Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Hajrat Mohammad Ed.4

Gupta,rampran · 2010/03/18

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ৰামলা এলিশে শ এশের ডিরেক্টর হয়
কর্তৃক বিদ্যালয় সমূহের লাইজেয়ী এ পু
শুকালে মােদিত
হজরত মােহা।
রামপ্রাণ গুপ্ত
তরুণ
পরিচালিত
১৩০৭
• • • • • • • • •
বেলগা
••
অ স্মৃতি লাইব্রেরী
চতুর্থ সংস্করণ
বরদা এজেন্সী,
কলেজ ট মার্কেট, কলিকাতা।
প্রাণ ও

মনােরঞ্জন গুপ্ত, বি-এসি,
বি, রাজেন্দ্র লাল টি,
কলিকাতা।
জ্যৈষ্ঠ,১৩৩৮
প্রিন্টার প্রশিণ পাল,
মেটকাফ প্রেস,
১৫নং নানা ত ট,
কলিকাতা-

4 ভূমিকা হজরত মােহাম্মদ’ ‘আরতি’ হইতে পুনর্মুদ্রিত হইল। পুনমুদ্রাঙ্কন কালে কিয়দংশ পরিবর্ধিত ও কিয়দংশ নূতন লিখিত হইল। নবনুর’-প্রকাশক যুক্ত মােহাম্মদ আসাদ আলী সাহেব হজরত মােহাম্মদ প্রকাশের সমস্ত ভার গ্রহণ করিয়া আমার কৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছেন। ইনি স্বতঃ- প্রবৃত্ত হইয়া ১ম সংস্করণের ভার গ্রহণ না করিলে হজরত মােহাম্মদ কখনও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হইত কিনা সরেহ। মহাপুরুষ মােহাম্মদ স্বীয় জীবনে অচল বিশ্বাস, সুগভীর নিষ্ঠা, কঠোর বৈরাগ্য এবং জ্বলন্ত উৎসাহের এক- শেষ প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার অলৌকিক গুণ- রাজি সকলেরই শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়। এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে হজরত মােহাম্মদের জীবনের রেখাপাত মাত্র হইয়াছে। যদি একজন পাঠকও এই গ্রন্থ পাঠ করিয়া তাঁহার গৌরবােল জীবন অনুশীলনে অনুরাগী হন, তাহা হইলেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে। কেদারপুর, টাঙ্গাইল, রামপ্রাণ গুপ্ত ১লা খব-১৩১১।

বঙ্গীয়
মােসলেম ভ্রাতৃবৃন্দকে
এই গ্রন্থ
সত্তাবের নিদর্শনস্বরূপ
উপহার প্রদান করিলাম।

হজরত মােহাম্মদ
**To bring about the restoration of Society to its
normal type, the Great Architect of the Universe
sends forth from time to time specially
authorised messengers to rouse, to stimulate
and to lead into the right way,
the erring sods of men"-
Blackie's Life of Burns
পয়গম্বর নােয়া সুবিশাল ভূখণ্ডের অধীশ্বর ছিলেন।
তদীয় অন্যতম পুত্র সাম (নােয়ার তিন পুত্র ছিল) তাহার
পরলােক গমনের পর সেই সুবিশাল সাম্রাজ্যের একাংশে
আধিপত্য স্থাপন করেন। সামের অধস্তন পঞ্চম পুরু-
ষের নাম যার বা আরব। আরব পিতার কনিষ্ট পুত্র
ছিলেন, এ কারণ পিতৃরাজ্য পরিত্যাগ করিয়া এক স্বতন্ত্র
রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তাহার শাসনাধীন দেশ তাঁহার
নামানুসারে আরব নামে প্রসিদ্ধ হয়। আরবদেশ

হনত মােহদ অনুৰ্বর ও বালুকাময় মরুস্থলীতে পরিপূর্ণ। পুরাকালে এই রুক্ষ-দৃশ্য দেশের অধিবাসিগণ সাতিশয় স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় ও পরজাতিদ্বেষী ছিল। এজন্য পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহের সঙ্গে আরবদেশের ঘনিষ্ঠ যােগ সংসাধিত হয় নাই। ইহার ফলে, আরবদেশ সুপ্রাচীন হইয়াও সভ্যতা আলােক লাভ করিতে অসমর্থ হইয়াছিল ; বহুকাল পৰ্যন্ত অজ্ঞান- তিমিরে আচ্ছন্ন ছিল। আরব জাতি খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরব জাতি সভ্যতার অতি নিম্নস্তরে অবস্থিত ছিল। এই সময় আরব জাতি বহু সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। এই সকল সম্প্রদায় স্ব স্ব প্রধান ছিল ; একে অন্যের আধিপত্য স্বীকার করিত না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য স্বতন্ত্র অধিপতি ছিল। তাহারা বংশানুক্রমে শাসনকার্য পরিচালন করিতেন। কিন্তু প্রজারঞ্জনই অধিপতিগণের প্রভুত্বের মূলভিত্তি ছিল। শাসনকার্যেও তাহাদিগকে প্রজার পরামর্শ গ্রহণ করিতে হইত। কোন বিজাতীয় শক্ত আরবদেশের দ্বারদেশে উপনীত হইলে অধিপতিগণ সম্মিলিত হইয়া তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইতেন। কিন্তু দেশমধ্যে এক দণ্ডের

হজরত মােহা
জন্যও আত্মকলহের বিরাম ছিল না। এক সম্প্রদায় অন্য
সম্প্রদায়ের ধ্বংসের জন্য সর্বদাই সচেষ্ট থাকিত। আরব
দেশীয় লােকের বীরত্বের অভাব ছিল না। ব্যান্ত্রের
বলের সঙ্গে তাহাদের বীরত্বের তুলনা করা যাইতে পারে।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে কলহ বর্ধন, নররক্তে পৃথিবীরঞ্জন
এবং দুর্বলের সর্বস্ব লুণ্ঠনই তাহাদের বীরত্বের সার্থকতা
ছিল। এই সময় আরবদেশ অজ্ঞানতিমিরে আচ্ছন্ন ছিল।
দাম্পত্য বন্ধন অত্যন্ত শিথিল এবং নৈতিকজীবন ঘাের
দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। নরনারী সুরাপানে উম্মত্ত হইয়া কাবা
মন্দিরের চতুর্দিকে উলঙ্গভাবে নৃত্য করিত। পুরুষ
সমাজের পণ্ডবৎ আচরণে নারীজাতির দুর্দশার সীমা ছিল
। বহুবিবাহ, দাসীসংসর্গ এবং যথেচ্ছা স্ত্রী পরি-
ত্যাগের কোন বাধাই ছিল না। কি পুরুষ, কি স্ত্রীলােক,
সকলেই দাসদাসিগণের সঙ্গে নিষ্ঠুরাচরণের একশেষ
* আরব দেশের সর্বপ্রধান ভজনালয়। একেশ্বরবাদের আদি
এবৰ্ত্তক ইব্রাহিম এই মন্দির স্থাপন করেন ; এক এবং অদ্বিতীয়
নিরাকার পরমেশ্বরের উপাসনার জন্যই এই মন্দির নির্মিত হইয়া-
ছিল। কিন্তু কালক্রমে আরববাসীরা পৌত্তলিক ধর্মাবলম্বী হইয়া
উঠে, এবং কাবা মন্দিরে বহু সংখ্যক দেব-দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়া
।তাদের পূর্ণাকরিতে আরম্ভ করে
১১

হরত মােহা করিত। তৎকালের আরব সমাজের ধর্মজীবন নৈতিক- জীবন অপেক্ষাও অধিক শােচনীয় ছিল। কাষ্ঠ এবং লােষ্ট্রও দেবতা বলিয়া, পূজিত হইত। এক কোরেশ সম্প্রদায়েরই দেবতার সংখ্যা পনের শতের নুন ছিল না। এ ধৰ্ম্ম কুসংস্কারবিদ্ধ ও আত্মার অবনতিকর হইলেও আরবগণের ধর্মবিশ্বাস সুগভীর ছিল। তাহাদের প্রকৃতি সাতিশয় তেজস্বিনী ছিল। তেজস্বিনী প্রকৃতির সঙ্গে সুগভীর ধর্মবিশ্বাস সম্মিলিত ছিল বলিয়া আরবগণ ধর্মের নামে অনেক সময় উন্মত্ত হইয়া উঠিত। পূর্বপুরুষ আরবদেশের ঈদৃশ দুরবস্থার সময় ৫৭০ খৃষ্টাব্দে মহাপুরুষ মােহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন। মােহাম্মদের জন্মপরিগ্রহের পূর্বেই তদীয় পিতার দেহান্তর হইয়াছিল। মােহাম্মদ কোরেশ সম্প্রদায়ের হাশিমবংশ সস্তৃত ছিলেন। তাঁহার মাতার নাম আমিনা। আমিনা রূপবতী, গুণ- বতী ও বুদ্ধিমতী রমণী ছিলেন। তিনিও মােহাম্মদের অতি শৈশবকালেই পরলােক গমন করেন। পিতৃমাতৃ- হীন মােহাম্মদের লালনপালনের ভার তদীয় বৃদ্ধ পিতামহ আবদুল মুতালিবের উপর পতিত হয়। বৃদ্ধ আবদুল হজরত মােহাম্মদ মুতালিবের হৃদয় বড় স্নেহপ্রবণ ছিল। মােহাম্মদের পিতার নাম আবদুল্লা; আবদুল্লা অতি সজ্জন ছিলেন। তিনি পিতার কনিষ্ঠ পুত্র এবং তাহার শেষ বয়সের স্নেহ- পুত্তলি ছিলেন। তাহার অকালমৃত্যুতে বৃদ্ধ পিতার হৃদয় শােকে ভাঙ্গিয়া পড়ে। তাহার তাদৃশ মর্মভেদী শশাকের সময় মােহাম্মদের সুন্দর সহাস্যমুখ শান্তি আনয়ন করিয়াছিল। শিশুর ভাবভঙ্গী, আকার-প্রকার বৃদ্ধের স্মৃতিতে বালক আবদুল্লাকে জাগাইয়া দিত। তিনি শিশুর মুখে চোখে আবদুল্লার প্রতিচ্ছায়া দেখিয়া নয়নের বারি নয়নেই নিবারণ করিতেন। তিনি পরিজনদিগকে উদ্দেশ করিয়া বলিতেন, তােমরা মােহাম্মদকে সযত্নে প্রতিপালন করিও। এই সুন্দর শিশুই আমার বংশের সৰ্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। দুর্ভাগ্যক্রমে মােহাম্মদ বাল্যকালেই স্নেহশীল প্রতিপালক পিতামহকেও হারাইয়াছিলেন। মৃত্যুকালে পৌকে স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র আবুতালেবের হস্তে সমর্পণ করিয়া যান। আবুতালেব ন্যায়বাদী এবং ধীমা ছিলেন। তিনি পিতৃমাতৃহীন ভ্রাতুস্পুত্রের প্রতি পালন জন্য আরবদেশের তৎকালােচিত কোন বন্দো- বস্তেরই ক্ৰটী করেন নাই। তিনি তাহাকে অপত্য-নির্বি- শেষে পালন করিয়াছিলেন।

প্রথম জীবন আবুতালেবের আশ্রয়ে মােহাম্মদের বাল্যকাল অতি- বাহিত হয় ; তিনি কৈশােরে পদার্পণ করিয়াই বাণিজ্যো- পলক্ষে সিরিয়া রাজ্যে গমন করেন। সিরিয়া গমনকালে তাহার বয়ঃক্রম চতুর্দশ বৎসরের অধিক ছিল না ; বিজাতীয় ভাষার বিন্দুবিসর্গও তাহার বােধগম্য ছিল না। এ কারণ সিরিয়ার সমস্তই হার নিকট দুর্বোধ্য বলিয়া প্রতীয়মান হইত। তথাপি এখানেই খৃষ্টবিশ্বাসীদের সংসর্গে ভঁহার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হইয়াছিল। এখানে আঁহার তরল হৃদয়ে যে ভাববীজ উপ্ত হয়, তাহাই কাল- ক্রমে ক্রমবিকাশের নিয়মে পরিবর্ধিত হইয়া সংসার-তাপ- ক্লিষ্ট অসংখ্য নরনারীর আশ্রয়স্থল ছায়া-শীতল মহামহী- রুহে পরিণত হয়। কোন বিদ্যালয়ে মােহাম্মদের শিক্ষা লাভ হয় নাই। তাঁহার আবির্ভাবকালে আরবদেশে লিখনপ্রণালী প্রবর্তিত ছিল। কিন্তু উহার শৈশবাবস্থা তখনও অতিক্রান্ত হয় নাই। মােহাম্মদ লিখিতে পারিতেন না। প্রকৃতির ১।

হরত মােহদ গ্রন্থপাঠেই তাহার শিক্ষালাভ হইয়াছিল। কিন্তু এই অনন্ত বিশ্বের যে কণামাত্র প্রত্যক্ষভাবে তদীয় দৃষ্টির গগচরীভূত হইত, প্রকৃতির রহস্য নির্ণয় জন্য তাহাই তাহার আয়ত্ত ছিল, তদতিরিক্ত ক্ষেত্রে তাহার প্রবেশপথ রুদ্ধ ছিল। মানবমস্তিষ্ক-উদ্ভাবিত গ্রন্থরাজি তাঁহার জ্ঞা-সম্পদ পরিবর্ধিত করিতে পারে নাই। পূৰ্বগামী আৰ্য্যগণের সঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার তাহার নিকট অর্গলব ছিল; নিঃসঙ্গ মােহাম্মদ মরুস্থলীপূর্ণ আরবদেশের ক্রোড়ে নিজের চিন্তা ও চতুর্দিক প্রাকৃতিক দৃশ্য লইয়াই আবিষ্ট থাকিতেন, এবং এই তন্ময়তাই তাঁহার চিত্তবিকাশের সেম্বরূপ হইয়াছিল। মােহাম্মদ বাল্যকাল হইতে চিন্তাশীল, সত্যনিষ্ঠ ও কর্তব্যপরায়ণ বলিয়া পরিচিত ছিলেন। তাঁহার কাৰ্য্য, কক্য ও চিন্তা সকলই সত্যানুপ্রাণিত ছিল। তিনি ধনও নিরর্থক বাক্যব্যয় করিতেন না। তিনি যাহা কিছু কতেন, তাহাই কাৰ্য্যোপযুক্ত, জ্ঞানগর্ভ এবং সারল্যপূর্ণ কলয়া প্রতীয়মান হইত। অকাপট্য, গান্তীৰ্য্য ও আন্ত- কিতা তাঁহার চরিত্রের বিশেষত্ব ছিল, কিন্তু তাহার প্রকৃতিতে অমায়িকতা, বন্ধুবাৎসল্য এবং রঙ্গরসেরও অভাব ছিল না। আদ্যকালের মােহাম্মদকে স্মরণ করিলে হজরত মােহাম্মদ আমাদের মানসপটে একটা সুন্দর নবীন যুবকের চিত্র অঙ্কিত হইয়া থাকে। এ যুবকের সর্বাঙ্গ জীবিকা অর্জনের পরিশ্রমে স্বেদসিক্ত, চিত্ত নবাগত ভাবের আবেশে অশান্ত, হৃদয় পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার অভাবে অমার্জিত ; কিন্তু তাহার বদনমণ্ডল জ্যোতির্ময় এবং তেজোদীপ্ত । প্রথম পরিণয় মােহাম্মদ যৌবনে পদার্পণ করিয়া খাদিজা নাম্নী এন- বতী বিধবা রমণীর কাৰ্যাধক্ষ্যের পদে নিয়ােজিত হন। তিনি তাঁহার কাৰ্যে পুনৰ্বার সিরিয়া রাজ্যে গমন কন্মে। সেখানে তিনি আপন কর্তব্য কৰ্ম্ম বিশ্বস্তভাবে যােগ্যচা- সহকারে সম্পাদন করিয়াছিলেন। তাহার নির্মল চরিত্র ও কর্তব্যনিষ্ঠা খাদিজার হৃদয়ে শ্রদ্ধার সঞ্চার করিয়াছিন এই শ্রদ্ধা ক্রমে অনুরাগে পরিণত হয়। খাদিজা অতি গুণবতী রমণী ছিলেন। তাঁহার অঙ্গুলিস্পর্শে মােহাম্মদে হৃদয়-তন্ত্রীতে অপূর্ব রাগিণী বাজিয়া উঠে। তৎকাৰে তিনি পঞ্চবিংশতি বর্ষের যুবক; খাদিজার বয়া চত্বারিংশৎ বর্ষ অতিক্রম করিয়াছিল। কিন্তু গুণমুখ মােহাম্মদ বয়সের ব্যবধান বিস্মৃত হইয়া তাহাকে পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ করেন। এই যে প্রেমের অভিসিঞ্চনে হজরত মােহামদ মােহাম্মদের হৃদয় ফুলের মত প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে, তাহা যতদিন খাদিজা জীবিত ছিলেন, ততদিন একদিনের জন্যও মলিন হয় নাই। তাহাদের প্রেমসিক্ত হৃদয় সর্বক্ষণ সদ্যোবিকশিত পুষ্পমঞ্জরীর ন্যায় সৌরভপূর্ণ থাকিত। সেই শিথিলবন্ধন দাম্পত্য-প্রেমের যুগে মােহাম্মদের এক- নিষ্ঠ প্রেম বিস্ময়ের বিষয় ছিল। * খাদিজা মােহাম্মদের সহিত পরিণীতা হইবার পর ২৫ বৎসর জীবিত ছিলেন। তাঁহাদের দাম্পত্য জীবন বড় মধুর ছিল। সেই বহুবিবাহের যুগে মােহাম্মদ তাহার জীবদ্দশায় দ্বিতীয় দার পরি- গ্রহ করেন নাই। খাদিজা বহুগুণালঙ্কতা সাধ্বী রমণী ছিলেন। তাহার পরলােক গমনের পর মােহাম্মদ আয়েসাকে বিবাহ করেন। আয়েসাও পতিপরায়ণা গুণবতী পত্নী ছিলেন। তিনি একদিন কথাপ্রসঙ্গে মােহাম্মদকে বলেন, “আমি কি খাদজি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নহি? তিনি বৃদ্ধা ও বিধবা ছিলেন। আমি কি খাদিজা অপেক্ষা আপনার অধিক প্রিয় নহি ?” মােহাম্মদ প্রত্যুত্তরে বলেন, “ঈশ্বর সাক্ষী, ইহা তােমার ভুল, যখন কেহ আমার বাক্যে বিশ্বাস করে নাই তখন খাদিজা আমার অনুগামিনী ছিলেন; সেই দুঃসময়ে সমগ্র পৃথিবীতে খাদিজা আমার একমাত্র সঙ্গিনী হিতাকাজিনী ছিলেন।” ফলতঃ খাদিজা তাহার জীবনের আশা ও সান্ত্বনা স্বরূপ ছিলেন। মােহাম্মদ খাদিজার মৃত্যুর পর বহুবিবাহ করিয়াছিলেন। খৃষ্টান ;

ইলাম ধনবতী খাদিজার সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ায় মােহাম্মদের অর্থের অভাব বিদূরিত হইয়াছিল ; তিনি বিষয়-কৰ্ম ত্যাগ করিয়া আধ্যাত্মিক উন্নতিসাধন জন্য কায়মনােবাক্যে প্রবৃত্ত হন। সৃষ্টিরহস্যের অন্তস্তলে কোন্ মহাশক্তি বিরাজিত রহিয়াছে, তাহার স্বরূপ কি, মানবের সুখ দুঃখ, বিপদ সম্পদের আবর্তন কোন্ লেখকগণ তজ্জন্য তাহার যথেষ্ট নিন্দা করিয়াছেন। আমীর আলী প্রভৃতি আধুনিক মােসলমান লেখকগণ নানা যুক্তি প্রদর্শন করিয়া তাহার কাৰ্য্যের সমর্থন করিয়াছেন। যুবক মােহাম্মদ প্রৌঢ়া খাদি জাকে বিবাহ করেন। মুর সাহেব লিখিয়াছেন, মােহাম্মদ সুদীর্ঘ পঞ্চবিংশতি বৎসর একমাত্র খাদিজার প্রেমে পরিতৃপ্ত ছিলেন। খাদিজা মােহাম্মদের জীবদ্দশায় পরলােক গমন করেন। তখন মােহাম্মদের বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বৎসর অতিক্রম করিয়াছিল। খাদি- জার মৃত্যুর পর মােহাম্মদ সৌদা নামক এক জন প্রৌঢ়া বিধবাকে বিবাহ করেন। অতঃপর মােহাম্মদ বালিকা আয়েসাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন। আয়েশা মােহাম্মদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচার- বন্ধু আবুবকরের কন্যা। তাঁহার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করিবার কল্পনাতেই মােহাম্মদ আয়েসার পাণিপীড়ন করেন। ইহার পর তিনি ওমরের বিধবা কন্যা হাফসাকে বিবাহ করেন।

