “তােমার সব কাজেই বাপু আঠারাে মাসে
বরক্ষিধের সময় বাছার কতক্ষণ তােমার ডালের জন্যে
পিত্যেশ করে বসে থাকতে পারে?”
অথিতি ফিরিতেছিল, অনঙ্গমােহিনী ঝঙ্কার দিয়া উঠিলেন,
ডালটা ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছ যে বড় ? তােমার রাগ দেখাবার
জন্মে ওটা নিয়ে আসতে বলেছিলাম নাকি ?-আক্কেলকেও
বলিহারি যাই বাপু!”
অদিতি বাটি রাখিয়া দিল। তাহারই পুত্র শ্রীমান অনুভােষ
সেটা হে মারিয়া তুলিয়া লইয়া বিপুল শব্দে চুমুক দিতে আরম্ভ
করিল, অন্যান্য ছেলেমেয়েগুলা উচ্চ কলরবে সমস্বরে কহিতে
লাগিল, “আমাকে, আমাকে
সত্বে সঙ্গে কয়েক জোড়া হাত একই সময়ে ডালের বাটির
চারিদিক শক্ত করিয়া ধরিয়া ফেলিল। অনমােহিনী একপাশ
দিয়া হাত বাড়াইয়া অনুতােয়ের ভােজৰে বাধা দিয়া কহিলেন,
“সবটা খানে যেন, ওদেরও একটু স্-ি
শক্ত বাসন পড়িয়া আছে সেগুল। মাজিতে হইবে,
বিছানা, বালিশ, লেপ, তােষক বাক্স, মাদুর প্রতি খােয়
বাকী—অদিতি দ্রুতগজে কলতলায় চলিয়া গেল।ৰাগরের
স
৭২

বারান্দায় একটা পিড়ি পাতিয়া বসিয়া নয়নতারা তাহার কাৰ্য্যের
তদারক করিতে লাগিলেন।
-“শাখাটা একটু তুলে নাও মেজবউ,-কাপড়ের আঁচল
কোমরে জড়িয়ে নিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় ?
-দেখি নিয়ে এস দিকিনি কড়াইটা, কেমন মাজা হ'ল,
ঘুরিয়ে ধর—দেখি ওপাশটা, এসব দাগ কিসের? চোখের মাথা
কি খেয়েছ ?-ফের ধুগে যাও। এই যা! ঝাঁটাগাছটা চুলে
বুঝি ?”—বলিয়া নয়নতারা অকস্মাৎ চীৎকার করিয়া উঠিলেন,
-“চোকখাকী, দেমাকের চোটে কিছু দেখতে পাও না, না?
আজ আবার তােকে দিয়ে সমস্ত বাসন মাজাব তবে আমার
নাম নয়নতারা! দেখি তুই কত বড় বদমাইস !-এসব ইচ্ছে
করে’ নয় ?—এসব আমাকে জব্দ করা নয়?”
অদিতি ঝাঁটাটার পানে চাহিল--দেওয়ালের গায়ে
নিরীহভাবে দাড় করান আছে ; কেমন করিয়া যে সেটাকে
সে চুইতে পারে তাহা অদিতি বুঝিতে পারিল না। অত্যন্ত
কুষ্ঠিতঘরে কহিল, “আমি ত ওটা ছুইনি মা--
“কের চোপা! এর ছায়াটা কোথায় পড়েছে একবার
চোখ খুলে দেখ গাে ৰাশাজালী,আমরা সব মুখ, কিছু ও
আর বুঝিনে,—ওই ছায়াটার ওপর দিয়ে তুমি যাওৰি?—আমি
মিখোরাপ্পী-*
এজি িকথা ছিল না,কৃত বাসনের দিকে চাহিয়া
তাহার সমস্ত ভরসা যেন নিঃশেষ হইয়া গেল এইলা
৭৩

ইহা নিয়ম আরার মাজিতে হইবে,কতবারের বিপদ অতিক্রম করিয়া ইহাদের ঘরে ভােলা যাইবে, তাহা আন্দাজ করিতে পারা যায় না। সমস্ত ছোঁয়াছুয়ি বাঁচাইয়া, হাজার রকমের গালাগালি এবং পিতৃপুরুষদিগের অজস্র নিন্দাবাদ নিঃশব্দে হজম করিয়া অদিতি বাসন-মাজা-পর্ব শেষ করিল। নয়নতারা কহিলেন, “এইবার চা করে নাও মেজ-বউ, তারপর বিছনাগুলাে কাচো।” বিছানা কাচিবার সময় আবার তদারক চলিল। “আস্তে আস্তে আছড়াে বাপু, পরের জিনিষ বলে কি অনি করেই কাচতে হয়?—মেয়েমানুষের অত জোর ভাল নয়, দিন দিন খাচ্ছ আর হাতিটি হ’চ্ছ— অদিতি নিজের রিক্ত শীর্ণ হাত দুইটার পানে চাহিয়া ম্লান হাসিল। দেয়ালের গায়ে ছিটকে গেল জলগুলাে, চৌবাচ্চার গায়েও লেগেছে,কলের জল দিয়ে কলের মাথাটা ধুয়ে দিয়ে, একটু গাজল বার করে দেব’খন, কলের ওপরে ছিটিয়ে দিয়ে, দেয়ালগুলাে ধুয়ে ফেলল মেজ-বউ, চৌবাচ্চার জল ছেড়ে দিয়ে, -চৌবাচ্চার বাইরেটায় জল দিতে ভুলাে না যেন-” জ্যেষ্ঠা কন্যা সুশীলা আসিয়া কহিল, “মা, ছেলেমেয়েগুলাের ক্ষিধে পেয়েছে, দাওনা গােটাকতক পয়সা, পকৌড়ি ডেকে যাচ্ছে, কিনে দিই- == ৭৪ স্বামী-তী কন্যার কানের নিকট মুখ লইয়া গিয়া, কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নীচু করিয়া নয়নতারা কহিলেন, “তাের বাপের পকেট থেকে চার অনা পয়সা বার করে নিয়ে যা সুশী, তার থেকে চারটে পয়স। কিন্তু আমার, আমায় দিয়ে যা বাছা,আর তিন আনার পকৌড়ি কিগে যা।-- সুশীলা অগ্রসর হইতেই, তাহাকে ডাকিয়া পূৰ্ব্বাপেক্ষা নিম্নস্বরে কহিলেন, “দুটি পকৌড়ি আমায় দিয়ে যাস সুশী, অরুচির মুখে বেশ গরম গরম চিবুব’খন-” তেথােটা বৎসর এই গৃহে কাটিয়াছে,-অদিতি ভাবে, এক- আধটা মাস নহে, এটা দুইটা বৎসর নহে,-কেমন করিয়া কাটাইলাম ?-বাপ-মা, ভাই-বোনদের চেহারা অস্পষ্ট হইয়া আসিতেছে,-ষােল বছর বয়সে আসিয়াছিলাম, আজ উনত্রিশ বছর বয়স হইল, বুড়া হইব আর কতদিন পরে?—আজ যদি এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ তুলিয়া দাড়াই, তাহা হইলে লােকে হাসিবে, বলিবে, এতগুলা বছর পরে আজ হঠাৎ ঢং করিতে বসিয়াছি। কিন্তু বয়স যে আমার হইয়াছে তাহা অনুভব করতে পারিতেছি না। কালাে মাথায় হয়ত আর কয়েকটা বছর পরেই সাদার ছােপ লাগিবে, কিন্তু তবুও ত মনে হয় না ৭৫

যাইনিয়ম
আমার শৈশবের মন, আমার বাপ-মা, ভাই বােনের গৃহকোণকে
অতিক্রম করিয়া আসিলাম
হঠাৎ তাহার শ্বশুর মহাশয়ের উচ্চ কণ্ঠস্বর শােনা গেল।
তাঁহার পকেট হইতে চার আনা পয়সা হারাইয়াছে, তাহারই
জন্য তিনি ঘুম থেকে উঠিয়াই চীৎকার করিতেছেন।
অদিতি অনিল তাহার শ্বাশুড়ী বলিতেছেন,-তুমি ঘুমােবার
পর আমরা বাপু কেউ ও-ঘরে আর যাইনি, কেবল মেজ-বউ
দু’ একবার গিয়েছিল, তাকেই না হয় ডেকে জিজ্ঞাসা কর—
কথাটার ভিতরকার ইঙ্গিত অদিতিকে যেন একেবারে
তব্ধ করিয়া দিল, আর কিছু শুনিবার সাহসও তাহার রহিল
রান্নাঘরে ফিরিয়া গিয়া ভালে কাঠি দিতে দিতে সে ভাবে,
ইহাদের কাছ হইতে কি কি পাওনা আর আমার বাকী
রহিল ?
কয়েকদিন ধরিয়া চিন্তা করিবার পর অদিতি সেদিন স্থির
করিয়া ফেলিল যে, তাহার কপালে যাহাই ঘটুক না কেন, সে
তাহার ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভার নিজের হাতেই গ্রহণ
করিবে।
পুত্র অঙ্কুতােষের বয়স হইয়াছে ফশ, কিন্তু এখন পর্যন্ত সে
প্রথম ভাগের গণ্ডী পার হইতে পারে নাই। এক, দুই হইতে

আরম্ভ করিয়া একশ’ পৰ্যন্ত গণিয়া যাওয়াটাকে সে অনাবশ্যক
পরিশ্রম বলিয়া মনে করে, সেইজন্যই অদ্যাবধি সে-কাজে হাত
দেয় নাই।
অদিতি তাহাকে দুই-একদিন লইয়া বসিয়া পড়াইবার
চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু তাহার ফলে যে গণ্ডগোলটা বাধিয়া
উঠিয়াছিল, মােকদ্দমায় সর্বস্ব হারিয়া অবশেষে হঠাৎ একদিন
বিজয়ী পাওনাদারকে নিজের এলাকার মধ্যে পাইলেও বােধ হয়
তেমনটি
হয় না।
কেন জানি না, তিপ্পান্ন সংখ্যাটির উপরে অনুতােষের বিশেষ
অনুরাগ দেখা যাইত সেদিন অদিতি নিজে এক হইতে
দশ পৰ্য্যন্ত গণিয়া ছেলেকে বলিল, “এইবার তুই বলে’ -”
অনুতােষ কহিল, “এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়-
তিপ্পান্ন—”
সংশােধন করিয়া দিয়া অদিতি কহিল, “তিপ্পান্ন নয়-সাত,
আট, নয়, দশ—
অনুতােষ দরজার দিকে আড়চোখে চাহিয়া দেখিল তাহার
উদ্ধারকর্জীদিগের মধ্যে কেহ আসিতেছে কি না। কাহাকেও না
দেখিতে পাইয়া কাতরকণ্ঠে বলিল, “সাত, আট নয়, দশ,
তিপ্পান্ন-”
অদিতি আবার শােধরাইয়া দিয়া মিষ্টস্বরে কহিল, “ভিল্লায়
নয় অ,-বল এগারাে, বারাে, তেরে, চোদ, পনেরাে-বল
আমার সঙ্গে সঙ্গে
৭৭

