Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Shri Shri Ramakrishna Mahima Part 1

Sen,akkhaykumar · 2010/02/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

প্রশ্ৰীৰামকৃষ্ণ মহিমা
**প্রথম ভাগ
•ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-পুথি প্রণেত
অক্ষয়কুমার সেন প্রণীত
ও প্রকাশিত।
কলিকাতা,
১১৫৪ নং গ্রে স্ত্রীট, বসুমতী ইলেকট্রো মেসিন প্রেসে
পুর্ণচন্দ্র মুখােপাধ্যায় দ্বারা মুদ্রিত।
১৩১ সাল, অগ্রহায়ণ।
All Rights Reserved ]
[ মূল্য • চৌদ্দ আনা মাত্র।

No text on this page.

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মা
শুনলে রামকৃষ্ণ কথা জীবন জুড়ায় এমি মিঠে।
পাষাণে জল ঝরে ভাই, মরা গাছ মরে উঠে।
• পাঠক,ও প্রবােধ—ইহারা দুই জন রঙ্গালয়ের অভিনেতা।
গিরিশ বাবুকে গুরু বলিয়া জানেন। রঙ্গালয়ে যখন চৈতন্যলীলা
অভিনয় হয়, তখন হইতে ইহারা রঙ্গালয়ে ভগবান্ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
পরমহংসদেবকে দর্শন করিয়াছেন, তঁাহার শ্রীপদরজ গ্রহণ করিয়া-
ছেন ও মহাপ্রসাদ ধারণ করিয়াছেন।
পা। দেখ, প্র—সকল রকম নেশা কম—যখন একটা নূতন
নেশা ধরা যায়, তখন দিন কয়েক বেশ মজা থাকে, তার পর
নেশাটার ধার মুড়ে যায় ; কাজেই আবার একটা নূতন নেশা
ধর্তে হয়। এই রকম করে সব নেশাই তাে ফেল হােললা, বাকি
ছিল গাঁজাটি, তাও বুঝি যায় যায়। আয়—আজ গাঁজার শ্রাদ্ধ
করে ছাড়বাে। এই ৰেলা ৭টা, চালাও গাজা, যতক্ষণ না
নেশা হয়। তাের কাছে কত গাঁজা আছে, দেখি।
প্র। চার আনার গাঁজা এই সকালে এনেছি।
পা। আচ্ছা চালাও-টিপাে—এই বলিয়া ধূমপান ও
কথােপকথন,

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা, ।
কথা হইতে হইতে পরমহংসদেবের কথা পড়িল।
পা। দেখ ভাই—সেই যে পরমহংস ঠাকুর, গিরিশ বাবু যাকে
গুরু গুরু বলেন, তিনি বেশ লােক—আচ্ছা সাধু। সাধুদের
যেমন জটা-ফটা থাকে, গেরুয়া কাপড় থাকে, গয়ে ছাই মাখা
থাকে, ই’য়ের তা কিছু নাই। আর একটি দেখেছ—সাধুর কিছু
অহঙ্কার নাই। ইনি আগেই লােককে নমস্কার করেন। চেহা-
রাটি কেমন ! ঠোঁট দুটি ঈষৎ রাঙ্গা রাঙ্গা, চোখ, গুলি বাঁকা
বঁকা, মুখখানি ঢল ঢল, আবার উহারই মধ্যে একটি জুলুস
আছে। দেখলেই মানুষের মনটি তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে।
কথাগুলি কেমন মিষ্টি ! গলার সুর কেমন মিষ্টি। এমন সুন্দর
গান ত ভাই কখন শুনি নাই। আমাদের থিয়েটারে কত
ভাল গাইয়ে রয়েছে ও আগেও কত ছিল। সকলকারই ত গান
শুনেছি, কিন্তু এমন কেউ গাইতে পারে নাই। ঐ মাগীর গলার
গরব কতে, এখন পরমহংস ঠাকুরের সকলেই সুখ্যাতি করে।
প্র। আর কি একটা পরমহংস ঠাকুরের গুণ আছে-
জানি শুনেছি, উনি দক্ষিণেশ্বরে রাণী রাসমণির কালীর
পূজারী ছিলেন। কালীর পূজা কৰ্ত্তে কৰ্তে মা সদয় হয়ে দেখা
দিয়েছিল । উনি যখন মনে করেন, ডালেই তখুনি
মায়ের দেখা পান, মায়ের সঙ্গে কথা হয়। সেই থিয়েটারে
একদিন মাগী গুলােকে দেখে মা আনন্দময়ী মা আনন্দময়ী
ব’লে মূচ্ছ। গেলেন, তার খানিক বাদে বিড় বিড় করে কি
বলতে লাগলেন।
পা। ও মুচ্ছা নয়, ওকে সমাধি বলে, আর ঐ যে বিড়-
বিড়ানি, ঐ মায়ের সঙ্গে কথা। উনি, শুনেছি, 'সব জাতে

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণমহিমা।
পারেন, মা সব বলে দেন। লেখা-পড়া জানেন না, কিন্তু
বড় বড় পণ্ডিত হেরে যায়।
প্র। আচ্ছা ভাই, লেখা-পড়া জানেন না, তবে কি করে
পণ্ডিতদের হারিয়ে দেন ?
পা। মায়ের সঙ্গে যার কথা হয়, সে লােক খানা কি! ওঁকে
পণ্ডিতদের সঙ্গে বেশী কথা কইতে হয় না; কি হয় শুন—
পণ্ডিতগুলাে দূর থেকে লম্ফঝম্প করে আসে, প্রথমে থােক
করে খুব তর্ক-বিতর্ক করে ; তার পরে, যখন বড় বাড়াবাড়ি হয়, ,
তখন ঐ পরমহংস ঠাকুর ছুয়ে দেন—আর পণ্ডিতগুলাের
ভেরা-চাকা লেগে যায়।
প্র। তার পর?
পা। তার পর আর কি, সে তর্জন-গর্জন করা দূরে থাক্‌,
কেউ হাত যােড় করে স্তব করে, কেউ পায়ে লুটে, কেউ বলে,
আমাকে চৈতন্য দাও—কেউ কাঁদে, এই রকম আর কি।
প্র। আচ্ছা ভাই—একটা কিছু দেখে ত অমন করে ; ছুয়ে
দিলে কি দেখে, কিছু শুনেছ ?
পা। হাঁ শুনেছি—কেউ শিব দেখে, কেউ কালী দেখে, কেউ
রাম দেখে, কেউ কৃষ্ণ দেখে আবার কেউ কেউ যে কি দেখে,
তা কিছু বোতে পারে না। কত লােক ঐ লােকটির
কাছে কাবু হয়ে গেছে। এই দেখ না, আমাদের চোখের
উপর, গিরিশ বাবু কি হয়ে গেলেন ! গিরিশ বাবু ত
একটা সিদা লােক নয়। লােকটা কারও কাছে মাথা নােয়ায়
। মেসসা, পিসা, মামা ইত্যাদি গুরুজনকে নমস্কার কওে হবে
ব’লে আত্মীয় লােকের বাড়ী যায় না। ঘাের নাস্তিক। বাঘে

৪
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
ধরে খেতে আসে, তবু ভগবানের নাম মুখে আনে না। সাধু
সন্ন্যাসী দেখলেই চড়, ঠেঙ্গা উছিয়ে রাখে। দেবদেবীর প্রতিমা
কাটারি দিয়ে টুকরা টুকরা করে কাটে। সব জানি ত—ঐ
পরমহংসঠাকুরকে প্রথম প্রথম থিয়েটারে কত • গাল দেওয়া
হ’লল। তার পরে পরমহংসঠাকুর সেই আপনার মন্তর
ছেড়ে দিয়ে ছুয়ে দিবা মাত্রই গিরিশ বাবু—কাবু। এখন
গিরিশ বাবুই ওঁকে ভগবান্ বলেন।
প্ৰ-আচ্ছা ভাই আর কেহ এমন হয়েছে জানিস্ ?
পা। হাঁ, সে দিন, শশধর তর্কচূড়ামণি বক্তৃতায় সহরকে
ততালপাড় করে দিলে। যে তার বক্তৃতা শুনে, সেই বাহর
দেয়। আজ এখানে বক্তৃতা, কাল সেখানে বক্তৃতা, একটা
হুলস্থুল পড়ে গেল। তার পর ঐ পরমহংসঠাকুর তার বাসায়
গিয়ে দেখা করে, তাকে ছুয়ে দিয়ে কি বল্লে ।
প্র। তার পর ?
পা। তার পর আর কি—যেমনি ছোঁয়া, অমনি বােবা
হওয়া। সেই শশধর কত দিন পরমহংসঠাকুরের পেছু পেছু
ঘুরলে, কি দেখলে, এখন আর সাড়াশব্দ নেই।
প্র। আর কারও কথা জানিস্ ?
পা। ঢের ঢের, অনেকসময়ে আবার বলবাে।
প্র। তুই এত কোথা হােতে শুলি ?
পা।
ওরে ভাই, আজকাল যেখানে যাই, সেইখানেই ঐ
পরমহংসঠাকুরের কথা।
• প্র। এখন ঐ ঠাকুর কোথায় ?
পা। শুনেছি, তিনি এখন কাশীপুরে একটি বাগান-বাড়ীতে
।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
আছেন। তার গলায় বেদনা হয়েছে, তাই তাঁর ভক্তের
সেখানে তাকে রেখে চিকিৎসা করাচ্চে। ব্যারাম বড় শক্ত।
শুনেছি, সহরের ডাক্তার কবিরাজ সব হার মেনে গেছে।
ডাক্তার সরকারও কিছু কতে পারেন নি।
প্র। চল এখন সেই পরমহংসঠাকুরকে দেখে আসি।
ব্যারাম এমন শক্ত হয়েছে, শুনে প্রাণটা কেমন করে উঠলাে।
পা। আমারও ভাই—তবে চল- আর গাঁজা আছে ?
প্র। আছে, এক টিপ হবে।
( সেই গাজা ছিলিমটি খেয়ে দুজনে পথে বেরুলাে। এখন
কেলা প্রায় দুপুর পেরিয়ে গেছে ; খানিক গিয়ে দুজনেরই খিদে
পেলে।)
প্র। ভাই, খিদেয় আর চলা যায় না, দেড় কোশের উপর
পথ।
সঙ্গে দুজনের মধ্যে কারও একটা পয়সা টেকে নাই।
যখন বেরিয়ে এসেছি, তখন যাই হােক্ যাব। তুই যে আগে
বল্লি, যে পরমহংস ঠাকুর আরও অনেক লােককে ছুয়ে দিয়ে
বােবা করে দিয়েছেন, তাদের কথা ববাে, কই, এখন বল্ না ।
দেখ, ঐ ঠাকুরটি
ঐ ঠাকুরটি যেমন সুন্দর, তার সম্বন্ধে কথাগুলিও
তেমনি।
পা। আমি সেদিন বাবু দত্তর গুলীর আজ্ঞাতে গিয়েছি-
লেম, সেখানে অনেকেই ঐ পরমহংসঠাকুরের কথা কচ্ছিল।
কথাগুলি বেশ শুতে লাগলাে। এক জন বােলে, কেশব সেন
এত চেলা কল্লেন, বিলাতে গিয়া বক্তৃতা দিয়ে বড় বড় সাহেবকে
মােহিত কল্লেন, এখানে ভারতবর্ষে কত ব্রাহ্ম-মন্দির স্থাপন
কল্লেন, তরবক্তৃতার এমন জোর যে, মানুষ শুনলেই তার বশ

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
হয়ে যায়--সেই বিডন গার্ডনে তােমাদের মনে নাই—যে দিন
বক্ততা হােললা, অত বড় বাগানটার বাহিরে ভিতরে লােক
আর ধরে না, সহয় তােলপাড়। তার পর কেশব বাবুর
পরমহংসঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয় ।
প্র। দেখা হয়ে কি হল ?
পা পা। সে লােকটি বল্লে, পরমহংসঠাকুরের, দিন কত সঙ্গ
করুতেই সেই কেশব বাবুর মােড় ফিরে গেল—সে কেশব
ববাদলে আর এক কেশব হয়ে গেল। আপনার শিষ্যদিগকে
নিয়ে দক্ষিণেশ্বর যাওয়া আলা করতে লাগলেন। কখন কখন
পরমহংসঠাকুরকে আপনার ঘরে আন্‌তেন। এই রকম হতে
হ'তে কেশব সেনের ' সে বক্তৃতার চোট কোন্ দিকে উড়ে
গেল, আর মুখটি বুজে পরমহংসঠাকুরের পা-তলাটিতে বসে
তিনি কি বলেন, সেই সবগুলি শুতেন। একদিন পরমহংসঠাকুর
কশব বাবুকে বলেছিলেন, কেশব, তুমি কেমন বক্তৃতা কর,
কিছু বল না? তাতে কেশব বাৰু জবাব দেন, “মহাশয় ! কামার
ঘরে কি ছু”চ বিক্ৰী।”
প্ৰ। কি আশ্চর্য, একজন কালীর পূজারী বামুন, মােটে
লেখা-পড়া জানা নাই—তাঁর কাছে কেশব বাবুর মত এত বড়
একটা লােক এমন হয়ে গেল ! এই ত সহরে হাজার হাজার
পূজারী বামুন, ভট্টাচাৰ্য, টোলের অধ্যাপক রয়েছেন, সংস্কৃত
ৰােল আউড়িয়ে দিক্ অধার করে দেন, কই, এমন ত কেউ
নয়, আর কোথাও আছে, তাও ত শুনি নাই।
পা।তুই ত নিজেই বল্লি-এই খানিক আগে যে, তােকে কে
বলেছিল যে, পরমহংসঠাকুর কালীর পূজারী ছিলেন। তাঁর

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
পূজায় মা খুসী হয়ে তাঁকে দেখা দিয়াছিলেন আর ডাক্-
লেই মা আসেন আর তার সঙ্গে কথা হয়। মা কালীর সঙ্গে
যার কথাবার্তা হয়, তাঁর সঙ্গে আবার কি কারও তুলনা আছে ?
ঈশ্বর জানিত লােক !
(প্র ও পা এই দুইজনের মধ্যে পা বুঝদার লােক, প্র বড়
কাচা)
প্র। আচ্ছা, পরমহংসঠাকুর মা কালীর পূজা কৰ্ত্ত কৰ্ত্তে
মা কালীর দেখা পেলেন-- আর এই সহরের ভিতরে এত
কালীমূর্তি রয়েছে, সব জায়গাতেই পূজারী বামুন রয়েছে—
মাকে বেশ সাজায়, বেশ ভােগ দেয় তারা এমন না হয়ে
আর রকম হয় কেন বল দেখি? কালীঘাট ত একটি পীঠস্থান--
মা জাগ্ৰত-সেখানকার ও ত খবর জানি
পা। যে যা চায়, সেই তাই পায়—পরমহংসঠাকুর মায়ের
পূজার জন্য পূজারী হয়েছিলেন, মা কালীর দর্শন পাবার
আশায় তার পূজারী হয়েছিলেন, মায়ের সঙ্গে কথা কইবার জন্য
পূজারী হয়েছিলেন, তাই মা কালী তার পূজা নিয়েছেন, তাঁকে
দেখা দিয়াছেন, তার সঙ্গে কথা ক'য়েছেন ৪ ডাকলেই এসে
কথা কন। আর এর উপরে ভক্তিযুক্ত হলে কি হবে, এরা ত
আর পূজারী নন-পূজার অরি। মা ও তেয়ি পূজা নেন, আর
মায়ের চরণ লাভ,কি মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার বদলে যা চান—
চাল কলা, তাই লাভ হয়। আর যারা পূজা দেওয়ান তাদের
সঙ্গে (দক্ষিণের খাতিরে ) কথাবার্তা হয়ে পূজাকাণ্ড শেষ হয়।
প্র। তুই ভাই এত বুঝলি কি করে এক সঙ্গেই ত এত
কাল রয়েছি—কৈ, আমি ত কিছু বুঝতে পারি নি।

*
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
e
}
পা। আমিও কিছু বুঝতেম না—তবে যে দিনে পরমহংস
ঠাকুর থিয়েটারে ডান পাটি বাড়িয়ে দিয়ে সমাধিগত হলেন,
আর গিরিশ বাবু চেঁচিয়ে বলেন, “আয় কে কোথায় আছি, শীঘ্র
পায়ের ধূলা নে,” আমি তাড়াতাড়ি এসে পায়ের ধূলা নিলুম আর
বল্পম, (সে সময়ে চোখে এক ফোটা জলও এল) ঠাকুর, কৃপা
কর। তার পর থেকে আমি কেমন একটু একটু বুঝতে পাচ্ছি,
আর আমাকে একটা কেমন কেমন করেছে। আমি দেখছি,
এই ঠাকুরেরই কৃপায় বুঝতে পাচ্ছি। আর একটি মজা, যত
এই ঠাকুরের কথা শুনি বা কলি—যা আমি কখন জানতাম না,
তাও আমি বুঝতে পারি।
প্ৰ। ঐ যে বল্লি, আমাকে কেমন কেমন ক'রেছে, ওর
মানে কি ? তােকে কি করেছে ? তাের কি হয়েছে—ভেঙ্গে
বল।
পা। আমি ঐ যা বলেছি, ওর বেশি কিছু আর বােতে
পারবাে না। তবে কেমন জাবি--যেমন খুব ঘুমিয়েছিলুম,
এখন ঘুমটা ভাঙ্গা ভাঙ্গ।
প্র। আমি তাের কথা কিছু বুঝতে পারিনে-হাঁ ভাই,
কি করে তাের মতন বুঝতে পারবাে?
পা। চ; এইত সেই ঠাকুরের কাছে যাচ্ছি। আমিও
আবার কিছু মাগবাে, তুইও কিছু মাগি।
প্র। আমি কি মাগ বাে, কিছু বুঝতে পাচ্ছি না, তুই ব'লে
কে ?
পা। যার কাছে যাচ্চি, তিনিই বুঝিয়ে দিবেন, মাগিয়ে
দিবেন।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ( এম্নি রামকৃষ্ণজীর মহিমার কথার এমনি মহিমা! প্র ও পা যত ঠাকুরের কথা কচ্চে, ততই তাদের চৈতন্য উদয় হচ্চে ও ঠাকুরের লীলার ভিতর বুদ্ধি প্রবেশ কচ্চে। রামকৃষ্ণ- নামই মহামন্ত্র-রামকৃষ্ণকথা আন্দোলনই আন্দোলনই সাধন-ভজন। লীলাকথা কীৰ্ত্তন করতে করতেই জীবের চৈতন্যোদয় হয়। কাঠে কাঠে ঘর্ষণ করলে যেমন সর্বভুক অগ্নির উৎপত্তি হয়, ঠিক সেই প্রকার রামকৃষ্ণকথা আন্দোলন করূতে করতে তমােনাশী চৈতন্যের উদয় হয়।) প্র। তুই যে বল্লি, পরমহংসঠাকুরের সঙ্গ পেয়ে কেশব বীর মােড় ফিরে গেল, ওটা কি বুঝতে পারলেন না-ভেঙ্গে বল্ দেখি । পা। যে লােকটি ঐ কথা বলেছিল, আমিও তাের মত ঐ বুঝতে না পেরে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম, তিনি যা বল্লেন, আমিও ভাল বুঝতে পারি নি। বােল্লেন—কেশব বাবু আগে নিরাকার নিরাকার কত্তেন, এখন মা মা করেন। এর মানে, কেশব বাবু আপনার ইচ্ছামত একটা পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, পরমহংসঠাকুর দেখলেন—গন্তব্য স্থানে যেতে হলে এটা ঠিক পথে যাওয়া হচ্ছে না, অম্নি কেশব বাবুকে ঠিক পথে চালিয়ে দিলেন। প্ৰ। কথাটা আর একটুকু ভেঙ্গে বল দেখি। পা। শশা, একটা উপমা দিয়ে বলি। যেমন একখানা নৌকা, তার মাঝি নাই। আর খুব ঝড় দিয়েছে। নৌকাটা দিক্‌-বেদিক্‌ মাছে না, যে দিকে ঝড়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেই দিকেই ছুটে যাচ্ছে তাতে যে চড়ায় লেগেই থােক আর শক্ত

১০
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
নিশ্চয়।
••
জায়গায় লেগেই হােক, ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে ডুবে যাবে তা
এমন সময় যদি একজন পাকা মাঝি সেই নৌকায়
টপ করে ওঠে, তহােলে মাঝিটি কি করে ? মাঝিটি অমি
হাটি ধরে ঠিক পথে চালিয়ে নিয়ে যায়। কেশব বাবু খুব
অনুরাগী লোক, ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, ঠাকুর ঠিক পথটি দেখিয়ে
দিলেন ও সেই দিকে চালিয়ে দিলেন।
“ঠাকুর রামকৃষ্ণজী গলার বেদনা হেতু প্রায় দশ মাস অন্ন
খেতে পারেন নাই। সেবকেরা পানীয়ভাবে তরল দ্রব্য
খেতে দিতেন। এখন তাও খেতে পারেন না। যা মুখে
দেন তার অধিকাংশই মুখ থেকে পড়ে যায় ; যৎকিঞ্চিৎ উদরগত
হয় ; তাই সেবকেরা খাওয়ার জন্য খাবার কিছু বেশী করে
করেন। আজ বেদনা বাড়াবাড়ি নামমাত্র মুখে দিয়েছেন
সম্মুখে পাত্রে সব পড়ে আছে।”
ঠাকুর দ্বিতলে যে ঘরে আছেন তার সকল দরজা জানালা
বন্ধ। যেখানে তাঁর শয্যা সেটি অতি নিভৃত স্থান। এখানে মানুষ
থাকূলে বাগানের মধ্যে নীচে কে আছে যাচ্ছে কিছুই জানা
যায় না। ভক্তবৎসল ঠাকুর কিন্তু জানতে পেরেছেন যে প্র ও
পা দর্শন লালসায় এসেছে, আর তাদের বড় ক্ষুধা পেয়েছে।
অমি ঠাকুর একজন সেবককে বল্লেন, দেখ, যে দুটি লােক
এই মাত্র নীচে এল তাদিগে শীঘ্র ডেকে নিয়ায়। সেবক আজ্ঞা-
মত সেই ভাগ্যবান দুটিকে সঙ্গে নিয়ে ঠাকুরের ঘরের দরজা
প্রবেশ করতে না করতে, ঠাকুর তাদিগে ঘন ঘন হাত বাড়িয়ে
ডেকে বল্লেন, আয় আয় আমি তােদের জন্য খাবার নিয়ে বসে
রয়েছি। তােদের বড় ক্ষুধা পেয়েছে খা খা । উভয়ে ঠাকুরকে

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। ১১ প্রণাম করে চরণ-রেণু নিয়ে আহলাদে আটখানা হয়ে মহা- প্রসাদ উদর পূর্ণ করে খেতে লাগলেন। “ভক্তিবান ও হৃদয়বান পাঠক, ছবিটি একবার হৃদয়-পটে একে দেখুন। আমার কি সাধ্য যে কাঠের কলমে কালি দিয়ে এই অপূর্ব লীলা-চিত্র আঁকতে পারি। লীলা কি বিচিত্র ! নিত্য অপেক্ষা লীলা অতীব সুন্দর। যিনি বাক্যমনের অগাে- চর, পুরুষপ্রধান, সর্বজ্ঞ, সর্বগ; সৰ্বাণুপ্রবিষ্ট, পূর্ণব্রহ্মসনাতন, অনাদি, অনন্ত, অখণ্ড সচ্চিদানন্দ তিনিই তার মর্তরঙ্গালয়ে আজ কাশীপুরের বাগানে কতিপয় ভক্তসঙ্গে জগতের চক্ষে ধূলা দিয়ে রামকৃষ্ণলীলার শেষাংশটি অভিনয় করছেন। অঙ্গের সাজ দীনতা হীনতা--জীব- হিতার্থে অপার করুণা। শরীরটি জীর্ণ শীর্ণ কঙ্কালসার। বাক্যমনের অগােচর হয়েও জীবকে শিক্ষা দিবার জন্য ঠিক তাদের মতন হয়ে,নিজে কি, তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন দীন দুঃখীর সাজটি মাত্র কিন্তু রাশি রাশি দেবেশ-দুল্লভ রত্নমণি অকাতরে যাকে তাকে বিতরণ কচ্চেন। প্র ও পাকে লয়ে তিনি আজ যে খেলাটি করলেন, তা শুনে কোন্ পাষাণ প্রাণ গােলবে! দেখুন, দয়ার তুলনা বা পরিমাণ আছে কি? দেখুন দেখি ঠিক সেই পতিত-পাবন বটেন কি না? জগদীশ্বরকে সর্বশক্তিমান জানিয়াও মানুষে যে কোন্ বুদ্ধিতে অবতার বাদের প্রতিবাদ করে, তা এ বুদ্ধিতে বুঝতে পান্তুম না-সে বুদ্ধিকে নমস্কার।” “রামকৃষ্ণজীর আনন্দময় মূর্তি। হাজার বদ্ধজীব হােক না কেন, যতক্ষণ তার কাছে থাকে, ততক্ষণ সে আনসাগরে ভাসতে থাকে, কখন ডুবে থাকে। রামকৃষ্ণজীর এই তাপ- ?

১২ শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। . নাই। নিবারণ-মহিমা আমরা বরাবর দেখেছি।” পা ও প্র পরমাননে উদর পূর্ণ করে মহাপ্রসাদ খেলেন। পরে ঠাকুরের কাছে বিদায় নেবার সময় চোখ ছল্ ছল্-জোড় হাতে বােললেন, ঠাকুর, আপনার চরণে যেন রতি মতি থাকে। ঠাকুর চুপ কোরে রৈলেন আর একটু হাসলেন। তার একটী ভুবন- মােহন হাসি মুখ ছিল, সেটা দেখলে আর তাকে কোন জন্মেও ভুর যাে নাই, সেই হাসিমুখটি দেখালেন। এরা পথে ঠাকুরের কথা কইতে কইতে, ঘরে এলেন। তার পর অল্পদিনের মধ্যেই তাঁরা , শুলেন - ঠাকুর আর লীলাধামে শুনে দিন কয়েক হায় হায় কোল্লেন, তারপর থেমে গেলেন। রামকৃষ্ণজীর কৃপায় এদের পূর্বপ্রকৃতি ক্রমে বােলে যেতে লাগলো। সংসার ধৰ্ম্মে অটি হােলো ; স্ত্রী-পুত্রের উপর কৰ্তব্য কি, বােধ হলল। নেশা ভাং কমে গেল, রামকৃষ্ণজীর কথা শুতে পেলে, মন দিয়ে শুনেন ; ঠাকুরের ভক্ত দেখলেই ভক্তিশ্রদ্ধা করেন, ঠাকুরের মহােৎসবে যােগ দেন ; রামকৃষ্ণজীর লীলাগুণ গীতছন্দে বাদ্যযন্ত্র সহকারে অনেকে একত্র হয়ে সমস্বরে কীৰ্ত্তন করেন ; রঙ্গালয়ে সাজ ঘরে রামকৃষ্ণজীর ফটো প্রতিমূর্তি রাখেন এবং অভিনয়ের দিনে সুন্দর সুন্দর গােছ গােছ ফুলের মালা দিয়ে সাজান ; যতবার সাজ ঘর থেকে রঙ্গমঞ্চে অভিনয় কোবৃতেসেন; ততবার ঠাকুরকে প্রণাম করেন ; অভিনেত্ নটীদিগে, ঠাকুরকে ভক্তি কোরতে বলেন; মধ্যে মধ্যে একসঙ্গে ঠাকুরের গুণের কথা কন। ক্রমে ঠাকুরের উপর ভালবাসা জন্মালাে। ; ;

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
;
এই রকমে বার তের বৎসর কেটে গেল--এখন তারা দেখ,
লেন, তারা যে ঠাকুরটিকে দেখেছেন, যাকে এত ভক্তি করেন,
তিনি বড় সিদা ঠাকুর নন্; একটা বড় কেওকেটা ন, তাঁর
মহিমা দেশ বিদেশের লােকদিগকে স্তম্ভিত করে দিলে ; ইংলণ্ড
আমেরিকা প্রভৃতি বড় বড় জায়গায় রামকৃষ্ণ নামের পতাকা
উড়ছে—দলে দলে সাহেব বিবি ঠাকুরের লীলাস্থল দেখতে
আছে, ইংলণ্ডের সর্ব প্রধান পণ্ডিত তার জীবনী লিখছেন,
তার বিষয় আন্দোলন করছেন, যে সব ঠাকুরের ভদিগে
ছেলেমানুষ জাতেন, তারা দিগবিজয়ী হয়ে উঠছেন—মানুষে
যা করতে পারেন নাই, সে সব কাজ কোরছেন। এই সকল
দেখে শুনে ঠাকুরের লীলাকথা শুতে তাদের বড় ইচ্ছা হল ।
একদিন ঠাকুরের শরণাপন্ন একটি
তাকে বােললেন—মশায়, আপনি
আমাদিকে ঠাকুরের কিছু কথা শুনাবেন ? আমাদের
ঠাকুরের কথা শুনার বড় সাধ হয়েছে। সে লােকটি থিয়েটা-
রের লােকদের মধ্যে রামকৃষ্ণ-ভক্তির স্রোত বইতে দেখে,
তাদের কাছে কেঁদে ফেলেন আর বলেন, দেখ ভাই,
আমি মূখ, আর রামকৃষ্ণজীর মহল্লীলা—তা আমি কেমন করে
বােল্বৈ, তবে তিনি কৃপা করে যা দেখিয়েছেন, যা শুনিয়ে-
ছেন ও জানিয়েছেন, তা বোল্বাে, তােমরা জিজ্ঞাসা কর।
পা। আপনারা যে রামকৃষ্ণজীকে ভগবান্ বলেন, সত্যি
কি তিনি ভগবান?
ভ। তুমি আগে একটা কথার জবাব দাও, তারপর আমি
ৰ’লবাে। তুমি ভগবান্ কাকে বল? তােমার ভগবান কিরূপ?

১৪ শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। পা। ভগবান্ মস্ত বড়, তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি মনে কল্লে সব করতে পারেন—তিনি এই সৃষ্টি দুনিয়ার মালিকরাম ভগবান্‌—কৃষ্ণ ভগবান্। আমি এই বুঝি। ভ। রামকৃষ্ণজীও তাই। পা। কৈ আমরা কিছু বুঝতে পারি নাই—আপনি বুঝিয়ে দিতে পারেন? ভগবান্ যে, তার প্রমাণ কি? • ভ। প্রমাণ, রামকৃষ্ণলীলা দর্শন ও তাঁর কৃপা। ভগবান্ যখন অবতার হয়ে আসেন, তখন তাতে একটা লক্ষণ থাকে— সেটি কি জান—যে দেহে কোন লক্ষণই থাকে না,সেই দেহধারী ভগবানের অবতার। অবতারকে কোন লক্ষণই পাওয়া যায় । অবতার উপলব্ধি ও প্রত্যক্ষের বিষয়। তিনি প্রত্যক্ষ হলে জানতে পারা যায় যে, তিনি লক্ষণাতীত—এই লক্ষণযুক্ত ; আমার ধারণা এই। পরমহংসদেব, অবতারের একটি লক্ষণ দিতেন, তাহা এই, -যে দেহে প্রেমভক্তির বন্যা বয়ে যায়, যিনি রাত্রিদিন ঈশ্বর- প্রেমে বিল, সেই দেহধারী ঈশ্বরের অবতার। যতদিন ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ না পাওয়া যায়, ততদিন এই লক্ষণ কেও বুঝতে পারে না। | আর একটি কথা বলতেন যে অবতার অচেনা গাছের মত। একরকম গাছ আছে তার নাম অচেনাগাছ তার মানে—কেও তাকে চিতে পারে নাই। আবার তিনি পাহারাওয়ালার হাতের আঁধারে লণ্ঠনের উপমা দিয়ে বলেছেন, যে তাঁকে চেনাও যায় ও দেখাও যায়। পাহারাওয়ালা রাত্রিতে গলি ঘু“জিতে পাহারা দিবার জন্য হাতে একটা লুণ্ঠন "রাখে তাকে ১৫ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। আঁধারে লণ্ঠন বলে। এই লণ্ঠনের এমন একটি গুণ আছে যে, যার হাতে থাকে, সে ঐ লণ্ঠনটি দিয়ে সকলকে দেখতে পায়, কিন্তু তাকে কেও দেখতে পায় না। তবে যদি পাহারওয়ালা ঐ লণ্ঠনটি আপনার নিজের দিকে ফিরিয়ে দেয়, তাহােলে তাকে দেখা ও চেনা যায় ; সেই রকম নরদেহধারী সেই চৈতন্যময় যে বলে নিজেকে লুকিয়ে রেখে আগােটা সৃষ্টি জীব-জগৎ দেখছেন, যদি সেই চৈতন্য আলােটা দিয়ে নিজেকে দেখিয়ে দেন, তাহােলে মানুষ তাকে দেখতে ও চিনতে পারে। এইখানে তােমাদিগকে একটী কথা বলি শুন অন্যান্য অবতারের মত রামকৃষ্ণজীকে যেন বড় শক্ত। এতে ত রজের ঐশ্বৰ্য্য নাই, এতে আগাগােড়া শুদ্ধসত্বের ঐশ্বৰ্য্য। দীন ভুক্তভাবে সত্ত্বের ঐশ্বৰ্য্য চেনা, ধরা বড় শক্ত। এখানে তাে রাক্ষসবংশ ধ্বংসও নাই, আর কুরুক্ষেত্রের অষ্টাদশ অক্ষোহিণী নিপাতও নাই আর অঘাসুর, বকাসুর, তাড়কা, পুতুনা বধ ও নাই। এ সব চোখে দেখে, কাণে শুনে লোকে একটা বুঝতে পারে, কিন্তু এখানে ঐশ্বৰ্য্য ; এ চোখে কাণে দেখা শুনা যায় না,-স্বতন্তর চোখ কাণ চাই। এবারে কি হ’লাে জান। এবারে ভগবানের ভাণ্ডারের রত্নমণি-যে রত্নমণি অকুল অপার মহাসাগরের জলে লুকানাে ছিল, তাই লুঠ হয়ে গেল। রামকৃষ্ণজী নিজের দেহ দিয়ে অগণ্য দুঃসাধ্য সাধন মন্থনে সে সব রত্নমণি বের করে মুড়ি মুড়কির মত জগতে বিলিয়ে দিলেন। এ সম্বন্ধে এই পৰ্য্যন্ত পরে যথাসাধ্য বলবাে। রামকৃষ্ণজী এখন আমাকে যা দেখি- য়েছেন, যা বুঝিয়েছেন, তাতে বেশ দেখতে পেয়েছি ও বুঝতে পেরেছি, যে তিনিই সেই ভগবান, ভগবানের অবতার, দুনি-

০
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
য়ার মালিক, সর্বশক্তিমান-সেই রাম-সেই কৃষ্ণ -সেই
কালী—সেই অখণ্ড সচ্চিদানন্দ—মনবুদ্ধির পার ও মনবুদ্ধির
গােচর।
তোমার আমার পক্ষে তাঁকে জানবার তার
লীলাদর্শনই সহজ পায় ।
পা। লীলা শ্রবণই করা যায়, দর্শন করা যায় কি রকম ?
ভ। তুমি যখন একাগ্ৰমনে ঐ পথে যাবে, তখন আপনিই
বুঝতে পারবে। অভাসে কথাটা কেমন জান, একটা সুন্দরীর
রূপবণন শুনতে শুনতে একটী ভাব উদয় হয়, তার পর ঐ ভাব
পেকে অন্তরে সুন্দরীর যেমন একটা ছবি উঠে, তেমনি লীলা-
কথা শুনতে শুনতে লীলার ভাব ফুটে, পরে ভাব পেকে লীলার
ছবি উঠে। এই ছবি দেখতে পেলেই বুঝতে পারবে যে, ঐ
লীলাটী যার, তিনি কে।
পা।--রাম-অবতারে, কৃষ্ণ-অবতারে কত শত আশ্চৰ্য্য
ঘটনা আছে, যেমন কাঠ সােণা হ’লপাষাণী মানুষ হ’ল
গিরিগােবর্ধন ধরা হ’ল, কৃষ্ণ কালী হলেন, পুতনা মােনলা, কংস
গেল, গীতা বােল্লেন। এখানে কৈ কি হল ?
২। এর চেয়ে অনেক বেশী বেশী হয়েছে। আজ পর্যন্ত যত
অবতার হয়েছেন, তারা সকলে মিলে যা করেছেন, রামকৃষ্ণজী
সে সব করে তার উপর আরও কিছু নূতন করেছেন, কিছু
বেশী করেছেন। তুমি যে সকল অবতারের কথা বলে, তঁাদের
লীলাকথা শুনেছ, তাই তঁাদিগে ভগবান বলে বিশ্বাস হয়েছে।
রামকৃষ্ণলীলা শুন, তা হলে রামকৃষ্ণজী কি বুঝতে পারবে।
তোমাদের রামে কৃষ্ণে যখন বিশ্বাস আছে, তখন রামকৃষ্ণলীলা
সহজে বুঝতে পারবে। যিনি একটী অবতার বুঝেন, তিনি

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা +: ون সব অবতারই বুঝেন।* যাঁর একটিতে বিশ্বাস নাই, তার কোনটিতেই নাই। সাগরে নিধিরত্ন যেমন জলের উপরে থাকে না, জলের ভিতরে থাকে এবং খুব ডুব দিলে সেই সব রত্ন যেমন পাওয়া যায়, তেমনি রামকৃষ্ণলীলা-সাগরে ডুব দাও, নানা নিধি পাবে, আর তাকে রত্নাকর বলে জান্‌তে পারবে। পা।-আপনি যে বলেন, সকল অবতারে যা করেছেন, রামকৃষ্ণজী যে সব করে আবার তার চেয়ে কিছু বেশী করে- ছেন; তা হলে আপনি কি বলেন, রামকৃষ্ণজী অন্যান্য অব- তরের চেয়ে বড় ? ভ।-সকল অবতারেই সেই এক ভগবান । ভিন্ন ভিন্ন নামরূপমাত্র ও ভিন্ন ভিন্ন লীলামাত্র। যখন যে লীলায় যা কাজ আবশ্যক হয়, তখন এক অবতার হয়ে সেই কাজ করেন। তার প্রত্যেক অবতারে, সব কাজ করার শক্তি থাকে, তবে সব কাজের আবশ্যক হয় না। তুমি তােমাদের রঙ্গালয়ের দৃষ্টান্তে বুঝে লও। তােমাদের ‘জনা’ অভিনয়ে অনেক চরিত্রের অভিনয় আছে, কিন্তু তুমি কেবলমাত্র দূিষকের চরিত্রটিই অভিনয় কর ; কিন্তু যদি রাজার, কি শিবের, কি গঙ্গা-রক্ষকের, কি অর্জুনের চরিত্র অভি- নয় করতে হয়, তা হােলে কি পার না? পার—তবে আবশ্যক হয় না; তেমনি সেই সৰ্বশক্তিমান ভগবান্ যে অবতারে যা দরকার, সেই অবতারে তাই করেন। এই রামকৃষ্ণ অবতারে সব আদর্শ অবতারের খেলা দেখানর আবশ্যক হওয়ায়, সব দেখি য়েছেন। তার আবার অবতারের মধ্যে ছােট বড় কি আছে ?

• ১৮ -
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
পা। আপনার কথায় ত বেড়ে মজা দেখছি,যেন কি
দেখছি। রামকৃষ্ণজী ভগবান্আমরা তাকে বার তের বৎ :
সৰ পূৰ্বে দেখেছি; ছুয়েছি, কৈ তায় কি হল?
ভ।তঁাকে দর্শন করে কিছু হয়নি, এমন কথা মনে আতে
নাই। তােমাদের খুব হয়েছে তবে বুঝতে পাছ না বটে।
দুল্লভ জিনিস সহজে পেলে, জিনিসের কিম্মত জানা যায় না,
মানুষে তা জানতেও পারে না। তােমাদের কি হয়েছে শুবে ?
তােমরা ভববন্ধনে মুক্ত হয়েছ ; তার উপর তাঁর কৃপা পেয়েছ,
রামকৃষ্ণজীর মহল্লীলা শুতে লালায়িত হয়েছ, আবার সকলের
সার তার স্বরূপ জানতে ব্যর্থ হয়েছ। মানুষের ভাগ্যে এর চেয়ে
আর কি হয় ? ঈশ্বরীয় শ্রবণ, ঈশ্বর দর্শন, এই মনুষ্যজীবনের
প্রধান উদ্দেশ্য। মানুষ কামিনীকাঞ্চনের দাস ; কামিনীকাঞ্চনের
জন্য লালায়িত ! তােমরাও বরাবর তাই ছিলে, আজ যে
কর্মের ফলে ভগবৎপাদপদ্ম লুব্ধ হয়েছ, সেই কর্মটিই রামকৃষ্ণ
দর্শন।
পা। আমরা রামকৃষ্ণজীকে বার তের বৎসরের পূর্বে
দর্শন করেছি, কিন্তু এখন যেমন তার কথা শুনতে, তার শ্রীমূর্তি
ফুল দিয়ে সাজাতে মনে হচ্ছে, এমন এত দিন হয়নি কেন ?
ভ। এর উত্তর—রামকৃষ্ণজী বলতেন, একটা বাড়ীর কার্ণিসে
বীজ তোলা ছিল, কালক্রমে অনেক বৎসর পরে বাড়ীটা ভূমি
সাৎ হ’ল ; তখন ঐ বীজ তাত-বাত পেয়ে আঁকুরে উঠলাে।
তোমাদেরও তাই। এখন সময় হয়েছে। ফল সময়সাপেক্ষ।
• পা। আপনার কথা শুনে, আমাদের খুব আশা ভরসা
হচ্ছে, আর মন প্রাণ শীতল হচ্ছে ।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। ভ।' এ আমার কথা নয় ; আমি যা বলছি, সব সেই জগৎ-গুরু রামকৃষ্ণজীর কথা; আমার মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে মাত্র! ছাদে বাঘের মুখ থাকে, বৃষ্টি হলে লােকে বলে, বাঘের মুখ দিয়ে জল পড়ছে; কিন্তু সে বাঘের মুখের জল নয়, সে আকাশের জল। আমার নিজের কথা, শক্তি, বুদ্ধি, কিছুই নাই,-সব তার। রামকৃষ্ণজীর একটী অভয়দা নাম আছে, সেই নামের মহিমায় তােমাদের আশা ভরসা বাড়ছে। রামকৃষ্ণজী আনন্দ- ময়, তাঁর লীলা কথায় আনন্দস্রোত বয়, তাই তােমাদের আনন্দ হচ্ছে। তােমরা ভাগ্যবান, তাকে প্রত্যক্ষ দর্শন করেছ, তাকে স্পর্শ করেছ, বার বাড়া নাই তার মহাপ্রসাদ ধারণ করেছ তােমাদের ত লীলা-কথা শুনে আনন্দ হবেই। তার লীলা কথা শ্রবণ কীৰ্ত্তনের এমন গুণ যে, যদি অতি বদ্ধজীবেও শুনে কি কীৰ্ত্তন করে, সেও আনন্দ-সাগরে ভাতে থাকবে। সংক্ষেপে তােমায় বলি শুন,—জগতে এমন জীব কেহই নাই, যে সরল প্রাণে রামকৃষ্ণ নাম করলে পরম আনন্দ না পায় ; জগতে এখনও এমন পাপের সৃষ্টি হয়নি যে, একবার সরল প্রাণে রাম- কৃষ্ণ নাম করলে তা তৎক্ষণাৎ ভস্মীভূত না হয় ; আর এখনও জগতে এমন ত্ৰিতাপ জ্বালার সৃষ্টি হয়নি যে, একবার রামকৃষ্ণ নাম করলে তা শীতল না হয়। পা। যাঁরা রামকৃষ্ণজীকে দর্শন করেছেন, কিন্তু চিনতে পারেন নি-যে তিনি ভগবান্‌—এমন অবস্থায় সেই সব দর্শকের ভগবান্ দর্শন হ’ল কি না? ভ। তাদেরও ভগবান্ দর্শন হ’ল। মনে কর, তুমি কাশ্মীরে

২০.
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
•
শীতকালে রাত্রিতে গিয়া উপস্থিত হয়েছ। তুমি বিদেশী লােক,
একটি বাসা খুজছ, এমন সময় সহরের ভিতরে একটি কোটালের
সঙ্গে দেখা হল, তিনি শশব্যস্তে : একটা বাসাবাড়ীর ঠিকানা
বলে দিলেন। কোটালটি কে জান? তিনি কাশ্মীরের রাজা
কোটালের বেশে দুইএকজন আপনার চেনা লােককে আপনার
মত সাজিয়ে, সঙ্গে করে নগর ভ্রমণ করছেন। এখন জিজ্ঞাসা
করি বল দেখি, তুমি যাঁর সঙ্গে কথা কইলে, যিনি তােমাকে
বাসার ঠিকানা বাতলে দিলেন, তিনি আসলে লােকটি কে?
তুমি চিনতে পারলে না বলে কি বলবাে যে তিনি রাজা নন।
তিনি রাজা, কোটালের বেশে মাত্র। তেমনি রামকৃষ্ণজী অখি-
লের রাজা তবে রামকৃষ্ণবেশে এইমাত্র । ইনিও আপনার সঙ্গে
পারিষদদিগে আপনার মত মানুষের বেশ পরিয়ে ধরা সহরে
এসেছেন। এইবার তুমি বুঝে দেখ, যে, রামকৃষ্ণজীর দর্শনে
তাঁদের ভগবান্ দর্শন হয়েছে কি না?
পা। অতি সুন্দর কথা, বড় আনন্দের কথা। আচ্ছা, না
চিনে ঈশ্বর দর্শন করলে কি ঈশ্বর দর্শনের কাজ হয় ?
ভ। একটা উনুনের কাছে একজন ঘুমুচ্ছে। বেতের
বেলায় ঘুমের ঘােরে যদি তার হাতটা আগুনে পড়ে, তা হলে
হাতটা পুড়ে কি না ? যদি অজান্তে আগুনে হাত দিলে হাত
পুড়ে, তাহােলে অজান্তে ঈশ্বর দর্শন করলে ঈশ্বর দর্শনের কাজ
হবে না কেন?
প। আপনার কথা শুনে আমার প্রাণটা কেমন কচ্ছে,
আমার মনে হচ্ছে, আমি যদি এখুনি রামকৃষ্ণজীকে চিনতে
পারি। আর একবার বলুন তাকে চিনবার কি উপায়।
1

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। ২১ ভ। আমি তােমার আগ্রহ দেখে, বেশ বুঝতে পারছি যে, তােমার উপর রামকৃষ্ণজীর অপারকৃপা। ভাই এইমাত্র তােমাকে বল্লাম যে, ভগবানের অবতারের কোন বিশেষ লক্ষণ নাই, তিনি চিনিয়ে দিলেই তাঁকে চেনা যায়, নচেৎ কার সাধ্য। রামকৃষ্ণজীর শ্রীমুখে শুনেছি রাম যখন বনে যান, তখন তাকে কেবলমাত্র সাতটি মুনিতে চিনতে পেরেছিল যে, ইনি সেই পূর্ণব্রহ্ম সনাতন, আর অপর সকলে জানতেন, রাম-রাজা দশরথের ছেলে। শ্রীকৃষ্ণ রহস্য নামক একখানি প্রাচীন সংস্কৃত নাটক আছে, তাতে দেখা যায় যে, কুরুসভাতে শ্রীকৃষ্ণ ভগ- ন কি না, এ সম্বন্ধে অনেক জল্পনা হয়েছিল। মানুষের কি কথা কৃষ্ণ অবতারে ব্রহ্মা শিব এদেরও ভ্রম লেগেছিল। পা। পরমহংসদেব এমন জিনিস, তবে লােকে অনেক বিপরীত কথা বলে কেন ? কেউ কেউ বলে,তিনি মহাত্মা, কেউ কেউ বলে, তিনি একজন সাধু, কেউ বলে সিদ্ধ ; আবার কেউ কেউ এমন কথা বলে যে, মুখে বলা যায় না কাণে শুনা যায় •• । ভ। মানুষ, আকারে একরকম হয়েও মানুষ নানা প্রকৃ- তির। যার যেমন উপলব্ধি, যার যেমন জিনিষ ভিতরে আছে, সে সেই রকম কথা বলে। রামকৃষ্ণজীর একটি গল্প শুন। এক- জন মহাপুরুষ ভাবে মগ্ন হয়ে,বাহ্য-চেতন হারিয়ে, একটি পথের ধারে পড়ে আছেন , এমন সময় একজন সাধু দেখে চিনতে পারলেন যে, ইনি মহাপুরুষ। সাধু তার পায়ের ধূলা নিয়ে, তার সেবার জন্য ভাবাবসানের অপেক্ষায় একপাশে বসে রৈলেন। তার কিঞ্চিৎ পরে একজন মাতাল উপস্থিত, সে টতে টতে

২২
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
C
একবার দাড়িয়ে মহাপুরুয়কে দেখে বলে—বা, এই যে
আমার মত ভায়ারও ফলার।
ঠাকুরের আর একটি কথা। যে সূতার ব্যবসা করে, সে
সূতা দেখলেই কোটি কোন্ নম্বরের সূতা বলে দিতে পারেন।
সাধু-সাধু দেখলেই চিনতে পারেন।
আর একটি উপমা -যে মুলাে খেয়েছে, যার পেটের ভিতর
মুলাে গজ, গজ, করছে, সে ঢেকুর তুলেই খালি মুলাের গন্ধ
উঠবে ; তেমনি যাদের মনে প্রাণে, পেটে কেবল কামিনী-
কাঞ্চন, যারা সংসারকীট, নেহাত বদ্ধজীব,তাদের মুখে অবি-
তার ভাব ভিন্ন আর কি বেরুবে ? তাদের কথা শুনলে,
কাণে হাত দিতে হয়, যে স্থানে থাকে, সে স্থান অবিলম্বে পরি-
ত্যাগ করতে হয়। ঈশ্বর আর অবিদ্যামায়া (কামিনী কাঞ্চন) এই
দুটি জিনিস। এ দুটির মধ্যে যার যেটি ইচ্ছা, সে সেটি পায় ।
নদী যেমন দুকূল বজায় রাখতে পারে ন', তেমনি জীব, দুটি
একসঙ্গে পায় না। হয় আমিরী নাও, নয় ফকিরি নাও
তেতলা নাও, নয় গাছতলা নাও। কামিনী-কাঞ্চন যারা প্রাণের
সাধে নিয়েছেন, তাদের ঈশ্বরের পথে কাটা। কামিনী কাঞ্চনের
একটা নেশা আছে, সেই নেশায় তার দুয়ার-ধরা, সেবকদিগে
বুধ করে রাখে ; মাথাটি তুলতে দেয় না। পানাতে যেমন
জল ঢেকে রাখে, মেঘে যেমন সঁদকে আড়াল করে রাখে,
তেমনি মায়া ঈশ্বরকে লুকিয়ে রাখে। ত্যাবা লাগলে যেমন
রােগী খালি হলুদে রং দেখে, তেমনি মায়া-াবা ধরলে কামিনী
কাঞ্চনের বর্ণ বই আর কিছু দেখতে পাওয়া যায় না।
অবিদ্যা মায়ার নেশার আর একটা মহিমা বলি, শুন, নেশা-

