Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Nepatthya
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
AIR
.
imgi
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
০
sra
নেপথ্য
—অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
প্রকাশক-বােধচন্দ্র মজুমদার
“দেব-সাহিত্য-কুটীর”
২১৷১ নং ঝামাপুকুর সেন
কলিকাতা
আশ্বিন-১৩৪১
-এক টাকা-
প্রিন্টার-এ, মজুমদার
“দেব প্রেস”
২৪ নং ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
এমনি করেই সব একদিন শেষ হয়ে গেলাে।
এতাে সহজে।
দু’দিনের সামান্য একটুখানি জ্বর, গায়ে ব্যথা আছে কি নেই,
বিছানায় তেমন করে গা ঢেলে পড়ে থাকবার কথাও হয়তো
মনে হয় নিচপলার নাড়ী গেলাে ছেড়ে, দেখতে-দেখতে তার
দুই চোখ অজস্র শূন্যতায় সাদা, স্তব্ধ হয়ে এলাে। ডাক্তার একটা
ডাকবার যে ভীষণ দরকার সে-সম্বন্ধে সচেতন হবার পর্যন্ত সময়
দিলাে না। সামান্য একটা নিশ্বাস ফেলার সঙ্গে-সঙ্গে নিশ্বাস
গেলাে ফুরিয়ে।
ব্যাপারটা সহ হয়তাে বা করা যায়, কিন্তু কিছুতেই যেন
বিশ্বাস করা যায় না।
নেপথ্য
শরীরময় তরল তনিমা অকস্মাৎ কততগুলি মৃত মাংসস্তুপে
আবিল হয়ে উঠলো, ছন্দ-উজ্জল রেখা-চাপল্যের উপর নামলে
সুবিস্তীর্ণ মেঘপুঞ্জ, শশাণিতের সুরায় নেই আর সেই তাপ আর
উচ্ছলতা, শরীরের মর্মরিত বসন্তবিহ্বল অরণ্যে আজ বালুকান্তীর্ণ
বিশাল মরুভূমি-অনাদি তা কী করে বিশ্বাস করে বললা?
এত আশা, এতাে ভয়, অগণন স্বপ্ন ও সন্দেহ-সব গেলাে
মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে !
ঘরে-দুয়ারে চপলার কতত চিহ্ন এখনাে উকি মারছে, হাওয়ায়
এখনাে তার সান্নিধ্যের তাপ, দেয়ালে মাথা কুটে মরছে এখনাে
তার হাসির হাহাকার। অথচ সে কোথাও নেই। আশ্চৰ্য্য,
কোথাও নেই সে চারদিকে। আকস্মিকতাটা এতাে প্রচণ্ড যে
নিরাবরণ, নিরুচ্চার শােকের মধ্যেও অনাদি নিষ্ঠুর একটা কৌতুক
অনুভব করছে।
একদিনের কথা তার এখনাে স্পষ্ট মনে পড়ে।
ফিরতে ফিরতে সেদিন অনাদির অনেক রাত হয়ে গিয়ে-
ছিলো। তাসের টেবিল থেকে বন্ধুরা কেউ তাকে উঠতে দেয় না,
ঘড়ির কাটা যতােই এগিয়ে চলে, বন্ধুরা তােই অমানুষিক খেপে
ওঠে: আরেক বাজি। এমনি করতে-করতে আকাশ-ভাঙা কী
বৃষ্টিটাই না সেদিন নেমে এলাে, অনাদির যাবার আর রাস্তা নেই।
তবু সে একবার দু হাতের মুঠিতে চেয়ারের হাতল দুটো শক্ত
নেপথ্য
করে চেপে ধরে প্রাণপণে বলেছিলে : আমি এবার উঠি।
-এই জলে ? হেসে সবাই তাকে একেবারে উড়িয়ে দিলে :
তুমি পাগল হয়েছ, অনাদি ?
বােকার মতাে মুখ করে অনাদি বললে,—কিন্তু রাত কতো
হয়েছে তার খেয়াল রাখাে ?
—কত আবার ! নটা এখনাে বাজে নি ।
হায়, ন’ না বাজলে যেন রাত হ’তে নেই।
তবু এটা একটা ডাহা মফস্বল। যেখানে সামান্য একটা
মিউনিসিপ্যালিটি পৰ্যন্ত নেই, যেখানে রাস্তায় নড়বড়ে খুটিতে
কালি-পড়া কাচের ঘেরাটোপে নগণ্য একটা কুপি পর্যন্ত জ্বলে
। আলাে জ্বালানােটা যেখানে বীভৎস একটা অপরাধের
মতাে মনে হয়, এমন জ্বলন্ত অন্ধকার। তারপর এই অনর্গল বৃষ্টি
নেমে এসেছে। এতে অন্ধকার যে বৃষ্টিটাকে পৰ্যন্ত যেন ভালাে
করে’ ধারণা করা যায় না।
অনাদি একরকম জোর করেই উঠে পড়লাে : না ভাই, চলি,
বউটা আবার ভাববে।
বন্ধুরা তাকে শত হস্তে বসিয়ে দিলে। বললে,বােস, পাকাশে
করিস নে। তিন-চার বছর বিয়ে হয়ে গেলাে, এখনাে তুই বউর
সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে বসে থাকৰি ? নিজের ভাবনাটা বউর উপর
চালান বিয়ে এখনাে আমাদের চোখে তুই খুলে দিতে চাস?
নেপথ্য
কঁচুমাচু মুখ করে অনাদি বললে,-না ভাই, জানিস না,
সত্যি-সত্যি আমার জন্যে ভাবছে। এতে রাত হয়ে গেলাে, তবু
ফিরছি না দেখে নিশ্চয়ই সে ঘর-বা’র করতে শুরু করে দিয়েছে।
ভারি ভীতু মেয়ে, লণ্ঠন নিয়ে চাকরকে হয়ত খুঁজতে পাঠিয়েছে
চারদিকে, কান্নাই বা এততক্ষণে জুড়ে দিয়েছে কিনা কে জানে!
তবু, চপলার কান্নার চেয়ে আকাশের কান্নাটাই এখন প্রবলতর।
দুর্বল, অসহায় ভঙ্গি করে’ অনাদিকে ফের বসতে হ’লল।
বৃষ্টি তখনাে ভালাে করে থামে নি, অনাদিকে আর ধরে
রাখা গেলো না, আগাছা-জঙ্গল ভেঙে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সে
দ্রুত দীর্ঘশ্বাসের মতাে বেরিয়ে গেলাে।
সােজা একেবারে তার বাড়ির দরজায়।
কিন্তু, কাকস্য পরিবেদনা, টু-শব্দটি কোথাও নেই।
চপলা দিব্যি খাওয়া-দাওয়া সেরে, রান্নাঘরে তােলা-পাট
শেষ করে সটান মশারি ফেলে শুয়ে পড়েছে। শুধু শোয়া নয়,
স্থূলকায় রাশীভূত একটি ঘুম।
কী আশ্চর্য, তুমি একেবারে ঘুমিয়ে পড়েছ দেখছি। মশারির
ভেতর দিয়ে ভিজে হাত বাড়িয়ে অনাদি তার খোঁপায় একটা
টান মারলাে : কই, এমন কথা তাে কোথাও লেখা ছিলাে না।
দু চোখ থেকে ঘুম ঠেলে জড়িত গলায় চপলা বললে,-কী
লেখা ছিলাে না ?
নেপথ্য
—যে, বিরহে একেবারে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়তে হয়।
—না, ঘুমােবে না! চপলা আরামে আরেকটু প্রসারিত
হ’ললা:কেমন সুন্দর আজ বৃষ্টি নেমেছে দেখেছ?
তারি জন্যে অনাদির জন্যে তার আর প্রতীক্ষা করবার দরকার
নেই। অনাদি না আসুক, তার ঘুম তো এলাে।
অনাদির গলায় তার মুখের মলিনতা টের পাওয়া গেলাে :
কেমন সুন্দর একা-একা খেয়েও নিয়েছ দেখছি। •
না, খাবে না! চপলা জলের মতাে বললে,আমার কি
আর খিদে পায় ?
-কিন্তু মুখে ভাত তােমার রুচলে, চপলা ? অনাদির গলা
একেবারে কাঠ।
-কেন রুচবে না? কেমন সেই
কেমন সেই মুড়ির ঘণ্টটা আজ
বেঁধেছিলুম! জিভটা বাড়িয়ে চেখে দেখ না একবার-ঐ টোপের
তলায়ই তাে ঢাকা আছে।
—আগে থাকতে মুড়ির ঘণ্টটা খেয়ে নিয়ে বুদ্ধিরই পরিচয়
দিয়েছিলে। অনাদি একটা কান্নিক খেয়ে মশারির বাইরে
চলে এলাে : কেননা, যেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার আর নাছােড়-
বান্দা বৃষ্টি তায় আমি ফিরছি না—কখন কী খারাপ সংবাদ
এসে পড়ে—সখ করে বঁধা মুড়ি-ঘণ্টটা খেয়ে নিলে ভালােই
করেছ।
১
নেপথ্য
তার মানে? বালিসের ভিতর থেকে চপলা ফোস করে’
উঠলাে।
অনাদিকে কেমন ক্লান্ত, কেষন-বা একটু কাতর শােনালল :
আমার জন্যে তুমি একটুও ভাবব না কেন, চপলা ?
—কেন, তােমার জন্যে কী আবার আমাকে ভাবতে হবে ?
এতো রাত হয়ে গেলে, ঘড়িতে দশটা কখন বেজে গেছে,
আমার এখনাে ফেরবার নাম নেই, আমার জন্যে তােমার এক
অতি ভাবনা হয় না? একটুও ভয় করে না তােমার?
বা রে, চপলা বিস্ময়ে একেবারে সাদা হয়ে গেলাে :
বিকেলবেলা বেড়াতে বেরিয়েছ, কোন কাজে কোথায় কখন
আটকা পড়েছ না-জানি, মিছিমিছি ভাবতে যাবাে কেন? ভয়
কিসের ?
—ভয় নেই? অনাদি গম্ভীর মুখে বললে,—যদি আমি আজ
ফিরতুম ?
-কী মুস্কিল! না ফিরবে তাে যাবে কোথায় ?
কে জানে কোথায় ! এতো রাতেও যখন ফিরছি না, রােজ
যে-সময়ে আমাদের এক ঘুম হয়ে যায়, অনাদি বিবর্ণ গলায়
বললে,-আমার কোনাে একটা বিশ্রী বিপদ হয়েছে বলেও তো
ভাবতে পারতে।
-বা রে, কী আবার তােমার বিশ্রী বিপদ হতে যাবে
নেপথ্য
এক ঝলক তারার আলাের মতাে চপলা হেসে উঠলাে; রাস্তায়
একমাত্র পাকি ছাড়া যেখানে কোনো গাড়ি নেই। আর সে-
পাকিও জোগাড় করতে হয় সাতদিন আগে খবর দিয়ে।
—কিন্তু আনাচে-কানাচে এখানে সাপ আছে জানো ?
জাত-সাপ! অনাদি বিষাক্ত মুখে বললে,আর সেই সাপ এই
বর্ষাকালেই বেশি বেরােয় ? সেদিন উঠোনের উপর নিজের চোখে
একটা দেখলে !
—সাপ আছে তাে আমি কী করবে? সাপ বলে’ জন্তু যখন
একটা আছেই, তখন পৃথিবীর কোনাে না কোনাে জায়গায় যে
থাকবে তাতে আশ্চর্য্য হ’বার তো কিছু আমি দেখতে পাচ্ছি না।
—কিন্তু সেই সাপে আজ কাটা পড়তে পারতুম। আমাকে
আর তুমি চোখেও দেখতে পেতে না।
কোন দুঃখে?
“তুমি আমার জন্যে একটুও ভাবব না বলে। অন্য স্ত্রী হলে-
মশারির ভিতর থেকে চপলা মুখ বাড়ালাে।
—অন্য স্ত্রী হলে, তার স্বামী এখনাে ফিরছে না দেখে,
কখনাে পুঁটুলি পাকিয়ে আরামে ঘুম মারতে পারতাে না।
অন্য স্ত্রী হলে আগে থাকতেই বুঝি দড়ি পাকিয়ে তারস্বরে
শােক করতে বসে যেতে ? চপলা চকিতে আবার মশারির মধ্যে
ডুকে গেলাে; গম্ভীর, আচ্ছন্ন গলায় বললে,যাও না, অন্য স্ত্রী
নেপথ্য
একটা ধরে নিয়ে এসাে না, কান্নার একেবারে একটা হরির-লুট
বসিয়ে দেবে’খন। ভূতের মতাে গুটি গুটি বাড়ি ফিরে এসে
দেখবে, তােমার সেই অন্য স্ত্রীটির আর বিধবা হতে কিছু
বাকি নেই।
অনাদি জল হয়ে গেলাে। তাড়াতাড়ি জামাটা ছেড়ে ফেলে
দুই হাতে মশারিটা সে তুলে ফেললে। গুমােটের পর এক
ঝলক উড়ন্ত বাতাসের মতো।
-তুমি আমাকে একটুও ভালােবাসে না, চপলা।
-কী করে বুঝলে বলো তাে? কোন্ বইয়ে আজ ওটা
পড়ে এলে জিগ্গেস করি ?
-ভালােবাসলে কি আমার সম্বন্ধে তুমি এমন নিশ্চিন্ত হয়ে
ঘুমিয়ে পড়তে পারতে?
-তুমি ভালােবাসার কী জানো? তােমাকে এতো
ভালােবাসি যে সে একটা ভীষণ নিশ্চিন্ত ভালােবাসা। এখন
ঘুষের মতাে নিশ্চিন্ত।
—কিন্তু ঘুম থেকে জেগে উঠে যদি দেখতে, আমি তােমার
পাশে নেই ?
চপলা হঠাৎ স্বামীকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরললা: পাগল।
আমাকে ছেড়ে তুমি যাবে কোথায়? আমাকে ছাড়া তােমার
কোথাও জায়গা আছে নাকি পৃথিবীতে?
নেপথ্য
সেই চপলা !
সমস্ত একটা অর্থহীন উপহাসের মতো লাগে না ?
সংসার-রচনায় এতো যার সাধ-আহলাদ ছিলাে, নিজে সাধ
করে সে আবার তা দু'পায়ে ঠেলে চলে গেলাে—এর মাঝে
প্রকাণ্ড একটা মজা আছে বৈ কি। সংসারের তুচ্ছাতিতুচ্ছ
কণিকতম জিনিসটিরো উপর তার কী অগাধ ছিলাে মায়া।
অনাদির অবস্থা তেমন কিছু নবনীতকোমল নয়, চপলার জতে
বিলাসের উপকরণ সে বেশি সংগ্রহ করতে পারতাে না, কিন্তু
নখে করে যেটুকু চপলা খুঁটে নিতে পারতাে তাই তার কাছে
অনেক। খেলো টিনের ফুল-তােলা একটি আয়না, দিশি একটা
মাের বাটি, শুক্ননা দু’পাতা আলতা—চপল তাতেই একেবারে
রাজ্যেশ্বরী। ফুরফুরে ঠোট দু’খানি পানের রসে যখন থেকে-
থেকে টুকটুক করে’ উঠতে, তখন তার কাছে কে লাগে ।
দেয়ালের কোণে-কোণে এখনাে পানের পিক্ লেগে আছে,
চিরুনির দাড়ায় আটকে আছে এখনাে দু’গাছি শুকনাে চুল।
দেয়ালে-বেঁধা ঘােট একটি আলমারি—তার উপর কতাে রাজ্যের
জিনিস যে সে জড়ো করেছে তার ইয়ত্তা নেই : কৌটো-শিশি,
পেয়ালা-পিরিচ, এটা-ওটা-সেটা, যা তার যখন চোখে ধরেছে।
আনাতে এখনাে ভাজ করা আছে তার সেই লাল সাড়িটা
জ্বর হবার পর বিছানায় শশাবার আগে যেটা সে শেষ ছেড়ে
-
নেপথ্য
রেখেছিল। ঘর নিয়ে গােছগাছের তার অন্ত ছিলাে না,
দেয়ালে ফ্রেমে-আঁটা এখনাে ঝুলছে তার তুলাের খরগােস,
কাপড়-পরানাে ক্যালেণ্ডারের মেয়েটা। নারকেলের দড়িতে
বোনা তার নিজের হাতের পা-পােষটা এখনাে দরজার কাছে।
নিঃসলিল মরুভূমিতে কতাে আর অনাদি বালুকণা খুঁড়বে? সব
চপলা অনায়াসে ফেলে যেতে পারলাে ।
ফেলে যেতে পারলে তার কোলের এই প্রথম ছেলেকে, যার
চোখের কাজলের দাগটা তার সলেহ ক’টি আঙুলের লীলায়
এখনাে জ্বলজ্বল করছে। ফেলে রেখে গেছে তার স্বামী–অনাদি
তার কথা আর কী ভাববে ?
এই তাে সব কিছুর মূল্য !
১৪
**
এই তাে সব কিছুর মূল্য। তার জন্যে কাব্য করতে কোনাে
উৎসাহ আসে না।
তবু অনাদি শব্দ করে’ই কঁদলে, এবং পাছে সেটা ভয়ানক
দৃষ্টিকটু হয় চপলার মৃতদেহটা সে অনেকক্ষণ দুই হাতে আঁকড়ে
ধরে রইলো।
নইলে সে-শােক কি সত্যি কথা দিয়ে ওজন করা যায় ?
অনাদি কী করবে বলো, মানুষের পরমতম শশাকের মুহূর্তেও
কতােগুলি সাধারণ শিষ্টাচার আছে। সেগুলাে না মানলে ভদ্রতা
বজায় থাকে না।
নইলে অনাদি জানে না কি তার শােকের এই অনির্বচনীয়
গভীরতা? কথা মানুষের কতােটুকু প্রকাশ
প্রকাশ করতে পারে ?
মানুষের গলার তেজ কতােখানি ?
১৫
নেপথ্য
তবু পাঁচজনকে শুনিয়ে অনাদিকে স্পষ্ট কঁদতে হলাে।
আর, পাঁচজন এমন যে, নিজের কানে না শুনলে কিছু সহজে
বিশ্বাস করতে চায় না। এক কথা শুনতে তখন তারা আরেক
কথা নে বলে।
এবং এই পাঁচজনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার জন্যেই
সে চপলার ফটোটা ঘরের দেয়াল জুড়ে এলার্জ করলে।
নইলে অনাদি কি আর জানে না যে চপলা সামান্য ঐ একটা
শুধু ছবি নয়? যে তার সর্ব-পরিব্যাপী অনুভূতিতে অসীম হয়ে
রয়েছে, যান্ত্রিক ঐ একটা ছবি তার কততটুকু উদঘাটন করতে
পারে? সঙ্কীর্ণ রেখা দিয়ে তুমি কতােখানি রূপ আনতে পারাে,
ছায়াতে কতােটুকু শারীরতা ?
তবু পাঁচজন তা দেখুক। অনেক সময় দিনের আলােতেও
তারা সূর্য দেখতে পায় না।
তাই পাঁচজন যখন অনেক ভয়ে-ভয়ে, গরু-চোরের মতো
মুখ করে এসে আমতা-আমতা করে বললে, অনাদি, এবার
আরেকটা বিয়ে কর, দু-আঙুলে ছােট্ট তুড়ি মেরে কথাটাকে
উড়িয়ে দিতে অনাদির বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলাে না। চারপাশে
এমনি সে একটা অনড় আবহাওয়া করে রেখেছে।
সেই রূঢ় বিজ্ঞাপনের সামনে পাঁচজনের আবেদনের কতােটুকু
জোর ?
নেপথ্য
বলা বাহুল্য, একান্তই সেটা পাঁচজনের জন্যে ।
তার নিজের জন্যে সমুদ্রের গর্জন নয়, সমুদ্রের অতলান্ত
গভীরতা। পক্ষবিক্ষেপ নয়, শূন্য প্রয়াণ ।
চপলার তিরােধানের পর থেকে জীবনে তার কোনো ছন্দ
নেই, সমস্ত একটা সমতল একঘেয়েমি। কোনাে বিস্ময় নেই,
কোনাে প্রত্যাশা নেই, বৈরাগ্যের কোনো একটা সে উদাস
রােমাঞ্চ পর্যন্ত নেই। সমস্ত একটা অতল অর্থহীনতা।
সমস্ত কিছু প্রাণহীন যান্ত্রিকতা দিয়ে তৈরি। জীবন শুধু
বিশাল একটা অভ্যাসের অত্যাচার।
সেই অন্ধ যান্ত্রিকতার নিয়মে অনাদি একদিন একটা গহ্বরে
এসে পা দিলাে—চপলার তিরােধানের শূন্যতা তার জীবনে যে
দৈত্যকায় গহ্বর সৃষ্টি করেছে ।
আর আশ্চৰ্য, সেখান থেকে সহজে সে আর উঠে আসতে
পারলাে না। বলাে, কোথায়ই বা সে উঠে আসবে?
কোথায় গেলে তার শােক, তার এতােদিনের বিস্তারিত
বিজ্ঞাপন, তার বহুলীকৃত আড়ম্বরের ঘটা, তার অবারিত
বিরহের ঔজ্জ্বল্য ! হায়, যদি পানীয়ই যেতে পারলাে শুকিয়ে,
তবে শুন্য পাত্রটা আর থাকে কেন? প্রেমই যদি মরে
গেলাে, তবে একটা অস্থিচর্মসার নিষ্ঠা নিয়ে অনাদি কী
করবে?
নেপথ্য
বন্ধু অমৃত একদিন তাকে গলির মােড়ে ধরে ফেললে।
বললে,-এ কী কাণ্ড, অনাদি ?
অনাদি মুচকে হেসে বললে,—কোনটা ?
-রাপারের নিচে ওটা ঐ কিসের পুঁটলি ?
অনাদি বিন্দুমাত্র লজ্জিত হ’বারাে ভাণ করলাে না; বললে,-
একটা সাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছি ভাই, আর এই এক বাক্স
সাবান।
অমৃতের ঠোট দুটো ঘৃণায় ভারি হয়ে উঠলাে : শেষকালে
বাজার করতেও শুরু করেছ দেখছি।
পৃথিবীতে কোথাও যেন এতে কিছুমাত্র এসে যায় না এমনি
উদাসীন গলায় অনাদি বললে,মেয়েটি ভীষণ গরিব, পরবার
একটা ভালাে সাড়ি নেই। আর জানােই তো, অপরিষ্কার
থাকাটা আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না।
কথা কয়টা অমৃত একটু চিবিয়ে চিবিয়ে বললে,-তা হলে
একেবারে প্রেমে পড়ে গিয়েছ বলো।
-প্রেম? অনাদি হঠাৎ গলা ছেড়ে হেসে উঠলে: হ্যা,
জীবে-দয়াকেও তুমি এক হিসেবে প্রেম বলতে পারে বটে।
—কিন্তু, এমন একদিন গেছে, অমৃত বাঁকা করে বললে,
যখন তােমার স্ত্রীর জন্যেই অমনি বাজার করে বাড়ি ফিরতে,
অনাদি। এরই জন্যে এতােদিন তুমি বাইরে এতে ফোটা-
১৮
নেপথ্য তিলক কেটে আঁক করে এসেছিলে ! ছি ছি ছি, শেষকালে কিনা এতােদূর নেমে এসেছ? —কী আর করা যায়। —সত্যিই তাে, কী আর করা যায় ! ঘৃণায় অমৃতের কথাগুলাে ধারালাে হয়ে উঠলাে : এতে আর তােমার স্ত্রীর স্মৃতির অবমাননা হচ্ছে না? যেন কোন অতিকায় মূর্থের সঙ্গে কথা কইছে এমনি অসহায় মুখ করে অনাদি বললে,-কী করে’ হচ্ছে ? আমি তো আর বিয়ে করি নি । —এতোক্ষণে একটা কথার মতাে কথা বলেছ বটে! অমৃত তার কাধে দুটো সপ্রশংস চাপড় দিলে : কিন্তু বিয়ের কোন- খানটায় তুমি বাকি রাখলে ? শুধু দু’টো মন্তরেরই কেবল মানে হয়, তা ছাড়া কোনাে নিষ্ঠা, কোনাে ত্যাগ, কোনো তপস্যারই কিছু দাম নেই ? —যা জানাে না তা নিয়ে কথা বলতে আস কেন ? অনাদি তার হাত থেকে ছাড়া পাবার জন্যে ছটফট করে উঠলাে : যাকে তুমি তপস্যা বলছ, ত্যাগ বলছ, তা আমার অন্তরের জিনিস, এটা শুধু বাইরের একটা অভ্যাস, একটা প্রাণহীন প্রাত্যহিকতা। আমি আজকাল ঠাকুরের রান্না খাই বলে’ও তত বলতে পারাে, তােমার আর নিষ্ঠা নেই, অনাদি'। আমার ১৯
নেপথ্য
বাইরের পােষাকটা দরিদ্র বলে আমার বুকের ভেতরটাও একে-
বারে ফাকা, এটা ভাবলে আমার ওপর অবিচার করা হবে ভাই।
বেশ তো, তবে বিয়েই একটা করে ফেল না কেন। এর
চেয়ে সেটা অনেক ভদ্রলােকের কাজ।
-বুঝবে না, তুমি বুঝবে না অমৃত, বিয়ে করলেই আমার
হাতে চপলার পরম অপমান ঘটবে, অনাদির গলা হঠাৎ কেমন
ঘােলাটে হয়ে এলাে : মৃত্যুর চেয়েও তার সে বড়াে পরাজয় আমি
সহ করতে পারবাে না।
—আর তােমার এই ব্যবহারে তােমার স্ত্রীর মুখ আহ্লাদে
একেবারে আটখানা হয়ে পড়ছে, না ?