ইহাই নিয়ম অমুতােষ অধিকতর ক্লিষ্টকণ্ঠে কহিল, “এগারাে, বারাে, তেরাে-তিপ্পান্ন—* অদিতি অসন্তুষ্ট হইল, ঈষৎ বিরক্তভাবে কহিল, “কেবল তিপ্পান্ন তিপ্পান্ন কোরাে না অনু,—আমি যা বলছি তাই বল” সুস্পষ্ট বিদ্রোহের সুরে অনুতােষ ঘাড় বাঁকাইয়া কহিল, “বাঃ রে, তিপ্পান্ন আবে না বুঝি?” “আসবে, তার এখনও দেরী আছে,-আগে পঞ্চাশ পর্যন্ত গণতে শেখাে, তারপর একান্ন, বাহান্ন, শেযে হবে তিপ্পান্ন—- দরজার কাছে ছােট ননদ সুনীলা আসিয়া দাঁড়াইল। বুদ্ধিমান অনুতােষ পিসিকে দেখিয়াই “ভ্যা” করিয়া কাদিয়া ফেলিল। সুনীল। মেয়েটির বয়স বেশী নয়, কিন্তু মাতার নাম সে রাখিতে পারে এমনি জিভের ধার। সে কহিল, “কি গাে মাষ্টারণী, ছেলে-ঠেঙানাে পাঠ চলছে বুঝি !-ও মা, দেখে যাও তােমার আদরের মেজ-বউয়ের কীৰ্ত্তি !-হ্যারে অনু, কি হয়েছে রে?” নির্ভয়ে অনুতােষ কহিল, “মা মেরেছে।” মেয়ের ডাকে নয়নতারা ঘরের দরজার কাছে আসিয়া কহিলেন, “এ বাড়ীর কোন ছেলেমেয়ের গায়ে হাত তুলবার আগে বেশ ভালাে করে বিবেচনা করে তুলল মেজ-উ- হাতখানা ভেঙে দিতে ত বেশী সময় লাগবে না বাছা,আর তা ছাড়া ছেলেরা আমাদের লেখাপড়া শিখুক আর নাই শিখুক, ওদের বাপ-ঠাকুর্দা, জ্যেঠা-খুড়ােনা বেঁচে থাকতে ওদের কোনও ৭৮ স্বামী-তীর্থ নিগ্রহ আমি সইতে পারব না, এ আমি তােমাকে বলে দিচ্ছি।” বলিয়া তিনি এবং সুনীল উভয়ে অনুতােষকে লইয়া চলিয়া গেলেন। কিন্তু অদিতি তবুও ছেলেকে লেখাপড়া শিখাইবার লােভ সংবরণ করিতে পারিল না। ইহার কয়েকদিন পরে সন্ধ্যাবেলায় উনানের উপর ভাতের হাঁড়ি চাপাইয়া রান্নাঘরের হারিকেন্ট। হাতে করিয়া, অদিতি প্রথম ভাগখানা সংগ্রহ করিয়া লইল। কাপড়ের তলায় বইটাকে লুকাইয়া লইয়া অনুতােষকে কাছে ডাকিয়া গায়ে মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিল, “আমার সঙ্গে ছাদে যাবি অনু? তোর জন্যে দুপুর বেলা লজেঞ্জস কিনে রেখেছিলাম, চ ছাদে গিয়ে তােকে দিই,এখানে বার করলে অন্য সবাই চাইবে কিনা,যাবি বাবা?-একটা গল্পও বলব’খন।” নিজের ছেলের সহিত এই প্রবঞ্চনায়, এবং মিথ্যাচ্ছলেও সকলকে বঞ্চিত করিয়া একজনকে কিছু দেওয়ার কথা উচ্চারণ করিবার গ্লানিতে অদিতির সত্যসন্ধ মন ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল, কিন্তু উপায় নাই, ইহাদের হাত হইতে নিজের সন্তানকে রক্ষা করিতে হইলে এই অসত্যের আশ্রয় না লইয়া কোনও উপায় নাই। অনুতােষ কহিল, “কই আগে লেবেঞ্চ দেখাও।” কাপড়ের ভিতর হইতে একটা ঠোঙা বাহির করিয়া অদিতি লজেস দেখাইল, অনুতােষ তৎক্ষণাৎ রাজী হইয়া কহিল, চল- ৭৯ - ইই নিয়ম মাতাপুত্ৰে নিঃশব্দপদে সিড়ি বাহিয়া ছাদে উঠিয়া গেল। শশুর, শাশুড়ী, ষা, ননদ এবং অন্যান্য ছেলেমেয়েগুলা তখন বিপুল কলরবেকারের ভিতরে সান্ধ্যবৈঠক বসাইয়াছে ; শী কাহারও ছাদে আসিবার সম্ভাবনা ছিল না। অদিতি পুত্রকে কোলের কাছে টানিয়া লইয়া প্রথম- ভাগখানা বাহির করিয়া স্নিগ্ধকণ্ঠে কহিল, “তুই যদি বােজ আমার কাছে একটু একটু পড়িস অনু, তাহলে তুই যা চাইবি তাই দেব—ঘুড়ি, লাটাই, লাট্ট, গুলি সব পাবি,কেমন পড়বি ত?” কুদ্ধ অনুতােষ কহিল, “এই বুঝি তােমার লেবেথুস ? আমি যাচ্ছি এখুনি ঠামা’কে বলে দিতে।” কাপড়ের ভিতর হইতে একটা কাঠ বাহির করিয়া অদিতি অকরুণভাবে বলিল, “আজ তােমাকে পড়তেই হবে, নইলে এই কাঠ আমি তােমার পিঠে ভাঙব,দশদিন আগে তােমাকে পড়া দিয়েছিলাম, সে পড়া আজ আমার চাই-ই।” নিরীহ মায়ের এ মূর্তি অনুতােষের কাছে সম্পূর্ণ নূতন ! বিলভাবে সে শুধু কহিল, “কিন্তু, লেবে?” “দেব পড়া হয়ে গেলে পর- প্রথম ভাগের একখানা পাতা খুলিয়া অদিতি বলিল, “জল’ বানান কর ত।” অনুতােষ চুপ করিয়া রহিল। ছেলেকে ভরসা দিয়া অদিতি কহিল, “ভুল হক, ভয় কি? - पानी- তুমি বলতে চেষ্টা কর অ-আমি বব না, মারব না, কিছু বলব না।” অনুভােষ তথাপি কোন শব্দ করিল না। অদিতি কহিল, “বল জE” দম-দেওয়া গ্রামােফোনের মতন অনুতােষের গলা হইতে বাহির হইল, “জ- “হ্যা, তারপর বলে যাও-বল জল’ বানান, লক্ষ্মী ছেলে বল, অমন চুপ করে থাকে কি?” কিন্তু নীরব অনুতােষের অটল নীরবতা ভঙ্গ হইল না। অদিতি আবার বলিল, “জ আর ল, জল—* অনুতােষ এতক্ষণে কথা কহিল, বলিল, “জ আর ল, জল- “কোন্ জ বল ত।” অনুতােষ আবার মূক হইয়া গেল। অদিতি এবার জিজ্ঞাসা করিল, * পড়ে’ বানান কর ? ।” অনুতােষের নিকট হইতে সাড়া পাওয়া গেল না। অদিতি বিরক্ত হইয়া বলিল, “প” অনুতােৰ কহিল, "প" “তারপর ?” অনুতােষ আর কথা কহিল না। অদিতি তাহাকে সাহায্য করিয়া বলিল, “ড়য়ে একানে ডে *ড়-য়ে একারে ডে, পড়ে।”

ইহইনিয়ম ‘কোন্ ড় বল ত।” অনুতােষ নীরব !—অসন্তুষ্টভাবে অদিতি কহিল, “জবাব দাও অপড়ে লিখতে কোন্ ড লাগে? বল, চুপ করে থেকো না।” কেন বলিতে পারি না, হঠাৎ অনুতােষের সুবুদ্ধির উদয় হইল, কহিল, “মধ্যাহ্ন র—” বিস্মিত হইয়া অদিতি কহিল, “কোন্ বললে ?” “মধ্যাহ্ন র— “মূর্ধন্য র?—সে আবার কি?” হতাশভাবে বইখানা পাশে রাখিয়া দিয়া অদিতি ভাবিতে লাগিল। মূর্ধন্য র’ জিনিষটা যেমন নূতন তেমনি অত- পূর্ব, দস্তুরমতন ভাষাতত্বের গবেষণা। “সিড়ির মাথায় কাহার মূর্তি দেখা দিতেই অদিতি সচেতন হইয়া উঠিয়া বইটা কাপড়ের তলায় লুকাইয়া ফেলিয়া কহিল, “গল্পটা শােন অ—দুর্ভিক্ষে তখন প্রাবস্তী নগর ছেয়ে গেছে বলিতে বলিতে তাহার সমস্তটা মন নিজের প্রতি ধিক্কারে পূর্ণ হইয়া গেল। মনে হইল, কেন এই লুকোচুরি, এত ভয়ই 'বা কিসের জন্য?—ইহাদের প্রশ্রয় ত এতগুলা বছর ধরিয়াই দিয়া আসিল, ফল ত কিছুই হইল না, এখন একটু ভিন্ন সুরের সঙ্গীতই না হয় চলুক না। এই যে অসত্য, এই যে মিথ্যা আচরণ তাহাকে ছেলের সামনে করিতে হইতেছে, ইহাতে ত ইহাদের কাছে এই কথাই শীকার করা হইতেছে তােমাদের অন্যায়ের কাছে হার ই মানিয়াছি। নিজের সন্তানের সম্মুখে এই যে অপমান সে নিজেই নিজেকে করিয়া বসিল, ইহার পরে কি নিজের মনের তৃপ্তিটুকুও তাহার অবশিষ্ট থাকিবে ? সিড়ির দিক হইতে চোখ ফিরাইয়া লইয়া, প্রথমভাগখানা পুনরায় বাহির করিয়া সম্পূর্ণ নিরুদ্বিয়কণ্ঠে অদিতি কহিল, ‘শােন অ, এই মাস শেষ হতে আর আট দিন বাকী আছে, এই আট দিনের ভিতরে তােমাকে প্রথম ভাগ শেষ করতে হবে, এটা মনে থাকে যেন, -আজ কম করে পড়া দিচ্ছি, এটা আমার কালকে চাই,কাল থেকে তারপর বেশী বেশী করে পড়া দেব।” সিড়ির মাথায় দাড়াইয়া বড়-যা অনঙ্গমােহিনী একেবারে অবাক হইয়া গিয়াছিলেন। তঁাহাকে এ সংসারে বেমানান হয় নাই,—এই বাড়ীর লােকগুলার সকল গুণই তাহাতে ছিল, এবং তাঁহার বিবাহের পর প্রথম প্রথম যখন তাহার শ্বমাতাঠাকুরাণী তাঁহাকে দুইটা কথা শুনাইতেন, তখন তদুত্তরে অনঙ্গমােহিনী গণিয়া গণিয়া নয়নতারাকে দশটা কথা বলিতেন, আর এমন করিয়া বলিতেন যে নয়নতারা তাঁহাকে আর দ্বিতীয়বার ঘটাইতে সাহস করিতেন না। অদিতির জীবন দুর্বহ করিয়া তােলার কাজে অনঙ্গমােহিনীর একটা বড় অংশ ছিল-আজ অপ্রত্যাশিতভাবে এই অতিসহিষ্ণু মেয়েটির কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের সুর শুনিয়া তিনি যেন ভিত হইয়া গেলেন। নিরীহ শান্ত মেষশাবকটি নিঃশৰে পড়িয়া মার খাইতে খাইতে অকস্মাৎ যদি ঘাড় ফিরাইয়া ঘুরিয়া দাঁড়ায়, তাহা হইলে

হাই নিয়ম
আশ্চৰ্য্য এবং বিরক্ত হয় না এমন প্রহারকর্তা বােধ হয়
বিরল !
অনঈমােহিনীও বিস্মিত হইলেন, কহিলেন, “কিগাে
অনুতােষের মা-জননী, তােমার ছেলের ওপর আমাদের দাবী-
দাওয়া আজ থেকে চুল নাকি ?-তা বেশ ভালােই মেজ-বউ,
আমাদের কাছে থাকলে ছেলে তােমার বিগ ড়ে যাবে বাপু,
নিজেই লালনপালন কোৱাে-নিজের পাঠা যখন, তখন ল্যাজের
দিক দিয়ে কাটাই ভালাে।” বলিয়া নীচে চলিয়া গেলেন।
অনুতােষ একবার মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া জ্যেঠাইমার
পিছনে পিছনে নামিয়া গেল।অদিতি শঙ্কিত হইল, বুঝিল
হঠাৎ এতটা সাহস দেখান ভালো হয় নাই। আজ যে অদৃষ্টে কি
ঘটিবে সেই কথা ভাবিতে ভাবিতেই সে পুনরায় রান্নাঘরে গিয়া
প্রবেশ করিল।
অনমােহিনী হাসিয়া বলিলেন, “ওগাে মা, তােমাদের
বাছুরের শিঙ, গজিয়েছে গো, আজকাল মাথা নাড়ে।” বলিয়া
হাসিতে হাসিতে বড় ননদ সুশীলার গায়ে চলিয়া পড়িলেন।
একপাল কুধার্ত নেকড়েবাঘের সম্মুখে এক টুকরা মাংস
ফেলিয়া দিলে যেমন হয়, তেমনিতর একটা নূতন মুখরােচক
কিছুর সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনায় ঘরসুদ্ধ সমস্ত লােকগুলা যেন
ই-হাঁ করিয়া উঠিল।
৮৪

দী-তীর্থ
নয়নতারা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হয়েছে গা, বড়বউ ?”
অনঙ্গমােহিনী কহিলেন, “তােমার মাষ্টারণী মেজবউ যে
তার ছেলেমেয়ের ভার নিজের হাতে নিতে চাইছে গাে,
আমরা মুখ, পেঁয়াে চাষা, ছেলেপুলে মানুষ করতে আমরা
জানিনে, একথা ত আমার মুখের ওপরেই আজ বলে’ দিলে—”
পশ্চাৎ হইতে অনুতােষ ফোড়ন দিয়া বলিল, “আমি পেথম
ভাগ না পড়লে মা বলেছে, আমার হাড় ভেঙে দেবে ঠাকমা,
আর তােমাকে বলেছে দজ্জাল, বজ্জাৎ,--আমায় শিখিয়ে
দিয়েছে, ঠামার কাছে খবরদার যানি”
শুনা খড়ের গাদায় যেন আগুন পড়িল। শ্বশুর, শাশুড়ী,
যা, ননদেরা, এবং ছেলেমেয়েগুলা মিলিয়া যে-রকম চীৎকার এবং
অসংযত ভাষায় গালাগালি আরম্ভ করিল, তাহা শুনিয়া রান্না-
ঘরে বসিয়া অদিতি কানে আঙ্গুল দিয়া লজ্জায় এবং ঘৃণায় মাটির
সহিত মিশিয়া গেল।
নয়নতারা দুই কন্যাকে সঙ্গে লইয়া অদিতিকে রান্নাঘর হইতে
হিড় হিড় করিয়া টানিয়া বাহির করিলেন, পাশের ঘরে লইয়া
গিয়া গর্জাইতে গর্শাইতে কহিলেন, “সুশী, খানিকটা সর্ষের তেল
গরম করে নিয়ে আয় ত-অনুতােষ, চেলাকাঠ একটা আন
দিকিনি-” বলিয়া একখানা কাপড় দিয়া হাত-পা বাঁধিয়া
অদিতিকে মাটিতে ফেলিয়া রাখিলেন।
নিমেষমাত্ৰ অদিতির দিকে চোখ তুলিয়া চাহিয়া অনুতােষ
ঘুরিয়া দাড়াইল,-হাত দুইটা মুঠা করিয়া কি যেন একটা
৮৫

