Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sri-hin Krishna

Basu,taritkumar · 2009/09/20

PDF Proofread

Front matter

শ্রী-হীন কৃষ্ণ সৌন্দৰ্য- ভাবে ভাষায় পাঠে অভিনয়ে চিন্তা- ভূমিকায় কথা-বার্তা নূতন টেকনিকে গেট-আপে About the author and his writings As a critic he is constructive, and as a creative writer he is original. His Bengali style is simple, forcible and humorous, as is evidenced from his perfectly new type of Bengali drama Sri-hin Krisna,” Filmland

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শ্রী-হীন কৃষ্ণ

No text on this page.

শী-হীন কৃষ্ণ
পরিত্রাণায় ‘পরাধীনানাং বিনাশায় চ ‘দ্যনা'।
‘মুক্তি’-সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥”
শ্রী-হীন কৃষ্ণ
তড়িৎ কুমার বসু

সূচি * * * * * ভূমিকা- ৩ ভূমিকা-৪ ভূমিকা- ৫-৩৬ ভূমিকা- ৫-৭ ভূমিকা- ৮-১০ ভূমিকা—১১-১৩ । ১। বন্ধুত্ব ২। ঠিকুজী- ৩। অনুৎসর্গ- যতীনের কথা voyanta (Mysticism) বিশ্ব-প্রেম ও স্বদেশপ্রেম নাটকে নূতন রূপ- ‘সিচুয়েশন’, ইবসে, স্ট্রাইণ্ডবার্গ, । মেটারলিঙ্ক, বার্ণাড-শ', হপম্যান্) সত্যিকারের নাটক ও টেকনিক নাটকের অভাব- ( শিশিরকুমার, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ) নাটকের ভাষা শী-হীন কৃষ্ণের কথা অনুৎসর্গ ও উৎসর্গ ৪। অভিনয় অভিনেতার গুণ প্রযােজনা ••• ভূমিকা-১৩-১৭ ভূমিকা—১৮-২০ * ভূমিকা-২২-২৬ ভূমিকা-২৭-২৮ ভূমিকা-২৯-৩৫ ভূমিকা৩৫- ভূমিকা-৩৭–৫১ ভূমিকা——৪০ ভূমিকা—৪১ ভূমিকা-৪২ ভূমিকা—৪৩-৪৪ ভূমিকা-৪৫-৪৬ ভূমিকা—৪৭-৪৮ ভূমিকা—৪৯-৫০ ভূমিকা-৫২ ••• . রং নির্বাচন ও রূপসজ্জা স্টেজ ম্যানেজার নৃত্যাভিনয় ৫। চরিত্র- ৬। শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ নাটক- প্রথম দৃশ্য = ৫ । দ্বিতীয় দৃশ্য

১। লেখকের
-হীন কৃষ্ণের জন্য আমাকে রকম-বেরকম
সহায়তা করেছে অনেকেই; বিশেষ ক'রে—‘বিদ্বান্
ভবানী, ‘বকা’ অশােক, ‘পাবী’ কালা-দা', পল্টন
পােটে, ‘ইংরিজী অখিল, ‘বিযেটাবী ননী, আমােদর
গৌরী, ‘আনন্দের’ টুনু। তা”-বলে আমি এদের
কাবােব কাছে কোন রকমে কৃতজ্ঞ নই, কারণ এরা যে
বন্ধু—সবাই আমার বন্ধু।
৩। লেখক ও পাঠকের সম্বন্ধ
লেখক ও পাঠকের সম্বন্ধ ঘনিষ্টতর হ’বার আশায়, লেখকের অনুরোধ -(১) পাঠক
যেৰ ৰী-হীন কৃষ্ণ সম্বন্ধে তার মতা, লেখককে ঠান্ন (২) সেই মতামতের সঙ্গে
যুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয় এই কাগজ-টুকু—অবশ্য নাম-ধাম সমেত। বকার হলে,
সেই মতামতটী বা তার কোন অংশ লেখক ছাপাবেন।
যার ‘মামতে’ সবার চেয়ে বেশী যুক্তি থাকবে, লেখক তাঁকে তার জিত
“লিীর’ এখন ‘পি-খানি’ সদর উপহাব দেবেন।
২ ।
পাঞ্চে গান
(পাঠক নম্বর)
লেখকের ঠিকানা
৪৯৩ যুগিখালী রোজ,
*..

ঠিকুজী
দ্বিতীয় নাটক—এটি আমার দ্বিতীয় নাটক। প্রথম নাটকের পুৰ্বেই কেন যে
এটি প্রকাশিত হ’ল, তার কারণ ব’লব সেই-দিন, যদি
কখনও প্রথমটী আত্মপ্রকাশ করবার সুযােগ পায় ।
জন্মশ্ৰী-হীন কৃষ্ণ প্রথম সৃষ্ট হয়-১৯২৪-২৫ সালে। অবশ্য তারপরে অনেক
রকমে একে মার্জিত করেছি।
শ্রোতা-আনকোরা অবস্থাতেই এটি আদরের সামগ্রী হয়েছিল আমার অনেক
বন্ধুরই কাছে। তাঁদের মধ্যে একজন আজগেকার
‘অমর’ যতীন-দাস। যতীন প্রথম শ্রোতা হয়েছিল
বােধ-হয়—১৯২৬-২৭ সালে।
‘নবশক্তি’-বন্ধুদের অনুরােধে ও সম্পাদক-মশাইয়ের সহৃদয়তায় শ্রী-হীন কৃষ্ণ
‘কালি-ঝুলি’ মেখে ‘নবশক্তি’তে আত্মপ্রকাশ করেছিল
-১৯২৯-৩০ সালে। বুঝি-বা ‘শিক্ষিত’ সম্পাদক-মশাই
‘বাধ্য হয়ে বুঝেছিলেন যে শ্ৰী-হীন কৃষ্ণকে ‘শ্রী-হীন
অবস্থায় প্রকাশ করাটা এক-রকমের সামঞ্জস্য !--সে
যাই হক, ‘নবশক্তির শ্রী-হীন কৃষ্ণের অনেক শক্তি
অনেক রকমে, লুপ্ত না-হলেও, সুপ্ত হয়েছিল।
উদ্যোগী—তবুও এই নাটকটী পুস্তক-আকারে দেখবার জন্য অনেকেই আমায়
বারংবার অনুরােধ করেছে। কিন্তু বন্ধু ননীর
সহৃদয়তাও অধ্যাপক অবনী বাবুর উদ্যোগ না থাকলে
এখন এ-বই ছাপা হত কি-না সন্দেহ।
ছাপা বইটা ছাপতে লাগল ‘কসে-কম দশমাস দশ-দিন ।
ভূমিকা—ভূমিকা লেখা শেষ হ’ল—জন্মাষ্টমী, ১৩৩৮।
প্রকাশ-পুস্তক আকারে প্রকাশিত হ’ল—শারদীয় বােধন, ১৩৩৮।
প্রকাশক-অধ্যাপক অবনীকুমার বসু, ‘বুষ্টল, ১৬৯ রস রােড, কলিকাতা।
প্রিন্টার—ক্ষিতিশচন্দ্র সান্যাল, সুশীল প্রিন্টিং ওয়ার্ক, ৪৮ পটলডাঙ্গা ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
লেখক-তড়িৎ কুমার বসু, ‘গিরীন্দ্র-গৃহ’, ৪৯৩ মুদিয়ালী রােড, কলিকাতা।

অনুৎসর্গ
অমর যতীন্ দাসকে,
যতীন্-ভাই,
চিরজিবী হ’ আমাদের পূর্ধ্ব-পুরুষরা।
আরে, তাদেরই ত’
উর্বর মস্তিস্ক থেকে একদিন বেরিয়েছিল—মানুষ মরে না : তার
‘স্বটী অমর আর সেইটেই নাকি ভারতের সেরা দর্শন।
বহুত-আচ্ছা, সেই জন্যেই ত আজও তাের সঙ্গে তেমনি হেসে
কথা বলে এত আনন্দ পাচ্ছি যে এখন আর নিজের কাছেও মুখ ফুটে
জিজ্ঞাসা কবা এতটুকু ইচ্ছে পৰ্য্যন্তও হচ্ছে না-‘বাংলার মানুষ
ম’রে বাঁচে, না বেঁচে মরে ?
স্বর্গ ও বাংলা
সে যাই হক, তুই ছিলি পুরুষ। পৌরষত্বের সেরা পরিচয় তার
অবাকরা সেই শেষের অশেষ-শক্তি। স্তম্ভিত ভারত আর্তনাদে সান্ত্বনা
পাবার আশায় সমস্বরে বলে উঠল—যতীন্ মহাপুরুষ। শুধু কি তাই,
সবার সম্মিলিত অশ্রুর তর্পনের স্রোত আন্তরিকতার দাবীতে তাের অমর
আত্মাটীকে স্বর্গের সপ্তম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে, সবাই নিজের বুকের
সাহারার-হাহাকারে ‘শান্তি-বারি’ সেচন করে সামনের অশান্তি দূর
করতে ব্যস্ত হ'ল।

[ ভূমিকা-৬ শ্ৰী-হীন কৃক ; নিষ্কর্মা হলেও, আমি ত’ তােদের চিনি ভাই ; আর অন্তত ‘মনসা” বা-কয়ে স্বর্গে ফোন্ করে সেখানকার অবস্থাটা কতক জানা সৌভাগ্য হয়েছে ! সত্যি কথা, একে ত’ সেকেলে স্বর্ণ, তাতে আবার ‘সুরের-দল’ সদাই সুরাপানে মত্ত : কালে-ভদ্রে নন্দনকানন “নিংড়ে যা” এক-আধ টুকরো কবিতার সন্ধান মেলে, তাও আবার উৰ্বশী-ম্যান কার ‘লাস্যের’ আলস্য-দূষিত। –কর্মীর এসব কি করে ভাল লাগতে পারে, বল্ ?—তাই তােদর মন এত ‘উড়-উড়’: পােড়া স্বর্গে বাস করেও সােনার বাংলার মিলন-পিয়াসী! আবার আবে আচ্ছা, আ-জীবন ‘আগুন’ নিয়ে খেলাই যাদের নিছক আনন, মরণের পর তারা কি এতই বদলায় যে ‘নিৰ্ব্বাণ’ হ'য়ে দাড়ায় তাদের চরম সুখ ! -সে পৰ্য্যায়ের ‘মহাপুরুষ’ অন্তত তুই ন’স। যদি অমর হ’, আমি জানি, স্বর্গ ছেড়ে তুই আবার বাংলায় ফিরে এসে, তাের অসমাপ্ত কাজের ভার নিয়ে আবার ভুগে ম'রে আনন্দ পাবি। তাই ত’ আজ নিতান্ত বিশ্বাসে, তােকে আমার নাটকের পাঠক করে, আর একবার সামান্ত একটু ‘বাংলার-বাণী শােনাতে তাের স্বর্গদ্বারে স্ব-শরীরে এসে হাজির। শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ হা-রে, এ সেই শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ,—যা আমার ‘শ্রী-হন্তের-দাবাক্ষরে পাঠোদ্ধার করে, তুই একদিন তোর ডাগর-কাল-আহলাদী চোখে কেমন-কেমন’ চাউনীর চমকু মেরে, আমার প্রাণে পুলকের সঞ্চারু করেছিলি।

-शैन वृक्ष ভূমিকা শ্রীহীন বাংলা ‘নাটকটী এত ভাল লাগে কেন?-এমন ‘মাথা-ওয়ালা’ প্রশ্নের সােজা উত্তর দেবার ভার ত’ তাের নিজের। আর যদি নিতান্তই আমার অন্তত একটা ‘সদুত্তরের প্রত্যাশা করে থাকি, তবে ব’তে বাধ্য হব যে তুই ‘শ্রী-হারা’ হবার ‘বিরহ’ আ-জীবন হাড়ে-হাড়ে অনুভব করেছিলি কি-না, তাই তাের এ শ্ৰী-হীন’ ভাল লাগে । —কি ব’ললি, বাংলার সবাই ‘ঐ-হারা’ !—শুধু আজ নয়, আট-শ’ বছর ধরে ! জমকাল জেদী -ঠাট্টা কি-রে, এমন ‘বেদ-বাক্যটা তাের কাছে ঠাট্টার মত ঠেল ! কিন্তু ভেবে দেখ,,এমনও ত’ একদিন হতে পারে যে আমার, শতেক’ -হ’, ‘একেক’ ভক্ত সরল-প্রাণে এ নাটকটার একটা মিষ্টি’-মানে ‘অদ্ভূত’-রকমে টেনে এনে আমায় ‘কলা-চুপ, করিয়ে রাখবে। আমার এত বড় একটা বিরাট-ভবিষ্যৎ' তুই বন্ধু হয়ে জলাঞ্জলী দিতে চা! -তবু ব’তে হবে!-নাঃ, এই জন্যেই ত’ ‘সদাশয় শত্ৰু পৰ্যন্তও ‘সুখ্যাতি করে তােকে আখ্যা দেয় যে তুই একটা ‘জমকাল-জেদী’! -ও কি-রে, তাের মুখে হাসি, হাতে ঘুসি !তাহলে দেখছি, আমাদের পরম-পরােপকারী-গার্জেন-সাহেব’ তােদের যে ভয় ক’রুতে শেখায়—তাতে এমন কিছু অন্যায় করে না, বল!

শ্রী-হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা-৮ রক্ষে কক্ ভাই, তাের ওঁচান’ হাত নামিয়ে ফেল: দেহ-তত্ত্বের আইন অনুসারে ‘বান্ধব-ঘুসির’ও কাজ এতটুকুও কম হয় না ! আশ্চৰ্য্য, বান্দা’-দলের মুক্তি-প্রয়াসী হয়ে তুই এত না-ছােড়বান্দা! বেশ ত’, তাের মত কৰ্মীরও সময় স্বর্গে যদি এত সস্তা হয়, তবে -হয় আমার কথামৃত’ শুনে খানিকটা বাজারে-বাণিজ্য করে নে’ দেখ,, শুধু পদ্মিনী-নারী’ নয়, জগতে এমন আরও অনেক কিছু আছে যাদের সৌন্দৰ্য-রূপে, গুণে এবং গন্ধেও। গন্ধ সৃষ্টিকে গন্ধে ভরিয়ে রাখা স্রষ্টার একটা বড় শিল্প, আর সাহিত্য কলারও একটা কায়েমী স্বৎ। তাই যুগে-যুগে কথাশিল্পী অভিনব পন্থার আশ্রয় নিয়েছে তার কথা’র অন্তর এই গন্ধে ভরিয়ে রাখবার নেশায়। কৃতকার্য হয়েছে অনেকেই অনেক রকমে, কিন্তু সবার সেরা কৌশলের আনন্দ দিয়েছে বােধ-হয় ‘মিষ্টিক’ বা ‘মমী লেখক-দল। দর্শনে মর্মবাদ দার্শনিক ‘মরমী’ মরণ-বাচন কৎ করে অনেকদিন আগেই এই অমূল্য তথ্য আবিষ্কার করে বসলেন্ যে আমাদের এই বাস্তব জগতের বাইরে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ সংসারের অতিরিক্ত আর একটা জগত আছে।

শ্রীহীন কৃষ্ণ
[ ভূমিকা-৯
দুঃখের কথা বলি শােন্, সেই অতীন্দ্রিয় বা মনোজগতে, ‘রবি’-ফবি
কোন্ ছার, আমি যে তড়িৎ আমারও দীপ্তি বিকাশ কবার নাকি
ক্ষমতা নেই, কেবল ‘আত্মা’ই সেখানকার একচ্ছত্র দ্বীপ্তিমান্
সম্রাট !
“নতত্র সূৰ্য্যো ভাতি
ন চন্দ্র তারক।
নেমা বিদূতে ভান্তি
কুততায় অগ্নিঃ।”
সভয়ে সন্তর্পণে একদল বাছাই চর’ পাঠিয়ে সন্ধান নিলাম—সেই
‘আত্ম-মহারাজ শুধু সেরা শক্তিশালী নন, সঙ্গে-সঙ্গে তিনি আবার
অচ্ছেদ্য, অদাহ, অক্লে, অশােধ্য, অবক্ত, অচিন্ত, অবিকারী, (চুপ,
হাসি নয় !), আর নিত্য সর্বব্যাপী, স্থির, অচল, ও সনাতন।-
“অচ্ছেদ্যোৎমদাহােয়মক্লেদ্যোয়শােয্য এব চ।
নিত্যঃ সৰ্ব্ব গতঃ স্থানুরচমােয়ং সনাতনঃ ॥”
প্রকাণ্ড আদপ করে বললাম-বন্দেগী মহারাজ, মানুষের
মানস-কুসুম দেবতার বর-পুত্রের চাইতেও যে অনেক শক্তিশালী হয়—
তার চাক্ষুষ প্রমাণ তুমিই !
যাক, এমন শক্তি-সেরা যে রাজর্ষিতার জ্ঞানের যিনি
অধিকারী তিনিই ‘মমী’ বা ‘মিষ্টিক’। সে-জ্ঞান কিন্তু ইন্দ্রিয়ের দ্বারা
লাভ করা যায় না,-রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ দিয়ে আয়ত্ত কবার চিজ,
তিনি
নতার সম্যক্ সন্ধান মেলা সম্ভব বােধ-হয় কেবলমাত্র
‘অনুভূতির মেহেরবানীতে।

[ ভূমিকা-১০ -হীন কৃষ্ণ সাহিত্যে মর্মবাদ সাহিত্যের সহায়তায় এই বিরাট-শক্তির সন্ধান দেবার লােভ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর তার জন্য উপায় উদ্ভাবন হ’লও অনেক রকমের। কিন্তু অতীন্দ্রিয়ের কথাটা সােজা ভাষায় ব্যক্ত করে নিছক দার্শনিকত্বের পরিচয় দেওয়াটা কবি বা সাহিত্যিকের কাছে সম্পূর্ণ সম্মানীয় বলে বােধ হ’ল না। তাই কবি কষ্টের সৃষ্টি করে শুধু রংয়ে, শুধু গন্ধে, শুধু সঙ্কেতে এই অতীন্দ্রিয়ের সন্ধান দেওয়া কতক সামঞ্জস্য মনে করে তৃপ্তিতে করৎ করতে লাগল। এমনি করে দর্শনের অতীন্দ্রিয়-বাদ কবিতায় কতক ইন্দ্রিয়-বাদে পরিণত হ’ল।-- সে যা’ হক, এদেশে ‘ওস্তাদ আখ্যা পেল সে-যুগের বৈষ্ণবের জন-কয়েক ‘মহাজন’, ও এ-যুগের ‘বৈষ্ণবের বংশােধর ব্রাহ্ম-রবীন্দ্রনাথ । এ দু’-যুগের লেখকদের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড প্রভেদ এই যে ধৰ্ম্ম-প্রচারের জন্য বৈষ্ণবেরা সাহিত্যের আশ্রয় নিয়েছিল, আর সাহিত্য-প্রচারের জন্য রবীন্দ্রনাথ ধৰ্ম্মের আশ্রয় নিয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথ ‘কবি’, আর বৈষ্ণবের ‘মহাজন। দর্শন ও সাহিত্য সুতরাং এখন বেশ ধারণা ক’তে পাচ্ছি যে- যে ভাবের ওপর দর্শন এতদিন ধরে এত আস্থা করে এসেছেতার সম্যক্ খোজ দেবার ক্ষমতা ইন্দ্রিয়ের নেই। তাই অতীন্দ্রিয়-বাদ দর্শনের এত পেরে ‘ভাব।

-হীন কৃষ্ণ
ভূমিকা-১১
সাহিত্যিক কিন্তু অতীন্দ্রিয়বাদকে দর্শনের সম্মান দেয় না, এবং
দেওয়াও দরকার বিবেচনা করে না। সাহিত্যিক যখন দেখে, কোন কবি
তার কোন কবিতাকে এমন গন্ধে, এমন রংয়ে, এমন সঙ্কেতে ভরিয়ে
রাখতে সক্ষম হয়েছে যে সেই কবিতা একটা কোনকিছু সু-ভাবের
সন্ধান দেয়,তখনই সে তার—সেই কবিতাকে সুখ্যাতি করে।
সত্যই, দর্শনের প্রিয় এই ভাবটী’, কিন্তু সাহিত্যের প্রিয়
এই ভাব নয়—এই ভাবের সঙ্কেত, করবার পন্থা। শুধু ভাষায়,
রংয়ে, গন্ধে, বা সঙ্কেতে একটা ভাবের সন্ধান দেওয়া যে সম্ভব— এইটেই
সাহিত্যের একটা ক্যাদার কৎ।
বিশ্ব-প্রেম ও স্বদেশপ্রেম
আচ্ছা, রকম-বেরকম ভাবের অভাব ত’ জগতে নেই, তবু
মরমী’-সাহিত্যিক তার সৃষ্টির মধ্যে কেবলমাত্র স্রষ্টার ভাবের সঙ্কেত দিতে
ব্যস্ত হয়েছিল,—কেন জানিস্ ?—তার প্রথম কারণ, ‘মর্মবাদটাই দর্শনের
কাছে সাহিত্যের কৃতজ্ঞতা ; আর তার দ্বিতীয় কারণ, পুরাণে। সেই ধৰ্ম্মের
যুগে ধর্মটাই ছিল সেরা ভাব।
আজ কিন্তু কর্মের যুগে দরূদী ‘ধৰ্ম্ম-বিবি’ আর তেমন তােয়াজ, পান
না। কৰ্ম্মী আজ চায় কৰ্ম্ম। তাই আজ কর্মীর কাছে কি বিশ্ব-প্রেম
কি বিশ্বনাথ-প্রেম—দুটোই সমান
নিস্তেজ। সত্যই ত’, কর্মের
প্রশস্ততা কম্পিটিশনে।
কম্পিটিসনের বেশী প্রিয় বিশ্ব-প্রেম হতে
স্বদেশ-প্রেম।
তাই আজ কৰ্ম্মীর সেরা জ্যান্ত ভাবতার
কৰ্ম্ম-সহায়ক স্বদেশপ্রেম!

[ ভূমিকা-১২ -হীন কৃষ্ণ 6 এ ত’ গেল সাধারণ যুক্তি, এ ছাড়াও একটা দার্শনিক যুক্তি শুনবি?- -দেখ, দর্শনের বিভিন্ন মত, ত’ আছেই, এবং একের দৃষ্টিতে অন্যের মতের গলদও যথেষ্ট। তাই না-কি, এক বার জন-কয়েক দার্শনিক মিলে সবার চেয়ে ভাল-মতের সন্ধান করূতে লাগল। তাদের ভাল দর্শন সিদ্ধান্তই হল শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের অনুরূপ। সে-যাই-হক, কৃষ্ণের দর্শন খৃষ্টের বা অন্যের চেয়ে যে বড় তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ কৃষ্ণ ওদের মত ইন্দ্রিয়কে একেবারে নষ্ট করে জগতে অনাসৃষ্টি ঘটাতে চায়নি—সে চেয়েছে জীবন্ত ইন্দ্রিয়ে সংযম। এখন দেখ, পশু-ক্ষমতা ও বিবেকতায় মিলিয়ে ত’ মনুষ্যত্ব। সুতরাং মানুষের মধ্যের পশু-ক্ষমতাকে একেবারে নষ্ট করতে যাওয়া ছােট-দরের দর্শন, আর সেই পশু-ক্ষমতাকে হত্যা না-করে তাতে সংষম মনুষ্যত্ব বিস্তার করাই–বড়-দরের দর্শন। এখন একটু ভাবলেই বুঝতে পাবি, বিশ্ব-প্রেমের উদ্দেশ্য মানুষের পশু-ক্ষমতা ধ্বংশ করা,অর্থাৎ মনুষ্যত্বকে অঙ্গহানী করা। তাই এই মনুষ্যত্ব-হানীকর বিশ্বপ্রেমকে যতই-না-কেন বিশ্বপ্রেম মনুষ্যত্ব রঙ্গিন তুলিকায় চি-চিকে ফুটফুটে করা হ’ক, মানুষের হানীকর মত মানুষের কাছে তা সর্বদাই হেসে ওড়াবার কথা মাত্র। আর একদিকে চেয়ে দেখ,—স্বদেশ-প্রেম। এ প্রেম মানুষের পক্ষমতাকে ধ্বংশ করে না,-সংযত করে; কারণ স্বদেশপ্রেমের সংগ্রামও একের ঔদ্ধত্য নয়, সঙ্ঘ-বিচারের অবশ্যম্ভাবী স্বদেশ প্রেম সিদ্ধান্ত। তাই এই মানবতাময় স্বদেশপ্রেমে বিকারগ্রস্থ মনুষ্যত্ব সহায়ক বিশ্বাস-ঘাতকের-দল যতই-না-কেন কালিমা লেপন করুক, এপ্রেম মানুষের মত মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশিত কবা চরম পন্থা।

-হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা—১৩ সত্যই, বিশ্বের ও বিশ্বনাথের পূত পূজার প্রধান ডালি তার স্বদেশপ্রেমের পবিত্র অঞ্জলী,-এ কেবল তার অন্তরের বিশ্বাস নয়, তার জ্ঞানের পূর্ণ বিকাশও। তাই ত’ আমি অত’ আদর করে বরণ করে নিলাম এই স্বদেশপ্রেমের মরমী-কবিরা যেমন তাদের সৃষ্টিকে স্রষ্টার শুধু সঙ্কেতে ভরিয়ে রাখতে চেয়েছে, আমিও তেমনি আমার সৃষ্টিকে স্বদেশপ্রেমের গন্ধে ভরিয়ে রেখেছি ;—হ, ভরিয়ে রেখেছি কিন্তু শুধু গন্ধে নয়, ভাবে-ভাষায়—সবরকমেই। তাই ত আমার সৃষ্টি তােদের এত আনন্দ দেয়। ভাবটী। এই গন্ধের-আট বিশ্লেষণ করা সবার কাজ নয় সত্যি,-তা’ বলে এ গন্ধ অনুভব কবার ক্ষমতা অনেকেরই আছে। তাই ত’ জন-কয়েক পাঠক এর মধ্যেই রায় দিয়েছে—-হীন কৃষ্ণ কেমন এক রকম বেশ চমৎকার লাগে”। নাটকে নূতন রূপ এই, শুধু স্বদেশপ্রেমের নামেই তাের মুখ-ময় যে অপূৰ্ব জ্যোতি বিকশিত হচ্চে,—তাতে আমি সব ভুলে শুধু চেয়েই আছি ঐ মধুর মুখ-থানির পানে, আর মনে-প্রাণে অনুভব ক’ছি—সত্যই আমার নাটকের ভাব অমৃতের উৎস। তার ওপর দেখ, নূতনত্ব শুধু গন্ধে, ঢংয়ে, ভাষায় পর্যবসিত করে আমি স্বস্তি পাই নি,আমি অনেক সন্ধান করেছি রূপেরও!- { ভুমিকা-১৪ -হীন কৃষ্ণ ও-কিরে, উঠি নি, পালাস নি,- ওরে, এ সে রূপ নয়, নারীর রূপ নয়,–এ নাটকের রূপ ;-এরূপে তাের মত আজন্ম সন্ন্যাসীর সতীত্ব এতটুকুও টুটবে না ? মন দিয়ে শােন্ তবে নাটকীয় রূপের এক-নিশ্বাসী ইতিহাস- বিশ্ব-সাহিত্যের সব জায়গাতেই সাধারণ কথােপকথন’ যখন ‘নাটক’ নামে উন্নত হ’ললেখকদের তখন লক্ষ্য হল তাদের ভাব ফুটিয়ে তােলা শুধু ‘চরিত্রের মধ্য দিয়ে। কত-দেশে কত-যুগ ধরে কত-লেখকই না এই চরিত্র-অঙ্কনের চেষ্টায় আত্মনিয়ােগ করেছে। এদের কালিদাস মধ্যে কৃতকাৰ্য্যতার পূর্ণ-বিকাশ উপলব্ধি করা যায় প্রাচ্যে সেপিয়ার কালিদাসে ও পাশ্চাত্যে সেপিয়ারে। সেই যাই হক, ‘রূঢ়’ (Crude) বিষয় নির্বাচন করা চরিত্র-নাটকের প্রথা ছিল। ইবসেন এই ‘রূঢ়’ বিষয় নির্বাচনের বিরুদ্ধে মাথা তুলে, ইবসে প্রথম জগতে দেখিয়ে দিলে যে সাধারণ জীবনের নিত্য-নৈমিত্তিক সুখ-দুঃখ নাটকের পক্ষে অন্তরায় ত’ নয়ই, বরং বেশ সহায়ক। সুতরাং এই নবীন-নাট্য-অষ্ট। তার নাটকে একটা সাধারণ ভাব বা সমস্যা (Problem) ফুটিয়ে তােলার জন্য, স্বাভাবিকতার (Realism) সাহায্য নিয়েছিল। তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এই সাধারণ ভাব বা সমস্যাটা ফুটিয়ে তােলা, আর সে বুঝেছিল যে তার এই উদ্দেশ্য সফল হবে স্বাভাবিকতার মধ্যে দিয়ে। তাই সে স্বাভাবিকতার মায়া রচনা করেছিল তার ভাব বা সমস্যা বিকাশের সুবিধার জন্য ; নতুবা নিছক স্বাভাবিকতায় তার কোন সাতন্ত্র লােভ ছিল না।

ঐ-হীন কৃষ্ণ
[ ভুমিকা-১৫
সে যাই হক, ভাব-ফোটানো যখন নাট্য-শিল্পের মূখ্য উদ্দেশ্য,
তখন শুধু “চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেই ভাব ফুটিয়ে তােলার চাইতে,
ঘটনা-সৃষ্টির দ্বারায় সেই মুখ্য উদ্দেশ্য সম্পন্ন করা, নবীন-নাট্য-গুরুর
কাছে ঢের বেশী কাৰ্য্যকারী প্রতিপন্ন হ’ল। কাজে কাজেই ইবসেন
হলেন ‘ঘটনা-সৃষ্টি-মুলক’ নাটকের প্রবর্তক ও নাটকে
স্বাভাবিকতার প্রদর্শক।
এই ধরণের নাটকের একটা মস্তবড় গুণ এই যে এরা মানুষের
মনের-ক্ষুধা মেটানাের সঙ্গে-সঙ্গে অলক্ষে মস্তিষ্ক চালনা করিয়ে আনন্দ
বর্ধন করে; আর-একটা মস্তবড় সুবিধা এই যে এরা
সিচুয়েস-নাটক অল্প সময়ের মধ্যে পাঠক বা দর্শকের মস্তিষ্কে ভাবের চালনা
করিয়ে দিতে সক্ষম হয় ।
তার প্রধান কারণ এই-ধরণের
নাটক গঠনে অন্য-রূপের মত ‘চরিত্র’-বজায় রাখার উদ্দেশ্যে যে সমস্ত
‘হাবি-জাবি’ কথার প্রয়ােজন, সে-সব উত্থাপনার প্রয়ােজন এখানে
একেবারেই হয় না।
কর্মী ইয়ােররাপের পক্ষে সময়ের পানে নজর রাখাই স্বাভাবিক।
তাই সারা ইয়ােরােপ এই ধরণের নাটকের নেশায় ভাে হয়ে
উঠল। দেশে দেশে কত শত লেখক ইবসেনের
মুক্তধারায়
ইউরােপ,
মুক্তধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে আরও অনেক নবব
রূপের সৃষ্টি করতে ব্যস্ত হ’ল।
ফরাসী নাট্যকাররা চরিত্র-নাটকের সব ‘চক্রান্ত দূর করে দিয়ে
তাদের গল্পে ও প্লটে ‘সরলতা সৃজন ক’ল; কিন্তু কথােপকথনে
সম-পরিমিততার (Symmetrical-Diologue) কায়দাটাই
নাকি তাদের বাই’ হয়ে দাড়াল।
• ফরাসী

