Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Lolit- Gatha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
-- -
No text on this page.
No text on this page.
ললিতগাধা
শ্রীললিতচন্দ্র মিত্র
মূল্য এক টাকা
কলিকাতা
৬ নং দীনবন্ধু লেন,
‘দীনধাম’ হইতে গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
ঞ্জিরবিহারীলাল নাথ
এমারেল্ড প্রিনিংওয়ার্ক
নন্দকুমারচৌকরলেন কালা
নিবেদন
গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার মতন, দ্বিজেন্দ্রলালের “বঙ্গ আমার পানের
ভাষার কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করিয়া তাহার বন্দনা করি। এই গীতটী
স্যার গুরুদাস প্রভৃতি সুধীগণ বড়ই পছন্দ করেন। সেই উৎসাহে
দ্বিজেন্দ্রলালের অপর গানের ভাষাগত অল্পবিস্তর পরিবর্তন করিয়া
তাহাতে নূতন ভাবের আবােপ করিয়াছি। ইহাতে যদি দোষ হইয়া
থাকে, পাঠকগণ ক্ষমা করিবেন।
রাস পূর্ণিমা, ১৩২৮।
দীনধাম, কলিকাতা
ললিতচন্দ্র মিত্র
No text on this page.
علامه مه جا *
No text on this page.
সুচী পত্তা বিষয় তঙ্খলা প্রণব ••• ••• ••• ••• s ৫ ••• ••• ••• • ও ও ও ••• ১০ ১২ ••• ••• ••• ••• no ••• বাশী গৌরী-নারায়ণী ... আগমনী বিজয়া ••• জাহ্নবী গঙ্গা শিব-রাত্রি দশহরায় সারদা সঙ্গীত হিমালয়ে তর্পণ পুত্ৰ-শােকে (১) পুত্র-শােকে (২) গচ্ছিত হরিণ ••• গৌতম-বুদ্ধ গৌর-নিমাই ••• কাশী-বারাণসী মন্দির-দর্শনে ••• ১৪ ••• ••• ••• ••• ১৭ ০ ০ ০ ••• ••• ••• २० २० ••• ••• t, ২৭ ••• see ২১ ••• পত্রা + + + ••• ৩৪ ৪১ ••• ••• ••• ৩৪ ••• ••• ৩৮ ••• ৪ ০ ••• ••• ৪৭-৪৫ ••• ••• ৪২ ••• ••• ••• ৪৫ বিষয় সাগর-সৈকতে ••• ম বঙ্গীয় সাহিত্য-সম্মিলনে ১। বাণী-বন্দনা ২। যশােহর-গৌরব ৩। ভারতী-চরণে ৪। ভাষা-জননী পূর্ণিমা মিলনে ১। রাস ২। আবাহন ৩। নিবেদন ৪। নিবেদনের উত্তর রামমােহন রায় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বিদ্যাসাগর পিয়ারীচাদ ••• ভূদেবচন্দ্র কবিত্রয় মধু মাইকেল মেঘনা-দর্শনে ••• বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যিক ত্রয়াধিপ কালীপ্রসন্ন সিংহ ••• ••• ৪৬ ••• ৪৮ ••• ••• ৪৯ ••• ৫০ ••• ••• ••• ••• ••• ren . . . ৫৪ ••• ••• ••• ••• ••• ••• ••• ••• • পত্রাঙ্ক বিষয় বিহারীলাল চক্রবর্তী ••• . . . ৬০ ••• ১১ ৬২ ৩ ০ ০ হেমচন্দ্র নবীনচন্দ্র সেন গিরিশচন্দ্র দ্বিজেন্দ্রলাল বিজয়চন্দ্র সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা ১। স্বাগত এe ••• ••• ••• ৩৫-৩৮ ••• ২। উত্তর ••• ••• ১৭ ••• ••• •• ••• ৭০ ••• ৭১ ser ••• 93 ••• ৭৩ ••• ••• ••• ••• ••• ••• ৭৭ রামগােপাল ঘােষ হরিশ্চন্দ্র মুখােপাধ্যায় উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় যােগেন্দ্রকৃষ্ণ বসু স্বরাজ সঙ্গীত ভারত-জননী বঙ্গ-বাহিনী নদীয়া-কাহিনী সতীর্থ সঙ্গম স্বাগত সম্ভাষণ বঙ্গ-উড়িষ্যা গােধেনু বলে বঙ্কিমং শিশিরকুমার ঘোষ••• ••• ••• ৭৯ ••• ••• ••• ••• ৮৫ ••• ••• ৮৭ ••• ৮৮ ••• ••• ••• ৯০
•
পত্রাঙ্ক
•••
বিষয়
দ্বিজেন্দ্রলাল (১)
দ্বিজেন্দ্রলাল (২) ...
স্যার জগদীশচন্দ্র
স্যার প্রফুল্লচন্দ্র
কাঙ্গালের নিবেদন
কৃষ্ণ-কথা
•••
•••
•••
=e
ভ্রম সংশােধন।
পৃষ্ঠা
পংক্তি
বিষয়
স্থলে নাম
•••
৩২
১
•••
•••
•••
বি
পিতরে বলে। পরমপূজনীয়া শ্ৰীমতী মাতাঠাকুষাণীর পবিত্র নামে এই গাথা উৎসৃষ্ট হইল। অষ্টম বরয যবে হইল অতীত, পিতার পবিত্র স্নেহে হইনু বঞ্চিত আদিষ্ট বিধানে তিনি ত্যজিলে ধরণী, একাধারে হইয়াছ জনকজননী। পিতা মাতা সেবা তাই করিতে সাধন, তােমার চরণ শিরে করেছি ধারণ। রাস পূর্ণিমা, সেবক- ১৩২৮। এললিস্ট মিত্র।
মা ; মা গর্ভধারিণি অষ! পুত্রে বিসরি দোষ, চির প্রদায়িনী মেহের স্নিগ্ধ প্রলম্ব ; তব যত তনয়ে তীর্থ গণিবে, তব দিব্য চরণধূলি রাজি, তব যত তনয়ে ধন্য হইবে, শুভ আশীষে তব মা জি তুমি ত জননি, যে আগত মৰ্ত্তে, অতুলন করুণায় সাজি, ধরি সুমঙ্গল ভগবৎ-অন্তর-বিমল-সুপ্রতিবিম্ব। সন্তান কারণ, নিজ দেহ রুধির বিগলিত করুণা ক্ষরিয়া, পুণ্য পয়ােধর উচ্ছলি, কোমল ক্ষুধিত মুখ’পর ঝরিয়া, পৰ্বত হইতে সুবিমল ধারে বারি প্রপাত প্রসন্ন- তৃপ্ত করিছ সদা, নব শিশু তৃষিত আনন বিম্ব। পরিহরি যত সুখ ভােগ, যখন মা শায়িত পীড়িত শয়নে, ত্যজিয়া অশন তব দিবস রজনী, ত্যজিয়া সুপ্তি তব নয়নে, বরিষ শান্তি মম শঙ্কিত প্রাণে, কর কত ক্লেশ অবলম্ব ; মা স্বর্গাদপি গরীয়সি। জননি অন্নদায়িনি অম্ব। = পিতৃপদে সরস করুন, মানস মােহন, অধর পরে। ভাবিতে আপন, আসিত ভরে। দারিদ্র-পেষণ, মনীষা বলে। করিয়া সৰ্জন, অমর দলে। হাসি বরিষণ পরের বেদন সলিলে নয়ন প্রথম জীবন করিলে দমন স্বভাব দর্পণ লভিলে আসন রচনা তােমার আনে অশ্র ধার রােগাতুর মনা করিত কামনা পুরবাসীজন সাদরে স্মরণ ধন্য সেই জন, করে দরশন মরমে সবার হাসির রঙ্গ। লভিতে সান্ত্বনা তোমার সঙ্গ। * মাঠে চাষীগণ, করিছে সবে। সবারে আপন নশ্বর ভবে। * নীলাম্বর মুখােপাধ্যায় মহাশয় যখন কাশ্মিরের সচিব ছিলেন, সেই সময়ে তাহার শিরঃপীড়া হয়। চিকিৎসার জন্য কলিকাতায় আসিবার সময়, তথাকার ডাক্তার-পিতৃদেবের অন্যতম বন্ধু বলিয়াছিলেন, আপনি কলিকাতায় গিয়া যদি দীনবন্ধুবাবুর সহিত আলাপ ও তাহার সঙ্গ লাভ করিতে পারেন, তাহা হইলে আর চিকিৎসার প্রয়ােজন হইবে না। নীলাম্বরবাবু আমাকে বলেন, “আমি তােমার বাবার সহিত দেখা করিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম, কিন্তু তিনি তখন রুগ্ন শয্যায়, আলাপের সুযােগ ঘটে নাই”।
পিতা স্বর্গঃ পিতা ধৰ্ম্মঃ
পিতা হি পরমন্তপঃ।
পিতরি প্রতিমাপন্নে
প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ ।
লিভ-গারা
তলা
সৰ্ব্ব খলু ব্ৰহ্ম এই-নাহি কিছু আর
মায়ার উপাধি যােগে বিশেষণ তার।
তাহার সৃষ্টির ইচ্ছা হইল যখন,
কারণ অর্ণবে ব্রহ্মা উদিল তখন।
পালন কারণে তিনি আছেন বেষ্টিয়া,
বিষ্ণুর ঐশ্বর্য রূপে সকলে মােহিয়া।
মাধুৰ্য অভাবে পূর্ণ পালন কোথায় ?
বৃন্দাবনে দেখা দেন শ্রীকৃষ্ণ লীলায়।
কালের বিধান চক্রে, সংহার যখন
রুদ্ররূপে মহামুৰ্ত্তি করেন ধারণ!
হাতেই হয় লীন সকল জগৎ
শিবের আধার ব্রহ্ম, একমাত্র সৎ।
জন্ম স্থিতি লয় যাহে সেই তলান্
শান্ত ভাবে উপাসনা করয়ে ধীমান
ললিত-গাথা
প্রণব
বাক্য মন ফিরে আসে নাহি পায় ঠিক
প্রণব কেবলমাত্র ব্রহ্মের প্রতীক;
করিছে প্রকর্ষ স্তুতি প্রণবে ওঙ্কার
পরব্রহ্ম পদে সেই হৃদয় ঝঙ্কার।
মাত্ৰাত্ৰয়ে মুৰ্ত্তি তার রয়েছে রচিত,
অনুচাৰ্য নাদ বিন্দু শেষে সুশােভিত।
মাত্রা আর ব্রহ্মপাদে ভেদ নাহি হয়
কহিতেছে শ্ৰতিবাক্যে মুনি-ঋষিচয় ।
আদিপাদ বৈশ্বানর, স্থান জাগরণ,
তৈজস দ্বিতীয়, তাহে স্বপ্ন দরশন।
সুষুপ্তি প্রজ্ঞান ঘন প্রজ্ঞা নাম আর,
তিন রূপে এক আত্মা ভেদ নাহি তার।
অব্যয় অদ্বৈতপাদ তুরীয় ঈশান
জগৎ প্রপঞ্চ হতে নিবৃত্তির স্থান।
প্রণব ওঙ্কার মন্ত্রে কর নমস্কার,
জপিলে উত্তীর্ণ হবে সাগর সংসার।
শ্রীকৃষ্ণ
চির শান্ত রসে, মুনি যোেগ তপে,
অভিরাম পদে, অবিরাম জপে।
করিলে করুণা, যত দাস জনে,
লভিয়ে শরণে, শুভ ভাগ্য গণে।
সব বিশ্ব চলে, তব সৌখ্য বলে,
ধরিলে হৃদয়ে, শিশু গোপ দলে।
নম নন্দকি নন্দন, কুঞ্জ বনে,
যিনি অব্যয় অক্ষর সিদ্ধ মনে।
জননী নয়নে তুমি নীলমণি,
করিতে বদনে,
সর দুগ্ধ ননী।
অতনু ত্যজিয়ে, মধু ভাব বশে,
বৃকভানু-সুতা, লহ রাস রসে।
অভিলাষ যথা, ভজ ভক্ত সবে
তব পদরজে, ভব পার হবে।
নম নন্দকি নন্দন, কুঞ্জ বনে,
যিনি অব্যয় অক্ষর সিদ্ধ মনে।
৪
ললিত-গাথা
বাঁশী
“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।”
বাজিছে শ্যামের বাঁশী ব্রজে উভরায় রে ;
যমুনা উজান বেগে কল কল ধায় রে ;
চিরানন্দ নন্দপুরে, শুনিয়া মােহন সুরে,
শিহরে যশােদা রাণী, পুলকিত কায় রে ;
রাখাল ‘হারেরে বলি, ছুটে আঙ্গিনায় রে ;
গৃহকাজ দূরে ফেলি, চলে গােপিকায় রে।
বাজে বাঁশী এক রবে, অবিরাম হায় রে,
গুণভেদে বাঁশী-রব, ভিন্ন শুনা যায় রে,
যশােমতী গুনে ধ্বনি, “দাও মাতা ক্ষীর ননী,”
আনিবারে নবনীত আনমনে ধায় রে ;
শুনিছে গােপের দল, বেণুর ভাষায় রে ;
“বহিব আনন্দে সদা নন্দের বাধায় রে।
বাণীর স্নেহের স্বর, রাখালে মাতায় রে,
ধেনু লয়ে আসে সবে, শিশুর শােভায় রে ;
“আয় রে রাখাল ভাই, চল সবে গােঠে যাই,
কহিতে রাখালরাজ, বাঁশরী বাজায় রে ;
এমন মেহের টান, সভায় সভায় রে,
স্বর্গেতে তুলিয়া দেয়, মানব-ধরায় রে।
বাঁশী
শুনিয়া শ্যামের বাঁশী, কদমতলায় রে,
রাখিতে নারিছে রাধা, কটি-মেখলায় রে ;
শুনিতেছে গরবিণী, “কোথা রাই বিনােদিনী,”
আর কি ডরিতে পারে, হীন কুটিলায় রে ;
অকাতরে লাজ মান সলিলে ভাসায় রে ;
অসিত-চরণে প্রাণ, সপিবারে যায় রে।
উড় রাজ-কররাশি মিশে মল্লিকায় রে,
হাসিছে শারদ নিশি রাসপূর্ণিমায় রে,
ব্রজ-স্ত্রী-শ্রবণে আসি, শ্যামের মােহন বাঁশী,
ডাকিছে সাদরে সবে, নিবৃত্তি-ক্রীড়ায় রে ;
রাধা নামে সাধা বাঁশী শুনে, গােপিকায় রে,
গাহিছে বিভাের তানে “জয় রাধিকায় রে”।
এখনও শ্যামের বাঁশী বাজে উভরায় রে,
অভাগা বধির যারা, শুনিতে না পায় রে ।
বাঁশরীর মন্ত্র বলে, ভূমার তরঙ্গ চলে,
অখণ্ড আনন্দ বাধা বাঁশরী-ধারায় রে।
পাপহারী বংশীধারী যাচি তব পায় রে-
বাঁশী-রব সদা যেন শ্রবণ জুড়ায় রে।
ললিত-গাথা
গৌরী-নারায়ণী
যে দিন অভয়ে! সাগর বেলায়, পূজিল তােমায় শ্রীরামচন্দ্র,
মন্ত্রমুগ্ধ সকল আনন ধ্বনিল হর্ষে জলদম,
সেদিন তােমার প্রভায় ধরার, প্রভাত হইল অশুভ রাত্রি,
বন্দিল সবে “জয় মা জননি জগত্তারিণি জগদ্ধাত্রি!”
ধন্য হইবে সন্তান সবে নিরখি তােমায় তিনটি রাত্রি,
জয় শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি মা মঙ্গল-দাত্রি।
নয়নয়ে ব্যক্ত করুণা, রসনা স্বস্তি বচনে লিপ্ত,
ললাটে গরিমা, বিমল হাস্যে অমল কমল-আনন দীপ্ত ;
দশ প্রহরণ শােভিছে নিত্য, জননি তােমার দশটি হস্তে
ভক্তিপূর্ণ চরণ তােমার ধরিছে কেশরী আপন মস্তে।
ধন্য হইবে সন্তান সবে নিরখি তােমায় তিনটি রাত্রি,
জয় শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি মা মঙ্গল-দাত্রি।
নিন্দা কুচ্ছ শুনিয়া পতির পাইলে মৰ্ম্মে অশেষ কষ্ট,
তখনি ত্যজিলে দেহের ভার, দক্ষযজ্ঞ হইল নষ্ট ;
কখন মা তুমি ভীষণ দীপ্ত, দৈত্য-অসুর-নাশিনী দৃশ্যে,
হাসিয়া কখন তুষিছ ভক্তে, শান্তি ঢালিছ নিখিল বিশ্বে ;
ধন্য হইবে সন্তান সবে নিরখি তােমায় তিনটি রাত্রি,
জয় শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি মা মঙ্গল-দাত্রি।
গৌরী-নারায়ণী
৭.
