Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kurukhettra-kalanka

Mukhopadhayay,kalibhushan · 2009/11/25

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক
কাব্য।
“মঃ কবি যশঃপ্রার্থী গমিষ্যাপহাস্যতাম।
প্রাংশুলভ্যে ফলে লােভাতুদ্বাহুরিব বামনঃ ।
অথবা কতবাগদারে বংশেহস্মিন, পূর্বসূরিভিঃ।
মণৌ বজ্রসমুৎকীর্ণ সূত্রসেবাস্তি মে গতিঃ ॥”
শ্রীকালীভূষণ মুখােপাধ্যায়
বিরচিত।
শ্রীবরদাকান্তমুখােট
প্রকাশিত
=qat
মূল্য ১১ এক টাকা।

কি--গিরিশ-যন্ত্রে,
প্রিন্টার শ্রীদিগম্বর দান কর্তৃক
মুদ্রিত ৪
সন ১২৯১। ১৭ মাঘ ।

উৎসর্গ।
লক্ষ্মী ও বাণী বৈরীভাব ত্যাগকরতঃ
বাঁহাতে একাধারে নিত্য-বিরাজমানা,
সাহিত্য-সমালােচনী সভার যিনি প্রতিষ্ঠাতা,
পূর্ববঙ্গে যিনি একমাত্র বিদ্যোৎসাহী বলিয়া বিখ্যাত,
যিনি অনাথের নাথ, বিপন্নের সহায়,
সেই ভাওয়ালাধিপতি, দীনপালক
বঙ্গীয় দ্বিজেন্দ্র-কুল-ভূষণ
আল শ্ৰীযুক্ত রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী বাহাদুর
ঠাকুরদাদা মহােদয়কে
এই ক্ষুদ্র কাব্যখানা
তদীয় চিরস্নেহ-পরিপালিত এই বালক
গ্রন্থকারের অকৃত্রিম ভক্তি ও
কৃতজ্ঞতার চিহ্নম্বরূপ
উৎসর্গীকৃত
হইল।

No text on this page.

উপহার । বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্যসূৰ্য্য, ভাওয়াল-রাজমন্ত্রী শ্রীল শ্রীযুক্ত রায় কালীপ্রসন্ন ঘােষ বাহাদুর মহোদয়ের করকমলে। মহাত্মন, যে যুবক দুই বৎসর পূর্বে সংসার-তরঙ্গে ভা সিয়া যাইতেছিল, আপনার স্নেহতরী আরােহণ করিয়া আজ সেই যুবক আপনার নিকট উপস্থিত। আপ- নার সেই দেবােপম অমৃতময়ী আশ্বাসবাণী—“আমাকে তাঁহার (আমার পিতার ) চিরস্নেহবদ্ধ অনুজ বলিয়া মনে রাখিও, যতদিন আমি আছি, তুমি অবান্ধব হইবে না ।”—আমার হৃদয়ে চিরকালের তরে অঙ্কিত থাকিবে। স্বয়ং ভারতী যাঁহাকে নিত্য নিত্য নূতন নূতন উপহার প্রদান করেন, আমি আজ কোন, সাহসে এই অকিঞ্চিৎকর উপহার লইয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইব? কিন্তু আপনি স্নেহময়, আমি স্নেহা- নুগতাই আমার সাহস অধিক। অর্থ ও ভাবহীন শিশুর বাক্যাবলী, অন্যের নিকট শ্রুতিমধুর না হইলেও - *

( 0 )
শিশুর স্নেহময় আত্মীয়ের নিকট তাহা পীযূষপূরিত
বলিয়া অনুমিত হয়। এই একমাত্র সাহসেই আজ এই
ক্ষুদ্রবুদ্ধি যুবক, তাহার হৃদয়ের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও
কৃতজ্ঞতার চিহ্নম্বরূপ এই ক্ষুদ্র উপহার নিয়া আপনার
নিকট উপস্থিত। আশা আছে এই আবদার রক্ষা
হইবে ।
ভবদীয় একান্ত স্নেহের
গ্রন্থকার।
-

* * * * *
* * *
কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক
কাব্য।
প্রথম সর্গ ।
নমি, মাগাে তব পদে বীণাপাণি বাণি!
কর দয়া দয়াময়ি অধম তনয়ে,
দুরাশা জলধি-নীরে দিয়াছি আঁপ ;-
যে ভাবে রক্ষিলে মাগাে বরপুত্রে তব
রক্ষ দাসে সেই ভাবে, এ মিনতি পদে ;
অন্য কোন আশা মাের নাহিক মানসে।
চিরদিন গুগহীনে দিয়াছ চরণ,

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক ।
'।
5.
=
এ ভরসা করি মনে হ’লু অগ্রসর,--
রত্নাকর, কালিদাস ভারত-ভূষণ,
গুণাগুণ বিবর্জিত ছিলেন যাহারা,
স্পশমণি স্পর্শে যথা, তথা ও চরণ
স্পর্শি ভব-পূজ্য তারা, তােমার প্রসাদ্রে।
গভীর নিশীথ কাল অতি ভয়ঙ্কর,
সবাই লভিছে শান্তি নিদ্রার প্রসাদে,
নাহি জাগে প্রাণী যেন নির্জীব ধরণী ;
মাঝে মাঝে নিশাচর ভয়ঙ্কর রবে
নানাদিকে ছুটাছুটি করিয়া ফিরিছে ।
লম্পট, তস্কর, দ, শৃগালের দল
টিপি টিপি চারিদিকে করিছে ভ্রমণ,
দেখিলে শিহরে প্রাণ, ভীষণ অবনী!
রজনীর নিস্তব্ধতা-অঙ্কে সুপ্ত একে
কুরুক্ষেত্র, ভাগ্যক্ষেত্র কুরু-পাণ্ডবের।
দুই পাশে ভাগ্য-রেখা সম শােভা পায়
*

প্রথমসর্গ ।
* * *
অগণন রণােন্মত্ত সৈনিক-নিবাস।
এসগাে কল্পনে, চল কৌরব-শিবিরে
ভারত-গৌরব যাহা দেবেন্দ্র-বাঞ্ছিত,
যার নামে কাপে বিশ্ব থর থর থরে,---
দ্বিতীয় স্বরগ মর্ত্তে, ক্ষত্রিয়-গৌরব ;
বীরদাপে যার কঁপে পাতালে বাসুকী,
ত্রিদিবে ত্রিদিবেশ্বর, মর্ত্তে পুরবাসী ;
জলধির দূরগম্য অগাধ সলিলে,
ভূধর-করে, রােষ পশে অবহেলে ।
অহহ কি বিরাটপুরী। কে করে নির্ণয়,
অগণন সৌধগাজী শােভে সারি সারি,
হিমালয় শৃঙ্গ জিনি শৃঙ্গাবলী যার
চুষিছে গগন যেন নয়নাগােচরে ;
ভূতলের অতুলন যার শােভা-রাজি,
কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন নিজে পারেনি বর্ণিত,
কি সাধ্য এ দীন কবি করিবে বর্ণন,
ভেলায় সাগর পার কে হয়েছে কবে ?
;

১
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
------
-
নীরব নিশীথে আজ ওকি দেখি ওই ?
জ্বলিছে আলােক যেন একটা প্রকোষ্ঠে ।
এস সহচরি, এস হয়ে অগ্রসর
দেখি কি ব্যাপার তথা হয় সংঘটন ।
হাঁ সত্য, তা নয় শুধু, ঐ দেখ চেয়ে,
কনক-আমিনে রাজে কুরুকুলেশ্বর,
দুঃশাসন, দ্রোণাচাৰ্য, মাতুল শকুনি,
কৃপাচার্য্য, জয়দ্ৰথ, অশ্বত্থামা, কর্ণ
বসিয়াছে চারিদিকে, সবাই নীরব ,
বিষাদ-সাগরে আজি ভাসে দুৰ্য্যোধন।
একি ভাব, সম্রাটের নাহি কিরে সুখ?
বিশাল ধরণী
বার করতলাশ্রিত,
যাহার কটাক্ষে কঁপে সরগ পাতাল,
তার কি এ ভাব আজি, রাজামনে কি রে
নাহি তবে সুখ ? ধিক্ এ ছার সংসারে ?
আশাভরে এসেছিনু মুখের আগারে
দেখিতে সাম্রাজ্য-সুখ, ভূপতি-রতনে—
মরীচিকা প্রায় তাহা ! ধন্য রে সংসার !

প্রথমসর্গ। - - * * * * * • ১৭ * * * *1* ১.৭ । • তিষ্ঠ ক্ষণকাল, শােন বিষম বারতা সংসারের বিষবৃক্ষ কিবা ভয়ঙ্কর ; বিষাদে সুদীর্ঘ শ্বাস ফেলি কতক্ষণে - কহিলা কাতরে তবে দুঃশাসন বীর- “বিশাল-বারিধি-নীরে ঝটিকা দেখিয়া কে দেয় ছাড়িয়া হাল হতাশ্বার হয়ে ? যে বিপদ-সিন্ধু মাঝে ভাসে কুরুকুল, এ ভাবে রহিলে তাহা হবে কি উদ্ধার ? জ্বলন্ত-বস্ত্রের শিখা না কর নির্বাণ, দহিবে সে কলেবর, না পাবে নিস্তার। ইব অগ্রসর সবে, দেখাব কেমনে নাশয়ে অরাতিকুল ক্ষত্রিয়কুমার। ছিছি দাদা ! একি তব খেদের সময়? ভব-পূজ্য আৰ্য্যসুত ক্ষত্রিয় সন্তান, কভু কাপুরুষ ভাব সাজে কি তাদের ? নিংহের কুমারে কেন শৃগালের ভয়? বীরদাপে যােদ্ধগণ সাজ একবার, দণ্ডিব পাণ্ডবে সবে সম্মুখ সমরে। D

কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক।
অনুজের বাক্য শুনি তুলিয়া বদন
উতরিলা মৃদুস্বরে কুরু-কুল-পতি,-
“সত্য যা কহিলে ভ্রাত! কিন্তু ভেবে দেখ
বিধাতা নিদয় এবে কুরুকুল প্রতি ;
অতুল বীরের পুঞ্জে পূর্ণ কুরুকুল,
প্রতাপে কাপয়ে ধরা থর থর থরে,
কি ফল তাহাতে হায়! বিপুল ঐশ্বর্য্যে
যে লাভ যক্ষের, ভ্রাত। তেমতি আমার
এ-বীর-বৃন্দের আশা-আকাশ-কুসুম ;
বিধাতা নিদয় যদি না হবে আমায়,
তবে কি অকালে শরশয্যাতে শয়ন
করিতেন পিতামহ বীর-চূড়ামণি ?
অকুল পাথারে ভাসে জীবনের তরী
কুল নাহি পাই ভাই, কি করি উপায় ?
গেল মান, গেল বীৰ্য্য, গৌরবাদি সব,
এত দিনে ভঙ্গ হল প্রতিজ্ঞা আমার ।
৮
উতরিলা কৃপাচার্য সুগম্ভীর স্বরে,

প্রথমসর্গ ।
৭
****
•••••••••,\
//\\\\+।।
•••••••••••
“কেন এত অনুতাপ আসন্ন সময়ে ?
অবহেলে লঘিয়াছ গুরু-উপদেশ,
কেন হে যাতনা এবে ভুঞ্জিছ অবােধ।
পড়ে কি হে মনে, যবে কহিলা কাতরে,
আগম-নিগম-জ্ঞানী পিতামহ তব,
বিনাযুদ্ধে পঞ্চগ্রাম দিতে পাণ্ডবেরে ?
মাতিয়া যৌবনমদে অবহেলি তাহে,
ভুঞ্জ প্রতিফল এবে যথােচিত তার।
এখনাে মঙ্গল যদি করহ কামনা,
যুধিষ্ঠির মহামতি ধৰ্ম্ম অবতার,
জগত-মঙ্গল, আর বংশের গৌরব,
পায়ে ধরি তাঁর কর শান্তির স্থাপন,
কৌরব-সাম্রাজ্য-লক্ষ্মী রহিবে অটুট।”
জলদগম্ভীর-স্বরে কহিলা রাধেয়,
শাপটি শাণিত অসি অরিন্দম করে ,
ধিক্ তােমা, কৃপাচার্য! ধিক্‌ শতবার,
জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ তুমি তাই এত ভয় ;

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
অরাতি-সূদনে তব এত যদি ত্রাস,
কে চাহে তােমারে ? কর গৃহে পলায়ন।
পূর্ণিমা নিশীথে, আর খদ্যোত আলােক
কিবা প্রয়ােজন? বৃথা কেন তুমি আর
করিছ শমনে ত্রান শঙ্কিত ব্রাহ্মণ ?
কি ছার পাণ্ডব যদি একা কর্ণ রােষে ?
কেনহে রাজেন্দ্র আর বলিয়ে কাতরে,
তপনের কিবা ভয় হুতাশন-তেজে।
সাজহ বীরেন্দ্র-বৃন্দ, চলহে সকলে,
দেখাইব কত বীৰ্য্য ধরে এ শরীর।”
-~-
এতক্ষণে রােষভরে বিস্ফারি নয়ন,
কহিতে লাগিল। দ্রোণ বীর-কুল-মণি,
“যৌবনের গরবেতে হ’য়ে জ্ঞানহীন,
পূজ্যপাদ শুরুকুলে কর অবহেলা ?
নাহি কিরে ত্রাস মূঢ় উন্মত্ত বৰ্ব্বর ?
বীৰ্য, শৌৰ্য্য তাের নাহি দ্রোণ-অগােচর'।
অমরের যমে ত্রাস, তাের শুধু নয়,
*

প্রথমসর্গ । কেবা না হালিবে শুনি এ প্রলাপ-বাণী ? শােন নীচাশয় তাের পতনের দিন হইয়াছে সন্নিকট মনে যেন গণি ; পতঙ্গের পক্ষ শুধু বিনাশ-কারণ ; ঘণায় পূরিল প্রাণ না সরে বচন, সিংহের পুরীতে আসি জম্বুক-তনয়, করিতেছে অপবিত্ৰ পবিত্ৰ-আলয় । বুঝিয়াছি কুরুকুল যাবে রসাতল যথা ধৰ্ম্ম তথা জয় কে করে খণ্ডন ?” লিত অন্তরে ছাড়ি কনক আসন পড়ি পদ-তলে, তবে ধৃতরাষ্ট্র-সুত, কহিতে লাগিলা খেদে ধরিয়া চরণ- “পুত্রের বচনে কবে রােষয়ে জনক ? মশক-দংশনে কভু রােমে কি বারণ ? কেন আর তাত! বৃথা রােষ অকারণ, তােমা বিনা গতি নাই এ বিপত্তি কালে, পদাশ্রিত দুৰ্য্যোধনে ঠেলিও না পায়। *

কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক।
* * * * * * *
;
যে দুঃখ-অর্ণবে ভালি, কুল নাহি তার,
তুমি কুলাইলে কুল হইবে উদ্ধার ;
হায় একি আজ তবে, একি ভাব তব,
সত্যই বিধাতা দাসে হইলেন বাম ?
তবে আর কোন্ সাধে বহি দেহ-ভার?”
কহিতে কহিতে রাজা নয়ন-সলিলে
তিতিল। ; কহিলা তবে দ্রোণ মহাবল,
সম্বোধিয়া দুর্যোধনে সস্নেহ বচনে :-~~-
“ক্ষান্ত হও বাপ ধন ! শুধু তব তরে
রহিয়াছে দ্রোণাচাৰ্য এখনাে জীবিত ;
স্নেহের কত যে শক্তি, বুঝিব কেমনে?
তা না হলে কেন আমি পাণ্ডবে ছাড়িয়ে,
রহিয়াছি কুরুকুলে লোেক-নিন্দা ত্যজে?
যত দিন বহে রক্ত দ্রোণের শিরায়,
তত দিন দুর্যোধন, কি ভয় তােমার ?
ম’রে কি মারিয়ে, তােম। রক্ষিব সতত।”
শুনিয়া আশ্বাস-বাণী উঠিলা ভূপতি,

প্রথমসর্গ ।
১১
বসিয়া কনকাসনে আরম্ভিলা পুনঃ,-
‘চির দিন বাঁধা দাস তােমার চরণে,
কি ভরসা তােমা বিনা কুরুকুলে আর ?
কে রাখিবে কুল মান তােমা ভিন্ন তাত!
কে ধরিবে বাড়বাগ্নি মহার্ণব বিনা ?
কিন্তু এবে হায় তাত! কি হবে উপায় ?
শত শত যােদ্ধ হত পাণ্ডবের তেজে,
নাহি দেখি রক্ষা। আর এ বিপুল রণে,
চারিদিক অন্ধকার করি দরশন,
নিত্য নিত্য হয় ক্ষয় মহারথী মাের ;
শত্রুপক্ষে মহারথী কতই প্রবল !
কর কৃপা কৃপাচার্য কেন কর রােষ,
জান ত প্রতিজ্ঞা দাস করিয়াছে যাহা
বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র-মেদিনী,
যত দিন বহে রক্ত দুৰ্য্যোধন-দেহে।”
উতরিলা কৃপাচাৰ্য ‘কেন দোষ মােরে,
তােমার মঙ্গল তরে দিনু উপদেশ,

১২
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
( কুরুক্ষের কোটরস্থ
নাহি ডরে কৃপা কভু সম্মুখ সমরে ;
নাহি কর খেদ বৎস! যুঝি প্রাণপণে
করিব তােমায় রক্ষা এ দুরন্ত রণে।
সম্বােধিয়া পৃথ্বীশ্বরে কহিলা শকুনি,--
বিষ-কুম্ভ-পয়ােমুখ, মুষিক-উপম,
কুরু-কুল-ধ্বংশ-হেতু, পাপিষ্ঠ বৰ্ব্বর,
বহ্নি তেজ যথ
ক্রমশঃ বিদগ্ধ করে সমস্ত কানন)--
“কি ভয় বাছনি তব এ ছার সমরে ?
জগ-অনুপম-বীর অশ্বত্থামা, দ্রোণ,
কৃপাচার্য্য, অয়দ্ৰথ, কর্ণ, দুঃশাসন,
থাকিতে এসব রথী ডর ভীমার্জুনে ?
নাহি কর ভয় যদি একা মামা বাচে।
পাণ্ডবেরে রাজ্য দিয়া সন্ধির প্রস্তাব,
হবে পূরণ কভু শকুনি থাকিতে।”
হয়ে পুলকিত চিত এবে দুঃশাসন
কহিতে লাগিল। পুনঃ গদগদ-স্বরে,
**

প্রথমসর্গ।
“মামার দয়ার সীমা কোথায় সংসারে,
সদাই ভাবনা তার মােদের মঙ্গল ;
ধন্য মােরা ভাগিনেয়, ধন্য তুমি মামা,
কুরুকুলে নাহি কুল ভুমি না রহিলে ।
গুরু দ্রোণাচাৰ্য্য! বল কি আদেশ তবে,
কুরু-কুল-দাসগণ তব মুখ-প্ৰেক্ষী ;
তুমিই ভরা গুরাে! তুমিই সম্বল,
দেখ মহারাজ আজ ভাসে দুঃখার্ণবে।”
ফেলিয়ে সুদীর্ঘ শ্বাস চাহি ঊর্ধদিকে,
ক্ষণেক থাকিয়া, চাহি নর-পাল পানে,
উতরিলা বীরদাপে দ্রোণাচাৰ্য্য তবে,-
“নিয়ত কাদে এ প্রাণ অর্জুনের তরে,
চির-অনুগত মম শিষ্য-চূড়ামণি ;
তবু তব পক্ষ যবে করেছি আশ্রয়
প্রাণপণে সংহারিব অরাতি-নিকরে ;
‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন।
করিনু প্রতিজ্ঞা, কল্য যামিনী-প্রভাতে
এ ।

১৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
পাণ্ডব-বীরেন্দ্র এক হইবে পতন ।
চল ষােদগণ তবে চলহে সকলে
রচিবারে চক্রব্যুহ নর-কালান্তক ;
নিজেই থাকিয়া তথা করিব সমর,
অরিকুলে হবে মহারথীর পতন।”
শুনিয়া কহিলা তবে কুরু-কুল-পতি,
উত্তম প্রস্তাব তাত ! বুঝিবে কিরীটী
নারায়ণী সেনা সহ সমর-প্রাঙ্গণে,
তবে আর কেবা আছে পাণ্ডব শিবিরে
ভেদিতে সে চক্রব্যুহ ভুবনে দুর্জয় ?
চল তবে সবে মিলে পশিয়ে শিবিরে,
গুরুর আদেশ মত রচিব সে ব্যুহ ;
কুরু-কুল-জয়-ধ্বজা উড়াইয়া তাহে
ভূতলে অতুল-কীর্তি লভিব সকলে।
ত্যজি সে নিভৃত-কক্ষ তবে বীরগণ,
একে একে চলিলেক বিশ্রাম-আগারে
;

22
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
- 1 = ।। ।।।।
যথা,ত্রিযামার শেষে তারকা-নিকর
একে একে অস্তমিত হয় ধীরে ধীরে।
.
৪

এ
তে
.
দ্বিতীয় সর্গ।
AHlৈ:
১০০১২১৯
Ruli]:-) :
নিশীথে নিভৃত-কক্ষে পাণ্ডব-শিবিরে,
যােড়শ বর্ষীয় যুবা সুভদ্রা-নন্দন
বৃষস্কন্ধ মহাভুজ, পাণ্ডুবংশ-কে,
সুর-সেনাপতি আলি যেন ধরাতলে,
নশ্বর মানব-রূপে লভিল। জনম।
কেশব মাতুল বার, পিতা ধনঞ্জয় ;
জ্যেষ্ঠতাত ধৰ্ম্মরূপী রাজা যুধিষ্ঠির,
ধন্য অভিমনু বীর পাণ্ডব-গৌরব ।
কেন গঞ্জে কুরু-পতি তরে মিছা আর ?
জ্বলিছে আলােক কক্ষে, বলসিছে সব,
উৎকণ্ঠিত মনে যুবা ঘুরিছে তথায়,
কভু বা কনকাননে, কভু বা শয্যায়,
২১

দ্বিতীয় সর্গ।
১৭
কভু বসে, কভু উঠে, কভু শূন্যপ্রাণে
তৃষিতচাতকসম করিছে লােকন,
কভু বা অস্ফুট স্বরে করে গুন্ গুন্ ।
মুদিলা নয়ন পুনঃ; একি ভাব তবে?
সমরের জ্বাস আজ হয়েছে কি মনে ?
একি বিপর্যয় হায়! অতাপ অনল?
আশীবিষ বিষহীন, হয় কি বিশ্বাস?
যমের মরণে ত্রান, কভু কি সম্ভবে ?
অকস্মাৎ দূরে হ’ল নূপুর-ঝঙ্কার ;
সতৃষ্ণনয়নে ফিরি, অলিন্দের পানে,
তৃষিত চাতক যেন ঘন-দরশনে,
অনিমেষনেত্রে যুবা, রহিলেক চাহি'।
কিন্তু নাহি পূরে আশা, অহহ কি যাতনা !
বিলম্বিত পদক্ষেপ যেন মনে গণে;
যায় মুহূর্ত যেন সবাই অচল,
প্রতিক্ষণ প্রতীক্ষণ করিল এরূপে।
---

১৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
এতক্ষণে বুঝিলাম, কিসের কারণ
যুবা হেন ভাবে আজ বসিয়ে বিরলে ।
প্রিয়তমা বিরহেতে ব্যাকুলিত হয়ে,
আশপথ নিরখিয়ে হয়েছে উন্মাদ ।
অভিমনু! এই কি হে বীরত্ব তোমার ?
বীৰ্য্য, শৌর্য, ধৈৰ্য্য তব বুবিনু নকল।
কুরুক্ষেত্র হবে ভুমিই আবার,
উড়াইবে জয়ধ্বজা পশুবশিবিরে ?
শান্ত হও, কেন এত ও উচাটন,
হেন তরলতা কে বীরের জাদরে।
অথবা অসহ্য যদি বিরহ অনল,
শান্ত কর ভারে ঢালি ধৈর্য দলিল,
কোথায় বিরহবিনা মিলনের মুখ,
দেখেছ কণ্টকশূন্য আমরা কভু ?
ক্ষণপরে ছাৱদেশে বিরাটতনয়া,
( অর্ণব-মন্থন-অণ্ডে পদ্মালয়া যেন )..
আলেখ্য পুতলীসম দাড়াইলা হাসি ।
.

দ্বিতীয় সর্গ।
• • • • • • • • • • • • • • • * * * * *
কোথায় উপমা ?
সে প্রেম-প্রতিমা,
শারদ চন্দ্রমা
চরণে ললাটে,
সুচারু নধর
রক্তিম অধর
শরমে কাতর,
কথা না ফোটে ।
ভুবন রঞ্জন
নয়নে অঞ্জন,
কোকিল গুঞ্জন
স্বরেতে বাজে,
চঞ্চল নয়ন
করে দরশন,
করে পলায়ন
কুরঙ্গ লাঙ্গে।
সরু কটী হেরি,
মনােদুঃখে হরি,
০

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
সব পরিহরি
ত্যঙ্গে না গুহা.
পীন-পয়ােধর,
চুম্বিতে অধর
উন্নত ভূধর
জিনিয়ে আহা!
হেরিয়ে গমন
ঘৃণায় বারণ
মানিছে হার,
তিল ফুল জিনি,
নাসিকা বাখানি,
কিবা ভুলখানি,
মৃণাল ছার!
মুক্ত-কেশ-দাম
হেরি ঘনশ্যাম,
লভিছে বিরাম
পৰ্ব্বতাড়ালে,
== ------

দ্বিতীয় সর্গ ।
* * * * * * * * * * *** *৮৮৮
রাঙ্গা টুক্ টু
মরি ঠোট টু,
হাসি ভরা মুখ
কটাক্ষ বঙ্কিম,
জগ নিরুপম,
হানে অবিরাম
** --------------
মন্মথবাণ ।
*•••
: +
লাবণ্য-আধার,
রূপ খানি তার,
মরি কি বাহার।
( হেরি। অবশ্য প্রাণ।
সরলতা ভরা,
চারু বিম্বাধরা,
নিরজনে গড়া,
মনেতে গণি,
প্রেমের পুতুল,
হেরিয়ে বাতুল,
= 4; --------

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
* * * * * * * *
সৃজন অতুল
প্রতিমাখানি।
অহহ! কি মূরতি
যেন হাসে রতি ;-
অপরূপ জ্যোতি,
দেয় কি শশী?
হেন রূপ ভবে,
কভু কি সম্ভবে ?
উপনীত তবে
কমলা আসি।
পূর্ণমনােরথ যুবা হ’ল এতক্ষণে
প্রফুল্ল-অন্তরে ত্যজি’ কনক-আসন,
অগ্রগরি’ মহানন্দে অৰ্জ্জুন-কুমার,
ধরিলা মৃণাল-ভুজ অতি সযতনে ।
চুম্বিয়া সে বিশ্বধরে ধরিয়া চিবুক
কহিতে লাগিল যুবা অতি মৃদুস্বরে ;
“কেন এত বিলম্বিলে প্রাণের প্রতিমে?
অসহ্য বিরহ-জ্বালা বাড়বাগ্নিলম
;
.
।

*
দ্বিতীয় সর্গ ।
জ্বলিল হৃদয়ে মম, তুমি তা বুঝিলে,
হ’ত কি বিলম্ব এত দিতে দরশন ?
তােমারে না হেরে প্রিয়ে মৱমজ্বালায়
অশেষ নিন্দিনু আমি সীমন্তিনীকুলে।”
এত কহি অভিনু বসিল। অাপনি,
বামপাশে বসিলেক উত্তরা রূপনী ;
জলদের পাশে যেন দামিনী সুন্দরী।
বীণা-বিনিন্দিত-স্বরে তবে এতক্ষণে
উতরিলা অভিমনু-হৃদয়-রঞ্জিনী ;
‘ক্ষমা কর এ দাসীরে নিজগুণবলে,
অপরাধ করে থাকি যদি ও চরণে;
বনুি শাশুড়ীপাশে চরণ সেবিতে,
কহিলা কত যে মাতা উপদেশবাণী,
প্রাণ ভরি’ শুনিয়াছি মিটিল না সাধ,
ইচ্ছা হয় শুনি সদা, সে সব বারতা।
কিন্তু, না বুঝিয়া আজ দারুণ বেদনা
দিয়াছে হৃদয়ে তব এ হতভাগিনী।

২৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
M\
ধিক্ মােরে, কত পুণ্যে পতিরূপে পে’
কুমার সদৃশ তােমা হেন গুণধরে ।
যে দিন জানিব নাথ! তােমার হৃদয়ে
দিয়াছে বেদনা দাসী, সে দিন আমার
জানিব জীবনে আর নাহি প্রয়ােজন,
গুণহীন ধনুকেতে কিবা লাভ আর ?”
প্রসারিয়া বাম বাহু সুভদ্রা-নন্দন
আনিলা সে মুখখানি বুকের ভিতর ;
যথা যেন বর্ষণান্তে নবঘন কোলে
শােভিল ইন্দ্রের ধনু ভুবন-রঞ্জন।
নােহাগে চুম্বিয়া পুনঃ বদন পঙ্কজে
কহিতে লাগিল। তবে অভিমনু বীর
এত যদি না হইবে প্রাণের পুতলী!
তবে কিলাে সদা রাখি হৃদয়-মন্দিরে,
শয়নে, ভােজনে, যুদ্ধে যবে যথা যাই,
তাের ধ্যানে লাে উত্তরে ! থাকি নিমগন।
কেন গরবিনি। তবে বৃথা খেদ এবে
-

ক
দ্বিতীয় সর্গ ।
२६
রূপগুণে বাঁধা আমি সদা তাের পাশে,
ও বদনচন্দ্রমার সুধা পান করি,
রহে সদা পরিতৃপ্ত এ চিত্ত-চকোর ;
ধন্য আমি তােমাহেন পত্নী-ধন লভি’!
পবিত্র করিলে তুমি এ পাণ্ডব-পুরী ।
বিমল কমল-মুখ মলিন দেখিলে,
দুঃসহ বেদনা মনে হয় উপস্থিত,
গ্রা’লে যদি রাহু চাদ
ভুবন-মােহন,
কে হেন পাষাণ, যার দুঃখ নাহি হয় ?
ও মুখ মলিন হলে পলকে প্রলয় ;
সংসার, সমর, রাজ্য সৰ ছার মাের।
প্রাণের প্রতিমে ! এ, দেখাই তােমারে,
আনিয়াছি চিত্ররাজি দিতে উপহার,
যতনে আঁকিয়ে যাহা দিলে সযতনে
রাজ-সভাগৃহে আজ রাজ-চিত্রকর।”
কহিলা উত্তরা পুনঃ ভুবনমােহিনী,
প্রসন্নেন্দু-মুখে চাহি’ অভিমপানে ;

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক ।
•••••••••••••
?
“স্বামীর সােহাগ বিনা অবনীমণ্ডলে,
রমণীজাতির কাম্য নাহি কিছু অর ।
পতি কবে মন্দ হয়,
সতীর নিকট
ভক্তপাশে অপবিত্র হয় গঙ্গোদক?
কোথায় সে চিত্ররাজি দেখিতে বাসনা,
কৃপা করে এনেছ যা দিতে উপহার।
প্রবল ঝটিকাশেষে বা অংশুমালী,
পশ্চিমগগনে পুনঃ হ'লে সমুদিত,
পুলকে পূরিত হয় জগতের জীব,
তথা পুলকিতচিত্তে কহিলা আঞ্জুনি ;
কেন ধনবিনিময়ে সে চিত্রনিচয়,
লভিতে বাসনা আগে বলনা আমায়।”
উতরিল সমস্বরে উত্তরা সুন্দরী ;
“বটে বটে, ভাল দেখি দেখি মুখখানি !”
এতেক কহিয়া বামা ও সারিয়া বাহু,
প্রাণেশের গলদেশ ধরিলা যতনে,

দ্বিতীয় সর্গ ।
२१
অমনি সে বিম্বাধরে করিলা চুম্বন,
প্রেমের আবেশে অভি প্রেমিক রতন।
পরাজিত হয়ে রণে অভিমন্যুপ্রিয়া,
লাজভয়ে নম্রমুখী হইলা তখন,
লজ্জাবতী লতা যথা হয় পরশনে,
লােহাগে ঢলিয়া বামা রহিল সেভাবে।
}
খুলিয়া একটী চিত্র ধরিলা আঞ্জুনি,
বিস্ফারি’ নয়ন তবে দেখিলা উত্তরা ;---
রামবনবাসচিত্র হৃদয়বিদারী
নব-জলধর-রামসহিত লক্ষ্মণ
পতির বিরহজ্বালা সহিতে না পারি,
রামসনে বনে সীতা করিছে গমন ।
তুচ্ছ করি’ রাজসুখে জনক-নন্দিনী
প্রফুলবদনে ধায় কান্তার পশ্চাতে,
তরঙ্গিণী ধায় যথা বারিধির পানে।
“হের নাথ, কত জ্বালা বিরহ-অনলে,

#
২৮
কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক।
কহিতে লাগিলা তবে উত্তরা রূপসী ;-
পাদপ-কোটরে বহ্নি করিলে প্রবেশ,
ক্রমে ক্রমে অস্ত্যদেশ করিয়া দহন,
অবশেষে নাশে যথা সমস্ত বিটপী,
তেমতি বিরহ-বহ্নি প্রবেশি’হৃদয়ে
কত যে যাতনা দেয় নশ্বর শরীরে,
নাশে প্রাণ কত শত অবলীলাক্রমে।
কহিলা আঞ্জুনি পুনঃ-“সীতার কাহিনী
শুনিলে পাষাণ গলে, জানত সকল,-
রাজার নন্দিনী সীতা রাজার ঘরণী,
জগন্মাতা, জগল্লক্ষ্মী, আদর্শ ললনা,
শিখাইতে নারীধৰ্ম্ম সীমন্তিনীকুলে
অসার নশ্বর দেহ করিলা ধারণ ;
তেই দেখ জলাঞ্জলি দিয়া রাজ-সুখে,
ত্যজি’ ধন-জন শুধু পতিসেবাতরে
গিয়াছিলা বনবাসে মনের হরষে ।
সুদুর্লভ পভি-পূজা কার ভাগ্যে হেন?”

দ্বিতীয় সর্গ ।
০
শুনিয়া স্বামীর কথা উত্তরা সুন্দরী,
কহিতে লাগিলা তবে অভিমপ্রতি
“পড়িয়াছে দাসী তব সীতার চরিত,
শুনিয়াছে কত কথা তােমার সদনে,
শুধু পতি-পূজাহেতু পৌলস্ত্যভবনে,
ভুঞ্জিলা যাতনা সতী অশেষপ্রকার,
দুরন্ত চেড়ীর কত প্রাণান্ত প্রহার,
বিষ্ঠা কীট রাবণের কত কুবচন ;
কিন্তু তবু মুখে তার পতিনাম সদা,
পতি-পদ দাধ্যান আছিল সতত।
সতীর পতিই ধৰ্ম্ম, পতিই সম্পদ,
পতিই মঙ্গল তার পতিই সম্পদ,
যাগ-যােগ-দান-ধর্মে নাহি প্রয়ােজন
পতি-পদ সদা ধ্যান সতীর সম্বল।
পতি বিনা গতি নাই সতীর সংসারে,
পারে কি বাঁচিতে মীন বারিহীন হ্রদে ?
এ জগতে কত জল নদীনদার্ণবে,
কিন্তু চাতকের তৃষ্ণা মেঘ-জল বিনা

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
• Ar A+
* - । । । ।
৭ ।।
মিটেনা কখন অন্য দলিলসেবনে ।
তেমতি সতীর সুখ পতিপূজা-বিনা
হয় না কখন ; যথা সুৰ্য্যরশ্মি বিনা
ফোটে না পদ্মিনী কভু চন্দ্রের কিরণে।
পছি-পদ পূজিবারে যার ভাগ্যে নাই
জীবনে মরণে তার উভয় সমান।
হায় ধিক! রামচন্দ্রে, হেন বৈদেহীরে
বিনাদোষে নিৰ্বামিতা করিলা কাননে,
নিরদয় পুরুষের নিরদয় হিয়া,
মাকাল ফলের মত বাহিরে সুন্দর।”
=
দেখিলা দ্বিতীয় চিত্র উত্তরা সুন্দরী,
সৰ্ব্বস্বান্ত হয়ে অক্ষে নিষধ ভূপতি,
দীনহীনবেশে ধায় গহন কাননে,
দময়ন্তী সতী ধায় পশ্চাতে তাহার ।
কামিনীর কমনীয় সুকোমলদেহে
‘কানন-ভ্রমণ-কষ্ট সহিবেনা কভু
তাই ফেলি’ দম’ীরে পলাইছে নল ;

দ্বিতীয় সর্গ ।
n; *
AAA^2 +44, fy. /
কিন্তু যে সতীর প্রাণে পতির বিচ্ছেদ,
প্রখর-তপন-তপ্ত গজালান সম,
না ভাবিলা মনে ইহা দমন্তী-ভূষণ।
n
এ চিত্রের পার্শ্বে চিত্র আরাে ভয়ঙ্কর,
নির্দয়, নির্মম নল নিদ্রিতা কাতারে
ফেলিয়া নির্জনবনে করিছে প্রয়াণ ;
পুরুষ-প্রণয়চিত্র দেখাইছে নরে।
ব্যথিত হইলা দেখি পাণ্ডু-কুল-বধূ,
বিষাদে নিশ্বাস ফেলি’ পুনঃ সুলােচন।
কহিতে লাগিল। তবে প্রিয়তমপ্রতি ;-
‘হাে কি বিষম দৃশ্য হৃদয়বিদারী !
হায় হায় ! এই কি গাে পুরুষের প্রাণ ?
এত কি কঠিন হয় মানবহৃদয় ?
ভবপূজ্য সুধীবর পুণ্যশ্লোক নল,
এই কি অচিার তঁার নারীর উপর ?
হউক সে নরের শ্রেষ্ঠ পুরুষ-প্রধান,
শত ধিক্কারের পাত্র আমার নিকট।”
4

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
দেখিলা তৃতীয় চিত্র বিরাটতনয়া ;-
নিবিড় কানন এক অতি ভয়ঙ্কর,
সাবিত্রীর অঙ্কদেশে সুচিরনিদ্রায়
নিদ্রিত হইয়া আছে পতি সত্যবান,
পশ্চাতে ভীষণ দণ্ড সাপটিয়া করে,
ঈাড়াইয়া হিরনেত্রে রবির নন্দন;
পতি-প্রাণ-সতী-তেজঃ অসহ্য দেখিয়া
কৃতাও ভীত আজি ; পারে না লইতে
সতীর পরমধন স্বামীর জীবন ;
যখ। মহৌষধিমুগ্ধ কাল ফণিবর
পারি' দংশিতে মন্ত্র-ওষধি-প্রভাবে,
স্বীয় তেজে দগ্ধ হয় আপন শরীরে।
ধরিলা চতুর্থ চিত্র অর্জুন-নন্দন,
দক্ষ-যজ্ঞলয়, শােভা অতি মনােহর।
তার মাঝে দক্ষতা হর-মনােরমা,
পিতৃ-মুখে পতি-নিন্দা শুনিয়া শ্রবণে,
আপনার দেহ সুখে দিলা বিসর্জন
।
*