ইহাই নিয়ম ভাবিয়া লইয়া অকস্মাৎ নয়নতারার উপরে ঝাপাইয়া পড়িল,- পাগলের মতন কিল, চড় বৰ্ষণ করিতে করিতে বলিতে লাগিল, “হারামজাদী রাকুসী, আছি চেলাকাঠ,হারামজাদী পেত্নী, তাের পিঠে ভাঙব চেলাকাঠ—” স্তম্ভিত নয়নতারা আত্মরক্ষা করিবারও অবকাশ পাইলেন না! সুশীলা, সুনীলা এবং অনমােহিনী জোর করিয়া অনু- তােষের হাত-পা ধরিয়া শূন্যে তুলিয়া লইয়া চলিলেন।-অনুতােষ চীৎকার করিয়া তাহাদের হাত ছাড়াইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। নয়নতারা গালাগালির চোটে কড়ি-বরগা ফাটাইতে লাগিলেন। পাশের ঘরে অনুতােষকে বন্ধ করিয়া বাহির হইতে শিকল তুলিয়া দেওয়া হইল। তাহার নিষ্ফল ক্রন্দন, নিষ্ফলতর আস্ফালনের শব্দ অদিতির কানে আসে,-পাশের ঘরের রুদ্ধ- বায়ের উপরে পদাঘাতে অতি পুরাতন বাড়ীটার এই ঘরের জীর্ণ দরজাটা অবধি যেন ঝন্‌ ঝন্ করিতেছে। নয়নতারা কহিলেন, “হারামজাদা খুনে-* গরম তেল আসিল, চেলাকাঠ আসিল,-তে দাত চাপিয়া অদিতি পড়িয়া রহিল, চোখ দিয়া একফোঁটা জলও বাহির হইল না। ও-ঘর হইতে অনুতােষের কান্নার শষ অদিতির কানে ভাসিয়া আসে-“আমার মা’কে ওরা মেরে ফেলল গাে !” অদিতির বুকের ভিতরে বসিয়া অনুতােষের জননী কহিলেন, “হায় অভাগা ?” ৮৬ बायो-और्ष কাঠটা মাটিতে ফেলিয়া দিয়া সুশীলা কহিল, “কি শক্ত হাড় বাবা, আমার হাতে ফোস্কা পড়ে গেল, তবু ত হারামজাদীর চোখ দিয়ে এক ফোটা জল বেরােল না!” হাত-পায়ের বাধন খুলিয়া দিয়া হাঁপাতে হাঁপাইতে নয়ন- তারা কহিলেন, “বেড়ালের প্রাণ-আষক আজ বিশেও কত বড় শয়তান, আমি একবার দেখব।” হাত, পিঠ, কপালের রক্তগুলা ধুইতে ধুইতে অদিতি হাসিল, নিজের মনেই কহিল, শৈশবে মাতার কাছে শিবপূজা করিতে শিখিয়াছিলাম,-ভবিষ্যৎ শশুরবংশের কল্যাণের জন্য, শাশুড়ী ননদ, যা, দেবর প্রভৃতির জন্য কত প্রার্থনাই না করিয়াছি,- সকলই সার্থক হইয়াছে। মায়ের কাছে বধুর কর্তব্য, গৃহিণীর কর্তব্য সম্বন্ধে কত উপদেশই না পাইয়াছিলাম, সে সকলও কাজে লাগাইতেছি। বাবার নিকট হইতে সন্তানপালন সম্বন্ধে কত কথাই না শুনিয়াছি, কত দৃষ্টান্তই না দেখিয়াছি, সকলই সফল হইয়াছে! বসিল। মাথায় জলপটি বাধিয়া অদিতি আবার আসিয়া রান্না করিতে মনে মনে ভাবিল, ইহাদের পাশবশক্তি তাহাকে কতখানি আঘাত করিতে পারে ? ইহাদের রুচি, ইহাদের ভাষা ইহাদের কুৎসিত আচরণ, ইহাদের জীবনযাত্রার প্রণালী এই সকল ৮৭

ইনিয়ম,
তাহাকে যত ব্যথা দিল, গায়ের ফোস্কা, শরীরের রক্ত তাহার
কাছে কিছুই নয়!
যে পবিত্রতার ভিতর হইতে সে তাহার শুচিশুভ্র মন,
কুমারী-হৃদয়ের ভক্তি ভালবাসা লইয়া আসিয়াছিল তাহা ব্যর্থ
হইয়া গেছে। দেবপূজার জন্য তাহার সমস্ত আয়ােজন কুকুরের
উচ্ছিষ্টে পরিণত হইয়াছে। তাহার প্রথম প্রভাতের ভ্র
জীবন,-এ জন্মে তাহাতে ফিরিয়া যাইবার কোন পথই
আর খােলা নাই!এতক্ষণ পরে অদিতির চোখে জল দেখা
দিল। জীবনের ভাগ্যপরীক্ষায় সে ঠকিয়াছে, মাণিকের সন্ধানে
বাহির হইয়া, সে মাটির ঘড়া লইয়া ঘরে ফিরিয়াছে।
বৎসরের স্বামীগৃহবাসের অনেক পুরস্কারের চিহ্নই ত সর্ব অঙ্গে
আঁকা আছে-চিতার আগুণে এই দেহটা যেদিন পুড়িয়া ছাই
হইয়া যাইবে, ওই দাগও মিলাইবে সেই দিন। কিন্তু সে সকলের
জন্য অদিতি সর্বান্তঃকরণে এই পশুধৰ্ম্মী মানবগুলাকে ক্ষমা
করিতে পারে।
কিন্তু তাহার সেই মন, সেই হৃদয়, যাহার
প্রসারকে ইহারা বাধা দিল, প্রতি কাৰ্যে প্রতি আচরণে প্রতি
পলে পরিপূর্ণ অপমান যাহারা সেই হৃদয়টিকে করিল, সে
অসম্মানের ডালি যাহারা অগ্রসর করিয়া দিল, তাহাদের সেই
অপরাধ ক্ষমা করিবার কথা যেন সে মনেও আনিতে পারে না।
তাহার অন্তর ক্রন্দন জাগিয়া রহিল,গায়ের ব্যথা, প্রহারের
দুঃখ তাহার তুলনায় মান হইয়া গেল।
-দেবর ভবতােষ রায়াঘরের মধ্যে আসিয়া কহিল, “বৌদি
,

বাণী-তী
আজকাল বাধতে বড়ই পরিশ্রম হয় বলে মনে হচ্ছে-
পষ্ট করে বললে তােমারও কষ্ট বাঁচে আমাদেরও সুবিধে হয় !”
একটু থামিয়া বলিল, “বৌদির চেহারা দিন দিন বেশ পাকিয়ে
উঠছে,-যেন শেওড়াতলার শাকচুন্নী !” বলিয়া সে হ হহ
করিয়া হাসিতে লাগিল। বােধ হয় ভাবিল, রসিকতা খুব
জোয়াল হইয়াছে ।
পূর্ণ দৃষ্টিতে ভবতােষের পানে চাহিয়া অদিতি কহিল,
“আপনাদের ঘরের বউ হয়ে যখন এসেছি, তখন আপনাদের
গৌরবের যাতে বিন্দুমাত্রও হানি না হয়, সেদিকে আমার
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকবে ?”
শ্লেষটা ভবতােষের নিরেট মস্তিষ্কে প্রবেশ করিল না,কিন্তু
একটা কোনও উত্তর দেওয়ার প্রয়ােজন অনুভব করিয়া সে কহিল,
“তা বটেই ত, তা বটেই ত”-বলিতে বলিতে সে বাহির
হইয়া গেল।
রাত্রিতে বিশ্বতােষ বাড়ী ফিরিলে নয়নতারা কহিলেন,
“তাের বউয়ের মুখে খ্যাংরা মেরে বাড়ী থেকে যদি না আজ দূর
করি বিশে, তাহলে আমি গলায় দড়ি দিয়ে মরব।”
বিশ্বতােষ কহিল, “হারামজাদী ফের তােমায় গাল দিয়েছে
৯

ইনিয়ম
নয়নতারা বলিলেন, “গাল?-শুধু গাল দিয়েছে বুঝি?
কেবল মারতে বাকী রেখেছে!-বিশ্বাস না হয় বরং জিজ্ঞেস
ক তাের ছেলেকে
বিশ্বততাষের আর শুনিবার প্রয়ােজন হইল না, ছুটিয়া রান্নাঘরে
ঢুকিল।
সকলের খাওয়া-দাওয়া হইয়া গেছে, পতিদেবতার ভাত
একপাশে ঢাকা দিয়া রাখিয়া, বহুকাল পরে অদিতি পিতাকে
পত্র লিখিতে বসিয়াছিল,—স্বামীর সাড়া পাওয়ামাত্র দোয়াত,
কলম, কাগজ একটা বাটির তলায় লুকাইয়া ফেলিল,—বিশ্বতােষ
ঘরে ঢুকিতেই তাহার দিকে চাহিয়া বলিল, “কাঠখানা এনে দিই,
নইলে তােমার হাতে ব্যথা লাগতে পারে, কি বল ?”
লাফাইয়া গিয়া বিশ্বতােষ অদিতির ঘাড় ধরিল, মাথাটা নীচু
করিয়া ধরিয়া মুখটা মাটির উপর ঘসিয়া দিতে দিতে কহিল,
“তাের মুখখানা আজ হেঁচে দিয়ে তবে জলগ্রহণ করব।”
মাড়ি দুইটা কাটিয়া রক্তের ধারায় ঘর ভাসিয়া যায়,—বিস্মিত
অদিতি ভাবে, এই ক্ষীণ শরীরে এত রক্ত কেমন করিয়াই বা
ছিল !
পবিত্ৰকুমাৰ অদিতির পত্র পাইলেন, কন্যা লিখিয়াছে-
“চরণেষ,
বাবা, অনেকদিন পরে তােমাকে চিঠি লিখছি।
১০

शामी-
এই গৃহে আসবার পূর্বে তােমাকে প্রশ্নে প্রশ্নে অতিষ্ঠ
করে তুলতাম সমাধানের জন্য।আজকে আমার মনে
আবার সন্দেহ জেগেছে, তার উত্তর তুমিই দিয়ে,কারণ
তােমার কথা ছাড়া আমি আর কারও কথাই মেনে চলৰ
• না।আমি আত্মহত্যা করব, না তােমার কোলে আবার
ফিরে যাব?
—পৃথিবীর ব্যাপার দেখে ভয় পেয়ে যে মরতে চাইছি,
এত ভীরু আমি নই, কিন্তু আমার বিশ্বাস, এর আমূল
পরিবর্তন দরকার,—কিন্তু কেমন করে যে সেটা সম্ভব হতে
পারে তা আমি জানিনে,-সেইজন্যেই তােমাকে লিখলাম।
—আমার কোনও কর্তব্য কৰ্মকে ফাকি দিয়ে আমি এড়াতে
চাইনে,—পৃথিবীর বৃহত্তর কর্মক্ষেত্র থেকে যদি আমার ডাক
আসে, তাহলে আমি কোনও শক্তির ভয়েই পিছিয়ে পড়াব
না।এদের কাছ থেকে যা পেলাম তা-ও আমার জমা রইল
তার জন্যে আমি কাউকেই দায়ী করব না।
-তেনাে বৎসরের জীবন মন্তবড় জীবন, অথচ সেটাকে জীর্ণ
বস্ত্রখণ্ডের মতন আজ ত্যাগ করে যেতে পারি কারও জন্যই
বিন্দুমাত্র দুঃখ অথবা সহানুভূতি অনুভব না করে, এই কথা
মনে হলেই কষ্ট হয়।
—তুমি আমায় জানিয়ে আমি আত্মহত্যা করব, না তােমার
কোলে ফিরে যাব ?
তােমার দিতু”
১১

ইনিয়ম
পবিত্ৰকুমার সমস্তই বুঝিলেন। তাঁহার কন্যা
দুঃখে তাঁহার নিকটে এরূপ পত্র লিখিতে পারে তাহা তাহার
নিকট অজ্ঞাত রহিল না। পত্রোত্তরে তিনি লিখিলেন—
“মা দিতু,
তােমার চিঠি পাইলাম, আমি নিজেকে অপরাধী না মনে
করিয়া পারিতেছি না। দূরদর্শিতার গৰ্ব যাহার যত অধিক সে-ই
তত বেশী ক্ষীণদৃষ্টির পরিচয় দেয়, ইহার দৃষ্টান্ত আমি নিজে।
নিজের কন্যাকে নিজের হাতে বলি দিয়াছি, এ কথা যখন আমার
মনে পড়ে তখন আর আমি আপনাকে সংবরণ করিতে পারি না।
তােমাকে যে লাভ করিল, অথচ মর্যাদা দিল না, সে যে
কতবড় দুর্ভাগা তাহা ভাবিতেও কষ্ট হয়।
আত্মহত্যার কথা মনেও আনিয়াে না। যদি বলি ইহা
পাপ তাহা হইলে কোনও নূতন কথা বলিলাম না। যদি বলি,
যে-জীবন তুমি দান করিতে পার না, সে-জীবন গ্রহণ করিবার
অধিকারী তুমি নও, তাহা হইলেও মৌলিক কিছু বলি না ;-
কিন্তু দুইটা উক্তিই সত্য।
এ জীবনে উহাদের ঘর করা ছাড়াও অন্য কাজ কাছে,
পৃথিবীর সেই মহত্তর কর্মেই আমি তােমাকে নিযুক্ত করিয়া
যাইতে চাই।
—ভুল একবার করিয়াছি, আবারও করিব কি না বলিতে
পারি না; কিন্তু পূৰ্ব্বাপেক্ষা সতর্ক হইয়াছি।
তােমার আত্মহত্যা করা যদি সঙ্গত বলিয়া মনে করিতাম,

স্বামী-স্তীর্ণ
যদি মনে করিতাম তােমাকে দিয়া এ জগতের আর কিছুই
করাইবার নাই, তাহা হইলে তােমাকে মরিতে বলিতাম, দ্বিধা
করিতাম না। কিন্তু আমি আমার মা'কে চিনি, সেইজন্যই
সমস্ত পৃথিবীর তরফ হইতে তাহাকে সহজে হারাইতে চাহি না।
তুমি তােমার পিতামাতার স্নেহের, ভাইবােনদের ভালবাসার
ভিতরে পূর্ণ মৰ্যাদায় ফিরিয়া এস।
জীবনের এই ক্রয়ােদশবর্ষব্যাপী বিরােধে তুমি যে পরাজিত
হও নাই, তাহা আমি জানি। তেরাে বৎসর ধরিয়া যে
চেষ্টা এবং যত্ন তুমি করিয়াছ তাহা আমি মনে মনে বুঝি,
-সেইজন্যই আজ পাষাণ ভেদ করিয়া গৈরিক নিঃস্রাব যদি
বা ছুটিয়া বাহির হইতে চায়, আমি তাহাতে বাধা দিব না।”
—পড়িতে পড়িতে অদিতি চোখের জল মুছিল।
সংসারের সকল সংবাদ জ্ঞাপন করিবার পর পবিত্ৰকুমার
যাহা লিখিয়াছিলেন, তাহা পড়িয়া শিশুপুত্রের সহস্র কৌতুক
হেরিয়া জননী যেমন সুপ্রসন্ন হাস্যে তাহাকে অভিনন্দিত করেন,
তেমনি করিয়া হাসিল,—আপন মনে কহিল, “ঠিক আগের
মতনই আছেন,-একটুও বদলাননি!”
পবিত্ৰকুমার নিজে অধ্যাপক ; সত্যের সহজ পথ ধরিয়া
সারল্যের অনাড়ম্বরতায় চলিতে তিনি অভ্যস্ত। মারপ্যাচ কিছু
বােঝেন না এবং সহও করিতে পারেন না।
অসময়ে, যত্র তত্র নিজের অধ্যাপনাবৃত্তির অপৰ্যাপ্ত লােভ
সংবরণ করিতে পারিতেন না বলিয়া, অদিতির অনেক সমেহ