[ ভুমিকা—১৬,
-হীন কৃষ্ণ
পর্তুগালের স্ট্রাইবাগ এই কথােপকথনের সম-পরিমিততায়
অপ্রাকৃতিকতার উচ্ছেদ করে, তার চরিত্রগুলােকে
স্ট্রাইণ্ডবার্গ
আরও স্বাভাবিক করবার চেষ্টা ক’রূল।
কিন্তু এই চরিত্রগুলােকেই একেবারে ‘হাওয়া করে ছাড়ল
মেটালিঙ্ক। ভাব’টাই তার কাছে সৰ্বস্ব। আর সব উপেক্ষা করে,
সে সেই-ভাব ফুটিয়ে তুলতে গেল—শুধু সঙ্কেতে, শুধু প্রতীয়ে বা ‘সিম্বলে
(Symbol)। সত্যই মেটালিঙ্ক, ভাবের ‘এক্সটি মিষ্ট
মেটারলিঙ্ক, (Extremist) পূজারী,-তাই সম্বন্ধে ‘শিল্পী’ অবনীন্দ্রনাথের
‘ভায়রা-ভাই’, আর ‘রক্তকরবী’-লেখকের বােধ-হয় নিকট
আত্মীয়! সে যাই হক, সব-চেয়ে অল্প ‘স্থানে’র (Space) মধ্যে ভাবের-উৎস
নিবদ্ধ করে রাখাটাই চিত্র-শিল্পের আকাঙ্খা। তাই প্রতীক বা সিম্বল
চিত্র-শিল্পের একটা মস্তবড় শক্তিশালী অবলম্বন। কিন্তু নাট্য-শিল্পের
স্থান’ (Space) ত’ বেশকিছু প্রশস্ত। তাই তাতেও এই প্রতীটাই
যদি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, তবে হয়ত সেটা ‘নাট্য-রূপী-সাহিত্য’ হওয়া সম্ভব,
কিন্তু সত্যিকারের নাটক’ কখনই হয় না।
সবার ওপরে টো-তুরুপ, ক’বলে কিন্তু আইরিসের বার্ণাড়-শ’,-
শুধু তার বুদ্ধির প্রমানে নয়, শুধু তার সােসিয়ালিসয়ের
বার্ণাড়শ
(Socialism) জোরে নয়; তার নাটকগুলাে হাস্য-রসে
পরিপূর্ণ করে রাখার জন্যেও। তাই তার পাঠক আমােদ পায়,
আনন্দও পায়।

-হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা-১৭ সবার চেয়ে বেশী ‘বিদ্রোহের চমক’ মারুলে কিন্তু জাৰ্ম্মাণীর হপম্যান্। সে প্রমান ক’রূতে ব্যস্ত হ’লনাটকে কোন দ্বন্দ্ব, কোন চটক, কোন আড়ম্বর, কোন কৃত্রিমতা ত’ থাকবেই না,—এমন কি, নাটক মার্জিত করা দোষ,-নাটকের বিষয়’ (theme) নির্বাচন করা অনুচিত,কারণ এ সব প্রকৃতি-বিরুদ্ধ—এ সবে নাটকের মধ্যে নাট্যকারের ব্যক্তিত্বের বিকাশ পায়। তাই ভাব, সমস্যা, বা বিষয়-নিৰ্বাচন একেবারে অনাদরে দূরে সরিয়ে হপম্যান প্রাকৃতিক তা’র (Naturalism) হপম্যান্ পূজায় আত্ম-নিয়ােগ ক’ল,—সাধারণ জীবনের সরল দৃশ্য। পৰ্য্যায় পর পর্যায় সে দেখাতে ব্যস্ত হল। ‘প্রাকৃতিক-পূজারী’র চিন্তা-ধারা চিক্‌-মিকিয়ে উঠল –“কই, মানুষের জন্ম ত’ আর্টের মুখ-চায় না, মানুষের মৃত্যু ত’ আর্টের তােয়াক্কা করে না,তবে কি দুঃখে নাটক আর্ট-মুখাপেক্ষী হবে ?”—সে যাই হ’, ইবসেনের কাছে ভাব বা সমস্যা ছিল মুখ্য, হপম্যানের কাছে ‘প্রাকৃতিকতা’ হয়ে দাঁড়াল মুখ্য। ইবসে ‘স্বাভাবিকতা বেছে নিয়েছিল তার সমস্যা ফোটাবার সুবিধার জন্য, হপ ম্যান্ ‘প্রাকৃতিকতা বরণ করেছিল কারণ এইটেই তার মূর্ত-শিল্প। t যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধিভবতি তাদৃশী, -তাই হপ ম্যানের নাটক হ’ল বড় স্বাভাবিক, বড় ‘আপন-করা, আর তার কথাগুলাে নাকি জীবন্ত। তবুও এই প্রাকৃতিক-পূজারী’কে ব’তে ইচ্ছা করে-ধীরে,-রজনী ধীরে”!-নাট্য-পূজারী, তুমি কি জানন, ‘ম্যাডােনা’র মাতৃত্ব-ভাব বাদ দিলে পড়ে থাকে শুধু কালি-ঝুলির কসরৎ, ‘তাজমহলের মােজ-ভাব ছেড়ে দিলে পড়ে থাকে শুধু সাহাজানের ইট-পাথর? সত্যই ‘ফটো’ আর ‘পেটিংয়ে’ আসমাজমী ফরা। বিশেষত আমরা ভারতবাসী, ভাবের উপাসক,তাই জাৰ্মাণ লেখকের এই ‘প্রাকৃতিক বেয়াদপী বরদাস্ত ক’তে নিতান্তই নারাজ।

[ ভূমিকা-১৮
-হীন কৃষ্ণ
রঙ্গমঞ্চে উপেক্ষা
৩
সে যাই হক, নব-যুগের এই ‘মুক্ত’ নাট্য-শিল্পীদের হাজার গুণের মধ্যে
অনেকেরই একটা মস্তবড় দোষ এই ছিল যে, এর রঙ্গমঞ্চ প্রায় উপেক্ষা
করে এদের প্রতিভার পথে এগিয়ে চলতে চেয়েছিল। ফলে দাড়াল
রঙ্গমঞ্চ-টেকনিকের অনাদর, ও নাটক-রূপা এক সাহিত্যের উদ্ভব। সত্যিই
এই ‘নাট্য-সাহিত্যের কয়েক-খানা জগত-সাহিত্যের উজ্জ্বল রত্ন,এই
‘নাট্য-সাহিত্যিকের কয়েকজন সকল দেশের গৰ্ব্ব : তবুও একথা ধ্রুব
সত্য যে রঙ্গমঞ্চ এদের দ্বারা সাহায্য পেয়েছে খুব কম। তাই এদের দ্বারা
এদের স্বদেশের রঙ্গমঞ্চের উন্নতি একেবারে একটুও হয়েছে কি-না তাও
ভেবে বলতে হয়।
.
রু
এদের চেয়ে কিন্তু টের কম প্রতিভা নিয়ে, নব-জাগ্রত কুসিয়ার
লেখকদল, একদিকে যেমন কুস-রঙ্গমঞ্চকে জগতের শীর্ষস্থান অধিকার
ক’তে অকাতরে সহায়তা করেছে, অন্যদিকে তেমনি ‘রুস্সাহিত্যকে
নব-নব রূপে পরিপুষ্ট করবার সাধ্যমত চেষ্টাও করেছে।
সত্যিকারের নাটক
+
সত্য কথা বলতে কি, নাটকের উদ্ভব ও স্থিতি প্রথম
‘বাচ্যাভিনয়ে’র উপদান হিসাবে, তারপর সাহিত্যের সম্পদ হিসাবে।
.

-হীন কৃষ্ণ [ ভুমিকা-১ সাহিত্যের পরিপুষ্টতার জন্য হাজার গঠন-প্ৰনালী বর্তমান, বাচ্যাভিনয়ের পরিপুষ্টতার জন্য কিন্তু কেবল মাত্র নাটক ভিন্ন অন্য কোন উপাদান নেই। সুতরাং নাটককে শুধু নাট্য-রূপী সাহিত্যে রূপান্তরিত করবার প্রচেষ্টা বাচ্যাভিনয়ের উন্নতির পক্ষে যথেষ্ট পরিপন্থা। তাই প্রত্যেক নটরাজ-ভক্তের এই সব রঙ্গমঞ্চ-উপেক্ষা-কারী নাট্য-সাহিত্যকে নেক নজরে দেখা উচিত কি-না ভাববার কথা। সে যাই হক, সত্যিকারের নাটক একদিকে যেমন রস-সৃষ্টি করূবে অন্যদিকে তেমনি অভিনয়ের উৎকর্ষ সাধনে সম্যক সাহায্য করবে। শুধু রঙ্গমঞ্চ-চালু’ কেতাব (Stage-Suceess) যেমন নাটক নয়, শুধু নাট্যরূপী-সাহিত্যও তেমনি নাটক নয়। টেকনিক বা গঠন-প্রণালী সুতরাং প্রকৃত নাটক সৃজনের গঠন-প্রণালীর উপর বিশেষ লক্ষ্য রাখা দরকার অন্ততঃ দু’টা বিভিন্ন দিক দিয়ে—প্রথম—(১) রস ; দ্বিতীয়—(২) অভিনয়। ছােট-খাট আরও অনেক গুণের মধ্যে এই দুটো মুখ্য গুণের সমন্বয় খালে—তবে সত্যিকারের নাটকের সৃষ্টি হয়, আর সেই নাটকের স্রষ্টা সত্যিকারের নাট্যকারের সম্মান পায়। কিন্তু মুস্কিল কি জানিস, এই দুই মুখ্য গুণের প্রত্যেকটাতেই যদি কোন শিল্পী জন্মগত অধিকারী না-হয়, তবে তার পক্ষে নাটকের চরম পরিণতির পানে অগ্রসর হতে যাওয়া বিড়ম্বনা। কারণ, কি লেখক, কি অভিনেতা প্রত্যেকেই ‘জন্মগত অধিকারী’ “(born)। তাই বলে এই জন্মগত অধিকারীত্বের ভূমিকা-২০] ঐ-হীন কৃষ্ণ সত্যই, সঙ্গে উৎকর্ষণার (Culture) সংযােগও না-হলে আজগেকার দিনে সত্যিকারের নাট্যকার হয়ে দাড়ান দুষ্কর। বর্তমান যুগের নাট্যকারকে হ’তে হবে ‘born and made',-born and not-made' নয় : তার অন্তরে পূর্ণ থাকা চাই জন্মগত নাট্য-উৎস, বাহিরে বিশ্বব্যাপ্ত শিক্ষা। সে যাই হক, প্রকৃত নাট্যকারের মধ্যে রস-সৃষ্টি গুণের সঙ্গে-সঙ্গে বর্তমান থাকা চাই অভিনয়ের গুণ,-তা’ সে গুণ ব্যক্ত বা অব্যক্ত যাই কেন হ'ক না। এই শেষােক্ত গুণের অভাবেই বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ কবি আমাদের রবীন্দ্রনাথও নাট্যকার হিসাবে খুব বড় নন। এখন এই দুই গুণের মাপকাটীর বিচারে যে টেকনিক্ বেশ সুন্দর ও সুবিধাজনক প্রতিপন্ন হবে, সেই টেকৃনিই ভাল,তা হয় হ’ সেটি সেক্ষপিয়ার-ইবসেনের টেনি কিম্বা একেবারে নূতন অন্য কিছু। আদত, কথা কি জানিস, নাট্যকার যে রস সৃষ্টি করতে চায়, তার লক্ষ্য থাকা উচিত, তার নিজের ব্যবহৃত বা পরিকল্পিত টেকনিকের মধ্যে সেই রস-সৃষ্টির সুবর্ণ সুযােগ আছে কি-না ; আর সঙ্গে-সঙ্গে সেই টেকনিকে অভিনেতৃবর্গ সেই রস-সৃষ্টি করতে সুযােগ পায় কি-না। এখন দেশ-কাল-পাত্র ভেদে, বিজ্ঞান ও ভাষার উন্নতির সঙ্গে-সঙ্গে অভিনয়ের টেকনিকের পরিবৰ্ত্তন হওয়াই স্বাভাৱিক ও সমীচিন। তাই সঙ্গে-সঙ্গে নাটকের টেকনিকেরও পরিবর্তন হওয়াটাই যুক্তি। সুতরাং কালিদাস—ভবভূতি-সেক্ষ পিয়ার-ইবসেন কিম্বা বর্তমান বার্ণাড়শ’ বা রুসের নাটকের টেনিকে একেবারে নিজেকে পৰ্য্যবসিত, করে রাখাট। কোন নবীন নাট্য-স্রষ্টার গৌরব বা আকাঙ্খার বস্তু হওয়া উচিত ত’ নয়ই, বরং দাসত্বরূপী মনের পরিচায়ক হওয়াই সম্ভাবনা।

হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা-২১ শিক্ষার-দাসৰ (Cultural Slavery) এত সােজা কথাগুলো বাবা কেন বলছি ?-এই তুই আমায় হাসালি! ওরে দেখ, রাজনৈতিক দাসত্বের (Political Slavery) মুক্তির জন্য তােরা অনেকেই প্রাণ উৎসর্গ করে অনেক কিছু কাজের-কাজ করেছি; কিন্তু জানিস্ কি, শিক্ষার দাসত্ব (Cultural Slavery) সারা বাংলা জুড়ে কত অঘটনই-না ঘটাচ্ছে :-জানিনা কবে কোন্ শুভক্ষণে কে-যে তার প্রাণ উৎসর্গ করে এই শিক্ষার দাসত্বের মুক্তির পথ প্রশস্ত করে রাজনৈতিক দাসত্বের মুক্তি পূর্ণ-অর্জন কবার সহায়তা কবে! দুঃখের কথা বলি শশা-আজকের দিনেও আমাদের রঙ্গমঞ্চ পুরােমাত্রায় সেক্ষপিয়ার-কালিদাসের পুণ্য নামের শ্রদ্ধ-অপমান “সুসম্পন্ন করেই বেশ সুখ অনুভব করে, কলেজের কর্তারা ত’ শুধু সেপিয়ারের চমৎকারিত্ব দেখানই নাট্য-শিক্ষার-চরমত এই সিদ্ধান্তে পোঁছে বসে আছেন ; বিধাতার হাত ফসকে যাও-বা দু’-চাটে পাঠক বা লেখক নবীনতার নেশায় (?) ক্ষণেকের জন্য ভরপুর হয়ে ওঠেন, তারাও আবার চেয়ে বসেন, হয় শ’-ইবসেন্ টেকনিক, নয় ত’ একেবারে কুসিয়ার টেকনি। কাউকে কিন্তু কখনও নিমেষের জন্য ব’লতে শুনিনি-“আর আর দেশের নাটক ‘এতটা এগিয়েছে, আমরা আমাদের নাটকে চাই, এ নূতনত্বের চেয়ে আরও নূতন ভাব, আরও নূতন রূপ”।

[ ভূমিকা-২৫ -হীন কৃষ্ণ নাটকের অভাব সে-কথা সত্য ভাই, দুঃখের কথা হলেও আমি মানতে বাধ্য যে আমাদের ভাল নাটক খুব কম। নাটকের এই অভাবের কারণও অনেক। তার মধ্যে প্রধান দুইটী-(১) আমাদের রঙ্গমঞ্চ (২) রঙ্গমঞ্চকে উপেক্ষা। 1 সত্যই গিন্নীশের মুগের পর হতে আজ পর্যন্ত আমাদের রঙ্গমঞ্চ নবীন নাট্যকারদের শুধু সাধ্যমত অনাদর করে ক্ষান্ত হয়নি, আবার মাঝে মাঝে ক্ষমতা প্রাপ্ত রঙ্গমঞ্চ-লেখক-দল (Play-wrights) এই সব নবীন নাট্যকারদের প্রতিভার উন্মেসের পরিচায়ক স্থানগুলি ‘না-বলে-নিয়ে তাদের প্রতিভাকে “মুকুলে-ঝরিয়ে দিয়েছিল। রঙ্গমঞ্চ-ইতিহাসের এই অধ্যায়ে কত নবীন লেখকের অশ্রুরাশির ও দীর্ঘনিশ্বাসের অজানা ইতিহাস মে মিলিয়ে আছে—তার ইয়ত্তা কে রাখে ? -তাই বুঝি নাটকের এই দুর্দশা ! সে-দিন,এই বছর কয়েক আগে,-এক শিক্ষিত-সম্প্রদায় রঙ্গমঞ্চের উন্নতির জন্য নবীন নেশায় ভরপুর হয়ে নটরাজের নৈবেম্ভ সাজিয়ে নিজেদের বিলিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়েছিল ;-তখন সবাই কত-না রঙিন আশা নিয়ে তাদের পানে তাকিয়েছিল। সত্যিই তাদের কারও বিদ্যা ছিল, কারও বুদ্ধি ছিল, কারও ক্ষমতা ছিল, কারও রূপও ছিল। উন্নতিও যে তারা কিছু করেনি—এমন নয়। তবু তারা কাজের-কাজ করেছে খুব কম। তার প্রথম কারণ তাদের অনেকেরই মধ্যে [ ভুমিকা-২৩ “ব্যক্তিত্ব বিকাশের” উন্মাদনা এসে প্রতিপত্তি করেছিল। এই “ব্যক্তিত্ব বিকাশের উন্মাদনার” বশেই তারা ভুলে বসেছিল যে অভিনয় ‘সঙ্খ-সাধনা” (team-work),-নাটকেরও চরম উদ্দেশ্যর সাফল্য এই “সঙ্খ-সাধনাতেই। আচ্ছা এখন বলত’ ভাই, সেদিন যখন বর্তমান বাংলার শ্রেষ্ঠ-নট শিশির কুমার, নবীনতার নামে ও ধাপ্পাবাজীতে, নটগুৰু গিরিশচন্দ্রের বুকে “চাকু”-চালিয়ে তাঁর ‘জনা’র “বিশ্বাসী” ‘বিদূষক’কে প্রায় “নাস্তিক” প্রতিপন্ন করে ছেড়ে ছিলেন, সেদিন গিরিশ স্বর্গে বসেও সজল চোখে ব্যথিত মুখে দীর্ঘ শিশিরকুমার নিশ্বাসের সঙ্গে-সঙ্গে কেঁদে উঠেছিলেন কিনা—“উঃ-”! সত্যি কথা বলতে কি ভাই, শিশিরের সবার বড় দোষ নবীনতার নাম নিয়ে এই “চাকু-চালানো”। নূতন নাটকের সৃষ্টির সাহাষ্ণ ত’ তিনি এতটুকুও করেন নি, বরং পুরাতনের ওপর এই “চাকু-চালিয়ে বেশ অমর্জাদাই করেছেন। আরে তাও কি কখনও হয়,-লেখায় সৃষ্টি করার ক্ষমতা যার নেই, সে কি শুধু পুরাতনের ওপর “চাকু-চালিয়ে নবীনতার সৃষ্টি করতে পারে ? নব-যুগের রঙ্গমঞ্চের উপযােগী টেকনিকের সৃষ্টি ক’রুতে হলে তাকে অভিনেতা হতে হবে-লেখকও হতে হবে। নতুবা পুরাতনের ওপর কলম চালাতে যাওয়া শুধু বিড়ম্বনা। সে যাই হক, দুঃখ এই যে এই নবীন সম্প্রদায় বেশ শিক্ষিত হয়েও পুরাতন নাটকের যথেষ্ট অমর্জদা করেছেন ও নতুন নাটকের সম্যক্ আদর করেন নি। সত্যি কথা বলতে কি, গিরিশের পর এল ‘গাঁজার-যুগ’! তারপর এল ‘মদেরঘুগ’ :—এই হচ্চে রঙ্গমঞ্চের দুধের ছােট্ট ইতিহাস।

f ভূমিকা-২৪ दी-शेन कृत উপন্যাসী নাটক দেখ, পূজারীকে যখন পূজার ঠা বজায় রাখতে হয়, অথচ পূজায় তার মন-প্রাণ লেগে থাকে না, তখন তাকে পূজা ক’তে হয়, দেবতার স্থানে, হয় উপদেবতা, না-হয় প্রাণ-হীন কোন পাথর। আমাদের শিক্ষিত নটরাজ পূজারীদেরও হয়ে দাড়াল ঠিক সেই অবস্থা। পেট-কাওয়াস্তে হ’ বা অন্য কোন কারণেই হক, তাদের অভিনয়ের ঠাটটা ঠিক বজায় রাখতে হ’ল, অথচ তারা তারা নূতন-নাটক-সৃষ্টিতে যথেষ্ট অনাদর ও ঔদাসিন্য দেখাল : কাজে কাজেই ‘উপদবতা এসে জুটুল,—উপন্যাসকে রূপান্তরিত করে অভিনয়ের ঠাট বজায় রাখতে হ’ল। অর্থাৎ এই ‘শিক্ষিত’ অভিনেতারাও, ‘আত্ম-বিশ্বাস হারিয়ে নটরাজের অপমান করে, নিজেদের অন্নের সংস্থান করতে লাগল এই-সব ঔপন্যাসিকের “নাম বিক্রয় করে। এই সব উপন্যাস-উপদেবতায় এত নজর পড়লে নট-দেবেরও দুর্ভিক্ষে-অনাদরে কাহিল হওয়াই স্বাভাবিক। সূতরাং উপন্যাস-উপদেবতার সেবা যে কোন নটরাজ-পূজারীর লজ্জার বিষয়,—তার প্রধান কারণ, এই প্রথা উপযুক্ত নাটক-উদ্ভবের পক্ষে প্রকৃষ্ট অন্তরায়। এমনি ধারা রূপান্তরিত উপন্যাসের অভিনয় যতই কৃতকার্য হবে, সত্যিকারের নাটক উদ্ভবের পথ ততই দুর্গম হয়ে দাড়াবে। সত্যিই দুঃখের কথা, এই অন্তরায়ের পােক বাংলার ‘শিক্ষিত নট-সঙ্খ,—কিন্তু কান্নার কথা এই অন্তরায়ের সহায়ক বাংলার শিল্পী ঔপন্যাসিক-সজ্জও। অন্তত শিল্পী শরৎয়ে’ এ ধারনা থাকা উচিৎ যে -হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা--২৫ শরৎচন্দ্র উপন্যাসের উদ্দেশ্য বা ধারা এক, নাটকের একেবারে স্বতন্ত্র। সুতরাং ভাল উপন্যাস ভাল নাটক না-হওয়াটাই যুক্তি : সুতরাং উপন্যাসকে রূপান্তরিত করে নাটক সৃষ্টি ক’তে যাওয়ার প্রথাটাই নাটকের উন্নতির পক্ষে অন্তরায়। এ সব জেনেও, শরৎ “শিল্পী” হয়েও, স্বেচ্ছায়,—শুধু ‘ম্যাম (Mammon) সাহেবের অনুরােধে,—নাট্য-শিল্পের অবনতির জন্য তার নাম এগিয়ে দেওয়াটাকেই আমি অ-শিল্পীর কাজ মনে করি ও দুঃখ পাই। এর চেয়ে শরৎ যদি তার সাধ্য মত একটী নাটক রচনা করে নটরাজের নৈবেদ্য সাজাতে বসে অকৃতকার্য হতেন,তবুও শ্রেষ্ট ঔপন্যাসিক শরৎয়ে’ শিল্পত্বের অভাব ভাববার মত দুর্ভাগ্য আমার একেবারেই হত না। রঙ্গমঞ্চকে উপেক্ষা আর একদিকে চেয়ে দেখ,—ঐ বিশ্বের কবি বাংলার ‘বি’, নটরাজের কিন্তু হাসি-কান্নার “রাম-ধনু” ! সাধারণের একটা স্বভাব এই যে তারা কারাের মধ্যে একটী গুণের চরম দেখলে, ভুল করে অন্য অনেক গুণ তার মধ্যে আরােপ করে কেমন একটা আমােদ পায়। মিষ্টিক-কবি হিসাবে রবীন্দ্রনথের রবীন্দ্রনাথ স্থান কেবল মাত্র বৈষ্ণব-সুফী-দের ঠিক পাশে, কিন্তু তা ব’লে নাট্যকার তিনি ন-নাটকের টেকনিক্, নাটকের ভাষা, নাটকের ঘটনা-সৃষ্টি—তার মধ্যে বিকাশ পেয়েছে খুব কম। ‘রক্তকরবী’র মত দুই-একখানা সাহিত্যের সম্পদ, তবু নাটক তারা কখনই নয়। রঙ্গমঞ্চ টেকনিককে এত উপেক্ষা এত অনাদর করলে সত্যিকারের নাটক কখনও সৃষ্ট হয় না।

[ ভূমিকা-২৬ শ্ৰী-হীন কৃ: -আরে না-না, আমাদের বর্তমান রঙ্গমঞ্চ প্রচলিত টেনিকের অনাদরের কথা আমি বলিনি। আরে সে ত’ বুড়ী ‘এলিজাবেত বিবি’র জীর্ণ ‘কঁাতার’ টেনি। আহা,–এক দিন বুড়ী বিবি-জানের ছিল একেবারে রূপকথার রূপ, তার কঁাতার’ ছিল রােমান্স-এ সব কথামৃত শুনে না-হয় বিরহের খানিকটা সময় কাটান সহজ, তা'বলে মিলনের রাতেও,-আরে ছি-ছি, সবাই তা হলে ঐ বুড়ী-প্রেম-মুগ্ধকারীদের যৌবনে যে সন্ধিহান হবে ! সত্যই যে-কোন ভদ্রলােকেরই আজকের দিনে তা বরদাস্ত না-করাটাই রুচীর পরিচয়। রবীন্দ্রনাথ রঙ্গমঞ্চের টেকনিকে উপেক্ষা করেছেন, অর্থাৎ তার টেকনিকে অভিনয় হলে অভিনয়ে ষ্টেজ, এফেক্ট’ (Stage-effect) ভাল হয় না। তাই তার ‘চিরকুমার সভ’ বা ‘শেষরক্ষা’কেও রঙ্গমঞ্চে দাড় করাবা জন্য আবার রঙ্গমঞ্চের টেনিকের সাহায্য নিতে হয়। কথাটা জানিস্ কি, প্রতিভা ও কল্পনা রবীন্দ্রনাথকে ভুলিয়ে দেয় বাস্তবতা। কবিতার পক্ষে এটা একটা গুণ, উপন্যাসের পক্ষে এটা তত দোষের নয়, কিন্তু নাটকে এট। অ চল । এই বাস্তবতা নাটকের একটা প্রধান অঙ্গ। নাট্য-জগতে সবাইকে হতে হবে ‘কসাচ-আর্টিষ্ট (Conscious Artist): PATAY ও বাস্তবতা হবে তাদের সমান আদরের চিজ। এখন আমাদের দেশে একদল রবীন্দ্র-ভক্ত আছে-যারা আমাদের বর্তমান রঙ্গমঞ্চকে ঘৃণা করে, সঙ্গে সঙ্গে আবার রবীন্দ্রনাথের এই সব নাট্য-রূপী রচনা অভিনয়ের জন্য চীৎকার বা ব্যর্থ-চেষ্টা করে এমন ‘নাক-উচু ভাব দেখায় যেন নাট্য-কলা একমাত্র তাদেরই রবীন্দ্র-ভক্ত ‘পেটেন্ট (patent)। অবশ্য এরা ‘শিল্প-পুচ্ছ-ধারী’- সাধারণ,-‘ম্যাসের’ (mass) সঙ্গে তফাৎ-এর ষ্টাইলয়ের’ (style) দাস’!

