Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prathama Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রথমা
No text on this page.
ধরা )
শ্রীপ্রেমেন্দ্রমিত্র
গুপ্ত ফ্রেস এও কোং
১১ কলেজ স্কোয়ার
কলিকাতা
এখন সংস্করণ ১৯৩২
দাম দেড় টাকা
১১নং কলেজ স্কোয়ার
আশুতােষ ঘােষ কর্তৃক
প্রকাশিত
নং ও কোর্ট হাজা
নর্থ বৃটিশ প্রেস হইতে
বিনয় ভূষণ রায় কর্তৃক মুক্তি
পরম শ্রদ্ধাস্পদ সুধা দাকে লেখকের আগ্রহ বই- পঞ্চশর বেনামী বন্দর পুতুল ও প্রতিমা মৃত্তিকা প্রথমা
No text on this page.
এ মাটির ঢেলা কবে কে ছুড়িল সূর্যের পানে ভাই
পৃথিবী যাহার নাম।
লক্ষ্যভ্রষ্ট চিরদিন সে যে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ফেরে
সূৰ্য্যেরে অবিরাম।
তারি সন্ততি আমাদেরও ভাই ব্যর্থ যে সন্ধান,
লক্ষ্য গিয়াছি ভুলি।
মােদের সকল স্বপনের গায় জানি না কেমন করি’
লেগেছে মলিন ধুলি।
মাটি ও পাথর কাটি আর কুঁদি দেবতা গড়িনু ঢের,
মাগিলাম কল্যাণ।
বেদীমূলে তার তবু শােণিতের দাগ লেগে থাকে ভাই,
দেবতার অপমান!
;
কত জীবনের কত সমাধির সমিধ, লইয়া ভাই,
যে আলাে জ্বালায়ে তুলি ;
দেখি তার জ্যোতি বিফলে মিলায়, নাচে শুধু ভয়াবহ
সর্পিল শিখাগুলি।
রাখীবন্ধনে বাঁধিব যাহারে তাহারে পরাই বেড়ি,
-সে মাের আপন ভাই
জীবন যাহারে ঘিরি’ গুঞ্জরে, তারি সূর্যের আলাে
দুই হাতে আগলাই।
প্রথমা
তারকা-লােকের জেনেছি ছন্দ, সূর্যোদয়ের বাণী,
সৃজিয়াছি ভালবাসা ;
তবু হিংসার অন্ধ কারায় সভয়ে লালন করি
শুধু বাঁচিবার আশা !
পথভ্রান্ত দেবতা মােদের, নয়নে অমৃত-ভাতি
হিংস্র নখর হাতে ;
জানি তার বাণী সর্বনাশিনী তবুও চলিতে হবে
তারি মূক ইসারাতে।
লক্ষ্যভ্রষ্ট পৃথিবীর ভাই সে আদিম অভিশাপ
বহি মােরা চিরদিন ;
আকাশের আলাে যত করি জয়, মিটিবে না কভু ভাই
আদি পঙ্কের ঋণ।
২
অগ্নি-আখরে আকাশে যাহারা লিখিছে আপন নাম
চেন কি তাদের ভাই।
দুই তুরঙ্গ জীবন-মৃত্যু জুড়ে তারা উদ্দাম,
দুয়েরি বল্গা নাই।
পৃথিবী বিশাল তারা জানিয়াছে আকাশের সীমা নাই,
ঘরের দেওয়াল তাই ফেটে চৌচির ;
প্রভঞ্জনের বিবাগী মনের দোলা লেগে নাচে ভাই,
তাদের হৃদয়-সমুদ্র অস্থির !
বলি তবে ভাই শােন তবে আজ বলি,
অন্তরে আমি তাদেরই দলের দলী;
রক্তে আমার অমনি গতির নেশা ;
নাসায় অগ্নি ফুরিছে যাহার, বিজলী ঠিকরে ক্ষুরে
আমি শুনিয়াছি সে হয়রাজের হ্রেষা !
যে শশাণিতধারা ঘুমায়ে কাটাল পুরুষ চতুর্দশ ;
দেখি আজো ভাই লাল তার রঙ, তাজা তার জৌলস।
আজো তার মাঝে শুনি সে প্রথম সাগরের আহ্বান ;
করি অনুভব কল্পনাতীত সৃষ্টির ঊষা হতে,
তার জয় অভিযান।
তপতী কুমারী মরু আজ চাহে প্রথম পায়ের ধূলি;
অজানা নদীর উৎস ডাকিছে ঘােমটা আধেক খুলি।
নিসঙ্গ গিরিচূড়া,
তুহিন তুষার-শয়নে আমারে স্মরিছে বিরহাতুরা।
উত্তর মেরু মােরে ডাকে ভাই দক্ষিণ মেরু টানে
ঝটিকার মেঘ মােরে কটাক্ষ হানে ;
গৃহ-বেষ্টনে বসি,
কখন প্রিয়ার কণ্ঠ বেড়িয়া হেরি পূর্ণিমা-শশী !
সুশীতল ধারা নদীটি বহুক মন্থরে তব তীরে,
গৃহবলিভূক পারাবতগুলি কূজন করুক ঘিরে,
পালিত তরুর ছায়ে থাক ঢাকা তােমাদের গৃহখানি ;
স্তোত্র রচিও, যদি পার তব প্রিয়ার আঁখি বাখানি।
ছােট এই আশা, সুখ,
ঈর্ষা করিনা, ঘৃণা নহে ভাই, শুধু নহি উৎসুক।
মনের গ্রন্থি জটীল বড় যে খুলিতে সহে না তর ;
সােহাগের ভাষা কখন্ শিখি যে নাই মােটে অবসর ;
শুনে কাল হ’ল ভাই,
অরণ্য-পথ গভীর গহন, সাগরের তল নাই।
৪
.
অগ্নি-আখরে আকাশে যাহারা লিখিছে আপন নাম,
আমি যে তাদের চিনি।
দুই তুরঙ্গ তাহাদের রথে, উদ্ধত উদ্দাম,
শােন তার শিঞ্জিনী।
মােদের লগ্ন-সপ্তমে ভাই রবির অট্টহাসি,
জন্ম-তারকা হয়ে গেছে ধূমকেতু।
নৌকা মােদের নােঙর জানেনা,
শুধু চলে স্রোতে ভাসি--
কেন যে বুঝিনা, বুঝিতে চাহিনা হেতু!
আমি কবি যত কামারের আর কাঁসারির আর ছুতােরের,
মুটে মজুরের,
—আমি কবি যত ইতরের।
আমি কবি ভাই কর্মের আর ঘৰ্ম্মের,
বিলাস-বিবশ মৰ্ম্মের যত স্বপ্নের তরে ভাই,
সময় যে হায় নাই।
মাটি মাগে ভাই হলের আঘাত
সাগর মাগিছে হাল,
পাতালপুরীর বন্দিনী ধাতু,
মানুষের লাগি কাঁদিয়া কাটায় কাল,
দুরন্ত নদী সেতুবন্ধনে বাঁধা যে পড়িতে চায়,
নেহারি আলসে নিখিল মাধুরী
সময় নাহি যে হায়!
মাটির বাসনা পুরাতে ঘুরাই
কুম্ভকারের চাকা,
আকাশের ডাকে গড়ি আর মেলি
দুঃসাহসের পাখা,
অংলিহ মিনার-দম্ভ তুলি,
ধরণীর গূঢ় আশার দেখাই উদ্ধত অঙ্গুলি!