ইহাই নিয়ম অনুযােগই তাঁহাকে পূৰ্বে শুনিতে হইয়াছে। তাহার আচাৰ্যত্বের পরিচয় তাহার পত্রের শেষে ছিল,-পবিত্ৰকুমার লিখিয়াছিলেন— “তােমার চিঠি পাইয়া আমার আর একটা কথা খুব বেশী করিয়া মনে হইতেছে, প্রাকৃটিক্যাল এডিউকেশান বলিয়া কোন পদার্থ এ পৃথিবীতে নাই, যাহা আছে তাহা হইতেছে প্রাক- টিক্যাল নলেজ, এবং প্রাকটিক্যাল এক্সপিরিয়েন্স; কারণ, যে মুহূর্তে কোন জিনিষ পুথি-কেতাব পড়িয়া শিক্ষকের কাছে শিখিতে যাইতে হয়, অথবা কাহারও উপদেশানুসারে হাতে- কলমে করিতে হয়, তখনি সেটা থিওরেটিক্যাল হইয়া ওঠে। আর সে-স্কুলে যাহা কিছু শিখান হয়, তাহা আর যাহাই হউক প্রাকৃটিক্যাল এডিউকেশান যে নয়, সে কথাটা আমি জোর করিয়াই বলিতে পারি। প্র্যাকটিক্যাল এডিউকেশান শিখাইতে গিয়া যখনই আমরা মনে করি যে, ইহাকে কার্যকরী করিয়া তুলিতে হইবে, তখনি সে প্র্যাকটিক্যালিটির আত্মবােধ আমাদিগকে এতটা থিওরেটিক্যাল করিয়া তােলে, যে মনে হয় আমরা যদি ইহার বিপরীত জিনিষটা শিখাইতে আসিতাম, তাহা হইলে হয়ত আত্মজ্ঞানের অভাবের দরুণ সেইটাই বেশী প্র্যাকটিক্যাল হইত। ইহার প্রমাণ দিতে হইলে এই কথা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, তথাকথিত কার্যকরী শিক্ষা পাইয়া যে সকল পণ্ডিত ব্যক্তি জীবনের কর্মক্ষেত্রে তাহা ব্যবহার করিতে গিয়াছেন, তাহারাই দেখিয়াছেন যে, তাহাদের মাষ্টারি-উপদেশানুসারে লব্ধ এবং বহুকষ্টে অর্জিত ১৪ স্বামী-ভী এ্যাকটিক্যাল এডিউকেশান এবং প্রাকৃটিক্যালিটির মাঝে আকাশ- পাতাল ব্যবধান !—তখন তাহাদের এক হয় সমস্ত অধীত বিদ্যা এবং কার্যকরী শিক্ষা ভুলিয়া যাইতে হইয়াছে, আর না হয় ত সেইটাকে আবার নূতন করিয়া ঢালিয়ঃ সাজিতে হইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদিগকে কাৰ্যকরী বিদ্যা শিক্ষা দিতেছে একথা বলাও যা, আর সােনার পাথর বাটিতে কাঁঠালের আমসত্ত্ব গুলিয়া খাইতেছি, বলাও তা। কোনও বিদ্যালয়েরই সাধ্য নাই যে কাৰ্যকরী বিদ্যা শিখায়, -ওটা শিখিতে হয় জীবনের কর্মক্ষেত্রে, তবে সেটাকে যদি কেহ কবিত্ব করিয়া পাঠশালা বলেন তাহা হইলে আমার আপত্তি করিবার কিছু নাই।” অদিতি হাসিল, আপন মনে কহিল, “ঠিক বাবার মতন। নিজের জীবনের দুঃখ-বেদনার কাহিনীও পিতার প্র্যাকটি- ক্যাল এডিউকেশান-থিওরীর বাহন হইয়া উঠিয়াছে দেখিয়া সে কৌতুক অনুভব না করিয়া পারিল না। পবিত্ৰকুমার শেষে লিখিয়াছিলেন, কন্যাকে তিনি আগামী রবিবার দিন আসিয়া গৃহে লইয়া যাইবেন। একটা কথা বলা হয় নাই।—বিশতােষের নাম ছিল বিখতােষ, যদিও সে তুই বড় একটা কাহাকেও করে নাই- ইহাই নিয়ম কিন্তু একেবারে কেহই তাহার উপর প্রীত ছিল না, একথা বলিলেও অতিশয়ােক্তির অপরাধ ঘটিবে। পাড়ার মােড়ে একটা দোকান আছে, তাহারই সম্মুখে একখানা কালাে রঙের কাঠের উপরে আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষরে লেখা, “শ্রীহরকুমার মুখোপাধ্যায়, লাইসেনিপ্রাপ্ত গাঁজা বিক্রেতা” -তাহার নীচের লাইনে লেখা, “এখানে সস্তায় ভালাে জিনিষ পাইবেন।” —এই হরকুমার বিশ্বততাষের উপর যে-রকম তুষ্ট ছিল সে-রকমটি কলিকালে বড় একটা দেখা যায় না ! হরকুমারকে বিশ্বের প্রতীক বলিয়া মনে করিয়া লইলে, বিশ্বততাষের নামের সার্থকতা সম্বন্ধে কেহ কোন প্রশ্ন তুলিতে সাহস করিবে না, দুইজনে এমনি ভালবাসা ! উভয়ের গভীর প্রীতির ফলে বিশ্বতােষের যেন-তেন-প্রকারেণ- রূপ যাহা কিছু আয়ের বেশীর ভাগ হরকুমারের বাক্স গিয়া উঠিত; এবং বিশ্বতােষের চোখ দুইটাও উত্তরােত্তর রক্তবর্ণ ধারণ করিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হইত না। —সেদিন রাত্রি বারােটার সময় বিশ্বতােষ কতকগুলা কাগজ- হাতে চোখ লাল করিয়া আসিয়া কহিল, “ওগাে মাষ্টারণী, এই চিঠি কখানা লিখে ফেল দিকিনি, দেখি একবার বিদ্যের বহর !” একটা কাগজ বাহির করিয়া কয়েকটা লােকের নাম-ঠিকানা দেখাইয়া পুনরায় বলিল, “দশটা চিঠি চাই, দশটা কপি— পকেট হইতে একটা খবরের কাগজ টানিয়া তুলিয়া, লাল ১৬ ফ্রেণ্ড, স্বামী-তীর্থ পেন্সিল দিয়া দাগ-দেওয়া একটা বিজ্ঞাপন দেখাইয়া সে কহিল, “পড়ে দেখাে মাষ্টারণী।”- এইবার নিজের বুকে হাত দিয়া বিশ্বতােষ বলিল, “শৰ্মা হেঁজিপেজি নয়,—ইচ্ছে করলে সব করতে পারে !-- চিঠিটা কে লিখেছে জানিস্ ?—গণেশ,-সেই শুড়ওলা গণেশ নয়,-মাই আমার বন্ধুগণেশ,বই লেখে, এবার ছাপতে দেবে, -কেমন লিখেছে একবার দেখি।”—বলিয়া চলিয়া যাইতে যাইতে আবার ফিরিয়া আসিয়া কহিল,-“দশখানা চিঠি কাল সকালে আমার চাই-ই, নইলে মজাটা টের পাইয়ে দেব বাবা, হা!”—বলিয়া বিশ্বতােয চলিয়া গেল। রাত্রি দ্বিপ্রহর, চারিদিক নিস্তব্ধ হইয়া গেছে। কাগজ- পত্রগুলা হাতে লইয়া অদিতি ভাবিল, ব্যাপারখানা কি? রান্নাঘরটা ধুইয়া রাখিয়া আসিয়াছিল, ততক্ষণে শুকাইয়া গেছে, হারিকেনে খানিকটা তেল ভরিয়া দোয়াত কলম লইয়া সেইখানে গিয়া বসিল। বাড়ীটা সৰু অন্ধকার গলির মধ্যে, সেই গলিটার ভিতরে সেইটাই শেষ বাড়ী এবং গলিতে প্রবেশ করিবার মাত্র একটা গলির মােড়ের একটা গ্যাসের আলােতে গলিটা রাত্রিকালে সামান্য একটু আলাে এবং যথেষ্ট পরিমাণ অন্ধকারের ভিতরে বাস করে। ৭

"
ইহাই নিয়ম
সেই গলিতে কোন কোনও দিন গভীর রাত্রিতে মাদুর
পাতিয়া বসিয়া বিশ্বতােষ তাহার কয়েকজন বন্ধুর সহিত গাঁজা
খাইত।
তেরাে বৎসরের বিবাহিত জীবনে ইহাদের জীবনযাত্রার
প্রণালীর কোনও সংবাদ জানিবার জন্য অদিতির বিন্দুমাত্র
কৌতূহলের পরিবর্তে অসহ ঘৃণা বর্তমান ছিল, কিন্তু আজ তাহার
হঠাৎ কি মনে হইল,—সে নিঃশব্দপদে অগ্রসর হইয়া আসিয়া
সদর দরজাটা একখানি খুলিতেই দেখিতে পাইল, একজন বড়
দাড়ীওয়ালা লােক বলিতেছে, “আমি কিন্তু ভাই মন্দোদরী
সাজ ব”
আর একটা লােক ফস করিয়া প্রশ্ন করিল, “বল্ ত মন্দো-
দরীরা ক’ ভাই ?”
হঠাৎ-ছাড়া-পাওয়া চাপা স্প্রিং-এর মতন আর একজন লােক
লাফাইয়া উঠিয়া বলিল, “বিভীষণ, মন্দোদরী, হনুমান, শিশুপাল,
সুগ্রীব, শূর্পণখা—হাহা, হুহু” বলিতে বলিতে তাহার মাথার
ভিতর গণ্ডগােল বাধিয়া গেল, সে বেপরােয়াভাবে কহিয়া চলিল,
“অযযাধ্যা, বারাণসী, বৃন্দাবন, ক্যাবলা, কলকাতা, তালগাছ,
আমি, গণশা, চিড়িয়াখানা, মরা-সুসাইটি, ভেটকীমাছ,
বিশে—
বিশ্বততাষের নাম করিতেই সে লাফাইয়া উঠিয়া তাহার
গালে ঠাস করিয়া একটা চড় বসাইয়া দিয়া নিজেই “ভ্যা” করিয়া
কঁদিয়া ফেলিল !-
।
১৮

স্বামী-
অদিতি দরজা ভেজাইয়া দিয়া নিঃশৰূপদে আবার রান্নাঘরে
আসিয়া বসিল, খবরের কাগজটা তুলিয়া লইতেই লাল পেন্সিলে
চিহ্নিত অংশটুকু চোখে পড়িল
সত্বর হউন। * সত্বর হউন।
আর চাকুরীর জন্য ভাবিতে হইবে না,-পয়সার জন্য চিন্তা
করিতে হইবে না। আমরা বহু চেষ্টায়, দীর্ঘ কালের অভিজ্ঞতায়
বেকার-সমস্যা-সমাধানের যে উপায় স্থির করিয়াছি, তাহা যেমন
নৃতন তেমনি অব্যর্থ। মাত্র পনেরাে টাকা খরচ করিলেই আমরা
আমাদের বহু সহস্র টাকা ব্যয়ে লব্ধ অভিজ্ঞতার ফল আপনাদের
গৃহদ্বারে পৌছাইয়া দিব।
একবার ভাবিয়া দেখুন, মুহুৰ্তমাত্র চিন্তা করুন,-মাত্র
পঞ্চদশটি মুদ্রা ব্যয় করিলেই আপনাদের সকল দুঃখ ঘূচিবে,!
বিলম্ব করিবেন না, আজই আমাদের নিকট টাকা
পাঠাইয়া দিন, অথবা আমাদের উপদেশ’ ভি পি করিতে
আদেশ দিন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য মাত্র নির্দিষ্টসংখ্যক লােককে আমাদের
উপদেশ’ বিতরণ করা , হইবে। অতএব বিলম্ব করিলে
আমাদের একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমরা আপনাদিগকে হতাশ
করিতে বাধ্য হইব।
সরউন।
সদর হউন।
এই সুবর্ণৰূর্যোগ হেলায় হারাইবেন না।

ইনিয়ম
-নীচে বিশ্বততাযের নাম, এবং খুব সম্ভবতঃ তাহার ফ্রেণ্ড,
অর্থাৎ বন্ধু গণেশের ঠিকানা দেওয়া আছে।
অদিতি এইবার তাহাদের ‘উপদেশ’ পড়িতে আরম্ভ করিল,
সেইটারই দশখানা নকল তাহাকে করিতে হইবে।
বেকার সমস্যার অপূর্ব সমাধান
প্রিয় মহাশয়,
আপনার প্রেরিত পনেরাে টাকা পাইয়াছি। আমাদের
‘উপদেশ গ্রহণ সম্বন্ধে আপনার সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের ধন্যবাদ
গ্রহণ করিবেন।
আপনাকে আমাদের প্রতিশ্রুত ‘উপদেশ’ পাঠান যাইতেছে,
—অনুগ্রহপূর্বক আপনি নিজেই উহা ব্যবহার করিবেন,—ইহার
সম্বন্ধে আর কাহাকেও কোন কথা বলিবেন না, এবং আমাদের
লিখিত পত্র অনুগ্রহপূর্বক কাহাকেও দেখাইবেন না ।
রাখিবেন এ সম্বন্ধে আপনি আমাদের নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কেহ
কিছু জানিতে চাহিলে, দয়া করিয়া আমাদিগের নাম এবং
ঠিকানা তাহাকে দিয়া দিবেন এবং পনেরাে টাকা পাঠাইয়া সকল
সংবাদ জানিতে বলিবেন।
উপদেশ’
আজকালকার দিনে চাকুরীটাকুরীর আশা ছাড়িয়া দিন,
ব্যবসা করুন,-Business।

