Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shrimanta
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
会 PS
No text on this page.
এক্সক্ত
চন্দ্রকান্ত দত্ত সরস্বতী বিদ্যাভূষণ
প্রণীত
প্রকাশক,
আশুতােষ ধর
আশুতােষ লাইব্রেরী
৩৯১ কলেজস্ট্রীট, কলিকাতা
ঢাকা ও চট্টগ্রাম।
মূল্য ॥• আট আনা
COPYRIGHT
RESERVED BY THE
PUBLISHER.
{
PRINIEL, BI
KEJ ITI VOLAN 0.1S
at the Asutosh Press, Dacua
উপহার
সমর্পণ করিলাম।
-=
No text on this page.
মায় প্রয় ভ গবতীর ইচ্ছা হইল, তিনি মর্ত্যে স্ত্রীলােকদিগের নিকট হইতে তাঁহার পূজা গ্রহণ করিবেন। এই কাৰ্য্য সাধন করিবার জন্য তিনি দেবী পদ্ম- বতীর সহিত পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন, ইন্দ্রের সভার নৰ্তকী পরম রূপসী রত্নমালা অপ্সরীকে অভিশাপ দিয়া স্বর্গ হইতে পৃথি- বীতে পাঠাইতে হইবে, তাহা হইলেই কাৰ্য সিদ্ধি হইবে ।
শ্ৰীমন্ত
একদিন ভগবতী রত্নমালাকে ডাকাইয়া আনিয়া
বলিলেন, “মহাদেবের সভায় আজ সমস্ত দেবতারা আসিবেন,
তােমাকে সেই সভায় নাচিতে হইবে, শিবেরও তােমার নৃত্য
দেখার একান্ত ইচ্ছা হইয়াছে।”
মহাদেবের সভায় সমস্ত দেবতারা সভা আলাে করিয়া
বসিয়া আছেন।
রতুমালা নাচিতেছে। তাহার নাচের ৱিণি
রিণি ঝিনি ঝিনি তালে, গায়ের হীরমুক্তা চুণিপাঃ। মরকতের
গহনার ঝলকে, নৃত্যের ভঙ্গিমায় আসর বেশ জমকালো
হইয়া উঠিয়াছে, দেবতারা সব মুগ্ধ হইয়া পাথরের মত বসিয়া
সে নাচ দেখিতেছেন। হঠাৎ ভগবতীর চাতুরাতে রত্নমালার
তালভঙ্গ হইল, তাহাতে দেবতারা সব বিরক্ত হইয়া উঠিলেন।
ভগবতী বলিলেন, “রত্নমালা তােমার বড় অহঙ্কার হইয়াছে যে,
তোমার মত অমন রূপ অমন নাচের ক্ষমতা বুঝি আর কাহারো
নাই, তাই এই দেবতার সভায়ও সেই অহঙ্কারটুকু মনে লইয়া
নাচিতে নাচিতে তাল কাটিয়া ফেলিলে। আমি তােমাকে
অভিসম্পাত দিতেছি, তুমি পৃথিবীতে যাইয়া মানুষ হইয়া
জন্ম লও।”
ভগবতার অভিশাপ শুনিয়া রত্নমালার মাথায় যেন
বজ্রাঘাত হইল। হায়, তাহাকে এমন সুখের স্বর্গ, স্বর্গে বাপ
মা ভাই বােন ছাড়িয়া দুঃখে কষ্টে ভরা পৃথিবীতে গিয়া
মানুষের ঘরে জন্মাইতে হইবে। সে দেবীর চরণে ধরিয়া
[ ২ ]
.
.
bipient
৬
দেবসভায় রত্নমালার নৃত্য
| পৃঃ-২
No text on this page.
শ্রীন
মন্ত
মিনতি করিয়া দিয়া বলিল, “দেবি, আমার অপরাধ ক্ষমা
করুণ, আমাকে এমন কঠিন শাপ দিবেন না।”
ভগবতী বলিলেন, “না রত্নমালা, আমার অভিসম্পাত
তােমাকে ভােগ করিতে হইবে। পৃথিবীতে ইছানী নগরের
বণিক লক্ষপতি তোমার পিতা আর তাহার স্ত্রী রম্ভবতী
তোমার মা হইবেন। আমার পূজা তোমার দ্বারাই পৃথিবীতে
প্রচার হইবে।” বলিতে বলিতে রত্নমালা ভন্ম হইয়া গেল।
ইছনা নগরের বণিক লক্ষপতির স্ত্রী রম্ভাবতীর গর্ভে
রত্নমালার পুনর্জন্ম হইল। বাপ মা তাহার নাম রাখিলেন
খুল্লনা। খুল্লনা চঁাদের মত দিবিব ফুটফুটে মেয়েটী। সে
যখন বিছানায় ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া কখনাে হাসিত, কখনাে
ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিয়া উঠিত, তখন রম্ভাবতী তাহার পাশে
বসিয়া তাহা দেখিয়া কত খুসাইনা হইত! দিন দিন খুল্লনা
বাড়িতে লাগিল, সাত মাসে তাহার অন্নপ্রাশন হইল।
যখন মাকে দেখিয়া তাহার সবেমাত্র-ওঠা ছােট্ট দাত দুইটী
বাহির করিয়া হাত বাড়াইয়া আধ আধ স্বরে মা মা বলিয়া
ডাকিয়া উঠিত, তখন তাহা দেখিয়া রম্ভাবতীর সারাটা প্রাণ
যেন আনন্দে ভরিয়া যাইত।
সে খুল্লনাকে বুকের মধ্যে
তুলিয়া লইয়া তাহার গােলাপের মত কচি মুখখানি চুম্বনে
ভরিয়া দিত; খুল্লনার হাসিতে যেন চারিদিকে চাদের আলাে
ছড়াইয়া পড়িত। এক দুই তিন করিয়া ক্রমে খুল্লনা ছয়
[ ৩ ]
শ্ৰীমন্ত
বছরে পা দিল। ধনী বাপের আদুরে মেয়ে সে, তাই বাপ
মায়ের দুই জনেরই সাধ হইল, মেয়ের বিবাহ দিয়া জামাই
ঘরে আনে। ঘটক পাঠাইয়া বরের খোঁজ চলিতে লাগিল।
ক্রমে খুল্লনা বারাে বছরে পড়িল। তার মেঘ-বরণ চুল,
তিল ফুলের মত নাক, গায়ের রং যেন পাকা সেন, ভাসা
ভাসা চোখ, গােলাপের পাপড়ির মত ঠোট দুখানি, শরীর
খানি যেন মাখন ছানিয়া তৈরী,খুল্লনার রূপে লক্ষপতির ঘর
আলাে হইয়া গেল। তাহার এরূপ দেখিয়া বাপমা দুই জনেই
ভাবিল, নিশ্চয়ই কোনও দেবতা আসিয়া তাহাদের ঘরে জন্ম
লইয়াছে। এমন ছবির মত সুন্দর মেয়েটী, তেমনি কুলে
শীলে রূপেগুণে একটী বরের খোঁজে লক্ষপতি চারিদিকে
ঘটক পাঠাইল।
উজ্জয়িনী নগর, সহরটী যেন ইন্দ্রের অমরাবতী।
দেশ হইতে কত লােক আসিয়া সে সহরে বাস করিতেছে,
কত সদাগর কত জিনিসের কেনা বেচা করিবার জন্য সেখানে
আসিয়া ঘর বাড়ী করিয়াছে। সেই সহরে ধনপতি নামে
একজন সদাগর বাস করিতেন, তিনি যেমন ধনেমানে, তেমনি
কুলেশীলে, তেমনি রূপেগুণে। তাহার পায়রা উড়াইয়া
[ ৪ ]
শ্ৰীমন্ত
খেলা করিবার খুব বাতিক ছিল। সেজন্য তিনি দেশ বিদেশ
হইতে যেখানে যত রকম সুন্দর ও দামী পায়রা পাওয়া যায়
বহু টাকা ব্যয় করিয়া তাহা কিনিয়া আনিতেন।
একদিন ধনপতি বন্ধুদিগকে লইয়া পায়রা উড়াইতে
ছিলেন। তাঁহার শ্বেতা নামে একটা পায়রা একেবারে উড়িয়া
চলিল, আর ফিরিয়া আসিল না। ধনপতি উৰ্দ্ধমুখে পায়রার
দিকে চাহিতে চাহিতে তাহার পেছনে পেছনে ছুটিলেন।
খুল্লনা তখন ইছানী নগরে সখীদিগকে লইয়া ধূলা দিয়া খেলা-
ঘর বাঁধিয়া খেলা করিতেছিল। ধনপতির পায়রা যাইয়া
তাহার কোলের উপর পড়িল। অমন সুন্দর খুল্লনা কখনাে
দেখে নাই, তাড়াতাড়ি সে পায়রাটাকে আঁচলে ঢাকিয়া লইয়া
বাড়ীর দিকে চলিল। ধনপতি তাহার কাছে উপস্থিত হইয়া
বলিলেন, “আমি উজানী নগরের একজন সদাগর, আমার
নাম শ্রীধনপতি দত্ত, জাতিতে গন্ধবণিক। আমার একটা
সখের পায়রা উড়িয়া আসিয়া তােমার গায়ে পড়িয়াছে, তুমি
তাহা লুকাইয়া রাখিয়াছ, আমার সে পায়রাটা দাও, অমন
পায়রা আর আমার একটাও নাই।
খুল্লন ধনপতির পরিচয় পাইয়া বুঝিল, এ সদাগর
তাহারই জেঠাতুত ভগ্নী লহনার স্বামী, কাজেই সম্পর্কে তাহার
ভগ্নীপতি। সে ভগ্নীপতিকে একটু পরিহাস করিবার সুযােগ
ও লােভ ছাড়িতে পারিলনা, হাসিয়া বলিল, “তুমি কোথাকার
[ ৫ ]
৯শ্ৰীমন্ত
সদাগর, কে তােমায় চিনে ? ভদ্রলােক কি কখনাে পাখী
তাড়াইয়া তাহার পেছনে পেছনে ছুটিয়া বেড়ায়? পায়রাটা
আসিয়া প্রাণের ভয়ে আমার কোলে লুকাইয়াছে, আমি
তাহাকে তােমার হাতে কিছুতেই দিতে পারি না, তাহাকে আমি
আশ্রয় দিয়াছি, প্রাণ দিয়াও তাহাকে রক্ষা করিব। এটা যে
তােমার পায়রা তাহার কোনও চিহ্ন আছে কি ? তুমি খুব
চতুর চালাক দেখিতেছি, কোনও রকমে কি দিয়া পায়রাটা
আদায় করিয়া লইতে চাও।—আচ্ছা যদি পায়রাটা নেহাতই
তুমি নিতে চাও তবে, দাঁতে কুটা লইয়া চাহিয়া নেও।”
খুল্লনার কথা শুনিয়া ধনপতি মনে করিলেন, এ মেয়েটী
বােধহয় লক্ষপতির হইবে নতুবা সে তাহাকে কি এমন করিয়া
ঠাটা করিতে সাহস করে ? তিনি আর সেখানে দাড়াইলেন
, ধীরে ধীরে গিয়া একটা গাছের তলায় বসিলেন। খুল্লনা
তার মুখের দিকে চাহিয়া ফিক করিয়া হাসিয়া পায়রাটা
লইয়া হেলিতে দুলিতে চলিয়া গেল। ধনপতি খুল্লনার অমন
চাদপান। মুখ ও সুন্দর রূপ দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া গেলেন।
লােকের কাছে জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি জানিতে পারিলেন,
তাহার অনুমানই সত্য, মেয়েটা যথার্থ ই লক্ষপতির কন্যা
খুল্লনা। তিনি জনার্দন পণ্ডিতকে খুল্লনার সহিত তাহার
বিবাহ সম্বন্ধ ঠিক করিয়া দিতে ধরিয়া বসিলেন।
জনাই পণ্ডিত ধনপতিকে আশ্বাস দিয়া লক্ষপতির বাড়ী
শ্ৰেীমন্ত
গিয়া উপস্থিত হইলেন। লক্ষপত বিহুদিন পরে পুরােহিতকে
দেখিয়া আনন্দে পায়ের ধূলি লইয়া বলিল, “ঠাকুর মহাশয়,
আমার মেয়ে খুল্লনার বিবাহের একটা সম্বন্ধ ঠিক করিয়া
দিন না।”
জনাই খুল্লনাকে দেখিয়া বলিলেন, “লক্ষপতি বারাে
বছরের মেয়ে হইয়াছে, এখনাে ইহার বিবাহ দিতেছ না,
তোমার যে চৌদ্দপুরুষ নরকে যাইবে।”
লক্ষপতি বলিল, “খুঁজিয়া খুজিয়াও ত মনােমত পাত্র
মিলিতেছে না, আপনি দয়া করিয়া একটা সম্বন্ধ ঠিক করিয়া
দিন।”
জনাই পণ্ডিত অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিলেন,
“গন্ধবণিক সমাজে খুল্লনার উপযুক্ত বরত খুঁজিয়া পাইনা,
কেবল উজানী নগরের ধনপতি সদাগর তােমার মেয়ের উপযুক্ত
বলিয়া আমার মনে হয় । তহাের যেমন রূপ, তেমন গুণ,
তেমন বিদ্যাবুদ্ধি, তেমন সে ধনেমানে কুলে শীলে। ইহার
হাতে খুল্লনা পড়িল তবে ঘট বুঝিয়া ফুল দেওয়া হইবে।
খুল্লনা সেখানে রাজরাণীর মত সুখে থাকিবে। এখানেই তুমি
মেয়ের সম্বন্ধ স্থির কর।”
পুরােহিতের মুখে ধনপতির রূপগুণ, বিদ্যা বুদ্ধি ও
বংশের কথা শুনিয়া লক্ষপতি সম্মত হইল। রম্ভাবতী কপাটের
আড়ালে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া মেয়ের বিবাহের কথা শুনিতে-
[ ৭ ]
শ্ৰীমন্ত
ছিল। জনাই পণ্ডিত চলিয়া গেলে সে লক্ষপতির কাছে
আসিয়া রাগিয়া বলিল, “তােমার কি বুদ্ধি শুদ্ধি একেবারে
লােপ পাইয়াছে যে, তুমি আমার অমন মেয়ে,সােনার
প্রতিমার মত যার রূপ, তাকে সতিনের ঘরে দিতে চাহিতেছ !
লহনাকে কি তুমি চেন না। সে যে খুল্লনাকে দিনরাত জ্বালা
যন্ত্রণা দিয়া ভাজা ভাজা করিবে। প্রাণ থাকিতে আমি অমন
বিবাহ হইতে দিব না, মেয়ে আমার আইবুড়াে হইয়া ঘরে
থাকিবে সেও ভাল। খুল্লনাকে গলায় বাঁধিয়া আমি জলে
ডুবিয়া মরিব, তবু তাহাকে দোজবরে দিতে পারিনা। চেষ্টা
করিয়া দেখ, না হয় আরাে কিছুদিন পরে আমরা মেয়ের বিবাহ
দিব। ধনে জনে ভরা প্রথম-বরে দিলে মেয়েও সুখে থাকিবে,
তােমার টাকা ব্যয়ও সার্থক হইবে, লােকেও ভাল বলিবে ;
তুমি ও-সব পাগলামি বুদ্ধি ছাড়িয়া দাও।”
লক্ষপতি বলিল, “শােন রম্ভা, খুল্লনার অদৃষ্টে তাহাই
আছে। অনেক দিন আগে এক গণকঠাকুর আসিয়া বলিয়া
গিয়াছেন যে, খুল্লনা সতিন-ঘরেই পড়িবে, এবং তাহাতেই সে
সুখী হইবে। তুমি আমি চেষ্টা করিয়া কি করিব ?”
স্বামীর কথা শুনিয়া রম্ভাবতা আর আপত্তি করিল না।
ধনপতির সাথেই খুল্লনার বিবাহ-সম্বন্ধ সুস্থির হইয়া গেল।
[ ৮
শ্ৰীমন্ত
ধনপতির স্ত্রী লহনা যখন শুনিল, তাহার স্বামী খুল্লনাকে
বিবাহ করিবার জন্য দিন স্থির করিয়া ফেলিয়াছে, তখন
রাগে দুঃখে তাহার বুক ফাটিয়া কান্না আসিতে লাগিল।
আহার নিদ্রা ছাড়িয়া দাসী দুৰ্বলার কাছে বসিয়া তাহার
মনের দুঃখের কথা বলিতে লাগিল, “শুনিয়াছিস্ দুৰ্বলা,
আমার যে কপাল পুরিয়া গেল, সদাগর আবার বিবাহ
করিবেন । আমার খুড়তুত বােন খুল্লনার সাথে তাঁহার সম্বন্ধ
স্থির হইয়া গিয়াছে। সাধু পায়রা উড়াইবার ছল করিয়া গিয়া
খুল্লনাকে দেখিয়া একেবারে ভুলিয়া গিয়াছেন। হায় দুর্বলা,
ছােট বােন আমার সতিন হইয়া আসিয়া আমার সাজান গুছান
সুখের সংসার আগলাইয়া বসিবে, এর চাইতে যে আমার
মরণ ভাল ছিল। কত সাধ করিয়া ঘর বাড়ী সাজাইয়া ছিলাম
তাহা সতিনের হাতে সঁপিয়া দিতে হইবে, সংসারে আমি
দাসী বাদীর মত হইয়া থাকিব, স্বামী আমার পর হইবে।”
দুর্বলা তাহাকে অনেক বুঝাইয়া সুঝাইয়া একটু শান্ত
করিল।
লহনা অভিমান করিয়া কয়েক দিন স্বামীর সাথে কোনও
শ্ৰীমন্ত
কথাই বলিল না। ধনপতি বুঝিলেন, তাহার এ রাগের অর্থ
কি ? তিনি লহনাকে অনেক করিয়া বুঝাইলেন, তিনি বিবাহ
করিয়া লহনাকে সুখেই রাখিবেন, বঁধিয়া বঁধিয়া তাহার
শরীর শুকাইয়া গিয়াছে, এজন্য তিনি আর একটা বিবাহ
করিবেন, নূতন বউ তার দাসী হইয়া থাকিবে,ইত্যাদি কত
কথাই তিনি লহনাকে বলিলেন, কিন্তু লহনা কিছুতেই স্বামীর
আবার বিবাহে রাজি হইল না । সে মনে মনে এটা বেশ
বুঝিল যে, নূতন বউ আসিয়া তাহার সমস্ত সুখ আত্মসাৎ
করিয়া বসিবে, সে যে সংসারে এতদিন রাণী ছিল, সেখানে
তাকে একটা বাজে লােকের মত থাকিতে হইবে। হিংসায়
তাহার গা জ্বলিয়া যাইতে লাগিল।
ধনপতি দেখিলেন, মহামুস্কিল ; তাগচ লহনাকে সম্মত
করিতে না পারিলে তাহার বিবাহ করাই হইবে না। তিনি
লহনাকে বলিলেন, “শোন লহনা, আমি বিবাহ করিয়া
তােমাকে কোনও কষ্টই দিবনা, আগে তুমি যেমন ছিলে
চিরকাল তেমনি থাকিবে। তুমি আমার ঘরের লক্ষী,
তােমাকে বিবাহ করিয়া আনিয়া আমার অদৃষ্ট ভাল
হইয়াছে, তোমাকে কি আমি অনাদর করিতে পারি লহনা ?
কাল তোমাকে আমি একখানা পাঠশাউ আর পাঁচ ভরি
সােনা দিয়া নৃতন ধরণের চুড়ি তৈরী করিয়া দিব ; লক্ষাটি
আমার, আর অমত করিও না।”
[ ১০ ।
শ্ৰীমন্ত ধনপতির আদরে ও পাটশাড়ী ও সােনার চুড়ির ললাভে লহনার সমস্ত অভিমান দূরে গেল, সে আনন্দে স্বামীকে বিবাহ করার অনুমতি দান করিল। প্রাতে জনাই পণ্ডিত আসিলে ধনপতি তাহাকে লক্ষ- পতির বাড়ী যাইয়া সম্বন্ধ স্থির করিতে বলিলেন। জনাই পণ্ডিত লক্ষপতিকে যাইয়া এ শুভ সংবাদ জানাইলেন। পতি ও রম্ভাবতী আনন্দে জনাই-এর পায়ের ধূলি লইয়া শুভদিন নির্ধারণ করিতে বলিল। জনাই অনেক শাস্ত্র ও পাঁজিপুথি ঘটিয়া ফাঙ্গুন মাসের ত্রয়ােদশী তিথি রােহিণী নক্ষত্রে বিবাহে লগ্ন করিলেন। বর ও কনের বাড়ীতে বিবাহের ধুম পড়িয়া গেল। শানাই এর মধুর সুরে আকাশ ভরিয়া উঠিল। তারপর শুভদিনে শুভলগ্নে বিবাহ হইয়া গেল। ধনপতি শ্বশুর শাশুড়ীকে প্রণাম করিয়া নববধূ খুল্লনাকে লইয়া সােনার পাল্কীতে চড়িয়া বাড়ী ফিরিলেন। লহনা হিংসায় জুলিতে জ্বলিতে বুকভরা দুঃখ লইয়া খুল্লনাকে বরণ করিয়া ঘরে তুলিল। [ ১১ ]
৯শ্ৰীমন্ত
৪
জ্জয়িনী নগরে দুই জন ব্যাধ বাস করিত। তাহারা
প্রতিদিন বনে বনে ঘুরিয়া পাখী ধরিয়া লইয়া গিয়া সহরে
বিক্রি করিত। একদিন তাহারা সাতনলায় আটার ফাঁদে দুইটা
শুক ও শারী ধরিল, শুক কোনও রকমে ফাঁদ হইতে উড়িয়া
গিয়া গাছের ডালে বসিল, কিন্তু শারী আর পলাইতে পারিল
। ব্যাধেরা তাহাকে ধরিয়া খাঁচায় পুরিল। তাহারা শাড়ীকে
ধরিয়া লইয়া যায় দেখিয়া শুকের মনে বড়ই দুঃখ হইল। (म
ব্যাধদিগকে বলিল, “ব্যাধ, তােমরা যে নিত্য নিত্য পাখা
মারিয়া পাপ করিতেছ এজন্য যে কি নরকজ্বালা তােমাদিগকে
ভােগ করিতে হইবে তাহা কি একবার ভাবিয়া দেখিয়াছ ?
পাখা মারিয়া মাংস বেচিয়া কতই বা পয়সা পাও, ইহাতে যে
তােমাদের পাপ হয় তাহাতে তোমরা সবংশে নষ্ট হইবে। যখন
মরিয়া যাইবে তখন এই টাকা পয়সা সাথে যাইবেনা, কেবল
পৃথিবীতে যে টুকু পাপ ও পুণ্য করিবে তাহাই সাথে যাইবে।
তোমরা মানুষ, তােমাদের যেমন সুখ দুঃখ আছে, ভগবান
কোনও প্রাণীকে তার চাইতে এক তিল কম দেন নাই। এসব
পাপ কাজ ছাড়িয়া দিয়া সৎভাবে থাক, জীবন তােমাদের
সুখের হইবে । শাস্ত্রে আছে, শিবিরজা একটা পায়রার প্রাণ
। ১২ ]
শ্ৰীমন্ত
রক্ষার জন্য তাহার নিজের শরীরের মাংস কাটিয়া দিয়াছিলেন।
তােমর শারীকে ছাড়িয়া দাও ব্যাধ, তার বদলে আমাকে
লইয়া যাও, রাজার কাছে আমাকে লইয়া গেলে আমার
মূল্য তিনি যাহা দিবেন, তাহাতে তােমরা আজীবন পরম
সুখে থাকিতে পারিবে।”
শুকের কথায় ব্যাধদের মনটা যেন কেমন হইল, তাহারা
শারীকে ছাড়িয়া দিয়া বলিল, “শুক, তােমার কথায় আজ
আমাদের অনেক শিক্ষা হইল, আর আমরা কোনো দিন
এমন পাপ কাজ করিব না।”
শারীকে ছাড়িয়া দিল দেখিয়া শুক উড়িয়া গিয়া
ব্যাধদের হাতের উপর বসিয়া কহিল, “আমাকে তােমরা
রাজার কাছে লইয়া যাও, তামাদ্বারা তােমাদের আশাতীত
লাভ হইবে।”
ব্যাধেরা দেখিল, এমন সুন্দর পক্ষী তাহারা জীবনে
কোনও দিন দেখে নাই ; পাখীর সােণার পাখা, তাহার
উপর চুনী, পান্না, নীলা ও মরকতের ফুটকি বসানাে, মাথায়
মাণিকের ঝুটী, হীরার ঠোট, পদ্মরাগ মণির চোখ, প্রবালের
পা, কণ্ঠস্বর কি মিষ্টি ! শুককে লইয়া ব্যাধের রাজ-দরবারে
চলিল , শুককে যাইতে দেখিয়া শারীও যাইয়া ব্যাধদের হাতে
উড়িয়া বসিল।
ব্যাধেরা যখন শুক শারীকে লইয়া রাজসভায় উপস্থিত
[ ১৩ ]
শ্ৰীমন্ত
হইল, রাজা, পাত্র, মিত্র, মন্ত্রী, উজীর, নাজির, সকলেই সেই
পক্ষী দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেন। অমন পক্ষী তাহা আর .