-হীন কৃষ্ণ
[ ভূমিকা-২৭
নাটকের অন্তরায়ক
এখন ভেবে দেখ , দুঃখের কথা হলেও এ সত্যি কথা যে বাংলার নাটক
উদ্ভবের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু সাধারণ’ নয়, শুধু ব্যবসাদার”
নয়, সঙ্গে-সঙ্গে আবার বাংলার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা শিশিরকুমার,
বাংলার শ্রেষ্ঠ-ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র, বাংলার শ্রেষ্ঠ-কবি
রবীন্দ্রনাথ।
',
নাটকের ভাষা
চ’তি সাহিত্যের ভাষার উপযুক্ত নাম-করণ বােধ-হয় “ব্রাহ্ম-ভাষা,
–ওপরটা দিব্যি চিক-চিকে, ধপধপে–আহা, যেন লুকানাে
পাউডার-পমেডের গন্ধ; কিন্তু ভেতরে-ভেতরে••••••••••••!
“বৈষ্ণব-যুগের সঙ্গে এই “ব্রাহ্ম”-যুগের ভাষার একটী প্রকাণ্ড
পার্থক্য এই যে-বৈষ্ণব-মহাজনেরা ‘নােংরা-ভাষার আবরণে
উচ্চ-ভাবের পরিবেষণ করেছিল,
করেছিল, আর এই ব্রাহ্ম-যুগের
লেখকেরা‘ভদ্র-ভাষার’ আবরণে নােংরা-ভাবের বিতরণ করছে।
–থাক, ভাল-মন্দের মন্তব্য জাহির ক’বার লােভট। আপাতত
সম্বরণ করে, এখন বল দিখিনি,-বৈষ্ণবের। ত’ ছিল ‘মহাজন,
সাধক,তবু তারা এই ‘নােংরা-ভাষা’র আশ্রয় নিয়েছিল কেন ?-কেন,
তার একটা মস্ত বড় কারণ এই যে এই ‘নােংরা-ভাষার মধ্যে যে একটা
“আন্তরিকতা প্রকাশ পায়, আর কোন ভাষায় তার সম্ভবনা নেই।
সত্যই, ব্রাহ্ম-যুগের
ভাষা কতকটা ‘মাজ্জিত’—সুতরাং
অনেকটা কৃত্তিমতা’র আবরণ : আর ‘বৈষ্ণব-যুগের ভাষা কতকটা
‘আমার্জিত’---সুতরাং অনেকটা আন্তরিকতার সহায়ক।

ভুমিকা-২৮ -হীন কৃষ্ণ এই ‘আন্তরিকতার অনুরােধে, বৈষ্ণব লেখকেরা সংস্কৃত-যুগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যে অপূৰ্ব্ব শক্তির পরিচয় দিয়েছিল—তা” সত্যই প্রশংসনীয়। বদ্ধ সামাজিক আইনে সে ভাষার স্থান যেখানেই হ’-না কেন, ভাষার ছাত্র মাত্রেই আজ এত দিন ধরে এই আন্তরিকতার-ভাষা-স্রষ্টাদের এই প্রশংসনীয় ‘দী’-টুকুর (Spirit) সামনে বাবার প্রণাম করে এসেছে। এখন মােটামুঢ়ী ভাবে বলতে গেলে নাটকের-ভাষায় ‘কৃত্রিমতা’র চেয়ে ‘আন্তরিকতা'র ঢের বেশী দরকার। তাই বলে আজগেকার নাটকের ভাষা কু-রুচীর পরিচায়ক হবে একথা আমি কখনই বলি-না। কিন্তু তবুও চলতি ‘ব্রাহ্ম-ভাষা-নাটকের পক্ষে উপযুক্ত একেবারেই নয়। নাটকের ভাষা রচনায় তিনটে দিক লক্ষ্য রাখতে হবে–(১) আন্তরিকতা (২) লােকের ব্যবহার (৩) অভিনয়ের সুবিধা ও কার্যকারিতা (Effectiveness)। দীনবন্ধুর ভাষায় প্রথম দুটো গুণই, ও গিরীশের ভাষায় তৃতীয় গুণটী সম্যক পরিস্ফুট হয়ে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের নাটকের ভাষায় দ্বিতীয় গুণটা কতক পরিমাণে দৃষ্ট হলেও, প্রথম ও তৃতীয় গুণের নিতান্তই অভাব। নিশ্চয়ই,-ঐ-হীন কৃষ্ণের ভাষা রচনার সময় আমার এ তিন দিকে লক্ষ্য ত’ ছিলই, তাছাড়া আমি জানি অভিনয়ে (ও নাটকে) লােকে আনন্দ চায় আমােদও চায় ;-তাই আমি আমার ভাষায় ভরিয়ে রেখেছি “হিউমায়’ (Humour,)-তাই এ ভাষা তােদের এত প্রিয়।

-হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা-২৯ নাটক শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ যে চরিত্র-নাটক’ নয়—তার প্রমাণ আমি বারবার দিয়েছি। প্রথম দৃশ্যেই নবীন ফোন ক’রূছে ‘বিষ্ণুলােক”, আবার শেষ দৃশ্যে সময় বা স্থান একেবারে উপেক্ষা করে আমি আমার গন্তব্য-পথে চলেছি। সুতরাং চরিত্র-নাটকে’র সনাতনী-মাপ-কাটী দিয়ে যদি কেউ শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ ওজন করতে আসে—তােরা দেখি ভাই, তার মাথায় যেন থাকে ‘গাধার টুপী’! হাস্যরস শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ হাস্যরসে পূর্ণ,শুধু হাসির হাসিতে নয়! এর ভাষায় হাসি,ভাবে কিন্তু “অ-মাখা আনন্দ। সত্যই, আমােদ-আহলাদের মধ্য দিয়ে শ্রু-হীন কৃষ্ণ সবার মধ্যে জাগিয়ে দিতে চায়, তার অন্ত-প্রবাহিত একটী মুখ্য-সমস্যা’ (Central Problem), আরও আনুসঙ্গিক ছােট-বড় অনেকগুলাে সমস্যা। এখন হাসির-রাশির ভাষার মাঝে ‘পাঠক” বা “দর্শক” চমকে উঠে, সেই অশ্রু মেশানাে ভাব ভাবতে-ভাবতে, আপন-ভােলা হয়ে উঠবে,—সেইত আমার সার্থকতা। আমার মুখ্য সমস্যা’টী সবারই সঙ্গোপনের সুখ স্বদেশপ্রীতি। স্বদেশপ্রীতিতে আনন্দ পায় না এমন মানুষ আজকে কে আছে রে ? তাই বলি, ঐ-হীন কৃষ্ণের ভাবে আনন্দ, ভাষায় আমােদ!

[ ভূমিক-৩০ -হীন কৃষ্ণ ঘটনা-সৃষ্টি ‘র-সূষ্টি করা,ভাবকে সুন্দর করে ভাষা”, “ঘটনার ও চরিত্রের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তােলাই নাট্যকারের আকাখা। আগেকার যুগে “চরিত্র”-সৃষ্টি করাই ছিল নাট্যকারের প্রধান অবলম্বন, বর্তমান যুগে কিন্তু ঘটনা-সৃষ্টি পাঠক ও লেখকের কাছে অধিক আদরণীয়। তার কারণ আমি পূর্বেই বলেছি। সত্যই, ভাব সুন্দর ক'রে ফুটিয়ে তােলা যখন নাট্যকারের উদ্দেশ্য, আর “ঘটনা”-সৃষ্টির দ্বারা সেই উদ্দেশ্য, অল্প সময় ও স্থানের মধ্যে সাধিত হয়, তখন বর্তমান যুগেও “চরিত্র-সৃষ্টির জন্য অনেক অযথা বিষয়ের অবতারণা, আধুনিক নাট্যকারের কাছে সমীচিন বলে মনে হয় না। চরিত্র সে যাই হ’, ‘ঘটনা-সৃষ্টির মধ্যেও ‘চরিত্রে’র দরকার,মুখ্য ভাবে নয়, গৌণ ভাবে। ঐ-হীন কৃষ্ণে ছয়টা অপেক্ষাকৃত বড় “চরিত্র” বর্তমান-কৃষ্ণ, নবীন, সাধনা, চঞ্চল, বিজু ও ভােম্বল। সবাই দেশ-ভক্ত, অথচ সবারই দেশ-ভক্তির ধারা ঠিক এক নয়। ওর ছটা যেন একটা রাগের ছটা রাগিনী । নামকরণ এই সব চরিত্রের নামকরণের দিকেও একটু লক্ষ্য করে দেখ, বুঝবি এদেরও ভেতরে-ভেতরে একটা মানে আছে।

শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ [ ভুমিকা-৩১ তা’ বলে তারা শুধু আদর্শবাদী চরিত্রবান’ নয়। নবীন নবীনতা চায় সত্য, ত’ব’লে পুরাতনের ভালতে তার একেবারেই কুসংস্কার (prejudice) নেই। সাধনা ঐ নাম নিয়েছে ব'লে, হিমালয়ের কোন শিখর-দেশে, আসন-গেড়ে বসে, চক্ষু বুজে উৰ্দ্ধ বাহতে, শুধু বিজবিজ করে মন্তর আউড়ে যায় না। প্রথম কথা এরা মানুষ,তবে নামের গুণ-গুলাে এদের মধ্যে বেশী—এই পর্যন্ত। কৃষ্ণ ও শ্রী কৃষ্ণ নাকি স্বয়ং খৃষ্ট, কিম্বা উভয়ের সম্বন্ধ “চোরে-চোরে”—এসব নিয়ে “লাঠালাঠী” ক’গে যত সব প্রত্নতাত্ত্বিকের দল। আমাদের কাছে,-কৃষ্ণ নামে রক্ত-মাংসের কোন কিছুর আবির্ভাব কখনও কিছু হয়ে থাকে ভালই । আর যদি না-হয়েও থাকে, কৃষ্ণ যদি শুধু কল্পনা ও বিচার-বুদ্ধির চরমতা হয়—তাতেও ত’ দুঃখ কবার কিছুই নেই। সাদা কথায় আমরা বুঝি কৰ্মীর ভাবই কৃষ্ণ। এই ভাব হয় হাজার রকমের। তাই কৃষ্ণও হাজার রূপের। এই রূপের অনৈক্যই কৃষ্ণের “মার্কামারা”-পূজারী বৈষ্ণব-সম্প্রদায়কেও অন্তত চারটি বড় দলে ও অনেক ছােট-খাট দলে বিভক্ত করে রেখেছে ; তাছাড়া আবার হিন্দু, দার্শনিক, সবাই ত আছেই। আর সব ভাবকে তেমন আমল না-দিয়ে বাংলার বৈষ্ণব-বাবাজীরা কৃষ্ণের মাধুর্য্যে” মগ্ন হয়েছিল। “এ” টাইটেলে কৃষ্ণকে তারা ভ'রে রাখল। ফল হ’ল কিন্তু বড় দুঃখের,-কৃষ্ণ-ভক্ত হয়েও হাজার হাজার বাঙ্গালীর কর্মের নেশা নষ্ট হ’লতারা হতে চাইল “নারী-মনা”, তারা চেরে ব’ল শুধু “মিলন”। } [ ভূমিক-৩২ -হীন কৃষ্ণ এই কৰ্ম্ম-হীন কৃষ্ণ বঙ্কিম-দ্বিজেনের ব্যথার কারণ হল, “ছন্নছাড়া”(?) দলের উপেক্ষার মূল হ’ল। তাই আধুনিক যুগের বাংলায় অ-বৈষ্ণব কৰ্ম্মীদল “গীতার” কৃষ্ণের আবার উদ্বোধন করে আনন্দ পেলাে। আমার কৃষ্ণ শুধু কৰ্মীর ভাৰ নয়, সে নিজেও কর্মী, আর সঙ্গে-সঙ্গে সে সব কর্মীর ‘সখা’ ; সব নিষ্কর্মার মধ্যে কর্মীর ভাব জাগিয়ে তুলে সে সবাইকে সখা করে নেবার জন্য ব্যস্ত। বর্তমান বাংলায় কশ্মীর মাপকাঠী তার দেশ-ভক্তি, তাই আমার কৃষ্ণ নিজেও দেশ-ভক্ত। সে শুধু মুখে দেশ ভক্তির ‘দর্শন’ আউড়ে সুখী হয় না, সে নিজেকে সব রকমে তৈরী করে রেখেছে, দরকারের সময় দেশের কাজে একেবারে কার্যকারী ভাবে উৎসর্গ করবার জন্য । কৃষ্ণের বেশ আমার কৃষ্ণ কর্মঠ,—সে সৈনিক। তাই বলে সে ‘পৌরানিক যুগের সৈনিকের সাজ-সজ্জা ভালবাসে না। সে যে সত্যিকারের দেশ-ভক্ত- দেশ-ভক্তির নামের অন্ধতায় পুরাতন-ভক্তির প্রশ্রয় তার মধ্যে স্থান পায় না। সে জানে এ কোন্ যুগ,সে জানে এ যুগের সৈনিকের কোন্ বেশে কাজ করা সুবিধা। সে পুরাতনে শুধু পচতে চায় না; নবীনতার উপকারীত্বের সন্ধান পেলে, সে তা মাথায় বরণ করে নেয়। তাই, কি ভাবে, কি বেশে, আমার কৃষ্ণ পুরাতন থেকে উদ্ভুত হলেও, ঠিক পৌরাণিক নয়।

শ্রীহীন কৃষ্ণ
[ ভুমিকা—৩৩
।
;
কফের বেশের রং
ওঃ, রংয়ের কথা,তার সর্ট-সার্টের রং ‘খাঁকী না-হ’য়ে ‘সবুজ’ হ’ল
কেন ?—আর সব ছেড়ে তার একটা কারণ বলি শােন্ :-
‘খাকী'-রংটা কেন সৈনিকদের জন্য মনােনিত হয়েছিল জানিস্ ?-
‘খাকী’ হচ্চে পাশ্চাত্যের ঘাসের রং; সুরাং মাটীর সঙ্গে মিশিয়ে পড়লে
ঘাসের রংয়ে ও সৈনিকের সাজের রংয়ে কোন অভেদ থাকে
না ;-তাই শত্রুর চোখ এড়িয়ে কাজ করতে সুবিধা হয়। বাংলার
ঘাসের রং কিন্তু সবুজ। তাই সৈনিকের সাজও সবুজ হওয়া
উচিত। সত্যই যে প্রিসিপলয়ে (Principle) পশ্চাত্য সৈনিকের
মধ্যে ঘাসের রং প্রচলিত, সেই প্রিসিপলয়েই (Principle) আমি কৃষ্ণের
বেশ ‘সবুজ’ করেছি।
-হীনত্ব
এখন ‘মাধুৰ্য’-পিয়াসী ‘বৈষ্ণব-ভাব’-প্রভাবান্তিত বাংলায় অকৰ্মীর
দল কৃষ্ণের প্রথম দর্শনে তাকে মাতে নারাজ হয়ে বলে উঠল-৫;
“তুমি
-হীন”।
কিন্তু বত’ ভাই ; এ ‘শ্রী-হীনত্ব’ কৃষ্ণে,--নাএ
‘শ্ৰ-হীনত্ব তাদের মনে’? হ্যা তুইত’ সে-কথা বলবি, নিজে শ্ৰী-হীন
কি-না! যাক, তাদের মনের ভুল যখন কাটুল, তারাও হ’ল কৰ্ম্মী কৃষ্ণের
অনুগামী সখা।
চল ও নর্তকী
দোষে-গুণে চঞ্চল বাংলার যুবক। দোষ হয়ত তার গুরুতর, তবু তার
মস্ত বড় একটা গুণ এই যে সে সত্যিকারের দেশ-ভক্ত-সে ‘সর্দারকে
স্বরেই চিনে ফেলে, সে বাংলার হাতছানিতে নিমেষে সব-ফেলে ছুটে যায়।

[ ভুমিকা-৩৪ -হীন কৃষ্ণ ওপরে-ওপরে নর্তকী চঞ্চলের প্রিয়। কিন্তু নর্তকী কে?- চঞ্চলই ত’ নিজেই বলছে নর্তকীর নাম ‘মনা : তবে নর্তকী কি চঞ্চলের মন’?—বাংলার যুবকের ‘মন’-প্রাণ’ ? ‘বিদেশী’-দল সময় বুঝে দুর্বলতা দেখে সেই যৌবন-মনকে কাম-কলায় ডুবিয়ে রাখতে চায়,-অকর্মন্য করে দাবিয়ে রাখতে চায়। যৌবন কিন্তু আজ দ্বন্দ্ব করছে, ‘বিদেশী’র সব অনাসৃষ্টি প্রভাব এড়িয়ে তার মনকে তাজা করে তুলে দেশের কাজে নিয়ােগ ক’তে। দুৰ্বলতা ‘তাকে বাবার বাধা দেয়। তবু শেষ পর্যন্ত সে ‘লাস্যের মায়া কাটিয়ে ‘তাণ্ডবে’ এগিয়ে চলে। এখন একটু চিন্তা ক'লে অনেক রকমেই স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে নাটক-লেখকের উদ্দেশ্য—বাইরের সব কিছুরই নীচে আর একটা অন্তর্নিহিত ভাব সঙ্গোপনে প্রবাহিত করাননা। তাই বলে প্রত্যেক কথায় প্রত্যেক ইঙ্গিতে, সেই ভাবের সঙ্কেত বজায় রাখাটা আমি ‘টেকনিকের দাসত্ব মনে করি,তাই তার চেষ্টাও করিনি। আমার সেই অন্তর্নিহিত ভাবের সঙ্গে বাহিক ভাষা প্রভৃতি সম্বন্ধ হচ্ছে, যেন একটা প্রশস্ত প্রবাহিণী ও তার আশপাশ দিয়ে এগিয়ে-যাওয়া একটা উপভােগ্য পথ :-মাঝে-মাঝে বন-জঙ্গলে প্ৰবাহিণী যখন একটু অন্তরালে পড়ে, সেই সব প্রকৃতির দৃশ্যও উপভােগ করার মাঝেও পরিব্রাজকের অনুভূতি’তে বর্তমান থাকে সেই প্রবাহিণী। ঠিক স্ত্রী -হীন কৃষ্ণ [ ভুমিকা-৩৫ অতুলনীয় শ্রীহীন কৃষ্ণ তাহলে এখন বুঝতেই ত’ পারছি, যে, ঐ-হীন কৃষ্ণের রূপে-গন্ধে ভ’রে, আছে সেই স্বদেশ-প্রীতির অনন্ত প্রবাহিণীর অফুরন্ত সেরা ভাব আর সেই বাংলার প্রাণের ভাব আমােদ-আল্লদের ভাষা, ঘটনা, ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ অভিনয় উপযােগী হয়ে নাটকের নাম সার্থক ক’ছে,—তাই শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ এত চমৎকার,-এর তুলনা নেই, বাংলা ভাষার আর কোথাও না। অনুৎসর্গ ও উৎসর্গ আরে-আরে করিস কি!—দোহাই ভাই, ক্ষ্যামা দে’ এমন টানা-টানী করি নি ! একে ত’ তাের সবার সেরা আধ্যাত্মিক শক্তি, তার সঙ্গে মিলেছে আবার স্বর্গীয় শক্তি,-এই ‘ডব শক্তির সঙ্গে, আমি কি ছাই জুজে উঠতে পারি। শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ তুই চা-বেশ ত’! —কিন্তু ভাই, সেটা আমি হ’তে দিচ্ছি না। তুই তাের স্বর্গীয় সোফায় শুয়ে আরামে শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ উপভােগ কবি, আর আমরা এখানে -বসে-বসে শুধু তারাই গুণব—সেটা হচ্ছে না, বন্ধু!

[ ভূমিকা—৩৬ -হীন কৃষ্ণ তার চেয়ে শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ তুলে দিলাম সেই সব কর্মীদের হাতে, যারা তাের-আমার সবারই সেরা ‘আনন্দ’কে এগিয়ে আবার জন্য মন-প্রাণের ডালি দিয়ে অক্লান্ত ‘পূজার’-কাজ করছে। যদি ইচ্ছে হয়, আয় আবার ফিরে আয়, স্বর্গ ছেড়ে ফিরে আয় আবার আমাদের এই বাংলায়,আবার এখানে এসে কাজ করে ভুগে-মরে আনন্দ পা’,আবার অবসর সময়ে আমার শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ হাতে তুলে নে’ জন্মাষ্টমী, ১৩৩৮ ‘গিরীন্দ্ৰগৃহ’ তােদের তড়িৎ-

অভিনয়
-হীন কৃষ্ণ সম্পূর্ণ অভিনয় উপযােগী।
জানি, এখনকার থিয়েটার-ওয়ালারা পচা ‘চরিত্র-নাটক অভিনয়
করতেই পটু। তার ‘ভােগান্তিও তারা পাচ্ছে হাতে-হাতে। তবু
তাদের স্বভাব যায় না। জীবন্তে ম'লেও। তারা সব সময়
সাসের দোহাই
নিজের মুখ তা ঢাকতে চায় ‘ম্যাসের (Mass) বা
জনসাধারণের দোহাইতে।
আমার কিন্তু ধারণা, সব দেশেরই ‘মা’ (Mass) প্রায় সমান :-
কোথাও তার ফ্যাক্টারীতে (factory) হাতুড়ী-পিটে আসে, কোথাও
বা আপিসে কলম-পিসে আসে ;-কেউ বাপের নাম বলতে
‘মামার নাম বলে ফেলে, কেউবা আবার ‘লাশ’ বলতে
“শালা’ বলে ফেলে। সত্যি কথা বলতে কি, সব দেশে সব যুগে
আর্ট প্রথম উপভােগ করে মাত্র জন-কয়েক রসজ্ঞ। ম্যাস’
তাদের মুখ চেয়ে থাকে। তাদের চোখ-ইসারায় ‘হা-কি-‘না’ বলে
খালাস পায়—এই মাত্র।
৩
সুতরাং যে আটিষ্ট হবে, সে আর্টের চচ্চ। করেই
কালি-কলমে হক বা অভিনয়ে হক। সে কখনৰ্মাসের
েিসর
দোহাই দিয়ে চোখ ঠাবে না।
মাটি,

ভূমিকা—৩৮
এ হীন কৃষ্ণ
আর্ট ওম্যাল
তবে একথা সত্য, যে সেই আটে যদি এমন একটা ‘তার’ থাকে
যার ঝঙ্কার ম্যাসের’ও প্রাণের ‘তারে স্পন্দন তােলে, তাহলে রসজ্ঞের
চোখ-ইসারায় প্রাণ খুলে সেই আর্টে ম্যাস্ সায় দেয়। শ্ৰ-হীন কৃষ্ণে
মজুত, আছে দেশ-ভক্তির ঝঙ্কার। আজ বাংলায় এমন
কোন্ ম্যাস্ আছে যার প্রাণে দেশ-ভক্তির ঝঙ্কার
স্পন্দন তােলে না?
তাই আমার বিশ্বাস -হীন কৃষ্ণের অভিনয়ে কাৰ্যকারীতা
অনিবাৰ্য্য। তবে অনেক কারণে আছে-বারের ‘নবাগত’ সত্যিকারের
আটিষ্ট-দলের দ্বারা এ নাটকের অভিনয় বাঞ্ছনীয়। সত্যিকারের শিল্পী
হ’তে হলে, এই ‘নবাগত’-দের অনেক গুণ নিয়ে আসতে হবে। নিম্নে
আমি ‘বিশেষ কয়েকটা মাত্র উল্লেখ করলাম :-
অভিনেতার গুণ
(১) প্রথমেই বলে রাখি অভিনয় সঙ-সাধনা ( Team-Work)
ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি অভিনয়ের অন্তরায়। সুতরাং কোন অভিনেতা,
অভিনয়ের সময়ে, তার হাবভাব, চা-চলন্ কথা-বার্তা প্রভৃতি, এমন
কোন নূতন রকমে দেখাতে চেষ্টা করবে না, যা সে রিহার্স্যালে”
সকলের সঙ্গে অভ্যাস করেনি,—এমন-কি ভাব-প্রবনতার (inspiration)
দোহাইতেও নয়। কারণ এমনি-ধারা অজানা নূতনত্বে অন্য
অভিনেতার অসুবিধা ত’ হয়ই, সঙ্গে-সঙ্গে আবার অভিনয়ের
উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হতে পারে। এই সােজা কথাগুলো এমন
সসাধনা
ভাবে বলবা দুর্ভাগ্য আমার হত না, যদি-না আমি
দেখতাম যে আমাদের সামনের রথী-মহারথী’ অভিনেতারা এই ব্যক্তিত্বের
অভিব্যক্তির নেশায় উন্মাদ হয়ে সত্যিকারের অভিনয়ে জলাঞ্জলি না-দিত ৮

-হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা-৩৯. (২) অভিনয় যখন সঙ্ঘ-সাধনা, অভিনেতাকে হতে হবে ত্যাগী ত্যাগ (Sacrificing.) i না-না, তা’ বলে অভিনেতাকে নিত্য-স্নায়ী নিরামিষাশী লােটাকম্বল-ধারী হতে হবে না। কিন্তু তবুও আভিনয়ে ‘ত্যাগী হওয়া শুধু কথার-কথাও নয়। একটা দৃষ্টান্ত নিয়ে বলি,-৪৪ পৃষ্টার শেষ দিকটা। এখানে কৃষ্ণের অভিনয় সাধনার চেয়ে শক্তিশালী হওয়াটাই নাটকের ও অভিনয়ের দরকার। এখন হয়ত’ এখানে সাধনা-অভিনেত্রী কৃষ্ণ-অভিনেতার চেয়ে সহজেই এত শক্তির পরিচয় দেয়, যে তার ওপরে ওঠা কৃষ্ণ-অভিনেতার ক্ষমতার বাইরে। সুতরাং তখনই সাধনা-অভিনেত্রীকে স্ব-ইচ্ছায় এমন অভিনয় করতে হবে, যার কাৰ্যকারীতা (effect) কৃষ্ণ-অভিনেতার চেয়ে কম প্রতিপন্ন হয়।–এ একটা অভিনয়ে ‘ত্যাগের দৃষ্টান্ত, আর এমনি-ধারা জায়গায় ত্যাগী হওয়াটাই শিল্পীর শিল্প। (৩) ত্যাগী হতে হলে চরিত্রে’র দরকার । তাই অভিনেতাকে ততটা ও সেই রকমের ‘চরিত্রবান হতে হবে, যাতে সে কাৰ্যকালে নামের বা ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তির লােভে জলাঞ্জলি দিয়ে, ত্যাগী চরিত্র হয়ে, সত্যিকারের শিল্পত্বের পরিচয় দেয়।

[ ভূমিকা—৪০ ঐ-হীন কৃষ্ণ সংযম (৪) অভিনেতার নিতান্তই দরকার ‘জ্ঞাশিল্পী’ “Conscious- Artist') হওয়া : অর্থাৎ তার মধ্যে কোন ভাব জাগিয়ে তােলা যেমন দরকার, সেই ভাবে ‘সংযমী হওয়াটাও তেমনি দরকার। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলি,—দ্বিতীয় দৃশ্যের প্রথম দিকটায় কৃষ্ণের দু-ফোটা চোখের জল গণ্ড পর্যন্ত পৌঁছান দরকার : কৃষ্ণের চোখের জল না-আসাটাও যেমন অভিনয় নয়,-কৃষ্ণের ধারায়-ধারায় চোখের জল পড়াটাও তেমনি অভিনয় নয়। অতি-ভাব বা অল্প-ভাব দুটোই অভিনয়ের দোষ। (৫) ঐ-হীন কৃষ্ণের অভিনেতাদের মধ্যে, হাব-ভাব-অাবৃত্তির ‘ক্ষিপ্ৰ-পরিবর্তন’ ‘(Quick Change) করুবার গুণ বিশেষ করে বর্তমান থাকা দরকার। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলি, ৪ পৃষ্ঠায় ক্ষিপ্ৰ-পরিবর্তন চঞ্চলের কথার মধ্যে—“আধুনিক বাংলার যে কোন যুবককেই দেশ-ভক্ত নয়-ব’ললেই তাকে অপমান করা হয় -এখন হাসি-ঠাট্টার মধ্যে চঞ্চল যদি ক্ষিপ্ৰ-পরিবর্তণে এ কথা-কটা না-বলে, তবে নাটকের বা অভিনয়ের কার্যকারীতা (effect) নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা। (৬) মােটা-মুটী ব’তে গেলে -হীন কৃষ্ণের অভিনয় হবে একটু ‘জলদে’। সুতরাং প্রত্যেক অভিনেতারই মুখস্ত থাকা দরকার শুধু তার নিজের ভূমিকার কথা নয়, তার সঙ্গে আর-আর সব নট-নটীর কথা-বার্তাও।

-হীন কৃষ্ণ
[ ভুমিকা-৪১
প্রযােজনা
শ্ৰ-হীন কৃষ্ণের
অনেক কারণে,—বিশেষ করে ওপরের গুণ-গুলাে যাতে সম্যক
পরিস্ফুট হয়, লক্ষ্য রাখার জন্য,একজন প্রযােজকের
(Director) দরকার।
সত্যই,
অভিনয়ের যখন প্রধান
সহ-সাধনায় সিচুয়েশনের মধ্য দিয়ে ভাব ফুটিয়ে তােলা, তখন একজন
প্রয়ােজকের নিতান্তই আবশ্যক।
এই প্রয়ােজকের পক্ষে কোন ‘পার্ট না-নেওয়াই মঙ্গল।
প্রত্যেক ‘আর্টিষ্ট এই প্রযােজকের,ব্যক্তিত্বকে হ’ বা না-হক,
পদবীকে ‘মিলিটারীর মত মান্য করে কাজ করতে বাধ্য।
আর এমনি ধারা সমবেত ভাবে মান্য ক’তে শিখলে শেষ পর্যন্ত
সুফলই ফ’লবে।
প্রয়ােজকের বিনা-অনুমতিতে, যদি কোন ‘আটিষ্ট, একেবারে
রঙ্গমঞ্চে, অন্যের-অজানা কোন কিছু নূতনত্ব দেখাতে গিয়ে, আর সব
‘আর্টিষ্টের অসুবিধার কারণ হয়ে দাড়ায়, প্রযােজক তখনই তার
‘কৈফিয়ৎ’ তলব, ক’রূবে, এবং দরকার হলে তাকে উপযুক্ত শাস্তি
দেবে।
ঐ-হীন কৃষ্ণের অভিনয়ে, প্রযােজককে সাহায্য কতে, দরকার,
(১) একজন আলো-ছায়ার বিশেষজ্ঞ (Light-Expert), (২) একজন
নিৰ্বাচন ও রূপ-সজ্জার (Make-Up) বিশেষজ্ঞ (৩) একজন কর্মঠ
ষ্টে-ম্যানেজার (Stage-Manager) (৪) একজন নৃত্যে বিশেষজ্ঞ
(Dancing-Master)-তাছাড়া আর-আর সব ত’ আছেই।

[ ভূমিকা-৪২
-হীন কৃষ্ণ
(১) আলো-ছায়ার বিশেষজ্ঞ
বিশেষজ্ঞের সৰ্ব্বদাই লক্ষ্য রাখা দরকার, যে তার আলাে-ছায়ার
মায়ার সামঞ্জস্য যেন সব রকমেই ‘ভাব’ পরিস্ফুট হবার সহায়ক
হয়।
এ নাটকের অভিনয়ের আরম্ভ বােধ-হয় এমনি ভাবে হ'লেই
ভাল হয় :-
সন্ধ্যার আঁধার নবীনের ঘর (রঙ্গমঞ্চ) ছেয়ে ফেলেছে। রঙ্গমঞ্চের
পেছনের (Deep') দরজা-জালা দিয়ে পড়ন্ত-সূর্যের শেষ আভাস
(relection) সাক্ষ্য দিচ্ছে। সেই আভাসে অস্পষ্ট দেখা
আরম্ভ
যাচ্ছে ঘরের মধ্যে চারূটে চেহারা তর্ক-যুদ্ধে হৈ-হৈ ক'ছে।
ঘরের আলাে জ্বল,-সবাইকে ভাল করে দেখা গেল।
দ্বিতীয় দৃশ্যে বাংলার সাধারণ রূপ’,হয়‘সিমবলি-সিনে’ (Symbolic
Scene), না-হয় সবাক বা নিৰ্বাক চিত্রাভিনয়ের সাহায্যে সম্যক
কাৰ্যকারী (effective) হবে বলে মনে হয়। সে যাই হক,
বাংলার রূপ
বাংলার
সব-কটী
‘রূপ’ই ফুটিয়ে তােলার
আলো-ছায়ার সামাঞ্জস্যের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা দরকার।
তা ছাড়া একেবারে শেষের ‘উষার অরুণে’ আলাের পরিবর্তন
ও ক্রম-বৃদ্ধি (Change of light and its gradation)
দেখাতে পারলে এফেক্ট’টা effect) খুবই ভাল হয়।