-কিন্তু তার মুখ অন্ধকারে কালাে হয়ে ওঠবারাে কোনাে
কারণ নেই। জীবন ধারণের নিশ্চয়ই কোথায় ক্ষমা আছে।
আমার যে সময় কাটে না, অমৃত।
বেশ তো, বিয়ে করলেই তাে কেটে যায়। বিকেলটা
তথন দু’জনে বসে দেখা-বিন্তি খেলতে পারাে।
--কিন্তু, অলক্ষ্যে অনাদি যেন শিউরে উঠলাে : বিয়ে করলে
তাকে আমার ভালােবাসতে হবে যে ।
-একেকটা তুমি কী যে ভীষণ কথা বললা, অনাদি। অমৃত
হেসে উঠলাে : নিজের স্ত্রীকে ভালােবাসবে, সে যেন তুমি
হনুমানের মতো সাগর লক্ষন করতে যাচ্ছ আরকি।
নেপথ্য -ওঃ, তা হ'লেই তাে সব মাটি। —কী মাটি ? —আমার এতােদিনকার কল্পনার আকাশ,—সে তুমি বুঝবে না, অমৃত। —অথচ এইখেনেই বা ভালােবাসার কোন অধ্যায়টা তুমি বাকি রাখলে ? শেষ পর্যন্ত বাহারে’ পাড়ের খােলতাই রঙের সাড়ি নিয়ে চলেছ। অমৃতর ভুরু দু’টো ঘন হয়ে উঠলাে : দয়া করে আমাকে আর কিছু তােমার বােঝাতে হবে না। নিজেকে বােঝচ্ছ, তাই বােঝও ইচ্ছে মতাে। একে তুমি ভালােবাসা বােলা না, অনাদির গলা অস্ফুট একটা কাকুতির মতাে শােনালাে : এ একটা ভিক্ষে। এখানে কিছুই না চাইতে পাওয়া যায় না, অমৃত ; দেবার বেলা হিসেবের খাতা মিলিয়ে দেখতে হয়। এ প্রেম নয়, এ একটা শুধু প্রসাধন। —তেমনি প্রসাধনের অর্থেই আরেকটা বিয়ে করে ফেলতে তােমার বাধা কী! অমৃত তীক্ষ একটা কুটি করলো : শিব সাজবার জন্যে ক'টা লােক আর বিয়ে করতে চান ? সেই- খানেও তো দরকার হলে সাড়ি কিনে দেয়া, সময় কাটে বলে’ পাশাপাশি চুপ করে বসে থাকা। তার অতিরিক্ত ভালােবাসার কোনাে অস্তিত্ব নেই, অন্ততঃ বিবাহিত ভালাে- বাসার। চরিত্রবানের মতো বিয়েই একটা করে ফেল, নেপথ্য অনাদি। তােমার সমস্ত ভালােবাসা চপলা অধিকার করুক, ক্ষতি নেই, কিন্তু তােমার এই স্ত্রীকে দয়া করে পরবার জন্যে সাড়ি, আর গায়ে মাখবার জন্যে সাবান কিনে দিলেই যথেষ্ট । এতােতেও যখন তােমার স্ত্রী কিছু আপত্তি করে নি, এটাতেও করবে না। এ-ও তােমার জীবনধারণেই একটা রসিকতা। বেশ তাে, এটাকেও তেমনি সেই অভ্যাসের পর্যায়ে নিয়ে এলেই চলবে। অমৃত বিজ্ঞের মতো সূক্ষ্মরেখায় একটু হাসলাে : ভয় নেই, তাইতেই তােমার দ্বিতীয় স্ত্রী, স্বর্ণবাসিনীব চেয়ে ও নিজেকে ধন্য মনে করবেন। বলতে কি, স্ত্রীরা, বিশেষতঃ দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীবা, এর অতিরিক্ত আর কিছু বিশেষ চাইতে শেখে নি। ভালােবাসা তাদের কাছে সাড়ি আর সাবান, কাব্যের খানিকটা ধোঁয়া নয়। তােমাকে কষ্ট করে আর এক ইঞ্চিও উর্জে উঠতে হবে না, অনাদি, যেখানে দাড়িয়ে আছে, সেখানেই থাকতে পারবে, মাঝখান থেকে দামি জিনিসগুলি আর অপাত্রে পড়বে না, তােমারো চেহারায় একটা নধব ভদ্রতা আসবে। আবে’ বােকা, এই ভদ্র সাজবার জন্যেই তাে বিয়ে করা। বললেও চলতো, অনাদি আবার বিয়ে করলে। যদি তার কারণই একটা শুনতে চাও, অনাদি ক্লান্ত, নির্লক্ষ্য, একেবারে মনোহীন। এমন একটা ব্যাখ্যায় যদি কেউ খুসি না হও, তবে সত্য কথাই ২২ ls so নেপথ্য বলা যাক,মাদিৰু সুংসারিক্কমবস্থা ভাল নয়, অনর্থক কতাে গুলি অপবয় করবার মতাে তার অঢেল য়সা নেই। তাই বলে অন্যদিকে অনুয়ে দিতে যাওয়া বৃথা। ধৰ্ম্ম তার দিকে, সমস্ত সংসার যুক্তি দিয়ে তার সঙ্গে এটে ওঠা যাবে না, তার নীরে সব অকাট্য বাণ, নিৰ্ম্মম, লক্ষ্যভেদী। অন্তত তার শিশু একটা সন্তান আছে—এ-কথাটা এতােদিন বাদে যেন তার মনে পড়লাে—অন্তত তার রক্ষণাবেক্ষণ চাই। তার আছে একটা বয়সের নির্জনতা, মধ্যরাত্রির মতাে ভয়াবহ, তার চাই একটা সহজ পরিপূর্তি। আর, বৈরাগ্যের কথাই যদি বলল, অনাদি প্রায় শঙ্করপন্থী-জগৎ মায়া, জীবন অনিত্য। সংসারে কোথায় কী টিকে আছে, ধূলো নিয়ে দু' দিনের হেলাফেলা করে'ই তাে সংসার । অন্তত স্বাস্থ্যটা তা হলে ভালো থাকে, সময়ে থাকে একটা স্বচ্ছন্দ ধারাবাহিকতা, সকালে উঠে ঠিক মতো তা হলে আপিস করা যায়। তারি জন্যে যদি বলে অনাদি কোনােদিন চপলাকে ভালাে- বাসে নি, তবে গরুর চামড়ায় জুতাে হয় বলেই সে কোনােদিন দুধ দেয় নি এমনি ধরণের একটা বাজে কথা বলা হবে। সংসারে মৃত্যুর যতাে দিন না আবির্ভাব হয়েছিলাে, সেই প্রেম ছিলো, মৃত্যুরর চেয়ে অবধারিত সত্য। সজ্জিপ্ত সেই দু’ বৎসরের প্রতিটি
নেপথ্য
মুহূর্ত তাে আর তােমরা ছুঁয়ে দেখ নি। তার ছিলাে এতাে তাপ,
এতাে তীক্ষ্ণতা। সামান্য একটা কায়িক তিরােধানেই কি তা
শূন্য হয়ে যাবে মনে করেছ ?
বিয়ে করলে, অন্তত রাধুনে বামুনটাকেও তো সে তুলে দিতে
পারবে।
২৪
তিন
এবার যে মেয়েটিকে অনাদি বিয়ে করলে, আশ্চৰ্য, পৃথিবীতে
এতাে নাম থাকতে, তার নাম কিনা তরল।
গরিবের ঘরের লাজুক, গ্রাম, ছােট একটি মেয়ে-সাধারণ
ঘর-কন্না নিয়ে যার দুই হাত থাকবে ব্যাপৃত-অনাদির আর
অকারণ কাব্যলিপ্সা নেই।
কিন্তু যাই বলল, মেয়েটি এমন নয় যার থেকে অনায়াসে তুমি
মুখ ফিরিয়ে নিতে পারাে, বা একবার দেখলেই তােমার দেখা
গেলাে ফুরিয়ে। কৃশতায় ছুরির ফলার মতাে ঝক্ঝক করছে।
যখন শুয়ে থাকে, চঁাদের একটি ফালি যেন বিছানায় ভেঙে
পড়েছে। পায়ে-পায়ে যখন ছুটে চলে এখানে-সেখানে, যেন
জলের শীতল একটি ধারা, নিজের মধ্যে নিজে সে আর আঁটছে
। যখন বা কাজের ফাকে-ফাকে এমনি কখনাে চুপ করে বসে
থাকে মনে হয় মেঘের ফাকে-ফাকে নীল আকাশের কয়েকটি ঘােট
টুকরাে;
নেপথ্য তার কৃশতাটি তার দীর্ঘতাকে সমস্ত শরীরে উচ্চারিত করেছে। সেই দীর্ঘতা একটা দীপ্তি। সেই দীর্ঘতা বহন করতে হয় না, বিচ্ছুরিত করতে হয়। ইদানি ছেলের মা হয়ে চপলা কেমন ফুলে উঠেছিলাে, হঁ্যা, স্বাস্থ্যের অকারণ অতি-স্ফীতিতে। এতােদিনে তার শরীর ফিরলো বলে’ অনাদিকেও মুখে প্রশংসা করতে হয়েছিলাে বটে। কিন্তু স্বাস্থ্য বলতে যা বােঝায় তার চেয়ে সৌন্দর্য্য যে কতাে বেশি বােঝায় এ-কথাটা অনাদির বুঝতে তখনাে বাকি ছিলাে বােধ হয় । দুই হাতের মুঠোতে তরলা কেমন অতি সহজেই ফুরিয়ে যাচ্ছে, তার সেই ফুরিয়ে-যাওয়াটুকুই অসীম। তার সমস্তটি অস্তিত্ব দুজ্ঞেয় একটা ইঙ্গিতের মতাে তীক্ষ, অসমাপ্য। ফুরিয়ে গিয়েও সে যেন শেষ হ’তে জানে না। তার উদ্ধৃত্তি হচ্ছে এই দীর্ঘতা, ধারালাে, উজ্জ্বল দীর্ঘতা। বাঁধ দিয়ে বন্যা আর তুমি কততকাল ঠেকাবে? দেয়ালের শুভ্রতা দিয়ে কতাে আর অন্ধকার ! . তবু অনাদিকে সেদিন বলতে হ’লল : তােমার আর কোনাে নাম নেই, তরল ? ঘুম থেকে উঠে তরলা শুকনাে বেণীটাকে খোঁপায় নিয়ে যাচ্ছিলাে ; বলে,বাপের বাড়িতে তরু বলেও ডাকে কেউ- কেউ। কেন, আমার নামটা কি তােমার পছন্দ হয় না? ;
নেপথ্য -না, না, খাসা নাম। অনাদি চঞ্চল হয়ে উঠলাে : ঠিক তােমার পরিষ্কার পরিচয়। তরলা—যেন একটি বহমান অনর্গলতা, কোথাও এতােটুকু বাধা নেই, বিরতি নেই। আমি তােমাকে তরল বলেই ডাকবাে। তরুর মধ্যে একটু স্পর্ধার ভাব আছে, অন্যায় একটা পুরুষত্বের দম্ভ। তুমি আমার তরল—বিগলিত লাবণ্য, নিজেকে বিতরণ করবার অপর্যাপ্ত মাধুরী দিয়ে তৈরি। চমৎকার নাম। কততগুলি কথা, অথচ মুখ ফুটে বলতে যেতেই অনাদির বুকের ভেতরটা কে মুচড়ে দিলাে। চমকে চাইলে সে চারদিকে। তার মনে হলাে কে যেন হঠাৎ আড়ি পেতে কথা কয়টা শুনে গেলাে, কে যেন কথাগুলির অন্তরালে মলিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললে। হ্যা, একদিন চপলা নামটাও তার ভালাে লেগেছিলাে। সেদিন, আশ্চৰ্য, সেই কথাটাও সে গােপন করতে পারে নি। কিন্তু চপলা-নামের সেদিন সে কী অলৌকিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলাে কে বলবে ? তার সেই দ্যুতিমান ক্ষণস্থায়িতার কোনাে আভাসই তো সেদিন সে জানতে পায় নি। তবু ভালাে লেগেছিলাে তো। সেই যে মেয়েটা, যার শরীর- ছায়ায় সে একদিন এসে বিশ্রাম নিয়েছিলাে, তার নামের কোনো গুণবাচক বিশেষত্ব ছিলো না। সে রাজলক্ষ্মীও হতে পারে, বেদানাবালাও হতে পারে। ২৭
নেপথ্য
কিন্তু সে ছিলাে চপলা। আর, মনে থাকে যেন, তুমি এখন
'তরলার গুণকীর্তন করছ।
অনাদির বুকটা গুহার মতাে ঠাণ্ডা হয়ে উঠলো।
তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বললে,চলাে, এখনাে
তুমি আমার জানােয়ারকে দেখ নি ?
তরলা ভীত, বিস্ফারিত চোখে চারদিকে তাকাতে লাগলাে।
বললে,জানােয়ার কে ?
অনাদি মুচকে একটু হেসে বললে,বলাে তাে কে ? পারলে
। আমাদের থােকা।
তরল ত্রিভুবনে এর কোনাে হদিস পেলাে না। মুখ ঘুরিয়ে
বললে,-এ কী বিচ্ছিরি নাম ।
—কেন, মন্দ কী ?
-এর চেয়ে আর কোনাে ভালাে নাম পেলে না?
—নাম একটা হলেই হলাে। অনাদির গলা রীতিমতাে
বিস্বাদ হয়ে উঠেছে।
-না, না, সে কী কথা? অতল মিগ্ধতায় তরলার চোখ দুটি
আয়ত হয়ে উঠলাে। আমি থােকার একটা খুব ভালাে দেখে
নাম রেখে দেবো।
—ত রেখে, অনাদির গলায় সামান্য একটাও আঁচড় পড়লাে
: কিন্তু ডাকবে ওকে ঐ জানােয়ার বলে।
নেপথ্য —এ কী বন্য আবদার তােমার! তরল অবাক হয়ে স্বামীর মুখের দিকে অপলক চেয়ে রইলাে। —হঁ্যা, অনাদির গলা কেমন অস্বাভাবিক গাঢ় হয়ে এসেছে : ঐ ওর মায়ের দেয়া নাম। ও হ’তে খুব কষ্ট পেয়েছে বলে ওর মা ওকে তাই বলে আদর করতো। তা, কী বলাে, ডাক-নাম একটা হ'লেই হয়, অনাদি তরলাকে হঠাৎ প্রবােধ দেবার জন্যেই যেন কাছে টেনে আনলাে : তুমি খুব ভালাে দেখে ওর একটা পােষাকি নাম রেখাে, কেমন ? কী রাখবে বলে দিকি ? কী নাম যে সে রাখবে তা স্বামীর উদাস, ভারাক্রান্ত দুই চোখের দিকে চেয়ে সেই মুহূর্তে সহসা সে কিছু ভেবে ঠিক করতে পারলাে না। তবু, অচেনা, অনাত্মীয় সেই থােকাকে নিয়ে উচ্ছঙ্খল নাড়া- চাড়া করবার জন্যে তরলার দুই হাত স্নেহে হঠাৎ আঁকুবাকু করে’ উঠলো। বছরও হয়তাে পােরে নি, রাশীভূত নমনীয়তা। দেখলেই কেমন অনাস্বাদিত ব্যথায় বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে। ঢেউয়ের মতাে তরলা তার দু বাহু উচ্ছসিত করে দিলো। কিন্তু, জানােয়ার তাে জানোয়ার, থােক। কিছুতেই তার কোলে আসবে না, কেবল কাদবে, ছাড়া পাবার জন্যে হাত-পা ছুঁড়ে প্রাণ- পণ তারস্বরে চীৎকার পাড়বে। দুর্বল এক টুকরাে শিশু, কিন্তু
নেপথ্য
স্বভাবে যেন তার বাঘের হিংস্রতা। তােমার কী আছে যা দিয়ে
তাকে তুমি ভােলাতে পারে? এনে দাও তাকে চুষিকাঠি, টিনের
ঝুমঝুমি, তূপীকৃত খাবারের পাহাড়—কিছুতেই তার শান্ত হবার
নাম নেই। কোল ভরে দাও তাকে অজস্র কোমলতা, তার মুখের
পাতা পড়ছে না। ডাকো তাকে ছােট-ছােট আদরের ভাষায়,
কিন্তু বন্যতায় সে বধির।
তা কঁদুক, অচেনা লােক দেখলে ছােট ছেলেপিলেরা একটু
কেঁদেই থাকে, তরলা তাকে কোল থেকে বুকের উপরে নিয়ে এলাে,
মেহের ব্যাকুলতায় উৎসারিত হয়ে পড়লো—জানােয়ারের গর্জনের
তবু বিরাম নেই।
কী তুমি তাকে দিতে পারাে, তরল অগত্যা দুধের বােতল
এনে তার মুখে পুরলে।
বিষম খেয়ে ছেলেটা প্রায় যায় আর কি।
পাশের ঘর থেকে অনাদি এলাে হাঁ-হাঁ করে ছুটে : কী
হলাে? কী করলে তুমি ছেলের ?
লজ্জায় বিবশ চক্ষু নামিয়ে তরলা কুন্ঠিত গলায় বললে,—ভারি
দুষ্টু ছেলে, কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।
-না, না, তুমি পারবে না, আন্নাকালিকে ডাকো। অনাদি
সামনে এক পা এগিয়ে এসে সূক্ষ্ম চোখে কী-একটা পৰ্যবেক্ষণ
করতে-করতে বললে, আগে তাে কোনােদিন ও এমন কাদতে
নেপথ্য
ও শুধু নামেই
, একতাল মাটির মতাে পড়ে থাকতাে।
জানােয়ার, ব্যবহারে একেবারে জল। এই এতােদিন ও সমানে
বােতলে করে দুধ খেয়ে এসেছে, কই, বিষম লাগতে তো
দেখিনি কখনাে।
আন্নাকালি এ-বাড়ির ঝি। প্রথম যখন চাকরি নিয়ে অনাদি
সস্ত্রীক এখানে আসে, তখন থেকেই সে আছে ।
-দাও, দাও, আমার কাছে দাও। ডাক শুনে হাতের কাজ
ফেলে আন্নাকালি এক দৌড়ে ছুটে এলাে : কোলের গরমে
'ছেলেটাকে যে একেবারে কাহিল করে ফেলেছ। হাত বাড়িয়ে
মশারির চাল থেকে পাখা-গাছটা পেড়ে দাও শিগগির। নিজের
পেটে না ধরলে কি আর ছেলে বশ করা যায় ? তরলার কোল থেকে
আন্নাকালি একরকম জোর করেই থােকাকে ছিনিয়ে নিলাে।
অমনি, আশ্চর্য, দেখতে-দেখতেই ভােজবাজি। ফুটন্ত দুধে
একটু সাইটি ক য়্যাসিড দিলেই যেমন তা মুহূর্তে ছানা হয়ে যায়,
তেমনি আন্নার কোলে গিয়ে থােকার সমস্ত কান্না স্তব্ধতায় নিটোল
হয়ে উঠলাে।
পৃথিবীর সমস্ত লজ্জা নিয়ে তরলা মুহমানের মতাে দাঁড়িয়ে
রইলাে। ঐ একতাল নমনীয় মাংস, তার মাঝে এতাে বিষাক্ত
হিংস্রতা ! আশ্রয়-ভিখারী দুর্বল একটা শিশু, তার মাঝে এই
উদ্ধত বিদ্রোহ !
নেপথ্য
থােকার এই স্তব্ধতা যেন কা’র প্রবল অট্টহাস্য দিয়ে তৈরি।
সমস্ত স্নায়ুতে তরল। ছটফট করে উঠলাে। থােকা তাে চুপ
করে’ নেই, যেন কে তার মসৃণ, নিষ্ঠুর দাঁতে উলঙ্গ হেসে
উঠেছে।
সাহস করে তরলা আবার থােকার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাে,
আনন্দে অস্ফুট গলায় বললে,এসাে।
আর কোন দুঃস্বপ্নের মধ্যে থেকে থােকা উঠলে হঠাৎ
চীৎকার করে।
অনাদি হাসিমুখে তরল গলায় বললে,—ব্যাটা তাে দেখছি
ভীষণ স্বার্থপর, তােমাকে মা বলে স্বীকারই করতে চায় না।
অপরাধের লজ্জায় তরলার দু চোখের পাতা ভারি হয়ে
এলাে। সে না-হয় তাকে পেটেই ধরে নি, কিন্তু তাই বলে তার
বুকে কি সেই একই সুধা সঞ্চিত হয়ে নেই ? নরম, অসহায় ঐ
একটুখানি থােক, তাকে কি সে কখনাে আপনার করে তুলতে
পারবে না?
রাত্রে থােকা আন্নাকালির ঘরে শােয়, আর এমনিই চুপ করে
সে ঘুমােয় যে তরলার বুকটা স্তব্ধতায় হাহাকার করে ওঠে।
-এ কি, কোথায় উঠছ ? মশারির চাল তুলে খাটের থেকে
তরলাকে চুপি-চুপি নামতে দেখে ভয় পেয়ে অনাদি তার আঁচল
চেপে ধরলাে।
৩২
নেপথ্য
-যাই থােকাকে এখানে নিয়ে আসি। তরল ধরা-পড়া
লজ্জিত গলায় বললে।
—এখানে, অনাদি চমকে উঠলো : এখানে নিয়ে আসতে
যাবে কেন? ওখানে ও দিব্যি ঘুমােচ্ছে।
-না, আমার কাছে, আমার বিছানায় ও ঘুমােবে। তরল
অনুনয়ের ভঙ্গিতে খাটের পাশ ঘেঁসে এসে দাড়ালো : কোলের
ছেলে আবার কখন আলাদা ঘরে গিয়ে ঘুমােয় ।
—কিন্তু ও যে আন্নাকালির ভারি ন্যাওটা।
তেমনি আমারাে হ’তে বা বাধা কী ? অন্ধকারে তরল
করুণ করে একটু হেসে উঠলে : আমি তাে আর ঐ তােমার ঝি-র
চেয়ে এমন কিছু খারাপ দেখতে নই। আমার হাত দু'টো তাে আর
বাঘের থাবা নয়।
তরলাকে হঠাৎ যেন নিশি-পেয়েছে। নইলে, কিছুর মধ্যে কিছু
নয়, ঘুমের মধ্যে থেকে উঠে সে চলেছে ছেলের সন্ধানে, চুপি-চুপি,
চোরের মতাে। এমন কথা কে কবে শুনেছিলে ?
অনাদি বিরক্তিতে বিস্বাদ গলায় বললে,-কেন মিছিমিছি
দিক্ করছ ? ওটাকে এখানে নিয়ে এলেই ভীষণ ভ্যাবাতে সুরু
করবে।
-তা ছােট ছেলেপিলে একটু কঁদেই। তাতে ঘুমের ব্যাঘাত
হয় বললে চলবে কেন ?
নেপথ্য মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে না পেরে অনাদি শােয়া ছেড়ে উঠে বসলো : এ কী মজার কথা, তাই বলে শুধু-শুধু তুমি ছেলে কঁদিয়ে আমার এই পাকা ঘুমটা নষ্ট করে দেবে? ওর সেই ছাদ- টানাে কান্নাটাই কি এখন তােমার খুব ভালাে লাগবে নাকি? —ত, শােনবার কান থাকলে লাগবে বৈ কি ভালাে। স্থলিত পায়ে তরল। দরজার দিকে এগিয়ে এলাে : কোথাকার কে-একটা ঝি-র কাছে শুয়ে চুপ করে ঘুমােনাের চাইতে মার বুকে মুখ রেখে তার সত্যিকারের কঁাদাটা অনেক ভালো শােনাবে। অনাদির বুকটা একেবারে জুড়িয়ে গেলাে মনে কোরাে না। মশারির বাইরে চলে আসতে-আসতে সে ঈষৎ রুক্ষ গলায় বললে, —কিন্তু সেটা ছেলের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালাে না-ও হতে পারে, তরল। শােনন, দাঁড়াও, শুধু আমার ঘুমের ব্যাঘাতের কথা বলছি না, সমস্ত রাতে ছেলেটাররা আর চোখের পাতা দুটো একত্র করতে পারবে না। মিছিমিছি ওকে ব্যস্ত করে লাভ কী ? সম্প্রতি ওর সম্মানের চেয়ে ওর স্বাস্থ্যটাই কি বড়ো জিনিস নয়? তরলা দু পায়ে অনড় দাঁড়িয়ে রইলাে । পিছন থেকে অনাদি শ্লথ পায়ে এগিয়ে এসে তাকে সস্নেহ আকর্ষণ করলে। বললে,—ওর জন্যে তােমাকে ভাবতে হবে না, ওর জন্যে লােক আছে। আমারই জন্যে কেউ নেই। আমারই ভাবনা ভাববার জন্যে তােমাকে নিয়ে এসেছি। ৩৪
নেপথ্য
স্বামীর সেই স্পর্শে তরল হঠাৎ নিজেকে ভারি অপরিচ্ছন্ন
মনে করলে।
সমস্ত রাতে সেই শুধু দু চোখ একত্র করতে পারলাে না।
খালি কান পেতে রইলাে কতােক্ষণ একটি শিশু-কণ্ঠের আনন্দিত
আর্তনাদে সমস্ত অন্ধকার উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
এবার যখন তরলা উঠে বসলাে, তখন অনাদিকে সে এতে-
টুকুও পাশ ফিরতে দিলাে না। অতি সন্তর্পণে, সঞ্চরমান একটা
ছায়ার মতো টলতে টলতে সে দরজার দিকে এগিয়ে এলাে।
দরজাটা যেন তার হয়ে কে আলগােছে খুলে দিলে ।
, এখানে সে শুধু অনাদির জন্যে আসে নি। অনাদি যদি
তার, তবে যেখানে যতােটুকু অনাদির আধিপত্য আছে, সব
খানেই তার সমান অধিকার, তার সমান বিস্তৃতি। কিছুই সে
ফেলতে পারবে না। যদি দাহ তাকে দিতে হয়, দীপ্তিও তাকে
দিতে হবে।
কিন্তু আন্নাকালি যে একেবারে দরজা বন্ধ করে ঘুমােয় এ
আবার কে জানতাে বললা ?