*
দ্বতীয় সর্গ।
-
* * * * * * * *
সতীর জ্বলন্ত দৃশ্য দেখাইতে নরে ।
ধন্য চিত্রকর ধন্য” বলিলা উত্তরা,
“দেখি নাই হেন দৃশ্য কভু চিত্রপটে ;
বাখানি তাহারে যার সুনিপুণ করে,
একে’ছে এ মনােহর চারু চিত্ররাজি।”
চাপিয়া ধরিয়া করে গােলাপী অধর,
উত্তরিলা মধুস্বরে উত্তরা-ঈশ্বর ;--
“বটে বটে এত দয়া চিত্রকরপ্রতি,
আমি বুঝি চিত্রগুলি শুধু ব’য়ে মরি ?”
ব্যস্ত কেন এত ? নহি সকাতর, দিতে
পুরস্কার উপযুক্ত” কহিলা উত্তরা।
b
খুলিলা পঞ্চম চিত্র সুভদ্রানন্দন,
চারিপাশে বামাগণ দামিনী বরণী,
তুলাব্রতে ব্ৰতী হয়ে সত্যভামা সতী
কৃষ্ণের সমান ধন দিবে মহর্ষিকে ;
ধন, বস্ত্র, অলঙ্কার ফুরায়েছে সব,
পৃদি-

৩৪
কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক।
পতির সমান ধন না পারি যােগাতে
বিষন্ন বদনে বলা আছে দাড়াইয়া,
পুলকে পূরিত চিত্ত দেবর্ষি নারদ ।
“উপযুক্ত প্রতিফল” বলিলা উত্তরা,
‘স্বামীর সমান ধন আছে কি সংসারে ?”
বিদ্রুপ করিয়া চিত্রে সত্যভামাপ্রতি,
কহিতে লাগিল। পুনঃ উত্তরা সুন্দরী
“স্বামীর সমান ধন দাও পােড়মুখি।
কেন এবে অধোমুখে দাড়াইয়ে আর ?
অতি ভয়ঙ্কর দৃশ্য ষষ্ঠ চিত্রপটে।
শর-শয্যাশায়ী ভীষ্ম ক্ষত্রিয়-ভাস্কর,
পাণ্ডব কৌরব সব থাকি' চারিদিকে,
অন্তকালে দেখিছে সে ভারত-ভূষণে ।
বড়ই বিষম দৃশ্য মরম বিদারী !
তিতিলা নয়ন-নীরে পাণ্ডব-দম্পতী ।
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি’ অভিমনুবীর

দ্বিতীয় সর্গ ।
ক্ষত্ৰতেজঃপূর্ণ-বাক্যে কহিতে লাগিলা ;---
“নহে এ বিষাদ-দৃশ্য শােন লাে উত্তরে,
ধন্যা বীর প্রসবিনী এ ভারতভূমি,
ভীষ্ম হেন মহারত্ন তনয় তাহার,-
পবিত্র হইল ধরা যাহার জনমে ।
নহে শর-শৰ্যা কভু ফুল-শয্যা এই,
যে ফুলের নিত্য গঞ্জে পুরিত ভুবন।
কা’রনা এমন মাধ, সাধি, নিজ কাজ
পশিতে অমর-ধামে কীর্তি রথে চড়ি’?
ধন্য ভীস্ম, বিশ্বে যার তুলনা-অভাব,
ত্রিলােক পূরিত সদা যশােগীতিগানে ।
হেন সুখ-দিন কভু হবে কি উত্তরে,
সাধি' স্বীয় কাজ যবে ভীষ্মদেব-সম,
ত্যজিব নশ্বর দেহ, রাখিয়া ধরায়
অনশ্বর কীৰ্তিরাজি কুরুক্ষেত্র রণে ?”
শীতল সলিলপূর্ণ-পাত্ৰ-গাত্রে যথা
উষ্ণ সমীরণ স্পর্শে জলবিন্দু বহে,

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
» « * * **
শুনিয়া অভির কথা তেমতি উত্তরা
অল্প অল্প আঁখি-নীরে তিতিলা সুন্দরী।
চাহি’ প্রাণেশের পানে আরম্ভিলা পুনঃ ;-
“ক্ষত্রিয়নন্দন তুমি বীরচূড়ামণি,
সাজে নাথ তব মুখে এসকল কথা,
কিন্তু, হায় । অবলার প্রাণে শেলসম
বিধিয়া দারুণ ব্যথা দেয় প্রাণেশ্বর।
কোমল নারীর প্রাণ ননীর গঠন।
বীর তুমি, তাই বুঝি বীরত্ব তােমার,
বধিয়া নারীর প্রাণ করিবে প্রকাশ ;
কার পানে চেয়ে নাথ বহি দেহভার,
জগত ভুলিয়া থাকি কা’র মুখ দেখে,
পলকে প্রলয় গণি’ কার অদর্শনে,
সুৰ্যমুখী সম থাকি পথপানে চেয়ে ।
ও মুখ মলিন হলে জগত আঁধার,
তুচ্ছ করি রাজ-সুখ নরক সমান ।
প্রসন্ন থাকিলে তুমি, গহন কানন
নন্দনকানন সম দাসীর নিকটে।”
:

দ্বিতীয় সর্গ।
বহিল রক্তিম গণ্ডে নয়নের নীর,
বরিষার জল যথা রক্তপদ্ম-দলে।
মুছাইয়া নেত্ৰ-নীর বসন-অঞ্চলে,
উত্তরিলা এবে পুনঃ উত্তরা-জীবন
‘বীরপত্নী বীরসুতা ভুই লাে উত্তরে,
ক্ষত্রিয় শােণিতে পূর্ণ ধমনী যাহার,
হায়, ছিছি, এই কি লাে তাহার উত্তর ?
আমরা ক্ষত্রিয়-সুত, সমরে কি ভয় ।
মৃগেন্দ্র শিশু কি কভু হয় ভীত চিত,
বিনাশিতে পশুকুল ? ডরে কি কখন,
দংশিতে মানবে কাল-ণ-ধর-শিশু ?
ক্ষত্রিয় ঘরণী হয়ে রণ ভয় চিতে,
কে বা না হাসিবে শুনি’ এ সব বারতা ?
ছাড় ভয়, ভয়শীলে, কর এ প্রার্থনা,
নির্ভয় অন্তরে পশি’সমর প্রাঙ্গণে,
সুচারু বরজে পশি’ সজারু যেমতি,
করে ছিন্ন ভিন্ন সব, তথা বিদলিয়া
অরাতি নিচয় রণে, পিতার মঙ্গল

৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
• • • • • • • • •
*** ** , , , , , , f/
যেন পারি সম্পাদিতে সম্মুখ সমরে ।
আছে কি লো হেন বীর এ ভব মণ্ডলে,
আটিতে সমর-ক্ষেত্রে পাণ্ডবের সনে ?
যাদের মঙ্গল তরে মঙ্গল আশ্রয়
ভুঞ্জিছে বিপদ সব বিপদ-ভঞ্জন ;
জগতের ইষ্ট সেই কৃষ্ণ দয়াময়
থাকিতে সহায় কিবা ভয় পাওবের ?
পাণ্ডব প্রতাপ ভবে রহিবে অটুট।”
এতেক কহিয়া অভি হইলা নীরব,
আরম্ভিলা পুনঃ তবে কহিতে উত্তরা
“সত্য যা কহিলে নাথ, কিন্তু নারী প্রাণ
আরাধন করে সদা পতির মঙ্গল,
নহিলে ক্ষত্রিয় বালা ডরে কি মরে ?
বীর প্রসবিনী মােরা এ ভারত ভূমে,
রণরঙ্গে কভু মােরা নাহি করি ভয় ;
যথা স্রোতস্বতী স্রোত শৈত্য-গুণাধার
সুমন্দ গতিতে বহে সাগরের পানে,

সু-
দ্বিতীয় সর্গ।
৩৯
A..
কিন্তু যদি প্রভঞ্জন যোঝে তার সাথে,
নহে সে কাতর যুদ্ধে, তেমতি সমরে
কর্তব্য বিমুখ নহে ক্ষত্রিয় ললনা ।
মাতুল-শ্বশুর মাের থাকিলে সহায়,
সুভদ্রার পুত্রবধূ না ডরে সমরে।
কিন্তু, ভেবে দেখ নাথ, কি ঘাের তরঙ্গ
উঠিয়াছে কুরুক্ষেত্র রণ-পয়ােধির,
• কত মহারত্ন ক্ষয় হইছে নিয়ত,
তাই কঁপে ছার প্রাণ শুধু তব তরে ।
অবােধ রমণী প্রাণ প্রবােধ না মানে
প্রাণেশ-মঙ্গল-হেতু সদাই শঙ্কিত।
হষে রণে অগ্রসর, বধিবে অবলা
এই কি মনন প্রভাে! করিয়াছ মনে?'
বিষাদ সাগরে হেরি’মগ্ন অবলারে,
ধরিয়া মৃণালভুজ কহিলা আঞ্জুনি ;
লয় নাই অভি রণে, কেন তবে ভয়,
বিষাদ মলিলে কেন ভাম অকারণ?

৪০ কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক। বদন প্রসন্ন করি’চাহ একবার। কহিলা উত্তরা পুনঃ অতি মৃদুম্বরে ;- “পিঞ্জরের পাখী যদি চায় বার বার উদঘাটন করি দ্বার করিতে প্রয়াণ তবে কি বিশ্বাস কভু হয় তার প্রতি উত্তরিলা এবে পুনঃ উত্তরা-জীবন- ‘রােধ দ্বার শক্ত করে হবে ভয় দূর।” হাসিয়া কহিলা বামা “কে করে বিশ্বাস, শিকল কাটাই সদা স্বভাব যাহার।” ‘বউ কথা কও' বলি ডাকিল বাহিরে, পাখী বুঝি হয়ে দুঃখী অভিমনু-দুখে। অর্জুন-নন্দন তবে কহিলা আপনি “পােড়ামুখ পাখি ! তুই আমার মতন ‘শিকল কাটার দায়ে পড়েছিলি কভু ?* ঘত যােগে বহ্নি সম অমনি উত্তরা, ছুটিলা তখন বেগে রােষের আবেশে । উড়িল কুগুল পিছে জলধর সম, দামিনী বরণী খেলে উত্তরা সুন্দরী।

দ্বিতীয় সর্গ ।
৪১
ধাইলা পশ্চাতে অভি, ধরিলা অঞ্চল,
‘শিকল কাটিল বুঝি’ কহিলা আবার ।
মানের তুফান এবে থামিল ত্বরিতে,
হালিয়া ফিরিয়া বালা অভির বদনে
করিলা চুম্বন সাধে, মরি কি বাহার
গােভিল সুবর্ণ থালে কোহিনুর মণি ;
আবেশে ঢলিয়া বামা রহিলা তখন,
সহকার করু’পরে স্বর্ণলতা যেন।
;
.

২
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক ।
* * * *
******
তৃতীয় সর্গ।
সুবিপুল শােকাৰ্ণবে ভাসে সুরপুরে,
শশাঙ্ক-বাসনা সতী রােহিণী রূপসী।
জীর্ণ শীর্ণ কলেবর মলিন বদন,
আলু বালু কেশ দাম পড়েছে ছড়িয়ে,
স্বামী বিনা এ জগতে কি আছে এমন,
তােষিতে সতীর মন পতিগত সদা।
আপনি চন্দ্র মা যার জীবন-ঈশ্বর,
কেন না আঁধার সব হবে তারে বিনা,
সুধাকর-সুধা বিনা কেমনে রূপসী
ধরিবে জীবন ভার আঁধার জগতে ?
হায় কভু কঁাদে বালা কভু চুপ থাকে,
ছট ফটু করি’ কভু কাটাইছে কাল,
*

তৃতীয় সর্গ ।
৪৩
৯১।
••
অচলা যামিনী যেন ভাবি মনে মনে,
কভু বা আপনি কহে দুঃখের বারতা ;
“হায় বিধে ! আর কি সে ধরিব জীবন,
অবােধ অসহ্য মন প্রবােধ না মানে,
বড়ই প্রখর হায় বিরহ--অনল,
ধীরে ধীরে জ্বালি’ আগে দহে পরে প্রাণ।
নিদাঘে মাতঙ্গ মত্ত রাখিলে বাঁধিয়া
যে দশা তাহার, আজ সে দশা আমার ।
অসহ্য অসহ্য আর না পারি সহিতে
হায় হায় কোথা গিয়া জুড়াইব প্রাণ?”
৮
এই রূপে বিলাপিয়া বিধু-প্রাণেশ্বরী,
চলিলা মনের দুঃখ বলিতে আপন,
সথা বিরাজেন লক্ষ্মী গোলক-ঈশ্বরী।
অনন্ত শয্যায় হরি নিদ্রায় বিভাের,
শিখাইতে নারী-ধৰ্ম্ম সীমন্তিনী-কুলে
পদপাশে বসে রমা সেবে পদযুগ,
ভােলানাথ পদ্মনাভ করে স্তুতি-গান,

৪৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
•• •••
h'
শনকাদি ঋষিগণ নিমগন ধ্যানে।
চিরশান্তি বিরাজিছে নাহি শােক তাপ,
কার সাধ্য সে শােভার করিবে বর্ণন ?
অনন্ত ছটায়
ক্ষীরােদ পাথারে
অমিয় আধারে
শােভিত নীরদ-কায়,
অনন্ত ফণায়,
অনন্ত শায়িত হয় ।
পীতাম্বর পরা
গলে পীতধড়া
শােভে বনমালা গলে,
সুনীল সলিলে,
মৃদুল হিল্লোলে
(হরি) মৃদুল মৃদুল দোলে।
( হরি) পুরুষ উত্তম, স-রজ-ভম
এই তিন গুণাধার,
কুল কুল নাদে, বহে গঙ্গা পদে
নাশিতে কলুষ ভার।
চির শাস্তি দিয়া, চৌদিক, ঘেরিয়া
জি’ সে সুখ আলয়,

তৃতীয় পর্গ ।
৪৫
অনন্ত শয্যায়, শাস্তির নিদ্রায়
(হরি) মহাসুখে নিদ্রা যায়।
পদপাশে বসে জগ-লক্ষ্মী হেসে,
বিভুপদ সেবা করে,
যেন ঘ-কোলে
সৌদামিনী খেলে,
৫
অপরূপ শোভা ধরে ।
রূপের তুলনা,
ভুবনে মিলে না,
কল্পনা ও মালে হার,
ও রূপের গাথা, কি গাবে কবিতা
নাহি কোন সাধ্য কার ।
অনন্ত সে পুর অনন্তু ঈশ্বর,
অনন্ত সকল তায়,
রূপের অন,
ভাবের অনন্ত,
অনন্ত বহিয়া যায় ।
অনন্ত আকাশ, অনন্ত বাতাস,
অনন্ত আমােক খেলে,
বিধি-বিষ্ণু-ভােলা, ভাবিয়া উতালা,
যাইতে অনন্তকুলে ।
*

৪৬
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
অনন্তের ছবি, এ অধম কবি,
কি আর আঁকিবে হায়,
যেন দয়া করে, এ দীন কিঙ্করে,
অনন্ত রাখেন পায়।
)
প্রণমি’ রমার পদে রােহিণী রূপসী,
দাড়াইলা নত শিরে বিষন্ন বদনে।
ব্যাকুলিত প্রাণে তারে সুধিল তখন,
ভুবন মােহিনী সতী কেশব-বাসনা ;-
( নন্দন কাননে যবে আসে ঋতুরাজ,
শুনিয়াছে পিকবর সুধাংশু-রমণী,
শুনিয়াছে অপ্সরার গান সুর-পুরে,
কিন্তু, যাহা ঝঙ্কারিল রােহিণীর কানে,
সব হার মানিলেক আজি তার কাছে,
সুধার ফোয়ারা যেন ছুটিল দিগন্তে।)
“কি লাগিয়ে এলে ধনি হেথা নিশাকালে,
অকুল হইল প্রাণ কহ বিধু-প্রিয়ে?”
৩

তৃতীয় সর্গ ।
f, sa, A.
৩
}
কাতরে নিশ্বাস ছাড়ি’ কহিলা রােহিণী ;-
“ক্ষম মাতঃ অভাগীরে ; শান্তির আগারে
পশিয়াছি নিশাকালে বেদনা জানাতে
তুমি বিনা ব্যথা মম কে বুঝিবে আর?
প্রবেশিলে শান্তিপুরে সবে শান্তি পায়,
কহ দেবি, কোন্ দোষে দাবী দোষী পদে,
অভাগীর শান্তি-সুখ নাহি কি জগতে ?
জগত-জননী তুমি, এই কি বিচার ?
নহে পটু স্রষ্টা দেবি, জগত জনে,
ন’লে কেন ত্রিভুবনে এত অবিচার?
কেন পূর্ণ রত্নাকর হিংস্র যাদোগণ,
অর্ধ ভূমণ্ডলে কেন না তাপে তপন,
এক পক্ষে অন্ধকার অন্য পক্ষে আলাে,
কেন জরা নাশ করে সুচারু যৌবন,
কালে কণ্টক কেন, বিধুর কলঙ্ক,
মহাতেজা মাৰ্ত্তণ্ডের কেন রাহু অরি,
প্রণয়ে বিচ্ছেদ কেন ধৰ্ম পথে বাধা,
সুখ দুঃখ মিলি’ কেন বৃষ্টি বিধাতার ?”

৪৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
* * *
==*
{
হাসিয়া কহিলা তবে রমা আদ্যাশক্তি;
“বৃথা কেন দোষ তুমি ক্ষপাকর-প্রিয়ে ?
অবলার কিবা বল কি বুঝিবে বল ,
গৃঢ়তম সৃষ্টিতত্ত্ব দুরূহ অশেষ,
শুনিতে বাসনা যদি সে সব বারতা,
কছি ভবে ব্যক্ত করে শােন অন দিয়া।
‘ক্ষম দেবি,” বাধা দিয়া কহিলা রােহিণী,
“কি কাজ আমার শুনি সে ঘূঢ় সংবাদ ?
যে অনল জ্বলিতেছে হৃদয়-করে,
কহ দেবি, কিরূপে ত হইবে নিৰ্ব্বাণ ?
-কি কাজ আমার ছাই সৃষ্টিতত্ত্ব গুনি,,
বল তত্ব কিসে দাসী ধরিবে জীবন।
অসহ্য অসহ্য দেবি, জীবন আমার,
নাহি মানি স্রষ্টা তুষ্টি, যা’ ছারখারে
স্বর্গ-মর্ত্য-রসাতল, নাহি খেদ তায়,
বুঝিয়াছি এ জগতে নাই সুবিচার।”

তৃতীয় সর্গ ।
৪৯
WAnA
MAvia a
৩০
কহিলা কাতরে তবে শুনি' পদ্মালয়া
“কহ লতি, কিবা জ্বালা হৃদয়ে তােমার
ব্যথিত অন্তর মম হেরি’ দশা তব,
শুনিতে উদ্বিগ্ন মন, কহলাে সত্বর।”
;
বিষাদের হাসি হাসি কহিলা রােহিণী
“দয়াবতী নাম আজ সার্থক তােমার ।
অন্তর যামিনী তােমা বলে মিছে লােকে।
আত্ম-সুখে রত লক্ষ্মি, আপনি সতত।
ভেবে দেখ রমে তুমি আপনার মনে,
কত যে দুখিনী আমি বলা নাহি যায় ;
ভুমি সতি, অঙ্কে নিয়ে কান্ত-পা দু'খানি,
সেবিছ মনের সাধে ত্যজিয়া বিশ্রাম,
হায় দুখিনীর প্রতি হয় না কি দয়া ?
(মণিহারা ফণিনীর যে দশা জগতে)
অসার হইল এই বামা-জন্ম মাের।
জননী গাে দয়াময়ী বিদিত ত্রিলােকে,
দুখিনী-তনয়া কি মা জ্বলিবে পরাণে ?