ঘাের বদ্ধজীব যারা, তারাই পরমহংসদেবকে অযথা বলে। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। টায় পড়লে, অমনি বুদ্ধিটিকে গুলিয়ে দিয়ে, জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলিকে । বলি দিয়ে, মানুষকে অমনি ভেড়া করে ফেলে ; তাদিগে জাতে দেয় না যে, তাদের হদ্দ-মুদ্দ দুর্দশা ও সর্বনাশ হয়েছে। আর একটি কথা, পাগলকে বা ভূতে পাওয়া লােককে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, হাঁ গাে, তুমি কেমন আছ? সে যেমন বলে, বেশ আছি, তেম্নি এরাও বলে, বেশ আছি। এখন যা জিজ্ঞাসা করেছিলে তার উত্তর দিলাম। বেশ বুঝে দেখ, কামিনীকাঞ্চনের নেশা না কাটলে ঈশ্বরের পথে গমন কি ঈশ্বর লাভের কোন উপায় নাই। এমন কি, সিদ্ধপুরুষকে দেখলে তাকে শ্রদ্ধা করা দূরে থাক্‌ বরং কটুকাটব্যই পেয়ে থাকে। পা।নেশাটা তবে কাটে কিসে? ভ।—রামকৃষ্ণজী একটা বেশ ঔষধ বাতলে দিয়েছেন। ঔষধ- টীও আজকাল, তার কৃপায় সহজে পাওয়া যায়। ঔষধটী সাধু- সঙ্গ। ঠাকুরের উপমা-যদি কেউ সিদ্ধি কি গাজার নেশায় হতচেতন হয়, তাহলে তাকে যেমন চাল ধােয়ানি জল খাও- য়ালে নেশা কাটে, তেমনি যারা অবিদ্যার নেশায় হু’শ হারি- য়েছে; তাদের পক্ষে সাধুসঙ্গ একেবারে ডিঃ গুপ্ত,-ভারি দাও- যাই। পা। কামিনী কাঞ্চনের নেশা কাটাতে হলে, যাদের মা ছেলে চাকরি বা বিষয়াদি আছে, তা কি ত্যাগ করতে হবে ? ভ। তা কেন? • রামকৃষ্ণজী সংসারীকে কামিনী কাঞ্চন ছাড়তে ত বলেন নি। তবে কামিনী কাঞ্চনের আসক্তিটি ছাড়তে বলেছেন। তিনি বলেছেন, কামিনী কাঞ্চনকে

২৪
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
অন্তরে ঠাই দিও না। কামিনী কাঞ্চনের উপর ভেসে
বেড়িও। কেমন জান, যেমন জলের উপর সদি নৌকা থাকে,
তা হলে নৌকার কোন হানি হয় না, কিন্তু যদি নৌকার
ভিতর জল ঢুকে, তা হলেই নৌকার সর্বনাশ। ধৰ্ম্মপত্নীকে
ঈশ্বর লাভের সহায় মনে কোরাে, একটি কি দুটা ছেলে হলেই
ভাই বােনের মত থেকো, আর উভয়েই সর্বদা ভগবানের
সেবা কোরাে। কাঞ্চনকে ডাল ভাতের যােগাড় মনে
কোরাে। ঈশ্বর লাভ করবার পথে সংসার খুব নিরাপদ স্থান।
রামকৃষ্ণজী সংসারে কেলার উপমা দিতেন। যেমন কেল্লার
ভিতর থেকে লড়াই করলে বিপক্ষের গােলাগুলি ও অস্ত্রাদি
গায়ে লাগে না, ক্ষুধা তৃষ্ণার সময় পান ভােজন করতে পাওয়া
যায়, আবার এদিকে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করাও চলে, তেমনি
সংসারে ভাত ডালের সঞ্চয় থাকায় সময় মত খেতে পাওয়া
যায়, ধৰ্ম্মপত্নীর সহবাসে কোনও দোষ হয় না ;
পরিবারবর্গ আছে, পীড়ার সময় সেবা করে। ফাঁকে বেরিয়ে
গেলে, এ সব সুবিধা থাকে না, কিন্তু প্রয়ােজন গুলি সব থাকে।
তবে এর ভিতর একটা কথা আছে—আগে সংসারকে
চিনতে হয়, তার পর তায় ঢুকতে হয়, নচেৎ ভরি মুস্কিল।
কাচা মানুষের সংসারে প্রবেশ করা আর হাতে তেল না মেখে
কাঠাল ভাঙ্গা একই কথা। হাতে তেল মেখে কঁাটাল ভাঙ্গলে
যেমন হাতে আঠা লাগে না, তেমনি মনে জ্ঞান ভক্তি মাখিয়ে
সংসারে প্রবেশ করলে, কামিনী কাঞ্চনের আসক্তিতে লটপট
করাতে পারে না। আগে জ্ঞান ভুক্তি অর্জন, পশ্চাৎ সংসারে
প্রবেশ।
আত্মীয় বন্ধু

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
ঠাকুরের উপদেশ,গায়ে হলুদ মাখা থাকলে যেমন জলে
কুমীরের ভয় থাকে না, তেমনি মনে জ্ঞান ভক্তি থাকলে সংসারে
কামিনীকাঞ্চন কিছু করতে পারে না।
আর একটা উপমা-লুকোচুরি খেলায় যে বুড়ী ছোঁয়, তার
যেমন আর চোর হবার ভয় থাকে না, তেমনি ঈশ্বর লাভ
করে সংসারে থাকলে আর চোর হতে হয় না।
আর একটা উপমা খুটি ধরে বানিয়ে ঘুরলে যেমন
পড় বার কোনও আশঙ্কা থাকে না, তেমনি ভগবাকে ধরে
সংসারে যদি কেউ থাকে, তার আর পতনের ভয় থাকে না।
এ সম্বন্ধে ঠাকুরের আর একটা কথা—একজন পাড়াগেঁয়ে
লােক, সঙ্গে একটী ব্যাগ আর একটা ছাতা। ব্যাগটীতে কাপড়-
চোপড় ও পাথেয় আছে। এখানে কলিকাতা সহর দেখতে
এসেছে; এ অতি তাজ্জব সহর ; সে পাড়াগেঁয়ে নূতন লােক,
এখানে যা দেখে, তাই তার পক্ষে আশ্চর্যের জিনিস; হাঁ
করে এটি উটি দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। তখন কোথা
যায়, কোথা থাকে, চিন্তা করতে করতে একটা দেউড়িতে বসে
পড়লাে ও কিছুক্ষণ মধ্যেই ভাবনায় ও পথমে হঠাৎ ঘুমিয়ে
পড়লল। একজন জোচ্চোর দেখলে, লােকটা ভারি আহাম্মক,
-হেলায় ব্যাগটি ও ছাতাটি হাতিয়ে সরে গেল। এ ঘুম থেকে
উঠে দেখলে—সর্বনাশ! ঠিক এই রকম যারা সংসার-সহরে
এসেছে, তারা যদি আগে আপনার বাসা-ঘর ঠিক না করে
ঘুরে বেড়ায়, তাদের এমনি দশা ঘটে।
ঠাকুরের আর একটা বড় সুন্দর কথা—মাঠে বর্ষাকালেক
কেরা মুণি রাখে। ঘূণির ভিতর জলের চিচিকানি খেলা দেখে,

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। পুটি মাছগুলাে তার ভিতর ঢুকে ; কিন্তু আর বেরুতে পারে না, তেমনি সংসারে কামিনীকাঞ্চনের চিকচিকানিতে মুগ্ধ হয়ে, বেরুবার পথ না জেনে, যারা সংসার-ঘুর্ণিতে ঢোকে, তাদের পুঁটি-মাছের মত দশা হয়। সংসারে খুব সাবধান হয়ে চলতে হয়। কামিনীকাঞ্চন নিয়ে খেলা, আর সাপ নিয়ে খেলা একই কথা। গুরুদেবের কাছে মহামন্ত্র ও মহৌষধি না শিখে, তাদের সঙ্গে খেলা করলে, প্রাণরক্ষার কোনও আশা নাই। পা। গুরুতে কি এই সব জানিয়ে দেন ? কৈ, আমাদে গুরু ত একটি মন্ত্র ছাড়া আর কিছুই বলে দেন নাই! তবে, কি মশায়, রকমারি গুরু আছেন ? ভ। তুমি যা বল্লে, তা বুঝেছি। তুমি যে গুরু ও শিষ্যের কথা বলে, সে কেমন জান? যেমন অন্ধের হাত ধরে অন্ধের গমন; পরিণামে উভয়েরই পতন অবশ্যম্ভাবী। তবে যদি শিষ্য ঈশ্বরানুরাগী হয়, তা হলে অনুরাগের বলে সে, সেই গুরুর ভিতরেই আসল গুরু বের করে নিতে পারে। এখানকার মতে, গুরু একটি আলাদা আর আসল গুরু একটি আলাদা। আসল গুরুটি কে জান?—ইষ্ট-মূর্তি। মনে কর,-পাখী একটি ডিম পাড়লে। কিছুকাল ঐডিমে তা দিতে দিতে,তার ভিতর থেকে একটি ছানা বেরুলাে- এখানেও অবিকল তাই। গুরু কাণে মন্ত্র দিলেন ; সেই মন্ত্রের মধ্যে একটি ইষ্ট আছেন। এখন সেই মন্ত্রে সাধন, ভজন, ধ্যান, জপ ইত্যাদি তাপ দিতে দিতে, তার ভিতর থেকে শাবকরূপ ইষ্ট-মূৰ্ত্তি বেরিয়ে পড়েন। যখন ইষ্ট বেরুলেন, তখন আৰু গুরু নাই। ছানাটি বেরুলে, ডিমটি আর থাকে না।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। পা। যদি গুরু,ইষ্ট আলাদা, তবে আপনারা পরমহংসদেবকে কি মনে করেন ? ভ। এখানে একাধারেই গুরু-ইষ্ট। যত দিন ধরা না দিয়ে খেলা করেন, তত দিন গুরু; যখন ধরা দেন, তখন ইষ্ট। ওখানে যেমন ইষ্ট পেলে আর গুরুরূপ থাকে না, এখানে সেরূপ নয়, ইষ্ট পেলেও রামকৃষ্ণরূপ থাকে। । পা। গুরু কাকে বলে ? গুরু এক, গুরু সেই ভগবান্। ভগবান্ ভিন্ন গুরুপদ- বাচ্য আর কেউ নয়। তবে এই গুরু লাভ করবার জন্য পথে যে সকল উপদেষ্টা পাওয়া যায়, তাহাদিগকে উপগুরু বলে। এই উপগুরুর মধ্যে মানুষই যে থাকেন, এমন কথা নয়, পশুও থাকতে পারে, পাখীও থাকতে পারে, বৃক্ষ লতাও থাকতে পারে, আবার দেব-দেবীও থাকতে পারেন। পথে, এদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে, কিন্তু গুরু যখন পাওয়া যায়, তখন আর বড় সম্পর্ক থাকে । তখন গুরু আর শিষ্য। উপগুরুতে কত দিন সম্পর্ক থাকে আর কখন বড় থাকে না, তার একটা উপমা দিয়ে তােমাকে, বলি শুন। একটি বরের যখন সম্বন্ধ হয়, তখন যে গ্রামে বিয়ে হবে, হয় ত সেই গ্রামের একটি অন্য কোন জেতের মেয়ে কি পুরুষ প্রথমে কথা আরম্ভ করে, তাকে দেখে, বর তখন এই ভেবে মনে মনে আদর করে যে, যে গায়ে আমার বিয়ে হবে, সেই গায়ে এর ঘর। তার পর দেখা-শুনার জন্য প্রতিবাসীরা আসে। বর তখন প্রথম ঘটক বা ঘটকীকে ছেড়ে দিয়ে প্রতি- বানীদিগকে এই ভেবে মনে মনে আদর করে যে, যাদের ঘরে বিয়ে হবে, এরা তাদের প্রতিবাসী। তার পর যখন পাকা এ } শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। দেখবার আবশ্যক হয়, তখন—হয় কনের বাপ, কি খুড়াে, কি মাশা, কি ভাই, এদের মত লােকের আসার প্রয়ােজন হয়। তখন বর, প্রতিবাসীকে ছেড়ে ক’নের বাপ, কি মামা, কি ভাই, এদিগে চিনে। বিয়ে হয়ে গেলে, সব ছেড়ে যায়, থাকে বর আর কনে। এখানেও ঠিক সেই রকম, গুরু পেলে আর বড় কেউ থাকে না তখন কেবল গুরু আর চেলা। রামকৃষ্ণজী বলেন, গুরু ঘটক। নায়ক-নায়িকার সম্মিলন- কাজে যেমন একজন ঘটকের আবশ্যক, ভগবানে ও জীবে মিলনের জন্য তেমনি গুরুর দরকার। এই গুরু রামকৃষ্ণজী। তােমরা শুনেছ, তিনি কৃপা করে একবার ছুয়ে দিলেই, লােক আপনার গুরু তার ভিতরে দেখতে পেতেন। ভগবান্ হলে, কার সাধ্য ভগবান্ দিতে পারে? তিনি আপনি ছুয়ে, শক্তি দিয়ে আপনাকে দেখিয়ে দিতেন। রামকৃষ্ণজী কেমন গুরু তােমাকে সংক্ষেপে বলি, শুন,- রামকৃষ্ণজীকে কেউ একবার ধরে, তার পর যদি সে ছেড়ে দেয়, তিনি আর ছাড়েন না সে ভুললে তিনি আর ভুলেন জা, সে টললে তিনি আর টলেন না। রামকৃষ্ণজীকে বন্ধু বলে একবার বাঁধন দিয়ে, কেউ যদি খেলে, তিনি আর খােলেন না। রামকৃষ্ণজীর সঙ্গে একবার যার ছোঁয়াছেই হয়ে গেছে,তিনি যে আবার সকের বাজারে কামিনীকাঞ্চনের বেসাৎ করবেন, সে পথে একবারে কাটা। রামকৃষ্ণজীর ভাবাবেশের আশাবাণী-আমি যাকে ধরবে, তাকে নিজের বরণ ধরিয়ে ছাড়বে। কাচপােকা আরসুলাকে ধৰলে, আরসুলার কাচপােকার বর্ণ হয়। ; L

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
.
তঁার আর একটি ভাবাবেশের কথা—আমি জাত-সাপ,
যাকে একবার ভােলাবাে, তাকে তিন ডাকের বেশী আর
ডাতে হবে না।
রামকৃষ্ণজী যার গুরু হন, তার আর কোন কর্ম নাই।
কেবল বগল বাজিয়ে দুহাত তুলে প্রাণ ছেড়ে ফুর্তি করাই তার
কাজ। তার জন্য তরী ঘাটে বাঁধা। সদা-সর্বদা চোখের
উপর সে, ঘাটও দেখতে পাচ্ছে, তরীও দেখতে পাচ্ছে, আর
কাণ্ডারীকেও দেখতে পাচ্ছে। সে আপনার মনে, মনের
মতন খেলে বেড়ায়। মনে জানে, যখন মন যাবে, তখন পার
•হয়ে চলে যাব। সে সংসারে খেলতে ভয় করে না। আগে
চোক মুদে খেলে অনেকবার পড়েছে, এখন চোক চেয়ে খেলতে
শিখেছে। আগে সংসার ধোঁকার টঠি ছিল, এখন সংসার
তার মজার কুঠী হয়েছে।
তােমরাও ত এখন কিছু বুঝতে পেরেছ। চোখ মেলে
দেখ রামকৃষ্ণজী কি! তিনি শুধু তােমার আমার গুরু নন,
তিনি জগদ্গুরু। রামকৃষ্ণজী চাঁদা মামা—সকলেরই সমান।
পা এা, রামকৃষ্ণজী সাক্ষাৎ ঈশ্বর! ঈশ্বর-দর্শনের ফল
কি ?
ভ। পরমহংসদেবের মহা বিশ্বাসী ভক্ত, তােমাদের গিরিশ
বাবু, যার মতন কবি ও নাট্যকার এখন আর দেখতে পাই না,
তিনি একখানি গ্রন্থে লিখেছেন, “কৃষ্ণ-দর্শনের ফল—ফষ্ণ-দর্শন।
আমিও তাই বুঝি।
পা। এটি বড় আশা-ভরসার কথা, আমরা কি আয়
ভগবানকে রামকৃষ্ণরূপে দেখতে পাব?

৩০ { শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ভ। নিশ্চয় পাবে। দেখবার জন্য ব্যাকুল হলেই দেখতে পাবে। তার বিগ্রহরূপটিও দেখতে পাবে, তা ছাড়া আরও রূপ আছে, তাও দেখতে পাবে। তিনি রূপের সাগর, তার অনেক রূপ আছে। পা। আমরা রামকৃষ্ণজীর মহাসমাধির কথা শুনেছি। তার শ্ৰীঅস্থি কলসীমধ্যে যে দিন কাঁকুড়গাছিতে রামবাবুর বাগানে সমাধি দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, সে দিন আমরাও ত ছিলেম। সে দেহ ত নষ্ট হয়ে গেছে, আবার কি করে দেখতে পাব? ভ। ভাই, তুমি রামকৃষ্ণজীকে মনুষ্য জ্ঞান করে কথা বছে। তােমাকে বার বার বলেছি যে, তিনি ঈশ্বর। রাম- কৃষ্ণরূপ তার বিগ্ৰহরূপ। তার দেহ পাঞ্চভৌতিক হয়েও পাঞ্চ- ভৌতিক নয়। রামকৃষ্ণজীর দেহ চিন্ময় দেহ। দেহখানি চৈতন্যের জমাট বাঁধা। দেহের অণু-পরমাণু চৈতন্যময়, তা আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। তার নলীলা অবসান হয়েছে বটে, কিন্তু দেহ অবসান হয় নাই। বিহু-বিলাসের দেহ কখনও নষ্ট হবার নয়। ভগবান্ ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু, ভক্তদের বাসনা পূর্ণ করবার জন্য বিগ্রহরূপ ধরেন আর সেই বিগ্রহরূপ তিনি কখনও নষ্ট করেন না ও সেরূপ করবার তার অধিকারও নাই। ভগবানের বিগ্রহরূপ ভগবানের নয়, সেটিভক্তদের। ' তােমার সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য পরমহংসদেবের একটি ভক্তের কথা বলি, শুন। "ভক্তটির নাম শ্রীদুর্গাচরণ। ইনি ঠাকুরের লীলাবসানে অত্যন্ত অধৈৰ্য্য হয়ে পড়েন। অন্ন-জল ত্যাগ। তিন চারি দিন উপবাসের পর নরেন্দ্রজী খবর পান। ' শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। নরেন্দ্রজীর অতি কোমল হৃদয়, দুর্গাচরণের বাসায় গিয়ে দেখেন যে, তিনি মৃতপ্রায় পড়ে আছেন। নরেন্দ্রজী তাকে খাওয়াবার জন্য অনেক চেষ্টা পান, কিন্তু কৃতকাৰ্য্য হতে পারলেন না। তখন তিনি বলেন, আমাকে কিছু খেতে দাও। দুর্গাচরণ অমনি দোকান থেকে একঠোঙ্গা খাবার এনে দিলেন। নরেন্দ্রজী যে কচুরিটি, কি যে গজাটি এক কামড় খেয়ে তার হাতে দেন, তিনি সেইটিখান। নরেন্দ্রজীর উদর পূর্ণ ছিল, কত খাবেন ! অবশিষ্ট খাবারগুলি দুর্গাচরণকে খাবার জন্য তাঁর হাতে দিলেন। তিনি “হায় রে পােড় কপাল” এই কথাটি বলতে বন্ধুতে ঠোঙ্গার খাবারগুলি দ্রুতপদে গঙ্গার জলে ফেলে দিলেন। পরদিন প্রতিবাসীরা অনেক জিদ ও ধরাবাঁধা করে তাকে ভাত বসান করালেন, ভাত যখন ফুটে এলাে, তখন দুর্গাচরণ একটা চেলা-কাঠ দিয়ে ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ি ভেঙ্গে দিলেন, আর এই বলে কাঁদতে লাগলেন, “হায় রে, আমার তেমন ঠাকুর চলে গেলেন,আর আমি ভাত খাব’?” ঠাকুর দুর্গা- চরণকে নাছােড়বান্দা দেখে,তাকে দেখা দিলেন,তার পর তিনি রেধে ভাত খান। পা। আহা! ঠাকুরের কথা যেমন মিষ্টি, ঠাকুরের ভক্ত- দের কথাও তেমি মিষ্টি। রামকৃষ্ণজীর ভক্তদের কথা আরও কিছু বলুন না মশায়। ভ। তােমার জিজ্ঞাস্য শুনে আমারও খুব আনন্দ হলাে। রামকৃষ্ণজীর এমন একটি কৃপা তােমার ভিতরে আছে যে, তাঁর লীলা-কৃথা তােমাকে বল্‌তে বল্‌তে আমার হৃদয়েও ফোয়ারা উঠছে; যা জানি না,তাও ঠাকুর জানিয়ে দিচ্ছেন। তােমার মত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। . লীলাতত্ত্ব-পিপাসূর সঙ্গ পেয়ে আমিও ধন্য হলাম। রামকৃষ্ণজীর ভক্তদের কথা অতি মধুর, আবার জীবশিক্ষার জন্য তাঁদের সঙ্গে ঠাকুর যে সকল খেলা করেছেন,সে আরও মধুর। শুনলে পাষাণে জল ঝরে, মরা গাছে মঞ্জরী উঠে, অতি বদ্ধজীবেরও চৈতন্য হয়, ভক্তি হয়, তাদের ভবসাগর পার হবার সম্বল হয়। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ- পুঁথিতে ও তাহার সম্বন্ধীয় বিবিধ গ্রন্থাদিতে এ সব কথা আছে। সেই সমস্ত গ্রন্থ দেখলে সকল খবর জানতে পারবে। পা। আচ্ছা মশায়, তবে এইখানেরই কথাই বলুন। আপনি যে বল্লেন, রামকৃষ্ণজীর রামকৃষ্ণরূপ ছাড়া আরও রূপ আছে, সে কি রকম? তিনি কিরূপেই বা রূপের সাগর হলেন? ভ। রামকৃষ্ণরূপটি আমাদের প্রিয় রূপ। এইটি তার বিগ্রহ রূপ, আর একটি বিরাট রূপ আছে। তার নিরাকার ভাবও আছে। আবার তিনি বলেছেন, সাকার নিরাকার ছাড়া ভগ- বানের আরও একটি অবস্থা আছে। ভক্তেরা তাঁর বিগ্রহরূপ ভিন্য অন্য রূপ দেখতে চান না, কিন্তু তিনি কিছু কিছু না দেখিয়ে ছাড়েন না। পা। বিগ্ৰহৰূপ রামকৃষ্ণরূপ বুঝলাম, আর আমরা ঐটিই দেখেছি,—বিরাট রূপ আবার কেমন ? ভ। এই জীব-জগৎ নিয়ে যে রূপটি রামকৃষ্ণজীর বিরাটুরূপ। সেই বিগ্রহরূপধারী জগদ্গুরু রামকৃষ্ণজী বিরাটে বহু হয়েছেন । স্থাবর, জাম, বৃক্ষ, লতা, গিরি, নদী, অনিল, অনল আর যাবতীয় প্রাণী যা দেখেছ যা শুনেছ সেই সব তিনি হয়েছেন। তিনি সকলের ভিতরে বাহিরে রয়েছেন। তিনি ভিন্ন আর কেহই নাই, আর কিছুই নাই। যা কিছু আছে, তা সেই তিনি।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
পা। অদ্ভুত কথা!—আপনি কি শাস্ত্রের কথা বােলছেন
আর ঈশ্বরের জায়গায় রামকৃষ্ণ নামটি বসিয়ে দিয়ে, তার মহিমা,
অযথাভাবে ব’লছেন? না—যা দেখছেন, তাই বলছেন?
ভ। রামকৃষ্ণজীর অপার মহিমা—রামকৃষ্ণজী ঈশ্বর, তিনি
সর্বেশ্বর, রাজরাজেশ্বর। তুমি শাস্ত্রের কথা বলে মনে
করছে ! আমি, শাস্ত্র কাকে বলে, তার নাম-গন্ধও জানি না।
এমন কি রামায়ণ, মহাভারত, যা দোকানী-
পরীতে জানে ও
পাঠ করে, আমি এই বয়স লাগাৎ তাও জানি না ও কখন
পাঠও করি নাই। আমার ত্রিশ বৎসর যখন বয়স, তখন রাম
কৃষ্ণজীর দর্শন লাভ করি, তখন পর্যন্ত আমি জান্তাম না যে,
কুরুপাণ্ডব রামায়ণে আছে কি মহাভারতে আছে। একদিন
রামকৃষ্ণজী আমাকে বললেন-গা, তুমি কি ব্রাহ্ম ? আমি
সে কথার কিছু জবাব দিতে পারলাম না। তখন পর্যন্ত আমি
জানি না যে, ব্রাহ্ম কাকে বলে, শাক্ত কাকে বলে, শৈব কাকে
বলে ; ভগবান্ কাকে বলে—আমি তাও জানি না। তিনি
আছেন কি-না—তাও জানি না, আর সে বিষয়ে কখন ভাবিও
না। তবে পরমহংসদেবকে দর্শন করবার এক বৎসর পূর্বে
পাড়াগাঁয়ে গুরুতে কাণে কৃষ্ণমন্ত্র দিয়াছেন—যখন মন্ত্র দিলেন,
তখন গুরুকে বললাম, এই যে বার বার মন্ত্র বল্লাম, কৈ,
কৃষ্ণকে ত দেখতে পাচ্ছি না। তিনি বললেন-সে কি তুমি
পারবে—পুরশ্চরণ করতে হয়—আর কত কি করতে হয় ।
তুমি গঙ্গাতীরে থাক, স্নানের পর বারাে বার মাত্র জপ করাে।
আমি কথা শুনে কেমন হয়ে গেলুম। সেই দিন থেকে কিসে
কৃষ্ণকে দেখতে পাই, কৃষ্ণের সঙ্গে খেলা করতে পাই; কৃষ্ণের
•
৭

৩ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। সঙ্গে একসঙ্গে গুড় রুটী খেতে পাই, এর জন্য প্রাণে ব্যাকুলত। উঠলাে। কৃষ্ণ যে ভগবান্‌-এ মনে করে নয়, কৃষ্ণ যে পারের কাণ্ডারী-এ মনে করে নয় ; তবে কৃষ্ণকে, কৃষ্ণ মনে করে। কৃষ্ণ বেশ দেখতে,এই মনে করে। তার হাত থেকে বাঁশীটি কেড়ে নিয়ে, তাকে কঁদাব, এই মনে করে ; তার, ননীর দেহটি দেখবাে, এই মনে করে—তাকে কোলে করে বেড়াব’ এই মনে করে ; ফুল দিয়ে তাকে সাজাব” এই মনে করে। গুড় রুটী আমার প্রিয় জিনিস, তাই তৈয়ার করে, তাকে সঙ্গে নিয়ে খাবাে, এই মনে করে—আর কত কি, তােমায় কত ব’বাে ! তখন আমাকে গয়লা বলে মনে ভাবতুম—কেউ যদি বলত, আমি বৃন্দাবন থেকে এলাম--আমি ব্রজবাসী—আমি অম্নি তাকে বলতাম, কানাই কেমন আছে? কখন কখন আমি ব্ৰজ- বাসীর মত আপনার মনে মনে হিন্দি ও বাঙ্গলা মিশিয়ে কথা কইতাম। তখন কানাইয়ের গান বাঁধতাম, আবার ব্রজবুলীতে গান বাঁধতাম। এখন আমি রামকৃষ্ণজীর কাছে এসে পড়েছি—রামকৃষ্ণজীর কাছে আসাতে এই বাই বেশী চেগে উঠলো ? রামকৃষ্ণজীকে তিন দিন দর্শন করেই আমি পাকা বুঝলাম যে, যদি কেউ কৃষ্ণ দেখাতে পারেন, তা হলে ইনিই পারেন, আর কেউ পারে না। এ সময় আমি মোটেই জানি যে, সেই কৃষ্ণ --এই রামকৃষ্ণজী। এখন কৃষ্ণের সম্বন্ধে কেমন জ্ঞান জান?--কৃষ্ণ যে মধুর রসের রসিক--তা জানি না; কৃষ্ণ যে পাণ্ডবের রথের সারথি—তা জানি না ; কৃষ্ণ যে কংসবধ করেছেন---তা জানি না ; কৃষ্ণ যে প্রভাসযজ্ঞের কর্তা- জানি মা ; কৃষ্ণ যে দ্বারকালীলা করেছেন---তা জানি না; -

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
জানি-কানাই যশােদার নীলমণি—জানি-কানাই রাখালদের
সঙ্গী, বাঁশী বাজায়, ননী চুরি করে খায়, গােচারণে যায় ।
গােকুলে সবাই তাকে প্রাণের চেয়েও ভালবাসে, রাই আরও
ভালবাসে, সে বড় সুন্দর—আমি এই সকল জানি। একটা
গান বলি শুন, তা হােলেই ভাবটা বুঝতে পারবে।
যাওয়ে বৃন্দাবনকি চাদ, যাওয়ে গােঠবিহারী।
যাওয়ে প্যারী-মােহনীয়া, যাওয়ে বনওয়ারী।
অলকা-তিলকা-শােভিত ভাল, শােভয়ে গলে বনশাল,
জড়িত বাস তড়িত জাল, গোপীগণ মনােহারী।
মােহনীয়া চূড়া পাখড়ি শিরে, হেলত দুলত পবনভরে,
আঁখি না পালটি রহ, দূরে, নিরখে গােপনারী।
চরণে নূপুর রুনুঝুনু বাজে, হাসত নাচত রাখালমাঝে,
চন্দ্রমা যে তারকামাঝে, ঝলকে কিরণ ডারি।
আগে আগে সব চলত ধেনু, চলত পিছুই বাজাই বেণু,
কবহি হাম পাওয়ে কানু, মােহন মুরলীধারী।
আমার শাস্ত্রজ্ঞানের কথা বােলতে বােলতে কোথায় এসে
পড়েছি।
পা। এটা ভারি রগড়ের কথা-বলুন, এতে রামকৃষ্ণজীর
জ্বলন্ত মহিমা দেখতে পাচ্ছি।
ভ। আমি পরমহংসদেবকে একদিনও কোন কথা বলি
নাই বা কিছু জিজ্ঞাসাও করি নাই, তবে এইটি জান্তাম যে,
তিনি যার বুকে হাত দেন, সে তখনি বাহজ্ঞানশূন্য হয়ে যায়,
আর ঐ অবস্থায় সে কৃষ্ণ দেখতে পায়। আমি ঐ আশায়
তার কাছে যেতে লাগলাম—শুধু যে ঐ আশাটিতে, তাও নয়,

৩৬
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
তাকে দেখলে কেমন কেমন হতুম, তাই যেতুম, আর মনে মনে
কতুম, কবে কৃপা করে আমার বুকে হাত দেবেন। কত দিন
গেল, তিনি আর বুকে হাত দেন না। আমি আশা করে যাই
আর নিরাশ হয়ে কাদতে কাদতে ফিরে আসি। জীবনে
মােটে দুটি কথা তাকে বলেছিলুম। একবার একদিন তাকে
নির্জনে খেয়ে বলেছিলুম, ঠাকুর, আমি বড় কাণা। তাতে তিনি
জবাব দিলেন, ঈশ্বর আছেন। আর একদিন তাকে বােলে
ছিলুম যে ঠাকুর—আপনি আমার ছোঁয়া কুলফী খেলেন না-
আমি বড় অপরাধী। তাতে তিনি মুচকি হেসে বললেন,
তুমি যদি দুপুর বেলায় কুফী আতে, তা হলে খেতুম'; ঠাণ্ডা
জিনিস রেতের বেলায় খেলে অসুখ হবে, তাই খাই নাই।
আমার সঙ্গে ঠাকুর যে রকম ব্যবহার করতেন, এমন যদি অন্য
কোন লােকের সঙ্গে হতাে, তা হলে সে প্রাণ গেলেও আর
তার কাছে যেতাে না। কত লােকে পায়ে হাত বুলাচ্ছে আর
আমি হাত বাড়ালেই, অনি “হয়েছে হয়েছে বলে, পা গুটিয়ে
নিতেন। কখন কখন পদ-রজ নিতে গেলে পেছিয়ে চলে যেতেন
আরব’তেন“হয়েছে,হ’য়েছে।”তিনি যে,এত তত্ত্ব-কথা বলতেন,
আমি তার কিছুই বুঝতে পারতাম না, একধারে চুপ করে
বসে থাকতাম, আর তাকে খালি দেখতাম। আমার বাপকে
আমি যেমন ভয় করতাম, ঠাকুরকেও তেমনি ভয় করতাম।
আমার বাপের মুখের আদল ঠাকুরের মুখে দেখতে পেতুম ও
এখনও পাই। তােমাকে কত ব’বাে, অনেক কথা। আমার
শাস্ত্র-রামকৃষ্ণজী; আমার জ্ঞান-রামকৃষ্ণজী। শাস্ত্র দেখার
মধ্যে রামকৃষ্ণজীকে দেখা। আমি যা বলছি--যা তিনি দেখাচ্ছেন
****

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। তাই বেলছি। আমি কারও জায়গায় রামকৃষ্ণজীকে বসাই নাই। আমি রামকৃষ্ণজীর জায়গায় রামকৃষ্ণজীকেই বসাচ্ছি। আমি যা দেখছি, তাই বােছি। পা। আপনি রামকৃষ্ণজীকে সকলের ভিতর দেখছেন- অদ্ভুত কথা ! তিনিই যদি প্রত্যেক বস্তু এবং প্রত্যেক জীব হয়েছেন, তা হলে সেই প্রত্যেক বস্তু বা জীবের ভিতর রাম- কৃষ্ণজী কেমন ভাবে আছেন ?-অংশ কি পূর্ণ? ভ। বড় অক্ষর না পড়তে শিখলে, যেমন ছােট অক্ষর পড়া যায় না, তেমনি আগে বিগ্রহরূপ না বুঝতে পাল্লে বিরাটুরূপ বুঝা যায় না। আমি যেমন দেখছি, বলি, শুন; অগণ্য রকমের ছোট বড় পাত্র যদি সাগরের জলে ডুবিয়ে রাখা যায়, তা হলে প্রত্যেক পাত্রের ভিতরে সাগর যেমন ভাবে থাকে, তেমনি রামকৃষ্ণজীকে আমি প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে দেখছি। এতে পূর্ণ কি অংশ, বুঝে নাও। তবে এই যে ছােট বড় পাত্র দেখছে, কোনটায় কম জল ধরে, কোনটায় বেশী জল ধরে, সে শক্তির খেলা মাত্র। পা। যদি প্রত্যেক ঘটে অর্থাৎ জীবে সেই সাগরের জল, তবে জীবের মধ্যে ভাল, মন্দ, সৎ, অসৎ ইত্যাদি এত রকমারি সে গুণের জন্য। রামকৃষ্ণজীর কথা-জল মাত্রই নারা- সে মণ। তবে এই জল নানা রকমের। কোন জলে খালি হাত- পা ধােওয়া চলে, কোন জলে স্নান করা চলে, কোন জল এমন পবিত্র যে, তার বিন্দু-পানে কি স্পর্শে জন্ম-জন্মান্তরের পাপ যায়—আবার এমন জল আছে, যাকে ছোঁয়াও যায় না। এই ও ; ৬ শশীরামকৃষ্ণ মামা। রকম, রাম সব ঘটে রয়েছেন ,কোথাও সাধু রাম, কোথাও লম্পট রাম, কোথাও চোর রাম। কোন রামকে নিয়ে আদর করতে হয়, কোন রামকে দূরে রেখে চলতে হয়। রামকৃষ্ণজীর অপর উপমা-সেই শ্যামা, কোথাও খাড়া ধরে শ্রীমন্দিরে ; কোথাও বৌ হয়ে কোণে ঘােমটা দিয়ে বসে, আর কোপ্পাও বারাণ্ডায় হুকো হাতে করে রয়েছেন। “সৰ্বঘটে বিরাজ করে, ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।” যত দিন না রামকৃষ্ণজীর কৃপা হয়, তত দিন এই যে শক্তির খেলা, এ সব কিছুই বুঝা য়ায় না। পা। ভগবান্ যখন সকল হয়েছেন, তার তিনি চৈতন্যস্বরূপ, তখন পাহাড়, পাষাণ প্রভৃতি জড়ের মধ্যে চৈতন্যের খেলা কৈ ? জীবের দেহখানি জড় বটে, কিন্তু ক্রিয়ায় তার মধ্যে চৈতন্যের খেলা দেখতে পাওয়া যায়। ভ। দুধকে দই, ক্ষীর, ননী, ঘি প্রভৃতি যে কোন অবস্থায় পরিণত কর না কেন, সকলের মধ্যেই যেমন সেই দুধ বা প্রত্যেকটিই যেমন সেই দুধের অন্যবিধ অবস্থা, তেমনি এক মূল চৈতন্যস্বরূপ ভগবান্ থেকে যা কিছু হয়েছে, সে সকলের মধ্যেই তিনি বা প্রত্যেকটি সেই চৈতন্যের অষ্টবিধ অবস্থা। তিনিই আধার, তিনিই আধেয়। স্থূলাবস্থাতে শরীরের উপাদান হয়ে দেহ হয়েছেন, আর সূক্ষ্মভাবে দেহী বা আত্মা হয়েছেন। দিকে যেমন সৃষ্টিতে চৈতন্যের অতি সূক্ষ্মাবস্থা মহাকাশ ; মহা কাশের স্থল-আকাশ ; আকাশের স্কুল—তেজ ; তেজের স্কুল- মরুৎ ; মরুতের স্কুলজল ও জলের স্কুল-ক্ষিতি; তেমনি জীবের শরীর সম্বন্ধে পরমাত্মা সুম্মাবস্থা, তার স্কুল জীবাত্মা, জীবাত্মার শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। স্থূল, মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার, তার স্কুল পাঞ্চভৌতিক দেহ। মায়ার অদ্ভুত খেলা। পা। এই বল্লেন, ভগবানের খেলা, আবার মায়ার খেলা বােছেন? মায়া শুনেছি ভুল, অনিত্য, ঐন্দ্রজালিক মাত্র। ভ। মন আঁদির অতীত অতি সুক্ষ্মতম চৈতন্যস্বরূপ ভগবান্ যে শক্তিতে এত স্কুল হয়ে এই জীব-জগৎরূপে পরিণত হয়েন, সেই শক্তির নাম মায়া। ভগবান্ যেমন সত্য ও নিত্য, তার মায়াও তেমনি সত্য ও নিত্য। সত্য, নিত্য হ’তে যা জন্মে, তা কি কখন অসত্য ও অনিত্য হয়? এই মায়াশক্তিই লীলাশক্তি। এই শক্তির বলে তিনি লীলা করেন। মায়াশক্তি ঈশ্বরাধীন হয়েও ঈশ্বরের চেয়ে মায়ার মহিমা বেশী। মায়া-শক্তির খেলা না থাকলে, ঈশ্বরের সত্তা, ঈশ্বর ভিন্ন অর কাহারও উপলব্ধির উপায় নাই। লীলাশক্তির খেলা ব্যতীত সৃষ্টিই নাই অর্থাৎ এই জীব-জগৎ নাই। জীব না থাকলে ঈশ্বর থেকেও নাই। যেমন জন্মান্ধের পক্ষে পূর্ণিমার আলাে, তেমনি জীবের অস- ভাতে ঈশ্বরের সত্তা থেকেও নাই। মায়াশক্তি সৃষ্টি করে জীবের জননী হয়ে তিনি জীবকে আপনাকে দেখিয়ে দিয়ে, পরে ঈশ্বরকে দেখিয়ে দেন। যেমন দর্পণ-সহায়ে প্রতিচ্ছায়া দেখা যায়, সেইরূপ জীব মায়াতে সৃষ্ট হয়ে, সেই মায়ার সাহায্যেই ঈশ্বর দর্শন করে। মায়া পথ ছেড়ে ন' দিলে জীবের ঈশ্বর- দর্শন হয় না। মায়াশক্তি ইচ্ছাময়ী-লীলাময়ী, এক হয়ে আবার দুভাবে খেলা করেন। এক বিদ্যাশক্তি, আর একটি অবিদ্যাশক্তি। এক শক্তির মধ্যেরকম ভাব, সে কেমন জান’, রামকৃষ্ণজীর এ সম্বন্ধে ৪০ শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা । উপমা-বিড়ালের একই দাত, সেই দাতে আপনার ছেলেকে ধরে যখন নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়,তখন ছেলের ঘাড়ে মােটেই দাত লাগে না, কিন্তু সেই দাতে যখন ইঁদুর ধরে, তখন ইদুরের আর দুর্দশার সীমা থাকে না। সেই রকম যখন মায়া বিদ্যাশক্তির দ্বারা জীবকে ধরেন, তখন জীবকে ঈশ্বরের পথে নিয়ে যান, আর যখন অবিদ্যাশক্তির দ্বারা ধরেন, তখন জীবকে একবারে মুগ্ধ করে রাখেন ; হাতে পায়ে দড়ি বেঁধে সংসারে ফেলে দেন। লীলাশক্তির সহায়ে সেই এক রামকৃষ্ণজী কিরূপে জীব- জগৎ হয়ে বিরাটুরূপী হয়েছেন, তার কথা বল্লাম। আর তার নিরাকার অবস্থা, তিনি বলতেন যে, সে কি রকম,”তা মুখে বলা যায় না। সেখানে জীব-জগৎ নাই, সৃষ্টি নাই, সব উড়ে যায়। সেখানে তুমি যেমন শুনেছ, মায়া ভুল ও ঐন্দ্রজালিক, তাই। মায়া ভুল হয়েও সত্য, আর সত্য হয়েও ভুল, এ সম্বন্ধে পরমহংসদেবের একটি সুন্দর মীমাংসা আছে। তিনি বােলতেন, জীব-জগৎ যখন আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তখন কি করে মিথ্যা বােলে বলি ; আবার শঙ্করের যে মত, সে মতে জীব-জগৎ থাকে না। মীমাংসার কথা যেটি, সেটি এই “তও বটে, তাও বটে,”। ঈশ্বরীয় অবস্থার ইতি হয় না, ভগবান্ এইটি,, অপর কিছু নন বা হােতে পারেন না, এমন কথা বললে তার ইতি করা হয়, তাকে সীমাবদ্ধ করা হয়। তিনি সব হতে পারেন, তার সম্বন্ধে সব সম্ভব ; এই ঠাকুরের মীমাংসা। প। পরমহংসদেব এমন ঠাকুর! আচ্ছা, আপনি যে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ৪১ বলেন, রামকৃষ্ণজীই সেই রাম, সেই কৃষ্ণ,কৈ, তাদের মত ত কোন বেশ-ভূষা কি অলৌকিক কাৰ্য্য দেখতে পাই নাই ; আর লােকেও কেউ বলে না ; তবে তার জল্পনা প্রায় অনেক স্থানে আজকাল হচ্ছে বটে। ভ। তুমি এই কথা প্রথমেই বলেছিলে, আবার এখন বােলছে। রামকৃষ্ণজীর সম্বন্ধে এখনও তােমার সন্দেহ রয়েছে। তুমি তাকে প্রার্থনা কর, তিনি বুঝিয়ে দেবেন-দেখিয়ে দেবেন। একটা কথা মােটামুটি বলি, শুন। অবতার-বিশেষে রূপ- বিশেষ হয়। রাম-অবতারে রামরূপ, কৃষ্ণ-অবতারে কৃষ্ণরূপ, এবারে রামকৃষ্ণ অবতারে রামকৃষ্ণরূপ। সব অবতারে সমান বেশ হয় না ও সমান কাজও হয় না। অবতার দুই রকম। এক অবতার ভূভার-হরণের জন্য, সাধুদের পরিত্রাণের জন্য, আর দুষ্টদমনের জন্য। আর এক অবতার—তাকে আদর্শবতার বলে। এই অবতারের কাৰ্য্য-ধৰ্ম্ম-সংস্থাপন করা, জীবকে শিক্ষা দেওয়া, আর পতিতের উদ্ধার করা। আদশাবতারে ঐশ্বৰ্য ব্যক্ত থেকেও থাকে না; বেশ-ভূষার আড়ম্বর থেকেও থাকে কেবল মাধুৰ্য্য। আদর্শাবতার নিরৈশ্বৰ্য্যে ঐশ্বর্যবান্ ও অরূপে রূপবান্। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণপুথি এই সম্বন্ধে যা বলে, তােমাকে তা শুনাইশুন। ‘‘আরে অবিশ্বাসী মন কি কব তােমাকে। চিরকাল মগ্ন তুমি সন্দেহের পাঁকে। যদি না বিশ্বাস তোর, মাের কিবা ক্ষতি। মুই জানি প্রভু মাের অখিলের পতি। থাকে না ;

৪২
শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ-মহিমা।
এত পাতা নেতা পথে হৃদয়বিহারী।
সংসার-জলধি-জলে পারের কাণ্ডারী ।
রতন মাণিক মম প্রাণ বুদ্ধি বল।
সম্পদ-বিপদ-সখা, সহায় সম্বল।
ঐশ্বর্য দেখিয়া তত্ত্ব করিতে নির্ণয়।
তাের মত সন্দ যেন মাের নাহি হয় ।
হউন প্রভুদেব পূজারী ব্রাহ্মণ।
পর-গৃহবাসী কিংবা, পরান্নে পান ।
হয় হউন তিনি নিরক্ষর বেশ।
অরূপ অ গুণ কিবা উন্মত্ত অশেষ ।
হয় হউন, পঞ্চভূত-দেহধারী ।
দীন-হীন-দ্বিজ-সাজ; বালক-আচারী।
বসন-ভূষণহীন সামান্যের ন্যায়।
জীর্ণশীর্ণকলেবর বেদনা গলায় ।
মত কিছু থাক্ তঁায়, না করি বিচার।
ভজিব, পূজিব প্রভূ ঠাকুর আমার ।
চাহ তুমি বেশ-ভূষা ঐশ্বৰ্য্যদর্শন।
অঙ্গে কান্তি নবদূৰ্ব্বাদলের বরণ !
রতন কুণ্ডল কানে লম্বমান বেণী।
বিজড়িত মুকুটেতে নানা রত্নমণি।
পদে পদে অশ্ব গজ রথ শােভমান।
পৃষ্ঠদেশে তৃণ, করে ধরা ধনুর্বাণ ।
কনকরণ বামে সীতা ঠাকুরাণী।
হরধনু-ভঙ্গলব্ধ জনক-নন্দিনী।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
৪৩
আরে মন নিরৈশ্বৰ্য দেখে পেলি ধোঁকা।
সেই রাম এই রামকৃষ্ণরূপে ঢাকা ।
চাহ তুমি দেখিবারে, শিরে শিখি-পাখা।
শােভিত সুন্দর ভালে অলকা-তিলকা।
দুলু দুলু গজমতি অতুল নাসায়।
চন্দ্রমা-কিরণ জিনি কৌস্তুভ গলায় ।
নয়ন দুখানি বাঁকা আকর্ণ-পূরিত ।
কান্তিময় নীল তনু চন্দনে চর্চিত।
মনােহর পীতবাস জড়িত তড়িতে।
‘ভুবনমােহন বেণু ঠামে ধরা হাতে।
শ্রীরাধার প্রেমে বাঁকা ত্রিভঙ্গিম ঠাম ।
গােপীমন-বিরঞ্জন নটবর শ্যাম।।
দুলে গলে বনমালা আপদলম্বিত।
পীতধড়া গুঞ্জবেড়া অঙ্গে সুশােভিত।
কনক: নূপুর পায় রুনুঝুনু রব।
রকত উৎপল জিনি চরণ-সৌষ্ঠব ।
পায়ে পায়ে প্রস্ফুটিত কমল-আবলি।
মকরন্দ-গন্ধে ছুটে ঝাঁকে ঝাঁকে অলি ।
আরে মন নিরৈশ্বৰ্য্য দেখে পেলি ধোঁকা।
সেই কৃষ্ণ, এই রামকৃষ্ণ রূপে ঢাকা।
সেই রাম, সেই কৃষ্ণ, রামকৃষ্ণ সাজে।
লীলান্তরে রূপান্তর আপনার কাজে।
রূপান্তর মাত্র কিন্তু গুণান্তর নয়।
মহল্লীল প্রভুর সাক্ষী পরিচয় ৷

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
যখন যেরূপ সাজ হয় দরকার।
সে রূপে সে সাজে অবতীর্ণ অবতার ।
সমভাবে সেই শক্তি বিরাজিত কাৰ্য্যে।
ঐশ্বৰ্য্যবানেতে যেন, তেন নিরৈশ্বর্যে।
ভগবান্ যে রূপই ধরুন না কেন, তার সেই রূপে, তার সব
রূপ থাকে। দাতাকর্ণের ঘরে যখন বুড় থুরথুরে বামুন হয়ে
হাজির, তখন কি তার ভিতরে কৃষ্ণরূপ ছিল না? কৃষ্ণাবতারে
হকে রামরূপ দেখাতে হয়েছিল। রামকৃষ্ণজীও অনেক রূপ
অনেক ভক্তকে দেখিয়েছেন। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-পুথিতে ইহার
বিশেষ বর্ণনা আছে। রামকৃষ্ণরূপ ছাড়া রামকৃষ্ণভক্তে অন্য
রূপ দেখতে চান না। একবার ঠাকুর গিরিশ বাবুকে বললেন,
“তুই কিছু দেখবি ?” ভক্ত উত্তর করলেন “তুমি তার ভিতরে
থাকবে ত?” প্রভু বল্লেন, “আমি আবার তার ভিতরে কেন
থাববা?” ভক্ত বল্লেন, “তবে আমি দেখতে চাই না।” ভগবা-
নের অন্য রূপ দেখে ভগবানকে পরীক্ষা করে লওয়া অপেক্ষা
ভগবানে মন অবিশ্বাস আর কিছু নাই। তবে রামকৃষ্ণজী
সংশয়চিত্তের সংশয়-বিমােচনের জন্য অনেক পরীক্ষা দিয়াছেন
ও অনেক রূপ দেখিয়েছেন।
রামকৃষ্ণজীকে দর্শন কোরলে, সব অবতারকে দর্শন করা
হয়। তাকে বুঝলে যাবতীয় বেদ, বেদান্ত, পুরাণাদি ও জগতে
যত ধৰ্ম আছে, সকলেরই মৰ্ম্ম অবগত হতে পারে। রামকৃষ্ণজীর
দেহে সমস্ত জগৎব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিটি আছে।
অামরি কি মনােহর ;
সমাধিস্থ কলেবর ;
নিশাকর বদন-মণ্ডলে।
1

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ৪৫ অপরূপ শােভা পায়, কিরণ হিল্লোল তায়, ঝলকে ঝলকে যবে খেলে। নিরখি শ্রীমুখ-ইন্দু, অন্তরের প্রেমসিন্ধু । আধার ছাড়িয়া ছুটে যায়। তােড়ে ভাসে তার জলে, বহু দূর-দূরাঞ্চলে, দুই কূলে যে রহে যেথায় । কত পথ ছুটে ঢেউ, সন্ধান না জানে কেউ, বিধিরও বিধানে নাহি লেখা। মায়া ঈশ্বরের শক্তি, অদ্ভুত তাহার কীর্তি, লীলার ভিতরে আছে ঢাকা। কোথা সূৰ্য কত দুরে, কেমনে বিমানে করে, লবণাম্বু লইয়া সিন্ধুর । অলক্ষ্যে চালিয়ে কল, ফটিক-নিৰ্ম্মল জল, চাতকের তৃষা যাহে দূর। ধরায় জলধিমালা, শূন্যমার্গে করে খেলা, ধরিয়া জলদ নামান্তর। এ বড় বিষম দায়, কিছুই না বুঝা যায়, • কেবা কিবা কোথা কার ঘর। এক শক্তি মােটে মূলে, কাৰ্যেতে ভিয়ান তুলে, লক্ষ কোটি সৃষ্টি রকমারি । দুটি বস্তু সমরূপ, বিশ্বমধ্যে অপরূপ, শক্তির শকতি বলি হারি। একে নাহি মিলে অন্ত, সকলেই ভিন্ন ভিন্ন, তারে, গুণে, গঠনে, বরণে।