দরজায় ধাক্কা দিতে তরলার সাহস হলাে না। পায়ের আঙুলে
ভর দিয়ে আরাে খানিকটা লম্বা হয়ে সে জানলা দিয়ে একবার
মুখ বাড়ালাে।
নড়বড়ে একটা তক্তপােষে, প্রায় কাঠেরই ওপর বলতে
নেপথ্য
পারাে, থােকা আন্নাকালির আঁচলের তলায় দিব্যি অঘােরে ঘুম
যাচ্ছে।
আর সে শুয়ে ছিলাে ফাপাননা গদির কোমলতায়। তার দুই
চোখে কিনা তবু এক ফোটা ঘুম আসছিলাে না।
দরজার উপরে তরলা তার কপাল কুটতে চাইলাে। হায়,
সে শুধু এখানে অনাদির জন্যেই এসেছে, আর ঐ খােকা, ঐ খােকা
তার কেউ নয় ।
সে যেন শুধু একটা জলাশয়, প্রয়ােজনের পাথর দিয়ে বাঁধানো,
নয় যেন সে নদী, নিজের বেগে বহমান, নিজের
মুক্তিতে
উৎসারিত। সে যেন এসেছে স্ত্রী হয়ে, মা হয়ে নয়।
খাঁচার পাখীর মতাে তরলা পাখা ঝাপটাতে লাগলাে।
চার
কিন্তু, যাই বলল, জানােয়ারের দিকে দু চোখ মেলে তাকানাে
যায় না।
খালি গায়ে ধুলাে-বালি মেখে কদাকার হয়ে বসে আছে।
সােহাগিনী আন্নাকালির সেদিকে নজর দেবার দরকার নেই।
তরলার আর সহ্য হলাে না, অথচ, কর্কশ হতে গিয়ে কেমন
করুণ করে’ বললে,—ছেলেটার এ কী হাল করে রেখেছ ?
আন্নাকালি দালানে বসে সুপুরি কাটছিলাে। কথাটার জবাব
দেয়া দূরে থাক, সে-কথা শুনে অন্তত যে একবার খােকার দিকে
চেয়ে দেখবে ততােটুকুও যেন তার কৌতূহল নেই।
—আমাকে তো ধরতে-ছুঁতে দাও না দেখি, কিন্তু সকাল
থেকে ছেলেটাকে যে ঐ মাটির উপর ফেলে রেখেছ এটা তােমার
কোন দিশি কাণ্ডজ্ঞান জিগ্গেস করি ?
E
৩৭
নেপথ্য
চোখ না তুলে পরম উদাসীনের মতাে আন্নাকালি বললে,
আমাকে তােমার কিছু শেখাতে হবে না। নিজের কাজ করে
গে যাও।
—কিন্তু ওর দেখা শােনা করাও আমার নিজের কাজ সেটা
কিছু খেয়াল রাখাে? তরল গর্জন করে উঠলাে।
কিন্তু আন্নাকালির গলায় ঝগড়ার কোনাে উৎসাহ দেখা গেলাে
। কথা কয়টাকে চিবিয়ে-চিবিয়ে
বললে,—নিজে পেটে
ধরলে তখন ছেলের দেখা শােনা করতে এসাে।
-কিন্তু তুমি কে ? তুমিই কি ওকে পেটে ধরেছ নাকি ?
-আমি কে, আন্নাকালি দীর্ঘ একটা ঢোক গিললে : সে-কথা
তােমাকে যে বলতে পারতো সে আজ বেঁচে নেই। সে আজ
বেঁচে নেই বলেই আমাকে কিনা হার সে-কথার জবাব
দিতে হচ্ছে।
-তুমি তো একটা ঝি । তােমাকে মাইনে দিয়ে রাখা
হয়েছে। তরল টগবগ করে উঠলাে।
-তাতে লজ্জার কিছু নেই, ছােট বো। আন্নাকালি তার
নির্দন্ত মুখে নির্ধারিত হেসে উঠলো : বলতে গেলে, তােমাকেও
তো মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে।
-কিন্তু তুমি তােমার মাইনের যােগ্য কাজ করছ না কেন
শুনি ? রান্নাঘর থেকে তরলা দালানে এসে পা দিলাে : ছেলের
৩০
নেপথ্য
দেখা শােনা করার জন্যেই যদি তুমি মাইনে পাও, তবে ওটা যে
অমনি মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে তুমি দেখতে পাও না?
-তুমিও দয়া করে চোখ দিয়ে না ওদিকে। আন্নাকালি
সুপুরি কাটতে লাগলাে : আমার কাজ আমি বুঝবে।
-তােমাকে বােঝানাে হচ্ছে। ব্যস্ত, দ্রুত পায়ে উঠোনে
নেমে তরল জানােয়ারকে সবেগে কোলে নিতে গেলাে।
যেন বাড়ি-ঘর হঠাৎ চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ছে এমনি উদ্বেল
ত্ৰস্ততায় আন্নাকালি থাক-থাক চীৎকার করে উঠলাে : ধরাে না,
খবরদার, ওকে ধরাে না বলছি।
সামনে যেন একটা কী মুৰ্ত্তিমান বিভীষিকা, তরল স্তম্ভিত
হ'য়ে রইলাে।
জানােয়ারকে তাড়াতাড়ি কোলে নিয়ে দুই হাতে গা তার
মােছতে-মােছাতে আন্নাকালি ভীত, বিহ্বল গলায় বললে,
সৎ-মার হাতে ওকে তুমি বার-বার ছুঁতে আস কেন বলো দিকি ?
বছর একটা কিছু অমঙ্গল হােক এই বুঝি তুমি মনে-মনে
মানৎ করে আছো ?
তরলা এক ধাক্কায় ঘরের মধ্যে মেঝের উপর এসে ছিটকে
পড়লাে।
অনাদি ঘরে ঢুকে থমকে দাড়ালো, ব্যাকুল হয়ে বললে,
এ কী, কী হলো তােমার? কোনো অসুখ-বিসুখ করলে নাকি ?
নেপথ্য
তরল তক্ষুনি আবার এক ঝটকায় সােজা হয়ে উঠে বসলাে :
তুমি ঐ ঝিটাকে এক্ষুনি বিয়ে করবে কিনা বলল?
—কে, আন্নাকালি? কথাটা যেন অনাদি বিশ্বাস করতে
পারছে না।
–হ্যা, ষােড়শােপচারে যাকে পূজো করছে দিন-রাত।
—কেন, কী করলাে? তার ওপর হঠাৎ তুমি এমন চটে
গেলে কেন ?
-না, তাকে কঁাধে করে নিয়ে নাচবে? অভিমানে ভর-ভর
দুটি চোখ তুলে তরলা স্বামীর মুখের দিকে তাকালাে: আমাকে
আজ ও কী বললে জাননা?
-কী বললে ?
—বললে, দিনে-রাতে আমি নাকি কেবল থােকার অমঙ্গল
কামনা করি।
-কা’র ? অনাদি খােলসা করে ব্যাপারটা যেন কিছু বুঝতে
পারলাে না : জানােয়ারের ?
-হ্যা, অমন ছেলের বাপ না হলে মাথাটা এমন তােমার
নিরেট হবে কেন? তরলা সমস্ত শরীরে রি-রি করে উঠলো :
আর, এতাে বড়ো তার মুখ, বলে কিনা, সৎ-মার হাতে তুমি
ওকে ছুঁতে এসাে না, ছােট বৌ।
অনাদি অনর্গল হেসে উঠলো : এই কথা?
50
নেপথ্য
-এই কথা মানে? তরলার রাগে সমস্ত আবহাওয়াটা যেন
ভাপিয়ে উঠলো : তুমি এর একটা কিছু বিহিত করবে না?
অনাদি কথাটাকে উড়িয়ে দিলে : গেঁয়ো একটা ছােটলােকের
কী-একটা না কথা, তা তুমি অতাে গায়ে মাখতে গেলে কেন?
-তাই বলে সামান্য ঝি হয়ে ও আমাকে অপমান করে
কথা কইবে? আর তাই তুমি আমাকে দাড়িয়ে শুনতে বলে ?
অনাদি নির্বিকারের মতাে বললে,—এতে তুমি অপমান
কোথায় দেখতে পেলে ?
তরলা অনড় একটা কাঠ হ'য়ে রইলাে : অপমান নয়? এতে
কিছুই অপমান নেই, বলাে ? আমি সৎ-মা, সেটা কি আমার
অপরাধ ? আমি এখানে এসে সমস্ত পাবদা, শুধু আমার ছেলে
ফিরিয়ে পাবাে না? ও কে যে সমস্তক্ষণ সেই ছেলে আমার আড়াল
করে রাখবে ? ওর নােংরা হাতে ছেলে ধরলে জাত যায় না,
আর আমি একটু ছুঁতে গেলেই তার অমঙ্গল হয় ?
এততাতেও যেন অনাদিকে উত্তপ্ত করা গেলাে না। সে তেমনি
ঠাণ্ডা, নিশ্চিন্ত গলায় বললে,—ওর মিথ্যে একটা কুসংস্কারের ওপর
রাগ করে লাভ কী ?
কুসংস্কার ? তরলা রাগে বরফের মতো জমে উঠলো।
-হ্যা, ছােটলােকদের মধ্যে এমনি ধারা একটা কুসংস্কার
আছে এদিকে ।
১
নেপথ্য
-বা রে,
—যে সৎ-মা হয়ে এসে ছেলের দেখা শােনা করলে সেই
ছেলের অমঙ্গল হয় ?
-হ্যা, অনাদির মুখে বিশীর্ণ একটি হাসি ফুটে উঠলো।
যতােদিন না সেই সৎ-মা নিজে সন্তানবতী হচ্ছে।
—তুমি তা সমর্থন করাে? কথাটা তরলা অনাদির মুখের
উপর সবেগে ছুঁড়ে মারলাে।
আমি কিছু
সমর্থন করতে যাবে কেন ? অনাদি
এগিয়ে এসে তরলার একখানি হাত ধরতে গেলো; কিন্তু আমি
বলি কী, এই হ্যাঙ্গাম-হুজুৎ করে কিছু লাভ নেই। যেমন বরাত
করে এসেছে, থাক ও ওর ঝির জিম্মায় ।
-কেন, কেন, আমার ছেলে কেন ঝি-র হাতে মানুষ হতে
যাবে ?
পাগল। তার তত দিন এখনাে ফুরিয়ে যায় নি। হাসিতে
অনাদিকে কেমন এখন পাশবিক দেখালো : তখন তাকে দিয়ে
তােমার কোল ভরে রেখাে, কারু সাধ্যি নেই তােমাকে কিছু
বলতে আসে। এখন ওকে কোলে নিতে গেলেই, দেখতে পাচ্ছ
তো, একেবারে যুগপ্রলয় ।
অনাদির হাতটা জোরে ঠেলে দিয়ে তরলা একছুটে উঠোনে
এসে হাজির।
একমনে জানােয়ার তখনাে ধূলো-বালি নিয়ে খেলা করছে।
৪২
নেপথ্য
আন্নাকালি বেঁচে আছে কি মরে গেছে, তরলা কোনাে দিকে
দৃকপাত করলাে না, দুই হাতে সবলে জানােয়ারকে কোলের উপর
তুলে নিলাে ।
আর জাননায়ারের গায়ে যতো জোর ছিলো সব সে তার মুখের
গহ্বরে এনে সমবেত করলে।
সে-কান্না শুনে তরলাররা কেমন কাটা দিয়ে উঠেছিলাে, মনে
হয়েছিলাে এ যেন মানুষের কান্না নয়, তবু কোনাে কিছুতে তার
দখল ছাড়বার কথা আর সে আমলেই আনতে পারলাে না।
রাজ্যের নাের ঘেটে কী করেছে দেখ ! তরলা জোর
করে তার সর্বাঙ্গে আঁচল বুলােতে লাগলাে : হাতে কী ওটা
তাের দস্যি ছেলে, ওমা, আস্ত কী একটা পােকা কিলবিল করছে।
মুখে পুরে দিলেই তাে গেছলাে।
-এমনিতে খেতে আর কিছু বাকি নেই। আন্নাকালি কোথা
থেকে বেরিয়ে এসে গলায় একটা ভারিক্কি টান দিলে : ওকে
নামিয়ে দাও, ছােট বৌ।
-তুমি আমার ওপর হুকুম করতে এসাে না বলছি। তরল।
চোখ পাকিয়ে বললে।
-কিন্তু কী ভীষণ ও কাদছে শুনতে পাচ্ছ না ?
-কাদছে তাে বেশ করছে। একশােবার কাদবে। আরো
কদবে। বলে’ তরল থােকার গালে হঠাৎ একটা ঠোনা বসিয়ে
৪৩
নেপথ্য
:
দিলাে : আমার ছেলে আমার বাড়িতে বসে যতাে খুসি কঁাদবে,
তাতে তােমার কী ?
-ওমা, গালে হাত দিয়ে আন্নাকালি একেবারে মাটির উপর
বসে পড়লল : তাই বলে তুমি ঐ দুধের বাচ্চাটাকে অমনি ধারা
মারবে নাকি গা ?
-কে, কে মারলাে? ঘরের ভিতর থেকে অনাদি এলােল ছুটে।
-মা মারবে না তাে মাইনে-করা একটা ঝি ওর গায়ে হাত
তুলবে নাকি ভেবেছ ? প্রসারিত ধনুকের মতাে হাত-পা বেঁকিয়ে
জানােয়ার প্রাণপণ শক্তিতে তার কোল থেকে বেরিয়ে আসতে
চাইছিলো, তরল তাকে দুই বলিষ্ঠ হাতে কঁাখের উপর সাপটে
ধরলাে : বেশ করবে, মারবাে। আমি মা, ছেলে আমার।
-এ কী আরম্ভ করেছ সকালবেলা? অনাদির গলা বিরক্তিতে
ঝাজিয়ে উঠলো : বাড়িতে টিকতে দেবে না নাকি ?
—তুমি এর মধ্যে কেন মাথা গলাতে আস বলাে তত ? তরল
এবার স্বামীর উপর মুখিয়ে এলাে : বা জানাে না, বােঝে না,
সব-তাতে তােমার মাতব্বরি করতে আসবার মানেটা কী ?
-আমি অতােশতাে কিছু বুঝতে চাই না, সানুনয় অথচ
অসহিষ্ণু গলায় অনাদি বললে, দয়া করে ওটাকে আন্নাকালির
কোলে নামিয়ে দাও, বাড়িটা একটু ঠাণ্ডা হােক।
--বাড়িতে বেশি তাত মনে হয় তাে ঐ আমবাগানের ছায়ায়
33
নেপথ্য
=
বসে’ হাওয়া খাও গে। তরল খােকাকে মুচড়ে দুমড়ে কোলের
ওপর চেপে রাখতে-রাখতে কুয়াের দিকে এগােতে লাগলাে :
ছেলে যখন বড়াে হয়ে ইস্কুলে পড়তে যাবে তখন তার ভালাে-
মন নিয়ে তম্বি করতে এসাে, এখন যতােক্ষণ ও আমার এলেকায়
তখন কাৰু আমি মুখ-নাড়া সইতে পারবাে না।
শুকনাে হাড়ে ঠক-ঠক করতে-করতে আন্নাকালি বললে,-
এ কী বােম্বেটে মেয়ে, বাবা! রাত-বিরেতে এ যে দস্তুরমতাে
ডাকাতি করতে পারে।
কিন্তু, বলা বাহুল্য, তরলা আর কোনােদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো
না। নিজ হাতে জল তুলে জানােয়ারকে স্নান করিয়ে দিতে
লাগলাে।
—কঁচা জলে চান করিয়ে ওর বুকে যে একেবারে সর্দি বসিয়ে
ছাড়বে। আন্নাকালি আবার একটা আর্তনাদ করে উঠলাে।
কতােটুকু জলে কতােখানি সর্দি হয় সে-কথা তরলাকে যেন
কেউ ঠাট করে’ শেখাতে না আসে, এমনি উদার ঔদাসীন্যে সাবান
দিয়ে রগড়েরগড়ে ছেলেকে সে স্নান করালাে। নিজের ট্রাঙ্ক থেকে
মােটা, খসখসে, রোয়া-ওঠা ভােয়ালে বার করে শুকনাে করে
দিলে সমস্ত গা। ট্যালকম পাউডার দিয়ে তাকে সাদা, পিছল
করে তুললাে।
গায়ে দিয়ে দিলো সব চেয়ে রঙিল, নতুনতম
একটা জামা, যার পাট ভাঙতে দৃষ্টি-কৃপণ আন্নাকালির এখনাে
৩৫
নেপথ্য
সাহস হয় নি। ভালাে করে চুল ওঠে নি, তবু সে সাধ্যমতত
সি থি কেটে দিলে। কপালে দিয়ে দিলাে লাল কালির টিপ।
কঁদছে কঁদুক, তাতে তরলার গ্রাহ নেই, এখন চোখে একটু
কাজল পরাতে পারলেই তার হয়ে যায় ।
দেয়ালে-বেঁধা সেই আলমারির মধ্যে কাজল-লতাটা একধারে
পড়ে আছে।
ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকে তরলা সটান অনাদির দিকে হাত
বাড়িয়ে দিলো : দাও দিকি আলমারির চাবিটা! অনাদিকে যেন
কে একটা ঘা দিলে : কেন, আলমারির চাবি দিয়ে তুমি কী
করবে?
—আলমারির চাবি দিয়ে আবার মানুষে কী করে? দাও,
তরল ছটফট করে উঠলাে : বাজে কথা কইবার আমার
সময় নেই।
অনাদি পাংশু মুখে জিগ্গেস করলে : কিছু নেবে নাকি
ওখান থেকে ?
-হা গাে হঁা, এতােক্ষণে মশায়ের বুদ্ধি খুলেছে। কী আর
হবে, তরল হেসে ফেললাে : ছেলেরই তাে বাপ ।
—কী নেবে শুনি?
-কাজল-লতা। থােকার চোখে কাজল একে দেবাে। আমার
কাঁদুনে ছেলেটা কেমন সাজলাে আজ, একটিবার দেখলেও না তাে
৪৬
নেপথ্য
চোখ ভরে। তরলা ফের হাত বাড়ালাে : দাও, আমি দাড়াতে
পাচ্ছি না। আমাকে গিয়ে এখন আবার ওর খাবার জোগাড়
করতে হবে।
অনাদির গলা গভীর নিস্পৃহতায় হঠাৎ ডুবে গেলাে : এই
কথা? তা, তার জন্যে আলমারি খােলবার কী দরকার?
কলাপাতায় তেল মেখে একটু কাজল করে নিলেই হয়।
কলাপাতা, কলাপাতা আমি এখন কোথায় পাবো ?
-তা বলো তাে, অনাদি জায়গা ছেড়ে উঠে দাড়ালাে : আমি
গিয়ে কেটে আনছি ।
-কিন্তু, কেন, হাতের কাছে আলমারিটা খুলতে বাধা কী ?
তরলা সন্দিগ্ধ চোখে অনাদিকে একবার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ
করলো : কাজল-লতাটা তবে কী জন্যে ওখানে তুলে রাখা
হয়েছে ?
—যেমন রয়েছে তেমনি থাক্ না। মিছিমিছি ওখানে হাত
দিয়ে লাভ কী ?
—মিছিমিছি কোথায় ?
বা রে, অনাদি আমতা-আমতা করে বললে,কলাপাতায়
যখন কাজ চলে যাচ্ছে, তখন ওটা মিছিমিছি নয় ?