৬
জাফরি কাটান জানালায় বুঝি
পড়ে জ্যোৎস্নার ছায়া,
প্রিয়ার কোলেতে কঁাদে সারঙ্গ
ঘনায় নিশীথ মায়া।
দীপহীন ঘরে আঘাে নিমিলিত
সে দু’টি আঁখির কোলে,
বুঝি দুটি ফোটা অশ্রুজলের
মধুর মিনতি দোলে,
সে মিনতি রাখি সময় যে হায় নাই,
বিশ্বকর্মা যেথায় মত্ত কৰ্ম্মে হাজার করে
সেথা যে চারণ চাই।
আমি কবি ভাই কামারের আর কাঁসারির
আর ছুতােরের, মুটে মজুরের,
-আমি কবি যত ইতরের।
টানি গুণ।
কামারের সাথে হাতুড়ি পিটাই
ছুতােরের ধরি তুরপুণ,
কোন্ সে অজানা নদীপথে ভাই
জোয়ারের মুখে
পাল তুলে দিয়ে কোন্ সে সাগরে,
জাল ফেলি কোন্ দরিয়ায় ;
কোন্ সে পাহাড়ে কাটি সুড়ঙ্গ,
কোথা অরণ্য উচ্ছেদ করি ভাই
কুঠার ঘায়।
৭
A
সারা দুনিয়ার বােঝা বই আর খােয়া ভাঙি
আর খাল কাটি ভাই, পথ বানাই,
স্বপ্নবাসরে বিরহিণী বাতি
মিছে সারারাতি পথ চায়,
হ্রায় সময় নাই।
।
বিরাট সেতু সে এধারের সাথে ওধার জুড়েছে ভাই- সে সেতু হয়েছ পার ? এ-ধারে তাহার আলাে জ্বলে নাক ও-ধারে অন্ধকার ; সেতু সে বৃহদাকার। এধারে যাহার মাটির দম্ভ ওধারে মাটির মায়া পদতলে যার অর মত জল, সে সেতু নহেক, বিবাহ দেয়নি এপারে ওপারে ভাই, রাখিবন্ধন নহে শুধু শৃঙ্খল; এধারের সাথে ওধারে জুড়েছ কঠিন বাঁধনে ভাই-- সেতু সে বিপুল-বল। ফুল হ’তে ফলে যে গােপন সেতু জানি রহস্য তার ; তারা হ’তে তারা যে সেতু উতরে লঙ্ঘি অন্ধকার, তাররা সন্ধান মেলে কিছু কিছু নিশীথ রাত্র ভরি ; শুধু এ সেতুর হেতু জানিনাক উতরিতে ভয়ে মরি। সব কিছু সে যে পার হয়ে চলে তবু কোথা নাহি পার, তীর নাহি মিলে সেতু সে নিরুদ্দেশ ?
প্রখনা
কঠিন বাঁধনে সব কিছু বাঁধে তবু লাগে নাক জোড়া,
যােজনার মাঝে বেদনার রহে রেশ।
সূর্যের পানে উদ্ধত তার যাত্রার সুরু ভাই,
অতল আঁধারে উৎরাই তার শেষ।
বিরাট সেতু সে লঙ্ঘিতে চায় শিশির-কণিকাটিরে
সে সেতু হয়েছ পার ?
এধারে তাহার বন্ধ্যা ধরণী, অন্ধ আকাশ শিরে,
-সেতু সে ব্যর্থতার ?
১০
মহাসাগরের নামহীন কূলে
হতভাগাদের বন্দরটিতে ভাই,
জগতের যত ভাঙ্গা জাহাজের ভীড়।
মাল বয়ে বয়ে ঘাল হ’ল যারা
আর যাহাদের মাস্তুল চৌচির,
আর যাহাদের পাল পুড়ে গেল
বুকের আগুনে ভাই,
সব জাহাজের সেই আশ্রয়-নীড়।
কূলহীন যত কালাপাণি মথি
লােণা জলে ডুবে নেয়ে,
ডুবাে পাহাড়ের গুতাে গিলে আর
ঝড়ের ঝাকুনি খেয়ে,
যত হায়রাণ লবেজান তরী
বরখাস্ত, হল ভাই,
পাঁজরায় খেয়ে চিড় ;
মহাসাগরের অখ্যাত কূলে
হতভাগাদের বন্দরটিতে ভাই,
সেই—অথৰ্ব্ব ভাঙ্গা জাহাজের ভীড়।
দুনিয়ায় কড়া চৌকীদারী যে ভাই
হুসিয়ার সদাগরী ,
হালে যার পানি মিলেনাক আর, তারে
যেতে হবে চুপে সরি ।
প্রথমা
কোমরের জোর কমে গেল যার ভাই
ঘুণ ধরে গেল কাঠে, আর যার
কলজেটা গেল ফেটে,
জনমেরমত জখম হ’ল যে যুঝে ;
সওদাগরের জেঠিতে জেঠিতে
খাতাঞ্জি-খানা ঢুড়ে,
কোন দপ্তরে ভাই,
খারিজ তাদের নাম পাবে নাক খুজে!
মহাসাগরের নামহীন কূলে
হতভাগাদের বন্দরটিতে ভাই
সেই সব যত ভাঙ্গা জাহাজের ভীড়,
শিরদাড়া যার বেঁকে গেল
আর দড়াদড়ি গেল ছিড়ে
কজা ও কল বেগড়াল অবশেষে,
জৌলষ গেল ধুয়ে যার আর
পতাকাও পড়ে নুয়ে ;
জোড় গেল খুলে,
ফুটো খােলে আর রইতে যে নারে ভেসে,
তাদের নােঙর নামাবার ঠাই
দুনিয়ার কিনারায়,
-যত হতভাগা অসমর্থের নির্বাসিতের নীড়।
১২
মাটির ঢেলা, মাটির ঢেলা,
রঙ দিলে কে তাের গায়ে ?
গড়লে তােরে কোন্ আদলের ছাঁচে?
ভুখ দিলে যে বুক দিলে যে
দুখ দিতে সে ভুলল না,
মৃত্যু দিলে লেলিয়ে পাছে পাছে।
কোন্ মেলাতে সাজিয়ে দিলে
বিকিয়ে দিলে কার হাতে ?
কোন্ খেয়ালির খেলেনা তুই হায়রে!
কোলের পরে দুলিস, কভু
মাটির পরে যাস, পড়ে
মালিন ধুলা লাগে সকল গায় রে !
আঘাত খেলে বুক ফাটে তাের
চোখের জলে যায় গলে,
চোট, খেয়ে তুই লুটিয়ে পড়িস, ভূয়ে।
কান্না হাসির দোলা লাগে,
রঙ যা কিছু যায় চটে,
বর্ষাধারায় যায় রে সে যায় ধুয়ে।
মাটির ঢেলা, মাটির ঢেলা,
ভাক্ছে তােরে তাের মাটি,
টাছে আপন স্নেহ-শীতল কোলে।
প্রথমা
ঢেউএর পরে জীবন-ভেলা
এমন সেথা দুবে না,
ভিড়বে নাক ভিড়ের হট্টগােলে।
ব্যাঘাত নাহি আঘাত নাহি,
খামখেয়ালির নেই খেলা,
নেইক মরণ-ভয়ের ভীষণ ভুরকুটি
বৃষ্টি-পরশ সরস-দেহে
জাগবে তৃণ হয়ত রে,
একটি ছােট উঠবে কুসুম ফুটি।
মাটির ঢেলা মাটির ঢেলা
ভুললে তাের চলবেনা,
তুই যে মাটি চিরকালের মাটি।
হঠাৎ কারিকরের হাতে
যদিবা রঙ যায় লেগে,
মাটি রে তুই মাটিই তবু
খাঁটি।
১৪
জীবন-বিধাতা, আজি বিদ্রোহীর লহ নমস্কার!