৪৬ শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। অবিনাশী যাবতীয়, নাহি কিছু শ্রেয়ঃ হেয়, রূপান্তর গুণান্তর বিনে। চতুর্মুখ হরি হর, যে শক্তির আজ্ঞাপর, হয়, লয়, যাহার ভিতরে। সেই শক্তি দিবানিশি, শ্রীপ্রভুদেবের দাসী, যুক্তকর লীলার আসরে | হেন প্রভু বিশ্বপতি, তাহার লীলার গতি, সাধ্য কার করে নিরূপণ । আকাশ মাটীর সনে, মিশে গেছে যেইখানে, সে নয় তাদের আয়তন । শ্রীপ্রভুর লীলা-রাজ্য, মহতী অব্যক্তাশ্চৰ্য্য, আদি অন্ত-বিহীন আভাস। অবিরত যুক্ত করে, যাবতীয় অবতারে, নিরাপদে মধ্যে করে বাস। রাজ-রাজ রামকৃষ্ণ, বিচারে সকলে তুষ্ট, বিবাদ-বিদ্বেষ-বিভঞ্জন। যার যাহা অধিকার, তিল নহে নষ্ট কার, সমভাবে সকলে পালন। গােকল বেদান্ত আদি, যেখানে যাবৎ বিধি- মত পথ ব্যক্ত চিরকাল। সকলে ধরিয়া বক্ষে, সমান যতনে রক্ষে, কৈলা প্রভু বিশ্ব ধৰ্ম্মপাল। রামকৃষ্ণজীর সব অলৌকিকত্ব। তাঁর গােটা জীবনটা অলৌকিকত্বে ভরা। তার লৌকিকত্ব কিছুই নাই। তার ।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। ৪৭ ক = কথা এখন পর্যন্তও কিছুই হয় নাই। আমি যখন লীলাকথা বােবে, তখন তেমমাকে দেখিয়ে দিয়ে যাবে যে, আজ পর্যন্ত অর্থাৎ রামকৃষ্ণজী অবতীর্ণ হবার পূর্বে যত অবতার হয়েছেন, আর তারা যা করেছেন, একা রামকৃষ্ণজী সেই সব করেছেন, আবার তার চেয়ে কিছু বেশী করেছেন। এখন কেবলমাত্র তােমাকে রামকৃষ্ণজীর দুই চারিটি উক্তিগীতা বছি মাত্র। এই উক্তিগীতা রামকৃষ্ণজীর মহামন্ত্র-বাক্য। এই উক্তি- গুলির ভিতরে রামকৃষ্ণজী বিশ্বজনীন ধৰ্ম্মের সার তত্ত্ব রেখে গেছেন। মাঘের হিমানী পরমাণুরূপে পড়ে, কিন্তু সেই হিমা নীরু এত"শক্তি যে পাষাণ জরিয়ে ফেলে, তেমনি রামকৃষ্ণজীর অতি সরল কথায় সরল গীতার ভিতর এমনি শক্তি নিহিত আছে যে, অতিবড় পাষাণচিত্ত-বদ্ধজীবে শুলেও তার অন্তরে অন্তরে, মজ্জায় মজ্জায়, শিরায় শিরায়, অস্থিতে অস্থিতে প্রবেশ করবে। একটি বিষয়কে নেড়ে চেড়ে না দেখলে বুঝা যায় না। পরম- হংসদেবের মহিমা যে এখনও এ দেশের লােকে দেখতে পান নাই ; তার কারণ, কেউ তাকে দেখেন নাই। তার মূৰ্ত্তিমা জলন্ত মহিমার মধ্যে থেকে, মহিমা দেখতে পাই নাই বলাও যা, আর হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দাড়িয়ে থেকে শীত লাগছে না বলাও তা। যাদের এমন স্থলেও শীত বােধ হচ্ছে না, দিগে বুঝতে হবে যে, তাদের শরীরে কিছু বিকার, জন্মেছে। একজন দীন-দুঃখী ব্রাহ্মণের ছেলে, নিরক্ষর কৈবর্তের ঠাকুরবাড়ীর পূজারী বামুন এমন সকল কথা বলে গেলেন, এমন একটি জীবন দেখিয়ে গেলেন যে, সেই কথার, সেই জীব- নের আভাস পেয়ে ভূমণ্ডলের চতুর্দিকের অতি উন্নতিশীল ৪৮ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। জাতির বড় বড় পণ্ডিত, বড় বড় বৈজ্ঞানিক, বড় বড় ধর্মতত্ত্ববিদ মহামান্যেরা মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বা অতি ভক্তিসহকারে তার লীলাস্থান অর্থাৎ কোন্‌খানে তিনি থাকতেন, কোত্থানে তিনি বসতেন, কোন্‌খানে তিনি শুতেন, কোন্ খানে কে তার বিষয় জানেন, কে তার সঙ্গে থাকতেন, সেই সব স্থানও লােককে দেখবার জন্য সাত সমুদ্র পার হয়ে দীন- ভাবে এখানে আছেন। রামকৃষ্ণজী যে গাছের তলায় বসে অগণ্য সাধন করে যাবতীয় ধর্মের গৃঢ়তত্ত্ব অবগত হয়েছেন, সেই গাছের পাতা, সেই সিদ্ধস্থানের মাটা কত হাজার হাজার লােকে আপন আপন দেশের আপন বাটীতে নিয়ে গিয়ে, গ্লাস্ কেসের ভিতর রেখে, আপনাকে পবিত্র মনে করছেন। যে দেশের লােকে হিন্দুদিগকে হীনবীৰ্য মনে করেন, পশু অপেক্ষাও নীচ মনে করেন, যে দেশের লােকেরা হিন্দুদিগকে পৌত্তলিক- ধর্মাবলম্বী বলে, মনে প্রাণে ঘৃণা করেন, যে দেশের লােকে বহু- কালাবধি পাদ্রী ধর্মোপদেষ্টা এ দেশে পাঠিয়ে দিয়ে হিন্দুদিগকে আলােয় নিয়ে যেতে ব্যবস্থা করেন, আজ সেই সেই দেশের উন্নতিশীল তত্ত্বপিপাসুরা রামকৃষ্ণজীকে যে ভক্তিপূর্বক পূজা করছেন, ইহা কি একটি অলৌকিক অপেক্ষা অলৌকিক নয় ? বিদেশীয় পণ্ডিতমণ্ডলীরা যখন পরমহংসদেবকে এরূপ পূজা, আরাধ্য ব’লে বুঝছেন, তখন এটা বুঝতে হবে যে, তঁারা পরম- হংসদেবের ভিতরে একটা কিছু নুতন আলাে দেখতে পেয়ে- ছেন। এখন জিজ্ঞাসা করি, বল দেখি, সকল দেশে সকল জাতিকে সকল ধর্মপন্থীকে, সকল তত্ত্বপিপাসুকে যিনি সমানভাবে আলো চালাে দেন, তিনি কে? অতি মুখকেও, চির-অন্ধকেও স্বীকার শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। তবে এই করতে হবে যে, তিনি জগদ্গুরু। সেই জগদ্গুরু রামকৃষ্ণজী। সেই চাঁদামামা রামকৃষ্ণজী। তিনি যে কি ধৰ্ম্ম দেখিয়ে গেলেন, যথাসাধ্য তা পরে বােল্বাে। রামকৃষ্ণজী যে রামকৃষ্ণজী হয়ে জগৎ মুগ্ধ করেছেন, এ কি তার মহিমা নয়? এখানের লোকে দেখতে যদি না পায়, তা হলে বলতে হবে, হয় তাদের চোক- কাণের বিকার ঘটেছে, কি বুদ্ধি বিগড়ে গেছেন কোনও কারণে দেখাশুনার পক্ষে একটা বাধা পড়েছে। হাজার হাজার লােকের চোক-কাণের, বুদ্ধির বিকার, এ কথা বলে আমার ছোেট মুখে বড় কথা বলা হয়। পর্যন্ত বাবার অধিকার আছে যে,যার রামকৃষ্ণজীকে দেখবেন, তঁারা যেন সরল প্রাণে, সাদা মনে ও সহজ বুদ্ধিতে দেখেন। যে বুদ্ধিতে মানুষ ভগবান্ গরিয়েছেন, যে বুদ্ধিতে পরনিন্দা পর- গ্লানিকে সৎজল্পনা বলে বুঝে রেখেছেন,যে বুদ্ধিতে অন্তরে দ্বেষ- হিংসার আগুন জেলে রেখে পরম শান্তিভােগ করছেন বলে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন, যে বুদ্ধিতে মিথ্যা, শঠতা, প্রবঞ্চনাকে ঠাই দিয়ে গজমতিহার পরেছি বলে বুঝে রেখেছেন, যে বুদ্ধিতে কামিনীকাঞ্চনের ক্রীতদাস হয়ে সমাজের গণ্যমান্য বৃ’লে বুঝে রেখেছেন, যে বুদ্ধিতে মনুষ্যত্বপদের বিনিময়ে পশুত্বপদে অভি। যিক্ত হয়ে আপনাকে গৌরবান্বিত বলে মনে করে রেখেছেন, যে বুদ্ধিতে প্রাণ ভরে একবার মা বলে ডাকতে পারেন না, এমন অসরল অপবিত্র, কূট, হীনবুদ্ধি নিয়ে, সেই সৎ অপেক্ষা সৎ, শুদ্ধাপেক্ষ' শুদ্ধ, পবিত্র অপেক্ষা পবিত্র রামকৃষ্ণজীকে দেখতে গেলে কি দেখবেন? দেখবেন, তিনি কৈবর্তের ঠাকুর- বাড়ীর পূজারি বামুন, এক জন পাগল, কতকগুলি রাপে ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। খেদূড়াননা ও মায়ে তাড়ানাে, সমাজচ্যুত, হেয়, মূখ , বকা লােকের গুরু, আর শেষে গলার পীড়ায় দেহ রাখলেন। আমি মানুষের চোক-কাণের বিকারের কথা বলুম। এখন কিসে বাধা দিয়েছে, তার কথা শুন। এক দিন দক্ষিণেশ্বরে গ্রীষ্ম : কালে পঞ্চবটীর শীতল ছায়ায় রামকৃষ্ণজীর কাছে, তার কতক গুলি ভক্ত বসে আছেন। নানা রকমের ঈশ্বরীয় কথা হচ্ছে, এমন সময় কথায় কথায় এড়েদহ, দক্ষিণেশ্বর ও বরাহনগরের লােক- দের কথা উঠলাে। ঠাকুরের উপর এদের জটিলা-কুটিলার ভাব ; তাই একটি ভক্ত কৌতূহলাক্রান্ত হয়ে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কত দূর-দূরান্তরের লােক এসে, এখানে শান্তিলাভ করে যাচ্ছেন, আর এরা আসেন না কেন? ঠাকুর মুখে কোন জবাব না দিয়ে, একটি গাই দড়াবাঁধা ছিল, সেই গাইটীকে দেখিয়ে দিলেন। গাইটী গঙ্গার গর্ভে চড়ায় দড়াবাঁধা ছিল এখন গঙ্গার জলের দিকে তাকিয়ে ছটফট করছে। গাইট দেখে কথার জবাব তখন কেউ বুঝতে পাল্লেন না। রামকৃষ্ণজীর কি মহিমা! এমন সময় আর চার পাঁচটী ছাড়া-গরু এসে গঙ্গার জলে নেমে গিয়ে ইচ্ছামত জল খেয়ে ডাঙ্গায় উঠলাে। তখন ঠাকুর বুঝিয়ে দিলেন যে, ঐ গাইটীর ভারি তৃষ্ণা পেয়েছে, কিন্তু বাঁধা রয়েছে, তাই এত কাছে জল, তবু খেতে পাচ্ছে না ; আর ঐ গরুগুলি ছাড়া ছিল, তাই তৃষ্ণা পাবামাত্র জল খেয়ে গেল। এখানকার লােকেরা বাঁধা আছে, তাই আসতে পারে না। ঠাকুর এ সম্বন্ধে আর একটা কথা বলতেন, লণ্ঠনের নীচে অন্ধকার থাকে—দুরে আলো পড়ে। সেই রকম মহাপুরুষদের

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
* * * * *
= ল + us
-
কাছের লােকেরা তাকে দেখতে পায় না, দূরের লােকেরা তার
ভাবে মুগ্ধ হয়। ঠাকুর আর একটী উপমা দিতেন, ব’তেন যে,
বাজ-বাটুলের বীচি তলায় পড়ে না, যোজনান্তর দূরে ছিটকে
পড়ে, আর সেখানে গাছ হয়। সেই রকম মহাপুরুষদের ভাব
দূরেতেই প্রকাশ পায় ও লােকে আদর করে।
শেষ কথা। জীব চার প্রকারের ;--নিত্যমুক্ত, মুক্ত, মুমুক্ষু
আর বদ্ধ। নিত্যমুক্ত আদতে মায়ার জালেই পড়ে না। মুক্ত জাল
কেটে পালায়। মুমুক্ষু কিসে জাল কাটতে পারে, তার চেষ্টা
করে আর বদ্ধ জালে পড়েছে, কিন্তু পালাবার মােটেই গা
নাই বরং কাদার ভিতর লুকুতে চায়! বদ্ধজীবের লক্ষণ
বদ্ধজীব কামিনী-কাঞ্চন বই যে আর কোন জিনিস আছে, তা
তার আক্কেলেই নাই। অর্থ উপায় করা, খাওয়া মাখা পরা,
আর বংশ বৃদ্ধি করা এইটাই সে জীবনের সার উদ্দেশ্য বুঝেছে।
ভূতে যেমন রাম নাম শুতে পারে না, বদ্ধজীবও তেমনি
ভগবানের কথায় কাণই পাবে না, বলবে—গুলে কি হবে ?
চল’, বরং খানিক ইয়ারকি দিয়ে আসি। কেউ বলে,-চল,ঘরের
কাজ-কর্ম দেখি,ওসব শোম্বার সময় আছে, সে বুড় বয়সে। এ
যাদের কথা, তারা ত বাপের ঠাকুর ; আবার কেউ কেউ এমন
কথা বলে, শুনলে প্রায়শ্চিত্ত কৰ্ত্তে হয়। বলে—কৃষ্ণ করেছিলেন,
তাই লীলা, আর আমরা করলেই বদমায়েসী। এ সকল
লােকের কাছে যদি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ চূড়া-ধড়া পােরে, হাতে বাঁশী
নিয়ে, রাইকে বামে কোরে এসে দাড়ান, তবু বিশ্বাস করবে না,
বরং বলবে,-“হ্যা গা ! তােমরা কোন্ থিয়েটারের বেশ
পােশাকগুলি করেছ ত।' অবতারে বিশ্বাস হওয়া বড় শক্ত।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ডাক্তার সরকার অত বড় লােক, তিনিই ঠাকুরের কাছে বলে- ছিলেন যে, যিনি চোরাবাণে বালীকে মেরেছেন; যিনি পাঁচ মাসের গর্ভবতী স্ত্রীকে বনে দিয়েছেন, এমন রামকে আমি ভগবান্ ব’লতে পারবাে না। আর একটা বাধার কথা বলি, শুন। এখনকার লােকে ভারি লেখাপড়া শিখে। সকলেই পণ্ডিত। অনেক পড়ে পাণ্ডিত্যা ভিমানে হৃদয়টী ভর্তি করে রেখেছে। বিদ্যাধ্যয়নে যিনি নিরহ- স্কার হন, তার অধ্যয়নই অধ্যয়ন, আর এই বিদ্যাধ্যয়নে অবি- দ্যার পা খােলে। বিদ্যার উদ্দেশ্যই তাই। বিদ্যায় মহা- বিদ্যাকে দেখিয়ে দেয়, কিন্তু যেখানে পাণ্ডিত্যাভিমান এসে জুটলাে, সেখানে আরও অবিদ্যার পঁাচ বেশী লাগলো। এই বিদ্যার অহঙ্কারে তার সর্বনাশ যে হয়েছে, এটা তাকে আর জাতে দেয় না। অহঙ্কারই একমাত্র ঈশ্বর-পথের কণ্টক। এই অহঙ্কারই মূর্তিমতী অবিদ্যা। অহঙ্কার অনেক রকমে হয়, কেবল সরস্বতীর করুণাতেই যে হয়, তা নয়, লক্ষ্মীর কৃপাতেও খুব হয়। আবার দুই বােনে এক জায়গায় যেখানে, সেখানের ত কথাই নাই। অহঙ্কার মানের হয়, কুলের হয়। অবিদ্যা নানাদিকে নানারঙ্গের ডুরি ছেড়েছেন, যাদিগে যেমনে পেয়েছেন, তাদিগে তেমনে বেঁধে কাবু করেছেন। পরমহংসদেবের পরীক্ষা দেবার কথা কি বল্লেন ? তার পরীক্ষা দেওয়া কি রকম ? সে অনেক কথা, আচ্ছা শুন ! দক্ষিণেশ্বরের রাণী রাসুমণির কালীবাড়ীতে পরমহংসদেবের ভ্রাতা রাণীর জেদে ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। মা-কালী-ভবতারিণীর নিত্য পূজা ও সেবায় ব্রতী হন। তখন পরমহংসদেব জ্যেষ্ঠের নিকটে মধ্যে মধ্যে থাকতেন। একদিন বেড়াচ্ছেন, এমন সময় রাণীর জামাই মথুরবাবু সেই জগমনাে- হন কান্তিমাখা কলেবর, ঈষৎ রক্তিধর, ঈষৎ বঙ্কিমনয়ন, বিশালবক্ষঃ, আজানুলম্বিত বাহু, বালার্কবৎ রাজকৃষ্ণজীকে দর্শন করে একেবারে মনে প্রাণে আকৃষ্ট হন। সােৎসাহে অপরের কাছে পরিচয় জিজ্ঞাসা করে জালেন, ইনি বড় ভট চাষ, মহা- শয়ের কনিষ্ঠ। মথুরবাবু কনিষ্ঠকে তার কাছে ডেকে আনতে ও মা-কালীর পূজায় ব্রতী করতে, জ্যেষ্ঠকে বিনয়-সম্ভাধে অনেক জিদ করেন। জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠের নিকট মথুরবাবুর অভি প্রায় প্রকাশ করায়, কনিষ্ঠ বল্লেন, আমি বড়মানুষের কাছে যেতে, কি পূজায় ব্রতী হতে পারবো না। মথুরবাবু যথাসাধ্য চেষ্টা করে অকৃতকার্য হয়ে দিনকত চুপ করে রইলেন। ঠাকুর-রামকৃষ্ণ ছেলেবেলা থেকে সুন্দর সুন্দর মাটীর দেব দেবীর প্রতিমূর্তি গড়তে জানেন। মৃন্ময় মূর্তিতে চক্ষুদান দেওয়া তার একটা বিশেষ মহিমা ও শক্তি ছিল। চক্ষুদানে মাটীর মূর্তি জীবন্ত বােধ হােত। দেশে, গ্রামে পূজোপলক্ষে প্রতিমা গড়া হলে আগেগদাই ঠাকুরকে দেখানাে হােতত। ঠাকুরের বাল্য নাম গদাই। তিনি প্রতিমার গঠন-দোষ দেখিয়ে দিতেন, কিন্তু চক্ষুদানটা, তিনি নিজে না দিলে কাহারও মনঃপূত হােত না। এখানে পুরীতে, তার ভাই যেখানে থাকেন, রামকৃষ্ণজী একটী গঙ্গামাটীর শিব ও একটা বৃষ গড়ে রেখে দিয়েছেন। ঘটনাক্রমে সেটী মথুরবাবুর চক্ষে পড়ে গেল। তিনি শিবটী ও ষাঁড়টা দেখ, ঠিক জীবন্ত বলে মনে করলেন এবং কে গড়েছে,

৫৪
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
তার খবরটী নিয়ে রাণীকে গিয়া দেখালেন,আর বল্লেন এটী যার
গড়া, তঁাকে যদি মা-কালীর পূজায় রাখা যায়, তা হােলে তিনি
শীঘ্র মা-কালীকে জাগ্রত কতে পারবেন। এই মনে করে
তিনি ঠাকুরের জ্যেষ্ঠকে বিশেষ অনুরােধ করলেন এবং বল্লেন,
আপনার ভাইকে মা-কালীর পূজায় রাখতেই হবে। বড় ভাই
বার বার জিদ করায়, ঠাকুর আর না বলতে পারলেন না।
বল্লেন, যদি হৃদুকে শুদ্ধ রাখা হয়, তা হােলে আমি থাকবাে।
মথুরবাবু সে কথা শুনে আনন্দে আটখানা হয়ে, ঠাকুরের আর
হৃদয়ের মাসিক বেতন ধার্য করে পূজায় নিযুক্ত করলেন।
মথুরবাবু মাঝে মাঝে ঠাকুরের কাছে ঈশ্বরীয় কথা শুনেন,
আর তার বীণা-বিনিন্দিত কণ্ঠের গান শুনেন। এই রকমে
কিছু দিন কেটে গেল।
ঠাকুর মা-কালীর বেশকারী হলেন। নিত্য নিত্য মা-কালীর
নূতন নূতন বেশ করেন। মথুরবাবু ও রাণী দেখে আশ্চর্য্য হন।
তারপর ঠাকুর-পূজার কাজ নিলেন। দিন দিন পূজা করতে
করতে তাঁর মনে রকম রকম ভাব উঠতে লাগলাে। মাঝে
মাঝে বাহ্য-জগৎ নেই বলে মনে হতে লাগলাে, আবার কখন
কখন নিজের শরীর পর্যন্ত ভুল বােধ হ’তে লাগলো। মনখানি
মায়ের পাছু পাছু ছােটে,আর রসনাটী আকুল হয়ে মা মা করে।
কখন কখন মা মা বলে এত কঁাদেন যে, চোখের জল মেঝেতে
পড়ে। কখন কখন মায়ের গায়ে কেবলই চার-ব্যজন করতে
থাকেন, আবার কখন মাখন মিছরি নিয়ে মা তুই খানা মা
এই বলে মা-কালীর মুখের কাছে ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন ।
কখন কখন পূজা করতে গিয়ে মায়ের পায়ে ফুল নাদিয়ে, আপ:

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। নার মাথায় দিয়ে বাহহারা হয়ে বসে থাকেন, কখন বা মা- কালীর নিশ্বাস পড়ছে কি না দেখবার জন্যে নাকের কাছে তুলে ধরেন। কোন দিন বা আরতির সময় কঁসির-ঘড়ী-বাদ্য শেষ গেলাে,নহবং নিস্তব্ধ হােলো,ঠাকুরের হাতের ঘন ঘন ঘণ্টা- রব ও পঞ্চপ্রদীপের চালনা আর থামে না। ঠাকুর যেন কলেব পুতুল। হৃদয়, ঠাকরেব আবেশ বুঝতে পেলে, তাঁকে ধরেন, আর ঠাকুর বাহহারা হয়ে যান। পুরীর বামুনরা মূচ্ছায়ােগ বুঝলেন। এত দিন, ঠাকুর মানুষের চোখে মানুষ ছিলেন, এইবার পাগল হলেন , সাধারণের প্রকৃতির সঙ্গে না মিলেই কাজেই পাগল। ক্রমে ঠাকুরের ভাব ----মহাভাব দিনের মধ্যে অনেকবার হতে লাগলো। পুবীর বামূনরা এখন পাকা, বুঝলেন যে, ঠাকুর মৃছা ও উদি-বােগ গও। ঠাকুর অকর্মণ বলে মথুরবাবুর কাছে বলতে লাগলাে। মথুরবাবু মনে মনে নানারকম ভাবেন, কিন্তু মুখে কিছু বল্‌তে সাহস করেন না। রামকৃষ্ণজীর মহিমা! এমন সময় পুরীতে এক ব্রাহ্মণী এসে জুটে গেলেন। এই ব্রাহ্মণী অদ্ভুত ক্ষমতাশালিনী। ভক্তি গ্রন্থ, পুরাণ, তন্ত্রাদি এর সব কণ্ঠস্থ। তান্ত্রিক মতে যাবতীয় সাধন- প্রণালী বিশেষ রকম জানেন। ঠাকুর ঐ ব্রাহ্মণীর কথা একবার বলেছিলেন যে, তিনি চতুর্বেমূৰ্তম তী। ব্রাহ্মী, ঠাকুরের অঙ্গে ভাব মহাভাব দেখেই, তাকে ভগবান্ বলে চিনতে পারলেন, আর পুরীতে ঐ কথা রাষ্ট করতে লাগলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণীর কথা প্রথমে কেউ গ্রাহ্য করলেন না। তার পর যখন শাস্ত্রের প্রমাণ দিয়ে, লম্বা চৌড়া শ্লোক আওড়াতে লাগলেন, তখন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। মথুরবাবুর চমক লাগলো। শাস্ত্রে ব্রাহ্মণীর বিলক্ষণ পারদর্শিতা দেখে মথুরবাবু অবাক হয়ে গেলেন; আর পরীক্ষা করার জন্যে বড় বড় পণ্ডিত এনে তার সঙ্গে বিচার করাতে লাগলেন। ব্রাহ্মণীর কণ্ঠে যেন সরস্বতীর আবির্ভাব হলাে, কোন পণ্ডিতই বিচারে হারাতে পারলেন না। শাস্ত্রে ভাব মহাভাবে যে সব লক্ষণ আছে, সেই সব বাক্য ও শাস্ত্রের প্রমাণ দিয়ে, আর পরমহংসদেবের মহাভাবের সময় তাঁর অঙ্গে সেই সব লক্ষণ দেখিয়ে দিয়ে ঠাকুরকে ভগবান্ বলে সাব্যস্ত করলেন। পণ্ডি- তেরা শাস্ত্রের উক্তিতে ও ঠাকুরের ভাবের লক্ষণে দেখলেন যে, সব মিলে যাচ্ছে, কিন্তু তবুও ঠাকুরকে ভগবান্ বলে স্বীকার করবেন না। পণ্ডিতদের পরাজয়ে, ব্রাহ্মণীর বাক্যে মথুর- বাবুর অনেক বিশ্বাস হােলদা ও ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি বাড়লাে, তখন তিনি মা-কালীর পূজা থেকে ঠাকুরকে মুক্তি দিয়ে—মাকালীর সেবার যেমন বন্দোবস্ত, তেমনি ঠাকুরের সেবার বন্দেজ করে দিয়ে নিজের বৈঠকখানায় দোতালার উপর তাকে রেখে দিলেন। হাজার হােল্ক মানুষের মন,তাই মথুরের মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। রাত্রিকালে পরমা সুন্দরী বেশ্যা এনে ঠাকুরের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করেন। পা। পরমহংসদেব বেশ্যা মাগীদের দেখে কি করতেন? ভ। শিশুমতি বালক নির্জনে হঠাৎ একটা ভয়ঙ্করী রাক্ষসী দেখলে যেমন মা মা করে, আর ভয়ে জড়সড় হয়,তেমনি ঠাকুর মা মা করে একেবারে বাহজ্ঞানশূন্য হয়ে যেতেন। পা। আর ঐ মাগীরা?

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ৫৭ ; P ভ। মাগীরা কেউ চীৎকার করে পালিয়ে যেতো, কেউ বা দাড়িয়ে দাড়িয়ে কঁদতে। মথুরবাবু বেশ্যা লাগিয়ে,একবার ঠাকু রের ভারি শক্ত পরীক্ষ, করেছিলেন। লছমীবাই বলে একটী বেশ্যা ছিল—সে মুনির মন টলাতে পারতাে। সে সুন্দরীও যেনি,তার ঘর-দুয়ার সাজসজ্জাও তেমনি; ঠিক যেন অগরী। মথুরবাবু একদিন তার সঙ্গে পরামর্শ করলেন যে, “তুমি অমুক দিনে সন্ধ্যার সময় তােমার মত আর পনের জন সুন্দরীকে বেশ করে সাজিয়ে, তােমার ঘরে যুটিয়ে রেখ, আমি ছােট ভট চাষকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। কেউ ঔর মন টলাতে পারে নাই, যদি তুমি পার, তা হােলে আমি বিশেষ পুরস্কার দিব। সে বল্লে, এটা আর আশ্চৰ্য্য কি? কত বড় বড় মাথা মুড়িয়েছি, এ অতি সামান্য কথা। তার পর নির্ধারিত দিনে বাইজীর ঘরে যত সাজ বেশ ছিল, সব গায়ে দিয়ে,আর ঐ রকম পনের জনকে সঙ্গে নিয়ে যত রকমের ফাদ আছে, সেগুলি সব যােগাড় করে নিয়ে, বাঘিনী শীকার ধরবার জন্যে যেমন থাবা গেড়ে বসে থাকে, সেও সেই রকম করে রৈল। মথুরবাবু বিকাল-বেলায় ফেটিং-গাড়ীতে বড় বড় দুটো ঘােড়া জোতালেন, আর ঠাকুরকে বল্লেন, ‘চল বাবা! গড়ের মাঠে বেড়িয়ে আসি। ঠাকুর রাজী হলেন। মথুরবাবু গড়ের মাঠে বেড়িয়ে, ঠিক সন্ধ্যার পর যথাস্থানে উপ- স্থিত। বাহির থেকে খবর নিলেন, সব ঠিক। মথুরবাবু ঠাকুরকে সেই ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে সােরে পড়লেন। পা। ঠাকুর কি করলেন ? ভ। ঠাকুর ঘরে ঢুকেই মা মা করে গীত গাইতে গাইতে

৫৮
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
;
সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন ; একমাত্র পরিধেয় বস্ত্রখানি কোমর
থেকে খসে গেল ; ঠাকুর দিগম্বর।
পা। আর মাগীরা ?
ভ। মাগীদের বুদ্ধিশুদ্ধি লােপ। কেউ বাতাস করতে
লাগলাে, কেউ কি করবে, বুদ্ধিহারা হয়ে হাঁ করে দাড়িয়ে রৈল,
কেউ বা মুখে জল দিলে, আর কেউ কেউ মথুরবাবু মথুরবাবু
ব’লে চীৎকার করতে লাগলো। মথুরবাবু তাদের চীৎকার
শুনে বুঝলেন, একটা কি ঘোর বিপদ হয়েছে। এসে দেখেন,
ঠাকুর সমাধিস্থ। মাগীর, মথুরবাবুকে বকতে লাগলাে, আর
বলে, “আহা ! এমন ছেলে মানুষকে কি এমন কৰ্তে হয়।”
মথুরবাবু তাদিগকে শান্ত করে দাড়িয়ে রৈলেন। ঠাকুরের
যেমনি বাহ্য চেতন এলাে, অমনি সেই আবেশস্থ অবস্থায় তাকে
গাড়ীতে নিয়ে পালিয়ে এলেন।
তার পর মথুরবাবু লজ্জায় আর ঠাকুরের কাছে মুখ দেখাতে
পারেন না। মহা বিপদ!
পা। কি আশ্চর্য্য! মানুষে যদি একটা সুন্দরী যুবতী
দেখে,তা হােলে লজ্জা, কুলশীল মনুষ্যত্বের বাইরে বেরিয়ে পড়ে,
আর এখানে ঐ রকম যােলটাআমার ত এই কথা শুনে বেশ
মনে লাগছে যে, বাস্তবিক ভগবান্ ভিন্ন এমন ধারা কেউ পারে
। আমরা থিয়েটারের লােক, আমাদের ঐ বিষয়ে মানুষ
চিতে ত বাকি নাই।
পা। কাঞ্চন দিয়ে কি কখন পরীক্ষা হয়েছিল?
ভ। মথুরবাবু ঠাকুরকে একবার ৫০০০০ পঞ্চাশ হাজার
টাকা দিতে চান; ঠাকুর তাতে অস্বীকার হওয়ার মথুরবাবু

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। বলেন, বাবা, তুমি যদি নিজে না নাও, তা হলে হৃদুর নামে কোম্পানীর কাগজ কিনে দি। ঠাকুর অতি বিরক্ত হয়ে বলেন, আমি তাও পারব না। হৃদুর নামে থাকলেও আমার এমন মনে হতে পারে যে, ও আমার টাকা, হৃদুর নামে আছে মাত্র। ভাই, ঠাকুরের ত্যাগের চেহারা দেখ’, ত্যাগ-কায়- বাক্য মনে। বাক্য বছে লব না, মনও তাই, আবার কায়া- খানিও বলছে লব না। ঠাকুরের কায়ে ত্যাগের বিষয় চক্ষে দেখা। শ্রীহস্তে টাকা কি পয়সা ছুইয়ে দেবা মাত্র হাত একে বেঁকে যেত ও জড় জিনিসের মত, অনেকক্ষণ অসাড় হ'য়ে থাতাে। এ অদ্ভুত ত্যাগের কথা কি কেউ কখন শুনেছ’! আর একবার লক্ষ্মী মাড়ােয়ারী টাকা দেবার জন্য মহা পীড়াপীড়ি করে। ঠাকুরকে কোনমতে রাজি করাতে না পেরে একদিন টাকার তােড়া নিয়ে হাজির। ঠাকুর টাকা দেখে ছােট ছেলের মত চীৎকার করেন, অবশেষে বাহহারা! লক্ষ্মী মাড়ােয়ারী এই না দেখে কি একটা মনে করে, তােড়া নিয়ে একবারে পালিয়ে গেল। মথুরবাবু আরও অনেক ঘটনাতে দেখেছিলেন যে, ঠাকুর যেমনি কামিনীতে অনাসক্ত, কাঞ্চনেও তেমনি। ঠাকুরের কাঞ্চনেতে অনাসক্তি দেখে মথুরবাবু নিজে মুক্তহস্ত হয়ে গেছলেন। এ সব ঘটনা পরে বলবাে। পা। ভগবান্‌কে দর্শন করলে সন্দেহ-মােচন হয় ; সর্বদা কাছে থেকেও মথুরবাবুর এত সন্দেহ ছিল কেন ? ভ। মথুরবাবু-স্বয়ং দেবতাবিশেষ, মা-কালীর পরম ভক্ত ; তিনি চিরকেলে ভক্ত, জন্ম জন্ম মায়ের ভক্ত, এখন তিনি রাম- কৃষ্ণলীলায় কাজ করুবেন বলে ঠাকুরের সঙ্গে নরদেহ ধরে

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
এসেছেন। তার মনে কোন সন্দেহ নাই। তবে জীবকে
শিক্ষা দিবার জন্য মথুরবাবুর মনে সন্দেহ দিয়ে, ঠাকুর তঁার সঙ্গে
এই রকম খেছেন। তিনি দেখাচ্ছেন, মানুষের দুর্বলতা কত,
দূর দেখ। তিনি দেখাচ্ছেন, মানুষের মনখানা কি রকম দেখ,
আর নিজে পরীক্ষা দিয়ে দেখাচ্ছেন, ভগবান্ কেমন দেখ, তিনি
নরদেহে এসে কি রকম লীলা করেন দেখ। ভাই, মানুষের
ভিতরে এই যে মনখানি আছে, এ বড় মুস্কিলে জিনিস। আবার
ঐ মন যদি সােজা হয়, তা হলে এমন সুন্দর আর নাই।
পা। মনটা কি ? ‘মন, মন, চিরকাল বলি বটে, কিন্তু
জিনিসটা কি, তা ত কৈ কিছু দেখতে শুনতে পাই না।
ভ। তুমি মাঝে মাঝে বড় শক্ত কথা তুছাে। অামি মুখ্য
মানুষ, তােমাকে মনের কথা কি বলবো, তবে ঠাকুর যেমন
দেখাচ্ছেন, তেমনি বলি শােন।
বিলাতি যাদুকরের মধ্যে উইলসন্ উৎকৃষ্ট যাদুকর। উইলস
সব ভেল্কী জানে, কিন্তু ভেল্কীখেলা একলায় হয় না বােলে, তাই
তাকে অপরকে সেই নিজের ভেল্কী শিখাতে হয়। যারা শিখে,
তাদের মধ্যে এক এক জন এমন উতুরে যায় যে, সে উইলসনের
প্রায় সমতুল্য দক্ষ হয়ে পড়ে। এখানেও তেমনি রামকৃষ্ণজীর
একটী শক্তি আছে, সেই শক্তির স্বভাব-খালি দুনিয়াতে ভেক্কী
খেলা। এই শক্তি যাদিগে নিয়ে ভেল্কী খেলে, তার প্রধান চেলা
এই মনখানি। মনখানা সেই শক্তির সর্দার খেলুড়ে। মনের
খেলা দেখতে পেলে, বুঝতে পাল্লে, তুমি দুনিয়ার খেলা বুঝতে
পারবে ও দেখতে পাবে।
পা। আপনি ভেঙ্গে বলুন, এ হিয়ালির মত লাগছে।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ; ভ। এই মন একটা ভারি মজার জিনিস। এর এক কর্ম খেলা। এ খালি খেলতে চায়। প্রত্যেক মানুষের ভিতরে, প্রত্যেক প্রাণীর ভিতরে, এ নানা প্রকৃতিতে খেলা করে। এর খেলাও রকমারি ; খেলাগুলি দেখলে সহজে বুঝা যায় না । এ সব সেই এক মনের খেলা। এই মন, এক হয়ে রকমারি খেলার জন্য অনেক হয়েছে। জন্ম জন্ম এর খেলা ফুরায় না। একটা দেহে যত পারে খেলে ; পরে সেই দেহটা নষ্ট হলে সে আপনার খেলার সামগ্রী লিয়ে আবার অন্য একটা টাটকা দেহে ঢুকে। সেই দেহে ফের খেলা করে। মনের একটা ঘুমাবার শয্যা আছে। যত দিন না সেইখানে গিয়া ঘাের সুষুপ্তিতে ঘুমায়, তত দিন খেলার বিরাম নাই। বিছানায় এক- বার ঘুমুলে আর উঠে না। মনের একটা কোন বিশেষ চেহারা কি বিশেষ স্বভাব নাই। যে যে দেহে খেলা করে, সেই সেই দেহের চেহারায় মনের চেহারা, আর তাদের স্বভাবে মনের স্বভাব ; এই সকল দেখে শুনে, জিনিসটা কি বুঝে নিতে হয়। মন শরীরের মধ্যে রয়েছে, আপন মনে খেলা করছে,কিন্তু যদি তাকে ধরতে যাও,কি দেখতে যাও, তা হলে অনি লুকিয়েছে; ত্রিভুবন খুজলেও ধরতে কি দেখতে পাবে না। এই রকমে যে সে লুকোয়, এও তার খেলা। মন শরীরের মধ্যে সর্বব্যাপী হয়ে রয়েছে। কেমন তা জান’—ঠিক যেন তিলের ভিতর তেল আছে ; বলতে পার না যে, অমুক জায়গাটীতে নাই। মন যদি শরীর থেকে চলে যায়, কি শরীরের কোন অংশ থেকে চলে যায়, তা হলে শরীরে কি শরীরের সেই অংশ জড় হয়ে যায়। ;

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
উইলসনের বাজীতে ঘােড়ার খেলা দেখেছাে ত ! মনের
তেমনি ঘােড়ার খেলা আছে। ঘােড়ারা তার খুব বশ, যা বলে,
ঘােড়ারা তাই শােনে। এই মনটা যেন ঘােড়াদের প্রাণ। যখন
ঘােড়ারা আস্তাবলে থাকে, তখন যেন মরা। আর যেমন মন
তাদের পীঠে চোড়ে লাগামটা ধরে, অনি যেন উচ্চৈঃশ্রবা,
তড়িতের চেয়েও ছােটে। মনের ঘােড় পাঁচটা, তাদের নাম
কি জান? চোখ, কান,নাক, জিব আর ত্ব। মন এদের পীঠে
চোড়লে কেও কোন কাজ করতে পারে না। চোখ
দেখতে পায় না, কান শুনতে পায় না, নাক শুকতে পারে না,
ত্ব অনুভব করতে পারে না। এই ঘােড়র খেলা, মলের সিদে
খেলা। মনের আরও বিস্তর খুব মারপ্যাচের খেলা আছে,
তা কিছু কিছু বলি শোন।
সাগরে যেমন নানা রত্ন আছে, মন-সাগরে ও তেনি নানা
জিনিস আছে। এই সকল জিনিসের নাম বিষয়-জ্ঞান। ঘােড়ায়
চোড়ে যা কিছু দেখে শুনে শিখে, সেই সব বিষয়-জ্ঞান। মন
বিষয়-জ্ঞান ভিতরে রেখে, সাগরের মতন এক বেশে থাকে।
যখন যে জিনিস তার দরকার হয়, তখনি নিজে ডুবুরি হয়ে,
নিজের ভিতরে ডুব মেরে সেই সব জিনিস তুলে আনে।
ডুবুরির কাজ যখন করে, তখন লােকে তার নাম দেয় স্মৃতি।
আবার ঐ মন যখন ভালমন্দ, সদসবিচার করবার জন্য
দুটো হয়ে আপনা আপনি ঝগড়া করে শেষে মীমাংসা
করে, তখন লােকে তার নাম দেয় বুদ্ধি। আবার যখন
ঐ মন পােটো হয়ে বিষয়ের পট সকল আপনার ভিতর
আঁক, তখন লােকে তার নাম দেয় চিত্ত। আবার যখন

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। • “আমি” “আমি” বলে মেতে বেড়ায়, তখন মনের নাম অহঙ্কার। মনের নানা রকম সাজ বেশ আছে। তােমরা রঙ্গালয়ের লােক, বেশ জান’ যে একজন অভিনেতা রকম রকম পােক পপারে দর্শকদিগে নানারকমের মূর্তি, প্রকৃতি দেখায় ; মন ও তেমনি নানারকম বেশ ধরে ও রকমারি খেলা দেখায় কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহদির পােষাক পপারে যে যে সব মূর্তি ও প্রকৃতি দেখায় সে সব পৈশাচিক মূর্তি ও প্রকৃতি। এই সব মুর্তি ও প্রকৃতি ছেড়ে আবার যখন ঈশ্বর আরাধনায় প্রবৃত্ত হয়, তখন দেবমূর্তি ধরে। মনের পৈশাচিক মূর্তি, দেহীর পরম শত্রু, আর দেবমূর্তি পরম বন্ধু। মনের পৈশাচিক-বেশ মলিন-বেশ, ঐ বেশে জীবকে বদ্ধ করে। আর দেব-বেশ শুদ্ধ-বেশ, এই বেশে জীবকে মুক্ত করে। মলিন অবস্থাতে মনের স্বভাব কেমন থাকে জান, ঠাকুর বােলতেন, ঠিক কুকুরের ল্যাজের মত। এই টান,সােজা হ’লল, আর ছেড়ে দাও তখনি কুণ্ডলি পাকিয়ে গেল। মনের দুটী অবস্থা মলিন ও শুদ্ধ। মলিন অবস্থাতে মনকে বিশ্বাস করা যায় না। শুদ্ধ অবস্থায় যদি তাকে ঈশ্বরের পাদপদ্মে বেঁধে রেখে দেওয়া যায়, তাহােলে ঠিক থাকে, নচেৎ সংসারে ছেড়ে দিলে আবার মলিন অবস্থায় (অপবিত্র অবস্থায় ) গিয়া পড়ে। ঠাকুর ব’তেন, যেমন হাতীর গা ধুইয়ে দিয়ে যদি হাতীশালে বেঁধে রাখা যায়, তাহলে পরিষ্কার থাকে, নচেৎ ফাকে ছেড়ে দিলে আবার গায়ে ধূলা মেখে সেই যেমনি ময়লা গা, তেমনি ময়লা গা করে ফেলে। শুদ্ধ অবস্থায় মনের আর মন নাম থাকে না, জখন তার নাম হয় চৈতন্য। চৈতন্য হলে যে

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
;
চৈতন্যে জগৎ চৈতন্যময়, সেই চৈতন্যময়ের সাক্ষাৎকার লাভ
করে ; তখন আর নীচে নেমে বদমাইসী করতে পারে না।
মনের একটা স্বভাব—তুমি তাকে যেখানে রাখবে, সে
তখন তার মত হয়ে থাকে। জড়ের সঙ্গে রাখ’ জড় হয়ে
থাকবে, চৈতন্যের সঙ্গে রাখ, চৈতন্য হয়ে থাকবে। যেমন
অঙ্গারকে মাটীতে ফেলে রাখলে মাটীর মতন হয়ে থাকবে,
আবার আগুনের সঙ্গে রাখ, আগুন হয়ে থাকবে।
একটা তারে ঝঙ্কার দিলে যেমন তায় নানা সুর বেলােয়,
তেমনি মন, আপনাতে আপনি বা দিয়ে নানা সুরে গায়। প্রাণীর
শরীর মনের বীণাযন্ত্র। শরীর চারি রকমের স্কুল, সুক্ষ্ম, কারণ
ও মহাকারণ। স্থূল শরীরে যখন মন খেলে, তখন কামিনী-
কাঞ্চনের পেছু পেছু ঘুরে বেড়ায় ; তখন কামিনীকান ছাড়া
যে, আর কোন জিনিস আছে, তা তার আক্কেলেই থাকে না। সে
তখন খালি জানে, খেতে, ঘুমুতে আর ইন্দ্রিয়-সেবা করতে।
যখন সূক্ষ্ম শরীরে খেলে, তখন দেহীর গা গরম হয়।
মনের খেলা তখন দেখতে পায়, সে তখন মনের সঙ্গে লড়াই
করতে পারে। লড়াই করতে করতে কখন হারে, কখন
জীতে। দেহীকে, আপনাকে দেখিয়ে দিয়ে তার সঙ্গে লড়াই
করে মজা করে।
কারণ শরীরে শিষ্ট শান্ত হয়ে থাকে, আর দেহীকে ঈশ্বর
দর্শনানন্দ ভােগ করায়। আর মহাকারণে নিজে ঘুমিয়ে,
জীবকে ঘুম পাড়ায়। এই ঘুমে আপনার রূপ, গুণ, বর্ণ হারায় ;
আর দেহীকে পরম শান্তির পদে তুলে দেয়।
এইটি ভাল করে ভেঙ্গে বলি শােন। সেতারে যেমন

ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ৬৫ যােলট। পরদা আছে আর ফি পরদায় তিন্ন ভিন্ন সুর উঠে, তেমনি দেহ-সেতারে সাতটী পরদা আছে, এই পরদায় পরদায় মন নানা সুরে গেয়ে বেড়ায়। পরমহংসদেব ব’তেন, প্রথম কার তিনটী পরদাতে একটী ঘাট হয়েছে। মন যখন ঐ তিন পরদায় বাজে, তখন দেহীকে একেবারে বেতালা করে। দেহীর লক্ষ্য কেবল আহার, নিদ্রা আর ইন্দ্রিয় সেবায়। দেহী কামিনী কাঞ্চনকে বুকের পাঁজর মনে করে বেহুশ হয়ে থাকে। মন যখন চতুর্থ পরদায় উঠে, তখন দেহীর ঘুম ভাঙ্গা ভাঙ্গা হয়। এই ঘুমুচ্ছে, এই ঘুম ভেঙ্গে চোকে উঠছে। এখন সে জানতে পেরেছে যে, কামিনীকাঞ্চন ছাড়া আরও মজার জিনিস আছে। এইটা চেত- মনের ঘর। এই জায়গা থেকে দেহী ঈশ্বরের রাজ্যের আভাস পায়। সে আভাস প্রথম প্রথম মিটমিটে আভাস, ক্ষণস্থায়ী, চঞ্চল বিদ্যুতের মত। এখন আর বেহুশ হয়ে ঘুমাবার যাে নেই। এই অবস্থায় কিছু দিন গেলে, তার গাটি আরও কিছু গরম হয়। আগে যে ঈশ্বর-রাজ্যের আভাসটা মিটমিটে ছিল, এখন সেটা আলাের মত, কিন্তু চঞ্চলতাও স্থায়ীত্বের সম্বন্ধে বড় ইতর বিশেষ হয় না; সেইজন্য ভগবানের কথায় একাগ্ৰমন হয়ে থাকতে পারেনা। ভ্যাভেনে মাছির মত ময়রার সন্দেশের থালাতেও বসে, আবার মেথরের ময়লার ভারেও বসে। পঞ্চম ঘরে মন উঠলে, দেহীর পূর্ব স্বভাব প্রায় বদলে যায়। এখন তাকে দেখলে আর আগেকার মানুষ বলে চেনা যায় না। এখন আর সে কামিনীকাঞ্চন নিয়ে ঘুমুতে চায় না। মাতালের যেমন মদ্যপানে থােক, এর তেমনি ঈশ্বরীয় কথা শ্রবণ কীর্তনে রােক। এখন তার মন মনের মতন। এখন সে অবিদ্যার কুরূপ দেখতে, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। পেয়েছে, মনের খেলার দৌড় বুঝেছে, মনের সঙ্গে লড়াই করতে শিখেছে, মনকে পেছু পেছু ছুটাতে পেরেছে, মনের ভিরকুট ধরতে পেরেছে, মনের পুতলােবাজির খেলার হদিস পেয়েছে। ষষ্ঠ ঘরে যখন উঠে, দেহী তখন ঈশ্বর দর্শন করতে পায়, কিন্তু ঈশ্বরকে ছুতে পারে না। ঠাকুর বলতেন, যেমন একটা লণ্ঠনের ভিতরের প্রজ্বলিত দীপশিখা লণ্ঠনের বাহির থেকে দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু ছুতে গেলে লণ্ঠনের কঁাচে বাধা লাগে, তেমনি দেহী এই জায়গায় বসে ঈশ্বরকে দেখতে পায়, কিন্তু ছুতে পারে না, একটা আবরণে আটক রাখে। এই অবস্থা দেহীর দুর্লভ অবস্থা। ঠাকুর বলতেন, পাঁচের ঘরে আর ছয়ের ঘরে বাচ খেলে বেড়ানাে ভারি মজা। বাচ খেলে বেড়ানো কি জান’–গঙ্গায় পাসী নিয়ে তক্‌- রার ক'রে ঘােড় দৌড়ের মত খেলা করা দেখেছ’ ত ? এক- বার এধারে আসে, একবার ওধারে যায়, তাকে বাচ, খেলা বলে। এখানে মনের বাচ-খেলা একবার ছয়ের ঘরে, এক- বার পাঁচের ঘরে,অর্থাৎ একবার ঈশ্বরকে দর্শন করে, আবার নীচে পাঁচের ঘরে নেমে, সেই দর্শন কীৰ্ত্তন করে। অর্থাৎ চতুর্থ ঘাটে মজা আদতেই নাই। কেননা অনেক সময়ে অবিদ্যামায়া তার শক্তিতে আচ্ছন্ন রাখেন। আবার এর উপর ঘরে অর্থাৎ সাতের ঘরে মন উঠলে, দেহীর ভােগ কি আস্বাদ ক’বার শক্তি থাকে না। এখানে মন মনহারা হয়, আর দেহীর সমাধি হয়। একেই বলে মনের লয়। লয় কেমন জান, একফোটা গঙ্গাজল নিজের রূপ-গুণ হারিয়ে গঙ্গার জলে মিশে এর নীচে শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ৬ গেল। মন-রূপ সুনের পুতুল গঙ্গা জলে গােলে গেল, এত দিনে মনের খেলা ফুরুলল। পা। আপনি ত মূখ লােক, কোন শাস্ত্র পড়েন নাই, সকলে বলেও তাই, তবে আপনি এত জালেন কি কোরে? ভ। আমি ত তােমাকে পূর্বে বােলেছি, রামকৃষ্ণজীকে দর্শন ক’বুলে সব দর্শন হয়, যাবতীয় অবতারের দর্শন হয়। তাকে বুঝলে সব শাস্ত্রের নিগূঢ় তত্ত্ব বুঝা যায়, সাধন-ভজনের ফল মানুষ অনায়াসে পায়। তাঁর দর্শনের এমন গুণ যে, একটা বেহুশ বদ্ধ জীবের হুশ আসে, ঘুমন্ত মানুষ জেগে উঠে, মূখ মানুষ পণ্ডিত হয়, কানার চোখ ফোটে, কালা শুতে পায়, খোঁড়া সাগর ডিঙ্গোয়, বােব। বক্তা হয়। তার বাক্যগুলি মহামন্ত্র, সেই সব বাক্যের বিষম জোর। যেখানে পড়ে, সে হাজার অাঁধার স্থান হােক না কেন, অমনি আলােময় হয়। ঠাকুর ব’তেন, চিরকেলে আঁধার ঘরে যদি একবার একটা দেশালায়ের কাটি জালা যায়, তা হলে চকিতে যেনগােটা ঘর- টীতে আলােময় হয়, তেমনি ঈশ্বরের বাক্য ও তার পাপড়লেই মানুষের চিরকেলে আঁধার কুটীর নিমেষে আলােকময় হয়ে। বারুদ আর আগুনের জোরে যেমন ছােট সীসার গােলা, কামানের মুখ দিয়ে বেরিয়ে একটা পাহাড়কে চুরমার করে দেয়, তেমনি ঠাকুরের কথার ভিতর এমনি শক্তি যে, নিগঢ় মায়ার আবরণ, যাতে ঈশ্বরকে ও ঈশ্বরের তত্ত্ব সকলকে আবরণ দিয়ে রেখেছে, সেই আবরণকে একেবারে চূর্ণ করে ফেলে। ঠাকুরের শ্রীবাক্যগুলি গােলার মতন শক্তিধর। ঠাকুরের শ্রীবাক্যের আর একটা মহিমা বলি শােন।

৬৮
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
লােকে যে কথা কয়, সে যেমন হাওয়ার কথা, হাওয়ায়
খােলে, হাওয়ায় দোলে, হাওয়ায় মিশায়, ঠাকুরের কথাগুলি
তেমন নয় ; কথাগুলি যেমন বেরুলো, তেমনি কানের ভিতর
দিয়ে ঢুকে হৃদয়ে পড়লাে। যেমনি হৃদয়ে পৌছে গেল,
অমনি কথিত বিষয়ের একটি প্রতিছবি হৃদয়ে উঠে পড়লো,
সে কেমন, জান’-যেমন এদিকে ক্যামেরার কলটিও টেপা,
আর ওদিকে ছবিটিও উঠা। যার অন্তরে ছবিটি উঠলাে,
সে ঠাকুরের কথাটা শুনে আর ছবিটি দেখে বিষয়টা একেবারে
বুঝে নিলে, দেখে নিলে, আবার চিরকালের মত সঞ্চয়
করে রাখলে। আর লােকে যে কথা কয়, সে হওয়ার
কথা, একান দিয়ে ঢুকলাে, আর ওকান দিয়ে বেরুলাে ;
কিছু তার একটা চিহ্ন থাকে না। যেমন যখন জলে
জাহাজটা চলে যায়, তখনি জলে একটা দাগ পড়ে, তার
পরেই সব মিলিয়ে যায়; এত বড় জাহাজটা জলটা দুখানা
করে দিয়ে গেল, তার কোন চিহ্নই রৈল না; তেমনি
মানুষের কথা, বলবার সময় খুব ধুমধাম কিন্তু একটা চিহ্ন
রাখতে পারে না, মানুষের অন্তরেই ঢুকে না, যদি ঢুকে
তােঠইই পায় না। ছেলে জলে খােলামকুচি নিয়ে
ছিনিমিনি খেলে, খােলামগুলা জলের উপর দিয়ে তবৃতর
করে লাফিয়ে চলে যায়, জলের ভিতরে আর যায় না।
ঠাকুরের কথার আর একটা মহিমা বলি শােন। ঐ যে
অন্তরে কথার প্রতিমূর্তি উঠলাে, ঐ ছবি জীবন্ত হয়। জীবন্ত
হয়ে বিবিনিন্দিত কষ্ঠে রামকৃষ্ণজীর মহিমা-গীত গায়, অতি
মধুর গীত ; শুলে দাবানল জল হয়। কথায় জান'-

ঐশীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
।
যখন তুমি শােকাকুল হয়ে পড়েছে; যখন তােমার অন্তরে
অবিদ্যা-মায় আগুন জ্বালবার চেষ্টা পাচ্ছে, সেই মুস্কিলের
সময়। আর কি করে জান’; যদি চোর ডাকাতে ধরতে আসে,
তা হলে পরম বন্ধুর মত, অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে, তুমি না ডাকতে
ডাতে আপনি বেরিয়ে এসে, এমন তর্জন গর্জন করে যে,
ভয়ে দস্যরা কোন্ দিকে পালাবে, তার পথ পায় না। অবিদ্যার
বাজারে চোর ডাকাতের ত অভাব নাই। কেবল চোর
ডাকাতেরই রাজ্য। অনাচে কানাচে চারিদিকে উকি
মাছে, এমন সহায় না থাকলে কি আর রক্ষা আছে ? এই
চোৰুকাত কারা জান' ; কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ,
মাৎসৰ্য্য, আর তাদের ছানাপােনা।
রামকৃষ্ণজীকে দর্শন করলে, তাঁর কৃপা পেলে গুপ্ত ভগবান্
ব্যক্ত হন ; দূরের ঈশ্বর কাছে হন ; সেই—ঈশ্বর, এই
ঈশ্বর হন; তিনি—ঈশ্বর, ইনি--ঈশ্বর হন আর দেবদেবীদিগকে
ঘরের লােক বলে মনে হয়। এখন বুঝ’-রামকৃষ্ণজী কি।
তােমরা রামকৃষ্ণজীকে দর্শন করেছ, তাঁর শরণাপন্ন হয়েছ,
তােমরাও ক্রমে বুঝতে পারবে ।
পা। আপনি মনের কথা বােছিলেন। মন এমন শক্তিধর !
মনকেই যে সর্বেসর্বা দেখছি। মনের উপর রামকৃষ্ণজীর
কোন আধিপত্য নাই
ভ। মন সর্বেসর্বা নয় ; সর্বেসর্বা রামকৃষ্ণজী। জ্ঞানে-
ত্রিয়দের মুখে লাগাম দিয়ে, মন যেমন তাদের উপর চোড়ে
বেড়ায়, তেমনি রামকৃষ্ণজী মনের মুখে লাগাম দিয়ে তার
পীঠে চোড়ে বেড়ান। রামকৃষ্ণজী মনকে যা করতে বলেন,
?