ক্ষে তােমার হেরম্ব-কণ্ঠ ঘােষিছে সতত সৰ্ব্ব সিদ্ধি,
কমলা চাহিয়া কমল নেত্রে, করিছে সকল শােভার বৃদ্ধি,
বামে ষড়ানন ধরিয়া অস্ত্র, নাশিছে যতেক অশুভ রিষ্টি,
বাজায়ে বীণায় শ্বেতবরণা, করিছে দিব্য জ্ঞানের সৃষ্টি।
ধন্য হইবে সন্তান সবে নিরখি তােমায় তিনটি রাত্রি,
জয় শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি মা মঙ্গল-দাত্রি ।
জননি তােমার পূজার তরে, আজি গাে জুড়িয়া ভারতবর্ষ,
উঠিছে উচ্চে সে কি কলরব, সে কি মা ভক্তি, সে কি মা হর্ষ,
জয় মা দুর্গে দুঃখহারিণি ললিত চরণে, চাহি মা মুক্তি,
জানি মা কেবল করুণা তােমার, জানিনা কিছুই শাস্ত্র যুক্তি।
ধন্থ হইবে সন্তান সবে নিরখি তােমায় তিনটি রাত্রি,
জয় শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি মা মঙ্গল-দাত্রি।
৮
ললিত-গাথা
আগমনী
হরিত আভায় শােভিছে ধরণী, থেমেছে বরষা ধারা,
শারদ গগন নীরদ শূন্য, হাসে চন্দ্র তারা,
হর্ষ ভরে দেখিবে সকলে, ধন্য ভাগ্য মানি,
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গােমায়ার প্রতিমা খানি।
পাইয়া গৌরী গিরির অধরে, খেলিছে মধুর হাসি,
ভায়ের স্নেহ করিছে স্ফীত, সাগর অষু রাশি,
পলক শূন্য নয়নে দেখিছে, জননী মেনকা রাণী
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গাে,মায়ার প্রতিমা খানি।
পাষাণ ভেদিয়া উঠিছে উচ্চে, সুখের পুণ্য ধারা,
আমােদে মত্ত হয়েছে সকলে, শৈলে বিহরে যারা
মধুর বচনে করিছে তৃপ্ত, গিরি রাজধানী,
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গাে,-মায়ার প্রতিমা খানি।
বৃক্ষ লতা হরষে পূর্ণ, গাহিছে বিহগ গান,
হেরিয়া সিংহ মায়ের চরণে, নাচিছে পশুর প্রাণ ;
বিষাদ ব্যাধি করেছে দূর, শান্তি সুষমা দানি
উমার প্রতিমা খানি,-সে যে গাে,মায়ার প্রতিমা খানি।
শুনি আগমনী মধুর কণ্ঠে, পুলকে হৃদয় নাচে,
আনন্দময়ী করিবে আশীষ, আসিয়া সবার কাছে,
রয়েছে আশায়, করিতে পূজা, ভক্তি পুষ্প দানি,
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গাে,মায়ার প্রতিমা খানি।
বিজয়া
আজি গাে সকল নয়ন হইতে, বহিছে সলিল ধারা,
কঁদিয়া নবমী করেছে গমন, ক্ষুব্ধ চন্দ্র তারা ,
বিদ্ধ করিয়া সবার প্রাণ, কহিছে বিদায় বাণী,
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গাে,—মায়ার প্রতিমা খানি।
কৈলাসে, কাদি চলেছে, গৌরী ত্যজিয়া গিরির বাসে,
চিত্ত তাহার দোলার মতন,
উভয়
মুখেতে ভাসে,
অঙ্ক হইতে করিতে বিদায়, নারিছে মেনকা রাণী
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গাে,--মায়ার প্রতিমা খানি।
কাতর কণ্ঠে করিছে রােদন, সকল শৈলবাসী,
ধূমের মতন, পাষাণ হইতে, উঠিছে দুঃখ রাশি ;
সুদূর আকাশে, যাইছে মিশিয়া, হৃদয়ে বজর হানি,
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গাে,মায়ার প্রতিমা খানি।
আঁধারে আলােকে, দিবস রাত্রি ব্যাপিয়া সকল কাজে,
সুখের স্মৃতিটি জাগিবে হৃদয়ে, সতত দুখের মাঝে,
মুদিত নয়নে করিবে ধ্যান, যুক্ত করিয়া পাণি,
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গাে,মায়ার প্রতিমা খানি।
সজল নয়নে মেহের তনয়া, যাইলে আপন বাসে,
বিজয়া দশমী, সবার স্মরণে অমনি ভাসিয়া আসে ;
নীরব হৃদয় তখনি পূজে, ভক্তি অশ্রু দানি,
উমার প্রতিমা খানি,—সে যে গােমায়ার প্রতিমা খানি।
ললিত-গাথা
জাহ্নবী গঙ্গা
কেশব চরণ ধৌত ঘৰ্ম্ম যে দিন জগতে হইল বর্ষ ;
তাপিত বক্ষ শান্তি-সিক্ত করিল তাহার তরল স্পর্শ।
রাখিতে নারিল পুণ্য প্রবাহ ব্রহ্মা ধরিয়া করঙ্ক হস্তে,
স্থাপিল তাহায় মনের হর্ষে, জটিল জটায় শঙ্কর মস্তে।
মুক্ত হইল সগর-সন্তান তােমার চরণ ধরিয়া অঙ্গে,
জয় সুরধুনি মধুর ভাষিণি কলুষনাশিনি জাহ্নবি গঙ্গে।
পুণ্য বলের অতুল জ্যোতি রহিবে সতত প্রভাব পূর্ণ,
ধৰ্ম্ম-বিহীন পাশব শক্তি, অচিরে হইবে শতধা চূর্ণ,
বােধিতে তােমার গতির প্রবাহ ধাইল কুঞ্জর ভীষণ রঙ্গে,
ভাসিয়া যাইল তৃণের মতন অমনি শীতল স্রোতের সঙ্গে।
মুক্ত হইল সগর-সন্তান তােমার চরণ ধরিয়া অঙ্গে।
জয় সুরধুনি, মধুর ভাষিণি কলুষনাশিনি জাহ্নবি গঙ্গে।
ন
অষ্ট বসুর শাপ বিমােচন করিল তােমার করুণ স্পর্শ,
কনিষ্ঠ তাদের বহিল কেবল করিতে বৃদ্ধি মায়ের হর্ষ
দেবতা দুর্লভ শুভ্র চরিত সাদরে পুরাণ করিছে ব্যাখ্যা,
ভক্ত-হৃদয় পূজিছে তােমায় প্রানি ভীষ্ম জননী আখ্যা।
মুক্ত হইল সগর-সন্তান তােমার চরণ ধরিয়া অঙ্গে
জয় সুরধুনি, মধুর ভাষিণি কলুষনাশিনি জাহ্নবি গঙ্গে।
জাহ্নবী গঙ্গা
১১
তোমার জলের অপার মহিমা হেরিছে নিগমে সবার নেত্র,
তুমিত জননী সবার শ্রেষ্ঠ ! ব্যাপিয়া বিশাল স্বভাব ক্ষেত্র ;
ভারত ভূমির পেলব অঙ্গে ঢালিছ স্নেহের পীযূষ স্তন্য
তাহার প্রসাদে সন্তান তৃপ্ত, তারাত চাহেনা করুণা অন্য।
মুক্ত হইল সগর-সন্তান তােমার চরণ ধরিয়া অঙ্গে
জয় সুরধুনি, মধুর ভাষিণি কলুষনাশিনি জাহ্নবি গঙ্গে।
কর মা করুণা করুণাদায়িনি অঞ্জলি করিছে প্রাণের ভক্তি
প্রভাতে নিত্য সেবিতে তােমায় আমরণ মাের থাকেগাে শক্তি।
রাখিও চরণে অন্তিমে যখন নিথর হইবে দেহের যন্ত্র,
ধ্বনিত হইবে উচ্চ কণ্ঠে মধুর তারকব্রহ্ম মন্ত্র।
মুক্ত হইল সগর-সন্তান তােমার চরণ ধরিয়া অঙ্গে
জয় সুরধুনি, মধুর ভাষিণি কলুষনাশিনি জাহ্নবি গঙ্গে।
১২
ললিত-গাথা
শিব-রাত্রি
উপবাস করে সুপবিত্র মনে,
অবসান নিশা করি জাগরণে,
প্রহরে প্রহরে হর পাদতলে,
দধি দুগ্ধ ঘৃতে মধু বিল্বদলে
কর ধৌত সবে চির ভক্তি ভরে,
মরণে লভিবে শিবলােক পরে।
নম শঙ্কর! দেব মহেশ হরে।
যিনি তুষ্ট সদা নিজ ভক্ত পরে।
তরু বিপরে অবসাদ লয়ে,
নিশি যাপিছ কেন, নিষাদ ! ভয়ে ?
নিজ ভাগ্যবলে তুমি ধন্য হলে,
শিব মস্তক সিঞ্চিত গাত্র জলে,
হর কিঙ্কর আসিল শেষ ক্ষণে
শিবলােক লভে গুণহীন জনে।
নম শঙ্কর। দেব মহেশ হরে।
যিনি তুষ্ট সদা নিজ ভক্ত পরে।
-
দশহরায়
তব জীবন মাধব পাদ হতে,
কহিছে মহিমা শত ভাগবতে।
কি গুণে তুষিলে, প্রমথেশ হরে,
রহিলে শশি-সেবিত ভাল’পরে।
চতুরানন সাধন তুচ্ছ করে,
ত্যজি বন্ধন আগত ভক্ত তরে।
প্রণমামি পদে, চির পুণ্যযুতা
-দশ পাপহরা ! তুমি শৈলসুতা।
অভিশপ্ত জনে করুণা সলিলে
অভিষিক্ত করে অধমে তরিলে ;
অবগাহি নরে তব দিব্য জলে,
মরতে লভিছে শুভ মুক্তি ফলে।
মম দেহ ভবে, অবসান হলে,
লহ মা! তনয়ে, তব পদতলে।
প্রণমামি পদে, চির পুণ্যযুতা
মদশ পাপহরা ! তুমি শৈলসুতা।
১৪
ললিত-গাথা
সারদা সঙ্গীত
শ্রীপঞ্চমী আজি বঙ্গে ;
ম্লান প্রকৃতি পুনঃ কল নিনাদিনী, কোকিল কূজন রঙ্গে ;
আজি কত ভবন, হর্ষে পূরিল, অর্পিয়া ভক্তি তব চরণে
কত পূরবাসী, তুষ্ট হইছে, লভি তব সকরুণ বচনে,
অঞ্জলি করিছে, সন্তান বৃন্দে, ফুল সহ সুললিত তানে,
কর সমুজ্জ্বল, যত মুঢ় অন্তর, জ্ঞানের পুণ্য তরঙ্গে।
বীণা বাদন, মুনি-ঋষি-সাধক-হরষিত মরমে পশিয়া,
সামরব ছন্দে ঝঙ্কারি, ওঙ্কার আলােক বিধূনিত করিয়া,
আদি প্রচারি সনাতন সত্যে, নিখিল বিশ্ব ভরিয়া,
মুখরিল স্থল জল ব্যোমে, পাদপ তৃণে, সিংহ পতঙ্গে।
অনশনে অবসন্ন জন, যখন মা শায়িত সমােজ চরণে,
লভিছে জীবনে তব বর অনুপম, লভিছে অমরতা মরণে,
অর্পিব ভক্তি যত সঞ্চিত প্রাণে, কৃপা কর অধম অপাঙ্গে;
মা ভারতি সরস্বতি বীণাপাণি ! বরিষ আশীষ বঙ্গে।
হিমালয়ে তর্পণ
কাঞ্চন কিরণ কিবা শােভে পূৰ্বাশায়
ঘুমন্ত প্রকৃতি ধীরে ত্যজিছে নিদ্রায়
অনীরদ নীলিমায়,
গিরিশৃঙ্গ দেখা যায়,
সুবৰ্ণ-মণ্ডিত চূড়া শােভিছে মাথায়
শিখাইতে উদারতা মানব সবায়,
অভ্রভেদ করি যেন. অনন্তে মিশায়।
নন্দন-নিন্দিত দৃশ্যে নয়ন জুড়ায়,
অবিরাম দরশন করিবারে চায়।
কোথা হতে মেঘরাশি, অকস্মাৎ ভেসে আসি,
আবরণ করে দিল সুবর্ণচূড়ায় ;
সম্মুখে দেখিয়ে এবে বাষ্পের মালায়,
প্রাণের পুলক দূরে হইল বিদায় ।
হেরি ব্যতিক্রম এই স্বভাব শােভায়
ব্যাকুলিত চিত্ত রহে মগ্ন প্রতীক্ষায় ;
ব্ৰহ্ম খলু সৰ্বাধার
ব্ৰহ্ম ছাড়া নাহি আর,
রয়েছে আবৃত নিত্য, অনিত্য মায়ায়।
তাহে লগ্ন হইবারে কেহ নাহি চায়
ত্যজিয়া কায়ায় আছে মজিয়া ছায়ায়।
'-
ললিত-গাথা
বিলীন হইলে মেঘ স্বভাব-লীলায়
উদিবে আবার সেই কনক-শােভায়
বিনা স্বরূপের ধ্যান,
নহে মায়া ব্যবধান ;
জীবন আহুতি কর দিব্য সাধনায়
নহিলে থাকিবে চির গভীর নিশায়
সংযমী জাগ্রত যাহে, প্রজ্ঞার প্রভায়।
কোথা পাব অধিকার ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসায়,
সাগরে রহেছি যেন চড়িয়া ভেলায় ;
আজি তিথি পুণ্যভরা,
স্বর্গ মর্ত্ত এক করা,
অর্পিব তর্পণ বারি পিতৃ-পিপাসায় ;
পাইলে পরম প্রীতি স্বর্গের পিতায়,
পরিতুষ্ট হন সেই পরম ব্রহ্মায় ।
দার্জিলিংএ রচিত
পুত্র-শােকে
(১)
ভেঙ্গে গেছে মাের স্বপ্নের ঘাের ! ছিড়ে গেছে মাের আশার তার।
মলিন বয়ানে, ভগ্ন পরাণে রহেছি সহিতে বিষাদ ভার ।
জীবন আমার হইতে তাহার চলে গেছে সুখ সুষমা হায় !
ঘন মেঘ রাশ, ঝটিকা বাতাস, বহিয়া হৃদয় চলিয়া যায়।
তনয় আমার! তনয়া আমার ! বক্ষে আবার ফিরিয়া আয়,
ততাদের জন্য, ছিলাম ধন্য, তােদের অধীর চিত্ত চায়।
জেগে আছে আজ মানসে আমার—তােমাদের সেই হরষ গান ;
হাসি খেলা সব ভুলিব কেমনে–করিছে সতত আকুল প্রাণ।
আর আসিবে না তনয়া-তনয়, নাহি আর উদে হৃদয় চাদ,
কিসের কারণ, অশুভ-বারণ শুভ অভিলাষে সাধিল বাদ।
তনয় আমার! তনয়া আমার ! বক্ষে আবার ফিরিয়া আয়,
তােদের জন্য, ছিলাম ধন্য, তােদের অধীর চিত্ত চায়।
আমার এ মন বিষাদ মগন, কেবল করিছে তােদের স্মরণ ;
বন্ধু আদি সব মলিন নীরব ; বিষাদ মগন এ “দীন ধাম,”
নাহি দেখি আর-সব অন্ধকার—কেমনে আঁধারে রহিব স্থির ;
নাহি আর হাসি—স্নান মুখে আছি, স্তব্ধ, হিয়ার স্পদ ধীর ;
তনয় আমার! তনয়া আমার। বক্ষে আবার ফিরিয়া আয়,
ততাদের জন্য, ছিলাম ধন্য, তােদের অধীর চিত্ত চায়।
२
১৮
ললিত-গাথা
অরূপ তাদের-পরশপুলকে শিহরে আবার তাপিত প্রাণ ;
মুদিত নয়ন করে দরশন, নাসিকা গন্ধ করিছে ঘ্রাণ।
শ্রবণে পশিয়া মরমে আমার, অতীতের বাণী জাগিয়া থাক,
তাহাদের স্মৃতি—পুণ্য সে অতি ! শূন্য হৃদয়ে ভরিয়া যাক।
তনয় আমার! তনয়া আমার ! বক্ষে আবার ফিরিয়া আয়,
তােদর জন্য, ছিলাম ধন্য, তােদের অধীর চিত্ত চায় ।
পুত্র-শােকে
(২)
ওই মহাসিন্ধুর ওপার হতে, কি সঙ্গীত ভেসে আসে,
সে চাহে কাতর চিতে আদর দিতে, সে হিয়ার মাঝে,
কহিতেছে অবিরাম মধুর ভাষে ?