লহ এই প্রীতিহীন প্রণিপাতখানি।
ক্রীতদাস মানবের মৃত্যুপুর হতে,
আজি কমণ্ডলু ভরি’
আনিয়াছি স্বেদ ও শােণিত,
—পূত পূজা-বারি।
আনিয়াছি পুঞ্জিত কালিমা
লেপিতে ললাটে তব চন্দন বিহনে,
পূজা তব আজি বিপরীত।
বিশ্বজোড়া হাহাকারে বাজে আজ নব-স্তোত্র তব,
অভিনব স্তুতি;
চিতাগ্নিতে অপরূপ আরতি তােমার,
ভস্মশেষে নৈবেদ্য নূতন।
নশ্বর মৃত্তিকা গেহে,
জর্জর তৃষিত দীন, যত নরনারী,
ধূলির মলিন অঙ্কে ধূলিসম শেষে,
বিদায় লইয়া গেল
গােপনে ফেলিয়া অশ্রুবারি;
তাহাদের সব ব্যথা, সব গ্লানি, জ্বালা, অভিশাপ,
পাপ, তাপ, লজ্জা, ভয়, কুণ্ঠা ও ক্রন্দন,
প্রতি ক্ষুদ্র দিবস-রাত্রির ঘৃণিত জীবন যাত্রা,
কলঙ্ক হতাশা আর কদৰ্য কলুষ,
প্রথম
সযতনে করিয়া চয়ন,
এ মাের প্রণামখানি করিনু বয়ন।
সেই নমস্কার,
তােমারে অর্পিনু আজি হে জীবন-বিধাতা আমার।
১৬
জীবন-শিয়রে বসি স্বপ্ন দেয় দোল;
ওরে ব্যর্থ-ব্যথাতুর,
সে মিথ্যায় মত্ত হয়ে সত্য তাের ভােল।
ব্যথিত শ্বাসের বাষ্পে ইন্দ্রধনু রচি ইন্দ্রজালে,
যদি সে মৃত্যুর মরু মরীচিকা সৃজিয়া সাজালে,
অনন্ত মৌনতা মাঝে কাতর দরদী,
এক কণা সুর লাগি
এত করি সাধিল সে যদি,
সৃষ্টির পাণ্ডুর ওষ্ঠে শীতল তিক্ততা,
অন্তরের নির্মম রিক্ততা,
ক্ষণিকের অপ্রচুর
শীর্ণ শুষ্ক হাসির ছলনা দিয়া রাখিতে আবরি,
এত সকাতর ব্যর্থ চেষ্টা যার
শুধু তার সকরুণ প্রেমটিরে স্মরি,
আজি তবে সযতনে হাস্য টানি ব্যথাম্লান মুখে,
নিদারুণ কপট কৌতুকে,
রঙীন বিষের পাত্র ওষ্ঠে তুলি ধরি
যাব পান করি।
•
অবিশ্বাসী প্রিয়ারেও অসঙ্কোচে দিব আলিঙ্গন
যে অধর করিল বঞ্চনা,
তাহারেও করিব চুম্বন।
যে আশার-ম্লান দীপখানি,
তিমির-রাত্রির তীরে আতঙ্কে শিহরি
বহুক্ষণ নিভে গেছে জানি,
১৭
তারি আলাে আছে করি ভাণ,
কণ্টকিত লক্ষ্যহীন পথে নিরুদ্দেশে করিব প্রয়াণ
—মিথ্যা অভিযান।
যে প্রেম জীবনে কভু মুঞ্জরে না, তারি মৃতমূলে
সমস্ত জীবন-রস
নিঙাড়িয়া সপি দিব জ্ঞাতসারে ভুলে
মৰ্ম্মগ্রন্থি খুলে।
ছল করি ভালােবাসি জরা-শােক-জর্জরিত
মূল্যহীন এ মাটির শব,
আগ্নেয় আয়ুর দ্বীপে ক্ষণকাল তরে
তার লাগি আয়ােজিব মিথ্যা মহােৎসব। )
}
যদিও সকল হাস্য-ফেনপুঞ্জতলে
জানি ক্ষুব্ধ ব্যথা-সিন্ধু দোলে ;
যদিও অশ্রুর মূল্যে কোন স্বর্গ মিলিবে না জানি,
হাসি-অশ্রু-উচ্ছলিত তবুও রঙীন
এ বিস্বাদ জীবনের বিষ-পাত্রখানি
ওষ্ঠে তুলি ধরি,
নিঃশেষিয়া যাব পান করি,
শুধু তার সযতন অনুরাগ স্মরি
জীবন-শিয়রে বসি দোলা দেয় যে স্বপ্ন-সুন্দরী।
১৮
দেবতার জন্ম হল।
দেবতার জন্ম হ’ল, সুপবিত্র সুন্দর প্রভাতে
মাটির কোলের পরে-
মার বুকে,
বিধাতার আশীৰ্বাদ লয়ে।
এমনি আমার ভগবান
বার বার জন্ম ল’ন মার বুকে
সুপবিত্র ধরণীর কোলে।
তার পর চেয়ে দেখি
কোথা মাের ভগবান ?
জীর্ণ গৃহ, আবর্জনা চারিদিকে,
তার মাঝে আললাহীন, বায়ুহীন কক্ষে,
ছিন্ন শয্যা পরে শুয়ে
রােগ-রুক্ষ ক্ষুধা-ক্ষীণ দেহ লয়ে
দেবতা আমার
ফেলে দীর্ঘশ্বাস।
আলােকের দেবতার আলাে নাহি মিলে,
মিলে নাক বায়ু।
রজনীর লক্ষ তারা চেয়ে-চেয়ে খোঁজে আর কঁাদে-
দেবতারে খুজে নাহি পায়।
কিম্বা দেখি-
চিনিতে না পারি ।
আমার দেবতা একি ?
কলুষ-বীভৎস মুখ, দৃষ্টিভরা পাপে, অঙ্গে অঙ্গে চিহ্ন কলঙ্কের- এই কি গাে দেবতা আমার ? -মার কোলে জন্ম যার জন্ম যার, এ পবিত্র মৃত্তিকার পরে। কার পাপ নিজেরে শুধাই মাের ভগবান হ’ল অন্নের কাঙ্গাল, বিকৃত কুৎসিৎ আর আত্মায় বামন, রুদ্ধ-বৃদ্ধি বুভুক্ষিত কদাকার প্রাণ! কার পাপ ? এ আমার, এ তােমার, এ যে সৰ্ব্ব মানবের পাপ দেবতার আলাে করি চুরি, অন্ন রাখি কেড়ে, শাস্তি তাই যায় বেড়ে বেড়ে দিনে দিনে। যত জন্ম ব্যর্থ করি দেবতার, যত প্রাণ পুষ্টি বিনা মরে, মানবের যাত্রা পথে তত জমে সুবিপুল বাধা আবর্জনা। দেবতার ব্যর্থ জন্ম। —সেই অশ্রু জমে আর জমে বিধাতার নেত্রকোণে ; ২০
যত গ্লানি মানবের হতেছে সঞ্চয়
সেই অশ্রু-প্লাবনের ভাঙ্গন ধারায়
মুছে যাবে কোন্ দিন।
সেই দিন হব শুচি।
*
-
আজ
বিকৃত ক্ষুধার ফাদে বন্দী মাের ভগবান কাদে,
কঁদে কোটি মার কোলে অন্নহীন ভগবান মাের ;
আর কঁদে পাতকীর বুকে
ভগবান প্রেমের কাঙ্গাল !