কোনাে দিন দেখেন নাই ! পাখীর পায়ের মণিমুক্তার আভায়
রাজ-সিংহাসনের ও রাজার পােষাকের হীরা জহরত একে-
বারে নিস্তেজ হইয়া গেল। শুক রাজাকে বলিল, “মহারাজ,
আমরা পূর্ব জন্মের পাপের ফলে পক্ষী হইয়া জন্মিয়াছি।
আমি রাজা বীরবাহুর পুত্র ছিলাম, ঋষি বিশ্বামিত্রের অভি-
শাপে আমরা স্বামী স্ত্রী দুই জনেই পক্ষি জন্ম পাইয়াছি।
তারপর কিছুদিন আমরা বৃন্দাবনে
ছিলাম, শ্রীকৃষ্ণের সাথে
সাথে গরুর পাল লইয়া গােষ্ঠে যাইতাম, কত খেলা
খেলিতাম ;-বড় সুখের ছিল সে জীবন আমাদের।
দিন স্বর্গের নন্দন বনে বেড়াইতে গিয়াছিলাম, দেবরাজ ইন্দ
আমাদিগকে কত কৌশল করিয়া ধরিয়া লইয়া গেলেন।
আমরা ইন্দ্রের সভায় খাঁচায় বসিয়া তাঁহাকে শাস্ত্রের কথা
শুনাইতাম। দেবতারা আমাদিগকে বড় ভাল বাসিতেন।
বৎস রাজা একবার তাহার বন্ধু ইন্দ্রের সভায় বেড়াইতে
গিয়া আমাদিগকে ইন্দ্রের নিকট হইতে চাহিয়া লইয়া গেলেন।
সেই দিন হইতে অামরা শ্রীবৎস রাজার হইলাম, রাজ সভায়
সােনার খাচায় বসিয়া আমরা রাজাকে শাস্ত্রের বচন শুনাইতাম,
তিনি নিজ হাতে আমাদের গায়ে চন্দন মাখিয়া দিতে
দিতে তাহা শুনিতেন। কিন্তু আমাদের কপালে সে সুখ সহ্য
এক
[ ১৪ }
শ্ৰীমন্ত
হইল না। রাজরাণী শণির কোপে পড়িয়া বনবাসী হইলেন।
আমরা আপনার প্রশংসার কথা শুনিয়া এখানে আসিলাম,
আসিয়া ব্যাধের হাতে ধরা পড়িলাম। আমরা আপনার
রাজসভাতেই থাকিব, আপনি ব্যাধদিগকে উপযুক্ত মূল্য দিয়া
বিদায় করুন।” রাজা বিক্রমকেশরী শুকের কথা শুনিয়া
মুদ্ধ হইয়া গেলেন, সভার লােক অবাক হইয়া পাথরের মত
বসিয়া রঙিল। তিনি ব্যাধদিগকে শুকশারীর মূল্য বাবদ
এক হাজার মােহর গণিয়া দিতে হুকুম করিলেন ।
রাজা পক্ষীর মুখে মানুষের মত কথা শুনিয়া বড়ই
আশ্চৰ্য্য হইলেন,—আরও আশ্চর্য্য হইলেন শাস্ত্রের কথা
শুনিয়া। তিনি পক্ষীদিগকে বলিলেন, “আমি তােমাদের
কথা শুনিয়া পরম আহলাদিত হইয়াছি, তােমরা আমার রাজ
সভায় থাক। আমিও তােমাদিগকে সোনার খাচায় রাখিয়া
ঘি ভাত দুধ-ক্ষীর খাওয়াইয়া তােমাদের নিকট হইতে শাস্ত্রের
কথা শুনিব।”
মন্ত্রী বলিলেন, “মহারাজ, এমন পক্ষী রাখার সােনার
খাচাত এদেশে মিলিবে না । গৌড় নগরে ভাল সােনার
খাচা তৈরী হয়। ধনপতি সদাগর বাণিজ্য করিতে সে
দেশে যাইয়া থাকেন, তাহাকেই খাঁচা অনিবার জন্য আদেশ
করুন।”
রাজা ধনপতিকে খাচা আনিতে গৌড়ে যাইবার আদেশ
[ ১৫ ]
৯শ্ৰীমন্ত করিলেন। ধনপতি মাথা হেঁট করিয়া বলিলেন, “মহারাজ, বাড়ীতে আমার কেহই নাই, শুধু মাত্র দুই স্ত্রী, তাহাদিগকে একেলা ফেলিয়া যাওয়া ভাল হয় না, অন্য কেহকে আদেশ করুন।” রাজা কিছুতেই ধনপতির অনুনয় বিনয় শুনিলেন না। কাজেই বাধ্য হইয়া ধনপতিকেই গৌড়ে যাইতে হইল। যাইবার সময় তিনি খুল্লনাকে লহনার হাতে তুলিয়া দিয়া তাহাকে আদর যত্ন করিবার জন্য বিশেষ করিয়া বলিয়া গেলেন। লহনা খুল্লনাকে আপন বােনের মত স্নেহ ও ভাল- বাসায় আদর যত্ন করিতে লাগিল। খুল্লনার কষ্ট হইবে মনে করিয়া লহনা তাহাকে সংসারের কোনও কাজ করিতে দিত না। লহনা নিজ হাতে খুল্লনার মাথায় ফুলেল তেল দিয়া তাহার গা ঘষিয়া স্নান করাইয়া দিত, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন রাঁধিয়া কাছে বসিয়া খাওয়াইত, তাহার নিজের ভাল ভাল পােষাক ও গহনা দিয়া খুল্লনাকে সাজাইয়া দিত, দুই জন এক ছািনায় শুইয়া কত গল্প করিত, কে বলিবে ইহারা দুই সতিন ?-যেন এক মায়ের পেটের দুইটা বােন। ( ১৬ ]
৯শ্ৰীমন্ত
দুর্বল তাহাদের বাড়ীর দাসী । বড় কুটিল স্বভাব
তার। কাহারাে ভাল সে দেখিতে পারেনা,-যেন চোখে
কাঁটা ফোটে। দুই সতিনের এমন ভাব তার সহ্য হইলনা।
সে মনে মনে ভাবিতে লাগিল, ইহাদের দুই জনের মন ভাঙ্গাইতে
হইবে, যে ঘরে সতিনে সতিনে ঝগড়া হয়না সে ঘরে দাসী
করিয়া সুখ নাই, ঝগড়াঝাটি হইলে বেশ একটু মজা দেখা
যায়, দুইজন দুইজনকে যদি বিষ নজরে দেখে তবে একজনের
নিন্দা আর একজনের কাছে করিয়া বেশ ভাল মানুষটি সাজা
যায়। এই ভাবিয়া দুর্বল লহনার কাছে যাইয়া হাজির
হইল। লহনা এখন খুল্লনার চুল
বাঁধিয়া দিতেছিল
। দুর্বল
তাহাকে আড়ালে ডাকিয়া লইয়া কহিতে লাগিল, “তােমার
কি কিছুই বুদ্ধি শুদ্ধি নাই গাে ? নিজের কপাল যে নিজেই
খাইতেছ। সতিনের এত তাদর ! ওমা, এমনত কোথাও
দেখি নাই! তুমি যতই কেন করনা, সতিন, বাঘ আর সাপ এ
কখনই পােষ মানিনা। আজ তুমি যে সতিনের জন্য এত
খানি করিতেছ একদিন সেই সতিনই তােমার বুকে ছােরা
মারিবে ।
খুল্লনার এমন সুন্দর রূপ, আর তুমি বুড়ী হইতে
চলিয়াছ, রূপের জৌলস আর তােমার তত নাই, সাধু গৌড়
হইতে আসিয়া তােমাকে আর ভালবাসিবেনা, খুল্লনাকেই সে
আদর সোহাগ করিবে, তােমার সংসারেই তােমাকে তাহার
দাসী বাদীর মত হইয়া থাকিতে হইবে। তােমাকে এক কথা
{ ১৭ ]
শ্ৰীমন্ত
;
বলিতেছি মা, রাগ হইওনা। এখনাে সাবধান হও, না হইলে
পরিণামে বড়ই বিপদে পড়িবে—এখন হয়ত আমার কথা
তােমার কাণে ভাল ঠেকিবেনা, কিন্তু দাসীর কথা বাসী হইলে
কাজে লাগিবে।”
লহনা দুৰ্বলার কথা শুনিয়া সত্যসত্যই মনে বড় ভয়
পাইল ; সে ভাবিল, স্বামী দেশে ফিরিয়া আসিয়া তাহাকে
হয়ত আর সুনজরে দেখিবেনা, খুল্লনাকেই ভাল বাসিবে।
সে দুর্বলাকে বলিল, “আমি এতদিন বুঝিতে পারি নাই, তুমি
আজ আমার পরম উপকার করিলে। চল আমার সই
লীলাবতীর বাড়ী যাইয়া তাহাকে ইহার উপায় জিজ্ঞাসা করি।”
তাহারা দুইজনেই যাইয়া লীলাবতীর বাড়া উপস্থিত
হইল। লীলা বহুদিন পরে সইকে দেখিয়া তাহাকে হঠাৎ
এমন সময়ে উপস্থিত হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করিল। লহনা
বলিল, “ভাই সই, আমায় এমন একটা উপায় বলিয়া দাও,
আমি যাহাতে খুল্লনাকে স্বামীর দুই চোখের বিষ করিয়া দিতে
পারি। সাধু গৌড় হইতে ফিরিয়া আসিয়া খুল্লনার রূপে
ভুলিয়া গিয়া আমাকে আর আগের মতন দেখিবেন না,
আমার যে কপাল তাহা হইলে পুড়িয়া যাইবে ভাই। তুমি
আমায় একটা উপায় করিয়া দাও।”
লীলাবতা বলিল, “সেটা সত্যি কথা সই, সতিনের বড়
জ্বালা। আমি তােমাকে একটা উপায় বলিয়া দেই, যদি
[ ১ ]
শ্ৰীমন্ত
তুমি খুল্লনাকে সামান্য কিছু খাবার দিয়া খুব কষ্টে রাখ, তাহা
হইলে অমন রূপ আর তাহার থাকিবেনা। সাধুও তাহা
হইলে আর তাহাকে অত ভালবাসিবেন না। আমি সাধুর
নামে তােমার কাছে একখানা চিঠি লিখিয়া দিতেছি, সাধু যেন
গৌড় হইতে তােমাকে লিখিতেছেন,—পিঞ্জর তৈরী করাইবার
জন্য অনেকদিন আমাকে গৌড় নগরে থাকিতে হইবে। কবে
যে বাড়ী ফিরিব তাহার ঠিক নাই। পিঞ্জরের জন্য কিছু
সোনার অভাব হইয়াছে, তুমি খুল্লনার গায়ের সমস্ত সােনার
অলঙ্কার খুলিয়া আমাকে তাহা পাঠাইয়া দিবে, আর তাহাকে
একখানা ছেডা ময়লা কাপড় পরাইয়া ছাগল চড়াইতে নিযুক্ত
করিবা, আমার ঘরে সে যেন আর শুইতে না পারে, তাহাকে
ঢেকা শালায় শুইতে দিও। আমার এই আদেশ যদি তুমি
পালন না কর তবে আমি বাড়ী আসিয়া তােমার মাথা মুড়াইয়া
আমার বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিব ” লীলাবতী অনেক চেষ্টা
কবিয়া ধনপতির হাতের লেখার মত করিয়া চিঠিখানা লিখিয়া
লহনার হাতে দিল, লহনা সন্তুষ্ট হইয়া তাহা লইয়া বাড়ী
ফিরিল।
বাড়া আসিয়া লােক-দেখানো চোখের জল ফেলিতে
ফেলিতে খুল্লনার কাছে গিয়া সে একেবারে কাঁদিয়া ফেলিল।
খুল্লনা তাহাকে কাঁদিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি
হইয়াছে দিদি ? তুমি কঁাদ কেন ?”
[ ১৯ ]
শ্ৰীমন্ত “সাধুর মতিগতি এমন কেন হইল, তাের তাের কপাল পুড়িয়াছে বােন, এই দ্যাখ তার চিঠি”—এই বলিয়া লহনা খুল্লনাকে চিঠিখানা দেখাইল। খুল্লন ভয়ে ভয়ে চিঠিখানা পড়িয়া শেষে একেবারে হাসিয়া কুটপাট হইয়া বলিল, “আচ্ছা পাগল দেখছি তুমি দিদি, কে যেন ঠাট্টা করিয়া আমাকে একটু কাদাইয়া মজা দেখিবার জন্য এই কাণ্ড করিয়াছে, এজন্য তুমি ভাবিওনা। সাধুর হাতের লেখা আর এ লেখায় যে আকাশ পাতাল তফাৎ রহিয়াছে, তাহাও কি দেখিতেছনা ?” লহনা বলিল, “সাধুর কি আর তাবসর আছে যে তিনি নিজে লিখিবেন, মুহুরি দিয়া লিখাইয়া দিয়াছেন, ইহাতে অবিশ্বাসের আর কিছুই নাই।” খুল্লনা বলিল, “তুমি যে অবাক কৰিলে দিদি, এমন চিঠি কি কখনো কেহ মুহুরি দিয়া লেখায় ? আমার কি অপরাধ যে তিনি আমাকে বিবাহ করি। আনিতে আনিতেই এমন সাজার ব্যবস্থা করিবেন ?” লহন। বলিল, “তুই আসিতে আসিতেই সাধুকে ঘর বাড়া ছাড়িয়া বিদেশে যাইতে হইল, তুই খণ্ড কপালী, রাক্ষস- গণা, তাই তাের উপর সাধুর এত রাগ।” লহনার কথা শুনিয়া খুল্লনার বড় রাগ হইল, সে বলিল “দ্যাখো দিদি, তােমার মুখে যা আসে তাই যে বল, ভাবিয়া চিন্তিয়া কথা বলিও কিন্তু !” ২• }
৯শ্ৰীমন্ত
লহন তৎক্ষণাৎ খুল্লনার চুলের মুঠা ধরিয়া তাহাকে
গালে মুখে পিঠে কিল চড় ঠোণ। মারিতে মারিতে শােয়াইয়া
ফেলিয়া বলিতে লাগিল, “কি হারামজাদী, ছোট মুখে বড়
কথা ! আসিতে না আসিতেই যে আমার উপর চোখ রাঙানি
দেখিতেছি ! সাধু আমাকে যাহা করিতে লিখিয়াছেন আমি
তাহা করিবই, তারপর যাহা সাধ্য থাকে করি।”
লহনার অমন মার আর খুল্লনা সহ্য করিতে পারিনা।
সে দুর্বলার হাতে পায়ে ধরিয়া কাঁদিয়া বলিল, “যা দুর্বল,
অামার বাপের বাড়ী যাইয়া আমার এ দুঃখের খবরটা তাহা-
দিগকে দিয়া আয়, আমি যে আর এ জ্বালা সহ্য করিতে
পারিনা, তাহারা যেন আসিয়া আমাকে লইয়া যায়।”
দুষ্টমতি দুর্ববলা বলিল, “আমি যদি এখনই গিয়া
তাহাদিগকে এ খবরটা দেই তবে লহনা নিশ্চয়ই আমাকেও
অপমান করিবে। তার চাইতে তুমি এক কাজ কর, এটা
যখন স্বামীর আদেশ, তখন তুমি অন্ততঃ কিছুদিন না হয়
তাহার কথামত কাজ কর। স্বামীর আদেশ লঙ্ঘন করিতে
নাই তাহাতে নরক ভোগ হয় । জানত, রামের কথায় সীতা
বনবাসে গিয়াছিলেন। তুমি দিন দুই চারি ছাগল চড়াও,
আমি একদিন অবসর মত যাইয়া তােমার বাপের বাড়ী খবর
দিয়া আসিব।”
খুল্লন দুর্ববলার কথা শুনিয়া ভাবিল’ সত্য সত্যই যদি
{ ২১ ]
৯শ্ৰীমন্ত
ইহা স্বামীর আদেশ হয়, তবে তাহা পালন না করা বড়ই
অধৰ্ম্মের কাজ হইবে।......সে অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া ছাগল
চড়াইতে স্বীকৃত হইল।
লহনা খুল্লনার গায়ের সমস্ত অলঙ্কার ও পরণের
কাপড় খুলিয়া লইয়া তাহাকে একখানা অতি ময়লা ছেড়া
কাপড় পরিতে দিল । খুল্লনা অতি কষ্টে কোনও রকমে
তাহা পরিল। তারপর লহনা ছাগলগুলি গণিয়া হিব
করিয়া প্রত্যেকটার গায়ে কালি দিয়া চিহ্ন করিয়া খুল্লনাকে
দিল, ভয় পাছে খুল্লনা বনের ভিতর এক আধটা হারাইয়া
আসে, বা অন্য কাহারও সাথে বদলাইয়া যায়।
খুল্লনা, ধনপতির বড় আদরের খুল্লনা,...বাপ মায়ের বড়
সােহাগের ধন খুল্লনা, ছেড়া ন্যাকড়া পরিয়া হাতে লাঠা
লইয়া মাথায় কচুর পাতা দিয়া চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে
ছাগলের পাল তাড়াইয়া লইয়া মাঠের দিকে চলিল। দুষ্ট
ছাগলের দল পথে যাইতে যাইতে ফসলের ক্ষেত দেখিয়া তাহা
খাইবার জন্য ছুটাছুটি করিয়া সেই দিকে যাইতে লাগিল।
কৃষকদের গালিগালাজ সহ্য করিয়া রোদে পুড়িয়া ঘামে
ভিজিয়া অভাগী খুল্লন ছাগল তাড়াইয়া লইয়া চলিল। পথে
একটা নদী পড়িল, ছাগলগুলিকে তাহার কোলে করিয়া একে
একে পার করিতে হইল। মাঠে যাইয়া ছাগলগুলি এদিক
ওদিক ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতে লাগিল। খুলনা তাহাদের
[ ২ ]
শ্ৰীমন্ত পেছনে পেছনে ছুটিয়া সেগুলিকে তাড়াইয়া দলের ভিতর আনিতে লাগিল। হায়, অমন কোমল সােনার শরীরে সে কষ্ট সহ্য হইবে কেন ? তাহার পা কুশের তাঙ্কুরে রক্তাক্ত হইয়া গেল, মাথা ঘুরিতে আরম্ভ করিল, সারাগায়ে দর দর করিয়া ঘাম ঝরিতে লাগিল, ক্ষুধায় তৃষ্ণায় তাহার শরীর অবসন্ন হইয়া আসিল। সন্ধ্যায় সে ছাগল তাড়াইয়া বাড়ী লইয়া আসিয়া তাহাদিগকে ঘরে বন্ধ করিল। লহনা একটা একটা করিয়া ছাগল গণিয়া লইল। তারপর খুল্লনা কচুর পাতা পাতিয়া খাইতে বসিল। লহনা তাহাকে কাকর ভরা ক্ষুদের জাউ, কলমীর শাক, ডালের বড়া, ও ডুমুরের ফুল চচ্চড়ী আনিয়া তাহাকে দিল,তাহাতে না আছে তেল, না আছে নুন ! খুল্লনা পেটের ক্ষুধায় তাহাই আধ পেটা খাইয়া উঠিয়া পড়িল। রাত্রিতে ঢেকী-শালে খড় পাতিয়া খড়ের বলিশ মাথায় দিয়া কোনও রকমে রাত্রি কাটাইল । ভােরে উঠিয়া আবার ছাগল লইয়া চলিল। এমনি করিয়া হতভাগিনী খুল্লনার দিন কাটিতে লাগিল। কি শীত, কি গ্রীষ্ম, কি বর্ষা, তাহাকে এমনি করিয়া প্রতিদিন ভােরে উঠিয়া ছাগল লইয়া বাহিরে যাইতে হইত, আর সন্ধ্যার সময় ফিরিতে হইত। সে বনে বৃক্ষ, লতা, ফুল, পাতা, পাখী, ভ্রমর যাহা দেখিত তাহারই কাছে সে চোখের জলে ভাসিতে ভাসিতে দুঃখের কথা বলিত, কিন্তু হায়, তাহার দিকে যে কেহই ফিরিয়া চাহিতনা, বা একটী মিষ্টি কথাও বলিতনা। [ ২৩ ]
শ্ৰীমন্ত
এক ক দিন খুল্লনা দুপুর বেলা বনের ভিতর ছাগল ছাড়িয়া
দিয়া গাছের শীতল ছায়ায় মৃদু বাতাসে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে,
গভীর ঘুম ; ছাগলেরা নূতন ঘাস ও কচি পাতার লােভে এদিক
ওদিক চলিয়া গিয়াছে । এমন সময় মা ভগবতী দেব-কন্যা
দিগকে লইয়া সেই বনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বনের
এক ধারে একটা সুন্দর সরােবর ছিল, ভগবতী দেব-কন্যা-
দিগকে সেই সরােবরের ধারে তাহার পূজা করিতে বলিয়া
তিনি স্বয়ং খুল্লনার মাতা রম্ভাবতীর বেশ ধরিয়া তাহার শিয়রে
বসিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া বলিতে লাগিলেন, “বাছা খুল্লন, আমি
তাের মা রম্ভাবতী, তাের কপালে যে আরও কত কষ্ট
আছে মা, তুই বনে ছাগল ছাড়িয়া দিয়া এখানে ঘুমাইয়া
পড়িয়াছি, তাের সাশী ছাগল যে বাঘে খাইয়া ফেলিয়াছে ।
আজ বাড়ী গেলে লহনা তােকে ছাগলের জন্য খুন করিয়া
ফেলিবে।–এই বলিয়া দেবী অন্তর্হিত হইলেন। স্বপ্ন দেখিয়া
খুল্লনা তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া মাকে দেখিবার জন্য চারিদিকে
চাহিল, কিন্তু কোথায় মা, কেহই যে নাই ? চারিদিকে শুধু
মাকে না দেখিয়া তাহার বুক ফাটিয়া কান্না আসিতে
লাগিল। কিন্তু হায়, একটু কাল কাঁদিয়া বুকটা পাতা
[ ২৪ ]
বন।
و روز
No text on this page.
শ্ৰীমন্ত
করিবার অবসরও যে ভগবান তাহাকে দেন নাই। সর্বশী
ছাগল বাঘে খাওয়ার কথা তাহার মনে পড়িল, সে তাড়াতাড়ি
উঠিয়া ছাগল খুজিতে লাগিল, সব ছাগলই খুঁজিয়া পাইল,
কিন্তু সর্বশীকে আর পাইল না। তাহার ঘুম শুকাইয়া গেল,
আজ বাড়ী গেলে লহনার হাতে আর রক্ষা নাই। সর্বশীকে
ডাকিতে ডাকিতে সে সারা বন ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল, কিন্তু
কোথাও তাহার দেখা পাইল না। দূরে উলুর শব্দ শুনিয়া সে
মনে ভাবিল, কাহারা বুঝি সর্ববশীকে বলি দিতেছে। সেই
শব্দ লক্ষ্য করিয়া সে যাইয়া সরােবর তীরে উপস্থিত হইল।
সেখানে পাঁচ জন দেবকন্যা ভগবতীর পূজা করিতেছিলেন,
কিন্তু খুল্লনা তাহাদিগকে দেবকন্যা বলিয়া চিনিতে পারিল
। সে তাহাদিগকে তাহার ছাগলের কথা জিজ্ঞাসা করিল।
তাহারা বলিলেন, “আমরা তােমার ছাগল দেখি নাই !••••••
তুমি কি দুঃখে এমন বনে বনে ঘুরিয়া বেড়াও? আমাদের
কাছে যদি সত্য কথা বল তবে তােমার সকল দুঃখ ঘুচাইব,
কিন্তু মিথ্যা কথা বলিলে আরও বেশী দুঃখে পড়িবে।”
খুল্লনা দেব-কন্যাদের কাছে তাহার সমস্ত দুঃখের কথা
বলিল। তাঁহারা বলিলেন “আমরা এই পাঁচ বােন দেবরাজ
ইন্দ্রের কন্যা, ভগবতীর পূজা করিবার জন্য এখানে আসিয়াছি।
তুমি যদি প্রতি মঙ্গলবারে তাহার পূজা কর, তবে তােমার
সকল দুঃখ ঘুচিবে, লহনা আর তােমাকে কোনও কষ্ট
[ ২ ]
৯শ্ৰীমন্ত
দিবেনা, স্বামী প্রাণের চেয়ে বেশী ভালবাসিবে, তুমি ছেলের
মা হইয়া সুখে ঘরকন্না করিতে পারিবে।”
খুল্লনা বলিল, “আমি জানিনা, কি রূপে পূজা করিতে
হয়, যদি আপনারা দয়া করিয়া বলিয়া দেন তবে আমি
ভগবতীর পূজা করিব।”
তখন দেব-কন্যারা তাহাকে একখান ভাল কাপড়
দিলেন। খুল্লনা সরােবরে স্নান করিয়া সেই কাপড় পড়িয়া
তাঁহাদের সহিত মিলিয়া পরম ভক্তিসহকারে মা মঙ্গলচণ্ডীর
পূজা করিলেন।
এমন সময় ভগবতী ব্রাহ্মণীর রূপ ধারণ করিয়া সেখানে
আসিয়া তাহাকে ছলনা করিবার জন্য বলিতে লাগিলেন, “তুমি
কেন ভগবতীর পূজা কর ? আমি বার বৎসর পূজা করিয়াও
কোনই ফল পাই নাই, আর ভগবতী কি তোমাকে দয়া করিয়া
বর দিবেন ?”
খুল্লনা বলিল, “ব্রাহ্মণি, তুমি ভগবতীর নিন্দা করিও না।
আমি তাহার পূজা করিবই।”
খুল্লনার ভক্তি ও বিশ্বাস দেখিয়া ভগবতী পরম সন্তুষ্ট
হইয়া ব্রাহ্মণীর বেশ পরিত্যাগপূর্বক সহসা ভগবতীর রূপ
ধারণ করিয়া বলিলেন, “বাছ খুল্লনা, আমিই সেই মঙ্গলচণ্ডী
ভগবতী, আমি তাের পূজা ও ভক্তিতে বড়ই সন্তুষ্ট হইয়াছি।
তুই প্রতি মঙ্গলবারে অামার পূজা করি, তাহা হইলেই
[ ২ ]
শ্ৰীমন্ত
তামি তাের সকল দুঃখ দূর করিব। আমি তােক বর
দিতেছি, সংসারে তাের আর কোনও দুঃখ থাকিবে না, স্বামী
তােকে লহনার চেয়েও বেশী ভাল বাসবে, তুই সােনার চাদ
ছেলের মা হইবি।”••••••এই বলিয়া তিনি অন্তর্হিত হইলেন।
খুল্লনার ছাগলের পাল আসিয়া সেখানে হাজির হইল (न
দেখিল, তাহার হারানাে সর্বশী ছাগলও সাথে সাথে
আসিয়াছে। সেই রাত্রিতে খুল্লনা আর বাড়ী ফিরিল না,
দেব-কন্যাদের সাথে বনেই ভগবতীর পূজায় আনন্দে কাটাইয়া
দিল।
ভগ বর্তী সেখান হইতে গিয়া লহনাকে স্বপ্ন দেখাইলেন,
“ছিছি, লহনা, এমন নিষ্ঠুর তুই। স্বামী খুল্লনাকে তাের
হাতে সঁপিয়া দিয়া গিয়াছে, আর তুই তাহাকে ছাগল চড়াইতে
বনে পাঠাইয়া দিয়াছিস্, পেট ভরিয়া খাইতে পৰ্যন্ত দিন !
সদাগর বাড়ী ফিরিয়া আসুক, তাের দুর্গতির সীমা থাকিবেনা।
সতিন বলিয়া কি তাহাকে অমন কষ্টই দিতে হয় ?