“কেন কাদিস সদা তাদের তরে,
যারা নাহিক আর তােদের ঘরে,
সবাই তারা, শরীর জীর্ণ ত্যাগ করেছে, নূতন আশে,
ওরে মানুষ যথা জীর্ণ ত্যজি, গ্রহণ করে নব বাসে ।
মিছে, তাদের কারণ, দুঃখ করা,
তারা পেয়েছে ত্রাণ, শান্তি ভরা,
পাবি আবার তাদের দেখা, আসবি যখন মহাকাশে।
কৌমার যৌবন জরা,দেহে মৃত্যু সেই ধারা—ধীর বুদ্ধি সদা ভাষে
কেন মায়া গৃহে আছিস বন্ধ,
ওরে মিছা শােকে হয়ে অন্ধ,
ওরে সেই সে পরমানন্দ! মােহ-বন্ধ যেব নাশে।
গেছে যাদের ছেলে, তাদের কাছে, তাহে কেন কান্না আসে।”
ললিত-গাথা
গচ্ছিত হরিণ
কাপাইয়া ফুলবন,
প্রভাতের সমীরণ
ধীরে ধীরে ছিল প্রবাহিত ;
আহ্নিক করিয়া শেষ
প্রণমিয়া পরমেশ
প্রাঙ্গণেতে যবে উপনীত ;
কিবা রূপ মনােলােভা ললাটে স্বর্গের শােভা
দেখিলাম তাপস রতন,
জ্ঞানভক্তি বিভূষিত
জটাজুট বিলম্বিত
সদানন্দ প্রশান্ত বদন।
মৃগশিশু ধরি করে
আধ বিজড়িত স্বরে
কহিলেন সাদরে আমায়
“যাব তীর্থ পৰ্যটনে নাহি জানি কোন ক্ষণে
আগমন করিব হেথায়।
প্রাণের হরিণ মাের
সপিলাম করে তাের
রেখ তারে করিয়া যতন,
আশ্রমে ফিরিব যবে
ফিরিয়া লইব তবে
এ পবিত্র মেহের রতন।”
হরিণ শিশুটি নিয়ে
মেহবারি বরষিয়ে
আনন্দেতে করিনু বৰ্দ্ধিত,
নির্দোষ আমােদ ভরে
বেড়াইত ঘরে ঘরে
ছুটাছুটি কতই করিত।
গচ্ছিত হরিণ চরণে হইয়া ক্ষত মাের পানে অবিরত ছলছল চাহিল যখন, অন্তরে পাইয়া ব্যথা তপােবন মৃগ কথা চিত্তমাকে হইল স্মরণ। তরল মেহের সার মাখা চরণে তার কষ্ট ক্ৰমে হইল বিদায় ; কৃতজ্ঞতা সুধারাশি আয়ত নয়নে ভাসি প্রকাশিত নীরব ভাষায়। বুঝিলাম সেইক্ষণ, ছাড়ি পুণ্য তপােবন শকুন্তলা করিলে প্রয়াণ প্রাণেতে পাইয়া দয়া, কেন সে পশুর হিয়া বিরহেতে ভাসাল বয়ান। দিবস যামিনী কত, আনন্দে হইল গত, খেলিতাম হরিণের সনে ; অকস্মাৎ একদিন তপােধন সমাসীন তুষিলেন আশীষ বচনে। আশ্রমে যাইতে হবে, মৃগশিশু সঙ্গে রবে, দাও ক্ষিরে গচ্ছিত সে ধন ; সন্ন্যাসিচরণ ধরে যাচিলাম করযােড়ে মৃগ মােরে করিতে অর্পণ। মমতা বিহীন তিনি, হৃদয় পাষাণ জিনি, চাহিলেন মৃগ পুনরায় ; তঁাহার কণ্ঠের স্বর বিন্ধিল হৃদয়স্তর আবার ধরিলাম পায় ;
২২
ললিত-গাথা
নড়িল জটার জাল
চক্ষু দুটি হ’ল লাল
লহ তবে শাপবহ্নি মম ;
ব্রহ্ম অভিশাপ ভয়ে,
অতি ব্যাকুলিত হয়ে
ফিরে দিনু মৃগ প্রিয়তম ।
আনত করিয়া শিরে
কহিলাম সন্ন্যাসীরে
যেই শিক্ষা দিলে তপােধন ;
জীবনে কখন (ও) আর রাখিব না অন্য কার
যবে দিবে গচ্ছিত রতন।
সস্মিত আননে চাহি,
করুণার দৃষ্টি বাহি’
আশীষিয়া তাপস প্রবর,
মুছাতে নয়ন বারি
বক্ষেতে লইয়া তারি
স্নেহভরে করিল উত্তর।
সুখকর ভ্রমঘােরে
মেহের মমতা ডােরে
যারে তুমি ভাবিছ আপন,
করুণা করিয়া বিধি,
দিয়াছেন সেই নিধি
তব কাছে গচ্ছিত কারণ।
পুত্র কন্যা যে তােমার গচ্ছিত যে বিধাতার
বৃথা কেন করিতেছ পণ ;
শুনিয়া বিবেকবাণী
আপন প্রমাদ মানি
বদিলাম তাপস চরণ।
গৌতমবুদ্ধ
ভাবিত সকলে আছিলে মুগ্ধ, নিরখি সতত শােভার কান্তি ;
অন্তরে কিন্তু খুজিতে নিত্য, কোথায় মিলিবে পুণ্য শান্তি ;
সকল যত্ন হইল ব্যর্থ, বিভব অঙ্কে রাখিতে রুদ্ধ,
স্বভাব আকারে দেখিতে জগৎ, হইল ব্যস্ত কুমার বুদ্ধ।
অহিংসা ধৰ্ম্ম হইল প্রচার, দূরিত হইল অজ্ঞান সুপ্তি,
হইল ছিন্ন কর্মবন্ধ, দেখিল জগৎ নিৰ্ব্বাণ মুক্তি।
নেহারি নেত্রে ব্যাধি দৈন্য, রি নেত্রে মৃত্যু রঙ্গ,
জীবের দুঃখ করিতে দূর, হইল তােমার কুহক ভঙ্গ ।
ত্যজিয়া সুপ্ত পত্নী পুত্র, ত্যজিয়া কক্ষ স্বর্ণমুক্ত,
দিব্য প্রেরণে হইলে বাহির, মায়ার বজ্র করিয়া মুক্ত।
অহিংসা ধৰ্ম্ম হইল প্রচার, দূরিত হইল অজ্ঞান সুপ্তি,
হইল ছিন্ন কৰ্ম্মবন্ধ, দেখিল জগৎ নির্বাণ মুক্তি।
কঠোর সাধনে হইলে মত্ত, মৃত্যু ছায়া করিল স্পর্শ
বুঝিলে সহসা আপন ভ্রান্তি, ভাতিল বিশ্বে বিপুল হর্ষ
ক্ষরিল হৃদয়ে করুণা উৎস, ধাইলে কাতরে যজ্ঞকুণ্ড
জীবের হিংসা করিতে রােধ, চাহিলে অর্পিতে আপন মুণ্ড।
অহিংসা ধৰ্ম্ম হইল প্রচার, দূরিত হইল অজ্ঞান সুপ্তি,
হইল ছিন্ন কর্মবন্ধ, দেখিল জগৎ নির্বাণ মুক্তি।
২৪
ললিত-গাথা
মাধবী নিশায় পূর্ণচন্দ্র, আছিলে যখন ধ্যান পূর্ণ
বােধি-দ্রুমের স্নিগ্ধ ছায়ায়, হইল মারের বিপ্ন চূর্ণ ;
কৰ্ম্মফলের বুঝিলে মৰ্ম্ম, নিৰ্ব্বাণ রত্ন পাইলে ভিক্ষা
আশ্রমে বুদ্ধ ধৰ্ম্ম সজঘ নূতন তত্ত্ব দিতেছে শিক্ষা।
অহিংস ধৰ্ম্ম হইল প্রচার, দূরিত হইল অজ্ঞান সুপ্তি,
হইল ছিন্ন কৰ্ম্মবন্ধ, দেখিল জগৎ নিৰ্ব্বাণ মুক্তি।
গৌর-নিমাই
শ্রীরাধা কৃষ্ণ যুগল মূৰ্ত্তি করিল মুগ্ধ গােকুল বাসী
একটি আধারে, দুইটি মূৰ্ত্তি হইল যুক্ত, গৌড়ে আসি;
আপন ভাবে আপনি মত্ত,
নিরােধ করিয়া চপল চিত্ত,
নয়নে বাহিত, প্রেম সলিলে, গৌরচন্দ্র ভাসিয়া যান।
যমুনা-পুলিনে, শ্যামের বাঁশী, ধ্বনিল কুঞ্জে মধুর তান ;
জাহ্নবীসিক্ত, নদের আঙ্গিনে, গৌরকণ্ঠ করিল গান।
পাপের প্রেরণে হইয়া ক্ষিপ্ত, জগাই মাধাই দুইটি ভাই,
ভীষণ রঙ্গে করিত ভ্রমণ, ভীত হইত পান্থ সবাই,
নিত্যাননে করিল প্রহার,
তথাপি বরষি’ দয়ার ভার,
তাপিত হৃদয় করিয়া বক্ষে, শান্তি, নিমাই করিল দান।
যমুনা-পুলিনে, শ্যামের বাঁশী, ধ্বনিল কুঞ্জে মধুর তান ;
জাহ্নবীসিক্ত, নদের আঙ্গিনে, গৌরকণ্ঠ করিল গান।
জগৎ গুরুর মধুর চিহ্ন, করিছে বিম্বিত যাহার প্রাণ,
গুরুর শরণে, তাহার দীক্ষা, করিতে বৃদ্ধি গুরুর মান,
কেশব ভারতী হইল ধন্য,
শিষ্যে মন্ত্র প্রদান জন্য,
সাগর সলিল হইতে ঘটিত, মেঘের যেমন উচ্চে স্থান,
যমুনা-পুলিনে, শ্যামের বাঁশী, ধ্বনিল কুঞ্জে মধুর তান ;
জাহ্নবীসিক্ত, নদের আঙ্গিনে, গৌরকণ্ঠ করিল গান।
ললিত-গাথা
বিষ্ণুপ্রিয়ার প্রণয়-পাশ, জননী শচীর স্নেহের টান,
কেমনে রাখিবে ধরিয়া তাহায়, বিশ্বের কল্যাণ যাহার ধ্যান,
নামেতে রুচি মধুর ধর্ম,
জীবেতে দয়া মধুর কৰ্ম্ম,
করিলে প্রচার, কলির শাসনে, বাঁচিল তাহাতে পাতকী প্রাণ ;
যমুনা-পুলিনে, শ্যামের বাঁশী, ধ্বনিল কুঞ্জে মধুর তান ;
জাহ্নবীসিক্ত, নদের আঙ্গিনে, গৌরকণ্ঠ করিল গান।
কাশী-বারাণসী।
কত পুণ্য তীর্থে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা,
তাহার মাঝে তীর্থ এক সকল তীর্থ-সেরা,
ধ্যানে গড়া তীর্থ সে যে, সাধনাতে ঘেরা ;
হায় রে যেমন তারার মাঝে পূর্ণিমার শশী,
সকল তীর্থ-রাণী তেমন কাশী-বারাণসী।
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা, মান-মন্দির উজল করা,
সবাই পূজেন বিশ্বনাথে পায়ে মাথা রেখে,
তারা আরত্রিকে ঘুমিয়ে, উঠে আরত্রিকে জেগে ;
হায় রে যেমন তারার মাঝে পূর্ণিমার শশী,
সকল তীর্থ-রাণী তেমন কাণী-বারাণসী।
এমন পুণ্য নদী কাহার, কোথায় এমন তটের বাহার,
ও পারেতে ব্যাসের ক্ষেত্র আকাশ-তলে মেশে,
যুগল-চরণ ধৌত করে অসি বরুণা এসে ;
হায় রে যেমন তারার মাঝে পূর্ণিমার শশী,
সকল তীর্থ-রাণী তেমন কাশী-বারাণসী।
মন্দিরেতে ভরা পুরী, শঙ্খ ঘণ্টা বাজে ভূরি,
সুদূর হতে আসে যাত্রী ভক্তি-অর্ঘ লয়ে,
তারা চরণ-তলে লুটিয়ে পড়ে চরণধূলি খেয়ে ;
হায় রে যেমন তারার মাঝে পূর্ণিমার শশী,
সকল তীর্থ-রাণী তেমন কাশী-বারাণসী।
ললিত-গাথা
অন্নপূর্ণার পুণ্য স্নেহ, কোথায় এমন পাবে কেহ
ছিলেন শিব আত্ম ভুলি ভিক্ষা-দণ্ড ধরি,
ঐ চরণের ধূলি যেন সদা মাথায় করি ;
হায় রে যেমন তারার মাঝে পূর্ণিমার শশী,
সকল তীর্থ-রাণী তেমন কাশী-বারাণসী।
মন্দির-দর্শনে
পুরুষােত্তমে, শরীর ক্ষেত্রে, দিব্য নয়নে করিতে দৃষ্টি,
কৰ্ম্ম, জ্ঞান, ধ্যান ভক্তি-চারিটি যােগের হয়েছে সৃষ্টি ;
শ্রীমন্দিরে প্রবেশ জন্য চারিটি দ্বার রয়েছে মুক্ত,
সবার শ্রেষ্ঠ সিংহ-দ্বার যােগেতে যেমন ভক্তি উক্ত।
সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্ম, মন্দির মধ্যে রয়েছে ব্যক্ত ;
দেখিয়া নেত্রে অরূপ চিত্রে হ’তেছে স্তব্ধ সকল ভক্ত।
জীব শরীর অন্নে পুষ্ট, মন্দিরে বিরাট অন্নছত্র,
পাইতে প্রসাদ সকলে মত্ত, জাতির বিচার নাহিক তত্র ;
স্থূল হইতে সূক্ষ্ম শ্রেষ্ঠ, কহিছে যাহারা শাস্ত্রে দক্ষ ;
অন্নছত্র হইতে উচ্চে, রতন বেদীর বিশাল বক্ষ।
সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্ম, মন্দির মধ্যে রয়েছে ব্যক্ত ;
দেখিয়া নেত্রে অরূপ চিত্রে হতেছে স্তব্ধ সকল ভক্ত।
প্রাণ-মন-বিজ্ঞানময় সূক্ষ্ম দেহের কোষপুঞ্জ,
ভেদিয়া গগন শােভিছে, ভােগ্য, নৃত্য, জগমােহন, কুঞ্জ।
সৃষ্টিধারায় করিতে রক্ষা “বহুস্তামি” কামনা মাত্র,
বাহ আকারে দেহের অঙ্গে করিছে প্রকাশ প্রাচীর গাত্র,
সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্ম, মন্দির মধ্যে রয়েছে ব্যক্ত ;
দেখিয়া নেত্রে অরূপ চিত্রে হ'তেছে স্তব্ধ সকল ভক্ত।
*
গীতার বিজয়-ভাষ্যকার দেবেন্দ্রবিজয় বসুর মন্দিরের
আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা অবলম্বনে পুরীতে রচিত।
ললিত-গাথা
আনন্দময় কারণ শরীর রূপকে দেখায় বিমান পুণ্য,
যাহার ভিতরে করিলে প্রবেশ হইবে সৰ্ব্ব কর্মশূন্য ;
হৃদয় দহরে ভাতিৰে তখন আত্মস্বরূপ ব্ৰহ্মরশ্মি ;
অভেদ জ্ঞান ধ্বনিবে উচ্চে দিব্য মন্ত্র,—“সােহহমস্মি”।
সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্ম, মন্দির মধ্যে রয়েছে ব্যক্ত,
দেখিয়া নেত্রে অরূপ চিত্রে হ’তেছে স্তব্ধ সকল ভক্ত
যাহার স্বরূপ করিতে স্থির নহে ত শক্ত ধ্যান মন্ত্র ;
কেমনে তাহারে দেখাবে শিল্পী হস্তে যাহার স্থূল যন্ত্র।
রূপের আরােপ করিতে তাহায় সকল চেষ্টা হইল পণ্ড,
তথাপি ভক্ত পূজিছে নিত্য চিত্র-আধার দারুর খণ্ড।
সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম, মন্দির মধ্যে রয়েছে ব্যক্ত,
দেখিয়া নেত্রে অরূপ চিত্রে হতেছে স্তব্ধ সকল ভক্ত।
সাগর-সৈকতে
(১)
যে দিন ব্ৰহ্মা করিল সৃষ্টি, ছুটিল বারিধি! তােমার অধু ,
কল্লোলে তােমার, করিছে ধ্বনিত, আপন বিষাণ, শঙ্কর শম্ভু ;
ঊর্মি তােমার রচিল শয়ন, যাহাতে বিষ্ণু লভিল সুপ্তি ;
মন্থনে তােমার উঠিল অমৃত, মৃত্যু হইতে করিতে মুক্তি।
অনিত্য জগতে শুধুই সত্য তােমার নৃত্য ভীষণ রঙ্গে,
কালের চিহ্ন হয় না অঙ্কিত কেবল তােমার সুনীল অঙ্গে।
ক
আপন হর্ষে উঠিছে নামিছে, শুভ্র লহরী অযুত লক্ষ ;
হাসিছে যেমন কৌস্তুভ রতন উজ্জ্বল করিয়া মাধব-বক্ষ ।
শ্যাম সলিল নেহারি নেত্রে, ভাবিয়া শ্যাম মােহন কান্তি--
পশিল তােমার অতল গর্ভে, গৌরচন্দ্র লভিতে শান্তি।
অনিত্য জগতে শুধুই সত্য তােমার নৃত্য ভীষণ রঙ্গে,
কালের চিহ্ন হয় না অঙ্কিত কেবল তােমার সুনীল অঙ্গে।
ર
ললিত-গাথা
( ৩ )
কৃষ্ণশেখর ঈষৎ উচ্চ করিতে স্পর্শ স্বর্গ-শ্রান্ত,
মানব মর্ত্তে করিতে প্রহার রজত-চরণ নহে ত শ্রান্ত ;
আলােকপুষ্প ফুটিছে বক্ষে আবৃত যখন তিমিরপুঞ্জে ;
বহুলে যেমন তারকাবৃন্দ শােভিত সুনীল আকাশকুঞ্জে।
অনিত্য জগতে শুধুই সত্য তােমার নৃত্য ভীষণ রঙ্গে,
কালের চিহ্ন হয় না অঙ্কিত কেবল তােমার সুনীল অঙ্গে।
( ৪ )
বিশ্বের ‘এ জন’ আপন চিত্র দেখিছে তােমার বিশাল যন্ত্রে ।
'তােমার প্রবাহ দিতেছে শিক্ষা কামনাশূন্য কর্মমন্ত্রে।
প্রেমিক প্রাণের মধুর শক্তি নিহিত তােমার হৃদয়ে, সিন্ধু !
প্রভাবে তাহার হইছ স্ফীত উদিলে গগনে পূর্ণ ইন্দু।
অনিত্য জগতে শুধুই সত্য তােমার নৃত্য ভীষণ রঙ্গে,
কালের চিহ্ন হয় না অঙ্কিত কেবল তােমার সুনীল অঙ্গে।
( ৫ )
;
শব্দে ব্রহ্ম প্রথম ব্যক্ত, করিছে প্রকাশ পুণ্য শাস্ত্র
তারি প্রতিধ্বনি করে কি ধ্বনিত তােমার মন্দ্র দিবস ?