এক দিন মার কোলে জন্ম লয়ে, শিরে লয়ে মার স্নেহাশীষ,
আর দিন সুন্দর আমার
স্বার্থে লােভে ক্রুরতায়, হিংসায় প্রচণ্ড লালসায়
কুৎসিৎ, জঘন্য, ভয়ঙ্কর মানবের পুরী হতে,
পঙ্কমাখা, শীর্ণ, ক্ষীণ, হিংসায় বক্ষত,
কদাকার, লালসা-জর্জর,
বিদায় লইয়া যান,
একটি করুণ শুধু রাখি দীর্ঘশ্বাস।
২১
“দ্বার খােল, খােল দ্বার, রাত্রির প্রহরী।”
কেঁদে কয় হতভাগ্য নিঃসম্বল মানবের দল,
কেঁদে কয় দিকে দিকে নিযুত জীবন।
অন্নে যে ভরে না বুক,
তৃষা যে অতৃপ্ত থেকে যায়,
প্রাণ আলাে চায়!
শূন্য ক্ষণগুলি
অকাজের সহস্র জঞ্জালে ভরিয়াতুলিতে নারি,
আর ভালাে নাহি লাগে।
দ্বার খােলল হে প্রহরী,,
আনাে নব ঊষালােক,
সঞ্জীবিত কর আজ নূতন অমৃতে,
নব-সৃষ্টি-গুঞ্জন-মুখর, ধরাতলে জন্ম দাও।
মাের মাঝে কোন্ প্রাণ-মহানদ
ছুটিয়াছে অন্তহীন অসীমের লাগি,
তাহারে চিনাও।
আবর্তে ঘুরিয়া মরে অন্ধ মাের বন্ধ প্রাণধারা,
বেদনায় সারা,
তাহারে দেখাও পথ--
দ্বার খােল, দ্বার খােল রাত্রির প্রহরী ।
২২
শুনেছ কি, শুনেছ কি অন্ধকার রন্ধ্র করি’
আলােকের আর্তস্বর, কঁাদে প্রতি তারকায়
কঁদে সারানিশি
তারে মুক্তি দাও।
যাহা আছে তাহা আছে ঢাকি,
যাহা পাই ভার হয়ে থাকে।
সত্যেরে চিনিব কোন ফাঁকে ?
হে প্রহরী, হানাে অসি নিশার মরমে,-
যুগ যুগান্তের এই সঞ্চিত আঁধার কেটে
যা
বেদনার উষ্ণ রক্তধারে ;
রক্ত-পারাবার হতে উদ্বোধন হােতূ আজ নূতন উষার।
২৩
সেথা তুমি পূর্ণ ছিলে
আপনাতে আপনি মগন,
আনন্দের স্পন্দহীন নিশ্চল গগনে ;
তাই বুঝি সৃজিলে আমারে
কাঁদিবার লাগি।
কাদিবার সাধ,
তাই তুমি মাের সাথে ছােট হবে, লুটাবে ধূলায়,
আঘাত করিবে আপনারে,-মূঢ় অবিশ্বাসে,
আবার ভাসিবে আঁখিনীরে।
সেথা তুমি পূর্ণ ছিলে
শুধু সেথা ছিল না ক’ আঁখিজল,
বিরহ বেদনা আর উষ্ণদীর্ঘশ্বাস।
আমার মাঝারে তাই
এমন করিয়া তুমি কঁাদ,
কাদ এত রূপে।
অকারণে কাঁদ একবার
জীবনের তীরে নামি
চিহ্নহীন বালুচরে ;
পুনঃ কঁাদ প্রেয়সীর, শ্রেয়সীর লাগি
বার বার দুরন্ত
যৌবনে
তার পর সমস্ত জীবন ধরি’
সশয়ে, দ্বিধায়, দ্বন্দ্বে,
বঞ্চনায়, আঘাতে ও হতাশায়
কাদ নানা ছলে।
:
২৪
নিখিল ভুবন ভরি’ খেলিতেছ কঁদিবার খেলা
অনাদি অতীত কাল ধরি।
বিস্ময়ে চাহিয়া দেখি,
সে খেলায় মাতি
কোথায় নেমেছ তুমি মাের সাথে,
জঘন্য পাপের মাঝে, বীভৎস ক্ষুধায়,
অসহ্য গ্লানির পঙ্কে,
পূতিগন্ধভরা, অচিন্ত্য কলুষে হীনতায়।
মাের সাথে পাপী হলে
বুকে তুলে নিলে মাের তাপ ;
মাের সাথে দুৰ্ব্বহ ব্যথার বােঝা স্কন্ধে নিলে তুলে,
পিশাচ সেজেছ মাের সাথে,
কুটিল, নিৰ্ম্মগ, ক্রুর, নৃশংস, নির্দয়।
বিস্ময়ে চাহিয়া দেখি, আর বসে রই
স্তব্ধ হয়ে ভয়ে ও বিস্ময়ে-
তােমার কান্নার খেলা অপরূপ, অদ্ভুত, ভীষণ, বুদ্ধির অতীত
।
যত কান্না ধরণীতে
তার মাঝে তুমি কঁাদ এই শুধু জানি-
আর ধন্য আপনারে মানি !
-
আজ আমি চলে যাই
চলে যাই তবে ;
পৃথিবীর ভাই বােন মাের ;
গ্রহ তারকার দেশে,
সাথী মাের এই জীবনের,
কেহ চেনা কেহ বা অচেনা,
তােমাদের কাছ হতে চলে যাই আজ।
কোথায় দুফোটা জল শুখাইবে তপ্ত ভূমিতলে,
একটি করুণ শ্বাস মিলাইবে উতলা বাতাসে,
আজ কয়ে যাব নাক সন্ধান হার!
নীল আকাশের গ্রহে একটি প্রার্থনা মাের,
রেখে যাই শুধু,
স্পন্দহীন বক্ষপুটে,
রেখে যাই মৃত্যুম্নান মৰ্ম্মকোষে মাের।
যে কেহ আমার ভাই, যে কেহ ভগিনী,
এই উৰ্ম্মি-উদ্বেলিত সাগরের গ্রহে,
অপরূপ প্রভাত সন্ধ্যার গ্রহে এই,
লহ শেষ শুভ ইচ্ছা মাের
বিদায় পরশ, ভালােবাসা ;
আর তুমি ও প্রিয়া মাের
অনন্ত রহস্যময়ী,
চির-কৌতুহল-জ্বালা
অসমাপ্ত চুম্বন খানিরে,
তৃপ্তিহীন।
প্রখমা
যদি প্রেম সত্য হয়,
যদি সত্য হয় এই অঞর সাধনা,
তবে আর বার
অদেখা আকাশে কোন
কোন নীহারিকা পুঞ্জে
নব-সূৰ্য্য-উদ্ভাসিত সে কোন সুন্দরী তারকার
হবে ফিরে পরিচয় ?