-সকালবেলা তােমার সঙ্গে আমি বাজে তর্ক করতে চাই
। তরলা শাসনের ভঙ্গিতে বললে,—দিয়ে দাও বলছি চাবিটা।
০৭
নেপথ্য ওটা আমার ছেলের জিনিস, আমার ছেলের কাজে লাগবে, ওতে তােমার কোনাে দায়-দাবি নেই। অনাদি গম্ভীর হয়ে বললে,-না। -কী না? -ঐ আলমারিতে হাত দেয়া যাবে না। —কেন ? অনাদি গলাটা বুঝি একবার খাঁখরে নিলো : ওটা ওর মা’র হাতে সাজানো। তরলার গলা দিয়ে বেরুলাে : কার হাতে সাজানাে? —ওর মা’র হাতে। কতােদিন থেকে কতাে যত্ন করে সে সব থরেথরে সাজিয়ে রেখেছে। নিমেষে সমস্ত পৃথিবী তরলার চোখে অন্ধকার হয়ে গেলাে। তবু প্রাণপণে দুই চোখ খুলে রেখে সে জিগগেস করলে : তাতে কী? কোথায় ওর মা? সে তাে মরে কবে ভূত হয়ে গেছে। -তবু জিনিসগুলাে তাে আছে। অনাদি একটা নৈর্ব্যক্তিক উক্তি করলে : সত্যি করে বলতে, পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে প্রাণ- হীন জিনিসগুলিরই আয়ু বেশি। -কেননা একটা জিনিস ভাঙলে তাড়াতাড়ি তুমি আরেকটা বাজার থেকে কিনে আনতে পারাে। কাজল-লতা না জুটলে
নেপথ্য
কলাপাতা আছে। তরলা ঘৃণায় একেবারে লেলিহান হয়ে উঠলাে :
কেবল মানুষের বেলায়ই তা হয় না।
বলে’ দ্বিরুক্তি না করে ছেলে কোলে নিয়ে সে দ্রুত-পায়ে
প্রস্থান করলে।
এবং একেবারে আন্নাকালির ঘরে।
ছেলেকে দুম করে তার পাশে নামিয়ে দিয়ে তরল চাপা
রাগে আচ্ছন্ন গলায় বললে,-নাও, নাও তােমাদের ছেলে। কে
আর ওকে ধরতে চায়? সব খুলে-টুলে আবার ওকে ভূত সাজিয়ে
দাও।
আন্নাকালি তো অবাক। কিন্তু তারো চেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে
খোকার স্তব্ধতা।
সেটা স্তব্ধতা নয়, সেটা একটা প্রেতায়িত অট্টহাস্য। সেটা
একটা তীক্ষ ও নিষ্ঠুর ধিক্কার ছাড়া কিছু নয়।
তরলা তার অন্তরের ভয়াবহ নির্জনতায় এসে আত্মগােপন
করলে। হায়, তারই ছিলো ছেলে, কিন্তু সে-ই মা হয়ে উঠতে
পারলাে না।
তাই,এতােদিনে সব তরল জলের মতাে পরিষ্কার বুঝতে
পারছে। তাই মাস ফুরিয়ে গেলেও ক্যালেণ্ডারের পাতাটা ছেড়া
হয় নি—সেই অক্টোবর মাস তেমনি জ্বলজ্বল করছে। জানলায়
যে পর্দাটা ঝুলছে, ধোঁয়ায়-ধূলােয় নােংরা হয়ে এলেও তা
৪৯
নেপথ্য
ধােপাড়ি দেবার নাম নেই। বলতে গেলেই অনাদি একেবারে
তার মাইনের হিসেব দিতে বসে গেছে : এতে সামান্য আয়ে
ধােপাবাড়ির বাবুগিরি কি আর পােবা যায়? সত্যিই তাে, সেটা
যে তার নিজের হাতে সেলাই-করা। যদ্দিন আছে থাক না অমনি
—তাতে কী এমন এসে যাচ্ছে? তাই, তাই সেদিন চায়ের বাটিতে
টান পড়লে অনাদি দোকান থেকে তক্ষুনি এক সেট চায়ের বাসন
কিনে নিয়ে এলাে, অথচ আলমারিতে শূন্য পেয়ালাগুলাে ঝকঝক
করছে ! হ’বেই তাে, মানুষের চেয়ে জিনিসেরই যে আয়ু বেশি।
হয়তো তার দামও বেশি—তরল দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে
কেঁদে উঠলাে।
কে জানে হয়তাে সে-ও শুধু একটা জিনিস। জিনিস হ’বার
জন্যেই তার যতােটুকু দাম।
।
পাঁচ তারপর থেকে তরল একেবারে চুপ করে গেলাে। তার কেবলই মনে হতে লাগলাে এটা যেন তার নিজের জায়গা নয়, সে যেন এসে নির্লজ্জের মতো কা’র অংশে একটা রূঢ় উঁত বসিয়েছে। সমস্ত সংসারে কা’র ছায়া রয়েছে ছড়িয়ে- কা’র তিরোধানের ছায়া। ফাটল-ধরা দেয়ালের আঁকাবাঁকা রেখা থেকে শুরু করে কড়িকাঠের ঝুলে । সমস্ত সংসার কে যেন দীর্থ, শীর্ণ হাতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাতাস কার দীর্ঘ নিশ্বাস দিয়ে তৈরি। সে তবে এখানে কেন এসেছিলাে, যদি সে এসে তার স্বামীর দুঃখকে দিলাে আরাে গভীর করে’, ঘােলা করে তুললাে তার স্মৃতির সমুদ্র! অনাদির জন্যে সত্যি-সত্যি তার মায়া করে, প্রতি পদে মনে হয়, সে যেন তার যােগ্য নয়, পারছে না স্বামীর এই নেপথ্য ঔদাসের মেঘ উড়িয়ে নিয়ে যেতে, তার বিরহের শুভ্রতায় নিয়ে আসতে বিস্মৃতির অন্ধকার। সে যেন এসেছে একটা কঙ্কাল, চপলার একটা মাত্র কায়িক অনুকল্প। গল্পের সেই নাকের বদলে সে যেন শুধু একটা নরুন। নিজের উপর তার অমানুষিক ধিক্কার আসে। সে নিজেকে একান্তে নিয়ে যেতে পারে না তার স্বামীর কাছে—তার উদয়ের পিছনটা ভয়াবহ অন্ধকার, তাদের দু’য়ের মাঝখানে সেই মৃত অতীত রয়েছে স্তুপীভূত হয়ে। হাত বাড়িয়ে ছেলের পায় না নাগাল, সে কিনা এতত দুৰ্বল—কে তাকে অনায়াসে দুই হাতে সবলে ঠেলে রেখেছে। তার সমস্ত শয্যায় ছড়িয়ে আছে কা’র মৃত্যুর কঠিন শীতলতা, শিশুর কণ্ঠে ফুপিয়ে উঠছে কা’র তিক্ত, তী প্রতিবাদ। তরল চোখ মেলে ঘরে-বাইরের এই রুক্ষ শূন্যতা আর সহ করতে পারে না। জ্বালায় সে দিন-দিন শুকিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু বলল, তার কী দোষ! এদিকে, ভাবাে, অনাদির কী অন্যায় ভুল, থেকে-থেকে কাজের অন্যমনস্কতার মধ্যে ডাক দিয়ে ওঠে : চপলা ! ধরাে, অন্ধকারে তরল। হয়তাে বারান্দা দিয়ে এ-ঘর থেকে রান্নাঘরে যাচ্ছে, পৃথিবীতে কোথাও যেন কিছু হয় নি এমনি মুখ করে অনাদি তাড়াতাড়ি বললে,—তাসের আড্ডায় আমার আজ নেপথ্য একটু দেরি হতে পারে, চপলা, আমার জন্যে বসে থেকো যেন। নামটা উচ্চারণ করেই লজ্জায় অনাদি কণ্টকিত হয়ে ওঠে, কিন্তু শব্দের আঘাতে শূন্যে যে ক'টি সূক্ষ্ম রেখা ফুটে ওঠে, তা ঠিক চপলারই ত্বরান্বিত চঞ্চল গতির কয়েকটা শীর্ণ দীপ্তি। সেই ক’টি রেখার পাখায় ভর দিয়ে এই যেন চপলা এ-ঘর থেকে রান্না- ঘরে চলে গেলাে। তরলা হয়তাে, ধরাে আরেকদিন, সন্ধ্যাবাতি দিয়ে লক্ষ্মীর পটের কাছে প্রণামে নুয়ে পড়েছে, তার ঐ সুকোমল বঙ্কিমায় কা’র একটি নাম যেন নিঃশব্দে রেখায়িত হয়ে ওঠে। মুখ দিয়ে অলক্ষ্যে তা’র বেরিয়ে এলাে : হঁ্যা, স্পষ্ট বাঙলা করে লক্ষ্মীর কাছে বর চাও চপলা, যেন এই রিডাকশানে চাকরিটা না খােয়া যায়। প্রণাম সেরে তরল উঠে দাঁড়াতেই, অনাদি গভীর অনু- শশাচনায় আপাদমস্তক বিমর্ষ হয়ে উঠলো। ছি ছি, তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? মাত্র একটা নাম সে সুস্থ মনে উচ্চারণ করতে পারবে না ? মাথা তার খারাপই হয়েছে বলতে হবে। কিছুর মধ্যে কিছু , দিব্যি সে বিকেলে আপিস করে বাড়ি ফিরলাে, বারান্দায় বসে’ তরল লণ্ঠনে তেল ভরছে, মাথার ঘােমটাটা কাঁধের উপর নেপথ্য খসা’, দুই হাত নােংরা বলে’ সচকিত হয়ে ঘােমটাটা তুলে দিতে পারছে না-এই তত একটা প্রাত্যহিকতার ছবি, অনাদির মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এলাে : চপল, এই টাকা ক’টা রাখাে দিকি। এবারের ডাকটা ভীষণ অনাবৃত, অনাদি একেবারে তরলার মুখােমুখি এসে দাড়িয়েছে। -কী বললে? তরল ফোস করে উঠলাে। -বললাম যে মাসের আজ পয়লা, মাইনে পেয়েছি, টাকা ক’টা বাক্সে তুলে রাখাে । গীড়িত মুখে অনাদি কোনাে প্রসন্ন- তার আভা আনতে পারলাে না। কিন্তু কী নাম ধরে ডাকলে আমাকে ? —বা রে, তােমার যে নাম তাই বলে ডাকলাম! সমস্ত মুখে অনাদি স্বচ্ছ একটা সরলতার ভাণ করলে। —আমার কী নাম ? তরল রুখে দাড়ালাে। -এমন প্রশ্ন তাে কোনােদিন শুনিনি। অনাদির অনাদির মুখে হাসির বদলে হাসির পরিশ্রমটাই ফুটে উঠলো : তােমার কী নাম তা তুমিই ভালাে বলতে পারো। নাও, এখন টাকা ক’টা রাখাে। অনাদি হাত বাড়িয়ে তরলার উড়ন্ত আঁচলটা মুঠো করে চেপে ধরলে। -ষাকে দিচ্ছিলে তাকে দাও গে যাও। জাল-হেঁড়া মাছের মত তরলা একটা ঘাই মারলে । ৫০
নেপথ্য
—কাকে আবার দিচ্ছিলাম ? অনাদি আকাশ থেকে পড়বার
চেষ্টা করলো : এ-ঘরে তুমি ছাড়া আর লােক কোথায় ?
—ঘরে থাকতে যাবে কেন? তরলার গলা হঠাৎ চোখের
জলে ঘােলাটে হয়ে উঠলো; সে আছে তােমার মনের মধ্যে।
কাউকে যেন সে কস্মিকালেও চেনে না এমনি একটা সাদা,
শুন্য দৃষ্টিতে অনাদি ঘরের চারদিকে তাকাতে লাগলাে : এমন
লােক আবার তুমি কোথায় দেখলে ?
-তােমার চপলা গাে চপলা। ঘৃণায় তরলার চোয়াল দুটো
বিশীর্ণ হয়ে উঠলাে : অন্ধকারে ঘরে ঢুকেই যাকে তুমি প্রথম
সম্ভাষণ করলে।
তরলার মুখশ্রী তখন এমন কিছু অপরূপ হয়ে ওঠেনি, আর
তা’র মানুষের গলায় এতাে যে বিষ ছিলাে তা-ও অনাদির জানতে
বাকি ছিলে এতদিন। কিন্তু সেই অনুপাতে তার কঠিন হবার
উপায় নেই, বরং তরলাকে নিজের কাছে ঘন করে আনবার
চেষ্টা করতে-করতে বললে,-কি শুনতে কী যে তুমি শােন, তার
ঠিক নেই।
ত, র, আর লাকী হয় ? এমন নাম আর কা’র
আছে ?
—যাক, আমাকে তুমি ছেলেমানুষ পাওনি। অভিমানে
তরলার চিবুকটা নিটোল হয়ে উঠলো।
-ছেলেমানুষ, একেবারে ছেলেমানুষ। অনাদি তরলার
নেপথ্য
মুখ, দিনের আকাশে ওঠা ধূসর চাদের মতাে বিষগ্ন সেই মুখ,
দুই হাতে তুলে ধরলল: নইলে সামান্য একটা কী নাম শুনতে
ভুল করে এমন গাল ফুলােও? চপলা-কে চপলা ? যদি সে
চপলাই হয়ে থাকে, চপলার মতাে কবে আবার সে মিলিয়ে
গেছে। তুমি সেই অন্ধকারে তরল, বিগলিত জ্যোৎস্নার মতাে
নেমে এসেছ। তুমি আমার কতাে বেশি।
—ছাই, তরলা কিছুতেই তার মুখ উন্মীলিত করে’ ধরলে
: সে নাম সব সময়ে তােমার মনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
—মনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে! অসহ স্নেহে অনাদি মুখ
নামিয়ে আনলাে : আর যে-নাম আমার মুখে বাসা বেঁধে আছে,
তার বুঝি কোনাে দাম নেই ?
—যাও, আমি তােমার কেউ নই। তরল। শুকনাে একটা
পাতার মতাে খসে পড়লাে : তবে কেন, কেন আমাকে বিয়ে
করতে গেলে ? এই অন্ধকারে বসে সারাক্ষণ তার নাম জপ
করে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতে না? সেই অন্ধকার ভালাে
করে দেখাবার জন্যে কেন আমাকে দিয়ে তুমি বাতি জ্বালালে ?
—তুমি কী বলছ যা-তা? অনাদি নিঃস্বের মতো চেহারা
করে দাড়িয়ে রইলাে।
—আমাকে যদি ভালােবাসতেই না পারবে, তরলার দুই চোখ
জলে ভরে উঠলাে : তবে আমাকে তুমি কেন বিয়ে করতে গেলে?
নেপথ্য
-তােমাকে ভালােবাসি না ? অনাদি এতােক্ষণে যেন
বলবার কতােগুলি কথা খুঁজে পেলে, ডান হাতটা তরলার দিকে
প্রসারিত করে বললে,—আমার গা ছুঁয়ে বলাে তাে কেমন
তােমাকে ভালােবাসি না আমি ? তােমাকে কতাে সব গয়না
গড়িয়ে দিলাম, যা যখন চাও, সব তােমাকে কিনে এনে দিচ্ছি,
এখানে পাওয়া যায় না, নিয়ে আসছি কলকাতা থেকে, তবু
বলল কি না, তােমাকে আমি ভালােবাসি না ? চপলার জন্যে
কী ছিলো? শুধু একটা কাচের আলমারি, তা-ও দেয়ালে
লাগানাে,—“আর তােমার জন্যে এনে দিয়েছি একটা ড্রেসিং
টেবল। বেচারি কোনােদিন একটা শিশির তেল মাখে নি,
তােমার কতাে রঙ-বেরঙের প্রসাধন। বুননা এই পাড়াগাঁয়ে
তােমার পায়ে জুতাে পর্যন্ত শােভা পাচ্ছে। তবু, তােমাকে
ভালােবাসি না? একথা তুমি বলতে পারলে ?
এইখানেও সেই চপলা, বেচারি সেই চপলার সঙ্গেই
তুলনা দেয়া।
—ছাই! তরলার গলা পাথর হয়ে এসেছে : সেই আগুনের
তলা থেকে আমার জন্যে এক মুঠো গরম ছাই নিয়ে এসেছ।
-মেয়েমানুষ কিনা! অনাদি এবার বিষিয়ে উঠলল ; তা
হলে এমন কথা আর কে বলবে ?
—হ্যা মেয়েমানুষ বলেই তাে বলছি। তরল কান্নায়
নেপথ্য
ক
হঠাৎ অনর্গল হয়ে উঠলাে : মেয়েমানুষ বলেই তাে তােমার
এই ভালােবাসা কঠিন একটা অপমানের মতাে লাগছে।
—অপমান!
-হ্যা, যখন আমার দাম, আমার দাবি, কতােগুলি শুধু
জিনিস দিয়ে ধার্য করা হচ্ছে। তুমি তাে আমাকে ভালােবাসো
না, ভালােবাসার একটা জিনিসকে ভালােবাসো তরলা দ্রুত
পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
অথচ নিজের কাছে এই ছিলাে অনাদির জোর, সমস্ত
সংসারের কাছে উচ্চ বিজ্ঞাপন যে তরলাকে সে একতিল দুঃখে
রাখেনি। অগােচরে কেউ যেন কখনাে তীক্ষ্ণ একটা আঁকুটি
করতে না পারে তরলা এখানে পর্যাপ্ত নয়। যখন যা সে
চেয়েছে, এবং কখনন কখনো তার প্রার্থনার বাইরে, তার শক্তির
অতিরিক্ত। সেদিন সে তার জন্যে, মনে আছে, প্রকাণ্ড
একটা ছবি বাঁধিয়ে এনেছিলো--শান্তনু আর গঙ্গার ছবি। ঘরে
তা’র একটা মেনকা ও বিশ্বামিত্র, ও দুর্বাসা ও শকুন্তলার ছবি
আছে, ওটা হলেই বাকি দেয়ালটা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
কলকাতার রাস্তায়-রাস্তায় কতো খোঁজাখুঁজি করে রবিবার
সেই ছবি সে সংগ্রহ করেছিলাে—হায় শুধু এই তরলার
জন্যে।
এখানে, ষ্টেশনে নামতে, গােড়াতেই অমৃতর সঙ্গে দেখা।
৫
নেপথ্য
অমৃত বললে,—এ কী, উইক-এণ্ডে তুমি কলকাতা গিয়েছিলে
নাকি ? কী মনে করে ?
-আর বলো কেন, অনাদি প্রফুল্লমুখে বললে,-এক দিতে
ফর্দ। সব তুমি নিজে গিয়ে নিয়ে এসাে।
—এটা কী? অমৃত ছবিটার দিকে আঙুল দেখালো ।
–মহিষীর নতুন করে ঘর সাজাবার সাধ হয়েছে। আর
কিছু চাই না, শান্তনু আর গঙ্গার ছবি চাই।
—তাই নিয়ে এলে? বলল কী, অনাদি ?
-না এনে উপায় কী! ছেলেমানুষ একটা সখ করে যখন
চাইলাে-
খুসি হয়ে অমৃত তার পিঠটা একবার ঠুকে দিলাে : ভালো
কথা। তা হলে বউর সঙ্গে প্রেমে পড়ে গিয়েছ বলাে।
• অপার সারল্যে অনাদি প্রায় বােকার মতাে মুখ করে
বললে, তার সঙ্গে চুলােচুলি করবাে বলেই তাে তাকে বিয়ে
করিনি।
সে আমার জন্যে এতাে করছে, আমি না-হয় তাকে
দুটো ফরমাজ-মতাে জিনিসই কিনে দিলাম।
--আরে, এক কথায় তাকেই তাে বলে প্রেম।
অমৃত যেন তাকে ঠাট্টা করছে এমনি একটা কথা মনে হতে
সে তা ঠেকাতে গেলাে। বললে,সামান্য একটা ছবি এনে
দিয়েছি বলে যদি মনে করাে-
নেপথ্য
-আরে বােক, তাই তাে আমরা চেয়েছিলাম।
—কিন্তু, কী করা যাবে বলাে, লজ্জা ও সাহসের মাঝামাঝি
গলায় অনাদি কথা কইলাে ; একটা লােক যদি সব সময়ে
তােমার সঙ্গে-সঙ্গে থাকে, তাকে তুমি এক-আধ সময়ে খুসি না
করে’ পারােই না। শত হলেও একটা জীবন্ত মানুষ তাে।
সারাদিন ঘরের মধ্যে বন্ধ, ঘর সাজানো ছাড়া তার আর কোনাে
কাজ নেই সংসারে, সে যদি সখ করে ছবি একটা চেয়েই থাকে,
তবে তুমি তা হাতে ধরে কোন মুখে বারণ করতে পারো শুনি?
অস্ফুট একটু হেসে অমৃত বললে,—একশােবার। তাই তাে
বলেছিলাম, পৃথিবী আবার চক্রাকারে ঘুরে আসে, অনাদি।
তবু কোথাও যেন এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা খোচা ছিলাে।
অনাদির কর্তব্যবােধকে তা বলে তা বিদ্ধ করতে পারবে না।
সে নিজে না ভরে উঠুক, তরলাকে সে রিক্ত, বঞ্চিত রাখতে
পারবে না।
অথচ এতােতেও তরলার তৃপ্তি নেই। এই উত্তপ্ত আশ্রয়,
উচ্ছ্বসিত স্বচ্ছলতা, দুর্নিবার নৈকট্য, তবু সে নিজেকে সুখী মনে
করতে পারলাে না, তার দুই চোখ বেয়ে অসীম একটি বেদনা
গলে পড়ছে।
কী বলে’ই বা তরল নিজেকে সুখী মনে করতে পারে? সে
সব পেয়েছে, স্বীকার করতে তার কুণ্ঠা নেই, স্বামীর আবিষ্ট
নেপথ্য
;
আবেষ্টন, স্বামীর উৎসারিত অজস্রতা—যদি বলতে চাও তাকে
প্রেম, প্রেম ; কিন্তু হায়, পায় নি সে স্বামীর সুখ, স্বামীর
পরিতৃপ্ত পূর্ণতা।
আকাশে সূর্য যদি না জাগে তা’র উলঙ্গ উদারতায়, তবে
জল কী করে উত্তাল হয়ে উঠবে ? তুমি যদি সুখী না হও, তবে
আমি কিসে সুখী হ’লাম ?
তরলা একান্তে, অন্ধকারে, তার অন্তরের নির্জনতায় এসে
বললাে।
তার জন্যে কতােগুলি জিনিসের স্তুপ, সাদা কতােগুলি হাড়ের
সমষ্টি। বন্ধ্যা পাতাবাহারের রঙিন কতােগুলি পাতা। সে যেন
এখানে এরি জন্যেই এসেছিলো? বাইরে চূণকাম-করা মৃত একটা
কবরের মতাে সে যেন কা’র সাথী হয়ে দাড়িয়ে আছে।
অথচ অনাদির জন্যে এতােটুকু সে কোথাও কৃপণতা করে
নি। কিন্তু পেলাে না সে কখনাে সমগ্র অনাদিকে। অনাদির
অতীত, সেই প্রথম প্রতপ্ত যৌবন, তার জন্যে নয়, তার জন্যে নয়
তা’র সেই দুর্ভেদ্য পবিত্রতা। বেহুলার মতো যেন সে একটা
কঙ্কাল নিয়ে ভেসে চলেছে। বিশাল সেই ভােজের পরে যেন
সে ভিখারিণীর মতো উচ্ছিষ্ট কুড়ােচ্ছে। সামনে যতাে সে
অগ্রসর হচ্ছে মুহূর্ত ঠেলে, ততােই যেন সে অপসৃত অতীত দীর্ঘ
ছায়া মেলে তাকে অনুসরণ করছে। যতােই সে ভরে তুলছে
নেপথ্য
তা’র পেয়ালা, চুমুক দেবার সময় কার মুখের প্রতিবিম্ব উঠছে
ভেসে। এই জীবন নিয়ে সে কী করবে, এই জিনিসের জীবন ?
সন্ধ্যের দিকে তরলা আলস্যে এলিয়ে আছে বিছানায়, নিঃশব্দ
পায়ে অনাদি ঘরে ঢুকলাে।
ঘরে বাতি জ্বালা হয় নি, নরম নতুন অন্ধকারে সমস্ত
শূন্যতাটা স্বপ্নের মতাে অবাস্তব মনে হচ্ছে, তার মাঝে তরলার
এই অসাময়িক শুয়ে থাকাটুকু করুণ, নিরুচ্চার একটা কাকুতির
মতাে মনে হলাে। ঘরের অন্ধকার যেন অনাদির অতলস্পর্শ
মায়ায় ঘন, গভীর হয়ে উঠলাে। তরলার এই বিসর্পিত ভঙ্গিতে
যেন উচ্চারিত হয়ে উঠেছে তার অসহায় রিক্ততা। অনাদি
আর নিজেকে গােপন করতে পারলাে না, পা টিপে টিপে সে
বিছানার কাছে এগিয়ে এলাে।
কোমল একটি বেদনায় তরলাকে এখন কী সুন্দর লাগছে ।
তা’র কৃশতাটি বাশির একটা উদাস টানের মতাে মিঠে। মিছি-
মিছি এতােদিন মনে-মনে তাকে সে একটা জিনিসের পর্যায়ে
রেখেছিলাে, মাত্র একটা প্রাণধারণের প্রাথমিক প্রয়ােজন, সত্যি
কি তাই, কিন্তু আজ, এই তরল, এলােমেলাে অন্ধকারে অনাদি
তার মেহের আর কোনাে কূল দেখতে পেলাে না। অন্ধকারে,
তার চোখের সামনে, সমস্ত অতীত ও ভবিষৎ একসঙ্গে গেলাে
নিশ্চিহ্ন হয়ে।
নেপথ্য হঁ্যা, মৃত্যু যদি সবই মুছে দিতে পারলে, নিঃশেষে সমস্ত দিতে পারলাে শেষ করে, তবে এইটুকু মায়া আর বাকি থাকে কেন? তরলা আর তার কাছে সামগ্রী নয়, তার জীবনের সমগ্রতা। নয় সে একটা অভ্যাস, সে আকাশ থেকে ঝরে পড়া আনন্দ। আরাে কাছে এগিয়ে এগিয়ে এসে তরলার গায়ে মৃদু-মৃদু ঠেলা দিয়ে অনাদি ব্যাকুল গলায় বললে,-একী, শুয়ে আছছা কেন? অসুখ করেছে নাকি কিছু ? স্বামীর ডাকে অসীম মমতা যেন উথলে উঠলাে। যে-হাত- খানি অনাদি তার কপালের উপর এনে রেখেছে তা যেন কতাে মৃতদিনের শীতলতা দিয়ে তৈরি। অনাদি অজস্র, অনর্গল হাতে তরলাকে আদর করতে লাগলাে, তার কপালে বুলাতে লাগলাে হাত, চুলের জটিল রুক্ষতা দিতে লাগলাে ছাড়িয়ে, নুয়ে পড়ে তার চোখের পাতার উপর চোখ রেখে বারেবারে তাকে জেগে উঠতে বললে,—কিন্তু তরলার শরীরের একটি রেখায়াে কোথাও প্রতিধ্বনি নেই, স্পর্শে নেই উত্তাপ, চোখে নেই দীপ্তি, ভঙ্গিতে নেই তীক্ষ্ণতা। নিস্তরঙ্গ, নির্ধাপিত শুধু একটা অস্তিত্বের বােঝা হয়ে পড়ে আছে। কী করেই বা সে সাড়া দিয়ে উঠবে বলাে? দুই উৎসারিত হাতে অনাদি শুধু এখন চপলাকে আদর করছে, চিরকাল যা’র
নেপথ্য
জন্যে তার দুই হাতে ছিলো অবারণ অজস্রতা, তার মাঝে
চপলাকেই বলছে জাগতে, যাকে জাগাবার জন্যে সে তার দুই
চোখে নিয়ে এসেছে এতাে আলাে, এতো পিপাসা! এর মাঝে
তার কোনাে মৌলিকতা নেই, শুধু ধারাবাহিক, বহু-অনুকৃত
একটা অভ্যাস। একটা যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি।
—ওঠো, অনাদি তাকে জোর করে কাছে টেনে আনবার
চেষ্টা করলে : অসময়ে এমনধারা বিছানা নিলে কেন ?
বিষাদে বিশাল দু’টি চোখ তুলে তরলা স্বামীর মুখের দিকে
তাকালাে।
কিন্তু, এ কী আশ্চর্য, ভয়ে ও বিস্ময়ে অনাদি একেবারে
নিষ্প্রভ হয়ে গেলাে, তরলার নিশ্চয়ই কোনাে অসুখ করেছে,
তার চোখে যেন চপলারই সেই বিশীর্ণ পাণ্ডুরতা। সেই ধূসর
ব্যর্থতার আভা, সেই কাতর, পরিশ্রান্ত একটা ভয়।
নিমেষে অনাদির সমস্ত স্পর্শ যেন শিথিল হয়ে এলাে।
ঠাণ্ডা লিলিকে একটা সাপের মতো সেই চপলার স্মৃতি যেন
তাকে হঠাৎ বেষ্টন করে’ ধরেছে।
–দাড়াও, আমি আসছি, তরলাকে তাড়াতাড়ি বালিসের
উপর নামিয়ে দিয়ে অনাদি উঠে দাড়ালাে : আমার পার্স টা
বােধ হয় বাইরের ঘরে টেবিলের ওপর ফেলে এসেছি।
সদরটা আবার ভােলা। অনাদি দ্রুত পায়ে পলায়ন করলে।
৬)
f সমস্ত সংসার থেকে তার নাম যেন অনাদি নিঃশেষে হারাতে দিতে পারবে না। কথায় ও স্তব্ধতায় তা যেন অহর্নিশ উঠছে অনুরণিত হয়ে । তা হােক, কিন্তু এ কী কাণ্ড! তরল এ আর কিছুতেই সহ্য করতে পারলো না। মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে এততদিনে সে অনাবৃত কণ্ঠে চীৎকার করে উঠলাে। আজ সমস্ত দুপুর সে খুঁটিনাটি করে ঘর গুছিয়েছে। প্রেম তার কাছে অমানুষিক একটা বিলাসিতা, প্রায় দুরারােহ পৰ্বত- চূড়ার মতাে, প্রেম সে চায় ও না বলতে গেলে । তার জন্যে থাক এই প্রাত্যহিক প্রয়ােজনের পৃথিবী, অনুদঘাতিনী সমতলতা তার থেকে এক ইঞ্চি তাকে টলায় কারাে সাধ্যি নেই। সমস্ত সংসার সে তার করতলের উপর নিয়ে আসবে, সমস্ত কলা- কৌশল তার নখদর্পণে। সূচ্যগ্র জায়গা সে কখনাে ছাড়বে না।
নেপথ্য
সেই ভেবেই আজ থেকে হঠাৎ আবার সে তার প্রভুত্ববিস্তার
করেছিলো। মলিন দিনের পর তারাঞ্চিত প্রদীপ্ত রাত্রির মতো
তরলার এই নবতর আবির্ভাবে অনাদির মনে সকাল থেকে খুসি
আজ আর ধরে নি। কিন্তু আকস্মিক এ কী বিস্ময়কর! আপিস
থেকে ফিরে আসতে আসতেই এ কী প্রবল সম্বর্ধনা !