ত্যজিয়া তােমার মহান মুর্তি চাহে না নয়ন অন্য দৃষ্টি
নমিছে কেবল তাহার চরণে যাহার ইচ্ছায় তােমার সৃষ্টি।
অনিত্য জগতে শুধুই সত্য তােমার নৃত্য ভীষণ রঙ্গে,
কালের চিহ্ন হয় না অঙ্কিত কেবল তােমার সুনীল অঙ্গে।
==
ম
(য, উ, অষ,মা)*
প্রণবের রূপে মাতা কর অবস্থিতি,
ব্ৰহ্ম পরা শক্তি,—সেই পরমা প্রকৃতি
হৈমবতী উমা, তিনি, ভগবতী মায়া,
বিশেষণে ব্যক্ত তাহে, অরূপের ছায়া।
সেই ছবি করে দূর মােহ, সবাকার,
সম্পা আলাে নাশে যথা, মেঘের আঁধার।
চতুর্মুখ ভক্তি ভরে করেন প্রণতি ;
“মাত্রাত্মিকা” রূপে মা তােমার বসতি।
“অনুচায্য অর্ধমাত্রা” তাহে অবসান,
তত্ত্বমসি মহাবিদ্যা” করে তব ধ্যান।
সকলি, তােমার শক্তি করিছে ধারণ
সৃষ্টি স্থিতি সংহারের তুমিই কারণ
মহামেধা, মহাস্মৃতি, পরম ঈশ্বরী
তােমার চরণে মাতা নমস্কার করি।
* দেবেন্দ্রবিজয় বসু গীতার বিজয় ভাষ্যে লিখিয়াছেন -যেমন
অ, উ, ম, হইতে পাওয়া যায় ওঁ ; তেমনি ম, উ, অ, হইতে পাওয়া যায়
‘ঘ’, বা, মা। অর্থাৎ যেমন সুরের পূর্ণ বিকাশ হইতে পূর্ণ বিরাম পর্যন্ত
পাওয়া যায় ওঁ, তেমনি সুরের বিরাম অবস্থা হইতে পূর্ণ বিকাশ অবস্থায়
পাওয়া যায় মা। প্রণবের দুই প্রধান রূপ ওঁ এবং মা। ও ব্ৰহ্ম বাচক,
আর মা, ব্রহ্মের পরা শক্তি মায়া বাচক।
৩৪
ললিত-গাথা
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
১
বাণী-বন্দনা
( আজি ), এসেছি, আজি মিলেছি আজি এসেছি মিলেছি,
মাগাে !
তব যতেক সন্তান ;
(আজি), মােদের যা কিছু আছে, এনেছি তােমার কাছে,
তােমারে করিতে সব দান।
( আজি , তুলিয়া হৃদয় হতে ভকতি কুসুম ভার,
মালিকা তােমার পদে দিব মাতা উপহার।
তােমার চরণ ধরি,
সকলে অঞ্জলি করি,
কর মাগাে আশীষ প্রদান।
(আজি), হৃদয়ের সব আশা,
জীবনের সব তৃষা
করিতেছে তােমার সন্ধান।
ঐ ভেসে আসে চিরাদৃত দরশন-সৌরভ,
ভেসে আসে উজ্জল কবিকুল-কলরব,
ভেসে আসে রাশি রাশি
ইতিহাস ঋজুভাষী,
ভেসে আসে নবীন বিজ্ঞান।
( আজি ), বিজয় চাঁদের আলাে হরের প্রসাদ ভাল,
এ মিলন স্বরগ সমান।
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
৫
( আজি), সকল সেবক মিলে তােমায় পূজিতে চায়,
তােমার চরণ ধূলি ললাটে মাখিতে চায়,
তােমার আসন তলে
শরণ লভিবে বলে,
করিয়াছে জীবনের ধ্যান।
( আজি), সব ভাষা সব বাক্
তােমার মহিমা গা’,
হােক সেই—চির বর্ধমান।
( বর্ধমান সাহিত্য-সম্মিলনে গীত)
৪৬
ললিত-গাথা
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
যশোহর গৌরব
যশাের আমার, যশাের আমার, জন্মিল যেথায় সাহিত্য-বীর,
যাহার জন্য তীর্থ হইল, বঙ্গে কপােতাক্ষ তীর ;
কাব্যে সৃজিল যে মধু-চক্র, সে বরপুত্র ভারতীর,
গৌড় বৃন্দ, চির আনন্দে করিছে পান সুধার ক্ষীর।
বাজুক যশােরে মিলনশঙ্খ, কম্পিত করি পবন ধীর
নৃত্য করুক দিব্য রঙ্গে, কপােতাক্ষ, যমুনা নীর।
যশাের আমার, যশাের আমার, মিলিত কণ্ঠে কৃষক বীর,
দেশের মুক্তি করিল পণ, অচল অটল ভক্ত স্থির ;
নীলের দুর্গ হইল ধ্বংস, ঘুচিল শঙ্কা কৃষক স্ত্রীর,
আবার ঢালিল বিমল শান্তি শ্যামল ক্ষেত্রে কর্মবীর।
বাজুক যশােরে মিলনশঙ্খ, কম্পিত করি পবন ধীর
নৃত্য করুক দিব্য বঙ্গে, কপোতাক্ষ, যমুনা নীর।
যশাের আমার, যশাের আমার, ভূষিল বাহার যমুনা তীর,*
বাণীর বরেতে, আছিল যাহার, অধরে হাস্য, নয়নে নীর ;
দর্পণে নেহারি করুণ চিত্র, আৰ্ত প্ৰজা-মণ্ডলীর,
দীনবন্ধু করিল দূর, তাদের দুঃখ সুগভীর।
বাজুক যশােরে মিলনশঙ্খ, কম্পিত করি পবন ধীর
নৃত্য করুক দিব্য বঙ্গে, কপােতাক্ষ, যমুনা নীর।
পিতৃদেবের জন্মভূমি যমুনা বেষ্টিত “চৌবেড়িয়া” পূৰ্ব্বে নদীয়ায়,
এক্ষণে যশােহরের অন্তর্গত।
;
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
৩৭
যশাের আমার, যশাের আমার, ছন্দে ঢপ বল্লরীর,
কিন্নর মধু করিল গান, শ্যাম রঙ্গ কাহিনীর ;
ছায়ায় যাহার, শিশিরে সিক্ত, অমৃত শান্ত লেখনীর
অমিয় নিমাই চরিত পুণ্য, আনিছে নয়নে অশ্রনীর।
বাজুক যশােরে মিলনশঙ্খ, কম্পিত করি পবন ধীর ;
নৃত্য করুক দিব্য রঙ্গে, কপােতাক্ষ, যমুনা নীর।
যশাের আমার, যশাের আমার, তারক শুভ্র মরীচির,
স্বর্ণলতায়, করিল জড়িত, চিত্র বঙ্গ-রমণীর ;
জীবনে দেখাল মহিলা মান, যশাের পল্লী-কামিনীর
কাব্য কুসুম, অঞ্জলি করি, চরণে সমােজ বাসিনীর।
বাজুক যশােরে মিলনশঙ্খ, কম্পিত করি পবন ধীর ;
নৃত্য করুক দিব্য রঙ্গে, কপােতাক্ষ, যমুনা নীর।
যশাের আমার, যশাের আমার, আজি গাে তােমার উচ্চশির,
বিনয় নম্ৰে করিছে স্পর্শ, পদারবিন্দ ভারতীর,
জ্ঞান ধৰ্ম্মে, সাহিত্য ক্ষেত্রে শীর্ষে যাহারা বাঙ্গালীর,
তাদের মিলনে ধন্য হইল, পুণ্য ভাগ্য নগরীর।
বাজুক যশােরে মিলনশঙ্খ, কম্পিত করি পবন ধীর
নৃত্য করুক দিব্য রঙ্গে, কপােতাক্ষ, যমুনা নীর।
(যশােহর সাহিত্য সম্মিলনে গীত)
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
ভারতী চরণে
পুণ্যক্ষেত্র পাটলিপুত্রে, আসিয়াছে আজি সব ভ্রাতা,
আশীষ করিতে স্নেহের পুত্রে, সাদরে ডাকিছে ভারতী মাতা
ভক্তি অর্ঘ্য করিয়া দান,
জননী চরণ করিব ধ্যান।
সাজ সাজ সকলে শুভ সাজে,
শুন মধুর স্বননে বীণা বাজে ।
নমিছে চরণে যতেক যাত্রী,
জয় মা ভারতি, বিদ্যাদাত্রি।
সাহিত্য সাধনে লভিতে সিদ্ধি, আশ্রয় কেবল সনাতন সত্য,
অর্জিত হইলে দর্শন শাস্ত্র, ভাতিবে হৃদয়ে পরম তত্ত্ব ;
মােহের শাসন নাশিবে নিত্য,
দিব্য, দর্শন, পুণ্য সাহিত্য।
সাজ সাজ সকলে শুভ সাজে,
শুন মধুর স্বননে বীণা বাজে ।
নমিছে চরণে যতেক যাত্রী
জয় মা ভারতি বিদ্যাদাত্রি।
যুক্তির দণ্ড, অমােঘ যন্ত্র, মন্থন করিতে বিজ্ঞান-সিন্ধু ;
প্রত্ন তত্ত্বে, ইতিহাস ক্ষেত্রে, ভীষণ শত্রু কৈতব বিন্দু।
জ্ঞানের সাগ্নিক আলােক রাশি,
রহিবে দীপ্ত, তিমির নাশি।
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
সাজ সাজ সকলে শুভ সাজে,
শুন মধুর স্বননে বীণা বাজে।
নমিছে চরণে যতেক যাত্রী,
জম মা ভারতি বিদ্যাদাত্রি।
শ্বেত চরণ পরশি মস্তে, সাদর যত্নে অর্পিব ভক্তি,
করুণা নেত্রে সেবক বৃন্দে, চাহ মা আশু সরস্বতি।
ভ্রাতৃ স্নেহের পূর্ণ ইন্দু,
করিছে স্ফীত হৃদয় সিন্ধু ।
সাজ সাজ সকলে শুভ সাজে,
শুন মধুর স্বননে বীণা বাজে
নমিছে চরণে যতেক যাত্রী,
জয় মা ভারতি বিদ্যাদাত্রি।
•
(বাঁকিপুর সাহিত্য সম্মিলনে গীত )
৪০
ললিত-গাথা
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
ভাষা জননী
(কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এম্-এ পরীক্ষায় বঙ্গ ভাষা নিৰ্বাচন
উপলক্ষে। হাওড়া সম্মিলনের জন্য।)
ভাষা আমার ! অতীত গর্বে, রয়েছ উচ্চ করিয়া শির ;
যাহার অঙ্গ করিছে দীপ্ত, জ্যোতি কাব্য কাহিনীর,
ধর্ম তত্ত্ব রয়েছে ব্যক্ত, গাথায় ভক্ত মণ্ডলীর,
বাণীর পূজায় তাহার অর্ঘ্য দেব আশুতােষ করিল স্থির।
পাইল সে ভাষা যােগ্য স্থান অঙ্কে বিশ্ব ভারতীর
মুক্ত হইল রুদ্ধ দ্বার আজি মা অর্ধ শতাব্দীর।
ভাষা আমার! অধুনা যাহার পুণ্য তীর্থে, গগমুখীর,
করিল সাধনা সে রাম মােহন ধৰ্ম্মে কর্মে তুল্য বীর
রচিল কবিতা গুপ্ত কবীশ লইয়া প্রভা প্রভাতীর,
ভূষিল যাহারে ঈশ্বরচন্দ্র লইয়া রত্ন বারিধির।
পাইল সে ভাষা যােগ্য স্থান অঙ্কে বিশ্ব ভারতীর,
মুক্ত হইল রুদ্ধ দ্বার আজি মা অর্ধ শতাব্দীর।
•
ভাষা আমার ! প্রতিভা ত্রিবেণী রচিল যাহার প্রয়াগ তীর
পূজিল ছন্দে সে মধুসূদন চরণ সরােজ বাসিনীর ;
বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে
৪১
সরস হাস্যে দীনবন্ধু মিশাল আবার নয়ন নীর,
মাতৃ মন্ত্র করিল গান দিব্য কণ্ঠে বঙ্কিম বীর।
পাইল সে ভাষা যােগ্য স্থান অঙ্কে বিশ্ব ভারতীর
মুক্ত হইল রুদ্ধ দ্বার আজি মা অর্ধ শতাব্দীর।
ভাষা আমার!
যাহার মহিমা বিশ্ব বীণায় ভারতীর
হইছে ধ্বনিত বিশ্ব মাঝে কিরণে গীত অঞ্জলির,
তনয় যাহার পাইল আদর চিত্তে জগৎ নিবাসীর
রবির কিরণ আদৃত যেমন সকল ক্ষেত্রে পৃথিবীর।
পাইল সে ভাষা যােগ্য স্থান অঙ্কে বিশ্ব ভারতীর
মুক্ত হইল রুদ্ধ দ্বার আজি মা অর্ধ শতাব্দীর।
ভাষা আমার ! আশা আমার। যাচিব করুণ ঈশ্বরীর, ,
হউক তােমার পুণ্য আসন শীর্ষে ভাষা মণ্ডলীর ;
তোমার চরণ করিব ধ্যান সতত নম্র করিয়া শির ;
তুমি মা কেবল দিব্য আলােক। আঁধার কুটীরে বাঙ্গালীর।
পাইল সে ভাষা যােগ্য স্থান অঙ্কে বিশ্ব ভারতীর
মুক্ত হইল রুদ্ধ দ্বার আজি মা অর্ধ শতাব্দীর।
৪২
ললিত-গাথা
পূর্ণিমা মিলনে
হাসিছে প্রকৃতি রাস রঙ্গে,
ঢালে পুলক সকল অঙ্গে;
ভরল কানন কুসুম গন্ধে, জ্যোছনা সিক্ত সে মধু রজনী।
শােভে গগনে শারদ ইন্দু,
উছলি উঠে সুধার সিন্ধু,
শুভ্র সুষমা ধরিছে বক্ষে কালিন্দী কাল বরণী।
বেণু বাদন শুনিয়া কুঞ্জে,
আসিছে ধাইয়া পুঞ্জে পুঞ্জে,
গৃহের কাৰ্য্য করিয়া তুচ্ছ, যতেক গােপের রমণী।
কৰ্ম্ম তাদের কামনা শূন্য,
কার্য-কারণে, অশেষ পুণ্য,
শ্যামের শরণে, পেয়েছে কূল, অকূলে জীবন তরণী।
বন্দি ললিত পদারবিন্দে,
বাজায়ে বংশী মধুর ছন্দে,
.আসিও অন্তে, গােবিন্দ। ত্যজিব এ প্রাণ যখনি।
দীনধাম, রাসপূর্ণিমা-১৩২২
পূর্ণিমা মিলনে
আবাহন
;
এস সাহিত্যিক সবে রাস পূর্ণিমায়,
লভিব বিমল সুখ, সেবিয়া তােমায়
এমন চাদের আলাে,
ঘুচিবে মনের কালাে,
মিলিব প্রাণের হর্ষে ভ্রাতায় ভ্রায় ;
দীনের প্রাঙ্গণ ধন্য মিলন আভায়।
কাত্যায়নী পুণ্যব্রত করিতে যাপন,
ধরিতে প্রাণের হরি ব্রজের রতন,
যমুনার উপকূলে,
কদৰ পাদপ মূলে,
সমর্পিল নারীজাত শ্রেষ্ঠ আভরণ,
শ্যামের চরণ বিনা কিবা প্রয়ােজন।
শারদ পূর্ণিমা নিশি, বিমল গগন,
কালিন্দীর কাল জল রজত বরণ,
বাঁশরী মধুর রবে,
ডাকিছে গােপিকা সকে
রাসের লীলায় সুখে করিতে নৰ্ত্তন ;
নিবৃত্তি সায়র নীরে হইতে মগন।
৪৪
পূর্ণিমা মিলনে
দেখাইল যেই চিত্র ব্রজ গােপিকায়,
ভাসিত হইয়া তার ত্রিদিব প্রভায়,
সাহিত্য সেবকগণ,
এস, করি সমর্পণ
জীবন সর্বস্ব ধন, ভারতীর পায় ;
পূর্ণিমা মিলন তিথি অনুকূল তায়।
দীনধাম, রাসপূর্ণিমা -১৩২৩।
পূর্ণিমা
মিলনে
নিবেদন
শরতের শশধর হাসিতেছে নীলিমায়,
হৃদয়ের যত তার, সাথে তার মিশে যায়।
সাহিত্য সেবকগণ,
সবিনয় নিবেদন,
কর সুখে আলাপন, এ মিলন পূর্ণিমায়,
প্রতিদানে ভালবাসা, ভালবাসা সদা পায়।
আসিয়াছ দীনধামে, সহৃদয় করুণায়,
কেমনে রাখিব মান, হইতেছি নিরুপায়।
বিদুরের ইতিহাসে,
ভরসার রেখা আসে,
আয়ােজন যদি হীন, তােমাদের তুলনায়,
হৃদয়ের ভালবাসা মাখা, জান আছে তায়।
(দীনধাম, রাস-পূর্ণিমা-১৩২৪)
৪৬
ললিত-গাথা
উত্তর
রামপ্রসাদীসুর
(সভাস্থলে রচিত ও গীত )
( নিমন্ত্রণ-কৰ্ত্তা ললিতচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের নিবেদনের উত্তরছলে ]
আমরা মিলেছি আজ তােমার ডাকে।
(এমন ) পরের ঘরে ঘরের মত
মিলন বল দেখে কে।
হাে’ কেন পৌর্ণমাসী
হাে’না কেন অমানিশি
( এমন ) ললিত চাদের ললিত কলা
কত পূর্ণ চাদে দেয়গাে ঢেকে ।
কেমনে মান রাখবে তুমি
আকুল প্রাণে ভাবছ বটে
দীনের মান যে দীনবন্ধু
নিজেই রাখেন সবাই রটে
৪৭
মান অভিমান গিয়ে ভুলে
হৃদয় তােমার দিলে খুলে
তাহে-বইছে মেহসুধার নদী
তরঙ্গ তার খেলছে চোকে।
দীন-ধামে এসব দীনে
বরষ বরষ এনে ডেকে
উজল থেকে এ পূর্ণিমার
রজত কিরণ প্রাণে মেখে
শুভার্থিন
বিজয়কৃষ্ণ শৰ্ম্মণঃ
(বন্দ্যোপাধ্যায়ােপাধিক )
৪
ললিত-গাথা
রামমােহন রায়
যখনি ধৰ্ম্মের গ্লানি হয়েছে ধরায়,
ভয়াবহ পরধর্ম করে অভ্যুত্থান,
তখনি পুরুষ এক দিব্য প্রেরণায়
আবিভূত সাধিবারে আদিষ্ট বিধান।
ভাষ্যের প্রভায় শাস্ত্র করি উদ্ভাসিত,
নির্বাণে অভাব হেরি তৃষিত আত্মার,
শঙ্কর শঙ্কর পদ করিয়া আশ্রিত,
পবিত্র মােহং বাক্য করিল প্রচার।
বিদেশী ধৰ্ম্মের শিক্ষা নহে ত নূতন,
সনাতন ধর্মপ্রসূ পুণ্য বাংলায় ;
উপনিষদের মৰ্ম্ম করিয়া থােষণ,
দেখাইলে তুমি দেব নবীন ভাষায়।
খ্রীষ্টান ধর্মের স্রোত করিতে বারণ,
আবির্ভাব তব বঙ্গে হইল রাজন্ !