শ্যামবাজার ট্রামের ডিপাে হইতে হাঁটিতে আরম্ভ করুন
কালীঘাট ট্র্যাডিপাে পৰ্য্যন্ত।-একটা নােটবুক সঙ্গে রাখিবেন,
আর একটা ফাউন্টেন পেন এবং এক বােতল অথবা এক শিশি
কালি,—আর তাহা যদি না পারেন, তাহা হইলে গােটাকয়েক
পেন্সিল এবং একটা ছুরি সঙ্গে থাকা চাই,শুধু নােটবুকে কাজ
হইবে না!
এইবার পূর্বদিকের ফুটপাথের উপরকার সমস্ত দোকানগুলার
জিনিষের নাম লিখিতে লিখিতে অগ্রসর হউন। হােমিওপ্যাথিক
ডাক্তারখানা, ছবি, বৃহৎ জ্যোতিষ-কাৰ্যালয়, হিন্দু, হােটেল,
-ভদ্রলােকদিগের আহারের স্থান,-লিখিয়া যান,থামিবেন
না।
সােজা চলিয়া যান কর্ণওয়ালিস থ্রট দিয়া, কলেজ স্ট্রীট
ছাড়াইয়া, ওয়েলিংটন স্ট্রীটের ভিতর দিয়া ধৰ্ম্মতলায় গিয়া পড়ুন।
ধর্মতলা স্ত্রীটের দক্ষিণদিকের ফুটপাথ ধরিয়া আগাইয়া যান।
এইবার চৌরঙ্গীর পূর্ব ফুটপাথ দিয়া অগ্রসর হউন। তাহার
পর আগুতােষ মুখার্জী রােড, তাহার পর বসা রােড।
এইবার পশ্চিম ফুটপাথ দিয়া ঐ প্রকার নােট করিতে করিতে
ফিরিয়া আসুন, কেবল চৌরঙ্গীতে চলিবার সময় পূর্ব ফুটপাথের
উপরে আসিবেন, দোকানগুলা আবার দেখিবেন,-রিভিযানের
কাজ হইবে,কারণ চৌরঙ্গীর পশ্চিম পাশে কোন দোকান
নাই।
ধর্মতলা স্ট্রীট দিয়া আসিবার সময় উত্তর ফুটপাথে থাকুন,

ইই নিয়ম ওয়েলিংটন স্ট্রীটে পড়িয়া আবার পশ্চিম ফুটপাথ ধরুন, এইবার সিধা চলিয়া যান শ্যামবাজার।-এখন বাড়ী ফিরুন,নােটবুকটা রাখিয়া দিন, স্নান করিয়া খাইয়া, একটু বিশ্রাম করিয়া লইতে পারিলেই ভালাে হয়। তারপর খাতাটা খুলিয়া এক এক ধরণের জিনিষগুলার আলাদা আলাদা লিষ্ট, করুন, অবশেষে গণিতে আরম্ভ করুন, দেখিবেন যােগে ভুল করিবেন না যেন! যে জিনিষের দোকান সৰ্ব্বাপেক্ষা অল্প আছে, “দুর্গা” বলিয়া সেই জিনিষেরই একটা দোকান কালবিলম্ব না করিয়া খুলিয়া ফেলুন,যদি লাভ না হয় তবে কি বলিয়াছি। এ সম্বন্ধে আরও কতনিশ্চয় হইতে হইলে আমাদের বড় বাজার- প্যালেট পাঠকরা আবশ্যক। আমাদের দ্বিতীয়সংখ্যক পুস্তিকায় তাহার কৌতুহলোদ্দীপক বিবরণ লিপিবদ্ধ হইয়াছে। তাহার জন্য বিশেষ মূল্য নির্ধারিত আছে। সে সম্বন্ধে বিস্তারীত জানিতে হইলে এক আনার ডাকটিকেট সহ পত্র লিখিতে হইবে। বিনীত বেকার-সমস্যা-সমাধান সমিতির পরিচালকবর্গ সমস্তটা পড়িয়া অদিতি মনে মনে বিশ্বততাষের ফ্রেণ্ড, গণেশের বুদ্ধির তারিফ না করিয়া পারিল না। কিন্তু তাহার মনে হইল, ইহা প্রবঞ্চনা, কতকগুলা অভাবগ্রস্ত লােকের ১০২

सागौ-डी
অসহায়তার সুবিধা গ্রহণ করিয়া নিজেদের পেট ভরাইবার হীন
ফন্দী ছাড়া ইহা আর কিছুই নহে। এই প্রবঞ্চনায় সে কোন
সাহায্যই করিতে পারে না, সে সাহায্য যত সামান্যই হউক
না কেন। বাক্য অথবা কাৰ্য্য দ্বারা কোন সহানুভূতিই যদি সে
এই উদ্দেশ্যের জন্য প্রকাশ করে তাহা হইলে তাহা অন্যায়
হইবে।
কালি, কলম, কাগজ পড়িয়া রহিল,-হারিকেনটা নিবাইয়া
দিয়া আঁচল বিছাইয়া শুইয়া, পিতামাতা ভাইবােনদের কথা
ভাবিতে ভাবিতে অদিতি ঘুমাইয়া পড়িল।
তাহার পরদিন সকালবেলা যে কাণ্ডটা ঘটিল তাহাকে ঠিক
কুরুক্ষেত্ৰই বােধ হয় বলা চলে।
অদিতি বলিয়াছিল, “আমি চিঠি লিখিনি।”
স্ত্রীর বুষ্টতা এবং দুঃসাহসের বহর দেখিয়া ক্রোধে বিশ্বতােষ
মিনিট দুয়েক কথা কহিতে পারিল ন, পরে বলিল, “তার
মানে?”
অদিতি কাগজপত্রগুলা বাহির করিয়া দিয়া জবাব দিল,
“এটা প্রবঞ্চনা,--আমি এ কাজে সামান্য একখানা চিঠি নকল
করে দিয়েও তােমাদের সাহায্য করতে পারিনে,-তুমি যেন
কিছু মনে কোরাে না।”

সে অত্যন্ত
ইহাই নিয়ম
বিশ্বতােষের মনে হইল, অদিতির মাথা নিশ্চয়ই খারাপ হইয়া
গেছে, তাহা না হইলে এই রকম কথা কোন প্রকৃতিস্থ লােকে
কহিতে পারে বলিয়া তাহার ধারণা ছিল না।
উত্তেজিত হইয়া কহিল, “প্রবঞ্চনা! তার অর্থ, এই রকম করলে
লােকের ঘরে টাকা আসবে না?”
অদিতি কহিল, “আসতে পারে, না-ও আসতে পারে,
তবুও আমার মনে হয়েছে এটা ঠিক নয়। আমি মন খুলে
তােমাদের একাজে কোনও উপকারই করতে পারিনে।
কাগজগুলো নাও, তােমার একটু দেরী হয়ে গেল, তা আর কি
কবে”
তাহার পর যে ব্যাপার আরম্ভ হইল তাহা স্বচক্ষে না
দেখিলে যেন ঠিক বিশ্বাস করা যায় না !
মাক, মুখ, মাথা, কপাল এবং বুক ও পিঠের রক্তে যখন সমস্ত
কাপড় লাল হইয়া গেল, তখন সেই নিশ্চল দেহের পানে
চাহিয়া শ্বশুর মহাশয় কহিলেন, “হারামজাদী মরে গেল
-
নাকি?”
তাহার পরের দিন সন্ধ্যাবেলা, নয়নতারা তাহার জ্যেষ্ঠপুত্র
সন্তোষের সহিত চীৎকার এবং গালাগালির মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ
হইয়াছিলেন। সন্তোষ সন্ধ্যাবেলা নিমন্ত্রণ খাইতে যাইবার জয়
১৪

স্বামী-তীর্থ
একটা সিল্কের পাঞ্জাবী কাহার নিকট হইতে জোগাড় করিয়া
আনিয়াছিল। কাহার না কাহার পাঞ্জাবী, কোন্ ছােটজাতের
কে জানে ? অতএব সেটাকে পবিত্র করিবার জন্য নয়নতারা
একফাকে আসিয়া পাঞ্জাবীটার উপরে গােবরজল ঢালিয়া দিয়া
গিয়াছিলেন,-ভরসা ছিল, রাত্রির অন্ধকারে দাগটা সন্তোষের
চোখে পড়িবে না, কিন্তু মাত্র কিছু অধিক হইয়া যাওয়াতে,
জিনিষটার সুগন্ধ সন্তোষের নাকে ধরা পড়িয়া গিয়া মুস্কিল
বাধাইল।
-অদিতির জ্ঞান ফিরিয়া আসিল,সমস্ত শরীরে অসহ
সন্ত্রণা। তাহার দেহের ভিতরে দূচ ফুটাইয়া যেন তাহার
সহিষ্ণুতার পরীক্ষা চলিতেছে ।
অদিতি ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল
। সে মনে মনে কহিল, “এ গৃহ আজই আমাকে ছাড়িতে
হইবে। বাবা লিখিয়াছেন, রবিবার দিন আসিয়া আমাকে
লইয়া যাইবেন, কিন্তু আমি আর অপেক্ষা করিতে পারি
,-তেরাে বৎসর আমার সহিয়াছে, কিন্তু আর মুহুৰ্ত্তমাত্রও
আমার সহিবে না।”
সে দেয়াল ধরিয়া উঠিয়া বসিল, দেয়াল ধরিয়াই ধীরে ধীরে
উঠিয়া দাড়াইল,-ভাবে বােধ হইল যেন মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া
যাইবে!
বাহিরের দিকে চাহিয়া অদিতি দেয়ালে পিঠ রাখিয়া স্থির
হইয়া দাড়াইয়া রহিল।

ইহাই নিয়ম
সেইদিনকার সকালের পরে যে কয়টা দিন কাটিয়াছে
সে ধারণা তাহার ছিল না। দিনের আলাে তখন যাই-যাই
করিতেছে। হাত-আয়নাটা লইয়া জানালার নিকটে আসিয়া
নিজের মুখের পানে চাহিয়া অদিতি মৃদু হাসিল,কপালে,
গালে, চিবুকে, নাকে রক্তগুলা শুকাইয়া রহিয়াছে । নিজের
কাপড় এবং সেমিজের পানে চাহিয়া অদিতি আবার ম্লান
হাসিল।
নয়নতারা তখন ও-ঘরে সান্ধ্যবৈঠক বসাইয়াছেন।
অদিতি উকি মারিয়া দেখিল কেহ কোথাও নাই। দেয়াল
ধরিয়া ধরিয়া সে কলতলায় আসিল। নাকমুখের রক্তগুলা
ধুইয়া লইয়া ঘরে ফিরিল ; কাপড়-সেমিজ ছাড়িয়া আর একটা
কাপড় পরিল,-তাহার পর পা টিপিয়া টিপিয়া সদর দরজার
নিকটে আসিতেই শুনিতে পাইল, সুশীলা কহিতেছে, “দুদিনে
ওটা মরে গেল কি না কে জানে,একবার দেখে আব মা?”
নয়নতারা কহিলেন, “চামারের ঘরের মেয়ে অত সহজে
মরে না লাে-তাের আর অত সােহাগে কাজ নেই বাছা।”
নিঃশব্দে দুয়ার খুলিয়া অদিতি বাহির হইয়া গেল।
গাড়ীতে বসিয়া অদিতি অনুভব করিতে লাগিল, তাহার
হাতের শাঁখা, তাহার কপালের সিদূর যেন তাহাকে গভীর
১০৬

স্বামী-তী নরকের দিকে টানিয়া লইয়া যাইতেছে ।--মনে হইল, যে জীবনকে পাপ মনে করিয়া, অন্যায় বিবেচনা করিয়া পশ্চাতে ফেলিয়া আসিল, সেই জীবনের জয়ধ্বজা সে নিজের অলেই বহন করিয়া লইয়া চলিয়াছে! কথাটা স্মরণ হইতেই কাপড়ের আঁচল দিয়া অদিতি কপালের সিঁদুর মুছিয়া ফেলিল, হাত দুইটা দিয়া পাগলের মতন ব্যস্তভাবে সিথির সিঁদুর ঘসিয়া বসিয়া নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলিতে লালি। গাড়ীর জানালার উপরে.আছড়াইয়া আছড়াইয়া শাখা দুইটা ভাঙ্গিতে গিয়া হাত কাটিয়া গেল, কিন্তু সেদিকে লক্ষ্য করিবার মতন অবসর যেন তাহার তখন ছিল না। ওই সি দূরে যেন তাহার কপাল পুড়িয়া যাইতেছিল, -ওই শাখাতে যেন তাহার হাত জ্বলিতেছিল! তাহার নব- জীবনের প্রভাতে ইহারা যেন তাহাকে মাথা তুলিতে দিবে না, তেরাে বৎসরের দুঃস্বপ্ন-শেষে তাহার প্রথম জীবনে ফিরিবার পথে ওই শাঁখা-সিদূর যেন প্রহরী! পথ ত আর শেষ হয় না—এলগিন যােড আর কতদূর! প্রান্ত অদিতি জানালার উপরে মাথা রাখিয়া মনে মনে কহিল, “আজ চলিলাম, ফিরিয়া চলিলাম,-রাত্রির দুঃস্বপ্ন ভুলিয়া যাইব, জীবনটাকে আবার ঢালিয়া সাজিব।” গেটের ভিতর দিয়া বাহিরের বাগান পার হইয়া গাড়ী- বারান্দার নীচে আসিয়া গাড়ী থামিল। কুমারী অদিতি ত্ৰয়ােৰশ বৰ্ষ পরে আপনার ঘরে ফিরিয়া আসিল। সে তাহার দেহের ব্যথা, সকল দুঃখ, সৰ্ব্ব অসম্মান ১০৭