—নাহি জানি।
নয় এই অযাচিত নিষ্ঠুর বিদায়।
••
আজ আমি চলে যাই
যত দুঃখ সহিয়াছি,
বহিয়াছি যত বােঝা, পেয়েছি আঘাত,
কাটায়েছি স্নেহ-হীন দিন,
আজ কোন ক্ষোভ নাই তাহাদের তরে,
কোন অনুতাপ আজ রেখে নাহি যাই।
একটি আকাঙক্ষা শুধু
জ্বলে রেখে গেনু।
আজো যারা আসে পিছে,
অনাগত পৃথিবীর জ্বণ-শিশু যত,
তারা যেন পৃথিবীরে এমন করিয়া নাহি দেখে।
আজ যারা বাসিতে পেল না ভালাে,
আমাদের চারিপাশে আজ যত প্রাণ,
২৭
প্রমা
অন্যায় দারিদ্র্যে আর হীন লালসায়
অন্ধ পঙ্গু হয়ে কঁাদে অশ্রুজলে উষ্ণ অভিশাপে,
তাহাদের সকল বেদনা
আজিকার মানবের যত গ্লানি পাপ,
আমাদের সাথে যেন মােরা সব
মুছে লয়ে যাই।
যারা আজো জন্ম লয় নাই,
তাহাদের প্রেম
ব্যর্থ নাহি হয় যেন এমন করিয়া
লােভের, ক্ষুধার ফাঁদে,
দেবতার দ্বার যেন তাহাদের তরে
আজিকার মত রােধ
নাহি করে স্বার্থ অসঙ্গত,
কপটতা, মােহ, প্রবঞ্চনা,
হিংসা, অহঙ্কার ;
—পৃথিবী সুন্দর হয় যেন।
বিধাতার আশীর্বাদ লােভ যেন নাহি কেড়ে রাখে
স্বার্থ করে অন্যায় বণ্টন
প্রেম বিনা কারাে জন্ম ব্যর্থ নাহি হয় যেন,
ছিড়ে যায় লালসার জাল,
ধুয়ে যায় আজিকার সব ক্ষুদ্র গ্লানি মলিনতা।
;
দিকে দিকে কোটি গৃহ ভেঙ্গে পড়ে আজ,
প্রচণ্ড লােলুপ এই মানবের বাসনার ঝড়ে ;
উপবাসী কঁদে মাতা মােহমত্তা নারীর অন্তরে,
২৮
প্রথম
কঁদে প্রিয়া উৎপীড়িত বারাঙ্গনা-বুকে,
—দেবতা কাঁদেন ভাঙা ঘরে।
পৃথিবীর ভাই বােন মাের
এই বিলাপের গ্রহে, মাের কান্না রেখে যাই আজ,
একটি বাসনা আর।
পশ্চাতে আসিছে যারা
তারা যেন ধরণীর এ কলুষ দেখিতে না পায় ;
মােদের চোখের জলে শেষ হােক সব তাপ গ্লানি
শেষ হােক মানব-আত্মার এই কাতর কাকুতি,
আমাদের বেদনায়।
তারা যেন সবে ভালবাসে।
মৃত্যুরে কে মনে রাখে ?
—মৃত্যু যায় মুছে।
যে তারা জাগিয়া থাকে তারে লয়ে জীবনের খেলা,
ভুবনের মেলা।
যে তারা হারাল দ্যুতি, যে পাখী ভুলিয়া গেল গান,
যে শাখে শুখাল পাতা
এ ভুবনে কোথা তার স্থান ?
নিখিলের ওষ্ঠপুটে ওষ্ঠ রাখি করিছে যে পান,
হে কবি আজিকে তার
তার তরে রচ শুধু গান।
রচ গান যৌবনের।
যে প্রেমের চিহ্ন নাই লাজরক্ত কোমল কপােলে,
কম্পমান হৃদপিণ্ডে, দুর্ণিবার রুধিরের দোলে,
তার তরে অকারণ শােক।
বারবার ছেড়ে তার জীর্ণতা-নিম্মোক
জীবনের যাত্রা হেরি মহাকাশ ব্যেপে,
তারায় তারায় তার জয়ধ্বনি উঠে কেঁপে কেঁপে।
: মৃত্যু-শােকস্তব্ধ গৃহদ্বারে,
আসে বারে বারে
সমারােহে শিশুর উৎসব,
বেদনার অন্ধকার বিদারিয়া প্রতিদিন দেখা দেয় প্রদীপ্ত গৌরব,
নিলজ্জ শিশুর হাসি।
কবরের মৃত্তিকায়, অবহেলি অশ্রদ্ধায়
তৃণে জাগে প্রাণ অবিনাশী।
G০
প্রথমা
.
ওরে ম্রিয়মাণ কবি উঠে বােস, শােক-শয্যা তােল
বন্ধুর বিরহ-ব্যথা ভােল,
কাণ পেতে শােন বসে জীবনের উন্মত্ত কল্লোল
আকাশ বাতাস মাটি উতরােল আজি উতরােল।
আজি এই প্রভাতের আশীৰ্বাদ খানি,
লও তব মাথে,
হে নগরী,
লও তব ধূলি-ধূম-ধুম্রজটা-বিভূষিত শিরে।
তব লৌহ-কাষ্ঠ-শিলা কারাগার হতে,
রক্তমসী-কলঙ্কিত, যন্ত্র-জর্জরিত তব
কর দুটি জুড়ি
আজি এই প্রভাতেরে কর নমস্কার।
মােহের দুঃস্বপ্নজাল বারেক ছিড়িয়া দুই হাতে
উর্ধে চাহ অভিশপ্তা
ওই নীল আকাশের পানে,
পুর সীমান্তে যেথা দিবসের মাঙ্গলিক বাজে
আলােকের সুরে।
তােমার ব্যথিত বক্ষে,
অন্ধকারে যেথা
অনির্বাণ অগ্নিকুণ্ড জ্বলে দিকে দিকে,
হারায় কঙ্কাল পথ
বিকারের পয়ােনালী মাঝে,
লুকায় সুড়ঙ্গ লাজ ভরে মৃত্তিকার তলে,
লােভ হিংসা ফেরে ছদ্মবেশে
অন্ধকারে নিঃশব্দ লােলুপ,
সেথা আজ ডেকে আন প্রভাত আলােরে ;
তার সাথে আন শান্তি,
লােভ-দীর্ণ তব ক্ষুব্ধ বুকে,
লালসার দৈন্য যাক ঘুচে।
প্রথমা
যন্ত্রের চক্রান্ত ভাঙি,
ভেদ করি ষড়যন্ত্র লৌহে আর লােভে
আসুক প্রভাতখানি,
-সৌম্য-শুচি কুমার সন্ন্যাসী
হে পতিতা ভােমার আলয়ে।
পুঞ্জীভূত সমস্ত কালিমা,
সমস্ত সঞ্চিত ব্যথা, লজ্জা গ্লানি পাপ,
মনস্তাপ বহু মানবের
ব্যাধি ও বিকার
সযত্নে লালিত,
দূর হােক সব আবর্জনা,
আলােকের কল্যাণ ধারায়।
শক্তির সাধনে মাতি,
হে উন্মত্তা নারী-কাপালিক,
অগণন জীবনের আশার শ্মশানে
আনন্দের শবাসনে বসি,
সুন্দরেরে গিয়াছিলে ভুলি ;
সীমাহীন আকাশের সুনীল বিস্ময়
রাত্রির রহস্য আর আলাে গন্ধ রূপ,
ভুলেছিলে সহজ প্রাণেরে।
সেই স্বেচ্ছা-নিৰ্বাসন হয়ে যাক শেষ।
প্রথমা
শক্তি-সুরা-রক্ত নেত্রে ভ্রুকুটির তলে
বিহঙ্গেরা বাঁধে নাই নীড় ;
প্রস্তর-নিষেধ-প্রান্তে জাগিছে সভয়ে
শীর্ণ তৃণ বিবর্ণ কুসুম,