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
কবিতার তপােবন করিলে স্থাপন,
কোরক কবির। যাহে লভিয়া আশ্রয়,
কল্পনা-কুসুম- মালা করিয়া ধারণ,
পূজেছিল শ্বেতভুজা-শ্বেত-পদদ্বয়।
তােমার যতেক শিষ্যে স্নেহ বষিয়া,
অফুটন্তু প্রতিভার করিতে উন্মেষ
প্রয়াস করিতে সদা, আনন্দিত-হিয়া
মাছিল তাহারা তব পুত্র-নিৰ্বিশেষ।
রবিশশী ছাত্রদ্বয় অমর প্রভায়
তােমার অক্ষয় কীৰ্ত্তি করিছে প্রচার ;
বঙ্কিম মণ্ডিত সদা সম্রাট-আভায়,
দয়াসিন্ধু, দীনবন্ধু হাস্য-অবতার।
কাব্যগুরু রূপে তুমি হইলে উদয়,
সাহিত্যের ধৰ্ম্মক্ষেত্রে আছে শিষ্য দ্বয়।
৪
৫০ ললিত-গাখা বিদ্যাসাগর ধৰ্ম্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণ-নারায়ণ, নিষ্কাম কৰ্ম্মের মৰ্ম্ম করিতে প্রচার কার্পণ্য-কাতর পার্থে,–অপার্থিব ধন- দিয়েছিলা উপদেশ কৰ্ম্মযােগর ; মধুর মুরতি তার দেখাতে আবার করেছিলে তুমি দেব জীবনের ব্রত ; কৰ্ম্মে মাত্র ছিল শুধু তব অধিকার, ফলাফল সমজ্ঞান করিতে সতত। উপেক্ষি বিপক্ষদল, সমাজ-তাড়ন, উপেক্ষি বিভব-প্রদ রাজার প্রসাদ, নিজ কর্তব্যের পথে করিলে গমন, রাখিয়া অপূর্ণ যত জীবনের সাধ। কৰ্ত্তব্যের পরানীতি শিখাতে সবায়, ঈশ্বর ঈশ্বরচন্দ্র প্রেরিল ধরায়।
পিয়ারীচঁাদ
“সাগর’ সস্তৃত রত্নে ভূষিত যে বেশ,
হেরিয়া প্রসন্ন নহে হৃদয় তােমার,
কল্পনা কাননে তাই করিয়া প্রবেশ,
গাঁথিলে স্বভাবজাত কুসুমের হার
জননীর পদাম্বুজে করিলে প্রদান,
‘মধুরে মধুর হ’ল অপূর্ব মিলন ;
হাসিল সুধীন্দ্র কত আনন্দিত-প্রাণ
সাহিত্যে দেখিয়াপুন নবীন কিরণ।
রতন-সম্ভব-বিভা, গন্ধ পরিমল,
একাধারে বিরাজিত, দেখাতে ভাষায়,
তব পরে হয়েছিল সাধনা সফল
অপার্থিব বঙ্কিমের দিব্য প্রতিভায়।
প্রণমি পিয়ারীচঁাদ বঙ্গের দুলাল।
তৰ স্থান অতি উচ্চে রবে চিরকাল।
ললিত-গাথা
ভূদেচন্দ্র
প্রবন্ধে বন্ধন করি পাঠকের মন,
মধুর অমৃত বাণী শুনালে সবায়,
শুনাত অতীতে যথা ঋষি তপােধন
আশ্রম বালকগণে অমিয় ভাষায় ।
করিতে জ্ঞানের জ্যোতি কুটীরে বিস্তার,
আজীবন যেই অর্থ করিলে অর্জন,
নিঃস্বার্থ সাত্ত্বিক দান করিতে প্রচার,
পরহিত ব্ৰত তাহে করিলে সাধন।
দেবের আকৃতি ধরি’ আসিলে ধরায়,
হেরিলে নয়নে সেই প্রশান্ত বয়ান,
নমিতে চরণে শির আপনি লুটায়,
ভক্তির নৈবেদ্য চাহে করিতে প্রদান।
সংসার তােমার ছিল পবিত্র আশ্রম,
জান করুণার তুমি আগম নিগম।
কবিত্ৰয় ।
–
“স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায়”
আদি উদ্দীপনা গীত, কবি রঙ্গলাল
শুনাইল কলকণ্ঠে মধুর ভাষায়,
ধ্বনিত হইবে যাহা বঙ্গে চিরকাল।
সেই উদ্দীপনা স্তোত্রে হইয়া অধীর,
বীর ছন্দে হেমচন্দ্র উচ্ছ্বসিত-প্রাণ
গাহিল, মরমে পশি স্বদেশ বাসীর,
“আর ঘুমাওনা” সেই মােহনীয় গান।
ভারতীর বরপুত্র মধুসুদন,
সাজাইতে মাতৃপদ নব সুষমায়,
দেশ দেশান্তর হতে আনিল ভূষণ,
পুলকিত গৌড়জন যাহার প্রভায়।
পবিত্র খিদিরপুর তীর্থ অনুপম
নববঙ্গ কবিতার প্রয়াগ সঙ্গম।
৫ খিদিরপুর হেমচন্দ্র পাঠাগারে বাৎসরিক উৎসবে পঠিত
৫৪
ললিত-গাথা
মধু মাইকেল
উদিলে অাদিত্যরূপে সাহিত্য-আকাশে,
আনন্দিত গৌড়জন নূতন আলােকে ;-
নিশা শেষে পূর্বাশায় ভানুর আভাসে,
পুলকিত হয় যথা জগতের লােকে।
বঙ্গভাষা পুণ্যখনি পূর্ণ মণিজালে,
মায়ের আদেশে তুমি, করিয়া খনন,
বিবিধ রতনরাজি কুড়াইয়া কালে,
তা সবে পূজিলে পুণ্য মায়ের চরণ।
“সেই শ্রেষ্ঠ নরকুলে লােকে যারে নাই
ভুলে”—দিব্য কণ্ঠে যেই গাহিয়াছ গান,
সার্থকতা তার, তােমারি জীবনে পাই,
যদিও ভিক্ষুক বেশে করেছ প্রস্থান।
কৃতঘ্নতা পাশ বঁধি বাঙ্গালীর গলে
বাঙ্গালা-পঙ্কজ রবি গেলে অস্তাচলে।
মেঘনা-দর্শনে *
যেই কালে ধান্যভরা পুণ্য বাঙ্গালায়,
নীলকর বিষধর বিষপাের মুখ
বুনেছিল নীলক্ষেত্র, বাণিজ্য আশায়,
অনল শিখায় ফেলি’ কৃষকের সুখ ;
সেই কালে, একদিন, পড়ে কি গাে মনে-
ভীষণ-তরঙ্গ নদ! উদরে তােমার
গ্রাসিতে আসিয়াছিলে বিকট-বদনে,
দীনের বন্ধুত্ব হেতু জনম যাহার।
যেই শিশু-করে হবে দুষ্টের দমন,
তাহারে বক্ষেতে ধরে যেই ভাগ্যবান্,
কেমনে নাশিবে তারে আসন্ন শমন,
উপেক্ষিয়া নিয়তির আদিষ্ট বিধান।
তাই তব জল হ’তে হইল উদ্ধার,
নীলদর্পণের জ্যোতি নাশিতে আঁধার।
একদিন রাত্রে নীলদর্পণ লিখিতে লিখিতে দীনবন্ধু মেঘনা
পার হইতেছিলেন। হঠাৎ নৌকা জলমগ্ন হইতে লাগিল, তখন সেই
আর্দ্র নীলদর্পণ তাহার হস্তে রহিয়াছে।
বঙ্কিমচন্দ্র।
ললিত-গাথা
বঙ্কিমচন্দ্র
বাসুদেব পাদপদ্ম করিয়া আশ্রয়,
একচ্ছত্র ধৰ্ম্মরাজ্য করিতে স্থাপন,
পুরাকালে মহাযজ্ঞ কুন্তীর তনয়
পবিত্র ভারতক্ষেত্রে করে সম্পাদন।
হীনবল এবে সব ভারত-সন্তান,
অতীতের পূতগাথা অলীক স্বপন;
কিন্তু দেব !
বীরতেজে তুমি বলীয়া,
পুরাণ কাহিনী পুন করেছ নূতন।
এক হস্তে দিব্যতান বীণার ঝঙ্কার,
অন্য করে শক্তিশেল কঠোর সন্ধান,
দিগন্তব্যাপিনী করি প্রতিভা অপার,
আপনার সিংহাসন করিলে মহান।
সাহিত্যের রাজসূয় তব অনুষ্ঠান,
জীবনের মহাব্রত পূর্ণ সমাধান।
সাহিত্যিক ত্রয়াধিপ
[ ১৮৬৫-১৮৭৩ ]
পুরাকালে পুণ্য রােমে অমর-জিনিত,
একাসনে ত্রয়াধিপ, করিল শাসন,
ধরায় ত্রিধারা যথা হইয়া মিলিত,
প্রকৃতির শুভাভীষ্ট করে সম্পাদন ;
দেখাতে আবার তাই বুঝি মা ভারতী
পবিত্র বঙ্গের ক্ষেত্রে করেছিল দান,
প্রতিভার বরপুত্র তিন মহারথী,
একযােগে সাধিবারে সাহিত্য-কল্যাণ।
মহাকবি মাইকেল পুরুষ বিরাট,
হাসিন্ধু দীনবন্ধু দীনের তারণ,
বঙ্কিম মাধুৰ্য্যমণি কোরক-সম্রাট,
একাধারে রাজদণ্ড করিল ধারণ।
ধন্য মাতা বঙ্গভাষা বড় ভাগ্য জোর
সাহিত্যিক ত্রয়াধিপ সিংহাসনে তাের।
ললিত-গাথা
কালীপ্রসন্ন সিংহ
প্রণাম করিয়া হৃদে, ঋষি দ্বৈপায়ন,
মহাভারতের কথা অমৃত সমান
বঙ্গজননীর করে করিলে অর্পণ,
অতুল তােমার কীৰ্ত্তি পবিত্র মহান।
সহজ সরল ভাষা করিয়া আশ্রয়,
সমাজের কথা তুমি করিলে রচিত,
দূর করিবারে যত কুরীতি-নিচয় ;
ভুতুম পাচার ডাকে সকলে মােহিত।
মহাত্মা ‘লঙে’র যবে, নীল প্রেরণায়,
কারাবাস অর্থদণ্ড হইল বিধান,
উদিল করুণরাশি তােমার হিয়ায়,
তখনি সহস্র মুদ্রা করিলে প্রদান।
সত্য সারস্বতাশ্রম” ত্বদীয় ভবন
বিজয়-গৌরব সদা করিছে বরণ।
বিহারীলাল চক্রবর্তী
নৰ গীতি-কবিতার উদয় অচলে,
কে তুমি অমর কবি সারদার গানে,
ঘুমন্ত প্রকৃতি পানে চাহ কুতূহলে,
জাগ্রত করিতে সবে সুমধুর তানে।
তােমার বীণার তারে করিয়া স্পন্দন,
তমসা তটিনী রাণী কুলু কুলু স্বনে
জগতের আদি কবি করিল বন্দন,
নিষাদ বধিল ক্রৌঞ্চে, যবে ক্রৌঞ্চী সনে
তব কাব্য-গগনের সমুজ্জ্বল রবি,
আলোকে করিয়া পূর্ণ বিশ্বের বিমান,
দেখাইল অন্তরের চির পুণ্য ছবি,
করিছে জগৎবাসী তাহার সম্মান।
আর প্রিয় শিষ্য তব এষার’ অক্ষয়,
বিহারী লালের কীর্তি ভুলিবার নয়।
৬
ললিত-গাথা
হেমচন্দ্র
'আর ঘুমাওনা মন্ত্র করি উচ্চারণ,
জাগাইলে তুমি সুপ্ত ভারত-সন্তান;
অচল পাণ যথা পাইল চেতন,
গুনিয়া প্রাচীন সেই ‘অরফিস-গান।
পরহিতে স্বার্থত্যাগ পবিত্র ভাষায়,
তৰ মহাকাব্যে দেব করিলে প্রচার,
উদ্ধারিতে স্বর্গচু্যত দেব-সম্প্রদায়,
দধীচির অস্থিদান সাধনা অপার ।
‘রে সতি রে সতি’ কাদাইলে পশুপতি-
বীণাকরে মহাঋষি আনিলে কৈলাস,
দশ মহাবিদ্যা চিত্রে,--অপূৰ্ব্ব মূরতি--
আদ্যাশক্তি সতী-লীলা হইল প্রকাশ।
‘কবিকুঞ্জ-ধাম অমর-ভবনে যাহা,
লভ্য হইয়াছে দিব্য প্রতিভায় তাহা।
নবীনচন্দ্র সেন
পুণ্য পূর্বাশার দ্বার করি উদঘাটিত,
কনক-কিরণ-পূর্ণ তরুণ তপন,
নবীন আলেকে সবে করে পুলকিত
রজনীর অন্ধকার করিয়া মােন
সেইরূপ একদিন,—শুভদিন গণি——
পবিত্র সাহিত্য-ক্ষেত্র করি উদ্ভাসিত,
পুণ্য চট্টগ্রাম হতে, নব দিনমণি
মেঘের আঁধার ভেদি হয় প্রকাশিত।
গুঞ্জরি তরুণ কণ্ঠে, পলাশীর রণ,
দেখাইলে বঙ্গজনে রঙ্গমতী শিলা ;
ত্রিধারায় পূজা করি নর-নারায়ণ,
শিখাইলে শেষতানে অবতার-লীলা।
চারু চট্টগ্রাম। তাের সার্থক জীবন,
দিয়াছ সাহিত্যে, চির নবীন কিরণ
ললিত-গাথা
গিরিশচন্দ্র
‘নিমচাদ’ ভূমিকায় তুষি সুধীজন,
নিদ্রাশেষে যবে তুমি হলে জাগরিত,
দেখিলে জয়ের ধ্বনি কাপায়ে পবন,
গৃহ পথ রঙ্গমঞ্চ করে মুখরিত।
প্রয়ােগ-বিজ্ঞানে যেই প্রতিভা-উন্মেষ,
নাটকে হইল সে যে পূর্ণ বিকশিত
স্ফীতধারা ভাগীরথী পাৰ্বত্যপ্রদেশ,
ত্যজিয়া বিশাল স্রোতে যথা প্রবাহিত।
বাণীর বরেতে তুমি দিব্য তুলিকায়,
ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষ করিলে চিত্রিত,-
নানা গন্ধে নানা বর্ণে নানান ধারায়,
কুসুম, কাননে যথা করে সুশােভিত।
রহিবে তােমার কীৰ্ত্তি অক্ষয় অপার,-
একাধারে হলে শ্রেষ্ঠ নট নাট্যকার।
দ্বিজেন্দ্রলাল (১৩১৯ সালে রাসপূর্ণিমায় দীনধামে পঠিত ) সাত বৎসরের কথা -- দোল-পূর্ণিমায়, সাহিত্যিক বন্ধুগণে হইয়া বেষ্টিত, মধুময় হাসি গানে, ফাগের খেলায়, মধুর মিলন তুমি কর প্রতিষ্ঠিত। ভায়ের স্নেহের যেই মন্দাকিনীধারা, তব পুণ্য অনুষ্ঠানে ছিল প্রবাহিত, আজি স্রোতস্বতীরূপে বঙ্গদেশ সারা ত্রিদিব-কল্লোল তানে করে নিনাদিত। এমনি চঁাদিনী রাতে, চঁাদের কিরণে, ৰাণী-পুত্রগণ-সেবা অতি সুশােভন, মৃদঙ্গের সুসঙ্গত তাল-লয় সনে, সঙ্গীত-গায়ক কণ্ঠে যথা বিমােহন। ধন্য হক, বঙ্গে তব পবিত্র পার্বণ- সাহিত্যিক-সেবা ব্রত পূর্ণিমা-মিলন।
৬৪
ললিত-গাথা
বিজয়চন্দ্র
( সাহিত্য-পরিষদে মহারাজাধিরাজ-বর্ধমান সম্বৰ্ধনে পঠিত )
সাহিত্যসেবকগণে সুখে সম্ভাষিয়া,
স্নেহপূর্ণ আলিঙ্গনে তুষিলে রাজন ;
মধুমাসে, মধুভাষে, সকলে মিলিয়া
বাণীর চরণ পূজা করিল সাধন।
সলিল কণায়, যথা হইছে বিম্বিত,
তাহারে বেষ্টিয়া থাকে, যেই দৃশ্য রাশি,
তােমার আদর মঞ্চে, তেমতি লক্ষিত,
বঙ্গের সকল ক্ষেত্র, সকল নিবাসী।
যেই যজ্ঞ করেছিল পাণ্ডব ভ্ৰাতায়,
সমাধা করিল তাহা নিঃস্বার্থ হইয়া,
বিজয় যতনে, আর বিজয় প্রভায়,
দূর দূরান্তর হতে, ঋত্বিক আসিয়া ।
সাহিত্যিক রাজসূয়, করি অনুষ্ঠান,
রহিবেক চির ধন্য, পুণ্য বর্ধমান।
সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা #
-
স্বাগত দেশের রত্ন।
কি দিব আদর যত্ন,
দীন হীনা পল্লী আজি, হে সৌম্য ধীমান্।
আসিয়াছ করি মনে
এ সুদূর নিরজনে,
চমকিত পুলকিত মুগ্ধ, এ পরাণ।
নীল কপােতাক্ষ জলে,
আনন্দ উছলি চলে,
বিটপে বিহগ গাহে সুমধুর গীতি।
নীরবে নির্জন মাঝে
অমিয় বাঁশরী বাজে
মরমে জাগিয়া উঠে সুখময়ী প্রীতি।
* কতিপয় বন্ধুর সহিত মধুসূদনের পৈতৃক ভিটা দেখিতে গিয়াছিলাম
সেই সময়ে স্বনামধন্যা মহিলা কবি শ্ৰীমতী মানকুমারী বসুজায়া তথায়
উপস্থিত ছিলেন। তিনি দয়া করিয়া উক্ত কবিতাটি পাঠাইয়া আমাদের
অভ্যর্থনা করেন।
ললিত-গাথা
যদিও লাগিছে ব্যথা
বুঝি নিজ অযােগ্যতা,
যদিও সে লাজ ভয় উঠে হিয়া ভরে,
তথাপি সান্ত্বনা চিতে-
ভকতে করুণা দিতে,
শ্রীকৃষ্ণ অতিথি হ’ল বিদুরের ঘরে।
সেই কথা মনে জাগে
হেথা বহু দিন আগে
জন্মিল অমর কবি শ্রীমধুসূদন ;
সে শুভ সৌভাগ্য রেখা
কপালে রয়েছে লেখা,
আর ত’ কিছুই নাই,শুধুই বেদন।
১৪ই কার্তিক
সাগরদাড়ী
১৩২২
সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা
বাণীর স্নেহের পাত্রী ।
আসিয়াছি তীর্থ যাত্রী
পুণ্যে ভরা পল্লী এ যে দেশ-অলঙ্কার
ভারতীর বরপুত্র,
করিয়াছে সুপবিত্র,
তৃণ পত্র ধূলি কণা নয়নে সবার।
নীল কপােতাক্ষ নীরে,
কি পবিত্র মধু ক্ষরে ;
মধু ৰায়ু অবিরাম প্রবাহিত ছন্দে।
প্রবেশ করিয়া কানে
পরশি মরম স্থানে
করিছে পথিক সবে পূরিত আনন্দে।
স্মরিয়া হতেছে ব্যথা,
কাদাইয়া বঙ্গমাতা,
অকালে গিয়াছে মধু মধুর সদন।
তথাপি সান্ত্বনা চিতে,
কবিতা কুসুম দিতে,
আছে গৃহে অধিষ্ঠাত্রী দুহিতা রতন।
ললিত-গাথা
চুম্বি' কপােতাক্ষ-বারি,
“যশােরে সাগরদাঁড়ি”
দাড়ায়ে থাকিবে চির কালের সাগরে
এ শুভ সৌভাগ্যহার
ভূষিত কণ্ঠেতে যার,
অমরাবতীর শােভা মৰ্ত্তে সেই ধরে।
রামগােপাল ঘােষ
বহু বরষের কথা-লভিলে জনম,
বাঙ্গালার পুণ্যতীর্থ, ত্রিবেণীর স্থান ;
হয়েছিল জীবনের ত্রিবেণী সঙ্গম
সুশিক্ষা, বাণিজ্য, আর সমাজ কল্যাণ।
তব কণ্ঠ, বাগ্মিতার গােমুখী প্রপাত,
করিল জাগ্রত বঙ্গে নিদ্রিত পরাণ,
দূর করিয়াছে কত অশুভ সস্পাত,
রেখেছে অক্ষুন্ন এই সমাধি শ্মশান *
ফুটেছিলে দীপ্তিমান্ শুক্র তারা সম,
বাঙ্গালার প্রভাতের নবীন কিরণে;
শাসন তন্ত্রের, আজি, বিধি অনুপম
আনিছে তােমার নাম সবার স্মরণে।
মনস্বী তেজস্বী বাগ্মী হে রামগোপাল
অক্ষয় তােমার কীৰ্ত্তি রবে চিরকাল।
* ইহার বক্তৃতায় নিমতলায় শবদাহ বন্ধ করিবার প্রস্তাবের
প্রত্যাহার হয়।
ললিত-গাথা
হরিশ্চন্দ্র মুখােপাধ্যায়
বিপন্নের পরিত্রাণ করিতে সাধন,
সম্পাদন করিবারে দুষ্কৃতের নাশ,
তােমার মনীষা শক্তি, করিলে চালন,
হয় নাহি ব্যর্থ সেই নিষ্কাম প্রয়াস।
নীলের অনলে, শস্য-শ্যামল ক্ষেত্রের,
পরিতপ্ত কৃষকের করুণ বেদন,
নিভীক সুরেতে সাধ তােমার পত্রের *
প্রতি ছত্র, বীরছন্দে করিত জ্ঞাপন।
পূর্ণ না হইতে তব জীবনের কাজ,
না হেরি আপন নেত্রে নীলের দমন,
গেলে চলি, কাদাইয়া বঙ্গের সমাজ,
দুঃখনীরে কৃষকেরে করি নিমজ্জন।
নিঃস্বার্থ স্বদেশ হিত, সাধনা তােমার,
পীড়িত প্রজার বন্ধু, পূজিত সবার।
* Hindoo Patriot.
উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারত সন্তান সবে বুঝিল যে দিন,
সহােদর-সূত্রে তারা রয়েছে বন্ধন,
কেমনে থাকিবে, হয়ে একতা-বিহীন,
মিলিয়া সাদরে সবে করে আলিঙ্গন।
নাহি-নদ, নদী, শৈল, ব্যবধান আর,
পরস্পর ভেদজ্ঞান দিল বিসর্জন,
দেশমাতৃকার সেবা ধৰ্ম্ম সবাকার,
ভারত জাতীয় “সঘ” হইল স্থাপন।
মায়ের পবিত্র ডাকে বরষ বরষ,
এক প্রাণে, এক স্থানে করি অধিষ্ঠান,
কর্তব্য পালনে, হৃদি সতত হরষ,
সাধনা করিতে পূর্ণ স্বদেশ কল্যাণ।
সেই যজ্ঞে ছিলে তুমি ঋত্বিক প্রথম,
আজি তাই জাগে, স্মৃতি তব পুণ্যতম।
৭২
ললিত-গাথা
যােগেন্দ্রকৃষ্ণ বসু
ষােড়শ বরষ গত, বঙ্গ জননীর
করুণ ক্রন্দন যবে উঠিল গগনে,
জাগিল সন্তান সব, প্রতিজ্ঞায় স্থির,
বন্দে মাতরম্ মন্ত্র উচ্চারি বদনে।
স্বদেশ সেবায় মত্ত সকল ভবন,
সকলের ব্রত ছিল স্বার্থ পরিত্যাগ,
নির্যাতন হয়েছিল অঙ্গের ভূষণ,
‘মায়ের দেওয়া মােটা বস্ত্রে দিব্য অনুরাগ
পবিত্র মায়ের নাম করাতে শ্রবণ,
প্রভাতে ভ্ৰমিত পুণ্য গায়কের দল,
করিত সবার কাছে ভিক্ষা নিবেদন,
নিঃস্বার্থে সাধিতে শুধু দেশের মঙ্গল।
শ্রেষ্ঠ হােতা ছিলে, তুমি সেই জাগরণে,
তাই আজি, চিত্ত আনে তােমায় স্মরণে ।
স্বরাজ-সঙ্গীত
সােদর আমার, সােদর আমার, মায়ের চরণে সপিয়া শির,
ত্যজিয়া! রতন, ত্যজিয়া ভূষণ, পরিবে বসন সন্ন্যাসীর।
দুরিতে দৈন্য, করিতে ধন্য, পুণ্য জ্যোতি স্বদেশ শ্রীর,
লইবে দীক্ষা, করিবে শিক্ষা, হইয়া অচল অটল স্থির।
ত্যাগের ধৰ্ম্ম করিতে গ্রহণ, ডাকিছে উচ্চে গান্ধী বীর,
বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে লভিবে অচিরে স্বরাজ স্থির।
সােদর আমার, সােদর আমার, জ্ঞানের পুণ্যবাহিনীর
অম্বু বিন্দু করিবে পান, সাধিবে শক্তি মনীষীর ;
জ্ঞানের শাস্ত্র আমােঘ অস্ত্র, ভীষণ আহবে ধরিত্রীর,
নিমিষে চূর্ণ, বিভব পূর্ণ হইবে দর্প অরাতির।
ত্যাগের ধৰ্ম্ম করিতে গ্রহণ, ডাকিছে উচ্চে গান্ধী বীর,
বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে লভিবে অচিরে স্বরাজ স্থির।
সােদর আমার, সােদর আমার, একই মায়ের স্তন্য ক্ষীর
করিয়া পান দিওনা প্রাণ বিচারতন্ত্রে স্বদেশীর ;
অর্থ ব্যতীত লভিবে শান্তি যুক্তি বাক্যে স্বদেশীর।
পাইবে আবার বিমল তৃপ্তি লইয়া বক্ষে ভ্রাতার শির।
ত্যাগের ধৰ্ম্ম করিতে গ্রহণ, ডাকিছে উচ্চে গান্ধী বীর,
বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে পাইবে অচিরে স্বরাজ স্থির।
৭8
ললিত-গাথা
সােদর আমার, সােদর আমার, ভীষণ মদির-রাক্ষসীর
কুহক হইতে পাইতে ত্রাণ, করিবে ধ্যান সুনীতির ;
মাতৃদত্ত পণ্যদ্রব্য সইবে আদরে পাতিয়া শির,
ধরিবে হৃদয়ে উচ্চ চিন্তা, ত্যজিবে পন্থা বিলাসীর।
ত্যাগের ধৰ্ম্ম করিতে গ্রহণ, ডাকিছে উচ্চে গান্ধী বীর,
বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে পাইবে অচিরে স্বরাজ স্থির।
ভারত-জননী
ঘন তমসাবৃত অম্বর ধরণী,
আছিল যেদিন ভারত-জননী,
ওঙ্কার রাণী
কহিল বাণী,
ভেদি সে শূন্য উঠিল স্বর।
“ওঠ, মা ওঠ, মা দেখ, মা চাহি,
তাের কাছে আছি আমি, চিন্তা নাহি,
জননী হীনা
কন্যা দীনা,
ওঠ, মা ওঠ, মা প্রদীপটি ধর।”
লৰি বনানী পৰ্বত-রাজি,
নেহারি ভারত সম্পদ-সাজি,
ধনাভিলাষী
বিদেশবাসী,
ৰাহিয়া সিন্ধু, পাতিল কর।
“ওঠ, মা ওঠ, মা দেখ, মা চাহি,
তাের কাছে আছি আমি, চিন্তা নাহি
কহিল বাণী
শােভার রাণী,
“পূর্ণ যে ঝাঁপি, পূর্ণ যে ধর।”
ললিত-গাথা
সে ধ্বনি উঠিয়া করুণচ্ছন্দে,
বিধাতৃ-চরণ প্রণমি বলে,
চরণঘাতে
ধ্বনিল বাতে
ভারত ধন্য সে অবনী’পর।
উজ্জ্বল দীপ, নাহি অন্ধকার,
বিতরিছ বিশ্বে অন্ন-ভার,
ভারত জননী
ভারত জননী
লভিয়াছ ভাগ্যে দুল্লভ বর।
বঙ্গ-বাহিনী ৯
ধাইছে যাহারা অভয় চিত্তে বঙ্গবাহিনী করিতে সৃষ্টি,
মস্তে তাদের স্বর্গ হইতে করিছে দেবতা পুষ্পবৃষ্টি ;
করিল তুচ্ছ প্রাণের মায়া,
ত্যজিল স্নিগ্ধ শান্তি ছায়া।
ধাইছে তাহারা সমর রঙ্গে,
করিতে তীর্থ মৃত্যু সঙ্গে ;
করিবে রক্ষা বিপদ খণ্ডি’
আপন পুত্রে মা রণচণ্ডী।
সকল কণ্ঠে ধ্বনিত পূৰ্ব্বে,—ধন্য প্রতাপাদিত্য বীর’,
বীরের ধৰ্ম্মে লইছে দীক্ষা, নমিয়া তাঁহার চরণে শির
বন্দিছে সকলে ভক্তি সঙ্গে,
বীর বরণীয় জননী বঙ্গে।
ধাইছে তাহারা সমর রঙ্গে,
করিতে তীর্থ মৃত্যু সঙ্গে।
করিবে রক্ষা বিপদ খণ্ডি
আপন পুত্রে মা রণচণ্ডী।
;
জার্মান যুদ্ধে ©Bengal Regiment গঠন উপলক্ষে।
৭৮
ললিত-গাথা
মুগ্ধ হইয়া বৃটনবাসী দেখিবে যখন আপন নেত্রে,
বঙ্গ ৰীরের বুদ্ধি শৌৰ্য্য, কম্পিত করে সমর ক্ষেত্রে,
রাখিতে তখন মানীর মান
উচ্চ অয়ন করিবে দান।
ধাইছে তাহার সমর রঙ্গে,
করিতে তীর্থ মৃত্যু সঙ্গে ;
করিবে রক্ষা বিপদ খণ্ডি’
আপন পুত্রে মা রণচণ্ডী।
আবাল বৃদ্ধ বনিতা আদি, যতেক মুগ্ধ স্বদেশবাসী,
অন্তর মধ্যে করুণ কণ্ঠে যাচিছে নিত্য মঙ্গল রাশি।
জিনিয়া সমরে অরাতিপুঞ্জে
আসিবে আবার স্নেহের কুঞ্জে।
ধাইছে তাহারা সমর রঙ্গে,
করিতে তীর্থ মৃত্যু সঙ্গে ,
করিবে রক্ষা বিপদ খণ্ডি
আপন পুত্রে মা রণচণ্ডী
•
নদীয়া-কাহিনী
নদীয়া আমার! নদীয়া আমার! জ্ঞানতীর্থ ভারতীর,-
বাহার অঙ্গ করিছে ধন্য, সলিল পুণ্য জাহ্নবীর,
উদিল যথায় ন্যায়ের শাস্ত্র, হরিয়া দর্প মৈথিলীর,
রঘুর মনীষা সৃজিল বিধান হিন্দু ধৰ্ম্মপদ্ধতির।
আজিও যথায় ললিত ছন্দে, কম্পিত করি পবন ধীর,
উক্ত কর্ণ পুলক পূর্ণ করিছে সে নাম শ্রীহরির।
নদীয়া আমার। নদীয়া আমার ! যথায় নিমাই সন্ন্যাসীর
কণ্ঠে উঠিত মধুর নাম, নয়নে ঝরিত প্রেম নীর ;
আপন রক্তে ঠাকুর নিতাই করিল মুক্তি পাতকীর,
পাইল ত্রাণ জগাই মাধাই, অসুর যাহারা দুর্নীতির।
আজিও যথায় ললিত ছন্দে, কম্পিত করি পবন ধীর,
ভক্ত কর্ণ পুলক পূর্ণ করিছে সে নাম শ্রীহরির।
নদীয়া আমার । নদীয়া আমার! যথায় বঙ্গ নিবাসীর
মধুর ভাষায়, কীৰ্ত্তিবাস রচিল, কীৰ্ত্তি বাল্মীকির ;
অমৃত চরিতে, মধুর গীতে যতেক ভক্তমণ্ডলীর
রয়েছে ব্যক্ত ধর্মতত্ত্ব, গৌর-কৃষ্ণ-কাহিনীর।
আজিও যথায় ললিত ছন্দে কম্পিত করি পবন ধীর,
ক্ত কর্ণ পুলক পূর্ণ করিছে সে নাম শ্রীহরির।
নদীয়া আমার। নদীয়া আমার! যথায় করুণা ঈশ্বরীর
করিল সিক্ত, কৃষ্ণনগর, কৃষ্ণচন্দ্র নৃপতির ;
!
৮০
ললিত-গাথা
সভায় যাহার, সতত দীপ্ত হইত জ্যোতি মনীষীর,
মায়ের মঙ্গল করিল গান রায় গুণাকর সাহিত্যবীর।
আজিও যথায় ললিত ছন্দে কম্পিত করি পবন ধীর
ভক্ত কর্ণ পুলক পূর্ণ করিছে সে নাম শ্রীহরির।
*
নদীয়া আমার! নদীয়া আমার! কাঙ্গালহরি ব্রাহ্ম বীর,
ভিন্ন পথে, করিল সাধনা, পরম পদে নমিয়া শির ;
করিল লােদন দীনবন্ধু, লইয়া দর্পণ স্বভাব শীর, +
ফুটাল আবার হাসির উৎস, বিরস চিত্তে স্বদেশীর।
আজিও যথায় ললিত ছন্দে, কম্পিত করি পবন ধীর
ভক্ত কর্ণ পুলক পূর্ণ করিছে সে নাম শ্রীহরির।
নদীয়া আমার ! নদীয়া আমার ! যথায় দেশ-প্রসূতির,
গাহিল মহিমা “দ্বিজ-ইন্দ্র” লইয়া বীণা ভারতীর,
“বটচ্ছায়ে” কুটীর ক্ষুদ্র আছিল, তীরে জালিঙ্গীর
ধন্য হইনু হেরিয়া তথায়, প্রথম রশ্মি পৃথিবীর ।
আজিও যথায় ললিত ছন্দে, কম্পিত করি পবন ধীর
ভক্ত কর্ণ পুলক পূর্ণ করিছে সে নাম শ্রীহরির।
* রামতনু লাহিড়ী।
+ খড়িয়ার তীরে ষষ্ঠীতলার বাটীতে পিতৃদেবের ‘নীলদর্পণ” “নবীন
. তপস্বিনী” প্রভৃতি রচিত হয়, সেই কুটীরে ১৮৬৫ সালে লেখকের জন্ম হয়।
পিতৃদেবের জন্মভূমি “চৌবেড়িয়া” পূর্বে নদীয়ার অন্তর্গত ছিল, এই জন্য
বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়াছেন, “দীনবন্ধুর নাম নদীয়ায় গৌরবের স্থল।
N
সতীর্থ-সঙ্গম
আজি গাে তােমার চরণে জননি ভক্তি প্রণাম করিব দান,
গাহিব তােমার করুণ কাহিনী, মিলিত কণ্ঠে ধরিয়া তান ;
জীবন সংগ্রামে বরষ বাহি, তােমার শরণ হৃদয়ে চাহি,
তােমারে পূজিতে মিলেছি, জননি! তােমার তরেতে সঁপিব প্রাণ ;
জ্ঞান জননি! এসেছি সকলে ভক্তি প্রণাম করিতে দান,
তােমার কৃপায় যাহারা জীবনে লভিল শিক্ষা লভিল জ্ঞান।
জননি তােমার যতনে ফুটিয়া কতই কোরক কতই মূল
ফুল্ল কুসুমে হইয়া বিকাশ গন্ধে ভরিল সকল কুল,
সহিল হরষে কতই দুঃখ, উজ্জ্বল করিতে তােমার মুখ,
তােমার সমীপে এসেছি জননি লভিতে তােমার আশীষ দান ;
জ্ঞান জননি! এসেছি সকলে ভক্তি প্রণাম করিতে দান,
তােমার কৃপায় যাহারা জীবনে লভিল শিক্ষা লভিল জ্ঞান।
* এই গান আমাদের কলেজের (Scottish Churches College)
অতীত ছাত্রদের সম্মিলনের দিনে গীত হয়। বিলাতে প্রায় সকল
বিদ্যালয়ে একটা করে স্কুল বা কলেজ গান আছে, যে গান সেই
বিদ্যালয়ের ছাত্রেরা বিদ্যালয়ের শুভদিনে বা সম্মিলনের দিনে গান
করে ; যে গান গাহিলে বা শুনিলে ছাত্রেরা পরজীবনে সুখময় অতীত
স্মৃতি স্মরণ করিয়া পুলকিত হয় এবং যাহা দ্বারা তাহাদের মধ্যে ঐক্য
বুদ্ধি হয়। আমাদের মনে হয় যে উল্লিখিত গানটি আমাদের
কলেজের ঐ প্রকার বিশেষ গান (College Song) হইবার জন্য উচ্চ
আশা করিতে পারে। (সহঃ সঃ College Magazine).