৫০
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
হায় মাতঃ একি তব উচিত বিচার,
নিজ সুখে তনয়ার দুঃখ নাহি বুঝ ?”
উতরিলা পুনঃ এবে মাধব-মােহিনী ;-
“কেন সতি বৃথা তুমি দোষ বিধাতায়,
যার যাহা কৰ্ম্ম ফল, অবশ্য তাহার
হইবে ভােগিতে, নাহি কেহ পারে তারে
করিতে খণ্ডন ; ভেবে দেখ মনে ধনি,
যেই যাের পাপে তব জীবন-ঈশ্বর
জনমিল ধরাতলে, কি সাধ্য আমার
বল খণ্ডাইতে তারে ? সামান্য বালিকা
নহত রােহিণি ! পার সব বুঝিবারে,
তবে কেন বৃথা মােরে দোষ ইন্দুপ্রিয়ে ?”
কহিলা গম্ভীরস্বরে রােহিণী আবার ;-
“না চাই শুনিতে আর মধুর বচন ;
বড় আশা করে আজ এসেছি আমি,
করিবারে দয়া-ভিক্ষা লক্ষ্মি তব কাছে।

*
তৃতীয় সর্গ ।
পূরিল সকল সাধ, মিটিল বাসনা,
অহহ কি পাষাণ চাপা হৃদয় তােমার ?
সম্বােধিয়া যােহিণীরে কহিলা কমলা ;
“সুখ,দুঃখ এ জগতে ভাগ্যের লিখন,
কৰ্ম্ম অনুযায়ী তাহা হইবে ভুগিতে;
ভেবে দেখ মনে সাধ্বি, যে ঘাের পাতক
করে শাপগ্রস্ত হ’ল প্রাণেশ তােমার ;
কৰ্ম্ম অনুরূপ শাস্তি হয়েছে উচিত।
নিদয়া নিঠুরা কভু নহিগাে রােহিণী,
কাদে প্রাণ তাের তরে, ফেটে যায় বুক।
বিরহিণী বালা সম হায় এ জগতে
আছে কি দুঃখিনী কেহ ? হায় মা আমার
শােকা-নয়নে তাের বহিতে দেখিয়া
ইচ্ছা হয় পুনঃ পশি সাগর মাঝারে।
শাম্ভ হও সতি, বৃথা বিলাপে কি ফল ?
এ অভাগী জন্মে জন্মে কেঁদেছে অনেক,
'য়েছে অনেক। তাই বলি মা আবার
-

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
১
বিলাপে নাহিক ফল! এবে এস দুইজনে
ভক্তি ভরা চিতে ডাকি বিপদ-ভঞ্জনে,
সকল বিপদ নাশ করিবেন যিনি।
হের হের বিধুপ্রিয়ে ইচ্ছাময় হরি
নিদ্রায় বিভাের আজ আপন ইচ্ছায় ।
এ কি নিদ্রা কভু সতি? অনন্তব্ৰহ্মাণ্ডে
যাহার ইচ্ছায় ঘটে সৃষ্টি, স্থিতি, লয়,
অনন্ত কৰ্ম্মের সুত্র বাঁধা বার করে
নিদ্রা কি সম্ভবে তার ? এস মােরা এবে
বুড়ি’দুই কর, প্রাণে হইয়ে বিভাের
ডাকি সৰ্ব্বদুঃখহারী প্রভু নারায়ণে।”
এতেক কহিলে লক্ষ্মী, জানু পাতি দোহে
ও হরে ও হরে” বলি ডাকিলা ভবেশে।
ভাঙ্গিল অনন্ত-নিদ্রা, জাগিয়া কেশব
কহিতে লাগিলা এবে—“কি কারণে, কহ
কোন দুঃখে পদ্মালয়ে! নিশীথ সময়ে
ডাকিছ আমাকে? বাধা হরি সদা পাশে,
»

তৃতীয় সর্গ।
তবে কোন দুঃখে কঁাদ ভবন্ধুঃখ হরা ?”
প্রাণের ভক্ত কি কেহ পড়েছে বিপদে ?”
উতরিলা পদ্মা তবে–“আবার ছলনা,
হরি আর কত বল করিবে এ রূপ ?
যুগে যুগে জন্মে জন্মে কত কষ্ট হয়
ভুঞ্জিল জগত-প্রাণী ছলনায় তব ।
হের নাথ হের ওই শশাঙ্ক মােহিনী
ভিখারিণী বেশে আজ পতিতা চরণে।
হয় না কি দয়া প্রভাে, আর কত জ্বালা
বল নাথ, দাসী আমি, বল দয়া করে
সহিবে অভাগী বালা? হের মুখ খানি
বিকচ-কমল-মম ছিল শোভা যার,
ফেটে যায় বুক এবে হেরিলে তাহায় !
দয়াময়, কৃপানেত্রে হের একবার ;
কিসে বালা ধরে প্রাণ বল কৃপা করি,
ছলনা চাতুরী ছাড়ি, ওহে অন্তর্যামি।”

৫৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
কহিলা কেশব—“লক্ষি, বুঝেছি সকল ;
হয়েছে স্মরণ সব, কাদিছে পরাণ ।
প্রাণের ভক্তের স্মরি’ অপার দুর্গতি ;
কর্মদোষে ভক্তশ্রেষ্ট ভুঞ্জে এ যাতনা ।
পরম ভকত জায়া রােহিণী আমার,
করহ সান্ত্বনা প্রিয়ে; অচিরে হইবে
দুঃখ রাশি দূর তার ; আসিবে ত্রিদিবে
ভক্ত মাের, সাধিকাজ নশ্বর ধরার।
বিশেষতঃ তুমি যারে সদয়া এ ভবে
কোন দুঃখ তার থাকে বল দুঃখহরা।”
কহিলা কমলা পুনঃ-“নাথ’ জানি আমি
ভকত বৎসল তুমি, ভক্তের জীবন,
কৃপাময়, কই মােরে পাপের সংসারে
হয় নি বঞ্চিত কভু তােমার কৃপায়
ভুলেনি’ত তােমা ধনে বােহিণীজীবন ?
তুমি ত ভুলনি, ভরে ওহে দীননাথ ?”

তৃতীয় সর্গ।
উতরিলা কমলেশ-“ধন্যা তুমি রমে!
এত যদি না হইবে তবে কি লাে থাকে
বাঁধা তাের পাশে সদা আপনি ভবেশ ?
তবে কি লাে অহর্নিশ জগতের প্রাণী
ডাকে মন প্রাণ সঁপি’ দয়াময়ী বলি’?
ভকতের প্রাণ তুমি পতিত পাবনি
শােন প্রিয়ে’ ভুলে নাই ভক্ত শ্রেষ্ঠ মােরে,
আমিও ভুলিনি তারে ; জানত কমলে,
লীলার মাহাত্ম্য ভবে করিতে প্রচার
কৃষ্ণ রূপে জন্ম মাের ধরণী মারে।
আমার পরম ভক্ত অর্জুন ঔরলে,
ভক্তশ্রেষ্ঠ চন্দ্র মােয় জন্মেছে ধরায় ;
নাম তার অভিমন্য, বীর চূড়ামণি ;
মাতুল রূপেতে আমি সহায় তাহার ।
কাল পূর্ণ এবে তার আলিবে সে ত্বরা,
রাখিয়া অক্ষয় কীৰ্ত্তি কুরুক্ষেত্র রণে।
আবার কহিলা রমা-“হরি প্রাণেশ্বর !

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
ধন্য তুমি, ধন্য তব ভক্ত-প্রেম ভবে ?
ভক্তের মঙ্গল ভরে সদা ব্যস্ত তুমি,
নিজ হ’তে শক্তি বেশী দিয়াছ ভক্তেরে।
প্রাণের রােহিণি ! হের, হের নারায়ণে
অপার দয়ার সিন্ধু, হের দুনয়নে।
যাও মনােমুখে সতি, আপন আলয়ে
অচিরে বাসনা তব হইবে পূরণ।”
গদগদ স্বরে তবে রােহিণী রূপসী
কহিতে লাগিলা পুনঃ,-“ভুলেছি সকল,
ভুলেছি বিরহ জ্বালা ভু’লেছি জগত!
অবশ হয়েছে প্রাণ, চলেনা চরণ।
মাের ম ধন্যা আজ কে আছে জগতে ?
ইচ্ছা হয় থাকি সদা যুগল চরণে,
সুধার ফোয়ারা যেন ঝড়িছে চৌদিকে,
আপনি আপন হারা হইয়াছি আজ।
কৃপাময়! কৃপাময়ি! এত কৃপা বােগ্যা
কভু নহে এই দাসী; ভিখারিণী আমি,

খুঁ
তৃতীয় সর্গ ।
কৃপা করি’ রেখাে পদে, দেহ বর মােরে
থাকে যেন মতি সদা যুগল চরণে।
প্রণমি কেশব পদে পূজিয়া রমায়
চলিলা রােহিণী তবে পুলকিত চিতে,
নানা উপচারে পূজি’ যথা ইষ্ট দেবে
ফিরে যায় ভক্ত জন মনের হরষে।

৫৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
চতুর্থ সর্গ।
প্রভাতে সমিতি-গৃহে পাণ্ডব-শিবিরে
বলেছেন ধর্মপুত্র রাজা যুধিষ্ঠির,
নকুল, সদেব, ভীম আত্মীয় স্বজন
বসেছে চৌদিকে সব ঘেরিয়া রাজায়,
তারকা নিকর যথা ঘেরে চন্দ্রমারে।
সহ সখা ধনঞ্জয় গিয়াছে মরে
লভিতে অতুল কীর্তি দুর্জয় আহবে
ভুবন-বিজয়ী নারায়ণী সেনাসহ।
বহিতেছে যেই ঝড় কুরুক্ষেত্র রণে,
অগণন বীর বৃন্দ হইতেছে হত,
হারাইছে কত মাতা প্রাণাধিক সুত,
হইতেছে অনাথিনী কত সতী হায়,
০

চতুর্থ সর্গ।
ভ্রাতুশােকে কঁদে কেহ, কেহ বন্ধু শশাকে,
প্রতিদিন ক্রন্দনের উঠে নব বােল।
হৃদয় কুটির আর বাসের কুটির
আলােকিয়া ছিল কারাে একটী প্রদীপ,
এ দুরস্ত ঝড় তারে নিবাইয়া হায়,
করেছে আঁধার আজ উভয় কুটির।
মাতৃ পিতৃ হীনা কোন অভাগিনী বালা
হৃদয় কন্দর মাঝে বড় সাধ করে,
রােপে ছিল তরু এক জীবন আশ্রয়,
যতনে করিত তায় প্রেম বারি দান,
এ বিপুল ঝড় তারে করে উলিত,
হরেছে শীতল ছায়া জীবন মরুর।
এইরূপ কত শত দেহের পতন
হইতেছে মহারণে সংখ্যা নাই তার।
০
ধর্মভীরু পাণ্ডবেশ বসি অধােমুখে
ভাবিছেন সমরের ভাবী ফলাফল,
ইহার উপর এক বিষম বারতা,

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
শুনিয়া ভালেন রাজা অকুল পাথারে,
নূতন কৌশল এক করি উদ্ভাবন
রচেছেন চক্রব্যুহ দ্রোণ মহাবীর
সৈন্য স্থাপনের প্রথা অতি সুনিপুণ,
আপনি কৃতান্তরূপী সব্যসাচী গুরু,
ব্যুহ মাঝে থাকি রণে করিছে আহ্বান
মুছিতে সিন্দুর-বিন্দু কত অভাগীর।
করিছেন চিন্তা রাজা কে যাইবে রণে,
কে ভেদিবে চক্রব্যুহ নর-কালান্তক।
চিন্তায় ব্যাকুল হেরি রাজা যুধিষ্ঠিরে
কহিতে লাগিলা রােষে ভীম মহাবল,
নির্ভয় হৃদয় যার বৃত্রাসুর সম,
যমদও সম গদা সদা ধার করে ;-
“মহারাজ, একি তব চিন্তার সময়?
প্রজ্জ্বলিত বহি শিখা হেরি গৃহ পরে ।
নিশ্চেষ্ট হইয়া কর উপায় চিন্তন ?
ঢালিলে কলঙ্ক তুমি ক্ষত্রিয় সমাজে!

চতুর্থ গর্গ ।
ফণধর শিশু কভু করে কি চিন্তন
কিরূপে দংশিবে নিজ শক্র মানবেরে ?
আমরা ক্ষত্রিয় পুত্র সদা জাগরুক,
আঘানিলে রণে কেহ অমনি প্রস্তুত।”
উত্তরিলা যুধিষ্ঠির সুগভীর স্বরে ;-
‘ভাই ভীম, বটে করী মহাবল অতি
কিন্তু বুদ্ধিহীন বলি বিফল সে বল,
হয় বাধ্য অনায়াসে ক্ষীণ মানুষের।
তেমতি বীরত্বে তব নাহি কোন সার ;
মহাবল হতে পার, নহ বীর তুমি।
ভূত ভবিষ্যৎ যে বা করিয়া চিন্তন
করেন গমন রণে; বীর সেই জন।
দেখ চিন্তি মনে ভাতঃ, যেই ভয়ঙ্কর
চক্রব্যুহ রচিয়াছে কুরু-সেনাপতি,
ভেবেছ উপায় কিছু ভেদিতে উহারে ?
শুধু পশু-বলে রণে ফল নাহি হয় ।
আজিকার চক্রব্যুহ রচি গুরুদেব
০
৪

ঃ
কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক।
প্রকাশিছে কত নিজ সমর পটুতা,
প্রিয়তম শিষ্য তাঁর অর্জুন কেবল
শিখেছিল হেন ব্যুহ ভেদন উপায়,
সংহরণ, কোশলাদি উহার মাঝারে
নির্গম উপায় যত, রণ পরিশেষে।
তাই চিন্তাকুল মন, নহে রণে ত্রাস
ভুবন-বিজয়ী-ভাই বিজয় আমার,
নাহি আজ উপস্থিত, নাই হেথা আজ
সৰ্ব্ব-বিঘ্ন-বিনাশন প্রাণের কানাই।
যুড়ি দুই হাত তবে কহিলা নকুল
শকুল সদৃশ যিনি শত্ৰু-অহি নাশে ;-
“কেন মিছে ভাব দাদা জান ত নকল,
আনিলে রণে শত্রু, শাস্ত্র-বিধি মতে
অবশ্য যাইতে হবে সমর প্রাঙ্গণে ;
বিলম্ব হইলে শত্রু হাসিবে নিশ্চয়।
নাহি ডরে কুরু দলে পাণ্ডু-পুত্রগণ,
ভীষ্ম, দ্রোণ, না থাকিলে ওরা এতদিনে

চতুর্থ সর্গ।
তুলা রাশি প্রায় সবে যাইত উড়িয়া,
ওদের বীরত্ব সব বুঝেছি ক’দিনে ।
সদা পাপে রত যারা নাহি ধৰ্ম্ম জ্ঞান,
কিসে দাদা তারা বল জিনিবেমরে ?
অথবা মরণ যদি থাকেই ললাটে,
তাতেই বা কেন ভয়, বীর-পুত্র মােরা,
কখনাে কাতর নহি সম্মুখ সমরে,
লভিতে অক্ষয় স্বর্গ পরাণ ত্যজিয়া।”
চাহি’সে অনুজ পানে কহিলা নরেশ,
অচল বারিধি মত সদা স্থির যিনি ;-
“বীরেন্দ্র কেশরী সম উত্তর তােমার ;
কিন্তু মনে কভু ভাই করেছ চিন্তন,
কি উপায়ে দ্রোণ ব্যুহে করিয়া প্রবেশ
লভিবে অতুল কীর্তি দুর্জয় সমরে ?
পাণ্ডবের গৰ্ব খর্ব হ’ল এতদিনে,
জানি কি মহানর্থ ঘটিবেরে আ’জ;
পাণ্ডবের সখা যিনি দেব বাসুদেব
-

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
থাকিলে নিকটে কোন ছিল না কো ভয় ;
গিয়াছে কীরিটী রণে, সুযােগ দেখিয়া
রচিয়াছে ব্যুহ দ্রোণ, ভেদিতে যাহায়
নাহি কোন বীর আর পাণ্ডব শিবিরে,
পার্থই জানয়ে শুধু এ রণ-কৌশল।
গভীর নিশীথে ঘাের দামিনী সম্পাতে
মানব সুষুপ্তি যথা ভাঙ্গে অকস্মাৎ,
সেইরূপ এতক্ষণে বদন তুলিয়া
করিলা লােকন অভি রাজানন পানে।
বীর-শােণিতের স্রোত বহিল শিরায়,
ভাতিল বিশাল নেত্র, উঠিয়া লত্বর
দাড়াইলা সভামাঝে অভিমন্যু বীর,
উজল হইল সভা রূপের ছটায়।
প্রজ্জ্বলিত দীপ হতে প্রদীপ জ্বালিলে
উভয় প্রদীপে যথা না হয় প্রভেদ,
তেমতি দেখিলা সবে বিস্ময় মানিয়া,
দ্বিতীয় অর্জুন এক হ’ল উপনীত।
০৪

In a wrishnau.al-৭, ৬
**
চতুর্থ সর্গ ।
******
দূর-দেশে নিরাশ্রয় মানব কখন
পড়িলে বিপদে, যদি কোন মহাবল
আসিয়া সহার হন, তখন কেমন
সাহসে সবল হয় বিপন্ন মান,
তেমতি অভির সেই বীরত্বব্যঞ্জক
বীর মুখ নিরখিয়া পাণ্ডু-সেনাগণ,
বিজয় উল্লাসে মত্ত হইল। অমনি ।
বহিল আশার স্রোত,পুনঃ হ’ল সাধ
আঁপ দিতে রণার্ণৰে সবার হৃদয়ে,
উৎসাহ ভাসিত হ’ল বদন-মণ্ডল।
ঘােড় করি করয় সুগভীর স্বরে
সম্বােধিলা বীরবর যুধিষ্ঠির ভূপে
“পূজ্যপাদ বিজ্ঞতম জ্যেষ্ঠতাত
তুমি,
অজ্ঞতম দাস আমি জ্ঞান বুদ্ধি হীন
দুষ্টতা করহ ক্ষমা মিনতি আমার,
দাসের বক্তব্য যাহা কর শ্রবণ;--
“নাহি কোন বীর আর পাণ্ডব শিবিরে”?
,

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
ভুবন-বিখ্যাত পাণ্ডুবংশ-রবি তুমি,
এ কথা কি শােভা পায় তােমার বদনে ?
হায় তাত, বড় ব্যথা বাজিল মরমে।
ধুরন্ধর, ধনুর্দর, কত বিদ্যমন,
বীরত্বের রঙ্গভূমি পাণ্ডব শিবির,
চতুষ্টয়ানুজ তব ভুবন বিজয়ী,
আপনি কংসারি তব সাধেন মঙ্গল,
আত্মীয় বান্ধব তব সবে মহারথী
নিজে তুমি যুধিষ্ঠির সদা ধৰ্ম্মে রত ;
হক সেই চক্রব্যুহ অজেয় জগতে,
অব্যর্থ কৌশল দ্রোণ করুন বিস্তার,
বীরেন্দ্র কেশরী এত বাহার সহায়,
‘অসম্ভব’ অসম্ভব হবে পক্ষে তার ।
আজ্ঞা কর তাত। দানে যাইতে সমরে,
দেখিতে বড়ই সাধ আচাৰ্য-কৌশল ;
হেলায় ভেদিয়া
ৰূহ ওপদ প্রসাদে,
পাণ্ডব-বিজয়-ধ্বজা উড়া’ব নিশ্চয়।