ইহাই নিয়ম
ভুলিয়া গেল—এই তাহার পিতার গৃহ, তাহার মাতার সংসার,
তাহার ভাইবােনদের সুখনীড়, তাহার শৈশব ও কৈশােরের
পর্গ ।
দোতলায় উঠিতে উঠিতে সে বারবার সি ড়ির ধূলাগুলা
গায়ে মাথায় মাখিয়া আপন মনে কহিতে লাগিল, “আমার
পিতৃভবন, আমার শৈশবের খেলাঘর, আমার নিজের ভিটা,
ভােমার কোল ছাড়িয়া দুইদিনের খো খেলিয়া আসিলাম,
পিছনের জঞ্জাল পিছনে ফেলিয়া আসিয়াছি,-পায়ে পায়ে আর
কোনও আবর্জনাই জড়াইব না,তােমায় ফেলিয়া থাকিতে
পারিলাম না, পরের ঘরের দুঃখ বহিয়া তােমার কাছেই ফিরিয়া
আসিলাম,তােমার সুনিবিড় মেহের অচ্ছেদ্য বন্ধনে আমাকে
বাঁধিয়া রাখিয়াে, সে স্নেহ হইতে আর আমায় কোনদিন দূরে
সরাইয়া দিয়াে না, শেষ নিশ্বাস যেন তােমার বুকে থাকিয়াই
ফেলিতে পারি।”
১০৮

বগলা
প্রফুল্লকুমার কলিকাতার কোন মেসে থাকিয়া লেখাপড়া
করে। পিতা জমিদারী ষ্টেটের ম্যানেজার। সেদিন তাঁহারই
কাছ হইতে পত্ৰ আসিয়াছিল।
ফেমাস্পদেষ্ণু,
পরমশুভাশীৰ্বাদ বিজ্ঞাপনমিদং। পরে বাবাজী তােমার
মঙ্গল শ্ৰীশ্ৰীস্থানে সর্বদা প্রার্থনা করিতেছি।
তােমার লেখাপড়া
উত্তম প্রকারেই প্রস্তুত
করিতেছ। শ্ৰীশ্ৰীপূজা সমাগতপ্রায়। তােমার অবকাশের আর
কত বিল আছে ? অবকাশ হওয়ামাত্র কালক্ষেপ না করিয়া
দেশাভিমুখে রওয়ানা হইলে, আনন্দলাভ করিব।
তােমার জ্ঞাত কারণ জানাইতেছি, মনিবের কাৰ্যব্যপদেশে
বরণশাহীতে গমন করিয়া এক অত্যন্ত দরিদ্র কন্যাদায়গ্রস্ত বৃদ্ধ

ইহাই নিয়ম
ব্রাহ্মণের সাক্ষাৎকার লাভ করি। কন্যাকে সৎপাত্রস্থ না করিতে
পারায় ব্রাহ্মণের দুশ্চিন্তার অবধি ছিল না, অবশেষে তিনি আমার
হাতে পায়ে ধরিয়া পড়িলেন।
তােমরা সকলেই বড় হইয়াছ, এখন তােমাদিগকে রাখিয়া
এ পৃথিবী হইতে যাইতে পারি, ইহাই মঙ্গলময় ভগবচরণে
অহর্নিশ প্রার্থনা। কিন্তু সংসারন্ধন ছিন্ন করিতে চাহিলেই
যদি তাহা পারা যাইত, তাহা হইলে ত আর কোনও চিন্তাই
ছিল না।
—আজ পক্ষকাল গত হইল তােমার নূতন-মা’কে লইয়া
গৃহে ফিরিয়াছি।-নারায়ণের ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।
স্বাক্ষণকন্যা অত্যন্ত সুশীলা, এবং ব্যবহারের দ্বারা এই অত্যল্প
সময়ের মধ্যেই সকলের প্রশংসালাভ করিতে সক্ষম হইয়াছেন।
ইহাআমার পক্ষে সান্ত্বনার কথা ।
—বাতব্যাধিতে বড়ই কষ্ট পাইতেছি, দন্তশূলের যন্ত্রণাও
অসহ্য হইয়া উঠিয়াছে। নিপঙক্তির একটি দাঁতও আর
অবশিষ্ট নাই, উপরের পঙক্তিরও অনেকগুলা গিয়াছে। যে
কয়টা আছে সেগুলা অত্যন্ত নড়িতেছে, কিন্তু সহজে যে পড়িবে
এমতও বােধ করিতেছি না। আর অধিক দিন এই আধিব্যাধিপূর্ণ
সংসারে বাস করিব না—ইহাই একমাত্র ভরসা।
-- আর একবার দারপরিগ্রহ করাতে তােমার বড়দাদা
বিশেষ সন্তুষ্ট হয় নাই। সে বরাবরই একােখা মানুষ, তাহার
বুদ্ধিসুদ্ধিও বিশেষ আছে বলিয়া কোনদিন মনে করি নাই।
১১০

বরণভালা বিবাহে আমারও মত ছিল না,আমার গৃহধর্থ ভগবানের অভিপ্রেত হইলে আর তিনি তিন তিনবার এমন করিয়া চোখে আঙ্গুল দিয়া তাহার ইচ্ছা জ্ঞাপন করিতেন না। কিন্তু গৃহিণী গৃহমুচ্যতে--সংসার আমার পক্ষে অরণ্যস্বরূপ, অসুখ হইলে কে-ই বা সেবা করে ? বাতব্যাধিতে ত প্রায়ই উত্থানশক্তি- রহিত হইয়া পড়িয়া থাকি—একফোটা জল গড়াইয়া দেয় কে? এই যে দন্তহীন মুখে কোন জিনিষ ভালাে করিয়া চক্মণ করিতে পারি না বলিয়া কিছু হজম হইতেছে না, এই যে দাতের অভাবে এত কষ্ট পাইতেছি, এ সকলেরই বা খবরদারী কে করে ? -মেয়েরা ত শ্বশুরবাড়ীতেই, তােমার কনিষ্ঠা যে দুইজন আছে, তাহারা ত নিজেদের খেলাধূলা, পড়াশুনা এবং ভাইপাে, ভাইঝি- দের লইয়া আদর করিতেই ব্যস্ত। নিজের ছেলেদের তদ্বির করিতেই ত বধূমাতাদের দিন কাটে। তোমার বড়দাদা রাগ করিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছে, পুত্রকন্যা নাতী-নাত্নী, পুত্রবধুরা সকলে মিলিয়াও কি আমার ভাষা করিতে পারিত না? ইহা রাগারাগির কথা নয়,--আমার শরীর দিন দিন খারাপ হইতেছে, অথচ তেমন সেবা হইতেছে কই ? তবুও তােমার দাদাকে যদি সে কথা বুঝাইতে যাই, তবে সে অসন্তুষ্ট হয়। যাক সকলই আমার অদৃষ্ট! তােমার টাকা কয়েকদিন পরে পাঠাইতেছি। বৌমাদের, ছেলেমেয়েদের, তােমার বড়দা-মেজদা’র, তােমার নৃতন- ১১১

ইহাই নিয়ম
প্রভৃতির জন্য পূজার বাজার তােমাকেই করিয়া আনিতে হইবে,
বস্তু ও দ্রব্যসামগ্রীর ফর্দ এবং উপযুক্ত পরিমাণ অর্থ পরে প্রেরণ
করিব।
-আমার শশুরমহাশয় সেদিন এখানে আসিয়াছিলেন,
তােমার বড়দা তাঁহাকে দেখিয়া আমাকে বলিল, “আপনি
বলিলেন, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, কিন্তু ইনি ত আমার সমবয়সী হইবেন?”
তােমার বড়দা’র ধারণা, সে নিজে বৃদ্ধ নয়, তাহার
সমবয়সী লােকদের বৃদ্ধ বলা চলে না! সে এইরূপ ভাব দেখায়
যেন আমার শ্বশুরমহাশয়কে ‘বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বলিয়া উল্লেখ করিয়া
আমি একটা গুরুতর অপরাধ করিয়াছি।
তাহার কথাবার্তার মধ্যে একটা ইঙ্গিত সব সময়েই প্রচ্ছন্ন
এবং পরিস্ফুট দেখি, আমার আয়ুষ্কাল আর বেশীদিন নয়,
অতএব আমার মৃত্যুর বাঁধনে আর একটি বালিকার মৃত্যুকে
বাঁধিয়া অন্যায় করিয়াছি।
এ সকল কথা আমার পক্ষে পীড়াদায়ক।
আমার আয়ুর
সংবাদ তােমার বড়দা’ কেমন করিয়া টের পাইল, তাহা জানি
। আমার বয়স হইয়াছে বলিয়াই যে আমি পূৰ্বে গত হইব,
এবং তােমার নূতন-মা’র বয়স কম বলিয়াই যে তিনি আমার
পরে মরিবেন, এ ধারণা মনে পােষণ করিয়া তােমার বড়দা
নিয়তিকে উপহাস করিতে চায়। ইহা যদি সত্য হইত,
তাহা হইলে ভােমার পূর্বের মায়েরা পরলােকগত হইতেন না!
তাঁহারা বয়সে আমার অপেক্ষা ছােট ছিলেন, এবং তােমার
১১২

বরণডালা দাদার যুক্তি অনুসারে বঁাচা উচিত ছিল তঁাহার, যাওয়া উচিত ছিল আমার, অথচ আমিই বঁচিয়া আছি!—কিন্তু এসব কথা লইয়া আলােচনা করিতে ক্লেশ অনুভব করি । আর যদি বাস্তবিক তােমার নূতন-মা’র পূর্বেই এখান হইতে যাইতে পারি, তােমাদের সকলকে রাখিয়া সেই দিব্যধামে যাইবার মতন সৌভাগ্য যদি সত্যই আমার হয়, সেই পরমবাঞ্ছিত দিবস যদি আগত প্রায় হইয়াই থাকে, তাহা হইলে এমন আশা কি করিতে পারি না যে, তােমরা সকলে মিলিয়া তােমার নূতন- মা’র সামান্য ভরণপােষণের ভার গ্রহণ করিবে ? তােমার বড়দা ত প্রায়ই আমার সম্ভাব্য মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে, কিন্তু সে নিজেও ত অমর হইয়া পৃথিবীতে আসে নাই! মরিব ত আমরা সকলেই একদিন, বারংবার নানাপ্রকারে সে কথাটা বলিয়া লাভ কি? -জীবন-বীমার দালালেরা হিতৈষিতা দেখাইতে আসিয়া যখন বলে, “ধরুন আপনি আপনার বীমার টাকার মাত্র এক কিস্তী দিয়াই যদি আগামী কল্য মারা যান, তাহা হইলে আপনার স্ত্রীপুত্ৰপরিজনেরা সম্পূর্ণ টাকা পাইবে,” তখন তাহাদের শুভানুধ্যায়িতায় মন যতটা পড়িত হয়, তােমার দাদার হিতাকাঙ্ক্ষিতায় তাহার অপেক্ষা কোন অংশে কম হয় না। -আমাকে শই সদরে যাইতে হইবে,—শানপুরের চৌহদ্দি লইয়া রায়েদের সহিত বিবাদ বাধিয়াছে,- আমি না গেলে ৮ ১১৩

ইহাই নিয়ম
তাহার মিটমাট অসম্ভব। তােমার প্রয়ােজনীয় অর্থ সদর
হইতেই প্রেরণ করিব।
-আবার বিবাহ করিতে আমার যথেষ্ট আপত্তি ছিল,
মাসখানেক পূৰ্বেও যখন বড়বাবু আমায় এ সম্বন্ধে অনুরােধ
করিয়াছিলেন, তখন তাহাকে অমত জানাইয়া বলিয়াছিলাম,
“পুত্রকন্যাদিগের মধ্যে ত আর কেহ ছােট নাই যে, তাহার
লালনপালনের নিমিত্ত আবার বিবাহ করিতে হইবে,-তবে,
নিজের সেবাশুশ্রুষার কথা, সে যখন অপর কেহ তৎসম্বন্ধে কোনও
চিন্তাই করে না, তখন আর বারংবার ওরূপ বিড়ম্বনায় প্রয়ােজন
কি ?”—কিন্তু বরণশাহীতে ওই ভদ্রলােক যেরূপ নিৰ্বন্ধসহকারে
আমাকে ধরিয়া পড়িলেন, তাহাতে আমার “না” বলিবার
উপায় রহিল না।
তােমার দাদা বলে, তাহার জ্যেষ্ঠা কন্যা বরুণার অপেক্ষাও
নাকি তােমার নৃত-মা বয়ঃকনিষ্ঠা-তােমার দাদার চিরকালই
সকল কথা বাড়াইয়া বলা স্বভাব। তােমার নৃতন-মা এবং বরুণা
বড় জোর সমবয়সী হইতে পারে, বরুণা কিছুতেই বড় না!
আমি সেদিন রান্নাঘরের পাশ দিয়া নীলপুকুরে স্নান করিতে
যাইবার সময় দেখিলাম, তােমার বড়দা’ ভারী-গলায় বড়-
ববৃমাতার কাছে বলিতেছে, “ওই শিশু মেয়েটাকে এমন করিয়া
বলি দেওয়া—”
ভাবিলাম, আমি কি আজই মরিয়াছি?—তােমার বড়দাদা
কি মেঠো-বক্তা হইয়া উঠিল ?
১১৪