৭০ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। সে তাই করে। মন যে এত - লাফিয়ে বেড়ায়, নেচে কুঁদে বেড়ায়, গরম হয়ে বেড়ায়, নানা বুজরুকি করে বেড়ায়, সে খালি রামকৃষ্ণজীর ইচ্ছায়, সে রামকৃষ্ণজীর জোরে ; কেমন তা জান’; হাঁড়িতে জল, চাল, দাল, দিয়ে জ্বাল দিলে, কিছুক্ষণ পরে চালাল গুলা লাফাতে থাকে। তারা যে লাফায়, সে তাদের বলে নয়, সে আগুনের বলে ; সেই রকম শরীর-হাড়ির ভিতরে মন, বুদ্ধি যে লাফিয়ে বেড়ায় সে তাদের বলে নয়, সে রামকৃষ্ণজীর শক্তির বলে। এই উপমাটি ঠাকুরেরই উপমা। পা। রামকৃষ্ণজী যখন এই উপমাটি দিয়ে বুঝিয়ে দিিেছ- লেন, তখন তিনি কি বলেছিলেন, জীবের শরীরে মন বুদ্ধি তার জোরে লাফিয়ে বেড়ায়-না,-মা-কালীর শক্তিতে লাফিয়ে বেড়ায়? তিনি ত কালী বই আর কিছু জাতেন না। ভ। তিনি বলেছিলেন, মা কালীর জোরে লাফিয়ে বেড়ায়। যীশু নিজেই সেই পিতা হয়ে যেমন সকল বিষয়ে পিতার শক্তি, পিতার ইচ্ছা, পিতার মহিমা, পিতার দোহাই দিতেন; তেমনি রামকৃষ্ণজী নিজে সেই মা হয়ে সেই রাম হ’য়ে, সেই কৃষ্ণ হয়ে, মায়ের শক্তি, মায়ের ইচ্ছা, মায়ের মহিমা বােলতেন; আবার কৃষ্ণের ইচ্ছা,কষ্ণের শক্তি ব’তেন; বা কখন কখন রামের শক্তি, রামের ইচ্ছা বােতেন। তিনি অন্য নামের দোহাই দিয়ে বােতেন বটে, কিন্তু আমাকে দেখিয়ে ছেন যে, তিনিই তাই। আমি কালীও জানি না, রামও জানি , আর 'কৃষ্ণকেও জানি না। আমি জানি রামকৃষ্ণ জ্বী। আবার

শ্রীশ্রীরামকৃজ্ঞ-মহিমা।
৭১
রামকৃষ্ণজীকে ধরে কালীকেও জানি, রামকেও জানি, কৃষ্ণকেও
জানি।
আমার রামকৃষ্ণজী ভিন্ন অন্য কোন বােধ নাই।
সময় তাঁকে বিগ্রহরূপে দেখেছিলাম, এখন তাঁকে বিরাটরূপে
দেখছি। এই জীব জগতে তাকেই দেখতে পাচ্ছি। তুমি
ত বেশ জান’, আমি মুখ-রামায়ণ মহাভারতও পড়িনি, কোন
সাধনও করিনি, কোন একটা কৰ্ম্মও করিনি। আমার সম্বল
রামকৃষ্ণজী। তুমি ঈশ্বরের যে নামই বল না কেন, আমি
সেই নামটির ভিতরে রামকৃষ্ণজীকেই দেখতে পাই, সুতরাং
রামকৃষজী ও তার শক্তি এই ভিন্ন আর কি বলবাে?
পা। মনের ভিরকুটি না ভাঙ্গলে, যখন কোন কাজই হবে
, তখন মনকে বুঝা যায়ই বা কি করে আর মনকে
ধরাই বা যায় কি করে? মনটাকে জাবার জন্য আমার
বড় ইচ্ছা হচ্ছে।
ভ। রামকৃষ্ণজীর মহিমা দেখ’; রামকৃষ্ণজীর দর্শন লাভের
মহিমা দেখ’; রামকৃষ্ণজীর মহৎ লীলা শ্রবণ কীর্তনের মাহাত্ম্য
দেখ’! সাক্ষাৎ মহিমা, মূর্তিমান মহিমা!
এই লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে কত শত নানাশাস্ত্রবিশারদ
উচ্চ উচ্চ উপাধিধারী পণ্ডিত রয়েছেন, কত শত রাজভাষা-
ভিজ্ঞ, নীতিজ্ঞ, বৈজ্ঞানিক প্রভৃতি উচ্চ উচ্চ পদাভিষিক্ত মহা-
মান্য ব্যক্তি রয়েছেন, কত শত কুবের সম অতুল ধনসম্পত্তিশালী
ধনাঢ্য রয়েছেন, কত শত নমস্য নানাবেশধারী ধৰ্ম্মজ্ঞ রয়েছেন,
কিন্তু তুমি যে থিয়েটারের লােক হয়ে উচ্চ ঈশ্বরীয়তত্ত্ব বুঝবার
ও জানবার জন্য ব্যাকুলতা প্রকাশ করছে ও দেখাচ্ছে, এই

৭২ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ব্যাকুলতাটা এতাবৎ লক্ষ লক্ষ লােকের মধ্যে ক জনার হয়েছে ? তুমি মহা ভাগ্যবান্, তুমি ধন্য ও রামকৃষ্ণজীর মহিমা ধন্য। রামকৃষ্ণ প্রভুর যে কৃপার বলে হঠাৎ তােমার মনে এতাদৃশ গুরুতর তত্ত্ব উদয় হয়েছে, সেই বলেই তােমাকে মনের বিষয় বুঝিয়ে ও জানিয়ে দেবে! রামকৃষ্ণজী পরম দয়াল। শরণাপন্ন হলে তিনি মনের ভিরকুটী ভেঙ্গে দেন। তুমি কেবল তাকে ধরে বসে থাক। পা। তাকে ধরে বসে থাকা কেমন ? ঠাকুরের মূর্তিটা স্মরণ কর, ভক্তি বিশ্বাসের জন্য প্রার্থনা কর, আর তাঁর লীলা গুণ কীৰ্ত্তন কর ও একর। পা। এই ক'ল্লেই হবে ? আর কিছু করতে হবে না? শুনেছি কত সাধন ভজন কল্লে, তবে কিছু হয়। ভ। ভাই! এখনও তুমি রামকৃষ্ণ-দর্শনের ফল কিছুই বুঝতে পার নাই। রামকৃষ্ণলীলাকথা আন্দোলন যে কি উচ্চ সাধন-ভজন, তা তুমি এখনও জানতে পার নাই। শ্রী শ্রীরাম- কৃষ্ণজীর শ্রীমূর্তি ফুল দিয়ে, গােড়ের মালা দিয়ে তােমরা যে সাজাও, তার চেয়ে উচ্চ সাধন আমি আর কিছু জানি না। সাধন-ভজন বিনে কিছু হয় না, তা আমি জানি, আর রামকৃষ্ণ- জীও কিছু সাধন-ভজন না করিয়ে ছাড়েন না। তবে রামকৃষ্ণজী যে সাধনা করিয়ে নেন, সে বড় মজার সাধনা। সে সাধনায় মানুষের আয়াস লাগে না, বড় ফুৰ্ত্তি আছে, আনন্দ আছে। সে কেমন জান’, যেমন এক জন লােকের বৃন্দাবন যাবার সাধ হয়েছে, রাধাকৃষ্ণ দর্শনের বড় সাধ হয়েছে, তার পাথেয় নাই, চলে যাবার শক্তিও নাই,আছে—কেবন্ধু সাধটি। এখন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। সে ঘুরূতে ঘুরূতে ঘটনা ক্রমে একটী সম্বল ওয়ালা লােকের কাছে এসে পড়লো। তিনি তার সাধটীর কথা শুনে বল্লেন-আয় আমার সঙ্গে আয়। সঙ্গে করে হাওড়ার ষ্টেশনে নিয়ে গিয়ে একখানি বৃন্দাবনের টিকিট কিনে দিলেন, পথে যা খাবে, তাও একটা হাঁড়িতে করে যোগাড় করে দিলেন, আবার একটা বিছানারও যােগাড় করে দিলেন, আর বল্লেন—যা, তুই এইবার বৃন্দাবনে যা। রামকৃষ্ণজী এমনি করে সম্বল দিয়ে ইষ্ট-দর্শনে পাঠিয়ে দেন। রামকৃষ্ণজীর কৃপায় এমন অঘটন উপায় যুটে পড়ে। ঠাকুর ব’তেন সরকারি বাতাস বইলে আর পাখার বাতাস দরকার হয় না। এখন সরকারি বাতাস চলছে, সাধন- ভজনরূপ পাখার বাতাস আবশ্যক নাই। সরকারি বাসটি কি, বুঝেছ? সেটি রামকৃষ্ণজীর কৃপা। তিনি বলছেন আমি এখন সশরীরে ; এখন কৰ্ম্মের আবশ্যক নাই। অনায়াসে পাকা ফসল পাবি। এক দিন হরিশ ( ঠাকুরের একটি সেবক) পঞ্চবটির তলে ধ্যান করছেন, ঠাকুর এখানে শ্রীমন্দির থেকে জাতে পেরেছেন। তখনই সেখানে হাজির; হরিশের বুকে হাত দিয়ে ধ্যান ভাঙ্গিয়ে দিয়ে, হাসতে হাসতে বল্লেন, “ওরে কার ধ্যান ক’চ্ছিস্? আয়-আমার সঙ্গে আয়, পাকা আম খাবি।” এখন বল’ দেখি, কোন্ কালে জীবকে এমন সাহস, এমন আশা কে কখন্ দিয়েছেন ! কেবলমাত্র এই ঠাকুরে দেখছি। যে গুরু হেলায় একটা জীবকে ইষ্ঠ-দর্শন করান, তাঁর মহিমা আমি কি বলবাে। তাঁর কথা বতে গেলে, ঠোঁটে ঠোঁটে যােড় লেগে যায়।

৭৪ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। প্রতাপ হাজরা, আর একটি লােক, ঠাকুরের কাছে ঐ কালীবাড়ীতে থাক্‌তেন। হাজরা এক জন মহাতপস্বী ; তপ জপ খুব ভালবাসেন, মালা ধরে জপ করা তার যেমন প্রাণ ছিল। হরদম্ জপ চলেছে। ঠাকুর কতবার তার হাত থেকে, মাল ছিনিয়ে লিতেন, মালা করতে কত বাধা দিতেন, আর বােলতেন—এখানে এসেছ’, মায়ের ইচ্ছায় সব আপনি হবে ; তিন টুকিতে কাজ হবে। এত মিহানাত কেন ? হাজরা কিন্তু সে কথায় বিশ্বাস করতেন না। তিনি ঠাকুরের কাছে মালাটি চেয়ে নিয়ে, আবার জপে বসতেন। হাজরা ঠাকুরের কাছে বহু কাল থেকে যুটেছেন। যখন ঠাকুর দেশে শিয়ড়ে হৃদয়ের বাড়িতে মধ্যে মধ্যে গিয়ে ২৪ মাস ক্রমান্বয়ে থাকতেন, সেই সময় থেকে হাজরা যুটেছেন। হাজরা রামকৃষ্ণলীলায় একটি বড় মজার জিনিষ। ঠাকুর, হাজরার সঙ্গে খেলা করে অবিশ্বাসী জীবকে ভূরি ভূরি জ্বলন্ত শিক্ষা দিয়েছেন আর নিজের, ভক্তদিগে একটা রঙ্গ দেখিয়েছেন। হাজরা যেমন জেতে চাষা, কাজেও অনেকটা তাই দেখালেন। তিনি এটা আর বিশ্বাস করতে পারলেন না যে, ঠাকুরের কৃপায় মানুষ বিনা চাষে ঘরে বসে খােল আনা পাকা ফসল পায়। হাজার সঙ্গে ঠাকুরের খেলাটি শুলে, অতি সহজে বিস্তর রামকৃষ্ণমহিমা দেখা যায় ; দেখলে-অতি বড় অবিশ্বাসী হৃদয়েরও ঠাকুরের পাদপদ্মে অটল বিশ্বাস জন্মে ; বেদবাক্য অপেক্ষা গুরুবাক্যের গুরুত্ব, গভীরত্ব ও সদ্য ফলদায়ীত্ব শক্তি প্রত্যক্ষ করে, আর একটি বিশেষ কথা –ঠাকুরের শরণাপন্ন হলে যে, হেলায় ঈশ্বর- লাভ হয়, এ বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহ থাকে না ।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
৭৫
ঈশ্বর,
কর্মে সাধন-ভজনে যাদের বাসনা থাকুততা,ঠাকুর তাঁদের
বাসনা পূরণের জন্য, কাকেও বে তেন—তুমি মা কালীর ঘরে
তিন দিন কিছু জপ কোনাে ; কাকেও বলতেন—যদি তিন
দিন না পার, এক দিন কোরো ; কাকেও বােলতেন—তুমি যদি
অন্য জপ ধ্যান করতে না পার, এখানের-( অর্থাৎ ঠাকুরের)
স্মরণ, মন, রেখাে'; কাকেও বােতেন—তােমার কিছু কৰ্ত্তে
হবে না, এখানে এলে গেলেই হবে—এই আজ এসেছ, আর
দুদিন এস ; কাকেও বােলতেন -তুমি এক দিন মঙ্গলবারে কি
শনিবারে এস, তা হলেই হবে। কখন কখন ভাবাবেশে
বেতন এখানে এসে সরল প্রাণে যে বােলবে, হে
তােমার তত্ত্ব বা তােমাকে কি করে জাবাে, সে নিশ্চয়ই তার
তত্ত্ব পাবে পাবে পাবে। শ্রীমুখে একবার বললেই যথেষ্ট, তবে
যে তিনি তিনবার বললেন ; এর মানে—এখনকার জীব একে-
বারে বিশ্বাসহারা, ভক্তিছাড়া, অবিদ্যার রূপে মরা, বিষয়-বিষে
জ্বরা ; তবু যদি বিশ্বাস করে, তাই তিনি তিনবার বেললেন।
ঠাকুর বেলতেন, কলির জীবকে যােলটাং বললে যদি একটাং
নেয়। তাই শিক্ষায় ও কর্মে ঠাকুর যােলটাং দেখালেন।
যে ঠাকুরের এই কথা, বুঝ দেখি, তার দয়া করুণার কি
আর সীমা আছে? এতেও মানুষ ঠাকুরকে নিলে না, ঠাকুরের
কথায় কান দিলে না। এদের নাম জীব, এদের নাম মানুষ।
হে রামকৃষ্ণজী ! আর যা দাও, দিও; যেখানে রাখতে হয়
রেখাে, কিন্তু ঠাকুর! দোহাই তােমার, মানুষের মত বুদ্ধিটি দিও
না, আর এমন মানুষের সঙ্গে রেখাে না। এই ত মানুষ, সামান্য
ধন, মান, য, পদের জন্য লালায়িত, কিন্তু ভগবান তুমি কোথা
;

ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
বা তােমাকে কি করে পাবাে, এ কথা কেউ বলে না। এই ত
মানুষের বুদ্ধি-কাঞ্চন ফেলে কঁাচের আদর করে ; মণির হার
ফেলে কালকূটভরা ফণীকে কণ্ঠে পরে। জীবের কথায় প্রাণ
শিউরে উঠে। ভাই প্রাণ ভরে বল’, জয় রামকৃষ্ণজীর জয়।
শুন’, প্রাণ জুড়ানাে ঠাকুরের কথা শুন’। ঠাকুরের ভাণ্ডার
কেমন শুন’, ঠাকুর দয়াল কত গুন’, ঠাকুরদাতা কত শুন’, ;
ঠাকুরের আশা ভরসা দেওয়া কত শুন’, ঠাকুরের মহিমা শুন’,-
ভাবাবেশে একদিন বােছেন,“ওরে যে একবার এসে একটা
নমস্কার করবে, তার আর ভয় কি ? ওরে যে শরণাপন্ন হবে,
তাকে কিছু কৰ্ত্তে হবে না। আমি অনেক দিন কঠোর ফঠোর
তপস্যা, সাধন-ভজন করে আমার ভিতরে একটা ছচ তৈয়ার
করে রেখেছি ; ঐ ছাঁচে ফেলে দিব, অম্নি গড়ন হয়ে যাবে ।
দেখবি একেবারে মায় বিবির মুখ শুদ্ধ, তায় উঠে গেছে। এই
ছাঁচটার সঙ্গে টেকশালের কলের উপমা। টেকশালে এদিগে
রূপার ডেলাটা ফেলে দিলেই, তখনই ওদিকে রাণীর মুখ সহিত
ঝক্‌মকে টাকা হয়ে বেরিয়ে যায়। ঠাকুরের ছাঁচটিও তেমনি।
বুঝ ভাই—কি ঠাকুর ! কেমন ঠাকুর ! আর কোথাকার ঠাকুর।
এখন চেয়ে দেখ’–কি ঠাকুর দর্শন করেছ, কার মহাপ্রসাদ
খেয়েছ। আর কি সাধনার বাকি রেখেছ। ভগবান দর্শনের
জন্য পূর্বজন্মে কতবার মাথা কেটে আহুতি দিয়েছিলে, সেই
ফলে এই ঠাকুরের দর্শন পেয়েছ। অবিদ্যার নেশায় অনেক।
দিন ঘুরেছ; তঁার দর্শনে নেশা গেছে, কেবল ঘােটা খানিক
আছে ; ঠাকুরের লীলাকথা আন্দোলন কর, মনের সাদে
ঠাকুরের প্রতিমূর্তি ফুল দিয়ে সাজাও, মনের মতন ভােগ দাও,

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
মনে মুক্ত। হাজার বােঝা, হাজার কাজ থাকলেও মুক্ত পুরুষ
বদ্ধ হন না।
পা। যে মন বেঁদে রেখেছে, সেই মনই বাধন খুলে দেয় !
তাহােলে মনটাকেই যে সর্বেসর্বা দেখছি। কিন্তু আপনি
পূৰ্ব্বে বল্লেন, রামকৃষ্ণজী মনের রাজা।
তুমি প্রভুর কৃপায় খুব লীলা দেখতে ও বুঝতে
পাছ। এখন শোন’,মনে আর ঠাকুরে প্রভেদ কি।
তােমাকে পূর্বে ভগবানের সম্রাট ও বিরাট মুৰ্ত্তির ও খেলার
কথা বলেছি। বাহ-জগৎ ও অস্তজগৎ নিয়ে যে খেলা, তার
কথা ও যথাসাধ্য বলেছি। এ অজগতের খেলা। একটা
কথা বিশেষ করে মনে রেখ— এই সৃষ্টিতে কেবল সেই একের
খেলা । এক মানে রামকৃষ্ণর্জী। রামকৃষ্ণজী বই আর দোসর
জিনিস নাই। লীলাতে এই এক—মূল—জিনিসটি অগণ্য
কোটি রকমে পরিণত হয়েছেন। যেখানে এক, সেখানে আর
কথা নাই। যেখানে লীলা অর্থাৎ অনন্ত কোটি, সেইখানেই
কথা। লীলা কথার প্রসঙ্গে আত্মা, পরমাত্মা ভগবান্‌, শক্তি,
মায়া, মন বুদ্ধি ইত্যাদি যা কিছু আমি বলি না কেন, তুমি বুঝে
নিও এই রামকৃষ্ণজী বই আর অন্য কিছু নয়। অবস্থা-ভেদে,
রূপ-ভেদে, আকার-ভেদে, গুণ-ভেদে, নাম-ভেদে ও বৃত্তি-ভেদে
এই একটি জিনিষ লীলাতে অনন্ত রকমে অনন্ত হয়েছেন
সুতরাং লীলা-কথায় এই এক জিনিসকে নানা নামে ব’তে
হয়। এই দুনিয়ায় কেবল একেরই রকমারি-সেটা কেমন
জান’-মােটামুটি উপমাতে যেমন একটা কাঠের কারখানা।
কারখানএ মূল উপাদান কেবল এক-কাঠ। এই এককাঠে

৮০ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। নানা জিনিষ হয়েছে যথা—বিম, তক্তা, দরজা, আলমারি, খাট, সিন্দুক, বাক্স, কৌটা, জাহাজ, খো ইত্যাদি ইত্যাদি। যেখানে শুধু কেবল কাঠ, সেখানে আর রকমারি নাই সুতরাং কথাও নাই ; কথার মধ্যে ঐ এক কথা-কাঠ। যেখানে কার- খানা, সেইখানে রকমারি ও তাদের নানা নাম হেতু নানা কথা। কারখানাতে কাঠের জিনিষগুলি সকলেই আকারে, বর্ণে, অবস্থায়, বৃত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন দেখায় বটে, কিন্তু সকলের ভিতরেই সেই এক-কাঠ বা সেই এক-কাঠে তৈয়ারি। এক কাঠ কারখানাতে নানা রকমারিতে পরিণত হওয়া হেতু যেমন সেই এক-কাঠেরই নানা নাম হয়েছে, তেমনি এই একম- কৃষ্ণজী, তাঁর লীলা-কারখানাতে স্থূল সূক্ষ্ম নানা ভাবে নানা রূপে পরিণত হওয়া হেতু এই এক-রামকৃষ্ণজীরই নানা নাম হয়েছে। সৃষ্টিতে সকলের মধ্যেই এই এক রামকৃষ্ণজী বা সকলগুলিই এই এক-রামকৃষ্ণজী-উপাদানে গঠিত। এইখানে একটা গান শুন:- হরে রামকৃষ্ণ বল’ রামকৃষ্ণ বল মন। রামকৃষ্ণ আমার ভুবনচন্দ্ৰ আলাে করেছেন ভুবন। যেই রাম যেই কৃষ্ণ, তিনি এই রামকৃষ্ণ, বিশ্বগুরু জগতের ইষ্ট, আমি দেখিছি পড়েছি স্পষ্ট শ্ৰীঅঙ্গে আছে লিখন । পেলে পরে দেখবি তারে, সাকারে সে নিরাকারে, আত্মারূপে সবার ভিতরে, সে চেতনে সেই জড়ে, কারণের মহাকারণ। কে রামকৃষ্ণ কোথাকারে, কাজ কি রে তাের সে বিচারে, তাের বিন্দু-আধার তায় সিন্ধু কি ধরে, তুই যাবি যদি ভবপারে ভজে নে অভয় চরণ। এখন সেই সাবেক মনের কথা। এক পরমাত্মা তিনি

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
;
••
আর বগল বাজিয়ে নাচো। আর বল'- জয় রামকৃষ্ণজীর জয়।
এখন তােমরা মুক্ত পুরুষ।
পা। মুক্ত হলেম কি করে ? যেমন ছিলাম, তেমনিই
রয়েছি—সেই রােগ, শােক, সংসারের খাটুনি, সেই সব রয়েছে,
আর ঘুরে বেড়াচ্ছি।
ভ। পূর্বের নেশার ঘাের আছে কি না? তাতেই এই
রকম দেখাচ্ছে, সেটা কেমন জান’ তুমি একটা খুব বলবান
ঘােড়ায় চড়েছ’ ঘােড়াটা খুব দৌড়চ্ছে ; এমন সময় মনে করলে
যে, আমি অমুক জায়গাটাতে একে থামাবাে; তার মত তুমি
দূর থেকে লাগাম টেনে আছে ; ঘােড়াটাও থেমে থেমে
আছে বটে; কিন্তু যেখানে থামাবাে বলে মনে করেছিলে,
সেখানে থামি খামি করেও আর দশ হাত এগিয়ে পড়ে।
তােমারও তাই ঘটেছে, দশ হাতের ভিতর আছ, কিন্তু থেমে
গেছে। এই টুকু গেলেই মুক্ত বলে জানতে পারবে।
আর ঐ যে বললে, যেমন সংসারের খাটুনি, তেমনি
রয়েছে। এর উত্তরে ঠাকুরের কথা শুন’ :—তিনি বােলতেন,
কেরাণী জেল থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে এলে, সে কেরাণীগিরিই
কবে-না-ধেই ধেই করে নেচে বেড়াবে? সংসারী লােক
ভগবানের কৃপায় মুক্ত হলে সংসারেই থাকে। সংসার কি
ভগবান্ ছাড়া? তাঁরই সংসার।
আর রােগ শােকের বিষয়-উনশালে থাকলেই গায়ে
অচি লাগে। সংসার জ্বলন্ত চুলল, সেখানে বসত বাড়ী। গায়ে
তাপ লাগবে না-না-গায়ে দাগ লাগবে না? এ সব সত্বেও
জীব ঈশ্বর কৃপায় মুক্ত হয়। নিজের অবস্থায় নিজে বুঝবে।

৭৮ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। পা। মুক্ত হয়েও ঘুচি, ঐ যে ঘােড়র উপমা দিয়ে বলেন, ওটা বুঝা গেল না ; ওটা কি রকমের? ভ। ওটা কি রকমের, অন্য কথায় শুন'। এক জন ( হাঁড়িগড়া) কুমাের একটা ঠি দিয়ে তার চাকাখানা বন্ বনিয়ে ঘুরিয়ে দেয়। লাঠি দিয়ে যতক্ষণ ঘুরুচ্ছিল, ততক্ষণ খুবই ঘুরছিল ; এখন লাঠিটা ছেড়ে দিয়েছে, তবু চাকা ঘুরছে। তােমার চাকাতে এত দিন লাঠি ছিল, কিন্তু যেই তাকে দর্শন করে ফেলেছ’, অমনি লাঠি তুলে নিয়েছেন, তবে এখনও যে ঘুছ, সে পূৰ্ব্বেকার পাকের দরুণ । এ ঘুরুনিতে অনেক কাজ আছে। ঠাকুর এই সময়ে আর এক রকমের কতকগুলি বাসন গড়বেন। পরে দেখতে পাবে। পা। ঘুরুণিটা কখন্ বন্ধ হবে ? আর হচ্ছে কি না, কি করে জাতে পারবাে ? ভ। রামকৃষ্ণজী নিজের ভিতরে তােমার মনটা যত টেনে নিবেন তত ঐ ঘুরুণি কতে থাকবে। যখন সব মনখানা টেনে নিবেন তখন একটা ভারি মজা দেখতে পাবে। সংসারের হোম, শােক, রােগ, ভয় ইত্যাদি এ গুলি থেকেও থাকবে না; এই শান্তির অবস্থা। থেকেও নাই—এখন তােমাকে সেটা বুঝতে পারবাে না। এ অবস্থার কথা, যখন হবে তখন বুঝবে। তােমার মনই তােমাকে দেখিয়ে দিবে, তােমাকে বুঝিয়ে দিবে। এখন তােমার মন বোলছে, বাঁদা রয়েছি, মুক্ত কি করে হােলুম ; তখন বেলবে, আমার আবার বাদন কিসের, আমি ত চির- কালই মুক্ত। সেইজন্য ঠাকুর বলতেন—মানুষ মনে বদ্ধ, ;

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
৮১
বিরাটে বাহিরে বহুধা হয়েছেন । এই বহুধা এক রকমে নয়,
আকারে, বরণে গুণে ও প্রকৃতিতে। এমন ভাবে তিনি
অনন্ত হয়েছেন যে, কার সাধ্য বুঝে যে, সেই এক জিনিষ
ও একের খেলা। এই এক জিনিষটীকেই আমরা নানা
নামে ডাকি। তিনি পরমাত্মা, তিনিই জীবাত্মা, তিনিই মন
ইত্যাদি। তিনিই কখন ঘােড়া ও কথন সওয়ার। তােমাদের
রঙ্গালয়ে দক্ষ-যজ্ঞে ভূত সাজে জান’ ত? যারা সাজে তারা
মানুষ, গায়ে, মুখে, হাতে কালি মেখে ভূত হয়, তেমনি আত্মা
গায়ে ময়লা মেখে মন হয়ে মনের খেলা খেলে। আবার ঐ
জিনিষই কতকগুলি উপাধি নিয়ে জীবাত্মা হয়ে থাকে। এই
সকল খেলা সব রামকৃষ্ণজীর গুপ্ত-খেলা। তিনি না দেখালে
কারাে দেখবার যাে নাই। এই ত শুলে, সব একের খেলা
আবার প্রত্যেকটিকেই আলাদা আলাদা দেখতে পাওয়া যায়।
দেহীরূপে এক রকম হয়ে আছেন ; আবার মনরূপে তারই
সঙ্গে আর এক রকম হয়ে রয়েছেন; আবার আর এক রকম
হয়ে উভয়কে আলাদা দেখছেন। অদ্ভুত খেলা !
পা। দেহীর সঙ্গে মন কি ভাবে আছে? আর মনকে ও
দেহীকে পৃথক্‌ ভাবে যে দেখছে, সে কে ?
ভ। মন, দেহীর সঙ্গে কেমন ভাবে আছে জান'? যেমন,
দুধের সঙ্গে জল আছে, কি ঘি আছে।
মনকে ও দেহীকে যে ভিন্ন বস্তু বলে দেখে, সে কে জান?
সে ঐ দেহী। সে আপনাকে আপনি দেখে। সে এত দিন
মনকে সঙ্গে নিয়ে, তার গায়ে কাদা মাখিয়ে খেছিল ; এখন
সে-খেলা বন্ধ করে, গায়ের ময়লা ধুয়ে, মনকে বিমল ক'রে

৮২ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। তার ভিতর দিয়ে আপনাকে আপনি দেখছে। এও তার আর এক রকম খেলা। যখন আপনাকে আপনি দেখে, তখন এই দেখাটাকে সাধু লােকে আত্মদর্শন বলেন। মনকে সঙ্গে নিয়েই এই দর্শনটি হয়। এখন মনের ইন্দ্রিয়-ঘােড়াগুলা আর নাই। এইখানে একটা মজার কথা শুন’-এই যে একটা “আমি” যে আজী- বনটা “আমি” “আমি” বলে তর্জন গর্জন ক’চ্ছিল, সেই আমিটা ঐ সময়ে এমন পালায় যে, তার গন্ধ মাত্র থাকে না। ত্রিভুবন খুজলেও কোথাও তাকে দেখতে পাবে না। পা। আপনার কথামত আত্মদর্শন মানে, জীবাত্মার স্ব- স্বরূপ দর্শন। আচ্ছা, এই দর্শন কি চক্ষুর দ্বারা হয়? ভ। না, বােধ দ্বারা। পা। এই দর্শন, সাকার কি নিরাকার ? এক রকম দেখায়, সে কি-মুখে ব’তে পাল্লুম না। তবে সে সময়ের অবস্থার আভাস দিতে পারি। যে লােক এই দর্শন করেন, তখন তার অবস্থা কেমন জান’-যেমন একজন গাঁজায় দম্ দিয়ে ভে। হয়ে বসে আছে। এখানে মনের ঘােড়র খেলা একদম্ বন্ধ। সে খেলা যেন কখনও ছিল না। এখানে সুখ দুঃখ, ভাল মন্দ কিছুই নাই। এ রাজ্য মহা- শান্তির রাজ্য ; তা সে যতক্ষণের জন্যেই হোক না । পা। এ অবস্থায় ভগবাকে কিরূপ দেখায় ? ভ। ঠাকুর বলতেন, একবার রাম হনূকে জিজ্ঞাসা করেন, হনুমান, তুমি আমাকে কি রকম দেখ’ ? হ বল্লেন হে রাম— তােমাকে কখন দেখি মহাগ্নি, আর আমি তার একটি ফিকি : ;

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। •• কখন দেখি তুমি প্রভু, আমি দাস ; আবার কখন দেখি, তোমায় আমায় ভেদ নাই। এখানে ভগবান্‌কে মহাগ্নি দেখায়। পা। জীবনন্মক্ত অবস্থায় মানুষ কি রকম ভাবে সংসারে থাকে ? সে সংসারে ভেসে বেড়ায়, তার ভিতর আর জল ঢুকে না। সে সংসারের সুখ দুঃখে চঞ্চল হয় না, ধ্রুবতারা ভগবানের লক্ষ্যটি হারায় না। তার দেহখানা যে দিকেই টলুক না কেন, মনখানা, ঠিক একেবারে কম্পাসের কাটার মত ঈশ্বরের পাদপদ্মের দিকে আঁটা থাকে। এই পরম শান্তির অবস্থা। ভগবানের অপার কৃপা না হলে, মানুষ এ অবস্থা পায় না। এই জীবন্মুক্তির অবস্থায় আমিটা একেবারে যায় না একটুকু থাকে, কিন্তু সে মরা-আমি হয়ে থাকে। পা। মনখানা, যােল-আনা রামকৃষ্ণজীর ভিতরে গেলেই যদি সব লেঠা মিটে যায় তা হলে কি করে, শীঘ্র মন- খানা তাতে যায় ? ইহার উপায় কি? এখন মনটাকে দেখছি, ঠিক মাছির মত, মধুতেও বসছে, আবার ময়লাতেও বছে। ভ। আগেএকেবারেই মধুর ধার দিয়েই যেত না, কেবল ময়লাতেই থাক্তত। এখন যার কৃপায় মধুর স্বাদ পেয়েছে, তারই কৃপায় সময়ে মৌমাছির মত স্বভাব পেয়ে অবিরত মধু- তেই থাকবে! তুমি এখন তাতে লেগে থাক’! তা হলেই সব হয়ে যাবে। ঠাকুর একটী গান করতেন, হরি সে লাগি রহরে ভাই। • তেরা বনতু বনত বনি যাই।

৮৪
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা
4
•
অঙ্কা তারে, বঙ্কা তারে, তারে সুদন কসাই,
শুগা পড়াকে গণিকা তারে, তারে মীরাবাই ।
দৌলৎ দুনিয়া মালখাজনা, বেনিয়া বয়েল চালাই,
এক বাৎসে ঠাণ্ডা পড়েগা খোঁজ খবর না পাই ।
য়্যাসি ভক্তি কর ঘট ভিতর, ছেড় কপট চতুরাই,
সেবা বন্দি অওর অধীনতা, সহজে মিলি রঘুরাই !
ঠাকুর আর একটি সুন্দর উপমা দিতেন। বর্ষাকালে
মাঠ একেবারে ডুবে যায়, তখন মাঠ আর দেখা যায় না; মাঠ
যেমন পুকুর ! তখন মাঠ কি করে ? সে কেবলমাত্র রাতদিন
আকাশ-পানে তাকিয়ে চুপ করে পড়ে থাকে ; সময়ে সে
দেখতে পায় যে, যে জলে তাকে ডুবিয়ে রেখেছিল, সে জল
আর নাই, সৰ শুকিয়ে গেছে - তুমিও তেমনি রামকৃষ্ণজীর
মুখপানে তাকিয়ে বসে থাক’; সময়ে দেখতে পাবে যে, যে
কামিনীকাঞ্চনের রসে তােমার মনকে ডুবিয়ে রেখেছে, সে
রস আর নাই ।
ঠাকুর আর একটা কথা বলতেন—হে জীব! তােমার দুটী
হাত, একটী ঈশ্বরের পাদপদ্মে রাখ’, আর একটা সংসারে রাখ’,
যার বেশী জোর, সে পরে টেনে নেবে।
পা। পরমহংসদেবের কথাগুলি কি সুন্দর। আমরা
নেশাখাের লােক, তার উপর বেশ্যাদের সঙ্গে ব্যবসা-তারও
একটা মৌতাত আছে, কিন্তু যতক্ষণ এর কথা শুনি ততক্ষণ সে
সব কিছুই মনে থাকে না। মনটাকে যেন তার কথায় একে-
বারে ভুলিয়ে রাখে। এই বয়সে অনেক রকমের কথা শুনেছি
কিন্তু এমন মন-মজানাে কথা কোনটিই নয়। যত শুছি, তত

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণমহিমা। অারও শুনতে মন যাচ্ছে, অথচ হাতে যে কি নগদ পাচ্ছি, তা ত কিছু বুঝছি না, আর যে সব কথা শুনছি, তাও যে কত দূর বুঝছি; তাও জানি না। এখন একটা জিজ্ঞাসা করি, সেই—জীবন্মুক্তির কথায় বল্লেন, আমিটা মরে যায় কিম্বা যদিই একটুকু থাকে, সে মরা- আমি হয়ে থাকে—ঐ কথাটা কি বলুন দেখি ? এ কথাটা মনের কথার চেয়েও শক্ত, ঠাকুরের কৃপায় যতটুকু দেখছি, বলি শুন”। ছেলে বেলা থেকে মানুষ যে এই “আমি” “আমি” রবটী ধরে, এটা বড় সৰ্ব্বনেশে রব। জুজু বলে ভয় দেখালে ছেলেরা যেমন ভয় পায়, অথচ জুজু বলে একটা কোন জিনিস নাই ; তেমনি “আমি” “আমি” ব'লে মানুষ যে চীৎকার করে বেড়ায়, কিন্তু আমি বলে কোন একটা জিনিসই নাই। ছেলে বড় হলে যেমন বুঝতে পারে যে, জুজু একটা ভয়-বাচক শব্দ মাত্র, তেমনি মানুষের জ্ঞান হলে সে বুঝতে পারে, আমি একটা অহঙ্কার- বাচক শব্দমাত্ৰ-জুজুর মত অলীক, মিথ্যা। পরমহংসদেব ব’তেন, আমিটা কেমন জান’-যেমন পিঁয়াজটী। পিঁয়াজের খােসা ছাড়াতে ছাড়াতে যেমন পিয়াজে আর পিঁয়াজ থাকে না; তেমনি শরীরটা ধরে বিচার করতে গেলে, আমিকে আর পাওয়া যায় না। মানুষে যে এত বিশ-বাউ জলে পড়েছে, মানুষে যে সিদে পথ ছেড়ে গােলকধাঁধার ভিতর ঢুকেছে, মানুষে যে এমন শুষ্ক ডাঙ্গায় বাস করে অকূল জলে ভাসছে, এর মূল কারণ এই নাই-আমিকে আছি-আমি জ্ঞান করা। আমি-জ্ঞানটি ৮৬ শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ; পূরাে অজ্ঞান ও অবিদ্যার বন্ধন, এই জ্ঞানটী হলেই তার ধোঁকার টাটী ভেঙ্গে যায় ; তার ধৰ্মধৰ্ম্ম, পাপ-পুণ্যের ধাঁধা ছুটে যায় ; তার শুচি অশুচি সমান হয় ; তার গলার হার গলায় রয়েছে, সে দেখতে পায় ; তার পূজা জপ ক্রিয়াকাণ্ড সব ঘুচে যায় ; তার বিশ্বময় হরিদর্শন হয় ; আর যা কিছু হয়, তা সেই অবস্থায় না পড়লে, কেউ বুঝতে পারে না। আমি অমুকের ছেলে, আমি অমুক, আমাকে জানিস্ না - এই সব কথাগুলি যে আমি বলে, সে আমিটা মিথ্যা নয় বটে, কিন্তু বস্তুতঃ সে অামি কে জান? সে আনি—তিনি মাত্র। এক বিষয়টী বিচার-বুদ্ধিতে স্থির করা যায় না, হাজার বার শুলেও বুঝা যায় না; তবে যখন ভগবান্ বুঝিয়ে দেন, দেখিয়ে দেন, তখন মানুষ বুঝতে পারে ও আমি-হারা হয়। সৃষ্টিতে একটা বই দুটী জিনিষ নাই। এই জীব-জগতে যা কিছু দেখছ’, সব সেই তিনি। মায়ার কৌশলে, বন্ধনে জীব “আমি” “আমি” করে। মায়ার এমন মােহিনী খেলা, এই আমিটি যে তিনি, এ ব্যাপারটা আর জানতেই দেয় না। এই মায়ার খেলায় জীব মুগ্ধ। মায়া, জীবকে তার খেলা প্রান্তেও দেখতে দেন না! এই মায়া দ্বিবিধ ভাবে খেলা ক’চ্ছেন। এক বিদ্যা- মায়া আর এক অবিদ্যা-মায়া। যে সব জীৰ অবিদ্যা মায়ার রাজ্যগত, তারা কামিনী-কাঞ্চন নিয়ে, গুরুহারা হয়ে বেহুশ হয়ে খেলছে। ইহারা মায়ার কিছুই খেলা দেখতে পায় না। ইহাদের দিনে-রেতে এক ধারা বইছে। আর যারা ভগ- বানের কৃপায় বিদ্যা-মায়ার অন্তর্গত, তাদিগে মায়া নিজের খেলা দেখিয়ে দিয়ে খেলতে খেলতে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
;
এমন জীব, কোটির মধ্যে একটাও দুলাভ। এ একটী যদি
মিলে, সে মায়ের বরপুত্র। এইটী জেনাে, ইনি বরপুত্র হলেও
হাসি কান্নার খেলা থেকে মুক্ত নন্। যতদূর খেলা, ততদূর
মায়ার রাজ্য। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর থেকে কীটাণুকীট পৰ্য্যন্ত
মায়ার ঘূর্ণিপাকে সব ঘুছেন। মায়ার বন্ধন কেমন জান’-
আভাসে যেমন রবারের গােলাকার দড়ি। যে বস্তুটাকে বাঁধে,
সেটা যতই মােট। হােক না কেন, দড়ির আয়তন ততই বৃদ্ধি
হয় ; আবার সেটা যতই সরু সূক্ষ্ম হােক না কেন, দড়ির আয়-
তন ততই সরু ও সূক্ষ্ম হয়। বস্তু যতই সুক্ষ্ম হােক, বন্ধনের মধ্যে
থাকতে হবে। এই বন্ধনের পর যে কি, তা আমি জানি না
ও তার কিছুমাত্র আভাসও জানি না। যিনি যতই বরপুত্র
হােন্ না কেন, বাঁধনের হাতে মুক্তি নাই। তবে বরপুত্রের
বাধন প্রার্থনীয় ও দেবেশবাঞ্ছিত। কেন না, এ বাঁধনে সুখ বই
দুঃখ নাই। এরা মায়ার খেলা দেখতে দেখতে যান। এখা
নেও অবিদ্যার বন্ধনের মত মনের হাসি কান্না আছে বটে,
কিন্তু এ হাসি কান্না আর এক রকমের। ইহাতে বেহুশ করে
, আর একটা মজা আছে। এই সব মায়ার খেলা; মায়ার
কৃপায় এ খেলা দেখবার জিনিস—শুরও নয় আর বলবারও
নয়।
“আমি”র কথা হচ্ছিল ; মায়া এই আমিটিকে আর দেখতে
দেয় না, আর “আমি”ও একেবারে যায় না। রামকৃষ্ণজী
জীবকে এই সব খবর জানিয়ে দিবার জন্য, অনেক সাধনা করে-
ছিলেন, আর মধ্যে মধ্যে বােতেন, নাহং, নাহ, তুই', অর্থাৎ
আমি নই, আমি নই,—তুমি—তুমি। জীব আমি ছেড়ে,
;