৮২
ললিত-গাথা
মরিয়া হৃদয়ে লাগিছে ব্যথা, অকালে কৃতান্ত করিল গ্রাস
জননি ভােমার কতই পুত্রে, সাধনা তাদের হইল নাশ,
সকলে মিলিয়া তাদের লাগি, বিধাতৃচরণে প্রণাম মাগি,
করুক তাহারা তােমার কাৰ্য্য লভিয়া স্বগে অক্ষয় স্থান।
জ্ঞান জননি! এসেছি সকলে ভক্তি প্রণাম করিতে দান,
তােমার কৃপায় যাহারা জীবনে লভিল শিক্ষা লভিল জ্ঞান।
ভ্ৰাতায় ভ্রাতায় করিব মিলন, ক্ষুদ্র মহৎ না করি’ বোধ,
হৃদয়ের দুঃখ হৃদয়ের ক্ষোভ ক্ষণেকের তরে করিব রােধ ;
নবীন প্রবীণ উভয়ে সাজি, মায়ের মন্দিরে মিলেছি আজি,
শিশুর মতন সরল প্রাণে মায়ের অমৃত করিতে পান।
জ্ঞান জননি! এসেছি সকলে ভক্তি প্রণাম করিতে দান,
তােমার কৃপায় যাহারা জীবনে লভিল শিক্ষা লভিল জ্ঞান।
স্বাগত সম্ভাষণ *
মায়ের চরণে প্রণত মন্তে ভক্তি-অর্ঘ্য করিয়া দান,
মাতৃযজ্ঞ করিতে পূর্ণ যাহারা সতত হৃদয়ে চান।
তাদের পাইয়া আমরা ধন্য, চাহি না আমরা করুণা অন্য ;
স্বাগত সুজন, সাহিত্যকুঞ্জে—সাহিত্য-সেবীর তীর্থস্থান।
যেখানে প্রথম দিব্য কণ্ঠে চণ্ডীদাস গাহিল গান,
এখন বাজায় বিশ্ব-বীণায় রবীন্দ্রনাথ মধুর তান।
জাতীয় সাহিত্য করিছে শােভিত, জাতীয় গরিমা, জাতীয় মান,
তাহার সাধনা হউক সতত মােদের ধর্ম মােদের ধ্যান,
করিব সকলে জীবন পণ, করিবে আশীষ দেবতাগণ,
এস হে সুজন, সাহিত্যকুঞ্জে—সাহিত্য-সেবীর তীর্থস্থান।
যেখানে প্রথম দিব্য কণ্ঠে চণ্ডীদাস গাহিল গান,
এখন বাজায় বিশ্ব-বীণায় রবীন্দ্রনাথ মধুর তান।
সাহিত্য-আলােকে হয়েছে মুক্ত, পীড়নে যাদের কাতর প্রাণ,
‘দাসত্ব মােচন, ‘নীলের ধ্বংস করিছে তাহার সাক্ষ্য দান,
সাহিত্য-শক্তি তুলনা-শূন্য, সাহিত্য সাধিছে কৰ্ম্ম পুণ্য ;
এস হে সুজন, সাহিত্যকুঞ্জে সাহিত্য-সেবীর তীর্থস্থান।
যেখানে প্রথম দিব্য কণ্ঠে চণ্ডীদাস গাহিল গান,
এখন বাজায় বিশ্ব-বীণায় রবীন্দ্রনাথ মধুর তান।
* কলিকাতায় সমাগত কংগ্রেসের প্রতিনিধিগণকে বঙ্গীয়-সাহিত্য
পরিষদের সম্ভাষণ।
৮৪
ললিত-গাথা
নাহিক অর্থ, নাহিক শক্তি, রাখিতে তােমার যােগ্য মান,
আছে গাে কেবল স্নেহের ধারা, তাহাই করিব সাদরে দান ;
ভাই ভাই মিলি, হৃদয় খুলি, সরল প্রাণে করি কোলাকুলি ;
স্বাগত সুজন, সাহিত্যকুঞ্জে-সাহিত্য-সেবীর তীর্থস্থান।
যেখানে প্রথম দিব্য কণ্ঠে চণ্ডীদাস গাহিল গান,
এখন বাজায় বিশ্ব-বীণায় রবীন্দ্রনাথ মধুর তান।
বঙ্গ-উড়িষ্যা।
( সমগ্র উড়িষ্যাবাসী বাঙ্গালী সম্মিলনীর দ্বিতীয় অধিবেশনে গীত)
(১)
বঙ্গ উড়িষ্যা দুইটি ভগিনী সতত বদ্ধ একতাসূত্রে,
সাদরে অঙ্গে লইছে সদাই উৎকল জননী বঙ্গপুত্রে ;
পুরুষােত্তম জগন্নাথে, করিতে পূজা ভক্তি সাথে
আসিছে যাত্রী নাহিক সংখ্যা, ভরিয়া পুণ্য তীর্থস্থান।
উৎকলে আমার প্রেমের নিমাই সিন্ধু সলিলে ত্যজিল প্রাণ,
বঙ্গ হইতে তাহাকে আমরা কেমনে করিব ভিন্ন জ্ঞান।
তুষিতে ভক্তে ভক্তাধীন হর্ষে ধাইল তাহার পিছে,
সাক্ষ্য দিতেছে সাক্ষীগােপাল, দেখি যে চক্ষে নহে ত মিছে;
কণ্ঠে লইয়া মধুর ছন্দে, যাহারে হিন্দু নিত্য বলে
সেই সে সবিতা পূজার জন্য, “কোন অর্ক” বিদ্যমান।
উৎকলে আমার প্রেমের নিমাই সিন্ধু সলিলে ত্যজিল প্রাণ,
বঙ্গ হইতে তাহাকে আমরা কেমনে করিব ভিন্ন জ্ঞান।
১৬
ললিত গাথা
মিটাতে প্রাণের ধৰ্ম্মবৃত্তি বিবিধ মন্দির হয়েছে সৃষ্টি,
ভুবনঈশ্বরে, দেবতাবৃন্দে, তৃষিত নয়ন করিবে দৃষ্টি,
এখন যাহার উদয়গিরি, এখন যাহার খণ্ডগিরি
করেছ গ্রহণ সকল চিত্তে শিল্পকলায় উচ্চ স্থান।
উৎকলে আমার প্রেমের নিমাই সিন্ধু সলিলে ত্যজিল প্রাণ,
বঙ্গ হইতে তাহাকে আমরা কেমনে করিব ভিন্ন জ্ঞান।
( ৪ )
এনেছ হেথায় দীনবন্ধু ! তােমার অজানা মধুর টানে
রাথিও শরণে দীনজনে, তােমারি চরণ তাহারা জানে
বাঙ্গালী উড়িয়া উভয় ভাই, থাকিব মিলিয়া একই ঠাই
হইয়া সকলে কামনা শূন্য করিব কেবল স্নেহের দান।
উৎকলে আমার প্রেমের নিমাই সিন্ধু সলিলে ত্যজিল প্রাণ,
বঙ্গ হইতে তাহাকে আমরা কেমনে করিব ভিন্ন জ্ঞান।
গােধেনু।
(মহাকালী গােরক্ষিণী সভায় গীত
কর্মক্ষেত্রে ধর্ম যাদের, আর্তে করিতে ত্রাণ,
পশুর দুঃখ, আপন দুঃখ, করেনা ভিন্ন জ্ঞান,
হইয়া মিলিত করিছে চেষ্টা ভক্তি যত্ন ভরে,
যাদের দুগ্ধে পালিত আমরা, তাদের হিতের তরে।
গােপাল সহিত ব্ৰজের গােপাল খেলিত বিবিধ রঙ্গে,
গােকুলে গােকুল করিত আদর, রাখাল বালক সঙ্গে,
করিত ধ্বনিত কানন গােষ্ঠ, বেণুর মধুর স্বরে,
যাদের দুগ্ধে পালিত আমরা, তাদের হিতের তরে।
পরের জন্য আপন স্তন্য জগতে যাহার দান,
“ভগবতী” নামে তাহারে হিন্দু করিছে জননী জ্ঞান ;
আনিত আহার মুনির তনয়া, আপন অঞ্চল ভরে,
যাদের দুগ্ধে পালিত আমরা, তাদের হিতের তরে।
ধেনুর হিতে দেশের হিত ; -তাহাতে নাহিক ভুল
হৃদয় ভিতরে অমােঘ কণ্ঠে, কহিছে হিতের মূল।
করিবে পণ হিয়ার মাঝে, দেবতা সাক্ষ্য করে
যাদের দুর্গে পালিত আমরা, তাদের হিতের তরে।
ললিত-গাথা
বন্দে বঙ্কিমং
( কাঁটালপাড়ায় গীত )
বলে বঙ্কিমং।
সুকামং সুঠামং কাঞ্চনবর্ণাভং
পূর্ণপ্রতিভং বঙ্কিমং।
দিব্য-প্ররণা-পুলকিত-জীবন
চিত্ত-বিভাসিত- নন্দন-কিরণং
সুনায়কং নরকুল-তিলকং
ধৰ্ম্ম-প্রচারকং বঙ্কিমং।
দেবােপম কণ্ঠে মুখরিত মাতৃকা মন্ত্র !
দেবােপম ভুজে ধৃত বাণীবীণাযন্ত্র ।
বন্দিছে তােমায় সকলে।
কবিকুলভূষণং নমামি সুজন
সুধীজনপূজনং বঙ্কিমং।
দেশ বিদ্যাদেশ ধৰ্ম্ম
দেশ হৃদি-দেশ মৰ্ম্ম
দেশ হি প্রাণাঃ শরীরে ;
বাহুতে দেশ মা শক্তি, হৃদয়ে দেশ মা ভক্তি-
ঋষির পবিত্র মন্ত্র জপিৰ অন্তরে।
বন্দে বঙ্কিম
“দেশ হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা-কমল-দল-বিহারিণী
বাণীবিদ্যাদায়িনী
ত্বয়েতি দৃষ্টং
নমামি ত্বাং নমামি সুকামং
সুঠামং বরেণ্যং বঙ্কিমং
সম্রাজং পালকং সাধকং
সুকেশং সুবেশং বঙ্কিমং।
ললিত-গাথা
শিশিরকুমার
( বাৎসরিক স্মৃতিসভায় গীত )
অমৃত আধার
হইল প্রচার
দুষ্টের দমন
করিলে সাধন
অমিয় নিমাই
পড়িবে সবাই
গৌরাঙ্গ চরণ
লভিলে আসন
স্মরণ স্থাপন
অন্তরে স্মরণ
ধন্য সেই জন
ভাবে সৰ্ব জন
পত্রিকা তোমার।
দশের তরে ।
শিষ্টের পালন।
জীবন ভরে।
চরিত সদাই।
আঁথির জলে।
করিয়া বন্দন।
অমর দলে
কিসের কারণ।
করিছে সবে ।
যারে অনুক্ষণ।
নশ্বর ভবে ।
দ্বিজেন্দ্রলাল
( টাউনহলে স্মৃতিসভায় গীত)
বঙ্গ তােমার, জননী তােমার, ধাত্রী তােমার, তােমার দেশ,
হেরিয়া তােমার মুদিত নয়ন, হেরিয়া তােমার স্থির কেশ,
হেরিয়া তােমার ধূলায় শয়ন, হেরিয়া তােমার অন্তিম বেশ,
সপ্ত কোটি মিলিত কণ্ঠে কঁদে উচ্চে,—নাহিক শেষ ।
কিসের দুঃখ, কিসের কষ্ট, কিসের কান্না, কিসের ক্লেশ,
“ধন্য-কীৰ্ত্তি দ্বিজ-ই।” গবে যখন কালের শেষ।
একদা যাহার সরস কণ্ঠ হাসায়ে বাংলা করিল জয়,
একদা যাহার দীপক-গীত ছাখিল ভারত অম্বরময়,
ছন্দ যাহার ভাষার অঙ্গে পরাল কতই নবীন বেশ,
তার কিনা আজি ধূলায় শয়ন, তার কিনা আজি হইল শেষ।
কিসের দুঃখ, কিসের কষ্ট, কিসের কান্না, কিসের ক্লেশ,
“ধন্য-কীৰ্ত্তি দ্বিজ-ইন্দ্র।” গাবে যখন কালের শেষ ।
গাহিল যে জন মুরজমন্দ্রে, কবিতাকুঞ্জে মধুর তান,
চিত্র করিল প্রতাপ ও শক্ত, দুর্গাদাস রাঠোর মান ;
দেখাল যতেক মােগল সিংহ, গাহিল দিব্য মেবার শেষ ;
ধন্য আমরা পাইয়া তাহায়–ধন্য তাহার পুণ্য দেশ।
কিসের দুঃখ, কিসের কষ্ট, কিসের কান্না, কিসের ক্লেশ,
“ধন্য-কীৰ্ত্তি দ্বিজ-ইন্দ্র।” গাবে যখন কালের শেষ !
ললিত-গাথা
লইল যাহারে শ্বেতবসনা, মুক্ত করিয়া স্বর্ণদ্বার,
আজি গাে কতই ক্ষুদ্র মহৎ, ভক্তি প্ৰণত চরণে যার,
সাহিত্য অপার কীৰ্ত্তি ঘােষিল, পরায়ে যাহারে অমর বেশ,
অকাল মৃত্যু গ্রাসিল তাহারে নাহিক হৃদয়ে দয়ার লেশ !
কিসের দুঃখ, কিসের কষ্ট, কিসের কান্না, কিসের ক্লেশ,
“ধন্য-কীৰ্ত্তি দ্বিজ ইন্দ্র!” গাবে যখন কালের শেষ ।
যদিও তােমার নিত্য বিরহে, নেহারি কেবল অাঁধার ঘাের,
কেটে যাবে মেঘ, তােমারি গরিমা, মােহের রজনী করিবে ভাের ;
আমরা পূজিব প্রতিমা তােমার-মানুষ আমরা, নহিত মেষ,
জ্যোতি তােমার, ধৰ্ম্ম তােমার, সাধনা তােমার, ব্যাপিবে দেশ।
কিসের দুঃখ, কিসের কষ্ট, কিসের কান্না, কিসের ক্লেশ,
“ধন্য-কীৰ্ত্তি দ্বিজ-ইন্দ্র।” গাবে যখন কালের শেষ!