ঘর গুছােতে-গুছােতে আলমারির মাথার উপরে তরল কি-
একটা হঠাৎ রােমাঞ্চকর আবিষ্কার করলে। বিশেষ কিছুই নয়,
ফ্রেমে-আঁটা চৌকো একটা ফটো—আষ্টেপৃষ্টে তার একটা মােটা
তােয়ালে দিয়ে বাঁধা।
ক্ষিপ্রহাতে সে-বাঁধনটা তরলা এক নিশ্বাসে খুলে ফেললল ।
যা সে ভেবেছিলাে, তারই সমবয়সী একটি মেয়ের ছবি, কে এই
মেয়ে তা আর তরলাকে খুলে বলে’ দিতে হবে না, তারাে মতো
কপালে তার সিদুরের টিপটা জ্বলজ্বল করছে বাঁধনটা খুলে
দিতেই মেয়েটি কেমন তার মুখের দিকে চেয়ে এক ঝলক হেসে
উঠলাে, পরিচিত প্রসন্ন হাসি। তরলার কেমন অশরীরী একটা
ভয় করে উঠলাে সেই হাসি দেখে।
কিন্তু যতাে ভয়ই সে পাক, অনাদির মতাে কখনাে নিলজ্জ
ভয় পাবে না। মড়ার মতাে রাখবে না তাকে সে আর তােয়ালে
দিয়ে বেঁধে, আলমারির আড়ালে, তাকে সে একটা বিশিষ্ট জায়গা
দেবে, একেবারে উন্মুক্ত উজ্জ্বলতায়।
নেপথ্য
ফটোটা তরলা একেবারে তাদের শােবার ঘরের দেয়ালে
এনে টাঙালে। টুলে করে দাড়িয়ে নিজের হাতেই পেরেক
পুতলে, আঙটাতে নিজেই বাঁধলে দড়ি, আঁচলে করে’ কাচের
থেকে ধূলাের পর্দাটা মুছে নিয়ে নিজেই ঝুলিয়ে দিলে ।
আপিস থেকে ফিরলে অনাদিকে সে একটা শুধু ফুলের
মালা কিনে এনে দিতে বলবে।
কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেলাে, বারান্দায় অনাদির
পায়ের শব্দ হ'তেই তরল হঠাৎ গলা ছাড়লে। তার এততটুকু
সেই শরীরের পাত্রে শােকের এতাে বড় একটা সমুদ্র যে কী
করে ধরলাে অনাদি সেই মুহূর্তে কিছু আয়ত্ত করতে পারলাে না।
অনাদি ঘরের মধ্যে ছুটে এলাে, ব্যাকুলতায় ভাঙা গলায়
জিগগেস করলে : কি, কী হলাে তােমার? সাপ ?
তরলা এতাে কান্নার মধ্যেও অদৃশ্যে বােধকরি একটু হাসলাে।
দেয়ালের দিকে আঙুল তুলে বললে,—কী ওটা?
ঘাড়ে ধরে অনাদির মুখটা যেন কে দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে
সে-ও কেমন, বললে ভুল হবে না, নিস্তেজ অবশ হয়ে
পড়লাে।
শুকনাে গলায় অনাদি একটা টোক গিললাে : হ্যা, ওটা,
ওটা তুমি কোথায় পেলে?
-যত্ন করে তােয়ালে দিয়ে যে মুড়ে রেখে দিয়েছিলে, কিন্তু
দিলে।
৬৭
নেপথ্য
লজ্জা কী, তরলা বিযে একেবারে জৰ্জর হয়ে উঠলো : দেয়ালে
একেবারে লম্বা করে টাঙিয়ে রাখলেই হয়।
—তুমিই টাঙিয়ে রেখেছ নাকি ? অনাদির মুখে স্বচ্ছ একটা
আভা দিলাে।
—খুসিতে একেবারে দেখছি ডগােমগাে করে’ উঠেছ ।
তরলা তাকে কথা দিয়ে একটা ধাক্কা দিলে : যাও না, পয়সা
খরচ করে একটা মালা নিয়ে এসো না। গান্ধর্ব মতে তােমাদের
আবার বিয়ে হােক, আমি দেখি ।
—একেকসময়ে কী যে তুমি বলাে, তরল ! আবহাওয়াটাকে
অনাদি পালা করে দিতে চাইলাে। তরলা যখন নিজে থেকেই
ছবিটা টাঙিয়েছে, তখন আর ভয় নেই, এমনি একটা সহজ
ধারণা করে অনাদি হালকা একটি হাসির টান দিয়ে বললে,
তবু যা হােক এতােদিনে একটা উদারতার পরিচয় দিলে। ঠিকই
তো, ওকে, সামান্য একটা ছবিকে লজ্জা করে আমাদের লাভ কী
—ও! লজ্জাটা তােমার ছবির কাছে! তরল লক্লক্ করে’
উঠলাে : রাখাে, ও-ছবি আমি রাখছি ওখানে টাঙিয়ে ।
-কেন, কী হলাে?
তরলা আবার একটা কান্নার ঢেউ তুললে :
-তাতে কী হয়েছে ? অনাদির গলা কাগজের মতাে সাদা
হয়ে এলাে : একটা শুধু মরা মানুষের ছবি।
৬৮
নেপথ্য
—বেশ তাে, সেই ছবিটাই আজ তােমার বিছানায় শুইয়ে
দেবে। কান্নার প্রাবল্যে তরলা নিজেই গিয়ে বিছানায়
আশ্রয় নিলে।
অনাদি হতভম্বের মতাে দাড়িয়ে রইলাে : আমি তাে কিছু
বুঝে উঠতে পারছি না। সামান্য একটা ছবির ওপর তােমার
এতাে রাগ কেন ?
কান্নায় প্রখর গলায় তরলা ঝাঁজিয়ে উঠললা: ছবি নিয়েই যদি
থাকবে, তবে ঠাট করে আমাকে বিয়ে করতে গিয়েছিলে কেন?
অনাদি তার মুখের কাছে মমতায় দুয়ে এলাে, কপালের
থেকে গুড়াে-গুড়ো চুলগুলি সরিয়ে দিতে দিতে বললে,তাতে
কী হয়েছে ? ও তাে সম্পর্কে তােমার দিদি।
স্বামীকে ঠেলে দিয়ে তরলা দুই হাতে মুখ ঢেকে বলে
উঠলো : শত্রু, শত্রু, ও আমার শত্রু।
—শত্রু? তুমি এ বলছ কী তরলা ?
-সাত জন্মের শত্রু। ওর দিকে তাকালেই ভয়ে আমার
গা-হাত-পা কাটা দিয়ে ওঠে। তরলা কান্নায় গলে পড়তে
লাগলাে : ওর দিকে যতাে তাকাবাে না ভাবি ততােই আরাে
বেশি করে তাকাতে হয়। ও আমার দিকে সব সময়ে চোখ
কটমট করে চেয়ে আছে। কী যেন আমাকে ও শাসাচ্ছে
সব সময় !
নেপথ্য
অনাদি জোরে হেসে উঠলাে। তরলাকে কোলের কাছে
টেনে এনে বললে,—পাগল ! ও খুব ভালাে মেয়ে ছিলাে। যেমন
নম্র, তেমনি নিরীহ। তুমি তাে আর ওকে দেখ নি, তুমি তাে
জানাে না, ওর মতাে—কথাটা অনাদি শেষ করতে পারলাে না।
জানলার বাইরে রাত্রির অন্ধকারে সে যেন চপলার সেই দুটি
বিশাল চক্ষুর উদ্ভাসিত দৃষ্টি দেখতে পাচ্ছে।
কোল থেকে সবেগে সরে যাবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করতে
করতে তরল বললে,-তবে সেই ভালাে মেয়েকেই চিরকাল
কোলে নিয়ে থাকলে পারতে। আমাকে তবে এখানে ডেকে
আনবার জন্যে তােমাকে কে মাথার দিব্যি দিয়েছিলাে ?
অনাদি উদাস গলায় বললে,নইলে আমি থাকতুম কী
করে ?
-কেন, ঐ ছবি নিয়ে ?
তাকে দুই বাহুতে নির্জীব করে রেখে অনাদি গাঢ় গলায়
বললে,—ও তাে একটা ছায়া, কিন্তু তুমি, তুমি আমার কতো
কাছে।
বরের মধ্যে পাতা-ঝরানাে শীতের খানিকটা শুকনাে হাওয়া
হা-হা করে উঠলাে।
তরলা কিছুতেই তবু নিজেকে ধরা দিলাে না, বললে,
আমি কাছে হ'লে কী হবে, কিন্তু তুমি তাে আমার কাছে নেই ?
৭০
নেপথ্য
কাছে নেই ? অনাদি স্নেহে ঘনতরাে হয়ে এলাে : তুমি
কী যে বলল, তরলা ! চোখ মেলে তুমি এটুকুও দেখতে
পাবে না ।
-এমনিতে দেয়ালটাও তো আমার কাছে ছিলাে। দ্রুত
একটা ভঙ্গি করে তরল উঠে বসলো : চোখ মেলে সবই তো
মানুষে দেখতে পারে।
-কী দেখতে পারে ?
—যা দেখবার। দূরে দেয়ালের দিকে তরলা ভীত, মূঢ়
দুটি চোখ তুললো : ঐ ফটো।
অনাদি আবার তাকে, তার এই রূঢ় ভঙ্গিটাকে নম্রতায়
নামিয়ে নিয়ে এলাে : মানুষে পারে না, কিছুই দেখতে পারে না
তরলা,-তার এই ক্ষুধা, এই শূন্যতা, এই অসীম ভালােবাসা।
কুণ্ডলীকৃত সাপের মতাে তরলা কিলবিল করে উঠলাে :
অকৃতজ্ঞ কোথাকার!
অনাদি সমস্ত শরীরে ঠাণ্ডা, পাথর হয়ে গেলো।
—এতােই যখন তাকে ভালােবাসে, তার জন্যে এতােই
যখন মন তােমার পােড়ড়া বাড়ির মতাে খাঁ-খাঁ করছে, তরল
আবার একটা কান্নার ঝাপটা হানলে : তখন আমাকে এই
শশানে তুমি ডেকে নিয়ে এলে কেন ?
—প্রাণের উৎসবে এই শ্মশান তুমি আবার শ্যামল করে
৭১
নেপথ্য
:
দেবে বলে। মরুভূমিতে নিয়ে আসবে শীতল জলধারা।
অনাদি ভাবে প্রায় বিভাের হয়ে উঠলাে : তাই তাে বলছিলাম
লােকে কিছুই বুঝতে পারে না, তরলা, কী অমৃতের পিপাসা
আমাদের রক্তে! কী ক্ষুধা নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াই! কতো
আমরা ভালােবাসতে পারি। কতাে
কতাে প্রয়োজন আমাদের
ভালােবাসার।
—ছাই!
—পুরুষের সে-শক্তি সে কল্পনা সে-মহত্ত্ব তােমরা ঠিক বুঝতে
পারবে না, তরল। অনাদি দার্শনিকের মতো উদাস মুখ
করলে : আমাদের স্নেহের সে সমুদ্র থেকে এক অঞ্জলি জল
কেউ তুলে নিলে আমরা মরুভূমি হয়ে যাই না। তখনই মরুভূমি
মনে হয় যদি আর কেউ এসে সে-জলে না স্নান করে।
-স্নান করতে গিয়ে তাে গায়ে কেবল কাদা মাখছি।
তরলার গলা বেদনায় ধূসর হয়ে এলাে।
মিথ্যে কথা! অনাদিও দেখাদেখি ম্লান মুখে বললে,
অকৃতজ্ঞ তা হলে তােমাকেই বলতে হয় ।
—তা হলে তুমি আমাকে ভালােবাসাে বলতে চাও?
-কিছুই বলতে চাই না, কেননা বলে কিছুই বােঝানাে
যাবে না, তরল, তুমি শুধু একবার আমার চোখের দিকে চেয়ে
৭২
নেপথ্য তুমি স্পর্শের প্রশ্রয়ে ভঙ্গিটা এবার তরলাকে শিথিল করে আনতে হলাে। স্পষ্ট একটু বা রূঢ় গলায় বললে,তবে আমার গা ছুঁয়ে বলল, দিব্যি গেলে বলে, ঐ ফটোটার চেয়ে আমাকে বেশি ভালােবাসাে। অলক্ষ্যে অনাদি বুঝি একবার দেয়ালের দিকে চোখ ফেরালাে। অন্ধকারে হঠাৎ সমস্ত দেয়ালটা কেমন শূন্য হয়ে গেছে । কিন্তু তরলার চোখ উঠেছে ক্ষুধিত, ক্ষুরের মতাে ধারালাে হ’য়ে : মিথ্যে বােলাে না যেন মিথ্যে যদি বলল, তবে আমিও কিন্তু অমনি একদিন চলে যাবাে বলে রাখছি। অনাদি তরলার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গদগদ হয়ে বললে, এ-কথা আবার জিগ্গেস করতে হয়। তুমি এতােতেও বুঝতে পারছ না? কিসের সঙ্গে কিসে? তরলা তার গায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বললে,—বলল, থামলে কেন ? অনাদি একটা টোক গিললাে কি-না বােঝা গেলো না; ধূসর, নিষ্প্রাণ গলায় বললে,-কিসের সঙ্গে কিসে! একটা জ্বল- জ্যান্ত সত্যের কাছে শুধু একটা ছায়া ! স্কুল একটা উপস্থিতির কাছে গত রাত্রের একটা স্বপ্ন! তরলার খােলা চুলের মধ্যে মুখ ঢেকে অনাদি হঠাৎ শিশুর মতাে অবুঝ গলায় বললে,-যে-লো মরে যায়, তরলা তাকে আমরা কখনাে ভালােবাসি না। ) ৫n
নেপথ্য
হঠাৎ, কাউকে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত হবার সময় না দিয়ে, ঘরের
সেই পুঞ্জীভূত শূন্যতা ভেঙে কা’র বজ্র-বিদারণ হাসি অন্ধকারে
থান-খান হয়ে পড়লাে। বেজে উঠলাে কা’র দ্রুত করতালি,
নিষ্ঠুর তীক্ষ একটা বিদ্রুপের হাহাকার। কে যেন এতােক্ষণ
এখানে আড়ি পেতে ছিলো, অনাদির মুখের কথাটা শেষ হতেই,
এখান থেকে সে ছুটে পালিয়েছে, ঝড়ের মতাে, ধুলো উড়িয়ে,
সমস্ত আকাশ অন্ধ করে’, উন্মাদ, দিশেহারা। এতােদিন
যেন সে তবু দুয়ারে বসে প্রতীক্ষা করেছিলাে, আর তার
আশা নেই, নেই আর তার কোনো আশ্রয়। তাই আবার
কে যেন একটা উপবাসী অট্টহাস্য করে গেলাে তার শেষ
সম্ভাষণ !
শব্দের অসহ প্রচণ্ডতায় অনাদি উঠলাে ধড়মড় করে’ : কী,
কী হলাে?
আর বিবর্ণ, স্তম্ভিত তরল। ভয়ে-ভয়ে স্বামীর একখানা হাত
ধরলাে : আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
এতাে অন্ধকার কোথায় যে এতােদিন সঞ্চিত হয়ে ছিলাে
অনাদিকে তা কে বলবে ? পকেট হাতড়ে দেশালাই বার করে
তাড়াতাড়ি সে আলো জ্বালালাে। কই, কে, কোথায়!
ব্যাপারটা বিশেষ কিছুই নয়, তরলা বললে ।
পেরেক আলগা হয়ে সদ্য-টাঙানাে বিশালায়তন সেই
৭০
নেপথ্য
ফটোটা মেঝের উপর ভেঙে পড়েছে। মেঝে-ময় গুড়াে-গুড়াে
হয়ে ছিটিয়ে পড়েছে কাচের কুচি, ফটোটা ধুলােয় রয়েছে
মুখ থুবড়ে।
কাচের টুকরােগুলি যেন কার হাহাকারের টুকরাে, অনাদি
নলে।
যে-লােক মরে যায়, তাকে আমরা কখনো ভালােবাসি না।
তরলা বিশ্বাসের সাহসে একেবারে উচ্ছঙ্খল হয়ে উঠলাে।
এতােদিন মিছিমিছি সে করুণার ভিখারি হয়ে ছিলাে, এখন সে
বিস্তার করলাে তার অধিকার, উড়ন্ত পাখির প্রসারিত পাখার
মতাে। তার স্বামী, তার ঘর, এমন কি ছেলে পৰ্যন্ত
তার। তার একার মালিকানা। তরলাকে আর কেউ ঠেকাতে
পারলাে না।
বলা বাহুল্য সেই ফটো আর বাঁধানাে হলাে না, তক্তপােষের
তলায় সঞ্চিত আবর্জনার মধ্যে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে পড়ে রইলাে।
দেয়ালের আলমারির মধ্যে যতাে উপকরণ থরেথরে সাজিয়ে
রাখা হয়েছিলো, সব সে দিলো ছত্রখান করে। পচা, পুরােনাে
যতাে ফ্যাসানের কঙ্কাল, তবলার সময় অনেক এসেছে এগিয়ে।
৭৬
নেপথ্য
হাতের বাজুতে কে কবে একটা কী মাদুলি বেঁধেছিলাে, সেটা
পৰ্য্যন্ত রয়েছে। মাদুলি পরেই ছেলে পেয়েছিলো বুঝি। এমন
একটা চিরুনির কন্যে কতােদিন থেকে তরলা ভাবছিলো, ঘরে
থাকতে কেন সে ফের কিনতে যাবে? হা, কিনতেই হবে ঠিক,
তরলার আঙুল ক’টা একসঙ্গে ছি-ছি করে উঠলাে, চিরুনির
ঈাড়ায় আটকে আছে কা’র শুকনাে ক’টা চুলের গুছি! জানালার
বাইরে ডােবার জলে চিরুনিটা সে ছুঁড়ে ফেললে। আর এটাই বা
রয়েছে কেন, এই কয়েক-দাগ-খাওয়া ওষুধের শিশিটা, পচা লাল
খানিকটা জল ! এটা দিয়ে কার মুখে জল দেয়া হচ্ছিল শুনি?
শিশিটা বােতলওলার কাছে বেচবার কথাটাও একবার তরল
ভাবতে পারলাে না।
দেখতে দেখতে দু’দিনের মধ্যে তরলা এমন বলে গেলাে যে
ঘুমের চোখে ভুল করেও তাকে আর চপলা বলে ডাকবার
জো নেই।
নিশ্চয়। কোথায় স্বামীকে সে আনন্দ-উৎসাহে উজ্জ্বল করে
রাখবে, তা না, নিজেই সে তার অকারণ বিষাদের ছোঁয়াচে দিনে
দিনে জুড়িয়ে আনছিলো। আর সে এই নিঃস্বতার ভার রাখবে
তার শরীরে, তার সংসারের চারধারে। ছটায় ও ছন্দে
সমস্ত আকাশে সে বিকীর্ণ হয়ে পড়লাে।
অনাদির দুই চোথ আলাের অসহ তীব্রতায় অন্ধ হয়ে
৭৭
নেপথ্য
গেলো। এতাে অনাবরণ যেন সহ্য করা যায় না, এতাে প্রখরতা।
দিনের রৌদ্রে ঘুমের সমস্ত কোমলতা গেছে নিঃশেষে নিশ্চিহ্ন
হয়ে। দেয়ালের কোণে-কোণে পানের সেই দাগগুলি পৰ্যন্ত
নেই। সেই লাল সাড়িটা দেখা গেলাে খণ্ড-খণ্ড হয়ে ঘর
মােছর ন্যাকড়া হয়েছে, ভূলাের সেই খরগােসটার বদলে দেয়ালে
এসেছে এখন রেশমের সুতােয় নীল পেখম-মেলা একটা ময়ূর।
অনাদি আর একটা টু শব্দ পর্যন্ত করতে পারে না-তা’র নিজে-
বই আর কোনাে মূল নেই। বরং সান্নিধ্যে আরাে তাকে উত্তপ্ত
হয়ে উঠতে হয়। তরলা খুঁজে পেয়েছে তার জায়গা, তার
বিশাল ভবিষ্যতের ক্ষেত্র, তাকে আর এখন পায় কে, তাকে
টলায় আর কার সাধ্যি ? কিছু বলতে আসুক না একবার অনাদি,
তরলা সমস্ত সংসার তছনছ, ওলােট-পালােট করে দেবে।
কী বা তােমার আর বলবার থাকতে পারে। যে-লােক মরে
যায় তাকে আমরা কখনো ভালােবাসি না !
ঘরময় বিস্মৃতির শুভ্রতায় অনাদি এখন, কেন কে জানে,
চপলার অশরীরী একটা উপস্থিতি অনুভব করে, পরিব্যাপ্ত একটা
অনুভুতির মতাে। তাকে যেন এখান থেকে কিছুতেই সম্পূর্ণ
তাড়ানাে যাবে না—তুমি তাকে তােমার বিছানা থেকে, তােমার
ঘর থেকে, তােমার জীবন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারাে, কিন্তু সে
পঁড়িয়ে রয়েছে তােমার বাইরে, ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল অন্ধকারে,
৭
নেপথ্য
দুয়ারের চৌকাঠের উপর বসে আছে অভিমানে মুখ ভার করে।
কখনাে তার সেই তলােয়ারের মত উলঙ্গ একটা হাসি শব্দের
তীক্ষ্ণতায় তার বুকের মধ্যে ঝলসে ওঠে। প্রতিবাদ করা বৃথা,
যে লােক মরে যায়, তাকে আমরা কখনাে ভালােবাসি না।
হ্যা, তাকে তরলারই সঙ্গে ভালােবাসার অভিনয় করতে হয় ।
এতে কিন্তু কথাটার অপব্যবহার হচ্ছে না। জীবনের কোনটা
নয় অভিনেয় ? তুমি যখন তােমার অনুভূতিতে নিৰ্বাক, স্তব্ধ হয়ে
বসে থাকে, সে-ও তােমার প্রকাশেরই একটা অভিনয় । আর যখন
তুমি মৃত্যুতে গেছ মুছে, সেও তােমার একটা বিস্মৃতির প্রতিচ্ছায়া!
ভালােবাসাতে অভিনয়ের অতিরিক্ত কিছু নেই। আগাগােড়া
তা একটা সমমাত্রিক মীমাংসা, একটা শারীরিক সামঞ্জস্য।
তাই তরলাকেও অনাদির ভালােবাসতে হচ্ছে। কিছুমাত্র
ত্রুটি না করে কোথাও ছেদ না রেখে ।
তবু থেকে-থেকে কেবল তার মনে হয় এর চেয়ে তার সেই
ছন্নছাড়া জীবনের এলােমেলাে ছন্দহীনতাও যেন ভালাে ছিলো
না। তার মাঝে পবিত্রতা ছিলাে না, আনন্দ ছিলাে না, আত্মার
উৎসার ছিলাে না। বলতে দুঃখ কি, এখানেও তাে তা নেই ।
নেই সেই সতেজ পবিত্রতা, সেই রােমাঞ্চিত দীপ্তি, সেই আত্মার
সৌগন্ধ্য। অমৃতর ভাষায়, এখানেও তত সেই প্রাণহীন অভ্যাসের
ধারাবাহিকতা।
৭১
নেপথ্য মাঝখান থেকে শুধু সে তা’র চপলাকেই ফিরিয়ে দিয়েছে। এর আগে, সমস্ত রাতের মলিনতার পর চপলার স্মৃতি তার মনে সুর্যোদয়ের মতো নির্মলতায় উজ্জ্বল ছিলাে, এখন সমস্ত দিনের উৎসবের পব চপলার স্মৃতি তার মনে ঠাণ্ডা, ভয়ার্ত অন্ধ- কারের মতাে গুটি-গুটি নেমে আসে। কিন্তু উপায় নেই, ধনুকের থেকে তীর গিয়েছে ছুটে, কথা সে এখন আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। তারই স্বাদে তরল এখন একেবারে একটা বাঘি- নীর মতাে প্রদীপ্ত হিংস্রতায় ঝলমল করে উঠছে। হ্যা, এমন কি ছেলে পৰ্য্যন্ত তার। -দেখ, তরল। একদিন কঠিন গলায় একটা হুকি ছাড়লো ওর নাম আমি বদলে রাখবে। -কী ? অন্যান্য ছেলেমানুষি আবদারের বেলায় যেমন, অনাদি এখন হাসতে পারলাে না। -নবকুমার। বেশ নাম, নয় ? তরলা গম্ভীর মুখে বললে, বঙ্কিমবাবুর দেয়া নাম। তুমি অমনি ফেলতে পারবে না। —হ্যা, ভালােই তো। অনাদি আপত্তি করবার কিছু দেখতে পেলাে না; ঐ ওর ভালাে নাম থাকবে। -শুধু ভালো নাম নয়। ডাকতেও হবে ওকে নবকুমার বলে। অনাদির মুখ শুকিয়ে গেলাে : কেন, জানােয়ার কী হলাে?