বরণডালা ০ এই সকল অত্যন্ত গরম গরম কথা শুনিয়া, আমি তােমার -মা’কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, আমার সহিত বিবাহ হওয়াতে দুঃখে শশাকে বেচারার বুক ফাটিতেছে কি না! তােমার নূতন-মা কথা না কহিয়া ঘাড় নাড়িয়া জানাইলেন,-না, তিনি শান্তিতেই আছেন। আমিও তাহাই বলি,-দরিদ্রের কন্যা, কোথায় কাহার হাতে পড়িয়া সারাটা জীবন অনশনে অৰ্ধাশনে মরিতেন—তাহার চেয়ে এ কত ভালাে হইয়াছে। খাওয়া-পরার ভাবনা নাই, সুখ- সুবিধার সীমা নাই,—বিধবা হইলেও কোনও অভাবই সহ করিতে হইবে না কোনদিন। আর সিথির সিঁদূর লইয়া, আমার পায়ে মাথা রাখিয়া যদি—এ সকল কথা তর্কের খাতিরে বলিতেছি, এরূপ ঘটনা যে আমার ঈপ্সিত তাহা নহে যদি তিনি আমার পূর্বেই যাইতে পারেন, তবে তাহার ন্যায় ভাগ্যবতী তােমার নূতন-মা’র যদি দুঃখ হইত, তাহা হইলে কি তিনি কিছু বলিতেন না? আমি ত দেখি, অত্যন্ত নিঃশব্দে তিনি সমস্ত দিন ঘর- সংসারের কাজ করেন, রাগ নাই, বিরক্তি নাই, ক্লান্তি নাই। তােমার দাদা সেদিন বলিল, শত অত্যাচার, সহ অপমান প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু যে মুখ বুজিয়া সহ করে, জীবনভাের নিত্য অসম্মানের অজস্র ইঙ্গিত কুড়াইয়া, সৰ্বগ্নানির কার্বন ডায়ক্সাইড বিষকে বনস্পতির মত পান করিয়া প্রতিদানে শুধু অক্সিজেনের

৮
ইহাই নিয়ম
অমৃতনিষেকে পৃথিবীকে যে স্নান করায়, তাহারই নাম বাংলার
মেয়ে, বঙ্গের বধূ। তােমার দাদার মতে, বাংলার মেয়ে শিবের
মত নীলকণ্ঠ,অঞ্জলি ভরিয়া গরল পান করিয়া, পীযুষ বিলাইয়া
দেবী হইয়া গেছে। তােমার দাদা বলে, সৰ্ব্বদেশের সর্বযুগের
নারীসমাজে শ্রেষ্ঠ আসন বাংলার কন্যা না চাহিয়াই পাইবে। সে-
আসন হইতে হাত বাড়াইলে আকাশ ছোয়া যায়—আর কোনও
দেশের মেয়ে নাকি তার নাগাল পায় না।
তােমার দাদা যে শুধু উকীল তাহাই নয়, সে রসায়নবিদ,
এবং দার্শনিক ও কবিও বটে।
তােমার নূতন-মা’কে ঘরে আনার মধ্যে যে এত প্রকাণ্ড
প্রকাণ্ড সমস্যা ছিল, তাহা কি পূৰ্বে জানিতাম।
-তােমার বড়দা একবার বলে, “এমন নীরবে, এমন শান্ত,
ঔদার্যের সহিত সকলকে ক্ষমা করিয়া, রিক্তহস্তে জীবনের
বন্ধুর পথে যাত্রা করিতে পারে শুধু বাংলার মেয়ে।”—আবার
অন্য সময়ে বলে, “এই শিশু, সংসারের কোন খবর এ জানে ?
পৃথিবীর কণ্টকসমাকীর্ণ পথে আরও কতকাল কেমন করিয়া
ইহাকে চলিতে হইবে, তাহার কিছুমাত্র কি এ এখনও বােঝে?
—ইহার পাথেয় কই, ইহার সম্বল কই?”
উকীল হিসাবে তােমার দাদার যথেষ্ট সুনাম আছে,কিন্তু
এক্ষেত্রে সে তাহার নিজের মােকদ্দমা নিজে মাটি করিতেছে।
স্বীয় অবস্থাটা সম্যকরূপে বুঝিবার মত বয়স যদি তােমার
নূতন-মা’র না-ই হইয়া থাকে, তাহা হইলে যে তাহার চিত্তে
১১৬

বরণডাল
সত্যকার কোনও দুঃখই উদিত হয় নাই, এই সিদ্ধান্তই কি
যথার্থ নয় ?
তােমার দাদা যে কি বলিতে চায়, তাহা আমার বােধগম্য
হয় না,-মােটের উপরে বুঝিতে পারি যে, সে সন্তুষ্ট হয় নাই
এবং বাড়ীসুদ্ধ সকলকেই তাহার মতাবলম্বী করিয়া তুলিতেছে।
-ওকালতিতে সে যথেষ্ট পয়সা উপার্জন করে, এবং আমার
সম্পত্তির উপরেও তাহার কোনই আকর্ষণ দেখি নাই কোনদিন,
নহিলে তাহাকে ত্যাজ্যপুত্র করিতাম।
সে এক সময় বলে যে, তােমার নূতন-মা যখন তাহার
অবস্থাটা ঠিক করিয়া অনুভব করিতে পারিবেন, সেদিনই নাকি
তাহার মৃত্যু হইবে! তাহার মতে, এ যেন দুররাতের
ভূমিকম্পে মাথার উপরে গৃহপতন,—অকস্মাৎ চমকিয়া যে মুহূর্তে
ভয় পাইয়া মানুষ জাগে, তাহার পরমুহূর্তেই নাকি চিরকালের
জন্য জ্ঞান হারায় ! আজ তােমার নৃ-মা সহজে কিছু বুঝিতে
পারিতেছেন না, কিন্তু নীড়হারা মন কোন্ সুদূরে ভাসে,
তাহার জীবনে একটা অত্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, এখনই নাকি
তিনি ইহার আভাস পাইতেছেন, যেদিন অত্যন্ত স্পষ্ট করিয়া
একথা তিনি বুঝিবেন, সেদিন তাহার সুপ্রসন্ন চিত্তকে আমরা
হারাইব,সেই হইবে নাকি এ গৃহ হইতে তাহার বিদায় !
তােমার দাদা যে কত কথাই বলিতে পারে।—সমস্ত শুনিয়া
আমার দৃঢ় প্রতীতি হইয়াছে, সুস্থ শরীরকে নিরর্থক ব্যস্ত
করিয়া ভােলা ছাড়া তাহার আর অন্য কোনও উদ্দেশ্য নাই।
১১৭

ইহাই নিয়ম
এক একবার মনে হয়, তাহার কি মক্কেলের অভাব হইয়াছে।
কোর্টে কি আজকাল তাহার যথেষ্ট কৰ্ম্ম জুটিতেছে না?
প্রতিমাসে সে যে-রকম পকেট ভর্তি করিয়া টাকা আনে, তাহাতে
সে ধারণাই যে সত্য, তাহাই বা বলি কেমন করিয়া?
-শুনিতেছি, কলিকাতায় ইনফ্লুয়েঞ্জা দেখা দিয়াছে।-তুমি
সাবধানে থাকিয়াে। ভবতারণদের বাড়ীর কোনও সংবাদ অনেক
দিন যাবৎ পাই না। তাহাদের বাড়ীর কে কেমন আছে,
তােমার অবসরমত একদিন জানিয়া আসিয়াে।
শানপুর হইতে হয়ত আমাকে সীমগঞ্জ যাইতে হইবে। বড়-
নদীর মাছের বন্দোবস্ত লইয়া ছােট তরফের সহিত মনােমালিন্ত
অনিবার্য। একটা রফা-নিষ্পত্তি করা আমাদের মনোগত
বাসনা।
-তােমার দাদা এই অত্যন্ত সহজ কথাটা কিছুতে বুঝিতে
চাহে,না যে, তােমর নূতন-মা'কে আমাদের গৃহে আনিয়া আমার
শ্বশুরমহাশয়কে আমি কত বড় একটা দায় হইতে মুক্ত করিয়াছি।
সৰ্বস্ব খরচ করিয়া, পিতৃপিতামহের ভিটামাটিটুকু পর্যন্ত শেষ
করিয়া হয়ত তিনি একটি তথাকথিত সুপাত্রের হস্তে কন্যা সমর্পণ
করিতেন,-এবং তাহার পরে নিজে আজীবন ভুগিয়া মরিতেন
এবং তৎসঙ্গে ভুগিতেন তঁাহার কন্যাটি,-এক দফা, পিতাকে
নিঃস্ব করার জন্য আত্মগ্লানিতে, দুই দফা, শ্বশুরগৃহের এবং
স্বামীর চমৎকার আচরণে এই যে আমাদের বৃহৎ ধনী-
পরিবারে, তোমার নুতন-মা ওইটুকু মেয়ে হইয়াও সৰ্বময়ী কী
১১৮

বরণডালা
হইয়া বসিলেন, এই যে তাঁহার পিতাকে একটী অচল পাই
পয়সা অবধি কন্যার বিবাহের জন্য খরচ করিতে হইল না, ইহার
জন্য কি তোমার নৃতন-মা এবং তাঁহাদের পরিবারস্থ লােকেরা
আমার প্রতি কৃতজ্ঞ ন’?
তােমার দাদার বড় বড় কথার অনেক সময় অর্থ খুজিয়া
পাওয়া শক্ত। সে বলিতেছে, তােমার নূতন-মা হয়ত সারাজীবন
তাঁহার দুঃখের কোন কথাই বলিবেন না, কিন্তু কোন্‌দিন
গৃহকোণে বসিয়া লােকলােচনের অগােচরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলিবেন,কেহ সে সংবাদ জানিবে না,-ঘােট একটুখানি
নিশ্বাস, অথচ তাহাতেই নাকি উল্টা হাওয়ায় পৃথিবীর পাল
ছিড়িবে!—আজ হউক, কাল হউক, এক বছর পরে হউক, দশ
বছর পরে হউক,ইহা নাকি একদিন ঘটবেই।—বিপদ মন্দ
নয়। তোমার নূতন মা যদি মুখ ফুটয়া কিছু বলেন, তাহা
হইলে তােমার দাদা তাহার ওকালতি বুদ্ধিতে একটা, চমংকার
মােকদ্দমা খাড়া করিবে ;-আর যদি তিনি সমস্ত জীবনেও কিছু
বলেন, তাহা হইলে তােমার বড়দা’ তােমার নৃত-মা’র দুঃখ,
শােক, বেদনা, অশ্রু, মায় দীর্ঘনিশ্বাস অবধি কল্পনা করিয়া লইয়া
আরও চমৎকার এক আর্জি গড়িয়া তুলিবে!—এ-রকম উকিল
লইয়া সংসারে বাস করা দুরূহ ব্যাপার সন্দেহ নাই।
—আমি কোনদিন ওকালতি করি নাই, দালালি করাও আমার
ব্যবসা নহে, সেইজন্যই তােমার দাদার কথার ইনাইয়া বিনাইয়া
জবাব দেওয়ার মত সামর্থ্য আমার নই। আমি শুধু এইটুকুই
১১৯

ইহাই নিয়ম বলিতে পারি যে, গুরুজনদের সম্বন্ধে তাহার আর একটু বেশী শ্রদ্ধা থাকিলে আমার পক্ষে সংসারে বাস করা সহজ হইত। তােমার নূতন মা’র বয়স হয়ত কম হইতে পারে, কিন্তু তাঁহার পিতা, মাতা এবং অন্যান্য গুরুজনেরা সকলেই কিছু শিশু ন’ন। তাহারা তােমর নূতন-মা’র শত্রু না, এবং পৃথিবীর সমস্ত ন্যায়বিচারবােধ তােমার দাদার একচেটিয়া না। তােমার নূতন-মা’র সেই সকল পরমাত্মীয়েরা তঁাহাদের কন্যার পক্ষে যাহা সর্বাপেক্ষা শুভ ও কাক্ষণীয় তাহাই করিয়াছেন, অথচ এ সকল যুক্তি তােমার দাদার সম্মুখে উপস্থিত করার জো নাই!—এ সংসারে তাহার অপেক্ষা বড় হিতৈষী তােমার নৃতন- মা’র কেহ কোনদিন ছিল অথবা আছে বলিয়া সে স্বীকার করে না। আত্মীয়-স্বজনেরা সকলেই তােমার বড়দা’র বুদ্ধির এবং স্বভাবের নিয়ত প্রশংসা করিয়া তাহার মস্তকটি উত্তমরূপে বিকৃত করিয়া তুলিয়াছে বলিয়া আমার বিশ্বাস ! তাহার মত আহম্মক আমি ত এ সংসারে আর দু’টি দেখিলাম না ! আগতে তােমার সর্বাঙ্গীন কুশল লিখিয়া সন্তুষ্ট করিয়াের অত্রৈব সমস্তই মঙ্গল। আমার আশীৰ্বাদ জানিবে । আশীৰ্বাদক-শ্ৰীঅদ্বৈতচরণ দেবশর্মণঃ ১২• বিরূপ এ পাচের-এক নম্বর ভবনের নূতন অধিবাসীরা অনিয়াছিলেন। কোথাকার কোন এক জমিদার অনেক লােকজন, লটবহর লইয়া আসিয়া একদিন পাচের-একে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। উমেশচন্দ্রের বাড়ীর নম্বর পাঁচ, পাঁচের-এক তাহার পাশেই অবস্থিত,-এবং গৃহের মালিকও তিনিই। পাশাপাশি খানসাতেক বাড়ী, সবগুলাই উমেশ বাবুর। গঙ্গার তীরে গৃহ- গুলি,অতএব অবস্থান খুব ভালাে নহে। কালীবাটের গঙ্গার পারত্রিক ব্যাপারে অনেক গুণ থাকিতে পারে, কিন্তু দৃশ্যসৌন্দর্য্য এবং স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার জন্য তাহার প্রথম পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা হয়ত কম। কিন্তু পুণ্যলােভাতুর নরনারীর সংখ্যা বাংলাদেশে তাই বলিয়া অল্প নহে,-ভগবৎ-চরণে সর্বস্ব উৎসর্গ করিতে যাহারা প্রস্তুত, সামান্য ভয়ে তাহারা ঘাবড়ায় না। ১২১