জরত মােহা কারণে হইয়া থাকে, বিপুল বিশ্বের নানা বৈপরীত্য ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যসুত্র কোথায় নিহিত আছে, এই সব তত্বানুসন্ধানেই তিনি ধ্যানরত তাপসের ন্যায় সমা- হিত হইতে আরম্ভ করেন। তিনি এরূপ এক সৌন্দৰ্য- ওমর প্রথমে আবুবকর এবং তারপর ওসমানের সঙ্গে আপনার কন্যার বিবাহের প্রস্তাব করেন। কিন্তু তাহারা উভয়েই সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ইহাতে তাহাদের মধ্যে এব বিবাদের সূচনা হয়। এই বিবাদ অঙ্কুরেই বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে মােহাম্মদ নিজে হাফসার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। হাফসার সঙ্গে বিবাহের পরবৎসর মােহাম্মদ হিন্দ-উস-সালমা ও জয়নব উম- উল-মসাকি (ইনি অতিশয় দয়াবতী ছিলেন বলিয়া লােকে ইহাকে গরিবের মা বলিত) নাম্নী দুই জন অনাথা মোসলমান রমণীকে বিবাহ করিয়া আশ্রয় প্রদান করেন। অতঃপর জৈয়েদ নামক এক জন মােসলমানের পরিত্যক্তা পত্নীর সঙ্গে মােহাম্মদের পরিণয় ক্রিয়া সম্পা- দিত হয়। জৈয়েদ মােহাম্মদের পােয্যপুত্র ছিলেন। এজন্য মােহাম্মদ তাঁহার পরিত্যক্তা পত্নীকে বিবাহ করিয়া তৎকালের আরবসমাজে অপবাদগ্রস্ত হন। এই বিবাহ সম্বন্ধে আমীর আলী লিখিয়াছেন, পৌত্তলিকেরা বিমাতা এবং শাশুড়ির সঙ্গে বিবাহ অনুমােদন করিত কিন্তু পােষ্যপুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করা তাহাদের সমাজে অতিশয় নিন্দনীয় ছিল। তাহাদের বিশ্বাস ছিল যে পােয্যপুত্র গ্রহণে একজাতত্ব ঘটে। আরবগণের তাদৃশ ভ্রান্ত বিশাস দূর করিবার ১

হজরত মােহাম্মদ
লােকের আভাস পাইয়াছিলেন, যেখানে সমস্ত বিশ্বের
অসংখ্য ধ্বন্যাত্মক সঙ্গীত এক মহাশক্তির পদতলে লয়
প্রাপ্ত হইয়া শ্রোতামাত্রেরই হৃদয় পুলকাবিষ্ট করিতেছে।
এই অপরূপ সৌন্দৰ্য্যলােকে উত্তীর্ণ হইবার জন্য তিনি
অহােরাত্র ধ্যানমগ্ন থাকিতেন। এই ভাবে পঞ্চদশ বর্ষ
অতিবাহিত হয়। মােহাম্মদ ৬০৯ খৃষ্টাব্দের রমজান মাসে
নির্জন গিরিকরে আত্মচিন্তা করিতে মক্কার নিকটবর্তী
হরপৰ্ব্বতে গমন করেন। খাদিজা তাঁহার সঙ্গিনী ছিলেন।
ছিল। *
জন্য কোরাণের ত্রয়ত্রিংশৎ অধ্যায়ের কতিপয় বচন প্রচারিত হইয়া-
* এই বিবাহ সম্বন্ধে মােহাম্মদের পবিত্রতার একটা
সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ এই যে, ঐ বিবাহ অস্তেও জৈয়েদ মােহাম্মদের
পূৰ্ব্ববৎ অনুরাগী ছিলেন। মােহাম্মদের আর একজন পত্নীর নাম
জোয়াইবিয়া। ইনি একটা যুদ্ধ উপলক্ষে মােহাম্মদের হস্তে বন্দী
হন। বন্দী রমণী মােহাম্মদের সদ্ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে পতিত্বে
বরণ করেন। মােহাম্মদ একজন ইহুদি রমণীকে বিবাহ করেন।
রমণীও যুক্ত উপলক্ষে মােহাম্মদের হস্তে বন্দী হন। মােহাম্মদের
এই পত্নীর নাম ছিল সফিয়া । মােহাম্মদ সৰ্বশেষে মহাবীর খালেদের
জনৈক আত্মীয়াকে (মৈমুনাকে) বিবাহ করেন। খালেদের সহিত
ঐতিসূত্রে আবদ্ধ হইবার উদ্দেশ্যেই মােহাম্মদ এই বৃদ্ধা রমণীর (বিবাহ
কালে ইহার বয়স পঞ্চাশ বৎসর অতিক্রম করিয়াছিল) পাণিগ্রহ

তাঁহারা হরপৰ্বতে একমাস অবস্থান করেন। এই সময় মােহাম্মদ একদা খাদিজাকে আনন্দবিহ্বল হইয়া বলেন, “আমি পরমেশ্বরের অনির্বচনীয় কৃপা লাভ করিয়াছি, আমার সমস্ত সংশয়-অন্ধকার বিদূরিত হইয়াছে, আমার মানসনয়নে এক অপরূপ আলােক উদ্ভাসিত হইয়াছে। কাবা মন্দিরের দেবমূর্তি সকল নির্জীব পদার্থ মাত্র। পরমেশ্বরই মনুষ্যের একমাত্র উপাস্য। তিনি মহান, জীবন্ত ও সত্যস্বরূপ। পরমেশ্বরই সমস্ত বিশ্বের একমাত্র নিয়ন্তা।” মােহাম্মদের ধ্যাননিরত অনন্যসাধারণ হৃদয়ে এই মহাসত্য প্রকটিত হইয়া তাহাকে বিমল আনন্দরসে পরিপ্লুত করিল; তিনি মনুষ্যমাত্রকেই এই আনন্দের অংশ করিতে ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন। তিনি একেশ্বর- কোন কোন ঐতিহাসিক মােহাম্মদের একজন গ্রীক জাতীয় উপপত্নী ছিল বলিয়া অপবাদ দিয়াছেন। কিন্তু এ অপবাদ অমূলক বলিয়া আমীর আলী সাহেব প্রদর্শন করিয়াছেন। আমরা সুপ্রসিদ্ধ হালামের বাক্যের মানুবাদ প্রদান করিয়া এই প্রসঙ্গের উপসংহার করিতেছি। কোরাণ পাঠ করিলে প্রত্যেক ব্যক্তির মনে এরূপ ধারণা জন্মে যে, এই গ্রন্থ আদ্যন্ত আত্মনিগ্রহ এবং নিষ্ঠার গৰ দ্বারা অনুপ্রাণিত। বস্তুতঃ কোন নবধর্ম প্রবর্তক বিলাসব্যসনে মত্ত হইয়া স্থায়ী ফল লাভ করিতে সমর্থ। করেন।

হজরত মােহাম্মদ বাদ ও বিশুদ্ধ নীতি প্রচার করিতে উখিত হইলেন। এই নব ধর্মের নাম ইসলাম। প্রথমে ইসলাম অতি মন ইসলাম শব্দের অর্থ ঈশ্বর নির্ভর। কাহারও কাহারও মতে ইসলাম শব্দের অর্থ পরিত্রাণ। “পরমেশ্বর ব্যতীত কোন উপায় নাই এবং মােহাম্মদ তাহার প্রেরিত ও ভৃত্য,” ইহাই ইসলামধর্মের মূল সূত্র। সাধু ভজনা, মূর্তি নির্মাণ, ইসলামধর্ম-বিরুদ্ধ। “পরমেশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়, তিনি শক্তিমান্, দয়ালু ও পরম প্রেমিক, মনুষ্য মাত্রেই সমান এবং দয়ার পাত্র, প্রবৃত্তি সংযম করা আবশ্যক, ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞ অন্তরে স্মরণ করা কর্তব্য, মনুষ্য মাত্রেই স্বীয় দুষ্কর্মের জন্য পরলােকে দায়ী” ইত্যাদি বিশ্বাসই ইসলামধর্মের ভিত্তিভূমি। উপা- সনা, উপবাস, দান ও তীর্থপৰ্যটন ইসলামধৰ্মচার উপায় বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে। এতন্মধ্যে উপাসনাই ইসলামধর্মাবলম্বীর সর্ব প্রধান কর্তব্য কর্ম। মােসলমান সমাজে দৈনিক পাঁচ বার ঈশরাে- পাসনার নিয়ম প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য মােহাম্মদ ঈশ্বরের আদেশ- বাণী লাভ করিয়াছিলেন। তিনি উপাসনার উপকারিতা সম্বন্ধে পুনঃ পুনঃ উপদেশ প্রদান করিয়াছেন। তিনি এক স্থানে বলিয়া- ছেন, “দেবদূতগণ দিবারাত্রি তােমাদের নিকট আবির্ভূত হইয়া থাকেন। দিবাচর দেবদূতগণ রাত্রিকালে স্বর্গে প্রত্যাবৃত্ত হইলে পরমেশ্বর জিজ্ঞাসা করেন, জীবসকলকে কি অবস্থায় দেখিয়া আসিয়াছ? তাহারা উত্তর করেন, আমরা মর্ত্যে গমন করিয়া জীবসকলকে উপাসনাত দেখিয়াছিলাম, ফিরিয়া আসিবার সময়ও ২২ হরত মােহন গতিতে আরবসমাজে প্রবিষ্ট হইয়াছিল, মােহাম্মদ লােকলােচনের অন্তরালে নির্জনে কতিপয় অন্তরঙ্গ নবীন যুবককে ধর্মোপদেশ দিতেন। একাদিক্রমে তিন বৎসর কাল ধর্মপ্রচারের পরও তাঁহার শিষ্যসংখ্যা চল্লিশের অধিক হয় নাই। তাহাদিগকে উপাসনাত দেখিয়া আসিয়াছি।” তিনি আর এক স্থানে বলিয়াছেন, “সর্বদা উপাসনা করিও, উপাসনা আমাদিগকে পাপ ও দুস্কাৰ্য্য হইতে রক্ষা করে। ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ পরম পবিত্র কর্ম।” একজন পাশ্চাত্য লেখক বলিয়াছেন, “মােসল- মানের প্রার্থনা-মন্দির মানবহন্তে নির্মিত নহে। ঈশ্বরসৃষ্ট পৃথিবীর সর্বস্থানে অথবা তাহার আকাশতলে মােসলমানের উপাসনা মন্দির। ইহা ইসলামধর্মের গৌরবের বিষয় সন্দেহ নাই। বস্তুতঃ মােসল- মানের নিকট স্থানাস্থানভেদ নাই ; উপাসনার সময় সমাগত হইলে সর্বত্র ব্যাকুল হৃদয়ে ঈশ্বরের গুণানুবাদ করা যাইতে পারে। ইহা, ইসলামধর্মের একটি বিশেষত্ব।” ইসলামধর্মানুমােদিত ঈশ্বর স্তুতি অতিশয় মনােহর, আমরা উহার শেষাংশ হইতে কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করিতেছি। “পরমেশর ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই। তিনি জীব-চিরকাল জীবন্ত। তাহার নিদ্ৰা নাই, তন্দ্রাও নাই। স্বর্গ মর্ত্য এবং স্বর্গ মর্তের যাবতীয় পদার্থ তঁাহার। তাহার অনুমতি ব্যতীত কে তাহার মহিমা ঘােষণা করিতে পারে? ভূত ভবিষ্যৎ সমই তাহার নখদর্পণে , কিন্তু তিনি আত্মম্বরূপ সম্বন্ধে যাহা প্রকাশ প্রথম প্রার মােহাম্মদের অন্যতম শিষ্যের নাম আবুবকর ছিল। আবুবকরের ধর্মোৎসাহ সাতিশয় প্রবল ছিল। তিন বৎসর পরে ইসলামধৰ্ম্মবিশ্বাসীর সংখ্যা চল্লিশ পূর্ণ হইলে তিনি প্রকাশ্য ভাবে ধর্মপ্রচার করিবার জন্য মােহাম্মদকে অনুরােধ করিলেন। প্রিয়তম শিষ্যের ঐকান্তিক অনুরােধ উপেক্ষা করিতে না পারিয়া মােহা- করিয়াছেন, তাহা ব্যতীত তাহার অন্য কোন তই মানবের জানায় নহে। স্বর্গে মর্ত্যে তাহার প্রভুত্ব, এ প্রভুত্ব রক্ষার জন্য তাঁহাকে কষ্ট স্বীকার করিতে হয় না। তিনি মহান্ ও শক্তিমান্।” আমরা আর একস্থান হইতে উদ্ধৃত করিতেছি। “হে পরমেশ্বর, আমাকে তােমার প্রেম বিতরণ কর, যেন আমি তােমাকে ভক্তি করিতে পারি, যেন তােমার প্রিয় কাৰ্য্য সাধন করিতে পারি। আমার নিকট তােমার প্রেমকে আত্মপ্রেম অপেক্ষা গরীয়ান কর।” দেবদূতগণ মানবের নিকট ঈশ্বরের বার্তা বহন করিয়া আনেন, ধর্মপ্রচার জন্য সময় সময় “প্রফেটগণ” (Prophets) জন্মগ্রহণ করেন, পরলােকে পাপ-পুণ্যের তিরস্কার ও পুরস্কার হইয়া থাকে, মােহাম্মদ এ সকল মতও প্রচার করিয়াছেন। অদৃষ্টবাদ, পুনরুত্থান ( Besurrection of the body) এবং শেষ বিচার দিন ইত্যাদি তত্ত্বও ইসলামধর্মের অঙ্গীভূত। মােহাম্মদের প্রচারিত একেবাদ তাহার নিজের উদঘাটিত ২৫ হজরত মােহাম্মদ স্মদ সৰ্বজন সমক্ষে স্বীয় ধর্মমত ঘােষণা করিবার জন্য আরবদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ভজনালয় কাবা মন্দিরে গমন করি- লেন। আবুবকর প্রথমতঃ একেশ্বরবাদের মহিমা বর্ণনা মূতন তত্ব নহে। এ সম্বন্ধে আমরা কোরাণের উক্তি উদ্ধৃত করিতেছি। “ইব্রাহিমের ধর্ম সত্য, ইব্রাহিম অনেকেশ্বরবাদী ছিলেন না। ১৩২। বল, আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করিলাম এবং যাহা ইব্রাহিমের প্রতি ও যাহা এসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাহাদের সন্তানগণের প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে এবং যাহা অপর তত্ত্ববাহকগণের প্রতি তাঁহাদের ঈশ্বর কর্তৃক প্রদত্ত হইয়াছে তৎ- সমুদয়ের প্রতি বিশাস স্থাপন করিলাম। তাহাদের কাহাকেও প্রভেদ করিতেছি না এবং সেই ঈশ্বরের অনুগত। ১৩৩। মুসায়ী ও ঈসায়ী লােকেরা বিশ্বাস করিলে আলােক পাইতে পারে । ১৩৪।” (গিরিশবাবুর কোরাণের বঙ্গানুবাদ, ২য় অধ্যায়।) ইসলামধর্মের নীতিও অতি বিশুদ্ধ। “অন্যের নিকট তুমি যেরূপ ব্যবহার পাইতে ইচ্ছা কর, তুমিও অন্যের প্রতি সেইরূপ ব্যবহার করিও।” ইসলামধর্মাবলম্বীকে এই মহৎ বাক্যই সংসার সমুদ্রে দিগ নির্ণয়-যন্ত্ররূপে ব্যবহার করিতে মােহাম্মদ উপদেশ প্রদান করিয়া- ছেন। “কাহারও সঙ্গে ব্যবহারকালে স্থায়ুপথভ্রষ্ট হইও না।” এই মহাক্যও মােহাম্মদের উপদেশ। দানধর্থ আচরণ জন্য মােহাম্মদ মােসলমানদিগকে পুনঃ পুনঃ উত্তেজিত করিয়াছেন, এবং মনুষ্যমাত্ৰকেই তাহার আয়ের এক নির্দিষ্ট অংশ পরােপকারার্থে হজরত মােহাম্মদ করিয়া তারপর পৌত্তলিকধর্মের দোষপ্রদর্শন করিলেন। উগ্ৰস্বভাব আরবগণ স্বধর্মের নিন্দা শ্রবণে ক্রোধান্ধ হইয়া বিধর্মীদিগকে ধরাপৃষ্ঠ হইতে অপমৃত করিবার প্রদান করিতে অনুশাসন করিয়াছেন। ঈশ্বরসৃষ্ট জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন না করিলে, কেহ তাহার প্রেমলাভ করিতে পারে না, ইহাই মােহাম্মদ-কথিত দান-মাহাত্ম। মােহাম্মদ একদিন উপদেশ দান কালে বলিয়াছিলেন, “সৃষ্টিকালে পৃথিবী কম্পিত হইতেছিল। একারণ ঈশ্বর পৃথিবীর উপর পর্বতের গুরুভার স্থাপন করিয়া উহাকে সুদৃঢ় করিয়াছিলেন। পৰ্বত অপেক্ষা লৌহ অধিক শক্তি শালী, কারণ, লৌহের আঘাতে পৰ্বত ভগ্ন হইয়া পড়ে। লৌহ অপেক্ষা অগ্নি অধিক শক্তিশালী, কারণ, অগ্নি লৌহকে দ্রব করে। অগ্নি অপেক্ষা জল অধিক শক্তিশালী, কারণ, জল অগ্নিকে নির্বাপিত করে। বায়ু জল অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী, কারণ, বায়ু জলকে সঞ্চালিত করে। কিন্তু যদি কোন সজ্জন দক্ষিণ হস্তে দান করিয়া বাম হস্তকে তাহা জানিতে না দেন, তবে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ, কারণ, তাঁহার নিকট সকলেই পরাজিত হয়।” ইলামধর্মের উপদেশ সর্বব্যাপী। প্রতিবেশীর সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করা আবশ্যক কোরাণে তৎসম্বন্ধেও উপদেশ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। আমরা কিয়দংশ উদ্ধৃত করিতেছি। “বিশ্বাসিগণ, তােমরা আপনগৃহ ব্যতীত (অন্য ) গৃহ, যে পর্যন্ত তাহার স্বামীর অনুমতি প্রার্থনা ও সালাম না কর, প্রবেশ করিও না। ২৭।” (গিরিশবাবুর কোরাণের বঙ্গানুবাদ, ১১শ হরত মােহাম্মদ উদ্দেশ্যে তাহাদিগকে নিষ্ঠুরভাবে প্রহার করিতে আরম্ভ করিল। কাবা মন্দিরে কোলাহল উখিত হইল। দয়ার্দ্রচিত্ত অধ্যায়।) মােহাম্মদের আবির্ভাব কালে আরব রমণীর অবস্থা অতি শশাচনীয় ছিল। আরবসমাজ ব্যভিচার, দাসী-সংসর্গ, সাময়িক বিবাহ ও বহুবিবাহ দোষে কলঙ্কিত ছিল। পিতা-মাতা আবশ্যক মত কন্যাসন্তানকে গৃহপালিত পশুবৎ বিক্রয় করিতে কুণ্ঠিত হইত না, আরব রমী পিতা বা স্বামীর সম্পত্তি স্বরূপ ছিল। তাহারা স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যান্য তক্ত সম্পত্তির ন্যায় উত্তরাধিকারীর হস্তগত হইত। এজন্য সৎপুত্রের সঙ্গে বিমাতার বিবাহের ন্যায় বীভৎস প্রথা আরবসমাজে দেখা যাইত। আরব পিতামার অনেক সময় কন্যাসন্তানকে মৃত্তিকাগর্ভে প্রােথিত করিয়া বধ করিত। আরব- সমাজের নারীজাতির কোন অধিকারই ছিল না। ফলতঃ তাহাদের দুর্দশার সীমা ছিল না। মােহাম্মদ নারীজাতির উন্নতি বিধানকল্পে বহু ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। মােহাম্মদের সমস্ত ব্যবস্থার মূলে নারী- জাতির প্রতি সম্মানের ভাব অন্তর্নিহিত রহিয়াছে। ব্যভিচার নিবারণ কল্পে অবরােধপ্রথা প্রবর্তিত করা হইয়াছিল। মােহাম্মদ দাসী-সংসর্গ নিষেধ করিয়াছিলেন। “বিশ্বাসী শুদ্ধাচারিণী রমণীকে ও তােমাদের পূর্ববর্তী গ্রন্থাধিকারীদিগের শুদ্ধাচারিণী কন্যাকে বিবাহ করিবার জন্য তােমাদিগকে অনুমতি দেওয়া হইতেছে। তােম রা গুপ্ত-প্রণয়- লােলুপ ব্যভিচারী না হইয়া এবং উপপত্নী গ্রহণ না করিয়া শুদ্ধাচারে কালযাপন পূর্বক তাহাদিগকে তাহাদের যৌতুক দান করিলেই এরূপ হজরত মােহাম্মদ তমিম পরিবারের লােকেরা দৌড়াইয়া আসিয়া তাহা- দিগকে শক্রর কবল লইতে রক্ষা করিল। তাহাদের তাদৃশ করিতে পার। ৭। (কোরাণ, ৫ম অধ্যায়)। দাসী-সংসর্গ নিষিদ্ধ হইয়াছিল। এই নিষেধবিধি কার্যকরী করিবার জন্য দাসী-বিবাহ অবৈধ বলিয়া ঘােষণা করা হইয়াছিল। (কোরাণ, ৪র্থ অধ্যায়, ২৫শ আয়েত)। মােহাম্মদ সাময়িক বিবাহের প্রথা তুলিয়া দিয়াছিলেন। পুরুষের বিবাহের সংখ্যা সীমাবদ্ধ করা হইয়াছিল। “তােমাদের যেরূপ অভিরুচি তদনুসারে দুই, তিন ও চারি নারীর পাণিগ্রহণ করিতে পার, পরন্তু যদি আশঙ্কা কর ন্যায় ব্যবহার করিতে পারিবে না, তবে এক নারীকে বিবাহ করিবে। অথবা তােমাদের দক্ষিণ হস্ত যাহার উপর অধিকার লাভ করিয়াছে, তাহাকে (পত্নী স্থলে) গ্রহণ করিবে। ইহা অন্যায় করার নিকটবর্তী। ৪।” (গিরিশ বাবুর কোরাণের বঙ্গানুবাদ, ৪র্থ অধ্যায়)। নারীজাতির প্রতি অসদাচরণ নিবারণ জন্য মােহাম্মদ উপদেশ প্রদান করিয়া গিয়াছেন। “বৈধরূপে তাহাদের সঙ্গ করিবে, পরন্তু যদি তােমরা তাহাদিগকে অবজ্ঞা কর, তবে হয়ত এমন এক বস্তুকে অবজ্ঞা করিলে যে, তাহাতে ঈশ্বর প্রচুর অকল্যাণ করিয়া থাকেন।” (গিরিশবাবুর কোরাণের বঙ্গানুবাদ, ৪র্থ অধ্যায়, ২৪ আয়েত)। মােহাম্মদের ব্যবস্থায় সংপুত্রের সঙ্গে বিমাতার বিবাহের প্রথা বিলুপ্ত হইয়াছিল। মােহাম্মদ নারীজাতিকে বিবিধ অধিকারে স্বত্ববতী করিয়াছেন। “যাহা পিতামাতা ও গণ ২৮ হজরত মােহাম্মদ সাহায্য প্রাপ্ত না হইলে মােহাম্মদ ও তদীয় অনুচরবর্গের প্রাণনাশ ঘটিত। # পরিত্যাগ করে, তাহা হইতে পুরুষের অংশ এবং যাহা পিতা ও স্বগণ পরিত্যাগ করে, তাহা অল্প বা অধিক হউক, তাহা হইতে নারীর অংশ নির্ধারিত। ৫-৭। “বিশ্বাসিগণ, বলপূর্বক স্ত্রীগণের স্বত্ব গ্রহণ করা তােমাদের অবৈধ। স্পষ্ট দুস্ক্রিয়ায় তাহাদের যােগ দেওয়া ব্যতীত তােমরা তাহাদিগকে যে কোন দ্রব্য দান করিয়াছ, তাহা গ্রহণে নিষেধ করিও না।” (গিরিশবাবুর কোরাণের বঙ্গা- বাদ, ৪র্থ অধ্যায়)। এ সকল সুব্যবস্থা সত্ত্বেও মােসলমান সমাজে নারীজাতির অবস্থা নানাকারণে সবিশেষ উন্নত হইতে পারে নাই কিন্তু উন্নতি লাভ যে করিয়াছিল, তাহা অবশ্য স্বীকার্য। এই ব্যাপারে আবু বকরই সর্বাপেক্ষা অধিক প্রহৃত হইয়া- ছিলেন। তিনি ২৪ ঘণ্টা অজ্ঞানাবস্থায় ছিলেন। আবুবকর মােহাম্মদের একান্ত অনুরক্ত ছিলেন। তিনি দিবারাত্রি সংজ্ঞাহীন থাকিয়া যখন প্রথম চক্ষুরুন্মীলন করিলেন, তখনই মােহাম্মদ কেমন আছেন, তাহা জানিতে উৎসুক হইলেন। একজন অনুচর তাহার সংবাদ লইয়া আসিয়া বলিল, তিনি কুশলে আছেন। আবুবকর এই সংবাদ শ্ৰণ করিয়া বলিলেন, “আমি মােহাম্মদকে না দেখিয়া অন্নজল কিছুই গ্রহণ করিব না।” তিনি সমস্ত দিন অনাহারে রহিলেন, তারপর রাত্রিকালে রাজপথ নির্জন হইলে মােহাম্মদের বাস ভবনে গমনপূর্বক তাহাকে দর্শন করিয়া উপবাস ভঙ্গ করিলেন।