—সঙ্কুচিত দুর্বল কাতর।
যন্ত্রের জটীল পথে
বিকলাঙ্গ জীবনের
হেরি শুধু ব্যঙ্গ-সমারােহ।
L
৩৪
ভাড়াটে কুঠি । নদীর স্রোতের জঞ্জাল সম আসিয়া জুটি। ওধারে তাহারা এধারে কাহারা ওপরে ও নীচে নানা ; পাশাপাশি রােজ ঘর করি ভাই- কেহ নয় কারাে জানা ! শুধু দুবেলায় চোখখাচোখি হয় একই সিড়ি দিয়ে উঠি। ভাড়াটে কুঠি। ওধারের ঘরে তাহাদের ছেলে বুঝি বা ধুকিছে জ্বরে ; এধারে প্রবাসী স্বামীটির লাগি বধূটি শুকায়ে মরে। নীচে মজলিসে সারাদিন গােল চলিছে দাবার ঘুটি। ভাড়াটে কুঠি একটি ইটের ব্যবধান রেখে পাশাপাশি থাকি শুয়ে ; এ ছাতের জল ও ছাতত গড়ায় ভিৎ গাড়া একই ভুয়ে।
ওইখানে শেষ; তার পরে আটা
জানালা কবাট দুটি।
ভাড়াটে কুঠি।
একদিন ফের ঘূর্ণিতে টানে,
কোনখানে যাই ভেসে ;
কিছু নাহি জানি, তবুও বিদায়
নিয়ে চলি ম্লান হেসে।
যা ছিল আড়াল রহে চিরকাল
বাধা নাহি যায় টুটি।
ভাড়াটে কুঠি।
শুধু কোনােদিন সঙ্গ-বিহীন
বিদ্রোহ করে প্রাণ ;
কঠিন দেয়ালে করাঘাত করে
ঘুচাইতে ব্যবধান।
ঘােচেনা আড়াল, ব্যাকুল হৃদয়
মিছে মরে মাথা কুটি।
ভাড়াটে কুঠি ।
হাঁকে ফিরিওলা-কাগজ বিক্রি
পুরাণাে কাগজ চাই।
ঘরের কোণেতে সঞ্চিত যত
তাড়াগুলি হাতড়াই।
পুরাণাে কাগজ চাই;
বহুদিন ধরে জঞ্জাল বাড়ে
সের দরে বেচি তাই।
দেখি সমুদ্রে
কেমন করিয়া একটি তাহার
হঠাৎ নজরে পড়ে ;
যাত্রী-জাহাজ
কোথায় ডুবিল ঝড়ে।
হঠাৎ নজরে পড়ে,
আবার কোথায় মানুষের মাথা,
বিকায় খুলির দরে।
নিরুদ্দেশ কে সন্তান লাগি
ঘােষিছে পুরস্কার ;
মৃত্যুঞ্জয় অমৃত কারা
করিছে আবিষ্কার।
ঘােষিছে পুরস্কার,
পলাতক খুনে লুকায়ে কোথায়
চাই যে হদিস তার।
প্রথমা
কোন্ সে বধূর বুকের আগুন
ভিতর করিয়া খাক,
অবশেষে লাগে বসনে তাহার ;
পুড়ে গেল সাত পাক
ভিতর করিয়া খা
কোন সে গিরির গরল অনল
ঘটাল দুর্বিপাক।
হারাণাে তারিখ ফিরে আসে ফের
পুরাণে কাগজ পড়ি ;
আমার নয়নে সহসা পােহায়
সে দিনের বিভাবরী।
পুরাণে কাগজ পড়ি;
রাখিল ধরণী সেই দিনটির
পায়ের চিহ্ন ধরি।
সে পদচিহ্ন কোথায় মিলাল
তারপরে নাহি খোঁজ।
মানুষের ঘরে সকলের বড়
উৎসব নওয়ােজ।
তার পরে নাহি খোঁজ ;
যাত্রী-জাহাজে ডুবিল যে, বুঝি,
তাররা ঘরে আজি ভােজ।
৩৮
প্রথম
রক্তে ছােপান অশ্রুতে ভেজা
পুরাতন যত পাতা,
সব জঞ্জাল আজিকে, হলেও
রঙীন সুতায় গাঁথা।
পুরাতন যত পাতা,
তাতে কোন্ দিন কি দাগ লাগিল
কে বৃথা ঘামায় মাথা।
হাঁকে ফিরিওলা, কাগজবিক্রি,
পুরাণাে কাগজ চাই।
ঘর ভরি যত মিছে জঞ্জাল
জমাবার নাহি ঠাই।
পুরাণাে কাগজ চাই;
আদর যাহার ফুরাল তাহারে
সের দরে বেচ ভাই।
নমাে নমাে নমাে ।
অপরূপ অনির্বচনীয়।
নমাে নমাে নমাে !
;
দেহের বীণাতে ওঠে ঝঙ্কারিয়া সুরের প্রণতি
নমাে নমাে নমাে !
নয় বাণী, নয় স্তুতি, নহেক প্রার্থনা
গান নয়, নয় আরাধনা,
শুধু দেহ-দীপ হতে ওঠে শিখা সম
নমাে নমাে নমাে !
সব অর্থ ডুবে যায় আনন্দের অতল সাগরে
শুধু অহৈতুক
অর্থহীন
নমাে নমাে নমাে।
দুবোধ প্রাণের ভাষা
বাণীর আরতি।
চেতনা হারায়ে যায় আনন্দের অপার পাথারে
সেথা হ’তে ওঠে শুধু
বাত্ময় অর্চনা,
নমাে নমাে নমাে
পরিপূর্ণ জীবনের প্রস্ফুটিত পদ্ম হ’তে ওঠে গন্ধসম
নমাে নমাে নমাে।
-
৪০
প্রখমা
৩
কথা খুজে নাহি মিলে, বিস্ময়ের রহে নাক সীমা
আনন্দের ঝটিকায় কঁপে প্রাণ স্পন্দমান তারকার মত ;
বিরাটের তীরে তীরে জীবন কল্লোলি ওঠে-
নমাে নমাে নমাে !
নমাে নমাে নমাে !
প্রণামের বিরাট আকাশে
সব গান ডুবে আছে,
মিলে আছে সব পূজা,
হারাইয়া আছে স্তুতি, সকল আরতি,
সমস্ত সাধনা,
কোটি কোটি তারকার মত।
মহা নীলাকাশ সম
মূর্তিমান সীমাহীন
নমাে নমাে নমাে !
৪১
ফের যদি ফিরে আসি।
ফিরে আসি যদি
কোনাে শুভ্র শরতের অম্লান প্রভাতে,
কিম্বা কোনাে নিদাঘের শুষ্ক রুক্ষ তপস্যার দ্বিপ্রহরে
কিম্বা শ্রাবণের বৃষ্টি-ধরা ছিন্নমেঘ রাতে কোনন,
নূতন
ধরণী পরে কারেও কি পারিব চিনিতে,
কাহারেও পড়িবে কি মনে?
এ জীবনে যাহাদের ভালােবাসিয়াছি
আজ ভালােবাসি যাহাদের
তাহাদের সাথে হবে দেখা ?
—পারিব চিনিতে?
;
জন্ম ল’ব হয়ত সে
কোন্ উৰ্ম্মি-ছন্দোময়ী ফেনশীর্ষ সাগরের তীরে
ডুবারীর ঘরে,
কিম্বা কোন্ জীর্ণ ঘরে কোন্ বৃদ্ধ নগরীর নগণ্য পল্লীতে
দীনা কোন্ পথের নটীর কোলে
কিম্বা -কোথা কিছু নাহি জানি।
এই আলাে সেদিন নয়নে জ্বলিবে কি ?
এই তারা এই নীলাকাশ সম্ভাষিবে আরবার ?
সেদিন কি এমনি ফুটিবে ফুল,
এইমত তৃণ,
জাগিবে কি পদতলে,
এইমত পুঞ্জ পুঞ্জ প্রাণ
সমস্ত নিখিলময় ?