নিশ্চিত মনে সুখে ঘরে শুইয়া ঘুমাইতেছি, আর খুল্লনা বাঘ
ভালুকে ভরা বনে রাত্রি কাটাইতেছে, এই পাপ হইতে তুই
রক্ষা পাইবিনা! যে জন্য খুল্লনাকে এত কষ্ট দিতেছিস
তাের সে আশায় ছাই পড়িবে।”
প্রভাতে স্বপ্ন দেখিয়াই লহনা জাগিয়া উঠিল, তাহার
সমস্ত গা ছম ছম্ করিতে লাগিল, ভয়ে গা শুকাইয়া গেল।
[ ২৭ ।
শ্ৰীমন্ত
সে দুর্বলকে বলিল, “দুর্বল আমি আজ বড়ই খারাপ স্বপ্ন
দেখিয়াছি। তাের কথায় আমি কি পাপ কাজে মতি দিয়া-
ছিলাম! খুল্লনাকে আমি কতইনা কষ্ট দিয়াছি, আমার
এ কলঙ্কের কথা যে শুনিবে সে-ই যে ছিছি করিবে। কাল
ভোরে খুলনা ছাগল লইয়া গিয়াছে, আজ এখনাে তাহার দেখা
নাই, এক বছর হইতে চলিল, কোনও দিন ত এমন হয় না।
তাহাকে কি সাপে বাঘে খাইল, না সে চোর ডাকাতের হাতে
পড়িল? সাধু গৌড়ে যাইবার সময় তাহাকে আমার হাতে
তুলিয়া দিয়া গিয়াছিনে, আর আমি এমন করিয়া তাহার
সর্বনাশ করিলাম। তুই-ইত আমায় এই দুর্বুদ্ধি দিয়াছিলি
দুর্বল। ? আমি কি বলিয়া সাধুর কাছে মুখ দেখাইব? কাকা
কাকীমা যখন আমাকে খুল্লনার কথা জিজ্ঞাসা করিবে তখন
আমি তাহাদিগকে কি বলিব ?” খুল্লনার জন্য মন বড়ই
উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল, এক তিলও আর সে বাড়ীতে টিকিতে
পারিল না।
খুলনা রোজ যে পথে ছাগল লইয়া যায়, সেও
সেই পথ ধরিয়া যাইতে লাগিল।
পথেই খুল্লনার সহিত তাহার দেখা হইল। খুল্লনাকে
দেখিবামাত্রই সে তাহাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া লইয়া বলিল,
“আমায় ক্ষমা কর, বােন, আমি লােকের কথায় তােকে এই
কষ্ট দিয়াছি। এক সংসারে থাকিলে ঝগড়া বিবাদ এক
আধটু হইয়া থাকে এজন্য মনে কিছু করি। আমি তোর
[ ২ ]
শ্ৰীমন্ত
বড় বােন, আমায় ক্ষমা কর। কাল রাত্রিতে তুই বাড়ী
ফিরিস্ নাই, এজন্য সারারাত আর চোখের পাতা ফেলিতে
পারি নাই, কেবল কাঁদিয়াই কাটাইয়াছি। চল খুল্লনা শীগগীর
বাড়ী চল। আর তােকে ছাগল চড়াইতে দিব না।” এই
বলিয়া লহনা খুল্লনাকে বাড়ী লইয়া আসিল। বাড়ী আসিয়া
নিজ হাতে তাহাকে গন্ধ তেলে স্নান করাইয়া ভাল কাপড় ও
গহনা পাইল। খুল্লনা লহনার এত আদর দেখিয়া ভক্তিভরে
মনে মনে মা মঙ্গলচণ্ডীকে প্রণাম করিল। যে খুল্লনাকে
লহনা এই একটা বছর ক্ষুদের ভাউ ও শাক চচ্চড়ী ছাড়া
আর কিছুই খাইতে দেয় নাই, আজ তাহার জন্য সে কত
রকম রাঁধাই রাঁধিল, তাহাদের নাম শুনিলে তােমাদের জিভ
জলে ভরিয়া আসিবে, বই পড়াই আর হইবেনা, কাজেই সে
সব নাম আর করিলামনা। তাহারা দুই জনেই এক থালায়
বসিয়া খাইয়া এক বিছানায় শুইয়া কত কথাই বলিতে
লাগিল।
ধনপতি পিঞ্জর লইয়া দেশে ফিরিলেন। সােনার পিঞ্জর
দেখিয়া সারা নগরময় একটা মহা আনন্দের সাড়া পড়িয়া
পড়িয়া গেল। দুর্বল লােকের নিকট সাধুর দেশে ফিরিবার
৯শ্ৰীমন্ত
কথা শুনিয়া তাড়াতাড়ি খুল্লনার নিকট গিয়া বলিল, “ছােট মা,
সাধু দেশে ফিরিয়াছেন।
এখনই তিনি রাজসভা হইতে বাড়ী
আসিবেন। লহনা তােমাকে যা কষ্ট দিয়াছে সাধুর কাছে
তাহার দশগুণ বাড়াইয়া বলিয়া তাহাকে সাধুর দুই চোখের
বিষ করিয়া দিও। সতিনের যত সর্বনাশ করিতে পারিবে,
ততই তুমি সুখে থাকিবে। আমি তােমারই দাসী, আম:কে
যাহা করিতে বলিবে তোমার জন্য আমি তাহাই করিব।
তােমাকে যে লহনা কষ্ট দিয়াছে তাহাতে আমার এইটুকু
দোষও নাই, আমি তাহাকে কত মানা করিলাম, কত হাতে
পায়ে ধরিয়া দিলাম, কিন্তু সে আমার কোনও কথাই
শুনিল না; বলিব কি ছােট মা, তােমার দুঃখ দেখিয়া আমার
বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। আহ, অমন সােনার সুখের
শরীরে কি অত কষ্ট সয় ? সতিন হ'লে কি আর অমন
করেই সাজা দিতে হয় মা ? লহনার শরীরে যেন বিধাতা-
পুরুষ এক তিল দয়া মায়াও দেন নাই। আমাদের ছােট
লােকের ঘরেও কিন্তু এমন হয় না। এসাে, তোমাকে আমি
ভাল করিয়া সাজাইয়া দেই, সে সাজ দেখিয়া যেন সাধু মােহিত
হইয়া যান, লহনাকে যেন আর দু’চক্ষে দেখিতে না পারেন।”
এই বলিয়া দুর্বল খুল্লনাকে সাজাইতে বসিল।
খুল্লনার বেশভূষা করিয়া দিয়া দুর্বল লহনার কাছে
গিয়া বলিতে লাগিল, “শুনিয়াছ বড় মা, সাধু যে দেশে ফিরি-
[ ৩ ]
শ্ৰীমন্ত
য়াছেন। খুল্লনা সে খবর পাইয়া আহলাদে আটখানা হইয়া
কত রকম সাজপােষাক পয়াি যে বসিয়াছে তাহার অন্ত নাই,
আমিত তাহার কাণ্ড দেখিয়া হাসিয়া অবাক। লজ্জা সরম
কি তার একেবারেই নাই ? ছি ছি বড় মা, আমি ঘেন্নায় মরে
যাই! তুমি সতিন হলেও তার ত বড় বােন, তােমার কাছে
তার একটু চক্ষুলজ্জা থাকা দরকার।
সদাগর বাড়ী আসিলেন। খুল্লনা যাইয়া তাহাকে প্রণাম
করিয়া আসিল, কিন্তু কথাবার্তা কিছুই বলিল না। লহনা
যাইয়া বলি, “তুমি খুল্লনাকে আমার হাতে দিয়া গিয়াছিলে,
এই এক বৎসর আমি নিজে না খাইয়া ভাল জিনিষটুকু
তাহাকে খাওয়াই ছি, নিজের ভাল ভাল কাপড় গহনা যাহা
তুমি আমাকে দিয়াছিলে তাহা সবই আমি তাহাকে পরা-
ইয়াছি। কোনও কষ্টে আমি তাহাকে রাখি নাই, শত
হইলেও ছােট বােন ত। কিন্তু পােড়া কপাল আমার,
আমার কাজের কি আর সুনাম আছে ? এত করিয়াও আমি
তাহার মন পাই নাই, সে পাড়ায় পাড়ায় আমার নিন্দা করিয়া
বেড়াইয়াছে। আমার কথায় বিশ্বাস না হয়, দুর্বলাকে
জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ। সংসারের যত কাজ সবই আমি
করিতাম, খুল্লনা জানেনা যে কেমন করিয়া উনানে একটা
ফু দিতে হয়, কেবল সে দিন রাত পাশা খেলিয়া বেড়ায়।
নাওয়া খাওয়ার সময় পর্যন্ত তাহার জ্ঞান থাকিত না, আমি
[ ৩১ )
শ্ৰীমন্ত
নিজে তাহার গা মাথা ঘষিয়া স্নান করাইয়া দিতাম, কিন্তু তবু
সে আমার দুর্নাম রটাইয়া বেড়াইত !” সদাগর লহনার কথায়
পরম সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে একটা হীরার হার পুরস্কার
দিলেন ।
?
সাধু লহনাকে বলিলেন, “হনা, আমি খুল্লনাকে বিবাহ
করিয়া আনিয়াই গৌড়ে চলিয়া গিয়াছিলাম, তাহার হাতের
রান্নাও আমি এক দিনও খাই নাই, আজ খুল্লনা রাঁধুক।”
লহনা দুই চোখ কপালে তুলিয়া বলিল, “ওমা, তুমি
বল কি ? তাহার হাতের রান্না কি তুমি মুখে দিতে পারিবে ?
সে যে ভাত পর্যন্ত কোনাে দিনও রাধিয়া দেখে নাই। আমি
যে অমন রাঁধি, পাড়ার সবাই শতমুখে আমার রান্নার সুখ্যাতি
করে, কোনাে কোনাে দিন আমার সে রান্না অবধি মূখে
রােচেনা তােমার, তা খুনার রাধা কি আর ভাল লাগিবে ?
এক বৎসর পরে বিদেশ হইতে আসিয়াছ, আজ আমিই
রধি।”
সাধু হাসিয়া বলিলেন, “না, আজ খুল্লনাই রাঁধুক।”
খুল্লনা স্নান করিয়া মনে মনে ভগবতীকে ডাকিয়া
পাকশালে গেল। ভগবতী তাসিয়া তাহার মাথায় হাত দিয়া
বর দিলেন, সে যাহা রাঁধিবে তাহা লােকে অমৃত বলিয়া
খাইবে,—এমন রান্না কেহ কোন দিন খায় নাই। ভগবতীর
বর পাইয়া খুল্লনা পরম আনন্দে বাঁধিতে লাগিল। শাক
শ্ৰীমন্ত। শুক্ত হইতে আরম্ভ করিয়া পিঠা পায়েশ পর্যন্ত পরিপাটি করিয়া রাধিয়া সাধুকে খাওয়াইল। সাধু তাহা খাইয়া এমন খুসী হইলেন যে, তাহার মনে হইল, তিনি জীবনে এমন রান্না কোনাে দিন খান নাই। তিনি শত মুখে রান্নার প্রশংসা করিতে লাগিলেন। সাধুর খাওয়া হইলে খুল্লনা লহনাকে খাওয়ার জন্য ডাকিল, কিন্তু সে রাগ করিয়া খুল্লনার রাঁধা কোনও জিনিষই খাইলনা। খুল্লনা তাহার হাতে পায়ে ধরিয়া কত সাধিল কিন্তু তাহার রাগ কিছুতেই পড়িল না। ঘরে, সরা দুই তিন বাসী পান্তা ভাত ছিল, লবণ মরিচ দিয়া তাহা খাইয়াই সে সেই দিন কাটাইল। সদাগব রাত্রিতে যাইয়া যেমন খাটে শুইলেন, অমনি ভগবতী খুল্লনার ভক্তি পরীক্ষা করার জন্য সাধুর জ্ঞান হরণ করিয়া লইলেন। খুল্লনা শয়ন ঘরে গিয়া স্বামীর পাশে বসিয়া তাহাকে হাত দিয়া নাড়া দিয়া দেখিল, তিনি মড়ার মত শক্ত হইয়া পড়িয়া রহিয়াছেন, খুল্লনা তাহার নাকের কাছে হাত লইয়া দেখিল, নিশ্বাসও বন্ধ। তখন সে স্বামীর পায়ের কাছে লুটাইয়া পড়িয়া কাদিতে দিতে ভগবতীকে ডাকিতে লাগিল। সে মনে স্থির করিল, বিষ খাইয়া সেও স্বামীর সাথে মরিবে। ভগবতী খুল্লনার ভক্তি দেখিয়া সাধুর জ্ঞান ফিরাইয়া দিলেন। সাধু চোখ মেলিয়া চাহিতেই খুল্লনা লজ্জায় মাথার কাপড় [ ৩৩ ]
গ্রীমগুe
টানিয়া দিয়া ঘরের কোণে যাইয়া জড়সড় হইয়া লুকাইয়া
রহিল। ধনপতি অনেক সাধ্য সাধনা করিয়া তাহাকে কাছে
আনিলেন। খুল্লনা তখন অভিমান করিয়া বলিতে লাগিল,
“তােমার এ ভালবাসা কেবল মুখে মুখে। তাহা না হইলে
গৌড়ে যাইয়া লহনা দিদির কাছে অমন করিয়া চিঠি লিখিয়া-
ছিলে কেন ? তােমার চিঠি পাইয়া দিদি আমার সমস্ত
গহনা কাড়িয়া নিয়া একখানা ছেড়া কাপড় পরিতে দিয়া
ছাগল চড়াইবার জন্য পাঠাইয়া দিয়াছিল। পেট ভরিয়া
খাইতে দেয় নাই, চেকৗশালে একখানা ছেড় মাদুর পাতিয়া
শুইয়া রাত কাটাইয়াছি। ভােরে উঠিয়া ছাগল লইয়া বাহির
হইয়াছি, সারাদিন পরে বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া ক্ষুদের জাউ
অব শাক আধপেটা খাইয়া শুইয়া রহিয়াছি। একটা বছর
আমার এমনি দুঃখে কষ্টে গিয়াছে।
যদি তোমার মনে
আমাকে সাজা দিবার ইচ্ছা ছিল, তুমি নিজ হাতে দিলেই
আমি তাহা হাসি মুখে মাথা পাতিয়া লইতাম। তাহা না
করিয়া তুমি সতিনের হাতে আমায় অমন যাতনা দিলে,
তােমার স্ত্রী হইয়া আমি বনে বনে ছাগল চড়াইয়া বেড়াইয়াছি,
ইহাতে কি তােমার গৌরব বড় বাড়িয়াছে ? তার চাইতে
আমার মরণও যে ভাল ছিল। বারটা মাস আমি যে কি
কষ্টে কাটাইয়াছি তাহা শশান,-জ্যৈষ্ঠ মাসে তুমি খাচা
তৈরী করিতে গৌড়ে গেলে, আমিও সেই মাসে ছাগল
[ ৩৪ ]
শ্ৰীমন্ত
চড়াইতে বনে গেলাম। আষাঢ় মাসে সমস্ত আকাশ নূতন
মেঘে ঢাকিল, অনবরত বৃষ্টি হইতে লাগিল, ছাগল চড়াইতে
যাইয়া কত যে জেঁকে আমাকে খাইল তাহার শেষ নাই,
কিন্তু আমার কপাল মন্দ তাই সাপে খাইল না, খাইলে আর
এ যন্ত্রণা ভােগ করিবে কে ? শ্রাবণ মাসে দিনরাত বৃষ্টির
অবসর নাই, আমি সেই বাদল মাথায় করিয়া কচু পাতায়
মাথা ঢাকিয়া বনে বনে ছাগল চড়াইয়া বেড়াইতাম। ভাদ্র,
মাসে মাঠ ঘাট সব জলে জলময় হইয়া গেল, আমি কোলে
করিয়া ছাগল পার করিয়া মাঠে লইয়া যাইতাম। আশ্বিন
মাসে লােকে মনের আনন্দে কত নূতন কাপড় নূতন গহনা
পরে, কিন্তু আমি না খাইয়া ছেড়া কাপড় পরিয়া বনে বনে
ছাগল চড়াই। শীতের কয়টা মাস আমি যে কি কষ্টে
কাটাইয়াছি, তাহা তুমি হয়ত শুনিলে বিশ্বাস করিবে না
ঢেকীশালে খড় পাতিয়া একখানা ছেড়া কাপড় গায়ে দিয়া
শীতে ঠক্ ঠক্ করিয়া কাপিতে কাঁপিতে আমাকে কাটাইতে
হত, শীত সহ্য করিতে না পারিয়া আগুণ জ্বালিতাম, সতিনের
চোখে আমার অত সুখ সহ্য হইত না, সেই জন্য সে তাহাতে
জল ঢালিয়া দিত।”—সদাগর তাহাকে বাধা দিয়া বলিলেন,
“থাক্, খুল্লনা, আর বলিতে হইবে না। কিন্তু কই, আমিত
লহনাকে তেমন কোনও চিঠি লিখি নাই, তুমি বুঝি ঠাট্টা
করিয়া এসব মনগড়া কথা বলিতেছ।”
;
[ ৩৫ ]
শ্ৰীমন্ত- “এই দেখ, তােমার হাতের লেখা চিঠিই আমি যত্ন করিয়া রাখিয়া দিয়াছি,” এই বলিয়া খুল্লনা চিঠিখানা সদাগরের হাতে দিল। সাধু চিঠি পড়িয়া লহনার উপর রাগে জ্বলিয়া উঠিলেন, তাঁহার বুঝিতে বাকি রহিল না যে, লহনা কেবল খুল্লনাকে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য এই জাল ছিঠি তৈরী করিয়া এত ষড়যন্ত্র করিয়াছে। তিনি খুল্লনাকে অনেক প্রবােধ দিয়া শান্ত করিয়া বলিলেন, “তুমি এজন্য দুঃখ করিও না, খুন্না, আমি লহনাকে ইহার উপযুক্ত শাস্তি দিব। ৮ কিছুদিন পরে সদাগর তাঁহার পিতার বার্ষিক শ্রাদ্ধ উপ- লক্ষে দেশ বিদেশের স্বজাতিদিগকে নিমন্ত্রণ করিলেন। তাঁহারা আসিয়া ছুতা ধরিয়া বসিল, ধনপতির বাড়া কেহ খাইবে না, কারণ তাহার স্ত্রী খুল্লনা বনে বনে ঘুরিয়া ছাগল চড়াইয়াছে। সীতাদেবী যেমন অগ্নি পরীক্ষা দিয়াছিলেন, যদি খুল্লনা তেমন পরীক্ষা দিতে পারে তবে তাহারা খুল্লনার চরিত্রে নিঃসন্দেহ হইয়া ধনপতির বাড়ীতে খাইবে। অথবা যদি ধনপতি এক লক্ষ টাকা দিতে পারেন তবে আর খুল্লনাকে পরীক্ষা দিতে হইবে না। তাহাদের কথা শুনিয়া ধনপতির মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল, সীতা ছিলেন দেবী, তিনি যে শ্ৰীমন্ত পরীক্ষা দিয়াছেন মানুষের সাধ্য কি সে পরীক্ষা দিতে পারে ? তিনি ঘরে যাইয়া লহনাকে তাহার অন্যায় কর্মের জন্য তিরস্কার করিতে লাগিলেন। খুল্লনা সে কথা শুনিয়া ধন- পতিকে বলিল, “তােমার কোনও চিন্তা নাই, আমি পরীক্ষাই দিব, যদি আমি সতী হই তবে অগ্নি পরীক্ষায় আমার একগাছি চুল ও পুড়িবেনা।” ধনপতি বলিলেন, “আমার ত বড়ই ভাবনা হইয়াছে। মানুষের কি সাধ্য আছে যে, সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারে? তুমি হয়ত পুড়িয়া মরিয়া যাইবে, আর আমার বংশের দুর্নামও যাইবে না। কাজেই তাহা না করিয়া এক কাজ করা যাউক, এক লক্ষ টাকাই দেই।” খুল্লনা বলিল, “আজ যদি টাকা দাও তবে তাহারা প্রত্যেক বৎসর এমন করিয়া টাকা আদায় করিবার জন্য ছুঁতা ধরিয়া বসিবে, অথচ আমার দুর্ণামও ঘুচিবে না। আমি মনে মনে জানি, আমার মধ্যে কোনও পাপ নাই, আমি পরীক্ষাই দিব, ধৰ্ম্ম আমাকে রক্ষা করিবেন। যদি তুমি আমাকে পরীক্ষা দিতে না দাও, তবে আমার এ কলঙ্কের বোঝা বহিয়া বেড়ান অপেক্ষা বিষ খাইয়া মরাও ভাল।” ধনপতি বাধ্য হইয়া খুল্লনাকে পরীক্ষা দিতে সম্মত হলেন। খুল্লনার পরীক্ষার আয়ােজন হইল। সদাগরেরা পরামর্শ করিয়া স্থির করিল, খুল্লনাকে গালার তৈরী ঘরে রাখিয়া [ ৩৭ ]
শ্ৰীমন্ত
সেই ঘরে আগুন লাগাইয়া দিতে হইবে, যদি সে সতী হয়
তবে তাহার কিছুই হইবে না, আর যদি সতী না হয় তবে
পুড়িয়া মরিবে। তখনই প্রকাণ্ড এক জতুগৃহ নিৰ্ম্মিত হইল।
খুল্লনা একমনে দেবী ভগবতীকে চিন্তা করিয়া সেই ঘরে
প্রবেশ করিল। সদাগরেরা সেই ঘরে আগুন ধরাইয়া দিল,
গালায় আগুন ধরাইয়া দেওয়া মাত্রই ধূ ধূ করিয়া জ্বলিয়া
উঠিল। খুল্লনা সেই আগুনের কুণ্ডের ভিতর বসিয়া একমনে
ভগবতীর ধ্যান করিতে লাগিল। এই ভীষণ পরীক্ষার কথা
দেবতারা শুনিয়া স্বর্গ ছাড়িয়া আসিয়া আকাশে মেঘের
আড়ালে থাকিয়া তাহা দেখিতে লাগিলেন। ধনপতি হাহাকার
করিয়া কাঁদিতে লাগিলেন, লহনাও লােক-দেখানাে কান্না
জুড়িয়া দিল।
আগুন যখন ধীরে ধীরে নিভিয়া গেল তখন খুল্লনা
আস্তে আস্তে সেই আগুনের কুণ্ড হইতে বাহির হইয়া আসিয়া
সদাগরদিগের সম্মুখে দাঁড়াইল। সকলে অবাক হইয়া
দেখিল, তাহার গায়ে আগুনের আঁচ লাগা দূরে থাক, পরণের
কাপড় খানিতে পৰ্য্যন্ত একটু ধোঁয়ার দাগ লাগে নাই।
সকলে বুঝিল, এ নিশ্চয় দেবী,
এ নিশ্চয় দেবী, মানুষের ক্ষমতায় কখনাে
এ পরীক্ষা দেওয়ার সাধ্য নাই। তখন সকলে তাহার পায়ে
পড়িয়া ক্ষমা চাহিতে লাগিল। খুল্লন লজ্জায় সেখান হইতে
পলাইয়া আসিয়া ঘরে ঢুকিল।
[ ৩৮ }
৯.মন্ত
সদাগরেরা আর খাইতে আপত্তি করিল না। খুল্লনা
স্বহস্তে রান্না করিয়া সকলকে খাওয়াইল। সদাগরেরা দেবীর
হাতের রান্না খাইল মনে করিয়া পরম আহলাদে বাড়ী ফিরিল।
কিন্তু ভগবান
বুঝি কেবল সুখ মানুষের কপালে লিখেন নাই। রাজা
বিক্রমকেশরীর ভাণ্ডারে শঙ্খ ও চন্দনের অভাব পড়িয়া গেল।
তিনি ধনপতিকে সিংহলে যাইয়া তাহা আনিতে আদেশ
করিলেন। সিংহলে যাওয়ার কথা শুনিয়া সাধুর মাথায়
যেন বাজ পড়িল ; এইত সেদিন গৌড়ে প্রায় এক বৎসর
কাটাইয়া আসিলেন, এবার আবার সিংহলে যাইতে হইবে,
তাহাও আবার সমুদ্রপথে। সাধু জোড় হাত করিয়া রাজাকে
বলিলেন, “মহারাজ, এইত আমি সেদিন গৌড় হইতে
আসিলাম, আপনার রাজ্যেত আরও কত সদাগর আছে,
তাহাদের একজনকে এজন্য আদেশ করুন।” কিন্তু রাজা
তাঁহার সে কথা শুনিলেন না। কাজেই ধনপতিকেই বাধ্য
হইয়া সিংহলে যাইতে স্বীকার করিতে হইল। রাজা তাহাকে
যাওয়ার জন্য খরচ বাবদ একলক্ষ টাকা দিতে আদেশ
করিলেন।
[ ৯ ]
৯শ্রীমস্ত লহনা যখন শুনিল, এবার সদাগরকে বহু দিনের জন্য সিংহল যাইতে হইবে, তখন তাহার আহলাদের সীমা রহিল । সে দেখিয়া লইবে, খুল্লনার অত আদর সােহাগ এবার কোথায় থাকে। সদাগরের সিংহলে যাওয়ার কথা শুনিয়া খুল্লনার মুখ- খানি একেবারে এতটুকু হইয়া গেল। সে ধনপতিকে বলিল, “তােমার অত দূর দেশে যাইয়া কাজ নাই, আমাদের ভাণ্ডারে যে শঙ্খ চন্দন আছে তাহাই রাজাকে দিয়া আইস। একবার তুমি গৌড়ে গিয়াছিলে, তখন লহনা দিদি আমাকে কত কষ্ট দিয়াছিল, এবং সেজন্য আমাকে কতইনা লাঞ্ছনা সহ্য করিতে হইল স্বজাতিদের কাছে। এবার যদি তুমি সিংহল যাও তবে না জানি আমার কপালে আরও কত দুঃখ আছে। আর দুই এক দিনের পথ নয়, সমুদ্র দিয়া কত মাসের পর মাস যাইতে হইবে। বাবার কাছে শুনিয়াছি, সে দেশ বড় খারাপ, সমুদ্রের পথে পায় পায় কত বিপদ,জলে হাঙ্গর কুমীর তিমি মকর, ডাঙ্গায় বাঘ ভালুক, তারপর আবার চোর ডাকাতের ভয়ও আছে, মানুষ সে দেশে গেলে প্রায়ই ফিরিয়া আসে না। তোমার পায়ে পড়ি তুমি অমন দেশে যাইওনা।” লহনা সব কথা শুনিল, শুনিয়া সে সদাগরকে বলিল, “কপাল আমাদের বড়ই মন্দ, তাহা না হইলে তােমাকে চির- কাল বিদেশেই কাটাইতে হইবে কেন? যখন রাজার আদেশ [ ৪০ ]
মন্ত
তখন না যাইয়া কি আর রক্ষা আছে ? এজন্য ভাবিয়া আর
ফল নাই। শীঘ্র যাহাতে ফিরিতে পার তাহার চেষ্টা করিও।
কেবল বাড়া বসিয়া থাকিলেত আর সংসার চলিবেন, বসিয়া
খাইলে রাজভাণ্ডারও শেষ হইয়া যায়। আজ আমাদের যে
টাকা পয়সা ধন দৌলত তাহা শশুর ঠাকুর বাণিজ্য করিয়াই
রাখিয়া গিয়াছেন। বাণিজ্য ছাড়া আমাদের অন্য উপায় নাই।”
সদাগর গণৎকার আনাইয়া সিংহল যাত্রার জন্য ভাল
দিন দেখাইলেন। সপ্তডিঙ্গা মধুকর সজ্জিত হইল। এদেশ
হইতে যে যে জিনিষ সিংহলে লইয়া গেলে প্রচুর লাভ হইবে,
সাহ নায়ে তাহা বােঝাই করা হইল। খুল্লনা তখন ছয়মাস
গর্ভবতী। সাধু তাহাকে বলিলেন, “আমি বােধ হয় বার
বছরের আগে সিংহল হইতে ফিরিয়া আসিতে পারিবনা। যদি
তোমার মেয়ে হয় তবে তাহার নাম শশিকলা রাখিও ও ভাল
বরে বিবাহ দিও। আর যদি ছেলে হয়, তবে তাহার নাম শ্ৰীমন্ত
রাখিয়া লেখা পড়া শিখাইও। যদি বার বৎসরের ভিতর
আমি ফিরিয়া না আসি তবে তাহাকে তালাসে সাত ডিঙ্গ।
সাজাইয়া সিংহল পাটনে পাঠাইও।” এই বলিয়া সদাগর
খুল্লনাকে এই সব কথা একখানা কাগজে লিখিয়া দিয়া
গেলেন।
খুল্লনা যখন দেখিল, সদাগর তাহার কথা না শুনিয়া
সত্য সত্যই সিংহল চলিয়াছেন, তখন সে উপায় না দেখিয়া
[ ৪১ ]
৯শ্ৰীমন্ত
;
স্বামীর মঙ্গলের জন্য মা মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করিতে বসিল।
সে ঘট বসাইয়া ফুল বেলপাতা দূর্বা ধূপ দীপ নৈবেদ্য দিয়া
এক মনে পূজা করিতে লাগিল। লহনা তাহা দেখিয়া যাইয়া
সদাগরকে বলিল, “দেখিয়া যাও, তােমার খুল্লনার কাণ্ড; সে