হজরত মােহাম্মদ
মােহাম্মদের প্রকাশ্যভাবে ধর্মপ্রচারের প্রথম উদ্যম
এইরূপ শােচনীয় হইয়াছিল। কিন্তু মােহাম্মদ ও তাঁহার
শিষ্যবৃন্দ ভগ্নোৎসাহ হন নাই। এই ঘটনার পর কতিপয়
দিবস অতিবাহিত হইলেই তাহারা পুনর্বার নবােৎসাহে
ধর্মপ্রচার করিতে আরম্ভ করিলেন। একে একে শিষ্য
সংখ্যাও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল ।
উৎপীড়নের সূচনা
মােহাম্মদ কোরেশ সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। কোরেশগণ
আরবদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ভজনালয় কাবা মন্দিরের পুরােহিত
ছিল। সুতরাং অন্যান্য সম্প্রদায় ধর্ম বিষয়ে তাহাদের
প্রভুত্বাধীন ছিল। একারণ মােহাম্মদের নবধর্মপ্রচারে
কোরেশগণই সর্বাপেক্ষা অধিক ভীত
হইল।
মােহাম্মদ সফলকাম
আপামর সাধারণ
সৰ্বশ্রেণীর ধর্মবিশ্বাসের আমূল পরিবর্তন ঘটিবে এবং
তাহাতে তাহাদের প্রভুত্ব ও প্রতিপত্তি সাংঘাতিকরূপে
আঘাতপ্রাপ্ত হইবে, তাহারা ইহা দিব্যচক্ষে দেখিতে
পাইয়া তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইল । মােহাম্মদ
সাম্যবার্তা ঘােষণা করিয়াছিলেন। তিনি জলদগম্ভীরস্বরে
হইলে
৩০

হজরত মােহাম্মদ
প্রচার করিয়াছিলেন, জগদীশ্বরের দৃষ্টিতে মনুষ্যমাত্রেই
সমান। এ মতের প্রবর্তনে কোরেশগণের প্রভুত্ব ও
প্রতিপত্তির বিলােপ অবশ্যম্ভাবী বলিয়া তাহারা অঙ্কুরেই
মােহাম্মদকে বিনষ্ট করিতে কৃতসঙ্কল্প হইল ।
কোরেশগণ একযােগে মােহাম্মদ ও তদীয় শিষ্যবৃন্দকে
উৎপীড়ন করিবার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করিতে
প্রতিজ্ঞা করিল। প্রত্যেক গৃহস্বামী আপন অধিকারে
নবধর্মকে কণ্ঠাবরােধ করিয়া বিনাশ করিবার ভারগ্রহণ
করিল। ইসলামধর্মবিশ্বাসিগণের অপমান ও লাঞ্ছনার
সীমা রহিল না ; তাহারা কারারুদ্ধ, অনাহারে ক্লিষ্ট
এবং প্রহৃত হইতে লাগিল। রমধা পৰ্বত এবং বৎহা
ইসলামধৰ্ম্ম-বিশ্বাসীদের নির্যাতনের স্থান ছিল।
পৌত্তলিকতায় আস্থাহীন বলিয়া প্রকাশ পাইলেই তাহাকে
কোরেশগণ মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকার উপর সূৰ্য-কিরণে
দগ্ধ করিত। যখন ঈদৃশ নিষ্ঠুর ব্যবহারে তাহাদের কণ্ঠ,
তালু শুষ্ক হইয়া পড়িত এবং মৃত্যু আসন্ন হইত, তখন
তাহাদিগকে হয় নবধর্ম পরিত্যাগ করিতে, না হয় মৃত্যুকে
আলিঙ্গন করিতে বলা হইত। কেহ কেহ পরিত্রাণ
লাভ জন্য নবধর্ম পরিত্যাগ করিতে প্রতিশ্রুত হইয়া
মুক্তিলাভের পরক্ষণেই পুনর্বার মােহাম্মদের শরণাপন্ন

হজরত মােহাম্মদ হইত; অধিকাংশ ব্যক্তিই আপন ধর্মমতে অটল থাকিত। * এইরূপ কঠোর উৎপীড়নেও কোন ফলােদয় হইল । ইসলামধর্মবিশ্বাসিগণ কিঞ্চিত্মত্ৰও বিচলিত বা ধর্মপ্রচারে বিরত হইলেন না, দিন দিন তাহাদের দল বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। কোরেশগণ পাশব বলে নবধর্মবিশ্বাসী- দিগকে বিনষ্ট করিতে না পারিয়া প্রলােভনে মােহাম্মদকে বশীভূত করিতে সঙ্কল্প করিল। * বিলাল নামক এক কাফ্রি ক্রীতদাস ইস্লামধর্ম গ্রহণ করিয়া- ছিল। তদীয় প্রভু ওমিয়া একারণ তাহাকে উৎপীড়নের একশেষ করিত। বিলালকে প্রত্যহ মধ্যাহ্নকালে বংহার উত্তপ্ত বালুকার উপর উর্দ্ধমুখে শয়ন করাইয়া তাহার বুকে গুরুভার প্রস্তর স্থাপন করা হইত। ওস্মিয়া কহিত বিলাল, হয় তুমি নবধৰ্ম্ম পরিত্যাগ কর, না হয় এইরূপ দুঃসহ যন্ত্রণা ভােগ করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইতে প্রস্তুত হও। কিন্তু বিলাল কিছুতেই স্বমত পরিত্যাগ করিতে স্বীকৃত হইত না, এবং পিপাসায় মৃত্যু দশা উপস্থিত হইলে অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের নামােচ্চারণ করিত। প্রত্যহ এইরূপ অশেষ যন্ত্রণা ভােগ করিতে করিতে তাহার প্রাণ সংশয় অবস্থা উপস্থিত হইয়াছিল। বিলাল এই অবস্থায় একদিন আবুবকরের দৃষ্টিপথে পতিত হওয়ায় তিনি তাহাকে জয় করিয়া তাহার জীবন রক্ষা করেন।

হজরত মােহাম্মদ একদিন মােহাম্মদ কাবা মন্দিরে উপবিষ্ট ছিলেন। সেই সময় মক্কার অন্যতম নেতা ওতবা তাহার নিকট গমন করিয়া বলিলেন, “মােহাম্মদ, তুমি কোরেশ সম্প্রদায় মধ্যে ভেদনীতি আনয়ন করিয়াছ, আমাদের ধর্মের নিন্দা করিতেছ, পূৰ্বপুরুষদিগকে পূৰ্বপুরুষদিগকে পাষণ্ড বলিয়া ঘােষণা করিতেছ। তােমার উদ্দেশ্য কি? ধন, মান, যশ, প্রভুত্ব, রাজত্ব, তুমি কোন্ আকাঙ্ক্ষায় আমাদের বিদ্রোহাচরণে প্রবৃত্ত হইয়াছ ? তােমার যাহা কামনা, তাহাই তােমার পদতলে বিলুষ্ঠিত হইবে; এ বিদ্রোহাচরণ পরিত্যাগ কর।” ওতবার এই প্রলােভন বাক্যে মােহাম্মদ কিঞ্চিৎমাত্রও চাঞ্চল্য প্রকাশ করিলেন না। গম্ভীর ভাবে উত্তর করিলেন, “আমি তােমাদের ন্যায়ই একজন মনুষ্য মাত্র। আমি প্রত্যাদেশ লাভ করিয়াছি যে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তােমরা কোনদিকে দৃপাত না করিয়া তাহাকে ভজনা কর, এবং যাহা গত হইয়াছে, তাহার নিমিত্ত অনুশােচনা কর । যাহারা পরলােক বিশ্বাস করে না এবং শাস্ত্রের নির্দেশ মত দান করে না, তাহারা দুঃখ পাইবে। কিন্তু যাহারা বিশ্বাসী ও সৎ- কর্মান্বিত, তাহারা পুরস্কার লাভ করিবে। হে ওতবা, তােমার নিকট সমস্ত প্রকাশ করা হইল, এখন S?

হজরত মােহাম্মদ তুমি যে পথ শ্রেষ্ঠ বলিয়া বিবেচনা কর, তাহাই অবলম্বন কর।” উৎপীড়ন কোরেশগণ মােহাম্মদকে প্রলােভনে বশীভূত করিতে অসমর্থ হইয়া পুনৰ্বার নববিশ্বাসীদলের প্রতি ঘাের উৎপীড়ন করিতে সঙ্কল্প করিল । তাহারা মােহাম্মদের পবিত্র অঙ্গে হস্তাণ করিল। তার পর নানা প্রকারে ইসলামধৰ্ম্ম-বিশ্বাসীদিগকে উৎপীড়ন করিতে লাগিল। তাহাদের পাশব অত্যাচারে অনেকের জীবন সংশয়াপন্ন হইয়া উঠিল। মােহাম্মদ প্রাণাধিক শিষ্যবৃন্দকে তাদৃশ দুর্দশাগ্রস্ত দেখিয়া, সাতিশয় মর্মাহত হইলেন, এবং তাহাদিগকে আবিসিনিয়া রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া কোরেশগণের পাশব অত্যাচারের হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিতে আদেশ করিলেন । এই সময় যিনি আবিসিনিয়া রাজ্যের অধিপতি ছিলেন, তিনি খৃষ্টধর্মা- বলম্বী, উদারম্বভাব ও ধর্মাত্মা ছিলেন। এই জন্যই মােহাম্মদ শিষ্যবৃন্দকে তাঁহার রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিতে আদেশ করিয়াছিলেন। তাহার আদেশ অনুসারে ইসলাম- ৩৪ হজরত মােহাম্মদ ধৰ্ম ঘােষণার পঞ্চম বর্ষে বীরপুরুষ ওসমানইবনে-আফা- নেতৃত্বে কিঞ্চিদধিক অশীতি সংখ্যক নরনারী আবিসিনিয়া রাজ্যে গমন করিল। প্রতিহিংসাপরায়ণ কোরেশগণ ঈদৃশ বহুসংখ্যক নববিশ্বাসীকে গ্রাসমুক্ত দেখিয়া ক্রোধে গর্জন করিতে লাগিল, এবং তাহাদিগকে প্রত্যর্পণ করিতে অনুরােধ করিয়া আবিসিনিয়া রাজ- দরবারে দূত প্রেরণ করিল। কোরেশ-দূত গৃহীত-আশ্রয় মােসলমানদিগকে রাজদরবারে ধর্মদ্রোহী বলিয়া অভিযুক্ত করিল। রাজা তাহাদিগকে সমবেত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমরা কেন ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়াছ?” আলীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা জাফর সমাগত মােসলমানদের মুখ- পাত্রস্বরূপ বলিতে লাগিলেন, “হে রাজ, আমরা অজ্ঞান- তিমিরাচ্ছন্ন বর্বর ছিলাম ; আমরা দেবদেবীর পূজক ছিলাম, নিত্য ব্যভিচারে লিপ্ত হইতাম, মৃতদেহের মাংস ভক্ষণ করিতাম, জঘন্য অশ্লীল বাক্যে জিহ্বা কলুষিত করিতাম, মনুষ্যত্বে জলাঞ্জলি দিয়াছিলাম, আতিথ্যধৰ্ম্ম পালন করিতাম না। আমাদের এইরূপ দুর্দশার সময় পরমেশ্বর আমাদের সমাজে একজন মহাপুরুষকে প্রেরণ করিয়াছেন; এই মহাপুরুষের বংশমর্যাদা, সত্যবাদিতা, সাধুতা এবং নির্মল চরিত্রের বিষয় আমরা সম্যক্ পরি-

হজরত মােহাম্মদ
জ্ঞাত আছি। তিনি আমাদিগকে একেশ্বরবাদ গ্রহণ
করিতে আহ্বান করিয়াছেন এবং পরমেশ্বরের সহিত
অন্য কোন পদার্থের সংযােগ সঙ্গত নহে বলিয়া শিক্ষা
দিয়াছেন । তিনি আমাদিগকে দেবদেবীর অর্চনা
করিতে নিষেধ করিয়াছেন এবং সত্য কথা কহিতে, ন্যস্ত
ধনের সদ্ব্যবহার করিতে, দয়ার্দ্রচিত্ত হইতে, এবং প্রতি
বাসীর স্বত্ব রক্ষা করিতে উপদেশ দিয়াছেন। তিনি
আমাদিগকে নারীজাতির কুৎসা এবং অনাথা বালিকার
অর্থ অপহরণ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। তিনি আমা-
দিগকে পাপ হইতে দূরে গমন করিতে, দুষ্কাৰ্য্য পরিত্যাগ
করিতে, ঈশ্বনােপালন করিতে, দরিদ্রের উপকার করিতে,
এবং পবিত্র দিনে উপবাস করিতে আদেশ করিয়াছেন।”
আবিসিনিয়ার অধিপতি এই উত্তরে প্রীত হইয়া কোরেশ--
দূতকে দরবার হইতে বহিস্কৃত করিয়া দিলেন ।
মােহাম্মদ ও “অতিপ্রাকৃত
কিঞ্চিদধিক অশীতি সংখ্যক মােসলমান আত্মরক্ষার
জন্য আবিসিনিয়া রাজ্যে প্রস্থান করিলে মােহাম্মদের
শিষ্যসংখ্যা খর্ব হইয়া পড়িয়াছিল ; কিন্তু ইহাতে তিনি

হজরত মােহাম্মদ কিঞ্চিৎমাত্রও ভগ্নোদ্যম না হইয়া পূৰ্ব্ববৎ অটল ভাবেই ধর্মপ্রচার করিতেছিলেন। নববিশ্বাসীদলের খর্বতা নিবন্ধন ইসলামধর্ম প্রচারের বিষ্ম উপস্থিত না হওয়ায় কোরেশগণ একান্ত ক্ষুন্ন হইয়াছিল । এ কারণ তাহারা মস্তিষ্কের বহু আলােড়নে মােহাম্মদকে নিষ্প্রভ করিবার জন্য এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করে। কোরেশগণ পূর্বগামী প্রেরিত মহাত্মাদের ন্যায় তাহাকেও অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করিয়া নবধর্মের অপার্থিতা প্রমাণিত করিতে বলিল। অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন মনুষ্যের সাধ্য নহে। মােহাম্মদ কখনও ঐশী শক্তির ভাণ করিয়া আত্মপ্রতিষ্ঠা করেন নাই। সত্যনিষ্ঠা তাহার চরিত্রের মূল- ভিত্তি ছিল। তিনি কোরেশগণের বিদ্বেষ বুদ্ধির হস্ত হইতে পরিত্রাণ লাভ কল্পে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করিতে স্বীকৃত হইয়া প্রবঞ্চনার আশ্রয় গ্রহণ করিলেন না। মােহ- স্মদ তাহাদিগকে মুক্তকণ্ঠে বলিলেন, “পরমেশ্বর আমাকে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন জন্য প্রেরণ করেন নাই। তিনি আমাকে তােমাদিগকে ধর্মোপদেশ প্রদান করিতে প্রেরণ করিয়াছেন। প্রভু পরমেশ্বরের অপার মহিমা! আমি একজন ঈশ্বর-প্রেরিত ধর্মোপদেষ্টা ব্যতীত অন্য কেহ নহি। দেবদূতগণ সাধারণতঃ মর্ত্যে আগমন করেন না,

হজরত মােহাম্মদ
নতুবা পরমেশ্বর একজন দেবদূতকেই তােমাদের নিকট
তাহার সত্য ধর্ম প্রচার করিতে প্রেরণ করিতেন।
আল্লার ভাণ্ডার আমার হস্তে ন্যস্ত, গুপ্ত তথ্য আমার
জ্ঞানের বিষয়ীভূত, অথবা দেবদূতের আত্মা আমার দেহ
সংযুক্ত, আমি কখনও এরূপ ঘােষণা করি নাই। ঐশ্বরিক
কৃপা ব্যতীত আমি নিজেই আমার আত্মশক্তিতে প্রত্যয়
করিতে পারি না। পরম কারুণিক দয়ালু পরমেশ্বরের
নামে বলিতেছি যে, স্বর্গমর্ত্যস্থ প্রাণীমাত্রেই সৰ্বজ্ঞানা-
ধার, সর্বশক্তিমান পরম পবিত্র প্রভুর মহিমা কীর্তন
করিয়া থাকে। প্রভু পরমেশ্বরই অজ্ঞান তিমিরাচ্ছন্ন
আরবসমাজে আলােক প্রদান কল্পে তাহার প্রকৃত স্বরূপ
সংস্থাপন এবং পরমজান প্রচার জন্য নিরক্ষর আরবগণের
মধ্য হইতে আমাকে ধৰ্ম্ম-সংস্থাপকের পদে প্রতিষ্ঠিত
করিয়াছেন। ইহা পরমেশ্বরের স্বেচ্ছাকৃত করুণা, তাঁহার
ইচ্ছা হইলে সকলেই তাঁহার করুণা লাভ করিতে পারে।
ঈশ্বর পরম দয়ালু।” ফলতঃ মহাপুরুষ মােহাম্মদ কখনও
অলৌকিক শক্তির মাহাত্মে ইসলামধর্মকে আরবসমাজে
প্রতিষ্ঠিত করেন নাই। তিনি জ্ঞান ও বিবেকের বর্তিকা
হন্তে কুসংস্কারবিদ্ধ আরবসমাজের অন্ধকাররাশি ধ্বংস
করিতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন ; আরবগণের কুসংস্কার
৩