৪২
পড়িবে কি মনে,
এই আলাে মাের চোখে একদিন লেগেছিল ভালাে ;
এই ধরণীর পরে আমি খেলা করিয়াছি,
কাদিয়াছি হাসিয়াছি
ভালােবাসিয়াছি ?
যে মুকুল আশাগুলি রেখে যাব আজ
জীবনের খেয়াঘাটে বিদায়-সন্ধ্যায় অর্ধস্ফুট,
তাহাদের সাথে আর
হবে ফিরে দেখা ?
এ জীবনে যত কাজ সাঙ্গ হ’ল নাকো,
যত খেলা রয়ে গেল বাকি,
ফিরে আর তাহাদের ?
আমার চোখের জল,
মাের দীর্ঘশ্বাস,
হতাশা, বেদনা,
তাহাদের সাথে পুনঃ হবে পরিচয়?
যত দুঃখ ফেলে রেখে যাব
তাহারা শুধাবে ডেকে,
ডেকে কহিবে কি প্রিয়া,
“আমারে ভুলিয়া ছিলে কেমন করিয়া ?”
আবার প্রিয়ার সাথে সুখে দুঃখে কাটিবে কি দিন,
এমনি করিয়া প্রতি জীবনের দণ্ড পল সুধাসিক্ত করি,
আনন্দ ছড়ায়ে চারিদিকে, আনন্দ বিলায়ে সৰ্বজনে?
৪৩
সকলেরে ভালােবেসে—ভালােবেসে সব কিছু
দুর্দিনে নির্ভয় আর দুঃখে ক্লান্তিহীন
চলিতে পাব কি দুইজনে
এক সাথে?
ফের যদি ফিরে আসি,
আরাে আলাে চক্ষে যেন আসি নিয়ে,
বুকে আরাে প্রেম যেন আনি
পৃথিবীকে আরাে যেন ভালাে লাগে ।
এবারের যত ভুল ভ্রান্তি
স্থলন পতন
ক্ষমায় ভুলিয়া আসি ;
আরাে আনি পথের পাথেয়
আনন্দ অক্ষয়।
৪৪
জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পাস, শুনিস্ কিরে কানে ?
মুগ্ধ কবি মগ্ন মােহের গানে।
বৎসহারা কোন সাহারা হাহা করে, কোথায় হাহা করে,
কোন্ সাগরে ঝড় উঠেছে, মেঘ-গরুড়ে আকাশ আড়াল করে ;
আবার কোথায় অনূকি ওড়ে বদ্ধ নালার জলে,
চড়ই দুটি বাঁধছে বাসা কড়িকাঠের তলে!
বিসুবিয়াস্ বিষ খেয়ে কে উগরে তােলে আগুন উগরে তােলে,
গ্রহ-তারার ঘূর্ণিপাকে মাথা ঘুরে উল্কা পড়ে টলে ;
আবার কোথায় মাকড়শাতে বুছে বসে জাল,
মহুয়া-বন মাৎ করে ওই মৌমাছিদের পাল।
জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পাস, শুনিস্ কিরে কানে ?
মুগ্ধ কবি মগ্ন মােহের গানে!
পুচ্ছে-বাঁধা অনল-জ্বালায় ধূমকেতু কে ছটফটিয়ে ছােটে,,
প্রসবব্যথায় কঁদিয়ে আঁধার আকাশ ফেটে নতুন তারা ফোটে ;
আবার কোথায় মৌটুসকি টুসকি মারে ফুলে,
পেরজাপতি হলুদ-ক্ষেতে বেড়ায় দুলে দুলে !
তেপান্তরে লাগল আগুনদুবলে আকাশ খুবলে নিলে আঁখি,
সৃষ্টিখানার ঝুটি ধরে কোন্ সে দানাে দিচ্ছে কোথা ঝাকি ;
আবার কোথায় রােদ উঁকি দেয় পাতার চিকের ফঁাকে,
কাঠবেড়ালির চমক লাগে বনশালিকের ডাকে।
জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পা, শুনিস্ কিরে কানে ?
মুগ্ধ কবি মগ্ন মােহের গানে!
৪৫
প্রথমা
বাঁজা ডাঙ্গায় লড়াই বাধে, হাজার সঁতে কামড়ে ছেড়ে টুটি,
লক্ষ খুনীর খুন চেপেছে, কবন্ধ ধড় খাচ্ছে লুটোপুটি ;
আবার কোথায় নিশীথ রাতে প্রদীপ মিটিমিটি,
রুদ্ধ-নিশাস পড়ছে বধূ প্রিয়তমের চিঠি।
বােল্ হাঙ্গরের লাগল গাদি, জাহাজ ডােবে ডুবাে পাহাড় লেগে,
কোন্ দেশেতে লাগল মড়ক, ভাগাড় আঁধার শুনি-ঋকের মেঘে ;
আবার কোথায় হাঁস চরে ওই শ্যাওলা-দীঘির ঘাটে
ঝিউড়ি মেয়ে ঘসতেছে পা খেজুর-গুড়ির পাটে!
জীবন-মহাদেবের নৃত্য দেখতে কি পাস, শুনিস্ কিরে কানে ?
মুগ্ধ কবি মগ্ন মােহের গানে।
তাতা থিয়া, তাতা থিয়া-ঠোকাঠুকি নীহারিকার মালায়,
তাতা থিয়া,-সিন্ধু নাচে বক্ষে জ্বালা বাড়বানল-জ্বালায়,
তারি সাথে যুগে যুগে দোলে, দোলে, দোলে,
নটরাজের নাচন্ চির-নারী-মাতার কোলে।
৪৬
কাগজের বুকে বিধে কলমের রূঢ় নখর, আমার অশ্রু হ’ল আজ ভাই কালাে আখর কবিতা হায় ! লােণ জল আজ ছন্দে দুলিয়া মিলে মিলায়। আকাশ আঁধার করে এসেছিল মেঘ বিপুল ; সেই মেঘ হ’ল কাননের কোণে কেতকী ফল- সুরভিশ্বাস। আকাশের ব্যথা মাটির মায়ায় হ’ল সুবাস। এ হৃদয়-ক্ষত হ’ল যে দিঠিতে নিষ্করুণ, তারি গানে তব প্রিয়ার গণ্ডে ফোটে অরুণ- উদয়াভাষ! আমার ঝঞ্চা তােমাদের দক্ষিণ বাতাস। মাের পতঙ্গ, দহিল যাহারে মােহিনী দীপ, সেই হ’ল তব প্রিয়ার ললাটে সুচারু টীপ নব শােভায়। মাের সূর্যের দাহনে তােমার নিশি পােহায়। আমার মরুর হাহাকারে হিয়া ব্যথা-বিধুর, তােমাদের দেশে আকাশ হ’ল যে মেঘ-মেদুর, স্নেহ-শীতল ! আমার প্লাবনে তােমাদের তীরে ফলে ফসল। ৪৭
তােমার প্রেমের আকাশে শােভে যে শশী নবীন ;
সে যে বিস্মৃত কোনাে ধরণীর স্পন্দহীন
শীতল শব।
মাের শুক্তির বুক-চেরা ধন তব বিভব।
তবু তাই হােক ; মাের অশ্রুর বাষ্পকুল
দিগন্তে তব রামধনু উঠি’, আলাের ফুল
মেলুক দল।
মাের শাজাহান কাঁদিয়া গড়ক তাজমহল।
৪৮
সার্সিতে জল-সারেঙ বাজে,
পথ আজি নির্জন ;
বাদলা-পােকার ফৰ্ত্তি নিয়ে
জাপানি লণ্ঠন।
কদম্বে আজ শিথিল রেণু
সুবাসে ভুরভুর,
বর্ষশেষের বাদল বাজায়
আজ বেহায়া সুর !