bbor ; • শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। তুমি তুমি কখন্ বলে, রামকৃষ্ণজীর কথিত তার একটি উপমা বলি শুন’। গরু পশু জাতি। বাছুরটি প্রসব হবা মাত্র হাম্বা হাম্বা রব ধরে। হাম্বা হাম্বা মানে-হাহে হামূহে, অর্থাৎ “আমি” ” “আমি”। বড় হলে, চাষা লাঙ্গলে বা গাড়ীতে যুতে দিনে-রেতে খাটায়, তবু আমি রবটী ছাড়ে না। বুড়াে হলাে, অস্থিচর্ম- সাৰ হ’লল, খাটুনির বিরাম নাই, তবু রবটী ছাড়ে না। তার পর মরে গেল ; চামড়াটা নিয়ে চেঁছে ছুলে, পিটিয়ে, টেনে ঢাক ছাইলে ; সেই চামড়া ঐ অবস্থাতেও বাজালে হা হা করে রবটী আর ছাড়ে না। সব শেষে শিরা, আঁতি ইত্যাদি নিয়ে তায় ক্রমাগত পাক দিয়ে দিয়ে তাত তৈয়ার করে। তখন সে অবস্থাতেও তার ভিতরে আমি থাকে। তার পর ধুনুরী যখন তার যন্ত্রে তঁত সংযােগ করে টান দিয়ে বাজায়, তখনও ক্ষীণ স্বরে “আমি” “আমি” রব করে। সকলের শেষে যখন জানু পেতে বসে, যন্ত্রটা ধরে, ডান হাতে মুগুর নিয়ে বার বার সেই তঁাতের উপর প্রবল বেগে ঘা মারে, তখন সে, সেই চিরকেলে “আমি” রবটী ছাড়ে আর তুহু তুহু করে। জীবকে এই রকমে খাটিয়ে, বাইয়ে, মুখ দিয়ে রক্ত উঠিয়ে, উদ্ব্যস্ত করে ধন, জন, মান ছাড়িয়ে নিয়ে, ক্রমাগত শােকে তাপে যদি জর্জরিত করা হয়,তখন সে আর “আমি” “আমি” করে না-বলে হে ভগবান, “তুমি” “তুমি”। জীবের এই রকম দুর্দশাগ্রস্থ না হলে, ঐ যে বজ্জাত আমি তার ভিতর ঢুকেছে, সে আমি আর যায় না। এই আমি স্বয়ং মূর্তিমতী মায়া। পা। আপনি পূৰ্ব্বে বল্লেন যে, আমি নামে যে জিনিষটী, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ৮৯ সেটী আমি নয়, সেটা তিনি। আবার এই আমিটীকেই বজ্জাত আমি ব’ছেন, তাহলে তিনি, বজ্জাত হলেন কি করে? ভ। মায়ার ভয়ঙ্কর খেলা, যতদিন না ঈশ্বর-লাভ হয়, তত- দিন পপিপুণ্য, ভালমন্দ, সৎ-অসৎ, এই সব দ্বন্দ্বভাব থাকে। আর ঈশ্বর লাভ হলে, মন্দ কি বজ্জাত বর কিছু থাকে না। বজ্জাত আমি কতদিন থাকে জান? যত দিন ঐ “আমি” কে না দেখতে পাওয়া যায়। তাকে দেখতে পেলে আর বজ্জাত থাকে । বজ্জাত অবস্থায়,“আমি” অহংকারে পরিপূর্ণ থাকে। এই অহংকার-মায়া। এই অহংকার নষ্ট হলেই ঐ আমিটা “তুমি” হয়। আমি যখন “তুমি” হয়, তখন তার আর মায়া-অহংকার থাকে না। আমি কে চিনতে পারলে অহংকার এমন পালায় যে, আর তাকে ত্রিভুবন খুজলেও দেখতে পাওয়া যায় না। রাম- কৃষ্ণজী মধ্যে মধ্যে ব’লতেন, দেখ’ আমিটীকে খুঁজতে গেলাম, কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না। সেই অদ্বিতীয় সর্বশক্তিমান ভগবান্ এক হয়েও, মায়াকে সঙ্গে নিয়ে জীব-জগৎ সৃষ্টি করে অগণ্য কোটি ‘আমি’ হয়ে খেলা করছেন। তিনি একটা মাত্র বস্তু, অনন্ত ঘটের ভিতর প্রবেশ করে অনন্ত “শমি” হয়ে রয়ে- ছেন। প্রত্যেক ঘটের প্রত্যেক অবস্থাতে সেই তিনি বই আর কেউ নয়। এই জন হলে আমি অর্থাৎ বজ্জাৎ আমি আর থাকে না; যা থাকে, তা তিনি। জ্ঞানমার্গীরা “অামি”কে যখন চিতে পারেন, তখন তারা সােহং বলেন,আর ভক্তের“তুমি” বা “তিনি”বলেন। ঠাকুর রাম- কৃষ্ণজা ভিতরে পূর্ণজ্ঞানী, কিন্তু জীব-শিক্ষার জন্য তিনি ভক্তি- ভাৰ দেখাতেন। ঠাকুরের মূর্তিটা যেন জ্ঞানময়, আর সেই • শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। ; মুর্তিটী ভক্তির চাদরে ঢাকা। ঠাকুর জানেন যে, এই কলিকালে জ্ঞান-পথে যাওয়া বড় শক্ত, আর ভক্তিপথে সহজ ; তাই সর্বদা তার ভক্তির চাদরখানি গায়ে থাকৃত; অর্থাৎ ঈশ্বর-লাভে ভক্তি-পথে যাবার জন্য তিনি সকলকেই উপদেশ দিয়েছেন। আমি-দর্শনের নাম আত্মদর্শন। আত্মদর্শন হলেই বজ্জাৎ “আমি” পালিয়ে যায় ; মে আর থাকে না। পূর্ণজ্ঞান হলেই আত্মদর্শন হয়, বা আত্মদর্শনে পূর্ণজ্ঞান হয়। পূর্ণ-জ্ঞানে আমিটা কিরূপ থাকে না, জান’—যেমন, যতক্ষণ না ঠিক দুফর বেলা হয় অর্থাৎ সূৰ্য্যটী ঠিক মাথার উপরে না উঠে, ততক্ষণ বস্তুর একটা ছায়া থাকে ; আর সুৰ্যটী মাথার উপর উঠলেই চারদিকে তাকাইলে ঐ ছায়াটা দেখতে পাওয়া যায় না; ঠিক তেমনি জ্ঞানসূৰ্য্য পূর্ণভাবে বিকাশ হবামাত্র ঐ বজ্জাৎ আমিটীকে আর দেখতে পাওয়া যায় না। তখন বেশ বুঝতে পারা যায় যে,এত দিন ছায়ার মতন ঐ বজ্জাৎ আমি ছিল। ছায়া মাত্রেই ছায়া হয়েও অলীক ; সুতরাং আমিটাও তদ্রুপ অলীক। অজ্ঞানে আমিটী ছায়াভাবে থাকে ; পূর্ণজ্ঞানে ছায়াটী অর্থাৎ বজ্জাৎ আমিটা চলে যায়। তবে থাকেন কে ? ছায়াটী যাকে ধরেছিল, তিনিই কেবল থাকেন। এই দর্শন অনবরত থাকে ; সংসারের কাজে নামলেই আবার আমি এসে পড়ে। তবে এখন আর তার কেরামত থাকে না। এই আত্মদর্শন হলেই দেখতে পাওয়া যায়, সেই এক ভগ- বান্ লীলায় সৃষ্টিতে অনন্ত হয়ে রয়েছেন। এই দর্শনের নাম বিরাট-রূপদর্শন। তুমি স্মরণ কর, বহু পূৰ্ব্বে বলেছি, রামকৃষ্ণ জীর বিরাটরূপ আছে—এই তার বিরাটরূপ। “ষে রামকৃষ্ণ- ।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ; জীকে চোদ্দপুয়া দেখেছি, সেই তাকেই এখন পৃথিবীতে প্রত্যেক বস্তুতে দেখতে পাচ্ছি। এই জগৎ রামকৃষ্ণময়। রামকৃষ্ণজী চোদপুয়াও বটেন, আবার এই বিরাটরূপীও বটেন। পৌত্তলিক- ধৰ্ম্মে যারা যারা দোষারােপ করেন, পৌত্তলিকতাকে যারা ভ্রান্ত ব'লে বাখ্যা করেন, এই আত্মদর্শন হলেই তাদের অজ্ঞানতা বেশ দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম প্রথম কেশব সেন,ঠাকুরের মা- কালীর উপর ভক্তি বিশ্বাস দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—মহাশয়, আপনার মা-কালী কত বড়? ঠাকুর উত্তর দেন-কেশব তুমি বিলাত গিয়াছিলে; সাগর দেখেছ ত? আমাদ্র মা-কালী তার চেয়েও বড়। আর একবার কেশব বাবু সশিয্যে ঠাকুরের সঙ্গে কোন পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় একজন পথের পাশ্ব স্থিত একটা গাছের ডাল ছেদন কচ্ছিল, ঠাকুর তাই দেখে অসহ আৰ্তনাদে ডাক ছেড়ে এই বলে কঁদতে লাগলেন, “ওগাে, আমার মাকে কাটছে”। কেশবকে ইহাতে দেখালেন যে, মা-কাপ সৃষ্টিময়ী, ব্রহ্মময়ী; শুধুই যে চোদ্দপােয়, তা নয়। আবার এদিকে মা- কালী চোদ্দপুয়ারূপে কত ঠিক, তার কতই যে দেখালেন, তার সীমা নাই। মা-কালীর নাকের কাছে তুলা ধরেও দেখেছেন ও দেখিয়েছেন যে, মা-কালীর নিশ্বাস পড়ছে। এক দিনের ঘটনা শুন’---ঠাকুর আপনার ছােট খাটে বসে আছেন, অনেক ভক্তও কাছে আছেন ; ঠাকুর হঠাৎ পূর্বদিকের দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে একবারে উঠানে হাজির ; যেখান থেকে মা-কালীর গােটা মন্দিরটী দেখতে পাওয়া যায়। ঠাকুর মহাভয়ে ব্যাকুল প্রাণে মন্দিরের নবরর দিকে উৰ্দ্ধদৃষ্টি করে ও হাত তুলে চীৎকার করে বােতে লাগলেন ‘দেখিস্ মা” পড়ে যাবি, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। পড়ে যাবি”। এই বলেই প্রায় বাহশূন্য। ভক্তেরা ধরাধরি করে তার ঘরে তাকে নিয়ে এলেন ; কতক্ষণ পরে ঠাকুরকে কারণ জিজ্ঞাসায়, উত্তর দিলেন মা মাতালের মতন টোতে টোতে নবরত্নের কার্ণিশের ধারে ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, পাছে পড়ে যায়, তাই ভয়ে আমি এমন হয়ে গিয়েছিলুম। রামকৃষ্ণজীর মহল্লীলা শুনে বুঝ’, সাকারবাদীরা কত রকম রসাস্বাদ করেন। তার মাকে চোদ্দপুয়াও দেখেন, আবার বিশ্বময়ী, ব্ৰহ্মময়ীও দেখেন। একজন ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন --ব্রাহ্মধৰ্ম্মে ও হিন্দু-ধৰ্ম্মে প্রভেদ কি ? ঠাকুর উত্তর করেন--শানাই বাজানো দেখেছ? যেখানে শানাই বাজে, সেখানে দুজনা শানাইওয়াল থাকে। এক জন কেবলমাত্র পো ধরে থাকে, আর একজন রাগরাগিণী বাঙ্গায়। ব্রাহ্মরা পেঁ। ধরে থাকে আর সাকারবাদীরা রাগরাগিণী বাজায়। রাগরাগিণী বাজায় এর মানে,সাকারবাদিরা ভগবাকে নানা রূপে সরাটে, বিরাটে, সাকারে, নিরাকারে,সকল রকমে সম্ভোগ করেন। রামকৃষ্ণজী অগণ্য সাধনা করে ও ভগবান্‌কে সকল রকমে সম্ভোগ করে জগৎকে এই বলে গেলেন—ভগবানে সব সস্তব। তিনি সব হতে পারেন ও হন। আর একটী কথা, বার বার বল্লেন যে-ভগবাকে কেউ সীমাবদ্ধ করবে না। তিনি এইটী—আর অটী নন্ বা হতে পারেন না; এই কথাটা জোর করে বল্‌বে না। ভগবানের সম্বন্ধে একটা বিশেষ মত প্রকাশ করলেই সেই অসীমকে সীমাবদ্ধ করা হয় ; তার সর্ব- শক্তিমানঙ্গে হস্তক্ষেপ করা হয়। এখনকার ব্যবসাদার ধর্মোপদেষ্টাদের মধ্যে এই মন্তব্য বড়ই

। শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
প্রবল। তারা বলেন, এই আমাদের মতটী বা আমরা যা বছ,
এইটিই সত্য, আর অপরে যা করে বা বলে তা ভ্রান্ত। এ
প্রকার বুদ্ধিযুক্ত অজ্ঞান ব্যবসাদারদিগে নমস্কার ।
আমিটি মরে গেলেই মানুষ মুক্ত হয়। ভগবান্ রামকৃষ্ণ
জীর কথা—“মুক্ত হব কবে, আমি যাবে যবে”। বদ্ধ, মুক্ত
এই দুটি অবস্থা কে জানিয়ে দেয় জান’? মন। মন যদি
তােনাকে বুঝিয়ে দেয় তুমি বদ্ধ, তা হলে তুমি বদ্ধ ; আর
মন যখন মুক্ত বলে জানিয়ে দেয়, তখন তুমি মুক্ত। সব
মনের খেলা। মনই ইহার ইন্দ্রিয়স্বরূপ। মন যতদিন বন্ধ
থাকে, ততদিন মন সর্বদাই সংশয়যুক্ত। এ অবস্থায় মনের নাম
সংশয়, আর মুক্তাবস্থায় মনের নাম চৈতন্য। মন, বুদ্ধি দুটী বস্তু,
কিন্তু শুদ্ধাবস্থায় একটি হয়, আর তখন তার নাম হয় চৈতন্য।
ভগবান্ মন বুদ্ধির অগােচর হয়েও মন-বুদ্ধির গােচর,
ইহার অর্থ—তিনি মনের সংশয়যুক্ত অবস্থার অগােচর,
অার শুদ্ধ-মন, শুদ্ধ-বুদ্ধির বা চৈতন্যাবস্থার গােচর। শুদ্ধমন
শুদ্ধবুদ্ধি বা চৈতন্যের সহায়েই যে চৈতন্যে জগৎ চৈতন্যময়,
সেই চৈতন্যময়ের সাক্ষাৎকার হয় এবং এই অবস্থাতে মন-বুদ্ধি
( খণ্ড চৈতন্য) চৈতন্যময়ের সঙ্গে মিশেও যেতে পারে। একটি
গানের কতটুকু বলি শুন'। এই গান ঠাকুর অনেক সময়ে
গাইতেন।
মজলাে অামার মন-মরা শ্যামাপদ নীলকমলে।
ভ্রমর কালাে, চরণ কালাে, কালােয় কালাে মিশে গেল ইত্যাদি।
মন যখন শ্যামাপদ নীল-কমলে মজে, তখন সেই মন
চৈতন্যাবস্থা প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ তখন তার আর মন নাম

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। নাই, তখন তার নাম শুদ্ধ মন বা চৈতন্য ; এখন তার পূর্ব- কার বর্ণ ফিরে গিয়ে শ্যামার পায়ের যে বর্ণ, সেই বর্ণ হয়ে গেছে। আবার এ দিকে মা চৈতন্যময়ী, সেই চৈতন্যময়ীর সঙ্গে মন-চৈতন্য সমজাতি হওয়া বশতঃ কালােয় কালাে মিশে গেল, এবং এই মিলনে সব গােল মিটে গেল, সংসারের খেলা ফুরালে ও তত্ত্বে তত্ত্ব এক ঠাঁই হল। মন শুদ্ধ হয়ে একবার চৈতন্য হলে অমনি চৈতন্যময় তাকে ধরে ফেলেন। ইহার অর্থ, মন চৈতন্য হলে, সে চৈতন্যময়ের সমজাতি হয় কি না? সমজাতি হলেই মিলন অবশ্যম্ভাবী। সমজাতি না হােলে কেউ কার সঙ্গে মিলে । দুধের সঙ্গে দুধ মিশে, কিন্তু ঘি যদিও ঐ দুধেই প্রস্তুত, তথাপি দুধে ঘিয়ে মিশে না। দুধে ঘি দিলেই, ঘিটা আলাদা ভাসবে। কিন্তু যদি ঐ দুধকে ঘি করা যায়, তা হােলে উভয়ের উভয়ত্ব নষ্ট হয়ে একত্ব হবে অর্থাৎ মিশে যাবে। চৈতন্যময়ে মায়া মিশ্রিত হয়ে এই সৃষ্টি জীব-জগৎ হয়েছে। এই জীব-জগৎ মায়া-বিমুক্ত হলেই চৈতন্য হয়ে যাবে । এ অবস্থায় সেই বহুরূপী একরূপী হন এবং তা কি প্রকার- কেবল তার গােচর মাত্র। এই ধ’রে বুঝ, সেই চৈতন্যময় মায়া উপাধি গ্রহণ করে, কেমন জীব-জগৎ হয়েছেন এবং জীব-জগতে যাবতীয় অনন্ত কোটি সেই তিনি বই আর কে ? এই দুনিয়া সেই একের খেলা কি প্রকার দেখ। মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার, আত্মা, জীবাত্মা এই সব যাবতীয় নাম সেই এক বস্তুর মাত্র। পাঁ। আত্মা,জীবাত্মার কথা নূতন হ’লল। এ দুটি কি রকম ?

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ভ। আত্মা, জীবাত্মা এই দুই ধরেই ধাবৎ খেলা। আত্মাকে আত্মাও বলে, আবার পরমাত্মাও বলে। ব্রহ্মজ্ঞানীর ব্রহ্ম, যােগীর আত্মা ও ভক্তের ভগবান্ এই তিনটি এক জিনিষ ও একের নাম ; বৃহদগ্নি থেকে যেমন গণনাতীত অগ্নিকণা বা ফিনকির সৃষ্টি, তেমনি আত্মা বা পরমাত্মা থেকে জীবাত্মাদের সৃষ্টি। এক পরমাত্মা নিজের মহাশক্তি মায়ার সহায়ে কোটি কোটি নানাজাতির, আকৃতির, গুণের ও বর্ণের জীবাত্মারূপে পরিণত বা তাদের সৃষ্টিকর্তা। জীব- ত্মারা পরমাত্মাতেই বিচরণ কচ্ছে, তাতেই সৃষ্ট এবং তাতেই লয় হয়। পরমাত্মার মধ্যে জীবাত্মা কেমন, উপমা দিয়ে বলি শুন’-পরমাত্মা যেমন অকূল, অপার মহাসাগর। এ সাগরের আদি অন্ত কিছুই নাই। এই সাগরে জীবাত্মারা কি ভাবে অবস্থিত জান’,-যেমন কোটি কোটি রকমের কোটি কোটি পাত্র এই সাগরের জলে নিমগ্ন। এই এক একটি জলপূর্ণ পাত্র এক একটি জীবাত্মা। জীবাত্মাদের মধ্যে যে কোটি কোটি রকমের শরীর, রূপ, আধাপাত্র, তাও ঐ জল থেকে হয়েছে। তােমাকে পূর্বেই বলেছি, সূক্ষ্মই স্থূল হয়েছেন—যেমন বাষ্প অতি সূক্ষ্ম, ঐ বাষ্প থেকে মেঘ হয়েছে, মেঘ থেকে জলকণা, জলকণা থেকে জলবিন্দু, জল-বিন্দু থেকে জল, আবার জল থেকে বরফ, তেমনি অতি সূক্ষ্ম পরমাত্মা স্থূল হয়ে আধার হয়ে ছেন, আর ঐ আধারের ভিতরে সেই জলরূপ পরমাত্মাই আছেন। জীবাত্মার জন্মও নাই, আর মরণও নাই। জল থেকে হয়, জুলে থাকে আবার জলেই মিশায়। ঘটের ভিতর জল-

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
রূপ যে জীবাত্মা, সেও যেমন ঘট ভাঙ্গলে জলে মিশায়, তেমনি
ঘটটাও স্কুল থেকে সূক্ষ্ম হয়ে সেই জলে মিশায়।
কাকে বলে জান’?—ঐ যে ঘট ভেঙ্গে ঘটের জল সাগরে
মিশিয়া যায়, কি আর এক ঘটে প্রবেশ করে, ওর নাম
মরণ। সূক্ষ্ম যেমন স্থূল হয়, স্থূলও তেমনি সূক্ষ্ম হয়—যেমন
বরফ গলে জল, জল থেকে মেঘ বাষ্প ইত্যাদি।
এই যে পরমাত্মাকে সাগরবৎ বললাম, তাও বলা যায়,
আবার মহাকাশও বলা যায়। বেদে শুনেছি মহাকাশ
বনে।
“বেদের আভাস, তুই ঘটাকাশ, ঘটের নাশকে মরণ বলে।
শূন্যেতে পাপ পুণ্য মান্য গণ্য করে সব খুয়ালে।”
বাষ্পের যেমন লাবস্থা মেঘ, জল কণা, জল, বরফ,
তেমনি মহাকাশের স্থলাবস্থা পঞ্চভূত। আবার এই পঞ্চভূত
পঞ্চীকৃত হয়ে জীব-জগৎ। সূক্ষ্ম থেকে স্কুল, স্কুল থেকে
সূক্ষ্ম যেমন, তেমনি নিত্য থেকে লীলা ও লীলা থেকে নিত্য।
এ দিক ধরে ওদিক যাওয়া যায়, আবার ওদিক থেকে এ
দিকে আসা যায়। একেই পরমহংসদেব অনুললাম-বিলােম
বলতেন। তিনি আরও একটি বড় সুন্দর কথা বােলতেন
—যার নিত্য, তারই লীলা--যার লীলা, তারই নিত্য।
এই জন্য ঠাকুর শঙ্করের মত জীবজগৎ মিথ্যা—এ কথা বলেন
নাই। তবে শঙ্করের মতকেও উড়িয়ে দেন নাই।
জীবাত্মা সম্বন্ধে রামকৃষ্ণজী যেমন বুঝাচ্ছেন, দেখাচ্ছেন,
আর এক রকমে তােমায় বলি শুন। জীবাত্মা আর কেহ
নয়,সেই পরমাত্মাই জীবাত্মা-তুফাতের মধ্যে, পরমাত্মায়

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
-
মায়া নাই, জীবাত্মায় মায়া আছে। পরমাত্মাই মায়া
উপাধি নিয়ে জীবাত্মা হয়েছেন। পরমাত্মায় মায়া থেকেও
নাই-তার মায়া তার কাছে মায়া নয়। মায়াতে তাকে
ভুলতে পারে না। মায়া, তাকে লাগে না; যেমন সাপের
কয়েসে বিষ আছে, কিন্তু সে বিষে সাপের কোন অপকার
হয় না, তেমনি পরমাত্মায় মায়া থেকেও তাঁকে, অভিভূত
করতে পারে না—জীবাত্মাকে মুগ্ধ করে। পরমাত্মার নির্লিপ্ত
ভাব, জীবাত্মার লিপ্তভাব। পরমাত্মা সাক্ষীস্বরূপ, আর
জীবাত্মা ফলভােগী। সুখ-দুঃখ, পাপ-পুণ্য, ভাল-মন্দ, জীবাত্মা
সব ভােগ করেন, পরমাত্মার কাছে এরা যেতে পারে না
সে কেমন জান’, যেমন ধূয়ায় যদি দেয়ালের গায়ে লাগে,
তা হলে দেয়ালে দাগ পড়ে, কিন্তু আকাশে কোন কলঙ্ক
বসাতে পারে না। যিনি মায়ামুক্ত পরমাত্মা কি শিব,
তিনিই মায়াযুক্ত জীবাত্মা কি জীব। এই জীবাত্মা, মায়াটা
ছেড়ে দিলেই স্ব-স্বরূপ প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ শিবত্বে গত হয়। জীব
শিব হয়ে জন্ম-মরণের ভয় থেকে এড়ান।
পা। পরমাত্মা স্বাক্ষীস্বরূপ আর জীবাত্মা ফলভােগ,
এই ব্যাপারটা কি রকম?
ভ। ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর মুখে এ বিষয় যেমন শুনা আছে।
তাই বলি, শুন’। একদিন ঠাকুর বল্লেন যে, আমার সাধন
ভজনের সময় এক দিন আমি পঞ্চবটীর তলায় বসে আছি,
হঠাৎ গাছের দিকে লক্ষ্য পড়ে। দেখলাম গাছের একটা
ডালে দুটী পাখী রয়েছে। একটা পাখী স্থির, ধীর, নড়ে চড়ে
না; যেমন সােলার পাখী, আর একটা ঠিক তার বিপরীত

১৮ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। প্রকৃতিযুক্ত; একবার পড়ছে, একবার লাফাচ্ছে, একবার খেলছে, একবার শব্দ করছে। খানিকক্ষণ পরে, যে পাখীটা স্থিরভাবে আছে, সে মুখ হাঁ ক’বলে, আর অপর চঞ্চল পাখীটা তার মুখের ভিতর ঢুকে গেল। যেমন মুখের ভিতর গেল, অমনি সেই অচঞ্চল পাখী মুখ মুদে দিলে। ঠাকুর সেইটা দেখে বুঝলেন যে, পরমাত্মার স্থির ভাব, সাক্ষীস্বরূপ অবস্থিত, আর জীবাত্মা হাসে, নাচে, কাঁদে, সুখ-দুঃখের ফল ভােগ করে, সময়ে পরমাত্মায় লয় হতে পারে। পা। যখন পরমাত্মাই জীবাত্ম হয়েছেন, তখন উভয়ের পাকের কারণ কি? আবার জীবাত্মার লয়ই বা কি প্রকার ? ভ। তােমাকে এই কিছু পূৰ্ব্বে বলেছি, সেই এক অনাদি, অনন্ত, নির্বিকার, নিরাকার, মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়াদির অগোচর, নামহীন, সৰ্বপ্রবিষ্ট, জীব-জগদি সৃষ্টির নিদান পরমাত্মা, নিজের মায়াশক্তি-প্রভাবে এক হয়েও লীলাতে বহুধা আকারে বর্ণে, গুণে, রসে, শব্দে, গন্ধে, স্পর্শে পরিণত হয়েছেন। মায়া শক্তিদ্ভুত এক একটা উপাধি নিয়ে, তিনি এক এক অবস্থাগত ; দৃষ্টান্তে যেমন গিরিশবাবু-তার নাম গিরিশ, জাতিতে কুলীন কায়স্থ, নাট্যকার, পণ্ডিত, কবিচূড়ামণি, রঙ্গমঞ্চের ব্যবস্থাপক, শিক্ষক ইত্যাদি। এই এক একটা তার উপাধি। বস্তুতঃ তিনি উপাধিহীন, কিন্তু এই উপাধিগুলির বন্ধনে, তিনি জীবাত্মা হয়ে রয়েছেন। যে মুহূর্তে তিনি নিজের স্বৰূপ অবগত হয়ে এই উপাধিগুলি অর্থাৎ বন্ধনগুলি পরিত্যাগ করবেন, তিনি তৎক্ষণাৎ পরমাত্মায় লয় হবেন। তােমরা বড় মাঠ দেখেছ? এক এক মাঠের মধ্যে হাজার হাজার কঁদি আছে । দিগুলি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। আর কিছুই নহে, কেবল সেই বিস্তৃত মাঠেরই অন্তর্গত খণ্ডাংশ। খণ্ডাংশগুলি চারিদিকে আইল দ্বারা পরিবেষ্টিত বা বন্ধনযুক্ত বশতঃ কঁদি নামে প্রচলিত। যদি সেই আইল বা বন্ধনগুলি তুলে দিয়ে কঁদিগুলিকে মুক্ত কর, তা হলে সেই মাঠ যাহা আইলৰন্ধন দ্বারা শত শত খণ্ড হয়েছিল, এখন এক প্রকাণ্ড বিস্তৃত ভূমিতে পরিণত হবে। এইরূপ জীবাত্মা উপাধি হ'তে বিমুক্ত হলেই সেই অসীম অনন্ত পরমাত্মাতে গত হবে। জীৰা- আর উপাধিত্যাগে এই অবস্থাগত হওয়ার নাম লয় । পা। আপনার মতে তবে পরমাত্মা নিরাকার ও মনােবুদ্ধির অগােচর ? ভ। নিরাকারও বটেন, সাকারও বটেন। আকাশ, বাতাস নিরাকার হয়েও যেমন একরকম সাকার, তেমনি পরমাত্মা নিরা- কার হয়েও একরকম সাকার ; অর্থাৎ যে যে আধারে আছেন, সেই সেই আধারের আকারে পরমাত্মার আকার। মানুষের আধারে মানুষের আকার ; গাভীর আধারে গাভীর আকার ; গাছের আধারে গাছের আকার। জলের ত কোন আকার নাই, কিন্তু যদি থালায় জল রাখ, তা হলে জল থালার মত গােল ; কলসীতে রাখ, কলসীর মত ; জালায় রাখ, জালা মত ; এখানেও এই ব্যাপার। মনােবুদ্ধির অগােচর হ'য়েও মনােবুদ্ধির গােচর। মনােবুদ্ধি যেখানে অশুদ্ধ, সেখানে অগােচর এদিকে শুদ্ধমন, শুদ্ধবুদ্ধির গােচর। এই রকম মায়া উপাধি থাকা হেতু তিনি এক অনন্ত হয়েও সান্ত; নির্বিকার হয়েও বিকারযুক্তনামহীন হয়েও নাম- ১০। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। যুক্ত, অর্থাৎ পরমাত্মা হয়েও জীবাত্মা অথচ পার্থক্যভাব। সেই জন্য ভগবান্ বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণজী এই সকল বিষয় আলােচনার সময় হাসতে হাসতে ব’তেন, তাও বটে, তাও বটে, আবার এ দুই ছাড়া যা কিছু তাও বটে। ঠাকুর এই ভাবটীতে সকল সন্দেহ থেকে মুক্ত করে দিলেন, সৰ্ব্বধৰ্ম্মসমন্বয় করলেন ; বিশ্বজনীন ধর্মের বনিয়'দ তুললেন ; আবহমানকাল ধৰ্ম্মে ধৰ্ম্মে যে একটা বিদ্বেষভাব ছিল, তার মূলােৎপাটন করে রামকৃষ্ণ-অবতারে বিবাদ-বিভঞ্জন নাম ধারণ করলেন। ঠাকুর যা কিছু কবুলেন না বললেন, তা সব শাস্ত্রীয়, তথাপি তার মধ্যে তার একটা বিশেষ নূতনত্ব আছে। নূতনত্বটী এই, তিনি কিছুই বাদ কি অগ্রাহ্য করলেন না। তাই জীবশিক্ষায় বল- লেন, সব সত্য, সব সত্য। তােমরা বিবাদ করবে না। যার যে মতে, যে পথে যেতে ইচ্ছা, সরল মনে, ব্যাকুল হয়ে সেই মতে সেই পথে চলে যাও। কারও দুদিন আগে, কারও দুদিন পরে অবশ্যই ঈশ্বৰ-লাভ হবে। ঠাকুরের কাছে যাবতীয় ধর্মপন্থী আসতেন। সকলেরই মনােরথ তিনি পূর্ণ করতেন। যিনি ঠাকুরকে ঈশ্বর-লাভের সহায়-স্বরূপ ধরেছেন, তিনিই ঈশ্বরলাভ করেছেন। ঈশ্বরতত্ত্ব যেন আমার ঠাকুরের ভাণ্ডা- রের মুড়ি-মুড়কি। চাইলেই এক অচল। ভাবাবেশে ব’ল- তেন, যদি ধন, পুত্র চাও, তারকনাথে যাও, আর যদি ভগৰান্ চাও, এখানে এস। পা। আপনি ঠাকুরের কাছে কি প্রার্থনা করেন বা তার কাছে কোন্ জিনিষের আকাঙ্ক্ষা করেন ? ভ। আমি এই প্রার্থনা করি, হে ঠাকুর, তােমাতে যেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। অন্য কেউ ; ভগবত্ব-ভাব আমার কখন না হয়, আর তােমার সেচরণ পরিত্যাগ করে ঈশ্বরলাভের চেষ্টা বা প্রয়াস কখন যেন মনেও না আসে। এই দুটী প্রার্থনা করি। পা। ভগ, ভগবান্ শুনাই যায় মাত্র। আরও শুনি, ললাকে ভগবান্ লাভ করে, তঁার দর্শন পায়, তাঁর সঙ্গে কথা কয়, তাঁর সঙ্গে খেলা করে, এ সকলও শুনছি। কেউ বলেন তিনি নিরাকার, মনােবুদ্ধির অগােচর ; আবার যােগীরা বলেন—যােগেরু দ্বারা তাকে লাভ করা যায়। যদি তাও বটে, তাও বটে, তবে ভগবান্ জিনিষটা কেমন? ভা। তােমার প্রশ্নই তােমার উত্তর ; তুমি তাকে যা ব’লবে, যা ভাববে, তিনি ঠিক সেই রকমের। আমি ঠাকুরের কাছে শুনেছি, একজন খুব অনুরাগী, গুরুর কাছে সাধন-ভজন কি করে করবেন, তার উপায় জিজ্ঞাসা করেন। গুরু বলেন- কোন্ জিনিষটা তােমার খুব প্রিয় অর্থাৎ কাকে তুমি খুব ভাল- বাস ? শিষ্য উত্তর করেন—আমি এই কাল মহিষটীকে ভাল- বাসি। গুরু সেই কথা শুনে, শিষ্যকে আদেশ করেন, তুমি ঐ মহিষীর ধ্যান করাে। গুরু-ভক্ত শিষ্য তাই করাতে, তিনি ভগবানকে মহিষরূপে লাভ করেন। এ দিকে মুনি, ঋষি, তপন্থী, যােগীরা যুগ-যুগান্তর তপস্যায়, সাধন-ভজনে, ধ্যানে রত। রা ধ্যানবলে তপস্যাবলে তাকে এমন প্রকাণ্ড দেখছেন, যে, তাঁর মহত্ত্বের কি বৃহত্ত্বের এক তিলও সীমা করতে পারেন না। যিনি এক স্থানে অসীম অনন্ত, তিনিই আর এক স্থানে সাকার- রূপে। বরাহ-বামন ইত্যাদি অবতারদের কথা শুনেছ ত? কৃষ্ণাবতারে শশাদার গােপাল, রাখালের সখা। রামরূপে

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
বিমাতার ষড়যন্ত্রে বনে গমন। যিনি জীবের হৃৎপদ্মে বিন্দুভাবে
অবস্থিত, তিনিই সৃষ্টির অধীশ্বর এবং তারই এক এক লােমৰূপে
কোটি কোটি ব্ৰহ্মাণ্ড বিরাজমান। রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ
যার কাছে পৌছুতে পারে না, তিনিই ঐ পাঁচভাবে পরিণত ;
আবার নিজেই ঐ পাঁচের সম্ভোগকর্তা। যিনি বজ্রের চেয়েও
কঠিন, তিনিই আবার প্রস্ফুটিত কমলদলের অপেক্ষাও কোমল।
যে যেমন ভাবে তাকে দেখে বা চিন্তা করে, তিনি তার কাছে
ঠিক তেমনি। এই ধ’রে বুঝ’ ভগবান্ কেমন ?
পা। যিনি ভগবান্ লাভ করেন, তাঁর অবস্থা কেমন?
ভ। আলু, বেগুন সিদ্ধ হলে আলু-বেগুনের যেমন অবস্থা
হয়, ভগবান্ লাভ হলে মানুষের সেই রকম অবস্থা হয়।
বান্ লাভ হলে, আর জৈবভাব থাকে না। তার প্রকৃতি অন্য
রকমের হয়ে যায়। মানুষের লক্ষণ আর তঁায় থাকে না।
মানুষে অর্থাৎ বদ্ধজীবে, তাকে দেখলে পাগল মনে করে।
এদিকে দেশ যুড়ে সকলে একরকম, আর অন্যদিকে কেবলমাত্র
একটী লােক, তিনি ভিন্ন রকম। দশের সঙ্গে একের না মি-
লেই, এক জন পাগল হলেন। এ কথা তােমাকে অনেক পূর্বে
একবার বলেছি। লােকের ভিতরে অতি অল্পসংখ্যক লােক
কে আদর করেন। এই অল্পসংখ্যকের মধ্যে যারা গণ্য,
তারা ঈশ্বরলুব্ধচিত্ত সাধক। এরা ঈশ্বরকে খুজছেন, এখনও
পান নাই। সাধকদের মধ্যে লাখে এক জন ঈশ্বর-লাভ করেন।
তাই রামপ্রসাদ একটা গানে বলেছেন, ‘লাখে ঘুড়ি একটা
কাটে হেসে দাও মা হাত চাপড়ি।” এই ধরে বুঝ’ মানুষ কত,
আর অমানুষ ক জন !

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ; পা। আত্মার সম্বন্ধে কথাবার্তা চলছিল, সেই বিষয়টিতেই আমার মন আকৃষ্ট আছে ; কাজেই তৎসম্বন্ধে আর দুই চারিটি কথা জিজ্ঞাসা না করে থাকা যায় না। প্রথম জিজ্ঞাস্য, জীবাত্মাই যদি পরমাত্মা বই আর কেউ নয়, তা হলে এক অদ্বিতীয় পরমাত্মা কি প্রকারে এত অগণ্য রক- মের, প্রকৃতির ও আকারের জীবাত্মারূপে পরিণত হলেন। ভ। তত্ত্বটী যে অতীব গুরুতর, দুর্বোধ্য ও জটিল, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। এটা ভারি ধাদার কথা-একবার তােমাকে অনেকটা বলেছি, আবার বলি শুন’—বৃষ্টির সময় দীঘির জলে গণনাতীত জলবিম্ব হয় দেখেছ? এখন বিচাৰ্য, ঐ বিম্বগুলি কি ; কি জিনিসে তৈয়ারি, আর তাদের ভিতরেই বা কি জিনিষ আছে। প্রত্যক্ষ দর্শনের ও বিচারের ফল, যে বিম্বগুলি জলে তৈরি হ’লল, আর তার ভিতরে জলই আছে। ঠিক সেই রকম জানবে, জীবাত্মাগুলি পরমাত্মাতে সৃষ্ট ও তাদের ভিতর সেই পরমাত্মাই আছেন। এইখানে একটা কথা বেশ বুঝে যেও যে, বিম্বগুলি দীঘির জলে জন্মালে মাত্র, কিন্তু কোন বিম্বটিই সেই দীঘি নয় ; সেই রকম এক অদ্বিতীয় মূলাধার পরমাত্মা হ’তে যে এই কোটি কোটি জীবাত্মা হয়েছে, এদের মধ্যে কোন জীবাত্মাই সেই পরমাত্মা নয়, অর্থাৎ দীঘি হ'তে যেমন বিম্বগুলির প্রভেদ, তেমনি পরমাত্মা হ’তে জীবাত্মাদের প্রভেদ। দীঘি কথাটির পরিবর্তে সাগর বলাই উচিত ছিল, কেবলমাত্র তােমাকে প্রত্যক্ষ উপমা দিয়ে বুঝাবার জন্য দীঘি বলেছি। সাগর যেমন সাগররূপে অনাদি অনন্তকাল পড়ে আছে, তার ৩ ১৪ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ; আর কোন পরিবর্তন নাই, তেমনি পরমাত্মা পরমাত্মারূপে আবহমানকাল অপরিবর্তনশীলভাবে স্বম্বরূপে বিরাজমান। সাগরে যেমন তরঙ্গ, বিম্বের জন্ম-স্থিতি-লয় এই ক্রীড়া, পর- মাত্মাতেও তেমনি এই পরিবর্তনশীল সৃষ্টিয় বস্তুর নিত্য ক্রীড়া। এইখানে জিজ্ঞাসা করতে পার’–সাগরের জলে বৃষ্টির জল পড়ায় যেমন অগণ্য বিম্ব জন্মায় ; এখানে যখন এক অদ্বিতীয় পরমাত্মা বই আর কোন বস্তুর সত্তা নাই, তখন পরমাত্মাতে কি দ্রব্য পােড়ে এই পরিবর্তনশীল জীব-জগতের সৃষ্টি হ’ললা ? এর উত্তর-বৃষ্টির জল আর অপর কিছু নয়, এও সেই সাগরের জল ; এতদিন মেঘরূপে শূন্যে ছিল, এখন জল হয়ে যার জল তাতেই পড় লাে ; ফল হােলাে তরঙ্গ ও বিম্বের সৃষ্টি, এখানেও ঠিক তাই পরমাত্মা থেকে শক্তি সেই শক্তি পরমাত্মাতেই পােড়লাে, ফল হােলাে জীব-জগতের সৃষ্টি। সাগরের জলে ও বৃষ্টির জলে যেমন প্রভেদ নাই—উভয়েই জল, তেমনি পর- মাত্মাতে ও তাঁর শক্তিতে কোন প্রভেদ নাই, উভয়েই সেই এক বস্তু, তবে স্থানবিশেষে, ভাববিশেষে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত হন মাত্র, যথা ;-ব্রহ্ম, পরমাত্মা, ভগবান্, মহামায়া, কালী, কৃষ্ণ, রাম, যীশু, আল্লা ইত্যাদি। এক এক পন্থায় লােক এক এক নামে ডাকে। ভক্তে বা সাধকে নামের সময়, কি ভাবের সময় পৃথক্‌ বটে, কিন্তু মূলে সকলেই পরস্পরে মিলে যান। একটী বই আর বস্তু নাই। সেই এক-লীলাতে বহু হয়েছেন ; বহুগুলি সেই একেতেই রয়েছেন, পরে সেই একে- তেই লয় হবেন। সৃষ্টির বস্তুগুলি চিরকাল হচ্ছেন, কিছুদিন থাকেন, আবার এক সময়ে অন্তর্ধান হন। সৃষ্টির কোন বস্তুর ;

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ধ্বংস নাই, কেবল তাদের সময়ে সময়ে গুণান্তর, বর্ণান্তর, আকারান্তর ও লােকান্তর হয় মাত্র, এর জন্য সৃষ্টিকে পরি- বৰ্তনশীল বলে। ভগবানের কৃপায় যারা এই জ্ঞান লাভ করেছেন, তারা জন্ম-মরণের জন্যে উৎফুল্ল বা এস্ত হন না। এই জ্ঞানই ভবসিন্ধুপারের ভেলা; এই জ্ঞানই ত্ৰিপজলার রক্ষাকবচ ; এই জ্ঞানের প্রভাবে মানব মুক্ত-চক্ষু হয় ও সুখ-দুঃখ উভ- য়েরই পারে গমন করে। এই জ্ঞান লাভ হলে জীবের ভব- বন্ধন-মােচন হয়, আর তার জন্ম হয় না। এই অবস্থাকেই ঠাকুর রামকৃষ্ণজী পােড়া হাঁড়ির অবস্থা বােতেন। কাঁচা অব- স্থায় হাঁড়ি ভাঙ্গলে কুমার আবার তাকে গড়ে, কিন্তু ঘড়ি পােড়ান হবার পর যদি ভাঙ্গে, তাতে আর গড়ন চলে না ; সেই রকম এই জ্ঞানাগ্নিতে জীবকে পুড়িয়ে এমন অবস্থায় উপনীত করায় যে, দেহত্যাগে তার আর জন্ম হয় না। এই অবস্থা-প্রাপ্ত জীবের সঙ্গে ঠাকুর আর একটা উপমা দিতেন, সে উপমাটী-সিদ্ধধান। ধান আগুনে সিদ্ধ হলে তার যেমন আর অঙ্কুরােৎপাদিকাশক্তি থাকে না, তেমনি জ্ঞানাগ্নিতে যে সকল পুণ্যবানরা সিদ্ধ হন, তাঁদের আর পুনর্জন্ম হয় না। এমন কি, জ্ঞানী যদি স্বেচ্ছায় দেহত্যাগও করেন, তবু আত্মহত্যাজনিত যে মহাপাপ, তাও তাকে স্পর্শ করতে পারে না। এক বস্তু, কিরূপে এত রকমারি হয়েছেন, রেত-শােণিতে কি রকমে হাড় হয়েছে, এ তত্ত্ব মা–লীলাশক্তির গােচর। প্রত্যেক রকমেই সেই এক বস্তুর সত্তা; শক্তির তারতম্যে ঐশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা কেবল মাত্র ছােট বড় উনােনােরূপে পরিণত হয়েছে। যেখানে বেশী শক্তি, সেখানে বেশী বিকাশ, যেখানে কম শক্তি, সেখানে কম বিকাশ। এখানে একটা মহা হিয়ালির কথা আছে, সেটা এই-বেশী শক্তির বিকাশ যেখানে, সেটাও যেমন স্বয়ং শক্তির ন্যায় অনন্ত অসীম, আর যেখানে কম শক্তির বিকাশ, সেখানেও অনন্ত অসীম। যে দিকে যাবে, সেই দিকেই মূলশক্তির ন্যায় অকূল অপার। বড়টীও যেমন, ছােটটীও তেমন। অখণ্ডের খণ্ড হয় । লীলাতে খণ্ড দেখায় বটে, কিন্তু সেই খণ্ডও অখণ্ডস্বরূপ অনন্ত ও অসীম। তাই ঠাকুর রামকৃষ্ণজী বলতেন যে, তুই ভগবানের ছােট ভাবটিও নিতে পারবি নাই আর বড় ভাবটিও লিতে পাবি নাই । পা। যেখানে লীলা-শক্তির প্রভাবে খণ্ড খণ্ড হয়েছেন, সেখানে সেই অখণ্ড পরমাত্মা কি রকম ভাবে আছেন? ভ। ঠাকুর বলতেন, পিচকারীর ভিতর যেমন সেই পিচ- কারীর কাঠিটী থাকে অর্থাৎ নির্লিপ্ত ভাব। এই অবস্থায়, সেই অখণ্ড পরমাত্মার কাৰ্য্য নাই, কেবল সাক্ষীস্বরূপ ; আর খণ্ডরূপ জীবাত্মা সুখ-দুঃখ ভােগ করেন। পা। আপনার মতে পরমাত্মাই মূল বস্তু; সেই পরমাত্মাই অগণ্য প্রকৃতির, আকারের ও গুণের জীবাত্মারূপে পরিণত, তা হলে মন, বুদ্ধি ইত্যাদি এগুলি কি ? ভ। জীবাত্মাকে তার নিজের রস ও সৃষ্টির রস-সম্ভোগ করাবার জন্য মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়াদি যন্ত্র সকল করে দিয়েছেন। এরা জীবাত্মার রস সম্ভোগের যন্ত্রস্বরূপ।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা ১৭ ই জীবাত্মাতে মায়া থাকা হেতু জীবাত্মা, পরমাত্মা থেকে পৃথক হয়ে গেছে। জীবাত্মাকে আর জাতে দিচ্ছে না যে, সে-সেই জিনিষ। সে মায়া নিয়ে “আমি” “আমি” ডাক ছাড়ছে। এ দিকে রূপরসের সৃষ্টিখানি চোখের উপর দিয়ে কর্তা তারই মধ্যে লুকিয়েছেন। জীবাত্মারা মজার রসের দুনিয়া পেয়েছে, আবার সেই সকল রস-সম্ভোগের প্রয়ােজনমত যন্ত্রগুলিও পেয়েছে এখন আর তাদিকে পায় কে? এই দুনিয়া- কেই সুখের নিদান মনে করে খেলা করছে। কর্তা ত সৃষ্টি ছেড়ে যান নাই,যদি কেহ সময়ক্রমে তার আভাস পায়, তা হলে ঐ যন্ত্রগুলির সহায়েই কে ধরে ফেলে। যন্ত্রগুলির এমন গুণ আছে যে, তাদিগে যে দিকে চালাবে, তারা সেই দিকেই নিয়ে যাবে। রূপরসে চালাও, রূপরসই দেখাবে,আবার পরমাত্মা পানে চালাও, তাকেই দেখিয়ে দেবে। তবে একটা কথা,রূপরসে একবার মজলে সহজে আর অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া বড়ই মুস্কিল। একটা কথা মনে রেখ'। জীবাত্মারা মায়ার ঘরে মনে করেছে যে, তারা স্ব স্ব প্রধান স্বাধীন—কিন্তু তা নয়। সকলেরই মুখের লাগাম সেই কর্তার হাতে আছে। তিনি যখন মনে করবেন, তখন তার ভাণ্ডারে আর আর সব যন্ত্র আছে, সেই সব যন্ত্র দিয়ে ঐ রূপ- রসেমত মনাদি যন্ত্রের গতি ফিরিয়ে দিবেন। এই সব যন্ত্রের নাম বিবেক, বৈরাগ্য, জ্ঞান, ভক্তি। যে মন-বুদ্ধিতে এই বিশালক্ষীর দয়ে এনে ডুবিয়েছে, সেই তারাই আবার উদ্ধার করে দেবে। এখন এই ধ’রে বুঝ’, মন-বুদ্ধি জীবাত্মাতে কি প্রকারে অবস্থিত, আর তারা কি ? পা। জ্ঞান, ভক্তি কি জিনিস্?