হজরত মােহাম্মদ পরিপুষ্ট করিয়া আত্মপ্রাধান্যের প্রতিষ্ঠা তাহার উদ্দেশ্য ছিল না। প্রকৃতির রুদ্র গম্ভীর “মেহমধুর মহােজ্জ্বল সৌন্দৰ্য্য” পরিস্ফুট ভাবে প্রদর্শন করিয়া পরমেশ্বরের প্রতি মানব হৃদয়কে অনুরক্ত করিবার উদ্দেশ্যেই মােহা- ম্মদ মহাসাধনায় সমস্ত জীবন ক্ষেপণ করিয়াছিলেন। একারণ তিনি কোরেশগণের কথামত অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় প্রদান করিতে স্বীকৃত হন নাই। কিন্তু তাহারা তাঁহার সরল বাক্যে সন্তুষ্ট না হইয়া তাহাকে বিবিধ প্রকারে বিদ্রুপ ও উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করে। তাহারা বলিয়াছিল, “হে মােহাম্মদ, নিশ্চয় জানিও যে, তােমার অথবা আমাদের বিনাশ না হইলে এ বিরুদ্ধাচরণ বিরাম লাভ করিবে না।” কোরেশগণের অত্যাচারের মাত্রা অতিশয় বৃদ্ধি পাইল। মােহাম্মদ নিজে অশেষ প্রকারে নিগৃহীত হইতে লাগিলেন, তাহার শিষ্যবৃন্দের লাঞ্ছনা ও অপমানের পরি- সীমা রহিল না। এই সময় একবার প্রলােভন মােহন- বেশে মােহাম্মদের নিকট উপস্থিত হইয়াছিল। একদিন প্রার্থনাকালে মােহাম্মদ তিনজন চাদেবীর ( অলাত, অলউজ্জা এবং মলাত) উল্লেখ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহাদের সম্বন্ধে তােমরা কি বিবেচনা কর? এই স্বকৃত হজরত মােহাম্মদ প্রশ্নের উত্তর তাঁহার মুখ হইতে নিঃসৃত হইবার পূর্বেই একজন পৌত্তলিক শ্রোতা বলিল, “ইহারা সমাদৃত দেবকুমারী,-ঈশ্বর-কৃপা লাভ করিবার জন্য সহায়তা করিতে পারেন।” মােহাম্মদ এই বাক্যের প্রতিবাদ না করিয়া ক্ষণকালের জন্য মৌনাবলম্বী রহিলেন। শ্রোতৃবর্গ মােহাম্মদকে পৌত্তলিকের বক্রবাক্যে মৌনাবলম্বী দেখিয়া সে বাক্য তাঁহার অভিপ্রেত বলিয়া বিবেচনা করিল, এবং আনন্দোৎফুল্লচিত্তে অদ্বিতীয় ঈশ্বরের মহিমাকীর্তনে প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু মহাপুরুষের মনুষ্যসুলভ দুৰ্বলতা বিদ্য- চ্ছটার ন্যায় মুহূর্তমধ্যে বিলীন হইয়া গেল। তিনি পরমুহূর্তেই বলিলেন, “তােমাদের দেবদেবী অন্তঃসারশূন্য নাম মাত্র। এই সকল দেবদেবী তােমাদের ও তােমা- দের পূর্বপুরুষগণের মস্তিষ্কেই সৃষ্ট হইয়াছে।” মােহাম্মদ প্রলােভনে পতিত না হইয়া পুনৰ্বার কোরেশজাতির সমস্ত উৎপীড়ন অম্লানবদনে সহ সহ করিতে প্রস্তুত হইলেন। কোরেশগণ তাহার ব্যবহারে একান্ত ক্ষুন্ন হইল; তাহাদের অত্যাচার-স্রোত প্রবলবেগে প্রবাহিত হইল। se

ওমরের দীক্ষা
কোরেশ সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা আবুজ্জহল মােহা-
স্মদকে হত্যা করিবার জন্য অনুচরদিগকে আদেশ
করিলেন; এবং আজ্ঞাপ্রতিপালনকারীকে একশত লােহিত
উষ্ট্র ও এক সহস্র রৌপ্য মুদ্রা পারিতােষিক দিতে
প্রতিশ্রুত হইলেন। ওমর নামক অমিতবলশালী
ধীসম্পন্ন কোরেশ মােহাম্মদের শিরচ্ছেদন করিতে প্রতিজ্ঞা
করিয়া উন্মুক্ত কৃপাণ হস্তে ধাবিত হইলেন। কিয়দুর
অগ্রসর হইয়াই ভঁহার ভগিনী ও ভগিনীপতির
ইস্লামধর্ম গ্রহণের সংবাদ অবগত হইলেন। এই
সংবাদে ক্রোধােন্মত্ত হইয়া ওমর ভগিনীর গৃহে গমন
করিলেন, এবং মূঢ়ের ন্যায় দিগ্বিদিক্বােধশূন্য হইয়া ভগিনী
ও ভগিনীপতিকে নির্দয়ভাবে প্রহার করিতে লাগিলেন।
তাহার দারুণ প্রহারে তাহারা ক্ষতবিক্ষত হইলেন ;-
ক্ষতস্থান হইতে রক্তধারা বহিল। কিন্তু তাঁহারা নবধর্ম
পরিত্যাগ করিতে সম্মত হইলেন না; বলিলেন, “আমরা
সাক্ষ্য দিতেছি যে, পরমেশ্বর ব্যতীত উপাস্য নাই
এবং মােহাম্মদ হার প্রেরিত ও ভৃত্য।” ওমরও
৪১

হজরত মােহদ
;
তাহাদের ধর্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা দেখিয়া বিস্মিত হইলেন।
তিনি অপ্রতিভ হইয়া ভগিনীর বাটীতেই সে দিন যাপন
করিতে মনন করিলেন। রাত্রিকালে তদীয় ভগিনীপতি
কোরাণ পাঠ করিতে আরম্ভ করিলেন । ওমরের
অশান্তচিত্ত তাহাদের মধুর আবৃত্তিতে আকৃষ্ট হইল ;
তিনি মনােযােগ সহকারে কোরাণ পাঠ শুনিতে লাগিলেন।
কোরাণের চিত্তবিমােহিনী বাণী শুনিতে শুনিতে তাহার
হৃদয় অভিভূত হইয়া পড়িল ; তিনি ইসলামধর্মে বিশ্বাস
স্থাপন করিলেন। মােহাম্মদকে দর্শন করিবার জন্য
তাহার প্রাণ ব্যাকুল হইয়া উঠিল ; রাত্রি প্রভাত হওয়া
মাত্র তিনি আরকমের গৃহাভিমুখে ছুটিয়া চলিলেন।
মােহাম্মদ শিষ্যগণ সহ আরকমের (জনৈক শিষ্য)
গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন ।
তাঁহার শিরচ্ছেদন
জন্য ওমরের ভীষণ প্রতিজ্ঞার সংবাদ ইতিপূৰ্বেই মার
সর্বত্র প্রচারিত হইয়াছিল। ওমর আসিয়া দ্বারে আঘাত
করিলেন। শিষ্যগণ ওমরের আগমনে শঙ্কাকুল হইলেন।
কিন্তু নির্ভীক মােহাম্মদ গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া ওমরের
সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। ওমর তাহাকে দেখিবামাত্র
জলদগম্ভীরস্বরে বলিয়া উঠিলেন, “আমি সাক্ষ্যদান
করিতেছি, পরমেশ্বর ব্যতীত উপাস্য নাই, এবং আপনি
২

হজরত মােহাম্মদ তাঁহার প্রেরিত ও ভৃত্য।” অতঃপর তিনি বাষ্পরুদ্ধ- কণ্ঠে তাহার হৃদয়ে যে আগুন জ্বলিতেছিল, তাহার পরিচয় দিলেন। মােহাম্মদ ওমরকে সত্যধৰ্ম্মানুরক্ত দেখিয়া একান্ত প্রীত হইলেন, এবং তাহাকে দৃঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া ঈশ্বরের নামে জয়ােচ্চারণ করিলেন। উৎপীড়ন অমিতবলশালী ধীশক্তিসম্পন্ন ওমর বিশ্বাসী দলভুক্ত হওয়াতে তাঁহাদের ক্ষমতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছিল তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু কোরেশগণ ইহাতে অত্যন্ত ক্ষুন্ন হইয়া তাহাদিগকে পূৰ্ব্বাপেক্ষা প্রবলভাবে উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করে। এই সময় কোরেশ-দূত আবিসিনিয়া হইতে ফিরিয়া আসিল। কোরেশগণ তাহার নিগ্রহের কথা শুনিয়া দাবানলের ন্যায় জ্বলিয়া উঠিল; এবং তাদৃশ অবমাননার প্রতিশোেধ লইবার জন্য বিশ্বাসীদলের প্রতি অত্যাচারের মাত্রা দ্বিগুণ করিতে বদ্ধপরিকর হইল। হাসিম ও মুতালিব বংশের অধিকাংশ লােকই

হরত মােহাম্মদ
ইসলামধর্মাবলম্বী ছিলেন। এজন্য কোরেশগণ এই দুই
বংশকে সমূলে বিনাশ করিতে সঙ্কল্প করিয়া তাহাদের
সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ না হইতে ও তাহাদের নিকট
ক্রয় বিক্রয় না করিতে পরস্পরে শপথ গ্রহণ পূর্বক
অঙ্গীকারবদ্ধ হইল। মােহাম্মদ ঈদৃশ উৎপীড়ন হইতে
পরিত্রাণ লাভ জন্য আত্মীয়স্বজন সহ মক্কার নিকটবর্তী
সেব আবৃতামিব নামক গিরিসঙ্কটে প্রস্থান করাই সঙ্গত
বলিয়া অবধারণ করিলেন। তদনুসারে তাহারা স্ব স্ব গৃহ
পরিত্যাগ করিয়া তথায় গমন করিলেন। এই স্থানে
মােহাম্মদকে সশিষ্যে তিন বৎসর কাল অবরুদ্ধের ন্যায়
থাকিতে হইয়াছিল। এই তিন বৎসর কাল তাহাদের
কষ্টের পরিসীমা ছিল না। যে সকল খাদ্য সামগ্রী
তাঁহাদের সঙ্গে ছিল, তাহা নিঃশেষিত হইলে তাহারা নূতন
করিয়া খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করিতে পারেন নাই। কারণ,
ইসলামধর্মবিরােধিগণ তাহাদের নিকট দ্রব্য বিক্রয় না
করিবার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল। ক্ষুধার্ত শিশুর ক্রন্দনে
চতুর্দিক মুখরিত হইয়া উঠে। শিশুর আর্তনাদও বিশ্বাসী
দলের হৃদয় চঞ্চল করিতে পারে নাই। কিন্তু মক্কার
কতিপয় নেতা তাহাদের ঈদৃশ দুর্দশা দর্শনে অনুতপ্ত
হইয়া আপনাদের ধর্মঘট শ্লথ করিতে যত্নশীল হইলেন।
৪৪

হজরত মােহাম্মদ
তাঁহাদের যত্নে ইসলামধর্মবিশ্বাসিগণ মক্কায় বাসােপযােগী
কতিপয় অধিকার লাভ করিলেন।
তদনুসারে তাহারা মক্কায় ফিরিয়া আসিলেন, কিন্তু
শান্তিসুখ ভঁহাদের অদৃষ্টে ছিল না।
তাহাদের
প্রত্যাবর্তনের পর ইসলামধর্মবিরােধিগণ তাহাদের প্রতি
পুনৰ্ব্বার পূৰ্ব্ববৎ উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করিল।
মােহাম্মদ মক্কাবাসীদিগকে কোন ক্রমে নবধর্মের অনুরাগী
করিতে না পারিয়া অভিনবক্ষেত্রে প্রচার করিলে সমধিক
ফললাভ হইবে বলিয়া বিবেচনা করিলেন। এজন্য তিনি
মক্কার সত্তর মাইল দূরবর্তী তায়েফ নগরে গমন করিলেন।
এখানে তিনি প্রবললাৎসাহে ধৰ্ম্মপ্রচার করিতে আরম্ভ
করিলেন।
কিন্তু এইস্থানে দীর্ঘকাল অবস্থান করিতে
পারেন নাই। তত্ৰত্য পৌত্তলিক অধিবাসীরা বিদ্বেষবুদ্ধির
বশবর্তী হইয়া তাহাকে নানা প্রকারে উৎপীড়ন করিতে
আরম্ভ করে; এবং তাহাতে তিনি ক্ষুন্ন হইয়া মক্কায়
প্রত্যাবর্তন করেন।
* মােহাম্মদ তায়েফ নগর হইতে প্রত্যাগমন কালে পথিমধ্যে
ভগ্ন হৃদয়ে যে প্রার্থনা করিয়াছিলেন, আমরা তাহার কিয়দংশ উদ্ধৃত
করিতেছি।“হে প্রভাে, আমি দুর্বলতা ও আত্মম্ভরিতাবশতঃ
তােমার নিকট আমার দুঃখকাহিনী নিবেদন করিয়া থাকি।
৪৫

মােহাম্মদের মদিনায় গমন এই সময় মােহাম্মদের যশঃপ্রভা দেশ-বিদেশে বিকীর্ণ হইয়া পড়িয়াছিল। যে সকল বিদেশীয় লােক বাণিজ্য বা তীর্থভ্রমণ উপলক্ষে মক্কায় আসিত, তাহাদের অনেকে মােহাম্মদের প্রাণােম্মদকর উপদেশে উদ্দীপিত হইয়া ইসলামধর্ম গ্রহণ করে। এই ভাবে ইসলাম- ধৰ্ম্মের বীজ দেশ-বিদেশে সর্বত্র উপ্ত হইয়াছিল । মােহাম্মদের তায়েফ নগর হইতে হইতে প্রত্যাবর্তনের অত্যল্প দিন পরেই মদিনার দ্বাদশজন ক্ষমতাশালী মনুষ্যের নিকট আমি নগণ্য। হে দুর্বলের বল পরমকারুণিক প্রভাে, তুমি আমার নিয়ন্তা, তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিও না। অপরিচিত বা শত্রুসমাকুল স্থানে আমাকে পরিত্যাগ করিও না। তুমি রুষ্ট না হইলে আমার কোন বিপদ নাই। তােমার জ্যোতিঃই আমার আশ্রয়স্থল ; তােমার জ্যোতিতে সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত হয়, এবং ইহকালে ও পরকালে শান্তি লাভ করা যায়। তুমি আমার প্রতি রুষ্ট হইও না। তােমার যেরূপ ইচ্ছা সেই ভাবে আমার বিপদ দুর কর। তােমার করুণা ব্যতীত শক্তি ও সাহায্য নাই।” •• ৪৬ হজরত মােহাম্মদ সম্রান্ত ব্যক্তি তাহার মহিমা শ্রবণে আকৃষ্ট হইয়া মক্কায় আগমনপূর্বক ইলামধৰ্ম্ম গ্রহণ করেন। ইহারা প্রতিগমনকালে মদিনায় ধর্মপ্রচার করিবার জন্য একজন প্রচারক সঙ্গে লইয়া যান। ইহার চেষ্টায় মদিনায় ইসলামধর্মের জ্যোতিঃ বিকীর্ণ হইয়া পড়ে ; এবং আপামর সকলেই ইলামধর্মের শরণাপন্ন হয়। এই ভাবে মক্কার বহির্ভাগে ইসলামধৰ্ম্মের প্রভাব ক্রমশঃ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় । কিন্তু মক্কার অধিবাসীরা মােহাম্মদের সহস্র উপদেশেও ইসলামধৰ্ম্মের মহিমা উপলব্ধি করিতে পারিল না। তাহাদের উৎপীড়নের মাত্রা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অবশেষে মােসলমানদের মক্কায় বাস করা অসাধ্য হইয়া উঠিল। মােহাম্মদ সশিষ্যে মদিনায় আশ্রয় লইতে ইচ্ছা করিলেন। মদিনার অধিবাসীরা মােহাম্মদ ও তাঁহার শিষ্যগণকে আনয়ন করিবার জন্য সত্তর জন সম্রান্ত ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করিলেন। মােহাম্মদ মােসলমান- দিগকে ক্রমে ক্রমে মক্কা পরিত্যাগ করিয়া গুপ্তভাবে মদিনায় গমন করিতে আদেশ করিলেন। শক্ৰসঙ্কুলস্থানে একজন মােসলমানকেও পরিত্যাগ করিয়া মােহাম্মদ নিজে নিরাপদ স্থানে গমন করিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ৫৭

হজরত মােহাম্মদ
এজন্য তিনি সর্বশেষে মক্কা হইতে প্রস্থান করিবার
সঙ্কল্প প্রকাশ করিলেন। তদীয় প্রিয়তম ধৰ্ম্মবন্ধু আবু-
বকর ও আলী তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া মদিনায় গমন
করিতে অনভিলাষী হইয়া মক্কায় বাস করিতে লাগিলেন।
ইহারা ব্যতীত্ব বিশ্বাসীদলভুক্ত সকলেই মদিনায় প্রস্থান
করিতে লাগিলেন। এইরূপ ক্রমিক প্রস্থানে মক্কানগর
অচিরে মােসলমানশূন্য হইয়া পড়িল। অতঃপর মােহাম্মদ
মদিনায় প্রস্থান জন্য উদ্যোগ করিলেন। ৬২২ খৃষ্টাব্দের
রবি-অল-আউয়ল (জুলাই) মাসের পঞ্চম দিবস
(সােমবার) সমাগত হইল। রাত্রি প্রভাতে মােহাম্মদ
মদিনাভিমুখে প্রস্থান জন্য প্রস্তুত হইলেন। এদিকে
বিরুদ্ধবাদিগণ সেই রাত্রিতেই মােহাম্মদকে হত্যা করিতে
ষড়যন্ত্র করিল। তাহারা আপনাদের পাপসঙ্কল্প কাৰ্য্যে
পরিণত করিবার জন্য মােহাম্মদের বাসগৃহ পরিবেষ্টন
করিল। কিন্তু মােহাম্মদ তাহাদের ষড়যন্ত্রের বিষয়
অবগত হইয়া তৎপূৰ্বেই আবুবকরের গৃহে প্রস্থান
করিয়াছিলেন।
মােহাম্মদ আবুবকরের গৃহে উপনীত হইয়া তাহাকে
সঙ্গে লইয়া সেই অন্ধকার রজনীতেই মদিনাভিমুখে প্রস্থান
করেন। আবুবকর তাহাকে শত্রুর প্রথম আক্রমণ হইতে
৪৮

হজরত মােহাম্মদ
রক্ষা করিবার জন্য কখনও তাহার সম্মুখবর্তী হইয়া কখনও
পশ্চাদ্বী হইয়া পথ চলিতে লাগিলেন। শত্রুর প্রথম
আক্রমণ নিজের উপর আনয়ন করিবার উদ্দেশ্যেই তিনি
এইরূপেপথ অতিবাহিত করিয়াছিলেন। মােহাম্মদের চরণে
প্রস্তরের দারুণ আঘাত লাগিল, তিনি পদব্রজে চলিতে
অক্ষম হইলেন। আবুবকর তাহাকে স্কন্ধে লইয়া চলিতে
আরম্ভ করিলেন। তাহারা সৌর নামক সঙ্কীর্ণ গিরিগুহার
নিকট উপনীত হইয়া সেখানে রাত্রিযাপন করিতে ইচ্ছা
করিলেন। আবুবকর তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়া উহা কোন
প্রকার বিপদসঙ্কুল কি না, তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন,
এবং সেখানে বহুসংখ্যক ছিদ্র দর্শন করিয়া তৎসমুদয়
পরিধেয় বস্ত্রদ্বারা বন্ধ করিয়া সাদির আগমন পথ রুদ্ধ
করিলেন। বস্ত্রখণ্ডের অল্পনিবন্ধন একটি ছিদ্রপথ
রুদ্ধ করিতে না পারিয়া তিনি সেখানে পদস্থাপন করিয়া
বসিয়া রহিলেন। এইভাবে যথােচিত সতর্কতা অবলম্বন
করিয়া আবুবকর মােহাম্মদকে আহ্বান করিলেন।
মােহাম্মদ গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া নিদ্রাভিভূত
হইলেন; আবুবকর রাত্রি জাগরণ করিয়া প্রহরীর কাৰ্য্যে
নিযুক্ত রহিলেন। তিনি যে ছিদ্রপথে পদস্থাপন করিয়া
রাখিয়াছিলেন, সে পথে এক বৃশ্চিক তাঁহাকে দারুণ
০৯

হজরত মােহামদ
দংশন করিল, তিনি যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া পড়িলেন ;
কিন্তু মােহাম্মদকে জাগরিত না করিয়া সমস্ত নীরবে সহ
করিতে লাগিলেন।
এদিকে বিরুদ্ধবাদিগণ মােহাম্মদকে গ্রাসমুক্ত
দেখিয়া শােণিতলােপ ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্রের ন্যায় তাহার
অনুসন্ধানে ধাবিত হইল, এবং তাঁহার পদাঙ্কের অনুসরণ
করিয়া সৌরুগুহার নিকট আলিয়া পঁহুছিল। হজরত
মােহাম্মদ ও আবুবকর তাহাদের পদশব্দ শুনিতে
পাইলেন। আবুবকর শঙ্কাকুল হইয়া বলিলেন, “আমরা
দুইজন, শসংখ্যা বহু, আর রক্ষা নাই।” মােহাম্মদ
বলিলেন, “আমরা দুইজন নহি, তিনজন, ঈশ্বর আমাদের
সঙ্গী, ঈশ্বর আমাদিগকে রক্ষা করিবেন।” আবুবকর ও
মােহাম্মদের গুহার ভিতরে প্রবেশ করিবার অব্যবহিত
পরেই ঊর্ণনাভ উহার মুখে জাল পাতিয়াছিল, এবং বন্য
কপােত, দ্বারমূলে
ডিম্ব প্রসব করিয়া রাখিয়াছিল ।
গুহার মুখে জাল ও দ্বারমূলে ডিম্ব দেখিয়া শত্রুগণ উহার
অভ্যন্তরে প্রবেশ না করিয়াই অন্য দিকে চলিয়া গেল,
মােহাম্মদ ও আবুবকর রক্ষা পাইলেন। তাঁহারা তিন
অহােরাত্র এই গুহার অভ্যন্তরে লুক্কায়িত রহিলেন। প্রতি
রজনীতে আবুবকরের কন্যা দুগ্ধ আনয়ন করিতেন ।

হজরত মােহাম্মদ তাহারা এই দুগ্ধ পান করিয়া ক্ষুন্নিবৃত্তি করিতেন। তাঁহারা চতুর্থ রজনীতে সৌগুহা পরিত্যাগ করিয়া মদিনাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তাহারা রাত্রিকালে পথ অতিবাহিত করিতেন, সূর্যোদয় হইবামাত্র লুক্কায়িত হইতেন। এই- ভাবে পথ অতিবাহিত করিয়া তাহারা চতুর্থ রজনীতে মদিনার নিকটবর্তী কোবা নামক স্থানে উপনীত হইলেন। এখানে চারিদিন যাপন করিয়া মােহাম্মদ আবুবকরকে সঙ্গে লইয়া রবি-অল-আউয়ল মাসের ষােড়শ দিবসে ( শুক্রবার) মদিনায় প্রবেশ করিলেন। মদিনায় মােহাম্মদ মদিনার আপামর সাধারণ সকলেই মােহাম্মদের শুভাগমনে আনন্দে জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল এবং তাহাকে মহাসমারােহে অভ্যর্থনা করিল। এখানে তাহার জীবনের নূতন অধ্যায় আরম্ভ হইল। মােহাম্মদ মক্কায় বাসকালে স্বহস্তে নিজের পরিধেয় বস্ত্রের সংস্কার করিতেন, এবং এক একদিন অন্নাভাবে অনাহারে থাকিতেন। তাঁহার জীবনের নূতন অধ্যায়েও এ বিষয়ে অবস্থান্তর ঘটে নাই।