চতুর্থ সর্গ।
নীরবিলা বীরবর, প্রসারিয়া বাহু
দিলা আলিঙ্গন প্রেমে রাজা যুধিষ্ঠির,
গদ গদ স্বরে পুনঃ কহিতে লাগিলা ;
“বন্যরে বাছনি মাের ধন্য পাণ্ডুকুলে,
উজল করিলি তুই ক্ষত্রিয় সমাজ
জানি তুই বীর বাপ, কিন্তু, এ পরাণ
চাহে পাঠাতে তােরে এ দুরন্ত রণে,
বংশের প্রদীপ তুই, অন্ধের নয়ন,
সুভদ্রার একমাত্র অঞ্চলের নিধি।”
•
“কেন ডর রাজাউতরিলা অভি,
“মুভদ্রা জননী যার, জনক বিজয়,
ভব-ভার-হারী-হরি মাতুল যাহার,
সে কি কভু
ভীত হয় এ ছার সমরে ?
দেহ আজ্ঞা, পশি’রণে আনি দিব বাঁধি,
কুরুকুলে আছে যত বড় বড় বীর।
মধ্যাহ্ন গগনে যদি যান অস্ত রবি,
মন্দ সমীরণ যদি ভাঙ্গে হিম গিরি,

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
তথাপি রােধিতে কেহ নারিবে মরে
ভুবন-বিজয়ী-বীর-অর্জুন-নন্দনে।
বড় সাধ মনে তাত দেখিতে সমরে,
কত বীৰ্য্য ধরে তব বৃদ্ধ গুরুবর ;
বড় সাধ মনে, পশি সমর-প্রাঙ্গণে,
কুলাঙ্গার কুরুরাজ আর দুঃশাসনে
সমুচিত দণ্ড দানে করিতে নির্বাণ
মাতা দ্রৌপদীর সেই হৃদয় অনল।
উতরিলা যুধিষ্ঠির সম্মিত বদনে ;
বীরেন্দ্র নন্দন তুই বীর চূড়ামণি,
বীরাঙ্গনা গর্ভে বাপ লভিলি জনম,
কেন না করিবি তুই বংশ সমুজ্জ্বল ?
ক্ষত্রিয় কাতর নহে পাঠাইতে কভু
প্রাণাধিক বীরপুত্রে দুরন্ত সমরে।
রহিবে ক্ষত্রিয় পিতা চির পুত্রহীন,
তবু নাহি চাহে কভু কাপুরুষ মুত ।
নাচে রে পরাণ অভি হেরি' তােমাধনে,

চতুর্থ সর্গ ;
৬৯
************
••••••••••
বংশের গৌরব তুই রাখিবি নিশ্চয় ।
কিন্তু বাপ, অজি তব দুরাকাঙ্ক্ষা শুধু
ভেদিতে দ্রোণের ব্যুহ দুর্জয় ভুবনে।”
আবার বিনীত স্বরে কহিলা আঞ্জুনি ;-
“কেন কর ভয় রাজা, জানি আমি সব ;
কহিলেন পিতা যবে মাতার সদনে,
শুনেছি সে দিন আমি এ রণ-কৌশল,
এ ব্যুহ ভেদন-প্রথা শুনেছি সকল,
শুনি নাই শুধু আমি নির্গম উপায় ;
কিন্তু তাহে কিবা ভয় কে রােধিবে মােরে,
শূন্য করি, ব্যুহ যবে হইব বাহির ।
•
রণােৎসাহে মাতি তবে মধ্যম পাণ্ডব
সম্বােধিয়া নর নাথে ভীম ভীমসেন
“পাধু-কুল-রবি, দাদা, অভিমনু এই,
হ’ব আমি রণক্ষেত্রে উহার সহায়,
নিরাতঙ্কে কর আজ্ঞা যাইতে মরে,
.

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
কৌরব গরব খর্ব হ'বে এত দিনে ;
নিশ্চয় নিশ্চয় রাজা ভাবিও অন্তরে,
সপত্নী বিজয় লক্ষ্মী হবে উত্তরার।”
আনন্দাশ্রু নীরে ভাসি রাজা যুধিষ্ঠির
কহিতে লাগিলা তবে ভীমসেন প্রতি ;
“জানি আমি মহাবীর অর্জুন কুমার,
হও ভ্রাতঃ তুমি আজ উহার সহায়,
আমিও যাইব রণে লয়ে সেনাদল
রক্ষিতে বাছারে আ’জ এ ঘাের সমরে।
যাও সবে অস্ত্রাগারে লইয়া অভিরে,
সাজাও উহারে সবে সেনাপতি সাজে,
শ্রীমধুসুদন নাম উচ্চারিয়া মুখে
হও অগ্রসর সবে সমর প্রাঙ্গণে।
।
এতেক কহিয়া রাজা বুড়ি’ দুই হাত
কহিতে লাগিলা তবে চাহি ঊর্ধদিকে
“দয়াময় হরি, দয়া করি রে’খ পদে,.

চতুর্থ সর্গ।
৭১
• N/A
১২।
/\/\
১১।
বিপদে করিও ত্রাণ বিপদ-ভঞ্জন।
স্নেহের পুতুল অভি যাইতেছে রণে,
বাছা মাের এক মাত্ৰ কুলের প্রদীপ,
পাণ্ডবের শুধু প্রভাে! তুমিই সহায়,
ভাগিনেয় তব যেন না পড়ে বিপদে।”
“জয় শ্রীমাধব জয়-জয় নারায়ণ
ধ্বনিল সে সভাতলে মহারথি-গণ।

"
পঞ্চম সর্গ।
ill
পাণ্ডব শিবির পাশে শোভে সরােবর,
শােভাময় পুষ্পোদ্যান রাজে তার কুলে,
গগনাবলম্বি-চূড়া শিবের মন্দির
শােভে তার মাঝে এক বিচিত্র গঠন।
প্রভাত কিরণে বোটে চারু-পুস্পরাজি-
জাতি, যুথী, বেল আদি গােলাপ মল্লিকা ;
পিক, কুহু ৰব গায় ; ভ্রমর ঝঙ্কারে
সুগন্ধ মাখিয়া দেহে খেলে মন্দ বায়ু,
সরসী জীবনে ফোটে পদ্মিনী রূপসী
সুমন্দ হিল্লোলে দোলে হেলিয়া দুলিয়া
ভানুর কিরণ পশি’ নরী লিলে
কাপায় সরােজপ্রাণ-রীর জল,

“
পঞ্চম সর্গ ।
রঞ্জিয়া প্রিয়ার দেহ সুবর্ণ আভায়
করে খেলা প্রেমাবেশে পঙ্কজ-বান্ধব।
পুত্রের মঙ্গল হেতু পশিয়া মন্দিরে
করিছেন শিব পূজা সুভদ্রা জননী।
কুসুম উদ্যানে পশি’ উত্তরা রূপসী
তুলিছে আপন মনে চারু পুষ্পরাজি।
কভু বা গাথিছে মালা, কভূ বাধে তােড়
কভু বালা ফুল সাজে সাজিছে আপনি।
খেলিছে প্রতিমা মহাস মুখে,
হেলিয়ে দুলিয়ে,
মাধুরী ছড়ায়ে,
পাইছে কখন আপন সুখে।
বহে ধীর ধীরি ম য় বায়,
উড়িছে কুন্তল,
জিনি’ মেঘ দল,
খেলিছে দামিনী-বরণ-কায় ।

৭৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
****
.
s
গুন্ গুন্ করি’ গাইছে বালা,
ভাবে আপনার
আপনি বিভাের,
তুলিছে কুসুম ভরিয়ে থালা ।
মুনি মনােহারি-নয়ন কোণে
সরল চাহনি
ভুবন মােহিনী,
কত হৃত কথা জাগায় প্রাণে।
ধরা যেন নহে কিছুই তার,
আপনার মনে
আপনার প্রাণে,
আত্মহারা হয়ে গাথিছে হার।
শােভিত উদ্যানে পুষ্পিত তরু,
রূপের কোয়াড়া
যুবতী
উত্তরা,

পঞ্চম সর্গ।
WAA
তাহার মাঝারে রাজিছে চারু ।
সে ফোয়াড় হতে লাবণ্য যেন,
আপনা আপনি
লুটায়ে মেদিনী,
দ্বিগুণ উজল করিছে বন।
প্রেমিক অনিল প্রেমের বশে,
ফুলের সুগন্ধে,
মনের আনন্দে,
যুবতী শরীর মাখায় রসে ।
প্রভাতে রবির শীতল ছবি,
যেরূপ মাধুরী
যেন নিজে হেরি,
পশে না উদ্যানে প্রমাদ ভাবি।
শেফালিকা তরু উপমা ছলে,
৪

ৈ
কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক ।
***%% ** ***
সুগন্ধ প্রসুন
করে বরষণ
আপন লােহাগে পড়িছে ঢ’লে ।
যুবতী-গমন নর্তন গণে
মৃদুল পবন
বেনুর কীর্তন
কুঞ্জ বংশ রন্ধে করিছে ক্ষণে।
আনন্দে মাতিয়া বিহগ গায়,
যপদের তানে
পিক কুহু গানে
আনন্দে উদ্যান ভাসিয়া যায়।
কোথাও কুসুম লতিকা চয়,
জগনিরুপমা
হেরি সে প্রতিমা
ক্ষীণ কটি ধরি’ বেষ্টিয়া রয় ।

S,
পঞ্চম সর্গ।
৭৭
AvvvvvvvvA
AA
“উত্তরা” “উত্তরা” ডাক পশিল শ্রবণে,
চমকি’ চাহিলা বাল চিনিলা সে স্বর,
ছুটিল তাড়িত বেগ শিরায় শিরায়,
উমরু নাচায় যথা ফণধর দেই।
ব্যাকুল অন্তরে বাল চাহিলা চৌদিকে,
কিন্তু না পূরিল সাধ না দেখিলা কারে ।
‘প্রিয়জন সম্ভাষণ প্রিয় জন কানে,
লেগে থাকে যেন হায় দিবস রজনী,
ভাবি’ মনে এই কথা বিরাট নন্দিনী
পুনঃ আরম্ভিলা ফুল করিতে চয়ন ।
কুহু কুহু পিক্বর ডাকিল কাননে,
অনুকরি সেই স্বর উদ্যান মাঝারে
কুহু কুহু
উচ্চ রব ধ্বনিল তখন।
শিহরিল প্রাণ এবে, ফিরিলা উত্তরা,
আর না ঘুরিল নেত্র, টানিল চুম্বকে,
অর্ধগাথা মালা করে রহিল পড়িয়া ।
হাসিতে হাসিতে তবে বিরাট-নন্দিনী
কহিতে লাগিলা এবে প্রিয়তম প্রতি ;-

4
৭৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক ।
+AAAAAAAA
WWWAAAA%,40" / "1" • • •
উচিত।
উ। একি বীর, কেন আজ পিক অবতার ?
অ। দেখি কেহ যদি পড়ে ফঁাদেতেআবার।
উ। ভয় নাই ঘটকিনী আছে উপস্থিত,
অ। বন খুজি
ঘটকালী না হয়
উ। বীর চূড়ামণি হয়ে মনে এত ভয়?
অ। ও নয়ন বাণে সবে মানে পরাজয়।
উ। আ’মরি আমরি রসিক বর,
উথলি’ পড়িল রসের সর।
অ। লাগিবে লাগিবে লাগিবে গায়,
আয় ত্বরা করে সরিয়ে আয় ।
উ। আ ছিছি আ ছিছি মরি হে লাজে,
একেলা পাইয়ে কানন মাঝে,
নারী সনে হেন ব্যাভার কর
সাবালি সাবালি সাবাসি বীর !
অ। আহা লাে লাজুক রমণিমণি !
থেকো সাবধানে বলিগাে ধনি,
L

পঞ্চম সর্গ।
লাগিলে বীরের আঁচড় গায় ।
হইবে সে দাগ উঠান দায় ।
উ। বটে বটে বটে রসিক রাজ
আঁচড় দেওয়া বীরের কাজ ?
বীরের বালাই লইয়ে মরি,
গাবে গুণ তব জগত-নারী।
অ। হয়েছে হয়েছে অনেক প্রিয়ে ।
পুড়াে’ না কথার ছলনা গেয়ে,
মানে হা’র অভি পড়ে বিপাকে
চিরদিন হার মেনেছি তােকে।
উ। বেশ বেশ বেশ বীরেন্দ্রমণি,
কুরুক্ষেত্র রণে যাবেন ইনি।
ভাল বীর সাজ লও ত পরি,
দু’হাতে দু’গাছ নােনার চুড়ী।

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
অ। কি বলিস্ বল নির্লজ্জ ছুড়ী
হাতে দিয়ে দিবি সােণার চুড়ী ?,
চুরিইত মাের হয়েছে কাল
ছেড়ে নাহি দি চোরাই মাল।
উ। চুরি করেছিলে নারীর মন
তাই চোর সহ চোরাই ধন
রেখেছি হৃদয় গারদে পূরে
মন্মথরাজার আদেশ ভরে।
সহাস্য আননে তবে অৰ্জ্জুন নন্দন
চুম্বি বিম্বাধরে তবে কহিলা প্রিয়ায় ;
“ক্ষমা দে ক্ষমা দে প্রিয়ে ক্ষমা দে এখন
চল যাই এবে মােরা জননী লকাশে,
যাব লাে উত্তরে তাের সপত্নী আনিতে,
গগনে বাড়িল বেলা দেখ চেয়ে ওই ।”
প্রবল আনন্দ স্রোত ফিরিল অমনি
উত্তরার ফুল্ল মুখ হইল মলিন ;
রে
--:

পঞ্চম সর্গ ।
৮১
বহিল নয়নাসার, বুঝিলা সকল
প্রাণেশ বিজয়-লক্ষ্মী করেছে কামনা।
ধরি প্রিয়তম করে গদ গদ স্বরে
কহিতে লাগিলা তবে বিরাট নন্দিনী ;-
“বল নাথ দেখিবারে যে বদন চাদে
রহিত ব্যাকুল নদ। এ চিত্ত-চকোর,
কেন সে বদন হেরে কঁাদে আজ মন,
;
০
কেন মনে জাগে নানা অমঙ্গল কথা ?”
“সত্যই কি পাগলিনী হইলে উত্তরে ?”
মুছায়ে নয়ননীর কহিল আঞ্জুনি
“ছিছি ছিছি একি তব খেদের সময় ?
হাসিবে ক্ষত্রিয় বালা এ কথা শুনিলে ;
বিভুর প্রসাদে আজ প্রাণ-পতি তব
অধিষ্ঠিত হইয়াছে সেনাপতি পদে,
মাধব মাতুল যার সৰ্ব্ব-ভয়-হারী,
পিতা যার বাহুবলে ভুবন বিজয়ী,
হয়ে তার নারী, ছিছি ডর ছার রণে,
.

*
२
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
««
!
সুভদ্রার পুত্রবধূ নহ কি উত্তরে ?
রেখ মতি নদা প্রিয়ে বিভুর চরণে,
হরিবে সকল ভয় ভব-ভয়-হারী
চল এবে যাই তবে যথা মা জননী
মােদের মঙ্গল তুরে পূজিছেন শিবে।”
ধরি প্রিয়তমা করে চলিলা বীরেন্দ্র,
ফেলিয়া সুদীর্ঘ শ্বাস চলিলা উত্তরা।
মানে প্রবােধ মন অবােধ এমন,
তথাপি রােধিলা সতী শােকের আবেগ।
শােকে পাছে অমঙ্গল ঘটে প্রাণেশের
এ ভয়েই শােকাগারে 'আটিলা অর্গল।
।
কতক্ষণে গেলা দোহে মন্দির প্রাঙ্গণে,
দেখিলা মুদিত নেত্রে সুভদ্রা জননী,
পূজিছেন ভােলানাথে ভুলিয়া সকল,
জ্বলিছে সুবর্ণ দীপ, ছুটিছে সুবাস ;
মন্দিরের মাঝখানে শিবলিঙ্গ রাজে।
প্রবেশি মন্দিরে তবে পাণ্ডব দম্পতী

*
পঞ্চম সর্গ।
৮৩
ভক্তি ভাবে প্রণমিলা শিবের চরণে,
আবীর বন্দিলা দোহে মাতৃপদ-যুগ।
জপ সাঙ্গ করি তবে কহিলা সুভদ্রা ;-
‘ধর দোহে আশীৰ্বাদ যুগ্ম বিশ্বদল,
শিবময় শিব দেহে রাখুন মঙ্গলে ;
বৎস অভি, মাতা তব মঙ্গলের তরে
পূজে ভক্তিভরে আজ শিব আশুতােষে,
কি হেতু আইলা হেথা বল যাদুমণি
আছে কিবা প্রয়ােজন শুনিতে বাসনা।”
.
উতরিলা উত্তরেশ-“সার্থক জননি
ভক্তি শ্রদ্ধা পরিপূর্ণ শিব আরাধনা,
তাই শিশুমতি পুত্র তব আজ মাতঃ
অধিষ্ঠিত পাণ্ডবের সেনাপতি পদে ;
মাগাে, ধর্মরাজ আজ প্রভাত সময়ে
হইলা আকুল অতি শুনিয়া বারতা
‘রচেছেন চক্রব্যুহ দ্রোণ মহাবল
শ--

৮৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক ।
ne
*** AA
ভেদিতে যাহাকে বীর বিরল ধরায়।
নেহারি সে ভাব মাতঃ হইনু কাতর;
সম্বােধি রাজায় তবে কহিলাম আমি,
“যাইতে প্রস্তুত রণে কুমার তােমার,
আসিবে অক্ষত দেহে নাশিয়া অরাতি।”
পুলকিত হ’ল রাজা শুনি কথা মম
আলিঙ্গন দিয়া কত করিলা আদর,
নানা বাক্যে লাগিলেন বুঝাইতে মােরে--
‘অতি ভয়ঙ্কর ব্যুহ নর-কালান্তক।
কিন্তু পুত্রে তব মাতঃ না দেখি বিমুখ
আনন্দে বরিলা রাজা সেনাপতি পদে ;
তাই এবে আসিয়াছি লইতে বিদায়,
পাণ্ডব বিজয়-ধ্বজা উড়াব সমরে ।”
পুলকিত চিতে তবে কহিলা সুভদ্রা ;-
“বীর চুড়ামণি বাপ, ধন্য তুই মাের,
ধন্যা আমি ভবে, ধরি তােমায় জঠরে,
পাণ্ডুবংশ সমুজ্জ্বল হ’ল তােমা হতে।

পঞ্চম সর্গ ।
৮৫
W,
‘প্রাণপুত্র সেনাপতি’ ইহা হতে আর
কি আছে আনন্দ-বাৰ্তা ক্ষত্রিয় মাতার?
নাচেরে ধমনী সব, নাচেরে পরাণ
আয় কোলে ল’য়ে বাপ চুমি চাঁদমুখ ;
আবার আবার বাছা বলরে আবার,
সত্যই কি মহারাজ দুঃখিনীর ধনে
বরেছেন পাণ্ডবের সেনাপতি পদে ?
ক্ষত্রিয় রমণী ভবে নাহি চাহে আন,
চাহে শুধু দেখিবারে বীরেন্দ্র কুমার ।
মায়ের পরাণ বাপ, অতি স্নেহময়,
তাতে তুই একমাত্র তনয় রতন,
তাই বুঝি কাঁপে প্রাণ পাঠাইতে তােরে •
দুর্জয় অরাতি পূর্ণ এই মহাহবে।
৮
“মাগাে কেন কর ভয়?” কহিলা কুমার
তােমার প্রসাদে মাতঃ তনয় তােমার
কুরু-বীরগণে ভাবে তৃণের সমান,
আসিব বিনাশি সবে অক্ষত শরীরে।”