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
•
ভ। ভক্তি-জিনিসটি যে কি, তা মুখে বার সাধ্য
নাই। তবে এই ভক্তির একটা তরঙ্গ উঠে, সেই তরঙ্গটির
কথা বরং কিছু বলা যায়। সে তরঙ্গটি কি জান'—সেটি
ভগবদ্দর্শন ও ভগবৎ-সেবার স্বার্থশূন্য ঐকান্তিক প্রবৃত্তি।
এই প্রবৃত্তি যে, মূল-বস্তু থেকে জন্মায়, তার নাম ভক্তি।
জিনিষটি ভগবানের ভাণ্ডারের একমাত্র মরকত এবং সেই
জন্যই তিনি জিনিষটিকে বড় ভালবাসেন। জিনিষটি ত
ভালবাসেনই, আবার এই জিনিষটি যে আধারে রাখেন, সে
আধারটাও ভালবাসেন। ভক্তি-লাভের কোন উপায় নাই ;
একমাত্র ভগবানের কৃপার উপর নির্ভর করে। তার কৃপাই
তাঁর ভক্তি। তিনি আপন ইচ্ছায় জীবকে দেন, সেটি কেমন
জান’-ভগবানের স্বভাব ঠিক একটি শিশুছেলের স্বভাবের
'মুত। বাবা, ছেলের হাতে একটি লাড় দিয়েছেন ; ছেলে
লাড়টিকে খুব আঁট করে নিয়ে বসে আছে ; এমন সময়
ছেলের বাপ কিম্বা কি কোন আত্মীয় যদি সেই লাড় টি
চায়, তখন সে হয় ত দেওয়া দূরে থাক্‌, লাড়, সহিত হাতটি
পেটের ভিতর লুকিয়ে রাখবে; আর বেজার হয়ে বলবে--না,
আমি লাড় দিব না। তার পরে (ছেলের যেমন স্বভাব) হয়
ত পথে একজন অপরিচিত লােক চোলে যাচ্ছে, তাকে হাত
বাড়িয়ে ডেকে, তার হাতে লাড় দিয়ে ফেলবে। ভক্তি দিবার
সম্বন্ধে ভগবানেরও এই রকম ব্যাপার। তিনি এই জিনিষটি
পরকে দিয়ে, তাকে আপনার করেন। আগে ভক্তি-দান, পরে
ভক্ত করা। ভক্তি দিয়ে ভক্ত করেন। এই ভক্তিটি পরীক্ষা
করবার জন্য ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর নিকটে ঠিক কষ্টি পাথরের মত

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। রামকৃষ্ণজীও তাই করতেন। মনের মত হলে নিতেন, না হ'লে ছেড়ে দিতেন। বেণে যেমন যার হাত থেকেই হােক কেন, সােনা হলেই আদর করে, ঠাকুরও তেমনি যার ভক্তি দেখতেন, তাকেই আদর করতেন-তা কে জানে হিন্দু; কে জানে যবন ; কে জানে ব্রাহ্ম ; কে জানে খৃষ্টান। বেশ্যা, লম্পট কি মাতাল এদের মধ্যে যেখ নে ঐ জিনিসটি দেখতে পেতেন, সেইখানেই আদর করতেন। রামকৃষ্ণজী যে ভগবান্, তঁার এই ভক্তি-প্রিয়তা স্বভাবই এক মহৎ প্রমাণ। যে কোন অবস্থার যে কোন প্রকৃতির, যে কোন দেশের যে কোন ধর্মের, যে কেহ থােক না কেন, তার ভিতরে ভক্তি দেখলেই, সে যেন ঠাকুরের আপনার চেয়েও আপনার। ঠাকুরের আর একটী স্বভাব দেখেছ? সেটি যে দেখবে, সেই সহজে বুঝতে পারবে যে, ঠাকুরই যেন নিজে সেই ভক্তি প্রিয় ভগবান্। যে যে আধারে ভক্তি আছে, সেই সেই আধারে যেন তিনিই বাস করে আছেন। এক জন যার হৃদয়ে ভক্তি আছে, কিন্তু কোন কালে অর্থাৎ রাককৃষ্ণ-অব- তারে কখন ঠাকুরের সঙ্গে দেখা নাই, তাকে কোথাও একবার ঠাকুর দেখতে পেলেই, ছুটে গিয়া ধ’তেন আর অল্পকালমধ্যে তাকে আপনার করে নিতেন। রাজ্যের মধ্যে যত দূরে যেখানে যত টেলিগ্রাফ, অফিস আছে, সকলেরই সঙ্গে যেমন বড় টেলি- গ্রাফ অফিসের সঙ্গে যােগ আছে, ঠিক তেমনি আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, যেখানে যে কোন ভক্তিমান চিত্ত আছে, তার সঙ্গে ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর সাক্ষাৎ যােগ রয়েছে। এই বিষয়টি সাক্ষ্য-প্রমাণ্ডের জন্য আমি নব্যভারতের বিংশ খণ্ড ৪র্থ সংখ্যায় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ২১০ পাতায় সাধ্বী-শবরী শীর্ষক এগার লাইনের নিয়ে যে লেখা আছে, সেটি পড়ি শুন’ (“সে দিবস পালমেন্টের মেম্বর ভিগবী সাহেব পরমহংস রামকৃষ্ণের সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন, তাহা পাঠ করিয়া কোন ভারত-সন্তানের মনে আশার সঞ্চার না হয় ? ডিগবী সাহেব বলেন, বর্তমান শতাব্দীর ইংলণ্ডের প্রধান লােক রবার্ট ব্রাউনিং ও জন্ রাসকিন ; কিন্তু তাহারাও নিরক্ষর রামকৃষ্ণের তুলনায় অন্ধকারে হাতড়াইয়া বেড়াইতেছেন’)।” ভাই, ভক্তির মহিমা দেখ’ আর ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর মহিমা দেখ’—কোথায় ঠাকুর রামকৃষ্ণজী আর কোথায় বা পূজনীয় ডিগবী সাহেব। সাহেবের ভিতরে ঠাকুর এমন একটি জিনিস রেখেছেন, ও মুগ্ধ হয়ে স্বদেশের মহামহােপাধ্যায় পণ্ডিতদ্বয়কে ক্ষুদ্র হতেও ক্ষুদ্রতম মনে করেছেন। ধন্য ঠাকুর রামকৃষ্ণজী আর ধন্য তাঁর ভক্তি। যেমন অন্ধকার দিয়ে আলাের মাহাত্মা বুঝা যায়, তেমনি অভক্তিমান্ হৃদয়ের মধ্য দিয়ে ভক্তিমানের মাহাত্ম্য লক্ষিত হয়। কোথায় সাত সাগর পারে ডিগৰী সাহেব, যিনি রামকৃষ্ণ- জীর নামটি শুনেছেন মাত্র, আর তাঁর উক্তি, উপদেশ ও জীবনী সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ শুনেছেন। এই মাত্র সম্বলে তিনি ঠাকুরের মহিমা বুঝলেন এবং ঠাকুরকে মহাপূজ্য জ্ঞানে অন্তরের মধ্যে রেখে নানাবিধ মহিমার প্রবন্ধ লিখলেন ও জনসাধারণের মধ্যে স্বার্থশূন্য ও অভিমানশূন্য হয়ে ঢাক পিটিয়ে জানালেন। আর এদিকে আমাদের স্বদেশী জাত ভেয়েরা, ঠাকুরের এত নিকটে থেকে, তার কথাবার্তা যাবতীয় নিজের কানে শুনে,

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
অলৌকিক জীবনী পৰ্যালােচনা করে, ঠাকুরকে এক জন উন্মত্ত
পাগল স্থির করে ফেললেন। শুধু ঠাকুরকে উন্মত্ত স্থির করেই
যে তারা নিশ্চিন্ত আছেন, এমন নয়—সেই সঙ্গে, আপনা-
দিগকেও কিছু স্থির করেছেন স্থির করেছেন কি, তা জান’?
যে, তারা ভারি সেয়ানা, চতুর, বুদ্ধিমান, গুণবান, ধীমা,
শ্রীমান্, বীৰ্যবান অর্থাৎ যতগুলি মান্ বা বান্ আছে, সেই
গুলির একচেটিয়া অধীশ্বর।
সাহেবেরাই বা কি জন্যে ঠাকুরের মহিমা টের পেলেন আর
জাত-ভাইরা অন্যবিধবুঝলেন, তার কারণ—সাহেবদের হৃদয়ে
ভক্তি আছে, আর এদের হৃদয় ভক্তিশূন্য। আমাদের ঠাকুরটিও
সেয়ানের চেয়ে সেয়ানা। এদিকে ভারি দয়াল, কেহ খেতে
পাচ্ছে না দেখতে পেলে, কেঁদে মাটা ভিজাতেন, কিন্তু ভক্তি-
দানের বেলা কৃপণের চেয়েও কৃপণ। কেউ যে ভোগা দিয়ে
কিছু হাতাবেন, এমন ছেলে সৃষ্টিতে আজ পর্যন্ত কেউ জন্মান
নি। ভক্তি-দানের স্থলে—এ দাতব্য যেখানে সেখানে হত
। ভাবাবেশে বলতেন, “আমি মনে ক’বলে আমড়াকে
ফজলি কতে পারি, কিন্তু তায় আমার দরকার কি? আমার
ফজলির বাগান রয়েছে। কেউ ভক্তি প্রার্থনা করলে একটা
গান গাইতেন, সেটা এই
গীত।
“আমি মুক্তি দিতে কাতর নই, আমি ভক্তি দিতে কাতর হই।
আমার ভক্তি যেবা পায়, তারে কেবা পায়, সে যে হয় ত্রিলোক-বিজয়ী।
এক ভক্তি আমার আছে, বৃন্দাবনে গােপ গোপী বিনে অন্যে নাহি জানে,
যাহার কারণে নন্দের ভবনে, পিতা জানে নন্দের বাধা মাথায় বই।
শুন চন্দ্রাবলী ভক্তির কথা কই, মুক্তি মিলে অনেক ভক্তি মিলে কই ;
যে ভক্তির জন্যে, পাতালনে, বলিরাজার দ্বারে দ্বারী হয়ে রই।

১১২ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ভক্তির সম্বন্ধে বৃন্দাবনের গােপ-গােপীরাই চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। এদের উদিকে আর গ্রাম নাই। এখন তুমি বুঝ’ ভক্তি কি জিনিস। ভক্তিও যে জিনিস, জ্ঞানও সেই জিনিস। তবে আস্বাদনে কিছু তফাৎ আছে ; সেটা উপমা দিয়ে ভেঙ্গে বলি,শুন,-তুমি ত কাচাগােল্লা খেয়েছ,আর মিছরি ও খেয়েছ’, 'উভয়েই যদিও মিষ্টি, তবু মিছরির সঙ্গে কঁচ-গােল্লার আস্বাদনে যেমন প্রভেদ, তেমনি জ্ঞান-ভক্তিতে প্রভেদ, ভক্তি কাঁচাগােল্লা, জ্ঞান মিছরি। আর একটা বিষয়ে, এই দুয়ের প্রভেদত্ব কতটুকু, উপমা দিয়ে বলি, শুন’, তুমি হুগলী ব্রিজ বা গঙ্গার পােল দেখেছ? পুলের দুধারে মানুষের গতিবিধির জন্য ফুটপাথ আছে এবং সেই ফুট- পাথের ধারে শক্ত বেড়া আছে-বেড়াটির উদ্দেশ্য সেই ফুট পাথে দিয়া,মানুষ যে রকম ভাবেই যাক না কেন, পুল থেকে গঙ্গার জলে পড়ে যাবার সম্ভাবনা নাই। এখানে ভক্তি ঠিক পুলের ফুটপাথের মত আর জ্ঞানটি ঠিক বেড়ার মত। ভক্তি- পথে যেতে যেতে যদি কারও অসাবধানতা বশত: পদস্খলনের অবস্থা ঘটে, জন এমত অবস্থায় তাকে রক্ষা করে। যেখানে ভক্তি আছেন, সেখানে জ্ঞানও আছেন। এর ঠিক উপমা জ্বলন্ত আগুন। যেখানে আগুন প্রজ্বলিত অবস্থায়, সেখানে পবনের অবস্থিতি থাকবেই থাকবে। ভক্তির সঙ্গে সঙ্গে যে জ্ঞান থাকেন, তাকে ভক্তিমিশ্রিত জ্ঞান বলে। আর যেখানে মিছরির অবস্থা, সেখা:ন নির্মল, কঠোর ও কর্কশ। এবংবিধ জ্ঞানের সঙ্গে ভক্তির উপমা ও তুলনা, যা ঠাকুরের মুখে কথিত, তা এই-জ্ঞান পুরুষ আর ভক্তি স্ত্রীলােকের প্রতি-সম্পন্ন। t শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। قاد د থাকে ; ; জ্ঞানের দ্বারাও ঈশ্বর-লাভ হয় আর ভক্তির দ্বারাও ঈশ্বর- লাভ হয় বটে, কিন্তু এর মধ্যে একটু বিশেষত্ব যা ঠাকুর বলতেন, তা এই,-একজন বড়লােকের যেমন সদরবাড়ী, অরবাড়ী সদর-বাড়ীতে সকলই যেতে পারেন, কিন্তু অন্দর- বাড়ীতে কেবল স্ত্রীলােকের মাত্র প্রবেশ অধিকার, পুরুষেরা সেখানে যেতে পারে না, তেমনি ঠিক ঈশ্বরেরও সদরবাড়ী অন্দরবাড়ী আছে, জ্ঞান পুরুষ-জাতি, তার সদর পর্যন্ত যাবার অধিকার। সদরে যদি ঈশ্বর বৈলেন, তবেই জ্ঞান দেখা পেলেন, নচেৎ অন্দর থেকে কখন্ ঈশ্বর সদরে আসবেন, এই প্রতীক্ষা করে জ্ঞানকে বসে থাকতে হয়; কিন্তু ভক্তি স্ত্রীজাতি, তিনি যদি দেখলেন, ঈশ্বর সদরে নাই, অমনি অন্দরে গেলেন ও ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করলেন। ভক্তির সদর অন্দরে উভয় স্থানেই যাবার অধিকার আছে; জ্ঞানের অন্দরে যাবার অধিকার নাই। এই জ্ঞান ভক্তি, যার বলে ঈশ্বর-দর্শন হয়, যত দিন না লাভ হয়, তত দিন জীবাত্মার নানাবিধ দেহে প্রবেশ ও দেহ-ত্যাগ অর্থাৎ জন্মমরণের পথ আর বন্ধ হয় না। পা। কথাগুলি বড়ই মজার গুছি-“ধরি মাছ, না ছুই পানি”—এই ত আগাগােড়া ভগবানের কর্ম দেখছি; এখন একটা কথা জিজ্ঞাস্য, জীবাত্মা কি রকমে বা কেমন ভাবে দেহে প্রবেশ করে, আর কেমন ভাবেই বা দেহকে ত্যাগ করে ? ভ। তুমি চন্দ্র কি সূর্যগ্রহণে যে ভাব, দেখেছ? এখানেও সেই ভাব। চন্দ্র কি সূৰ্য্যকে যখন রাহু ধরে বা ছাড়ে, তখন রাহুকে কেউ দেখতে পায় না; তবে চন্দ্র কি সূর্যের অঙ্গে যে ক্রিয়া দেখা যায়, সেই ক্রিয়াই যেমন রাহুর চন্দ্রে কি সুৰ্য্যে প্রবেশ ১১৪ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা বা চন্দ্র কি সূৰ্য পরিত্যাগের জ্ঞাপক; তেমনি দেহারের কার্য- কারিতাশক্তি বা তদভাবই জীবাত্মার দেহমধ্যে প্রবেশ এবং দেহত্যাগের পরিচায়ক। দেহের কতকগুলি সাধারণ লক্ষণে জানা যায় যে, জীবাত্মা কখন্ দেহে আছেন বা কখন্ দেহ ত্যাগ ক’বলেন। এ বিষয়ে একটা বড় সুন্দর কথা আছে—জন্মের সময় সদেহে আসেন, মরণের সময় সে দেহটী ত্যাগ করে যান ; এই আমার উপলব্ধি। দেহত্যাগের সময় দেহত্যাগ বেশ স্পষ্ট বুঝা যায়, কিন্তু জন্মের সময় দেহগ্রহণ কি রকমে হয়, এ বিষয়ে কোন উপলব্ধি নাই। জীবাত্মা, পরমাত্মার হাতের পুতুল। জীবাত্মা নিজেও জন্ম-মরণ জানতে পারে না। মায়ার খেলার বেজায় কায়দা। মায়া, তােমাকে কোন রকমে জানতে দেবে না যে, সে তােমাকে, তােমার ভিতর ঢুকে বেদের বানরের মত খেলাচ্ছে। যত দিন না মায়া ত্যাগ হয়, তত দিন ঘরের ভিতর প্রবেশের কোন উপায় নাই। পা। মায়া যায় তবে কিসে? ভ। মায়াকে চিতে জানতে পারলেই, সে পালায়—স কেমন জান’-এক গেরস্থর ঘরে চোর পড়েছে, এমন সময় যদি গেরস্থ টের পায়, তা হলে চোর যেমন পালিয়ে যায়, তেমনি মায়াকে জানতে পারলেই মায়া ত্যাগ করে। ঠাকুরের একটা সুন্দর গল্প শুন’-এক জন মন্ত্র-ব্যবসায়ী গোঁসাই বামুন শিষ্যবাড়ী যাবেন ; তঁার তল্পিদার নাই। এখানে সেখানে খুঁজতে খুঁজতে একটা মুচির সঙ্গে দেখা হয়। ব্রাহ্মণ মুচিকে বললেন, “ওরে আমার তল্পি নিয়ে যাবি ?” সে বলে, “ঠাকুর, আমি যে মুচি।” ব্রাহ্মণের খুব দরকার, তিনি বললেন,

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
১১৫
তা তুই চল, আমি কাকেও বলব না।” মুচি স্বীকার হলাে,
কিন্তু সেই সঙ্গে বলে যে, যদি কেউ আমাকে চিনতে কি
জানতে পারে, তা হলে আমি তখনই পালিয়ে আসব।
ব্রাহ্মণ তাতেই সায় দিলেন। পরে তল্পি সাজিয়ে ঘর হতে
বেরুলেন এবং এক ব্রাহ্মণ-শিষ্যের বাড়ীতে হাজির হলেন। মুচি
ভয়ে চুপ চাপ মেরে এক ধারে আলাদা বসে থাকে।
এক দিন ঐ শিষ্য-বাড়ীর একজন, তল্পিদারকে ভাল জাতি
জ্ঞানে অনুমতি করেন, “ওরে মুখ ধুব’, ঝারিটা সরিয়ে দে ত।”
তল্পিদার সশঙ্কিত, ভয়ে জড়-সড়ঝারি ছুতে আর সাহস হয় না।
মুচি যত সঙ্কোচ হ'য়ে আজ্ঞা-পালনে দেরি করছে, ততই ঝারি
সরিয়ে দিবার জন্য কড়া হুকুম বার বার উচ্চৈঃস্বরে বেরুচ্ছে।
তল্পিদার নেহাত আজ্ঞ: অপালন করায়, ব্রাহ্মণ রেগে বলেন
“বেটা,তুই মুচি না কি? ব্রাহ্মণ মানি না?” তখন সে কঁপতে
কাপতে বললে, “ঠাকুর মহাশয়গাে ! আমাকে চিনেছে,
আমি চল্লেম।” এই বলে দ্রুত বেগে পলায়ন। এখানেও ঠিক
তাই ; মায়াকে চিনতে পারলেই মায়া চলে যা। তবে
আর একটা কথা,যিনি কামিনী কাঞ্চনে মুগ্ধ করে রাখেন,
তিনি অবিদ্যা মায়া। অবিদ্যা মায়া গেলেই বিদ্যামায়ার রাজ্য
এসে গেল। এ রাজ্যের আর কূল-কিনারা নাই। যত
দূর পথই যাও না কেন, বিদ্যামায়ার রাজ্য শেষ হয় না।
শুনেছি, সমাধিস্থ হলে বিদ্যামায়ার পারে যায়—সে বহুদূরের
কথা, তার আমার তিল মাত্র উপলব্ধি নাই। এখন আমি
দেখছি, সব শক্তির খেলা, গােটা ব্রহ্মাণ্ডই মা রাজ-রাজে-
শরীর রাজ্য। মূল পরমা প্রকৃতি থেকে এই সৃষ্টি। ব্ৰক্ষা,

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
;
বিষ্ণু, মহেশ্বর ইহারই আজ্ঞানুবর্তী। সেই আদিপুরুষ একের
অবতাররূপে অবতীর্ণ হবার সময়, এই পরমা প্রকৃতির ভিতর
দিয়ে তাঁকে আসতে হয়, তার শক্তিতে শক্তিমান্ হয়ে খেলা
করেন, আবার তার ভিতর দিয়েই তিরােহিত হন। ঠাকুরের
মুখে শুনেছি-
অনুস্ত রাধার মায়া কহনে না যায়।
কোটি কৃষ্ণ কোটি রাম হয়, মায় লয়।”
ঠাকুর ব’তেন-অবতারেরা প্রত্যেকেই এই মহাশক্তি
সাগরের এক একটা বুদ্বুদ মাত্র।
এই সৃষ্টিতে যা কিছু দেখছ’, বা শুছ’, বা বােধ ক’বছ, বা
কল্পনা ক’বৃছ, সব সেই পরম প্রকৃতিতে সৃষ্ট ও তাদের ভিতরে
ঐ প্রকৃতিই আছেন। তিনিই দেহ, তিনিই দেহী ; তিনিই যন্ত্র,
তিনিই যন্ত্রী ; তিনিই রথ, তিনিই রথী; তিনিই পুরুষ, তিনিই
প্রকৃতি ; সর্বেসর্বাণী তিনি।
প্র। মশায়। আপনার ভারি গােলমেলে ধাধার কথা,
কেন না, কিছু পুর্বে আপনি আত্মাকেই সর্বেসর্বা বলেছেন,
এখন আবার শক্তিকেই সর্বেসর্বা ব’লছেন। যার শক্তি, তাঁকে
রাখছেন ধামা ঢাকা, আর শক্তিকে ক’বছেন সৰ্বেসৰ্ব্বা? আর
এক কথা, প্রকৃতি শক্তিই যদি আধার আধেয় ও যাবতীয় সৃষ্ট
বস্তু, তবে পুরুষ গেলেন কোথা ?
উ। রামকৃষ্ণজীর কথা—যত দিন গুরুর কৃপায় ঈশ্বর-লাভ ও
আত্মদর্শন না হয়, তত দিন এই সকল ঈশ্বরীয় তত্ত্ব বড়ই জটিল
ও দুর্বোধ্য। ঈশ্বর লাভ না হলে হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকি ও
ছুটাছুটি ফুরায় না। কিন্তু একবার ঈশ্বর-দর্শন ও আত্ম-দর্শন
;

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা।
১১৭
কেন,
।
হ'লে অস্তজগৎ ও যাবতীয় তত্ত্ব দিবালোকের ন্যায় প্রত্যক্ষ হয়
ও যাবতীয় সন্দেহ বিদূরিত হয়।
সেই অনাদি, অখিল, একেশ্বর, যে নামেই অভিহিত হউক
একটা বই আর দুটী বস্তু নয়। তাঁর দুটী অবস্থা
এক নিত্য,অপরটী লীলা। নিত্যাবস্থায়,তিনি কিমভুত কিমাকার,
তা তিনিই জানেন, এইটুকু বলেই নিত্যাবস্থার কথা শেষ
হলাে, কিন্তু লীলাবস্থায়, সেই এক বস্তু এত রকমে পরিণত যে,
তাকে তুমি যা বলবে, তিনি তাই, আর সেই সম্বন্ধে দেখবার,
ববার, শুবার এত, যে, যুগ-যুগান্তর দেখে, বলে শুনে তার
এক তিলও শেষ হবার নয়।
যিনি পুরুষ, তিনিই প্রকৃতি। একেই দুই বটে, অথচ উভয়ে
অভেদ। দুয়ে মিলে এক। লীলার জন্য বা সৃষ্টির জন্য এক
থেকে দুই হ’য়েছেন—সে কেমন রকম জান,- যেমন একটা
ছােলা ; জল পেয়ে দুটী দানাতে বিভক্ত, ফল হলো, দুই দানার
মধ্যে অঙ্কুরােদগম; তেমনি ঠিক এক বস্তু, পুরুষ প্রকৃতি ভাবে
পরিণত হয়ে সৃষ্টির উৎপত্তির কারণ হলেন। পরমাত্মা বা ব্রহ্ম
স্বম্বরূপে তিনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, লীলার অবস্থায়
অর্থাৎ সৃষ্টি করতে হলে তার শক্তির প্রয়ােজন হয়। শুধু
মাটীতে যেমন গড়ন হয় না, তায় জল মিশান চাই, তেমনি
লীলার স্থলে একা ব্ৰহ্মে কাজ হয় না, শক্তির বিশেষ প্রয়ােজন।
সেই এক বস্তুই লীলায় এক ভাবে পুরুষ আর এক ভাবে প্রকৃতি।
বস্তুর কিছুমাত্র প্রভেদ নাই, তবে লীলায় বিবিধ অবস্থাগত হয়ে
প্রভেদ দেখাচ্ছেন মাত্র ; যেমন ময়দা পেশা জাঁতা, জতাতে
আছে কি?, দুখানি চক্রাকার প্রস্তর। একখানির উপরে আর
;

১৮ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। একখানি স্থাপিত। নিম্নকার পাথরের ঠিক মধ্যস্থলে একটা কাঠের কীল আছে, আর উপরের প্রস্তরের ঠিক মধ্যস্থানে একটা ছিদ্র আছে। ছিদ্রের ভিতর কীটী পরিয়ে দিয়ে, দুখানি প্রস্তরকে একত্র কাৰ্য করানতে, কাৰ্য-ফল যেমন ময়দা, ঠিক তেমনি এক বস্তু দুই ভাবে পরিণত হয়ে উভয়ে কাৰ্য্য করায় কাৰ্য্যফল এখানে সৃষ্টি। তুমি তাকে সুধু পুরুষও বলতে পার, সুধু প্রকৃতিও বলতে পারি, আবার পুরুষ প্রকৃতিও বল্‌তে পার। যেখানে পুরুষ ও প্রকৃতি এই দুই ভাবে খেলায় রত, সেখানে তার লীলাবস্থা। লীলাতে পুরুষের চেয়ে শক্তির খেলাই বিশেষ দেখতে পাওয়া যায়—এই বিষয়ে ঠাকুরের উপমা কি জান’--ঘরে যেমন একজন কৰ্ত্তা আছেন, তিনি বুড় আর খুব গুড়ক-খাের। রাতদিন তঁার কর্ম, খালি তামাক খাওয়া ; কথা মােটেই কন না ; নিহাত কথা কইতে হলে জোর বলেন, ‘হু”। আর বাড়ীর কর্ম-কাজ যা কিছু কণ্ঠে বা দেখতে হয়, সব গিন্নীর উপর ভার। গিন্নী, খুব পাকা গিন্নী ; কাজের যা ব্যবস্থা, তা সব জানেন ও করেন, কেবলমাত্ৰ কৰ্ত্তার সায় নেবার জন্য একবার জিজ্ঞাসা করেন মাত্র। গিন্নী হাজার পাকা হ'লেও কর্তাকে জিজ্ঞাসা না করে কোন কাজ করেন না আর করবার উপায়ও নাই। কাজের যত কিছু বেওর, গিন্নী কর্তার কাছে সব আউড়ে গেলেন ; কৰ্ত্তা সবগুলি শুনে, উত্তর কল্লেন, ‘দু'। গিন্নী কর্তার ‘হু’টি পেয়ে, কর্মক্ষেত্রে তৎপর ফিরে এলেন, আর নানাদিকে নানা হুকুম চালিয়ে কাজ করতে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে যারা থাকে বা যারা আসে, তারা গিন্নীকেই সৰ্বে- সৰ্বা দেখছেন ও বুঝছেন। কৰ্ত্তা আছেন কি না, তার কোন ;

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। লক্ষণই পায় না ; এখানে লীলাক্ষেত্রেও তাই ; শক্তির খেলাই লক্ষিত হয় ও তারই প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়। লীলাতে রাজরাজেশ্বরী শক্তিরই রাজ্য ও কারখানা। জাতার দুখানি পাথরের মধ্যে নীচের খানি যেমন কেবল আছে মাত্র, উপরের খানিই ক্রিয়া করে ;, তেমনি লীলার স্থলে পুরুষ আছেন মাত্র, কিন্তু যাবতীয় খেলা একমাত্র শক্তির। যতক্ষণ মন আছে, যতক্ষণ আমি আছি, ততক্ষণ তার রাজ্যের ভিতরে ; তার ওপারে অর্থাৎ মন-নাশে ও অহং-নাশে যে কি অবস্থা বা কোথায় স্থিতি, তার আমি কিছু বোতে পারলাম না। পা। কখন্ তিনি কৰ্ত্তা আর কথ তিনি গিন্নী ? উ। নিগুণ অবস্থায় কৰ্ত্তা, সগুণ অবস্থায় গিন্নী। সেই একেরই এই উভয়বিধ অবস্থা। যিনি নিগুণ, তিনিই সগুণ। নিগুণের আস্বাদ পাওয়া যায় না, সগুণের আস্বাদ পাওয়া যায়। প। আপনি জীবাত্মার দেহান্তে, অন্য দেহধারণ বা পর- জন্ম মানেন ? উ। খুব মানি। ইহ জন্ম, পরজন্ম ত মানিই, আবার জীবাত্মা, বস্তুর ছায়া-বহনের ন্যায় এক জন্মের কর্মফল ও প্রকৃতি শুদ্ধ সঙ্গে নিয়ে, যে জন্মান্তরে যান, তাও মানি। এই অতি গুহ রহস্যটি বুঝাবার জন্য ঠাকুর একটা গল্প বলেছেন, শুন—এক রাজার চারটা ছেলে, ছেলেরা প্রাসাদের মধ্যেই থাকে ও খেলাও করে। একদিন রাজার ছেলেরা ও চাকরদের ছেলেরা খেলা করার জন্য এক সঙ্গে সমবেত হয়েছে। রাজার বড় ছেলে, অন্য সকলকে বল্লে, ‘এস ভাই, আমি রাজা’, মধ্যম বল্লে,আমি মন্ত্রী, সেজ বল্লে, ‘আমি সেনাপতি। রাজা উচ্চাসনে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ; বল’ মন্ত্রী করযোড়ে সম্মুখে দণ্ডায়মান, সেনাপতি অন্যান্য ছেলেগণকে সৈন্য সাজিয়ে নিজে সেনাপতি হয়ে সজ্জিত। ছােট ছেলে এই সব দেখে শুনে বল্লে—“না ভাই, আমি এ খেলা খেলবাে না।” কনিষ্ঠের এ খেলায় ভাবান্তর দেখে বড় ভাই জিজ্ঞাসা কল্লেন, “তুমি তবে কি খেলা খেলবে?” তখন সে উত্তর দিলে,“তুই উবুড় হয়ে শশা, আমি তাের পিঠে কাপড় কাচি। এই গল্প শেষ হবার পর ঠাকুর বল্লেন, 'এই যে ছােট ছেলে পূর্বজন্মে ধােপ ছিল ; কৰ্ম্মফলে রাজার ঘরে জন্মেছে, কিন্তু পূর্বজন্মের সংস্কার-কাপড় কাচা, এ জন্মেও বলবতী রয়েছে। ফুল তেল দেখেছ'—মনে কর, চামেলি তেল। চামেলির সৌরভ-রেণু রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়, তেলের সঙ্গে চামেলি তেল করে। তৈলাবস্থায় যদিও ফুলের কলেবর থাকে না বটে, কিন্তু চামেলি নষ্ট হয় না- চামেলি বর্তমান থাকে। সৌরভ-রেণুই কা:সৌরভ-সম্পত্তিই চামেলির সারভাগ। সেই সারাংশ পূর্বে পুষ্পধারে ছিল, এখন তৈলাধারে—এই প্রভেদ মাত্র। চামেলি তেল-মধ্যে পরিণত হয়েও যেমন তেলের মধ্যে সেই চামেলিরই গন্ধ ও গুণ বৰ্তমান,ঠিক তেমনি জীবাত্মা পূৰ্বদেহ পরিবর্তন করে, অন্ত দেহ ধারণ করলেও তার নূতন দেহে পূৰ্ব্ব-প্রকৃতি থাকে। প। কৰ্ম্ম ও প্রকৃতির কারণ কে ? ভ। বাসনা, প্রবৃত্তি অর্থাৎ ভােগ-বিলাস বা ইন্দ্রিয় সুখের ইচ্ছা। লােকে বলে শুনেছ’ ত, “জপ-তপ-কল্লে কি হয়, মরুতে জানা চাই।” এর মানে, ঠিক দেহত্যাগকালীন জীব যদি বাসনা সহিত মরে, তা হলে সেই সব বাসন ভােগ করবার জন্য পুনরায় তার জন্মগ্রহণ অবশ্যম্ভাবী। অবশ্যম্ভাবী। আর যদি ভগবানের শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা নাম বা তঁাকে স্মরণ করতে কতে দেহ রাখে, তা হােলে আর আসতে হয় না। অবিরত রসনা দ্বারা কি মনের দ্বারা ভগবানের নামাভ্যাস, কি তার স্মরণ, কি মননাভ্যাসের নাম সাধনা। সাধ- নার উদ্দেশ্য এই, যেন তাকে অন্তিম সময়ে মনে হয়। তােমাকে পূর্বে বলেছি, অবিদ্যা বিজড়িত মন, ভ্রান্ত অসৎ-বুদ্ধি সহায়ে অনবরত সঙ্কল্প বিকল্প দ্বারা ইহ-সুখের কল্পনা করছে, যথা- কি করে ধন হবে, কিসে মান হবে, ছেলে হবে, বাড়ী বিষয় হবে ইত্যাদি। কল্পনার ক্রিয়া নিদ্রাবস্থাতেও বিরাম নাই। তুমি যখন হিসাব করে এই বিষয়টি দেখবে, তখন দেখতে পাবে, ঠিক কুমোরের চাকার মত, কল্পনার চাকা রাত দিন ঘূরুচে। এই ঘূরুনিটি বন্ধ করা চাই ; ইহার নাম নিবৃত্তি। এটি দু উপায়ে হয়। প্রথম ও প্রধান উপায়, ঈশ্বরের নাম করা, তার সেবা করা, সাধু-সঙ্গ করা, তত্ত্বালাপ করা, মধ্যে মধ্যে নির্জনে বাস করা ও তাকে প্রার্থনা করা। পা। প্রার্থনাতে কি বােলতে হবে? কি বলে প্রার্থনা করতে হবে ? ভ। বােলতে হবে -হে ভগবান্ ! তুমি বই আর আমার কেউ নাই, যারা বা যা আছে, এ কেবল দু-দিনের জন্য, আর বলতে হবে, আমাকে ভক্তি দাও। ভক্তি ছাড়া আর কিছুই চাই না। ভক্তির বলে আমার মন-খানি যেন সর্বদা তােমার পাদপদ্মে লগ্ন থাকে। পা। নিবৃত্তির আর দ্বিতীয় উপায় কি? ভ। নিত্যানিত্য বা সদসস্তুর বিচার। এ সম্বন্ধে ঠাকুরের উপদেশ-ছােট-খাট বাসনাগুলি ভােগ করে নিও, আর ঝড় ১২২ শশীবামকৃষ্ণ-মহিমা। ; গুলিকে বিচার দ্বারা মন থেকে তাড়িয়ে দিও। প্রবৃত্তির নিবৃত্তি করার নাম ( ঠাকুরের কথা ) মনের মােড় ফিরিয়ে দেওয়া। মন যাচ্ছিল মেটে-বুরুজের দিকে, তাকে দক্ষিণেশ্বরের দিকে ফিরিয়ে দিবার নাম মােড় ফিরান’! এই মােড় ফিরতে হলে, মন যে সহবাসে ছিল, তাকে অন্য সহবাসে নিয়ে আতে হবে ; মন যে সঙ্কল্পে ছিল, তাকে তার বিপরীত সঙ্কল্পে আনতে হবে, মন যে কাজে ছিল, তাকে ভিন্ন-কাজে আনতে হবে। এইখানে তোমাকে সেই সাবেক কথা একটা বলি,-দেখ মনই সকলের গােড়া। মন ফিলেই সব ফিরবে। চৌদ্দপুয়া শরীরটাকে যাবতীয় কাজে, একা মনই, বেদের বানরের মত নাচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সে যা বল্‌ছে, শরীর- টাকে তাই করতে হচ্ছে। মনকে বােলতে হবে, ভাই, ওদিকে যেও না, ও জিনিস চেও না, ও পাবার জন্য ভেবাে না, আর ওদের সঙ্গে থেকো না। এদিকে এস, এই চিন্তা কর, আর এইখানে থাক-এর নাম মােড়-ফিরান। প্রবৃত্তির পথের মতন নিবৃত্তিতেও সঙ্কল্প আছে, সহবাস আছে ও কাজও আছে। তবে প্রবৃত্তির পথে যে ভাবের সঙ্কল্প, সহবাস ও কাজ ; নিবৃত্তির পথে সেগুলি ভিন্ন-প্রকৃতির; এই মাত্র অনেক পূর্বে সেই মনের কথায় বলেছি,মনের স্বভাব একটানা-একটা বিষয়ে সে মােল-আনা মাতোয়ারা ; মাছের পক্ষে যেমন জল, তেমনি সে বিষয় ব্যতীত প্রাণে বাঁচে ; কিন্তু যদি একবার কোন উপায়ে তাকে বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ফিরিয়ে দিতে পার, তা হােলে পূৰ্ব্ব-বিষয়ে আর যেতে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। বলুন। চাইবে না। ঘাের প্রবৃত্তির পথ থেকে একবার ঘুরিয়ে নিবৃত্তিতে এলে আর প্রবৃত্তিতে যাবে না। যদিও অনেক কালের স্বভাব- বশতঃ এক একবার যায়, কিন্তু সে তখনি ফিরে আবে, আর নিবৃত্তির পথে তিন গুণ বলে অগ্রসর হবে। দেখলে বোধ হবে, যেন প্রবৃত্তির পথে একবার গিয়েছিল, সে কেবল খানিক গায়ে জোর বাড়াবার জন্য। পা। জোর বাড়াবার কথাটা বুঝতে পারলাম না—ভেঙ্গে যে পথে গেলে মহাবল বলহীন হয়, সেখানে গিয়া বল বা জোর হবে কি করে ? ভ। তুমি কখন কাউকে, নালা কি বড় খানা ডিঙ্গুতে দেখ নাই ? যদি কোন লােককে একটা খাল লাফিয়ে এপার থেকে ও-পারে যেতে হয়, তা হােলে সে কি করে ? প্রথমে সে খানিক পেছু দিকে হােটে যায়, তার পর সেখান হ'তে দৌড়ে এসে খাল্টা কুন্দে লাফিয়ে পড়ে। এখানে যেমন পেছিয়ে যাওয়া, গায়ে জোর-সঞ্চারের জন্য, ওখানেও তাই। তবে খাল-পারের সময়ে স্বেচ্ছায় পেছু হটে যাওয়া আর ওখানে ভ্রমবশতঃ যাওয়া—এইটুকু তফাৎ। কাজ করতে করতে এই সকল বিষয় স্বতই বুঝা যায় ! অবস্থায় না পড়লে এই সব তত্ত্ব উপলব্ধি হয় না। কাজ করা একান্ত প্রয়ােজন। কাজের দ্বারাই প্রবৃত্তিতে গিয়াছে, আবার কাজের দ্বারাই নিবৃত্তিতে ফিরতে হবে ? প্রবৃত্তি-প্রবৃত্তির কাজে যেমন হয়েছে, নিবৃত্তিও—নিবৃত্তির কাজে হবে। তবে এ কথা স্বীকার্য যে, প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্তির অভ্যাসে অনেকটা কষ্ট আছে ও শ্রম আছে ; সে কষ্ট ও শ্রম কেমন জান’,-মনে কর-অমি ;

১২৪ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। কলিকাতায় পাথুরিয়াঘাটায় থাকি। এই স্থানের উত্তরে তিন ক্রোশ অন্তরে দক্ষিণেশ্বর, আর এর দক্ষিণে তিন ক্রোশ অন্তরে মেটিয়াবুরুজ। মেটিয়াবুরুজের পথ যেন প্রবৃত্তির পথ ; আর দক্ষিণেশ্বরের পথ যেন নিবৃত্তির পথ। আমি মেটিয়াবুরুজের পথে গিয়া সেখানে হাজির। ভুক্তভোগী হ'য়ে এখন বুঝেছি, এ অতি অশান্তির স্থান। শান্তির স্থানের অনুসন্ধান করায় বুঝলাম ; দক্ষিণেশ্বর যাওয়া বই আর উপায় নাই। এখন আমায় কি করতে হবে? মেটিয়াবুরুজ থেকে পুনরায় পাথু- রিয়াঘাটায় আসতে হবে। এই ফিরত পথে আমাকে হাড়ির হালে পড়তে হবে। এখানে বড় কষ্ট, বড় শ্রম। পরে যখন পাথুরিয়াঘাটা থেকে উত্তরে দক্ষিণেশ্বরের পথে যেতে আরম্ভ কবুব’ তখন প্রাণে শান্তির সঞ্চার হবে। “পরে যতই এগুবে’ ততই শান্তি বৃদ্ধি হবে। এ পথে ও যেতে যেতে সাবেক সংস্কার- বশতঃ মন বার বার মেটেবুরুজের অঞ্চলের তরঙ্গে ফেবে, কিন্তু এতে ভাল বই আর মন্দ হবে না। কণ্ঠস্থ অর্থ ভুলে গিয়, অন্য অর্থ মুখস্থ করায় যে রকম কষ্ট ; উদরস্থ ভােজ্য উদগীরণ দ্বার। পাকস্থলীকে অন্য ভােজ্য ধারণের উপযােগী করায় যেমন কষ্ট, প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্তিতে অস। তেমনি কষ্ট। আর একটা কথা, নিবৃত্তির পথে অগ্রসর হলে যতই কষ্ট আসুক না কেন, এতে পথিককে উদ্দেশ্য পথে অগ্রগামীই করে থাকে। সে কষ্ট, কি যাতনা, কি শ্ৰম তার মহাকষ্ট, মহাযাতনা ও মহামের রক্ষা কবচ : পথিকের অবস্থায় না পড়লে, পর্যটনের বিষয় যেমন ভাল উপলব্ধি হয় না, তদ্রুপ কর্মক্ষেত্রে না এলে এই সকল বিষয়ের জ্ঞান জন্মে না।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
তাই ঠাকুর বেলিতেন—সাধনাসাগরে না ডুব, দিলে রতন মিলে
। কৰ্ম্ম কর’ কৰ্ম্ম চাই—সিদ্ধি সিদ্ধি বলে চেঁচালে নেশা
হয় না। সিদ্ধি আনা চাই, বাটা চাই, উদরস্থ করা চাই,
তবে নেশা হবে। কৰ্ম্মই প্রবৃত্তি,
কৰ্ম্মই প্রবৃত্তি, নিবৃত্তির মূল। প্রবৃত্তিমার্গে
যেমন প্রবৃত্তি-কৰ্ম্মযােগে প্রবৃত্তিরাজ্যে এসে পড়েছি, তেমনি
নিবৃত্তিমার্গে নিবৃত্তি-কৰ্ম্মযােগে নিবৃত্তি-রাজ্যে আসতে হবে।
উভয় স্থানেই সেই এক কৰ্ম্ম। কর্মের সাধারণী নাম কৰ্ম্ম বটে,
কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির কৰ্ম্ম আছে ; সুতরাং তাদের ফলও নানা
প্রকার। আম, কাঁঠাল, আতা, আনারস, এগুলিও ফল,
আবার কুচলেও ফল। আম আতা দেহের পুষ্টিকারক, আর
কুচলে প্রাণনাশক ; সেই প্রকার কৰ্ম্মও নানা জাতির, কোন
কৰ্ম্মে বাচায়, কিসেও নষ্ট করে। প্রবৃত্তিমার্গের কর্মাচরণে
কেবল তৎপ্রকৃতি অনুযায়ী কর্মকেই বৃদ্ধি করে ও জীবকে
দুর্ভেদ্য ও অচ্ছেদ্য বন্ধনে বদ্ধ করে ; আর নিবৃত্তি-মার্গের কর্মে,
কৰ্ম্মের হ্রাস ও বন্ধনমুক্ত করে।
পা। আপনি যে যে কাৰ্য্যের সহায়ে নিবৃত্তিতে আসতে
হবে বােলছেন, এ সবগুলিই যে ভারি কঠিন। সংসারে ঘাের
ভােগবাসনার আসক্তি। এ আসক্তি যে কিছুতেই ছাড়তে
চায় না---এর উপায় কি
ভ। ফিরে ঘুরে প্রকারান্তরে সেই এক কথা। ছাড়বার
মত কৰ্ম্ম কর। একবারে ছাড়ে না বটে, কিন্তু ক্রমে ক্রমে
যে ছাড়বে না, এমন কিছু কথা নয়। মহাব্যাধি সত্বর
আবােগ্য হয় না, তবে রীতিমত ঔষধ পেলে, ক্রমে ব্যাধিমুক্ত
হয়। তেঁতুলতলায় বাস করে, তেঁতুল খেয়ে রােগ করেছ,
?

১২৬ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। এখন নিমতলায় যাও, নিমপাতা খাও, নিমতলায় বসতি কর, তবে রােগ যাবে। তুমি এখনও সেই তেঁতুলতলায় রয়েছ, এখান থেকেই রোগ গেল না, রােগ গেল না বলে চেঁচালে । কি হবে ? প পা। খুব সহজ উপায় কি বলুন দেখি, যাহাতে ঈশ্ব- লাভ হয় ? ভ। ঠাকুর রামকৃষ্ণজী এই সম্বন্ধে একটী গীত গাইতেন, সেই গানটি শুন— ৫ হরি সে লাগি মহ রে ভাই। তেরা ন ত বনত বনি যাই। অঙ্কা তারে বা তারে, তারে সুজন কসাই, শুগা পড়ায় কে গণিকা তারে, তারে মিরাবাই। এস ভক্তি কর ঘট ভিতর ছােড় কপট চতুরাই, সেবা বলি আউর দীনতা সহজে মিলি রঘুরা ই। বিষয়-ঘাটা মলিন বৃদ্ধির কপটতা ও চতুরতা পরিত্যাগ করে ভগবানে লেগে থাক’, তা হলেই তুমি ভগবানকে পাবে। প। তাকে না পেলে, তায় কি করে লেগে থাবাে ? আমাকে ভেঙ্গে বলুন, বুঝতে পাচ্ছি না। ভ। আমি তােমার সঙ্গে এত দিন রামকৃষ্ণজীর মহিমা- কথার প্রসঙ্গে কাটাচ্ছি। আমি তােমার কথা শুনে বেশ বুঝেছি, তুমি সাকারবাদী ; কৃষ্ণরূপ ভালবাস। তােমার বাড়ীতে কৃষ্ণমূর্তি আছে ; তুমি ফুল-চন্দন দিয়ে নিত্য নূতন বেশ করে দিয়ে সাজাবে। তােমরা থিয়েটারের লােক, সাজান' বিষয়ে বিশেষ বুঝ’। যেমন থিয়েটারে বিশ্বমঙ্গলে কৃষ্ণ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। সাজাও, ঠিক তেমনি করে তােমার ঠাকুরটীকে সাজাবে। গ্রীষ্মকালে গায়ে বাতাস দিবে, শীতে গায়ে কাপড় দিবে, সুন্দর বিছানা করে দিবে, যেখানে যা ভাল জিনিস পাবে, কৃষ্ণের জন্যে আবে আর সকলের সার, ছানা-মাখনের ভােজ্য এনে ভােগ র্দিবে। ভােগ দিবার সময় কেঁদে কেঁদে বলল, কৃষ্ণ! তােমায় খেতে হবে। কখনও বা কৃষ্ণলীলা পাঠ করবে, আর কখন বা যারা কৃষ্ণের দেখা পেয়েছেন বা কৃষ্ণকে ভালবাসেন, তাদের সঙ্গ করূবে। এই সকল কাজে থালেই তােমার তায় লেগে থাকা হবে। পা। মহাশয়, ঐ কথাটি শুনে আমার মনটা কেমন কচ্ছে ---যেখানে আপনি ব'ল্লেন, কেঁদে কেঁদে বলল-কৃষ্ণ, তােমায় খেতে হবে ! সত্য কি তিনি খাবেন ? ভা। নিশ্চয় খাবেন, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ রেখ না। আমি ভগবান্‌কে খেতে দেখেছি। পা। বলেন কি মহাশয় ? আপনার কথা শুনে গা শিউরে উঠলো, আর আমার ভারি কান্না পাচ্ছে। আমি অতি নর- ধম, মলিনাত্মা, যাবতীয় অপকর্মে কলঙ্কিত , আমার ছোঁয়া জিনিস কি ভণবান খাবেন ? ভা। হা রামকৃষ্ণজী! আমি আগে ঐ রকম মনে করতাম, কিন্তু রামকৃষ্ণজীর কৃপায় আমার সে সন্দেহ গেছে, সে সন্দেহ দূর হয়েছে। বলি, তবে শুন’“তুমি যেমন তােমার নিজের মধ্যে মলিনতা দেখছে, পাপ কালিমা দেখছে, তেমনি যদি ভগবানের করুণার কিছু আভাস দেখতে পেতে, কি জাতে পারুতে ; তা হােলে ও কথা আর মুখে আনতে পারতে না।

১২।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
ভগবান্ যে করুণার সাগর, দয়ার নিবি। আমি যতই পাপ করি
কেন, সে দয়ার সাগরের কাছে কিছুই নয় এক দুয়াত কালি
যদি তুমি দীঘির জলে ঢেলে দাও, তা হােলে কালিটী কি আর
কালি থাকে ? সে দীঘির জলে মিশিয়ে দীঘির জল হয়। এক
বিন্দু শিশির, সে কি সূৰ্য্য ঠাকুরের কাছে যেতে পারে ? লােক
লােকান্তর অন্তর থেকেই শিশির কোথায় উ৮ে যায়। যে ভগবান
কারাগারে জন্ম গ্রহণ করেন, সে ভগবান্ ভক্তের দায়ে নিজে
বাধা সান, যে ভগবান গােপ-বালকের উচ্ছিষ্ট খান, যে ভগবান্
ব্রাহ্মণের পদ-চিহ্ন বক্ষে ধারণ করেন, যে ভগবান নিজের রক্ত
দিয়ে জীব-জন্তুকে পালন কচ্ছেন, সেই ভগবান্“তুমি কোথায়
একটুকু কি করেছ, এটা খতিয়ে নিয়ে বসে আছেন ? ছি !
ছি! দয়ার সাগর ভগবানে ও কলঙ্ক দিও না।
তার করুণার সীমার একটুকু আভাস যদি লােকে পেতে, তা
হ'লে তাকে একটা প্রণামও কেউ করতাে না, কেউ তাকে খাতি-
রেও অতো না। তার দয়ার পার নাই, কুল-কিনারা নাই।
বাপের তুলনায় দেখ’না , ছেলের যতই দোষ হােক না কেন, মা
বাপ মােটেই গ্রহণ করেন না। আর ভগবান যিনি জগতের মা
বাপ, যার পরম পিয়ারের এই জীব-জগৎ-~-এই সৃষ্টির উপর
তার বাৎসল্যের উত্তাল তরঙ্গ এত প্রবল যে, সেখানে কোটি
কোটি অপরাধের সাগর ঢেলে দিলে কোথায় যে তলিয়ে যায়,
তার আর খোঁজ-খবর পাওয়া যায় না !
দয়াময় রামকৃষ্ণজীর কাছে তাঁর অপার করুণার আভাস
পেয়ে, তােমাকের গিরীশবাবুই ঠাকুরের চরণ-দুটি লক্ষ্য করে
বলেছিলেন যে, হায় হায়! পাপ ঢালুবার এমন নরদমা পাব’

রামকৃষ্ণ-মহিমা। ১২৯ বলে যদি অাগে জান্তাম, তা হােলে মনের সাধে, পেট ভরে পাপ করে পাপ করার সাধ মিটিয়ে নিতাম। এখন দর্শন করেছি আর পাপ কবার উপায় নাই। পা।-কেন মহাশয় রামকৃষ্ণজীকে দর্শন করলে কি আর পাপকর্ম করা যায় না? ভ।—সাধ্য কি ? ভগবদ্দর্শনের অদ্ভুত ফল। যেমন প্রজ- লিত আগুনে শুষ্কপাত চকিতে ভস্মীভূত হয়, তেমনি তার দর্শনমাত্রেই কোটি কোটি জন্মের যাবতীয় পাপরাশি একেবারে বিনাশ হয়। পাপ-নাশের সঙ্গে আর একটা নাশ হয়-সেটা কি জান',—সেটা পুনর্জন্মের অঙ্কুর। ঈশ্বর দর্শন হলে, আর জন্ম হয় না। একটি গানের একটুকু বলি, গুন’- “জয় জগতজীবন জগবন্ধু। শুনেছি পুরাণে কয়, পুনজ ম নাহি হয়, বারেক হেরিলে মুখ ইন্দু ॥” পাপ-মুক্তির পর অন্তর পবিত্র হলে জীব আর পাপকাৰ্য করতে পারে না। পা-ভগবানের জীবে যদি এত দয়া, তবে লােকে সে রােগ, শশাকে, অর্থাভাবে অশেষ কষ্ট পাচ্ছে, তিনি মুক্ত করেন - } কেন? ভ।-তুমি যদি নিজের হাতে নালা কেটে, বেনাে জল ঘরে ঢুকাও, তাহলে তার দোষ কি? কর্মের একটা 4 আছে আর কাকে কৰ্ম্মফল ভােগ করতে হয়, একথা স্বীকার কর ? তিনি যে কাজ তােমাকে নিষেধ করেছেন, তুমি তাই করছে। তিনি বলছেন, আগুনে হাত দিও না, তুমি আগুনে হ ৩ দিচ্ছ, পুড়বে না ত কি? তিনি ভাল মন্দ বিশেষভাবে শ্ৰীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। দেখিয়ে দিচ্ছেন, বলে দিচ্ছেন তুমি আপন ইচ্ছায় ভালটীর দিক দিয়ে যাবে না, কেবল মন্দটীরই সহবাসে থ’র। সুতরাং তে' মার রােগ, শোক অভাব ইত্যাদি অবশ্যম্ভাবী ভােগ্য। যে যেমন জন্তু তার সহবাসে, তুমি তারই যা আছে, তাই পাবে। সাপের কাছে থাক’-বিষ পাবে; কামধেনুর কাছে থাক’--ক্ষীর পাবে ' কামিনী-কাঞ্চন সাক্ষাৎ মূর্তিমতী অবিদ্যা—সাপিনী, তুমি সৰ্ব্বদাই তার চিন্তায়, তার সহবাসে আছ, সুতরাং রােগ, শােক, দুঃখ বই আর কি পাবার প্রত্যাশা করতে পার? সৰ্ব্বসস্তাপ- নাশিনী কামধেনুরূপা , জগন্মাতার চিন্তায়, সহবাসে থাক’, অবশ্যই শান্তি-ক্ষীর পাবে। একটা কথা, শুন’--বেদ, বেদান্ত, তন্ত্র, মন্ত্র, গীতা, পুরাণাদি এই যে শাস্ত্রের মহতী ভাণ্ডার—এ কি, জান’–এইগুলি সব ভগা- বদ্বাক্য , এসব তার নিজের শীমুখের উক্তি। এই যাবতীয় শাস্ত্রের মধ্যে, তিনি কেবল একটা কথা বলছেন, সে কথাটি এই--“রে জীব ! তােমাকে আমার উপাসনা করতে হবে না, আমার জন্য তপস্যা বা সাধনা করতে হবে না, আমার সেবা করতে হবে না তুই যাতে সুখে থাকিস, তুই তাই কর, আমি তা হলেই খুব খুসী।” ভগবান্ মুখে বলছেন এইটী, কিন্তু তার সৃষ্টিকৌশলে এমন একটি ফিকির-কল করে রেখেছেন যে, জীব নিজের সুখের কি মঙ্গলের কাজ করতে গেলেই, ভগবানের আরাধনা, তপস্যা বা সাধনা-কৰ্ম্ম ভিন্ন, অন্য কোন কর্মপথেই তার সুখ কি মঙ্গলের আশা নাই ; সুতরাং জীবকে বাধ্য হয়ে, তার সেবা, আরাধনা ও সেবা করতে হয়। সৃষ্টির মধ্যে একা ভগবান্ বই শান্তি- সুখের আশা আর কিছুতেই নাই। ;

শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। কিন্তু হতভাগ্য জীব, এমন দিশেহারা, এমন কাণ, এমন বধির যে, সেই গিটীর কামিনী-কাঞ্চন ছাড়া, সাক্ষাৎ কঁাচা- সােনা ভগবান্তর দিক্‌ দিয়েই যাবে না, সে রূপই দেখবে না, তার কথাই শুনূবে না। জীব একান্ত বেবাগ হলে, দয়ার সাগর স্বয়ং মূর্তি ধরে মানুষের মত হয়ে বাগ মানাতে আসেন তবু কি চোখ চেয়ে দেখে ? ভগবান্ দয়ার ভরে অস্থির ; সুতরাং তাকে নিজের দায়ে, জীবের দুয়ারে দুয়ারে ঘূরে বাগ মানাতে যেতে হয় ; তখন জীব ভগবাকে না-ছােড়বান্দা দেখে, কি করে জান’-ভগবাকে পাগল জ্ঞানে হেসে উড়িয়ে দেয়। ভাই, জীবের কথায় জিব, বেরিয়ে পড়ে। বুঝ’, এর নাম জীব, দেখ, এই জীবের বুদ্ধি! এদিকে ঐ বুদ্ধিতে আকাশে উড়ছে, দু-বছরের পথ তিন দিনে যাচ্ছে, এক দেশ থেকে অপর দেশে পাঁচ মিনিটে খবর পাঠাচ্ছে, মহাবল পাঁচটা ভূতকেই ক্রীতদাসের মত হুকুমে খাটাচ্ছে, অঙ্গহীনের অঙ্গ করে দিচ্ছে, আর কত শত অদ্ভুত কাজ করছে। বুদ্ধির চোটে গােটা পৃথিবী থরথরি কম্পবা, কিন্তু ঈশ্বরের বিষয়ে এলেই, সেই বুদ্ধি একে- বারে ডিগবাজী খেয়ে পড়ে। তেলির ছেলেকে লাঙ্গলে 'কোদালে কান্তেতে দেখতে পাবে, যেন সাক্ষাৎ ভীম, কিন্তু ক খ শিখ, বার বেলা, আর তার বুদ্ধি বেরােয় না; যদি কিঞ্চিৎ বেরােয়, সেটা যেমন হােরমিলার কোম্পানীর গাধাটে ভড়, মােলেও এগুতে চায় না। ঈশ্বর-প্রসঙ্গ বা ঈশ্বর-তত্ত্বে জীবের বুদ্ধিও এই রকমের। জীব, নিজের মঙ্গল, নিজের সুখ কিসে আছে, তা চিনতে জানে না। যখন সুখের কারণ জাতে পারে, তখন দুনিয়ার যাবৎ বস্তু ছেড়ে দিয়ে, সেই ভগবানের মধ্যে, সেই ভগবানের ১৩২, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণমহিমা। ৫ সঙ্গে বাস করতে প্রয়াস পায়। সংসারে কোন বস্তুতে কেহ কখন কিছু সুখই পায় না; যাবতীয় পুরাণ তার সাক্ষী। সংসারকে সুখের আকর জ্ঞানে, যে এর আশ্রয় নিয়েছে, সেই শেষে প্রাণে সারা গেছে। সংসার কেমন জান'-যেমন কলাই, জাতার মধ্যভাগে একটি কাঠের কীল আছে ; যে কলাই-দানটী সেই কীলের কাছে থাকে, সে আর ভাঙ্গা যায় না, বাকি যত দানা সব ভাঙ্গা যায়, কেউ বা গুড়াে হয়ে যায়। জাতায় যেমন কীলটি রয়েছে, তেমনি সংসারে ভগবান রয়েছেন। তুমি সংসারে ভগবানের কাছে যদি থাক্‌তে পার’, তা হলে আর পেষা যাবে না। জাতীয় কীলের কাছে যেমন কলাই-দানাটা রক্ষা পায়, তুমিও তেমনি সংসারে ভগবানের কাছে থাকলে রক্ষা পাবে। কীল পরিত্যাগ করে জাঁতার • অন্য স্থানে গেলেই জাত। তার কর্ম করবে ; ঠিক তেমনি ভগবাকে ছেড়ে সংসারে থাকূলেই ত্ৰিতাপ, অশান্তি অপরিহার্য ও অনিবাৰ্য্য। ভগবান্ জীবকে আঁস্তাকুঁড় ও সােনা-কুঁড় দুই- টীর কথা বলে দিয়ে সংসারে ছেড়ে দিয়েছেন। তুমি যদি আস্তাকুঁড়েই যাও, তিনি কি করবেন ? ভগবান্ কল্পতরু, তুমি তার কাছে যা চাইবে, তিনি তাই দিবেন। চোর যখন মা- কালীর পূজা করে বর চায়, তখন কি তিনি বলেন যে, তােকে বর দিব না। তিনি মানস-পূজার জন্য চোর ও সাধু উভয়কেই বর দেন। তিনি কর্মের সঙ্গে তার ফল বেঁধে রেখেছেন। চোর চুরির ফল পায়, সাধু তার আরাধনার ফল পায়। এখন তুমি বুঝলে ত, যে জীব নিজের দোষে কষ্ট পায়, আর ভগবান্ দয়া- ময়, করুণাময় ও মঙ্গলময়।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। গা। শুনা যায়, জীব মাতৃগর্ভে যােগাবস্থায় থাকে । ভগবানে সংষতচিত্তে থাকে, একথা সত্য কি ? ভ। ঠাকুর রামকৃষ্ণগীর শ্রীমুখে এ বিষয় কিছু আমি নিজে শুনি নাই বা অন্য কারও কাছে তিনি এ সম্বন্ধে যদি কিছু বলে থাকেন, তাও শুনি নাই ; তবে তিনি আমাকে যতটুকু বুঝাচ্ছে, তাতে বোধ হয়, কথা সত্য। আরও একটি মহাজনের পদে শুনেছি গর্ভে যখন, যোগী তখন, মীই প'ড়ে খেলাম মাটী, মহাজন-বাক্য অবশ্য বিশ্বাসযােগ্য। জীবের শৈশবাবস্থায় প্রকৃত সাধকের লক্ষণ দেখা যায়, অনেক সময়েই বালকের মুখে সাক্ষাৎ ঈশ্বরের বাক্য শুনতে পাওয়া যায় ; ঠাকুর রামকৃষ্ণজীও বলতেন, সিদ্ধাবস্থায় জীবের বালকের মত স্বভাব হয়। সাধু-ভক্তের ন্যায় বালকের মধ্যে সরলতা বড়ই প্রবল। বালক সত্ত্ব, রজ, তম, তিন গুণের কারুর বশ নয়। বাকের এবংবিধ স্বভাব-প্রকৃতি, সরলতা ইত্যাদি থাকা মাতৃগর্ভে যােগীর অবস্থায় থাকার পরিচায়ক। পা। এখন এসব কথা থাক,। আপনি একটা মনের কথা, ভারি টেনে বােলেছেন। আমি সত্যই কৃষ্ণ ভালবাসি, তাকে খাওয়াতে ভালবাসি। মনে মনে জানি, কৃষ্ণ বেশ, পেলে, নিয়ে নানারকমে সাধ মিটাই। এত দিন ভাবটা চেপে রেখেছিলাম, কিন্তু আজ আর রাখতে পারলাম না। কৃষ্ণে ভারি সক, মনের সক, মনে মনেই মিটাই ; বােতে পারেন—ছােকরাকে পাওয়া যায় কি করে ? আপনারা বলেন রামকৃষ্ণজী ভগবান্, কৃষ্ণও ভগবান্, কিন্তু রামকৃষ্ণরূপ অপেক্ষা কৃষ্ণরূপটিতে কেমন একটা বিশেষ নেশা। বােধ করি, কথাটী আপনাকে বড় ভাল লাগবে না, কেন না, আপনারা রামকৃষ্ণরূপে মুগ্ধ ; তঁাকেই সর্বেসর্বা জানেন, ১৩৪ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। । তারই লীলাকথা আন্দোলন করেন, তাঁরই নাম পূজা-উৎসবাদিতে প্রমত্ত। ভ। ছি ছি, তুমি এমন কথা বল’ যে, কৃষ্ণকথা, কি কৃষ্ণরূপ কি কৃষ্ণভক্ত ভাল লাগবে না। তুমি কৃষ্ণ-প্রিয়, কৃষ্ণানুরাগী, আমার পর যতনের জিনিস। তুমি সুষ্ণানুরাগী বােলেই রামকৃষ্ণজীর দর্শন লাভ করেছ। সেই কৃষ্ণই এই রামকৃষ্ণজী, তফাতের মধ্যে এবারে খেলার বর্ণ'টা বড় ঘাের করেছেন আর সাজটা একদম বলেছেন। তবে কি জান, যেখানে জানিয়ে দিচ্ছেন কি দেখিয়ে দিচ্ছেন, সে দেখছে—একই দুধ, কখন মাখন, কখন দই, কখন, মাই, কখন রাবড়ি, কখন ঘি। দইই বল আর মাখনই বল অব ঘিই বল’ সেই এক দুধেরই অন্যরূপ অবস্থা; তফাৎ থাকে আকারে অর স্বাদে। ঠিক এই র : ভগবান্, যে ভাবেই আসুন বা যে রূপেই আসুন, তার ভিতরে সেই তিনি। কৃষ্ণজী অন্তর্যামী, প্রত্যেক জীদের হৃদয়ে আছেন। যে কোন পে, বা যে কোন ভাবে সরল অস্তরে ভগবানের চিন্তা যিনি এ ?- যার করেছেন, তাঁকে রামকৃষ্ণজীর কাছে আসতে হয়েছে ও হবে। রমজীও বার বার ভাবাবেশে বলেছেন, যে ব্যক্তি সরল প্রাণে একবার তাঁর চিন্তা করেছে, তাকে এখানে আসতে হবে। পা। যে ব্যক্তি রামকৃষ্ণরূপ ভিন্ন অন্যরূপের আকাক্ষী, রাস- কাজী তাকে নিজের কাছে আকৃষ্ট করে নিয়ে গিয়ে কি কবেন ? ভ। প্রথমতঃ তিনি ভক্তের অভিলষিত রূপের কথা, তাঁর গুণের কথা, লীলার কথা প্রকাশ্যে ও গােপনে সেই ভক্তকে শুন:- নে। এতে কি কাজ করা হয় জান’? সেই ভক্তের অভিলষিত ক অধিকতর ব্যাকুলতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তার পরে ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা সঙ্গীত ; ফখন দেখেন, ভগবানের উপর এবারে খুব টান বেড়ে গেছে, তখন ভক্ত যেখানে যেতে চান, যে রূপ দেখতে চান, সেখানে সঙ্গে নিয়ে সেই সাধের রূপটী দেখিয়ে দেন। এখন তিনি পথে কোন রূপেই জাতে দিবেন না, যে, ভক্তের অভিলষিত রূপটি, রামকৃষ্ণজীরই নিজের অন্যবিধ রূপ। এমন ধারা খেলা করেন কেন জান? রামকৃষ্ণজী কারও ভাব নষ্ট করেন না। যে কৃষ্ণ ভালবাসে, তার কাছে কেবল কৃষ্ণ-কথা, কৃষ্ণলীলার মাধুরী বৰ্ণন ও প্রদর্শন, কৃষ্ণ যে কালীরূপ বাসে, তার কাছে খালি কালী-কথা, শ্যামা সঙ্গীত। যিনি নিরাকারবাদী, তার কাছে চূড়ান্ত বেদান্তের কথা ; সগুণ বাদীর কাছে সগুণের কথা, আর নিগুণবাসীর কাছে নিগুণের কথা। রামকৃষ্ণজীর ভাব যে, যে কোনরূপে বা যে কোন ভাবে ভগবদনুরাগী হলেই হলো। যে, যে রকমে, ভাবে কি পথে যাক না কেন, সেই এক জনের কাছেই পঁহুছাবে। ঠাকুর রাম- কৃ +জীর এই সৰ্ববাদী-সৰ্বসম্মত, অসাম্প্রদায়িক, সার্বভৌমিক, বিশ্বজনীন ভাবের মাধুর্যে তার নিকটে, কি বিভিন্ন প্রকারের সাকার বাদী, কি যোগপথাৰম্বী, কি বৈদান্তিক, কি দরবেশ, কি খৃষ্টান সকলেরই সমাবেশ হতো। এই রসেভা বসুন্ধরা যেমন যাবতীয় ফুল-ফলপ্রসবিনী গুল্ম লতা বৃক্ষরাজীর পুষ্টকর উপাদান বহন করেন, আমাদের রামকৃষ্ণজীর দেহেও ঠিক সেই রকম সকল মতের, পথের লােকের পুষ্টিসাধিকা শক্তিরস বহন করে। এই জন্যই রামকৃষ্ণজীর নাম বিবাদ-ভঞ্জন, জগদগুরু। রামকৃষ্ণজীর শরণা- পন্ন যিনি হয়েছেন, তারই অভীষ্টসিদ্ধ ও ইষ্টলাভ হয়েছে। যিনি অন্যরূপের দর্শনের জন্য রামকৃষ্ণজীর প্রদর্শিত পথে তার সঙ্গে যান, T

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণু-মহিম।
তিনি তখন রামকৃষ্ণজীকে বুঝতে বা চিনতে পারেন না। পরে
যখন রামকৃষ্ণজীর কৃপায় পূর্ণ-মনােরথ হন, তখন রামকৃষ্ণজীকে
বুঝতে পারেন ও চিনতে পারেন।
পা। কি বুঝেন, কি চিনেন ?
ভ। এইটি বুঝেন, আর এইটি প্রত্যক্ষ দেখেন যে, যার কাছে
রামকৃষ্ণজী পঁহুছিয়ে দিলেন, তিনি যে বস্তু" আর রামকৃষ্ণজীও
সেই বস্তু,' তবে আকারভেদে ও ভাব-ভেদে, আস্বাদনে একটুকু
তফাৎ থাকে। আস্বাদনে প্রভেদ, ইহার অর্থভাবে প্রভেদ ;
সে কেমন জান’, কোথাও ভগবান্ বোধ থাকবে, কোথাও ভগবান
বোধ থাকবে না। যেমন তোমার কৃষ্ণে সখা ভাব ; তুমি
কানাইকে পেলে কি প্রণাম করবে ? না-তাব পাতলায় ঘােড়
হাত করে ববে ? তুমি যেমন তােমার ইয়ারের সঙ্গে ব্যবহার
কর, একসঙ্গে খাও, একসঙ্গে বােসস ইত্যাদি, ঠিক তেমনি করবে ;
কিন্তু রামকৃষ্ণজীর উপর গুরু-ভাব অর্থাৎ ভগবান্ ভাব প্রবল
থাকবে। যদিও দুইই সেই এক বস্তু, বেশ বুঝতে পারে, তথাপি
আকারের, রূপের ও ভাবের পার্থক্যে এই প্রভেদটুকু থাকবে।
পা। সকল রূপেই কি সেই এক বস্তু, সেই এক ভগবান্ ?
কালী, কৃষ্ণ, রাম, শিব, রাধা, সীতা ইত্যাদি এই সব যাবতীয়
আকার ও রূপ কি সেই এক ভগবানের ? আর সাকারেও যে
বস্তু, নিকারেও সেই বস্তু?
ভ। তা নয় ত কি ?
পা। তা যদি হয়, তবে এই যাবতীয় আকারে ও ৰূপে, সেই
একমাত্র ভগবান্, কি প্রকারে বিবিধ ভক্তের বাসনা পূর্ণের জন্য
চিরকাল সৰ্ব্বদাই এই সব বিবিধ রূপে বিদ্যমান আছেন ? নে করুন

শ্রীরামকৃষ্ণু মহিমা।
আমাদের থিয়েটারে এক এক জনের দুটি তিনটি পার্ট থাকে।
কোন পার্ট দেখাবার জন্য রাজার বেশ ধরতে হয় ; কোন পার্ট
সহরকোটালের বেশ ধরূতে হয়, কোন পাটে কয়েদীর বেশ ধরতে
হয়, কিন্তু এক স্থলেই যদি রাজা, সহরকোটাল ও কয়েদীর উপস্থি-
তির আবশ্যক হয়, তা হেলে কি এক জনের দ্বারায় ঐ তিন রূপ
সম্ভব হহতে পারে ? একজন বারে বারে নানা-রূপে বেশে আসতে
পারে, কিন্তু এককালীন একজনে কখনই একরূপ ভিন্ন অরূপ
দেখাতে পারে না।
ভ। আমি তােমার কথা বুঝেছি। এক ভগবান্ যদি নানা-
রূপে আকারে সর্বত্রে সমানভাবে সৰ্ব্বদা বিরাজমান থাকতে অক্ষম
হন, তা হোলে তিনি আর ভগবান্ কিসের ? ভগবানের যে
অনন্ত বিশেষণট আছে, তার মানে কি জান'—তিনি অনন্ত এক
র কমে নন, তিনি অনন্ত রকমে অনন্ত। ভগবানে সকল সম্ভব।
ভগবান্ যে কি, তা ভগবান্ ব্যতীত কে জেনেছে বা জানবে না
জানা সম্ভব। তুমি দু দশটি রূপেব কথা বেছো কি, আমি বাং-
কৃষ্ণজীর কাছে সেই এক ভগবনের এক এক রূগেই অনন্তর কথা
শুনেছি।
রামকৃষ্ণজী একদিন ভক্তমণ্ডলির মধ্যে মন্তের আভাস দিবার
জন্য বেছেন, সেখানে যেতে পথের দুধারে গেলো থোলো রাম,
খােলো গেলো কৃষ্ণ ঝুলছে। এক এক করে থোলােতে এই
কৃষ্ণ অহে, এক এক রামের থেংলোতে এত বাম আছে, তে,
গণনাতে অনন্ত ; আবার ঐ সকল পোলো গুলি'ও গণতাতে অনন্ত
একটী খোলাের একটী কৃষ্ণ এসে বৃন্দাবনে লীলা করেছিলেন।
একটা খােলোর একটি রাম এসে অবােধ্যায় না এহণ করেছিলেন

রামকৃষ্ণু-মহিমা। এক একটী মূৰ্ত্তি মূর্তিতে অনন্ত হয়েও প্রত্যেকের মধ্যেই সে পুর্ণ- ব্ৰহ্মত্ব বিরাজমান। ভগবান্ একাধারেও যেমন অনন্ত, অনস্তাধারেও তেমনি অনন্ত। আমরা যেমন ক্ষুদ্র জীব, আমাদের আরও তদনু- বায়ী ক্ষুদ্র, সে অনন্তের ভাব কেমন করে বুঝবাে বল ? সেই জন্য রামকৃষ্ণজী বোতেন, এক সের ঘটিতে কি পাঁচ সের দুধ ধরে । শেষ কথা, যিনি সাকারে, তিনিই নিরাকারে। যার সাকার, তঁারই নিরাকার। সাকার নিরাকার, দুই তিনি। এই দুই ছাড়া আয় ও যা কিছু আছে, তাও তিনি। একটি বই তাে আর দেরি। জিনিস নই ; সুতরাং যতই রকমরর কথা শুনেছ, যত রকমারি দেখেছ’ সব সেই তার, সকলেই সেই তিনি। যিনি আধার, তিনিই আধেয়। যিনি অদ্বৈত, তিনিই দ্বৈত। দ্বৈতাদ্বৈত দুই সে একেরই যে ভাগ্যবান জীব ঠিক, ঠিক, দ্বৈতবাদী, তিনিই ঠিক, ঠিক, অদ্বৈতবাদী। প্রকৃত দ্বৈতবাদীতে ও প্রকৃত অদ্বৈতবাণীতে কোন প্রভেদ নাই। অনন্তের মধ্যে সেই একের খেলা, ২িনি দেখতে পেয়েছেন, তারই ঠিক অদ্বৈত-জ্ঞান হয়েছে। বহুতে একের সত্তা এই বোধকে অদ্বৈতজ্ঞান বলে। এই জ্ঞানার্জনে জীব শিবত্ব অবস্থা অথাৎ দেব-দুর্লভ অবস্থা প্রাপ্ত হয় ; তাই রাম ফজী বেলতেন, ‘অদ্বৈতজ্ঞাৰ আঁচলে বেঁধে যা ইচ্ছা তাই কর।” “যা ইচ্ছা তাই কর,” তার মানে, এবংবিধ অদ্বৈতজ্ঞান-বিশিষ্ট - যা তা করূতে পারেন না, অর্থাৎ তিনি যা করেন, তা তার ঠিক, কাৰ্থ করা হয়, কেন না, তার আর বেতালে পা পড়বার যে নই।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ভগবানের অশ্চির্য খেলা, সে খেলাও আবার অনন্ত ; তুমি যত কালই খেলা দেখ’ না কেন, সেই খেলা ক্রমাগতই অনন্ত বদলে পরিলক্ষিত হবে। সাগরের মধ্যে যতই প্রবেশ করা যায়, ততই যেমন সাগরের প্রকাণ্ডতা বৃদ্ধি হয়, তেমনি ভগবানের খেলা যতই দেখা যায়, ততই তার খেলার আকার বাড়ে। খেলা রকমারিতেও যেমন অনন্ত, আকারেতেও তেমনি অনন্ত। অনন্ত জিনিসটি মানু- ষের মাথায় ধারণা হয় না। যিনি অনন্তের তিলের তিল স্ত তিলের আভাস পেয়েছেন, অর্থাৎ সেই একাওতার বৃহত্ত্বের কণায় কণামাত্র আভাস পেয়েছেন, তিনি অনন্ত কের, জোর অ পর্যন্ত উচ্চারণ করেই নির্বাক, ও আত্মহারা হন। এই আতহারা কেমন জান’?--শুড়ির দোকানে কত জালা জালা, পিপে পিপে মদ আছে, তার মধ্যে এক বােতল খেয়েই যেমন একজন বাহার। হয় ; অনন্তের আভাসেও বাহহারা তজপ। প। অবতার বা সাকারবাদে অনেক লােকে আপত্তি করেন ও বলেন, যিনি অনন্ত ও অখণ্ড, তিনি কখনও সান্ত বা খও হতে পারেন না; অতএব অবতার বাদে—কি কোন মুক্তি-বিশেষে, সেই অনন্তের, অখণ্ডের আরােপ, এ কেবল মাত্র প্রান্তিমূলক। ভ। যিনি এরূপ কথা বলেন, তাঁর মাথায় মােটেই অনন্তের ভাবের আভাস পর্যন্ত নাই; অনন্তের অথই তার উপলব্ধি নাই। তিনি ভগবানে যে অনন্ত বিশেষণ ভূষায় ভূষিত করেন, এ কেবল- মাত্র মুখে, প্রাণে প্রাণে নহে। আমার বক্তব্য, যিনি অনন্ত, তিনি সর্বৈব প্রকারে ও সর্বৈব অবস্থায় অনন্ত ; আকারে অনন্ত, রূপে অনন্ত, ভাবে অনন্ত, রসে অনন্ত, গন্ধে অনন্ত, শব্দে 'অনন্ত, স্পর্শে অনন্ত। তিনি অখণ্ড ও খ এ দুইই। যিনি অনন্ত, তিনি ১৪। শ্রীরামকৃষ্ণু মহিমা। যে রূপেই বা যে সীমাবিশিষ্ট আকারেতেই পরিণত হউন না কেন, তঁার অনন্তত্ব সকল অবস্থাতে বিদ্যমান থাকে। তিনি অনন্তেও যেমন অনন্ত, সীমাবিশিষ্ট খণ্ডেও সেই রকম অনন্ত। এর উপমা গঙ্গাজল ; হিমালয় হতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বহমান আগােটা ভাগীরথীর জলে যে পাবনী মহিমা আছে, সেই পাবনী-মহিমা ভাণী- রশীর যেখানে হউক এক বিন্দুতেও বিদ্যমান। আকারে সীমাবদ্ধ হলেও তঁাহাতে ভগবানের অনন্তত্ব, অখণ্ডত্ব, সর্ব শক্তিমানত্বের ক্রটি থাকে না। যে জগজ্জননী বিশ্ববাসিনী, তিনিই আবার বিন্দুবাসিনী ; বিশ্ববাসিনী অবস্থাতেও তিনি যেমন, বিন্দুবাসিনী অবস্থাতেও ঠিক তেমনি। লীলাময়ী কখন দিগম্বুরা, কখন সাম্বরা ; সকল অবস্থা- তেই তিনি। তুমি থিয়েটারের অভিনেতা, যে সাজই ধর না কেন, তােমার তুমি সকল বেশেই সমান ভাবে থাকে। এ সকল প্রত্যক্ষ দর্শন দ্বারা ভক্তের বা সাধকের উপলব্ধির কথা, পুস্তক পাঠার কথার কথা নহে বা কূট বিচারের কথা নহে। বিনি অনন্ত বা অখণ্ড, তিনি সান্ত বা খও হতে পারেন না, এ কথাটি বল্লেই, তার অনন্তত্বে প্রতিবাদ করা হয়। অনন্ত যদ সাম্ভ হবার শক্তিহীন হলেন, তা হলে তার অনন্তত্ব কোথায় রৈল ? তিনি কেবলমাত্র অনন্ত অার কিছু নন্, এইটা বল্লেই তার অনন্তত্বে গণ্ডী দেওয়া হয় ; সাকার উপাসকদের সাকার উপাসনা দ্বারা গণ্ডী দেওয়া হয় না। ? রামপ্রসাদীর গানে এক জায়গায় বোলেছেন, = “রামপ্রসাদ বলে, মাতৃভাবে আমি তত্ত্ব করি যারে, চাতরে কি ভাঙ্গবাে হাঁড়ি বুঝনারে মন ঠারেঠোরে।”

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ১৪১. । তাঁর আর একটী গীত- কে জানে সে কালী কেমন, ষড়দর্শনে না পায় দরশন। মূলাধারে সহস্রধারে যোগী যারে করে মনন, পদ্মবনে হংসসনে হংসীরূপে করে রমণ। আত্মারামের আত্মা কালী, রাম-প্রেয়সী সীতা যেমন, কালী সৰ্ববটে বিরাজ করে ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছ। যেমন । প্রসবে ব্ৰহ্মাণ্ড অণ্ড প্রকাগুতা বুঝ কেমন, আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না, ধরূবে শশী হয়ে বামন।” আর একটি গান- “এই যত সব মাগীর খেলা, মাগীর গুপ্তভাবে আপ্ত লীলা। সগুণে নিগুণে বাধিয়ে বিবাদ, ঢেলা দিয়া ভাঙ্গছে ঢেলা, মাগী সকল কাজে সমান রাজি, নারাজ খালি কাজের বেলা। রামপ্রসাদ বলে, থা করে বােসে ভবার্ণবে ভাসিয়ে ভেলা, উজান এলে উজিয়ে যাবি, ভাটিয়ে যাবি ভাটার বেলা। রামপ্রসাদ যে কালীকে চৌদ্দপুয়া সসীম আকারে দেখেছিলেন, সেই কালীকেই ব্ৰহ্মময়ী দেখেছিলেন। জগৎপূজ্য যে ব্যাস পুরাণ প্রণেত, তিনিই আবার বেদান্তের লেখক। ব্যাসবিরচিত বেদান্তের ভাষ্যকার শঙ্কর ও র.মানুজ। জন্ম জন্ম সাধনসঙুত ভগবৎকৃপা ব্যতীত ব্যাস-প্রণীত গ্রন্থাদি জীবের, কোন প্রকারেই ধারণা হয় না। কোথাও কোন ব্যক্তির বিষয়ে, কোন মতামত প্রকাশ করবার ১৪২ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। পূর্বে যেমন তার বিশেষ পরিচয় অবগত হওয়া প্রয়ােজন, তদ্রুপ ঈশ্বরতন্তু সাধারণের মধ্যে বার পূর্বে ঈশ্বর-লাভ হওয়া চাই। জীবের ঈশ্বর-লাভ হ'লে কেও কেও আর কথা কইতে পারেন না, কেও বা সৎবিষয় আন্দোলন দ্বারা যতদিন বাঁচেন, সেই কয়েকদিন সদালাপে অতিবাহিত করেন। ঈশ্বর দর্শন, ঈশ্বর-লাভ ও-ঈশ্বরের আজ্ঞা ব্যতীত ঈশ্বর বিষয়ে কোন মতামত প্রকাশের অধিকারী কেহ হতে পারেন না। যারা সাকার উপাসনার প্রতিবাদী, তাঁরা কোন ভাবেরই উপাসক বা সাধক নন। যে কোন ভাবেই হউক, ঠিক ঠিক উপাসক যিনি, তিনি কোন উপাসকের নিন্দা করূহে পারেন না; তার কারণ, তিনি বেশ জানেন ও বুঝেন যে, সকলেই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ও ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতিতে ও পদ্ধতিতে সেই একেরই উপা- সনা কচ্ছেন। দ্বিতীয় কারণ, যিনি ঠিক ঠিক, উপাসক, তিনি এক- মনে আপনার ভাবেই মত্ত থাকেন, অণ্ঠ দিকে লক্ষ্য করবার অবকাশ পান না। সাগরের তীরেই যত শব্দ, সাগরের ভিতরে প্রবেশ করলে আর শব্দ থাকে না, ঠিক তেমনি ঈশ্বর-পথের বহিভূতেই যাবতীয় কোলাহল ; সেখানে প্রবেশ করলে আর গােলমাল থাকে না। ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর মতে সাকার উপাসনার প্রতিবাদ করা, ঘোর অজ্ঞানের কাজ। ঈশ্বর-পন্থীদের পরস্পর বিবাদ-ভঞ্জন কর- . বার জন্য, ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর অবতারণা ; এটি তার লীলার প্রতি ছরেও প্রতি অক্ষরে স্পষ্টাক্ষরে লেখা আছে। কূট তর্ক বুদ্ধি কি কূট বিচারবুদ্ধি দ্বারা ভগবানের সাকারবাদের প্রহি করা নিষ্প্রয়োজন। এই কূটবুদ্ধির অন্য নাম ঘোর সন্দেহ। সরল-মতি ব্যক্তিদের এরূপ সন্দেহ ঘটলে গুরুপদে আশ্রয় গ্রহণ করা প্রেয়। গুম-বাক্যে নিষ্ঠাই এংবিধ সন্দেহরূপ বিষবৃক্ষের কুঠার- শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। ১৪৩ ৪) স্বরূপ। শ্রীগুরুপদানুরক্ত পূর্ণমনােরথ ভক্তিমানের এই সন্দেহকে ভবব্যাধি বলেন। অনেকে আবার বলেন, এই সন্দেহই সেই ভীষণ তম, যাতে ভগবানকে জীবের চক্ষু থেকে একবারে আড়াল করে রাখে। যে হৃদয়-মুকুবে ভগবানের রূপ প্রতিবিম্বিত হয়, সেই মুকুরখানিকে এই সন্দেহ মলিন করে রাখে। সদগুরু সংসর্গে ও তাঁর কৃপায় সূর্যোদয়ে আঁধারের ন্যায় তমস্ দূরীভূত হয়।, ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর কাছে এটি আমি প্রত্যক্ষ দেখেছি। কত দেশ-বিদেশ থেকে ঠাকুরের কাছে সময়ে সময়ে কত দিগ্বি- জয়ী বড় বড় শাস্ত্রবিদ পণ্ডিতেরা আসতেন। প্রথমতঃ তারা ঠাকুরের সঙ্গে বিদ্যাভিমানে মত্ত হয়ে ভয়ঙ্কর বাকচ্ছটা সহকারে ঈশ্বর-তত্ত্ব-বিষয়ে এমন তর্ক-বিতর্ক, বাদ-প্রতিবাদ করতেন ও ঠাকুরকে এমন অবস্থাপন্ন করে ফেলতেন যে, তিনি আর কি বোল- বেন, তার পথ পেতেন না। লােকে বুঝতে, ঠাকুর পরাজয় হলেন। এমন সময় ঠাকুর কি কতেন জান’? তিনি বােতেন, আমি মল কি মূত্র ত্যাগে যাব। একবার যাব’ বোল্লে আর থাকবার যো নাই যেমনি বলা, তেমনি উঠা। ভক্তের প্রভুর ধারা অনেক বুঝে ঠাকুরকে উঠতে দেখে’ অমনি একজন জলপাত্র নিয়ে ঠাকুরের পেছু পেছু চল্লেন। প। ঠাকুর পরাজয় হলেন এ কেমন কথা ? ভ। তুমি এত ব্যস্ত হ’চ্ছ কেন? আগে সবটুকু শুন’। ঠাকুরের পরাজয়ের খুব কারণ আছে। বিদ্যাভিমানীদের বাসনাই বিচাবে জয়লাভে প্রশংসিত হবেন এবং তাদের অধ্যয়নের উদ্দেশ্যই তাই। ঠাকুরের ডােলপেটা নাম শুনে, তার কাছে ঐ বাসনাতেই এসেছেন ; ঠাকুর কল্পতরু ; যার যা বাসনা, তাই তিনি পূর্ণ করেন।

১৪৪ ঐ শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। অমানীকে অতিমান দিতে থাকুরের মত এমন দাতা কোথা শুনি নাই।' । তার পরে ঠাকুরের পথে যেতে যেতেই ভাবাবেশ; চছেন ঠিক মাতালের মত, আবার শ্রীমুখে বিড় বিড় করে কত কি বােতেন, কখন কিছু বুঝা যেত, কখন কিছু বুঝা যেত না। এই ভাবে যথাস্থানে একমাত্র বসেই দ্রুতপদে ফিরে আতেন, আর সেই তার্কিককে ছুয়ে দিয়ে বােলতেন, কৈ আপনি কি বােল ছিলে, বল, দেখি। এই ছুঁয়ে দেওয়াটিই করুণানিধির অপার করুণা। প্রভুদেবের স্পর্শে তার্কিক পণ্ডিতেরা কেমন এক রকম হয়ে যেতেন—সেটা কেমন জান’? সর্পবিদ্যাবিদ সাপুড়ে,জড়ি হাতে করে উন্নত-ফণা সাপকে ধলে, সাপটি যেমন হয়, পণ্ডিতদের অব স্থাও ঠিক তেমনি হােতো। এখন আর সে আগেকার চক্ৰধরা ভাব নাই, লম্বা চওড়া শ্লোক আউড়ে ফেঁাশ-ফেশানি নাই—সেই বিস্তৃত ফণা ভুজঙ্গম, এখন যেমন কঁচে। এই ভাবে কিছুক্ষণ ঠাকুরের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকতেন ; তার পরেই, কেও বা হাঁটু গেড়ে জোড় হাতে ঠাকুরকে স্তব স্তুতি করতেন, কেও ব! বোতেন—“দেহি মে চৈতন্য”, আবার কেও বা কেবল ঠাকুরের পা-তলে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদে মাটি ভিজাতেন। এইখানে আমার একটি কথা আছে। কথাটী-সকল বিষয়েরই ছবি আছে ; যে ঘটনাটী কথায় শুলে, তার ছবিটি একবার চোখ, মুদে দেখ দেখি। এই ছবিটী যদি তুমি দেখতে পাও, তা হলে তৎক্ষণাৎ বুঝবে যে, ঠাকুরের কৃপায় কেমন চকিতের মধ্যে মহা- বিরােধিনী ভয়ঙ্করী অবিছা মায়ার তম আবরণ দুরীভূত হতো। জন্ম জন্ম কঠোর তপস্যাতেও যে বস্তু জীবের লাভ হয় না, প্রভু শ্রামকৃষ্ণ-মহিমা।... ১৪৫. দেবের জশনে ও স্পর্শে অপেক্ষাকৃত অধিক দুর্লভ বস্তু লাভ হতো। ঠাকুরের করুণার সীমা নাই। সন্দেহ-আঁধারের জন্যই পণ্ডিতেরা কিছু পূর্বে অহঙ্কারজনিত বিদ্যভিমানে উন্নত মস্তক ছিলেন। প্রভু দেবের স্পশেই সেই মস্তক ভূমিতলে বিলুণ্ঠিত; এর অর্থ—তকা- বস্থায় যে তত্ব তার্কিকদের চক্ষের অপ্রত্যক্ষীভূত ছিল, ঠাকুরের স্পর্শশক্তিতে সেই তত্ব দিনালােকে বস্তুর ন্যায় প্রত্যক্ষীভূত হােলাে। দয়ানিধি কল্পতরু ভগবান্ চৈতন্যদানে তমস্ দূর করে দিয়ে সত্য তত্ত্ব প্রত্যক্ষ করবার শক্তি দিলেন। আর এক কথা, এই সন্দেহই জগতের যাবতীয় জীবকে তৈল- কার যন্ত্রে আবদ্ধ-চক্ষু বৃষের ন্যায় সংসার-কর্মক্ষেত্রে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সাধনার পথেও এই তিমির তিরােহিত হয় বটে, কিন্তু সেটি জন্ম জন্ম কঠোর সাধনার ফল। আর এ দিকে রামকৃষ্ণজীর মহিমা দেখ। সাধনার পথে তম নষ্ট আর প্রভুর কৃপায় তমস, নষ্ট, এ দুয়ে তফাৎ কত জন? যেমন ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা পদব্রজে বৃন্দাবন গমন আর আহারীয় দ্রব্যাদি সহ টিকিট লাভে রেলপথে বৃন্দাবন গমন। দ্বিতীয় উপমা, কূপ খনন দ্বারা জলপান ও স্বচ্ছসলিল। পুষ্করিণীতে জলপান। যার পশমাৰ জীবের চৈতন্যোদয় হয়, তিনি কি বস্তু, এ কি জীবের প্রণিধানে আসে ? ভাই, একবার মন প্রাণ খুলে জয় রামকৃষ্ণ বল। জীব অধীতশাস্ত্র হলেও, বিনা চৈতন্তে সে পশুর কিঞ্চিৎ উচ্চ শ্রেণী মাত্র। অচৈততে চৈতন্য সঞ্চার, আর পাষাণে প্রাণ সঞ্চার, এ দুয়ে কিছুই তফাৎ নাই। রামরূপে প্ৰভু একটা মাত্র পাষাণীকে মানবীনী করেছিলেন এবারে রামকৃষ্ণরূপে অপার দয়ার ভরে শত শত পাষাণ-হৃদয়কে সচেতন করে অপার মহিমা দেখালেন। চৈতন্য হলে জীবের কি ১৪৬ শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। প্রকার অবস্থান্তর হয়, তা মুখে বলা যায় না। সেই জন্য তােমাকে বার বার বলেছি, রামকৃষ্ণলীলা বলবার নয়, গুবার নয়, কেবল মত্র দেখ বার। প। চৈতন্য হলে, কি রকম হয়, তবু যত টুকু পারেন বলুন না ? ভ) চৈতন্য লাভ ও মহামায়ার প্রসন্নতা লাভ, একই কথা। দেখ’ যে কখন থিয়েটার দেখে নাই, পাড়াগেঁয়ে চাষা-ভূষা লোক, সে যৰি তােমাকে জিজ্ঞাসা করে, হেঁ মশায়। থিরেটারে কি দেখান, কি আছে?—তা হলে তুমি তাকে কি বলবে বা কি বােঝাবে? এখানে তজপ—এই সৃষ্টি, মায়ের রঙ্গালয়। এই জগতের মধ্যে আর এক জগৎ আছে। এই জগতের নাম বাহ-জগৎ, আর ভিতরে যে জগৎ আছে, তার নাম অন্তর্জগৎ। বাহ-জগত অম্ভ র্জগতের সূচীপত্রস্বরূপ। মা-রঙ্গময়ী—এই জগতয়ে যে রঙ্গ করু- ছেন, তার নাম অবাক, রঙ্গ। টিকিট কি ফি পাশ যেমন তােমা- দের থিয়েটারে প্রবেশের উপায়, বাহ-জগৎ থেকে অন্তর্জগত প্রবেশে মায়ের প্রসন্নতা বা চৈতন্য একমাত্র উপায়। চৈতন্য হলে এই বাহজগতকে আবার আর একরকম দেখবে; যদিও অচৈতন্য- বহার বাহ-জগত আর চৈতন্যাবস্থার বাহজগৎ, সেই একই, তত্ত্ব চৈতন্যাবস্থায় দেখৰে যে, তার পূর্বেকার প্রকৃতি, চেহারা বর্ণ এক- দম অন্য রকমের হয়ে গেছে। সচৈতন্ঠে চোখ, চেয়ে দেখা নয়, চোখ মুদে দেখা। আলােয় আঁধারে সমান দেখা যায়। চামড়ার চোখ দুটা তখন নামেমাত্র চক্ষু, দেখবার বেলা আর এক চোখের আবশ্যক। সেই চোখে অবাক, রঙ্গ দেখা যায়। অবাক, রঙ্গের দু একটী খেলা বলি শুন’,-তুমি একটী চৌদ্দপুয়া পরিমিত অস্থি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ১৪৭, • চর্মে গড়া মানুষ মাত্র। তুমি জান যে, এই দেহটিই আমি; কিন্তু তা নয়-তুমি দেহ ছাড়া অর্থাৎ দেহতে তােমাতে আলাদা। এই দেহের ভিতরে একটা মন রয়েছে; ঐ মন দিবানিশি সংকল্প বিকল্প করছে। ঐ একটী মন, কখন কখন দুটী হয়ে পরষ্পর ঝগড়া করে ; আবার সেই ঝগড়া নিষ্পত্তির জন্য অন্য একজন বিবাদ-ক্ষেত্রে উদয় হয় ;এ সওয়ায় চিত্ত, বুদ্ধি, অহঙ্কার, জীবাত্মা, পরমাত্মা, কাম- ক্রোধাদি ছয় রিপু এই দেহে রয়েছে ও কাজ করছে। এই সকল যাবতীয় তত্ত্ব বহু পূর্বে তােমাকে বলেছি। এই সব অবাক,-রঙ্গ ; দিবানিশি দেহে রয়েছে, কত কি খেলা করছে, মানুষ কিন্তু কিছুই টের পায় না। এ সওয়ায় আরও কত অকথ্য বস্তু দেহের মধ্যে রয়েছে—তুমি কি তাদের বিষয় কিছু বুঝতে পারুছােনা-তাদিকে দেখতে পাও? পুতুলওয়ালা যেমন নানা কলে কৌশলে পুতুলগুলিকে নাচায়, মা-রঙ্গময়ী জীবের দেহের মধ্যে সাতসতেরগণ্ডা জিনিস দিয়ে নিজের ইচ্ছামত সকল দেহীকেই খেলাচ্ছেন। দেহীদের ভিতর দিয়ে তিনি সৃষ্টির সকল খেলা খেলিয়ে নে; তারিপ এইটা যে তাঁর রঙ্গ-কৌশলে দেহীদিগে তার কিছুই জানতে দেন না—তবে যে আধারে মা প্রসন্ন হয়ে চৈতন্য দেন, সেই আধার এই সকল খেলা দেখতে পায়। অবাক, রঙ্গ –এই সৃষ্টিতে প্রত্যেক দেহে এক একটী “আমি” রয়েছে এবং প্রত্যেকেই অহংকারে আমি আমি রবে গগন ফাটাচ্ছে, কিন্তু সত্যতঃ “আমি” বলে এত লক্ষ কোটি আমি নাই। আমিদের স্থলে যিনি আছেন, মায়ের বিনা প্রসন্নতা লাভে তাকে দেখবার উপায় নাই।