হজরত মােহাম্মদ কিন্তু তিনি কালক্রমে পৃথিবীর প্রবলতম সম্রাট অপেক্ষাও অধিক শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছিলেন। মােহাম্মদ মদিনায় আগমন করিয়া সমস্ত অধিবাসীকে ইসলামধর্মানুরাগী দেখিয়া তাঁহাদের ধর্মচর্চার জন্য যথােপযুক্ত বন্দোবস্ত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি প্রথমেই একমাত্র অদ্বিতীয় নিরাকার পরমেশ্বরের উপ- সনার জন্য মন্দির এবং গৃহতাড়িত মােসলমানদের জন্য বাসভবন নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি স্বহস্তে মন্দিরের নির্মাণ কাৰ্যে সাহায্য করিয়াছিলেন ; এই ধৰ্ম্মমন্দির সৌষ্ঠবশালী ছিল না। মন্দিরের প্রাচীর ইষ্টক ও কর্দমের এবং ছাদ তালপত্রের ছিল। মন্দিরের একাংশ নিরাশয় বক্তিগণের বাস জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এই অনাড়ম্বর মন্দিরের প্রত্যেক অনুষ্ঠান বিনা জাকজমকে, সম্পাদিত হইত। মােহাম্মদ কখনও আবরণহীন গৃহতলে দণ্ডায়মান হইয়া, কখনও বা একটি তালবৃক্ষে ভর দিয়া ব্যাকুল হৃদয়ে ধর্মোপদেশ প্রদান করিতেন; এবং অনুরক্ত শ্রোতৃবৃন্দ তাহার প্রাণােম্মদকর উপদেশে আত্মহারা হইত। এই সময় মদিনার অধিবাসিগণ দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত এক সম্প্রদায়ের নাম আউস, অপর সম্প্রদায়ের ছিল।

হজরত মােহাম্মদ হইল। নাম খুজরাজ। এই সম্প্রদায়দ্বয়মধ্যে ঘাের অভাব ছিল, তাহারা একে অন্যের রক্তপাত জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকিত। আউস ও খজরাজগণ ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসের গুণে আপনাদের চিরাগত শত্রুতা বিস্মৃত হইয়া ইসলামধর্মের পতাকামূলে মিলনের মােহন-মন্ত্রে সমবেত মােহাম্মদ মদিনাবাসীদের সমস্ত বিবাদের নিরসন করিয়া তাহাদিগকে একসুত্রে সন্নিবদ্ধ করিলেন। তারপর এই সম্মিলন সুদৃঢ় করিবার উদ্দেশ্যে তাহাদিগকে এক সাধারণ উপাধিতে ভূষিত করা হইল। এই উপাধির নাম আনসার। আনসার শব্দের অর্থ সহায়তাকারী। মদিনাবাসীরা সঙ্কটকালে ইসলামধৰ্ম্মের সহায়তা করিয়াছিল বলিয়া এই গৌরবসূচক উপাধি লাভ করিল। যে সকল মক্কাবাসী স্বধর্ম রক্ষার জন্য স্বর্গাদপি গরীয়সী জন্মভূমি এবং স্নেহ- মমতার পীঠস্থান গৃহ পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছিল, তাহাদিগকে মহজ্জরিণ (নিৰ্বাসিত) উপাধি প্রদত্ত হইল। মােহাম্মদ মহরিণ ও আনসারদের মধ্যে অচ্ছেদ্য বন্ধন সংস্থাপন জন্য তাহাদিগকে লইয়া ধৰ্ম্মমণ্ডলীর প্রতিষ্ঠা করিলেন। মণ্ডলীর বিশ্বাসীমাত্রেই ভ্ৰাতৃভাবে অনুপ্রাণিত এবং সুখে দুঃখে একসুত্রে সন্নিবদ্ধ হইল।

ইসলাম এবং রাজশক্তি ছিল। মােহাম্মদ নবপ্রতিষ্ঠ ধর্মমণ্ডলীকে একমাত্র ধর্মবলে অনুবিদ্ধ করিয়া ক্ষান্ত রহিলেন না। একমাত্র অদ্বিতীয় নিরাকার পরমেশ্বরের উপাসনার প্রতিষ্ঠা, পাপে আকণ্ঠ- নিমজ্জিত আরবসমাজের উদ্ধার এবং বহুধা-বিভক্ত আরব জাতির ঐক্য-বন্ধন মােহাম্মদের জীবনের উদ্দেশ্য এই উদ্দেশ্য সাধন কল্পে কেবল ধর্মবলই যথেষ্ট ছিল না, রাজশক্তিরও প্রয়ােজন ছিল। দুর্ধর্ষ আরব জাতিকে ইস্লামধৰ্ম্মমূলক নৈতিক ও সামাজিক অনুসাশনের সম্যক অনুগত করিবার জন্য রাজশক্তির প্রয়ােজন ছিল। এজন্য মােহাম্মদ নবপ্রতিষ্ঠিত ধৰ্ম্ম- মণ্ডলীকে রাজশক্তিসম্পন্ন করিয়া এক প্রজাতন্ত্র রাজ্যের সুত্রপাত করিলেন । কোন স্থানের অধিবাসিগণ কর্তৃক ইসলামধর্ম পরিগৃহীত হইলেই সে স্থানকে এই মণ্ডলীর শাসনাধীন করিবার নিয়ম বিধিবদ্ধ হইল। মােহাম্মদ আপনাকে মণ্ডলীর অধিনেতৃপদে প্রতি- স্থাপিত করিলেন। তিনি এইরূপে একাধারে ধর্ম- ৫৪ হজরত মােহাম্মদ সংস্থাপক, শাসনকর্তা, অধিনেতা, অধ্যাপক ও বিচারক হইলেন। * এই সময় মদিনা ও তাহার চতুঃপাশ্ববর্তী স্থানসমূহে বহুসংখ্যক ইহুদির বাসভূমি ছিল। এই সময় ইহুদি * নবধর্মের প্রতিষ্ঠা করিয়া মানবজাতির কল্যাণ সাধন করাই মােহাম্মদের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল। রাজ্য-লালসা কখনও তাঁহার হৃদয় অধিকার করে নাই, নবধৰ্ম্মের সর্বাঙ্গীন প্রতিষ্ঠার জন্য আবশ্যক বলিয়াই তিনি এক অভিনব সাম্রাজ্যের পত্তন করিয়াছিলেন। তঁাহার ন্যায় সংসারনির্লিপ্ত মহাপুরুষ এ পৃথিবীতে অতি বিরল। মােহাম্মদের আশ্চৰ্য বৈরাগ্য ছিল। মুতন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মােহাম্মদ একদা তদীয় প্রিয়তমা কন্যা ফতেমার গৃহে গমন করেন। এই সময় ফতেমা অন্নাভাবে তিন দিন উপবাস-ক্লিষ্ট ছিলেন। প্রিয়তমা কন্যার মুখে এই দুরবস্থার কথা শুনিয়া মােহাম্মদ ধীরচিত্তে বলিলেন, “ফতেমা, দুঃখিত হইও না; তােমার পিতাও অদ্য চারিদিন উপবাস- ক্লিষ্ট।” এই বলিয়া তিনি গাত্রাবরণ উন্মােচন করিয়া ক্ষুধার যন্ত্রণা উপশম করিবার জন্য উদরে যে প্রস্তরখণ্ড বন্ধন করিয়া ছিলেন, তাহা প্রদর্শন করেন। আমরা আর একটি ঘটনার উল্লেখ করিতেছি। একদিন মােহাম্মদ দিবাভাগে মােটা দড়ির জাল-বােনা খাটিয়ার উপর বিনা শয্যায় শয়ন করিয়া নিদ্রিত হইয়াছিলেন। ঐ সকল মােটা দড়ির স্পর্শে তাহার কোমল অঙ্গে রক্তাভ দাগ

হজরত মােহা
কৈনুকা, বনি নজির, কুরেজা প্রভৃতি নানা সম্প্রদায়ে
বিভক্ত ছিল । মােহাম্মদ ইহুদিদিগকে সন্তুষ্ট করিতে
উদ্যোগী হইয়া তাহাদের সঙ্গে সন্ধি সংস্থাপন করিলেন ।
এই সন্ধি অনুসারে মােহাম্মদ তাহাদিগকে স্বচ্ছন্দভাবে
স্ব স্ব ধর্মকর্মের অনুষ্ঠান করিতে অনুমতি দিলেন ।
এবং ইহুদিরাও মােসলমানদের সঙ্গে সর্বপ্রকার শত্রুত'-
চরণে বিরত থাকিতে অঙ্গীকার করিল। ইসলামধর্মের
সঙ্গে তাহাদের ধর্মমতের প্রভূত পার্থক্য ছিল। একারণ
তাহারা মােহাম্মদের প্রতি কিছুতেই সন্তুষ্ট হইতে পারিল
। মােহাম্মদের উদার ব্যবহার নিবন্ধন ইহুদিগণ
প্রকাশ্যভাবে তাহার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করিতে আরম্ভ
করিল, কিন্তু তাহাদের অন্তরে অন্তরে বিদ্বেষভাব পরিপুষ্ট
হইতে লাগিল।
মদিনাবাসীর প্রাণগত আনুকূল্যনিবন্ধন ইসলামধর্মের
পড়িয়াছিল। ওমর তাহাকে এই অবস্থায় দেখিয়া অশ্রুজল সংবরণ
করিতে পারেন নাই। মােহাম্মদ জাগরিত হইয়া তাহার অশ্রুজল
মােচনের কারণজিজ্ঞাসু হন। তিনি ওমরের কথা শুনিয়া বলেন,
“ইহকালের সুখ আমার লক্ষ্য নহে, আমি পরলােকের সম্পদ প্রার্থী।
তুমি কি ইহা ইচ্ছা কর না?”

হজরত মােহাম্মদ মূল সুদৃঢ় হইয়া উঠিল; এবং মােহাম্মদ জ্বলন্ত উৎসাহে আরব দেশের সর্বত্র একেশ্বরবাদের মহিমা ঘােষণা করিতে আরম্ভ করিলেন। তাহার প্রচার ফলে বহুস্থানের অসংখ্য নরনারী পৌত্তলিকতা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক একেশ্বরবাদে দীক্ষিত হইয়া মদিনার ধর্মমণ্ডলীর আশ্রয় গ্রহণ করিতে লাগিল । ইহাতে প্রত্যহ মােহাম্মদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। একারণ কোরেশদের ক্ষোভের সীমা রহিল না। তাহারা মােহাম্মদকে ধ্বংস করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইল। মদিনাবালী ইহুদিদের ইসলাম- ধৰ্ম্ম-বিদ্বেষের কথা মক্কায় অপরিজ্ঞাত ছিল। অনেকেশ্বর- বাদী কোরেশেরা একমেবাদ্বিতীয় পরমেশ্বরের উপাসক মােহাম্মদের ধ্বংস কামনায় ষড়যন্ত্র করিবার জন্য একেশ্বর- বাদী ইহুদিদের নিকট দূত প্রেরণ করিতে আরম্ভ করিল, একারণ মােহাম্মদ আশ্রয়দাতা শিষ্যরন্দের রক্ষার জন্য উৎকণ্ঠিত হইলেন।

যুদ্ধের সূচনা কিছুতেই কোরেশদের উৎপীড়নের নিবৃত্তি না দেখিয়া, মােহাম্মদ বুঝিতে পারিলেন যে, অস্ত্রবলের প্রয়ােগ ব্যতীত দেশব্যাপী শত্রুতাচরণের মুলােচ্ছেদ করিবার অন্য উপায় নাই এবং তরবারি হস্তে অগ্রসর না হইলে দেশমধ্যে শান্তির প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর নহে। মােহাম্মদের নিজের স্বভাব রক্তপাতের বিরােধী ছিল । তারপর মুসলমানগণ শান্তির অভিলাষী হইয়াছিলেন। তাহারা মক্কায় নিপীড়নের একশেষ সহ্য করিয়া মদিনায় আগমন করেন। এখানে শান্তির মৃদুহিল্লোলে তাহাদের সমস্ত জ্বালাযন্ত্রণা উপশমিত হয়। তাহারা সে শান্তি পরিত্যাগ- পূৰ্ব্বক অশেষবিধ ক্লেশপূর্ণ যুদ্ধে নিরত হইতে ইচ্ছুক ছিলেন না। মদিনাবাসিগণ মােহাম্মদ ও তদীয় শিষ্য- বৃন্দকে আশ্রয় প্রদান করেন। কেহ অগ্রগামী হইয়া তাহাদিগকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইলে, মদিনাবাসিগণ সে শত্রুর গতিরােধ করিতে প্রতিশ্রুত ছিলেন; কিন্তু মােহাম্মদ বিনা কারণে অস্ত্রধারণ করিলে তাহারা তাঁহার অনুকুলে দণ্ডায়মান হইবেন না বলিয়াই ধাৰ্য্য হজরত মােহাম্মদ ছিল। ফলতঃ, কি মােহাম্মদের নিজের স্বভাব, কি মােসলমানগণের মতি গতি, কি মদিনাবাসীদের সঙ্গে সন্ধিবন্ধন, সমস্তই অস্ত্রধারণের প্রতিকূল ছিল। এ কারণ, মােহাম্মদ যাহাতে বিরক্তপাতে নিরাপদ হইতে পারেন, তজ্জন্য নানারূপ যত্ন করেন। কিন্তু কিছুতেই শত্রুতাচরণ বিদূরিত করিতে না পারিয়া কোরেশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র- The people of Medina were pledged only to defend the Prophet from attack, not to join him in any aggressive steps against the Koreish.--Muir's Life of Mahomed. আমাদের কথার সমর্থন জন্য নিম্নে কোরাণ হইতে দুইটি বচন উদ্ধত হইল ‘পরন্তু তাহারা নিবৃত্ত রহিলে নিশ্চয় ঈশ্বর ক্ষমাশীল ও দয়ালু। ১৮৯। * যদি তাহারা নিবৃত্ত হয়, তবে অত্যাচারী ব্যতীত হস্তক্ষেপ করিতে নাই। ১৯০, দ্বিতীয় সুরা। (গিরিশ বাবুর অনুবাদ) ** যদি নিবৃত্ত হও (হে মক্কাবাসিগণ,) তবে তাহা তােমাদের জন্য মঙ্গল। ১৯। যাহারা অত্যাচার করিয়াছে, তাহাদিগকে বল, যদি তাহারা অত্যাচার হইতে নিবৃত্ত হয়, তবে যাহা গত হইয়াছে, তাহাদের জন্য ক্ষমা করা যাইবে।” ৩৯, অষ্টম সুরা। এইরূপ আরও অনেক বচন উদ্ধৃত করা যাইতে পারে।

হজরত মােহাম্মদ ধারণ করিতে বাধ্য হইলেন, এবং তদনুরূপ প্রত্যাদেশও লাভ করিলেন । প্রথম যুদ্ধ অতঃপর মােহাম্মদ যুদ্ধায়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন । কোরেশেরাও উদাসীন রহিল না, দিবারাত্রি পরিশ্রম করিয়া অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করিতে লাগিল । এই উদ্যোগ- পৰ্ব্বকালে মােহাম্মদ বিদেশগামী কোরেশ বণিকৃদিগকে * যাহারা সাংসারিক জীবনকে পরলােকের জন্য বিক্রয় করে, তাহাদের উচিত যে ঈশ্বরের পথে সংগ্রাম করিতে থাকে এবং যে ব্যক্তি ঈশ্বরের পথে সংগ্রাম করিয়া জয়ী বা হত হয়, পরে আমি তাহাকে শীঘ্র মহা পুরস্কার দান করি। ৭৪। অতএব (হে মােহাম্মদ) পরমেশ্বরের পথে সংগ্রাম কর, তুমি জীবনে ব্যতীত প্রপীড়িত হইবে না, বিশ্বাসিগণকে উত্তেজিত কর, সত্বরেই ঈশ্বর কাফেরদিগের সময় বন্ধ করিবেন। ঈশ্বর যুদ্ধ বিষয়ে সুদৃঢ় ও শান্তি বিষয়ে সুদৃঢ়। ৮৪। চতুর্থ সুরা। (গিরিশ বাবুর কোরাণের বঙ্গানুবাদ।) ৬.

হজরত মােহাম্মদ
আক্রমণ করিবার জন্য সাতবার সৈন্য প্রেরণ করিয়া-
ছিলেন। এই সকল যুদ্ধযাত্রা সামান্য ছিল। প্রথম
অভিযানে যুদ্ধ হয় নাই, মােসলমানগণ কোরেশদের সঙ্গে
সন্ধি সংস্থাপন করিয়া মদিনায় ফিরিয়া আইসেন। দ্বিতীয়
অভিযানে মােসলমানগণ কোরেশ বণিকদের সম্মুখবর্তী
হইলে তাহারা ভয় পাইয়া পলায়ন করে।
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চমবার মােসলমানগণ কোরেশ
বণিকদের আগমন সংবাদ পাইয়া মদিনা হইতে বহির্গত
কিন্তু প্রতিবারেই তাহাদের পঁহুছিবার পূর্বেই
কোরেশেরা চলিয়া যায়, এবং তাহারা বিনাযুদ্ধে মদিনায়
ফিরিয়া আইসে। একদল মক্কাবাসী মদিনার প্রান্ত হইতে
উষ্ট্র সকল অপহরণ করিয়া লইয়া যাওয়ায় ষষ্ঠ অভিযান
করা হয়। এবারও মােসলমানদের পঁহুছিবার পূর্বেই
কোরেশেরা চলিয়া গিয়াছিল । সপ্তম অভিযানে বতনন
খােলা নামক স্থানে মােসলমানদের সঙ্গে একদল কোরেশ
বণিকের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে কোরেশেরা সম্পূর্ণরূপে
পরাস্ত হয়, এবং মােসলমানগণ তাহাদের সমস্ত পণ্যদ্রব্য
হস্তগত করে। এই যুদ্ধ রজব মাসে সংঘটিত হইয়াছিল ।
তৎকালের আরবসমাজে রজব মাসে যুদ্ধ করা অত্যন্ত
গহিত কাজ বলিয়া পরিগণিত ছিল। এজন্য রজব

হজরত মােহাম্মদ যুদ্ধ হওয়াতে মােহাম্মদের বড় নিন্দাবাদ হয়। কিন্তু এই যুদ্ধে তাহার সম্মতি ছিল না। যুদ্ধকর্তৃগণ মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হইলে মােহাম্মদ তাহাদিগকে যথেষ্ট তিরস্কার করিয়াছিলেন। তিনি লুষ্ঠিত দ্রব্যের কিঞ্চিত্রও গ্রহণ করেন নাই। মােসলমানগণ বিদেশযাত্রী কোরেশ বণিকদিগকে আক্রমণ করিয়া অপকাৰ্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন কিনা ? এ প্রশ্নের উত্তরে চেরাগ আলী যাহা লিখিয়াছেন, আমরা এখানে তাহার সারমর্ম প্রদান করিতেছি। কোরেশদের তাড়নায় মােসলমানগণ মক্কা পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। কোরেশেরা তাহাদিগকে বলপূর্বক জন্মভূমি হইতে নির্বাসিত করিয়াছিল, এরূপ নির্দেশ করা যাইতে পারে। সুতরাং মােসলমানগণ তাহাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে syferata fayl Wheaton's Elements of International Law নামক গ্রন্থানুসারে এক রাজ্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের যুদ্ধ উপস্থিত হইলে শত্রুর সম্পত্তি অপহরণ করিয়া তাহা রাজকোষে সঞ্চিত করা অথবা সৈনিক শ্রেণীর মধ্যে বিভাগ করিয়া দেওয়া যুদ্ধ- নীতির প্রথম সূত্রানুমােদিত। সম্পত্তি অপহরণ কালে স্থানাস্থান অথবা আকার প্রকার কিছুই বিচার করিবার প্রয়ােজন নাই। কি প্রচীন, কি আধুনিক উভয়বিধ যুদ্ধশাস্ত্রেই এইরূপ মত পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে। তৎকালে মক্কার শাসনপ্রণালী Patriarchal ছিল।

হজরত মােহাম্মদ বতনন খােলর যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই মােহাম্মদ যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহকারী একদল কোরেশ বণিকে আক্রমণ করিতে সসৈন্যে যাত্রা করেন। দ্বিতীয় হিজরীর (৬২৩ খৃঃ) রমজান মাসের দ্বাদশ দিবসে উভয় দল বদর নামক স্থানে পরস্পরের সম্মুখবর্তী হইল। কোরেশ বণিকেরা শত্রুর আগমন সংবাদ অবগত হইয়া পূর্বেই মক্কার কোন নির্দিষ্ট সৈন্য ছিল না। আবশ্যকমত সকলেই তরবারী হস্তে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইত। সুতরাং বিবাদ আরম্ভ হইবার পর প্রত্যেক মক্কাবাসী মােসলমানের শত্রু হইয়াছিল। একারণ মােসলমানগণ বাণিজ্য-ব্যবসায়ী বিদেশযাত্রী কোরেশ- দিগকে আক্রমণ ও তাহাদের সম্পত্তি অপহরণ করিবার অধিকারী ছিল। এই সকল অভিযানকে পর অপহরণের বাসনায় সৈন্য প্রেরণ রূপে নির্দেশ করা সঙ্গত নহে। বস্তুতঃ মােহাম্মদ আত্মরক্ষার জন্য কোরেশদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘােষণা করিয়াছিলেন, এই সকল অভিযান তাহার অংশ মাত্র ছিল। মদিনায় আশ্রয়গ্রহণ করিবার সময় মােসলমানগণ লুণ্ঠনকাৰ্য্য হইতে বিরত থাকিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল। তাহারা এ প্রতিজ্ঞার বিরুদ্ধে কাজ করিলে তাহা লইয়া অবশ্যই প্রতিবাদ হইত। এই সকল অভিযানে মদিনাবাসীও গমন করিত। তাহারা আততায়ীরূপে যুদ্ধে যােগ দিবে না বলিয়াই ধার্য ছিল।