*
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
“কৌরবেরা তৃণ সম বটে তব কাছে
জান না কি বাপ ধন” কহিলা সুভদ্র;
“কুরুবীরগণ অতি ধৰ্ম্ম জ্ঞান হীন
পাপ পথে সদা তারা করে বিচরণ,
অন্যায় সমরে রত নিয়ত কেবল,
তাই কঁপে প্রাণ বাপ! নহে অন্য ভয়।
নহেরে বিমুখ কভু ক্ষত্রিয় জননী
পাঠা’তে সম্মুখ রণে প্রিয়তম সুতে।”
অবনমি’ শির তবে কহিলা সুধী ;
“আশীৰ্ব্বাদ কর মাতঃ বিজয় নন্দন
অবশ্য বিজয় লাভ করিবে সমরে ;
কেন কর শঙ্কা মনে, কি ছার কৌরবে ?
সহস্র চাতুরীজাল পাতুক তাহারা,
মাধবের ভাগিনেয় নাহি ডরে তাহে।”
‘ভুবন বিজয়ী বাপ” উতরিলা ভদ্রা-
জানি তুমি বাহু বলে বট সৰ্ব্বজয়ী ;

পঞ্চম সর্গ ।
৮৭
+ । । । । । । । । ।
যঃ ও বৎস মনসাধ মিটাও সমরে,
ধর আশীৰ্বাদ বাপ, এই বিল দল,
হউক সহায় তাের দেব ত্রিলোচন,
সকল বিপদে তােরে রক্ষিখেন তিনি।
যাও বৎস হাঙ্গণে করি আশীৰ্বাদ,
যুদ্ধক্ষেত্র হয় যেন মম বক্ষঃস্থল ।
কেন মা উত্তরে তাের মলিন বদন,
এ নহে "মা তাের কভু বিষাদের কথা,
হইয়া প্রসন্ন ডাক দুঃখহর হরে,
সৰ্ব্ববিঘ্ন বিদূরিত করিবেন তিনি।”
••
প্রণমিয়া অভিমনু শিবের চরণে,
বন্দিল চরণপদ্ম নিজ জননীর
চাহি উত্তরার পানে হইল। বিদায়।
মুছিতে নয়ননীর বিরাট বালার
অলক্ষিতে মুছি গেল সিন্দরের ফেঁটা,
সুভদ্রার বক্ষঃস্থল হইল কম্পিত ।

.
j
ষষ্ঠ সর্গ।
বাজিল সমর ভেরী পাণ্ডব শিবিরে,
নাচিল সৈনিক হিয়া, কাপিল বসুধা ;
বাজিগণ হ্রেষারব করিল সঘনে,
‘পাণ্ডবের জয়’ রব ভেদিল অম্বর।
চলিল পাণ্ডবসেনা কাতারে কাতাকে,
সাজিয়া বীরেন্দ্র সাজে বিচিত্র স্যন্দনে
চলিলেন সেনাপতি অভিমনু ৰীর,
দেবসেনা ল’য়ে যথা ধায় ষড়ানন ।
রক্ষিতে কুমার আজ রুদ্র মূর্তি ধরি,
চলেছেন ভীমসেন পশ্চাতে পশ্চাতে ;
নকুল স’দেব সহ নিজে ধৰ্ম্মরাজ
বাহিরিলা মহাতেজে রক্ষিতে অভিরে।
rap - 4 = 4 = = = = = = = Purus -
-------- --- = = = = = =

ষষ্ঠ সর্গ।
৮৯
v'',,,
ধাইল পাণ্ডবসেনা কঁপায়ে মেদিনী
বায়ুকোণ ঝড় যেন, পৃথিবী নাশিতে ।
দেখা দিল ক্রমে ক্রমে দ্রোণ-চক্ৰব্যহ
কৃতান্ত-সদন বেন সৰ্ব্বসংহারক,
মহোল্লাসে রণ-ডঙ্কা পাণ্ডব সেনানী
বাজাইয়া কাপাইলা সমর-প্রাঙ্গণ।
মরণের ত্রাস এবে গেল চলি’দূরে,
নবীন উল্লাসে সবে হ’ল মাতােয়ারা
আবার আবার সবে করিল হুঙ্কার
আবার আবার বাজে সমরের ভেরী।
শুনিবিপক্ষের রব দ্বিগুণ উল্লাসে
করিল নিনাদ পুনঃ কুরু-সেনাদল।
•
কতক্ষণে অভিমন্ত হয়ে অগ্রসর
নিরখিলা জয়দ্রথে নূহ-দ্বার মাঝে,
রুদ্রতেজে বীরবর রক্ষে ব্যহ পথ
দুরন্ত-কৃতান্ত যেন নাশিতে মানবে।
-

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
,
ধীরে ধীরে অগ্রগরি' অর্জন-নন্দন,
পটিয়া খর অলি অরিন্দম করে
গভীর গর্জনে তবে কহিতে লাগিলা ;
“প্রবেশিবে
বৃহ মাঝে পাণ্ডু সেনাপতি
সব্যসাচী পিতা যার, মাতুল কেশব,
বীরাঙ্গনা ভদ্রা যারে ধরিল জঠরে।
সহে বিলম্ব আর ছাড় শীঘ্র পথ,
অথবা যুদ্ধের সাধ যদি থাকে মনে
সমরের ইচ্ছা তব অবশ্য মিটা’ব।”
"
ভকুটি করিয়া তবে জয়দ্রথ বীর
সম্বােধিলা পাৰ্থ-সুতে
সম্মিত বদনে
‘অতি রূঢ় হইলেও বালকের বাণী
অমৃত বর্ষণ করে মানব শ্রবণে ;
কেন হেথা অভিমন্যু ? এ নহে তােমার
শৈশবের ক্রীড়াভূমি, কি দেখিবে বল ?
নাই হেথা তােমাদের খেলার জিনিষ,
অথবা খেলার সাথী নাই হেথা তব ।”

**,
ষষ্ঠ সর্গ ।
N\AN
১১।
গরজি’ বিষম রােষে, ( মৃগেন্দ্র যেমতি)
নিষ্কোষিত অসি করে কহিলা কুমার ;
মূঢ় তুই, কি বুঝিবি নির্লজ্জ তস্কর,
ক্ষত্রিয় শিশুর লীলাস্থল রণাঙ্গণ,
ধনুর্বাণ অলি গদা ক্রীড়ার জিনিষ ।
বীরেন্দ্র কেশরী যত বটে সাথী তার ।
‘নাই হেথা তােমাদের খেলার জিনিষ
এ কথা যথার্থ বটে ওরে দুরাচার,
তা না হলে কেন হ’বি রণে পরাঘুখ,
বলিহারি বীরপণা বীর চূড়ামণি !
মরণের ভয় মনে? কর পলায়ন
কাপুরুষ নাহি বধে ক্ষত্রিয়কুমার।”
ক
শুনিয়া অভির কথা জ্বলিয়া মরমে
আরম্ভিলা বীরদাপে জয়দ্রথ পুন;-
“এতই আস্পর্ধা ওরে অবােধ বালক ?
নিশ্চয় বুঝিনু তাের শমন নিকট,
সমঝের সাধ তাের অবশ্য মিটাব ;

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
ধরি শীঘ্র অসি করে হও অগ্রসর।”
এতেক কহিয়া বীর ধরিয়া কৃপাণ
হইলা প্রবৃত্ত তবে ভীষণ সংগ্রামে
কিন্তু হায়, ব্যর্থ যথা উত্তাল তরঙ্গ
ভাঙ্গিতে দুর্ভেদ্য গিরি, তেমতি সন্ধান
যত কিছু করিলেক বীর জয়দ্ৰথ,
সকল বিফল হ’ল অভির নিকটে।
বীর মদে মাতি’তবে অর্জুন কুমার
প্রবেশিলা মহারবে চক্রব্যুহ মাঝে
(আনায় মাঝারে ব্যাঘ্র পশয়ে যেমতি)
হেথা ভীম ভীমসেন রক্ষিতে কুমারে
বহদ্বারে হইলে আসি উপস্থিত,
মহারবে জয়দ্রথ রােধিলা সে পথ
বাঁধিল বিষম যুদ্ধ নর-কালান্তক।
গ্রহ দোষে হায় আজ ভীমের বিক্রম
নিষ্ফল হইল সব ; অস্থির হইয়া
:

ষষ্ঠ পর্গ ।
১৩
ব্যুহের
চৌদিকে বীর ফিরিতে লাগিল,
যথা যেন পিঞ্জরেতে হেরি বদ্ধ সুতে
আকুল প্রাণেতে ঘরে বিহঙ্গম পিতা
ভাঙ্গিয়া পিঞ্জর দ্বার উদ্ধারিতে তারে।
মহােল্লাসে জয়দ্রথ রক্ষে বৃহদ্বার
অজেয় আজি সে রণে শিবের প্রসাদে।
;
প্রবেশি ব্যুহের মাঝে অৰ্জ্জুন-কুমার
হেরিলা চৌদিকে কুরু-মহারথিগণে ;-
দুৰ্য্যোধন, দ্রোণাচাৰ্য, অশ্বত্থামা, কর্ণ,
কৃপাচার্য্য, দুঃশাসন, শকুনি, লক্ষ্মণ,
শল, সাল, ভূরিশ্রবা, কাথ, সােমদত্ত,
বৃন্দারক, বৃষসেন, সুষেণ, প্রবাহু,
মূর্তিমান শূরগণ বিরাজে চৌদিকে
আরাে আরাে কত ধীর সংখ্যা করা ভার ।
হেরিয়া অভিরে এবে কুরু-সেনাদল
বৰ্ম্ম চৰ্ম্ম গদাকরে ধাইলা সকলে,
যথা যবে ব্যাঘ্ৰ শিশু পশে গ্রাম মাঝে,

১ঃ
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
««।
ধায় গ্রামবাসিগণ বধিতে উহারে।
কিন্তু ওই স্মিতমুখে উত্তরা ভূষণ
হেলায় বিনাশি সবে করিলা হুঙ্কার ;
এইরূপ কত শত বীরের পতন,
হইল সে রণস্থলে সংখ্যা নাহি তার ;
মহাবনে দাবদাহ হইয়া যেমন
নাশি তরুরাজি সব করে ছারখার,
তেমতি এ বীর আজ চক্রব্যুহ মাঝে,
করিলেক ছিন্ন ভিন্ন কৌরব বাহিনী।
মুহূর্তেকে ঘাের রােল উঠিল অম্বরে
ছুটাছুটি আরম্ভিল কুরুসেনাদল,
মুছিল সিন্দুর-বিন্দু কত অভাগীর,
হারাইলা কত মাতা নয়নের মণি।
তাড়াইয়া সেনাদল হ'য়ে অগ্রসর
(বেগবতী স্রোতস্বিনী যেন মহারবে
ভেদি গিরি বনস্থল হয় আগুসার)
হেরিলা
সম্মুখে অভি দুঃশাসন বীরে।
প্র

ষষ্ঠ বর্গ ।
•
হাসিয়া কুমার তারে কহিলা তখন
“ভাল সুপ্রভাত আজ তাই বীরবর
ঘটিল তােমার সহ হেথা সম্মিলন,
আপনি কি সেই প্রভু, যিনি সভামাঝে
করেছিল অপমান পাণ্ডুপুত্রগণে?
অহে! জ্বলে প্রাণ মন স্মরিলে সে কথা,
এখনাে নিশভাবে পঁাড়ায়ে বৰ্বর ?
ভাল, নাই কিরে প্রাণে মরণের ত্রাস ?
ধর ধনুঃ, বাণ, অলি, নহিলে স্মরণ
করহ অন্তিমে যারে করিতে মনন।”
উতরিলা বীরদাপে তবে দুঃশাসন,
“তারে ক্ষুদ্রমতি শিশশা, জানি আমি তাের
নিশ্চয় হয়েছে কাল নিকট আগত,
ন’লে কেন হয়ে ছার গেমায়ু অধম
কেশরী আবাসে দম্ভে করিবি প্রবেশ ?
হও অগ্রসর, আজ মির বাসনা
মিটাইব তাের, রণে এ জনম তরে।”

উs
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
An Aho
এতেক কহিয়া বীর ধরিয়া নারাচ,
নিষঙ্গ হইতে দিগ্ধ জুড়িলা তাহায়।
দৃঢ় করে অভিমন্যু ধরিয়া সংগ্রাহ,
বিশাল কোদণ্ডে মৌৰ্বি করি আরােপণ,
বিধিলা সুতীক্ষ খড়গ দুঃশাসন শিরে ;
আহত হইয়া বীর করিল প্রয়াণ ।
অমনি গরজি ঘাের কাল-পৃষ্ট করে
মহাবীর কর্ণ আলি আক্রমিলা পুনঃ ।
টঙ্কারি শিঞ্জিনী কর্ণ হ’ল অগ্রসর
বাঁধিল ভীষণ রণ সৰ্বসংহারক,
বীরদাপে বসুন্ধরা হইল কম্পিত।
অবহেলে সৌভদ্ৰেয় কৰ্ণ কৰ্ণমূলে
বিঁধিলা শাণিত শর, হইয়া কাতর
মনােদুঃখে রণস্থল ত্যজিলা রাধেয় ।
কিন্তু হায়, ভয়ানক সেই রণস্থল,
এক না যাইতে অন্য হয় অগ্রসর ;-
বীর-নাদে হুঙ্কারিয়া তখন শকুনি
ও

ষষ্ঠ সর্গ।
১৭
অৰ্জ্জুন-কুমার
প্রতি হ’ল প্ৰধাবিত।
‘রক্ষা মাই রক্ষা নাই” কহিলা শকুনি
কিছুতে নিস্তার আজ নাই দুরাশয়,
বহু দিন উপবাসী এই করপাল,
রক্ত পান করি তাের মিটাবে পিয়াস,
অব্যর্থ শরব্য এর, থাকিলে শকতি
রােধ কর গতি এর, নহিলে শঙ্কট।
প্রতিরােধি অসিঘাত আপন ফলকে
ভিন্দিপালে অভিমন্যু করিল প্রহার,
আহত হইয়া বেগে অমনি শকুনি
ত্যজিয়া সে রণভূমি করিলা প্রয়াণ ।
রক্তবীজ বধে যথা নিহত হইলে
একটি অসুর, অন্য জন্মিত আবার,
তেমতি অসংখ্য বীর-পরিপূর্ণ ব্যুহে
পরাজিত হলে এক অভিমন্যু সনে,
অমনি গরজি পুনঃ অন্য এক জন
করে আক্রমণ আমি দ্বিগুণ উলালে ।

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
WAA% th=
৫.
1.
এবার গর্জিলা রণে প্রাজ্ঞ মহাবল
কৃপাচার্য্য নাম যার ভুবনে বিদিত;
“বেড়েছে সাহস বড় ক্ষুদ্রমতি শিশশা?
দৈবযােগে কর্ণাদিকে করি পরাজয়
ভেবেছ কি বীরশূন্য হ’ল কুরুপুরী ?
প্রাণের বাসনা আজ ছাড় রে অবােধ ।
হিমালয়-শৃঙ্গ যদি যায় ঔড়া হয়ে,
অহি যদি হত হয় ভেকের পীড়নে,
অস্ত যদি যায় রবি পূরব অম্বরে,
তথাপি কৃপের হাতে নাহি তাের ত্রাণ ।
ধর অলি, শরাসন, দ্রুঘন, নারাচ,
৭ যাহা অভিরুচি, ল’য়ে হও অগ্রসর,
শমন সদনে তাের অবশ্য গমন
করিতে হইবে আজ অবােধ বালক।
প্রাট-জীমূত-মন্দ্র-সদৃশ নিনাদে
ধরিয়া কাৰ্ম্মক করে গর্জিলা কুমার ;
“ছড়ি কু বাসনা ওহে দুৰ্ব্ব দ্ধি ব্রাহ্মণ

ষষ্ট অর্গ।
১৯
D
অস্ত্র শস্ত্র যােদ্ধ বেশ না সাজে তােমার।
ভুলিয়া স্বজাতি ধর্ম পরধর্মে যেই
করে বিচরণ, তার সম কেবা আর
আছে দুরাচার এই অবনী মাঝারে ?
নিজ হিত আশা যদি কর মূঢ় দ্বিজ,
কর পলায়ন, নৈলে কিছুতে নিস্তার
নাহি আজ মাের হাতে, জানিও নিশ্চয়।
দু’টা আস্পর্ধার কথা বলিয়ে কি ভাব
ভীত হবে সমরেতে অৰ্জ্জুন-নন্দন?
আবার আবার বলি, কর পলায়ন,
ক্ষত্রিয় না করে হিংসা, ব্রাহ্মণের প্রতি।
বজ্ৰনাদে কৃপাচাৰ্য উতরিলা পুনঃ,-
“বিধির নির্বন্ধ কেবা খাইতে পারে,
একান্তই আজ তাের ঘটিবে মরণ,
ধরি অস্ত্র আত্মরক্ষা কর দুরাশয়,
বৃথা বাক্য আড়ম্বরে নাহি প্রয়ােজন
শিয়রে বসিল তাের কৃতান্ত করাল।
k

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
{
-
টঙ্কারি কাৰ্ম্মক তবে গভীর নিনাদে
আক্রমিলা কৃপাচার্য অভিমন্যু শূরে,
ছুটিল আশুগকুল, ছাইল অম্বর,
ধূলিরাশি সমাচ্ছন্ন করিল চৌদিকে।
ধন্য বীর পার্থ সুত! মুহূর্তেক মাঝে
পরাজিত হয়ে কৃপা করিলা প্রয়াণ।
-
কুমার লক্ষ্মণ তবে লইয়া কাৰ্ম্মক
রণাঙ্গণে পদার্পণ করিলা তখন।
বীর চুড়ামণি অভি কহিলা তাহারে ;-
“রাশাকেনরে ভাই, যাও ফিরি ঘরে
শিশু তুই তাের সহ কি বিবাদ মাের ?
ভয়ঙ্কর রণক্ষেত্র জান না কি ভাই ?
{
০
অহিশিশু গাত্র স্পর্শ করিলে যেমন
রােষাগ্নি তাহার হয় দ্বিগুণ জ্বলিত,
দুৰ্য্যোধনাত্মজ তথা দ্বিগুণ নিনাদে
সম্বােধিয়া ভদ্ৰামুতে কহিতে লাগিল;-

ষষ্ঠ পর্গ ।
=****
\/\/\/ad/
* *
“ছাড়িয়া বাক্যের ছটা বল স্পষ্টকরি”
কুণ্ঠিত হইয়া থাক যদি যুদ্ধ দিতে,
নিরস্ত্রকে আক্রমণ নহে ক্ষাত্রধর্ম
যুঝিতে বাসনা যদি লও অস্ত্র করে ;
শাণিত কৃপাণ তবে ধরি’ অভিমন্যু
ধাইলা লক্ষ্মণ-পানে অতি দ্রুতগতি,
চক্ষের নিমিষে হায় কুমার লক্ষ্মণ
চির সুষুপ্তির ক্রোড়ে লভিলা বিশ্রাম,
হাহাকার রব এবে উঠিল অম্বরে
শােকেতে কাতর হ’ল কৌরব-বাহিনী ।
জ্ঞানহারা হয়ে শশাকে রাজা দুৰ্য্যোধন
ধাইলা কোদণ্ড নিয়ে অভিমন্যু প্রতি ;
হেরিয়া তাহারে অভি দ্বিগুণ উল্লাসে
কহিতে লাগিল। তবে ;–“মনের বাসনা
বিধি বুঝি এত দিনে পূরাইল মাের ;
ক্ষত্রিয় কুলের গ্লানি আয় নরাধম,