की-शेन.कुक ভূমিকা-৪৩ অভিনয়ে রং বিভিন্ন রং বিভিন্ন ভাব ফুটিয়ে তােলবার পক্ষে সহায়ক। তাই বিশেষজ্ঞ সৰ্ব্বদাই নজ রাখবে যেন তার মনােনীত রং অভিনয়ের ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলে। অভিনয়ের সুবিধার সুবিধার জন্য, নিম্নে আমি রস-সৃষ্টি করবার সহায়ক রং ও সেই রংয়ের সামঞ্জস্যক অন্য রংয়ের একটা তালিকা দিলাম। এই তালিকা সঙ্কলনের জন্য আমি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য বর্ণ-বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণ সাহায্য নিয়েছি। সামঞ্জস্যক রং ( প্রাচীন হিন্দু ) (পাশ্চাত্য) শৃঙ্গার কাল কমলানেবু, পিঙ্গল (Auburn), ঈষৎ পিঙ্গল (Brown)। যে কোন রং। হাস্য সাদা ৩ + ৩ সবুজ, অলিভ, (Olive)। ৪০০ } লাল ৫ ০ সবুজ, অলিভ। করুণ কমলানেবু, পিঙ্গল, ঈষৎ পিঙ্গল। ৫ ০ ০ ০৫০ ধূসর ভয়ানক কাল • ০ ০ ০ বীভৎস কমলানেবু, পিঙ্গল, ঈষৎ পিঙ্গল। লাল, পাটল (Russet), চকোলেট। ভায়ােলেট, ল্যাভেণ্ডা, কচ,। ০০০ সবুজ হলদে { ভূমিকা-৪৪ -হান কৃষ্ণ এই তালিকা, আলো, সাজ-সজ্জা প্রভৃতির রং বিষয়ে, সনাতন হিন্দু ও পাশ্চাত্য মতের ফল ও অভিনয়ের নির্দেশক। তাই বলে আজ, বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে, পুরাতনের এই চিন্তা-ধারায় যে নিজেকে সম্পূর্ণ পর্যবসিত করে রাখতে হবে তার কোন মানে নেই। আমিও তা’ করিনি,-কৃষ্ণকে আমি সবুজে সাজিয়েছি—তার সবুজ-প্রাণের আভাস দিতে,—বীভৎস-রস সৃষ্টি করতে কখনই নয়। তাছাড়া হিন্দু-রস পার্শ্বে লিখিত রংগুলো সবসময়েই যে সামঞ্জস্যক—এ কথা আমার মনে হয় না। ‘আদি’-রসে ‘অভিসারিকা বা ‘পরকীয়া’কে কাল-রংয়ে ভূষিত করার বেশ একটা যুক্তি পাওয়া যায় সত্যি, কিন্তু ‘মুগ্ধা’ বা ‘নবােঢ়া’কে ‘বাসন্তী রংয়ের সাজে, আর ‘মধ্যা’ বা ‘অনূঢ়া’কে লীলা (Lilac) রংয়ে ভূষিতা দেখতে আমার ভাল লাগে। তাই ব’ছি যদি বিশেষ কোন যুক্তি থাকে, তবে অসঙ্কোচে এ তালিকা অমান্য করে নিজের মনােমত রং বেছে নেবেন । আর তা যদি না থাকে তবে এই তালিকার নির্দেশ মেনে চলাই ভাল।

-হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা—৪৫ (২) নির্বাচন ও রূপসর্তজা (Makeup) পুরানো সেই যাত্রার যুগে আমাদের অভিনয় ছিল শুধু বাচ্যাভিনয়। বর্তমান যুগে আমাদের ‘থিয়েটারী’ অভিনয় কিন্তু মুখ্য ভাবে বাচ্যাভিন হলেও, গৌণভাবে দৃশ্যাভিনয়ও বটে। তাই চলতি কথায় আমরা যাত্রা শুনি, কিন্তু থিয়েটার দেখি-ও-শুনি। সুতরাং এখন থেকে চেহারা ও রূপ-সজ্জার দিকে আমাদের বেশ নজর রাখা দরকার, যদিও আমাদের রঙ্গমঞ্চে এ বিভাগটা এতদিন ধরে প্রায় অনাদৃত হয়েই আসছে। নিম্নে আমি দুই-একটা চরিত্রে এ-বিষয়ে সঙ্কেত দিলাম- কৃষ্ণ ছয় ফুট লম্বা, হাড় চওড়া কিন্তু শরীরে অযথা মাংস নেই ; সরল উন্নত বক্ষ, ‘আ-জানু লম্বিত বাহু’। বেশ-চওড়া কপালের নিচের দিকটা যেন একটু উন্নত। কপালের দু-পাশ হ'তে, তিন জোড়া সােজা রেখা, একটু কোনের মত করে, পর-পর মাঝখানে এসে মিলেছে। ‘যুগ্ম-জ্ব চোখের বাইরের দিক্কার কোনেও বেশ খানিকটা নেমে এসেছে। নাকের গােড়ার ঠিক ওপর পর-পর তিনটে রেখা আড়-ভাবে দেখা দেয়। কাল-ডাগর-তীক্ষ্ণ-দীপ্ত চোখ। চুলকাল কিন্তু যেন কতক অসমান। নাক—বেশ বড়, নাকের উচু হাড়-টুকু মধ্যে অবস্থিত। নাকের ছিদ্র বেশ বড়। চোয়ালমাড়ীর-দাতের নিচের দিকটা চোয়াল বেশ চওড়া, আর সামনের দিকটা যেন চারু-কোনা। ঠোট—ঠোটের রাঙা জায়গাটা একটু যেন বেশী । রং—যেন বন্দরে-পােড়া,তাবাটে-কাল ।

{ ভুমিকা—৪৬
-হীন কৃষ্ণ
সাধনা-
সাধনা ‘পদ্মিনী'। ভারতচন্দ্রের ভাষায় ‘পদ্মিনী-নারী’র বর্ণনা এইরূপ:-
“নুন কমল
কুঞ্চিত কুন্তল
ঘন কুচস্থল মৃদু-হাসিনী।
ক্ষুদ্র বন্ধ নাসা
মৃদুমন্দ ভাষা
নিত্য-গীতে আশা সত্যবাদিনী ।
দেব দ্বিজে ভক্তি
পতি অনুরক্তি
অল্প বতিভক্তি নিদ্রা-ভােগিনী।
সুললিত কায়
লােম নাহি গায়
পদ্ম গন্ধ কয় সেই পদ্মিনী।”
মুখ—কিছু মাংসল।
কপাল-একটু উন্নত।
নাক-সােজা উন্নত।
দাত—যেন কুন্দ ফল!
ঠোট-পাতলা,-লালের আভা।
রং—যেন স্বর্ণের আভা।
প্রত্যেক অভিনেতা ও অভিনেত্র রূপ বা রূপসজ্জা এমনি ধারা
প্রাচীন হিন্দু ‘লক্ষণ অনুমােদিত, বা আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত, হওয়াই
সর্বদাই বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে, বিশেষজ্ঞের নজর থাকা উচিৎ ছােট
‘রাে’-গুলাের পানে, কারণ ছােট রােলে ‘কথা’ কম, তাই রূপ ও
রূপ-সজ্জার দরকার বেশী

[ ভূমিকা-৪৭
(৩) ষ্টেজ ম্যানেজার,
এই পদের উপকারিতা বাংলার ষ্টেজ, কিছু কিছু মানে। তাই
এ পদের সব দায়িত্ব নির্দেশ না-করে, এখানে আমি শুধু এইটুকুই বলব
যে স্টেজ-ম্যানেজারের ক্ষিপ্রতা ও কর্মঠতার অভাবে অভিনেতার
অসুবিধার কারণ হবে, ও সঙ্গে-সঙ্গে অভিনয়ের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবার
সম্ভাবনা।
বিশেষ করে এই দুটো বড়-গুণের খুব বেশী দরকার -হীন কৃষ্ণের
দ্বিতীয়-দৃশ্যে। দ্বিতীয়-দৃশ্যের ‘পৰ্য্যায়’-গুলাে ঠিক সময়মত পরিবর্তিত
না-হলে অভিনয়ের অঙ্গহানি হবে।
যদি ‘রিভলভিং স্টেজে’র (Revolving Stage) সুবিধা থাকে,
অবশ্য ম্যানেজারের কাজ অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু তা যদি না-থাকে, সময় ও গুরুত্বের পানে নজর রেখে, কিঞ্চিৎ
বুদ্ধি খরচ করে ম্যানেজারকে ষ্টেজ, সাজাতে হবে ।
‘সাধারণ রঙ্গমঞ্চে’ দ্বিতীয়-দৃশ্য সাজাবার একটা প্রস্তাব’ আমি
এখানে ক’লাম।
ষ্টেজের
বাঁ-দিক্কার গেট-উইংসের (Gate-Wings) 97969
‘কৰ্ম্মী-কুঞ্জে’র রকের
খানিকট। বেরিয়ে আছে।। এখানেই
কৃষ্ণ-নবীন-সাধনার স্থান’ (Position)। এই বাঁ-দিকেই, ‘কর্মী-কুঞ্জের
পেছনে প্রায় মিড-উইংসের (Mid-Wings) কাছে একটা কাল-স্ক্রীনের
অন্তরালে সাজানো থাকবে—দ্বিতীয় পর্যায়।

[ ভুমিকা-৪৮ -হীন কৃষ্ণ ঠিক এর উল্টো দিকে, অর্থাৎ ডান্-দিকের প্রায় মিড-উইংসের (Mid-Wings) কাছে, ঠিক্ দ্বিতীয় পর্যায়ের সামনা-সামনি, অমনি-ধার। কাল-স্ক্রীনের অন্তরালে সাজানো থাকবে—প্রথম পৰ্য্যায়। ‘ডিপে’ (Deep) বাংলার সাধারণ রূপের সামঞ্জস্যক স্ত্রী তার পেছনে সাজানাে থাকবে—তৃতীয় পৰ্যায়। যেমন ‘অভিসারিনী’ দ্বিতীয় পর্যায় হতে প্রথম পর্যায়ের পানে পা বাড়াবে, অমনি দ্বিতীয় পর্যায় স্ক্রীনে আবৃত করে যথাসম্ভব ক্ষিপ্রতায় সেখানে চতুর্থ পর্যায় সাজাতে হবে। এখানে যদি ডিরেক্ট-মশায় প্রথম পৰ্যায়ের প্রেমের ‘বায়-প্লে'তে (Bye-Play) কিছু ‘টেম্পাে’ (Tempo) বাড়াবার ও ল্যাণ্ডিং’ (Landing) মন্থরে কবার ব্যবস্থা করেন তা হলে চতুর্থ পৰ্য্যায় সাজাতে কোন অসুবিধাই হবে না। তার পর প্রথম পর্যায়ের স্থানে পঞ্চম পৰ্যায়, ও ‘ডিপে’ (Deep) তৃতীয় পর্যায়ের স্থানে ষষ্ঠ ও সপ্তম পৰ্য্যায় সাজানো সুবিধা। কিন্তু হােট স্টেজে অভিনয় করা যদি কোন কারণে নিতান্তই দরকার হয়ে পড়ে, তবে কৃষ্ণ-নবীন-সাধনাকে ‘অডিটোরিয়ামের (Auditorium) কোন সুবিধাজনক স্থানে দাড় করিয়ে কাজ চালিয়ে দেওয়া বােধহয় নিতান্তই মন্দ হবে না।

শ্রী-হীন কৃষ্ণ
[ ভূমিকা—৪৯
"
(৪) মৃত্যাভিনয়
প্রাচীন-হিন্দুরা সাধারণ নাচকে ‘নৃত্ত’ বলত; আর যে নাচের মধ্য
দিয়ে একটা রস-সৃষ্টি ৰা ভাব-ফোটানাে হত, তাকে ‘নৃত্য’ ব’ত।
-হীন কৃষ্ণের দ্বিতীয় দৃশ্য সপ্তম পৰ্যায়ে বর্তমান আছে “নৃত্য: সত্যই,
এ শুধু নাচ, নয়—এ নৃত্যাভিনয়।
ভাল-মন্দে মিশিয়ে
মিশিয়ে বাংলার যুবক-সে চঞ্চল। বিদেশীর
অত্যাচার-অনাচারে আজ বাঙ্গালী যুবকের প্রাণ’ বড় অকৰ্ম্মণ্য, বড়
জড়তাময় করে ফেলেছে। যুবক চায়, এ সব অন্তরায় কাটিয়ে উঠে, সে
আবার তার প্রাণকে পুন-সঞ্জীবিত করবে।
‘বিদেশীরা বাঙ্গালী যুবককে ভুলিয়ে রাখতে চায় তাদের
‘আনন্দ-নাচে। কিন্তু তা কি হয় ?—যে উঠতে চায়, তাকে এত
সহজে ভােলান’ বড় দুষ্কর। তবু ‘বিদেশীরা নাছােড়বান্দা। তাই তারা
যুবককে ভােলাতে আরও উদ্যমে কাম-কলার-নাচ’ আরম্ভ ক’বুল।
কিন্তু যুবক উঠবেই-বাচবেই : তাই বিদেশীদের একটু দূরে সরে
যেতে হল।
তখন সে প্রাণ দিয়ে প্রাণ’ জাগাতে ব্যস্ত হ’ল। তাই ‘আশা’ উদয়
হ’ল। আশা’ আশা দিয়ে, যুবককে তার ‘অন্তর জাগাতে পরামর্শ
দিল।
যুবক আশায় উন্মাদ হ’ল। তার প্রাণের’-যৌবনের প্রতীক ‘নর্তকী’
জাগার আভাস দিল ।
কিন্তু কলঙ্ক-ভরা নর্তকী তার আনন্দের চেয়ে দুঃখের মাত্রা বাড়িয়ে
তুলল। যুবক মূচ্ছিতের মত হ’ল।

[ ভূমিকা—৫০
শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
‘আশা’ আবার আশা দিতে লাগল। যে লাস্যে জগন্মাতা
নিতি-নটরাজকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, সেই নাচে ‘আশা’ যুবককে
ও তার প্রাণ’কেও জাগিয়ে তুলতে সহায়তা ক’ল।
যুবকের প্রাণ’ ‘লাস্যে’ নেচে উঠল যুবক আনন্দে আত্মহারা হল।
কিন্তু বিদেশীরা কখনই ছাড় নেওয়ালা নয়। তারা আবার তাদের
পূর্ণ-প্রভাব বিস্তার ক’রুতে যথাসাধ্য চেষ্টা ক’ল।
‘বিদেশী’র প্রভাবে আবার যুবকের মধ্যে দুর্বলতা এসে দেখা
দিল।
যুবক ‘আত্ম-নিন্দা করে উঠল। যুবককে প্রায় ‘বিদেশী’ জয়
ক’ল। যুবক প্রায় জ্ঞান-হারা হয়ে দাড়াল।
সময়ে ‘সর্দারে’র ডাক এল। সদ্দার’ যুবকের প্রাণকে শুধু
কলঙ্ক-মােছা করে ছাড়ল না, তাকে আবার তাণ্ডব’ নাচিয়ে
কাজের-কাজ ক’তে লাগল।
এমনি ধারা নাটকের সঙ্গে ওতপ্রােত ভাবে মিলিয়ে
নৃত্যাভিনয় বাংলায় এই প্রথম। তা ছাড়া, বাংলার প্রাণের এই
নাচে ‘লাস্য’ও আছে-তাণ্ডব’ও আছে। এ নাচ একদিন বাংলার
প্রত্যেক নৃত্য-শিল্পীর আকাঙ্খার বস্তু হবে। সুতরাং প্রথম হতেই
নৃত্য-শিক্ষক বাংলার প্রাণের এই নাচ, ফুটিয়ে তুলতে সম্যক যত্নবান
হলেই ভাল হয়।

-হীন কৃষ্ণ [ ভূমিকা শেষের কথা সবার শেষে, সবার চেয়ে দরকারী কথা এই যে, অভিনয়ের উন্নতির মূলে প্রাচীন হিন্দুর ছিল ‘ভক্তি আর আধুনিক ইয়ােরােপের আছে ‘শৃঙ্খলায় সম্মান’ (Discipline)। হিন্দুর কাছে তার ‘নাট্যশাস্ত্র’ ছিল ‘পঞ্চম-বেদ’,-তাই ভক্তির শ্রেষ্ঠ অর্থ পাশ্চাত্যের কাছে তার অভিনয় হ’ঙ্গে ‘জাতীয়-উন্নতি',—তাই শৃঙ্খলার মূল মন্ত্র। সত্যই, আজ যে নিজে হতে চায় সত্যিকারের নটরাজ-পূজারী, যে উৎকর্ষ ক’তে চায় সত্যিকারের অভিনয়, যে দৃঢ় ক’তে চায় তার ‘জাতীয়-উন্নতি’ তার মধ্যে পূর্ণভাবে বিরাজ করা উচিৎ,—হয় সেই সনাতন ভক্তি' নয়ত ঐ আধুনিক শৃঙ্খলা'। ঐ চরিত্র বড়- কৃষ্ণ কৰ্মীর ভাব সবারই সখা। নবীন যার মধ্যে নবীনতা’ মুখ্য বাংলার নবীন। সাধনা যার মধ্যে সাধনা' মুখ্য নবীনের স্ত্রী। চঞ্চল বাংলার ‘চঞ্চল’-যুবক নবীনের বন্ধু । নর্তকী চঞ্চল-যুবকের প্রাণ চঞ্চলের প্রেয়সী। বিজু যে কালে-ভদ্রে চম মারে নবীন-চঞ্চলের বন্ধু । সাদাসিদে কংগ্ৰে-ভক্ত নবীন-চঞ্চলের বন্ধু। ছােট একজন আধুনিক ছাত্র দ্বিতীয় দৃশ্য,—প্রথম পর্যায় । একজন আধুনিক যুবতী দ্বিতীয় দৃশ্য,দ্বিতীয় পর্যায়। একজন ‘আলােক-প্রাপ্তা’ যুবতী দ্বিতীয় দৃশ্য,-তৃতীয় পর্যায়। ০ ০ ০ তিনজন যুবতী চারজন যুবক ‘বিবাহিতা ‘স্বামী দ্বিতীয় দৃশ্য,-চতুর্থ পৰ্য্যায়। ‘স্বাস্থ্যবান’ যুবক দ্বিতীয় দৃশ্য,—পঞ্চম পৰ্যায়। দ্বিতীয় দৃশ্য,যষ্ঠ পৰ্যায়। কুমারী অন্তত চার-পাঁচজন বন্দী’ চারজন ‘নাচওয়ালী’ (জীপসী সাজে) অন্তত ছ'জন ‘নাচওয়ালী (মিশরী সাজে) ‘আশা’ ও অন্তত আট-ন’জন সঙ্গিনী বাহিনী দ্বিতীয় দৃশ্য,-সপ্তম পৰ্যায়। অন্তত কুড়ি-পঁচিল্ লন যুবক -হীন প্রথম দৃশ্য নবীন-কুমারের সজ্জিত বৈঠকখানা। রঙ্গমঞ্চের একেবারে ভেতরের (Deep) মাঝখানে বন্দরের-চাদর-বিছান ছােট-পায়া-যুক্ত দুটো পাশাপাশি তক্তের উপর গােটা-দুয়েক তাকিয়া। তক্তের পেছনের একপাশে স্ক্রী-ফেলা দরজা, আর একপাশে খােলা খড়খড়ি-জানালা। কোণের ষ্ট্যাণ্ডের ওপর ‘চিত্তরঞ্জনের ছােট বাষ্ট, (bust),বাষ্টের নীচে খদ্দরের-কাপড়ে-জরির-লেখা বাধান মটো (motto)- আর সহ্য হয় না, স্বরাজ চাইই চাই; আর এক কোপের ষ্ট্যাণ্ডের ওপর পেতলের টবে জীবুম্ভ গাছ। তক্তের পেছনের দেওয়ালে ভারত- মা’র ছবি। রঙ্গমঞ্চের মধ্যে দু’পাশে (Mid-Wings') বইঠাসা দুটো মুখোমুখি আলমারী। একদিকের আলমারীর পাশে পড়বার টেবিল ও চেয়ার, আর একদিকের আলমারীর পাশে ভূৈসিং-টেবিল।

২
ঐহীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
রঙ্গমঞ্চের সামনের একধারে (near Gate-Wing)
খদ্দরের-রুমাল-চাদর-মােড়া চায়ের টেবিলটার ওপর
ট্রে-ভৰ্ত্তি চায়ের সরঞ্জাম ও তার দু'পাশে দুই চেয়ার ;
অন্যধারে ফোনের বাক্স ও বই,
আর একটা
ইজি-চেয়ার।
ইজিচেয়ারে অর্ধশায়িত নবী-কুমার। তার কাপড় ও
থি-কোয়ার্টার-হাত-ওয়ালা পাঞ্জাবী-জামা—ধপধপে
সাদা মিহি-খন্দরের। তার পা দু'খানা চটীর উপর
আরামে রক্ষিত। চেহারায় মালুম হয় সে তর্ক-যুদ্ধে
ক্লান্ত হয়ে চায়ে চুম্বন চালিয়েছে।
ড্রেসিং-টেবিলের সামনে চঞ্চল চা খেতে খেতে
চেহারাটার দিকে একবার চেয়ে নিচ্ছে। তার পায়ে
‘কেডস', পরণে কালাপেড়ে আটপৌরে পরিষ্কার
কাপড়, গায়ে টুইসার্ট। চঞ্চলের চেহারায় তাকে
চালাক বলে ধরা যায়, শক্তিমান্ ব’লে বােঝা যায়।
চায়ের টেবিলের পাশে,-ভেতরের চেয়ারে ভােম্বল,
বাইরের চেয়ারে বিজু। ভােম্বলের খালি পা, মােটা
খদ্দরের ছােট কাপড় ও বােম-শুষ্ক বেনিয়ান; তার
শরীর চর্বিবহুল, মুখে বােকার ছাপ। বিজুর পায়ে
সাইকেল-স্যাণ্ডেল, কাপড় খদ্দরের, আমা সিকে
সার্ট ,সে একটা ম্যাগাজিনে মনােযােগ দিয়েছে।
সকালেরই বয়স প্রায় সমান,ত্রিশের কাছাকাছি।
৫ সমম,-সন্ধ্যার পর।

প্রথম দৃশ্য ] -হীন কৃষ্ণ তর্ক-যুদ্ধের এক অধ্যায় শেষ হবার ছাপ পড়েছে অল্প-বিস্তর সকলেরই মুখের ওপর। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পরে অনেকটা অনুযােগের স্বরে ডােম্বল আবার আরম্ভ করল- তােম্বল ••••• আচ্ছা বিজু, সুরেন-দা’ থেকে আরম্ভ করে আমাদের সুভাষ পৰ্যন্ত হাজার হাজার লোেক যার জন্যে প্রাণপাত করলে, তা কি সত্যই একেবারে বৃথা যেতে পারে ? চঞ্চল চায়ের পেয়ালাটা আস্তে টেবিলের ওপর রেখে লাফিয়ে উঠে থিয়েটারী ঢংয়ে বলতে লাগল চঞ্চল......বিজু খ, ওকে ধর,-বাছারে আমার স্বদেশসমস্যায় ওর বুঝি সমাধি হয় ! এক সঙ্গে তিনজনে ব'লে উঠল— ভােল••( রাগে,) নসেস্ (non-sense) ! বিজু......( কৃত্রিম গাম্ভীর্যে) একটু সিরিয়াস্ (serious) হতে শেখ, চঞ্চল। নবীন আহা, (সুরে, দু'বার) মেষ তােম নহ ত মানুষ’! সুতরাং ভাইধন, দেশ-ভক্তি-টক্তি তােমার মগজে কি করে চুকবে ?

৪ শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ ( প্রথম দৃশ্য সম্মিলিত আক্রমণে বেচারা একটু হতভম্ব হয়ে সকলের মুখের পানে চাইল ; তার পর হঠাৎ কোথা থেকে যেন শক্তি সঞ্চয় করে, ওদের চেয়ে এক পর্দা উচু গলায় বলতে লাগল- চঞ্চল......কী, ডেফামেস ( defamation ),—আমায় ‘মেষ বলা,-স্বরাজ-গভমেন্ট আসুক, তােমার নামে স্বরাজী-কোর্টে এক-ধারা মেরে তবে আমি জল গ্রহণ এক সঙ্গে তিনজনে ঠাট্টা করল- বিজু••••••আহা বেশ। নবীন•••••"ব্রেলভা, ব্রেভ ( bravo) ! ডােম্বল•••••"সাধু সাধু! চঞ্চল......আপাতত, আমি এই এক চুমুক চা খেয়ে তােদের আবার বলি,-গুরে রাসভের দল, (স্পষ্ট ও প্রাণ-ছোওয়া ভাবে) আধুনিক বাংল্পর যে কোন যুবককেই দেশ-ভক্ত নয়-বললেই তাকে অপমান করা হয়, এই সামান্য কথাটা তােদের মগজে ঢােকে। বিজু একটু চালাকি-হাসি-মাখা কণ্ঠে প্রশ্ন করলে ......অর্থাৎ তুই আমাদের বােঝাতে চাস, ‘চরিত্রবান’ চঞ্চলও যতটা দেশভক্ত-তাের রসেভরা ‘নৰ্তকী’ও ঠিক ততটা দেশভক্ত।

প্রথম দৃষ্ট] শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ নবীন......আরে রাম রাম, তাহলে ত’ স্বরাজ শুধু আমাদের ঘরে কেন, চঞ্চলের ‘চিৎপুরে’ও বাসা বাঁধত। ভােম্বল...স্বরাজ অত সােজা নয় দাদা ! == নবীন......তা আর জানিনা ভায়া, ‘স্বরাজ-শালা সেকেলে জামাইয়ের চেয়েও বেইমান, একেলে বিয়ের বউয়ের চেয়েও দরদী, আর চিরকেলে পাথরের দেবতার চেয়েও নিস্পন্দ! ভােল......ঠাট্টা নয় দাদা, স্বরাজ পেতে হলে চরিত্র চাই, সাধনা। চাই, শিক্ষা চাই, কাচার চাই- বিজু......(হাসতে হাসতে একই স্বরে)-কংগ্রেসে গ্ৰীয়ে সরবৎ বিতরণ করা চাই, শীতে চায়ের ছাত্র খােলা চাই-চাই কি, লীডারদের মাথা কামিয়ে নামাবলী গায়ে দিয়ে ‘ব হরি বােল’ বলা চাই- চঞ্চল..••••(একই স্বরে)—চঞ্চলদের ‘চিৎপুর’ ছাড়াচাই, মাগীগুলাের ‘মা’সতী হওয়া চাই, আর মদ্দাগুলাের হিমালয় পর্বতে জন্মান চাই।

-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
নবীন,
০ ০ ০ ০ ০ ০
আঃ শালারা, তােরা বড় বেসুরাে, তােম্বলের তাল
ভেঙ্গে দিলি।
( ভােম্বলকে সহজ কণ্ঠে ) তুমি বলে যাও ত’ ভাই,
এরা সব কোনকিছুরই সিরিয়াসনেস (seriousness)
বােঝে না,একেবারে গাড়ােল !
এক সঙ্গে দু’জনে একই রকম দমকে বলতে লাগল
চঞ্চ••
ডেফ-আ-মে-সন্ । def'a-ma'tion
'ডেফ-আ-মে-সন্ ( def'a-ma'tion
বিজু
০ ০ ০ ০
)
নবীন......(মুখ ভেংচে) থাম-থা-থা-থা!
ভােল..••••ঠাট্টা নয় চঞ্চল, তুই যদি দেশের সত্যিকারের কিছু
করতে চাস, তবে তাের চরিত্র সংশােধন করতেই হবে।
বিজু"""""বাপরে, সে ‘ও পারবে না ।
s
আর করতেও চাই না,কারণ আসেড, (unsexed)
হলে স্বরাজ লাভে একটুও সহায়তা করবে বলে
আমার মনে হয় না।

প্রথম দৃশ্য ।
-হীন কৃষ্ণ
৭
নবীন
। • • •
তা আর হবে কেন ? আচ্ছা, সমাজের খাতিরে
পাত্র-পাত্রীর ভেদাভেদ-জ্ঞান থাকাটার কিছু দরকার
আছে বলে মনে হয় কি চঞ্চল ?
চঞ্চ••••• নিশ্চয়ই মনে হয় কিন্তু সমাজের খাতিরে, কি
কিসের খাতিরে তা বুঝি না। আর তুমিও বােধ
হয় স্বীকার করবে সে জ্ঞানটা তােমার শ্রমান চঞ্চল
কুমারের খুবই টন্টনে আছে!—তা না-হলে সে
বৌদিকে প্রণাম করত না, আর নৰ্তকীকে নিয়ে হুল্লোই
বিজু•••••.হরি হরি, তুই কি আমার পাদ্রীরে! পেটুক-শালা
পেট পুরে খাবার জন্যে ত বৌদির উপর অচলা ভক্তি।
সকলের উচ্চ হাস্য।
ভােল••••কিন্তু আমি মানি না,-চরিত্র, ধৰ্ম্ম, এ সব না হলে
চঞ্চল'—তাহলে বলতে হবে তুমি ইতিহাস মান না। শ্রীকৃষ্ণ,
আকবর, নেলসন্সকলেরই আমার চেয়ে ঢের বেশ
‘তােমাদের ঐ চরিত্রেরই দোষ ছিল।
উচ্ছন্ন যাবে, দেব-দ্বিজে একেবারে ভক্তি নেই।

ঐহীন কৃষ্ণ
প্রথম দৃশ্য
নবীন••••"ওহে ইতিহাসে লেনিন্ আছে, গান্ধী আছে—
বিজু••••••—কামাল, স্যা-ইয়াটু-সেন
***
চঞ্চল......-ঐঅরবিন্দ থেকে রাসবিহারী-দা’ পৰ্যন্ত সবাই
আছেন।
আমিও ত ঠিক তাই বলতে চাই
‘তােমাদের ঐ সেকেলে-চরিত্র’ দেশের-কাজ করবার
একটুও মাপকাঠি নয়। যার শক্তি আছে সেই
দেশের-কাজ করেছে ও করছে,
কামিনী-কাঞ্চনের মােহ থাক বা না-থাক্।
নবীন•••••কিন্তু চরিত্র জিনিষটা
-
চঞ্চল••••••—থাক দাদা, তুমি আর চরিত্রের লেকচার ঝেড়াে না,
তােমার সে অধিকার নেই !সাত বছর বিয়ে করেছ,
সাত মিনিট ও বৌদিকে চোখের
বৌদিকে চোখের আড়াল হতে
দাওনি। সত্যি কথা বলতে কি, তােমার চেয়ে
আমিও
বােধ-হয় বেশী
চরিত্রবান ।আমি
তবু সাত-সাত দিন
নর্তকীর সঙ্গে
এ্যাপয়েন্টমেন্ট, (appointment) করি !