হজরত মােহাম্মদ মক্কায় সংবাদ প্রেরণ করিয়াছিল। সংবাদ পাইয়া অবিলম্বে একসহ বীরপুরুষ তাহাদের সাহায্যার্থ বদরে আসিয়া উপনীত হইল। মােহাম্মদের সঙ্গে কেবলমাত্র তিনশত পাঁচজন যােদ্ধা ছিল। কিন্তু তিনি শত্রুর সংখাধিক্য নিবন্ধন ভীত হইলেন না, ঈশ্বরের নাম স্মরণ করিলেন। তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হইল। কোরেশ সৈন্য মােসলমানের প্রবলপরাক্রম সহ্য করিতে না পারিয়া ছিন্ন ভিন্ন হইয়া গেল। মােহাম্মদ জয়শ্রীলাভ করিয়া সপ্ততিজন বন্দীসহ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন * আইভিং প্রভৃতি লেখকগণ নির্দেশ করিয়াছেন যে, কোরেশ- বণিকদের ধন লুণ্ঠনের জন্যই মােহাম্মদ বদরের যুদ্ধ করিয়াছিলেন। আমির আলী প্রভৃতি মােসলমান-লেখকগণের মতে, কোরেশের মােসলমানদিগকে প্যুদস্ত করিবার জন্য মদিনা আক্রমণ করিতে অগ্রসর হওয়াতেই বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আমরা গিরিশ বাবুর গ্রন্থ পাঠ করিয়া জানিতে পারি যে, মােহাম্মদের সমসময়ে একদল মদিনাবাসীর বিশ্বাস ছিল যে, তিনি অর্থ লােভেই বদরের যুদ্ধ করিয়াছিলেন। কতিপয় মদিনাবাসী যুদ্ধ করিবার জন্য মােহাম্মদের সহিত মদিনা হইতে বহির্গত হইয়াছিল, কিন্তু কিয়দ্র গমন করিয়াই প্রাপ্ত বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া যুদ্ধ না করিয়াই মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে। কয়স নামক একজন বীরপুরুষ যুদ্ধ করিবার জন্য মােহাম্মদের ৬৪ হজরত মােহাম্মদ মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হইয়াই কোরেশ বন্দী- দিগকে মুক্তি প্রদান করিলেন। মােসলমানগণ বন্দীদের সঙ্গে যথেষ্ট সদ্ব্যবহার করিয়াছিলেন। তাহারা পদব্রজে চলিয়া বন্দীদের কষ্ট নিবারণের জন্য অশ্ব দিত, নিজেরা খর্জুর দ্বারা উদরপূর্তি করিয়া তাহাদের তৃপ্তির জন্য রুটী সংগ্রহ করিত। মােহাম্মদ বদরের যুদ্ধে অল্পসংখ্যক সৈন্য লইয়া বহুসংখ্যক কোরেশ-সৈন্য পরাজিত করিয়াছিলেন। সঙ্গে বহির্গত হয় । মােহাম্মদ তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কিজন্য যুদ্ধ করিতে ইচ্ছা করিয়াছ?” কয়স উত্তর করে, “মক্কায় বণিকদের পণ্যদ্রব্যই আমাকে যুদ্ধে ব্ৰতী করিয়াছে।” কয়স ইসলাম- ধর্ম বিশ্বাসী ছিল না; এজন্য মােহাম্মদ তাহাকে ফিরাইয়া দেন। মােহাম্মদের অর্থলাভ এ যুদ্ধের কারণ নহে, বিরােধী কোরেশদিগকে দমন করিয়া মােসলমানদিগকে নিরাপদ করিবার জন্যই তিনি বদরের যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, এরূপ সমসাময়িক প্রমাণের অভাব নাই। এই যুদ্ধের প্রাক্কালে মােহাম্মদ সহচর বন্ধুগণের মত জিজ্ঞাসা করেন। আবুবকর তাহার প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “কোরেশদলপতিরা কখনও ইসলামধর্ম গ্রহণ করিবে না এবং সৰ্ব্বদা অন্যের ধর্মাচরণে ব্যাঘাত জন্মাইবে। একারণ তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ করাই শ্রেয়।” আবুবকর মােহাম্মদের একান্ত অন্তরঙ্গ ছিলেন। মােহাম্মদের কোন মনােভাব আবুবকরের নিকট শুক্কায়িত থাকিবার সম্ভাবনা ছিল না।

হজরত মােহাম্মদ ইহাতে মােসলমানদের ধর্মবিশ্বাস সুগভীর হইল। ইসলাম- ধর্ম ও তাহার প্রতিষ্ঠা ঈশ্বরেরই বিধান বলিয়া তাহাদের সুদৃঢ় প্রতীতি জন্মিল। তাহারা ধর্মের জন্য জীবন পণ করিল। ফলতঃ, মােসলমানেরা বদরের যুদ্ধক্ষেত্রে জয় লাভ করিয়া সমধিক দুর্জয় হইয়া উঠিল। কোরেশেরা যুদ্ধে পরাজিত হইয়া অপমানে জ্বলিতে লাগিল, এবং অপমানের প্রতিশােধ লইবার কল্পনায় দুই- শত অশ্বারােহী সৈন্য গুপ্তভাবে মদিনায় গমন করিয়া মােসলমানদিগকে নিগ্রহ করিতে আরম্ভ করিল। মােসলমান বীরপুরুষগণ কোরেশদের আগমনের সংবাদ পরিশ্রুত হইয়া রণসজ্জা পরিধান পূর্বক বহির্গত হইল । কোরেশ সৈন্য তাহাদিগকে দর্শন করিয়া ভয়বিহ্বলচিত্তে পৃষ্ঠভঙ্গ দিল । মােসলমানগণ পলায়মান সৈন্তের পশ্চাদ্বত্তী হইল । * এই অনুসরণকালে একদা মােহাম্মদ শিবির হইতে কিয়দূরে একাকী একটি বৃক্ষের তলে শয়ন করিয়াছিলেন। ডারথার নামক একজন অমিতবলবান দুর্দান্ত কোরেশ তাঁহাকে তদবস্থায় আক্রমন করে, এবং তাহাকে বধ করিবার জন্য তরবারি নিষ্কাশিত করিয়া বলে, “হে মােহাম্মদ, এখন তােমাকে কে রক্ষা করিবে ?” কিন্তু

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিযান
কোরেশেরা ক্রমাগত দুইবার এই ভাবে পরাজিত
হইয়া কিছুকালের জন্য শত্রুতাচরণ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক নীরব
হইল। বদরের যুদ্ধে মােহাম্মদ জয়শ্রী লাভ করাতে
ইলাম-বিদ্বেষী ইহুদীদিগের ক্ষোভের পরিসীমা রহিল
নানা প্রকারে মােসলমানের সঙ্গে
শত্রুতাচরণ করিতে আরম্ভ করিল। তাহারা মােহাম্মদ
এবং ইসলামধর্মকে লােকের নিকট অবজ্ঞাত করিবার
অভিপ্রায়ে বিদ্রুপাত্মক কবিতার প্রচার করিতে আরম্ভ
মােহাম্মদ কিঞ্চিত্র ভীত না হইয়া বজ্রকঠোর স্বরে উত্তর করেন,
“ঈশ্বর”; এই উত্তরে ভারথারের হৃদয় কম্পিত হইয়া উঠিল,
তরবারি তাহার হস্ত হইতে খসিয়া পড়িল। মােহাম্মদ বিদ্বেগে
সে তরবারি তুলিয়া লইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, এখন তােমাকে
কে রক্ষা করিবে?” ডারথার ভয়ে কাদিতে দিতে বলিল, “আমার
আর কেহ নাই, তুমি আমাকে রক্ষা কর ।” মােহাম্মদ তাহাকে
ক্ষমা করিলেন, তাহার তরবারি তাহাকে ফিরাইয়া দিলেন। ডারথার
ইসলামধর্ম গ্রহণ করিল।

হজরত মােহাম্মদ করিল। কবি নামক একজন ইহুদি মক্কানগরে গমনপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত কোরেশ-বীরদের শৌর্যবীর্যের কাহিনী গৃহে গৃহে প্রচার করিয়া তাহাদের পরিবারবর্গের শােকা- বনত হৃদয় উত্তেজিত করিয়া বিদ্বেষভাবে পরিপুষ্ট করিতে গিল। একদিন কতিপয় কৈনুকা বংশীয় ইহুদি ইন্দ্রিয়- পরবশ হইয়া পল্লিগ্রামস্থ একজন দুগ্ধ-বিক্ৰেত্রী কিশােরীর লজ্জাশীলতার ব্যাঘাত করিল। মােহাম্মদ ইহাতে উত্যক্ত হইয়া তাহাদিগকে ইলামধর্ম গ্রহণ করিতে অথবা মদিনা পরিত্যাগ করিয়া যাইতে আদেশ করিলেন। তাহারা মােহাম্মদের আদেশ অবহেলা করিয়া আপনাদের দুর্গ মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিল। মােহাম্মদ সসৈন্যে তাহাদের দুর্গ পরিবেষ্টন করিলেন । পঞ্চদশ অহােরাত্ৰব্যাপী অবরােধের পর তাহারা তাহার হস্তে আত্মসমর্পণ করিল । তিনি তাহাদিগকে ক্ষমা করিলেন; তাহারা (সাত শত। স্ব স্ব অস্ত্র-শস্ত্র মােসলমানের হস্তে পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সিরিয়া রাজ্যে প্রস্থান করিল। সাত শত ইহুদি মদিনা পরিত্যাগ করিলে মােসলমান- গণ একদল শত্রুর হস্ত হইতে রক্ষা প্রাপ্ত হইল। কিন্তু অনতিকাল মধ্যেই শক্রর আর কতিপয় দল কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিল। ইহুদিদিগের মদিনা পরিত্যাগের হজরত মােহাম্মদ অব্যবহিত পরেই মােহাম্মদ সংবাদ পাইলেন যে, কর- করতােল কদর নামক স্থানের কতিপয় লােক মােহাম্মদের বিরুদ্ধে দলবদ্ধ হইয়াছে। এই সংবাদ শ্রবণ করিয়া দুই শত মােসলমান সৈন্ত যুদ্ধযাত্রা করে; কিন্তু নির্দিষ্ট স্থানে কোন শত্রু না দেখিয়া ফিরিয়া আইসে । মােহাম্মদ নিজে এই সৈন্যদলের সঙ্গে ছিলেন। এই সময় সাবা ও মহাতেল কুলের কতিপয় লােক দলবদ্ধ হইয়া মদিনার প্রান্তে তস্করবৃত্তি আরম্ভ করে। এজন্য মােহাম্মদ করকরতােল কদর হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া তাহাদের বিরুদ্ধে সৈন্যসহ যাত্রা করেন। এবারও বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে মােসলমান সৈন্যের সাক্ষাৎ হয় নাই। এই অভিযানের পর মােহাম্মদ তুরগামী একদল কোরেশ বণিককে আক্রমণ করিবার উদ্দেশ্যে কতিপয় অশ্বারােহী সৈন্য প্রেরণ করেন। বণিকদল মােসলমান সৈন্য দেখিয়া পলায়ন করে। সৈন্যগণ পলায়িত বণিকদের পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি হস্তগত করিয়া মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হয়।

যুদ্ধ এই তিনটি ক্ষুদ্র অভিযানের পর মােসলমানদিগকে প্রবল যুদ্ধে নিরত হইতে হইল। কোরেশেরা মােসলমান হস্তে ক্রমান্বয়ে দুই বার পরাজিত হইয়া কিছুকালের জন্য নীরব হইয়াছিল, কিন্তু মােহাম্মদকে ধ্বংস করিবার সঙ্কল্প পরিত্যাগ করে নাই। তৃতীয় হিজিরীতে তাহারা পুনরায় মােহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিয়া তিন সহস্র সৈন্য সমভিব্যাহারে মদিনার অভিমুখে ধাবিত হইল। কোরেশ- বাহিনী দশম দিনে মদিনার অদূরবর্তী (৩ মাইল) ওহদ পৰ্বত শৃঙ্গে আসিয়া পঁহুছিল। মােহাম্মদ এক সহস্র মােসলমান সৈন্য লইয়া শত্রুর গতিরােধ করিতে আগমন করিলেন। ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মােসলমানগণ, শত্রু সৈন্যের অস্ত্রাঘাতে দলে দলে প্রাণ পরিত্যাগ করিতে লাগিল। স্বয়ং মােহাম্মদ গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হইলেন। বিজয় কোরেশদের অঙ্কশায়িনী হইলেন। কিন্তু এই বিজয় লাভ করিতে তাহাদের পক্ষেরও বহুসংখ্যক বীরপুরুষ প্রাণ বিসর্জন করিয়াছিল। ইহাতে কোরেশ সৈন্ত দুর্বল হইয়া পড়ে। এজন্য তাহারা জয়লাভ ৭০

হজরত মােহাম্মদ
করিল।
সত্বেও মদিনা আক্রমণের সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিয়া মক্কায়
প্রস্থান করিল।
কোরেশেরা মক্কায় প্রত্যাবৃত্ত হইয়া মদিনা আক্রমণের
পূৰ্ব্বে প্রতিনিবৃত্ত হওয়ার জন্য অনুশােচনা করিতে আরম্ভ
এজন্য তাহারা অচিরে পুনৰ্বার যুদ্ধায়ােজনে
প্রবৃত্ত হইল। এই সংবাদ মদিনায় পঁহুছিলে মােহাম্মদ
মােসলমানের প্রতাপ প্রদর্শন করিয়া শত্রুকুলের মনে ভয়
উৎপাদন পূর্বক তাহাদিগকে যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত করিতে
মনন করিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সসৈন্যে মদিনা
পরিত্যাগ করিয়া জমরাল আসাদ নামক স্থানে আসিয়া
শিবির সংস্থাপন করিলেন । কোরেশেরা এই সংবাদ
অবগত হইয়া স্তম্ভিত হইয়া পড়িল এবং সমস্ত যুদ্ধায়ােজন
পরিত্যাগ করিল। মােহাম্মদ সসৈন্যে মদিনায় ফিরিয়া
গেলেন।
মােহাম্মদ বিনা রক্তপাতে ফিরিয়া আসিলেন, কিন্তু
তাহাকে মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হইয়াই আবার যুদ্ধযাত্রা
করিতে হইল। তলহা ও সালমা নামক দুইজন আরব
অধিনেতা দলবদ্ধ হইয়া মদিনার পার্শ্ববর্তী স্থান সমূহ
লুণ্ঠন করিতে উদ্যত হওয়াতে মােসলমান সৈন্য যুদ্ধযাত্রা
করিল। শত্রুরা তাহাদিগকে দেখিয়া ঘর বাড়ী ছাড়িয়া
৭১

হজরত মােহাম্মদ পলায়ন করে। মােসলমান সৈন্য তাহাদের সমস্ত সম্পত্তি হস্তগত করিয়া মদিনায় ফিরিয়া আইসে । ইহার পর (হিজিরী চতুর্থ অব্দে) মােহাম্মদ একদল ইহুদির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিতে বাধ্য হন। মদিনা হইতে চারিদিনের পথ দূরবর্তী নাজেদ নামক স্থানে ধর্ম প্রচার করিবার জন্য তৎস্থানের অধিনেতা আবুরা মােসলমানদিগকে আহ্বান করিলেন। তদনুসারে মােহাম্মদ সত্তর জন মােসলমানকে তথায় প্রেরণ করিলেন। তত্রত্য অধিবাসীরা প্রেরিত মােসলমানদিগকে আবুরার অজ্ঞাতসারে আক্রমণ করিল। সমস্ত মােসলমান নিহত কেবল আমরু নামক একজন মােসলমান দৈবাৎ প্রাণরক্ষা করিয়া মদিনার অভিমুখে যাত্রা করিলেন । আমরু পথিমধ্যে মদিনা হইতে প্রত্যাগত দুইজন নাজেদ- অধিবাসীকে নিদ্রিত অবস্থায় দেখিতে পাইলেন, এবং প্রতিহিংসার বশবর্তী হইয়া তাহাদিগকে তদবস্থাতেই বধ করিলেন। অতঃপর তিনি মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া মােহাম্মদের নিকট সমস্ত অবস্থা জ্ঞাপন করিলেন । মহাপুরুষ মােসলমানদের শােচনীয় মৃত্যুতে একান্ত মর্মাহত হইলেন। পথিমধ্যে নিহত দুই ব্যক্তি তাঁহার নিকট অভয় প্রাপ্ত হইয়াছিল। এজন্য তিনি তাহাদের হত্যার জন্য হইল।

হজরত মােহাম্মদ
ক্ষতিপূরণ করিতে আদেশ করিলেন। নাজেদের
অধিবাসীরা বনিনজিরবংশীয় ইহুদিদের সঙ্গে সন্ধি-সূত্রে
আবদ্ধ ছিল। মােহাম্মদ ইহাদের অধিনেতার যােগে
ক্ষতিপূরণের অর্থ নিহত ব্যক্তিদ্বয়ের উত্তরাধিকারীদিগকে
প্রদান করিবার অভিপ্রায়ে তাহার গৃহে গমন করিলেন।
বনিনজিরবংশীয়গণ আন্তরিক বিদ্বেষের বশবর্তী হইয়া এই
সুযােগে মােহাম্মদকে হত্যা করিবার জন্য আয়ােজনে
প্রবৃত্ত হইল। মােহাম্মদ এই বিষয় গােপনে অবগত
হইয়া তাহাদের গ্রাস হইতে উদ্ধার পাইলেন। তিনি
গৃহে আগমন করিয়া তাহাদিগকে ইসলামধর্ম গ্রহণ অথবা
মদিনা পরিত্যাগ করিতে আদেশ করিলেন। তাহারা
এই আদেশ প্রতিপালনে অস্বীকৃত হইল। মােহাম্মদ
তাহাদের ব্যবহারে উত্যক্ত হইয়া অস্ত্রধারণ করিলেন।
কিয়ৎকাল প্রতিকুলাচরণের পর ইহুদিগণ ধন-প্রাণ রক্ষার
অভিপ্রায়ে অস্ত্র-শস্ত্র মােসলমানের হস্তে অর্পণপূৰ্ব্বক মদিনা
পরিত্যাগ করিল।
বনিনজিরবংশীয় ইহুদিরা নির্বাসিত হইবার পর আর
একদল শত্ৰু উপস্থিত হইল। আলমার ও সালন কুলের
লােকেরা মােহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিয়া সৈন্য
সংগ্রহ করিতে লাগিল। এজন্য তাহাদিগকে দমন করিবার
৭৩

হজরত মােহাম্মদ
জন্য সৈন্য প্রেরিত হইল। কিন্তু তাহারা মােসলমান
সৈন্তের আগমনে পলায়ন করিল। মােসলমান সৈন্য
কাহারও রক্তপাত না করিয়া মদিনায় ফিরিয়া গেল।
ইহার অব্যবহিত পরেই মােহাম্মদ দোমতােজন্দন
নামক স্থানে সসৈন্যে গমন করিলেন। এইস্থানে খােৰ্মা
ও যবের আমদানী হইত। তত্ৰত্য কতকগুলি দুষ্ট
লােক দলবদ্ধ হইয়া বিদেশীয়দের প্রতি অত্যাচার
করিতেছিল। মােহাম্মদ ইহাদিগকে দমন করিবার জন্যই
সসৈন্যে গমন করেন। কিন্তু দুৰ্বত্তেরা তাহার আগমন
সংবাদ শ্রবণ করিয়া পলায়ন করিল। মােহাম্মদ বিনাযুদ্ধে
অভীষ্ট সিদ্ধ করিয়া মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন।
কিন্তু মােসলমান সৈন্যের একদিনের জন্যও বিশ্রাম
ছিল না। প্রাগুক্ত অভিযানের অব্যবহিত পরেই (হিজিরী
পঞ্চম অব্দে) মােহাম্মদকে আবার অস্ত্রধারণ করিতে হইল
লােহিত সাগরের অনতিদূরে মস্তকবংশীয়েরা কোরেশদের
সঙ্গে সম্পর্কন্বিত এবং তাহাদের ন্যায় পৌত্তলিক ছিল।
তাহারা পঞ্চম হিজিরীতে মােহাম্মদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
করিতে সমুদ্যত হয়। মােহাম্মদ এই সংবাদ অবগত হইয়া
সসৈন্যে তাহাদের
আবাসভূমিতে উপনীত হইলেন।
মস্তকেরা মােসলমান সৈন্যের গতিরােধ জন্য আগমন
;
৭৪