কি এক ডাকিনী দেবতার পূজা আরম্ভ করিয়াছে। প্রতি
মঙ্গলবারে সে উপবাসী থাকিয়া ধূপ দীপ জ্বলিয়া নৈবেদ্য
সাজাইয়া এমনি করিয়া পূজা করে। জিজ্ঞাসা করিলে বলে,
‘মা ভগবতীর পূজা করি, এ পূজায় সমস্ত অমঙ্গল দূরে যায়।
জ্ঞাতীরা ইহা দেখিয়া কত নিন্দা করে, কিন্তু সে কাহারাে
কথায় বড় একটা কাণ দেয়না। আমার ভয় হয়, তার জন্য
তােমার উঁচু মাথা সমাজের কাছে হেঁট হইয়া যাইবে। তাহা
ছাড় সংসারে যে একটা অমঙ্গল হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই।
যে বংশে এক শিব পূজা ছাড়া অন্য কোনও পূজা কোনও
কালে হয় নাই, সে বংশের বউ ডাকিনী দেবতার পূজা
আরম্ভ করিয়াছে। আমার কথায় যদি তােমার বিশ্বাস না
হয় তবে দেখিয়া যাও।”
ধনপতি লহনার সাথে খুল্লনার পূজার ঘরে চলিলেন।
যাইতে যাইতে লহনা ভাবিল, “আজ স্বামীকে দিয়া খুল্লনার
সাজার একশেষ করিয়া ছাড়িব।”
সাধু পূজার ঘরে গিয়া দেখিলেন, খুল্লন সত্য সত্যই
পূজা করিতেছে, তাহা দেখিয়া রাগে সদাগর জ্বলিয়া উঠিলেন।
শ্ৰীমন্ত
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া দাড়াইয়া থাকিয়া বলিলেন, “এ তােমার
কি হইতেছে খুল্লনা? আমার সংসারে একটা অমঙ্গল আনি-
বার জন্য তুমি এই ডাকিনী পূজা আরম্ভ করিয়াছ? তােমার
এ পূজার কথা শুনিয়া জ্ঞাতিরা আবার আমাকে এক ঘরে
করিবার জন্য চুল ধরিয়া বসিবে। আর বিশেষতঃ আমি
দেবাদিদেব মহাদেবের ভক্ত, তুমি আমার স্ত্রী হইয়া তাহার
বিপরীত কাজ করিতেছ। আমার চোখের উপর আমার
বাড়ীতে তােমাকে আমি কিছুতেই এ মেয়ে দেবতার পূজা
করিতে দিবনা।” এই বলিয়া তিনি রাগে দেবীর পূজার ঘট
পায়ের লাথি মারিয়া ফেলিয়া দিলেন, ফুল নৈবেদ্য চারিদিকে
ছড়াইয়া পড়িল।
খুল্লনা স্বামীর এই দুৰ্ম্মতি দেখিয়া ভয়ে আকুল হইয়া
বলিতে লাগিল, “অমন কথা মুখে আনিওন গাে, অমন কথা
মুখে আনিওনা।
আমি তােমার অমঙ্গলের জন্য এ পূজা
করিনা। আমাদের মঙ্গলের জন্যই মা মঙ্গলচণ্ডীর পূজা
করিতেছি, এ পূজা করিলে মানুষের রােগ, শােক, দুঃখ, দুর্দশা
সব দূরে যায়। রাজা রামচন্দ্র এই পূজা করিয়া লঙ্কা জয়
করিয়াছিলেন। তুমি ভয় করিওনা, এ পূজায় মঙ্গল ছাড়া
কখনাে অমঙ্গল হয়না, তুমি মা ভগবতীকে এখানে ভক্তিভরে
প্রণাম কর, হায়, হায়, তুমি মায়ের পূজার ঘট পায়ে ঠেলিয়া
ফেলিলে।”
[ ৪৩ ]
শ্ৰীমন্ত সদাগর আরও রাগিয়া বলিলেন, “আমি মহাদেবের ভক্ত, আর তুই আমার স্ত্রী হইয়া মেয়ে দেবতার পূজা করিয়া আমার ধৰ্ম্মনষ্ট করিতেছিস, আবার আমাকে এখানে প্রণাম করিতে বলিস্, ধিক্ তােকে!” এই বলিয়া তিনি পূজার ঘট আবার লাথি মারিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়া নৌকায় উঠিলেন। খুল্লনা আবার পূজার সামগ্রী সাজাইয়া গুছাইয়া স্বামীর এই দুৰ্ম্মতির জন্য কাঁদিয়া কাঁদিয়া ভগবতীর কাছে বার বার ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিল। ভগবতী ভঁহার প্রতি সদাগরের অমন ব্যবহার দেখিয়া পদ্মাবতীকে ডাকিয়া বলিলেন, “ধনপতির বড় অহঙ্কার হইয়াছে, সে অহঙ্কারে মত্ত হইয়া আজ আমার পুজার ঘট লাথি মারিয়া ফেলিয়া সিংহল যাত্রা করিয়াছে। আমি তাহার এ অহঙ্কার নিশ্চয়ই চূর্ণ করিব,- তাহার সপ্তডিঙ্গা মধুকর সাগরের জলে ডুবাইয়া তাহাকে আমি প্রাণে মারিব,-তবে আমার গায়ের জ্বালা জুড়াইবে, অপমানের ঠিক প্রতিশােধ নেওয়া হইবে। পদ্মা, তুমি এখনই ভূত প্রেত লইয়া গিয়া সদাগরের সাত ডিঙ্গা সমুদ্রের জলে ডুবাইয়া দাও।” পদ্ম বলিলেন, “ভগবত, তাহা হইলে আর তােমার পূজা হইবে না। যদি সদাগরের সাতডিঙ্গা ডুবাইয়া তাহাকে প্রাণে মারিয়া ফেল, তবে তুমি যে জন্য রত্নমালাকে অভিশাপ- [ ৪৪ )
শ্ৰীমন্ত
দিয়া পৃথিবীতে নিয়াছ তাহা কোনই কাজে আসিবে না।
সদাগর যে পাপ করিয়াছে সে পাপের জন্য তাহার ছয় ডিঙ্গা
ডুবাইয়া তাহাকে অনেক কষ্ট দিয়া সিংহলে লইয়া যাইব,
সেখানে তাহাকে রাজ-কারাগারে বন্দী করাইব। তাহা
হইলে তােমার দুই কাজই সিদ্ধ হইবে।”
সদাগরের
সপ্তডিঙ্গা মধুকর কত দেশ, কত গ্রাম, কত
নগর, কত নদনদী অতিক্রম করিয়া শেষে যাইয়া মগরায়
উপস্থিত হইল। ভগবতী এইখানে তাঁহার ছয়খানি নৌকা
ডুবাইয়া তাহাকে শাস্তি দিবার ইচ্ছা করিয়া মেঘ, পবন,
বরুণ ও নদনদীদিগকে ডাকিয়া খুব ঝড় বৃষ্টি তুলিয়া দিতে
আদেশ করিলেন। ভগবতীর আদেশে তখনই আকাশ
কালাে মেঘে ঢাকিয়া ফেলিল, বিদ্যুৎ চমকাইতে লাগিল,
কড় কড় করিয়া বাজ পড়িতে আরম্ভ করিল, নদীর জল উথাল
পাথাল করিয়া ঝড় বহিতে লাগিল। ঝড় দেখিয়া মাঝী
মাল্লাদের প্রাণ শুকাইয়া গেল, সাগর ভয়ে অস্থির হইয়া
শিব নাম জপ করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু কিছুতেই
কিছু হইল না, মাঝীরা প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াও নৌকা বাঁচা-
ইতে পারিল না, একে একে ছয়খানি নৌকা ডুবিয়া গেল।
[ ৪৫ ]
শ্ৰীমন্ত সদাগর যে নৌকায় ছিলেন সেখানা ডুবিতে ডুবিতে অতিকষ্টে রক্ষা পাইল। সেখান হইতে সদাগর একখানি মাত্র নৌকা লইয়া সমুদ্রের পথে চলিতে চলিতে যাইয়া চিংড়ি দহে উপস্থিত হইলেন। সেখানে কেবল মস্ত বড় বড় চিংড়ি মাছ থাকে এই জন্য এস্থানটার নাম হইয়াছে চিংড়ি দহ। প্রকা প্রকাণ্ড চিংড়ি, তাদের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মস্ত মস্ত গোফ। নৌকার সাড়া পাইয়া চিংড়িগুলি সব গোঁফ উঁচু করিয়া ভাসিয়া উঠিল। সদাগর দূর হইতে তাহা দেখিয়া মাঝীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “একি, সমুদ্রের মধ্যে নল খাগড়ার বন কেন ?” মাঝরা হাসিয়া বলিল, ‘ওসব নল খাগড়ার বন নয় সাধু, ও চিংড়ি মাছের গোঁফ !” এই বলিয়া তাহারা কতক- গুলি চাউল গুড়া জলে ফেলিয়া দিল, আর চিংড়ি মাছেরা মনের আনন্দে তাহা খাইতে লাগিল। সেখান হইতে তাহার যাইয়া কঁকড়া দহে উপস্থিত হইল । সেখানে ভীষণ কাঁকড়া। প্রকাও প্রকাণ্ড দাড়া তাদের, তাহাতে করাতের মত ধার। তাহারা সেই দাড়া দিয়া কামড়াইয়া নৌকা আটকাইয়া ফেলিল। আর নৌকা চলে না। সদাগর বলিলেন, “এত বড় কঁকড়া ত কোথাও দেখি নাই, দাত দিয়া কামড়াইয়া এতবড় নৌকা আটকাইয়া [ ৪ ] শ্ৰীমন্ত- ফেলিল।” মাঝীদের ভিতর কয়েকজন খুব চালাক লােক ছিল, তাহারা এই পথে অনেকবার আসা যাওয়া করিয়াছে, তাহারা খুব জোরে শেয়ালের মত চেচাইতে লাগিল। তােমরা বোধ হয় জান, শেয়াল খুব কাঁকড়া খায়, কাকরা- রাও সেজন্য শেয়ালকে বড় ভয় করে। শেয়ালের ডাক শুনিবামাত্রই কাকড়ারা নৌকা ছাড়িয়া দিয়া প্রাণের ভয়ে যাইয়া সমুদ্রের নীচে লুকাইল। এই রকম করিয়া সদাগর সাপ-দহ, কুমীর-দহ, কড়ি-দহ, শঙ্খ দহ ইত্যাদি করিয়া বহু দহ পার হইয়া সিংহলের প্রায় কাছে কালীদহে গিয়া উপস্থিত হইলেন। সেখানে তিনি এক অদ্ভুদ কাণ্ড দেখিলেন। দেখিলেন, সমুদ্রের নীল জল ধূ ধূ করিতে করিতে যাইয়া আকাশের সাথে মিশিয়া গিয়াছে, তাহাতে পাহাড়ের মত ঢেউ উঠিয়াছে। সেই অগাধ জলের উপর একখানি সুন্দর ফুলের বন ভাসিতেছে, তাহাতে নানা গাছে নানা রঙের সুন্দর সুগন্ধি ফুল ফুটিয়া রহিয়াছে, বাতাসে ফুলের গন্ধ চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতেছে, ভ্রমরেরা মধুলােভে গুণ গুণ করিয়া সেই ফুলের উপর উড়িয়া বেড়াইতেছে। কোকিল, পাপিয়া, চন্দনা কত পাখী গাছে গাছে উড়িয়া কতই মধুস্বরে গান গাহিতেছে। সেই বনের উপর মণি মুক্তা খচিত নীল চাদোয়া টাঙ্গানো, চারি ধারে সােণার নিশান উড়িতেছে, শাদা চামর দুলিতেছে, মুক্তার মালা ঝুলিতেছে। [ ৪৭ )
৯শ্ৰীমন্ত
•••এই সমস্তের চাইতে একটা আরও বেশী আশ্চর্যের জিনিস
ছিল সেখানে,সেই ফুলবনের একধারে সমুদ্রের জলের
উপর এক মস্ত বড় পদ্মের বন, তাহাতে লাল, নীল, সাদা,
পীত, সবুজ, নানা রঙ্গের পদ্মফুল ফুটিয়া রহিয়াছে, ভ্রমরেরা
পদ্মে পদ্মে উড়িয়া মধু খাইতেছে। সমুদ্রের ঢেউএ পদ্মগুলি
হেলিয়া দুলিয়া পড়িতেছে। তাহার একটী পদ্মের উপর
একটী সােল বছরের পরমা সুন্দরী মেয়ে হাসিমুখে বসিয়া
এক হাতে একটা প্রকাণ্ড হাতী ধরিয়া গিলিতেছে, আবার
তাহা উদগার করিয়া ফেলিতেছে, আবার তাহা গিলিতেছে,
হাতীটা মাঝে মাঝে পলাইবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু সে
মেয়েটা লেজ ধরিয়া হাতীটাকে টানিয়া আনিয়া গালে
পুরিতেছে। তাহাদের ভারে পদ্মটা হেলিতেছে মাত্র কিন্তু
ডুবিতেছে না। সাধু এই কমলে কামিনী অর্থাৎ পদ্মের
উপর স্ত্রীলােক দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেন,—এমন
অপার সমুদ্র, উত্তাল ঢেউ, তাহাতে পদ্মবন, তাহার উপর
আবার স্ত্রীলােক বসিয়া হাতী গিলিতেছে ! সমস্তই অদ্ভুত !!
এই ব্যাপার কেবল সদাগর নিজেই দেখিলেন, মাঝী মাল্লার
কিছুই দেখিতে পাইলেন না। সদাগর মনে করিলেন, সিংহলে
যাইয়া রাজসভায় এ কথা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাহা হইলে
সমস্ত কথা জানিতে পারিবেন।
সিংহলের রত্নমালা-ঘাটে যাইয়া সাধু নৌকা লাগাইলেন।
[ ৪৮ ]
শ্ৰীমন্ত
ঘাটে উঠিবামাত্রই কোটাল আসিয়া তাহাকে রাজার নিকট
লইয়া যাইবার জন্য জেদ করিতে লাগিল।
সাধু রাজার
জন্য নানা জিনিসের ভেট সাজাইয়া লইয়া গিয়া রাজসভায়
হাজির হইলেন।
সিংহল-রাজ শালবান সদাগরকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
“তুমি কে, তােমার বাড়ী কোথায় ? কি জন্য সিংহলে
আসিয়াছ ?
সত্য করিয়া বল।”
ধনপতি বলিলেন, “মহারাজ আমি একজন সদাগর,
নাম শ্রীধনপতি দত্ত, জাতিতে গন্ধবণিক। বাড়ী বঙ্গদেশের
উজ্জয়িনী নগরে। উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমকেশরীর ভাণ্ডারে
চন্দন ও শঙ্খ ফুরাইয়া গিয়াছে, আমি রাজার আদেশে আপনার
রাজ্য হইতে তাহা কিনিয়া লইতে আসিয়াছি, আর সেই সঙ্গে
আপনার রাজ্যে কিছুদিন বাণিজ্য করিবারও ইচ্ছা আছে,
দয়া করিয়া মহারাজ আমাকে সে অনুমতি দিন।”
রাজা সদাগরের দেওয়া সমস্ত ভেটের জিনিস দেখিয়া
ও তাহার কথা শুনিয়া পরম সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে সিংহলে
বাণিজ্য করিতে ও শঙ্খ, চন্দন ইত্যাদি প্রয়ােজনীয় দ্রব্য
লইয়া যাইতে অনুমতি দিলেন। সদাগর রাজাকে অভিবাদন
করিয়া বিদায় হইলেন।
রাজার পুরােহিত অগ্নিশর্মা আসিয়া রাজসভায় উপস্থিত
হইলেন। তিনি নামে যেমন অগ্নিশর্মা, কাজেও তাই।
[ ৪৯ ]
৯গ্ৰীমন্ত রাজসভার চারিদিকে ভেটের জিনিষ দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ সব জিনিষ পত্তর কোথা হইতে আসিল মহারাজ ?” পাত্র মিত্র সকলে বলিল, “একজন সদাগর সিংহলে বাণিজ্য করিতে আসিয়াছে, সে ইহা মহারাজকে দিয়াছে।” অগ্নিশর্মা তখন রাগে অগ্নিশর্মা হইয়া বলিলেন, “আজকাল দেশ হইতে গুরু ব্রাহ্মণের সম্মান লােপ পাইয়াছে, যত ভেট সব রাজ-রাজড়ার, ব্রাহ্মণের বেলায় রম্ভা। এমন দেশে না থাকাই ভাল”। বলিয়া রাগে তিনি রাজসভা ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলে, পাত্র মিত্র সকলে তাহাকে এক রকম পায়ে ধরিয়া শান্ত করিল রাজা সদাগরকে ডাকিয়া আনিবার আদেশ করিলেন । সদাগর আসিলে অগ্নিশর্মা বলিলেন, “কি হে বাপু সদাগর, সিংহলে ত বাণিজ্য করিতে আসিয়াছ, কিন্তু রাজার পুরােহিতকে যে কিছু দিয়া সম্মান করিতে হয়, তাহা কি তোমার জানা নাই ?” ধনপতি বড়ই লজ্জা পাইয়া কয়েকটা মােহর দিয়া অগ্নিশর্মাকে প্রণাম করিলেন। অগ্নিশর্মা পরম পরিতুষ্ট হইয়া তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন, “পথে ত মঙ্গল মত আসিয়াছ, কোনও কষ্ট ত হয় নাই ? আসিতে পথে কি কি দেখিলে ?” সদাগর বলিলেন, “পথে বড়ই কষ্ট পাইয়াছি, সাগর- [ ৫০ ]
শ্ৰীমন্ত
সঙ্গমে আসিয়া জল-ঝড়ে আমার ছয় খানি ডিঙ্গা ডুবিয়া গিয়াছে,
বাণিজ্যের জন্য যে সব জিনিষ আনিয়াছিলাম, তাহা প্রায় সবই
নষ্ট হইয়া গিয়াছে, মহাদেবের দয়ায় কোনও রকমে প্রাণে
বাঁচিয়া আসিয়াছি । তারপর কালীদহে আসিয়া এক অদ্ভুত
দৃশ্য দেখিলাম। দেখিলাম,সমুদ্রের জলের উপর প্রকাণ্ড
এক পদ্মবন, একটা ফোটা পদ্মের উপর দেবতার মত সুন্দরী
একটী মােল সতের বছরের মেয়ে বসিয়া একটা হাতী ধরিয়া
গিলিতেছে, আবার ওরাইয়া ফেলিতেছে, ভারে পদ্মটা ডাটা
সহ থর থর করিয়া কাঁপিতেছে, কিন্তু ডুবিতেছে না। এরকম
আশ্চর্য ব্যাপার আমি কখনাে জীবনে দেখি নাই বা কোথাও
শুনি নাই।”
সাধুর কথা শুনিয়া রাজা ও পাত্র মিত্র সকলেই হাসিয়া
আকুল ! সদাগর নিশ্চয়ই পাগল, তাহা না হইলে এমন কথা
কি কেহ বলে ? . কেহ কেহ জিজ্ঞাসা করিল, “ওহে সাধু,
তােমার কি নেশা ভাঙ্গ টাঙ্গ অভ্যাস আছে ? বিদেশে আসিয়া
বুঝি ভয় পাইয়াছিলে, তাই নৌকার ভিতর শুইয়া চোখ বুজিয়া
স্বপ্ন দেখিতেছিলে। ভাগ্যে তােমার নৌকা গিলিয়া ফেলে
নাই।”
এই সব ঠাট্টা তামাসা শুনিয়া সদাগর ভিতরে ভিতরে
খুব রাগিয়া গেলেন, কিন্তু বাহিরে সে রাগটা প্রকাশ করিতে
পারিলেন না, কি জানি, একে রাজ সভা, তাহাতে আবার
[ ৫১ ]
৯মস্ত
বিদেশ। তিনি বলিলেন, “মহারাজ, আপনার অজ্ঞা পাইলে
সেই কমলেকামিনী বাঁধিয়া আনিয়া আপনার রাজসভায় হাজির,
করিতে পারি।”
সদাগরের কথা শুনিয়া পাত্র মিত্র সকলে বলিতে লাগিল,
“বেটা ভণ্ড, রাজসভায় বসিয়া এমন জ্বলজ্যান্ত মিথ্যা কথা
বলিস্ ! বেটা নিশ্চয়ই চোর ডাকাত হইবে, সাধুর ছদ্মবেশ
ধরিয়া সিংহলে আসিয়াছে।”
সদাগর আর এই কটুবাক্য সহ্য করতে না পারিয়া
বলিলেন, “মহারাজ, দয়া করিয়া এখনই সমুদ্রের ধারে
চলুন, আমার কথা সত্য কি মিথ্যা তাহার প্রমাণ দিব।
প্রতিজ্ঞা করুন মহারাজ, যদি আমি কমলে-কামিনী দেখাইতে
পারি তবে অর্ধেক রাজ্য আমাকে দিবেন। আর যদি আমি
দেখাইতে পারি, তবে আমার বাণিজ্যের জিনিস ও মধুকর
ডিঙ্গা আপনার হইবে এবং আমাকে কারাগারে বন্ধ করিয়া
রাখিবেন।”
রাজা ও পাত্র মিত্র সকলেই সদাগরের কথায় স্বীকৃত
হইলেন। তখনই সমুদ্র-পারে যাওয়ার জন্য হাতী, ঘােড়া,
পাল্কী, নৌকা, লােকলস্কর সাজিল। রাজা শালবন
সদাগরকে সঙ্গে লইয়া পাত্রমিত্র সহ কালীদহে চলিলেন।
কালীদহে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কেবল সমুদ্রের
নীলজল পাহাড়ের মত ঢেউ তুলিয়া গড়াইয়া যাইতেছে,
সমুদ্রের সাদা ফেনা ছাড়া আর কোথাও কিছু নাই, পদ্মের
বন দূরে থাকুক, একটা পদ্মের পাতা পর্যন্ত নাই। সকলে
সদাগরকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, “কি সদাগর, কোথায়
তােমার কমলে কামিনী ?”
সদাগর বলিলেন,“মহারাজ, আমি মিথ্যা কথা বলি নাই।
আমার সাথের মাঝিমাল্লারা ইহার সাক্ষী আছে। আমার
বােধ হয় আপনি এত লােক জন লইয়া আসিয়াছেন, সেই জন্য
সে ভয় ও লজ্জা পাইয়া লুকাইয়া আছে। আর সমুদ্রের
যেমন ঢেউ, এক টুকরা খড় ধরিলে দুই টুকরা হইয়া যায়,
স্রোতে হয়ত পদ্মের বন ছিড়িয়া ভাসিয়া গিয়াছে। মহারাজ,
লােকজন বিদায় দিয়া আপনি একাকী আমার সঙ্গে থাকুন,
আমি নিশ্চয়ই আপনাকে কমলে কামিনী দেখাইব। আমি
বিদেশী সদাগর, আপনার রাজ্যে বাণিজ্য করিতে আসিয়াছি,
কিজন্য আমি মিথ্যা কথা বলিব ?”
পাত্রমিত্র সকলেই বলিতে লাগিল, “বেটা নিশ্চয়ই
ডাকাত আর না হয় পাগল।”
রাজা শালবান ধনপতির মাঝিদিগকে ডাকিয়া কমলে
কামিনীর কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। মাঝিরা সকলেই এক
বাক্যে বলিল, “না মহারাজ, আমরা কেহই কিছু দেখি
নাই।”
তখনই রাজা সদাগরকে বাঁধিয়া কারাগারে লইয়া যাইতে
[ ৫ ]
শ্ৰীমন্ত
হুকুম দিলেন। সেই দিন হইতে সদাগর চোখের জলে বুক
ভাসাইয়া কারাগারে দিন কাটাইতে লাগিলেন। তাহার
মধুকর ডিঙ্গা ও বাণিজ্যের দ্রব্য সমস্তই রাজভাণ্ডারে বাজেয়াপ্ত
হইয়া গেল।
রাত্রিতে সদাগর কারাগারে ঘুমাইয়া আছেন, এমন সময়
ভগবতী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশ ধরিয়া তাহার শিয়রে বসিয়া স্বপ্ন
দেখাইলেন,—“সদাগর, যদি তুমি ভগবতীর পূজা কর, তবে
তােমার সমস্ত দুঃখ ঘুচিবে, তুমি কারাগার হইতে মুক্তি
পাইয়া বাণিজ্য করিয়া নৌকা ভরিয়া ধন দৌলত লইয়া দেশে
ফিরিতে পারিবে, সাগর সঙ্গমে মগরার জল-ঝড়ে তােমার যে
ছয়খানা নৌকা ডুবিয়া গিয়াছে, তাহাও ভগবতীর বরে ফিরিয়া
পাইবে। আর যদি চণ্ডীর পূজা না কর, তবে এই কারাগারেই
তােমাকে পচিয়া পচিয়া মারিতে হইবে। লহনা ও খুল্লনা
পেটের দায়ে সূতা বেচিবে।”
স্বপ্ন দেখিয়া সদাগরের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। তিনি
মনে মনে বলিতে লাগিলেন, “যদি কারাগারে আমার প্রাণও
যায়, তবু আমি মহাদেবের পূজা ছাড়িয়া অন্য কাহাকেও পূজা
করিব না। মহাদেবই আমার একমাত্র দেবতা।”
( ৫৪ ]
শ্ৰীমন্ত ধনপতির সিংহল-যাত্রার কয়েক মাস পরেই খুল্লনার একটা ছেলে হইল। স্বামীর কথামত সে ছেলের নাম রাখিল শ্ৰীমন্ত। শ্ৰীমন্ত ক্রমে ক্রমে পাঁচ বছরে পড়িল। দিন রাত কেবল খেলিয়াই বেড়াইত। খুল্লন শ্ৰীমন্তকে কোলে লইয়া ভাগবত শোনে, শ্ৰীমন্ত ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণের সমস্ত লীলা শুনিয়া খেলার সাথীদিগকে লইয়া সেই খেলাই খেলে।—কখনাে সে শ্রীকৃষ্ণ সাজিয়া পুতনা রাক্ষসীর মাই খাইয়া তাহাকে মারিয়া ফেলে, কখনাে ননী চুবি করিয়া খায়, কখনো কালীয় সাপের মাথায় পা দিয়া তাহাকে জব্দ করে, কখনাে গােপাল সাজিয়া গরুর পাল লইয়া গােষ্ঠে যায়, কখনো কংস বধ করে, কখনাে কদম তলায় বাঁকা হইয়া দাড়াইয়া বাঁশী বাজায়, কখনাে মথুরায় গিয়া রাজা হয়। সারা দিন ছেলেকে এমন করিয়া খেলিয়া বেড়াইতে দেখিয়া খুল্লনার বড়ই চিন্তা হইল। পাঁচ বছরের ছেলে, এখনাে তাহার হাতে খড়ি হইল না। তাই সে পুরােহিতকে ডাকিয়া ভাল দিনে শ্রীমন্তের হাতে খড়ি দিয়া তাহাকে জন- দ্দন ওঝার পাঠশালায় পাঠাইয়া দিল। শ্ৰীমন্ত অল্প দিনের মধ্যেই ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কার, জ্যোতিষ, পুরাণ, ন্যায় [ ৫৫ ]
মস্ত
;
প্রভৃতি নানা শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হইয়া উঠিল। তাহার বিদ্যা
দেখিয়া তনাই পণ্ডিত পর্যন্ত আশ্চৰ্য্য হইয়া গেলেন।
এক দিন শ্ৰীমন্ত গুরু মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করল,
“আচ্ছা গুরু মহাশয়, পুতনা রাক্ষসী শ্ৰীকৃষ্ণকে মাই-এ বিষ
মাখাইয়া খাওয়াইয়া তাহাকে মারিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিয়া-
ছিল, আর যশােদা ও দৈবকী কৃষ্ণকে মায়ের মতন ভাল
বাসিয়া কত কষ্টে লালন পালন করিয়াছিলেন; কিন্তু শেষে
যশােদা দৈবকীও স্বর্গে গেলেন আর পাপ-মতি পুতনাও স্বর্গে
গেল, ইহার কারণ কি ?”