প্রথম দৃশ্য ] ঐ-হীন কৃষ্ণ বিজু'হিংসে দাদা, তােমার সুখের ওপর হিংসে! ওরে, তার চাইতে তুই নিজেই একটা বিয়ে করে ফেল্ না, সাত, সেকেণ্ডও তাকে চোখের আড়াল হতে দিসনি। চঞ্চল......আরে, বিয়ের সাধ ছিল যােল আনা! কিন্তু বিয়ে কাকে?-একটা বাঁদী সেভ- গাকে (slave girl)। ডােম্বল......( ঠাট্টার মত ক'রে) যােগ্যং যােগেন যােজয়েৎ! নবীন•••••"বালাই, যা!—রূপসী হাে’ বা না-হাে’, বঙ্গবালার ওপর ত’ বাংলার দুর্ভিক্ষ কোন দিনই নজর দেয় নি। বিজু...•••একবার তুই শুধু হা-বল, দেখ, আমি লটুকে-লট লাকে-লা এনে হাজির করি । চঞ্চল•••••তােবা, তােবা, তাের ক্ষমতার তারিফ, যদি দাদাও -করে, তবে তাকেও আমি বলে ফেলব—‘আমার ভাবী—ভামিনীর-ভ্রাতা । নবীন••••••আর তাের বৌদিকে বলবি–“মাইরি-মাইরি’? চঞ্চল জিভ, কামড়ে নাক-কাণ মােলা অভিনয় করল।

১০ @-হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য তারপর বিজুর পানে চেয়ে সে সহজ কণ্ঠে বলল- চঞ্চল দেখ, বিজু, জগতের কোন দাগই হাজার চেষ্টাতেও একেবারে মুছে যায় না। দাসত্ব-প্রথা স্বর্গ লাভ করল, কিন্তু তার বংশের বাতি জ্বালুতে রেখে গেল বাংলার মেয়ে ! এই দাসী-পনা অশ্রু-সম্বল বেচারীদের সঙ্গে আমি করব প্রেম ? আরে ছি ছি, তার চেয়ে নর্তকী ঢের ভাল,তার অন্তত এটুকু ক্ষমতা আছে যে সে ইচ্ছে করলে আমায় তার ডেরা থেকে তাড়াতে পারে। আর বিংশ শতাব্দীতে বিয়ে করাটা আমি কি মনে করি জানিস ?-ধৰ্ম্ম-অর্থ-কাম নষ্ট করা, ও সময়ের অপব্যবহার করা নবীন ( ঠাট্টায় )—আর চরিত্রহীনতার চরম পরিচয় ! চঞ্চল উইদাউট্‌ অফেন্স, ( without offence) একেবারে ঠিক তাই দাদা। ভােম্বল•••( রেগে)•একেবারে ‘ফুলে’র (fool) প্রতিমূর্তি! চঞ্চল•••••( হাঁসি চেপে ) তাহলে খুব উগ্র-গন্ধ-ভরা ফুল! তা যদি না-হত, আজকালকার বৈষ্ণবী-সন্ন্যাসী-কংগ্রেসের ছাপ-মারা অমন্ মাথাটাও ধরে উঠবে কেন ? নবীন “আরে ম্লেচ্ছ, তুই এ মাথার মূল্য কি বুঝবি ? সবুর কর, দেখবি কোনদিন এতে পদ্মফুল ফুটে উঠেছে। হাসল সবাই ভেম্বলের কিন্তু বােকার হাসি। , মানতেই প্রথম দৃশ্য ] এবীন কৃষ্ণ বিজু••••••কিন্তু চঞ্চল এটা মানিস্ ত’, যে কাউকে কাউকে ‘নাই’ দিলে মাথায় ওঠে চঞ্চল (ফল করে) যেমন স্ত্রীকে। চঞ্চলের কথা যেন শুনেও না-শুনে, আগেকার বেশে বিজু বলেই চলল- বিজু ••—তােকে আমরা লাইসেন্স, (license) দিই বলে বিবাহ-প্রথাটাকে এত হেয়-জ্ঞান করা? চঞ্চল • হেয়-জ্ঞান নয় চঁাদ, বরং প্রথাটার আমি খুব তারিফ, করি! নভেল পড়ে যেমন আমার ‘মােনা-ছুড়ী’ নৰ্তকী নাম ধারণ করলে, ইনটেলিজেসিয়ার (Intelligentia) হাতে পড়ে তেমনি কামের নাম হ’ল প্রেম, আর কামের ইন্ধন যােগাবার পন্থা হ’ল বিবাহ-প্রথা। নবীন কিন্তু এ প্রথাটারও ত’ একটা ব্রাইট সাইড(bright side) আছে ?

শ্রী-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
চঞ্চল"সব জিনিষেরই আছে দাদা! মৃত্যুকামীর কাছে তীব্র
বিষই বােধ-হয় সবার চেয়ে উপকারী।
নবীন
"হয়-ত’ সত্যি! কিন্তু তুই যখন কাম-জয়ী নস, বা হবার
ইচ্ছেও নেই, তখন তাের এই ‘তারিফ-করা’ সংস্কারের
কাছে, একটু মাথা নীচু করে একটা মেয়ে উদ্ধার
করলে এমন কি ক্ষতি ভাই-জীবন ?
চঞ্চল......ক্ষতি ?-ক্ষতি একটু আছে বৈ-কি দাদা! আজ যদি
দেশের সত্যিকারের ডাক আসে, হয়-ত’ তখনই আমরা
তড়াক করে লাফিয়ে পড়তে পারব,কিন্তু তুমি?-
বিজু'তা ঠিক, দাদার আমার
আমার বৌদির কাছ
থেকে
সেন্টিমেন্টাল(sentimental) বিদায় নিতেই ঘণ্টাখানেক
কেটে যাবে।
ডােম্বল ( সহাস্যে) শেষ পর্যন্ত যাওয়াই হয়-কিনা কে জানে?
চঞ্চল••••••(লাফিয়ে উঠে) হুররে, ভােম্বলদাস!
(স্পষ্ট ও প্রাণ-ছোওয়া ভাবে)—তাই স্বরাজের শুভদিন
-আসা পৰ্যন্ত আমরা শুভদৃষ্টি করব না, বন্ধনহীন
হয়ে থাকব,
কেমন ত’?
4

এম দৃশ্য ]
-হীন কৃষ্ণ
ভােম্বল ( আশ্চৰ্য্যভাবে ) আরে, তুইও তাহলে স্বরাজ চাস ?
চঞ্চল কে না-চায় ডােম্বল !
নবীন••••••আরে, আমরা ত’ স্বরাজ চাই দু’মুটো খেতে পাব
বলে,-
বিজু
কিম্বা হাটে-মাঠে হাজার অপমানের হাত এড়াব ব'লে,-
ভােল••••••(মাতব্বরী চালে)-ও-সব বাজে কথা, স্বরাজ আমাদের
বার্থ, রাইট
(birth right)
বলে। কিন্তু
মদ-মেয়ে-মানুষের ফাঁকে তাের আবার স্বরাজের সাধ
হল কেনরে চঞ্চল?
চঞ্চল••••••( সহাস্যে) কেন, স্বরাজ চিন্তা কি তােদেরই একচেটে
কংগ্রেস-বীর’ ?
(ভাবের অভিনয়ে)—আহা, আমারও কি সাধ হয় না,
একপাশে নর্তকীকে নিয়ে, আর একপাশে
‘সুরা-সুন্দরীর
সৌন্দৰ্য্য উপভােগ করতে করতে
কথনও উড়ােজাহাজে অমরার পথে তারকার মাঝে
মিশে যাই, আবার কখনও-বা টর্পেডাে কন্দরে
মৎস্যদেশের সাইরেণ-সুন্দরী’দের আবাহন করে বলি-
‘চ’লে এস কম্পিটিসন (competition )
বিজু••••••(জোরে) জী রহ কবি-কলঙ্ক।

১৪
ঐ-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
নবীন••••••ভাই-জীবন, আজ সুবিধামত দু’-একটা ‘পেগ’ (peg)
বাড়িয়ে দিও, দেখবে স্বরাজ না-পেয়েই—‘মিটেছে
সকল সাধ’ ( সুরে )।
চঞ্চল••••••অসম্মান কর না দাদা! তােমাদের আশীর্বাদে
আমার পান দর্শনে-নর্তকী নমস্কার
করে, পিপে
ফুপিয়ে ওঠে, আর মাতাল মুচ্ছা যায়!
তিনজনে একসঙ্গে-
ভােম্বল•••( বিরক্তিতে) আঃ, আবার!
বিজু•••••"বলতেই হবে আশীর্ববাদের জোর আছে !
নবীন••••••অতি গর্বেব হতা লঙ্কা!
চঞ্চল •••••লঙ্কা উচ্ছন্ন যাক! আমি কিন্তু দাদা, স্বরাজ না-এলে
মরছি না। বৌদির অনেক নিমক খেইছি,-এতাের
বিনিময়ে তাকে এটুকু দেখাবার সাধ আছে যে তার
ছেলেদেরও যেন আমাদের মত এমন অপমানের বােক
মাথায় করে আর না-দাড়াতে হয়।
তিনজনে একসঙ্গে-
নবীন••••••অহ, আশীৰ্বাদ করি—
বিজু••••••(সুরে) “যে অনলে জ্বলছে রে প্রাণ”
ভােল•••(ভাবে ও আন্তরিকতায়)উঃ, তাের মধ্যে এত, তবে তুই
মদ খাস্ কেন ?

প্রথম দৃশ্য ] শ্রী-হীন কৃষ্ণ চঞ্চল••••••ওটা কিছু নয়, মাত্র একটু ভাব-প্রবণতা! মদ না-খেয়ে কি আর করবার আছে তােম্বল ? (আন্তরিকতায়) দেখ, তােদের ঐ শাসকদের ওপর সবার চেয়ে সেরা অভিশাপ আমি কেন দিই জানিস্ ? তারা আমাদের নিষ্কৰ্ম্মা করেছে বলে। বিংশ শতাব্দীতে আমাদের জন্ম, আমাদের আর্মী (army ), নেভী (navy), ওয়ার (war) নেই, নেই, নেই-যে দিকে চাইবি সব বন্ধ,—কিছুই নেই,—দেশের একটা বােন্ড, বিউগল কল্ (bold bugle-call ) পৰ্য্যন্ত নেই। ( ভাবের আতিশষে ) স্বরাজ চাই কেন জানি ? কাজ করব বলে,—ওরে কাজ করব বলে,—নিৰ্মা হয়ে যে দেহে-মনে-প্রাণে বাত, ধরে গেল । নবীন••••••শালা আজ ভাটীখানা মেরে এসেছে। বিজু••••••(জোরে ও জলদে) দাও শালাকে কংগ্রেসে চড়িয়ে ! ভােম্বল আনন্দে-উল্লামে করমর্দন করবার জন্য চঞ্চলের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে লল- ভেম্বল (আন্তরিকতায়) যাবি, চল্ কংগ্রেসে- এন্তে চঞ্চল পকেট হতে একটা সিগারেট বার করে তার হাতে দিল। বিরক্তিতে তােম্বল সেটাকে দূরে নিক্ষেপ করল। ।

! ঐ-হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য চঞ্চল, (শান্ত স্বরে )ভােম্বল, দেশের এক নম্বর ভীরু মডারেট, কিন্তু দ্বিতীয় নম্বর,তাের ঐ কংগ্রেস্। মাপ করি ভােম্বল, কিন্তু এটা নিছক সত্য কথা। মানি, এর মত বড় জাতীয় ইন্সটিটিউসন ( institution) আর নেই। কিন্তু আমাদের মত বিজিত সকল দেশেরই ওপ ইন্সটিটিউসকে ( open institution ) ভীরু হতেই হবে। এদের না-নিয়ে কোনদিন চলৰে , কিন্তু এদের নিয়েও বিশেষ কোন কাজের কাজ হবে । বিজিত দেশে মার্কা-মারা হওয়া মানে জানিস? সত্যিকারের কাজ করবার পথে অন্তরায়কে টেনে আনা, সুতরাং কংগ্রেসে ঢুকে পাকামাে করা মানে,—বােকামােনা তিনজনেই নিমেষে আগুণ হয়ে উঠল, আর তাদের সম্মিলিত চিৎকার ও আস্ফালনে সারা ঘরখানা কাপতে লাগল- ভােল:-(রাগে কাপতে কাপতে বিকৃত স্বরে) কীঃ, কী! বিজু (অভিনয়ে)-আরে আরে দুরন্ত তাতার’! নবীন •(দাড়িয়ে সজোরে)সাধনা, সাধনা।

প্রথম দৃশ্য ]
ক্রীন কৃষ্ণ
দরজা
দিয়ে হাসিভরা মুখে
সাধনা প্রবেশ
করতে-করতে-
সাধনা•••••ন-ভায়ােলেন্স, নন-ভায়ােলেন্স, (non-violence)।
সাধনা ‘পদ্মিনী।
তার পরণে খদ্দরের ঢাকাই-সাড়ী ও সেমিজ,পরিষ্কার,
পরিচ্ছন্ন। মাথার কাল-কুঞ্চিত কেশরাশের এলো-
খোঁপার ওপর পিনে-আটা কাপড়ের পাড় টা ঘােটার
এক-পাশ বেড়ে পিঠে পড়েছে। তার সিতেয় সিদুর,
কপালে সিদুরের টিপ; নাকের ছােট্ট না-চাবিতে
লেখা-“মা”, গলায় সরু-সুন্দর-লিগলিগে-মফ-চেনে
লেখা—“সাধনা”। হাতে শুধু তিনগাছা ক'রে
সরু-চুড়ী। এক আঙুলে আংটী, তাতে লেখা “দেশ”।
তার হাসিমাখা মুখখানির প্রথম দর্শনেই সবাই
উৎফুল, ডােম্বল কেবল সেখানে বসেই সভয়ে-সঙ্কোচে
প্রণাম ক’রুল।
নবীন••••••আরে,
তােমার ঠাকুর-পাে-রত্নটীকে সামলাও !
দেব-দানব-স্বর্গ-মর্ত্য এমন কি কংগ্রেসকে পৰ্যন্ত
হেয় করা?(কৃত্রিম-ক্রোধে চঞ্চলের প্রতি ঘুসি দেখিয়ে) “আর
ধৈরজ নামানে!”
হাস্য-ত দুই ‘সম্মুখ-যােকা’র মাঝে শান্তি-মুর্তিতে
সাধনা এগিয়ে এল।

১৮ -হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য তার ফুটন্ত হাসি চাপ বার বৃথা চেষ্টা করতে করতে সে কৃত্রিম শাসনের স্বরে নবীনকে বলল- - সাধনা•••••"তুমি থাম দেখি! দোষ ত’ তােমারই ! বাংলায় বাড়ী ঘরে স্ত্রী রয়েছে,যত পার তার কাছে বীরত্ব ফলাও। তা-নয়, লাগতে গেছ এক— হাসির রাশি মিশিয়ে) —এক ‘বিয়ে-না-করা বীরের সঙ্গে ? ধন্য সাহস! হাড়-কখানা যে গুড়িয়ে দেবে ! নবীন••••••( কৃত্রিম গাম্ভীর্যে) অহহ নারী, একদিন ছিলে তুমি শক্তি, আজ তুমি হয়েছ শক্তি-হারী! সাধনা••••••(এবউ স্বরে) চমৎকার পুরুষ, একদিন ছিলে তুমি ক্ষমতার আধার, আজ তুমি হয়েছ অক্ষমতার চঞ্চল••••••(চীৎকারে) লং লিভ, আওয়ার (Long live our) বৌদি। (বিজু ও ডােম্বলকে) এই, বনা সব,হিপ হিপ হুররে, হিপ হিপ হুররে! (সাধনার পানে চেয়ে) এস দাদা-বিজয়িনী (হাত বাড়িয়ে দিয়ে) শেক্‌ (shake) ! নবীন••••••(ঠে দিয়ে) পর-স্ত্রী অস্পৃশ্য ! মাত্র মুহূর্তের জন্য চঞ্চল নবীনের পানে তাকাল।

প্রথম দৃশ্য ] শ্ৰহীৰ কৃষ্ণ তখনই প্রাণ খােলা হাসিমুখে সাধনার সঙ্গে হস্ত-মর্দন করতে-ক’তে সে জাহির করল- চঞ্চল.•••••দাদা যখন আপন, বৌদি বুঝি কখনও পর হয়। নবীন••••••না না, “ও” পর-স্ত্রী নয়, আপন- নিমেষে নবীনের কথা বাধা দিয়ে সাধনা বলে উঠল- সাধনা••••••—বিবাহিতেরা, ভাই, ভারী স্বার্থপর ! চঞ্চল •••••"স্বাগতং, ব্যাচিলার’ (bachelor) বৌদি। সকলের উচ্চহাস্য। তারপর চঞ্চলের ভাষায়, বিজুর সুরে, কীৰ্ত্তনের ঢংয়ে, কৃত্রিম ভাবে আস্ফালন করতে-করতে তিনজনে বার-বার গাইল- বিজু, চঞ্চল ও ভােল•••••• “বৌদি, মাইরি, কি বলিব আর- জীবনে মরণে শয়নে স্বপনে তুমি থেকো ব্যাচিলার (bachelor)!” হাসির ফোয়ারা ছুটল ।

২ @হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃষ্ণ হাসির বেগ কোন রকমে কিঞ্চিৎ কমিয়ে সাধনা জিজ্ঞাসা ক'ল- সাধনা••••••তা যেন হ’ল ভাই, কিন্তু তােমাদের কোন্ পাশায় কুরুক্ষেত্রের সৃষ্টি হচ্ছিল, শুনি? আর কাউকে কোনকিছু বলবার অবসর না-দিয়ে-- চঞ্চল••••••( তাড়াতাড়ি) ও কিছু-না বৌদি! আমি বলছিলুম, বাংলায় মেয়ের ভাগ ন’-আনা। যদি সত্যিকারের দেশের উন্নতি চাও, তবে ‘নয়’-কে হয়’ কর। তাদের হেঁসেলে আর আঁতুড় ঘরে বন্দী করে রাখলে চলবে না।এইটুকুতেই দাদা রেগে আগুন। আমায় কি বল্লে জান বৌদি?—“গাধা, তাের বৌদি যদি হাটে-মাঠে লেকচার (lecture) দিতে থাকে, কিম্বা সেনার সাজ প'রে তলােয়ার ঘুরিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়, তবে, শুয়ার পেটুক, তুই কি খেয়ে তাল ঠুকবি ?”–(আন্তরিকতার অভিনয়ে) আচ্ছা তুমিই বলত বৌদি, পেটুককে পেটুক বললে তার রাগ হয়-কি-না? হাসি-মুখে সাধনা সম্মতি জানাতে লাগল। তােম্বল ফ্যালফ্যাল করে শুধু চেয়েই রইল। নবীন ও বিজু দারুণ-চাঞ্চল্যে একসঙ্গে বলে উঠল নবীন•••••"বাপস, নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার । বিজু••• (ম্যাগাজিনের একখানা কাগজ ছিড়ে)এই নে’ সার্টিফিকেট, (certificate), তুইই নয়’-কে ‘হয় ক'ৰ্তে পারি!

প্রথম দৃশ্য ] -হীন কৃষ্ণ ২১ সাধন••••••( চঞ্চলকে) ও লােকগুলাের কথা ছেড়ে দাও! ওরা অন্তরে-বাইরে ডিসপেপটিক্ (dyspeptic)। তুমি খাওয়ায় সচ্চিা, বলায় সাচ্চা,তাইত’ তুমি আমার ভাই। আমরা কিন্তু আজ ভাই-বােনে এক সঙ্গে খাব,কেমন ত’ ? চঞ্চল ত-তর করে নবীনের পাশে গিয়ে তার কানে-কানে বলল- চঞ্চল••••"ফ হেভস্ সেক্ (For heaven's sake) দাদা, মাইরি বাঁচাও! নবীন ••••••কেন রে ? চঞ্চল ••••"আজ নৰ্তকীর সঙ্গে এপয়েন্টেড, ডে (appointed day)। সাধনা•••••• (হেসে) এর মধ্যে এত বড় শত্রুর সঙ্গে শুধু মিলন নয়, আবার পরামর্শ! চঞ্চল••••••সত্যি বৌদি, যারা ছােট মেয়েদের টাকার আণ্ডীল নিয়ে বিয়ে করে, তারা শুধু আমাদের শত্রু নয়, তােমাদেরও! নবীন•••••• (ভয় দেখানাের স্বরে) চঞ্চল! চঞ্চল••••• (সরল অনয়ে) দাদা, ‘মাহি পরমাে ধর্মঃ”।

२२ -হীন কৃষ্ণ [ প্রথম পৃষ্ঠ নবীন••••••( কাজের-কথা বলার ভাণে ) যাক, তাহলে সেই ভাল। তুই এখনই যা। বােকা লােকটা আর্টের নামে অনেক টাকার অপব্যয় করছে। বায়স্কোপ খােলবার ‘চারটা এমন চালাকি করে ছাড়বি ; যেন সে অনায়াসে চক্রে পড়ে। দেখিস, আমার মাথা খেতে যেন তার যুবতী মেয়েটার চক্রে পড়ে নিজেই শেষকালে— চঞ্চল••••••—বৌদি, দেখচ-দেখ চ- নবীনের প্রতি অনুনয়-প্রতিবাদের কণ্ঠে সাধনা••••••নাঃ, ‘ও’ খেয়ে যাবে। নবীন••••••( বিরক্তির ভাবে) আঃ, কাজের সময় নাক-কান্ন? একে ত’ স্টুপিডটাকে (stupid) কাজ দিলে বৌদিদের সঙ্গে সদালাপে ভুলে বসে থাকেন। —গর্দভ, রাসকেল ( rascal ), মিথ্যে-কথার-ঝুড়ি। যা বলচি এখনও চঞ্চল••••••(হেসে) দাদা আমার, সত্যের অপলাপের যুধিষ্ঠির’! নবীন••••••এখনও !

প্রথম দৃশ্য ]
ঐ-হীন কৃষ্ণ
চঞ্চল••••••এই চঞ্চল চল। বৌদি, কি করব, দাদার আদেশ।
যা বৌদি, কাল এসে তােমার প্রসাদ আগে জিভে
কেমন ত’ বৌদি ?
পেতে নেব।
সাধনা••••••( সহাস্যে) ঠিক
?
চঞ্চল.•••••সত্যি, বৌ-রাণী।
দু’জনের মধুর হাস্য ;-হঠাৎ হাস্ত সংবরণ করে বিজু
ও তােম্বলকে
চা ত’ এখনও ওঠ। তােদের
যদি একটা সেন্স, ( sense) থাকে! দাদার গর্জনকে
ভয় না-করি, বৌদির অভিশাপকে
সাধনা••••••( তিরস্কারের মাধুৰ্যে )—দুষ্ট, ভাই!
চঞ্চল••••••( ভােম্বল ও বিজুর হাত ধরে। সেই জন্যই ত’ বৌদি, এই
‘স্বাড়ের-নাদী-দুটোকে’ বচি—ওরে, এখনও চ,
শেষকালে যখন মধুমাখা ‘দুষ্ট মিছরিমাখা ছুরিতে,
আর আপন-করা ভাই’ পর-করা মুখভারী’তে পরিণত
হবে, তখন হয়ত গর্দভগুলাের জ্ঞান হবে।

২ ৪ ঐহীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য অভিমানের স্বরে বিজু বলে উঠল-- বিজু•••••চ ভাই, সত্যিইবৌদি হরিণা’ হলেও, একচক্ষু-বিশিষ্টা! আমাদের সঙ্গে একটা কথা বলবারও ফুরসৎ- দু’জনে একসঙ্গে বিজুকে দমিয়ে দিল {.একাকা মাৰ ককাসেৰে মানিক। চঞ্চল••••••( সুরে) “ও তাের মান করা কি সাজে” । নবীন•••...একটা প্রাণ, ক’জনকে বাটোয়ারা করে দেবে মানিক। সাধনা তার পােজে, মুখে-চোখে ভৎসনা উদ্ভাসিত করে তীব্র কণ্ঠে নবীনের কথার প্রতিবাদ করল-- সাধনা••••••আঃ! লাফাতে লাফাতে চঞ্চল ও বিজু সমস্বরে চীৎকার করতে লাগল-- চঞ্চল•••••সিভিল-ওয়ার, সিভিওয়ার (civil war)! বিজু•••••দুর্বল ভীরু, কর পলায়ন! ডােম্বলকে টানতে- টাতে চঞ্চল ও বিজু বেগে প্রস্থান করল। এন্তে পথের পানে এগিয়ে মধুর কণ্ঠে সাধনা ডাকল- সাধনা•••••• ঠাকুর-পােয় বিজু ও চঞ্চল••••••( দুর হ'তে) কাল, বৌ-দেবী। সাধনা••••••( সস্নেহে) ঠিক এস ভাই। উত্তরের প্রতীক্ষায় স্থির নেত্রে সাধনা দাড়িয়ে রইল।

প্রথম দৃশ্য ] ঐ-হীন কৃষ্ণ २८ তার অবস্থা দেখে নবীন মুচকে হেসে ব্যঙ্গ করে গাইল- নবীন......(সুরে )--“তুমি এস হে আমার তৃষিত তাপিত- নিমেষে ঘুরে এগিয়ে এসে সাধনা প্রতিবাদ করল- সাধনা••••••‘তৃষিত’ না-হলেও ‘পিত-চিত বটে! বাংলার বৌ হবার মত দুঃখ কোথাও দেখেছ ?—আহা, বাংলার বর, -তােমরই তুলনা তুমি’ নবীন......(হেসে) তাইত আমি চাই-ডাইভােস (divorce), নিকে, বিজাতি-বিবাহ,—যাতে তােমরা দেখে-শুনে, হয় একটা খাজা-গােরা, না-হয় একটা অজা-মেড়ো বেছে নিয়ে দিন-রাত অফুরন্ত চেল্লাও-‘নাথ হে, নাথ হে'— সাধনা......(শ্নেসে) ওঃ, যদি তােমার শুভ-ইচ্ছা অচিরে পূর্ণ হয়, তা হলে তােমাদের কি দুর্দশাই-না হবে বলত ? শেয়াল-কুকুরও যে তােমাদের পানে ফিরে তাকাবে না ! এই বিনা-পয়সার বিয়ের ব্যবসা-কারবার ওঠাতেই হবে, তা-ছাড়া হয়ত-বা বনে গিয়ে ছাগী-পাঁঠীর শরণাপন্ন হয়ে গর্জন করতে হবে- “প্রিয়ে চারুশীলে, প্রিয়ে চারুশীলে”। ত

?
এ-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
নবীন••••••এ সব বাংলার ‘জ্যান্ত-মােমের-পুতুলের চেয়ে জানােয়ার
ফানােয়ার বরং ভাল,কারণ হয়ত তাদের কাছে
তবু একটু প্রাণের সাড়া পাওয়া গেলেও যেতে পারে।
সাধনা••••••সবই রুচির ওপর নির্ভর করে,হরিণের রুচি শ্যামল
হরিৎ ক্ষেত্রে,-শৃগালের রুচি পূতিগন্ধে,—বীরের রুচি
সৌন্দর্য্যে ;কিন্তু এসব ভীরুর রুচি ?-কুৎসিতে।
নবীন••••••( হাসির শ্লেসে) তা ঠিক আমার রুচি ত’ একমাত্র তুমিই !
কিন্তু হে বিষময়ী সাহসিকে, তুমি তােমার রুচির সীমা
অতিক্রম করেছ।
সাধনা•••••.(হাসির শ্লেসে) তা ঠিক, যে দিন থেকে অজ্ঞানে
‘ভেতাে-ভীরুকে পতিত্ব-পদে বরণ করেছি।
নবীন••••••(রাগের অভিনয়ে) “আবার, আবার সেই কামান গর্জন’!
—জগৎ যাক, শেষে এক দুর্বল অবলা আমায়
বলতে সাহস করে কিনা ভীরু’ ।
সাধনা••••••( শ্লেসের হাসিতে)
দুঃখ কি, বিশেষ্যের শােভা ত’
বিশেষণেই !
নবীন••••••কিন্তু, হে প্রগলভা-পরাকাষ্ঠা, তুমি ত’ জান যে আমি
নবীন বাংলার চির-নবীন।
সাধনা••••••( উচ্চ আবৃত্তিতে ) “ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা”।
এক হাতে সাধনার চুলের মুঠো ধরে আর এক হাতে
তার পিঠে সােহাগী-কিল মারতে মারতে
নবীন••••••“আধ-মরাদের এই’ মেরে তুই বাঁচা” ।

প্রথম দৃশ্য ] -হীন কৃষ্ণ २१ সাধনা••••••উ, ছাড় ছাড় ! সত্যি বলচি আধমরা আমরা কখনই ; তবে পুরাে-মরা কিনা কে জানে! নবীন•••• হে অল্পে অসহে, (হাত ছেড়ে ) আজ আমি তােমায় অল্পে ছাড়ব না ! সাধনা.•••••( হাত জোড় করে) দোহাই দেবাদিদেব, দেবাদিদেব, সারারাতের অযাচিত পরিশ্রমে আমার স্বামীর ভিটেটা ধােপা-পাড়া ক'রে তুল’না ! সাধন প্রণয়ের হাসি ছড়িয়ে দিল। নবীনকে অলক্ষে এগুতে হল। একহাতে সে সাধনাকে বুকের কাছে টেনে এনে, অঙ্গ হাতে তার চিবুক স্পর্শ করে আদৰ করল- নবীন......স্বামী-সােহাগিনী, ( চুম্বনের আকাক্ষা দমন করতে-করতে) নাঃ, এখন ও-সব নয়! স্ত্রী বলে কিনা ভীরু শােন নারী, আমার পূর্ব-পুরুষ-রত্নদের শ্রেষ্ঠ জয় কোথায় জান?—যেদিন তােমাদের ঘােমটা পরিয়ে হারেমূয়ে ঢুকিয়ে সাধনা......হারামী করে! ওগাে, সে ত’ শ্রেষ্ঠ পরাজয়, জয় নয়ত। তবে শােন পুরুষ, আমার পূর্ব-নারী-মণিদের শ্রেষ্ঠ জয় কোথায় জান ?—যে দিন তােমাদের শক্ত বাহু থেকে সকল শক্তি হরণ করে শুধু সেইটুকু মাত্র বাকী রেখেছিল যতটুকু নারীর পদসেবার জন্য দরকার !