নেপথ্য -ও আবার একটা নাম? তরলা বিদ্যুতের মতাে দ্রুত একটা ঝিলিক দিয়ে উঠলো : কোনাে ভদ্রলােকের ছেলের অমন নাম থাকে ? ভূভারতে তুমি কোথাও শুনেছ মানুষকে কেউ কখনাে জানােয়ার বলে ? অনাদি হাসবার একটা অকায়িক চেষ্টা করলাে : সেইটাই তাে ওর বিশেষত্ব। কে জানে হয়তো এই নামেই ও একদিন স্বনাম- ধন্য হয়ে উঠবে। —আগাগােড়া বাপের মতাে একটি সুগােল বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে। তরল ভুবন-ভুলানো একটা কুটি করলে : আর নামটা নবকুমার হলেই ও আর কোনােদিন ইস্কুলে প্রমােশন পাবে না, না ? বেশ তাে, ঐটেই ওর পােষাকি নাম থাক, ইস্কুলের খাতায়, গেজেটের পৃষ্ঠায়, জনতার পতাকার ওপরে। অনাদি যেন অপরাধীর মতাে বললে,—কিন্তু তোমার-আমার কাছে ও সামান্য একটা জানােয়ার। -না, তােমাকে নবকুমার বলেই ডাকতে হবে। —বড় যে বড়ো নাম। অনাদি ম্লান হয়ে গেলাে : পাঁচ অক্ষর। বলতে যে কেবল বাধবে। —শুধু কুমার বললেই চুকে যাবে, তরলা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো : নইলে কাজ নেই, অকাজ নেই, কী কেবল একটা অশিক্ষিত, অভদ্র নাম ধরে ডাকা।
নেপথ্য কিন্তু যাই বলল, যতােই কেননা তড়পাও, আন্নাকালিকে কিছুতেই রাজি করানাে গেলাে না। -তােমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি, ঝি, থােকাকে তুমি এখন থেকে কুমার বলে ডাকবে। —যা ওর নাম তাই বলে ডাকবাে। আন্নাকালি কথাটা শুনেও শুনলো না। -হ্যা, ওব নাম হচ্ছে কুমার, নবকুমার। ভদ্রলােকের বাড়িতে ভদ্রলােকের মতো নাম চাই। বুঝলে? -আমি তােমাদেব অতােশতো ভদবললাকি সামলাতে পারবাে না, ছােট বৌ। আন্নাকালি মুখ ঘুবিয়ে বললে,—চিব- কাল যা বলে ওকে ডেকে এসেছি তাই বলে ডাকবো। -এই সেদিন জন্মালো, এইটুকু ছেলেব আবার চিবকাল কী, জিগগেস করি? তরলা ঝজিয়ে উঠলাে। -ও আমার চিরকালেব ছেলে। নিজের পেটে যখন ধবে নি, তখন ও তুমি বুঝবে না, ছােটবো । -আমি বুঝতে কিছু চাইও না। আমার খোকাকে তুমি ঐ বুনাে নাম ধরে ডাকতে পারবে না তাই তােমাকে আগে থাকতে বলে দিচ্ছি। -তােমার থােকা? -তবে কি তােমার?
নেপথ্য
আন্নাকালি মূঢ় চোখে চারদিকে তাকাতে লাগলাে।
তরলা রূঢ় শাসনের ভঙ্গিতে বললে,অতএব, আমার দেয়া
নামেই ওকে ডাকতে হবে।
আন্নাকালির গলায় আরেক জন কে কথা ক'য়ে উঠলাে :
অসম্ভব ।
কী অসম্ভব ?
-পারবাে না, পারবাে না ওকে তোমার নামে ডাকতে।
আন্নাকালির গলা সিসের মতাে ভারি হয়ে উঠলাে : ও আমার
জানােয়ার। জানােয়ারের মতাে ও ওর মা, আমার ঘরের লক্ষ্মীকে
খেয়ে গেছে।
পারবে না? তরলা রাগে লেলিহান হয়ে উঠলো : ডাকো
দেখি আর ওকে ঐ বিএ নামে। ঘরের লক্ষ্মীকে চলে যেতে
হয়েছে, তা হলে এবার তার ঘরের ঝিটাকেও চলে যেতে হবে।
এব্যাপারে শেষ পর্যন্ত অনাদি এসে নাক ঢোকালে।
আন্নাকালির দিকে মমতা-স্নান করুণ চোখে তাকিয়ে অনাদি
বললে,—নামে কী হয়। নাম একটা যা-হােক ডাকলেই চলে
যায়। নবকুমার—বেশ নাম, খাসা নাম, ছােট্ট করে আমরা
ওকে কুমার বলে ডাকবাে।
—সে আমি পারবাে না বাবু, আমার এই কার্তিকের মতাে
ছেলে। আন্নাকালি ফুপিয়ে উঠলাে।
নেপথ্য
-কার্তিকের মতাে ছেলেকে তুমি তাই জানােয়ার বলে
ডাকবে, না ? তরলা গলা উচিয়ে বললে।
—আরে কার্তিকেরই তাে আরেক নাম কুমার। অনাদি
হেসে উঠলাে, কিন্তু সেই হাসিতে কোনাে প্রসন্নতা নেই : তােমার
কথাটাই তাে পুরােপুরি বহাল থাকছে।
—আমি পারবাে না বাবু, আন্নাকালির স্বর এবার কান্নায়
গলে পড়লাে : এ ওর মায়ের দেয়া নাম।
—আর আমি ওর মা নই ? তরল দৃঢ়, দীপ্ত গলায় বললে ।
অনাদির গলা যেন অত্যন্ত ক্লান্ত ও দুর্বল শােনালাে : সবই
যখন যেতে পারলে, এটাও যাক্। সংসার থেকে তার নামটাও
তো কবে মুছে গেছে ।
—তার জন্যে বুকটা যদি বা তবু ভেঙে চৌচির হয়ে যেতো।
তরল। এবার স্বামীর দিকে তেরছা করে চোখের একটা খোচা
মারলাে : সেই নাম জপ করতে-করতে তাে বনে গিয়ে জানােয়ার
সাজতে পারলে না দেখি। এই তরলারই কাছে এসে শেষে
হাত পাতলে।
-সেই জন্যেই তাে বলছি, অনাদি ধূসর গলায় বললে,
তােমার রাজত্বের জয়জয়কার হােক। হঠাৎ গলা উঁচিয়ে
আন্নাকালিকে সে একটা ধমক দিলে : মা যা নতুন নাম রেখে
দিয়েছেন তাই তােমাকে ডাকতে হবে।
নেপথ্য
-তা তাে আমিও বলছি। আন্নাকালি চোখের জল মুছলে :
জানােয়ার ওর মায়ের দেয়া নাম।
-না, এ মা, এ মা যা নাম রাখলাে। অনাদি আরেকট
অনাবশ্যক ধমক দিলাে।
-ছেলের আবার ক’টা মা হয় ? বিস্ময়ে আন্নাকালি একে-
বারে একটা পাঁচের মতাে মুখ করলে।
– য’টাই হােক না কেন, আমি বলছি তােমাকে ওর কুমার
বলে ডাকতে হবে।
-আমার মুখে ও আসবে না।
-তবে আমাদের মুখেই বা আসছে কী করে’ শুনি?
অনাদির গলা তপ্ত হয়ে উঠলাে।
-তুমি পারবে বলেই আমি পারবাে, তেমন কথা মনে
কোরাে না, বাবু, আন্নাকালি অভিভূতের মতাে বসে পড়লাে :
জীবনে কতােই তাে তুমি পারলে একে-একে, তােমার অসাধ্য
আর কী থাকতে পারে এর পর ? কিন্তু সে আমার কাছে তার ছেলে
জিম্ম করে রেখে গেছে। তােমার কাছে তার কোনাে দাম নেই,
তার উপর সামান্য এ একটা নাম, কেননা তোমার অনেক
কিছু আছে, অনেক কিছু তুমি পেয়েছ, কিন্তু, আন্নাকালি
হাপুস চোখে কেঁদে উঠলাে : আমি ভারি গরিব, আমি
ভারি মুর্থ ।
নেপথ্য
অনাদি এবার কী উত্তর দেয় দেখবার জন্যে তরলা তার দিকে
একটা তীক্ষ্ণ কুটি করলাে।
অনাদি রাগে চিড়বিড় করে উঠলাে : তুমি আমাদের কথা
শুনবে কিনা বললা ?
টলতে টলতে আন্নাকালি উঠে পড়লাে : যতােই তার
কার্তিকের মতাে নাম রাখাে বাপু, আমার মুখে তার মায়ের
দেয়া নামই তােমরা শুনতে পাবে চিরকাল।
—এই বাড়িতে? এতােক্ষণে তরলা তার সমস্ত শরীরে ঝঙ্কার
দিয়ে উঠলাে।
আন্নাকালি কিছু কথা বলতে পারলাে না। অনাদিও রইলো
খানিকটা শূন্যের মতাে দাঁড়িয়ে।
অনাদির উপস্থিতিটা তরলকে সাহসে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
সে মরীয়ার মতাে বললে,—এই বাড়ি আমার, মনে রেখাে, এর
প্রতিটি ইট, তােমার মাইনের প্রতিটি টাকা। যতাে খুসি এর
বাইরে গিয়ে তুমি জানােয়ার বলে চেঁচাতে পারো, কিন্তু এখানে
মুখ ফুটে জানােয়ারের ‘জা’ বললে, তােমাকেও আমার তক্ষুনি
‘যা’ বলতে হবে। তরলা এক পা এগিয়ে এলাে : নিজের মুখতার
তো বড়াই করছিলে, কথাটা কিছু বুঝতে পারলে ?
আন্নাকালি ভাঙা, অবসন্ন গলায় বললে,-এ-কথা শুনেও
যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারলুম না, তখন কথাটা তােমার
নেপথ্য
মনে-প্রাণে বুঝেছি বলে’ই ধরতে হবে। কী করবাে বলল, ওকে
যখন কিছুতেই ছাড়তে পারবো না, ওর মা যখন আমাকে মাথার
দিব্যি দিয়ে বারণ করে গিয়েছে—তথন জানােয়ারের জন্যে সবই
আমাকে সইতে হবে।
—আবার ! আশ্চৰ্য্য, তরলার আগে অনাদিই কখন হুঙ্কার
দিয়ে উঠলাে।
আর সেই গর্জনে তরলা তার সর্বাঙ্গে পুলকিত স্পর্ধার একটা
বিচিত্র পেখম মেলে ধরলাে।
সামান্য একটা নাম নিয়ে কী ছেলেমানুষি যে সে করতে
পারলাে ভাবতে অনাদি এখন মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
কিন্তু এইটেই বিস্ময়ের শেষ বলে মনে কোরো না।
একদিন, এতে শাস্ত্র ও শাসনের পর, অনাদিই তার ছেলেকে
বুকের ওপর তুলে নিয়ে কানে-কানে চুপি-চুপি, প্রায় আত্মহারার
মতাে তাকে ডাকলে : জানােয়ার!
আর অমনি পিছন থেকে তরল একটা লাফ দিয়ে উঠলাে
কি, কী বলে ডাকলে ওকে ?
অনাদির মুখ যেন কে শুষে নিলে : কই, কখন কী বলে
ভাকলাম।
-আমি বুঝি কিছু শুনতে পাই না ভেবেছ ? সব-সব শুনতে
পাই।
নেপথ্য
অনাদির মনে হলাে এ-কথা যেন তরল বললে না। এ-কথা
যেন ঘরের দেয়ালের গায়ে স্পষ্ট লেখা আছে।
অনাদি দুই চোখ তীক্ষ করে তাকে দেখতে গেলাে। না,
দেয়ালের মতােই স্পষ্ট তরলা তার সামনে দাড়িয়ে।
কাগজের মতাে শুকনাে, সাদা গলায় সে বললে,-অনেক
দিনের অভ্যেস কিনা মুখ দিয়ে কেমন বেরিয়ে আসে।
তরলা কেমন বিশীর্ণ হেসে উঠলাে : আগে-আগে যেমন ভুল
করে আমাকেই কিনা তুমি চপলা বলে ডেকে উঠতে, না ?
অনাদির সমস্ত শরীর যেন পুষ্পিত অরণ্যের মতাে বিল
হয়ে উঠলাে।
তরলার মাঝে খুঁজতে গেলে সে-নাম, ধরতে
গেলাে সে-ছায়া।
তরলা আবার তরলাতে মিলিয়ে গেলো। যাবার সময়
লীলায়িত তর্জনী হেলিয়ে বললে,-এ-সব বাজে অভ্যেস তােমাকে
ছাড়তে হবে।
এক অভ্যেস থেকে আরেক অভ্যেস। অনাদি নিরালম্ব,
নিঃসম্বলের মতাে দাড়িয়ে রইলাে।
এতাে সহজে অনাদিকে ছেড়ে দিলেও আন্নাকালির বেলায়
তা’র রাশ সে আলগা করতে পারলো না।
একদিন বিকেল বেলা, দেখা গেলাে, ঘরের এক কোণে
জানােয়ার মাথায় একটা ধামা নিয়ে ভাঙা-ভাঙা পায়ে ফিরিয়ালার
নেপথ্য
অভিনয় করছে, আর চৌকাঠের পারে বসে হাতে একটা জামা
নিয়ে আন্নাকালি তাকে একটানা সাধ্য-সাধনা করে চলেছে :
এসাে, এসো জানােয়ার, কেমন এখন রাঙা জামা পরে কোলে
চড়ে’ তুমি হাওয়া খেতে যাবে। তােমাকে ইষ্টিশানে নিয়ে
যাবােখন, গাড়ি আসবে ধোঁয়া দিতে-দিতে, কতাে লােক নামবে
পুঁটলি আর প্যাট হাতে করে’,-চলল, দেখবে চলল, তোমার
মা এলাে কিনা জানােয়ার।
জানােনায়ারের তাতে জক্ষেপ নেই।
এমন সময়, বলা বহুলতরে হবে, মূর্তিমান অবশ্যম্ভাবীর মতো
তরলা দরজার গােড়ায় এসে দাড়ালাে।
এবার জক্ষেপ করলে না আন্নাকালি ।
সামনের দিকে ব্যাকুল দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আন্নাকালি
দ্রুত অনর্গলতায় বলে উঠলাে : শিগগির আয়, শিগগির চলে
আয়, জানােয়ার, ঐ তােকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে।
চোখের সুমুখে তরলকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে জাননায়ারের
খেলাধুলাে সব মাথায় রইলো। উঠি-পড়ি করে’ ছুটতে ছুটতে
আন্নাকালির কোলের আশ্রয়ে এসে সে রক্ষা পেলে। আন্নাকালির
আঁচলের স্কুপে মুখ লুকিয়ে স্বস্তিতে সে উঠলাে খিলখিল করে’
হেসে। আর আন্নাকালি তা’র করতলে পৃথিবীর সমস্ত কোমলতা
নিয়ে এসে তার সমস্ত গায়ে অকৃপণ হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাে।
নেপথ্য বললেও চলতাে, রাগে তবলার সমস্ত স্নায়ুশিরা তখন ছিড়ে পড়ছে। হাতে-পায়ে যেন আর কোনাে বশ নেই। কিন্তু সেই অবশ হাতে যে এতাে শক্তি ছিলাে তরলারো তা বিশ্বাস হতাে না। কোথা থেকে সে একেবারে একটা ঈগলের মতাে ঝাঁপিয়ে পড়লাে। আন্নাকালির বুকের থেকে ছেলেকে সে উপড়ে ছিনিয়ে নিয়ে এলাে, বললে, শীতের একটা ঝাপটাৰ মতাে বললে,—যথেষ্ট হয়েছে, আর আদিখ্যেতা করতে হবে না। আমার ছেলে ঝিয়ের কাছে মানুষ হবে এ আমি বরদাস্ত করতে পারবো না। কাচের বাসনের মতো আন্নাকালি মেঝের উপর ভেঙে খান- খান হয়ে গেলাে। আর জানােয়াব তাে জানোয়ার, নখে করে সে বাঘের হিংস্রতা নিয়ে এসেছে, দাতে নিয়ে এসেছে সে সাপের বিষ । নিজে না যতাে সে হয়রান হলো তার চেয়ে তরলকেই সে বেশি ক্লান্ত করে ফেলেছে। অমন করে হাত-পা ছেড়ে চুপ করে বসে থাকবার সময় অব যারই থাক, আন্নাকালির নেই । পীড়িত মুখে তাকেই আবার উঠতে হলাে দুই হাতে তাকেই আবার বাড়িয়ে দিতে হলাে বিশীর্ণ কাকুতি : আয়, আয় বাবা। আমার ওপর না করাে, ওর ওপর দয়া করাে ছােট বৌ, কাদতে কাদতে ও যে প্রায় নীল হয়ে গেলো ।
নেপথ্য
তরল তাকে যেন প্রায় একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলে
এমনি দাপটে কথা কইলে : যাও, যাও, মিথ্যে আর তােমার
সােহাগ করতে হবে না, ছেলে নীল হ’লল কি কালাে হলো
এ-বাড়িতে দাড়িয়ে তােমাকে তা দেখতে হবে না।
—তা, ওকে দাও আমার কোলে, আমি যাচ্ছি, ওকে বাইরে
থেকে বেড়িয়ে নিয়ে আসি একটু। তারপর আন্নাকালির শুকনাে,
কুঁচকোনো চোখ দুটো চোখের জলে চকচক করে উঠলো :
তারপর সন্ধে হতেই খেয়ে-দেয়ে যখন ও ঘুমিয়ে পড়বে, তখন
তােমার কোলে ওকে শুইয়ে দিয়ে আমি চলে যাবো না-হয় ।
এখন যে ও বড় কাদছে !
-থাক্। তরলা মুখ বেঁকিয়ে বললে,—যথেষ্ট আদর দেখিয়েছ ।
মা’র চেয়ে যে ভালােবাসে তাকে বলে ডান ।
এতাে দুঃখেও আন্নাকালিকে বুঝি একবার হাসতে হলাে।
বললে,—যদি বলাে, আমি তার চেয়েও খারাপ, ছছাটবে। আমি
একটা ঝি।
—তবে ঝি-র মতােই ব্যবহার করতে শেখাে ! জলের মধ্যে
বঁড়শিতে-বেঁধা মাছের মতো ছেলেকে তরল সাপটে ধরেছে।
—তাই করবো, কিন্তু ওর কান্না যে শােনা যাচ্ছে না।
-শােনা যাচ্ছে না তো কে শুনতে বলছে ? সােজা রাস্তার
গিয়ে দাড়ালেই তাে পারাে।
নেপথ্য
-তা পারি, কিন্তু আগে একটু ওকে থামতে দাও।
-কেন থামতে যাবে? তরলা রুখে উঠলাে; ওর নিজের
বাড়িতে যতো খুসি ও কাদবে, তােমার তাতে কী? এমন কোন্
বাড়িটা তুমি দেখাতে পারে, যেখানে ছেলে-পিলে কাদে না
একটুও? বােবার মতাে মুখ বুজে বসে থাকে ?
—তবু, কী রকম করছে দেখ, আন্নাকালি কাতর গলায়
বললে,-আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ওকে একটু খানি
আমাকে ঠাণ্ডা করতে দাও, ছােট বো, আমার কোলে ও মানুষ
হচ্ছিলাে।
তরলা ঝামটা দিয়ে উঠলাে : তােমাকে দিয়েই যদি ছেলে
মানুষ করা চলতাে তাে আমাকে আর সাধ করে ডেকে আনা
হয়েছিলাে কেন?
এতােটা যেন আন্নাকালির সহ হলো না। শূন্য হাতে চোখের
জল মুছতে-মুছতে সে সরে পড়লো।
সন্ধেবেলা আপিস থেকে অনাদি একটু ব্যস্ত হয়েই বাড়ি
ফিরলাে। ছেলের কান্নায় দেখতে-দেখতে বাড়ির সমস্ত চেহারা
গেছে বদলে। সেই কান্নায় তরলার জাজ্বল্যমান উপস্থিতিটা পর্যন্ত
অস্পষ্ট হয়ে এলাে। ছেলের কান্নার মধ্য দিয়ে আর কিছু সে
দেখতে পেলো না।
তাই তার গলায় এলে হঠাৎ অনাবশ্যক ধার ; বললে,
নেপথ্য
এতাে দিনকার পুরােনাে ঝি, আন্নাকালিকে তুমি তাড়িয়ে
দিলে ?
—তাড়িয়ে দিলাম ? তরলা তখন একহাতে জোর করে
খােকার পা দুমড়ে ধরে আরেক হাতে মােজা পরাবার চেষ্টা
করছিলো, তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলাে : তােমাকে কে বললো
শুনি?
—কে আবার বলবে? এক নিমেষেই অনাদি তার গলা
নামাতে পারলাে না। আমি যে নিজের চোখে দেখে এলাম।
-কী দেখে এলে ?
ইষ্টিশনের পােলের ধারে একা বসে’ সে কাদছে, সঙ্গে
তা’র আজ খােকা নেই, নবকুমার নেই।
—তুমি তখুনি গদোগদো হয়ে রুমাল দিয়ে তার চোখের
জল মুছিয়ে দিতে গেলে বুঝি ? তরল দাউদাউ করে উঠলাে :
আর মিথ্যুক মাগী বুঝি অমনি আমার নামে তােমার কাছে
লাগালাে, বললে, আমি তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি ?
—সে আমাকে কিছুই বলতে আসেনি, অনাদির গলা প্রচ্ছন্ন
বিরক্তিতে গম্ভীর হয়ে এলাে : তাকে একা বসে কাদতে দেখে
ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। কী যে ভীষণ ভয় পেলাম, তরলা, কী
বলবাে। দুর থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে তাকে জিগ্গেস
করলুম : খােকা-কুমার কোথায় ?
নেপথ্য
—সে কী বললে ?
বললে, তুমি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে দাও নি ।
—আর সেইটেই তাকে তাড়িয়ে দেয়া হলাে বলছ ? তরলার
জিভটা ঘৃণায় সূক্ষ্ম হয়ে এলাে : তুমি কি আপিস করাে, না, ঘাস
খাও ?
-হ্যা, সেইটেই তাকে তাড়িয়ে দেয়া হলাে, তরল। অনাদি
ধূসর গলায় বললে,-সঙ্গে তার থােকা নেই, তার মানে
এ-বাড়িতে আন্নাকালিও আৰু নেই।
নেই তো নেই, বাঁচা গেছে। তরল তখন খােকার গলায়
জামার বােতাম আঁটছে না ফাস বাধছে বােঝা দুষ্কর : ছেলে যেন
ওরই আর-কি। ওরই যেন মৌরসি স্বত্ব।
বেশ তো, ও থাকতােই না ওর কাছে, অনাদি ছেলেটার
এ-দুর্গতি আর চোখ মেলে দেখতে পারছিলাে না : ওকে
ছাড়াও তাে তোমার কতাে কাজ, কতাে জায়গা ছিলো,
—তােমাকে একসােবার বলেছি না, তরলা একেবারে একটা
বােমার মতে ফেটে পড়লো : এ-বাড়ির সব কিছু এখন আমার,
আমার ছেলে, আমার স্বামী, আমার ঝি।
কিন্তু আর যাই হােক, অনাদি আমতা-আমতা করে
বললে,-ঝি-টির ওপর তুমি ভারি অবিচার করেছ।
38
নেপথ্য
শেষ পর্যন্ত তােমাকে দিয়ে যে তাকে তাড়িয়ে দেয়া
হয় নি সেইটেই যেন সে ভাগ্য বলে মনে করে।
অনাদি এক মুহূর্ত গাম্ভীর্যে অটল হয়ে দাড়ালো, ছেলের
দিকে লক্ষ্য করে বললে,-ও হ’বার অনেক আগে থেকেই এ
সংসারে সে আছে, যখন আমরা প্রথম এখানে আসি, সে আজ
কতােদিনের কথা। ওর মা ওকে কতাে সমিহ করে চলতাে।
ওকে কঠিন কথা কিছু না বললেই পারতে।
—বলেছি, বেশ করেছি। তরলা গর্জে উঠলাে : রাজ্যে যেন
আর ঝি নেই, অবাধ্য, দুর্দান্ত কোথাকার! ওর মা কী করতে।
-করতাে সে-কথা আমাকে বলতে এসাে না। আমিই ওর মা।
এর পর অনাদি আর কী বলতে পারে ?