পণ্ডিত মহাশয় বলিলেন, “সমস্তই বাবা, সেই শ্রীকৃষ্ণের
ইচ্ছা।”
শ্ৰীমন্ত জিজ্ঞাসা করিল, “শূর্পনখা রামচন্দ্রকে আত্মদান
করিতে গিয়াছিল, কিন্তু ফলে তাহার নাককান কাটা গেল।
আপনি বলিয়াছেন যে, নয় প্রকার ভক্তির মধ্যে আত্মদানই
শ্রেষ্ঠ, তবে শূর্পনখা আত্মদান করিয়াও এমন শাস্তি পাইল
কেন?”
পণ্ডিত মহাশয় বলিলেন, “ওসব বাবা, ভগবানের খেলা।”
শ্ৰীমন্ত বলি, “এমন অন্যায় ইচ্ছা ভগবানের হইবে
কেন ? আমি এসব বুঝিতে পারিলাম না, আপনি আমাকে
ভাল করিয়া ব্যাখ্যা করিয়া ইহা বুঝাইয়া দিন।”
গুরু দেখিলেন, মহামুস্কিল! তাঁহার পেটে অত বিদ্যা
[ ৫৬ ]
নাই যে তিনি এত কথা শ্ৰীমন্তকে শাস্ত্র প্রমাণ দেখাইয়া ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিতে পারেন। কাজেই শ্ৰীমন্তের উপর তঁাহার বড়ই রাগ হইল, এক ফোঁটা ছেলে, তাহার পেটে গুরু-ঠকানাে বুদ্ধি! তিনি বলিলেন, “দ্যাখ ছিরাই, আমার এই পচাশী বছর বয়সে তাের মত হাজার ছেলে আমি পড়াই- য়াছি, কিন্তু কাহাকেও শাস্ত্রের কথা বুঝাইতে অত টীকা টিপ্পনীর দরকার হয় নাই। তুই এক রত্তি ছেলে হইয়া এমন জ্যাঠা হইয়াছি যে আমার বিদ্যা পরীক্ষা করিতে আসিস্? তাের বড়ই অহঙ্কার হইয়াছে, আমি যদি উচিত কথা বলি, তবে এখনই মাথা হেঁট করিয়া পাঠশালা হইতে বাহির হইয়া যাইতে হইবে।” শ্ৰীমন্ত বলিল, “গুরুমহাশয়, একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলে ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিতে পারেন না, দুইবার জিজ্ঞাসা করিলে আবার রাগ করেন কেন? যাহা বুঝিতে পারিব না তাহা শত বার আপনাকে জিজ্ঞাসা করিব, যতক্ষণ পর্যন্ত না বুঝিব, ততক্ষণ আপনাকে বলিয়া দিতেই হইবে। আমায় এমন কি অপমানের কথা আপনি বলিবেন যে, আমাকে মাথা হেঁট করিয়া চলিয়া যাইতে হইবে ?” গুরু এবার রাগিয়া একেবারে টঙ, হইয়া বলিতে লাগি- লেন, “বেণের ছেলে হইয়া তুই আমাকে এত ছাত্রের মধ্যে অপমান করিলি ? ছােট মুখে তাের বড় কথা! তাের মা [ ৫৭ ]
শ্ৰীমন্ত
ছাগল চড়াইয়া খাইত। প্রায় বার তের বছর হইল তাের বাপ
সিংহলে গিয়াছে, আমরা শুনিয়াছি, সে সেখানে মরিয়াছে,
আর তাের মা এখনো মাছ খায়, শাঁখা হাতে দেয়, পেড়ে শাড়ী
পরে, সিঁথিতে সিন্দুর দেয়। আর তুই তার ছেলে হইয়া
আসি আমাকে অপমান করিতে !"
গুরু মহাশয়ের মুখে মায়ের নিন্দা শুনিয়া শ্ৰীমন্ত আর
সহ্য করিতে পারিল না, সে বলিল, “দেখুন গুরু মহাশয়,
আপনি ব্রাহ্মণ বলিয়া তাপনার এত কথা আমি সহ্য করিলাম।
আমার বাবা সিংহলে আছেন, তিনি মরিবেন কেন ? আপনি
জানিয়া শুনিয়া আমার মায়ের নিন্দা করিতেছেন। এমন
কথা কোনও ভদ্রলােকের মুখ দিয়া বাহির হয় না, আপনি
নিশ্চয়ই ছােট ব্রাহ্মণ।”
গুরু মহাশয় রাগে চোখ লাল ও টিকি খাড়া করিয়া
দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিলেন, “পাজি, এখনই তুই এখান হইতে
দূর হ, আমি ছােট লােকের বাচ্চাকে পড়াই না। পড়াইলে
আমার জাত যাইবে।”
শ্ৰীমন্ত তখনই পুথি পত্র লইয়া তাপমানে ও রাগে
চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে পাঠশালা হইতে বাহির হইয়া
বাড়ীর দিকে চলিল। বাড়ী আসিয়া সে চুপ করিয়া এক ঘরে
ঢুকিয়া দুয়ার বন্ধ করিয়া শুইয়া কাঁদিতে লাগিল।
তানেক বেলা হইয়া গেল তবু মন্তকে বাড়া ফিরিতে
( ৫৮ ]
দেখিয়া খুল্লনার বড়ই চিন্তা হইল। সেই ভােরে উঠিয়া শ্ৰীমন্ত পাঠশালে গিয়াছে, দুপুর হইতে চলিল তবু আজ তাহার দেখা নাই, অন্য দিন ত তাহার বাড়ী ফিরিতে এত দেরী হয় না। তবে কি তাহার কোনও আপদ বিপদ হইল ? তাহার গায়ে হীরা মুক্তার অলঙ্কার আছে, সেই লােভে ত কেহ তাহাকে গলা টিপিয়া মারিয়া ফেলে নাই ? মায়ের প্রাণ নানা রকম ভয়ে কাঁপিয়া উঠিতে লাগিল। খুলনা একবার মন্তের বাড়ী আসিবার পথে গিয়া দেখিয়া আসে, আবার রান্না ঘরে গিয়া শ্ৰীমন্তের জন্য বাড়া ভাতের কাছে বসে। এমনি ঘর-বাহির করিয়া অনেকক্ষণ কাটাইয়! যখন সে দেখিল, শ্ৰীমন্ত আর বাড়ী ফিরিল না, অথচ বেলা অনেক বাড়িয়া গেল, তখন সে আর বাড়ীতে টিকিতে পারিল না। শ্ৰীমন্ত যখন বাড়ী আসিয়া ঘরে দুয়ার দেয়, তখন লহনাই মাত্র তাহা দেখিয়াছিল ; সে দুবলার কানে কানে সেকথা বলিয়া দুই জনে মুখ টিপিয়া টিপিয়া হাসিল। খুনা কঁদিতে কাঁদিতে যাইয়া দুর্বলাকে একবার শ্ৰীমন্তের খোজ করিয়া আসিতে বলিল। দুর্বল। এদিক সেদিক একটু ঘুরিয়া বেড়াইয়া খুল্লনাকে আসিয়া বলিল, সে শ্ৰীমন্তের কোনই খোঁজ পাইল না। সেই কথা শুনিয়া খুল্লনার প্রাণ শুকাইয়া গেল। সে দুর্বলাকে সাথে লইয়া নিজেই এপাড়া সেপাড়া তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া জনার্দন পণ্ডি- তের বাড়ী যাইয়া উপস্থিত হইল। পণ্ডিত মহাশয়ের পায়ে ; [ ৫৯ }
মন্ত
পড়িয়া চোখের জলে মাটী ভাসাইয়া খুল্লনা বলিতে লাগিল,
“বলুন গুরু মহাশয়, আমার ছিরাই কোথায় ? আমি যে
তাহাকে সারা গ্রামটা খুজিয়াও পাইলাম না, সেত এমন
করিয়া বাড়ী ফিরিতে কোনো দিন দেরি করে না। আপনার
চারি মাসের মাহিয়ানা বাকি রহিয়াছে, তাহা আদায় করিবার
জন্য বুঝি তাহাকে লুকাইয়া রাখিয়াছেন। আপনার পায়ে
ধরিয়া বলিতেছি, তাহাকে বাহির করিয়া দিন। আমি আজই
আপনাকে বাকি মাহিনার দ্বিগুণ দিব।”
গুরু মহাশয় আগেই শ্ৰীমন্তের কথায় রাগিয়া অগ্নিশর্মা
হইয়াছিলেন, এখন আবার তাহার মায়ের কথায় যেন তঁাহার
কাটা ঘায়ে নুণের ছিটা পড়িল। তিনি বলিলেন, “দেখ খুল্লনা,
তুমি ঘরের বউ হইয়া এমন লাজ শরমের মাথা খাইয়া গ্রামে
গ্রামে ঘুরিয়া বেড়াইতেছ, এটা কিন্তু কিছুতেই ভাল কাজ
হইতেছে না। তােমার কি জাত মানের ভয় নাই ? ছেলে ঘরে
ফিরিয়া গিয়াছে, তবু তুমি তাহার জন্য ঘুরিয়া বেড়াইতেছ,
আর অনর্থক আমাকে কতকগুলা মন্দ কথা বলিলে। মনে
রাখিও, ব্রাহ্মণের উপর মিথ্যা দোষারােপ করিলে তােমার ভাল
হইবে না। আমি কি চোর না ডাকাত যে তােমার ছেলেকে
লুকাইয়া রাখিব ?” পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট এই রূপ কটু কথা
শুনিয়া খুল্লনা আবার চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে বাড়ীর
দিকে চলিল।
[ ৬০ ]
শ্ৰীমন্ত
বাড়ী ফিরিয়া শুনিল, লহনা ঘরে বসিয়া তাহার সখী-
দিগকে বলিতেছে, “ছেলে কি আর কাহারাে হয় না? কিন্তু
খুল্লনা যেমন ছেলে-পাগলী এমন আর কোথাও দেখি নাই।
ছেলে ত গোঁসা করিয়া ঘরে দুয়ার দিয়া পড়িয়া আছে, আর
মা সারা পাড়ায় তাহাকে খুঁজিয়া মরিতেছে; আমাকেও
অবধি একটা কথা জিজ্ঞাসা করিল না। ছেলেও কিন্তু আচ্ছা
আদুরে হইয়া উঠিতেছে দিন দিন।”
১২
লহনার
হনার কথা শুনিয়া খুল্লনা তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়া দেখিল
সত্য সত্যই ঘর ভিতর হইতে খিল বন্ধ রহিয়াছে।
সে বাহির হইতে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বলিতে লাগিল, “দুয়ার খােল
বাবা শ্ৰীমন্ত, তােকে না দেখিয়া আমি যে কত খুঁজিয়া
আসিলাম। কি জন্য তুই এমন রাগ করিয়া বসিয়া আছিস্?
কিসের দুঃখ তাের আমাকে বল। আমার কিসের অভাব ?
তুই যাহা চাহিবি আমি তােকে তাহাই দিব। দুয়ার খােল
বাবা, তাহা না হইলে আমি এইখানে কপাল খুড়িয়া মরিব।”
মায়ের কান্নায় শ্ৰীমন্ত দুয়ার খুলিয়া দিল। খুলনা
তাহাকে কোলে লইয়া আঁচলে চোখ মুছাইয়া কত কথাই
জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। শ্ৰীমন্ত কিন্তু কোনই উত্তর
[ ৬১ ]
৯শ্ৰীমন্ত
দিল না, কেবলই কাঁদিতে লাগিল। দাসী দুলা শ্ৰীমন্তের
মাথায় তেল দিয়া তাহাকে স্নান করাইল । খুল্লনা পঞ্চাশ
ব্যঞ্জন দিয়া সােণার থালায় ভাত বাড়িয়া খাওয়ার জন্য তাহাকে
সাধিতে লাগিল, কিন্তু শ্ৰীমন্ত কোনও মতেই খাইতে স্বীকৃত
হইল না। সে বলিল, “মা, আজ গুরু মহাশয় আমাকে অত
ছাত্রের মধ্যে বড়ই অপমান করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন,
বাবা সিংহল গিয়া মরিয়া গিয়াছেন, আর তুমি সধবার মত
পেড়ে শাড়ী পর, মাছ খাও, হাতে শাঁখা পর, সিঁথিতে সিন্দুর
দাও, এজন্য লোকে নাকি তোমাকে কত নিন্দা করে। আমি
এ অপমান কিছুতেই সহ্য করিতে পারিব না মা, যদি তুমি
আমাকে সাত ডিঙ্গা সাজাইয়া বাবার খোঁজে সিংহল যাইতে
অনুমতি দাও, তবেই আমি ভাত খাইব, তাহা না হইলে আমি
খাইয়া মরিব, তােমার কোনাে কথাতেই ভুলিব না।”
অতটুকু ছেলের মুখে অমন প্রতিজ্ঞার কথা শুনিয়া
খুল্লনার প্রাণ কাঁপিয়া উঠিল। সে তাহাকে কোলে লইয়া
আঁচলে চোখ মুছাইতে মুছাইতে বলিল, “ওসব কথায় কান
দিও না বাবা, ললাকে হিংসা করিয়া কত কথাই বলে। সিংহল
কি আর এখানে ?
সে যে বহু দূরের পথ, সমুদ্র দিয়া যাইতে
হয়, সমুদ্রে সাপ, কুমীর, হাঙ্গর, তিমি, কত ভীষণ ভীষণ জন্তু
থাকে, কত দস্যু সে পথে ঘুরিয়া বেড়ায়! তুমি বড় হও বাবা,
তখন বাণিজ্যে যাইও, এ বয়সে কি সমুদ্রে যাওয়া যায় ?
[ ৩২ )
৯শ্ৰীমন্ত
বাবার কাছে শুনিয়াছি সিংহলে যে যায় সে-ই খুব কষ্ট পায়।
তুমি ছেলে মানুষ, সে কষ্ট সহিতে পারিবে না। সিংহলে
যাইতে হইলে প্রকাণ্ড নৌকা গড়িতে হয় ; এক শত কারিগর
যদি এক বৎসর অনবরত খাটে, তবে সে রকম একখানা নৌকা
তৈরী হয়।
মায়ের কথা শােন বাবা, এখন ভাত খাও, তুমি
বড় হইলেই আমি তােমাকে সাত ডিঙ্গা সাজাইয়া সিংহলে
পাঠাইয়া দিব।”
শ্ৰীমন্ত বলিল, “মা, আমি তােমার কোনও কথাই
শুনিব না। আমি সিংহলে যাইবই, যদি তুমি অনুমতি না
দেও, তবে আমি জলে ডুবিয়া মরিব, তবু অমন অপমানের
কথা শুনিয়া বাঁচিয়া থাকিতে পারিব না। আমি এখনই শুনিতে
চাই, তুমি আমাকে সিংহলে যাওয়ার জন্য সাত ডিঙ্গা তৈরী
করিয়া দিবে কিনা ?”
খুল্লনা অগত্যা অনুমতি দিল ।
তখন শ্ৰীমন্তের মুখে
হাসি ফুটিয়া উঠিল। সে মায়ের কোলে বসিয়া পেট পুরিয়া
মনের আনন্দে ভাত খাইল ।
তখনই উজ্জয়িনী নগরের পথে পথে ঢোল বাজাইয়া
ঘােষণা করিয়া দেওয়া হইল, যে শীঘ্র শীঘ্র সাত ডিঙ্গা তৈরী
করিয়া দিতে পারিবে, তাহাকে যথেষ্ট টাকা পুরস্কার দেওয়া
হইবে। ভগবতী দেখিলেন, যদি মানুষ সাত ডিঙ্গা তৈরী
করিতে আরম্ভ করে, তবে অন্ততঃ দুই তিন বৎসরের পূর্বে
[ ৬৩ }
শ্ৰীমন্ত তাহা কিছুতেই শেষ হইবে না, তাহা হইলে তাহার কাৰ্য্য- সিদ্ধিতেও বিলম্ব হইয়া যাইবে, কাজেই তিনি বিশ্বকর্মা ও তাহার পুত্র দারুবৰ্ম্মাকে ডাকিয়া কহিলেন, “আজ রাত্রির ভিতর তােমাদিগকে শ্ৰীমন্তের সিংহলে যাওয়ার জন্য সাতখানা নৌকা তৈরী করিয়া দিতে হইবে। হনুমানকে সাথে লইয়া যাও, তাহা হইলে তােমার কাজের সুবিধা হইবে।” বিশ্বকৰ্ম্মা, দারুবৰ্ম্মা ও হনুমান তিন জন তিন বৃদ্ধ কারিগরের রূপ ধরিয়া উজ্জয়িনী নগরে উপস্থিত হইয়া নৌকা তৈরী করার প্রার্থনা জানাইলেন। তাহাদিগকে অতি বৃদ্ধ দেখিয়া শ্ৰীমন্ত জিজ্ঞাসা করিল, “তােমরা যেমন বুড়া, তেমন শরীরের চেহারা, কানে শােন না, চোখে দেখ না, গায়ে এক তিল বল নাই, লাঠি ভর ছাড়া হাটিতে পার না, ইহাতে কেমন করিয়া তােমরা আমার সাত ডিঙ্গা তৈরী করিবে ? আর যে সে ডিঙ্গা নয়, সমুদ্রে যাওয়ার ডিঙ্গা। তােমাদের চেহারা দেখিয়া ত আমার ভরসা হয় না। তােমাদের বাড়ী কোথায় ?” বিশ্বকর্মা বলিলেন, “আমাদের বাড়ী পুরন্দরপুর । আমরা বৃদ্ধ হই আর রােগাই হই, তুমি যদি অনুমতি দাও তবে সকলের চেয়ে বেশী তাড়াতাড়ি আমরা তােমার সাত ডিঙ্গা তৈরী করিয়া দিতে পারিব।” তাহাদের কথা শুনিয়া শ্ৰীমন্ত তাহাদের উপরেই ডিঙ্গা [ ৬৪ ] ৯শ্রীমন্ত নির্মাণের ভার দিল। তিনজন কারিগর মিলিয়া এক রাত্রির মধ্যেই ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়া সাত ডিঙ্গা নিৰ্মাণ করিয়া রাত্রি শেষে স্বর্গে চলিয়া গেলেন। প্রাতে শ্ৰীমন্ত ঘুম হইতে উঠিয়া কারিগরদিগের সন্ধানে গিয়া দেখে—ভ্রমরা নদীর জলে সাত ডিঙ্গা ভাসিতেছে, কিন্তু কারিগরেরা কেহ নাই। তখন তাহার মনে হইল, নিশ্চয়ই কোনাে দেবতা আসিয়া এই ডিঙ্গা তৈরী করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। তাহা না হইলে পৃথিবীতে এমন কেহ নাই, যাহারা তিনজন মিলিয়া এক রাত্রির মধ্যে এমন সুন্দর করিয়া এত বড় সাতখানা নৌকা নিৰ্মাণ করিয়া দিতে পারে । তখনই যাত্রার আয়ােজন চলিতে লাগিল । দৈবজ্ঞ আসিয়া যাত্রার দিন দেখিয়া বলিল, “আগামী রবিবার মৃগশিরা নক্ষত্রে দশমী তিথিতে বণিজকরণ যােগে যাত্রাই উৎকৃষ্ট, ইহাই বাণিজ্য ব্যাপারে সর্বোত্তম দিন। এই যাত্রায় তুমি মগরায় জল-ঝড়ে খুব কষ্ট পাইবে, কিন্তু ভগবতী তােমাকে রক্ষা করিবেন।” বাণিজ্যের নানা জিনিসে নৌকা পূর্ণ করা হইল। শ্ৰীমন্ত রাজার অনুমতি লইয়া সিংহল যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিল। খুল্লনা দিন রাত বসিয়া কায়মনে দুর্গতিনাশিনী মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করিয়া দেবীর চরণে পুত্রের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করিল। যাত্রার দিনে সে শ্ৰীমন্তের হাতে দেবীর আশীর্বাদী দূর্বা ও ফুল দিয়া বলিলেন, “সুখে দুঃখে সব [ ৬৫ ] শ্ৰীমন্ত সময় মা মঙ্গলচণ্ডীর নাম স্মরণ করিয়া এই ফুল ও দূর্বা সাথে সাথে রাখিও। কখনাে ভগবতীর নাম ভুলিও না, তিনিই তােমাকে আপদে বিপদে রক্ষা করিবেন।” পাছে ধনপতি শ্ৰীমন্তকে চিনিতে না পারেন, এই ভয়ে তাহার হাতে ধনপতির আংটী ও ছাতা দিয়া দিলেন। শ্ৰীমন্ত মা ও বিমাতাকে প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইয়া দুর্গা দুর্গা বলিয়া নৌকায় উঠিল। খুল্লনা চোখের জল মুছিতে মুছিতে মা মঙ্গলচণ্ডীকে ডাকিতে ডাকিতে যাইয়া নদীর ধারে দাঁড়াইল। মাঝি-মাল্লার বদর বদর বলিয়া দাঁড়ে টান দিল। দেখিতে দেখিতে মন্তের সাত ডিঙ্গার বহর চোখের আড়ালে চলিয়া গেল। খুলনা চোখের জল মুছিতে মুছিতে বাড়ী ফিরিল। শ্রীমন্ত মন্ত বহু নদনদী, গ্রাম, নগর, বন্দর, তীর্থ অতিক্রম করিয়া আসিয়া মগরায় উপস্থিত হইল। এই সেই মগরা, যেখানে ধনপতি জল-ঝাড়ে পড়িয়া সমস্ত নৌকা হারাইয়া মাত্র একখানা নৌকা লইয়া সিংহলে গিয়াছিলেন। ভগবা এইখানে মন্তকে পরীক্ষা করিবার জন্য জল- ঝড়ের সৃষ্টি করিলেন। তুমুল বেগে ঝড় উঠিল, নদীর জলে [ ৬৬ }
শ্ৰীমন্ত
পাহাড়ের মত ঢেউ উঠিয়া তীরে আছাড় খাইয়া পড়িতে
লাগিল। মেঘে বৃষ্টিতে চারিদিক অন্ধকার হইয়া গেল।
নৌকার পালের দড়ি ছিড়িয়া মাস্তুল ভাঙ্গিয়া নৌকায় ঝলকে
ঝলকে জল উঠিতে লাগিল। শ্ৰীমন্ত ভয়ে চীৎকার করিয়া
কঁদিয়া বলিতে লাগিল, “মা ভগবতি, একি করিলে মা ?
আমায় রক্ষা কর, আমার সমস্ত আশা ভরসা যে নষ্ট হয়,
তুমি ছাড়া এ বিপদে কে আমায় রক্ষা করিবে ?” এই বলিয়া
সে ঝড়ের ভিতর নদীতে লাফাইয়া পড়িল। অমনি ভগবতীর
কৃপায় বড় বৃষ্টি থামিয়া নদীতে মাত্র এক হাঁটু জল হইল।
শ্ৰীমন্ত ভগবতীর চরণে সহস্র সহস্র প্রণাম জানাইয়া আবার
গিয়া নৌকায় উঠিল। নৌকা আবার চলিতে লাগিল ।
চলিতে চলিতে শ্রীমন্তের নৌকার বহর যাইয়া কালীদহে
উপস্থিত হইল, যেখানে ধনপতি কমলে কামিনী দেখিয়াছিলেন।
ভগবতী এবারও শ্ৰীমন্তকে ছলনা করিবার জন্য সমুদ্রের নীল
জলের উপর সুন্দর একখানি ফুলের বন সৃষ্টি করিলেন,
তাহার এক ধারে একখানি পদ্মের বন, ভগবতী স্বয়ং একজন
ষােল বছর বয়সের স্ত্রীলােকের মূর্তি
ধরিয়া একটা পদ্মের
উপর বসিয়া একটী হাতী ধরিয়া গিলিতে লাগিলেন,—ঠিক
যেমন ধনপতি দেখিয়াছিলেন।
শ্ৰীমন্ত এই অদ্ভুত কাণ্ড
দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। সে নৌকার মাঝি-মাল্লাদিগকে
ডাকিয়া সে দৃশ্য দেখাইতে লাগিল ; কিন্তু তাহারা কিছুই
[ ৬৭ ]
দেখিতে পাইল না, কেবল দেখিল, নীল সাগরের সীমাহীন বুকের উপর কেবল ঢেউএর পর ঢেউ গড়াইয়া যাইতেছে, আর তাহাতে সাদা ফেনাগুলি ভাসিয়া যাইতেছে। শ্ৰীমন্ত অনেকক্ষণ ধরিয়া সেই সুন্দর অদ্ভুত দৃশ্য দেখিল, দেখিয়া ভাবিল, ইহা হয়ত কোনও দেবতার ছলনা। যাহা হউক, ইহা সিংহলের অতি নিকটে, সিংহলে গিয়া এ কথা সেখান- কার রাজসভায় বলিব, রাজ-সভায় অনেক পণ্ডিত থাকেন, তাহারা নিশ্চয়ই এ বিষয় জানেন, তাহা হইলেই ব্যাপারটা বুঝিতে পারা যাইবে । সেখান হইতে শ্ৰীমন্তের সাত ডিঙ্গা যাইয়া সিংহলের রত্নমালা ঘাটে লাগিল। ঘাটে নৌকা বাঁধিয়া মাঝি মাল্লারা উপরে উঠিয়া বাজনা বাজাইয়া সদাগরের আগমন ঘােষণা করিল। সেই বাজনার শব্দে কোটাল আসিয়া শ্ৰীমন্তের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিল। শ্ৰীমন্ত বলিল, “আমি বিদেশী সদাগর, বাণিজ্য করিতে এ দেশে আসিয়াছি।” কোটাল বলিল, “যদি বাণিজ্য করিতে সিংহল আসিয়া থাক, তবে আগে গিয়া রাজার সাথে দেখা করিয়া আইস। যদি চুরি ডাকাতি হয়, তবে আমার মাথা কাটা যাইবে। বিদেশী লােক এদেশে আসিলে রাজার হুকুম লইয়া এদেশে কিতে হয়। আর আমি এ দেশের কোটাল, আমাকে পঞ্চাশ কাহন বখশিস্ দিতে হইবে।” [ ৬৮ ]
শ্ৰীমন্ত
কোটালের কথা শুনিয়া শ্ৰীমন্তের বড় রাগ হইল, সে
বলিল, “এই সবে ঘাটে আসিয়া ডিঙ্গা বাঁধিলাম, জলটুকু
অবধি মুখে দেই নাই, এখনই কি রাজার কাছে না গেলে নয় ?
বশিস্ টখশিস্ এখানে কিছু মিলিবে না বাপু।”
কোটাল বলিল, “তুই বেটা নিশ্চয়ই ডাকাত, সাধুর
ঢঙ্গ করিয়া আসিয়াছিস, সুবিধা পাইলেই গৃহস্থের পাড়ায়
ঢকিয়া ডাকাতি করিয়া পলাইয়া যাইবি। বাণিজ্য টানিজ্য
ওসব কিছু নয়, অনেক বেটাই অমন সদাগরী ঢঙ্গ ধরিয়া
আসিয়া শেষে লুটপাট করিয়া রাতারাতি চম্পট দেয়।”
শ্ৰীমন্ত বলিল, “দেখ কোটাল, তুমি লােক চিনিয়া কথা
বলিতে জান না। তুমি নিজে যেমন, অন্যকেও তেমনি মনে
কর। আমার ধন-দৌলতের কোনাে অভাব নাই, কোন্ দুঃখে
আমি চুরি ডাকাতি করিব ?”