হজরত মােহাম্মদ করিল। উভয় সৈন্য পরস্পরের সম্মুখবর্তী হইলে ওমর উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, “ইসলামধর্ম গ্রহণ কর, তােমাদের জীবন ও ধনসম্পত্তি রক্ষা পাইবে।” তাহারা অস্বীকার করিল। তখন মােসলমান সৈন্য তাহাদিগকে আক্রমণ করিল, তাহাদের প্রবল আক্রমণে মস্তকেরা পরাজিত হইল। মােসলমান সৈন্য বিজয়ােল্লাসে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিল। মােহাম্মদ মস্তকের যুদ্ধ হইতে মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হইয়াই অভিনব বিপদে পতিত হইলেন। তাঁহার প্রতি গমনের অল্পদিন পরেই দশ সহস্র কোরেশ সৈন্য মদিনা বিধ্বস্ত করিবার জন্য মক্কা হইতে বহির্গত হইল। কুরেজা- বংশীয় ইহুদিরা তাহাদের সঙ্গে যােগ দিয়া মােহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিল। মােহাম্মদ শত্রুর গতিরােধ জন্য তিন সহস্র সৈন্যসহ মদিনার অদূরবর্তী যানা পৰ্ব্বতের পাদদেশে উপনীত হইলেন। শত্রু সৈন্য আলিয়া মােসল- মান সৈন্যের সম্মুখে শিবির সংস্থাপন করিল। প্রথম দিনের যুদ্ধে আলী, ওমর নামক একজন কৃতান্ত সদৃশ প্রবলপরাক্রান্ত বীরপুরুষকে দ্বৈরথ যুদ্ধে হত্যা করিলেন। ক্রমাগত যুদ্ধ চলিতে লাগিল। এই যুদ্ধকালে নমির নামক একজন কোরেশ গােপনে ইসলামধর্ম গ্রহণ করিয়া ৭৫ হজরত মােহাম্মদ মােহাম্মদের শরণাগত হইল। তাহার চক্রান্তে কুরেজা ও কোরেশ সৈন্যদের মধ্যে ভেদ উপস্থিত হইয়া নানা- প্রকার গােলযােগের সৃষ্টি করিল। তাহারা ভীত হইয়া পড়িল। যুদ্ধস্থান পরিত্যাগের কল্পনা তাহাদের মনে উখিত হইল। তাহাদের ঈদৃশ মানসিক অবস্থার সময় দুরন্ত ঝটিকা উপস্থিত হইয়া তাহাদের সমস্ত শিবির বিশৃঙ্খল ও বিধ্বস্ত করিয়া ফেলিল। তাহারা এই ঘটনায় ভীতিবিহ্বল হইয়া পলায়ন করিল। যানা পর্বতের পাদ- দেশে মােসলমান সৈন্যকে এই ঝটিকার মধ্যে উনত্রিশ দিন অবস্থান করিতে হইয়াছিল। এই সময় মধ্যে দুরন্ত শীত এবং খাদ্যাভাব নিবন্ধন তাহাদের কষ্টের একশেষ হইয়াছিল। মােহাম্মদকে এই যুদ্ধে যেরূপ কষ্টভােগ ও পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল, অন্য কোন যুদ্ধে সেরূপ হয় নাই। মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়াই কুরেজা ইহুদি- দের বাসস্থান অবরােধ করিলেন। তাহারা পঞ্চবিংশতি দিন ব্যাপি অবরােধের পর আত্মসমর্পণ পূৰ্ব্বক জীবন ভিক্ষা করিয়া নিৰ্বাসন দণ্ড প্রার্থনা করিল। মােহাম্মদ তাহাদের প্রার্থনা গ্রাহ করিলেন না; কিন্তু তাহারা তাহাতে নিরাশ না হইয়া পুনঃ পুনঃ কাকুতি মিনতি করিতে হজরত মােহাম্মদ লাগিল। অবশেষে মােহাম্মদ ইহুদিদের প্রার্থনা মত তাহাদের বিচারভার সাদ নামক একজন প্রধান শিষ্যের হস্তে অৰ্পণ করিলেন। সাদ ইহুদিদের বন্ধু বলিয়া খ্যাত ছিলেন। কিন্তু সাদের নৃশংস বিচারে পুরুষদিগের প্রাণদণ্ড এবং রমণী ও বালকদের দাসত্ব বিধান হইল। সাদ প্রাগুক্ত যুদ্ধে অত্যন্ত আহত হন, এজন্যই তিনি কুরেজাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া তাদৃশ কঠোর ব্যবস্থা করিয়াছিলেন বলিয়া ইতিহাস লেখকগণ উল্লেখ করিয়াছেন। কুরেজা ইহুদিগণের হত্যার পর মােসলমান সৈন্য উপযুপরি পাঁচটি ক্ষুদ্র অভিযান করিয়াছিল। আমরা এই সকল অভিযানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করিতেছি (১) সয়ফলকার অভিযান, কোন যুদ্ধ হয় নাই। (২) মদিনার নিকটবর্তী কোন স্থানের অধিবাসীরা দুই জন মােসলমানকে হত্যা করিয়াছিল । মােহাম্মদ তাহাদিগকে এই দুকার্যের প্রতিফল দিবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। তাহাদের আগমনে অধিবাসীরা পলায়ন করে। মােসল- মান সৈন্য বিনাযুদ্ধে মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হয়। (৩) হজরত মােহাম্মদ খরবিয়া নামক স্থানে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। তাহারা কয়েকজন লােককে হত্যা করিয়া হজরত মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাগমন করে। (৪) মােহাম্মদ ফদকের সাদবংশীয়দের বিরুদ্ধে মহাবীর আলীকে প্রেরণ করেন। আলী যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হন। (৫) কতিপয় তস্কর মােহাম্মদের দুইটি উষ্ট্র অপহরণ করায় মদিনার বহির্ভাগে একটি যুদ্ধ হয়। তস্করেরা মােসলমান সৈন্যের অস্ত্রাঘাত সহ করিতে না পারিয়া পলায়ন হােদয়বিয়ার সন্ধি । এই সময় মােহাম্মদ একবার জন্মভূমি মক্কা দর্শন করিবার জন্য আগ্রহান্বিত হইলেন। তিনি পুণ্যমাসে (জেকদ মাসের প্রথম সােমবারে) ছয়শত মােসলমান সৈন্য সমভিব্যাহারে নিরস্ত্র হইয়া মক্কাযাত্রা করিলেন। কোরেশেরা এই সংবাদ অবগত হইয়া তাহার গতিরােধ জন্য সৈন্য প্রেরণ করিল। মােহাম্মদ এইবার তাহাদের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন। কোরেশেরা তাঁহার দূতকে অব- জ্ঞাত করিয়া ফিরাইয়া দিল। নিৰ্বিবাদে মক্কা দর্শন করিয়া মদিনায় প্রত্যাবর্তন করাই মােহাম্মদের ইচ্ছা ৭ হজমও মােহাম্মদ ছিল। এ-কারণ তিনি পুনর্বার দূত প্রেরণ করিলেন। বহু আন্দোলনের পর দশ বৎসরের জন্য সন্ধি স্থাপিত হইল; মােসলমান এবং কোরেশ, উভয়েই দশ বৎসরের জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণে বিরত থাকিতে প্রতিশ্রুত হইল। মােহাম্মদ মক্কায় প্রবেশ ক্ষান্ত করিয়া প্রত্যাবর্তন করিতে স্বীকৃত হইলেন; কোরেশেরা পর বৎসর তাঁহাকে সশিষ্যে কোষবদ্ধ তরবারি লইয়া তিন দিন মক্কায় যাপন করিতে দিতে অঙ্গীকার করিল। মােসলমানগণ মক্কায় আসিল। এই সন্ধির নাম হােদয়বিয়ার সন্ধি। মােহাম্মদ মদিনায় ফিরিয়া আসিয়া খয়বারের ইহুদি- দের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। খয়বারের ইহুদিরা অত্যন্ত পরাক্রমশালী ছিল। তাহারা মােসলমানদের উচ্ছেদসাধনার্থ যুদ্ধের আয়ােজনে প্রবৃত্ত ছিল। মােহাম্মদ এজন্যই তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। মােসলমান- গণ খয়বার আক্রমণ করিলে ইহুদিরা প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করিতে লাগিল। কিন্তু আলীর নেতৃত্বে মােসলমান সৈন্য তাহাদিগকে পরাজিত করিয়া খয়বার অধিকার করিল। ইহার পর মােহাম্মদ ফদক এবং ওয়াদি-উল- করার ইহুদিদিগকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। (৭ হিজিরী)।

হজরত মােহা
মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া হােদয়বিয়ার
সন্ধির নির্দিষ্ট সময় মত দুই সহস্ৰ শিষ্য সমভিব্যাহারে
মক্কা গমন করিলেন। কোরেশেরা তাঁহার আগমনে মক্কা
পরিত্যাগ করিয়া প্রস্থান করিল।
মােহাম্মদ জন্মভূমি দর্শন করিয়া তিন দিন পর মদিনায়
যাত্রা করিলেন।
মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হইয়াই যুদ্ধোদ্যমে নিরত
হইলেন। তিনি সিরিয়ার নিকটবর্তী মুতা নামক স্থানে
ধর্মপ্রচার জন্য দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। তত্ৰত্য খৃষ্টান
অধিবাসীরা তাঁহাকে হত্যা করে। মােহাম্মদ এই হত্যার
প্রতিশােধ লইবার জন্য মদিনায় ফিরিয়া আসিয়া সৈন্য
প্রেরণ করিলেন। মােসলমান সৈন্য মুতার সম্মুখবর্তী
হইলে তত্ৰত্য অধিবাসীরা তাহাদিগকে আক্রমণ করিয়া
অত্যন্ত বিব্রত করিয়া তুলিল। ক্রমান্বয়ে তিন জন
মােসলমান সেনাপতি জীবন বিসর্জন করিলেন। শেষে
বীরশ্রেষ্ঠ খালেদ সেনাপতির পদ গ্রহণপূর্বক প্রবল
পরাক্রমে শত্রু-সৈন্য নাশ করিয়া বিজয়পতাকা উডডীন
করিলেন। (৮ম হিজিরী।) অতঃপর মােসলমান সৈন্য
মদিনায় প্রত্যাবৃত্ত হইল।
৮০

কাবা মাকেশ্বরের উপাসনার প্রতিষ্ঠা জন্য মুতার যুদ্ধের অল্পদিন পরেই কোরেশেরা সন্ধির নিয়ম ভঙ্গ করিয়া বনি খুজা বংশীয় মােসলমানদিগকে আক্রমণ করিল। তাহারা কোরেশদিগকে দমন করিবার মােহাম্মদের সাহায্য সাহায্য প্রার্থনা করিল। তিনি তাহাদের আহ্বানে অবিলম্বে দ্বাদশ সহস্র সৈন্য সমভি- ব্যাহারে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করিলেন। আবুসুফিয়ান এবং মােহাম্মদের পিতৃব্য আব্বাস প্রমুখ কোরেশ দল- পতিগণ অগ্রসর হইয়া ইসলামধর্ম গ্রহণ করিলেন। মােহাম্মদ বিপুলবাহিনীসহ আগমন করায় এবং দলপতিগণ ইসলামধর্ম গ্রহণ করিয়া তাহার পক্ষাবলম্বী হওয়ায় কেহই আর তাহার গতিরােধ করিতে অগ্রসর হইল না। তিনি সগৌরবে মক্কায় প্রবেশ করিয়া কাবা মলল তিন শত যাইটটি মূর্তি ভগ্ন করিলেন। কোরেশেরা বিস্মিত লােচনে এই দৃশ্য দেখিতে লাগিল। অতঃপর মক্কার সমস্ত নর- নারী মােহাম্মদের শরণাপন্ন হইয়া ইসলাম-ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিল ; মােহাম্মদ কিয়দ্দিস মক্কায় বাস করিয়া মদিনায় প্রতিগমন করিলেন। ১

হজরত মােহাম্মদ
৫.
পৌত্তলিকতার দুর্গম্বরূপ
কাবা মনি একেশ্বরের
উপাসনা প্রতিষ্ঠিত হইবার সঙ্গে সঙ্গেই ইসলাম-ধর্মের
জ্যোতিঃ আরবদেশের সর্বত্র বিকীর্ণ হইয়া অজ্ঞান তিমিরা-
চ্ছন্ন নরনারীর হৃদয় আলােকিত করিল। আরবদেশ
হইতে দেবদেবীর উপাসনা বিলুপ্ত হইল।
হওয়াজন ও সকিফ ব্যতীত আরবের অন্য সমস্ত
সম্প্রদায় ইসলাম-ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়া মােহাম্মদের শরণাপন্ন
হইল ; তাহার ঐশ্বৰ্য্য প্রভাব এবং প্রতিপত্তি সমধিক
বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল। হওয়াজন ও সকিফ বংশীয় অধিনেতৃ-
গণ ত্রিশ সহস্র সৈন্য সংগ্রহ করিয়া মদিনা আক্রমণ
করিবার জন্য বহির্গত হইল। মােহাম্মদ এই সংবাদ
পাইয়া শত্রু সৈন্যের গতিরােধ করিতে সসৈন্যে যাত্রা
করিলেন। হােলয়ন নামক স্থানে উভয় সৈন্য পরস্পরের
সম্মুখীন হইলে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মােসলমান সৈন্য
শত্রুর প্রবল আক্রমণ সহ করিতে না পারিয়া পলায়ন
করিতে আরম্ভ করিল। মােহাম্মদ ও আবুসুফিয়ান
তাহাদিগকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। সৈন্যগণ
তাঁহাদিগের উৎসাহপূর্ণ বাক্যে উদ্দীপ্ত হইয়া শদিগকে
দুর্জয় পরাক্রমে আক্রমণ করিল। শকুল তাহাদের
পরাক্রম প্রতিরােধ করিতে না পারিয়া পৃষ্ঠ প্রদর্শন

হজরত মােহাম্মদ
করিল। বিজয়লক্ষ্মী মােসলমানের অঙ্কশায়িনী হইলেন।
শত্রু সৈন্যের ছয় সহস্র অশ্ব ও চারি সহস্র উষ্ট্র ও চারি
সহস্র রৌপ্যমুদ্রা মােসলমানদের হস্তগত হইল। এক দল
সকি হওয়াজন সৈন্য রণক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিয়া
তায়েফ নগরে আশ্রয় গ্রহণ করিল। মােহাম্মদ তায়েফ
নগর অবরােধ করিলেন। কিয়দ্দিবস অতিবাহিত হইলে
তত্ৰত্য অধিবাসীরা তাঁহার হস্তে আত্মসমর্পণ করিয়া
ইলাম-ধর্ম গ্রহণ করিল ।
মােহাম্মদ তায়েফ নগর পরিত্যাগ করিয়া সগৌরবে
মদিনায় ফিরিয়া আসিলেন। তিনি মদিনায় প্রতিগমন
করিয়া অবগত হইলেন যে, রােমসম্রাট হিরাক্লিয়াস
তাহার প্রতাপ খর্ব করিবার জন্য আরব সীমান্তে বহু
সংখ্যক সৈন্য সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন। মােহাম্মদ তাহাদের
বিনাশ সাধন উদ্দেশ্যে বিপুল যুদ্ধায়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন।
আবুবকর প্রভৃতি প্রচার বন্ধুগণ আপনাদের সঞ্চিত সমস্ত
অর্ধ মােসলমানজাতির রক্ষার জন্য উৎসর্গ করিলেন।
মােসলমান রমণীগণ আপনাদের বসন ভূষণ বিক্রয় করিয়া
লব্ধ অর্থ মােহাম্মদের হস্তে সমর্পণ করিল। মােহাম্মদ
বিপুল বাহিনী সংগ্রহ করিয়া রােম সাম্রাজ্য আক্রমণ
করিবার জন্য ধাবিত হইলেন।
মােসলমান সৈন্ত

হজরত মােহাম্মদ সিরিয়ার প্রান্তদেশে উপনীত হইল। এই সময় বােম- সম্রাট সাম্রাজ্যের আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দূর করিবার জন্য সমস্ত শক্তি নিয়ােগ করিয়াছিলেন । এজন্য তিনি মােসলমান সৈন্যের সম্মুখীন হইলেন না। মােহাম্মদ বিনা যুদ্ধে ফিরিয়া আসিলেন। মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া আরবদেশের সুশাসন ও আরবদেশের বহির্ভাগে ধর্মপ্রচার জন্য মনাে- নিবেশ করিলেন। পার্শ্ববর্তী রাজ্য সমূহের রাজস্যবৃন্দ মােহাম্মদের সঙ্গে সখ্যস্থাপন জন্য দূত প্রেরণ করিতে আরম্ভ করিলেন। মােহাম্মদ অবিশ্রান্ত যুদ্ধ হইতে বিশ্রাম লাভ করিয়া পরমেশ্বরের ধ্যান ধারণায় নিরত হইলেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘকাল শান্তিতে যাপন করিতে পারিলেন না। তাঁহার একমাত্র পুত্র অকালে কাল- গ্রাসে পতিত হইল। মােহাম্মদ একমাত্র বংশধরের অকাল মৃত্যুতে শশাকে অনুবিদ্ধ হইলেন। এই নিদারুণ শােকের সময়েও ধর্মবিশ্বাস তাহাকে পরিত্যাগ করিল । তিনি প্রিয়তম পুত্রের সমাধির সময় আকুল কণ্ঠে বলিলেন, “হে পুত্র। আজ সাক্ষ্য প্রদান কর যে, ঈশ্বর তােমার প্রভু, পয়গম্বর তােমার পিতা এবং ইসলাম তােমার ধর্ম।” তিনি ঈশ্বরের নাম স্মরণ করিয়া দুঃসহ ৮

হজরত মােহাম্মদ
পু-শােক সহ্য করিলেন। মােহাম্মদ মক্কা গমন করিতে
ইচ্ছা করিলেন। তিনি দশম হিজিরীর জেলকদ মাসে
মক্কা যাত্রা করিলেন। যথাসময়ে জন্মভূমিতে উপনীত
হইয়া সমস্ত ক্রিয়াকলাপ সমাপন করিলেন। তারপর
সমাগত মােসলমানদিগকে মধুর ধর্মোপদেশ প্রদান করিয়া
মদিনায় ফিরিয়া আসিলেন।
মােহাম্মদের তিরােধান
মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া পীড়াক্রান্ত
হইয়া পড়িলেন। ক্রমশঃ তাহার পীড়া অত্যন্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত
হইল। একাদশ হিজিরীর রবি-অল-আউয়ল মাসের ৯ই
তারিখ শুক্রবার আগত হইল। মােহাম্মদ চিরাগত
প্রথামত মসজিদে উপাসনার জন্য গমন করিতে উদ্যত
হইলেন, কিন্তু দৌর্বল্যবশতঃ দুই এক পদ অগ্রসর হইয়াই
মূচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। তাঁহার পরিবর্তে আবুবকর
মসজিদে গমন করিয়া উপাসনা করিতে আরম্ভ করিলেন।
ইহাতে সমবেত উপাসকগণ ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল, অনেকে
অশ্রু বিসর্জন করিতে আরম্ভ করিল। মােহাম্মদ এই

হজরত মােহাম্মদ
সংবাদ পরিশ্রুত হইয়া আলী ও আব্বাসের স্কন্ধে ভর
করিয়া মসজিদে গমন করিলেন । আবুবকরের উপাসনা
শেষ হইলে তিনি সমবেত মােসলমানদিগকে লক্ষ্য করিয়া
বলিতে লাগিলেন, “তােমরা আমার মৃত্যুর জনরব শুনিয়া
ভীত হইয়াছ। কিন্তু ইতিপূর্বে কি কোন পয়গম্বর
চিরজীবী হইয়াছেন যে, আমিও মৃত্যুর হস্ত হইতে
পরিত্রাণ লাভ করিয়া তােমাদের সঙ্গে চিরকাল বাস
করিব ? সকলি ঈশ্বরেচ্ছায় সম্পন্ন হয় ; সকলেরি নির্দিষ্ট
সময় আছে, তাহার অগ্র পশ্চাৎ করা কাহারও সাধ্য
নহে। যিনি আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন, আমি তাঁহার
নিকট ফিরিয়া যাইতেছি। তােমরা ঐক্যসুত্রে বদ্ধ
থাকিও, পরস্পরকে প্রেম ও সম্মান করিও, বিপদের সময়
একে অন্যের সাহায্য করিও, একে অন্যকে ধর্মবিশ্বাসে
অটল থাকিতে ও সৎকাৰ্য্য সাধন করিতে উৎসাহিত
ধৰ্ম্মবিশ্বাস এবং সৎকাৰ্য্যই মানুষের মঙ্গল
বিধান করিয়া থাকে।
অন্য সকল কাৰ্য্যই তাহাদিগকে
ধ্বংসের পথে লইয়া যায়।”
মােহাম্মদ ধর্মোপদেশ প্রদান করিয়া গৃহে ফিরিয়া
আসিলেন। ইহার তিন দিন পর তিনি “প্রভাে! তােমার
ইচ্ছা পূর্ণ হউক” বলিয়া চক্ষু মুদ্রিত করিলেন। তাঁহার
করিও।