২
এ-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
নবীন••
"হাঁগাে, সে ত’ শ্রেষ্ঠ পরাজয়, জয় নয়ত! আচ্ছা এই
সব প্রবীর-পুরুষ-প্রবরদের শ্রেষ্ঠ সুবিধা কি জান?
সব দেব-দেবী ছেড়ে মা-ষষ্ঠীর কৃপা তােমাদের ওপর
অফুরন্ত !
সাধনা••••••আর এই সব বিজেতানারী-মাণিক্যদের শ্রেষ্ঠ
সুবিধা কি জান?—সব আইন-ফাইন ছেড়ে
‘বে-আইনী-আইনের কৃপা তােমাদের ওপর।
অপার!
নবীন••••••তাই নাকি! কিন্তু আমাদের মত পুরুষ-সিংহদের শ্রেষ্ঠ
কৌশল কি বলত ?—তােমাদের ঐ ‘নারী’ নাম
দেওয়াতে,তােমরা অবলা, তােমাদের অরি নেই,
শুধু এ কথাগুলাে বলে এই সিংহরা ‘দুষ্ট শশক’ বেঁধে
সংসারে শান্তি স্থাপন করেছে।
সাধনা••••••বল কি । কিন্তু আমাদের মত নারী-নাগিনীদের শ্রেষ্ঠ
কৌশল কি বলত ?—আমাদের ঐ রমণী’ নাম
নেওয়াতে—আমরা সুন্দরী, আমাদের তুলনা নেই,
কথাগুলাে বলে এই নাগিনীরা’
‘সল্যাজ-শেয়াল’ বেঁধে সংসারে শান্তি স্থাপন করেছে।
শুধু এই

প্রথম দৃশ্য ]
-হীন কৃষ্ণ
নবীন
সল্যাজ-শেয়াল’!—কি এত বড় স্পর্ধা! বুদ্ধিহীনা
নারী, আজ আমি বলব তােমাদের বােকামাের চরমতা
কোথায়!—পুরুষ তােমাদের দাসী করে নিয়েছে,
-একেবারে নিছক বাঁদী-দাসী,মুখে কিন্তু তারা
তােমাদের বলে দেবী, লক্ষী, শক্তি, সরলা, এমনি
ধারা কত কি ‘রাবিশ’-বুদ্ধিহীনা নারী-রত্ন তােমরা,
সেই মধুমাখা বিষকে অমৃত জ্ঞান করে পূর্ণ-প্রাণে
পুরুষের পদসেবা করতে নিজেকে হারিয়ে ফেল!
সাধনা•••••কি, এত বড় অপ্রিয় সত্য কথা ! বুদ্ধির বৃহস্পতি
পুরুষ—আজ আমি বলব তােমাদের বােকামাের
চরমতা কোথায় !-নারী তােমাদের বন্ধনময় করে
নিয়েছে,একেবারে নিছক বন্ধন,—আসামীর চেয়েও
নিৰ্ম্মম বন্ধন ;-মুখে কিন্তু তারা তােমাদের বলে
দেবতা, স্বামী, প্রভু, প্রাণনাথ, ‘তােমা বিনা আর
জানিনা, এমনি ধারা কত কি ছাই-ভস্ম, বুদ্ধির-টেকি
পুরুষ-প্রবর তােমরা, সেই সত্য-মাখা মিথ্যাকে
প্রাণের-টান মনে করে, সব কিছু এক সঙ্গে উচ্ছন্ন
দিয়ে নারীর পদস্পর্শ করে বারবার বল
‘দেহি পদ-পল্লবমুদার।

-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
তােমরা ভেতরে-ভেতরে
নবীন......(আশ্চর্যের অভিনয়ে) বাপরে,
এত বড় মাকাল-ফলটী”।
সাধনা••••••(একই স্বরে) মাগাে, তােমরা ভেতরে-ভেতরে এত বড়
অত্যাচারী !
নবীন••••••( মাতব্বরী গর্বে ) অত্যাচার নয় সাধনা, ওটা শুধু শক্তির
খেয়াল! শক্তি দিয়ে আমরা তােমাদের জয় করে
রেখেছি, তাই আমাদের শক্তির খেয়াল একটু-আধটু
তােমাদের সহ্য করতেই হবে।
সাধনা......ইংরাজ যখন তোমাদের ঐ-একই কথা বলে ?
নবীন••••••তখন সেগুলাে ‘কানের ভেতর দিয়ে একেবারে
মরমে পশে’! আরে, তাই ত’ আমরা স্বরাজ চাই।
সাধন••••••আমাদের হলে ‘ডবল-স্বরাজ’ চাই।
;
নবীন•••••.(হেসে) কিছুই লাভ হবে না সুন্দরী ; স্বরাজেই বল,
আরবিরাজেই বল, তােমরা যে তিমিরে সেই তিমিরে।

প্রথম দৃশ্য ]
ঐ-হীন কৃষ্ণ
সাধনা...... কাতরে ) স্বরাজ! স্ব-রাজ!
নবীন..
কেঁদে আর লাভ কি বল, যখন ওটাকে পাওয়া যাবে,
তখন যাহােক একটা ভাগ-বাঁটরা করে নেওয়া যাবে।
সাধনা••••••( আরও কাতরে ) স্বরাজ।
নবীন•••
দুপুর রাতে শােবার সময় প্রাণে ‘মহরম জাগাচ্ছ কেন
মানময়ী ?
সাধনা
•( করুণ কাতরে উচ্চে ) স্বরাজ !
নবীন
)
বিরক্তিতে) নাঃ, নারীকে বিশেষত স্ত্রীকে পলিটিকসে
(polities) প্রবেশ করানাের কি মুস্কিল দেখত ।-
রাত-বেরাতে এমনি করে ক্ষেপে উঠল। সাধনা।
সাধনা•••• • স্বরাজ!
নবীন......( উচ্চে) সাধনা,-সাধনা !
সাধনা••••••(একই স্বরে ) স্বরাজ-সরাজ!
নবীন••••••তাই ত’, কি করি?
সাধনা.....(টপ,ক'রে ) স্বরাজ!

ঐ-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
নবীন•• স্বরাজ-করা কি সােজা সাধনা, ও ত’ছোঁড়াদের কাজ।
কাল সকালে আমি ওদের ব’লে স্বরাজ পাবার যাহােক
একটা বন্দোবস্ত করব।
সাধনা••••••( দাবীতে) স্বরাজ ।
নবীন•••••"এক্ষুণি কোথায় পাব ?
সাধনা••••••( অবুঝের মত) স্বরাজ।
নবীন••••••আঃ, বড় একগুয়ে তুমি !
সাধনা.•••••(
চাই-ই ভাবে ) স্বরাজ!
নবীন..•••••দেখ, ঠাট্টার সময় যদি এমনি-ধারা ইয়ারকি কর, তবে
কেষ্টোচন্দোরকে ফো ( phone) করে একশ’-বছর
রাধাকে বিরহে কঁদাবার কৌশলটা শিখে নেব কিন্তু।
সাধনা।
( বাজে-কথা-ছাড় ভাবে ) স্বরাজ।
নবীন......নাঃ,
জ্বালাতনে পড়লাম !
দেখি
ফোল্টাই (phone) করি, ভায়রা-ভাই আমার ত’
সাক্ষাৎ যুবতী-কনট্রোলার (controller) হয় আমার
একটা হিল্লে করুক, না-হয় স্বরাজ পাবার পথটা
বাতলে দিক।
সাধনা•••••• পাগলের মত ক্রন্দনে) পরাজ! স্বরাজ !! স্বরাজ !
সাধনা ভাবে বিভাের হ'য়ে খাটে পড়ল।

প্রথম দৃশ্য ] ঐ-হীন কৃষ্ণ নবীন ব্যস্ত হয়ে ফোন্ ক’তে লাগল-- নবীন•••••“৪৯” বিষ্ণু-লােক : রাইট’ও (right o)। --হ্যালাে ( Hullo ), এটা কি কৃষ্ণচন্দ্র দেবতার কুঠী ? দেবতা ঘরে আছেন ? —আমি নবীন। দেখা হবে-না কি? আপনি খবর দিন, বােধ-হয় তিনি (আন্তরিকতায়) নবীনের আহ্বান উপেক্ষা ক’রুতে পাবেন না ! কি বললেন, নবীনা না-হলে তিনি দেখা করবেন না? ( ডান হাতে ফোনের মুখ চেপে ধরে) এই মরেছে। ঢেকী স্বগগে গেলেও ধান ভানে! ( ফোনে হেসে) আচ্ছা, তার এই ‘কৈবিক’ সাক্ষাৎ-প্রথার কারণটা বলতে পারেন ? -কি! ( আশ্চর্য্যে। তিনি বলেন, নারী-জাগরণ ভিন্ন, ভারতের মুক্তির সম্ভাবনা নেই। ফোন নামিয়ে গম্ভীরে-চিন্তায় নবীন আর একবার শেষের কথা-কটা উচ্চারণ ক’ল। আবার ফোন তুলে নিয়ে হেসে বলল- --কারণটা ত’ বেশ ! আর নবীনার জন্যই ত’ আমি কে ডাকছি।

৩৪
শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
-কি ? (রাগের গাম্ভীর্যে) মিথ্যে কথা মানে কি ?
—আরে বাংলায় নবীন-নবীনা ‘একই’ ! আজকাল
এখানে আর (অল্প হেসে) (স্ত্রীলিঙ্গের আকার পর্যন্ত
নেই !
কা’র-নবীনার বয়স ?—ওঃ একেবারে (মুচ কী হেসে)
ভ-যুবতী!—হ তা’ হবে, বােধ-হয় আপনাদের
রাধার চেয়েও সুন্দরী, —অন্তত ‘বঙ্কিমী-মতে আমার
কাছে ত’ বটে।
নবীন জোরে হেসে উঠল।
হাঁ, একটু শীঘ্ৰ ডেকে দেবেন—
“থ্যাঙ্ক ইউ ( Thank you )।
(ফোন হাতে রেখে) নাঃ, বড় মুস্কিলের কথা
কেষ্ট-চাদের-আমার এ-বয়সে এখনও ‘মেয়ে-য়ােগ’
যায়নি দেখছি!
( আবার ফোন্ কানে নিয়ে, ) ইয়েস্ (yes ), তিনি কাজে
ব্যস্ত ?-রাধা-কুঞ্জে ?-
( ডান হাতে ফোনের মুখ চেপে ধরে )—এই মরেছে।
( আবার কোনে কতক্ষণ পরে
দেখা হবে ?—পাঁচ
মিনিট ?
—আচ্ছা বেশ, আমি অপেক্ষা করছি।

প্রথম দৃশ্য ]
শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
গল্প ক'ব ? আপনার সঙ্গে ?বেশ ত’, পরম
আনন্দে। কিন্তু আপনাকে ত’ চিনতে পারলাম না ?
ওঃ, আপনি ললিতা—সেই জন্যই আপনার স্বর
{ মধুর হেসে) মধু-মাখা !
—নবীনা ? হাঁ ভয়ঙ্কর অসুস্থ, জ্ঞান-হারা ।
-প্রাণে কি চায়, কি করে বলব বলুন?
মুখে
ত’ ব’ছে ‘স্বরাজ।
--আমায় ভালবাসে কি-না,-কি ব’লব
বলুন! মেয়েমানুষের ওপরটা রসভরা কিন্তু ভেতরটা
মরীচিকা,—আমাদের চোদ্দপুরুষের সাধনায় তার
সন্ধান মেলেনি।
হাসচেন যে ?
( নিজেই হেসে আশ্চর্য্যে) আমি রসিক ?—( মধুর আদাবে )
আপনার মেধাকে প্রশংসা করি,নবীনা কিন্তু স্বীকার
করে না।
—হ, বড় ঝগড়া করে আমার সঙ্গে।
-কোথায় যাব? নন্দন কাননে ? সেখানে নাচের
মজলিস্ ? কিন্তু কেমন করে-কার সঙ্গে নাচব ?
-আপনার সঙ্গে ? অশেষ ধন্যবাদ, কিন্তু
—( দুষ্টামীর হাসি মিশিয়ে ) ‘কিন্তু শুনবেন না? যাওয়া
চাই ?

-হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য —কি বললেন ? একঘেয়ে ‘বন্দুকী-বাচ’ ও ‘তলােয়ারী-তান’ আপনাদের ভাল লাগে না ? উচ্চ হাস্যের আতিশয্যে নবীন ফোনটা নামিয়ে নিল। হটাৎ সে চিন্তিত হয়ে উচ্চারণ করল- ‘বন্দুকী-বাচ’ ! ‘তলােয়ারী-তান’!—কে জানে ! আবার সে ফোন কানে তুলে নিল - (হেসে) হাসব না ! আপনি এমন ঠাট্টা শুরু ক’লেন, দেবতা ছেড়ে কখন কেউ মানুষ চায় ? কি বললেন, নূতনত্বই জীবন?—সে আপনাদের পক্ষে, আমাদের কাছে ত’ রাজার ও স্ত্রীর গােলামী করাই জীবন। পাঁচ মিনিট ত’ হ’ল। ঠাকুর যখন রাধা কুঞ্জে, তার সঙ্গে দেখা করা দেখছি বিশ-বাঁও জলে ! -আপনার সঙ্গে আরও খানিকটা গল্প করব ? কিন্তু দেবতাকে যে বড় দরকার ! —রাত্রে ? রাত্রে যাওয়া ত’ মুস্কিল! নবীনা ? আচ্ছা চেষ্টা করব। আবার দেখা হবে বৈকি। নিশ্চয়ই হবে, তবে আপনার মনে রাখলে হয় এখন তবে রাধা-কুঞ্জে কনেক্সান্টা (echnection) করে দিন, নমস্কার —

প্রথম দৃশ্য ]
ঐ-হীন কৃষ্ণ
৩৭
ফোনে ললিতার চুম্বনের শব্দে চমকে, ফোন হাতে
—কি করলে? কি করলে ! কি, কিস্ (kiss ),
ললিতা আমার কাণে
কাণে কিস্ ক'লে—আমার
‘সতীত্ব আমার ‘পত্নী-ভক্তি’, হায়-হায়, সব একসঙ্গে
এক সেকেণ্ডে উবে গেল।
( ফোনে উচ্চে) ললিতা, কি করলে ? ললিতা,ললিতা?
(চ’কে উঠে) ও, আপনি ললিতা নন্ ! কৃষ্ণ!-
নমস্কার দেবতা।
নবীন-নবীনা একসঙ্গে
খবর ?-খবর সাঙ্ঘাতিক।
এই মুহূর্তে আপনাকে চায় !
পাঁচ মিনিট পরে ?
( আশ্চযযা )
অস্ত্র-পরীক্ষা
!
আপনি করবেন ?-আচ্ছা, এখন ওখানে কি
‘ম্যানকা-ফ্যানকা’র নতুন নাম অস্তোর-টস্তোর’?
-না, তবে?
হালাে ! হালাে ! (Hullo) আচ্ছা আপনি শীঘ্র
আসুন তখন বােঝা যাবে।
—টা-টা (Ta-ta)।

[ প্রথম দৃশ্য
নবীন••••••( ফোন্ রাখতে রাখতে) ওঃ, স্বর্গটাও শেষে বিলেতেরই
ইমিটেট ( Imitator) হয়ে পড়ল ! শালাদের
দেশে একজনে ভানে ধান, ত’ বলে, হাজারে হাজারে
তুলেছে তান !—কি চালিয়াৎ।
দ্যা তা-আমার
রাধা-কুঞ্জে হুরী নিয়ে হররা চালিয়েছেন, আমায় বলা
হ’ল কি-না অস্ত্র-পরীক্ষা !—নাঃ কানটায়,অধৰ্ম্ম,
জন্ম-জন্মান্তরের পাপ না-থাকলে কেউ কি কখন
স্বর্গের মত লােচ্চা জায়গায় ফোন করে ?
সাধনার বিদ্রুপের হাসিতে নবীন জ্বলে উঠল।
হা-হ্যা করে দাত বার করছ যে বড় ? তােমার
জন্যই ত’ !
অষুধ
সাধনা•••••হাসব না-ত’ কি কাব,—দেখি কানটায়
দিয়ে দিই—
হাসতে-
হাতে সাধনা এগিয়ে গেল নবীনের কানে
হাত দেবার আশঙ্কা দেখিয়ে
নবীন••••••( বিরক্তিতে, দু-এক-পা পিছিয়ে ) যাও যাও!

প্রথম দৃশ্য ] শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ হঠাৎ কৃষ্ণের প্রবেশ। দীর্ঘ চেহারায় ভারতীয় শক্তিমান আদর্শের সুলক্ষণ বৰ্ত্তমান,-নলিন নয়ন, নাসিকা উন্নত, প্রশস্ত কপালে রক্ত-রংয়ের ত্রিশূল-তিলক । পরণে সার্ট, ও সর্ট, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো—সবই সবুজ ঘাসের রঙ। কোমরে রিভলভা-সমেত- খাপ-যুক্ত বেল্ট। চাল-চলনে চেহারায় সে সৈনিক, সে কর্মঠ। কৃষ্ণ......( হাসি চেপে ) নমস্কার দম্পতি। মাপ করবেন, কান-টানাটানির টা-অব-ওয়ার (Tug-of-war)! বেশ-বেশ, আপাততঃ প্রবেশের অনুমতি দিয়ে বাধিত নবীন••••••কোন্ গগনের চঁাদ, মাণিক ?-একবার মুখখানা দেখি ! কৃষ্ণ...আমি কৃষ্ণ। দু’জনে ক্ষণেক অবাক হয়ে তার আপাদ-মস্তক দেখল। নবীন......(গােঙাতে গােঙাতে) সাধনা, রিভলবার !

৪.
ঐ-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
সাধনা ডেস্ক, থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে কৃষ্ণের পানে
তাগ করল।
নবীন•••"সােনার
চাদ আমার, ফল-পারুসনিফিকেসান
(False personification), হাউস্-ট্রে-বায়-নাইট,
(House trespass by night), দম্পতির-প্রেমে-বাধা
-দেওয়া, পরস্ত্রী-লুকিয়ে-দেখ,—বাপধন জেলের ভয়
নেই ?
কৃষ্ণ•••••(সহাস্যে) আরে জেলের ভয় থাকলে কি আর ‘ইন্দ্রের
‘একচ্ছত্র রাজত্ব চুরমার করে সাধারণ-চালিত
রাজত্বের ভিত্তি গাড় যায়।
}
নবীন
••( শ্লেষে )
আয় বাপ,
ওরে আমার লেনী-রে ।
বুকে আয় ।
কৃষ্ণ••••( আশ্চর্য্যে) লেনী ! তােমরা তাকে চেন নাকি ?—সে
আমার ব্ল্যাঙ্কে’র (Rank) লােক। আমি কৃষ্ণ।
নবীন
প্রভু, আপাততঃ এখানে না-বলে-আবির্ভাব কি
মতলবে ?—চুরি, চামারী, বাটপাড়ি?
কৃষ্ণ-নবীন-নবীনার সম্মিলিত আহ্বানে ও নিমন্ত্রণে।

প্রথম দৃশ্য ]
শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
৪১
সাধনা
কিন্তু তুমি যে কৃষ্ণ নও !
কৃষ্ণ" আমিই কৃষ্ণ, নবীনা।
সাধনা তােমার মুরলী ?
কৃষ্ণ'••••(বেল্টের খাপে হাত দিয়ে) এই ত' নব-দেবী,একবার বাজাব
কি ?
নবীন""রাধে-মাধব, ওটা এমন সময় এখানে
বাজালে
গগাপিনী ত’ গােপিনী, আমার মত নবীনই পাগল
হয়ে উঠবে, আর ‘শাউড়ী-ননদিনীরা সারা জীবন
রী-রী করতেই থাকবে !
কৃষ্ণের হাত।
নবীন
কৃষ্ণ-নাম-ধারী পল্ট-মহারাজ, তােমার
অৰ্জ্জুন-খানা কোথায় ফেলে এলে চাদ ?
কৃষ্ণ-অর্জুন ? অর্জুন ত’ এখানেই।
নবীন•••••( আশ্চর্য্যে। এখানে ?
কৃষ্ণ•••(হেসে) হ হে !
(নবীনের চিবুক স্পর্শ করে) এই ত' অৰ্জ্জুন,আর তােমার
মত বাংলার হাজার যৌবনময়
অর্জুন।
যুবকের প্রত্যেকেই

82 ঐ-হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য নবীন: মধু-মধু, সত্যি কথা-বার্তায় মনে হচ্ছে তুমি ভদ্রলােকের-জামাই, তবে এমন অভ্যেস কেন বলত ? রাত-বেরতে- -আমি কৃষ্ণ। বিশ্বাস হচ্ছে না? ( পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে) বড় মুস্কিল নিমন্ত্রণ-বাড়ীতে পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশের তনুমতি ! সত্যি কথা বলতে কি বন্ধু-বান্ধবী, যদি সেকাল হ'ত আমি শুধু অভিশাপ দিয়ে চলে যেতাম !--যাক, একালের দেবতাদের নজর তাত ছােট নয় ! এই নেও পরিচয় পত্র- নন সাধনার হাত হতে রিভলবার নিয়ে কৃষ্ণের পানে তেমনি তাগ রেখে এক দনে বলল- - নবীন••••••( তাড়াতাড়ি) সাধনা, একবার চট করে দেখে নেওত’ এ কোন্ ধানের নতুন চা ? চিঠি পড়ে সাধনার মুখের সন্দেহের ছায়া বিশ্বাসে পরিণত হ’ল, নবানের কাছ থেকে তাড়াতাড়ি রিভলবার কাড়তে কাড়তে, সে অনুনয় ক'ল- সাধনা ••••••( আন্তরিকতার ব্যস্ততায়) করেছ কি, এই রাধার পত্র, দেখ পড়ে—ইনি কে?

প্রথম দৃশ্য ]
শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
=
.
রিভলবার ঠিক তেমনি রেখে সাবিনাকে সরাতে
সরাতে-
নবীন•••...ক্ষেপে যেওনা সাধনা !
(চিঠিটা নিতে নিতে) নারীর কথায় মাত্র-একবার বিশ্বাস
করে পুরুষে ‘আপেল-পাপের প্রসার হয়েছিল,
সে ‘আপেলের আপীল’ আজও হল না !—আবার
আমি এত সহজেই নারীকে বিশ্বাস করব ?
কৃষ্ণ...... (হেসে) বিশেষত, চাণক্য পণ্ডিত লিখে রেখেছে
“বিশ্বাসং নেব কর্তব্য স্ত্রী রাজকুলেষু চ” !
সাধনা......(ভেজা-কণ্ঠে ) আচ্ছা দেবতা, তােমারও দেশে এমন কি
একটা ‘মুখ দেবী’ নেই যে লিখে রেখেছে—“বিশ্বাস
নৈব কর্তব্য পুংস্তু প্রভৃতি—”
নবীন••••••( চিঠি পড়তে পড়তে অবাক হয়ে )-কি কাণ্ড, এযে বাবা
কেবলই গুলিয়ে উঠছে! সেকেলে গয়লানী-রাধী
একেবারে ‘রৈবিক’ হয়ে কেষ্টকে সম্বােধন করছে
ওগো বর,তার পরে গণ্ডা-দশেক প্রাণ ত-তর-করা
কথা লিখে দারুণ অভিমানে ব’লছে—“ওগাে আমার
পাথরের ঠাকুর, এমনি করে এতদিন ধরে শুধু
সৈন্য-সামন্ত ও জন-হিতে নিজেকে একেবারে ডুবিয়ে
রাখতে হয় ? তােমার চির-আরাধিকাকে ভুলে যাও,
ক্ষতি কি! কিন্তু তার কুঞ্জের অস্ত্রাগারের উন্নতি দেখা
কি তােমার কর্তব্য নয় ?”—বাপরে বিধু, কালে-কালে
আরও কত-কি দেখতে হবে !

৪৪ ঐহীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য সাধনার চোখ দুটো এতক্ষণ ধরে বােঝাতে চাইছিল কৃষ্ণে পূর্ণ বিশ্বাস। কৃষ্ণ তা বুঝল। মধুর হাস্য বিনিময়ের পত্ন সঙ্কোচ এড়িয়ে সাধনা আপন-করা সুরে ডাকুল- সাধনা......(মধুরে) সখা ! কৃষ্ণ......( মধুরে) সখি! সাধন! ••••••( আবৃত্তিতে ) “কত যুগ ছিনু তব ভরসায়। এলে কিগাে তুমি আজি বরষায় ?” কতক-অন্যমন-নবীনের হাত হতে রিভলবাটা কেড়ে নিয়ে নবীনের পানে তাগ ক'রে ধ'রে, সহাস্যে একবার সংস্কৃত কায়দায় ও একবার বাংলা কায়দায় কৃষ্ণ আবৃত্তি কল- কৃষ্ণ......‘পরিত্রাণায় ‘পরাধীনানাং বিনাশায় চ ‘ দনাম। ‘মুক্তি’সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।”

প্রথম দৃশ্য ।
শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ
৪৫
নবীন.•••••দেখ, তােমার হাতে যখন তাগ-করা রিভলবার তখন
তুমি যে কৃষ্ণ—এ বিষয়ে আমার কোন সংশয়ই
থাকলেও চলবে না! কিন্তু তবুও স্বামী-রূপী আমি
কৃষ্ণের ডান হাত তার নরম দুটো হাতে ধরে সাধনা
তৃপ্তিতে আবেগে বলে উঠল—
সাধনা
‘বন্ধু!
কৃষ্ণ......(মধুর হাসি মিশিয়ে ) বান্ধবী।
এ্যা,
এ
বে
একেবারে
নবীন••••••( আশ্চর্যের অভিনয়ে
‘ডিয়া-ডিয়ারী’ ভাব!
সাধনা কৃষ্ণের আরও কাছে এগিয়ে এল । নবীনের
পানে তাকিয়ে দু'জনেই মধুরে হাসতে লাগল।
নবীন,
• • • • •
উঃ,
সৌভাগ্য ভারতে এখনও ডাইভােস্-কোর্ট,
(Divorce Court) খােলা হয় নি।
সাধনা......শুধু তােমার কেন ? সেটা বাংলার পােনের আনা
সনাতন স্বামীর সৌভাগ্য।

শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য নবীন • 'ওগাে বন্ধুর-বান্ধবী, সময় মত সেটা নিয়ে তােমার সঙ্গে রগড়া-রগড়ী করা যাবে, আপাতত হাস্যময়ী সাধনাকে কৃষ্ণের কাছ থেকে টেনে এনে নিজের বাহুতে বেষ্টন করে হাসি— দেখ ঠাকুর, আমি ‘উন্নত-যুগের নবীন হ'লেও সনাতন স্বামী বটে ত’!—তাই তােমাদের দুজনের সৌহার্দ্যটা গাঢ়তর হয়ে আমার মরম-খানা মােলায়েম করবার আগে, আমি তােমার সঙ্গে একটা বােঝা-পড়া করতে চাই। কৃষ••••••সেটা চলবে না বন্ধু ! তা হলে শুধু, গােপিনী-গুচ্ছ নয়, গোপের গােয়াল পৰ্যন্ত আমার সঙ্গে এমন বােঝা-পড়া করতে চাইবে যে এই ক্ষুদ্র প্রাণটুকুকে বাঁচিয়ে রাখা দায় হবে ! নবীন......যায় প্রাণ ভিক্ষে মেঙ্গে খেয়াে ! কিন্তু দেখ, আমার এই সৌন্দর্য্যের মণি-টুকুর সঙ্গে সদালাপ করবার প্রবল বাসনা যদি তােমার মনে জেগে ওঠে, তবে তাকে ‘বৌদি-টোদি' বলে সম্বােধন করাই সমীচীন- সাধনা••••••( সরলতা-মাখা উচ্চ হাস্যে)—সাহিত্যের মলয় আছে, সাইকোলজীর নজীর আছে, ভাবনা কিসে সখা !