কোটাল বলিল, “অমন মুখে মুখে অনেক বেটাই অনেক
কথা বলে। আচ্ছা, যদি তুমি ধনী সদাগর হইয়া থাক, তবে
তােমার মাথার ঐ সোণার মুকুটটা সাগরের জলে ফেলিয়া
দাও দেখি।”
শ্ৰীমন্ত ছেলে মানুষ, টাকারও অভাব নাই তার, কাজেই
সে কোটালের কথায় মাথার সােণার মুকুটটা সাগরের জলে
ঘুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া দেখাইয়া দিল যে, আমি একজন
ধনী সদাগর বই কি ?
[ ৬৯ ]
#শ্ৰীমন্ত
ভগবতী তখন পদ্মাবতীকে সাথে লইয়া আকাশ পথে
যাইতেছিলেন। তিনি শ্রীমন্তের কাণ্ডটা দেখিয়া পদ্মকে
বলিলেন, “দেখিলে পদ্মা, খুল্লনার ছেলে শ্ৰীমন্ত একটা কত
বড় বােকা, কোটালের কথায় সে অনায়াসে অমন সোণার
মুকুটটা সাগরের জলে ফেলিয়া দিল ! খুল্লনা বােজ আমার
পূজা করে, আমি তাহাকে অভিশাপ দিয়া স্বর্গ হইতে
পৃথিবীতে আনিয়াছি, বনে দেখা দিয়া তাহার মঙ্গল করিবার
জন্য তাহার কাছে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি ; অাজ তাহার ছেলে
খামখেয়ালী করিয়া লক্ষ টাকার সোনার মুকুটটা নষ্ট করিয়া
ফেলিতে বসিয়াছে, ইহা আমি স্বচক্ষে দেখিয়া সহ্য করতে
পারিব না।
এক মাত্র পুত্র শ্ৰীমন্তকে সিংহলে পাঠাইয়া
খুল্লনা কাঁদিয়া কাটিয়া ভাবিয়া চিন্তিয়া দিন কাটাইতেছে, চল
পদ্মা, এই মুকুট লইয়া তাহার কাছে গিয়া একটু প্রবােধ দিয়া
আসি।” এই বলিয়া দেবী জল হইতে মুকুট তুলিয়া লইয়া
উজানী নগরের দিকে চলিলেন।
খুল্লনা তখন ঘরে জানালার ধারে বসিয়া নীলাকাশের
দিকে চাহিয়া শ্ৰীমন্তের কথা ভাবিতেছিল। ভগবতী যাইয়া
তাহাব সম্মুখে মুকুটটা ফেলিয়া দিলেন। শ্ৰীমন্তের মুকুট
দেখিয়া খুল্লনা চমকিয়া উঠিল, একি! এ যে শ্ৰীমন্তের
মাথার টোপর, বাণিজ্যে যাইবার সময় সে নিজেই যে উহা
শ্ৰীমন্তের মাথায় পরাইয়া দিয়াছে, আজ কত দিন হয় শ্ৰীমন্ত
[ ৭০ ]
শ্ৰীমন্ত
সিংহল যাত্রা করিয়াছে, এত দিন পরে এই মুকুট কোথা
হইতে আসিল ? মায়ের প্রাণ কঁদিয়া উঠিল, চোখের জলে
তাহার বুক ভাসিয়া গেল। সে ভগবতীকে ডাকিয়া বলিতে
লাগিল, “মা, আমার আবার কোন্ সর্বনাশ হইল ?”
ভগবতী তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন,
‘খুল্লনা, তুমি দিন রাত কান্নাকাটি কর, এই জন্য তােমাকে
প্রবােধ দিতে আসিলাম। তােমার কোনই চিন্তা নাই, তুমি
নিশ্চিন্ত হইয়া থাক। শ্ৰীমন্ত নিরাপদে সিংহলে পেঁছিয়াছে।
সেখানকার কোটালের কথায় সে এই টোপর সমুদ্রের জলে
ফেলিয়া দিয়াছিল, আমি তাহা তুলিয়া লইয়া আসিয়াছি।
তাহার জন্য তোমার কোনাে চিন্তা নাই, আমি বিপদে আপদে
তাহাকে রক্ষা করিব, তারপর সেখানকার রাজকতা বিবাহ
করাইয়া আমি তােমার কোলের ছেলে আবার তােমার কোলে
ফিইয়া আনিব।”
খুল্লনা বলিল, “মা, আপনার দয়াতেই আমি পুত্রের মুখ
দেখিয়াছি, যাহা আপনি নিজে দয়া করিয়া দিয়াছেন, তাহা
যদি আপনি না রক্ষা করেন, তবে আর কে রক্ষা করিবে ?
আমি ছিরাইকে আপনার পায়ে সঁপিয়া দিয়াছি, এখন আপনার
চরণই আমার ভরসা।”
খুল্লাকে প্রবােধ দিয়া ভগবতী কৈলাসে চলিয়া
গেলেন।
( ৭১ ]
শ্ৰীমন্ত
শ্ৰীমন্ত
মন্ত নানা জিনিসে ভেট সাজাইয়া রাজসভায় গিয়া
উপস্থিত হইল।
রাজা ভেটের জিনিস দেখিয়া
পরম আনন্দিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কে, কি জন্য
সিংহলে আসিয়াছ ?”
শ্ৰীমন্ত বলিল, “মহারাজ, আমার বাড়া বঙ্গদেশে,
উজানী নগরে। আমরা জাতিতে গন্ধবণিক, নাম শ্ৰীমন্ত দত্ত।
রাজা বিক্রনকেশরার দেশে বাণিজ্য করিবার জন্য আপনার
রাজ্যে আসিয়াছি।”
রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি কি জিনিষ লইয়া বাণিজ্য
করিতে আসিয়াছ ?”
শ্ৰীমন্ত বলিল, “মহারাজ, আমাদের দেশে যে সব জিনিষ
বেশী পাওয়া যায়, তাহা লইয়াই বাণিজ্য করিতে আসিয়াছি।
সে সব জিনিসের বদলে যাহা আপনার রাজ্যে বেশী পাওয়া
যায় এবং আমাদের দেশে মোটেই পাওয়া যায় না বা কল্প
পাওয়া যায় তাহা লইয়া যাইব। আমি নারিকেলের বদলে
শঙ্খ, বিড়ঙ্গের বদলে লবঙ্গ, বহেরার বদলে শুপারী, সিন্দুরের
[ ৭২ }
৯শ্ৰীমন্ত বদলে হিঙ্গুল, পাট ও শণের বদলে চামর, চই এর বদলে চন্দন, ঝিনুকের বদলে মুক্তা, লবণের বদলে সৈন্ধব লইয়া যাইব। ইহা ছাড়া মাষ, মসুরী, চিনা, মুগ, তিল, মাড়ুয়া, ছােলা ইত্যাদি লইয়া আসিয়াছি।” রাজা বলিলেন, “বেশ, তুমি আমার রাজ্যে ইচ্ছামত বাণিজ্য করিতে পার।” রাজ-সভায় সভা-পণ্ডিত অগ্নিশর্মা বসিয়াছিলেন, শ্ৰীমন্ত তাঁহাকেও কিছু ভেট দিয়া প্রণাম করিল। পণ্ডিত সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “পথে কুশলে আসিয়াছ ত? কোনও কষ্ট হয় নাই ? পথে কি কি দেখিলে বল শুনি।” শ্ৰীমন্ত বলিতে লাগিল, “রাজার আদেশে সাত ডিঙ্গা লইয়া কত নদনদী বাহিয়া কত দেশ বিদেশের মধ্য দিয়া ত্রিবেণীর ঘাটে আসিলাম, রাত্রি দিন নৌকা বাহিয়া সাগর- সঙ্গমের কাছে মগরায় আসিয়া ঝড় বৃষ্টিতে বহু কষ্ট পাইলাম, ভগবতী দয়া করিয়া সে বিপদে রক্ষা করিলেন। সেখান হইতে যাত্রা করিয়া শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথ দেব দেখিয়া কালীদহে পেীছিলাম। কালীদহে যাহা দেখিলাম, তাহা জীবনে কেন স্বপ্নেও কোনাে দিন দেখি নাই। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য, দেখি- লম সমুদ্রের জলের উপর এক প্রকাণ্ড পদ্মের বন, একটা পদ্মের উপর বসিয়া একটা সুন্দরী স্ত্রীলােক একটা হাতী মস্ত ধরিয়া একবার গিলিতেছে, আবার বমি করিয়া ফেলিতেছে, আবার গিলিতেছে। তাহার ভারে পদ্মটা থর থর করিয়া কঁপিতেছে, কিন্তু ডুবিতেছে না।” রাজা ও পাত্র মিত্র সকলেই শ্ৰীমন্তের কথা শুনিয়া হাসিয়া উঠিলেন। তাঁহাদের মনে হইল, বহুদিন পূর্বে আর এক সদাগর এমনি কথা বলিয়াছিল, কিন্তু কাজে কিছুই নহে, সব মিছে কথা। এবারও ঠিক তাই। শ্ৰীমন্ত তাহাদিগকে হাসিতে দেখিয়া বলিল, “আপনারা আমার কথা শুনিয়া হয়ত মনে করিতেছেন, আমি মিথ্যা কথা বলিতেছি, কিন্তু আমি ধৰ্ম্ম সাক্ষা করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি, আমি যাহা বলিয়াছি তাহার এক বর্ণও মিথ্যা নহে। আপ- নারা যদি দয়া করিয়া আমার সাথে কালীদহে যান, তবেই দেখিতে পারিবেন, আমার কথা সত্য কিনা। যদি আমার কথা মিথ্যা হয়, তবে আমার সাত ডিঙ্গা অাপনায় লুটিয়া লইয়া মশানে আমাকে হত্যা করিবেন।” রাজা বলিলেন, “বেশ কথা, যদি তুমি আমাকে কমলে কামিনী’ দেখাইতে পার, তবে আমি অর্ধেক রাজ্য আর রাজ- কন্যা সুশীলাকে তোমায় দান করব; কিন্তু যদি মিথ্যা হয়, তবে তোমার সাতডিঙ্গা ত যাইবেই তা ছাড়া মানে তোমার প্রাণ যাইবে। তখনই রাজা পাত্র মিত্র লইয়া কালীদহে চলিলেন। [ ৭৪ ]
৯শ্ৰীমন্ত
রাজ্যের লােকেরা যখন সেই অদ্ভুত কথা শুনিল, তখন
তাহারাও সেই দৃশ্য দেখিবার জন্য সাথে সাথে চলিল।
কালীদহে যাইয়া দেখে, কোথাও কিছুই নাই, কেবল
সাগরের নীল জল ঢেউ খেলিয়া বহিয়া চলিয়াছে, পদ্মবনের
নামগন্ধও সেখানে নাই। রাজা রাগিয়া আগুন হইয়া গেলেন।
পাত্রমিত্র সকলে বলিতে লাগিল, “কি সদাগর, কোথায়
তোমার কমলে কামিনী ? ঠাট্টা করিবার বুঝি আর যায়গা
পাও নাই, মহারাজের সাথে ঠাট্টা তামাসা করিতে
আসিয়াছ ?”
শ্ৰীমন্ত মহারাজের সম্মুখে জোড় হাত করিয়া বলিল,
“দোহাই মহারাজ, আমি আপনার কাছে এক তিলও মিথ্যা
কথা বলি নাই; আমি স্বচক্ষে যাহা দেখিয়াছি, তাহাই
বলিতেছি। হয়ত ইহা কোনও দেবতার মায়া, এত লোকজন
দেখিয়া তিনি লুকাইয়া গিয়াছেন। আমার আর কোনও
সাক্ষা নাই, আমি তাহা দেখিয়া আমার মাঝি-মাল্লাদিগকে
দেখাইয়া ছিলাম, তাহাদিগকে আপনি জিজ্ঞাসা করিয়া
জানিতে পারেন।”
রাজা মাঝিদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন। মাঝিরা বলিল,
“মহারাজ, সাধু আমাদিগকে সে কথা বলিয়াছিলেন সত্য, কিন্তু
আমরা কেহই কিছু দেখিতে পাই নাই।”
পাত্রমিত্র রাজাকে বলিল, “মহারাজ, এ বেটা সাধুও
[ ৭৫ ]
৯শ্ৰীমন্ত
নয়, সদাগরও নয়, নিশ্চয়ই এ বেটা ডাকাত-বদমায়েস, চুরি
ডাকাতি করিতে এদেশে আসিয়াছে। ইহার উচিত শাস্তি
হওয়া দরকার।”
রাজা তখন সিপাহী লস্করদিগকে শ্ৰীমন্তের সাত ডিঙ্গা
লুট করিয়া রাজভাণ্ডারে লইয়া যাইতে এবং
শ্ৰীমন্তকে
বাঁধিয়া দক্ষিণ মনে নিতে আদেশ করিলেন। সেখানে
তাহার প্রাণ দণ্ড হইবে। তখনই সিপাহীরা শ্ৰীমন্তের গায়ের
সমস্ত মণিমুক্তার অলঙ্কার ও সাজ পােষাক কাড়িয়া লইয়া
তাহাকে নৌকার দড়ি দিয়া বাঁধিয়া ফেলিল। তাহার
বাণিজ্যের সমস্ত জিনিষ-ঘােড়া বলদ, মহিষ ও গাড়ী বোঝাই
করিয়া রাজভাণ্ডারে লইয়া যাওয়া হইল। শ্ৰীমন্ত রাজার
পায়ে পড়িয়া চোখের জলে মাটী ভিজাইয়া কত কাঁদিল !
কিন্তু পাষাণ রাজা তাহার সে কান্না কানেই তুলিলেন না।
তাহাকে মনে লইয়া যাওয়ার জন্য আদেশ করিয়া তিনি
হাসিমুখে পাত্রমিত্রদিগকে লইয়া রাজসভায় চলিয়া গেলেন।
[ ৭৬
শ্ৰীমন্ত
১৫
শ্ৰীমন্তকে
মন্তকে তখনই মসানে লইয়া যাওয়া হইল। সেখানে
তাহার মাথা কাটা হইবে। ঘাতক তীক্ষ্ণ খড়গ লইয়া
আসিয়া তাহার পাশে দাঁড়াইল। শ্ৰীমন্ত চোখের জলে ভাসিতে
ভাসিতে তাহার নৌকার মাঝিদিগকে কাছে ডাকিয়া বলিল,
“ভাই, এখনই ত আমার প্রাণ যাইবে, আর তােমাদের সাথে
দেখা হইবে না। মায়ের সাথেও আর জীবনে দেখা হইল না।
আমাদের বাণিজ্যের জিনিস সবই রাজা লুঠ করিয়া লইয়া
গিয়াছেন, তােমরা আর এদেশে থাকিও না। ভিক্ষা করিয়া
দেশে চলিয়া যাও। দেশে যাইয়া রাজাকে বলিও, শ্ৰীমন্ত
পিতার দেখা পায় নাই, সিংহল-রাজের হুকুমে মসানে তাহার
প্রাণ গিয়াছে। রাজা যেন আমার দুই মাকে খাইতে দেন,
তঁাহাদের যেন কোনও কষ্ট না হয়। গুরুমহাশয়কে আমার
প্রণাম জানাইয়া বলিও, তাহার কথাতেই শ্ৰীমন্ত সিংহলে
আসিয়া প্রাণে মরিল। দুৰ্বলাকে বলিও, সে যেন মায়েদের
সেবা শুশ্রুষা করে। আমি মায়ের এক ছেলে, মা যখন
আমার মরার খবর পাইবেন, তখনই যে তিনি আমার শােকে
ছটফট করিয়া মরিয়া যাইবেন। তাহাকে কি বলিয়া এই
সংবাদ দিবে ভাই ? মা যে আমার কত আশা করিয়া বসিয়া
[ ৭৭ ]
;
অাছেন। এই কি তাঁহার আশার ফল ফলিল ? মাকে
আমার এমন করিয়া মরার কথা বলিও না ; তাহাকে বলিও
নৌকা ডুবি হইয়া শ্ৰীমন্ত মরিয়াছে। আর আমার বলার
কিছুই নাই ভাই, তােমরা দেশে ফিরিয়া যাও।”
কোটাল তাহার বিলম্ব দেখিয়া তাড়াতাড়ি কথাবার্তা
শেষ করিবার জন্য গালিগালাজ আরম্ভ করিল। শ্ৰীমন্তের
কাপড়ের আঁচলে কয়েকটা সােনার মােহর বাঁধা ছিল, সে
তাহা কোটালের হাতে দিয়া বলিল, “ভাই কোটাল, আর একটু
সময় দাও ভাই, আর ত এ জীবনে পৃথিবীর মুখ দেখিব না !
জীবনে কোনই ধৰ্ম্মকাজ করিতে পারি নাই, অদৃষ্টের দোষে
অজি মনে প্রাণ যাইবে। আমায় একটু সময় দাও ভাই,
মরার সময় আমি একটু তর্পণ করিয়া লই।” টাকা হাতে
পাইয়া কোটাল মনে মনে ভারী খুসী হইয়া বলিল, “নাও
তাড়াতাড়ি সারিয়া নাও, আর বেশী সময় দিবার হুকুম নাই।”
সেই মসানের ধারে একটা সরােবর ছিল। শ্ৰীমন্ত
তাহাতে স্নান করিয়া তিলক ফোঁট। কাটিয়া ঘাটের উপর
তর্পণ করিতে বসিল। তর্পণ শেষ করিয়া সে সূৰ্য্যকে নমস্কার
করিয়া বলিতে লাগিল, “সূৰ্য্য দেব,তুমি ত পৃথিবীর সবই দেখি-
ছে, আমি যে কমলে কামিনী দেখিয়াছি তাহা ত মিথ্যা কথা
নহে, সত্য কথা বলিয়া আজ আমার প্রাণ যাইতেছে। যদি
আমার কথা সত্য হয়, তবে যেন আমার প্রাণ রক্ষা হয়, আর
( ৭৮ !
যদি মিথ্যা কথা বলিয়া থাকি, তবে যেন প্রাণ যায় । আমার
আর অন্য কোনও প্রমাণ নাই, তুমিই আমার একমাত্র সাক্ষী।”
শ্ৰীমন্ত এইরূপে সূৰ্যের স্তব করিতেছে ; কোটাল তাহার দেরি
দেখিয়া চুল ধরিয়া তাহাকে উপরে টানিয়া তুলিতে তুলিতে
বলিতে লাগিল, “বেটা ভণ্ড, ডাকাতি করিতে সিংহলে আসিয়া
আবার লােক দেখানাে পূজা তর্পণ আরম্ভ করিয়াছি, এখনই
এই মাথা দুইখণ্ড হইয়া মাটাতে গড়াগড়ি করিবে, মরার সময়
আবার কিসের পূজা?” কোটালের সাথে সিপাহী বরকন্দাজ
যাহারা আসিয়াছিল, তাহারা শ্ৰীমন্তের চুলের মুঠা ধরিয়া
তাহাকে হিছড়িয়া টানিয়া উপরে তুলিয়া ঘাতককে মাথা কাটিয়া
ফেলিতে হুকুম করিল। ঘাতক খড়গ উঠাইল, সূর্যের কিরণে
খড়গ ঝিক্ মিক্ করিয়া ঝলসিয়া উঠিল। এমন সময় শ্রীমন্তের
চক্ষু হঠাৎ সরোবরের জলে পড়িল, সে দেখিল জলে ফুল ও
দূর্বা ভাসিতেছে, তখনই তাহার মায়ের কথা মনে পড়িল,
যাত্রা করিয়া সিংহলে আসিবার সময় তাহার মা তাহাকে
ভগবতীর আশীর্বাদা ফুলদূর্বা সাথে দিয়া বলিয়া দিয়াছিল,
সম্পদে বিপদে ভগবতীর স্মরণ করিবে। কিন্তু কই, সে ত
একবারও ভগবতীকে স্মরণ করে নাই। সে তখন কোটালের
পায়ে ধরিয়া বলিতে লাগিল, “ভাই কোটাল, এতক্ষণ যখন
সময় দিয়াছ, আর একটু সময় আমাকে ভিক্ষা দাও, এই মরণ
কালে তোমার চরণে আমার এই একমাত্র শেষ প্রার্থনা, আমি
[ ৭৯ ]
শ্ৰীমন্ত একবার জীবনের শেষ প্রাণ ভরিয়া মা ভগবতীকে ডাকিয়া লই।” তাহার অমন কথা শুনিয়া নিষ্ঠুর কোটালের মনেও একটু দয়া হইল। সে বলিল, “এইবার কিন্তু শেষ, আর চালাকি করিলে চলিবে না, যাহাকে ডাকিতে হয় প্রাণ ভরিয়া ডাকিয়া নেও।” শ্ৰীমন্ত চোখ বুজিয়া বসিয়া ভগবতীর মূর্তি ধ্যান করিতে লাগিল। তাহার ধ্যানে কৈলাশে ভগবতীর আসন নড়িয়া উঠিল। তাহা দেখিয়া তিনি পদ্মাবতীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “পদ্মা, তুমি গণিয়া দেখ দেখি, দেবতা, মানুষ, যক্ষ, রক্ষ, পিশাচ, নাগ, দৈত্য, দানব কে আমাকে ডাকিতেছে ? তাহার ধ্যানে আমার আসন টলিতেছে—মন চঞ্চল হইয়া উঠিতেছে।” পদ্মাবতী গণিয়া বলিলেন, “ভগবতি, তােমার দাসী খুল্ল- নার ছেলে অাজ সিংহলের মসনে বসিয়া তােমাকে ডাকিতেছে। এখনই মানে রাজার হুকুমে তাহার প্রাণ যাইবে, এই মরণ সময়ে সে তােমাকে ডাকিতেছে। তুমিই তাহার এই মৃত্যু ঘটাইলে, তুমি মায়া করিয়া কালীদহে কমলে কামিনী হইয়া- ছিলে, শ্রমন্ত তাহা দেখিয়া রাজাকে সেই কথা বলিয়াছিল, রাজা কমলে কামিনী দেখিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু শ্ৰীমন্ত তাহা দেখাইতে পারে নাই, সেই অপরাধে এখনই মসানে তাহার প্রাণ যাইবে। খুল্লনা দিনরাত তােমার পূজা করে, সেই পূজার ফলে বুঝি তুমি তাহার একমাত্র পুত্রকে এমন করিয়া মারিয়া [ ৮০ ]
শ্রীমন্ত
ফেলিবার ফন্দি করিয়াছ? ছেলে মরিলে খুল্লনাও সেই শােকে
মারা যাইবে, তাহা হইলে পৃথিবীতে আর কেহ তােমার পূজা
করিবে না। পূজা প্রচার করিবার জন্য এতদিন যত চেষ্টা
করিলে সমস্তই বৃথা হইল। এখন লােকে তোমার নিন্দা ছাড়া
পূজা কখনই করিবে না। এখনই গিয়া শ্ৰীমন্তকে রক্ষা কর।”
পদ্মবতার কথা শুনিয়া শ্ৰীমন্তের জন্য ভগবতীর বড়ই
দুঃখ হইল, আর রাগ হইল সিংহলের রাজার উপর। তিনি
তখনই তঁাহার আট হাজার যােগিনীকে সাজাইয়া সাথে লইয়া
নিজে দশভুজা সিংহবাহিনী মূর্তিতে দশ হাতে দশ অস্ত্র ধরিয়া
যুদ্ধের জন্য সিংহলে চলিলেন। ভূত, প্রেত ও যােগিনীগণের
চীৎকারে-অস্ত্রের ঝন্ঝনিতে স্বর্গের দেবতারা পৰ্যন্ত ভয়ে
কপিতে লাগিলেন। আজ বুঝি ভগবতী পৃথিবী রসাতলে
দিতে যাইতেছেন। স্বর্গের রাজা ইন্দ্র তখনই দেবর্ষি নারদকে
ভগবীর কাছে পাঠাইয়া দিলেন। নারদ যাইয়া দেবীর পায়ের
ধূলা মাথায় লইয়া বলিলেন, “মা, একি! আজ কি আপনি
স্বর্গ মর্ত্য পাতালে প্রলয় ঘটাইবেন ? আজ আপনিই যে স্বয়ং
যুদ্ধে সাজিয়াছেন ? একজন মানুষ রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে
আপনার এত সাজ সজ্জার ত কোনই দরকার নাই। আপনি
ইচ্ছা করিলেই স্বর্গ মর্ত্য পাতাল ওলট পালট করিয়া দিতে
পারেন। মশা মারিতে কামান দাগিবার
কামান দাগিবার প্রয়ােজন কি ?
মানুষের বিরুদ্ধে আপনার যুদ্ধ কিছুতেই শােভা পায় না।
[ ৮১ ]
মম্ভe আপনি দয়া করিয়া এসব যুদ্ধের আয়ােজন পরিত্যাগ করিয়া বৃদ্ধা রুগ্ন ব্রাহ্মণী বেশে সিংহলে যাইয়া কোটালের নিকট হইতে শ্ৰীমন্তকে চাহিয়া লইয়া আসুন। যদি না দেয়, তবে যুদ্ধের আয়ােজন করিবেন।” নারদের কথায় ভগবতী সেই ভীষণ মূর্তি পরিত্যাগ করিয়া বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী সাজিলেন। তাহার মাথায় পাকাচুল, মুখে একটীও দাঁত নাই, গায়ের চামড়া ঝুলিয়া পড়িয়াছে, শরীর একেবারে রােগ, মাথা ঠক্ ঠক করিয়া নড়ে। তিনি লাঠি ভর করিয়া বাম কঁাখে ভিক্ষার ঝুলি লইয়া নুইয়া নুইয়া ধীরে ধীরে হাটিতে হাটিতে যাইয়া মসানে উপস্থিত হইলেন। তখনো শ্ৰীমন্ত ধ্যানে বসিয়া আছে, ঘাতক কাছেই খড়গ লইয়া দাড়া- ইয়া রহিয়াছে। ভগবতী কোটালের মাথায় হাত দিয়া আশী- বাদ করিয়া বলিলেন,“বাবা কোটাল, আমি বড় গরীব বামুণের মেয়ে, তােমার কাছে একটী ভিক্ষার জন্য আসিয়াছি। দেখি- তেছ আমার শরীর কত রােগা, এমন কেই আমার নাই যে একবার আমার দিকে ফিরিয়া চায় । এই নাতিটা আমার সম্বল। ছেলে মানুষ খেলিতে খেলিতে এদেশে আসিয়া পড়ি আছে, বুদ্ধিশুদ্ধি ত আর তেমন হয় নাই, কাজেই কি বলিতে কি বলিয়াছে। তুমি বাবা ইহাকে ছাড়িয়া দাও। আমার আশীর্বাদে তুমি ধনে পুত্রে লক্ষীবন্ত হইবে। আমার দুঃখের কথা কি বলিব বাবা, ছেলেবেলায় তপস্যা করিয়া কপাল- [ 8 ]
.???
মশানে শ্ৰীমন্ত
बागल
পৃঃ-৮
No text on this page.