১৮ ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। লােকে বলে—তার অনেক পরিচিত লোক আছে অর্থাৎ সে -দিগে চিনে, কিন্তু বাস্তবিক, সে কাকেও চিনে না, বা জানে না, এমন কি, সে তার মা, স্ত্রী, পুত্র, পরিবারলিগেও চিনে না—সে নিজেকেও নিজে চিনে না। সে—কি, কোথা হতে এসেছে, কোথা রয়েছে, কোথা যাবে, কি কবে, এ সকল কিছুই জানে না। মা-রঙ্গময়ীর প্রসন্নতা-প্রসুত চৈতন্য বিনা, কিছুই চিম্বার বা জাম্বার উপায় নাই জীবজগতে রূপ, রস, গন্ধ, স্পশ ও শব্দের যে লক্ষকোটি রক- মারি দেখছো, এই সব রকমারিই এক পাকের তিয়ানে উৎপন্ন। এদের মধ্যে ছােট বড় নাই, ভাল মন্দ নাই, শ্রেষ্ঠ নিকৃষ্ট নাই। বিশাল সৃষ্টির মধ্যেও যা আছে, এক একটি দেহাধারেও সেই সব আছে। রূপান্তর গুণান্তর বই কাহারও নাশ নাই, ইত্যাদি ইত্যাদি চৈতন্যবান্ বিনা আর কেও দেখতে পায় না। এখন বুঝ’-চৈতন্য কি। এই দেব-দুর্লভ চৈতন্য রামকৃষ্ণজীর ঈষৎ করুণকটাক্ষে জীবের দেহে সমূদিত হতো। চৈতন্যই ভব- সাগর উত্তীর্ণ হবার একমাত্র তরণী এবং তায় রামকৃষ্ণজীই একমাত্র কর্ণধার। ঠাকুর অন্ধ জীবকে তার এই অপার করুণার ও মহাশক্তির পরিচয় দিবার জন্যে সময়ে সময়ে ভাবাবেশে বােলতেন-জাত সাপ ধরুলে, বড় বেশী ডাকতে হয় না—একবার কি দুবার, জোর-না হয় তিনবার—এর মানে কি জান? কতকগুলি সাপের মুখে কালকূট বিষ থাকে, তাদিগে জাত সাপ বলে, যেমন গোখরা, কেউটে, কালিয়াগ ইত্যাদি। আর কতকগুলির বিষ নাই, যেমন--মেটেলি, ঢড়া ইত্যাদি। নির্বিষেরা যদি ব্যাঙ ধরে, তা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণু-মহিমা। হেলে ব্যাঙকে অনেকক্ষণ কেঁও কেঁও করে ডাকতে হয়; কিন্তু যদি বিষধরে ধরে, তা হােলে বেশী ডাকতে হয় না, কেন না বিষের জোরে শীঘ্রই জেরে ফেলে। এই উপমায় ঠাকুর নিজের পরিচয় দিয়ে, এই বােতেন যে, আমি এমন জাতির—যাকে ছোঁব, তাকে বড় বেশী তর্ক-বিতর্ক কতে হবে না, শীঘ্রই তার কাজ মিটবে। ঠাকুর আবার কখন কখন বােতেন—তেলাপােকায় আরশুলা ধরূলে আরশুলার বর্ণ'টা ঠিক, তেলাপােকার গায়ের বর্ণের মত হয়ে যায়--এর মানে, আমি (ঠাকুর) যাকে ধরুবাে, আমার মত তার বর্ণ হবে। গিরিশ বাবুকে বােলেছিলেন, এই বেলা খেয়ে, মেখে ও ভােগ কোরে নে । এর পরে আর হবে না। ঠাকুরের অনেকগুলি ধনী, মানী, গুণী ভক্ত ও প্রথমতঃ অর্থাৎ ঠাকুরকে দর্শন কনার পূর্বে, কেবলমাত্র নাম শুনে বলেছিলেন-- এই বয়সে কত হংস দেখলাম--যদি যাই, নাক-মােল দিয়ে আলাে ; কেও বলেছিলেন, দু কথায় থ বানিয়ে দিয়ে আবো, গিরিশ বাবুও প্রথম দর্শনে বােলেছিলেন, এই উনবিংশ শতাব্দীতে বুজরুকি দেখলাম-কিন্তু প্রভুর কেমন মােহিনী এব কি দুবার ভাল সরল-বালক-সুলভ-স্বভাব ও পরমানন্দময় মুক্তি দর্শনে, অভিমানী ভক্তেরা এ জন্মের মত শ্ৰীশ্ৰীপদে বিকিয়ে গেলেন, তাদের পূর্বেকার যুক্তিতর্ক, বিচার, বুদ্ধি অভিমানাদি রামকৃষ্ণরূপ- সাগরে কোথায় তলিয়ে গেল, তার আর খোজ খবর মাত্র পেলেন না। ঠাকুর পরম রূপবা-দেখলে আর বাঁচাও নাই। এমন অরূপে রূপের ছবি সৃষ্টিতে কেও কখন দেখেন নাই। কেবল রূগেই যে মােহনা নয়গুণেও তেমনি মােহন। অতি / অনেক শ্রীরামকৃষ্ণু-মহিমা। t সুন্দর বাঁকা বাঁকা চোখ দুটি, কাণ পর্যন্ত টানা। তাতে আবার এমন মেহনত্ব যে, সেই চোখে কারু পানে তাকালে তার আর রক্ষা নাই। মনপাখী দিয়া ফাকি পলাতে না পারে। অনিবাৰ্য শরাঘাত সহ্মানিলে কারে । ধমুশরে মারে, আঁখি-শরে দেয় প্রাণ। আঁকিতে নারিনু বাঁকা আঁখির সন্ধান। (রামকৃষ্ণপুথি)। প্রশস্ত ললাট, ঈষৎ রক্তিম কুঁদেকাটা ঠোট দুটি ; নিরুপম মুখখানি, ধীর মন সমীরণে আন্দোলিত কালিন্দীর স্বচ্ছসলিলের ন্যায় মৃদু হাসিতে ঢল ঢল ; যেন তায় চাঁদের কিরণ মাখা, পরি- মিত গ্রীবা, কণ্ঠে মুহলীর স্বর, বিশাল বক্ষস্থল, আজানুলম্বিত বাহু- যুগল, শােভমান পা দুটি, কমলাদপি কোমল চরণতল, স্পর্শে লৌহ- দেহ কাঞ্চনময় হয়। যাবতীয় পূর্ণগুণে শ্রীঅঙ্গ পরিপূরিত। তার মধ্যে দয়াই যেন যােল-আনার অধিক; ; বিতরণও মূক্ত হস্তে ; তিলবৎ মূলে তালবৎ দান, তাতেই দর্শকবৃন্দ বিভােয়; সুতরাং শ্ৰীআধারে কত কি আছে, তা দেখবার কেহ অবকাশ পান নাই। লীলা অতি গভীর, নিজে পাতালও তলা পান না। বাহৈশ্বৰ্য্য থেকেও কিছুমাত্র নাই; অন্তরৈশ্বৰ্যে কিন্তু কোটি কোটি বিশ্বও শুলিয়া যায়, সেইজন্য রামকৃষ্ণলীলা মুখে বলা যায় না । শুনবার নয়, কেবল দেখবার। যা দেখা যায়, তা কথায় প্রকাশ হবার নয়। ঠাকুর যেমন গুপ্তাবতার, লীলা খানিও তদ্রুপ। অদ্ভুত খেলা। মহাব্যক্ত হয়ে মহাগুপ্ত। অতি-সরলকে বুঝা- মহাধ্যায়। অতি সরলে যেন অতি বঁকার ভাব, ঠিক তেমি ব্যক্ত- শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। বতারে গুপ্তাবতারের ভাব। বস্তু প্রত্যক্ষ না হহলে, এক বস্তুতে বিপরীত ভাবের খেলা বুঝবার নয়। পা। ঠিক বটে মশায়, এখানকার কথাগুলি শুনতে বেশ লাগছে, কিন্তু কিছু বুঝা যাচ্ছে না। বাহৈশ্বৰ্য্য অস্তরৈশ্বৰ্য্য কি রকম? ব্যক্ত হয়ে গুপ্ত; সরল বা সােজা হােয়ে বাঁকা, এই বা কি প্রকার ? ভ। ঈশ্বরের লীলতত্ত্ব এত খুলে বলা যায় না; ইঙ্গিত ইসারায় বুঝে নিতে হয়। চোখে, নাকে, বদন-ভঙ্গিমাতে যেমন বলতে পারে, বচনে তেমন পারে না। আমি বরাবরই তােমাকে বলে আছি-অমি মুর্থ মানুষ, ভাষা-জ্ঞান নাই, শাস্ত্র-পাঠ নাই, তীর্থ-পথ্যটন নাই, সাধন-ভজন নাই, আমার বল, বুদ্ধি, সহায়, সম্বল সকল রামকৃষ্ণজী; তিনি যেমন দেখাচ্ছেন, উপলব্ধি করাচ্ছেন, সেই গুলিই যেমন করে হােক কঁকিয়ে কঁকিয়ে তােমাকে বছি এইমাত্র। বাহ্যৈশ্বৰ্য কাকে বলি জান’? যে ঐশ্বর্যের বলে পাষাণখানা মানুষ হয়ে গেল, কাঠের নৌকাটা সােনা হয়ে গেল, ভীষণ হরধনুখানা বালকের হাতে দুখানা হয়ে গেল, ভয়ঙ্কর তাড়কার নিপাত হলো, জলের উপর গুরুভার পাষাণ ভাসতে লাগলো,কোড়ে আঁঙ্গুলের উপর পতটী তুলে ধরা হলো, দুগ্ধপােষ্য শিশুর দ্বারা রাক্ষসী প্রাণ হারালো, বাঁশীর গানে যমুনার জল উজান বৈল, দেখতে দেখতে কৃষ্ণ কালী হ'লো, চতু- ৰ্ম্ম থ পঞ্চমুখের ধাঁদা উঠলো, হাতে মাথা কাটা গেল, তিন পায়ে ত্রিভুবন ঢাকা পড়লো, ঈতে ধরণীর ভার সৈল ইত্যাদি ইত্যাদি এই বাহৈশ্বর্যের খেলা ; এ খেলা রামকৃষ্ণ-লীলার বিষয়ীভূত হয়েও বিষয়ীভূত নয়। এখানে শুৰূ-সত্বের থেলা—যার বলে এক শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। । কথায় অন্তরের চির-ঘুমন্ত সাপ জেগে উঠলো, অবাকু-রঙ্গালয়ের দুয়ার খােল পড়লাে, চির-আসক্তির জিনিসে অনাসক্তি হলাে আপনার যার পর হ’লল ও পর যার, আপনার হ’ললা; মনের গতি, বর্ণ ফিরে গেল, কোটি কোটি জন্মের পথ এক নিমিষের মধ্যে ফুরিয়ে গেল, ইন্দ্রিয়দের নুতন খােরাক জুটলে, জগৎ নূতন হলো, দেহে আত্মায় পৃথক হলাে, হাড়গােড়গুলাে চলে বেড়ালো, বেদ-পুরাণের ভাব অন্তরে আপনি ফুটলো, অনন্ত কোটি জিনিস একটা হয়ে দাড়ালো, একটা জিনিস অনন্ত রূপে, বর্ণে, গন্ধে, রসে ও শব্দে অনন্তে পরিণত হলো, ভাল মন্দ এক বিছানায় শুয়ে ঘুমুলো, আর যে ভগবানের দুয়ার প্রবেশে ই, চন্দ্র, বায়ু, বরুণ, বম ইত্যাদি ভয়ে কম্পমান, সেই ভগবান্ আপনার চেয়েও আপনার হলো—এই সব রামকৃষ্ণজীর খেলার অন্তর্গত। বাহৈশ্বর্যের কাণ্ড ইন্দ্রিয়ের আয়ত্তাধীন, তাই মুখে বলা চলে, কিন্তু অন্তরৈয্যের কাণ্ড ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত হয়েও তাদের বিষয়ীভূত নয়, এই জন্য বর্ণনা করা যায় না, এই হেতু আমি ক্রমাগত বার বার বােলছি, রামকৃষ্ণলীলা বলবার নয়, কেবল দেখবার। রামকৃষ্ণলীলা, যে তিলের তিল বুঝেছে, তার আর মুখে কথা বেরয় কি? মনে করে- এ যে অবাক রঙ্গ-এ কি মুখে বলা যায়-না-কাকেও বুঝান’ যায়। দ্বিতীয় কথা, রামকৃষ্ণজী ব্যক্ত হয়ে গুপ্ত আর অতি সরল, সােজ। হােয়ে ও অতি বাঁকা—সে কেমন ধারা, ধীর স্থিরচিত্তে শুন’-রাম- কৃষ্ণজীর জন্মস্থান হলাে এমন একটা স্থানে, যে স্থানটি তাঁর জন্মাবার পূৰ্বে জনসাধারণে পরিচিত হবার কোন কারণই নাই। যেখানে তার পিতৃদেবের আরাসবাটি অর্থাৎ যে পুণ্য বাস্তুতে প্রভুদেবের ঐশ্রীরামকৃষ্ণ মহিলা। জন্ম হলো, তাই কোন সেটি গ্রামের ভদ্রপল্লীর মধ্যে। স্থানটি গ্রামের এক প্রান্তভাগে—প্রতিবাসী জোলা-তাঁতি, আর ডােন, হিন্দুতে যাদিগে হীনজাতি বা ইতরজাতি বলে। অদূরে শ্মশান, আবিল ভাঙ্গা, নানাজাতি গাছ-পাতায় পরিপূর্ণ, মৃতদেহ-লােলুপ শকুনি, কুকুর ও শিয়ালের নৃত্য-ভূমি, নিকটে একটি খাল, সন্ধ্যার পর একলা যাওয়া যায় না। পিতৃদেব তাই কোন একজন সম্পত্তি বান, সম্পত্তির মধ্যে সাতপুয়া জমি, গরিবের একশেষ; কিন্তু বুঝে যেও দৈন্য নন। ভিটার মধ্যে একখানি আৰাসবাটি, অর্থাভাবে কাঠের বদলে বাঁশের সাজ, কুঁড়ে ঘরের মত একখানি ঠাকুর ঘর, একখানি বইঘর আর একটি টেকিশালা। নাভাবে প্রভুদেব ভূমিষ্ট হলেন টেকিশালে। জন্মের পর পালন করলেন একটি কামা- রের ঘরের দুঃখিনী কড়ে রাড়ী। নিকটে সম্পত্তিবান্ লােকের বাস আছে বটে, তারাও বহুপরিবার, ঘরে ছেলে-পুলেও অনেকগুলি, রামকৃষ্ণজী কিছু বড় হলে পর, তাঁদের ছেলেদের সঙ্গে তত না মিশে, মিশলেন কি না অতি দুঃখী, দীন খেটে-খেকো লােকের ছেলে দের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে সর্বদা সহবাস, তাদের সঙ্গে খেলা, তাদের সঙ্গে গরু চরাতে যাওয়া। লেখাপড়া শিখবার নামটা মাত্র নাই। বেশী বয়সে কর্তৃপক্ষের জেদে পাঠশালে গেলেন, কিন্তু লেখাপড়ায় মােটে মন নাই। অনেক কষ্টে বিদ্যা হলাে কাঠাকে পৰ্যন্ত। কিছু কিছু বর্ণপরিচয় হলো, তালপাতায় ঠাকুরদের নাম লিখতে শিখলেন। এইখানে বিদ্যার খতম্। পূর্ণ বালক বয়সে এবং যৌবনের প্রারম্ভে ঠাকুরবাড়ীর পূজারীর চাকরিতে নিযুক্ত ইলেন, -তাই কোন্ একটী সজ্জাতির ঠাকুরবাড়ী, ঠাকুরবাড়ী কি না, কৈবৰ্ত্তের, তাও আবার চাষী-কৈবর্ত নয়, জেলে কৈবর্ত! যেখানে ঐশ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। এই ঠাকুরবাড়ী, সেখানের কোন সজ্জাতিই প্রকাশ্যে এই ঠাকুর- বাড়ীর প্রসাদ গ্রহণ করেন না। ঠাকুরবাড়ীর অধিকারিণী খ্যাত নাম রাণী রাসমণি; তার প্রতিষ্ঠিত দেবী মা-ভবতারিণীর ও রাধাকান্তের বিপুল আয়ােজন সহ নিত্য ভোগরাগের ব্যবস্থা। শুনেছি, প্রার্থী অভাবে মহাপ্রসাদ গঙ্গায় ফেলে দিতে হতাে। কৈবর্তের ঠাকুরের প্রসাদ ব’লে ভাল লােকে গ্রহণ করতো না। রামকৃষ্ণজী এই ঠাকুরবাড়ীর পূজারীর কাজে নিযুক্ত। রামকৃষ্ণজী ঠাকুরদের সেবায় অন্যান্য পূজারীদের মত বৈধ আচার কি কাজ রাখতে পারলেন না। তিনি মহাপ্রেমে দেব-দেবীর সেবা পূজা ও বেশ করে দিতেন। সাধারণ জীবের প্রকৃতিতে আর রামকৃষ্ণজীর প্রকৃতিতে একেবারে বিপরীত সুতরাং বিধি- বাদীয়দের চক্ষে তিনি পাগল বলে সাব্যস্ত হলেন। তার পর তার বড় ভাই রামকুমার ঠাকুর দেশে নিয়ে গিয়ে ঠাকুরের বিয়ে দিলেন। যার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলো, তিনি আবার একজন দশকৰ্ম্মান্বিত যজমেনে ব্রাহ্মণ। খুব গরীব, পাচটী ছয়টা পােষ্য, কষ্টে দিন কাটা। দেশের চলনানুসারে ঠাকুরকে বিয়ে করতে হােলে পণ দিয়ে, তাও বড় কম নয়, পূরাপূরি তিন-শ। ঠাকুরের স্বভাব ঠিক একটি ছেলে-মানুষের স্বভাবের মত। সত্ব, রজ, তম এ তিনের কোন গন্ধ নাই—আপন পর বিচার নাই, সম্পর্ক-বিচারের ধার ধারেন না, কামিনী-কাঞ্চনে মােটে মন নাই, যেখানে এ সম্বন্ধ, সেখানে ঘাের ঘৃণা, তার উপর মাঝে মাঝে ভাবাবেশ। পরিধেয়-কখন কোমরে, কখন বগলে, সৰ্ব্বদাই এবং সঠিই মােহন কণ্ঠে ভগবলীলাগুণগীত। আচারে ব্যাভারে মানুষেরু সঙ্গে একবারে বিপরীত। কাজেই এখানেও শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। শওর-বাড়ীর লোকেরাও পাগল বলে ঠাওরালেন। তার পর কলিকাতায় এলেন। নিজের নিয়মিত কাজ, মা-ভব- রিণীর সেবা দিন দিন কতে কতে রামকৃষ্ণজীর অন্তরে প্রবল ঝড় উঠে পড়লাে। অতি কঠিন কঠিন সাধন-ভজন আরম্ভ হলো, অধিকাংশই গােপনে; কখন কখন মানুষের চক্ষে পড়তেন। সাধন-ভজনে অমানুষিক আচার, কখন বালকবৎ কখন পিশাচবৎ কখনও উন্মাবৎ। এই সব কেমম জান'—হয়তো রামকৃষ্ণজী মা- ভবতারিণীর খাটে শুয়ে আছেন, কখন গাছে উঠে মুত্রত্যাগ করছেন, কখন ঘৃণাবিবর্জিত অবস্থাপন্ন; বিষ্ঠা-চন্দনে সমান জ্ঞান ও তৎবৎ আচরণ। এই সকল দেখে শুনে নিম্ন শ্রেণীর লােক থেকে মায় শাস্ত্রবিদ পণ্ডিত ব্রাহ্মণ পৰ্যন্ত ঠাকুরকে ঘাের উন্মাদ বলে পাকা জ্ঞান কলেন। সাধন-ভজন সমাধার পর যখন প্রকৃতিস্থ হলেন, তখন জীবকে জ্ঞান, ভক্তি, চৈতন্য ও ঈশ্বরতত্ত্ব বিলবার জন্য ব্যাকুল হলেন। জীবের এখানে কামিনী- কাঞ্চনে, বিদ্যামদে, মানে, যশে ঘাের আসক্তি ; কেও রামকৃষ্ণজীর পশার জিনিস্ চায় না। সুতরাং তার কথায় কেও কর্ণপাতও করে না। ঠাকুর তখন লােকের দ্বারে দ্বারে খরিদদার যুটাবার জন্য যেতে আরম্ভ করলেন। কোথা কে সাধু শুদ্ধাত্মা আছেন; কোথা কে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত আছেন, এই খুঁজে খুঁজে তাদের আশ্রমে গিয়া দেখা করেন। কেও ঠাকুরকে ঠাকুরের মত আদর দেন না। ক্ষুধা পেয়েছে, কারও কাছে কিছু খেতে চাচ্ছেন—সে দিবে না- ঠাকুর নাছােড়বান্দা। রামকৃষ্ণজীর অতি কোমল অঙ্গ, সত্য সতাই যেমন নবনীতে গাহু। মাটীতে পা ফেলে চলে গেলে, পদে পদে পা কেটে রক্তাক্ত হবার আশঙ্কা। একবার ফুস্কা লুচিল শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণমহিমা। থারে আঙ্গুল কেটে গিছলল—এই ধ’রে বুঝ’ কি কোমল শরীর। দশ বিঘা চলে যেতে হলে গাড়ির দরকার ; এই গাড়ি ভাড়ায় জন্য লােকের মুখাপেক্ষী হতে হােততা। এইখানে একটা কথা প্রণিধান কর। যে ঠাকুর ত্যাগীর শিয়ােমণি—যার তাগ কায়বাক্যমনে একতানে বাঁধা, কামিনী কাঞ্চন-স্পর্শে যার অঙ্গ-বিকার হতে, যিনি পার্থিব কোন বস্তুর প্রার্থী নন, সুতরাং যার কোন বস্তুরই অভাব ছিল না, যার মা- কালীগত প্রাণ, যার সর্বদা মা-কালীর সঙ্গে কথা হ’তত ; যিনি মনে করলেই তৎক্ষণাৎ তায় তন্ময় হ’তেন, তার লােকের দুয়ারে দুয়ারে দীন ভিখারীর মত সশঙ্কিতে যাবার প্রয়ােজন কি ? এর কারণ যদি জানতে চাও, তাহলে আকাশ পানে ঐ মেঘগুলিকে চেয়ে দেখ’। এই বর্ষা কাল, মেঘগুলিকে ডাকতে হয় না, আপনি ব্যাকুল হয়ে চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। কেন জান’-জল দিয়ে উত্তপ্ত ধরণীকে তাপ থেকে রক্ষা করবার জন্য—সুদু ধরণীকে শীতল করা নয়, আবার তাকে শস্যশালিনী করবার জন্য। ঠাকুর রামকৃষ্ণ- জীরও এই মেঘের দশা-অপার করুণাসিন্ধু দয়াবতার-মেঘ যেমন জলভারে চঞ্চল, ঠাকুরও তেমনি করুণার ভরে চঞ্চল। ব্যাকুল প্রাণে দিগ্বিদিগ জ্ঞানশূন্য হয়ে দুয়ারে দুয়ারে এখানে সেখানে ঘুরছেন—একমাত্র উদ্দেশ্য ঈশ্বরতরূপ শীতল শান্তিদানে ত্রিতাপ সন্তাপ থেকে জীবকুলকে রক্ষা করবার জন্যে। তাঁর দয়ার ইয়ত্তা নাই ; দয়ার তিলের তিল অনুভব করবার মানুষের শক্তি নাই। ঠাকুরের দয়ার কথা শুন’-তার দেহখানি যেমন দয়ার্ড, তেমনি কষ্ট-সহিষ্ণু। দয়া ও কষ্টসহিষ্ণুতার বিষয় যদি দেখতে চাও, তা ফলে এই সৰ্ব্বসহা মাটা পানে তাকিয়ে দেখু’-কঠোর লােহার শ্রীরামকৃষ্ণু-মহিমা। ১৫+: কোদালে, লাঙ্গলে নানা উপায়ে খুঁজছে, কাটছে,-সে যেমন এক বারও রুষ্ট হয় না, কিছু বলে না-বরং তার বদলে মামা দ্রব্য দিয়ে লােকের পরমােপকার করে ; ঠাকুরও তদ্রুপ, কত লােকে কত কটুকাটব্য বলছে, কত লােকে কত রকমে অঙ্গের উপর অত্যাচার করেছে, কত শত অসদ্ব্যবহার করেছে, তিনি কিন্তু তাদের মঙ্গল-বিধানে ও সাধনে সর্বদাই তৎপর ও ব্যাকুল। তার দেহটি মেন, তার কথাতো তােমাকে বলেছি, তার উপরে অতি সামান্য অনিয়ম কি অত্যাচার, হলেই তিনি সহজেই অসুস্থ হােন। একবার ভারি পেটের পীড়া-অন্ন ত্যাগ করুত হলো, দিনের মধ্যে একবার মাত্র অতি অল্প জলসাগু ; এমন অবস্থাতেও তার এখানে ওখানে যাবার বিরাম নাই। তার কাছে একটি মহা-তাপসী থাকতেন; তিনি হজরা নামে পরিচিত। হাজরা একদিন ঠাকুরকে বুঝালেন - তুমি সিদ্ধ পুরুষ, মুক্ত পুরুষ, সমাধিপর ;-তায় তন্ময় হয়ে থাক না কেন ? পীড়িত শরীর--- এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ার দরকার কি ? ঠাকুর বাল কের মত, যে যা বলে, তাই কখনি বিশ্বাস করেন ; হজরার কথা শুনে, মনে কগেন, তাই-ত বটে, আমার ছুটাছুটি কবার আবশ্যক কি !। এই ভাবতে ভাবতে পঞ্চবটীতে গিয়া হাজির। সেখানে গিয়াই একবারে কেঁদে অস্থির এবং দ্রুত- পদে তখনি ফিরে এসে হাজরাকে বল্লেন—ওরে শালা, আমি তােমার কথা শুনবাে নাই, জল খেয়েও দুয়ারে দুয়ারে গিয়া পরের উপকার করূবো। এখন বুব’ দেখি, ঠাকুরের দয়ার অসার পসার কতখানি। এ এয়ার ভাব কি মানুষের মাথায় আসে? মানুষমাত্রেই ঘাের স্বার্থপর, বিনা স্বার্থে অতি

১৫
ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
সামান্য কাজও করে না ; সুতরাং স্বার্থপর হৃদয়ে দখ। পাকা
দূরে যাক্, দয়ার মহিমা কি তার আভাস পর্যন্ত প্রবেশ
করতে পারে না।
এই কাল গুরু-হারা কাল
;
এ কালে ভগবানের বিষয়
চিন্তা করা দূরে যাক, তিনি যে আছেন, এ বিশ্বাসই মানুষের
ঘটে নাই। কোটির মধ্যে দু এক জনের, যাদের এ বিশ্বাস
আছে, তিনি পাকা বুঝে রেখেছেন যে, জীবের ভগবান্-লাভের
কোন উপায় নাই। তবে পুরাণাদিতে কি প্রাচীন সাধুভক্তের
মধ্যে যে ভগবান্‌-লাভের কাহিনী শুনতে পাওয়া যায়, সে
কোন্ কালের কথা। কখন কার কি হয়ে গেছে, সে ধর্তব্য
নয়। এখন আর সে দিন নাই। এবংবিধ কোটি কোটি
মানুষের মধ্যে দু এক জন যারা অপেক্ষাকৃত উন্নত, তারা
জোর কর্মকাণ্ডে পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। এই ত কালের গতিক
এমন সময় ঠাকুরের অবতারণা। অবতীর্ণ আবার কেমন
ভাবে? একবারে বাহৈশ্বৰ্যবিহীন—লােকে যে ধরবে, তার
কোন কিছুই নাই। অতি সরল, অতি সােজা, অতি দীন-বেশ।
যিনি জ্ঞানীর ব্রহ্ম, যোগীর আত্মা, ভক্তের ভগবান্ , যিনি সৃষ্টি-
প্রসবিনী আদ্যাশক্তি মহাদেবীর স্বামী; যিনি জীব জগতের
জন, পালন ও নিধন কার্যের একমাত্র দেবতা ;-সেই তিনি
ঙ্গে এই দীন-দ্বিজ-নিরক্ষর-বেশে কাঙ্গালের মত মানুষের দুয়ারে
সুয়ারে ভ্রাম্যমান, এ ব্যাপার জীবের মাথায় ঢুকে কি করে?
ভগবান যখন লীলার বেশে অবতাৰ হ’য়ে লীলাক্ষেত্রে অবতীর্ণ
হন, তখন তাকে চেনা বড়ই মুস্কিল-বড়ই শক্ত।-এখন বুঝলে ,
ব্যক্ত হয়ে গুপ্ত আর সােজা হয়ে যাক। কাকে বলে?

ঐশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। থাকে ; সর্বশক্তিমান্ ভগবামের যাবতীয় অবস্থা অপেক্ষা দেহধারণে লীলাক্ষেত্রে অবতারণা-ব্যাপার অতি দুবোধ্য ও বিস্ময়কর। জ্ঞানী ও যােগীর চক্ষে ভগবান্ তেজোময়, ভক্তের চক্ষে র- চায়। এই কারণে জ্ঞানী ও যােগীর রুচি অপেক্ষা ভক্তের কাছ সহস্রগুণে প্রশংসনীয় ও বাঞ্ছনীয়। জ্ঞানী ও যোগীর রুচি এক- ধেয়ে অর্থাৎ ভগবাকে এক রকমেই সম্ভোগ করেন, ভক্তে কিন্তু নানা ভাবে ও রসে সম্ভোগ করেন। এই বিষয়টি ঠাকুব রামকৃষ্ণজী সানাই বাজনার উপমা দিয়ে বুঝিয়েছেন। যারা সানাই বাজায়, তাদের মধ্যে দুজনের হাতে সানাই একজন খালি পে ধরে সুরটা দিয়ে যায়, আর অপর ব্যক্তি বিবিধ রাগ-রাগিণী বাজায়। এখানেও তাই জ্ঞানীও যােগর একভাবে আস্বাদ, ভক্তের ঋলে, ঝোলে, হলে ও ভাজায় রসময়কে আস্বাদ করেন। এমন মনে করো না যে, ভগবান্ কেবলমাত্র তঁার সাকার রূপটিই ভক্তকে দেখা, আর কিছু দেখা না—তা নয়—তিনি নিজেই যে জীব-জগৎ- ৰূপে পরিণ ৩, তিনি নিজেই যে পঞ্চভূদি চতুর্বিংশতত্ব ; তিনি নিজেই যে জীব-জগতে আত্মারূপে বিরাজিত-এগুলিও দেখান, আবার তার, যে একটি নিরাকার ভাব আছে, তার জানিয়ে দেন। জ্ঞানী ও বােগী =া ভক্তের ভাবের সন্ধানও পান না। ভক্তে ভগবানের যাবতীয় অবস্থা পরজ্ঞাত হয়েন, তৎসম্বন্ধে ঠাকুর রামকৃষ্ণজী হনুমানের প্রতি রামচন্দ্রের একটা প্রশ্নের কথা উল্লেখ কোরে বুঝিয়েছেন ; সেটি এই-রামচন্দ্র একদিন তনুকে জিজ্ঞাসা করুলেন, “হে হ! তুমি আমাকে কি রকম দেখে ?” তায় হনু বল্লেন-“হে রা, আমি তােমাকে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। কখন দেখি, তুমি প্রভু, আমি দাস ; কখন দেখি, তুমি বৃহ- দাগি, আমি তার একটা ফিনকি, আবার কখন দেখি, তােমায় আমায় ভিন্ন ভেদ নাই।' ইনুকে রামচন্দ্র তার সকল ভাবই দেখালেন। হনু কিন্তু অন্যভাব দুটিতে লক্ষ্য না রেখে, সেব্য সেবক ভক্তিভাবেই রৈলেন। ভক্তিভাবের মধুর আস্বাদন একবার জানলে কি পেলে, কেউ আর অপর কিসেও যেতে কি থাকতে চান না। দেবর্ষি নারদেরও এই ভাব। জ্ঞানী ও যােগীর তুলনায় ভক্তদের কোটি গুণে কষ্ট আছে, কিন্তু এমনি ভক্তের জাতি, ভক্তির চাটের লােভে, জেনে শুনেও যাবতীয় কষ্টকে গায়ের তালঙ্কার করে রাখে। উদ্ধৰ বৃন্দাবনে গােপীনী- দিগকে যােগতত্ত্ব বল্লেন, কিন্তু কেউ সে কথা কানেও নিলে না। কৃষ্ণবিরহে গায়ের চামড়া পুড়ে গেল, সোনার কান্তি অঙ্গারবৎ হলো, কেঁদে কেঁদে অন্ধ হ’লল, তবু কেউ একবার চোখ, মুলে না। মিছরির রস খেলে যেমন বােলা গুড়ে মোটেই মন হয় না, তেমনি চোখ চেয়ে যে একবার ভগ- বানকে সম্ভোগ করেছে, সে মরে গেলে ও আর চোখ মুদে দেখতে চায় না। ভাই বলিহারি ব্রজের ভাব-যােগানন্দ, ব্রহ্মানন্দ তার কাছে কিসেও লাগে না। হায়রে তপস্বী মহাঋষি মুনিগণ। ত্রিভুবন সর্বজন-আরাধ্য চরণ। আজীবন অনশন তরুতলে বাস। অবিরত নানা ব্রত কঠোর সন্ন্যাস। প্রয়াস কেবলমাত্র তুচ্ছ ধন হেতু। ত্রিতাপ সন্তাপ শুয়ে হয়ে অতি ভীতু। ১ শীরামকৃষ্ণ মহিমা। বাধা। যােগানন্দ ব্রহ্মানন্দ সুখ দুঃখ পার। দেখিতে হলো না সাধ ব্ৰজের ব্যাপার। যােঘানন্দ ব্রহ্মানন্দ কি আনন্দ ধরে। যে আনন্দ গােপিনীর এক বিন্দু নীরে। ( শ্রীরামকৃষ্ণপুথি।) দেহধারী ভগবানকে চেনা বড় শক্ত। তিনি যে ভাবে বা যে রূপেই আসুন না কেন, তিনি চিনবার শক্তি না দিলে, কেউ চিনতে পারেন না। এক চৈতন্য দ্বারায় তাকে ধরা যায়। আমি দিবালোকে বস্তু-দর্শনের ন্যায় স্পষ্ট দেখ,' ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর দেহখানি কেবলমাত্র চৈতন্যের জটি যেমন খুব ঠাণ্ডা পেয়ে জমাট বেঁধে বরব আকারে পরিণত হয়, তেমনি ঠিক :ৈ ভক্তির হিল্লোল, যোগে প্রভুদেবের শ্রীদেহখানি হয়েছে। এই দেহধারী চৈতন্য- ময়কে ধবার জন্য, তার প্রদত্ত চৈতন্যই একমাত্র উপায়। চৈতন্যের সহাৱেই চৈতন্যময় গােচর হন। ভক্তিতে ও চৈতন্য আমি বড় তফাৎ দেখছি না; যে ভক্তি সেই চৈতন্য, যে চতন্য, সেই ভক্তি। মানুষের মন-বুদ্ধি যত দিন মলিনা- বস্থায় থাকে, তত দিন তারা স্বতন্ত্র প্রকৃতিযুক্ত থাকে, কাগই মন-দ্ধি এই উভয় নামে অভিহিত হয়, কিন্তু ভগবানের কৃপায় তারা নিৰ্ম্মল অবস্থা প্রাপ্ত হবা মাত্র, সেই দুটি জিসি মিলে একটী হয়। এই মিলন অবস্থায় তাদের পূর্ব-প্রকৃত বা নাম কিছুই থাকে না, তখন তাদের নাম চৈতন্য। যে, ষে প্রকৃতির বা জাতির বস্তু, সে সেই প্রকৃতি বা আহিব বস্তু চিতে পারে ও তাকে রূতে পারে। সুতরাং চৈত।”

ঐশ্রীরামকৃষ্ণু-মহিমা। ৫ চৈতন্যসহায়ে চৈতন্যময়কে ধরে, আর অচৈতন্যবানেরা অবিদ্যার বাজারের বস্তু চিনে ও তাদিগে ধরে। জীবের হৃদয়ে চৈতন্য দিয়ে আপন স্বেচ্ছায় চৈতন্যময় ধরা দেন। প্রভুদেবের প্রেমিক ভক্ত দেবেন্দ্র বাবু একবার তাঁর স্বরূপ দেখে আনন্দোৎফুল্ল অস্থির হন; ঠাকুর তৎক্ষণাৎ সেটি জানতে পেরে, তার দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে একটি গীত গাহিতে থাকেন। গীত এই- ওরে কুশিলব, কি কর গৌরব, ধরা না দিলে কি পার ধর্তে। দেহধারী লীলাক্ষেত্রে যতই সামান্য বেশে থাকুন না কেন, চৈতন্যবানে ঠিক তার স্ব-স্বরূপ দেখতে পান। চৈতন্যের সহায়ে রামকৃষ্ণভক্তেরা তাঁদের সেই দীনবেশধারী ঠাকুরকে দীননাথরূপে দেখছেন; তঁার নিরক্ষরবেশে তাকে সর্বজ্ঞরূপে দেখছেন; তার নিরশ্বৈর্যের মধ্যে তাকে ষড়ৈশ্বর্যবান্ দেখ- ছেন ও সসীম আকারের মধ্যেই তঁাকে অসীম দেখছেন। রামকৃষ্ণজীর পাদপদ্মে সরল বিশ্বাস রেখে চলে চল, সত্বর পূর্ণমনােরথ হবে। অবতাররূপী ঈশ্বরের রূপান্তর দেখে, কি তার কোন অমানুষী-শক্তির পরিচয় নিয়ে, তঁায় বিশ্বাস কর, বার কল্পনা আর তায় ঘাের অবিশ্বাস করা, একই কথা। কথাটা খুলে বলি শুন’-তুমি বলবে, যদি রামকৃষ্ণজী তার ঐরূপে আমাকে কালী, কি কৃষ্ণ, কি রামরূপ দেখা, তা হলে আমি তাকে ভগবান্ ব'লে মাতে পারি—এরূপ ধারণা- হলে বুঝে নিও, এ আর কিছুই নয়, কেবল ঘাের অবিশ্বাস মাত্র। বার একরূপে বিশ্বাস না হয়, তার কোনৰূপেই বিশ্বাস হবে না। মানুষের বুদ্ধির তারিপ দেখ’-অকুল মাগর-পায়ে যেতে একখানি কাঠের তক্তার উপর বিশ্বাস শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। পার; করছে; এই ভয়ঙ্কর সংসারে মুক্তিমতী অবিদ্যার হাতে মন- প্রাণ দিতে বিশ্বাস করূছে, কিন্তু রামকৃষ্ণ-পাদপদ্মে বিশ্বাসের সময় মানুষের যত আশঙ্কা, যত সন্দেহ, যত তর্ক ও যত বিচার। মানুষ যত বাহাদুর, মানুষের যতটা দোউড়, তা আমি বিশেষ জেনে শুনে একটা আক্কেল পেয়েছি, এবং সেই আকেলমত বলছি-ভাই চিবিয়ে খেও না--গিলে খাও। চিবিয়ে খাওয়া কাকে বলে জান’-তর্ক-যুক্তি বিচার-সহায়ে বিশ্বাস করার চেষ্টার নাম চিবিয়ে খাওয়া। তুমি যাদের উপর ভরসা রেখে যেতে মনে করছে, তাদের ততদূর যাবার গায়ে বল নাই। ভগবান্ তর্ক, যুক্তি ও বিচাবের তিনি ইন্দ্রিয়াতীত, মনাতীত। তােমার একমাত্র পূজি তােমার মন- থানা-সে মনের কি সাধ্য যে, তার কাছে যাবে ; তার কাছে যেতে হলে মনখানা পথে পড়ে থাকবে -এমত স্থলে বিচার, তর্ক, যুক্তি নিয়ে কি কাজ হবে ? তার পক্ষে সহজ সরল উপায় গিলে খাওয়া অর্থাৎ “তুমি যা কর ঠাকুর” এই বলে সরল প্রাণে তার শরণাপন্ন হওয়া। তাকে না পাও, তার নামের আশ্রয় গ্রহণ কর। মসুদ্ধি যতদিন গায়ে ময়লা মেখে ভুত হয়ে বসে থাকে, ততদিন হাঁক, ডাক, জারিজুরি তর্জন-গর্জন কতে দেখতে পাওয়া যায়; আর যখন ময়লাটা কেটে যায়, তখন তাদের অবস্থা ঠিক নিমকপেকো প্রভুপরায়ণ কুকুরের মত। মানুষকে ভুতে পাওয়ার কথা শুনেছ’ত? ভুতে পেলে ও 'ভু ছাড়লে যেমন অবস্থা, সমল অবস্থায় ও বিনা অবস্থায়, মনবুদ্ধির অব স্থা কদ্রুপ।

শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা মনখানাতে যে ভুটী পেয়ে রয়েছে সেই ভুতকে ছাড়তে হলে অর্থাৎ সমল মনকে বিমল করতে হলে, ভগবানের নামের শরণ লওয়া একটি সহজ উপায়। অবিরত সরল- প্রাণে ভগবানের নাম কবুত করতে সমল মন বিমল হয়। ঠাকুর রামকৃষ্ণজী বার বার বলেছেন, নামের অপার মহিমা। নামই বীজ, নামই গাছ, নামই ফল। নামের ভিতরেই ভগবান্ নিজে আছেন। কথায় বলে মানুষ সহজে নেয় না, তাই রামকৃষ্ণজী জীবশিক্ষার জন্য নিজে প্রাতঃসন্ধ্যা করতালি দিয়ে তালে তালে নাচতে নাচতে ভগবানের নাম নিতেন। নামে উন্মত্ত হয়ে যেতেন। তার পর নামােন্মত্ততা গভীর সমাধিতে পরিণত হতো। এতে ঠাকুর জীবকে দেখাচ্ছেন ও বলছেন, যে সমাধি জন্ম জন্ম বিবিধ কঠোর সাধনার ফল, সেই সমাধি নামের বলেও পাওয়া যায়। এ বিষয়টি অর্থাৎ নামের বলে সমাধিপর হওয়া কেমন, তা তিনি একটি বিশেষ উপমা দিয়ে বুঝাতেন—যথা—এক সাধু বৈষ্ণব প্রথমে এই বলে সংকীর্তন আরম্ভ করলেন, “গোটর আমার মাতা হাতি।” ক্রমাগত *গােউর আমার মাতা হাতি” বল্‌তে এতে যখন ভাবে!দ্বেপ হলো, তখন “গােউর” কথাটি ছেড়ে দিয়ে, বলতে থাকেন- “আমার মাতা হাতি” পরে যখন সেই ভাব অপেক্ষাকৃত উর্জ উঠলো, তখন “মাতা হাতি” বই আর বেরােয় না ; পরে যখন ভাব আরও প্রবল হলো, তখন সাধুর মুখে কেবল “হাতি হ”ি ; পরে অতুচ অবস্থায় খালি “হ” বলেই বাহ- শূন্য ও নীরব অর্থাৎ সমাধিপর। নামের শরণাপন্ন হওয়া, নাম শবন, নাম কীৰ্তন করা, ঠাকুর র মকৃষ্ণ মীর মতে, একেই

শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা।
নারদীয় উক্তি বলে। কলিকালে ভগবান-লাতে এই নারীর
ভক্তিই প্রশস্ত। রামকৃষ্ণজীর ভাবটি কেমন,ভিতরে গভীর
পূর্ণ ষােলআনা জ্ঞান, কিন্তু কাল পাত্র দেখে জীবশিক্ষার
জন্য সর্বদা ভক্তির চাদরখানি গায়ে দিয়ে থাকতেন। হাতিয়
যেমন দু রকমের দাত; যে পাতে খাদ্য-দ্রব্য চিবিয়ে খায়, সে
দাত ভিতবে লুকান থাকে, আর বাহিরে দেখার জন্য অন্য
দাত, সেই রকম ঠাকুরের ভিতরে জ্ঞান আর উপরে লােক
শিক্ষাৎ জন্য ভক্তিভাব। নামাহাত্মে ঠাকুর যে গীতগুলি গাইতেন
বলি শুন’-
(১) নামের ভরসা কালী কবি গো তােমার।
কাজ কি আমার কোশাণী তের হাসি লােকাচার।
নামেতে কাল-ফাস কাটে, জেটে তা দিয়েছে বটে;
আমি ত সেই জটের মুটে, হরেছি আর হব কার।
নামেতে যা হব হব, মিছে কেন মরি ভেবে,
একান্ত করেছি শিবে, শিবের বচন সার।
(২) আমি দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি।
আখেরে এ দীনে, না তারাে কেমনে, দেখা যাবে-গে। শঙ্করী।
যদি নাশি গো-ব্রাহ্মণ, হত্যা করি প্রাণ,
সুরাপান আদি বিনাশি নাবী,
আমি এ সব পাহক, না ভাবি তিলেক, ব্ৰহ্মপদ নিতে পারি।
ঠাকুব এই গান গাইতে গাইতে বিভাের হতেন; সেই শিখো-
রত্ব অবস্থা বিন দেখেছেন, তিনিই বুঝেছেন যে, নামের
মহিমা কি।

রামকৃষ্ণ-মহিমা। ৫ চৈতন্যলীলায় গিরিশ বাবুর বিরচিত নাম-মাহাত্মের গীত জামরাই ত খাও~ এমন মধুর হরির নাম হরি বলনা। সাধের পণে কিনবি হরি সাধ কেন তোর হলো না। পাপী তাপী নাহিক রে বিচার; হরি বােল্লে রে একবার, করুণার তুলনা নাহি তার, নামে হও মাতােয়ারা মিছা কাজে ভুল না। ভাই—বিচা, তর্কে কিছু দরকার নাই; ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর প্রদর্শিত পথে খালি নাম সম্বল করে চল’-দেখবে, সময়ে ঠিক জায়গায় পৌছে গেছে। তােমাকে গীতাও পড়তে হবে না, বেদান্ত, সাংখ্য দর্শনও দেখতে হবে না, পঞ্চপাও করতে হবে না, তীর্থে তীর্থে চারি ধামেও ঘুরতে হবে না, ধ্যান-জপ ও ফরূতে হবে না, সন্ন্যাসও নিতে হবে না, স্ত্রী-পুত্র ও ছাড়তে হবে না, ঘর-দুয়ার দেশ ত্যাগ করতে হবে না, কোন কঠোরতাই নিতে হবে না ; দয়াব নিধি, ভবপারের কাণ্ডাৰী রামকৃষ্ণজীকে ধরে বসে থাক’, অতি সত্বর কাজ গেছে যাবে। দয়াল রামকৃষ্ণ গী নিজে বহুকাল কঠোর কঠোর সাধন-ভজনে সিদ্ধিলাভ করে, তার ভজনবিহীন বল-বিহীন, সম্বলবিন, অনাশ্রয়, দীন, শরণাপন্নদিগের জন্য সমস্ত সাধনা ঞ্জিত ফল গুলি সঞ্চয় করে বেখেছেন। পিতার বহু শ্ৰমার্জিত সম্প ও যেমন অকস্মৃণ্য অলস ছেলেরও ভোগ্য, তেমনি রাম- ঈজীর শরণাপন্নদের মধ্যে যিনি যতই নিকৃষ্ট হন না কেন, তিনিও তাঁর সম্পত্তির অধিকারী। রামকৃষ্ণজীকে আপনার চে3েও অপূনার মনে করে, দুনিয়ার মজা লুঠো, কোন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিম। চিন্তা নাই ; সময়ে দেখতে পাবে, ঠাকুর ঠিক প্রিয় পাবে নিয়ে গেছেন। সাবধান-মাঝিকে ছেড়ে না-আর যা ইচ্ছা তাই কর। পিপে পিপে মদ খাও, কোন ক্ষতি হবে না, কিন্তু অগ্রভাগ ঠাকুরকে দিয়ে খেও; যেখানে ইচ্ছ। সেখানে যেও, কিন্তু মাঝিকে সঙ্গে নিয়ে যেও। ঠাকুর রামকৃষ্ণজী এমন দয়াল, যে একবার তাঁর শরণাপন্ন হয়, সে যেখানে ভঁকে নিয়ে যায় শ্মশানই হউক আর মশানই হউক, তিনি পরম পিরীতে সঙ্গে যান ও সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন—সাবধান-বার বার সাবধান--রামকৃষ্ণজীকে ছেড়ে না। যদি বল আমি—মলিনাত্ম, মলিন-মন কর্তৃক পরিচালিত, কাম-ক্রোধাদির অধীন এবং তজ্জনিত কত পাপকর্ম করেছি, আমার আর উপায় কি আছে ? তা হলে তুমি এখনও রামকৃষ্ণজীকে দেখতে পাও নাই ; তাঁর দয়ার অসার পস- রের কিছুই জানতে পার নাই ; রামকৃষ্ণলীলার আভাসও পাও নাই। ভগবানের ভাণ্ডারে দয়া নামে য়ে একটি অপূর্ব জিনিৰ আছে ; সেই দয়াতে রামকৃষ্ণজীর দেহখানি গঠিত। দয়াময় ঠাকুরের শ্রীঅঙ্গ কেবলমাত্র দয়া বই অন্য উপাদান নাই। সেই দয়ার বলে ও গুণে স্বয়ং সৃষ্টীশ্বর, রামকৃষ্ণরূপ- ধারী—সে কেন জান? তােমার আমার মতন ঘণ্য, অস্প- লীয়, হীনবুদ্ধি জীবের উদ্ধারের জন্য। রামকৃষ্ণজীর রূপ, পতিত-পাবনরূপ, কাঙ্গাম-শরণ-রূপ, দীনবন্ধ, রূপ। যে রূপের এই গুণ ও এই মাধুরী, সেই রূপের কাছে, তুমি আবার মলিনাত্মা, মলিন-মন, রিপুর অধীন—এই ভেবে সিন্ধুপারে নিজেকে উপারবিহীন মনে কোৰে হতাশ হচ্ছে ! হায় রে ;

শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা। বুদ্ধি! দেখ’-প্লস যেমন চোরকে, তার সাৰ্য্যকারীদের স'ইত মায় বামালে গ্রেপতার করে, দয়ানিধি রামকৃষ্ণজীও বড়রিপুপরিবেষ্টিত ইন্দ্রিয়াধিরাজ মনকে তােমার যাবজয় কৃত অপকৰ্ম্মের সহিত পাক ৬াও কোরে নিয়ে যাবেন। পুলিশের বিচারালয়ে যেমন অপরাধীয় কারাবাস-শাস্তির বিধি, দয়াল রামকৃষ্ণজীর বিচাৱালয়ে ভবকারাবাস-মুক্তির বিধি-বেকসুর খালাস। পুলিস ন্যায়বা, প্রভুদেব দয়াল। প্রভুদেবের মধ্যে জয়ার উত্তাল-তরঙ্গ এত প্রবল যে, সেখানে অগণ্য অচ্চ- শৃঙ্গবিশিষ্ট কোট গেটি হিমাচল সদৃশ গুৰু কলেবর ন্যায় উপনীত হবামাত্র, তাকে যে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তার নাম-গন্ধ-মাত্র পাওয়া যায় না। রামকৃষ্ণনামের শরণা হোলে তিনি তাকে অচিরে কাছে নিয়ে যেতে নিজের আইনে ৰজ আছেন। এজলাসে একবার দয়ামর মূর্তি দর্শন করুণামাত্র, সে থালা, তার মন খালাস ও গত কৰ্ম্মফল মাত্ৰে সৰ মমূলে বিনষ্ট হয়। এখন নামের মহিমায় প্রভুর মহিমা বুঝলে ত? খুব সাবধান-দয়ানিধি রামকৃষ্ণ নামটি ছেড়ো না। এখন সেই পূর্বের কথা—বিচার-বুদ্ধি দ্বারা ভগবানের সাকারবাদের প্রতিবাদ করা, ঠাকুর রামকৃষ্ণজীর মতে ঘােৰ গানের কাজ। সকল ভারে, সকল মতে সাধনা দ্বারা ভগবানকে নানাভাবে নানারূপে প্রত্যক্ষ কবে, ভগবান্ রাম- কৃষ্ণজী যাবতীয় বিবাদমান ধৰ্ম্মপন্থীদিগের মীমাংসার উদ্দেশে এই বলছেন-হােমরা যে, বা বােছ সব সত্য ; আপনার বে, আপনার পথে সরল-প্রাণে চলে যাও, অবশ্যই ঈশ্ব রকে এক সময়ে লাভ করবে। এই সুবিশাল, সার্বভৌমিক, ; শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা উদার ভাব, একমাত্র রামকৃষ্ণজীর মধ্যেই বিকাশ। এখন তাঁর চরণাশ্রিত ভক্তগণের মধ্যেও এই ভাব পরিলক্ষিত হয়। যেখানে তাঁর কৃপা, সেখানে কোন ধর্মের বা মতের প্রতি বিদ্বেষভাব স্থান পায় না। রামকৃষ্ণপন্থীরা ভগবানের যাবতীয় ভাব, রূপ অতি শ্রদ্ধার সহিত শিরােধার্য করেন। কোন পন্থীর সঙ্গে তাদের সম্পূর্ণ মেল না হােতে পারে, কিন্তু তাদের কোন ধৰ্ম্মের বা মতের প্রতি বিদ্বেষভাব মােটেই নাই; এটা জাজ্জল্য- মান দেখতে পাওয়া যায়, এবং ইহাই রামকৃষ্ণভক্তের এক বিশেষ লক্ষণ। সন্তান-সন্ততিরা যেমন মা-বাপের স্বভাব স্বভাবতই আপনা হােতেই পেয়ে থাকে, রামকৃষ্ণ-ভক্তেরাও তদ্রুপ এই উদার ভাবটী তাদের ঠাকুরের নিকট পেয়েছেন। ঠাকুর রাম- কৃষ্ণজীর ভাবের কথা বারম্বার বলেছি। তার মধ্যে এই জগৎ- গ্রাহ, জগৎ-প্রশংসিত,সাৰ্বভৌমিক বিশালভাবের বিকাশ থাকা হেতু,তিনিই একমাত্র জগদ্গুরু নামের বাচ্য, এবং যাবতীয় পথে বা মতে তিনিই একমাত্র অধিষ্ঠাত্রী দেবতা, উহাই তার পরি- চায়ক। লােক-প্রকাশক সুৰ্য-কিরণে প্রকাশমান যাবতীয় বর্ণের ন্যায়, যাবতীয় নিগুঢ় ঐশীতপ্রকাশক রামকৃষ্ণলীলায় সকল ধৰ্ম্মের, মতের বা পথের সরল জলন্ত মূর্তিমান্ লক্ষণ সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই অমানুষী সৰ্বসম্মত ধর্মতত্ত্বের স্ফুরণ, এক ভগবান ভিন্ন অন্য কোথাও প্রকাশের স্থান নহে। যাবতীয় মতে কঠোর কঠোর সাধনা দ্বারা ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করতঃ ধৰ্মমাত্রেই যে, সৰ সত্য এটি প্রতিপাদন করা, এক ভগবান্ ভিন্ন আর কাহার ও শক্তিতে নাই। কামিনী-কাঞ্চন-গত-প্রাণ, মায়ামুখ, ঘাের-তমসাচ্ছন্ন, একান্ত ইন্দ্রিয়সেৰী ও জড়ভাবাপন্ন জীবকে ;

১৭ শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। চৈতন্যের মুরলী-বাদন দ্বারা জাগরিত করা,এক ভগবান্ ভিন্ন অন্য কাহারও আয়ত্তে নাই। অনধীত-শাস্ত্র নিরক্ষরবেশে যাবতীয় শাস্ত্রের নিগুঢ় তত্ত্ব সরল কথায়, সরল উপমাসহকারে বাখ্যা করতঃ জগতের যাবতীয় শাস্ত্রাধ্যায়ী সুধীমণ্ডলীকে মুগ্ধ ও নীরব করা এক ভগবান্ ভিন্ন এ শক্তির বিকাশ অন্যত্রে সম্ভবপর কখনই হােতে পারে না। যে আ ধারে ভগবৎ-শক্তির বিকাশ, সে, যে আধারই হউক না কেন, সেই আধারধারীকেই ভগবান বলতে হবে। যেখানে কৃষ্ণের ভাবের স্ফুর্তি, সেই আধার দর্শনে কৃষ্ণ- দর্শন ভক্তমাত্রেই বিশ্বাস করেন। কেহ কেহ যােগপথালী বলেন, মানুষমাত্রেই সাধনা দ্বারা কৃষ্ণ হতে পারে; কিন্তু এ কথা বিশ্বাসযােগ্য নয়, কেন না, ঠাকুর রামকৃষ্ণজী এ কথায় সায় দেন না। ভগবানের কৃপায় মানুষ কত দূর উচ্চপদ পান, তার সম্বন্ধে ঠাকুর বলেছেন, যথা—একজন ভক্ত ভগবানের সেবা করে। একদিন ভগবান্ নিজের বিছানায় শুয়ে আছেন,ভক্ত পদসেবা করছেন- এমন সময়ে তার ঘুম এসে গেছে ; ভগবান্ ভক্তকে বল্লেন-“তাের ঘুম পেয়েছে, তা আচ্ছা, আমার এই বিছানার একপাশে শুয়ে ঘুমাে।” ভক্ত প্রভুর আজ্ঞায় তার বিছানায় ঘুমুতে লাগলো। এতে বেশ বুঝা যাচ্ছে, জীব কখনই ভগবান্ হতে পারে না। অজ্ঞানের জোরে কেহ মামুন্ বা নাই মানু—বা কেহ বলুন বা নাই বলুন; কিন্তু যে আধারে ভগবৎ-শক্তির বিকাশ, সেই আধারধারীকেই ভগবান্ বলে মাতে হবে। তা না হলে বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, গীতা সব মিথ্যা হয়। পুরাণাদি গ্রন্থ, ভগ- বানের যে সকল লক্ষণ আরোপ করেন, রামকৃষ্ণজীতে সে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। ১১ সমস্তই রয়েছে। মহামায়ার এমনই খেলা, তিনি দেহধারী ভগ- বাকে জানিয়ে দিয়াও জানতে দেন নাই। এ কথাটি কেমন, তা আমি তোমাকে একবার বলেছি আবার খুলে বলি শুন’ প্রভুদেবের সাধন-ভজন-লীলায় একটী স্ত্রীলোক তার কাছে এসে জুটলেন ; তিনি যেমন বিদ্যাবতী, তেমনি ভক্তিমতী। শাস্ত্রীয় বিচারে কোন পণ্ডিত তাঁকে পরাজয় করতে পারেন নাই। তিনি প্রভুর লীলায় ব্রাহ্মণী নামে বিদিত। মথুরবাবু লে সময়ের যাবতীয় পণ্ডিতমণ্ডলীকে নিমন্ত্রণ দ্বারা আহ্বান করে ব্রাহ্মণীর সঙ্গে শান্ত্রিক বিচার করান, কিন্তু ব্রাহ্মণীকে কেহ পরাস্ত করতে পারেন না। ব্রাহ্মণী নিজের বিদ্যা ও ভক্তির সহায়ে রামকৃষ্ণ- জীকে ভগবান্ বলে ঠাওরালেন, আর সেই শুভ তত্ত্ব পণ্ডিত- মণ্ডলীর মধ্যে জ্ঞাপন করলেন। পণ্ডিতেরা বিশ্বাস না করায়, দেহধারী ঈশ্বরাবরের যে সব লক্ষণ পুরাণ গ্রন্থাদিতে লেখা আছে, সেই সব লক্ষণগুলিই রামকৃষ্ণজীর মধ্যে রয়েছে, এ ব্যাপারটী পণ্ডিতদিগে ব্রাহ্মণী স্পষ্ট দেখিয়ে দিলেন। পণ্ডিতের। শাস্ত্রবাক্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে লক্ষণগুলি চাক্ষুষ দেখলেন ও স্বীকার করলেন ; কিন্তু লক্ষণধারী রামকৃষ্ণজীকে আর ভগবান্ বলতে পারলেন না। এই দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, শাস্ত্ৰপায়ে বা শাস্ত্রে, ভগবান্‌কে জানিয়ে দিয়াও, জানিয়ে দিতে পারে না। সামান্য সরল যুক্তি ধরে গেলেও চিনতে পারি বা নাই পারি, অন্ততঃ স্বীকার ও কতে হবে যে, যেখানে লক্ষণ আছে সেখানে বস্তু ও নিশ্চয় আছে ; কেননা ছায়ার ন্যায় লক্ষণই বস্তুর পরিচায়ক। যেখানে বস্তু আছে, সেখানে লক্ষণ, প্রকাশক স্বরূপ বিদ্যমান থাকে, আর যেখানে লক্ষণ, সেখানে সে যে বস্তুর ১৭২ শ্রীরামকৃষ্ণ-মহিমা। লক্ষণ সেই বস্তুর সত্বা অবশ্যম্ভাবী। মনে কর, তুমি উদ্ভিদ-শাস্ত্র অধ্যয়নে জানতে পারলে, বটনামে একটা গাছ আছে। সে গাছের একটা বিশেষ গুণ, যে, তার ছায়া শীতকালে উষ্ণ ও গ্রীষ্মকালে শীতল। পুস্তক পাঠে গাছের গুণ মাত্র তুমি জানলে, কিন্তু গাছটি কেমন চক্ষে কখন দেখা নাই। সুতরাং গাছটী হঠাৎ দেখলে চিন্বারও কোন শক্তি নাই। একবার বিদেশ ভ্রমণে, দারুণ গ্রীষ্মকালে পথশ্রান্ত, পিপশায় শুষ্ককণ্ঠ, ঘর্মাক্ত- কলেবর এমন অবস্থায় ঘটনাক্রম এক বৃক্ষতলে উপস্থিত। বৃক্ষতল বড়ই শীতল, কিঞ্চিৎ কালমধ্যেই পরম তৃপ্তি বােধ হলো। প্রাণের আরাম-প্রদ বৃক্ষটীকে বার বার দেখতে দেখতে পুস্তকে যে বটের কথা পড়ছিল সেটা মনে পড়ে গেল। গাছটা বট কি না, বিশেষরূপে জাবার জন্য শীতকাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থিতি করে দেখলে, শীতে বৃক্ষ-তল খুব গরম। এখন তুমি চিতে পার বা নাই পার, ঐ গাছটীকে বটগাছ বলবে কি না? বল দেখি? একটী গীত শুন’। • আমি সাধে কি রামকৃষ্ণ পুজি। সে যে আমার, অকুল পাথার ভব নদীর করুণ মাঝি সে যে আমার পরম সখা, নিজে খুজে দিলেন খো, শত দোষে হয় না বাঁকা, যা বলি হন তাতেই রাজি । সদাই পাছু পছু ফিরে, পাছে কিছু পড়ি ফেরে, ভেবে মরি বুঝতে নারি, সে ভজে কি আমি তলি। সে যে আমার অতি অাপন, প্রাণের মতন করেন স্বতন, কে আর এমন সুহৃদ সুজন, যেমন আমার রাজকৃষ্ণজী। . ইতি প্রথম ভাগ।

No text on this page.

No text on this page.

Shri Shri Ramakrishna Mahima Part 1

Author
Sen,akkhaykumar
Title
Shri Shri Ramakrishna Mahima Part 1
File name
Shri Shri Ramakrishna Mahima Part 1
Text
OCR done
Citation
1910
Published
2010/02/5
Publisher
Sri Akkhaykumar Sen, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
179
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Sen,Akkhaykumar
DLI number
513283
Barcode
4990010020275.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
jEV9a4y53h8
Download PDF

Shri Shri Ramakrishna Mahima Part 1