২
apa
আট
অনাদিব কিছু বলার নেই বটে, আরেক জনের ছিলাে।
তরলাই এখন মা, অথচ এই মা’র কোলে এসে নবকুমার
এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে না, দিনরাত কান্নার তা’র এলােমেলাে
তুফান চলেছে। ওকে যেন মানা করে দেয়া হয়েছে তরলার
মুখের দিকে চেয়ে হাসতে, তরলার বুকে শুয়ে ঘুমােতে, তরলার
নাক-মুখ-চোখ নিয়ে খেলা করতে।
অথচ বলল, নিজের পেটে ধরলেই বা তরলা এর চেয়ে আর
কী বেশি কবতে পারতাে ? তরলার শরীরে কোথাও এতােটুকু
একটা ক্লান্তির বেখা নেই, রাত-দিন এই ছেলে, তার নবকুমারের
পরিচর্যায় সে প্রচুর হয়ে উঠেছে। কড়ি-কাঠে রিঙ বেঁধে ঝুলিয়ে
দিয়েছে দোলনা, নেটের রঙিন মশারির ভেতর ঝুলিয়ে দিয়েছে
বল, কতো খাবার, কতাে খেলনা, ময়রা আর মনোহারির দোকান
সাজিয়ে দিয়েছে দু’পাশে-তবু ছেলের মন ওঠে না। ঐ যেটুকু
সময় সে ঘুমােয়, আর সময় নেই, অসময় নেই, সারাক্ষণই তার
চীৎকার।
নেপথ্য সেই চীৎকারে বাড়িটার চেহারা কেমন বিশীর্ণ বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। যেন বসতিহীন গভীর কোন জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা, পােড়ো বাড়ি। সব সময়েই গা-টা কেমন ছমছম করে, চারপাশটা কেমন অনাবশ্যক ফাকা, ছাড়া-ছাড়া লাগে । হাত বাড়িয়ে দেয়ালগুলােকে যেন আর হাতের কাছে পাওয়া যায় না, হাত বাড়াতে গেলেই কেমন তারা হেঁটে-হেঁটে সরে দাড়ায়। যেন সেই আগেকার আঁট, ঠাসা, ঘন আবহাওয়াটা আর নেই, এই চীৎকারে শতছিদ্র হয়ে গেছে। সবখানেই কেমন একটা যেন বি বিশৃঙ্খলা, রাত না হতেই অন্ধকারের ছায়া পড়েছে এমনি একটা অর্থহীন আতঙ্ক। দিনের বেলায়, নানা কাজের অবকাশে তরল এই কান্নার তবু একটা অর্থ খুঁজে পায়, কিন্তু মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে থেকে নব- কুমার যখন একেকটা হঠাৎ উন্মাদ আৰ্তনাদ করে ওঠে, তখন সে-কান্নায় তরলার আর মায়া বা রাগ হয় না, নিরাবরণ, নিরবয়ব একটা ভয় করতে থাকে। এ যেন নবকুমারের গলা নয়, কোনাে নিদ্রাহীন নিশাচরীর গলা! তাই এটা একটা শশাকের কান্না নয়, দুঃস্বপ্নের কান্না! কিন্তু ভয় করলে তরলার চলবে কেন? সে জিততে এসেছে, ভয় পেয়ে অবলীলায় তার ভাগ সে ছেড়ে দিতে আসে নি। তাই মশারি তুলে বাইরে তাকে চলে আসতে হলাে। ১৭
নেপথ্য
বালিসের তলা হাতড়ে কুড়িয়ে নিতে হলে দেয়াশলাই। টোপের
নিচে পাথরের বাটিতে পান্তুয়া একটা সে লুকিয়ে রেখেছে, এটা
এখন নবকুমারের মুখে পুরতে হবে।
আশ্চৰ্য্য, মশারির থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে-আসতে
তরলা ভাবলে, এতাে কান্নাতেও, অনাদির এমন দৃঢ়কায় ঘুম,
এক ইঞ্চিও কোথাও টললাে না, শুধু তাকেই যেন কে ঠেলে
জাগিয়ে দিয়েছে।
তরল দু আঙুলে স্পষ্ট একটা কাঠি ধরালে। আর স্পষ্ট কে
বেন তার হাতের ওপর নুয়ে পড়ে ফু দিয়ে কাঠিটা নিবিয়ে
দিলো।
অবশ হাতে তরল। আবার চেষ্টা করলো। চকিত শিখায়
কাঠিটা উঠলো ধরে’, আর তক্ষুনি, তরল। সেই আলােতে স্পষ্ট
শুনতে পেলাে, ছােট-ছােট স্ফুলিঙ্গে কে যেন হঠাৎ খিলখিল করে’
হেসে উঠেছে ।
দেয়াশলাই ধরললা বটে, কিন্তু হাতের কাছে লণ্ঠনটা কিছুতেই
খুঁজে পাওয়া গেলাে না। সিসের মতাে ভারি একটা অন্ধকার,
বাড়ি-চাপা-পড়া একটা অতিকায় অসহায়তার মতাে। তার ভেতর
থেকে আবার নবকুমারের সেই কান্না।
তরল অনাদিকে হঠাৎ ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে দিলে : তুমি
শুনতে পাচ্ছ না, কুমার কী রকম কাদছে ।
নেপথ্য
—কঁদছে ? কে ? অনাদি ধড়মড় করে উঠে বসলাে।
-কে আবার কবে ? কুমার। উঠে আলােটা একবার
-ও, কুমার ? যেন গভীর হতাশায় অনাদি বালিসের উপর
ঢলে পড়লাে : ঠাট করে তখন আন্নাকে না তাড়ালেই হতো ।
-আর, যাদের বাড়ি আন্না নেই, তাদের ছেলে কি আর
কোনােকালে বড়াে হয় ?
—যাদের আন্না নেই, তাদের আবার আর কেউ থাকে
হয়তো।
-এতােই যখন মায়া, কথাটা তরলা অন্ধকারে আর তলিয়ে
দেখতে চাইলাে না : তখন আন্নাকে বেখে আমাকে তাড়িয়ে
দিলেই পারতে। কোনাে কথা নেই, অনাদি কখন নিটোল
নিশ্চিন্ততায় ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিন্তু ঘুমােনাে তরলার অদৃষ্টে লেখা নেই, সে মা, তার
ছেলেকে এখন শান্ত করতে হবে। কিসের ভয়, দৃঢ় হাতে তরল
লণ্ঠন জ্বালালাে। খাবার যদি নবকুমার মুখে না-ই তােল, কোনো
উপায় নেই, কঁাধে করে ঘরময় তাকে পাইচারি করে বেড়াতে
নবকুমারকে শান্ত করবার জন্যে ভয়েভয়ে ছােট-ছােট পায়ে
তরল ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগলো। সঙ্গে-সঙ্গে আর যেন কে
নেপথ্য তার পায়ে-পায়ে নিঃশব্দে পদচারণা করছে। তরলা যেমনি তাড়াতাড়ি মােড় ঘুরে যাচ্ছে, সেও অমনি পেছনে চলে যাচ্ছে পালিয়ে । যদি তুমি দাঁড়িয়ে থাকে, সেও অমনি দাড়িয়ে পড়লাে। তরলা যেন নবকুমারকে নয়, কার যেন মৃত, গলিত একটা হৃৎপিণ্ডের বােঝা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তা’র একবার ইচ্ছে হলাে এই মাংসপিণ্ডটা জানলার বাইরে সে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। নিশ্চিন্ত, নির্মল, পরিচ্ছন্নতায় আবার সে তার স্বামীর পাশে শুয়ে ঘুম যায়, সেই প্রসারিত, উচ্ছ্বসিত তৃপ্তিতে। সমুদ্রের কল্লোলের মতাে সে-ঘুম, কতাে জীবন সে যেন ঘুমুতে পারে নি। কী হবে এই মরুভূমিতে বর্ষণ নিয়ে এসে, তরলা এবার নিজে অবগাহন করুক, তা’র ঘুমে, তা’র অবসাদে, তার অন্ধকারে। মশারিটা যেন কে আস্তে-আস্তে তুলতে লাগলাে। -তুমি দেখছ না, দেখতে পাচ্ছ না তুমি ? তরল। হঠাৎ দিগ্বিদিক হারিয়ে চীৎকার করে উঠলো : ওঠো, ওঠো শিগগির। -কেন, কী হলাে? ঘরে আগুন লাগলো না কেউ আত্ম- হত্যা করলাে অনাদি কিছু বুঝতে না পেরে বােবা গলায় আরেকটা চীৎকার করলে। মশারি তুলে তােমার বিছানায় কে ঢুকে পড়লাে। তরলা কাঁপছে, কথা বলতে পারছে না। :
নেপথ্য
-আমার বিছানায় ? অনাদির যেন এতােক্ষণে হুস হলাে,
হাতড়ে হাতড়ে বিছানাটা একবার সে ভালাে করে অনুভব
করলে : কৈ, কোথায় ?
তরল নিজেই এবার পর্যবেক্ষণ করবার জন্যে খাটের কাছে
এগিয়ে এলাে : আমি তখন দেখলুম যে স্পষ্ট করে,—কে তােমার
মশারি তুলে গুটি-গুটি ঢুকে পড়ছে।
ভয়ে তরলা শুকিয়ে একেবারে এতােটুকু হয়ে গেছে।
অনাদি তাকে ব্যস্ত হয়ে সামনে টেনে আনলাে। বললে,
কা’কে দেখলে বলাে তাে? চোর-ডাকাতের মতো মনে হলাে ?
স্বামীর স্পর্শের উত্তপ্ত পরিমণ্ডলে চলে এসে তরলার এতাে-
ক্ষণে সাহস হলাে বােধ হয়। তাই সে দস্তুর মতাে রাগ করতে
পারলাে, বললে,—ঘরের দরজাটা যে বন্ধ আছে, দেখতে পাচ্ছ
? আর চোর-ডাকাত এসে সুনিদ্রা দেবার জন্যে তােমার
বিছানায় গিয়ে ঠাই নেবে মনে করাে নাকি ?
—তবে কে? অনাদি যেন কিছু বুঝতে পারছে না। এমনি
মূঢ়ের মতাে তাকিয়ে রইলাে।
—আমার মরণ ! বিছানায় যেতে-যেতে তরলা স্বামীর গায়ে
একটা ধাক্কা দিলে : এবার সরে দিকি, আমাকে ঘুমুতে দাও।
নবকুমার এবার যতােই কেননা কঁদুক, তরলা আর কিছুতেই
বিছানা ছেড়ে উঠে যাচ্ছে না।
:
১০১
নেপথ্য
কঁদতে-কাদতে নবকুমারের অসুখ করে গেলাে। দু চোখে
তরলা আর কোনাে পথ পেলাে না। ব্যস্ত হয়ে বললে,—শিগগির
ডাক্তার ডাকো।
এই সামান্য একটু গা-গরম হয়েছে কি না, অনাদি আদপেই
কথাটা গায়ে মাখলাে না: ডাক্তার দিয়ে কী হবে?
–না, কী যেন ওর হয়েছে, ও ভালাে করে চাইছে না,
ভালাে করে কাদছে না পর্যন্ত, তরলা কাতরতায় গলে পড়লাে :
শিগগির ডাক্তার ডেকে আনাে বলছি।
-ভালাে করে কাদছে না তাে ভালো কথা। কান্না ওর
থামুক তাই তাে আমরা চাইছিলাম এতো দিন।
-তার মানে ? আহত সাপের মতাে তরলা হঠাৎ ফণা তুললে।
-মানে, এই বলছিলাম কিনা, অনাদি শুকনাে একটা টোক
গিললাে ; কচি ছেলে, এমনিতেই সেরে যাবে, ডাক্তারের কী
দরকার!
দরকার না-দরকার তুমি তার বুঝবে কী? তরল ঝামটা
দিয়ে উঠলো : ছেলের দরকার না হয়, আমার দরকার, ডাক্তার
তােমাকে আনতেই হবে।
অগত্যা ডাক্তার এসে ব্যবস্থা করে গেলাে।
কিন্তু বলতে কি, ছেলের গলায় সেই কান্না আর আসে না।
সেই তার পুরােনাে অভিযােগ, সেই তার তেজী, দুর্দান্ত আর্তনাদ।
নেপথ্য
এখন যদিও সে মাঝে-মাঝে কাদে, দুপুরের বােদে ছাদেব
কার্ণিশে বসে ।" . ত একটা কাকের আওয়াজ।
দিনের পর দিন !' রের আনাগােনা, ব্যবস্থার পর ব্যবস্থা,
এটা নয় তো ওটা, • .লের গলায় কণ্ঠস্ববের সেই উত্তাল উগ্রতা
নেই। থেকে-থেকে ক্ষীণ একটু গুঙিয়ে উঠছে, পােড়
বাড়িব শূন্যতায় পা হওয়ার অন্ধ কাবানিব মতো। যেন
কতাে ত’র কাঁদবার ?”, কিন্তু কিছুই সে প্রকাশ করতে পারছে
না। চাপা একটা কান্ন তাকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে, সেই চাপা
কান্নায় তার গায়ে এসে? ** ব, এই বীভৎসতা। চিকিৎসার
কটি হচ্ছে এ-কথা তুমি বহু'। . ও বলতে পারাে না, এটাকে
সেবা অসম্ভব অপচয় না বলে
। অভাব বললে আকাশকে
তবে খানিকটা শুন্য বলে’ ভাণ, ' । তবু, এতােতেও, ছেলের
গায়ে মাসের আব আভাস । •, স্ববে নেই কান্নাব সেই
শিহৰণ। না কাদতে পেয়ে গা গণহড পড়ছে তার বেরিয়ে,
চামড় আসছে পাৎলা হয়েদিন ? নি। দেখতে হচ্ছে একটা
সদ্যস্ফুটিত পাখিব ছানাব মতে বী •। তাকে নিয়ে হাঁটতে-
হাঁটতে তরলা শ্রান্তিতে কালি হয়ে গেলে • কাঁদে, না কঁাদুক,
একটুখানি হাসতে বা তা’র বাধা কী। কতো আদর, কতো
সােহাগ, তবু তার মুখে হাসিব একটি রেখা ফোটানাে গেলো না।
তাকে যেন মাথার দিব্যি দিয়ে হাসতে কে এর ব’ দিয়েছে।
নেপথ্য
কলকাতা থেকে নামজাদা ডাক্তার না নিয়ে তবলা
ছাড়বে না।
-ওর জন্যে দেখছি আমার প্রায় ফ; বার জোগাড়।
অনাদির মুখ বিরক্তিতে বােধ করি রুক্ষ হয়ে উঠল।
-ওব জন্যে মানে? আমি বলছি । আমার জন্যে
ডাক্তাব নিয়ে আসবে ।
—তােমার আবাব কী হলাে ?
—আমি আর আমাব ছেলে আলাদা কি ?
অনাদি হতাশ মুখে বললে,-তােম, ৪ এই বিলাসিতাব ভাব
আমি আর বইতে পারি না, তবলা ।
-বিলাসিতা ? আমার ছেলেকে মমি অচিকিৎসায় মরতে
দেবাে না এটাকে তুমি আমার গা তা বলতে চাও? তবলা
একটানে তার হাতে চুড়ি খুলে ফেললো : নাও, না ও
এগুলাে, এদিয়ে আমার দে ৭ ন্যে তুমি ডাক্তার নিয়ে এসাে।
করে দাড়িয়ে আছে, কী, বিলাসিতার ভার তো আমিই
নামিয়ে ফেলছি একে।
কলকাতা থেকেও ভক্তার এসে গেলাে, কিন্তু কিছুরই কোনাে
সুরাহা হলাে ন' ।
অনাদি বলল,-~~তুমি এমনি খালি হাত-পায়ে থেকো না,
তরলা, গয়ন? " গায়ে দাও।
১০
নেপথ্য
-খালি হাত-পা মানে? তরল মিনতিতে বিশাল, অসহায়
দু’টি চোখ তুলে স্বামীর মুখের দিকে তাকালাে : অ'মার দু’হাত
ভরা আমার ছেলে, তুমি দেখতে পাও না ?
-কিন্তু তােমার দিকে যে আর তাকাতে পাচ্ছি না, তরল।
–থাক, দয়া করে এখন কেবল ছেলের দিকে তাকাও।
স্বামীর হাতটা দূরে ঠেলে দিয়ে তরল বললে,-রাখাে।
রাখে। ওগুলাে সরিয়ে । কখন কী কাজে লাগে কিছুই বলা যায় না।
এইখানটাতেই অনাদির মন উঠছিলাে না যে জমকালো
গয়নাগুলি খুলে ফেলে তরলা কেমন আলাদা হয়ে উঠেছে। তার
সেই উচ্ছল ফেনিলতার আর ঝাঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, কেমন
স্তিমিত হয়ে এসেছে মেঘমলিন শীতল একটি সন্ধ্যার মতাে। পুঞ্জিত
শরীরে গম্ভীর একটি ঔদাস্ত। প্রায় যেন চপলার মতাে দেখতে।
তখনকার দিনে চপলার এতো সৌভাগ্য ছিলাে না, গায়ে তার
ছিলাে পবিত্র একটি দরিদ্রতা, নিৰ্ম্মল একটি শুচিস্মিতি—এখনকার
তরলা যেন তারই প্রতিবেশিনী, তারই প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে।
গায়ে আর তার সেই দ্যুতিমান অহঙ্কার নেই, লুটিয়ে পড়েছে
সন্তান-মেহের স্নিগ্ধ একটি জ্যোৎস্না, শীতল একটি প্রশান্তি। তাই
তাে অনাদি তার দিকে চোখ মেলে তাকাতে পারছে না, আবার
কী রকম তার ভুল হয়ে যাচ্ছে।
১০৫
নেপথ্য
কিন্তু সেদিন তরলার কোনাে ভুল করবার কারণ ছিলাে না।
ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘরে বারান্দায় অনবরত পাইচারি
করছে, তরলার এক সময় মনে হলাে কে যেন পেছন থেকে এসে
কাধের উপর থেকে নবকুমারকে ছিনিয়ে নেবার জন্যে তার হাত
ধরে নির্মম একটা টান দিলাে।
—কে ? তরলার সমস্ত শরীর ঠাণ্ডা একটা ভয়ে অসহ্য কাটা
দিয়ে উঠলো।
প্রশ্নটা জিগেস করে তার উত্তর পাবার জন্যে সেখানে সে
এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারলাে না, এত দ্রুত পায়ে ছুটে
এলো ঘরের মধ্যে, আলোর আশ্রয়ে। দুই অজস্র হাতে নবকুমারকে
অনুভব করতে লাগলো, ঝরিয়ে দিলাে তার অকৃপণ আশীৰ্বাদ।
আলাের কাছে তার মুখ নিয়ে এসে ভীত, বিহ্বল গলায় সে
আবার জিগ্গেস করলে : কে রে, কে রে, নবকুমার ?
নবকুমারের মুখে সে-উত্তর স্পষ্ট লেখা আছে।
ভয়ে তরল। একটা স্তুপীভূত পাথর হয়ে গেলাে বুঝি। এতে
দিনে, এ-প্রশ্ন জিগগেস করবার পর, নবকুমার আজ হেসে
উঠেছে। মৃত, বিবর্ণ, নিরবয়ব সে-হাসি। তা’র নিতল নিঃশব্দতায়
ভয়ঙ্কর তা’র মুখরতা।
অনাদিকে সে তারপর সরাসরি গিয়ে বললে,আমরা
এ-বাড়ি ছেড়ে পালাই এসাে।
নেপথ্য
প্রশ্নটার হাওয়া যে কোনদিকে বইছে অনাদি কিছু বুঝতে
পারলাে না : কেন?
—এ-বাড়ি থাকলে ছেলে আমার ভালো হবে না।
—তােমার আবদারের যে আর সীমা নেই দেখছি। অনাদি
হাল ছেড়ে দিলাে : চাকরি-বাকরি ফেলে ছেলে নিয়ে আমি এখন
চেঞ্জে যাই।
—না, চেঞ্জে কেন ? এইখানেই, আর কোনো একটা
বাড়িতে ।
-এইখানেই ? অনাদি হেসে উঠবে কিনা বুঝতে পারলো না :
কেন, এ-বাড়িটা কী দোষ করলাে ? এমন খটখটে পাকা বাড়ি,
চারিদিকে এমন খােলামেলা
—তা হােক, তরলা ভীত, আর্ত মুখে বললে,—এ-বাড়িটা
ভালাে নয়, এ-বাড়িতে সব সময় যেন কে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
—তা তাে সব সময়েই আমি দেখতে পাচ্ছি।
—দেখতে পাচ্ছ ? তরল চীৎকার করে উঠলাে : কাকে ?
অনাদি উঠলাে হেসে : কা’কে আবার ! তােমাকে। তুমিই
তাে সব সময় তােমার ছেলে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ ।
-না, আমি নয়। তরল নয়, ঘরের দেয়াল যেন কথা
কইলাে; আর কেউ। সত্যিকারের যা’র এই ছেলে সত্যিকারের
ৰা’র এই ঘর-দোর।
১০৭
নেপথ্য
-তুমি কী বলছ যা-তা? অনাদি ব্যাকুল হাতে তরলাকে ধরে
ফেললল : রাত-দিন না ঘুমিয়ে তুমি দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছ।
--আমার সমস্ত জীবনটাই দুঃস্বপ্ন। আমার এখান থেকে
কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
-কেন, তুমি যাবে কেন ? তােমার এ বাড়ি-ঘর, তােমার
এ-ছেলে, তােমার এ-সংসারের প্রতিটি ধূলিকণা। অনাদি তাকে
উৎসাহিত করতে চেষ্টা করলাে : তুমি কেন হার মানবে, দাবী
ছাড়বে তােমার অখণ্ড পৃথিবীর? কী না কী অন্ধকারে তুমি
দেখ, সে তােমার শুধু আমাকে সন্দেহ, আমাকে অবিশ্বাস।
তরলাকে অনাদি আরাে কাছে টেনে আনলাে : তুমি কি এতো
দিনেও কিছু বুঝতে পারলে না, তবলা, আমার এই অফুরন্ত
ভালােবাসা ? সে তাে কবে ধূলো হয়ে হাওয়ায় উড়ে গেছে ।
তাকে তাে কবে আমি তােমার মাঝে বিসর্জন দিয়েছি। আমাকে
তুমি এখনাে কেবল সন্দেহ করছ, তাই তােমার প্রতিপদে ভয়,
প্রতি বিশ্বাসে যন্ত্রণা ! আর তােমাকে এমন ভালােবাসতে দিলে
বলেই আমাকেও তুমি এ-যন্ত্রণার ভাগ দিচ্ছ।
—কিন্তু দেখ, দেখ, তরলা সচকিত হয়ে উঠলাে : নবকুমার
এমন হেসে উঠছে কেন?
—ভালােই তাে, ওর হাসিই তাে তুমি চেয়েছিলে। শরীর
এখন ওর বেশ ভালাে আছে বলেই হাসছে।
SOG
নেপথ্য —এ তােমার শরীর ভালাে থাকবার চেহারা ? দেখ দিকি ওর এই হাসিটা? আমাদের মুখের দিকে চেয়ে ও একটা তীক্ষ্ণ ঠাট্টা করছে না? —তােমাকে নিয়ে আর আমি পারলাম না, তবলা। অনাদি উঠে পড়লো : বেশ, ওই তাে তােমার ভয়, বলাে তাে আমি ওকে আজই হাসপাতালে রেখে দিয়ে আসি। তুমি একটু খােলা হাত- পায়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচো ক’দিন। -কী বলো তুমি ! পাগল ! অসহায়, নিষ্প্রভ একটু হেসে তরলা নবকুমারকে বুকের মধ্যে নিপীড়ন করে’ ধরলাে। তরল। তারপর আঁট করে ঘরের খিল লাগালে, আলােটা আজ আর নিবতে দিলাে না। তাইতেও তার স্বস্তি নেই। জানলার গরাদের ওপারে কে যেন এসে দাড়িয়েছে, অলক্ষ্যে বাড়িয়ে দিয়েছে তার হাতের শীর্ণতা। কোথায় মানুষের কণ্ঠে হাওয়া উঠেছে কাতরােক্তি করে’ কখনাে নয়, কখনাে তােমার নয়, এ-ছেলে আমার, আমার এ-ছেলে। তরলা নবকুমারকে বুকের পাঁজরের উপর পিষে ধরলো। সে ছাড়বে না। তার দাবি, হারবে না তার অতিকায় আত্মদৈত্যে। কাছে। হাওয়ায় কথা অমন একটা ভেসে এলেই তাে আর হলো না।
নেপথ্য
-কখনাে না, নবকুমারের কপালে তরলা একটা ছােট্ট
চুমু খেলাে : আমার এ-ছেলে।
তক্ষুনি সে আলােয় গিয়ে দাঁড়ালাে। হঁা, তক্ষুনি আবার
নবকুমার বিশীর্ণ মুখে বীভৎস হেসে উঠেছে ।
'_''
DIpar R
-কী হে, তােমার যে আর দেখা পাওয়া যায় না! এক
সন্ধ্যায় বন্ধুদের শিরােভূষণ হ'য়ে এসে অমৃতই প্রথম হক
পাড়লাে।
-এসো, এসো, অনাদি তাদের বাইরের ঘরে নিয়ে এলো :
ক'দিন থেকে ছেলেটার ভারি অসুখ।
তার জন্যে বাড়ির বার হওয়া যায় না? শ্ৰীশ একটা
চিমটি কাটলাে : আর কিছু আকর্ষণ আছে বলল ।
—আকর্ষণ আছে, অনাদি শ্রান্ত মুখে একটু হাসলাে : কিন্তু
তােমাদের মনের মতাে করে হয়তাে বলতে পারবাে না।
—তােমার মনের মতাে করে বলতে পারলেই যথেষ্ট। অমৃত
বন্ধুদের দিকে চেয়ে একবার চোখ টিপলাে : নইলে আমাদের
ঘরেও ছেলেপিলের অসুখ হয় ।
১১১
নেপথ্য
-অসুখটা যে ক'দিন থেকে ভারি বাড়াবাড়ি যাচ্ছে।
-কী যে বাড়াবাড়ি যাচ্ছে তা আর আমাদের বুঝিয়ে বলতে
হবে না। সন্তোষের কথায় সবাই একবাক্যে অনাবৃত হেসে
উঠলাে।
অনাদির ভালো লাগছিলাে না অন্তত আজকের আলাপটা
এরকম একটা ধারা নের, কিন্তু উপায় নেই, মফস্বলের পুরুষের
আড্ডায় সাধারণ যা নিয়ম, একে-অন্যের স্ত্রী সম্বন্ধেই আলােচনা
করতে হবে।
তাকে যেন সম্বর্ধনা করছে এমনি উদার ভঙ্গিতে অমৃত তার
পিঠ ঠুকে দিলো : তা হলে স্ত্রীর সঙ্গে প্রেমে পড়ে গিয়েছে
বলাে।
—পড়বে না? শ্ৰীশ বললে,-এ যে দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী।
হারানাে রতন।
অনাদি অমৃতকে লক্ষ্য করলে : তার বদলে তােমরা ভবে কী
চেয়েছিলে আমার কাছে ?
—বিয়ে করে তাই বলে এ-রকম কবি হয়ে উঠবে আশা
করি নি।
-কী আশা করেছিলে ?