শ্ৰীমন্ত দোষে এমন স্বামী পাইয়াছি যে, তঁাহার সম্বলের মধ্যে আছে একটা ষাড়, ষাঁড়ে চড়িয়া শ্মশানে মনে ঘুরিয়া বেড়ান, আর গাঁজা ভাঙ্গ সিদ্ধি খান, সংসারের কোনাে ধার ধারেন না। ভাই ছিল আমার একটী, সে সমুদ্রে ডুবিয়া মরিল, স্বামী বিষ খাই- লেন। বড় দুঃখের কপাল বাপু আমার। দাও বাবা, বড় বেলা হইয়া গেল, অনেক দূর যাইতে হইবে, হাটিতে আর পারি না, ছিরার কাঁধে ভর দিয়া কোনও রকমে ধীরে আস্তে যাইব, ছিরাকে ভিক্ষা চাই।” কোটাল বলিল, “আমি রাজার হুকুম পালন করিতে আসিয়াছি মাত্র, ইহাকে ছাড়িয়া দেওয়ার আমার কোনই ক্ষমতা নাই। তুমি ইহার আশা ছাড়িয়া দাও, রাজা ইহার প্রাণদণ্ডের হুকুম দিয়াছেন। যদি নিতান্তই ইহার প্রাণ ভিক্ষা চাও, তবে রাজার কাছে যাও, তিনি বড় দানশীল, দয়া করিলেও করিতে পারেন। আমি যদি তােমাকে ইহার প্রাণ দান করি তবে রাঙ্গা আমার প্রাণ লইবেন।” কোটালের কথা শুনিয়া ভগবতী পদ্মাবতীকে স্মরণ করিলেন। পদ্মা আসিয়া ভগবতীর কাণে কাণে বলিলেন, “রাজসভায় অত লােকের মাঝে তুমি কেন যাইবে ? শ্ৰীমন্তকে কোলে লইয়া বস, দেখি কোটাল কেমন করিয়া তাহার প্রাণ লইতে পারে।” ভগবতী হাসিয়া শ্ৰীমন্তকে কোলে লইয়া বসিলেন। [ ৮৩ ]
৯শ্রীম
কিন্তু
০
ঘাতক কোটালকে বলিল, “কোটাল ভাই, ব্যাপার কি ?
বুড়ী একা আসিয়াছিল, এখন দেখি দুই জন হইল। এই
মসানে বুড়ী যে হঠাৎ কোথা হইতে আসিল, তাহাও দেখিলাম
। বুড়ী সদাগরের প্রাণ ভিক্ষা চাহিল, তাহা না পাইয়া
তাহাকে কোলে করিয়া বসিল। আশী বছরের বুড়ী,
তাহার চোখ দিয়া যেন রাগে আগুন জ্বলিতেছে । আমার
মনে হয়, কোনও দেবতা ইহাকে রক্ষা করিতে ছদ্মবেশে
আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। তাহ না হইলে এত সিপাহী
লস্কর দেখিয়াও বুড়ীর মনে ভয় হয় না। আজ যে কপালে
কি আছে কে জানে ? যদি সদাগরকে ছাড়িয়া দিয়া যাই,
তবে রাজার হাতে আমাদের প্রাণ যাইবে ; আর যদি সদাগরের
প্রাণ লইতে চাই, তবে না জানি মনে আমাদেরই প্রাণ যায়।”
কোটাল তাহার কথায় গর্জিয়া বলিল, “এই বুড়ী
বামণীকে ঠেলিয়া ফেলিয়া সদাগরের চুলের মুঠা ধরিয়া মাথাটা
কাটিয়া লও ”
ঘাতক যেমন এমন্তের মাথায় খড়ের ঘা মালি,
খড়গখান। অমনি ঝম্ ঝম্ করিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িয়া গেল।
শ্ৰীমন্তের গায়ে একটুও কাঁটার আঁচড় লাগিল না। এক দুই
তিন করিয়া কয়েকখানা খড়গ শ্রীমন্তের গায়ে লাগিয়া দুই খণ্ড
হইয়া গেল, কিন্তু শ্রীমন্তের কিছুই হইল না দেখিয়া কোটাল
ভাবিল, এই বুড়াই যত অনর্থের মূল, ইহাকে সরাইতে না
{ ৪৪ ]
শ্ৰীমন্ত
পারিলে আর কাৰ্য্য সিদ্ধি হইবে না, বুড়ী যেন কি মায়া জানে।
এই ভাবিয়া সে ব্রাহ্মণীকে বলিল, “দ্যাখ, বুড়ি, এখনই এখান
হইতে দূর হ, তাহা না হইলে তাের মাথা এই মসানের ধূলায়
লুটাইবে। স্ত্রীলোক বলিয়া আমরা এতক্ষণ কিছু বলি নাই,
আর আমরা তাহা মানিব না, ডাইনী বুড়ী তুই কোথা হইতে
আসিয়া আমাদের এক পলকের কাজে এত গােলমাল
বাঁধাইয়া দিলি। এখনই সরিয়া যা, না গেলে এই সিপাহী
লক্কর দিয়া আগে তাের মাথা কাটাইব।”
ভগবর্তী কোনও কথা বলিলেন না; যেমন বসিয়াছিলেন,
এমনুকে কোলে লইয়া তেমনি বসিয়া রহিলেন। কোটাল
তঁাহার গায়ে খড়গ মারিল, খড়গ দুই খণ্ড হইয়া ভাঙ্গিয়া
পড়িল। সিপাহী লস্কর আসিয়া তাঁহাকে ঠেলিয়া ফেলিবার
জন্য টানাটানি করিতে লাগিল। ইহা দেখিয়া পদ্মাবত ঘণ্টা
বাজাইয়া নাগিনী, ডাকিনী, দানা ও পিশাচদিগকে ডাকিলেন।
তাহারা যে যাহাকে সম্মুখে পাইল, তাহারই ঘাড় মটকাইয়া
রক্ত খাইতে লাগিল। রাজার সিপাহী লস্করের সহিত
ভগবতীর ডাকিনী, নাগিনী, ভূত, পিশাচদিগের ভীষণ যুদ্ধ
বাঁধিয়া গেল।
একে একে রাজার সমস্ত সৈন্য সামন্ত মরিয়া
গেল দেখিয়া কোটাল উপায় না দেখিয়া রাজাকে গিয়া
জানাইল, “মহারাজ, সদাগরকে লইয়া মনে গেলাম, কিন্তু
এক ব্রাহ্মণী আসিয়া সর্বনাশ ঘটাইল। সে সৈন্য সামন্ত
[ ৮৫ ]
মন্ত
লইয়া আসিয়া আমাদের সমস্ত সিপাহী লস্কর মারিয়া
ফেলিয়াছে। আমার মনে হয় বুড়ী কোনও রাজার দূত
হইয়া আসিয়াছে, কোনও বিদেশী রাজা নিশ্চয়ই যুদ্ধ করিবার
জন্য আসিয়া আপনার রাজ্যে উঠিয়াছে ; আর রক্ষা নাই
মহারাজ, এবার বুঝি সবংশে মরিতে হয় !”
কোটালের কথা শুনিয়া রাজা তখনই সেনাপতিকে
সৈন্য সাজাইতে হুকুম দিলেন। রাজ্যময় সাজ সাজ রব
পড়িয়া গেল। হাতীশালে হাতী, ঘোড়াশালে ঘােড়া, দুর্গে সৈন্য
সাজিতে লাগিল। যুদ্ধের বাদ্যে কানে তালা লাগিয়া গেল।
শ্ৰীমন্ত যুদ্ধের বাজনা ও সৈন্য-সামন্তের কোলাহল
শুনিয়া ভগবতীকে বলিল, “মা, আপনি যে-ই হউন, এখন
আমার জন্য কেন আপনি বিপদে পড়িবেন ?
রাজা বড় দুরন্ত, আর তাহার যত সৈন্য সামন্ত, তাহাতে সে
এক নিমেষে সমস্ত মারিয়া কাটিয়া লণ্ডভণ্ড করিয়া ফেলিবে।
আপনি স্ত্রীলােক হইয়া এই সামান্য লােকজন লইয়া অত সৈন্য
সামন্তের সাথে কিছুতেই পারিয়া উঠিবেন না। ঐ শুনুন,
রাজার সৈন্য সামন্ত এইদিকে আসিতেছে।”
শ্ৰীমন্তের কথা শুনিয়া ভগবতী হাসিয়া কহিলেন,
“তােমার কোনাে ভয় নাই বাছা, রাজা লোকজন লইয়া
বাজনা বাজাইয়া তাহার মেয়ের সাথে তােমার বিবাহ দিতে
আসিতেছে।”
সরিয়া পড়ুন।
[ ৮৬ ]
গবতী আরও দৈত্য, দানব, ভূত, প্রেত, যক্ষ, রক্ষ, পিশাচ,
নাগিনী, যােগিনী, ডাকিনী ও ভৃতিকে স্মরণ করিলেন।
অমনি ভীষণ ভীষণ অস্ত্রশস্ত্র লইয়া তাহার আসিয়া যুদ্ধস্থলে
উপস্থিত হইল। ভগবতী নিজে বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী বেশ পরিত্যাগ
করিয়া দশহাতে দশ অস্ত্র লইয়া দশভুজা মূর্তিতে দেখা
দিলেন।
দুই দলে ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ভগবতীর সেনারা
রাজার সৈন্যদিগের মাথা চিবাইয়া রক্ত শুষিয়া খাইয়া
আনন্দে তাথৈ তাথৈ করিয়া নাচিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিল।
এইরূপে রাজার সৈন্য, সামন্ত, সিপাহী, লস্কর, হাতী, ঘােড়া,
অস্ত্রশস্ত্র সবই শেষ হইয়া গেল। মসানে রক্তের ঢেউ
খেতে আরম্ভ করিল, মড়া পড়িয়া পড়িয়া পাহাড়ের মত
উচু হইয়া উঠিল।
দূতের মুখে যখন রাজা শুনিলেন যে, তাহার সমস্ত
সৈন্যই মরিয়াছে তখন তাহার প্রাণ চমকিয়া উঠিল। দূত
বলিল, “মহারাজ, আর রক্ষা নাই, এবার সবংশে মরিতে
হইবে।
স্বয়ং ভগবতী যুদ্ধে আসিয়াছেন।
যদি রক্ষা
[ ৮৭ ]
৯শ্ৰীমন্ত
পাইতে চান তবে এখনই মনে গিয়া তঁাহার পায়ে পড়িয়া
ক্ষমা ভিক্ষা করুন, নচেৎ আর উপায় নাই মহারাজ।”
রাজা তখনই উদ্ধশ্বাসে মসানে গিয়া গলায় কাপড় দিয়া
ভগবতীর পায়ের উপর উপুর হইয়া পড়িয়া বলিতে লাগিলেন,
“মা, আমাকে ক্ষমা করুন, আপনি দয়া না করিলে আর রক্ষা
নই, আমার রাজ্য ছারেখারে যাইবে। আমি জানি না মা,
আপনি যুদ্ধে আসিয়াছেন, তাহা জানিলে আমি আগেই আসিয়া
আপনার পায়ে ক্ষমা চাহিতাম। আপনার জ্ঞান সন্তানকে
ক্ষমা করুন ।”
রাজার স্তবস্তুতিতে দেবীর প্রাণ দয়ায় গলিয়া গেল।
তিনি বলিলেন, “শালবান, তুমি বড়ই অন্যায় কাজ করিয়াছ ;
এই বালক আমার দাস, সে বাণিজ্য করিতে সিংহলে
আসিয়াছে, আর তুমি তাহার সাত ডিঙ্গা লুঠ করিয়া লইয়া
মসানে তাহার প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়াছ । সে তোমার
রাজ্যে চুরিও করে নাই, নিতান্ত ছেলেমানুষ সে, বিনা অপরাধে
তাহাকে তুমি অমন শাস্তির হুকুম দিলে। যদি তুমি মন্তকে
তাহার সমস্ত জিনিস ফিরাইয়া দিয়া পরম সমাদরে তাহার
সহিত তােমার কন্যা সুশীলার বিবাহ দেও, তবে আমি তােমর
সব অপরাধ ক্ষমা করিব।”
রাজা বলিলেন, “মা, এখন জানিলাম যে, সদাগর
আপনার ভক্ত। আগে জানিলে আমি ইহার প্রতি এমন
[ 88 ]
শ্ৰীমন্ত ব্যবহার কখনই করিতাম না। সদাগর রাজসভায় পাত্র-মিত্রের সম্মুখে এক অসম্ভব কথা বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল। আমাকে কালীদহে কমলে কামিনী দেখাইতে চাহিয়াছিল ; যদি দেখাইতে পারে, তবে তাহার সাত নৌকা আমার রাজ- ভাণ্ডারে যাইবে, আর দক্ষিণ মনে তাহার প্রাণ দণ্ড হইবে । কিন্তু সদাগর তাহা দেখাইতে পারে নাই, এমন কি মাঝি- মাল্লারাও পর্যন্ত সে কথা অস্বীকার করিয়াছে। মা, আপনি আমার প্রতি একটা মস্ত বড় অন্যায় আদেশ করিয়াছেন, আমি জাতিতে ক্ষেত্র হইয়া কিরূপে বণিকের ছেলের সাথে মেয়ের বিবাহ দিব ? আমাকে এজন্য যে সমাজে নিন্দা পাইতে হইবে।” ভগবর্তী বলিলেন, “আমার কথার চেয়ে তােমার সমাজটা কি এমনই বেশী হইল ? আমি বলিতেছি, এজন্য সমাজে তােমার কোনই নিন্দা হইবে না। শ্ৰীমন্ত তােমার কাছে কোনই মিথ্যা কথা বলে নাই, কালীদহে সত্য সত্যই সে কমলে কামিনী দেখিয়াছে। সে তােমাকে তাহা দেখাইবে, যদি না দেখাইতে পারে, তবে তুমি তাহার প্রাণ লইও, আমি আর কোনও কথাই বলিব না।” ভগবতীর কথা শুনিয়া রাজা কমলে কামিনী দেখিতে ইচ্ছা করিয়া পাত্রমিত্র সাথে লইয়া কালীদহে চলিলেন। দেবী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীবেশে এমন্তের হাত ধরিয়া যাইতে লাগিলেন। [ ৮৯ ]
শ্ৰীমন্ত
সেখানে উপস্থিত হইয়া ভগবতী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশ
করিত্যাগ করিয়া মােল বছরের এক পরমা সুন্দরীর রূপ
ধরিলেন। সমুদ্রের উপর এক পদ্মের বন সৃষ্টি হইল। দেবী
একটী পদ্মের উপর বসিয়া হাতী ধরিয়া গিলিতে লাগিলেন।
তাহা দেখিয়া শ্ৰীমন্তের মুখে হাসি ফুটিয়া উঠিল, সে সকলকে
তাহা দেখাইয়া বলিল, “দেখুন মহারাজ, আমি মিথ্যা কথা
বলিয়াছি কিনা ?”
শ্ৰীমন্তের নিকট রাজা প্রতিজ্ঞায় হারিয়া গিয়া মুখ
নীচু করিলেন। তিনি জোড় হাত করিয়া দেবীকে বলিলেন,
“মা, বুঝিলাম, সবই আপনার মায়া। আমি শ্ৰীমন্তের সহিত
সুশীলার বিবাহ দিব। কিন্তু মা, এই যুদ্ধে আমার বৃদ্ধ পিতা,
আত্মীয় স্বজন ও সৈন্য সামন্ত সমস্তই মরিয়াছে, কাজেই এক
বৎসর আমাকে অশৌচ পালন করিতে হইবে। তাহার
আগে আমি কিরূপে মেয়ের বিবাহ দিব ?”
ভগবতী শ্ৰীমন্তকে বলিলেন, “তুমি এ বৎসর সিংহলে
থাকিয়া রাজকন্যা বিবাহ করিয়া উজানীতে ফিরিয়া যাইও।
সেখানে গিয়া আমার পূজার প্রচার করিও। আমি এখান
হইতে কৈলাসে চলিলাম।”
শ্ৰীমন্ত বলিল, “মা, তাহা হইবে না। গামাকে দেশে
পেছাইয়া দিয়া তবে আপনি কৈলাশে যাইবেন। নতুবা রাজা
আমাকে আবার না জানি কত কষ্ট দিবে।”
( ২০ )
৯শ্ৰীমন্ত পদ্মবতী ভগবতীকে বলিলেন, “তুমি সমস্ত মৃত সৈন্য- দিগকে বাঁচাইয়া দাও, তাহা হইলে শ্ৰীমন্তের বিবাহের জন্য অার এক বৎসর বিলম্ব করিতে হইবে না। শীঘ্র তাহার বিবাহ দিয়া তাহাকে দেশে পেঁৗছাইয়া শেষে আমরা কৈলাশে যাইব।” ভগবতী তখনই হনুমানকে ঔষধ আনিবার জন্য আদেশ করিলেন। হনুমান তখনই পাহাড় পর্বত খুঁজিয়া বিশল্য- করণী, অস্থি-সঞ্চারিণী, ও মৃতসঞ্জীবনী নামে তিনটী ঔষধ লইয়া আসিল। পদ্মাবতী, জয়া ও বিজয়া তিন জনে ঔষধ বাটিয়া তিনটী কলসীতে রাখিলেন। ভগবতী সেই ঔষধ-জল সমস্ত মড়া সৈন্যের উপর ছিটাইয়া দিলেন। অমনি সৈন্যেরা। বঁচিয়া উঠিয়া ভয়ে বাড়ীর দিকে ছুটিয়া পলাইল। তেমনি করিয়া দেবী হাতী ঘােড়াগুলিকেও বাঁচাইয়া দিলেন। ১৭ ভগবতী পদ্মাবতীকে মন্তের বিবাহের শুভ দিন দেখিতে বলিলেন। পদ্মাবতী বিবাহের উপযুক্ত একটা খুব ভাল দিন দেখিয়া দিলেন। তখনই সিংহল রাজ্যের ঘরে ঘরে রাজকন্যার বিবাহের আনন্দ সংবাদ রটিয়া গেল। রাজা- ময় একটা তুমুল আনন্দের সাড়া পড়িল। রাজবাড়ীতে গীত ( ৯১ ]
শ্ৰীমন্তg
বাদ্য আরম্ভ হইল, আত্মীয় স্বজন সব আসিয়া রাজবাড়ী
ভরিয়া গেল ।
শ্ৰীমন্ত ভগবতীকে বলল, “মা, আমি দেশ হইতে মনে
বড়ই কষ্ট পাইয়া সিংহলে বাবাকে খুজিতে আসিয়াছি।
তাঁহাকে না পাইলে আমি বিবাহও করিব না, দেশেও যাইব না।
বহু বৎসর ধরিয়া পিতার কোনও খোজ খবর পাই নাই, নানা
লােকে নানা কথা বলিতেছে ; এমন সময় যদি আমি বিবাহ
করিয়া দেশে যাই তবে হয়ত জ্ঞাতিরা ছল ধরিয়া বসিবে,
কেহই আমার বাড়া ভাত খাইবে না। যাহাতে আমি বাবাকে
পাইতে পারি আগে আপনি সে ব্যবস্থা করুন। আমি যখন
সিংহলে আসি তখন এক গণক বামুন আমায় বলিয়া দিয়াছেন,
যে পিতা কারাগারে বন্দী হইয়া আছেন। আপনি যখন
আমাকে এত দয়াই করিয়াছেন, তখন আমি যে জন্য সিংহলে
আসিয়াছি, যাহাতে সে কাব্য সিদ্ধ হয়, দয়া করিয়া তাহাই
করুন, আর আমি কিছুই চাই না।”
ভগবতী রাজাকে বলিলেন, “শালবনি, তুমি আমাকে
তােমার বন্দীঘর দান কর।”
রাজা তখনই দেবীকে তাহা দান করিলেন। দেব।
আবার তা এমকে দিলেন। মন্তের আদেশে এক
একজন করিয়া বা তাহার সম্মুখে আনা হইতে লাগিল।
তাহাদের কেহ দশ বৎসর, কেই বার বৎসর, কেহ পাঁচ বৎসর,
[ ৯৭ ]
শ্রম
কেহ দুই তিন বৎসর, এমনি করিয়া রাজার কারাগারে বন্দী
হইয়া আছে। তাহাদের এক একজনের চুল ও দাড়ি গোঁফ
জটা ধরিয়া গিয়াছে। হাত পায়ের নখ বড় হইয়া তাকিয়া
বাঁকিয়া গাছের শিকড়ের মত আঙ্গুলে জড়াইয়া গিয়াছে।
শ্ৰীমন্ত নাপিত ডাকাইয়া তাহাদের এক একজনের চুল দাড়ি
ও নখ কাটাইয়া স্নান করাইয়া ভাল কাপড় পরাইয়া পরিচয়
লইতে লাগিলেন, আর প্রত্যেককে বাড়ী যাওয়ার খরচ ও
কাপড় দিয়া বাড়ী পাঠাইয়া দিতে লাগিল। এমন করিয়া
প্রায় সাতঘর বন্দী শেষ হইয়া আসিল, তবু শ্ৰীমন্ত তাহার
পিতার দেখা না পাইয়া বড়ই আকুল হইয়া উঠিল বন্দী-
ঘরের সিপাহী আসিয়া বলিল, “সাতঘর বন্দী সবই শেষ হইয়া
গিয়াছে, আর একজনও বন্দী নাই।” এই কথা শুনিয়া
শ্ৰীমন্তের মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল, হায় যাহার জন্য
সে এত দুঃখ কষ্ট সহ্য করিল, তাহারই দেখা নাই ! সে
সিপাহীদিগকে ভাল করিয়া বন্দী-ঘর খুঁজিয়া দেখিতে বলিল।
তাহারা যাইয়া এক এক একটা করিয়া ঘর খুঁজিয়া দেখিতে
লাগিল। ঘরগুলি ভীষণ অন্ধকার, চামচিকা, ইন্দুর, পেঁচা
ও ব্যাঙ ঘরগুলিতে তাহাদের আডডা গড়িয়া তুলিয়াছে,
দুর্গন্ধে ঘরের ভিতর টিকে সাধ্য কাহার ? সেই অন্ধকারে
লীদিগকে হাতড়াইয়া খুজিয়া বাহির করিতে হয়। সিপাহীরা
সমস্ত ঘর এক এক করিয়া খুঁজিয়া যখন শেষ ঘরটায়
[ ৩ ]
মন্ত
খুঁজিতেছিল, তখন তাহাদের পা একজন বন্দীর গায়ে
লাগিল। তাহার বুকে পাষাণ চাপাইয়া রাখা হইয়াছে,
ধীরে ধীরে সে নিশ্বাস ফেলিতেছে। সিপাহীরা তাহার চুলের
মুঠা ধরিয়া আনিয়া শ্ৰীমন্তের কাছে হাজির করিল। শ্ৰীমন্তের
আদেশে নাপিত বন্দীর দাড়ি চুল ও নখ কাটিয়া দিল।
বন্দীর দিকে চাহিয়া শ্ৰীমন্তের তাহার মায়ের কথা মনে
পলি, খুল্লনা তাহাকে বলিয়া দিয়াছিল,—সাধুর গায়ের বর্ণ
উজ্জ্বল গৌর, নাকের বাঁ ধারে একটা আঁচিল, কপালে তিল,
বেশ উঁচু খাড়া নাক, লম্বা চেহারা, চণ্ডীর ঘট পায়ে
ঠেলিয়াছেন বলিয়া পায়ে একটা গােদ আছে। এমন্ত মনে
মনে ভাবিতে লাগিল, ইনিই হয়ত তাহার পিতা ধনপতি সদাগর
হইবেন।
ধনপতি শুনিয়াছিলেন, রাজার জামাই আজ সমস্ত বন্দী-
দিগকে মুক্তি দিতেছেন। তিনি মন্তকে হাত জোড় করিয়া
বলিতে লাগিলেন, “ধর্মাবতার, ভগবান আপনার
করুন। আপনি দয়ার সাগর, তাই আজ আমাদিগকে মুক্তি
দিতেছেন, যে বিবাহ উপলক্ষে আপনি এই পুণ্য কাজ করিলেন,
মহাদেবের কৃপায় আপনার সে বিবাহ সুখের হইবে,
আপনি সুখে রাজত্ব করুন, আমি শিব পূজা করিয়া ঠাকুরের
কাছে সেই প্রার্থনা করিব । বহু দিন বন্দী হইয়া আছি,
আজ আপনার দয়ায় মুক্তি পাইলাম। কিন্তু দেশে ফিরিয়া
মঙ্গল
}
[ ৪ ]
যাইবার সম্বল নাই, দয়া করিয়া পথের খরচটা দিয়া দিন,
আর একখানা কাপড় আপনার কাছে ভিক্ষা চাই।”
শ্ৰীমন্ত তাহাকে বলিল, “তােমার পরিচয় দাও বন্দী।
তােমার কি নাম, কোন্ জাতি, কোথায় বাড়ী, তােমাদের
দেশের রাজা কে, কেন এখানে আসিয়া বন্দী হইলে, দেশে
তোমাকে কে কে আছে, সব কথা আমায় বল, আমি তােমাকে
পুরস্কার দিয়া দেশে পাঠাইব ।”
ধনপতি বলিলেন, “আমার নাম ধনপতি দত্ত, আমরা
গন্ধবণিক, বঙ্গদেশে উজ্জয়নী নগরে আমার বাড়ী, রাজার
নাম বিক্রম কেশরী । আমি রাজার জন্য শঙ্খ চন্দন নিতে
সিংহলে আসিয়াছিলাম, পথে কালীদহে কমলে কামিনী দেখিয়া
আসিয়া রাজসভায় তাহা বলিয়াছিলাম, কিন্তু রাজাকে তাহা
দেখাইতে পারি নাই, এই জন্য বার বৎসর বন্দী হইয়া আছি।
দেশে আমার দুই স্ত্রী আছে, তাহাদের নাম লহনা ও খুল্লনা,
আমার কোনো ছেলেপিলে নাই, তবে আমি যখন বাণিজ্যে
আসি তখন খুল্লনার ছয় মাস গর্ভ ছিল, ছেলে কি মেয়ে
হইয়াছে জানি না।
ধনপতির কথা শুনিয়া শ্ৰীমন্তের আর বুঝিতে বাকি
রহিল না যে, ইনিই তাহার পিতা ধনপতি। কিন্তু সে পিতাকে
তাহার কোনও পরিচয় না দিয়া বলিল, “আজ আপনি আমার
এখানে আহার করিবেন, কাল সকালে উঠিয়া আপনাকে
{ ৯৫ ]
গ্রীমগুe
আমি দেশে ফিরিবার ভাল বন্দোবস্ত করিয়া দিব, আপনার
কোনই কষ্ট হইবে না।”
ধনপতি স্বীকৃত হইয়া বলিলেন, “আমি বার বৎসর
যাবৎ শিবপূজা করিতে পারি নাই, আজ একটু শিবপূজা
করিতে চাই। শিবপূজা না করিয়া আমি জল গ্রহণ করিতে
পারিব না।”
শ্ৰীমন্ত আজ রাজ-জাম হইতে চলিয়াছে, সুতরাং
তাহার কিছুই অভাব নাই, যাহাকে যেই আদেশ করিতেছে
সে তৎক্ষণাৎ তাহা করিতেছে। চাকর নফরদিগকে সে
ধনপতিকে স্নান করাইয়া শিব পূজার যােগাড় করিয়া দিতে
আদেশ করিল, তখনই পাঁচসাত জন চাকর ছুটিয়া আসিয়া
কেহ ধনপতির মাথায় সুগন্ধি তেল মাখাইয়া দিল, কেহ কুঙ্কুম
চন্দনে গা ঘষিয়া দিল, কেহ মাথায় জল ঢালিতে লাগিল, কেহ
গা মােছাইয়া দিল, কেহ গরদের কাপড় পরাইয়া দিল।
ব্রাহ্মণেরা শিব পূজার যােগার করিয়া দিলেন, মালী ফুল
তুলিয়া লইয়া আসিল। ধনপতি মনের আনন্দে শিবপূজা
করিতে লাগিলেন। পূজা শেষ করিয়া উঠিয়া ধনপতির মনে
হইল, আজ তাহাকে ইহারা এত আদর যত্ন করে কেন !