প্রথম দৃশ্য ]
এ-হীন কৃষ্ণ
৪৭
কৃষ্ণ••••"তাছাড়া আত্মনেপদী ছেড়ে পরস্মৈপদীর শরণাগত
হওয়া কৃষ্ণের কুষ্ঠীতে লেখা নেই। বৌদি’ সম্বন্ধটা
দাদার আবছায়ার মধ্য দিয়ে আর বান্ধবী একেবারে
আপন-করা নিজের।
( মধুরে)-বান্ধবী !
কৃষ্ণের ডান হাতখানা তার দুহাতে চেপে ধরে বড়
আপন-করা সুরে সাধনা কৃষ্ণের মাধুর্যের পূর্ণ সম্মান
বজায় রাখল।
সাধনা
'বন্ধু, চির সখা !
কৃষ নবীনকে কোন কথা বলবার অবসর না-দিয়েই,
একেবারে তাকে বক্ষের সন্নিকটে টেনে এনে বাহুতে
বেষ্টন করে হাতে লাগল।
নবীন•••••( জিভকেটে )—আরে ছাে-ছে, কর কি ? তুমি কেষ্ট
-হয়ে যদি রাধা হ’তে, তাহলে সাধনার মান
ভাঙাতে আমার সাত-দিন সময় যেত।
সাধনা...' (নভেলা ব্যঙ্গে)-ওঃ, তুমি যেখেনে গিয়ে সুখী হও
যাওনা! আমার তাতে কি ?
নবীন
সুখী সাধনা ? (নৈরাশ্যের ম্লান হাসিতে) বাঙ্গালীর সুখ
বােধ-হয় শুধু নরকে ।
}

৪৮
ঐ-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
সাধনা"( অভিনয়ে। তবে যাও নর, স্বচ্ছন্দে নরকের নারকী হও !
( সুরে ) “ফিরে এলে হে বিজয়ী
রাখিব তােমারে বক্ষে”।
নবীন
( আবৃত্তিতে)--
"বটে,
তবে,
“নক আমার হউক মঞ্জুর
বিদায়-বন্ধু, লও আদাব”।
সাধন।•••••( অভিমানে) দেখছ সখা, এমনি করে দিন-রাত গায়ে
পড়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া করে !
নবীন আমার সকল প্রেরণার উৎস ত’ তুমিই !
কৃষ্ণ'এ তােমার দারুণ অমার্জনীয় অন্যায় বন্ধু !
দম্পতী এক সঙ্গে মত, দিল—
নবীন দেবতা, তােমার ‘স্বর্গীয় বিচারশক্তির প্রশংসা
করতে পারছি না, মার্জনা ক’র’!
সাধনা ( উৎসাহে )ডেনীয়া-ডেনীয়া একেবারে
‘আশু-মুখুজ্জে’!
কৃষ্ণ-বিনয় বাহুল্য বন্ধু ! নারীর বিপক্ষে পুরুষ দাড়ালে কি
বিলাতের, কি স্বর্গের, সব দেশেরই ‘পেনাল-কোড
একটু সত্ৰস্ত হয়ে কাঁপতে থাকে।
দু’জনে একসঙ্গে সুখ্যাতি কল--
নবীন বিচারপতি, তুমি সত্যবাদী !
সাধনা •••••অবলাপতি, তুমি প্রিয়ভাষী!
• •

প্রথম দৃশ্য । -হীন কৃষ্ণ ৪৯ কৃষ্ণ••••••( ঠাট্টায় ) এস ‘বন্ধু-বান্ধবী’, তাহলে আমাদের একটা ‘নিজস্ব-সুখ্যাতি-সভা’ খােলা যাক ! নবীন••• দেখ মিষ্টি-বন্ধু, তােমায় আমি প্রাণের-বন্ধু করে নিতে রাজী আছি, যদি তুমি রাধাকে একশ’ বছর বিরহে কঁাদানাের ‘আর্টটা আমায় চট করে শিখিয়ে দাও, ( স্বর নরম করে )-আর বিনা কষ্টে বিনা কষ্টে কেমন ঐ দারুণ সময়টা তুমি কাটিয়েছ তার সঙ্কেতটা আমায় সােজা করে বল। সাধনা......( ঠাট্টায়,-“উদাত্ত’ অনুকরণে ) অহে, ভক্ত-রে আমার, সিদ্ধি খেয়ে জন্ম-জন্মান্তর হিমালয়ের পাদদেশে সাধনার পর সাধনার শরণাপন্ন হও, তবে ত’ সিদ্ধিলাভ করবে। কৃষ্ণ ••••এই ত’ আমার বান্ধবীর উপযুক্ত কথা। নবীন••••••(ঠে দিয়ে) নমস্কার ‘ব্রুটাস-সাহেব,'নমস্কার, সাক্ষাৎ ‘সুরেন-বাঁড়ুজ্জের ভায়রা-ভাই ! কৃষ্ণ......(হেসে) অভ্যেস দোষ ভাই। ক্ষণেক হাস্য-বিনিময়ের পরে, হঠাৎ গম্ভীর হয়ে সে বলল- তােমাদের নিমন্ত্রণ শ্রেষ্ঠ দেবতারও লােভনীয়, কিন্তু আর যে সময় নেই—বিদায় বন্ধু, আসি বান্ধবী !

• ঐ-হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য কৃষ্ণের গাম্ভীর্ষে দু'জনের প্রাণ সমস্বরে দাবী ক’রুল- সাধনা ও নবীন......সেকি আমাদের স্বরাজ? কৃষ্ণ......স্বরাজ আবার কি ? নবীন••••••বিশেষ এমন কিছু নয় ! ( পরিষ্কার উচ্চারণে,দু’বার ) নবীনের তাপিত ক্ষুব্ধ ‘প্রেয়সীর’ একমাত্র সান্ত্বনার চিজ,!-বুঝেছ দেবতা ! কৃষ্ণ..••••দেবতা ত’ আর প্রেয়সী নয় সখা, যে সব জিনিষই মুখেব কাছে জুগিয়ে ধরবে। নবীন......( সত্যতার জোরে হাজার বছরের ধৰ্ম্ম-ভীরু ভারত, সেটা হাড়ে-হাড়ে বুঝেছে : ( দাবীতে) কিন্তু তবু আমাদের স্বরাজ চাই। কৃষ্ণ......(হেসে) সর্বনাশ, স্বরাজ আদায় করা কি সােজা ? ‘কালিন্দীকূলের সেরা সতী’ হওয়ার চেয়েও শক্ত। সাধনা•••••(হেসে, নিতান্ত বিশ্বাসের আভাসে) তাই ত’, এমন রথীর সাহায্য আমাদের স্বরাজ চাই,—চাই যে ভাই। সই, দেবতার কি সাধ্য- নবীন......( অভিমানে তবে ‘হাওয়া’ হয়ে পড়’ নৈবেদ্য-লােভী! চাই। * * * * *

প্রথম দৃশ্য ]
শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
কৃষ্ণ•••••• অনুনয়ে) সখা !
নবীন•••••• অভিমানের তীব্রতায় )—শােন কৃষ্ণ, নবীন চায় শুধু স্বরাজ,
অন্য কোন আশীর্বাদ নয়, যদি সাহায্য করতে অক্ষম
হও,-এই শেষ নমস্কার !
কৃষ্ণ••••••( অনুনয়ে) বান্ধবী !
সাধনা••••••( অভিমানে)—শােন বন্ধু, নবীনা চায় শুধু স্বরাজ, অন্য
কোন আশীর্বাদ নয়, যদি সাহায্য করতে অক্ষম হও,
প্রার্থনা করি তােমরা সুখে থাক !
( কিঞ্চিৎ বিরক্তিতে) কি মুস্কিল, শক্তি সঞ্চয় করে উপযুক্ত
হও তবে ত’ শক্ত আশা পূর্ণ হবে !
নবীন••••••বা:, দিব্যি গাইছ দেবতা! শক্তি ?‘বিশ্বরূপ দেখিয়ে
তুমি না জগৎ-বরেণ্য : এস, আজ আমি তােমায়
‘বাংলার রূপ দেখাব।
•"সখি, স্বরাজ ভিন্ন অন্য কোন ‘বর’
সাধনা••••••( স্নান হেসে —ছি সখা, তােমার সখিকে ‘অসতীত্বের
প্রলােভন দেখাতে তােমার বুকে একটুও বাজল না—
নিষ্ঠুর ঠাকুর?

-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃশ্য
নবীন•••...(হাসির সঙ্গে । মাইরি দেবতা, সাধনা-বিবির যদি নিতান্ত
অসুবিধা না-হয়, তুমি বরং বরের চাইতে আমায়
একটা ‘ক’নে’ দিও।
কৃষ্ণ..••••(হেসে) মাল। যদি তাতেও মিত, না-হয় সখিকে
বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাধার বােনুকে তােমার এখানে
অভিসারে পাঠান যেত। কিন্তু স্বরাজ পেতে হলে
যে ভায়া ‘মতির মালা’ চাই,—শক্তি-সাধনা-
নবীন••••••পুরানাে ছোঁদো সুরে বেড়ে গাইছ দেবতা !
সাধনা••••••সত্যি কথা সখা, হিমালয়ের দক্ষিণে যত সাধক আছে,
জগত ত’ দূরের কথা,
তোমার বৃন্দাবনের
পুষ্পবালাদের সম্মিলিত পুষ্পের ডালিও বােধ-হয়
তাদের কাছে ম্লান হবে।
০ ০ ০ + ০ ০
সত্যি সখি, সবই সত্যি! কিন্তু দুঃখ বাঁশ ও বাঁশী
এক নয় ! তারা ধর্মের সাধক, কৰ্ম্ম জানে না, মানে
,তারা স্বরাজ চায় না। তারা তাই কশ্মী
স্বরাজীর ‘নীরব-শত্রু’—গলগ্রহ।

প্রথম দৃশ্য ]
-হীন কৃষ্ণ
নবীন••••••ওগাে কৃষ্ণ-বিহারী, পঁচিশ বছর আগেকার বাংলার
বুকের রক্ত-ধারার প্রথম
“উৎস-উ’ আজ
প্রশান্ত মহাসাগরে পরিণত হয়ে, সারা ভারতে যে
তুফান তুলেছে, তােমার রাধা ও সুধার মাঝে মাথা
তুলে, কুঞ্জ-কুঠিরের একটু ফাঁক দিয়ে, একবারও
ক্ষণেকের জন্য,—সেদিকে একটু তাকিয়ে দেখবার
সাহস কি তােমার হয়েছিল ?
.
কৃষ্ণ.•••••( আনন্দে ও ভাবে) আরে বল কি! তারা,তারা যে
আমার সেরা দরদী! তাই তারা রাধার মুখের গ্রাস
কেড়ে নিয়ে আমায় চির-বাঁধা করে রেখেছে;
তা’রাই ত’ আমার ‘বৈষ্ণবত্ব ঘুচিয়ে একেবারে
‘গীতার’-ঘূর্ণীতেঘােরাচ্ছে,-নারী-মােহন বেশ ছাড়িয়ে,
এমনি বীর-বরেণ্য বেশ পরিয়েছে,(করুণতা ও গর্বের মিশ্রনে)
ফসী-কাঠে নিজেদের মাথা লটুকে, আমায় প্রেমে
বেঁধে পুড়িয়ে মারছে-
সাধনা••••••(হেসে) কিন্তু আশ্চৰ্য্য সখা, তােমার এত দুঃখে
একটাও শেয়াল-কুকুর কেঁদে উঠছে না!

.৫৪
-হীন কৃষ্ণ
[ প্রথম দৃষ্ট
।
কৃষ্ণ••••বরাৎ, বেচারাদের বরাৎ নেহাতই মন্দ! (হেসে)
তােমাদের জন্য জন্তু-জানােয়ার-ফানােয়ার আমায়
ভাল-বাসবার সুযোেগ কোথেকে পাবে বল !
একবার সাধনার, একবার নামের পানে চেয়ে কৃষ্ণ
দুষ্টামীর হাসি হাসল ।
নবীন......(হেসে ফেলে) বাঃ, বেড়ে চালিয়েছ রাজা!
হের-ফের কেন মাণিক?-সােজা বাংলায় বলে ফেল
-সাধনা-সুন্দরী, তুমি আমায় ভালবাস ?”
সাধনা......(উচ্চ হাস্তে ) আর সাধনা-সুন্দরী সরল বাংলায় উত্তর
দিক্‌—“যে পুরুষ স্বরাজ-সাধনা না-করে অন্য সাধনায়
মাতে, বঙ্গ-নারীর তাকে ভালবাসা যে পাপ।”
করবার জন্যই ত’ আমিও
কৃষ্ণ.•••..কিন্তু সই, স্বরাজ উপভােগ
সাধনার শরণাপন্ন !
নবীন......আরে, (সুরে) ‘কত কত ঐছন কহব মদন পরতাপে’!
‘কাম-শাস্ত্রে বশীকরণ অধ্যায়ে তুমি পুরােপুরী মার্ক
পাবে কেষ্ট-চন্দের !

প্রথম দৃশ্য ]
ঐ-ইন কৃষ্ণ
৫৫
আমরা কিন্তু ভিক্ষে
সাধনা.•••••( অনুনােদন পাবেই জেনে ) স্বরাজ,
করে পেতে চাই না
নবীন......চমৎকার, এই ত’ নবীন-সাধনার কথা !
কৃষ্ণ......(হেসে) নবীন, দেখছি—নিতান্তই তুমি তােমার
‘বৌ-মুখােত্বের’ দৌড় দেখাবার জন্যে আজ আমায়
নিমন্ত্রণ করেছ !
নবীন......না-গাে বৃন্দাবন-বল্লভ, ‘বিশ্ব-রূপ দেখিয়ে বিশ্ব-সভার
গর্ব হ'য়ে আছ গর্বিত তুমি,-তাই
তুমি,-তাই আজ
নবীন-সাধনা নব ‘বাংলার রূপ তােমাকেই দেখাবে।
সাধনা......তাই ভাল, তাই ভাল সখা! সে রূপ অপরূপ!
(হেসে) সে রূপে যেন তুমি গ'লে যেও না, তাহলে
ষােড়শ-গগাপিনী গাধা-কান্না কঁদবে কিন্তু।
কৃষ্ণ••••"যদি অমন খারা দুর্ভাগ্যও হয়, বােৰ-হয় সে কান্নারও
তীব্রতাকে স্নান করে : বাজবে কেবল সাধনা !
-কেমন ত’?
নবনি..••••( ঠেস দিয়ে) বাজবে বৈকি সখা, বাজবে কিন্তু শুধু
কৃষ্ণের মন-মাঝে!
সাধনা •••••( সরল হাস্তে )—কৃষ্ণ যদি নবীন হয়,কারণ সাধনা বাজে
কেবল নবীন-মাঝে।
কৃষ্ণ-সাধনার সাম্মলিত হাস্য।

শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ [ প্রথম দৃশ্য নবীন...... (কৃত্রি ন গাম্ভির্ষে)-ব্যস, এখন রুদ্ধ কর জাভের জলদ, টেনে ধর ভালবাসার ভাষার উচ্ছাসের বক্সাটা, চকিতে চুপি-চুপি চলে চল এই চরণ অনুসরণ করে, আমি ‘বাংলার নব রূপ দেখিয়ে দিই। কৃষ্ণ......( দৃঢ় বিশ্বাসের তৃপ্তিতে ) রূপসী বাংলার রূপ- নিশ্চয়ই অপরূপ ! কৃষ্ণের এই একান্ত বিশ্বাস,নবীন কয়েক মূহুর্তের জন্য নিশ্চলতায় উপলব্ধি ক'ল । ক্রমেই তার অন্তরের উদব্যস্ততা বাইরে প্রকাশ পেতে লাগল। আপন-হারা হয়ে সে উচ্চারণ ক’রুল । নবীন...•••( বিকৃত স্বরে) আমার বাংলা -রূপসী রূপসী !! (উন্মাদনায়) হাহা-হা-হা !!! উন্মাদনার হাস্যে অশ্রুর প্লাবণ ব'য়ে যেতে লাগল যখন তার বিদ্রোহী জিহবা করুণভারে কেঁদে উঠল- হা-হা-হা-অপরূপ!-অপরূপ !!-অপরূপ !!! সমবেদনার সাধনা অশ্রুর সান্তনা অত জানান। কৃষ্ণ স্তম্ভিত হল। নবীন কতক ধাতত্ত্ব হয়ে ওদের সঙ্গে প্রস্থান করল।

দ্বিতীয় দৃশ্য
বাংলার রূপ-সাধারণ
রঙ্গমঞ্চের সামনের একপাশে (near (fate-Wings)
নবীন কুমারের বৈঠকখানার বাইরের রকের খানিকটা
বেরিয়ে রয়েছে ;-দরজার ডানদিকের দেওয়ালে
টাবলেটে লেখা—“কৰ্ম্মী-কুঞ্জ”, বদিকের দেওয়ালের
টাৰলেটে—“নবীন-সাধনা” ।
সামনের ফাকা জায়গাটার (Deep' and other
‘wings') ওধারে অনেক বাড়ী-ঘরদোর,—বেশীর
ভাগই ভাঙ্গা ও পরিত্যক্ত। কোথাও শ্মশান-ভাগাড়,
কোথাও বা আবার বদ্ধ জলাশয়। কোথাও শেয়াল
শকুনীর আধিপত্য, ইকোথাও বা আবার ঘুঘু-পেঁচার
চীৎকার।
রঙ্গমঞ্চ আধারে আবৃত।
রকের ওপরে নবীনের পেছনে কৃষ্ণ ও সাধনার প্রবেশ
কৃষ্ণ.•••••( করুণ ভাবে )
নবীন, সাধনা,একি এত আঁধার ।
সাধনা...... ম্লান হেসে) হয়ত’, অন্ধকারে তােমায় ভাল দেখাবে
বলে সখা ।
নবীন••••••(স্নান হেসে )
••
পাঁচ ‘মহাপুরুষের হাতে
পড়ে পার্থিব
বাংলা ‘দেবীত্ব লাভ করে ‘স্বর্গীয়া’ হয়ে পড়েছেন
কাজেকাজেই একটু আয়েসী হ'তেই হবে তাই
ঘুম তার সােহাগ, অন্ধকার তার আরাম !

(৮
-হীন কৃষ্ণ
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
কৃষ্ণ......( করুণ ভাবের আতিশষে ) উঃ, বাংলা এত কাল !
সাধনা......তবু ত’ সখা আমরা ওকে চব্বিশ ঘণ্টা ঘােসে-মেজে
ফিটফাট ক'রে রাখবার কত চেষ্টাই-না করেছি।
কৃষ্ণ......কল্পনার-মানসী বাস্তব-বাংলা, তােমার আজও এই দশা !
–কি করে এমন হ’ল ?
নিমেষে সমস্বরে স্বামী-স্ত্রী উত্তর ক’রুল --
সাধনা......দাসীপনা!
নবীন......অধীনতা।
কৃষ্ণ......অসহ, এ মূৰ্ত্তি কেন দেখালে ?
সাধনা......(সমবেদনায় ) আহা, কেঁদ’ না, কেঁদ’ না সাধনার-সখা !
নবীন, • ''তবে আশা এইটুকু যে মাঝে-মাঝে এই
‘কাল বরণে’ এমনি ধারা-
ফ্লা-লাইট (Flash-Light) চমকে উঠল।
‘বিজলীর রেখা ফুটে উঠে বাংলার রূপে একটু
আভার জৌলস দেয় ।
রঙ্গমঞ্চের বাহির হ'তে একটা ফ্লাসে ( Flasli )
দেখা গেল এক কোণের মধ্যে “রূপ” দর্শনে উন্মুখ
কৃষ্ণ,-ব্যথার-বী সাধনা তার দক্ষিণ হস্ত বরে
মুখপানে চেয়ে আছে,---বাম পাশে নবীন, নবীনের
অন্ধে কৃষ্ণের বা হস্ত ।
আর একটি ফ্লাল ( Flasli) নবীনের হস্ত চালিত।
নবনি..•••"দেখ সখা, সুরূপ হােক, কুরূপ হােক—এই বাংলার
}

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ
৯
বাংলার রূপ—প্রথম পৰ্য্যায়
নবীনের ফ্লাসে দেখা গেল প্রথম পৰ্য্যায়।-এক যুবক
পাঠে রত।
সে আধুনিক ছাত্র—রােগা, ছিপছিপে,
চোখে চসমা, বাহারে-চুলের বাবু। তরল উপন্যাস
ও কবিতার পাতায় তার চোখ, হাতের পেন্সিল
দাতের সঙ্গে সােহাগে ব্যস্ত ;-মনে হয় বিশ্ব-জগত
তার বাহ্যজ্ঞানের বাইরে।
বাংলার রূপ—দ্বিতীয় পর্যায়
নবীনের ক্লাসে দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখা গেল এক যুবতী
বেশবিন্যাসে ব্যস্ত। তার পরণে ফিরােজা, মাথায় এলো
থােপা, পায়ে জরীর পাঞ্জাবী, হাতে এসেন্সের স্প্রে ।
সে আধুনিক অভিসারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে,—তাই,
তবার সে দেখে হাতের ঘড়ি, তত তাড়াতাড়ি সে
স্পের পাম্প চালায়।

ঐ-ইন কৃষ্ণ
[ দ্বিতীয় দৃষ্ট
বাংলার রূপ-তৃতীয় পৰ্যায়
নবীনের ফ্লাসে তৃতীয় পর্যায়ে দেখা গেল এক সজ্জিত
তার একধারের টেবিল-হারমােনিয়ামের পাশে
এক ‘আলােক-প্রাপ্তা’ যুবতী।
তার কণ্ঠে বাংলার কোন এক কোমল কবির
কাব্য-কথায়-ঢাকা কামের-সঙ্কেতময় একটা মেয়েলী
গান।
তার দু'পাশে দুই যুবক, ঘরে আরও কয়েকটা
যুবক-যুবতীর সমাগম,—বলা দুষ্কর কোটী তার গানে
মুগ্ধ, আর কোটী তার যৌবনে মুগ্ধ।
নবীন...... (স্নান হাশে) ওরা বলে—এই-ই সভ্যতা।
সাধনা......( রাগে ) মানুষ বলে—এই-ই মূখ।
)

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
-হীন কৃষ্ণ
বাংলার রূপ-আবার দ্বিতীয় ও প্রথম পর্যায়
অভিসারিণী নব ঢংয়ে প্রথম পর্যায়ে এসে, যুবকের
চোখে সন্তর্পণে হাত দিয়ে হাসতে লাগল। যুবক
তাকে সযত্নে পাশে বসাল। তাদের চঞ্চল চোখ
দু’জোড়া মাঝে মাঝে সরমে বইগুলাের সাহায্য নিতে
লাগল ; ক্রমে তারা প্রেমে পা দিল।
বাংলার রূপ—চতুর্থ পৰ্য্যায়
নবীনের ফ্লাসে চতুর্থ পর্যায়ে দেখা গেল খাটে এক
বিবাহিতা শয়ন করে আছে। বালিসের ওপর তার
‘কনুইয়ের ভর, সেই হাত নীচে-পা-ছড়িয়ে-বসা
স্বামীর গলায় বেষ্টিত। আর এক হাতের অঙ্গলি
সংযােগে সে তার স্বামীর মাথার চুল চিকিয়ে
দিচ্ছে। দু’জনের মুখে কামের ছাপ,—দুজনেই প্রেমে
মণ্ডল।
এই পৰ্য্যায় দেখে নবীন সাধনার পানে সরস ইঙ্গিত
করল। চাপা হাসির আভা মুখময় ছড়িয়ে সাধনা
কৃষ্ণের পানে তাকাল। কৃষ্ণ দু’জনকে দু'হাতে একটু
জোরে চেপে ধরে-
কৃষ্ণ......(হাসি চেপে ) এই অপ, বাঙ্গালী, জেরা সরম্ কোরাে।
তিন জনেই হাল।

७२
की शैन कृता
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বাংলার রূপ—আবার তৃতীয় পর্যায়
সকলেই কামে রেঙে উঠেছে।
নবীন......দিব্যি, চালিয়েছ ভায়ারা !
সাধনা••••••আঃ!
নবীন•••...(শ্লেসে) বাংলার ‘রূপ’ আস্বাদন করছ সখা !
কৃষ্ণ.•••••খুব,—পরম তৃপ্তিতে।
সাধনা..."তৃপ্তিতে !—ছলনা তােমার মজ্জাগত হয়ে পড়েছে
সথা।
কৃষ্ণ•••...সত্যি না সখি, নবীনের বাংলার ‘অন্ধ-রূপে আমারও
আত্মা অন্ধ হয়ে উঠেছিল।
নবান•••...(শ্লেসে । আর এমন সুরূপে তােমার আত্মা একটু আলাে
পেলে গােপিনী-নাথ ?
কৃষ্ণ...•••কুরূপ হ'লেও, প্রাণ আছে।
সাধনা••••••সখা, এর চেয়ে অন্ধকার ভাল !
কৃষ্ণ••••••না সখি, অতীতের চির-অচলায়তনে-বদ্ধ বাংলাকে
ভবিষ্যতের আশার-নেশায় উন্মাদ হ'তে হ'লে, কিছু
পদস্খলনের সম্ভাবনা ;-তাই ব’লে সেটাকে জোর
করে বন্ধ করলে অগ্রসর হবার পথে যে অন্তরায়
হবে।
সাধনা......মানি সব, কিন্তু দেখছ কি চলেছে ?—এ যে নেশা,
নেশার চেয়ে ভয়ঙ্কর।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
-হীন কৃষ্ণ
কৃষ্ণ••••• অবাক করলে সাধনা,-গান ত’ তােমার ভালবাসা !
নবীন......(হেসে) ছেড়ে দাও সখা, ওর ভালবাসার অন্ত নেই।
যে ওকে একটু মন দিয়ে চায় সেই ত’ ওর ভালবাসা।
সাধনা......( আন্তরিকতায়) সে সত্যি সখা, গান আমার প্রাণ।
কিন্তু দীপকের সময় মল্লার! ধ্রুপদ-খেয়ালের সময়
ঠুংরি-টপ্পা?—সেত’ গান নয়, গানের অপমান! ছিঃ,
এই কি ‘অধীন বাংলার গান !
নবান.....( ঠাট্টায় ) রামচন্দ্র, এটা খেমটা নাচ !
সাধনা•••••• ওগাে তার চেয়েও অধম। গান লােককে যতটা
উচু করে ঠিক ততটা নীচু করে । বাংলার এখন
দরকার প্রাণময় যৌবন। কিন্তু এ গানে যৌবন নষ্ট
হয়,-ভীরু করে—
নবীন••••••( থিয়েটারী ঢংয়ে, রিভলবার এগিয়ে দিয়ে )—এই নাও,
নাও, তবে
যাও সাধনা, এ গানের রচয়িতার শির লে’আও!

[ দ্বিতীয় দৃশ্য
৬৪
কৃষ্ণ......হাসি নয় ভাই ; যে গানে যৌবন নষ্ট করে, কাপুরুষ
করে, স্বাধীনতা-পিয়াসা বাংলায় তার স্থান হওয়া
উচিত মদের গেলাসের পাশে।
আর সেই গান
রচয়িতার
নবীন...... মস্তক চূর্ণ করা উচিত, কেমন ত’ ?
যাও বীরা-সাধনা, হত্যার
করালমূর্তি দেখাও সেই ভীরুত্ব-ইনজেক্ট-কারীদের।
( অভিনয়ে) তবে যাও,
কৃষ্ণের উচ্চহাস্যে, নবীন সরল অনুযােগের আন্তরিকতায়
বলতে লাগল
হাসছ সখা, তুমি ত’ জান', এই-সব হাওয়ায়-ওড়া
কামে-ভরা ‘কোমল-কবির-দল একদিন নাকি মাত্র
‘সতের জন সৈন্যদের এক রকমে বাংলার স্বাধীনতা
ও সতীত্ব হরণ’ করবার সহায়তা করেছিল, আর
আজও আর এক রকমে হাজার বাঙ্গালীকে ‘
বাড়ী
পরিয়ে’ ‘বালিকা’ ক'রে তুলছে
কৃষ্ণ...... নাঙ্গে
কে তুমি যুবক, বিশ্ব যাদের গুণগ্রাহী তুমি
সেই বিশ্ব-কবিদের সেই মহাজনদের ধ্বংস চাও?
নবীন......সখ, আমি নবীন, আর এই আমার নবীনা সাধনা,
আমারই প্রেয়সী,
( সরলতায়স্বাধীন বিশ্বের পক্ষে যা’ অমৃত, হয়ত
‘অধীন বাংলার পক্ষে তা গরল !

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
সাধনা••••••(অভিনয়ে) অহহ, যাও স্বামী, যাও প্রিয়, যাও বীর, ধর
অস্ত্র, কণ্টক উচ্ছেদ কর, গরল মুছে ফেল, গরলের
ফোয়ারা ধ্বংস কর!
নবীন .....(ঠাট্টায় ) আরে ছো, শত্রু ছােট হলে তার উপযুক্ত সৈন্য
পাঠানই বীরত্ব। নারী-হৃদয়’ কবিদের বিপক্ষে নারীর
সংগ্রামই শােভা পায় !
কৃষ্ণ......কি আর করবে, তবে যাও সমরাঙ্গণে সখি! জানত,
নারী আমার অবসর সময়ের আনন্দ। সুতরাং আমি
‘নারী-হৃদয়’ কবিদের উচ্ছেদের পক্ষপাতী হব কোন
প্রাণে?–বরং, নিতান্তই যদি দরকার বিবেচনা কর,
অল্প বিস্তর ভয়-টয় দেখিয়ে কাপুরুষ কবিদের সুপুরুষ
করে তুলে কাজের-কাজী করে নিও।

-হীন কৃষ্ণ
[ দ্বিতীয় দৃষ্ণ
বাংলার রূপ—আবার প্রথম পর্যায়
যুবক-যুবতী চোখে-চোখী, প্রায় মুখে-মুখী।
সাধনা ..ছি, ছি, বাংলার তরুণ-তরুণী,—বাংলার ভবিষ্যৎ।
নবীন......(ঠাটায়) কিন্তু ওদের কবিতাভিনয়টা খুব বেশী দূৰণীয়
কি প্রিয়া ?—দেখত, সখার সখি, প্রেমে ওদের কি
অনাবিল সাধনা !
কৃষ্ণ.•••••চল ত’ সাধনা, আমরা ওদের সাধনার একটু পরখ
করে আসি।
কৃষ্ণ দু'জনকেই টেনে নিয়ে চলল। পায়ের শব্দে যুবক
ত্ৰস্তে যুবতী ছেড়ে বইটায় মনােনিবেশের ভাণ করল ।
আশা-হতা যুবতী কৃষ্ণের পানে বাবার বিরক্তির
কটাক্ষ নিক্ষেপ করতে লাগল আর কৃষ্ণের হাসির
যে উচ্চ হতে উচ্চতর হতে লাগল।
যুবক••••••(দারুণ বিরক্তিতে) কে আপনি?
কৃষ্ণ..••••(সহাস্যে) শ্রীকৃষ্ণ।
যুবতী..••••( রাগে) -
-হীন কৃষ্ণ !
কৃষ্ণের অসস্মিতর মধুর হাস্তে সে আরও জ্বলে উঠল।

তিীয় দৃশ্য ]
@হীন কৃষ্ণ
তুমি-আমি
যুবক......বিনা অনুমতিতে ভদ্রলােকের ঘরে প্রবেশ করা
কৃষ্ণ,
-বিদেশী কায়দায় অশােভনীয়, কেমন ত’? কিন্তু সে
কায়দা মান্বার দরকার বিবেচনা করি-ন যুবক।
সহকৰ্ম্মী :
আমাদের মধ্যে আসবে
কায়দা ?
যুবতী......আপনারা কি চান ?
কৃষ্ণ......কি চাই ?—সবই ত’ চাই। তােমার কাছে চাই নারী,
তােমরা নিজেরা শক্তির আধার হও,—ওদের শক্তিময়
হ'তে সহায়তা কর । আর ওদের কাছে চাই, ওরা
যেন এমনভাবে নিজেদের মানুষ করে তােলে যে
বাংলার হাতছানিতে ছুটে যায়, বাংলার সঙ্কেতে
সাড়া দেয়।
( বই গুলো দেখে )—একি ‘কোমল কবিতা’ ! চমৎকার
যুবক, বাস্তবে নারী, চিন্তায় নারীত্ব।
বইগুলাে দূরে ফেলে
—এমন করে তােমার পৌরুষের হানি করবার এখন
আর সময় নেই। দ্বারে যে নবীনের আহ্বান, প্রস্তুত
হও ! দরকার হয়, স্বাধীন ভারতে অবসর মত
‘কোমল-কবি'দের সম্মান কর । এখন কৰ্ম্মের দিনে
প্রস্তুত হও কর্মী, প্রস্তুত হও !