হজরত মােহাম্মদ পবিত্র আত্মা নশ্বর দেহ পরিত্যাগ করিল। মহাপুরুষ আরবজাতির উদ্দাম স্বভাব সংযত * এবং একেশ্বরবাদের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করিয়া আপন জীবনব্রত সাধনপূর্বক ইহ- লােক পরিত্যাগ করিলেন। আরবজাতির উদ্দাম স্বভাব সংযত করিবার কিরূপ অসাধারণ ক্ষমতা মােহাম্মদের ছিল, তাহা প্রদর্শন করিবার জন্য আমরা একটি বিষয়ের উল্লেখ করিতেছি। তৎকালের আরবসমাজে সুরার অতিশয় প্রচলন ছিল। অতি মৃদু প্রকৃতির লােকও সহসা সুরাপান পরিত্যাগ করিতে পারে না। উগ্র প্রকৃতির আরবীয়দের পক্ষে পান-দোষ পরিত্যাগ করা একরূপ অসম্ভব ছিল। চতুর্থ হিজিরীতে মােহাম্মদ সুরাপানের অবৈধতা বিষয়ে প্রত্যাদেশ লাভ করেন। এই প্রত্যাদেশের বিষয় ঘােষণা দ্বারা প্রচার করা হইয়াছিল। এই ঘােষণা প্রচারকালে যাহারা মদ্যপান করিতেছিল, তাহারা পানপাত্র দূরে ফেলিয়া দিল আর সুরা স্পর্শ করিল না। সুরাপায়ীরা সমস্ত ভাণ্ড ভাঙ্গিয়া ফেলিল। পথে পথে সুরাস্রোত বহিল। ঘটনায় কেবল যে মােসলমানের উপর মােহাম্মদের প্রভাব প্রকাশ পাইতেছে, তাহা নহে, ইহাতে তাহাদের সুগভীর সরল বিশ্বাসেরও প্রমাণ রহিয়াছে। ৮৭ ইলামের প্রতিষ্ঠার কারণ মােহাম্মদ প্রথমতঃ এয়ােদশ বৎসর মক্কায় বাস করিয়া ইসলাম-ধর্ম প্রচার করেন। এই সময়ে তিনি স্বীয় পাবকশিখা সদৃশ উপদেশে কঠিন হৃদয় আরবদিগকে বিগলিত করিতে যত্ন করেন। তাঁহার ধর্মপ্রচারের ফলে মক্কার অনেকে ইসলাম-ধৰ্ম্ম গ্রহণ করেন; এবং মক্কার বহির্ভাগেও কোন কোন স্থানে (মক্কার বহির্ভাগের স্থান সমূহের মধ্যে মদিনার নামই সর্বাগ্রে উল্লেখযােগ্য) ই- লাম-ধৰ্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সমগ্র আরবের লােক- সংখ্যার তুলনায় ইসলাম-ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসীর সংখ্যা নগণ্য ছিল। মােহাম্মদ এয়ােদশ বৎসরের সাধনায়ও সাফল্যলাভ করিতে অসমর্থ হইয়া এবং বিরুদ্ধবাদী কোরেশদের উৎপীড়ন সহ করিতে না পারিয়া সশিষ্যে মদিনায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। মদিনার অনুরক্ত শিষ্যগণের সাহায্যে মােহাম্মদ ধর্মমণ্ডলীর প্রতিষ্ঠা করিয়া তাহাকে রাজশক্তি সম্পন্ন করিয়া তুলেন। এই ধৰ্ম্মমণ্ডলীর সহায়তায় তিনি ইস লামধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। তাহার জ্বলন্ত ধর্মোৎসাহ, হজরত মােহাম সর্বগ্রাহী সাম্যবাদ, উদ্দীপনাপূর্ণ বাগ্মীতা, নির্মল চরিত্র, বিপুল সাহস এবং সুদৃঢ় সহনশীলতার কথা ক্রমশঃ আরবদেশে পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়ে; এবং তজ্জন্য আরব- দেশের নানা স্থান হইতে বহু লোেক আকৃষ্ট হইয়া তাহার শিষ্যত্ব স্বীকার করে। এই ভাবে আরবদেশের সর্বত্র দ্রুতগতিতে ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠা আরম্ভ হয়। কিন্তু মােহাম্মদের জন্মভূমি মক্কার অধিবাসী কোরেশদের চিত্ত * ইসলামধর্মের সাম্যবাদ যথার্থই সর্বগ্রাহী। মােসলমান মাত্রেই সমান। অতি নীচ মােসলমানেরও কোরাণ পাঠ ও মসজিদে উপাসনা করিবার অধিকার রহিয়াছে। রাজত্ব ও দাসত্বের মধ্যে কেবল গুণের পার্থক্য ; অনেক কীতদাস বুদ্ধি ও শৌবলে রাজসিংহাসন অধিকার করিয়াছেন। দাসত্বপ্রথা ঈদৃশ সাম্যবাদের বিরােধী বলিয়া মােহাম্মদ তাহার পক্ষপাতী ছিলেন না। যে-সকল ব্যক্তি যুদ্ধে বন্দী হয়, কেবলমাত্র তাহাদিগকেই দাসত্বে আবদ্ধ করিবার নিয়ম তিনি অনুমােদন করেন। কিন্তু দাসত্ব মােনই পরমেশরের চক্ষে প্রীতিকর কাৰ্য্য বলিয়া তিনি বর্ণনা করিয়াছেন। বন্দী ব্যতীত আর কাহাকেও দাসত্ব নিগড়ে আবদ্ধ করিতে মােহদ নিষেধ করিয়াছেন; কিন্তু মােসলমানসমাজে আজ পর্যন্তও দাস বিয়ের প্রথা প্রচলিত রহিয়াছে। এ-এথা যে ইসলাম-বিরুদ্ধ, তাহাতে সন্দেহ নাই। ; s হজরত মােহদ উত্তরােত্তর অধিকতর বিদ্বেষ-বিষে পূর্ণ হইয়া উঠে। মােহাম্মদ পঞ্চ বৎসর মদিনায় অতিবাহিত করিয়া সশিয্যে মা দর্শন জন্য গমন করেন। এই সময়ে তিনি কোরেশ- দের সঙ্গে সন্ধি সংস্থাপন করেন। এই সন্ধি ইতিহাসে হােদয়বিয়ার সন্ধি বলিয়া খ্যাত হইয়াছে। মােহাম্মদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচার-বন্ধু আবুবকর বলিয়াছেন,—“হােদয়- বিয়ার সন্ধি স্থাপন জন্য ইসলামধর্মের যেরূপ প্রচার হয়, আর কিছুতে সেরূপ হয় নাই।” যে-সকল ইসলামধৰ্ম্ম- বিশ্বাসী কোরেশদের হস্তে লাঞ্ছনার আশঙ্কায় আপনাদের ধৰ্ম্ম-বিশ্বাস গােপন রাখিত, তাহারা হােয়দবিয়ার সন্ধিতে স্বাধীন ও প্রমুক্ত হইয়া প্রকাশ্যে ইসলামধর্মের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপাদন করে। ইহাতে অসংখ্য নরনারীর কুসংস্কার দূর হয়; এবং তাহারা ইসলামধর্ম গ্রহণ করে। যােদয়- বিয়ার সন্ধি স্থাপনের পর মােহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া ধর্মপ্রচার করিবার জন্য পারস্যরাজ, রােমকসাই, মিশরের শাসনকর্তা ও আবিসিনিয়ার অধিপতির নিকট দূত প্রেরণ করেন। ইহার ফলে এই সব দেশে ইসলাম- ধর্মের পক্ষপাতী কতিপয় ব্যক্তির উদ্ভব হয় এবং পারস্য- রাজ্যের উপরিভাগ এয়মানের শাসনকর্তা প্রজামণ্ডলীসহ ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন। হােদয়বিয়ার সন্ধি স্থাপনের হরত মােহাম্মদ এক বৎসর পর মােহাম্মদ পুনর্বার মা দর্শন জন্য গমন করেন। এই সময়ে বহু লােক ইসলামধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করে। ইহার পর বৎসর মােহাম্মদ মক্কার সমস্ত নরনারীকে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করেন। মক্কার একেশ্বর- বাদ পরিগৃহীত হইবার পর অচিরে সমগ্র আরবদেশে ইসলামধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মােহাম্মদ মক্কায় শান্ত স্বভাব ছিলেন ; বাক্যবলই তাঁহার একমাত্র সম্বল ছিল। কিন্তু তিনি মদিনায় তেজস্বিতা প্রকাশ করেন, বাহুবল উঁহার সহায় হইয়া- ছিল। মক্কায় বাসকালে ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠা মন্দ- গতিতে হইয়াছিল, মদিনা গমনের পর হইতেই দ্রুতগতিতে ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠা আরম্ভ হয়। এ-কারণ অনেকে মনে করেন যে, মােহাম্মদ বাক্যবলে ধর্মপ্রচার করিতে অসমর্থ হইয়া বাহুবলের আশ্রয় গ্রহণ পূর্বক কৃতকাৰ্য্য হন। ১১ বাহুবল ও মােহাম্মদ কি প্রণালীতে ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠা হয় তাহার রেখাপাত আমরা পূর্বেই করিয়াছি । মােহাম্মদের মদিনায় গমনের পর মােসলমান সৈন্য যতবার যুদ্ধযাত্রা করিয়াছিল, আমরা তাহার সংক্ষিপ্ত অথচ আমূল বৃত্তান্ত প্রদান করিয়াছি। মােহাম্মদের আদেশে মােসলমান সৈন্য তেত্রিশবার যুদ্ধযাত্রা করিয়াছিল। তন্মধ্যে তেরবার কোরেশদিগের বিরুদ্ধে, ছয়বার ইহুদিদের বিরুদ্ধে, দুই- বার খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে এবং বারবার, বারটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করা হইয়াছিল। ইসলাম ও মােসলমানের বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে কোরেশদের শত্রুতাচরণই সর্বাপেক্ষা প্রবল ছিল। কোরেশদের নিম্নেই ইহুদিদের বিদ্বেষভাব প্রবল ছিল। কোরেশ ও ইহুদি ধরাপৃষ্ঠ হইতে ইসলাম ও মােসলমাদের চিহ্ন পর্যন্ত মুছিয়া ফেলিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছিল। মােহাম্মদ এয়ােদশ বৎসর বাক্যবলে শত্রুতাচরণ নিবৃত্ত করিতে যত্ন করেন। কিন্তু তাহাতে কৃতকাৰ্য্য হইতে না পারিয়া বাহুবলের প্রয়ােগ করেন। মােহাম্মদ আত্মরক্ষা বা হজরত মােহাম্মদ শনাশ করার দেশেই অস্ত্রধারণ করিয়াছিলেন। এজন্যই আমরা দেখিতে পাই যে, যাহার বিষেষভাব * কোন কোন লেখক লিখিয়া গিয়াছেন যে, লুণ্ঠনলােপ আরবদের প্রীতির জন্যই মােহাম্মদ অনেক স্থানে অস্ত্রধারণ করিয়াছিলেন। আমাদের ইহা বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না। মােহাম্মদ নিজে নিলো মহাপুরুষ ছিলেন। আমরা গিরিশ- বাবুর গ্রন্থ অবলম্বন করিয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করিতেছি। মােহাম্মদ অন্তিমকালে কতকগুলি স্বর্ণমুদ্রা প্রাপ্ত হন। তিনি নিজ কার্যের জন্য ৬৭টি রাখিয়া অবশিষ্টগুলি বিতরণ করিবার জন্য আয়েসার হস্তে অর্পণ করেন। ইহার কিছুকাল পরেই তিনি ব্যাধির যন্ত্রণায় সংজ্ঞাশুন্য হন। তিনি সংজ্ঞালাভ করিয়া মোহরগুলি বিতরণ করা হইয়াছে কি না, তাহাই প্রথমে জিসা করেন। আয়েশা বলেন, বিতরণ করা হয় নাই। তিনি মােহরগুলি দরিদিগকে দান করিতে বলিয়া পুনর্বার সংজ্ঞাশূন্য হন। মােহাম্মদ কিছুকাল পরে সংজ্ঞাণাভ করিয়া মুদ্রাগুলি বতরণ করা হইয়াছে কি না, পুনঃ জিজ্ঞাসা করেন। আয়েশা পূৰ্ব্বমত উত্তর দেন। ইহাতে মােহাম্মদ মােহরগুলি আলীর হাতে দেন। আলী বিতরণ করিলে তিনি বলেন, “এক্ষণে আমি শান্তি- লাভ করিলাম।” ঈদৃশ মহাপুরুষ যে শিষ্যগণের লুণ্ঠন বাসনা চরিতার্থ করিবার জন্য নররক্তপাত করিতেন, তাহা আমাদের বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না।

হজরত মােহাগ যত প্রবল ছিল, তাহার বিরুদ্ধে তত অধিকবার যুদ্ধযাত্রা করা হইয়াছিল। কিন্তু পরবারের অধিক যুদ্ধ করিতে হয় নাই। মােসলমানগণ তেত্রিশবার যুদ্ধযাত্রা করিয়া- ছিল। তন্মধ্যে মােহাম্মদ পনরবার তাহাদের সহগামী ছিলেন। বস্তুতঃ মােহাম্মদ বাহুবলের সাহায্যে ধর্মপ্রচার করেন নাই। তাঁহার অনুষ্ঠিত যুদ্ধের ফলে কদাচিৎ কেহ ইসলামধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল । এ-কথা অবশ্য স্বীকার্য যে, শকুল যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় নিবন্ধন দুর্বল হইয়া পড়াতে গৌণভাবে তরবারি ইসলাম- ধর্মের পথ পরিষ্কৃত করিয়াছিল। একেশ্বরবাদের শ্রেষ্ঠতা মােহাম্মদের সময়ে মােসলমান সৈন্য তেত্রিশবার যুদ্ধযাত্রা করিয়াছিল বলিয়া আমরা উল্লেখ করিয়াছি। কিন্তু এই সংখ্যা সম্বন্ধে মতভেদ দৃষ্ট হয়। সাদ-কাতির-ওয়াকিদির (মুর সাহেবের মতে ইনি একজন বিশ্বাসযােগ্য ঐতিহাসিক) মতে একশত একবার যুদ্ধযাত্রা হইয়াছিল। জয়েদ-বিন-আকরমের মতে মাত্র উনিশবার যুদ্ধযাত্রা হইয়াছিল। কিন্তু আমরা নানা কারণে তেত্রিশ সংখ্যাই সর্বাপেক্ষা গ্রহণযােগ্য বলিয়া বিবেচনা করি। যুদ্ধযাত্রার সংখ্যা সম্বন্ধে মৌলভী চেরাগ আলী যাহা বলিয়াছেন, আমরা এখানে তাহা the pracuje : -The number of Mohammad's ৯৪ হজরত মােহাখ এবং মােহাম্মদের গুণগ্রামই মুখ্যভাবে ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠার হেতু ছিল। আমরা একটি দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিতেছি। মােহাম্মদ শেষবার দ্বাদশ সহস্র সৈন্য সমভি- ব্যাহারে মক্কায় প্রবেশ করেন। তাঁহার বিপুল বাহিনীর নিকট কোরেশেরা মন্তক অবনত করিতে বাধ্য হয়, এবং শত্রুতাচরণ পরিত্যাগ করে। তিনি তরবারি দূরে নিক্ষেপ করিয়া প্রেম ও করুণা বিস্তার পূর্বক তাহাদিগকে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করিয়াছিলেন। মােহাম্মদ বিজয়ী বীরের ন্যায় মক্কায় প্রবেশ করিলে অধিনেতৃবৃন্দ দণ্ডভয়ে ব্যাকুল চিত্তে তাহার নিকট আসিয়া দাড়াইয়াছিল। তিনি expeditions has been unduly exaggerated, first by biographers, who noted down every expedition or warlike enterprise reported in the several authentic and unauthentic traditions long after their occurrences and did not at all trouble their heads by criticising them ; and secondly, by giving all missions, deputations, embassies, pilgrims' journies, and merchantile enterpriess under the category of "Ghazavat" and "Saraya", lately construed by European writers as "plundering expeditions" or "a despatch of body of men with hostile intents."

হজরত মােহাম্মদ
তাহাদিগকে সম্বােধন করিয়া জিজ্ঞাসা করেন, “তােমরা
কি ভাবিতেছ ?” তাহারা উত্তর করে, “ক্ষমাশীল
পিতার পুত্র, আপনি আমাদের উপর ক্ষমতা লাভ
করিয়াছেন।” মােহাম্মদ প্রত্যুত্তরে বলেন, “পুরাকালে
ইউসফ উৎপীড়নকারীদিগকে ক্ষমা করিয়া যাহা বলিয়া-
ছিলেন, অন্য আমি তাহারই পুনরুক্তি করিতেছি।
তােমাদিগকে তিরস্কার করিব না, ঈশ্বর পরম দয়ালু,
তিনি তােমাদের সমস্ত অপরাধ মার্জনা করিবেন।
তােমরা স্বাধীন, ইচ্ছা করিলে চলিয়া যাইতে পার।”
মােহাম্মদের সৌজন্য ও সদ্ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া সমস্ত
মক্কাবাসী ইসলামধর্ম গ্রহণ করে।
,
মােহাম্মদ চরিত্র
মােহাম্মদের জীবন পরমেশ্বরের সেবা ও মানবজাতির
কল্যাণের জন্য উৎসর্গীকৃত হইয়াছিল। এ-জীবনের
আদ্যন্ত মধুময়।
মােহাম্মদ আত্মীয়-স্বজনে স্নেহশীল
ও বন্ধুবান্ধবে প্রতিমান ছিলেন, তিনি দাসদাসীর সঙ্গে
সাতিশয় সদ্ব্যবহার করিতেন। তাঁহার তিরােভাবের

হজরত মােহাম্মদ পর আনস নামক একজন ভৃত্য বলিয়াছিল, আমি দশ বৎসর কাল মহাপুরুষের অধীনে কাজ করিয়াছি; তিনি একদিনের জন্যও আমাকে কটু কথা বলেন নাই। বালক- বালিকা তাহার অত্যন্ত প্রিয় ছিল, অনেক সময় তাহাকে পথিমধ্যে দাড়াইয়া বালকবালিকাদিগকে আদর করিতে দেখা যাইত। তিনি জীবনে কাহাকেও কখন প্রহার করেন নাই। অভিসম্পাত বা কটুবাক্য একদিনের জন্যও তঁাহার রসনা কলুষিত করে নাই। মােহাম্মদ পীড়িতের সেবা করিতেন, শবাধার দেখি- লেই বহন করিয়া সমাধি স্থানে লইয়া যাইতেন। ক্রীত- দাসের গৃহে সানন্দে ভােজন করিতেন, স্বহস্তে জীর্ণবস্ত্র সংস্কার করিয়া পরিধান করিতেন, অনেক সময় স্বয়ং গাভী দোহন করিতেন। তিনি সৌজন্তের আধার ছিলেন। কাহারও সঙ্গে সাক্ষাৎকালে হস্ত মর্দন করিবার সময় তিনি কখনও প্রথমে হস্ত পরিত্যাগ করিতেন না। কেহই তাহার ন্যায় মুক্তহস্ত, বীরহৃদয় ও সত্যনিষ্ঠ ছিল না। তিনি আশ্রিতকে আশ্রয় দান করিতে সাতিশয় তৎপর ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মিষ্টভাষী ও প্রিয়বাদী ছিলেন। “সত্যং ক্ৰয়াৎ, প্রিয়ং জয়াৎ, মা জয়াৎ সত্যমপ্রিয়ম” এই নীতি তিনি অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করিতেন। তিনি হজরত মােহাগ শােকাকে সান্ত্বনা ও দরিদ্রকে উৎসাহ প্রদান জন্য অতি দীন হীন ব্যক্তির গৃহেও অকুণ্ঠিত চিত্তে গমন করিতেন। তাহাদের অনেকে তাঁহাকে পথিমধ্যে ধরিয়া আপনাদের দুঃখ কাহিনী নিবেদন করিত। এক- বার তিনি অনবসর বশতঃ একজন ধর্মজিজ্ঞাসু অন্ধকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন। এ-কারণ তিনি আমরণ অনুশােচনা করিয়া গিয়াছেন। তিনি বলিতেন, আমি ধৰ্ম্ম-জিজ্ঞাসু অন্ধকে প্রত্যাখ্যান করিয়া ঈশ্বরের অভিপ্রায়- বিরুদ্ধ কাৰ্য্য করিয়াছি। গরীব দুঃখীর জন্য তাহার দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত থাকিত। থাকিত। অনেক গৃহহীন নিরাশ্রয় ব্যক্তি তাহার গৃহে রাত্রি যাপন করিত। তিনি আহারে প্রবৃত্ত হইবার প্রাক্কালে পরমেশ্বরের আশীর্বাদ ভিক্ষা, ও আহারান্তে তাহার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেন । তাঁহার জীবনে একদিনের জন্যও এ নিয়মের ব্যত্যয় হয় নাই। তিনি প্রবল শত্রুকেও অকুণ্ঠিত চিত্তে ক্ষমা করিতেন। মােহাম্মদ কোন প্রকার বিলাসিতার প্রশ্রয় দিতেন । তাঁহার ভােজ্য ও পরিচ্ছদ অতি সামান্য ছিল। এক এক দিন তাঁহাকে অন্নাভাবে অনাহারে থাকিতে হইত। অনেক সময় কেবলমাত্ৰ খজুর ও জল তাহার | ১৮

হজরত মােহাম্মদ
ক্ষুন্নিবৃত্তি করিত। কোন কোন রাত্রিতে তৈলাভাবে তাহার
গৃহে সন্ধ্যা-দীপ জ্বলিত না। মােসলমান ঐতিহাসিকগণ
বলেন, পরমেশ্বর তাহার নিকট পৃথিবীর ধনভাণ্ডার খুলিয়া
দিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করেন।
ফলতঃ আত্মপ্রতিষ্ঠা অথবা আত্মসুখ মােহাম্মদের
জীবনের উদ্দেশ্য ছিল না। একমাত্র অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের
উপাসনার প্রতিষ্ঠা, পাপে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আরব সমা-
জের উদ্ধার এবং বহুধা বিভক্ত আরবজাতির ঐক্যবন্ধন
মােহাম্মদের প্রতিকার্য্যের মূলমন্ত্র ছিল। তাঁহার সফল
জীবন; তিনি স্বীয় মূলমন্ত্রে সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন।
তাহার সাধনায় মূর্খতা ও কুসংস্কার-সমাচ্ছন্ন আরবদেশে
সত্য ধর্মের রশ্মি বিকীর্ণ হইয়া পড়ে, সে-রশ্মির সম্পাতে
আরবদেশের অন্ধকার দূরীভূত এবং তদ্দেশবাসিগণ ধৰ্ম্মে
ও চরিত্রে সমুজ্জ্বল হইতে আরম্ভ করে। আরবগণ এক
মহামন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া সমস্ত বিবাদ বিসম্বাদ বিস্মৃত হয়,
এবং ঐক্যবলে অসাধ্য সাধন করিতে আরম্ভ করে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Hajrat Mohammad Ed.4

Author
Gupta,rampran
Title
Hajrat Mohammad Ed.4
File name
Hajrat Mohammad Ed.4
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2010/03/18
Publisher
Barada Ajency, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
102
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Biography
Keywords
Gupta,Rampran
DLI number
511083
Barcode
4990010018263.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
jiwJqKx32rF
Download PDF

Hajrat Mohammad Ed.4