হয়ত শেষে চণ্ডীর কাছে বলি দিবে। কিন্তু যখন শ্ৰীমন্ত
তাহাকে লইয়া খাইতে বসিল, তখন তাহার মনের সন্দেহ দূর
হইল। পিতাপুত্র দুইজন এক যায়গায় খাইতে বসিল, বামুণ
শ্ৰীমন্ত
সোণার থালায় সােণার বাটীতে পঞ্চাশ ব্যঞ্জন দিয়া ভাত
বাড়িয়া আনিয়া দিল। ধনপতি শাকশুক্ত যাহা মুখে দেন,
তাহাই যেন তাহার মুখে অমৃতের মতন লাগে।
পরে তিনি আজ পেট ভরিয়া তৃপ্তির সহিত ভাত
খাইলেন।
খাওয়া শেষ হইলে সােণার খাটে ধনপতি বিশ্রাম
করিতে লাগিলেন। শ্ৰীমন্ত কিন্তু এখনো পরিচয় দেয় নাই
যে, সে ধনপতির ছেলে। সে ধনপতির খাটের পাশে বসিয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কি বাংলা লেখা পড়িতে
পারেন ?”
ধনপতি বললেন, “বাংলা ও নাগরী দুই-ই আমি পড়িতে
জানি।”
শ্ৰীমন্ত তাহার হাতে এক খানা চিঠি দিয়া বলিল,
“এ চিঠিখানা পড়ন।”
ধনপতি পড়িতে লাগিলেন,-“অশেষ মঙ্গলধাম শ্ৰীমতী
খুল্লনা সুন্দরী আমার আশীর্বাদ জানিবা। আজ আমি রাজার
আদেশে শঙ্খ চন্দন আনিবার জন্য সিংহলে চলিলাম। তুমি
এখন গর্ভবতী ; যদি তােমার মেয়ে হয়, তবে তাহার নাম
শশিকলা রাখিয়া ভাল বরে তাহার বিবাহ দিও। আর যদি
ছেলে হয়, তবে তাহার নাম শ্ৰীমন্ত রাখিয়া ভাল করিয়া
লেখা পড়া শিখাইও। বার বৎসরের মধ্যে যদি আমি ফিরিয়া
৭.
[ ৯৭ ]
৯শ্রীমস্ত
আসি, তবে তাহাকে আমার সন্ধানে সিংহলে পাঠাইয়া
দিও। ইতি
আশীর্বাদক,
ধনপতি দত্ত।”
পত্র পড়িয়া ধনপতির চোখ জলে ভরিয়া গেল। তিনি
বলিতে লাগিলেন, “এ পত্র আমি আসিবার সময় খুল্লনাকে
লিখিয়া দিয়া আসিয়াছিলাম । ইহা কেমন করিয়া সিংহলে
আসিল ? ইহা যে আমার মানিক ভাণ্ডারে রাখিতে বলিয়া-
ছিলাম, তবে কি কোনও চোর ডাকাত উজানী নগর লুটপাট
করিয়া লইয়া আসিয়াছে ? হায়, তাহা হইলে বাড়ী ফিরিয়া
গিয়া আমি কি দেখিব ?”
শ্ৰীমন্ত তাহাকে সান্ত্বনা করিয়া পায়ের ধূলি লইয়া বলিল,
“বাবা, দুঃখ করিবেন না, আমিই আপনার পুত্র শ্ৰীমন্ত।”
তারপর একে একে সে সমস্ত ব্যাপার ধনপতিকে শুনাইল।
এমন্তের মুখে সমস্ত কথা শুনিয়া ধনপতি আনন্দে
আত্মহারা হইয়া তাহাকে কোলে তুলিয়া লইলেন। তিনি
সমস্ত পৃথিবীর রাজত্ব পাইলেও বুঝি এত সুখী হইতেন না।
শ্ৰীমন্ত তাহাকে বলিল, “আপনি মঙ্গলচণ্ডীর পূজা
না.করিয়া এত দুঃখ পাইলেন। চণ্ডীর দয়ায় আমি সিংহলে
আসিয়াছি, তিনি মশানে আমার প্রাণ রক্ষা করিয়াছেন,
ভগবার দয়া না হইলে আজ আপনার সাথে আমার দেখা
[ ৪৮ }
৯শ্ৰীমন্ত
হইত না। আপনি মা মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করুন, সমস্ত বিপদ
দূর হইবে।”
পুত্রের কথায় ধনপতি রাগে জ্বলিয়া উঠিয়া বলিলেন,
“আমার বংশে তুই কুপুত্র জন্মিয়াছি। আমাদের বাপ
ঠাকুর দাদা চৌদ্দ পুরুষ শিব পূজা করিয়া স্বর্গে গেলেন,
আর তুই ডাকিনী দেবতার পূজা আরম্ভ করিয়াছি। আমার
প্রাণ যায় তাও স্বীকার, তবু মেয়ে দেবতার পূজা কখনাে
আমি করিতে পারিব না।” এই বলিয়া তিনি মন্তকে
কোল হইতে নামাইয়া দিলেন ।
শ্ৰীমন্ত কোনও উত্তর না দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া
থাকিয়া বলিল, “বাবা, সিংহলের রাজা শালবান আমার
সাথে তাহার মেয়ের বিবাহ দিতে চাহিতেছেন, দিনও স্থির
হইয়া গিয়াছে, আপনি অনুমতি দিন।”
ধনপতি রাগিয়া উঠিয়া বলিলেন, “না-না, এ পাপ
দেশে বিবাহ করিয়া কাজ নাই। চল, দেশে চলিয়া যাই।
রাজা যে কি পাষণ্ড তাহা ত আর বুঝিতে বাকি নাই ।
মহাদেব দয়া না করিলে তােমারও মনে প্রাণ যাইত,
আমিও বন্দী ঘরে পচিয়া মরিতাম। এ দেশে বিবাহ
করিলে দেশে যাইয়া একঘরে হইয়া থাকিতে হইবে। দেশে
যাইয়া তােমাকে কুলীন ঘরে সাত বিবাহ করাইব। তুমি
এ দেশে বিবাহ করিও না।”
[ ৪৯ ]
৯শ্ৰীমন্ত
১৮
ভ লগ্নে শুভ দিনে রাজকন্যা সুশীলার সাথে শ্ৰীমন্তের
বিবাহ হইয়া গেল।
ফুল-শয্যা রাত্রিতে ভগবতী খুল্লনার রূপ ধরিয়া মন্তের
শিয়রে বসিয়া তাহাকে স্বপ্ন দেখাইলেন, “বাছা শ্ৰীমন্ত, রাজার
জামাই হইয়া এ অভাগিনী মাকে ভুলিয়া গিয়াছিস্? তুই
দেশে ফিরিয়া আসিবি বলিয়া যে কত আশা করিয়া বসিয়া
আছি ! তুই এখানে পঞ্চাশ ব্যঞ্জনে ভাত খাস্, সােণার,
খাটে ঘুমাস্, কিন্তু আমাদের যে এখন দুই বেলা পেট ভরিয়া
শাকভাতও জোটে না। রাজা আমাদের বাড়ী ঘর টাকা
কড়ি সব কাড়িয়া লইয়া গিয়াছে, আমরা দুই বোেন এখন সূতা
কাটিয়া খাই। কি কষ্টে যে আমাদের দিন যাইতেছে, তাহা
তুই আজ আর বুঝিতে পারিবি না ! আমরা রােগে ভুগিয়া
ভুগিয়া মরিতে বসিয়াছি। তােকে দেখিব বলিয়া বুঝি আজও
প্রাণ বাহির হয় নাই।”
স্বপ্ন দেখিয়া শ্ৰীমন্ত কঁদিয়া উঠিল। সুশীল তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিলে মন্ত স্বপ্নের কথা বলিল। সুশীলা কহিল,
“স্বপ্ন কি কখনাে সত্য হয়, সে জন্য মনে কিছু করিও না।”
[ ১০০ ]
৯শ্ৰীমন্ত
শ্ৰীমন্ত বলিল, “না সুশীলা, আমার মন কিছুতেই প্রবােধ
মানিতেছে না, আমি কালই সাত ডিঙ্গা সাজাইয়া বাড়ী রওনা
হইব, মা সেখানে কত কষ্টে আছেন, আর আমি ছেলে হইয়া
তার দিকে ফিরিয়াও চাহিব না?”
সুশীলা বলিল, “তুমি অস্থির হইও না, আমি লােক
পাঠাইয়া শীঘ্র তাদের খবর দিতেছি।
লােকের সাথে যথেষ্ট
টাকা পয়সা কাপড় চোপড় পাঠাইয়া দিব, তাহারা তাহা হইলে
খুব সুখে থাকিবেন।”
শ্ৰীমন্ত বলিল, “না সুশীলা, ও কথা বলিও না, আমি
বাড়ী গিয়া নিজ চোখে মাকে না দেখিলে আমার প্রাণ
কিছুতেই শান্ত হইবে না।”
সুশীলা বলিল, “তুমি রাজার জামাই, সিংহলের অর্ধেক
রাজ্য তুমি পাইবে, তাহা ছাড়িয়া কি তুমি দেশে গিয়া
দোকানদারী করিয়া খাইতে চাও?”
শ্ৰীমন্ত বলিল, “হাঁ, সুশীলা, আমি তাই চাই। মায়ের
হাসি মুখ দেখিয়া শাক ভাত খাইয়াও আমি সুখে থাকিব।
যদি তুমি আমার সাথে যাইতে চাও, তবে মন স্থির কর।
আমি নিশ্চয়ই দেশে যাইব।”
সুশীল স্বামীর পায়ে ধরিয়া বলিল, “আর এক বছর
এখানে থাকিয়া যাও, তারপর দুই জনেই এক সাথে উজানী
যাইব।”
[ ১০১
শ্ৰীমন্ত- ; শ্ৰীমন্ত বলিল, “না সুশীলা, মায়ের জন্য আমার মন কাঁদিতেছে। জানি না, আমার জন্য মা যেন কত কাঁদিতেছেন, কতই না কষ্ট পাইতেছেন ; আর আমি এখানে রাজসুখে থাকিয়া রাজ-ভােগ খাইব ?” পরদিন ভাের হইতে হইতেই রাজা রাণীর কানে কথাটা গেল। তাহারা দুই জনেই শ্ৰীমন্তকে কত রকমে বুঝাইয়া আরও কিছু দিন সিংহলে থাকিয়া যাইতে বলিলেন। কিন্তু শ্ৰীমন্ত তাহাদিগকেও ঐ একই কথা বলিল। অগত্যা তঁাহারা শ্ৰীমন্তকে দেশে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। সুশীলাও স্বামীর সাথে যাইবে। তখনই সাত ডিঙ্গা মধুকর সাজান হইল। রাজা ধনপতি ও শ্ৰীমন্তের যে সব জিনিস লুট করিয়া লইয়া- ছিলেন, তাহাত ফিরাইয়া দিলেনই, তাহা ছাড়া রাজ-ভাণ্ডারের প্রায় অর্ধেক মণিমুক্তা হীরা জহরত নৌকা বােঝাই করিয়া দিলেন। রাজা ধনপতিকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, “বেহাই, অপরাধ লইবেন না, না জানিয়া বড়ই অন্যায় কাজ করিয়াছি, ক্ষমা করিবেন।” সদাগর হাসিয়া বলিলেন, “না মহারাজ, আপনার দোষ কি? আমার অদৃষ্টে কষ্ট ছিল, ভোগ করিলাম। সে জন্য আপনাকে অপরাধী করিব কেন?” রাজারাণী মেয়ে ও জামাইকে আশীর্বাদ দিয়া বিদায় ( ১০২ ।
দিলেন। তাহাদের চোখে জল ঝরিয়া পড়িতে লাগিল।
সুশীল মা বাপকে প্রণাম করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে গিয়া
নৌকায় উঠিল, শ্ৰীমন্ত ও ধনপতি সাতডিঙ্গা মধুকর সাজাইয়া
মনের আনন্দে আবার বাড়ীর দিকে চলিল।
যখন
খন গিয়া তাহাদের সাতডিঙ্গা মধুকর মগরায় পেীছিল,
তখন ধনপতি তাহার সেই ছয় ডিঙ্গা ও বাণিজ্য-দ্রব্যের
শােকে পাগলের মত হইয়া উঠিলেন। তিনি শ্ৰীমন্তকে
বলিলেন, “শ্ৰীমন্ত, তুমি দেশে যাও, আমি আর যাইব না।
এই মগরায় আমার সর্বনাশ হইয়া গিয়াছে, ছয় ডিঙ্গা ডুবিয়াছে
কি সুখে আর আমি বাড়ী ফিরিব ? যখন সেই মাঝি মাল্লা-
দের স্ত্রীপুত্র আসিয়া তাহাদের কথা জিজ্ঞাসা করিবে, তখন
আমি তাহাদিগকে কি বলিব ? কি বলিয়া আমি তাহাদিগকে
মুখ দেখাইব? এই মগরার জলে ডুবিয়া মরিব। তুমি
দেশে চলিয়া যাও, রাজাকে বলিও, আমি পথে আসিতে
আসিতে মরিয়া গিয়াছি। তােমার দুই মাকে সুখে রাখিও,
তাহাদের যেন কোনও কষ্ট না হয়। শিবপূজা করিতে
কখনও ভুলিও না। যাহাতে দেশে ও সমাজে সুনাম থাকে,
সর্বদা সেইদিকে লক্ষ্য রাখিও।”
[ ১০৩ ]
শ্ৰীমন্ত
ধনপতির কথা শুনিয়া শ্ৰীমন্তের মাথায় যেন বাজ
পড়িল। আজ তাহার এত আনন্দ, এত কষ্টের পর সে
আজ পিতাকে লইয়া রাজ-কন্য; বিবাহ করিয়া দেশে ফিরি
তেছে, এই আনন্দের মধ্যে তাহার পিতার মুখে এ আবার কি
সর্বনাশের কথা !
দেখিতে দেখিতে ধনপতি মগরার জল ঝাঁপ দিয়া
পড়িল। শ্ৰীমন্ত তখনই জোড় হাত করিয়া মা মা বলিয়া
ভগবতীকে ডাকিতে লাগিল । ভগবতী তখনই নৌকার সাথে
সাথে আকাশ পথ দিয়া যাইতেছিলেন।
দিয়া যাইতেছিলেন। তঁাহার দয়ায়
মগরার জল এক হাটু হইয়া গেল।
মগরায় জঝড়ের সময় ধনপতির যে নৌকা ডুবিয়াছিল,
ভগবতীর আদেশে সমুদ্রের দেবতা বরুণ তাহা লইয়া গিয়া
অতি যত্নে নিজের ভাণ্ডারে রাখিয়া দিয়াছিলেন। মাঝি-
মাল্লারা ও বরুণের পুরীতে সুখে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া যেন স্বপ্ন
দেখিতেছিল। ভগবতীর আদেশে এখন বরুণদেব বাণিজোর
দ্রব্যাদি সহ ছয় ডিঙ্গা ও মাঝিমাল্লাদিগকে ফিরাইয়া দিলেন ।
মাঝীদের মনে হইতে লাগিল, তাহারা সেন গুম হইতে জাগিয়া
উঠিল। তাহারা সদাগরকে বলিতে লাগিল, “সাধু, ঝড় বৃষ্টি
থামিয়া গিয়াছে, আর এখানে বিলম্ব করিয়া লাভ নাই। চলুন
সিংহলের দিকে নৌকা যাওয়া যাক।”
ধনপতি হাসিয়া মাঝিদিগকে সমস্ত কথা বুঝাইয়া দিয়া
[ ১০৪ ]
মন্ত,
বলিলেন, “মহাদেবের দয়ায় এবার রক্ষা পাইলাম, জয় শিব
শঙ্কর, বিশ্বেশ্বর কি জয় !”
মাঝিমাল্লারাও সাথে সাথে মহাদেবের জয়ধ্বনি করিয়া
শ্ৰীমন্ত চক্ষু বুজিয়া ভগবতার ধ্যান করিতে লাগিল।
উঠিল।
ত যাইয়া খুল্লনাকে সংবাদ দিল যে, তাহার পুত্র শ্ৰীমন্ত
সিংহলের রাজকন্যা বিবাহ করিয়া পিতাকে লইয়া দেশে
ফিরিয়াছে। একদিন দেবী ভগবতীও তাহাকে এই কথাই
বলিয়াছিলেন । খুল্লনার তখন আহলাদের সামা রহিল না।
সে ও লহনা বে বরণ করিয়া আনিতে সাতজন এয়াে এবং
বাদ্যবাজন লইয়া ভ্রমরা নদীর ধারে সদাগরের বহরের কাছে
গিয়া উপস্থিত হইল। মন্ত দূর হইতে তাহাদিগকে দেখিয়া
উঠিয়া আসিয়া লইনা ও খুল্লনাকে প্রণাম করিল। তাহারা
আনন্দে শ্ৰীমন্তকে বুকের ভিতর টানিয়া লইয়া আশীর্বাদ
করিল , ধনপতি উপরে উঠয়া আসিলে তাহারা তাহাকে
প্রণাম করিয়া দেখিল, তাহার সেই সোনার কান্তি শরীর আর
নাই সমস্ত গা দাদে ভরিয়া গিয়াছে, পায়ের গোদটা আরও
বড় হইয়াছে। ধনপতি তাহাদিগকে বৌ বরণ করিয়া ঘরে
লইয়া যাইতে বলিলেন। সকলে সােণার উঁদ বৌ দেখিয়া
( ১০৫ }
শ্রীম ভারী খুসী হইল লহনা ও খুল্লনা এয়ােদিগকে লইয়া বো বরণ করিয়া সােণার দোলায় তুলিয়া বাড়ী লইয়া আসিল। পরে পরে ধনপতি ও শ্ৰীমন্ত বাড়ী আসিলেন। বহুদিন পরে আবার ধনপতির বাড়ীতে আনন্দের ঢেউ উঠিল। শ্ৰীমন্ত মায়ের কাছে সিংহলের সমস্ত কথা বলিল। খুল্লনা মনের আনন্দে চণ্ডীপূজা করিয়া নগরের সমস্ত লােকদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া প্রসাদ দিল। কিন্তু এখনাে তাহাদের দুঃখের শেষ হয় নাই। তাহাদি- গকে আরও বিড়ম্বনা ও দুঃখ কষ্ট সহ্য করিতে হইবে। ধনপতি ও শ্ৰীমন্ত শঙ্খচন্দন ও রাজ-ভেট লইয়া গিয়া বিক্রম- কেশরী রাজার সভায় হাজির হইলেন । পাত্র, মিত্র, উজীর, নাজীর, মন্ত্রী, কোটালে রাজসভা গম গম করিতেছে। রাজা তাহাদিগকে পরম সমাদরে অভ্যর্থনা করিয়া বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “সিংহল হইতে ফিরিতে এত বিলম্ব হইল কেন সাধু ?” ধনপতির আদেশে শ্ৰীমন্ত সমস্ত কথা আগাগােড়া রাজসভায় বলিল। শ্রীমন্তের কথা শুনিয়া সভা সমেত সমস্ত লােক অবাক হইয়া গেল। বেশী অবাক হইল কমলে কামিনীর কথা শুনিয়া। রাজা বলিলেন, “তােমার প্রতি যখন ভগবতীর এতই দয়, তবে তুমি ইচ্ছা করিলেই আমাকে এখানেও কমলে কামিনী দেখাইতে পার।” | ১০৬ )
পাত্র মিত্র সকলে শ্ৰীমন্তকে ঠাট্টা করিতে লাগিল।
রাজা বলিলেন, “শােন শ্ৰীমন্ত, যদি তুমি আমাকে কমলে
কামিনী দেখাইতে পার তবে আমি আমার মেয়ে জয়াবতীর
সাথে তােমার বিবাহ দিব। আর যদি না দেখাইতে পার
তবে মনে তােমার প্রাণ যাইবে।
রাজার আদেশে কোটালের সিপাহী বরকন্দাজ সহ
শ্ৰীমন্তকে মনে লইয়া গেল। শ্ৰীমন্ত মনে বসিয়া একমনে
ভগবতীকে ডাকিতে লাগিল। ভগবতী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী সাজিয়া
সেখানে আসিয়া রাজার সিপাহী বরকন্দাজদিগকে গিলিয়া
খাইয়া শ্ৰীমন্তকে কোলে করিয়া বসিলেন। কোটাল যাইয়া
মহারাজকে এই কথা জানাইল। কোটালের কথা শুনিয়া
মহারাজের বুঝিতে বাকি রহিল না যে, সত্য সত্যই ভগবতী
শ্ৰীমন্তের সহায়।
মহারাজ তখনই ছুটিয়া মসানে গিয়া সেই বুড়ীর পায়ের
তলায় গলবস্ত্র হইয়া পড়িয়া বলিতে লাগিলেন, “মা, আমি
তােমার অজ্ঞান সন্তান ! বুঝিতে না পারিয়া শ্ৰীমন্তের কথায়
বিশ্বাস করিতে পারি নাই। এখন আমি সমস্তই ত বুঝিতে
পারিয়াছি, আমার আর কোনও অবিশ্বাস নাই। আমার
সিপাহী বরকন্দাজদিগকে বাঁচাইয়া দাও, আমি শ্ৰীমন্তের
সাথে জয়াবতীর বিবাহ দিব।”
ভগবতী হাসিয়া রাজার সিপাহী সৈন্যদিগকে বাঁচাইয়া
( ১০৭ ।
৯শ্ৰীমন্ত দিলেন। ভ্রমরা নদীর ধারেই মসান। দেখিতে দেখিতে সেই নদীর জল পদ্মবনে ভরিয়া গেল, শত শত পদ্ম ফুল ফুটিয়া উঠিল। রাজা বিস্ময়ে অবাক হইয়া দেখিলেন, ভ্রমরার জলে কমলে কামিনী। রাজা ও পাত্র মিত্র সকলেই হাত তুলিয়া ভগবতীর উদ্দেশ্যে প্রণাম করিলেন। তারপর শুভ দিন দেখিয়া মহাসমারােহে রাজা বিক্রম- কেশরী কন্যা জয়াবতাকে শ্ৰীমন্তের সহিত বিবাহ দিলেন। রাজ্যে একটা আনন্দের রােল পড়িয়া গেল। নৃত্যগীত, আমােদ আল্লাদ, বাদ্যবাজন, আতসবাজী, আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ এক মাস ভরিয়া খুব মহাসমারােহে চলিতে লাগিল। এদিকে ধনপতি মনের আনন্দে শিবপূজা করিতে বসিয়াছেন। মটার শিব গড়িয়া ধূপদীপ জ্বালিয়া ফুল বেল- পাতা নৈবেদ্য সাজাইয়া ধ্যান করিতে লাগিলেন। কিন্তু একি অাজ এমন হয় কেন ? তিনি যতই জটাজুটধারী মহাদেবকে ভাবেন, ততই যে তাহার মনে ভাসিয়া ওঠে অৰ্দ্ধনারীশ্বর মহাদেবের মূর্তি। মহাদেবের মূর্তির ডানদিকের অদ্ধেক খানা ঠিক মদেবের মূর্তি আছে, কিন্তু বামদিকের অর্ধেক ভগবতার মূর্তি। একই শরীরে শিব ও দুর্গা। ধনপতি ঢোখ মেলিয়া চাহিয়া দেখেন, তঁাহার মাটার গড়া শিবও সেই অর্ধনারীশ্বর হইয়া বসিয়া আছেন । তখন তিনি সেই খানে উপুড় হইয়া গড় করিয়া বলিতে লাগিলেন, “মা, ( ১০৮ ]
;
স্ত
এত দিন আমি তােমাকে চিনিতে পারি নাই, চিনিতে না
পারিয়া তােমাকে নানা কথা বলিয়াছি। এখন বুঝিতে
পারিয়াছি, শিব ও দুর্গা ভিন্ন নহে; মা, আমার অপরাধ ক্ষমা
কর মা!” এই বলিয়া তিনি দেবীর চরণামৃত পান করিয়া
সারা গায়ে মাখিলেন। অমনি তাহার গায়ের দাদ ও পায়ের
গােদ সারিয়া গেল। নারীশ্বর মূৰ্ত্তি অন্তর্হিত হইয়া গেলেন।
শ্ৰীমন্ত নূতন বৌ লইয়া বাসিয়ছে। জ্ঞাতি কুটুম্ব
আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব সকলেই বরবধূকে আশীর্বাদ করিয়া
নানা যৌতুক দিতেছে। যখন তাহারা সকলে চলিয়া গেল
তখন ভগবতী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর রূপ ধরিয়া আশীর্বাদ করিয়া
গেলেন। শ্ৰীমন্ত তাহাকে চিনতে পারিয়া খুল্লনাকে বলিল,
“মা, এই বেশে ভগবতী আমাকে মনে প্রাণ বাঁচাইয়াছেন।
খুল্লন ব্রাহ্মণীকে সােণার আসনে বসাইয়া ফুল জল দিয়া
তঁাহার পূজা করিল। ধনপতি আসিয়া তাঁর পায়ে প্রণাম
করিলেন। ভগবতী তখন একটু রাগিয়া বলিলেন, “উঠ
ধনপতি, এতদিন ত কেবল আমাকে তিরস্কারই করিলে, এখন
আবার নমস্কার কেন ? আগের সব কথা কি ভুলিয়া গিয়াছ ?
তুমি পুরুষ হইয়া কেন মেয়ে
কেন মেয়ে দেবতার পায়ে মাথা
ঠেকাইতেছ ?”
ভগবতীর রাগ দেখিয়া শ্ৰীমন্ত ও খুল্লনা তাহার স্তব স্তুতি
[ ১০৯ ]
শ্ৰীমন্ত
করিয়া বলিল, “মা, আপনি ক্ষমা না করিলে সন্তানের দোষ
আর কে ক্ষমা করিবে ?”
ভগবতী সন্তষ্ট হইয়া সদাগরের মাথায় হাত দিয়া
আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন, “আজ হইতে আর তােমার
কোনও দুঃখ থাকিবে না ধনপতি, তুমি নিয়ম মত আমার
পূজা করিও, আমার কৃপায় তুমি ধনে পুত্রে লক্ষীবন্ত হইয়া
বণিক সমাজে যথেষ্ট মান সম্মান লাভ করিবে। আমার
পূজা প্রচার করিবার জন্যই তােমাদিগকে এত কষ্ট দিয়াছি।
তােমার স্ত্রী খুল্লনা পূর্ব জন্মে ইন্দ্রের সভায় রত্নমালা নামে
নকী ছিল, কেবল পৃথিবীতে আমার পূজা প্রচার করিবার
জন্যই তাহাকে অভিসম্পাত দিয়া এখানে আনিয়াছি। এখন
সে শাপমুক্ত হইয়া স্বর্গে চলিয়া যাইবে। তাহার জন্য আর
তােমরা দুঃখ করিও না।”
স্বর্গ হইতে তখনই ইন্দ্রের রথ আসিয়া উপস্থিত হইল।
খুল্লনা ধনপতি ও লহনাকে প্রণাম করিয়া শ্ৰীমন্ত, সুশীলা,
জয়াবতী ও দুলাকে আশীর্বাদ করিয়া ভগবতীর সাথে
গিয়া রথে উঠিল। রথ দেখিতে দেখিতে আকাশের গায়ে
মিলাইয়া গেল।
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.