দ্বিজেন্দ্রলাল
( সালিখা পূর্ণিমা মিলনে গীত)
সােদর আমার, সােদর আমার, আজি এ পুণ্য সমিতির
মিলনক্ষেত্রে, আসিছে নেত্রে, জ্যোতি তােমার দিব্য শ্রীর,
আমােদ হর্ষ করিতে বৃদ্ধি, নুতন পৰ্ব্ব করিলে স্থির,
করিলে মিলন পূর্ণিমায়, লইয়া সেবকে ভারতীর।
মিলন ‘মলিন, বিহনে তােমার, ঝরিছে নয়নে অশ্রনীর,
কাদিছে উচ্চে মিলিত কণ্ঠ, সপ্তকোটি স্বদেশীর।
সােদর আমার, সােদর আমার, কীৰ্ত্তি বঙ্গ-জননীর,
শুনালে প্রথমে মিলন-দিবসে, হইল উচ্চ নম্র শির,
ছুটিল নাচিয়া তড়িৎ প্রবাহ, উষ্ণ রক্ত ধমনীর,
হৃদয় ভিভরে যাইল গলিয়া, তুষার দৈন্য-হিমানীর।
মিলন ‘মলিন, বিহনে তােমার, ঝরিছে নয়নে অশ্রনীর,
কাদিছে উচ্চে মিলিত কণ্ঠ, সপ্তকোটি স্বদেশীর।
সােদর আমার, সােদর আমার, মহিমা পুণ্য জাহ্নবীর,
শেষ মন্ত্রে করিলে গান, লইয়া ছন্দ বাহিনীর,
চাহিলে সুপ্তি চাহিলে শান্তি চরণে ত্ৰিতাপহারিণীর ;
মুগ্ধ নেত্রে দেখিল সকলে, ত্রিদিব কান্তি মনীষীর।
মিলন “মলিন, বিহনে তােমার, ঝরিছে নয়নে অশ্রনীর,
কাদিছে উচ্চে মিলিত কণ্ঠ, সপ্তকোটি স্বদেশীর।
১৪
ললিত-গাথা
সােদর আমার, সােদর আমার, করুণা করুণা-দায়িনীর,
অচিরে বাসনা করিল পূর্ণ লইয়া তনয়ে আপন তীর,
উঠিল স্বর্গে বিপুল হর্ষ, বাজিল বীণা ভারতীর,
পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র ঢাকিল তিমির যামিনীর।
মিলন ‘মলিন, বিহনে তােমার, ঝরিছে নয়নে অশ্রনীর,
কাদিছে উচ্চে মিলিত কণ্ঠ, সপ্তকোটি স্বদেশীর।
স্যার জগদীশচন্দ্র
(ইউনিভারসিটি ইনষ্টিটিউটে গীত )
আজি গো সকল অধরপ্রান্তে খেলিছে হাসির ধারা,
সাদরে তােমায় করিছে বরণ পুণ্য বঙ্গ সারা
মুগ্ধ করিয়া সবার প্রাণ কহিছে বিজ্ঞান-বাণী
তােমার প্রতিভা খানি, ধীমান! তােমার মনীষা খানি।
সুদূর হইতে বিজয় বারতা ঘােষিলে মধুর ভাবে,
হরষ সলিল সবার নয়নে আপনি ভাসিয়া আসে;
চাহিলে পূজিতে ভকতি কুসুমে, ভরিয়া যুগল পাণি
তোমার প্রতিভা খানি, ধীমান! তােমার মনীষা খানি।
আছিল নিহিত পুরাণ কাহিনী কবিতা কুসুম মাঝে,
মন্ত্র তােমার ভূষিল তাহায় বিজ্ঞান সুলভ সাজে ;
আশীষ বচনে করিছে ধন্য, শ্বেতবরণা রাণী
তােমার প্রতিভা খানি, ধীমান! তােমার মনীষা খানি।
;
সৃষ্টি তােমায় করিল নূতন অতীত গৌরব রাশি,
ধ্বনিত হইল সকল গগনে পূরব জ্ঞানের বাঁশী
দেবতা যতেক শশাভিত করিছে অমর আলােক দানি’
তােমার প্রতিভা খানি, ধীমান। তােমার মনীষা খানি।
ললিত-গাথ।
স্যার প্রফুল্লচন্দ্র
(সুহৃদ-সূর্যোদয়-সাহিত্য-সমিতিতে-গীত )
পুণ্য কুটীরে, তাপস পুণ্য জ্ঞানের পুণ্য ধারা,
জ্ঞানের জন্য করিত প্রদান, আপন জীবন সারা ;
অতীত চিত্র, সবার মানসে স্বতই দিতেছে আনি,
তােমার বদন খানি, ধীমান! প্রফুল্ল বদন খানি।
বাহিরে শুধুই গৃহীর আকার, ভিতরে ঋষির সাজ,
সঁপেছ জীবন, সাধিতে কেবল দেশের বিবিধ কাজ ;
সমান আদর করিয়া সকলে, কহিছে মধুর বাণী,
তােমার বদন খানি ধীমান! প্রফুল্ল বদন খানি।
আপন জন্য নহেত সঞ্চিত, তােমার অর্থ রাশি ;
নীরবে বিতর করুণ দীনে, মিশায়ে সাদর হাসি ;
পুত্ৰ সমান দেখিছে শিষ্যে, মেহের আলােক দানি,
তােমার বদন খানি, ধীমান! প্রফুল্ল বদন খানি।
উপাধি পেয়েছে নূতন ভূষণ, ভূষিয়া তােমার অঙ্গ ;
প্রফুল্ল সে জন, পেয়েছ যে জন, তােমার প্রফুল্ল সঙ্গ ;.
চুমিছে সাদরে, হইয়া ধন্য, জননী বঙ্গ রাণী,
তােমার বদন খানি, ধীমান । প্রফুল্ল বদন খানি।
কাঙ্গালের নিবেদন
বাবু হয়োনা সং সেজোন।
শুন নিবেদন,
বাঙ্গালা মায়ের কাঙ্গাল
ছাওয়ালগণ।
*মায়ের দেওয়া মােটা কাপড়,
মাথায় তুলে করূবে আদর,
মিহির বাহার, চিকন বুনন,
নাইরে প্রয়ােজন
দিও না মুখে বিড়ি সিগারেট,
ভবে না তাহে তােমার পেট,
সেই পয়সায় কমাও কিছু
গৃহের অনাটন।
মদের গন্ধ নিওনা নাকে,
পড়িবে না। পাপের পাকে
সংযমের পুণ্য পথে:
সদ। বিচরণ।
মাথায় হাট, গলায় ফাঁসি,
সেই বিলাতী ঢং রাশি রাশি,
শপথ করে সাগর-নীরে
কর নিক্ষেপণ।
-
শি,
ললিত-গাথা
নিত্য সাবান, সখের গন্ধ,
সবাই তােমরা কর বন্ধ,
গৌরবেতে মনের সৌরভ
কর বিকীরণ।
বিলাসিতার ভীষণ গ্রাস,
ত্যাগের মন্ত্রে করে নাশ
চিরাননে, সোনার বাঙ্গালা,
রবে নিমগন ।
কর উচ্চ চিন্তার আরাধন,
সাত্ত্বিকতায় প্রাণ ধারণ,
অভাব অভাব হবে, যাবে
দুঃখ বিসর্জন।
পুরাতনের কথায় শুনি,
ছিল এই দেশেতে ঋষি মুনি,
যারা জ্ঞানের জন্য রচেছিল,
পুণ্য তপােবন।
তােমরা তাদের তনয় সবে
তাদের শিক্ষা মাথায় লবে,
আবার হবে দেশটি তােমার
শান্তি নিকেতন।
কৃষ্ণকথা
(দ্বন্দাবনে
কৃষ্ণ অষ্টমীর রাতি,
তারকা রােহিণী ভাতি,
জয়ন্তীর যোেগ পুণ্যতম।
কংস কারাগারে হরি,
দেবকীর অপরি,
চারি ভুজে শােতে মনােরম ।
জনক করিল বক্ষে,
দ্বিভুজ হেরিল চক্ষে,
চলিলেন নন্দের ভবনে।
যমুনা তরঙ্গময়,
উপজিল হৃদে ভয়,
ভাবিলেন যাইব কেমনে।
অকস্মাৎ শিবা আসে,
পারে যায় অনায়াসে,
বসুদেব দেখিল যখন।
-যমুনার কাল নীরে,
চলিলেন ধীরে ধীরে,
জলে হ’ল শিশুর পতন।
রাখিতে ভক্তের মান,
বসুধার অঙ্কে যান,
বসুদেব-এন্ত অতিশয় ।
তখনি আবার পায়,
পর পারে চলে যায়,
উপনীত নন্দের আলয় ।
ললিত-গাথা হেথা নন্দগোপজয়া, প্রসবিল যােগমায়। বসুদেব লইল তাহায়। ফিরে যায় কারাগারে, কেহ নাহি দেখে তারে, মুগ্ধ সবে মায়ার মায়ায়। অষ্টম প্রসব কথা, কংস মনে দিল ব্যথা, কন্যা লয় করিতে নিধন। আকাশেতে মহামায়া, প্রকাশিল নিজ কায়া, কহিলেন বচন ভীষণ তােমারে বধিবে যেই, গােকুলে বাড়িছে সেই, অন্য শিশু করােনা সংহার। না মানি আকাশবাণী, অসুর সকলে আনি, শিশু বধ করিল প্রচার সে গােলােক পরিহরি, গােকুলে আসিল হরি দুষ্কৃতের করিতে নিধন। সুখের সলিলে ভাসি, গােপ গােপী সবে আসি, দেখিলেন নন্দের নন্দন। যশােদার নবনীত, নীলমণি মুখে দিত, গােঠে যেত বাজাইয়া বেণু। রাখাল বালকগণ, সদা আনন্দিত মন, হাম্বা রবে হরষিত ধেনু। শুনিয়া শ্যামের বাঁশী, যমুনার জল রাশি, চিরানন্দে বহিত উজান।
কৃষ্ণকথা ১০১ ব্রজবালা কুঞ্জবনে, মধুর মুরলী স্বনে সদা হ’ত রােমাঞ্চিত প্রাণ। শিশুর খেলায় রত, উৎপাত শত শত, করিত যে ব্ৰজের রতন। চুরি করি খেত ননী, রুষ্ট নহে কোন ধনি, তুষ্ট সবে চুষিতে বদন । অপরূপ লীলা চয়, শুনিলে বিস্ময় হয়, কিন্তু তাহে সকলি সম্ভব। সে যে পরব্রহ্ম সার, পদে তার নমস্কার, অপ্রাকৃত বিভূতি বিভব । বধ করে পূতনায়, শকট ভাঙ্গিল পায়, গুরু ভারে তৃণাবর্তে নাশে । জুম্ভন করিল যদা, যশােদা দেখিল তদা, মুখ মধ্যে বিশ্বরূপ হাসে। তনয়ে বন্ধন তরে, রাণী যত বুজু ধরে, সব হয় দ্বি অঙ্গুল নূন। জননীরে হেরি শ্রান্ত, অবশেষে হরি ক্ষান্ত, দেখাইল আপনার গুণ। উদূখল বাঁধা অঙ্গে, দামােদর ধায় রঙ্গে, ভাঙ্গিবারে যমল অর্জুন। কুবের তনয় দ্বয় পাদপে উদয় হয়, ঘুচে গেল শাপ নিদারুণ।
ললিত-গাথা বৃন্দাবনে গােচারণ, করে যবে নারায়ণ, বৎস দৈত্যে করিল নিধন। বকাসুরে তুণ্ডে ধরি, অবলীলাক্রমে হরি তৃণবৎ করে বিদারণ। বিহার করেন বনে রাখাল বালক, সনে, অঘাসুর করে আক্রমণ। ব্ৰহ্ম বন্ধ হয় ভেদ অসুর করিল খেদ, কৃষ্ণ হাতে হইল মরণ | বৎস, বৎসপালগণে, ল’য়ে আনন্দিত মনে, খেলিতেন নন্দের তনয়। মহিমা দর্শন আশে পদ্মযােনি তথা আসে, তাহাদের অন্য স্থানে লয় । ব্ৰহ্মার ছলনা সব, বুঝিলেন সে মাধব, তাহাদের সৃজিলেন পুন। হইল মােহের নাশ, চতুর্থ প্রকাশ, স্তব করে নারায়ণ-গুণ। তাল বৃক্ষে, তাল বন, রহিয়াছে সুশােভন, তথা রহে ধেনুক অসুর। নিতে ফল অভিরাম, যায় কৃষ্ণ বলরাম, দৈত্য দেহ করিলেন চুর। কালিন্দীর হ্রদ তলে, কালিয় সর্পের দলে সদা বিষে করিত ভরণ।
কৃষ্ণকথা সুমধুর নৃত্য করি, বিষধর শির পরি, হরি তারে করিল দমন । হইতে এরবন, দাবাগ্নির আক্রমণ, ব্রজবাসী তাপদগ্ধ প্রাণ। কাতরভঞ্জন হরি, বদন ব্যাদান করি, দাবানল করিলেন পান। গােপরূপী প্রলম্বরে, শ্রীকৃষ্ণ ছলনা করে, ক্রীড়া করে ভাণ্ডীরক বনে। পৃষ্ঠে করি আরােহণ, রােহিণী-হৃদয়-ধন, পাঠালেন শমন ভবনে। গােধন গোপালগণ, প্রবেশিয়া মুঞ্জবন পাইলেন দাবাগ্নির ত্রাস। কাতরেতে অবিরাম ডাকে কৃষ্ণ বলরাম, অগ্নি হরি করিলেন গ্রাস। ব্রজের কুমারীগণ, হইয়া সংযত মন কাত্যায়নী করিত প্রণতি। “অধীশ্বরি মহামায়ে, যাচি মা তােমার পারে নন্দসুতে কর মাের পতি। অরুণ উদয় হলে, কালিন্দীর কাল জলে যায় সবে করিতে সিয়ান। পুলিনে বসন রাখি, দেখিল মেলিয়া আঁখি স্থাসহ তীরে ভগবান।
১৫৪ ললিত-গাথা বসন লইয়া করে, কদম্ব পাদপ পরে আরােহিল লজ্জানিবারণ। সঙ্কুচিতা ধীরে ধীরে, বসন চাহিল ফিরে, হরি তাহে করে প্রত্যর্পণ। “হইয়াছ সবে ধন্য, মধুর বিহার জন্য প্রতীক্ষায় রই সতীগণ। অন্তরে করিয়া হরি, হরি পাদপদ্ম শ্মরি গৃহে সবে করিল গমন। দেবযজ্ঞ ব্ৰতধারী, চিনিয়া বংশীধারী, প্রত্যাহার করে ভগবান। বিষাদিত অতিমাত্র, পতি সবে কৃপা পাত্র, বিপত্নী করিলেন জ্ঞান। ভক্তিযোেগ হৃদে ধরি, অন্তরে প্রণমি হরি, কৃষ্ণপদ করিলেন সার। তখন ব্রাহ্মণকুল, বুঝিয়া আপন ভুল, সেই পদে করে নমস্কার। ইন্দ্ৰযজ্ঞ গােপগণ, যথাবিধি সম্পাদন, করিবারে করিলে প্রয়াস। সৰ্ব্ব যজ্ঞেশ্বর হরি, তাহাদের রােধ করি, জানালেন নিজ অভিলাষ । গোধন ব্রাহ্মণগণ, শৈলরাজি রম্য বন, তাহাদের করিয়া উদ্দেশ।
কৃষ্ণকথা ১০৫ আহুত সম্ভার ল'য়ে, সবে এক মন হয়ে, কর এই পুণ্য যজ্ঞ শেষ । ইন্থের হইল কোপ, বিনাশিতে যত গোেপ, বাত্যা বারি করিল প্রেরণ। বিপদ ভঞ্জন হরি, আপনার হস্তে ধরি, তুলিলেন গিরি গোবর্ধন। পৰ্ব্বত করে আসি, পরিতুষ্ট ব্রজবাসী, সপ্তদিন করিল নিবাস। বুঝিয়া আপন ভ্রান্তি, ইন্দ্রের হইল শান্তি, মেঘ শূন্য হইল আকাশ। ত্রিদিব ত্যজিয়া দেব, নমিলেন বাসুদেব, কৃষ্ণজ্ঞান করিলেন দান। দুগ্ধে অভিষেক করি, সুরভি হৃদয় ভরি, গাহিলেন গােবিন্দের গান । একাদশী উপবাসে, পূজা করি পীত বাসে, নিশা স্নানে নন্দ ধৃত যবে। যাইয়া বরুণ স্থানে, পিতারে ফিরিয়া আনে, ব্রজবাসী আনন্দিত সবে । শারদ পূর্ণিমা রাতি, ফুল্ল মল্লিকার ভাতি, প্রেমপূর্ণ কামহীন রাসে। যােগমায়া সমাশ্রিত, হরি অতি হরষিত, পূইতে ব্ৰত অভিলাষে।
১০৬ ললিত-গাথা শুনিয়া বাঁশীর ধ্বনি, শ্যাম পাশে, যত ধনি, হরি বিনা সকলেই মিছে। আপনারে নাহি জ্ঞান, হরি পদ শুধু ধ্যান, ব্যবধান মায়া রাখে পিছে। চাতুরির ছলে হরি, আবার পরীক্ষা করি, বুঝিলেন ‘পূর্ণ সমর্পণ। মণ্ডল আকার ধরে, বনমালী নৃত্য করে, রাস লীলা হ’ল সমাপন। রজনী প্রভাত যবে, কৃষ্ণের আদেশে সবে, গােপবধূ করিল প্রস্থান। মায়ামুগ্ধ গােপপতি, হৃদয় সরল অতি, পার্শ্বে পত্নী দেখিল শয়ান । নন্দে মহাসৰ্প গ্রাসে, সকলে কম্পিত ত্রাসে হরি করে চরণ প্রহার। তাহার স্পর্শের বলে, অভিশাপ যায় চলে সুদর্শন করে নমস্কার । গােপিকা বেষ্টিত হয়ে, রামকৃষ্ণ ভ্রাতৃদ্বয়ে করে যবে সুমধুর গান। শঙ্খচূড় যক্ষ বলে, খেদায় গােপিকা দলে কৃষ্ণ তার বধিলেন প্রাণ। বৃষভের রূপ ধরে, গোঠে আগমন করে নৃত্য করে অরিষ্ট ভীষণ।
কৃষ্ণকথা ১০৭, তাহারে করিয়া নাশ, নাশিল সবার ত্রাস আনন্দিত গােপ গােপীগণ ॥ ভীষণ তুরঙ্গবেশী, দেখি কৃষ্ণ দৈত্য কেশী অনায়াসে করিল নিধন। ময় পুত্র ব্যোম যবে, হরিল বালক সবে, বধে তারে শ্রীমধুসূদন ৷ বীণা হাতে দেবঋষি, নারদ গােকুলে পশি ভবিষ্যৎ নিবেদিল পায়। তবে কৃষ্ণ বলরাম, ত্যাগ করি ব্রজ ধাম চাহিলেন যেতে মথুরায় । কংসের আদেশ মত, বৃন্দাবনে সমাগত, হইলেন অর সুজন। অমােঘ প্রাক্তন গতি, নাহি জানি মুঢ়মতি কংস তারে করে সমর্থন। উঠি অঙ্কুরের রথ, সাধিবারে মনােরথ লইলেন নন্দের বিদায়। প্রবােধি রাখাল ধেনু, চুম্বিয়া কুঞ্জের রেণু, নমিলেন মা যশােদায় ॥ ব্রজলীলা সাঙ্গ করি, বলরাম সঙ্গে হরি, মথুরায় করিল গমন। নিরানন্দ গােচারণ, নিরানন্দ কুঞ্জবন, নিরানন্দ নলের ভবন। * সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.