ইহাই নিয়ম
শ্ৰীযুক্ত উমেশচন্দ্র এঞ্জিনীয়ার,-তাহারই সহিত কথাবার্তা
স্থির করিয়া পলতগায়ের জমিদার প্রিয়নাথ পাঁচের-একে
তাহাদের একান্নবর্তী পরিবার হইয়া উঠিলেন।
প্রিয়নাথ বলিলেন, “মা'র অবস্থা খারাপ, গাঁয়ের ডাক্তাররা
বলল যে, আর বাঁচবেন না।—ওঁর আবার গঙ্গাতীরে মরবার
সখ, তাই নিয়ে এলাম কালীঘাটে। তা আপনার খরচ পড়ল
অনেক —শুধু ওঁকে আলেই হ’ল না, একান্নবর্তী পরিবার কিনা,
তাই অতে হ’ল বাড়ীমুকু, সবাইকেই কালীঘাট দেখাবার
আপনার রেলগাড়ী ভাড়াতেই খরচ পড়ে গেল ঢের,
একবার হিসেব করুন—
ভদ্রতার খাতিরে উমেশচন্দ্র বলিলেন, “তা খরচ একটু
বেশী পড়বেই ত—”
প্রিয়নাথ কহিলেন, “আমি কিন্তু মরব দেশে, নিজের
বাগানের কাঠ, যত খুসী নিলেই হ’ল, কানাকড়িটি খরচ নেই,
গাড়ীভাড়ার চিন্তা নেই,—নিজের জমিজায়গা, মন্দির বানাও,
আশ্রম বানাও, যা তােমার ইচ্ছে, নিজের জমিদারীর ভেতর,
কে তােমাকে ঠেকাচ্ছে ?—আর এখানে কত অসুবিধে!--*
প্রিয়নাথের মাতার সম্বন্ধে যে সংবাদ পাইলেন তাহাতে
উমেশচন্দ্রের মনে হইল, আর দু'চার দিনের মধ্যেই হয়ত বৃদ্ধা
১২২

বিক্রপ
গঙ্গাতীরে দেহ রাখিবেন।—তাহার যথেষ্ট বয়স হইবার কথা এবং
হইয়াছেও,—চল শক্তি এবং বাক্শক্তি রহিত অবস্থা; শরীরের
বামপার্থ পক্ষাঘাতে অবশ।-জীবনের গভীরতম অমানিশা তিনি
পার হইয়া আসিয়াছেন, এইবার নবসূর্যোদয়ের পানে যাত্রা
আরম্ভ করিলেই হয়।—কিন্তু পশ্চিম দিগন্তে অপরাহু বেলায় যে
দিবাকর ম্লান মৃত্যুপার, মানুষ তাহার জন্য শ্লোক রচনা
করে না।
প্রিয়নাথ বলিলেন, “মাতাঠাকুরাণীর ত গত হওয়ার সময়
হয়ে এল,—ওঁর চিতার ওপর একটা মঠ দিতে চাই,—এই
ছােট্টখাট্ট একটুখানি। কিন্তু বাইরেটা বেশ বাহারে হওয়া
চাই, পলতাগাঁয়ের যেন তাতে মুখরক্ষে হয়! ভেতরে কিন্তু
আমি থার্ড ক্লাস ইট দেব তা বলে রাখছি, আপনি একটু
সস্তায়-টন্তায় করে দেবেন,দেখুন দিখিনি হিসেব করে কত
পড়বে-
বৃদ্ধা পুত্র, কন্যা, নাতি, নাত্নী এবং পুত্রকন্যাদের নাতি
নত্বীদিগের অবধি সকলেরই “ক-মা”।
প্রিয়নাথ। বাড়ীর কয়েকটি ছেলেমেয়েকে তাঁহার বাড়ীর
উঠান খেলা করিতে দেখিয়া উমেশচন্দ্র একদিন জিজ্ঞাসা
করিলেন, “তােমাদের ‘কা-মা কেমন আছেন?”
১২৩

ইহাই নিয়ম
একটি ছােট মেয়ে অগ্রসর হইয়া আসিয়া বলিল, “খারাপই
ত ছিলেন, এখন ভালাে হয়ে উঠছেন ! দেশ থেকে আসবার
সময় বাবা বলেছিলেন, ‘কর্তা-মা’র একটা কিছু হয়ে গেলেই
আমাদের চিড়িয়াখানা, মরা-সুসাইটি দেখিয়ে নিয়ে দেশে
ফিরবেন,তখন বলেছিলেন সবসুদ্ধ এক মাসও লাগবে না,
এখন এদিকে আমার গঙ্গাজলের ছেলের সঙ্গে পুতুলের বিয়ের
তারিখ পার হয়ে গেল-” বলিয়া মেয়েটি মুখ ভার করিয়া
কহিল, “সই যে কি ভাবছে!”
প্রিয়নাথ বলিলেন, “লােকসানী বরাত মশাই, আপনার
এক মাসের বাড়ীভাড়া পাওনা হ’ল,-ওদিকে কাজকর্ম সব
রইল, পড়ে’-বলে এসেছিলাম মাসখানেকের মধ্যেই ফিরব,
অথচ এদিককার কোনও বন্দোবস্তই এখন পর্যন্ত হ’ল না ;
হয়ত সবাইকে নিয়েই শেষ অবধি দেশে ফিরতে হবে। আবার
হয়ত কিছুদিন পরে সবাইকে নিয়েই এখানে আসতে হবে।
লােকসানী বরাত ছাড়া কখনও এমন হয় শুনেছেন?”
একটু থামিয়া বলিলেন, “আমি ভাবছি প্রায়শ্চিত্তের
বন্দোবস্ত করব, বেশী খরচপত্তর করে’ নয়, এই অল্পেম্বল্পে।
তাতে ত অনেক সময় এপার ওপার হয়ে যায় শুনেছি। যাই
হক, একটা কাজ ত’ এগিয়ে থাক—আপনি কি বলেন?”
১২৪

বিক্রপ
উমেশচন্দ্র সংবাদ পাইলেন, বৃদ্ধা ক্রমে সুস্থ হইয়া উঠিতেছেন,
আজকাল বিছানায় উঠিয়া বসিতে পারেন,
হাত নাড়িয়া,
মুখ নাড়িয়া ধীরে ধীরে কথা কহিবার চেষ্টা করেন ?
প্রিয়নাথ কিন্তু প্রায়শ্চিত্তের সমস্ত আয়ােজন করিলেন, এবং
নির্দিষ্ট দিনে তঁাহার মাতার প্রায়শ্চিত্ত হইয়া গেল।
সকালবেলা প্রাতভোজনে হাত দিবামাত্রই পাঁচের-এক
হইতে কোলাহল উখিত হইল। উমেশচন্দ্র স্ত্রীকে বলিলেন,
“প্রিয়নাথবাবুর মা বােধহয় মারা গেলেন।”
—পাঁচের-এক নম্বরে আসিয়া উমেশচন্দ্র ডাকিলেন,
“প্রিয়নাথবাবু--”
প্রিয়নাথের কনিষ্ঠা কন্যা বাহির হইয়া আসিল, কান্নার
আবেগে ফুলিয়া ফুলিয়া বলিল, “বাবা মরে গেছে
উমেশচন্দ্র কহিলেন, “প্রিয়নাথবাবুকে ডেকে দাও ত খুকী।
—তোমাদের ‘কর্তা-মা মারা গেলেন কখন ?”
মেয়েটি কহিল, “বাবা মরে গেছে-”
বিস্ময়স্তম্ভিত উমেশচন্দ্র কহিলেন, “কি বলে ?”
বিষয়টা পরিষ্কার হইল যখন প্রিয়নাথের মেজ ভাই ভূতনাথ
বাহিরে আসিয়া দেখা দিলেন। উমেশচন্দ্র শুনিলেন, ‘কর্তা-মা’
বেশ ভালােই আছেন, কবিরাজ ভরসা দিয়া গিয়াছেন যে ভালাে

ইহাই নিয়ম রকম তমি হুইলে হয়ত দু'চার দিনের মধ্যেই একটু আধটু চলিয়া ফিরিয়াও বেড় ইতে পারিবেন। কিন্তু মারা গিয়াছেন প্রিয়নাথ ! কলতলায় মুখ ধুইতে গিয়া সেই যে হঠাৎ শব্দ করিয়া মাটিতে পড়িলেন, আর উঠিলেন না! ড ক্তর ডাকা হইয়াছে ; তিনি বলিতেছেন, সন্ন্যাসবােগে পলতাগাঁয়ের জমিদার পরলােক- গত হইয়াছেন। প্রিয়নাথের বাদ্ধের দিন উমেশচন্দ্র নিমন্ত্রণ খাইলেন। ‘কর্তা-মা’ বেশ নীরােগ হইয়া উঠিয়াছেন, মুখে কথাও ফুটিয়াছে মন্দ নয় ! একখানা লাঠিতে ভর দিয়া সমস্ত আযােজনের তত্ত্বাবধান নিজেই করিলেন। অনেক কঁ নিয়া কাটিয়া উমেশ- চন্দ্রকে বলিলেন, তিনি আসিয়াছিলেন কাশিনী ভাগীরথীনীরে নিজের দেহাবশেষ সমর্পণ করার জন্য, অথচ তাহার পরিবর্তে আপন সন্তানকে রাখিয়া চলিলেন।বৃদ্ধা সংস্কৃত জানিতেন না, উমেশচন্দ্রও অবশ্য জানিতেন না, কিন্তু উমেশচন্দ্র শুনিয়াছিলেন একটা কথা, নিয়তি কেন বাধ্যত,মনে মনে একবার তাহাই স্মরণ হইল, মুখে কিছু বলিলেন না,-অদূরে পরিচিত এক সংস্কৃতের অধ্যাপক ভােজনে বসিয়াছেন, এবং নিজের সংস্কৃত- কানকে বিশ্বাস নাই । অত্যন্ত মৃদুস্বরে, অনেক অপাতের মধ্য দিয়া বৃদ্ধা বলিলেন, “আমরা দেশে ফিছি বাবা, দিন দশ পনেবাের ভেতরেই। -প্রিয়র চিতার ওপর একটা মঠ দিতে চাই, এই ছােটখাট, অল্প ১২৬ বিক্রপ খরচে, তুমিই করিয়ে দিয়ে বাবা, একটু কমে-সমেকাল থেকেই আরম্ভ করে দাও, দেশে ফিরবার আগে যেন দেখে যেতে পারি- উমেশচন্দ্র বলিলেন, “আচ্ছা, আপনি কিছু ভাববেন না, সে সব যা করবার আমি আপনার ছেলেদের সঙ্গে পরামর্শ করে করব’খন- ‘কর্তা-মা’ কহিলেন, “চার পাশে চারখানা পাথর দিয়ে না বাবা,-পাথর-টাথরের হাঙ্গাম না করাই ভালাে, ওসবের বড় দাম। পাঁচ ছেলে আমার, একজনের জন্যেই কি অত খরচ করতে আমি পারি, তুমিই বল !-একদিকে একখানা পাথর দিয়ে, বড় করে লিখে দিয়ে, পলতাগাঁয়ের জমিদার। অক্ষরগুলাে যেন পষ্ট পষ্ট হয়,-মা’র নাম নেত্যকালী দেবী, বাপের নাম ফামনাথ বাঁড়ুয্যে,ওরে ভূতােব ভালাে করে'-নেত্যকালীটা একটু ডাগর করে’ লিখাে-” গঙ্গাতীৰে যেখানে চিতার আগুন আকাশপানে উঠিয়াছিল, সেখানে একটি ছােট স্মৃতিস্তম্ভ উঠিল। ‘কর্তা-মা’ নিজে তদারক করিলেন, কহিলেন, “মাতা শ্রীনৃত্যকালী দেবী” যত বড় অক্ষরে লেখা হইয়াছে, তাহার চেয়ে আরও কিছু বড় হইলেই যেন মানানসই হইত! উমেশচন্দ্রকে বলিলেন, “তুমি ওটা উঠিয়ে বড় করে লেখাবারই বন্দোবস্ত কর বাবা, খরচ যা দু' একটাকা বেশী লাগে দেব’খন, ওতে আর হিসেব করে কি হবে?” ১২৭

ইহাই নিয়ম
‘কর্তা-মা’ সকলের সহিত দেশে ফিরিলেন, কালীঘাট
রহিলেন প্রিয়নাথ ! বৃদ্ধা যাওয়ার সময় উমেশচন্দ্রকে কহিয়া
গেলেন, “তােমার সব টাকা দেশে গিয়েই পাঠিয়ে দেব
—বাড়ীভাড়া হইতে আরম্ভ করিয়া স্মৃতিস্তম্ভের মালমশলার
দাম অবধি একটি পয়সাও পাওয়া যায় নাই।
উমেশচন্দ্র বলিলেন, “আচ্ছা—”
দিন কয়েক পরে উমেশচন্দ্রের নামে প্রিয়নাথের মেজ
ভাইয়ের নিকট হইতে একখানা পত্ৰ আসিল,—“কর্তা-মা
দেশে পৌছিয়াই মারা গিয়াছেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ কামনা
তাহার অপূর্ণ রহিল, কত দুঃখ লইয়াই যে তিনি মরিলেন।
—তাহার শ্রাদ্ধের ব্যাপারে আবার কতকগুলা টাকা ব্যয় করিতে
হইবে, উমেশচন্দ্রের প্রাপ্য টাকা দিতে কিছুদিন বিলম্ব হইতে
পারে, তিনি যেন না এ টি গ্রহণ করেন।
উমেশচন্দ্র সে টাকার কথা ভুলিয়া গেলেন, এবং তাহার
অপেক্ষা ঢের শীঘ্র ভুলিয়া গেলেন প্রিয়নাথের ভাইয়েরা!
গঙ্গাতীরের সেই স্মৃতিস্তম্ভটি সেদিন হঠাৎ তার চোখে
পড়িল,-বড় অক্ষরে লেখা, পাগাঁয়ের জমিদার, এবং তার
চেয়েও বড় অক্ষরে লেখা, মাতা শ্রীনৃত্যকালী দেবী।-অক্ষর
এখনও বড়ই, কিন্তু মানুষের অতীত জীবনের অসম্মানের স্মৃতির
মত ঝাপসা হইয়া গেছে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ehai Niyam

Author
Gupta, Sri Ashis
Title
Ehai Niyam
File name
Ehai Niyam
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2009/09/7
Publisher
Guha Ray Sri Shailendranath
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Short stories
DLI number
512626
Barcode
4990010019682.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
isnAwLzQdb1
Download PDF

Ehai Niyam