ঘরের কোণে ঝাপসা আলােয়
জমকালো মজলিশ,
চেঁচিয়ে কথা কইতে বাধে
-আধ-ফোটা ফিসফিস্ ।
ঘারী বিনা কাজরী নাহি
নেইক কাজল কালাে,
দুটি প্রাণীর মজলিসই আজ
সবার চেয়ে ভালাে।
বীণার তারে মরচে ধরা
কাজ কি পাড়াপাড়ি ;
আজকে নীরব ঠোঁটের সাথে
ঠোটের কাড়াকাড়ি !
৪৯
মেঘলা-মােহ ধরে যে আজ
কপােত-কূজনে,
বর্ষাশেষের বেহায়া রেশ
শুছি দুজনে !
চিকুর চেয়ে চম্কে দেবে
করােনা চিক্ কঁক,
আজ দেওয়ানা দেয়ার শােন
দিল-দরদী ডাক !
দরিয়াতে আজ কই দাদুরি
হাযুণ সব চুপ;
মেঘলা দিন আজ দাড় ফেলে যায়
আঁধারে ঝুপ ঝুপ!
বাদলা-পােকার পালা পাখা
পড়ছে খসে খসে,
সার্সিতে জল-সারেঙ বাজে
শুছি বসে বসে।
হালকা বেণীর বন্ধনী আজ
আলগা করেই রাখ,
শুধু শীতল অধর দিয়ে
নীরব চুমা আঁক।
যাযাবর হাঁস নীড় বেঁধেছিল বন-হংসের প্রেমে,
আকাশ-পথের কোন সীমান্তে থেমে ;
সে কবে আমার মনে,
ডুবেছে বিস্মরণে।
আজি শুধু তার শূন্য নীড়টি ঘিরি,
হতাশ আশার উদাস অলস মৌমাছি মরে ফিরি।
বেদিয়ার মেয়ে মরু ছেড়ে হ’ল মােতি-মহলের বাঁদী,
চঞ্চল চোখ বােরখাতে দিল বাঁধি ;
সে কবে আমার মনে,
ডুবেছে
বিস্মরণে
আজি শুধু তার ত্যক্ত জীর্ণ ঘরে,
পুরানাে স্মৃতির শ্রীহীন শুকানন পল্লব কঁদি মরে।
;
শুননা চড়ায় সারাদিন করে শুনি কলরব,
ঘাটে ভেসে লাগে শেফালি শিশুর শব।
আমার পরাণে আজি,
উৎসব বেশে সাজি,
হৃদয়ের পথে কঙ্কালগুলি চলে।
বাসর-রাতের দীপ নিভে গেছে বিধবা-নয়ন-জলে।
আর বরষের পথিক-পাখীর পায়ের চিহ্নখানি,
নূতন পলিতে ঢাকা পড়িয়াছে জানি,
তােমার মনের চরে ;
জানি কভু ক্ষণতরে,
স্মৃতির জোয়ার সরাবে না আবরণ।
তােমার আকাশে আমার পাখার বিদায় চিরন্তন।
উড়াে মেঘে কবে ছায়া করেছিল আমার দগ্ধ মরু,
বাড়াল একটি শাখা মুমূষু তরু;
আজো তারি পথ চাহি,
জানি বৃথা দিন বাহি;
স্খলিত পরাগ পুষ্প লবে না তুলি।
বিদুল্লতা ছুয়েছে যে তার ভস্ম বাসনাগুলি !
।
তবুও মনের বাতায়নে মাের রাখিলাম দীপ জ্বালি
জীবন নিঙাড়ি সেহরস তাহে ঢালি
চাহিনাক সান্ত্বনা,
অশ্রুতে ভিজাব না,
মনের তৃষিত মরুর দারুণ দাহ।
ভব পথ-চাওয়া-দীপ-শিখা সনে মাের শেষ উদ্বাহ।
তৃতীয় প্রহরে চাঁদ উঠেছিল নগর-শিখর ছুঁয়ে ;
তুমি তারি মত মাের ‘পরে ছিলে নুয়ে,
কহ নাই কোন কথা।
বাণীহীন ব্যাকুলতা,
কেঁপেছিল শুধু নত আঁখি-পল্লবে ;
কৃশ শশাঙ্ক-লেখা সমবে দেখা দিল মোর নভে।
সেদিন যে-কথা কহিতে পারনি, আজ কেন বৃথা মন,
তাহারি অর্থ খুঁজে মরে অকারণ !
কেন মিছে ভাবি বসি,
শুখায়েছে যে সরসি
তারি কমলের কি ছিল মৰ্ম্ম-কোষে !
প্রভাতী তারার ইসারা খুজিতে কেন চাহি এ প্রদোষে
জ্যোৎস্নাধারায় আকাশের চোখে আজো যে লেগেছে নেশা ;
কুয়াশায় আজ স্মৃতি ও স্বপ্ন মেশা।
থাকে যদি মনে থাক,
একটি সজল দাগ,
হারানাে রাতের এক ফোটা অশ্রুর।
নূতন আঁখির দ্যুতিতে তােমার স্মৃতি হােক সুমধুর।
কালাে দীঘিজল, তারি সুশীতল মায়া তব দুটি চোখে ;
ও দেহে শ্রাবণ-মেঘছায়া ফেলিল কে।
তুমি যেন শর্বরী,
তারকার স্নেহ হরি’
নেমেছ আসিয়া নীরবে হৃদয়-তীরে,
দূর দিগন্তে নভােসীমন্তে আঁকি শশী-লেখাটিরে।
কুমারী কোরক যে আলােকে জাগে, স্মিতমুখে তব ক্ষরে ;
পাখীরা ঘুমায় স্নিগ্ধ তােমার স্বরে।
তনুর লাবণী সনে,
দেখিয়াছি পড়ে মনে,
হরিৎ-ধান্য-ব্যাকুল গ্রামের সীমা,
কানন-কণ্ঠ-লগ্ন নদীর মনােহর ভঙ্গিমা।
ধুধু প্রান্তর তােমার প্রণয়ে হ’ল ছােট প্রাঙ্গন ;
দীপ হতে করে, বহ্নি আকিঞ্চন।
তব মমতায় ঘিরে,
অসীম আকাশ-তীরে,
সীমার ধরণী গড়ি মােরা অক্ষয়।
তুমি আছ তাই গৃহদীপ সনে তারকারা কথা কয়।
৫৪
অক্ষর সূচি ১ ৪৭ ৫৪ ৪৫ অগ্নি আখরে আকাশে যাহারা আজ আমি চলে যাই আজি এই প্রভাতের আমি কবি যত কামারের আর বরষের পথিক-পাখীর এ মাটির ঢেলা কবে কে ছুড়িল কাগজের বুকে বিঁধে কলমের কালাে দীঘি জল জীবন বিধাতা আজি জীবন মহাদেবের নৃত্য জীবন শিয়রে বসি তৃতীয় প্রহরে উঁদ উঠেছিল দেবতার জন্ম হ’ল দ্বার খােল খােল দ্বার নমাে নমাে ফের যদি ফিরে আসি বিরাট সেতু সে ভাড়াটে কুঠি মহাসাগরের নামহীন কূলে মাটির ঢেলা মাটির ঢেলা মৃত্যুরে কে মনে রাখে ১৭ ২৩ ৪০ ৪২ ৯ ১১
যাযাবর হাঁস নীড় বেঁধেছিল
হাঁকে ফিরিওয়ালা
সার্সিতে জল-সারেঙ, বাজে
সেথা তুমি পূর্ণ ছিলে
৪৯
No text on this page.
No text on this page.