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
• vandari ।
******
* ১/AAAA
যদি নাহি রণ হতে কর পলায়ন
জীবনের রণসাধ মিটাইব আজ।
পড়ে কি বর্বর মনে? পাণ্ডুপুত্র গণে
করেছিলি অপমান রাজসভা মাঝে,
প্রতিশােধ প্রতিশােধ অবশ্য তাহার
পাইবি পাইবি মূঢ় পাইবি নিশ্চয়।
যে শয্যায় পুত্র তাের করেছে শয়ন
সে শষ্যাই তাের তরে হয়েছে রচিত;
স্বর্গমর্ত্য রসাতল আসে যদি সব
রক্ষিতে আহবে তােরে, তথাপি কখন
পাবি নিস্তার আজ জানিস, নিশ্চয়
যদি নাহি পৃষ্টভঙ্গ দিল, রণ হতে।”
৩
এতেক কহিয়া অভি লইয়া নারাচ
ইষুধি হইতে বাণ জুড়িলা তাহায় ;
এক হস্তে লয়ে ঘন অন্য হয়ে ফল
আক্রমিল দুর্যোধনে আসুরিক তেজে,
চক্ষের নিমিষে হায় উত্তরা-ভুষণ

ষষ্ঠ পর্গ ।
বিক্ষত করিলা দেহ কৌরব রাজার,
একেশােকাতুর, তাহে খর-শরাঘাত,
সহিতে না পারি' রাজা করিল। পয়াণ।
কৌরব-ঈশ্বরে হেরি বিপদে মগন
ধাইলা রক্ষিতে তারে দ্রোণের তনয়
ভুবন বিজয়ী যিনি নিজ ভুবলে ;
আক্রমিলা অশ্বত্থামা ভীষণ বিক্রমে।
‘আয় আয়” বলি গর্জি অর্জুন কুমার
সে ভীষণ গতিরােধ করিলা তখন ;
বাধিল তুমুল রণ, কাপিল মেদিনী,
অস্থিরা বিজয়লক্ষ্মী না পায় আশ্রয়
অকস্মাৎ শরাঘাতে দ্রোণের নন্দন
ভূমে
হইলা পতিত ।
মূচ্ছিত হইয়া
এতক্ষণে শােকে জ্ঞানহারা হয়ে হায়
বিশাল কাৰ্ম্মক করে লয়ে দ্রোণাচার্য
ধাইল। সে রণাঙ্গণে শােকান্ধ হইয়া
•
#
*

১০৪
কুরুক্ষেত্ৰকলঙ্ক।
সে ভীষণ মূর্তি হেরি’ অরি সৈন্যগণ
গর্ণিল প্রমাদ মনে, হইলা ব্যাকুল
মৃদুমন্দ স্বরে তবে কহিলা কুমার ;
“হায় দেব বল শুনি, কেমনে যুঝিব
আমি তব সনে রণে, হয়ে শিষ্য-পুত্র ?
একেত ব্রাহ্মণ তুমি তাহে পিতৃগুরু
কেমনে ধরিৰ অসি বল তা আমায় ?”
গর্জিয়া অমনি দ্রোণ কহিলা অভিরে
“ওরে মূঢ় ভেবেছ কি পাইবি নিস্তার
বালক-সুলভ-মধুমাখা-কথা কয়ে?
মরণের ত্রাস বুঝি জাগিয়াছে মনে ।
জানিস, জানিস, স্থির, কিছুতে নিস্তার
নাহি তাের আ’জ, এই দ্রোণের করেতে ;
দৈব যােগে কৃপকর্ণে পরাস্ত করিয়া
বীর চূড়ামণি বলি ভাবি, নিজেরে ?
জানি আমি তুই মাের প্রিয়শিষ্যসুত,
কিন্তু যে দারুণ ব্যথা না জানি কি চাপে

ষষ্ঠ সর্গ ।
••••••••••
A/\/
•••••••••••••
পাইয়াছে আজ মাের প্রাণাধিক সুত,
সে জ্বালার প্রশমন অবশ্য করিব,
ধর অস ধনুর্বাণ যাহা ইচ্ছা হয়,
মরণ নিশ্চয় তাের জানিস, পামর।”
‘রােষিয়া অৰ্জ্জুনসুত নিলা অসি করে,
আহ্বানিয়া দ্রোণাচার্য্যে কহিতে লাগিল।
“ভাল শিক্ষা পিতৃগুরা ! হয়েছে তােমার
সংসর্গের ফল ইহা নহে কিছু আন ।
ভাল, ধর অলি ধনুঃ হও অগ্রসর,
কাতর সম্মুখ রণে নহে পাৰ্থ-সুত।
অর্জুননন্দন বটে শিশু অল্পমতি,
কিন্তু ফণধরশিশু নহে কভু ভীত
দংশিতে আপন অরি পাইলে নিকটে,
সমরের সাধ তব অবশ্য পূৱাব
মনেতে জানিও স্থির আজি এই রণে
পিতাপুত্রে এক তল্পে করাব শয়ন ।
বহুদিন সাধ যদি পূৱাইল বিধি,
k

কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক।
অনর্থক বাক্যযুদ্ধে নাহি প্রয়ােজন,
হও অগ্রসর রণে, স্মর ইষ্টদেবে ;
স্বর্গমর্ত্য রসাতল একত্র হইয়া
আসে যদি আজ এই সমরপ্রাঙ্গণে,
তথাপি তােমার কভু নাহিক নিস্তার ;
ভেবেছ কি শুধু দুট বাক্য আড়ম্বরে
হইবে পশ্চাৎগামী অর্জুন-নন্দন?
এ দুরাশা যদি মনে হয়ে থাকে তব
বার্ধক্যের ফল ইহা, নহে কিছু আন
আর না আর না আর না সহে বিলম্ব,
ধরি অসি আত্মরক্ষা করহ এখন।
=
।
রােষাবেশে লয়ে অসি অভিমন্যু বীর
ধাইলা দ্রোণের পানে, কপিল ধরণী,
উভয়ে তুমুল রণে হ’ল আত্মহারা
হুঙ্কারে স্তম্ভিত যেন হইল বসুধা ।
‘আজি বুঝি পৃথিবীর প্রলয়ের দিন
সেনাদল মনে মনে গণিলা এ কথা । •

যষ্ঠ সর্গ।
•r\n\••• • Anand০০৭
| 4 |
•••
রােধিল দর্শন পথ, রােধিল শ্রবণ,
মন্ত্রে মন্ত্রে কেন্দ্রে কেন্দ্রে অম্বরে পাতালে
সে হুঙ্কার প্রতিধ্বনি হইতে লাগিল ;
ভয়াকুল পাখীকুল উড়িল আকাশে,
কি হয় কি হয় অজি সবে মনে গণে।
ধন্য বীর অভিমন্য ধন্য বীরপনা,
পাণ্ডব কুলের গৰ্ব্ব রহিল অটুট।
“যতােধৰ্ম্মস্ততােজয়” এই মহারােলে
অকস্মাৎ রণভূমি হইল ধ্বনিত।
অসহ্য আশুগকুলে ব্যাকুল হইয়া
রণস্থল ত্যজি দ্রোণ করিল গমন।
হেথা কুরুবীরগণ শিবির মাঝারে
বসিয়া ভাবিছে আজ কি হবে উপায়।
প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের ভয়ে দ্রোণ মহাবীর,
মলিন বদনে বসে ভাবিছেন কত।
হেন কালে দুর্যোধন প্রবেশি’ তথায়
পড়ি গুরু-পদ-তলে কহিলা কাতরে ;-

১০৮
কুরুক্ষেত্র-কলঙ্ক।
রক্ষা কর গুরুদেব কি হবে উপায়
বিষম অনল আজ হ’ল প্রজ্জ্বলিত ;
নাহি দেখি পথ নাহি দেখি কিছু আর,
ধন, মান, জন, সব যায় রসাতলে,
ভাঙ্গে বুঝি এত দিনে প্রতিজ্ঞা আমার।
সম্বােধিয়া দুৰ্যোধনে কহিলা শকুনি
“ত্যজ শঙ্কা দুর্যোধন কেন কর ভয়
উপযুক্ত যুক্তি যেবা কহিব তােমারে,
বড়ই প্রবল শত্ৰু এই অভিমন্যু,
সপ্তরথী একত্ৰিয়ে চল রণাঙ্গণে,
নিরস্ত্র করিয়া প্রাণে মারিব উহারে,
শবধে ধৰ্ম্মাধর্ম নাহিক বিচার।
রােষভরে দ্রোণাচাৰ্য কহিলা তখন
“যায় যাক প্রাণ, জন, যা পুত্র মিত্র,
তথাপি বর্বর প্রথা আচরি সমরে
কলঙ্কের ডালি স্কন্ধে না লইব কভু।

যষ্ঠ সর্গ ।
১০৯
প্রিয়তম শিষ্য মাের পার্থ মহারথ,
হায় কোন্ প্রাণে আজ অন্যায় সমরে,
বধিয়া কুমারে তার লব পাপ ভার?
ধিক্ কুরু-বীরবৃন্দে ধিক্ শতবার।
'শুনিয়া দ্রোণের বাণী এ বিপত্তি কালে
ক্রোধভরে উতরিলা বীর দুঃশাসন ;-
“চিরদিন এক কথা শুনি তব মুখে
প্রিয়তম শিষ্য তব অর্জুন কেবল,
আমরা যে আছি শুধু চিনির বলদ ;
অশ্রাব্য বচন আর না চাই শুনিতে।
ঘরের টেকীই তুমি নক্ররূপ ধরি
মজালে কৌরবপুরী মজালে সকল ।
যার অম্নে চিরকাল হতেছ পালিত
তাঁহার মঙ্গল তুমি করহ এরূপ !
যাও তুমি যথা তব শিষ্য প্রিয়তম
আমরাই আজি রণে রক্ষিব রাজায়
গুরু তুমি, আর কিবা কহিব তােমারে ।

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক। Vr vvvvv- চল সবে অগ্রসর হই রণাঙ্গণে, ল’য়ে কলঙ্কভার অন্যায় সমরে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের পাপ লও গে মাথায়। কহিলা গরজি দ্রোণ পুনঃ সকলেরে, চণ্ডালের সহবাস করে যেই জন, আচরণ শিখে সেই চণ্ডালের মত ; ঠেকেছি প্রতিজ্ঞাপাশে যাইব কোথায় ? ক্ষুদ্রবুদ্ধি দুঃশাসন, কি বুঝিবি তুই ; দ্রোণ-চিতে রণ ভয় ? অসম্ভব কথা, দাড়াও বীরেন্দ্রগণ, সঁাড়াও সকলে, যায় যা থাকে থাক্ জীবন মােদের করিব করিব বধ অর্জুন-কুমারে, নারিবে রক্ষিতে কেহ এই ধরাতলে। রােষে মনােদুঃখে তবে দ্রোণ মহাবীর ধরি ধনুর্বাণ পুনঃ চলিলা সমরে, কুরুবীরগণ তার পশ্চাতে পশ্চাতে

,
ষষ্ঠ সর্গ।
১১১
দ্বিগুণ হুঙ্কার করি হ’ল প্রধাবিত।
আনায় মাঝারে ব্যাঘ্র পড়িলে যেমন
বিনাশিতে তারে ঘেরে মানব সকল,
সেইরূপ সপ্তরথী ঘেরিল অভিরে ।
বিস্ময় মানিয়া বীর কহিলা তখন,
“নিয়ত অধৰ্ম পথে যাহাদের গতি
তাদের অকাৰ্য কিছু নাই অবনীতে,
কিন্তু না ভাবিল, মনে দুরাচারগণ,
সপ্তরথী কেন তােরা শতরখী হ'লে
না ডরে সমরে কভু অৰ্জ্জুন-নন্দন;
ডাক, আর কে কে আছে তােদের শিবিরে,
এক বারে রণ-সাধ মিটা’ব সবার
অগ্র পশ্চাতের খেদ কা’র নাহি রবে।
উত্তরিলা সমস্বরে পুনঃ দু:শাসন;
ওরে কুলাঙ্গার তাের উপদেশ বাণী
শুনিতে আসিনি মােরা সমর প্রাঙ্গণে,
শবধে ধর্মাধর্ম কে মানে কখন ?
০%

১১২
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
পতঙ্গের মত হয়ে জ্বলন্ত অনলে
দিয়াছিস, ঝাপ যবে, জানিস, তখন,
কিছুতেই পরিত্রাণ নাহি পাবি আর,
যেরূপেই হয় তােরে বধিব নিশ্চয়।”
“বধ বধ” শব্দ করি তবে সপ্তরথী
ঘেরিয়া অভিরে সবে আরম্ভিলা রণ ;
লেখনি! দ্বিখণ্ড হও, কি লিখিবে ছাই,
কুরুক্ষেত্র, ধৰ্ম্মক্ষেত্র’ নাম তব আ জ
হইল সার্থক! তুমি যাও রসাতলে ;
কবিতে! তুমিও কেন কর না গমন,
কুলুষিত করিও না দেহখানি আর
গাইয়া এ পাপ গাথা মানব সমাজে।
হায় কি ভীষণ দৃশ্য হের একবার,
জগতে অতুল যারা বীরত্ব প্রভাবে,
তাহাদের বীর ধৰ্ম্ম করহ লােকন,
ঘৃণায় পূরিবে মন ; হের পুনৰ্ব্বার,
যােড়শ বর্ষীয় ওই পাণ্ডব বালকে

-
ষষ্ঠ বর্গ ।
১১৩
ঘেরিয়া বীরেন্দ্র দল বরষিছে শর ;
নেত্র • তুমি অন্ধ হও, কি দেখিবে আর ?
জানি না কি পাপে ধরা সহে এই ভার।..
হায় হায় হের ওই কর্ণ ধার নাম
শরাঘাতে অস্ত্রহীন করিল অভিরে।
কর্ণ । কর্ণ । কি করিলে ? এতই কঠিন
হৃদয় তােমার ? হায়! হ’ল না কি প্রাণে
দয়ার সঞ্চার, হেরি নবনীত দেহ ?
ধিক, তােমা সবে ধিক, ধিক, শত বার ।
রোষে দুঃখে সম্বোধিয়া সপ্তরথী প্রতি
কহিতে লাগিলা তবে অভিমন্যু বীর
“আরে রে পাপিষ্ঠগণ ক্ষত্ৰ-কুল-গ্লানি,
কিসে
মুখ
দেখাইবি ক্ষত্রিয় সমাজে?
হাসিবে রমণীগণ শুনিলে এ কথা ;
মাধব মাতুল বার, সেই ধনুর্দ্ধর
মরণের ত্রাস নাহি করে ক্ষণকাল ;
( কিন্তু নিরস্ত্র যে আমি এই খেদ মনে)।

-
১১৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
WW
.।
“ধৰ্ম্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে লিলি কলঙ্ক,
ক্ষত্রিয়ের ধৰ্ম্ম সব দিলি জলাঞ্জলি;
ছিছি রণে ঘৃণা হয় তােদর সহিত ।
তবু না ভাবিল, মনে পাইবি নিস্তার ;
যতক্ষণ রক্তস্রোত বহিবে শিরায়
ততক্ষণ প্রতিফল পাইকি নিশ্চয় ৷
এতেক কহিয়া বীর যা কিছু নিকটে
পাইলা, ধরিয়া তাহা করিলা নিক্ষেপ,
হায় ফুরাইল সব, না দেখি’ উপায়
ভগ্নচক্র স্যন্দনের করিল ক্ষেপণ।
হইল দুন্দুভি-ধ্বনি গগন মণ্ডলে
কুসুম-বর্ষণ হ’ল অভির মস্তকে।
আর নাই, জ্ঞান নাই বুদ্ধি শক্তি বল,
(কত আর সবে বল ও কোমল দেহে)
উন্মাদের মত বীর যুঝিতে লাগিলা,
অস্থির হইল দাপে কুরু সপ্তরথী,
কি হয় কি হয় মনে করে শঙ্কা সবে।

ষষ্ঠ সর্গ ।
১১৫
আর না, আর না, এবে হয়েছে অধিক ;
কবিতে! রাখ গাে কথা ক্ষান্ত দাও গান ;
এখনও কুরুকুলে অশনি-সম্পাত
হ’ল না হ’ল না কেন ? পাপ সপ্তরথী
এখন ও দাড়াইয়া আছে ‘ধৰ্ম্মক্ষেত্রে ?
অহৈ কি পাষাণ হিয়া, অহহ কি পরাণ!
এরাই বীরেন্দ্র নামে পূজিত জগতে ?
গেল সব গেল সব, সব ফুরাইল।
হায় হায় হের ওই দুঃশাসন-সুত
গদা হাতে রহিয়াছে অভির পশ্চাতে,
করিল করিল বুঝি প্রহার এবার,
উত্তরার সৰ্ব্বনাশ হ’ল সংঘটন,
কেড়ে নিল সুভদ্রার বক্ষের মাণিক।
মূচ্ছিত হইয়া বলী পড়িলা ভূতলে,
তিতিল রক্তিম গও নয়ন আরে
জাগিল হৃদয়ে যেন কার মুখ খানি,
ছুটিল রুধির ধারা প্রবল হইয়া।
*

১১৩
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
AAMA
Athar
পিতৃ মাতৃ মাতুলের চরণ স্মরিয়া,
চির সুষুপ্তির অঙ্কে (অভি) লভিলা বিশ্রাম ।
৫

সপ্তম সর্গ।
;
চির অস্তাচলে গেলে পাণ্ডু-কুল-রবি,
ভগবান্ সূৰ্য্যদেব গেলা অস্তাচলে।
নিবিল সমরানল কুরুক্ষেত্ৰ-ধামে,
নিবিল তপন-তাপ নশ্বর ধরায় ।
আইল যামিনী তবে অবনী মাঝারে;
শােকার্ণবে মগ্ন হ’ল পাণ্ডব শিবির
ভূমে অচেতন পড়ে রাজা যুধিষ্ঠির,
নকুল, স’দেব, ভীম, আর যােদ্ধাগণ,
তুমুল সংগ্রামে, শােকে, অবসন্ন হয়ে
বসেছে ঘেরিয়া সবে পাণ্ডব-ঈশ্বরে।
হেন কালে কৃষ্ণসহ বীর ধনঞ্জয়
প্রবেশিলা শিবিরেতে; অমনি তখন

-~-
১১৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
শশাকের বিষম রােলে রােধিল শ্রবণ ;
মুহা প্রাজ্ঞ কৃষ্ণ-সখা বুঝিলা সকল ।
মহা রণে যিনি সদা অচল অটল,
খরতর অস্ত্রাঘাতে না হ’ল কাতর,
হায় আজ হেন বীর অস্থির হইয়া
বসিল ভূতলে, নেত্রে বহিল আমার।
কতক্ষণে স্থির হয়ে কহিলা অৰ্জ্জুন,
সম্বােধিয়া স্বীয়াজ ভীম ভীমসেনে--
“কই দাদা কহ যাহা ঘটিল সমরে,
উদ্বিগ্ন হইল প্রাণ শুনিতে সে কথা,
বীরপুত্র যদি মরে সম্মুখ সমরে,
বীর পিতা তাহে কভু না হয় কাতর।”
বিষাদে সুদীর্ঘ শ্বাস ছাড়ি’ভীমসেন
কহিলা কাতরে তবে অর্জনের প্রতি ;-
“কি কব ভাই রে পার্থ ! না সরে বচন,
হৃদযের তন্ত্রী সব গিয়াছে ছিড়িয়া,

সপ্তম সর্গ ।
১১৯
******
জীবনে মরিয়া আছি অভির বিহনে,
অভাগাই বটে তার নিধন-কারণ ;
সহায় হইয়া তার গিয়াছিনু রণে,
কিন্তু হায় বৃহ মাঝে নারিনু যাইতে !
এতেক কহিয়া ভীম আদ্যোপান্ত সব,
বিবরিয়া কহিলেক অর্জন-সদনে,
কুমারের রূহভেদে বিষম শপথ,
অত্যাশ্চাৰ্য ৰীরপণা বৃহভেদ কালে,
দুর্জয় সমর তার ব্যুহের মাঝারে,
কুরু-বীর-সিংহদের রণে পরাজয়,
সপ্তরথী সহ তার দুর্দর্য সমর,
অবশেষে কৌরবের অন্যায়ক্রমণ।
বর্ণিয়া সকল কথা ক্ষান্ত হ’ল ভীম,
দর, দর, নেত্রনীর করিল পারে ।
D
কহিলা আবার তবে সুভদ্রা-ভূষণ ;
“অহাে ধন্য অভিমনু বংশের তিলক,

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
এ বীরত্ব গাথা শুনি নাচে মাের প্রাণ,
ধন্য আমি এই ভবে জনক তাহার।
হেন বীরকুলমণি অন্যায় সমরে,
ত্যজিল পরাণ শুধু এই দুঃখ মনে।”
তবে যুধিষ্ঠিরে হেরি শােকে অচেতন,
সম্বােধিয়া বাসুদেব কহিলা ভাহারে ;-
“ত্যজ শােক ধৰ্ম্মরাজ, কি ফল ইহায় ?
অজ্ঞ জন নহ তুমি কি কব তােমারে ?
সম্মুখ সমরে পড়ি বীর অভিমন্যু
গেলা চলি স্বর্গধামে কীর্তি-রথে চড়ি ।
যতু দিন রবি শশী থাকিবে ধরায়,
ততদিন জীবগণ গাবে তার গাথা।
বংশ সমুজ্জল করি বীরেন্দ্র কুমার,
গিয়াছে অমর ধামে ত্যজি মর ধাম,
এ নহে তােমার রাজা বিষাদের কথা,
তবে কেন বৃথা শােকে আছ নিমগন ?