শ্ৰ-হীন কৃষ্ণ
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বাংলার রূপ—আবার চতুর্থ পৰ্য্যায়
কৃষ্ণ, নবীন, সাধনা, সবাই সন্তর্পণে চতুর্থ পর্যায়ের
সামনে এগিয়ে এল।
সাধনা একবার প্রেম-রত দম্পতীর পানে চাইল,
তার পর মুচকী হেসে কৃষ্ণকে আর বেশী অগ্রসর হতে
মধুরে মানা ক’ল। কৃষ্ণও মধুরে সাধনাকে উপেক্ষা
করে, কোমল তিরস্কারে বোটীকে ডাকল।
কৃষ্ণ......বৌদি,
বোটী লজ্জায় ঘােমটা টাল
—দ্বারে নবীনের আহ্বান, দাদা-খানার সময়ে মাথা
তােলবার অবস্থা রেখ।
স্বামী......( উঠতে উঠতে দারুণ বিরক্তিতে) কে-রে, এগিয়ে আয় ত’ ?
বোঁচা তাকে ধরে পেছনে টাতে লাগল।
ওরা তিনজনে তৃতীয় পর্যায়ের সামনে ঘুরে রকের ধারে
এল।
সব সময়েই কৃষ্ণ বারু-বার বলতে লাগল
কৃষ্ণ......-দ্বারে নবীনের আহ্বান, প্রস্তুত হও কর্মী !
সব পর্যায়ের সন্ত্রস্ত সবাই গােল করে উঠল।
সবাই......কে ? কে?

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
ঐহীন কৃষ্ণ
রঙ্গমঞ্চে পূর্ণ আলাে।
সবাই......(সমস্বরে)-কেরে ?
কৃষ্ণ......আমি শ্রীকৃষ্ণ।
সবাই......(সমস্বরে)-এ-হীন কৃষ্ণ !
উচ্চে
-কী
সবাই......( জোরে )
কৃষ্ণ......( দুই হাতে দুই রিভলবার নিয়ে আরও জোরে)-কী ? ?
সবাই......( সভয়ে, আস্তে )-শ্ৰীকৃষ্ণ।
?
রিভলবার দেখতেই সাধনা কেমন এক রকম হয়ে
গিয়ে তাড়াতাড়ি কৃষ্ণের হাত হ'তে সে-দুটো ছিনিয়ে
অন্দরে রেখে এল।
কৃষ্ণ......( সহজ কণ্ঠ) দ্বারে নবীনের আহ্বান, প্রস্তুত হও কর্মী।
রঙ্গমঞ্চ আবার আলােক-হীন, কেবল ক্লাসে পূর্ববৎ
তিন মূর্তি।
কৃষ্ণ......কি
দেখালে সখা,
ভীরুর দিল,
নিরাশা-দুরাশাময় !
সাধনা......ছি ধীমান, অধৈৰ্য্য তােমার শােভা পায় না।
নবীনের কাছ থেকে ক্লাস নিয়ে
এই দেখ সখা, সাধনার নবীন ‘বাংলা-রূপ’!

-হীন কৃষ্ণ [ দ্বিতীয় দৃষ্ট বাংলার রূপ—পঞ্চম পৰ্য্যায় পঞ্চম পর্যায়ে মাস। সুদৃঢ় স্বাস্থ্যবান যুবক। আশ-পাশে এক্সারসাইজের (Exercise-Physical) সরঞ্জাম। শরীর চর্চার পর অবসাদ সময়ে সে “গীতায় মন দিয়েছে। তার কাছে এক কুমারী তখনও দীপিংয়ে মত্ত । কৃষ্ণের আশান্বিত দৃষ্টি,-আনন্দে অগ্রসর। নবীনের হাসি ; সাধনার তৃপ্তি। সাধনা......ওরে—ওরে, দেখু—দেখ, তােদের শ্রীকৃষ্ণ এসেছে। আশ্চর্য হয়ে, ‘যুবক' ভাল-ক'রে কৃষ্ণকে দেখে আনলে ‘কুমারীকে বলল- যুবক......( আনন্দে ) এই’, সর্দার ! - কুমারী, নমস্কার, সর্দার ! মুখে আনন্দ ও তৃপ্তির ছাপ। যুবক......( কাজের কথা বলার ভবে) সর্দার, বক্সিংয়ের সঙ্গে যু-যুৎ- ও টারূগেট-প্রাটিস্টা ( Target-Practice) -হ'লে আর নবীনকে দেখে, আননে) নবীন দা’ (তৃপ্তির হাসিতে) ওঁ ত্রয়ী, নবীন-সাধনা-কৃষ্ণ ! (কুমারীকে বাম পাশে নিয়ে) -এ-ই’, সত্যিই আমাদের শুভদিন আগত সকলের নিমন্ত্রণ। ••••••( মুচকি হেসে) সকলের যােগ দেওয়া চাই। কুমারী সকলের হাগ। সাধনা যষ্ঠ পর্যায়ে চাল নিয়ােগ ক’বুল

দ্বিতীয় দৃশ্য
-হীন কৃষ্ণ
৭১
বাংলার রূপ-ষষ্ঠ পৰ্য্যায়
বন্দী,অন্ধকারার বদ্ধ ঘরে”। কৃষ্ণকে দেখে
আশায়-উদ্বিগ্নে সে ‘সালিউট’ ( Salute) ক’রুল,
সম্মানের সঙ্গে কৃষ্ণ ‘রিটার্ণ (Return) দিল।
বন্দী দু’হাতে হাতছানি দিয়ে আনলে ‘কাহাদের ডাল।
তারা এল,-তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাল
কাপড়ে মােড়া। কৃষ্ণকে দেখে তারা আনন্দে লাফাতে
লাগল, কৃষ্ণ সর্বদাই সালিউট (Salute) করে রইল।
তাদের প্রত্যেকেরই শরীরে অনেক রকম অত্যাচারের
চিহ্ন। সেই চিহ্ন দেখিয়ে প্রত্যেকেই কি-যেন-কি
বলতে চায়।
সমবেদনার আতিশষে কৃষ্ণ করুণতায় পূর্ণ হয়ে সজল
চোখে বলে উঠল
কৃষ্ণ••••••(কান্নার সুরে) সাধনা, সই !
কৃষ্ণের চোখে জল।
নবীন নিমিষে সাধনার কাছ থেকে ক্লাস কেড়ে নিল।
কৃষ্ণ.•••••( চোখ মুছে, কৃত্রিম হাসিতে)—কি নবীন, সাধনার প্রিয়দের
দেখে তােমারও যে চোখ ঝলসে গেল ?
সত্যের আনন্দে সাধনা জানিয়ে দিল।
সাধনা••••••( উৎসাহে) আরও অনেক আছে, দেখবে না সখা ?

ঐ হীন কৃষ্ণ [ দ্বিতীয় দৃশ্য নবীন......(চোখ মুছে) স্বামী জাতটাই বড় হিংসুকে সানা ! তােমার আর মেলা ‘প্রিয়ের’ মিলন হলে, গরম হয়ে শেষে সবাই কি-একটা কাণ্ড করে ব’সব ?—সে কাজ নেই। তার চেয়ে এস সখা, সাধনার ‘প্রিয় ছেড়ে সবাইয়ের এক ‘অপ্রিয়-প্রিয়’কে দেখাই। নবীন সাধনার পানে চাইল,ইচ্ছা স্থানান্তরে পাঠায়। তাই তাকে বলল--- সাধনা, সখার জলযােগ ? সাধনা.•••••( অভিমানে না, আমি যাব না ; সখা দেখছ- নবীন...... ( অছিলায় ) অতিথি সৎকার- সাধনার মুখভার। কৃষ্ণের মধুর হাতে প্রথমে সে কুটী ক’বুল,—শেষে, সহাস্যে কিন্তু অনিচ্ছায়, সে প্রস্থান করল। নবীন... (হেসে) দেখ, দেখ, অপূর্ব রূপ ব্ৰজমনােহর, নবীন সপ্তম পর্যায়ে ক্লাস নিয়ােগ ক’বুল— দ্বিতীয় দৃশ্য ] শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ বাংলার রূপ-সপ্তম পৰ্যায় বিছান-ফরাসের তাকির ঠেস দিয়ে অর্ধশায়িত অবস্থায় ঘৃণায়-চিন্তায় চঞ্চল,—পাশে আদরের মদের সরঞ্জাম ও অনাদরের তবলা। চঞ্চল......( ঘৃণায়,-বিরক্তিতে) ছি-ছি-ছি এই আমার প্রাণ । ‘বাঙ্গালী প্রাণের এই দশা ! অত্যাচারে-অনাচারে, আজ, এত অকর্মণ্য-এত জড়তাময়, যে আমরা প্রাণের পুরােনা প্রলেপের চিহ্ন—আবার অত্যাচার -এই--এই- উন্মাদের মত তবলা, মদ প্রভৃতির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করতে লাগল। ( করুণতায়) আর-না, আর সয় না- ডিক্যাটা তুলে মদ্য পান-- এমন সময় দু'চারজন ‘বিদেশী’-নাচ,ওয়ালী জীপসী সাজে ট্যাম্বােরীণ, বাজাতে-বাজাতে বেগে প্রবেশ ক’ল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে চঞ্চলের আশে-পাশে ঘুরে-ফিরে তারা ক্ষিপ্রগতিতে ‘বিদেশী আনন্দ নাচ নাচতে লাগল। চঞ্চল..••••( ক্রন্দনের সুরে)—হ-আ-, এদের প্রাণ,-বিদেশী প্রাণ এই, এই বুকে,এত জোরে,—এমনি পদাঘাতে আনন্দের পর আনন্দ আস্ফালন ! চঞ্চলের মদ্যপান ।

৭৪ ঐহীন কৃষ্ণ [ দ্বিতীয় আর একদল মিশরী বেশী ‘বিদেশী’-নাচওয়ালীর প্রবেশ ও দুই পাশের জীপসী নাচের মধ্যে তাদের “কাম-কলার নাচ”। চঞ্চল......( উন্মাদের হাস্তে ) হাঃ হাঃ, শুধু অত্যাচার নয়, শুধু পদাঘাত নয়, আবার রন্ধে-রন্ধে কামের বীজ বপন । চমৎকার ! চমৎকার ! আবার মদ্যপান। ক্ষণেক পরে শক্তিমানের মত উঠে বাড়িয়ে সে দাবী ক'ল-- চঞ্চল.••••নাঃ, চ'বে না,-হ'তে ,-হ'তে দেব ’ –‘বিদেশী’র অত্যাচারে-অপমানে নিজেদের এত জখম এত জড় হতে দেব না !~- এক হাতে মদের বােতল আর এক হাতে তবলার হাতুড়ী নিয়ে চঞ্চল•• দূর হ'য়ে যা',-দূর হয়ে যা',-দূর, দূর- সব নাচ ওয়ালারা দূরে সরে গেল। আমায় উঠতে দে'- আমায় বাঁচতে দে',- আমি বাঁচব-আমি বাঁচব।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
-হীন কৃষ্ণ
প্রাণ দিয়ে তখন সে তার প্রাণের খোঁজ করতে
লাগল। তার স্বর বড় করুণ, বড় আবেগময়-
প্রাণ’-আমার !
‘প্রাণ-আমার ! আমার
'বাংলা-প্রাণ ।
দুঃখে-শোকে-ক্ষোভে, চঞ্চল বিছানার উপর লুটিয়ে
পড়ল। “বিদেশী’-নাচওয়ালীরা সভয়ে উকি মেরে
মাঝে মাঝে দেখতে লাগল।
অপর দিক হতে একদল নর্তকী-ঘেরা এক নর্তকী-রাণী
(আশা) প্রবেশ করুল। তার স্বর্গীয় বেশ, সৌম্যমুর্তি,
শান্ত নাচ, সাত্তার ভাব।
এ স্বর্গীয় নর্তকী-রাণীর (আশা) প্রথম দর্শনেই
‘বিদেশী'-নাচ ওয়ালীরা পালাল।
অনেক পরে সজল চোখে চঞ্চল মুখ তুলল—
চঞ্চল••••••কে তুমি?‘আশা’?
রাণীর সম্মতির সঙ্কেত,-চঞ্চলের সজল চোখে আনন্দের
‘আশা’,-আসবে,—সে আসবে? আমার ‘বাংলা-প্রাণ
ফিরে আসবে ?
তারা নাচে এই ভাব দেখাল—আসবে, সে আসবে
চঞ্চল......( উৎসাহে) সত্যি আসবে
?
নাচ সম্মতি জানাল।

ঐ-হীন কৃষ্ণ
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
চঞ্চল......( ভাবে ) কোথায় সে !–কই সে ‘বাংলা-প্রাণ ।
‘নাচ দেখাল সে অন্তরে।
চঞ্চল......অন্তরে ।
অন্তরে !-
অন্তর তবে এখনও সজাগ আছে ?
আনন্দে, উৎসাহে, ও ভাবের আতিশষ্যে-
এস অন্তরের প্রাণ,—এস ‘বাংলার প্রাণ’,দেখা দেও,
দেখা দেও।
রঙ্গমঞ্চের ভেতর থেকে আস্তে আস্তে ফু ড়ে উঠতে
লাগল এক মুক্তি। তার সর্বাঙ্গ ‘কাল’ কাপড়ে মােড়া,
সে প্রায় নিশ্চল।
সে মূর্তি দেখে চঞ্চল আত্মহারা হ'ল,—তার স্বর কেঁদে
উঠল। -
চঞ্চল..••••এ্যা! এত কাল, এত কলঙ্ক : এই প্রাণ, আমার
প্রাণ, আমার বাংলার-প্রাণ।
কান্নার আতিশয্যে চঞ্চল মুচ্ছিতের মত হয়ে পড়ল।
‘আশার-দল’ সেই নাচ আরম্ভ করল, যে ‘লাতে
জগন্মাতা নিদ্রিত নটরাজকে জাগিয়ে তুলেছিলেন।
ক্রমে ‘অন্তর’-হতে-উঠা মূৰ্ত্তির ওপরের আবরণ খসে
পড়ল। আশা' হাত ধরে আনলে সেই নকীকে
তুলন্স।

দ্বিতীয় দৃশ্য। শহীন কৃষ্ণ ৭ ‘নকী’র রাঙা কাঁচুলী, কটির কাপড় রাঙা, হাতে রাঙা জবা, রাঙা ধরে রঙিন হাসি। সেই হাসিতে ‘আশা’র সঙ্গিনীরা যােগ দিল। আস্তে-আস্তে চঞ্চল উঠতে লাগল,আর ‘আশা’ আনন্দ হতে লাগল। - চঞ্চল......( অবাক হ'য়ে )—তুমি ?-তুমিই বাংলার প্রাণ হাসির-রাশি ছড়িয়ে প্রস্থানের পথে সঙ্গিনী-সহ ‘আশা নিয়ে গেল- আশা......, ‘কালি-মাখা ‘বাংলার প্রাণ ‘আশা’র দলের প্রস্থান। চঞ্চল,"তবু এত সুন্দরী ! অপূর্ব সুন্দরী ! নর্তকী’, ‘প্রাণ’ আমার-আমার ‘বাংলা-প্ৰাণ’ ! চঞ্চল নর্তকী’কে ব’বতে গেল, নর্তকী’ সরে গিয়ে হাসতে লাগল। তাদের অলক্ষ্যে ‘বিদেশী’-নাচওয়াসীদের পাগুলাে আস্তে-আস্তে এগিয়ে আসতে লাগল, সঙ্গে-সঙ্গে নর্তকী’র লাস্যে ভাবান্তরিত হয়ে কামের ছায়ার বিকাশ পড়তে লাগল। ‘বিদেশী’-নাচওয়ালীদের পায়ের তাল পড়তে লাগল। তাদের পিচকিরী হতে এসেন্সের গন্ধে ‘নর্তকী ভ'রে উঠল, আর তার ‘লাস্যে কাম-কলা’ ফুটে বেরুতে লাগল। চঞ্চল•••••ও-নয়, ও-নয় নর্তকী’!-দাগা প্রাণে তাজা তাল তুলতে হবে ‘প্রাণ’!—আজ প্রাণ চায় পূর্ণ-প্রাণ!

ঐহীন কৃষ্ণ
[ দ্বিতীয় বৃ
বিদেশী'র তালে নর্তকী’র লা-কাম-কলা আরও
ফুল।
চঞ্চল••••••(নৈরাশ্যে) পারলে না।-প্রাণ জাগাতে পারলে না !
দিতে পালে না, ‘প্রাণ’!
‘লাস্তে’ কামের ঝলক। চঞ্চল ডিক্যাষ্টার মুখে
ধ’ল। আকণ্ঠ পান করে দম নেবার মুখে চঞ্চল
ঝঙ্কার দিল -
চঞ্চল......(খৃণায় ও বিরক্তিতে) নােংরা, নিজে
নিজে মােংরা, আমায়ও
ডুবিয়ে রাখতে চাস্ নােংরায় !
‘নৰ্তকী’র মুখে বাধা-তবুও ‘লাতে কাম। চঞ্চলের
আবার মদ্যপান। মিশরী-বেশীরা লান্তের কামে
সাড়া দিল।
চঞ্চল......( চঞ্চল হ'রে )-দূর-দূর, সব দূর হ !
বিদেশী......( এঙ্গে )--লাঞ্ছিতাই প্রাণ !
চঞ্চল......(জোর গলায়) -নাঃ-আমার প্রাণ’কে আর লাঞ্ছিত
থাকতে দেব না !
‘লা’ আরও চ’লল, মিশরী-বেশীদের যোগদান।
বিদেশী......( একসঙ্গে )-লাঞ্ছিতাই প্রাণ ।
চঞ্চল......( নরম গলায় )-না,-আমার
‘প্রাণ’ লাঞ্ছিতা থাকলে
আর-যে চলে না !
আর ও ‘লা', আরও মিশরী কাম-কলা-
বিদেশী......(একসঙ্গে )- লাঞ্ছিতাই প্রাণ!
এবার চঞ্চল চুপ–পাথরের মত নিশ্চল।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
-হীন কৃষ্ণ
‘সে’র চরমতাৰ কাম-কলাৰ তীব্ৰছটা। চঞ্চল
মন্ত্রমুগ্ধ সর্পের স্যায় ‘নর্তকী’র অনুসরণ ক’তে লাগল।
সব নাচ ওয়ালীদের জয়ের আনন্দ নাচ। চঞ্চল
একেবারে মুগ্ধ। তার এক হাতে প্লাস, আর এক
হাতে ‘নৰ্তকী। জ্ঞান-হারা চঞ্চল দুটোকেই যেন
একসঙ্গে অধর স্পর্শ করাতে চায় :--কাছে—কাছে—
আরও আরও
কৃষ্ণ......( সর্দারী আদেশের স্বরে ) চন্চল্ (চঞ্চল) !
চঞ্চল থাল, তার চক্ষু বিস্ফারিত।
কৃষ্ণ......(আরও জোরে ) বঙ্গ-সেনা ।
চঞ্চলের হাতের গ্লান্ পড়ল। আবেশ-মাখা নর্তকী
চ’কে উঠে চঞ্চলের ডানহাত চেপে ধরল। সে হাত
ছাড়াতে দেরী হবে বুঝে, চঞ্চল নর্তকী'কে টানতে
টাতে ডাকের সন্ধানে চলল। তখন আর সব
নাচওয়ালী পর-পর তাকে বাধা দিতে এল,কেউ
অচিলে কেউ কাঁচুলীতে তাকে বাঁধতে চায়।
বাধা তুচ্ছ করে, কোনটা সরিয়ে, কোনটা বুকের
ওপর নিয়ে,-শক্তিমান চঞ্চল চল ডাকের উদ্দেশে।
সে কৃষ্ণের সামনে এসে ‘াটে’ (Attention)
হয়ে দাড়াতে চাইল, কিন্তু পেছ টানে তার দেহ অল্প
কম্পিত।
কৃষ্ণের সর্দার ভাব,-মুখ গম্ভীর, দৃষ্টি দীপ্ত।
এ দিকে সবার অলক্ষ্যে খাবারের থালা হাতে স্তম্ভিত
সাধনার প্রবেশ।

শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ [ দ্বিতীয় দৃশ্য কৃষ্ণ......( চীৎকারে সর্দারী আদেশ ) বঙ্গ-সেনা, ‘সালিউট ("Salute')। সাধনার হাতের থালা পড়ল, কিন্তু কেউই সে দিকে লক্ষ্য করল না। চঞ্চলের কষ্টে তােলা ডান হাতটা সঙ্গে সঙ্গে বাধা-দেওয়া নর্তকী’ও উঠল। নমে এই চমৎকার সালিউটের রিটার্ণ ( ‘Return) দিল। তারপর মধুর হাসিতে দু’হাত বাড়িয়ে আদরে ডাল- কৃষ্ণ..•••• মধুরে) প্রিয়, বন্ধু । চঞ্চল ......(মধুরে) সর্দার, সখা । ‘বিদেশী-নাচওয়ালীরা দূরে সরে গিয়ে ভয়ে-অবাকে মুখ-চাওয়া-চায়ী ক’তে লাগল। সাধনা......( আশ্চযো) -চঞ্চল ঠাকুরপাে ! চঞ্চল তাড়াতাড়ি নর্তকীকে পেছনে লুকাতে চেষ্টা করে ভয়ে-সন্ত্রস্ত-কষ্টে হেসে-কোন রকমে তার মৰ্য্যাদা রক্ষা করতে ব্যস্ত হল। চঞ্চল ......বৌ-রাণী। অবাক-হওয়া নর্তকীর বেশ দেখে, সাধনা এন্তে তাকে আবৃত করে, একেবারে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। নৰ্তকী’ সভয়ে চমকে চাইতে লাগল ।

দ্বিতীয় দৃশ্য
-হীন কৃষ্ণ
৮১
সাধনা......(আপন-করা তিরস্কারে) আর অমন-ধারা ক’রূলে আমি
ভারী রাগ করব কিন্তু।
সাধনার এত আপন-করা ব্যবহারে ‘নকী’ সঙ্কুচিত
হ’ল-কষ্টে তার মুখ হ’তে বা’র হ’ল--
নর্তকী:•••••আমি যে অসতী ।
নবীন......অসতী !---তা বটে, অনেক দিনের অনেক কারণে শুধু
চঞ্চলের প্রাণ কেন, সারা বাংলার প্রাণ’ই ত’
অসতীত্বের ঘুণে ‘জবুথবু হয়ে আছে।
সাধনা......কিন্তু চিরকেলে অসতী একটা সাড়ায় এক নিমেষে যে
হয়ে ওঠে সতী ।
ঠিক! সতী-অসতী, সৎ-অসৎ, সবাইয়ের সম্মিলিত শক্তির
অর্ঘ্যেই স্বরাজ-সাধনার সাফল্য।
সাধনা......( নর্তকীকে) তাইত, তােমাকেও আজ হতে হবে
কলঙ্ক-মােছা তাজা প্রাণ-আমারই বােন। হবে না
| ০ ০ ০
বােন?
নর্তকী’র চোখে জল, সেই জল মুছতে মুছাতে-
ছি বােন, নিজেকে দুর্বল মনে করাই সবার চেয়ে বড়
দুর্বলতা।
‘সই, সত্যই তুমি আজ অসতীরও সাধনা ?
সাধনা••••••সখা, আজ সাধনার বড় দরকার সবাইকে,-সতী,
অসতী-প্রত্যেককেই।

শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
[ দ্বিতীয় দৃশ
নবীন...... ( চঞ্চলকে) দেখেচিস, আমার সাধনার উদারতা !
চঞ্চল......থাক, মেলা ঘেটিও না ভায়া ! আমার ওসব জানা
আছে। কাজের সময় সবাই একেবারে কাজী উপাধি
পায় ! তাছাড়া সতী-মহলে সাধনা আজকাল পায় শুধু
‘আঁতুড়ে গন্ধ’ আর ‘স্ত্রীরােগ।–সুতরাং অরুচি
হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষতঃ এই মাত্র সেদিন,
‘ঝড়ের রাতে ও প্লাবনে’, ‘সতীর বন্ধ দুয়ারের পাশে,
‘অসতী’, ‘শােষণে-জর্জরিতের ও দুর্ভিক্ষপীড়িতের
নিশ্বাসে অশ্রু মিশিয়ে টেকা তুরুপ করেছিল,
-আরে তাইত তােমার সাধনার এত উদারতা !
নবীন••••••ওরে নােনা-নিঘিনে-নেমকহারাম !
এতক্ষণ সাধনা ও কৃষ্ণ দুজনে নর্তকী’র দু’হাত ধরে
তাকে অনেক কিছু বােঝাতে চাইছিল। চঞ্চল চুপ ক'রে
সেই দিকে মন দিল, আর নবীন নিঃশব্দে হাতে
লাগল। শেষে নর্তকী মধুর হেসে সায় দিল, অপর
দুজনেও তৃপ্তির হাসি হাল। তখন তিন জনেই
মাধুর্যে মগ্ন হ’ল ।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
ঐ-হীন কৃষ্ণ
৮৩
চঞ্চল ছুটে গিয়ে গম্ভীর হয়ে নেপালী-সালিউটে' হাত
কাপাতে-কাপাতে কৃষ্ণের কাছে দাবী ক’ল—
চঞ্চল......( অভিনয়ে) এই-সা নাহি চলেগা সর্দার ।
কৃষ্ণ..••••( সহাস্যে) নাহি চলেগা ?
চঞ্চল......(তেমনি ভাবে ) জরুর নেহি, ইয়ে মেরা নৰ্তকী'।
কৃষ্ণ.•••••তােহারা নৰ্তকী'
নর্তকী......( সুমধুর হাস্যে )—সখা !
কৃষ্ণ.•••••বলত’ সই, তুমি কার ?
নর্তকী......( আনন্দে ) সখা, তােমার আশীর্বাদে ও সাধনার
সােহগে আমি হ’ব সারা বাংলার !
?
সাধনা উল্লাসে ‘নকী'র হাতখানি চেপে ধরুল –
কৃষ্ণ••••••( উচ্চ হাস্যে) চঞ্চল, শুধু একা সর্দারের নয়, তােমার
‘নৰ্তকী’ আজ সারা বাংলার ।
সাধনা..••••ওর পণ, নতুন তালে বাংলা মাতাবে, যৌবনে আশার
আলাে জ্বালবে, কর্মীর নেশায় উন্মাদনা আনবে।
নবীন••••••( ঠাট্টার হাসিতে ) কেমন হুকো হলি ?
চঞ্চল......(সুরে) “আমি যারে ভালবাসি তারে ওগাে পাইনা
সকলের হাস্য, কৃত্রিম দুঃখে চঞ্চল বসে পড়ল।

৮৪
-হীন কৃষ্ণ
{ দ্বিতীয় দৃশ]
দূর হ'তে মার্কিংয়ের (marching) তালে সুর ভেসে
আতে লাগল-“বন্দে মাতরম্*।
কৃষ্ণ......(আনন্দে ও অধৈর্যে) ওরে ডাক এসেছে, ডাক এসেছে!
নবীন......( উন্মাদনায়) আয়, আয়, সবাই আয়-ছুটে আয়।
সব পর্যায়ের ভাল-মন্দ সবাই ছুটে এল, আরও
অনেকে এল। কৃষ্ণের উপদেশে চঞ্চল তাদের সবাইকে
‘ব্যাঙ্কে’ ( rank) দাড় করাল। কেবল ‘বিদেশী
নাচওয়ালীরা সভয়ে এককোণে জড়-সড় হয়ে উকি
মারতে লাগল।
বন্দে মাতরম্ ” দল এল। সর্দারকে সম্মান দেখিয়ে
সেই বাহিনী দাড়াল।
কৃষ্ণ......( বাহিনীকে) বাংলা-সেনা, নবীন সাধনার সম্মান।
কৃষ্ণের আদেশে একসঙ্গে বাহিনীর সবাই সম্মান
দেখা,
এক (দু’হাত জোড় ),
দুই (কপালে),
(ক্ষণেক পরে)
তিন (পাশে)।
সাধনা......( বাহিনীকে) পরাধীন দেশে সবাইয়ের এক সঙ্গে এক
প্রাণে স্বরাজ সাধনা, সেই ত’ সত্যিকারের একমাত্র
সাধনা।
নবীন......বঙ্গসেনা, প্রাণ দিয়ে দেশকে ভালবাসা, সেই ত’
চির নবীনতা।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শ্ৰী-হীন কৃষ্ণ
৮৫
কৃষ্ণ
* * * * *
বঙ্গসেনা, অতীতের দুর্বলতা দূর করে, চির নবীন হয়ে
দেশের উন্নতির জন্য কাজ করাই মানবতা। ছােট-বড়,
ভাল-মন্দ,—তােমরা প্রত্যেকেই দেশের কাজ করবার
উপযুক্ত। আর এই দেশের কাজে পরিপূর্ণতা আনাই
প্রত্যেকেরই নিজস্ব ও সমবেত ভাবে একমাত্র উচ্চ
আদর্শ। এখন এস বীর, এই আদর্শ সামনে নিয়ে
মানবতাময় হয়ে আমরা সবাই এগিয়ে যাই।
( নর্তকীর পানে) নব-জাগ্রত নৰ্তকী ?
কৃষ্ণের ইঙ্গিতে ‘নৰ্তকী’ ‘তাণ্ডব’ নাচ আরম্ভ করল।
‘তাণ্ডবে’র চরমতায় আপনা-হতেই সবাইয়ের পায়ের
তাল পড়তে লাগল।
‘নর্তকীর নাচের তালে—“বন্দে মাতরম্', সকলের
কণ্ঠের গানে “বন্দে মাতরম্”।
কৃ......( আদেশে)-বাংলা-সেন, ফর ওয়ার্ড-মার্চ,(Forward-March)
সম্মিলিত
বাহিনী
এগুতে
লাগল, ‘বিদেশী
নাচ ওয়ালীরা পেছুতে লাগল।
আর আকাশে উষার অরুণ উকি মেরে উঠল।
যবনিকা পতন

প্রকাশক ::
অধ্যাপক-অবনীকুমার বসু
‘বুকস্টল, ১৬৯ রসায়রাড, কলিকাতা।
সুশীল প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ লিমিটেড,
৪৮নং পটলডাঙ্গা ষ্ট্রীট হইতে
ক্ষিতিশচন্দ্র সান্যাল দ্বারা মুদ্রিত।

IMG

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sri-hin Krishna

Author
Basu,taritkumar
Title
Sri-hin Krishna
File name
Sri-hin Krishna
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/09/20
Publisher
Abanikumar Basu, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Natake Natun Rup
DLI number
513323
Barcode
4990010020312.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
jIYVUzFiwZT
Download PDF

Sri-hin Krishna