-ভেবেছিলুম ভদ্রলােকই থাকবে বরাবর। খাবে-দাবে,
আপিস করবে-
১১২
নেপথ্য
-আর সন্ধ্যের সময় তাস পিটবে আমাদের সঙ্গে। সন্তোষ
আকস্মিক উত্তেজিত হয়ে বললে।
-যদি বলো তাে, তাস পেড়ে আনতে পারি—আমার দৈনিক
রুটিন থেকে যেটুকু বাদ পড়েছিলাে মনে করে। অনাদি হাসবার
একটা অমানুষিক চেষ্টা করলাে; নইলে, তা ছাড়া আর কী
করছিলুম বলাে?
—স্ত্রীর প্রেমে হাবু-ডুবু খাচ্ছিলে। তাস খেলবার জন্যে
গােল হয়ে বসতে-বসতে শ্ৰীশ আর সন্তোষ একসঙ্গে বলে
উঠলাে।
শষতো দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। অমৃত একটা কুটিল
ইঙ্গিত করলাে।
অনাদির সমস্ত কথায় শান্ত একটি ব্যথা যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে
উঠলাে : ভালােবাসতে পারি আমরা অনেক স্ত্রীলােককে, কিন্তু
স্ত্রী বলতে আমাদের সেই একজন, আমাদের যিনি প্রথম।
যতােটাই তুমি বিয়ে করে না কেন, সেই প্রথমার মতাে কেউ
নয়। আর সব বাপি, মাত্র একটা অভ্যেস। শুধু শরীর ও
মনের নিয়ম বাঁচিয়ে চলা।
হঠাৎ, অনাদির মুখে কথাটা শেষ হতে-না-হতেই, কোথা
থেকে একটা বিজপের তীক্ষ্ণ অট্টহাসি দেয়ালে দেয়ালে হা-হা
করে উঠলাে। অট্টহাসি, কিন্তু শােনালো একটা আর্তকণ্ঠের
১১৬
নেপথ্য
কঠিন চীৎকারের মতাে। সবাই ক্ষণকালের জন্যে স্তব্ধ, সন্ত্রস্ত
হয়ে উঠলো। চীৎকারটা যেন বাড়ির ভিতর থেকে গড়িয়ে-
গড়িয়ে এ-ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই যে-যার পায়ে খাড়া
হয়ে দাড়ালাে।
আগাগােড়া ভীষণ অন্ধকার। সন্ধ্যার এ-সময়টায় এতাে
অন্ধকার হ’বার যেন কথা নয়। সেই অন্ধকার যেন কার স্কুল,
দুর্ভেদ্য একটা উপস্থিতির মতো। সবল দুই হাতে সেটাকে
ঠেলে তবে অনাদিকে ঘরের চৌকাঠের কাছে এসে পৌছুতে
হলাে।
অবশ, নিৰ্বাপিত গলায় ডাকলে : তরলা।
কোনাে সাড়া নেই, নিরুত্তর, নিশ্চেতন অন্ধকার। থােকা,
নবকুমারের গলায় পর্যন্ত অক্ষুট একটা শব্দ শােনা গেলাে না।
ঘরের স্পষ্ট কিছু হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, অন্ধকারের ভারে
ঘরের বাতিটাও পর্যন্ত নিবে গেছে। দেয়াশলাইয়ের জন্যে
অনাদি পকেট হাতড়ালে-দেয়াশলাইটা বাইরের ঘরে সে ফেলে
এসেছে। তার জন্যে অন্ধের মতাে দেয়ালে-চৌকাঠে ঠোকর
খেতে-খেতে খলিত পায়ে বাইরের ঘরের দিকে সে রওনা হলাে।
আর দেয়াশলাই নিয়ে ফিরে আসবার সময়, আশ্চৰ্য্য, চোখের
সামনে লণ্ঠনটা সেখানে জ্বলতে দেখেও সেটার কথা সে কিছু
ভাবতে পারলাে না।
১০
নেপথ্য
অন্ধকারে, এদিকে-ওদিকে বন্ধুরাও কেমন স্তম্ভিতের মতো
দাড়িয়ে আছে।
যতােক্ষণে না অনাদি ফিরে এসে দেয়াশলাইয়ের একটা কাঠি
ধরালো।
কাঠির সেই ক্ষীণােদ্ভাসিত চকিতে আলােতে এবার সেই
আর্তনাদটা অনাদির কণ্ঠে এসে বাসা নিয়েছে : এ কী!
এতােক্ষণে বন্ধুদের যেন হুস হলাে। করবার মতো একটা
কাজ পেয়ে এতােক্ষণে বাইরের ঘর থেকে লণ্ঠনটা অমৃত নিয়ে
আসতে পারলে যা থােক।
লণ্ঠনের স্থির আলােতে এবার যা অনাদি দেখলো, তাতে
তার দেহে কোথাও আর এককণা রক্ত রইলাে না।
তরলা দুয়ারের কাছে মেঝের ওপর শােয়, তার মাথায়
কোথায় খানিকটা কেটে এলােমেলো কালাে চুলের মধ্যে থেকে
রক্তের একটি ধারা নেমে এসেছে।
কিন্তু সেই দৃশ্যের চেয়ে আরাে যেন একটা ভয়াবহ দৃশ্য
ছিলো। অনাদি কেন কে জানে, প্রথম সেই দিকেই অগ্রসর
হলাে।
কিন্তু বৃথা, ডাক্তার ডেকে আনবার সময় নেই, থােকার
শেষ হয়ে গেছে।
তরল ! অনাদি ক্ষিপ্তের মতাে গর্জন করে উঠলাে।
১১৫
নেপথ্য
সবাই এলাে তার এই উদগত শােকাকুলতাকে প্রশমিত
করতে। অমৃত বললে,-ভয় নেই, জ্ঞান আছে। পুলিন
ডাক্তারকে শিগগির ডেকে নিয়ে এসাে, শ্রীশ।
অনাদিকে সবিস্তার সব বন্দোবস্ত করতে হলাে, কিন্তু মূৰ্ছা
ভাঙতে-ভাঙতে প্রায় তাের।
তা’র সেই দুৰ্বল, বিশাল চাওয়ার দিকে চেয়ে অনাদির সমস্ত
শরীর মমতায় আচ্ছন্ন হয়ে এলাে : কী করে পড়ে গেলে, তরলা ?
তরল চারিদিকে শুন্য চোখে তাকাতে-তাকাতে বললে,
আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাে।
ফেলে দিলাে? কে ফেলে দিলাে? অনাদি আঁৎকে উঠলাে।
-ওর মা।
—কা’র মা? তুমি কী বলছ, তরলা ?
-কী জানি ওর নাম! মনে-মনে তরলা অন্ধকার হাতড়াতে
লাগলাে : ভুলে গেছি, মনে পড়ছে না, হঁ্যা, থােকা
খােকার মা।
থােকার মা আবার কোখেকে এলাে? সিথির দুই ধারে
অনাদি তার চুলগুলি পাট করে দিতে লাগলাে : তুমিই তাে
ওকে কোলে নিয়ে হাঁটছিলে।
-না, আমি নয়, সত্যিকারের সেই মা, সত্যিকারের যার
এই বাড়ি।
নেপথ্য
-তুমি এখন একটু ঘুমােবার চেষ্টা করো তো।
—ঘুমােবো, কিন্তু বলল, খােকার খুব বেশি চোট লাগে নি
তাে ? তরলা তার হাতের দুই মুঠি হঠাৎ শক্ত করে ধরলো :
ই, আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেই হলাে কিনা।
আমি যেন ওকে বুকে-পিঠে করে মানুষ করছি না।
-তুমি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলে, তরলা !
—আমি যেন ওর চেয়ে থােকাকে কিছু কম ভালােবাসি।
তরলার দুই চোখ জলে আবছা হয়ে এলাে : খােকাকে আমার
কাছে দাও না এনে একটুখানি।
-তুমি ভালো হয়ে ওঠো, তখন কোলে নেবে বৈকি।
-না, আমি এখুনি বেশ ভালাে আছি, আমি দিবি। ওকে
কোলে নিতে পারবাে। দুই চোখে অবারিত বিশ্বাস নিয়ে
তরল স্বামীর মুখের দিকে তাকালাে : জানো, যতােই কেননা
আমাকে ও ধাক্কা দিক, আমি কোল থেকে আমার খােকাকে
কিছুতেই ছেড়ে দিই নি। বলল, আমি হেরে যাবাে, আমি মা
নই, আমি হেরে যাবো ওর কাছে ?
-কে তােমাকে ধাক্কা দিতে আসবে, তরল ? অনাদি তার
মাথার কাছে করুণায় নেমে এলাে ; কী একটা বাজে স্বপ্ন
দেখছিলে, অনবরত খাটুনির জন্যে দুৰ্ব্বলতায় ঘুরে পড়ে গেছ,
কি ঐ টেবলটার কোণায় হয়তো ধাক্কা খেয়েছিলে
১১৭
নেপথ্য
:
-নয়, নয়, সত্যি তা নয়। তরলা সর্বাঙ্গে কেঁপে উঠতে
লাগলাে : জোর করে আমার হাত থেকে ও খােকাকে ছিনিয়ে
নিতে এলাে, আমি কিছুতেই তাকে ছেড়ে দিলুম না, তাই
আমাকে ঠেলে ফেলে দিলাে দরজার চৌকাঠের ওপর। আমার
কথা তােমার বিশ্বাস হয় না? ভয়ে স্বামীর বুকের মধ্যে তরলা মুখ
লুকোলে : তুমিও তাকে একদিন দেখবে দেখাে। সে মরেনি,
এখানেই সে কোথায় আছে।
অনাদি বিমুঢ় চোখে চারদিকে তাকাতে লাগলাে—কোথায়!
হঠাৎ তরল উঠলাে আবার ঝঙ্কার দিয়ে : খােকা—কী জানি
ওর নাম-ওকে রাখলে কোথায় ?
--আছে ও পাশের ঘরে। বােজা গলায় অনাদি বললে।
পাশের ঘরে! কার কাছে ?
অনাদি আমতা-আমতা করতে লাগলো।
-কা’র কাছে ওকে রেখে এলে ? সেই আন্নাকালিকে
আবার ডেকে এনেছ নাকি ? তরল উঠে ৰসবার দুর্বল একটা
চেষ্টা করলাে : দেখাে, ওকে সাবধান করে দিয়ে, খবরদার
আমি যে-নাম ওর রেখেছিলাম, কী জানি সেই নাম—আমার
কিছু মনে পড়ছে না কেন, সেই নাম, সেই নামে ওকে
ডাকতে হবে।
—আন্নাকালিকে আর কোথায় পাবাে?
১১০
নেপথ্য
তবে থােকা, থােক। এখন কার কাছে পাশের ঘরে ?
তরল। ডুকরে কেঁদে উঠলাে : ওর মা, ওর মা'র কাছে বুঝি?
–দাড়াও দেখে আসি। অনাদি জোর করে ঘরের বাইরে
চলে এলাে।
১১৯
সেই যে তরলা বিছানায় ভেঙে পড়লাে, আর তার গা-ঝাড়া
দিয়ে উঠবার নাম নেই। দেখা দিলে প্রবল জ্বর, দেখতে লাগলাে
বিভীষিকা। দিনের আলােয় যখনই মুহূর্তগুলি একটু তরল হয়ে
আসে, তরলা শূন্য চোখে চারদিকে চেয়ে কেঁদে ককিয়ে ওঠে।
আমার থােক, আমার নবকুমার।
অনাদি তার চারধারে আদরে ঝরে পড়তে থাকে : তুমি
ভালাে হয়ে ওঠো, ভয় কী, থােক। আবার ফিরে আসবে, তরল।।
ফিরে আসবে। তরল যেন কথাটার আদ্যোপান্ত কিছু
বুঝতে পারলাে না : ফিরেই যদি আসবে তবে ও গেলাে কেন
বলো? আমি কি ওকে যথেষ্ট ভালােবাসি নি ?
-যে গেছে সে যাক, তাকে যেতে দাও। কী যে প্রবােধ
নেবে অনাদি হাঁপিয়ে উঠলো : পরের ছেলে, থাক ও পরে
নিয়ে।
১২০
নেপথ্য
—পরের ছেলে! কিন্তু আমি কি ওর মা ছিলুম না?
বাইরের ঘুটঘুটি অন্ধকারের দিকে অনাদি নিস্পলক চোখে
তাকিয়ে রইলাে।
-তুমি জানাে না, আমি যতােই কেননা মা হই, ও আমার
মা ছিলাে না’ এ-কথা কে যেন ওকে শিখিয়ে দিয়ে গেলাে। তরল
ভীত একটা নিশ্বাস ফেললো। তাই সেদিন থেকে ওর মুখে সেই
তেতাে সেই বিস্বাদ একটা হাসি ভেসে উঠেছিলাে, যেন সব সময়ে
আমার মুখের দিকে চেয়ে বিষাক্ত একটা ঠাট্টা করছে। কে যেন
ওকে শিখিয়ে দিয়ে গেলো।
অনাদি আর কিছু কথা বলবার না পেয়ে তার মুখের কাছে
সুয়ে এসে বললে,তুমি এখন একটু চুপ করে শুয়ে থাকো,
তরলা, ডাক্তার তাই বলে গেছেন। চুপ করে শুয়ে থাকতে না
ভালাে লাগে, অন্য কথা বলাে, কেমন সুন্দর আজ মেঘ করেছে,
কততদিন এ-দিকটায় বৃষ্টি হয় নি, চাষবাসের কী দুর্দিন যাচ্ছে
ঘােরতরী-
কোনো কথাই তরলা কানে তুললল না, নিঃস্ব, অসহায়
গলায় চীৎকার করে উঠলাে : তুমি জানাে না, আমি-আমিই
তাকে মেরে ফেলেছি।
-তুমি মারতে যাবে কেন ? জোর করে যদি কেউ ছিনিয়ে
নিয়ে যায়-
১২১
নেপথ্য
গেলুম।
—হ্যা, তাই তাে, কিছুতেই তাকে আমি রাখতে পারলুম
।
তরলা কান্নায় ফুপিয়ে উঠলাে : হেরে গেলুম, ভীষণ হেরে
এ-কলঙ্ক কিছুতেই আমি সইতে পারছি না।
মৃত্যুর সঙ্গে মানুষে কে পারবে বলে ? এটা আমাদের
পরাজয় নয়, এটাই আমাদের পরিচয়, তরলা।
—হার নয় ? আর্তনাদে তরলা যেন সর্বাঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে
উঠলাে; আমার এতাে যৌবন, এতাে আকাঙ্ক্ষা, এতাে ভালাে-
বাসা সব শুকিয়ে ম্রিয়মান হয়ে গেলাে, তুমি তাকে হার বলবে
? নিমেষে কথাটাকে তবলা অন্য অর্থে নিয়ে গেছে : কোথাকার
একটা মৃত্যু, মৃত্যুর সেই একটা ছায়া, কালাে একটা স্মৃতি—তা’র
কাছে আমি হেরে যাবো? আমার এই জীবন, আমার এই
কামনার দীপ্তি, এই আমার অস্তিত্বের উজ্জ্বলতা—কিছুতেই আমি
তার সঙ্গে পেরে উঠবে না ?
রাতের ডাক্তার এসে দেখে গেলাে। তার মামুলি, যান্ত্রিক
গলায় ছাড়া, আর কিছু সে বেশি আশা দিতে পারলাে না।
রাত তখন গভীর, মেঘের ভারে আকাশ যেন শূন্যের উপরে
খানিকটা ধোঁয়ার মতাে ঝুলছে, ঘরের কোণে বাতি জ্বলছে নিবু-
নিবু, তরল স্বপ্নে হঠাৎ দুই হাত দিয়ে স্বামীর গলা জড়িয়ে
ধরলাে : ও যদি আসে, তবে তুমি আমাকে কখনাে ছেড়ে দিয়ে
। তুমি তো আমাকে ওর চেয়ে অনেক, অনেক বেশি
নেপথ্য
ভালােবাসাে। তুমি হেরে যেয়াে না, হেরে যেয়াে না ওর কাছে,
আমার মতাে হেরে যেয়াে না। তােমার বুকের মধ্যে আমাকে
খুব জোর করে ধরে রেখাে।
অনাদি তাকে দুই হাতের উষ্ণ নিবিড়তায় আবৃত করে
ধরলাে : কে, কে আসবে, তরলা?
-আমি কি তাকে কখনাে দেখেছি ? তরলা হেসে উঠলাে
কিনা অস্পষ্ট আলােতে কিছু বােঝা গেলাে না।
অনাদির কেমন ভয় কবতে লাগলাে। হঁ্যা, দরজাটা বন্ধ
আছে তখন থেকে, হাত বাড়িয়ে শিয়রের জানলাটা সে এবার
আস্তে বন্ধ করে দিলে । অন্ধকার আকাশটা যেন একদৃষ্টে তার
মুখের দিকে চেয়ে আছে।
-না, না, জানলাটা বন্ধ করছ কেন, তােমার ভয় কী?
তরল শ্রান্ত, অশরীরী গলায় বললে,—যদি সে আসেই, স্পষ্ট মুখের
উপর তাকে বলে দিয়ে : তােমার চেয়ে একে, তরলকে আমি
বেশি ভালােবাসি। তুমি কুৎসিত একটা মৃত্যু, এ পরিপূর্ণ একটা
জীবন, আগুনের মতাে বহু আগুনের উৎস। বলে দিয়ে স্পষ্ট
করে’ : ‘তুমি একটা স্মৃতি, আর এ একটা উজ্জ্বল, উত্তপ্ত
উপস্থিতি। তুমি একটা ছায়া, আর এ একটা রক্তময় রূপ !
প্রলাপের ঘােরে অনেকগুলি কথা বলে ফেলে তরল। পাতে
লাগলো : তুমি তাকে বলে দিয়াে, তা হলেই সে হেঁট মুখে
নেপথ্য
চলে যাবে। তুমি হেটে না যেন, আমার মতাে তুমিও তার
কাছে হার মেনে না। ভয় কী, জানলাটা খুলে দাও।
না, ভয় কী, জানলাটা অনাদি খুলে দিলাে।
তরল বললে,-এ কী, তুমি এখন ঘুমুতে আসবে না?
-না, অনাদি দৃপ্ত, দৃঢ় গলায় বললে,-আমি তােমার পাশে
বসে আজ জাগবাে।
-হ্যা, স্বামীর হাতের মধ্যে তরলা তার দুর্বল, ক্লিষ্ট হাতখান
ঢেলে দিলাে, বললে,আজ রাতটা আমার কাছে কেমন বি
লাগছে। সারা রাত জেগে আমাকে তুমি পাহারা দাও।
-তাই বলে তােমাকেও আর জেগে পাহারা দিতে হবে
। অনাদি অনুনয় করে বললে,তুমি ঘুমােও।
-ঘুম আসছে না যে। ভারি ভয় করছে যে আমার। তুমি
আমার আরাে কাছে সরে এসাে।
-ভয় কিসের ? অনাদি তার শরীরের সমস্ত দৃঢ়তা দিয়ে
উচ্চারণ করলে : আমিই তো তােমার আছি।
হ্যা, অনাদিই তো তার আছে। যদি কেউ আসেও আজ
রাত করে, তার প্রেতায়িত পরিশূন্যতায়, অনাদি তাকে শুধু
তার এই সবল উপস্থিতি দিয়ে প্রতিহত করবে। কেই বা
আসবে তার কাছে, মৃত একটা মুহূর্ত, ব্যয়িত একটা দীর্ঘশ্বাস!
জীবনের এই উৎসবে উড়ে-আসা একমুঠো শ্মশানের ভ ! তা'র
১২০
নেপথ্য এই বিস্তৃত বিস্মৃতির আকাশে কোথাকার কোন এক রাত্রির জাগরণ! মিথ্যা কথা। সেবায় ও পরিশ্রমে অনাদি দৈত্যকায় হয়ে উঠলাে। হ্যা, পৃথিবীতে সে বাঁচতে এসেছিলাে, এসেছিলো ভােগ করতে। তার জন্যে আকাশে ছিলাে প্রশ্রয়, প্রতি সূর্যোদয়ে ছিলাে উদার অভ্যর্থনা। ক্ষণকালিক জ্বলন্ত একটা বিদ্যুতের মতাে হাহাকারে বিদীর্ণ হয়ে দীর্ঘ দিন ধরে সে অবিচল অন্ধ- কারের উপাসনা করতে আসে নি। রক্তে ছিলাে তার পিপাসা, স্নায়ুতে ছিলাে তার ঝঙ্কার। তার প্রেম ছিলাে সময়ের মতো অসীম হয়ে। সময়-এই সময়ই ছিলাে অনাদির শেষ আশ্রয়, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তা’র অবারিত এই স্রোত-যে-স্রোতে স্মৃতির সমস্ত কলঙ্ক, সমস্ত আবর্জনা নিঃশেষে ধুয়ে যাবার কথা। কেননা স্মৃতি নিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না, তার চাই নিষ্ঠুর স্থূলতা, তার চাই একটি উদ্ধত মেরুদণ্ড। অনাদি তেমন করেই বাঁচতে চেয়েছিলাে—ভয় কী, পৃথিবীতে মানুষ তেমন করেই বাঁচতে এসেছে। জীবনের শােভাযাত্রায় দুর্নিবার অগ্রসরই হচ্ছে বঁাচা ! এই মাত্র শেষ দাগ ওষুধ খাইয়ে অনাদি মুহমানের মতাে ইজিচেয়ারে এসে আধখানা একটু শুয়েছে, নিস্পন্দ হয়ে আছে নিথর কালাে রাত্রি, হঠাৎ কা’র ভীরু পায়ের শব্দে, শিথিল একটু সাড়ির খসখসানিতে অনাদির তন্দ্রা ভেঙে গেলাে। ১২৫
নেপথ্য
ঘরে বিশেষ আলাে ছিলাে না, অনিদ্রায় প্রখর তার দুই
চক্ষুর দীপ্তিতে অনাদি স্পষ্ট দেখতে পেলাে কে যেন কখন সন্তর্পণে
ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
দুই চোখের সমবেত নিষ্পলকতায় অনাদি সেই আগন্তুকের
দিকে পাষাণীভূতের মতাে চেয়ে রইলো।
পরনে কবেকার লাল সেই পুরােনাে একটা সাড়ি, সদ্য
পানের রসে ঠোট দু'টি পিছল হয়ে টুকটুক করছে, আলতো
খােপাটা পিঠের উপর ভেঙে পড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে রাশি-রাশি
সুরভিত কোমলতা, সমস্ত বাড়াবার ভঙ্গিতে লঘু-বঙ্কিম সলজ্জ
একটি মাধুৰ্য-স্পষ্ট, একেবারে স্পষ্ট চপলা। বহু যুগের শুদ্ধ,
পিপাসিত প্রতীক্ষা দিয়ে যেন তৈরি। একা আসে নি, কোলে
তা’র থােকা। হেঁট হয়ে আঁচলের তলায় শান্ত, পরিতৃপ্ত মুখে
মা’র সে দুধ খাচ্ছে।
অনাদি কথা বলতে গেলে, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুলাে
, দু’পায়ে দাড়াতে গেলো, কিন্তু পায়ের নিচে তার মাটি নেই।
চপল তার দিকে একবার চেয়েও দেখলাে না, যেন কতাে
রাত সে ঘুমুতে পারে নি, এখুনি শুতে পেলে যেন সে স্বর্গ পায়
এমনি নির্ভুল আত্ম-নিমগ্নতায় আস্তে আস্তে সে খাটের দিকে
এগিয়ে আসতে লাগলাে।
মলিন, মুমু কণ্ঠে তরলা উঠলে হঠাৎ চীৎকার করে : ওকে
নেপথ্য
ফিরিয়ে দাও, ওকে চেঁচিয়ে চলে যেতে বলাে শিগগির।
বলে দাও যে লােক মরে যায়, তাকে আমরা কখনাে
ভালােবাসি না।
অনাদি প্রাণপণে চীৎকার করে উঠতে চাইলাে, কিন্তু তার
কণ্ঠস্বর পাথরের মতো কঠিন।
-উ, শিগগির এসো, অন্ধকারে তরল আবার একটা
আৰ্তনাদ ছুঁড়ে মারলো : গলার উপর আমার কে হাত চেপে
ধরেছে। ঠেলে সরিয়ে দাও সেই হাত। আমার নিশ্বাস যে বন্ধ
হয়ে এলাে।
অনাদি এতােক্ষণে যেন বিমুঢ় বিহ্বলতায় উঠে দাঁড়াতে
পারলো। শুনলে কে যেন তাকে ডাকছে, তার কাছেই, এই
ঘরের মধ্যে।
তা’র মনে পড়ে গেলাে, অকস্মাৎ মনে পড়ে গেলাে, ঘরের
মধ্যে বিছানায় তরল শুয়ে আছে।
অনাদি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে তরলাকে নিবিড় করে
কাছে টেনে আনলাে।
আশ্চৰ্য্য, অনাদি রাশীকৃত সেই অন্ধকারে স্পষ্ট দেখতে পেলাে
কে যেন তরলার কণ্ঠ থেকে তার হাতের গ্রন্থিটা আস্তে আস্তে
খুলে নিচ্ছে। দুই হাতে তরলাকে আর সম্পূর্ণ করে ধরে রাখা
যাচ্ছে না।
১২৭
* * #
নেপথ্য
চেঁচিয়ে উঠবার আগে অনাদি লণ্ঠনের শিখাটা জোর করে
বাড়িয়ে দিলো।
স্পষ্ট সে এবার দেখতে পেলো তরলাকে সরিয়ে দিয়ে বিছানায়
চপলা আছে ওয়ে।
সে আর চেঁচাতে পারলাে না
সমাপ্ত
১২৮
No text on this page.
No text on this page.