সপ্তম সর্গ।
১২১
"
কহিলা কাতরে তবে রাজা যুধিষ্ঠির ;-
দেব বসুদেব, আর কি কব তােমারে,
সরে বচন হায় আমিই কেবল
প্রিয়তম কুমারের বিনাশ-কারণ।
“বিজ্ঞতম ধর্মরাজ,” কহিলা কেশব,
কাপুরুষ জন হয় শােকেতে ব্যাকুল ;
তােমারে বুঝাতে শক্তি নাহিক আমার,
জান ত সকল রাজা, এ মহীমণ্ডলে
কে করে বিনষ্ট করে ? আত্মা অনশ্বর।
জীর্ণ বাস তেয়াগিয়া নরগণ যথা
নবীন বসন পুনঃ করে পরিধান,
তথা আত্মা এক দেহ করি পরিত্যাগ,
অপর দেহকে পুনঃ করয়ে আশ্রয় ।
কৰ্ম্ম অনুযায়ী ক্রিয়া এই ধরাতলে,
কৰ্ম্মভােগ শেষ হলে দেহের বিনাশ।
তবে কেন মহারাজ অকারণ তুমি,
অনর্থক শােক-নীরে আছ নিমগন ?,

२२
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
পাদপ-আশ্রয়ে থাকে যথা লতাবলী,
তথা পাণ্ডু পুত্ৰগণ তব পদানত,
তােমাকে দেখিলে তারা শােকে অচেতন,
কেন না শশাকের রােল উঠিবে শিবিরে ?
হাসিবে বিপক্ষ তব, বাড়িবে সাহস,
ত্যজ বৃথা পরিতাপ, ধরহ ধৈর্য।”
।
নীরবিলা বাসুদেব ;
পাইয়া প্রবােধ
কহিতে লাগিলা খেদে পাণ্ডবেশ পুনঃ ;-
‘কৃষ্ণ হে পাণ্ডবসখা! মহাশােকে যদি
কেহ হয় জর্জরিত, তবুও তােমার
পীযূষপূরিত কথা পশিলে শ্রবণে,
যুড়ায় তাপিত প্রাণ, ভুলে যায় সব।
সুঠাম বঙ্কিম বেশ হেরিলে তােমার,
ভুলে যায় শােক তাপ জগতের প্রাণী।
তবে কেন আমি আর না পাব প্রবােধ ?
জানি সব, বুঝি সব, তবু যেন ভাই
প্রাণের ভিতর দিয়া কে দেয় জ্বালিয়া

*
সপ্তম সর্গ ।
১২৩
}
t
দারুণ শােকের বহ্নি জীবন নাশিতে ।
মনে হলে সেই কথা এখনাে পরাণ
দহে যেন দাবদাহে, ফেটে যায় বুক।
অহহ! জালে বদ্ধ করি কিরাতি যেমন
নাশয়ে মৃগেন্দ্র শিশু, তেমতি আমার
প্রাণাধিক
সুতে আজ অন্যায় সমরে
বধিল কৌরব গণ অসহায় করি ;
কেড়ে নিল পাপিগণ অস্ত্রশস্ত্র যত,
হায়! পুত্র দস্যু-করে ত্যজিল পরাণ ।
প্রবেশিতে ব্যুহ মাঝে বার বার মােরা
করিনু বিফল যত্ন ; হায়! অন্ত কালে
নারিনু বাছার মুখ করিতে লােকন,
নারিনু সে শুষ্ক কণ্ঠে জলবিন্দু দিতে।
এতেক কহিয়া রাজা কাদিলা নীরবে,
আবার কহিলা তবে সুভদ্রা-ঈশ্বর ;-
সহে না সহে না জ্বালা সহে না পরাণে,
কহ দাদা যম কারে করিল স্মরণ ?

১২৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক ।
এহেন আম্পৰ্দা কার কৌরব পুরীতে,
জানিয়া অনলে কেবা করিল প্রবেশ,
যেই পাপ সাধি বাদ মারিল পুত্রেরে,
অহহ! পি হয়ে আমি এখনাে করিনি
উপযুক্ত দণ্ড তার? ধিক, মোরে ধিক্ !
হাসিবে ক্ষত্রিয়গণ শুনিলে এ কথা ।
কহ দাদা কে রােধিল তব গম্য পথ,
উপযুক্ত শাস্তি আমি প্ৰদানিব তারে।”
উত্তরিলা ভীমসেন অতি মৃদুম্বরে ;-
“আর কি কহিব ভাই, কি শুনিবে আর,
বারদাপে যবে অভি প্রবেশিল ব্যুহে,
রক্ষিতে পশ্চাতে মােরা ধাইনু সকলে,
কিন্তু পাপ জয়দ্রথ ঘটাইয়া বাদ,
শঙ্করের বরে পথ রােধিল সবার।”
রােষে ক্ষোভে সিংহনাদে গর্জিলা কীরিটী ;
বটে বটে সে পাপাত্মা রােধিল দুয়ার ?

সপ্তম সর্গ।
A
অসহ্য অসহ্য জ্বালা সহে না পরাণে,
হায় গু অভিমন্যু নিরাশ্রয় হয়ে
অন্যায় সমরে তুমি ত্যজিলে জীবন ?
আর না আর না আমি সয়েছি অনেক।
শােন কৃষ্ণ, শােন দাদা, শােন বীরগণ,
অর্জুন প্রতিজ্ঞা করে সবার সমক্ষে,
সুৰ্যাস্তের পূর্বে কল্য বধিব বধিব
নীচাশয় জয়দ্রথে সমর প্রাঙ্গণে
হিমালয় শৃঙ্গ যদি যায় চূর্ণ হয়ে,
শূন্য তােয় হয় যদি সপ্তবারিনিধি,
দেবাসুর, যক্ষ আদি কিন্নর সকল,
স্বর্গ, মর্ত্য, রসাতল, একত্র হইলে
অর্জুন-প্রতিজ্ঞা কভু হবে না বিফল,
বাসুদেব, ধৰ্ম্মরাজ না দিলে আশ্রয় ।
গুরুহত্যা, ব্ৰহ্মহত্যা ভণহত্যা আদি,
যত কিছু আছে পাপ অবনী মাঝারে,
সব যেন মাের হয় লঙ্েিল শপথ ;
একান্ত প্রতিজ্ঞা যদি না পারি রক্ষিতে,
.

৪
১২৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
পশিয়া জ্বলন্তানলে সবার সমক্ষে,
ত্যজিব এ ছার প্রাণ অবলীলাক্রমে।”
কঁপিল শিবির সব, কাপিল বসুধা
শুনি, অর্জুনের এই প্রতিজ্ঞা ভীষণ।
।
গুঞ্জ
;

রে
অষ্টম সর্গ ।
" : । [Pশীয় JAHI PIE
০
;
আইল যামিনী তবে পাণ্ডব-শিবিরে,
শােকের বসন যেন পরিল জগত
নিস্তব্ধ শিবির আজ, নাহিক উল্লাস,
সকলেই শােকাবেগে আছে অচেতন।
সৈনিকের কোলাহল, যন্ত্রাদির তান,
উৎসব সঙ্গীত আদি আমােদ প্রমােদ,
কিছুই শ্রবন-পথে না করে প্রবেশ,
ভয়াবহ নিস্তব্ধতা সৰ্ব্বত্র বিরাজে।
০
.
হের ওই নৃত্য-শালা, আইলে যামিনী
ভােগ-সুখ-স্রোতে যাহা হত ভাসমান,
আজহা গাঢ়তর তামসে আবৃত,

১২৮
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
একটি প্রদীপ নাহি জ্বলে কোন স্থানে।
ওই যে মন্ত্রণাগৃহ, নিত্য নিত্য যাহা
চিন্তাকুল মন্ত্রিগণে থাকিত পূরিত,
আজ তাহা শূন্যভাবে রয়েছে পড়িয়া-
একটি প্রাণীও তথা না ফেলে নিশ্বাস ।
ওই যে ভীষণকান্তি দ্বারপালগণ,
নিষ্কোষিত অশি করে করিত হুঙ্কার,
মলিন বসনে তারা নীরবে নীরবে,
ধীরে ধীরে পদক্ষেপ করিছে চৌদিকে।
বহিছে পবন অতি মন্দ মন্দ গতি,
শিশির শােকা ঝরে বৃক্ষরাজি হতে,
তৈলাভাবে দীপাবলী জ্বলে ক্ষীণভাবে
মূর্তিমান, শােক যেন বিরাজে চৌদিকে।
হইয়ে দুখিনী নিদ্রা অভিমন্যু শােকে
পাঠায়েছে তা আজ পাণ্ডব-শিবিরে।

*
---
অষ্টম সর্গ ।
১২৯
নীরব প্রকোষ্ঠে শুভ্র-বাস-পরিহিতা
একাকিনী ব’সে তুমি কে গাে প্রভাময়ি ?
স্তিমিত আলােক, যার রূপের আভায়,
হয়েছে উজ্জ্বল, হায়! একি বেশ তার ?
নাই অঙ্গে আভরণ, নয়নে কজ্জল,
ললাটে সিন্দুরবিন্দু, কেশের বিন্যাস,
অধরে তাম্বুল-রাগ, অলক্ত চরণে,
নাই সেই যৌবনের টল টল ভাব ।
হতাশ নয়নে বালা চাহে চতুর্দিকে,
কি জানি কি প্রাণ হ’তে নিয়াছে ছিড়িয়া।
আবার মনের দুঃখে কহিছে অভাগী ;-
“হায় নাথ, বার বার করিনু বারণ,
না শুনিলে মানা কেনে দহিতে দাসীরে ?
জানি কি পাপে বিধি দিলা হেন জ্বালা !
চিরদিন দগ্ধ হ'তে বুঝিনু বিধাতা
পাঠাইলা অভাগরে নশ্বর ধরায়।”
কহিতে কহিতে তবে হল কণ্ঠরােধ,
*

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
WAA
অচেতনে ভূমে বালা রহিলা পড়িয়া।
অহাে এই কিরে বিশ্ব সংসারের গতি।
বিধাতঃ হে। ইহাই কি বিচার তােমার ?
সরল মূরতি খানি না জানি সংসার,
হাসিত খেলিত নিত্য আপনার মনে,
পশিয়া উদ্যানে সুখে তুলিত কুসুম,
গাইত আপন প্রাণে জোছনা আলােকে,
স্বরগ বিভৰ আদি না চাহিত কিছু,
রহিত বিভাের শুধু পতি পানে চেয়ে ।
কোন প্রাণে, হে বিধাতঃ! এ কোমল প্রাণে
দিলে হেন জ্বালা বল নিদয় হইয়া ?
ধীরে ধীরে উত্তরার সহচরী আসি,
লইলা সে দেহ খানি অঙ্কেতে তুলিয়া।
সিঞ্চিলা বদনে ধীরে সুবাসিত জল,
সুচারু চামর নিয়ে করিলা ব্যজন।
.
রহিয়া সখীর কোলে শােকে অচেতন,

অষ্টম সর্গ ,
,
দেখিলা সুখের স্বপ্ন উত্তরা দুখিনী ;
নাজিয়া বীরেন্দ্র সাজে অভিনু বীর
আলিয়াছে ফিরি এবে পাণ্ডব শিবিরে,
লভিয়া
অতুল
কীর্তি
কুরুক্ষেত্র রণে।
অপূৰ্ব তােরণ সব রাজিছে চৌদিকে,
বধ্বজ কদলীতলে রাজে পূর্ণ কুম্ভ,
পাণ্ডব সেনানী থাকি কাতারে কাতারে
ভেটিছে কুমারে সবে বিজয়-নিনাদে।
কুলবালা লাজ বর্ষে অভির মস্তকে,
অগণন তােপধ্বনি হ’তেছে শিবিরে।
বাহিরিয়া ধৰ্ম্মরাজ ভ্রাতৃগণসহ
আলিঙ্গন দিয়া ঘরে আনিলা কুমারে ;
আনন্দে সুভদ্রা মাতা দিয়া আশীৰ্বাদ,
মুখ চুম্বি তনয়েরে বইলা কোলে,
আনন্দের স্রোত যেন বহিল শিবিরে
উৎসবে মাতিল সবে ভুলিয়া সকল।
কতক্ষণে বীরসিংহ উত্তরার পাশে
বসিয়া হাসিয়া তবে প্রফুল্ল অন্তরে
*

কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
*** *
আদরে করিলা কত প্রিয় সম্ভাষণ ;
মানেতে বসিলা পুনঃ বিরাট-নন্দিনী ।
ভুজপাশে বাঁধি অভি চুম্বিলা কান্তারে,
শিহরিতে গাত্র, বালা পাইল। চেতন ।
“কোথা গেলে কোথা গেলে” বলিতে বলিতে
সহচরী গলা ধরি, কঁদিতে লাগিলা,
“হায় কেন মােহ ভঙ্গ হইল আমার ?
মােহ কেন চির মােহ না হইল সই ?
অহহ! অসময় দেখি, সবাই নিদয় ?
আবার কহিলা বালা উন্মাদিনীপ্রায়,
“দেখ সই, কত দূর আছে প্রাণেশ্বর,
বিনাইয়া দেলাে মোের কুন্তল-নিচয় ।
আনি ফুল বাঁধ তােড়া, পরাও ভূষণ
সহে না বিলম্ব সই, এল বুঝি অভি।
কহিলা আবার “সই কি কাজ ভূষণে,
নারীর ভূষণ কিবা আছে এ জগতে

অষ্টম সর্গ।
arts/
প্রিয়তম স্বামী বিনা ? নাই প্রয়ােজন,
দেলাে সই খুলি ফেলি ছার অলঙ্কার।”
চেতনা পাইয়া পুনঃ, চাহি সখীপানে
আরম্ভিলা পার্থ-বধূ “কোথা আমি সই,
কোথা মাের প্রাণধন, বল সখী বল ;
“উত্তরা উত্তরা ডাক ফুরাল কি মাের ?
রাজার দুহিতা রাজপুত্রবধূ হয়ে
হইলাম হায় ! ভবে চির অভাগিনী।
কাল যে উত্তরা ছিনু আজ (ও) তাহা আমি,
(কিন্তু) আমার মতন’ আমি নাই কেন আজ ?”
ফেলিয়া সুদীর্ঘ শ্বাস তবে এতক্ষণে
উত্তরার সহচরী কহিতে লাগিল;-
‘সত্যই কি প্রিয়দখি, হলে পাগলিনী ?
একেত অভির শােকে দহিছে পরাণ,
তা’তে তব হেন দশা হেরিয়া নয়নে,
কেমনে ধরিব বল পাপ দেইভার?

*
১৩৪
কুরুক্ষেত্ৰ-কলঙ্ক।
fu'v
*
এরূপে দিবস নিশি ফেলে নেত্ৰজল
কেমনে ধরিবে প্রাণ বল সহচরি।”
কহিলা কাতরে পুনঃ উত্তরা দুখিনী ;~~
“আর কি আছে লাে সই জীবনের সাধ ?
উত্তরার সুখ-রবি গেছে অস্তাচলে।
সহচরি! কর এবে সখীর যে কাজ,
চিরদিন দুখিনীরে বাসিয়াছ ভাল
শেষ উপকার মাের সাধহ এখন।
ওই শােন ডাকে মােরে জীবন-ঈশ্বর,
সহে না বিলম্ব সই, হওলল সদয়,
জ্বেলে দাও চিত; মােরে দাও গাে বিদায়,
ভুল উত্তরার নাম এ জনম তরে।
বলিও মায়েরে সই করিও সান্ত্বনা,
উত্তরা গিয়াছে সুখে চির-শান্তিধামে।”
বলিতে বলিতে বালা পাগলিনী প্রায়,
যাই নাথ, যাই নাথ’ উচ্চারিয়া মুখে,
.

অষ্টম সর্গ।
AM0
।
বাহিরিল তীর-বেগে উদঘাটিয়া দ্বার,
ধাই ধরিতে তারে সখী উত্তরার ।
অকস্মাৎ নিস্তব্ধতা ভেদিয়া আকাশে
জলদগম্ভীর-স্বরে হ’ল দৈববাণী ;-
“মহাপাপে মগ্ন হবে পাণ্ডুবংশ সব
গর্ভবতী সতী তুমি ত্যজিলে পরাণ ;
শান্ত হও সাধ্বি, তুমি ধন্যা এই ভবে,
সম্মুখ সমরে পড়ি প্রাণেশ তােমার,
গেলা চলি স্বর্গধামে রাখিয়া কীরতি।
মহাত্মা তােমার গর্ভে লভিল জনম
যা হ’তে বংশােজ্জ্বল হবে এ ভারতে ;
যাও ঘরে, রেখাে মতি শ্রীকৃষ্ণের পায়।”
বিস্ফারি নয়ন তবে গগন মণ্ডলে
ত্রিভঙ্গ-মুরলী-ধরে হেরিলা উত্তরা।
চাহিতে চাহিতে সেই অনন্ত মূরতি
বিলিন হইয়া গেল আকাশের গায় ।

" " ক খ
কুরুক্ষেত্ৰ-কল।
-
- ১
“বিধি হে তুমিও বাম অসময় পেযে”
কহিতে কহিতে বালা পড়িলা ভূতলে।
সম্পূর্ণ।
* উল
ক
এ এক
এম

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kurukhettra-kalanka

Author
Mukhopadhayay,kalibhushan
Title
Kabya
File name
Kurukhettra-kalanka
Text
OCR done
Citation
1884
Published
2009/11/25
Publisher
Baradakanta Mukhoti, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Kurukhettra-Kalanka
DLI number
512843
Barcode
4990010019878.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
jWQunhoMU1d
Download PDF

Kurukhettra-kalanka